Tafseer ibn Kathir — কুরাইশ 106:1 – আন-নাসর 110:3
Contents
- কুরাইশ 106:1
- কুরাইশ 106:2
- কুরাইশ 106:3
- কুরাইশ 106:4
- আল-মাউন 107:1
- আল-মাউন 107:2
- আল-মাউন 107:3
- আল-মাউন 107:4
- আল-মাউন 107:5
- আল-মাউন 107:6
- আল-মাউন 107:7
- আল-কাউসার 108:1
- আল-কাউসার 108:2
- আল-কাউসার 108:3
- আল-কাফিরুন 109:1
- আল-কাফিরুন 109:2
- আল-কাফিরুন 109:3
- আল-কাফিরুন 109:4
- আল-কাফিরুন 109:5
- আল-কাফিরুন 109:6
- আন-নাসর 110:1
- আন-নাসর 110:2
- আন-নাসর 110:3
কুরাইশ 106:1
এ সূরার ফযীলত সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী (রঃ) তাঁর কিতাবুল খিলাফিয়্যাত' এ একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত উম্মিহানী বিনতে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা কুরায়েশদেরকে সাতটি ফযীলত প্রদান করেছেন। (এক) আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (দুই) নবুওয়াত তাদের মধ্যে রয়েছে। (তিন) তারা আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। (চার) তারা যমযম কূপের পানি পরিবেশনকারী। (পাঁচ) আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হস্তী অধিপতিদের উপর বিজয় দান করেছেন। (ছয়) দশবছর পর্যন্ত তারা আল্লাহর ইবাদত করেছে যখন অন্য কেউ ইবাদত করতো না। (সাত) তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমের একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরকুরআনের বর্তমান উসমানী (রাঃ) সংস্করণের বিন্যাসে এ সূরাটিকে সূরা ফীল হতে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। উভয় সূরার মধ্যে (আরবি) দ্বারা পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ সূরাটিও সূরা ফীল এরই অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ), আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন যে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে বলা হয়েছেঃ আমি মক্কা হতে হাতীদের ফিরিয়ে রেখেছি এবং হাতী ওয়ালাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কুরায়েশদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় অবস্থানের জন্যেও এ সূরার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে এরূপ ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। আবার এই অর্থও লিখিত হয়েছে যে, শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতে কুরায়েশরা দূর দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতো। কেননা, মক্কার মত সম্মানিত শহরে বসবাস করার কারণে সবাই তাদের সম্মান করতো। তাদের সঙ্গে যারা থাকতো তারাও শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতে সক্ষম হতো। একইভাবে নিজ দেশেও তারা। সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। যেমন কুরআনের অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, আমি হরমকে শান্তিমূলক স্থান হিসেবে মনোনীত করেছি, অথচ লোকদেরকে তাদের চতুর্দিক হতে ছিনতাই করা হয়?” (২৯:৬৭) কিন্তু সেখানে যারা অবস্থান করে তারা সম্পূর্ণ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত থাকে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর মধ্যে প্রথম যে (আরবি) টি রয়েছে ওটা বিস্ময় প্রকাশক (আরবি) এবং উভয় সূরা অর্থাৎ সূরা ফীল এবং সূরা লিঈলাফি কুরাইশ সম্পূর্ণ পৃথক। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে।আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ এই গৃহের মালিকের ইবাদত করা তাদের উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমাকে শুধু এ আদেশই দেয়া হয়েছে যে, আমি এই শহরের প্রভুর ইবাদত করবো যিনি ওকে হরম বানিয়েছেন, যিনি সকল জিনিষের মালিক। আমাকে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (২৭:৯১) সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ যিনি ক্ষুধায় আহার্য দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন তাঁর ইবাদত কর এবং ছোট বড় কোন কিছুকে তার অংশীদার করো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ আদেশ যে পালন করবে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সুখে-শান্তিতে কালাতিপাত করাবেন। পক্ষান্তরে তার অবাধ্যাচরণ যে করবে তার ইহকালের শান্তিকেও অশান্তিতে পরিণত করা হবে এবং আখেরাতেও সে শান্তির পরিবর্তে ভয়ভীতি ও হতাশার সম্মুখীন হবে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে ওর প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওটা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে, তারা যা করতো তজ্জন্যে আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল; ফলে, সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো।” (১৬:১১২-১১৩)একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে কুরায়েশগণ! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেছেন, ঘরে বসিয়ে তোমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন, চতুর্দিকে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তোমাদেরকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। এরপরও তোমাদের কি হলো যে, তোমরা এই বিশ্ব প্রতিপালকের ইবাদত করবে না এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদকে অবিশ্বাস করবে? তোমাদের উপর কি এমন বিপদ আপতিত হলো, যে কারণে তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের সামনে মাথানত করবে?”
কুরাইশ 106:2
এ সূরার ফযীলত সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী (রঃ) তাঁর কিতাবুল খিলাফিয়্যাত' এ একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত উম্মিহানী বিনতে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা কুরায়েশদেরকে সাতটি ফযীলত প্রদান করেছেন। (এক) আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (দুই) নবুওয়াত তাদের মধ্যে রয়েছে। (তিন) তারা আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। (চার) তারা যমযম কূপের পানি পরিবেশনকারী। (পাঁচ) আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হস্তী অধিপতিদের উপর বিজয় দান করেছেন। (ছয়) দশবছর পর্যন্ত তারা আল্লাহর ইবাদত করেছে যখন অন্য কেউ ইবাদত করতো না। (সাত) তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমের একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরকুরআনের বর্তমান উসমানী (রাঃ) সংস্করণের বিন্যাসে এ সূরাটিকে সূরা ফীল হতে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। উভয় সূরার মধ্যে (আরবি) দ্বারা পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ সূরাটিও সূরা ফীল এরই অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ), আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন যে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে বলা হয়েছেঃ আমি মক্কা হতে হাতীদের ফিরিয়ে রেখেছি এবং হাতী ওয়ালাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কুরায়েশদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় অবস্থানের জন্যেও এ সূরার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে এরূপ ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। আবার এই অর্থও লিখিত হয়েছে যে, শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতে কুরায়েশরা দূর দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতো। কেননা, মক্কার মত সম্মানিত শহরে বসবাস করার কারণে সবাই তাদের সম্মান করতো। তাদের সঙ্গে যারা থাকতো তারাও শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতে সক্ষম হতো। একইভাবে নিজ দেশেও তারা। সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। যেমন কুরআনের অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, আমি হরমকে শান্তিমূলক স্থান হিসেবে মনোনীত করেছি, অথচ লোকদেরকে তাদের চতুর্দিক হতে ছিনতাই করা হয়?” (২৯:৬৭) কিন্তু সেখানে যারা অবস্থান করে তারা সম্পূর্ণ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত থাকে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর মধ্যে প্রথম যে (আরবি) টি রয়েছে ওটা বিস্ময় প্রকাশক (আরবি) এবং উভয় সূরা অর্থাৎ সূরা ফীল এবং সূরা লিঈলাফি কুরাইশ সম্পূর্ণ পৃথক। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে।আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ এই গৃহের মালিকের ইবাদত করা তাদের উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমাকে শুধু এ আদেশই দেয়া হয়েছে যে, আমি এই শহরের প্রভুর ইবাদত করবো যিনি ওকে হরম বানিয়েছেন, যিনি সকল জিনিষের মালিক। আমাকে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (২৭:৯১) সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ যিনি ক্ষুধায় আহার্য দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন তাঁর ইবাদত কর এবং ছোট বড় কোন কিছুকে তার অংশীদার করো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ আদেশ যে পালন করবে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সুখে-শান্তিতে কালাতিপাত করাবেন। পক্ষান্তরে তার অবাধ্যাচরণ যে করবে তার ইহকালের শান্তিকেও অশান্তিতে পরিণত করা হবে এবং আখেরাতেও সে শান্তির পরিবর্তে ভয়ভীতি ও হতাশার সম্মুখীন হবে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে ওর প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওটা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে, তারা যা করতো তজ্জন্যে আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল; ফলে, সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো।” (১৬:১১২-১১৩)একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে কুরায়েশগণ! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেছেন, ঘরে বসিয়ে তোমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন, চতুর্দিকে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তোমাদেরকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। এরপরও তোমাদের কি হলো যে, তোমরা এই বিশ্ব প্রতিপালকের ইবাদত করবে না এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদকে অবিশ্বাস করবে? তোমাদের উপর কি এমন বিপদ আপতিত হলো, যে কারণে তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের সামনে মাথানত করবে?”
কুরাইশ 106:3
এ সূরার ফযীলত সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী (রঃ) তাঁর কিতাবুল খিলাফিয়্যাত' এ একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত উম্মিহানী বিনতে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা কুরায়েশদেরকে সাতটি ফযীলত প্রদান করেছেন। (এক) আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (দুই) নবুওয়াত তাদের মধ্যে রয়েছে। (তিন) তারা আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। (চার) তারা যমযম কূপের পানি পরিবেশনকারী। (পাঁচ) আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হস্তী অধিপতিদের উপর বিজয় দান করেছেন। (ছয়) দশবছর পর্যন্ত তারা আল্লাহর ইবাদত করেছে যখন অন্য কেউ ইবাদত করতো না। (সাত) তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমের একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরকুরআনের বর্তমান উসমানী (রাঃ) সংস্করণের বিন্যাসে এ সূরাটিকে সূরা ফীল হতে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। উভয় সূরার মধ্যে (আরবি) দ্বারা পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ সূরাটিও সূরা ফীল এরই অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ), আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন যে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে বলা হয়েছেঃ আমি মক্কা হতে হাতীদের ফিরিয়ে রেখেছি এবং হাতী ওয়ালাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কুরায়েশদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় অবস্থানের জন্যেও এ সূরার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে এরূপ ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। আবার এই অর্থও লিখিত হয়েছে যে, শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতে কুরায়েশরা দূর দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতো। কেননা, মক্কার মত সম্মানিত শহরে বসবাস করার কারণে সবাই তাদের সম্মান করতো। তাদের সঙ্গে যারা থাকতো তারাও শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতে সক্ষম হতো। একইভাবে নিজ দেশেও তারা। সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। যেমন কুরআনের অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, আমি হরমকে শান্তিমূলক স্থান হিসেবে মনোনীত করেছি, অথচ লোকদেরকে তাদের চতুর্দিক হতে ছিনতাই করা হয়?” (২৯:৬৭) কিন্তু সেখানে যারা অবস্থান করে তারা সম্পূর্ণ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত থাকে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর মধ্যে প্রথম যে (আরবি) টি রয়েছে ওটা বিস্ময় প্রকাশক (আরবি) এবং উভয় সূরা অর্থাৎ সূরা ফীল এবং সূরা লিঈলাফি কুরাইশ সম্পূর্ণ পৃথক। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে।আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ এই গৃহের মালিকের ইবাদত করা তাদের উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমাকে শুধু এ আদেশই দেয়া হয়েছে যে, আমি এই শহরের প্রভুর ইবাদত করবো যিনি ওকে হরম বানিয়েছেন, যিনি সকল জিনিষের মালিক। আমাকে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (২৭:৯১) সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ যিনি ক্ষুধায় আহার্য দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন তাঁর ইবাদত কর এবং ছোট বড় কোন কিছুকে তার অংশীদার করো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ আদেশ যে পালন করবে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সুখে-শান্তিতে কালাতিপাত করাবেন। পক্ষান্তরে তার অবাধ্যাচরণ যে করবে তার ইহকালের শান্তিকেও অশান্তিতে পরিণত করা হবে এবং আখেরাতেও সে শান্তির পরিবর্তে ভয়ভীতি ও হতাশার সম্মুখীন হবে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে ওর প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওটা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে, তারা যা করতো তজ্জন্যে আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল; ফলে, সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো।” (১৬:১১২-১১৩)একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে কুরায়েশগণ! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেছেন, ঘরে বসিয়ে তোমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন, চতুর্দিকে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তোমাদেরকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। এরপরও তোমাদের কি হলো যে, তোমরা এই বিশ্ব প্রতিপালকের ইবাদত করবে না এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদকে অবিশ্বাস করবে? তোমাদের উপর কি এমন বিপদ আপতিত হলো, যে কারণে তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের সামনে মাথানত করবে?”
