Tafseer ibn Kathir — আল-কিয়ামা 75:21 – আল-ইনসান 76:19
Contents
- আল-কিয়ামা 75:21
- আল-কিয়ামা 75:22
- আল-কিয়ামা 75:23
- আল-কিয়ামা 75:24
- আল-কিয়ামা 75:25
- আল-কিয়ামা 75:26
- আল-কিয়ামা 75:27
- আল-কিয়ামা 75:28
- আল-কিয়ামা 75:29
- আল-কিয়ামা 75:30
- আল-কিয়ামা 75:31
- আল-কিয়ামা 75:32
- আল-কিয়ামা 75:33
- আল-কিয়ামা 75:34
- আল-কিয়ামা 75:35
- আল-কিয়ামা 75:36
- আল-কিয়ামা 75:37
- আল-কিয়ামা 75:38
- আল-কিয়ামা 75:39
- আল-কিয়ামা 75:40
- আল-ইনসান 76:1
- আল-ইনসান 76:2
- আল-ইনসান 76:3
- আল-ইনসান 76:4
- আল-ইনসান 76:5
- আল-ইনসান 76:6
- আল-ইনসান 76:7
- আল-ইনসান 76:8
- আল-ইনসান 76:9
- আল-ইনসান 76:10
- আল-ইনসান 76:11
- আল-ইনসান 76:12
- আল-ইনসান 76:13
- আল-ইনসান 76:14
- আল-ইনসান 76:15
- আল-ইনসান 76:16
- আল-ইনসান 76:17
- আল-ইনসান 76:18
- আল-ইনসান 76:19
আল-কিয়ামা 75:21
১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।
আল-কিয়ামা 75:22
১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।
আল-কিয়ামা 75:23
১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।
আল-কিয়ামা 75:24
১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।
আল-কিয়ামা 75:25
১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।
আল-কিয়ামা 75:26
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:27
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:28
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:29
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:30
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:31
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:32
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:33
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:34
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:35
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:36
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:37
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:38
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:39
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-কিয়ামা 75:40
২৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মৃত্যু ও মৃত্যু-যাতনার খবর দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ঐ কঠিন অবস্থায় সত্যের উপর স্থির থাকার তাওফীক দান করুন! (আরবি) শব্দটিকে এখানে ধমকের অর্থে নেয়া হলে অর্থ হবেঃ হে আদম সন্তান! তুমি যে আমার খবরকে অবিশ্বাস করছে তা ঠিক ও উচিত নয়, বরং তার কাজ-কারবার তো তুমি দৈনন্দিন প্রকাশ্যভাবে দেখতে রয়েছে। আর যদি এটা (আরবি) অর্থে নেয়া হয় তবে তো ভাবার্থ বেশী প্রতীয়মান হবে। অর্থাৎ যখন তোমার রূহ্ তোমার দেহ থেকে বের হতে লাগবে এবং তোমার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। এটা ঐ অস্থিগুলোকে বলা হয় যেগুলো বক্ষ এবং কাঁধের মাঝে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পরন্তু কেন নয়- প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও, তবে তোমরা ওটা ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও!” (৫৬:৮৩-৮৭) এখানে ঐ হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যা বিশর ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে সূরা ইয়াসীনের তাফসীরে গত হয়েছে। (আরবি) যা (আরবি)-এর বহুবচন, ঐ হাড় যা হলকূমের কাছে রয়েছে। বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছে কি? আবূ কালাবা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ কোন ডাক্তার ইত্যাদির দ্বারা কি আরোগ্য দান করা যেতে পারে? হযরত কাতাদাহ্ (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ) এবং ইবনে যায়েদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটা ফেরেশতাদের উক্তি। অর্থাৎ এই রূহকে নিয়ে কোন্ ফেরেশতারা আকাশের উপর উঠে যাবে, রহমতের ফেরেশতারা, না আযাবের ফেরেশতারা?মহান আল্লাহ্ উক্তিঃ পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। এর একটি ভাবার্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখিরাত তার উপর জমা হয়ে যাবে। ওটা দুনিয়ার শেষ দিন হয় এবং আখিরাতের প্রথম দিন হয়। সুতরাং সে কঠিন হতে কঠিনতম অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে কারো উপর আল্লাহ্ রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। দ্বিতীয় ভাবার্থ হযরত ইকরামা (রঃ) হতে এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বড় ব্যাপার অন্য এক বড় ব্যাপারের সাথে মিলিত হয়। বিপদের উপর বিপদ এসে পড়ে। তৃতীয় ভাবার্থ হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ মনীষী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং মরণোন্মুখ ব্যক্তির কঠিন যন্ত্রণার কারণে তার পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। পূর্বে সে তো এই পায়ের উপর চলাফেরা করতো, কিন্তু এখন এতে জীবন কোথায়? আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে, কাফন পরানোর সময় পদনালীর সাথে পদনালী মিলে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, দু’টি কাজ দু’দিকে জমা হয়ে যায়। এক দিকে তো মানুষ তার মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে মাটিকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত, অপরদিকে ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যেতে ব্যস্ত। নেককার হলে তো ভাল প্রস্তুতি ও ধুমধামের সাথে নিয়ে যান এবং বদকার হলে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থার সাথে নিয়ে যান। