Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আত-তাকাসুর 102:1 – আল-ফীল 105:5

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আত-তাকাসুর 102:1
  2. আত-তাকাসুর 102:2
  3. আত-তাকাসুর 102:3
  4. আত-তাকাসুর 102:4
  5. আত-তাকাসুর 102:5
  6. আত-তাকাসুর 102:6
  7. আত-তাকাসুর 102:7
  8. আত-তাকাসুর 102:8
  9. আল-আসর 103:1
  10. আল-আসর 103:2
  11. আল-আসর 103:3
  12. আল-হুমাযা 104:1
  13. আল-হুমাযা 104:2
  14. আল-হুমাযা 104:3
  15. আল-হুমাযা 104:4
  16. আল-হুমাযা 104:5
  17. আল-হুমাযা 104:6
  18. আল-হুমাযা 104:7
  19. আল-হুমাযা 104:8
  20. আল-হুমাযা 104:9
  21. আল-ফীল 105:1
  22. আল-ফীল 105:2
  23. আল-ফীল 105:3
  24. আল-ফীল 105:4
  25. আল-ফীল 105:5

আত-তাকাসুর 102:1

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:2

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:3

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:4

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:5

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:6

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:7

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আত-তাকাসুর 102:8

১-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এবং মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ উদাসীনতা অক্ষুন্ন থেকেছে!”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম,(আরবি) (অর্থাৎ বানী আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে) এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় (আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি যখন নবী করীম (সঃ)-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “বানী আদম বলছেঃ আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছে। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ (রঃ)]সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছেঃ “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্যে রেখে চলে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিষ যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (ওগুলো হলো) আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুটি জিনিস তার সাথে অবশিষ্ট থেকে যায়, লোভ ও আকাঙখা।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)হযরত যহহাক (রঃ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ “আমার।” তখন হযরত যহহাক (রঃ)তাকে বললেনঃ “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।” অতঃপর তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নের কবিতাংশটি পাঠ করেন। (আরবি) অর্থাৎ “যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) রুকে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐমাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দুটি গোত্র বানূ হারিসাহ্ এবং বানূ হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলেঃ দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলেঃ চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে বলতে শুরু করেঃ বলতো, এর মত তোমাদের মধ্যে কেউ কি ছিল? মৃত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে নিয়ে তারা নানা অপবাদ দিতে থাকে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করে। আল্লাহ তায়ালা তখন এ সূরার প্রথম দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, এমন কি তোমরা কবরে উপনীত হও। অর্থাৎ কবরে উপনীত হয়ে নিজেদের সর্দারদের ব্যাপারেও গর্ব করতে থাকো। অথচ তোমাদের উচিত ছিল সেখানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ব পুরুষদের মরে যাওয়া ও পচে গলে যাওয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের পরিণতি চিন্তা করা উচিত ছিল।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহংকার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে। সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বেদুইনের মৃত্যুকালে তার পরিচর্যার জন্যে হাজির হলেন এবং যথা অভ্যাস বললেনঃ “কোন ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ তুমি গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” লোকটি তখন বললোঃ আপনি পবিত্রতা লাভ করার কথা বলছেন, কিন্তু এটা এমন জ্বর যার প্রকোপ বড়দেরকেও ঘায়েল করে ফেলে এবং কবরে পৌছিয়ে দেয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে তোমার কথাই ঠিক।” এ হাদীসেও (আরবি) শব্দ রয়েছে। আলোচ্য সূরাতেও (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করে কবরে উপনীত হওয়া। জামে তিরমিযীতে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্ধিহানই ছিলাম।” (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে মায়মূন ইবনে মিহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উমর ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি (আরবি)এই আয়াত পাঠ করেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনঃ “হে মায়মূন (রঃ)! কবরসমূহ দেখার উদ্দেশ্য হলো যিয়ারত করা, প্রত্যেক যিয়ারতকারী নিজের জায়গায় ফিরে যায়। অর্থাৎ হয়তো জাহান্নামের দিকে যায়, না হয় জান্নাতের দিকে যায়।” একজন বেদুইন এক ব্যক্তির মুখে এ আয়াত দু’টি শুনে বলেছিলঃ “আসল বাসস্থান তো অন্যত্রই বটে।”এরপর আল্লাহ্ তা'আলা হুমকির সুরে দু'দুবার বলেনঃ কখনো নয়, শ্রীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলিঃ কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। এ অর্থও করা হয়েছে যে, প্রথমবার কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়বার মু'মিনদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।তারপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হতে তবে এরূপ দাম্ভিকতার মধ্যে পতিত থাকতে না। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের শেষ মনযিল আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকতে না। এরপর প্রথমোক্ত বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেছেনঃ তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই। সেই জাহান্নামের ভয়াবহতা এক নযর দেখেই ভয়ে-ভীতিতে অন্যেরা তো বটেই, আম্বিয়ায়ে কিরামও হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন। ওর কাঠিন্য ও ভীতি প্রত্যেকের অন্তরে ছেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে বহু হাদীসে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরপর অবশ্যই সেইদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিহ্যাক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর (রাঃ)ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “যে কারণ আপনাদের দুজনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম (রাঃ) নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশী পরিমানে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোন জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আওয়ায আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশী বেশী পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উম্মে হায়সাম (রাঃ)-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবু হায়সাম (রাঃ) কোথায়?” উম্মে হায়সাম (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুণি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম (রাঃ) ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতিমধ্যে আবু হায়সামও (রাঃ) এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোন সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভাল ভাল খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।” এ ধারায় এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃহযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এসেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ “এখানে বসে আছ কেন?” উত্তরে তাঁরা বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে।” তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ দুই সাহাবী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার স্বামী কোথায়?” মহিলা উত্তরে বললেনঃ “তিনি আমাদের জন্যে মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে এসেই পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ “আমার বাড়িতে আজ আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই।” পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তা তাযা খেজুরের কাদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ বেছে বেছে আনলেই তো হতো?” আনসারী বললেনঃ “ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর (একটা বকরী বা মেষ যবাহ করার জন্যে) আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখো, দুগ্ধবতী (কোন বকরী বা মেষ) যবাহ করো না।” অতঃপর আনসারী তাঁদের জন্যে (কিছু একটা) যবাহ করলেন এবং তারা সেখানে আহার করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “দেখো, ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমরা ঘর থেকে বেরিয়েছিলে, অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছ। এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আযাদকৃত দাস হযরত আবূ উসায়েব (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে আমাকে ডাক দেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাদেরকেও ডেকে নেন। তারপর এক আনসারীর বাগানে গিয়ে বললেনঃ “দাও ভাই, খেতে দাও।” আনসারী তখন এক গুচ্ছ আঙ্গুর এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং সঙ্গীরা তা ভক্ষণ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারীকে বললেনঃ “ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।” আনসারী পানি এনে দিলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পান করলেন। তারপর নবীকরীম (সঃ) বললেনঃ “কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খেজুর গুচ্ছ উঠিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেনঃ “এ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হতে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা। তবে তিনটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তা হলো সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী খাদ্য এবং শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযোগী গৃহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) খেজুর ভক্ষণ করেন ও পানি পান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই নিয়ামত সম্বন্ধে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে এটা পাঠ করে শুনান। যখন তিনি(আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন নিয়ামত সম্বন্ধে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? খেজুর খাচ্ছি, পানি পান করছি, ঘাড়ের উপর তরবারী ঝুলছে, শত্রু শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং আমরা কোন নিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হববা?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ভয় করো না, শীঘ্রই নিয়ামত এসে পৌঁছবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এর হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) মুআয ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর চাচা) বলেনঃ “আমরা এক মজলিসে বসেছিলাম এমন সময় নবী করীম (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তাঁর মাথায় পানির চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল (তিনি গোসল করে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল)। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনাকে তো বেশ আনন্দিত চিত্ত মনে হচ্ছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাই।” তারপর “গিনা বা ধন ঐশ্বর্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যার অন্তরে আল্লাহ ভীতি রয়েছে তার জন্যে “গিনা বা ধন সম্পদ খারাপ জিনিষ নয়। মনে রেখো, পরহেযগার ব্যক্তির জন্যে সুস্থতা গিনার চেয়েও উত্তম। আনন্দ চিত্ততাও আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “নিয়ামতের প্রশ্নে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে বলা হবেঃ “আমি কি তোমাকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করিনি? ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তোমাকে কি পরিতৃপ্ত করিনি?” হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি এমন নিয়ামত ভোগ করছি যে, সে সম্বন্ধে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে? আমরা তো যবের রুটি ভক্ষণ করছি, (তাও পেট পুরে নয়, বরং) অর্ধভুক্ত থেকে যাচ্ছি?” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ) এর কাছে অহী পাঠালেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা কি (পায়ের আরামের জন্যে) জুতা পরিধান কর না এবং (তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে) ঠাণ্ডা পানি পান কর না? এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) করেছেন) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পেট পুরে আহার করা, ঠাণ্ডা পানি পান করা ছায়াদানকারী ঘরে বাস করা, আরামদায়ক ঘুম যাওয়া, আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করা, এমনকি মধু পান করা, সকাল বিকাল আহার করা, ঘি, মধু, ময়দার রুটি ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ শারীরিক সুস্থতা, কান চোখের সুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেঃ তোমরা এ সবকে কি কাজে ব্যবহার করেছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় ওগুলোর প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)।সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“দু'টি নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ খুবই উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। ও দু'টি নিয়ামত হলো স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা।” অর্থাৎ মানুষ এ দুটোর পূর্ণ কৃতজ্ঞতা ও প্রকাশ করে না এবং এদুটোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অবগত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এ দুটি ব্যয় করে না। উল্লেখ্য যে, সম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী পোশাক, ক্ষুধা নিবৃত্তির উপযোগী আহার এবং শীত গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার গহ ছাড়া অন্য সবকিছু সম্পর্কেই কিয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উষ্ট্রে আরোহণ করিয়েছি, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি। তোমাকে হাসি খুশীভাবে আনন্দ উজ্জ্বল জীবন যাপনের। সুযোগ দিয়েছি। এবার বল তো, এগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোথায়?”

আল-আসর 103:1

বর্ণিত আছে যে, হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) মুসলমান হওয়ার পূর্বে একবার মুসাইলামা কাযযাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সময় মুসাইলামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবী করেছিল। হযরত আমর (রাঃ)-কে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ “এখন কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কোন অহী অবতীর্ণ হয়েছে?” হযরত আমর (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “একটি সংক্ষিপ্ত, অলংকার পূর্ণ সূরা নাযিল হয়েছে।মুসাইলামা জিজ্ঞেস করলোঃ “সেটি কি?” হযরত আমর (রাঃ) তখন (আরবি) সূরাটি পাঠ করে শুনালেন। মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললোঃ “জেনে রেখো, আমার উপরও এরকম সূরা নাযিল হয়েছে। হযরত আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সেটি কি?” সে তখন বললোঃ (আরবি) তারপর জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আমর (রাঃ)! বল, তোমার অভিমত কি?” তখন হযরত আমর (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তো নিজেই জান যে, তোমার মিথ্যা ও ভণ্ডামী সম্পর্কে আমি অবহিত রয়েছি।” হলো বিড়ালের মত আকৃতি বিশিষ্ট একটা পশু। তার কান দুটি ও বুক কিছুটা প্রশস্ত ও বড়। দেহের অন্যান্য অংশ খুবই নিকৃষ্ট ও বাজে। ভণ্ড, দুবৃত্ত ও মিথ্যাবাদী মুসাইলামা এ রকম বাজে কথাকে আল্লাহ পাকের পবিত্র কালামের সাথে তুলনা করতে চেয়েছিল। তার এ ধরনের ঘৃণ্য ভণ্ডামী দেখে আরবের মূর্তি পূজকরাও তাকে মিথ্যাবাদী এবং ফালতু বলে সহজেই বুঝে নিয়েছিল। দু’জন সাহাবীর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তাঁদের পরস্পর সাক্ষাৎ হতো তখন একজন এ সূরাটি পড়তেন এবং অপরজন শুনতেন। তারপর পরস্পর সালাম বিনিময় করে বিদায় নিতেন।হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এই একটি মাত্র সুরা চিন্তা ভাবনা ও মনোযোগের সাথে পাঠ করে এবং অনুধাবন করে তবে এই একটি সূরাই যথেষ্ট।১-৩ নং আয়াতের তাফসীর‘আসর এর অর্থ হলো কাল বা সময়, যেই কাল বা সময়ে মানুষ পাপ পূণ্যের কাজ করে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, আসর এর অর্থ হলো আসরের নামায বা আসরের নামাযের সময়। কিন্তু প্রথমোক্ত উক্তিটিই মাশহুর বা প্রসিদ্ধ। এই কসমের পর আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও ভাল কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় অর্থাৎ নিজে সৎকাজ করে ও অন্যকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, আর বিপদে-আপদে নিজে ধৈর্য ধারণ করে ও অন্যকেও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, জনগণ কষ্ট দিলে ক্ষমার মাধ্যমে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে যে বাধাবিঘ্ন ও বিপদের সম্মুখীন হয় তাতেও ধৈর্য ধারণ করে, তারা এই সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সৌভাগ্যের অধিকারী।

আল-আসর 103:2

বর্ণিত আছে যে, হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) মুসলমান হওয়ার পূর্বে একবার মুসাইলামা কাযযাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সময় মুসাইলামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবী করেছিল। হযরত আমর (রাঃ)-কে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ “এখন কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কোন অহী অবতীর্ণ হয়েছে?” হযরত আমর (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “একটি সংক্ষিপ্ত, অলংকার পূর্ণ সূরা নাযিল হয়েছে।মুসাইলামা জিজ্ঞেস করলোঃ “সেটি কি?” হযরত আমর (রাঃ) তখন (আরবি) সূরাটি পাঠ করে শুনালেন। মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললোঃ “জেনে রেখো, আমার উপরও এরকম সূরা নাযিল হয়েছে। হযরত আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সেটি কি?” সে তখন বললোঃ (আরবি) তারপর জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আমর (রাঃ)! বল, তোমার অভিমত কি?” তখন হযরত আমর (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তো নিজেই জান যে, তোমার মিথ্যা ও ভণ্ডামী সম্পর্কে আমি অবহিত রয়েছি।” হলো বিড়ালের মত আকৃতি বিশিষ্ট একটা পশু। তার কান দুটি ও বুক কিছুটা প্রশস্ত ও বড়। দেহের অন্যান্য অংশ খুবই নিকৃষ্ট ও বাজে। ভণ্ড, দুবৃত্ত ও মিথ্যাবাদী মুসাইলামা এ রকম বাজে কথাকে আল্লাহ পাকের পবিত্র কালামের সাথে তুলনা করতে চেয়েছিল। তার এ ধরনের ঘৃণ্য ভণ্ডামী দেখে আরবের মূর্তি পূজকরাও তাকে মিথ্যাবাদী এবং ফালতু বলে সহজেই বুঝে নিয়েছিল। দু’জন সাহাবীর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তাঁদের পরস্পর সাক্ষাৎ হতো তখন একজন এ সূরাটি পড়তেন এবং অপরজন শুনতেন। তারপর পরস্পর সালাম বিনিময় করে বিদায় নিতেন।হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এই একটি মাত্র সুরা চিন্তা ভাবনা ও মনোযোগের সাথে পাঠ করে এবং অনুধাবন করে তবে এই একটি সূরাই যথেষ্ট।১-৩ নং আয়াতের তাফসীর‘আসর এর অর্থ হলো কাল বা সময়, যেই কাল বা সময়ে মানুষ পাপ পূণ্যের কাজ করে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, আসর এর অর্থ হলো আসরের নামায বা আসরের নামাযের সময়। কিন্তু প্রথমোক্ত উক্তিটিই মাশহুর বা প্রসিদ্ধ। এই কসমের পর আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও ভাল কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় অর্থাৎ নিজে সৎকাজ করে ও অন্যকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, আর বিপদে-আপদে নিজে ধৈর্য ধারণ করে ও অন্যকেও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, জনগণ কষ্ট দিলে ক্ষমার মাধ্যমে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে যে বাধাবিঘ্ন ও বিপদের সম্মুখীন হয় তাতেও ধৈর্য ধারণ করে, তারা এই সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সৌভাগ্যের অধিকারী।