কুরাইশ 106:4
এ সূরার ফযীলত সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী (রঃ) তাঁর কিতাবুল খিলাফিয়্যাত' এ একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত উম্মিহানী বিনতে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা কুরায়েশদেরকে সাতটি ফযীলত প্রদান করেছেন। (এক) আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (দুই) নবুওয়াত তাদের মধ্যে রয়েছে। (তিন) তারা আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। (চার) তারা যমযম কূপের পানি পরিবেশনকারী। (পাঁচ) আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হস্তী অধিপতিদের উপর বিজয় দান করেছেন। (ছয়) দশবছর পর্যন্ত তারা আল্লাহর ইবাদত করেছে যখন অন্য কেউ ইবাদত করতো না। (সাত) তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমের একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরকুরআনের বর্তমান উসমানী (রাঃ) সংস্করণের বিন্যাসে এ সূরাটিকে সূরা ফীল হতে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। উভয় সূরার মধ্যে (আরবি) দ্বারা পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ সূরাটিও সূরা ফীল এরই অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ), আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন যে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে বলা হয়েছেঃ আমি মক্কা হতে হাতীদের ফিরিয়ে রেখেছি এবং হাতী ওয়ালাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কুরায়েশদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় অবস্থানের জন্যেও এ সূরার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে এরূপ ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। আবার এই অর্থও লিখিত হয়েছে যে, শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতে কুরায়েশরা দূর দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতো। কেননা, মক্কার মত সম্মানিত শহরে বসবাস করার কারণে সবাই তাদের সম্মান করতো। তাদের সঙ্গে যারা থাকতো তারাও শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতে সক্ষম হতো। একইভাবে নিজ দেশেও তারা। সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। যেমন কুরআনের অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, আমি হরমকে শান্তিমূলক স্থান হিসেবে মনোনীত করেছি, অথচ লোকদেরকে তাদের চতুর্দিক হতে ছিনতাই করা হয়?” (২৯:৬৭) কিন্তু সেখানে যারা অবস্থান করে তারা সম্পূর্ণ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত থাকে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর মধ্যে প্রথম যে (আরবি) টি রয়েছে ওটা বিস্ময় প্রকাশক (আরবি) এবং উভয় সূরা অর্থাৎ সূরা ফীল এবং সূরা লিঈলাফি কুরাইশ সম্পূর্ণ পৃথক। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে।আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ এই গৃহের মালিকের ইবাদত করা তাদের উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমাকে শুধু এ আদেশই দেয়া হয়েছে যে, আমি এই শহরের প্রভুর ইবাদত করবো যিনি ওকে হরম বানিয়েছেন, যিনি সকল জিনিষের মালিক। আমাকে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (২৭:৯১) সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ যিনি ক্ষুধায় আহার্য দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন তাঁর ইবাদত কর এবং ছোট বড় কোন কিছুকে তার অংশীদার করো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ আদেশ যে পালন করবে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সুখে-শান্তিতে কালাতিপাত করাবেন। পক্ষান্তরে তার অবাধ্যাচরণ যে করবে তার ইহকালের শান্তিকেও অশান্তিতে পরিণত করা হবে এবং আখেরাতেও সে শান্তির পরিবর্তে ভয়ভীতি ও হতাশার সম্মুখীন হবে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে ওর প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওটা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে, তারা যা করতো তজ্জন্যে আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল; ফলে, সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো।” (১৬:১১২-১১৩)একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে কুরায়েশগণ! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেছেন, ঘরে বসিয়ে তোমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন, চতুর্দিকে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তোমাদেরকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। এরপরও তোমাদের কি হলো যে, তোমরা এই বিশ্ব প্রতিপালকের ইবাদত করবে না এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদকে অবিশ্বাস করবে? তোমাদের উপর কি এমন বিপদ আপতিত হলো, যে কারণে তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের সামনে মাথানত করবে?”
আল-মাউন 107:1
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:2
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:3
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:4
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:5
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:6
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-মাউন 107:7
ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।১-৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।" এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।" (৪:১৪২)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না। একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না। হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-কাউসার 108:1
১-৩ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে তিনি বললেন অথবা তার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ “এই মাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি তা কি তোমরা জান?” উত্তরে তারা বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কাওসার হলো একটা জান্নাতী নহর। তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে এটা দান করেছেন। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেই কাওসারের ধারে সমবেত হবে। আসমানে যতো নক্ষত্র রয়েছে সেই কাওসারের পিয়ালার সংখ্যাও ততো। কিছু লোককে কাওসার থেকে সরিয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলবো: হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত!” তখন তিনি আমাকে বলবেনঃ “তুমি জান না, তোমার (ইন্তেকালের) পর তারা কত রকম বিদআত আবিষ্কার করেছে!” হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সেই কাওসারের দুটি ধারা আকাশ থেকে অবতরণ করবে।সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এ ঘটনা মসজিদে নববীতে (সঃ) ঘটেছে। এজন্যেই অধিকাংশ কারী বলেন যে, এ সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ হাদীস থেকেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ প্রত্যেক সূরার সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা প্রত্যেক সূরার পৃথক আয়াত।মুসনাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমাকে কাওসার দান করা হয়েছে। কাওসার একটি প্রবাহিত ঝর্ণা বা নহর, কিন্তু গর্ত নয়। ওর দুপাশে মুক্তার তৈরি তবু রয়েছে। ওর মাটি খাটি মিশকের ওর পাথরও খাঁটি মুক্তাদ্বারা নির্মিত। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসমানে জান্নাতে এ নহর দেখেছিলেন। এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “এটা কোন নহর?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এর নাম কাওসার, যে কাওসার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আপনাকে দান করেছেন। এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে।অন্য এক হাদীসে আছে যে, কাওসারের পানি দুধের চেয়েও বেশী সাদা, মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট। সেই কাওসারের তীরে লম্বাগ্রীবা বিশিষ্ট পাখিরা বসে রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সে সব পাখি তো খুব সুন্দর!” নবী করীম (সঃ) বললেনঃ ‘সেগুলো খেতেও খুব সুস্বাদু।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি?” উত্তরে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করলে হযরত উমার (রাঃ) পাখিগুলো সম্পর্কে উপরোক্ত কথা বলেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন এ নহরটি জান্নাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত। (এ হাদীসটি মুনকার বা অস্বীকৃত)। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কাওসারের পানি ঝরার শব্দ শুনতে পছন্দ করে সে যেন তার অঙ্গুলিদ্বয় তার কর্ণদ্বয়ে রাখে। (সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি মুনকাতা বা ছেদ কাটা) প্রথমতঃ এ হাদীসের সনদ সমার্থ নয়, দ্বিতীয়তঃ অর্থ হলো কানে আঙ্গুল দিয়ে কাওসারের পানি ঝরার মত শব্দ শোনা যাবে, অবিকল সেই আওয়াজই যে শোনা যাবে এমন নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসারের মধ্যে ঐ কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলা খাস করে তার নবী (সঃ)-কে দান করেছেন। আবু বাশার (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কে বলেনঃ লোকদের তো ধারণা এই যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) বললেনঃ জান্নাতে যে নহরটি রয়েছে সেটা ঐ কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ খাস করে তার নবী (সঃ)-কে প্রদান করেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো বহু কল্যান। বহু সংখ্যক তাফসীরকার এরকমই লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা দুনিয়ার ও আখেরাতের বহু প্রকারের কল্যাণের কথা বুঝানো হয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা নবুওয়াত, কুরআন ও পরকালের পুণ্যকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কাওসারের তাফসীরে নহরে কাওসারও বলেছেন। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর যার উভয় তীর স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। ইয়াকূত ও মণি-মুক্তার উপর ওর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঐ কাওসারের পানি বরফের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইববে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি মারফু রূপেও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযার (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ সময় বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী বানূ নাজ্জার গোত্রীয়া মহিলা বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমার স্বামী এই মাত্র আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সম্ভবতঃ তিনি বানু নাজ্জারের ওখানে। আটকা পড়ে গেছেন। আপনি এসে বসুন।" অতঃপর হযরত হামযার (রাঃ) স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা আহার করলেন। হযরত হামযা’র (রাঃ) স্ত্রী আনন্দের সুরে বললেনঃ “আপনি নিজেই আমাদের গরীব খানায় তাশরীফ এনেছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমি তো ভেবেছিলাম যে আপনার দরবারে হাজির হয়ে আপনাকে হাউযে কাওসার প্রাপ্তি উপলক্ষে মুবারকবাদ জানাবো। এই মাত্র হযরত আবূ আম্মারাহ (রাঃ) আমার কাছে এই সুসংবাদ পৌঁছিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হ্যা, সেই হাউযে কাওসারের মাটি হলো ইয়াকূত, পদ্মরাগ, পান্না এবং মণি মুক্তা।" খারামা ইবনে উসমান নামক এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। তবে এটাকে হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিয়ীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কাওসার একটি নহরের নাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি স্বীয় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং করবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। অর্থাৎ হে নবী। (সঃ) তুমি নফল নামায ও কুরবানীর মাধ্যমে লা-শারীক আল্লাহর ইবাদত কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (৬ ? ১৬২-১৬৩)।কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা’ এবং কুরবানী আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে করতো। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যে পশু কুরবানীতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না তা তোমরা খেয়োনা, কেননা, এটা ফিসক বা অন্যায়াচরণ।” (৬:১২১) এটাও বলা হয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নামাযের সময়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাধা। এটা হযরত আলী (রাঃ) হতে গায়ের সহীহ সনদের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শাবী (রঃ) এ শব্দের তাফসীর এটাই করেছেন। হযরত আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো নামায শুরু করার সময় হাত উঠানো। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ বুক কিবলার দিক রেখে কিবলা মুখী হওয়া। (এই তিনটি উক্তিই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ জায়গায় একটি নিতান্ত মুনকার হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর অর্থ কি?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “(আরবি) এর অর্থ কুরবানী নয়, বরং আপনার প্রতিপালক আপনাকে নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুর সময়, রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় এবং সিজদাহ করার সময় দু’হাত তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই আমাদের এবং যে সব ফেরেশতা সপ্তম আকাশে রয়েছেন তাদের নামায। প্রত্যেক জিনিষের সৌন্দর্য রয়েছে, নামাযের সৌন্দর্য হলো প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাননা।”হযরত আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নিজের পিঠ রুকু হতে উঠানোর সময় সমতল করে বুক প্রকাশ করে অর্থাৎ স্বস্তি অর্জন করো। এগুলো সবই গারীব বা দুর্বল উক্তি।(আরবি) এর অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এ উক্তিটিই হলো সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু যবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের নামাযের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়ত সম্মতভাবে কুরবানী করেছে। আর যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি। একথা শুনে হযরত আবু বারদাহ ইবনে দীনার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আজকের দিনে গোশতের চাহিদা বেশী হবে ভেবেই কি আপনি নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তা হলে তো খাওয়ার গোশতই হয়ে গেল অর্থাৎ কুরবানী হলো না।” সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বর্তমানে আমার কাছে একটি বকরীর শাবক রয়েছে, কিন্তু ওটা দুটি বকরীর চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয়। এ বকরীর শাবকটি কি আমার জন্যে যথেষ্ট হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমার পরে ছয় মাসের বকরী শাবক অন্য কেউ কুরবানী করতে পারবে না।” ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ তার কথাই যথার্থ যে বলে যে, এর অর্থ হলোঃ নিজের সকল নামায শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে আদায় করো, তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে আদায় করো না। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর যিনি তোমাকে এরকম বুযুগী ও নিয়ামত দান করেছেন যে রকম বুযুগী ও নিয়ামত অন্য কাউকেও দান করেননি। এটা একমাত্র তোমার জন্যেই নির্ধারিত করেছেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম।মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) এবং আতা (রঃ) একই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরার শেষ আয়াতে বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীই তো নির্বংশ। অর্থাৎ যারা তোমার (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর) শত্রুতা করে, তারাই অপমানিত, লাঞ্ছিত, তাদেরই লেজকাটা। এই আয়াত আস ইবনে ওয়ায়েল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই দুবৃত্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আলোচনা শুনলেই বলতোঃ “ওর কথা রাখো, ওর কথা রাখো, ওর কোন পুত্র সন্তান নেই। মৃত্যুর পরই সে বেনাম-নিশান হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ তাআলা তখন এ সূরা অবতীর্ণ করেন।শামর ইবনে আতিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, উকবা ইবনে আবী মুঈত সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং কুরায়েশদের একটি দল সম্পর্কে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে বাযযারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ যখন মক্কায় আসে তখন কুরায়েশরা তাকে বলেঃ “আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেখতে পান সে সমগ্র জাতি থেকে পৃথক হয়ে আছে, এতদসত্ত্বেও নিজেকে সবচেয়ে ভাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করছে। অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক এবং যমযম কূপের দেখাশোনাকারী।” দুবৃত্ত কা'ব তখন বললোঃ “নিঃসন্দেহে তোমরা তার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসের সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ।হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আবূ লাহাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সন্তানের ইন্তেকালের পর এ দুর্ভাগা দুবৃত্ত মুশরিকদেরকে বলতে লাগলো “আজ রাত্রে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধারা বিলোপ করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত শত্রুকেই বুঝানো হয়েছে। যাদের নাম নেয়া হয়েছে এবং যাদের নাম নেয়া হয়নি তাদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।শব্দের অর্থ হলো একাকী। আরবে এ প্রচলন রয়েছে যে, যখন কারো একমাত্র সন্তান মারা যায় তখন তাকে আবার বলা হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তানদের ইন্তেকালের পর শত্রুতার কারণে তারা তাকে আবতার বলছিল। আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আবতার’ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ যার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত আলোচনা, নাম নিশানা মুছে যায়। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্পর্কেও ধারণা করেছিল যে, সন্তান বেঁচে থাকলে তার আলোচনা জাগরুক থাকতো। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। অথচ তারা জানে না যে, পৃথিবী টিকে থাকা অবধি আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর নাম টিকিয়ে রাখবেন। নবী করীম (সঃ)-এর শরীয়ত চিরকাল বাকি থাকবে। তার আনুগত্য সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রিয় ও পবিত্র নাম সকল মুসলমানের মনে ও মুখে রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তার নাম আকাশতলে উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকবে। জলে স্থলে সর্বদা তাঁর নাম আলোকিত হতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তার আল ও আসহাবের প্রতি দরূদ ও সালাম সর্বাধিক পরিমাণে প্রেরণ করুন। আমীন!
আল-কাউসার 108:2
১-৩ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে তিনি বললেন অথবা তার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ “এই মাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি তা কি তোমরা জান?” উত্তরে তারা বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কাওসার হলো একটা জান্নাতী নহর। তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে এটা দান করেছেন। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেই কাওসারের ধারে সমবেত হবে। আসমানে যতো নক্ষত্র রয়েছে সেই কাওসারের পিয়ালার সংখ্যাও ততো। কিছু লোককে কাওসার থেকে সরিয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলবো: হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত!” তখন তিনি আমাকে বলবেনঃ “তুমি জান না, তোমার (ইন্তেকালের) পর তারা কত রকম বিদআত আবিষ্কার করেছে!” হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সেই কাওসারের দুটি ধারা আকাশ থেকে অবতরণ করবে।সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এ ঘটনা মসজিদে নববীতে (সঃ) ঘটেছে। এজন্যেই অধিকাংশ কারী বলেন যে, এ সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ হাদীস থেকেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ প্রত্যেক সূরার সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা প্রত্যেক সূরার পৃথক আয়াত।মুসনাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমাকে কাওসার দান করা হয়েছে। কাওসার একটি প্রবাহিত ঝর্ণা বা নহর, কিন্তু গর্ত নয়। ওর দুপাশে মুক্তার তৈরি তবু রয়েছে। ওর মাটি খাটি মিশকের ওর পাথরও খাঁটি মুক্তাদ্বারা নির্মিত। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসমানে জান্নাতে এ নহর দেখেছিলেন। এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “এটা কোন নহর?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এর নাম কাওসার, যে কাওসার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আপনাকে দান করেছেন। এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে।অন্য এক হাদীসে আছে যে, কাওসারের পানি দুধের চেয়েও বেশী সাদা, মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট। সেই কাওসারের তীরে লম্বাগ্রীবা বিশিষ্ট পাখিরা বসে রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সে সব পাখি তো খুব সুন্দর!” নবী করীম (সঃ) বললেনঃ ‘সেগুলো খেতেও খুব সুস্বাদু।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি?” উত্তরে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করলে হযরত উমার (রাঃ) পাখিগুলো সম্পর্কে উপরোক্ত কথা বলেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন এ নহরটি জান্নাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত। (এ হাদীসটি মুনকার বা অস্বীকৃত)। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কাওসারের পানি ঝরার শব্দ শুনতে পছন্দ করে সে যেন তার অঙ্গুলিদ্বয় তার কর্ণদ্বয়ে রাখে। (সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি মুনকাতা বা ছেদ কাটা) প্রথমতঃ এ হাদীসের সনদ সমার্থ নয়, দ্বিতীয়তঃ অর্থ হলো কানে আঙ্গুল দিয়ে কাওসারের পানি ঝরার মত শব্দ শোনা যাবে, অবিকল সেই আওয়াজই যে শোনা যাবে এমন নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসারের মধ্যে ঐ কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলা খাস করে তার নবী (সঃ)-কে দান করেছেন। আবু বাশার (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কে বলেনঃ লোকদের তো ধারণা এই যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) বললেনঃ জান্নাতে যে নহরটি রয়েছে সেটা ঐ কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ খাস করে তার নবী (সঃ)-কে প্রদান করেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো বহু কল্যান। বহু সংখ্যক তাফসীরকার এরকমই লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা দুনিয়ার ও আখেরাতের বহু প্রকারের কল্যাণের কথা বুঝানো হয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা নবুওয়াত, কুরআন ও পরকালের পুণ্যকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কাওসারের তাফসীরে নহরে কাওসারও বলেছেন। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর যার উভয় তীর স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। ইয়াকূত ও মণি-মুক্তার উপর ওর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঐ কাওসারের পানি বরফের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইববে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি মারফু রূপেও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযার (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ সময় বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী বানূ নাজ্জার গোত্রীয়া মহিলা বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমার স্বামী এই মাত্র আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সম্ভবতঃ তিনি বানু নাজ্জারের ওখানে। আটকা পড়ে গেছেন। আপনি এসে বসুন।" অতঃপর হযরত হামযার (রাঃ) স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা আহার করলেন। হযরত হামযা’র (রাঃ) স্ত্রী আনন্দের সুরে বললেনঃ “আপনি নিজেই আমাদের গরীব খানায় তাশরীফ এনেছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমি তো ভেবেছিলাম যে আপনার দরবারে হাজির হয়ে আপনাকে হাউযে কাওসার প্রাপ্তি উপলক্ষে মুবারকবাদ জানাবো। এই মাত্র হযরত আবূ আম্মারাহ (রাঃ) আমার কাছে এই সুসংবাদ পৌঁছিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হ্যা, সেই হাউযে কাওসারের মাটি হলো ইয়াকূত, পদ্মরাগ, পান্না এবং মণি মুক্তা।" খারামা ইবনে উসমান নামক এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। তবে এটাকে হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিয়ীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কাওসার একটি নহরের নাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি স্বীয় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং করবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। অর্থাৎ হে নবী। (সঃ) তুমি নফল নামায ও কুরবানীর মাধ্যমে লা-শারীক আল্লাহর ইবাদত কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (৬ ? ১৬২-১৬৩)।কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা’ এবং কুরবানী আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে করতো। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যে পশু কুরবানীতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না তা তোমরা খেয়োনা, কেননা, এটা ফিসক বা অন্যায়াচরণ।” (৬:১২১) এটাও বলা হয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নামাযের সময়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাধা। এটা হযরত আলী (রাঃ) হতে গায়ের সহীহ সনদের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শাবী (রঃ) এ শব্দের তাফসীর এটাই করেছেন। হযরত আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো নামায শুরু করার সময় হাত উঠানো। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ বুক কিবলার দিক রেখে কিবলা মুখী হওয়া। (এই তিনটি উক্তিই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ জায়গায় একটি নিতান্ত মুনকার হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর অর্থ কি?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “(আরবি) এর অর্থ কুরবানী নয়, বরং আপনার প্রতিপালক আপনাকে নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুর সময়, রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় এবং সিজদাহ করার সময় দু’হাত তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই আমাদের এবং যে সব ফেরেশতা সপ্তম আকাশে রয়েছেন তাদের নামায। প্রত্যেক জিনিষের সৌন্দর্য রয়েছে, নামাযের সৌন্দর্য হলো প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাননা।”হযরত আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নিজের পিঠ রুকু হতে উঠানোর সময় সমতল করে বুক প্রকাশ করে অর্থাৎ স্বস্তি অর্জন করো। এগুলো সবই গারীব বা দুর্বল উক্তি।(আরবি) এর অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এ উক্তিটিই হলো সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু যবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের নামাযের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়ত সম্মতভাবে কুরবানী করেছে। আর যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি। একথা শুনে হযরত আবু বারদাহ ইবনে দীনার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আজকের দিনে গোশতের চাহিদা বেশী হবে ভেবেই কি আপনি নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তা হলে তো খাওয়ার গোশতই হয়ে গেল অর্থাৎ কুরবানী হলো না।” সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বর্তমানে আমার কাছে একটি বকরীর শাবক রয়েছে, কিন্তু ওটা দুটি বকরীর চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয়। এ বকরীর শাবকটি কি আমার জন্যে যথেষ্ট হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমার পরে ছয় মাসের বকরী শাবক অন্য কেউ কুরবানী করতে পারবে না।” ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ তার কথাই যথার্থ যে বলে যে, এর অর্থ হলোঃ নিজের সকল নামায শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে আদায় করো, তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে আদায় করো না। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর যিনি তোমাকে এরকম বুযুগী ও নিয়ামত দান করেছেন যে রকম বুযুগী ও নিয়ামত অন্য কাউকেও দান করেননি। এটা একমাত্র তোমার জন্যেই নির্ধারিত করেছেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম।মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) এবং আতা (রঃ) একই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরার শেষ আয়াতে বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীই তো নির্বংশ। অর্থাৎ যারা তোমার (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর) শত্রুতা করে, তারাই অপমানিত, লাঞ্ছিত, তাদেরই লেজকাটা। এই আয়াত আস ইবনে ওয়ায়েল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই দুবৃত্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আলোচনা শুনলেই বলতোঃ “ওর কথা রাখো, ওর কথা রাখো, ওর কোন পুত্র সন্তান নেই। মৃত্যুর পরই সে বেনাম-নিশান হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ তাআলা তখন এ সূরা অবতীর্ণ করেন।শামর ইবনে আতিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, উকবা ইবনে আবী মুঈত সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং কুরায়েশদের একটি দল সম্পর্কে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে বাযযারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ যখন মক্কায় আসে তখন কুরায়েশরা তাকে বলেঃ “আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেখতে পান সে সমগ্র জাতি থেকে পৃথক হয়ে আছে, এতদসত্ত্বেও নিজেকে সবচেয়ে ভাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করছে। অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক এবং যমযম কূপের দেখাশোনাকারী।” দুবৃত্ত কা'ব তখন বললোঃ “নিঃসন্দেহে তোমরা তার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসের সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ।হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আবূ লাহাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সন্তানের ইন্তেকালের পর এ দুর্ভাগা দুবৃত্ত মুশরিকদেরকে বলতে লাগলো “আজ রাত্রে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধারা বিলোপ করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত শত্রুকেই বুঝানো হয়েছে। যাদের নাম নেয়া হয়েছে এবং যাদের নাম নেয়া হয়নি তাদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।শব্দের অর্থ হলো একাকী। আরবে এ প্রচলন রয়েছে যে, যখন কারো একমাত্র সন্তান মারা যায় তখন তাকে আবার বলা হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তানদের ইন্তেকালের পর শত্রুতার কারণে তারা তাকে আবতার বলছিল। আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আবতার’ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ যার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত আলোচনা, নাম নিশানা মুছে যায়। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্পর্কেও ধারণা করেছিল যে, সন্তান বেঁচে থাকলে তার আলোচনা জাগরুক থাকতো। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। অথচ তারা জানে না যে, পৃথিবী টিকে থাকা অবধি আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর নাম টিকিয়ে রাখবেন। নবী করীম (সঃ)-এর শরীয়ত চিরকাল বাকি থাকবে। তার আনুগত্য সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রিয় ও পবিত্র নাম সকল মুসলমানের মনে ও মুখে রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তার নাম আকাশতলে উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকবে। জলে স্থলে সর্বদা তাঁর নাম আলোকিত হতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তার আল ও আসহাবের প্রতি দরূদ ও সালাম সর্বাধিক পরিমাণে প্রেরণ করুন। আমীন!
