Tafseer ibn Kathir — আল-মুযযাম্মিল 73:19 – আল-মুদ্দাসসির 74:28
Contents
- আল-মুযযাম্মিল 73:19
- আল-মুযযাম্মিল 73:20
- আল-মুদ্দাসসির 74:1
- আল-মুদ্দাসসির 74:2
- আল-মুদ্দাসসির 74:3
- আল-মুদ্দাসসির 74:4
- আল-মুদ্দাসসির 74:5
- আল-মুদ্দাসসির 74:6
- আল-মুদ্দাসসির 74:7
- আল-মুদ্দাসসির 74:8
- আল-মুদ্দাসসির 74:9
- আল-মুদ্দাসসির 74:10
- আল-মুদ্দাসসির 74:11
- আল-মুদ্দাসসির 74:12
- আল-মুদ্দাসসির 74:13
- আল-মুদ্দাসসির 74:14
- আল-মুদ্দাসসির 74:15
- আল-মুদ্দাসসির 74:16
- আল-মুদ্দাসসির 74:17
- আল-মুদ্দাসসির 74:18
- আল-মুদ্দাসসির 74:19
- আল-মুদ্দাসসির 74:20
- আল-মুদ্দাসসির 74:21
- আল-মুদ্দাসসির 74:22
- আল-মুদ্দাসসির 74:23
- আল-মুদ্দাসসির 74:24
- আল-মুদ্দাসসির 74:25
- আল-মুদ্দাসসির 74:26
- আল-মুদ্দাসসির 74:27
- আল-মুদ্দাসসির 74:28
আল-মুযযাম্মিল 73:19
১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সূরাটি জ্ঞানীদের জন্যে সরাসরি উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয়। যে কেউ হিদায়াত প্রার্থী হবে সেই প্রতিপালকের মর্জি হিসেবে হিদায়াতের পথ পেয়ে যাবে এবং তাঁর কাছে পৌঁছে যাওয়ার ওয়াসীলা লাভ করবে। যেমন অন্য সূরায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৭৬:৩০)।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এবং তোমার সাহাবীদের একটি দল যে কখনো কখনো দুই তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত কিয়াম কর, কখনো কখনো অর্ধেক রাত্রি পর্যন্ত এবং কখনো কখনো এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত কিয়াম করে থাকে এবং তাহাজ্জুদের নামাযে কাটিয়ে দাও তা আল্লাহ খুব ভালই জানেন। অবশ্য তোমরা এর সঠিক হিসাব রাখতে পার না। কেননা এটা খুবই কঠিন কাজ। দিবস ও রজনীর সঠিক পরিমাণ একমাত্র আল্লাহই নির্ধারণ করে থাকেন। কারণ কখনো দিন ও রাত উভয়ই সমান সমান হয়ে থাকে, কখনো রাত ছোট হয় ও দিন বড় হয় এবং কখনো দিন ছোট হয় ও রাত বড় হয়। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা জানেন যে, এটা পালন করার শক্তি তোমাদের নেই। সুতরাং এখন থেকে তোমরা রাত্রির নামায ততটাই পড় যতটা তোমাদের জন্যে সহজ। কোন সময় নির্দিষ্ট থাকলো না যে, এতোটা সময় কাটানো ফরয। এখানে কিরআত দ্বারা নামায অর্থ নেয়া হয়েছে। যেমন সূরা বানী ইসরাইল রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার কিরআত খুব উচ্চ স্বরেও পড়ো না এবং খুব নিম্ন স্বরেও না।” এখানে (আরবি) দ্বারা কিরআতকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর সাথীগণ এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নামাযে সূরা ফাতিহা পড়া বাধ্যতামূলক নয়। সূরা ফাতিহাকে পড়া যাবে এবং অন্য কোন জায়গা হতেও পড়া চলবে। একটি আয়াত পড়াও যথেষ্ট হবে। আবার এই মাসআলার দৃঢ়তা ঐ হাদীস দ্বারা করেছেন যাতে রয়েছে যে, তাড়াতাড়ি করে নামায আদায়কারীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “কুরআনের যে অংশ তোমার নিকট সহজ তা দ্বারা নামায পড়।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে) এ মাযহাব জমহূরের বিপরীত। জমহূর তাদেরকে এ জবাব দেন যে, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতিহা পাঠ করলো না তার নামায হলো না।”সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায, যাতে উম্মুল কুরআন (অর্থাৎ সূরা ফাতিহা) পাঠ করা হয় না তা অকেজো, তা অকেজো, তা অকেজো ও অসম্পূর্ণ।”ইবনে খুযাইমার (রঃ) সহীহ গ্রন্থে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফূ’রূপে বর্ণিত আছেঃ “ঐ ব্যক্তির নামায হয় না যে নামাযে উম্মুল কুরআন পাঠ করে না।”মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ ভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে। এ আয়াতটি, বরং পুরো সূরাটি মাক্কী। এটা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। ঐ সময় জিহাদ ছিল না, বরং মুসলমানরা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলেন। এরপরও গায়েবের এ খবর দেয়া এবং কার্যতঃ ওটা প্রকাশ পাওয়া যে, মুসলমানরা পরবর্তীকালে পুরোপুরিভাবে জিহাদে লিপ্ত হয়েছেন, সুতরাং এটা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটা বড় ও স্পষ্ট নির্দশন। উপরোক্ত ওযরগুলোর কারণে মুসলমানরা রাত্রির কিয়ামের দায়িত্ব হতে মুক্ত হয়ে যায়।