Tafsir Ahsanul Bayaan — হুদ 11:1 – ইউসুফ 12:111
Contents
- হুদ 11:1
- হুদ 11:2
- হুদ 11:3
- হুদ 11:4
- হুদ 11:5
- হুদ 11:6
- হুদ 11:7
- হুদ 11:8
- হুদ 11:9
- হুদ 11:10
- হুদ 11:11
- হুদ 11:12
- হুদ 11:13
- হুদ 11:14
- হুদ 11:15
- হুদ 11:16
- হুদ 11:17
- হুদ 11:18
- হুদ 11:19
- হুদ 11:20
- হুদ 11:21
- হুদ 11:22
- হুদ 11:23
- হুদ 11:24
- হুদ 11:25
- হুদ 11:26
- হুদ 11:27
- হুদ 11:28
- হুদ 11:29
- হুদ 11:30
- হুদ 11:31
- হুদ 11:32
- হুদ 11:33
- হুদ 11:34
- হুদ 11:35
- হুদ 11:36
- হুদ 11:37
- হুদ 11:38
- হুদ 11:39
- হুদ 11:40
- হুদ 11:41
- হুদ 11:42
- হুদ 11:43
- হুদ 11:44
- হুদ 11:45
- হুদ 11:46
- হুদ 11:47
- হুদ 11:48
- হুদ 11:49
- হুদ 11:50
- হুদ 11:51
- হুদ 11:52
- হুদ 11:53
- হুদ 11:54
- হুদ 11:55
- হুদ 11:56
- হুদ 11:57
- হুদ 11:58
- হুদ 11:59
- হুদ 11:60
- হুদ 11:61
- হুদ 11:62
- হুদ 11:63
- হুদ 11:64
- হুদ 11:65
- হুদ 11:66
- হুদ 11:67
- হুদ 11:68
- হুদ 11:69
- হুদ 11:70
- হুদ 11:71
- হুদ 11:72
- হুদ 11:73
- হুদ 11:74
- হুদ 11:75
- হুদ 11:76
- হুদ 11:77
- হুদ 11:78
- হুদ 11:79
- হুদ 11:80
- হুদ 11:81
- হুদ 11:82
- হুদ 11:83
- হুদ 11:84
- হুদ 11:85
- হুদ 11:86
- হুদ 11:87
- হুদ 11:88
- হুদ 11:89
- হুদ 11:90
- হুদ 11:91
- হুদ 11:92
- হুদ 11:93
- হুদ 11:94
- হুদ 11:95
- হুদ 11:96
- হুদ 11:97
- হুদ 11:98
- হুদ 11:99
- হুদ 11:100
- হুদ 11:101
- হুদ 11:102
- হুদ 11:103
- হুদ 11:104
- হুদ 11:105
- হুদ 11:106
- হুদ 11:107
- হুদ 11:108
- হুদ 11:109
- হুদ 11:110
- হুদ 11:111
- হুদ 11:112
- হুদ 11:113
- হুদ 11:114
- হুদ 11:115
- হুদ 11:116
- হুদ 11:117
- হুদ 11:118
- হুদ 11:119
- হুদ 11:120
- হুদ 11:121
- হুদ 11:122
- হুদ 11:123
- ইউসুফ 12:1
- ইউসুফ 12:2
- ইউসুফ 12:3
- ইউসুফ 12:4
- ইউসুফ 12:5
- ইউসুফ 12:6
- ইউসুফ 12:7
- ইউসুফ 12:8
- ইউসুফ 12:9
- ইউসুফ 12:10
- ইউসুফ 12:11
- ইউসুফ 12:12
- ইউসুফ 12:13
- ইউসুফ 12:14
- ইউসুফ 12:15
- ইউসুফ 12:16
- ইউসুফ 12:17
- ইউসুফ 12:18
- ইউসুফ 12:19
- ইউসুফ 12:20
- ইউসুফ 12:21
- ইউসুফ 12:22
- ইউসুফ 12:23
- ইউসুফ 12:24
- ইউসুফ 12:25
- ইউসুফ 12:26
- ইউসুফ 12:27
- ইউসুফ 12:28
- ইউসুফ 12:29
- ইউসুফ 12:30
- ইউসুফ 12:31
- ইউসুফ 12:32
- ইউসুফ 12:33
- ইউসুফ 12:34
- ইউসুফ 12:35
- ইউসুফ 12:36
- ইউসুফ 12:37
- ইউসুফ 12:38
- ইউসুফ 12:39
- ইউসুফ 12:40
- ইউসুফ 12:41
- ইউসুফ 12:42
- ইউসুফ 12:43
- ইউসুফ 12:44
- ইউসুফ 12:45
- ইউসুফ 12:46
- ইউসুফ 12:47
- ইউসুফ 12:48
- ইউসুফ 12:49
- ইউসুফ 12:50
- ইউসুফ 12:51
- ইউসুফ 12:52
- ইউসুফ 12:53
- ইউসুফ 12:54
- ইউসুফ 12:55
- ইউসুফ 12:56
- ইউসুফ 12:57
- ইউসুফ 12:58
- ইউসুফ 12:59
- ইউসুফ 12:60
- ইউসুফ 12:61
- ইউসুফ 12:62
- ইউসুফ 12:63
- ইউসুফ 12:64
- ইউসুফ 12:65
- ইউসুফ 12:66
- ইউসুফ 12:67
- ইউসুফ 12:68
- ইউসুফ 12:69
- ইউসুফ 12:70
- ইউসুফ 12:71
- ইউসুফ 12:72
- ইউসুফ 12:73
- ইউসুফ 12:74
- ইউসুফ 12:75
- ইউসুফ 12:76
- ইউসুফ 12:77
- ইউসুফ 12:78
- ইউসুফ 12:79
- ইউসুফ 12:80
- ইউসুফ 12:81
- ইউসুফ 12:82
- ইউসুফ 12:83
- ইউসুফ 12:84
- ইউসুফ 12:85
- ইউসুফ 12:86
- ইউসুফ 12:87
- ইউসুফ 12:88
- ইউসুফ 12:89
- ইউসুফ 12:90
- ইউসুফ 12:91
- ইউসুফ 12:92
- ইউসুফ 12:93
- ইউসুফ 12:94
- ইউসুফ 12:95
- ইউসুফ 12:96
- ইউসুফ 12:97
- ইউসুফ 12:98
- ইউসুফ 12:99
- ইউসুফ 12:100
- ইউসুফ 12:101
- ইউসুফ 12:102
- ইউসুফ 12:103
- ইউসুফ 12:104
- ইউসুফ 12:105
- ইউসুফ 12:106
- ইউসুফ 12:107
- ইউসুফ 12:108
- ইউসুফ 12:109
- ইউসুফ 12:110
- ইউসুফ 12:111
হুদ 11:1
আলিফ লা-ম রা। এ (কুরআন) এমন গ্রন্থ যার আয়াতগুলি মজবুত (সুবিন্যস্ত) করা হয়েছে,[১] অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে[২] প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতা (আল্লাহ)র পক্ষ হতে। [৩]
[১] অর্থাৎ, তা এত পাকাপোক্ত যে, তার শব্দবিন্যাস ও অর্থ বিবৃতিতে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। অথবা তার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা ও জটিলতা নেই। অথবা তা পরিবর্তন ও রহিত হওয়ার নয়।
[২] তারপর তাতে আহকাম ও শরয়ী বিধি-বিধান, নসীহত ও কাহিনী, আক্বায়েদ ও ঈমানসংক্রান্ত বিষয় এবং চরিত্র ও ব্যবহার নীতি-নৈতিকতার বিষয়গুলোকে যেভাবে পরিষ্কার ও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, পূর্ব কিতাবসমূহে তার দৃষ্টান্ত মিলে না।
[৩] অর্থাৎ, আপন বাণীতে তিনি প্রজ্ঞাময়, ফলে তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণকৃত বাণী হিকমত থেকে খালি নয়। তিনি মহাজ্ঞাতাও অর্থাৎ, তিনি সমস্ত বিষয় ও তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত আছেন। ফলে তাঁর কথার উপর আমল করার মাধ্যমেই মানুষ অমঙ্গল থেকে বাঁচতে পারবে।
হুদ 11:2
এই (বলা হয়েছে) যে, আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করো না; আমি (নবী) তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।
হুদ 11:3
আরও এই যে, তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট (পাপের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তিনি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দান করবেন[১] এবং প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে তার যথাযথ মর্যাদা দান করবেন।[২] আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের[৩] শাস্তির আশঙ্কা করি।
[১] যে পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকে কুরআন 'ধোঁকার সরঞ্জাম' বলেছে, সেই পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকেই এখানে 'উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম' বলে অভিহিত করেছে। এর মর্মার্থ হল এই যে, যে ব্যক্তি আখেরাত থেকে অমনোযোগী হয়ে পার্থিব সরঞ্জাম দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য তা 'ধোঁকার সরঞ্জাম' রূপে গণ্য হবে, কারণ এর পরে তাকে নিকৃষ্ট পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে। আর যে আখেরাতের জন্য প্রস্ত্ততি নেওয়ার সাথে সাথে তার দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য এই কিছু দিনের সরঞ্জাম 'উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম'। কারণ সে তা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করে।
[২] (অথবা প্রত্যেক অধিক আমলকারীকে অধিক সওয়াব দান করবেন। অথবা যে পাপ করবে তাকে একটি পাপেরই শাস্তি দেবেন; কিন্তু যে পুণ্য করবে, তাকে ঐ একটির বিনিময়ে ১০টি পুণ্য দান করবেন। আর সে মর্যাদা ও পুণ্য হল, ইহকালে সম্মান এবং পরকালে জান্নাত। -সম্পাদক)
[৩] মহাদিন বলতে কিয়ামতের দিন।
হুদ 11:4
আল্লাহরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।
হুদ 11:5
জেনে রাখ, তারা নিজ নিজ বুক কুঞ্চিত করে, যাতে তাঁর দৃষ্টি হতে লুকাতে পারে।[১] জেনে রাখ, তারা যখন নিজেদের কাপড় (দেহে) জড়ায়, তিনি তখনও সব জানেন যা কিছু তারা গোপন করে এবং যা কিছু প্রকাশ করে। তিনি তো মনের ভিতরের কথাও জানেন।
[১] এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে তফসীরবিদগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, ফলে তার উদ্দেশ্য কি তাতেও মদভেদ আছে। এর পরেও সহীহ বুখারীতে (সূরা হূদের তফসীরে) বর্ণনাকৃত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ দ্বারা বুঝা যায় যে, উক্ত আয়াতটি সেই সকল মুসলিমদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা লজ্জার খাতিরে পেশাব-পায়খানার সময় এবং স্ত্রী-সহবাসের সময় উলঙ্গ হওয়াকে অপছন্দ করত; এই ভেবে যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দেখছেন। ফলে তারা এই সময় লজ্জাস্থান আবৃত করার নিমিত্তে নিজেদের বক্ষদেশকে ঘুরিয়ে দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, রাত্রের অন্ধকারে যখন তারা বিছানাতে নিজেদেরকে কাপড় দ্বারা আচ্ছাদিত করে, তখনও তিনি তাদেরকে দেখেন এবং তাদের চুপে চুপে ও প্রকাশ্যে আলাপনকেও তিনি জানেন। উদ্দেশ্য হল যে, লজ্জা-শরম আপন জায়গায় ঠিক আছে, কিন্তু তাতে এত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। কারণ যে সত্তার কারণে তারা এরূপ করে, তাঁর নিকট তা গুপ্ত নয়। তবে এরূপ কষ্ট করায় লাভ কি?
হুদ 11:6
আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই।[১] আর তিনি প্রত্যেকের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন;[২] সবই সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহ্ফুযে লিপিবদ্ধ) রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, তিনি রুযীর যিম্মাদার ও দায়িতত্ত্বশীল। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল সৃষ্টিজীব, মানুষ হোক বা জীন, পশু হোক বা পক্ষীকুল, ছোট হোক বা বড়, জলচর হোক বা স্থলচর; মোটকথা, তিনি সমুদয় প্রাণীকে তার প্রয়োজন মত রুযী দান করেন।
[২] مستقر ومستودع (স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র)এর ব্যাখ্যার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। অনেকের নিকট مستقر হল চলা ফেরা করতে করতে যেখানে থেমে যায় সেই জায়গা এবং যেখানে অবস্থান করে তা হল مستودع । কেউ কেউ বলেন, মায়ের গর্ভাশয় হল مستقر আর পিতার পিঠ হল مستودع। আবার অনেকের নিকট মানুষ বা পশু জীবিত অবস্থায় যেখানে অবস্থান করে তা হল তার مستقر এবং মৃত্যুর পর যেখানে দাফন করা হবে তা হল তার مستودع। (তাফসীর ইবনে কাসীর) ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, مستقر হল মায়ের গর্ভাশয় এবং مستودع হল পৃথিবীর সেই অংশ যেখানে মানুষ দাফন হয়। ইমাম হাকেমের এক বর্ণনা অনুযায়ী এই অর্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সুতরাং অর্থ যাই হোক, আয়াতের অর্থ পরিষ্কার যে, আল্লাহ তাআলা সকলের (স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র) সম্পর্কে অবগত। তিনি সকলকে রুযী দানের ক্ষমতা রাখেন এবং তিনি রুযীর দায়িতত্ত্বশীল। আর তিনি আপন দায়িতত্ত্ব পূর্ণ করে থাকেন।
হুদ 11:7
আর তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছ দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপরে ছিল;[১] যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করে নেন, তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম কে?[২] আর যদি তুমি বল, ‘নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে’, তাহলে যারা অবিশ্বাসী তারা অবশ্যই বলবে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট যাদু।’
[১] এ কথাই সহীহ হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এক হাদীসে পাওয়া যায় যে, "আল্লাহ তাআলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে, সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্য লিখেছেন। আর সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।" (বুখারী ও মুসলিম)
[২] অথবা কে উত্তম কর্ম করে? অর্থাৎ এই আকাশ ও পৃথিবী শুধু শুধু বেকার ও বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেননি; বরং তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হল, মানুষ ও জীন জাতিকে পরীক্ষা করা যে, তাদের মধ্যে কে সৎকর্ম করছে?
বিঃদ্রঃ- আল্লাহ তাআলা এখানে এই কথা বলেননি যে, কে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ আমল করে; বরং এই কথা বলেছেন যে, কে সবচেয়ে বেশি ভালো আমল করে। কারণ ভালো, উত্তম বা নেক আমল হল তা, যা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হবে এবং সুন্নত (নবী (সাঃ) এর তরীকা) অনুযায়ী হবে। যদি কোন আমলে এই দুই শর্তের মধ্যে কোন একটি শর্ত পাওয়া না যায়, তবে তা নেক আমল নয়, তাতে তা পরিমাণে যতই বেশি হোক। আল্লাহর নিকট সেই আমলের কোন মর্যাদা নেই।
হুদ 11:8
আর যদি আমি নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য[১] তাদের শাস্তিকে বিলম্বিত করি, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, ‘সেই শাস্তিকে কিসে আটক রাখছে?’ স্মরণ রেখ, যেদিন ওটা তাদের উপর এসে পড়বে, তখন তা ফিরাবার কেউ থাকবে না, আর যা নিয়ে তারা উপহাস করছিল, তা এসে তাদেরকে ঘিরে নেবে। [২]
[১] أُمَّةٌ (উম্মাহ বা উম্মত) শব্দটি কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়েছে। শব্দটি أم থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ হল উদ্দেশ্য। এখানে এর অর্থ হল সেই মেয়াদ ও সময়, যা সময় আযাব অবতীর্ণ করার জন্য উদ্দিষ্ট। (ফাতহুল কাদীর) সূরা ইউসুফের ১২:৪৫নং (وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ) আয়াতেও একই অর্থ পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরো যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তার মধ্যে একটি অর্থ হল, ইমাম বা নেতাঃ যেমন (إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً) অর্থাৎ, নিশ্চয় ইবরাহীম ছিল একজন ইমাম। (সূরা নাহল ১৬:১২০) মিল্লাত, দ্বীন বা মতাদর্শঃ যেমন (إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ) অর্থাৎ, আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি। (সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩) জামাআত বা দলঃ যেমন (وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ) অর্থাৎ, যখন সে মাদয়্যানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছে। (সূরা ক্বাস্বাস ২৮:২৩) (وَمِن قَوْمِ مُوسَى أُمَّةٌ) অর্থাৎ, মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা (অন্যকে) ন্যায় পথ দেখায় ও ন্যায় বিচার করে। (সূরা আ'রাফ ৭:১৫৯) ইত্যাদি। আরো একটি অর্থ হল সেই বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতি যাদের নিকট কোন রসূল প্রেরিত হয়েছিলেনঃ (وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَسُولٌ) অর্থাৎ, প্রত্যেক জাতির জন্য এক একজন রসূল ছিল। (সূরা ইউনুস ১০:৪৭) একে উম্মতে দাওয়াতও বলা হয়। অনুরূপ নবীদের প্রতি ঈমান আনয়নকারী জাতিকে উম্মত বা উম্মতে ইত্তিবা' বা উম্মতে ইজাবাহ বলা হয়। (ইবনে কাসীর)[২] এখানে তাড়াতাড়ি চাওয়াকে ঠাট্টা-উপহাস করা বলা হয়েছে। কারণ তাদের সেই তাড়াতাড়ি ঠাট্টা-উপহাস স্বরূপই হত। সুতরাং উদ্দেশ্য তাদেরকে এই কথা বুঝানো যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আযাবে দেরী হওয়াতে মানুষের উদাসীন হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তাঁর আযাব যে কোন সময় আসতে পারে।
হুদ 11:9
আর যদি আমি মানুষকে স্বীয় অনুগ্রহ আস্বাদন করিয়ে তার নিকট হতে তা ছিনিয়ে নিই, তাহলে সে নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে।[১]
[১] সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে যে খারাপ গুণ পাওয়া যায়, এই আয়াতে ও পরের আয়াতে তারই বর্ণনা রয়েছে। হতাশা ভবিষ্যতের সাথে সম্পৃক্ত আর অকৃতজ্ঞতা অতীত ও বর্তমানের সাথে সম্পৃক্ত।
হুদ 11:10
আর যদি তার উপর আপতিত কোন কষ্টের পর তাকে কোন নিয়ামত আস্বাদন করাই, তাহলে সে বলতে শুরু করে, ‘আমার সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে গেল’; [১] (আর তখন) সে উৎফুল্ল অহংকারী হয়ে যায়। [২]
[১] অর্থাৎ, ভাবে যে আমার কষ্টের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। আমার আর কোন কষ্ট আসবে না।
[২] অর্থাৎ, তার নিকট যা কিছু থাকে, তা নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং অন্যদের উপর অহংকার করে। অবশ্য এই মন্দ গুণ থেকে মু'মিন ও সৎকর্মশীলগণ স্বতন্ত্র, যেমন পরের আয়াতে এই কথা পরিষ্কার বুঝা যায়।
হুদ 11:11
কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান। [১]
[১] অর্থাৎ, মু'মিনগণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক বা দুঃখ-কষ্টে থাকুক উভয় অবস্থাতেই তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) শপথ করে বলেছেন, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য যে ফায়সালাই করেন, তাদের ভালোর জন্যই করেন। যদি সে সুখ লাভ করে, তাহলে তার উপর সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ হয়)। আর যদি কোন দুঃখ-কষ্ট পায়, তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, আর এটাও তাঁর জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ) হয়। এই বৈশিষ্ট্য একজন মু'মিন ব্যতীত অন্য কারো নয়।" (মুসলিম) অন্য আরো একটি হাদীসে বলেন যে, "একজন মু'মিন যখন কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় এবং কষ্ট পায়, এমনকি তার পায়ে কাঁটা প্রবিষ্ট হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তার কারণে তাঁর গুনাহ মাফ করে দেন।"(আহমাদ ৩/৪) সূরা মাআরিজের ৭০:১৯-২২ নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।)
হুদ 11:12
তোমার নিকট যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়, সম্ভবতঃ তুমি হয়তো তার কিছু অংশ বর্জন করবে এবং ‘তার প্রতি কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয়নি কেন? অথবা তার সাথে কোন ফিরিশতা আসেনি কেন?’ তাদের এই কথায় তোমার মন সঙ্কুচিত হবে। (কিন্তু হে নবী!) তুমি তো শুধুমাত্র একজন সতর্ককারী।[১] আর আল্লাহই হচ্ছেন প্রত্যেক বস্তুর উপর দায়িত্বশীল।
[১] মুশরিকরা নবী (সাঃ) সম্পর্কে বলত যে, তাঁর উপর কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করা হয় না কেন? কিংবা তাঁর নিকট কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয় না কেন। (সূরা ফুরক্বান ২৫:৭-৮) অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে "আমি জানি যে, তারা তোমার ব্যাপারে যে কথা বলে, তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়।" (সূরা হিজর ১৫:৯৭) এই আয়াতে ঐ সকল উক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, সম্ভবতঃ তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়, আর কিছু কথা যা তোমার নিকট অহী করা হয়, তা মুশরিকদের উপর কষ্টকর মনে হয়, হতে পারে যে, তুমি তা তাদেরকে শুনাতে পছন্দ করবে না। কিন্তু তোমার কাজ শুধু সতর্ক ও তবলীগ করা, তা তুমি সর্বাবস্থায় চালিয়ে যাও।
হুদ 11:13
তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজে রচনা করেছে? বল, ‘তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ স্বরচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং (সাহায্যার্থে) আল্লাহ ছাড়া যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ [১]
[১] ইমাম ইবনে কাসীর লিখেছেন যে, প্রথমে আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা তোমাদের এই দাবীতে সত্যবাদী হও যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সবরচিত, তাহলে তোমরা তার মত কুরআন রচনা করে দেখাও; তাতে তোমরা যার ইচ্ছা সাহায্য নিতে পার। কিন্তু তোমরা এরূপ কক্ষনো করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, (قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا) অর্থাৎ, বল, যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জীন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।" (সূরা বনী ইস্রাঈল ১৭:৮৮) তারপর আল্লাহ তাআলা এই চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, পূর্ণ কুরআন রচনা করে পেশ করতে না পারলে, দশটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে। পুনরায় তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, একটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন সূরা ইউনুসের ১০:৩৮ নং আয়াতে এবং সূরা বাক্বারার শুরুতে এ কথা বলেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর) এর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ চ্যালেঞ্জ এ হতে পারে যে, অনুরূপ একটি কথাই তৈরী করে পেশ কর। যেমন আল্লাহ বলেন, (فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِين) অর্থাৎ, তারা যদি সত্যবাদী হয়, তাহলে এর সদৃশ কোন কথা উপস্থিত করুক না। (সূরা ত্বুর ৫২:৩৪) কিন্তু অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়ক্রম অনুসারে পর্যায়ক্রম এই চ্যালেঞ্জের সমর্থন পাওয়া যায় না। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
হুদ 11:14
অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আল্লাহরই জ্ঞান দ্বারা। আর এও যে, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাহলে এখন তোমরা মুসলমান হবে কি? [১]
[১] অর্থাৎ, এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম হওয়ার পরেও কি 'কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত কিতাব' এই কথা স্বীকার করার জন্য এবং মুসলমান হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হবে না?
হুদ 11:15
যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান করে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না।
হুদ 11:16
এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে। [১]
[১] উক্ত আয়াত দু'টি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে, তাতে যাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তারা হল রিয়াকারী (লোক দেখানো বা সুনাম নেওয়ার জন্য আমলকারী)। অনেকের নিকট তারা হল ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে দুনিয়াদারদের কথা বলা হয়েছে। কারণ অনেক দুনিয়াদার, যারা নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রাপ্য তাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, আখেরাতে তাদের জন্য শাস্তি ব্যতীত আর কিছুই থাকবে না। উক্ত বিষয়টি কুরআন মাজীদের সূরা বনী ইস্রাঈলের ১৭:১৮ নং আয়াত ও সূরা শূরার ৪২:২০ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
হুদ 11:17
যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আগত স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ওর সঙ্গে তাঁর পক্ষ হতে এক সাক্ষীও বিদ্যমান, আর ওর পূর্বে (সাক্ষী) ছিল আদর্শ ও করুণা স্বরূপ মূসার গ্রন্থ; (সে কি তার মত যে অনুরূপ নয়)?[১] এমন লোকেরাই এ (কুরআন)-এর প্রতি বিশ্বাস রাখে।[২] আর সমস্ত দলের মধ্য হতে যে ব্যক্তি এই (কুরআন) অমান্য করবে, তার প্রতিশ্রুত স্থান হবে দোযখ।[৩] অতএব তুমি এ (কুরআন) সম্পর্কে সন্দেহে পড়ো না। নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এটা সত্য (গ্রন্থ); কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ্বাস করে না। [৪]
[১] কাফের ও অস্বীকারকারীদের বিপরীত মু'মিন ও দ্বীনদারদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। "প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণ"এর অর্থ হল, সেই 'প্রকৃতি' যার উপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর তা হল এক আল্লাহকে স্বীকার ও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার প্রকৃতি। যেমন নবী (সাঃ) বলেছেন, সকল শিশু প্রকৃতির উপর জন্ম গ্রহণ করে, অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।" (বুখারী) يَتْلُوْهُ এর অর্থ হল, ওর পিছনে বা ওর সঙ্গে। অর্থাৎ, তার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষীও বিদ্যমান। সে সাক্ষী হল কুরআন অথবা মুহাম্মাদ (সাঃ), যিনি সেই সুস্থ মানব-প্রকৃতির দিকে আহবান করেন। আর এর পূর্বে মূসা (আঃ)-এর কিতাব তাওরাতও সাক্ষী; যা পথনির্দেশক ও রহমতের কারণও বটে। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কিতাবও কুরআনের উপর ঈমান আনার জন্য পথ দেখায়। উদ্দেশ্য এই যে, একজন সেই ব্যক্তি, যে অস্বীকারকারী ও কাফের এবং তার বিপরীত অন্য আর এক ব্যক্তি, যে আল্লাহর সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার এক সাক্ষী হল কুরআন বা নবী (সাঃ), অনুরূপ পূর্বে অবতীর্ণ কিতাব তাওরাতেও তার পথনির্দেশনার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং সে বিশ্বাসী। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে? অর্থাৎ, উভয়ে সমান হতে পারে না। কারণ একজন মু'মিন আর দ্বিতীয়জন কাফের। একজন সর্বপ্রকার দলীল দ্বারা সমৃদ্ধ। আর অন্যজন একেবারে দলীলশূন্য।[২] অর্থাৎ, যাদের মাঝে উক্ত গুণ পাওয়া যায়, তারা কুরআন কারীম ও নবী (সাঃ) এর প্রতি ঈমান রাখে।[৩] 'সমস্ত দল' থেকে উদ্দেশ্য হল, সারা পৃথিবীতে যে সকল ধর্ম বা মতবাদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, পারসীক, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজক, পৌত্তলিক ও অবিশ্বাসী ইত্যাদি থেকে যে কেউ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রতি ঈমান না আনবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম। উক্ত বিষয়টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জান আছে! এই উম্মতের যে ইয়াহুদী অথবা খ্রিষ্টান আমার নবুঅত সম্পর্কে শ্রবণ করবে অথচ আমার প্রতি ঈমান আনবে না, সে জাহান্নামে যাবে।" (মুসলিম) এ বিষয়টি এর পূর্বে সূরা বাক্বারার ২:৬২ নং ও সূরা নিসার ৪:১৫০-১৫২ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে।[৪] এ বিষয়টিকে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যেমন (وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তুমি যতই চাও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৩ আয়াত) (وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তাদের সম্বন্ধে ইবলীস তার ধারণা সত্য প্রমাণ করল, ফলে তাদের মধ্যে একটি মু'মিন দল ব্যতীত সবাই তার অনুসরণ করল। (সূরা সাবা' ৩৪:২০ আয়াত)
হুদ 11:18
আর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে?[১] ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশতা)গণ বলবে, ‘এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।’[২]
[১] অর্থাৎ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ইহজগৎ পরিচালনা বা পরজগতে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেননি, তাদের সম্পর্কে বলা যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই ক্ষমতা বা এখতিয়ার দিয়েছেন।
[২] এর ব্যাখ্যা হাদীসে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মু'মিন ব্যক্তিকে তার পাপের কথা স্বীকার করাবেন, তিনি বলবেন, তুমি জান, তুমি অমুক অমুক পাপকাজ করেছ? সে ব্যক্তি তা স্বীকার করে বলবে, হ্যাঁ, আমি করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি সেই পাপসমূহকে পৃথিবীতেও প্রকাশ করিনি। যাও আজও তা ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু অন্য লোক বা কাফেরদের ব্যাপার এমন হবে যে তাদেরকে সাক্ষীদের সম্মুখে ডাকা হবে এবং সাক্ষী এই সাক্ষ্য দেবে যে, এরাই ঐ সমস্ত লোক, যারা নিজেদের প্রতিপালকের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল।" (বুখারীঃ তফসীর সূরা হূদ)
হুদ 11:19
যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে।[১] আর তারাই পরকাল সম্বন্ধেও অবিশ্বাসী।
[১] অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখার জন্য তাতে বক্রতা ও দোষ বের করার চেষ্টা করত এবং লোকদেরকে সে ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ করত।
হুদ 11:20
তারা (সমগ্র) ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারত না, আর তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন সাহায্যকারীও ছিল না। ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে। ওরা শুনতে সক্ষম ছিল না এবং দেখতও না। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদের সত্যকে অস্বীকার ও অপছন্দ করার ব্যাপার এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা তা শুনতে ও দেখতে সক্ষম ছিল না। অথবা এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা তো তাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দিয়েছিলেন; কিন্তু তার দ্বারা তারা হক কথা না শ্রবণ করেছে আর না হক দর্শন করেছে। ঠিক যেন (فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلا أَبْصَارُهُمْ وَلا أَفْئِدَتُهُمْ مِنْ شَيْء) "তাদের কর্ণ, তাদের চক্ষু ও তাদের হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি।" (সূরা আহক্বাফ ৪৬:২৬) কারণ তারা হক শ্রবণে বধির ও হক দর্শনে অন্ধ হয়ে ছিল। যেমন তারা জাহান্নামে প্রবেশ করার সময় (আফসোস) করে বলবে, (لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِير) অর্থাৎ, যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।" (সূরা মুলক ৬৭:১০)
হুদ 11:21
ওরা সেই লোক, যারা নিজেরা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর যেসব (উপাস্য) তারা মিথ্যা কল্পনা করে রেখেছিল, তাদের থেকে তারা সবাই উধাও হয়ে গেছে।
হুদ 11:22
এটা সুনিশ্চিত যে, পরকালে তারাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
হুদ 11:23
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকার্যাবলী সম্পন্ন করেছে, আর নিজেদের প্রতিপালকের কাছে বিনত হয়েছে, তারাই হবে জান্নাতবাসী; তাতে তারা অনন্তকাল থাকবে।
হুদ 11:24
উভয় দলের দৃষ্টান্ত এরূপ; যেমন এক ব্যক্তি অন্ধ ও বধির এবং আর এক ব্যক্তি দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন।[১] এই দু’ ব্যক্তি কি তুলনায় সমান হবে? (কখনও নয়।) তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
[১] পূর্বের আয়াতে মু'মিন ও কাফের এবং সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগ্যবান লোকদের কথা আলোচিত হয়েছে। এই আয়াতে উভয়ের উদাহরণ বর্ণনা করে উভয়ের আসল রূপ আরো ভালভাবে পরিষ্ফুটিত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, একজন দৃষ্টিহীন ও বধির। আর অন্যজন চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন। কাফের ইহকালে সত্যের সৌন্দর্য দর্শন করা থেকে বঞ্চিত এবং পরকালে পরিত্রাণের পথ লাভে বঞ্চিত। অনুরূপ কাফের সত্যের দলীল শোনা থেকে বঞ্চিত থাকে, ফলে এমন কথাবার্তা থেকে তারা বঞ্চিত থেকে যায়, যা তার জন্য কল্যাণকর। এর বিপরীত একজন মু'মিন বুঝার ক্ষমতা রাখে, সত্য দর্শন ও গ্রহণ করে এবং হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। সুতরাং সে সত্য ও ভালোর অনুসরণ করে। দলীল-প্রমাণ শ্রবণ করে ও তার দ্বারা মনের সন্দেহ দূর করে এবং বাতিল থেকে দূরে থাকে। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে? অস্বীকৃতিসূচক জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ, উভয়ে সমান হতে পারে না। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন,(لا يَسْتَوِي أَصْحَابُ النَّارِ وَأَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُون) অর্থাৎ, জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়, জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।" (সূরা হাশর ৫৯:২০) অন্য আর এক স্থানে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে "অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়। অন্ধকার ও আলো, রৌদ্র ও ছায়া সমান নয়, জীবিত ও মৃত সমান নয়।" (সূরা ফাত্বির ৩৫:১৯-২০)
হুদ 11:25
আর নিশ্চয় আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছি, (নূহ বলল,) ‘অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী।
হুদ 11:26
তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করো না,[১] আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।[২]
[১] এটা সেই তাওহীদের দাওয়াত, যা প্রত্যেক নবী নিজ নিজ সম্প্রদায়কে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, (وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُون) অর্থাৎ, আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রসূল, তাঁর প্রতি এই অহী ব্যতীত প্রেরণ করিনি যে, আমি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মা'বুদ নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।" (সূরা আম্বিয়া ২১:২৫)
[২] অর্থাৎ যদি আমার প্রতি ঈমান না আনো এবং এই তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণ না কর, তাহলে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।
হুদ 11:27
তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যেসব নেতৃস্থানীয় লোক অবিশ্বাসী ছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদেরই মত মানুষ দেখতে পাচ্ছি।[১] আর আমরা দেখছি যে, শুধু ঐ লোকেরাই না বুঝে[২] তোমার অনুসরণ করছে, যারা আমাদের মধ্যে নিতান্তই হীন।[৩] আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না; বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে মনে করছি।’
[১] এটা সেই সন্দেহ, যা এর পূর্বে কয়েক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে, তা হল কাফেরদের নিকট কোন মানুষের নবী ও রসূল হওয়াটা বড় আশ্চর্যের বিষয় ছিল। যেমন বর্তমানে বিদআতীদেরকেও আশ্চর্য লাগে এবং তারা রসূল (সাঃ)-এর মানুষ হওয়ার কথা অস্বীকার করে।
[২] সর্বযুগে সত্যের ইতিহাসে এ কথা বিদ্যমান যে, শুরুতে দ্বীনের উপর ঈমান আনয়নকারী সর্বদা তারাই হয়ে থাকে, যাদেরকে সমাজে অসহায় ও হীন মনে করা হয় এবং সম্মানী ও সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরা তা থেকে বঞ্চিত থাকে। এমনকি এটা পয়গম্বরগণের অনুসারীদের পরিচয় বলে গণ্য হয়েছে। সুতরাং যখন রোমের বাদশাহ হিরাকল আবু সুফিয়ানকে নবী (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সময় এ কথাটিও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, "সমাজের সম্মানিত সবল লোকেরা তাঁর আনুগত্য করছে, না দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা?" তখন আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, "দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা।" এ কথা শুনে হিরাকল বলেছিলেন, "রসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে।" (বুখারী) কুরআন কারীমেও বর্ণনা করা হয়েছে যে, সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরাই সর্বপ্রথম পয়গম্বরদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করতে থেকেছে। (যুখরুফঃ ২৩) আর মু'মিনদের পার্থিব অবস্থা এই ছিল বলে কাফেররা তাঁদেরকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করত। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে সত্যের অনুসারীগণই সম্মানী ও মর্যাদাসম্পন্ন, তাতে তাঁরা ধন-সম্পদের দিক থেকে যতই দুর্বল হন। আর সত্য অস্বীকারকারীরাই হীন ও অসম্মানী; যদিও তারা পার্থিব বিষয়ে সমৃদ্ধিশালী হয়।
[৩] হকপন্থী মু'মিনগণ যেহেতু আল্লাহ ও রসূলের বিধানের বিপরীত নিজের জ্ঞান ও রায় ব্যবহার করে না, সেহেতু বাতিলপন্থীরা ভাবে যে, এরা বুঝার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে না; বরং আল্লাহর রসূল তাদেরকে যে দিকে ঘুরায় সে দিকেই ঘুরে যায়, যে বস্তু থেকে বিরত থাকতে বলে, তা থেকে বিরত থাকে। অথচ এটাও মু'মিনদের একটি বড় গুণ; বরং ঈমানের অপরিহার্য চাহিদা। কিন্তু কাফের ও বাতিলপন্থীদের নিকট উক্ত গুণও একটি ত্রুটি।
হুদ 11:28
সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, আমি যদি স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর (প্রতিষ্ঠিত) থাকি এবং তিনি আমাকে নিজ সন্নিধান হতে করুণা (নবুঅত) দান করে থাকেন,[১] অতঃপর ওটা তোমাদের চোখে না পড়ে,[২] তাহলে কি আমি ওটা তোমাদেরকে মেনে নিতে বাধ্য করব, অথচ তোমরা ওটা অপছন্দ কর?[৩]
[১] بينة (প্রমাণ) দ্বারা ঈমান ও একীন আর رحمة (করুণা) দ্বারা নবুঅত বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তা নূহ (আঃ)-কে প্রদান করেছিলেন।
[২] অর্থাৎ, তোমরা তা দেখা থেকে অন্ধ হয়ে যাও। সুতরাং না তোমরা তার গুরুত্ব বুঝতে পার, আর না তা মানার জন্য প্রস্ত্তত হও। বরং তা মিথ্যাজ্ঞান করার জন্য ও তাঁর বিরোধিতা করার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠ তাহলে---।
[৩] যখন ব্যাপার এই, তখন এই হিদায়াত ও রহমত তোমাদের ভাগে কিভাবে আসতে পারে?
