Tafsir Ahsanul Bayaan — আল-ইসরা 17:1 – মারইয়াম 19:98
Contents
- আল-ইসরা 17:1
- আল-ইসরা 17:2
- আল-ইসরা 17:3
- আল-ইসরা 17:4
- আল-ইসরা 17:5
- আল-ইসরা 17:6
- আল-ইসরা 17:7
- আল-ইসরা 17:8
- আল-ইসরা 17:9
- আল-ইসরা 17:10
- আল-ইসরা 17:11
- আল-ইসরা 17:12
- আল-ইসরা 17:13
- আল-ইসরা 17:14
- আল-ইসরা 17:15
- আল-ইসরা 17:16
- আল-ইসরা 17:17
- আল-ইসরা 17:18
- আল-ইসরা 17:19
- আল-ইসরা 17:20
- আল-ইসরা 17:21
- আল-ইসরা 17:22
- আল-ইসরা 17:23
- আল-ইসরা 17:24
- আল-ইসরা 17:25
- আল-ইসরা 17:26
- আল-ইসরা 17:27
- আল-ইসরা 17:28
- আল-ইসরা 17:29
- আল-ইসরা 17:30
- আল-ইসরা 17:31
- আল-ইসরা 17:32
- আল-ইসরা 17:33
- আল-ইসরা 17:34
- আল-ইসরা 17:35
- আল-ইসরা 17:36
- আল-ইসরা 17:37
- আল-ইসরা 17:38
- আল-ইসরা 17:39
- আল-ইসরা 17:40
- আল-ইসরা 17:41
- আল-ইসরা 17:42
- আল-ইসরা 17:43
- আল-ইসরা 17:44
- আল-ইসরা 17:45
- আল-ইসরা 17:46
- আল-ইসরা 17:47
- আল-ইসরা 17:48
- আল-ইসরা 17:49
- আল-ইসরা 17:50
- আল-ইসরা 17:51
- আল-ইসরা 17:52
- আল-ইসরা 17:53
- আল-ইসরা 17:54
- আল-ইসরা 17:55
- আল-ইসরা 17:56
- আল-ইসরা 17:57
- আল-ইসরা 17:58
- আল-ইসরা 17:59
- আল-ইসরা 17:60
- আল-ইসরা 17:61
- আল-ইসরা 17:62
- আল-ইসরা 17:63
- আল-ইসরা 17:64
- আল-ইসরা 17:65
- আল-ইসরা 17:66
- আল-ইসরা 17:67
- আল-ইসরা 17:68
- আল-ইসরা 17:69
- আল-ইসরা 17:70
- আল-ইসরা 17:71
- আল-ইসরা 17:72
- আল-ইসরা 17:73
- আল-ইসরা 17:74
- আল-ইসরা 17:75
- আল-ইসরা 17:76
- আল-ইসরা 17:77
- আল-ইসরা 17:78
- আল-ইসরা 17:79
- আল-ইসরা 17:80
- আল-ইসরা 17:81
- আল-ইসরা 17:82
- আল-ইসরা 17:83
- আল-ইসরা 17:84
- আল-ইসরা 17:85
- আল-ইসরা 17:86
- আল-ইসরা 17:87
- আল-ইসরা 17:88
- আল-ইসরা 17:89
- আল-ইসরা 17:90
- আল-ইসরা 17:91
- আল-ইসরা 17:92
- আল-ইসরা 17:93
- আল-ইসরা 17:94
- আল-ইসরা 17:95
- আল-ইসরা 17:96
- আল-ইসরা 17:97
- আল-ইসরা 17:98
- আল-ইসরা 17:99
- আল-ইসরা 17:100
- আল-ইসরা 17:101
- আল-ইসরা 17:102
- আল-ইসরা 17:103
- আল-ইসরা 17:104
- আল-ইসরা 17:105
- আল-ইসরা 17:106
- আল-ইসরা 17:107
- আল-ইসরা 17:108
- আল-ইসরা 17:109
- আল-ইসরা 17:110
- আল-ইসরা 17:111
- আল-কাহফ 18:1
- আল-কাহফ 18:2
- আল-কাহফ 18:3
- আল-কাহফ 18:4
- আল-কাহফ 18:5
- আল-কাহফ 18:6
- আল-কাহফ 18:7
- আল-কাহফ 18:8
- আল-কাহফ 18:9
- আল-কাহফ 18:10
- আল-কাহফ 18:11
- আল-কাহফ 18:12
- আল-কাহফ 18:13
- আল-কাহফ 18:14
- আল-কাহফ 18:15
- আল-কাহফ 18:16
- আল-কাহফ 18:17
- আল-কাহফ 18:18
- আল-কাহফ 18:19
- আল-কাহফ 18:20
- আল-কাহফ 18:21
- আল-কাহফ 18:22
- আল-কাহফ 18:23
- আল-কাহফ 18:24
- আল-কাহফ 18:25
- আল-কাহফ 18:26
- আল-কাহফ 18:27
- আল-কাহফ 18:28
- আল-কাহফ 18:29
- আল-কাহফ 18:30
- আল-কাহফ 18:31
- আল-কাহফ 18:32
- আল-কাহফ 18:33
- আল-কাহফ 18:34
- আল-কাহফ 18:35
- আল-কাহফ 18:36
- আল-কাহফ 18:37
- আল-কাহফ 18:38
- আল-কাহফ 18:39
- আল-কাহফ 18:40
- আল-কাহফ 18:41
- আল-কাহফ 18:42
- আল-কাহফ 18:43
