Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-মুদ্দাসসির 74:29 – আল-কিয়ামা 75:20

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-মুদ্দাসসির 74:29
  2. আল-মুদ্দাসসির 74:30
  3. আল-মুদ্দাসসির 74:31
  4. আল-মুদ্দাসসির 74:32
  5. আল-মুদ্দাসসির 74:33
  6. আল-মুদ্দাসসির 74:34
  7. আল-মুদ্দাসসির 74:35
  8. আল-মুদ্দাসসির 74:36
  9. আল-মুদ্দাসসির 74:37
  10. আল-মুদ্দাসসির 74:38
  11. আল-মুদ্দাসসির 74:39
  12. আল-মুদ্দাসসির 74:40
  13. আল-মুদ্দাসসির 74:41
  14. আল-মুদ্দাসসির 74:42
  15. আল-মুদ্দাসসির 74:43
  16. আল-মুদ্দাসসির 74:44
  17. আল-মুদ্দাসসির 74:45
  18. আল-মুদ্দাসসির 74:46
  19. আল-মুদ্দাসসির 74:47
  20. আল-মুদ্দাসসির 74:48
  21. আল-মুদ্দাসসির 74:49
  22. আল-মুদ্দাসসির 74:50
  23. আল-মুদ্দাসসির 74:51
  24. আল-মুদ্দাসসির 74:52
  25. আল-মুদ্দাসসির 74:53
  26. আল-মুদ্দাসসির 74:54
  27. আল-মুদ্দাসসির 74:55
  28. আল-মুদ্দাসসির 74:56
  29. আল-কিয়ামা 75:1
  30. আল-কিয়ামা 75:2
  31. আল-কিয়ামা 75:3
  32. আল-কিয়ামা 75:4
  33. আল-কিয়ামা 75:5
  34. আল-কিয়ামা 75:6
  35. আল-কিয়ামা 75:7
  36. আল-কিয়ামা 75:8
  37. আল-কিয়ামা 75:9
  38. আল-কিয়ামা 75:10
  39. আল-কিয়ামা 75:11
  40. আল-কিয়ামা 75:12
  41. আল-কিয়ামা 75:13
  42. আল-কিয়ামা 75:14
  43. আল-কিয়ামা 75:15
  44. আল-কিয়ামা 75:16
  45. আল-কিয়ামা 75:17
  46. আল-কিয়ামা 75:18
  47. আল-কিয়ামা 75:19
  48. আল-কিয়ামা 75:20

আল-মুদ্দাসসির 74:29

১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্‌ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)