হুদ 11:29
আর হে আমার সম্প্রদায়! আমি এতে তোমাদের কাছে কোন ধন-সম্পদ চাচ্ছি না;[১] আমার বিনিময় তো শুধু আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। আর আমি তো বিশ্বাসীদেরকে তাড়িয়ে দিতে পারি না।[২] নিশ্চয় তারা নিজেদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে। পরন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। [৩]
[১] যাতে তোমাদের মনে এই সন্দেহ না এসে যায় যে, এই নবুঅতের দাওয়াত দ্বারা আমার উদ্দেশ্য পার্থিব ধন-সম্পদ অর্জন করা। আমি এই কর্ম একমাত্র আল্লাহর আদেশে এবং তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করছি, তিনিই আমাকে এর প্রতিদান দেবেন।[২] এতে বুঝা যাচ্ছে যে, নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের নেতারাও, সমাজে দুর্বল ভাবা হতো এমন মু'মিনদেরকে নূহ (আঃ)-এর মজলিস বা তাঁর নিকট থেকে দূরে রাখার দাবী করেছিল। যেমন মক্কার নেতারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট অনুরূপ দাবী করেছিল, যার ফলে আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমের এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছিলেন, (وَلا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ) অর্থাৎ, আর যে সব লোক সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে আহবান করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে, তাদেরকে তুমি দূরে সরিয়ে দিয়ো না। (সূরা আনআম ৬:৫২)(وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلاَ تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ) অর্থাৎ, তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহবান করে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। (সূরা কাহ্ফ ১৮:২৮)[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যকারীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তাদেরকে নবীর নিকট থেকে দূর করার দাবী করাটা তোমাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। তারা তো মাথার উপর বসিয়ে রাখার উপযুক্ত, দূরে ছুঁড়ে ফেলার মত নয়।
হুদ 11:30
আর হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদেরকে তাড়িয়েই দিই, তবে আল্লাহর (শাস্তি) হতে কে আমাকে রক্ষা করবে? [১] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ কর না?
[১] বুঝা যায় যে, এমন লোকদেরকে নিজের কাছ হতে দূর করে দেওয়া, আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির কারণ।
হুদ 11:31
আর আমি তোমাদেরকে বলছি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে। আমি অদৃশ্যের কথাও জানি না। আর আমি এটাও বলি না যে, আমি ফিরিশতা। আর যারা তোমাদের চোখে হীন, আমি তাদের সম্বন্ধে এটা বলি না যে, আল্লাহ কখনো তাদেরকে কোন মঙ্গল দান করবেন না; [১] তাদের অন্তরে যা কিছু আছে, তা আল্লাহ উত্তমরূপে জানেন। (এরূপ বললে) আমি অবশ্যই যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’[২]
[১] বরং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঈমান রূপে বড় উত্তম বস্তু দান করে রেখেছেন এবং তারই ভিত্তিতে তারা আখেরাতে জান্নাতের মত নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হবে এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেও বড় মর্যাদাবান হতে পারবে। সুতরাং তাদেরকে তোমাদের হেয় প্রতিপন্ন করা তাদের জন্য কোন ক্ষতির কারণ নয়। অবশ্য তোমরাই আল্লাহ তাআলার নিকট পাপী হবে; কারণ তোমরা আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন কর অথচ আল্লাহর নিকট তারা বড় সম্মানিত।
[২] কারণ, যে বস্তুর জ্ঞান আমার নিকট নেই, একমাত্র আল্লাহর নিকট রয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলা যুলুম।
হুদ 11:32
তারা বলল, ‘হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে বিতর্ক করেছ এবং সে বিতর্ক অনেক বেশি করে ফেলেছ।[১] সুতরাং যে সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছ, তা আমাদের সামনে আনয়ন কর; যদি তুমি সত্যবাদী হও।’[২]
[১] কিন্তু এর পরেও আমরা ঈমান আনছি না।
[২] এটা সেই আহাম্মকি ও বেওকুফী যা ভ্রষ্ট সম্প্রদায় পূর্ব থেকে করে আসছে, তারা আপন পয়গম্বরদের বলত যে, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদের উপর আযাব অবতীর্ণ করিয়ে আমাদেরকে ধ্বংস করে দাও! অথচ যদি তারা জ্ঞানী হত, তাহলে তারা বলত যে, যদি তুমি সত্যবাদী হও এবং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রসূল হও, তাহলে আমাদের জন্যও দু'আ কর, যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন; যাতে আমরা তা গ্রহণ করতে পারি।
হুদ 11:33
সে বলল, ‘ওটা তো আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সামনে আনয়ন করবেন এবং তোমরা তাঁকে ব্যর্থ করতে পারবে না।[১]
[১] অর্থাৎ, আযাব আসা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপর, এ নয় যে আমি যখন চাইব, তখনই তোমাদের উপর আযাব চলে আসবে। এর পরেও আল্লাহ তাআলা যখন আযাবের ফায়সালা করে নেবেন বা প্রেরণ করে দেবেন, তখন তাঁকে কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না।
হুদ 11:34
আর আমি যদি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাই, তবুও আমার উপদেশ তোমাদের কোন উপকারে আসবে না; যদি আল্লাহই তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা রাখেন।[১] তিনিই তোমাদের প্রতিপালক। আর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।’ [২]
[১] إِغْوَآءٌ এর অর্থ হল পথভ্রষ্ট করা। অর্থাৎ, তোমাদের কুফরী ও অস্বীকার করা এমন পর্যায়ে পৌছে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা এবং হিদায়াত পাওয়া অসম্ভব। উক্ত অবস্থাকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মোহর লাগিয়ে দেওয়া বলা হয়। যার পরে হিদায়াতের আর কোন আশা করা যায় না। উদ্দেশ্য এই যে, যদি তোমরাও সেই বিপদ সীমায় পৌঁছে গেছ, তাহলে যদিও আমি তোমাদের মঙ্গল কামনা করি; অর্থাৎ সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি, তবুও এই মঙ্গল কামনা ও চেষ্টা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, কারণ তোমরা ভ্রষ্টতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছ।
[২] হিদায়াত ও ভ্রষ্টতাও তাঁরই হাতে আছে এবং তাঁরই নিকট সকলকে ফিরে যেতে হবে, যেখানে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমলের প্রতিদান দেবেন। ভাল লোকদেরকে তাদের ভাল আমলের প্রতিদান এবং মন্দ লোকদেরকে তাদের মন্দ আমলের প্রতিফল দেবেন।
হুদ 11:35
তবে কি তারা (অবিশ্বাসীরা) বলে, সে (মুহাম্মাদ) এটা (কুরআন) নিজেই রচনা করেছে? তুমি বলে দাও, ‘যদি আমি তা নিজে রচনা করে থাকি, তবে আমার এই অপরাধ আমার উপর বর্তাবে, আর (অমূলক দাবী করে) তোমরা যে অপরাধ করছ, তা হতে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত।’ [১]
[১] কোন কোন তফসীরবিদের নিকটে উক্ত কথোপকথন নূহ ও তাঁর সম্প্রদায়ের মাঝে হয়েছিল। আবার অনেকের ধারণা যে, এটা পূর্বাপর থেকে বিচ্ছিন্ন বাক্য স্বরূপ নবী (সাঃ) এবং মক্কার মুশরিকদের মাঝে হওয়া কথোপকথন। উদ্দ্যেশ্য এই যে, যদি এই কুরআন আমার তৈরী করা হয়, আর আমি আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কিতাব বলাতে মিথ্যুক হই, তবে তা আমার অপরাধ, তার শাস্তি আমিই ভোগ করব। কিন্তু তোমরা যা করছ, আমি তা থেকে মুক্ত। তোমরা তা জান, তার সাজা আমার উপর নয়, তোমাদের উপরেই বর্তাবে, তার চিন্তা-ভাবনা কি তোমাদের কিছু আছে?
হুদ 11:36
আর নূহের প্রতি অহী প্রেরিত হল, যারা বিশ্বাস করেছে, তারা ছাড়া তোমার সম্প্রদায় হতে আর কেউই বিশ্বাস করবে না, কাজেই যা তারা করছে, তার জন্য তুমি দুঃখ করো না। [১]
[১] যখন নূহ (আঃ) এর সম্প্রদায় আযাব আসার জন্য বলেছিল, তখন এই কথা বলা হয়েছিল এবং নূহ (আঃ) আল্লাহর দরবারে দু'আ করেছিলেন যে, 'হে আমার প্রভু! পৃথিবীতে বসবাসকারী একজন কাফেরকেও জীবিত রেখো না।' আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এখন অতিরিক্ত আর কেউ ঈমান আনবে না, অতএব এ নিয়ে তুমি চিন্তা করো না।'
হুদ 11:37
আর তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার অহী (প্রত্যাদেশ) অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর,[১] আর যালেমদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলো না। নিশ্চয়ই তাদেরকে ডুবানো হবে। [২]
[১] 'আমার চোখের সামনে' এবং 'আমার তত্ত্বাবধানে' এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার সিফাত 'চক্ষু'র প্রমাণ রয়েছে; (কোন উদাহরণ বা সদৃশ বর্ণনা না করে) যার প্রতি ঈমান রাখা অপরিহার্য। 'আমার অহী অনুযায়ী' এর অর্থ হল তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ইত্যাদিকে যেভাবে আমি বলব, ঠিক সেইভাবেই তৈরী কর। কোন কোন তফসীরবিদ উক্ত স্থানে কিশতীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, তার তলা এবং তাতে কি ধরনের কাঠ ও অন্যান্য আসবাবপত্র লাগানো হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে উক্ত বিষয়টি কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তার পূর্ণ বিবরণের সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটে আছে।
[২] অনেকে 'যালেম' বলতে নূহ (আঃ)-এর পুত্র এবং তাঁর স্ত্রীকে বুঝেছেন, তারা মু'মিন ছিল না এবং তারা ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেকে এর দ্বারা ডুবে মরা পুরো জাতিকে বুঝেছেন। উদ্দেশ্য হল, তাদের জন্য অবকাশ বা অব্যাহতি চাইবে না। কারণ এখন তাদের ধ্বংসের সময় এসে গেছে। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের ধ্বংসের জন্য তাড়াতাড়ি করো না, নির্ধারিত সময়ে তারা ডুবে শেষ হয়ে যাবে। (ফাতহুল কাদীর)
হুদ 11:38
সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল। আর যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানদিগের কোন দল তার নিকট দিয়ে গমন করল, তখনই তার সাথে উপহাস করতে লাগল।[১] সে বলল, ‘যদি তোমরা আমাদেরকে উপহাস কর, তাহলে আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা আমাদেরকে উপহাস করছ।
[১] যেমন বলতে লাগল, 'ওহে নূহ! তুমি কি নবী হতে হতে ছুতোর হয়ে গেলে? অথবা হে নূহ! কিশতী কি ডাঙ্গায় চলবে নাকি?' ইত্যাদি।
হুদ 11:39
সুতরাং সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, সে কোন্ ব্যক্তি যার উপর এমন শাস্তি আসবে, যা তাকে লাঞ্ছিত করে দেবে এবং তার উপর চিরস্থায়ী শাস্তি আপতিত হবে।’ [১]
[১] এর অর্থ হল, জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি, যা তাদের জন্য পার্থিব আযাবের পর প্রস্তুত আছে।
হুদ 11:40
অবশেষে যখন আমার নির্দেশ এসে পৌঁছল এবং ভূ-পৃষ্ঠ (চুলা) হতে পানি উথলিয়ে উঠতে লাগল[১] তখন আমি বললাম, ‘প্রত্যেক যুগল (প্রাণীর) জোড়া জোড়া তাতে (নৌকাতে) উঠিয়ে নাও[২] এবং নিজ পরিবারবর্গকেও; তবে তাকে নয় যার সম্বন্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়ে আছে।[৩] আর যে বিশ্বাস করেছে তাকেও (উঠিয়ে নাও)।’[৪] বস্তুতঃ অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউই তার প্রতি বিশ্বাস করেনি। [৫]
[১] تنور এর অর্থ অনেকে রুটি পাকানোর তন্দুর চুলো, অনেকে 'আইনুল অরদাহ' নামক বিশেষ স্থান এবং কেউ কেউ ভূ-পৃষ্ঠ করেছেন। হাফেয ইবনে কাসীর (রঃ) এই শেষের অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠের সকল স্থান হতেই ঝরনার মত পানি উঠেছিল, তুফান আনার অবশিষ্ট কমতি উপর থেকে আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি পূরণ করেছিল।
[২]( অর্থাৎ, নর ও মাদী। এরূপ সকল সৃষ্ট জীবের জোড়া জোড়া কিশতীতে রেখে নেওয়া হয়েছিল। আর অনেকে বলেন, যে গাছপালাও রাখা হয়েছিল। আর আল্লাহই ভালো জানেন। (যুগল জীবের এক এক জোড়া বলতে যেসব প্রাণী স্ত্রী-পুরুষের মিলনে বংশ বিস্তার করে এবং পানির মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে না কেবল তাদেরকেই জাহাজে উঠানো হয়েছিল। -সম্পাদক)
[৩] অর্থাৎ, যাদের ডুবে মরা আল্লাহর তকদীরে নির্ধারিত আছে। উদ্দেশ্য সমস্ত কাফের, অথবা এই استثناء (বিয়োজন) 'পরিবারবর্গ' শব্দ থেকে করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিজ পরিবারবর্গকে কিশতীতে আরোহণ করিয়ে নাও, সে ব্যতীত যার সম্বন্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ, একঃ পুত্র কিন্আন বা য়্যাম এবং দুইঃ নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী ওয়াইলা, এরা উভয়ে কাফের ছিল, তাদেরকে কিশ্তীতে আরোহণকারীদের জামাআত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
[৪] অর্থাৎ সমস্ত ঈমানদারগণকে কিশতীতে তুলে নাও।
[৫] কেউ কেউ (কিশতীতে আরোহীদের) সর্বমোট (নারী ও পুরুষ মিলে) সংখ্যা ৮০ জন এবং কেউ কেউ তার থেকেও কম বলেছেন। যাদের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর তিন পুত্র সাম, হাম, ইয়াফেস ও তাঁদের স্ত্রীগণও ছিলেন, কারণ তাঁরা মুসলমান ছিলেন। এদের মধ্যে য়্যামের স্ত্রীও ছিলেন। য়্যাম ছিল কাফের; কিন্তু তার স্ত্রী মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁকে কিশতীতে উঠানো হয়েছিল। (ইবনে কাসীর)
হুদ 11:41
সে বলল, ‘তোমরা এতে আরোহণ কর, এর গতি ও স্থিতি আল্লাহরই নামে;[১] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াবান।’
[১] উক্ত বাক্য দ্বারা ঈমানদারগণকে সান্তনা ও সাহস দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, নির্ভয়ে ও নিঃশঙ্ক চিত্তে কিশ্তীতে আরোহণ কর, আল্লাহ তাআলাই এই কিশ্তীর সংরক্ষক, তা তারই আদেশে চলবে ও তারই আদেশে থামবে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানে বলেন, (فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنْتَ وَمَنْ مَعَكَ عَلَى الْفُلْكِ فَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجَّانَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ، وَقُلْ رَبِّ أَنْزِلْنِي مُنْزَلًا مُبَارَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ) অর্থাৎ, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা কিশ্তীতে আরোহণ করবে, তখন বল, আল্লাহর যাবতীয় প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন। আরও বল, পালনকর্তা! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও, যা হবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী।" (সূরা মু'মিনুন ২৩:২৮-২৯) কোন কোন উলামা কিশ্তী বা সওয়ারীতে আরোহণ করার সময় بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا পড়া মুস্তাহাব বলেছেন। কিন্তু (سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ) আয়াত পড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
হুদ 11:42
আর সেই নৌকাটিই তাদেরকে নিয়ে পর্বততুল্য তরঙ্গের মধ্যে চলতে লাগল।[১] নূহ স্বীয় পুত্রকে ডাকতে লাগল -- এবং সে ছিল ভিন্ন স্থানে -- (বলল), ‘হে আমার পুত্র! আমাদের সাথে সওয়ার হয়ে যাও এবং অবিশ্বাসীদের সঙ্গী হয়ো না।’ [২]
[১] অর্থাৎ, যখন ভূপৃষ্ঠের উপর পানি ছিল, এমনকি পাহাড়-পর্বতও পানিতে ডুবে ছিল, আর কিশ্তী নূহ (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীদেরকে নিজের বুকে নিয়ে আল্লাহর আদেশে এবং তাঁর হিফাযতে পর্বত-সদৃশ তরঙ্গের মত চলমান ছিল। তাছাড়া এমন তুফানী পানিতে কিশ্তীর মূল্যই বা কি? এই জন্য অন্যত্র আল্লাহ তাআলা তা অনুগ্রহ রূপে বর্ণনা করেছেন। (إِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ * لِنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذْكِرَةً وَتَعِيَهَا أُذُنٌ وَاعِيَة) অর্থাৎ, যখন পানি উথলে উঠেছিল, তখন আমি তোমাদেরকে আরোহণ করিয়েছিলাম নৌযানে। আমি এটা করেছিলাম তোমাদের শিক্ষার জন্য এবং যাতে স্মৃতিধর কর্ণ এটা স্মরণ রাখে। (সূরা হা-ক্কাহ ৬৯:১১-১২) (وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ * تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِمَنْ كَانَ كُفِرَ) অর্থাৎ, তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক নৌযানে। যা চলল আমার চোখের সামনে, এ ছিল অবিশ্বাসীদের প্রতিফল। (সূরা ক্বামার ৫৪:১৩-১৪)[২] এটা নূহ (আঃ) এর চতুর্থ পুত্র ছিল,যার উপাধি ছিল কিনআন এবং নাম ছিল য়্যাম। নূহ (আঃ) তাকে এই বলে দাওয়াত দিলেন যে, তুমি মুসলমান হয়ে যাও এবং কাফেরদের সাথে থেকে -- যারা ডুবে মরবে, তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
হুদ 11:43
সে বলল, ‘আমি এমন কোন পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।’[১] সে বলল, ‘আজ আল্লাহর শাস্তি হতে কেউই রক্ষাকারী নেই। তবে তিনি যার প্রতি দয়া করবেন, সে (রক্ষা পাবে)।’ ইতিমধ্যে তাদের উভয়ের মাঝে একটি তরঙ্গ অন্তরাল হয়ে পড়ল। অতঃপর সে ডুবে যাওয়া লোকেদের অন্তর্ভুক্ত হল।[২]
[১] তার ধারণা ছিল যে, কোন উঁচু পর্বতের চূড়ায় চড়ে আমি পরিত্রাণ পেয়ে যাব, সেখানে পানি কিভাবে পৌঁছবে?
[২] পিতা-পুত্রের মাঝে এই সব কথোপকথন চলছিল, এমন সময় এক উত্তাল তরঙ্গ এসে তাকে ডুবিয়ে দিল।
হুদ 11:44
আর বলা হল, ‘হে ভূমি! তুমি নিজ পানি শুষে নাও[১] এবং হে আকাশ! তুমি ক্ষান্ত হও।’ তখন পানি কমে গেল ও নির্ধারিত কার্য সম্পন্ন হল।[২] নৌকা জুদী (পাহাড়) [৩]-এর উপর এসে থামল। আর বলা হল, ‘অন্যায়কারীরা আল্লাহর করুণা হতে দূর হোক।’ [৪]
[১] ابلعي 'গিলে ফেলা' শব্দটির ব্যবহার জীবের জন্য হয়ে থাকে। কারণ তারা নিজের মুখের খাবার গিলে ফেলে। এখানে পানি শুষে নেওয়াকে গিলে ফেলা বলাতে এই হিকমত পরিলক্ষিত হয় যে, পানি ধীরে ধীরে শুকায়নি; বরং আল্লাহর আদেশে যমীন সমস্ত পানি একসাথে সেই রূপ গিলে ফেলেছিল যেরূপ জন্তু খাবার গিলে ফেলে।
[২] অর্থাৎ সমস্ত কাফেরকে পানিতে ডুবিয়ে মারা হল।
[৩] 'জুদী' একটি পাহাড়ের নাম। যা অনেকের মতে (ইরাকের) 'মাওসেল' নামক শহরের নিকটে অবস্থিত। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ও সেই পাহাড়ের নিকট বসবাস করত।
[৪] بعدٌ (দূর) শব্দটি ধ্বংস এবং আল্লাহর অভিশাপ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কুরআন কারীমে বিশেষভাবে আল্লাহর ক্রোধভাজন সম্প্রদায়সমূহের জন্য কয়েক স্থানে ঐ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
হুদ 11:45
আর নূহ নিজ প্রতিপালককে ডেকে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার এই পুত্রটি আমারই পরিবারভুক্ত। আর তোমার প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তুমি সমস্ত বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক।’ [১]
[১] নূহ (আঃ) পিতৃ-বাৎসল্যের আবেগে পড়ে আল্লাহর দরবারে উক্ত দু'আ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি ভেবে ছিলেন যে, সম্ভবতঃ সে মুসলমান হয়ে যাবে, যার জন্য তার সম্পর্কে উক্ত আবেদন করেছিলেন।
হুদ 11:46
তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে নূহ! এই ব্যক্তি তোমার পরিবারভুক্ত নয়,[১] সে অসৎকর্মপরায়ণ।[২] অতএব তুমি আমার কাছে সে বিষয়ে আবেদন করো না, যে বিষয়ে তোমার কোনই জ্ঞান নেই।[৩] আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি অজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’[৪]
[১] নূহ (আঃ) বংশীয় সম্পর্ক অনুযায়ী তাকে আপন পুত্র বলেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঈমানের কারণে দ্বীনী সম্পর্কের দিক থেকে তাঁর সেই কথা নাকচ করে বলেছিলেন যে, সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ একজন নবীর প্রকৃত পরিবারভুক্ত তারা, যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, তাতে সে যেই হোক না কেন। আর যদি কোন ব্যক্তি তাঁর প্রতি ঈমান না আনে, যদিও সে নবীর পিতা, পুত্র বা স্ত্রীও হয়, তবুও সে নবীর পরিবারভুক্ত নয়।
[২] এই কথা দ্বারা পরিবারভুক্ত না হওয়ার কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। এতে জানা গেল যে, যার ঈমান ও নেক আমল নেই, তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে আল্লাহর নবীগণও বাঁচাতে পারবেন না। বর্তমানে মানুষ পীর-ফকীর ও বুযুর্গদের সাথে সম্পর্ককেই পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট মনে করে এবং (সহীহ আকীদাহ ও) নেক আমলের কোন প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করে না। অথচ (সহীহ আকীদাহ ও) নেক আমল ছাড়া নবীর সাথে বংশীয় আত্মীয়তাও কোন কাজে আসবে না। তাহলে অনবীদের সাথে এরূপ সম্পর্ক আর কি কাজে আসবে?