- আল-কাহফ 18:44
- আল-কাহফ 18:45
- আল-কাহফ 18:46
- আল-কাহফ 18:47
- আল-কাহফ 18:48
- আল-কাহফ 18:49
- আল-কাহফ 18:50
- আল-কাহফ 18:51
- আল-কাহফ 18:52
- আল-কাহফ 18:53
- আল-কাহফ 18:54
- আল-কাহফ 18:55
- আল-কাহফ 18:56
- আল-কাহফ 18:57
- আল-কাহফ 18:58
- আল-কাহফ 18:59
- আল-কাহফ 18:60
- আল-কাহফ 18:61
- আল-কাহফ 18:62
- আল-কাহফ 18:63
- আল-কাহফ 18:64
- আল-কাহফ 18:65
- আল-কাহফ 18:66
- আল-কাহফ 18:67
- আল-কাহফ 18:68
- আল-কাহফ 18:69
- আল-কাহফ 18:70
- আল-কাহফ 18:71
- আল-কাহফ 18:72
- আল-কাহফ 18:73
- আল-কাহফ 18:74
- আল-কাহফ 18:75
- আল-কাহফ 18:76
- আল-কাহফ 18:77
- আল-কাহফ 18:78
- আল-কাহফ 18:79
- আল-কাহফ 18:80
- আল-কাহফ 18:81
- আল-কাহফ 18:82
- আল-কাহফ 18:83
- আল-কাহফ 18:84
- আল-কাহফ 18:85
- আল-কাহফ 18:86
- আল-কাহফ 18:87
- আল-কাহফ 18:88
- আল-কাহফ 18:89
- আল-কাহফ 18:90
- আল-কাহফ 18:91
- আল-কাহফ 18:92
- আল-কাহফ 18:93
- আল-কাহফ 18:94
- আল-কাহফ 18:95
- আল-কাহফ 18:96
- আল-কাহফ 18:97
- আল-কাহফ 18:98
- আল-কাহফ 18:99
- আল-কাহফ 18:100
- আল-কাহফ 18:101
- আল-কাহফ 18:102
- আল-কাহফ 18:103
- আল-কাহফ 18:104
- আল-কাহফ 18:105
- আল-কাহফ 18:106
- আল-কাহফ 18:107
- আল-কাহফ 18:108
- আল-কাহফ 18:109
- আল-কাহফ 18:110
- মারইয়াম 19:1
- মারইয়াম 19:2
- মারইয়াম 19:3
- মারইয়াম 19:4
- মারইয়াম 19:5
- মারইয়াম 19:6
- মারইয়াম 19:7
- মারইয়াম 19:8
- মারইয়াম 19:9
- মারইয়াম 19:10
- মারইয়াম 19:11
- মারইয়াম 19:12
- মারইয়াম 19:13
- মারইয়াম 19:14
- মারইয়াম 19:15
- মারইয়াম 19:16
- মারইয়াম 19:17
- মারইয়াম 19:18
- মারইয়াম 19:19
- মারইয়াম 19:20
- মারইয়াম 19:21
- মারইয়াম 19:22
- মারইয়াম 19:23
- মারইয়াম 19:24
- মারইয়াম 19:25
- মারইয়াম 19:26
- মারইয়াম 19:27
- মারইয়াম 19:28
- মারইয়াম 19:29
- মারইয়াম 19:30
- মারইয়াম 19:31
- মারইয়াম 19:32
- মারইয়াম 19:33
- মারইয়াম 19:34
- মারইয়াম 19:35
- মারইয়াম 19:36
- মারইয়াম 19:37
- মারইয়াম 19:38
- মারইয়াম 19:39
- মারইয়াম 19:40
- মারইয়াম 19:41
- মারইয়াম 19:42
- মারইয়াম 19:43
- মারইয়াম 19:44
- মারইয়াম 19:45
- মারইয়াম 19:46
- মারইয়াম 19:47
- মারইয়াম 19:48
- মারইয়াম 19:49
- মারইয়াম 19:50
- মারইয়াম 19:51
- মারইয়াম 19:52
- মারইয়াম 19:53
- মারইয়াম 19:54
- মারইয়াম 19:55
- মারইয়াম 19:56
- মারইয়াম 19:57
- মারইয়াম 19:58
- মারইয়াম 19:59
- মারইয়াম 19:60
- মারইয়াম 19:61
- মারইয়াম 19:62
- মারইয়াম 19:63
- মারইয়াম 19:64
- মারইয়াম 19:65
- মারইয়াম 19:66
- মারইয়াম 19:67
- মারইয়াম 19:68
- মারইয়াম 19:69
- মারইয়াম 19:70
- মারইয়াম 19:71
- মারইয়াম 19:72
- মারইয়াম 19:73
- মারইয়াম 19:74
- মারইয়াম 19:75
- মারইয়াম 19:76
- মারইয়াম 19:77
- মারইয়াম 19:78
- মারইয়াম 19:79
- মারইয়াম 19:80
- মারইয়াম 19:81
- মারইয়াম 19:82
- মারইয়াম 19:83
- মারইয়াম 19:84
- মারইয়াম 19:85