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে। রূহ আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেনঃ তোমরা এই রূহকে পুনরায় যমীনেই নিয়ে যাও। কারণ আমি তাদের সবকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করবো। যেমন এটা হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে। এ বিষয়টিই অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর বিজয়ী, তিনিই তোমাদের হিফাযতের জন্যে তোমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে যায় তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না। তারপর তাদের সকলকেই তাদের সত্য মাওলা আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনে রেখো যে, হুকুম তারই এবং তিনিই সত্বরই হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২) এরপর ঐ কাফির ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, নিজের আকীদায় সত্যকে অবিশ্বাসকারী এবং স্বীয় আমলে সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী ছিল। কোন মঙ্গলই তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। না সে আল্লাহর কথাকে আন্তরিয্কভাবে বিশ্বাস করতো, না শারীরিকভাবে তার ইবাদত করতো, এমনকি সে নামাযও কায়েম করতো না। বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর সে তার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়েছিল দম্ভভরে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা তাদের আপন জনের নিকট ফিরে আসতো তখন তারা ফিরতো উফুল্ল হয়ে।” (৮৩:৩১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সে তার পরিজনের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। যেহেতু সে ভাবতো যে, সে কখনই ফিরে যাবে না।” (৮৪:১৩-১৪) এর পরেই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ফিরে যাবে। তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।” (৮৪:১৫)। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ধমক ও ভয় প্রদর্শনের সুরে বলেনঃ দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আবার দুর্ভোগ তোমার জন্যে, দুর্ভোগ! আল্লাহ্ সঙ্গে কুফরী করেও তুমি দম্ভ প্রকাশ করছো! যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “(বলা হবেঃ) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত।” এটা তাকে ঘৃণা ও ধমকের সুরে কিয়ামতের দিন বলা হবে। আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প কিছুদিন খাও ও সুখ ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমরা তো অপরাধী।” (৭৭:৪৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাও, আল্লাহ ছাড়া যার ইচ্ছা ইবাদত করতে থাকো।” (৩৯:১৫) এ সমুদয় স্থানে এসব কথা ধমকের সুরেই বলা হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ)- কে (আরবি)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, নবী পাক (সঃ) আবূ জেহেলকে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমে হুবহু এই শব্দগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ফরমানের পর আল্লাহর ঐ দুশমন বলেছিলঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ? জেনে রেখো যে, তুমি ও তোমার প্রতিপালক আমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এই দুই পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি আমিই।”মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে? অর্থাৎ সে কি এটা ধারণা করে যে, তাকে মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করা হবে না? তাকে কোন হুকুম ও কোন কিছু হতে নিষেধ করা হবে না? এরূপ কখনো নয়, বরং দুনিয়াতেও তাকে আদেশ ও নিষেধ করা হবে এবং পরকালেও তার কৃতকর্ম অনুসারে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতকে সাব্যস্ত করা এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা। এ জন্যেই এর দলীল হিসেবে বলা হচ্ছেঃ মানুষ তো প্রকৃত পক্ষে শুক্রের আকারে প্রাণহীন ও ভিত্তিহীন পানির এক নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ফোটা ছাড়া কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওটাকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করেন, তারপর তা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়, এরপর মহান আল্লাহ্ ওকে আকৃতি দান করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর নারী। যে আল্লাহ্ এই তুচ্ছ শুক্রকে