Tafsir Ahsanul Bayaan — ত্বোয়া-হা 20:1 – আল-হাজ্জ 22:78
Contents
- ত্বোয়া-হা 20:1
- ত্বোয়া-হা 20:2
- ত্বোয়া-হা 20:3
- ত্বোয়া-হা 20:4
- ত্বোয়া-হা 20:5
- ত্বোয়া-হা 20:6
- ত্বোয়া-হা 20:7
- ত্বোয়া-হা 20:8
- ত্বোয়া-হা 20:9
- ত্বোয়া-হা 20:10
- ত্বোয়া-হা 20:11
- ত্বোয়া-হা 20:12
- ত্বোয়া-হা 20:13
- ত্বোয়া-হা 20:14
- ত্বোয়া-হা 20:15
- ত্বোয়া-হা 20:16
- ত্বোয়া-হা 20:17
- ত্বোয়া-হা 20:18
- ত্বোয়া-হা 20:19
- ত্বোয়া-হা 20:20
- ত্বোয়া-হা 20:21
- ত্বোয়া-হা 20:22
- ত্বোয়া-হা 20:23
- ত্বোয়া-হা 20:24
- ত্বোয়া-হা 20:25
- ত্বোয়া-হা 20:26
- ত্বোয়া-হা 20:27
- ত্বোয়া-হা 20:28
- ত্বোয়া-হা 20:29
- ত্বোয়া-হা 20:30
- ত্বোয়া-হা 20:31
- ত্বোয়া-হা 20:32
- ত্বোয়া-হা 20:33
- ত্বোয়া-হা 20:34
- ত্বোয়া-হা 20:35
- ত্বোয়া-হা 20:36
- ত্বোয়া-হা 20:37
- ত্বোয়া-হা 20:38
- ত্বোয়া-হা 20:39
- ত্বোয়া-হা 20:40
- ত্বোয়া-হা 20:41
- ত্বোয়া-হা 20:42
- ত্বোয়া-হা 20:43
- ত্বোয়া-হা 20:44
- ত্বোয়া-হা 20:45
- ত্বোয়া-হা 20:46
- ত্বোয়া-হা 20:47
- ত্বোয়া-হা 20:48
- ত্বোয়া-হা 20:49
- ত্বোয়া-হা 20:50
- ত্বোয়া-হা 20:51
- ত্বোয়া-হা 20:52
- ত্বোয়া-হা 20:53
- ত্বোয়া-হা 20:54
- ত্বোয়া-হা 20:55
- ত্বোয়া-হা 20:56
- ত্বোয়া-হা 20:57
- ত্বোয়া-হা 20:58
- ত্বোয়া-হা 20:59
- ত্বোয়া-হা 20:60
- ত্বোয়া-হা 20:61
- ত্বোয়া-হা 20:62
- ত্বোয়া-হা 20:63
- ত্বোয়া-হা 20:64
- ত্বোয়া-হা 20:65
- ত্বোয়া-হা 20:66
- ত্বোয়া-হা 20:67
- ত্বোয়া-হা 20:68
- ত্বোয়া-হা 20:69
- ত্বোয়া-হা 20:70
- ত্বোয়া-হা 20:71
- ত্বোয়া-হা 20:72
- ত্বোয়া-হা 20:73
- ত্বোয়া-হা 20:74
- ত্বোয়া-হা 20:75
- ত্বোয়া-হা 20:76
- ত্বোয়া-হা 20:77
- ত্বোয়া-হা 20:78
- ত্বোয়া-হা 20:79
- ত্বোয়া-হা 20:80
- ত্বোয়া-হা 20:81
- ত্বোয়া-হা 20:82
- ত্বোয়া-হা 20:83
- ত্বোয়া-হা 20:84
- ত্বোয়া-হা 20:85
- ত্বোয়া-হা 20:86
- ত্বোয়া-হা 20:87
- ত্বোয়া-হা 20:88
- ত্বোয়া-হা 20:89
- ত্বোয়া-হা 20:90
- ত্বোয়া-হা 20:91
- ত্বোয়া-হা 20:92
- ত্বোয়া-হা 20:93
- ত্বোয়া-হা 20:94
- ত্বোয়া-হা 20:95
- ত্বোয়া-হা 20:96
- ত্বোয়া-হা 20:97
- ত্বোয়া-হা 20:98
- ত্বোয়া-হা 20:99
- ত্বোয়া-হা 20:100
- ত্বোয়া-হা 20:101
- ত্বোয়া-হা 20:102
- ত্বোয়া-হা 20:103
- ত্বোয়া-হা 20:104
- ত্বোয়া-হা 20:105
- ত্বোয়া-হা 20:106
- ত্বোয়া-হা 20:107
- ত্বোয়া-হা 20:108
- ত্বোয়া-হা 20:109
- ত্বোয়া-হা 20:110
- ত্বোয়া-হা 20:111
- ত্বোয়া-হা 20:112
- ত্বোয়া-হা 20:113
- ত্বোয়া-হা 20:114
- ত্বোয়া-হা 20:115
- ত্বোয়া-হা 20:116
- ত্বোয়া-হা 20:117
- ত্বোয়া-হা 20:118
- ত্বোয়া-হা 20:119
- ত্বোয়া-হা 20:120
- ত্বোয়া-হা 20:121
- ত্বোয়া-হা 20:122
- ত্বোয়া-হা 20:123
- ত্বোয়া-হা 20:124
- ত্বোয়া-হা 20:125
- ত্বোয়া-হা 20:126
- ত্বোয়া-হা 20:127
- ত্বোয়া-হা 20:128
- ত্বোয়া-হা 20:129
- ত্বোয়া-হা 20:130
- ত্বোয়া-হা 20:131
- ত্বোয়া-হা 20:132
- ত্বোয়া-হা 20:133
- ত্বোয়া-হা 20:134
- ত্বোয়া-হা 20:135
- আল-আম্বিয়া 21:1
- আল-আম্বিয়া 21:2
- আল-আম্বিয়া 21:3
- আল-আম্বিয়া 21:4
- আল-আম্বিয়া 21:5
- আল-আম্বিয়া 21:6
- আল-আম্বিয়া 21:7
- আল-আম্বিয়া 21:8
- আল-আম্বিয়া 21:9
- আল-আম্বিয়া 21:10
- আল-আম্বিয়া 21:11
- আল-আম্বিয়া 21:12
- আল-আম্বিয়া 21:13
- আল-আম্বিয়া 21:14
- আল-আম্বিয়া 21:15
- আল-আম্বিয়া 21:16
- আল-আম্বিয়া 21:17
- আল-আম্বিয়া 21:18
- আল-আম্বিয়া 21:19
- আল-আম্বিয়া 21:20
- আল-আম্বিয়া 21:21
- আল-আম্বিয়া 21:22
- আল-আম্বিয়া 21:23
- আল-আম্বিয়া 21:24
- আল-আম্বিয়া 21:25
- আল-আম্বিয়া 21:26
- আল-আম্বিয়া 21:27
- আল-আম্বিয়া 21:28
- আল-আম্বিয়া 21:29
- আল-আম্বিয়া 21:30
- আল-আম্বিয়া 21:31
- আল-আম্বিয়া 21:32
- আল-আম্বিয়া 21:33
- আল-আম্বিয়া 21:34
- আল-আম্বিয়া 21:35
- আল-আম্বিয়া 21:36
- আল-আম্বিয়া 21:37
- আল-আম্বিয়া 21:38
- আল-আম্বিয়া 21:39
- আল-আম্বিয়া 21:40
- আল-আম্বিয়া 21:41
- আল-আম্বিয়া 21:42
- আল-আম্বিয়া 21:43
- আল-আম্বিয়া 21:44
- আল-আম্বিয়া 21:45
- আল-আম্বিয়া 21:46
- আল-আম্বিয়া 21:47
- আল-আম্বিয়া 21:48
- আল-আম্বিয়া 21:49
- আল-আম্বিয়া 21:50
- আল-আম্বিয়া 21:51
- আল-আম্বিয়া 21:52
- আল-আম্বিয়া 21:53
- আল-আম্বিয়া 21:54
- আল-আম্বিয়া 21:55
- আল-আম্বিয়া 21:56
- আল-আম্বিয়া 21:57
- আল-আম্বিয়া 21:58
- আল-আম্বিয়া 21:59
- আল-আম্বিয়া 21:60
- আল-আম্বিয়া 21:61
- আল-আম্বিয়া 21:62
- আল-আম্বিয়া 21:63
- আল-আম্বিয়া 21:64
- আল-আম্বিয়া 21:65
- আল-আম্বিয়া 21:66
- আল-আম্বিয়া 21:67
- আল-আম্বিয়া 21:68
- আল-আম্বিয়া 21:69
- আল-আম্বিয়া 21:70
- আল-আম্বিয়া 21:71
- আল-আম্বিয়া 21:72
- আল-আম্বিয়া 21:73
- আল-আম্বিয়া 21:74
- আল-আম্বিয়া 21:75
- আল-আম্বিয়া 21:76
- আল-আম্বিয়া 21:77
- আল-আম্বিয়া 21:78
- আল-আম্বিয়া 21:79
- আল-আম্বিয়া 21:80
- আল-আম্বিয়া 21:81
- আল-আম্বিয়া 21:82
- আল-আম্বিয়া 21:83
- আল-আম্বিয়া 21:84
- আল-আম্বিয়া 21:85
- আল-আম্বিয়া 21:86
- আল-আম্বিয়া 21:87
- আল-আম্বিয়া 21:88
- আল-আম্বিয়া 21:89
- আল-আম্বিয়া 21:90
- আল-আম্বিয়া 21:91
- আল-আম্বিয়া 21:92
- আল-আম্বিয়া 21:93
- আল-আম্বিয়া 21:94
- আল-আম্বিয়া 21:95
- আল-আম্বিয়া 21:96
- আল-আম্বিয়া 21:97
- আল-আম্বিয়া 21:98
- আল-আম্বিয়া 21:99
- আল-আম্বিয়া 21:100
- আল-আম্বিয়া 21:101
- আল-আম্বিয়া 21:102
- আল-আম্বিয়া 21:103
- আল-আম্বিয়া 21:104
- আল-আম্বিয়া 21:105
- আল-আম্বিয়া 21:106
- আল-আম্বিয়া 21:107
- আল-আম্বিয়া 21:108
- আল-আম্বিয়া 21:109
- আল-আম্বিয়া 21:110
- আল-আম্বিয়া 21:111
- আল-আম্বিয়া 21:112
- আল-হাজ্জ 22:1
- আল-হাজ্জ 22:2
- আল-হাজ্জ 22:3
- আল-হাজ্জ 22:4
- আল-হাজ্জ 22:5
- আল-হাজ্জ 22:6
- আল-হাজ্জ 22:7
- আল-হাজ্জ 22:8
- আল-হাজ্জ 22:9
- আল-হাজ্জ 22:10
- আল-হাজ্জ 22:11
- আল-হাজ্জ 22:12
- আল-হাজ্জ 22:13
- আল-হাজ্জ 22:14
- আল-হাজ্জ 22:15
- আল-হাজ্জ 22:16
- আল-হাজ্জ 22:17
- আল-হাজ্জ 22:18
- আল-হাজ্জ 22:19
- আল-হাজ্জ 22:20
- আল-হাজ্জ 22:21
- আল-হাজ্জ 22:22
- আল-হাজ্জ 22:23
- আল-হাজ্জ 22:24
- আল-হাজ্জ 22:25
- আল-হাজ্জ 22:26
- আল-হাজ্জ 22:27
- আল-হাজ্জ 22:28
- আল-হাজ্জ 22:29
- আল-হাজ্জ 22:30
- আল-হাজ্জ 22:31
- আল-হাজ্জ 22:32
- আল-হাজ্জ 22:33
- আল-হাজ্জ 22:34
- আল-হাজ্জ 22:35
- আল-হাজ্জ 22:36
- আল-হাজ্জ 22:37
- আল-হাজ্জ 22:38
- আল-হাজ্জ 22:39
- আল-হাজ্জ 22:40
- আল-হাজ্জ 22:41
- আল-হাজ্জ 22:42
- আল-হাজ্জ 22:43
- আল-হাজ্জ 22:44
- আল-হাজ্জ 22:45
- আল-হাজ্জ 22:46
- আল-হাজ্জ 22:47
- আল-হাজ্জ 22:48
- আল-হাজ্জ 22:49
- আল-হাজ্জ 22:50
- আল-হাজ্জ 22:51
- আল-হাজ্জ 22:52
- আল-হাজ্জ 22:53
- আল-হাজ্জ 22:54
- আল-হাজ্জ 22:55
- আল-হাজ্জ 22:56
- আল-হাজ্জ 22:57
- আল-হাজ্জ 22:58
- আল-হাজ্জ 22:59
- আল-হাজ্জ 22:60
- আল-হাজ্জ 22:61
- আল-হাজ্জ 22:62
- আল-হাজ্জ 22:63
- আল-হাজ্জ 22:64
- আল-হাজ্জ 22:65
- আল-হাজ্জ 22:66
- আল-হাজ্জ 22:67
- আল-হাজ্জ 22:68
- আল-হাজ্জ 22:69
- আল-হাজ্জ 22:70
- আল-হাজ্জ 22:71
- আল-হাজ্জ 22:72
- আল-হাজ্জ 22:73
- আল-হাজ্জ 22:74
- আল-হাজ্জ 22:75
- আল-হাজ্জ 22:76
- আল-হাজ্জ 22:77
- আল-হাজ্জ 22:78
ত্বোয়া-হা 20:1
ত্ব-হা-।
ত্বোয়া-হা 20:2
তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি।[১]
[১] এর অর্থ আমি কুরআন এই জন্য অবতীর্ণ করিনি যে, তুমি তাদের কুফরী করা ও ঈমান না আনার দুঃখে নিজেকে কষ্টে ফেলবে এবং আফসোস ও দুঃশ্চিন্তা করবে যেমন এই আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে,{فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا} অর্থাৎ, তারা এই বাণী বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে। (সূরা কাহ্ফ ১৮:৬) বরং আমি তো কুরআনকে নসীহত ও স্মারকগ্রন্থ হিসাবে অবতীর্ণ করেছি; যাতে প্রত্যেক মানুষের অন্তরে তওহীদ (একতত্ত্ববাদ)এর যে প্রেরণা সুপ্ত আছে তা জাগ্রত হয়। এখানে شَقَاء এর অর্থঃ কষ্ট ও ক্লান্তি।
ত্বোয়া-হা 20:3
বরং এমন ব্যক্তিকে উপদেশ দেওয়ার জন্য যে (আল্লাহকে) ভয় করে।
ত্বোয়া-হা 20:4
এটা তাঁর নিকট হতে অবতীর্ণ; যিনি সমুচ্চ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।
ত্বোয়া-হা 20:5
পরম দয়াময় আরশে সমাসীন। [১]
[১] তিনি আরশে সমাসীন; যেভাবে তাঁর মাহাত্ম্যের সাথে শোভনীয়। কিভাবে বা কিরূপে তা কারো জানা নেই। এই আরশ বা মহাসন আল্লাহর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। সর্বোচ্চ জান্নাত ফিরদাউসের উপরে বিদ্যমান। যার পায়া ও প্রান্ত আছে, ছায়া আছে।
ত্বোয়া-হা 20:6
যা আছে আকাশমন্ডলীতে, পৃথিবীতে, এই দুয়ের অন্তর্বর্তী স্থানে ও ভূগর্ভে তা তাঁরই। [১]
[১] ثَرَى ভূগর্ভঃ পৃথিবীর সর্বনিম্ন জায়গা, অর্থাৎ পাতাল।
ত্বোয়া-হা 20:7
তুমি যদি উচ্চস্বরে কথা বল, তাহলে তিনি তো গুপ্ত ও অব্যক্ত সবই জানেন। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর যিকর অথবা তাঁর নিকট দু'আ ও প্রার্থনা উচ্চশব্দে করার প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি তো গোপন থেকে গোপনতর কথাও শুনেন ও জানেন। অথবা أَخفَى শব্দের অর্থ হল আল্লাহ তাআলা ঐ সমস্ত কথা সম্পর্কেও অবহিত যা তিনি তকদীরে লিখে দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের নিকট এখনও প্রকাশ করেননি। অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত ঘটিতব্য সকল ঘটনা সম্পর্কে তিনি পরিজ্ঞাত।
ত্বোয়া-হা 20:8
আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, সমস্ত উত্তম নাম তাঁরই। [১]
[১] অর্থাৎ, উপাস্য (ইবাদতের যোগ্য) তিনিই, যিনি উপরোক্ত গুণাবলীর অধিকারী। আর তাঁর সুন্দর নামাবলীও আছে, যা দ্বারা তাঁকে আহবান করা হয়। উপাস্য তিনি ব্যতীত অন্য কেউ নয়, না তাঁর মত সুন্দর নাম কারো আছে। অতএব তাঁকে সঠিকভাবে জানা, তাঁকেই ভয় করা উচিত, তাঁকেই ভালবাসা উচিত, তাঁকেই বিশ্বাস করা উচিত এবং তাঁরই আজ্ঞা পালন করা উচিত। যাতে মানুষ যেদিন তাঁর নিকট ফিরে যাবে সেদিন লজ্জিত না হয়; বরং তাঁর কৃপা ও ক্ষমা লাভ করে আনন্দিত এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করে সৌভাগ্যবান ও সুখী হয়।
ত্বোয়া-হা 20:9
মূসার বৃত্তান্ত তোমার কাছে পৌঁছেছে কি?
ত্বোয়া-হা 20:10
সে যখন আগুন দেখল, তখন তার পরিবারবর্গকে বলল, ‘তোমরা এখানে অবস্থান কর। আমি আগুন দেখেছি; সম্ভবতঃ আমি তোমাদের জন্য তা হতে কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারব অথবা ওর নিকট কোন পথ প্রদর্শক পাব।’ [১]
[১] এ ঘটনা ঐ সময়কার যখন হযরত মূসা (আঃ) মাদয়্যান হতে আপন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (একটি মতানুসারে যিনি শুআইব (আঃ)-এর কন্যা ছিলেন) নিজের মাতার নিকট ফিরে যাচ্ছিলেন। রাত্রি ছিল অন্ধকার এবং রাস্তাও ছিল অজানা। কোন কোন ব্যাখ্যাতার কথানুসারে স্ত্রীর প্রসবের সময় ছিল আসন্ন এবং তাঁর জন্য আগুনের প্রয়োজন ছিল। কিংবা শীতের কারণে তাপ তথা আগুনের প্রয়োজন বোধ হয়। এমতাবস্থায় দূর হতে তাঁরা আগুনের শিখা দেখতে পান। পরিবারকে অর্থাৎ স্ত্রীকে, (কেউ কেউ বলেন, সঙ্গে চাকর ও শিশুও সঙ্গে ছিল, যার কারণে বহুবচন শব্দ ব্যবহূত হয়েছে।) বললেন, 'তোমরা এখানে অপেক্ষা কর। আমি আশা করি সেখান হতে আগুন সংগ্রহ করব অথবা কমসে কম সেখান হতে পথের সন্ধান পাব।'
ত্বোয়া-হা 20:11
অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসল, তখন আহবান করে বলা হল,[১] ‘হে মূসা!
[১] মূসা (আঃ) যখন আগুনের নিকট পৌঁছলেন, তখন সেখানে একটি গাছ হতে আওয়াজ এল। (যেমন,সূরা কাসাস ২৮:৩০নং আয়াতে বিস্তারিত আছে।)
ত্বোয়া-হা 20:12
নিশ্চয় আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল,[১] কারণ তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ।’ [২]
[১] জুতা খোলার আদেশ এই কারণেই দেওয়া হয়েছিল যে, এতে আছে বিনয়ের প্রকাশ ও অধিক সম্মান প্রদর্শন। কেউ কেউ বলেন, জুতাগুলি এমন গাধার চামড়া দিয়ে তৈরী ছিল, যা পাকা করা হয়নি। আর পশুর চামড়া বিশেষ পদ্ধতিতে পাকা করার পরই পবিত্র হয়। কিন্তু এ মত সুচিন্তিত নয়। কারণ, চামড়া পাকা করা ব্যতীত জুতা বানানো যায় কিভাবে? অথবা উপত্যকার পবিত্রতার কারণে জুতা খুলতে বলা হয়েছিল; যেমন কুরআনের শব্দে তা প্রকাশ। এ ছাড়াও এর দুটি দিক রয়েছে; আর তা হল, এ আদেশ উপত্যকার সম্মানার্থে ছিল অথবা যাতে উপত্যকার পবিত্রতার প্রভাব খালি পায়ে মূসা (আঃ)-এর অভ্যন্তরে বেশী শোষণ করতে পারে, তার জন্য ছিল। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
[২] طُوى (তুওয়া) ঐ উপত্যকার নাম।
ত্বোয়া-হা 20:13
আমি তোমাকে মনোনীত করেছি;[১] অতএব যে অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করা হচ্ছে তুমি তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ কর।
[১] অর্থাৎ, নবুঅত, রিসালত ও কথোপকথনের জন্য।
ত্বোয়া-হা 20:14
নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; অতএব আমারই উপাসনা কর[১] এবং আমাকে স্মরণের জন্য নামায কায়েম কর।[২]
[১] এটি শরীয়তের ভারসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম ও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভার, যে ব্যাপারে প্রত্যেক ব্যক্তি ভারপ্রাপ্ত। এ ছাড়া তিনিই যখন একমাত্র উপাস্য হওয়ার যোগ্য, তখন তিনিই সমস্ত ইবাদতের একমাত্র অধিকারী।
[২] ব্যাপকভাবে ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পর বিশেষভাবে নামায পড়তে আদেশ করা হয়েছে; যদিও ইবাদতের মধ্যে নামাযও শামিল। যাতে তার যে বিশেষ গুরুত্ব আছে তা প্রকাশ পায়। لِذِكرِي এর একটি অর্থ হল যে, তুমি আমাকে স্মরণ কর। কারণ আমাকে স্মরণ করার মাধ্যম হল ইবাদত। আর ইবাদতের মধ্যে নামায এক বিশেষ গুরুতত্ত্বপূর্ণ শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। দ্বিতীয় অর্থ হল, যখনই তোমার আমাকে স্মরণ হবে, তখনই তুমি নামায পড়। অর্থাৎ যদি কোন সময় ঔদাস্য, ভুল বা ঘুমের প্রভাবে আমাকে স্মরণ করতে না পার, তাহলে উক্ত অবস্থা পার হয়ে আমাকে স্মরণ হতেই তুমি নামায পড়। যেমন নবী (সাঃ) বলেছেন, "নিদ্রা অবস্থায় কোন শৈথিল্য নেই। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থায় হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার উচিত, স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর।" (মুসলিম, মিশকাত ৬০৪নং)
ত্বোয়া-হা 20:15
কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই; যাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করতে পারে।
ত্বোয়া-হা 20:16
সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। [১]
[১] এই জন্য যে, আখেরাতের উপর বিশ্বাস করা হতে অথবা তার স্মরণ হতে বিমুখতা অবলম্বন উভয়ই ধ্বংসের কারণ।
ত্বোয়া-হা 20:17
হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?’
ত্বোয়া-হা 20:18
সে বলল, ‘এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দিই এবং এটা দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষ পালের জন্য গাছের পাতা পেড়ে থাকি এবং এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।’
ত্বোয়া-হা 20:19
তিনি বললেন, ‘হে মূসা তুমি এটা নিক্ষেপ কর।’
ত্বোয়া-হা 20:20
অতঃপর সে তা নিক্ষেপ করল, আর সাথে সাথে তা সাপ হয়ে ছুটতে লাগল।
ত্বোয়া-হা 20:21
তিনি বললেন, ‘তুমি একে ধর এবং ভয় করো না, আমি একে এর পূর্ব রূপে ফিরিয়ে দেব। [১]
[১] এটি মূসা (আঃ)-কে মু'জিযা রূপে দান করা হয়েছিল, যা 'মূসার লাঠি' নামেই প্রসিদ্ধ।
ত্বোয়া-হা 20:22
এবং তুমি তোমার হাত বগলে রাখো, এটা বের হয়ে আসবে দোষমুক্ত[১] উজ্জ্বল হয়ে অপর এক নিদর্শন স্বরূপ।
[১] 'দোষমুক্ত'-এর অর্থ, হাতের এই ভাবে শুভ্র ও উজ্জ্বল হয়ে বের হওয়াটা কোন রোগের কারণে নয়, যেমন কুষ্ঠরোগীদের চামড়া সাদা হয়ে থাকে। বরং এটি দ্বিতীয় মু'জিযা যা আমি তোমাকে দান করেছি। যেমন অন্য এক জায়গায় এই দুই মু'জিযার কথা একত্রে বর্ণনা করে বলেন,{فَذَانِكَ بُرْهَانَانِ مِن رَّبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ} অর্থাৎ, এ দুটি ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য তোমার প্রতিপালক-প্রদত্ত প্রমাণ। (সূরা কাসাস ২৮:৩২)
ত্বোয়া-হা 20:23
এটা এই জন্য যে, আমি তোমাকে দেখাব আমার মহা নিদর্শনগুলির কিছু।
ত্বোয়া-হা 20:24
তুমি ফিরআউনের নিকট যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করেছে।’ [১]
[১] ফিরআউনের উল্লেখ এই কারণে যে, মূসা (আঃ)-এর জাতি বানী ইস্রাঈলকে দাসে পরিণত করে রেখেছিল। তাদের উপর নানান প্রকার অত্যাচার চালাত। এ ছাড়া তার অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যও চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি সে দাবী করে বসেছিল যে, {أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى} অর্থাৎ, আমিই তোমাদের উচ্চতম প্রতিপালক। (নাযিআতঃ ২৪)
ত্বোয়া-হা 20:25
সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও।
ত্বোয়া-হা 20:26
এবং আমার কর্ম সহজ করে দাও।
ত্বোয়া-হা 20:27
আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও।
ত্বোয়া-হা 20:28
যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।
ত্বোয়া-হা 20:29
আমার স্বজনবর্গের মধ্য হতে আমার জন্য একজন সহায়ক নিযুক্ত কর।
ত্বোয়া-হা 20:30
আমার ভাই হারূনকে।
ত্বোয়া-হা 20:31
তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় কর।
ত্বোয়া-হা 20:32
এবং তাকে আমার কর্মে অংশী কর।[১]
[১] কথিত আছে যে, মূসা (আঃ) যখন ফিরআউনের রাজ-প্রাসাদে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন তখন এক (পরীক্ষার) সময় তিনি খেজুর বা মুক্তার বদলে আগুনের অঙ্গারটুকরো মুখে ভরে নিয়েছিলেন। যার ফলে তাঁর জিভ পুড়ে যায় এবং তিনি তোতলা হয়ে যান। (ইবনে কাসীর) যখন আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন যে, তুমি ফিরআউনের কাছে যাও এবং আমার পয়গাম তাকে পৌঁছে দাও তখন মূসা (আঃ)-এর অন্তরে দুটি কথার উদ্রেক হয়; প্রথম এই যে, ফিরআউন অত্যন্ত দোর্দন্ড-প্রতাপ ও অহংকারী রাজা; বরং প্রতিপালক ও প্রভু হওয়ার পর্যন্ত দাবীদার। আর দ্বিতীয় এই যে, তাঁর হাতে ফিরআউনের জাতিভুক্ত একটি লোক (ভুলক্রমে) খুন হয়েছিল, যার কারণে তিনি নিজের জীবন রক্ষার্থে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ এক ফিরআউনের প্রতাপ ও পরাক্রমশালিতার, আর দুই নিজের হাতে ঘটে যাওয়া খুনের বদলার আশঙ্কা। অন্য একটি তৃতীয় জিনিস তা হল, তোতলামি বা জিহ্বার জড়তা। মূসা (আঃ) দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আমার হৃদয় উন্মুক্ত কর; যাতে আমি রিসালাতের বোঝা বইতে পারি। আমার কাজ সহজ করে দাও; অর্থাৎ যে গুরুদায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করেছ, তাতে আমার সাহায্য কর। আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও, যাতে আমি ফিরআউনের সামনে তোমার পয়গাম পূর্ণভাবে পৌঁছাতে পারি এবং প্রয়োজনে জবানী প্রতিরক্ষা করতে পারি। সেই সাথে এই দু'আও করলেন যে, আমার ভাই হারূনকে (যিনি বয়সে মূসার চেয়ে বড় ছিলেন) আমার পৃষ্ঠপোষক ও সহায়ক হিসাবে আমার উজির ও সহকর্মী বানিয়ে দাও। وَزِير শব্দটি مُوَازِر এর অর্থে, অর্থাৎ অপরের বোঝা বহনকারী। যেরূপ একজন উজির (মন্ত্রী) রাজার বোঝা বহন করেন ও রাজ্য পরিচালনায় তাঁর উপদেষ্টা হন, সেইরূপ হারূন (আঃ) আমার উপদেষ্টা ও বোঝা বহনকারী সঙ্গী হোক।
ত্বোয়া-হা 20:33
যাতে আমরা তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি প্রচুর।
ত্বোয়া-হা 20:34
এবং তোমাকে স্মরণ করতে পারি অধিক।[১]
[১] এখানে উক্ত দু'আ করার কারণ বলা হয়েছে। যাতে এইভাবে তোমার পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার সাথে সাথে বেশী বেশী তোমার তসবীহ-যিকরও করতে পারি।
ত্বোয়া-হা 20:35
তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তুমি সমস্ত অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত। আর তুমি যেমন আমার বাল্যকালে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তেমনি এখনও তুমি তোমার অনুগ্রহ হতে আমাকে বঞ্চিত করো না।
ত্বোয়া-হা 20:36
তিনি বললেন, হে মূসা! তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেওয়া হল। [১]
[১] এখান হতে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর তোতলামি ভাল করে দিয়েছিলেন। অতএব এটা বলা ঠিক নয় যে, মূসা (আঃ)-এর পুরো তোতলামি দূর হওয়ার দু'আ করেননি, সেই জন্য তা কিছুটা বাকী থেকে গিয়েছিল। থাকল ফিরআউনের এই উক্তি{وَلَا يَكَادُ يُبِينُ} (এ তো পরিষ্কার কথা বলতেও পারে না।) তা ছিল পূর্ব পরিস্থিতি হিসাবে মূসা (আঃ)-কে তাচ্ছিল্য করার জন্য। (আইসারুত তাফাসীর)
ত্বোয়া-হা 20:37
আমি তো তোমার প্রতি আরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম। [১]
[১] দু'আ কবুল হওয়ার সুসংবাদের সাথে সাথে অধিক সান্ত্বনা ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাঁর বাল্যকালের সেই অনুগ্রহের কথাও স্মরণ করাচ্ছেন, যখন তাঁর মা হত্যার ভয়ে আল্লাহর আদেশে তাঁকে তাঁর দুধপানের বয়সে একটি কাঠের কফিনে রেখে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।
ত্বোয়া-হা 20:38
যখন আমি তোমার মায়ের অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়েছিলাম যা ছিল নির্দেশ দেওয়ার।
ত্বোয়া-হা 20:39
এই মর্মে যে, তুমি তাকে সিন্দুকের মধ্যে রাখো, অতঃপর তা (নীল) দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও যাতে দরিয়া ওকে তীরে ঠেলে দেয়, ওকে আমার ও ওর এক শত্রু তুলে নেবে।[১] আর আমি আমার নিকট হতে তোমার উপর ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম,[২] যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও।[৩]
[১] 'শত্রু' বলে ফিরআউনকে বুঝানো হয়েছে। কারণ সেই ছিল আল্লাহ তথা মূসা (আঃ)-এর শত্রু। যখন কাঠের সেই শবাধার ঢেউয়ের সাথে রাজ-প্রাসাদের নিকট পৌঁছল, তখন তা তুলে এনে দেখা হল, যাতে একটি নিষ্পাপ শিশু ছিল। ফিরআউন তার স্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে রাজবাড়ীতে লালন-পালনের জন্য রেখে দিল।
[২] অর্থাৎ, ফিরআউনের অন্তরে বা সর্বসাধারণের অন্তরে তোমার ভালবাসা ভরে দিয়েছিলাম।
[৩] আল্লাহর মহাশক্তি তথা তার সুরক্ষা ও হিফাযতের নৈপুণ্য ও চমৎকারিত্ব দেখুন যে, যে শিশুটির জন্য ফিরআউন অসংখ্য শিশু-সন্তান হত্যা করিয়েছিল; যাতে সে জীবিত না থাকে, সেই শিশুকে ফিরআউনের কোলেই লালন-পালন করালেন, মা তাঁর নিজ শিশুকে দুধ দান করলেন এবং উপরন্তু শিশুর শত্রু ফিরআউনের কাছ হতে দুধপানের পারিশ্রমিকও আদায় করলেন! সুতরাং কত পবিত্র তিনি, যিনি প্রবলতা, সার্বভৌমত্ব, গর্ব ও মাহাত্ম্যের অধিকারী!
ত্বোয়া-হা 20:40
যখন তোমার ভগ্নী এসে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব, কে এই শিশুর লালন-ভার নেবে?’[১] তখন আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে; [২] অতঃপর আমি তোমাকে দুশ্চিন্তা হতে মুক্তি দিই এবং আমি তোমাকে বহু পরীক্ষায় ফেলি।[৩] অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদ্য়্যানবাসীদের মধ্যে অবস্থান করেছিলে,[৪] হে মূসা! এর পরে তুমি নির্ধারিত সময়ে[৫] উপস্থিত হলে।
[১] এটা ঐ সময়ের কথা যখন মূসা (আঃ)-এর মা কফিনটি সমুদ্রে ফেলে দিলেন এবং মেয়েকে বললেন, একটু লক্ষ্য রাখো যে, কোথায়, কোন তীরে গিয়ে পৌঁছে এবং ওর সাথে কি আচরণ করা হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন মূসা (আঃ) ফিরআউনের মহলে পৌঁছে গেলেন, তখন তিনি ছিলেন সবেমাত্র দুধ খাওয়ার শিশু। সাথে সাথে স্তন্যদাত্রী মহিলা ও আয়াদেরকে ডাকা হল; কিন্তু মূসা (আঃ) কারো স্তনবৃন্ত মুখে নিলেন না। এদিকে তাঁর বোন সব লক্ষ্য করছিলেন। পরিশেষে বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এমন এক মহিলার কথা বলব, যে তোমাদের এই সমস্যা দূর করে দেবে?' তারা বলল, 'বল কে? নিয়ে এসো তাকে।' তৎক্ষণাৎ তিনি আপন মাকে (যিনি মূসা (আঃ)-এরও মা) ডেকে নিয়ে এলেন। যখন মা সন্তানকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিলেন, তখন মূসা আল্লাহর কৌশল ও ইচ্ছায় দুধ পান করতে শুরু করলেন।[২] এখানে অন্য একটি অনুগ্রহের কথা বলা হচ্ছে। আর তা হল, যখন মূসা (আঃ) ভুলক্রমে এক কিবতীকে এক ঘুসি মারলে সে মারা যায়। যার আলোচনা সূরা কাসাস ২৮:১৫ নং আয়াতে আসবে।[৩] فُتُون শব্দটি دخول وخروج শব্দ দু'টির মত ক্রিয়ামূল, এর অর্থ ابتَلَينَاكَ ابتِلاَء অর্থাৎ, আমি তোমার খুব পরীক্ষা নিয়েছি। অথবা তা فِتنَة শব্দের বহুবচন। যেমন, حجرة এর বহুবচন حجور ও بدرة এর বহুবচন بدور এসে থাকে। আর এর অর্থ হবে আমি তোমাকে বহুবার পরীক্ষায় ফেলেছি। উদাহরণ স্বরূপ যে বছর ছিল সন্তান হত্যার বছর সেই বছর আমি তোমাকে জন্ম দিয়েছি। তোমার মা তোমাকে সমুদ্রের ঢেউয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। সমস্ত দুধদানকারিণী মহিলাদের দুধ তোমার জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলাম। তুমি একদিন ফিরআউনের দাড়ি ধরে নেওয়ার কারণে সে তোমাকে হত্যার ইচ্ছা করেছিল। তোমার হাতে একজন কিবতী খুন হয়ে গিয়েছিল ইত্যাদি। কিন্তু সমস্ত পরীক্ষায় আমি তোমাকে সাহায্য ও উত্তীর্ণ করেছি।[৪] একজন কিবতীকে অনিচ্ছাকৃত মারার পর তুমি সেখান হতে বের হয়ে মাদয়্যান চলে গেলে এবং সেখানে কয়েক বছর কাটালে।[৫] তুমি এমন সময়ে এসে উপস্থিত হলে যে সময়টি আমি তোমার সাথে কথা বলার ও তোমাকে নবুঅত দান করার জন্য নির্ধারিত করেছিলাম। অথবা এখানে قَدَر অর্থ বয়স। অর্থাৎ, বয়সের এমন এক পর্যায়ে তুমি এলে, যে বয়স নবুঅতের জন্য উপযুক্ত; আর তা হল চল্লিশ বছর।
ত্বোয়া-হা 20:41
আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য প্রস্তুত করে (মনোনীত করে) নিয়েছি।
ত্বোয়া-হা 20:42
তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনসমূহসহ যাত্রা শুরু কর এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না।[১]
[১] এখানে আল্লাহর পথে আহবানকারীদের জন্য মহতী শিক্ষা রয়েছে, আর তা এই যে, তাঁরা আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করবেন।
ত্বোয়া-হা 20:43
তোমরা দু’জন ফিরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে।
ত্বোয়া-হা 20:44
তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে,[১] হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে, অথবা ভয় করবে।
[১] এই গুণটিও আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। কারণ, কঠোরতা অবলম্বনের ফলে বীতরাগ হয়ে মানুষ পালিয়ে যায়। পক্ষান্তরে নম্রতা অবলম্বনের ফলে নিকটবর্তী, প্রভাবিত ও সত্য গ্রহণকারী হয়।
ত্বোয়া-হা 20:45
তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা অবশ্যই আশংকা করি যে, সে আমাদেরকে দ্রুত শাস্তি দিতে উদ্যত হবে অথবা অন্যায় আচরণে সীমালংঘন করবে।’
ত্বোয়া-হা 20:46
তিনি বললেন, ‘তোমরা ভয় করো না, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি; আমি শুনব ও দেখব।[১]
[১] অর্থাৎ, তুমি ফিরআউনকে যা কিছু বলবে ও তার প্রত্যুত্তরে সে তোমাদেরকে যা কিছু বলবে, আমি তা শুনব ও তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করব। আর সেই অনুযায়ী আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এবং তার সকল চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিব। সুতরাং তোমরা তার নিকট যাও এবং দ্বিধা ও ভয় করো না।
ত্বোয়া-হা 20:47
সুতরাং তোমরা তার নিকট যাও এবং বল, অবশ্যই আমরা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত রসূল, সুতরাং আমাদের সাথে বানী ইসরাঈলকে যেতে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তো তোমার নিকট এনেছি তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে নিদর্শন এবং সালাম (শান্তি) তাদের প্রতি যারা সৎ পথের অনুসরণ করে।[১]
[১] এ সালাম অভিবাদনের জন্য নয়; বরং শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি আমন্ত্রণ। যেমন মহানবী (সাঃ) রোমসম্রাট হিরাকলকে পত্রে লিখেছিলেন أَسلِم تَسلَم অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ করে নাও, শান্তিতে বসবাস করবে। এভাবে তিনি পত্রের শুরুতে {وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى} (শান্তি তাদের প্রতি যারা সৎপথের অনুসরণ করে) এ কথাগুলো লিখতেন। (ইবনে কাসীর) এর অর্থ এই যে, কোন অমুসলিমকে পত্র লিখলে বা কোন সভায় সম্বোধন করতে হলে উক্ত শব্দাবলী দ্বারা সালাম দেওয়া যেতে পারে; যা সৎপথ গ্রহণের সাথে শর্ত-সাপেক্ষ।
ত্বোয়া-হা 20:48
নিশ্চয় আমাদের প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করা হয়েছে যে, শাস্তি তার জন্য, যে মিথ্যা মনে করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
ত্বোয়া-হা 20:49
ফিরআউন বলল, ‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক?’