[৩] এর দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী 'আ-লিমুল গায়ব' হন না। তাঁরা ততটুকু জানেন যতটুকু অহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে ইলম দান করেন। নূহ (আঃ) যদি পূর্ব থেকে জানতেন যে, তাঁর আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, তাহলে অবশ্যই তিনি তা থেকে বিরত থাকতেন।
[৪] এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নূহ (আঃ)-কে কৃত নসীহত। যার উদ্দেশ্য হল, তাঁকে সেই উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করা, যা আমলকারী বিজ্ঞ লোকদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে।
হুদ 11:47
সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট এমন বিষয়ে আবেদন করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, আর তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর এবং আমার প্রতি দয়া না কর, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হয়ে যাব।’ [১]
[১] যখন নূহ (আঃ) অবগত হলেন যে, তাঁর প্রার্থনা ঠিক হয়নি, তখন অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করে নিলেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর দয়া ও ক্ষমার প্রার্থী হলেন।
হুদ 11:48
বলা হল, ‘হে নূহ! অবতরণ কর[১] আমার পক্ষ হতে শান্তিসহ এবং তোমার ও তোমার সাথে যে জাতিসকল[২] রয়েছে তাদের প্রতি কল্যাণসমূহ নিয়ে। আর অনেক জাতি এরূপও হবে যাদেরকে আমি কিছুকাল (দুনিয়ার) সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করব। তারপর তাদেরকে স্পর্শ করবে আমার পক্ষ হতে কঠিন শাস্তি।[৩]
[১] এই অবতরণ কিশতী থেকে ছিল অথবা সেই পর্বত থেকে ছিল, যেখানে কিশতী গিয়ে থেমেছিল।
[২] এর উদ্দেশ্য হয় সেই জাতি হবে, যারা নূহ (আঃ)-এর কিশতীতে সওয়ার ছিল, নতুবা ভবিষ্যতে আগমনকারী সেই জাতি উদ্দেশ্য, যারা পরবর্তীতে তাঁদের বংশ থেকে জন্ম নেবে। পরবর্তী বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্বিতীয় অর্থই অধিক সঠিক।
[৩] এরা সেই (অবিশ্বাসী) জাতি, যারা কিশ্তীতে পরিত্রাণপ্রাপ্তদের বংশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আসতে থাকবে। উদ্দেশ্য হল যে, সেই কাফেরদেরকে পার্থিব জীবন যাত্রার জন্য আমি ভোগ-সম্ভার অবশ্যই দেব। কিন্তু শেষে তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।
হুদ 11:49
এটা হচ্ছে অদৃশ্য সংবাদসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা আমি তোমার কাছে অহী (প্রত্যাদেশ) মারফত পৌঁছিয়ে দিচ্ছি, ইতিপূর্বে এটা না তুমি জানতে, আর না তোমার সম্প্রদায় জানত।[১] সুতরাং তুমি ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম সংযমশীলদের জন্যই। [২]
[১] এ কথা নবী (সাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে এবং তিনি যে ইল্মে গায়ব জানতেন না, তা স্পষ্ট করা হচ্ছে এই বলে যে, এ সব গায়বের খবর, যা আমি তোমাকে অবগত করিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া তুমি ও তোমার সম্প্রদায় এ থেকে বেখবর ছিলে।[২] অর্থাৎ, তোমার সম্প্রদায় তোমাকে যে মিথ্যাজ্ঞান করছে এবং তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তাতে ধৈর্য্য ধারণ কর। কারণ আমি তোমার সাহায্যকারী এবং কল্যাণকর পরিণাম তোমার ও তোমার অনুগামীদের জন্যই রয়েছে; যারা তাকওয়ার মত গুণে গুণান্বিত। عاقبة ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শুভ পরিণামকে বলা হয়। এখানে মুত্তাকী, পরহেযগার তথা সংযমশীলদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। তাদেরকে শুরুতে যতই কষ্ট ভোগ করতে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য ও শুভ পরিণামের অধিকারী তারাই হবে। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন, (إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ) অর্থাৎ, নিশ্চয় আমি আমার রসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে। (সূরা মু'মিন ৪০:৫১) (وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ * إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنْصُورُونَ * وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ) অর্থাৎ, আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।" (সূরা স্বা-ফফাত ৩৭:১৭১-১৭৩)
হুদ 11:50
আর আ’দ (জাতি)এর প্রতি তাদের ভাই[১] হূদকে (নবীরূপে) প্রেরণ করলাম; সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তোমরা শুধু মিথ্যা রচনাকারী। [২]
[১] তাদের ভাই বলে তাদেরই সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে।
[২] অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করে তোমরা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করছ।
হুদ 11:51
হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক শুধু তাঁরই দায়িত্বে রয়েছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; তবুও কি তোমরা বুঝ না? [১]
[১] এটা কি বুঝ না যে, যে ব্যক্তি (তোমাদের নিকট থেকে) কোন পারিশ্রমিক ও লোভ ছাড়াই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিচ্ছে, সে আসলে তোমাদের মঙ্গলকামী? আয়াতে 'হে আমার সম্প্রদায়!' শব্দ দ্বারা দাওয়াতের একটি সুন্দর পদ্ধতি বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ, 'হে কাফেরদল!' বা 'হে মুশরিকদল!' শব্দ ব্যবহার না করে 'হে আমার সম্প্রদায়' বলে স্নেহের সাথে সম্বোধন করা হয়েছে।
হুদ 11:52
হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (তোমাদের পাপের জন্য) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি করবেন।[১] আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না।’ [২]
[১] হূদ (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে তওবা ও ইস্তিগফার করার নির্দেশ দিলেন এবং সেই সমস্ত কল্যাণের কথাও বললেন, যা তওবা ইস্তিগফারকারী সম্প্রদায় লাভ করে থাকে। যেমন কুরআন কারীমের আরো অনেক স্থানে এ সব কল্যাণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (সূরা নূহের ৭১:১০-১২নং আয়াত দ্রষ্টব্য)[২] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে যে দাওয়াত দিচ্ছি, তা অস্বীকার করো না এবং নিজেদের কুফরীর উপর অটল থেকো না। এরূপ করলে আল্লাহর দরবারে অপরাধী ও পাপী হয়ে উপস্থিত হবে।
হুদ 11:53
তারা বলল, ‘হে হূদ! তুমি তো আমাদের সামনে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করনি। আর তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদেরকে বর্জন করব না এবং আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী নই।[১]
[১] একজন নবী সর্বপ্রকার দলীল ও প্রমাণ পেশ করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চামচিকা-চোখোদের তা নজরে আসে না। হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ও ধৃষ্টতা প্রকাশ করে বলেছিল যে, আমরা প্রমাণ ব্যতীত শুধু তোমার কথামত আমাদের উপাস্যদেরকে কিভাবে বর্জন করব?
হুদ 11:54
আমাদের কথা তো এই যে, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে হতে কেউ তোমাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করেছে।’[১] সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক, তোমরা যে অংশী করছ নিশ্চিতভাবে আমি তা হতে মুক্ত। [২]
[১] অর্থাৎ, তুমি যে আমাদের উপাস্যদের অপমান ও তাদের সাথে বেআদবী করছ এই কথা বলে যে, এরা কোন কিছু করতে সক্ষম নয়, মনে হচ্ছে আমাদের উপাস্যরাই তোমার এই বেআদবীর কারণে তোমার কিছু করে দিয়েছে এবং তাতে তোমার মন-মস্তিষ্ক খারাপ হয়ে গেছে। যেমন বর্তমানে নামধারী কিছু মুসলিমও এরূপ চিন্তা-ভাবনার শিকার হয়ে আছে। যখন তাদের বলা হয় যে, এই সকল মৃতব্যক্তি ও বুযুর্গদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তখন তারা বলে যে, এটা তাঁদের শানে বেআদবী এবং বড় আশঙ্কা আছে যে, তাঁরা এরূপ বেআদবদেরকে বিপদগ্রস্ত করবেন! আল্লাহর কাছে এমন গাঁজারে গল্প ও মনগড়া মিথ্যা কথা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।
[২] অর্থাৎ, আমি সেই সমস্ত মূর্তি ও উপাস্য থেকে সম্পর্কহীন। আর তোমাদের যে বিশ্বাস যে, তারা আমার কিছু ক্ষতি করে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাদের এ ক্ষমতাই নেই যে, তারা কারোর উপকার করে অথবা অপকার।
হুদ 11:55
সুতরাং তাঁকে (আল্লাহকে) ছেড়ে, তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও। অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। [১]
[১] যদি আমার কথার উপর তোমাদের বিশ্বাস না হয়; বরং তোমরা নিজেদের এই দাবীতে সত্যবাদী হও যে, এই সকল মূর্তি কিছু করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে এই নাও! আমি উপস্থিত আছি, তোমরা এবং তোমাদের উপাস্য সহ সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে কিছু করে দেখাও। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী হন। যার ফলে তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস থাকে যে, নিঃসন্দেহে তিনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।
হুদ 11:56
নিশ্চয় আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ভরসা করেছি। ভূপৃষ্ঠে যত বিচরণকারী জীব রয়েছে তাদের প্রত্যেকেরই চুলের ঝুঁটি তিনি ধারণ করে আছেন (সবাই তাঁর করায়ত্তে)।[১] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক সরল পথে আছেন। [২]
[১] অর্থাৎ, যে সত্তার হাতে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আছে, তিনি সেই সত্তা যিনি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক। আমার সর্বপ্রকার ভরসা তাঁরই উপর রয়েছে। এই বাক্য দ্বারা হূদ (আঃ)-এর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করে রেখেছ, তাদের উপরেও একমাত্র আল্লাহরই ক্ষমতা ও কর্তৃতত্ত্ব আছে। আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে যা ইচ্ছা আচরণ করতে পারবেন; তারা কারোর কিছুই করতে পারবে না।
[২] অর্থাৎ, তিনি তওহীদের যে দাওয়াত দিচ্ছেন, নিঃসন্দেহে উক্ত দাওয়াতই হচ্ছে সরল সঠিক পথ। সেই পথ অবলম্বন করে তোমরা পরিত্রাণ ও কল্যাণ লাভ করতে পারবে। পক্ষান্তরে সেই সরল পথ বিচ্যুতি ও বিমুখতা ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ হবে।
হুদ 11:57
অতঃপর যদি তোমরা বিমুখ হয়ে যাও, তাহলে আমাকে যে পয়গাম দিয়ে তোমাদের প্রতি পাঠানো হয়েছে, আমি তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।[১] আর আমার প্রতিপালক অন্য কোন জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন এবং তোমরা তাঁর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না;[২] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক প্রত্যেক বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, এর পরে আমার দায়িত্ব শেষ এবং তোমাদের উপর সমস্ত প্রমাণ পূর্ণ হয়ে গেছে।
[২] অর্থাৎ, তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের জমি-সম্পদের মালিক অন্যদেরকে বানিয়ে দেবেন, তিনি এরূপ করার ক্ষমতা রাখেন এবং মোকাবেলায় তোমরা তাঁর কিছুই করতে পারবে না। বরং তিনি আপন ইচ্ছা ও হিকমত অনুযায়ী এরূপ করে থাকেন।
[৩] অবশ্যই তিনি আমাকে তোমাদের প্রতারণা ও চক্রান্ত থেকে সুরক্ষিত রাখবেন এবং শয়তানী চাতুরী থেকে রক্ষা করবেন। তাছাড়া সকল ভাল ও মন্দ ব্যক্তিদেরকে তাদের ভাল ও মন্দ আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও প্রতিফল দান করবেন।
হুদ 11:58
আর যখন আমার (শাস্তির) হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি হূদকে এবং যারা তার সাথে বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে স্বীয় করুণায় রক্ষা করলাম। আর তাদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম অতি কঠিন শাস্তি হতে। [১]
[১] অতি কঠিন শাস্তি থেকে উদ্দেশ্য সেই 'কল্যাণশূন্য বায়ু' যার দ্বারা হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায় আ'দকে ধ্বংস করা হয়েছিল এবং যা থেকে হূদ (আঃ) ও তাঁর প্রতি ঈমান আনায়নকারীদের বাঁচিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
হুদ 11:59
আর এই আ’দ সম্প্রদায় নিজেদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলিকে অস্বীকার করল এবং তাঁর রসূলদেরকে অমান্য করল,[১] পক্ষান্তরে তারা প্রত্যেক প্রবল প্রতাপশালী হঠকারীর নির্দেশ অনুসরণ করল।[২]
[১] আ'দ সম্প্রদায়ের নিকট একজনই নবী হূদ (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তারা তাঁর রসূলদেরকে অমান্য করল। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় এই কথা প্রকাশ যে, একজন রসূলকে অমান্য ও অস্বীকার করার মানে, যেন সকল রসূলকে অমান্য ও অস্বীকার করা। কারণ সমস্ত রসূলদের প্রতি ঈমান রাখা অপরিহার্য। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, এ সম্প্রদায় তাদের কুফরী ও অস্বীকার করাতে এমন অতিরঞ্জন করে ফেলেছিল যে, হূদ (আঃ)-এর পরেও যদি আমি তাদের মাঝে কয়েকজন রসূল প্রেরণ করতাম, তাহলে তারা সেই সকল রসূলদেরকেও অস্বীকার ও মিথ্যাজ্ঞান করত এবং তাদের নিকটে কোন মতেই এই আশা ছিল না যে, তারা কোন একজন রসূলের প্রতি ঈমান আনত। অথবা এও হতে পারে যে, তাদের নিকট আরো রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা সকলকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল।
[২] অর্থাৎ, তারা আল্লাহর পয়গম্বরদেরকে তো মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, কিন্তু যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করত ও অবাধ্য ছিল, সেই সম্প্রদায় তাদেরই আনুগত্য করল।
হুদ 11:60
আর এই দুনিয়াতে অভিসম্পাত তাদের সঙ্গে সঙ্গে রইল এবং কিয়ামতের দিনও।[১] জেনে রেখো! আ’দ (সম্প্রদায়) নিজ প্রতিপালককে অমান্য করল। আরো জেনে রেখো, দূর হয়ে গেল আ’দ (আল্লাহর করুণা হতে); যারা হূদের সম্প্রদায় ছিল। [২]
[১] لعنة (লানত, অভিসম্পাত) শব্দটির অর্থ হল আল্লাহর রহমত থেকে দূর হওয়া, মঙ্গলময় বস্তু থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং লোকের অসন্তুষ্টি ও নিন্দার শিকার হওয়া। দুনিয়াতে এই অভিসম্পাত এইভাবে হবে যে, মু'মিনদের মাঝে সর্বদা তাদের আলোচনা নিন্দা ও অসন্তুষ্টির সাথে হবে। আর কিয়ামতের দিন এইভাবে হবে যে, তারা সকলের সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং আল্লাহর শাস্তিতে গ্রেফতার হবে।
[২] بُعْدٌ শব্দটিও রহমত থেকে দূর এবং অভিসম্পাত ও ধ্বংসের অর্থে ব্যবহার হয়, এর পূর্বেও তা বর্ণনা করা হয়েছে।
হুদ 11:61
আর আমি সামূদ (জাতি)এর নিকট তাদের ভাই সালেহকে (নবীরূপে প্রেরণ করলাম)।[১] সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[২] তিনি তোমাদেরকে পৃথিবী (মাটি) হতে সৃষ্টি করেছেন[৩] এবং তোমাদেরকে তাতে আবাদ করেছেন।[৪] অতএব তোমরা (নিজেদের পাপের জন্য) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর প্রত্যাবর্তন কর তাঁরই দিকে; নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটবর্তী, আহবানে সাড়াদানকারী।’
[১] وإلى ثمودَ পূর্ব বাক্যের উপর সংযোজন হয়েছে, অর্থাৎ, وأرسلنا إلى ثمود অর্থাৎ আমি সা'মূদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছি। এ সম্প্রদায় তাবুক ও মদীনার মাঝে মাদায়েন সালেহ (হিজর) নামক স্থানে বসবাস করত এবং এ সম্প্রদায় আ'দ সম্প্রদায়ের পরে আবির্ভূত হয়েছিল। সালেহ (আঃ)-কে এখানেও সা'মূদের ভাই বলেছেন। এর উদ্দেশ্য হল তাদেরই বংশ ও গোত্রেরই এক ব্যক্তি।
[২] সালেহ (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে সর্বপ্রথম তওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, যেমন সমস্ত নবীদের তরীকা তাই ছিল।
[৩] অর্থাৎ, প্রথমে তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তা এরূপ যে তোমাদের পিতা আদম (আঃ) মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। অতঃপর সকল মানুষ আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং সমস্ত মানুষ আসলে মাটি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। অথবা অর্থ এই যে, তোমরা যা কিছু ভক্ষণ করছ, তা মাটি থেকেই উৎপন্ন হয় এবং সেই খাবার দ্বারা সেই বীর্য তৈরী হয় যা মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির উপাদান হয়।
[৪] অর্থাৎ, তোমাদের মাঝে ভূমি আবাদ ও চাষ করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা সৃষ্টি করেছেন, যার দ্বারা তোমরা বসবাসের জন্য ঘর নির্মাণ কর, খাবারের জন্য চাষাবাদ কর এবং জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করার জন্য কারিগরী করে থাক।
হুদ 11:62
তারা বলল, ‘হে সালেহ! তুমি তো ইতিপূর্বে আমাদের মধ্যে আশার পাত্র ছিলে, তুমি কি আমাদেরকে ঐ বস্তুর উপাসনা করতে নিষেধ করছ; যার উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষেরা করে এসেছে? আর যে ধর্মের দিকে তুমি আমাদেরকে আহবান করছ, বস্তুতঃ আমরা তো সে সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে রয়েছি।’[১]
[১] অর্থাৎ, যেহেতু নবীগণ আপন সম্প্রদায়ে স্বভাব-চরিত্র, আমানত ও দ্বীনের ব্যাপারে সর্বোত্তম হন, সেহেতু তাঁর নিকট থেকে সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেক কল্যাণের আশাবাদী হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সালেহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাঁকে এই কথা বলেছিল। কিন্তু তওহীদের দাওয়াত দেওয়া মাত্র তাদের উক্ত আশাস্থল, তাদের চোখের কাঁটা হয়ে গেল এবং সালেহ (আঃ) তাদেরকে যে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, সেই দ্বীনের (তওহীদের) প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করল।
হুদ 11:63
সে (সালেহ) বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, যদি আমি নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমার প্রতি নিজের করুণা (নবুঅত) দান করে থাকেন;[১] অতএব আমি যদি আল্লাহর অবাধ্য হই,[২] তাহলে তার শাস্তি হতে কে আমাকে রক্ষা করবে? সুতরাং তোমরা তো আমার ক্ষতিই বৃদ্ধি করছ। [৩]
[১] بينةٍ (প্রমাণ) এর অর্থ হল সেই ঈমান ও ইয়াকীন, যা আল্লাহ তাআলা পয়গম্বরগণকে দান করেন এবং রহমত (করুণা) এর অর্থ নবুঅত। যেমন এর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
[২] এখানে অবাধ্য হওয়ার অর্থ এই যে, যদি আমি তোমাদেরকে সত্যের দাওয়াত ও এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেওয়া ছেড়ে দিই, যেমন তোমরা চাচ্ছ।
[৩] অর্থাৎ, যদি আমি এরূপ করি, তাহলে তোমরা আমার কোন উপকার করতে পারবে না, বরং তোমরা আমার আরো অমঙ্গল ও ক্ষতিই বৃদ্ধি করবে।
হুদ 11:64
আর হে আমার সম্প্রদায়! এটা হচ্ছে আল্লাহর উটনী, যা তোমাদের জন্য নিদর্শন। অতএব ওকে ছেড়ে দাও; আল্লাহর যমীনে চরে খাক, আর ওকে খারাপ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করো না, অন্যথা তোমাদেরকে আকস্মিক শাস্তি এসে পাকড়াও করবে।’ [১]
[১] এটা সেই উটনী যা আল্লাহ তাআলা তাদের কথা অনুযায়ী তাদের চক্ষুর সামনে এক পর্বত বা একটি পাথর থেকে বের করেছিলেন। এই জন্যই তাকে ناقة الله (আল্লাহর উটনী) বলা হয়েছে। কারণ তা একমাত্র আল্লাহর আদেশে মু'জিযা স্বরূপ অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে উল্লিখিত পন্থায় আবির্ভূত হয়েছিল। তার ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে, তাকে যেন কেউ কোন কষ্ট না দেয়, নচেৎ তোমরা আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হবে।
হুদ 11:65
কিন্তু তারা ওকে মেরে ফেলল। তখন সে বলল, ‘তোমরা নিজেদের ঘরে আরো তিনটি দিন জীবন উপভোগ করে নাও। এ একটি এমন প্রতিশ্রুতি যাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা নেই।’ [১]
[১] কিন্তু সেই যালেমরা এমন উত্তম মু'জিযা দেখার পরেও শুধু ঈমান থেকে দূরেই থাকেনি; বরং প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর আদেশের সীমালঙ্ঘন করে (সেই উটনীর পা কেটে) তাকে মেরে ফেলল। তার পরে তাদেরকে তিন দিন সময় দেওয়া হল এই বলে যে, তিন দিন পর তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
হুদ 11:66
অতঃপর যখন আমার (আযাবের) নির্দেশ এসে পৌঁছল,[১] তখন আমি সালেহকে এবং যারা তার সাথে বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে নিজ করুণায় রক্ষা করলাম, আর বাঁচালাম সেই দিনের বড় লাঞ্ছনা হতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক শক্তিমান, পরাক্রমশালী।
[১] এর উদ্দেশ্য সেই আযাব, যা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চতুর্থ দিনে এসেছিল এবং সালেহ (আঃ) ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসীদের ছাড়া সকলকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
হুদ 11:67
আর সেই অত্যাচারীদেরকে এক প্রচন্ড গর্জন এসে পাকড়াও করল;[১] ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে (মৃত অবস্থায়) উপুড় হয়ে পড়ে রইল। [২]
[১] এই আযাব صيحة (প্রচন্ড শব্দ, মেঘগর্জন) রূপে এসেছিল। অনেকের মতে এটা জিবরীল (আঃ) এর প্রচন্ড গর্জন ছিল এবং অনেকের নিকট তা আকাশ থেকে আসা কোন গর্জন ছিল। যে গর্জনে তাদের অন্তর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরিশেষে তাদের মৃত্যু সংঘটিত হয়েছিল। তার পরে বা তার সাথে সাথেই ভূমিকম্প (رجفة) এসেছিল। যা সমস্ত বস্তুকে তছনছ করে দিয়েছিল; যেমন সূরা আ'রাফের ৭:৭৮ নং আয়াতে (فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَة) শব্দ এসেছে।[২] পাখি মরার পর যেরূপ মাটিতে পড়ে থাকে, অনুরূপ এরাও মৃত্যুবরণ করে মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে ছিল।
হুদ 11:68
যেন তারা সেই গৃহগুলিতে কখনো বসবাস করেনি।[১] ভালরূপে জেনে রাখ! সামূদ সম্প্রদায় নিজ প্রতিপালককে অস্বীকার করল; জেনে রাখ! সামূদ সম্প্রদায় (তাঁর) করুণা হতে দূর হয়ে পড়ল ।
[১] তাদের গ্রামকে অথবা তাদেরকে অথবা উভয়কে মুদ্রিত ভুল অক্ষরের মত এমনভাবে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক যেন তারা সেখানে কখনও বসবাস করেনি।
হুদ 11:69
আর আমার প্রেরিত ফিরিশতারা ইব্রাহীমের নিকট সুসংবাদ[১] নিয়ে আগমন করে বলল, ‘সালাম।’[২] ইব্রাহীমও (উত্তরে) বলল, ‘সালাম।’[৩] অতঃপর অনতিবিলম্বে একটা ভুনা বাছুর নিয়ে এল। [৪]
[১] এটা আসলে লূত (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়ের ঘটনার এক অংশ । লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর চাচাতো ভাই ছিলেন। তাঁর গ্রাম মৃত সাগরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছিল। আর ইবরাহীম (আঃ) ফিলিস্তীনে বসবাস করতেন। যখন লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেওয়ার ফায়সালা করে নেওয়া হল, তখন তাদের নিকট ফিরিশতা পাঠানো হল। উক্ত ফিরিশতাগণ লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের নিকট যাওয়ার পথে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়েছিলেন এবং তাঁকে পুত্র-সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
[২] অর্থাৎ, سلمنا عليك سلامًا (আমরা আপনাকে সালাম দিচ্ছি।)
[৩] যেরূপ প্রথম সালাম এক ঊহ্য ক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ছিল, অনুরূপ এ سلامٌ 'মুবতাদা' অথবা 'খবর' হওয়ার কারণে পেশ অবস্থায় আছে। পূর্ণ বাক্য হবে, أمرُكٌمْ سَلاَمٌ يا عَلَيْكُمْ سَلامٌ
[৪] ইবরাহীম (আঃ) বড় মেহমান-নেওয়ায ছিলেন। তিনি জানতে পারেননি যে, এঁরা ফিরিশতা মানুষের রূপধারণ করে এসেছেন এবং এঁদের পানাহারের কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং তিনি তাঁদেরকে (মানুষ) মেহমান মনে করেন এবং অবিলম্বে মেহমানদের খাতির করার জন্য বাছুরের ভুনা গোশত তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত করলেন। এতে বুঝা যায় যে, মেহমানকে জিজ্ঞাসা করা জরুরী নয়; বরং ঘরে যা কিছু আছে তাই মেহমানের সামনে পেশ করা উচিত।
হুদ 11:70
কিন্তু যখন সে দেখল যে, তাদের হাত সেই খাদ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না, তখন তাদেরকে অদ্ভুত ভাবতে লাগল এবং মনে মনে তাদের ব্যাপারে শঙ্কিত হল;[১] (এ দেখে) তারা বলল, ‘তুমি ভয় করবে না, আমরা লূত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’ [২]
[১] ইবরাহীম (আঃ) যখন দেখলেন যে, তাঁরা খাবার খাচ্ছেন না, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। বলা হয় যে, তাঁদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, কারো বাড়িতে আগত মেহমান যদি মেহমানি গ্রহণ না করে, তাহলে ভাবা হত যে, আগত মেহমান কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। এই ঘটনাতে এও বুঝা গেল যে, আল্লাহর পয়গম্বরগণ গায়বের খবর জানতেন না। ইবরাহীম (আঃ) যদি গায়বের খবর জানতেন, তাহলে তিনি বাছুরের ভুনা গোশত আনতেন না এবং তাঁদের ব্যাপারে ভীতি অনুভব করতেন না।
[২] তাঁর এই ভীতি ফিরিশতাগণ অনুভব করতে পেরেছিলেন, অথবা সেই চিহ্ন দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন যা এমতাবস্থায় মানুষের মুখমন্ডলে প্রকাশ পায়, অথবা ইবরাহীম (আঃ)-এর কথাবার্তার মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়েছিল, যেমন অন্য স্থানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, {إِنَّا مِنكُمْ وَجِلُونَ} "আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত।" (সূরা হিজর ১৫:৫২) সুতরাং ফিরিশতাগণ বললেন, আতঙ্কিত হবেন না, আপনি যা ভাবছেন আমরা তা নই। বরং আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছি এবং আমরা লূত সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছি।
হুদ 11:71
সে সময় তার স্ত্রী দন্ডায়মান ছিল, সে হেসে উঠল।[১] তখন আমি তাকে (ইব্রাহীমের স্ত্রীকে) সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পর ইয়াকূবের।
[১] ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী কেন হেসেছিলেন? অনেকে বলেন, লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে তিনিও অবগত ছিলেন, তাই তাদের ধ্বংসের সংবাদ শুনে তিনি আনন্দ অনুভব করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, এই জন্য হেসেছিলেন যে, দেখো! আকাশে তাদের ধ্বংসের ফায়সালা হয়ে গেছে, আর এই সম্প্রদায় এখনো বেখবর হয়ে বসে আছে। অনেকে বলেন, বাক্যটি অগ্র-পশ্চাৎ হয়ে আছে এবং হাসির সম্পর্ক সেই সুসংবাদের সাথে আছে, যে সুসংবাদ ফিরিশতাগণ উভয় বৃদ্ধকে দিয়েছিলেন। আর আল্লাহই অধিক জানেন।
হুদ 11:72
সে বলল, ‘হায় ভাগ্য! আমি কি সন্তান প্রসব করব অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ! বাস্তবিকই এটা তো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার!’ [১]
[১] উক্ত স্ত্রী সারাহ ছিলেন। তিনি নিজে বৃদ্ধা ও তাঁর স্বামী ইবরাহীম (আঃ)ও বৃদ্ধ ছিলেন। এই জন্য বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল, আর তারই বহিঃপ্রকাশ তাঁর দ্বারা হয়েছিল।
হুদ 11:73
তারা বলল, ‘তুমি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময়বোধ করছ?[১] (হে নবীর) পরিবার! তোমাদের প্রতি তো আল্লাহর (বিশেষ) করুণা ও তাঁর বরকতসমূহ রয়েছে।[২] নিশ্চয় তিনি প্রশংসার যোগ্য মহিমান্বিত।’
[১] এটা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন। অর্থাৎ তুমি আল্লাহ তাআলার ফায়সালা ও ভাগ্যের উপর বিস্ময়বোধ করছ? অথচ তাঁর জন্য কোন বস্তুই দুষ্কর নয়। আর না তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণের মুখাপেক্ষী, তিনি যা চান, তা كن (হও) শব্দ দ্বারা তৈরী করতে পারেন।[২] ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রীকে এখানে ফিরিশতাগণ 'আহলে বায়ত' বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার জন্য বহুবচন (আপনাদের) শব্দ ব্যবহার করেছেন। যাতে প্রথমতঃ এই কথা প্রমাণ হয় যে, স্ত্রী সর্বপ্রথম আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়তঃ এ প্রমাণ হয় যে, 'আহলে বায়তের' জন্য বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করাও ঠিক। যেমন সূরা আহযাবের ৩৩:৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-এর পবিত্রা স্ত্রীগণকেও 'আহলে বায়ত' বলেছেন এবং তাঁদেরকেও বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ দ্বারা সম্বোধন করেছেন।
হুদ 11:74
অতঃপর যখন ইব্রাহীমের সেই ভয় দূর হয়ে গেল এবং সে সুসংবাদ প্রাপ্ত হল, তখন আমার (প্রেরিত ফিরিশতাদের) সাথে লূত-সম্প্রদায় সম্বন্ধে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে দিল। [১]
[১] এই তর্ক-বিতর্কের অর্থ হল, ইবরাহীম (আঃ) ফিরিশতাগণকে বললেন যে, আপনারা যে গ্রামকে ধ্বংস করতে যাচ্ছেন, সেখানে লূত বর্তমানে উপস্থিত আছে। এর উত্তরে ফিরিশতাগণ বললেন "আমরা জানি যে, সেখানে লূত বসবাস করেন। কিন্তু আমরা তাঁর স্ত্রী ছাড়া তাঁকে ও তাঁর বাড়ির লোকদেরকে বাঁচিয়ে নেব।" (আনকাবূত ৩২)
