Lafzullah

Tafsir Ahsanul Bayaan — আত-তাওবা 9:1 – ইউনুস 10:109

Author / source: Bayaan Foundation

Contents
  1. আত-তাওবা 9:1
  2. আত-তাওবা 9:2
  3. আত-তাওবা 9:3
  4. আত-তাওবা 9:4
  5. আত-তাওবা 9:5
  6. আত-তাওবা 9:6
  7. আত-তাওবা 9:7
  8. আত-তাওবা 9:8
  9. আত-তাওবা 9:9
  10. আত-তাওবা 9:10
  11. আত-তাওবা 9:11
  12. আত-তাওবা 9:12
  13. আত-তাওবা 9:13
  14. আত-তাওবা 9:14
  15. আত-তাওবা 9:15
  16. আত-তাওবা 9:16
  17. আত-তাওবা 9:17
  18. আত-তাওবা 9:18
  19. আত-তাওবা 9:19
  20. আত-তাওবা 9:20
  21. আত-তাওবা 9:21
  22. আত-তাওবা 9:22
  23. আত-তাওবা 9:23
  24. আত-তাওবা 9:24
  25. আত-তাওবা 9:25
  26. আত-তাওবা 9:26
  27. আত-তাওবা 9:27
  28. আত-তাওবা 9:28
  29. আত-তাওবা 9:29
  30. আত-তাওবা 9:30
  31. আত-তাওবা 9:31
  32. আত-তাওবা 9:32
  33. আত-তাওবা 9:33
  34. আত-তাওবা 9:34
  35. আত-তাওবা 9:35
  36. আত-তাওবা 9:36
  37. আত-তাওবা 9:37
  38. আত-তাওবা 9:38
  39. আত-তাওবা 9:39
  40. আত-তাওবা 9:40
  41. আত-তাওবা 9:41
  42. আত-তাওবা 9:42
  43. আত-তাওবা 9:43
  44. আত-তাওবা 9:44
  45. আত-তাওবা 9:45
  46. আত-তাওবা 9:46
  47. আত-তাওবা 9:47
  48. আত-তাওবা 9:48
  49. আত-তাওবা 9:49
  50. আত-তাওবা 9:50
  51. আত-তাওবা 9:51
  52. আত-তাওবা 9:52
  53. আত-তাওবা 9:53
  54. আত-তাওবা 9:54
  55. আত-তাওবা 9:55
  56. আত-তাওবা 9:56
  57. আত-তাওবা 9:57
  58. আত-তাওবা 9:58
  59. আত-তাওবা 9:59
  60. আত-তাওবা 9:60
  61. আত-তাওবা 9:61
  62. আত-তাওবা 9:62
  63. আত-তাওবা 9:63
  64. আত-তাওবা 9:64
  65. আত-তাওবা 9:65
  66. আত-তাওবা 9:66
  67. আত-তাওবা 9:67
  68. আত-তাওবা 9:68
  69. আত-তাওবা 9:69
  70. আত-তাওবা 9:70
  71. আত-তাওবা 9:71
  72. আত-তাওবা 9:72
  73. আত-তাওবা 9:73
  74. আত-তাওবা 9:74
  75. আত-তাওবা 9:75
  76. আত-তাওবা 9:76
  77. আত-তাওবা 9:77
  78. আত-তাওবা 9:78
  79. আত-তাওবা 9:79
  80. আত-তাওবা 9:80
  81. আত-তাওবা 9:81
  82. আত-তাওবা 9:82
  83. আত-তাওবা 9:83
  84. আত-তাওবা 9:84
  85. আত-তাওবা 9:85
  86. আত-তাওবা 9:86
  87. আত-তাওবা 9:87
  88. আত-তাওবা 9:88
  89. আত-তাওবা 9:89
  90. আত-তাওবা 9:90
  91. আত-তাওবা 9:91
  92. আত-তাওবা 9:92
  93. আত-তাওবা 9:93
  94. আত-তাওবা 9:94
  95. আত-তাওবা 9:95
  96. আত-তাওবা 9:96
  97. আত-তাওবা 9:97
  98. আত-তাওবা 9:98
  99. আত-তাওবা 9:99
  100. আত-তাওবা 9:100
  101. আত-তাওবা 9:101
  102. আত-তাওবা 9:102
  103. আত-তাওবা 9:103
  104. আত-তাওবা 9:104
  105. আত-তাওবা 9:105
  106. আত-তাওবা 9:106
  107. আত-তাওবা 9:107
  108. আত-তাওবা 9:108
  109. আত-তাওবা 9:109
  110. আত-তাওবা 9:110
  111. আত-তাওবা 9:111
  112. আত-তাওবা 9:112
  113. আত-তাওবা 9:113
  114. আত-তাওবা 9:114
  115. আত-তাওবা 9:115
  116. আত-তাওবা 9:116
  117. আত-তাওবা 9:117
  118. আত-তাওবা 9:118
  119. আত-তাওবা 9:119
  120. আত-তাওবা 9:120
  121. আত-তাওবা 9:121
  122. আত-তাওবা 9:122
  123. আত-তাওবা 9:123
  124. আত-তাওবা 9:124
  125. আত-তাওবা 9:125
  126. আত-তাওবা 9:126
  127. আত-তাওবা 9:127
  128. আত-তাওবা 9:128
  129. আত-তাওবা 9:129
  130. ইউনুস 10:1
  131. ইউনুস 10:2
  132. ইউনুস 10:3
  133. ইউনুস 10:4
  134. ইউনুস 10:5
  135. ইউনুস 10:6
  136. ইউনুস 10:7
  137. ইউনুস 10:8
  138. ইউনুস 10:9
  139. ইউনুস 10:10
  140. ইউনুস 10:11
  141. ইউনুস 10:12
  142. ইউনুস 10:13
  143. ইউনুস 10:14
  144. ইউনুস 10:15
  145. ইউনুস 10:16
  146. ইউনুস 10:17
  147. ইউনুস 10:18
  148. ইউনুস 10:19
  149. ইউনুস 10:20
  150. ইউনুস 10:21
  151. ইউনুস 10:22
  152. ইউনুস 10:23
  153. ইউনুস 10:24
  154. ইউনুস 10:25
  155. ইউনুস 10:26
  156. ইউনুস 10:27
  157. ইউনুস 10:28
  158. ইউনুস 10:29
  159. ইউনুস 10:30
  160. ইউনুস 10:31
  161. ইউনুস 10:32
  162. ইউনুস 10:33
  163. ইউনুস 10:34
  164. ইউনুস 10:35
  165. ইউনুস 10:36
  166. ইউনুস 10:37
  167. ইউনুস 10:38
  168. ইউনুস 10:39
  169. ইউনুস 10:40
  170. ইউনুস 10:41
  171. ইউনুস 10:42
  172. ইউনুস 10:43
  173. ইউনুস 10:44
  174. ইউনুস 10:45
  175. ইউনুস 10:46
  176. ইউনুস 10:47
  177. ইউনুস 10:48
  178. ইউনুস 10:49
  179. ইউনুস 10:50
  180. ইউনুস 10:51
  181. ইউনুস 10:52
  182. ইউনুস 10:53
  183. ইউনুস 10:54
  184. ইউনুস 10:55
  185. ইউনুস 10:56
  186. ইউনুস 10:57
  187. ইউনুস 10:58
  188. ইউনুস 10:59
  189. ইউনুস 10:60
  190. ইউনুস 10:61
  191. ইউনুস 10:62
  192. ইউনুস 10:63
  193. ইউনুস 10:64
  194. ইউনুস 10:65
  195. ইউনুস 10:66
  196. ইউনুস 10:67
  197. ইউনুস 10:68
  198. ইউনুস 10:69
  199. ইউনুস 10:70
  200. ইউনুস 10:71
  201. ইউনুস 10:72
  202. ইউনুস 10:73
  203. ইউনুস 10:74
  204. ইউনুস 10:75
  205. ইউনুস 10:76
  206. ইউনুস 10:77
  207. ইউনুস 10:78
  208. ইউনুস 10:79
  209. ইউনুস 10:80
  210. ইউনুস 10:81
  211. ইউনুস 10:82
  212. ইউনুস 10:83
  213. ইউনুস 10:84
  214. ইউনুস 10:85
  215. ইউনুস 10:86
  216. ইউনুস 10:87
  217. ইউনুস 10:88
  218. ইউনুস 10:89
  219. ইউনুস 10:90
  220. ইউনুস 10:91
  221. ইউনুস 10:92
  222. ইউনুস 10:93
  223. ইউনুস 10:94
  224. ইউনুস 10:95
  225. ইউনুস 10:96
  226. ইউনুস 10:97
  227. ইউনুস 10:98
  228. ইউনুস 10:99
  229. ইউনুস 10:100
  230. ইউনুস 10:101
  231. ইউনুস 10:102
  232. ইউনুস 10:103
  233. ইউনুস 10:104
  234. ইউনুস 10:105
  235. ইউনুস 10:106
  236. ইউনুস 10:107
  237. ইউনুস 10:108
  238. ইউনুস 10:109

আত-তাওবা 9:1

তোমরা যে অংশীবাদীদের সাথে সন্ধি স্থাপন করেছিলে, আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ হতে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হল। [১] [১] মক্কা বিজয়ের পর ৯ হিজরীতে রসূল (সাঃ) আবু বাকর, আলী এবং অন্যান্য সাহাবা (রাঃ)গণকে কুরআনের এই আয়াতসমূহ ও বিধান দিয়ে মক্কা পাঠালেন, যাতে তাঁরা তা প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করে দেন। তাঁরা নবীর আদেশ মোতাবেক ঘোষণা করলেন যে, কোন ব্যক্তি উলঙ্গ হয়ে কা'বা ঘরের তাওয়াফ করবে না। বরং আগামী বছর থেকে কোন মুশরিককে বাইতুল্লাহর হজ্জের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে না। (বুখারীঃ নামায ও হজ্জ অধ্যায়, মুসলিমঃ হজ্জ অধ্যায়)

আত-তাওবা 9:2

সুতরাং (হে অংশীবাদীরা!) তোমরা দেশে চার মাসকাল (নিরাপদে) চলাফেরা কর।[১] আর জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহকে হীনবল করতে পারবে না এবং আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। [২] [১] এই সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা সেই মুশরিকদের জন্য ছিল, যাদের সাথে স্থায়ী চুক্তি ছিল। অথবা চার মাস থেকে কম ছিল। অথবা চার মাস থেকে বেশী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে চুক্তি রক্ষার কোন আগ্রহ ছিল না। তাদেরকে চার মাস মক্কায় থাকার অনুমতি দেওয়া হল। এর মানে হল যে, সেই সময়ের মধ্যে যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তাহলে তাদের জন্য এখানে থাকার অনুমতি হবে। অন্যথা তাদের জন্য জরুরী হবে যে, তারা চার মাস পর আরব উপদ্বীপ থেকে বের হয়ে যাবে। অতঃপর যদি উভয় এখতিয়ারের মধ্যে কোন একটা গ্রহণ না করে, তাহলে তাদেরকে জঙ্গী কাফের বলে গণ্য করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের জন্য লড়াই জরুরী হবে; যাতে আরব দেশ কুফর ও শিরকমুক্ত হতে পারে। [২] অর্থাৎ, এই অবকাশ এই জন্য দেওয়া হয়নি যে, এখন তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ সম্ভব নয়; বরং এতে তোমাদের কল্যাণই উদ্দেশ্য। যে ব্যক্তি এর মধ্যে তাওবাহ করে মুসলিম হতে চাইবে, সে মুসলিম হয়ে যাবে। নতুবা জেনে রাখ তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর যে সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছা রয়েছে তা তোমরা কোনক্রমেই ব্যর্থ করতে পারবে না এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবধারিত লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে পরিত্রাণ পেতে পারবে না।

আত-তাওবা 9:3

মহান হজ্জের দিনে[১] আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ হতে মানুষের প্রতি এ এক ঘোষণা যে, আল্লাহর সাথে অংশীবাদীদের কোন সম্পর্ক নেই এবং তাঁর রসূলের সাথেও নয়। যদি তওবা কর, তাহলে তোমাদের কল্যাণ হবে, আর তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহকে হীনবল করতে পারবে না। আর অবিশ্বাসীদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও। [১] সহীহায়ন (বুখারী, মুসলিম) ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে প্রমাণিত যে, মহান বা বড় হজ্জ বলতে কুরবানীর (১০ই যিলহজ্জ) দিনকে বোঝানো হয়েছে। (বুখারী ৪৬৫৫, মুসলিম ৯৮২, তিরমিযী ৯৫৭নং) এই দিনে মিনাতে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা শুনানো হয়। ১০ই যুলহজ্জকে বড় হজ্জের দিন এই জন্য বলা হয় যে, এই দিনে হজ্জের সব থেকে অধিক ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী আদায় করা হয়ে থাকে। আর সাধারণতঃ লোকেরা উমরাহকে 'হাজ্জে আসগার' (ছোট হজ্জ) বলত। এই জন্য উমরাহ থেকে পৃথক করার জন্য হজ্জকে 'হাজ্জে আকবার' (বড় হজ্জ) বলা হয়। পক্ষান্তরে জনসাধারণের মাঝে এই কথা প্রসিদ্ধ আছে যে, জুমআর দিনে হজ্জের (আরাফাতের) দিন পড়লে তা বড় হজ্জ (বা আকবরী হজ্জ) হয়। কিন্তু এ কথার কোন দলীল নেই, এ হল ভিত্তিহীন কথা।

আত-তাওবা 9:4

তবে অংশীবাদীদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ ও পরে যারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকেও সাহায্য করেনি, তোমরা তাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পালন কর। [১] নিশ্চয় আল্লাহ সাবধানীদেরকে ভালোবাসেন। [১] এটা হল মুশরিকদের চতুর্থ দল। তাদের সাথে যত দিনের চুক্তি ছিল সেই সময় পর্যন্ত তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কেননা, তারা চুক্তি পালন করেছিল এবং তার পরিপন্থী কোন আচরণ প্রদর্শন করেনি। এই জন্য মুসলিমদের পক্ষেও চুক্তি পালনকে জরুরী করা হয়েছিল।

আত-তাওবা 9:5

অতঃপর নিষিদ্ধ মাসগুলি[১] অতিবাহিত হলে অংশীবাদীদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর,[২] তাদেরকে বন্দী কর,[৩] অবরোধ কর এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থাক।[৪] কিন্তু যদি তারা তওবা করে, যথাযথ নামায পড়ে ও যাকাত প্রদান করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও।[৫] নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] সেই 'নিষিদ্ধ মাসগুলি' বলতে কোন্ কোন্ মাস উদ্দেশ্য তাতে মতভেদ রয়েছে। একটি রায় হল যে, তা থেকে উদ্দেশ্য হল ঐ চার মাস, যা হারাম (বা নিষিদ্ধ) বলে প্রসিদ্ধ; অর্থাৎ, রজব, যুলক্বাদ্, যুলহাজ্জ ও মুহাররাম মাস। আর সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা ১০ই যুলহজ্জ তারীখে করা হয়েছিল। এই হিসাবে তাদেরকে ঘোষণার পর ৫০ দিন অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, নিষিদ্ধ মাসগুলি অতিবাহিত হওয়ার পর মুশরিকদেরকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করার আদেশ জারী করা হয়। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর বলেছেন যে, এখানে 'নিষিদ্ধ মাসগুলি' বলতে হারামকৃত ঐ চার মাস নয়; বরং এখানে ১০ই যিলহজ্জ থেকে ১০ই রবীউস সানী পর্যন্ত চার মাসকে বুঝানো হয়েছে। আর এই চার মাসকে নিষিদ্ধ মাস এই জন্য বলা হয়েছে যে, সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা হিসাবে এই চার মাসে সেই সব মুশরিকদের সাথে লড়াই ও তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুমতি ছিল না। সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা হিসাবে এই ব্যাখ্যা যথোপযুক্ত বলে মনে হয়। আর এ ব্যাপারে আল্লাহই অধিক জানেন।[২] কোন কোন মুফাসসিরগণ এই আদেশকে ব্যাপক বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ, বৈধ ও নিষিদ্ধ যে জায়গাতেই পাও তাদেরকে হত্যা কর। আর কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেন, উক্ত আদেশকে {وَلاَ تُقَاتِلُوهُمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِن قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ} "আর মাসজিদুল হারামের (কা'বা শরীফের) নিকট তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না; যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে তোমরা তাদেরকে হত্যা কর।" (সূরা বাকারাহ ২:১৯১ আয়াত) এই আয়াত দ্বারা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কেবল হারাম শরীফের সীমানার বাইরে হত্যা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (ইবনে কাসীর)[৩] অর্থাৎ, তাদেরকে বন্দী কর অথবা হত্যা কর।[৪] অর্থাৎ এটাই যথেষ্ট মনে করো না যে, তাদের সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হলে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। বরং যেখানে যেখানে তাদের আশ্রয়স্থল, দুর্গ ও ঘাঁটি আছে সেখানে তাদের প্রতীক্ষায় থাকো; এমনকি তোমাদের অনুমতি ছাড়া তাদের যেন কোথাও যাওয়া-আসা পর্যন্ত সম্ভব না হয়।[৫] অর্থাৎ, তাদের বিরুদ্ধে কোন রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। কেননা, তারা মুসলমান হয়ে গেছে। বুঝা গেল যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা জরুরী। যদি কোন ব্যক্তি তার মধ্যে কোন একটি ত্যাগ করে, তাহলে তাকে মুসলিম ভাবা যাবে না। যেমন আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) এই আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করে যাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আর বলেছিলেন যে, 'আল্লাহর কসম! আমি সেই সব লোকদের বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়ব, যারা নামায ও যাকাতের মাঝে পার্থক্য করবে।' (বুখারী, মুসলিম) অর্থাৎ, নামায তো পড়ে; কিন্তু যাকাত প্রদান করে না।

আত-তাওবা 9:6

আর অংশীবাদীদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তুমি তাকে আশ্রয় দাও যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।[১] তা এ জন্য যে, তারা অজ্ঞ লোক। [২] [১] এই আয়াতে পূর্বোক্ত জঙ্গী কাফেরদের ব্যাপারে এক অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে, যদি কোন কাফের আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও। অর্থাৎ, তাকে নিজেদের হিফাযত ও নিরাপত্তায় রাখ; যাতে কোন মুসলিম তাকে হত্যা করতে না পারে। আর যাতে সে আল্লাহর বাণী শোনা ও ইসলাম সম্পর্কে জানার অবকাশ পায়। সম্ভবতঃ এইভাবে তার তাওবাহ ও ইসলাম কবুল করার পথ বেরিয়ে আসবে। অতঃপর যদি সে আল্লাহর বাণী শোনা সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে তাকে তার নিজ নিরাপদ জায়গায় পৌঁঁছে দাও। উদ্দেশ্য এই যে, নিজেদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পালন করতে হবে; যতক্ষণ না সে নিজের গন্তব্যস্থলে নির্বিঘ্নে পৌঁছে যায়। যেহেতু তার প্রাণ রক্ষা করা তোমাদের দায়িত্ব। [২] অর্থাৎ, আশ্রয়প্রার্থী (শরণার্থী)-দেরকে আশ্রয় দেওয়ার অনুমতি এই জন্য দেওয়া হয়েছে যে, এরা হল অজ্ঞ লোক। সম্ভবতঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা তাদের কানে এলে এবং মুসলিমদের আখলাক-চরিত্র দেখলে সে ইসলামের সত্যতার বিশ্বাসী হয়ে যাবে এবং ইসলাম গ্রহণ করে আখেরাতের আযাব থেকে বেঁচে যাবে। যেমন হুদাইবিয়ার চুক্তির পর বহু সংখ্যক কাফের নিরাপত্তা চেয়ে মদীনায় আসা-যাওয়া করত। যার ফলে মুসলিমদের চরিত্র ও আচরণ প্রত্যক্ষ করে ইসলাম বুঝা তাদের জন্য সহজ হল। অতঃপর তাদের মধ্যে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করল।

আত-তাওবা 9:7

আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নিকট অংশীবাদীদের চুক্তি কিরূপে বলবৎ থাকবে?[১] তবে যাদের সাথে তোমরা মাসজিদুল হারামের সন্নিকটে পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছ, তারা যতদিন তোমাদের চুক্তিতে স্থির থাকবে, তোমরা তাদের চুক্তিতে স্থির থাক। নিশ্চয় আল্লাহ সাবধানীদেরকে পছন্দ করেন। [২] [১] এই প্রশ্নবাচক শব্দটি নেতিবাচক। অর্থাৎ, যে সকল মুশরিকদের সাথে তোমাদের চুক্তি আছে তাদের ছাড়া আর কারো চুক্তি বলবৎ থাকবে না। [২] অর্থাৎ, চুক্তি বজায় রাখা আল্লাহর নিকট বড় পছন্দনীয় কাজ। অতএব তার প্রতি যত্ন রাখা জরুরী।

আত-তাওবা 9:8

কেমন করে (তাদের চুক্তি বলবৎ থাকবে)? অথচ অবস্থা এই যে, তারা যদি তোমাদের উপর বিজয় লাভ করে, তাহলে তোমাদের আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের কোন মর্যাদা দেবে না, [১] তারা মুখে তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করে, কিন্তু তাদের হৃদয় তা অস্বীকার করে। বস্তুতঃ তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী। [১] كَيف (কেমন করে?) শব্দটি পুনরায় তাকীদের জন্য নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। إِلّ অর্থ হল আত্মীয়তা এবং ذِمَّة শব্দের অর্থ হল অঙ্গীকার। অর্থাৎ, সেই মুশরিকদের মুখের কথার কি দাম আছে, যাদের অবস্থা এই যে, যদি তারা তোমাদের উপর বিজয় লাভ করে, তাহলে কোন আত্মীয়তা ও অঙ্গীকার রক্ষা করবে না। কোন কোন মুফাসসিরগণের নিকট প্রথম كَيف (বাক্য) মুশরিকদের এবং দ্বিতীয় كَيف (বাক্য) ইয়াহুদীদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে। কেননা, পরবর্তী আয়াতে গুণ বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করে। আর এই অভ্যাস ইয়াহুদীদেরই ছিল।

আত-তাওবা 9:9

তারা আল্লাহর আয়াতকে নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে ও তারা লোকদেরকে তাঁর পথ হতে নিবৃত্ত করে। নিশ্চয় তারা যা করে থাকে, তা অতি জঘন্য।

আত-তাওবা 9:10

তারা কোন বিশ্বাসীর সাথে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না, তারাই সীমালংঘনকারী।[১] [১] বারবার এ কথা পুনরুক্তির উদ্দেশ্য হল, মুশরিক ও ইয়াহুদীদের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ এবং অন্তরের গোপন শত্রুতার জ্বালাকে মুসলিমদের জন্য প্রকাশ করে দেওয়া।

আত-তাওবা 9:11

অতঃপর তারা যদি তওবা করে, যথাযথ নামায পড়ে ও যাকাত দেয়, তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। [১] আর জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শনসমূহ স্পষ্টরূপে বিবৃত করি। [১] নামায হল তাওহীদ ও রিসালতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার পর ইসলামের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যা আল্লাহর হক। তাতে আল্লাহর ইবাদতের বিভিন্ন দিক রয়েছে। এতে রয়েছে হাত বেঁধে কিয়াম, রুকূ ও সিজদা। এতে রয়েছে দু'আ ও মুনাজাত, আল্লাহর বড়ত্ব ও মহিমা এবং নিজের মিনতি ও অসহায়তার প্রকাশ। ইবাদতের এই সমস্ত প্রকার ও ধরন কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। নামাযের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও ফরযকৃত রুকন হল যাকাত। যাতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাথে বান্দারও হক শামিল রয়েছে। যাকাতের অর্থ দ্বারা সমাজের ও বিশেষ করে যাকাতদাতার আত্মীয় গরীব-মিসকীন ও অক্ষম লোকদের প্রয়োজন মিটে থাকে। এই জন্য হাদীসে দুই সাক্ষ্য দানের পর উক্ত দু'টি বিষয়কে পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেছেন, "আমাকে আদেশ করা হয়েছে যে, লোকদের বিরুদ্ধে আমি যেন ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষী দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রসূল। আর নামায কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে।" (বুখারী ঈমান অধ্যায়, মুসলিম ঈমান অধ্যায়) আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি যাকাত প্রদান করে না, তার নামাযও গ্রহণযোগ্য নয়।' (ঐ)

আত-তাওবা 9:12

আর তারা যদি তাদের চুক্তির পর তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ও তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে খোঁটা দেয়, তাহলে অবিশ্বাসীদের নেতৃবর্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। এরা এমন লোক যাদের কোনই চুক্তি (বা কসম) নেই। [১] সম্ভবতঃ তারা নিরস্ত হতে পারে। [১] أيمان শব্দটি يمين এর বহুবচন। যার অর্থ হল কসম। أئمة শব্দটি إمام শব্দের বহুবচন, অর্থঃ নেতা বা লিডার। উদ্দেশ্য হল, যদি এই সব লোকেরা অঙ্গীকার বা চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে আর দ্বীনের ব্যাপারে খোঁটা মারে, তাহলে প্রকাশ্যভাবে এরা কসম খেলেও এদের কসমের কোন মূল্য নেই। বরং কাফেরদের ঐ নেতৃবর্গের বিরুদ্ধে লড়াই কর। সম্ভবতঃ এর ফলে তারা কুফর থেকে ফিরে আসবে। এ থেকে হানাফী উলামাগণ দলীল গ্রহণ করে প্রমাণ করেন যে, যিম্মী (ইসলামী দেশে অবস্থানকারী অমুসলিম) যদি চুক্তি ভঙ্গ না করে দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে খোঁটা দেয় বা কুমন্তব্য করে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করা হবে না। কেননা, কুরআন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দু'টি শর্ত উল্লেখ করেছে। অতএব যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই দু'টি শর্ত পাওয়া যাবে তাদেরকে হত্যা করা হবে না। কিন্তু ইমাম মালেক (রঃ), ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এবং অন্যান্য উলামাগণ দ্বীনের ব্যাপারে খোঁটা দেওয়া বা নিন্দা গাওয়াকে চুক্তি ভঙ্গ করা বলে গণ্য করেছেন। এই জন্য তাঁদের নিকটে দু'টি শর্তই একত্রিত হয়। অতএব এই প্রকার যিম্মী ব্যক্তিকে হত্যা করা (মুসলিম সরকারের জন্য) বৈধ; যেমন বৈধ চুক্তি ভঙ্গকারীকেও হত্যা করা। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আত-তাওবা 9:13

তোমরা কি সে সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করবে না, [১] যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে ও রসূলকে বহিষ্কার করার সংকল্প করেছে?[২] ওরাই প্রথম তোমাদের বিরুদ্ধে বিবাদ সৃষ্টি করেছে।[৩] তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? আল্লাহই এ বিষয়ে বেশী হকদার যে, তোমরা তাঁকে ভয় কর; যদি তোমরা মু’মিন (বিশ্বাসী) হয়ে থাক। [১] মহান আল্লাহ এখানে মুসলিমদেরকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। [২] এ থেকে দারুন নাদওয়ার সেই পরামর্শ উদ্দেশ্য, যাতে মক্কার সর্দাররা নবী (সাঃ)-কে দেশ হতে বহিষ্কার, কারাবদ্ধ অথবা হত্যা করার ব্যাপারে মন্ত্রণা করেছিল। [৩] এ থেকে উদ্দেশ্য বদর যুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের সেই আচরণ, যাতে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক কাফেলার হিফাযতের জন্যই বের হয়েছিল। কিন্তু কাফেলা রক্ষা পেয়ে পার হয়ে গেছে দেখেও তারা বদর প্রান্তরে মুসলিমদের সাথে লড়াই করার প্রস্তুতি নিতে লাগল এবং তাঁদেরকে উত্ত্যক্ত করে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালো। যার কারণে পরিশেষে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েই গেল। কিম্বা এ থেকে কাবীলা বানী বাকরের সেই সাহায্য উদ্দেশ্য যা কুরাইশরা তাদের জন্য করেছিল। অথচ তারা রসূল (সাঃ)-এর অঙ্গীকারবদ্ধ মিত্র বানী খুযাআহ গোত্রের উপর হামলা করেছিল। বাস্তবপক্ষে কুরাইশদের এই সাহায্য চুক্তির পরিপন্থী ছিল।

আত-তাওবা 9:14

তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। তোমাদের হাতে আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দেবেন, ওদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, ওদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন এবং বিশ্বাসীদের হৃদয় প্রশান্ত করবেন।

আত-তাওবা 9:15

এবং ওদের হৃদয়ের ক্ষোভ দূর করবেন। [১] আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে তওবা করার তওফীক দিয়ে থাকেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [১] অর্থাৎ, মুসলিমরা যখন দুর্বল ছিল তখন মুশরিকরা তাদের উপর অত্যাচার করত। যার কারণে মুসলিমদের হৃদয় দুঃখ-পীড়িত ও ব্যথিত ছিল। যখন তোমাদের হাতে ওরা খুন হবে এবং অপমান ও লাঞ্ছনা তাদের ভাগে আসবে, তখন স্বাভাবিকভাবে অত্যাচারিত মুসলিমদের কলিজা ঠান্ডা হবে ও তাদের মনের রাগ ও ক্ষোভ দূর হয়ে যাবে।

আত-তাওবা 9:16

তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, [১] অথচ এখনও আল্লাহ জেনে নেননি যে, তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে[২] এবং কে আল্লাহ, তাঁর রসূল ও বিশ্বাসিগণ ব্যতীত অন্য কাউকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনি? [৩] আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [৪] [১] অর্থাৎ, পরীক্ষা ও যাচাই না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [২] যেন জিহাদের দ্বারা পরীক্ষা করা হল। [৩] وَلِيجَة শব্দের অর্থঃ অন্তরঙ্গ প্রাণ-প্রিয় বন্ধু। যেহেতু মুসলিমদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শত্রুদের সাথে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করা হয়েছিল, সেহেতু এটাও পরীক্ষার একটি উপকরণ ছিল। যাতে মু'মিনদেরকে অন্যান্যদের থেকে পৃথক করা হয়েছে। [৪] অর্থাৎ, আল্লাহ তো পূর্ব হতেই সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। কিন্তু জিহাদ বিধিবদ্ধ করার হিকমত ও যৌক্তিকতা এই ছিল যে, এ থেকে খাঁটি ও অখাঁটি, অনুগত ও অবাধ্য বান্দা কে তা প্রকাশ পেয়ে সামনে এসে যাবে; যাদেরকে প্রত্যেক ব্যক্তি দেখে ও চিনে নিতে পারবে।

আত-তাওবা 9:17

অংশীবাদীরা যখন নিজেরাই নিজেদের কুফরী (অবিশ্বাস) স্বীকার করে, তখন তারা আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে এমন হতে পারে না।[১] ওরা এমন যাদের সকল কর্ম ব্যর্থ [২] এবং ওরা জাহান্নামেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। [১] مساجد الله থেকে মাসজিদুল হারাম উদ্দেশ্য। বহুবচন শব্দ ব্যবহার হয়েছে এই জন্য যে, এটা হল সমস্ত মসজিদের কিবলা এবং কেন্দ্রস্থল। অথবা আরবী ভাষায় একবচনের জায়গায় বহুবচন ব্যবহার করা বৈধ। উদ্দেশ্য হল যে, আল্লাহর ঘর (অর্থাৎ, মাসজিদুল হারাম) নির্মাণ বা আবাদ করা হল ঈমানদারদের কাজ; যারা শিরক ও কুফরী করে এবং সে কথা স্বীকারও করে, তাদের কাজ নয়। যেমন তালবিয়াতে তারা বলত, لبيك! لا شريك لك، إلا شريكًا هو لك، تملكه وما ملك। অর্থাৎ, আমি তোমার জন্য হাযির, তোমার কোন শরীক নেই। তবে সেই শরীক যা তোমার আছে। তুমি তার ও তার মালিকানাভুক্ত সবকিছুর মালিক। (মুসলিমঃ তালবিয়া পরিচ্ছেদ) কিম্বা এ থেকে উদ্দেশ্য সেই স্বীকার যা প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীরা করে থাকে ও বলে যে, আমি ইয়াহুদী, আমি খ্রিষ্টান, আমি অগ্নিপূজক বা আমি পৌত্তলিক ইত্যাদি। (ফাতহুল ক্বাদীর) [২] অর্থাৎ, তাদের সেই আমল যা বাহ্যতঃ ভাল মনে হয়; যেমন, কা'বাগৃহের তওয়াফ, উমরাহ, হাজীদের খিদমত প্রভৃতি সবই ব্যর্থ। কেননা, ঈমানবিহীন এই সমস্ত আমল ফলহীন বৃক্ষের মত (নিষ্ফল) অথবা সেই ফুলের মত যার কোন সৌরভ নেই।

আত-তাওবা 9:18

তারাই তো আল্লাহর মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা আল্লাহতে ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না, ওদেরই সম্বন্ধে আশা যে, ওরা সৎপথ প্রাপ্ত হবে। [১] [১] যেমন হাদীসেও এসেছে যে, নবী (সাঃ) বলেছেন "যখন তোমরা দেখবে যে, মানুষ মসজিদে (নামাযের জন্য) নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছে, তখন তোমরা তার ঈমানের ব্যাপারে সাক্ষ্য দাও।" (তিরমিযীঃ সূরা তাওবার তাফসীর, হাদীসটিকে আল্লামা আলবানী যয়ীফ বলেছেন, যয়ীফুল জামে' ৫০৯নং) কুরআন মাজীদে এখানেও আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমানের পর যে সব আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা হল নামায, যাকাত এবং আল্লাহর ভয়। যা হতে নামায, যাকাত ও আল্লাহ-ভীতির মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব প্রকাশ পায়।

আত-তাওবা 9:19

যারা হাজীদের পানি সরবরাহ করে এবং মাসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করে, তোমরা কি তাদেরকে তাদের সমজ্ঞান কর, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর নিকট তারা সমতুল্য নয়।[১] আল্লাহ অনাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। [২] [১] মুশরিকরা হাজীদেরকে পানি পান করানো ও মাসজিদুল হারামের দেখাশোনা করার যে কাজ করত, তার দরুন তাদের বড় গর্ব ছিল। কিন্তু সে তুলনায় তারা ঈমান ও জিহাদের কোন গুরুত্ব দিত না। অথচ এর গুরুত্ব মুসলিমদের কাছে ছিল। আল্লাহ তাআলা বললেন, তোমরা কি হাজীগণকে পানি পান করানো মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার সমতুল্য মনে কর? জেনে রাখ! আল্লাহর নিকট উভয় সমতুল্য নয়; বরং মুশরিকদের কোন কর্মই গ্রহণযোগ্য নয়; যদিও তা আপাতদৃষ্টিতে ভাল মনে হয়। যেমন পূর্বোক্ত আয়াতের (حَبِطَت أعمَالُهُم) (তাদের সকল কর্ম ব্যর্থ) শব্দাবলীতে সে কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোন কোন বর্ণনায় এ আয়াত অবতীর্ণের কারণস্বরূপ বলা হয়েছে যে, একদা মসজিদে নববীর নিকট কিছু মুসলমান একত্রিত ছিল। তার মধ্যে একজন বলল, ইসলাম গ্রহণ করার পর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আমল আমার নিকটে হাজীগণকে পানি পান করানো। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, মাসজিদুল হারামকে আবাদ করা। তৃতীয় ব্যক্তি বলল, বরং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ হল সব আমলের মধ্যে উত্তম আমল। উমর (রাঃ) যখন তাদেরকে আপোসে ঐরূপ কথাবার্তা বলতে শুনলেন তখন তাদেরকে ধমক দিয়ে বললেন, তোমরা রসূল (সাঃ)-এর মিম্বরের নিকট নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না। সেদিন ছিল জুমআর দিন। হাদীসের বর্ণনাকারী নু'মান বিন বাশীর (রাঃ) বলেন যে, আমি জুমআর পর নবী (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আমাদের আপোসের সেই কথোপকথন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হল। (মুসলিমঃ ইমারাহ অধ্যায়) যাতে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ সব থেকে বেশী উত্তম আমল। কথা প্রসঙ্গে আসলে এখানে জিহাদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমান ছাড়া কোন আমল গ্রহণযোগ্য নয়, এই জন্য প্রথমে তা বর্ণনা করা হয়েছে। মোটকথা প্রথমতঃ জানা গেল যে, জিহাদ থেকে বড় আমল আর কিছু নেই। দ্বিতীয়তঃ জানা গেল যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ মুশরিকদের অমূলক ধারণা ছাড়াও মুসলিমদের নিজ নিজ অনুমান অনুযায়ী কিছু আমলকে অন্য কিছু আমলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়াও ছিল। অথচ এ কাজ শরীয়তদাতারই ছিল; কোন মুমিনের নয়। মু'মিনদের কাজ হল, প্রত্যেক সেই কথার উপর আমল করা, যা আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। [২] অর্থাৎ, এই লোকেরা যা ইচ্ছা তাই দাবী করুক। আসলে তারা অনাচারী যালেম; অর্থাৎ, মুশরিক। কেননা, শিরক হল সব চাইতে বড় যুলুম ও অনাচার। এই যুলুমের কারণে তারা আল্লাহর হিদায়াত থেকে বঞ্চিত। এই জন্য তাদের সাথে হিদায়াতপ্রাপ্ত মুসলিমদের কোন তুলনাই নেই।

আত-তাওবা 9:20

যারা ঈমান এনেছে, (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় বড়। আর তারাই হল সফলকাম।

আত-তাওবা 9:21

তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজ দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন; যেখানে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-সমৃদ্ধি রয়েছে।

আত-তাওবা 9:22

সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে আছে মহাপ্রতিদান। [১] [১] এই সব আয়াতে সেই ঈমানদারদের ফযীলত ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁরা হিজরত করেছেন এবং জান-মাল দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। আল্লাহর নিকটে তাঁদের মর্যাদা সবার উচ্চে এবং তাঁরাই সফলকাম মানুষ। তাঁরাই আল্লাহর রহমত ও তাঁর সন্তুষ্টি এবং চিরস্থায়ী নিয়ামতের হকদার। তারা এর হকদার নয়, যারা নিজেদের মুখে সরল সাজে এবং নিজেদের বাপ-দাদাদের তরীকাকেই আল্লাহর প্রতি ঈমানের তুলনায় শ্রেয় ও প্রিয় মনে করে।

আত-তাওবা 9:23

হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতৃগণ যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে পছন্দ করে, তাহলে তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবক করবে, তারাই হবে অত্যাচারী। [১] [১] এটা সেই বিষয় যে ব্যাপারে কুরআন কারীমে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। (সূরা আলে ইমরান ৩:২৮, ৩:১১৮, সূরা মায়িদাহ ৫:৫১, সূরা মুজাদালাহ ৫৮:২২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য) এখানে জিহাদ ও হিজরতের আলোচনায় আনুষঙ্গিকভাবে (যেহেতু এ বিষয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট তাই) উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, জিহাদ ও হিজরতের ব্যাপারে তোমাদের বাপ-ভাই ইত্যাদির মহব্বত যেন বাধা সৃষ্টি না করে। কেননা, তারা যদি এখনো পর্যন্ত কাফের হয়, তাহলে তারা তোমাদের ভালোবাসার পাত্র হতেই পারে না। বরং তারা তোমাদের শত্রু। আর যদি তোমরা তাদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক রাখ, তাহলে স্মরণ রেখো যে, তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