সুস্থ ও সবল মানুষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি কি তাকে ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো বেশী সক্ষম হবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার ওকে ফিরিয়ে আনবেন (মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করবেন) এবং এটা তাঁর কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) এই আয়াতের ভাবার্থের ব্যাপারেও দু’টি উক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ। যেমন সূরা রুমের তাফসীরে এর বর্ণনা ও আলোচনা গত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত মূসা ইবনে আবী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক স্বীয় ঘরের ছাদের উপর উচ্চস্বরে কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই সূরার (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন তখন তিনি (আরবি)পাঠ করেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এতে সক্ষম।” জনগণ তাঁকে এটা পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা পাঠ করতে শুনেছি।” (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদেও রয়েছে। কিন্তু দু’টি কিতাবেই ঐ সাহাবী (রাঃ) -এর নাম উল্লেখ করা হলেও কোন ক্ষতি নেই)সুনানে আবূ দাউদেই হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সূরা (আরবি) পাঠ করবে এবং (আরবি) (৯৫:৮) এই আয়াত পর্যন্ত পড়বে সে যেন পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হ্যাঁ, (আপনি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক) এবং সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আমি নিজেও একজন সাক্ষী।” (৯৫:১) আর যে, ব্যক্তি (আরবি) এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (হ্যাঁ) পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি (আরবি)-এ সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি) (অর্থাৎ “সুতরাং তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে!”) (৭৭:৫০) এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে তখন যেন সে (আরবি) (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ এবং জামে তিরমিযীতেও রয়েছে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই সূরা কিয়ামাহর শেষ আয়াতের পরে (আরবি) বলতেন। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি) পাঠ করার পর (আরবি) বলেছেন।
আল-ইনসান 76:1
সহীহ্ মুসলিমের হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ইতিপূর্বে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জুমআ’র দিন ফজরের নামাযে সূরা আলিফ-লাম-তানযীল এবং হাল আতা আলাল ইনসান পাঠ করতেন। একটি মুরসাল গারীব হাদীসে রয়েছে যে, যখন এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তা পাঠ করেন তখন তাঁর নিকট একটি কালো বর্ণের সাহাবী (রাঃ) বসেছিলেন। যখন জান্নাতের গুণাবলীর বর্ণনা আসে তখন হঠাৎ তাঁর মুখ হতে একটা ভীষণ চীৎকার বের হয় এবং সাথে সাথে তাঁর দেহ হতে প্রাণ পাখী উড়ে যায়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের সাথী এবং তোমাদের ভাই-এর প্রাণ জান্নাতের আগ্রহে বেরিয়ে গেছে।” ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি মানুষকে এমন অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন যে, তার নিকৃষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। তিনি তাকে পুরুষ ও নারীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং বিভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত করার পর তাকে বর্তমান রূপ ও আকৃতি দান করেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আমি তাকে পরীক্ষা করবার জন্যে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন করেছি। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্যে যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম?” (৬৭:২) সুতরাং তিনি তোমাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দান করেছেন যাতে আনুগত্য ও অবাধ্যতার মধ্যে পার্থক্য করতে পার।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি। অর্থাৎ অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে আমার সরল সোজা পথ তোমার কাছে খুলে দিয়েছি। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি পথের নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা অন্ধত্বকে হিদায়াতের উপর প্রাধান্য দিয়েছিল।” (৪১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাকে দু'টি পথই দেখিয়েছি।” (৯০:১০) অর্থাৎ ভাল ও মন্দ দু'টি পথই প্রদর্শন করেছি। (আরবি)-এই আয়াতের তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পথ দেখানো দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ আমি তাকে মায়ের পেট হতে বের হবার পথ দেখিয়েছি। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। প্রথম উক্তিটিই সঠিক।