আল-মুদ্দাসসির 74:30

১১-৩০ নং আয়াতের তাফসীর যে কলুষিত ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং পবিত্র কুরআনকে মানুষের কথা বলে আখ্যায়িত করেছে, এখানে তার শাস্তির বর্ণনা হচ্ছে। যে নিয়ামতরাশি তাকে দেয়া হয়েছে, প্রথমে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে একাকী মায়ের পেট হতে বের হয়েছে। তার না ছিল কোন মাল-ধন ও না ছিল কোন সন্তান সন্ততি। সঙ্গে তার কিছুই ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মালদার বানিয়েছেন। তাকে প্রচুর মাল দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, হাজার দীনার বা স্বর্ণ মুদ্রা, কারো কারো মতে লক্ষ দীনার, আবার কেউ কেউ বলেন যে, জমি-জমা ইত্যাদি দান করেছেন। সন্তান দান করার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, তেরোটি সন্তান এবং অন্য কেউ বলেন যে, দশটি সন্তান দান করেছেন, যারা সবাই তার পাশে বসে থাকতো। চাকর-বাকর, দাস-দাসী তার জন্যে কাজ-কর্ম করতো এবং সে মজা করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন যাপন করতো। মোট কথা, তার ধন-দৌলত, দাস-দাসী এবং আরাম-আয়েশ সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। তবুও প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ হতো না। সে আরো বেশী কামনা করতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ এখন কিন্তু আর এরূপ হবে না। সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। অর্থাৎ সে জ্ঞান লাভের পরেও আমার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অয়েল’ হলো জাহান্নামের একটা উপত্যকার নাম, যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতেই হবে তবুও ওর তলদেশে পৌছতে পারবে না। আর ‘সাউদ’ হলো জাহান্নামের একটি অগ্নি পাহাড়ের নাম যার উপর কাফিরকে চড়ানো হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত সে উপরে উঠতেই থাকবে। তারপর সেখান থেকে নীচে ফেলে দেয়া হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তেই থাকবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সে এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বা দুর্বল বলেছেন। সাথে সাথে এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সাঊদ হলো জাহান্নামের একটি আগুনের পাহাড়ের নাম। জাহান্নামীকে এর উপর চড়তে বাধ্য করা হবে। তাতে হাত রাখা মাত্রই তা গলে যাবে এবং উঠানো মাত্রই স্বাভাবিক হাত হয়ে যাবে। পায়ের অবস্থাও তাই হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক কংকরময় ভূমির নাম, যার উপর দিয়ে কাফিরকে মুখের ভরে টেনে আনা হবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সাউদ হলো জাহান্নামের এক শক্ত পিচ্ছিল পাথর যার উপর জাহান্নামীকে উঠানো হবে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদান করবো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এমন শাস্তি যা হতে কখনো শান্তি লাভ করা যাবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাকে এই কষ্ট ও শাস্তির নিকটবর্তী এ জন্যেই করেছি যে, সে ঈমান হতে বহু দূরে ছিল এবং চিন্তা-ভাবনা করে এটা গড়ে নিচ্ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পর্কে সে একটা মন্তব্য করবে!অতঃপর তার উপর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হচ্ছেঃ অভিশপ্ত হোক সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করলো! আরবদের পরিভাষা অনুযায়ী তার ধ্বংসের শব্দ উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, সে ধ্বংস হোক! সে কতই না জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে! সে কতই না নির্লজ্জতাপূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছে! বারবার চিন্তা-ভাবনা করার পর ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর সে পিছন ফিরেছে ও দম্ভ প্রকাশ করেছে। তারপর ঘোষণা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং মুহাম্মাদ (সঃ) তার পূর্ববর্তী লোকদের যাদুমন্ত্র বর্ণনা করছে এবং ওটাই মানুষকে শুনাচ্ছে। সে বলছেঃ এটা তো তোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম হলো ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা মাখযুমী, যে কুরায়েশদের নেতা ছিল। হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঘটনাটি হলোঃ একদা এই অপবিত্র ওয়ালীদ হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলো এবং তাঁর নিকট হতে কুরআন কারীমের কিছু অংশ শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। হযরত আবূ বকর (রাঃ) তখন তাকে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখান থেকে বের হয়ে সে কুরায়েশদের সমাবেশে গিয়ে হাযির হলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে জনমন্ডলী! বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যে কুরআন পাঠ করে থাকেন, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতাও নয়, যাদু-মন্ত্রও নয় এবং পাগলের কথাও নয়। বরং খাস আল্লাহর কথা! এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।” কুরায়েশরা তার একথা শুনে নিজেদের মাথা ধরে নেয় এবং বলেঃ “এ যদি মুসলমান হয়ে যায় তবে কুরায়েশদের একজনও মুসলমান হতে বাকী থাকবে না।” আবূ জেহেল খবর পেয়ে বললোঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না। দেখো, আমি কৌশলে তাকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দিচ্ছি।” একথা বলে সে মাথায় এক বুদ্ধি এঁটে নিয়ে ওয়ালীদের বাড়ীতে গেল এবং তাকে বললোঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে চাঁদা ধরে বহু অর্থ জমা করেছে এবং ওগুলো তারা আপনাকে দান করতে চায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “বাঃ! কি মজার ব্যাপার? আমার তাদের চাঁদা ও দানের কি প্রয়োজন? দুনিয়ার সবাই জানে যে, আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী। আমার সন্তান-সন্ততিও বহু রয়েছে।” আবূ জেহেল বললোঃ “হ্যাঁ, তা ঠিক বটে। কিন্তু লোকদের মধ্যে এই আলোচনা চলছে যে, আপনি যে আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করছেন তা শুধু কিছু লাভের আশায়।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ বললোঃ “আমার বংশের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে যে এসব গুজব রটেছে তা তো আমার মোটেই জানা ছিল না? আচ্ছা, এখন আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আর কখনো আমি আবূ বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাবো না। মুহাম্মাদ (সঃ) যা কিছু বলে তা তো লোকপরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, ওয়ালীদ কুরআন কারীম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলঃ “কুরআনের ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার পর এই ফলাফলে পৌঁছেছে যে, ওটা কবিতা নয়, ওতে মধুরতা রয়েছে, ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। এটা বিজয়ী, বিজিত নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা যাদু।” এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। নবী (সঃ) তাকে কুরআন পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে তার অন্তর নরম হয়ে যায় এবং পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আবূ জেহেল এ খবর পেয়ে বড় ঘাবড়ে যায় এবং ভয় করে যে, না জানি হয়তো সে মুসলমান হয়েই যাবে। তাই, সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে পড়ে এবং একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে তাকে বলেঃ “আপনার কওম আপনার জন্যে মাল জমা করতে চায়।” সে জিজ্ঞেস করেঃ “কেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আপনাকে দেয়ার জন্যে। উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আপনার যাতায়াত বন্ধ করা। কেননা, আপনি সেখানে শুধু মাল লাভ করার উদ্দেশ্যেই গমন করে থাকেন।” এ কথা শুনে ওয়ালীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং বলেঃ “আমার কওমের মধ্যে আমি যে সবচেয়ে বড় মালদার এটা কি তারা জানে না?” আবূ জেহেল উত্তর দিলোঃ “হ্যাঁ, জানে বটে। কিন্তু এখন তো মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি শুধু মাল লাভের আশাতেই তাঁর হয়ে গেছেন। আপনি যদি এই বিশ্বাস মানুষের অন্তর হতে মুছে ফেলতে চান তাহলে আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ব্যাপারে একটি কঠোর উক্তি করুন। যাতে লোক বুঝতে পারে যে, আপনি তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আপনি তার কথাকে মোটেই পছন্দ করেন না।” সে বললোঃ “আমি তার ব্যাপারে কি বলবো? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, সে যে কুরআন আমাকে শুনিয়েছে, আল্লাহর কসম! ওটা কবিতা নয়, কাসীদা নয়, ছন্দ নয় এবং জ্বিনের কথাও নয়। তোমাদের তো খুব ভাল জানা আছে যে, দানব ও মানবের কথা আমার খুবই ভাল স্মরণ আছে এবং আমি একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। ভাষার ভালমন্দ গুণ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কালাম এগুলোর কোনটিই নয়। তাঁর কালামের মধ্যে এমন মধুরতা ও লালিত্য রয়েছে যে, ওটা সমস্ত কালামের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কালামের মধ্যে বড়ই আকর্ষণ রয়েছে। সুতরাং তুমিই বল, আমি তাঁর কালামের বিরুদ্ধে কি বলতে পারি?” আবূ জেহেল তখন বললোঃ “দেখুন, আপনি এর বিরুদ্ধে কিছু একটা না বলা পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে আপনার কওমের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে তা দূর হতে পারে না। সে তখন বললোঃ “আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিছু অবকাশ দাও, আমি চিন্তা করে এর সম্পর্কে কিছু একটা উক্তি করবো।” সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার খাতিরে শেষে বলে ফেললোঃ “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়।” তখন (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, দারুন নুদওয়াতে বসে কাফিররা পরামর্শ করলো যে, হজের মৌসুমে জনগণ চতুর্দিক থেকে আসবে। সুতরাং এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) সম্বন্ধে কি উক্তি করা যেতে পারে? তার সম্পর্কে এমন একটা উক্তি করা যাক যা সবাই এক বাক্যে বলবে, যাতে তা আরবে এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কবি বললো, কেউ বললো যাদুকর, কেউ বললো গণক, কেউ জ্যোতির্বিদ বললো এবং কেউ পাগল বললো। ওয়ালীদ বসে বসে চিন্তা করছিল। বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে বড় রকমের ভঙ্গিমা করে বললোঃ “দেখো, এ লোকটির কথা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন কিছুই নয়। এটা তো মানুষেরই কথা।” আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দেখো, তারা তোমার কি উপমা দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।” (১৭:৪৮)। এরপর আল্লাহ্ তার শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ডুবিয়ে দিবো যা অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির আগুন।যা গোশত, অস্থি, চর্ম সবই খেয়ে ফেলবে। আবার এগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হবে এবং পুনরায় জ্বালিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং এ শাস্তি না তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে, না মৃত অবস্থায় ছেড়ে দিবে। এই জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশ জন প্রহরী। তারা হবে অত্যন্ত কঠোর হৃদয়। তাদের অন্তরে দয়ার লেশমাত্র থাকবে না। হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (আরবি) আল্লাহ্ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবী (রাঃ)-এর একজন লোককে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-ই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।” তখন একজন লোক এসে নবী (সঃ)-কে এ খবর দেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে এ খবর দিয়ে দেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করবো যে, জান্নাতের মাটি কেমন? আর তোমরা জেনে রেখো যে, জান্নাতের মাটি হলো সাদা ময়দার মত।” তারপর ইয়াহুদীরা তাঁর কাছে আসলো এবং তাঁকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলো। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো দু’বার উত্তোলন করলেন এবং দ্বিতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি তাদেরকে জানালেন যে, তাঁরা সংখ্যায় উনিশ জন)। অতঃপর তিনি ঐ ইয়াহুদীদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “জান্নাতের মাটি কেমন?” তারা তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললোঃ “হে ইবনে সালাম (রাঃ)! আপনিই এঁদেরকে এ খবরটি দিয়ে দিন!” তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “যেন ওটা সাদা রুটী।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, ওটা ঐ সাদা রুটীর মত যা নির্ভেজাল ময়দা দ্বারা তৈরী।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আজ তো আপনার সাহাবীগণ হেরে গেছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কি ভাবে।” সে উত্তর দিলোঃ “ইয়াহূদীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তাদের নবী কি তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন? উত্তরে তারা বলেছে যে, তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত এর উত্তর দানে অক্ষম।” এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “এমন কওমকে কি করে পরাজিত বলা যেতে পারে যাদেরকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা তাদের জানা নেই। তখন তারা বলে যে, তারা ঐ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নবীকে জিজ্ঞেস করে? আল্লাহ্‌ ঐ দুশমনদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো যারা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, তিনি যেন তাদের প্রতিপালককে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। তখন তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়।” অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ডেকে আনা হলে তারা বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! জাহান্নামের রক্ষকদের সংখ্যা কত?” উত্তরে নবী (সঃ) তাঁর হস্তদ্বয়ের অঙ্গুলিগুলো খুলে দিয়ে দু’বার দেখান এবং দ্বিতীয় বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ রাখেন অর্থাৎ অঙ্গুলির ইশারায় তিনি জানান যে, জাহান্নামের রক্ষীরা হলেন সংখ্যায় ঊনিশ জন। আর তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তোমরা বলবে যে, ওটা সাদা ময়দার মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদীদের প্রশ্নের উত্তরে জাহান্নামের রক্ষীদের সংখ্যা বলে দেয়ার পর তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন?” তখন তারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং শেষে বললোঃ “হে আবূল কাসিম (সঃ)! ওটা রুটির মত।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সাদা ময়দার রুটির মত।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা জামে তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে)