ত্বোয়া-হা 20:50
মূসা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথ নির্দেশ করেছেন।’[১]
[১] মানুষের জন্য যে আকার-আকৃতি যথোপযুক্ত ছিল তা মানুষকে এবং পশুদের জন্য যে আকার-আকৃতি যথোপযুক্ত ছিল তা তাদেরকে দান করেছেন। আর 'পথ-নির্দেশ' করার অর্থ হল প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার প্রকৃতিগত আবশ্যকতা অনুসারে বসবাস, পানাহার ও আচার-আচরণের নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। আর সেই নিয়মানুসারে প্রত্যেক জীব নিজের জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করে এবং নিজ নিজ মেকী জীবনের দিন-রজনী অতিবাহিত করে থাকে।
ত্বোয়া-হা 20:51
ফিরআউন বলল, ‘তা হলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি?’ [১]
[১] ফিরআউন কথার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রশ্নটি করেছিল। অর্থাৎ অতীত কালের লোকেরা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করেই পৃথিবী হতে বিদায় নিয়েছে, তাদের অবস্থা কি হবে?
ত্বোয়া-হা 20:52
মূসা বলল, ‘এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকট লিপিবদ্ধ আছে; আমার প্রতিপালক বিভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না।’[১]
[১] মূসা (আঃ) উত্তরে বলেছিলেন, সে জ্ঞান না আমার আছে, না তোমার। অবশ্য সে জ্ঞান আমার প্রতিপালকের আছে, যা তাঁর নিকট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। আর সেই অনুসারে তিনি তাদেরকে শাস্তি অথবা শান্তি দান করবেন। আল্লাহর জ্ঞান প্রতিটি জিনিসে এমনভাবে পরিব্যাপ্ত আছে যে, তাঁর দৃষ্টি হতে ছোট-বড় কোন জিনিসই লুক্কায়িত নয়; আর না তিনি কিছু বিস্মৃত হন। পক্ষান্তরে সৃষ্টির জ্ঞানে উক্ত দুই প্রকার ত্রুটিই বিদ্যমান। প্রথমতঃ তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ; যা সর্বব্যাপী নয়। আর দ্বিতীয়তঃ জ্ঞান লাভের পর তারা ভুলেও যায়। আমার প্রভু উক্ত উভয় শ্রেণীর ত্রুটি হতে পবিত্র। পরবর্তী আয়াতসমূহে প্রভুর আরো কিছু গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে।
ত্বোয়া-হা 20:53
যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন বিছানা এবং তাতে করে দিয়েছেন তোমাদের চলবার পথ। তিনি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং আমি তা দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি।
ত্বোয়া-হা 20:54
তোমরা আহার কর ও তোমাদের গবাদি পশু চরাও;[১] অবশ্যই এতে বহু নিদর্শন আছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য। [২]
[১] অর্থাৎ, এই বিভিন্ন প্রকার উৎপন্ন ফল-ফসলের মধ্যে কিছু তোমাদের পানাহার ও বিলাস-ভোগের জন্য, আর কিছু তোমাদের জীব-জন্তুদের জন্য।
[২] نُهَى শব্দটি نُهيَة এর বহুবচন যার অর্থঃ বিবেক, জ্ঞান। أولو النُّهى এর অর্থঃ বিবেকবান, জ্ঞানসম্পন্ন। ( نُهيَة এর মূল অর্থঃ শেষ, সমাপ্তি বা নিষেধ।) বিবেক বা জ্ঞানকে نُهيَة এবং বিবেকবান বা জ্ঞানীকে ذُو نُهيَة এই জন্য বলা হয় যে, তারই মতানুসারে কোন কাজ সম্পন্ন বা কোন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। অথবা এই কারণে যে, তা মানুষকে পাপ হতে নিষেধ করে। (ফাতহুল কাদীর)
ত্বোয়া-হা 20:55
আমি মাটি হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং তা হতে পুনর্বার বের করব। [১]
[১] কোন কোন বর্ণনায় মাইয়েতকে কবরে রাখার পর তিন মুঠি মাটি দেওয়ার সময় এই আয়াত পাঠ করা নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তবে সূত্রের দিক দিয়ে হাদীসটি দুর্বল। পরন্তু আয়াত পাঠ ছাড়া তিনবার মাটি দেওয়ার বর্ণনা ইবনে মাজাহতে আছে, যা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত। সেই জন্য দাফনের সময় দুই হাত দিয়ে কবরে তিনবার মাটি দেওয়াকে উলামাগণ মুস্তাহাব বলেছেন।
(দেখুন আহকামুল জানাইয ১৫২পৃঃ, ইরওয়াউল গালীল ৩/২০০, ২৫১নং, আলবানী)
ত্বোয়া-হা 20:56
আমি তো তাকে আমার সমস্ত নিদর্শন দেখিয়েছিলাম; কিন্তু সে মিথ্যাজ্ঞান করেছে ও অমান্য করেছে।
ত্বোয়া-হা 20:57
সে বলল, ‘হে মূসা! তুমি কি আমাদের নিকট এসেছ তোমার জাদু দ্বারা আমাদেরকে আমাদের দেশ হতে বহিস্কার করে দেওয়ার জন্য? [১]
[১] যখন ফিরআউনকে স্পষ্ট প্রমাণাদির সাথে সাথে ঐ সমস্ত মু'জিযা যা লাঠি ও উজ্জ্বল হাত রূপে মূসা (আঃ)-কে দান করা হয়েছিল। ফিরআউন এ সবকে জাদুর কারসাজি মনে করল ও বলতে লাগল, তুমি কি আমাদেরকে জাদুর জোরে আমাদের দেশ (মিসর) হতে বিতাড়িত করতে চাচ্ছ?
ত্বোয়া-হা 20:58
আমরাও অবশ্যই তোমার নিকট উপস্থিত করব এর অনুরূপ জাদু, সুতরাং আমাদের ও তোমার মাঝে নির্ধারণ কর এক নির্দিষ্ট সময় ও এক মধ্যবর্তী স্থান,[১] যার ব্যতিক্রম আমরাও করব না এবং তুমিও করবে না।’[২]
[১] مَوعِد শব্দটি ক্রিয়ামূল। অথবা কাল ও স্থানবাচকও হতে পারে। অর্থাৎ, কোন জায়গা বা কোন দিন নির্ধারিত কর।
[২] مكانًا سُوى পরিষ্কার সমতল ভূমি; যেখানে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যেক ব্যক্তি সহজেই দেখতে পারে। অথবা এমন মধ্যবর্তী জায়গা যেখানে দুই দল সহজেই উপস্থিত হতে পারে।
ত্বোয়া-হা 20:59
মূসা বলল, ‘তোমাদের নির্ধারিত সময় উৎসবের দিন[১] এবং সেই দিন পুর্বাহ্নে জনগণকে সমবেত করা হবে।’
[১] অর্থাৎ, নওরোজ অথবা বাৎসরিক কোন মেলা বা অনুষ্ঠানের দিন; যাকে তারা ঈদরূপে পালন করত।
ত্বোয়া-হা 20:60
অতঃপর ফিরআউন প্রস্থান করল এবং পরে তার কৌশলসমূহ একত্রিত করল ও তারপর আসল। [১]
[১] অর্থাৎ, বিভিন্ন শহর হতে সুদক্ষ জাদুকরদেরকে একত্রিত করে সমাবেশে উপস্থিত হল।
ত্বোয়া-হা 20:61
মূসা তাদেরকে বলল, ‘দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না, করলে তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করবেন; আর যে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে।’ [১]
[১] যখন ফিরআউন রাজসভায় জাদুকরদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উৎসাহিত করছিল এবং তাদেরকে পুরস্কার ও বিশেষ নৈকট্য দানের কথা প্রকাশ করছিল, অনুরূপ মূসা (আঃ)ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বে তাদেরকে উপদেশ দিলেন এবং তাদের বর্তমান আচরণের ব্যাপারে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখালেন।
ত্বোয়া-হা 20:62
তারা আপোসে নিজেদের কর্ম সম্বন্ধে বিতর্ক করতে লাগল এবং তারা গোপনে পরামর্শ করল। [১]
[১] মূসা (আঃ)-এর উপদেশে তাদের আপোসে কিছু মতভেদ দেখা দিল। কেউ কেউ চুপিসারে বলতে লাগল, ইনি সত্যিকারেই আল্লাহর নবী না হন। যেহেতু তাঁর কথাবার্তা তো জাদুকরদের মত নয়; বরং নবীদের মত মনে হচ্ছে। আর কেউ এর বিপরীত মত প্রকাশ করল।
ত্বোয়া-হা 20:63
ওরা বলল, ‘এই দুইজন অবশ্যই জাদুকর, তারা তাদের জাদু দ্বারা তোমাদেরকে তোমাদের দেশ হতে বহিষ্কার করতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন-ব্যবস্থা নস্যাৎ করতে চায়।[১]
[১] مُثلى শব্দটি طَرِيقَة শব্দের বিশেষণ; আর এটি أَمثَل শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এর অর্থঃ উৎকৃষ্ট। অর্থ এই যে, যদি এরা দুই ভাই জাদু বলে বিজয়ী হয়ে যায়, তাহলে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত লোকেরা তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। আর তাতে আমাদের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাবে ও তাদের ক্ষমতা লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া আমাদের উৎকৃষ্ট জীবন-ব্যবস্থা বা উত্তম ধর্মমত ও মযহাবকেও নস্যাৎ করে ফেলবে। অর্থাৎ, ফিরআউনীরা তাদের শিরকীয় ধর্মমতকে উত্তম ধর্মমত বলে মনে করত; যেমন বর্তমানে প্রত্যেক বাতিল ধর্মমত ও দলের লোকেরা এই ভুল ধারণাই পোষণ করে থাকে। মহান আল্লাহ সত্যই বলেছেন, {كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ} অর্থাৎ, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল। (রূমঃ ৩২)
ত্বোয়া-হা 20:64
অতএব তোমরা তোমাদের কলা-কৌশল সুসংহত কর। তারপর সারিবদ্ধ হয়ে উপস্থিত হও। আজকে যে জয়ী হবে সেই হবে সফল।’
ত্বোয়া-হা 20:65
ওরা বলল, ‘হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি।’
ত্বোয়া-হা 20:66
মুসা বলল, ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর।’[১] সুতরাং ওদের জাদুর প্রভাবে মূসার মনে হল, ওদের দড়ি ও লাঠিগুলো যেন ছুটাছুটি করছে।[২]
[১] মূসা (আঃ) তাদেরকে প্রথমে নিজেদের খেলা দেখাতে বললেন, যাতে এটা তাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, জাদুকরের এতবড় একটি দল যাদেরকে ফিরআউন একত্রিত করে নিয়ে এসেছে তাদেরকে এবং অনুরূপ তাদের জাদুর নৈপুণ্যে ও ভেল্কিবাজিতে তিনি ভীত নন। দ্বিতীয়তঃ ওদের জাদুর ভেল্কি যখন আল্লাহর মু'জিযার সামনে চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তখন এর একটি সুন্দর প্রতিক্রিয়া হবে এবং জাদুকররা ভাবতে বাধ্য হবে যে, এটা জাদু নয়; বরং সত্যই তিনি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত। নচেৎ ক্ষণিকের মধ্যে তাঁর একটি লাঠি আমাদের সমস্ত ভেল্কির জিনিসকে গিলে ফেলল কিভাবে?
[২] কুরআনের শব্দাবলী দ্বারা জানা যায় যে, দড়ি ও লাঠিগুলো সত্য সত্যই সাপ হয়ে যায়নি। বরং তা জাদুর প্রভাবে এ রকম মনে হচ্ছিল। যেমন সম্মোহন বিদ্যা বা ইন্দ্রজালের সাহায্যে চোখে ধাঁধা বা ভেল্কি লাগিয়ে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এর প্রভাব অবশ্যই হয়ে থাকে যে, সাময়িক ও অস্থায়ীভাবে দর্শকদেরকে অভিভূত করে ফেলে। যদিও সেই জিনিসের বাস্তবতায় কোন পরিবর্তন ঘটে না। দ্বিতীয় কথা এই জানা গেল যে, জাদু যত বড়ই হোক না কেন জিনিসের আসলত্ব বা প্রকৃততত্ব বদলাতে পারে না।
ত্বোয়া-হা 20:67
মূসা তার অন্তরে কিছু ভয় অনুভব করল।
ত্বোয়া-হা 20:68
আমি বললাম, ‘ভয় করো না; নিশ্চয় তুমিই প্রবল।[১]
[১] এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে মূসা (আঃ)-এর মনে ভয়ের সঞ্চার হল। আর তা ছিল প্রকৃতিগত স্বাভাবিক ব্যাপার; যা নবুঅত ও ত্রুটিহীনতার পরিপন্থী নয়। কারণ, নবী একজন মানুষই হয়ে থাকেন; যিনি মানবীয় স্বাভাবিক আচরণের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। এখান হতে এ কথা বুঝা যায় যে, যেমন নবীগণ অন্যান্য মানুষের মত বিপদগ্রস্ত হন, তেমনি তাঁরা জাদুর প্রভাবে প্রভাবিতও হতে পারেন। যেমন নবী (সাঃ)-এর উপর ইয়াহুদীরা জাদু করেছিল এবং তার প্রভাব তিনিও অনুভব করেছিলেন। এতে নবুঅতের কাজ প্রভাবিত হয় না। আল্লাহ তাআলা নবীকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিয়ে থাকেন এবং জাদুর ফলে অহী ও রিসালতের কর্তব্য আদায়ে প্রভাব পড়তে দেন না। তাছাড়া এটাও হতে পারে যে, মূসা (আঃ)-এর এই ভয় হল যে, আমার লাঠি ফেলার আগে আগেই জনগণ যেন জাদু ও ভেল্কিবাজি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যায়। কিন্তু অধিকতর সম্ভাবনায় তাঁর ভয় এই কারণে হয়েছিল যে, জাদুকররা যে ভেল্কি দেখাল তা লাঠির দ্বারা। আর তাঁর হাতেও ছিল লাঠি, যা মাটিতে ফেলার অপেক্ষায় ছিলেন। মূসা (আঃ)-এর মনে হল যে, দর্শকরা যেন সন্দেহ ও সংশয়ে না পড়ে যায় এবং তারা যেন এটা ভেবে না নেয় যে, দু'দলই একই ধরনের জাদু প্রদর্শন করল। এই জন্য এ ফায়সালা ও নির্ণয় কিভাবে সম্ভব যে, কোনটা জাদু এবং কোনটা মু'জিযা? কে বিজয়ী এবং কে পরাজিত? অর্থাৎ, জাদুও মু'জিযার মধ্যে পার্থক্য সাধনের যে উদ্দেশ্য, সেটা বোধ হয় উপর্যুক্ত কারণে সম্ভব হবে না। এখান হতে বুঝা গেল যে, নবীর নিজ হতে মু'জিযা দেখানো তো অনেক দূরের কথা, অধিকাংশ সময়ে তাঁর এটাও জানা থাকে না যে, তাঁর হাত দ্বারা কোন্ শ্রেণীর মু'জিযা প্রকাশ পাবে। নবীদের হাতে মু'জিযা প্রকাশ করার কাজ একমাত্র আল্লাহর। যাই হোক, মূসা (আঃ)-এর এই সন্দেহ ও সংশয় দূর করে মহান আল্লাহ বললেন, 'হে মূসা! কোন প্রকার ভয় ও ভীতির কারণ নেই, তুমিই বিজয়ী হবে।' এই বাক্য দ্বারা প্রকৃতিগত ভয় এবং অন্যান্য আশংকা সবই দূর করে দিলেন। সুতরাং শেষ পর্যন্ত তাই হল, যা পরবর্তী আয়াতসমূহে বলা হয়েছে।
ত্বোয়া-হা 20:69
তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর, এটি ওরা যা করেছে তা গ্রাস করে ফেলবে। ওরা যা করেছে তা তো জাদুকরের কৌশলমাত্র, এবং যেখান হতেই সে আগমন করুক, জাদুকর কখনই কৃতকার্য হবে না।’
ত্বোয়া-হা 20:70
অতঃপর জাদুকররা সিজদায় পড়ল ও বলল, ‘আমরা হারূন ও মূসার প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।’
ত্বোয়া-হা 20:71
ফিরআউন বলল, ‘তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার পূর্বেই কী তোমরা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রধান যে তোমাদের জাদু শিক্ষা দিয়েছে। অতএব নিশ্চয় আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীতভাবে[১] কেটে ফেলব এবং তোমাদেরকে খেজুর কান্ডে শূলবিদ্ধ করব। আর তখন তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে যে, আমাদের মধ্যে কার শক্তি কঠোরতর ও দীর্ঘস্থায়ী।’
[১] 'বিপরীতভাবে' এর অর্থ হল, ডান হাত ও বাম পা অথবা বাম হাত ও ডান পা।
ত্বোয়া-হা 20:72
তারা বলল, ‘আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন এসে গেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন[১] তাঁর উপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেব না। সুতরাং তুমি যা করতে চাও তাই কর। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবন সম্বন্ধে যা করবার করতে পারো। [২]
[১] এই অনুবাদ ঐ সময় সঠিক হবে যখন وَالَّذِي فَطَرَنِي বাক্যের সংযোগ مَا جَاءنَا বাক্যের সাথে ধরা হবে। পক্ষান্তরে কিছু ব্যাখ্যাতা وَالَّذِي فَطَرَنِي বাক্যটিকে শপথ বাক্য বলেছেন। অর্থাৎ, সেই সত্তার শপথ যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন! আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন এসে গেছে, তার উপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেব না।
[২] অর্থাৎ, তোমার যা করার ক্ষমতা আছে, তাই কর। আমরা জানি, তোমার ক্ষমতা শুধু এই পার্থিব জীবনেই চলতে পারে। পক্ষান্তরে আমরা ঈমান এনেছি সেই পালনকর্তার উপর যাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দুনিয়া ও আখেরাতে সমানভাবে চলে। মৃত্যুর পর আমরা তোমার শাসন ও অত্যাচার থেকে তো বেঁচে যাব। কারণ দেহ হতে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার পর আমাদের প্রতি তোমার এখতিয়ার শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে থাকি, তাহলে মৃত্যুর পরও আল্লাহর এখতিয়ারের বাইরে বের হওয়া সম্ভব নয়। তিনি আমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে সক্ষম। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পর এক মু'মিনের জীবনে যে মহা পরিবর্তন আসা আবশ্যক, পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী ও আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি যে দৃঢ়-বিশ্বাস হওয়া দরকার, অতঃপর এই আকীদা ও বিশ্বাসের উপর যে দুঃখ-কষ্ট আসে তা যে উদ্যম, ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার সাথে বরণ করার প্রয়োজন, জাদুকররা তার একটি প্রকৃষ্ট নমুনা পেশ করেছে। ঈমান আনার পূর্বে কেমন তারা ফিরআউনের নিকট থেকে পুরস্কার ও পার্থিব পদ-মর্যাদার আকাঙ্ক্ষী ছিল, কিন্তু ঈমান আনার পরে কোন প্রলোভন ও প্ররোচনা তাদেরকে বিচলিত করতে পারেনি এবং দন্ড ও শাস্তির হুমকিও তাদেরকে ঈমান হতে বিমুখ করতে সফল হয়নি।
ত্বোয়া-হা 20:73
আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস করেছি; যাতে তিনি আমাদের পাপরাশি এবং তুমি আমাদেরকে যে জাদু করতে বাধ্য করেছিলে (তার পাপ) ক্ষমা করে দেন। আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠতম ও অবিনশ্বর।’[১]
[১] এটি ফিরআউনের উক্তি, 'তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে যে, আমাদের মধ্যে কার শক্তি কঠোরতর ও দীর্ঘস্থায়ী'-এর উত্তর। অর্থাৎ, হে ফিরআউন! তুমি আমাদেরকে যে কঠিন শাস্তি দেওয়ার ধমক দিচ্ছ, তার তুলনায় আল্লাহর নিকট যে প্রতিদান পাব, তা অত্যধিক শ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী।
ত্বোয়া-হা 20:74
নিশ্চয় যে তার প্রতিপালকের নিকট অপরাধী হয়ে উপস্থিত হবে তার জন্য আছে জাহান্নাম; সেখানে সে মরবেও না এবং বাঁচবেও না।[১]
[১] অর্থাৎ, আমার আযাবে অতিষ্ঠ হয়ে তারা মরণ কামনা করবে, কিন্তু তাদের মরণ আসবে না। আর দিবারাত্রি আযাবের কষ্ট ভোগ করতে থাকা, পানাহারের জন্য যাক্কুমের মত অতি তিক্ত গাছ, জাহান্নামীদের দেহ হতে নির্গত রক্ত-পুঁজ পেতে থাকা, এটা কি কোন জীবন হল? হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে বাঁচাও।
ত্বোয়া-হা 20:75
আর যারা তাঁর নিকট বিশ্বাসী হয়ে ও সৎকর্ম করে উপস্থিত হবে, তাদের জন্য আছে সমুচ্চ মর্যাদাসমূহ।
ত্বোয়া-হা 20:76
স্থায়ী জান্নাত যার নিচে নদীমালা প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এই পুরস্কার তাদেরই যারা পবিত্র।[১]
[১] জাহান্নামীদের বিপরীত ঈমানদারদেরকে জান্নাতে যে সুখময় বিলাস-জীবন দেওয়া হবে মহান আল্লাহ এখানে তার উল্লেখ করেছেন এবং পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এর উপযুক্ত তারাই হবে যারা ঈমান আনার পর ঈমানের চাহিদাও পূরণ করে। অর্থাৎ, তারা সৎকর্ম করে ও নিজের আত্মাকে পাপাচার হতে পবিত্র রাখে। মুখে কিছু বাক্য পাঠ করার নাম ঈমান নয়, বরং বিশ্বাস, স্বীকার ও আমলের সমষ্টির নাম হল ঈমান।
ত্বোয়া-হা 20:77
আমি অবশ্যই মূসার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এই মর্মে যে, আমার দাসদের নিয়ে রাতারাতি বের হয়ে যাও[১] এবং ওদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে এক শুষ্ক পথ নির্মাণ কর।[২] পশ্চাৎ হতে এসে তোমাকে ধরে ফেলবে, এ আশঙ্কা করো না এবং ভয়ও করো না।[৩]
[১] যখন ফিরআউন ঈমান আনল না এবং বানী ইস্রাঈলদেরকে মুক্তও করল না, তখন মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে এই আদেশ করলেন।
[২] এর বিস্তারিত আলোচনা সূরা শুআরাতে আসবে। মূসা (আঃ) আল্লাহর আদেশে সমুদ্রে লাঠি মারলেন যার কারণে সমুদ্র পার করার জন্য শুকনো রাস্তা তৈরী হয়ে গেল।
[৩] আশঙ্কা ফিরআউন ও তার সৈন্যদলের, আর ভয় পানিতে ডুবে মরার।
ত্বোয়া-হা 20:78
অতঃপর ফিরআউন তার সেনাবাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলে সমুদ্র ওদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করল।[১]
[১] যখন সেই শুকনো রাস্তা দিয়ে ফিরআউন তার সৈন্য সামন্তরা চলতে শুরু করল, তখন আল্লাহ সমুদ্রকে আদেশ করলেন, 'তুমি আগের অবস্থায় ফিরে যাও।' আর তা সঙ্গে সঙ্গে চোখের পলকে শুকনো রাস্তা সমুদ্রের ঢেউয়ে পরিণত হল এবং ফিরআউন তথা তার সৈন্য-সামন্ত সবই সমুদ্রে ডুবে মরল। غَشِيَهم এর অর্থ عَلاهُم وأصَابَهُم অর্থাৎ, সমুদ্রের পানি তাদের উপরে এসে তাদেরকে ঢেকে নিল। مَا غَشِيَهم এর পুনরাবৃত্তি ভয়ঙ্করতা বর্ণনার জন্য।
ত্বোয়া-হা 20:79
ফিরআউন তার সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করেছিল, সৎপথ দেখায়নি। [১]
[১] যার ফলে সমুদ্রে ডুবে মরা তাদের ভাগ্য ছিল।
ত্বোয়া-হা 20:80
হে বানী ইস্রাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে তোমাদের শত্রু হতে উদ্ধার করলাম, আমি তোমাদেরকে ত্বুর পাহাড়ের ডান পাশে (তাওরাত) দানের প্রতিশ্রুতি দিলাম[১] এবং তোমাদের নিকট ‘মান্ন্’ ও ‘সালওয়া’ প্রেরণ করলাম। [২]
[১] ووَاعَدنَاكُم "আমি তোমাদেরকে তূর পাহাড়ের ডান পাশে (তাওরাত) দানের প্রতিশ্রুতি দিলাম।" এখানে 'তোমাদের' সর্বনাম বহুবচন ব্যবহারের অর্থ হল যে, মূসা ত্বুর পাহাড়ে তোমাদেরকে প্রতিনিধিরূপে নিয়ে আসবে, যাতে আমি তোমাদের সামনেই তার সঙ্গে কথোপকথন করতে পারি। অথবা বহুবচন সর্বনাম এই কারণে ব্যবহার করা হয়েছে, যেহেতু মূসা (আঃ)-কে ত্বুর পাহাড়ে আহবান করা হয়েছিল বানী ইস্রাঈলদের স্বার্থেই তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যই।[২] 'মান্ন্ ও সালওয়া' অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা সূরা বাক্বারাহ ২:৫৭ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। 'মান্ন্' ছিল কোন মিষ্টি খাদ্য যা আকাশ হতে অবতীর্ণ হত। আর 'সালওয়া' হল এক জাতীয় পাখি যা অধিক সংখ্যায় তাদের কাছে আসত এবং তারা তাদের প্রয়োজন মত তা ধরত ও রান্না করে খেত। (ইবনে কাসীর)
ত্বোয়া-হা 20:81
তোমাদের যে উপজীবিকা দান করলাম তা হতে পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর এবং এ বিষয়ে সীমালংঘন করো না। [১] করলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ পতিত হবে। আর যার উপরে আমার ক্রোধ পতিত হবে সে অবশ্যই ধ্বংস হবে। [২]
[১] طُغيَان এর অর্থঃ সীমালংঘন করা। অর্থাৎ হালাল ও পবিত্র জিনিসের সীমা ছেড়ে হারাম ও অপবিত্র জিনিসের দিকে অতিক্রম করো না। অথবা আল্লাহর অনুগ্রহসমূহকে অস্বীকার করে বা অনুগ্রহকারীর অবাধ্য হয়ে সীমালংঘন করো না। এই সমস্ত ভাবার্থের উপর طُغيَان শব্দ ব্যবহার করা যায়। আর কেউ কেউ বলেন যে, এখানে طُغيَان এর অর্থ হল, তোমরা প্রয়োজন মত পাখি ধর এবং প্রয়োজনের বেশী ধরে সীমা অতিক্রম করো না।
[২] এর অন্য এক অর্থ বর্ণনা করা হয়, আর তা হল, 'সে হাবিয়া তথা জাহান্নামে পতিত হবে।' হাবিয়া জাহান্নামের নিম্নস্তরকে বলা হয়। অর্থাৎ সে জাহান্নামের গভীর বিভাগের উপযুক্ত বাসিন্দা হবে।
ত্বোয়া-হা 20:82
নিশ্চয় আমি তার জন্য বড় ক্ষমাশীল যে তওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকাজ করে ও সৎপথে অবিচল থাকে। [১]
[১] মহান আল্লাহর ক্ষমাযোগ্য হওয়ার জন্য চারটি জিনিস আবশ্যক; (ক) কুফর, শিরক ও পাপ হতে তওবা। (খ) ঈমান, (গ) সৎকর্ম ও (ঘ) সৎপথে অটল থাকা। অর্থাৎ উক্ত অবস্থায় অবিচল থাকা, যাতে ঈমানের অবস্থায় মৃত্যু আসে। অন্যথা স্পষ্ট যে, তওবা ও ঈমানের পর যদি কেউ কুফরী ও শিরকের রাস্তা অবলম্বন করে এবং সেই অবস্থায় তার মৃত্যু এসে যায়, তাহলে ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তির যোগ্য হতে হবে।
ত্বোয়া-হা 20:83
হে মূসা! তোমার সম্প্রদায়কে পশ্চাতে ফেলে তোমাকে ত্বরা করতে বাধ্য করল কিসে?
ত্বোয়া-হা 20:84
সে বলল, ‘ওই তো ওরা আমার পশ্চাতে আসছে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি তাড়াতাড়ি তোমার নিকট এলাম, তুমি সন্তুষ্ট হবে এই জন্য।’ [১]
[১] লোহিত সাগর পার করার পর মূসা (আঃ) বানী ইস্রাঈলের সম্মানিত লোকদেরকে সাথে নিয়ে ত্বুর পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হলেন। কিন্তু প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের তীব্র বাসনায় সাথীদেরকে পিছনে রেখে দ্রুত গতিতে পাহাড়ে পৌঁছে গেলেন। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, তোমার সন্তুষ্টি তাড়াতাড়ি পাবার আশায়। আর তারা আমার পিছনেই আসছে। কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, তারা আমার পিছনে আসছে; বরং অর্থ হল, তারা আমার পিছনে ত্বুর পাহাড়ের নিকটেই রয়েছে এবং আমার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
ত্বোয়া-হা 20:85
তিনি বললেন, ‘তুমি (চলে আসার) পর আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি এবং সামেরী ওদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।’ [১]
[১] মূসার ত্বুর পাহাড়ে যাওয়ার পর সামেরী নামক এক ব্যক্তি বানী-ইস্রাঈলদেরকে বাছুর পূজায় লাগিয়ে দিল। যার সংবাদ আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-কে ত্বুর পাহাড়েই দিলেন যে, সামেরী তোমার জাতিকে পথভ্রষ্ট করে ফেলেছে। ফিতনা বা পরীক্ষায় ফেলার সম্পর্ক আল্লাহ নিজের দিকেই করেছেন শুধু সৃষ্টিকর্তা হিসাবে। নচেৎ এই পথভ্রষ্টতার কারণ হল সামেরী; যেমন أَضَلَّهمُ السَّامري (সামেরী ওদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে) বাক্য দ্বারা পরিষ্কার।
ত্বোয়া-হা 20:86
অতঃপর মূসা তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেল ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে। সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি?[১] তবে কি তোমাদের কাছে সেই সময় দীর্ঘ মনে হল?[২] অথবা তোমরা কি চাও যে, তোমাদের উপর তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ নেমে আসুক? তাই তোমরা আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?’[৩]
[১] এর অর্থ জান্নাত বা বিজয় বা সফলতার প্রতিশ্রুতি; যদি তারা ধর্মের উপর সুদৃঢ় থাকে। অথবা তাওরাত প্রদানের প্রতিশ্রুতি; যার জন্য তাদেরকে ত্বুর পাহাড়ে ডাকা হয়েছিল।
[২] সেই প্রতিশ্রুতির কাল কি সুদীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল যে তোমরা ভুলে গেলে এবং বাছুর পূজা শুরু করে দিলে?
[৩] মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তার ত্বুর পাহাড় হতে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে দৃঢ় থাকবে। অথবা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরাও আপনার পিছু পিছু ত্বুর পাহাড়ে আসছি। কিন্তু রাস্তাতে থেমে গিয়ে তারা বাছুর পূজা শুরু করে দিল।
ত্বোয়া-হা 20:87
ওরা বলল, ‘আমরা তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি[১] বরং আমাদেরকে সম্প্রদায়ের অলঙ্কারের ভার বহন করতে দেওয়া হয়েছিল, পরে আমরা তা আগুনে নিক্ষেপ করেছিলাম; অতঃপর সামেরীও ঐরূপ নিক্ষেপ করেছিল।
[১] অর্থাৎ, আমরা নিজ এখতিয়ারে এ কাজ করিনি। বরং এই ভুল আমাদের বিনা এখতিয়ারে হয়ে গেছে। পরবর্তীতে সে কারণ বলা হচ্ছে।
ত্বোয়া-হা 20:88
অতঃপর সে ওদের জন্য গড়ল এক গো-বৎস (বাছুর); এক অবয়ব, যা গরুর শব্দ করত। ওরা বলল, এই হল তোমাদের এবং মূসার উপাস্য;[১] কিন্তু মূসা ভুলে গেছে।’
[১] زِينَة বলে অলংকার এবং القَوم (সম্প্রদায়) বলে ফিরআউনের সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। কথিত আছে যে, এই সমস্ত অলংকার তারা ফিরআউনীদের কাছ হতে সাময়িক ব্যবহারের জন্য চেয়ে নিয়েছিল। সেই কারণেই وِزر এর বহুবচন أَوزَار (বোঝা বা ভার) শব্দ ব্যবহার হয়েছে। কারণ এ সব তাদের জন্য বৈধ ছিল না। মোটকথা, ঐ সমস্ত অলংকার জমা করে একটি গর্তে রাখা হল। সামেরী -- যে মুসলিমদের কিছু ভ্রষ্ট দলের মত -- ভ্রষ্ট ছিল সেও কিছু মাটি রাখল; যেমন পরে সে কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তারপর সে সমস্ত অলংকারকে গলিয়ে একটি এমন ধরনের বাছুর বানাল, যার ভিতর হাওয়া প্রবেশ-বাহির হওয়ার কারণে এক ধরনের শব্দ সৃষ্টি হত। আর সেই শব্দ দ্বারাই সে বানী-ইস্রাঈলকে বিভ্রান্ত করল। সে তাদেরকে বলল, মূসা তো ভুলে গেছেন। তিনি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ত্বুর পাহাড়ে গেছেন, অথচ মূসা ও তোমাদের উপাস্য তো এটিই।
ত্বোয়া-হা 20:89
তবে কি ওরা ভেবে দেখে না যে, তা তাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাদের কোন ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতাও রাখে না? [১]
[১] আল্লাহ তাআলা তাদের মূর্খতা স্পষ্ট করার জন্য বলেছেন, জ্ঞানান্ধরা কি এতটুকুও বুঝতে সক্ষম নয় যে, তাদের হাতে গড়া ঐ বাছুর দেবতা তাদের কোন কথার উত্তরও দিতে পারে না, তাদের কোন লাভ-নোকসানও করতে পারে না। অথচ মা'বুদ ও উপাস্য ঐ সত্তাই হতে পারেন, যিনি সকলের মিনতি শোনা, উপকার বা অপকার করা এবং প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা রাখেন।
ত্বোয়া-হা 20:90
হারূন ওদেরকে পূর্বেই বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তোমাদের কেবল পরীক্ষা করা হয়েছে। নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক পরম দয়াময়। সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল।’ [১]
[১] হারূন (আঃ) এ কথা তখনই বলেছিলেন, যখন এই লোকেরা সামেরীর কথা অনুসারে বাছুরের পূজা শুরু করে দিয়েছিল।
ত্বোয়া-হা 20:91
ওরা বলেছিল, ‘আমাদের নিকট মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা কিছুতেই এর পূজা হতে বিরত হব না।’ [১]
[১] ইস্রাঈলীদেরকে বাছুর পূজা এত ভাল লেগেছিল যে, তারা হারূন (আঃ)-এর কথায় কর্ণপাত করল না এবং তার সম্মান ও ইবাদত ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাল।
ত্বোয়া-হা 20:92
মূসা বলল, ‘হে হারূন! তুমি যখন দেখলে ওরা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল,
ত্বোয়া-হা 20:93
আমার অনুসরণ করা হতে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে?’ [১]
[১] অর্থাৎ, যদি তারা তোমার নিষেধ পালন করতে অস্বীকার করেছিল, তাহলে তোমার উচিত ছিল, সাথে সাথে ত্বুর পাহাড়ে এসে আমাকে এর খবর দেওয়া। তুমিও আমার নির্দেশের পরোয়া করনি। অর্থাৎ, তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মর্যাদা রক্ষা করনি।
ত্বোয়া-হা 20:94
হারূন বলল, ‘হে আমার সহোদর! আপনি আমার দাড়ি ও মাথা (চুল) ধরবেন না। আসলে আমি আশঙ্কা করলাম যে, আপনি বলবেন, তুমি বানী ইস্রাঈলদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ[১] এবং তুমি আমার কথার অপেক্ষা করনি।’[২]
[১] মূসা (আঃ) নিজ জাতিকে শিরকের পাপে ভ্রষ্ট হতে দেখে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত ছিলেন এবং এই বুঝেছিলেন যে, হয়তো বা তাঁর ভাই হারূন যাঁকে তিনি প্রতিনিধিরূপে রেখে গিয়েছিলেন তাঁরও কিছু অবহেলা ও শৈথিল্য আছে। যার কারণে অত্যন্ত ক্রোধের সাথে হারূন (আঃ)-এর দাড়ি ও চুল ধরে টান মেরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। যার ফলে তিনি মূসা (আঃ)-কে এত কঠোরতা প্রদর্শন না করতে আবেদন জানান।[২] সূরা আ'রাফ (৭:১৪২ আয়াত) এ হারূন (আঃ)-এর উত্তর এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, লোকেরা আমাকে দুর্বল ভেবেছিল এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। যার অর্থ হল, হারূন (আঃ) নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পালন করেছিলেন এবং তাদেরকে বুঝানো ও বাছুর পূজা হতে বিরত করার ব্যাপারে কোন প্রকার ত্রুটি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। কিন্তু ব্যাপারটিকে তিনি এত বাড়তে দেননি, যাতে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি না হয়ে যায়। কারণ হারূন (আঃ)-কে হত্যা মানেই তাঁর সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে আপোসে রক্তপাত শুরু হয়ে যেত এবং বানী ইস্রাঈলরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ত; যারা একে অপরের রক্ত-পিপাসু হত। যেহেতু মূসা (আঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, সেহেতু তিনি এ স্পর্শকাতর পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেননি। আর সেই কারণেই তিনি হারূন (আঃ)-এর প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটি পরিষ্কার হওয়ার পর তিনি আসল অপরাধীর দিকে ফিরলেন। সুতরাং হারূন (আঃ)-এর উক্তি, 'আসলে আমি আশঙ্কা করলাম যে, আপনি বলবেন, তুমি বানী ইস্রাঈলদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ এবং তুমি আমার কথার অপেক্ষা করনি' থেকে এই দলীল নেওয়া ঠিক নয় যে, মুসলিমদের মাঝে একতা ও সংহতি বজায় রাখার স্বার্থে শিরকী কর্মকান্ড ও অন্যায়কে মেনে নেওয়া উচিত। (যেমন কিছু লোক এ ধারণা রেখে থাকে।) কারণ হারূন (আঃ) না এমন করেছিলেন, আর না তাঁর উক্তির উদ্দেশ্য এমন ছিল।
ত্বোয়া-হা 20:95
মূসা বলল, ‘হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি?’