আত-তাওবা 9:24

বল, ‘তোমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, স্ত্রী ও আত্মীয়গণ, অর্জিত ধনরাশি এবং সেই ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার অচল হওয়ার ভয় কর এবং প্রিয় বাসস্থানসমূহ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুতঃ আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’ [১] [১] এই আয়াতেও উপরোক্ত বিষয়কে বড় তাকীদের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। عَشِيرَة শব্দটি বহুবচনমূলক বিশেষ্য, এর অর্থঃ সেই নিকটতম আত্মীয়-স্বজন যাদের সাথে দিন-রাত বাস করে মানুষের জীবন অতিবাহিত হয়। অর্থাৎ, স্ববংশ ও স্বগোত্রের লোকজন। اقتراف অর্থ হল উপার্জন করা। تجارة লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় (ব্যবসা)-কে বলা হয়। كساد অচল হওয়াকে বলা হয়; অর্থাৎ, পণ্য মজুদ থাকে, কিন্তু ক্রয়-বিক্রয় হয় না। কিংবা পণ্যের প্রয়োজন সময় পার হয়ে গেছে, যার কারণে লোকের কাছে তার চাহিদা থাকে না। مَسَاكن থেকে উদ্দেশ্য হল সেই বাসস্থান বা ঘর-বাড়ি, যা মানুষ শীত-গ্রীষ্ম ও ঝড়-বৃষ্টির কষ্ট, শত্রু ও হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ হতে বাঁচা ও আশ্রয় নেওয়ার জন্য, ইজ্জত রক্ষা করে বসবাস করা এবং নিজ সন্তান-সন্ততির হিফাযতের জন্য তৈরী করে থাকে। এই সমস্ত জিনিস স্ব-স্ব স্থানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ সবের গুরুত্ব ও উপকারিতাও অনস্বীকার্য। মানুষের হৃদয়ে এ সবের ভালোবাসাও প্রকৃতিগত ভালোবাসা এবং যা নিন্দনীয় নয়। কিন্তু এ সবের ভালোবাসা যদি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি ভালোবাসা থেকে অধিক হয় এবং তা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে এ কথা আল্লাহর নিকট কঠিনভাবে অপছন্দনীয় এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ। আর এ কাজ এমন অবাধ্যতা যার কারণে মানুষ আল্লাহর হিদায়াত হতে বঞ্চিত হতে পারে; যেমন আয়াতের শেষাংশে হুমকিমূলক শব্দ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে। হাদীসের মধ্যে নবী (সাঃ)ও এই বিষয়টিকে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যেমন, একদা উমার (রাঃ) বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার জান ছাড়া সমস্ত বস্তু থেকে অধিক প্রিয়।' তিনি বললেন, "যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কারো নিকট তার জান থেকে প্রিয় না হয়েছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মু'মিন হতে পারে না।" উমার (রাঃ) বললেন, 'আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার জান থেকেও প্রিয়।' তিনি বললেন, "হে উমার! এখন (তুমি পূর্ণ মু'মিন)।" (বুখারীঃ কসম ও নযর অধ্যায়) এক দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "তাঁর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয়তম হয়েছি।" (বুখারীঃ ঈমান অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) এক অন্য হাদীসে জিহাদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "যখন তোমরা 'ঈনাহ' (কোন জিনিসকে কিছু দিনের জন্য ধারে বিক্রয় করে পুনরায় সেই জিনিসকে কম দামে ক্রয় করে নেওয়ার) ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।" (আহমাদ ২/২৮,৪২, ৮৪, আবু দাঊদ ৩৪৬২নং, বাইহাকী ৫/৩১৬)

আত-তাওবা 9:25

আল্লাহ তোমাদেরকে তো বহুক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনাইনের যুদ্ধের দিনেও; যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।[১] [১] মক্কা ও তায়েফের মধ্যস্থলে একটি উপত্যকার নাম হুনাইন। এখানে হাওয়াযিন এবং সাকীফ নামক দুই গোত্র বসবাস করত। এই উভয় গোত্রের লোকেরা তীর নিক্ষেপ কাজে বড় পটু বলে প্রসিদ্ধি ছিল। এরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে কথা রসূল (সাঃ) জানতে পারলে ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে সেই গোত্র দু'টির সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্যে 'হুনাইন' উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। এই যুদ্ধ মক্কা বিজয়ের ১৮/১৯ দিন পর শওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। উল্লিখিত উভয় গোত্রের লোকেরা পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুতি নিয়েই ছিল। তারা বিভিন্ন ঘাঁটিতে তীরন্দাজদেরকে মোতায়েন করে দিল। এদিকে মুসলিমদের মাঝে আত্মগর্ব সৃষ্টি হল যে, আজ আমরা কমসে কম সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হব না। অর্থাৎ, আল্লাহর মদদ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের সংখ্যাধিক্যের উপর ভরসা করে বসলেন। আল্লাহর নিকট এই গর্ব পছন্দ ছিল না। পরিণামস্বরূপ যখন হাওয়াযিনের সুদক্ষ তীরন্দাজরা বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর ধারণাতীতভাবে একই সাথে তীর বর্ষণ করতে শুরু করল, তখন মুসলিম বাহিনী বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পলায়ন শুরু করল। যুদ্ধ-ময়দানে কেবল নবী (সাঃ) ১০০ জন মত সৈন্য নিয়ে অবিচলিত থাকলেন। তিনি মুসলিমদেরকে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা আমার কাছে এসো। আমি হলাম আল্লাহর রসূল।' কখনো কখনো তিনি এই যুদ্ধ-কবিতা পড়তেন, أنا النبي لا كذب ـ أنا ابن عبد المطلب অর্থাৎ, 'আমি হলাম নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।' পুনরায় তিনি আব্বাস (রাঃ)-কে (যাঁর গলার আওয়াজ বড় উঁচু ছিল) আদেশ করলেন যে, 'মুসলিমদেরকে একত্রিত করার জন্য ডাক দাও।' অতএব তাঁর আওয়াজ শুনে মুসলিমরা লজ্জিত হলেন এবং পুনরায় ময়দানে একত্রিত হলেন। অতঃপর এমন দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জয়ী করে দিলেন। আল্লাহর মদদ এমনভাবে এল যে, তাঁদের উপর সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন; যার ফলে তাঁদের অন্তর থেকে কাফেরদের ভয় দূর হয়ে গেল। দ্বিতীয়তঃ ফিরিশতাদল প্রেরণ করলেন। এই যুদ্ধে মুসলিমরা (নারী ও শিশু সহ) ৬ হাজার কাফেরকে বন্দী করলেন। (যাদেরকে নবী (সাঃ) তাদের অনুরোধে ছেড়ে দিলেন।) প্রচুর পরিমাণে গনীমতের মাল হস্তগত হল। যুদ্ধের পর কাফেরদের বেশ কয়েকজন সর্দার বা নেতৃস্থানীয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এখানে তিনটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনাকে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন।

আত-তাওবা 9:26

তারপর আল্লাহ তাঁর নিকট হতে তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের উপর সান্ত্বনা বর্ষণ করলেন; যাতে তাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং এমন এক সৈন্যবাহিনী অবতীর্ণ করলেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি এবং তিনি অবিশ্বাসীদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। আর এটিই অবিশ্বাসীদের কর্মফল।

আত-তাওবা 9:27

এর পরও যাকে ইচ্ছা তাকে আল্লাহ তওবা করার তওফীক দান করেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।

আত-তাওবা 9:28

হে বিশ্বাসিগণ! অংশীবাদীরা তো অপবিত্র।[১] সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মাসজিদুল হারামের নিকট না আসে।[২] যদি তোমরা দারিদ্রে্র আশঙ্কা কর, তাহলে জেনে রাখ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাঁর নিজ করুণায় তিনি তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। [৩] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [১] অংশীবাদী বা মুশরিকরা অপবিত্র কথার অর্থ হল, আকীদা-বিশ্বাস ও আমল হিসাবে তারা (অভ্যন্তরীণভাবে) অপবিত্র। কারো কারো নিকটে মুশরিক বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক উভয়ভাবে অপবিত্র। কেননা, তারা পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার সেইরূপ খেয়াল রাখে না, যেরূপ শরীয়ত নির্দেশ করেছে। [২] এটা সেই হুকুম যা সন ৯ হিজরীতে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণার সাথে করা হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা পূর্বে (১-২নং আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল মাসজিদুল হারামের জন্য। নচেৎ প্রয়োজন মোতাবেক মুশরিকরা অন্যান্য মসজিদে প্রবেশ করতে পারে। যেমন নবী (সাঃ) সুমামাহ বিন উসালকে মসজিদে নববীর থামে বেঁধে রেখেছিলেন। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর হৃদয়ে ইসলাম ও নবীর মহব্বত সৃষ্টি করেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পরন্তু অধিকাংশ উলামাগণের নিকট এখানে 'মাসজিদুল হারাম' থেকে উদ্দেশ্য পূর্ণ হারাম এলাকা। অর্থাৎ, হারাম-সীমানার ভিতর মুশরিকদের প্রবেশ নিষেধ। কিছু আসার (সাহাবার উক্তি ও কর্ম) অনুসারে এই হুকুম থেকে যিম্মী ও খাদেমদেরকে পৃথক করা হয়েছে। উমার বিন আব্দুল আযীয (রঃ) আলোচ্য আয়াতের ভিত্তিতে নিজ রাজত্বকালে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদেরকেও মুসলিমদের মসজিদে প্রবেশ না করার আদেশ জারী করেছিলেন। (ইবনে কাসীর) [৩] মুশরিকদের উপর হারাম প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার কারণে কিছু মুসলিমদের মনে চিন্তা হল যে, হজ্জের মৌসুমে অধিকাধিক লোক জমা হওয়ার কারণে যে ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে থাকে, তাতে প্রভাব পড়তে পারে। আল্লাহ তাআলা বললেন, দারিদ্রে্র ভয় করো না। তিনি অতিসত্বর নিজ অনুগ্রহে তোমাদেরকে ধনবান বানিয়ে দেবেন। সুতরাং বিভিন্ন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ফলে বহু গনীমতের মাল মুসলিমদের হস্তগত হল। অতঃপর ধীরে ধীরে সারা আরববাসী মুসলমান হয়ে গেল। পরিণামে হজ্জের মৌসুমে হাজীদের গমনাগমন ঠিক সেইরূপ হয়ে গেল যেমন পূর্বে ছিল; বরং তার থেকেও বেশী হল। আর সেই সংখ্যাবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত।

আত-তাওবা 9:29

যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ও পরকালেও নয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা নিষিদ্ধ মনে করে না এবং সত্য ধর্ম অনুসরণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া আদায় করে। [১] [১] মুশরিকদের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে যুদ্ধের আদেশের পর এই আয়াতে ইয়াহুদী-নাসারাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করার আদেশ করা হচ্ছে। (যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে তাহলে) তারা জিযিয়া-কর দিয়ে মুসলিমদের অধীনে বসবাস-অধিকার গ্রহণ করে নিক। জিযিয়া হল, নির্ধারিত কিছু অর্থ; যা বাৎসরিকভাবে সেই অমুসলিমদের নিকট থেকে আদায় করা হয়, যারা কোন মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করতে চায়। এর বিনিময়ে তাদের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের হিফাযতের দায়িত্ব মুসলিম রাষ্ট্রের উপর বর্তায়। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা আল্লাহ এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখত, তা সত্ত্বেও তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে না। এ থেকে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর প্রতি সেইভাবে ঈমান না রাখবে যেভাবে আল্লাহ নিজ পয়গম্বরদের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। আর এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের আল্লাহর প্রতি ঈমানকে এই জন্য সঠিক বলা হয়নি যে, ইয়াহুদী-নাসারা উযাইর এবং ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বেটা ও উপাস্য বলে বিশ্বাস করে। যেমন পরবর্তী আয়াতে এ ব্যাপারে তাদের আকীদার কথা প্রকাশ করা হয়েছে।

আত-তাওবা 9:30

আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়)। তারা তো তাদের মতই কথা বলছে, যারা তাদের পূর্বে অবিশ্বাস করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, তারা উল্টা কোন্ দিকে যাচ্ছে!

আত-তাওবা 9:31

তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে[১] এবং মারয়্যামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদেরকে শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র একক উপাস্যের উপাসনা করবে, তিনি ব্যতীত (সত্য) উপাস্য আর কেউই নেই, তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র। [১] এর ব্যাখ্যা আদী বিন হাতেম (রাঃ)-এর বর্ণনাকৃত হাদীস হতে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর মুখে এই আয়াত শুনে আরজ করলাম যে, ইয়াহুদী-নাসারারা তো নিজেদের আলেমদের কখনো ইবাদত করেনি, তাহলে এটা কেন বলা হয়েছে যে, তারা তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে? তিনি বললেন, এ কথা ঠিক যে, তারা তাদের ইবাদত করেনি। কিন্তু এটা তো সঠিক যে, তাদের আলেমরা যা হালাল করেছে তাকে তারা হালাল এবং যা হারাম করেছে তাকে তারা হারাম বলে মেনে নিয়েছে। আর এটাই হল তাদের ইবাদত করা। (সহীহ তিরমিযী আলবানী ২৪৭১নং) কেননা, হারাম-হালাল করার এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহর। এই এখতিয়ার ও অধিকারের কথাকে যদি কোন ব্যক্তি অন্যের আছে বলে বিশ্বাস করে নেয়, তাহলে এর মানে হবে, সে তাকে রব (প্রভু) মেনে নিয়েছে। এই আয়াতে সেই লোকদের জন্য বড় সতর্কতা রয়েছে, যারা নিজেদের ইমাম-বুযুর্গদেরকে হালাল-হারাম করার অধিকার দিয়ে রেখেছে এবং যাদের কাছে তাঁদের কথার তুলনায় কুরআন হাদীসের উক্তির কোন গুরুত্ব নেই।

আত-তাওবা 9:32

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, অথচ আল্লাহ স্বীয় নূর (দ্বীন-ইসলাম)কে পূর্ণত্বে পৌঁছানো ব্যতীত নিরস্ত হবেন না, যদিও অবিশ্বাসীরা অপ্রীতিকর মনে করে। [১] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা রসূল (সাঃ)-কে যে সত্য দ্বীন এবং হিদায়াত দিয়ে প্রেরণ করেছেন, ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ও মুশরিকরা চায় যে, বিতর্ক ও মিথ্যারোপের মাধ্যমে তা নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আর তার উপমা হল এমন এক ব্যক্তির যে সূর্যের কিরণ অথবা চাঁদের জ্যোৎস্নাকে নিজের ফুৎকার দ্বারা নিভিয়ে ফেলতে চায়। সুতরাং এটা যেমন অসম্ভব, ঠিক তেমনি যে সত্য দ্বীন আল্লাহ তাআলা রসূল (সাঃ)-কে দিয়ে পাঠিয়েছেন তা দুনিয়া থেকে মুছে বা মিটিয়ে ফেলা অসম্ভব। এ ধর্ম অন্যান্য সমস্ত ধর্মের উপর বিজয়ী থাকবে; যেমন পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা সে কথা উল্লেখ করেছেন। 'কাফের' শব্দের আভিধানিক অর্থ হল গোপনকারী। এই জন্য রাতকেও 'কাফের' বলা হয়; যেহেতু রাত নিজ অন্ধকার দ্বারা সমস্ত বস্তুকে গোপন করে নেয়। অনুরূপ কাফেররাও আল্লাহর 'নূর' (জ্যোতি)-কে গোপন করতে চায় অথবা নিজেদের হৃদয়ে কুফরী ও মুনাফিকববী এবং মুসলিম এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও শত্রুতা লুকিয়ে রাখে, এই জন্য তাদেরকেও 'কাফের' বলা হয়।

আত-তাওবা 9:33

তিনিই পথনির্দেশ (কুরআন) এবং সত্য ধর্ম সহ নিজ রসূল প্রেরণ করেছেন, যাতে তাকে সকল ধর্মের উপর জয়যুক্ত করেন, [১] যদিও অংশীবাদীরা অপ্রীতিকর মনে করে। [১] দলীল ও প্রমাণের দিক দিয়ে এ বিজয় সর্বকালের জন্য। তথাপি যখনই মুসলিমরা দ্বীনের উপর আমল করেছে, তখনই তাদের পার্থিব বিজয় লাভ হয়েছে। আর এখনো যদি মুসলিমরা দ্বীনের উপর আমল করে, তাহলে তাদের বিজয়ও অবশ্যম্ভাবী হবে। এই ব্যাপারে আল্লাহর ওয়াদাও আছে যে, আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে, তবে শর্ত হল যে, মুসলিমদেরকে আল্লাহর দলে পরিণত হতে হবে।

আত-তাওবা 9:34

হে মুমিনগণ! নিশ্চয় অনেক পন্ডিত-পুরোহিত মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায় উপায়ে ভক্ষণ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে থাকে।[১] আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। [২] [১] أحبَار শব্দটি حِبْر এর বহুবচন। এটা এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কথাকে খুব সুন্দর করে পেশ করার দক্ষতা রাখে। আর সুন্দর ও নকশাদার পোশাককেও ثَوبٌ مُحَبِّر বলা হয়ে থাকে। এখানে উদ্দেশ্য ইয়াহুদী উলামা। رُهبَان শব্দটি رَاهِب এর বহুবচন যার উৎপত্তি رهبنة শব্দ থেকে। এ থেকে উদ্দেশ্য নাসারা উলামা। কারো কারো নিকটে এ থেকে উদ্দেশ্য হল, নাসারাদের সুফীগণ। উলামার জন্য তাদের নিকট বিশেষ শব্দ قسّيسين রয়েছে। এই উভয় শ্রেণীর ধর্মধ্বজীরা এক তো আল্লাহর কালামকে বিকৃত ও পরিবর্তিত করে লোকদেরকে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক ফতোয়া ও বিধান দিত এবং এইভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে বাধা প্রদান করত। আর দ্বিতীয়তঃ এই পন্থায় তারা তাদের নিকট হতে অর্থ উপার্জন করত; যা তাদের জন্য হারাম ও বাতিল ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বহু সংখ্যক মুসলিম উমালাদের অবস্থাও ওদের মতই। আর এ হল নবী (সাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার প্রমাণ। যাতে তিনি বলেছিলেন لتتّبعن سنن من كان قبلكم অর্থাৎ, "তোমরা অবশ্যই পূর্ববর্তী উম্মতদের তরীকা অনুসরণ করবে।" (বুখারীঃ ই'তিসাম অধ্যায়) [২] আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন যে, এটা যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের আদেশ। যাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর যাকাত দ্বারা আল্লাহ তাআলা মাল-ধনকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেন। এই জন্য উলামাগণ বলেন, যে মাল থেকে যাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে নিন্দনীয়) 'জমা করে রাখা' মাল নয়। আর যে মাল থেকে যাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে 'জমা করে রাখা' ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই কুরআনী ধমক। সুতরাং সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "প্রত্যেক সোনা ও চাঁদীর অধিকারী ব্যক্তি যে তার হক (যাকাত) আদায় করে না, যখন কিয়ামতের দিন আসবে তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদীকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবে। অতঃপর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবে। যখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই তা পুনরায় গরম করে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছে। অতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় জান্নাতের দিকে না হয় দোযখের দিকে।" (মুসলিম যাকাত অধ্যায়) বলাই বাহুল্য যে, পূর্বোক্ত শ্রেণীর ভ্রষ্ট উলামা ও সূফীদের পরে ভ্রষ্ট ধনবানরাই সাধারণ মানুষদের ভ্রষ্টতার জন্য অধিকাংশে দায়ী। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মন্দ থেকে হিফাযতে রাখুন। আমীন।

আত-তাওবা 9:35

যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশ দাগা হবে, (আর বলা হবে) এ হচ্ছে তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চিত জিনিসের স্বাদ গ্রহণ কর।

আত-তাওবা 9:36

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট নিশ্চয়ই মাসসমূহের সংখ্যা হল বারো মাস। এর মধ্যে চারটি মাস হল নিষিদ্ধ (পবিত্র)।[১] এটাই সরল বিধান।[২] অতএব তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি যুলুম করো না।[৩] আর অংশীবাদীদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। [৪] আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ সাবধানীদের সাথে রয়েছেন। [১] আল্লাহর বিধান 'কিতাবুল্লাহ' থেকে উদ্দেশ্য হল 'লাওহে মাহফূয'। সৃষ্টির প্রারম্ভিক কাল থেকেই আল্লাহ তাআলা (বছরে) বার মাস নির্ধারিত করেছেন। তার মধ্যে চারটি মাস হল নিষিদ্ধ মাস, যাতে বিশেষ করে লড়াই-ঝগড়া নিষিদ্ধ। এই কথাকে নবী (সাঃ) এইভাবে বর্ণনা করেছেন, "যামানা ঘুরে-ফিরে পুনরায় সেই অবস্থাতে এসে গেছে যে অবস্থাতে তখন ছিল, যখন আল্লাহ তাআলা আকাশ-পৃথিবী রচনা করেছেন; বার মাসে এক বছর। যার মধ্যে চারটি হল নিষিদ্ধ মাস; তিনটি মাস ক্রমান্বয়ে যুলকা'দাহ, যুলহাজ্জাহ ও মুহাররাম। আর চতুর্থ মাসটি হল রজব মুযার; যা জুমাদাল আখের ও শা'বান মাসের মধ্যস্থলে পড়ে। (বুখারঃ কিতাবুত তাফসীর সূরা তাওবাহ ৯:পরিচ্ছেদ, মুসলিম ক্বাসামাহ অধ্যায়) "যামানা ঘুরে-ফিরে পুনরায় সেই অবস্থাতে এসে গেছে" এর অর্থ হল আরবের মুশরিকরা মাসগুলিকে নিয়ে যে আগা-পিছা করত (যার বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসছে) এ কথায় তার খন্ডন করা হয়েছে।[২] অর্থাৎ, এই মাসগুলি এই পর্যায়ক্রমে হওয়া যেমন আল্লাহ রেখেছেন, যার মধ্যে চার মাস হল নিষিদ্ধ মাস। আর এই হিসাবই সঠিক ও সংখ্যাও পরিপূর্ণ।[৩] অর্থাৎ, এই নিষিদ্ধ ও পবিত্র মাসগুলিতে লড়াই-ঝগড়া করে তার পবিত্রতা বিনষ্ট করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হয়ে।[৪] কিন্তু এই নিষিদ্ধ মাসগুলি অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর। তবে যদি তারা যুদ্ধ করতে বাধ্য করে, তাহলে নিষিদ্ধ মাসগুলিতেও তোমাদের জন্য যুদ্ধ করা বৈধ হবে।

আত-তাওবা 9:37

(এই মাসগুলোর পবিত্রতাকে অন্য মাসে) পিছিয়ে দেওয়া কুফরীর মধ্যে আরো বৃদ্ধি মাত্র, [১] যা দ্বারা অবিশ্বাসীদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয় (এইরূপে) যে, তারা সেই পবিত্র মাসকে কোন বছর বৈধ মনে করে এবং কোন বছর অবৈধ মনে করে। যাতে আল্লাহ যে মাসগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, তারা যেন সেগুলোর সংখ্যা পূর্ণ করে নিতে পারে,[২] অতঃপর আল্লাহ যা অবৈধ করেছেন তা বৈধ করে নেয়। তাদের মন্দ কর্মগুলো তাদের কাছে শোভনীয় করা হয়েছে। আর আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। [১] نَسِيء অর্থ হল পিছিয়ে দেওয়া। আরবেও নিষিদ্ধ মাসে লড়াই-ঝগড়া এবং লুটতরাজ করাকে খুবই অপছন্দ করা হত। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তিন মাসের পবিত্রতাকে খেয়াল রেখে যুদ্ধ ও লুট-হত্যা করা থেকে বিরত থাকা তাদের জন্য বড় সমস্যার বিষয় ছিল। এই জন্য এর সমাধান তারা এই বের করেছিল যে, যে নিষিদ্ধ মাসে তারা যুদ্ধ ও লুটমার করতে চাইত, তাতে তারা করে ফেলত এবং ঘোষণা করে দিত যে, এর পরিবর্তে অমুক মাস নিষিদ্ধ ও পবিত্র। উদাহরণ স্বরূপ মুহাররাম মাসের পবিত্রতাকে নষ্ট করে তার জায়গাতে সফর মাসকে পবিত্র মাস বলে নির্ধারিত করত। আর এইভাবে নিষিদ্ধ ও পবিত্র মাসগুলিতে আগে-পিছে ও রদ-বদল করতেই থাকত। এ কাজকে বলা হত نَسِيء। মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে বললেন, এটা হল কুফরীতে বাড়াবাড়ি। কেননা, এই পরিবর্তন ঘটানোর পশ্চাতে তাদের লড়াই-ঝগড়া ও পার্থিব স্বার্থলাভ করা ছাড়া অন্য কিছু উদ্দেশ্য নয়। আর নবী (সাঃ)ও এর সমাপ্তি ঘোষণা এই বলে করেছেন যে, যামানা ঘুরে-ফিরে নিজ অবস্থায় এসে গেছে। অর্থাৎ, এখন হতে আগামী মাসগুলির পর্যায়ক্রম তেমনিই থাকবে, যেমন বিশ্ব-সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে। [২] অর্থাৎ, এক মাসের পবিত্রতাকে নষ্ট করে তার জায়গাতে অন্য মাসকে হারাম নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য এই হত যে, আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাসকে পবিত্র করেছেন তার গণনা যেন পূর্ণ থাকে। গণনা পূর্ণ করায় আল্লাহর মতে একমত ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যে এই মাসগুলিতে লড়াই-ঝগড়া ও লুটতরাজ নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন তার তারা কোন পরোয়া করত না। বরং উক্ত প্রকার অন্যায়-অত্যাচার করার জন্য এই পরিবর্তন ঘটাত।

আত-তাওবা 9:38

হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের কি হলো যে, যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে (জিহাদে) বের হতে বলা হয়, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়। তবে কি তোমরা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন নিয়ে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস তো পরকালের তুলনায় অতি সামান্য।

আত-তাওবা 9:39

যদি তোমরা (জিহাদে) বের না হও, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতি সৃষ্টি করবেন, আর তোমরা তাঁর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।[১] আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। [১] রোমের খ্রিষ্টান বাদশাহ হিরাক্লের ব্যাপারে খবর পাওয়া গেল যে, তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-প্রস্ত্ততি নিচ্ছেন। সুতরাং নবী (সাঃ) তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিতে আদেশ করলেন। এটা ছিল শওয়াল মাসের ৯ হিজরীর ঘটনা। সময়টা ছিল প্রখর গ্রীষ্মের সময় আর সফরও ছিল খুব লম্বা। কোন কোন মুসলিম ও মুনাফিকবদের উপর এটা বড় কষ্টকর মনে হল; যার প্রকাশ এই আয়াতের মধ্যে করা হয়েছে এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করা ও ধমক দেওয়া হয়েছে। এটাকে তাবূক যুদ্ধ বলা হয়; যা আসলে ঘটেনি। ২০ দিন মুসলিমরা শাম দেশের নিকটবর্তী তাবূকে থেকে পুনরায় ফিরে এলেন। এ যুদ্ধের সৈন্যদেরকে 'জাইশুল উসরাহ' (সংকট-সৈন্য) বলা হয়। কেননা, এই দীর্ঘ সফরে সৈন্যদেরকে দীর্ঘ সময় বড় সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। اثَّاقَلتُم অর্থাৎ, অলস ভারাক্রান্ত হয়ে পিছনে থাকতে চাও। এর বহিঃপ্রকাশ কোন কোন লোকের মধ্যে হয়েছিল। কিন্তু এর সম্বন্ধ সকলের প্রতি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আত-তাওবা 9:40

যদি তোমরা তাকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য না কর, তাহলে আল্লাহই (তাকে সাহায্য করবেন যেমন তিনি) তাকে সাহায্য করেছিলেন সেই সময়ে, যখন অবিশ্বাসীরা তাকে (মক্কা হতে) বহিষ্কার করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল দুজনের মধ্যে একজন; যখন উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল। সে তখন স্বীয় সঙ্গী (আবু বাকর)কে বলেছিল, ‘তুমি বিষণ্ণ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।’[১] অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন এবং এমন সেনাদল দ্বারা তাকে শক্তিশালী করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনি[২] এবং তিনি অবিশ্বাসীদের বাক্য নীচু করে দিলেন, আর আল্লাহর বাণীই সমুচ্চ রইল।[৩] আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১] জিহাদ থেকে যারা পিছিয়ে থাকতে অথবা গা বাঁচাতে চায়, তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, যদি তোমরা সাহায্য না কর, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ তাআলা নিজ নবীর মদদ সেই সময়ও করেছিলেন যখন তিনি সওর গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর তাঁর সঙ্গী (আবু বকর (রাঃ))-কে বলেছিলেন, "চিন্তা করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।" এর বিস্তারিত বর্ণনা হাদীস গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। হিজরতের ঘটনায় আবু বাকর (রাঃ) বলেন, যখন আমরা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি নবী (সাঃ)-কে বলেছিলাম, 'ঐ মুশরিকরা (যারা আমাদের পিছন ধরেছে তারা) যদি নিজেদের পায়ের নিচে তাকায়, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে দেখে নেবে।' নবী (সাঃ) বললেন, "হে আবু বাকর! তোমার সেই দুই ব্যক্তি সম্বন্ধে কি ধারণা, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ?" অর্থাৎ, যাদের সাথে আল্লাহর সাহায্য ও মদদ রয়েছে। (বুখারীঃ সূরা তাওবার ব্যাখ্যা) [২] এখানে সেই দুই প্রকার সাহায্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর রসূল (সাঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন। প্রথমতঃ হল প্রশান্তি বা সান্ত্বনা এবং দ্বিতীয়তঃ হল ফিরিশতাদের সহযোগিতা। [৩] অবিশ্বাসী কাফেরদের বাক্য বলতে শিরক, আর আল্লাহর বাণী বলতে তাওহীদ উদ্দেশ্য। যেমন, এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল "একজন বীরত্বের শক্তি প্রকাশ করার জন্য যুদ্ধ করে, একজন স্বগোত্রের অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করে যুদ্ধ করে, আর অন্য একজন লোক দেখানোর জন্য যুদ্ধ করে, এদের মধ্যে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কার হয়? তিনি বললেন, "যে আল্লাহর কালেমা (বাণী)-কে সুউচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করে, তার যুদ্ধ আল্লাহর রাস্তায় হয়।" (বুখারীঃ ইলম অধ্যায়, মুসলিমঃ ইমারা অধ্যায়)

আত-তাওবা 9:41

দুর্বল হও অথবা সবল, সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও[১] এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে। [১] এর নানা অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, একাকী হও কিম্বা দলবদ্ধভাবে, খুশী হয়ে অথবা অখুশী হয়ে, গরীব হও অথবা আমীর, যুবক হও অথবা বৃদ্ধ, পায়ে হেঁটে হোক অথবা সওয়ার হয়ে, সন্তানবান হও অথবা সন্তানহীন, সৈন্যদলের অগ্রে থাকো অথবা পিছনে। ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, আয়াতটি এই সমস্ত অর্থের জন্য ব্যাপক হতে পারে। যেহেতু আয়াতের অর্থ এই যে, "তোমরা জিহাদে বের হও; চাহে তা তোমাদের জন্য ভারী মনে হোক অথবা হালকা।" আর এই অর্থে উল্লিখিত সমস্ত অর্থ এসে যায়।

আত-তাওবা 9:42

আশু লাভের সম্ভাবনা থাকলে[১] এবং সফরও সহজ হলে তারা অবশ্যই তোমার সহগামী হতো,[২] কিন্তু তাদের নিকট পথের দূরত্বই দীর্ঘতর বোধ হতে লাগল। আর তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, ‘যদি আমাদের সাধ্য থাকত, তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে বের হতাম।’ তারা (মিথ্যা বলে) নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে।[৩] আর আল্লাহ জানেন যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী। [১] এখান থেকে সেই সব লোকদের কথা আরম্ভ হচ্ছে, যারা ওজর পেশ করে নবী (সাঃ) থেকে অনুমতি নিয়েছিল; অথচ বাস্তবে তাদের ওজর বলতে কিছু ছিল না। عَرَضٌ থেকে উদ্দেশ্যঃ পার্থিব স্বার্থ, অর্থাৎ, গনীমতের মাল। [২] অর্থাৎ, তোমার সাথে জিহাদে শরীক হতো। কিন্তু দূর সফর তাদেরকে বাহানা খুঁজতে বাধ্য করল। [৩] অর্থাৎ, মিথ্যা কসম খেয়ে। কেননা, মিথ্যা কসম খাওয়া মহাপাপ।

আত-তাওবা 9:43

আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তোমার নিকট সত্যবাদী স্পষ্ট ও মিথ্যাবাদী জ্ঞাত হওয়ার পূর্বে তুমি তাদেরকে অনুমতি কেন দিলে?[১] [১] এখানে নবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে যে, জিহাদে শরীক না হওয়ার অনুমতি প্রার্থীদেরকে তাদের ওজর সত্য ছিল কি না, তা তদন্ত করে না দেখে কেন অনুমতি দিয়ে দিলে? কিন্তু এই তিরস্কারেও স্নেহের প্রভাব বেশী ছিল। এই জন্য উক্ত ত্রুটির ক্ষমার কথা প্রথমেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। জেনে রাখা দরকার যে, এই তিরস্কার এই জন্য করা হয়েছে যে, অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ার সাথে কাজ নেওয়া হয়েছে এবং পূর্ণভাবে সত্যতা যাচাই করে দেখার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। নচেৎ তদন্তের পর যার সত্যই ওজর আছে তাকে অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর তরফ থেকে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। যেমন তিনি বলেছেন, {فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضِ شَأْنِهِمْ فَأْذَن لِّمَن شِئْتَ مِنْهُمْ} "অতএব তারা তোমার কাছে তাদের কোন কাজের অনুমতি চাইলে তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দাও।" (সূরা নূর ২৪:৬২ আয়াত) 'যাকে ইচ্ছা' মানে হল, যার কাছে সত্যিকারে ওজর আছে, তাকে অনুমতি দেওয়ার অধিকার তোমার রয়েছে।

আত-তাওবা 9:44

যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, তারা নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ করার ব্যাপারে তোমার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করবে না।[১] আর আল্লাহ পরহেযগারদের সম্বন্ধে খুব অবগত আছেন। [১] এখানে খাঁটি মু'মিনদের আচরণ বর্ণনা করা হয়েছে। বরং তাদের অভ্যাসই তো এই যে, তারা বড়ই উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে অগ্রণী হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করে থাকে।

আত-তাওবা 9:45

অবশ্য ঐসব লোক তোমার কাছে অনুমতি চেয়ে থাকে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে না, আর তাদের অন্তরসমূহ সন্দেহগ্রস্ত। অতএব তারা নিজেদের সন্দেহে হতবুদ্ধি হয়ে রয়েছে।[১] [১] এখানে সেই মুনাফিক্বদের কথা বর্ণনা হচ্ছে, যারা ছোট্ট ধরনের বাহানা বের করে রসূলের সাথে জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল। তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না। আর তার অর্থ এই যে, সেই ঈমানহীনতাই তাদেরদেরকে জিহাদে না যেতে বাধ্য করেছিল। পক্ষান্তরে যদি ঈমান তাদের অন্তরে সুদৃঢ় হত, তাহলে তারা না জিহাদ থেকে গা বাঁচাতো, আর না-ই তাদের মনে কোন প্রকার সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি হতো। জেনে রাখা দরকার যে, উক্ত জিহাদে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে মুসলিমরা চার দলে বিভক্ত ছিলেন। প্রথম দল হল তাঁরা, যাঁরা নির্দ্বিধায় প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দল তাঁরা, যাঁদের প্রথম প্রথম দ্বিধা ছিল এবং তাঁদের মন ভ্রষ্ট ছিল। কিন্তু সত্বর তাঁরা সে দ্বিধাকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তৃতীয় দল তাঁরা, যাঁদের শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার কারণে অথবা সওয়ারী ও সফরের খরচ না থাকার কারণে সত্যসত্যই ওজর ছিল। যাঁদেরকে স্বয়ং আল্লাহ অনুমতি দান করেছিলেন। (এ ব্যাপারে বর্ণনা ৯১-৯২নং আয়াতে এসেছে।) চতুর্থ দল তাঁরা, যাঁরা কেবল অলসতার কারণে শরীক হননি এবং যখন নবী (সাঃ) ফিরে এলেন তখন তাঁরা নিজেদের ত্রুটি ও গোনাহর কথা স্বীকার করে নিজেদেরকে তওবা ও শাস্তির জন্য পেশ করে দিলেন। এ ছাড়া বাকী লোকেরা মুনাফিক্বদল ও তাদের গুপ্তচর ছিল। এখানে মুসলিমদের প্রথম দল এবং মুনাফিক্বদের কথা উল্লেখ হয়েছে। বাকী তিন দল মুসলিমদের বর্ণনা পরবর্তীতে আসবে।

আত-তাওবা 9:46

আর যদি তারা (যুদ্ধে) বের হওয়ার ইচ্ছা করত, তাহলে এর কিছু সরঞ্জাম তো প্রস্তুত করত,[১] কিন্তু আল্লাহ তাদের যাত্রাকে অপছন্দ করেছেন, এ জন্য তাদেরকে বিরত রাখলেন[২] এবং বলে দেওয়া হলো, ‘তোমরাও বসে থাকা (অক্ষম) লোকদের সাথে বসে থাকো।’ [৩] [১] যারা মিথ্যা ওজর পেশ করে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি লাভ করেছিল এ কথা সেই মুনাফিক্বদের সম্বন্ধে বলা হচ্ছে যে, যদি তারা জিহাদে যাবার ইচ্ছা রাখত, তাহলে অবশ্যই তার জন্য প্রস্তুতি নিত। [২] فثَبَّطَهُم শব্দের অর্থ হল, তাদেরকে বিরত রাখলেন। অর্থাৎ, পিছনে থেকে যাওয়া তাদের কাছে পছন্দনীয় বানিয়ে দেওয়া হল। সুতরাং তারা অলস হয়ে গেল এবং মুসলিমদের সাথে বের হল না। (আইসারুত্ তাফাসীর) উদ্দেশ্য হল যে, তাদের বদমায়েশি ও দুরভিসন্ধি সম্পর্কে আল্লাহ অবগত ছিলেন। এই জন্য আল্লাহর তকদীরগত ইচ্ছা এটাই ছিল যে, তারা না যাক। [৩] এটা সেই আল্লাহর ইচ্ছার প্রকাশরূপ আদেশ, যা তকদীরে লেখা ছিল। অথবা অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হয়ে রসূল (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ঠিক আছে! তোমরা নারী, শিশু, রোগী ও বৃদ্ধদের দলে শামিল হয়ে তাদের মত ঘরে বসে থাক।

আত-তাওবা 9:47

যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত তাহলে কেবল তোমাদের মাঝে বিভ্রাটই বৃদ্ধি করত[১] এবং তারা তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছুটাছুটি করত।[২] আর তোমাদের মধ্যে তাদের কতিপয় অনুগত (গুপ্তচর) রয়েছে। [৩] আল্লাহ যালেমদের সম্বন্ধে খুব অবগত আছেন। [১] এই মুনাফিক্বরা যদি মুসলিম সৈন্যদলে শরীক হত, তাহলে এরা ভুল রায় ও পরামর্শ দিয়ে মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির কারণ হত। [২] إيضاع শব্দের অর্থ হল নিজ সওয়ারীকে দ্রুতবেগে দৌড়ানো। অর্থাৎ চুগলখোরী প্রভৃতি দ্বারা তোমাদের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি করায় ছুটাছুটি করত এবং তাতে তারা কোন একটি মিনিটও বরবাদ করত না। আর এখানে 'ফিতনা' থেকে উদ্দেশ্য আপোসের মাঝে বিচ্ছিন্নতা, শত্রুতা ও বিদ্বেষ। [৩] এ থেকে জানা যায় যে, মুনাফিক্বদের গোয়েন্দাগিরী করার জন্য কিছু মানুষ মু'মিনদের সাথেও সৈন্যদলে শামিল ছিল, যারা মুনাফিক্বদের নিকট মুসলিমদের খবর পৌঁছে দিত।

আত-তাওবা 9:48

তারা তো পূর্বেও ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল, আর তোমার (ক্ষতি সাধনের) জন্য কর্মসমূহ উলট-পালট করেছিল। পরিশেষে সত্য সমাগত হল এবং আল্লাহর দ্বীন বিজয় লাভ করল[১] অথচ তাদের কাছে এটা অপ্রীতিকরই ছিল। [২] [১] এই জন্য অতীত ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে তোমাকে অবহিত করা হয়েছে। আর এ কথাও বলা হয়েছে যে, এই মুনাফিক্বদল যে তোমাদের সাথে যায়নি তাতে তোমাদের জন্য মঙ্গলই হয়েছে। নচেৎ যদি তারা যেত, তাহলে তাদের কারণে এই সকল বিপর্যয় সৃষ্টি হত। [২] অর্থাৎ, এই মুনাফিক্বরা যখন থেকে তুমি মদীনায় আমগন করেছ তখন থেকেই তোমার বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টি করতে এবং তোমার (ক্ষতি সাধনের) জন্য কর্মসমূহ উলট-পালট করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিশেষে বদর যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিজয় ও আধিপত্য দান করলেন; যা তাদের জন্য অসহনীয় ও অপছন্দনীয় ছিল। অনুরূপ উহুদ যুদ্ধেও ঐ মুনাফিক্বদল রাস্তা থেকেই ফিরে এসে সমস্যা সৃষ্টি করার এবং তারপরও প্রত্যেক জায়গাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করেই আসছিল। পরিশেষে মক্কা জয় হল এবং অধিকাংশ আরববাসীরা মুসলমান হয়ে গেল। যার কারণে তারা আক্ষেপ ও আফসোসে হাত মলতে থেকে গেল।

