Tafseer ibn Kathir — আল-মাসাদ 111:1 – আন-নাস 114:6
Contents
আল-মাসাদ 111:1
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” (অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন। অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “আমি নবী করীম (সঃ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা আবু লাহাব।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল। আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।(আরবি) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী (রঃ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী (রঃ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ(আরবি)অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের (নিন্দনীয় ব্যক্তির) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না। তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" (১৭:৪৫) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও (সঃ) তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী (সঃ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার কোন নিন্দে করেননি।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “মুযাম্মাম ধ্বংস হোক।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “আমি একজন পূত পবিত্র রমনী। আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও (রাঃ) ছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয়। না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “তোমার সাথী (কবিতার ভাষায়) আমার দুর্নাম রটনা করেছে।” হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন কসম করে বললেমঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আল-মাসাদ 111:2
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” (অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন। অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “আমি নবী করীম (সঃ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা আবু লাহাব।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল। আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।(আরবি) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী (রঃ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী (রঃ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ(আরবি)অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের (নিন্দনীয় ব্যক্তির) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না। তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" (১৭:৪৫) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও (সঃ) তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী (সঃ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার কোন নিন্দে করেননি।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “মুযাম্মাম ধ্বংস হোক।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “আমি একজন পূত পবিত্র রমনী। আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও (রাঃ) ছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয়। না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “তোমার সাথী (কবিতার ভাষায়) আমার দুর্নাম রটনা করেছে।” হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন কসম করে বললেমঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আল-মাসাদ 111:3
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” (অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন। অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “আমি নবী করীম (সঃ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা আবু লাহাব।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল। আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।(আরবি) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী (রঃ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী (রঃ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ(আরবি)অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের (নিন্দনীয় ব্যক্তির) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না। তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" (১৭:৪৫) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও (সঃ) তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী (সঃ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার কোন নিন্দে করেননি।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “মুযাম্মাম ধ্বংস হোক।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “আমি একজন পূত পবিত্র রমনী। আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও (রাঃ) ছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয়। না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “তোমার সাথী (কবিতার ভাষায়) আমার দুর্নাম রটনা করেছে।” হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন কসম করে বললেমঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আল-মাসাদ 111:4
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” (অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন। অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “আমি নবী করীম (সঃ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা আবু লাহাব।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল। আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।(আরবি) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী (রঃ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী (রঃ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ(আরবি)অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের (নিন্দনীয় ব্যক্তির) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না। তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" (১৭:৪৫) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও (সঃ) তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী (সঃ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার কোন নিন্দে করেননি।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “মুযাম্মাম ধ্বংস হোক।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “আমি একজন পূত পবিত্র রমনী। আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও (রাঃ) ছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয়। না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “তোমার সাথী (কবিতার ভাষায়) আমার দুর্নাম রটনা করেছে।” হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন কসম করে বললেমঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আল-মাসাদ 111:5
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” (অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন। অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “আমি নবী করীম (সঃ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাচা আবু লাহাব।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল। আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।(আরবি) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী (রঃ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী (রঃ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ(আরবি)অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের (নিন্দনীয় ব্যক্তির) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না। তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" (১৭:৪৫) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও (সঃ) তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী (সঃ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার কোন নিন্দে করেননি।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “মুযাম্মাম ধ্বংস হোক।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “আমি একজন পূত পবিত্র রমনী। আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন(আরবি) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও (রাঃ) ছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয়। না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে বললোঃ “তোমার সাথী (কবিতার ভাষায়) আমার দুর্নাম রটনা করেছে।” হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন কসম করে বললেমঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আল-ইখলাস 112:1
মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা নবী করীম (সঃ) কে বললোঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমাদের সামনে তোমার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা কর।" তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো যিনি সৃষ্ট হননি। এবং যার সন্তান সন্ততি নেই। কেননা, যে সৃষ্ট হয়েছে সে এক সময় মৃত্যুবরণ করবে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুবরণও করবেন না এবং তাঁর কোন উত্তরাধিকারীও হবে না। তিনি কারো সন্তান নন এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। (ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইমাম ইবনে আবী হাতিমও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবী করিমের (সঃ) নিকট এসে বলেঃ “আমার সামনে আপনার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা করুন!” তখন আল্লাহ তাআলা (আরবি) সূরাটি অবতীর্ণ করেন। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ)] অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, কুরায়েশদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি নাযিল করেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিষেরই নিসবত বা সম্বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর নিসবত হলো(আরবি) এবং তাকেই বলা হয় যিনি অন্তসারশূণ্য নন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদে নবী করীম (সঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোকের নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। তারা ফিরে এসে নবী করীম (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে আপনি আমাদের নেতা মনোনীত করেছেন তিনি প্রত্যেক নামাযে কিরআতের শেষে।(আরবি) সূরাটি পাঠ করতেন।” নবী করীম (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “সে কেন এরূপ করতো তা তোমরা তাকে জিজ্ঞেস কর তো?” তাকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ সূরায় আল্লাহর রাহমানুর রাহীমের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, এ কারণে এ সূরা পড়তে আমি খুব ভালবাসি।" এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।”সহীহ বুখারীর কিতাবুস সলাতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী মসজিদে কুবার ইমাম ছিলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করার পরই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। তারপর কুরআনের অন্য অংশ পছন্দমত পড়তেন। একদিন মুক্তাদী তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি সূরা ইখলাস পাঠ করেন, তারপর অন্য সূরাও এর সাথে মিলিয়ে দেন, কি ব্যাপার? হয় শুধু সূরা ইখলাস পড়ুন অথবা এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য সূরা পড়ুন।” আনসারী জবাব দিলেনঃ “আমি যেমন করছি তেমনি করবো, তোমাদের ইচ্ছা হলে আমাকে ইমাম হিসেবে রাখখা, না হলে বলো, আমি তোমাদের ইমামতি ছেড়ে দিচ্ছি।” মুসল্লীরা দেখলেন যে, এটা মুশকিল ব্যাপার! কারণ উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই ছিলেন ইমামতির সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তাই তার বিদ্যমানতায় তারা অন্য কারো ইমামতি মেনে নিতে পারলেন না (সুতরাং তিনিই ইমাম থেকে গেলেন)। একদিন রাসুলুল্লাহ (সঃ) সেখানে গমন করলে মুসল্লীরা তাঁর কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তিনি তখন ঐ ইমামকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি মুসল্লীদের কথা মানো না কেন? প্রত্যেক রাকআতে সূরা ইখলাস পড় কেন?” ইমাম সাহেব উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ সূরার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ সূরার প্রতি তোমার আসক্তি ও ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দিয়েছে।”মুসনাদে আহমদে ও জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আরবি) এই সূরাটিকে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “ তোমার এ ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবে।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক অন্য একটি লোককে রাত্রিকালে বারবার (আরবি) এ সূরাটি পড়তে শুনে সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। লোকটি সম্ভবতঃ ঐ লোকটির এ সূরা পাঠকে হালকা সওয়াবের কাজ মনে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “ তোমরা প্রত্যেকেই কি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে না?” সাহাবীদের কাছে এটা খুবই কষ্ট সাধ্য মনে হলো। তাই, তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা আছে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।" মুসনাদে আহমদে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত কাতাদা ইবনে নু’মান (রাঃ) সারা রাত ধরে সুরা ইখলাস পড়তে থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে এটা জানানো হলে তিনি বললেন, “এ সুরা অর্ধেক কুরআন অথবা এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমতুল্য।” মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। তিনি জনগণকে বলেন! “ তোমাদের মধ্যে কারো প্রত্যেক রাত্রে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠের ক্ষমতা আছে কি?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা থাকতে পারে?” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের (এর সমতূল্য)।" এমন সময় নবী করীম (সঃ) সেখানে এসে পড়লেন এবং হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আবু আইয়ুব (রাঃ) সত্য কথাই বলেছে।” জামে তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ তোমরা সমবেত হও, আজ আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবো।” সাহাবীগণ সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘর থেকে বের হয়ে এসে(আরবি) সূরাটি পাঠ করলেন। তারপর আবার ঘরে চলে গেলেন। সাহাবীরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবেন, সম্ভবত আকাশ থেকে কোন অহী এসেছে।” এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে এসে বললেনঃ “আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনানোর জন্যে কথা দিয়েছিলাম। জেনে রেখো যে, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”হযরত আবুদ দারদার (রাঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ “তোমরা কি প্রতিদিন কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে অপারগ?” সাহাবীগণ আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ব্যাপারে আমরা খুবই দুর্বল এবং অক্ষম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা কুরআনকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের রিওয়াইয়াত সাহাবীদের একটি বড় জামাআত হতে বর্ণিত রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথাও হতে তাশরীফ আনলেন, তাঁর সাথে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে এ সূরাটি পাঠ করতে শুনে বললেনঃ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।" হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি ওয়াজিব হয়ে গেছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জান্নাত (ওয়াজিব হয়ে গেছে)।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান, সহীহ, গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “ তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাত্রিকালে (আরবি) সূরাটি তিনবার পড়ার ক্ষমতা রাখে না? এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতূল্য। (এ হাদীসটি হাসিম আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেনঃ “আমরা পিপাসার্ত ছিলাম, চারদিকে রাতের গভীর অন্ধকার, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখন অসিবেন এবং নামায। পড়াবেন আমরা তারই অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় এলেন এবং আমার হাত ধরে বললেনঃ “পড়।” আমি নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বললেনঃ “পড়।” আমি বললামঃ কি পড়বো? তিনি বললেনঃ “প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে। প্রতিদিন তোমার জন্যে দুই বারই যথেষ্ট।” (এ হাদীস আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসাঈর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “এ তিনটি সূরা পাঠ করলে এগুলো তোমাকে প্রত্যেক জিনিষ হতে রক্ষা করবে।”মুসনাদে আহমদে হযরত তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিম্নলিখিত কালেমা দশবার পাঠ করবে সে চল্লিশ লাখ পূণ্য লাভ করবে। (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক একক, অভাবমুক্ত, তিনি স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, সন্তানও না (অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীও নেই, সন্তানও নেই) এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (হাদীসের একজন বর্ণনাকারী খলীল ইবনে মুররাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং অন্যান্য ইমাম তাঁকে খুবই দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন)মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কেউ যদি আরো বেশী বার পাঠ করে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)! বললেন:“আল্লাহ এর চেয়েও অধিক ও উত্তম প্রদানকারী (অর্থাৎ আল্লাহ পাক বেশীও দিতে পারবেন, তার কোনই অভাব নেই।)”হ্যরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) সুরাটি দশবার পাঠ করবে আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন, যে বিশ বার করবে তার জন্যে তৈরি করবেন জান্নাতে দু'টি প্রাসাদ এবং যে ব্যক্তি ত্রিশবার পাঠ করবে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতে তিনটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমরা এর চেয়েও বেশী বার পড়ি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ এর চেয়েও অধিকদাতা।” (এ হাদীসটি মুরসাল এবং উত্তম। দারিমী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পঞ্চাশবার, (আরবি) পাঠ করে আল্লাহ তা'আলা তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়া’লা সৃসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) দিনে দুইশত বার পাঠ করে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা এক হাজার পাঁচশত পুণ্য লিখে থাকেন যদি তার উপর কোন ঋণ না থাকে। এটাও বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা সৃসিলী (রঃ)। এর সনদও দুর্বল। জামে তিরমিযীর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রত্যহ দুইশত বার পাঠ করে তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়, যদি সে ঋণগ্রস্ত না হয়।”জামে তিরমিযীর একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ঘুমোবার জন্যে বিছানায় যায়, তারপর ডান পাশ ফিরে শয়ন করতঃ একশতবার(আরবি) পাঠ করে তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! তোমার ডান দিক দিয়ে জান্নাতে চলে যাও।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুইশত বার। পাঠ করে তার দুইশত বছরের পাপ মিটিয়ে দেয়া হয়।” (এ হাদীসটি আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসায়ীতে এই সূরার তাফসীরে হযরত বারীদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ কালে দেখেন যে, একটি লোক নামায পড়ছে এবং নিম্নলিখিত দুআ করছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এ সাক্ষ্যসহ আবেদন করছি যে, আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনি কারো মুখাপেক্ষী নন, আপনি এমন সত্ত্বা যার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং যার সমতুল্য কেউ নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! এ ব্যক্তি ইসমে আযমের সাথে দু'আ করেছে। আল্লাহর এই মহান নামের সাথে তার কাছে কিছু যাঞ্চা করলে তিনি তা দান করেন এবং এই নামের সাথে দু’আ করলে তিনি তা কবুল করে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) ছাড়াও অন্যান্য আসহাবে সুনানও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি কাজ এমন রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এগুলো সম্পাদন করে সে জান্নাতের দরজাগুলোর যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে এবং জান্নাতের যে কোন হ্যারের সাথে ইচ্ছা বিবাহিত হতে পারবে। (এক) যে ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়, (দুই) নিজের গোপনীয় ঋণ পরিশোধ করে এবং (তিন) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দশবার (আরবি) সূরাটি পাঠ করে।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! এ তিনটি কাজের যে কোন একটি যদি কেউ করে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “একটি করলেও একই রকম সম্মান সে লাভ করবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময়।(আরবি) পাঠ করবে আল্লাহ। তা'আলা তার ঘরের বাসিন্দাদেরকে এবং প্রতিবেশীদেরকে অভাবমুক্ত করে:দিবেন।” (হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি যঈফ বা দুর্রল)মুসনাদে আবী ইয়ালায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা তাবুকের যুদ্ধ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। সূর্য এমন স্বচ্ছ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কারভাবে উদিত হলো যে, ইতিপূর্বে কখনো এমনভাবে সূর্য উদিত হতে দেখা যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজ এ রকম উজ্জ্বল দীপ্তির সাথে সূর্যোদয়ের কারণ কি?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আজ মদীনায় মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়ার (রাঃ) ইন্তেকাল হয়েছে। তার জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের জন্যে আল্লাহ রাব্বল আলামীন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসমান থেকে পাঠিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তার কোন্ আমলের কারণে এরূপ হয়েছে?” জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “তিনি দিন রাত সব সময় চলাফেরায় উঠা বসায় সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। আপনি যদি তার জানাযার নামাযে হাজির হতে চান তবে চলুন, আমি জমীন সংকীর্ণ করে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তাই ভাল।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইবনে মুআবিয়া (রাঃ)-এর জানাযার নামায আদায় করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বায়হাকীও (রঃ) তার ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ নামক গ্রন্থে ইয়াযীদ ইবনে হারুণের (রঃ) রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ (রঃ) আ’লা ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এই আ’লা মাওযূ হাদীস বর্ণনা করে থাকেন বলে তার নামে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন)মুসনাদে আবী ইয়ালায় এ হাদীসের অন্য একটি সনদও রয়েছে। তাতে বর্ণনাকারী ভিন্ন ব্যক্তি। তাতে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) ইন্তেকাল করেছেন। আপনি কি তার জানাযার নামায পড়তে চান?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা" হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পালক দ্বারা জমীনে আঘাত করলেন। এর ফলে সমস্ত গাছ পালা, টিলা ইত্যাদি নিচু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃতের জানাযা দেখতে গেলেন। তিনি নামায শুরু করলেন। তাঁর পিছনে ফেরেশতাদের দুটি কাতার বা সারি ছিল। প্রত্যেক সারিতে সত্তর হাজার ফেরেশতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মুআবিয়ার (রাঃ)-এরূপ মর্যাদার কারণ কি?" জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ (আরবি) সূরাটির প্রতি তাঁর বিশেষ ভালবাসা এবং উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে ও আসতে যেতে এ সূরাটি পাঠ করাই তার এ মর্যাদার কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তার এ হাদীসের সনদে মাহবুব ইবনে হিলাল রয়েছেন। আবু হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, ইনি বর্ণনাকারী হিসেবে মাশহুর নন। মুসনাদে আবী ইয়ালায় বর্ণিত এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইনি নন, সেখানে এর স্থলে আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ রয়েছেন। কিন্তু মাহবুব ইবনে হিলালের বর্ণনাই যথার্থ বলে মনে হয়। কারণ আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাহবুব রিওয়াইয়াতের আরো বহু সনদ রয়েছে এবং সব সনদই যঈফ বা দুর্বল)মুসনাদে আহমদে হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মুমিনের মুক্তি কোন আমলে রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে উকবা’ (রাঃ) জিহবা সংযত রেখো, নিজের ঘরেই বসে থাকো এবং নিজের পাপের কথা স্মরণ করে কান্নাকাটি করো।” পরে দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি নিজেই আমার সাথে করমর্দন করে বললেনঃ হে উকবা (রাঃ) আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইঞ্জীল, যবূর এবং কুরআনে অবতীর্ণ সমস্ত সূরার মধ্যে উৎকৃষ্ট সূরার কথা বলবো?” আমি উত্তর দিলামঃ “হ্যা হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! অবশ্যই বলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর আমাকে উৎসর্গিত করুন! তিনি তখন আমাকে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, তারপর বললেনঃ “হে উকবা (রাঃ)“ এ সুরাগুলো ভুলো না। প্রতিদিন রাত্রে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উকবা (রাঃ) বলেনঃ এরপর থেকে আমি এ সূরাগুলোর কথা ভুলিনি এবং এগুলো পাঠ করা ছাড়া আমি কোন রাত্রি কাটাইনি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং ত্বরিৎ তার হাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উত্তম আমলের কথা বলে দিন। তখন তিনি বললেনঃ “শোননা, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তুমি তার সাথে সম্পর্ক মিলিত রাখবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করবে তুমি তাকে দান করবে। তোমার প্রতি যে যুলুম করবে তুমি তাকে ক্ষমা করবে।” (এ হাদীসের কিছু অংশ ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাঁর জামে তিরমিযীতে যুহদ’ শীর্ষক অধ্যায়ে সংযোজন করেছেন এবং বলেছেন যে, এ হাদীসটি হাসান। মুসনাদে আহমদেও এ হাদীসের আরেকটি সনদ রয়েছে)সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রিকালে যখন বিছানায় যেতেন তখন এ তিনটি সূরা পাঠ করে উভয় হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা দেহের যত দূর পর্যন্ত হাত পৌঁছানো যায় ততদূর পর্যন্ত হাতের ছোঁয়া দিতেন। প্রথমে মাথায়, তারপর মুখে, এবং এরপর দেহের সামনের অংশে তিনবার এভাবে হাতের ছোঁয়া দিতেন। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদে বর্ণিত হয়েছে)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ (শানে নুযূল) পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইয়াহুদিরা বলতঃ আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করি।” আর খৃস্টানরা বলতোঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) ঈসার (আঃ) পূজা করি।” মাজুসীরা বলতোঃ “আমরা চন্দ্র সূর্যের উপাসনা করি।” আবার মুশরিকরা বলতোঃ আমরা মূর্তি পুজা করি।” আল্লাহ তা'আলা তখন এই সুরা অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলোঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর মত আর কেউই নেই। তার কোন উপদেষ্টা অথবা উযীর নেই। তিনি একমাত্র ইলাহ্ বা মাবুদ হওয়ার যোগ্য। নিজের গুণ বিশিষ্ট ও হিকমত সমৃদ্ধ কাজের মধ্যে তিনি একক ও বে-নযীর। তিনি সামাদ অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী। সমস্ত মাখলুক, সমগ্র বিশ্বজাহান তার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সামাদ তাকেই বলে যিনি নিজের নেতৃত্বে, নিজের মর্যাদায়, বৈশিষ্ট্যে, নিজের বুযর্গীতে, শ্রেষ্ঠত্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের, হিকমতে, বুদ্ধিমত্তায় সবারই চেয়ে অগ্রগণ্য। এই সব গুণ, শুধুমাত্র আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। তিনি পূত পবিত্র মহান সত্তা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সবারই উপর বিজয়ী, তিনি বেনিয়ায। সামাদ এর একটা অর্থ এও করা হয়েছে যে, ‘সামাদ’ হলেন তিনি যিনি সমস্ত মাখলুক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকেন। যিনি চিরন্তন ও চিরবিদ্যমান। যার লয় ও ক্ষয় নেই এবং যিনি সব কিছু হিফাযতকারী। যার সত্তা অবিনশ্বর এবং অক্ষয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) সেই সত্তা যিনি কোন কিছু আহারও করেন না। এবং যার মধ্য হতে কোন কিছু বেরও হয় না। আর যিনি কাউকেও বের করেন না। অর্থাৎ তিনি কাউকেও জন্ম দেন না। তাঁর কোন সন্তান সন্ততি নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন। তাঁর পিতা মাতা নেই। এ তাফসীর খুবই উত্তম ও উৎকৃষ্ট। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) থেকে উপরোক্ত বর্ণনা উল্লিখিত রয়েছে। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী' থেকে বর্ণিত আছে যে, সামাদ এমন জিনিষকে বলা হয় যা অন্তঃসার শূন্য নয়, যার পেট নেই। শাবী (রঃ) বলেন যে, সামাদ' এর অর্থ হলো যিনি পানাহার করেন না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ্ (রঃ) বলেন যে, “সামাদ’ এমন নুরকে বলা হয় যা উজ্জ্বল, রওশন ও দ্বীপ্তিময়।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, সামাদ’ এমন এক সত্তা যার পেট নেই। অথাৎ যিনি আহারের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং মাওকুফ। হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাঁর আস সুন্নাহ গ্রন্থে সামাদ এর উপরোক্ত সব তাফসীর উল্লেখ করে লিখেছেন যে, আসলে এ সব কথাই সত্য ও সঠিক। উল্লিখিত সমস্ত গুণ এবং বৈশিষ্ট্য আমাদের মহান প্রতিপালকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বড়। তাঁর আহারের প্রয়োজন নেই। সবই ধবংস হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি চিরন্তন। তার লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনি অবিনশ্বর।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহর সন্তান সন্ততি নেই, পিতা মাতা নেই, স্ত্রী নেই। যেমন কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা, কি করে তাঁর সন্তান হতে পারে? তার তো স্ত্রী নেই, সকল জিনিষ তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন!” (৬:১০১) অর্থাৎ তিনি সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিক, এমতাবস্থায় তাঁর সৃষ্টি ও মালিকানায় সমকক্ষতার দাবীদার কে হবে? অর্থাৎ তিনি উপরোক্ত সমস্ত আয়েব থেকে মুক্ত ও পবিত্র। যেমন কুরআনের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলেঃ দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছে; এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভনীয় নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।” (১৯:৮৮-৯৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময়, সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, বরং তারা তাঁর সম্মানিত বান্দী। কথার দিক থেকেও এই বান্দাসমূহ আল্লাহকে অতিক্রম করে না, বরং তারা আল্লাহর ফরমান যথারীতি পালন করে।" (২১:২৬-২৭) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে। অথচ জ্বিনেরা জানে তাদেরকে ও শাস্তির জন্যে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বর্ণিত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র।” (৩৭:১৫৮-১৫৯)সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে এতো বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। মানুষ বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে, তবুও তিনি তাকে অন্ন দান করছেন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করছেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে অবিশ্বাস করে, অথচ এটা তার জন্যে সমীচীন নয়। সে আমাকে গালি দেয়, অথচ এটাও তার জন্যে সমীচীন ও সঙ্গত নয়। তারা আমাকে অবিশ্বাস করে বলে যে, আমি নাকি প্রথমে তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছি পরে আবার সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবো না। অথচ দ্বিতীয়বারের সৃষ্টির চেয়ে প্রথমবারের সৃষ্টি তো সহজ ছিল না। যদি আমি প্রথমবারের সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে থাকি তবে দ্বিতীয়বারের সৃষ্টিতে সক্ষম হবো না কেন?” আর সে আমাকে গালি দিয়ে বলে যে, আমার নাকি সন্তান রয়েছে, অথচ আমি একাকী, আমি অদ্বিতীয়, আমি অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। আমার কোন সন্তান সন্ততি নেই। আমার পিতা মাতা নেই, এবং আমার সমতুল্য কেউ নেই।”
আল-ইখলাস 112:2
মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা নবী করীম (সঃ) কে বললোঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমাদের সামনে তোমার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা কর।" তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো যিনি সৃষ্ট হননি। এবং যার সন্তান সন্ততি নেই। কেননা, যে সৃষ্ট হয়েছে সে এক সময় মৃত্যুবরণ করবে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুবরণও করবেন না এবং তাঁর কোন উত্তরাধিকারীও হবে না। তিনি কারো সন্তান নন এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। (ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইমাম ইবনে আবী হাতিমও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবী করিমের (সঃ) নিকট এসে বলেঃ “আমার সামনে আপনার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা করুন!” তখন আল্লাহ তাআলা (আরবি) সূরাটি অবতীর্ণ করেন। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ)] অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, কুরায়েশদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি নাযিল করেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিষেরই নিসবত বা সম্বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর নিসবত হলো(আরবি) এবং তাকেই বলা হয় যিনি অন্তসারশূণ্য নন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদে নবী করীম (সঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোকের নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। তারা ফিরে এসে নবী করীম (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে আপনি আমাদের নেতা মনোনীত করেছেন তিনি প্রত্যেক নামাযে কিরআতের শেষে।(আরবি) সূরাটি পাঠ করতেন।” নবী করীম (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “সে কেন এরূপ করতো তা তোমরা তাকে জিজ্ঞেস কর তো?” তাকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ সূরায় আল্লাহর রাহমানুর রাহীমের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, এ কারণে এ সূরা পড়তে আমি খুব ভালবাসি।" এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।”সহীহ বুখারীর কিতাবুস সলাতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী মসজিদে কুবার ইমাম ছিলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করার পরই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। তারপর কুরআনের অন্য অংশ পছন্দমত পড়তেন। একদিন মুক্তাদী তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি সূরা ইখলাস পাঠ করেন, তারপর অন্য সূরাও এর সাথে মিলিয়ে দেন, কি ব্যাপার? হয় শুধু সূরা ইখলাস পড়ুন অথবা এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য সূরা পড়ুন।” আনসারী জবাব দিলেনঃ “আমি যেমন করছি তেমনি করবো, তোমাদের ইচ্ছা হলে আমাকে ইমাম হিসেবে রাখখা, না হলে বলো, আমি তোমাদের ইমামতি ছেড়ে দিচ্ছি।” মুসল্লীরা দেখলেন যে, এটা মুশকিল ব্যাপার! কারণ উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই ছিলেন ইমামতির সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তাই তার বিদ্যমানতায় তারা অন্য কারো ইমামতি মেনে নিতে পারলেন না (সুতরাং তিনিই ইমাম থেকে গেলেন)। একদিন রাসুলুল্লাহ (সঃ) সেখানে গমন করলে মুসল্লীরা তাঁর কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তিনি তখন ঐ ইমামকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি মুসল্লীদের কথা মানো না কেন? প্রত্যেক রাকআতে সূরা ইখলাস পড় কেন?” ইমাম সাহেব উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ সূরার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ সূরার প্রতি তোমার আসক্তি ও ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দিয়েছে।”মুসনাদে আহমদে ও জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আরবি) এই সূরাটিকে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “ তোমার এ ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবে।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক অন্য একটি লোককে রাত্রিকালে বারবার (আরবি) এ সূরাটি পড়তে শুনে সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। লোকটি সম্ভবতঃ ঐ লোকটির এ সূরা পাঠকে হালকা সওয়াবের কাজ মনে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “ তোমরা প্রত্যেকেই কি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে না?” সাহাবীদের কাছে এটা খুবই কষ্ট সাধ্য মনে হলো। তাই, তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা আছে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।" মুসনাদে আহমদে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত কাতাদা ইবনে নু’মান (রাঃ) সারা রাত ধরে সুরা ইখলাস পড়তে থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে এটা জানানো হলে তিনি বললেন, “এ সুরা অর্ধেক কুরআন অথবা এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমতুল্য।” মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। তিনি জনগণকে বলেন! “ তোমাদের মধ্যে কারো প্রত্যেক রাত্রে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠের ক্ষমতা আছে কি?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা থাকতে পারে?” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের (এর সমতূল্য)।" এমন সময় নবী করীম (সঃ) সেখানে এসে পড়লেন এবং হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আবু আইয়ুব (রাঃ) সত্য কথাই বলেছে।” জামে তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ তোমরা সমবেত হও, আজ আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবো।” সাহাবীগণ সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘর থেকে বের হয়ে এসে(আরবি) সূরাটি পাঠ করলেন। তারপর আবার ঘরে চলে গেলেন। সাহাবীরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবেন, সম্ভবত আকাশ থেকে কোন অহী এসেছে।” এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে এসে বললেনঃ “আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনানোর জন্যে কথা দিয়েছিলাম। জেনে রেখো যে, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”হযরত আবুদ দারদার (রাঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ “তোমরা কি প্রতিদিন কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে অপারগ?” সাহাবীগণ আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ব্যাপারে আমরা খুবই দুর্বল এবং অক্ষম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা কুরআনকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের রিওয়াইয়াত সাহাবীদের একটি বড় জামাআত হতে বর্ণিত রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথাও হতে তাশরীফ আনলেন, তাঁর সাথে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে এ সূরাটি পাঠ করতে শুনে বললেনঃ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।" হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি ওয়াজিব হয়ে গেছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জান্নাত (ওয়াজিব হয়ে গেছে)।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান, সহীহ, গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “ তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাত্রিকালে (আরবি) সূরাটি তিনবার পড়ার ক্ষমতা রাখে না? এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতূল্য। (এ হাদীসটি হাসিম আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেনঃ “আমরা পিপাসার্ত ছিলাম, চারদিকে রাতের গভীর অন্ধকার, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখন অসিবেন এবং নামায। পড়াবেন আমরা তারই অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় এলেন এবং আমার হাত ধরে বললেনঃ “পড়।” আমি নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বললেনঃ “পড়।” আমি বললামঃ কি পড়বো? তিনি বললেনঃ “প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে। প্রতিদিন তোমার জন্যে দুই বারই যথেষ্ট।” (এ হাদীস আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসাঈর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “এ তিনটি সূরা পাঠ করলে এগুলো তোমাকে প্রত্যেক জিনিষ হতে রক্ষা করবে।”