ত্বোয়া-হা 20:96
সে বলল, ‘আমি দেখলাম যা ওরা দেখেনি। অতঃপর আমি দূত (জিবরীল)এর পদচিহ্ন হতে একমুষ্ঠি ধূলা নিলাম এবং তা আমি (বাছুরের উপর) নিক্ষেপ করলাম।[১] আমার মন আমার জন্য এরূপ করা শোভন করল।’
[১] অধিকাংশ মুফাসসিরগণ الرَّسُول (দূত) বলতে জিবরীল (আঃ)-কেই বুঝিয়েছেন। আর এর অর্থ বলেছেন যে, সামেরী জিবরীলের ঘোড়া পার হতে দেখল এবং তার পায়ের নিচের কিছু মাটি নিজের কাছে রেখে নিল। যার মধ্যে কিছু অলৌকিক প্রভাব বিদ্যমান ছিল। সে সেই মাটিকে গলিত অলংকার বা বাছুর এর ভিতর ভরে দিল; যার ফলে ওর ভিতর হতে এক ধরনের আওয়াজ বের হতে শুরু হল। আর তা তাদের ভ্রষ্টতা ও ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়াল।
ত্বোয়া-হা 20:97
মূসা বললেন, ‘দূর হও! তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য এটিই থাকল যে, তুমি বলবে ‘‘আমি অস্পৃশ্য’’[১] এবং তোমার জন্য থাকল এক নির্দিষ্টকাল যার ব্যতিক্রম হবে না।[২] আর তুমি তোমার সেই উপাস্যের প্রতি লক্ষ্য কর, যার পূজায় তুমি রত ছিলে, আমরা অবশ্যই ওকে জ্বালিয়ে দেব অতঃপর ওকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সাগরে নিক্ষেপ করব। [৩]
[১] অর্থাৎ, তুমি সারা জীবন এটি বলতে থাকবে যে, আমার নিকট হতে দূরে থাকো, আমাকে স্পর্শ করো না বা ছুঁয়ো না। কারণ তাকে স্পর্শ করার সাথে সাথে (সামেরী ও স্পর্শকারী) উভয়েই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ত। সেই কারণে যখনই সে কোন মানুষকে দেখত, তখনই হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠত, 'আমাকে ছুঁয়ো না।' কথিত আছে যে, পরবর্তীতে সে মানুষের বসতি এলাকা ছেড়ে জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে জীব-জন্তুদের সাথে তার জীবন অতিবাহিত হয় এবং সে মানুষের জন্য শিক্ষার এক নমুনা হয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য যে যত বেশী বাহানা, ছল-চাতুরি ও ধোঁকাবাজি করবে দুনিয়া ও আখেরাতে তার শাস্তিও সেই হিসাবে তত বেশী কঠিন ও শিক্ষণীয় হবে।
[২] অর্থাৎ, আখেরাতের শাস্তি এর ভিন্ন অতিরিক্ত; যা তাকে অবশ্য-অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
[৩] এখান হতে বুঝা গেল যে, শিরকের চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া; বরং তার নাম-নিশান ও অস্তিত্ব মিটিয়ে ফেলা দরকার, চাহে তার সম্পর্ক যত বড়ই ব্যক্তিত্বের সাথে হোক না কেন। আর এটা তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধা ও অপমান নয়; যেমন বিদআতী, কবর ও তাজিয়া পূজারীরা মনে করে থাকে, বরং এটি তাওহীদের উদ্দেশ্য ও ধর্মীয় আত্মচেতনাবোধের দাবী। যেমন এই ঘটনায় 'দূত (জিবরীল)এর পদচিহ্ন'-এর মাহাত্ম্য খেয়াল করা হয়নি; যাতে বাহ্য-দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক বরকত দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। বরং তা সত্ত্বেও তার পরোয়া করা হয়নি। কারণ তা শিরকের মাধ্যম ও অসীলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ত্বোয়া-হা 20:98
তোমাদের উপাস্য কেবল আল্লাহই, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। সর্ব বিষয় তাঁর জ্ঞানায়ত্তে।’
ত্বোয়া-হা 20:99
পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আমি এইভাবে তোমার নিকট বর্ণনা করি[১] এবং নিশ্চয় আমি তোমাকে আমার নিকট হতে উপদেশ (কুরআন) দান করেছি। [২]
[১] অর্থাৎ, যেরূপ আমি ফিরআউন ও মূসার ঘটনা বর্ণনা করেছি, ঠিক অনুরূপ বিগত নবীদের ঘটনাও তোমার সামনে তুলে ধরছি; যাতে তুমি তাদের সম্পর্কে অবহিত হও এবং তার মধ্যে যে সব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে তা লোকেদের সামনে প্রকাশ কর; যাতে লোকেরা তার আলোকে সঠিক পন্থা অবলম্বন করতে পারে।
[২] ذِكر (উপদেশ বা স্মরণ) বলতে (কুরআন আযীম)-কে বুঝানো হয়েছে। যা দ্বারা বান্দা নিজের প্রভুকে স্মরণ করে সরল পথের অনুসরণ করে, (উপদেশ গ্রহণ করে) মুক্তি তথা সুখ-সৌভাগ্যের পথ অবলম্বন করে।
ত্বোয়া-হা 20:100
যে কেউ এ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে,[১] ফলতঃ সে কিয়ামতের দিন (মহাপাপের) বোঝা বহন করবে। [২]
[১] অর্থাৎ এর প্রতি ঈমান আনবে না এবং এতে যা কিছু লিপিবদ্ধ রয়েছে তার উপর আমলও করবে না।
[২] অর্থাৎ মহাপাপের বোঝা বহন করবে, কারণ তার আমলনামা পুণ্য থেকে খালি ও পাপে পরিপূর্ণ থাকবে।
ত্বোয়া-হা 20:101
ঐ (পাপের শাস্তি)তে ওরা স্থায়ী হবে[১] এবং কিয়ামতের দিন এই বোঝা ওদের জন্য কত মন্দ হবে।
[১] না ওরা তা হতে বাঁচতে পারবে আর না পালাতে।
ত্বোয়া-হা 20:102
যেদিন শিঙ্গায়[১] ফুৎকার দেওয়া হবে সেদিন আমি অপরাধীদের (চক্ষু) নীল হয়ে যাওয়া অবস্থায় সমবেত করব।
[১] صُور অর্থাৎ, শিংগা; যাতে ইস্রাফীল (আঃ) আল্লাহর আদেশে ফুঁ দেবেন এবং তখন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। (মুসনাদে আহমাদ ২/১৯১) অন্য একটি হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন যে, "ইস্রাফীল (আঃ) শিংগা মুখে ভরে দাঁড়িয়ে আছেন, মাথা নত করে প্রভুর আদেশের অপেক্ষায় আছেন যে, কখন তাঁকে আদেশ করা হবে এবং তিনি ফুঁ মারবেন।" (তিরমিযী, কিয়ামতের বিবরণ) ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুঁতে সকলেই মারা যাবে। আর দ্বিতীয় ফুঁতে আল্লাহর আদেশে সকলেই জীবিত হবে এবং হাশরের মাঠে জমায়েত হবে। আলোচ্য আয়াতে দ্বিতীয় ফুঁকের কথাই বলা হয়েছে।
ত্বোয়া-হা 20:103
ওরা নিজেদের মধ্যে চুপি চুপি বলাবলি করবে,[১] ‘তোমরা পৃথিবীতে মাত্র দশদিন অবস্থান করেছিলে।’
[১] ভীষণভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কারণে একে অপরের সঙ্গে চুপি চুপি কথা বলবে।
ত্বোয়া-হা 20:104
ওরা কি বলবে তা আমি ভাল জানি। ওদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশী উত্তম পথের অনুসারী[১] বলবে, ‘তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে।’
[১] অর্থাৎ সবার থেকে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। অর্থাৎ, দুনিয়ার জীবন তাদের কাছে কয়েক দিন বরং কয়েক ঘন্টা বলে মনে হবে। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেছেন,{وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ} যে দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা শপথ করে বলবে যে, তারা দুনিয়াতে মুহূর্তকালের বেশী অবস্থান করেনি। (সূরা রূম ৩০:৫৫) এই বিষয়টি আরো বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে; যেমন সূরা ফাতির ৩৫:৩৭, সূরা মু'মিনূন ২৩:১১২-১১৪, সূরা নাযিআত ৭৯:৪৬ ইত্যাদি। উদ্দেশ্য হল, অস্থায়ী জীবনকে যেন স্থায়ী জীবনের উপর প্রাধান্য না দেওয়া হয়।
ত্বোয়া-হা 20:105
ওরা তোমাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, ‘আমার প্রতিপালক সে সবকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে উড়িয়ে দেবেন।
ত্বোয়া-হা 20:106
অতঃপর তিনি ভূমিকে মসৃণ সমতল ভূমিতে পরিণত করবেন।
ত্বোয়া-হা 20:107
যাতে তুমি উঁচু-নীচু দেখবে না।’
ত্বোয়া-হা 20:108
সেই দিন ওরা আহবানকারীর অনুসরণ করবে,[১] এই ব্যাপারে (তাদের) কোন বক্রতা থাকবে না।[২] আর পরম দয়াময়ের নিকট সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। [৩]
[১] যে দিন উঁচু-নিচু, পর্বত-উপত্যকা, আকাশ-ছোঁয়া অট্টালিকা, সব বরাবর ও সমতল হয়ে যাবে। সমুদ্র ও নদ-নদী শুকিয়ে যাবে, সমস্ত পৃথিবী সমতলভূমিতে পরিণত হবে। তারপর একজন আহবানকারীর শব্দ আসবে, যার পিছু পিছু সমস্ত লোক চলতে শুরু করবে।
[২] অর্থাৎ, সেই আহবানকারী থেকে এদিক-ওদিক হবে না।
[৩] সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করবে, মৃদু পদধ্বনি আর কানাকানি ছাড়া কিছুই শোনা যাবে না।
ত্বোয়া-হা 20:109
পরম দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন ও যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন, সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সে দিন কোন কাজে আসবে না।[১]
[১] আল্লাহ যাঁদেরকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন, তাঁদের ছাড়া সেদিন কারো সুপারিশ কারো জন্য কোন কাজে লাগবে না। আর যারা অনুমতিপ্রাপ্ত হবেন তাঁরাও যে কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না। বরং সুপারিশ তাদেরই জন্য করা হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকবেন। এরা কারা হবে? এরা হবে শুধুমাত্র তাওহীদপন্থী; যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। এ বিষয়টি কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আলোচিত হয়েছে। যেমন সূরা নাজম ৫৩:২৬, সূরা আম্বিয়া ২১:২৮, সূরা সাবা ৩৪:২৩, সূরা নাবা ৭৮:৩৮ এবং আয়াতুল কুরসীতে ২:২৫৫।
ত্বোয়া-হা 20:110
তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত। কিন্তু ওরা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। [১]
[১] পূর্বের আয়াতে সুপারিশ সম্পর্কে যে নিয়ম-নীতির কথা উল্লেখ হয়েছে এখানে তার কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে। আর তা হল আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো এ ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান নেই যে, কে কত বড় অপরাধী এবং সে সুপারিশ পাবার অধিকারী কিনা? সেই জন্য একমাত্র আল্লাহই এ ব্যাপারে ফায়সালা করবেন যে, কোন্ কোন্ ব্যক্তি নবী ও সৎলোকদের সুপারিশের অধিকারী? কারণ প্রত্যেক মানুষের অপরাধের প্রকারভেদ ও কেমনত্ব আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, জানতে পারেও না।
ত্বোয়া-হা 20:111
সকল মুখমন্ডলই সেই চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক (আল্লাহর) জন্য অবনমিত হবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।[১]
[১] কারণ, সেদিন মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে ইনসাফ করবেন। প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রাপ্য অধিকার প্রাপ্ত হবে। এমনকি যদি কোন শিংবিশিষ্ট ছাগল কোন বিনা শিং-এর ছাগলের উপর অত্যাচার করে থাকে, তাহলে তারও বদলা দেওয়া হবে। (আহমাদ ২/২৩৫, মুসলিম) সেই জন্য ঐ হাদীসেই মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করে দাও।" নচেৎ কিয়ামতের দিন তা দিতে বাধ্য হবে। এক অন্য হাদীসে তিনি বলেন, "তোমরা অত্যাচার করা হতে দূরে থাকো, কেননা অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারের কারণ হবে।" আর সবার থেকে বেশী ব্যর্থ হবে সেই ব্যক্তি, যে শিরকের বোঝা নিয়ে উপস্থিত হবে। কারণ শিরক হল বড় যুলম (মহা অন্যায়), যা ক্ষমার অযোগ্য।
ত্বোয়া-হা 20:112
আর যে বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করে তার কোন অবিচার ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চনার আশঙ্কা নেই। [১]
[১] বে-ইনসাফি (অন্যায় বা অবিচার) এই যে, অন্যের পাপের বোঝা কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। আর অধিকার হনন বা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এই যে, নেকীর বদলা কম করে দেওয়া হবে। কিয়ামতে এ উভয় জিনিসই হবে না।
ত্বোয়া-হা 20:113
এইরূপেই আমি কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি এবং ওতে সতর্কবাণী নানাভাবেই বর্ণনা করেছি, যাতে তারা সংযত হয়[১] অথবা এটা তাদের জন্য উপদেশ হয়। [২]
[১] অর্থাৎ, পাপাচার, হারাম ও কুকর্ম করা হতে বিরত হয়।
[২] অর্থাৎ, আনুগত্য, নৈকট্য লাভ করার আকাঙ্ক্ষা অথবা পূর্ববর্তী উম্মতের অবস্থা ও ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার মত চিন্তা-ভাবনা ওদের ভিতর সৃষ্টি করে।
ত্বোয়া-হা 20:114
আল্লাহ অতি মহান, সত্য অধীশ্বর।[১] তোমার প্রতি আল্লাহর অহী (প্রত্যাদেশ) সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তুমি কুরআন পাঠে তাড়াতাড়ি করো না। [২] আর বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর।’[৩]
[১] যাঁর সুখের প্রতিশ্রুতি ও শাস্তির ধমক সত্য, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য এবং তাঁর প্রতিটি কথা সত্য।[২] জিবরীল (আঃ) যখন অহী নিয়ে আসতেন ও শুনাতেন, তখন নবী (আঃ)ও তার কিছু ভুলে যাওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি পড়তেন। আল্লাহ তাঁকে এ রকম করতে নিষেধ করে বললেন, প্রথমে অহী মনোযোগ দিয়ে শোনো, তা মুখস্থ করানো ও অন্তরে স্থান করে দেওয়া আমার কাজ; যেমন এ কথা সূরা কিয়ামাহ ৭৫:১৬-১৯ নং আয়াতে আসবে।[৩] অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে অধিক জ্ঞান লাভের জন্য প্রার্থনা করতে থাকো। এ নির্দেশে উলামাদের জন্য উপদেশ রয়েছে যে, তাঁরা যেন ফতোয়া দেওয়ার ব্যাপারে পূর্ণ গবেষণা-বিবেচনা ও চিন্তা-ভাবনা করবেন। তাড়াহুড়ো থেকে দূরে থাকবেন এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করার পথ অবলম্বন করতে কোন প্রকার আলস্য ও ক্রটি করবেন না। এখানে জ্ঞান বলতে কুরআন-হাদীসের জ্ঞান। কুরআনে এটিকেই 'ইলম' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর এর জ্ঞানীদেরকে উলামা বলা হয়েছে। অন্যান্য জ্ঞান যা মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্জন করে থাকে তা হল, শিল্প, পেশা ও কারিগরী। নবী (সাঃ) যে জ্ঞানের জন্য প্রার্থনা করতেন, তা একমাত্র অহী ও রিসালাতের জ্ঞান; যা কুরআন ও হাদীসে বিদ্যমান। যার দ্বারা মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, চরিত্র ও ব্যবহারে সংস্কার সাধন হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কথা বুঝতে পারা যায়। এই শ্রেণীর দু'আর মধ্যে একটি দু'আ যা তিনি বলতেন তা এই, اَللّهُمَّ انْفَعْنِيْ بِمَا عَلَّمْتَنِيْ وَعَلِّمْنِيْ مَا يَنْفَعُنِيْ وَزِدْنِيْ عِلْمًا। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! যা কিছু আমাকে শিখিয়েছ তার দ্বারা আমাকে উপকৃত কর এবং আমাকে সেই জ্ঞান দান কর, যা আমাকে উপকৃত করবে। আর আমার ইলম আরো বৃদ্ধি কর। (সঃ ইবনে মাজাহ ১/৪৭)
ত্বোয়া-হা 20:115
আমি তো ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দান করেছিলাম। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল; আমি তাকে দৃঢ়সংকল্প পাইনি। [১]
[১] ভুলে যাওয়াটা প্রতিটি মানুষের প্রকৃতিগত ব্যাপার। আর ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা ও সংকল্পের অদৃঢ়তাও সাধারণতঃ মানুষের প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। এই দুই দুর্বলতাই শয়তানের কুমন্ত্রণার ফাঁদে পড়ার কারণ হয়ে বসে। উক্ত দুর্বলতার মধ্যে যদি আল্লাহর আদেশের অবাধ্যাচরণ ও অন্যথাচরণের সংকল্প শামিল না থাকে, তাহলে ভুলে যাওয়া বা ইচ্ছার দুর্বলতার ফলে ঘটে যাওয়া ত্রুটি নবুঅতের নিষ্কলুষতা ও পূর্ণতার প্রতিকূল নয়। কারণ, ত্রুটির পর তড়িঘড়ি লজ্জিত হয়ে নবী আল্লাহর দরবারে মাথা নত করেন তথা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনায় মশগুল হয়ে পড়েন। (যেমন আদম (আঃ) করেছিলেন।) আদম (আঃ)-কে আল্লাহ বুঝিয়ে বলেছিলেন যে, শয়তান তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সে যেন তোমাদেরকে পাকে-প্রকারে জান্নাত হতে বের না করে দেয়। এই নির্দেশকেই মহান আল্লাহ এখানে عَهد বলে উল্লেখ করেছেন। আদম (আঃ) সে নির্দেশ ভুলে গিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে এক বৃক্ষের নিকট যেতে তথা সেই বৃক্ষ হতে কিছু খেতে নিষেধ করেছিলেন। আদম (আঃ)-এর অন্তরেও এ কথা ছিল যে, তিনি ঐ বৃক্ষের নিকট যাবেন না। কিন্তু যখন শয়তান আল্লাহর কসম খেয়ে এটা বুঝাতে চাইল যে, এই গাছে বা ফলে এমন প্রভাব আছে, যদি তা কেউ একবার খেয়ে নেয়, তাহলে সে অনন্তকালীন জীবন ও চিরস্থায়ী রাজত্ব লাভ করবে। তখন তিনি নিজ সংকল্পের উপর অটল থাকতে পারলেন না। আর সংকল্পে স্থির না থাকার ফলে শয়তানের চক্রান্তের শিকার হয়ে পড়লেন।
ত্বোয়া-হা 20:116
(স্মরণ কর,) যখন আমি ফিরিশতাগণকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদাহ কর’, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদাহ করল; সে অমান্য করল।
ত্বোয়া-হা 20:117
অতঃপর আমি বললাম, ‘হে আদম! এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত হতে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। [১]
[১] এখানে شقى মেহনত পরিশ্রম ও কষ্টের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ জান্নাতে খাওয়া, পান করা, পরা ও থাকার যে সুযোগ-সুবিধা বিনা পরিশ্রমে ভোগ করছ, জান্নাত হতে বের হলে এই চারটি জিনিসের জন্য মেহনত ও পরিশ্রম করতে বাধ্য হবে। যেমন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে এই মূল জিনিসের প্রাপ্তির জন্য পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, মেহনত ও পরিশ্রমের কথা বলতে শুধু আদমকে সম্বোধন করা হয়েছে; স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সম্বোধন করা হয়নি। অথচ নিষিদ্ধ ফল আদম ও হাওয়া উভয়েই ভক্ষণ করেছিলেন। এর কারণ প্রথমতঃ এই যে, মূল সম্বোধনযোগ্য আদমই ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ (পরিশ্রম ও কষ্ট করে) মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করার দায়িত্ব কেবল পুরুষের; নারীর নয়। আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে এই মেহনত ও পরিশ্রম থেকে বাঁচিয়ে 'ঘরের রানী'র মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে সেই আল্লাহ প্রদত্ত এই সম্মানকে দাসত্বের বেড়ি মনে করা হচ্ছে। যার থেকে মুক্তি লাভের জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে আন্দোলনে নেমেছে। হায়! শয়তানের প্ররোচনা কতই না প্রভাবশালী এবং তার বিছানো জাল কতই না সুন্দর ও মনোলোভা!
ত্বোয়া-হা 20:118
তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্ত হবে না এবং নগ্নও হবে না।
ত্বোয়া-হা 20:119
সেখানে পিপাসার্ত হবে না এবং রোদ্র-ক্লিষ্ট ও হবে না।’
ত্বোয়া-হা 20:120
অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, ‘হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষ ও অক্ষয় রাজ্যের কথা?’
ত্বোয়া-হা 20:121
অতঃপর তারা তা হতে ভক্ষণ করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা বাগানের বৃক্ষপত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হল; ফলে সে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল। [১]
[১] অর্থাৎ, বৃক্ষ বা তার ফল খেয়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করল; যার পরিণতিতে সে ভ্রষ্টতায় পতিত হল।
ত্বোয়া-হা 20:122
এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন। সুতরাং তিনি তার তওবা কবুল করলেন ও তাকে পথ নির্দেশ করলেন। [১]
[১] এখান থেকে কিছু লোক প্রমাণ করেন যে, আদমের উক্ত অবাধ্যাচরণ নবুঅতের আগের ঘটনা। পরবর্তীতে তাঁকে নবুঅত দান করা হয়েছে। কিন্তু আমরা বিগত আলোচনায় অবাধ্যতার যে স্বরূপ ও বাস্তবিকতা বর্ণনা করেছি, তা নবুঅতের নিষ্কলুষতার প্রতিকূল নয়। কারণ এই প্রকার ভুল-ত্রুটি যার সম্বন্ধ আল্লাহর বার্তা পৌঁছানো ও শরীয়ত প্রচারের সাথে নয়; বরং তা ব্যক্তিগত কর্মের সাথে সম্পৃক্ত, তাও আবার তার কারণ ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা, তাহলে বাস্তবে তা অবাধ্যাচরণ বা পাপ নয়; যার কারণে মানুষ আল্লাহর শাস্তিযোগ্য গণ্য হয়। পরন্তু আদম (আঃ)-এর জন্য যে 'অবাধ্য' শব্দ ব্যবহার হয়েছে তা (আল্লাহর কাছে) তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও উন্নত স্থান থাকার কারণে। যেহেতু বড়দের সামান্য ভুলও বড় বলে ধরা হয়। এই কারণে আলোচ্য আয়াতে (তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন) এর অর্থ এই নয় যে, উক্ত ভুলের পর তাঁকে নবুঅতের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। বরং এর অর্থ হল, লজ্জিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনার পর আবার তাঁকে সেই মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হল; যা তিনি আগেই লাভ করেছিলেন। তাঁকে পৃথিবীতে অবতরণের ফায়সালা আল্লাহর ইচ্ছা, হিকমত ও কল্যাণময় রহস্যের ভিত্তিতেই ছিল। এখানে এটা মনে করা উচিত নয় যে, এ ফায়সালা আদমের প্রতি আল্লাহর ক্রোধের ফলস্বরূপ হয়েছিল।
ত্বোয়া-হা 20:123
তিনি বললেন, ‘তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সঙ্গে জান্নাত হতে নেমে যাও। পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সৎপথের নির্দেশ এলে, যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখ-কষ্টও পাবে না।
ত্বোয়া-হা 20:124
যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন[১] এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।’ [২]
[১] এই 'সংকীর্ণতাময় জীবন' বলতে কেউ কেউ কবরের আযাব মনে করেন। আবার কেউ মনে করেন, দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও ব্যাকুলতাময় জীবন যা আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন বড় বড় ধনবান ব্যক্তিরা প্রাপ্ত হয়ে থাকে।
[২] এর অর্থ সত্যিকার চোখের অন্ধ অবস্থায়। অথবা জ্ঞান হতে বঞ্চিত অবস্থায়। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন এমন কোন প্রমাণ তার মাথায় আসবে না, যা পেশ করে সে আযাব হতে নিজেকে বাঁচাতে পারে।
ত্বোয়া-হা 20:125
সে বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলে? অথচ আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম!’
ত্বোয়া-হা 20:126
তিনি বলবেন, ‘তুমি এইরূপ ছিলে, আমার নিদর্শনাবলী তোমার নিকট এসেছিল কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। সেইভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।
ত্বোয়া-হা 20:127
আর এইভাবেই আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালংঘন করেছে ও তার প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করেনি। আর পরকালের শাস্তি অবশ্যই কঠোরতর ও চিরস্থায়ী।’
ত্বোয়া-হা 20:128
তবে কি এ কথা তাদেরকে পথনির্দেশ করে না যে, আমি তাদের পূর্বে এরূপ কত জনপদকে ধ্বংস করে দিয়েছি, যাদের বাসস্থান দিয়ে তারা অতিক্রম করে থাকে। অবশ্যই এতে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন আছে।
ত্বোয়া-হা 20:129
তোমার প্রতিপালকের পূর্ব-ঘোষণা না থাকলে এবং একটি কাল নির্ধারিত না হলে (শাস্তি) অবশ্যম্ভাবী হত। [১]
[১] মক্কার মুশরিক ও মিথ্যাজ্ঞানকারীরা কি এটা চিন্তা করে না যে, তাদের আগে অনেক জাতি গুজরে গেছে যাদের এরা স্থলাভিষিক্ত এবং এরা তাদের বসতির উপর দিয়ে যাতায়াত করে, যাদেরকে আমি মিথ্যাজ্ঞান করার জন্যই ধ্বংস করেছি। যাদের ভয়ানক পরিণামে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে অনেক নির্দশন। কিন্তু এ মক্কাবাসীরা নিজেদের চক্ষু বন্ধ করে তাদেরই অনুকরণ করে যাচ্ছে। যদি আল্লাহ পূর্বেই এরূপ সিদ্ধান্ত না নিতেন যে, তিনি কোন প্রমাণ পূর্ণ হওয়া ছাড়া এবং ঐ সময় আসার আগে যা তিনি অবকাশ হিসাবে কোন জাতিকে (ঢিল) দিয়ে রেখেছেন কাউকে ও ধ্বংস করবেন না, তাহলে হঠাৎ আল্লাহর আযাব তাদের উপর এসে পড়ত এবং তারা ধ্বংস হয়ে যেত। অর্থ এই যে, নবীকে মিথ্যাজ্ঞান করা সত্ত্বেও তাদের উপর কোন আযাব না এলে তারা যেন এটা না মনে করে যে, আগামীতেও তা আসবে না। বরং আল্লাহ তাদেরকে এখন ঢিল দিয়ে রেখেছেন; যেমন তিনি প্রত্যেক জাতিকে দিয়ে থাকেন। ঢিল ও অবকাশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহর আযাব হতে তাদেরকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
ত্বোয়া-হা 20:130
সুতরাং ওরা যা বলে সে বিষয়ে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সূর্যের উদয় ও অস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা কর এবং রাত্রিকালে ও দিনের প্রান্তভাগসমূহে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর; [১] যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।[২]
[১] কোন কোন মুফাসসিরগণের মতে তসবীহ (প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা) বলতে নামায এবং এ আয়াত হতে পাঁচ অক্তের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। সূর্য উঠার আগে ফজরের নামায, সূর্য ডোবার আগে আসরের নামায, 'রাত্রিকালে' বলতে মাগরিব ও এশার নামায এবং 'দিনের প্রান্তভাগসমূহ' বলতে যোহরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। কেননা যোহরের সময় দিনের প্রথম ভাগের শেষ প্রান্ত এবং দিনের শেষ ভাগের প্রথম প্রান্ত। আর কিছু উলামার মতে, এই সময় গুলোতে সাধারণভাবে আল্লাহর মহিমা তথা প্রশংসা বর্ণনার কথা বলা হয়েছে; যার মধ্যে নামায, কুরআন পাঠ, যিকর, দু'আ ও নফল ইবাদত সবই শামিল। অর্থ এই যে, তুমি মক্কার মুশরিকদের মিথ্যা ভাবার কারণে অধৈর্য ও মনঃক্ষুণ্ণ হবে না; বরং আল্লাহর মহিমা ও প্রশংসা বর্ণনা করতে থাকো। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করবেন তাদেরকে পাকড়াও করবেন।[২] এর সম্পর্ক 'পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর'-এর সাথে। অর্থাৎ উক্ত সময়গুলোতে আল্লাহর মহিমা বর্ণনা কর এই আশায় যে আল্লাহর নিকট এমন মর্যাদা ও সুউচ্চ স্থান প্রাপ্ত হবে, যাতে তুমি সন্তুষ্ট ও খোশ হয়ে যাবে।
ত্বোয়া-হা 20:131
আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না।[১] তোমার প্রতিপালকের জীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী। [২]
[১] এটি সেই একই বিষয়ীভূত কথা, যা এর আগে সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৬-১৯৭ আয়াতে, সূরা হিজর ১৫:৮৮ আয়াতে, সূরা কাহ্ফ ১৮:৭ আয়াতে আলোচিত হয়েছে।[২] এর অর্থ আখেরাতের প্রতিদান ও পুরস্কার যা দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও অন্যান্য উপভোগ্য জিনিস অপেক্ষা উত্তম ও স্থায়ী। 'ঈলা'র হাদীসে বর্ণিত আছে যে, উমার (রাঃ) নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে দেখলেন, তিনি বিনা বিছানায় একটি চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন। আর তাঁর ঘরের আসবাব-পত্রের অবস্থা এই যে, শুধু দুটি চামড়ার জিনিস ছাড়া আর কিছুই নেই। উমার (রাঃ)-এর চক্ষু দিয়ে পানি এসে পড়ল। নবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "উমার কি ব্যাপার? কাঁদছ কেন?" উত্তর দিলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! রোম ও পারস্যের রাজারা কি সুখ-শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছে, আর আপনি সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও আপনার জীবনের এই অবস্থা!' তিনি বললেন, "উমার! তুমি কি এখনও সন্দেহে আছ? ওরা তো তারা, যাদের সুখ-শান্তি পৃথিবীতেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।" অর্থাৎ, পরকালে ওদের জন্য কিছুই থাকবে না। (বুখারীঃ সূরা তাহরীমের তাফসীর, মুসলিমঃ ঈলা)
ত্বোয়া-হা 20:132
তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও এবং ওতে অবিচলিত থাক।[১] আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাই না। আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। আর সংযমীদের জন্য শুভ পরিণাম।
[১] এই আদেশ নবী (সাঃ)-এর সাথে তাঁর সমস্ত উম্মতের জন্য। অর্থাৎ, মুসলিমদের জন্য জরুরী যে, তাঁরা নিজেদের নামাযের প্রতি যত্নবান হবে এবং পরিবারের লোকেদেরকেও নামাযের জন্য তাকীদ করবে।
ত্বোয়া-হা 20:133
ওরা বলে, ‘সে তার প্রতিপালকের নিকট হতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনে না কেন?’[১] তাদের নিকট কি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত হয়নি? [২]
[১] অর্থাৎ, তাদের ইচ্ছামত কোন নিদর্শন; যেমন সামূদ জাতির জন্য উটনী আনা হয়েছিল।
[২] 'পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ' বলতে তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ঐগুলোতে কি নবী (সাঃ)-এর গুণাবলীর কথা উল্লেখ নেই, যার দ্বারা তাঁর নবী হওয়ার সত্যতা প্রমাণিত হয়? অথবা অর্থ এই যে, এদের কি পূর্ববর্তী জাতিদের অবস্থা জানা নেই যে, তারা যখন তাদের ইচ্ছামত মু'জিযা প্রদর্শনের দাবি করল এবং তাদেরকে তা দেখানো হল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনল না বলে তাদেরকে ধ্বংস করা হল?
ত্বোয়া-হা 20:134
যদি আমি ওদেরকে তার[১] পূর্বে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তাহলে ওরা বলত, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট একজন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই তোমার নিদর্শন মেনে নিতাম।’
[১] এখানে 'তার' বলতে শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।
ত্বোয়া-হা 20:135
বল, ‘প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে[১] সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর। অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কারা আছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।’ [২]
[১] অর্থাৎ, কাফের ও মুসলিম প্রত্যেকেই এই অপেক্ষায় আছে যে, দেখা যাক, কুফর বিজয়ী হয়, না ইসলাম।
[২] অর্থাৎ, সে জ্ঞান তোমাদের হয়ে যাবে যে, আল্লাহর সাহায্যে সফল ও কৃতকার্য কারা হবে। বলা বাহুল্য, এই সফলতা মুসলিমদের ভাগে এসেছিল। আর তাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামই সরল পথ এবং তার অনুসারীরাই সৎপথপ্রাপ্ত।
আল-আম্বিয়া 21:1
মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, [১] অথচ ওরা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। [২]
[১] হিসাবের সময় বলতে কিয়ামত; যা প্রতি সেকেন্ড নিকটবর্তী হয়ে চলেছে। আর প্রতিটি আগমনকারী জিনিসই নিকটবর্তী এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু স্বস্থানে তার নিজের জন্য কিয়ামত। তাছাড়া বিগত যুগসমূহের তুলনায় কিয়ামত নিকটে; কারণ (বিশ্বসৃষ্টির পর হতে) যে সকল যুগ পার হয়ে গেছে তা অপেক্ষা অবশিষ্ট যুগ অতি অল্প।
[২] অর্থাৎ, ওর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হতে অমনোযোগী, পৃথিবীর চাকচিক্যে নিমজ্জিত (যা সেদিনকার জন্য ক্ষতিকর) এবং ঈমানের চাহিদা হতে উদাসীন (যা সেদিনকার জন্য কল্যাণকর)।
আল-আম্বিয়া 21:2
যখনই ওদের প্রতিপালকের কোন নতুন উপদেশ আসে ওরা তা কৌতুকচ্ছলে শ্রবণ করে। [১]
[১] অর্থাৎ, কুরআন যা সময়ানুসারে প্রয়োজন মত নিত্য নতুনভাবে অবতীর্ণ হয়। যদিও তা তাদেরই উপদেশের জন্য অবতীর্ণ হয় তবুও তারা এমনভাবে শ্রবণ করে যেন তারা তা নিয়ে হাসিঠাট্টা, উপহাস ও খেলা করছে; অর্থাৎ তা নিয়ে তারা কোন চিন্তা-ভাবনা করে না।
আল-আম্বিয়া 21:3
ওদের অন্তর থাকে অমনোযোগী। সীমালংঘনকারীরা গোপনে পরার্মশ করে, ‘এতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পড়বে?’ [১]
[১] নবীর মানুষ হওয়ার ব্যাপারটা তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া তারা এ কথাও বলে যে, তোমরা কি দেখ না, সে একজন জাদুকর? দেখে-শুনেও তোমরা তাঁর জাদুর ফাঁদে কেন পা দিচ্ছ?