আল-আসর 103:3

বর্ণিত আছে যে, হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) মুসলমান হওয়ার পূর্বে একবার মুসাইলামা কাযযাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সময় মুসাইলামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবী করেছিল। হযরত আমর (রাঃ)-কে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ “এখন কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কোন অহী অবতীর্ণ হয়েছে?” হযরত আমর (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “একটি সংক্ষিপ্ত, অলংকার পূর্ণ সূরা নাযিল হয়েছে।মুসাইলামা জিজ্ঞেস করলোঃ “সেটি কি?” হযরত আমর (রাঃ) তখন (আরবি) সূরাটি পাঠ করে শুনালেন। মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললোঃ “জেনে রেখো, আমার উপরও এরকম সূরা নাযিল হয়েছে। হযরত আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সেটি কি?” সে তখন বললোঃ (আরবি) তারপর জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আমর (রাঃ)! বল, তোমার অভিমত কি?” তখন হযরত আমর (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তো নিজেই জান যে, তোমার মিথ্যা ও ভণ্ডামী সম্পর্কে আমি অবহিত রয়েছি।” হলো বিড়ালের মত আকৃতি বিশিষ্ট একটা পশু। তার কান দুটি ও বুক কিছুটা প্রশস্ত ও বড়। দেহের অন্যান্য অংশ খুবই নিকৃষ্ট ও বাজে। ভণ্ড, দুবৃত্ত ও মিথ্যাবাদী মুসাইলামা এ রকম বাজে কথাকে আল্লাহ পাকের পবিত্র কালামের সাথে তুলনা করতে চেয়েছিল। তার এ ধরনের ঘৃণ্য ভণ্ডামী দেখে আরবের মূর্তি পূজকরাও তাকে মিথ্যাবাদী এবং ফালতু বলে সহজেই বুঝে নিয়েছিল। দু’জন সাহাবীর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তাঁদের পরস্পর সাক্ষাৎ হতো তখন একজন এ সূরাটি পড়তেন এবং অপরজন শুনতেন। তারপর পরস্পর সালাম বিনিময় করে বিদায় নিতেন।হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এই একটি মাত্র সুরা চিন্তা ভাবনা ও মনোযোগের সাথে পাঠ করে এবং অনুধাবন করে তবে এই একটি সূরাই যথেষ্ট।১-৩ নং আয়াতের তাফসীর‘আসর এর অর্থ হলো কাল বা সময়, যেই কাল বা সময়ে মানুষ পাপ পূণ্যের কাজ করে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, আসর এর অর্থ হলো আসরের নামায বা আসরের নামাযের সময়। কিন্তু প্রথমোক্ত উক্তিটিই মাশহুর বা প্রসিদ্ধ। এই কসমের পর আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও ভাল কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় অর্থাৎ নিজে সৎকাজ করে ও অন্যকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, আর বিপদে-আপদে নিজে ধৈর্য ধারণ করে ও অন্যকেও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, জনগণ কষ্ট দিলে ক্ষমার মাধ্যমে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে যে বাধাবিঘ্ন ও বিপদের সম্মুখীন হয় তাতেও ধৈর্য ধারণ করে, তারা এই সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সৌভাগ্যের অধিকারী।

আল-হুমাযা 104:1

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:2

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:3

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:4

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:5

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:6

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:7

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:8

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-হুমাযা 104:9

১-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।

আল-ফীল 105:1

১-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা যে কুরায়েশের উপর বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন, * এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যে বাহিনী হস্তী সঙ্গে নিয়ে কাবা গৃহ ধ্বংস করার জন্যে অভিযান চালিয়েছিল। তারা কাবা গৃহের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা নাম ও নিশানা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সর্বপ্রকারের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। বাহ্যতঃ তারা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে তারা বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা প্রায় সবাই মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের অশুভ উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মূলতঃ মহানবীর (সঃ) পূর্বাভাষ এবং তাঁর আগমনী সংবাদ। সেই বছরই তাঁর জন্ম হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ হে কুরায়েশের দল! আবিসিনিয়ার (হাবশের) ঐ বাহিনীর উপর আমি • তোমাদেরকে বিজয় দান করেছি, তাতে তোমাদের কল্যাণ সাধন আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নিজের গৃহ রক্ষার জন্যেই ঐ বিজয় দান করেছি। আমার প্রেরিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াতের মাধ্যমে সেই গৃহকে আমি আরো অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবো। মোটকথা, আসহাবে ফীল বা হস্তী অধিপতিদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এটাই যা বর্ণনা করা হলো। বিস্তারিত বর্ণনা (আরবি) এর বর্ণনায় গত হয়েছে যে, হুমায়ের গোত্রের শেষ বাদশাহ নূনুয়াম, যে ছিল মুশরিক, তার সময়ের মুসলমানদেরকে পরিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল। ঐ সব মুসলমান ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী। তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। তাঁদের সবাইকে শহীদ করে দেয়া হয়েছিল। দাউস যু সালাবান নামক একটি মাত্র লোক বেঁচেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় পৌছে রোমের বাদশাহ কায়সারের কাছে ফরিয়াদ করলেন। কায়সার। ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তিনি হাবশের (আবিসিনিয়ার) বাদশাহ নাজাশীকে লিখলেনঃ “দাউস যু সালাবানের সঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠিয়ে দিন। সেখান থেকে শক্রদেশ নিকটবতী ছিল। বাদশাহ নাজাশী আমীর ইবনে ইরবাত ও আবরাহা ইবনে সাহাব আবু ইয়াকসুমকে সৈন্য পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব দিয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী যুনুয়াসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল ইয়ামনে পৌঁছলো এবং ইয়ামন ও তথাকার অধিবাসীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। শূনুয়াস পালিয়ে গেল এবং সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলো। যুনুয়াসের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র ইয়ামন হাবশের বাদশাহর কর্তৃত্বে চলে গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ হিসেবে আগমনকারী উভয় সর্দার ইয়ামনে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে নিজ নিজ বিভক্ত সৈন্যদলসহ মুখোমুখী সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তত হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে উভয় সর্দার পরস্পরকে বললোঃ অযথা রক্তপাত করে কি লাভ, চলো আমরা উভয়ে লড়াই করি। যে বেঁচে যাবে, ইয়ামন এবং সেনাবাহিনী তার অনুগত থাকবে।” এই কথা অনুযায়ী উভয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলো। আমীর ইবনে ইরবাত আবরাহার উপর আক্রমণ করলো এবং তরবারীর এক আঘাতে তার চেহারা রক্তাক্ত করে ফেললো। নাক, ঠোট এবং চেহারার বেশ কিছু অংশ কেটে গেল। এই অবস্থা দেখে আবরাহার ক্রীতদাস আদাহ্ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরবাতকে হত্যা করে ফেললো। মারাত্মকভাবে আহত আবরাহা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন চিকিৎসার পর তার ক্ষত ভাল হলো এবং সে ইয়ামনের শাসনকর্তা হয়ে বসলো। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী এ খবর পেয়ে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং একপত্রে জানালেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার শহরসমূহ ধ্বংস করবো এবং তোমার টিকি কেটে আনবো।” আবরাহা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ পত্রের জবাব লিখলো এবং দূতকে নানা প্রকারের উপটৌকন, একটা থলের মধ্যে ইয়ামনের মাটি এবং নিজের মাথার কিছু চুল কেটে ওর মধ্যে রাখলো ও ওর মুখ বন্ধ করে দিলো। তাছাড়া চিঠিতে সে নিজের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে লিখলোঃ “ইয়ামনে মাটি এবং আমার মাথার চুল হাযির রয়েছে, আপনি নিজের কসম পূর্ণ করুন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন!" এতে নাজাশী খুশী হলেন এবং ইয়ামনের শাসনভার আবরাহাকে লিখে দিলেন। তারপর আবরাহা নাজাশীকে লিখলোঃ “আমি ইয়ামনে আপনার জন্যে এমন একটি গীর্জা তৈরি করছি যে, এরকম গীর্জা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে কখনো তৈরি হয়নি। অতি যত্ন সহকারে খুবই মযবুত ও অতি উঁচু করে ঐ গীর্জাটি নির্মিত হলো। ঐ গীর্জার চূড়া এতো উঁচু ছিল যে, চূড়ার প্রতি টুপি মাথায় দিয়ে তাকালে মাথার টুপি পড়ে যেতো। আরববাসীরা ঐ গীর্জার নাম দিয়েছিল কালীস' অর্থাৎ টুপি ফেলে দেয়া গীর্জা। এবার আবরাহা মনে করলো যে, জনসাধারণ কা’বায় হজ্ব না করে বরং এ গীর্জায় এসে হজ্ব করবে। সারাদেশে সে এটা ঘোষণা করে দিলো। আদনানিয়্যাহ ও কাহতা নিয়্যাহ গোত্র এ ঘোষণায় খুবই অসন্তুষ্ট, আর কুরায়েশরা ভীষণ রাগান্বিত হলো। অল্প কয়েকদিন পরে দেখা গেল যে, এক ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে ঐ গীর্জায় প্রবেশ করে পায়খানা করে এসেছে। প্রহরীরা পরের দিন এ অবস্থা দেখে বাদশাহর কাছে খবর পাঠালো এবং অভিমত ব্যক্ত করলো যে, কুরায়েশরাই এ কাজ করেছে। তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে বলেই এ কাণ্ড তারা করেছে। আবরাহা তৎক্ষণাৎ কসম করে বললোঃ “আমি মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি ইট পর্যন্ত খুলে ফেলবো।”অন্য এক বর্ণনায় এরূপও আছে যে, কয়েকজন উদ্যোগী কুরায়েশ যুবক ঐ গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বাতাস প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়েছিল বলে আগুন ভালভাবে ঐ গীর্জাকে গ্রাস করেছিল এবং ওটা মাটিতে ধ্বসে পড়েছিল। অতঃপর ক্রুদ্ধ আবরাহা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো। তাদের সাথে এক বিরাট উঁচু ও মোটা হাতী ছিল। ঐরূপ হাতী ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। হাতীটির নাম ছিল মাহমুদ। বাদশাহ নাজাশী মক্কা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে ঐ হাতিটি আবরাহাকে দিয়েছিল। ঐ হাতীর সাথে আবরাহা আরো আটটি অথবা বারোটি হাতী নিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে বায়তুল্লাহর দেয়ালে শিকল বেঁধে দিবে, তারপর সমস্ত হাতীর গলায় ঐ শিকল লাগিয়ে দিবে। এতে শিকল টেনে হাতীগুলো সমস্ত দেয়াল একত্রে ধ্বসিয়ে দিবে। মক্কার অধিবাসীরা এ সংবাদ পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লো। যে কোন অবস্থায় এর মুকাবিলা করার তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। যুনফর নামক ইয়ামনের একজন রাজ বংশীয় লোক নিজের গোত্র ও আশে পাশের বহু সংখ্যক আরবকে একত্রিত করে দুবৃত্ত আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছা। ছিল অন্যরকম। যুনফর পরাজিত হলেন এবং আবরাহার হাতে বন্দী হলেন। যুনফরকেও সঙ্গে নিয়ে আবরাহা মক্কার পথে অগ্রসর হলো। খাশআম গোত্রের এলাকায় পৌঁছার পর নুফায়েল ইবনে হাবীব আশআমী একদল সৈন্য নিয়ে আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরাই আবরাহার হাতে পরাজয় বরণ করলেন। নুফায়েলকেও যুনফরের মত বন্দী করা হলো। আবরাহা প্রথম নুফায়েলকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু পরে মক্কার পথ দেখিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে নিয়ে চললো। তায়েফের উপকণ্ঠে পৌঁছলে সাকীফ গোত্র আবরাহার সাথে সন্ধি করলো যে, লাত মূর্তিটি যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে, আবরাহার সৈন্যরা ঐ প্রকোষ্ঠের কোন ক্ষতি সাধন করবে না। সাকীফ গোত্র আবু রিগাল নামক একজন লোককে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্যে আবরাহার সঙ্গে দিলো। মক্কার কাছে মুগমাস নামক স্থানে তারা অবস্থান করলো। আবরাহার সৈন্যেরা আশেপাশের জনপদ এবং চারণভূমি থেকে বহু সংখ্যক উট এবং অন্যান্য পশু দখল করে নিলো। এগুলোর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উটও ছিল। এতে আরবের কবিরা আবরাহার নিন্দে করে কবিতা রচনা করলো সীরাতে ইবনে ইসহাকে ঐ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।অতঃপর আবরাহা নিজের বিশেষ দূত হানাতাহ হুমাইরীকে বললোঃ তুমি মক্কার সর্বাপেক্ষা বড় সর্দারকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। এবং ঘোষণা করে দাওঃ আমরা মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি, আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। তবে হ্যা, মক্কাবাসীরা যদি কাবাগৃহ রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসে এবং আমাদেরকে বাধা দেয় তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হানাতাহ মক্কার জনগণের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেমই মক্কার বড় নেতা। হানাতাহ আবদুল মুত্তালিবের সামনে আবরাহার বক্তব্য পেশ করলে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাও নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও নেই।” আল্লাহর সম্মানিত ঘর। তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন্ত স্মৃতি। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজের ঘরের হিফাজত নিজেই করবেন। অন্যথায় তাঁর ঘরকে রক্ষা করার সাহসও আমাদের নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও আমাদের নেই।