- মারইয়াম 19:86
- মারইয়াম 19:87
- মারইয়াম 19:88
- মারইয়াম 19:89
- মারইয়াম 19:90
- মারইয়াম 19:91
- মারইয়াম 19:92
- মারইয়াম 19:93
- মারইয়াম 19:94
- মারইয়াম 19:95
- মারইয়াম 19:96
- মারইয়াম 19:97
- মারইয়াম 19:98
আল-ইসরা 17:1
পবিত্র ও মহিমময় তিনি[১] যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি[২] ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আকসায়,[৩] যার পরিবেশকে আমি করেছি বরকতময়,[৪] যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; [৫] নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ।
[১] سُبْحَانَ হল, سَبَّحَ يُسْبِّحُ এর মাসদার (ক্রিয়া বিশেষ্য)। অর্থ হল, أُنَزِّهُ اللهَ تَنْزِيْهًا অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক দোষ-ত্রুটি থেকে আল্লাহর পবিত্র ও মুক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করছি। সাধারণতঃ এর ব্যবহার তখনই করা হয়, যখন অতীব গুরুতত্ত্বপূর্ণ কোন ঘটনার উল্লেখ হয়। উদ্দেশ্য এই হয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা যতই অসম্ভব হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা, তিনি উপকরণসমূহের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তো كُنْ শব্দ দিয়ে নিমিষে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। উপায়-উপকরণের প্রয়োজন তো মানুষের। মহান আল্লাহ এই সব প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতা থেকে পাক ও পবিত্র।[২] إِسْراءٌ শব্দের অর্থ হল, রাতে নিয়ে যাওয়া। পরে لَيْلًا উল্লেখ করে রাতের স্বল্পতার কথা পরিষ্কার করা হয়েছে। আর এরই জন্য لَيْلًا 'নাকেরাহ' (অনির্দিষ্ট) এসেছে। অর্থাৎ, রাতের এক অংশে অথবা সামান্য অংশে। অর্থাৎ, চল্লিশ রাতের এই সুদীর্ঘ সফর করতে সম্পূর্ণ রাত লাগেনি; বরং রাতের এক সামান্য অংশে তা সুসম্পন্ন হয়।[৩]أَقْصَى দূরত্বকে বলা হয়। 'আল-বাইতুল মুকাদ্দাস' বা 'বাইতুল মাকদিস' ফিলিস্তীন বা প্যালেষ্টাইনের কদস অথবা জেরুজালেম বা (পুরাতন নাম) ঈলীয়া শহরে অবস্থিত। মক্কা থেকে ক্বুদ্স চল্লিশ দিনের সফর। এই দিক দিয়ে মসজিদে হারামের তুলনায় বায়তুল মাকদিসকে 'মাসজিদুল আকসা' (দূরতম মসজিদ) বলা হয়েছে।[৪] এই অঞ্চল প্রাকৃতিক নদ-নদী, ফল-ফসলের প্রাচুর্য এবং নবীদের বাসস্থান ও কবরস্থান হওয়ার কারণে পৃথক বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে। আর এই কারণে একে বরকতময় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।[৫] এটাই হল এই সফরের উদ্দেশ্য। যাতে আমি আমার এই বান্দাকে বিস্ময়কর এবং বড় বড় কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। তার মধ্যে এই সফরও হল একটি নিদর্শন ও মু'জিযা। সুদীর্ঘ এই সফর রাতের সামান্য অংশে সুসম্পন্ন হয়ে যায়। এই রাতেই নবী (সাঃ)-এর মি'রাজ হয় অর্থাৎ, তাঁকে আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন আসমানে নবীদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সপ্তাকাশের উপরে