আল-মুদ্দাসসির 74:31

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:32

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:33

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:34

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:35

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:36

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:37

৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শাস্তির কাজের উপর এবং জাহান্নামের রক্ষণাবেক্ষণের উপর আমি ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করেছি, যারা নির্দয় ও কঠোর ভাষী। এ কথার দ্বারা কুরায়েশদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। যখন জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় তখন আবূ জেহেল বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমাদের দশ জন কি তাদের এক জনের উপর জয় লাভ করতে পারবে না?” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি জাহান্নামের প্রহরী করেছি ফেরেশতাদেরকে। তারা মানুষ নয়। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করাও যাবে না এবং ক্লান্ত করাও যাবে না।এটাও বলা হয়েছে যে, আবূল আশদাইন, যার নাম ছিল কালদাহ ইবনে উসায়েদ ইবনে খালফ, বলেঃ “হে কুরায়েশদের দল! তোমরা (জাহান্নামের উনিশ জন প্রহরীদের) দু’জনকে প্রতিহত কর, বাকী সতেরো জনকে প্রতিহত করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট।” সে ছিল বড় আত্মগর্বী এবং সে বড় শক্তিশালীও ছিল। তার শক্তি এতো বেশী ছিল যে, সে গরুর চামড়ার উপর দাঁড়াতো। তখন দশজন লোক তার পায়ের নীচ হতে ঐ চামড়াকে বের করার জন্যে এতো জোরে টান দিতো যে, চামড়া ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো, তথাপি তার পা একটুও নড়তো না। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে বলেছিলঃ “আসুন, আমরা দু’জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। যদি আপনি আমাকে ভূপাতিত করতে পারেন তবে আমি আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিবো।” তার কথামত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে মল্লযুদ্ধ করে কয়েকবার তাকে ভূপাতিত করেন, কিন্তু এর পরও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য সে লাভ করেনি। ইমাম ইবনে ইসহাক (রঃ) মল্লযুদ্ধ সম্বলিত ঘটনাটি রাকানাহ্ ইবনে আবৃদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি (ইবনে কাসীর রঃ) বলি যে, এই দু'জনের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। সম্ভবতঃ ওর এবং এর, উভয়ের সাথেই মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এই সংখ্যার উল্লেখ পরীক্ষা স্বরূপই ছিল। এক দিকে কাফিরদের কুফরী খুলে যায় এবং অপরদিকে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, এই রাসূল (সঃ)-এর রিসালাত সত্য। কেননা, তাদের কিতাবেও এই সংখ্যাই ছিল। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। মুমিন ও কিতাবীদের সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং কাফিররা বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ তা'আলা এই অভিনব উক্তি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছেন? এখানে এটা উল্লেখ করার মধ্যে কি হিকমত রয়েছে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন। আল্লাহ্‌ এ সমুদয় কাজ হিকমত ও রহস্যে পরিপূর্ণ।মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়কিফহাল। তাদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সংখ্যার আধিক্যের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই আছে। এটা মনে করো না যে, তাদের সংখ্যা মাত্র ঊনিশই। যেমন গ্রীক দার্শনিকরা এবং তাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা অজ্ঞতা বশতঃ বুঝে নিয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘উকূলে আশারাহ্' এবং নুফুসে তিসআহ’। কিন্তু এটা তাদের এমন একটা দাবী যার উপর দলীল কায়েম করতে তারা সম্পূর্ণরূপে অপারগ। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই আয়াতের প্রথম অংশের উপর তো তাদের দৃষ্টি পড়েছে বটে, কিন্তু এর শেষাংশের সাথে তারা কুফরী করতে রয়েছে! যেখানে সুস্পষ্ট শব্দ বিদ্যমান রয়েছেঃ তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং শুধু ঊনিশের কি অর্থ হতে পারে? সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মিরাজ সম্বলিত হাদীসে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বায়তুল মা'মূরের বিশেষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওটা সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে। ওর মধ্যে প্রত্যহ পালাক্রমে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে থাকেন। কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে তারা তাতে প্রবেশ করতেই থাকবেন। কিন্তু ফেরেস্তাদের সংখ্যা এতো অধিক যে, একদিন যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ঐ বায়তুল মা'মূরে প্রবেশ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত আর তাদের ওর মধ্যে প্রবেশ করার পালা পড়বে না।”হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখোনা এবং আমি এমন কিছু শুনছি যা তোমরা শুনো না। আকাশ চড়ু চড়ু শব্দ করছে এবং চড়ু চডু শব্দ করার তার অধিকার রয়েছে। এমন চার অঙ্গুলী পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদায় পতিত থাকেন না। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। আর তোমরা বিছানায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে প্রেমালাপ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে পারতে না, বরং ক্রন্দন ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে জঙ্গলের দিকে চলে যেতে!” এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি গাছ হতাম এবং আমাকে কেটে ফেলা হতো (তবে কতই না ভাল হতো)!” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, জামে তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। এ হাদীসটি হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপেও বর্ণিত আছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সপ্ত আকাশে পা পরিমিত, কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এবং হস্ততালু পরিমিত এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা কিয়াম, রুকূ' অথবা সিজদার অবস্থায় না রয়েছেন। অতঃপর কাল কিয়ামতের দিন তারা সবাই বলবেনঃ “(হে আল্লাহ!) আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি। তবে (এ কথা সত্য যে,) আমরা আপনার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করিনি।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নাসর মরূযীর (রঃ) ‘কিতাবুস সলাত' নামক পুস্তকে হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আমি যা শুনছি তা তোমরাও শুনছো কি?" সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশকে তার এই চড়চড় শব্দের জন্য তিরস্কার করা যায় না। কেননা ফেরেশতা এতো বেশী রয়েছেন যে, আকাশের মধ্যে কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত এমন জায়গাও ফাঁকা নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা রুকূ' বা সিজদা অবস্থায় আছেন।”উক্ত পুস্তকেই হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে পা রাখা পরিমাণ এমন জায়গা ফাঁকা নেই যেখানে কোন একজন ফেরেশতা সিজদা অথবা কিয়ামের অবস্থায় না আছেন। এ জন্যেই কুরআন কারীমের মধ্যে ফেরেশতাদের নিম্নলিখিত উক্তি বিদ্যমান রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমরা সারিবদ্ধভাবে (দণ্ডায়মান) থাকি এবং আমরা (আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর) তাসবীহ পাঠকারী।”