হুদ 11:75
নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিল বড় সহিষ্ণু প্রকৃতির, কোমল হৃদয়ের, আল্লাহ অভিমুখী।
হুদ 11:76
হে ইব্রাহীম! এ (তর্ক) হতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা কিছুতেই টলবার নয়। [১]
[১] ফিরিশতাগণ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেন, এখন এই তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই, তর্ক-বিতর্ক বাদ দিন! তাদের ধ্বংসের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সেই আদেশ এসে গেছে, যা তাঁর নিকট তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং উক্ত আযাব এখন না কারো তর্ক-বিতর্কে বন্ধ হবে, আর না কারোর দু'আতে স্থগিত হবে।
হুদ 11:77
আর যখন আমার ফিরিশতারা লূতের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তাদের ব্যাপারে চিন্তাবৃত হল এবং তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর বলল, ‘আজকের দিনটি অতি কঠিন।’ [১]
[১] লূত (আঃ)-এর অস্থিরতার কারণ তফসীরবিদগণ এই লিখেছেন যে, উক্ত ফিরিশতাগণ দাঁড়িবিহীন তরুণের আকৃতিতে এসেছিলেন, ফলে লূত (আঃ) নিজ সম্প্রদায়ের নোংরা স্বভাবের কারণে এই পরিস্থিতিকে বড় সংকটজনক ভাবছিলেন। কারণ তিনি জানতেন না যে, আগত উক্ত তরুণগুলি, (মানুষ) মেহমান নয়; বরং আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতা, যাঁরা এই সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্যই এসেছেন।
হুদ 11:78
আর তার সম্প্রদায় তার কাছে ছুটে এল এবং তারা পূর্ব হতে কুকর্ম করেই আসছিল;[১] লূত বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! (তোমাদের ঘরে) আমার এই কন্যারা রয়েছে, এরা তোমাদের জন্য পবিত্রতম।[২] অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার মেহমানদের ব্যাপারে লাঞ্ছিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভালো মানুষ নেই?’ [৩]
[১] যখন সেই সমকাম লোভী লম্পটরা জানতে পারল যে, কিছু সুন্দর যুবক লূতের বাড়িতে মেহমান এসেছে, তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে এল এবং তাদেরকে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করতে লাগল, যাতে তাদের সাথে আপন বিকৃত যৌন-কামনা চরিতার্থ করতে পারে।
[২] অর্থাৎ, যদি এখানে আসার পিছনে তোমাদের উদ্দেশ্য যৌন-প্রবৃত্তিই পূরণ করে শান্তি ও তৃপ্তি অর্জন করাই হয়, তাহলে তার জন্য আমার নিজের মেয়েরা উপস্থিত আছে, তাদেরকে তোমরা বিয়ে করে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করে নাও। এটাই তোমাদের জন্য সর্বদিক থেকে কল্যাণকর হবে। কোন কোন তফসীরকার বলেন, (লূত (আঃ) আমার) কন্যা বলে সমগ্র জাতির মহিলাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং তাদেরকে স্বীয় কন্যা এই জন্য বলেছেন যে, পয়গম্বরগণ নিজ উম্মতের জন্য পিতৃতুল্য। উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের উক্ত কাজের জন্য নারীজাত আছে, তাদেরকে বিবাহ কর ও নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ কর। (ইবনে কাসীর)
[৩] অর্থাৎ, আমার বাড়িতে আগত মেহমানদের সাথে জোরপূর্বক দুর্ব্যবহার করে আমাকে অপমানিত করো না। তোমাদের মাঝে কি এমন কোন ন্যায়নিষ্ঠ ভাল মানুষ নেই, যে অতিথিপরায়ণতার চাহিদা ও এই স্পর্শকাতর অবস্থাকে বুঝতে পারে এবং তোমাদেরকে তোমাদের নোংরা সংকল্প থেকে বিরত রাখে? লূত (আঃ) এ সব কথা এই জন্য বলেছিলেন যে, তিনি সেই ফিরিশতাগণকে অভ্যাগত (মানুষ) মুসাফির ও মেহমান ভাবছিলেন। ফলে তিনি তাদের হিফাযত করাকে নিজ ইজ্জত ও সম্মান রক্ষার জন্য জরুরী ভাবছিলেন। যদি তিনি জানতে পারতেন, কিংবা তিনি 'আ-লিমুল গায়ব' হতেন, তাহলে ঐ অস্থিরতায় ভুগতেন না; যে অস্থিরতার কথা কুরআন মাজীদ এখানে বর্ণনা করেছে।
হুদ 11:79
তারা বলল, ‘তুমি নিশ্চয় জানো যে, তোমার এই কন্যাগুলিতে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, আর আমরা কি চাই, তাও তুমি অবশ্যই জানো।’ [১]
[১] অর্থাৎ বৈধ ও স্বাভাবিক নিয়মকে তারা একদম অস্বীকার করে দিল এবং অস্বাভাবিক কর্ম এবং নির্লজ্জতার উপর অটল থাকল। যাতে আন্দাজ করা যায় যে, এই সম্প্রদায় তাদের সেই অশ্লীল কুকর্মে কত বাড়া বেড়েছিল এবং বিকৃত যৌনাচারে কতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
হুদ 11:80
সে বলল, ‘হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।’[১]
[১] শক্তি থেকে উদ্দেশ্য হল নিজ দৈহিক বল ও উপকরণ-শক্তি অথবা সন্তান-সন্ততিদের ক্ষমতা। 'দৃঢ় স্তম্ভ' থেকে উদ্দেশ্য হল বংশ, গোত্র বা অনুরূপ কোন সুদৃঢ় আশ্রয়। অর্থাৎ, নিরুপায় হয়ে তিনি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন যে, 'হায়! যদি আমার নিজের শক্তি থাকত বা কোন আত্মীয়-স্বজন ও আমার গোত্রের আশ্রয় ও সাহায্য-সহযোগিতা হত, তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। আমি ঐ দুর্বৃত্তদেরকে সামলে নিতাম এবং মেহমানদের হিফাযত করতে পারতাম।' লূত (আঃ)-এর উক্ত আশা আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী নয়। যেহেতু বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা বৈধ। আর 'আল্লাহর উপর ভরসা'র সহীহ অর্থও এই যে, প্রথমে সকল বাহ্যিক উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করতে হবে, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। হাত-পা বেঁধে বসে থাকা এবং মুখে 'আল্লাহর উপর ভরসা আছে' বলা একেবারে ভুল ব্যাখ্যা। সুতরাং বাহ্যিক উপকরণের দিকে লক্ষ্য রেখে লূত (আঃ) যা বলেছেন, বিলকুল ঠিকই বলেছেন। যাতে এই কথা প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর পয়গম্বরগণ যেমন 'আ-লিমুল গায়ব' হন না, অনুরূপ তাঁরা ইচ্ছাময়ও হন না (যেমন বর্তমানে মানুষ অনেকের ব্যাপারে এরূপ বিশ্বাস রাখে)। যদি দুনিয়াতে নবীদের কোন এখতিয়ার থাকত, তবে অবশ্যই লূত (আঃ) নিজ অক্ষমতা ও সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন না, যা তিনি উল্লিখিত শব্দে ব্যক্ত করেছেন।
হুদ 11:81
তারা বলল, ‘হে লূত! আমরা তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত (ফিরিশতা), ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। অতএব তুমি রাত্রির কোন এক ভাগে নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে (অন্যত্র) চলে যাও। তোমাদের কেউ যেন পিছনের দিকে ফিরেও না দেখে, কিন্তু তোমার স্ত্রী নয়, তার উপরেও ঐ (আযাব) আসবে, যা অন্যান্যদের উপরে আসবে। তাদের (শাস্তির) নির্ধারিত সময় হল প্রভাতকাল; প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?’ [১]
[১] ফিরিশতাগণ যখন লূত (আঃ)-এর অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা স্বচক্ষে দেখে নিলেন, তখন বললেন, 'হে লূত (আঃ) আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমাদের নিকট তো দূরের কথা, এখন ওরা আপনার নিকটেও পৌঁঁছতে পারবে না। আপনি কিছুটা রাত থাকতে আপনার স্ত্রী ছাড়া বাকি লোকজনসহ এখান থেকে অন্যত্র সরে যান! প্রত্যুষকালেই এই গ্রামকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।'
হুদ 11:82
অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি ঐ ভূ-খন্ডের উপরিভাগকে নীচে করে দিলাম এবং তার উপর ক্রমাগত ঝামা পাথর বর্ষণ করলাম।
হুদ 11:83
যা বিশেষরূপে চিহ্নিত করা ছিল তোমার প্রতিপালকের নিকট; আর ঐ (জনপদ)গুলি এই যালেমদের নিকট হতে বেশী দূরে নয়। [১]
[১] এই আয়াতে هي (ঐ) এর লক্ষ্যবস্তু কোন কোন মুফাসসির সেই চিহ্নিত ঝামা পাথর বলেছেন যা তাদের উপর বর্ষণ করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে অনেকের নিকট তার লক্ষ্যবস্তু হল, সেই সমস্ত জনপদ যা ধ্বংস করা হয়েছিল; যা শাম ও মদীনার মাঝে অবস্থিত ছিল। আর 'যালেম' দ্বারা মক্কার মুশরিক ও অন্যান্য মিথ্যাজ্ঞানকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা যে, তোমাদের উপরেও সেরূপ আযাব আসতে পারে।
হুদ 11:84
আর আমি মাদয়্যানের (অধিবাসীদের)[১] প্রতি তাদের ভ্রাতা শুআইবকে প্রেরণ করলাম; সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া আর কেউ তোমাদের সত্যিকার উপাস্য নেই; আর তোমরা মাপে ও ওজনে কম করো না,[২] আমি তোমাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি।[৩] আর আমি তোমাদের উপর এক সর্বগ্রাসী দিনের শাস্তির ভয় করছি।[৪]
[১] মাদয়্যান সম্বন্ধে জানার জন্য সূরা আ'রাফের ৭:৮৫নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।[২] (শুআইব (আঃ) নিজ সম্প্রদায়কে) তওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর, সেই সম্প্রদায়ের মাঝে যে ওজন ও পরিমাপে কম দেওয়ার মত প্রসিদ্ধ বদ অভ্যাস ছিল, তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করলেন। তাদের এই অভ্যাস ছিল যে, যখন তাদের নিকট কেউ কিছু বিক্রি করতে আসত, তখন তাদের নিকট থেকে ওজনে ও পারিমাপে বেশি নিত এবং যখন কোন ক্রেতার নিকট কিছু বিক্রি করত, তখন ওজনে কম দিত ও দাঁড়ি মারত।[৩] এটা উক্ত নিষেধাজ্ঞার কারণ যে, যখন আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর অনুগ্রহ করছেন এবং তিনি তোমাদের অবস্থা ভাল ও সচ্ছল করেছেন, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, তখন তারপরেও এরূপ জঘন্য কর্ম কেন করছ?[৪] এটা দ্বিতীয় কারণ যে, যদি তোমরা তোমাদের এই কর্ম থেকে বিরত না হও, তবে আমার ভয় হয় যে, কিয়ামতের দিনের আযাব থেকে তোমরা রক্ষা পাবে না। محيط (পরিবেষ্টনকারী বা সর্বগ্রাসী) দিন হল কিয়ামতের দিন, সেই দিন না কোন পাপী আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা পাবে, আর না পালিয়ে কোথাও লুকাতে পারবে।
হুদ 11:85
হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা মাপ ও ওজনকে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন কর এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না,[১] আর পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়ো না। [২]
[১] নবীগণের দাওয়াত দুটি গুরুতত্ত্বপূর্ণ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমঃ আল্লাহর হক আদায় করা এবং দ্বিতীয়ঃ বান্দার হক আদায় করা। 'তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর' বাক্য দ্বারা প্রথম এবং 'তোমরা মাপে ও ওজনে কম করো না' বাক্য দ্বারা দ্বিতীয় হকের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখন তারই তাকীদস্বরূপ তাদেরকে ইনসাফের সাথে পূর্ণমাত্রায় ওজন ও পরিমাপ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং লোকদেরকে কোন বস্তু কম দেওয়া থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট এটা একটা বড় অন্যায় এবং আল্লাহ তাআলা পূর্ণ একটি সূরাতে উক্ত অন্যায়ের জঘন্যতা ও আখেরাতে তার শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ، الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ، وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ অর্থাৎ, মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।" (সূরা মুত্বাফফিফীন ৮৩:১-৩)[২] আল্লাহর অবাধ্যতা করে, বিশেষ করে মানুষের অধিকার নষ্ট করে; যেমন ওজন ও পরিমাপে কম বেশি করাতে পৃথিবীতে অবশ্যই ফাসাদ সৃষ্টি করা হয়, যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।
হুদ 11:86
যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহ প্রদত্ত যা অবশিষ্ট থাকে,[১] তাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম। আর আমি তো তোমাদের পাহারাদার নই।’ [২]
[১] بقيت الله (আল্লাহ প্রদত্ত অবশিষ্ট) এর অর্থ হল, সেই মুনাফা যা ওজনে কোন প্রকার কম-বেশি না করে সঠিক মাপে ধার্মিকতার সাথে পণ্য দেওয়ার পর অর্জন হয়ে থাকে। যেহেতু তা হালাল ও পবিত্র এবং তাতে বরকত আছে, যার জন্য সেই মুনাফাকে আল্লাহর অবশিষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে শুধু তবলীগ করতে পারি এবং তাও আল্লাহর আদেশে করছি। কিন্তু তোমাদেরকে অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখা ও তার উপর শাস্তি দেওয়া আমার ইচ্ছাধীন নয়। উভয় কর্মের এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর আছে।
হুদ 11:87
তারা বলল, ‘হে শুআইব! তোমার ধর্মনিষ্ঠা[১] কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্য বর্জন করি, যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষরা করে আসছে? অথবা আমাদের নিজেদের মালে নিজেদের ইচ্ছানুসারে আচরণ বর্জন করি।[২] তুমি তো বড় সহিষ্ণু, সদাচারী! [৩]
[১] صلوةٌ শব্দের অর্থ হল, ইবাদত, ধর্মনিষ্ঠা অথবা তেলাঅত।
[২] কোন কোন মুফাসসিরের নিকট এর অর্থ যাকাত ও সাদকা, সকল আসমানী কিতাবে তার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর আদেশকৃত যাকাত বের করা, আল্লাহর অবাধ্যদের উপর বড় কঠিন হয় এবং তারা ভাবে যে, যেখানে আমরা নিজ পরিশ্রম ও ক্ষমতাবলে সম্পদ উপার্জন করি, সেখানে তা খরচ করা বা না করাতে আমাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে কেন? এবং তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বের করার জন্য আমাদেরকে কেন বাধ্য করা হবে? অনুরূপ ইনকাম ও ব্যবসা ইত্যাদিতে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধতার নিষেধাজ্ঞাও এ সকল লোকদের উপর বড় কষ্টকর হয়। সম্ভবত ওজনে ও পরিমাপে কম দেওয়া থেকে নিষেধ করাকেও তারা নিজ সম্পদের ব্যাপারে অনুচিত হস্তক্ষেপ ভেবেছে এবং এই শব্দে তা অস্বীকার করেছে। এর উভয় ভাবার্থই সঠিক।
[৩] শুআইব (আঃ)-কে তারা বিদ্রূপ স্বরূপ উক্ত ব্যাক্য বলেছিল।
হুদ 11:88
সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, যদি আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর নিকট হতে একটি উত্তম সম্পদ (নবুঅত) দান করে থাকেন[১] (তবুও কি আমি নিজ কর্তব্য থেকে বিরত থাকব)? আর আমি এটা চাই না যে, আমি তোমাদের বিপরীত সেই সব কাজ করি, যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি;[২] আমি তো আমার সাধ্যমত সংশোধন করারই ইচ্ছা পোষণ করি।[৩] আর আমার কৃতকার্যতা তো শুধু আল্লাহরই সাহায্যে;[৪] আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী।
[১] 'উত্তম সম্পদ'এর দ্বিতীয় অর্থ নবুঅতও করা হয়েছে। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে যে কর্ম থেকে বিরত থাকতে বলব, তার বিপরীত সে কর্ম আমি নিজে করব, তা হতে পারে না।
[৩] আমি তোমাদেরকে যে কর্ম করার বা না করার আদেশ দিই, তাতে আমার উদ্দেশ্য, সাধ্যমত তোমাদের সংশোধন।
[৪] অর্থাৎ, সত্য পর্যন্ত পৌঁছনোর আমার যে প্রবল ইচ্ছা, তা একমাত্র আল্লাহর তওফীক বা সাহায্যেই সম্ভব। এই জন্য প্রত্যেক কাজে আমি আল্লাহরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি।
হুদ 11:89
আর হে আমার সম্প্রদায়! আমার প্রতি তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ যেন তোমাদেরকে এমন কাজে উদ্বুদ্ধ না করে, যাতে তোমাদের উপর সেইরূপ (আযাব) এসে পতিত হয়, যেরূপ নূহের সম্প্রদায় অথবা হূদের সম্প্রদায় অথবা সালেহর সম্প্রদায়ের উপর পতিত হয়েছিল। আর লূতের সম্প্রদায় তো তোমাদের হতে দূরে নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদের অবস্থানক্ষেত্র তোমাদের থেকে দূরে নয়, অথবা সেই কারণ তোমাদের থেকে দূরে নয় যে কারণে তারা আযাবে পতিত হয়েছিল।
হুদ 11:90
আর তোমরা তোমাদের পাপের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; নিশ্চয় আমার প্রতিপালক পরম দয়ালু, অতি প্রেমময়।’
হুদ 11:91
তারা বলল, ‘হে শুআইব! তুমি যা বল, তার অনেক কথা আমাদের বুঝে আসে না[১] এবং আমরা অবশ্যই নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি।[২] তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতাম।[৩] আর তুমি আমাদের উপর পরাক্রমশালীও নও।’ [৪]
[১] এই কথা তারা হয় ঠাট্টা-বিদ্রূপ স্বরূপ বলেছিল। কারণ প্রকৃতপক্ষে তাঁর কথা যে তারা বুঝতো না -তা নয়। সুতরাং এই অবস্থাতে এখানে বুঝতে না পারার কথা রূপকার্থে হবে। অথবা তাদের উদ্দেশ্য গায়েব সম্পর্কিত কথা বুঝতে না পারার ওজর প্রকাশ করা। যেমন মরণের পর পুনর্জীবন, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি। এই হিসাবে বুঝতে না পারার কথা প্রকৃতার্থে ধরা হবে।
[২] এ দুর্বলতা শারীরিক দুর্বলতা ছিল, যেমন অনেকের মতে শুআইব (আঃ) চোখে কম দেখতেন অথবা তিনি শারীরিক দিক থেকে শীর্ণকায় ও পাতলা ছিলেন অথবা এই জন্য তাঁকে দুর্বল বলেছে যে, তিনি নিজে একা বিরোধীদের সাথে মুকাবিলা করার ক্ষমতা রাখতেন না।
[৩] বলা হয় যে, শুআইব (আঃ)-এর স্বগোত্র থেকে তাঁর কোন সমর্থক ছিল না, কিন্তু সে গোত্র যেহেতু কুফর ও শিরকের দিক থেকে তাঁর জাতির সাথে ছিল, ফলে একই ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সেই গোত্রের খেয়াল শুআ'ইব (আঃ)-এর সাথে কঠিন দুর্ব্যবহার করা এবং তাঁর ক্ষতি সাধন করাতে বাধা হয়ে ছিল।
[৪] যেহেতু তোমার গোত্রের মর্যাদা আমাদের অন্তরে আছে, সেহেতু আমরা ক্ষমার চোখে দেখছি।
হুদ 11:92
সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার স্বজনবর্গ কি তোমাদের কাছে আল্লাহ অপেক্ষাও অধিক পরাক্রমশালী? তোমরা তাঁকে বিস্মৃত হয়ে পশ্চাতে ফেলে রেখেছ।[১] নিশ্চয়ই তোমাদের সমস্ত কার্যকলাপ আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্তে রয়েছে।
[১] তোমরা আমাকে আমার স্বজনবর্গের কারণে ছেড়ে দিচ্ছ। কিন্তু যে মহান আল্লাহ আমাকে নবুঅতের মর্যাদা দান করেছেন, তাঁর কোন সম্মান ও মর্যাদার কোন খেয়াল তোমাদের অন্তরে নেই এবং তাঁকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখে দিয়েছ! এখানে শুআইব (আঃ) أعزُّ عليكم منِّي 'আমার থেকে বেশী মর্যাদাবান' এর স্থানে أعزُّ عليكم من الله 'আল্লাহর থেকে বেশী মর্যাদাবান বা পরাক্রমশালী' বলেছেন। এতে এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, নবীর অসম্মান করা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই অসম্মান করা। কারণ নবীগণ আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হন। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে হকপন্থী উলামাদের অসম্মান করা ও তাঁদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করা আসলে আল্লাহর দ্বীনের অসম্মান ও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করার নামান্তর। কারণ তাঁরা আল্লাহর দ্বীনের ধারক ও বাহক। واتَّخذتموه তে 'ه' এর লক্ষ্যবস্তু আল্লাহ, অর্থ এই যে, আল্লাহর সেই জিনিস, যা দিয়ে তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, তাকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখেছ, তোমরা তার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করনি।
হুদ 11:93
আর হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা নিজেদের অবস্থায় কাজ করতে থাক আমিও (আমার) কাজ করে যাচ্ছি; এখন সত্বরই তোমরা জানতে পারবে, কার উপর আসবে লাঞ্ছনাকর শাস্তি ও কে মিথ্যাবাদী; আর তোমরা প্রতীক্ষায় থাক, আমিও প্রতীক্ষায় রইলাম।’ [১]
[১] তিনি যখন দেখলেন যে, এ সম্প্রদায় নিজ কুফরী ও শিরকের উপর অটল এবং তাদের উপর ওয়ায-নসীহতের কোন প্রভাব পড়ছে না, তখন বললেন, ঠিক আছে তোমরা নিজের পথে চলতে থাক। অতি সত্ত্বর সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী কে এবং লাঞ্ছনাকর শাস্তির উপযুক্ত কে তা অবশ্যই জানতে পারবে।
হুদ 11:94
যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি নিজ করুণায় রক্ষা করলাম শুআইবকে এবং তার সাথে যারা বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে। আর যারা সীমালংঘন করেছিল তাদেরকে পাকড়াও করল এক বিকট গর্জন,[১] ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে (মৃত অবস্থায়) উপুড় হয়ে পড়ে রইল।
[১] সেই চিৎকার শুনে তাদের অন্তর ফেটে চুর চুর হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল। তার পরে পরেই ভূমিকম্পও আরম্ভ হয়েছিল। যেমন সূরা আ'রাফের ৭:৯১ নং আয়াত ও সূরা আনকাবূতের ২৯:৩৭ নং আয়াতে আলোচনা হয়েছে।
হুদ 11:95
যেন তারা এই গৃহগুলিতে বাস করেইনি। জেনে রাখ, (আল্লাহর করুণা হতে) দূর হল মাদয়্যান, যেমন দূর হয়েছিল সামূদ (সম্প্রদায়)।[১]
[১] অর্থাৎ, অভিশপ্ত হল, আল্লাহর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত হল।
হুদ 11:96
আমি মূসাকে প্রেরণ করলাম আমার নিদর্শনাবলী ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে। [১]
[১] কোন কোন তফসীরবিদের মতে নিদর্শনাবলী থেকে উদ্দেশ্য হল তাওরাত এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল মু'জিযাসমূহ। আর অনেকে বলেন যে, 'নিদর্শনাবলী' হল নয়টি মু'জিযা এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল লাঠি। যদিও লাঠি উক্ত নয় নিদর্শনেরই অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু এ মু'জিযা যেহেতু খুবই গুরুতত্ত্বপূর্ণ ছিল, সেহেতু তাকে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হুদ 11:97
ফিরআউন ও তার প্রধানবর্গের নিকট,[১] তারা ফিরআউনের নির্দেশ মেনে চলতে লাগল অথচ ফিরআউনের নির্দেশ মোটেই সঠিক ছিল না। [২]
[১] ملاء (পারিষদবর্গ, প্রধানবর্গ) জাতির সম্মানিত ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদেরকে বলা হয়। (এর ব্যাখ্যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে।) ফিরাউনের সাথে তার দরবারের সম্মানিত লোকদের নাম এই জন্য নেওয়া হয়েছে যে, জাতির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাই সর্ববিষয়ে দায়িতত্ত্বশীল হয়ে থাকে এবং জাতির মানুষ তাদেরই অনুসরণ করে চলে। যদি তারা মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনত, তবে অবশ্যই ফিরাউনের সমস্ত জাতি ঈমান আনত।
[২] رشيد শব্দের অর্থ হল, সঠিক, বিবেকসম্মত, যুক্তিসঙ্গত, জ্ঞানসম্পন্ন ইত্যাদি। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কথাই সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। আর ফিরআউনের কথা, যা সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল না, তারা তার অনুসরণ করল।
হুদ 11:98
কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে।[১] আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে।[২]
[১] অর্থাৎ ফিরআউন, যেমন দুনিয়াতে তাদের পথপ্রদর্শনকারী ও অগ্রবর্তী ছিল, কিয়ামতের দিনও সে তাদের অগ্রবর্তীই থাকবে এবং নিজ জাতিকে নিজের নেতৃত্যে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
[২] وِرْدٌ পানির ঘাটকে বলা হয়, যেখানে পিপাসিতরা আপন পিপাসা নিবৃত্ত করে। কিন্তু এখানে জাহান্নামকে وِرْد বলা হয়েছে।مورود সেই স্থান বা ঘাট অর্থাৎ জাহান্নাম; যেখানে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ স্থানও নিকৃষ্ট এবং যারা যাবে তারাও নিকৃষ্ট। আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন।
হুদ 11:99
আর অভিশাপ তাদের সাথে সাথে রইল এই দুনিয়াতে এবং কিয়ামত দিবসেও।[১] তা হল নিকৃষ্ট পুরস্কার যা তাদেরকে দেওয়া হবে। [২]
[১] 'লানত' (অভিশাপ) আল্লাহর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত হওয়া। সুতরাং দুনিয়াতেও তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত এবং যদি তারা ঈমান না আনে, তবে আখেরাতেও রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে।
[২] رفدٌ কোন পুরস্কার বা দানকে বলা হয়। এখানে অভিশাপকে পুরস্কার বলা হয়েছে। তাই তাকে অতি নিকৃষ্ট পুরস্কার বলা হয়েছে।مرفود সেই পুরস্কার বা দানকে বলা হয়, যা কাউকে প্রদান করা হয়। এটি الرفد এর তা'কীদ স্বরূপ ব্যবহার হয়েছে।
হুদ 11:100
এটা ছিল সেই জনপদসমূহের কতিপয় অবস্থা যা আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি, ওগুলির মধ্যে কোন কোন জনপদ তো বিদ্যমান রয়েছে এবং কোন কোনটি নির্মূল হয়ে গেছে।[১]
[১] قائم (বিদ্যমান) দ্বারা ঐ সকল শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যার ধংসাবশেষ এখনও ছাদসহ বিদ্যমান রয়েছে। আর حصيد ,محصود এর অর্থে; সেই শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যা কাটা ফসলের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী যুগের যে কতিপয় শহর ও জনপদের কাহিনী আমি বর্ণনা করছি, তার মধ্যে কোন কোন শহরের ধংসাবশেষ এখনও বর্তমান আছে, যা শিক্ষামূলক স্মৃতি। আর কোন কোন জনপদকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, যা একেবারে দুনিয়া থেকে মিটে গেছে এবং শুধু ইতিহাসের পাতায় তা বাকি রয়ে গেছে।
হুদ 11:101
আমি তাদের প্রতি অত্যাচার করিনি,[১] কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে।[২] বস্তুতঃ যখন তোমার প্রতিপালকের হুকুম এসে পৌঁছল, তখন তাদের সেই উপাস্যগুলি, আল্লাহকে ছেড়ে ওরা যাদের উপাসনা করত, তারা ওদের কোন কাজে লাগল না। উল্টো তারা তাদের ধ্বংসই বৃদ্ধি করল। [৩]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে শাস্তি দিয়ে ও ধ্বংস করে।
[২] (বরং তারাই) কুফরী ও অবাধ্যতা করে (নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে।)
[৩] অথচ তাদের বিশ্বাস এই ছিল যে, এরা তাদেরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে এবং মঙ্গল এনে দেবে। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব উপস্থিত হল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের উক্ত বিশ্বাস ভ্রান্ত ছিল এবং এ কথা প্রমাণ হয়ে গেল যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ কারোর মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতা রাখে না।
হুদ 11:102
আর এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যেমন পূর্ববর্তী জনপদসমূহকে ধ্বংস করেছেন, অনুরূপ ভবিষ্যতেও তিনি অত্যাচারীদেরকে পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা অবশ্যই অত্যাচারীদেরকে ঢিল দেন। কিন্তু যখন তাদেরকে পাকড়াও করেন, তখন কোন সুযোগ দেন না।" অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)
হুদ 11:103
নিশ্চয় এতে[১] সে ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে, যে ব্যক্তি পরকালের শাস্তিকে ভয় করে। ওটা এমন একটা দিন হবে, যেদিন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে এবং ওটা হবে সকলের উপস্থিতির দিন। [২]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর ধর-পাকড়ে অথবা এই ঘটনাবলীতে, যা নসীহত ও শিক্ষার জন্য বর্ণনা করা হয়েছে (তাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে)।
[২] অর্থাৎ, হিসাব ও প্রতিদানের জন্য।
হুদ 11:104
আর আমি ওটা নির্দিষ্ট একটি কালের জন্যই বিলম্বিত করছি। [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়াতে দেরী হওয়ার একমাত্র কারণ হল যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতঃপর যখন সেই নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্ব করা হবে না।
হুদ 11:105
যখন সেদিন আসবে, তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না।[১] সুতরাং তাদের মধ্যে কেউ হবে দুর্ভাগ্যবান এবং কেউ হবে সৌভাগ্যবান।
[১] 'কথাও বলতে পারবে না' কথাটির অর্থ হল, আল্লাহ তাআলার সামনে কারোর কোন কথা বলার বা সুপারিশ করার হিম্মত ও সাহস হবে না। তবে যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। সুপারিশ সম্পর্কিত লম্বা হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "সেই দিন আম্বিয়াগণ ছাড়া কারোর কথা বলার হিম্মত ও সাহস হবে না। আর আম্বিয়াগণের মুখে সেদিন একমাত্র এই কথা হবে, 'হে আল্লাহ! আমাকে পরিত্রাণ দাও, আমাকে পরিত্রাণ দাও।" (বুখারী)
হুদ 11:106
অতএব যারা দুর্ভাগ্যবান তারা তো হবে দোযখে; তাতে তাদের চীৎকারও আর্তনাদ হতে থাকবে।
হুদ 11:107
তারা অনন্তকাল সেখানে থাকবে, যতকাল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে;[১] যদি না তোমার প্রতিপালকের অন্য ইচ্ছা হয়।[২] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তা সম্পাদনে সুনিপুণ।