আত-তাওবা 9:49

আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যে বলে, ‘আমাকে (যুদ্ধে না যাওয়ার) অনুমতি দাও এবং আমাকে ফিতনায় ফেলো না।’ সাবধান! তারা তো ফিতনায় পড়েই গেছে। আর নিশ্চয়ই জাহান্নাম অবিশ্বাসীদেরকে বেষ্টন করবে। [১] [১] 'আমাকে ফিতনায় ফেলো না' এর একটা অর্থ হল যে, যদি তুমি আমাকে অনুমতি না দাও, তাহলে বিনা অনুমতিতে থেকে গেলে আমার মহাপাপ হবে। এই হিসাবে ফিতনার অর্থে হবে পাপ। অর্থাৎ, 'আমাকে পাপে ফেলো না।' ফিতনার দ্বিতীয় অর্থ ধ্বংস। অর্থাৎ, আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসে পতিত করো না। কথিত আছে যে, জাদ্দ্ বিন কাইস আরয করল যে, '(হে মুহাম্মাদ!) তুমি আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে ফিতনায় ফেলো না। কারণ রোমান মহিলাদেরকে দেখে আমি ধৈর্য ধারণ করতে পারব না।' তার কথা শুনে নবী (সাঃ) মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তাকে না যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। পরক্ষণে এই আয়াত অবতীর্ণ হল। আল্লাহ তাআলা বললেন, "তারা তো ফিতনায় পড়েই রয়েছে।" অর্থাৎ, জিহাদ থেকে দূরে সরে থাকা এবং তা বর্জন করা তো স্বস্থানে একটা বড় ফিতনা ও মহাপাপ; যাতে তারা আলিপ্ত আছে। আর মরণের পর জাহান্নাম তাদেরকে বেষ্টন করবে; যেখান হতে পালিয়ে যাওয়ার কোন পথ পাবে না।

আত-তাওবা 9:50

যদি তোমার প্রতি কোন মঙ্গল উপস্থিত হয়, তাহলে তাতে দুঃখিত হয়। আর যদি তোমার উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো প্রথম থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম’, এবং তারা খুশী হয়ে ফিরে যায়। [১] [১] বাগধারায় এখানে حسنةٌ (মঙ্গল) বলে সাফল্য ও গনীমতের মাল, আর سيئةٌ (বিপদ) বলে অসাফল্য, পরাজয় এবং যুদ্ধে অনুরূপ আশঙ্কনীয় ক্ষতিকে বুঝানো হয়েছে। উক্ত আচরণে সেই অভ্যন্তরীণ অপবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যা মুনাফিক্বদের অন্তরে বিদ্যমান ছিল। যেহেতু অপরের বিপদের সময় আনন্দিত হওয়া এবং মঙ্গল লাভের সময় মনে দুঃখ ও কষ্ট অনুভব করা হল, নিতান্ত শত্রুতার নিদর্শন।

আত-তাওবা 9:51

তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ আমাদের উপর আসতে পারে না। তিনিই আমাদের কর্মবিধায়ক। আর বিশ্বাসীদের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করা।’ [১] [১] এ কথা মুনাফিক্বদের জবাবে মুসলিমদেরকে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং উৎসাহ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। কেননা, যখন মানুষ এ কথার বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর লিখিত কর্ম অবশ্যই ঘটবে এবং যা কিছু বিপদ ও মঙ্গল আমাদের কাছে আসবে, তা আল্লাহর নির্ধারিত তকদীরের অংশবিশেষ। তখন মানুষের জন্য বিপদ বরদাস্ত করা সহজ হয়ে যায় এবং তার উৎসাহে বৃদ্ধি সাধন হয়।

আত-তাওবা 9:52

তুমি বলে দাও, ‘তোমরা কেবল আমাদের জন্য দু’টি মঙ্গলের মধ্যে একটি মঙ্গলের প্রতীক্ষায় রয়েছ;[১] আর আমরা তোমাদের জন্য এই প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ হতে অথবা আমাদের হাত দ্বারা কোন শাস্তি প্রদান করবেন।[২] অতএব তোমরা অপেক্ষা করতে থাক, আমরা তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ রইলাম।’ [১] অর্থাৎ, বিজয় অথবা শহীদী মরণ; উভয়ের মধ্যে যেটাই লাভ হয়, সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গলকর। [২] অর্থাৎ, আমরা তোমাদের ব্যাপারে দু'টি অমঙ্গলের মধ্যে একটির অপেক্ষা করছি, হয় আসমান থেকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর আযাব প্রেরণ করবেন যাতে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, না হয় আমাদের হাতে আল্লাহ তোমাদেরকে হত্যা কিম্বা বন্দী হওয়ার শাস্তি প্রদান করবেন। আর তিনি উভয় ব্যাপারে শক্তিমান।

আত-তাওবা 9:53

তুমি (আরো) বলে দাও, ‘তোমরা সন্তুষ্টির সাথে ব্যয় কর কিংবা অসন্তুষ্টির সাথে, তোমাদের পক্ষ থেকে তা কখনই গৃহীত হবে না; [১] নিঃসন্দেহে তোমরা আদেশ লংঘনকারী সমাজ।’ [১] أنفِقُوا আদেশসূচক ক্রিয়া। কিন্তু এখানে শর্ত ও জাযার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, যদি তোমরা ব্যয় কর, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কিম্বা এখানে আদেশ খবরের অর্থে এসেছে। উদ্দেশ্য হল, উভয় কর্মই সমান; ব্যয় কর অথবা না কর। তোমরা সন্তুষ্টির সাথে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলেও তা অগ্রহণযোগ্য। কেননা, তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হল ঈমান। আর সেটাই তোমাদের মাঝে নেই। পক্ষান্তরে অসন্তুষ্টির সাথে খরচ করা মাল এমনিতেই আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত। কেননা, এখানে সঠিক উদ্দেশ্য বিদ্যমান নেই, যা কবুল হওয়ার জন্য জরুরী। এই আয়াতটি সেইরূপ যেরূপ আল্লাহ পাক বলেন, {اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لاَ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ} "তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর।" (সুরা তাওবাহ ৮০ আয়াত) অর্থাৎ, উভয়ই সমান।

আত-তাওবা 9:54

আর তাদের দান-খয়রাত গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে, আর তারা নামাযে শৈথিল্যের সাথেই উপস্থিত হয় এবং তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই দান করে থাকে। [১] [১] এখানে তাদের স্বাদক্বাহ কবুল না হওয়ার তিনটি কারণ দর্শানো হয়েছে। প্রথম হল, তাদের কুফর ও অবাধ্যাচরণ। দ্বিতীয় হল, শৈথিল্যের সাথে নামায আদায় করা। যেহেতু, না তারা নামাযের সওয়াবের আশা রাখে, আর না-ই তা ত্যাগ করা দরুন শাস্তিকে ভয় করে। কেননা, আশা ও ভয় হল ঈমানের নিদর্শন, যা হতে তারা বঞ্চিত। আর তৃতীয় হল, তারা সন্তুষ্টচিত্তে খুশীর সাথে দান-খয়রাত করে না। আর যে কাজে অন্তর সন্তুষ্ট থাকে না, সে কাজ কবুল হয় কি করে? আসল কথা হল এই তিনটি কারণ এমন যে, তার মধ্যে একটি কারণই আমল কবুল না হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাহলে যে আমলে এই তিনটি কারণই একত্রিত হবে, সে আমল যে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়, তাতে কি কোন সন্দেহ থাকতে পারে?

আত-তাওবা 9:55

অতএব তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তানাদি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে। [১] আল্লাহর ইচ্ছা শুধু এটাই যে, এসব বস্তুর মাধ্যমে তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি প্রদান করবেন[২] এবং তাদের প্রাণ কাফের অবস্থাতে দেহত্যাগ করবে। [৩] [১] কারণ, এ সব তাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। যেমন মহান আল্লাহ আরো বলেন, "আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না।" (সূরা ত্বাহা ২০:১৩১ আয়াত) "তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্য স্বরূপ যে ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি দান করি তার দ্বারা তাদের জন্যে সর্বপ্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? বরং তারা বুঝে না।" (সূরা মু'মিনূন ২৩:৫৫-৫৬ আয়াত)[২] ইমাম ইবনে কাসীর এবং ইবনে জারীর ত্বাবারী (রঃ) বলেছেন, এ শাস্তি থেকে যাকাত ও আল্লাহর রাস্তায় দান-খয়রাত উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, এই মুনাফিক্বদের নিকট থেকে যাকাত ও স্বাদক্বাহ (যা তারা নিজেদেরকে মুসলমান প্রকাশ করার জন্য দিয়ে থাকে তা) দুনিয়াতে কবুল করে নেওয়া হোক, যাতে এইভাবে তাদেরকে সম্পদের মারও দুনিয়াতে দেওয়া হয়।[৩] পরন্তু তাদের মৃত্যু কুফরী অবস্থায় আসবে। যেহেতু, তারা আল্লাহর পয়গম্বরকে সত্য হৃদয়ে স্বীকার করতে রাজী নয়; বরং তারা তাদের কুফরী ও নিফাকেই দস্তরমত অটল রয়েছে।

আত-তাওবা 9:56

আর তারা আল্লাহর কসম করে বলে যে, তারা (মুনাফিকরা) তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তারা হচ্ছে ভীতু সম্প্রদায়। [১] [১] এই ভীরুতার ফলেই তারা মিথ্যা কসম খেয়ে এটা প্রকাশ করতে চায় যে, আমরাও তোমাদের দলভুক্ত।

আত-তাওবা 9:57

যদি তারা কোন আশ্রয়স্থল অথবা গিরি-গুহা কিংবা লুকাবার একটু স্থান (তহখানা) পায়, তাহলে তারা অবশ্যই (লাগামহীন ঘোড়ার মত) ক্ষিপ্রগতিতে সেই দিকে পলায়ন করবে। [১] [১] অর্থাৎ, দ্রুত গতিতে পলায়ন করে নিজেদের আশ্রয়স্থলে চলে যাবে। যেহেতু তোমাদের সাথে তাদের যতটা সম্পর্ক আছে তা সম্প্রীতি ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে নয়, বরং শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার ভিত্তিতে।

আত-তাওবা 9:58

আর তাদের মধ্যে এমন কতক লোক রয়েছে যারা স্বাদক্বার (বণ্টন) ব্যাপারে তোমার প্রতি দোষারোপ করে।[১] অতঃপর যদি তারা ঐ সমস্ত স্বাদক্বাহ হতে (অংশ) প্রাপ্ত হয়, তাহলে তারা সন্তুষ্ট হয়, আর যদি তারা তা থেকে (অংশ) না পায়, তাহলে ক্ষুব্ধ হয়।[২] [১] এ হল তাদের আর একটি বড় ত্রুটির বিবরণ যে, তারা নবী (সাঃ)-এর ন্যায়পরায়ণ প্রশংসনীয় ব্যক্তিত্বকে (নাউযু বিল্লাহ) স্বাদক্বাহ-খয়রাত ও গনীমতের মাল বণ্টনে ইনসাফহীন বলত। যেমন হাদীসে এসেছে যে, তিনি একদা স্বাদক্বার মাল বণ্টন করছিলেন। ইত্যবসরে ইবনু যিল খুয়াইসিরা বলে উঠল, বণ্টনে ইনসাফ করুন। তিনি বললেন, "আফসোস তোমার প্রতি! আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে আর কে করবে?" (বুখারীঃ মানাকিব অধ্যায়, মুসলিমঃ যাকাত অধ্যায়) [২] তার মানে, এই অপবাদ দেওয়ার আসল উদ্দেশ্য হল অর্থ লাভ করা। যাতে তাদেরকে ভয় করে তিনি বেশী দেন অথবা তারা এই মাল পাওয়ার উপযুক্ত হোক আর না-ই হোক, তাদেরকে যেন অবশ্যই তার ভাগ দেওয়া হয়।

আত-তাওবা 9:59

আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাদেরকে যা কিছু দান করেছিলেন যদি তারা তা নিয়ে সন্তুষ্ট হত, আর বলত, ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, ভবিষ্যতে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ হতে আমাদেরকে আরো দান করবেন এবং তাঁর রসূলও, আমরা আল্লাহরই প্রতি আগ্র আগ্রহান্বিত রইলাম।’ (তাহলে তা তাদের জন্য উত্তম হত।)

আত-তাওবা 9:60

(ফরয) স্বাদক্বাসমূহ শুধুমাত্র নিঃস্ব,[১] অভাবগ্রস্ত এবং স্বাদক্বাহ (আদায়ের) কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের মনকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করা আবশ্যক তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (সংগ্রামকারী) ও (বিপদগ্রস্ত) মুসাফিরের জন্য।[২] এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত (ফরয বিধান)। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। [১] এই আয়াতে সমালোচনার দরজা বন্ধ করার জন্য স্বাদক্বাহ পাওয়ার হকদার লোকদের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। এখানে স্বাদক্বাসমূহ থেকে উদ্দেশ্য যাকাত। আয়াতের প্রারম্ভে إنَّمَا শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; যা সীমাবদ্ধ বা নির্দিষ্টীকরণের জন্য আসে। الصَّدَقَات শব্দে ال আর্টিক্যালটি শ্রেণী বুঝাবার জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, (যাকাত) শ্রেণীর স্বাদক্বাহ এই আট ধরনের লোকদের উপর সীমাবদ্ধ বা তাদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যাদের উল্লেখ আয়াতে এসেছে। এরা ছাড়া অন্য কারো জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শুদ্ধ নয়। উলামাদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, এই আট প্রকার লোক সকলের মাঝেই যাকাত বণ্টন করা জরুরী। নাকি এদের মধ্য হতে যাদের মাঝে ইমাম অথবা যাকাত আদায়কারী প্রয়োজন মনে করবে প্রয়োজন মোতাবেক বণ্টন করতে পারেন? ইমাম শাফেয়ী (রঃ) প্রভৃতিগণ প্রথম রায়টিকে এবং ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রভৃতিগণ দ্বিতীয় রায়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় রায়টিই হল অধিক সঠিক। ইমাম শাফেয়ী (রঃ)এর রায় মোতাবেক যাকাতের অর্থ কুরআনে বর্ণিত আট ধরনের লোকদের মধ্যে সকলের উপর ব্যয় করা জরুরী। অর্থাৎ, অধিকতর প্রয়োজন ও বৃহত্তর কল্যাণের খাত না দেখেই অর্থকে আট ভাগ করে আট জায়গাতেই কিছু কিছু করে খরচ করতে হবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় রায় অনুযায়ী অধিকতর প্রয়োজন ও বৃহত্তর কল্যাণের খেয়াল রাখা জরুরী। সুতরাং যে খাতে অর্থ ব্যয় করা অধিক প্রয়োজন অথবা যদি কোন খাতে ব্যয় করা অধিক জরুরী হয়, তাহলে সেখানে প্রয়োজন মত যাকাতের মাল ব্যয় করা যাবে। যদিও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার জন্য অর্থ অবশিষ্ট না থাকে। এই রায়ে যেসব যৌক্তিকতা রয়েছে, তা প্রথম রায়ে নেই। [২] উক্ত আট প্রকার খাতের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এইরূপঃ- (ক-খ) 'ফকীর ও মিসকীন' (নিঃস্ব-অভাবগ্রস্ত): যেহেতু উভয় শব্দ প্রায় সমতুল্য; একটি অপরের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ফকীরকে মিসকীন ও মিসকীনকে ফকীর বলা হয়ে থাকে। সেহেতু এই দুয়ের সংজ্ঞাতে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। যদিও উভয় শব্দের অর্থে এ কথা সুনিশ্চিত যে, যে অভাবী, যে নিজ প্রয়োজন ও দরকার পূর্ণ করার জন্য চাহিদা অনুযায়ী টাকা-পয়সা ও উপকরণ থেকে বঞ্চিত, তাকেই ফকীর-মিসকীন বলা হয়। মিসকীনের ব্যাপারে এক হাদীস এসেছে যে, নবী (সাঃ) বলেছেন, 'মিসকীন' সে নয় যে দু-এক লোকমার জন্য বা দু-একটি খেজুরের জন্য লোকের দরজায় দরজায় ঘুরে ফিরে বেড়ায়। বরং 'মিসকীন' তো সেই যার কাছে এতটা পরিমাণ মাল থাকে না, যাতে তার প্রয়োজন মিটে যায়। যে না নিজের দরিদ্রতাকে প্রকাশ করে যে, লোকে তাকে গরীব ও হকদার বুঝে স্বাদক্বা-খায়রাত করবে। আর না সে নিজে থেকে কারো কাছে যাচ্ঞা করে। (বুখারী ও মুসলিম যাকাত অধ্যায়) হাদীসে আসল মিসকীন উক্ত ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা হয়েছে। নচেৎ ইবনে আব্বাস প্রভৃতিগণের নিকট 'মিসকীন'-এর সংজ্ঞা হল, যে অভাবী এবং ঘুরে-ফিরে লোকের কাছে ভিক্ষা ও যাচ্ঞা করে বেড়ায়। আর 'ফকীর'-এর সংজ্ঞা হল, যে অভাবী হওয়া সত্ত্বেও চাওয়া ও যাচ্ঞা করা হতে বিরত থাকে। (ইবনে কাসীর) (গ) স্বাদক্বা (আদায়ের) কাজে নিযুক্ত কর্মচারীঃ এ থেকে উদ্দেশ্য সরকারের সেইসব কর্মচারী যারা যাকাত ও স্বাদক্বা আদায় ও বণ্টন এবং হিসাব-নিকাশ করার দায়িত্বে নিযুক্ত। (পারিশ্রমিক ও বেতন স্বরূপ এদেরকে যাকাতের মাল দেওয়া চলবে।) (ঘ) যাদের মনকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করা আবশ্যকঃ প্রথমতঃ সেই কাফের যে কিছু কিছু ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়, এমন ব্যক্তিকে সাহায্য করলে আশা করা যায় যে, সে ইসলাম গ্রহণ করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই নও-মুসলিম যাকে ইসলামে দৃঢ়স্থির থাকার জন্য সাহায্য করার দরকার হয়। তৃতীয়তঃ সেই লোকও এর শামিল যাকে সাহায্য করলে আশা করা যায় যে, সে নিজের এলাকার লোকদেরকে মুসলিমদের উপর হামলা করা থেকে বিরত রাখবে এবং অনুরূপভাবে সে নিজের নিকটতম মুসলিমদেরকে রক্ষা করবে। উক্ত সকল লোক এবং এই শ্রেণীর আরো অন্যান্য লোকের উপর যাকাতের মাল ব্যয় করা যেতে পারে; চাহে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ ধনবান হোক না কেন। হানাফীদের নিকটে এই খাত বর্তমানে অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এ কথা শুদ্ধ নয়। অবস্থা ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক যামানাতে এই খাতের উপর যাকাতের অর্থ খরচ করা বৈধ। (ঙ) দাসমুক্তিঃ কিছু কিছু উলামাগণ 'দাস' বলতে কেবল সেই দাস উদ্দেশ্য মনে করেছেন, যার মালিক তাকে তার ত্রুয়-মূল্য উপার্জন করে দেওয়ার শর্তে মুক্তির চুক্তি লিখে দিয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য উলামাগণ সর্বপ্রকার যুদ্ধবন্দী ও ক্রীতদাসকে বুঝিয়েছেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) শেষোক্ত রায়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। (চ) ঋণগ্রস্তঃ এ থেকে প্রথমতঃ সেই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে নিজ পরিবারের খরচাদি এবং জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে লোকদের কাছে ঋণ গ্রহণ করেছে। আর তার কাছে নগদ কোন টাকা পয়সা নেই এবং এমন কোন আসবাব-পত্রও (বা জমি-জায়গাও) নেই যা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ সেই যামিন ব্যক্তি যে কারো যামিন হয়েছে, অতঃপর যামানতের টাকা তার আসল যিম্মেদার আদায় করতে না পারলে তার ঘাড়ে এসে পড়েছে। তৃতীয়তঃ যার ফল-ফসলাদি দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে বা বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তার ফলে সে ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছে। এই সমস্ত লোকদেরকে যাকাতের ফান্ড্ থেকে সাহায্য করা বৈধ। (ছ) আল্লাহর পথঃ এর অর্থ হল জিহাদ। অর্থাৎ, যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র ক্রয় করতে এবং মুজাহিদের জন্য (চাহে সে ধনবান হোক না কেন) যাকাতের মাল ব্যয় করা জায়েয। আর হাদীসে এসেছে যে, হজ্জ এবং উমরাহও 'ফী সাবীলিল্লাহ'র অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ কিছু উলামাগণের নিকট ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজও 'ফী সাবীলিল্লাহ'র অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতেও জিহাদের মতই আল্লাহর কলেমাকে উচ্চ করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। (জ) মুসাফিরঃ অর্থাৎ, যদি কোন মুসাফির (বৈধ) সফরে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে; সে যদিও তার দেশে বা ঘরে প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে থাকে, তবুও যাকাতের খাত থেকে তার মদদ করা বৈধ।

আত-তাওবা 9:61

তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং বলে, ‘সে প্রত্যেক কথায় কর্ণপাত করে থাকে।’ তুমি বলে দাও, ‘সে কর্ণপাত তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর।[১] সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং মুমিনদের (কথাকে) বিশ্বাস করে। আর সে তোমাদের মধ্যে বিশ্বাসী লোকদের জন্য করুণাস্বরূপ। যারা আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয় তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।’ [১] এখানে পুনরায় মুনাফিক্বদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। নবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে এক অশালীন আচরণ প্রদর্শন করে বলতে লাগল যে, সে বড় কান-পাতলা! অর্থাৎ, সে প্রত্যেকের (প্রত্যেক) কথা শোনে (ও মেনে) নেয়। (সম্ভবতঃ নবী (সাঃ)-এর সহনশীলতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার দেখে তাদের এ ব্যাপারে ধোকা হয়েছিল।) আল্লাহ তাআলা বললেন, না! আমার পয়গম্বর মন্দ ও অশান্তির কোন কথা শোনে না। যা শোনে তা তোমাদের জন্য মঙ্গলদায়ক এবং ভাল। (যেমন তোমরা মিথ্যা কসম খেয়ে ও মিথ্যা ওজর পেশ করে তার কাছে ক্ষমা চাইলে সে তোমাদের মুখের কথা শুনে ক্ষমা করে দেয়। আর এটা তোমাদের জন্য অবশ্যই উত্তম।)

আত-তাওবা 9:62

তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তারা তোমাদের কাছে আল্লাহর শপথ করে থাকে। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রসূল হচ্ছেন বেশী হকদার (এই বিষয়ে) যে, তারা যেন তাঁকে সন্তুষ্ট করে; যদি তারা বিশ্বাসী হয়ে থাকে।

আত-তাওবা 9:63

তারা কি জানে না যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহলে সুনিশ্চিতভাবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন; সে তাতে অনন্তকাল থাকবে। এটা হচ্ছে চরম লাঞ্ছনা।

আত-তাওবা 9:64

মুনাফিকরা আশংকা করে যে, তাদের (মুসলমানদের) প্রতি এমন কোন সূরা নাযিল হয়ে পড়ে, যা তাদেরকে সেই মুনাফিকদের অন্তরের কথা অবহিত করে দেবে। তুমি বলে দাও, ‘তোমরা বিদ্রূপ করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই বিষয়কে প্রকাশ করেই দিবেন, যে সম্বন্ধে তোমরা আশংকা করছিলে।’

আত-তাওবা 9:65

আর যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তাহলে তারা নিশ্চয় বলবে যে, ‘আমরা তো শুধু আলাপ-আলোচনা ও হাসি-তামাশা করছিলাম।’ তুমি বলে দাও, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং রসূলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছিলে?’ [১] [১] মুনাফিক্বরা আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিদ্রূপ করত। মু'মিনদের সাথে ঠাট্টা-ব্যঙ্গ করত। এমনকি রসূল (সাঃ) সম্বন্ধেও অসভ্য কথা বলা হতেও বিরত থাকত না। যার খবর কোন না কোনভাবে কিছু মুসলিম এবং পরে রসূল (সাঃ)-এর কাছে পৌঁছে যেত। কিন্তু যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হত তখন পরিষ্কারভাবে বাহানা বের করত আর বলত যে, আমরা এমনি আপোসে হাসি-মজাক করছিলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, হাসি-মজাকের জন্য তোমাদের সামনে (সব বাদ দিয়ে কেবল) আল্লাহ, তাঁর আয়াত এবং তাঁর রসূলই ছিলেন? উদ্দেশ্য এই যে, যদি উদ্দেশ্য আপোসে হাসি-মজাক করাই হত তাহলে আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ ও রসূল তার মাঝে কেন আসত? এটা নিঃসন্দেহে তোমাদের সেই কূট আচরণ ও কপটতার বহিঃপ্রকাশ, যা আমার আয়াত ও পয়গম্বরের প্রতি তোমাদের অন্তরে লুক্কায়িত রয়েছে।

আত-তাওবা 9:66

তোমরা এখন (বাজে) ওজর পেশ করো না, তোমরা তো নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার পর কুফরী করেছ,[১] যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, [২] তবুও কতককে শাস্তি দিব, কারণ তারা অপরাধী। [৩] [১] অর্থাৎ, তোমরা যে ঈমান প্রকাশ করে আসছিলে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার পর তার কোন মূল্য বাকী থাকল না। প্রথমতঃ সে ঈমানের ভিত্তিও মুনাফিক্বী ছিল। তবুও এরই অসীলায় প্রকাশ্যভাবে তোমরা মুসলিমদের মধ্যে পরিগণিত হতে। কিন্তু এখন সেখানেও কোন ঠাঁই নেই। [২] এ থেকে উদ্দেশ্য এমন লোক যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে নিয়েছে এবং খাঁটি মুসলমান হয়ে গেছে। [৩] এরা সেই লোক যাদের তওবা করার তওফীক ভাগ্যে জোটেনি এবং কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপর অটল থেকেছে। এই জন্য এই শাস্তির কারণও বর্ণনা করা হয়েছে যে, তারা পাপিষ্ঠ ও অপরাধী ছিল।

আত-তাওবা 9:67

মুনাফিক পুরুষেরা এবং মুনাফিক নারীরা এক অপরের অনুরূপ।[১] তারা অসৎকর্মের নির্দেশ দেয়, সৎকর্ম হতে বিরত রাখে এবং নিজেদের হাতগুলিকে (আল্লাহর পথে ব্যয় করা হতে) বন্ধ করে রাখে।[২] তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, সুতরাং তিনিও তাদেরকে ভুলে গেছেন।[৩] নিঃসন্দেহে মুনাফিকরাই হচ্ছে অতি অবাধ্য। [১] মুনাফিক্বরা যে কসম খেয়ে মুসলিমদেরকে জানাত যে, 'আমরা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত' আল্লাহ পাক তাদের এই কথার খন্ডন করলেন যে, ঈমানদারদের সাথে এদের কি সম্পর্ক? অবশ্য এরা হল সবাই মুনাফিক্ব, চাহে পুরুষ হোক অথবা মহিলা, তারা সকলে সমান। অর্থাৎ, কুফরী ও মুনাফিক্বীতে উভয়েই তুল্যমূল্য। পরবর্তীতে তাদের গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যা মু'মিনদের গুণের সম্পূর্ণ উল্টো ও বিপরীত।[২] এ থেকে উদ্দেশ্য হল কৃপণতা করা। অর্থাৎ, মু'মিনদের গুণ হল; তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে থাকে। কিন্তু মুনাফিক্বদের গুণ এর বিপরীত; তারা কৃপণতা করে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহর পথে ব্যয় করে না।[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলাও তাদের সাথে এমন ব্যবহার করবেন যে, যেন তিনি তাদেরকে ভুলে গেছেন। যেমন, অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন, "আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব, যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে।" (সূরা জাষিয়াহ ৪৫:৩৪ আয়াত) তার মানে হল, যেমন তারা দুনিয়াতে আল্লাহর হুকুম-আহকামকে বর্জন করেছিল, তেমনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজ অনুগ্রহ ও দয়া হতে বঞ্চিত করবেন। এখানে আল্লাহর ভুলে যাওয়া (কর্মের অনুরূপ দন্ডদান নীতি এবং) অলংকার শাস্ত্রের রীতি অনুযায়ী সাদৃশ্য সাধনের জন্য বলা হয়েছে। নচেৎ আল্লাহর সত্তা ভুলে যাওয়া থেকে পাক ও পবিত্র। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আত-তাওবা 9:68

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, এটা তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ করেছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।

আত-তাওবা 9:69

(তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত,[১] যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছ,[২] যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল।[৩] দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত। [৪] [১] অর্থাৎ, তোমাদের অবস্থাও কর্ম এবং পরিণামের দিক দিয়ে পূর্ববর্তী কাফেরদের মতই। এখন অদৃশ্যভাবে বলার পরিবর্তে মুনাফিক্বদেরকে সরাসরি সম্বোধন করা হচ্ছে। [২] خَلاق এর দ্বিতীয় অর্থ পার্থিব অংশও করা হয়েছে। অর্থাৎ, তোমাদের তকদীরে পার্থিব যতটা অংশ লিখে দেওয়া হয়েছিল তা উপভোগ করে নাও, যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজেদের পার্থিব অংশ উপভোগ করে নিয়েছে। অতঃপর মৃত্যু অথবা আযাবের শিকার হয়েছিল। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াত এবং তাঁর পয়গম্বরদেরকে মিথ্যা জানার ব্যাপারে। অথবা দ্বিতীয় অর্থ হল যে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও খেল-তামাশায় যেমন তারা মগ্ন ছিল, তোমাদের অবস্থাও ঠিক তাই। আয়াতে পূর্ববর্তী লোক বলতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন এক হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন "অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির পথ অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত এবং হাত হাত পরিমাণ (সম্পূর্ণরূপে) এমনকি তারা যদি গোসাপের গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে।" সাহাবাগণ বললেন, 'আল্লাহর রসূল ইয়াহুদ ও খ্রীষ্টানরা?' তিনি বললেন, "তবে আবার কারা?" (বুখারী, মুসলিম ও হাকেম) [৪] أولئك (ওরাই) বলতে উদ্দেশ্য সেই লোকেরা যারা উল্লিখিত অভ্যাসে ও গুণে গুণান্বিত; যাদের উপমা দেওয়া হচ্ছে তারা এবং যাদের জন্য উপমা দেওয়া হচ্ছে তারাও। অর্থাৎ, যেমন তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অসফল, তোমরাও সেইরূপ হবে। অথচ তারা তোমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী এবং মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা অধিক সমৃদ্ধ ছিল। এ সত্ত্বেও তারা আল্লাহর আযাব থেকে পরিত্রাণ পায়নি; তাহলে তোমরা, যারা তাদের চাইতে সব দিক দিয়ে কম, তারা কেমন করে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে?

আত-তাওবা 9:70

তাদের কাছে কি তাদের পূর্ববর্তী নূহ সম্প্রদায় এবং আদ ও সামূদ সম্প্রদায়, ইব্রাহীমের সম্প্রদায় এবং মাদয়্যানের অধিবাসিগণ এবং বিধ্বস্ত জনপদের অধিবাসিগণের সংবাদ কি আসেনি?[১] তাদের কাছে তাদের রসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছিল।[২] বস্তুতঃ আল্লাহ তো তাদের প্রতি অত্যাচার করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি অত্যাচার করত। [৩] [১] এখানে সেই ছয় সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে যাদের বাসস্থান ছিল শাম দেশে। এ দেশ আরব দেশের সন্নিকটেই অবস্থিত। আর তাদের কিছু কথা হতে পারে তারা তাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে শুনেও ছিল। নূহ নবী (আঃ)-এর সম্প্রদায়; যাদেরকে তুফানে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। আ'দ সম্প্রদায়; যাদেরকে বল ও শক্তিতে প্রবল থাকা সত্ত্বেও প্রচন্ড ঝড় দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। সামূদ সম্প্রদায়; যাদেরকে এক আসমানী গর্জন দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল। ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায়; যাদের বাদশাহ নমরূদ বিন কিনআন বিন কূশকে মশা দ্বারা মারা হয়েছিল। মাদয়্যানবাসী (শুআইব (আঃ)-এর সম্প্রদায়); যাদেরকে বিকট শব্দ ও ভূমিকম্প দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। মু'তাফিকাতবাসী (বিধ্বস্ত জনপদের অধিবাসী) লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়' যাদের জনপদের নাম ছিল 'সাদুম'। 'মু'তাফিকাত'এর অর্থ হল, উল্টো-পাল্টাকৃত। এদের উপরে প্রথমতঃ আসমান থেকে পাথর বর্ষণ করা হয়েছিল, আর দ্বিতীয়তঃ তাদের জনপদকে উল্টো-পাল্টা করে দেওয়া হয়েছিল। যার কারণে বস্তিটার উপরিভাগ নিম্নে এবং নিম্নভাগ উপরে হয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই তাদেরকে 'আসহাবে মু'তাফিকাত' বলা হয়। [২] এ সকল সম্প্রদায়ের কাছে তাদেরই মধ্য হতে একজন করে পয়গম্বর এসেছিলেন, কিন্তু তারা তাঁদের কথার গুরুত্ব দেয়নি। বরং মিথ্যাজ্ঞান ও শত্রুতার পথ অবলম্বন করেছিল। যার পরিণামে আল্লাহর আযাব এসেছিল। [৩] অর্থাৎ, এই আযাব ছিল তাদের যুলুম, অত্যাচার ও সীমালংঘনে অবিচল থাকার পরিণাম। এমনি অকারণে কেউ আল্লাহর আযাবের শিকার হয়নি।

আত-তাওবা 9:71

আর বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু,[১] তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে।[২] আর যথাযথভাবে নামায আদায় করে ও যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে।[৩] এসব লোকের প্রতিই আল্লাহ অতি সত্বর করুণা বর্ষণ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান হিকমতওয়ালা। [১] মুনাফিক্বদের নিন্দনীয় গুণের তুলনায় মু'মিনদের প্রশংসনীয় গুণ উল্লেখ করা হচ্ছে। তাদের প্রথম গুণ হল, তারা এক অপরের বন্ধু, সাহায্যকারী ও সহানুভুতিশীল। যেমন, হাদীসে এসেছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "মু'মিন মুমিনের জন্য দেওয়ালস্বরূপ; যার এক ইঁট অপর ইঁটকে শক্ত করে ধরে থাকে।" (বুখারীঃ নামায অধ্যায়, মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, "পরস্পর সম্প্রীতি ও দয়া-দাক্ষিণ্যে মু'মিনদের উপমা হল একটি দেহের মত, যখন তার কোন এক অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন তার সারা দেহ জ্বর ও ব্যথায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। (বুখারীঃ আদব অধ্যায়, মুসলিম) [২] এটা হল ঈমানদারদের দ্বিতীয় বিশেষ গুণ। مَعرُوف (সৎ) সেই কাজকে বলা হয়, যাকে শরীয়ত নেক ও ভাল বলে চিহ্নিত করেছে। আর مُنكَر (অসৎ) সেই কাজকে বলা হয়, যাকে শরীয়ত মন্দ ও খারাপ বলে আখ্যায়িত করেছে। সেই কাজ সৎ বা অসৎ নয়, যা লোকেরা নিজেদের খেয়াল-খুশী মত ভাল বা মন্দ বলে থাকে। [৩] নামায হল আল্লাহর হকসমূহের মধ্যে একটি প্রধান ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আর যাকাত বান্দার হকসমূহের মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। এই জন্য এই দু'টিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তারা সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে।

আত-তাওবা 9:72

আল্লাহ বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীদেরকে এমন উদ্যানসমূহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, যেগুলোর নিম্নদেশে বইতে থাকবে নদীমালা, সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে। আরও (প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন) চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে (জান্নাতে আদনে)[১] পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় (নিয়ামত)। [২] এটাই হচ্ছে অতি বড় সফলতা। [১] যা মণিমুক্তা দ্বারা বানানো হয়েছে। عَدن শব্দের কয়েকটি অর্থ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অর্থ হল চিরস্থায়ী। [২] হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতে সমস্ত নিয়ামতের মধ্যে জান্নাতীদের সব থেকে বড় নিয়ামত হিসাবে যা লাভ হবে, তা হল আল্লাহর সন্তুষ্টি। (বুখারী, মুসলিম, রিক্বাক ও জান্নাত অধ্যায়)

আত-তাওবা 9:73

হে নবী! তুমি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর[১] এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।[২] তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম এবং তা কত নিকৃষ্ট ঠিকানা। [৩] [১] এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে কাফের ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে ও তাদের প্রতি কঠোর হতে আদেশ করা হচ্ছে। নবী (সাঃ)-এর গত হওয়ার পর তাঁর উম্মত হল এ সম্বোধনের লক্ষ্য। কাফেরদের সাথে সাথে মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধেও জিহাদ করার যে আদেশ করা হয়েছে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এক রায় হল এই যে, যদি মুনাফিক্বদের মুনাফিক্বী এবং তাদের চক্রান্ত স্পষ্টাকারে প্রকাশ পায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হবে; যেমন কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় রায় হল যে, মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ হল এই যে, তাদেরকে জিহ্বা দ্বারা ওয়ায-নসীহত করা হবে অথবা তারা চারিত্রিক কোন সীমালংঘন করলে তাদের উপর হদ্দ্ (দন্ডবিধি) জারী করা হবে। তৃতীয় রায় হল যে, জিহাদের হুকুম কাফেরদের ব্যাপারে এবং কঠোরতা মুনাফিক্বদের ব্যাপারে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই সমস্ত রায়ের মধ্যে কোন পরস্পর-বিরোধিতা নেই। কেননা, অবস্থা ও পরিস্থিতি বুঝে এসব রায়ের মধ্যে কোন একটার উপর আমল করা বৈধ। [২] غِلظَة শব্দটি رَأفَة এর বিপরীত; যার অর্থ হল নম্রতা ও দয়া। এই হিসাবে غِلظَة এর অর্থ হল কঠোরতা ও শক্তিমত্তার সাথে শত্রুদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া। কেবলমাত্র জিহ্বা দ্বারা কঠোরতা উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু তা নবী (সাঃ)-এর সুমহান চরিত্রের পরিপন্থী। সুতরাং তা তিনি অবলম্বন করতে পারতেন না এবং আল্লাহ তাআলা তা অবলম্বন করতে আদেশও দিতেন না। [৩] জিহাদ এবং কঠোরতার সম্পর্ক পার্থিব জীবনের সাথে। আর আখেরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রয়েছে যা নিকৃষ্টতম স্থান।

আত-তাওবা 9:74

তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, তারা (গালি) বলেনি, অথচ নিশ্চয়ই তারা কুফরী কথা বলেছে এবং নিজেদের ইসলাম গ্রহণের পর কাফের হয়ে গেছে,[১] আর তারা এমন বিষয়ের সংকল্প করেছিল যা তারা কার্যকরী করতে পারেনি।[২] আর তারা শুধু এই জন্য দোষারোপ করেছিল যে, তাদেরকে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর রাসূল অভাবমুক্ত করে দিয়েছিলেন,[৩] অনন্তর যদি তারা তওবা করে, তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে; আর যদি তারা বিমুখ হয়, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রদান করবেন এবং ভূ-পৃষ্ঠে তাদের না কোন অলী (অভিভাবক) হবে, আর না কোন সাহায্যকারী। [১] মুফাসসিরগণ এ আয়াতের তফসীরে নানান ঘটনা নকল করেছেন, যাতে মুনাফিক্বরা রসূল (সাঃ)-এর শানে বেআদবীমূলক কথা বলেছিল, যা কিছু মুসলিম শুনে ফেলেছিলেন এবং তাঁরা নবী (সাঃ)-এর কাছে এসে সে কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা বাহানা বানাতে শুরু করল। বরং তারা কসম পর্যন্ত খেয়ে বলল যে, তারা এমন কথা বলেনি। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হল। এ থেকে এও জানা গেল যে, নবী (সাঃ)-এর শানে বেআদবীমূলক কথা বলা কুফরী। তাঁর শানে যে ব্যক্তি বেআদবীমূলক অশালীন মন্তব্য করবে, সে ব্যক্তি মুসলিম থাকতে পারে না। [২] এ ব্যাপারেও কয়েকটি ঘটনা নকল করা হয়েছে। যেমন, তাবুক থেকে ফিরার পথে মুনাফিকবরা রসূল (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে এক চক্রান্ত করেছিল, যাতে তারা সফল হয়ে ওঠেনি। দশ-বারোজন মুনাফিক্ব এক উপত্যকায় তাঁর পিছু নেয়, যেখানে তিনি বাকী সৈন্য থেকে পৃথকভাবে প্রায় একাকী অতিক্রম করছিলেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল যে, এই সুযোগে অতর্কিতে তাঁর উপর আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করে ফেলবে! কিন্তু এর খবর অহী মারফৎ জানতে পারলে তিনি সতর্ক হয়ে বেঁচে যান। [৩] মুসলিমদের হিজরতের পর মদীনা শহর কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যার কারণে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যও বড় উন্নতি লাভ করতে লাগল এবং তার ফলে মদীনাবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হয়ে উঠল। মদীনার মুনাফিক্বরাও এতে উপকৃত হল। আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতে এ কথাই বলেছেন, তারা কি এই দোষ আরোপ করে অথবা এই কথায় নারাজ যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে ধনী বানিয়ে দিয়েছেন? অর্থাৎ এটা নারাজ হওয়ার, রাগ বা দোষের কথা তো নয়। বরং তাদেরকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে, তিনি তাদেরকে দরিদ্রতা থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল ও ধনবান বানিয়ে দিয়েছেন। জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ তাআলার সাথে রসূল (সাঃ)-এর উল্লেখ এই জন্য করা হয়েছে যে, এই সচ্ছল ও ধনবান হওয়ার বাহ্যিক কারণ হলেন নবী (সাঃ)। আসলে আল্লাহই হলেন সচ্ছলতা ও ধনদাতা। এই জন্যই আয়াতে مِن فَضلِه একবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিয়েছেন।