মুসনাদে আহমদে হযরত তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিম্নলিখিত কালেমা দশবার পাঠ করবে সে চল্লিশ লাখ পূণ্য লাভ করবে। (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক একক, অভাবমুক্ত, তিনি স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, সন্তানও না (অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীও নেই, সন্তানও নেই) এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (হাদীসের একজন বর্ণনাকারী খলীল ইবনে মুররাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং অন্যান্য ইমাম তাঁকে খুবই দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন)মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কেউ যদি আরো বেশী বার পাঠ করে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)! বললেন:“আল্লাহ এর চেয়েও অধিক ও উত্তম প্রদানকারী (অর্থাৎ আল্লাহ পাক বেশীও দিতে পারবেন, তার কোনই অভাব নেই।)”হ্যরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) সুরাটি দশবার পাঠ করবে আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন, যে বিশ বার করবে তার জন্যে তৈরি করবেন জান্নাতে দু'টি প্রাসাদ এবং যে ব্যক্তি ত্রিশবার পাঠ করবে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতে তিনটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমরা এর চেয়েও বেশী বার পড়ি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ এর চেয়েও অধিকদাতা।” (এ হাদীসটি মুরসাল এবং উত্তম। দারিমী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পঞ্চাশবার, (আরবি) পাঠ করে আল্লাহ তা'আলা তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়া’লা সৃসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) দিনে দুইশত বার পাঠ করে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা এক হাজার পাঁচশত পুণ্য লিখে থাকেন যদি তার উপর কোন ঋণ না থাকে। এটাও বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা সৃসিলী (রঃ)। এর সনদও দুর্বল। জামে তিরমিযীর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রত্যহ দুইশত বার পাঠ করে তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়, যদি সে ঋণগ্রস্ত না হয়।”জামে তিরমিযীর একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ঘুমোবার জন্যে বিছানায় যায়, তারপর ডান পাশ ফিরে শয়ন করতঃ একশতবার(আরবি) পাঠ করে তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! তোমার ডান দিক দিয়ে জান্নাতে চলে যাও।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুইশত বার। পাঠ করে তার দুইশত বছরের পাপ মিটিয়ে দেয়া হয়।” (এ হাদীসটি আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসায়ীতে এই সূরার তাফসীরে হযরত বারীদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ কালে দেখেন যে, একটি লোক নামায পড়ছে এবং নিম্নলিখিত দুআ করছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এ সাক্ষ্যসহ আবেদন করছি যে, আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনি কারো মুখাপেক্ষী নন, আপনি এমন সত্ত্বা যার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং যার সমতুল্য কেউ নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! এ ব্যক্তি ইসমে আযমের সাথে দু'আ করেছে। আল্লাহর এই মহান নামের সাথে তার কাছে কিছু যাঞ্চা করলে তিনি তা দান করেন এবং এই নামের সাথে দু’আ করলে তিনি তা কবুল করে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) ছাড়াও অন্যান্য আসহাবে সুনানও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি কাজ এমন রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এগুলো সম্পাদন করে সে জান্নাতের দরজাগুলোর যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে এবং জান্নাতের যে কোন হ্যারের সাথে ইচ্ছা বিবাহিত হতে পারবে। (এক) যে ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়, (দুই) নিজের গোপনীয় ঋণ পরিশোধ করে এবং (তিন) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দশবার (আরবি) সূরাটি পাঠ করে।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! এ তিনটি কাজের যে কোন একটি যদি কেউ করে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “একটি করলেও একই রকম সম্মান সে লাভ করবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময়।(আরবি) পাঠ করবে আল্লাহ। তা'আলা তার ঘরের বাসিন্দাদেরকে এবং প্রতিবেশীদেরকে অভাবমুক্ত করে:দিবেন।” (হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি যঈফ বা দুর্রল)মুসনাদে আবী ইয়ালায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা তাবুকের যুদ্ধ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। সূর্য এমন স্বচ্ছ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কারভাবে উদিত হলো যে, ইতিপূর্বে কখনো এমনভাবে সূর্য উদিত হতে দেখা যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজ এ রকম উজ্জ্বল দীপ্তির সাথে সূর্যোদয়ের কারণ কি?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আজ মদীনায় মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়ার (রাঃ) ইন্তেকাল হয়েছে। তার জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের জন্যে আল্লাহ রাব্বল আলামীন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসমান থেকে পাঠিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তার কোন্ আমলের কারণে এরূপ হয়েছে?” জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “তিনি দিন রাত সব সময় চলাফেরায় উঠা বসায় সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। আপনি যদি তার জানাযার নামাযে হাজির হতে চান তবে চলুন, আমি জমীন সংকীর্ণ করে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তাই ভাল।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইবনে মুআবিয়া (রাঃ)-এর জানাযার নামায আদায় করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বায়হাকীও (রঃ) তার ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ নামক গ্রন্থে ইয়াযীদ ইবনে হারুণের (রঃ) রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ (রঃ) আ’লা ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এই আ’লা মাওযূ হাদীস বর্ণনা করে থাকেন বলে তার নামে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন)মুসনাদে আবী ইয়ালায় এ হাদীসের অন্য একটি সনদও রয়েছে। তাতে বর্ণনাকারী ভিন্ন ব্যক্তি। তাতে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) ইন্তেকাল করেছেন। আপনি কি তার জানাযার নামায পড়তে চান?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা" হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পালক দ্বারা জমীনে আঘাত করলেন। এর ফলে সমস্ত গাছ পালা, টিলা ইত্যাদি নিচু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃতের জানাযা দেখতে গেলেন। তিনি নামায শুরু করলেন। তাঁর পিছনে ফেরেশতাদের দুটি কাতার বা সারি ছিল। প্রত্যেক সারিতে সত্তর হাজার ফেরেশতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মুআবিয়ার (রাঃ)-এরূপ মর্যাদার কারণ কি?" জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ (আরবি) সূরাটির প্রতি তাঁর বিশেষ ভালবাসা এবং উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে ও আসতে যেতে এ সূরাটি পাঠ করাই তার এ মর্যাদার কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তার এ হাদীসের সনদে মাহবুব ইবনে হিলাল রয়েছেন। আবু হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, ইনি বর্ণনাকারী হিসেবে মাশহুর নন। মুসনাদে আবী ইয়ালায় বর্ণিত এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইনি নন, সেখানে এর স্থলে আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ রয়েছেন। কিন্তু মাহবুব ইবনে হিলালের বর্ণনাই যথার্থ বলে মনে হয়। কারণ আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাহবুব রিওয়াইয়াতের আরো বহু সনদ রয়েছে এবং সব সনদই যঈফ বা দুর্বল)মুসনাদে আহমদে হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মুমিনের মুক্তি কোন আমলে রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে উকবা’ (রাঃ) জিহবা সংযত রেখো, নিজের ঘরেই বসে থাকো এবং নিজের পাপের কথা স্মরণ করে কান্নাকাটি করো।” পরে দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি নিজেই আমার সাথে করমর্দন করে বললেনঃ হে উকবা (রাঃ) আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইঞ্জীল, যবূর এবং কুরআনে অবতীর্ণ সমস্ত সূরার মধ্যে উৎকৃষ্ট সূরার কথা বলবো?” আমি উত্তর দিলামঃ “হ্যা হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! অবশ্যই বলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর আমাকে উৎসর্গিত করুন! তিনি তখন আমাকে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, তারপর বললেনঃ “হে উকবা (রাঃ)“ এ সুরাগুলো ভুলো না। প্রতিদিন রাত্রে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উকবা (রাঃ) বলেনঃ এরপর থেকে আমি এ সূরাগুলোর কথা ভুলিনি এবং এগুলো পাঠ করা ছাড়া আমি কোন রাত্রি কাটাইনি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং ত্বরিৎ তার হাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উত্তম আমলের কথা বলে দিন। তখন তিনি বললেনঃ “শোননা, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তুমি তার সাথে সম্পর্ক মিলিত রাখবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করবে তুমি তাকে দান করবে। তোমার প্রতি যে যুলুম করবে তুমি তাকে ক্ষমা করবে।” (এ হাদীসের কিছু অংশ ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাঁর জামে তিরমিযীতে যুহদ’ শীর্ষক অধ্যায়ে সংযোজন করেছেন এবং বলেছেন যে, এ হাদীসটি হাসান। মুসনাদে আহমদেও এ হাদীসের আরেকটি সনদ রয়েছে)সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রিকালে যখন বিছানায় যেতেন তখন এ তিনটি সূরা পাঠ করে উভয় হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা দেহের যত দূর পর্যন্ত হাত পৌঁছানো যায় ততদূর পর্যন্ত হাতের ছোঁয়া দিতেন। প্রথমে মাথায়, তারপর মুখে, এবং এরপর দেহের সামনের অংশে তিনবার এভাবে হাতের ছোঁয়া দিতেন। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদে বর্ণিত হয়েছে)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ (শানে নুযূল) পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইয়াহুদিরা বলতঃ আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করি।” আর খৃস্টানরা বলতোঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) ঈসার (আঃ) পূজা করি।” মাজুসীরা বলতোঃ “আমরা চন্দ্র সূর্যের উপাসনা করি।” আবার মুশরিকরা বলতোঃ আমরা মূর্তি পুজা করি।” আল্লাহ তা'আলা তখন এই সুরা অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলোঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর মত আর কেউই নেই। তার কোন উপদেষ্টা অথবা উযীর নেই। তিনি একমাত্র ইলাহ্ বা মাবুদ হওয়ার যোগ্য। নিজের গুণ বিশিষ্ট ও হিকমত সমৃদ্ধ কাজের মধ্যে তিনি একক ও বে-নযীর। তিনি সামাদ অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী। সমস্ত মাখলুক, সমগ্র বিশ্বজাহান তার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সামাদ তাকেই বলে যিনি নিজের নেতৃত্বে, নিজের মর্যাদায়, বৈশিষ্ট্যে, নিজের বুযর্গীতে, শ্রেষ্ঠত্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের, হিকমতে, বুদ্ধিমত্তায় সবারই চেয়ে অগ্রগণ্য। এই সব গুণ, শুধুমাত্র আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। তিনি পূত পবিত্র মহান সত্তা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সবারই উপর বিজয়ী, তিনি বেনিয়ায। সামাদ এর একটা অর্থ এও করা হয়েছে যে, ‘সামাদ’ হলেন তিনি যিনি সমস্ত মাখলুক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকেন। যিনি চিরন্তন ও চিরবিদ্যমান। যার লয় ও ক্ষয় নেই এবং যিনি সব কিছু হিফাযতকারী। যার সত্তা অবিনশ্বর এবং অক্ষয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) সেই সত্তা যিনি কোন কিছু আহারও করেন না। এবং যার মধ্য হতে কোন কিছু বেরও হয় না। আর যিনি কাউকেও বের করেন না। অর্থাৎ তিনি কাউকেও জন্ম দেন না। তাঁর কোন সন্তান সন্ততি নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন। তাঁর পিতা মাতা নেই। এ তাফসীর খুবই উত্তম ও উৎকৃষ্ট। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) থেকে উপরোক্ত বর্ণনা উল্লিখিত রয়েছে। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী' থেকে বর্ণিত আছে যে, সামাদ এমন জিনিষকে বলা হয় যা অন্তঃসার শূন্য নয়, যার পেট নেই। শাবী (রঃ) বলেন যে, সামাদ' এর অর্থ হলো যিনি পানাহার করেন না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ্ (রঃ) বলেন যে, “সামাদ’ এমন নুরকে বলা হয় যা উজ্জ্বল, রওশন ও দ্বীপ্তিময়।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, সামাদ’ এমন এক সত্তা যার পেট নেই। অথাৎ যিনি আহারের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং মাওকুফ। হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাঁর আস সুন্নাহ গ্রন্থে সামাদ এর উপরোক্ত সব তাফসীর উল্লেখ করে লিখেছেন যে, আসলে এ সব কথাই সত্য ও সঠিক। উল্লিখিত সমস্ত গুণ এবং বৈশিষ্ট্য আমাদের মহান প্রতিপালকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বড়। তাঁর আহারের প্রয়োজন নেই। সবই ধবংস হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি চিরন্তন। তার লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনি অবিনশ্বর।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহর সন্তান সন্ততি নেই, পিতা মাতা নেই, স্ত্রী নেই। যেমন কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা, কি করে তাঁর সন্তান হতে পারে? তার তো স্ত্রী নেই, সকল জিনিষ তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন!” (৬:১০১) অর্থাৎ তিনি সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিক, এমতাবস্থায় তাঁর সৃষ্টি ও মালিকানায় সমকক্ষতার দাবীদার কে হবে? অর্থাৎ তিনি উপরোক্ত সমস্ত আয়েব থেকে মুক্ত ও পবিত্র। যেমন কুরআনের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলেঃ দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছে; এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভনীয় নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।” (১৯:৮৮-৯৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময়, সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, বরং তারা তাঁর সম্মানিত বান্দী। কথার দিক থেকেও এই বান্দাসমূহ আল্লাহকে অতিক্রম করে না, বরং তারা আল্লাহর ফরমান যথারীতি পালন করে।" (২১:২৬-২৭) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে। অথচ জ্বিনেরা জানে তাদেরকে ও শাস্তির জন্যে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বর্ণিত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র।” (৩৭:১৫৮-১৫৯)সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে এতো বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। মানুষ বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে, তবুও তিনি তাকে অন্ন দান করছেন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করছেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে অবিশ্বাস করে, অথচ এটা তার জন্যে সমীচীন নয়। সে আমাকে গালি দেয়, অথচ এটাও তার জন্যে সমীচীন ও সঙ্গত নয়। তারা আমাকে অবিশ্বাস করে বলে যে, আমি নাকি প্রথমে তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছি পরে আবার সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবো না। অথচ দ্বিতীয়বারের সৃষ্টির চেয়ে প্রথমবারের সৃষ্টি তো সহজ ছিল না। যদি আমি প্রথমবারের সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে থাকি তবে দ্বিতীয়বারের সৃষ্টিতে সক্ষম হবো না কেন?” আর সে আমাকে গালি দিয়ে বলে যে, আমার নাকি সন্তান রয়েছে, অথচ আমি একাকী, আমি অদ্বিতীয়, আমি অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। আমার কোন সন্তান সন্ততি নেই। আমার পিতা মাতা নেই, এবং আমার সমতুল্য কেউ নেই।”