আল-কাউসার 108:3
১-৩ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে তিনি বললেন অথবা তার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ “এই মাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি তা কি তোমরা জান?” উত্তরে তারা বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কাওসার হলো একটা জান্নাতী নহর। তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে এটা দান করেছেন। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেই কাওসারের ধারে সমবেত হবে। আসমানে যতো নক্ষত্র রয়েছে সেই কাওসারের পিয়ালার সংখ্যাও ততো। কিছু লোককে কাওসার থেকে সরিয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলবো: হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত!” তখন তিনি আমাকে বলবেনঃ “তুমি জান না, তোমার (ইন্তেকালের) পর তারা কত রকম বিদআত আবিষ্কার করেছে!” হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সেই কাওসারের দুটি ধারা আকাশ থেকে অবতরণ করবে।সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এ ঘটনা মসজিদে নববীতে (সঃ) ঘটেছে। এজন্যেই অধিকাংশ কারী বলেন যে, এ সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ হাদীস থেকেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ প্রত্যেক সূরার সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা প্রত্যেক সূরার পৃথক আয়াত।মুসনাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমাকে কাওসার দান করা হয়েছে। কাওসার একটি প্রবাহিত ঝর্ণা বা নহর, কিন্তু গর্ত নয়। ওর দুপাশে মুক্তার তৈরি তবু রয়েছে। ওর মাটি খাটি মিশকের ওর পাথরও খাঁটি মুক্তাদ্বারা নির্মিত। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসমানে জান্নাতে এ নহর দেখেছিলেন। এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “এটা কোন নহর?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এর নাম কাওসার, যে কাওসার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আপনাকে দান করেছেন। এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে।অন্য এক হাদীসে আছে যে, কাওসারের পানি দুধের চেয়েও বেশী সাদা, মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট। সেই কাওসারের তীরে লম্বাগ্রীবা বিশিষ্ট পাখিরা বসে রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সে সব পাখি তো খুব সুন্দর!” নবী করীম (সঃ) বললেনঃ ‘সেগুলো খেতেও খুব সুস্বাদু।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি?” উত্তরে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করলে হযরত উমার (রাঃ) পাখিগুলো সম্পর্কে উপরোক্ত কথা বলেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন এ নহরটি জান্নাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত। (এ হাদীসটি মুনকার বা অস্বীকৃত)। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কাওসারের পানি ঝরার শব্দ শুনতে পছন্দ করে সে যেন তার অঙ্গুলিদ্বয় তার কর্ণদ্বয়ে রাখে। (সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি মুনকাতা বা ছেদ কাটা) প্রথমতঃ এ হাদীসের সনদ সমার্থ নয়, দ্বিতীয়তঃ অর্থ হলো কানে আঙ্গুল দিয়ে কাওসারের পানি ঝরার মত শব্দ শোনা যাবে, অবিকল সেই আওয়াজই যে শোনা যাবে এমন নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসারের মধ্যে ঐ কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলা খাস করে তার নবী (সঃ)-কে দান করেছেন। আবু বাশার (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কে বলেনঃ লোকদের তো ধারণা এই যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) বললেনঃ জান্নাতে যে নহরটি রয়েছে সেটা ঐ কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ খাস করে তার নবী (সঃ)-কে প্রদান করেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো বহু কল্যান। বহু সংখ্যক তাফসীরকার এরকমই লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা দুনিয়ার ও আখেরাতের বহু প্রকারের কল্যাণের কথা বুঝানো হয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা নবুওয়াত, কুরআন ও পরকালের পুণ্যকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কাওসারের তাফসীরে নহরে কাওসারও বলেছেন। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর যার উভয় তীর স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। ইয়াকূত ও মণি-মুক্তার উপর ওর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঐ কাওসারের পানি বরফের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইববে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি মারফু রূপেও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযার (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ সময় বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী বানূ নাজ্জার গোত্রীয়া মহিলা বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমার স্বামী এই মাত্র আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সম্ভবতঃ তিনি বানু নাজ্জারের ওখানে। আটকা পড়ে গেছেন। আপনি এসে বসুন।" অতঃপর হযরত হামযার (রাঃ) স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা আহার করলেন। হযরত হামযা’র (রাঃ) স্ত্রী আনন্দের সুরে বললেনঃ “আপনি নিজেই আমাদের গরীব খানায় তাশরীফ এনেছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমি তো ভেবেছিলাম যে আপনার দরবারে হাজির হয়ে আপনাকে হাউযে কাওসার প্রাপ্তি উপলক্ষে মুবারকবাদ জানাবো। এই মাত্র হযরত আবূ আম্মারাহ (রাঃ) আমার কাছে এই সুসংবাদ পৌঁছিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হ্যা, সেই হাউযে কাওসারের মাটি হলো ইয়াকূত, পদ্মরাগ, পান্না এবং মণি মুক্তা।" খারামা ইবনে উসমান নামক এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। তবে এটাকে হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিয়ীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কাওসার একটি নহরের নাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি স্বীয় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং করবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। অর্থাৎ হে নবী। (সঃ) তুমি নফল নামায ও কুরবানীর মাধ্যমে লা-শারীক আল্লাহর ইবাদত কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (৬ ? ১৬২-১৬৩)।কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা’ এবং কুরবানী আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে করতো। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যে পশু কুরবানীতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না তা তোমরা খেয়োনা, কেননা, এটা ফিসক বা অন্যায়াচরণ।” (৬:১২১) এটাও বলা হয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নামাযের সময়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাধা। এটা হযরত আলী (রাঃ) হতে গায়ের সহীহ সনদের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শাবী (রঃ) এ শব্দের তাফসীর এটাই করেছেন। হযরত আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো নামায শুরু করার সময় হাত উঠানো। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ বুক কিবলার দিক রেখে কিবলা মুখী হওয়া। (এই তিনটি উক্তিই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ জায়গায় একটি নিতান্ত মুনকার হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর অর্থ কি?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “(আরবি) এর অর্থ কুরবানী নয়, বরং আপনার প্রতিপালক আপনাকে নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুর সময়, রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় এবং সিজদাহ করার সময় দু’হাত তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই আমাদের এবং যে সব ফেরেশতা সপ্তম আকাশে রয়েছেন তাদের নামায। প্রত্যেক জিনিষের সৌন্দর্য রয়েছে, নামাযের সৌন্দর্য হলো প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাননা।”হযরত আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নিজের পিঠ রুকু হতে উঠানোর সময় সমতল করে বুক প্রকাশ করে অর্থাৎ স্বস্তি অর্জন করো। এগুলো সবই গারীব বা দুর্বল উক্তি।(আরবি) এর অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এ উক্তিটিই হলো সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু যবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের নামাযের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়ত সম্মতভাবে কুরবানী করেছে। আর যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি। একথা শুনে হযরত আবু বারদাহ ইবনে দীনার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আজকের দিনে গোশতের চাহিদা বেশী হবে ভেবেই কি আপনি নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তা হলে তো খাওয়ার গোশতই হয়ে গেল অর্থাৎ কুরবানী হলো না।” সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বর্তমানে আমার কাছে একটি বকরীর শাবক রয়েছে, কিন্তু ওটা দুটি বকরীর চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয়। এ বকরীর শাবকটি কি আমার জন্যে যথেষ্ট হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমার পরে ছয় মাসের বকরী শাবক অন্য কেউ কুরবানী করতে পারবে না।” ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ তার কথাই যথার্থ যে বলে যে, এর অর্থ হলোঃ নিজের সকল নামায শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে আদায় করো, তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে আদায় করো না। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর যিনি তোমাকে এরকম বুযুগী ও নিয়ামত দান করেছেন যে রকম বুযুগী ও নিয়ামত অন্য কাউকেও দান করেননি। এটা একমাত্র তোমার জন্যেই নির্ধারিত করেছেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম।মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) এবং আতা (রঃ) একই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরার শেষ আয়াতে বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীই তো নির্বংশ। অর্থাৎ যারা তোমার (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর) শত্রুতা করে, তারাই অপমানিত, লাঞ্ছিত, তাদেরই লেজকাটা। এই আয়াত আস ইবনে ওয়ায়েল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই দুবৃত্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আলোচনা শুনলেই বলতোঃ “ওর কথা রাখো, ওর কথা রাখো, ওর কোন পুত্র সন্তান নেই। মৃত্যুর পরই সে বেনাম-নিশান হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ তাআলা তখন এ সূরা অবতীর্ণ করেন।শামর ইবনে আতিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, উকবা ইবনে আবী মুঈত সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং কুরায়েশদের একটি দল সম্পর্কে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে বাযযারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ যখন মক্কায় আসে তখন কুরায়েশরা তাকে বলেঃ “আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেখতে পান সে সমগ্র জাতি থেকে পৃথক হয়ে আছে, এতদসত্ত্বেও নিজেকে সবচেয়ে ভাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করছে। অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক এবং যমযম কূপের দেখাশোনাকারী।” দুবৃত্ত কা'ব তখন বললোঃ “নিঃসন্দেহে তোমরা তার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসের সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ।হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আবূ লাহাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সন্তানের ইন্তেকালের পর এ দুর্ভাগা দুবৃত্ত মুশরিকদেরকে বলতে লাগলো “আজ রাত্রে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধারা বিলোপ করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত শত্রুকেই বুঝানো হয়েছে। যাদের নাম নেয়া হয়েছে এবং যাদের নাম নেয়া হয়নি তাদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।শব্দের অর্থ হলো একাকী। আরবে এ প্রচলন রয়েছে যে, যখন কারো একমাত্র সন্তান মারা যায় তখন তাকে আবার বলা হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তানদের ইন্তেকালের পর শত্রুতার কারণে তারা তাকে আবতার বলছিল। আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আবতার’ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ যার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত আলোচনা, নাম নিশানা মুছে যায়। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্পর্কেও ধারণা করেছিল যে, সন্তান বেঁচে থাকলে তার আলোচনা জাগরুক থাকতো। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। অথচ তারা জানে না যে, পৃথিবী টিকে থাকা অবধি আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর নাম টিকিয়ে রাখবেন। নবী করীম (সঃ)-এর শরীয়ত চিরকাল বাকি থাকবে। তার আনুগত্য সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রিয় ও পবিত্র নাম সকল মুসলমানের মনে ও মুখে রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তার নাম আকাশতলে উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকবে। জলে স্থলে সর্বদা তাঁর নাম আলোকিত হতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তার আল ও আসহাবের প্রতি দরূদ ও সালাম সর্বাধিক পরিমাণে প্রেরণ করুন। আমীন!