হযরত আবূ রাজা’ মুহাম্মাদ (রঃ) হযরত হাসান (রঃ)-কে প্রশ্ন করেনঃ “হে আবূ সাঈদ (রঃ)! যে ব্যক্তি পূর্ণ কুরআনের হাফিয হয়েও তাহাজ্জুদের নামায পড়ে না, শুধু ফরয নামায আদায় করে, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “সে তো কুরআনকে বালিশ বানিয়ে নিয়েছে। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ! আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে বলেনঃ সে ঐ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল যে, আমি তাকে শিখিয়ে ছিলাম। আরো বলেনঃ তোমাদেরকে ওটা শিখানো হয়েছে যা তোমরা নিজেরা জানতে না এবং তোমাদের বাপ দাদারাও জানতো না।” তখন আবূ রাজা' (রঃ) তাঁকে আবার বলেনঃ “হে আবূ সাঈদ (রঃ)! আল্লাহ তা’আলা তো বলেছেনঃ কুরআন হতে তোমরা যা সহজভাবে পড়তে পার পড়।” হযরত হাসান (রঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। পাঁচটি আয়াত হলেও পড়।” সুতরাং বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, কুরআনের হাফিযের রাত্রের নামাযে কিছু না কিছু কিয়াম করা হযরত ইমাম হাসান বসরী (রঃ)-এর মাযহাবে ওয়াজিব ছিল। একটি হাদীসও এর প্রমাণ দিচ্ছে, যাতে রয়েছে যে, সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে এমন একটি লোক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হলো ঐ ব্যক্তি যার কারণে শয়তান প্রস্রাব করে থাকে। এর এক ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এশার ফরয নামাযও পড়ে না। এটাও বলা হয়েছে যে, রাত্রে নফল হিসেবে কিয়াম করে না।সুনানে রয়েছেঃ “হে কুরআন ওয়ালাগণ! তোমরা বিতর পড়তে থাকো।” অন্য এক হাদীসে আছেঃ “যে ব্যক্তি বিতর পড়ে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি হতেও বেশী গরীব হলো আবূ বকর ইবনে আবদিল আযীয হাম্বেলীর (রঃ) উক্তি, যিনি বলেন যে, রমযান মাসের কিয়াম ফরয। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।মু’জামে তিবরানীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) (আরবি) এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেনঃ “ওটা একশটি আয়াত। (এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ আমি শুধু এটা মুজামে তিবরানীতেই পেয়েছি)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর। অর্থাৎ তোমরা ফরয নামাযের হিফাজত কর এবং ফরয যাকাত আদায় কর। এ আয়াতটি ঐ গুরুজনদের দলীল যারা বলেন যে, মক্কা শরীফেই যাকাত ফরয হওয়ার হুকুম নাযিল হয়েছে। তবে কি পরিমাণ বের করা হবে, নেসাব কি ইত্যাদির বর্ণনা মদীনা শরীফে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ পূর্বযুগীয় মনীষীদের উক্তি এই যে, এই আয়াত পূর্ববর্তী রাত্রির কিয়ামের হুকুম সম্বলিত আয়াতকে মানসূখ বা রহিত করে দিয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ "দিন-রাত্রে পাচঁ ওয়াক্ত নামায ফরয।” লোকটি প্রশ্ন করেঃ “এ ছাড়া কি অন্য কোন নামায আমার উপর ফরয আছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, তবে তুমি নফল হিসেবে পড়তে পার।”মহান আল্লাহর উক্তিঃ তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতে থাকো, যার উপর আল্লাহ তোমাদেরকে খুবই উত্তম ও পুরোপুরি বিনিময় প্রদান করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে? তিনি তার জন্যে এটা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন।”(২:২৪৫) আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্যে ভাল কাজ যা কিছু অগ্রীম প্রেরণ করবে তোমরা তা পাবে আল্লাহর নিকট। ওটা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে নিজের সম্পদের চেয়ে (নিজের) উত্তরাধিকারীর সম্পদকে বেশী ভালবাসে?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে নিজের সম্পদের চেয়ে উত্তরাধিকারীদের সম্পদকে বেশী ভালবাসে।” তিনি বললেনঃ “যা বলছো চিন্তা করে বল।” তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো এটা ছাড়া অন্য কিছু জানি না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি যা (আল্লাহর পথে) খরচ করবে তাই শুধু তার নিজের সম্পদ, আর যা সে রেখে যাবে তাই তার উত্তরাধিকারীদের সম্পদ।” (এ হাদীসটি হাফিয আকূল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সুনানে নাসাঈতেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। অর্থাৎ খুব বেশী বেশী আল্লাহকে স্মরণ কর এবং তোমাদের সমস্ত কার্যে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু ঐ ব্যক্তির উপর যে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