আল-ইখলাস 112:3
মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা নবী করীম (সঃ) কে বললোঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমাদের সামনে তোমার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা কর।" তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো যিনি সৃষ্ট হননি। এবং যার সন্তান সন্ততি নেই। কেননা, যে সৃষ্ট হয়েছে সে এক সময় মৃত্যুবরণ করবে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুবরণও করবেন না এবং তাঁর কোন উত্তরাধিকারীও হবে না। তিনি কারো সন্তান নন এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। (ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইমাম ইবনে আবী হাতিমও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবী করিমের (সঃ) নিকট এসে বলেঃ “আমার সামনে আপনার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা করুন!” তখন আল্লাহ তাআলা (আরবি) সূরাটি অবতীর্ণ করেন। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ)] অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, কুরায়েশদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি নাযিল করেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিষেরই নিসবত বা সম্বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর নিসবত হলো(আরবি) এবং তাকেই বলা হয় যিনি অন্তসারশূণ্য নন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদে নবী করীম (সঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোকের নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। তারা ফিরে এসে নবী করীম (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে আপনি আমাদের নেতা মনোনীত করেছেন তিনি প্রত্যেক নামাযে কিরআতের শেষে।(আরবি) সূরাটি পাঠ করতেন।” নবী করীম (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “সে কেন এরূপ করতো তা তোমরা তাকে জিজ্ঞেস কর তো?” তাকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ সূরায় আল্লাহর রাহমানুর রাহীমের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, এ কারণে এ সূরা পড়তে আমি খুব ভালবাসি।" এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।”সহীহ বুখারীর কিতাবুস সলাতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী মসজিদে কুবার ইমাম ছিলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করার পরই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। তারপর কুরআনের অন্য অংশ পছন্দমত পড়তেন। একদিন মুক্তাদী তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি সূরা ইখলাস পাঠ করেন, তারপর অন্য সূরাও এর সাথে মিলিয়ে দেন, কি ব্যাপার? হয় শুধু সূরা ইখলাস পড়ুন অথবা এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য সূরা পড়ুন।” আনসারী জবাব দিলেনঃ “আমি যেমন করছি তেমনি করবো, তোমাদের ইচ্ছা হলে আমাকে ইমাম হিসেবে রাখখা, না হলে বলো, আমি তোমাদের ইমামতি ছেড়ে দিচ্ছি।” মুসল্লীরা দেখলেন যে, এটা মুশকিল ব্যাপার! কারণ উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই ছিলেন ইমামতির সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তাই তার বিদ্যমানতায় তারা অন্য কারো ইমামতি মেনে নিতে পারলেন না (সুতরাং তিনিই ইমাম থেকে গেলেন)। একদিন রাসুলুল্লাহ (সঃ) সেখানে গমন করলে মুসল্লীরা তাঁর কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তিনি তখন ঐ ইমামকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি মুসল্লীদের কথা মানো না কেন? প্রত্যেক রাকআতে সূরা ইখলাস পড় কেন?” ইমাম সাহেব উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ সূরার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ সূরার প্রতি তোমার আসক্তি ও ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দিয়েছে।”মুসনাদে আহমদে ও জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আরবি) এই সূরাটিকে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “ তোমার এ ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবে।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক অন্য একটি লোককে রাত্রিকালে বারবার (আরবি) এ সূরাটি পড়তে শুনে সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। লোকটি সম্ভবতঃ ঐ লোকটির এ সূরা পাঠকে হালকা সওয়াবের কাজ মনে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “ তোমরা প্রত্যেকেই কি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে না?” সাহাবীদের কাছে এটা খুবই কষ্ট সাধ্য মনে হলো। তাই, তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা আছে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।" মুসনাদে আহমদে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত কাতাদা ইবনে নু’মান (রাঃ) সারা রাত ধরে সুরা ইখলাস পড়তে থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে এটা জানানো হলে তিনি বললেন, “এ সুরা অর্ধেক কুরআন অথবা এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমতুল্য।” মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। তিনি জনগণকে বলেন! “ তোমাদের মধ্যে কারো প্রত্যেক রাত্রে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠের ক্ষমতা আছে কি?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা থাকতে পারে?” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের (এর সমতূল্য)।" এমন সময় নবী করীম (সঃ) সেখানে এসে পড়লেন এবং হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আবু আইয়ুব (রাঃ) সত্য কথাই বলেছে।” জামে তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ তোমরা সমবেত হও, আজ আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবো।” সাহাবীগণ সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘর থেকে বের হয়ে এসে(আরবি) সূরাটি পাঠ করলেন। তারপর আবার ঘরে চলে গেলেন। সাহাবীরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবেন, সম্ভবত আকাশ থেকে কোন অহী এসেছে।” এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে এসে বললেনঃ “আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনানোর জন্যে কথা দিয়েছিলাম। জেনে রেখো যে, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”হযরত আবুদ দারদার (রাঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ “তোমরা কি প্রতিদিন কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে অপারগ?” সাহাবীগণ আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ব্যাপারে আমরা খুবই দুর্বল এবং অক্ষম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা কুরআনকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের রিওয়াইয়াত সাহাবীদের একটি বড় জামাআত হতে বর্ণিত রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথাও হতে তাশরীফ আনলেন, তাঁর সাথে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে এ সূরাটি পাঠ করতে শুনে বললেনঃ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।" হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি ওয়াজিব হয়ে গেছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জান্নাত (ওয়াজিব হয়ে গেছে)।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান, সহীহ, গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “ তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাত্রিকালে (আরবি) সূরাটি তিনবার পড়ার ক্ষমতা রাখে না? এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতূল্য। (এ হাদীসটি হাসিম আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেনঃ “আমরা পিপাসার্ত ছিলাম, চারদিকে রাতের গভীর অন্ধকার, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখন অসিবেন এবং নামায। পড়াবেন আমরা তারই অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় এলেন এবং আমার হাত ধরে বললেনঃ “পড়।” আমি নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বললেনঃ “পড়।” আমি বললামঃ কি পড়বো? তিনি বললেনঃ “প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে। প্রতিদিন তোমার জন্যে দুই বারই যথেষ্ট।” (এ হাদীস আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসাঈর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “এ তিনটি সূরা পাঠ করলে এগুলো তোমাকে প্রত্যেক জিনিষ হতে রক্ষা করবে।”মুসনাদে আহমদে হযরত তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিম্নলিখিত কালেমা দশবার পাঠ করবে সে চল্লিশ লাখ পূণ্য লাভ করবে। (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক একক, অভাবমুক্ত, তিনি স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, সন্তানও না (অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীও নেই, সন্তানও নেই) এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (হাদীসের একজন বর্ণনাকারী খলীল ইবনে মুররাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং অন্যান্য ইমাম তাঁকে খুবই দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন)মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কেউ যদি আরো বেশী বার পাঠ করে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)! বললেন:“আল্লাহ এর চেয়েও অধিক ও উত্তম প্রদানকারী (অর্থাৎ আল্লাহ পাক বেশীও দিতে পারবেন, তার কোনই অভাব নেই।)”হ্যরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) সুরাটি দশবার পাঠ করবে আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন, যে বিশ বার করবে তার জন্যে তৈরি করবেন জান্নাতে দু'টি প্রাসাদ এবং যে ব্যক্তি ত্রিশবার পাঠ করবে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতে তিনটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমরা এর চেয়েও বেশী বার পড়ি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ এর চেয়েও অধিকদাতা।” (এ হাদীসটি মুরসাল এবং উত্তম। দারিমী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পঞ্চাশবার, (আরবি) পাঠ করে আল্লাহ তা'আলা তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়া’লা সৃসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) দিনে দুইশত বার পাঠ করে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা এক হাজার পাঁচশত পুণ্য লিখে থাকেন যদি তার উপর কোন ঋণ না থাকে। এটাও বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা সৃসিলী (রঃ)। এর সনদও দুর্বল। জামে তিরমিযীর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রত্যহ দুইশত বার পাঠ করে তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়, যদি সে ঋণগ্রস্ত না হয়।”জামে তিরমিযীর একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ঘুমোবার জন্যে বিছানায় যায়, তারপর ডান পাশ ফিরে শয়ন করতঃ একশতবার(আরবি) পাঠ করে তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! তোমার ডান দিক দিয়ে জান্নাতে চলে যাও।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুইশত বার। পাঠ করে তার দুইশত বছরের পাপ মিটিয়ে দেয়া হয়।” (এ হাদীসটি আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসায়ীতে এই সূরার তাফসীরে হযরত বারীদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ কালে দেখেন যে, একটি লোক নামায পড়ছে এবং নিম্নলিখিত দুআ করছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এ সাক্ষ্যসহ আবেদন করছি যে, আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনি কারো মুখাপেক্ষী নন, আপনি এমন সত্ত্বা যার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং যার সমতুল্য কেউ নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! এ ব্যক্তি ইসমে আযমের সাথে দু'আ করেছে। আল্লাহর এই মহান নামের সাথে তার কাছে কিছু যাঞ্চা করলে তিনি তা দান করেন এবং এই নামের সাথে দু’আ করলে তিনি তা কবুল করে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) ছাড়াও অন্যান্য আসহাবে সুনানও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি কাজ এমন রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এগুলো সম্পাদন করে সে জান্নাতের দরজাগুলোর যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে এবং জান্নাতের যে কোন হ্যারের সাথে ইচ্ছা বিবাহিত হতে পারবে। (এক) যে ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়, (দুই) নিজের গোপনীয় ঋণ পরিশোধ করে এবং (তিন) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দশবার (আরবি) সূরাটি পাঠ করে।