আত-তাওবা 9:75

তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ যদি আমাদেরকে নিজ অনুগ্রহ হতে দান করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা দান-খয়রাত করব এবং সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো।

আত-তাওবা 9:76

অতঃপর যখন আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহ দান করলেন, তখন তারা তাতে কার্পণ্য করতে লাগল এবং বিমুখ হয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। [১] [১] এই আয়াতটি সাহাবী সা'লাবাহ বিন হাত্বেব আনসারী (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে বলে কোন কোন মুফাসসির উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা শুদ্ধ নয়। সঠিক মত হল এই যে, এতেও মুনাফিক্বদের আরো একটি মন্দ আচরণ বর্ণনা করা হয়েছে।

আত-তাওবা 9:77

পরিণামে আল্লাহ তাদের শাস্তিস্বরূপ তাদের অন্তরসমূহে মুনাফিক্বী (কপটতা) স্থায়ী করে দিলেন তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হওয়ার দিন পর্যন্ত। যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে নিজেদের কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিল এবং তারা মিথ্যা বলত।

আত-তাওবা 9:78

তারা কি জানত না যে, আল্লাহ তাদের মনের গুপ্ত কথা এবং গোপন পরামর্শ অবগত আছেন? এবং নিশ্চয় আল্লাহ অদৃশ্য বিষয়ে মহাজ্ঞানী? [১] [১] এতে সেই সমস্ত মুনাফিক্বদের প্রতি তিরস্কার ও ধমক রয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সাথে অঙ্গীকার করে থাকে, অতঃপর তার পরোয়া করে না। যেন তারা ভাবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের গোপন কথা এবং অন্তরের রহস্য জানেন না। অথচ আল্লাহ তাআলা সব কিছুর ব্যাপারে অবগত, তিনি অদৃশ্যজ্ঞাতা, তিনি গায়েবের সমস্ত খবর জানেন।

আত-তাওবা 9:79

বিশ্বাসীদের মধ্যে সতস্ফুতভাবে যারা (নফল) সাদকা দান করে এবং যারা নিজ পরিশ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে এবং উপহাস করে, [১] আল্লাহ তাদেরকে উপহাস করেন[২] এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [১] مُطَََّوِّعََِْينَ শব্দের অর্থ হল ওয়াজেব সাদকাহ (যাকাত) ছাড়াও নিজ খুশী মতে আল্লাহর রাহে অতিরিক্ত ব্যয়কারী। جُهد শব্দের অর্থ হল শ্রম ও কষ্ট। অর্থাৎ, সেই সব মানুষ যারা ধনবান নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজেদের মেহনত ও কষ্টের সাথে উপার্জিত সামান্য মাল থেকেও অল্প কিছু দান করে থাকে। আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক্বদের আরো একটি নোংরা আচরণের কথা উল্লেখ হয়েছে। আর তা এই যে, যখন আল্লাহর রসূল (সাঃ) যুদ্ধ প্রভৃতির ব্যাপারে মুসলিমদেরকে দান করতে আহবান করতেন, তখন তাঁরা তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে ক্ষমতানুযায়ী দান করতেন। কারো কাছে অধিক মাল থাকলে তিনি বেশী বেশী স্বাদক্বাহ করতেন। আর অল্প থাকলে অল্পই দিতেন। এই মুনাফিক্বরা উভয় প্রকার মুসলমানদের প্রতি ভৎর্সনা করত। আর অধিক দানকারীর জন্য বলত, এর উদ্দেশ্য হল লোক দেখানো। আর স্বল্প দানকারীকে বলত, তোমার এই সামান্য মাল স্বাদক্বাহ করায় কি উপকার হবে? অথবা আল্লাহ তাআলা তোমার এই স্বল্প মালের মুখাপেক্ষী নন। (বুখারী সূরা তাওবার ব্যখ্যা পরিচ্ছেদ, মুসলিম যাকাত অধ্যায়) এইভাবে মুনাফিকরা মুসলিমদের সাথে ঠাট্টা-পরিহাস করত। [২] অর্থাৎ, মু'মিনদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার বদলা এইভাবে দিয়ে থাকেন যে, তাদেরকে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন। এটি হল (কর্মের অনুরূপ দন্ডদান নীতি এবং) অলংকার শাস্ত্রের সাদৃশ্য সাধনের রীতি। অথবা এটা হল বদদুআস্বরূপ। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাদের সাথেও উপহাস করুন, যেমন তারা মুসলিমদের সাথে করে থাকে।

আত-তাওবা 9:80

তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না;[১] যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। [২] আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না। [৩] [১] সত্তরের সংখ্যা আধিক্য বর্ণনার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, তুমি যত বেশীই তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর না কেন, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না। এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ৭০ বারের অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করলে তারা ক্ষমালাভ করবে।[২] এখানে ক্ষমা না করার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে মানুষ কারো সুপারিশের আশায় বসে না থাকে; বরং ঈমান ও নেক আমলের পুঁজি সংগ্রহ করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়। যদি এই আখেরাতের পাথেয় কারো কাছে না থাকে, তাহলে এমন কাফের ও অবাধ্যদের জন্য কেউ সুপারিশ করবে না। যেহেতু আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের জন্য সুপারিশের অনুমতিই দান করবেন না।[৩] এই হিদায়াত (পথপ্রদর্শন) থেকে সেই হিদায়াত উদ্দেশ্য যা মানুষকে তার অভীষ্ট (ঈমান) পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। নতুবা হিদায়াত অর্থ হল, পথনির্দেশ করা। যার সুব্যবস্থা প্রত্যেক মু'মিন ও কাফেরের জন্য করে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, "আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি; হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।" (সূরা দাহর ৭৬:৩ আয়াত) তিনি আরো বলেছেন, "এবং আমি কি তাকে দু'টি পথ দেখাইনি?"(সূরা বালাদ ৯০:১০ আয়াত)

আত-তাওবা 9:81

যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল[১] এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, ‘তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।’ তুমি বলে দাও, ‘জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম’; যদি তারা বুঝতে পারত! [২] [১] এখানে সেই মুনাফিকবদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যারা তাবুক যুদ্ধে শরীক হয়নি এবং মিথ্যা অজুহাত পেশ করে না যাওয়ার অনুমতি নিয়েছিল। خِلاف এর অর্থ হল পিছন অথবা বিরুদ্ধাচরণ। অর্থাৎ, রসূল (সাঃ)-এর চলে যাওয়ার পর তাঁর পিছনে অথবা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে মদীনাতে বসে থাকল। [২] অর্থাৎ, যদি তাদের এটা জানা থাকত যে, দোযখের আগুনের উষ্ণতার তুলনায় দুনিয়ার (গ্রীষ্মের) উষ্ণতা কিছুই নয়, তাহলে তারা কখনই পিছনে থাকত না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার এই আগুন জাহান্নামের আগুনের ৭০ অংশের একাংশ। অর্থাৎ, জাহান্নামের আগুনের উষ্ণতা দুনিয়ার আগুনের থেকে ৬৯ গুণ বেশী। (বুখারীঃ সৃষ্টি রচনা অধ্যায় জাহান্নামের বিবরণ পরিচ্ছেদ) হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সে আগুন হতে রক্ষা করো।

আত-তাওবা 9:82

অতএব তারা (দুনিয়াতে) অল্প হাসি হাসুক, আর (আখেরাতে) অনেক কাঁদা কাঁদতে থাকুক,[১] সেই কাজের প্রতিফল স্বরূপ যা তারা করত। [১] قَلِيلًا আর كَثِيرًا শব্দ দু'টি হতে পারে মাসদারের সিফাত (ক্রিয়ামূলের বিশেষণ), অর্থাৎ, ضَحِكًا قَلِيلًا এবং بُكَاءً كَثِيرًا অথবা যারফ (ক্রিয়া-বিশেষণ), (অর্থাৎ, زَمَانًا قَلِيلًا وَزَمَانًا كَثِيرًا অনুযায়ী দুই যবর রয়েছে। আর উভয় শব্দ দু'টিই হল আদেশসূচক, যা খবরের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। তার মানে হল, এরা ইহকালে হাসবে কম এবং পরকালে কাঁদবে বেশী।

আত-তাওবা 9:83

আল্লাহ যদি তোমাকে (মদীনায়) তাদের কোন সম্প্রদায়ের[১] কাছে ফিরিয়ে আনেন, অতঃপর তারা (কোন জিহাদে) বের হতে অনুমতি চায়,[২] তাহলে তুমি (তাদেরকে) বল, তোমরা কখনো আমার সাথে (কোন জিহাদে) বের হবে না এবং আমার সাথী হয়ে কোন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করবে না; তোমরা প্রথমবারে বসে থাকাকে পছন্দ করেছিলে,[৩] অতএব তোমরা ঐসব লোকেদের সাথে বসে থাক, যারা পশ্চাদবর্তী থাকার যোগ্য। [৪] [১] এ সম্প্রদায় থেকে মুনাফিক্বদল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে তাবুক থেকে মদীনায় সহী-সালামতে ফিরিয়ে আনেন, যেখানে পিছনে থেকে যাওয়া মুনাফিক্বরাও রয়েছে। [২] অর্থাৎ, কোন অন্য যুদ্ধে সাথে যাবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। [৩] এ হল আগামীতে সাথে না নিয়ে যাওয়ার কারণ। অর্থাৎ, তোমরা যেহেতু প্রথমবার সাথে যাওনি, সেহেতু এখন তোমরা এর যোগ্য নও যে, তোমাদেরকে কোন যুদ্ধে সাথে নিয়ে যাওয়া হবে। [৪] অর্থাৎ, এখন তোমাদের এমন অবস্থা যে, তোমরা সেই নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সাথে বসে থাক, যারা যুদ্ধে শরীক হওয়ার পরিবর্তে ঘরে বসে থাকে। নবী (সাঃ)-কে এই নির্দেশ এই জন্য দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের সেই দুঃখ-বেদনা আরো বৃদ্ধি পায়, যা তারা পিছনে থাকার কারণে পেয়েছে।

আত-তাওবা 9:84

ওদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার উপর কখনো (জানাযার) নামায পড়বে না এবং তার কবরের কাছেও দাঁড়াবে না;[১] তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা অবাধ্য অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। [২] [১] এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, যখন আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু হয়ে গেল, তখন তার ছেলে আব্দুল্লাহ (যে মুসলিম ছিল এবং তার নাম বাপের মতই ছিল) রসূলের (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে বলল, (বরকতস্বরূপ) আপনি আপনার কামীস (জামা)টা আমাকে দিন, যাতে আমার পিতাকে কাফন স্বরূপ পরিয়ে দিই এবং আপনি তার জানাযার নামাযও পড়ে দিন। মহানবী (সাঃ) নিজের কামীস খানা দিয়ে দিলেন এবং তার জানাযার নামায পড়ানোর জন্যও উপস্থিত হলেন। উমার (রাঃ) নবী (সাঃ)-কে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা এমন লোকের জানাযা পড়তে নিষেধ করেছেন, তাহলে আপনি কেন এর ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনার দু'আ করবেন?' তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলা আমাকে এর এখতিয়ার দান করেছেন। অর্থাৎ, বাধা দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যদি তুমি ৭০ বার তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না।' আমি তার জন্য ৭০ বার অপেক্ষা অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করব।" সুতরাং তিনি তার জানাযার নামায পড়ালেন। আল্লাহ তাআলা তৎক্ষণাৎ এই আয়াত অবতীর্ণ করে বললেন, আগামীতে মুনাফিক্বদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দু'আ কোনক্রমেই করা যাবে না। (বুখারী, সূরা বারাআতের ব্যাখ্যা, মুসলিম মুনাফিক্বদের বিবরণ)[২] এটা ছিল জানাযার নামায ও ক্ষমা প্রার্থনা নিষেধ হওয়ার কারণবিশেষ। যার অর্থ হল যাদের মৃত্যু কুফরী, শিরক ও মুনাফিক্বীর উপর হবে, তাদের না জানাযা নামায পড়া হবে, আর না তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়েয হবে। এক হাদীসে তো এমনও এসেছে যে, নবী (সাঃ) যখন কবরস্থানে পৌঁছলেন তখন জানা গেল যে, আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে দাফন করে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর তিনি তাকে কবর থেকে বের করতে আদেশ করলেন। তিনি তাকে নিজের হাঁটুর উপর রেখে তার উপর নিজ মুখের (বরকতময়) থুথু মারলেন। অতঃপর তাঁর কামীস তাকে পরিয়ে দিলেন। (বুখারীঃ কামীস পরিধান পরিচ্ছেদ, জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ মুনাফিক্বদের মন্দ গুণাবলী পরিচ্ছেদ) কিন্তু এ সব তার কোন কাজে আসেনি। এ হতে জানা গেল যে, যে ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে, তার জন্য পৃথিবীর বড় বড় ব্যক্তিত্বের ক্ষমা প্রার্থনার দু'আ এবং সুপারিশ কোন উপকারে আসবে না।

আত-তাওবা 9:85

তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ তো শুধু এই চান যে, তিনি সে সবের মাধ্যমে দুনিয়ায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং কুফরী অবস্থাতেই তাদের প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে।

আত-তাওবা 9:86

তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাস কর এবং তাঁর রসূলের সঙ্গী হয়ে জিহাদ কর, এই মর্মে যখন কুরআনের কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয়, তখন তাদের মধ্যকার সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তোমার কাছে অনুমতি চায় ও বলে, আমাদেরকে অব্যাহতি দাও, আমরাও বসে থাকা লোকদের সঙ্গী হব। [১] [১] এটা হল সেই মুনাফিক্বদের বর্ণনা যারা ছল-বাহানা করে যুদ্ধে শরীক হওয়া থেকে পিছনে থাকা পছন্দ করেছিল। أولو الطَّول থেকে উদ্দেশ্য সামর্থ্যবান, ধনী শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ। অর্থাৎ, এমন লোকেদেরকে পিছনে থাকা উচিত ছিল না। কেননা, তাদের কাছে আল্লাহর দেওয়া সব কিছু মওজুদ ছিল। قاعِدِين থেকে কিছু অসুবিধার কারণে 'বসে থাকা' ব্যক্তিরা উদ্দেশ্য। যেমন, পরবর্তী আয়াতে তাদেরকে অন্তঃপুরবাসী নারীদের সাথে তুলনা করে خَوَالِف বলা হয়েছে। যা خَالِفَة এর বহুবচন অর্থাৎ, পিছনে থাকা নারীগণ।

আত-তাওবা 9:87

তারা অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে থাকতে পছন্দ করল এবং তাদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেওয়া হল। সুতরাং তারা বুঝতে অক্ষম। [১] [১] অন্তরে মোহর লেগে যাওয়াঃ এটি অব্যাহতভাবে গোনাহ করতে থাকার কুফল। যার বিশদ আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে। অন্তরে মোহর লাগার পর মানুষ চিন্তা-ভাবনা করা ও কিছু বুঝার যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।

আত-তাওবা 9:88

কিন্তু রসূল ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল, তারা নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা জিহাদ করল; তাদেরই জন্য রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই হচ্ছে সফলকাম।

আত-তাওবা 9:89

আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত; তারা সেখানে অনন্তকাল অবস্থান করবে। এটা হচ্ছে (তাদের) বিরাট সফলতা। [১] [১] মুনাফিক্বদের বিপরীত ঈমানদারদের অভ্যাস হল, তারা নিজ জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। আল্লাহর পথে জান-মাল কুরবান করার ব্যাপারে কোন পরোয়া ও দ্বিধাবোধ করে না। তাদের নিকটে আল্লাহর আদেশ পালনই হল সর্ব উচ্চে। তাদেরই জন্য আখেরাতের মঙ্গল ও জান্নাতের নিয়ামত প্রস্তুত রয়েছে; মতান্তরে দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণ রয়েছে। আর এরাই লাভ করবে পরিত্রাণ ও মহাসাফল্য।

আত-তাওবা 9:90

মরুবাসী কিছু (বেদুঈন) লোক অজুহাত পেশ করে অনুমতি চাওয়ার উদ্দেশ্যে এল। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে মিথ্যা বলেছিল, তারা বসে রইল। তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, অতি নিকটেই তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসবে।[১] [১] উক্ত অজুহাত পেশকারীদের ব্যাপারে তফসীরবিদদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এরা শহর থেকে দূরে বসবাসকারী সেই লোক, যারা মিথ্যা ওজর পেশ করে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি নিয়েছিল। এদের দ্বিতীয় প্রকার ছিল তারা, যারা এসে ওজর পেশ করার কোন প্রয়োজন মনে না করেই বসে রইল। আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক্বদের উক্ত দুই শ্রেণীর লোকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে উভয় ধরনের লোকেরাই শামিল। আর 'তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে' বলে মিথ্যা ওজর পেশকারী ও বসে থাকা উভয় প্রকার ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য তফসীরবিদরা 'অজুহাত পেশকারীদল' বলতে এমন মরুবাসী বেদুঈন মুসলিমদেরকে বুঝিয়েছেন, যারা সঠিক ও সত্য ওজর পেশ করে অনুমতি নিয়েছিল। আর مُعَذِّرُوْنَ আসলে তাদের নিকটে مُعْتَذِرُوْنَ ছিল। ت হরফটিকে ذ হরফে পরিবর্তন করে সমীকরণ করা হয়েছে। আর 'مُعْتَذِر'এর অর্থ হল আসলেই যাদের ওজর আছে। এই হিসাবে আয়াতের পরবর্তী বাক্যতে মুনাফিক্বদের কথা উল্লেখ আছে এবং আয়াতে উভয় দলের কথা বর্ণনা হয়েছে। এর প্রথম অংশে সেই সব মুসলিমদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের সত্যিকার ওজর ছিল। আর দ্বিতীয় অংশে সেই মুনাফিক্বদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ওজর পেশ না করেই বসে ছিল। আর আয়াতের শেষাংশে যে ধমক এসেছে, তা হল এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের জন্যই। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

আত-তাওবা 9:91

দুর্বল, পীড়িত এবং অর্থব্যয় করতে যারা অসমর্থ তাদের কোন অপরাধ নেই; যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী হয়। সৎকর্মপরায়ণদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন পথ নেই। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। [১] [১] এই আয়াতে সেই সব লোকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের সত্যিকার ওজর ছিল। আর তাদের সে ওজরও স্পষ্ট ছিল। যেমন, (ক) বৃদ্ধ ও অক্ষম লোক। অন্ধ অথবা খোঁড়া প্রভৃতি লোকরাও এই শ্রেণীর আওতায় এসে পড়ে। কেউ কেউ এদেরকে অসুস্থ লোকদের মধ্যে গণ্য করেছেন। (খ) অসুস্থ ব্যক্তি। (গ) তারা যাদের নিকট জিহাদ করার সরঞ্জাম ছিল না এবং বায়তুল মাল থেকেও তাদের মদদ করা হয়নি। 'আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী' হয় এইভাবে যে, তারা অন্তরে জিহাদের প্রতি ব্যাকুল আগ্রহ ও মুজাহিদদের প্রতি ভালবাসা রাখে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দুশমনদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে এবং যথাসাধ্য আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে। এমন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিরা যদি জিহাদে শরীক হতে অপারগ হয়, তাহলে তাদের কোন গোনাহ নেই।

আত-তাওবা 9:92

আর ঐ লোকদেরও (বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন পথ) নেই, যারা তোমার নিকট এই উদ্দেশ্যে এল যে, তুমি তাদেরকে বাহন দান করবে, (যাদেরকে) তুমি বললে, ‘আমার নিকট তোমাদেরকে আরোহণ করাবার মত কোন বাহন নেই।’ তখন তারা এমন অবস্থায় ফিরে গেল যে, তাদের চক্ষু হতে অশ্রু বইতে লাগল এ দুঃখে যে, তাদের কাছে ব্যয় করার মত কোন কিছুই নেই। [১] [১] এখানে মুসলিমদের দ্বিতীয় এক দলের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যাদের কাছে কোন প্রকার সওয়ারী বা বাহন ছিল না। আর নবী (সাঃ)ও তাদেরকে সওয়ারী দিতে ওজর পেশ করলেন। যার ফলে তাদের মনে এমন কষ্ট হল যে, তাদের চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রু বিগলিত হল। 'রাযিবয়াল্লাহু আনহুম।' (আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হন।) বুঝা গেল যে, আন্তরিকতাপূর্ণ খাঁটি মুসলিমগণ, যাঁদের কোন না কোন প্রকার সত্যই জিহাদে না যাওয়ার অজুহাত ছিল, গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল খবর সম্পর্কে অবহিত মহান আল্লাহ তাদেরকে জিহাদে অংশ গ্রহণ না করতে অনুমতি দিয়ে পৃথক করে দিলেন। বরং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ) এইসব ওজর-ওয়ালা মানুষদের ব্যাপারে জিহাদে শরীক মুজাহিদদেরকে বললেন যে, "তোমাদের পিছনে মদীনার কিছু লোক এমনও রয়েছে যে, তোমরা যে উপত্যকাই অতিক্রম করছ এবং যে পথই চলছ তারা সওয়াবে তোমাদের বরাবর শরীক রয়েছে।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা কি করে হতে পারে অথচ তারা মদীনায় বসে আছে?' তিনি বললেন, "ওজর তাদেরকে সেখানে আটকে রেখেছে। (কিন্তু তাদের হৃদয়-মন তোমাদের সাথে আছে।)" (বুখারীঃ জিহাদ অধ্যায়, মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ, যাদেরকে ওজর যুদ্ধে শরীক হতে রুখে দিয়েছে তাদের সওয়াব পরিচ্ছেদ)

আত-তাওবা 9:93

অভিযোগ তো শুধুমাত্র ঐ লোকদের বিরুদ্ধেই যারা ধনবান হওয়া সত্ত্বেও (যুদ্ধে গমন না করার) অনুমতি চায়। তারা অন্তঃপুরবাসী মহিলাদের সাথে থাকতে পছন্দ করল। আর আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিলেন, সুতরাং তারা জ্ঞানলাভে অক্ষম।[১] [১] এরা মুনাফিক্ব যাদের বর্ণনা ৮৬-৮৭নং আয়াতে এসেছে। এখানে দ্বিতীয়বার বিশুদ্ধচিত্ত মুসলিমদের মোকাবেলায় তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু প্রত্যেক জিনিস তার বিপরীতধর্মী জিনিস দ্বারা জানা বা চেনা যায়। خَوالِف শব্দটি خَالِفَة এর বহুবচন; যার অর্থ হল পিছনে থাকা মহিলা, এখানে উদ্দেশ্য হল, মহিলা, শিশু, অক্ষম, খুব অসুস্থ এবং বৃদ্ধ ব্যক্তি; যারা জিহাদে শরীক হতে অপারগ। لاَ يَعلَمُون এর অর্থ হল, তারা জানে না যে, জিহাদে পিছনে থাকা কত বড় অপরাধ। নচেৎ তারা সম্ভবতঃ রসূল (সাঃ) থেকে পিছনে বসে থাকত না।

আত-তাওবা 9:94

যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের কাছে অজুহাত পেশ করবে। তুমি বলে দাও, ‘তোমরা অজুহাত পেশ করো না; আমরা কখনই তোমাদেরকে বিশ্বাস করব না। আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ এবং তাঁর রসূল তোমাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে এমন সত্তার কাছে যিনি অদৃশ্য এবং প্রকাশ্য সকল বিষয়ই অবগত আছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।’

আত-তাওবা 9:95

যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তারা তখন অচিরেই তোমাদের সামনে শপথ করে বলবে, যেন তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। অতএব তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; তারা হচ্ছে অতিশয় ঘৃণ্য, আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম, তা হল তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল।

আত-তাওবা 9:96

তারা এ জন্য শপথ করবে, যেন তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, অনন্তর যদি তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন দুষ্কর্মকারী লোকদের প্রতি রাজী হবেন না। [১] [১] উক্ত তিন আয়াতে ঐ সকল মুনাফিকদের কথা আলোচিত হয়েছে, যারা তাবুক অভিযানে মুসলিমদের সাথে শরীক হয়নি। এরা নবী (সাঃ) ও মুসলিমদেরকে সুস্থ ও সফলভাবে ফিরে আসতে দেখে নিজেদের ওজর পেশ করে তাঁদের নিকট বিশ্বস্ত হতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন তুমি তাদের নিকট উপস্থিত হবে, তখন তারা ওজর পেশ করবে, তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, আমাদের নিকট ওজর পেশ করায় কোন লাভ নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদের নিকট তোমাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। এখন তোমাদের মিথ্যা ওজর আমরা কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি? বস্তুতঃ এই সব ওজরের আসল রহস্য অতি অল্প সময়ের মধ্যে আরো পরিষ্কারভাবে উদ্ঘাটিত হয়ে যাবে। তোমাদের কর্ম, যা আল্লাহ তাআলা দেখছেন এবং রসূল (সাঃ)-এর সামনেও পরিষ্ফুটিত। অতএব স্বয়ং তিনি তোমাদের ওজরের আসল রহস্য উদঘাটন করে দেবেন। আর যদি পুনরায় তোমরা রসূল (সাঃ) ও মুসলিমদেরকে প্রতারিত করতে ও ধোঁকা দিতে কৃতকার্য হয়েই যাও, তবে এমন এক সময় অবশ্যই আসবে, যখন তোমাদেরকে এমন এক সত্তার নিকট উপস্থিত করা হবে, যিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছু ভালভাবেই অবগত আছেন। তাঁকে তো আর ধোঁকা দিতে পারবে না; তিনি তোমাদের সকল আসল রহস্য তোমাদের সামনে খুলে দেবেন। দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন যে, তুমি ফিরে এলে ওরা শপথ করবে, যাতে তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। অতএব তুমি তাদেরকে নিজের অবস্থাতে ছেড়ে দাও। ওরা নিজেদের বিশ্বাস ও কর্ম অনুযায়ী অপবিত্র। তারা যা কিছু করেছে তার প্রাপ্যই হল জাহান্নাম। তৃতীয় আয়াতে বলেছেন, ওরা তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শপথ করবে। কিন্তু ঐ সকল অবুঝদের জানা নেই যে, যদি তুমি তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই যাও, তবে তারা যে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূর হওয়া ও পালিয়ে যাওয়ার পথ অবলম্বন করেছে, তার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি কিভাবে সন্তুষ্ট হতে পারেন?

আত-তাওবা 9:97

মরুবাসী (বেদুঈন) লোকেরা কুফরী ও কপটতায় অতি কঠোরতম।[১] আর তারা এই কথারই বেশী উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাঁর রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন তাদের ঐসব বিধি-সীমার জ্ঞান হয় না।[২] আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। [১] পূর্ব বর্ণিত আয়াতসমূহে ঐ সকল মুনাফিকদের আলোচনা ছিল, যারা মদীনা শহরে বসবাস করত। আর কিছু মুনাফিক ছিল যারা মদীনার বাইরে মরু এলাকায় বসবাস করত। মরু এলাকায় বসবাসকারীদেরকে 'আ'রাব' (বেদুঈন) বলা হয় যা 'আ'রাবী' শব্দের বহুবচন। শহরবাসীদের আচার-ব্যবহার অপেক্ষা তাদের আচার-ব্যবহারে বেশি কঠোরতা ও রুক্ষতা পাওয়া যায়। অনুরূপ তাদের মধ্যে যারা কাফের ও মুনাফিক ছিল তারা কুফরী ও মুনাফিকীর ব্যাপারে শহরবাসীদের চাইতে বেশি কঠোর ছিল এবং শরীয়তের বিধান সম্বন্ধেও বেশি অজ্ঞ ছিল। এই আয়াতে তাদের ও তাদের সেই আচরণের কথা বর্ণিত হয়েছে। কিছু হাদীসেও তাদের চাল-চলন সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন একদা কিছু বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কি তোমাদের সন্তানদেরকে চুমা দাও?' সাহাবায়ে কিরামগণ উত্তরে বললেন 'হাঁ।' তারা বলল 'আল্লাহর শপথ! আমরা তো চুমা দিই না।' তাদের এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "আল্লাহ তাআলা যদি তোমাদের অন্তর থেকে মায়া-মমতা ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন, তবে আমার আর কি করার আছে?" (বুখারী ও মুসলিম) [২] এর কারণ হল যেহেতু তারা শহর থেকে দূরে বসবাস করত এবং আল্লাহ ও রসূল (সাঃ)-এর কথা শ্রবণ করার সুযোগ পেত না ।

আত-তাওবা 9:98

আর মরুবাসীদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে[১] যে, তারা যা কিছু ব্যয় করে তা জরিমানা মনে করে[২] এবং তোমাদের প্রতি (কালের) আবর্তন (দুঃসময়)এর প্রতীক্ষায় থাকে; [৩] (বস্তুতঃ) অশুভ আবর্তন তাদের উপরই পতিত হোক।[৪] আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। [১] এখন সেই দুই শ্রেণী বেদুঈনদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে, এরা প্রথম শ্রেণীর বেদুঈন। [২] غُرْمٌ অর্থ জরিমানা। অর্থাৎ এমন ব্যয় যা মানুষকে একদম অনিচ্ছার সাথে নিরুপায় হয়ে করতে হয়। [৩] - دَوَائِرُ- دَائِرَةٌ এর বহুবচন অর্থঃ কালের আবর্তন, বিপদাপদ। অর্থাৎ তারা মুসলিমদের উপর দুর্দিন ও বিপদ আসার অপেক্ষায় থাকে। [৪] এটা বদ্দুআ। (অর্থাৎ, অশুভ আবর্তন তাদের উপরই পতিত হোক।) অথবা সংবাদ দেওয়া হচ্ছে যে, তাদেরই দুর্দিন আসবে। কারণ তারাই দুর্দশাগ্রস্ত হওয়ার উপযুক্ত।

আত-তাওবা 9:99

আর মরুবাসীদের মধ্যে কতিপয় লোক এমনও আছে যারা আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, আর যা কিছু ব্যয় করে, তাকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপকরণ ও রসূলের দুআ লাভের উপকরণরূপে মনে করে।[১] স্মরণ রাখ, তাদের এই ব্যয়কার্য নিঃসন্দেহে তাদের জন্য (আল্লাহ) নৈকট্য লাভের কারণ। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে নিজ করুণায় প্রবেশ করাবেন;[২] নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। [১] এটা বেদুঈনদের দ্বিতীয় শ্রেণী, শহর থেকে দূরে থাকার পরেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান আনার তাওফীক দান করেছিলেন এবং সেই ঈমান দ্বারা তাদের ঐ অজ্ঞতাও দূর করে দেন, যা বেদুঈন হওয়ার কারণে বেদুঈনদের মধ্যে সাধারণতঃ পাওয়া যেত। সুতরাং তারা আল্লাহর পথে ব্যয়কৃত সম্পদকে জরিমানা ভাবত না; বরং তা আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দু'আ পাওয়ার উপায় মনে করত। এ দ্বারা স্বাদাক্বাহ প্রদানকারীদের জন্য নবী (সাঃ) যে বর্কতের দু'আ করতেন তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন স্বাদাক্বাহ প্রদানকারীর জন্য নবী (সাঃ) এই বলে দু'আ করেছিলেন, (اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ أَبِيْ أَوْفَى) "হে আল্লাহ ! আবু আওফার বংশের উপর রহমত বর্ষণ করুন।" (বুখারী, মুসলিম) [২] এটা সুসংবাদ যে, তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছে এবং তারা আল্লাহর রহমতের অধিকারী।

আত-তাওবা 9:100

আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী,[১] আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্ত্তত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীমালা প্রবাহিত; যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে,[২] এ হল বিরাট সফলতা। [১] এই আয়াতে তিন শ্রেণীর লোকের বর্ণনা বিদ্যমান। প্রথমঃ মুহাজিরগণ, যাঁরা দ্বীনের খাতিরে আল্লাহ ও রসূলের আদেশ পালনার্থে মক্কা ও অন্যান্য এলাকা থেকে হিজরত করতঃ সকল কিছু ত্যাগ করে মদীনায় চলে যান। দ্বিতীয়ঃ আনসারগণ, এঁরা মদীনার অধিবাসী ছিলেন। এঁরা সর্বাবস্থায় রসূল (সাঃ)-এর সাহায্য ও সুরক্ষা বিধান করেছিলেন এবং মদীনায় আগত মুহাজিরদের যথাযথ সম্মান করেছিলেন এবং নিজেদের সবকিছু তাদের খিদমতে কুরবান করে দিয়েছিলেন। এখানে সেই উভয় শ্রেণীর 'আস্-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' (অগ্রবর্তী ও প্রথম) ব্যক্তিবর্গের কথা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ সেই উভয় শ্রেণীর মধ্যে ঐ সকল ব্যক্তি যাঁরা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা কারা ছিলেন তা নির্ধারণ করণে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকের নিকট 'আস্-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' তাঁরা, যাঁরা উভয় ক্বিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। অর্থাৎ ক্বিবলা পরিবর্তন হওয়ার পূর্বে যে সমস্ত মুহাজির ও আনস্বারগণ মুসলমান হয়েছিলেন তাঁরা। আবার অনেকের নিকট 'আস্-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' ঐ সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম, যাঁরা হুদাইবিয়ায় অনুষ্ঠিত বাইআতে-রিযওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবার অনেকের নিকট ওঁরা হলেন তাঁরা, যাঁরা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইমাম শওকানী (রহঃ) বলেন, সকল অভিমতই সঠিক হতে পারে। তৃতীয়ঃ- ঐ সকল ব্যক্তি, যাঁরা একনিষ্ঠভাবে সেই মুহাজির ও আনস্বারদের অনুগামী ছিলেন। কেউ কেউ বলেন,তাঁরা হলেন পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণ, যাঁরা নবী (সাঃ)-এর দর্শন লাভ করতে পারেননি, কিন্তু সাহাবায়ে কিরামগণের সাথী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আবার কেউ কেউ তা সাধারণ রেখেছেন, অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মুসলিম মুহাজির ও আনস্বারদের সাথে মহব্বত রাখবেন ও তাঁদের আদর্শের উপর চলবেন, তাঁরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এতে পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণও এসে যাচ্ছেন। [২] 'আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট' বাক্যটির অর্থ হল, আল্লাহ তাআলা তাঁদের সৎকর্ম গ্রহণ করেছেন, মানুষ হিসাবে তাঁদের কৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাঁদের উপর অসন্তুষ্ট নন। যদি তা না হত, তাহলে উক্ত আয়াতে তাঁদের জন্য জান্নাত ও জান্নাতের নিয়ামতের সুসংবাদ দেওয়া হল কেন? এই আয়াত দ্বারা এটাও জানা গেল যে, আল্লাহর এই সন্তুষ্টি সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী। যদি রসূল (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কিরামগণের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত (যেমন এক বাতিল ফির্কার বিশ্বাস আছে), তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন না। এ থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের সমস্ত ত্রুটি মার্জনা করে দিয়েছেন, তখন তাঁদের সমালোচনা করে তাঁদের ভুল-ত্রুটি বর্ণনা করা কোন মুসলিমের উচিত নয়। বস্তুতঃ এটাও জানা গেল যে, তাঁদের প্রতি মহব্বত রাখা এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ। আর তাঁদের প্রতি শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। {فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالأَمْنِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ}

আত-তাওবা 9:101

মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশেপাশে আছে তাদের মধ্য হতে কতিপয় এবং মদীনাবাসীদের মধ্যে হতেও কতিপয় লোক এমন মুনাফিক্ব রয়েছে; যারা মুনাফিক্বীতে অটল।[১] তুমি তাদেরকে জান না,[২] আমি তাদেরকে জানি। আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করব,[৩] অতঃপর (পরকালেও) তারা মহা শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। [১] مَرَدَ এবং تَمَرَّد এর অর্থ হল নরম, মোলায়েম এবং খালি। সুতরাং পাতা নেই এমন ডালকে, দেহে লোম নেই এমন ঘোড়াকে এবং মুখমন্ডলে এখনো দাঁড়ি-মোছ গজায়নি এমন বালককে أَمْرَدُ বলা হয়। যেমন কাঁচকে صَرْحٌ مُمَرَّدٌ অর্থাৎ مُجَرَّدٌ (স্বচ্ছ) বলা হয়। (مَرَدُوْا عَلَى النِّفَاقِ) এর অর্থ হবে 'تَجَرَّدُوا عَلَى النِّفَاقِ' অর্থাৎ তারা নিজেদেরকে মুনাফিকির জন্য খালি করে নিয়েছে, অর্থাৎ, খাঁটি মুনাফিকিতে তারা অনড়। [২] এখানে কত পরিষ্কার বাক্যে নবী (সাঃ)-এর 'আ-লিমুল গায়ব' না হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আফসোস! যদি বিদআতীরা কুরআন বুঝার তাওফীক পেত। [৩] কেউ কেউ এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন যে, তা হল পৃথিবীর অপমান-লাঞ্ছনা, তারপর আখেরাতের শাস্তি। আবার কেউ কেউ বলেন, পৃথিবীরই দ্বিগুণ শাস্তি।

আত-তাওবা 9:102

আরো কতক লোক আছে যারা নিজেদের অপরাধসমূহ স্বীকার করেছে,[১] যারা সৎকর্মের সাথে অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে।[২] আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন।[৩] নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। [১] এরা সেই সকল একনিষ্ঠ মুসলিম, যারা কোন ওজর আপত্তি ছাড়াই শুধু শৈথিল্যের কারণে তাবুক অভিযানে নবী (সাঃ)-এর সাথে শরীক হয়নি। তবে পরে তারা আপন ভুল বুঝতে পারে এবং তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করে নেয়। [২] 'সৎকর্ম' বলতে ঐ সকল নেক আমল, যা তারা জিহাদে না যাওয়ার পূর্বে করেছিল। এর ভিতর কিছু যুদ্ধে তাদের অংশ গ্রহণের আমলও ছিল। আর 'অসৎকর্ম' থেকে উদ্দেশ্য হল তাবুকের যুদ্ধে তাদের পিছিয়ে থাকা। [৩] আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা ও সম্ভাবনার অর্থই হল, তা নিশ্চিত। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাদের অপরাধের স্বীকারোক্তিকে তওবার স্থানে রেখে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।

আত-তাওবা 9:103

তুমি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদাকাহ গ্রহণ কর, যার দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশোধিত করে দেবে। আর তাদের জন্য দুআ কর,[১] নিঃসন্দেহে তোমার দুআ হচ্ছে তাদের জন্য শান্তির কারণ। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। [১] এটা সাধারণ আদেশ। স্বাদাক্বাহ থেকে উদ্দেশ্য ফরযকৃত স্বাদাক্বাহ অর্থাৎ যাকাত হতে পারে, আবার নফল স্বাদাক্বাহও হতে পারে। এখানে নবী (সাঃ)-কে আদেশ দেওয়া হচ্ছে যে, স্বাদাক্বাহ দ্বারা তুমি মুসলিমদেরকে পবিত্র কর। এতে এই কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যাকাত ও স্বাদাক্বাহ মানুষের আখলাক-চরিত্রকে পবিত্র করার একটি বড় উপায়। এ ছাড়া স্বাদাক্বাহ কে স্বাদাক্বাহ এই জন্য বলা হয় যে, স্বাদাক্বাহ দাতা নিজের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী। দ্বিতীয় বিষয় এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, স্বাদাক্বাহ উসুলকারীর উচিত, স্বাদাক্বাহদাতার জন্য দু'আ করা। যেমন এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বর (সাঃ)-কে দু'আ করার আদেশ দিয়েছেন এবং নবী (সাঃ) উক্ত আদেশ অনুযায়ী দু'আ করতেন। এই সাধারণ আদেশ থেকে এটাও দলীল নেওয়া হয়েছে যে, যাকাত উসূল করার দায়িতত্ত্ব সমসাময়িক বাদশা বা শাসকের। যদি কেউ তা প্রদান করতে অস্বীকার করে, তবে আবু বাকর (রাঃ) ও সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)গণের আমল অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা অপরিহার্য। (ইবনে কাসীর)

আত-তাওবা 9:104

তারা কি এটা অবগত নয় যে, আল্লাহই নিজ বান্দাদের তওবা কবুল করে থাকেন এবং তিনিই দান-খয়রাত গ্রহণ করেন,[১] আর নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম করুণাময়? [১] 'তিনিই দান-খয়রাত বা স্বাদাক্বাহ গ্রহণ করেন' (এই শর্তের উপর যে তা হালাল উপার্জন থেকে হতে হবে) এর অর্থ হল তা বৃদ্ধি করেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে; নবী (সাঃ) বলেছেন "যে ব্যক্তি (তার) বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ থেকে একটি খেজুর পরিমাণও কিছু দান করে -- আর আল্লাহ তো বৈধ অর্থ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণই করেন না -- সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তা ঐ ব্যক্তির জন্য লালন-পালন করেন; যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্ব-শাবককে লালন-পালন করে থাকে। পরিশেষে তা পাহাড়ের মত হয়ে যায়।" (বুখারী১৪১০নং, মুসলিম ১০১৪নং)