আল-মুযযাম্মিল 73:20
১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সূরাটি জ্ঞানীদের জন্যে সরাসরি উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয়। যে কেউ হিদায়াত প্রার্থী হবে সেই প্রতিপালকের মর্জি হিসেবে হিদায়াতের পথ পেয়ে যাবে এবং তাঁর কাছে পৌঁছে যাওয়ার ওয়াসীলা লাভ করবে। যেমন অন্য সূরায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৭৬:৩০)।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এবং তোমার সাহাবীদের একটি দল যে কখনো কখনো দুই তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত কিয়াম কর, কখনো কখনো অর্ধেক রাত্রি পর্যন্ত এবং কখনো কখনো এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত কিয়াম করে থাকে এবং তাহাজ্জুদের নামাযে কাটিয়ে দাও তা আল্লাহ খুব ভালই জানেন। অবশ্য তোমরা এর সঠিক হিসাব রাখতে পার না। কেননা এটা খুবই কঠিন কাজ। দিবস ও রজনীর সঠিক পরিমাণ একমাত্র আল্লাহই নির্ধারণ করে থাকেন। কারণ কখনো দিন ও রাত উভয়ই সমান সমান হয়ে থাকে, কখনো রাত ছোট হয় ও দিন বড় হয় এবং কখনো দিন ছোট হয় ও রাত বড় হয়। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা জানেন যে, এটা পালন করার শক্তি তোমাদের নেই। সুতরাং এখন থেকে তোমরা রাত্রির নামায ততটাই পড় যতটা তোমাদের জন্যে সহজ। কোন সময় নির্দিষ্ট থাকলো না যে, এতোটা সময় কাটানো ফরয। এখানে কিরআত দ্বারা নামায অর্থ নেয়া হয়েছে। যেমন সূরা বানী ইসরাইল রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার কিরআত খুব উচ্চ স্বরেও পড়ো না এবং খুব নিম্ন স্বরেও না।” এখানে (আরবি) দ্বারা কিরআতকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর সাথীগণ এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নামাযে সূরা ফাতিহা পড়া বাধ্যতামূলক নয়। সূরা ফাতিহাকে পড়া যাবে এবং অন্য কোন জায়গা হতেও পড়া চলবে। একটি আয়াত পড়াও যথেষ্ট হবে। আবার এই মাসআলার দৃঢ়তা ঐ হাদীস দ্বারা করেছেন যাতে রয়েছে যে, তাড়াতাড়ি করে নামায আদায়কারীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “কুরআনের যে অংশ তোমার নিকট সহজ তা দ্বারা নামায পড়।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে) এ মাযহাব জমহূরের বিপরীত। জমহূর তাদেরকে এ জবাব দেন যে, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতিহা পাঠ করলো না তার নামায হলো না।”সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায, যাতে উম্মুল কুরআন (অর্থাৎ সূরা ফাতিহা) পাঠ করা হয় না তা অকেজো, তা অকেজো, তা অকেজো ও অসম্পূর্ণ।”ইবনে খুযাইমার (রঃ) সহীহ গ্রন্থে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফূ’রূপে বর্ণিত আছেঃ “ঐ ব্যক্তির নামায হয় না যে নামাযে উম্মুল কুরআন পাঠ করে না।”মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ ভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে। এ আয়াতটি, বরং পুরো সূরাটি মাক্কী। এটা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। ঐ সময় জিহাদ ছিল না, বরং মুসলমানরা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলেন। এরপরও গায়েবের এ খবর দেয়া এবং কার্যতঃ ওটা প্রকাশ পাওয়া যে, মুসলমানরা পরবর্তীকালে পুরোপুরিভাবে জিহাদে লিপ্ত হয়েছেন, সুতরাং এটা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটা বড় ও স্পষ্ট নির্দশন। উপরোক্ত ওযরগুলোর কারণে মুসলমানরা রাত্রির কিয়ামের দায়িত্ব হতে মুক্ত হয়ে যায়।হযরত আবূ রাজা’ মুহাম্মাদ (রঃ) হযরত হাসান (রঃ)-কে প্রশ্ন করেনঃ “হে আবূ সাঈদ (রঃ)! যে ব্যক্তি পূর্ণ কুরআনের হাফিয হয়েও তাহাজ্জুদের নামায পড়ে না, শুধু ফরয নামায আদায় করে, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “সে তো কুরআনকে বালিশ বানিয়ে নিয়েছে। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ! আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে বলেনঃ সে ঐ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল যে, আমি তাকে শিখিয়ে ছিলাম। আরো বলেনঃ তোমাদেরকে ওটা শিখানো হয়েছে যা তোমরা নিজেরা জানতে না এবং তোমাদের বাপ দাদারাও জানতো না।” তখন আবূ রাজা' (রঃ) তাঁকে আবার বলেনঃ “হে আবূ সাঈদ (রঃ)! আল্লাহ তা’আলা তো বলেছেনঃ কুরআন হতে তোমরা যা সহজভাবে পড়তে পার পড়।” হযরত হাসান (রঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। পাঁচটি আয়াত হলেও পড়।” সুতরাং বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, কুরআনের হাফিযের রাত্রের নামাযে কিছু না কিছু কিয়াম করা হযরত ইমাম হাসান বসরী (রঃ)-এর মাযহাবে ওয়াজিব ছিল। একটি হাদীসও এর প্রমাণ দিচ্ছে, যাতে রয়েছে যে, সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে এমন একটি লোক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হলো ঐ ব্যক্তি যার কারণে শয়তান প্রস্রাব করে থাকে। এর এক ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এশার ফরয নামাযও পড়ে না। এটাও বলা হয়েছে যে, রাত্রে নফল হিসেবে কিয়াম করে না।সুনানে রয়েছেঃ “হে কুরআন ওয়ালাগণ! তোমরা বিতর পড়তে থাকো।” অন্য এক হাদীসে আছেঃ “যে ব্যক্তি বিতর পড়ে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি হতেও বেশী গরীব হলো আবূ বকর ইবনে আবদিল আযীয হাম্বেলীর (রঃ) উক্তি, যিনি বলেন যে, রমযান মাসের কিয়াম ফরয। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।মু’জামে তিবরানীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) (আরবি) এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেনঃ “ওটা একশটি আয়াত। (এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ আমি শুধু এটা মুজামে তিবরানীতেই পেয়েছি)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর। অর্থাৎ তোমরা ফরয নামাযের হিফাজত কর এবং ফরয যাকাত আদায় কর। এ আয়াতটি ঐ গুরুজনদের দলীল যারা বলেন যে, মক্কা শরীফেই যাকাত ফরয হওয়ার হুকুম নাযিল হয়েছে। তবে কি পরিমাণ বের করা হবে, নেসাব কি ইত্যাদির বর্ণনা মদীনা শরীফে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ পূর্বযুগীয় মনীষীদের উক্তি এই যে, এই আয়াত পূর্ববর্তী রাত্রির কিয়ামের হুকুম সম্বলিত আয়াতকে মানসূখ বা রহিত করে দিয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ "দিন-রাত্রে পাচঁ ওয়াক্ত নামায ফরয।” লোকটি প্রশ্ন করেঃ “এ ছাড়া কি অন্য কোন নামায আমার উপর ফরয আছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, তবে তুমি নফল হিসেবে পড়তে পার।”মহান আল্লাহর উক্তিঃ তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতে থাকো, যার উপর আল্লাহ তোমাদেরকে খুবই উত্তম ও পুরোপুরি বিনিময় প্রদান করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে? তিনি তার জন্যে এটা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন।”(২:২৪৫) আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্যে ভাল কাজ যা কিছু অগ্রীম প্রেরণ করবে তোমরা তা পাবে আল্লাহর নিকট। ওটা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে নিজের সম্পদের চেয়ে (নিজের) উত্তরাধিকারীর সম্পদকে বেশী ভালবাসে?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে নিজের সম্পদের চেয়ে উত্তরাধিকারীদের সম্পদকে বেশী ভালবাসে।” তিনি বললেনঃ “যা বলছো চিন্তা করে বল।” তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো এটা ছাড়া অন্য কিছু জানি না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি যা (আল্লাহর পথে) খরচ করবে তাই শুধু তার নিজের সম্পদ, আর যা সে রেখে যাবে তাই তার উত্তরাধিকারীদের সম্পদ।” (এ হাদীসটি হাফিয আকূল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সুনানে নাসাঈতেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। অর্থাৎ খুব বেশী বেশী আল্লাহকে স্মরণ কর এবং তোমাদের সমস্ত কার্যে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু ঐ ব্যক্তির উপর যে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