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! এ তিনটি কাজের যে কোন একটি যদি কেউ করে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “একটি করলেও একই রকম সম্মান সে লাভ করবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময়।(আরবি) পাঠ করবে আল্লাহ। তা'আলা তার ঘরের বাসিন্দাদেরকে এবং প্রতিবেশীদেরকে অভাবমুক্ত করে:দিবেন।” (হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি যঈফ বা দুর্রল)মুসনাদে আবী ইয়ালায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা তাবুকের যুদ্ধ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। সূর্য এমন স্বচ্ছ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কারভাবে উদিত হলো যে, ইতিপূর্বে কখনো এমনভাবে সূর্য উদিত হতে দেখা যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজ এ রকম উজ্জ্বল দীপ্তির সাথে সূর্যোদয়ের কারণ কি?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আজ মদীনায় মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়ার (রাঃ) ইন্তেকাল হয়েছে। তার জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের জন্যে আল্লাহ রাব্বল আলামীন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসমান থেকে পাঠিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তার কোন্ আমলের কারণে এরূপ হয়েছে?” জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “তিনি দিন রাত সব সময় চলাফেরায় উঠা বসায় সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। আপনি যদি তার জানাযার নামাযে হাজির হতে চান তবে চলুন, আমি জমীন সংকীর্ণ করে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তাই ভাল।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইবনে মুআবিয়া (রাঃ)-এর জানাযার নামায আদায় করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বায়হাকীও (রঃ) তার ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ নামক গ্রন্থে ইয়াযীদ ইবনে হারুণের (রঃ) রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ (রঃ) আ’লা ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এই আ’লা মাওযূ হাদীস বর্ণনা করে থাকেন বলে তার নামে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন)মুসনাদে আবী ইয়ালায় এ হাদীসের অন্য একটি সনদও রয়েছে। তাতে বর্ণনাকারী ভিন্ন ব্যক্তি। তাতে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) ইন্তেকাল করেছেন। আপনি কি তার জানাযার নামায পড়তে চান?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা" হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পালক দ্বারা জমীনে আঘাত করলেন। এর ফলে সমস্ত গাছ পালা, টিলা ইত্যাদি নিচু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃতের জানাযা দেখতে গেলেন। তিনি নামায শুরু করলেন। তাঁর পিছনে ফেরেশতাদের দুটি কাতার বা সারি ছিল। প্রত্যেক সারিতে সত্তর হাজার ফেরেশতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মুআবিয়ার (রাঃ)-এরূপ মর্যাদার কারণ কি?" জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ (আরবি) সূরাটির প্রতি তাঁর বিশেষ ভালবাসা এবং উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে ও আসতে যেতে এ সূরাটি পাঠ করাই তার এ মর্যাদার কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তার এ হাদীসের সনদে মাহবুব ইবনে হিলাল রয়েছেন। আবু হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, ইনি বর্ণনাকারী হিসেবে মাশহুর নন। মুসনাদে আবী ইয়ালায় বর্ণিত এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইনি নন, সেখানে এর স্থলে আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ রয়েছেন। কিন্তু মাহবুব ইবনে হিলালের বর্ণনাই যথার্থ বলে মনে হয়। কারণ আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাহবুব রিওয়াইয়াতের আরো বহু সনদ রয়েছে এবং সব সনদই যঈফ বা দুর্বল)মুসনাদে আহমদে হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মুমিনের মুক্তি কোন আমলে রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে উকবা’ (রাঃ) জিহবা সংযত রেখো, নিজের ঘরেই বসে থাকো এবং নিজের পাপের কথা স্মরণ করে কান্নাকাটি করো।” পরে দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি নিজেই আমার সাথে করমর্দন করে বললেনঃ হে উকবা (রাঃ) আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইঞ্জীল, যবূর এবং কুরআনে অবতীর্ণ সমস্ত সূরার মধ্যে উৎকৃষ্ট সূরার কথা বলবো?” আমি উত্তর দিলামঃ “হ্যা হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! অবশ্যই বলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর আমাকে উৎসর্গিত করুন! তিনি তখন আমাকে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, তারপর বললেনঃ “হে উকবা (রাঃ)“ এ সুরাগুলো ভুলো না। প্রতিদিন রাত্রে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উকবা (রাঃ) বলেনঃ এরপর থেকে আমি এ সূরাগুলোর কথা ভুলিনি এবং এগুলো পাঠ করা ছাড়া আমি কোন রাত্রি কাটাইনি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং ত্বরিৎ তার হাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উত্তম আমলের কথা বলে দিন। তখন তিনি বললেনঃ “শোননা, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তুমি তার সাথে সম্পর্ক মিলিত রাখবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করবে তুমি তাকে দান করবে। তোমার প্রতি যে যুলুম করবে তুমি তাকে ক্ষমা করবে।” (এ হাদীসের কিছু অংশ ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাঁর জামে তিরমিযীতে যুহদ’ শীর্ষক অধ্যায়ে সংযোজন করেছেন এবং বলেছেন যে, এ হাদীসটি হাসান। মুসনাদে আহমদেও এ হাদীসের আরেকটি সনদ রয়েছে)সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রিকালে যখন বিছানায় যেতেন তখন এ তিনটি সূরা পাঠ করে উভয় হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা দেহের যত দূর পর্যন্ত হাত পৌঁছানো যায় ততদূর পর্যন্ত হাতের ছোঁয়া দিতেন। প্রথমে মাথায়, তারপর মুখে, এবং এরপর দেহের সামনের অংশে তিনবার এভাবে হাতের ছোঁয়া দিতেন। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদে বর্ণিত হয়েছে)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ (শানে নুযূল) পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইয়াহুদিরা বলতঃ আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করি।” আর খৃস্টানরা বলতোঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) ঈসার (আঃ) পূজা করি।” মাজুসীরা বলতোঃ “আমরা চন্দ্র সূর্যের উপাসনা করি।” আবার মুশরিকরা বলতোঃ আমরা মূর্তি পুজা করি।” আল্লাহ তা'আলা তখন এই সুরা অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলোঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর মত আর কেউই নেই। তার কোন উপদেষ্টা অথবা উযীর নেই। তিনি একমাত্র ইলাহ্ বা মাবুদ হওয়ার যোগ্য। নিজের গুণ বিশিষ্ট ও হিকমত সমৃদ্ধ কাজের মধ্যে তিনি একক ও বে-নযীর। তিনি সামাদ অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী। সমস্ত মাখলুক, সমগ্র বিশ্বজাহান তার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সামাদ তাকেই বলে যিনি নিজের নেতৃত্বে, নিজের মর্যাদায়, বৈশিষ্ট্যে, নিজের বুযর্গীতে, শ্রেষ্ঠত্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের, হিকমতে, বুদ্ধিমত্তায় সবারই চেয়ে অগ্রগণ্য। এই সব গুণ, শুধুমাত্র আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। তিনি পূত পবিত্র মহান সত্তা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সবারই উপর বিজয়ী, তিনি বেনিয়ায। সামাদ এর একটা অর্থ এও করা হয়েছে যে, ‘সামাদ’ হলেন তিনি যিনি সমস্ত মাখলুক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকেন। যিনি চিরন্তন ও চিরবিদ্যমান। যার লয় ও ক্ষয় নেই এবং যিনি সব কিছু হিফাযতকারী। যার সত্তা অবিনশ্বর এবং অক্ষয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) সেই সত্তা যিনি কোন কিছু আহারও করেন না। এবং যার মধ্য হতে কোন কিছু বেরও হয় না। আর যিনি কাউকেও বের করেন না। অর্থাৎ তিনি কাউকেও জন্ম দেন না। তাঁর কোন সন্তান সন্ততি নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন। তাঁর পিতা মাতা নেই। এ তাফসীর খুবই উত্তম ও উৎকৃষ্ট। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) থেকে উপরোক্ত বর্ণনা উল্লিখিত রয়েছে। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী' থেকে বর্ণিত আছে যে, সামাদ এমন জিনিষকে বলা হয় যা অন্তঃসার শূন্য নয়, যার পেট নেই। শাবী (রঃ) বলেন যে, সামাদ' এর অর্থ হলো যিনি পানাহার করেন না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ্ (রঃ) বলেন যে, “সামাদ’ এমন নুরকে বলা হয় যা উজ্জ্বল, রওশন ও দ্বীপ্তিময়।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, সামাদ’ এমন এক সত্তা যার পেট নেই। অথাৎ যিনি আহারের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং মাওকুফ। হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাঁর আস সুন্নাহ গ্রন্থে সামাদ এর উপরোক্ত সব তাফসীর উল্লেখ করে লিখেছেন যে, আসলে এ সব কথাই সত্য ও সঠিক। উল্লিখিত সমস্ত গুণ এবং বৈশিষ্ট্য আমাদের মহান প্রতিপালকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বড়। তাঁর আহারের প্রয়োজন নেই। সবই ধবংস হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি চিরন্তন। তার লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনি অবিনশ্বর।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহর সন্তান সন্ততি নেই, পিতা মাতা নেই, স্ত্রী নেই। যেমন কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা, কি করে তাঁর সন্তান হতে পারে? তার তো স্ত্রী নেই, সকল জিনিষ তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন!” (৬:১০১) অর্থাৎ তিনি সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিক, এমতাবস্থায় তাঁর সৃষ্টি ও মালিকানায় সমকক্ষতার দাবীদার কে হবে? অর্থাৎ তিনি উপরোক্ত সমস্ত আয়েব থেকে মুক্ত ও পবিত্র। যেমন কুরআনের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলেঃ দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছে; এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভনীয় নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।” (১৯:৮৮-৯৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময়, সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, বরং তারা তাঁর সম্মানিত বান্দী। কথার দিক থেকেও এই বান্দাসমূহ আল্লাহকে অতিক্রম করে না, বরং তারা আল্লাহর ফরমান যথারীতি পালন করে।" (২১:২৬-২৭) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে। অথচ জ্বিনেরা জানে তাদেরকে ও শাস্তির জন্যে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বর্ণিত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র।” (৩৭:১৫৮-১৫৯)সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে এতো বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। মানুষ বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে, তবুও তিনি তাকে অন্ন দান করছেন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করছেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে অবিশ্বাস করে, অথচ এটা তার জন্যে সমীচীন নয়। সে আমাকে গালি দেয়, অথচ এটাও তার জন্যে সমীচীন ও সঙ্গত নয়। তারা আমাকে অবিশ্বাস করে বলে যে, আমি নাকি প্রথমে তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছি পরে আবার সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবো না। অথচ দ্বিতীয়বারের সৃষ্টির চেয়ে প্রথমবারের সৃষ্টি তো সহজ ছিল না। যদি আমি প্রথমবারের সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে থাকি তবে দ্বিতীয়বারের সৃষ্টিতে সক্ষম হবো না কেন?” আর সে আমাকে গালি দিয়ে বলে যে, আমার নাকি সন্তান রয়েছে, অথচ আমি একাকী, আমি অদ্বিতীয়, আমি অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। আমার কোন সন্তান সন্ততি নেই। আমার পিতা মাতা নেই, এবং আমার সমতুল্য কেউ নেই।”
আল-ইখলাস 112:4
মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা নবী করীম (সঃ) কে বললোঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমাদের সামনে তোমার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা কর।" তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো যিনি সৃষ্ট হননি। এবং যার সন্তান সন্ততি নেই। কেননা, যে সৃষ্ট হয়েছে সে এক সময় মৃত্যুবরণ করবে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুবরণও করবেন না এবং তাঁর কোন উত্তরাধিকারীও হবে না। তিনি কারো সন্তান নন এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। (ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইমাম ইবনে আবী হাতিমও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবী করিমের (সঃ) নিকট এসে বলেঃ “আমার সামনে আপনার প্রতিপালকের গুণাবলী বর্ণনা করুন!” তখন আল্লাহ তাআলা (আরবি) সূরাটি অবতীর্ণ করেন। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ)] অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, কুরায়েশদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি নাযিল করেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিষেরই নিসবত বা সম্বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর নিসবত হলো(আরবি) এবং তাকেই বলা হয় যিনি অন্তসারশূণ্য নন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদে নবী করীম (সঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোকের নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। তারা ফিরে এসে নবী করীম (সঃ) কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে আপনি আমাদের নেতা মনোনীত করেছেন তিনি প্রত্যেক নামাযে কিরআতের শেষে।(আরবি) সূরাটি পাঠ করতেন।” নবী করীম (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “সে কেন এরূপ করতো তা তোমরা তাকে জিজ্ঞেস কর তো?” তাকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ সূরায় আল্লাহর রাহমানুর রাহীমের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, এ কারণে এ সূরা পড়তে আমি খুব ভালবাসি।" এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।”সহীহ বুখারীর কিতাবুস সলাতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী মসজিদে কুবার ইমাম ছিলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করার পরই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। তারপর কুরআনের অন্য অংশ পছন্দমত পড়তেন। একদিন মুক্তাদী তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি সূরা ইখলাস পাঠ করেন, তারপর অন্য সূরাও এর সাথে মিলিয়ে দেন, কি ব্যাপার? হয় শুধু সূরা ইখলাস পড়ুন অথবা এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য সূরা পড়ুন।” আনসারী জবাব দিলেনঃ “আমি যেমন করছি তেমনি করবো, তোমাদের ইচ্ছা হলে আমাকে ইমাম হিসেবে রাখখা, না হলে বলো, আমি তোমাদের ইমামতি ছেড়ে দিচ্ছি।” মুসল্লীরা দেখলেন যে, এটা মুশকিল ব্যাপার! কারণ উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই ছিলেন ইমামতির সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তাই তার বিদ্যমানতায় তারা অন্য কারো ইমামতি মেনে নিতে পারলেন না (সুতরাং তিনিই ইমাম থেকে গেলেন)। একদিন রাসুলুল্লাহ (সঃ) সেখানে গমন করলে মুসল্লীরা তাঁর কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তিনি তখন ঐ ইমামকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি মুসল্লীদের কথা মানো না কেন? প্রত্যেক রাকআতে সূরা ইখলাস পড় কেন?” ইমাম সাহেব উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ সূরার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ সূরার প্রতি তোমার আসক্তি ও ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দিয়েছে।”মুসনাদে আহমদে ও জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আরবি) এই সূরাটিকে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “ তোমার এ ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবে।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক অন্য একটি লোককে রাত্রিকালে বারবার (আরবি) এ সূরাটি পড়তে শুনে সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। লোকটি সম্ভবতঃ ঐ লোকটির এ সূরা পাঠকে হালকা সওয়াবের কাজ মনে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “ তোমরা প্রত্যেকেই কি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে না?” সাহাবীদের কাছে এটা খুবই কষ্ট সাধ্য মনে হলো। তাই, তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা আছে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।" মুসনাদে আহমদে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত কাতাদা ইবনে নু’মান (রাঃ) সারা রাত ধরে সুরা ইখলাস পড়তে থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে এটা জানানো হলে তিনি বললেন, “এ সুরা অর্ধেক কুরআন অথবা এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমতুল্য।” মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। তিনি জনগণকে বলেন! “ তোমাদের মধ্যে কারো প্রত্যেক রাত্রে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠের ক্ষমতা আছে কি?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের মধ্যে কার এ ক্ষমতা থাকতে পারে?” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের (এর সমতূল্য)।" এমন সময় নবী করীম (সঃ) সেখানে এসে পড়লেন এবং হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আবু আইয়ুব (রাঃ) সত্য কথাই বলেছে।” জামে তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ তোমরা সমবেত হও, আজ আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবো।” সাহাবীগণ সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘর থেকে বের হয়ে এসে(আরবি) সূরাটি পাঠ করলেন। তারপর আবার ঘরে চলে গেলেন। সাহাবীরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাবেন, সম্ভবত আকাশ থেকে কোন অহী এসেছে।” এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে এসে বললেনঃ “আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনানোর জন্যে কথা দিয়েছিলাম। জেনে রেখো যে, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।”হযরত আবুদ দারদার (রাঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ “তোমরা কি প্রতিদিন কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে অপারগ?” সাহাবীগণ আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ব্যাপারে আমরা খুবই দুর্বল এবং অক্ষম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা কুরআনকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। (আরবি) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের রিওয়াইয়াত সাহাবীদের একটি বড় জামাআত হতে বর্ণিত রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথাও হতে তাশরীফ আনলেন, তাঁর সাথে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে এ সূরাটি পাঠ করতে শুনে বললেনঃ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।" হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি ওয়াজিব হয়ে গেছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জান্নাত (ওয়াজিব হয়ে গেছে)।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান, সহীহ, গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “ তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাত্রিকালে (আরবি) সূরাটি তিনবার পড়ার ক্ষমতা রাখে না? এ সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতূল্য। (এ হাদীসটি হাসিম আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেনঃ “আমরা পিপাসার্ত ছিলাম, চারদিকে রাতের গভীর অন্ধকার, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখন অসিবেন এবং নামায। পড়াবেন আমরা তারই অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় এলেন এবং আমার হাত ধরে বললেনঃ “পড়।” আমি নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বললেনঃ “পড়।” আমি বললামঃ কি পড়বো? তিনি বললেনঃ “প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে। প্রতিদিন তোমার জন্যে দুই বারই যথেষ্ট।” (এ হাদীস আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসাঈর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “এ তিনটি সূরা পাঠ করলে এগুলো তোমাকে প্রত্যেক জিনিষ হতে রক্ষা করবে।”মুসনাদে আহমদে হযরত তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিম্নলিখিত কালেমা দশবার পাঠ করবে সে চল্লিশ লাখ পূণ্য লাভ করবে। (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক একক, অভাবমুক্ত, তিনি স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, সন্তানও না (অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীও নেই, সন্তানও নেই) এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (হাদীসের একজন বর্ণনাকারী খলীল ইবনে মুররাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং অন্যান্য ইমাম তাঁকে খুবই দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন)মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কেউ যদি আরো বেশী বার পাঠ করে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)! বললেন:“আল্লাহ এর চেয়েও অধিক ও উত্তম প্রদানকারী (অর্থাৎ আল্লাহ পাক বেশীও দিতে পারবেন, তার কোনই অভাব নেই।)”হ্যরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) সুরাটি দশবার পাঠ করবে আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন, যে বিশ বার করবে তার জন্যে তৈরি করবেন জান্নাতে দু'টি প্রাসাদ এবং যে ব্যক্তি ত্রিশবার পাঠ করবে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতে তিনটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমরা এর চেয়েও বেশী বার পড়ি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ এর চেয়েও অধিকদাতা।” (এ হাদীসটি মুরসাল এবং উত্তম। দারিমী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পঞ্চাশবার, (আরবি) পাঠ করে আল্লাহ তা'আলা তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়া’লা সৃসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে(আরবি) দিনে দুইশত বার পাঠ করে তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা এক হাজার পাঁচশত পুণ্য লিখে থাকেন যদি তার উপর কোন ঋণ না থাকে। এটাও বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু ইয়ালা সৃসিলী (রঃ)। এর সনদও দুর্বল। জামে তিরমিযীর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রত্যহ দুইশত বার পাঠ করে তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়, যদি সে ঋণগ্রস্ত না হয়।”জামে তিরমিযীর একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ঘুমোবার জন্যে বিছানায় যায়, তারপর ডান পাশ ফিরে শয়ন করতঃ একশতবার(আরবি) পাঠ করে তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! তোমার ডান দিক দিয়ে জান্নাতে চলে যাও।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুইশত বার। পাঠ করে তার দুইশত বছরের পাপ মিটিয়ে দেয়া হয়।” (এ হাদীসটি আবু বকর বার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে নাসায়ীতে এই সূরার তাফসীরে হযরত বারীদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ কালে দেখেন যে, একটি লোক নামায পড়ছে এবং নিম্নলিখিত দুআ করছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এ সাক্ষ্যসহ আবেদন করছি যে, আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনি কারো মুখাপেক্ষী নন, আপনি এমন সত্ত্বা যার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং যার সমতুল্য কেউ নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! এ ব্যক্তি ইসমে আযমের সাথে দু'আ করেছে। আল্লাহর এই মহান নামের সাথে তার কাছে কিছু যাঞ্চা করলে তিনি তা দান করেন এবং এই নামের সাথে দু’আ করলে তিনি তা কবুল করে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ী (রঃ) ছাড়াও অন্যান্য আসহাবে সুনানও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি কাজ এমন রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এগুলো সম্পাদন করে সে জান্নাতের দরজাগুলোর যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে এবং জান্নাতের যে কোন হ্যারের সাথে ইচ্ছা বিবাহিত হতে পারবে। (এক) যে ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়, (দুই) নিজের গোপনীয় ঋণ পরিশোধ করে এবং (তিন) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দশবার (আরবি) সূরাটি পাঠ করে।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! এ তিনটি কাজের যে কোন একটি যদি কেউ করে?” উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “একটি করলেও একই রকম সম্মান সে লাভ করবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময়।(আরবি) পাঠ করবে আল্লাহ। তা'আলা তার ঘরের বাসিন্দাদেরকে এবং প্রতিবেশীদেরকে অভাবমুক্ত করে:দিবেন।” (হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি যঈফ বা দুর্রল)মুসনাদে আবী ইয়ালায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা তাবুকের যুদ্ধ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। সূর্য এমন স্বচ্ছ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কারভাবে উদিত হলো যে, ইতিপূর্বে কখনো এমনভাবে সূর্য উদিত হতে দেখা যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজ এ রকম উজ্জ্বল দীপ্তির সাথে সূর্যোদয়ের কারণ কি?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আজ মদীনায় মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়ার (রাঃ) ইন্তেকাল হয়েছে। তার জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের জন্যে আল্লাহ রাব্বল আলামীন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসমান থেকে পাঠিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তার কোন্ আমলের কারণে এরূপ হয়েছে?” জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “তিনি দিন রাত সব সময় চলাফেরায় উঠা বসায় সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। আপনি যদি তার জানাযার নামাযে হাজির হতে চান তবে চলুন, আমি জমীন সংকীর্ণ করে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তাই ভাল।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইবনে মুআবিয়া (রাঃ)-এর জানাযার নামায আদায় করলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর বায়হাকীও (রঃ) তার ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ নামক গ্রন্থে ইয়াযীদ ইবনে হারুণের (রঃ) রিওয়াইয়াতে বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ (রঃ) আ’লা ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এই আ’লা মাওযূ হাদীস বর্ণনা করে থাকেন বলে তার নামে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন)মুসনাদে আবী ইয়ালায় এ হাদীসের অন্য একটি সনদও রয়েছে। তাতে বর্ণনাকারী ভিন্ন ব্যক্তি। তাতে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) ইন্তেকাল করেছেন। আপনি কি তার জানাযার নামায পড়তে চান?