আত-তাওবা 9:105

তুমি বলে দাও, তোমরা কাজ করতে থাক। অচিরেই তোমাদের কার্যকলাপ আল্লাহ দেখবেন এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীগণও দেখবে।[১] আর অচিরেই তোমাদেরকে অদৃশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞাতা (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের সকল কৃতকর্ম জানিয়ে দেবেন।’ [১] يرى এর অর্থ হল দেখা ও জানা। অর্থাৎ তোমাদের কর্ম শুধু আল্লাহ তাআলাই দেখেন না; বরং সে বিষয়ে (অহী দ্বারা) আল্লাহর রসূল (সাঃ) এবং মু'মিনগণও অবগত হন। (এ কথা মুনাফিক্বদের ব্যাপারেই বলা হচ্ছে।) এই শ্রেণীর আয়াত পূর্বেও (৯৪ নম্বরে) উক্ত হয়েছে। এখানে ঈমানদারদের কথা অতিরিক্ত ব্যক্ত হয়েছে। আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর খবর দেওয়াতে তারাও মুনাফিকদের (মুনাফিকি) আমল জানতে পারে।

আত-তাওবা 9:106

আরো কতক লোক রয়েছে, যাদের ব্যাপারে (সিদ্ধান্ত) আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে;[১] হয় তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন[২] অথবা তাদের তওবা কবুল করবেন।[৩] আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। [১] তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রথমতঃ মুনাফিক্বরা পিছিয়ে ছিল। দ্বিতীয়তঃ এমন কিছু (মুসলিম) লোক পিছিয়ে ছিল, যাদের কোন ওজর ছিল না। তারা তাদের নিজ অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিল; কিন্তু তাদেরকে সাথে সাথে ক্ষমা করা হয়নি; বরং তাদের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ আসা অবধি অপেক্ষা করা হয়েছিল। এই আয়াতে সেই শ্রেণীর লোকদের কথা আলোচিত হয়েছে। (এরা তিনজন ছিল, যাদের বর্ণনা সামনে আসবে।) [২] যদি তারা আপন ত্রুটির উপর অটল থাকে। [৩] যদি তারা আন্তরিকভাবে খাঁটি তওবা করে নেয়।

আত-তাওবা 9:107

আর কেউ কেউ এমন আছে, যারা ক্ষতি সাধন করার উদ্দেশ্যে, কুফরী করার উদ্দেশ্যে, বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এবং যে ব্যক্তি ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তার ঘাঁটিস্বরূপ (একটি নতুন) মসজিদ নির্মাণ করেছে।[১] তারা অবশ্যই শপথ করে বলবে, ‘মঙ্গল ভিন্ন আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই।’ আর আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, অবশ্যই তারা মিথ্যাবাদী।[২] [১] এই আয়াতে মুনাফিক্বদের আরো একটি অত্যন্ত নোংরা ষড়যন্ত্রের কথা বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলঃ- তারা একটি মসজিদ নির্মাণ করে (কুরআন উক্ত মসজিদটিকে 'মাসজিদু য্বিরার' নামে অভিহিত করেছে)। তারা নবী (সাঃ)-কে বুঝাতে চায় যে, বৃষ্টি, ঠান্ডা ইত্যাদির সময়ে দুর্বল ও অসুস্থ লোকদের দূরে (মসজিদে ক্বুবায়) যেতে বড় কষ্ট হয়। ফলে তাদের সুবিধার্থে আমরা অপর একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি সেখানে গিয়ে নামায পড়েন, যাতে আমরা বরকত লাভে ধন্য হই। নবী (সাঃ) তখন তাবুক অভিযানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর নামায পড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু ফিরার পথে আল্লাহ তাআলা অহী দ্বারা মুনাফিকদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ফাঁস করে দিলেন। তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হল যে, আসলে এই মসজিদ তারা মুসলিমদের ক্ষতিসাধন, কুফরীর প্রচার, মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শত্রুদের জন্য আশ্রয়স্থল বানাবার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছে। [২] অর্থাৎ, মিথ্যা শপথ করে তারা নবী (সাঃ)-কে প্রতারিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাদের চক্রান্ত ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করলেন এবং বলে দিলেন যে, এদের উদ্দেশ্য সৎ নয় এবং তারা যা প্রকাশ করছে তাতে তারা মিথ্যুক।

আত-তাওবা 9:108

তুমি কখনো ওতে (নামাযের জন্য) দাঁড়াবে না;[১] অবশ্যই যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই আল্লাহভীতির উপর স্থাপিত হয়েছে, তাতেই (নামাযের জন্য) দাঁড়ানো তোমার অধিক সমুচিত।[২] সেখানে এমন সব লোক রয়েছে যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে পছন্দ করে।[৩] আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা সম্পাদনকারীদেরকে পছন্দ করেন। [১] অর্থাৎ, তুমি সেখানে গিয়ে নামায পড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, সে অনুযায়ী সেখানে গিয়ে নামায পড়বে না। সুতরাং মহানবী (সাঃ) সেখানে নামায তো পড়েননি; বরং কতিপয় সাহাবীকে পাঠিয়ে সেই তথাকথিত মসজিদটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এই কর্ম দ্বারা দলীল নিয়ে উলামাগণ বলেন, যদি কোন মসজিদ আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত, মুসলিমদেরকে বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়, তবে তাকে 'মসজিদে য্বিরার' বলা যাবে এবং তা ভেঙ্গে ধ্বংস করে দিতে হবে। যাতে মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও ভেদাভেদ সৃষ্টি না হয়। [২] 'যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই আল্লাহ-ভীতির উপর স্থাপিত হয়েছে' সে মসজিদ কোনটি? এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ কেউ মসজিদে ক্বুবা, আবার কেউ কেউ মসজিদে নববী বলেছেন। সালাফদের কেউ কেউ উভয়কেই বলেছেন। ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন, যদি এই আয়াত দ্বারা মসজিদে ক্বুবা ধরা হয়, তবে কতিপয় হাদীস দ্বারা মসজিদে নববীকে (أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى) বলে সমর্থন করা হয়েছে এবং উভয়ের মাঝে কোন বিরোধ নেই। কারণ মসজিদে ক্বুবা যদি (أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى) এর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, তবে মসজিদে নববী তো আরো অধিকভাবে সেই মর্যাদার অধিকারী। [৩] হাদীসে এসেছে যে, তাঁরা হলেন ক্বুবাবাসী। তাঁরা পবিত্রতা অর্জনে পানি ব্যবহার করতেন বলে মহান আল্লাহ তাঁদের প্রশংসা করেছেন। (প্রকাশ থাকে যে, ঢেলার সাথে পানি ব্যবহার করার হাদীস সহীহ নয়। ইরওয়াউল গালীল ৪২নং দ্রঃ) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, এই আয়াত এই কথার প্রমাণ যে, এমন পুরাতন মসজিদে নামায আদায় করা উত্তম, যে মসজিদ একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার নিমিত্তে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুরূপ নেক লোকদের জামাআতে এবং এমন ব্যক্তিদের সাথে নামায পড়া উত্তম যারা পূর্ণরূপে ওযূ করতে ও পবিত্রতা অর্জনে বিশেষ যত্নবান।

আত-তাওবা 9:109

০৯) তবে কি সে ব্যক্তি উত্তম, যে নিজ ইমারতের ভিত্তি আল্লাহভীতি ও তাঁর সন্তুষ্টির উপর স্থাপন করেছে অথবা সেই ব্যক্তি, যে স্বীয় ইমারতের ভিত্তি স্থাপন করেছে কোন পতনমুখী গর্তের কিনারায়, অতঃপর তা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়?[১] আর আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে পথ দেখান না। [১] এই আয়াতে মু'মিন ও মুনাফিকদের আমলের উদাহরণ বর্ণনা করা হয়েছে। মু'মিনদের আমল আল্লাহ-ভীতির ভিত্তিতে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে হয়। আর মুনাফিক্বদের আমল লোক প্রদর্শন ও উদ্দেশ্য-ভ্রষ্টতার উপর ভিত্তি করে হয়। যা ভূমির সেই অংশের মত যার তলদেশ দিয়ে উপত্যকার পানি প্রবাহিত হয় এবং সেখানকার মাটিকে নিজের সাথে বয়ে নিয়ে যায়। ফলে সেই অংশের তলদেশ ফাঁকা হয়ে যায়। বিদিত যে, তার উপর কোন ঘর নির্মাণ করলে অতি সত্ত্বর তা ভেঙ্গে পড়বে। সেই মুনাফিকদের মসজিদ নির্মাণের কাজও অনুরূপ, যা তাদের নিয়ে জাহান্নামে পতিত হবে।

আত-তাওবা 9:110

তাদের এই ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সদা তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।[১] আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। [১] 'অন্তর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়' এর অর্থ হল, মারা যায়। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত এই গৃহ তাদের অন্তরে আরো বেশি সন্দেহ ও মুনাফিকী সৃষ্টি করার কারণ হয়ে থাকবে। যেমন বাছুর পূজারীদের হৃদয়-মনে বাছুর-প্রীতি জমে বসেছিল।

আত-তাওবা 9:111

নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্বাসীদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন-সম্পদসমূহকে বেহেশ্তের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন;[১] তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা হত্যা করে এবং নিহত হয়ে যায়। এ (যুদ্ধে)র দরুন (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জীলে এবং কুর’আনে; আর নিজের অঙ্গীকার পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর অন্য কে আছে?[২] অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাক তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর, যা তোমরা সম্পাদন করেছ।[৩] আর এটা হচ্ছে মহাসাফল্য। [১] এখানে আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও দয়ার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তিনি মু'মিনদেরকে তাদের জান ও ঐ সম্পদ যা তাঁরা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তার বিনিময়ে জান্নাত প্রদান করেছেন। অথচ এই জান ও মালও সেই আল্লাহরই দান। আবার মূল্য ও বদলা হিসাবে যা দান করেছেন, অর্থাৎ সেই জান্নাত নেহাতই মূল্যবান। [২] এটা উক্ত ক্রয়-বিনিময়ের তা'কীদ যে, আল্লাহ তাআলা এই সত্য অঙ্গীকার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং কুরআনেও করেছেন। আর আল্লাহর চেয়ে অধিক অঙ্গীকার পূরণকারী কে হতে পারে? [৩] এ কথা মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে। কিন্তু এই আনন্দ তখনই করা যাবে, যখন মুসলিমগণ উক্ত ব্যবসা মেনে নেবে। অর্থাৎ, আল্লাহর পথে জান ও মাল কুরবানী করতে কোন দ্বিধা করবে না।

আত-তাওবা 9:112

তারা হচ্ছে তওবাকারী, ইবাদতকারী, প্রশংসাকারী, রোযা পালনকারী, রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে বাধা প্রদানকারী, আল্লাহর বিধি-সীমাসমূহের সংরক্ষণকারী।[১] আর তুমি বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও।[২] [১] এখানে ঐ সকল মু'মিন ব্যক্তিদের আরো কিছু গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে, যাদের জান ও মাল আল্লাহ তাআলা জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে তওবাকারী হবে, নিয়মিত আপন প্রভূর ইবাদতকারী হবে, আর মুখে আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনাকারী এবং এই আয়াতে বর্ণিত সকল গুণের অধিকারী হবে। অধিকাংশ তফসীরবিদদের মতে سَائحُون এর অর্থ রোযাপালনকারী। এই অর্থকেই ইবনে কাসীর (রহঃ) সহীহ ও প্রসিদ্ধ মত বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অনেকে তার অর্থ আল্লাহর পথে জিহাদ বলেছেন। এরপরেও 'সিয়াহাত' এর অর্থ দেশ-ভ্রমণ নয় যেমন অনেকে এই অর্থ নিয়েছেন। অনুরূপ ইবাদতের জন্য পাহাড়ের চূড়া, গুহা এবং নির্জন মরুভূমিতে গিয়ে বসবাস করাও এর অর্থ নয়। কারণ তা বৈরাগ্যবাদের একটা অংশ যা ইসলাম ধর্মে নেই। তবে হ্যাঁ, ফিতনার সময় নিজের দ্বীন বাঁচানোর তাগীদে শহর ও জনবসতি ত্যাগ করে জঙ্গল ও মরুভূমিতে গিয়ে বাস করার অনুমতি হাদীসে দেওয়া হয়েছে। (বুখারী) [২] উদ্দেশ্য হল যে, বিশ্বাসী বা পূর্ণ মু'মিন ঐ ব্যক্তি; যে কথা ও কর্মে ইসলামী শিক্ষার উত্তম নমুনা হয় এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনকারী নয় বরং তার সংরক্ষণকারী হয়। এরূপ পূর্ণ মু'মিনরাই সুসংবাদের অধিকারী। এটা সেই কথাই, যা কুরআনে (آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَات) শব্দ দ্বারা বার বার উক্ত হয়েছে। এখানে কিছু নেক আমলের কথা কিঞ্চিৎ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

আত-তাওবা 9:113

অংশীবাদীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও বিশ্বাসীদের জন্য সঙ্গত নয়; যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, তাদের কাছে একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। [১] [১] এই আয়াতের তফসীর সহীহ বুখারীতে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন নবী (সাঃ)-এর চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, তখন নবী (সাঃ) তার নিকট গেলেন। তার নিকট আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ বিন আবী উমাইয়্যাহ বসেছিল। নবী (সাঃ) বললেন, "চাচাজান! 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ে নিন, যাতে আমি আল্লাহর নিকট আপনার জন্য প্রমাণ পেশ করতে পারি। আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ বিন আবী উমাইয়্যাহ বলল, "হে আবু তালেব! (মৃত্যুর) সময় আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে?" (শেষে ঐ অবস্থাতেই তার মৃত্যু হল।) নবী (সাঃ) বললেন, "যতক্ষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে নিষেধ না করা হবে, ততক্ষণ আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব।" তখন উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হল, যাতে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। (সহীহ বুখারী) এবং সূরা ক্বস্বাস্বের ২৮:৫৬ নং আয়াত (إِنَّكَ لاَ تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ) আয়াতটিও এই মর্মে অবতীর্ণ হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় আছে যে, একদা নবী (সাঃ) তাঁর মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ আহমদ ৫ম খন্ড ৩৫৫পৃঃ) আর নবী (সাঃ) নিজ সম্প্রদায়ের জন্য যে দু'আ করেছিলেন, (اَللّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِيْ فَإِنَّهُمْ لاَ يَعْلَمُوْنَ) "হে আল্লাহ! তুমি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা অজ্ঞ।" তা এই আয়াতের বিরোধী নয়। কারণ এই দু'আর অর্থ হল তাদের জন্য হিদায়াত কামনা করা। অর্থাৎ তারা আমার মর্যাদা ও সম্মান থেকে বেখবর, তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দাও, যাতে তারা ক্ষমার যোগ্য হয়ে যায়। আর জীবিত কাফের ও মুশরিকের জন্য হিদায়াতের দু'আ করা বৈধ।

আত-তাওবা 9:114

আর ইব্রাহীমের নিজ পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা তো কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে ছিল, যা সে তার সাথে করেছিল। অতঃপর যখন তার নিকট এ সুস্পষ্ট হল যে, সে (পিতা) আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিল।[১] বাস্তবিকই ইব্রাহীম ছিল অতিশয় কোমল হৃদয়, সহনশীল। [২] [১] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ) যখন পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু ও জাহান্নামী, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলেন এবং তারপর আর ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। [২] আর শুরুতে পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও তাঁর কোমল-হৃদয় ও সহনশীলতার কারণেই ছিল।

আত-তাওবা 9:115

আর আল্লাহ এরূপ নন যে, কোন জাতিকে পথপ্রদর্শন করার পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেন; যে পর্যন্ত না তাদেরকে সেসব বিষয় পরিষ্কারভাবে বলে দেন, যা হতে তারা বেঁচে থাকবে;[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ। [১] আল্লাহ তাআলা যখন মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে নিষেধ করে দিলেন, তখন কিছু সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ), যাঁরা এই কর্ম করেছিলেন, তাঁরা এই ভেবে চিন্তিত হলেন যে, তাঁরা তাঁদের মুশরিক আত্মীয়দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে ভ্রষ্টতার কাজ করেননি তো? আল্লাহ তাআলা বললেন যে, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ কোন বস্তুর নিষিদ্ধতা ঘোষণা না করেন, ততক্ষণ তিনি তার উপর কোন ধর-পাকড় করেন না এবং তাকে ভ্রষ্টতাও গণ্য করেন না। তবে নিষিদ্ধ কর্ম থেকে কেউ বিরত না থাকলে আল্লাহ তাআলা তাকে পথভ্রষ্ট করে দেন। ফলে যাঁরা উক্ত আদেশের পূর্বে মৃত মুশরিক আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তাঁদের ধর-পাকড় হবে না, কারণ তাঁরা উক্ত নির্দেশ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

আত-তাওবা 9:116

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব নিশ্চয়ই আল্লাহরই; তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন; আর তোমাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া না কোন বন্ধু আছে, আর না কোন সাহায্যকারী।

আত-তাওবা 9:117

আল্লাহ ক্ষমা করলেন নবীকে এবং মুহাজির ও আনসারদেরকে যারা সংকট মুহূর্তে নবীর অনুগামী হয়েছিল,[১] এমন কি যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর বাঁকা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল,[২] তারপর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি বড় স্নেহশীল, পরম করুণাময়। [১] তাবুক যুদ্ধের সফরকে 'সঙ্কটমুহূর্ত' বলে অভিহিত করেছে। কারণ প্রথমতঃ তখন গ্রীষ্মকাল ছিল। দ্বিতীয়তঃ ফসল কাটার সময় ছিল। তৃতীয়তঃ অনেক দূরের সফর ছিল। চতুর্থতঃ সফরের সম্বলও ছিল অতি অল্প। ফলে এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদেরকে (جَيش العُسرَة) (সঙ্কটকালের সেনা) বলা হয়। তওবার জন্য জরুরী নয় যে, পূর্বে গুনাহ বা ভুল হয়ে থাকবে। ভুল বা পাপ ছাড়াও উচ্চমর্যাদা ও অজান্তে সম্পাদিত ত্রুটির জন্য তওবা করা হয়। এখানে মুহাজির ও আনসারদের প্রথম দলটির তওবাও এই অর্থে, যাঁরা বিনা দ্বিধায় নবী (সাঃ)-এর আদেশ শোনামাত্র জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। [২] এটা সেই দ্বিতীয় দলটির বর্ণনা, যাঁরা উপরে উল্লিখিত কারণে শুরুতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং আনন্দের সাথে জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। অন্তরের দ্বিধার অর্থ ধর্মে কোন প্রকার দ্বিধা বা সন্দেহ নয়; বরং উল্লিখিত সাংসারিক ও পারিপারশ্বিক কারণে জিহাদে শরীক হওয়াতে ইতস্ততঃ করা হয়েছিল।

আত-তাওবা 9:118

আর ঐ তিন ব্যক্তিকেও ক্ষমা করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছিল;[১] পরিশেষে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল[২] আর তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও হতে বাঁচার অন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তওবা করে।[৩] নিশ্চয় আল্লাহই হচ্ছেন তওবা গ্রহণকারী, পরম করুণাময়। [১] خُلِّفٌوْا আর مُرْجَوْنَ এর অর্থ একই; অর্থাৎ যাঁদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল এবং পঞ্চাশ দিন পর তাদের তওবা কবুল হয়েছিল। তাঁরা তিন জন সাহাবী ছিলেন। কা'ব বিন মালেক, মুরারাহ বিন রাবী' ও হিলাল বিন উমাইয়াহ (রাঃ)। এঁরা তিনজনই ছিলেন অতি মুখলেস (খাঁটি) ব্যক্তি। যাঁরা ইতিপূর্বে মহানবী (সাঃ)-এর সাথে সকল জিহাদে শরীক হয়েছিলেন। শুধু তাবুক যুদ্ধে অবহেলাবশতঃ শরীক হননি। পরে তাঁরা আপন ভুল বুঝতে পারলেন ও ভাবলেন যে, জিহাদে শরীক না হয়ে পিছিয়ে থাকায় অপরাধ তো করেছি; কিন্তু পুনরায় মুনাফিকদের ন্যায় রসূল (সাঃ)-এর নিকট মিথ্যা অজুহাত পেশ করার মত ভুল আর করব না। সুতরাং তাঁরা নবী (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে পরিষ্কারভাবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিলেন এবং তার শাস্তির জন্য নিজেদেরকে পেশ করলেন। নবী (সাঃ) তাঁদের বিষয় আল্লাহকে সোপর্দ করে দিলেন যে, আল্লাহ তাদের বিষয়ে কোন ফায়সালা পাঠাবেন। এরপরেও নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)গণকে সেই তিন ব্যক্তির সাথে কোন সামাজিক সম্পর্ক রাখতে, এমনকি কথাবার্তা বলতেও নিষেধ করে দেন এবং চল্লিশ দিন পর তাঁদেরকে নিজ নিজ স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার আদেশ দেন। সুতরাং তাই করা হয়। আরো দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁদের তওবা কবুল করা হয় এবং উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। (উক্ত ঘটনা বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী ও মুসলিম, কিতাবুত তাওবাহ) [২] সামাজিক বয়কটের ফলে তাঁদেরকে যে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিল এটা তারই বর্ণনা । [৩] অর্থাৎ পঞ্চাশ দিন পর আল্লাহ তাআলা তাঁদের কাকুতি-মিনতি শোনেন এবং তওবা কবুল করেন।

আত-তাওবা 9:119

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।[১] [১] সত্যবাদিতার কারণে আল্লাহ তাআলা সেই তিনজন সাহাবী (রাঃ)-এর শুধু অপরাধই ক্ষমা করে দেননি; বরং তাঁদের তওবার কথা কুরআনের আয়াতরূপে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে মু'মিনদেরকে আল্লাহ-ভীতি অবলম্বন করার ও সত্যবাদীদের সাথে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ-ভীতি থাকবে সে সত্যবাদীও হবে। আর যে মিথ্যুক হবে, জেনে রাখুন যে, তার অন্তর আল্লাহ-ভীতি থেকে খালি হবে। এই জন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মিথ্যা বলা মুনাফিক্বের একটি লক্ষণ।

আত-তাওবা 9:120

মদীনাবাসী ও তাদের পার্শ্ববর্তী মরুবাসীদের জন্য সঙ্গত নয় যে, আল্লাহর রসূলের (সঙ্গী না হয়ে) পিছনে থেকে যাবে[১] এবং তার প্রাণ অপেক্ষা নিজেদের প্রাণকে প্রিয় মনে করবে।[২] কারণ,[৩] আল্লাহর পথে তাদেরকে যে পিপাসা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা পায়, আর অবিশ্বাসীদের ক্রোধ সৃষ্টি করে এমন স্থানে তারা যে পদক্ষেপ করে[৪] এবং শত্রুদের নিকট হতে তারা যা লাভ করে,[৫] তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তাদের জন্য এক একটি নেক আমল লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ পুণ্যবানদের পুণ্যফল বিনষ্ট করেন না। [১] তাবুক যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য যেহেতু সাধারণভাবে সকলকে ডাক দেওয়া হয়েছিল। ফলে বিকলাঙ্গ, বৃদ্ধ ও শরয়ী ওজর-ওয়ালা ব্যতীত সকলের জন্য তাতে শরীক হওয়া জরুরী ছিল। কিন্তু এরপরেও যে সকল মদীনাবাসী বা মদীনার আশে-পাশে বসবাসকারীগণ সেই যুদ্ধে শরীক হয়নি, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তিরস্কার ও ধমক স্বরূপ বলছেন যে, রসূল (সাঃ) থেকে পিছিয়ে থাকা তাদের উচিত হয়নি। [২] অর্থাৎ এটাও উচিত নয় যে, তারা নিজেদের জান বাঁচিয়ে নেবে এবং রসূল (সাঃ)-এর জান বাঁচানোর প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ থাকবে না। বরং রসূল (সাঃ)-এর নিকটে থেকে তাদের নিজেদের জান বাঁচানোর চেয়ে রসূল (সাঃ)-এর সুরক্ষা বিধান করা বেশি দরকার। [৩] ذلك দ্বারা পিছিয়ে না থাকার কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের এই জন্য পিছিয়ে থাকা উচিত নয় যে, আল্লাহর পথে যে পিপাসা, ক্ষুধা ও ক্লান্তি তাদেরকে স্পর্শ করে বা তাদের এমন পদক্ষেপ যাতে কাফেরদের মনে ক্রোধ বৃদ্ধি পায়, অনুরূপ শত্রু পক্ষের মানুষ হত্যা বা তাদেরকে বন্দী করে, তার প্রত্যেকটিই তাদের জন্য নেক আমল হিসাবে লিখিত হয়। অর্থাৎ নেক আমল শুধু এই নয় যে, মানুষ মসজিদে বা কোন এক নির্জন স্থানে বসে বসে নফল নামায, কুরআন তেলাঅত, আল্লাহর যিকর ইত্যাদি করবে। বরং জিহাদে যে সকল কষ্ট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়; এমনকি এমন কর্ম যার দ্বারা শত্রুর মনে ভীতি বা ক্রোধের সঞ্চার হয়, তার সকল কিছু আল্লাহর নিকট নেক আমল রূপে লিখিত হয়। ফলে শুধু ইবাদত করার উদ্দেশ্যেও জিহাদ থেকে দূরে থাকা ঠিক নয়, বিনা ওজরে জিহাদে ফাঁকি দেওয়া তো দূরের কথা। [৪] এর অর্থ পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে এমন এলাকা অতিক্রম করা যে, তাদের পদক্ষেপ ও ঘোড়ার পদশব্দে শত্রুর মনে ত্রাস ও কম্পন শুরু হয় এবং তাদের হৃদয়ে ক্রোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। [৫] 'শত্রুদের নিকট হতে তারা যা লাভ করে।' এর অর্থ হল তাদের দলের মানুষকে হত্যা বা বন্দী করে অথবা তাদেরকে পরাজিত করে এবং গনীমতের সম্পদ অর্জন করে।

আত-তাওবা 9:121

আর ছোট-বড় যা কিছু তারা ব্যয় করে এবং যত উপত্যকা অতিক্রম করে,[১] তা তাদের জন্য লিপিবদ্ধ হয়, যাতে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মসমূহের অতি উত্তম বিনিময় প্রদান করতে পারেন। [১] পর্বতমালার মধ্যবর্তী যে জায়গা দিয়ে বৃষ্টির পানি বয়ে যায়, তাকে وَادي (উপত্যকা) বলা হয়। এখানে সাধারণ প্রান্তর ও এলাকা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহর পথে অল্প-বিস্তর যা কিছু ব্যয় করবে, অনুরূপ যত প্রান্তর অতিক্রম করবে (অর্থাৎ জিহাদে অল্প বা বেশি যতটাই সফর করবে) তা সবই নেকী হিসাবে তাদের আমল-নামায় লেখা হবে, যার উপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সর্বোত্তম বিনিময় প্রদান করবেন।

আত-তাওবা 9:122

আর বিশ্বাসীদের জন্য সঙ্গত নয় যে, তারা (জিহাদের জন্য) সবাই একত্রে বের হয়ে পড়ে; সুতরাং তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল বহির্গত হয় না কেন, যাতে অবশিষ্ট লোক ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে থাকে এবং যাতে তারা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে এলে তাদেরকে সতর্ক করতে পারে। যাতে তারা সাবধান হতে পারে। [১] [১] কোন কোন তাফসীরবিদের নিকট জিহাদের আদেশের সাথে এই আয়াতের সম্পর্ক রয়েছে। উদ্দেশ্য হল যে, যখন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে জিহাদ থেকে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের জন্য কঠিন শাস্তি ও ডাঁট-ধমকের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তখন সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)গণ বড় সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন এবং যখনই জিহাদের সময় আসত, তখনই সকলেই তাতে শরীক হওয়ার চেষ্টা করতেন। এই আয়াতে তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, সমস্ত জিহাদ এমন নয় যে, তাতে সকলের শরীক হওয়া জরুরী হবে (যেমন তাবুক যুদ্ধে জরুরী ছিল)। বরং এক দলের শরীক হওয়াই যথেষ্ট হবে। তাঁদের নিকট لِيَتَفَقَّهُوا এর সম্বোধিত ব্যক্তি ওরা, যারা জিহাদে অংশ নেবে না। অর্থাৎ একদল জিহাদ করতে যাবে এবং تَبقَى طَائِفَة (বাক্যটি ঊহ্য হবে) এক দল সেখানে থেকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করবে। অতঃপর মুজাহিদগণ যখন ফিরে আসবে, তখন তাদেরকেও দ্বীনের বিধান অবগত করিয়ে ভীতি প্রদর্শন করবে। এই আয়াতের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল যে, জিহাদের সাথে এই আয়াতের কোন সম্পর্ক নেই; বরং এতে দ্বীনের শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা এবং তার পদ্ধতির কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ, যে কোন গোত্র বা জামাআত থেকে কিছু মানুষ দ্বীনী শিক্ষা অর্জনের জন্য আপন বাড়ি-ঘর ছেড়ে মাদ্রাসা বা জ্ঞান লাভের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তা অর্জন করবে এবং শিক্ষা নিয়ে ফিরে এসে স্বগোত্রের লোকদেরকে ওয়ায-নসীহত করবে। দ্বীনের জ্ঞান লাভ করার অর্থ হল দ্বীনের আদেশ ও নিষেধের জ্ঞান অর্জন করা যাতে আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারে আর আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বাঁচতে পারে এবং স্বগোত্রেও ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধের কাজ করতে পারে।

আত-তাওবা 9:123

হে বিশ্বাসীগণ! ঐ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের আশে-পাশে অবস্থান করে[১] এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়।[২] আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ পরহেযগার (সাবধানী)দের সাথে থাকেন। [১] এই আয়াতে কাফেরদের সাথে জিহাদ করার এক গুরুতত্ত্বপূর্ণ মৌলিক নিয়ম-নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। তা এই যে, কাফেরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, প্রথমে তাদের সাথে জিহাদ করবে। যেমন নবী (সাঃ) প্রথমে আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুশরিকদের সাথে জিহাদ করেছেন, যখন তাদের সাথে জিহাদ শেষ করলেন এবং আল্লাহ তাআলা মক্কা, তায়েফ, ইয়ামান, ইয়ামামা, হাজার, খাইবার, হাযরে মাউত ইত্যাদির উপর মুসলিমদেরকে বিজয়ী করলেন এবং আরবের সমস্ত গোত্র দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল, তখন তিনি আহলে কিতাবদের সাথে জিহাদের সূচনা করলেন এবং নবম হিজরী সনে রোমানদের সাথে জিহাদের জন্য তাবুক রওয়ানা হলেন যা আরব উপদ্বীপের নিকটবর্তী ছিল। উক্ত নীতি অনুযায়ী নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদীন (রাঃ)গণ রোমের খ্রিষ্টানদের এবং ইরানের অগ্নিপূজকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। [২] অর্থাৎ কাফেরদের প্রতি মুসলিমগণের মন নরম নয়, কঠোর হওয়া দরকার। যেমন (أَشِدّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُم) (الفتح-২৯ "কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল" সাহাবায়ে কিরামগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। অনুরূপ (أَذِلَّّةٍ عَلَى الْمُؤمِنِينَ أَعِزّةٍ عَلَى الْكَافِرِين) (المائدة-৫৪) মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য।

আত-তাওবা 9:124

আর যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, ‘এই সূরা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান (বিশ্বাস) বৃদ্ধি করল?’[১] আসলে যেসব লোক ঈমান এনেছে, এই সূরা তাদের ঈমানকে বর্ধিত করেছে এবং তারা আনন্দ লাভ করছে। [২] [১] এই সূরাতে মুনাফিকদের যে স্বভাব-চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে, এই আয়াতটি তারই পরিশিষ্ট ও পরিপূরক। এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, যখন তাদের অনুপস্থিতিতে কোন সূরা বা তার কোন অংশ অবতীর্ণ হত এবং যখন তারা জানতে পারত তখন তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ স্বরূপ নিজেরা পরস্পর বলাবলি করত যে, 'এর দ্বারা তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি হল?' [২] আল্লাহ তাআলা বলেন, যে সূরা অবতীর্ণ হয় তাতে অবশ্যই মু'মিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং মু'মিনরা আপন ঈমান বৃদ্ধি হওয়াতে আনন্দিত হয়। এই আয়াতটিও মানুষের ঈমান কম-বেশি হওয়ার প্রমাণ বহন করে; যেমন মুহাদ্দিসগণের মত।

আত-তাওবা 9:125

পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, এই সূরা তাদের অপবিত্রতার সাথে আরো অপবিত্রতা বর্ধিত করেছে এবং তারা কাফের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। [১] [১] অন্তরে রোগের অর্থ হল মুনাফিকি এবং আল্লাহর আয়াত বিষয়ে সন্দেহ। (আল্লাহ তাআলা) বলেন, এই সূরাসমূহ মুনাফিকদেরকে তাদের মুনাফিকি ও অপবিত্রতা আরো বৃদ্ধি করে এবং তারা নিজেদের কুফরী ও মুনাফিকিতে এমন সুদৃঢ় হয়ে যায় যে, তাদের ভাগ্যে তওবা করার সুযোগই লাভ হয় না। ফলে কুফরীর উপরেই তাদের মৃত্যু ঘটে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানে বলেছেন, "আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।" (বানী ইস্রাঈল ১৭:৮২) এটা ঠিক তাদের চূড়ান্ত দুর্ভাগ্য যে, যে জিনিস দ্বারা মানুষের অন্তর হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, সেই জিনিসই তাদের ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন কোন ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও পেট খারাপ থাকলে, যে খাবার দ্বারা মানুষ শক্তি ও সুস্বাদ গ্রহণ করে, সেই খাবার সেই ব্যক্তির রোগ বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আত-তাওবা 9:126

আর তারা কি লক্ষ্য করে না যে, তারা প্রতি বছর একবার বা দু’বার কোন না কোন বিপদে পতিত হয়ে থাকে? [১] তবুও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণও করে না। [১] يُفْتَنُوْنَ এর অর্থ 'পরীক্ষা করা হয়' বিপদ বা দুর্যোগে ফেলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি। (কিন্তু এই অর্থ বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।) অথবা বিপদ বলতে শারীরিক অসুস্থতা ও কষ্ট অথবা যুদ্ধে শরীক হওয়ার সময় যে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় তা বুঝানো হয়েছে। পূর্বাপর বাক্য অনুযায়ী এই অর্থই অধিক সঠিক হবে।

আত-তাওবা 9:127

আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয়, তখন তারা একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে (এবং ইঙ্গিতে বলে); ‘তোমাদেরকে কেউ দেখছে না তো?’ অতঃপর তারা ফিরে যায়;[১] আল্লাহ তাদের অন্তরকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কারণ, তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই। [২] [১] অর্থাৎ তাদের উপস্থিতিতে যখন এমন সূরা অবতীর্ণ হয়, যাতে মুনাফিকদের বদমায়েশি ও চক্রান্তের দিকে ইঙ্গিত থাকে, তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকাতাকি করে চুপি চুপি কেটে পড়ে, ইঙ্গিতে অথবা মনে মনে বলে, মুসলিমদের কেউ তোমাদেরকে দেখছে না তো? [২] অর্থাৎ আল্লাহর আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরকে কল্যাণ ও হিদায়াত-বিমুখ করে দিয়েছেন।

আত-তাওবা 9:128

অবশ্যই তোমাদের নিকট আগমন করেছে তোমাদেরই মধ্যকার এমন একজন রসূল,[১] যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়,[২] যে তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্ক্ষী,[৩] বিশ্বাসীদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ণ। [৪] [১] নবী (সাঃ)-কে প্রেরণ করে মুসলিমদের প্রতি যে বৃহৎ অনুগ্রহ করা হয়েছে, সূরার শেষে তারই আলোচনা করা হয়েছে। নবী (সাঃ)-এর প্রথম বৈশিষ্ট্য এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি আমাদের মতই মানুষ। তিনি নূর বা অন্য কিছু নন; যেমন বিকৃত আকীদার শিকার কিছু মানুষ জনসাধারণকে এই শ্রেণীর গোলক-ধাঁধায় ফেলে থাকে। [২] عنت এমন বস্তুকে বলা হয় যার দ্বারা মানুষ কষ্ট পায়, ইহলৌকিক দুঃখ-কষ্ট এবং পারলৌকিক শাস্তি উভয়ই এর অন্তর্ভুক্ত। নবী (সাঃ)-এর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, তাঁর পক্ষে আমাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট দুঃসহ। তাঁর দ্বীনও সহজ। নবী (সাঃ) বলেছেন, "আমাকে সহজ ও সরল একনিষ্ঠ দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।" (মুসনাদে আহমাদ) অন্য এক হাদীসে বলেন, "নিশ্চয় এই দ্বীন সহজ।" (সহীহ বুখারী) [৩] নবী (সাঃ)-এর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি আমাদের হিদায়াত এবং আমাদের ইহ-পরকালের কল্যাণ কামনা করেন এবং আমাদের জাহান্নামী হওয়াকে অপছন্দ করেন। এই জন্যই নবী (সাঃ) বলেছেন, "আমি তোমাদেরকে তোমাদের কোমর ধরে টানি, কিন্তু তোমরা আমার হাত ছাড়িয়ে জবরদস্তির সাথে জাহান্নামে প্রবেশ কর।" (বুখারী) [৪] এটা নবী (সাঃ)-এর চতুর্থ বৈশিষ্ট্য। এই সমস্ত উত্তম আচরণ তাঁর সর্বোচ্চ চরিত্র এবং মহান গুণের বহিঃপ্রকাশ। নিশ্চয় তিনি মহান চরিত্রের অধিকারী। সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম।

আত-তাওবা 9:129

অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়,[১] তবে তুমি বলে দাও, ‘আমার জন্য তো আল্লাহই যথেষ্ট।[২] তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি, আর তিনি হচ্ছেন অতি বড় আরশের মালিক।’ [৩] [১] অর্থাৎ, তোমার নিয়ে আসা শরীয়ত ও রহমতের দ্বীন থেকে। [২] যিনি আমাকে কাফের ও অস্বীকারকারীদের চক্রান্ত থেকে বাঁচিয়ে নেবেন। [৩] প্রকাশ থাকে যে, এই আয়াত পড়লে আল্লাহ সকল দুশ্চিন্তা ও সমস্যার জন্য যথেষ্ট হন-- এ হাদীসটি জাল।

ইউনুস 10:1

আলিফ লা-ম রা। এ হল বিজ্ঞানময় গ্রন্থের আয়াত। [১] [১] الحَكِيْمِ (বিজ্ঞানময়) কিতাব অর্থাৎ, কুরআন কারীমের বিশেষণ। এর একটি অর্থ তাই যা অনুবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। তার আরো কয়েকটি অর্থ করা হয়েছে। যেমন الْمُحْكَمِ - অর্থাৎ, হালাল ও হারাম এবং দন্ডবিধি ও যাবতীয় বিধান দানে মযবুত। حَكِيْمٌ -حَاكِمٌ এর অর্থে। অর্থাৎ, মতভেদ ইত্যাদিতে মানুষের মাঝে ফায়সালা বা সমাধান দাতা গ্রন্থ। (সূরা বাক্বারাহ ২:২৩) حكيم - محكوم فيه এর অর্থে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা এই কুরআনে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফায়সালা দিয়েছেন।

ইউনুস 10:2

লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর[১] যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট উচ্চ মর্যাদা। [২] অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর।’[৩] [১] এটি বিস্ময়ের জন্য অস্বীকৃতিমূলক জিজ্ঞাসা, যাতে তিরস্কার বা ধমকও শামিল আছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানব জাতির মধ্য হতে একজনকে রসূল করে প্রেরণ করেছেন; এতে আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। কারণ, রসূল তাদের স্বজাতি হওয়ার কারণে তিনি সঠিকভাবে তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। যদি তিনি স্বজাতি না হয়ে ফিরিশতা বা জীন হতেন, তাহলে উভয় অবস্থাতেই রিসালাতের আসল উদ্দেশ্য সাধন হত না। কারণ মানুষ তাঁর সাথে একাত্মতাবোধ না করে ভিন্নতাবোধ করত। দ্বিতীয়ত তারা তাঁকে দেখতেও পেত না। আর যদি কোন জীন অথবা ফিরিশতাকে মানুষরূপে প্রেরণ করতাম, তবে ঐ একই প্রশ্ন আসত যে, এরাও তো আমাদের মতই মানুষ। ফলে তাদের উক্ত বিস্ময়ের কোন অর্থই থাকত না। [২] قَدَمَ صِدْقٍ এর অর্থ 'উচ্চ মর্যাদা' উত্তম প্রতিদান ও ঐ সকল নেক আমল যা একজন মু'মিন তার জীবনে করে থাকে। [৩] কাফেররা মহানবী (সাঃ)-কে অস্বীকার করার যখন কোন পথ পেত না, তখন তারা এই বলে নিজেদেরকে বাঁচাতে চাইত যে, এ তো একজন যাদুকর। (নাউযু বিল্লাহ)