আল-মুদ্দাসসির 74:1
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:2
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:3
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:4
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:5
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:6
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:7
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:8
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:9
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:10
১-১০ নং আয়াতের তাফসীর সহীহ বুখারীতে হ্যরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জমহুরের উক্তি এই যে, সর্বপ্রথম ওহী হলো (আরবি) (৯৬:১) এ আয়াতটি। যেমন এই সূরার তাফসীরে আসবে ইনশা আল্লাহ।সহীহ বুখারীতে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আবূ সালমা ইবনে আবদির রহমান (রাঃ)-কে কুরআন কারীমের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবি)-এই আয়াতটি।" ইয়াহইয়া (রঃ) তাঁকে পুনরায় বলেনঃ “লোকেরা তো বলছে যে, …… (আরবি)-এ আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত জাবির (রাঃ)-কে আমি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি আমাকে ঐ জবাবই দিয়েছিলেন যা আমি তোমাকে দিলাম। তারপর আমি আবার তাঁকে ঐ প্রশ্নই করেছিলাম যা তুমি আমাকে করলে। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত জাবির (রাঃ) বলেছিলেনঃ আমি তোমাকে ঐ কথাই বললাম যে কথা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি হেরা পর্বতের গুহায় আমার প্রতিপালকের ধ্যান করছিলাম। সেখান হতে অবতরণ করে আমি শুনতে পেলাম যে, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি আমার সামনে পিছনে ডানে এবং বামে তাকালাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। আমি তখন মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম তখন কিছু একটা দেখতে পেলাম। আমি তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে বললামঃ আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং আমার উপর ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকো। হযরত খাদীজা (রাঃ) তাই করলো এবং ঐ সময়। (আরবি) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “একদা আমি চলতে রয়েছি, হঠাৎ আকাশের দিক হতে আমার কানে একটা শব্দ পৌঁছলো! চক্ষু উঠিয়ে দেখলাম যে, হেরা পর্বতের গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীর উপর বসে রয়েছেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বাড়ী এসেই বলিঃ আমাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করে দাও। আমার কথামত বাড়ীর লোকেরা আমাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে। তখন (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো মূর্তি। তারপর ক্রমান্বয়ে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ এবং এই হিসাবই রক্ষিত আছে। এর দ্বারা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, এর পূর্বেও কোন ওহী এসেছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটি বিদ্যমান রয়েছেঃ “ইনি ঐ ফেরেশতা যিনি হেরা পর্বতের গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন।” অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ), যিনি তাঁকে সূরা আলাকের নিম্নের আয়াতগুলো গুহার মধ্যে পড়িয়েছিলেনঃ (আরবি)এরপর কিছু দিনের জন্যে তাঁর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যখন তার যাতায়াত আবার শুরু হয় তখন প্রথম ওহী ছিল সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এইভাবে এদু’টি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে যে, আসলে সর্বপ্রথম ওহী হচ্ছে সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ওহী হলো এই সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। এর স্বপক্ষে রয়েছে মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে বর্ণিত হাদীসগুলো, যেগুলোতে