হানাতাহ তখন তাকে বললোঃ “ঠিক আছে, আপনি আমাদের বাদশাহর কাছে চলুন।” আবদুল মুত্তালিব তখন তার সাথে আবরাহার কাছে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শণ বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তাঁকে দেখা মাত্র যে কোন মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। আবরাহা তাকে দেখেই সিংহাসন থেকে নেমে এলো এবং তার সাথে মেঝেতে উপবেশন করলোঃ সে তার দোভাষীকে বললোঃ তাকে জিজ্ঞেস করঃ তিনি কি চান? আবদুল মুত্তালিব জানালেনঃ “বাদশাহ আমার দু’শ উট লুট করিয়েছেন। আমি সেই উট ফেরত নিতে এসেছি।” বাদশাহ আবরাহা তখন দো-ভাষীর মাধ্যমে তাঁকে বললোঃ প্রথম দৃষ্টিতে আপনি যে শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন, আপনার কথা শুনে সে শ্রদ্ধা লোপ পেয়ে গেছে। নিজের দু’শ উটের। জন্যে আপনার এতো চিন্তা অথচ স্বজাতির ধর্মের জন্যে কোন চিন্তা নেই! আমি আপনাদের ইবাদতখানা কা’বা ধ্বংস করে ধূলিসাৎ করতে এসেছি।" একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জবাবে বললেনঃ “শুন, উটের মালিক আমি, তাই উট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে এসেছি। আর কাবাগৃহের মালিক হলেন স্বয়ং আল্লাহ। সুতরাং তিনি নিজেই নিজের ঘর রক্ষা করবেন।” তখন ঐ নরাধম বললোঃ “আজ স্বয়ং আল্লাহও কাবাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না।” একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “তা আল্লাহ জানেন এবং আপনি জানেন।” এও বর্ণিত আছে যে, মক্কার জনগণ তাদের ধন সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আবরাহাকে দিতে চেয়েছিল, যাতে সে এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা হতে বিরত থাকে। কিন্তু আবরাহা তাতেও রাজী হয়নি। মোটকথা, আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন এবং মক্কাবাসীদেরকে বললেনঃ “তোমরা মক্কাকে সম্পূর্ণ খালি করে দাও। সবাই তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।” তারপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়েশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা গৃহে গিয়ে কাবার খুঁটি ধরে দেয়াল ছুঁয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন এবং কায়মনোবাক্যে ঐ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ গৃহ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করলেন। আবরাহা এবং তার রক্ত পিপাসু সৈন্যদের অপবিত্র ইচ্ছার কবল থেকে কাবাকে পবিত্র রাখার জন্যে আবদুল মুত্তালিব কবিতার ভাষায় নিম্নলিখিত দুআ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা নিশ্চিন্ত, কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক গৃহমালিক নিজেই নিজের গৃহের হিফাযত করেন। হে আল্লাহ! আপনিও আপনার গৃহ আপনার শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করুন। আপনার অস্ত্রের উপর তাদের অস্ত্র জয়যুক্ত হবে এমন যেন কিছুতেই না হয়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কা'বা গৃহের খুঁটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে ওর আশে পাশের পর্বতসমূহের চূড়ায় উঠে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, কুরবানীর একশত পশুকে নিশান লাগিয়ে কা'বার আশে পাশে ছেড়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি দুবৃত্তরা আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া পশুর প্রতি হাত বাড়ায় তাহলে আল্লাহর গযব তাদের উপর অবশ্যই নেমে আসবে।পরদিন প্রভাতে আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় প্রবেশের উদ্যোগ আয়োজন করলো। বিশেষ হাতী মাহমুদকে সজ্জিত করা হলো। পথে বন্দী হয়ে আবরাহার সাথে আগমনকারী নুফায়েল ইবনে হাবীব তখন মাহমুদ নামক হাতীটির কান ধরে বললেনঃ “মাহমুদ! তুমি বসে পড়, আর যেখান থেকে এসেছে সেখানে ভালভাবে ফিরে যাও। তুমি আল্লাহর পবিত্র শহরে রয়েছে।” একথা বলে নুফায়েল হাতির কান ছেড়ে দিলেন এবং ছুটে গিয়ে নিকট এক পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। মাহমুদ নামক হাতীটি নুফায়েলের কথা শোনার সাথে সাথে বসে পড়লো। বহুচেষ্টা করেও তাকে নড়ানো সম্ভব হলো না। পরীক্ষামূলক ভাবে ইয়ামনের দিকে তার মুখ ফিরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই হাতী তাড়াতাড়ি উঠে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। পূর্বদিকে চালাবার চেষ্টা করা হলে সেদিকেও যাচ্ছিল, কিন্তু মক্কা শরীফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চালাবার চেষ্টা করতেই বসে পড়লো। সৈন্যরা তখন হাতীটিকে প্রহার করতে শুরু করলো। এমন সময় দেখা গেল এক ঝাঁক পাখি কালো মেঘের মত হয়ে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসছে। চোখের পলকে ওগুলো আবরাহার সেনাবাহিনীর মাথার উপর এসে পড়লো। এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে। ফেললো। প্রত্যেক পাখির চঞ্চতে একটি এবং দুপায়ে দুটি কংকর ছিল। কংকরের ঐটুকরাগুলো ছিল মসুরের ডাল বা মাস কলাই এর সমান। পাখিগুলো কংকরের ঐ টুকরোগুলো আবরাহার সৈন্যদের প্রতি নিক্ষেপ করছিল। যার গায়ে ঐ কংকর পড়ছিল সেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভবলীলা সাঙ্গ করছিল। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল আর নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল কারণ তারা তাঁকেই পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে এনেছিল। নুফায়েল তখন পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করে অন্যান্য কুরায়েশদের সাথে আবরাহা ও তার সৈন্যদের দুরাবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঐ সময় নুফায়েল নিম্নলিখিত কবিতাংশ পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আর আশ্রয়স্থল কোথায়? স্বয়ং আল্লাহই তো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শোনো, দুবৃত্ত আশরম পরাজিত হয়েছে, জয়ী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুফায়েল আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হাতী ওয়ালাদের দুরাবস্থার সময়ে তুমি যদি উপস্থিত থাকতে! মুহাসসাব প্রান্তরে তাদের উপর আযাবের কংকর বর্ষিত হয়েছে। তুমি সে অবস্থা দেখলে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হতে। আমরা পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছিলাম। আমাদের হৃৎপিণ্ড কাঁপছিল এই ভয়ে যে, না জানি হয় তো আমাদের উপরও এই কংকর পড়ে যায় এবং আমাদেরও দফারফা করে দেয়। পুরো সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে পালাচ্ছিল ও নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল, যেন নুফায়েলের উপর হাবশীদের ঋণ রয়েছে।”ওয়াকেদী (রঃ) বলেন যে, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙএর। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। ওদের পায়ের রঙছিল লাল। অন্য এক রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, মাহমুদ নামক হাতীটি যখন বসে পড়লো এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। তখন সৈন্যরা অন্য একটি হাতীকে সামনের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে পা বাড়াতেই তার মাথায় কংকরের টুকরো পড়লো এবং আর্তনাদ করে পিছনে সরে এলো। অন্যান্য হাতীও তখন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করলো। কয়েকটির উপর কংকর পড়ায় তৎক্ষণাৎ ওগুলো মারা গেল। যারা ছুটে পালাচ্ছিল তাদেরও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। এবং অবশেষে সবগুলোই মারা গেল। আবরাহা বাদশাহও ছুটে পালালো, কিন্তু তারও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। সানআ (তৎকালীন ইয়ামনের রাজধানী) নামক শহরে পৌঁছার পর সে মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো এবং কুকুরের মত ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করলো। তার কলেজা ফেটে গিয়েছিল। কুরায়েশরা প্রচুর ধন সম্পদ পেয়ে গিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব তো সোনা সংগ্রহ করে করে একটি কূপ ভর্তি করেছিলেন। ঐ বছরই সারা দেশে প্রথম ওলা ওঠা এবং প্লেগ রোগ দেখা দেয়। হরল, হান্যাল প্রভৃতি কটুগাছও ঐ বছর উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর ভাষায় এ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এবং যেন বলছেনঃ যদি তোমরা আমার ঘরের সম্মান এভাবে করতে থাকতে এবং আমার রাসূল (সঃ)-এর কথা মানতে তবে আমিও সেভাবে তোমাদের হিফাযত করতাম এবং শত্রু দল থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিতাম। (আরবি) শব্দটি বহুবচন, এর একবচন আরবী অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খুবই কঠিন বা শক্ত। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) শব্দ দুটি ফারসী শব্দ। (আরবি) এর অর্থ হলো প্রস্তর সমন্বিত মৃত্তিকা। (আরবি) শব্দটি শব্দের (আরবি) বহুবচন।(আরবি) মাঠের ফসলের ঐ সব পাতাকে বলা হয় যেগুলো এখনো পাকেনি। (আরবি) এর অর্থ হলো ঝাক ঝক পাখী, বহুসংখ্যক এবং ক্রমাগত আগমনকারী। কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মত এবং নখ ছিল কুকুরের মত।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সবুজ রঙ-এর এই পাখিগুলো সমুদ্র হতে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মত। এ সম্পর্কে আরো বহু উক্তি রয়েছে। পাখির ঝাঁক আবরাহার সৈন্যদের মাথার উপর অবস্থান করে চীৎকার করছিল এবং কংকর নিক্ষেপ করছিল। যার মাথায় ঐ কংকর পড়ছিল তা তার পায়খানার দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রবল বাতাস বইতে লাগলো। এর ফলে আশে পাশের বালুকণা এসে তাদের চোখে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদেরকে ঘায়েল করে ফেললো।(আরবি) এর অর্থ হলো ভূষি এবং (আরবি) অর্থহলো ভক্ষিত বা টুকরো টুকরো কৃত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শস্যদানার উপরের ভূষিকে (আরবি) বলা হয়। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ক্ষেতের শস্যের ঐ পাতা যেগুলো পশুরা খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তছনছ করে দিলেন এবং সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন। তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কোন কল্যাণই তারা লাভ করতে সমর্থ হলো না। তাদের দুরাবস্থার খবর অন্যদেরকে পৌছানোর মত কেউই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল না। অল্পসংখ্যক যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বেঁচেছিল তারাও পরে ধুকে ধুকে মরেছিল। স্বয়ং বাদশাহ্ও এক টুকরো গোশতের মত হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে সে সানআতে পৌছলো। সেখানে পৌছেই তার কলেজা ফেটে গেল এবং সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াকসূ ইয়ামানের শাসন ভার গ্রহণ করলো। তারপর তার অন্য ভাই মাসরুক ইবনে আবরাহা সিংহাসনে আরোহন করলো। এ সময়ে ঘূইয়াযান হুমাইরী কিসরার (পারস্য সম্রাট) কাছে গিয়ে হাবশীদের কবল থেকে ইয়ামনকে মুক্ত করার জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলো। কিসরা সাইফের সাথে একদল বাহাদুর সৈন্য পাঠালো। সেই সৈন্যদল হাবশীদেরকে পরাজিত করে আবরাহার বংশধরদের কবল থেকে ইয়ামনের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতঃপর হুমাইরীয় গোত্র ইয়ামন শাসন করতে থাকে। আরবের লোকেরা এই উপলক্ষে উৎসব পালন করে। চারদিক থেকে হুমাইরীয় গোত্রের বাদশাহকে অভিনন্দন জানানো হয়। হযরত আয়েশা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ “আবরাহার সৈন্যদলের দু’জন সৈন্যকে আমি মক্কা শরীফে দেখেছি। তারা উভয়েই অন্ধ এবং চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তারা বসে বসে ভিক্ষা করতো।”হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেন যে, যে আসাফ ও নায়েলা নামক মূর্তিদ্বয়ের পার্শ্বে মুশরিকরা কুরবানী করতো সেখানে বসে ঐ লোক দুটি লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইতো। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাতীর চালক, যার নাম ছিল আনীসা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, আবরাহা নিজে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি, বরং শামর ইবনে মাকসূত নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। পাখিগুলো তাদের উপর রাত্রিকালে এসেছিল এবং সকাল পর্যন্ত তাদের সকলকে তছনছ করে ফেলেছিল। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল। আসল কথা হলো এই যে, স্বয়ং বাদশাহ্ আবরাহা আশরম হাবশী নিজেই সৈন্যদল নিয়ে এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল। শামর ইবনে মাকসূদ হয় তো কোন একদল সৈন্যের সেনাপতি ছিল। বহু সংখ্যক আরব কবি এ ঘটনাকে নানাভাবে তাঁদের কবিতায় বর্ণনা করেছেন।একটি রিওয়াইয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে নবী করীম (সঃ) একটি টিলার উপর উঠেছিলেন। সেখান থেকে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উষ্ট্ৰীটি সেখানে বসে পড়েছিল। সাহাবী (রাঃ)গণ বহু চেষ্টা করেও উস্ত্রীকে উঠাতে পারলেন না। তখন তারা বললেন যে, উষ্ট্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “না, সে ক্লান্তও হয়নি এবং বসে পড়া তার অভ্যাসও নয়। তাকে ঐ আল্লাহ্ থামিয়ে দিয়েছেন যিনি হাতীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মক্কাবাসীরা যে শর্তে সম্মত হবে আমি সেই শর্তেই তাদের সাথে সন্ধি করবো। তবে, আল্লাহর অমর্যাদা হতে পারে এমন কোন শর্তে আমি সম্মত হবো” তারপর তিনি উস্ত্রীকে ধমক দেয়া মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মক্কার উপর হাতী ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি, বরং তিনি তাঁর নবী (সঃ) ও ঈমানদার বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। জেনে রেখো যে, মক্কার মর্যাদা আজ ঐ অবস্থাতেই ফিরে এসেছে যে অবস্থায় গতকাল ছিল। খবরদার! প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট (খবর) পৌছিয়ে দিবে।”