আরশের নীচে 'সিদরাতুল মুন্তাহা'য় মহান আল্লাহ অহীর মাধ্যমে নামায এবং অন্যান্য কিছু শরীয়তের বিধি-বিধান তাঁকে দান করেন। এ ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা বহু সহীহ হাদীসে রয়েছে এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত উম্মতের অধিকাংশ উলামা ও ফুকহা এই মত পোষণ করে আসছেন যে, এই মি'রাজ মহানবী (সাঃ)-এর সশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। এটা স্বপ্নযোগে অথবা আত্মিক সফর ও পরিদর্শন ছিল না, বরং তা ছিল দেহাত্মার সফর ও চাক্ষুষ দর্শন। (তা না হলে এ ঘটনাকে অস্বীকারকারীরা অস্বীকার করবে কেন?) বলা বাহুল্য, এ ঘটনা মহান আল্লাহ (অলৌকিকভাবে) তাঁর পূর্ণ কুদরত দ্বারা ঘটিয়েছেন। এই মি'রাজের দু'টি অংশ। প্রথম অংশকে 'ইসরা' বলা হয়; যার উল্লেখ এখানে করা হয়েছে। আর তা হল, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফর করার নাম। এখানে পৌঁছে নবী (সাঃ) সমস্ত নবীদের ইমামতি করেন। বায়তুল মাকদিস থেকে তাঁকে আবার আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এটা হল এই সফরের দ্বিতীয় অংশ। যাকে 'মি'রাজ' বলা হয়েছে। এর কিঞ্চিৎ আলোচনা সূরা নাজমে করা হয়েছে এবং বাকী বিস্তারিত আলোচনা হাদীসসমূহে বর্ণিত রয়েছে। সাধারণভাবে সম্পূর্ণ এই সফরকে 'মি'রাজ' বলে আখ্যায়িত করা হয়। 'মি'রাজ' সিড়ি বা সোপানকে বলা হয়। আর এটা রসূল (সাঃ)-এর পবিত্র মুখ-নিঃসৃত শব্দ عُرِجَ بِي إِلَى السَّمَاءِ (আমাকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয় বা আরোহণ করানো হয়) হতে গৃহীত। কেননা, এই দ্বিতীয় অংশটা প্রথম অংশের চেয়েও বেশী গুরুতত্ত্বপূর্ণ ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ব্যাপার। আর এই কারণেই 'মি'রাজ' শব্দটাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মি'রাজের সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, তা হিজরতের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এক বছর পূর্বে। আবার কেউ বলেছেন, কয়েক বছর পূর্বে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপ মাস ও তার তারীখের ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ অথবা ২৭ তারীখে হয়েছে। কেউ বলেছেন, রজব মাসের ২৭ তারীখ এবং কেউ অন্য মাস ও অন্য তারীখের কথাও উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল কাদীর) (মহানবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবা (রাঃ)গণের নিকট তারীখের কোন গুরুতত্ত্ব অথবা এ দিনকে স্মরণ ও পালন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলেই, তা সংরক্ষিত হয়নি। -সম্পাদক)
আল-ইসরা 17:2
আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম ও তা(কে) করেছিলাম বানী ইস্রাঈলের জন্য পথ-নির্দেশক; (বলেছিলাম,) তোমরা আমাকে ব্যতীত অপর কাউকেও কর্মবিধায়ক রূপে গ্রহণ করো না ।
আল-ইসরা 17:3
তোমরাই তো তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে (কিশতীতে) আরোহণ করিয়েছিলাম, নিশ্চয় সে ছিল পরম কৃতজ্ঞ দাস। [১]