[১] এই বাক্য দ্বারা কিছু মানুষ এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে যে, জাহান্নামের আযাব কাফেরদের জন্যও চিরস্থায়ী নয়; বরং সাময়িক। অর্থাৎ, ততদিন থাকবে, যতদিন আকাশ ও পৃথিবী থাকবে। (তারপর শেষ হয়ে যাবে।) কিন্তু এই কথা ঠিক নয়। কারণ এখানে مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالأرضُ কথাটি আরববাসীদের দৈনন্দিন কথাবার্তা ও পরিভাষা অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে। আরববাসীদের অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা কোন বস্তুর চিরস্থায়িতত্ত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্য হত, তখন তারা বলত,(هذا دائمٌ دوام السموات والأرض) "এই বস্তু আকাশ ও পৃথিবীর মত চিরস্থায়ী।" সেই পরিভাষাকে কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ কাফের ও মুশরিকরা চিরকালব্যাপী জাহান্নামে থাকবে, যা কুরআন বিভিন্ন স্থানে, خَالِدِينَ فِيهَآ أَبَدًا শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছে। তার দ্বিতীয় এক অর্থ এও করা হয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী থেকে উদ্দেশ্য হল 'জিনস' (শ্রেণী)। অর্থাৎ, ইহলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী; যা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এ ছাড়া পারলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী পৃথক হবে। যেমন কুরআনে তার পরিষ্কার বর্ণনা এসেছে। يوم تبدل الأرض غير الأرض والسموات অর্থাৎ, যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও।" (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৮) আর পারলৌকিক উক্ত আকাশ ও পৃথিবী, জান্নাত ও জাহান্নামের মত চিরস্থায়ী হবে। এই আয়াতে সেই পারলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা বলা হয়েছে, ইহলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা নয়, যা ধ্বংস হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর) এই উভয় অর্থের যে কোন অর্থ নেওয়া হলে আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষফুটিত হয়ে যাবে এবং উপস্থাপিত সমস্যা দূর হয়ে যাবে। ইমাম শওকানী (রঃ) এর আরো কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন, যা জ্ঞানীরা দেখতে পারেন। (ফাতহুল কাদীর)[২] এই ব্যতিক্রমেরও কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে সব থেকে সঠিক অর্থ এই যে উক্ত ব্যতিক্রম তওহীদবাদী মু'মিন পাপীদের জন্য। এই অর্থ অনুযায়ী এর পূর্ব আয়াতে شقي (দুর্ভাগ্যবান) শব্দটি ব্যাপক ধরতে হবে। অর্থাৎ কাফের ও পাপী মু'মিন উভয়কে বুঝাবে। আর إلا مَا شَاءَ رَبُّكَ দ্বারা পাপী মু'মিনরা ব্যতিক্রম হয়ে যাবে। আর ما شاء তে مَا হরফটি مَن এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
হুদ 11:108
পক্ষান্তরে যারা সৌভাগ্যবান, তারা থাকবে বেহেশ্তে। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে, যতকাল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে; যদি না তোমার প্রতিপালকের অন্য ইচ্ছা হয়।[১] এ হবে অফুরন্ত অনুদান। [২]
[১] এই ব্যতিক্রমও পাপী মু'মিনদের জন্য। অর্থাৎ, অন্য মু'মিনদের মত এই গোনাহগার মু'মিনরা প্রথম থেকে শেষ অবধি জান্নাতে থাকবে না। বরং শুরুতে কিছু দিন তাদেরকে জাহান্নামে থাকতে হবে, পরে আল্লাহর ইচ্ছায় আম্বিয়া ও মু'মিনদের সুপারিশে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেমন সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত।
[২] غير مجذوذ এর অর্থ হল غير مقطوع অর্থাৎ, এমন অফুরন্ত অনুদান যা শেষ হওয়ার নয়। এই বাক্য দ্বারা এই কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যে সকল পাপী মু'মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বে'র করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তারা ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী হবে এবং সকল জান্নাতীগণ আল্লাহ প্রদত্ত অনুদান ও তাঁর নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে, তা কোন কালে কখনও শেষ হবে না।
হুদ 11:109
সুতরাং এরা যার উপাসনা করে, তার সম্বন্ধে তুমি এতটুকুও সংশয় করো না; তারাও ঠিক সে রূপেই উপাসনা করছে যেরূপে তাদের পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষরা করত এবং নিশ্চয় আমি তাদেরকে তাদের প্রাপ্য পূর্ণভাবে দিয়ে দিব; একটুকুও কম করব না। [১]
[১] এর অর্থ সেই আযাব, তারা যার হকদার হবে, তাতে কোন কম করা হবে না।
হুদ 11:110
আর আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম, অতঃপর ওতে মতভেদ করা হল।[১] যদি একটি উক্তি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে পূর্বেই স্থিরীকৃত হয়ে না থাকত, তাহলে ওদের মাঝে চূড়ান্ত মীমাংসা হয়েই যেত।[২] আর অবশ্যই তারা এ (কুরআন) সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, কিছু লোক সেই কিতাব মেনে নিল, আর কিছু লোক তা মেনে নিল না। এই কথা বলে নবী (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, পূর্ব নবীগণের সাথেও এই ব্যবহার হতে থেকেছে, কিছু সংখ্যক মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান আনত এবং অন্যরা মিথ্যাজ্ঞান করত। অতএব তোমাকে মিথ্যাজ্ঞান করা হলে ঘাবড়ে যাবে না।
[২] এর অর্থ এই যে, যদি আল্লাহ তাআলা তাদের শাস্তির জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে না রাখতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে অবিলম্বে ধ্বংস করে দিতেন।
হুদ 11:111
আর নিশ্চিতরূপে তাদের প্রত্যেকের (সময় যখন এসে যাবে, তখন) অবশ্যই তোমার প্রতিপালক তাদেরকে তাদের কর্মফল পূর্ণরূপে প্রদান করবেন; নিশ্চয়ই তিনি তাদের কার্যকলাপের পূর্ণ খবর রাখেন।
হুদ 11:112
অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, সেইভাবে সুদৃঢ় থাক এবং সেই লোকেরাও যারা (কুফরী হতে) তওবা করে তোমার সাথে রয়েছে; আর সীমালংঘন করো না।[১] নিশ্চয় তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করেন।
[১] এই আয়াতে প্রথমত নবী (সাঃ) ও মু'মিনগণকে অটল থাকার কথা বলা হচ্ছে, যা শত্রুর মুকাবিলা করার জন্য একটি বড় অস্ত্র। দ্বিতীয়ত طغيان (সীমালঙ্ঘন) করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা মুমিনের চারিত্রিক শক্তি এবং উচ্চমানের মধ্যমপন্থী চরিত্র গঠনের জন্য একান্ত জরুরী। এমনকি উক্ত সীমালঙ্ঘন, শত্রুর সাথে ব্যবহার করার সময়েও বৈধ নয়।
হুদ 11:113
আর তোমরা যালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথা তোমাদেরকে দোযখের আগুন স্পর্শ করবে,[১] আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কেউ সহায় হবে না, অতঃপর তোমাদেরকে কোন সাহায্যও করা হবে না।
[১] এর অর্থ হল, যালেমদের সাথে নম্রতা, তোষামোদ (ও সাদৃশ্য অবলম্বন) করে তাদের সাহায্য অর্জন করো না। এতে তারা এ কথা ভাবার সুযোগ পাবে যে, তোমরা তাদের অন্য কথাকেও পছন্দ কর। এইভাবে এটা তোমাদের এক বড় অন্যায় হবে; যা তোমাদেরকে তাদের সাথে জাহান্নামের আগুনের হকদার বানাতে পারে। এতে যালেম শাসকদের সাথে সম্পর্ক রাখার অবৈধতা প্রমাণ হয়। তবে যদি এতে কোন সাধারণ কল্যাণ অথবা দ্বীনী স্বার্থ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে অন্তরে ঘৃণা রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা বৈধ হবে। যেমন কোন কোন হাদীসে এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়।
হুদ 11:114
নামায কায়েম কর দিবসের দু’প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে;[১] নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; [২] এটা হচ্ছে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ।
[১] দু'প্রান্ত থেকে কেউ কেউ ফজর ও মাগরেবের নামায, কেউ কেউ শুধু এশা এবং কেউ কেউ মাগরেব ও এশা উভয় নামাযের সময় উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, সম্ভবতঃ এই আয়াতটি মি'রাজের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়েছে। কারণ তার পূর্বে শুধু দুই নামায ওয়াজিব ছিল, প্রথম সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে এবং দ্বিতীয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে। আর রাতের শেষাংশে তাহাজ্জুদের নামায ছিল। পরে তাহাজ্জুদ নামাযের অপরিহার্যতা উম্মতের জন্য মাফ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকের মতে তাহাজ্জুদ নামাযের অপরিহার্যতা নবী (সাঃ)-এর জন্যও মাফ করে দেওয়া হয়েছিল। (ইবনে কাসীর) আর আল্লাহই ভালো জানেন।[২] যেমন হাদীসসমূহে তা পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। "পাঁচ ওয়াক্তের নামায, এক জুমআহ থেকে অপর জুমআহ পর্যন্ত এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত, তার মধ্যবর্তী পাপসমূহকে মিটিয়ে দেয়; যদি কাবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকা হয় তবে।" (মুসলিম) অন্য আর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "বল দেখি, যদি তোমাদের কারো দরজার সামনে একটি নদী প্রবাহিত হয় এবং সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে তার শরীরে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকবে কি?" সাহাবায়ে-কিরামগণ বললেন, না। তিনি বললেন, "পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এটিই। এই নামাযগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ মুছে ফেলেন।" (বুখারী ও মুসলিম) সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর সাথে একটি গাছের নিচে ছিলাম। তিনি আমার সামনে গাছের একটি শুষ্ক ডাল ধরে হিলিয়ে দিলেন। এতে তার সমস্ত পাতা খসে পড়ল। অতঃপর বললেন, "হে সালমান! তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না কি যে, কেন আমি এরূপ করলাম?" আমি বললাম, 'কেন করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, "মুসলিম যখন সুন্দরভাবে ওযু করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, তখন তার পাপরাশি ঠিক ঐভাবেই ঝরে যায়, যেভাবে এই পাতাগুলো ঝরে গেল।" আর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন। (আহমাদ, নাসাঈ, তাবারানী, সহীহ তারগীব ৩৫৬নং) এক ব্যক্তি এক মহিলাকে চুম্বন দিয়ে ফেলে। পরে সে নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বিষয়টি জানায়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন; "দিনের দুপ্রান্ত সকাল ও সন্ধ্যায় এবং রাতের প্রথম ভাগে নামায কায়েম কর। নিশ্চয়ই পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়।" (সূরা হূদ ১১:১১৪) লোকটি জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রসূল! একি শুধু আমার জন্য?' তিনি বললেন, "না, এ সুযোগ আমার সকল উম্মতের জন্য।" (বুখারী ও মুসলিম)
হুদ 11:115
আর ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের পুণ্যফলকে পন্ড করেন না।
হুদ 11:116
যেসব উম্মত তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে, আমি যাদেরকে রক্ষা করেছিলাম তাদের মধ্য হতে অল্প কতক ব্যতীত এমন সজ্জন ছিল না, যারা পৃথিবীতে অশান্তি ঘটাতে বাধা প্রদান করত।[১] যালেমরা যে আরাম-আয়েশে ছিল তার পিছনেই পড়ে রইল। আর তারা ছিল অপরাধী।[২]
[১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী জাতির মধ্য থেকে এমন নেক লোক কেউ ছিল না, যারা নোংরা ও ফাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে নোংরা, অশ্লীলতা ও ফাসাদ সৃষ্টি করা হতে বিরত রাখত? তারপর বলেন, এরূপ মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছিল, তাদেরকে আমি সেই সময় আযাব থেকে রক্ষা করেছি। আর অবশিষ্ট লোকদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
[২] অর্থাৎ এ যালেমরা, নিজেদের যুলমের উপর অটল ছিল এবং আপন মত্ততায় উন্মত্ত ছিল। পরিশেষে আযাবে তাদেরকে ঘিরে ফেলেছিল।
হুদ 11:117
আর তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেন, অথচ ওর অধিবাসীরা সদাচারী থাকে।
হুদ 11:118
তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে তিনি সকল মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা সদা মতভেদ করতেই থাকবে।
হুদ 11:119
তবে যাদের প্রতি তোমার প্রতিপালক দয়া করেন তারা নয়, আর এ জন্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন[১] এবং ‘আমি জীন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই’ তোমার প্রতিপালকের এই বাণী পূর্ণ হবেই। [২]
[১] ولذلك (এই জন্যই) শব্দে 'এই' বলতে কি বুঝানো হয়েছে? অনেকে 'মতভেদ' এবং অনেকে 'দয়া' বুঝিয়েছেন। উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য এই যে, আমি মানুষ জাতিকে পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছি। যে ব্যক্তি সত্য দ্বীনের বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। আর যে তা বরণ ও গ্রহণ করে নেবে, সে কৃতকার্য এবং আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর লিখিত তকদীরে ও ফায়সালাতে এ কথা নির্ধারিত হয়ে আছে যে, কিছু মানুষ জান্নাত ও কিছু মানুষ জাহান্নামের অধিকারী হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামকে মানুষ ও জীন দ্বারা পরিপূর্ণ করা হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "জান্নাত ও জাহান্নাম একদা আপোসে ঝগড়া আরম্ভ করল; জান্নাত বলল, কি ব্যাপার আমার মাঝে কেবল তারাই আসবে, যারা দুর্বল ও সমাজের নিম্নস্তরের লোক? জাহান্নাম বলল, আমার ভিতরে তো বড় বড় পরাক্রমশালী ও অহংকারী মানুষরা থাকবে।" আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বললেন, 'তুমি আমার রহমত, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, রহম করব।' আর জাহান্নামকে বললেন, 'তুমি আমার শাস্তি, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, শাস্তি দেব।' আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়কে পরিপূর্ণ করবেন। জান্নাতে সর্বদা তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া থাকবে। জান্নাত খালি থাকলে পরিশেষে আল্লাহ তাআলা এমন সৃষ্টি সৃজন করবেন যারা জান্নাতের অবশিষ্ট স্থানে বসবাস করবে। আর জাহান্নাম, জাহান্নামীদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও যখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, 'তুমি পরিপূর্ণ হয়েছ কি?' তখন সে 'আরো আছে কি?' বলে আওয়াজ দেবে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাতে নিজ পা রেখে দেবেন, যার ফলে জাহান্নাম 'বাস! বাস! তোমার মর্যাদার কসম!' বলে আওয়াজ দেবে।" (বুখারী)
হুদ 11:120
রসূলদের ঐ সব বৃত্তান্ত আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি, এর দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করি। এর মাঝে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং বিশ্বাসীদের জন্য উপদেশ ও স্মরণীয় বস্তু।
হুদ 11:121
হে নবী! যারা বিশ্বাস করে না তাদেরকে বল, ‘তোমরা যেমন করছ করতে থাক এবং আমরাও আমাদের কাজ করছি।
হুদ 11:122
এবং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষা করছি।’ [১]
[১] অর্থাৎ, অবিলম্বে তোমরা জানতে পারবে যে, শুভ পরিণামের অধিকারী কে এবং এও জানতে পারবে যে যালেমরা কৃতকার্য হতে পারবে না। সুতরাং আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অবিলম্বে পূর্ণ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে জয়যুক্ত করেছেন এবং পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের অধীনে এসে গেছে।
হুদ 11:123
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব কিছু প্রত্যাবর্তিত হবে, সুতরাং তুমি তাঁর উপাসনা কর এবং তাঁর উপর নির্ভর কর। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক উদাসীন নন।
ইউসুফ 12:1
আলিফ লা-ম রা। এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।
ইউসুফ 12:2
নিশ্চয় আমি এটি অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআনরূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। [১]
[১] আসমানী গ্রন্থসমূহকে অবতীর্ণ করার উদ্দেশ্য হল, মানুষকে হিদায়াত ও পথ প্রদর্শন করা। আর উক্ত উদ্দেশ্য তখনই অর্জন হবে, যখন সেই গ্রন্থ এমন ভাষায় হবে, যে ভাষা তারা বুঝতে পারবে। এই জন্যই সমস্ত আসমানী গ্রন্থ যে জাতির হিদায়াতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে সে জাতির ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। কুরআন কারীম যেহেতু সর্বপ্রথম আরববাসীদেরকে লক্ষ্য করে অবতীর্ণ করা হয়েছে, সেহেতু তা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাছাড়া আরবী ভাষা সাহিত্য- শৈলী, শব্দালঙ্কার, অলৌকিকতা ও অর্থ প্রকাশের দিক থেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষা। এই জন্য আল্লাহ তাআলা এই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ (কুরআন মাজীদ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ (আরবী) ভাষাতে, সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি, সর্বশ্রেষ্ঠ ফিরিশতা (জিবরীল)এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন এবং মক্কা যেখানে অবতীর্ণ হতে আরম্ভ হয়েছে, তা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান, যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে, সে মাসটিও সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমযান মাস এবং যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছে, সে রাতও সর্বশ্রেষ্ঠ রাত শবেকদরের রাত।
ইউসুফ 12:3
আমি তোমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী[১] বর্ণনা করছি, অহীর মাধ্যমে তোমার কাছে এই কুরআন প্রেরণ করে; যদিও এর পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত। [২]
[১] قصص শব্দটি মাসদার (ক্রিয়া-বিশেষণ)। অর্থ হল কোন বস্তুর পেছনে লাগা। উদ্দেশ্য চমৎকার ঘটনা। কেচ্ছা, শুধু কোন কল্পিত কাহিনী বা মনোরঞ্জন উপন্যাসকে বলা হয় না; বরং অতীতে ঘটে গেছে এমন ঘটনার বর্ণনাকে (অর্থাৎ, তার পিছনে লাগাকে আরবীতে কিসসা) 'কেচ্ছা' বলা হয়। (ইউসুফ (আঃ)-এর) এ ঘটনা ঠিক অতীতে সংঘটিত ইতিহাসের বাস্তব বর্ণনা এবং এতে হিংসা ও শত্রুতার পরিণতি, আল্লাহর সাহায্যের আজব পদ্ধতি, মন্দ-প্রবণ মনের পাপাচরণের কুফল এবং মানুষের বিভিন্ন অবস্থার সুন্দর বর্ণনা এবং বড় গুরুতত্ত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যার জন্য কুরআন একে 'সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী' বলে আখ্যায়িত করেছে।
[২] কুরআন কারীমের এই শব্দাবলী দ্বারাও পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, নবী করীম (সাঃ) 'আ-লিমুল গায়েব' ছিলেন না, নচেৎ আল্লাহ তাআলা তাঁকে উক্ত ঘটনা সম্পর্কে 'অনবহিত' আখ্যায়িত করতেন না। দ্বিতীয় কথা এও বুঝা গেল যে, তিনি আল্লাহর সত্য নবী। কারণ তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেই এই সত্য ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি কোন শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন না যে, তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আর না অন্য কারোর সাথে তাঁর এমন সম্পর্ক ছিল যে, তার নিকট থেকে শ্রবণ করে এরূপ ঐতিহাসিক ঘটনা তার গুরুতত্ত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি অংশ সহ বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা নিঃসন্দেহে তা অহীর মাধ্যমে তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। যেমন এখানে সে কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।
ইউসুফ 12:4
যখন ইউসুফ[১] তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা! আমি (স্বপ্নে) এগারটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্র দেখলাম;[২] দেখলাম ওরা আমাকে সিজদাহ করছে।’
[১] অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! তোমার সম্প্রদায়ের নিকট ইউসুফ (আঃ)-এর ঘটনা বর্ণনা কর, যখন সে তার পিতাকে বলল---। ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা ছিলেন ইয়াকূব (আঃ); যেমন অন্য জায়গায় স্পষ্টভাবে তা উল্লিখিত হয়েছে। আর হাদীসেও উক্ত সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে, কারীম (সম্মানিত) বিন কারীম বিন কারীম, ইউসুফ বিন ইয়াকূব বিন ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম)। (আহমাদ ২/৯৬)[২] কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, এগারটি নক্ষত্র থেকে উদ্দেশ্য হল, ইউসুফ (আঃ)-এর এগার ভাই। আর চাঁদ ও সূর্য থেকে উদ্দেশ্য হল, তাঁর পিতা-মাতা। এ স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) ৪০ অথবা ৮০ বছর পর যখন তাঁর পিতা-মাতা সহ সমস্ত ভায়েরা মিসরে গিয়ে তাঁর সামনে সিজদাবনত হয়েছিলেন, তখন বাস্তব রূপ পেয়েছিল। যেমন এ কথা সূরার শেষের দিকে (১২:১০০ নং আয়াতে) আসবে।
ইউসুফ 12:5
(পিতা ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের নিকট বর্ণনা করো না, করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।[১] শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।[২]
[১] ইয়াকূব (আঃ) সপ্ন শুনে অনুমান করলেন যে, তাঁর এই পুত্র মহা সম্মানের অধিকারী হবে। ফলে তিনি ভয় করছিলেন যে, এই স্বপ্ন শুনে তাঁর অন্য ভাইরাও তাঁর মর্যাদার কথা বুঝতে পেরে তাঁর কোন ক্ষতি না করে বসে। তাই তিনি এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতে নিষেধ করলেন।
[২] তিনি ভাইদের চক্রান্তের কারণও বলে দিলেন যে, শয়তান যেহেতু মানুষের চিরশত্রু সেহেতু সে মানুষকে ভ্রষ্ট ও হিংসা-বিদ্বেষে নিমজ্জিত করার সর্বদা সুযোগ খোঁজে। বলা বাহুল্য, এটা শয়তানের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল যে, ইউসুফ (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ভাইদের মনে হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। যেমন পরে সত্য সত্যই সে তাই করেছিল এবং ইয়াকূব (আঃ)-এর আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।
ইউসুফ 12:6
এভাবে[১] তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন, আর তোমার প্রতি[২] ও ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনের প্রতি[৩] তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্বে তা পূর্ণ করেছিলেন। তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।’
[১] অর্থাৎ যেভাবে তোমাকে তোমার প্রভু বড় মহত্তপূর্ণ স্বপ্ন দেখানোর জন্য বেছে নিয়েছেন, সেইভাবে তোমার প্রভু তোমাকে সম্মান দানে মনোনীত করবেন এবং স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) শিখাবেন। تأويل الأحاديث এর প্রকৃত অর্থ হল কথার গভীরে পৌঁছনো। এখানে উদ্দেশ্য হল, স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য।
[২] এর উদ্দেশ্য হল নবুঅত; যা ইউসুফ (আঃ)-কে প্রদান করা হয়েছিল। অথবা সেই নেয়ামতসমূহ যা ইউসুফ (আঃ)-কে মিশরে প্রদান করা হয়েছিল।
[৩] এর দ্বারা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাই, তাঁদের সন্তানাদিকে বুঝানো হয়েছে। যারা পরে আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী হয়েছিলেন।
ইউসুফ 12:7
নিশ্চয়ই ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। [১]
[১] অর্থাৎ, এই ঘটনাতে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং নবী (সাঃ)-এর নবুঅতের সত্যবাদিতার বড় নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন তফসীরবিদ এখানে ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের নাম এবং তাঁদের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইউসুফ 12:8
(স্মরণ কর) যখন তারা (তার ভাইরা) বলেছিল, ‘আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার (সহোদর) ভাই[১] (বিনয়ামীন)ই আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি (সংহত) দল,[২] আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছেন। [৩]
[১] 'তার (সহোদর) ভাই' বলে বিনয়্যামীনকে বুঝানো হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, আমরা দশ ভাই শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর ইউসুফ ও বিনয়্যামীন মাত্র দুইজন। এর পরেও তারা আমাদের পিতার চক্ষুর শীতলতা ও মনের প্রফুল্লতা!
[৩] এখানে বিভ্রান্তির অর্থ হল ভুল; যা তাঁদের ধারণা অনুযায়ী তাঁদের পিতা ইউসুফ ও বিনয়্যামীনকে অধিক ভালবেসে করেছিলেন।
ইউসুফ 12:9
ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোন (দূরবর্তী) স্থানে ফেলে এস, তাহলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে এবং তারপরে তোমরা (তওবা করে) ভাল লোক হয়ে যাবে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তওবা করে নেবে। অর্থাৎ, কূপে নিক্ষেপ করা অথবা হত্যা করার পর সেই গোনাহ থেকে আল্লাহর নিকট তওবা করে নেবে।
ইউসুফ 12:10
তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘ইউসুফকে হত্যা করো না, বরং যদি তোমরা কিছু করতেই চাও, তাহলে তাকে কোন গভীর কূপে[১] নিক্ষেপ কর, যাত্রীদলের কেউ তাকে তুলে নিয়ে যাবে।’ [২]
[১] جبٌ কূপকে ও غِيابَةٌ কূপের গভীরতাকে বলা হয়। কূপ এমনিতেই গভীর হয় এবং তাতে নিক্ষিপ্ত বস্তুকে দেখতে পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও কূপের গভীরতার কথা উল্লেখ করে অতিশয়োক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, পথচারী মুসাফির, যখন পানির খোঁজে কূপের নিকট আসবে, তখন হয়তো কেউ জানতে পারবে যে, কূপে কোন মানুষ পড়ে আছে এবং সে তাকে তুলে নিজের সাথে নিয়ে যাবে। ইউসুফ (আঃ)-এর এক ভাই এই বুদ্ধি দয়াবশতঃ পেশ করলেন। হত্যার পরিবর্তে উক্ত বুদ্ধিতে সত্যই সহানুভূতির আর্দ্রতা ছিল। ভাইদের মনে হিংসার আগুন এমনভাবে জ্বলে উঠেছিল যে, উক্ত অভিমত তিনি ভয়ে ভয়ে পেশ করে বলেছিলেন যে, যদি তোমাদেরকে কিছু করতেই হয়, তবে এরূপ কর।
ইউসুফ 12:11
তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদেরকে অবিশ্বাস করছেন কেন, যদিও আমরা তার হিতাকাঙ্ক্ষী?[১]
[১] এতে বুঝা যায় যে, ইতিপূর্বে ভাইরা ইউসুফ (আঃ)-কে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং পিতা তাঁদের সাথে পাঠাতে অস্বীকার করেছিলেন।
ইউসুফ 12:12
আপনি আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন, সে ফল-মূল খাবে ও খেলাধূলা করবে,[১] আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
[১] খেলাধূলা ও ভ্রমণের প্রতি আকর্ষণ মানুষের (বিশেষ করে শিশুদের) প্রকৃতিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। এই জন্য আল্লাহ তাআলা কোন যুগেই বৈধ খেলা ও ভ্রমণের ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা জারী করেননি। ইসলামেও শর্ত-সাপেক্ষে তার বৈধতা আছে। অর্থাৎ, এমন খেলাধূলা ও ভ্রমণ বৈধ, যাতে শরয়ী কোন আপত্তি না থাকে অথবা তা কোন হারাম পর্যন্ত পৌঁছে না দেয়। সুতরাং ইয়াকূব (আঃ)ও খেলাধূলার ব্যাপারে কোন আপত্তি করেননি। অবশ্য এই আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে, তোমরা খেলাধূলায় বিভোর হয়ে যাবে, আর তাকে হয়তো নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলবে। কারণ সেই এলাকার উন্মুক্ত ময়দানে ও মরুভূমিতে সাধারণতঃ নেকড়ে বাঘ থাকত।
ইউসুফ 12:13
সে বলল, ‘তোমাদের ওকে নিয়ে যাওয়াটা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হবে। আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা ওর প্রতি অমনোযোগী হলে ওকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।’
ইউসুফ 12:14
তারা বলল, ‘আমরা একটি (সংহত) দল হওয়া সত্ত্বেও যদি নেকড়ে বাঘ ওকে খেয়ে ফেলে, তাহলে তো আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’ [১]
[১] এই কথা দ্বারা পিতাকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, তা কি করে সম্ভব হতে পারে? আমাদের এতগুলো ভায়ের উপস্থিতিতে ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলবে?
ইউসুফ 12:15
অতঃপর যখন তারা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে গভীর কূপে নিক্ষেপ করতে একমত হল। এমতাবস্থায় আমি তাকে (ইউসুফকে) জানিয়ে দিলাম, ‘তুমি তাদেরকে তাদের এই কর্মের কথা অবশ্যই বলে দেবে; যখন তারা তোমাকে চিনবে না।’ [১]
[১] কুরআন মাজীদ অতি সংক্ষেপে উক্ত ঘটনা বর্ণনা করছে। ঘটনা এই যে, যখন তাঁরা তাঁদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র অনুযায়ী ইউসুফ (আঃ)-কে কূপে নিক্ষেপ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে সান্তনা ও সাহস দেওয়ার জন্য অহী করলেন যে, তুমি ঘাবড়ে যেয়ো না, আমি শুধু তোমার সুরক্ষাই করব না; বরং তোমাকে এমন মর্যাদার অধিকারী করব যে, তোমার সকল ভাইরা তোমার দরবারে ভিক্ষা চাওয়ার জন্য আসবে এবং তুমি তাদেরকে বলবে যে, তোমরা আপন ভায়ের সাথে এর পূর্বে পাষাণ-হৃদয়ের আচরণ করেছিলে, যা শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে যাবে। ইউসুফ (আঃ) যদিও সেই সময় শিশু ছিলেন, কিন্তু যে শিশু নবুঅত লাভ করে, শৈশবেও তার প্রতি অহী অবতীর্ণ হয়। যেমন ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমাস সালাম) প্রভৃতি নবীগণের প্রতি অহী অবতীর্ণ হয়েছিল।
ইউসুফ 12:16
তারা রাতে কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার নিকট এল।
ইউসুফ 12:17
তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না; যদিও আমরা সত্যবাদী।’ [১]
[১] অর্থাৎ, যদিও আমরা আপনার নিকট বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হতাম, তবুও আপনি ইউসুফ সম্পর্কে আমাদের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করতেন না। এখন তো এমনিতেই আমাদের ব্যক্তিত্ব সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের মত, এখন আপনি আমাদের কথা আর কিভাবে বিশ্বাস করবেন?