রয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা মুদ্দাসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কুরায়েশদেরকে যিয়াফত দেয়। খাওয়া-দাওয়ার পর তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “আচ্ছা, তোমরা এই লোকটিকে [হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে] কি বলতে পার?” কেউ কেউ বললো যে, তিনি যাদুকর। অন্য কেউ বললো যে, না, তিনি যাদুকর নন। কেউ কেউ তাঁকে গণক বললো। আবার অন্য কেউ বললো যে, না তিনি গণকও নন। কেউ কেউ তাকে কবি বলে মন্তব্য করলো, কিন্তু অন্য কেউ বললো যে, তিনি কবিও নন, তাদের কেউ কেউ এই মন্তব্য করলো যে, তিনি এমন যাদুকর যে যাদু তিনি লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত হয়েছেন। পরিশেষে তারা এতেই একমত হলো যে, তাঁকে এরূপ যাদুকরই বলা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে খুবই দুঃখিত হলেন এবং তিনি কাপড় দ্বারা মাথা ঢেকে নেন এবং গোটা দেহকেও বস্ত্রাবৃত্ত করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি) এর শানে নুযূল এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ উঠো, সতর্ক বাণী প্রচার কর। অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্পের সাথে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং জনগণকে আমার সত্তা হতে, জাহান্নাম হতে এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন কর। প্রথম ওহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নবী রূপে মনোনীত করা হয়েছে। আর এই ওহী দ্বারা তাঁকে রাসূল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। অর্থাৎ অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করা হতে দূরে থাকো। যেমন কবি গাইলান ইবনে সালমা সাকাফী বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি পাপাচারের পোষাক ও বিশ্বাসঘাতকতার চাদর হতে নিজেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখেছি।” স্বীয় কাপড় পবিত্র রাখো অর্থাৎ পাপকার্য ছেড়ে দাও এবং আমলকে সংশোধন করে নাও, এরূপ ব্যবহার আরবী পরিভাষায়ও বহু দেখা যায়। ভাবার্থ এও হতে পারেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি গণকও নও এবং যাদুকরও নও, সুতরাং মানুষ তোমাকে যাই বলুক না কেন তুমি কোন পরোয়া করবে না। যে ব্যক্তি ওয়াদা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তাকে আরবরা ময়লা ও অপরিষ্কার কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে, বিশ্বাসঘাতকতা করে না তাকে পবিত্র কাপড় ওয়ালা বলে থাকে। কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যখন দুষ্কার্য ও মলিনতা দ্বারা নিজের মর্যাদাকে কলুষিত ও অপবিত্র করবে না, তখন সে যে কাপড়ই পরিধান করবে তাতেই তাকে সুন্দর দেখাবে।” ভাবার্থ এও হবেঃ অপ্রয়োজনীয় পোশাক পরিধান করো না, নিজের কাপড়কে পাপ মলিন করো না, কাপড়কে পাক-সাফ রাখো, ময়লা ধুয়ে ফেলো, মুশরিকদের মত নিজের পোষাককে অপবিত্র রেখো না। প্রকৃতপক্ষে এই ভাবার্থগুলো সবই ঠিক। এটাও হবে, ওটাও হবে। সাথে সাথে অন্তরও পবিত্র এবং কলুষমুক্ত হতে হবে। অন্তরের উপর কাপড়ের প্রয়োগ আরবদের কথায় পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি ইমরুল কায়েস বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ফাতিমা (কবির প্রেমিকা)! তুমি তোমার এসব চলনভঙ্গী ছেড়ে দাও, আর যদি তুমি আমা হতে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে থাকো তবে উত্তমরূপে পৃথক হয়ে যাও। আমার কোন ব্যবহার ও চরিত্র যদি তোমার কাছে খারাপ লেগে থাকে তবে আমার কাপড়কে তোমার কাপড় হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তা পৃথক হয়ে যাবে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নিজের অন্তরকে ও নিয়তকে পরিষ্কার রাখো। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ তোমার চরিত্রকে ভাল ও সুন্দর কর। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) অর্থাৎ অপবিত্রতা হতে দূরে থাকো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ প্রতিমা বা মূর্তি হতে দূরে থাকো। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদও (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রতিমা বা মূর্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ) ও হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ নাফরমানী পরিত্যাগ কর। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।”(৩৩:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং মূসা (আঃ) তার ভাই হারূনকে বলেছিলঃ আমার পরে তুমি আমার কওমের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।” (৭:১৪২)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ অধিক চাওয়ার সাথে আল্লাহর উপর নিজের ভাল আমলের ইহসান প্রকাশ করো না। রবী ইবনে আনাসেরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। হযরত খাসীফ (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কল্যাণ প্রার্থনার আধিক্য দ্বারা দুর্বলতা প্রকাশ করো না। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ নবুওয়াতের ইহসানের বোঝা মানুষের উপর রেখে ওর বিনিময়ে দুনিয়া তলব করো না। সুতরাং চারটি উক্তি হলো। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সর্বোত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল। জানেন।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ কর। অর্থাৎ আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে জনগণের পক্ষ হতে তোমাকে যে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ধৈর্য অবলম্বন কর। আল্লাহ তোমাকে করেছেন তাতে সদা লেগে থাকো। (আরবি) শব্দ দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কি করে শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিংগাধারণকারী ফেরেশতা নিজের মুখে শিংগা ধরে রেখেছেন এবং ললাট ঝুঁকিয়ে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন হুকুম হয়ে যাবে এবং তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদেরকে আপনি কি করতে বলছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তোমরা নিম্নের কালেমাটি বলতে থাকবে (আরবি) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক, আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন হবে এক সংকটের দিন অর্থাৎ কঠিন দিন, যা কাফিরদের জন্যে সহজ নয়। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলবেঃ এটা কঠিন দিন।”(৫৪:৮) বর্ণিত আছে যে, হযরত যারারাহ ইবনে আওফা (রঃ) বসরার কাযী ছিলেন। একদা তিনি তাঁর মুক্তাদীদেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং নামাযে তিনি এই সূরাটিই তিলাওয়াত করছিলেন। পড়তে পড়তে যখন তিনি (আরবি) এই আয়াতগুলো পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তিনি ভীষণ জোরে চীকার করে ওঠেন এবং সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায় যে, তাঁর প্রাণ পাখী তাঁর দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে গেছে! আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত নাযিল করুন!
আল-মুদ্দাসসির 74:11
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:12
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:13
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:14
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:15
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:16
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:17
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:18
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:19
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:20
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:21
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:22
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:23
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:24
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:25
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:26
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:27
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)
আল-মুদ্দাসসির 74:28
১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)