[১] নূহ (আঃ)-এর প্লাবনের পর মানব বংশের উৎপত্তি তাঁর (নূহ (আঃ)) সেই ছেলেদের থেকে হয়েছে, যারা নূহ (আঃ) এর কিশতীতে সওয়ার ছিল এবং প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এই জন্য বানী-ইস্রাঈলকে সম্বোধন করে বলা হল যে, তোমাদের পিতা নূহ (আঃ) আল্লাহর বড়ই কৃতজ্ঞ বান্দা ছিলেন। অতএব তোমরাও তোমাদের পিতার ন্যায় কৃতজ্ঞতার পথ অবলম্বন কর এবং আমি মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে যে রসূল বানিয়ে প্রেরণ করেছি তাকে অস্বীকার করে সে নিয়ামতের কুফরী করো না।
আল-ইসরা 17:4
আর আমি (তাওরাত) কিতাবে বানী ইস্রাঈলকে জানিয়েছিলাম যে, নিশ্চয়ই তোমরা পৃথিবীতে দু-দুবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমরা অতিশয় অহংকারস্ফীত হবে ।
আল-ইসরা 17:5
অতঃপর এই দু-এর প্রথম প্রতিশ্রুত কাল যখন উপস্থিত হল, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কঠোর রণ-কুশলী বীর দাসদেরকে; যারা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে সমস্ত কিছু ধ্বংস করল; আর এ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়ারই ছিল। [১]
[১] এখানে সেই লাঞ্ছনা ও ধ্বংসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা ব্যাবিলনের (অগ্নিপূজক) শাসক বুখতে নাসরের (বা বুখতে নাসসারের) হাতে খ্রীষ্টপূর্ব প্রায় ছয়শ' সালে জেরুজালেমে ইয়াহুদীদের উপর আপতিত হয়েছিল। সে নির্বিচারে ব্যাপকভাবে ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করেছিল এবং বহু সংখ্যক ইয়াহুদীকে দাস বানিয়েছিল। আর এটা তখন হয়েছিল, যখন তারা আল্লাহর একজন নবী শা'য়া (আঃ)-কে হত্যা অথবা আরমিয়া (আঃ)-কে বন্দী করেছিল এবং তাওরাতের বিধি-বিধানকে অমান্য করে অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধ করেছিল। কেউ বলেন, বুখতে নাসরের পরিবর্তে মহান আল্লাহ জালূতকে শাস্তি স্বরূপ তাদের উপর আধিপত্য দান করেছিলেন। সে তাদের উপর সীমাহীন যুলুম ও অত্যাচারের রুলার চালিয়েছিল। পরে ত্বালূতের নেতৃত্বে দাউদ (আঃ) তাকে হত্যা করেছিলেন।
আল-ইসরা 17:6
অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জন্য যুদ্ধের পালা ঘুরিয়ে (বিজয়) দিলাম, তোমাদেরকে ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে করলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ। [১]
[১] অর্থাৎ, বুখতে নাসর অথবা জালূতের হত্যার পর আমি পুনর্বার তোমাদেরকে মাল-ধন, সন্তান-সন্ততি এবং মান-সম্মান দানে ধন্য করলাম। অথচ এ সবই তোমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আর তোমাদেরকে আরো অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী করে দিলাম।
আল-ইসরা 17:7
তোমরা সৎকর্ম করলে সৎকর্ম নিজেদেরই জন্য করবে, আর মন্দকর্ম করলে তাও নিজেদের জন্য; অতঃপর পরবর্তী প্রতিশ্রুত কাল উপস্থিত হলে আমি আমার দাসদেরকে প্রেরণ করলাম তোমাদের মুখমন্ডল কালিমাচ্ছন্ন করবার জন্য, প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে প্রবেশ করেছিল পুনরায় সেই ভাবেই তাতে প্রবেশ করবার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিল তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করবার জন্য।[১]