আল-ফীল 105:2

১-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা যে কুরায়েশের উপর বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন, * এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যে বাহিনী হস্তী সঙ্গে নিয়ে কাবা গৃহ ধ্বংস করার জন্যে অভিযান চালিয়েছিল। তারা কাবা গৃহের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা নাম ও নিশানা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সর্বপ্রকারের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। বাহ্যতঃ তারা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে তারা বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা প্রায় সবাই মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের অশুভ উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মূলতঃ মহানবীর (সঃ) পূর্বাভাষ এবং তাঁর আগমনী সংবাদ। সেই বছরই তাঁর জন্ম হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ হে কুরায়েশের দল! আবিসিনিয়ার (হাবশের) ঐ বাহিনীর উপর আমি • তোমাদেরকে বিজয় দান করেছি, তাতে তোমাদের কল্যাণ সাধন আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নিজের গৃহ রক্ষার জন্যেই ঐ বিজয় দান করেছি। আমার প্রেরিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াতের মাধ্যমে সেই গৃহকে আমি আরো অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবো। মোটকথা, আসহাবে ফীল বা হস্তী অধিপতিদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এটাই যা বর্ণনা করা হলো। বিস্তারিত বর্ণনা (আরবি) এর বর্ণনায় গত হয়েছে যে, হুমায়ের গোত্রের শেষ বাদশাহ নূনুয়াম, যে ছিল মুশরিক, তার সময়ের মুসলমানদেরকে পরিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল। ঐ সব মুসলমান ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী। তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। তাঁদের সবাইকে শহীদ করে দেয়া হয়েছিল। দাউস যু সালাবান নামক একটি মাত্র লোক বেঁচেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় পৌছে রোমের বাদশাহ কায়সারের কাছে ফরিয়াদ করলেন। কায়সার। ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তিনি হাবশের (আবিসিনিয়ার) বাদশাহ নাজাশীকে লিখলেনঃ “দাউস যু সালাবানের সঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠিয়ে দিন। সেখান থেকে শক্রদেশ নিকটবতী ছিল। বাদশাহ নাজাশী আমীর ইবনে ইরবাত ও আবরাহা ইবনে সাহাব আবু ইয়াকসুমকে সৈন্য পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব দিয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী যুনুয়াসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল ইয়ামনে পৌঁছলো এবং ইয়ামন ও তথাকার অধিবাসীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। শূনুয়াস পালিয়ে গেল এবং সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলো। যুনুয়াসের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র ইয়ামন হাবশের বাদশাহর কর্তৃত্বে চলে গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ হিসেবে আগমনকারী উভয় সর্দার ইয়ামনে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে নিজ নিজ বিভক্ত সৈন্যদলসহ মুখোমুখী সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তত হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে উভয় সর্দার পরস্পরকে বললোঃ অযথা রক্তপাত করে কি লাভ, চলো আমরা উভয়ে লড়াই করি। যে বেঁচে যাবে, ইয়ামন এবং সেনাবাহিনী তার অনুগত থাকবে।” এই কথা অনুযায়ী উভয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলো। আমীর ইবনে ইরবাত আবরাহার উপর আক্রমণ করলো এবং তরবারীর এক আঘাতে তার চেহারা রক্তাক্ত করে ফেললো। নাক, ঠোট এবং চেহারার বেশ কিছু অংশ কেটে গেল। এই অবস্থা দেখে আবরাহার ক্রীতদাস আদাহ্ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরবাতকে হত্যা করে ফেললো। মারাত্মকভাবে আহত আবরাহা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন চিকিৎসার পর তার ক্ষত ভাল হলো এবং সে ইয়ামনের শাসনকর্তা হয়ে বসলো। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী এ খবর পেয়ে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং একপত্রে জানালেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার শহরসমূহ ধ্বংস করবো এবং তোমার টিকি কেটে আনবো।” আবরাহা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ পত্রের জবাব লিখলো এবং দূতকে নানা প্রকারের উপটৌকন, একটা থলের মধ্যে ইয়ামনের মাটি এবং নিজের মাথার কিছু চুল কেটে ওর মধ্যে রাখলো ও ওর মুখ বন্ধ করে দিলো। তাছাড়া চিঠিতে সে নিজের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে লিখলোঃ “ইয়ামনে মাটি এবং আমার মাথার চুল হাযির রয়েছে, আপনি নিজের কসম পূর্ণ করুন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন!" এতে নাজাশী খুশী হলেন এবং ইয়ামনের শাসনভার আবরাহাকে লিখে দিলেন। তারপর আবরাহা নাজাশীকে লিখলোঃ “আমি ইয়ামনে আপনার জন্যে এমন একটি গীর্জা তৈরি করছি যে, এরকম গীর্জা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে কখনো তৈরি হয়নি। অতি যত্ন সহকারে খুবই মযবুত ও অতি উঁচু করে ঐ গীর্জাটি নির্মিত হলো। ঐ গীর্জার চূড়া এতো উঁচু ছিল যে, চূড়ার প্রতি টুপি মাথায় দিয়ে তাকালে মাথার টুপি পড়ে যেতো। আরববাসীরা ঐ গীর্জার নাম দিয়েছিল কালীস' অর্থাৎ টুপি ফেলে দেয়া গীর্জা। এবার আবরাহা মনে করলো যে, জনসাধারণ কা’বায় হজ্ব না করে বরং এ গীর্জায় এসে হজ্ব করবে। সারাদেশে সে এটা ঘোষণা করে দিলো। আদনানিয়্যাহ ও কাহতা নিয়্যাহ গোত্র এ ঘোষণায় খুবই অসন্তুষ্ট, আর কুরায়েশরা ভীষণ রাগান্বিত হলো। অল্প কয়েকদিন পরে দেখা গেল যে, এক ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে ঐ গীর্জায় প্রবেশ করে পায়খানা করে এসেছে। প্রহরীরা পরের দিন এ অবস্থা দেখে বাদশাহর কাছে খবর পাঠালো এবং অভিমত ব্যক্ত করলো যে, কুরায়েশরাই এ কাজ করেছে। তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে বলেই এ কাণ্ড তারা করেছে। আবরাহা তৎক্ষণাৎ কসম করে বললোঃ “আমি মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি ইট পর্যন্ত খুলে ফেলবো।”অন্য এক বর্ণনায় এরূপও আছে যে, কয়েকজন উদ্যোগী কুরায়েশ যুবক ঐ গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বাতাস প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়েছিল বলে আগুন ভালভাবে ঐ গীর্জাকে গ্রাস করেছিল এবং ওটা মাটিতে ধ্বসে পড়েছিল। অতঃপর ক্রুদ্ধ আবরাহা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো। তাদের সাথে এক বিরাট উঁচু ও মোটা হাতী ছিল। ঐরূপ হাতী ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। হাতীটির নাম ছিল মাহমুদ। বাদশাহ নাজাশী মক্কা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে ঐ হাতিটি আবরাহাকে দিয়েছিল। ঐ হাতীর সাথে আবরাহা আরো আটটি অথবা বারোটি হাতী নিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে বায়তুল্লাহর দেয়ালে শিকল বেঁধে দিবে, তারপর সমস্ত হাতীর গলায় ঐ শিকল লাগিয়ে দিবে। এতে শিকল টেনে হাতীগুলো সমস্ত দেয়াল একত্রে ধ্বসিয়ে দিবে। মক্কার অধিবাসীরা এ সংবাদ পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লো। যে কোন অবস্থায় এর মুকাবিলা করার তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। যুনফর নামক ইয়ামনের একজন রাজ বংশীয় লোক নিজের গোত্র ও আশে পাশের বহু সংখ্যক আরবকে একত্রিত করে দুবৃত্ত আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছা। ছিল অন্যরকম। যুনফর পরাজিত হলেন এবং আবরাহার হাতে বন্দী হলেন। যুনফরকেও সঙ্গে নিয়ে আবরাহা মক্কার পথে অগ্রসর হলো। খাশআম গোত্রের এলাকায় পৌঁছার পর নুফায়েল ইবনে হাবীব আশআমী একদল সৈন্য নিয়ে আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরাই আবরাহার হাতে পরাজয় বরণ করলেন। নুফায়েলকেও যুনফরের মত বন্দী করা হলো। আবরাহা প্রথম নুফায়েলকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু পরে মক্কার পথ দেখিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে নিয়ে চললো। তায়েফের উপকণ্ঠে পৌঁছলে সাকীফ গোত্র আবরাহার সাথে সন্ধি করলো যে, লাত মূর্তিটি যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে, আবরাহার সৈন্যরা ঐ প্রকোষ্ঠের কোন ক্ষতি সাধন করবে না। সাকীফ গোত্র আবু রিগাল নামক একজন লোককে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্যে আবরাহার সঙ্গে দিলো। মক্কার কাছে মুগমাস নামক স্থানে তারা অবস্থান করলো। আবরাহার সৈন্যেরা আশেপাশের জনপদ এবং চারণভূমি থেকে বহু সংখ্যক উট এবং অন্যান্য পশু দখল করে নিলো। এগুলোর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উটও ছিল। এতে আরবের কবিরা আবরাহার নিন্দে করে কবিতা রচনা করলো সীরাতে ইবনে ইসহাকে ঐ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।অতঃপর আবরাহা নিজের বিশেষ দূত হানাতাহ হুমাইরীকে বললোঃ তুমি মক্কার সর্বাপেক্ষা বড় সর্দারকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। এবং ঘোষণা করে দাওঃ আমরা মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি, আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। তবে হ্যা, মক্কাবাসীরা যদি কাবাগৃহ রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসে এবং আমাদেরকে বাধা দেয় তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হানাতাহ মক্কার জনগণের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেমই মক্কার বড় নেতা। হানাতাহ আবদুল মুত্তালিবের সামনে আবরাহার বক্তব্য পেশ করলে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাও নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও নেই।” আল্লাহর সম্মানিত ঘর। তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন্ত স্মৃতি। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজের ঘরের হিফাজত নিজেই করবেন। অন্যথায় তাঁর ঘরকে রক্ষা করার সাহসও আমাদের নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও আমাদের নেই।হানাতাহ তখন তাকে বললোঃ “ঠিক আছে, আপনি আমাদের বাদশাহর কাছে চলুন।” আবদুল মুত্তালিব তখন তার সাথে আবরাহার কাছে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শণ বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তাঁকে দেখা মাত্র যে কোন মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। আবরাহা তাকে দেখেই সিংহাসন থেকে নেমে এলো এবং তার সাথে মেঝেতে উপবেশন করলোঃ সে তার দোভাষীকে বললোঃ তাকে জিজ্ঞেস করঃ তিনি কি চান? আবদুল মুত্তালিব জানালেনঃ “বাদশাহ আমার দু’শ উট লুট করিয়েছেন। আমি সেই উট ফেরত নিতে এসেছি।” বাদশাহ আবরাহা তখন দো-ভাষীর মাধ্যমে তাঁকে বললোঃ প্রথম দৃষ্টিতে আপনি যে শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন, আপনার কথা শুনে সে শ্রদ্ধা লোপ পেয়ে গেছে। নিজের দু’শ উটের। জন্যে আপনার এতো চিন্তা অথচ স্বজাতির ধর্মের জন্যে কোন চিন্তা নেই! আমি আপনাদের ইবাদতখানা কা’বা ধ্বংস করে ধূলিসাৎ করতে এসেছি।" একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জবাবে বললেনঃ “শুন, উটের মালিক আমি, তাই উট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে এসেছি। আর কাবাগৃহের মালিক হলেন স্বয়ং আল্লাহ। সুতরাং তিনি নিজেই নিজের ঘর রক্ষা করবেন।” তখন ঐ নরাধম বললোঃ “আজ স্বয়ং আল্লাহও কাবাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না।” একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “তা আল্লাহ জানেন এবং আপনি জানেন।” এও বর্ণিত আছে যে, মক্কার জনগণ তাদের ধন সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আবরাহাকে দিতে চেয়েছিল, যাতে সে এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা হতে বিরত থাকে। কিন্তু আবরাহা তাতেও রাজী হয়নি। মোটকথা, আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন এবং মক্কাবাসীদেরকে বললেনঃ “তোমরা মক্কাকে সম্পূর্ণ খালি করে দাও। সবাই তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।” তারপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়েশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা গৃহে গিয়ে কাবার খুঁটি ধরে দেয়াল ছুঁয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন এবং কায়মনোবাক্যে ঐ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ গৃহ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করলেন। আবরাহা এবং তার রক্ত পিপাসু সৈন্যদের অপবিত্র ইচ্ছার কবল থেকে কাবাকে পবিত্র রাখার জন্যে আবদুল মুত্তালিব কবিতার ভাষায় নিম্নলিখিত দুআ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা নিশ্চিন্ত, কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক গৃহমালিক নিজেই নিজের গৃহের হিফাযত করেন। হে আল্লাহ! আপনিও আপনার গৃহ আপনার শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করুন। আপনার অস্ত্রের উপর তাদের অস্ত্র জয়যুক্ত হবে এমন যেন কিছুতেই না হয়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কা'বা গৃহের খুঁটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে ওর আশে পাশের পর্বতসমূহের চূড়ায় উঠে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, কুরবানীর একশত পশুকে নিশান লাগিয়ে কা'বার আশে পাশে ছেড়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি দুবৃত্তরা আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া পশুর প্রতি হাত বাড়ায় তাহলে আল্লাহর গযব তাদের উপর অবশ্যই নেমে আসবে।পরদিন প্রভাতে আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় প্রবেশের উদ্যোগ আয়োজন করলো। বিশেষ হাতী মাহমুদকে সজ্জিত করা হলো। পথে বন্দী হয়ে আবরাহার সাথে আগমনকারী নুফায়েল ইবনে হাবীব তখন মাহমুদ নামক হাতীটির কান ধরে বললেনঃ “মাহমুদ! তুমি বসে পড়, আর যেখান থেকে এসেছে সেখানে ভালভাবে ফিরে যাও। তুমি আল্লাহর পবিত্র শহরে রয়েছে।” একথা বলে নুফায়েল হাতির কান ছেড়ে দিলেন এবং ছুটে গিয়ে নিকট এক পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। মাহমুদ নামক হাতীটি নুফায়েলের কথা শোনার সাথে সাথে বসে পড়লো। বহুচেষ্টা করেও তাকে নড়ানো সম্ভব হলো না। পরীক্ষামূলক ভাবে ইয়ামনের দিকে তার মুখ ফিরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই হাতী তাড়াতাড়ি উঠে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। পূর্বদিকে চালাবার চেষ্টা করা হলে সেদিকেও যাচ্ছিল, কিন্তু মক্কা শরীফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চালাবার চেষ্টা করতেই বসে পড়লো। সৈন্যরা তখন হাতীটিকে প্রহার করতে শুরু করলো। এমন সময় দেখা গেল এক ঝাঁক পাখি কালো মেঘের মত হয়ে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসছে। চোখের পলকে ওগুলো আবরাহার সেনাবাহিনীর মাথার উপর এসে পড়লো। এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে। ফেললো। প্রত্যেক পাখির চঞ্চতে একটি এবং দুপায়ে দুটি কংকর ছিল। কংকরের ঐটুকরাগুলো ছিল মসুরের ডাল বা মাস কলাই এর সমান। পাখিগুলো কংকরের ঐ টুকরোগুলো আবরাহার সৈন্যদের প্রতি নিক্ষেপ করছিল। যার গায়ে ঐ কংকর পড়ছিল সেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভবলীলা সাঙ্গ করছিল। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল আর নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল কারণ তারা তাঁকেই পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে এনেছিল। নুফায়েল তখন পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করে অন্যান্য কুরায়েশদের সাথে আবরাহা ও তার সৈন্যদের দুরাবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঐ সময় নুফায়েল নিম্নলিখিত কবিতাংশ পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আর আশ্রয়স্থল কোথায়? স্বয়ং আল্লাহই তো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শোনো, দুবৃত্ত আশরম পরাজিত হয়েছে, জয়ী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুফায়েল আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হাতী ওয়ালাদের দুরাবস্থার সময়ে তুমি যদি উপস্থিত থাকতে! মুহাসসাব প্রান্তরে তাদের উপর আযাবের কংকর বর্ষিত হয়েছে। তুমি সে অবস্থা দেখলে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হতে। আমরা পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছিলাম। আমাদের হৃৎপিণ্ড কাঁপছিল এই ভয়ে যে, না জানি হয় তো আমাদের উপরও এই কংকর পড়ে যায় এবং আমাদেরও দফারফা করে দেয়। পুরো সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে পালাচ্ছিল ও নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল, যেন নুফায়েলের উপর হাবশীদের ঋণ রয়েছে।”ওয়াকেদী (রঃ) বলেন যে, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙএর। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। ওদের পায়ের রঙছিল লাল। অন্য এক রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, মাহমুদ নামক হাতীটি যখন বসে পড়লো এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। তখন সৈন্যরা অন্য একটি হাতীকে সামনের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে পা বাড়াতেই তার মাথায় কংকরের টুকরো পড়লো এবং আর্তনাদ করে পিছনে সরে এলো। অন্যান্য হাতীও তখন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করলো। কয়েকটির উপর কংকর পড়ায় তৎক্ষণাৎ ওগুলো মারা গেল। যারা ছুটে পালাচ্ছিল তাদেরও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। এবং অবশেষে সবগুলোই মারা গেল। আবরাহা বাদশাহও ছুটে পালালো, কিন্তু তারও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। সানআ (তৎকালীন ইয়ামনের রাজধানী) নামক শহরে পৌঁছার পর সে মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো এবং কুকুরের মত ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করলো। তার কলেজা ফেটে গিয়েছিল। কুরায়েশরা প্রচুর ধন সম্পদ পেয়ে গিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব তো সোনা সংগ্রহ করে করে একটি কূপ ভর্তি করেছিলেন। ঐ বছরই সারা দেশে প্রথম ওলা ওঠা এবং প্লেগ রোগ দেখা দেয়। হরল, হান্যাল প্রভৃতি কটুগাছও ঐ বছর উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর ভাষায় এ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এবং যেন বলছেনঃ যদি তোমরা আমার ঘরের সম্মান এভাবে করতে থাকতে এবং আমার রাসূল (সঃ)-এর কথা মানতে তবে আমিও সেভাবে তোমাদের হিফাযত করতাম এবং শত্রু দল থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিতাম। (আরবি) শব্দটি বহুবচন, এর একবচন আরবী অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খুবই কঠিন বা শক্ত। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) শব্দ দুটি ফারসী শব্দ। (আরবি) এর অর্থ হলো প্রস্তর সমন্বিত মৃত্তিকা। (আরবি) শব্দটি শব্দের (আরবি) বহুবচন।(আরবি) মাঠের ফসলের ঐ সব পাতাকে বলা হয় যেগুলো এখনো পাকেনি। (আরবি) এর অর্থ হলো ঝাক ঝক পাখী, বহুসংখ্যক এবং ক্রমাগত আগমনকারী। কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মত এবং নখ ছিল কুকুরের মত।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সবুজ রঙ-এর এই পাখিগুলো সমুদ্র হতে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মত। এ সম্পর্কে আরো বহু উক্তি রয়েছে। পাখির ঝাঁক আবরাহার সৈন্যদের মাথার উপর অবস্থান করে চীৎকার করছিল এবং কংকর নিক্ষেপ করছিল। যার মাথায় ঐ কংকর পড়ছিল তা তার পায়খানার দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রবল বাতাস বইতে লাগলো। এর ফলে আশে পাশের বালুকণা এসে তাদের চোখে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদেরকে ঘায়েল করে ফেললো।(আরবি) এর অর্থ হলো ভূষি এবং (আরবি) অর্থহলো ভক্ষিত বা টুকরো টুকরো কৃত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শস্যদানার উপরের ভূষিকে (আরবি) বলা হয়। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ক্ষেতের শস্যের ঐ পাতা যেগুলো পশুরা খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তছনছ করে দিলেন এবং সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন। তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কোন কল্যাণই তারা লাভ করতে সমর্থ হলো না। তাদের দুরাবস্থার খবর অন্যদেরকে পৌছানোর মত কেউই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল না। অল্পসংখ্যক যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বেঁচেছিল তারাও পরে ধুকে ধুকে মরেছিল। স্বয়ং বাদশাহ্ও এক টুকরো গোশতের মত হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে সে সানআতে পৌছলো। সেখানে পৌছেই তার কলেজা ফেটে গেল এবং সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াকসূ ইয়ামানের শাসন ভার গ্রহণ করলো। তারপর তার অন্য ভাই মাসরুক ইবনে আবরাহা সিংহাসনে আরোহন করলো। এ সময়ে ঘূইয়াযান হুমাইরী কিসরার (পারস্য সম্রাট) কাছে গিয়ে হাবশীদের কবল থেকে ইয়ামনকে মুক্ত করার জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলো। কিসরা সাইফের সাথে একদল বাহাদুর সৈন্য পাঠালো। সেই সৈন্যদল হাবশীদেরকে পরাজিত করে আবরাহার বংশধরদের কবল থেকে ইয়ামনের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতঃপর হুমাইরীয় গোত্র ইয়ামন শাসন করতে থাকে। আরবের লোকেরা এই উপলক্ষে উৎসব পালন করে। চারদিক থেকে হুমাইরীয় গোত্রের বাদশাহকে অভিনন্দন জানানো হয়। হযরত আয়েশা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ “আবরাহার সৈন্যদলের দু’জন সৈন্যকে আমি মক্কা শরীফে দেখেছি। তারা উভয়েই অন্ধ এবং চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তারা বসে বসে ভিক্ষা করতো।”হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেন যে, যে আসাফ ও নায়েলা নামক মূর্তিদ্বয়ের পার্শ্বে মুশরিকরা কুরবানী করতো সেখানে বসে ঐ লোক দুটি লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইতো। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাতীর চালক, যার নাম ছিল আনীসা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, আবরাহা নিজে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি, বরং শামর ইবনে মাকসূত নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। পাখিগুলো তাদের উপর রাত্রিকালে এসেছিল এবং সকাল পর্যন্ত তাদের সকলকে তছনছ করে ফেলেছিল। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল। আসল কথা হলো এই যে, স্বয়ং বাদশাহ্ আবরাহা আশরম হাবশী নিজেই সৈন্যদল নিয়ে এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল। শামর ইবনে মাকসূদ হয় তো কোন একদল সৈন্যের সেনাপতি ছিল। বহু সংখ্যক আরব কবি এ ঘটনাকে নানাভাবে তাঁদের কবিতায় বর্ণনা করেছেন।একটি রিওয়াইয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে নবী করীম (সঃ) একটি টিলার উপর উঠেছিলেন। সেখান থেকে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উষ্ট্ৰীটি সেখানে বসে পড়েছিল। সাহাবী (রাঃ)গণ বহু চেষ্টা করেও উস্ত্রীকে উঠাতে পারলেন না। তখন তারা বললেন যে, উষ্ট্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “না, সে ক্লান্তও হয়নি এবং বসে পড়া তার অভ্যাসও নয়। তাকে ঐ আল্লাহ্ থামিয়ে দিয়েছেন যিনি হাতীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মক্কাবাসীরা যে শর্তে সম্মত হবে আমি সেই শর্তেই তাদের সাথে সন্ধি করবো। তবে, আল্লাহর অমর্যাদা হতে পারে এমন কোন শর্তে আমি সম্মত হবো” তারপর তিনি উস্ত্রীকে ধমক দেয়া মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মক্কার উপর হাতী ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি, বরং তিনি তাঁর নবী (সঃ) ও ঈমানদার বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। জেনে রেখো যে, মক্কার মর্যাদা আজ ঐ অবস্থাতেই ফিরে এসেছে যে অবস্থায় গতকাল ছিল। খবরদার! প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট (খবর) পৌছিয়ে দিবে।”