ইউসুফ 12:18
আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়।[১] তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’[২]
[১] বলা হয় যে, তাঁরা একটি ছাগল ছানা যবেহ করে ইউসুফের জামায় রক্ত লেপন করে নেন এবং এ কথা তাঁরা ভুলে যান যে, যদি ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলত, তবে অবশ্যই তাঁর জামাও ছিঁড়ে যেত। কিন্তু জামা অক্ষত অবস্থায় ছিল। যা দেখে এবং তার উপর ইউসুফ (আঃ)-এর স্বপ্ন এবং নিজ নবুঅতের জ্ঞান দ্বারা অনুমান করে ইয়াকূব (আঃ) বললেন, ঘটনা ঐরূপ ঘটেনি, যেরূপ তোমরা বর্ণনা করছ; বরং তোমরা নিজের মন থেকে সাজিয়ে এ কথা বলছ। সুতরাং যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াকূব (আঃ) ঘটনার আসল রহস্য জানতেন না, ফলে ধৈর্য ছাড়া কোন অবলম্বন এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন উপায় তাঁর ছিল না।
[২] মদীনার মুনাফেকরা যখন আয়েশা (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, তখন নবী (সাঃ) তাঁর ব্যাপারে যা বুঝেছিলেন ও বলেছিলেন তার উত্তরে তিনিও বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের আব্বার ঐ উদাহরণই দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং "আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।" অর্থাৎ আমারও ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
ইউসুফ 12:19
এক যাত্রীদল এসে তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল। সে বলে উঠল, কি সুখবর! এ যে এক কিশোর![১] অতঃপর তারা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখল।[২] তারা যা করছিল, সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত ছিলেন। [৩]
[১] وارد (পানি সংগ্রাহক) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কাফেলা বা যাত্রীদলের জন্য পানি ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে কাফেলার আগে আগে যাত্রা করে; যাতে উপযুক্ত স্থানে কাফেলা থাকার ব্যবস্থা হয়। উক্ত পানি সংগ্রাহক যখন কূপের নিকট এল ও পানি উঠানোর জন্য বালতি নিচে নামাল, তখন ইউসুফ (আঃ) তার দড়ি ধরে নিলেন। পানি সংগ্রাহক একটি সুদর্শন শিশু দেখে তাঁকে উপরে টেনে তুলল এবং অতি আনন্দিত হল।
[২] بضاعة বাণিজ্যের পণ্যকে বলা হয়। أسروه (লুকিয়ে রাখল) এর فاعل (কর্তা) কে? অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসার পণ্য হিসাবে কে লুকিয়ে রেখেছিল? এতে মতভেদ আছে। হাফেয ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত কর্মের কর্তা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদেরকে ধরেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, যখন বালতির সাথে ইউসুফ (আঃ) কূপ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন সেখানে তাঁর ভাইরাও উপস্থিত ছিলেন। তারপরেও তাঁরা প্রকৃত ঘটনা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা এ কথা বলেননি যে, এটা আমাদের ভাই। আর ইউসুফ (আঃ)ও হত্যার ভয়ে তাঁরা যে তাঁর ভাই এ কথা প্রকাশ করেননি। বরং তাঁর ভায়েরা তাঁকে বিক্রির পণ্য বললেও তিনি নিশ্চুপ থাকলেন এবং নিজেকে বিক্রি হওয়াটাই পছন্দ করলেন। সুতরাং সেই পানি সংগ্রাহক কাফেলার লোকদেরকে সুসংবাদ শুনালো যে, একটি ছেলে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই কথা পূর্ব আলোচনার সাথে মিলে না। (বরং খাপছাড়া মনে হয়।) এর বিপরীত ইমাম শওকানী (রঃ) أسروه শব্দটির কর্তা পানি সংগ্রাহক ও তার সাথীদেরকে ধরে বলেছেন যে, তারা এ কথা প্রকাশ করেনি যে, এই ছেলেটি কূপে পাওয়া গেছে। কারণ তা প্রকাশ করলে কাফেলার সমস্ত লোকই ঐ "বাণিজ্যিক পণ্যে" শরীক হয়ে যেত। বরং কাফেলার লোকদের নিকট গিয়ে এ কথা বলল যে, কূপের মালিক তাদেরকে এই ছেলেটি মিশরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করার জন্য দিয়েছে। কিন্তু সব থেকে উত্তম উক্তি হল এই যে, কাফেলার লোকরা ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসাপণ্য গণ্য করে লুকিয়ে নিয়েছিল, যাতে তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা তাঁর খোঁজে এখানে এসে না যায় এবং বিনা মূল্যে তাকে ফিরিয়ে দিতে না হয়। কারণ কূপে একজন ছেলে পাওয়া যাওয়া, এই কথাই প্রমাণ করে যে, সে কোন স্থানীয় কোন বাসিন্দা হবে এবং খেলাধূলা করতে করতে কূপে পড়ে গিয়ে থাকবে।
[৩] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে যা কিছু ঘটছিল, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। তার পরেও আল্লাহ তাআলা এত কিছু এই জন্য হতে দিলেন, যাতে আল্লাহর লিখিত ভাগ্য বাস্তবায়িত হয়। তাছাড়া এতে নবী (সাঃ) এর জন্য সান্ত্বনা রয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বর (সাঃ)-কে জানাচ্ছেন যে, তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা অবশ্যই তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং আমি তা থেকে তাদেরকে বিরত রাখার ক্ষমতাও রাখি। কিন্তু আমি তাদেরকে সেইরূপ ঢিল দিচ্ছি, যেরূপ ইউসুফের ভাইদেরকে ঢিল দিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি ইউসুফকে মিসরের রাজ-সিংহাসনে বসিয়েছিলাম এবং তার ভাইদেরকে অক্ষম ও অসহায় করে তার দরবারে উপস্থিত করেছিলাম। হে নবী! এমন এক সময় আসবে, যখন তোমারও এরূপ মাথা উঁচু হবে এবং এই কুরায়েশ দলপতিরা তোমার ভ্রূর ইঙ্গিত ও মুখের কথার অপেক্ষায় থাকবে। সুতরাং মক্কা বিজয়ের দিন উক্ত অবস্থা অতি সত্ত্বর এসে গিয়েছিল।
ইউসুফ 12:20
আর তারা তাকে স্বল্প মূল্যে মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল।[১] তারা ছিল এতে নির্লোভ। [২]
[১] ভাইরা অথবা অন্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী কাফেলার লোকেরা বিক্রি করেছিল।
[২] কারণ কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু, যা মানুষ বিনা পরিশ্রমে অর্জন করে, তা যতই দামী হোক না কেন, তার সঠিক মূল্য মানুষের নিকট পরিষ্ফুটিত হয় না।
ইউসুফ 12:21
মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে[১] বলল, ‘সম্মানজনকভাবে এর থাকবার ব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।’ আর এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম[২] তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।
[১] বলা হয় যে, সে সময় মিসরের বাদশাহ ছিলেন রাইয়ান বিন অলীদ এবং মিসরের 'আযীয' যিনি ইউসুফকে খরিদ করেছিলেন, তিনি বাদশার খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর স্ত্রীর নাম অনেকে রাঈল এবং অনেকে যুলাইখা বলেছেন। আর আল্লাই ভালো জানেন।
[২] অর্থাৎ, যেমন আমি ইউসুফ (আঃ)-কে কূপ থেকে, যালেম ভাইদের কবল থেকে পরিত্রাণ দিলাম, অনুরূপ আমি ইউসুফকে মিসরের ভূখন্ডে একটি উৎকৃষ্ট বাসস্থান প্রদান করলাম।
ইউসুফ 12:22
সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম।[১] আর এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
[১] অর্থাৎ, নবুঅত অথবা নবী হওয়ার পূর্বের জ্ঞান ও বিচার ক্ষমতা।
ইউসুফ 12:23
সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।)’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ [১]
[১] এখান থেকে ইউসুফ (আঃ)-এর এক নতুন পরীক্ষা আরম্ভ হল। মিসরের আযীযের স্ত্রী, যাকে তার স্বামী বলেছিল যে, ইউসুফকে সম্মানের সাথে রাখবে, সে ইউসুফ (আঃ)-এর রূপ-সৌন্দর্য দেখে আসক্তা হয়ে পড়ল এবং উপযাচিকা হয়ে তাঁকে ব্যভিচারের দিকে আহবান করতে লাগল। কিন্তু ইউসুফ (আঃ) তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকলেন।
ইউসুফ 12:24
নিশ্চয় সেই মহিলা তার প্রতি আসক্তা হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত;[১] যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।[২] তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম।[৩] অবশ্যই সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।
[১] কোন কোন মুফাসসির এর এই মর্মার্থ বর্ণনা করেছেন যে, (لَولاَ أَن رَّأى بُرْهَانَ رَبِّهِ) বাক্যটির পূর্ব বাক্য (وَهَمَّ بِهَا) এর সাথে কোন সম্পর্ক নেই; বরং তার উত্তর ঊহ্য আছে। অর্থাৎ বাক্যটি হল এরূপ لَولاَ أنْ رَأى بُرْهَانَ رَبِّهِ لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِهِ অর্থ হবে, "যদি ইউসুফ আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করত, তাহলে যে কাজের সংকল্প সে করেছিল তা করে বসত।" এই অর্থই অধিকাংশ মুফাসসিরগণের তফসীর সমর্থন করে। আর যাঁরা তা لَولاَ শব্দের সাথে জুড়ে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, (সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত; যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত। অর্থাৎ) ইউসুফ (আঃ) (নিদর্শন দেখার ফলে মন্দের) কোন সংকল্পই করেননি। কিন্তু পূর্বেকার তফসীরবিদগণ তা আরবীর বর্ণনাভঙ্গির পরিপন্থী বলেছেন এবং এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)ও সংকল্প করে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রথমতঃ এই সংকল্প ও ইচ্ছা এখতিয়ারী ছিল না; বরং আযীযের স্ত্রীর প্রলোভন ও চাপ তাতে প্রভাবশীল ছিল। দ্বিতীয়তঃ কোন পাপ করার ইচ্ছা করাটা পবিত্রতার পরিপন্থী নয়; বরং পাপ কাজে লিপ্ত হওয়া পবিত্রতার পরিপন্থী। (ফাতহুল কাদীর, ইবনে কাসীর) কিন্তু সত্যানুসন্ধানী মুফাসসিরগণ এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, যদি আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট প্রমাণ না দেখতেন, তবে ইউসুফ (আঃ)ও পাপের সংকল্প করে নিতেন। অর্থাৎ, তিনি তাঁর প্রভুর স্পষ্ট প্রমাণ দেখেছিলেন, ফলে আযীযের স্ত্রীর নিকটবর্তী হওয়ার ইচ্ছাই করেননি। বরং পাপের দিকে আহবান শুনেই مَعَاذَ الله বলেছিলেন। অবশ্য পাপ-ইচ্ছা না করার অর্থ এ নয় যে, তাঁর মনে কোন কামনা ও বাসনাই জাগ্রত হয়নি। মনের ভিতর পাপের কামনা ও বাসনা জাগা, আর তার ইচ্ছা করে নেওয়া দু'টি আলাদা জিনিস। প্রকৃতত্ব এই যে, যদি কারো মনের ভিতর একেবারেই কামনা ও বাসনা না জাগে, তাহলে এমন ব্যক্তির এরূপ পাপকর্ম থেকে বিরত থাকা কোন কৃতিত্ব নয়। কৃতিত্ব তো তখনই হবে, যখন মনের মাঝে চাহিদা ও বাসনা সৃষ্টি হবে এবং মানুষ তার উপর নিয়ন্ত্রণ এনে তা থেকে বিরত থাকবে। ইউসুফ (আঃ) এরূপই পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহ্যের নযীরবিহীন কৃতিত্ব পেশ করেছেন।
[২]প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী এখানে لَولاَ শব্দটির জওয়াব (উত্তর) ঊহ্য আছে, আর তা হল (لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِه) অর্থাৎ, যদি ইউসুফ (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করতেন, তবে তিনি যা ইচ্ছা করেছিলেন, তা করে বসতেন। উক্ত নিদর্শন কি ছিল? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। উদ্দেশ্য হল যে, প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এমন কোন জিনিস তাকে দেখানো হয়েছিল যে, তা প্রত্যক্ষ করে তিনি যৌন-কামনা সংবরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বরগণকে এইভাবেই হিফাযত করে থাকেন।
[৩] অর্থাৎ, যেরূপ আমি ইউসুফ (আঃ)-কে নিদর্শন দেখিয়ে, কুকর্ম বা তার ইচ্ছা থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম, অনুরূপ আমি তাকে সর্ববিষয়ে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করেছি। কারণ সে আমার মনোনীত ও বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইউসুফ 12:25
তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল[১] এবং মহিলাটি পিছন হতে (তাকে টেনে রুখতে গিয়ে) তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারা মহিলাটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলাটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে কুকর্ম কামনা করে, তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ব্যতীত কি দন্ড হতে পারে?’ [২]
[১] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এ নারী মন্দকর্মের ইচ্ছায় অটল, তখন তিনি বাইরে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে পালাতে লাগলেন, আর তাঁকে ধরার জন্য সে নারীও তাঁর পশ্চাতে দৌড়তে লাগল। এইভাবে উভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল।
[২] অর্থাৎ স্বামীকে দেখেই সে (নারী) সতী-সাধী সেজে গেল এবং ইউসুফকে সর্বপ্রকার দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর জন্য শাস্তিও ঠিক করে ফেলল। অথচ প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত ছিল। দোষী সে নিজেই ছিল। আর ইউসুফ (আঃ) একেবারে নিষ্পাপ ছিলেন। তিনি সেই কুকর্ম থেকে বাঁচতে আগ্রহী ও সচেষ্ট ছিলেন।
ইউসুফ 12:26
সে (ইউসুফ) বলল, ‘সেই আমার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিল।’[১] মহিলাটির পরিবারের একজন সাক্ষী[২] সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে মহিলাটি সত্য কথা বলেছে এবং সে মিথ্যাবাদী।
[১] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এ মহিলা সমস্ত দোষ তাঁর উপরই চাপিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি আসল রহস্য বর্ণনা করে বললেন যে, সেই আমাকে কুকর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছে। আর আমি তার স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য বাইরের দরজার দিকে ছুটে পালিয়ে এসেছি।
[২] এটা তারই বংশের কোন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিল, যে উক্ত ফায়সালা করেছিল। ফায়সালাকে এখানে شهد (সাক্ষ্য দিল) শব্দে এই জন্য বুঝানো হয়েছে যে, তখনও বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। কোন কোন বর্ণনায় একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর সাক্ষ্যদানের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু তা সহীহ সূত্রে সাব্যস্ত নয়। সহীহাইন (বুখারী-মুসলিমে) তিনজন দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বলার হাদীস আছে। যাদের মধ্যে এ চতুর্থ শিশু নয়, যার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়।
ইউসুফ 12:27
আর যদি তার জামা পিছন দিক হতে ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে মহিলাটি মিথ্যা কথা বলেছে এবং সে সত্যবাদী।’
ইউসুফ 12:28
সুতরাং গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পিছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়েছে, তখন সে বলল, ‘এটা তোমাদের (নারীদের) ছলনা; নিশ্চয় তোমাদের ছলনা বিরাট! [১]
[১] এ কথাটি মিসরের আযীযের ছিল, তিনি নিজ স্ত্রীর কুস্বভাব দেখে নারী সম্পর্কে (আমভাবে) এই মন্তব্য করেছিলেন। এটা আল্লাহর মন্তব্য নয়। আর না এই উক্তি সকল নারীর ক্ষেত্রে সঠিক। সুতরাং তা সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে নারী মাত্রই সকলকে ছলনাময়ী ও চক্রান্তের বেড়াজাল বলে চিহ্নিত করা কখনই কুরআনের উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকে উক্ত বাক্য দ্বারা নারী সম্পর্কে এরূপ কথাবার্তা বলে থাকে।
ইউসুফ 12:29
হে ইউসুফ! তুমি এ বিষয়কে উপেক্ষা কর[১] এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তুমিই অপরাধিনী।’[২]
[১] অর্থাৎ, এ কথা প্রচার করো না।
[২] এতে বুঝা যায় যে, মিসরের আযীযের নিকট ইউসুফ (আঃ) যে নির্দোষ তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ইউসুফ 12:30
নগরে কতিপয় মহিলা বলল, ‘আযীযের স্ত্রী তার যুবক দাসের কাছে যৌন-মিলন কামনা করে; তার প্রেম তাকে উন্মত্ত করে ফেলেছে। আমরা তো তাকে দেখছি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।’ [১]
[১] যেরূপ পর্দা দ্বারা সুবাস গোপন করা যায় না, প্রেম-ভালোবাসার বিষয়টিও অনুরূপ। মিসরের আযীয ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত ঘটনা ভুলে যাওয়ার জন্য বললেন। আর সত্যই তিনি তাঁর পবিত্র মুখে এর কোন চর্চাই করেননি। তার পরেও ঘটনাটি জঙ্গলের আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল এবং মিসরের মহিলাদের মাঝে এর দারুণ চর্চা হতে লাগল। মহিলারা আশ্চর্য হল এই ভেবে যে, (স্বামী থাকতেও যুলাইখা অন্যাসক্তা!) যদি প্রেম করার খুব ইচ্ছাই ছিল, তাহলে একজন সুদর্শন (স্বাধীন) পুরুষের সাথে করত। সে আপন দাসের প্রতি প্রেমে উন্মত্তা হয়ে পড়েছে! এটা তার বড় মূর্খামি!
ইউসুফ 12:31
মহিলাটি যখন তাদের চক্রান্তের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল[১] এবং একটি বৈঠকের আয়োজন করল।[২] তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিল এবং তাকে বলল, ‘তাদের সামনে বের হও।’[৩] অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তারা তার (রূপ-মাধুর্যে) অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল।[৪] তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! এ তো মানুষ নয়। এ তো এক মহিমান্বিত ফিরিশতা!’ [৫]
[১] মিসরের মহিলাদের পশ্চাতে সমালোচনা এবং নিন্দা ও ভৎর্সনাকে 'চক্রান্ত' বলা হয়েছে। যার ফলে কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, শহরের সেই নারীদের নিকটেও ইউসুফ (আঃ)-এর অপরূপ সৌন্দর্যের সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারাও কোনক্রমে সেই সৌন্দর্যের অধিকারী (ইউসুফ)-কে দেখতে চাচ্ছিল। সুতরাং তারা তাদের সেই চক্রান্ত (গুপ্ত কৌশলে) কৃতকার্য হয়ে গেল। যেহেতু আযীয-পত্নী এই কথা প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলাদেরকে যিয়াফত করল এবং তাদের ভোজনের ব্যবস্থা করল যে, আমি যার প্রতি আসক্তা হয়ে পড়েছি, সে শুধু একজন দাস বা সাধারণ ব্যক্তি নয়; বরং সে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক এমন অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী যে, তাকে দেখে মন মুগ্ধ ও প্রাণ লুণ্ঠিত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
[২] অর্থাৎ, এমন বসার স্থান নির্দিষ্ট করল, যেখানে হেলান-বালিশ রাখা হয়ে ছিল। যেমন বর্তমানে আরবদের মাঝে এরূপ মজলিস প্রসিদ্ধ আছে, এমনকি হোটেল ও রেস্তরাঁতেও তা রাখা হয়।
[৩] অর্থাৎ, ইউসুফ (আঃ)-কে প্রথমে আড়ালে রাখা হয়েছিল। অতঃপর যখন উপস্থিত সব মহিলারা (ফল বা অন্য কিছু কেটে খাওয়ার জন্য) ছুরি হাতে নিল, তখন আযীয-পত্নী (যুলাইখা) ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত মজলিসে আসার আদেশ দিল।
[৪] অর্থাৎ, ইউসুফের মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে প্রথমতঃ তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার কথা স্বীকার করল এবং দ্বিতীয়তঃ তারা নিজেরা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ল যে, (ফল কাটার জায়গায়) নিজ নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসল, ফলে তাদের হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে গেল। হাদীসে এসেছে যে, ইউসুফকে (সৃষ্টির) অর্ধেক রূপ দান করা হয়েছিল। (মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
[৫] এর অর্থ এ নয় যে, ফিরিশতাগণ আকার-আকৃতিতে মানুষ থেকে অধিক সুন্দর। কারণ, ফিরিশতাদেরকে তো মানুষ দেখেইনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা মানুষ সম্পর্কে নিজেই কুরআন মাজীদে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি তাদেরকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা তীন) সেই মহিলাগণ ইউসুফ (আঃ)-কে 'মানুষ নয়' এই জন্য বলেছিল যে, তারা তখন যেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ব্যক্তিকে দেখেছিল, সেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী কোন মানুষকে কখনো দেখেনি এবং তারা এই জন্য তাঁকে ফিরিশতা বলেছিল যে, সাধারণতঃ মানুষ মনে করে যে, ফিরিশতাগণ রূপ ও গুণের দিক থেকে এমন হন, যা মানুষ থেকে ঊর্ধ্বে। এ থেকে বুঝা গেল যে, নবীগণের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র গুণাবলীর কারণে তাঁদেরকে মানব-বংশ থেকে বের করে 'নূরের সৃষ্টি' বলা সর্বযুগের এমন মানুষদের স্বভাব ছিল, যারা নবুঅত ও তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে অজ্ঞ।
ইউসুফ 12:32
সে বলল, ‘এই সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করেছ।[১] আমি তো তার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছি; কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আমি তাকে যা আদেশ করি, সে যদি তা না করে, তাহলে অবশ্যই সে কারারুদ্ধ হবে এবং লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ [২]
[১] যখন আযীযের স্ত্রী দেখল যে তার ছলনা ও চক্রান্ত সফল ও কৃতকার্য হয়েছে এবং ইউসুফের রূপ দেখে সমালোচক মহিলারা অভিভূত হয়ে পড়েছে, তখন বলতে লাগল যে, তাকে এক ঝলক দেখাতেই তোমাদের এ অবস্থা হয়ে গেল, তাহলে কি এখন তার প্রেম-জালে আবদ্ধ হওয়ার কারণে তোমরা আমার নিন্দা করবে? এ তো সেই তরুণ, যার সম্পর্কে তোমরা আমার নিন্দা করেছ।
[২] সমালোচক মহিলাদেরকে অভিভূত হতে দেখে তার স্পর্ধা আরো বেড়ে গেল এবং লজ্জা-শরমের সমস্ত পর্দা খুলে দিয়ে সে তার অসৎ কামনা আরো একবার প্রকাশ করল। (এবং এবারে অস্বীকার অবস্থায় তাকে হুমকি দেখানো হল।)
ইউসুফ 12:33
ইউসুফ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই মহিলারা আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়। তুমি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না কর, তাহলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ [১]
[১] ইউসুফ (আঃ) মনে মনে উক্ত দু'আ করেছিলেন। কারণ মুমিনের জন্য দু'আ একটি হাতিয়ার। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে একজন হল সেই ব্যক্তি, যাকে একজন সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী কুকর্ম করার জন্য আহবান করে। কিন্তু সে তাকে এই বলে উত্তর দেয় যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।"
(বুখারী ও মুসলিম)
ইউসুফ 12:34
অতঃপর তার প্রতিপালক তার আহবানে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
ইউসুফ 12:35
নিদর্শনাবলী দেখার পরও তাদের মনে হল যে, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে। [১]
[১] নির্দোষিতা ও পবিত্রতা প্রকাশ হওয়ার পরেও ইউসুফ (আঃ)-কে জেলখানায় পাঠানোতে আযীযের দৃষ্টিতে এই যুক্তি ও কল্যাণ থাকতে পারে যে, তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছিলেন, যাতে সে পুনরায় ইউসুফ (আঃ)-কে নিজ প্রেম-জালে ফাঁসানোর চেষ্টা না করতে পারে, যেমন তার ইচ্ছা তাই ছিল।
ইউসুফ 12:36
তার সাথে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি (আঙ্গুর) নিঙড়ে মদ তৈরী করছি’ এবং অপরজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।’ [১]
[১] উক্ত দুই যুবক রাজকর্মচারী ছিল। প্রথমজন শারাব পান করানোর কাজ করত এবং দ্বিতীয়জন রুটি তৈরী করত। কোন কারণে উভয়কে জেলখানায় বন্দী করা হয়েছিল। ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন। দাওয়াত ও তবলীগের সাথে সাথে ইবাদত ও আচরণ, পরহেযগারী ও সচ্চরিত্রতার দিক থেকে জেলখানার অন্যান্য বন্দীদের থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) করার বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। উক্ত বন্দীদ্বয় যখন স্বপ্ন দেখল, তখন তারা ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট এল এবং বলল, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি। আপনি আমাদেরকে আমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দিন। কেউ কেউ محسن শব্দটির অর্থ এই বলেছেন যে, আপনি স্বপ্নের ভাল তাৎপর্য বর্ণনা করতে পারেন।
ইউসুফ 12:37
ইউসুফ বলল, ‘তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয়, তা আসবার পূর্বে আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দেব, এ জ্ঞান আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তারই অন্তর্ভুক্ত।[১] যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরলোকে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি। [২]
[১] অর্থাৎ, আমি যে তাৎপর্য বলব, তা জ্যোতিষী ও গণকদের মত ধারণা বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, যাতে ঠিক ও ভুল উভয়েরই সম্ভাবনা থাকে। বরং আমার তাৎপর্য সুদৃঢ় জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হবে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে প্রদান করা হয়েছে। যাতে ভুলের কোন অবকাশ নেই।
[২] এটা ইলহাম ও আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান লাভের কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আমি সেই লোকদের মতবাদ বর্জন করেছি, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না। এরই বদৌলতে আমার উপর আল্লাহর এই অনুগ্রহ হয়েছে।
ইউসুফ 12:38
আমি আমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক এবং ইয়াকূবের দ্বীন অনুসরণ করি।[১] আল্লাহর সাথে কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নয়।[২] এটা আমাদের এবং সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
[১] পিতামহ-প্রপিতামহকেও পিতা বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ তাঁরাও পিতা। পুনরায় পর্যায়ক্রমে প্রপিতামহ ইবরাহীম (আঃ) তাঁরপর পিতামহ ইসহাক (আঃ) এবং তাঁরপর পিতা ইয়াকূব (আঃ)-কে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, প্রথমে প্রথম পুরুষ, অতঃপর দ্বিতীয় পুরুষ ও সবশেষে তৃতীয় পুরুষকে উল্লেখ করেছেন।
[২] সেই তওহীদের দাওয়াত এবং শিরকের খন্ডন; যা প্রত্যেক নবীর বুনিয়াদী ও প্রাথমিক শিক্ষা এবং দাওয়াত ছিল।
ইউসুফ 12:39
হে আমার কারা-সঙ্গীদ্বয়![১] ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? [২]
[১] 'কারাসঙ্গী' বা জেলখানার সাথী এই জন্য বলেছেন যে, এরা সকলে দীর্ঘ সময় ধরে জেলখানায় বন্দী হয়ে ছিল।
[২] অর্থাৎ, সত্তা, গুণ ও সংখ্যার দিক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপালক। অর্থাৎ, সেই সকল (কল্পিত) প্রতিপালক উত্তম, যারা নিজ নিজ সত্তার দিক থেকে এক অপর হতে আলাদা, গুণের দিক থেকে এক অপর হতে পৃথক এবং সংখ্যার দিক থেকেও বিভিন্ন, নাকি সেই আল্লাহ উত্তম, যিনি নিজ সত্তা ও গুণে একক, যাঁর কোন অংশীদার নেই এবং তিনি সকলের উপর পরাক্রমশালী ও ক্ষমতাবান?