আল-আম্বিয়া 21:4
সে বলল, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কথাই আমার প্রতিপালক অবগত আছেন এবং তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা।’ [১]
[১] তিনি সমস্ত বান্দার কথা শ্রবণ করেন ও সকলের আমল সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তোমরা যে মিথ্যা বলছ, তা তিনি শুনছেন আর আমার সত্যতা ও যে দাওয়াত আমি তোমাদের দিচ্ছি তার যথার্থতা সম্পর্কে ভালোই জানেন।
আল-আম্বিয়া 21:5
বরং ওরা বলে, ‘এ হল আবোল-তাবোল স্বপ্ন; বরং সে তা উদ্ভাবন করেছে, বরং সে একজন কবি। [১] অতএব সে আমাদের নিকট এক নিদর্শন আনুক; যেরূপ (নিদর্শন সহ) পূর্ববর্তীগণ প্রেরিত হয়েছিল।’ [২]
[১] গোপনে সমালোচনাকারী অত্যাচারীরা এতেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা বলে, এ কুরআন তো অর্থহীন স্বপ্নের মত বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারার এক সমষ্টি। বরং তা নিজের মনগড়া (স্বকপোলকল্পিত), বরং সে একজন কবি তথা এই কুরআন পথনির্দেশকারী গ্রন্থ নয়, কবিতাগুচ্ছ। অর্থাৎ, তারা কোন এক শ্রেণীর কথার উপর অটল নয়, বরং প্রত্যহ নিত্য নূতন পাঁয়তারা বদলায় এবং নূতন নূতন অভিযোগ আরোপ করে।
[২] অর্থাৎ, যেমন সামুদ জাতির জন্য উটনী ও মূসা (আঃ)-এর জন্য লাঠি ও উজ্জ্বল হাত ইত্যাদি।
আল-আম্বিয়া 21:6
এদের পূর্বে যে সব জনপদ আমি ধ্বংস করেছি ওর অধিবাসীরা বিশ্বাস করত না; তবে এরা কি বিশ্বাস করবে? [১]
[১] অর্থাৎ, এর আগে আমি যত বসতি ধ্বংস করেছি তারা এমন ছিল না যে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী মু'জিযা দেখানোর পর তারা ঈমান এনেছে; বরং তারা মু'জিযা দেখার পরও ঈমান আনেনি। যার কারণে ধ্বংসই ছিল তাদের পরিণতি। তাহলে কি মক্কাবাসীদের ইচ্ছানুসারে কোন মু'জিযা দেখানো হলে তারা কি ঈমান আনবে? কক্ষনো না; বরং তারা অবিশ্বাস ও বিরোধিতার পথেই অগ্রসর হতে থাকবে।
আল-আম্বিয়া 21:7
তোমার পূর্বে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; [১] যাদের নিকট আমি অহী পাঠাতাম। তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। [২]
[১] সমস্ত নবীই পুরুষ মানুষ ছিলেন। না মানুষ ছাড়া, না পুরুষ ছাড়া অন্য কেউ নবী হয়েছেন। অর্থাৎ, নবুঅত শুধুমাত্র মানুষের ও পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট। এ থেকে বোঝা গেল যে, কোন নারী নবী হননি। কারণ নবুঅতের দায়িত্ব ও কর্তব্য এমন, যা নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
[২] এখানে أهل الذكر (আহলে ইলম বা জ্ঞানী) বলতে আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে, যারা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের জ্ঞান রাখত। অর্থাৎ, তোমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর যে, যে সকল নবী গত হয়েছে তারা মানুষ ছিল, না অন্য কিছু? উত্তরে তারা বলবে, সমস্ত নবী মানুষই ছিলেন। এ থেকে কিছু লোক তাকলীদ (অন্ধানুকরণ) করার আবশ্যকতা প্রমাণ করেন; যা সঠিক নয়। তাকলীদ হল কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও তার নির্দিষ্ট ফিকহ (শরয়ী জ্ঞান)-কে একমাত্র অবলম্বনীয় মনে করা ও তার উপর আমল করা; অন্য কথায় তা বিনা দলীলে মেনে নেওয়া। অথচ আয়াতে আহলে যিকর বলতে কোন বিশেষ ব্যাক্তিকে বুঝানো হয়নি; বরং প্রত্যেক সেই জ্ঞানীকে বুঝানো হয়েছে যে তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞান রাখত। বাস্তবপক্ষে এখানে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাকলীদ খন্ডন করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে তো উলামাদের দিকে রুজু করার উপর তাকীদ রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য; যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এখানে কোন ব্যক্তি বিশেষের অাঁচল ধরার হুকুম দেওয়া হয়নি। পক্ষান্তরে তাওরাত ও ইঞ্জীল আসমানী গ্রন্থ ছিল এবং কোন মানব রচিত ফিকহ ছিল না? সুতরাং এর অর্থ হল, উলামাদের সাহায্যে শরীয়তের উক্তি ও বক্তব্য সম্পর্কে জেনে নাও। আর এটাই হল আলোচ্য আয়াতের সঠিক মর্মার্থ।
আল-আম্বিয়া 21:8
আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা আহার্য ভক্ষণ করত না এবং তারা চিরজীবীও ছিল না। [১]
[১] বরং তারা খাবারও খেত এবং মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে চিরস্থায়ী জীবনের পথে পাড়ি দিয়েছে। এ কথা বলে নবীগণের মানুষ হওয়ারই প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে।
আল-আম্বিয়া 21:9
অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, সুতরাং আমি তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করলাম। আর সীমালংঘনকারীদেরকে ধ্বংস করলাম। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি অনুসারে নবীদের ও মু'মিনদেরকে আমি মুক্তিদান করলাম এবং সীমালংঘনকারী কাফের ও মুশরিকদের আমি ধ্বংস করে দিলাম।
আল-আম্বিয়া 21:10
আমি অবশ্যই তোমাদের প্রতি এমন গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ আছে, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?
আল-আম্বিয়া 21:11
আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি। [১] যার অধিবাসীরা সীমালংঘনকারী ছিল এবং তাদের পরে অপর জাতি সৃষ্টি করেছি।
[১] قصم এর অর্থ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা। আর كَم (কত) আধিক্য বর্ণনার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ কত বসতি আমি ধ্বংস করেছি, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছি। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেন, নূহের পর আমি কত (মানব) বসতি ধ্বংস করেছি। (সূরা বানী ইস্রাঈল ১৭:১৭)
আল-আম্বিয়া 21:12
অতঃপর যখন ওরা আমার শাস্তির কথা অনুভব করল, তখনই ওরা জনপদ হতে পলায়ন করতে লাগল। [১]
[১] অনুভব করার অর্থ ইন্দ্রীয় দ্বারা জানা। অর্থাৎ, যখন তারা চোখ দ্বারা আযাব বা আযাবের লক্ষণ আসতে দেখল অথবা কান দ্বারা মেঘের গর্জন শুনে জানতে পারল, তখন তারা তা থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে শুরু করল। ركض এর অর্থ হল, ঘোড়ার উপর চড়ে তাকে দৌড়ানোর জন্য পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করা। আর এখান থেকেই এই শব্দ পলায়নের অর্থে ব্যবহার হতে লাগে।
আল-আম্বিয়া 21:13
(ওদের বলা হয়েছিল,) ‘তোমরা পলায়ন করো না[১] এবং তোমাদের ভোগ-সম্ভারের নিকট ও তোমাদের আবাস গৃহে ফিরে এসো; [২] যাতে এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।’[৩]
[১] এটি ফিরিশতাদের আহবান অথবা মু'মিনরা উপহাস ছলে এ কথা বলেছিল।
[২] অর্থাৎ, যে সব সুখ-সুবিধা ও ভোগ-বিলাসের উপকরণ তোমাদেরকে দান করা হয়েছিল এবং যা তোমাদের কুফরী ও সীমালংঘনের কারণ ছিল, আর ঐ সব বাড়ি-ঘর যেখানে তোমরা বসবাস করতে ও যার সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নিয়ে গর্ব করতে, সে দিকেই ফিরে এস!
[৩] আযাবের পর তোমাদের অবস্থা কি, তা তো জিজ্ঞাসা করা হোক? তোমাদের এ অবস্থা কি জন্য ও কেন হল? এ প্রশ্ন উপহাসের জন্য। তাছাড়া ধ্বংসের যাঁতাকলে পিষে ফেলার পর উত্তর দেওয়ার যোগ্যতা কি তাদের কখনও থাকতে পারে?
আল-আম্বিয়া 21:14
ওরা বলল, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।’
আল-আম্বিয়া 21:15
আমি ওদেরকে কাটা শস্য ও নিভানো আগুনের মত না করা পর্যন্ত ওদের এ আর্তনাদ স্তব্ধ হয়নি। [১]
[১] যতক্ষণ জীবনের স্পন্দন ছিল তারা নিজেদের অত্যাচারের কথা স্বীকার করেছে। حَصِيد কাটা ফসল এবং خامِد নিভে যাওয়া আগুনকে বলে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তারা কাটা ফসল ও নিভে যাওয়া আগুনের মত ভষ্মস্তূপে পরিণত হয়ে গেল। কোন প্রকার শক্তি, ক্ষমতা, অনুভূতি ও স্পন্দন কিছুই তাদের মাঝে রইল না।
আল-আম্বিয়া 21:16
আকাশ ও পৃথিবী এবং যা উভয়ের অন্তর্বর্তী তা আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। [১]
[১] বরং এর পিছনে বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য ও যুক্তি ছিল। যেমন বান্দারা আমার স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা করবে, সৎলোকদেরকে সৎকাজের প্রতিদান এবং পাপীদেরকে পাপের শাস্তি দেওয়া হবে ইত্যাদি।
আল-আম্বিয়া 21:17
আমি যদি চিত্তবিনোদনের উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার নিকট যা আছে তা নিয়েই করতাম; [১] যদি আমি তা করতামই। [২]
[১] অর্থাৎ, নিজের কাছেই কিছু জিনিস খেলার জন্য সৃষ্টি করে নিতেন এবং নিজের শখ পূরণ করে নিতেন। এ বিশাল বিশ্ব ও তাতে সচেতন জীব ও জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন সৃষ্টির কি প্রয়োজন ছিল?
[২] 'আমি তা করিনি' --এই অনুবাদের তুলনায় আরবী বাগধারায় 'যদি আমি তা করতামই' বেশী সঠিক। (ফাতহুল কাদীর)
আল-আম্বিয়া 21:18
বরং আমি সত্য দ্বারা মিথ্যার উপর আঘাত হানি; সুতরাং তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়; ফলে মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। [১] তোমরা যা বর্ণনা করছ তার জন্য দুর্ভোগ তোমাদের! [২]
[১] বিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য এই যে, এখানে ন্যায় ও অন্যায়ের যে দ্বন্দ্ব, ভালো ও মন্দের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছে তার মধ্যে ন্যায় ও ভালোকে বিজয়ী করা ও অন্যায় ও মন্দকে পরাজিত করা। সুতরাং আমি সত্য দ্বারা অসত্যের উপর, ন্যায় দ্বারা অন্যায়ের উপর এবং ভালো দ্বারা মন্দের উপর আঘাত করি, যাতে অসত্য, অন্যায় ও মন্দের বিলুপ্তি ঘটে। دمغ মাথার উপর এমন আঘাতকে বলা হয় যা মগজ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর زهق এর অর্থ শেষ হওয়া, ধ্বংস হওয়া বা বিনষ্ট হওয়া।
[২] অর্থাৎ, প্রতিপালকের প্রতি তোমরা যে সব ভিত্তিহীন কথা আরোপ করছ বা উদ্ভব করছ (যেমন এ পৃথিবী একটি খেলনা মাত্র, একজন খেলোয়াড়ের বাজে শখ, আল্লাহর স্ত্রী বা সন্তান আছে ইত্যাদি) তা তোমাদের ধ্বংসের মূল কারণ। কেননা এটাকে খেলতামাশা মনে করার ফলে তোমরা সত্য হতে দূর হওয়া এবং অসত্যকে বরণ করার ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিধা ও ভীতি অনুভব কর না, যার শেষ পরিণাম তোমাদের ধ্বংস ও সর্বনাশ।
আল-আম্বিয়া 21:19
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা তাঁরই মালিকানাধীন;[১] আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে[২] তারা তাঁর উপাসনা করতে অহংকার করে না এবং ক্লান্তি বোধও করে না।
[১] অর্থাৎ, সকলেই তাঁর অধীনস্থ দাস বা মালিকানাভুক্ত গোলাম, সুতরাং যখন তোমরাই কোন দাসকে নিজের পুত্র এবং কোন দাসীকে নিজের স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও, তাহলে মহান আল্লাহ নিজের অধীনস্থ দাস-দাসীদের মধ্যে হতে কাউকে পুত্র এবং কাউকে স্ত্রী রূপে কিভাবে গ্রহণ করতে পারেন?
[২] এখানে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে। তাঁরাও আল্লাহর দাস বা বান্দা। এই বাক্য দ্বারা তাঁদের সম্মান, মর্যাদা প্রকাশ পাচ্ছে যে, তাঁরা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তাঁরা তাঁর কন্যা নয়; যেমন মুশরিকরা বিশ্বাস করে।
আল-আম্বিয়া 21:20
তারা দিবা-রাত্রি তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; তারা শৈথিল্য করে না।
আল-আম্বিয়া 21:21
ওরা মাটি হতে তৈরী যে সব উপাস্য গ্রহণ করেছে সেগুলি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম? [১]
[১] জিজ্ঞাসা অস্বীকৃতির জন্য। অর্থাৎ, তারা তা করতে পারবে না। তাহলে যারা কোন জিনিসেরই ক্ষমতা রাখে না তাদেরকে কিভাবে তারা আল্লাহর শরীক বানায় ও তাদের ইবাদত করে?
আল-আম্বিয়া 21:22
যদি আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে বহু উপাস্য থাকত তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। [১] সুতরাং ওরা যে বর্ণনা দেয় তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র, মহান।
[১] সত্য সত্যই যদি পৃথিবী ও আকাশে একের অধিক উপাস্য থাকত তাহলে বিশ্ব পরিচালনা দুই সত্তার হাতেই থাকত। দুজনের ইচ্ছা, বিবেক ও মর্জি কার্যকর হত। আর যখন দুই সত্তার ইচ্ছা ও ফায়সালা চলত তখন এ বিশ্ব-ব্যবস্থা এভাবে চলতেই পারত না, যেভাবে আদি হতে অবিরাম গতিতে চলে আসছে। কারণ দুজনের ইচ্ছায় সংঘর্ষ বাধত, উভয়ের সিদ্ধান্ত ও সংকল্প, এখতিয়ার ও বিবেক এক অপরের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হত, যার পরিণাম হত ধ্বংস ও বিপর্যয়। কিন্তু এমন আজ পর্যন্ত হয়নি। যার পরিষ্কার অর্থ হল, পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটাই সত্তা আছে, যার ইচ্ছা ও সংকল্প বাস্তবায়িত হয়। যা কিছুই হয় শুধু এবং শুধু তাঁরই আদেশে হয়। তিনি যা প্রদান করেন তাতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই এবং তিনি যা বারণ করেন তা দেওয়ার মত কেউই নেই।
আল-আম্বিয়া 21:23
তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।
আল-আম্বিয়া 21:24
ওরা কি তাঁকে ভিন্ন বহু উপাস্য গ্রহণ করেছে? বল, ‘তোমরা তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর। এটিই আমার সঙ্গে যা আছে তাদের জন্য উপদেশ এবং এটিই উপদেশ ছিল পূর্ববর্তীদের জন্য।’ [১] কিন্তু ওদের অধিকাংশই প্রকৃত সত্য জানে না। ফলে ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
[১] প্রথম উপদেশ বলে কুরআন এবং দ্বিতীয় উপদেশ বলে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহকে বুঝানো হয়েছে। এর অর্থ এই যে, কুরআনে তথা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে শুধু মাত্র একই উপাস্যের উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়্যাতের (উপাস্যত্ব ও প্রতিপালকত্বের) বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু এ সব মুশরিকরা এ সত্যকে মানতে প্রস্তুত নয় এবং একগুঁয়েমির সাথে একেশ্বরবাদ (তাওহীদ) হতে মুখ ফিরিয়ে চলে।
আল-আম্বিয়া 21:25
আমি তোমার পূর্বে ‘আমি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর’-এ প্রত্যাদেশ ছাড়া কোন রসূল প্রেরণ করিনি। [১]
[১] সমস্ত নবীগণও এই একেশ্বরবাদের বাণী নিয়েই আগমন করেছিলেন।
আল-আম্বিয়া 21:26
ওরা বলে, ‘পরম দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি পবিত্র মহান! বরং তারা তো তাঁর সম্মানিত দাস।
আল-আম্বিয়া 21:27
তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না এবং তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে। [১]
[১] এখানে মুশরিকদের এক ধারণার খন্ডন করা হয়েছে। তাদের ধারণা, ফিরিশতারা আল্লাহর কন্যা। কিন্তু আল্লাহ বলেন, তারা আমার কন্যা নয়; বরং তারা আমার সম্মানিত ও আজ্ঞাবহ দাস। তাছাড়া পুত্র-কন্যার প্রয়োজন তখন পড়ে, যখন কেউ বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখনই সন্তান সাহারা ও সাহায্যকারী হয়। আর এই কারণেই সন্তানদেরকে 'বার্ধক্যের লাঠি' বলা হয়। কিন্তু বার্ধক্য, দুর্বলতা, স্থবিরতা এ সব এমন জিনিস, যা মানুষের সাথে সম্পর্কিত, আল্লাহর সত্তা এ সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি হতে পাক ও পবিত্র। সেই জন্য তাঁর সন্তান বা কোন প্রকার সাহারার প্রয়োজন নেই। আর ঠিক এই কারণেই কুরআনে বারবার এ বিষয়টিকে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, তাঁর কোন সন্তানাদি নেই।
আল-আম্বিয়া 21:28
তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত। তারা সুপারিশ করে কেবল তাদের জন্য যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট[১] এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।
[১] এখান হতে জানা গেল যে, নেক লোক ও নবীগণ ছাড়া ফিরিশতাগণও সুপারিশ করবেন। সহীহ হাদীসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু ঐ সুপারিশ ঐ সকল লোকেদের জন্য হবে যাদেরকে আল্লাহ পছন্দ করবেন। আর এ কথা পরিষ্কার যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর অবাধ্য বান্দাদের জন্য নয়; বরং গোনাহগার বাধ্য বান্দাদের জন্য, অর্থাৎ ঈমানদার ও তাওহীদপন্থীদের জন্যই সুপারিশ পছন্দ করবেন।
আল-আম্বিয়া 21:29
তাদের মধ্যে যে বলবে, ‘আমিই উপাস্য তিনি ব্যতীত’ তাকে আমি শাস্তি দিব জাহান্নামে; [১] এভাবেই আমি সীমালংঘনকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।
[১] অর্থাৎ, এই ফিরিশতাদের মধ্য হতে কেউ যদি উপাস্য হওয়ার দাবী করে তাহলে তাকেও আমি জাহান্নামে পাঠাব। এ বাক্যটির বক্তব্য শর্তসাপেক্ষ, যা সংঘটিত হওয়া জরুরী নয়। উদ্দেশ্য শিরকের খন্ডন ও তাওহীদের প্রতিষ্ঠা। যেমন তিনি অন্যত্র বলেন, {قُلْ إِن كَانَ لِلرَّحْمَنِ وَلَدٌ فَأَنَا أَوَّلُ الْعَابِدِينَ} অর্থাৎ, বল, পরম দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান থাকলে আমিই হতাম তার উপাসকগণের অগ্রণী। (যুখরুফঃ ৮১) {لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ} অর্থাৎ,যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে। (যুমারঃ ৬৫) এ সমস্ত বাক্যের বক্তব্য শর্তসাপেক্ষ; যা সংঘটিত হওয়া আবশ্যক নয়।
আল-আম্বিয়া 21:30
অবিশ্বাসীরা কি (ভেবে) দেখে না যে, [১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী একসঙ্গে মিলিত ছিল; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিয়েছি[২] এবং প্রত্যেকটি সজীব বস্তুকে পানি হতে সৃষ্টি করেছি; [৩] তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না?
[১] এখানে বাহ্যিক চক্ষু দিয়ে দেখা নয় বরং অন্তর চক্ষু দিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা কি চিন্তা-ভাবনা করে না? তারা কি জানে না?
[২] رَتق এর অর্থ বন্ধ, মিলিত। এবং فَتق এর অর্থ বিদীর্ণ করা, খোলা, আলাদা করা। অর্থাৎ, আকাশ ও পৃথিবী শুরুতে একত্রে মিলিত ছিল অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করি। আকাশকে উপরে উঠিয়েছি, যেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ হয়। আর পৃথিবীকে এমন এক স্থানে রেখেছি যাতে নানান উদ্ভিদ উৎপন্ন করার উপযোগী হয়। (এ আয়াত হতে মহাকাশের মহাবিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া যায়। -সম্পাদক)
[৩] পানির অর্থ বৃষ্টির পানি বা ঝরনার পানি হলেও একথা পরিষ্কার যে, পানি দ্বারা উদ্ভিদ জন্মে এবং প্রতিটি জীবের নবজীবন লাভ হয়। আর যদি এর অর্থ বীর্য হয়, তাহলেও অর্থের কোন সমস্যা হয় না। কারণ প্রতিটি জীবের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে এই বীর্য (কারণবারি); যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে বের হয়ে স্ত্রীর গর্ভাশয়ে স্থান লাভ করে।
আল-আম্বিয়া 21:31
এবং আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি পর্বতমালা; যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়[১] এবং আমি তাতে[২] করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ; যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।
[১] অর্থাৎ যদি পৃথিবীতে এত বড় বড় পর্বত না থাকত, তাহলে পৃথিবী সব সময় নড়াচড়া করত। যার কারণে পৃথিবী মানুষ ও জীব-জন্তুর বসবাসের উপযোগী হত না। আমি পর্বতের বোঝা দিয়ে পৃথিবীকে আন্দোলিত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছি।
[২] তাতে অর্থাৎ, পৃথিবীতে বা পর্বতমালায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রশস্ত পথ বা পর্বতমালার মাঝে উপত্যকা তৈরী করেছি। যাতে এক জায়গা হতে অন্যত্র যাওয়া সহজ হয়। يَهتَدُون এর অন্য এক অর্থ এও হতে পারে যে, ঐ পথ দ্বারা যাতে তারা নিজেদের জীবিকা ও জীবনযাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
আল-আম্বিয়া 21:32
এবং আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ স্বরূপ। [১] কিন্তু তারা আকাশস্থ নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
[১] 'সুরক্ষিত ছাদ' অর্থাৎ, পৃথিবীর জন্য সুরক্ষিত ছাদ; যেমন তাঁবু বা গম্বুজের ছাদ হয়। অথবা এই অর্থে সুরক্ষিত যে, আল্লাহ তাকে পৃথিবীর উপর পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। নচেৎ আকাশ যদি পৃথিবীর উপর ভেঙ্গে পড়ে, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে পড়বে। অথবা তা শয়তানসমূহ হতে সুরক্ষিত, যেমন তিনি বলেছেন,{وَحَفِظْنَاهَا مِن كُلِّ شَيْطَانٍ رَّجِيمٍ} অর্থাৎ, আমি আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে সুরক্ষিত করেছি। (হিজরঃ ১৭)
আল-আম্বিয়া 21:33
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিবস এবং সূর্য ও চন্দ্র; [১] প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে। [২]
[১] অর্থাৎ রাত্রিকে আরামের জন্য ও দিবসকে জীবিকা অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেছি, সূর্যকে দিনের ও চাঁদকে রাতের নিদর্শন বানিয়েছি। যাতে মাস ও বছর গণনা সম্ভব হয়; যা মানুষের জন্য একটি জরুরী বিষয়।
[২] যেরূপ একজন সাঁতারু পানির উপর সাঁতার কাটে, অনুরূপ চন্দ্র ও সূর্য নিজ নিজ কক্ষ পথে সন্তরণ অর্থাৎ, বিচরণ করে।
আল-আম্বিয়া 21:34
আমি তোমার পূর্বে কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে? [১]
[১] মক্কার কাফেররা নবী (সাঃ)-এর ব্যাপারে বলত যে, সে তো একদিন মারাই যাবে। এ আয়াত তারই উত্তর। আল্লাহ বললেন, মৃত্যু তো প্রত্যেক মানুষের জন্য অবধারিত। মুহাম্মাদ (সাঃ)ও এই নিয়ম-বহির্ভূত নয়। কারণ সেও একজন মানুষ। আর আমি কোন মানুষকে অমরতা দান করিনি। কিন্তু যারা এ কথা বলে তারা কি মরবে না? এ হতে মুশরিকদের মতবাদেরও খন্ডন হয়ে যায়; যারা দেবতা, আম্বিয়া ও আওলিয়াগণের চিরজীবী থাকার ধারণা পোষণ করে থাকে। আর সেই ভিত্তিতেই তারা তাঁদেরকে নিজেদের সাহায্যকারী ও বিপত্তারণ মনে করে। সুতরাং কুরআন-বিরোধী এই ভ্রষ্ট আকীদা হতে আমরা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
আল-আম্বিয়া 21:35
জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি।[১] আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [২]
[১] কখনো দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে, কখনো পার্থিব সুখ-শান্তি দিয়ে, কখনো সুস্বাস্থ্য ও প্রশস্ততা দিয়ে, কখনো অসুস্থতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে, কখনো ধনবত্তা ও বিলাস-সামগ্রী দিয়ে, কখনো দরিদ্রতা ও অভাব দিয়ে পরীক্ষা করে থাকি। যাতে কে কৃতজ্ঞ ও কে অকৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল ও কে অধৈর্য তা আমি পরীক্ষা করি। কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির এবং অকৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যহীনতা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বড় কারণ।
[২] ওখানে তোমাদের কর্মানুসারে ভাল-মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য উত্তম এবং যারা অসৎকর্মশীল তাদের জন্য মন্দ বিনিময় দেওয়া হবে।
আল-আম্বিয়া 21:36
অবিশ্বাসীরা যখন তোমাকে দেখে, তখন তারা তোমাকে শুধু বিদ্রূপের পাত্ররূপেই গ্রহণ করে; তারা বলে, ‘এই কি সেই, যে তোমাদের উপাস্যগুলির সমালোচনা করে?’ অথচ তারাই পরম করুণাময়ের আলোচনার বিরোধিতা করে থাকে। [১]
[১] এর পরেও তারা রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে নিয়ে বিদ্রূপ-ঠাট্টা করে? যেমন অন্যত্র বলেছেন, {وَإِذَا رَأَوْكَ إِن يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَذَا الَّذِي بَعَثَ اللهُ رَسُولًا} অর্থাৎ, ওরা যখন তোমাকে দেখে তখন ওরা তোমাকে কেবল উপহাসের পাত্ররূপে গণ্য করে এবং বলে, 'এই কি সেই; যাকে আল্লাহ রসূল করে পাঠিয়েছেন? (ফুরকানঃ ৪১)
আল-আম্বিয়া 21:37
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরা-প্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব; সুতরাং তোমরা আমাকে তাড়াতাড়ি করতে বলো না। [১]
[১] এ কথা কাফেরদের আযাব চাওয়ার উত্তরে বলা হয়েছে। যেহেতু মানুষের প্রকৃতিই হল জলদি ও তাড়াহুড়ো করা, সেহেতু তারা নবীর সঙ্গেও জলদি করতে চায় যে, তোমার আল্লাহকে বলে আমাদের উপর অতি শীঘ্র আযাব অবতীর্ণ করা হোক। আল্লাহ বললেন, জলদি করো না, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে নিজ নির্দশনাবলী দেখাব। এখানে নির্দশন বলতে আযাবও হতে পারে অথবা রসূল (সাঃ)-এর সত্যতার দলীল-প্রমাণাদিও হতে পারে।
আল-আম্বিয়া 21:38
আর তারা বলে, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল, এই প্রতিশ্রুতি কখন পূর্ণ হবে?
আল-আম্বিয়া 21:39
যদি অবিশ্বাসীরা সেই সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে অগ্নি প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে সাহায্য করাও হবে না (তাহলে তারা এ কথা বলত না)। [১]
[১] এখানে এর উত্তর ঊহ্য আছে। অর্থাৎ যদি এরা জানত, তাহলে আযাবের জন্য তাড়াতাড়ি করত না অথবা তারা নিশ্চিতরূপে জানত যে, কিয়ামত আসবে অথবা কুফরীর উপর অটল থাকত না বরং ঈমান আনয়ন করত।
আল-আম্বিয়া 21:40
বরং হঠাৎ করেই ওটা তাদের উপর আসবে এবং তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে; [১] ফলে তারা ওটা রোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না। [২]
[১] অর্থাৎ, তারা কিছুই বুঝতে পারবে না যে, তারা কি করবে। (তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে।)
[২] অর্থাৎ, তাদেরকে তওবা বা ওজর-অজুহাত পেশ করার অবসর দেওয়া হবে না।
আল-আম্বিয়া 21:41
তোমার পূর্বেও অনেক রসূলকেই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছিল; পরিণামে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা বিদ্রূপকারীদেরকে পরিবেষ্টন করেছিল। [১]
[১] রসূল (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, মুশরিকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে দুঃখিত ও মনঃক্ষুণ্ণ হবে না। এরূপ বিদ্রূপ কোন নুতন কথা নয়; বরং তোমার পূর্বের সমস্ত নবীদের সাথে একই দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই আযাবই তাদের উপর পতিত হয়েছে যার ব্যাপারে তারা বিদ্রূপ করত। যে আযাব আসা তাদের ধারণায় ছিল অসম্ভব। যেমন অন্যত্র বলেছেন,{وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُواْ عَلَى مَا كُذِّبُواْ وَأُوذُواْ حَتَّى أَتَاهُمْ نَصْرُنَا} অর্থাৎ, তোমার পূর্বেও অনেক রসূলগণকে অবশ্যই মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা ও ক্লেশ দেওয়া সত্ত্বেও তাদের নিকট আমার সাহায্য না আসা পর্যন্ত তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। (আনআমঃ ৩৪) এখানে রসূল (সাঃ)-এর সান্তনার সাথে সাথে কাফের ও মুশরিকদের জন্য হুঁশিয়ারী ও ধমক রয়েছে।
আল-আম্বিয়া 21:42
বল, ‘রাতে ও দিনে পরম করুণাময় হতে কে তোমাদেরকে রক্ষা করবে?’ তবুও তারা তাদের প্রতিপালকের স্মরণ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আল-আম্বিয়া 21:43
তবে কি আমি ব্যতীত তাদের এমন উপাস্যও আছে, যারা তাদেরকে রক্ষা করতে পারে? [১] তারা তো নিজেদেরকেই সাহায্য করতে পারে না এবং আমার (শাস্তি) হতে তাদেরকে রক্ষা করা হবে না।[২]
[১] তোমাদের কাজ-কারবার এমন যে, দিন-রাত্রির যে কোন সময়ে তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসতে পারে। সেই আযাব হতে তোমাদেরকে দিনে-রাতে কে রক্ষা করছে? আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ আছে কি, যে তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব ও গযব হতে রক্ষা করতে পারে?
[২] এর অর্থ হল, তারা আমার আযাব হতে রক্ষা পাবে না; অর্থাৎ, তারা নিজেদেরকে সাহায্য করতে ও আল্লাহর আযাব হতে মুক্ত করতে সক্ষম নয়, তাহলে তারা অপরের সাহায্য করবে কিভাবে? অথবা অপরকে আযাব থেকে বাঁচাবে কিভাবে?
আল-আম্বিয়া 21:44
বরং আমিই তাদেরকে এবং তাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে ভোগ-সম্ভার দান করেছিলাম; অধিকন্তু তাদের আয়ুষ্কালও হয়েছিল দীর্ঘ।[১] তারা কি দেখছে না যে, আমি তাদের দেশকে চতুর্দিক হতে সংকুচিত করে আনছি; [২] তবুও কি তারাই বিজয়ী? [৩]
[১] যদি তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ-বিলাসে অতিবাহিত হয়, তাহলে কি তারা মনে করে যে, তারা সঠিক পথে আছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের কোন কষ্ট হবে না? বরং তাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখ-বিলাস তো আমার 'ঢিল দেওয়া' নীতির অংশবিশেষ। এতে কারো ধোকায় পড়া উচিত নয়।[২] কুফরীর এলাকা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে এবং ইসলামের এলাকা বিস্তৃত হয়ে চলেছে। কুফরীর পায়ের তলা হতে মাটি সরে যাচ্ছে এবং ইসলামের বিজয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর মুসলিমরা দেশের পর দেশ জয় করে যাচ্ছে। (অনেকে এই আয়াত ও সূরা রা'দের ১৩:৪১ নং আয়াত দ্বারা পৃথিবীর ভূমিক্ষয় ও তার কিছু অংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া বুঝেছেন। অল্লাহু আ'লাম। -সম্পাদক)[৩] কুফরীর অনগ্রসরতা ও ইসলামের অগ্রসরতা দেখেও কি কাফেররা মনে করে যে তারাই বিজয়ী? অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্ন। অর্থাৎ তারা জয়ী নয়; বরং পরাজিত, বিজয়ী নয়; বরং বিজিত, সম্মানিত নয়; বরং অসম্মান ও অপমান তাদের ভাগ্য।
আল-আম্বিয়া 21:45
বল, ‘আমি তো শুধু অহী দ্বারাই তোমাদেরকে সতর্ক করি; কিন্তু যারা কানে কালা তাদেরকে যখন সতর্ক করা হয়, তখন তারা আহবান শুনতে পায় না।’ [১]
[১] অর্থাৎ, কুরআন শুনিয়ে তাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি আর এটিই আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু যাদের কানকে আল্লাহ হক (সত্য) শোনা হতে বধির ও কালা করে দিয়েছেন, চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন এবং অন্তরে তালা মেরে দিয়েছেন, তাদের উপর এই কুরআন ও উপদেশ কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।
আল-আম্বিয়া 21:46
তোমার প্রতিপালকের শাস্তির কিছু মাত্রও তাদেরকে স্পর্শ করলে তারা নিশ্চয় বলে উঠবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! নিশ্চয় আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আযাবের কিছু মাত্রও যদি তাদেরকে স্পর্শ করে, তাহলে তারা বলে উঠবে এবং নিজেদের অন্যায় স্বীকার করবে।
আল-আম্বিয়া 21:47
কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাসমূহ; সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনের হয়, তবুও তা আমি উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। [১]
[১] مَوَازِين শব্দটি مِيزان এর বহুবচন। এর অর্থঃ দাঁড়িপাল্লাসমূহ। কিয়ামতের দিন পাপ-পুণ্য ওজন করার জন্য কয়েকটি দাঁড়িপাল্লা হবে, নতুবা দাঁড়িপাল্লা তো একটিই হবে, তবে ওর বিশেষ মহত্তের জন্য বা বিভিন্ন ধরনের আমলের দিকে লক্ষ্য রেখে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের আমল ও কর্মসমূহ অতীন্দ্রীয়, তা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ও অনুভূত নয়, তার বাহ্যিক কোন রূপ বা অস্তিতত্ত্ব নেই, তাহলে তার ওজন কিভাবে সম্ভব? আধুনিক যুগে এই প্রশ্নের কোন গুরুত্ব নেই। যেহেতু বর্তমানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এ প্রশ্নের উত্তর সহজ করে দিয়েছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে নিরাকার তথা ওজনহীন বস্তুও ওজন করা যাচ্ছে। যখন মানুষের দ্বারা এটা সম্ভব তখন মহান আল্লাহর জন্য আকারহীন বা ওজনহীন অশরীরী জিনিসকে ওজন করা কেমন করে কঠিন হতে পারে? তাঁর মহিমা হল, তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। এ ছাড়া এও হতে পারে যে, (ন্যায়-বিচার করতে) মানুষকে দেখানোর জন্য তিনি নিরাকার বস্তুকে সাকার বানাবেন এবং তা ওজন করবেন। যেমন হাদীসসমূহে কিছু কর্মের সাকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ সবরূপঃ কিয়ামতের দিন কুরআন এক ফ্যাকাসে বর্ণের শীর্ণ পুরুষের বেশে কুরআন তেলাঅতকারীর সামনে উপস্থিত হবে। সে জিজ্ঞেস করবে, 'তুমি কে?' সে বলবে, 'আমি কুরআন যা তুমি রাত্রি জাগরণ করে পাঠ করতে ও দিনে পিপাসার্ত অবস্থায় পাঠ করতে।' (আহমাদ ৫/৩৪৮, ৩৫২, ইবনে মাজাহ) অনুরূপভাবে মুমিনের কবরে তার সৎকর্ম এক সুন্দর সুরভিত যুবকের রূপ ধরে আসবে এবং কাফের ও মুনাফিকদের কাছে এর বিপরীত রূপ নিয়ে। (আহমাদ ৫/২৮৭) এর বিস্তারিত ব্যখ্যা জানার জন্য দেখুন সূরা আ'রাফের ৭:৯ নং আয়াতের টীকা।
আল-আম্বিয়া 21:48
আমি মূসা ও হারূনকে দিয়েছিলাম সত্যাসত্যের মাঝে পার্থক্যকারী (গ্রন্থ তাওরাত) এবং সংযমীদের জন্য জ্যোতি ও উপদেশ। [১]
[১] এখানে তাওরাতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে; যা মূসা (আঃ)-কে দেওয়া হয়েছিল। এতেও পরহেযগারদের জন্য উপদেশ ছিল; যেমন কুরআনকে 'পরহেযগারদের জন্য হিদায়াত' (আল্লাহভীরুদের জন্য পথপ্রদর্শক) বলা হয়েছে। কারণ যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই তারা আল্লাহর কিতাবের দিকে ধ্যানই দেয় না। সুতরাং আসমানী কিতাব তাদের জন্য কিভাবে উপদেশ ও পথ নির্দেশের কারণ হতে পারে। উপদেশ ও পথ নির্দেশ পাওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক হচ্ছে আসমানী কিতাবের দিকে ধ্যান দেওয়া এবং তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা।
আল-আম্বিয়া 21:49
যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং কিয়ামত সম্পর্কে থাকে ভীত সন্ত্রস্ত। [১]
[১] এগুলি পরহেযগার আল্লাহভীরুদের গুণাবলী। যেমন সূরা বাক্বারার শুরুতে ও অন্যান্য জায়গায় তাঁদের গুণাবলীর কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-আম্বিয়া 21:50
আর এ হল কল্যাণময় উপদেশ; যা আমি অবতীর্ণ করেছি; তবুও কি তোমরা এটাকে অস্বীকার করবে? [১]
[১] এই কুরআন যা স্মরণকারীদের জন্য স্মারকগ্রন্থ, উপদেশ, কল্যাণ ও মঙ্গলময়; এটিকেও আমিই অবতীর্ণ করেছি। তোমরা আল্লাহর পক্ষ হতে তা অবতীর্ণ হওয়াকে কেমন করে অস্বীকার করছ? অথচ তোমরা স্বীকার কর যে, তাওরাত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ কিতাব।
আল-আম্বিয়া 21:51
নিশ্চয় আমি এর পূর্বে[১] ইব্রাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্বন্ধে ছিলাম অবগত। [২]
[১] 'এর পূর্বে'র একটি অর্থ ইবরাহীম (আঃ)-কে সুমতি পথ নির্দেশনা, জ্ঞান-বুদ্ধি দান করার ঘটনা মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেওয়ার আগের। অথবা এর অর্থ ইবরাহীম (আঃ)-কে নবুঅত দান করার পূর্বে সৎপথের জ্ঞান দান করা হয়েছিল।
[২] অর্থাৎ, আমি জানতাম যে, সে এই জ্ঞানের যোগ্য এবং সে তা সঠিক প্রয়োগ করবে।
আল-আম্বিয়া 21:52
যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলল, ‘এই মূর্তিগুলি কি, যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ?’ [১]
[১] تَمَاثِيل শব্দটি تِمثَال শব্দের বহুবচন। এর মূল অর্থ হল, কোন জিনিসের হুবহু প্রতিকৃতি। যেমন পাথর নির্মিত, কাগজে বা দেওয়ালে চিত্রিত প্রতিমূর্তি বা ছবি। এখানে উদ্দেশ্য সেই প্রতিমাসমূহ যাদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর জাতির লোকেরা নিজেদের মাবূদ ও উপাস্য বানিয়ে পূজা করত। عَاكِف শব্দটি عكوف এর কর্তৃকারক রূপ, যার অর্থ কোন জিনিসকে অাঁকড়ে ধরা, তার প্রতি ঝুঁকে জমে বসা। আর এখান থেকেই এসেছে اعتكاف (ই'তিকাফ) যার অর্থ আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশে ইবাদতকারী মসজিদের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখে সেখানে একাগ্রতার সাথে অবস্থান করে। এখানে আয়াতের অর্থ মূর্তিদের তা'যীম ও ইবাদত করা এবং তাদের থানে খাদেম বা পূজারী রূপে অবস্থান করা। এই মূর্তিপূজা বা ছবি পূজার প্রচলন বর্তমানে কবরপূজারী ও পীরপূজারীদের মধ্যে ব্যাপকহারে বিদ্যমান। তারা তাদের পীর-বুযুর্গদের ছবি বড় সম্মানের সাথে ঘরে ও দোকানে বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে টাঙ্গিয়ে রাখে (এবং ফুল-বাতি ও আগরবাতি ইত্যাদি দিয়ে সেলাম, নমস্কার বা প্রণিপাতও করে থাকে)। আল্লাহ তাদের সুমতি দান করুন।
আল-আম্বিয়া 21:53
তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি।’ [১]
[১] যেমন আজকাল অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের জালে ফেঁসে যাওয়া মুসলিমদেরকে বিদআত ও জাহেলী প্রথা বা কর্মকান্ড থেকে বাধা দিলে তারা উত্তরে বলে, 'আমরা এসব কেমন করে ছাড়ব? আমাদের পিতৃপুরুষেরা এসব করে আসছে।' আর এই ধরনের উত্তর ঐ সকল লোকেরাও দিয়ে থাকে, যারা কিতাব ও সহীহ সুন্নাহর স্পষ্ট উক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের নেতা, উলামা ও বুযুর্গদের অভিমত ও চিন্তাধারাকে মানা আবশ্যক মনে করে।
আল-আম্বিয়া 21:54
সে বলল, ‘তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পিতৃ-পুরুষরাও রয়েছ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।’
আল-আম্বিয়া 21:55
তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের নিকট সত্য এনেছ, না তুমি কৌতুক করছ?’ [১]
[১] এ কথা তারা এই জন্য বলেছিল যে, তারা এর আগে তাওহীদের বাণী শুনেইনি। তারা ভাবল, ইবরাহীম আমাদের সাথে মস্করা করছে না তো?