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা" হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পালক দ্বারা জমীনে আঘাত করলেন। এর ফলে সমস্ত গাছ পালা, টিলা ইত্যাদি নিচু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃতের জানাযা দেখতে গেলেন। তিনি নামায শুরু করলেন। তাঁর পিছনে ফেরেশতাদের দুটি কাতার বা সারি ছিল। প্রত্যেক সারিতে সত্তর হাজার ফেরেশতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “মুআবিয়ার (রাঃ)-এরূপ মর্যাদার কারণ কি?" জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ (আরবি) সূরাটির প্রতি তাঁর বিশেষ ভালবাসা এবং উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে ও আসতে যেতে এ সূরাটি পাঠ করাই তার এ মর্যাদার কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তার এ হাদীসের সনদে মাহবুব ইবনে হিলাল রয়েছেন। আবু হাতিম রাযী (রঃ) বলেন যে, ইনি বর্ণনাকারী হিসেবে মাশহুর নন। মুসনাদে আবী ইয়ালায় বর্ণিত এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইনি নন, সেখানে এর স্থলে আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ রয়েছেন। কিন্তু মাহবুব ইবনে হিলালের বর্ণনাই যথার্থ বলে মনে হয়। কারণ আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাহবুব রিওয়াইয়াতের আরো বহু সনদ রয়েছে এবং সব সনদই যঈফ বা দুর্বল)মুসনাদে আহমদে হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মুমিনের মুক্তি কোন আমলে রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে উকবা’ (রাঃ) জিহবা সংযত রেখো, নিজের ঘরেই বসে থাকো এবং নিজের পাপের কথা স্মরণ করে কান্নাকাটি করো।” পরে দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি নিজেই আমার সাথে করমর্দন করে বললেনঃ হে উকবা (রাঃ) আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইঞ্জীল, যবূর এবং কুরআনে অবতীর্ণ সমস্ত সূরার মধ্যে উৎকৃষ্ট সূরার কথা বলবো?” আমি উত্তর দিলামঃ “হ্যা হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! অবশ্যই বলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর আমাকে উৎসর্গিত করুন! তিনি তখন আমাকে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, তারপর বললেনঃ “হে উকবা (রাঃ)“ এ সুরাগুলো ভুলো না। প্রতিদিন রাত্রে এগুলো পাঠ করো।” হযরত উকবা (রাঃ) বলেনঃ এরপর থেকে আমি এ সূরাগুলোর কথা ভুলিনি এবং এগুলো পাঠ করা ছাড়া আমি কোন রাত্রি কাটাইনি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং ত্বরিৎ তার হাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উত্তম আমলের কথা বলে দিন। তখন তিনি বললেনঃ “শোননা, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তুমি তার সাথে সম্পর্ক মিলিত রাখবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করবে তুমি তাকে দান করবে। তোমার প্রতি যে যুলুম করবে তুমি তাকে ক্ষমা করবে।” (এ হাদীসের কিছু অংশ ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাঁর জামে তিরমিযীতে যুহদ’ শীর্ষক অধ্যায়ে সংযোজন করেছেন এবং বলেছেন যে, এ হাদীসটি হাসান। মুসনাদে আহমদেও এ হাদীসের আরেকটি সনদ রয়েছে)সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রিকালে যখন বিছানায় যেতেন তখন এ তিনটি সূরা পাঠ করে উভয় হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা দেহের যত দূর পর্যন্ত হাত পৌঁছানো যায় ততদূর পর্যন্ত হাতের ছোঁয়া দিতেন। প্রথমে মাথায়, তারপর মুখে, এবং এরপর দেহের সামনের অংশে তিনবার এভাবে হাতের ছোঁয়া দিতেন। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদে বর্ণিত হয়েছে)১-৪ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ (শানে নুযূল) পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইয়াহুদিরা বলতঃ আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করি।” আর খৃস্টানরা বলতোঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) ঈসার (আঃ) পূজা করি।” মাজুসীরা বলতোঃ “আমরা চন্দ্র সূর্যের উপাসনা করি।” আবার মুশরিকরা বলতোঃ আমরা মূর্তি পুজা করি।” আল্লাহ তা'আলা তখন এই সুরা অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলোঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর মত আর কেউই নেই। তার কোন উপদেষ্টা অথবা উযীর নেই। তিনি একমাত্র ইলাহ্ বা মাবুদ হওয়ার যোগ্য। নিজের গুণ বিশিষ্ট ও হিকমত সমৃদ্ধ কাজের মধ্যে তিনি একক ও বে-নযীর। তিনি সামাদ অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী। সমস্ত মাখলুক, সমগ্র বিশ্বজাহান তার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সামাদ তাকেই বলে যিনি নিজের নেতৃত্বে, নিজের মর্যাদায়, বৈশিষ্ট্যে, নিজের বুযর্গীতে, শ্রেষ্ঠত্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের, হিকমতে, বুদ্ধিমত্তায় সবারই চেয়ে অগ্রগণ্য। এই সব গুণ, শুধুমাত্র আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। তিনি পূত পবিত্র মহান সত্তা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সবারই উপর বিজয়ী, তিনি বেনিয়ায। সামাদ এর একটা অর্থ এও করা হয়েছে যে, ‘সামাদ’ হলেন তিনি যিনি সমস্ত মাখলুক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকেন। যিনি চিরন্তন ও চিরবিদ্যমান। যার লয় ও ক্ষয় নেই এবং যিনি সব কিছু হিফাযতকারী। যার সত্তা অবিনশ্বর এবং অক্ষয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) সেই সত্তা যিনি কোন কিছু আহারও করেন না। এবং যার মধ্য হতে কোন কিছু বেরও হয় না। আর যিনি কাউকেও বের করেন না। অর্থাৎ তিনি কাউকেও জন্ম দেন না। তাঁর কোন সন্তান সন্ততি নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন। তাঁর পিতা মাতা নেই। এ তাফসীর খুবই উত্তম ও উৎকৃষ্ট। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) থেকে উপরোক্ত বর্ণনা উল্লিখিত রয়েছে। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী' থেকে বর্ণিত আছে যে, সামাদ এমন জিনিষকে বলা হয় যা অন্তঃসার শূন্য নয়, যার পেট নেই। শাবী (রঃ) বলেন যে, সামাদ' এর অর্থ হলো যিনি পানাহার করেন না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ্ (রঃ) বলেন যে, “সামাদ’ এমন নুরকে বলা হয় যা উজ্জ্বল, রওশন ও দ্বীপ্তিময়।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, সামাদ’ এমন এক সত্তা যার পেট নেই। অথাৎ যিনি আহারের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং মাওকুফ। হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাঁর আস সুন্নাহ গ্রন্থে সামাদ এর উপরোক্ত সব তাফসীর উল্লেখ করে লিখেছেন যে, আসলে এ সব কথাই সত্য ও সঠিক। উল্লিখিত সমস্ত গুণ এবং বৈশিষ্ট্য আমাদের মহান প্রতিপালকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বড়। তাঁর আহারের প্রয়োজন নেই। সবই ধবংস হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি চিরন্তন। তার লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনি অবিনশ্বর।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহর সন্তান সন্ততি নেই, পিতা মাতা নেই, স্ত্রী নেই। যেমন কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা, কি করে তাঁর সন্তান হতে পারে? তার তো স্ত্রী নেই, সকল জিনিষ তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন!” (৬:১০১) অর্থাৎ তিনি সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিক, এমতাবস্থায় তাঁর সৃষ্টি ও মালিকানায় সমকক্ষতার দাবীদার কে হবে? অর্থাৎ তিনি উপরোক্ত সমস্ত আয়েব থেকে মুক্ত ও পবিত্র। যেমন কুরআনের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলেঃ দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছে; এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভনীয় নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।” (১৯:৮৮-৯৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময়, সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, বরং তারা তাঁর সম্মানিত বান্দী। কথার দিক থেকেও এই বান্দাসমূহ আল্লাহকে অতিক্রম করে না, বরং তারা আল্লাহর ফরমান যথারীতি পালন করে।" (২১:২৬-২৭) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে। অথচ জ্বিনেরা জানে তাদেরকে ও শাস্তির জন্যে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বর্ণিত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র।” (৩৭:১৫৮-১৫৯)সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে এতো বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। মানুষ বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে, তবুও তিনি তাকে অন্ন দান করছেন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা দান করছেন।সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে অবিশ্বাস করে, অথচ এটা তার জন্যে সমীচীন নয়। সে আমাকে গালি দেয়, অথচ এটাও তার জন্যে সমীচীন ও সঙ্গত নয়। তারা আমাকে অবিশ্বাস করে বলে যে, আমি নাকি প্রথমে তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছি পরে আবার সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবো না। অথচ দ্বিতীয়বারের সৃষ্টির চেয়ে প্রথমবারের সৃষ্টি তো সহজ ছিল না। যদি আমি প্রথমবারের সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে থাকি তবে দ্বিতীয়বারের সৃষ্টিতে সক্ষম হবো না কেন?” আর সে আমাকে গালি দিয়ে বলে যে, আমার নাকি সন্তান রয়েছে, অথচ আমি একাকী, আমি অদ্বিতীয়, আমি অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী। আমার কোন সন্তান সন্ততি নেই। আমার পিতা মাতা নেই, এবং আমার সমতুল্য কেউ নেই।”
আল-ফালাক 113:1
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল।সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে। (আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন।মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল। এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন। ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি।সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন। দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।” দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম। এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে। তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো। প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-ফালাক 113:2
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল।সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে। (আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন।মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল। এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন। ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি।সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন। দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।” দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম। এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে। তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো। প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-ফালাক 113:3
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল।সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে। (আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন।মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল। এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন। ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি।সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন। দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।” দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম। এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে। তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো। প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-ফালাক 113:4
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল।সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে। (আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন।মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল। এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন। ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি।সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন। দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।” দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম। এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে। তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো। প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-ফালাক 113:5
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল।সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে। (আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন।মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল। এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন। ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি।সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন। দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।” দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম। এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে। তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো। প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আন-নাস 114:1
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”
আন-নাস 114:2
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”
আন-নাস 114:3
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”
আন-নাস 114:4
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”
আন-নাস 114:5
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”
আন-নাস 114:6
১-৬ নং আয়াতের তাফসীরএ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি। আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে। ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে।অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি। একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)।মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন। তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।” হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।” হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”