আল-ফীল 105:3

১-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা যে কুরায়েশের উপর বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন, * এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যে বাহিনী হস্তী সঙ্গে নিয়ে কাবা গৃহ ধ্বংস করার জন্যে অভিযান চালিয়েছিল। তারা কাবা গৃহের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা নাম ও নিশানা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সর্বপ্রকারের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। বাহ্যতঃ তারা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে তারা বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা প্রায় সবাই মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের অশুভ উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মূলতঃ মহানবীর (সঃ) পূর্বাভাষ এবং তাঁর আগমনী সংবাদ। সেই বছরই তাঁর জন্ম হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ হে কুরায়েশের দল! আবিসিনিয়ার (হাবশের) ঐ বাহিনীর উপর আমি • তোমাদেরকে বিজয় দান করেছি, তাতে তোমাদের কল্যাণ সাধন আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নিজের গৃহ রক্ষার জন্যেই ঐ বিজয় দান করেছি। আমার প্রেরিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াতের মাধ্যমে সেই গৃহকে আমি আরো অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবো। মোটকথা, আসহাবে ফীল বা হস্তী অধিপতিদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এটাই যা বর্ণনা করা হলো। বিস্তারিত বর্ণনা (আরবি) এর বর্ণনায় গত হয়েছে যে, হুমায়ের গোত্রের শেষ বাদশাহ নূনুয়াম, যে ছিল মুশরিক, তার সময়ের মুসলমানদেরকে পরিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল। ঐ সব মুসলমান ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী। তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। তাঁদের সবাইকে শহীদ করে দেয়া হয়েছিল। দাউস যু সালাবান নামক একটি মাত্র লোক বেঁচেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় পৌছে রোমের বাদশাহ কায়সারের কাছে ফরিয়াদ করলেন। কায়সার। ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তিনি হাবশের (আবিসিনিয়ার) বাদশাহ নাজাশীকে লিখলেনঃ “দাউস যু সালাবানের সঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠিয়ে দিন। সেখান থেকে শক্রদেশ নিকটবতী ছিল। বাদশাহ নাজাশী আমীর ইবনে ইরবাত ও আবরাহা ইবনে সাহাব আবু ইয়াকসুমকে সৈন্য পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব দিয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী যুনুয়াসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল ইয়ামনে পৌঁছলো এবং ইয়ামন ও তথাকার অধিবাসীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। শূনুয়াস পালিয়ে গেল এবং সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলো। যুনুয়াসের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র ইয়ামন হাবশের বাদশাহর কর্তৃত্বে চলে গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ হিসেবে আগমনকারী উভয় সর্দার ইয়ামনে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে নিজ নিজ বিভক্ত সৈন্যদলসহ মুখোমুখী সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তত হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে উভয় সর্দার পরস্পরকে বললোঃ অযথা রক্তপাত করে কি লাভ, চলো আমরা উভয়ে লড়াই করি। যে বেঁচে যাবে, ইয়ামন এবং সেনাবাহিনী তার অনুগত থাকবে।” এই কথা অনুযায়ী উভয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলো। আমীর ইবনে ইরবাত আবরাহার উপর আক্রমণ করলো এবং তরবারীর এক আঘাতে তার চেহারা রক্তাক্ত করে ফেললো। নাক, ঠোট এবং চেহারার বেশ কিছু অংশ কেটে গেল। এই অবস্থা দেখে আবরাহার ক্রীতদাস আদাহ্ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরবাতকে হত্যা করে ফেললো। মারাত্মকভাবে আহত আবরাহা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন চিকিৎসার পর তার ক্ষত ভাল হলো এবং সে ইয়ামনের শাসনকর্তা হয়ে বসলো। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী এ খবর পেয়ে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং একপত্রে জানালেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার শহরসমূহ ধ্বংস করবো এবং তোমার টিকি কেটে আনবো।” আবরাহা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ পত্রের জবাব লিখলো এবং দূতকে নানা প্রকারের উপটৌকন, একটা থলের মধ্যে ইয়ামনের মাটি এবং নিজের মাথার কিছু চুল কেটে ওর মধ্যে রাখলো ও ওর মুখ বন্ধ করে দিলো। তাছাড়া চিঠিতে সে নিজের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে লিখলোঃ “ইয়ামনে মাটি এবং আমার মাথার চুল হাযির রয়েছে, আপনি নিজের কসম পূর্ণ করুন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন!" এতে নাজাশী খুশী হলেন এবং ইয়ামনের শাসনভার আবরাহাকে লিখে দিলেন। তারপর আবরাহা নাজাশীকে লিখলোঃ “আমি ইয়ামনে আপনার জন্যে এমন একটি গীর্জা তৈরি করছি যে, এরকম গীর্জা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে কখনো তৈরি হয়নি। অতি যত্ন সহকারে খুবই মযবুত ও অতি উঁচু করে ঐ গীর্জাটি নির্মিত হলো। ঐ গীর্জার চূড়া এতো উঁচু ছিল যে, চূড়ার প্রতি টুপি মাথায় দিয়ে তাকালে মাথার টুপি পড়ে যেতো। আরববাসীরা ঐ গীর্জার নাম দিয়েছিল কালীস' অর্থাৎ টুপি ফেলে দেয়া গীর্জা। এবার আবরাহা মনে করলো যে, জনসাধারণ কা’বায় হজ্ব না করে বরং এ গীর্জায় এসে হজ্ব করবে। সারাদেশে সে এটা ঘোষণা করে দিলো। আদনানিয়্যাহ ও কাহতা নিয়্যাহ গোত্র এ ঘোষণায় খুবই অসন্তুষ্ট, আর কুরায়েশরা ভীষণ রাগান্বিত হলো। অল্প কয়েকদিন পরে দেখা গেল যে, এক ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে ঐ গীর্জায় প্রবেশ করে পায়খানা করে এসেছে। প্রহরীরা পরের দিন এ অবস্থা দেখে বাদশাহর কাছে খবর পাঠালো এবং অভিমত ব্যক্ত করলো যে, কুরায়েশরাই এ কাজ করেছে। তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে বলেই এ কাণ্ড তারা করেছে। আবরাহা তৎক্ষণাৎ কসম করে বললোঃ “আমি মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি ইট পর্যন্ত খুলে ফেলবো।”অন্য এক বর্ণনায় এরূপও আছে যে, কয়েকজন উদ্যোগী কুরায়েশ যুবক ঐ গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বাতাস প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়েছিল বলে আগুন ভালভাবে ঐ গীর্জাকে গ্রাস করেছিল এবং ওটা মাটিতে ধ্বসে পড়েছিল। অতঃপর ক্রুদ্ধ আবরাহা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো। তাদের সাথে এক বিরাট উঁচু ও মোটা হাতী ছিল। ঐরূপ হাতী ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। হাতীটির নাম ছিল মাহমুদ। বাদশাহ নাজাশী মক্কা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে ঐ হাতিটি আবরাহাকে দিয়েছিল। ঐ হাতীর সাথে আবরাহা আরো আটটি অথবা বারোটি হাতী নিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে বায়তুল্লাহর দেয়ালে শিকল বেঁধে দিবে, তারপর সমস্ত হাতীর গলায় ঐ শিকল লাগিয়ে দিবে। এতে শিকল টেনে হাতীগুলো সমস্ত দেয়াল একত্রে ধ্বসিয়ে দিবে। মক্কার অধিবাসীরা এ সংবাদ পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লো। যে কোন অবস্থায় এর মুকাবিলা করার তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। যুনফর নামক ইয়ামনের একজন রাজ বংশীয় লোক নিজের গোত্র ও আশে পাশের বহু সংখ্যক আরবকে একত্রিত করে দুবৃত্ত আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছা। ছিল অন্যরকম। যুনফর পরাজিত হলেন এবং আবরাহার হাতে বন্দী হলেন। যুনফরকেও সঙ্গে নিয়ে আবরাহা মক্কার পথে অগ্রসর হলো। খাশআম গোত্রের এলাকায় পৌঁছার পর নুফায়েল ইবনে হাবীব আশআমী একদল সৈন্য নিয়ে আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরাই আবরাহার হাতে পরাজয় বরণ করলেন। নুফায়েলকেও যুনফরের মত বন্দী করা হলো। আবরাহা প্রথম নুফায়েলকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু পরে মক্কার পথ দেখিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে নিয়ে চললো। তায়েফের উপকণ্ঠে পৌঁছলে সাকীফ গোত্র আবরাহার সাথে সন্ধি করলো যে, লাত মূর্তিটি যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে, আবরাহার সৈন্যরা ঐ প্রকোষ্ঠের কোন ক্ষতি সাধন করবে না। সাকীফ গোত্র আবু রিগাল নামক একজন লোককে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্যে আবরাহার সঙ্গে দিলো। মক্কার কাছে মুগমাস নামক স্থানে তারা অবস্থান করলো। আবরাহার সৈন্যেরা আশেপাশের জনপদ এবং চারণভূমি থেকে বহু সংখ্যক উট এবং অন্যান্য পশু দখল করে নিলো। এগুলোর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উটও ছিল। এতে আরবের কবিরা আবরাহার নিন্দে করে কবিতা রচনা করলো সীরাতে ইবনে ইসহাকে ঐ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।অতঃপর আবরাহা নিজের বিশেষ দূত হানাতাহ হুমাইরীকে বললোঃ তুমি মক্কার সর্বাপেক্ষা বড় সর্দারকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। এবং ঘোষণা করে দাওঃ আমরা মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি, আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। তবে হ্যা, মক্কাবাসীরা যদি কাবাগৃহ রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসে এবং আমাদেরকে বাধা দেয় তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হানাতাহ মক্কার জনগণের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেমই মক্কার বড় নেতা। হানাতাহ আবদুল মুত্তালিবের সামনে আবরাহার বক্তব্য পেশ করলে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাও নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও নেই।” আল্লাহর সম্মানিত ঘর। তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন্ত স্মৃতি। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজের ঘরের হিফাজত নিজেই করবেন। অন্যথায় তাঁর ঘরকে রক্ষা করার সাহসও আমাদের নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও আমাদের নেই।হানাতাহ তখন তাকে বললোঃ “ঠিক আছে, আপনি আমাদের বাদশাহর কাছে চলুন।” আবদুল মুত্তালিব তখন তার সাথে আবরাহার কাছে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শণ বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তাঁকে দেখা মাত্র যে কোন মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। আবরাহা তাকে দেখেই সিংহাসন থেকে নেমে এলো এবং তার সাথে মেঝেতে উপবেশন করলোঃ সে তার দোভাষীকে বললোঃ তাকে জিজ্ঞেস করঃ তিনি কি চান? আবদুল মুত্তালিব জানালেনঃ “বাদশাহ আমার দু’শ উট লুট করিয়েছেন। আমি সেই উট ফেরত নিতে এসেছি।” বাদশাহ আবরাহা তখন দো-ভাষীর মাধ্যমে তাঁকে বললোঃ প্রথম দৃষ্টিতে আপনি যে শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন, আপনার কথা শুনে সে শ্রদ্ধা লোপ পেয়ে গেছে। নিজের দু’শ উটের। জন্যে আপনার এতো চিন্তা অথচ স্বজাতির ধর্মের জন্যে কোন চিন্তা নেই! আমি আপনাদের ইবাদতখানা কা’বা ধ্বংস করে ধূলিসাৎ করতে এসেছি।" একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জবাবে বললেনঃ “শুন, উটের মালিক আমি, তাই উট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে এসেছি। আর কাবাগৃহের মালিক হলেন স্বয়ং আল্লাহ। সুতরাং তিনি নিজেই নিজের ঘর রক্ষা করবেন।” তখন ঐ নরাধম বললোঃ “আজ স্বয়ং আল্লাহও কাবাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না।” একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “তা আল্লাহ জানেন এবং আপনি জানেন।” এও বর্ণিত আছে যে, মক্কার জনগণ তাদের ধন সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আবরাহাকে দিতে চেয়েছিল, যাতে সে এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা হতে বিরত থাকে। কিন্তু আবরাহা তাতেও রাজী হয়নি। মোটকথা, আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন এবং মক্কাবাসীদেরকে বললেনঃ “তোমরা মক্কাকে সম্পূর্ণ খালি করে দাও। সবাই তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।” তারপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়েশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা গৃহে গিয়ে কাবার খুঁটি ধরে দেয়াল ছুঁয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন এবং কায়মনোবাক্যে ঐ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ গৃহ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করলেন। আবরাহা এবং তার রক্ত পিপাসু সৈন্যদের অপবিত্র ইচ্ছার কবল থেকে কাবাকে পবিত্র রাখার জন্যে আবদুল মুত্তালিব কবিতার ভাষায় নিম্নলিখিত দুআ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা নিশ্চিন্ত, কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক গৃহমালিক নিজেই নিজের গৃহের হিফাযত করেন। হে আল্লাহ! আপনিও আপনার গৃহ আপনার শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করুন। আপনার অস্ত্রের উপর তাদের অস্ত্র জয়যুক্ত হবে এমন যেন কিছুতেই না হয়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কা'বা গৃহের খুঁটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে ওর আশে পাশের পর্বতসমূহের চূড়ায় উঠে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, কুরবানীর একশত পশুকে নিশান লাগিয়ে কা'বার আশে পাশে ছেড়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি দুবৃত্তরা আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া পশুর প্রতি হাত বাড়ায় তাহলে আল্লাহর গযব তাদের উপর অবশ্যই নেমে আসবে।পরদিন প্রভাতে আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় প্রবেশের উদ্যোগ আয়োজন করলো। বিশেষ হাতী মাহমুদকে সজ্জিত করা হলো। পথে বন্দী হয়ে আবরাহার সাথে আগমনকারী নুফায়েল ইবনে হাবীব তখন মাহমুদ নামক হাতীটির কান ধরে বললেনঃ “মাহমুদ! তুমি বসে পড়, আর যেখান থেকে এসেছে সেখানে ভালভাবে ফিরে যাও। তুমি আল্লাহর পবিত্র শহরে রয়েছে।” একথা বলে নুফায়েল হাতির কান ছেড়ে দিলেন এবং ছুটে গিয়ে নিকট এক পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। মাহমুদ নামক হাতীটি নুফায়েলের কথা শোনার সাথে সাথে বসে পড়লো। বহুচেষ্টা করেও তাকে নড়ানো সম্ভব হলো না। পরীক্ষামূলক ভাবে ইয়ামনের দিকে তার মুখ ফিরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই হাতী তাড়াতাড়ি উঠে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। পূর্বদিকে চালাবার চেষ্টা করা হলে সেদিকেও যাচ্ছিল, কিন্তু মক্কা শরীফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চালাবার চেষ্টা করতেই বসে পড়লো। সৈন্যরা তখন হাতীটিকে প্রহার করতে শুরু করলো। এমন সময় দেখা গেল এক ঝাঁক পাখি কালো মেঘের মত হয়ে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসছে। চোখের পলকে ওগুলো আবরাহার সেনাবাহিনীর মাথার উপর এসে পড়লো। এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে। ফেললো। প্রত্যেক পাখির চঞ্চতে একটি এবং দুপায়ে দুটি কংকর ছিল। কংকরের ঐটুকরাগুলো ছিল মসুরের ডাল বা মাস কলাই এর সমান। পাখিগুলো কংকরের ঐ টুকরোগুলো আবরাহার সৈন্যদের প্রতি নিক্ষেপ করছিল। যার গায়ে ঐ কংকর পড়ছিল সেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভবলীলা সাঙ্গ করছিল। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল আর নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল কারণ তারা তাঁকেই পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে এনেছিল। নুফায়েল তখন পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করে অন্যান্য কুরায়েশদের সাথে আবরাহা ও তার সৈন্যদের দুরাবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঐ সময় নুফায়েল নিম্নলিখিত কবিতাংশ পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আর আশ্রয়স্থল কোথায়? স্বয়ং আল্লাহই তো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শোনো, দুবৃত্ত আশরম পরাজিত হয়েছে, জয়ী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুফায়েল আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হাতী ওয়ালাদের দুরাবস্থার সময়ে তুমি যদি উপস্থিত থাকতে! মুহাসসাব প্রান্তরে তাদের উপর আযাবের কংকর বর্ষিত হয়েছে। তুমি সে অবস্থা দেখলে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হতে। আমরা পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছিলাম। আমাদের হৃৎপিণ্ড কাঁপছিল এই ভয়ে যে, না জানি হয় তো আমাদের উপরও এই কংকর পড়ে যায় এবং আমাদেরও দফারফা করে দেয়। পুরো সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে পালাচ্ছিল ও নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল, যেন নুফায়েলের উপর হাবশীদের ঋণ রয়েছে।”ওয়াকেদী (রঃ) বলেন যে, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙএর। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। ওদের পায়ের রঙছিল লাল। অন্য এক রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, মাহমুদ নামক হাতীটি যখন বসে পড়লো এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। তখন সৈন্যরা অন্য একটি হাতীকে সামনের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে পা বাড়াতেই তার মাথায় কংকরের টুকরো পড়লো এবং আর্তনাদ করে পিছনে সরে এলো। অন্যান্য হাতীও তখন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করলো। কয়েকটির উপর কংকর পড়ায় তৎক্ষণাৎ ওগুলো মারা গেল। যারা ছুটে পালাচ্ছিল তাদেরও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। এবং অবশেষে সবগুলোই মারা গেল। আবরাহা বাদশাহও ছুটে পালালো, কিন্তু তারও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। সানআ (তৎকালীন ইয়ামনের রাজধানী) নামক শহরে পৌঁছার পর সে মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো এবং কুকুরের মত ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করলো। তার কলেজা ফেটে গিয়েছিল। কুরায়েশরা প্রচুর ধন সম্পদ পেয়ে গিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব তো সোনা সংগ্রহ করে করে একটি কূপ ভর্তি করেছিলেন। ঐ বছরই সারা দেশে প্রথম ওলা ওঠা এবং প্লেগ রোগ দেখা দেয়। হরল, হান্যাল প্রভৃতি কটুগাছও ঐ বছর উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর ভাষায় এ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এবং যেন বলছেনঃ যদি তোমরা আমার ঘরের সম্মান এভাবে করতে থাকতে এবং আমার রাসূল (সঃ)-এর কথা মানতে তবে আমিও সেভাবে তোমাদের হিফাযত করতাম এবং শত্রু দল থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিতাম। (আরবি) শব্দটি বহুবচন, এর একবচন আরবী অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খুবই কঠিন বা শক্ত। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) শব্দ দুটি ফারসী শব্দ। (আরবি) এর অর্থ হলো প্রস্তর সমন্বিত মৃত্তিকা। (আরবি) শব্দটি শব্দের (আরবি) বহুবচন।(আরবি) মাঠের ফসলের ঐ সব পাতাকে বলা হয় যেগুলো এখনো পাকেনি। (আরবি) এর অর্থ হলো ঝাক ঝক পাখী, বহুসংখ্যক এবং ক্রমাগত আগমনকারী। কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মত এবং নখ ছিল কুকুরের মত।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সবুজ রঙ-এর এই পাখিগুলো সমুদ্র হতে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মত। এ সম্পর্কে আরো বহু উক্তি রয়েছে। পাখির ঝাঁক আবরাহার সৈন্যদের মাথার উপর অবস্থান করে চীৎকার করছিল এবং কংকর নিক্ষেপ করছিল। যার মাথায় ঐ কংকর পড়ছিল তা তার পায়খানার দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রবল বাতাস বইতে লাগলো। এর ফলে আশে পাশের বালুকণা এসে তাদের চোখে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদেরকে ঘায়েল করে ফেললো।(আরবি) এর অর্থ হলো ভূষি এবং (আরবি) অর্থহলো ভক্ষিত বা টুকরো টুকরো কৃত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শস্যদানার উপরের ভূষিকে (আরবি) বলা হয়। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ক্ষেতের শস্যের ঐ পাতা যেগুলো পশুরা খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তছনছ করে দিলেন এবং সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন। তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কোন কল্যাণই তারা লাভ করতে সমর্থ হলো না। তাদের দুরাবস্থার খবর অন্যদেরকে পৌছানোর মত কেউই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল না। অল্পসংখ্যক যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বেঁচেছিল তারাও পরে ধুকে ধুকে মরেছিল। স্বয়ং বাদশাহ্ও এক টুকরো গোশতের মত হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে সে সানআতে পৌছলো। সেখানে পৌছেই তার কলেজা ফেটে গেল এবং সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াকসূ ইয়ামানের শাসন ভার গ্রহণ করলো। তারপর তার অন্য ভাই মাসরুক ইবনে আবরাহা সিংহাসনে আরোহন করলো। এ সময়ে ঘূইয়াযান হুমাইরী কিসরার (পারস্য সম্রাট) কাছে গিয়ে হাবশীদের কবল থেকে ইয়ামনকে মুক্ত করার জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলো। কিসরা সাইফের সাথে একদল বাহাদুর সৈন্য পাঠালো। সেই সৈন্যদল হাবশীদেরকে পরাজিত করে আবরাহার বংশধরদের কবল থেকে ইয়ামনের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতঃপর হুমাইরীয় গোত্র ইয়ামন শাসন করতে থাকে। আরবের লোকেরা এই উপলক্ষে উৎসব পালন করে। চারদিক থেকে হুমাইরীয় গোত্রের বাদশাহকে অভিনন্দন জানানো হয়। হযরত আয়েশা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ “আবরাহার সৈন্যদলের দু’জন সৈন্যকে আমি মক্কা শরীফে দেখেছি। তারা উভয়েই অন্ধ এবং চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তারা বসে বসে ভিক্ষা করতো।”হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেন যে, যে আসাফ ও নায়েলা নামক মূর্তিদ্বয়ের পার্শ্বে মুশরিকরা কুরবানী করতো সেখানে বসে ঐ লোক দুটি লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইতো। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাতীর চালক, যার নাম ছিল আনীসা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, আবরাহা নিজে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি, বরং শামর ইবনে মাকসূত নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। পাখিগুলো তাদের উপর রাত্রিকালে এসেছিল এবং সকাল পর্যন্ত তাদের সকলকে তছনছ করে ফেলেছিল। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল। আসল কথা হলো এই যে, স্বয়ং বাদশাহ্ আবরাহা আশরম হাবশী নিজেই সৈন্যদল নিয়ে এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল। শামর ইবনে মাকসূদ হয় তো কোন একদল সৈন্যের সেনাপতি ছিল। বহু সংখ্যক আরব কবি এ ঘটনাকে নানাভাবে তাঁদের কবিতায় বর্ণনা করেছেন।একটি রিওয়াইয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে নবী করীম (সঃ) একটি টিলার উপর উঠেছিলেন। সেখান থেকে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উষ্ট্ৰীটি সেখানে বসে পড়েছিল। সাহাবী (রাঃ)গণ বহু চেষ্টা করেও উস্ত্রীকে উঠাতে পারলেন না। তখন তারা বললেন যে, উষ্ট্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “না, সে ক্লান্তও হয়নি এবং বসে পড়া তার অভ্যাসও নয়। তাকে ঐ আল্লাহ্ থামিয়ে দিয়েছেন যিনি হাতীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মক্কাবাসীরা যে শর্তে সম্মত হবে আমি সেই শর্তেই তাদের সাথে সন্ধি করবো। তবে, আল্লাহর অমর্যাদা হতে পারে এমন কোন শর্তে আমি সম্মত হবো” তারপর তিনি উস্ত্রীকে ধমক দেয়া মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মক্কার উপর হাতী ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি, বরং তিনি তাঁর নবী (সঃ) ও ঈমানদার বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। জেনে রেখো যে, মক্কার মর্যাদা আজ ঐ অবস্থাতেই ফিরে এসেছে যে অবস্থায় গতকাল ছিল। খবরদার! প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট (খবর) পৌছিয়ে দিবে।”