আল-আম্বিয়া 21:56
সে বলল, ‘বরং তোমাদের প্রতিপালক তো আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক, যিনি ওগুলি সৃষ্টি করেছেন। আর আমি এ বিষয়ে অন্যতম সাক্ষী। [১]
[১] অর্থাৎ, আমি কৌতুক করছি না; বরং এমন এক জিনিস পেশ করছি যার জ্ঞান ও নিশ্চয়তা আমি লাভ করেছি। আর তা হল এই যে, তোমাদের উপাস্য এসব মূর্তি নয়; বরং একমাত্র উপাস্য সেই প্রতিপালক, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মালিক ও সৃষ্টিকর্তা।
আল-আম্বিয়া 21:57
শপথ আল্লাহর! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্তিগুলি সম্বন্ধে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব।’ [১]
[১] এ কথা ইবরাহীম (আঃ) মনে মনে সংকল্প করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, তিনি চুপিসারে এ কথা বলেছিলেন; যার উদ্দেশ্য ছিল কিছু লোককে শোনানো। আর আল্লাহই অধিক জানেন। كَيد (কৌশল) অবলম্বন করার অর্থঃ সেই কর্মগত প্রচেষ্টা, যা তিনি মৌখিক উপদেশ দানের পর গর্হিত কাজ বন্ধ করার লক্ষ্যে কার্যতঃ করতে চেয়েছিলেন। আর তা হল, মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা।
আল-আম্বিয়া 21:58
অতঃপর সে তাদের বড় মূর্তিটি ছাড়া অন্যগুলিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল; যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে।[১]
[১] যখন তারা সকলেই তাদের ঈদ বা কোন অনুষ্ঠানের দিন বাইরে চলে গেল, তখন ইবরাহীম (আঃ) এই সুযোগে সকল মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেললেন। শুধু বড় মূর্তিটিকে রেখে দিলেন। কেউ বলেন, কুড়ুল তার হাতে ধরিয়ে দিলেন, যাতে তারা তাকে জিজ্ঞেস করে।
আল-আম্বিয়া 21:59
তারা বলল, ‘আমাদের উপাস্যগুলির প্রতি এরূপ আচরণ কে করল? সে নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারী।’ [১]
[১] যখন তারা অনুষ্ঠান সেরে ফিরে এল, তখন তারা দেখল মূর্তিগুলো সব ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে। তারা বলতে লাগল যে, এ কোন বড় অত্যাচারী লোকেরই কাজ।
আল-আম্বিয়া 21:60
কেউ কেউ বলল, ‘আমরা এক যুবককে ওদের সমালোচনা করতে শুনেছি, তার নাম ইব্রাহীম।’ [১]
[১] ওদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, ইবরাহীম নামে এক যুবক আছে না, সে কিন্তু আমাদের দেব-দেবীর বিরুদ্ধে কথা বলে, বোধ হয় এটি তারই কাজ।
আল-আম্বিয়া 21:61
তারা বলল, ‘তাকে লোক সম্মুখে উপস্থিত কর, যাতে তারা সাক্ষ্য দিতে পারে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, যাতে তারা তার শাস্তি প্রত্যক্ষ করতে পারে; যাতে ভবিষ্যতে এ কাজ করতে কেউ সাহস না পায়। অথবা এর অর্থঃ যাতে লোকেরা সাক্ষী দিতে পারে যে, তারা তাকে মূর্তিগুলো ভাঙ্গতে দেখেছে বা ওদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনেছে।
আল-আম্বিয়া 21:62
তারা বলল, ‘হে ইব্রাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যগুলির প্রতি এরূপ আচরণ করেছ?’
আল-আম্বিয়া 21:63
সে বলল, ‘বরং ওদের মধ্যে এই বড়টিই এরূপ করেছে। সুতরাং তোমরা ওদেরকেই জিজ্ঞেস কর; যদি ওরা কথা বলতে পারে।’ [১]
[১] সুতরাং ইবরাহীম (আঃ)-কে জনসমক্ষে আনা হল এবং জিজ্ঞাসা করা হল। ইবরাহীম (আঃ) উত্তর দিলেন যে, এ কাজ তো বড় মূর্তিটিই করেছে। যদি এই ভাঙ্গা মূর্তিগুলো কথা বলতে পারে, তাহলে এদেরকেই জিজ্ঞেস কর। তাদের জন্য এ বক্রোক্তি আভাসে তিরস্কারস্বরূপ ব্যবহার করেছিলেন, যাতে তারা জানতে পারে যে, যারা কথা বলার ক্ষমতা রাখে না, বা কোন জিনিস সম্পর্কে কোন খবর রাখে না, তারা মাবূদ হতে পারে না; তাদেরকে সঠিক অর্থে 'উপাস্য' বলাই সঠিক নয়।। একটি সহীহ হাদীসে ইবরাহীম (আঃ)-এর 'বরং ওদের মধ্যে এই বড়টিই এরূপ করেছে' উক্তিটিকে তাঁর মিথ্যা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি তিনটি মিথ্যা বলেছিলেন; দু'টি আল্লাহর জন্য এবং একটি নিজের জন্য। প্রথমঃ তাঁর কথা, আমি অসুস্থ। (অথচ তিনি অসুস্থ ছিলেন না।) দ্বিতীয়ঃ 'বরং ওদের মধ্যে এই বড়টিই এরূপ করেছে।' আর তৃতীয়ঃ আপন স্ত্রী সারাকে বোন বলা। (সহীহ বুখারী, আম্বিয়া অধ্যায়) সম্প্রতিকালের কিছু ব্যাখ্যাকারিগণ এই সহীহ হাদীসটিকে কুরআন-বিরোধী মনে করে অস্বীকার করেছেন এবং সহীহ মানার ব্যাপারে তাকীদ করলে তাঁরা সেটাকে অতিরঞ্জন ও বর্ণনার উপর অন্ধবিশ্বাস বলে মনে করেন। কিন্তু তাদের এ অভিমত সঠিক নয়। নিঃসন্দেহে বাস্তবিকতার দিক দিয়ে এগুলিকে যেরূপ মিথ্যা বলা যায় না, ঠিক অনুরূপই বাহ্যিকভাবে এগুলিকে মিথ্যা থেকে খারিজ করাও যায় না। কারণ এগুলি আল্লাহর জন্যই বলা হয়েছিল। আর কোন পাপ কাজ আল্লাহর জন্য হতে পারে না। অবশ্য এটা তখনই সম্ভব যখন এগুলি বাহ্যিক দৃষ্টিতে মিথ্যা হলেও প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা নয় বলে মেনে নেওয়া যায়। যেমন আদম (আঃ)-এর ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, 'আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হল; ফলে সে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।' অথচ তাঁর নিষিদ্ধ গাছ খাওয়ার কাজকে তাঁর ভুলে যাওয়া বা ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতার পরিণতিও বলা হয়েছে। যার পরিষ্কার অর্থ হল, প্রত্যেক কাজের দু'টি দিক থাকতে পারে; একদিক ভালো এবং অপরদিক মন্দ। ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্ত কথাগুলি একদিক দিয়ে বাহ্যিকরূপে মিথ্যা ছিল। কারণ তা ছিল বাস্তব ও সত্যের বিপরীত। মূর্তিগুলি তিনি নিজেই ভেঙ্গেছিলেন, কিন্তু ভাঙ্গার সম্পর্ক বড় মূর্তিটির দিকে জুড়লেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, (এই কাজের মাধ্যমে তাদেরকে জ্ঞান দেওয়া,) তাদেরকে তিরস্কার করা এবং তওহীদ সাব্যস্ত করা, সেহেতু বাস্তবতার দিক দিয়ে আমরা তা মিথ্যা না বলে, প্রমাণের পূর্ণতা দানের একটি কৌশল এবং মুশরিকদের মূর্খতা প্রতিপাদন ও প্রকাশ করার একটি যুক্তিময় পদ্ধতি বলব। এ ছাড়া হাদীসের মধ্যে এসব উক্তিকে মিথ্যা বলে আখ্যায়ন যে পরিস্থিতিতে করা হয়েছে তাও বিবেচ্য। আর তা হল হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে সুপারিশ করা হতে নিজেকে দূরে রাখা। যেহেতু পার্থিব জীবনে তিন জায়গায় তার ত্রুটি হয়ে গিয়েছিল। যদিও লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বাস্তবতার দিক দিয়ে তা মিথ্যা (ত্রুটি) নয়। কিন্তু তিনি আল্লাহর মাহাত্ম্য ও প্রতাপের জন্য এত ভীত হবেন যে, এ কথাগুলির মিথ্যার সাথে বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকার কারণে পাকড়াও যোগ্য মনে করবেন। অতএব হাদীসের উদ্দেশ্য ইবরাহীম (আঃ)-কে মিথ্যা সাব্যস্ত করা কখনই নয়; বরং উদ্দেশ্য হল, ঐ অবস্থার বিবরণ, যা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ভয়ে তাঁর ঘটবে।
আল-আম্বিয়া 21:64
তখন তারা মনে মনে চিন্তা করে দেখল এবং একে অপরকে বলতে লাগল, ‘তোমরাই তো সীমালংঘনকারী।’[১]
[১] ইবরাহীম (আঃ)-এর এই উত্তরে তারা চিন্তায় পড়ল ও কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে একে অপরকে বলতে লাগল, আসলে তোমরাই তো সীমালংঘনকারী। যারা নিজেদের জীবন রক্ষা করতে ও ক্ষতি সাধনকারীর প্রতিরোধ করতে পারে না, তারা ইবাদতের যোগ্য কিভাবে হতে পারে? কেউ কেউ এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, মূর্তিদের রক্ষা না করতে পারায় একে অপরকে ভৎর্সনা করল ও রক্ষা না করতে পারায় একে অপরকে অত্যাচারী বলল।
আল-আম্বিয়া 21:65
অতঃপর তাদের মস্তক অবনত হয়ে গেল (এবং তারা বলল), ‘তুমি তো জানই যে, ওরা কথা বলতে পারে না।’[১]
[১] হে ইবরাহীম! তুমি আমাদেরকে কেন বলছ যে, ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর; যদি ওরা বলতে পারে। অথচ তুমি ভালভাবেই জান যে,ওরা বলতে সক্ষম নয়।
আল-আম্বিয়া 21:66
সে বলল, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর, যারা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না?
আল-আম্বিয়া 21:67
ধিক্ তোমাদেরকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর তাদেরকে! তবে কি তোমরা বুঝবে না।’[১]
[১] যখন তারা তাদের অক্ষমতার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হল, তখন ইবরাহীম (আঃ) তাদের অজ্ঞতার উপর আফসোস করে বললেন, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে এমন অক্ষমদের ইবাদত কর?
আল-আম্বিয়া 21:68
তারা বলল, ‘তাকে পুড়িয়ে দাও এবং সাহায্য কর তোমাদের উপাস্যগুলিকে; যদি তোমরা কিছু করতে চাও।’ [১]
[১] ইবরাহীম (আঃ) যখন নিজের প্রমাণাদি পূর্ণরূপে পেশ করলেন এবং ওদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা এমনভাবে প্রকাশ করলেন যে, তারা কোন উত্তর করতে পারল না। কিন্তু যেহেতু তারা ছিল হিদায়াতের সুযোগ লাভে বঞ্চিত তথা কুফরী ও শিরক তাদের অন্তরকে অন্ধকার করে রেখেছিল, সেহেতু তারা তখন শিরক হতে তওবা করার পরিবর্তে ইবরাহীম (আঃ)-এর বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত হল এবং নিজেদের দেব-দেবীর দোহাই দিয়ে তাঁকে আগুনে ফেলার প্রস্তুতি শুরু করে দিল। যথারীতি আগুনের বিরাট একটি কুন্ড তৈরী করা হল। আর ওর মধ্যে ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রস্তর নিক্ষেপক যন্ত্র দ্বারা নিক্ষেপ করল। কিন্তু আল্লাহ আগুনকে আদেশ করলেন যে, 'তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।' উলামাগণ বলেন যে, 'শীতল' বলার সাথে 'নিরাপদ' শব্দ যদি আল্লাহ না বলতেন, তাহলে ওর শীতলতা ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য অসহনীয় হত। মোট কথা এটি একটি মস্ত বড় মু'জিযা; যা আল্লাহর হুকুমে আকাশ ছোঁয়া অগ্নির লেলিহান শিখা ফুলের বাগানে রূপান্তরিত হয়ে ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য প্রকাশ পেল। আর এইভাবে আল্লাহ নিজের খাস বান্দাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করলেন।
আল-আম্বিয়া 21:69
আমি বললাম, ‘হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’
আল-আম্বিয়া 21:70
তারা তার সাথে চক্রান্ত করার ইচ্ছা করেছিল; কিন্ত আমি তাদেরকে করে দিলাম সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
আল-আম্বিয়া 21:71
আর আমি তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই (শাম) দেশে, যেথায় আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য। [১]
[১] বেশির ভাগ ব্যাখ্যাতাগণের নিকট এ থেকে শাম (বর্তমানে সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইন) দেশকে বুঝানো হয়েছে। যাকে শস্য-শ্যামলতা, ফলমূল, নদ-নদীর আধিক্য ও সেই সাথে বহু নবীর বাসস্থান হওয়ার কারণে বরকতময় ও কল্যাণময় বলা হয়েছে।
আল-আম্বিয়া 21:72
আমি তাকে (ইব্রাহীমকে) দান করলাম ইসহাক এবং অতিরিক্ত (পৌত্র)রূপে ইয়াকুবকে; [১] আর প্রত্যেককেই করলাম সৎকর্মপরায়ণ।
[১] نَافِلة এর অর্থ অতিরিক্ত। অর্থাৎ, ইবরাহীম শুধু পুত্রের জন্য দু'আ করেছিলেন। কিন্তু আমি বিনা দু'আয় অতিরিক্ত হিসাবে তাকে পৌত্রও দান করলাম।
আল-আম্বিয়া 21:73
আর আমি তাদেরকে করলাম নেতা, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত; তাদের কাছে আমি অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, নামায কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে। তারা আমারই উপাসনা করত।
আল-আম্বিয়া 21:74
লুতকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান, আর তাকে উদ্ধার করেছিলাম এমন এক জনপদ হতে, যার অধিবাসীরা লিপ্ত ছিল অশ্লীল কর্মে; তারা ছিল এক সত্যত্যাগী মন্দ সম্প্রদায়।
আল-আম্বিয়া 21:75
এবং তাকে আমি আমার অনুগ্রহভাজন করেছিলাম; নিশ্চয় সে ছিল সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত। [১]
[১] লূত (আঃ) ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র (ভাইপো), তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারী এবং তাঁর সাথে ইরাক হতে শামে হিজরতকারীদের একজন। আল্লাহ লূত (আঃ)-কেও জ্ঞান হিকমত অর্থাৎ, নবুঅত দান করেছিলেন। তিনি যে এলাকার নবী ছিলেন তার নাম ছিল সাদূম। এটি প্যালেষ্টাইনের মৃতসাগর লাগোয়া জর্ডানের নিকটতম একটি শস্য-শ্যামল এলাকা ছিল। যার বড় অংশ এখন সমুদ্রের গর্ভে। তার জাতি সমকামিতার মত জঘন্য অপরাধ, রাস্তায় বসে পথচারীদের প্রতি কটূক্তি করা, তাদেরকে কষ্ট দেওয়া, ছোট ছোট পাথর ছুঁড়ে মারা ইত্যাদি অপকর্মে ছিল পাকা। সেগুলোকে আল্লাহ এখানে خَبَائث অশ্লীল কর্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন। শেষ পর্যন্ত লূত ও তাঁর অনুসারীদেরকে বাঁচিয়ে নিয়ে (অনুগ্রহভাজন করে) অবশিষ্ট জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
আল-আম্বিয়া 21:76
আর (স্মরণ কর) নূহকে; পূর্বে সে যখন আহবান করেছিল, তখন আমি সাড়া দিয়েছিলাম তার আহবানে এবং তাকে ও তার পরিজনবর্গকে মহাসংকট হতে উদ্ধার করেছিলাম।
আল-আম্বিয়া 21:77
এবং আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যারা আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, তারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়; এ জন্য তাদের সকলকেই আমি নিমজ্জিত করেছিলাম।
আল-আম্বিয়া 21:78
এবং স্মরণ কর দাঊদ ও সুলাইমানের কথা, যখন তারা বিচার করছিল শস্য ক্ষেত্র সম্পর্কে; তাতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল কোন সম্প্রদায়ের মেষ; আর আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম তাদের বিচার।
আল-আম্বিয়া 21:79
আমি সুলাইমানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম[১] এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমি পর্বত[২] ও পক্ষীকুলকে[৩] দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, ওরা তার সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত; আমিই ছিলাম এই সবের কর্তা।[৪]
[১] ব্যাখ্যাতাগণ এ ঘটনাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তির ছাগল অন্য ব্যক্তির ক্ষেতে রাত্রে ঢুকে ফসল নষ্ট করে দেয়। দাঊদ (আঃ) যিনি নবী হওয়ার সাথে সাথে একজন বাদশাহও ছিলেন, তিনি ফায়সালা করলেন যে, ক্ষেতের মালিক ছাগলগুলি নিয়ে নিক; যাতে তার ক্ষতিপূরণ হয়। সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালায় একমত হলেন না। বরং তিনি ফায়সালা করলেন যে, ছাগলগুলি ক্ষেতের মালিককে কিছু দিনের জন্য দেওয়া হোক; সে সেগুলি দ্বারা উপকৃত হবে এবং ক্ষেত ছাগলের মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হোক, সে ক্ষেতের সেচ-যত্ন ও দেখাশুনা করে ঠিক করুক। যখন ক্ষেত পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে, তখন ক্ষেত ক্ষেতের মালিককে ও ছাগলগুলি ছাগলের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। প্রথম ফায়সালার তুলনায় দ্বিতীয় ফায়সালা এই জন্যই ভালো যে, এতে কাউকেই নিজের মাল হতে বঞ্চিত হতে হচ্ছে না। কিন্তু প্রথম ফায়সালায় ছাগলের মালিককে ছাগল থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এ সত্ত্বেও আল্লাহ দাঊদ (আঃ)-এরও প্রশংসা করেছেন ও বলেছেন যে, আমি দাঊদ ও সুলাইমান উভয়কেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছি। কিছু লোক এখান থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, প্রত্যেক মুজতাহিদ (শরীয়তের বিধান বর্ণনা করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি তাঁর প্রচেষ্টায়) সঠিকতায় পৌঁছে থাকেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন এ দাবী সঠিক নয়। কোন একটি ব্যাপারে দুই ভিন্নমুখী মীমাংসাকারী দুই মুজতাহিদ একই সময়ে সঠিকতায় উপনীত হতে পারেন না। ওঁদের মধ্যে একজন ঠিক ফায়সালাদাতা ও অপরজন ভুল ফায়সালাদাতা হিসাবে গণ্য হবেন। অবশ্য এ কথা আলাদা যে, ভুল ফায়সালাদাতা মুজতাহিদ আল্লাহর নিকট অপরাধী নন; বরং তাঁকেও একটি নেকী দান করা হবে; যেমন হাদীসে এসেছে। (ফাতহুল কাদীর)
[২] এর অর্থ এই নয় যে, পাহাড় দাঊদ (আঃ)-এর তসবীহর আওয়াজে প্রতিধ্বনিত হত। কারণ, তাতে কোন মু'জিযা (অলৌকিকতা) প্রমাণ হয় না। যেহেতু যে কেউ আওয়াজ করলেই তো পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়। বরং এর অর্থ হল, দাঊদ (আঃ)-এর সাথে পাহাড়ও তসবীহ পাঠ করত এবং তা বাস্তব সত্য, রূপক অর্থে নয়।
[৩] অর্থাৎ, পাখিরাও দাঊদ (আঃ)-এর তসবীহ পড়ার সাথে সাথে তসবীহ পড়তে শুরু করত। وَالطَّيرَ শব্দটির শেষে যবর কিরাআতে এর সংযোগ হবে الجِبَال এর সাথে। আর পেশ কিরাআতে ঊহ্য বিধেয়র উদ্দেশ্য হবে; অর্থাৎ, والطَّيرُ مسخَّراتٌ আর এর অর্থ হবে, পক্ষীকুলও (তার) অনুগত।
[৪] অর্থাৎ, দাঊদকে ফায়সালা বুঝিয়ে দেওয়া, প্রজ্ঞা দান করা এবং পাখি ও পাহাড়কে তার অনুগত করে দেওয়া এসব কাজ আমিই করেছি। এতে কারো আশ্চর্য্য প্রকাশ করার অথবা অস্বীকার করার কিছুই নেই। কারণ আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি।
আল-আম্বিয়া 21:80
আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে;[১] সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?
[১] অর্থাৎ, আমি লোহাকে দাঊদের জন্য নরম বানিয়ে দিয়েছিলাম; যা দিয়ে সে যুদ্ধের পোশাক লৌহবর্ম তৈরী করত, যা তোমাদেরকে যুদ্ধে আঘাত থেকে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দান করে থাকে। কাতাদা (রঃ) বলেন, দাঊদ (আঃ)-এর আগে বর্ম তৈরী হত; কিন্তু তা হত স্বাভাবিক পাতের, কড়া ও শিকলহীন। দাঊদ (আঃ) সর্বপ্রথম কড়া ও শিকলবিশিষ্ট বর্ম তৈরী করেন। (ইবনে কাসীর)
আল-আম্বিয়া 21:81
এবং সুলাইমানের বশীভূত করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; [১] যা তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হত সেই দেশের দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি। আর প্রত্যেক বস্তু সম্পর্কে আমি অবগত।
[১] যেমন পাহাড় ও পাখিকে দাঊদ (আঃ)-এর অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল, তেমনি হাওয়াকেও সুলাইমান (আঃ)-এর অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তার পারিষদবর্গ সহ সিংহাসনে বসতেন এবং যেখানে ইচ্ছা করতেন এক মাসের রাস্তা মাত্র কয়েক ঘন্টায় পৌঁছে যেতেন। হাওয়া তাঁর সিংহাসনকে উড়িয়ে নিয়ে যেত। কল্যাণময় দেশ বলতে শাম (প্যালেষ্টাইন ও সিরিয়া)-কে বুঝানো হয়েছে।
আল-আম্বিয়া 21:82
শয়তানদের মধ্যে কতক তার জন্য ডুবুরীর কাজ করত, এটা ছাড়া অন্য কাজও করত; [১] আর আমি তাদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম।[২]
[১] জীনরাও সুলাইমান (আঃ)-এর অনুগত ছিল; তারা তাঁর আদেশে সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তা তুলে আনত। অনুরূপভাবে অন্যান্য নির্মাণ কাজ প্রভৃতিও তাঁর ইচ্ছামত করত।
[২] অর্থাৎ, জীনদের মধ্যে যে অবাধ্যতা ও ফাসাদী স্বভাব ছিল, তা থেকে আমি সুলাইমানকে রক্ষা করেছি। ফলে তার সম্মুখে তাদের অবাধ্য হওয়ার উপায় ছিল না।
আল-আম্বিয়া 21:83
আর (স্মরণ কর) আইয়ুবের কথা; যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলল, ‘আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’
আল-আম্বিয়া 21:84
তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম; তার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম, তাকে তার পরিবার পরিজনকে ফিরিয়ে দিলাম, তাদের সাথে তাদের মত আরো দিলাম আমার বিশেষ করুণা স্বরূপ এবং উপাসনাকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। [১]
[১] পবিত্র কুরআনে আইয়ুব (আঃ)-কে ধৈর্যশীল বলা হয়েছে। (সূরা স্বাদঃ ৩৮:৪৪) এর অর্থ, তাঁকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলা হয়েছিল, যাতে তিনি ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা করতে ছাড়েননি। এই পরীক্ষা ও দুঃখ-কষ্ট কি ধরনের ছিল তার কোন প্রামাণিক বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও কুরআনের বর্ণনা হতে বুঝতে পারা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ধন-দৌলত, সন্তানাদি দান করেছিলেন। অতঃপর পরীক্ষা স্বরূপ তিনি এক সময় তাঁর কাছ হতে সমস্ত কিছু কেড়ে নিলেন। এমনকি তিনি শারীরিক সুস্থতা থেকেও বঞ্চিত হলেন এবং নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। কথিত আছে যে, আঠারো বছর দীর্ঘ পরীক্ষার পর তিনি আল্লাহর সমীপে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন এবং সুস্থতার সাথে সাথে ধন-দৌলত ও সন্তানাদি দ্বিগুণ দান করলেন। (এর কিছু ব্যাখ্যা সহীহ ইবনে হিববান এর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়ঃ ৪/২৪৪, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/২০৮) বিপদে আপত্তি, অভিযোগ ও অনুযোগ করা এবং ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করা ধৈর্যের পরিপন্থী। আর এ সকল কাজ আইয়ুব (আঃ) কখনও করেননি। অবশ্য মুক্তি প্রার্থনা ধৈর্যের পরিপন্থী নয়। সেই কারণে আল্লাহ তাআলা তার জন্য "আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম" শব্দ ব্যবহার করেছেন।
আল-আম্বিয়া 21:85
আর (স্মরণ কর) ইসমাঈল, ইদরীস ও যুলকিফল[১] এর কথা; তাদের প্রত্যেকেই ছিল ধৈর্যশীল।
[১] যুলকিফল সম্পর্কে মতভেদ আছে যে, তিনি নবী ছিলেন কি না? কেউ কেউ বলেন, তিনি নবী ছিলেন। আবার কেউ বলেন, তিনি ওলী ছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ সম্পর্কে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে বিরত থেকেছেন। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেছেন যে, নবীদের সঙ্গে তাঁর নাম উল্লেখ হওয়াই তাঁর নবী হওয়ার কথা স্পষ্ট করে। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
আল-আম্বিয়া 21:86
তাদেরকে আমি আমার অনুগ্রহভাজন করেছিলাম, নিশ্চয় তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।
আল-আম্বিয়া 21:87
আর (স্মরণ কর) যুন-নুন[১] (মাছ-ওয়ালা ইউনুস)এর কথা, যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গেল এবং মনে করল, আমি তার প্রতি কোন সংকীর্ণতা করব না।[২] অতঃপর সে অনেক অন্ধকার[৩] হতে আহবান করল, ‘তুমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র, মহান। নিশ্চয় আমি সীমালংঘনকারী।’
[১] 'যুন-নূন' (মাছ-ওয়ালা) বলতে ইউনুস (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে, যিনি নিজের জাতির উপর রাগান্বিত হয়ে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখিয়ে, আল্লাহর বিনা অনুমতিতে সেখান হতে পলায়ন করেছিলেন। যার কারণে আল্লাহ তাঁকে পাকড়াও করলেন এবং এক বড় তিমি মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। এর কিছু বিবরণ সূরা ইউনুসের ১০:৯৮ নং আয়াতের টীকায় বর্ণিত হয়েছে এবং কিছু বর্ণনা সূরা সাফফাতে ৩৭:১৩৯-১৪৮ নং আয়াতে আসবে।[২] অধিকাংশ অনুবাদে বলা হয়েছে, 'আমি তার উপর কোন ক্ষমতাই রাখি না।' বা 'আমি তাকে পাকড়াও করতে পারব না।' আল্লাহর প্রতি এমন ধারণা কুফরী এবং একজন নবী এমন ধারণা করতে পারে না। সুতরাং এর সঠিক মর্মার্থ হল, 'সে মনে করল, আমি তার প্রতি কোন সংকীর্ণতা সৃষ্টি করব না' অথবা 'সে ধারণা করল, আমি তার জন্য কোন শাস্তির ফায়সালা করব না।' (ফাতহুল ক্বাদীর)[৩] ظُلمَات শব্দটি ظُلمَة শব্দের বহুবচন যার অর্থঃ অনেক অন্ধকার। ইউনুস (আঃ) বেশ কয়েকটি অন্ধকারে ছিলেন; যথা রাত্রির অন্ধকার, সমুদ্রের পানির অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকার।
আল-আম্বিয়া 21:88
তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে উদ্ধার করলাম দুশ্চিন্তা হতে এবং এভাবেই আমি মু’মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।[১]
[১] আমি ইউনুস (আঃ)-এর দু'আ কবুল করেছিলাম এবং তাকে অন্ধকার ও মাছের পেট থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর যে কোন মু'মিন বিপদাপদে ও দুঃখ-কষ্টে পড়ে আমাকে ডাকবে আমি তাকে পরিত্রাণ দেব। হাদীসেও এসেছে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "যে কোন মুসলিম এই দু'আ (লা ইলাহা ইল্লা আন্তা---)এর সাহায্যে আল্লাহর নিকট কিছু চাইবে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।
(তিরমিযী ৩৫০৫নং, আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।)
আল-আম্বিয়া 21:89
আর স্মরণ কর যাকারিয়ার কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা (সন্তানহীন) ছেড়ে দিও না এবং তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।’
আল-আম্বিয়া 21:90
অতঃপর আমি তার আহবানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহয়্যাকে, [১] আর তার জন্য তার স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্না করেছিলাম।[২] তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আশা ও ভীতির সাথে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। [৩]
[১] যাকারিয়া (আঃ)-এর বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের জন্য দু'আ করা এবং আল্লাহর সন্তান দান করা প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় বিস্তারিত আলোচনা (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩৭-৪১ ও সূরা মারয়্যামের ১৯:২-১১ আয়াতে) পার হয়ে গেছে। এখানেও এই শব্দ দ্বারা তার প্রতি ইশারা করা হয়েছে।[২] সে বন্ধ্যা ও সন্তান জন্মদানের অযোগ্যা। আমি তা দূর করে তাকে সৎ সন্তান জন্মদানের যোগ্যতাসম্পন্না করেছিলাম।[৩] দু'আ কবুলের জন্য এই সকল গুণের প্রতি যত্ন রাখা জরুরী, যার উল্লেখ এখানে বিশেষভাবে করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহর নিকট বিনীত হওয়া, কাকুতি-মিনতি সহকারে প্রার্থনা করা, সৎকাজে প্রতিযোগিতা করা, আশা ও ভীতির সাথে তাঁকে ডাকা।
আল-আম্বিয়া 21:91
আর স্মরণ কর সেই নারী (মারয়্যাম)এর কথা, যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করেছিল, অতঃপর তার মধ্যে আমি আমার রূহ্ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন। [১]
[১] এখানে মারয়্যাম ও ঈসা (আঃ)-এর আলোচনা, যা এর আগে (সূরা মারয়্যামের ১৯:১৬-৩৪ নং আয়াতে) পার হয়ে গেছে।
আল-আম্বিয়া 21:92
নিঃসন্দেহে তোমাদের এ জাতি, (আসলে) একই জাতি।[১] আর আমিই তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা আমার উপাসনা কর।
[১] এখানে 'উম্মাহ' (উম্মত বা জাতি) বলতে দ্বীন ও ধর্মকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের সকলের ধর্ম একই। আর তা হল তাওহীদ (একতত্ত্ববাদ, অদ্বিতীয়বাদ বা একেশ্বরবাদের) ধর্ম; যার প্রতি সকল আম্বিয়া মানুষকে আহবান করেছেন এবং মিল্লাত হল মিল্লাতে ইসলাম যা ছিল সকল আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-দের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ)। যেমন নবী (সাঃ) বলেছেন, "আমরা নবীর দল আপোসে বৈমাত্রেয় ভাই (সকলের পিতা এক, মা পৃথক পৃথক); আমাদের দ্বীন একই। (ইবনে কাসীর)
আল-আম্বিয়া 21:93
কিন্তু মানুষ নিজেদের কার্যকলাপে পরস্পরের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করেছে; প্রত্যেকেই আমার নিকট প্রত্যাবর্তনকারী। [১]
[১] অর্থাৎ, একত্ববাদ বা তাওহীদের রাস্তা এবং এক আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল মুশরিক ও কাফের হয়ে পড়ল। অন্যদিকে নবীদের অনুসারীরাও নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। কেউ ইয়াহুদী, কেউ খ্রিষ্টান, আবার কেউ অন্য কিছু। আর ভাগ্যচক্রে মুসলিমরাও আজ এই ব্যাধির শিকার; এরাও অনেক দলে বিভক্ত। এদের সকলের ফায়সালা আল্লাহর নিকট হবে, যখন তারা তাঁর নিকট ফিরে যাবে।
আল-আম্বিয়া 21:94
সুতরাং যদি কেউ বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করে, তবে তার কর্ম-প্রচেষ্টা অগ্রাহ্য হবে না এবং নিশ্চয় আমি তা লিখে রাখি।
আল-আম্বিয়া 21:95
যে জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি তাদের পক্ষে জরুরী যে, তার অধিবাসীবৃন্দ ফিরে আসবে না। [১]
[১] এখানে حَرَام এর অর্থ বিপরীতমুখী; অপরিহার্য বা জরুরী। যেমন অনুবাদে প্রকাশিত। অথবা لاَ শব্দটি অতিরিক্ত। অর্থাৎ যে জনদপকে আমি ধ্বংস করেছি, তার পৃথিবীতে ফিরে আসা হারাম (অসম্ভব)। অথবা যে জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি, তার তওবা অসম্ভব।
আল-আম্বিয়া 21:96
এমন কি যখন য়্যাজূজ ও মা’জূজকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে। [১]
[১] য়্যা'জূজ-মা'জূজ এর বিস্তারিত বিবরণ সূরা-কাহফের শেষে (১৮:৯৩-৯৮ আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঈসা (আঃ)-এর বর্তমানে তাদের প্রকাশ ঘটবে। এরা এত বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে যে, প্রতিটি উঁচু জায়গা হতে ছুটে আসছে মনে হবে। তাদের অনিষ্টকারিতা ও অত্যাচারে মুসলিমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এমনকি ঈসা (আঃ) মুসলিমদের নিয়ে তূর পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। অতঃপর ঈসা (আঃ)-এর অভিশাপে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের শবদেহের দুর্গন্ধে সর্বদিক ভরে উঠবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এক জাতীয় পাখি প্রেরণ করবেন; যারা তাদের লাশগুলো তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষাবেন, যাতে সারা পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যাবে। (এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। বিস্তারিত দেখার জন্য তাফসীর ইবনে কাসীর দ্রষ্টব্য।)
আল-আম্বিয়া 21:97
অমোঘ প্রতিশ্রুতি কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ অবিশ্বাসীদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে,[১] তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন; বরং আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম।’
[১] য়্যা'জূজ-মা'জূজ বের হওয়ার পর কিয়ামতের সত্য প্রতিশ্রুতি অতি নিকটে এসে পড়বে। আর যখন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা দেখে কাফেরদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে।
আল-আম্বিয়া 21:98
তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর সেগুলি তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।[১]
[১] এই আয়াতটি মক্কার মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে; যারা লাত, মানাত, উয্যা ও হুবালের পূজা করত। এরা ছিল সব পাথরের তৈরী মূর্তি, যা ছিল জড়, অচেতন ও জ্ঞানহীন। সেই কারণে আয়াতে مَا تَعبُدُون শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আর আরবী ভাষায় مَا শব্দটি জ্ঞানহীনদের জন্যই ব্যবহার হয়। অর্থাৎ বলা হচ্ছে যে, তোমরা ও তোমাদের পূজ্যরা যাদের মূর্তি গড়ে তোমরা পূজা কর, সকলেই জাহান্নামের ইন্ধন হবে। পাথরের গড়া মূর্তিগুলির যদিও কোন দোষ নেই; কারণ তারা প্রাণহীন জড়পদার্থ, যাদের জ্ঞান বা অনুভূতি কিছুই নেই -- তবুও তাদেরকেও পূজারীদের সঙ্গে জাহান্নামে দেওয়া হবে। শুধু মুশরিকদেরকে এই বুঝিয়ে অধিক অপমান ও লাঞ্ছিত করার জন্য যে, তোমরা যাদেরকে নিজেদের ভরসাস্থল মনে করতে, তারাও তোমাদের সাথে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে।
আল-আম্বিয়া 21:99
যদি তারা উপাস্য হত, তাহলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। [১]