ইউসুফ 12:40
তাকে ছেড়ে তোমরা শুধু এমন কতকগুলি নামের উপাসনা করছ যা তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখে নিয়েছ। এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি।[১] বিধান দেওয়ার অধিকার শুধু আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারোও উপাসনা করবে না। এটাই সরল-সঠিক দ্বীন।[২] কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। [৩]
[১] এর এক অর্থ এই যে, তাদের 'উপাস্য' নামটি তোমরা নিজেরাই দিয়েছ। প্রকৃতপক্ষে না তারা উপাস্য, আর না সে সম্পর্কে কোন প্রমাণ আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেই উপাস্যদের বিভিন্ন নাম যা তোমরা দিয়ে রেখেছ; যেমন বর্তমানে, খাজা গরীব নেওয়ায, গঞ্জ বখশ, কিরনী ওয়ালা, কারমাঁ ওয়ালা, গওসে আযম, দস্তগীর, মুশকিল কুশা (অনুরূপ দাতা সাহেব, খাজাবাবা, সাঁইবাবা) ইত্যাদি এসব তোমাদের নিজেদের মনগড়া নাম, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এর কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করা হয়নি।[২] এই দ্বীন, যার দিকে আমি তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি, যাতে কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করার কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক ও সুদৃঢ়, যা অবলম্বন করার আদেশ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।[৩] যার কারণে অধিকাংশ মানুষ শির্কে লিপ্ত হয়, মহান আল্লাহ বলেন,{وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللّهِ إِلاَّ وَهُم مُّشْرِكُونَ} অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৬){وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ} অর্থাৎ, তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৩)
ইউসুফ 12:41
হে আমার কারাসঙ্গীদ্বয়![১] তোমাদের একজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে তার প্রভুকে মদ্য পান করাবে[২] এবং অপরজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে শূলবিদ্ধ হবে, অতঃপর তার মস্তক হতে পাখি আহার করবে।[৩] যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।’ [৪]
[১] তওহীদের নসীহত করার পর এখন ইউসুফ (আঃ) তাদের বর্ণনাকৃত স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা করছেন।
[২] এ সেই ব্যক্তি যে স্বপ্নে নিজেকে আঙ্গুরের জুস তৈরী করতে দেখেছিল। এর পরেও তিনি উভয়ের মধ্যে কোন একজনকে নির্দিষ্ট করেননি, যাতে যে শূলবিদ্ধ হবে, সে আগে থেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে।
[৩] এ সেই ব্যক্তি যে স্বপ্নে নিজ মাথার উপর রুটির ঝুড়ি বহন করতে দেখেছিল।
[৪] অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্ত যা আমি স্বপ্নের তাৎপর্য হিসাবে বর্ণনা করেছি, তা পূর্ব থেকেই স্থিরীকৃত হয়ে আছে। নিঃসন্দেহে তা বাস্তবায়িত হবে। যেমন হাদীসে আছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, যতক্ষণ স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা না করা হয়, ততক্ষণ তা পাখির পায়ে (অস্থিতিশীল) থাকে। অতঃপর যখন তার তাৎপর্য বর্ণনা করে দেওয়া হয়, তখন তা বাস্তবে সংঘটিত হয়।" (আহমাদ, ইবনে কাসীর)
ইউসুফ 12:42
ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।’ কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয় বলবার কথা ভুলিয়ে দিল; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থেকে গেল। [১]
[১] بضع শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার জন্য ব্যবহার হয়। অহাব বিন মুনাব্বেহ বলেন, আইয়ুব (আঃ) তাঁর ব্যাধি অবস্থায় এবং ইউসুফ (আঃ) জেলখানায় সাত বছর ছিলেন। আর বুখতে নাসরের আযাবও সাত বছর ছিল। পক্ষান্তরে অনেকে বলেন, বারো বছর এবং অনেকের মতে চৌদ্দ বছর জেলখানাতে ছিলেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
ইউসুফ 12:43
রাজা বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী; ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।’
ইউসুফ 12:44
তারা বলল, ‘এটা আবোল-তাবোল স্বপ্ন এবং আমরা এরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই।’ [১]
[১] أضغاثٌ শব্দটি ضغثٌ এর বহুবচন, যার অর্থ হল ঘাসের গোছা। أحلامٍ শব্দটি حُلم এর বহুবচন যার অর্থ হল স্বপ্ন। أضغاث أحلام এর অর্থ হবে, অর্থহীন স্বপ্ন বা বিক্ষিপ্ত খেয়াল, যার কোন ব্যাখ্যা হয় না। উক্ত স্বপ্ন মিসরের সেই রাজা দেখলেন, আযীয যাঁর মন্ত্রী ছিলেন। এই স্বপ্ন দ্বারা আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে জেল থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। সুতরাং রাজার সভাসদ, জ্যোতিষী ও গণকমন্ডলী সকলে সেই জটিল স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা করতে অক্ষমতা প্রকাশ করল। কেউ কেউ বলেন, জ্যোতিষী প্রভৃতিদের অক্ষমতা প্রকাশ করার অর্থ, তাদের আদৌ ব্যাখ্যার জ্ঞান ছিল না। পক্ষান্তরে কিছু তফসীরবিদ বলেন, তারা ব্যাখ্যা জানতো না এমন নয়, আর না তারা না জানার কথা বলেছে, বরং তারা কেবল উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করার অক্ষমতা প্রকাশ করেছে।
ইউসুফ 12:45
দু’জন কারা-বন্দীর মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পরে তার স্মরণ হল সে বলল, ‘আমি এর তাৎপর্য তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠিয়ে দাও।’ [১]
[১] এ ব্যক্তি জেলখানার সঙ্গীদ্বয়ের একজন ছিল, যে অবিলম্বে ছাড়া পাবে। তাকে ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন যে, 'তুমি তোমার প্রভুর (মালিকের) নিকট আমার কথা বলবে, যাতে আমিও মুক্ত হতে পারি।' সেই ব্যক্তির হঠাৎ স্মরণ হল এবং সে বলল, 'আমাকে সময় দাও, আমি তোমাদেরকে এই স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দেব।' সুতরাং সেখান থেকে বের হয়ে সে সোজা ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট গেল এবং স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তার তাৎপর্য জানতে চাইল।
ইউসুফ 12:46
সে বলল, ‘হে ইউসুফ! হে মহা সত্যবাদী! সাতটি স্থূলকায় গাভী, ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে আপনি আমাদেরকে ব্যাখ্যা দিন, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং যাতে তারা অবগত হতে পারে।’
ইউসুফ 12:47
ইউসুফ বলল, ‘তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে, তা ব্যতীত সমস্ত শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে।
ইউসুফ 12:48
এরপর আসবে সাতটি কঠিন (দুর্ভিক্ষের) বছর, এই সাত বছর যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকে তা খাবে;[১] শুধু সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। [২]
[১] আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা-জ্ঞান প্রদান করেছিলেন, ফলে তিনি অবিলম্বে সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুঝতে পারলেন। তিনি সাতটি মোটা-তাজা গাভী দ্বারা এমন সাতটি বছর অর্থ নিলেন, যে বছরগুলিতে খুব ভাল ফসল উৎপন্ন হবে। আর সাতটি শীর্ণকায় গাভী দ্বারা তার বিপরীত দুর্ভিক্ষের সাতটি বছর অর্থ নিলেন। অনুরূপ সাতটি সবুজ শীষ দ্বারা ব্যাখ্যা নিলেন যে, যমীনে অধিকহারে ফসল উৎপন্ন হবে এবং সাতটি শুষ্ক শীষ দ্বারা যমীনে সাত বছর ফসল উৎপন্ন না হওয়ার ব্যাখ্যা নিলেন। সেই সাথে তার জন্য কি ব্যবস্থা নিতে হবে তাও বলে দিলেন; বললেন, 'পর পর সাত বছর চাষাবাদ করবে এবং যে শস্য উৎপন্ন হবে, তা কেটে শীষ সহ জমা রাখবে; যাতে শস্য ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে। পরে যখন সাতটি দুর্ভিক্ষের বছর আসবে, তখন সে শস্য তোমাদের কাজে আসবে, যা তোমরা সঞ্চয় করে রাখবে।'
[২] مما تحصنون (যা তোমরা সংরক্ষণ করবে)এর অর্থ হল, সেই শস্যবীজ যা পুনরায় চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখবে।
ইউসুফ 12:49
এবং এরপর আসবে এক বছর, সেই বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সেই বছর মানুষ ফলের রস নিঙড়াবে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, দুর্ভিক্ষের সাতটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পর প্রচুর বৃষ্টি হবে, ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং তোমরা আঙ্গুর থেকে তার রস বের করবে, যায়তুন থেকে তেল বের করবে এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকে দুধ দোয়াবে। উক্ত ব্যাখ্যার সাথে স্বপ্নের খুব সূক্ষ্ণ সম্পর্ক আছে, যা একমাত্র সেই ব্যক্তিই বুঝতে পারে, যাকে আল্লাহ তাআলা সঠিক বুঝার ক্ষমতা দান করেছেন এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে তা প্রদান করেছিলেন।
ইউসুফ 12:50
রাজা বলল, ‘তোমরা ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এস।’[১] সুতরাং যখন দূত তার কাছে উপস্থিত হল, তখন সে বলল, ‘তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিল, তাদের অবস্থা কি?[২] আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্বন্ধে সম্যক অবগত।’
[১] উদ্দেশ্য এই যে, যখন সেই ব্যক্তি ব্যাখ্যা নিয়ে বাদশার নিকট গেল ও ব্যাখ্যা বর্ণনা করল, তখন সেই ব্যাখ্যা ও ইউসুফ (আঃ)-এর বলা তদবীর শ্রবণ করে বাদশাহ বড় প্রভাবিত হলেন এবং তিনি অনুমান করলেন যে, এই ব্যক্তি, যাঁকে বেশ কিছুদিন থেকে জেলে রাখা হয়েছে, তিনি অসাধারণ জ্ঞান, মর্যাদা ও উচ্চ যোগ্যতার অধিকারী। সুতরাং বাদশাহ তাঁকে দরবারে উপস্থিত করার জন্য আদেশ দিলেন।
[২] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এখন বাদশাহ সম্মান দিতে প্রস্তুত, তখন তিনি এইভাবে শুধু অনুগ্রহের পাত্র হয়ে জেল থেকে বের হওয়া পছন্দ করলেন না। বরং আপন চরিত্রকে উচ্চ এবং নিজের পবিত্রতাকে সাব্যস্ত করাকে প্রাধান্য দিলেন, যাতে পৃথিবীর সামনে তাঁর নির্মল চরিত্র ও সুউচ্চ মর্যাদা পরিষ্ফুটিত হয়ে যায়। কারণ একজন (দায়ী) আল্লাহর পথে আহবানকারীর জন্য এই পবিত্রতা ও মহান চরিত্র খুবই জরুরী।
ইউসুফ 12:51
রাজা মহিলাদেরকে বলল, ‘কী ব্যাপার তোমাদের? যখন তোমরা ইউসুফের কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিলে, (তখন কি সে সম্মত হয়েছিল?)’ তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! আমরা তার মধ্যে কোন দোষ দেখিনি।’[১] আযীযের স্ত্রী বলল, ‘এক্ষণে সত্য প্রকাশ পেয়ে গেল। আমিই তার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিলাম, আর সে অবশ্যই সত্যবাদী। [২]
[১] বাদশার জিজ্ঞাসাবাদে সমস্ত মহিলা ইউসুফ (আঃ) এর পবিত্রতার কথা স্বীকার করল।
[২] এখন আযীযের স্ত্রী যুলাইখারও এই কথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকল না। সে স্বীকার করল যে, ইউসুফ নির্দোষ এবং প্রেমের পয়গাম আমার পক্ষ থেকেই ছিল। ইউসুফের এই ত্রুটির সাথে কোন সম্পর্ক নেই।
ইউসুফ 12:52
এটা এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি[১] এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। [২]
[১] জেলখানাতে যখন ইউসুফ (আঃ)-কে এই সমস্ত সংবাদ জানানো হল, তখন তিনি তা শ্রবণ করে এই কথা বলেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি বাদশার নিকট গিয়ে এই কথা বলেছিলেন এবং কোন কোন তফসীরকারকের নিকট এটাও যুলাইখারই উক্তি ছিল। উদ্দেশ্য এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর অনুপস্থিতিতেও তাকে মিথ্যাভাবে অপবাদ দিয়ে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করব না। বরং আমানতদারীর চাহিদা সামনে রেখেই আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, আমি আমার স্বামীর খিয়ানত করিনি এবং কোন বড় পাপ করে বসিনি। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
[২] যে, সে আপন ছলনা ও চক্রান্তে সর্বদা কৃতকার্য থাকবে। বরং তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে ও সাময়িক হয়। পরিশেষে সত্য ও সত্যবাদীরই জয় হয়। সত্যবাদীদেরকে সাময়িক কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় মাত্র।
ইউসুফ 12:53
আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, [১] মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ, [২] কিন্তু সে নয় যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন।[৩] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
[১] এটা যদি ইউসুফ (আঃ)-এর উক্তি হয়, তাহলে এটা তাঁর পক্ষ থেকে আত্মবিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। কেননা এটা সুস্পষ্ট যে, সব দিক থেকেই তাঁর পবিত্রতা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। পক্ষান্তরে এটা যদি মিশরের বাদশার স্ত্রীর কথা হয়, (যেমন ইবনে কাসীরের মত) তাহলে তা বাস্তবের উপরই প্রতিষ্ঠিত। কেননা সে নিজের অপরাধ এবং ইউসুফ (আঃ)-কে ফুসলানো ও ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করানোর কথা স্বীকার করেছিল।
[২] এটা সে তার নিজের কৃত অপরাধের কারণ উল্লেখ করে বলছে যে, মানুষের মনের প্রবণতা এমন যে, সে তাকে মন্দ কর্মের প্রতি প্ররোচিত করে এবং খারাপ কাজের দিকে অগ্রসর করে।
[৩] অর্থাৎ, মনের কুপ্রবণতা থেকে সেই বেঁচে থাকে, যার প্রতি আল্লাহর রহমত ও অনুকম্পা হয়। যেমন তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে বাঁচিয়ে নিলেন।
ইউসুফ 12:54
রাজা বলল, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এস, আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করব।[১] অতঃপর রাজা যখন তার সাথে কথা বলল, তখন বলল, ‘আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বাসভাজন।’ [২]
[১] যখন বাদশা আযীয (রাইয়ান বিন অলীদ)-এর সামনে ইউসুফ (আঃ)-এর জ্ঞান ও মর্যাদা সহ তাঁর চরিত্রের উৎকর্ষতা ও পবিত্রতাও প্রস্ফুটিত হয়ে গেল, তখন তিনি আদেশ করলেন যে, তাঁকে (ইউসুফ (আঃ)-কে) আমার কাছে পেশ কর; আমি তাঁকে আমার সঙ্গী (প্রিয়পাত্র) ও মন্ত্রী (পরামর্শদাতা) বানাতে চাই।
[২] مَكِيْنٌ অর্থাৎ মর্যাদার অধিকারী এবং أمِيْنٌ (বিশ্বস্ত) অর্থাৎ রাষ্ট্র রহস্যবিদ।
ইউসুফ 12:55
সে বলল, ‘আমাকে দেশের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করুন।[১] নিশ্চয়ই আমি সুসংরক্ষণকারী, সুবিজ্ঞ।’ [২]
[১] خَزَائِنُ শব্দটি خِزَانَةٌ শব্দের বহুবচন। خِزَانَةٌ এমন স্থানকে বলা হয় যেখানে জিনিসপত্র হিফাযতে রাখা হয়। خَزَائِنُ الْأرْضِ বলতে সেই সব গুদামকে বুঝানো হয়েছে, যেখানে রসদ-শস্য জমা করা হতো অর্থাৎ, শস্যাগার। তিনি এ (শস্যাগারের) ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার ইচ্ছা এই জন্য প্রকাশ করলেন, যাতে (স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যা অনুসারে) আসন্ন দুর্ভিক্ষের জন্য উচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে শস্য সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে। সাধারণ অবস্থায় যদিও পদ বা নেতৃত্ব প্রার্থনা করা বৈধ নয়, কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর এই পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে জানা যায় যে, বিশেষ অবস্থায় যদি কোন লোক এটা মনে করে যে, জাতি ও রাষ্ট্রের উপর আগত সঙ্কটের উচিত ব্যবস্থার যথাযথ যোগ্যতা আমার মধ্যে বিদ্যমান, যা অন্যের মধ্যে নেই, তাহলে সে নিজের যোগ্যতা অনুসারে এই বিশেষ পদ প্রার্থনা করতে পারে। পক্ষান্তরে ইউসুফ (আঃ) মূলতঃ পদ প্রার্থনাই করেননি। বরং যখন মিসরের রাজা তাঁর সামনে এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন তিনি এমন পদ গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, যাতে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি জাতি ও রাষ্ট্রের সেবা সুন্দর ও সহজভাবে করতে পারেন।[২] حفيظ অর্থাৎ, আমি শস্যাগারের এমনভাবে সুরক্ষা করব যে, আমি কখনো তার অপব্যয় ঘটতে দিব না। عَلِيْمٌ অর্থাৎ, শস্য জমা করা, ব্যয় করা এবং রাখার ও বের করার উত্তম জ্ঞান রাখি।
ইউসুফ 12:56
এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; সে ঐ দেশে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত।[১] আমি যাকে ইচ্ছা তার প্রতি দয়া করে থাকি। আর আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না।[২]
[১] অর্থাৎ আমি ইউসুফ (আঃ)-কে ঐ দেশের উপর এমন শক্তি ও কৌশল প্রদান করলাম যে, মিসরের রাজা তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতেন এবং তিনি মিসরের মাটিতে এমন অধিকার প্রয়োগ করতেন, যেমন কোন মানুষ নিজ গৃহে প্রয়োগ করে থাকে। তিনি যেখানে ইচ্ছা সেখানে অবস্থান করতেন, পুরা মিসর ছিল তাঁর পরিপূর্ণ অধীনস্থ।
[২] এটা যেন তাঁর সেই সবরের সুফল, যা তিনি ভাইদের অন্যায়-অত্যাচারের উপর করেছিলেন এবং ঐ সুদৃঢ় পদক্ষেপের (বদলা ছিল) যা তিনি যুলাইখার পাপের আহবানের মোকাবিলায় এখতিয়ার করেছিলেন এবং সেই দৃঢ়তার (বদলা ছিল), যা তিনি কয়েদখানার জীবনে অবলম্বন করেছিলেন। ইউসুফ (আঃ)-এর এই পদ সেই পদ ছিল, যার উপর ইতিপূর্বে মিসরের সেই রাজা অধিষ্ঠিত ছিলেন, যাঁর স্ত্রী ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছিল। কারো কারো মন্তব্য যে, উক্ত রাজা ইউসুফ (আঃ)-এর দা'ওয়াত ও তবলীগে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। অনুরূপ কারো কারো মন্তব্য যে, মিসরের রাজা ইতফীরের মৃত্যুর পর ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে যুলাইখার বিয়ে হয়েছিল এবং দুটি সন্তানও হয়েছিল; একজনের নাম আফরাইম এবং দ্বিতীয়জনের নাম মীশা ছিল। আফরাইমই ছিল ইউশা' বিন নূন ও আইউব (আঃ)-এর স্ত্রী 'রাহমাত'-এর পিতা। (তাফসীর ইবনে কাসীর) কিন্তু এ কথাটা কোন বিশ্বস্ত সূত্রে প্রমাণিত নয়, তাই বিবাহ সংক্রান্ত কথাটা বিশুদ্ধ বলে মনে হয় না। এ ছাড়া উক্ত মহিলার পক্ষ থেকে পূর্বে যে অসদাচরণ প্রদর্শিত হয়েছিল, তার কারণে এক নবী পরিবারের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম হওয়ার কথা নেহাতই অনুচিত মনে হচ্ছে।
ইউসুফ 12:57
অবশ্যই যারা বিশ্বাসী ও সাবধানী তাদের জন্য পরকালের পুরস্কারই উত্তম।
ইউসুফ 12:58
ইউসুফের ভাইগণ এল এবং তার নিকট উপস্থিত হল। সে তাদেরকে চিনল, কিন্তু তারা তাকে চিনতে পারল না। [১]
[১] এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন ফল-ফসল-সমৃদ্ধ সাতটি বছর সমাপ্ত হয়ে দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হল, যা মিশর দেশের সমস্ত এলাকা ও শহরকে আক্রমণ করল, এমনকি কানআন পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল, যেখানে ইয়াকূব (আঃ) ও ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা বসবাস রত ছিলেন। ইউসুফ (আঃ) এই দুর্ভিক্ষের জন্য সুকৌশলের সাথে যে সুব্যবস্থা নিয়েছিলেন তা সফল হল এবং শস্যপ্রাপ্তির জন্য সব দিক থেকে লোকজন তাঁর কাছে আসতে লাগল। ইউসুফ (আঃ)-এর প্রসিদ্ধি কানআন পর্যন্তও পৌঁছে গেল যে, মিসরের বাদশা এভাবে শস্য বিক্রি করছেন। সুতরাং পিতার আদেশে ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরাও বাড়ি থেকে পুঁজি নিয়ে শস্য প্রাপ্তির জন্য রাজদরবারে উপস্থিত হলেন, যেখানে ইউসুফ (আঃ) রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভায়েরা তাঁকে চিনতে পারেননি, কিন্তু তিনি তাঁদেরকে চিনে নিয়েছিলেন।
ইউসুফ 12:59
আর সে যখন তাদের খাদ্য-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন বলল, ‘তোমরা আমার নিকট তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে নিয়ে এস। তোমরা কি দেখছ না যে, আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দিই এবং আমিই উত্তম অতিথিপরায়ণ? [১]
[১] ইউসুফ (আঃ) অপরিচিত থেকে স্বীয় ভাইদেরকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলে তারা অন্যান্য কথা বলার সাথে সাথে এটাও বলে ফেলল যে, আমরা দশ ভাই এখানে উপস্থিত রয়েছি, কিন্তু আরো দুজন বৈমাত্রেয় ভাই আছে, তাদের একজন তো জঙ্গলে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয়জনকে আববা সান্ত্বনা স্বরূপ নিজের কাছে রেখে নিয়েছেন, আমাদের সাথে পাঠাননি। তখন ইউসুফ (আঃ) বললেন, আগামীতে তাকেও নিয়ে আসবে, তোমরা কি দেখ না যে, আমি মাপও পরিপূর্ণ দিচ্ছি এবং চমৎকাররূপে আতিথ্যও করছি।
ইউসুফ 12:60
কিন্তু তোমরা যদি তাকে আমার নিকট নিয়ে না আস, তাহলে আমার নিকট তোমাদের জন্য কোন খাদ্য-সামগ্রী থাকবে না এবং তোমরা আমার নিকটবর্তী হবে না।’ [১]
[১] লোভ দেওয়ার সাথে এটা ধমক ছিল যে, যদি তোমরা এগার নম্বর ভাইকে সাথে না নিয়ে আসো, তাহলে না তোমরা শস্য পাবে, আর না আমার পক্ষ থেকে আতিথ্যের সুব্যবস্থা থাকবে।
ইউসুফ 12:61
তারা বলল, ‘ওর বিষয়ে আমরা ওর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।’ [১]
[১] অর্থাৎ সেই ভাইকে নিয়ে আসার জন্য আমরা আব্বাকে উদ্ধুদ্ধ করব, আশা করি যে, আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা সফল হব।
ইউসুফ 12:62
ইউসুফ তার (কর্মচারী) যুবকদেরকে[১] বলল, ‘তাদের দেওয়া পণ্যমূল্য তাদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দাও;[২] যাতে ওরা স্বজনগণের নিকট ফিরে যাওয়ার পর তারা তা চিনতে পারে, তাহলে সম্ভবতঃ তারা পুনরায় ফিরে আসবে।’
[১] فِتْيَانٌ (যুবকগণ) শব্দ থেকে এখানে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, যারা রাজদরবারে ভৃত্য-চাকর এবং খাদেম-সেবক ও গোলাম-দাস হিসেবে নিযুক্ত ছিল।
[২] এর অর্থ সেই পণ্যমূল্য বা পুঁজি যা ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা শস্য ক্রয় করার জন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। رِحَالٌ (সফর সামান বা মালপত্র)-এর অর্থ তাদের ঐসব সরঞ্জাম যা তাদের সফরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। 'পুঁজি' গুপ্তভাবে তাদের সরঞ্জামে রেখে দেয়ার আদেশ এ জন্য দিয়েছিলেন যে, হয়তো দ্বিতীয়বার আসার জন্য তাদের কাছে পুঁজি না থাকলে এই পুঁজি নিয়েই চলে আসবে।
ইউসুফ 12:63
অতঃপর যখন তারা তাদের পিতার নিকট ফিরে এল, তখন বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য খাদ্য-সামগ্রী নিষিদ্ধ করা হয়েছে।[১] সুতরাং আমাদের সাথে আমাদের ভাইকে পাঠিয়ে দিন; যাতে আমরা খাদ্য-সামগ্রী পেতে পারি। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
[১] অর্থাৎ, আগামীর শস্যপ্রাপ্তি বিন্য়্যামীনকে পাঠানোর উপর নির্ভরশীল। যদি সে আমাদের সাথে যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে। আর যদি না যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে না। সুতরাং তাকে আমাদের সাথে অবশ্যই পাঠান, যেন গত বারের মত দ্বিতীয়বারও শস্য পাই। আর ইউসুফকে পাঠাবার সময় যে ভয় করেছিলেন, সে ধরনের ভয় করবেন না। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের।
ইউসুফ 12:64
সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে ওর সম্বন্ধে সেইরূপই বিশ্বাস করব, যেরূপ বিশ্বাস ওর ভাই সম্বন্ধে পূর্বে তোমাদেরকে করেছিলাম?[১] সুতরাং আল্লাহই শ্রেষ্ঠ রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ [২]
[১] অর্থাৎ, ইউসুফকেও সাথে নিয়ে যাবার সময় এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, কিন্তু যা কিছু হলো তা সকলের কাছে স্পষ্ট। এখন বল আমি তোমাদের প্রতি কিভাবে আস্থা রাখি?
[২] আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু শস্যের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, তাই পিতা বিনয়্যামীনকে তাদের সাথে পাঠাতে অস্বীকার করা উচিত মনে করলেন না এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তাকে পাঠাবার জন্য তৈরী হয়ে গেলেন।
ইউসুফ 12:65
যখন তারা তাদের মালপত্র খুলল, তখন তারা দেখতে পেল তাদের পণ্যমূল্য তাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করতে পারি?[১] এই তো আমাদের দেওয়া পণ্যমূল্য আমাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। পুনরায় আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী এনে দেব এবং আমরা আমাদের ভাইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করব এবং আমরা অতিরিক্ত আর এক উষ্ট্রী বোঝাই পণ্য আনব।[২] যা এনেছি তা পরিমাণে অল্প।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, বাদশাহ আমাদের যথারীতি আতিথ্যও করলেন এবং আমাদের পুঁজিও ফেরৎ দিলেন, তাঁর এই সদ্ব্যবহারের পর আর আমাদের কি চাই?
[২] কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিকে ততটা পরিমাণ শস্য দেওয়া হতো যতটা তার উট বহন করতে পারতো, বিনয়্যামীনের কারণে একটি উটের বোঝ পরিমাণ শস্য আরো বেশি পাওয়া যেতো।
[৩] يسير এর একটি ভাবার্থ এই যে, রাজার জন্য এক উটের বোঝা পরিমাণ শস্য দেয়া সহজ, কষ্টকর ব্যাপার নয়। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, ذلك দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই শস্যের দিকে যা তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল এবং يسير এর অর্থ অল্প, অর্থাৎ যে পরিমাণ শস্য আমরা সাথে নিয়ে এসেছি তা অল্প। বিন্য়্যামীনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে যদি বেশি পরিমাণে শস্য পাওয়া যায়, তাহলে তো ভাল কথা, আমাদের প্রয়োজনাদি ভালোরূপে পূরণ হয়ে যাবে।
ইউসুফ 12:66
পিতা বলল, ‘আমি ওকে কক্ষনো তোমাদের সাথে পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা তাকে আমার নিকট অবশ্যই ফিরিয়ে আনবে; তবে তোমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে সে কথা ভিন্ন।’[১] অতঃপর যখন তারা তাঁর নিকট অঙ্গীকার করল, তখন সে বলল, ‘আমরা যা কিছু বলছি, আল্লাহ তার বিধায়ক।’
[১] অর্থাৎ, তোমরা সকলে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড় অথবা তোমরা ধ্বংস কিংবা গ্রেপ্তার হয়ে যাও, যা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তোমরা অসমর্থ, তাহলে তা ভিন্ন কথা, উক্ত পরিস্থিতিতে তোমাদের ওযর গ্রহণযোগ্য হবে।
ইউসুফ 12:67
সে (ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (শহরের) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।[১] আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। বিধান আল্লাহরই।[২] আমি তাঁরই উপর নির্ভর করলাম এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা আল্লাহরই উপর নির্ভর করুক।’
[১] যখন বিনয়্যামীন সহ এগারো জন ভাই মিসর অভিমুখে রওয়ানা দিল, তখন তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কেননা একই পিতার এগারো জন পুত্র যারা দেহের উচ্চতা এবং আকার-আকৃতিতেও শ্রেষ্ঠ, যখন একসাথে একই স্থান অথবা দলবদ্ধভাবে কোথাও দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সাধারণতঃ লোকেরা আশ্চর্য এবং হিংসার দৃষ্টিতে দেখে, আর এটাই নজর লাগার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে বদনজর থেকে বাঁচাবার জন্য উপায় স্বরূপ এই নির্দেশনা দিলেন। নজর লাগা সত্য। এটি নবী (সাঃ) থেকে বহু বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন একটি হাদীসে আছে; الْعَيْنُ حَقٌّ অর্থাৎ নজর লাগা সত্য। (বুখারীঃ চিকিৎসা অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) এবং নবী (সাঃ) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য স্বীয় উম্মতকে কতিপয় উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস ভালো লাগে, তখন بَارَكَ اللهُ বলো। (মুঅত্ত্বা মালিক, আলবানীর তা'লীকাতে মিশকাত ১২৮৬নং) যার নজরে নজর লাগে, তাকে গোসল করতে বলা এবং তার গোসলের এই পানি সেই ব্যক্তির শরীরে ঢালা যাকে নজর লেগেছে। (পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি) অনুরূপ ﴿مَا شَاءَ اللهُ لاَ قُوَّةَ إلاَّ بِالله﴾ِ পড়া কুরআন থেকে প্রমাণিত। (সূরা কাহফ ১৮:৩৯) ﴿قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ﴾ এবং ﴿ قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ﴾ নজর লাগার চিকিৎসায় পড়ে ফুঁক দেওয়া উচিত। (তিরমিযী)
[২] অর্থাৎ, উক্ত নির্দেশনা বাহ্যিক উপায়, সতর্কতা ও সুব্যবস্থা স্বরূপ; যা অবলম্বন করার আদেশ মানুষকে করা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্যে কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে না। ঘটবে সেটাই যেটা তাঁর সিদ্ধান্ত বা ফায়সালা অনুসারে তাঁর হুকুম হবে।
ইউসুফ 12:68
যখন তারা তাদের পিতা তাদেরকে যেভাবে আদেশ করেছিল সেভাবেই প্রবেশ করল, তখন আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে ওটা তাদের কোন কাজে আসল না; ইয়াকূব শুধু তার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করেছিল মাত্র।[১] আর সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল; কারণ আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়। [২]
[১] অর্থাৎ, এই কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্যকে মুলতবি বা রদ করা সম্ভব নয়, তবুও ইয়াকূব (আঃ)-এর মনে বদনজর লেগে যাওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তার ভিত্তিতে তিনি এরূপ বলেছিলেন।
[২] অর্থাৎ এই কৌশল অবলম্বন ইলাহী অহীর আলোকে ছিল এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না --এ আকীদাও আল্লাহর শিখানো জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই ছিল, যে ব্যাপারে অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ।
ইউসুফ 12:69
তারা যখন ইউসুফের সামনে হাজির হল, তখন সে তার (সহোদর) ভাইকে নিজের কাছে রাখল এবং বলল, ‘আমিই তোমার (সহোদর) ভাই, সুতরাং তারা যা করত, তার জন্য তুমি দুঃখ করো না।’[১]
[১] কতিপয় মুফাসসিরীন বলেন যে, এক একটি রুমে দু'জন করে ভাইকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল, এমনিভাবে বিনয়্যামীন যখন একাই অবশিষ্ট রয়ে গেলেন, তখন ইউসুফ (আঃ) তাঁকে একটি পৃথক রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। অতঃপর নির্জনে তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করলেন এবং পূর্বের ঘটনা উল্লেখ করে বললেন যে, এই ভায়েরা আমার সাথে যে আচরণ করেছে তার জন্য দুঃখ করো না। আর কতিপয় মুফাসসিরীন বলেন যে, বিনয়্যামীনকে আটকানোর জন্য যে ফন্দি বা বাহানা করার ছিল, সে সম্পর্কেও তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি পেরেশান না হন। (ইবনে কাসীর)
ইউসুফ 12:70
অতঃপর সে (ইউসুফ) যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন সে তার (সহোদর) ভাই-এর মালপত্রের মধ্যে পানপাত্র (সা’) রেখে দিল।[১] অতঃপর এক আহবায়ক চীৎকার করে বলল, ‘হে যাত্রীদল[২] তোমরা নিশ্চয়ই চোর।’ [৩]
[১] মুফাসসিরগণ বলেছেন যে, এই سِقَايَة (পানপাত্র)টি স্বর্ণ অথবা রৌপ্যনির্মিত ছিল। পানি পান করা ছাড়া শস্য মাপার কাজও তার দ্বারা নেওয়া হতো। ওটা চুপিসারে বিনয়্যামীনের মালপত্রে রেখে দেওয়া হয়েছিল।
[২] الْعِيْرُ বাস্তবে সেই উট, গাধা অথবা খচ্চরদলকে বলা হয় যাদের উপর শস্য চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, এখানে এর অর্থ হচ্ছে أصْحَابُ الْعِيْرِ অর্থাৎ যাত্রীদল।
[৩] চুরির এই দোষারোপ স্বস্থানে বাস্তবিক ছিল। কেননা আহবায়ক সেবক ইউসুফ (আঃ)-এর পরিকল্পিত কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিল না। অথবা এর অর্থ এই যে, তোমাদের অবস্থা তো চোরদের মত, যেহেতু রাজার অনুমতি ছাড়াই তাঁর পানপাত্র তোমাদের মালপত্রের ভিতরে রয়েছে।
ইউসুফ 12:71
তারা তাদের দিকে চেয়ে বলল, ‘তোমরা কি হারিয়েছ?’
ইউসুফ 12:72
তারা বলল, ‘আমরা রাজার পানপাত্র (সা’) হারিয়েছি; যে ওটা এনে দেবে, সে এক উট বোঝাই মাল পাবে এবং আমি তার যামিন।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমি এই কথার যামানত দিচ্ছি যে, তল্লাশি চালানোর পূর্বে যে ব্যক্তি এই শাহী পানপাত্র আমাদেরকে ফেরত বা খুঁজে দেবে, তাকে পুরস্কার অথবা পারিশ্রমিক স্বরূপ এতটা পরিমাণ শস্য প্রদান করা হবে, যা একটি উট বহন করতে পারে।
ইউসুফ 12:73
তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! তোমরা তো জান যে, আমরা এই দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে আসিনি এবং আমরা চোরও নই।’ [১]
[১] ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা যেহেতু এই সুপরিকল্পিত কৌশল সম্পর্কে অনবগত ছিলেন, যা ইউসুফ (আঃ) অবলম্বন করেছিলেন, সেহেতু তাঁরা নিজেদের ব্যাপারে চোর হওয়ার এবং দেশে অশান্তি সৃষ্টি করার কথা শপথ করে খন্ডন করছিলেন।
ইউসুফ 12:74
তারা বলল, ‘যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তাহলে তার শাস্তি কি?’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের মালপত্রে উক্ত শাহী পানপাত্র পাওয়া গেলে তার শাস্তি কি হবে?
ইউসুফ 12:75
তারা বলল, ‘এর শাস্তি এই যে, যার মালপত্রের মধ্যে পাত্রটি পাওয়া যাবে, সেই হবে তার বিনিময়।[১] এভাবে আমরা সীমালংঘনকারীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।’ [২]
[১] অর্থাৎ চোরকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঐ ব্যক্তির হাতে দাসরূপে সঁপে দেওয়া হতো, যার সে চুরি করতো। এটা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে শাস্তি ছিল, তাই সেই মোতাবেক ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা এই শাস্তির প্রস্তাব পেশ করলেন।
[২] এই উক্তিটিও ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের। কতক ব্যাখ্যাকারীদের নিকট এ উক্তি ইউসুফ (আঃ)-এর কর্মচারীদের। তারা বলেছিল, আমরাও যালিম (অপরাধী)-দেরকে এ ধরনেরই সাজা দিয়ে থাকি। কিন্তু পরবর্তী আয়াতের এই অংশ 'রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না' এ কথার খন্ডন করছে।
ইউসুফ 12:76
অতঃপর সে তার (সহোদর) ভ্রাতার মালপত্র তল্লাশি করার পূর্বে ওদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল।[১] এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম।[২] আল্লাহ ইচ্ছা না করলে রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না।[৩] আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি।[৪] আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে অধিক জ্ঞানী।[৫]
[১] প্রথমে অন্য ভাইদের মালপত্রের তল্লাশি নিল এবং শেষে বিনয়্যামীনের মালপত্র দেখল, যাতে করে তাদের সন্দেহ না হয় যে, এটা কোন সুপরিকল্পিত কৌশল।
[২] অর্থাৎ, আমি ইউসুফকে অহীর মাধ্যমে এই কৌশলটি বুঝিয়ে দিলাম। এ থেকে জানা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরনের কৌশল-পথ অবলম্বন করা বৈধ; যার বাহ্যিক রূপ বাহানা ও ফন্দি, এই শর্তে যে উক্ত পথ যেন কোন শরয়ী নিয়মের পরিপন্থী না হয়। (ফাতহুল কাদীর)
[৩] অর্থাৎ রাজার যে আইন তথা নিয়ম মিসরে প্রচলিত ছিল, সেই মোতাবেক বিনয়্যামীনকে এভাবে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাই তারা যাত্রীদলকেই জিজ্ঞেস করল যে, বল, এই অপরাধের দন্ড কি হওয়া উচিত?