আল-ফীল 105:4

১-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা যে কুরায়েশের উপর বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন, * এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যে বাহিনী হস্তী সঙ্গে নিয়ে কাবা গৃহ ধ্বংস করার জন্যে অভিযান চালিয়েছিল। তারা কাবা গৃহের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা নাম ও নিশানা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সর্বপ্রকারের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। বাহ্যতঃ তারা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে তারা বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা প্রায় সবাই মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের অশুভ উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মূলতঃ মহানবীর (সঃ) পূর্বাভাষ এবং তাঁর আগমনী সংবাদ। সেই বছরই তাঁর জন্ম হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ হে কুরায়েশের দল! আবিসিনিয়ার (হাবশের) ঐ বাহিনীর উপর আমি • তোমাদেরকে বিজয় দান করেছি, তাতে তোমাদের কল্যাণ সাধন আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নিজের গৃহ রক্ষার জন্যেই ঐ বিজয় দান করেছি। আমার প্রেরিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াতের মাধ্যমে সেই গৃহকে আমি আরো অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবো। মোটকথা, আসহাবে ফীল বা হস্তী অধিপতিদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এটাই যা বর্ণনা করা হলো। বিস্তারিত বর্ণনা (আরবি) এর বর্ণনায় গত হয়েছে যে, হুমায়ের গোত্রের শেষ বাদশাহ নূনুয়াম, যে ছিল মুশরিক, তার সময়ের মুসলমানদেরকে পরিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল। ঐ সব মুসলমান ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী। তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। তাঁদের সবাইকে শহীদ করে দেয়া হয়েছিল। দাউস যু সালাবান নামক একটি মাত্র লোক বেঁচেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় পৌছে রোমের বাদশাহ কায়সারের কাছে ফরিয়াদ করলেন। কায়সার। ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তিনি হাবশের (আবিসিনিয়ার) বাদশাহ নাজাশীকে লিখলেনঃ “দাউস যু সালাবানের সঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠিয়ে দিন। সেখান থেকে শক্রদেশ নিকটবতী ছিল। বাদশাহ নাজাশী আমীর ইবনে ইরবাত ও আবরাহা ইবনে সাহাব আবু ইয়াকসুমকে সৈন্য পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব দিয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী যুনুয়াসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল ইয়ামনে পৌঁছলো এবং ইয়ামন ও তথাকার অধিবাসীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। শূনুয়াস পালিয়ে গেল এবং সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলো। যুনুয়াসের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র ইয়ামন হাবশের বাদশাহর কর্তৃত্বে চলে গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ হিসেবে আগমনকারী উভয় সর্দার ইয়ামনে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে নিজ নিজ বিভক্ত সৈন্যদলসহ মুখোমুখী সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তত হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে উভয় সর্দার পরস্পরকে বললোঃ অযথা রক্তপাত করে কি লাভ, চলো আমরা উভয়ে লড়াই করি। যে বেঁচে যাবে, ইয়ামন এবং সেনাবাহিনী তার অনুগত থাকবে।” এই কথা অনুযায়ী উভয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলো। আমীর ইবনে ইরবাত আবরাহার উপর আক্রমণ করলো এবং তরবারীর এক আঘাতে তার চেহারা রক্তাক্ত করে ফেললো। নাক, ঠোট এবং চেহারার বেশ কিছু অংশ কেটে গেল। এই অবস্থা দেখে আবরাহার ক্রীতদাস আদাহ্ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরবাতকে হত্যা করে ফেললো। মারাত্মকভাবে আহত আবরাহা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন চিকিৎসার পর তার ক্ষত ভাল হলো এবং সে ইয়ামনের শাসনকর্তা হয়ে বসলো। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী এ খবর পেয়ে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং একপত্রে জানালেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার শহরসমূহ ধ্বংস করবো এবং তোমার টিকি কেটে আনবো।” আবরাহা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ পত্রের জবাব লিখলো এবং দূতকে নানা প্রকারের উপটৌকন, একটা থলের মধ্যে ইয়ামনের মাটি এবং নিজের মাথার কিছু চুল কেটে ওর মধ্যে রাখলো ও ওর মুখ বন্ধ করে দিলো। তাছাড়া চিঠিতে সে নিজের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে লিখলোঃ “ইয়ামনে মাটি এবং আমার মাথার চুল হাযির রয়েছে, আপনি নিজের কসম পূর্ণ করুন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন!" এতে নাজাশী খুশী হলেন এবং ইয়ামনের শাসনভার আবরাহাকে লিখে দিলেন। তারপর আবরাহা নাজাশীকে লিখলোঃ “আমি ইয়ামনে আপনার জন্যে এমন একটি গীর্জা তৈরি করছি যে, এরকম গীর্জা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে কখনো তৈরি হয়নি। অতি যত্ন সহকারে খুবই মযবুত ও অতি উঁচু করে ঐ গীর্জাটি নির্মিত হলো। ঐ গীর্জার চূড়া এতো উঁচু ছিল যে, চূড়ার প্রতি টুপি মাথায় দিয়ে তাকালে মাথার টুপি পড়ে যেতো। আরববাসীরা ঐ গীর্জার নাম দিয়েছিল কালীস' অর্থাৎ টুপি ফেলে দেয়া গীর্জা। এবার আবরাহা মনে করলো যে, জনসাধারণ কা’বায় হজ্ব না করে বরং এ গীর্জায় এসে হজ্ব করবে। সারাদেশে সে এটা ঘোষণা করে দিলো। আদনানিয়্যাহ ও কাহতা নিয়্যাহ গোত্র এ ঘোষণায় খুবই অসন্তুষ্ট, আর কুরায়েশরা ভীষণ রাগান্বিত হলো। অল্প কয়েকদিন পরে দেখা গেল যে, এক ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে ঐ গীর্জায় প্রবেশ করে পায়খানা করে এসেছে। প্রহরীরা পরের দিন এ অবস্থা দেখে বাদশাহর কাছে খবর পাঠালো এবং অভিমত ব্যক্ত করলো যে, কুরায়েশরাই এ কাজ করেছে। তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে বলেই এ কাণ্ড তারা করেছে। আবরাহা তৎক্ষণাৎ কসম করে বললোঃ “আমি মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি ইট পর্যন্ত খুলে ফেলবো।”অন্য এক বর্ণনায় এরূপও আছে যে, কয়েকজন উদ্যোগী কুরায়েশ যুবক ঐ গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বাতাস প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়েছিল বলে আগুন ভালভাবে ঐ গীর্জাকে গ্রাস করেছিল এবং ওটা মাটিতে ধ্বসে পড়েছিল। অতঃপর ক্রুদ্ধ আবরাহা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো। তাদের সাথে এক বিরাট উঁচু ও মোটা হাতী ছিল। ঐরূপ হাতী ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। হাতীটির নাম ছিল মাহমুদ। বাদশাহ নাজাশী মক্কা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে ঐ হাতিটি আবরাহাকে দিয়েছিল। ঐ হাতীর সাথে আবরাহা আরো আটটি অথবা বারোটি হাতী নিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে বায়তুল্লাহর দেয়ালে শিকল বেঁধে দিবে, তারপর সমস্ত হাতীর গলায় ঐ শিকল লাগিয়ে দিবে। এতে শিকল টেনে হাতীগুলো সমস্ত দেয়াল একত্রে ধ্বসিয়ে দিবে। মক্কার অধিবাসীরা এ সংবাদ পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লো। যে কোন অবস্থায় এর মুকাবিলা করার তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। যুনফর নামক ইয়ামনের একজন রাজ বংশীয় লোক নিজের গোত্র ও আশে পাশের বহু সংখ্যক আরবকে একত্রিত করে দুবৃত্ত আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছা। ছিল অন্যরকম। যুনফর পরাজিত হলেন এবং আবরাহার হাতে বন্দী হলেন। যুনফরকেও সঙ্গে নিয়ে আবরাহা মক্কার পথে অগ্রসর হলো। খাশআম গোত্রের এলাকায় পৌঁছার পর নুফায়েল ইবনে হাবীব আশআমী একদল সৈন্য নিয়ে আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরাই আবরাহার হাতে পরাজয় বরণ করলেন। নুফায়েলকেও যুনফরের মত বন্দী করা হলো। আবরাহা প্রথম নুফায়েলকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু পরে মক্কার পথ দেখিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে নিয়ে চললো। তায়েফের উপকণ্ঠে পৌঁছলে সাকীফ গোত্র আবরাহার সাথে সন্ধি করলো যে, লাত মূর্তিটি যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে, আবরাহার সৈন্যরা ঐ প্রকোষ্ঠের কোন ক্ষতি সাধন করবে না। সাকীফ গোত্র আবু রিগাল নামক একজন লোককে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্যে আবরাহার সঙ্গে দিলো। মক্কার কাছে মুগমাস নামক স্থানে তারা অবস্থান করলো। আবরাহার সৈন্যেরা আশেপাশের জনপদ এবং চারণভূমি থেকে বহু সংখ্যক উট এবং অন্যান্য পশু দখল করে নিলো। এগুলোর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উটও ছিল। এতে আরবের কবিরা আবরাহার নিন্দে করে কবিতা রচনা করলো সীরাতে ইবনে ইসহাকে ঐ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।অতঃপর আবরাহা নিজের বিশেষ দূত হানাতাহ হুমাইরীকে বললোঃ তুমি মক্কার সর্বাপেক্ষা বড় সর্দারকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। এবং ঘোষণা করে দাওঃ আমরা মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি, আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। তবে হ্যা, মক্কাবাসীরা যদি কাবাগৃহ রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসে এবং আমাদেরকে বাধা দেয় তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হানাতাহ মক্কার জনগণের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেমই মক্কার বড় নেতা। হানাতাহ আবদুল মুত্তালিবের সামনে আবরাহার বক্তব্য পেশ করলে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাও নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও নেই।” আল্লাহর সম্মানিত ঘর। তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন্ত স্মৃতি। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজের ঘরের হিফাজত নিজেই করবেন। অন্যথায় তাঁর ঘরকে রক্ষা করার সাহসও আমাদের নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও আমাদের নেই।হানাতাহ তখন তাকে বললোঃ “ঠিক আছে, আপনি আমাদের বাদশাহর কাছে চলুন।” আবদুল মুত্তালিব তখন তার সাথে আবরাহার কাছে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শণ বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তাঁকে দেখা মাত্র যে কোন মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। আবরাহা তাকে দেখেই সিংহাসন থেকে নেমে এলো এবং তার সাথে মেঝেতে উপবেশন করলোঃ সে তার দোভাষীকে বললোঃ তাকে জিজ্ঞেস করঃ তিনি কি চান? আবদুল মুত্তালিব জানালেনঃ “বাদশাহ আমার দু’শ উট লুট করিয়েছেন। আমি সেই উট ফেরত নিতে এসেছি।” বাদশাহ আবরাহা তখন দো-ভাষীর মাধ্যমে তাঁকে বললোঃ প্রথম দৃষ্টিতে আপনি যে শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন, আপনার কথা শুনে সে শ্রদ্ধা লোপ পেয়ে গেছে। নিজের দু’শ উটের। জন্যে আপনার এতো চিন্তা অথচ স্বজাতির ধর্মের জন্যে কোন চিন্তা নেই! আমি আপনাদের ইবাদতখানা কা’বা ধ্বংস করে ধূলিসাৎ করতে এসেছি।" একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জবাবে বললেনঃ “শুন, উটের মালিক আমি, তাই উট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে এসেছি। আর কাবাগৃহের মালিক হলেন স্বয়ং আল্লাহ। সুতরাং তিনি নিজেই নিজের ঘর রক্ষা করবেন।” তখন ঐ নরাধম বললোঃ “আজ স্বয়ং আল্লাহও কাবাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না।” একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “তা আল্লাহ জানেন এবং আপনি জানেন।” এও বর্ণিত আছে যে, মক্কার জনগণ তাদের ধন সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আবরাহাকে দিতে চেয়েছিল, যাতে সে এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা হতে বিরত থাকে। কিন্তু আবরাহা তাতেও রাজী হয়নি। মোটকথা, আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন এবং মক্কাবাসীদেরকে বললেনঃ “তোমরা মক্কাকে সম্পূর্ণ খালি করে দাও। সবাই তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।” তারপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়েশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা গৃহে গিয়ে কাবার খুঁটি ধরে দেয়াল ছুঁয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন এবং কায়মনোবাক্যে ঐ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ গৃহ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করলেন। আবরাহা এবং তার রক্ত পিপাসু সৈন্যদের অপবিত্র ইচ্ছার কবল থেকে কাবাকে পবিত্র রাখার জন্যে আবদুল মুত্তালিব কবিতার ভাষায় নিম্নলিখিত দুআ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা নিশ্চিন্ত, কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক গৃহমালিক নিজেই নিজের গৃহের হিফাযত করেন। হে আল্লাহ! আপনিও আপনার গৃহ আপনার শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করুন। আপনার অস্ত্রের উপর তাদের অস্ত্র জয়যুক্ত হবে এমন যেন কিছুতেই না হয়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কা'বা গৃহের খুঁটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে ওর আশে পাশের পর্বতসমূহের চূড়ায় উঠে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, কুরবানীর একশত পশুকে নিশান লাগিয়ে কা'বার আশে পাশে ছেড়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি দুবৃত্তরা আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া পশুর প্রতি হাত বাড়ায় তাহলে আল্লাহর গযব তাদের উপর অবশ্যই নেমে আসবে।পরদিন প্রভাতে আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় প্রবেশের উদ্যোগ আয়োজন করলো। বিশেষ হাতী মাহমুদকে সজ্জিত করা হলো। পথে বন্দী হয়ে আবরাহার সাথে আগমনকারী নুফায়েল ইবনে হাবীব তখন মাহমুদ নামক হাতীটির কান ধরে বললেনঃ “মাহমুদ! তুমি বসে পড়, আর যেখান থেকে এসেছে সেখানে ভালভাবে ফিরে যাও। তুমি আল্লাহর পবিত্র শহরে রয়েছে।” একথা বলে নুফায়েল হাতির কান ছেড়ে দিলেন এবং ছুটে গিয়ে নিকট এক পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। মাহমুদ নামক হাতীটি নুফায়েলের কথা শোনার সাথে সাথে বসে পড়লো। বহুচেষ্টা করেও তাকে নড়ানো সম্ভব হলো না। পরীক্ষামূলক ভাবে ইয়ামনের দিকে তার মুখ ফিরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই হাতী তাড়াতাড়ি উঠে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। পূর্বদিকে চালাবার চেষ্টা করা হলে সেদিকেও যাচ্ছিল, কিন্তু মক্কা শরীফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চালাবার চেষ্টা করতেই বসে পড়লো। সৈন্যরা তখন হাতীটিকে প্রহার করতে শুরু করলো। এমন সময় দেখা গেল এক ঝাঁক পাখি কালো মেঘের মত হয়ে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসছে। চোখের পলকে ওগুলো আবরাহার সেনাবাহিনীর মাথার উপর এসে পড়লো। এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে। ফেললো। প্রত্যেক পাখির চঞ্চতে একটি এবং দুপায়ে দুটি কংকর ছিল। কংকরের ঐটুকরাগুলো ছিল মসুরের ডাল বা মাস কলাই এর সমান। পাখিগুলো কংকরের ঐ টুকরোগুলো আবরাহার সৈন্যদের প্রতি নিক্ষেপ করছিল। যার গায়ে ঐ কংকর পড়ছিল সেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভবলীলা সাঙ্গ করছিল। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল আর নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল কারণ তারা তাঁকেই পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে এনেছিল। নুফায়েল তখন পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করে অন্যান্য কুরায়েশদের সাথে আবরাহা ও তার সৈন্যদের দুরাবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঐ সময় নুফায়েল নিম্নলিখিত কবিতাংশ পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আর আশ্রয়স্থল কোথায়? স্বয়ং আল্লাহই তো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শোনো, দুবৃত্ত আশরম পরাজিত হয়েছে, জয়ী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুফায়েল আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হাতী ওয়ালাদের দুরাবস্থার সময়ে তুমি যদি উপস্থিত থাকতে! মুহাসসাব প্রান্তরে তাদের উপর আযাবের কংকর বর্ষিত হয়েছে। তুমি সে অবস্থা দেখলে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হতে। আমরা পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছিলাম। আমাদের হৃৎপিণ্ড কাঁপছিল এই ভয়ে যে, না জানি হয় তো আমাদের উপরও এই কংকর পড়ে যায় এবং আমাদেরও দফারফা করে দেয়। পুরো সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে পালাচ্ছিল ও নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল, যেন নুফায়েলের উপর হাবশীদের ঋণ রয়েছে।”ওয়াকেদী (রঃ) বলেন যে, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙএর। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। ওদের পায়ের রঙছিল লাল। অন্য এক রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, মাহমুদ নামক হাতীটি যখন বসে পড়লো এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। তখন সৈন্যরা অন্য একটি হাতীকে সামনের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে পা বাড়াতেই তার মাথায় কংকরের টুকরো পড়লো এবং আর্তনাদ করে পিছনে সরে এলো। অন্যান্য হাতীও তখন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করলো। কয়েকটির উপর কংকর পড়ায় তৎক্ষণাৎ ওগুলো মারা গেল। যারা ছুটে পালাচ্ছিল তাদেরও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। এবং অবশেষে সবগুলোই মারা গেল। আবরাহা বাদশাহও ছুটে পালালো, কিন্তু তারও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। সানআ (তৎকালীন ইয়ামনের রাজধানী) নামক শহরে পৌঁছার পর সে মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো এবং কুকুরের মত ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করলো। তার কলেজা ফেটে গিয়েছিল। কুরায়েশরা প্রচুর ধন সম্পদ পেয়ে গিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব তো সোনা সংগ্রহ করে করে একটি কূপ ভর্তি করেছিলেন। ঐ বছরই সারা দেশে প্রথম ওলা ওঠা এবং প্লেগ রোগ দেখা দেয়। হরল, হান্যাল প্রভৃতি কটুগাছও ঐ বছর উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর ভাষায় এ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এবং যেন বলছেনঃ যদি তোমরা আমার ঘরের সম্মান এভাবে করতে থাকতে এবং আমার রাসূল (সঃ)-এর কথা মানতে তবে আমিও সেভাবে তোমাদের হিফাযত করতাম এবং শত্রু দল থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিতাম। (আরবি) শব্দটি বহুবচন, এর একবচন আরবী অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খুবই কঠিন বা শক্ত। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) শব্দ দুটি ফারসী শব্দ। (আরবি) এর অর্থ হলো প্রস্তর সমন্বিত মৃত্তিকা। (আরবি) শব্দটি শব্দের (আরবি) বহুবচন।(আরবি) মাঠের ফসলের ঐ সব পাতাকে বলা হয় যেগুলো এখনো পাকেনি। (আরবি) এর অর্থ হলো ঝাক ঝক পাখী, বহুসংখ্যক এবং ক্রমাগত আগমনকারী। কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মত এবং নখ ছিল কুকুরের মত।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সবুজ রঙ-এর এই পাখিগুলো সমুদ্র হতে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মত। এ সম্পর্কে আরো বহু উক্তি রয়েছে। পাখির ঝাঁক আবরাহার সৈন্যদের মাথার উপর অবস্থান করে চীৎকার করছিল এবং কংকর নিক্ষেপ করছিল। যার মাথায় ঐ কংকর পড়ছিল তা তার পায়খানার দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রবল বাতাস বইতে লাগলো। এর ফলে আশে পাশের বালুকণা এসে তাদের চোখে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদেরকে ঘায়েল করে ফেললো।(আরবি) এর অর্থ হলো ভূষি এবং (আরবি) অর্থহলো ভক্ষিত বা টুকরো টুকরো কৃত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শস্যদানার উপরের ভূষিকে (আরবি) বলা হয়। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ক্ষেতের শস্যের ঐ পাতা যেগুলো পশুরা খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তছনছ করে দিলেন এবং সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন। তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কোন কল্যাণই তারা লাভ করতে সমর্থ হলো না। তাদের দুরাবস্থার খবর অন্যদেরকে পৌছানোর মত কেউই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল না। অল্পসংখ্যক যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বেঁচেছিল তারাও পরে ধুকে ধুকে মরেছিল। স্বয়ং বাদশাহ্ও এক টুকরো গোশতের মত হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে সে সানআতে পৌছলো। সেখানে পৌছেই তার কলেজা ফেটে গেল এবং সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াকসূ ইয়ামানের শাসন ভার গ্রহণ করলো। তারপর তার অন্য ভাই মাসরুক ইবনে আবরাহা সিংহাসনে আরোহন করলো। এ সময়ে ঘূইয়াযান হুমাইরী কিসরার (পারস্য সম্রাট) কাছে গিয়ে হাবশীদের কবল থেকে ইয়ামনকে মুক্ত করার জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলো। কিসরা সাইফের সাথে একদল বাহাদুর সৈন্য পাঠালো। সেই সৈন্যদল হাবশীদেরকে পরাজিত করে আবরাহার বংশধরদের কবল থেকে ইয়ামনের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতঃপর হুমাইরীয় গোত্র ইয়ামন শাসন করতে থাকে। আরবের লোকেরা এই উপলক্ষে উৎসব পালন করে। চারদিক থেকে হুমাইরীয় গোত্রের বাদশাহকে অভিনন্দন জানানো হয়। হযরত আয়েশা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ “আবরাহার সৈন্যদলের দু’জন সৈন্যকে আমি মক্কা শরীফে দেখেছি। তারা উভয়েই অন্ধ এবং চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তারা বসে বসে ভিক্ষা করতো।”হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেন যে, যে আসাফ ও নায়েলা নামক মূর্তিদ্বয়ের পার্শ্বে মুশরিকরা কুরবানী করতো সেখানে বসে ঐ লোক দুটি লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইতো। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাতীর চালক, যার নাম ছিল আনীসা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, আবরাহা নিজে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি, বরং শামর ইবনে মাকসূত নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। পাখিগুলো তাদের উপর রাত্রিকালে এসেছিল এবং সকাল পর্যন্ত তাদের সকলকে তছনছ করে ফেলেছিল। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল। আসল কথা হলো এই যে, স্বয়ং বাদশাহ্ আবরাহা আশরম হাবশী নিজেই সৈন্যদল নিয়ে এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল। শামর ইবনে মাকসূদ হয় তো কোন একদল সৈন্যের সেনাপতি ছিল। বহু সংখ্যক আরব কবি এ ঘটনাকে নানাভাবে তাঁদের কবিতায় বর্ণনা করেছেন।একটি রিওয়াইয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে নবী করীম (সঃ) একটি টিলার উপর উঠেছিলেন। সেখান থেকে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উষ্ট্ৰীটি সেখানে বসে পড়েছিল। সাহাবী (রাঃ)গণ বহু চেষ্টা করেও উস্ত্রীকে উঠাতে পারলেন না। তখন তারা বললেন যে, উষ্ট্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “না, সে ক্লান্তও হয়নি এবং বসে পড়া তার অভ্যাসও নয়। তাকে ঐ আল্লাহ্ থামিয়ে দিয়েছেন যিনি হাতীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মক্কাবাসীরা যে শর্তে সম্মত হবে আমি সেই শর্তেই তাদের সাথে সন্ধি করবো। তবে, আল্লাহর অমর্যাদা হতে পারে এমন কোন শর্তে আমি সম্মত হবো” তারপর তিনি উস্ত্রীকে ধমক দেয়া মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মক্কার উপর হাতী ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি, বরং তিনি তাঁর নবী (সঃ) ও ঈমানদার বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। জেনে রেখো যে, মক্কার মর্যাদা আজ ঐ অবস্থাতেই ফিরে এসেছে যে অবস্থায় গতকাল ছিল। খবরদার! প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট (খবর) পৌছিয়ে দিবে।”