[১] অর্থাৎ, সত্যি-সত্যিই এরা যদি মা'বূদ হত বা কোন প্রকার এখতিয়ারের মালিক হত এবং তোমাদেরকে জাহান্নাম যাওয়া হতে রক্ষা করতে পারত, তাহলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না। কিন্তু তারা নিজেরাও জাহান্নামে তোমাদের শিক্ষার জন্য প্রবেশ করবে, সুতরাং তারা তোমাদেরকে কিভাবে রক্ষা করবে? পরিণতিতে আবেদ (উপাসক) ও মা'বূদ (উপাস্য) উভয়ই চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে।
আল-আম্বিয়া 21:100
সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ এবং সেথায় তারা কিছুই শুনতে পাবে না। [১]
[১] অর্থাৎ সকলেই কঠিন দুঃখ-কষ্টে আর্তনাদ করতে থাকবে। যার ফলে তারা একে অপরের আওয়াজও শুনতে পাবে না।
আল-আম্বিয়া 21:101
নিশ্চয় যাদের জন্য আমার নিকট থেকে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে, তাদেরকে তা (জাহান্নাম) হতে দূরে রাখা হবে। [১]
[১] কোন কোন মানুষের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে বা মুশরিকদের পক্ষ হতে এ প্রশ্ন উঠতে পারে; বরং বাস্তবে উঠেও থাকে যে, যেমন ঈসা (আঃ), উযায়র, ফিরিশতা ও বহু সৎলোকদেরও তো ইবাদত করা হয়ে থাকে, তাহলে এরাও কি তাদের ইবাদতকারীর সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করবে? এ আয়াতে সে উত্তর দেওয়া হয়েছে। আর তা এই যে, তাঁরা ছিলেন আল্লাহর নেক বান্দা; যাঁদের নেকীর কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁদেরকে চিরস্থায়ী সুখী জীবন বা জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জাহান্নাম হতে সুদূরে থাকবেন। এ শব্দগুলি দ্বারা এ কথাও পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে এই ইচ্ছা ও কামনা রেখে মারা যায় যে, তার মৃত্যুর পর তার কবরকে মাজার বানানো হোক এবং লোকেরা তাকে প্রয়োজন পূরণকারী (দাতা) মনে করে তার নামে নযর-নিয়ায পেশ করুক ও তার পূজা (ও সিজদাহ) হোক, তাহলে সে ব্যক্তিও জাহান্নামের ইন্ধন হবে। কারণ আল্লাহকে ছেড়ে অথবা তাঁর সাথে নিজের ইবাদতের প্রতি আহবানকারী (তাগূত) নিঃসন্দেহে সেই নেক মানুষদের আওতায় কখনও পড়বে না, 'যাদের জন্য আল্লার নিকট থেকে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে।'
আল-আম্বিয়া 21:102
তারা ওর (জাহান্নামের) ক্ষীণতম শব্দও শুনতে পাবে না এবং সেথায় তাদের মন যা চায় তারা চিরকাল তা ভোগ করবে।
আল-আম্বিয়া 21:103
মহাভীতি[১] তাদেরকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে না এবং ফিরিশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে (এবং বলবে), ‘এ তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।’
[১] 'মহাভীতি' বলতে মৃত্যু বা ইস্রাফীল (আঃ)-এর শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় অথবা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে মৃত্যুকে যবেহ করার সময় সৃষ্ট ভীতিকে বুঝানো হয়েছে। তবে ইস্রাফীলের শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় এবং কিয়ামত কায়েম হওয়ার সময় সৃষ্ট ভীতিই পূর্বাপর আলোচনার বেশী নিকটবর্তী।
আল-আম্বিয়া 21:104
সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দপ্তর; [১] যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য; আমি এটা পালন করবই।
[১] অর্থাৎ, যেমন লেখক লেখার পর খাতাপত্র গুটিয়ে রেখে দেয়। যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, {وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ} অর্থাৎ, আকাশ তাঁর ডান হাতে গুটানো থাকবে। (যুমারঃ ৬৭) سِجِلّ এর অর্থ দপ্তর বা রেজিষ্টার। অর্থ এই যে, লেখকের লেখার পর যেমন কাগজপত্র গুটিয়ে নেওয়া সহজ, তেমনি সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর জন্য আকাশ সুবিস্তৃত হওয়ার সত্ত্বেও তা নিজের হাতের মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া কোন কঠিন ব্যাপার নয়।
আল-আম্বিয়া 21:105
আমি (যাবূর) কিতাবে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, ‘নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা[১] পৃথিবীর অধিকারী হবে।’
[১] الزَبور বলতে যাবূর কিতাবকেই বুঝানো হয়েছে, আর الذِّكر বলতে উপদেশ, যেমন অনুবাদে প্রকাশ। বা যাবূর বলতে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ, আর যিকর বলতে লাওহে মাহফূয। অর্থাৎ, প্রথমে লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ ছিল এবং পরে আসমানী কিতাবসমূহেও লেখা হয়েছে যে, নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে। কোন কোন মুফাস্সির الأرض (পৃথিবী) বলতে জান্নাত অর্থ নিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, তার অর্থঃ কাফেরদের দেশ ও জমি-জায়গা। আয়াতের অর্থ হল, আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারাই পৃথিবীর অধিকারী হবে। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা যতদিন সৎকর্মশীল ছিল, ততদিন তারাই পৃথিবীর উপর ক্ষমতাসীন হয়ে উন্নতশির ছিল এবং ভবিষ্যতেও যখনই তারা এই গুণের অধিকারী হবে, আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা তাদের হাতেই আসবে। বলা বাহুল্য, মুসলিমদের পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা হতে বঞ্চিত থাকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে যেন কোন প্রকার সংশয় ও প্রশ্ন উদিত না হয়। যেহেতু এ প্রতিশ্রুতি মুসলিমদের সৎকর্মশীলতার সাথে শর্ত-সাপেক্ষ। আর إذا فات الشرط فات المشروط নীতি অনুসারে যখন মুসলিমরা ঐ শর্ত পালনে অক্ষম হল, তখন তারা পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা ও আধিপত্য থেকে বঞ্চিত হল। সুতরাং এখানে শাসন-ক্ষমতা পাওয়ার উপায় ও পথ বলে দেওয়া হয়েছে, আর তা হল সৎকর্ম। অর্থাৎ, আল্লাহ ও রসূলের বিধি-বিধান অনুসারে জীবন অতিবাহিত করা এবং শরীয়তের নিয়ম-কানুন ও সীমা মেনে চলা। (মুসলিমরা যেদিন নিজেদের জীবন ও পরিবারে ইসলামী সংবিধানকে বাস্তবায়িত করতে পারবে, সেদিনই ফিরে পাবে পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা।)
আল-আম্বিয়া 21:106
উপাসনাকারী সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে পয়গাম। [১]
[১] 'এতে' বলতে ঐ উপদেশ ও সতর্কবাণী যা এই সূরায় বিভিন্ন ভঙ্গিমায় বর্ণিত হয়েছে। 'পয়গাম'-এর উদ্দেশ্যঃ যথেষ্টতা ও উপকারিতা। অথবা 'এতে' বলতে কুরআন মাজীদকে বুঝানো হয়েছে, যা মুসলিমদের জন্য উপকারী ও যথেষ্ট। উপাসনাকারী বা আবেদ বলতে বিনয় নম্রতার সাথে আল্লার ইবাদতকারী এবং শয়তান ও খেয়াল-খুশীর উপর আল্লাহর আনুগত্যকে প্রাধান্যদানকারী। আর ইবাদত ও আনুগত্যের মস্তক হল, নামায।
আল-আম্বিয়া 21:107
আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু করুণা রূপেই প্রেরণ করেছি। [১]
[১] এর অর্থ হল, যে ব্যক্তি রসূল (সাঃ)-এর রিসালতের উপর ঈমান আনবে সে আসলে উক্ত করুণা ও রহমতকে গ্রহণ করবে। পরিণামে দুনিয়া ও আখিরাতে সে সুখ ও শান্তি লাভ করবে। আর যেহেতু রসূল (সাঃ)-এর রিসালাত বিশ্বজগতের জন্য, সেহেতু তিনি বিশ্বজগতের রহমত রূপে; অর্থাৎ নিজের শিক্ষা দ্বারা বিশ্ববাসীকে ইহ-পরকালের সুখের সন্ধান দিতে প্রেরিত হয়েছিলেন। কিছু উলামা তাঁকে এই অর্থেও বিশ্বজগতের জন্য করুণা বলেছেন যে, তাঁর কারণেই এই উম্মত (তাঁর দাওয়াত গ্রহণ অথবা বর্জনকারী মুসলিম অথবা কাফের সকলেই) নির্মূলকারী ব্যাপক ধ্বংসের হাত হতে রেহাই পেয়েছে। যেভাবে পূর্ববর্তী বহু জাতিকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, উম্মাতে মুহাম্মাদিয়াকে ঐ রকম আযাব দিয়ে ধ্বংস করে নির্মূল করা হয়নি। বহু হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, মুশরিকদের উপর বদ্দুআ ও অভিশাপ না করাও ছিল তাঁর করুণারই একটি বিশেষ অংশ। তাঁকে তাদের উপর বদ্দুআ করতে আবেদন করা হলে তিনি বলেছিলেন, "আমি অভিশাপকারীরূপে প্রেরিত হইনি; আমি কেবল করুণারূপে প্রেরিত হয়েছি।" (মুসলিম ২০০৬নং) অনুরূপ রাগান্বিত অবস্থায় কোন মুসলিমকে তাঁর অভিশাপ বা গালিমন্দ করাকে কিয়ামতের দিন তার জন্য রহমতের কারণ হওয়ার দু'আ করাও তাঁর দয়ারই একটি অংশ। (আহমাদ ২/৪৩৭, আবুদাউদ ৪৬৫৯নং, সিলসিলাহ সহীহাহ আলবানী ১৭৫৮নং) এই কারণেই একটি হাদীসে তিনি বলেছেন, "আমি রহমতের মূর্তপ্রতীক হয়ে আল্লাহর পক্ষ হতে বিশ্বজগতের জন্য একটি উপহার।" (সহীহুল জামে' ২৩৪৫নং)
আল-আম্বিয়া 21:108
বল, ‘আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্য একই উপাস্য। সুতরাং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হবে কি?’ [১]
[১] এখানে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, প্রকৃত রহমত অর্জন হল, তাওহীদকে বরণ এবং শিরক বর্জন করা।
আল-আম্বিয়া 21:109
যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বল, ‘আমি তোমাদেরকে যথাযথভাবে জানিয়ে দিয়েছি। [১] আর আমি জানি না যে, তোমাদেরকে যে বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা নিকটবর্তী, না দূরবর্তী। [২]
[১] অর্থাৎ, যেমন আমি জানি যে, তোমরা আমার তাওহীদের ও ইসলামের আহবান হতে বিমুখতা অবলম্বন করে আমার শত্রু হয়েছ, তেমনি তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আমিও তোমাদের শত্রু ও আমাদের আপোসের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ চলবে।
[২] এই প্রতিশ্রুতি বলতে কিয়ামত বা ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের প্রতিশ্রুতি। অথবা প্রতিশ্রুতি বলতে আল্লাহর তরফ হতে তোমাদের বিরুদ্ধে আমাকে দেওয়া জিহাদের অনুমতি।
আল-আম্বিয়া 21:110
নিশ্চয় তিনি জানেন উচ্চ স্বরে ব্যক্ত কথা এবং যা তোমরা গোপন কর।
আল-আম্বিয়া 21:111
আমি জানি না, হয়তো এটা তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা এবং কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ।’
আল-আম্বিয়া 21:112
(রসূল) বলেছিল,[১] ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দাও। আর আমাদের প্রতিপালক তো দয়াময়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র সহায়স্থল তিনিই।’[২]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেরী; আমি জানি না যে, তা তোমাদের পরীক্ষার জন্য, নাকি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত জীবনোপভোগে তোমাদেরকে অতিরিক্ত অবকাশ দেওয়ার জন্য।
[২] অর্থাৎ, তোমরা আমার সম্পর্কে যে বিভিন্নমুখী কথা বলছ বা আল্লাহর জন্য সন্তান থাকার কথা বলছ, এ সব কথার বিরুদ্ধে তিনিই দয়াময় এবং তিনিই সহায়ক।
আল-হাজ্জ 22:1
হে মানবমন্ডলী! তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে; (আর জেনে রেখো যে,) নিঃসন্দেহে কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার।
আল-হাজ্জ 22:2
যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নিজ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। [১]
[১] পূর্বোক্ত আয়াতে যে প্রকম্পনের কথা বলা হয়েছে যার পরিণতি এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যার অর্থঃ মানুষের মধ্যে কঠিন ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। আর এটি ঘটবে ঠিক কিয়ামতের পূর্বমুহূর্তে, আর তার পরই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অথবা এ ঘটনা কিয়ামতের (জন্য শিঙ্গায় ফুৎকার করার) পর ঐ সময় ঘটবে, যখন মানুষ কবর হতে উঠে হাশরের ময়দানে জমায়েত হবে। অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারিগণ দ্বিতীয় অর্থ নিয়েছেন। আর তার সমর্থনে কিছু হাদীস পেশ করেন, যেমন মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে আদেশ করবেন যে, যেন তিনি নিজ সন্তানদের মধ্য হতে হাজারে ৯৯৯ জনকে জাহান্নামের জন্য বের করে দেন। এই কথা শুনে গর্ভবতীরা তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে, বালকরা বৃদ্ধ হয়ে পড়বে, আর মানুষকে দেখে মাতাল মনে হবে, অথচ তারা আসলে মাতাল হবে না; বরং আল্লাহর আযাবের ভয়াবহতার জন্য এ রকম (কিংকর্তব্যবিমূঢ়) হবে। সাহাবাদের কাছে এ কথা অত্যন্ত ভারী মনে হল, তাদের চেহারার রং পাল্টে গেল। নবী (সাঃ) তা দেখে বললেন ভয়ের কিছু নেই। ৯৯৯ জনের সংখ্যা য়্যা'জূজ-মা'জূজের মধ্য হতে হবে আর তোমাদের মাত্র একজন। তোমাদের সংখ্যা অন্য মানুষদের তুলনায় এমন হবে, যেমন সাদা গরুর গায়ে একটি কালো লোম অথবা কালো গরুর গায়ে একটি সাদা লোম। আর আমি আশা করি যে, তোমরাই হবে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ বা এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক। তা শুনে সাহাবারা আনন্দে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি উচ্চারিত করলেন। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা হাজ্জ) প্রথম বক্তব্যও অমূলক নয়। কিছু দুর্বল হাদীস দ্বারা তার সমর্থন পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রকম্পন হেতু ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কথাই এখানে স্পষ্ট। অবশ্য একই শ্রেণীর ভয় ও আতঙ্ক উভয় সময়েই হবে। সেই জন্য দু'টি মতই সঠিক হতে পারে। কারণ, দুই সময়েই মানুষের অবস্থা হবে সে রকমই হবে, যে রকম উক্ত আয়াত ও সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বলা হয়েছে।
আল-হাজ্জ 22:3
মানুষের মধ্যে কতক আছে যারা অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। [১]
[১] যেমন বলে, আল্লাহ পুনর্বার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন, বা তাঁর সন্তান আছে ইত্যাদি।
আল-হাজ্জ 22:4
তার সম্বন্ধে এই নিয়ম করে দেয়া হয়েছে যে, [১] যে কেউ তার সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং তাকে পরিচালিত করবে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির শাস্তির দিকে।
[১] অর্থাৎ, শয়তান সম্পর্কে বিধি-লিপিতে এই রকমই স্থিরীকৃত আছে।
আল-হাজ্জ 22:5
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, তাহলে (ভেবে দেখ যে,) আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাটি হতে, তারপর বীর্য হতে, তারপর রক্তপিন্ড হতে, তারপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি গোশতপিন্ড হতে;[১] যাতে আমি তোমাদের নিকট (আমার সৃজনশক্তির মহিমা) ব্যক্ত করি।[২] আমার ইচ্ছা অনুযায়ী তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিত রাখি,[৩] তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি; পরে যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু ঘটানো হয়[৪] এবং তোমাদের মধ্যে কাউকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় অকর্মণ্য (স্থবিরতার) বয়সে; যার ফলে সে যা কিছু জানত, সে সম্বন্ধেও সজ্ঞান থাকে না।[৫] আর তুমি ভূমিকে দেখ শুষ্ক, অতঃপর তাতে আমি বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।[৬]
[১] অর্থাৎ, বীর্য থেকে চল্লিশ দিন পর জমাট রক্তে ও তা থেকে গোশতপিন্ডে পরিণত হয়। مُخَلَّقَة (পূর্ণাকৃতি) বলতে এমন ভ্রূণকে বুঝানো হয়েছে যার আকার-আকৃতি পরিপূর্ণ ও স্পষ্ট। এ রকম ভ্রূণের মধ্যে রূহ (আত্মা) ফুঁকে দেয়া হয়। আর غَير مُخَلَّقَة (অপূর্ণাকৃতি) এর বিপরীত; যার আকার-আকৃতি পূর্ণতা লাভ করে না এবং তাতে রূহও ফুঁকা হয় না। বরং সময়ের আগেই তা গর্ভচ্যুত হয়ে যায়। সহীহ হাদীসসমূহেও গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের এই সকল সৃষ্টি-পর্যায়ের কথা উল্লেখ হয়েছে। যেমন একটি হাদীসে আছে, নবী (সাঃ) বলেন, "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (অর্থাৎ তার মূল উপাদান প্রথমে) ৪০ দিন তার মাতার গর্ভে শুক্ররূপে থাকে। অতঃপর ৪০ দিন লাল জমাট রক্ত পিন্ডরূপে অবস্থান করে, তৎপর ৪০ দিনে গোশত পিন্ডরূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তার নিকট এক ফিরিশতা পাঠিয়ে তার রূহ ফুঁকা হয়---।" (বুখারী, মুসলিম, আবু দাঊদ, মিশকাত ৮২ নং) অর্থাৎ, চার মাস পর ভ্রূণে আত্মাদান করা হয় এবং তা পরিপূর্ণ মানবাকৃতিতে বিকাশ লাভ করে।[২] অর্থাৎ, এইভাবেই আমি আমার সৃষ্টিশক্তির নিপুণতা ও মহিমা তোমাদের জন্য প্রকাশ করি।[৩] অর্থাৎ, যাকে গর্ভচ্যুত করা হয় না। (নষ্ট করা হয় না।)[৪] অর্থাৎ, পরিণত বয়সের আগেই। আর পরিণত বয়স বলতে প্রাপ্তবয়স্ক বা জ্ঞান ও শক্তির পরিপূর্ণতার বয়স (প্রৌঢ়ত্ব)-কে বুঝানো হয়েছে। যা ৩০ ও ৪০ এর মাঝামাঝি বয়স।[৫] এর অর্থঃ অতি বার্ধক্যে মানুষের শক্তি দুর্বল ও অবনতির সাথে সাথে জ্ঞান ও স্মরণশক্তি হ্রাস পেয়ে যায় এবং স্মৃতি ও জ্ঞানের দিক থেকে একজন শিশুর ন্যায় হয়ে যায়। যেমন সূরা ইয়াসীনে (৩৬:৬৮ আয়াতে) বলা হয়েছে, {وَمَنْ نُعَمِّرْهُ نُنَكِّسْهُ فِي الْخَلْقِ أَفَلَا يَعْقِلُونَ} অর্থাৎ, আমি যাকে দীর্ঘ জীবন দান করি তাকে তো জরাগ্রস্ত করে দিই। এবং সূরা তীনে (৯৫:৫ আয়াতে) বলা হয়েছে, {ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ} অর্থাৎ, অতঃপর আমি তাকে হীনতার সবচেয়ে নিমনস্তরে ফিরিয়ে দিয়েছি।[৬] এটি মৃতদেরকে পুনর্জীবিত করার ব্যাপারে আল্লাহর মহাশক্তির দ্বিতীয় প্রমাণ। প্রথম প্রমাণ ছিল যে, যিনি সামান্য এক ফোঁটা পানি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করতে ও সুন্দর অস্তিত্বে পরিণত করতে সক্ষম। এ ছাড়া বয়সের বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে বার্ধক্যের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, যখন তার দেহ সহ বুঝ ও চিন্তাশক্তি সব কিছু দুর্বলতা ও অবনতির শিকার হয়ে পড়ে। যে আল্লাহর এমন শক্তি তাঁর জন্য কি পুনর্বার সৃষ্টি করা কোন কঠিন কাজ? যিনি মানুষকে বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম তিনি অবশ্য অবশ্যই মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করে নতুন এক অস্তিত্ব দানে সক্ষম। দ্বিতীয় প্রমাণ, তুমি ভূমিকে শুষ্ক ও মৃত দেখ, কিন্তু বৃষ্টির পর তা কেমন সঞ্জীবিত শস্য-শ্যামল নানান প্রকৃতির উদ্ভিদ ও নানান ফল ফসলে ভরে ওঠে। এভাবেই মহান আল্লাহ কিয়ামত দিবসে মানুষদেরকে কবর থেকে উঠাবেন। যেমন হাদীসের মধ্যে এসেছে যে, একজন সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবেন তার কোন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি জগতের মধ্য থেকে বর্ণনা করুন। নবী (সাঃ) বললেন, তুমি কি এমন উপত্যকা পার হয়েছ, যা শুকনো ও মৃত এবং পরে তা শস্য-শ্যামল দেখেছ? সাহাবী বললেন, জী হ্যাঁ! তিনি বললেন, অনুরূপ ভাবেই মানুষ পুনর্জীবিত হবে। (আহমাদ ৪/১১, ইবনে মাজাহ ১৮০নং)
আল-হাজ্জ 22:6
এটা এ জন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং তিনিই সর্ববিষয়ে শক্তিমান।
আল-হাজ্জ 22:7
আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোন সন্দেহ নেই। আর অবশ্যই আল্লাহ কবরে যারা আছে তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন।
আল-হাজ্জ 22:8
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ জ্ঞান, পথনির্দেশ ও দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে।
আল-হাজ্জ 22:9
(সে বিতন্ডা করে) ঘাড় বাঁকিয়ে,[১] লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করবার জন্য; তার জন্য ইহলোকে রয়েছে লাঞ্ছনা। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে আস্বাদ করাবো জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
[১] ثَانِي কর্তৃকারক, এর অর্থঃ যে বাঁকায়। عِطف মানে পার্শ্ব বা ঘাড়। এ দুটি শব্দ দ্বারা বিতন্ডার অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে এমন লোকের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যে শরীয়ত অথবা যুক্তিভিত্তিক বিনা কোন প্রমাণে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করে এবং সেই সময় সে অহংকারবশতঃ (পার্শ্ব পরিবর্তন করে, ঘাড় বাঁকিয়ে) মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেমন অন্যত্র উক্ত অবস্থাকে অন্য ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে {وَلَّى مُسْتَكْبِرًا كَأَن لَّمْ يَسْمَعْهَا} অর্থাৎ, দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়; যেন ওরা এ শুনতে পায় নি। (লুকমানঃ ৭) {لَوَّوْا رُؤُوسَهُمْ} অর্থাৎ, তারা মাথা ফিরিয়ে নেয় (মুনাফিকূনঃ ৫) {أَعْرَضَ وَنَأَى بِجَانِبِهِ} অর্থাৎ, মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অহংকারে দূরে সরে যায়। (বানী ইস্রাঈলঃ ৮৩, ফুসসিলাতঃ ৫১)
আল-হাজ্জ 22:10
(সেদিন তাকে বলা হবে,) ‘এটা তোমার কৃতকর্মেরই ফল। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যাচার করেন না।’
আল-হাজ্জ 22:11
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার সাথে; তার কোন মঙ্গল হলে তাতে সে প্রশান্তি লাভ করে এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; [১] সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইহকালে ও পরকালে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।
[১] حَرف মানে প্রান্ত, কিনারা। কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি স্থিতিশীল ও নির্বিচল হয় না। এ রকমই যে ব্যক্তি দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহ, সংশয় ও অমূলক ধারণার শিকার সেও বিচলিত ও অস্থির হয়; দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অবলম্বন তার ভাগ্যে জোটে না। কারণ তার উদ্দেশ্য হয় শুধু পার্থিব স্বার্থ। যদি তা অর্জিত হয়, তাহলে ভাল। নচেৎ পূর্বধর্মে, অর্থাৎ কুফরী ও শিরকের দিকে ফিরে যায়। এর বিপরীত যারা সত্যিকার মুসলিম, ঈমান ও ইয়াকীনে সুদৃঢ়, তারা সুখ-দুঃখ না দেখেই দ্বীনের উপর অটল থাকে। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং দুঃখ-দুর্দশায় ধৈর্য ধারণ করে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে এক দ্বিধাগ্রস্ত ব্যক্তির অনুরূপ আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (বুখারী, সূরা হাজ্জের তফসীর) কোন কোন ব্যক্তি মদীনায় হিজরত করে আসত। অতঃপর তার পরিবারের সন্তান হলে অথবা গৃহপালিত পশুর মধ্যে বরকত হলে সে বলত, ইসলাম ভালো ধর্ম। আর বিপরীত হলে বলত, এ ধর্ম ভালো নয়। কিছু কিছু বর্ণনায় এ আচরণ মরুবাসী নও-মুসলিমদের বলে উল্লেখ হয়েছে। (ফাতহুল বারী দ্রঃ)
আল-হাজ্জ 22:12
সে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে, যা তার কোন অপকার করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। এটাই চরম বিভ্রান্তি।
আল-হাজ্জ 22:13
সে ডাকে এমন কিছুকে যার অপকার তার উপকার অপেক্ষা নিকটতর; কত নিকৃষ্ট এই অভিভাবক এবং কত নিকৃষ্ট এই সহচর। [১]
[১] কিছু ব্যাখ্যাকারীর নিকট يَدعُو শব্দটি يَقُول এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, গায়রুল্লাহর পূজারী কিয়ামত দিবসে বলবে, যার অপকার তার উপকার অপেক্ষা নিকটতর; কত নিকৃষ্ট সেই অভিভাবক এবং কত নিকৃষ্ট সেই সহচর। অর্থাৎ, এ কথা সে নিজের মাবূদদের সম্পর্কে বলবে। কেননা, সেদিন তার আশার শিশমহল ভেঙ্গে চুরমার হবে এবং এই সমস্ত মাবূদ যাদের ব্যাপারে ধারণা ছিল যে, তারা আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাবে, সুপারিশ করবে, সেদিন তারা নিজেরাই তার সাথে জাহান্নামের জ্বালানী হবে। مَولَى অর্থ অভিভাবক, সাহায্যকারী। আর عَشِير অর্থ সহচর সাথী ও নিকটাত্মীয়। সাহায্যকারী ও বন্ধু তো সেই হয়, যে বিপদ ও দুঃখে কাজে আসে। কিন্তু এই সমস্ত মাবূদ নিজেরাই আযাবে বন্দী থাকবে, এরা অন্যের উপকার কিভাবে করবে? সেই কারণে তাদেরকে নিকৃষ্ট অভিভাবক ও সহচর বলা হয়েছে। তাদের ইবাদতে ক্ষতিই আর ক্ষতি আছে; লাভের কোন অংশই নেই। কিন্তু এখানে যে বলা হয়েছে, "যার অপকার তার উপকার অপেক্ষা নিকটতর" (তার মানে তাতে কিছু না কিছু উপকার আছে, কিন্তু) এ কথাটি এমন, যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে {وَإِنَّا أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَى هُدًى أَوْ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ} অর্থাৎ, নিশ্চয় আমরা (আল্লাহর বিশ্বাসী) অথবা তোমরা (অস্বীকারকারিগণ) সৎপথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি। (সূরা সাবা ৩৪:২৪) এ কথা স্পষ্ট যে, সৎপথে তারাই থাকবে যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী। কিন্তু সে কথা স্পষ্ট শব্দে না বলে ইঙ্গিত ও প্রশ্নসূচক শব্দে বলা হয়েছে; যা শ্রোতার মনে বেশি দাগ কাটে এবং প্রভাবশীল হয়। অথবা উক্ত কথার সম্পর্ক দুনিয়ার সাথে। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করায় সত্বর ক্ষতি হল এই যে, সে ঈমান থেকে হাত ধুয়ে বসে; যা নিকটতর অপকার। আর আখেরাতে ওর ক্ষতি তো সুনিশ্চিত।
আল-হাজ্জ 22:14
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।
আল-হাজ্জ 22:15
যে মনে করে, আল্লাহ তাঁকে (রসূলকে) কখনই ইহকালে ও পরকালে সাহায্য করবেন না, সে আকাশের দিকে একটি রশি বিলম্বিত করুক, পরে তা বিচ্ছিন্ন করুক; অতঃপর দেখুক তার কৌশল তার আক্রোশের হেতু দূর করে কি না। [১]
[১] এর একটি অর্থ এই করা হয়েছে যে, এমন ব্যক্তি যে মনে করে আল্লাহ তাঁর নবীকে সাহায্য না করুন, কারণ তাঁর বিজয়লাভে তার বড় কষ্ট হয়, সে যেন ঘরের ছাদ হতে একটি রশি ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করুক, হয়তো বা আত্মহত্যা তাকে সেই ক্ষোভ ও রাগ হতে রক্ষা করবে, যা সে আল্লাহর রসূলের বর্ধমান প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে অন্তরে অনুভব করে। এই অর্থ নিলে السَّمَاء বলতে ঘরের ছাদ বুঝাবে। আর দ্বিতীয় অর্থ হল এই যে, সে একটি রশি নিয়ে আকাশে চড়ুক ও আকাশ হতে অহী ও সাহায্য আসা বন্ধ করে দিক (যদি সে তা করতে পারে)। অতঃপর সে লক্ষ্য করুক যে, এতে তার কলিজা ঠান্ডা হল কি না? ইমাম ইবনে কাসীর প্রথম ও ইমাম শাওকানী দ্বিতীয় তাৎপর্যকে বেশি পছন্দ করেছেন। অবশ্য পূর্বাপর আলোচনা হতে দ্বিতীয় তাৎপর্যই সঠিকতার বেশি নিকটতর মনে হয়।
আল-হাজ্জ 22:16
এভাবেই আমি সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে ওটা অবতীর্ণ করেছি, আর নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সৎপথ প্রদর্শন করেন।
আল-হাজ্জ 22:17
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, যারা স্বাবেয়ী, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক[১] এবং যারা অংশীবাদী[২] হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন;[৩] নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী। [৪]
[১] মাজূস বা অগ্নিপূজক বলতে ইরানের আগুন-পূজারী সম্প্রদায়, যারা দুই খোদায় বিশ্বাসী, প্রথম অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা (ও অমঙ্গলের খোদা) এবং দ্বিতীয় আলোর সৃষ্টিকর্তা (ও মঙ্গলের খোদা)। প্রথমটিকে আহরামান ও দ্বিতীয়টিকে ইয়াযদান বলে।
[২] উক্ত ভ্রষ্ট দলগুলো ছাড়া যারাই আল্লাহর সাথে শিরক করে, তারাই 'অংশীবাদী' অর্থে শামিল।
[৩] এদের মধ্যে কারা হকপন্থী ও কারা বাতিলপন্থী তা একমাত্র ঐ দলীল দ্বারা পরিষ্কার যা আল্লাহ কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন এবং শেষ নবীকেও এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন। {هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ} অর্থাৎ, তিনি তাঁর রসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, অপর সমস্ত ধর্মের উপর একে জয়যুক্ত করবার জন্য। এখানে ফায়সালা বলতে ঐ শাস্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ বাতিলপন্থীদেরকে কিয়ামতে দেবেন। ঐ শাস্তি দ্বারাও স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কে ন্যায়ের পথে ও কে অন্যায়ের পথে ছিল।
[৪] এই ফায়সালা শুধু ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার জোরে হবে না; বরং তা হবে ন্যায় ও ইনসাফ-ভিত্তিক। কারণ তিনি সমস্ত জিনিস সম্বন্ধে অভিহিত ও জ্ঞাত।
আল-হাজ্জ 22:18
তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যারা আছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে; সিজদা করে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমন্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু,[১] এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে; [২] আর অনেকের প্রতি অবধারিত হয়েছে শাস্তি।[৩] আল্লাহ যাকে হেয় করেন তার সম্মানদাতা কেউই নেই; [৪] নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।[৫] (সাজদাহ-৬)
[১] কিছু ব্যাখ্যাকারী বলেছেন, এই সিজদার অর্থ ঐ সমস্ত জিনিসের আল্লাহর নিয়ম-বিধির অনুগত হওয়া। কারো এ শক্তি নেই যে, সে বিধির অন্যথা করে। তাঁদের নিকট সিজদা বলতে আনুগত্য ও ইবাদতের সিজদা নয়; যা একমাত্র জ্ঞানসম্পন্ন জীবের সাথে সম্পৃক্ত। তবে কিছু কিছু ব্যাখ্যাকারিগণ তা মূল অর্থেই ব্যবহার হয়েছে বলে মনে করেন। তাঁরা বলেন, প্রতিটি সৃষ্টি নিজ নিজ পদ্ধতিতে সিজদা করে থাকে। যেমনঃ 'যারা আকাশমন্ডলীতে আছে' বলতে ফিরিশতাগণ, 'যারা পৃথিবীতে আছে' বলতে প্রত্যেক মানুষ, জীন ও পশুপক্ষী এবং অন্যান্য সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে। এরা সবাই নিজ নিজ ভঙ্গিমায় আল্লাহকে সিজদা করে এবং তাঁর মহিমা ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ বলেন, সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং ওদের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু ওদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। (সূরা ইসরা ১৭:৪৪) এখানে চন্দ্র সূর্য্য নক্ষত্রমন্ডলীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেহেতু মুশরিকরা এদের ইবাদত করত তাই। আল্লাহ বললেন, তোমরা এদেরকে সিজদা কর, অথচ এরা আল্লাহকে সিজদা করে ও তাঁর আজ্ঞা পালন করে। অতএব তোমরা এদেরকে সিজদা করো না, বরং সিজদা তাঁকে কর, যিনি এদের সৃষ্টিকর্তা। (দেখুন, ফুসসিলাত ৪১:৩৭) সহীহ হাদীসে এসেছে, আবু যার (রাঃ) বলেন, একদা নবী (সাঃ) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি জানো, সূর্য কোথায় যায়?" আমি বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভাল জানেন।' তিনি বললেন, "সূর্য যখন ডুবে যায় তখন আরশের নীচে গিয়ে আল্লাহকে সিজদা করে। তারপর তাকে পূর্বাকাশে উদিত হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু একদিন এমন আসবে, যেদিন বলা হবে, তুমি ফিরে যাও; অর্থাৎ যেখান হতে এসেছ, ওখানেই ফিরে যাও।" (বুখারী, মুসলিম) এভাবেই একজন সাহাবীর কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি স্বপ্নে গাছকে নিজের সাথে সিজদা করতে দেখেছেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ১০৫৩নং) পাহাড় ও গাছের সিজদায় তাদের ছায়া পূর্ব-পশ্চিমে ঝুঁকে পড়াও শামিল। এ ব্যাপারে সূরা রা'দের ১৩:১৫ আয়াতে ও নাহল ১৬:৪৮-৪৯ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে।[২] এখানে সিজদা বলতে আনুগত্য ও ইবাদতের সিজদা, যা বহু সংখ্যক মানুষ করে থাকে এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অধিকারী হয়।[৩] এরা ওরাই যারা ইবাদতের সিজদাকে অস্বীকার করে কুফরীর পথ অবলম্বন করে। অন্যথায় সৃষ্টিগতভাবে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন হয়ে সিজদাকে অস্বীকার করার উপায় তাদেরও নেই।[৪] কুফরী অবলম্বন করার পরিণতি অসম্মান ও লাঞ্ছনা এবং আখেরাতের চিরস্থায়ী আযাব। যা থেকে রক্ষা করে কাফেরদেরকে সম্মান দেওয়ার মত কেউই থাকবে না।[৫] এই আয়াত শেষে তিলাঅতের সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দ্রষ্টব্য।