(৩৭:১৬৪-১৬৬) (এ হাদীসটির মারফূ’ হওয়া খুবই গরীব বা দুর্বল। অন্য রিওয়াইয়াতে এ উক্তিটি হযরতইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্য সনদে হযরত আলা ইবনে সা'দ (রাঃ) হতেও মারফূ’’রূপে এটা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে এটাও গারীব বা দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) এমন সময় (মসজিদে) আগমন করেন যে, ঐ সময় নামায শুরু হয়ে গেছে। দেখেন যে, তিনজন লোক (নামাযে না দাঁড়িয়ে) বসে আছে। তাদের একজন ছিল আবূ জাহশ লায়সী। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা উঠো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়?” তখন দু’জন উঠলো এবং আবূ জাহশ উঠতে অস্বীকার করে বললোঃ “যদি এমন কোন লোক আসে যে আমার চেয়ে শক্তিশালী এবং আমাকে সে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে ফেলে দিতে পারে ও আমার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিতে পারে তবে আমি উঠবো, অন্যথায় উঠবো না।” তার একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “এসো, আমিই তোমার সাথে মল্লযুদ্ধ করি।” অতঃপর তিনি তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং তার চেহারাকে মাটিতে মিলিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) আসলেন এবং আবূ জাহশকে তাঁর নিকট হতে ছাড়িয়ে নিলেন। এতে হযরত উমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঐ ক্রোধের অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে আবূ হাফস! তোমার হয়েছে কি?” হযরত উমার (রাঃ) তখন তার কাছে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হযরত উমার (রাঃ) তার উপর সন্তুষ্ট থাকলে অবশ্যই তার প্রতি দয়া করতো। হে উমার (রাঃ)! আল্লাহর কসম! তুমি ঐ দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মাথা আমার কাছে আনতে পারলে আমি বড়ই খুশী হতাম।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তার দিকে ধাবিত হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঐ নরাধম দূরে চলে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) তুমি এখানে বসে পড়। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আবূ জাহশের নামায হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। দুনিয়ার আকাশে বিনয় প্রকাশকারী অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঠাবেন না এবং তারা একথা বলতে বলতে হাযির হবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ইবাদতের হক আদায় করতে পারিনি।" দ্বিতীয় আকাশেও এই একই অবস্থা।” হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোন্ তাসবীহ পাঠ করে থাকেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, দুনিয়ার আকাশবাসীরা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা রাজত্বও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি।” দ্বিতীয় আকাশবাসীরা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা মর্যাদা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর মহিমা ঘোষণা করছি।” আর তৃতীয় আকাশবাসী ফেরেশতারা পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চিরঞ্জীব যিনি এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেন না তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! তুমি তোমার নামাযে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইতিপূর্বে যা আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন এবং আমার নামাযে যা পড়তে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কি হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনো এটা পড়বে এবং কখনো ওটা পড়বে। প্রথমে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে যা পড়তে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে আল্লাহ!) আমি আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ হতে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার হতে আমি আপনারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার চেহারা মর্যাদাপূর্ণ।” (এ হাদীসটি ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ফারাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস, এমন কি মুনকার বা অস্বীকৃতও বটে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসহাক ফারাভী (রঃ) হতে হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করে থাকেন এবং ইমাম ইবনু হিব্বানও (রঃ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করে থাকেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম আকীলী (রঃ) এবং ইমাম দারকুতনী (রঃ) তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো তিনি তালকীন কবুল করতেন তবে তার কিতাবগুলো বিশুদ্ধ। ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইসহাক ফারাভী (রঃ) বর্ণনাকারী মুশতারাব এবং তার শায়েখ আবদুল মালিক ইবনে কুদামাহ আবূ কাতাদাহ জমিহীর (রঃ) ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর (রঃ) তাঁর এই হাদীসকে কি করে রিওয়াইয়াত করলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বললেন, না তার অবস্থা জানলেন এবং না এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বর্ণনা করলেন! হ্যাঁ তবে এটুকু করেছেন যে, ওটাকে অন্য সনদে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মুরসালের দু’টি সনদ এনেছেন। একটি হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে এবং অপরটি হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে)হযরত আদী ইবনে ইরতাত (রঃ) মাদায়েনের জামে মসজিদে তাঁর ভাষণে বলেনঃ আমি একজন সাহাবী হতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এমন বহু ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকেন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়। ঐ অশ্রু ঐ ফেরেশতাদের উপর পতিত হয় যারা নামাযে নিমগ্ন থাকেন। তাদের মধ্যে এমন ফেরেশতাও রয়েছেন যারা দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে রুকুতেই রয়েছেন এবং অনেকে সিজদাতেই রয়েছেন। কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিঠ ও মাথা উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করবেনঃ ‘আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারিনি।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নসর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে কোন ত্রুটি নেই)এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্যে সাবধান বাণী।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা চন্দ্রের অবসান ঘটা রাত্রির এবং আলোকোজ্জ্বল প্রভাতকালের শপথ করে বলেনঃ এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম। এর দ্বারা যে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে তা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় আরো বহু মনীষীর উক্তি।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা মানুষের জন্যে সতর্ককারী, তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্যে। অর্থাৎ যে ইচ্ছা করবে সে এই সতর্ক বাণীকে কবুল করে নিয়ে সত্যের পথে এসে যাবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে এর পরেও এটা থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে থাকবে, এখান হতে দূরে সরে থাকবে এবং এটাকে প্রতিরোধ করতে থাকবে। সবারই জন্যে এটা সতর্ক বাণী।