আল-ফীল 105:5

১-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা যে কুরায়েশের উপর বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন, * এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যে বাহিনী হস্তী সঙ্গে নিয়ে কাবা গৃহ ধ্বংস করার জন্যে অভিযান চালিয়েছিল। তারা কাবা গৃহের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা নাম ও নিশানা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সর্বপ্রকারের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। বাহ্যতঃ তারা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে তারা বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা প্রায় সবাই মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের অশুভ উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মূলতঃ মহানবীর (সঃ) পূর্বাভাষ এবং তাঁর আগমনী সংবাদ। সেই বছরই তাঁর জন্ম হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ হে কুরায়েশের দল! আবিসিনিয়ার (হাবশের) ঐ বাহিনীর উপর আমি • তোমাদেরকে বিজয় দান করেছি, তাতে তোমাদের কল্যাণ সাধন আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নিজের গৃহ রক্ষার জন্যেই ঐ বিজয় দান করেছি। আমার প্রেরিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াতের মাধ্যমে সেই গৃহকে আমি আরো অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবো। মোটকথা, আসহাবে ফীল বা হস্তী অধিপতিদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এটাই যা বর্ণনা করা হলো। বিস্তারিত বর্ণনা (আরবি) এর বর্ণনায় গত হয়েছে যে, হুমায়ের গোত্রের শেষ বাদশাহ নূনুয়াম, যে ছিল মুশরিক, তার সময়ের মুসলমানদেরকে পরিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল। ঐ সব মুসলমান ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী। তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। তাঁদের সবাইকে শহীদ করে দেয়া হয়েছিল। দাউস যু সালাবান নামক একটি মাত্র লোক বেঁচেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় পৌছে রোমের বাদশাহ কায়সারের কাছে ফরিয়াদ করলেন। কায়সার। ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তিনি হাবশের (আবিসিনিয়ার) বাদশাহ নাজাশীকে লিখলেনঃ “দাউস যু সালাবানের সঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠিয়ে দিন। সেখান থেকে শক্রদেশ নিকটবতী ছিল। বাদশাহ নাজাশী আমীর ইবনে ইরবাত ও আবরাহা ইবনে সাহাব আবু ইয়াকসুমকে সৈন্য পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব দিয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী যুনুয়াসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল ইয়ামনে পৌঁছলো এবং ইয়ামন ও তথাকার অধিবাসীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। শূনুয়াস পালিয়ে গেল এবং সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলো। যুনুয়াসের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র ইয়ামন হাবশের বাদশাহর কর্তৃত্বে চলে গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ হিসেবে আগমনকারী উভয় সর্দার ইয়ামনে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে নিজ নিজ বিভক্ত সৈন্যদলসহ মুখোমুখী সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তত হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে উভয় সর্দার পরস্পরকে বললোঃ অযথা রক্তপাত করে কি লাভ, চলো আমরা উভয়ে লড়াই করি। যে বেঁচে যাবে, ইয়ামন এবং সেনাবাহিনী তার অনুগত থাকবে।” এই কথা অনুযায়ী উভয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলো। আমীর ইবনে ইরবাত আবরাহার উপর আক্রমণ করলো এবং তরবারীর এক আঘাতে তার চেহারা রক্তাক্ত করে ফেললো। নাক, ঠোট এবং চেহারার বেশ কিছু অংশ কেটে গেল। এই অবস্থা দেখে আবরাহার ক্রীতদাস আদাহ্ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরবাতকে হত্যা করে ফেললো। মারাত্মকভাবে আহত আবরাহা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন চিকিৎসার পর তার ক্ষত ভাল হলো এবং সে ইয়ামনের শাসনকর্তা হয়ে বসলো। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী এ খবর পেয়ে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং একপত্রে জানালেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার শহরসমূহ ধ্বংস করবো এবং তোমার টিকি কেটে আনবো।” আবরাহা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ পত্রের জবাব লিখলো এবং দূতকে নানা প্রকারের উপটৌকন, একটা থলের মধ্যে ইয়ামনের মাটি এবং নিজের মাথার কিছু চুল কেটে ওর মধ্যে রাখলো ও ওর মুখ বন্ধ করে দিলো। তাছাড়া চিঠিতে সে নিজের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে লিখলোঃ “ইয়ামনে মাটি এবং আমার মাথার চুল হাযির রয়েছে, আপনি নিজের কসম পূর্ণ করুন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন!" এতে নাজাশী খুশী হলেন এবং ইয়ামনের শাসনভার আবরাহাকে লিখে দিলেন। তারপর আবরাহা নাজাশীকে লিখলোঃ “আমি ইয়ামনে আপনার জন্যে এমন একটি গীর্জা তৈরি করছি যে, এরকম গীর্জা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে কখনো তৈরি হয়নি। অতি যত্ন সহকারে খুবই মযবুত ও অতি উঁচু করে ঐ গীর্জাটি নির্মিত হলো। ঐ গীর্জার চূড়া এতো উঁচু ছিল যে, চূড়ার প্রতি টুপি মাথায় দিয়ে তাকালে মাথার টুপি পড়ে যেতো। আরববাসীরা ঐ গীর্জার নাম দিয়েছিল কালীস' অর্থাৎ টুপি ফেলে দেয়া গীর্জা। এবার আবরাহা মনে করলো যে, জনসাধারণ কা’বায় হজ্ব না করে বরং এ গীর্জায় এসে হজ্ব করবে। সারাদেশে সে এটা ঘোষণা করে দিলো। আদনানিয়্যাহ ও কাহতা নিয়্যাহ গোত্র এ ঘোষণায় খুবই অসন্তুষ্ট, আর কুরায়েশরা ভীষণ রাগান্বিত হলো। অল্প কয়েকদিন পরে দেখা গেল যে, এক ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে ঐ গীর্জায় প্রবেশ করে পায়খানা করে এসেছে। প্রহরীরা পরের দিন এ অবস্থা দেখে বাদশাহর কাছে খবর পাঠালো এবং অভিমত ব্যক্ত করলো যে, কুরায়েশরাই এ কাজ করেছে। তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে বলেই এ কাণ্ড তারা করেছে। আবরাহা তৎক্ষণাৎ কসম করে বললোঃ “আমি মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি ইট পর্যন্ত খুলে ফেলবো।”অন্য এক বর্ণনায় এরূপও আছে যে, কয়েকজন উদ্যোগী কুরায়েশ যুবক ঐ গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বাতাস প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়েছিল বলে আগুন ভালভাবে ঐ গীর্জাকে গ্রাস করেছিল এবং ওটা মাটিতে ধ্বসে পড়েছিল। অতঃপর ক্রুদ্ধ আবরাহা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো। তাদের সাথে এক বিরাট উঁচু ও মোটা হাতী ছিল। ঐরূপ হাতী ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। হাতীটির নাম ছিল মাহমুদ। বাদশাহ নাজাশী মক্কা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে ঐ হাতিটি আবরাহাকে দিয়েছিল। ঐ হাতীর সাথে আবরাহা আরো আটটি অথবা বারোটি হাতী নিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে বায়তুল্লাহর দেয়ালে শিকল বেঁধে দিবে, তারপর সমস্ত হাতীর গলায় ঐ শিকল লাগিয়ে দিবে। এতে শিকল টেনে হাতীগুলো সমস্ত দেয়াল একত্রে ধ্বসিয়ে দিবে। মক্কার অধিবাসীরা এ সংবাদ পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লো। যে কোন অবস্থায় এর মুকাবিলা করার তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। যুনফর নামক ইয়ামনের একজন রাজ বংশীয় লোক নিজের গোত্র ও আশে পাশের বহু সংখ্যক আরবকে একত্রিত করে দুবৃত্ত আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছা। ছিল অন্যরকম। যুনফর পরাজিত হলেন এবং আবরাহার হাতে বন্দী হলেন। যুনফরকেও সঙ্গে নিয়ে আবরাহা মক্কার পথে অগ্রসর হলো। খাশআম গোত্রের এলাকায় পৌঁছার পর নুফায়েল ইবনে হাবীব আশআমী একদল সৈন্য নিয়ে আবরাহার মুকাবিলা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরাই আবরাহার হাতে পরাজয় বরণ করলেন। নুফায়েলকেও যুনফরের মত বন্দী করা হলো। আবরাহা প্রথম নুফায়েলকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু পরে মক্কার পথ দেখিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে নিয়ে চললো। তায়েফের উপকণ্ঠে পৌঁছলে সাকীফ গোত্র আবরাহার সাথে সন্ধি করলো যে, লাত মূর্তিটি যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে, আবরাহার সৈন্যরা ঐ প্রকোষ্ঠের কোন ক্ষতি সাধন করবে না। সাকীফ গোত্র আবু রিগাল নামক একজন লোককে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্যে আবরাহার সঙ্গে দিলো। মক্কার কাছে মুগমাস নামক স্থানে তারা অবস্থান করলো। আবরাহার সৈন্যেরা আশেপাশের জনপদ এবং চারণভূমি থেকে বহু সংখ্যক উট এবং অন্যান্য পশু দখল করে নিলো। এগুলোর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উটও ছিল। এতে আরবের কবিরা আবরাহার নিন্দে করে কবিতা রচনা করলো সীরাতে ইবনে ইসহাকে ঐ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।অতঃপর আবরাহা নিজের বিশেষ দূত হানাতাহ হুমাইরীকে বললোঃ তুমি মক্কার সর্বাপেক্ষা বড় সর্দারকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। এবং ঘোষণা করে দাওঃ আমরা মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি, আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। তবে হ্যা, মক্কাবাসীরা যদি কাবাগৃহ রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসে এবং আমাদেরকে বাধা দেয় তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হানাতাহ মক্কার জনগণের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেমই মক্কার বড় নেতা। হানাতাহ আবদুল মুত্তালিবের সামনে আবরাহার বক্তব্য পেশ করলে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাও নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও নেই।” আল্লাহর সম্মানিত ঘর। তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন্ত স্মৃতি। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজের ঘরের হিফাজত নিজেই করবেন। অন্যথায় তাঁর ঘরকে রক্ষা করার সাহসও আমাদের নেই এবং যুদ্ধ করার মত শক্তিও আমাদের নেই।হানাতাহ তখন তাকে বললোঃ “ঠিক আছে, আপনি আমাদের বাদশাহর কাছে চলুন।” আবদুল মুত্তালিব তখন তার সাথে আবরাহার কাছে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শণ বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তাঁকে দেখা মাত্র যে কোন মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। আবরাহা তাকে দেখেই সিংহাসন থেকে নেমে এলো এবং তার সাথে মেঝেতে উপবেশন করলোঃ সে তার দোভাষীকে বললোঃ তাকে জিজ্ঞেস করঃ তিনি কি চান? আবদুল মুত্তালিব জানালেনঃ “বাদশাহ আমার দু’শ উট লুট করিয়েছেন। আমি সেই উট ফেরত নিতে এসেছি।” বাদশাহ আবরাহা তখন দো-ভাষীর মাধ্যমে তাঁকে বললোঃ প্রথম দৃষ্টিতে আপনি যে শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন, আপনার কথা শুনে সে শ্রদ্ধা লোপ পেয়ে গেছে। নিজের দু’শ উটের। জন্যে আপনার এতো চিন্তা অথচ স্বজাতির ধর্মের জন্যে কোন চিন্তা নেই! আমি আপনাদের ইবাদতখানা কা’বা ধ্বংস করে ধূলিসাৎ করতে এসেছি।" একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জবাবে বললেনঃ “শুন, উটের মালিক আমি, তাই উট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে এসেছি। আর কাবাগৃহের মালিক হলেন স্বয়ং আল্লাহ। সুতরাং তিনি নিজেই নিজের ঘর রক্ষা করবেন।” তখন ঐ নরাধম বললোঃ “আজ স্বয়ং আল্লাহও কাবাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না।” একথা শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেনঃ “তা আল্লাহ জানেন এবং আপনি জানেন।” এও বর্ণিত আছে যে, মক্কার জনগণ তাদের ধন সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আবরাহাকে দিতে চেয়েছিল, যাতে সে এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা হতে বিরত থাকে। কিন্তু আবরাহা তাতেও রাজী হয়নি। মোটকথা, আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন এবং মক্কাবাসীদেরকে বললেনঃ “তোমরা মক্কাকে সম্পূর্ণ খালি করে দাও। সবাই তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।” তারপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়েশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা গৃহে গিয়ে কাবার খুঁটি ধরে দেয়াল ছুঁয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন এবং কায়মনোবাক্যে ঐ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ গৃহ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করলেন। আবরাহা এবং তার রক্ত পিপাসু সৈন্যদের অপবিত্র ইচ্ছার কবল থেকে কাবাকে পবিত্র রাখার জন্যে আবদুল মুত্তালিব কবিতার ভাষায় নিম্নলিখিত দুআ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা নিশ্চিন্ত, কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক গৃহমালিক নিজেই নিজের গৃহের হিফাযত করেন। হে আল্লাহ! আপনিও আপনার গৃহ আপনার শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করুন। আপনার অস্ত্রের উপর তাদের অস্ত্র জয়যুক্ত হবে এমন যেন কিছুতেই না হয়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কা'বা গৃহের খুঁটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে ওর আশে পাশের পর্বতসমূহের চূড়ায় উঠে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, কুরবানীর একশত পশুকে নিশান লাগিয়ে কা'বার আশে পাশে ছেড়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি দুবৃত্তরা আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া পশুর প্রতি হাত বাড়ায় তাহলে আল্লাহর গযব তাদের উপর অবশ্যই নেমে আসবে।