ইউনুস 10:3

নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন,[১] তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন।[২] তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশকারী কেউ নেই।[৩] ঐ (স্রষ্টা ও পরিচালক) আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর।[৪] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না? [১] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আ'রাফের ৭:৫৪ নং আয়াতের টীকা।[২] অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করে তিনি এমনিই ছেড়ে দেননি, বরং সারা বিশ্ব-জাহানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন যে, কখনো পরস্পরের মাঝে কোন সংঘর্ষ হয় না। সকল বস্তু তাঁরই নির্দেশে নিজ নিজ কর্মে রত আছে।[৩] মুশরিক ও কাফের - যারা এখানে সম্বোধিত - তাদের বিশ্বাস ছিল যে, যে সকল মূর্তির তারা উপাসনা করে, তারা আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, সেখানে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর এই অনুমতিও একমাত্র তাদের জন্য দেওয়া হবে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করবেন। الأنبياء-২৮ (وَلاَ يَشفَعُونَ إِلاَّ لِمَن ارتَضَى)النجم-২৬) (لا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى)[৪] অর্থাৎ এমন আল্লাহ যিনি বিশ্ব-জগতের স্রষ্টা এবং তার পরিচালক ও ব্যবস্থাপক। এ ছাড়া সমস্ত এখতিয়ারের পরিপূর্ণ মালিক একমাত্র তিনিই। ফলে একমাত্র তিনিই উপাসনা পাওয়ার যোগ্য।

ইউনুস 10:4

তোমাদের সকলকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য; নিশ্চয় তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনিই পুনর্বারও সৃষ্টি করবেন, যাতে তাদেরকে ইনসাফ মত প্রতিফল প্রদান করেন যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে। আর যারা কুফরী করেছে তারা তাদের আচরিত কুফরীর ফলে পান করার জন্য পাবে উত্তপ্ত পানি এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [১] [১] এই আয়াতে কিয়ামত সংঘটন, আল্লাহর নিকট সকলের উপস্থিতি এবং উত্তম প্রতিদান ও শাস্তির বর্ণনা আছে। উক্ত বিষয় কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ইউনুস 10:5

তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চন্দ্রকে আলোকময় বানিয়েছেন[১] এবং ওর (গতির) জন্যে কক্ষসমূহ নির্ধারিত করেছেন, যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার।[২] আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। [১] ضِيَآءٌ , ضُوْءٌ সমার্থবোধক শব্দ। এখানে 'মুযাফ' (সম্বন্ধপদের প্রথমাংশ) উহ্য আছে; অর্থাৎ, ذات ضياء والقمر ذا نور "সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চন্দ্রকে আলোময় বানিয়েছেন।" অথবা তাকে অতিশয়োক্তি বলে ধরা হবে; অর্থাৎ ঠিক যেন তা নিজেই প্রদীপ্ত ও আলো। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তার পরিচালনার কথা বর্ণনার পর উদাহরণ স্বরূপ আরো কিছু বস্তুর বর্ণনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ব-পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত। তার মধ্যে সূর্য ও চন্দ্র অধিক গুরুতত্ত্বপূর্ণ। সূর্যের তাপ ও তার আলোর প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেকেই জানে। অনুরূপ চন্দ্রের মৃদু জ্যোৎস্নালোকের যে মধুরতা ও উপকারিতা আছে, তাও বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। বৈজ্ঞানিকদের মতে সূর্যের নিজস্ব আলো আছে আর চন্দ্রের নিজস্ব আলো নেই বরং সূর্যের আলো থেকে আলো গ্রহণ করে থাকে। (ফাতহুল কাদীর) والله أعلم بالصواب [২] অর্থাৎ আমি চন্দ্র পরিভ্রমণের কক্ষপথ নির্ধারণ করে দিয়েছি। কক্ষপথ বলতে তার ঐ পরিভ্রমণপথকে বুঝায়, যা চাঁদ এক দিন ও এক রাত্রে তার বিশেষ পরিক্রমণ দ্বারা অতিক্রম করে। উক্ত কক্ষ হল আটাশটি। প্রত্যেক রাত্রে একটি কক্ষ সমাপ্ত করে, তাতে কখনো কোন ব্যতিক্রম হয় না। প্রথম কক্ষগুলিতে চাঁদকে ছোট ও সরু দেখা যায়। তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এমন কি চৌদ্দ রাত্রি বা চৌদ্দতম কক্ষে গিয়ে তা পূর্ণ (পূর্ণিমার) চন্দ্র রূপে প্রকাশ হয়। তার পর পুনরায় ছোট ও সরু হতে আরম্ভ করে, এমনকি শেষে এক বা দুই রাত্রি লুক্কায়িত থাকে এবং পরে প্রথম দিনের ক্ষীণচন্দ্র রূপে উদিত হয়। চন্দ্রের উপকারিতা এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, "যাতে তোমরা বছরের গণনা ও সময়ের হিসাব করতে পার।" অর্থাৎ চন্দ্রের সেই কক্ষপথ ও গতি দ্বারাই মাস ও বছর গণনা হয়, যার দ্বারা তোমাদের সকল বস্তুর হিসাব রাখা সহজ হয়। অর্থাৎ বছর বার মাসের, মাস উনত্রিশ বা ত্রিশ দিনের, দিবারাত্রি চবিবশ ঘণ্টার, সমান সমান দিন হলে বার ঘণ্টা করে এবং শীত ও গ্রীষ্মকালে কমবেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া পার্থিব উপকার ও কাজ-কারবার শুধু সেই চন্দ্রের কক্ষপথের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং তাতে দ্বীনী লাভও অর্জন হয়। নতুন চাঁদ দ্বারা হজ্জ, রমযানের রোযা, নিষিদ্ধ মাস এবং অন্যান্য ইবাদতের সময়কাল নির্দিষ্ট করা হয়, প্রত্যেক মু'মিন তার গুরুতত্ত্ব দিয়ে থাকে।

ইউনুস 10:6

নিঃসন্দেহে রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনের মধ্যে এবং আল্লাহ যা কিছু আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে সাবধানী সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।

ইউনুস 10:7

যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকে এবং এতেই যারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে উদাসীন;

ইউনুস 10:8

এই লোকদের নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

ইউনুস 10:9

নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন,[১] শান্তির উদ্যানসমূহে তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে। [১] এর দ্বিতীয় অর্থ এই করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে ঈমান আনার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য পুলস্বিরাত পার হওয়া সহজ করে দেবেন। এই অর্থে بإيمانهم এ بـ (সাবাবিয়্যাহ) কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহার হয়েছে। কোন কোন তফসীরবিদের মতে তা 'ইস্তিআনাহ' (সাহায্যের) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আর তার অর্থ হবে যে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাস ও ঈমানের সাহায্যে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদের জন্য এমন আলোর ব্যবস্থা করবেন, যার সাহায্যে তারা চলাফেরা করবে; যেমন সূরা হাদীদে (৫৭:১২ নং আয়াতে) এর বর্ণনা এসেছে।

ইউনুস 10:10

সেখানে তাদের বাক্য হবে, ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ (হে আল্লাহ! তুমি মহান পবিত্র)![১] এবং পরস্পরের অভিবাদন হবে সালাম।[২] আর তাদের শেষ বাক্য হবে, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ (সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য)। [১] অর্থাৎ জান্নাতিগণ সর্বদা আল্লাহর প্রশংসা ও তসবীহ পাঠে রত থাকবে। যেমন হাদীসে এসেছে যে "জান্নাতিগণের মুখে এমনভাবে তসবীহ ও তাহমীদ স্বয়ংক্রিয় করা হবে, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস স্বয়ংক্রিয়।" (মুসলিম) অর্থাৎ, যেমন নিজের কোন ইচ্ছা ব্যতিরেকে যেরূপ শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে, অনুরূপ জান্নাতীদের মুখে কোন ইচ্ছা ছাড়াই আল্লাহর হামদ ও তাসবীহর শব্দ আসতে থাকবে। [২] অর্থাৎ তারা পরস্পরকে এই (আসসালামু আলাইকুম) বলে সালাম দেবে, ফিরিশতাগণও তাদেরকে সালাম দেবেন।

ইউনুস 10:11

যদি আল্লাহ মানুষের অকল্যাণ তরান্বিত করতেন যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ তরান্বিত করতে আগ্রহী, তাহলে অবশ্যই তারা ধ্বংস হয়ে যেত।[১] সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে ঘুরপাক খেতে ছেড়ে দিই। [১] এর এক অর্থ এই যে, যেমন মানুষ কোন উত্তম বস্তু অন্বেষণে তাড়াতাড়ি করে, অনুরূপ তারা শাস্তি অন্বেষণেও তাড়াতাড়ি করে, তারা পয়গম্বরদেরকে বলে যে, 'যদি তোমরা সত্যই পয়গম্বর হও, তাহলে সেই শাস্তি আনয়ন কর, যা থেকে তোমরা আমাদেরকে ভীতিপ্রদর্শন করছ।' আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আমি যদি তাদের চাওয়া অনুযায়ী শীঘ্র শাস্তি প্রেরণ করতাম, তবে তারা অনেক পূর্বে মৃত্যু ও ধ্বংস কবলিত হয়ে যেত। কিন্তু আমি ঢিল দিয়ে তাদেরকে পূর্ণ সুযোগ দিই। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, মানুষ যেমন নিজের জন্য ভালাই ও মঙ্গলের দু'আ করে, যা আমি মঞ্জুর করি। অনুরপ মানুষ যখন রাগান্বিত অবস্থায় বা কষ্টে থাকে, তখন নিজের জন্য ও আপন সন্তান-সন্ততি ইত্যাদির জন্য বদ্দুআ করে, তা আমি এই জন্য ছেড়ে দিই যে, সে তো মুখে ধ্বংস চাচ্ছে, কিন্তু তার অন্তরে সে ইচ্ছা নেই। কিন্তু যদি আমি মানুষের বদ্দুআ অনুযায়ী তাদেরকে সাথে সাথে ধ্বংস করতে আরম্ভ করতাম, তবে অতি সতত্ত্বর এরা মৃত্যু ও ধ্বংস কবলিত হয়ে যেত। এই জন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "তোমরা নিজেদের উপর, নিজেদের সন্তানের উপর এবং নিজেদের সম্পদ ও কারবারের উপর বদ্দুআ করো না। এমন না হয়ে যায় যে, তোমাদের বদ্দুআ এমন সময়ে হয়ে যায়, যে সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে দু'আ কবুল করা হয়, অতঃপর তিনি তোমাদের সে বদ্দুআ কবুল করে নেন।" (মুসলিম, আবু দাউদ)

ইউনুস 10:12

আর যখন মানুষকে কোন ক্লেশ স্পর্শ করে, তখন শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়েও আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার সেই কষ্ট ওর নিকট হতে দূর করে দিই, তখন সে নিজের পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে; যেন তাকে যে কষ্ট স্পর্শ করেছিল তা মোচন করার জন্য আমাকে ডাকেইনি;[১] এইভাবেই সীমালংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে শোভনীয় করা হয়েছে। [২] [১] এটা মানুষের ঐ অবস্থার বিবরণ, যা অধিকাংশ মানুষের অভ্যাস। বরং অনেক আল্লাহতে বিশ্বাসী মানুষও এই শিথিলতার শিকার হয়ে থাকে। আর তা এই যে, মসীবতের সময় খুব 'আল্লাহ-আল্লাহ' করা হয়, দু'আ করা হয়, তওবা-ইস্তিগফারের যথাযথ খেয়াল রাখা হয়। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা মসীবতের সেই কঠিন সময় পার করে দেন, তখন আল্লাহর দরবারে দু'আ করা থেকে গাফেল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের দু'আ কবুল করে তাদেরকে যে বালা-মসীবত থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার তওফীক তাদের ভাগ্যে জোটে না। [২] এই আমল শোভন করা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ অথবা অবকাশস্বরূপ হতে পারে। শয়তানের পক্ষ থেকে কুমন্ত্রণা দ্বারাও হতে পারে। আবার মানুষের ঐ আত্মার পক্ষ থেকেও হতে পারে, যে আত্মা মানুষকে নোংরা কাজে উদ্বুদ্ধ করে। ((يوسف-৫৩) إِنَّ النَّفْسَ لأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ বস্তুতঃ সীমালংঘনকারীরাই এর শিকার হয়। এখানে অর্থ এই দাঁড়ালো যে, দু'আ থেকে বিমুখতা, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা থেকে ঔদাস্য এবং প্রবৃত্তিপূজা ইত্যাদি কর্মকে তাদের জন্য সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর)

ইউনুস 10:13

আমি অবশ্যই তোমাদের পূর্বে বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল। তাদের নিকট তাদের রসূলগণও প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল; কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমি অপরাধীদেরকে এইরূপেই শাস্তি দিয়ে থাকি। [১] [১] এটা মক্কার কাফেরদের জন্য সতর্কবাণী যে, পূর্ব জাতির ন্যায় তোমরাও ধ্বংস হতে পার।

ইউনুস 10:14

অতঃপর আমি তাদের স্থলে তোমাদেরকে তাদের পর ভূমন্ডলে আবাদ করলাম,[১] যেন আমি প্রত্যক্ষ করি যে, তোমরা কিরূপ কাজ কর। [১] خلائف, خليفة এর বহুবচন। যার অর্থ হল, পূর্ব জাতির প্রতিনিধি। অথবা এক অপরের প্রতিনিধি বা স্থলাভিষিক্ত।

ইউনুস 10:15

আর যখন তাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে পাঠ করা হয়,[১] তখন যারা আমার সাক্ষাতের ভয় করে না, তারা বলে, ‘এটা ছাড়া অন্য কোন কুরআন আনয়ন কর অথবা এতে পরিবর্তন কর।’[২] তুমি বলে দাও, ‘আমার জন্য এটা সম্ভব নয় যে, আমি নিজের পক্ষ হতে এতে পরিবর্তন করি।[৩] আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়, আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি। যদি আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তাহলে আমি এক অতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করি।’ [৪] [১] অর্থাৎ, এমন আয়াত যার দ্বারা আল্লাহর উপাস্যতত্ত্ব ও একতত্ত্ববাদকে বুঝা যায়। [২] অর্থ এই যে, এই কুরআন মাজীদের পরিবর্তে অন্য কুরআন আনয়ন কর অথবা এই কুরআনে আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবর্তন সাধন কর। [৩] অর্থাৎ, দুটো প্রস্তাবই মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যেহেতু এতে আমার কোন এখতিয়ার নেই। [৪] এটা পূর্ব কথার তাকীদ। আমি তো শুধু সেই কথার অনুসারী, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি অবতীর্ণ হয়। তাতে কিছু রদবদল বা কমবেশি করলে কিয়ামতের দিনের শাস্তি থেকে আমি রক্ষা পাব না।

ইউনুস 10:16

বল, ‘আল্লাহর ইচ্ছা হলে আমি তোমাদের কাছে এটা পাঠ করতাম না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে ওটা জানাতেন না।[১] আমি এর পূর্বেও তো জীবনের এক দীর্ঘ সময় তোমাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছি; তবুও কি তোমরা বুঝতে পার না?’ [২] [১] অর্থাৎ সমস্ত কিছু আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর; তিনি চাইলে আমি তোমাদেরকে তা না পড়ে শুনাতাম, আর না তোমরা তা জানতে পারতে। অনেকে أَدْرَاكُمْ এর অর্থ أَعْلَمَكُمْ بِهِ عَلَى لِسَانِيْ অর্থাৎ, আর না তিনি তোমাদেরকে আমার মুখ দ্বারা এই কুরআন জানাতেন। [২] অর্থাৎ, তোমরা তো জান যে, নবুঅত দাবী করার পূর্বে দীর্ঘ চল্লিশ বছর আমি তোমাদের মাঝে অতিবাহিত করেছি। আমি কি তখন কোন শিক্ষকের নিকট কিছু শিক্ষা নিয়েছিলাম? অনুরূপ তোমরা আমার আমানতদার ও সত্যবাদী হওয়ার কথাও স্বীকার করতে। এখন কি সম্ভব যে, আমি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করতে আরম্ভ করব? উক্ত দুটি কথার অর্থ এই যে, এই কুরআন একমাত্র আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত গ্রন্থ। আমি না কারোর নিকট শ্রবণ করে বা শিখে তা বর্ণনা করেছি, আর না এমনিই মিছামিছি আমি তা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করেছি।

ইউনুস 10:17

অতএব সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে? নিঃসন্দেহে এমন অপরাধিগণ সফলকাম হবে না।

ইউনুস 10:18

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপাসনা করে[১] যা তাদের কোন অপকারও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না।[২] অথচ তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।[৩] তুমি বলে দাও, ‘তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে, আর না পৃথিবীতে?[৪] তিনি পবিত্র এবং তারা যে অংশী করে, তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।’ [৫] [১] অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত অতিক্রম করে, পূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত বর্জন করে নয়। কারণ মুশরিকরা আল্লাহর ইবাদত করত এবং তার সাথে সাথে গায়রুল্লাহরও ইবাদত করত। [২] অথচ প্রকৃত উপাস্যের যোগ্যতা এই থাকবে যে, তিনি তাঁর অনুগতদেরকে উত্তম প্রতিদান এবং তাঁর অবাধ্যদেরকে শাস্তি প্রদানে ক্ষমতাবান হবেন। [৩] অর্থাৎ, তাদের সুপারিশে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রয়োজন পূরণ করেন। আমাদের দুরবস্থা দূর করে দেন এবং শত্রুদের সুখ নষ্ট করে দেন। অর্থাৎ, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা করত, তাদেরকে উপকার ও অপকারে স্বেচ্ছাধীন (এবং স্বতন্ত্র উপাস্য) ভাবত না, বরং আল্লাহ ও নিজেদের মাঝে মাধ্যম বা অসীলা ভাবত। [৪] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা জানেন না যে, তাঁর কেউ অংশীদার আছে, বা তাঁর দরবারে সুপারিশকারীও হবে? ঠিক যেন মুশরিকরা আল্লাহ তাআলাকে জানাতে চায় যে, তুমি জান না। আমরা তোমাকে জানাচ্ছি যে, তোমার অংশীদারও আছে এবং এমন সুপারিশকারীও আছে, যারা তার বিশ্বাসীদের জন্য সুপারিশ করবে! [৫] আল্লাহ তাআলা বলেন, মুশরিকদের এসব কথা ভিত্তিহীন, আল্লাহ তাআলা এ সকল কথা থেকে পবিত্র এবং বহু ঊর্ধ্বে।

ইউনুস 10:19

সমস্ত মানুষ (প্রথমে) এক জাতিই ছিল, অতঃপর তারা মতভেদ সৃষ্টি করল।[১] যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে পূর্ব-ঘোষণা না থাকত, তাহলে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যেত। [২] [১] অর্থাৎ শিরক হল মানুষের নিজেদের মনগড়া কর্ম। কেননা, প্রথমে এর কোন অস্তিতত্ত্বই ছিল না। সকল মানুষ একই দ্বীন ও একই পথের পথিক ছিল। আর সে পথ হল ইসলামের পথ, যার আসল ভিত্তি হল তাওহীদ। নূহ (আঃ) পর্যন্ত মানুষ সেই তাওহীদের উপর অটল ছিল। পরবর্তীতে তাদের মাঝে একতত্ত্ববাদে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং কিছু মানুষ আল্লাহর সাথে, অন্যদেরকেও উপাস্য, প্রয়োজন পূরণকারী এবং দুঃখ-কষ্ট মোচনকারী ভাবতে আরম্ভ করে। [২] অর্থাৎ যদি আল্লাহর এই ফায়সালা না হত যে, "পূর্ণ প্রমাণ সাব্যস্ত হওয়ার পূর্বে কাউকে শাস্তি দিব না", অনুরূপ তিনি সৃষ্টি-জগতের (হিসাব-নিকাশের) জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত না করে থাকতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তাদের মাঝে ঘটিত মতবিরোধের ফায়সালা করে দিতেন এবং মু'মিনদেরকে বড় সুখী ও কাফেরদেরকে শাস্তি ও কষ্টের সম্মুখীন করতেন।

ইউনুস 10:20

তারা বলে, ‘তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয়নি কেন?’[১] সুতরাং তুমি বলে দাও, ‘অদৃশ্যের খবর শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন।[২] অতএব তোমরা প্রতীক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় থাকলাম।’ [১] এদের উদ্দেশ্য হল, কোন বড় ও স্পষ্ট নিদর্শন বা মু'জিযাহ; যেমন সামুদ জাতির জন্য উটনী প্রকাশ করা হয়েছিল। অনুরূপ তাদের দাবী ছিল, এ (মক্কার কাফের)-দের জন্য সাফা পাহাড়কে সোনার পাহাড়ে পরিবর্তন করে অথবা মক্কার সমস্ত পর্বতমালা দূর করে তার স্থলে নদী ও বাগান তৈরী করে অথবা অনুরূপ কোন মু'জিযাহ (অলৌকিক বস্তু) প্রকাশ করে দেখানো হোক। [২] অর্থাৎ আল্লাহ যদি চান, তবে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মু'জিযা প্রকাশ করে দেখাতে পারেন। কিন্তু তার পরেও যদি তারা ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর নীতি এই যে, এরূপ জাতিকে তিনি অতি সতত্ত্বর ধ্বংস করে দেন। ফলে একমাত্র তিনিই জানেন যে, কোন জাতির জন্য তাদের চাহিদা মত মু'জিযা প্রকাশ করে দেওয়া তাদের জন্য মঙ্গল হবে, না অমঙ্গল। অনুরূপ এটাও একমাত্র তিনিই জানেন যে, যদি তাদের চাহিদা মত মু'জিযা না দেখানো হয়, তাহলে তাদেরকে কতটা অবকাশ দেওয়া হবে? যার ফলে আয়াতের শেষাংশে বলেছেন, "তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম।"

ইউনুস 10:21

মানুষকে কোন বিপদ স্পর্শ করার পর যখন আমি তাদেরকে কোন নিয়ামতের স্বাদ উপভোগ করাই,[১] তখনই তারা আমার আয়াতসমূহ সম্বন্ধে দূরভিসন্ধি (কুমতলব) করতে থাকে।[২] তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহ দুরভিসন্ধিতে অধিক তৎপর।’[৩] নিশ্চয়ই আমার ফিরিশতাগণ তোমাদের সকল দুরভিসন্ধি লিপিবদ্ধ করছে। [১] মসীবতের পর নিয়ামত উপভোগ করার অর্থ হল, অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ এবং কষ্ট ও মসীবতের পর পর্যাপ্ত পরিমাণে রুযী পাওয়া, জীবন-উপকরণের আতিশয্য ইত্যাদি। [২] এর অর্থ এই যে, তারা আমার ঐ সকল নিয়ামতের কদর ও তার উপর আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে না; বরং কুফরী ও শিরক করে। অর্থাৎ এটা তাদের নোংরা ষড়যন্ত্র যা তারা আল্লাহর নিয়ামতের পরিবর্তে বেছে নেয়। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহ যে কৌশল অবলম্বন করেন, তা তাদের থেকে অনেক বেশি ত্রিুয়াশীল। আর তা এই যে, তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখেন, তিনি চাইলে অবিলম্বে তাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন। আর যদি তাঁর হিকমতে বিলম্ব করার প্রয়োজন হয়, তবে বিলম্বে পাকড়াও করেন। আরবী ভাষায় مكر গুপ্ত ষড়যন্ত্র ও কৌশলের সাথে কাজ করাকে বলে; তা ভালও হতে পারে, আবার মন্দও হতে পারে। এখানে আল্লাহর (আচমকা) শাস্তি ও পাকড়াওকে 'দুরভিসন্ধি বা ষড়যন্ত্র' বলা হয়েছে।

ইউনুস 10:22

তিনিই (সেই মহান সত্তা), যিনি তোমাদেরকে স্থলভাগে ও জলভাগে ভ্রমণ করান;[১] এমন কি যখন তোমরা নৌকায় অবস্থান কর, আর সেই নৌকাগুলো লোকদের নিয়ে অনুকূল বায়ুর সাহায্যে চলতে থাকে, আর তারা তাতে আনন্দিত হয়। (হঠাৎ) তাদের উপর এক প্রচন্ড (প্রতিকূল) বায়ু এসে পড়ে এবং প্রত্যেক দিক হতে তাদের উপর তরঙ্গমালা ধেয়ে আসে, আর তারা মনে করে যে, তারা (বিপদে) বেষ্টিত হয়ে পড়েছে,[২] (তখন) সকলে আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে আল্লাহকেই ডাকতে থাকে,[৩] ‘(হে আল্লাহ!) যদি তুমি আমাদেরকে এ হতে রক্ষা কর, তাহলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ হয়ে যাব।’ [১] يُسَيِّرُكُمْ তিনি তোমাদেরকে ভ্রমণ করান বা চলা-ফেরা ও ভ্রমণ করার তওফীক দেন। 'স্থলভাগে' অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে পা দান করেছেন যার দ্বারা তোমরা চলাফেরা কর, যানবাহনের ব্যবস্থা করেছেন, যার উপর অরোহণ করে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ কর। 'জলভাগে' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নৌকা ও জলজাহাজ তৈরী করার জ্ঞান দান করেছেন, তোমরা তা তৈরী করে তার মাধ্যমে সাগরে ভ্রমণ কর। (যে বস্তু দ্বারা তোমরা নৌযান তৈরী কর, তাকে পানির উপর ভাসার প্রকৃতি দান করেছেন।) [২] أُحِيْطَ بِهِمْ এর অর্থ হল, যেরূপ শত্রু কোন সম্প্রদায় বা কোন শহরকে বেষ্টন করে বা ঘিরে ফেলে এবং সেই সম্প্রদায় শত্রুর দয়ার উপর নির্ভরশীল থাকে, অনুরূপ যখন তারা তুফান ও বড় বড় তরঙ্গের মাঝে বেষ্টিত হয়, তখন তারা মৃত্যুকে তাদের সম্মুখে দেখতে পায়। [৩] অর্থাৎ তখন তারা দু'আতে গায়রুল্লাহকে শরীক করে না, যেমন তারা স্বাভাবিক অবস্থায় করে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় তারা বলে যে, এই বুযুর্গ ব্যক্তিরাও আল্লাহর খাস বান্দা, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকেও এখতিয়ার দিয়ে রেখেছেন এবং তাঁদের দ্বারা আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাই। কিন্তু যখন এই রূপ বালা-মসীবতে পড়ে, তখন ঐ সকল শয়তানী যুক্তি ভুলে যায় এবং শুধু আল্লাহকে স্মরণ করে ও একমাত্র তাঁকেই ডাকে। এতে প্রথমতঃ এই কথা বুঝা যায় যে, মানুষের প্রকৃতিতে এক আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সেই প্রবণতা বা প্রকৃতিকে চাপা দিয়ে ফেলে; কিন্তু মসীবতের সময় উক্ত প্রবণতা মানব মনে স্বতঃ বিকাশ লাভ করে বা উক্ত তওহীদী প্রকৃতি ফিরে আসে। আরো বুঝা গেল যে, তওহীদ মানুষের প্রকৃতিগত মৌলিক বস্তু, যা থেকে মানুষের বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। কারণ তওহীদ থেকে বিচ্যুত থাকা, সহজাত প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত থাকার নামান্তর; যা সরাসরি ভ্রষ্টতা। দ্বিতীয়তঃ এই কথা বুঝা যায় যে, মুশরিকরা যখন এরূপ মসীবতের সম্মুখীন হত, তখন তারা তাদের তৈরী করা উপাস্যদেরকে ছেড়ে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকত। সুতরাং ইকরামা বিন আবু জাহল সর্ম্পকে পাওয়া যায় যে, মক্কা বিজয়ের পর তিনি মক্কা থেকে (কাফের অবস্থায়) পালিয়ে যান। তিনি হাবশাহ যাওয়ার জন্য এক নৌকায় বসেন। নৌকা সামুদ্রিক ঝড়ের মুখে পড়লে নৌকার মাঝি যাত্রীগণকে বলল যে, এখন এক আল্লাহর নিকট দু'আ কর, কারণ তোমাদেরকে তিনি ছাড়া এই তুফান থেকে পরিত্রাণ দানকারী আর কেউ নেই। ইকরামা বলেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, যদি সমুদ্রের মাঝে পরিত্রাণ দাতা একমাত্র আল্লাহ হন, তাহলে অবশ্যই স্থলভাগেও পরিত্রাণ দাতা একমাত্র তিনিই হবেন। আর মুহাম্মাদ তো সেই কথাই বলেন। সুতরাং তিনি স্থির করে নিলেন, যদি আমি এখান থেকে বেঁচে জীবিত ফিরে যেতে পারি, তাহলে মক্কা ফিরে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করব। সুতরাং তিনি নবী (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে মুসলমান হয়ে যান। (নাসাঈ, আবু দাউদ ২৬৮৩নং) কিন্তু পরিতাপের বিষয়! উম্মতে মুহাম্মাদীর কিছু মানুষ এমনভাবে শির্কে ফেঁসে আছে যে, বালা-মসীবত ও কষ্টের সময়েও তারা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া বাদ দিয়ে মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিদেরকেই ত্রাণকর্তা মনে করে এবং তাঁদেরকেই সাহায্যের জন্য আহবান করে! সুতরাং ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রা-জিঊন। فليبك على الإسلام من كان باكيًا।

ইউনুস 10:23

অতঃপর যখনই আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে।[১] হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে,[২] (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য, তারপর আমারই দিকে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম জানিয়ে দেব। [১] এটা মানুষের সেই অকৃতজ্ঞ (নিমকহারাম) স্বভাবের বর্ণনা, যা ১২নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া কুরআনের আরো বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা এর বর্ণনা দিয়েছেন। [২] আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা অকৃতজ্ঞতা ও বিদ্রোহাচরণ করে নাও। তোমরা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জীবন উপভোগ করে পরিশেষে তোমাদেরকে আমার নিকটেই ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের দস্ত্তরমত শাস্তি দেব।

ইউনুস 10:24

বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিই,[১] যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করে থাকি। [১] حَصِيدًا - فعيل - مفعول অর্থে। أي محصودًا অর্থাৎ এমন ফসল যা কেটে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয় এবং ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়। পার্থিব্য জীবনকে এইরূপ ক্ষেতের সাথে তুলনা করে তা যে ক্ষণস্থায়ী; চিরস্থায়ী নয়, তা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। ফসলও বৃষ্টির পানি দ্বারা বড় এবং সবুজ ও সতেজ হয়, কিন্তু পরে তা কেটে-শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।

ইউনুস 10:25

আল্লাহ (মানুষ)কে শান্তির আবাসের দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন।

ইউনুস 10:26

যারা কল্যাণকর কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ (জান্নাত) এবং আরো অধিক (আল্লাহর দীদার)।[১] তাদের মুখমন্ডলকে মলিনতা আচ্ছন্ন করবে না এবং লাঞ্ছনাও না; তারাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল বাস করবে। [১] এই زِيَادَةٌ -'অধিক'এর কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু হাদীসে এর ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলার দীদার বা দর্শনসুখ বর্ণনা করা হয়েছে। জান্নাতীদেরকে জান্নাত ও জান্নাতের সকল নিয়ামত দান করার পর এই দীদার দ্বারা সম্মানিত করা হবে। (মুসলিম)

ইউনুস 10:27

পক্ষান্তরে যারা মন্দ কাজ করে, তারা তাদের মন্দ কাজের শাস্তি পাবে ওর অনুরূপ মন্দ।[১] আর লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছাদিত করে নেবে। আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে তাদের রক্ষাকর্তা কেউই থাকবে না।[২] তাদের মুখমন্ডল যেন অন্ধকার রাত্রির আস্তরণে আচ্ছাদিত।[৩] এরা হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল থাকবে। [১] পূর্ব আয়াতে জান্নাতীদের আলোচনা ছিল, তাতে বলা হয়েছিল যে, তাদেরকে তাদের নেক আমলের কয়েকগুণ বদলা দেওয়া হবে এবং পরে আল্লাহর দীদার লাভে ধন্য হবে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, অসৎ কর্মের বদলা তার সমপরিমাণ দেওয়া হবে। سَيِّئَاتٌ (মন্দ)এর অর্থ হলঃ কুফর, শিরক এবং অন্যান্য গুনাহের কাজ।[২] যেমন আল্লাহ তাআলা মু'মিনদেরকে রক্ষা করবেন, অনুরূপ সেদিন তাদেরকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রদান করবেন, এ ছাড়া তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সুপারিশ করার অনুমতিও দেবেন, তাঁদের সুপারিশও তিনি গ্রহণ করবেন।[৩] এটা এ কথার অতিশয়োক্তি যে, তাদের মুখমন্ডল খুবই কালো হবে। এর বিপরীত মু'মিনদের মুখমন্ডল সতেজ ও উজ্জ্বল হবে; যেমন সূরা আলে ইমরানের ৩:১০৬ নং আয়াত (يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوه), সূরা আবাসার ৮০:৩৮-৪১ নং আয়াত এবং সূরা কিয়ামাহ ৭৫:২২ নং আয়াতে এ কথা বর্ণিত হয়েছে।

ইউনুস 10:28

আর স্মরণ কর, যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব।[১] অতঃপর অংশীবাদীদেরকে বলব, ‘তোমরা ও তোমাদের নিরূপিত অংশীরা স্ব-স্ব স্থানে অবস্থান কর।’[২] অতঃপর আমি তাদের পরস্পরকে পৃথক করে দেব[৩] এবং তাদের সেই অংশীরা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের উপাসনা করতে না। [১] جَمِيْعًا(সকল) এর অর্থ হল শুরু থেকে শেষ অবধি পৃথিবীবাসী সমস্ত মানুষ ও জীন, আল্লাহ তাআলা সকলকে একত্রিত করবেন। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন (وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدًا) অর্থ "আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।" (সূরা কাহ্ফ ১৮:৪৭ আয়াত)[২] তাদের বিপরীত মু'মিনদেরকে অন্য দিকে স্থান দেওয়া হবে, অর্থাৎ মু'মিন এবং কাফের ও মুশরিকদেরকে আলাদা আলাদা করে এক অপর থেকে পৃথক করে দেওয়া হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, (وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ)"(বলা হবে) হে অপরাধীগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।" (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫৯ আয়াত) (يَوْمَئِذٍ يَصَّدَّعُونَ) "সেই দিন মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে।" (সূরা রূম ৩০:৪৩ আয়াত) অর্থাৎ দুই দলে। (ইবনে কাসীর)[৩] অর্থাৎ, পৃথিবীতে তাদের পরস্পর যে বিশেষ সম্পর্ক ছিল, তা শেষ করে দেওয়া হবে, এরা এক অপরের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের তথাকথিত উপাস্য তাদের ইবাদতের কথা, তাদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকার কথা, তাদের নামে নযর-নিয়ায পেশ করার কথা অস্বীকার করবে।

ইউনুস 10:29

বস্তুতঃ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট যে, আমরা অবশ্যই তোমাদের উপাসনা সম্বন্ধে উদাসীন ছিলাম।’ [১] [১] তারা বলবে, আমাদের অস্বীকার করার কারণ হল যে, তোমরা কি করতে আমরা তো তার কিছুই জানতাম না। আর আমরা যদি মিথ্যা বলি, তাহলে আমাদের মাঝে আল্লাহ সাক্ষী আছেন এবং সাক্ষ্যের জন্য তিনি যথেষ্ট। তাঁর সাক্ষ্য দানের পর আর কোন প্রমাণের কোন প্রয়োজনই নেই। উক্ত আয়াত এই কথার স্পষ্ট দলীল যে, মুশরিকরা যাদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকত, তা শুধু পাথরের মূর্তিই ছিল না (যেমন বর্তমান যুগের কবর পূজারীরা তাদের কবর পূজাকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য বলে থাকে যে, এই ধরনের আয়াত মূর্তিপূজা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে); বরং তাদের জ্ঞান ও বুঝার শক্তি ছিল। তাদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদের আকার ও মূর্তি বানিয়ে পূজা আরম্ভ করেছিল; যেমন নূহ (আঃ)-এর জাতির কর্ম-পদ্ধতি প্রমাণ করে এবং সহীহ বুখারীতে যার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, মানুষ যতই নেক হোক, এমনকি নবী বা রসূল হোক, মৃত্যুর পর সে পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে বেখবর। তার অনুসারী ও বিশ্বাসীরা তাকে সাহায্যের জন্য ডাকে, তার নামে নযর-নিয়ায পেশ করে, তার কবরে মেলা-খেলার ব্যবস্থা করে, অথবা অন্য কিছু করে, সে কিন্তু এসব কর্ম থেকে বেখবর থাকে। এই শ্রেণীর সকল ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন সব অস্বীকার করবে। এই কথাই সূরা আহক্বাফের ৪৬:৫-৬নং আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে।

ইউনুস 10:30

সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় পূর্ব কৃতকর্মগুলো যাচাই করে নেবে[১] এবং তাদেরকে তাদের প্রকৃত অভিভাবক (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। আর যেসব মিথ্যা (উপাস্য) তারা বানিয়ে নিয়েছিল সেসব তাদের নিকট থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। [২] [১] অর্থাৎ জেনে নেবে বা স্বাদ গ্রহণ করবে। [২] অর্থাৎ তথাকথিত কোন উপাস্য বা ত্রাণকর্তা সেখানে কোন কাজে আসবে না, কেউ কারোর কোন কষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখবে না।

ইউনুস 10:31

তুমি বল, ‘তোমাদেরকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী হতে রুযী দান করে কে? অথবা কর্ণ ও চক্ষুসমূহের মালিক কে? আর মৃত হতে জীবন্ত এবং জীবন্ত হতে মৃত বের করে কে? আর সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে কে?’ তারা বলবে, ‘আল্লাহ।’[১] অতএব তুমি বল, ‘তাহলে কেন তোমরা সাবধান হও না?’ [১] এই আয়াত দ্বারাও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মুশরিকরা আল্লাহ তাআলাকে মালিক, সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক এবং তাঁকে বিশ্ব-পরিচালক হিসাবে স্বীকার করত। কিন্তু স্বীকারের পরেও যেহেতু তারা তাঁর একতত্ত্ববাদে অন্যদেরকে শরীক করত, তার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাহান্নামের জালানী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে অনেক ঈমানের দাবীদারও উক্ত তওহীদে উলুহিয়্যার অস্বীকারকারী। "তাদের অন্তরগুলি পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ।" আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত করুন। আমীন।

ইউনুস 10:32

সুতরাং তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ, যিনি তোমাদের প্রকৃত প্রতিপালক। অতএব সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কি আছে? তবে তোমরা (সত্য ছেড়ে) কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১] [১] অর্থাৎ প্রভু ও উপাস্য তো তিনিই, যাঁর জন্য তোমরা নিজেরাই স্বীকার কর যে, তিনি সমস্ত বস্তুর স্রষ্টা, মালিক এবং পরিচালক। এরপরে সেই উপাস্যকে ছেড়ে তোমরা যে উপাস্য মনগড়াভাবে তৈরী করছ, তা ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা তোমাদের বুঝে আসছে না কেন? তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ?

ইউনুস 10:33

এইভাবে সত্যত্যাগীদের সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের এই কথা সত্য প্রতিপন্ন হয়ে গেল যে, তারা বিশ্বাস করবে না। [১] [১] অর্থাৎ, যেরূপ এই মুশরিকরা সবকিছু স্বীকার করার পরেও নিজেদের শিরকের উপর অটল আছে এবং তা বর্জন করতে প্রস্ত্ততই নয়, অনুরূপ তোমার প্রভুর এই কথাও সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, এরা ঈমান আনবে না। কারণ এরা ভ্রষ্টতার পথ ছেড়ে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার জন্য প্রস্ত্ততই নয়, সুতরাং হিদায়াত ও ঈমান তাদের নসীবে জুটবে কিভাবে? এই কথা অন্য স্থানে এই ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, (وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَافِرِينَ) "কিন্তু কাফেরদের প্রতি শাস্তির হুকুমই বাস্তবায়িত হয়েছে।" (সূরা যুমার ৩৯:৭১ আয়াত)

ইউনুস 10:34

তুমি বল, ‘তোমাদের নিরূপিত শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে প্রথমবারও সৃষ্টি করে, আবার পুনর্বারও সৃষ্টি করে?’ তুমি বল, ‘আল্লাহই প্রথমবারও সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনিই পুনর্বারও সৃষ্টি করবেন। অতএব তোমরা (সত্য হতে) কোথায় ফিরে যাচ্ছ?’ [১] [১] মুশরিকদের শিরক কর্মের অসারতাকে পরিষফুটিত করার জন্য তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে যে, বল, 'তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করছ, তারা কি এই বিশ্বজগৎকে প্রথমে সৃষ্টি করেছে? অথবা পুনরায় তা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে?' কক্ষনই না। প্রথম সৃষ্টিকারীও আল্লাহ এবং কিয়ামতের দিন তিনিই পুনরায় সকলকে জীবিত করবেন। সুতরাং তোমরা হিদায়াতের পথ ছেড়ে কোথায় ফিরে যাচ্ছ?