আল-কাফিরুন 109:1
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আল-কাফিরুন 109:2
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আল-কাফিরুন 109:3
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আল-কাফিরুন 109:4
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আল-কাফিরুন 109:5
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আল-কাফিরুন 109:6
সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাওয়াফের পর দুই রাকআত নামাযে এই সূরা এবং (আরবি) সূরা পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমেই হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নত নামাযেও এ সূরা দুটি পাঠ করতেন। মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের পূর্বের দুই রাকআতে এবং মাগিরিবের পরের দুই রাকআ’তে (আরবি) এই সূরা দুইটি বিশেরও অধিকবার অথবা দশেরও অধিকবার পাঠ করতেন।মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে এবং মাগরিবের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে (আরবি) এবং এই সূরা দুটি চব্বিশ বার অথবা পঁচিশবার পড়তে দেখেছি। মুসনাদে আহমদেরই অন্য এক রিওয়াইয়াতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এক মাস ধরে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত নামাযে এবং মাগরিবের পরের দুই রাকআতে নামাযে (আরবি) এ সূরা দু'টি পাঠ করতে দেখেছেন। (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে নাসায়ীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)এই সূরাটি যে কুরআনের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য এ বর্ণনাটি ইতিপূর্বে গত হয়েছে। (আরবি) সূরাটিও একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।মুসনাদে আহমদে হযরত নওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে (তাঁর পিতাকে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যয়নব (রাঃ) কে তুমি তোমার কাছে নিয়ে প্রতিপালন কর।” নওফিলের (রাঃ) পিতা এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি তাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন রেখে এসেছো?” তিনি (নওফিল (রাঃ)-এর পিতা মুআবিয়া উত্তরে বললেনঃ “শয়নের পূর্বে পড়ার জন্যে আপনার কাছে কিছু ওয়াযীফা শিখতে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেনঃ (আরবি) পাঠ করো, এতে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।" হযরত জিবিল্লাহ ইবনে হা'রিসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন। সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। কেননা, এটা হলো শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবদুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন তখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হারিস ইবনে জিবিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমি ঘুমোবার সময় পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন তুমি বিছানায় ঘুমোতে যাবে তখন (আরবি) পাঠ করবে। কেননা, এটা শিরক হতে মুক্তি লাভের উপায়।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএই মুবারক সূরায় আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের আমলের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মক্কার কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হলেও পৃথিবীর সমস্ত কাফিরকে এই সম্বোধনের আওতায় আনা হয়েছে। এই সূরার শানে নুযূল এই যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললোঃ “এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ প্রতিমাগুলোর ইবাদত করুন, পরবর্তী বছর আমরাও এক আল্লাহর ইবাদত করবো।” তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আদেশ করছেনঃ তুমি বলে দাওঃ হে কাফিরগণ! না আমি তোমাদের উপাস্যদের উপাসনা করি, না তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা কর। আর না আমি তোমাদের উপাস্যদেরকে উপাসনা করবো, তোমরা আমার মাবুদের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আমি শুধু আমার মায়ূদের পছন্দনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁরই উপাসনা করবো, তোমাদের পদ্ধতি তো তোমরা নির্ধারণ করে নিয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা শুধু মনগড়া বিশ্বাস এবং খাহেশাতে নাফসানী বা কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে, অথচ তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের হিদায়াত বা পথ। নির্দেশ পৌছে গেছে।” (৫৩:২৩) অতএব, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সংস্পর্শ হতে নিজেকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে নিয়েছেন এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ও উপাস্যদের প্রতি সর্বাত্মক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, প্রত্যেক ইবাদতকারীরই মাবুদ বা উপাস্য থাকবে এবং উপাসনার পদ্ধতি থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর উম্মত শুধু আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত বা উপাসনা করেন। নবী করীমের (সঃ) অনুসারীরা তাঁরই শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদত করে থাকে। এ কারণেই ঈমানের মূলমন্ত্র হলোঃ , (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল।” পক্ষান্তরে কাফির মুশরিকদের উপাস্য বা মাবুদ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন, তাদের উপাসনার পদ্ধতিও ভিন্ন ধরনের। আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতির সাথে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন কাফিরদেরকে জানিয়ে দেনঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্যে আমার দ্বীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাওঃ আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে ক্ত।” (১০:৪১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে।” (৪২:১৫) অর্থাৎ আমাদের কর্মের জন্যে তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমাদের কর্মের জন্যে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে লিখা হয়েছেঃ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন অর্থাৎ কুফর, আর আমার জন্যে আমার দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম। আয়াতের শব্দ হলো (আরবি) কিন্তু অন্যান্য আয়াতে যেহেতু এর উপর ওয়াকফ হয়েছে সেই হেতু এখানেও (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) কে উহ্য রাখা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারের মতে এ আয়াতের অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের বর্তমান উপাস্যদের উপাসনা করি না, ভবিষ্যতের জন্যেও তোমাদেরকে হতাশ করছি যে, সমগ্র জীবনে ঐ কুফরী আমার (নবী (সঃ)-এর) দ্বারা কখনো সম্ভব হবে না। একইভাবে তোমরা আমার প্রতিপালকের ইবাদত বর্তমানেও কর না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।এখানে ঐ সব কাফিরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ঈমান আনয়ন না করার ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার জানা রয়েছে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় ঐ ব্যাপারে তাদের অধিকাংশ হঠকারিতা ও কুফরীতে লিপ্ত হয়।" (৫:৬৮)কোন কোন আরবী সাহিত্য বিশারদ হতে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন যে, একটি বাক্যকে দু’বার গুরুত্ব আরোপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্য কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা তো জাহান্নাম দেখবেই, আবার বলি তোমরা তো ওটা দেখবেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষে।আলোচ্য সূরায় একই রকম বাক্য দু'বার ব্যবহারের তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রথম বাক্যে উপাস্য এবং দ্বিতীয় বাক্যে ইবাদত বা উপাসনার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রথম বাক্যে বর্তমান এবং দ্বিতীয় বাক্যে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। তৃতীয়তঃ প্রথম বাক্যের তাগীদের জন্যেই দ্বিতীয় বাক্যের অবতারণা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এখানে চতুর্থ একটি কারণ আবু অব্বিাস ইবনে তাইমিয়া (রঃ) তার কোন এক কিতাবে উল্লেখ। করেছেন। তিনি বলেনঃ আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় প্রথম বাক্য জুমলায়ে ফেলিয়া এবং দ্বিতীয় বাক্য জুমলায়ে ইসমিয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না, আমার নিকট হতে অনুরূপ কোন আশাও কেউ করতে পারে না। এ উক্তিটিও ভালো বলেই মনে হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এ আয়াত থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাফিররা। সবাই এক জাতি। এ কারণে ইয়াহূদীরা খৃস্টানদের এবং খৃস্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারে। উভয়ের মধ্যে বংশগত ও কার্যকরণ গত সামঞ্জস্য ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এ কারণে ইসলাম ছাড়া কুফরীর যতগুলো পথ রয়েছে, বাতিল হিসেবে সবই এক ও অভিন্ন। ইমাম আহমদ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা বলেন যে, ইয়াহূদীরা খৃষ্টানদের বা খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একে অন্যের অংশীদার ও উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আন-নাসর 110:1
পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই সূরাটি কুরআন কারীমের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সর্বশেষ কোন সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে তা কি তুমি জান?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, সূরা ইযাজাআ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহু' (সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছে।)” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তখন বললেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আইয়ামে তাশরীকের (১১ই, ১২ইও ১৩ই যিল হজ্ব তারিখের) মধ্যভাগে (আরবি) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হলে তিনি বুঝতে পারেন যে, এটা বিদায়ী সূরা। সুতরাং তখনই তিনি সওয়ারী তৈরি করার নির্দেশ দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। তারপর তিনি তার সুপ্রসিদ্ধ খুৎবাহ প্রদান করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বাযার (রঃ) এবং হাফিয বারহাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যখন (আরবি) সূরা অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “আমার পরলোক গমনের খবর এসে গেছে।” এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কাঁদতে শুরু করলেন। তারপরই তিনি হাসতে লাগলেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমার আব্বার (সঃ) পরলোক গমনের সময় নিকটবর্তী হওয়ার খবর শুনে আমার কান্না এসেছিল। কিন্তু আমার কান্নার সময় তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি ধৈর্য ধারণ করে। আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে তুমিই সর্ব প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসায়ীতে এটা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাতে হযরত ফাতিমার (রঃ) উল্লেখ করা হয়নি)১-৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়স্ক মুজাহিদদের সাথে হযরত উমার (রাঃ) আমাকেও শামিল করে নিতেন। এ কারণে কারো কারো মনে সম্ভবতঃ অসন্তুষ্টির ভাব সৃষ্টি হয়ে থাকবে। একদা তাদের মধ্যে একজন আমার সম্পর্কে মন্তব্য করলেনঃ সে যেন আমাদের সাথে না থাকে। তার সমবয়সী ছেলে আমাদেরও তো রয়েছে।” তার এ মন্তব্য শুনে হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ তোমরা তো তাকে খুব ভাল রূপেই জান!” একদিন তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং আমাকেও স্মরণ করলেন আমি বুঝতে পারলাম যে, আজ তিনি তাদেরকে কিছু দেখাতে চান। আমরা সবাই হাজির হলে তিনি সকলকে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবি) সূরাটি সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি (অর্থাৎ এ সূরাটি কিসের ইঙ্গিত বহন করছে)।” কেউ কেউ বললেনঃ “এ সূরায় আল্লাহ তাআলার গুণগান করার জন্যে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্যে আমাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এলে এবং আমাদের বিজয় সূচিত হলেই যেন আমরা এইরূপ করি।” কেউ কেউ আবার সম্পূর্ণ নীরব থাকলেন, কিছুই বললেন হযরত উমার (রাঃ) তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার মতামতও কি এদের মতই?” আমি উত্তরে বললামঃ না, বরং আমি এই বুঝেছি এ সূরায় রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোক গমনের ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁকে এটা জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তার ইহলৌকিক জীবন শেষ হয়ে এসেছে। সুতরাং তিনি যেন তাঁর প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমিও এটাই বুঝেছি।