পরদিন প্রভাতে আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় প্রবেশের উদ্যোগ আয়োজন করলো। বিশেষ হাতী মাহমুদকে সজ্জিত করা হলো। পথে বন্দী হয়ে আবরাহার সাথে আগমনকারী নুফায়েল ইবনে হাবীব তখন মাহমুদ নামক হাতীটির কান ধরে বললেনঃ “মাহমুদ! তুমি বসে পড়, আর যেখান থেকে এসেছে সেখানে ভালভাবে ফিরে যাও। তুমি আল্লাহর পবিত্র শহরে রয়েছে।” একথা বলে নুফায়েল হাতির কান ছেড়ে দিলেন এবং ছুটে গিয়ে নিকট এক পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। মাহমুদ নামক হাতীটি নুফায়েলের কথা শোনার সাথে সাথে বসে পড়লো। বহুচেষ্টা করেও তাকে নড়ানো সম্ভব হলো না। পরীক্ষামূলক ভাবে ইয়ামনের দিকে তার মুখ ফিরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই হাতী তাড়াতাড়ি উঠে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। পূর্বদিকে চালাবার চেষ্টা করা হলে সেদিকেও যাচ্ছিল, কিন্তু মক্কা শরীফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চালাবার চেষ্টা করতেই বসে পড়লো। সৈন্যরা তখন হাতীটিকে প্রহার করতে শুরু করলো। এমন সময় দেখা গেল এক ঝাঁক পাখি কালো মেঘের মত হয়ে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসছে। চোখের পলকে ওগুলো আবরাহার সেনাবাহিনীর মাথার উপর এসে পড়লো। এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে। ফেললো। প্রত্যেক পাখির চঞ্চতে একটি এবং দুপায়ে দুটি কংকর ছিল। কংকরের ঐটুকরাগুলো ছিল মসুরের ডাল বা মাস কলাই এর সমান। পাখিগুলো কংকরের ঐ টুকরোগুলো আবরাহার সৈন্যদের প্রতি নিক্ষেপ করছিল। যার গায়ে ঐ কংকর পড়ছিল সেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভবলীলা সাঙ্গ করছিল। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল আর নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল কারণ তারা তাঁকেই পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে এনেছিল। নুফায়েল তখন পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করে অন্যান্য কুরায়েশদের সাথে আবরাহা ও তার সৈন্যদের দুরাবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। ঐ সময় নুফায়েল নিম্নলিখিত কবিতাংশ পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আর আশ্রয়স্থল কোথায়? স্বয়ং আল্লাহই তো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শোনো, দুবৃত্ত আশরম পরাজিত হয়েছে, জয়ী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুফায়েল আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হাতী ওয়ালাদের দুরাবস্থার সময়ে তুমি যদি উপস্থিত থাকতে! মুহাসসাব প্রান্তরে তাদের উপর আযাবের কংকর বর্ষিত হয়েছে। তুমি সে অবস্থা দেখলে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হতে। আমরা পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছিলাম। আমাদের হৃৎপিণ্ড কাঁপছিল এই ভয়ে যে, না জানি হয় তো আমাদের উপরও এই কংকর পড়ে যায় এবং আমাদেরও দফারফা করে দেয়। পুরো সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে পালাচ্ছিল ও নুফায়েল নুফায়েল বলে চীৎকার করছিল, যেন নুফায়েলের উপর হাবশীদের ঋণ রয়েছে।”ওয়াকেদী (রঃ) বলেন যে, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙএর। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। ওদের পায়ের রঙছিল লাল। অন্য এক রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, মাহমুদ নামক হাতীটি যখন বসে পড়লো এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। তখন সৈন্যরা অন্য একটি হাতীকে সামনের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে পা বাড়াতেই তার মাথায় কংকরের টুকরো পড়লো এবং আর্তনাদ করে পিছনে সরে এলো। অন্যান্য হাতীও তখন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করলো। কয়েকটির উপর কংকর পড়ায় তৎক্ষণাৎ ওগুলো মারা গেল। যারা ছুটে পালাচ্ছিল তাদেরও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। এবং অবশেষে সবগুলোই মারা গেল। আবরাহা বাদশাহও ছুটে পালালো, কিন্তু তারও এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ছিল। সানআ (তৎকালীন ইয়ামনের রাজধানী) নামক শহরে পৌঁছার পর সে মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো এবং কুকুরের মত ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করলো। তার কলেজা ফেটে গিয়েছিল। কুরায়েশরা প্রচুর ধন সম্পদ পেয়ে গিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব তো সোনা সংগ্রহ করে করে একটি কূপ ভর্তি করেছিলেন। ঐ বছরই সারা দেশে প্রথম ওলা ওঠা এবং প্লেগ রোগ দেখা দেয়। হরল, হান্যাল প্রভৃতি কটুগাছও ঐ বছর উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর ভাষায় এ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এবং যেন বলছেনঃ যদি তোমরা আমার ঘরের সম্মান এভাবে করতে থাকতে এবং আমার রাসূল (সঃ)-এর কথা মানতে তবে আমিও সেভাবে তোমাদের হিফাযত করতাম এবং শত্রু দল থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিতাম। (আরবি) শব্দটি বহুবচন, এর একবচন আরবী অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খুবই কঠিন বা শক্ত। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) শব্দ দুটি ফারসী শব্দ। (আরবি) এর অর্থ হলো প্রস্তর সমন্বিত মৃত্তিকা। (আরবি) শব্দটি শব্দের (আরবি) বহুবচন।(আরবি) মাঠের ফসলের ঐ সব পাতাকে বলা হয় যেগুলো এখনো পাকেনি। (আরবি) এর অর্থ হলো ঝাক ঝক পাখী, বহুসংখ্যক এবং ক্রমাগত আগমনকারী। কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মত এবং নখ ছিল কুকুরের মত।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সবুজ রঙ-এর এই পাখিগুলো সমুদ্র হতে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মত। এ সম্পর্কে আরো বহু উক্তি রয়েছে। পাখির ঝাঁক আবরাহার সৈন্যদের মাথার উপর অবস্থান করে চীৎকার করছিল এবং কংকর নিক্ষেপ করছিল। যার মাথায় ঐ কংকর পড়ছিল তা তার পায়খানার দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রবল বাতাস বইতে লাগলো। এর ফলে আশে পাশের বালুকণা এসে তাদের চোখে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদেরকে ঘায়েল করে ফেললো।(আরবি) এর অর্থ হলো ভূষি এবং (আরবি) অর্থহলো ভক্ষিত বা টুকরো টুকরো কৃত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শস্যদানার উপরের ভূষিকে (আরবি) বলা হয়। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ক্ষেতের শস্যের ঐ পাতা যেগুলো পশুরা খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তছনছ করে দিলেন এবং সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন। তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কোন কল্যাণই তারা লাভ করতে সমর্থ হলো না। তাদের দুরাবস্থার খবর অন্যদেরকে পৌছানোর মত কেউই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল না। অল্পসংখ্যক যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বেঁচেছিল তারাও পরে ধুকে ধুকে মরেছিল। স্বয়ং বাদশাহ্ও এক টুকরো গোশতের মত হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে সে সানআতে পৌছলো। সেখানে পৌছেই তার কলেজা ফেটে গেল এবং সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াকসূ ইয়ামানের শাসন ভার গ্রহণ করলো। তারপর তার অন্য ভাই মাসরুক ইবনে আবরাহা সিংহাসনে আরোহন করলো। এ সময়ে ঘূইয়াযান হুমাইরী কিসরার (পারস্য সম্রাট) কাছে গিয়ে হাবশীদের কবল থেকে ইয়ামনকে মুক্ত করার জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলো। কিসরা সাইফের সাথে একদল বাহাদুর সৈন্য পাঠালো। সেই সৈন্যদল হাবশীদেরকে পরাজিত করে আবরাহার বংশধরদের কবল থেকে ইয়ামনের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতঃপর হুমাইরীয় গোত্র ইয়ামন শাসন করতে থাকে। আরবের লোকেরা এই উপলক্ষে উৎসব পালন করে। চারদিক থেকে হুমাইরীয় গোত্রের বাদশাহকে অভিনন্দন জানানো হয়। হযরত আয়েশা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ “আবরাহার সৈন্যদলের দু’জন সৈন্যকে আমি মক্কা শরীফে দেখেছি। তারা উভয়েই অন্ধ এবং চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তারা বসে বসে ভিক্ষা করতো।”হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) বলেন যে, যে আসাফ ও নায়েলা নামক মূর্তিদ্বয়ের পার্শ্বে মুশরিকরা কুরবানী করতো সেখানে বসে ঐ লোক দুটি লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইতো। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাতীর চালক, যার নাম ছিল আনীসা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, আবরাহা নিজে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি, বরং শামর ইবনে মাকসূত নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। পাখিগুলো তাদের উপর রাত্রিকালে এসেছিল এবং সকাল পর্যন্ত তাদের সকলকে তছনছ করে ফেলেছিল। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল। আসল কথা হলো এই যে, স্বয়ং বাদশাহ্ আবরাহা আশরম হাবশী নিজেই সৈন্যদল নিয়ে এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল। শামর ইবনে মাকসূদ হয় তো কোন একদল সৈন্যের সেনাপতি ছিল। বহু সংখ্যক আরব কবি এ ঘটনাকে নানাভাবে তাঁদের কবিতায় বর্ণনা করেছেন।একটি রিওয়াইয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে নবী করীম (সঃ) একটি টিলার উপর উঠেছিলেন। সেখান থেকে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উষ্ট্ৰীটি সেখানে বসে পড়েছিল। সাহাবী (রাঃ)গণ বহু চেষ্টা করেও উস্ত্রীকে উঠাতে পারলেন না। তখন তারা বললেন যে, উষ্ট্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “না, সে ক্লান্তও হয়নি এবং বসে পড়া তার অভ্যাসও নয়। তাকে ঐ আল্লাহ্ থামিয়ে দিয়েছেন যিনি হাতীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মক্কাবাসীরা যে শর্তে সম্মত হবে আমি সেই শর্তেই তাদের সাথে সন্ধি করবো। তবে, আল্লাহর অমর্যাদা হতে পারে এমন কোন শর্তে আমি সম্মত হবো” তারপর তিনি উস্ত্রীকে ধমক দেয়া মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মক্কার উপর হাতী ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি, বরং তিনি তাঁর নবী (সঃ) ও ঈমানদার বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। জেনে রেখো যে, মক্কার মর্যাদা আজ ঐ অবস্থাতেই ফিরে এসেছে যে অবস্থায় গতকাল ছিল। খবরদার! প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট (খবর) পৌছিয়ে দিবে।”