ইউনুস 10:35

তুমি বল, ‘তোমাদের শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে সত্য পথের সন্ধান দেয়?’ তুমি বলে দাও যে, ‘আল্লাহই সত্য পথ প্রদর্শন করেন;[১] তবে কি যিনি সত্য পথ প্রদর্শন করেন, তিনিই অনুসরণ করার সমধিক যোগ্য, না ঐ ব্যক্তি যে অন্যের পথ প্রদর্শন করা ছাড়া নিজেই পথপ্রাপ্ত হয় না?[২] তাহলে তোমাদের কি হল? তোমরা কিরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছ?’ [৩] [১] অর্থাৎ, পথ ভুলে যাওয়া মুসাফিরদের পথ দানকারী এবং অন্তরকে ভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিশা দানকারীও একমাত্র আল্লাহ। ওরা যাদেরকে শরীক করে, তারা এরূপ করতে সক্ষম নয়। [২] অর্থাৎ, অনুসরণীয় ব্যক্তি কে? যে ব্যক্তি দর্শন করে, শ্রবণ করে এবং মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয় সে, নাকি ঐ ব্যক্তি যে অন্ধ ও বধির হওয়ার কারণে নিজে ততক্ষণ পথ চলতেও পারে না, যতক্ষণ না তাকে অন্য লোক পথে না রেখে আসে বা হাত ধরে না নিয়ে যায়? [৩] অর্থাৎ, তোমাদের জ্ঞানের কি হয়ে গেছে? তোমরা কিভাবে আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিকে সমান ভাবছ? এবং ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করছ? অথচ এই সব দলীলের দাবী হচ্ছে যে, একমাত্র সেই আল্লাহকেই একমাত্র উপাস্য মানা হোক এবং সব রকমের ইবাদত একমাত্র তারই জন্য নির্দিষ্ট মানা হোক।

ইউনুস 10:36

আর তাদের অধিকাংশ লোক শুধু ধারণার অনুসরণ করে; নিশ্চয়ই বাস্তব ব্যাপারে ধারণা কোন কাজে আসে না।[১] তারা যা করছে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত। [২] [১] সার কথা হল যে, মানুষ শুধু ধারণাবশে চলে অথচ তারা জানে যে, হক, সত্য, বাস্তব ও প্রমাণপুঞ্জের মোকাবেলায় খেয়াল-খুশি এবং অনুমান ও ধারণার কোন মূল্যই নেই। কুরআন শরীফে ظن শব্দটি একীন (দৃঢ়বিশ্বাস) এবং ধারণা দুই অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এখানে উদ্দেশ্য হল, দ্বিতীয় অর্থ; অর্থাৎ (ধারণা)। [২] অর্থাৎ, তিনি তাদের এই হঠকারিতার শাস্তি দেবেন। কারণ প্রমাণ না থাকার পরেও, তারা শুধু উদ্ভট কল্পনা ও বিকৃত ধারণার পিছনে পড়েছিল এবং জ্ঞান বুদ্ধি দ্বারা কোন কাজ নেয়নি ।

ইউনুস 10:37

আর এই কুরআন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দ্বারা কল্পনাপ্রসূত রচনা নয়। পক্ষান্তরে এটা তো সেই কিতাবসমূহের সমর্থক যা এর পূর্বে (অবতীর্ণ) হয়েছে[১] এবং বিধানসমূহের বিশদ বর্ণনাকারী,[২] এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই।[৩] (এ হল) বিশ্বপ্রতিপালকের পক্ষ হতে (অবতীর্ণ)। [৪] [১] যা এই কথার প্রমাণ যে, এই কুরআন মিথ্যা রচিত নয়; বরং সেই সত্তার অবতীর্ণকৃত, যিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। [২] অর্থাৎ, হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধ ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনাকারী। [৩] এই কিতাবের শিক্ষাতে, তার বর্ণিত ইতিহাস ও কাহিনীতে এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ঘটনাবলীতে কোন সন্দেহ নেই। [৪] এ সকল কথা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এই গ্রন্থ মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ হয়েছে, যিনি অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবগত।

ইউনুস 10:38

তারা কি বলে যে, ‘এটা তার (নবীর) স্বরচিত?’ তুমি বল, ‘তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং (এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য) আল্লাহ ব্যতীত যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’[১] [১] এই সকল তথ্য ও প্রমাণাদির পরেও যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রচিত গ্রন্থ,তবে তিনিও তোমাদের মত একজন মানুষ, তোমাদের ভাষাও তাঁর মতই আরবী, তিনি তো একা, তোমরা যদি নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হও, তাহলে পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক, ভাষাবিদ এবং শিক্ষিত জ্ঞানীদেরকে একত্রিত কর এবং এই কুরআনের সব থেকে ছোট সূরার মত একটি সূরা রচনা করে উপস্থাপন কর। কুরআন কারীমের এই চ্যালেঞ্জ আজও বিদ্যমান। এর উত্তর পাওয়া যায়নি। যাতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এই কুরআন কোন মানুষের মেহনতের ফল নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই বাণী, যা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি তিনি অবতীর্ণ করেছেন।

ইউনুস 10:39

বরং তারা এমন বিষয়কে মিথ্যা মনে করেছে, যাকে নিজ জ্ঞানের পরিধিতে আনয়ন করেনি[১] এবং এখনো তাদের নিকট ওর পরিণাম (আযাব বা ব্যাখ্যা) এসে পৌঁছেনি।[২] এরূপভাবে তারাও মিথ্যা মনে করেছিল, যারা তাদের পূর্বে গত হয়েছে; অতএব দেখ সেই অত্যাচারীদের পরিণাম কি হয়েছিল? [৩] [১] অর্থাৎ কুরআন ও তার অর্থ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা ছাড়াই, তাকে মিথ্যাজ্ঞান করেছে। [২] অর্থাৎ কুরআন যে সকল পূর্বঘটিত এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ঘটনাবলী বর্ণনা করেছে, তার পূর্ণ সত্যতা ও তার প্রকৃততত্ত্ব তাদের নিকট পরিস্ফুটিত হয়নি। তার পরেও মিথ্যাজ্ঞান করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। অথবা এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তারা কুরআনের যথাযথ অধ্যয়ন না করেই মিথ্যাজ্ঞান করতে আরম্ভ করেছে। অথচ যদি তারা সঠিকভাবে তা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করত এবং সেই সকল বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করত, যা কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার কথা প্রমাণ করে, তাহলে অবশ্যই তার অর্থ ও তাৎপর্য বুঝার পথ তাদের জন্য খুলে যেত। এই ব্যাখ্যায় تأويل (পরিণাম)এর অর্থ হবে, কুরআন কারীমের রহস্য, নিগূঢ় তত্ত্ব, ব্যঞ্জনা ও তাৎপর্য। [৩] এটা সেই কাফের ও মুশরিকদের জন্য হুঁশিয়ারি ও ধমক যে, তোমাদের মত তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরাও আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা মনে করেছিল, তাদের পরিণতি কি হয়েছে তোমরা দেখে নাও? যদি তোমরা মিথ্যাজ্ঞান করা থেকে বিরত না হও, তাহলে তোমাদের পরিণতিও তাদের থেকে স্বতন্ত্র হবে না।

ইউনুস 10:40

আর তাদের মধ্যে এমন কতক লোক আছে যারা এতে বিশ্বাস করবে এবং এমন লোকও আছে যে, তারা এতে বিশ্বাস করবে না। আর তোমার প্রতিপালক অশান্তি সৃষ্টিকারীদেরকে ভালরূপে জানেন। [১] [১] তিনি ভালভাবে অবগত আছেন যে, হিদায়াতের উপযুক্ত কে? সুতরাং তাকে হিদায়াত দান করেন। আর এও অবগত আছেন যে, ভ্রষ্টতার উপযুক্ত কে? সুতরাং তার জন্য ভ্রষ্টতার সকল পথ খুলে দেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ, তাঁর কোন কর্মে অবিচারের কোন লেশমাত্র নেই। যে যার উপযুক্ত, তিনি তাকে তাই দান করে থাকেন।

ইউনুস 10:41

আর যদি তারা তোমাকে মিথ্যা মনে করতে থাকে, তাহলে তুমি বলে দাও, ‘আমার কর্ম(ফল) আমি পাবো, আর তোমাদের কর্ম(ফল) তোমরা পাবে। আমি যে কর্ম করি, তার সাথে তোমাদের কোন সম্পর্ক নেই এবং তোমরা যে কর্ম কর, তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’[১] [১] অর্থাৎ, সব রকমভাবে বুঝানো ও প্রমাণ পেশ করার পরেও যদি তারা মিথ্যাজ্ঞান করা থেকে বিরত না হয়, তবে তুমি তাদেরকে এই কথা বলে দাও। উদ্দেশ্য হল, আমার কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া, আর তা আমি সম্পন্ন করে ফেলেছি। সুতরাং এখন না তোমরা আমার আমলের যিম্মাদার আর না আমি তোমাদের আমলের যিম্মাদার । সকলকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে, সেখানে সকল ব্যক্তির ভালো ও মন্দ আমলের হিসাব নেওয়া হবে। এটা ঠিক (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، لا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ) এর মতই । আর ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর অনুসারীরা বলেছিলেন, {إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ} "তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার উপাসনা কর, তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য সৃষ্টি হল শত্রুতা ও বিদ্বেষ, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ।" (সূরা মুমতাহিনাহ ৬০:৪ আয়াত)

ইউনুস 10:42

আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা তোমার (কথার) প্রতি কান পেতে রাখে। তবে কি তুমি বধির লোকদেরকে শুনাবে; যদিও তাদের বোধশক্তি না থাকে? [১] [১] অর্থাৎ, সামনে তারা কুরআন শ্রবণ করে, কিন্তু কুরআন শ্রবণ যেহেতু হিদায়াতের উদ্দেশ্যে নয়, ফলে তাদের কোন লাভ হয় না। যেমন একজন (কালা) বধিরের কোন লাভ হয় না। বিশেষ করে বধির যদি অবুঝ হয়। কারণ বধির জ্ঞানী হলে ইঙ্গিত বা ইশারা দ্বারা কিছু বুঝে নিতে পারে। কিন্তু এরা তো জ্ঞানহীন বধিরের মত, এরা তো বিলকুল অবুঝ বধির।

ইউনুস 10:43

আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে কি তুমি অন্ধকে পথ দেখাবে; যদিও তাদের দৃষ্টিশক্তি না থাকে?[১] [১] অনুরূপ কিছু মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে দেখে, কিন্তু যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য অন্য কিছু থাকে, ফলে তাদেরও অন্ধ ব্যক্তিদের মত কোন লাভ হয় না। বিশেষ করে সেই অন্ধ ব্যক্তি, যে চোখ থাকতেও অন্ধ হয়। কারণ অনেক অন্ধ লোক আছে, যারা অন্তর-দৃষ্টি দ্বারা দেখে। তারা চোখের দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরেও, অনেক কিছু বুঝে নিতে পারে। কিন্তু এরা সেই অন্ধের মত যে অন্ধ অন্তর-দৃষ্টি থেকেও বঞ্চিত। এসব কথার উদ্দেশ্য হল, নবী (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া। যেমন একজন ডাক্তার যখন জেনে নেন যে, রোগী চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে অধৈর্য এবং সে আমার নির্দেশনা ও চিকিৎসার কোন পরোয়া করে না, তখন তিনি তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেন না এবং তার জন্য সময় নষ্ট করতে পছন্দ করেন না।

ইউনুস 10:44

নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না, পরন্তু মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে। [১] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সব রকম যোগ্যতা প্রদান করেছেন; চক্ষু দান করেছেন, যার দ্বারা দর্শন করতে পারে, কর্ণ দান করেছেন, যার দ্বারা শ্রবণ করতে পারে, জ্ঞান ও বুঝার শক্তি দান করেছেন যার দ্বারা হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু যদি সে সেই যোগ্যতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে সঠিক পথ বেছে না নেয়, তাহলে সে নিজেই নিজের উপর অত্যাচার করছে। আল্লাহ তাআলা তো তার উপর কোন অত্যাচার করেননি।

ইউনুস 10:45

আর যেদিন তিনি তাদেরকে একত্রিত করবেন, (সেদিন ওদের মনে হবে যে, দুনিয়ায়) যেন তারা দিবসের মুহূর্তকাল মাত্র অবস্থান করেছিল।[১] তারা পরস্পর একে অপরকে চিনবে।[২] বাস্তবিকই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঐসব লোক, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছিল এবং তারা সৎপথপ্রাপ্ত ছিল না। [১] অর্থাৎ হাশরের কঠিন অবস্থা দেখে তারা পৃথিবীর সমস্ত সুখ ও আরাম ভুলে যাবে এবং পার্থিব জীবন এমন মনে হবে যে, ঠিক যেন পৃথিবীতে এক-আধ ঘণ্টা বসবাস করেছে।(لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا)(দেখুন: সূরা নাযিআত ৭৯:৪৬)[২] হাশরের ময়দানে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা হবে, যা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। একটি সময় এমনও হবে যখন একজন অপরজনকে চিনবে, কোন কোন সময় এমন হবে যে, একে অন্যকে ভ্রষ্টতার জন্য দায়ী করবে, কোন কোন সময় এমন ভয়ানক হবে যে,(فَلا أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلا يَتَسَاءَلُونَ) "সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না।" (সূরা মু'মিনূন ২৩:১০১)

ইউনুস 10:46

আর আমি তাদের সাথে যে শাস্তির অঙ্গীকার করছি, যদি ওর কিছু অংশ তোমাকে দেখিয়ে দিই, অথবা তোমাকে মৃত্যু দান করি, সর্বাবস্থায় তাদেরকে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। আর আল্লাহ তাদের সকল কৃতকর্মেরই সাক্ষী।[১] [১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন, আমি সেই কাফেরদের ব্যাপারে অঙ্গীকার করছি যে, যদি তারা কুফরী ও শিরকের উপর অনড় থাকে, তবে তাদের উপরেও আল্লাহর ঐরূপ শাস্তি আসতে পারে, যেরূপ পূর্ববর্তী জাতির উপর এসেছে। সেই শাস্তির কিছু অংশ তোমার জীবদ্দশায় প্রেরণ করাও সম্ভব, যা দেখে তোমার চক্ষু শীতল হবে। কিন্তু যদি তার পূর্বেও তোমাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়, তবুও কোন ব্যাপার নয়। কারণ সেই সকল কাফেরদেরকে অবশেষে আমার নিকটেই ফিরে আসতে হবে। তাদের সকল আমল ও অবস্থা আমার জানা আছে। সেখানে তারা আমার শাস্তি থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? অর্থাৎ, পৃথিবীতে আমার বিশেষ হিকমতের ফলে ওরা শাস্তি থেকে বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু আখেরাতে আমার শাস্তি থেকে বাঁচার কোন উপায় তাদের থাকবে না। কারণ কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার উদ্দেশ্যই হল, সেখানে অনুগতকে তার আনুগত্যের প্রাপ্য এবং অবাধ্যকে তার অবাধ্যতার শাস্তি প্রদান করা হবে।

ইউনুস 10:47

প্রত্যেক উম্মতের জন্য এক একজন রসূল ছিল। সুতরাং যখন তাদের রসূল এসেছে, তখন ন্যায়ভাবে তাদের ফায়সালা করা হয়েছে,[১] আর তাদের প্রতি কোন অবিচার করা হয়নি। [১] এর একটি অর্থ এই যে, সকল জাতির নিকট আমি রসূল প্রেরণ করেছি। আর যখন রসূল তার তবলীগের দায়িত্ব পূর্ণ করে দিত, তখন আমি তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে দিতাম। অর্থাৎ, পয়গম্বর ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে বাঁচিয়ে নিতাম আর অন্যান্যদেরকে ধ্বংস করে দিতাম। কারণ, (وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا) অর্থাৎ, "কোন রসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি প্রদান করি না।" (সূরা ইসরা' ১৭:১৫) আর এই ফায়সালাতে তাদের প্রতি কোন রকম অবিচার ও অত্যাচার হয় না। কারণ অত্যাচার তখনই হবে, যখন কোন গুনাহ ছাড়া তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করা হবে। অথবা কোন পূর্ণ প্রমাণ পেশ করা ছাড়াই তাদেরকে পাকড়াও করা হবে। (ফাতহুল কাদীর) এর দ্বিতীয় অর্থ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর সম্পর্ক হচ্ছে কিয়ামতের দিনের সাথে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সমস্ত উম্মত যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, তখন সেই উম্মতের প্রতি প্রেরিত রসূলও তাদের সাথে থাকবেন, সকলের আমলনামাও থাকবে এবং সাক্ষী স্বরূপ ফিরিশতাগণও উপস্থিত হবেন এবং এইভাবে সমস্ত উম্মত ও তাদের রসূলের মাঝে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করা হবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, উম্মতে মুহাম্মাদীর ফায়সালা সর্বপ্রথম করা হবে। যেমন নবী (সাঃ) বলেন,"যদিও আমরা সর্বশেষে এসেছি, কিন্তু কিয়ামতের দিন সকলের অগ্রভাগে থাকব এবং সমস্ত সৃষ্টির আগেই আমাদের ফায়সালা করা হবে।" (মুসলিম, তাফসীর ইবনে কাসীর)

ইউনুস 10:48

আর তারা বলে, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও (তাহলে বল), এই অঙ্গীকার কখন (পূর্ণ) হবে?’

ইউনুস 10:49

তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত আমি তো আমার নিজের জন্য কোন অপকার ও উপকারের মালিক নই।’ প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়-সীমা আছে; যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পৌঁছে যাবে, তখন তারা মুহূর্তকাল না বিলম্ব করতে পারবে, আর না ত্বরা করতে পারবে।[১] [১] মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে আল্লাহর আযাব উপস্থিত করার জন্য বলত, তারই উত্তরে বলা হচ্ছে যে, আমি তো নিজেরই কোন লাভ বা ক্ষতির মালিক নই; অন্য কাউকে ক্ষতি বা লাভ দেওয়া তো দূরের কথা। হ্যাঁ, এসব ক্ষমতা আল্লাহর হাতে এবং তিনি নিজের ইচ্ছামত কাউকে ক্ষতি বা লাভ দেওয়ার ফায়সালা করেন। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা সকল উম্মতের জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। সেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তিনি তাদেরকে ঢিল ও অবকাশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যখন সেই নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও আগে-পিছে হবে না। সতর্কতাঃ- এখানে এ কথাটি অতি গুরুতত্ত্বপূর্ণ যে যখন সৃষ্টির সেরা, রসূলগণের সর্দার মুহাম্মাদ (সাঃ) কারোর লাভ-ক্ষতি বা উপকার-অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, তখন তাঁর পরে মানুষের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি এমনও কি হতে পারে যে, সে কারো প্রয়োজন পূরণ এবং সমস্যা দূর করার ক্ষমতা রাখে? অনুরূপ আল্লাহর পয়গম্বরের নিকট সাহায্য চাওয়া, তাঁর নিকট ফরিয়াদ করা, "ইয়া রাসূলাল্লাহ মাদাদ" এবং 'أغثني يارسول الله' (হে আল্লাহর রসূল! আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে উদ্ধার করুন) ইত্যাদি শব্দ দ্বারা আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করা কোন মতেই বৈধ নয়। কারণ এটা কুরআন শরীফের উক্ত আয়াত এবং এরূপ অন্যান্য স্পষ্ট নির্দেশের পরিপন্থী; বরং এটা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।فنعوذ بالله من هذا

ইউনুস 10:50

তুমি বল, তোমরা বল তো, যদি তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব রাতে অথবা দিনে এসে পড়ে, তাহলে আযাবের মধ্যে এমন কোন্ জিনিস রয়েছে যে, অপরাধীরা তা তাড়াতাড়ি চাচ্ছে? [১] [১] অর্থাৎ, শাস্তি তো এক অতি অপছন্দনীয় বস্তু, যা মন অপছন্দ করে এবং প্রকৃতিগতভাবে মন তা অস্বীকার করে, কিন্তু ওরা এর মাঝে এমন কি ভালাই দেখল যে, তা তাড়াতাড়ি উপস্থিত করার জন্য বলে?

ইউনুস 10:51

তাহলে কি তা যখন এসেই পড়বে তখন তা (বা তাঁকে) বিশ্বাস করবে? (বলা হবে,) হ্যাঁ এখন মানলে?[১] অথচ তোমরা এর জন্য তাড়াহুড়া করছিলে। [১] কিন্তু শাস্তি চলে আসার পর মেনে নেওয়ায় লাভ কি?

ইউনুস 10:52

অতঃপর যালেমদেরকে বলা হবে, ‘চিরস্থায়ী শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে থাকো, তোমাদেরকে তো তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিফলই দেওয়া হচ্ছে।’

ইউনুস 10:53

তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তা (শাস্তি) কি সত্য?’[১] তুমি বল, ‘হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের কসম! তা অবশ্যই সত্য; আর তোমরা কিছুতেই ব্যর্থ করতে পারবে না।’ [১] অর্থাৎ তারা জিজ্ঞাসা করে যে, কিয়ামত এবং পুনরুত্থান (মানুষ মৃত্যুবরণ করে পচে-গলে মাটি হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠা কি সত্য? আল্লাহ তাআলা বলেন, হে নবী! তাদেরকে বলে দাও যে, তোমাদের মাটি হয়ে মাটির সাথে মিশে গেলেও, তা তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ব্যর্থ ও অপারগ করতে পারবে না। অতএব পুনর্জীবন অবশ্যই ঘটবে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মত আয়াত কুরআনে শুধু আর দুটি আছে, যাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর পয়গম্বরকে আদেশ করেছেন যে, তিনি যেন শপথ করে কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা প্রচার করেন। প্রথমটি সূরা সাবা'র ৩৪:৩ নং আয়াত, আর দ্বিতীয়টি সূরা তাগাবুনের ৬৪:৭ নং আয়াত।

ইউনুস 10:54

আর যদি প্রত্যেক যালেমের কাছে পৃথিবীর সমপরিমাণ (মাল) থাকে, তাহলে সে তা মুক্তিপণ দিয়েও নিজের প্রাণ রক্ষা করতে উদ্যত হবে।[১] যখন তারা আযাব দেখতে পাবে তখন (নিজেদের) মনস্তাপকে গোপন রাখবে। আর তাদের ফায়সালা করা হবে ন্যায়ভাবে এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না। [১] অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত প্রকার সম্পদ দিয়েও যদি তারা শাস্তি থেকে রক্ষা পায়, তবে তা দেওয়ার জন্য তৈরী হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানে মানুষের নিকট থাকবেই বা কি? উদ্দেশ্য হল যে, শাস্তি থেকে রক্ষার কোন পথই থাকবে না।

ইউনুস 10:55

মনে রেখো যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। মনে রেখো যে, আল্লাহর অঙ্গীকার সত্য, কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই অবগত নয়।

ইউনুস 10:56

তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান, আর তোমরা সবাই তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।[১] [১] উক্ত আয়াতে আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তুর উপর আল্লাহর পূর্ণ মালিকানা, আল্লাহর ওয়াদার সত্যতা, জীবন ও মরণ তাঁর ইচ্ছায় সংঘটন এবং তাঁর দরবারে সকলের উপস্থিতির বর্ণনা আছে। যার উদ্দেশ্য পূর্বোক্ত আলোচনাকে পরিষ্ফুটিত ও সমর্থন করা। আর তা এই যে, যে সত্তা এত বিশাল ক্ষমতার অধিকারী, তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা পেয়ে মানুষ কোথায় যেতে পারে? এবং হিসাব-নিকাশ নেওয়ার জন্য তিনি যে একটি দিন নির্ধারিত করে রেখেছেন, সে দিন থেকে কে রেহাই পাবে? আল্লাহর ওয়াদা অবশ্যই সত্য, কিয়ামত অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে এবং সকল ভাল ও মন্দ লোকদেরকে তাদের নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান ও প্রতিফল দেওয়া হবে।

ইউনুস 10:57

হে মানব জাতি! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের তরফ হতে উপদেশ[১] ও অন্তরের রোগের নিরাময়[২] এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথপ্রদর্শক ও করুণা সমাগত হয়েছে। [৩] [১] অর্থাৎ যে ব্যক্তি মন দিয়ে কুরআন পাঠ করবে এবং তার অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, কুরআন তার জন্য উপদেশ। ওয়াযের প্রকৃত অর্থ হল পরিণাম ও ফলাফল স্মরণ করিয়ে দেওয়া; চাহে তা উৎসাহ দানের মাধ্যমে হোক বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে। আর একজন উপদেষ্টা (বক্তা) একজন ডাক্তারের মত, তিনি রোগীকে ঐ সকল বস্তু থেকে বিরত থাকতে বলেন, যা রোগীর শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপ কুরআনও উৎসাহদান ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ওয়ায-নসীহত করে এবং ঐ সকল পরিণাম ও ফলাফল সম্পর্কে সতর্ক করে, যা আল্লাহর অবাধ্যাচরণের কারণে ভোগ করতে হবে। আর ঐ সকল কর্ম থেকে নিষেধ করে যে কর্ম দ্বারা মানুষের আখেরাত বরবাদ হয়।[২] অর্থাৎ, অন্তরে তাওহীদ ও রিসালাত এবং সঠিক ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে যে সন্দেহ ও সংশয়ের রোগ সৃষ্টি হয়, তা দূরীভূত করে এবং কুফরী ও মুনাফিকীর পঙ্কিলতা ও আবর্জনা থেকে হৃদয়কে পরিষ্কার করে দেয়।[৩] এই কুরআন মু'মিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত (সুপথ ও করুণা) লাভের অসীলা। প্রকৃতপক্ষে কুরআন পৃথিবীর সকলের জন্য হিদায়াত ও রহমত লাভের কারণ। কিন্তু যেহেতু মু'মিনগণই তার দ্বারা উপকৃত হয়, ফলে এখানে শুধু তাদের জন্যই হিদায়াত ও রহমত বলা হয়েছে। এই বিষয়টি কুরআন কারীমের সূরা বানী ইস্রাঈলের ১৭:৮২ নং আয়াত ও সূরা হা-মীম সাজদাহর ৪১:৪৪ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া (هدًى للمُتَّقِين) এর টীকা দ্রষ্টব্য।

ইউনুস 10:58

তুমি বলে দাও, ‘এ হল তাঁরই অনুগ্রহ ও করুণায়; সুতরাং এ নিয়েই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত;[১] এটা তারা যা (পার্থিব সম্পদ) সঞ্চয় করছে তা হতে অধিক উত্তম।’ [১] 'আনন্দ' বা 'খুশি' বলা হয় ঐ অবস্থাকে যা কোন আকাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনের ফলে মানুষ নিজ মনে অনুভব করে। মু'মিনগণকে বলা হচ্ছে যে, এই কুরআন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত, এ অনুগ্রহ লাভ করে মু'মিনগণের আনন্দিত হওয়া উচিত। এর অর্থ এই নয় যে, আনন্দ প্রকাশ করার জন্য জালসা-জলুস করে, আলোকসজ্জা বা অন্য কোনরূপ অপচয়ের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করবে। যেমন বর্তমানের বিদআতীরা উক্ত আয়াত দ্বারা 'নবীদিবস' ইত্যাদি অভিনব বিদআতী অনুষ্ঠান বৈধ হওয়ার কথা প্রমাণ করতে চায়।

ইউনুস 10:59

তুমি বল, ‘আচ্ছা বল তো, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রুযী অবতীর্ণ করেছেন, অতঃপর তোমরা তার কিছুকে বৈধ ও কিছুকে অবৈধ করে নিয়েছ’;[১] বল, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে (তার) অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?’ [১] এখানে মুশরিকরা যে সকল পশুকে তাদের মূর্তির নামে উৎসর্গ করে নিজেদের জন্য তা হারাম করে নিত, সেই সকল পশুকে হারাম বা অবৈধ করার কথা বুঝানো হয়েছে। সূরা আন্আমে এর বিস্তারিত আলোচনা পার হয়ে গেছে।

ইউনুস 10:60

আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামত দিবস সম্বন্ধে তাদের কি ধারণা?[১] বস্তুতঃ আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ,[২] কিন্তু অধিকাংশ লোকই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।[৩] [১] অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন? [২] (মানুষের প্রতি আল্লাহর একটি অনুগ্রহ) এই যে, তিনি পৃথিবীতে মানুষকে পাপের জন্য সত্ত্বর পাকড়াও করেন না; বরং তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে রেখেছেন। অথবা এর অর্থ এই যে, তিনি পার্থিব নিয়ামত বিনা পার্থক্যে মু'মিন ও কাফের সকলকে প্রদান করেন। অথবা যে বস্তু মানুষের জন্য উপকারী ও জরুরী, তা হালাল করেছেন, হারাম করেননি। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না। অথবা তাঁর হালালকৃত বস্তুকে হারাম করে নেয়।

ইউনুস 10:61

তুমি যে অবস্থাতেই থাক না কেন, যে অবস্থাতেই তুমি কুরআন হতে যা কিছু পাঠ কর না কেন এবং তোমরা যে কাজই কর না কেন, যখন তোমরা সে কাজ করতে শুরু কর, তখন আমি তোমাদের পরিদর্শক হই; আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ধূলিকণা পরিমাণও কোন বস্তু তোমার প্রতিপালকের (জ্ঞানের) অগোচর নয় এবং তা হতে ক্ষুদ্রতর অথবা তা হতে বৃহত্তর কোন কিছু নেই, যা সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহ্ফুযে লিপিবদ্ধ) নেই।[১] [১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ) এবং মু'মিনদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তিনি সমস্ত সৃষ্টির অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন এবং সর্বক্ষণ তিনি মানুষের সকল অবস্থা অবলোকন করছেন। আকাশ ও পৃথিবীর ছোট-বড় কোন বস্তুই তাঁর নিকট লুক্কায়িত নয়। উক্ত বিষয়টি ইতিপূর্বে সূরা আন্আমের ৬:৫৯ নং আয়াতে পার হয়ে গেছে। তাঁরই নিকট অদৃশ্যের চাবি রয়েছে; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে (বৃক্ষের) একটি পাতাও পড়ে না, মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণা অথবা রসযুক্ত কিম্বা শুষ্ক এমন কোন বস্তু পড়ে না, যা সুস্পষ্ট কিতাবে (লিপিবদ্ধ) নেই।" অনুরূপ সূরা আন্আমের ৬:৩৮নং আয়াতে এবং সূরা হূদের ১১:৬ নং আয়াতেও উক্ত বিষয়কে বর্ণনা করা হয়েছে। যখন ঘটনা এই যে, তিনি আকাশ ও পৃথিবীতে অবস্থিত সকল বস্তুর নড়া-চড়ার খবর রাখেন, তখন তিনি মানুষ ও জীন জাতি, যারা আল্লাহর ইবাদতের ভারপ্রাপ্ত ও আদেশপ্রাপ্ত তাদের চলা-ফেরা ও কর্মকান্ড থেকে কিভাবে বেখবর থাকবেন?

ইউনুস 10:62

মনে রেখো যে, আল্লাহর বন্ধুদের[১] না কোন আশংকা আছে আর না তারা বিষণ´ হবে। [২] [১] অবাধ্য ব্যক্তিদের কথা আলোচনার পর আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত ব্যক্তিদের কথা আলোচনা করছেন। তাঁরা হলেন আল্লাহর আওলিয়া। 'আওলিয়া' শব্দটি ওলীর বহুবচন। যার আভিধানিক অর্থ হল, নিকটবর্তী। এর পরিপ্রেক্ষিতে আওলিয়াউল্লাহর অর্থ হবে, ঐ সকল নেক ও খাঁটি মু'মিন ব্যক্তিগণ, যাঁরা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থেকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই জন্য পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজেই এই শব্দ দ্বারা তাঁদের প্রশংসা করেছেন, "তারা হচ্ছে সেই লোক যারা বিশ্বাস করেছে (ঈমান এনেছে) এবং সাবধানতা (পরহেযগারি) অবলম্বন করে থাকে।" আর ঈমান ও পরহেযগারি বা তাকওয়াই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মূল ভিত্তি এবং একমাত্র উপায়। এই হিসাবে সকল মুত্তাকী মু'মিনই হচ্ছে আল্লাহর ওলী (বন্ধু)। পক্ষান্তরে কিছু মানুষের ধারণা যে, ওলী হতে হলে কারামত দেখানো জরুরী। অতঃপর তারা মনগড়া ওলীদের জন্য সত্য-মিথ্যা কিছু কারামতের কথা প্রচার করে থাকে। এ ধারণা ও কর্ম নেহাতই ভ্রান্ত। ওলী হওয়ার সাথে কারামতের না কোন সম্পর্ক আছে, আর না কারামত ওলী হওয়ার জন্য শর্ত। এটা স্বতন্ত্র ব্যাপার যে, যদি কোন ওলী দ্বারা কোন কারামত প্রকাশ হয়ে যায়, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছা, তাতে সেই বুযুর্গের ইচ্ছা প্রবিষ্ট থাকে না। কিন্তু কোন মুত্তাকী মু'মিন এবং সুন্নতের অনুসারী দ্বারা কোন কারামত প্রকাশ হোক বা না হোক, তাঁর বিলায়াতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। [২] আশংকা বা ভীতির সম্পর্ক ভবিষ্যতের সাথে এবং বিষণ্ণতা ও চিন্তার সম্পর্ক অতীতের সাথে। উদ্দেশ্য এই যে, যেহেতু তাঁদের পার্থিব জীবন আল্লাহ-ভীতির সাথে অতিবাহিত হয়ে থাকে, ফলে কিয়ামতের ভয়াবহতায় তাঁদের সে রকম ভয় থাকবে না, যেমন অন্যান্যদের থাকবে। বরং তাঁরা নিজ ঈমান ও তাকওয়ার কারণে আল্লাহর রহমত ও বিশেষ দয়ার আশাধারী এবং তাঁর প্রতি সুধারণা পোষণকারী হবেন। অনুরূপ পৃথিবীতে তাঁরা যা কিছু ছেড়ে যাবেন অথবা পৃথিবীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভে বঞ্চিত থাকার ফলে তাঁদের কোন দুশ্চিন্তা ও আফসোস হবে না। এর দ্বিতীয় এক অর্থ এই যে, পৃথিবীতে তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত যে সব বস্তু তাঁরা অর্জন করতে পারেননি, তার জন্য তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করবেন না, কারণ তাঁরা জানেন যে, এসব কিছু আল্লাহর ফায়সালা ও ভাগ্যের ব্যাপার। তাতে তাঁদের অন্তর রুষ্ট হয় না; বরং তাঁদের অন্তর আল্লাহর ফায়সালার উপর খুশি ও সন্তুষ্ট থাকে।

ইউনুস 10:63

তারা হচ্ছে সেই লোক, যারা বিশ্বাস করেছে এবং সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে।

ইউনুস 10:64

তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে[১] এবং পরকালেও; আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তন নেই; এটাই হচ্ছে বিরাট সফলতা। [১] পার্থিব সুসংবাদ বলতে সত্য স্বপ্নকে বুঝানো হয়েছে অথবা সেই সুসংবাদকে বুঝানো হয়েছে যা মৃত্যুর সময় ফিরিশতাগণ একজন মু'মিনকে দিয়ে থাকেন, যেমন কুরআন ও হাদীসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইউনুস 10:65

আর ওদের কথা যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। নিশ্চয়ই যাবতীয় শক্তি-সম্মান আল্লাহরই জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।

ইউনুস 10:66

মনে রেখো, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যত কিছু আছে নিঃসন্দেহে সে সব আল্লাহরই; আর যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য শরীকদেরকে আহবান করে, তারা কোন্ বস্তুর অনুসরণ করছে? তারা শুধু ধারণার অনুসরণ করছে এবং শুধু অনুমানপ্রসূত কথা বলছে। [১] [১] অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা কোন প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়; বরং তা শুধু ধারণা, আন্দাজ ও অনুমানের কারসাজি। মানুষ এখনও যদি নিজের জ্ঞান ও বুঝশক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে অবশ্যই তার নিকট এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আল্লাহ তাআলার কোন অংশীদার নেই। যদি তিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করাতে একক, কেউ তাঁর শরীক নয়, তাহলে ইবাদতে অন্যরা কিভাবে শরীক হতে পারে?