[৪] যেমন নিজ দয়া ও অনুগ্রহে ইউসুফকে সুউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।
[৫] অর্থাৎ প্রত্যেক জ্ঞানী থেকে বড় কোন না কোন জ্ঞানী থাকে। সুতরাং কোন জ্ঞানী যেন এই ধোকায় নিপতিত না হয় যে, আমিই এই যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। কতক মুফাসসিরীন বলেছেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর একজন সর্বজ্ঞানী অর্থাৎ মহান আল্লাহ আছেন।
ইউসুফ 12:77
তারা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তাহলে তার (সহোদর) ভাইও তো ইতিপূর্বে চুরি করেছিল।’[১] কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল এবং তাদের কাছে প্রকাশ করল না। সে (মনে মনে) বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর[২] এবং তোমরা যা বলছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’
[১] এটা তারা নিজেদের পবিত্রতা ও সাধুতা প্রকাশ করার জন্য বলেছিলেন। কেননা ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীন উভয়ই তাঁদের সহোদর ভাই ছিলেন না বরং বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। কতিপয় ব্যাখ্যাকারী ইউসুফ (আঃ)-এর চুরির ব্যাপারে দুটি রহস্যময় কথা উল্লেখ করেছেন, যা কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর ভিত্তিশীল নয়। বিশুদ্ধ কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, তাঁরা নিজেদেরকে তো নেহাত সাধুতা ও সচ্চরিত্রের অধিকারী প্রমাণ করলেন। আর ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীনকে হীন চরিত্রের সাব্যস্ত করলেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁদেরকে চোর ও বেঈমান প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করলেন।
[২] ইউসুফ (আঃ)-এর এই উক্তি থেকেও স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা তাঁর সম্বন্ধে চুরি করার কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ আরোপের কাজ করেছিলেন।
ইউসুফ 12:78
তারা বলল, ‘হে আযীয![১] এর পিতা আছেন অতিশয় বৃদ্ধ, সুতরাং এর স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন! আমরা তো আপনাকে দেখছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন।’ [২]
[১] তাঁরা ইউসুফ (আঃ)-কে 'আযীয' (মিসরের রাজা) এ জন্য বলেছিলেন যে, সেই সময় সমস্ত মৌলিক এখতিয়ার ও শক্তি ইউসুফ (আঃ)-এর হাতেই ছিল। আর মিসরের আসল রাজা শুধু নামমাত্র রাজা ছিলেন।
[২] পিতা তো অবশ্যই বৃদ্ধ ছিলেন, কিন্তু এখানে তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিনয়্যামীনকে মুক্ত করা। তাঁদের মাথায় ইউসুফ (আঃ) সংক্রান্ত কথা স্মরণ হচ্ছিল যে, এমন আবার না হয় যে, বিনয়্যামীনকে ছেড়ে পিতার কাছে আমাদেরকে ফিরে যেতে হয় এবং তিনি আমাদেরকে বলেন যে, তোমরা আমার বিনয়্যামীনকে ইউসুফের মত হারিয়ে এলে। তাই ইউসুফ (আঃ)-এর মহানুভবতা ও অনুগ্রহের প্রশংসা করে এই কথা বললেন, হয়তো তিনি এ অনুগ্রহটুকুও করবেন যে, বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর স্থলে অন্য কোন ভাইকে রেখে নেবেন।
ইউসুফ 12:79
সে বলল, ‘যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি! এরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী হব।’ [১]
[১] এই উত্তর এ জন্য দিলেন যে, বিনয়্যামীনকেই আটকে রাখাই তো ইউসুফ (আঃ)-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।
ইউসুফ 12:80
যখন তারা তার নিকট হতে সম্পূর্ণ নিরাশ হল, তখন তারা নির্জনে গিয়ে পরামর্শ করতে লাগল।[১] ওদের মধ্যে যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিল সে বলল, ‘তোমরা কি জান না যে, তোমাদের পিতা তোমাদের নিকট হতে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বেও তোমরা ইউসুফের ব্যাপারে ত্রুটি করেছিলে। সুতরাং আমি কিছুতেই এই দেশ ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন[২] অথবা আল্লাহ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। [৩]
[১] কেননা বিনয়্যামীনকে ছেড়ে যাওয়া ভীষণ কঠিন ছিল, তাঁরা পিতাকে মুখ দেখানোর যোগ্য ছিলেন না। তাই তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এখন কি করা যায়?
[২] তাঁদের বড় ভাই এই পরিস্থিতিতে নিজের মধ্যে পিতার সাথে সাক্ষাৎ করার শক্তি ও ক্ষমতা না পেয়ে স্পষ্ট বলে ফেললেন যে, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এখান থেকে যাব না; যতক্ষণ পর্যন্ত না আব্বাজান নিজে তদন্ত করে দেখে আমার নির্দোষ হওয়ার কথা বিশ্বাস করে নেবেন এবং আমাকে আসার অনুমতি দেবেন।
[৩] 'আল্লাহ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন' এর অর্থ হলো যে, কোন প্রকারে আযীয (মিসরের বাদশা) বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে আমার সাথে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেন। অথবা এর অর্থ হলো এই যে, আল্লাহ তাআ'লা আমাকে এতটা শক্তি দান করুন যে, আমি বিনয়্যামীনকে তরবারির জোরে অর্থাৎ শক্তির জোরে মুক্ত করে আমার সাথে নিয়ে যাই।
ইউসুফ 12:81
তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং বল, হে আমাদের পিতা! আপনার পুত্র চুরি করেছে এবং আমরা যা জানি, তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম।[১] আর অদৃশ্যের ব্যাপারে আমরা অবহিত ছিলাম না।[২]
[১] অর্থাৎ, আমরা যে কথা দিয়েছিলাম যে, আমরা বিনয়্যামীনকে সকুশল ফিরিয়ে নিয়ে আসব, তা আমাদের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দিয়েছিলাম, পরে যে ঘটনা ঘটল এবং যার কারণে বিনয়্যামীনকে রেখে আসতে হল, এটা তো আমাদের ধারণাতীত বিষয়। দ্বিতীয় অর্থ হলো এই যে, আমরা চুরির যে শাস্তির কথা বলেছিলাম যে, চোরকেই চুরির পরিবর্তে রেখে নেওয়া হোক, তা আমরা আমাদের জ্ঞানানুসারে নির্ধারণ করেছিলাম, এতে কোন প্রকার অসদুদ্দেশ্য ছিল না। (যেহেতু আমরা সুনিশ্চিত ছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ চুরি করতেই পারে না।) কিন্তু ঘটনাক্রমে যখন সামানের তল্লাশি নেওয়া হলো, তখন চুরিকৃত পানপাত্র বিনয়্যামীনের মালপত্র থেকেই বের হলো।
[২] অর্থাৎ ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ঘটনা সম্পর্কে আমরা অনবগত ছিলাম।
ইউসুফ 12:82
যে জনপদে আমরা ছিলাম ওর অধিবাসীদেরকে এবং যে যাত্রীদলের সাথে আমরা এসেছিলাম তাদেরকেও জিজ্ঞাসা করুন; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’ [১]
[১] الْقَرْيَة অর্থাৎ মিসর যেখানে তাঁরা শস্য নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। এখানে মিসর বলতে মিসরবাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অনুরূপ الْعِيْر (কাফেলা) বলতে কাফেলার যাত্রীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আপনি মিসরে গিয়ে মিসরবাসীদেরকে এবং কাফেলার যাত্রীদেরকে যারা আমাদের সাথে এসেছে জিজ্ঞেস করে নিন যে, আমরা যা বলছি তাই সত্য; এতে মিথ্যার কোন মিশ্রণ (অবকাশ) নেই।
ইউসুফ 12:83
ইয়াকূব বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে নিয়েছে;[১] সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়; হয়তো আল্লাহ ওদের সকলকেই আমার কাছে এনে দেবেন।[২] নিশ্চয় তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
[১] ইয়াকূব (আঃ) যেহেতু বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং মহান আল্লাহ তাঁকে অহীর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে অবগতও করেননি, সেহেতু তিনি এটাই বুঝেছিলেন যে, আমার এই ছেলেরা যেমন এর পূর্বে ইউসুফ সম্পর্কে মনগড়া কথা বলেছিল, অনুরূপ এর সম্পর্কেও মনগড়া কথা বলছে। এরা বিনয়্যামীনের সাথে কি আচরণ করেছে? এর নিশ্চিত জ্ঞান ইয়াকূব (আঃ)-এর নিকট ছিল না বটে, কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর ঘটনার উপর অনুমান করে তাঁদের সম্পর্কে তাঁর মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল।
[২] এমতাবস্থায় ধৈর্য ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তবুও ধৈর্যের সাথে আশার বাসা ভেঙ্গে দেননি। جَمِيْعًا (সকলকেই) অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ), বিনয়্যামীন এবং তাঁদের বড় ভাই, যিনি লজ্জার বশবর্তী হয়ে মিসরেই থেকে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, আব্বাজান হয় আমাকে এ অবস্থায় আসার অনুমতি দিন, আর না হয় আমি যে কোন প্রকারে বিনয়্যামীনকে সাথে নিয়ে ফিরব।
ইউসুফ 12:84
সে ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, ‘আফসোস ইউসুফের জন্য!’[১] আর শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল[২] এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট ।
[১] অর্থাৎ, এই টাটকা ঘা ইউসুফ হারানোর পুরাতন ঘাকেও তাজা করে তুলল।
[২] অর্থাৎ চোখের কালো তারা ভীষণ শোক ও দুঃখের কারণে সাদা হয়ে গিয়েছিল।
ইউসুফ 12:85
তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা স্মরণ করতেই থাকবেন, যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষু হবেন অথবা মৃত্যুবরণ করবেন।’ [১]
[১] حَرَضٌ ঐ শারীরিক বিকার অথবা বিবেকের দুর্বলতাকে বলা হয় যা বার্ধক্য, প্রেম-ভালবাসা অথবা নিরন্তর দুশ্চিন্তার কারণে মানুষের মাঝে দেখা দেয়। পিতার মুখে ইউসুফের কথা উল্লেখের কারণে তাঁর ভাইদের হিংসা-অগ্নি আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল, ফলে স্বীয় পিতাকে তাঁরা এমনটি বললেন।
ইউসুফ 12:86
সে বলল, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ শুধু আল্লাহরই নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহর নিকট হতে তা জানি, যা তোমরা জান না। [১]
[১] এর উদ্দেশ্য, হয় সেই ইউসুফের দেখা স্বপ্ন যার সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, এর ব্যাখ্যা (বাস্তবতা) অবশ্যই সামনে আসবে এবং তিনি ইউসুফকে সিজদা করবেন। অথবা তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, ইউসুফ জীবিত আছে, জীবনে অবশ্যই তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে।
ইউসুফ 12:87
হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাঁর সহোদরের অনুসন্ধান কর[১] এবং আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না, কারণ অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয় না।’[২]
[১] অতএব তিনি উক্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই স্বীয় পুত্রদেরকে এই আদেশ করলেন।[২] যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন: ﴿وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلاَّ الضَّآلُّونَ﴾ "কেবল ভ্রষ্ট লোকরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে থাকে।" (সূরা হিজর ১৫:৫৬) এর অর্থ এই যে, মুমিনদেরকে চরম কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যহারা ও সংযমহীন হতে নেই এবং আল্লাহর অসীম কৃপার আশা ছাড়তে নেই।
ইউসুফ 12:88
যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল[১] তখন বলল, ‘হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি[২] এবং আমরা তুচ্ছ পণ্য নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন[৩] এবং আমাদেরকে দান করুন; [৪] নিশ্চয় আল্লাহ দানীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।’
[১] তাঁদের মিসর আগমনের এটা তৃতীয় দফা ছিল।
[২] অর্থাৎ শস্য নেবার জন্য আমরা যে পরিমাণ পণ্যমূল্য (পুঁজি) নিয়ে এসেছি, তা অতি অল্প ও নগণ্য।
[৩] অর্থাৎ আমাদের অল্প পুঁজির দিকে লক্ষ্য না করে আমাদেরকে এর পরিবর্তে পূর্ণ মাপ দিন।
[৪] অর্থাৎ আমাদের এই অল্প পুঁজি গ্রহণ করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও খয়রাত করুন। কোন কোন ব্যাখ্যাকারী এর অর্থ করেছেন যে, আমাদের ভাই বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।
ইউসুফ 12:89
সে বলল, ‘তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে (পরিণাম সম্বন্ধে) অজ্ঞ?’ [১]
[১] যখন তাঁরা অতি নম্রতার সাথে দান-খয়রাত করার অথবা ভাইকে মুক্ত করার জন্য আপীল করলেন এবং সাথে সাথে পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র-বিচ্ছেদের আঘাতের কথাও উল্লেখ করলেন, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর হৃদয় আকুল হয়ে পড়ল, চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে গেল এবং বাস্তব ঘটনা ব্যক্ত করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তিনি ভাইদের শত্রুতার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে উদার চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে ভুলে যাননি। সুতরাং তিনি বললেন, এ কাজ তোমরা তখন করেছিলে, যখন তোমরা মূর্খ ও অজ্ঞ ছিলে।
ইউসুফ 12:90
তারা বলল, ‘তবে কি তুমিই ইউসুফ?’[১] সে বলল, ‘আমিই ইউসুফ এবং এই আমার সহোদর; আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; যে ব্যক্তি সংযম ও ধৈর্য অবলম্বন করে, আল্লাহ সেইরূপ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’ [২]
[১] ভায়েরা যখন মিসর-অধিপতির মুখ থেকে সেই ইউসুফের কথা শুনলেন, যাকে বাল্যকালে তাঁরা কানআনের এক অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করে দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা অবাক হলেন এবং তাঁর দিকে মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে ভাবলেন, ব্যাপার এমন তো নয় যে, যিনি আমাদের সাথে আলাপ করছেন, তিনিই ইউসুফ? তা নাহলে ইউসুফের ঘটনা তিনি কিভাবে জানতে পারলেন? সুতরাং তাঁরা প্রশ্ন করলেন যে, তুমিই ইউসুফ তো নও?
[২] প্রশ্নের জবাবে স্বীকারোক্তির সাথে সাথে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ এবং ধৈর্য ও সংযমের শুভ পরিণামের কথা বর্ণনা করে বললেন যে, তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রে কোন প্রকার ত্রুটি করনি, কিন্তু এটা আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানী যে, তিনি না শুধু আমাকে কুয়া থেকে পরিত্রাণ দিলেন; বরং মিসরের রাজত্বও দান করলেন। আর এটা হলো সেই ধৈর্য ও সংযমের সুফল, যার তওফীক আল্লাহ আমাকে দান করেছিলেন।
ইউসুফ 12:91
তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে আমরাই ছিলাম অপরাধী।’ [১]
[১] ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর এই মহিমা দেখে নিজেদের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে নিলেন।
ইউসুফ 12:92
সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই।[১] আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।
[১] ইউসুফ আলাইহিস সালামও নবুঅতী গরিমা দেখিয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন: যা হয়েছে তা হয়ে গেছে, আজ তোমাদেরকে কোন প্রকার ভৎর্সনা ও নিন্দা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ও মক্কার ঐসব কাফির এবং কুরাইশ বংশের নেতাদেরকে যারা তাঁর রক্ত-পিয়াসী ছিল এবং নানাবিধ যাতনা দিয়েছিল উক্ত শব্দগুলিই বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
ইউসুফ 12:93
তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার মুখমন্ডলের উপর রাখো; তিনি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন।[১] আর তোমরা তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে এস।’ [২]
[১] জামা মুখমন্ডলে রাখা মাত্র চোখের জ্যোতি ফিরে আসা একটি অলৌকিক মু'জিযা ও কারামত ছিল।
[২] এই বলে ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পরিবারের সকলকে মিসর আসার আহবান জানালেন।
ইউসুফ 12:94
অতঃপর যাত্রীদল যখন বের হয়ে পড়ল, তখন তাদের পিতা বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে ভারসাম্যহীন মনে না কর, তাহলে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।’ [১]
[১] এদিকে উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছে মু'জিযা স্বরূপ ইউসুফ (আঃ)-এর সুগন্ধি আসতে লাগল। এটা যেন এ কথার ঘোষণা ছিল যে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ আসে রসূলও অনবগত থাকেন, যদিও পুত্র নিজ শহরের কোন কূপে থাকে (তবুও তিনি জানতে পারেন না)। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ যখন ব্যবস্থা করে দেন, তখন মিসরের মত দূর দূরান্ত এলাকা থেকেও পুত্রের সুগন্ধি চলে আসে।
ইউসুফ 12:95
তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন।’ [১]
[১] ضَلَال এর অর্থ মমতাময় ভালবাসার সেই বিহ্বলতা যা ইয়াকূব (আঃ)-এর স্বীয় পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে ছিল। পুত্রগণ বলতে লাগলেন, এখনও পর্যন্ত আপনি সেই আগের ভুলে; অর্থাৎ ইউসুফের মহব্বতে বিভোল রয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পরও ইউসুফের মহব্বত আপনার মন থেকে দূর হয়নি।
ইউসুফ 12:96
অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তার মুখমন্ডলের উপর জামাটি রাখল তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল।[১] সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে তা জানি, যা তোমরা জান না?’ [২]
[১] অর্থাৎ, যখন সুসংবাদদাতা এসে ইয়াকূব (আঃ)-এর চেহারায় উক্ত জামা রাখল, তখন অলৌকিকভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল।
[২] কেননা আমার নিকট জ্ঞানের একটি মাধ্যম অহীও আছে, যা তোমাদের মধ্যে কারো কাছে নেই। উক্ত অহীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদেরকে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুপাতে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন।
ইউসুফ 12:97
তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী।’
ইউসুফ 12:98
সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব,[১] তিনি অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
[১] সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে ভবিষ্যতে দু'আ করার ওয়াদা করলেন। উদ্দেশ্য এই ছিল যে, রাতের শেষ প্রহরে যে সময়টি আল্লাহর ইবাদতের জন্য তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ সময় সেই সময়ে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ করব। দ্বিতীয় কথা এই যে, ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি অন্যায় করেছিলেন, সেহেতু তাঁর পরামর্শ নেওয়া জরুরী ছিল। তাই তিনি সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে পরে করার ওয়াদা করলেন।
ইউসুফ 12:99
অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল[১] এবং বলল, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।
[১] অর্থাৎ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং ভক্তিপূর্ণ আপ্যায়ন করলেন।
ইউসুফ 12:100
আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল[১] এবং তারা সবাই তার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।[২] সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা;[৩] আমার প্রতিপালক তা বাস্তবে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে[৪] এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও[৫] আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে[৬] আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] কতিপয় ব্যাখ্যাকরীদের মত যে, ইউসুফ (আঃ)-এর মাতা বলতে বিমাতা এবং আপন খালা ছিলেন। কেননা তাঁর আপন মাতা বিনয়্যামীনের জন্মের পর মারা গিয়েছিলেন। ইয়াকূব (আঃ) তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বোনকে বিবাহ করেছিলেন। উক্ত খালাই ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথে মিসর গিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর) কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী এর বিপরীত বলেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর নিজস্ব মাতা মারা যাননি, তিনিই ইয়াকূব (আঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন।
[২] কেউ কেউ এর তরজমা করেছেন যে, তারা সবাই আদব ও সম্মান করতঃ তার সামনে অবনত হল। কিন্তু ﴿وَخَرُّوْا لَهُ سُجَّدًا﴾ এর শব্দগুলো প্রমাণ করছে যে, তারা ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে মাটিতে সিজদাবনত হয়েছিলেন। অর্থাৎ সিজদার অর্থ এখানে সিজদাই। তবে এই সিজদা সম্মানের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আর সম্মানের (তা'যীমী) সিজদা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে জায়েয ছিল। ইসলামে শিরকের দরজা বন্ধ করার জন্য সম্মানসূচক সিজদাকেও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন সম্মানসূচক সিজদাও কারো জন্য বৈধ নয়। ("মুআয যখন শাম (দেশ) থেকে ফিরে এলেন তখন নবী (সাঃ)-কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বললেন, "একি মুআয?" মুআয বললেন, 'আমি শাম গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকেরা তাদের যাজক ও পাদ্রীগণকে সিজদা করছে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনার জন্য সিজদা করব।' তা শুনে তিনি বললেন "খবরদার! তা করো না। কারণ, আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করতে কাউকে আদেশ করতাম, তাহলে মহিলাকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।) (ইবনে মাজাহ ১৮৫৩ নং, আহমাদ ৪/৩৮১, ইবনে হিব্বান ৪১৭১ নং, হাকেম ৪/১৭২, বায্যার ১৪৬১নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২০৩নং)
[৩] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ) যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এসব পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার এই তা'বীর (ব্যাখ্যা) সামনে এল যে, মহান আল্লাহ তাঁকে রাজ সিংহাসনে বসালেন এবং পিতা-মাতা সহ সকল ভায়েরা তাঁকে সিজদা করলেন।
[৪] আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের মধ্যে কূপ থেকে বের করার কথা উল্লেখ করলেন না, যেন তাতে তাঁর ভায়েরা লজ্জিত না হন, এ হল নববী চরিত্র।
[৫] এটাও উদার চরিত্রের একটি নমুনা যে, ভাইদেরকে একটুও দোষারোপ না করে শয়তানকে উক্ত কীর্তিকলাপের কারণ বানালেন।
[৬] মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কানআন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بَدْو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।
ইউসুফ 12:101
হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ[১] এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ; [২] হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান কর এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর।’ [৩]
[১] অর্থাৎ মিসরের রাজত্ব দান করেছ; যেমন পূর্বে বিস্তারিত উল্লেখ হয়েছে।
[২] ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন, যাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী অবতীর্ণ হতো এবং বিশেষ বিশেষ কথার জ্ঞান তাঁকে প্রদান করা হতো। অতএব উক্ত নবুঅতী জ্ঞানের আলোকে পয়গম্বর স্বপ্নের ব্যাখ্যাও সঠিকভাবে করে নিতেন। তথাপি মনে হচ্ছে যে, স্বপ্ন ব্যাখ্যার বিষয়ে তাঁর বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল। যেমন কয়েদখানার সঙ্গীদের স্বপ্নের এবং সাতটি গাভীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
[৩] মহান আল্লাহ ইউসুফ (আঃ)-এর উপর যেসব অনুগ্রহ করেছিলেন সেগুলিকে তিনি স্মরণ করে এবং আল্লাহর অন্যান্য গুণাবলী উল্লেখ করে দু'আ করছেন যে, মুসলিম অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয় এবং আমাকে সজ্জনদের সাথে মিলিত কর। সজ্জনগণ অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর পূর্বপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাক আলাইহিমাস সালাম প্রভৃতি। কতক লোক এখান হতে সংশয়ে পতিত হয়েছে যে, ইউসুফ (আঃ) মৃত্যুর দু'আ করেছিলেন। অথচ এটা মৃত্যুর দু'আ নয়, বরং আমরণ ইসলামের উপর অটল থাকার দু'আ।
ইউসুফ 12:102
এটা অদৃশ্য লোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি অহী দ্বারা অবহিত করছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল, তখন তুমি তাদের নিকট ছিলে না। [১]
[১] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকালে, যখন তারা তাকে কূপে নিক্ষেপ করে এসেছিল। অথবা উদ্দেশ্য ইয়াকূব (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকালে, যাতে তারা তাকে এই বলেছিল যে, ইউসুফ (আঃ)-কে নেকড়ে বাঘে খেয়ে নিয়েছে এবং এই হল রক্তরঞ্জিত তার জামা। এই বলে তার সাথে ছলনা করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ এ স্থানেও এ বিষয়ের খন্ডন করেছেন যে, নবী কারীম (সাঃ) গায়বের এলেম (অদৃশ্যের জ্ঞান) রাখতেন। তবে এখানে খন্ডন সাধারণ জ্ঞানের নয়, কেননা মহান আল্লাহ তাঁকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। এ খন্ডন প্রত্যক্ষ দর্শনের, যেহেতু সেই সময়ে তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অনুরূপ এমন লোকদের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল না, যাদের কাছ থেকে তিনি তা শুনতে পারেন। এ তো শুধু আল্লাহই, যিনি তাঁকে এই অদৃশ্য ঘটনার সংবাদ দিয়েছেন, যা এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, তিনি আল্লাহর সত্য নবী এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর উপর অহী অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ আরো কয়েক স্থানে অনুরূপ অদৃশ্যের জ্ঞানের এবং প্রত্যক্ষ দর্শনের কথা খন্ডন করেছেন। (উদাহরণ স্বরূপ দেখুনঃ সূরা আলে ইমরান ৩:৭ ও ৩:৪৪ নং আয়াত, সূরা ক্বস্বাস্ব ২৮:৪৫-৪৬নং আয়াত এবং সূরা স্বা-দ ৩৮:৬৯-৭০ নং আয়াত)
ইউসুফ 12:103
তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ পূর্বের ঘটনাবলী সম্বন্ধে অবহিত করছেন, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহর পয়গম্বরদের পথ অনুসরণ করে চিরস্থায়ী মুক্তির অধিকারী হয়ে যায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনয়ন করে না। কেননা তারা বিগত সম্প্রদায়ের ঘটনা শোনে বটে; কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য নয়, শুধু মনোরঞ্জন ও আনন্দ উপভোগ করার জন্য। তাই তারা ঈমান থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।
ইউসুফ 12:104
আর তুমি তো তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক দাবী করছ না,[১] এ (কুরআন) তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। [২]
[১] যাতে তাদের সংশয় সৃষ্টি হয় যে, নবুঅতের দাবি তো শুধু ধন সঞ্চয় করার বাহানা।
[২] যেন মানুষ এর দ্বারা হিদায়াত গ্রহণ করে এবং নিজ ইহ-পরকাল সাজিয়ে নেয়। এখন বিশ্ববাসী যদি এ থেকে বিমুখ হয় এবং হিদায়াত গ্রহণ না করে, তাহলে ত্রুটি তাদের এবং সেটা তাদের দুর্ভাগ্য। কুরআন তো বাস্তবে বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত ও নসীহতই নিয়ে এসেছে। (পারস্য কবি বলেন,) 'চামচিকা যদি দিনের বেলায় না দেখে, তাহলে সূর্যের দোষ কি?'
ইউসুফ 12:105
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কত নিদর্শন রয়েছে যা তারা প্রত্যক্ষ করে; কিন্তু তারা এই সকলের প্রতি উদাসীন। [১]
[১] নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং উভয়ের মধ্যে অসংখ্য বস্তুর অস্তিত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা ও স্রষ্টা আছেন, যিনি উক্ত বস্তুসমূহকে অস্তিত দান করেছেন এবং একজন পরিচালক আছেন, যিনি এসব এমনভাবে পরিচালনা করছেন যে, আদিকাল থেকে এই নিয়ম-শৃঙ্খলা সুচারুরূপে চালু আছে; অথচ এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সংঘর্ষ নেই। কিন্তু মানুষ এসব কিছু দেখার পরও এমনিই উপেক্ষা ও অতিক্রম করে চলে যায়, না তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, আর না এ সবের মাধ্যমে নিজ প্রতিপালককে চেনে।
ইউসুফ 12:106
০৬) তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে। [১]
[১] এটা সেই বাস্তবতা যার বর্ণনা কুরআন সুস্পষ্টাকারে বিভিন্ন স্থানে করেছে। আর তা এই যে, মুশরিকরা তো স্বীকার করত, আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, সবকিছুর মালিক, রুযীদাতা এবং পরিচালক শুধু মহান আল্লাহই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্যকেও শরীক করত। আর এইভাবেই অধিকাংশ মানুষই মুশরিক। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগে লোকেরা তাওহীদে রবূবিয়্যাত (প্রতিপালকত্বের তাওহীদ)-কে তো মেনে নেয়; কিন্তু তাওহীদে উলূহিয়্যাত (উপাসত্বের তাওহীদ)-কে মানতে প্রস্তুত হয় না। বর্তমান যুগের কবর পূজারীদের শিরকও ঠিক এই ধরণের যে, তারা কবরস্থ ব্যক্তিদেরকে উলূহিয়্যাতের গুণাবলীর অধিকারী মনে করে তাদেরকে সাহায্যের জন্য আহবানও করে এবং ইবাদতের বেশ কিছু অনুষ্ঠানও তাদের উদ্দেশ্যে পালন করে। আল্লাহ আমাদেরকে এত্থেকে বাঁচান। আমীন।
ইউসুফ 12:107
তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ?
ইউসুফ 12:108
তুমি বল, ‘এটাই আমার পথ। আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারীবৃন্দও।[১] আল্লাহ পবিত্র। [২] আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’
[১] অর্থাৎ, এই তাওহীদের পথই আমার পথ; বরং তা সকল নবীর পথ। এ দিকেই আমি এবং আমার অনুবর্তীরা শরয়ী দলীল সহ পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে মানুষকে আহবান করে থাকি।
[২] অর্থাৎ, আমি ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ অংশীদার, সমকক্ষ, মন্ত্রী, পরামর্শদাতা, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী থেকে পবিত্র।
ইউসুফ 12:109
তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; যাদের নিকট অহী পাঠাতাম।[১] তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল, তা দেখার জন্য তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি? যারা সংযমশীল তাদের জন্য পরলোকের গৃহই উত্তম; তোমরা কি বুঝ না?
[১] এই আয়াত এ কথার প্রমাণ যে, সকল নবী পুরুষ ছিলেন এবং মহিলাদের মধ্য হতে কেউ নবুঅত লাভ করেনি। অনুরূপ তাঁরা সকলেই সমাজবদ্ধ জনপদের অধিবাসী ছিলেন, যাতে ছোট শহর, বড় শহর এবং গ্রামাঞ্চলও শামিল। তাঁদের মধ্যে কেউই মরুবাসী (বেদুঈন) ছিলেন না। কেননা মরুবাসীরা নগরবাসীদের তুলনায় কঠোর মেজাজের এবং অসভ্য চরিত্রের হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে শহরবাসীরা তাদের তুলনায় কোমল, গম্ভীর, সভ্য ও ভদ্র হয়ে থাকে। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্য নবুঅতের জন্য আবশ্যক।
ইউসুফ 12:110
অবশেষে যখন রসূলগণ নিরাশ হল[১] এবং (লোকে) ভাবল যে, তাদেরকে মিথ্যা (প্রতিশ্রুতি) দেওয়া হয়েছে,[২] তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য এল।[৩] অতঃপর আমি যাকে ইচ্ছা করলাম, তাকে উদ্ধার করা হল।[৪] আর অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি রদ করা হয় না।
[১] এ নৈরাশ্য স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান নিয়ে আসার ব্যাপারে ছিল।[২] ক্বিরাআত হিসেবে এই আয়াতের কয়েকটা অর্থ করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থ এই যে, ظَنُّوا এর কর্তা القوم অর্থাৎ কাফেরদেরকে করা হোক। অর্থাৎ কাফেররা প্রথমে তো শাস্তির ধমক পেয়ে ভয় করল; কিন্তু যখন বেশি দেরী হল তখন ধারণা করল যে, পয়গম্বরের দাবি অনুসারে আযাব তো আসছে না, আর না আসবে বলে মনে হচ্ছে, সেহেতু বলা যায় যে, নবীদের সাথেও মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য নবী করীম (সাঃ)-কে সান্তনা প্রদান করা যে, তোমার সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে দেরী হওয়ার কারণে ঘাবড়ানোর দরকার নেই, পূর্বের সম্প্রদায়সমূহের উপর আযাব আসতে অনেকানেক বিলম্ব হয়েছে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত অনুসারে তাদেরকে অনেক অবকাশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি রসূলগণ স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছেন এবং লোকেরা ধারণা করতে লেগেছে যে, তাদের সাথে আযাবের মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে।[৩] এতে বাস্তবে মহান আল্লাহর অবকাশ দানের সেই নীতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা তিনি অবাধ্যদেরকে দিয়ে থাকেন, এমনকি এ সম্পর্কে তিনি স্বীয় নবীদের ইচ্ছার বিপরীতও অধিকাধিক অবকাশ দেন, তাড়াহুড়া করেন না। ফলে অনেক সময়ে নবীদের অনুবর্তীরাও আযাব থেকে নিরাশ হয়ে বলতে শুরু করেন যে, তাদের সাথে এমনিই মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। স্মরণ থাকে যে, মনের মধ্যে শুধু এ ধরনের কুমন্ত্রণার উদ্রেক ঈমানের পরিপন্থী নয়।[৪] এ উদ্ধারের অধিকারী শুধু ঈমানদাররাই ছিল।
ইউসুফ 12:111
তাদের কাহিনীতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। এটা এমন বাণী; যা মিথ্যা রচনা নয়, বরং এটা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী, সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ এবং বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথ-নির্দেশ ও করুণা। [১]
[১] অর্থাৎ এই কুরআন যাতে ইউসুফ (আঃ) সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ঘটনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে, মনগড়া নয়। বরং তা পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং এতে রয়েছে দ্বীনের সমস্ত জরুরী মাসায়েলের বিবরণ। আর রয়েছে ঈমানদারদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।