আল-হাজ্জ 22:19
এরা দু’টি বিবদমান দল;[১] তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে। সুতরাং যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি।
[১] هذان خَصمَان (এরা দু'টি বিবদমান দল) এই দু'টি দ্বিবচন শব্দ। কিছু মুফাসসিরের নিকট এ থেকে উক্ত পথভ্রষ্ট দল এবং তাদের মোকাবেলায় মুসলিম দল উদ্দেশ্য বলেছেন। উভয় দল তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে কলহ-বিবাদ করে; মুসলিমরা তাঁর একত্ববাদ ও মৃত্যুর পর পুনর্জীবনে বিশ্বাসী। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দলটি আল্লাহর ব্যাপারে বিভিন্ন ভ্রষ্টতার শিকার। অন্য কিছু মুফাসসিরগণের নিকট এর মাধ্যমে বদর যুদ্ধে শরীক মুসলিম ও কাফেরদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার শুরুতে মুসলিমদের মধ্যে হামযা, আলী, উবাইদাহ (রাঃ), আর অন্য দিকে তাঁদের মোকাবেলায় কাফেরদের মধ্যে উতবা, শাইবাহ ও অলীদ বিন উতবাহ ছিল। (বুখারীঃ সূরা হাজ্জের তাফসীর) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, এই দুই অর্থই সঠিক এবং আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল।
আল-হাজ্জ 22:20
যার ফলে তাদের উদরে যা আছে তা এবং তাদের চর্ম বিগলিত করা হবে।
আল-হাজ্জ 22:21
আর তাদের জন্যে থাকবে লৌহনির্মিত হাতুড়িসমূহ।
আল-হাজ্জ 22:22
যখনই তারা যন্ত্রণাকাতর হয়ে জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে; আর (তাদেরকে বলা হবে,) ‘আস্বাদ কর দহন-যন্ত্রণা।’ [১]
[১] এই আয়াতে জাহান্নামীদের আযাবের কিছু বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা তাদেরকে ভোগ করতে হবে।
আল-হাজ্জ 22:23
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেথায় তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা এবং সেথায় তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। [১]
[১] জাহান্নামীদের বিপরীত এখানে জান্নাতবাসীদের ও তাদেরকে যেসব নেয়ামত দান করা হবে তার আলোচনা করা হচ্ছে।
আল-হাজ্জ 22:24
তাদেরকে পবিত্র বাক্যের দিকে পথনির্দেশ করা হবে[১] এবং তারা পরিচালিত হবে পরম প্রশংসাভাজন আল্লাহর পথে। [২]
[১] অর্থাৎ, জান্নাত এমন একটি স্থান; যেখানে কেবল পবিত্র ও সভ্য কথাই হবে, সেখানে অশ্লীল, পাপ ও অসভ্য কথা উচ্চারিত হবে না।
[২] অর্থাৎ, তাদেরকে এমন জায়গার দিকে পথনির্দেশ করা হবে, যেখানে শুধু আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা-ধ্বনিই চতুর্দিকে ধ্বনিত হবে। আর যদি এর সম্পর্ক পৃথিবীর সাথে হয়, তাহলে এর অর্থ (অতীতকালের) হবে, অর্থাৎ দুনিয়ায় তাদেরকে কুরআন ও ইসলামের পথে পরিচালিত করা হয়েছিল।
আল-হাজ্জ 22:25
যারা অবিশ্বাস করে এবং মানুষকে নিবৃত্ত করে[১] আল্লাহর পথ হতে ও ‘মাসজিদুল হারাম’ হতে; যাকে আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সবারই জন্য সমান।[২] আর যে ওতে সীমালংঘন করে পাপকার্যের ইচ্ছা করে,[৩] তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।[৪]
[১] নিবৃত্ত করে বলতে বাধা দেয়; এরা হল, মক্কার কাফেররা যারা সন ৬ হিজরীতে মুসলিমদেরকে মক্কায় গিয়ে উমরাহ করতে বাধা দিয়েছিল এবং মুসলিমদেরকে হুদাইবিয়া থেকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল।
[২] এতে মতভেদ রয়েছে যে, 'মাসজিদুল হারাম' বলতে শুধু কা'বা-ঘরকে বুঝানো হয়েছে, নাকি পুরো হারাম এলাকাকে বুঝানো হয়েছে? কারণ কুরআনে কোথাও কোথাও পূর্ণ হারাম এলাকার জন্যও 'মাসজিদুল হারাম' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ খন্ডের নাম উল্লেখ করে সমগ্র বুঝানো হয়েছে। এবারে বিশেষভাবে মাসজিদুল হারামের কথা সম্পর্কে সকলেই একমত যে, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা, মুসাফির, স্বদেশী ও প্রবাসী সকলের অধিকার সমান। অর্থাৎ বিনা কোন পার্থক্যে দিবারাত্রির যে কোন সময় সেখানে সকলেই ইবাদত করতে পারে। সেখানে কারো জন্য কোন মুসলিমকে ইবাদত করতে বাধা দেওয়ার অনুমতি নেই। তবে যে সব উলামাগণ 'মাসজিদুল হারাম' বলতে পূর্ণ হারাম এলাকা বুঝেছেন, তাঁদের মধ্যে এক দলের মত হল, মক্কার পূর্ণ হারাম এলাকা সকল মুসলিমদের জন্য সমান; এর ঘর-বাড়ি ও জমি-জায়গার কেউ মালিক নয়। সেই জন্য এ সবের কেনা-বেচা ও ভাড়ায় দেওয়া তাঁদের নিকট অবৈধ। যে কোন ব্যক্তি যে কোন জায়গা থেকে হজ্জ বা উমরাহ করতে মক্কায় যাবে, তার অধিকার রয়েছে সে যেখানে ইচ্ছা সেখানে অবস্থান করতে পারে। মক্কার বাসিন্দাদের দায়িত্ব হল, তারা যেন কাউকেও নিজেদের বাড়িতে থাকতে বাধা না দেয়। দ্বিতীয় মত হল, ঘর-বাড়ী ও জায়গা বিশেষ মালিকের হতে পারে এবং মালিকানা হস্তান্তর তথা বেচা-কেনা ও ভাড়ায় দেওয়া বৈধ। তবে ঐ সমস্ত জায়গা, যার সম্পর্ক হজ্জের সঙ্গে; যেমন মিনা, মুযদালিফা ও আরাফার ময়দান --তা সাধারণী ওয়াকফ। এ সবের কারো মালিক হওয়া বৈধ নয়। এই মাসআলাটি পূর্ববর্তী ফুকহাদের নিকট বেশ বিতর্কিত। তবে অধুনা যুগের সমস্ত উলামাই বিশেষ মালিকানা ও স্বত্বাধিকারের কথা স্বীকার করেন। এখন এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রঃ)ও এটাকেই ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) তথা ফুকহাগণের পছন্দনীয় মত বলে উল্লেখ করেছেন। (দেখুনঃ মাআরিফুল কুরআন ৬/২৫৩)
[৩] إلحاد এর অর্থঃ বাঁকা পথ বা টেরামি অবলম্বন করা। এখানে কুফর ও শিরক সহ সমস্ত পাপকেই বুঝানো হয়েছে। এমন কি কিছু উলামা কুরআনের শব্দ থেকে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যদি কেউ হারামের মধ্যে পাপের ইচ্ছা পোষণ করে (কার্যে পরিণত না করলেও) সে এই সতর্কবাণীর আওতায় পড়বে। কেউ কেউ বলেন, পাপের শুধু ইচ্ছা করলেই তার পাকড়াও হবে না; যেমন অন্যান্য স্পষ্ট দলীল দ্বারা পরিষ্কার। তবে ইচ্ছা যদি কাজে পরিণত করার কাছাকাছি (সংকল্পে) পৌঁছে যায়, তাহলে সে অবশ্যই শাস্তিযোগ্য হবে।
[৪] এ শাস্তি ঐ সমস্ত লোকেদের জন্য যারা উক্ত পাপকার্যে লিপ্ত হবে।
আল-হাজ্জ 22:26
আর স্মরণ কর, যখন আমি ইব্রাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম কাবা গৃহের স্থান,[১] (তখন বলেছিলাম,) আমার সাথে কোন শরীক স্থির করো না[২] এবং আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, নামায আদায়কারী, রুকূ ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রেখো। [৩]
[১] অর্থাৎ, কা'বা-গৃহের স্থান চিনিয়ে দিয়েছিলাম ও সেখানে ইবরাহীমের বংশধরের জন্য বসতি স্থাপন করলাম। এখান হতে বুঝা যাচ্ছে যে, নূহ (আঃ)-এর যুগে বন্যার ধ্বংসকারিতার পর কা'বার পুনর্নির্মাণ সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আঃ)-এর হাত দ্বারা হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীস দ্বারাও এ কথা প্রমাণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন, "পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম মসজিদ 'মাসজিদুল হারাম' এবং ওর চল্লিশ বছর পর 'মাসজিদুল আকসা' নির্মিত হয়েছে। আহমাদ ৫/১৫০, ১৬৬-১৬৭, মুসলিমঃ মাসাজিদ)
[২] কা'বা নির্মাণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এখানে শুধু একমাত্র আমার ইবাদত হবে। এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল যে, মুশরিকরা এখানে যে সব মূর্তি সাজিয়ে রেখেছে এবং এখানে এসে যে তাদের ইবাদত করছে, তা পরিষ্কার অন্যায়। যেখানে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত হওয়া উচিত ছিল, সেখানে দেব-দেবীর পূজা হচ্ছে! (আর একজনের অধিকার অন্যজনকে দেওয়ার নামই হল, অন্যায়।)
[৩] অর্থাৎ, কুফরী, মূর্তিপূজা এবং অন্যান্য অপবিত্র ও নোংরা জিনিস হতে পবিত্র রেখো। এখানে শুধু নামায আদায়কারী ও তাওয়াফকারীদের কথা বলা হয়েছে, কারণ এই দুটি ইবাদত কা'বার জন্য বিশেষ ইবাদত। নামাযের সময় ঐ দিকেই মুখ করে দাঁড়াতে হয় এবং তাওয়াফ একমাত্র ঐ ঘরেরই করা হয়। কিন্তু বিদআতীরা অনেক মাজারের তাওয়াফও আবিষ্কার করে ফেলেছে। আবার কোন কোন নামাযের জন্য তাদের কিবলাও অন্য! আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন। আমীন।
আল-হাজ্জ 22:27
এবং মানুষের মাঝে হজ্জের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটসমূহের পিঠে (সওয়ার হয়ে), [১] তারা আসবে দূর-দূরান্তর পথ অতিক্রম করে। [২]
[১] যা খাবারের অভাব, সফরের দূরত্ব ও ক্লান্তির জন্য ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
[২] এটি আল্লাহর কুদরতের মহিমা যে, মক্কার পাহাড়-চূড়া হতে উচ্চারিত সেই অনুচ্চ আহবান পৃথিবীর কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে; প্রত্যেক হজ্জ ও উমরাহ সম্পাদনকারী হজ্জ ও উমরার সময় সেই আহবানে 'লাব্বাইক' বলে সাড়া দিয়ে থাকেন।
আল-হাজ্জ 22:28
যাতে তারা তাদের কল্যাণের জন্য উপস্থিত হতে পারে[১] এবং তিনি তাদেরকে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু[২] হতে যা রুযী হিসাবে দান করেছেন ওর উপর (যবেহকালে কুরবানীর) বিদিত দিনগুলিতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।
[১] এ কল্যাণ দ্বীনী হতে পারে; যেমন নামায, তাওয়াফ ও হজ্জ-উমরার কার্যাবলী দ্বারা আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। আর পার্থিবও হতে পারে; যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা অর্থ উপার্জন হয়।
[২] 'গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু' বলতে উট, গরু, ছাগল ও ভেড়াকে বুঝানো হয়েছে। এদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার অর্থ, এদের যবেহ করা, যা আল্লাহর নাম নিয়েই করা হয়। আর 'বিদিত দিনগুলি' বলতে যবেহর দিনগুলি; অর্থাৎ তাশরীকের দিনসমূহকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং যবেহর দিন হল, কুরবানীর দিন (১০ম যুলহজ্জ) ও তার পরের তিন দিন (১১,১২,১৩ই যুলহজ্জ) পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। সাধারণতঃ 'বিদিত দিনগুলি' বলতে যুলহজ্জ মাসের প্রথম দশক এবং 'নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনসমূহ' বলতে তাশরীকের দিনগুলোকে বুঝানো হয়। কিন্তু এখানে 'বিদিত' যে বাগধারায় ব্যবহার হয়েছে তাতে মনে হয় যে, এখানে তাশরীকের দিনগুলিকেই বুঝানো হয়েছে। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
আল-হাজ্জ 22:29
অতঃপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে, [১] তাদের মানত পূর্ণ করে[২] এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন (কা’বা) গৃহের। [৩]
[১] অর্থাৎ, ১০ম যুলহজ্জ তারিখে জামরাতুল কুবরা (বা আক্বাবার বড় জামরায়) পাথর মারার পর হাজীরা প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যান। যার পর ইহরাম খুলে ফেলেন এবং এক কথায় স্ত্রী-মিলন ছাড়া ঐ সব কাজ যা ইহরাম অবস্থায় অবৈধ ছিল, বৈধ হয়ে যায়। আর অপরিচ্ছন্নতা দূর করার অর্থ হল, চুল ও নখ ইত্যাদি কেটে নিয়ে তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করা, সেলাই করা কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি।
[২] যদি কেউ মানত করে থাকে; যেমন মানত করে থাকে যে, আল্লাহ যদি আমাকে তাঁর পবিত্র ঘর কা'বা দর্শন করার সৌভাগ্য দান করেন, তাহলে আমি অমুক নেকীর কাজ (যেমনঃ নামায, রোযা বা দান) করব।
[৩] عَتِيق মানে প্রাচীন, উদ্দেশ্য কা'বাগৃহ। অর্থাৎ মাথা নেড়া করা বা চুল ছেঁটে ফেলার পর (হজ্জের তাওয়াফ) তাওয়াফে ইফাযাহ করে, যাকে তাওয়াফে যিয়ারাহও বলা হয়। এটি হজ্জের একটি রুকন; যা আরাফায় অবস্থান ও জামরাতুল কুবরায় পাথর মারার পর করা হয়। পক্ষান্তরে তাওয়াফে কুদূম কিছু লোকের নিকট ওয়াজিব, আবার কিছু লোকের কাছে সুন্নত। আর তাওয়াফে বিদা' (বিদায়ী তাওয়াফ) সুন্নতে মুআক্কাদাহ (বা ওয়াজিব); যা বেশির ভাগ উলামাদের নিকট ওজর থাকলে ত্যাগ করা বৈধ। যেমন সর্বসম্মতিক্রমে ঋতুমতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এ তাওয়াফ মাফ। (আইসারুত্ তাফাসীর)
আল-হাজ্জ 22:30
এটাই বিধান। আর কেউ আল্লাহর নিষিদ্ধ বিধানসমূহের[১] সম্মান করলে তার প্রতিপালকের নিকট তার জন্য এটাই উত্তম। তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ জন্তু, এগুলি ব্যতীত যা তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হয়েছে; [২] সুতরাং তোমরা দূরে থাক মূর্তিরূপ অপবিত্রতা[৩] হতে এবং দূরে থাক মিথ্যা কথন হতে। [৪]
[১] এখানে নিষিদ্ধ বা সম্মানীয় বিধানসমূহ বলতে হজ্জের সেই সকল অনুষ্ঠান যার বিস্তারিত আলোচনা একটু আগে হয়েছে। সম্মান করার অর্থঃ সেগুলোকে যথানিয়মে পালন করা। অর্থাৎ, তার অন্যথা করলে আল্লাহর সম্মানীয় বিধানের অসম্মান করা হয়।[২] 'যা পাঠ করে শুনানো হয়েছে' এর অর্থঃ যার হারাম হওয়ার কথা (কুরআনে) বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন {حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالْدَّمُ} (সূরা মাইদার ৫:৩ নং) আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।[৩] رِجس এর অর্থ অপবিত্রতা। এখানে কাঠ, লোহা বা অন্য যে কোন জিনিসের তৈরী মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা অপবিত্রতা এবং আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির কারণ। অতএব এ থেকে দূরে থাকো।[৪] মিথ্যা সাক্ষীও মিথ্যা কথনের পর্যায়ভুক্ত। যাকে হাদীসে শিরক ও মাতা-পিতার অবাধ্যতার পর তৃতীয় পর্যায়ের বড় পাপ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। আর সব থেকে বড় মিথ্যা কথা, আল্লাহ যেসব জিনিস হতে পবিত্র সেগুলোকে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করা। যেমন আল্লাহর সন্তান আছে, অমুক বুযুর্গ আল্লাহর এখতিয়ারে শরীক আছে বলা, 'আল্লাহ অমুক কাজ কিভাবে করতে সক্ষম' বলা; যেমন মক্কার কাফেররা পুনর্জীবনকে অবাস্তব মনে করত। অথবা নিজে নিজে আল্লাহর হারামকৃত জিনিসকে হালাল বা হালালকৃত জিনিসকে হারাম করে নেওয়া; যেমন মুশরিকরা কিছু পশুকে নিজের জন্য হারাম করে নিয়েছিল। এ সকলই মিথ্যা কথা। এ সব থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরী।
আল-হাজ্জ 22:31
আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে,[১] তাঁর কোন শরীক না করে; আর যে কেউ আল্লাহর শরীক করে (তার অবস্থা) সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [২]
[১] حُنَفَاء এটি حَنِيف শব্দের বহুবচন। যার মূল অর্থ এক দিকে ঝুঁকে পড়া, একদিকে, একতরফ বা একনিষ্ঠ হওয়া। এখানে শিরক থেকে তাওহীদের দিকে এবং কুফর ও বাতিল থেকে ইসলাম ও সত্য ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া। অথবা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা। উদ্দেশ্য হল, "তোমরা দূরে থাক মূর্তিরূপ অপবিত্রতা হতে----- একনিষ্ঠ হয়ে---।"
[২] যেমন বড় বড় পাখি ছোট কোন জীবকে অত্যন্ত দ্রুত ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, বা বাতাস কিছুকে উড়িয়ে নিয়ে দূরে কোথাও নিক্ষেপ করে এবং যার কোন হদিস পাওয়া যায় না; উক্ত দুই অবস্থাতেই মৃত্যু অবধারিত। ঠিক অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে, সে সুস্থ প্রকৃতি ও আন্তরিক পবিত্রতার দিক দিয়ে পবিত্রতা ও নির্মলতার এক উচ্চাসনে আসীন হয়। কিন্তু যখনই সে শিরকের পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখনই সে নিজেকে উঁচু হতে একদম নীচে, পবিত্রতা হতে অপবিত্রতায় এবং নির্মলতা হতে কর্দম ও পঙ্কিলতায় নিক্ষেপ করে।
আল-হাজ্জ 22:32
এটাই আল্লাহর বিধান। আর কেউ আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীকসমূহের সম্মান করলে এটা তো তার হৃদয়ের সংযমশীলতারই বহিঃপ্রকাশ। [১]
[১] شَعَائر শব্দটি شَعيرة এর বহুবচন। যার অর্থ বিশেষ চিহ্ন ও নিদর্শন। যেমন যুদ্ধের জন্য একটি প্রতীক চিহ্ন (বিশেষ শব্দ নিদর্শনরূপে) বেছে নেওয়া হয়। যার দ্বারা একে অপরকে চিনতে পারে। এই অর্থে আল্লাহর নিদর্শন বা প্রতীক হল তাই, যা দ্বীনের বিশেষ চিহ্ন অর্থাৎ ইসলামের এমন কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিধান যার দ্বারা একজন মুসলিমের সবাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিত্ব বিশেষরূপে প্রকাশ পায় এবং অন্য ধর্মাবলম্বী হতে তাকে সহজে পৃথকভাবে চেনা যায়। সাফা-মারওয়া পাহাড়কেও এই কারণেই আল্লাহর নিদর্শন বলা হয়েছে, যেহেতু মুসলিমরা হজ্জ বা উমরাতে এই দুয়ের মাঝে সাঈ করে থাকেন। এখানে হজ্জে অন্যান্য কর্মসমূহের মধ্যে কুরবানীর পশুকে আল্লাহর নিদর্শন বা প্রতীক বলা হয়েছে। আর কুরবানীর পশুর তা'যীম বা সম্মান বলতে তা খুব ভালো ও মোটাতাজা দেখে পছন্দ করা, (তাকে তোয়াজ করে খাওয়ানো, তার যাতে কোন ক্ষতি না হয়, তার বিশেষ খেয়াল রাখা ইত্যাদি)। ওর সম্মানকে অন্তরের 'তাকওয়া' (পরহেযগারী) বলা হয়েছে, অর্থাৎ তা অন্তরের এমন এক কাজ যার বুনিয়াদ হল তাকওয়া। (প্রকাশ থাকে যে, তার পা ধুয়ে দেওয়া বা শিং ও ক্ষুরে তেল মাখিয়ে দেওয়া অতিরঞ্জনের পর্যায়ভুক্ত। -সম্পাদক)
আল-হাজ্জ 22:33
এ (পশু)গুলোতে তোমাদের জন্য নানাবিধ উপকার রয়েছে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য; [১] অতঃপর ওগুলির কুরবানীর স্থান প্রাচীন গৃহের নিকট। [২]
[১] উক্ত উপকার লাভ হয় সওয়ার হয়ে, তার দুধ পান করে, তার লোম ইত্যাদি সংগ্রহ করে এবং তার বংশ-বিস্তারের মাধ্যমে। নির্দিষ্ট কাল বলতে যবেহ করার সময়, অর্থাৎ যবেহ না হওয়া পর্যন্ত উক্ত উপকার তোমরা গ্রহণ করে থাকো। এখান হতে বুঝা গেল যে, কুরবানীর জন্তু দ্বারা যবেহ না হওয়া পর্যন্ত উপকার নেওয়া যেতে পারে। সহীহ হাদীসেও এর সমর্থন মিলে। এক ব্যক্তি কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়ে যাচ্ছিল। নবী (সাঃ) তাকে বললেন, "ওর উপর সওয়ার হও।" সে বলল, 'এটি কুরবানীর পশু।' নবী (সাঃ) বললেন, "তুমি ওর উপর সওয়ার হও।" (বুখারী, হজ্জ অধ্যায়)
[২] হালাল বা কুরবানী হওয়ার স্থান, অর্থাৎ যেখানে তা যবেহ করে হালাল বা কুরবানী করা হয়। অর্থাৎ, এই পশুগুলো কা'বাগৃহ ও হারামে পৌঁছে যায় অতঃপর হজ্জের কার্যাদি সম্পন্ন করে সেখানে আল্লাহর নামে কুরবানী করে দেওয়া হয়। সুতরাং উপরোক্ত উপকার গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর যদি তা শুধু মাত্র হারামের জন্য 'হাদ্ই' হয়, তাহলে হারামে পৌঁছেই তা যবেহ করে দেওয়া হয় এবং মক্কার গরীবদের মাঝে তার গোশত বিলি করে দেওয়া হয়।
আল-হাজ্জ 22:34
আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি[১] সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে;
[১] مَنسَك শব্দটি نَسك يَنسك এর ক্রিয়ামূল। অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা। ذَبِيحَة (যবেহকৃত পশুকে)ও نَسِيكَة বলা হয়, যার বহুবচন نُسُك । এর একটি অর্থঃ আনুগত্য ও ইবাদত করাও বটে। যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কামনায় পশু কুরবানী করাও তাঁর এক প্রকার ইবাদত। আর সেই জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে তার সন্তুষ্টি লাভের আশায় জন্তু যবেহ করলে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত (বা শিরক) করা হয়। অথবা مَنسَِك (সীনে যবর বা যের দিয়ে) স্থানবাচক শব্দ। অর্থঃ যবেহ বা ইবাদত করার জায়গা। এখান হতেই مَنَاسِك الحَجّ বলা হয়; অর্থাৎ ঐ সমস্ত জায়গা যেখানে হজ্জের কার্যাদি সমাধা করা হয়। যেমন আরাফাত, মুযদালিফা, মিনা ও মক্কা। সাধারণভাবে শুধু হজ্জের কার্যসমূহকেও مَنَاسِك الحَج বলা হয়ে থাকে। আয়াতের অর্থ হল, আমি পূর্বেও প্রত্যেক জাতির জন্য যবেহ বা ইবাদতের নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে এসেছি, যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করত। এর মধ্যে হিকমত এই যে, তারা আমার নাম নিবে; অর্থাৎ, 'বিসমিল্লাহ, অল্লাহু আকবার' বলে যবেহ করবে। অথবা আমাকে স্মরণে রাখবে।
আল-হাজ্জ 22:35
যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।
আল-হাজ্জ 22:36
আর (কুরবানীর) উটকে[১] করেছি আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীকসমূহের অন্যতম; তোমাদের জন্য তাতে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান অবস্থায় ওগুলির উপর (নহর করার সময়) তোমরা আল্লাহর নাম নাও।[২] অতঃপর যখন ওরা কাত হয়ে পড়ে যায়[৩] তখন তোমরা তা হতে আহার কর[৪] এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকে ও যাঞ্চাকারী অভাবগ্রস্তকে।[৫] এইভাবে আমি ওদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
[১] بُدن শব্দটি بَدَنَة এর বহুবচন। এর অর্থ মোটা-তাজা দেহবিশিষ্ট পশু। কুরবানীর পশু সাধারণতঃ মোটা-তাজা হয় বলে তাকে بَدَنَة বলা হয়। ভাষাবিদগণ শুধু উটের জন্যই এ শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু হাদীসের দৃষ্টিতে গরুর জন্যও بَدَنَة শব্দের ব্যবহার সঠিক। অর্থ এই যে, উট বা গরু যা কুরবানীর জন্য (মক্কায়) নিয়ে যাওয়া হয় তাও আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শন ও প্রতীকসমূহের মধ্যে গণ্য। অর্থাৎ, তা আল্লাহর ঐ সকল নির্দেশের অন্তর্ভূত; যা মুসলিমদের জন্যই নিদৃষ্ট এবং তাঁদের বিশেষ চিহ্ন।[২] صَوَافّ শব্দটি مَصفُوفَة এর অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান অবস্থায়। উটকে এভাবেই দাঁড়ানো অবস্থায় নহর করা হয়। তার সামনের বাম পা বেঁধে দেওয়া হয়; ফলে তিন পা খোলা অবস্থায় খাড়া থাকে।[৩] অর্থাৎ, যখন দেহ থেকে রক্ত বের হয়ে গিয়ে তা মাটিতে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং প্রাণত্যাগ করে, তখন তার গোশত কাটতে শুরু করো। কারণ জীবন্ত পশুর গোশত কেটে খাওয়া নিষিদ্ধ। মহানবী (সাঃ) বলেন, "জীবিত অবস্থায় কোন পশুর শরীর হতে কেটে নেওয়া গোশত মৃতের ন্যায় (হারাম)।" (আবূ দাঊদঃ শিকার অধ্যায়, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)[৪] কিছু উলামার নিকট এই আদেশের মান ওয়াজেব। অর্থাৎ, কুরবানীর গোশত খাওয়া কুরবানীকারীর জন্য জরুরী। তবে অধিকাংশ উলামাগণের নিকট উক্ত আদেশের মান মুস্তাহাব বা জায়েয। অর্থাৎ, কুরবানীকৃত পশুর গোশত খাওয়া উত্তম। অতএব কেউ যদি সম্পূর্ণ গোশ্ত্কে বিলি করে দেয় এবং কিছু মাত্রও না খায়, তাহলে তাতেও কোন দোষ নেই।[৫] قَانِع এর অর্থ ভিক্ষুক। এর অন্য একটি অর্থ অল্পে তুষ্ট ব্যক্তি। অর্থাৎ, অভাবী কিন্তু ভিক্ষা করে না বা কারো কাছে কিছু চায় না। আর مُعتَرّ শব্দের অর্থ (যাঞ্চাকারী অভাবগ্রস্ত) কেউ কেউ করেছেন, বিনা যাঞ্চায় আগত ব্যক্তি। আর কেউ قَانِع এর অর্থ ভিক্ষুক আর مُعتَرّ এর অর্থ অতিথি করেছেন। যাই হোক, এই আয়াত দ্বারা দলীল নিয়ে বলা হয় যে, কুরবানীর গোশ্ত্কে তিন ভাগ করা উচিত; একভাগ নিজে খাওয়ার জন্য, দ্বিতীয় ভাগ অতিথি ও আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়ার জন্য এবং তৃতীয় ভাগ ভিক্ষুক ও সমাজের অভাবগ্রস্তদের জন্য। এ কথার সমর্থনে এই হাদীসটি তুলে ধরা হয়, যাতে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "আমি তোমাদেরকে তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা খাও, প্রয়োজন মত জমা রাখো।" অন্য একটি বর্ণনার শব্দাবলী এই, "খাও, সা'দক্বা কর ও জমা রাখো।" আর একটি বর্ণনায় এসেছে, "খাও, খাওয়াও ও সা'দক্বা কর।" (বুখারীঃ কুরবানী অধ্যায়, মুসলিম, সুনান) কেউ কেউ দু'ভাগ করার কথা বলেন, অর্ধেক নিজের জন্য ও বাকী অর্ধেক সা'দক্বার জন্য। এঁরা এর আগের (২২:২৮ নং) আয়াত {فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ} (অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও) থেকে দলীল গ্রহণ করেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা নিক্তি ধরে এ রকম দু'ভাগ বা তিনভাগ করার কথা বোঝা যায় না। বরং সাধারণভাবে তা খাওয়া ও খাওয়ানোর কথাই বলা হয়েছে। অতত্রব এই সাধারণ নির্দেশকে সাধারণ রাখাই উচিত এবং ভাগাভাগির কোন নিয়ম বেঁধে দেওয়া উচিত নয়। অবশ্য কুরবানীর চামড়ার ব্যাপারে সকলেই একমত যে, তা নিজে ব্যবহার কর কিংবা সা'দক্বা করে দাও, বিক্রি করার অনুমতি নেই; যেমন হাদীসে আছে। (আহমাদ ৪/১৫) তবে কিছু উলামা চামড়া বিক্রি করে তার মূল্য গরীবদের মাঝে বন্টন করার অনুমতি দিয়েছেন। (ইবনে কাসীর)বিঃদ্রঃ- কুরআন কারীমে এখানে কুরবানীর বর্ণনা হজ্জের মাসআলার সঙ্গে আনুষঙ্গিকভাবে এসেছে। যার ফলে হাদীস অস্বীকারকারীরা এই প্রমাণ করতে চায় যে, কুরবানী শুধুমাত্র হাজীদের জন্য; অন্যান্য মুসলিমদের জন্য তা জরুরী নয়। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। কারণ অন্য জায়গায় ব্যাপকভাবে কুরবানীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেমন {فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ} অর্থাৎ নিজ প্রভুর জন্য নামায পড় ও কুরবানী কর। (সূরা কাউসার) আর মহানবী (সাঃ) এই আয়াতের মর্মার্থ কার্যতঃ এভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, মদীনার জীবনে প্রতি বছর ১০ই যিল-হজ্জ কুরবানী করেছেন এবং মুসলিমদেরকে কুরবানী করতে তাকীদ করেছেন। সেহেতু সাহাবা (রাঃ)গণও কুরবানী করেছেন। তাছাড়া মহানবী (সাঃ) যেখানে কুরবানী সম্পর্কে বেশ কিছু উপদেশ দিয়েছেন সেখানে তিনি একথাও বলেছেন যে, ১০ই যিলহজ্জ আমরা সর্বপ্রথম নামায পড়ব, তারপর কুরবানীর পশু যবেহ করব। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের আগেই কুরবানী করল। সে গোশত খাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করল; তার কুরবানী হল না। (বুখারীঃ ঈদ অধ্যায়, মুসলিমঃ কুরবানী অধ্যায়) এখান থেকে পরিষ্কার যে কুরবানীর আদেশ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য; সে যেখানেই থাক। কারণ হাজীগণ তো ঈদের নামাযই পড়েন না। অতএব এখান থেকেও স্পষ্ট হয় যে, এ নির্দেশ হাজী ছাড়া অন্যদের জন্য। তবে কুরবানী করা ওয়াজেব নয়; সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্। ঠিক অনুরূপ লোক দেখানোর জন্য বেশ কয়েকটি কুরবানী করাও সুন্নাহর পরিপন্থী। যেহেতু হাদীসানুসারে একটি পরিবারের সকলের তরফ হতে কেবল একটি পশুই যথেষ্ট। সাহাবাদের আমলও অনুরূপ ছিল। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
আল-হাজ্জ 22:37
আল্লাহর কাছে কখনোও ওগুলির গোশত পৌঁছে না এবং রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া (সংযমশীলতা); এভাবে তিনি ওগুলিকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এই জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আর তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদেরকে।
আল-হাজ্জ 22:38
নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে রক্ষা করেন (তাদের দুশমন হতে)।[১] নিশ্চয় তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।
[১] যেমন সন ৬ হিজরীতে কাফেররা শক্তির জোরে মুসলিমদেরকে উমরাহ করার জন্য মক্কায় প্রবেশ করতে দিল না। মহান আল্লাহ দু' বছর পরেই কাফেরদের সেই শক্তি চূর্ণ করে মুসলিমদের শত্রুমুক্ত করলেন; তাঁদের উপর মুসলিমদেরকে জয়ী করলেন।
আল-হাজ্জ 22:39
যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত।[১] আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।
[১] অধিকাংশ সালাফের মত এই যে, এই আয়াতে সর্বপ্রথম জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। যার দু'টি উদ্দেশ্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে; অত্যাচার বন্ধ করা ও আল্লাহর কালেমা উঁচু করা। কারণ যদি অত্যাচারিত মানুষের সাহায্য না করা হয় এবং তাদের ফরিয়াদে সাড়া না দেওয়া হয়, তাহলে পৃথিবীতে সবলরা দুর্বলদেরকে এবং শক্তিশালীরা শক্তিহীনদেরকে বাঁচতেই দেবে না। যার কারণে পৃথিবী অরাজকতা ও অশান্তিতে ভরে উঠবে। অনুরূপ আল্লাহর কালেমাকে উঁচু এবং বাতিলকে ধ্বংস করার চেষ্টা না করলে, বাতিল শক্তির আধিপত্য পৃথিবীর সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা হরণ করে নেবে এবং আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য কোন উপাসনালয় অবশিষ্ট থাকবে না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ সূরা বাক্বারার ২:২৫১ নং আয়াতের টীকা।) صَومَعة صَوَامِع এর বহুবচন, এর অর্থ ছোট গীর্জা بِيعَة بِيَع এর বহুবচন, এর অর্থ বড় গীর্জা। صَلَوات বলতে ইয়াহুদীদের উপাসনালয় ও مَساجد বলতে মুসলিমদের উপাসনালয় মসজিদকে বুঝানো হয়েছে।
আল-হাজ্জ 22:40
তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ী হতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিষ্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গীর্জা, ইয়াহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী।
আল-হাজ্জ 22:41
আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ)ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে।[১] আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে। [২]
[১] আলোচ্য আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। যার বাস্তবায়ন খেলাফতে রাশেদা ও প্রথম শতাব্দীর ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যার কারণে তাঁদের রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বিস্তার লাভ করেছিল, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল এবং মুসলিমরা মাথা উঁচু করে জীবন যাপন করতে পেরেছিলেন। আজও সউদী আরবে -- আলহামদুলিল্লাহ -- ঐ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। যার বর্কতে পৃথিবীর মধ্যে সউদী আরব শান্তি ও নিরাপত্তার দিক দিয়ে একটি শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ দেশ বলে পরিচিত। বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে সফল রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য বড় হৈচৈ ও হাঙ্গামা শোনা যায় এবং প্রত্যেক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়করা সফল রাষ্ট্রের দাবিও করে থাকেন। কিন্তু প্রত্যেক ইসলামী রাষ্ট্রে অশান্তি, বিশৃংখলা, হত্যা, লুঠতরাজ, দুর্নীতি ও অবনতি ব্যাপক হয়ে আছে এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে চলেছে। এর একমাত্র কারণ এই যে, তাঁরা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান না মেনে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ (ধর্মহীন) বিধান দ্বারা সাফল্য অর্জন করতে চান। যা আকাশ স্পর্শ করা ও বাতাসকে মুষ্ঠিবদ্ধ করার মত অবাস্তব অপচেষ্টা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলিতে কুরআনের বর্ণিত নিয়মানুসারে নামায প্রতিষ্ঠা ও যাকাত প্রদান ব্যবস্থা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাদানের বিধান বাস্তবায়ন না করা হবে এবং এ লক্ষ্যকে রাজনীতির অন্যান্য কার্যের উপর অগ্রাধিকার না দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সফল রাষ্ট্র কায়েম করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
[২] প্রত্যেক ব্যাপার আল্লাহর আজ্ঞাধীন এবং তাঁর তদবীরের মুখাপেক্ষী। তাঁর আজ্ঞা, হুকুম ও অনুমতি বিনা এ বিশ্বের কোন গাছের একটি পাতাও নড়ে না। সুতরাং কে আল্লাহর আজ্ঞা ও নিয়ম-নীতি হতে বিচ্যুত হয়ে সত্যিকার সফলতা ও কৃতকার্যতা অর্জন করতে পারে?