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “(এ বছরই আমার ইন্তেকাল হবে) আমাকে আমার মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় অবস্থান করছিলেন, একদা তিনি বলেনঃ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে পড়েছে। ইয়ামনের অধিবাসীরা এসে গেছে।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কেমন লোক?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তারা কোমল প্রাণ ও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের অধিকারী। ঈমান, বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমত এ সবই ইয়ামনবাসীদের রয়েছে।” (এ হাদসিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যেহেতু এ সূরাটিতে রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোকগমনের সংবাদ ছিল সেহেতু সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আখেরাতের কাজে পূর্বের চেয়ে অধিক মনোযোগী হন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেছে এবং ইয়ামনবাসী এসে পড়েছে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কি (প্রকৃতির লোকে)?” উত্তরে তিনি বললেন! “তাদের অন্তর কোমল, স্বভাব নম্র এবং তারা ঈমান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা সমূহের মধ্যে পুরো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে (আরবি) এ সূরাটিই সর্বশেষ সূরা। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ “সব মানুষ এক দিকে এবং আমি ও আমার সাহাবীরা এক দিকে। জেনে রেখো যে, মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরত নেই, তবে রয়েছে। জিহাদ এবং নিয়ত।” মারওয়ানকে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি শোনালে তিনি বলে ওঠেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো” ঐ সময় মারওয়ানের সাথে তার মজলিসে হযরত রাফে ইবনে খাদীজ (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) তাঁদের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন! “এঁরাও এ হাদীসটি জানেন এবং বর্ণনা করতে পারেন। কিন্তু একজন নিজের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশংকায় এবং অপরজন যাকাত আদায়ের পদমর্যাদা থেকে বরখাস্ত হওয়ার ভয়ে এটা বর্ণনা করছেন না।" একথা শুনে মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কে চাবুক মারতে উদ্যত হলে উভয় সাহাবী মারওয়ানকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “শোনো মারওয়ান! হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) সত্য কথাই বলেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীস নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেনঃ “হিজরত আর অবশিষ্ট নেই, তবে জিহাদ এবং নিয়ত বাকি রয়েছে। তোমাদেরকে যখন চলতে বলা হবে তখন তোমরা উঠে দাড়িয়ে চলতে শুরু করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) তবে হ্যা, এটাও মনে রাখতে হবে যে, যে সব সাহাবী (রাঃ) হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর শহর ও দূর্গের বিজয় দান করবেন এবং আমাদেরকে সাহায্য করবেন তখন আমরা যেন তার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করি ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এ সূরায় এ নির্দেশই তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন। তাছাড়া আমরা যেন নামায আদায় করি ও নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি, এ নির্দেশও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। তাদের এ অর্থ ও তাফসীরও খুবই সুন্দর ও বিশুদ্ধ, এতে কোন সন্দেহ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন চাশতের আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, ওটা ছিল চাশতের নামায, কিন্তু আমরা জানি যে, তিনি চাশতের নামায নিয়মিতভাবে আদায় করতেন না। তাছাড়া ঐসময় ব্যস্ততা ছিল এবং কাজকর্মও অনেক ছিল। তিনি ছিলেন মুসাফির, এ অবস্থায় কি করে তিনি চাশতের নামায পড়তে পারেন? এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের সময়ে মক্কা শরীফে রমযানের শেষ পর্যন্ত উনিশ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি ফরয নামাযও কসর করেছিলেন। তিনি রোযাও রাখেননি। তাঁর সঙ্গীয় প্রায় দশ হাজার মুসলমান সবাই এ নিয়ম পালন করেছিলেন। এতে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আট রাকআত নামায মক্কা বিজয়ের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ছিল। এ কারণেই সেনাবাহিনী প্রধান বা সমকালীন ইমামের জন্যে কোন শহর জয় করার সাথে সাথে ঐ শহরে আট রাকআত নামায আদায় করা মুস্তাহাব।হযরত সা'দ ইবনে অক্কাস (রাঃ) মাদায়েন বিজয়ের দিন অনুরূপ আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন। এই আট রাকআত নামায দুই রাকআত করে আদায় করতে হবে। কারো কারো মতে আট রাকআতে একবার সালাম ফিরালেই চলবে। অর্থাৎ একবারই সালাম ফিরানোর নিয়তে আট রাকআত নামায পড়া যাবে। কিন্তু সুনানে আবি দাউদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ নামায প্রতি দুই রাকআতে সালাম ফিরিয়ে আদায় করেছিলেন। অন্যান্য তাফসীরও বিশুদ্ধ। যেমন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেছেন যে, এ সূরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ইন্তেকালের সংবাদ দেয়া হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যে মক্কা থেকে কাফিররা তোমাকে চলে যেতে বাধ্য করেছে, সেই মক্কা বিজয় যখন তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে, নিজের পরিশ্রমের ফলে যখন দেখতে পাবে, আরো যখন দেখতে পাবে যে, জনগণ আল্লাহর ধর্মে দলে দলে প্রবেশ করছে তখন তুমি স্বীয় প্রতিপালকের তাসবীহ ও তাহমীদ পাঠ করবে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তুমি পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকো। মনে রেখো যে, তোমার ইহকালীন দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং এখন পরকালের প্রতি মনোযোগী হও। সেখানে তোমার জন্যে বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে। তোমার মেহমানদারী স্বয়ং আমিই করবো। কাজেই আমার রহমত ও কুদরতের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে অধিক পরিমাণে আমার প্রশংসা করো, তাওবা ইসতিগফার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুল করে থাকেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভর রুকু ও সিজদায় নিম্নলিখিত তাসবীহ অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহাপবিত্র এবং আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের (আরবি) এ আয়াতের উপর অধিক পরিমাণে আমল করতেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর শেষ জীবনে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র, তার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা, আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট তাওবা করছি।” তিনি আরো বলতেনঃ “আমার প্রতিপালক আমাকে আদেশ দিয়ে রেখেছেনঃ যখন আমি দেখতে পাই যে, মক্কা বিজয় অত্যাসন্ন এবং দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করছে তখন যেন আমি এ কালেমা অধিক পরিমাণে পাঠ করি। সুতরাং আল্লাহর রহমতে আমি মক্কা বিজয় প্রত্যক্ষ করেছি। এ কারণে এখন (মনোযোগ সহকারে) এ কালেমা নিয়মিত পাঠ করছি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শেষ বয়সে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠতে বসতে চলতে ফিরতে এবং আসতে যেতে নিম্নের তাসবীহ পড়তে থাকতেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র এবং তাঁর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।" হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার এর কারণ জিজ্ঞেস করলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা নাসর তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহপাক আমাকে এরকমই আদেশ দিয়েছেন।”মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রায়ই এ সূরা তিলাওয়াত করতেন এবং রুকূতে তিনবার নিম্নের দু'আ পড়তেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহা পবিত্র। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, দয়ালু।" বিজয় অর্থে এখানে মক্কা বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই। আরবের সাধারণ গোত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপারে কোনই মতানৈক্য হয়নি। আরবের সাধারন গোত্রগুলো অপেক্ষা করছিল যে, যদি মুহাম্মদ (সঃ) স্বজাতির উপর জয়যুক্ত হন এবং মক্কা তাঁর পদানত হয় তবে তিনি যে সত্য নবী এব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ থাকবে না।আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর প্রিয় নবী (সঃ) কে মহাবিজয় দান করলেন তখন এরা সবাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। এরপর দু'বছর যেতে যেতেই সমগ্র আরব ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো। প্রত্যেক গোত্রের উপর ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। সহীহ বুখারীতেও হযরত আমর ইবনে সালমার (রাঃ)এ উক্তি বিদ্যমান রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের সাথে সকল গোত্র ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। তারা ইসলাম গ্রহণের জন্যে অপেক্ষা করছিল এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলঃ নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে এবং তাঁর স্বজাতিকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। যদি মুহাম্মদ (সঃ) সত্য নবী হয়ে থাকেন তবে নিজের জাতির উপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবেন এবং মক্কার উপর তার বিজয় পতাকা উড়বে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রাপ্য।মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহর এক প্রতিবেশী সফর থেকে ফিরে আসার পর হযরত জাবির (রাঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেই প্রতিবেশী মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব-কলহ এবং নতুন নতুন বিদআতের কথা ব্যক্ত করলে হযরত জাবির (রাঃ)-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। তিনি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেনঃ “আমি সরদারে দো জাহান, শাফীউল মুযনিবীন, রহমাতুল লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে বটে, কিন্তু শীঘ্রই তারা দলে দলে এই দ্বীন থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করবে।”
আন-নাসর 110:2
পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই সূরাটি কুরআন কারীমের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সর্বশেষ কোন সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে তা কি তুমি জান?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, সূরা ইযাজাআ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহু' (সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছে।)” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তখন বললেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আইয়ামে তাশরীকের (১১ই, ১২ইও ১৩ই যিল হজ্ব তারিখের) মধ্যভাগে (আরবি) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হলে তিনি বুঝতে পারেন যে, এটা বিদায়ী সূরা। সুতরাং তখনই তিনি সওয়ারী তৈরি করার নির্দেশ দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। তারপর তিনি তার সুপ্রসিদ্ধ খুৎবাহ প্রদান করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বাযার (রঃ) এবং হাফিয বারহাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যখন (আরবি) সূরা অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “আমার পরলোক গমনের খবর এসে গেছে।” এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কাঁদতে শুরু করলেন। তারপরই তিনি হাসতে লাগলেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমার আব্বার (সঃ) পরলোক গমনের সময় নিকটবর্তী হওয়ার খবর শুনে আমার কান্না এসেছিল। কিন্তু আমার কান্নার সময় তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি ধৈর্য ধারণ করে। আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে তুমিই সর্ব প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসায়ীতে এটা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাতে হযরত ফাতিমার (রঃ) উল্লেখ করা হয়নি)১-৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়স্ক মুজাহিদদের সাথে হযরত উমার (রাঃ) আমাকেও শামিল করে নিতেন। এ কারণে কারো কারো মনে সম্ভবতঃ অসন্তুষ্টির ভাব সৃষ্টি হয়ে থাকবে। একদা তাদের মধ্যে একজন আমার সম্পর্কে মন্তব্য করলেনঃ সে যেন আমাদের সাথে না থাকে। তার সমবয়সী ছেলে আমাদেরও তো রয়েছে।” তার এ মন্তব্য শুনে হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ তোমরা তো তাকে খুব ভাল রূপেই জান!” একদিন তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং আমাকেও স্মরণ করলেন আমি বুঝতে পারলাম যে, আজ তিনি তাদেরকে কিছু দেখাতে চান। আমরা সবাই হাজির হলে তিনি সকলকে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবি) সূরাটি সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি (অর্থাৎ এ সূরাটি কিসের ইঙ্গিত বহন করছে)।” কেউ কেউ বললেনঃ “এ সূরায় আল্লাহ তাআলার গুণগান করার জন্যে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্যে আমাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এলে এবং আমাদের বিজয় সূচিত হলেই যেন আমরা এইরূপ করি।” কেউ কেউ আবার সম্পূর্ণ নীরব থাকলেন, কিছুই বললেন হযরত উমার (রাঃ) তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার মতামতও কি এদের মতই?” আমি উত্তরে বললামঃ না, বরং আমি এই বুঝেছি এ সূরায় রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোক গমনের ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁকে এটা জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তার ইহলৌকিক জীবন শেষ হয়ে এসেছে। সুতরাং তিনি যেন তাঁর প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমিও এটাই বুঝেছি।