আল-মুদ্দাসসির 74:38

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:39

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:40

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:41

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:42

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:43

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:44

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:45

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:46

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:47

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:48

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:49

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:50

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:51

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:52

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:53

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:54

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:55

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-মুদ্দাসসির 74:56

৩৮-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই তার আমলের উপর পাকড়াও করা হবে। কিন্তু যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা স্বর্গোদ্যানে শান্তিতে বসে থাকবে। তারা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবেঃ কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবেঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। অজ্ঞতা বশতঃ আমাদের মুখে যা এসেছে তা-ই বলেছি। যেখানেই কাউকেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি সেখানেই আমরা তাদের সঙ্গে হয়ে গেছি এবং কিয়ামতকেও অস্বীকার করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। এখানে দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, নিম্নের আয়াতেও মৃত্যু অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকবে।" (১৫:৯৯) হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)-এর মৃত্যু সম্পৰ্কীয় হাদীসেও শব্দটি মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার নিকট মৃত্যু এসে গেছে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। কেননা, শাফাআতের পাত্রের ব্যাপারেই শুধু শাফাআত ফলদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রাণটিও কুফরীর উপরই বের হয়েছে তার জন্যে সুপারিশ কি করে ফলদায়ক হতে পারে? সে চিরতরে হাবিয়াহ জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেমন ভীত-এস্ত গর্দভ যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়নপর। ফারসী ভাষায় যাকে (আরবি) বলে, আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা সিংহ। বলে। আর হাবশী ভাষায় তাকে (আরবি) বলা হয়।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ বস্তুতঃ তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলেঃ আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তা না দেয়া পর্যন্ত আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।" (৬:১২৪)হযরত কাতাদাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ তারা চায় যে, তাদেরকে বিনা আমলেই ছেড়ে দেয়া হোক।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আখিরাতের ভয় পোষণ করে না। কারণ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ বিশ্বাসই তাদের নেই। সুতরাং যেটাকে তারা বিশ্বাসই করে না সেটাকে ভয় করবে কি করে?মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রকৃত কথা এই যে, কুরআনই সকলের জন্যে উপদেশ বাণী। অতএব, যার ইচ্ছা সে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করুক। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।" (৭৬:৩০) অর্থাৎ তোমাদের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার উপর নির্ভরশীল।পরিশেষে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ একমাত্র তিনিই (আল্লাহই) ভয়ের যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “একমাত্র আমিই ভয়ের যোগ্য, সুতরাং একমাত্র আমাকেই ভয় করতে হবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করা চলবে না। যে ব্যক্তি আমার সাথে শরীক করা হতে বেঁচে গেল সে আমার ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