(আরবি) এখানে (আরবি) হওয়ার কারণে (আরবি) এবং (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর হয়েছে। এর (আরবি) হলো (আরবি) এর সর্বনামটি। অর্থাৎ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি এমন অবস্থায় যে সে হতভাগ্য বা ভাগ্যবান। যেমন সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল বেলায় স্বীয় নফসকে বিক্রিকারী হয়ে থাকে, হয় সে ওকে মুক্তকারী হয়, না হয় ওকে ধ্বংসকারী হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকে নির্বোধদের নেতৃত্ব হতে রক্ষা করুন!” হযরত কাব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নির্বোধদের নেতৃত্ব কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা ঐ সব নেতা যারা আমার পরে নেতৃত্ব লাভ করবে। তারা না আমার সুন্নাতের উপর আমল করবে, না আমার তরীকার উপর চলবে। যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং উৎপীড়নমূলক কার্যে সাহায্য করবে তারা আমার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। জেনে রেখো যে, তারা আমার হাউযে কাওসারের উপরও আসতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে না এবং তাদের অত্যাচারমূলক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে না তারা আমার এবং আমি তাদের। তারা আমার হাউযে কাওসারে আমার সাথে মিলিত হবে। হে কা'ব (রাঃ)! রোযা ঢাল স্বরূপ, সাদকা বা দান-খয়রাত পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয় এবং নামায আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ অথবা বলেছেনঃ মুক্তির দলীল। হে কাব (রাঃ)! (দেহের) ঐ গোশত জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে। ওটা জাহান্নামেরই যোগ্য। হে কা'ব (রাঃ)! মানুষ সকাল বেলায় নিজের নফসকে বিক্রী করে থাকে। কেউ ওকে আযাদকারী হয় এবং কেউ হয় ওকে ধ্বংসকারী।” সূরা রূমের (আরবি) আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। (৩০:৩০) এ আয়াতের তাফসীরে হযরত জাবির (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটি গত হয়েছেঃ “প্রত্যেক সন্তান ইসলামের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার জিহ্বা চলতে থাকে, হয় সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হয়, না হয় অকৃতজ্ঞ হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিই (বাড়ী হতে) বের হয় তারই দরজার উপর দু’টি পতাকা থাকে, একটি থাকে ফেরেশতার হাতে এবং অপরটি থাকে শয়তানের হাতে। যদি সে এমন কাজের জন্যে বের হয়ে থাকে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট, তবে ফেরেশতা তাঁর পতাকা নিয়ে তার সাথী হয়ে যান এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে ফেরেশতার পতাকার নীচেই থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে বের হয়, শয়তান তার পতাকা নিয়ে তার সাথে হয়ে যায় এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে শয়তানের পতাকা তলেই থাকে।”
আল-ইনসান 76:2
সহীহ্ মুসলিমের হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ইতিপূর্বে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জুমআ’র দিন ফজরের নামাযে সূরা আলিফ-লাম-তানযীল এবং হাল আতা আলাল ইনসান পাঠ করতেন। একটি মুরসাল গারীব হাদীসে রয়েছে যে, যখন এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তা পাঠ করেন তখন তাঁর নিকট একটি কালো বর্ণের সাহাবী (রাঃ) বসেছিলেন। যখন জান্নাতের গুণাবলীর বর্ণনা আসে তখন হঠাৎ তাঁর মুখ হতে একটা ভীষণ চীৎকার বের হয় এবং সাথে সাথে তাঁর দেহ হতে প্রাণ পাখী উড়ে যায়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের সাথী এবং তোমাদের ভাই-এর প্রাণ জান্নাতের আগ্রহে বেরিয়ে গেছে।” ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি মানুষকে এমন অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন যে, তার নিকৃষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। তিনি তাকে পুরুষ ও নারীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং বিভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত করার পর তাকে বর্তমান রূপ ও আকৃতি দান করেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আমি তাকে পরীক্ষা করবার জন্যে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন করেছি। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্যে যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম?” (৬৭:২) সুতরাং তিনি তোমাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দান করেছেন যাতে আনুগত্য ও অবাধ্যতার মধ্যে পার্থক্য করতে পার।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি। অর্থাৎ অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে আমার সরল সোজা পথ তোমার কাছে খুলে দিয়েছি। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি পথের নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা অন্ধত্বকে হিদায়াতের উপর প্রাধান্য দিয়েছিল।” (৪১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাকে দু'টি পথই দেখিয়েছি।” (৯০:১০) অর্থাৎ ভাল ও মন্দ দু'টি পথই প্রদর্শন করেছি। (আরবি)-এই আয়াতের তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পথ দেখানো দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ আমি তাকে মায়ের পেট হতে বের হবার পথ দেখিয়েছি। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। প্রথম উক্তিটিই সঠিক।(আরবি) এখানে (আরবি) হওয়ার কারণে (আরবি) এবং (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর হয়েছে। এর (আরবি) হলো (আরবি) এর সর্বনামটি। অর্থাৎ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি এমন অবস্থায় যে সে হতভাগ্য বা ভাগ্যবান। যেমন সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল বেলায় স্বীয় নফসকে বিক্রিকারী হয়ে থাকে, হয় সে ওকে মুক্তকারী হয়, না হয় ওকে ধ্বংসকারী হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকে নির্বোধদের নেতৃত্ব হতে রক্ষা করুন!” হযরত কাব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নির্বোধদের নেতৃত্ব কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা ঐ সব নেতা যারা আমার পরে নেতৃত্ব লাভ করবে। তারা না আমার সুন্নাতের উপর আমল করবে, না আমার তরীকার উপর চলবে। যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং উৎপীড়নমূলক কার্যে সাহায্য করবে তারা আমার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। জেনে রেখো যে, তারা আমার হাউযে কাওসারের উপরও আসতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে না এবং তাদের অত্যাচারমূলক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে না তারা আমার এবং আমি তাদের। তারা আমার হাউযে কাওসারে আমার সাথে মিলিত হবে। হে কা'ব (রাঃ)! রোযা ঢাল স্বরূপ, সাদকা বা দান-খয়রাত পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয় এবং নামায আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ অথবা বলেছেনঃ মুক্তির দলীল। হে কাব (রাঃ)! (দেহের) ঐ গোশত জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে। ওটা জাহান্নামেরই যোগ্য। হে কা'ব (রাঃ)! মানুষ সকাল বেলায় নিজের নফসকে বিক্রী করে থাকে। কেউ ওকে আযাদকারী হয় এবং কেউ হয় ওকে ধ্বংসকারী।” সূরা রূমের (আরবি) আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। (৩০:৩০) এ আয়াতের তাফসীরে হযরত জাবির (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটি গত হয়েছেঃ “প্রত্যেক সন্তান ইসলামের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার জিহ্বা চলতে থাকে, হয় সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হয়, না হয় অকৃতজ্ঞ হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিই (বাড়ী হতে) বের হয় তারই দরজার উপর দু’টি পতাকা থাকে, একটি থাকে ফেরেশতার হাতে এবং অপরটি থাকে শয়তানের হাতে। যদি সে এমন কাজের জন্যে বের হয়ে থাকে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট, তবে ফেরেশতা তাঁর পতাকা নিয়ে তার সাথী হয়ে যান এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে ফেরেশতার পতাকার নীচেই থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে বের হয়, শয়তান তার পতাকা নিয়ে তার সাথে হয়ে যায় এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে শয়তানের পতাকা তলেই থাকে।”
আল-ইনসান 76:3
সহীহ্ মুসলিমের হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ইতিপূর্বে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জুমআ’র দিন ফজরের নামাযে সূরা আলিফ-লাম-তানযীল এবং হাল আতা আলাল ইনসান পাঠ করতেন। একটি মুরসাল গারীব হাদীসে রয়েছে যে, যখন এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তা পাঠ করেন তখন তাঁর নিকট একটি কালো বর্ণের সাহাবী (রাঃ) বসেছিলেন। যখন জান্নাতের গুণাবলীর বর্ণনা আসে তখন হঠাৎ তাঁর মুখ হতে একটা ভীষণ চীৎকার বের হয় এবং সাথে সাথে তাঁর দেহ হতে প্রাণ পাখী উড়ে যায়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের সাথী এবং তোমাদের ভাই-এর প্রাণ জান্নাতের আগ্রহে বেরিয়ে গেছে।” ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি মানুষকে এমন অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন যে, তার নিকৃষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। তিনি তাকে পুরুষ ও নারীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং বিভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত করার পর তাকে বর্তমান রূপ ও আকৃতি দান করেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আমি তাকে পরীক্ষা করবার জন্যে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন করেছি। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্যে যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম?” (৬৭:২) সুতরাং তিনি তোমাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দান করেছেন যাতে আনুগত্য ও অবাধ্যতার মধ্যে পার্থক্য করতে পার।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি। অর্থাৎ অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে আমার সরল সোজা পথ তোমার কাছে খুলে দিয়েছি। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি পথের নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা অন্ধত্বকে হিদায়াতের উপর প্রাধান্য দিয়েছিল।” (৪১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাকে দু'টি পথই দেখিয়েছি।” (৯০:১০) অর্থাৎ ভাল ও মন্দ দু'টি পথই প্রদর্শন করেছি। (আরবি)-এই আয়াতের তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পথ দেখানো দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ আমি তাকে মায়ের পেট হতে বের হবার পথ দেখিয়েছি। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। প্রথম উক্তিটিই সঠিক।(আরবি) এখানে (আরবি) হওয়ার কারণে (আরবি) এবং (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর হয়েছে। এর (আরবি) হলো (আরবি) এর সর্বনামটি। অর্থাৎ আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি এমন অবস্থায় যে সে হতভাগ্য বা ভাগ্যবান। যেমন সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল বেলায় স্বীয় নফসকে বিক্রিকারী হয়ে থাকে, হয় সে ওকে মুক্তকারী হয়, না হয় ওকে ধ্বংসকারী হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকে নির্বোধদের নেতৃত্ব হতে রক্ষা করুন!” হযরত কাব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নির্বোধদের নেতৃত্ব কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা ঐ সব নেতা যারা আমার পরে নেতৃত্ব লাভ করবে। তারা না আমার সুন্নাতের উপর আমল করবে, না আমার তরীকার উপর চলবে। যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং উৎপীড়নমূলক কার্যে সাহায্য করবে তারা আমার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। জেনে রেখো যে, তারা আমার হাউযে কাওসারের উপরও আসতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে না এবং তাদের অত্যাচারমূলক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে না তারা আমার এবং আমি তাদের। তারা আমার হাউযে কাওসারে আমার সাথে মিলিত হবে। হে কা'ব (রাঃ)! রোযা ঢাল স্বরূপ, সাদকা বা দান-খয়রাত পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয় এবং নামায আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ অথবা বলেছেনঃ মুক্তির দলীল। হে কাব (রাঃ)! (দেহের) ঐ গোশত জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে। ওটা জাহান্নামেরই যোগ্য। হে কা'ব (রাঃ)! মানুষ সকাল বেলায় নিজের নফসকে বিক্রী করে থাকে। কেউ ওকে আযাদকারী হয় এবং কেউ হয় ওকে ধ্বংসকারী।” সূরা রূমের (আরবি) আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। (৩০:৩০) এ আয়াতের তাফসীরে হযরত জাবির (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটি গত হয়েছেঃ “প্রত্যেক সন্তান ইসলামের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার জিহ্বা চলতে থাকে, হয় সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হয়, না হয় অকৃতজ্ঞ হয়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিই (বাড়ী হতে) বের হয় তারই দরজার উপর দু’টি পতাকা থাকে, একটি থাকে ফেরেশতার হাতে এবং অপরটি থাকে শয়তানের হাতে। যদি সে এমন কাজের জন্যে বের হয়ে থাকে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট, তবে ফেরেশতা তাঁর পতাকা নিয়ে তার সাথী হয়ে যান এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে ফেরেশতার পতাকার নীচেই থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে বের হয়, শয়তান তার পতাকা নিয়ে তার সাথে হয়ে যায় এবং তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সে শয়তানের পতাকা তলেই থাকে।”
আল-ইনসান 76:4
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:5
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:6
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:7
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:8
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:9
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:10
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:11
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:12
৪-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর মাখলূকের মধ্যে যে কেউই তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে তার জন্যে তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন শৃংখল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে।” (৪০:৭১-৭২)হতভাগ্যদের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ ও ভাগ্যবানদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাদেরকে পান করানো হবে এমন পানীয় যার মিশ্রণ হবে কাফূর। কাফূর একটি নহরের নাম যা হতে আল্লাহর খাস বান্দারা পানি পান করবে এবং শুধু ওর দ্বারাই পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যেই এখানে এটাকে (আরবি) দ্বারা (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর উপর (আরবি) বা যবর দেয়া হয়েছে। কিংবা এই পানি সুগন্ধির দিক দিয়ে কপূরের মত অথবা ওটা আসলই কপূর। আর (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি) ক্রিয়াটির কারণে। এই নহর পর্যন্ত যাওয়াও তাদের প্রয়োজন হবে না। তারা তাদের বাগানে, মহলে, মজলিসে, বৈঠকে যেখানেই ইচ্ছা করবে তাদের কাছে ঐ পানি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। (আরবি)-এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা উৎসারিত করা যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে - আমরা কখনো তোমাতে ঈমান আনবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে।” (১৭:৯০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নহর।" (১৮:৩৩)এখন এই লোকদের পুণ্যময় কাজের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ইবাদতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের উপর ছিল তা তো তারা যথাযথভাবে পালন করতোই, এমন কি তারা যেসব দায়িত্ব নিজেরাই নিজেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল সেগুলোও তারা পুরোপুরিভাবে পালন করতো। অর্থাৎ তারা তাদের নযরও পুরো করতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানবে বা প্রতিজ্ঞা করবে তা যেন সে পুরো করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার নযর মানবে সে যেন তা পুরো না করে (অর্থাৎ যেন সে আল্লাহর নাফরমানী না করে)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন)আর তারা কিয়ামত দিবসের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজগুলোকে পরিত্যাগ করে, যে দিবসের সন্ত্রাস সাধারণভাবে সবকেই পরিবেষ্টন করবে। সেই দিন সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তবে আল্লাহ পাক কারো প্রতি রহম করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। ঐদিন সন্ত্রাস আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত ছেয়ে যাবে।(আরবি)-এর অর্থ হলো ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া বা চতুর্দিক পরিবেষ্টন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই সৎকর্মশীল লোকগুলো আল্লাহর মহব্বতে হকদার লোকদের উপর সাধ্যমত খরচ করে থাকে। কারো কারো মতে, সর্বনামটি (আরবি)-এর দিকে ফিরেছে। শব্দের দিক দিয়ে এটাই বেশী প্রকাশমানও বটে। অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি চরম আসক্তি এবং এর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা তা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে এবং অভাবগ্রস্তদেরকে দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মালের প্রতি আসক্তি এবং ওর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ওটা সে আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে।” (২:১৭৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।” (৩:৯২)হযরত নাফে (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রুগ্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গুরের মৌসুমে আঙ্গুর পাকতে শুরু করলে তার স্ত্রী হযরত সুফিয়া (রাঃ) লোক পাঠিয়ে এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন। ঠিক ঐ সময়েই দরজায় এক ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আঙ্গুর ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলেন। সুতরাং তা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর আবার লোক গিয়ে আঙ্গুর ক্রয় করে আনে। কিন্তু এবারও ভিক্ষুক এসে পড়ে এবং ভিক্ষা চেয়ে বসে। এবারও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তা ভিক্ষুককে দিয়ে দিবার নির্দেশ দেন। সুতরাং এবারও ঐ আঙ্গর ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবার ঐ ভিক্ষুককে বলে দেনঃ “আল্লাহর কসম! এর পরেও তুমি ফিরে আসলে তোমাকে আর কিছুই দেয়া হবে না।” অতঃপর আবার তিনি এক দিরহামের আঙ্গুর আনিয়ে নেন।” (এটা ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “উত্তম সাদকা হলো ঐ সাদকা যা তুমি এমন অবস্থায় করছো যে, তুমি সুস্থ শরীরে রয়েছে, মালের প্রতি তোমার ভালবাসা রয়েছে, ধনী হওয়ার তোমার আকাঙ্খা আছে এবং গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ও তোমার রয়েছে (এতদসত্ত্বেও তুমি সাদকা করছে)।” অর্থাৎ মালের প্রতি লোভ-লালসাও রয়েছে, ভালবাসাও আছে এবং অভাব অনটনও রয়েছে, এতদসত্ত্বেও আল্লাহর পথে দান করা হচ্ছে।ইয়াতীম ও মিসকীন কাকে বলে এর বর্ণনা ও বিশেষণ ইতিপূর্বে গত হয়েছে। আর বন্দী সম্পর্কে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুসলমান আহলে কিবলা বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ সময় তো শুধু মুশরিক বন্দীরাই ছিল। এর প্রমাণ হলো ঐ হাদীসটি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন যে, তাঁরা যেন তাদের সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নির্দেশ অনুসারে সাহাবীগণ পানাহারের ব্যাপারে নিজেদের অপেক্ষা ঐ বন্দীদের প্রতিই বেশী লক্ষ্য রাখতেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এখানে বন্দী দ্বারা গোলামকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি আম বা সাধারণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন এবং মুসলমান ও মুশরিক সবকেই এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। গোলাম ও অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগীদ বহু হাদীসেই রয়েছে। এমন কি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) স্বীয় উম্মতকে বিদায় উপদেশে বলেনঃ “তোমরা নামাযের হিফাযত করবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (গোলাম ও বাদীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা বলেঃ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। অর্থাৎ তারা এই সদ্ব্যবহারের কোন প্রতিদান মানুষের কাছে চায় না এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক এ কামনাও তারা করে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থা দ্বারা যেন এটাই ঘোষণা করে যে, তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে থাকে। তারা যেন এর বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট পারলৌকিক পুণ্য লাভ করতে পারে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! ঐ পুণ্যময় লোকেরা উপরোক্ত কথা মুখে প্রকাশ করেন না, বরং এটা তাদের মনের ইচ্ছা, যা আল্লাহ পাক জানেন এবং তিনি তা প্রকাশ করে থাকেন যাতে এতে জনগণের আগ্রহ জন্মে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই পবিত্র দলটি এই খায়রাত ও সাদকা করে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আযাব হতে বাঁচতে চায়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ, অন্ধকার এবং সুদীর্ঘ। তাদের বিশ্বাস যে, এর উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাদের উপর দয়া করবেন এবং ঐ ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর দিনে তাদের এই পুণ্যের কাজগুলো তাদের উপকারে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সংকীর্ণতা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো দীর্ঘতা। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐদিন কাফিরদের মুখ বিকৃত হয়ে যাবে, ভ্রূকুঞ্চিত হবে এবং তাদের চক্ষুদ্বয়ের মাঝখান দিয়ে ঘর্ম বইতে থাকবে যা রওগণ গন্ধকের মত হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং চেহারা জড় হয়ে যাবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ভয় সন্ত্রাসের কারণে তাদের আকৃতি বিকৃত হয়ে যাবে এবং কপাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে খুবই মন্দ ও কঠিন দিন। কিন্তু সবচেয়ে উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত হলো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিটি। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হলো কাঠিণ্য। অর্থাৎ ঐদিন হবে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ।মহান আল্লাহ বলেন যে, তাদের এ আন্তরিযকতা ও সৎ কর্মের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐ দিনের ভয়ংকর অবস্থা হতে রক্ষা করবেন। শুধু তাই নয়, এমন কি সেই দিনের দুরবস্থার স্থলে তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। এখানে কতই না অলংকার পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল সহাস্য ও প্রফুল্ল।" (৮০:৩৮-৩৯) এটা প্রকাশমান কথা যে, মন আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকলে চেহারাও হবে উজ্জ্বল ও হাস্যময়। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন সময় আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং মনে হতো যেন চন্দ্রের খণ্ড। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন, ঐ সময় তার চেহারা মুবারকের শিরাগুলো আনন্দে উজ্জ্বল ও চমকিত ছিল (শেষ পর্যন্ত)।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। অর্থাৎ তাদের বসবাস ও চলাফেরার জন্যে মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করবেন প্রশস্ত জান্নাত ও পবিত্র জীবন এবং পরিধান করার জন্যে দিবেন রেশমী বস্ত্র। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা সুলাইমান দারানীর (রঃ) সামনে (আরবি) সূরাটি পাঠ করা হয়। কারী যখন (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, তাঁরা পার্থিব কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড়ই আফসোস যে, প্রবৃত্তির চাহিদা এবং মঙ্গলের স্থলে কামনা বহুজনকে গলাটিপে হত্যা করেছে। প্রবৃত্তির চাহিদা এমনই এক জিনিস যা মানুষকে নিকৃষ্টতম লাঞ্ছনা, অপমান এবং বিপদ আপদের মধ্যে নিক্ষেপ করে থাকে।”
আল-ইনসান 76:13
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:14
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:15
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:16
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:17
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:18
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।
আল-ইনসান 76:19
১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে। পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩) এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।