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “(এ বছরই আমার ইন্তেকাল হবে) আমাকে আমার মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় অবস্থান করছিলেন, একদা তিনি বলেনঃ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে পড়েছে। ইয়ামনের অধিবাসীরা এসে গেছে।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কেমন লোক?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তারা কোমল প্রাণ ও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের অধিকারী। ঈমান, বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমত এ সবই ইয়ামনবাসীদের রয়েছে।” (এ হাদসিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যেহেতু এ সূরাটিতে রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোকগমনের সংবাদ ছিল সেহেতু সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আখেরাতের কাজে পূর্বের চেয়ে অধিক মনোযোগী হন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেছে এবং ইয়ামনবাসী এসে পড়েছে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কি (প্রকৃতির লোকে)?” উত্তরে তিনি বললেন! “তাদের অন্তর কোমল, স্বভাব নম্র এবং তারা ঈমান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা সমূহের মধ্যে পুরো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে (আরবি) এ সূরাটিই সর্বশেষ সূরা। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ “সব মানুষ এক দিকে এবং আমি ও আমার সাহাবীরা এক দিকে। জেনে রেখো যে, মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরত নেই, তবে রয়েছে। জিহাদ এবং নিয়ত।” মারওয়ানকে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি শোনালে তিনি বলে ওঠেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো” ঐ সময় মারওয়ানের সাথে তার মজলিসে হযরত রাফে ইবনে খাদীজ (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) তাঁদের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন! “এঁরাও এ হাদীসটি জানেন এবং বর্ণনা করতে পারেন। কিন্তু একজন নিজের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশংকায় এবং অপরজন যাকাত আদায়ের পদমর্যাদা থেকে বরখাস্ত হওয়ার ভয়ে এটা বর্ণনা করছেন না।" একথা শুনে মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কে চাবুক মারতে উদ্যত হলে উভয় সাহাবী মারওয়ানকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “শোনো মারওয়ান! হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) সত্য কথাই বলেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীস নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেনঃ “হিজরত আর অবশিষ্ট নেই, তবে জিহাদ এবং নিয়ত বাকি রয়েছে। তোমাদেরকে যখন চলতে বলা হবে তখন তোমরা উঠে দাড়িয়ে চলতে শুরু করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) তবে হ্যা, এটাও মনে রাখতে হবে যে, যে সব সাহাবী (রাঃ) হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর শহর ও দূর্গের বিজয় দান করবেন এবং আমাদেরকে সাহায্য করবেন তখন আমরা যেন তার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করি ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এ সূরায় এ নির্দেশই তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন। তাছাড়া আমরা যেন নামায আদায় করি ও নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি, এ নির্দেশও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। তাদের এ অর্থ ও তাফসীরও খুবই সুন্দর ও বিশুদ্ধ, এতে কোন সন্দেহ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন চাশতের আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, ওটা ছিল চাশতের নামায, কিন্তু আমরা জানি যে, তিনি চাশতের নামায নিয়মিতভাবে আদায় করতেন না। তাছাড়া ঐসময় ব্যস্ততা ছিল এবং কাজকর্মও অনেক ছিল। তিনি ছিলেন মুসাফির, এ অবস্থায় কি করে তিনি চাশতের নামায পড়তে পারেন? এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের সময়ে মক্কা শরীফে রমযানের শেষ পর্যন্ত উনিশ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি ফরয নামাযও কসর করেছিলেন। তিনি রোযাও রাখেননি। তাঁর সঙ্গীয় প্রায় দশ হাজার মুসলমান সবাই এ নিয়ম পালন করেছিলেন। এতে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আট রাকআত নামায মক্কা বিজয়ের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ছিল। এ কারণেই সেনাবাহিনী প্রধান বা সমকালীন ইমামের জন্যে কোন শহর জয় করার সাথে সাথে ঐ শহরে আট রাকআত নামায আদায় করা মুস্তাহাব।হযরত সা'দ ইবনে অক্কাস (রাঃ) মাদায়েন বিজয়ের দিন অনুরূপ আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন। এই আট রাকআত নামায দুই রাকআত করে আদায় করতে হবে। কারো কারো মতে আট রাকআতে একবার সালাম ফিরালেই চলবে। অর্থাৎ একবারই সালাম ফিরানোর নিয়তে আট রাকআত নামায পড়া যাবে। কিন্তু সুনানে আবি দাউদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ নামায প্রতি দুই রাকআতে সালাম ফিরিয়ে আদায় করেছিলেন। অন্যান্য তাফসীরও বিশুদ্ধ। যেমন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেছেন যে, এ সূরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ইন্তেকালের সংবাদ দেয়া হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যে মক্কা থেকে কাফিররা তোমাকে চলে যেতে বাধ্য করেছে, সেই মক্কা বিজয় যখন তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে, নিজের পরিশ্রমের ফলে যখন দেখতে পাবে, আরো যখন দেখতে পাবে যে, জনগণ আল্লাহর ধর্মে দলে দলে প্রবেশ করছে তখন তুমি স্বীয় প্রতিপালকের তাসবীহ ও তাহমীদ পাঠ করবে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তুমি পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকো। মনে রেখো যে, তোমার ইহকালীন দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং এখন পরকালের প্রতি মনোযোগী হও। সেখানে তোমার জন্যে বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে। তোমার মেহমানদারী স্বয়ং আমিই করবো। কাজেই আমার রহমত ও কুদরতের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে অধিক পরিমাণে আমার প্রশংসা করো, তাওবা ইসতিগফার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুল করে থাকেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভর রুকু ও সিজদায় নিম্নলিখিত তাসবীহ অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহাপবিত্র এবং আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের (আরবি) এ আয়াতের উপর অধিক পরিমাণে আমল করতেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর শেষ জীবনে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র, তার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা, আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট তাওবা করছি।” তিনি আরো বলতেনঃ “আমার প্রতিপালক আমাকে আদেশ দিয়ে রেখেছেনঃ যখন আমি দেখতে পাই যে, মক্কা বিজয় অত্যাসন্ন এবং দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করছে তখন যেন আমি এ কালেমা অধিক পরিমাণে পাঠ করি। সুতরাং আল্লাহর রহমতে আমি মক্কা বিজয় প্রত্যক্ষ করেছি। এ কারণে এখন (মনোযোগ সহকারে) এ কালেমা নিয়মিত পাঠ করছি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শেষ বয়সে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠতে বসতে চলতে ফিরতে এবং আসতে যেতে নিম্নের তাসবীহ পড়তে থাকতেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র এবং তাঁর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।" হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার এর কারণ জিজ্ঞেস করলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা নাসর তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহপাক আমাকে এরকমই আদেশ দিয়েছেন।”মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রায়ই এ সূরা তিলাওয়াত করতেন এবং রুকূতে তিনবার নিম্নের দু'আ পড়তেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহা পবিত্র। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, দয়ালু।" বিজয় অর্থে এখানে মক্কা বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই। আরবের সাধারণ গোত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপারে কোনই মতানৈক্য হয়নি। আরবের সাধারন গোত্রগুলো অপেক্ষা করছিল যে, যদি মুহাম্মদ (সঃ) স্বজাতির উপর জয়যুক্ত হন এবং মক্কা তাঁর পদানত হয় তবে তিনি যে সত্য নবী এব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ থাকবে না।আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর প্রিয় নবী (সঃ) কে মহাবিজয় দান করলেন তখন এরা সবাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। এরপর দু'বছর যেতে যেতেই সমগ্র আরব ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো। প্রত্যেক গোত্রের উপর ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। সহীহ বুখারীতেও হযরত আমর ইবনে সালমার (রাঃ)এ উক্তি বিদ্যমান রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের সাথে সকল গোত্র ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। তারা ইসলাম গ্রহণের জন্যে অপেক্ষা করছিল এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলঃ নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে এবং তাঁর স্বজাতিকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। যদি মুহাম্মদ (সঃ) সত্য নবী হয়ে থাকেন তবে নিজের জাতির উপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবেন এবং মক্কার উপর তার বিজয় পতাকা উড়বে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রাপ্য।মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহর এক প্রতিবেশী সফর থেকে ফিরে আসার পর হযরত জাবির (রাঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেই প্রতিবেশী মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব-কলহ এবং নতুন নতুন বিদআতের কথা ব্যক্ত করলে হযরত জাবির (রাঃ)-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। তিনি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেনঃ “আমি সরদারে দো জাহান, শাফীউল মুযনিবীন, রহমাতুল লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে বটে, কিন্তু শীঘ্রই তারা দলে দলে এই দ্বীন থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করবে।”
আন-নাসর 110:3
পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই সূরাটি কুরআন কারীমের এক চতুর্থাংশের সমতুল্য।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সর্বশেষ কোন সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে তা কি তুমি জান?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, সূরা ইযাজাআ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহু' (সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছে।)” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তখন বললেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আইয়ামে তাশরীকের (১১ই, ১২ইও ১৩ই যিল হজ্ব তারিখের) মধ্যভাগে (আরবি) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হলে তিনি বুঝতে পারেন যে, এটা বিদায়ী সূরা। সুতরাং তখনই তিনি সওয়ারী তৈরি করার নির্দেশ দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। তারপর তিনি তার সুপ্রসিদ্ধ খুৎবাহ প্রদান করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বাযার (রঃ) এবং হাফিয বারহাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যখন (আরবি) সূরা অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “আমার পরলোক গমনের খবর এসে গেছে।” এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কাঁদতে শুরু করলেন। তারপরই তিনি হাসতে লাগলেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমার আব্বার (সঃ) পরলোক গমনের সময় নিকটবর্তী হওয়ার খবর শুনে আমার কান্না এসেছিল। কিন্তু আমার কান্নার সময় তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি ধৈর্য ধারণ করে। আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে তুমিই সর্ব প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসায়ীতে এটা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাতে হযরত ফাতিমার (রঃ) উল্লেখ করা হয়নি)১-৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়স্ক মুজাহিদদের সাথে হযরত উমার (রাঃ) আমাকেও শামিল করে নিতেন। এ কারণে কারো কারো মনে সম্ভবতঃ অসন্তুষ্টির ভাব সৃষ্টি হয়ে থাকবে। একদা তাদের মধ্যে একজন আমার সম্পর্কে মন্তব্য করলেনঃ সে যেন আমাদের সাথে না থাকে। তার সমবয়সী ছেলে আমাদেরও তো রয়েছে।” তার এ মন্তব্য শুনে হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ তোমরা তো তাকে খুব ভাল রূপেই জান!” একদিন তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং আমাকেও স্মরণ করলেন আমি বুঝতে পারলাম যে, আজ তিনি তাদেরকে কিছু দেখাতে চান। আমরা সবাই হাজির হলে তিনি সকলকে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবি) সূরাটি সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি (অর্থাৎ এ সূরাটি কিসের ইঙ্গিত বহন করছে)।” কেউ কেউ বললেনঃ “এ সূরায় আল্লাহ তাআলার গুণগান করার জন্যে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্যে আমাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এলে এবং আমাদের বিজয় সূচিত হলেই যেন আমরা এইরূপ করি।” কেউ কেউ আবার সম্পূর্ণ নীরব থাকলেন, কিছুই বললেন হযরত উমার (রাঃ) তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার মতামতও কি এদের মতই?” আমি উত্তরে বললামঃ না, বরং আমি এই বুঝেছি এ সূরায় রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোক গমনের ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁকে এটা জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তার ইহলৌকিক জীবন শেষ হয়ে এসেছে। সুতরাং তিনি যেন তাঁর প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমিও এটাই বুঝেছি।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “(এ বছরই আমার ইন্তেকাল হবে) আমাকে আমার মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় অবস্থান করছিলেন, একদা তিনি বলেনঃ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে পড়েছে। ইয়ামনের অধিবাসীরা এসে গেছে।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কেমন লোক?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তারা কোমল প্রাণ ও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের অধিকারী। ঈমান, বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমত এ সবই ইয়ামনবাসীদের রয়েছে।” (এ হাদসিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যেহেতু এ সূরাটিতে রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরলোকগমনের সংবাদ ছিল সেহেতু সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আখেরাতের কাজে পূর্বের চেয়ে অধিক মনোযোগী হন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেছে এবং ইয়ামনবাসী এসে পড়েছে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ইয়ামনবাসীরা কি (প্রকৃতির লোকে)?” উত্তরে তিনি বললেন! “তাদের অন্তর কোমল, স্বভাব নম্র এবং তারা ঈমান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা সমূহের মধ্যে পুরো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে (আরবি) এ সূরাটিই সর্বশেষ সূরা। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ “সব মানুষ এক দিকে এবং আমি ও আমার সাহাবীরা এক দিকে। জেনে রেখো যে, মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরত নেই, তবে রয়েছে। জিহাদ এবং নিয়ত।” মারওয়ানকে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি শোনালে তিনি বলে ওঠেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো” ঐ সময় মারওয়ানের সাথে তার মজলিসে হযরত রাফে ইবনে খাদীজ (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) তাঁদের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন! “এঁরাও এ হাদীসটি জানেন এবং বর্ণনা করতে পারেন। কিন্তু একজন নিজের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশংকায় এবং অপরজন যাকাত আদায়ের পদমর্যাদা থেকে বরখাস্ত হওয়ার ভয়ে এটা বর্ণনা করছেন না।" একথা শুনে মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কে চাবুক মারতে উদ্যত হলে উভয় সাহাবী মারওয়ানকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “শোনো মারওয়ান! হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) সত্য কথাই বলেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীস নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেনঃ “হিজরত আর অবশিষ্ট নেই, তবে জিহাদ এবং নিয়ত বাকি রয়েছে। তোমাদেরকে যখন চলতে বলা হবে তখন তোমরা উঠে দাড়িয়ে চলতে শুরু করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) তবে হ্যা, এটাও মনে রাখতে হবে যে, যে সব সাহাবী (রাঃ) হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর শহর ও দূর্গের বিজয় দান করবেন এবং আমাদেরকে সাহায্য করবেন তখন আমরা যেন তার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করি ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এ সূরায় এ নির্দেশই তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন। তাছাড়া আমরা যেন নামায আদায় করি ও নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি, এ নির্দেশও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। তাদের এ অর্থ ও তাফসীরও খুবই সুন্দর ও বিশুদ্ধ, এতে কোন সন্দেহ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন চাশতের আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, ওটা ছিল চাশতের নামায, কিন্তু আমরা জানি যে, তিনি চাশতের নামায নিয়মিতভাবে আদায় করতেন না। তাছাড়া ঐসময় ব্যস্ততা ছিল এবং কাজকর্মও অনেক ছিল। তিনি ছিলেন মুসাফির, এ অবস্থায় কি করে তিনি চাশতের নামায পড়তে পারেন? এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের সময়ে মক্কা শরীফে রমযানের শেষ পর্যন্ত উনিশ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি ফরয নামাযও কসর করেছিলেন। তিনি রোযাও রাখেননি। তাঁর সঙ্গীয় প্রায় দশ হাজার মুসলমান সবাই এ নিয়ম পালন করেছিলেন। এতে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আট রাকআত নামায মক্কা বিজয়ের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ছিল। এ কারণেই সেনাবাহিনী প্রধান বা সমকালীন ইমামের জন্যে কোন শহর জয় করার সাথে সাথে ঐ শহরে আট রাকআত নামায আদায় করা মুস্তাহাব।হযরত সা'দ ইবনে অক্কাস (রাঃ) মাদায়েন বিজয়ের দিন অনুরূপ আট রাকআত নামায আদায় করেছিলেন। এই আট রাকআত নামায দুই রাকআত করে আদায় করতে হবে। কারো কারো মতে আট রাকআতে একবার সালাম ফিরালেই চলবে। অর্থাৎ একবারই সালাম ফিরানোর নিয়তে আট রাকআত নামায পড়া যাবে। কিন্তু সুনানে আবি দাউদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ নামায প্রতি দুই রাকআতে সালাম ফিরিয়ে আদায় করেছিলেন। অন্যান্য তাফসীরও বিশুদ্ধ। যেমন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেছেন যে, এ সূরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ইন্তেকালের সংবাদ দেয়া হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যে মক্কা থেকে কাফিররা তোমাকে চলে যেতে বাধ্য করেছে, সেই মক্কা বিজয় যখন তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে, নিজের পরিশ্রমের ফলে যখন দেখতে পাবে, আরো যখন দেখতে পাবে যে, জনগণ আল্লাহর ধর্মে দলে দলে প্রবেশ করছে তখন তুমি স্বীয় প্রতিপালকের তাসবীহ ও তাহমীদ পাঠ করবে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তুমি পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকো। মনে রেখো যে, তোমার ইহকালীন দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং এখন পরকালের প্রতি মনোযোগী হও। সেখানে তোমার জন্যে বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে। তোমার মেহমানদারী স্বয়ং আমিই করবো। কাজেই আমার রহমত ও কুদরতের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে অধিক পরিমাণে আমার প্রশংসা করো, তাওবা ইসতিগফার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুল করে থাকেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভর রুকু ও সিজদায় নিম্নলিখিত তাসবীহ অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহাপবিত্র এবং আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের (আরবি) এ আয়াতের উপর অধিক পরিমাণে আমল করতেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর শেষ জীবনে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো অধিক পরিমাণে পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র, তার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা, আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট তাওবা করছি।” তিনি আরো বলতেনঃ “আমার প্রতিপালক আমাকে আদেশ দিয়ে রেখেছেনঃ যখন আমি দেখতে পাই যে, মক্কা বিজয় অত্যাসন্ন এবং দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করছে তখন যেন আমি এ কালেমা অধিক পরিমাণে পাঠ করি। সুতরাং আল্লাহর রহমতে আমি মক্কা বিজয় প্রত্যক্ষ করেছি। এ কারণে এখন (মনোযোগ সহকারে) এ কালেমা নিয়মিত পাঠ করছি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শেষ বয়সে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠতে বসতে চলতে ফিরতে এবং আসতে যেতে নিম্নের তাসবীহ পড়তে থাকতেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহাপবিত্র এবং তাঁর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।" হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার এর কারণ জিজ্ঞেস করলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা নাসর তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহপাক আমাকে এরকমই আদেশ দিয়েছেন।”মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রায়ই এ সূরা তিলাওয়াত করতেন এবং রুকূতে তিনবার নিম্নের দু'আ পড়তেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি মহা পবিত্র। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, দয়ালু।" বিজয় অর্থে এখানে মক্কা বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই। আরবের সাধারণ গোত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপারে কোনই মতানৈক্য হয়নি। আরবের সাধারন গোত্রগুলো অপেক্ষা করছিল যে, যদি মুহাম্মদ (সঃ) স্বজাতির উপর জয়যুক্ত হন এবং মক্কা তাঁর পদানত হয় তবে তিনি যে সত্য নবী এব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ থাকবে না।আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর প্রিয় নবী (সঃ) কে মহাবিজয় দান করলেন তখন এরা সবাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। এরপর দু'বছর যেতে যেতেই সমগ্র আরব ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো। প্রত্যেক গোত্রের উপর ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। সহীহ বুখারীতেও হযরত আমর ইবনে সালমার (রাঃ)এ উক্তি বিদ্যমান রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের সাথে সকল গোত্র ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। তারা ইসলাম গ্রহণের জন্যে অপেক্ষা করছিল এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলঃ নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে এবং তাঁর স্বজাতিকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। যদি মুহাম্মদ (সঃ) সত্য নবী হয়ে থাকেন তবে নিজের জাতির উপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবেন এবং মক্কার উপর তার বিজয় পতাকা উড়বে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রাপ্য।মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে যে, হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহর এক প্রতিবেশী সফর থেকে ফিরে আসার পর হযরত জাবির (রাঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেই প্রতিবেশী মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব-কলহ এবং নতুন নতুন বিদআতের কথা ব্যক্ত করলে হযরত জাবির (রাঃ)-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। তিনি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেনঃ “আমি সরদারে দো জাহান, শাফীউল মুযনিবীন, রহমাতুল লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে বটে, কিন্তু শীঘ্রই তারা দলে দলে এই দ্বীন থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করবে।”