আল-কিয়ামা 75:1

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:2

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:3

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:4

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:5

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:6

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:7

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:8

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:9

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:10

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:11

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:12

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:13

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:14

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:15

১-১৫ নং আয়াতের তাফসীর এটা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে জিনিসের উপর শপথ করা হয় ওটা যদি প্রত্যাখ্যান করার জিনিস হয় তবে ওর পূর্বে (আরবি) এ কালেমাটি নেতিবাচকের গুরুত্বের জন্যে আনয়ন করা বৈধ। এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার উপর এবং অজ্ঞ লোকদের এর প্রত্যাখ্যানের উপর যে, কিয়ামত হবে না, শপথ করা হচ্ছে। মহান আল্লাহ তাই বলছেনঃ আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের এবং আরো শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের কসম, এবং তিরস্কারকারী আত্মার কসম নয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, দুটোরই কসম! হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত আ’রাজ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এর দ্বারাও হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। কেননা, তাঁর মতে প্রথমটির শপথ এবং দ্বিতীয়টির শপথ নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি এই যে, আল্লাহ পাক দুটোরই শপথ করেছেন। যেমন হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সবাই অবহিত। (আরবি)-এর তাফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুমিনের নফস উদ্দেশ্য এটা সব সময় নিজেই নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে যে, এটা কেন করলে? কেন এটা খেলে? কেন এই ধারণা মনে এলো? হ্যাঁ, তবে ফাসিকের নফস সদা উদাসীন থাকে। তার কি দায় পড়েছে যে, সে নিজের নফসকে তিরস্কার করবে?এটাও বর্ণিত আছে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক কিয়ামতের দিন নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। সৎকর্মশীল নফস সৎকর্মের স্বল্পতার জন্যে এবং অসৎকর্মশীল নফস অসৎকর্মের আবির্ভাবের কারণে নিজে নিজেকে ভৎসনা করবে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা নিন্দনীয় নফসকে বুঝানো হয়েছে, যা অবাধ্য নফস। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ নফস উদ্দেশ্য যা ছুটে যাওয়া জিনিসের উপর লজ্জিত হয় এবং তজ্জন্যে নিজেকে ভৎসনা করে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ উক্তিগুলো ভাবার্থের দিক দিয়ে প্রায় একই ভাবার্থ এই যে, এটা ঐ নফস যা পুণ্যের স্বল্পতার জন্যে এবং দুষ্কার্য হয়ে যাওয়ার জন্যে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে।মহান আল্লাহ বলেনঃ মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না? এটা তো তাদের বড়ই ভুল ধারণা। আমি ওগুলোকে বিভিন্ন জায়গা হতে একত্রিত করে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিবো এবং ওকে পূর্ণভাবে গঠিত করবো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আমি ওকে উট বা ঘোড়ার পায়ের পাতার মত বা খুরের মত বানিয়ে দিতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ দুনিয়াতেও ইচ্ছা করলে আমি তাকে এরূপ করে দিতে পারতাম। শব্দ দ্বারা তো বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কি ধারণা করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করবো না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্বরই আমি ওগুলো একত্রিত করবো। আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। আমি ইচ্ছা করলে সে পূর্বে যা ছিল তার চেয়েও কিছু বেশী করে দিয়ে তাকে পুনরুত্থিত করতে পারবো। ইবনে কুতাইবাহ (রঃ) ও যাজ্জাজ (রঃ)-এর উক্তির অর্থ এটাই।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মানুষ তার সামনে পাপকর্মে লিপ্ত হতে চায়। অর্থাৎ পদে পদে সে এগিয়ে চলেছে। বুকে আশা বেঁধে রয়েছে এবং বলছেঃ পাপকর্ম করে তো যাই, পরে তাওবা করে নিবো। তারা কিয়ামত দিবসকে, যা তাদের সামনে রয়েছে, অস্বীকার করছে। যেন সে তার মাথার উপর সওয়ার হয়ে আগে বেড়ে চলেছে। সদা-সর্বদা তাকে এ অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, সে পদে পদে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবে যার উপর আল্লাহ পাক দয়া করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা।এই আয়াতের তাফসীরে পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীর উক্তি এটাই যে, সে পাপকার্যে তাড়াতাড়ি করছে এবং তাওবা করতে বিলম্ব করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ সে হিসাবের দিনকে অস্বীকার করছে। ইবনে যায়েদেরও (রঃ) এটাই উক্তি। এটাই বেশী প্রকাশমান ভাবার্থও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছেঃ সে প্রশ্ন করেঃ কখন কিয়ামত দিবস আসবে? তার এ প্রশ্নটি অস্বীকৃতিসূচক। তার বিশ্বাস তো এটাই যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে- যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে বলঃ কিয়ামত কখন হবে? তুমি তাদেরকে বলে দাও – ওর জন্যে একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে যা হতে তোমরা এক ঘন্টা আগেও বাড়তে পার না এবং পিছনেও সরতে পার না।” (৩৪:২৯-৩০)এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে।" (১৪:৪৩) তারা ভয়ে ও সন্ত্রাসে চক্ষু ফেড়ে ফেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকবে। (আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। দুটোর অর্থ প্রায় একই।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন। আর সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। অর্থাৎ দুটোকেই জ্যোতিহীন করে জড়িয়ে নেয়া হবে। ইবনে যায়েদ (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য যখন নিষ্প্রভ হবে এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (৮১:১-২) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মানুষ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জবাব দেয়া হবেঃ না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। এই দিন ঠাঁই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ না আছে তোমাদের জন্যে কোন আশ্রয়স্থল এবং না আছে এমন জায়গা যেখানে গিয়ে তোমরা অচেনা ও অপরিচিত হয়ে যাবে।” (৪২:৪৭)।ঘোষিত হচ্ছেঃ সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত, যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৪) তার চক্ষু-কৰ্ণ, হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, সে অন্যদের দোষ-ত্রুটি দেখতে রয়েছে, আর নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন! বলা হয় যে, তাওরাতে লিখিত রয়েছেঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাই এর চোখের খড়-কুটা দেখতে পাচ্ছ, অথচ তোমার নিজের চোখের তীরটিও দেখতে পাচ্ছ না?”কিয়ামতের দিন মানুষ বাজে বাহানা, মিথ্যা প্রমাণ এবং নিরর্থক ওর পেশ করবে, কিন্তু তার একটি ওযরও গৃহীত হবে না।(আরবি)-এর আর একটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলোঃ যদিও সে পর্দা ফেলে দেয়। ইয়ামনবাসী পর্দাকে (আরবি) বলে থাকে। কিন্তু উপরের অর্থটিই সঠিকতর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন জ্ঞান সম্মত ওযর পেশ করতে না পেরে তার নিজেদের শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলবেঃ আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিকই ছিলাম না।" (৬:২৩) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা তাঁর সামনে শপথ করে করে নিজেদেরকে সত্যবাদী বানাতে চাইবে, যেমন আজ দুনিয়ায় তোমাদের সামনে মিথ্যা কসম খাচ্ছে, তারা নিজেদেরকে কিছু একটা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।" মোটকথা, কিয়ামতের দিন তাদের ওযর-আপত্তি তাদের কোনই উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন কাজে আসবে না।” (৪০:৫২) তারা তো শিরকের সাথে সাথে নিজেদের সমস্ত দুষ্কর্মকেই অস্বীকার করে ফেলবে, কিন্তু সবই বৃথা হবে। তাদের ঐ অস্বীকৃতি তাদের কোনই উপকারে আসবে না।