আল-হাজ্জ 22:42
লোকে যদি তোমাকে মিথ্যা মনে করে, তাহলে (এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই, কারণ) তাদের পূর্বে তো নূহের সম্প্রদায়, আ’দ এবং সামূদও মিথ্যা মনে করেছিল।
আল-হাজ্জ 22:43
এবং ইব্রাহীম ও লূতের সম্প্রদায়ও।
আল-হাজ্জ 22:44
এবং মাদয়্যানবাসীরাও (তাদের নবীদেরকে মিথ্যা মনে করেছিল) এবং মিথ্যা মনে করা হয়েছিল মূসাকেও। আমি অবিশ্বাসীদেরকে অবকাশ দিয়েছিলাম এবং পরে তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম।[১] অতএব কেমন (ভয়ঙ্কর) ছিল আমার প্রতিকার (শাস্তি)! [২]
[১] এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া হয়েছে যে, যদি মক্কার কাফেররা তোমাকে মিথ্যা মনে করে, তাহলে এটা কোন নতুন কথা নয়, বরং সমস্ত বিগত জাতি তাদের নবীদের সাথে এরূপ ব্যবহারই করেছে। আমিও তাদেরকে ঢিল ও অবকাশ দিতে থেকেছি। অতঃপর যখন তাদের অবকাশের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তখন তাদেরকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি। এতে মক্কার মুশরিকদের জন্য এই ইশারা ও ইঙ্গিত রয়েছে যে, মিথ্যাজ্ঞান করা সত্ত্বেও তোমরা আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদে আছ, আর তার অর্থ তোমরা এই বুঝো না যে, তোমাদেরকে কেউ পাকড়াও করবে না। বরং এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে অবকাশ বা ঢিল; যা তিনি প্রত্যেক জাতিকে দিয়েছেন। অতঃপর তারা যদি এই অবকাশ সময়কে কাজে লাগিয়ে আনুগত্য ও বাধ্য হওয়ার রাস্তা অবলম্বন না করেছে, তাহলে তাদেরকে ধ্বংস কিংবা মুসলিম কর্তৃক পরাজিত ও লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়েছে। (অনুরূপ তোমাদেরও হবে।)
[২] অর্থাৎ, কেমন করে আমি তাদেরকে নিজ অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত করে শাস্তি ও ধ্বংসের সম্মুখীন করেছিলাম।
আল-হাজ্জ 22:45
আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ যেগুলির বাসিন্দা ছিল যালেম, এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল এবং কত কূপ পরিত্যক্ত হয়েছিল ও কত সুদৃঢ় প্রাসাদও।
আল-হাজ্জ 22:46
তারা কি দেশ ভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতি-শক্তিসম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারতো। বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়। [১]
[১] যখন কোন জাতি ভ্রষ্টতার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে তারা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের যোগ্যতা পর্যন্তও হারিয়ে ফেলে, তখন পথপ্রাপ্তির পরিবর্তে বিগত জাতিসমূহের মত তাদেরও ভাগ্যে ধ্বংসই জোটে। আলোচ্য আয়াতে জ্ঞানের সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে জুড়া হয়েছে; যার দ্বারা প্রমাণ করা হয় যে, জ্ঞান-বুদ্ধির অবস্থান হৃদয়ে। পক্ষান্তরে কিছু উলামা বলেন, জ্ঞানের অবস্থানক্ষেত্র মস্তিষ্ক বা মগজ। আবার কেউ কেউ বলেন, উক্ত উভয় মতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারণ কোন কিছুকে জানা ও বোঝার জন্য হৃদয় ও মস্তিষ্কর পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
আল-হাজ্জ 22:47
তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে; অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেন না। তোমার প্রতিপালকের একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান। [১]
[১] এই কারণে এরা নিজেদের হিসাব অনুসারে জলদি করে। কিন্তু আল্লাহর হিসাবে এক দিন হাজার বছরের সমান। এই হিসাবে আল্লাহ যদি কাউকে একদিন (২৪ ঘণ্টার) অবকাশ দেন তাহলে আযাবের জন্য এক হাজার বছর, অর্ধেক দিনের অবকাশে ৫০০ বছর, ছয় ঘণ্টার অবকাশে ২৫০ বছর প্রয়োজন। এইভাবে আল্লাহর পক্ষ হতে এক ঘণ্টা অবকাশ পাওয়ার অর্থ কমবেশি ৪০ বছরের অবকাশ পাওয়া যায়। (আইসারুত্ তাফাসীর) আয়াতের অন্য একটি অর্থ হল, আল্লাহর কুদরতে এক দিন ও এক হাজার বছর উভয়ই সমান। সুতরাং তরান্বিত বা বিলম্বিত করাতে কোন পার্থক্য নেই। এরা ত্বরান্বিত করে, আর তিনি বিলম্বিত করেন। তবে এ কথা সুনিশ্চিত যে, তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পূর্ণ করবেন। আবার কেউ কেউ এর তাৎপর্য পরকাল মনে করে বলেছেন যে, কিয়ামতের ভয়াবহতা এত বেশি হবে যে, তার একদিন কারো নিকট এক হাজার বছর; বরং অনেকের নিকট ৫০ হাজার বছর বলে মনে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, পরকালের একদিন বাস্তবেই এক হাজার বছর সমান হবে।
আল-হাজ্জ 22:48
আর আমি অবকাশ দিয়েছি কত জনপদকে যখন তারা ছিল অত্যচারী; অতঃপর তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। [১]
[১] সেই কারণেই অবকাশ নীতির কথার আবার বর্ণনা হচ্ছে যে, আমার পক্ষ থেকে শাস্তির ব্যাপারে যতই দেরী হোক না কেন, আমার হাত থেকে কেউ রক্ষা পাবে না এবং পালাতেও পারবে না। শেষ পর্যন্ত আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে।
আল-হাজ্জ 22:49
বল, ‘হে মানুষ! আমি তো তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’ [১]
[১] এটি কাফের ও মুশরিকদের আযাব দাবি করার জবাবে বলা হচ্ছে যে, হে নবী! তুমি বল, আমার কাজ তো কেবল সতর্ক করা ও সুসংবাদ দেওয়া। আযাব ও শাস্তি প্রেরণ করা আল্লাহর কাজ। কাউকে জলদি পাকড়াও করা অথবা কাউকে দেরীতে পাকড়াও করা, এ কাজ তাঁর হিকমত ও ইচ্ছাধীন। তার জ্ঞানও আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। এ কথা যদিও মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, তবুও যেহেতু নবী (সাঃ) ছিলেন সারা মানবকুলের পথপ্রদর্শক ও রসূল, সেই জন্য সম্বোধন 'হে মানুষ' দিয়ে করা হয়েছে। এই আয়াতে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত কাফের ও মুশরিকদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যারা মক্কার লোকেদের মত আচরণ করবে।
আল-হাজ্জ 22:50
সুতরাং যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।
আল-হাজ্জ 22:51
আর যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে[১] তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী।
[১] مُعَاجِزِين শব্দের অর্থ হল এই ধারণা পোষণ করা যে, তারা আমাকে ব্যর্থ করে দেবে, নিষ্ক্রিয় বা ক্লান্ত করে ফেলবে, আর আমি তাদেরকে পাকড়াও করতে সক্ষম হব না। কারণ তারা পুনর্জীবন ও হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে অবিশ্বাসী ছিল।
আল-হাজ্জ 22:52
আমি তোমার পূর্বে যে সব রসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি তাদের কেউ যখনই আকাঙ্ক্ষা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, আল্লাহ তা বিদূরিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুদৃঢ় করেন।[১] আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] تَمَنى শব্দের একটি অর্থ আকাঙ্ক্ষা করেছে বা অন্তরে কল্পনা করেছে। দ্বিতীয় অর্থঃ পড়েছে বা আবৃত্তি করেছে। এই হিসাবে أُمنِية এর অর্থ হবে আকাঙ্ক্ষা, কল্পনা বা পাঠ। প্রথম অর্থ অনুযায়ী এর তাৎপর্য হবে, তার আকাঙ্ক্ষায় শয়তান বাধা সৃষ্টি করল; যাতে তা পূর্ণ না হয়। আর রসূল ও নবীদের আকাঙ্ক্ষা এটাই হয় যে, বেশি সংখ্যক মানুষ ঈমান আনয়ন করুক। কিন্তু শয়তান বাধা সৃষ্টি করে বেশি সংখ্যক মানুষকে ঈমান গ্রহণ করা হতে দূরে রাখতে চায়। দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী এর তাৎপর্য দাঁড়াবে যে, যখনই আল্লাহর রসূল ও নবীগণ অহীলব্ধ কথা পড়ে শুনান, তখনই শয়তান উক্ত অহীর কথার সাথে নিজের কিছু কথা মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করে বা লোকেদের মনে সংশয় সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ শয়তানের সমস্ত বাধা দূর করে অথবা তেলাঅতে তার কিছু মিলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাকে অকৃতকার্য করে অথবা শয়তানের প্রক্ষিপ্ত সন্দেহ ও সংশয় নিরসন করে নিজের কথা বা আয়াতকে সুদৃঢ় করেন। এর মাধ্যমে রসূল (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, এই শ্রেণীর কর্মকান্ড শয়তান শুধুমাত্র তোমার সাথেই করেনি; বরং তোমার পূর্ববর্তী সকল নবীদের সাথেই করেছে। সুতরাং তুমি কিছুমাত্র বিচলিত হবে না। শয়তানের ঐ সমস্ত চক্রান্ত ও দুরভিসন্ধি হতে যেমন আমি পূর্বের নবীদেরকে রক্ষা করেছি, তেমনি তুমিও সুরক্ষিত থাকবে এবং শয়তানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ নিজের বাণীকে পাকাপোক্ত ও সুদৃঢ় করবেন। কোন কোন মুফাসসির এখানে غرانيق এর কেচ্ছা উল্লেখ করেন; কিন্তু সত্যানুসন্ধানী উলামাগণের নিকট তার কোন অস্তিত্ব নেই। আর সেই কারণে তা এখানে উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন নেই।
আল-হাজ্জ 22:53
এটা এ জন্য যে, শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, তিনি তা পরীক্ষা স্বরূপ করেন তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এবং যারা পাষাণ-হৃদয়।[১] নিশ্চয় অত্যাচারীরা চরম বিরোধিতায় রয়েছে।
[১] শয়তান এ রকম আচরণ এই জন্য করে থাকে, যাতে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। আর শয়তানের জালে ঐ সমস্ত মানুষ ফেঁসে থাকে, যাদের অন্তরে আছে কুফরী ও মুনাফিকীর রোগ বা যাদের অন্তর অধিক পাপ করার ফলে পাথরের ন্যায় কঠিন হয়ে পড়ে।
আল-হাজ্জ 22:54
আর এ জন্যেও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত সত্য; অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন তার প্রতি অনুগত হয়।[১] যারা বিশ্বাস করেছে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত করেন। [২]
[১] অর্থাৎ, শয়তানের প্রক্ষেপণ যা আসলে তার প্ররোচনা; যা মুনাফিক, মুশরিক ও কাফেরদের জন্য যেমন ফিতনা ও পরীক্ষার কারণ হয়, তেমনি অন্য দিকে যারা জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মু'মিন মানুষ; তাঁদের ঈমান ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআন সত্য। আর তার ফলে তাঁদের অন্তর আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়।
[২] ইহকালে এবং পরকালেও। ইহকালে এইভাবে যে, তাঁদেরকে সত্য পথের দিশা দেন এবং তা অবলম্বন ও অনুসরণ করার প্রয়াস ও প্রেরণা দান করেন। অসত্য ও অন্যায়ের বুঝ দান করেন এবং তা থেকে তাঁদেরকে দূরে রাখেন। আর পরকালে সরল পথে পরিচালিত করার অর্থ জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে বাঁচিয়ে জান্নাত দান করবেন এবং সেখানে আপন অনুগ্রহ ও সাক্ষাৎ দানে ধন্য করবেন। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করো।
আল-হাজ্জ 22:55
যারা অবিশ্বাস করেছে তারা ওতে সন্দেহ পোষণ করা হতে বিরত হবে না; যতক্ষণ না তাদের নিকট কিয়ামত এসে পড়বে আকস্মিকভাবে অথবা এসে পড়বে এক বন্ধ্যা (অশুভ) দিনের শাস্তি। [১]
[১] يَومٌ عَقِيم এর মূল অর্থ বন্ধ্যা দিন। আর তা হল কিয়ামতের দিন। এ দিনকে বন্ধ্যা এই কারণে বলা হয়েছে যে, তারপর আর কোন দিন হবে না। যেমন যার সন্তান হয় না তাকে বন্ধ্যা বলা হয়। অথবা এই কারণে যে, সেদিন কাফেরদের জন্য কোন দয়া থাকবে না, অর্থাৎ সেদিন তাদের জন্য কল্যাণশূন্য হবে। যেমন আযাব স্বরূপ আসা ঝড়কে رِيحٌ عَقِيم বলা হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, {إِذْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الرِّيحَ الْعَقِيمَ} অর্থাৎ, যখন আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম অকল্যাণকর বায়ু। (সূরা যারিয়াত ৫১:৪১) অর্থাৎ এমন বায়ু; যার মধ্যে কোন কল্যাণ ও বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল না।
আল-হাজ্জ 22:56
সে দিন আল্লাহরই আধিপত্য হবে;[১] তিনিই তাদের বিচার করবেন; যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তারা অবস্থান করবে সুখময় জান্নাতে।
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে সাময়িকভাবে পুরস্কার স্বরূপ অথবা পরীক্ষা স্বরূপ মানুষ রাজত্ব আধিপত্য ও ক্ষমতা লাভ করে থাকে। কিন্তু পরকালে কারো কোন প্রকার ক্ষমতা থাকবে না। ক্ষমতা ও রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই থাকবে। কর্তৃত্ব ও আধিপত্য একমাত্র তাঁরই হবে। {الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ لِلرَّحْمَنِ وَكَانَ يَوْمًا عَلَى الْكَافِرِينَ عَسِيرًا} অর্থাৎ, সেদিন প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে পরম দয়াময়ের এবং অবিশ্বাসীদের জন্য সেদিন হবে বড় কঠিন। (সূরা ফুরকান ২৫:২৬) {لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ} অর্থাৎ, আজ কর্তৃত্ব কার? এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই। (সূরা মু'মিন ৪০:১৬)
আল-হাজ্জ 22:57
আর যারা অবিশ্বাস করে ও আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তাদেরই জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।
আল-হাজ্জ 22:58
যারা হিজরত করেছে আল্লাহর পথে এবং পরে (শত্রুর হাতে) নিহত হয়েছে অথবা মৃত্যুবরণ করেছে[১] তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করবেন। [২] আর নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই তো সর্বোৎকৃষ্ট রুযীদাতা।[৩]
[১] অর্থাৎ, সেই হিজরতের অবস্থায় যদি মারা গেছে অথবা শহীদ হয়ে গেছে।
[২] অর্থাৎ, জান্নাতের নিয়ামত; যা না শেষ হবে, না ধ্বংস।
[৩] কারণ তিনি বিনা হিসাবে, বিনা অধিকারে এবং বিনা চাওয়ায় রুযী দিয়ে থাকেন। তাছাড়া মানুষ এক অপরকে যা দিয়ে থাকে তাও আল্লাহরই দেওয়া। সেই কারণে আসল ও উৎকৃষ্ট রুযীদাতা তিনিই।
আল-হাজ্জ 22:59
তিনি তাদেরকে অবশ্যই এমন স্থানে প্রবেশ করাবেন যা তারা পছন্দ করবে[১] এবং নিশ্চয় আল্লাহ সম্যক জ্ঞানময়, পরম সহনশীল।[২]
[১] কারণ, জান্নাতের সুখ-সম্পদ এমন হবে, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং কোন মানুষের অন্তরের কল্পনাতেও আসেনি। সুতরাং এমন নিয়ামত কে পছন্দ করবে না এবং এ রূপ সুখ-সম্পদ পেয়ে কে খুশি হবে না?
[২] সম্যক জ্ঞানময় বা সর্বজ্ঞ; তিনি সৎ লোকেদের দর্জা ও মর্যাদাস্তর এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে খুব জানেন। পরম সহনশীল; তিনি কুফরী ও শিরককারীদের ধৃষ্টতা ও অবাধ্যতা লক্ষ্য করেন। কিন্তু তিনি তাৎক্ষণিক পাকড়াও করেন না।
আল-হাজ্জ 22:60
এটাই হয়ে থাকে,[১] কোন ব্যক্তি নিপীড়িত হয়ে তুল্য প্রতিশোধ গ্রহণ করলে ও পুনরায় সে অত্যাচারিত হলে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন;[২] আল্লাহ নিশ্চয় পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল।[৩]
[১] অর্থাৎ, আমি মুহাজিরদের সঙ্গে বিশেষ করে শহীদী অথবা স্বাভাবিক মরণের যে ওয়াদা করেছি, তা অবশ্যই পূর্ণ হবে।
[২] العقُوبَة (প্রতিশোধ) এমন শাস্তি ও সাজাকে বলা হয়, যা কোন কাজের বিনিময়ে দেওয়া হয়। অর্থ এই যে, যদি কেউ অন্য কারো প্রতি অত্যাচার করে, তাহলে অত্যাচারিত ব্যক্তির জন্য সেই পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করার অধিকার আছে যে পরিমাণ অত্যাচার তার প্রতি করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধ নেবার পর যখন অত্যাচারী ও অত্যাচারিত উভয়ে সমান হয়ে যায়, তারপর অত্যাচারী যদি অত্যাচারিতের উপর আবার অত্যাচার করে, তাহলে আল্লাহ সেই অত্যাচারিতকে অবশ্যই সাহায্য করেন। সুতরাং এ সন্দেহ করা উচিত নয় যে, অত্যাচারিত ব্যক্তি ক্ষমা না করে প্রতিশোধ নিয়ে ভুল করেছে। না তা ভুল নয়। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ এর অনুমতি দিয়েছেন। সেই জন্য আগামীতেও সে আল্লাহর সাহায্যের অধিকারী হবে।
[৩] এই আয়াতে ক্ষমা করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, তোমরাও ক্ষমা কর। এর অন্য একটি অর্থ এও হতে পারে যে, অত্যাচারী যে পরিমাণ অত্যাচার করেছে সেই পরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়াতে আল্লাহর কোন পাকড়াও হবে না, যেহেতু আল্লাহ তার অনুমতি দিয়েছেন। বরং তা ক্ষমাযোগ্য। বরং প্রতিশোধ গ্রহণ অত্যাচারীর কাজের অনুরূপ হওয়ার জন্য দৃশ্যতঃ এক রকম অত্যাচার হলেও, আসলে প্রতিশোধ গ্রহণ কোন অত্যাচার নয়।
আল-হাজ্জ 22:61
এটা এ জন্য যে, আল্লাহ রাত্রিকে প্রবিষ্ট করেন দিবসের মধ্যে এবং দিবসকে প্রবিষ্ট করেন রাত্রির মধ্যে। [১] আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
[১] অর্থাৎ, যে আল্লাহ এ প্রকার প্রবিষ্ট করার কাজ করতে সক্ষম, সে আল্লাহ অত্যাচারীদের নিকট হতে তাঁর অত্যাচারিত বান্দাদের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম।
আল-হাজ্জ 22:62
এ জন্যও যে, আল্লাহ; তিনিই সত্য[১] এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে আহবান করে, তা নিঃসন্দেহে অসত্য। আর আল্লাহ; তিনিই তো সমুচ্চ, সুমহান।
[১] এই কারণে তাঁর দ্বীন সত্য, তাঁর ইবাদত সত্য, তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর নিজ বন্ধুদেরকে তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করাও সত্য। সেই আল্লাহ নিজের অস্তিত্ব, গুণাবলী ও কার্যাবলীতেও সত্য।
আল-হাজ্জ 22:63
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যার ফলে পৃথিবী সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে? নিশ্চয় আল্লাহ সম্যক সূক্ষ্ণদর্শী, পরিজ্ঞাত। [১]
[১] لَطِيف এর অর্থঃ সূক্ষ্ণদর্শী; তাঁর জ্ঞান ছোট-বড় প্রতিটি জিনিসে পরিব্যাপ্ত আছে। অথবা তার অর্থঃ অনুগ্রহপরায়ণ; অর্থাৎ নিজ বান্দাদেরকে রুযী দানের ব্যাপারে তিনি অনুগ্রহপরায়ণ। خَبِير এর অর্থঃ পরিজ্ঞাত; তিনি ঐ সমস্ত জিনিস সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত (পূর্ণ খবর রাখেন), যাতে বান্দাদের কাজের তদবীর ও সংশোধন রয়েছে। অথবা তাদের যাবতীয় প্রয়োজন সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।
আল-হাজ্জ 22:64
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তাঁরই।[১] আর নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই অভাবমুক্ত, সর্বপ্রশংসনীয়।
[১] সৃষ্টির দিক দিয়ে, মালিকানার দিক দিয়ে এবং নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দিক দিয়ে। কারণ সকল সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। যেহেতু তিনি অভাবশূন্য অমুখাপেক্ষী। সেই সত্তা সকল পরিপূর্ণতা ও ক্ষমতার অধিকারী, সকল অবস্থায় প্রশংসার যোগ্যও একমাত্র তিনিই।
আল-হাজ্জ 22:65
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন[১] পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সমস্তকে এবং তাঁর নির্দেশে সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহকে। তিনিই আকাশকে ধরে রাখেন, যাতে ওটা পৃথিবীর উপর তাঁর অনুমতি ছাড়া পতিত না হয়। [২] নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি বড় দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। [৩]
[১] যেমন জীবজন্তু, নদী-নালা, গাছপালা ও অন্যান্য অসংখ্য জিনিস, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়।
[২] অর্থাৎ, তিনি চাইলে আকাশ পৃথিবীর ওপর ভেঙ্গে পড়বে। আর তার ফলে পৃথিবীর সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, কিয়ামতের দিন আল্লাহর ইচ্ছায় আকাশ ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে।
[৩] এই কারণেই উক্ত জিনিসগুলো মানুষদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং আকাশকেও ভেঙ্গে পড়তে দেন না। কল্যাণে নিয়োজিত করার অর্থঃ ঐ সমস্ত জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভবপর ও সহজ করে দিয়েছেন।
আল-হাজ্জ 22:66
তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন; অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, পুনরায় তোমাদেরকে জীবন দান করবেন। নিশ্চয় মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ। [১]
[১] এখানে 'মানুষ' বলে মনুষ্য জাতিকে বুঝানো হয়েছে। কিছু মানুষের কৃতজ্ঞ হওয়া এ কথার পরিপন্থী নয়। কারণ বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে এই অকৃতজ্ঞতা, নেমকহারামি ও কুফরী পাওয়া যায়।
আল-হাজ্জ 22:67
আমি প্রত্যেক জাতির জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছি ইবাদত পদ্ধতি; যা তারা অনুসরণ করে।[১] সুতরাং তারা যেন অবশ্যই এ ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্ক না করে। [২] তুমি তাদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহবান কর। নিশ্চয় তুমি সরল পথেই প্রতিষ্ঠিত।[৩]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক যুগে আমি মানুষের জন্য পৃথক পৃথক শরীয়ত নির্ধারিত করেছি, যা কিছু বিষয়ে এক অপর হতে আলাদা। যেমন তাওরাত মূসা (আঃ)-এর উম্মতের জন্য, ইঞ্জীল ঈসা (আঃ)-এর উম্মতের জন্য এবং কুরআন হল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতের জন্য শরীয়ত ও জীবন ব্যবস্থা।
[২] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তোমাকে যে দ্বীন ও শরীয়ত দান করেছেন, তা পূর্ববর্তী দ্বীনসমূহের মূলনীতিরই অনুসারী। সুতরাং পূর্ববর্তী শরীয়তের অনুসারীদের উচিত, এখন শেষ নবী (সাঃ)-এর শরীয়তের উপর ঈমান আনা। আর উচিত নয়, তাঁর সাথে এ ব্যাপারে তর্ক-বিবাদ করা।
[৩] অর্থাৎ, তুমি ওদের তর্ক-বিবাদের কোন পরোয়া করবে না। বরং তাদেরকে নিজ প্রতিপালকের দিকে আহবান করতে থাক। কারণ 'সিরাতে মুস্তাকীম' (সরল পথে) কেবল তুমিই প্রতিষ্ঠিত আছ, বাকী পূর্বের সমস্ত শরীয়ত এখন রহিত।
আল-হাজ্জ 22:68
তারা যদি তোমার সাথে বিতন্ডা করে, তবে বল, ‘তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সম্যক অবহিত।
আল-হাজ্জ 22:69
তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করে দেবেন।’ [১]
[১] অর্থাৎ, সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রমাণের পরও যদি তারা তর্ক-বিবাদ হতে বিরত না হয়, তাহলে তাদের ব্যাপার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও। যেহেতু তিনিই কিয়ামত দিবসে তোমাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দেবেন। আর সে দিন পরিষ্কার হয়ে যাবে, হক কি ও বাতিল কি? কারণ তিনি সেই মোতাবেক সকলকে বদলা দেবেন।
আল-হাজ্জ 22:70
তুমি কি জানো না যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা অবগত আছেন? এ সবই লিপিবদ্ধ আছে এক কিতাবে। অবশ্যই এটা আল্লাহর নিকট সহজ। [১]
[১] এখানে মহান আল্লাহ নিজের জ্ঞানের পরিপূর্ণতা এবং তার মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টিকে বেষ্টন করার কথা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, তাঁর সৃষ্টি যে যা করবে তার জ্ঞান আল্লাহর পূর্ব হতেই ছিল। যে সব মানুষ স্বেচ্ছায় সৎপথ অবলম্বন করবে এবং যারা স্বেচ্ছায় পাপের পথে চলবে তা তিনি আগেই জানতেন। সুতরাং সেই জ্ঞান অনুসারে এ সমস্ত জিনিস তিনি আগেই লিখে রেখেছেন। আর মানুষের কাছে এ কথা যতই কঠিন মনে হোক না কেন, আল্লাহর জন্য তা একদম সহজ। আর এটিই হল ভাগ্যের বিষয়, যার উপর ঈমান আনা একান্ত জরুরী। যাকে হাদীসে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে যখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপর তখন সৃষ্টিকুলের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। (মুসলিম, তকদীর অধ্যায়) আর সুনানের বর্ণনাগুলোতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং বলেন, লেখ। কলম বলল, কি লিখব? মহান আল্লাহ বললেন, (কিয়ামত পর্যন্ত) যা কিছু ঘটবে সব কিছু লিখে ফেল। সুতরাং কলম আল্লাহর আদেশে কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে তা লিখে ফেলল।" (আহমাদ ৫/৩১৭ আবূ দাঊদ, তিরমিযী)
আল-হাজ্জ 22:71
তারা ইবাদত করে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর যার সম্পর্কে তিনি কোন দলীল প্রেরণ করেননি এবং যার সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞান নেই; [১] বস্তুতঃ যালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই।
[১] অর্থাৎ, তাদের নিকট না আছে কোন লিখিত দলীল, যার দ্বারা তারা কোন আসমানী কিতাব হতে প্রমাণ দেখাতে পারবে। আর না আছে তাদের জ্ঞানভিত্তিক কোন প্রমাণ (যুক্তি), যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করার বৈধতায় পেশ করতে পারবে।
আল-হাজ্জ 22:72
তাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হলে তুমি অবিশ্বাসীদের মুখমন্ডলে অসন্তোষের লক্ষণ দেখবে; যারা তাদের নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করে, তাদেরকে তারা আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। [১] তুমি বল, ‘তবে কি আমি তোমাদেরকে এটা অপেক্ষা মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? তা হল জাহান্নাম; যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে দিয়েছেন[২] এবং তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।’
[১] হাত দিয়ে তাদের উপর হাত তুলে অথবা মুখ দিয়ে অশ্লীল কথা বলে। অর্থাৎ, আল্লাহর একত্ববাদ, রসূলের রিসালাত ও কিয়ামতের বর্ণনা মুশরিক পথভ্রষ্টদের বরদাস্তের বাইরে; যার বহিঃপ্রকাশ তাদের চেহারায়, কখনো কখনো তাদের হাত ও মুখ দ্বারা হয়ে থাকে। ঠিক এই অবস্থা বর্তমানের বিদআতী পথহারা দলগুলির। যখন কুরআন ও হাদীস দ্বারা তাদের ভ্রষ্টতা স্পষ্ট করা হয়, তখন তাদের আচরণও কুরআন ও হাদীসের বিরুদ্ধে সেইরূপ হয়, যেরূপ এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াত শুনে এখন শুধু তোমাদের চেহারা পরিবর্তন হয়, কিন্তু এমন এক সময় আসবে -- তোমাদের আচরণ হতে তোমরা তওবা না করলে -- তখন তোমাদেরকে এর থেকে অত্যন্ত কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। আর তা হল জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে থাকা, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ কাফের ও মুশরিকদেরকে দিয়েছেন।
আল-হাজ্জ 22:73
হে লোক সকল! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে, তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো, তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না, যদিও তারা এই উদ্দেশ্যে সবাই একত্রিত হয়।[১] আর মাছি যদি তাদের নিকট হতে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে সেটাও তারা ওর নিকট হতে উদ্ধার করতে পারে না; [২] পূজারী ও দেবতা কতই না দুর্বল। [৩]
[১] অর্থাৎ, এই সব বাতিল উপাস্যরা যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত সাহায্যের জন্য আহবান কর, এরা সকলে সম্মিলিত হয়ে একটি সামান্য ছোট মাছি সৃষ্টি করতে চাইলে তাও তারা পারবে না। এ সত্ত্বেও যদি তোমরা তাদেরকে নিজেদের অভাব-অভিযোগ দূর করার মালিক মনে কর, তাহলে তোমাদের জ্ঞানের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। এখান হতে পরিষ্কার হয় যে, আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হত তারা শুধুমাত্র পাথরের প্রাণহীন প্রতিমাই ছিল না; (যেমন বর্তমানের কবরপূজারীরা বলে থাকে) বরং তারা ছিল জ্ঞানের অধিকারী। অর্থাৎ, তারা আল্লাহর নেক বান্দা ছিল, যাদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদেরকে (মূর্তি বানিয়ে) আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিয়েছিল। সেই জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, 'এরা সকলে একত্রিত হলেও একটি সামান্য মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করায় সক্ষম নয়।' এই চ্যালেঞ্জ কেবলমাত্র পাথরের প্রাণহীন মূর্তিদেরকে দেওয়া যেতে পারে না।
[২] এখানে তাদের অধিক অক্ষমতা ও অসহায়তার কথা প্রকাশ পেয়েছে। আর তা এই যে, সৃষ্টি করা তো দূরের কথা; তাদের নিকট হতে মাছির ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া খাবারটুকুও উদ্ধার করার ক্ষমতা পর্যন্ত তারা রাখে না।
[৩] طالب বলতে মনগড়া দেবতা আর مطلوب বলতে মাছিকে বুঝানো হয়েছে। আবার অনেকের নিকট طالب বলতে পূজারী ও مطلوب বলতে দেবতাকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসে কুদসীতে বাতিল উপাস্যদের অক্ষমতার কথা এইভাবে বর্ণিত হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, "তার চাইতে বড় অত্যাচারী কে হতে পারে, যে আমার (সৃষ্টি করার) মত সৃষ্টি করতে চায়। যদি সত্যিকারে কারো মধ্যে এ শক্তি থাকে, তাহলে সে যেন একটি পিঁপড়ে বা একটি যব সৃষ্টি করে দেখাক।" (বুখারীঃ লেবাস অধ্যায়)
আল-হাজ্জ 22:74
তারা আল্লাহর যথোচিত মর্যাদা উপলব্ধি করে না; [১] আল্লাহ নিশ্চয়ই চরম ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।
[১] আর সেই কারণেই মানুষ আল্লাহর অসহায় সৃষ্টিকেও তাঁর সমকক্ষ, সমতুল্য ও অংশীদার বানিয়ে নেয়। যদি তারা মহান আল্লাহর মহত্ব ও মর্যাদা, তাঁর অসীম শক্তি ও ক্ষমতার কথা সঠিকভাবে অনুমান ও উপলব্ধি করতে পারত, তাহলে কখনই তারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করত না।
আল-হাজ্জ 22:75
আল্লাহ ফিরিশতাদের মধ্য হতে মনোনীত করেন বাণীবাহক (দূত) এবং মানুষের মধ্য হতেও।[১] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [২]
[১] رَسُول رُسُل এর বহুবচন। এর অর্থঃ প্রেরিত দূত, বাণী বাহক। মহান আল্লাহ ফিরিশতা দ্বারাও বাণী বহনের কাজ নিয়েছেন। যেমন জিবরীল (আঃ)-কে অহী (প্রত্যাদেশ) পৌঁছানোর জন্য নির্বাচিত করেছেন; তাঁর কাজ নবীদের নিকট অহী পৌঁছানো অথবা আযাব নিয়ে কোন জাতির নিকট যাওয়া। আর মানুষের মধ্যেও কিছুকে বাণী-বাহক দূত রূপে নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁদেরকে মানুষের পথ দেখানোর কাজে নিয়োগ করেছেন। এঁরা সকলেই ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও দাস, তবে নির্বাচিত ও মনোনীত। কিন্তু কেন? আল্লাহর ইচ্ছায় শরীক করার জন্য; যেমন কোন কোন মানুষ তাঁদেরকে আল্লাহর শরীক মনে করে থাকে? কখনই না, বরং শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর জন্য তাঁরা মনোনীত হন।
[২] তিনি বান্দাদের সকল কথা শ্রবণ করেন ও তাদের সকল কাজ প্রত্যক্ষ করেন। অর্থাৎ, তিনি অবগত যে, রিসালাতের যোগ্য কে? যেমন অন্য জায়গায় বলেছেন {اللهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ} অর্থাৎ, রসূলের পদ বা দায়িত্ব আল্লাহ কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন। (সূরা আনআম ৬:১২৪ আয়াত)
আল-হাজ্জ 22:76
তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তিনি তা জানেন এবং সমস্ত বিষয় আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।[১]
[১] যখন সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, তখন মানুষ তাঁর অবাধ্যতা করে কোথায় যেতে পারে? এবং তাঁর আযাব হতে কিরূপে পরিত্রাণ পেতে পারে? মানুষের জন্য কি এটা উচিত নয় যে, তারা আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করবে? পরবর্তী আয়াতে সে কথাই স্পষ্ট করা হচ্ছে।
আল-হাজ্জ 22:77
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রুকূ কর, সিজদা কর[১] এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম[২] হতে পার। [৩] (সাজদাহ-ইমাম শাফেয়ীর মতে)
[১] অর্থাৎ, নামাযের প্রতি যত্নবান হও যা শরীয়তে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইবাদতের আদেশও করা হয়েছে, যার মধ্যে নামাযও শামিল। কিন্তু নামাযের বিশেষ গুরুতত্ত্ব ও মর্যাদার দিক দিয়ে লক্ষ্য রেখে তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ হয়েছে।[২] অর্থাৎ, সফলতা আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর আনুগত্যে; অর্থাৎ সৎকর্ম সম্পাদনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে শুধু দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও বিলাস-সামগ্রীর আধিক্যে সফলতা নেই; যেমন অধিকাংশ মানুষের ধারণা।[৩] এই আয়াত শেষে তিলাঅতের সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দ্রষ্টব্য।
আল-হাজ্জ 22:78
এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত; [১] তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি; [২] তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ মেনে চল);[৩] তিনি[৪] পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এই গ্রন্থেও; যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরা সাক্ষী স্বরূপ হও মানব জাতির জন্য।[৫] সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি!
[১] এই 'সংগ্রাম' বলতে কেউ কেউ সেই বৃহৎ 'জিহাদ' উদ্দেশ্য নিয়েছেন যা আল্লাহর কালেমা ও দ্বীনকে উন্নত করার জন্য কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে করা হয়। আবার কেউ কেউ আল্লাহর আদেশাবলী মান্য করার অর্থ নিয়েছেন; যেহেতু তাতেও 'নাফসে আম্মারাহ' (মন্দপ্রবণ মন) ও শয়তানের মুকাবিলা করতে হয়। আবার কেউ কেউ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তা হল প্রত্যেক সেই চেষ্টা-চরিত্র, যা হক ও সত্যের শির উন্নত এবং বাতিল ও অন্যায়ের শির অবনত তথা চূর্ণ করার জন্য করা হয়।[২] অর্থাৎ, এমন আদেশ নেই, যা মান্য করা অত্যন্ত কষ্টকর (তবে প্রতিটি কর্মেই এক-আধটুকু কষ্ট তো করতেই হয়)। বরং পূর্ববর্তী শরীয়তের কিছু কঠিন আদেশ রহিত করে দেওয়া হয়েছে এবং মুসলিমদের জন্য এমন অনেক সহজতা দান করা হয়েছে; যা পূর্ববর্তী শরীয়তে ছিল না।[৩] আরব জাতি ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর ছিল। সেই হিসাবে ইবরাহীম (আঃ) হলেন আরববাসীর পিতা। আর অনারবরাও ইবরাহীম (আঃ)-কে একজন উচ্চ সম্মানীয় ব্যক্তি হিসাবে শ্রদ্ধা করত; যেমন পুত্র তার পিতাকে শ্রদ্ধা করে থাকে। সেই হিসাবে তিনি সকলের আদি পিতা ছিলেন। এ ছাড়াও ইসলামের নবী (আরবী হওয়ার কারণে) ইবরাহীম (আঃ) তাঁরও পিতা ছিলেন। আর এই জন্য তিনি সকল উম্মতে মুহাম্মাদীরও পিতা হলেন। এই জন্য বলা হচ্ছে যে, এটাই হল ইসলাম ধর্ম; যা মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন; যা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীমেরই ধর্ম। অতএব তোমরা সেই ধর্মের অনুসারী হও।[৪] هُوَ (সে বা তিনি) শব্দটি দ্বারা কেউ কেউ বলেন, ইবরাহীমকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই ইবরাহীম (আঃ)-ই তোমাদের 'মুসলিম' নামকরণ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, উক্ত সর্বনাম দ্বারা আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি (আল্লাহ)ই তোমাদের নাম রেখেছেন 'মুসলিম'।[৫] এই সাক্ষ্যদান কিয়ামতের দিন হবে; যেমন হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। (সূরা বাকারার ২:১৪৩ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য)