ইউনুস 10:67

তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের বিশ্রামের জন্য রাত্রি সৃষ্টি করেছেন এবং দর্শনের জন্য দিন সৃষ্টি করেছেন। যে সম্প্রদায় কথা শোনে তাদের জন্য এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে।

ইউনুস 10:68

তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি পবিত্র। তিনিই অমুখাপেক্ষী।[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তাঁরই।[২] এ বিষয়ে তোমাদের কাছে কোন প্রমাণও নেই। তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলছ, যা তোমাদের জানা নেই? [১] আর যিনি কারোর মুখাপেক্ষী নন, তাঁর সন্তানেরও প্রয়োজন নেই। কারণ সন্তান সাহায্য-সহযোগিতার জন্যই প্রয়োজন হয়। আর তিনি যখন সহযোগিতার মুখাপেক্ষী নন, তখন তাঁর সন্তানের প্রয়োজনই বা কি?[২] আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তু যখন তাঁরই, তখন সকল বস্তু তাঁরই দাস ও গোলাম। তার পরেও তাঁর সন্তানের আর কি প্রয়োজন আছে? সন্তানের প্রয়োজন তারই হয়, যার কোন সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। আর যাঁর আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তুর উপর কর্তৃতত্ত্ব চলে, তাঁর প্রয়োজনই বা কি হতে পারে? তাছাড়া ঐ ব্যক্তি সন্তানের প্রয়োজন অনুভব করে, যে ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর পর সম্পদের ওয়ারিস দেখতে বা বানাতে পছন্দ করে। আর আল্লাহ তাআলার সত্তা কখনো ধ্বংস হবে না। সুতরাং তাঁর সন্তান নির্ধারণ করা এত বড় অপরাধ যে, সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, (تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا، أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا) অর্থাৎ, এতে যেন আকাশসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা পরম দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। (সূরা মারয়্যাম ১৯:৯০-৯১)

ইউনুস 10:69

তুমি বলে দাও, ‘যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে[১] তারা সফলকাম হবে না।’ [২] [১] افتراء এর অর্থ হল মিথ্যারোপ করা। এর পরেও বাড়তি كذب 'মিথ্যা' শব্দটি তাকীদের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। [২] এখানে সফলকাম বা কৃতকার্য বলতে পরকালের কৃতকার্যতাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর ক্রোধ ও তাঁর শাস্তি থেকে নিষ্কৃতিলাভ। যেহেতু শুধু পার্থিব ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ কৃতকার্যতা নয়। যেমন অনেকে কাফেরদের ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখে ভুল ধারণা এবং সন্দেহ ও সংশয়ের শিকার হয়। এই জন্যই পরবর্তী আয়াতে বলেছেন যে, "দুনিয়ায় কিছু সুখ-সম্ভোগ; তারপর আমারই দিকে তাদেরকে ফিরে আসতে হবে।" অর্থাৎ, পৃথিবীর আরাম-আয়েশ আখেরাতের তুলনায় একেবারে নগণ্য, যার কোন গণনাই হয় না। তার পর তাদেরকে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। অতএব ভালভাবে জেনে রাখা দরকার যে, কাফের, মুশরিক এবং আল্লাহর অবাধ্যজনদের পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনৈতিক উন্নতি এই কথার প্রমাণ নয় যে, এই জাতি সফলকাম ও কৃতকার্য এবং আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের এই জাগতিক উন্নতি তাদের নিরলস প্রচেষ্টার ফল, যা বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অনুযায়ী প্রত্যেক সেই জাতি অর্জন করতে পারে, যে উপায়-উপকরণ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে তা অর্জনের জন্য তাদের মত চেষ্টা-চরিত্র করবে; তাতে সে জাতি মু'মিন হোক বা কাফের। তাছাড়া এই ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবকাশ ও ঢিল দেওয়ার ফলও হতে পারে। যার আলোচনা এর পূর্বে বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে।

ইউনুস 10:70

(ওদের জন্য) দুনিয়ায় কিছু সুখ-সম্ভোগ রয়েছে। তারপর আমারই দিকে তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তাদেরকে তাদের অবিশ্বাসের বিনিময়ে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।

ইউনুস 10:71

আর তুমি তাদেরকে নূহের বৃত্তান্ত শোনাও; যখন সে নিজের সম্প্রদায়কে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থান এবং আল্লাহর নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদেশ দেওয়া যদি তোমাদের কাছে দুঃসহ মনে হয়, তবে আমার তো আল্লাহরই উপর ভরসা। সুতরাং তোমরা তোমাদের শরীকদেরকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের কর্তব্য স্থির করে নাও,[১] অতঃপর তোমাদের সেই কর্তব্য-বিষয়ে যেন কোন প্রচ্ছন্নতা না থাকে।[২] তারপর আমার সাথে (যা করতে চাও তা) নিস্পন্ন করে ফেল, আর আমাকে মোটেই অবকাশ দিও না। [১] অর্থাৎ, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে রেখেছ, তাদের সাহায্য অর্জন কর। (তোমাদের ধারণা অনুযায়ী যদি তারা তোমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে।) [২] غمة শব্দটির দ্বিতীয় অর্থ হল, অস্পষ্টতা ও প্রচ্ছন্নতা। অর্থাৎ আমার বিরুদ্ধে তোমাদের কর্তব্য পরিষ্কার ও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

ইউনুস 10:72

অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তো তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না।[১] আমার পারিশ্রমিক তো শুধু আল্লাহরই যিম্মায় রয়েছে। আর আমাকে হুকুম করা হয়েছে যে, আমি যেন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের অন্তর্ভুক্ত থাকি।’ [২] [১] (আমি তো তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না) যে, তার কারণে তোমরা এই অপবাদ দিতে পারবে যে, নবুওয়াতের দাবীদার হয়ে আমার উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ অর্জন করা।[২] নূহ (আঃ)-এর এই কথা দ্বারাও জানা গেল যে, সকল আম্বিয়াগণের দ্বীন ইসলামই ছিল। যদিও শরীয়তের নিয়ম-নীতি ভিন্ন ও তরীকা বিভিন্ন ছিল। যেমন (لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجا) المائدة-৪৮ দ্বারা বুঝা যায়। কিন্তু সকলের দ্বীন ছিল ইসলাম। দেখুনঃ সূরা নামল ২৭:৪৪, ২৭:৯১, সূরা বাক্বারাহ ২:১৩১-১৩২, সূরা ইউসুফ ১২:১০১, সূরা ইউনুস ১০:৮৪, সূরা আ'রাফ ৭:১২৬, সূরা মাইদাহ ৫:৪৮, ৫:১১১ এবং সূরা আনআম ৬:১৬২-১৬৩ নং আয়াত।

ইউনুস 10:73

অতঃপর তারা তাকে মিথ্যুক মনে করল,[১] অতএব আমি তাকে এবং যারা তার সাথে নৌকায় ছিল, তাদেরকে উদ্ধার করলাম ও তাদেরকে প্রতিনিধি বানালাম।[২] আর যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা জ্ঞান করেছিল, তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। সুতরাং দেখ, যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল, তাদের পরিণাম কি হয়েছিল? [১] অর্থাৎ, নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় সব রকমের ওয়ায-নসীহত শোনার পরেও মিথ্যাজ্ঞান করা থেকে বিরত থাকল না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা নূহ (আঃ) ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে নৌকায় আরোহণ করিয়ে বাঁচিয়ে নিলেন এবং বাকি সকলকে, এমনকি নূহ (আঃ)-এর একজন পুত্রকেও ডুবিয়ে মারলেন। [২] অর্থাৎ সেই সময় যারা জীবিত ছিল, তাদেরকে তাদের পূর্বের মানুষদের স্থলাভিষিক্ত করলাম। মানুষের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের বংশ থেকেই, বিশেষ করে নূহ (আঃ)-এর তিন পুত্র থেকে বিস্তার লাভ করেছে। এই জন্য নূহ (আঃ)-কে দ্বিতীয় আদম বলা হয়।

ইউনুস 10:74

আবার আমি তার (নূহের) পরে অপর নবীদেরকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করলাম, সুতরাং তারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিয়ে এল।[১] কিন্তু পূর্বে তারা যা মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, তা বিশ্বাস করবার ছিল না।[২] এভাবেই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন। [৩] [১] অর্থাৎ, এমন প্রমাণ ও মু'জিযাসমূহ নিয়ে এসেছিলেন, যা প্রমাণ করত যে, সত্য সত্যই তাঁরা আল্লাহর রসূল; যাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেছেন। [২] কিন্তু এই জাতি রসূলদের দাওয়াতের উপর ঈমান আনেনি, শুধু এই কারণে যে, যখন পূর্বে এই সকল রসূল তাদের নিকট এসেছিলেন, তখন তারা চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সাথে সাথে তাদেরকে অস্বীকার করে দিয়েছিল। তাদের প্রথমবারের এই অস্বীকার তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র অন্তরায় হয়ে গিয়েছিল। আর তারা এটাই ভেবেছিল যে, আমরা তো প্রথমে অস্বীকার করে ফেলেছি, এখন আর তা মেনে কি হবে? ফল এই দাঁড়ালো যে, তারা ঈমান থেকে বঞ্চিত থাকল। [৩] অর্থাৎ, যেভাবে কুফরী ও মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের হৃদয় মোহরাংকিত হয়েছিল, ঐভাবেই ভবিষ্যতেও যে জাতি রসূলগণকে মিথ্যাজ্ঞান করবে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করবে, তাদের অন্তরও মোহরাংকিত হবে এবং পূর্ব জাতিসমূহের মত তারাও হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকবে।

ইউনুস 10:75

অতঃপর আমি তাদের পর মূসা ও হারূনকে[১] আমার নিদর্শনাবলী সহ ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট পাঠালাম, [২] কিন্তু তারা অহংকার করল, আর তারা ছিল পাপাচারী সম্প্রদায়। [৩] [১] এখানে রসূলগণের কথা সাধারণভাবে আলোচনা করার পর মূসা ও হারূনের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। অথচ তাঁরাও রসূলগণের বর্ণনায় শামিল। কিন্তু যেহেতু তাঁরা বিশিষ্ট রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত, তাই বিশেষভাবে আলাদা করে তাঁদের কথা বর্ণনা করেছেন।[২] মূসা (আঃ)-এর এ সকল নিদর্শনাবলী (মু'জিযা) প্রসিদ্ধ আছে, বিশেষ করে ন'টি স্পষ্ট নিদর্শন, যা সূরা বানী ইস্রাঈলের ১৭:১০১ নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন।[৩] অর্থাৎ, যেহেতু তারা বড় বড় অপরাধ ও পাপকর্মে অভ্যাসী ছিল, যার কারণে তারা আল্লাহর প্রেরিত রাসূলকেও অহংকার প্রদর্শন করল। কারণ এক পাপ অন্য পাপকে আকর্ষণ করে এবং পাপের উপর অটল থাকলে, বড় বড় পাপকর্ম সাধনে সাহস যোগায়।

ইউনুস 10:76

অতঃপর যখন তাদের প্রতি আমার নিকট হতে সত্য পৌঁছল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট যাদু।’[১] [১] যখন অস্বীকার করার কোন বিবেকগ্রাহ্য প্রমাণ না থাকে, তখন তা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য বলে দেয় যে, এটা তো যাদু!

ইউনুস 10:77

মূসা বলল, ‘সত্য যখন তোমাদের কাছে পৌঁছল, তখন সে সম্পর্কে তোমরা কি বলছ, এটা কি যাদু? অথচ যাদুকররা তো সফলকাম হয় না।’ [১] [১] যখন মূসা (আঃ) বললেন, তোমরা একটু চিন্তা করে দেখ, সত্যের দাওয়াত ও সঠিক কথাকে তোমরা যাদু বলছ! এটা কি যাদু হতে পারে? যাদুকর তো কখনো কৃতকার্যই হতে পারে না। অর্থাৎ ইচ্ছা আনুযায়ী চাহিদা পূরণ এবং অবাঞ্ছিত পরিণতি থেকে বাঁচতে সে অকৃতকার্যই থেকে যায়। আর আমি তো আল্লাহর রসূল, আমি আল্লাহর সাহায্য পাই এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে মু'জিযা ও স্পষ্ট নিদর্শন প্রদান করা হয়েছে। যাদু ও যাদুবিদ্যার আমার প্রয়োজনই বা কি আছে? তাছাড়া আল্লাহ তাআলার প্রদর্শিত মু'জিযার তুলনায় তার মূল্যই বা কতটুকু?

ইউনুস 10:78

তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের নিকট এই জন্য এসেছ যে, আমাদেরকে সেই পথ হতে ফিরিয়ে দেবে, যাতে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছি, আর পৃথিবীতে তোমাদের দু’জনের আধিপত্য স্থাপিত হবে?[১] আমরা তোমাদের দু’জনকে বিশ্বাস করবার নই।’ [১] এটা অস্বীকারকারীদের অন্য একটি কাটহুজ্জতি; যা তারা প্রমাণাদি পেশ করতে অক্ষম হয়ে প্রয়োগ করে থাকে। প্রথম এই যে, তুমি আমাদেরকে আমাদের বাপ-দাদার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছ। দ্বিতীয় এই যে, ধন-সম্পদ ও কর্তৃত্ব আমাদের হাতে, তা আমাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তুমি নিজের আয়ত্তে করতে চাচ্ছ। ফলে আমরা কখনই তোমার প্রতি ঈমান আনব না। অর্থাৎ, বাপ-দাদার মতবাদে অটল অন্ধ বিশ্বাস এবং পার্থিব ধন-সম্পদ ও মর্যাদার বাসনা তাদেরকে ঈমান গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছিল। এর পরবর্তীতে ফিরআউনের বিচক্ষণ যাদুকরদের ডাকা এবং মূসা ও যাদুকরদের মুকাবিলা করার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরা আ'রাফে উল্লেখ হয়েছে এবং সূরা ত্বহাতেও তার বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ।

ইউনুস 10:79

ফিরআউন বলল, ‘আমার কাছে সমস্ত সুদক্ষ যাদুকরকে উপস্থিত কর।’

ইউনুস 10:80

তারপর যখন যাদুকররা আসল, তখন মূসা তাদেরকে বলল, ‘নিক্ষেপ কর যা কিছু তোমরা নিক্ষেপ করতে চাও।’

ইউনুস 10:81

অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন মূসা বলল, ‘তোমরা যা এনেছ তাই হল যাদু; নিশ্চয়ই আল্লাহ এখনই এটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন;[১] (কেননা) আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কাজ সার্থক করেন না।’ [২] [১] সুতরাং এমনই হল, মিথ্যা কি আর সত্যের মুকাবিলায় জয়ী হতে পারে? যাদুকররা তাদের যাদু-বিদ্যায় যতই দক্ষতা অর্জন করে থাকুক, তারা যা কিছু পেশ করেছিল, তা যাদু ও ইন্দ্রজাল (চোখের ভেলকিই) ছিল। কিন্তু মূসা (আঃ) যখন আল্লাহর আদেশে তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন, তখন সে সকল ইন্দ্রজালকে এক পলকে শেষ করে দিল। [২] আর এই সব যাদুকররাও অশান্তি সৃষ্টিকারী ছিল। তারা শুধু পার্থিব সুখ অর্জনের জন্য যাদু শিক্ষা করেছিল আর যাদুর ভেলকি দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানাতো। আল্লাহ তাআলা তাদের এই দুষ্কর্মকে কিভাবে সার্থকতা দান করবেন?

ইউনুস 10:82

আল্লাহ নিজ বাণী[১] দ্বারা সত্যকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা করেন; যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে থাকে। [১] এই 'কালেমা' বা বাণী হল ঐ সকল প্রমাণ ও স্পষ্ট দলীল, যা আল্লাহ তাআলা আপন কিতাবে অবতীর্ণ করে এসেছেন এবং যা তিনি পয়গম্বরগণকে প্রদান করতেন। অথবা ঐ সকল মু'জিযা (অলৌকিক কর্মকান্ড) যা আল্লাহ তাআলার আদেশে পয়গম্বরগণের হাতে প্রকাশ হত, অথবা আল্লাহর সেই আদেশ যা তিনি 'কুন' শব্দ দ্বারা দিয়ে থাকেন।

ইউনুস 10:83

অতঃপর ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গ নির্যাতন করবে, এই আশঙ্কায় মূসার প্রতি তার গোত্রের[১] লোকদের মধ্যে শুধু অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত আর কেউ বিশ্বাস স্থাপন করল না।[২] বাস্তবিকপক্ষে ফিরআউন ছিল সেই দেশে উদ্ধত, আর অবশ্যই সে ছিল সীমালংঘনকারীদের একজন। [৩] [১] قَوْمِهِ -এর 'ه' (তার) সর্বনাম দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ 'তার' বলতে মূসা (আঃ)-কে ধরেছেন। কারণ উক্ত আয়াতে সর্বনামের পূর্বে তাঁরই নাম উল্লেখ হয়েছে। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর গোত্র থেকে কিছু মানুষ ঈমান এনেছিল। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর ও অন্যান্যরা 'তার' বলতে ফিরআউনকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ ফিরআউনের সম্প্রদায় থেকে কিছু মানুষ ঈমান এনেছিল। এর প্রমাণ হল, বনী ইস্রাঈলরা তো একজন রসূল ও পরিত্রাতার অপেক্ষায় ছিল এবং মূসা (আঃ) রূপে তারা তা পেয়ে গিয়েছিল। আর সেই হিসেবে (কারূন) ছাড়া সকল বনী ইস্রাঈল তাঁর প্রতি ঈমান রাখত। ফলে এটাই সঠিক যে ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ (তার গোত্রের কিছু লোক) থেকে উদ্দেশ্য হল ফিরআউনী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ, যারা মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান এনেছিল; তার মধ্যে তার স্ত্রী আসিয়াও ছিলেন। [২] কুরআন কারীমের এই পরিষ্কার বর্ণনা থেকে এই কথাও বুঝা যাচ্ছে যে, এই অল্প সংখ্যক লোক যারা ঈমান এনেছিল, তারা ফিরআউনী সম্প্রদায়ের লোক ছিল। কারণ ফিরআউন, তার দরবারী ও শাসকবর্গের তরফ থেকে শাস্তির ভয় তাদেরই ছিল। যদিও বনী ইস্রাঈলরা ফিরআউনের দাসতত্ত্ব ও অধীনত্বের লাঞ্ছনা বেশ কিছু দিন থেকে সহ্য করে আসছিল। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার সাথে না তার কোন সম্পর্ক ছিল, আর না এই কারণে অতিরিক্ত শাস্তির সম্ভাবনা ছিল। [৩] আর মু'মিনগণ তার সীমালংঘনকারী ও অত্যাচারী স্বভাব থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন।

ইউনুস 10:84

মূসা বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! যদি তোমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখ, তাহলে তাঁরই উপর ভরসা কর; যদি তোমরা মুসলিম হও।’[১] [১] বনী ইস্রাঈলগণ ফিরআউনের পক্ষ থেকে যে অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার ছিল, মূসা (আঃ) আসার পরেও তা কম হয়নি, ফলে তিনি বড় চিন্তান্বিত ছিলেন। বরং মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাঁকে এমন কথাও বলে ফেলেছিল যে, হে মূসা! যেমন আমরা আপনার আগমনের পূর্বে ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের নিপীড়নে নিপীড়িত ছিলাম, অনুরূপ আপনার আগমনের পরেও আমাদের একই অবস্থা। এর পরিপ্রেক্ষিতে মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, আশা করি যে আমার প্রভু অবিলম্বে তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করে দেবেন। তবে এর জন্য জরুরী যে, তোমরা একমাত্র এক আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অধৈর্য হয়ো না। (সূরা আ'রাফের ৭:১২৮-১২৯ নং আয়াত দ্রষ্টব্য) এখানেও মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যদি তোমরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্যশীল হও, তাহলে একমাত্র তাঁরই উপর ভরসা কর।

ইউনুস 10:85

তারা বলল, ‘আমরা আল্লাহরই উপর ভরসা করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে যালেম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করো না।

ইউনুস 10:86

আর তুমি তোমার নিজ করুণায় অবিশ্বাসী সম্প্রদায় হতে আমাদেরকে রক্ষা কর।’ [১] [১] তারা আল্লাহর উপর ভরসা করার সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে দু'আও করেছিল। দু'আ অবশ্যই মু'মিনদের জন্য একটি বড় হাতিয়ার এবং বড় সহায়-সম্বল।

ইউনুস 10:87

আমি মূসা ও তার ভায়ের প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) করলাম, ‘তোমরা উভয়ে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য মিসরে গৃহ নির্মাণ কর। আর তোমরা নিজেদের সেই গৃহগুলোকে নামায পড়ার স্থানরূপে গণ্য কর[১] এবং নামায প্রতিষ্ঠা কর। আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।’ [১] এর অর্থ এই যে, নিজ নিজ বাসস্থানকে মসজিদ বানিয়ে নাও এবং কিবলার (বাইতুল মাকদিসের) দিকে তার মুখ করে নাও। যাতে ইবাদত করার জন্য তোমাদেরকে বাইরে গির্জা ইত্যাদিতে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়, যেখানে ফিরআউন ও তার দল-বলের অত্যাচারের ভয় থাকে।

ইউনুস 10:88

আর মূসা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গকে পার্থিব জীবনের শোভা ও সম্পদ দান করেছ। হে আমাদের প্রতিপালক! যার কারণে তারা তোমার পথ হতে (মানুষকে) বিভ্রান্ত করে। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দাও এবং তাদের অন্তরকে কঠিন করে দাও,[১] যাতে তারা যন্ত্রণাময় শাস্তি না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস স্থাপন না করতে পারে।’ [২] [১] যখন মূসা (আঃ) দেখলেন যে, ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের উপর আমার ওয়াজ-নসীহতের কোন প্রভাব পড়ছে না এবং এরূপ মু'জিযা দেখেও তার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না, তখন তার জন্য বদ্দুআ করলেন। এখানে আল্লাহ তাআলা সেই বদ্দুআর কথা বর্ণনা করেছেন। [২] অর্থাৎ সে যদিও ঈমান আনে, তবে শাস্তি দেখার পর যেন আনে, যে ঈমান তার জন্য কোন লাভদায়ক হবে না। এখানে কারো মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া উচিত নয় যে, পয়গম্বরগণ শুধু হিদায়াতের দু'আ করেন, ধ্বংসের জন্য বদ্দুআ করেন না। কারণ দাওয়াত-তবলীগ এবং সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ দলীল পেশ করার পর যখন এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আর ঈমান আনার কোন আশা নেই, তখন শেষ উপায় এটাই থাকে যে, সেই জাতির ব্যাপার আল্লাহর দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া। এটা ঠিক যেন আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে, যা কোন ইচ্ছা ছাড়াই পয়গম্বরদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। যেমন নূহ (আঃ) সাড়ে নয়শ বছর তবলীগ করার পর শেষে নিজ সম্প্রদায়ের উপর বদ্দুআ করে বলেছিলেন, (رَبِّ لا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارا) "হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফেরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না।" (সূরা নূহ ৭১:২৬ আয়াত)

ইউনুস 10:89

তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘তোমাদের উভয়ের দুআ কবুল করা হল। অতএব তোমরা অবিচল থাক[১] এবং অবশ্যই তাদের পথ অনুসরণ করো না যাদের জ্ঞান নেই।’ [২] [১] এর একটি অর্থ এই যে, তোমরা নিজ বদ্দুআর উপর অবিচল থাকো; যদিও তার বাস্তব রূপ প্রকাশ পেতে দেরী হয়। কারণ তোমাদের দু'আ অবশ্যই কবুল করা হয়েছে। কিন্তু তা কখন বাস্তবায়ন করব, তা একমাত্র আমার ইচ্ছা ও হিকমতের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং কোন কোন তফসীরবিদ বর্ণনা করেছেন যে, সেই বদ্দুআর চল্লিশ বছর পর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছে। সেই বদ্দুআ অনুযায়ী ফিরআউন যখন পানিতে ডুবতে আরম্ভ করল, তখন সে বলল, 'আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছি।' কিন্তু এই ঈমানে তার কোন লাভ হয়নি। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তুমি আপন দাওয়াত-তবলীগ, বনী ইস্রাঈলদেরকে পথ প্রদর্শন এবং তাদেরকে ফিরআউনের দাসত্ব থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য চেষ্টা-চরিত্র অব্যাহত রাখ। [২] অর্থাৎ যারা আল্লাহর নিয়ম-নীতি, তাঁর আইন-কানুন এবং তাঁর কর্মগত কৌশল ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, অবশ্যই তোমরা তাদের মত হয়ে যেয়ো না; বরং এখন অপেক্ষা ও ধৈর্য ধারণ কর, আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজ হিকমত ও কৌশল অনুযায়ী অবিলম্বে অথবা বিলম্বে তাঁর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পূর্ণ করবেন। কারণ তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না ।

ইউনুস 10:90

আর আমি বানী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম,[১] অতঃপর ফিরআউন তার সৈন্যদলসহ অন্যায় ও বিদ্বেষবশতঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল।[২] পরিশেষে যখন সে ডুবতে লাগল, তখন বলতে লাগল, ‘যে কথায় বানী ইস্রাঈল বিশ্বাস করেছে, আমিও তাতে বিশ্বাস করলাম যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ [১] অর্থাৎ, সমুদ্র চিরে, তাতে শুষ্ক পথ তৈরী করে দিলাম (যেমন সূরা বাক্বারার ২:৫০ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং আরো বিস্তারিত আলোচনা সূরা শুআ'রা ২৬:৬৩-৬৫ আয়াতে আসবে) এবং তোমাদেরকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিলাম।[২] অর্থাৎ, আল্লাহর আদেশে অলৌকিকভাবে তৈরী শুষ্ক পথে, যে পথ দিয়ে মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায় সমুদ্র পার হয়েছিলেন, ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্তও সমুদ্র পার হওয়ার ইচ্ছায় ঐ পথে চলতে আরম্ভ করে। উদ্দেশ্য ছিল যে, মূসা বনী ইস্রাঈলদেরকে আমার দাসত্ব থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য রাতারাতি তাদেরকে নিয়ে পালিয়েছে, পুনরায় তাদেরকে দাসত্বেরবেড়ীতে আবদ্ধ করতে হবে। যখন ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্ত সেই সামুদ্রিক পথে প্রবেশ করে গেল, তখন আল্লাহ তাআলা সাগরকে পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী চলাচলের আদেশ দিলেন। ফলে ফিরআউন সহ তার সৈন্যদল সকলে সাগরে ডুবে মরল।

ইউনুস 10:91

এখন (ঈমান আনছ)? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্য ছিলে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।[১] [১] আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, এখন ঈমান আনায় আর কোন মঙ্গল নেই। কারণ ঈমান আনার যে সময় ছিল, সে সময় তুমি অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য ও ফাসাদ রচনায় রত ছিলে।

ইউনুস 10:92

অতএব আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করব, যেন তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক;[১] আর নিঃসন্দেহে অনেক লোকই আমার নিদর্শনাবলী হতে উদাসীন। [১] যখন ফিরআউন ডুবে মারা গেল, তখন তার মৃত্যুর কথা অনেক মানুষের বিশ্বাস হচ্ছিল না। আল্লাহ তাআলা সাগরকে আদেশ দিলেন, ফলে সাগর তার মৃত লাশকে উপকূলে ফেলে দিল এবং সকলে তাকে (মৃত) দেখল। প্রসিদ্ধি আছে যে, আজও তার মৃতদেহ মিসরের যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। (কিন্তু সে লাশ কি তারই?) আল্লাহই অধিক জানেন।

ইউনুস 10:93

আমি বানী ইস্রাঈলকে বসবাস করার জন্য অতি উত্তম বাসস্থান প্রদান করলাম, আর আমি তাদেরকে আহার করবার জন্য উৎকৃষ্ট বস্তুসমূহ দান করলাম। অতঃপর তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরই তারা মতভেদ করল।[১] যাতে তারা মতভেদ করত নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক কিয়ামত দিবসে তাদের মধ্যে তার ফায়সালা করবেন। [১] অর্থাৎ, প্রথমতঃ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা না করে নিজেদের মাঝে মতভেদ শুরু করে দেয়, আর এই মতভেদ মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে ছিল না; বরং জ্ঞানলাভ করার পর করেছিল। যাতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এই মতভেদ শুধুমাত্র শত্রুতা ও অহংকারবশতঃ ছিল।

ইউনুস 10:94

অতঃপর (হে নবী!) আমি যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যদি তুমি সে (গ্রন্থ) সম্পর্কে সন্দিহান হও, তাহলে তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখ, যারা তোমার পূর্বের গ্রন্থ পাঠ করে। নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার নিকট সত্য এসেছে। সুতরাং তুমি কখনই সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।[১] [১] এই সম্বোধনটি হয় সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে অথবা নবী (সাঃ)-কে এই সম্বোধন করে এর দ্বারা উম্মতকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কারণ কোন অহীর ব্যাপারে নবী (সাঃ)-এর সংশয় ও সন্দেহ হতেই পারে না। "তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখ, যারা তোমার পূর্বের গ্রন্থ পাঠ করে।" কথাটির উদ্দেশ্য হল, কুরআন মাজীদের পূর্বে আসমানী কিতাব (তাওরাত, ইঞ্জীল ইত্যাদি) যাদের নিকট বিদ্যমান, তাদের নিকট থেকে কুরআন সম্পর্কে জেনে নাও। কারণ সেই কিতাবসমূহে তার বহু নিদর্শন এবং শেষ পয়গম্বরের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে।

ইউনুস 10:95

আর ঐসব লোকদেরও অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহর আয়াতগুলোকে মিথ্যা মনে করেছে, নচেৎ তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [১] [১] এটাও প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে সম্বোধন করে বুঝানো হচ্ছে যে, মিথ্যাজ্ঞান করার পথই হচ্ছে ক্ষতি ও ধ্বংসের পথ।

ইউনুস 10:96

নিঃসন্দেহে যাদের সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের বাক্য সত্য হয়েছে, তারা বিশ্বাস করবে না;

ইউনুস 10:97

যদিও তাদের নিকট সমস্ত নিদর্শন আগত হয়, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করেছে।[১] [১] এরা ঐ সকল মানুষ, যারা কুফর ও আল্লাহর অবাধ্যাচরণে এমনভাবে নিমজ্জিত থাকে যে, তাদের উপর ওয়াজ-নসীহতের কোন প্রভাব পড়ে না এবং কোন প্রমাণ তাদের জন্য ফল দেয় না। কারণ পাপাচরণ করে করে সত্য গ্রহণের প্রাকৃতিক ক্ষমতা তারা শেষ করে দিয়েছে। তারা তাদের চোখ খুললেও তখন খুলে, যখন আল্লাহর শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে পড়ে। আর তখন সেই ঈমান আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না। ((فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا "অতঃপর তাদের এ ঈমান তাদের কোন উপকারে আসল না, যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করল।" (সূরা মু'মিন ৪০:৮৫ আয়াত)

ইউনুস 10:98

সুতরাং কোন জনপদ বিশ্বাস করল না কেন, যাদের বিশ্বাস উপকারী হত; ইউনুসের সম্প্রদায়ের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র,[১] যখন তারা বিশ্বাস করল, তখন আমি তাদের থেকে পার্থিব জীবনে অপমানজনক শাস্তি বিদূরিত করে দিলাম এবং এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত তাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করলাম। [২] [১] এখানে لَولاَ শব্দটি আফসোস প্রকাশের জন্য هَلاَّ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে, অর্থাৎ আমি যে জনপদগুলিকে ধ্বংস করেছি, তার মধ্য থেকে কোন একটি জনপদবাসীও কেনই বা এমন হলো না যে, এমন সময়ে ঈমান নিয়ে আসত, যে সময়ে ঈমান আনলে তাদের জন্য ফলপ্রসূ হত! তবে ইউনুস (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। যখন তারা ঈমান আনল,তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর থেকে আযাব রহিত করে দিলেন। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হল এই যে, যখন ইউনুস (আঃ) দেখলেন যে, তাঁর দাওয়াত ও তবলীগে তাঁর সম্প্রদায় প্রভাবিত হচ্ছে না, তখন তিনি নিজ সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিলেন যে, অমুক দিন তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসবে এবং তিনি নিজে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যখন মেঘের মত তাদের উপর আযাবের লক্ষণাদি দেখা দিল, তখন তারা শিশু, নারী এমনকি জীবজন্তু সমেত এক মাঠে সমবেত হল এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতির সাথে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল। আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল করে তাদের উপর থেকে আযাব রহিত করে দিলেন। ইউনুস (আঃ) পথচারী পথিকের নিকট থেকে নিজ সম্প্রদায়ের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে থাকলেন। পরিশেষে তিনি যখন জানতে পারলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্প্রদায়ের উপর থেকে আযাব রহিত করে দিয়েছেন, তখন যেহেতু সেই সম্প্রদায় তাকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, তাই তিনি সেই সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে যাওয়া পছন্দ করলেন না। বরং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি অন্য কোন দিকে চলে গেলেন। এই সফরে তাঁকে নৌকা থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। (এ ঘটনা যথাস্থানে দ্রষ্টব্য।) (ফাতহুল কাদীর) অবশ্য ইউনুস (আঃ)-এর সম্প্রদায় কখন ঈমান এনেছিল তা নিয়ে মুফাসসিরগণের মাঝে মতভেদ আছে। (কেউ কেউ বলেন যে,) তারা আযাব দেখার পর ঈমান এনেছিল, যে সময়ের ঈমান ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তা নিজের উক্ত রীতি থেকে স্বতন্ত্রভাবে তাদের ঈমান কবুল করেছেন। অথবা এমন পর্যায় আসেনি যে, সেই সময় তাদের ঈমান ফলপ্রসূ হত না। কিন্তু কুরআন কারীম ইউনুস (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে إلاَّ দ্বারা যেভাবে আলাদা করেছে, তা প্রথম ব্যাখ্যাকেই সমর্থন করে। আর আল্লাহই ভালো জানেন। [২] কুরআন পার্থিব আযাব রহিত হওয়ার ব্যাপারে পরিষ্কার বর্ণনা দিয়েছে, আখেরাতের আযাব রহিত হওয়ার ব্যাপারে কোন বর্ণনা দেয়নি। ফলে কিছু তফসীরবিদের ধারণা যে, তাদের উপর থেকে আখেরাতের আযাব রহিত করা হয়নি। কিন্তু যখন কুরআন পরিষ্কারভাবে বর্ণনা দিয়েছে যে, পার্থিব আযাব ঈমান আনার কারণে রহিত করা হয়েছিল, তখন আর আখেরাতের আযাব সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার কোন প্রয়োজনই থাকে না। কারণ আখেরাতের আযাবের ফায়সালা তো ঈমান আনা ও না আনার উপর ভিত্তি করেই হবে। ঈমান আনার পর ইউনুস (আঃ)-এর সম্প্রদায় যদি আপন ঈমানের উপর অটল থাকে, তবে অবশ্যই তারা আখেরাতের আযাব থেকেও রক্ষা পাবে। তবে এর বিপরীত হলে শুধু পৃথিবীতেই আযাব থেকে রক্ষা পাবে। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

ইউনুস 10:99

আর যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে বিশ্বের সকল লোকই বিশ্বাস করত;[১] তাহলে তুমি কি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবে? [১] কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে ইচ্ছা করেননি। কারণ এটা তাঁর সেই হিকমত ও কৌশলের বিপরীত, যা পূর্ণরূপে তিনিই জানেন। এ কথা এই জন্য বলেছেন যে, নবী (সাঃ)-এর বড় আকাঙ্ক্ষা হত যে, সকল মানুষ মুসলিম হয়ে যাক। আল্লাহ তাআলা বললেন, এটা হতে পারে না। কারণ আল্লাহর পরিপূর্ণ হিকমত এবং প্রজ্ঞাময় কৌশলের উপর প্রতিষ্ঠিত ইচ্ছার চাহিদা তা নয়। এই জন্য পরে বলেছেন যে, তুমি মানুষকে ঈমান আনার জন্য কিভাবে বাধ্য করতে পার? যেহেতু তোমার মাঝে না তার ক্ষমতা আছে, আর না তুমি তার ভারপ্রাপ্ত।

ইউনুস 10:100

অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো বিশ্বাস স্থাপন করার সাধ্য নেই; আর আল্লাহ নির্বোধ লোকদের উপর (কুফরীর) অপবিত্রতা স্থাপন করে দেন। [১] [১] 'অপবিত্রতা' থেকে উদ্দেশ্য হল আযাব বা কুফরী। অর্থাৎ, যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, তারা কুফরীতেই নিমজ্জিত থাকে এবং এই ভাবেই আযাবের উপযুক্ত হয়ে যায়।

ইউনুস 10:101

তুমি বলে দাও, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে তোমরা তার প্রতি লক্ষ্য কর। আর নিদর্শনাবলী ও সতর্ককারী (নবী) তাদের উপকারে আসে না, যারা বিশ্বাস করে না।’

ইউনুস 10:102

অতএব তারা শুধু ঐ লোকদের অনুরূপ ঘটনাবলীর প্রতীক্ষা করছে, যারা তাদের পূর্বে গত হয়ে গেছে। তুমি বলে দাও, ‘তাহলে তোমরা (ওর) প্রতীক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষারতদের অন্তর্ভুক্ত রইলাম।’ [১] [১] অর্থাৎ, এ সকল মানুষ যাদের উপর কোন প্রমাণ ও ধমক প্রভাব বিস্তার করে না, ফলে তারা ঈমান আনে না। তারা কি এই অপেক্ষায় আছে যে, তাদের সাথে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটুক; যা পূর্ববর্তী জাতিরা ভোগ করেছে। অর্থাৎ মু'মিনদেরকে রক্ষা করে বাকি সকলকে ধ্বংস করে দেওয়া হত। (যেমন পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।) যদি তারই অপেক্ষায় থাকে, তবে ঠিক আছে, তোমরাও অপেক্ষা কর, আমিও অপেক্ষা করছি।

ইউনুস 10:103

অতঃপর আমি স্বীয় রসূলদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা বিশ্বাস করেছে তাদেরকেও, অনুরূপ বিশ্বাসীদেরকেও উদ্ধার করা আমার দায়িত্ব।

ইউনুস 10:104

তুমি বলে দাও,[১] ‘হে লোক সকল! যদি তোমরা আমার দ্বীন সম্বন্ধে সন্দিহান হও, তাহলে আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের উপাসনা কর, আমি তাদের উপাসনা করি না।[২] বরং আমি তাঁর উপাসনা করি, যিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটান।[৩] আর আমাকে এই আদেশ করা হয়েছে যে, আমি যেন বিশ্বাসীদের দলভুক্ত হই।’ [১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে আদেশ করছেন যে, তুমি সকল মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দাও যে, তোমার তরীকা এবং মুশরিকদের তরীকা এক নয়, এক অপর থেকে ভিন্ন। [২] অর্থাৎ, যদি তোমরা আমার দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ কর, যাতে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত হয় এবং এটাই সত্য দ্বীন, অন্য কোন দ্বীন নয়, তাহলে মনে রেখো যে, আমি তোমাদের সেই (বাতিল) উপাস্যদের কখনই ও কোন অবস্থাতেই উপাসনা করব না, যাদের উপাসনা তোমরা কর। [৩] অর্থাৎ, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হাতে। ফলে তিনি যখন ইচ্ছা তোমাদেরকে ধ্বংস করতে পারেন। কারণ মানুষের প্রাণ তাঁরই হাতে আছে।

ইউনুস 10:105

(আর আল্লাহ আমাকে এও আদেশ করেছেন যে), তুমি নিজেকে ধর্মের উপর একনিষ্ঠভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখ[১] এবং কখনই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। [১] حنيف শব্দের অর্থ হল, একনিষ্ঠ। অর্থাৎ, সকল ধর্ম ত্যাগ করে একমাত্র ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করা এবং সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর অভিমুখী হওয়া।

ইউনুস 10:106

আর আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুকে আহবান করো না, যা না তোমার কোন উপকার করতে পারে, না কোন ক্ষতি করতে পারে। বস্তুতঃ যদি এইরূপ কর, তাহলে তুমি অবশ্যই যালেমদেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।[১] [১] অর্থাৎ, যদি আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্যকে ডাক, যে কারোর উপকার-অপকার করতে পারে না, তাহলে তা যুলম (অন্যায়) হবে। যুলম (অন্যায়) হল, وضع الشي في غير محله (কোন বস্তুকে তার নিজ স্থান থেকে সরিয়ে অন্য স্থানে রাখা।) ইবাদত একমাত্র সেই আল্লাহর হক, যিনি সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং জীবনধারণের সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থাপনাও তিনিই করেছেন। সুতরাং সেই ইবাদতের অধিকারী ব্যতীত অন্য কারোর ইবাদত করলে, ইবাদতকে (যথাস্থানে না রেখে) বড় ভুল স্থানে রাখা হয়। এই জন্যই শিরককে বড় যুলম (মহা অন্যায়) বলা হয়েছে। এখানে যদিও সম্বোধিত নবী (সাঃ); কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষ ও উম্মতে মুহাম্মাদীই উদ্দিষ্ট।

ইউনুস 10:107

যদি আল্লাহ তোমাকে কোন কষ্টে নিপতিত করেন, তাহলে তিনি ছাড়া তার মোচনকারী আর কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার মঙ্গল চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই।[১] তাঁর দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করে থাকেন। আর তিনি চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। [১] মঙ্গল বা উত্তম বস্তুকে এখানে এই জন্য 'ফায্ল' বা অনুগ্রহ বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার সাথে যে ভাল ব্যবহার করে থাকেন, আমলের দিক থেকে যদিও বান্দা তার অধিকারী নয়; তবুও এটা তাঁর অনুগ্রহ বা দয়া যে, তিনি মানুষের আমল না দেখে তার উপর রহম ও দয়া করে থাকেন।

ইউনুস 10:108

তুমি বল, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সত্য এসে গেছে।[১] সুতরাং যারা সৎপথ অবলম্বন করবে, তারা তো নিজেদের মঙ্গলের জন্য সৎপথ অবলম্বন করবে[২] এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে, তারা তো নিজেদের ধ্বংসের জন্যই পথভ্রষ্ট হবে।[৩] আর আমি তোমাদের কর্মবিধায়ক নই।’[৪] [১] হক বা সত্য হল কুরআন ও দ্বীন ইসলাম। যাতে আল্লাহর একতত্ত্ববাদ ও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতের উপর ঈমান অন্তর্ভুক্ত। [২] অর্থাৎ তার ফল সে নিজেই ভোগ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে। [৩] তার ক্ষতি ও শাস্তি তার নিজের উপরেই বর্তাবে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। সুতরাং কেউ হিদায়াতের পথ অনুসরণ করলে তাতে আল্লাহর শক্তিতে কোন বৃদ্ধিলাভ হবে না এবং যদি কেউ কুফরী ও ভ্রষ্টতাকে বেছে নেয়, তবে তাতে আল্লাহর সার্বভৌমতত্ত্ব ও শক্তিতে কোন পার্থক্য পড়বে না। সুতরাং ঈমান ও হিদায়াতের জন্য অনুপ্রাণিত করা এবং কুফরী ও ভ্রষ্টতা থেকে বিরত থাকার জন্য তাকীদ ও ভীতি-প্রদর্শন করা, উভয়েরই উদ্দেশ্য হল, মানুষের মঙ্গল কামনা করা। আল্লাহর নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য বা স্বার্থ নেই। [৪] অর্থাৎ, আমাকে এই দায়িতত্ত্ব দেওয়া হয়নি যে, আমি তোমাদেরকে সর্বাবস্থাতে মুসলিম বানিয়ে ছাড়ব। বরং আমি তো শুধু সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, দ্বীনপ্রচারক ও তার আহবায়ক। আমার কাজ হল শুধু মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দেওয়া, অবাধ্যদেরকে আল্লাহর আযাব ও তাঁর পাকড়াও থেকে ভীতি-প্রদর্শন করা এবং আল্লাহর বাণীর দাওয়াত ও তবলীগ করা। এই দাওয়াত মেনে কেউ ঈমান আনলে ভাল। আর কেউ না মানলে, আমার দায়িতত্ত্ব এ নয় যে, আমি তাকে জোর করে তা মানাবো।

ইউনুস 10:109

তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়েছে, তুমি তার অনুসরণ কর এবং আল্লাহর ফায়সালা না আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ কর।[১] আর তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ফায়সালাদাতা।[২] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যা প্রত্যাদেশ করেন, তা শক্তভাবে ধর, যা আদেশ করেন, তা পালন কর, যে জিনিস থেকে নিষেধ করেন, সে জিনিস থেকে বিরত থাক এবং কোন বিষয়ে শৈথিল্য করো না। আর অহী অনুযায়ী চলতে যে কষ্ট হবে, বিরোধীদের পক্ষ থেকে যে কষ্ট আসবে এবং দাওয়াত ও তবলীগের পথে যে সমস্যার সম্মুখীন হবে, সব কিছুর উপর ধৈর্য ধারণ কর এবং শক্তভাবে সব কিছুর মোকাবিলা কর। [২] কারণ, তাঁর জ্ঞান পরিপূর্ণ, তাঁর ক্ষমতা ও শক্তি অপরিসীম এবং তাঁর করুণাও সর্বব্যাপী। ফলে তাঁর থেকে উত্তম বিচারক ও ফায়সালাদাতা আর কে হতে পারে?