আল-কিয়ামা 75:16

১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্‌ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।

আল-কিয়ামা 75:17

১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্‌ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।

আল-কিয়ামা 75:18

১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্‌ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।

আল-কিয়ামা 75:19

১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্‌ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।

আল-কিয়ামা 75:20

১৬-২৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তিনি ফেরেশতার নিকট হতে কিভাবে ওহী গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহী গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই তাড়াতাড়ি করতেন। তাই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসবে তখন তুমি শুনতে থাকবে। অতঃপর যে ভয়ে তিনি এরূপ করতেন সেই ব্যাপারে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার বক্ষে ওটা জমা করে দেয়া এবং তোমার ভাষায় তা পড়িয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। অনুরূপভাবে তোমার দ্বারা এর ব্যাখ্যা করিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো মুখস্থ করানো, দ্বিতীয় অবস্থা হলো পড়িয়ে নেয়া এবং তৃতীয় অবস্থা হলো বিষয়টির ব্যাখ্যা করিয়ে নেয়া। তিনটিরই দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে গ্রহণ করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমার প্রতি আল্লাহর ওহীর সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করো না এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি সাধন করুন।” (২০:১১৪)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা পাঠ করি অর্থাৎ আমার নাযিলকৃত ফেরেশতা ওটা পাঠ করে তখন তুমি ঐ পাঠের অনুসরণ কর অর্থাৎ শুনতে থাকে এবং তার পাঠ শেষ হলে পর পাঠ করো। আমার মেহেরবানীতে তুমি পূর্ণরূপে মুখস্থ রাখতে সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বরং এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। মুখস্থ ও পাঠ করিয়ে নেয়ার পর এটাকে ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, যাতে তুমি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট শরীয়ত সম্পর্কে অবহিত হতে পার।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইতিপূর্বে ওহী গ্রহণ করতে খুবই কষ্ট বোধ হতো। এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। তাই তিনি ফেরেশতার সাথে সাথে পড়তে থাকতেন এবং স্বীয় ওষ্ঠ মুবারক হেলাতে থাকতেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) স্বীয় ওষ্ঠ নড়িয়ে দেখিয়ে দেন এবং তাঁর শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-ও নিজের উস্তাদের মত নিজের ওষ্ঠ নড়িয়ে তাঁর শিষ্যকে দেখান। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাড়াতাড়ি ওহীর আয়ত্ত্ব করার জন্যে তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে সঞ্চালন করো না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন জিবরাঈল (আঃ) এটা পাঠ করে তখন তুমি নীরবে তা শ্রবণ করবে। তার চলে যাওয়ার পর তার মত করেই তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে এও রয়েছে যে, যখন ওহী অবতীর্ণ হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চক্ষু নীচু করে নিতেন এবং ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি তা পাঠ করতেন মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্বযুগীয় বহু মুফাসির গুরুজনও এটাই বলেছেন)এও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সদা-সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাকতেন এই ভয়ে যে, না জানি হয়তো তিনি ভুলে যাবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আতিয়্যাহ আওফী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার দায়িত্ব আমারই। হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই উক্তি।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে কিয়ামতকে অস্বীকার করতে, আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে অমান্য করতে এবং তাঁর প্রসিদ্ধ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য না করতে উদ্বুদ্ধকারী হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম এবং আখিরাত বর্জন। অথচ আখিরাতের দিন হলো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঐ দিন বহু লোক এমন হবে যাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যেমন সহীহ্ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ “শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। বহু হাদীসে মুতাওয়াতির সনদে, যেগুলো হাদীসের ইমামগণ নিজেদের কিতাবসমূহে আনয়ন করেছেন, এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। এ হাদীসগুলোকে কেউ সরাতেও পারবে না এবং অস্বীকারও করতে পারবে না। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন আকাশ মেঘশূন্য ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তখন সূর্য ও চন্দ্রকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট ও অসুবিধা হয় কি?” উত্তরে তারা বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “এভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে।”সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেই হযরত জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চন্দ্রকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সুতরাং তোমরা সক্ষম হলে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ ফজরের নামাযে) এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বের নামাযে (অর্থাৎ আসরের নামাযে) কোন প্রকার অবহেলা করো না।এই বিশুদ্ধ কিতাব দু’টিতেই হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের, তথাকার পাত্র এবং প্রত্যেক জিনিসই স্বর্ণ নির্মিত, আর দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের, তথাকার পাত্র, বাসন এবং সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত। এই জান্নাতগুলোর অধিবাসীদের এবং আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চাদর ছাড়া আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এটা জান্নাতে আদনের বর্ণনা।” সহীহ মুসলিমে হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের জন্যে আমি আরো কিছু বৃদ্ধি করে দিই তা তোমরা চাও কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আপনি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেছেন, আমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন। সুতরাং আমাদের আর কোন্ জিনিসের প্রয়োজন থাকতে পারে?” তৎক্ষণাৎ পর্দা সরে যাবে। তখন ঐ জান্নাতীদের দৃষ্টি তাদের প্রতিপালকের প্রতি পতিত হবে এবং তাতে তারা যে আনন্দ ও মজা পাবে তা অন্য কিছুতেই পাবে না। এই দীদারে বারী তা’আলাই হবে তাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এটাকেই (আরবি) বলা হয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে রয়েছে জান্নাত এবং তারা মহান আল্লাহ্‌ দীদার বা দর্শনও লাভ করবে।” (১০:২৬) সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের ময়দানে মুমিনদের উপর হাসিযুক্ত তাজাল্লী নিক্ষেপ করবেন।এসব হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মুমিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাকের দীদার বা দর্শন লাভে ধন্য হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতী তার রাজ্য ও রাজত্ব দু'হাজার বছর দেখতে থাকবে। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী বস্তু সমান দৃষ্টির মধ্যে থাকবে। সব জায়গাতেই তারই স্ত্রী ও খাদেম দেখতে পাবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতী প্রত্যহ দুই বার করে আল্লাহ্ পাকের চেহারা অবলোকন করবে। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযীতেও রয়েছে। আমরা ভয় করছি যে, যদি এই প্রকারের সমস্ত হাদীস ও রিওয়াইয়াত এবং এগুলোর সনদসমূহ ও বিভিন্ন শব্দ এখানে জমা করি তবে বিষয় খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। বহু সহীহ ও হাসান হাদীস, বহু সনদ অন্যান্য সুনানের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমাদের এই তাফসীরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসেও গেছে। অবশ্য তাওফীক প্রদানের মালিক একমাত্র আল্লাহ)আল্লাহর শুকর যে, এই মাসআলায় অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার দীদার কিয়ামতের দিন মুমিনদের লাভ হওয়া সম্পর্কে সাহাবা, তাবেঈন এবং পূর্বযুগীয় গুরুজনদের ইত্তেফাক ও ইজমা রয়েছে। ইসলামের ইমামগণ ও মানব জাতির হাদীগণও এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। যারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত রাশিকে দেখা বুঝানো হয়েছে, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আবূ সালিহ্ (রঃ) হতে তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের এ উক্তি সত্য হতে বহু দূরে এবং এটা কৃত্রিমতাপূর্ণ। তাঁদের কাছে এ আয়াতের জবাব কোথায়? যেখানে পাপীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “কখনই (তাদের ধারণা সত্য) নয়, নিশ্চয়ই সেই দিন তাদের প্রতিপালক হতে তাদেরকে পর্দার মধ্যে রেখে দেয়া হবে (অর্থাৎ তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হবে)।” (৮৩:১৫) হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, পাপী ও অপরাধীদের দীদারে ইলাহী হতে বঞ্চিত হওয়া দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সৎ লোকেরা দীদারে ইলাহী লাভ করে ধন্য হবে। মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং (আরবি)-এ আয়াতের শব্দের ধারাও এটাই প্রমাণ করছে যে, মুমিনরা মহান প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কতকগুলো চেহারা সেদিন অতি সুন্দর দেখাবে। কেননা, দীদারে রবের উপর তাদের দৃষ্টি পড়তে থাকবে, তাহলে কেন তাদের চেহারা সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে না? পক্ষান্তরে, বহু মুখমণ্ডল সেদিন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, এই আশংকায় যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় আসন্ন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হবে যে, সত্বরই তাঁদের উপর আল্লাহর পাকড়াও আসছে এবং অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন কতক মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কতক মুখ কালো হবে।” (৩:১০৬) মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিগুলোও অনুরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল। আর বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফির ও পাপাচারী।” (৮০:৩৮-৪২)মহিমান্বিত আল্লাহর এ উক্তিগুলোও ঐ রূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল অবনত, ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। তাদেরকে অত্যুষ্ণ প্রস্রবণ হতে পান করানো হবে। তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী’ (এক প্রকার কন্টকময় গুল) ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে না। বহু মুখমণ্ডল সেই নি হবে আনন্দোজ্জ্বল, নিজেদের কর্ম-সাফল্যে পরিতৃপ্ত, সুমহান জান্নাতে।” (৮৮:২-১০) এই বিষয়েরই আরো বহু আয়াত রয়েছে।