[১] দ্বিতীয়বার আবার তারা ফাসাদ সৃষ্টি করল। যাকারিয়া (আঃ)-কে হত্যা করল এবং ঈসা (আঃ)-কেও হত্যা করার প্রচেষ্টায় ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে বাঁচিয়ে নেন। এর ফলস্বরূপ রোমসম্রাট টিটাস (Titas)-কে আল্লাহ তাদের উপর আধিপত্য দান করেন। সে জেরুজালেমের উপর আক্রমণ করে তাদের লাশের গাদা লাগিয়ে দেয়, শত শত মানুষকে বন্দী করে, তাদের ধন-সম্পদ লুটে নেয় ধর্মপুস্তিকাগুলোকে পদতলে দলিত-মথিত করে, বায়তুল মাকদিস ও সুলাইমানী হাইকাল (উপাসনালয়)-কে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদেরকে চিরদিনের জন্য বায়তুল মাকদিস থেকে বহিষ্কার করে দেয়। এইভাবে খুব করে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়। আর এই সর্বনাশ তাদের উপর নেমে এসেছিল সন ৭০ খ্রীষ্টাব্দে।
আল-ইসরা 17:8
সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন; কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের পূর্ব আচরণের পুনরাবৃত্তি কর; তবে আমিও (আমার শাস্তির) পুনরাবৃত্তি করব।[১] আর জাহান্নামকে আমি করেছি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য কারাগার।[২]
[১] এখানে তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও, তাহলে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে। যার অর্থ হল, দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা অর্জন করবে। আর যদি পুনরায় আল্লাহর অবাধ্যতার পথ অবলম্বন করে যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করায় লিপ্ত হও, তাহলে আমি আবারও তোমাদেরকে লাঞ্ছনা ও অবমাননাগ্রস্ত করব; যেমন ইতিপূর্বে দুইবার আমি তোমাদের সাথে এই ধরনের আচরণ করেছি। আর হলও তা-ই। এই ইয়াহুদীরা নিজেদের মন্দ আচরণ থেকে ফিরে আসেনি। তারা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতের ব্যাপারে সেই আচরণই প্রদর্শন করে, যে আচরণ প্রদর্শন করেছিল মূসা (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতের ব্যাপারে। যার ফলস্বরূপ তৃতীয়বার মুসলিমদের হাতে তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত হতে হয় এবং অত্যধিক লাঞ্ছনার সাথে তাদেরকে মদীনা ও খায়বার থেকে নির্বাসিত হতে হয়।
[২] অর্থাৎ, দুনিয়ার এই লাঞ্ছনার পর জাহান্নামে আরো পৃথক শাস্তি রয়েছে, যা সেখানে তারা ভোগ করবে।
আল-ইসরা 17:9
নিশ্চয় এ কুরআন এমন পথনির্দেশ করে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
আল-ইসরা 17:10
আর যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি মর্মান্তিক শাস্তি।
আল-ইসরা 17:11
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে; বস্তুতঃ মানুষ শীঘ্রতা-প্রিয়।[১]
[১] মানুষ যেহেতু দ্রুততা প্রিয় এবং দুর্বল মনের তাই যখন সে কোন কষ্টের শিকার হয়, তখন ধ্বংসের জন্য ঐভাবে বদ্দুআ করে, যেভাবে কল্যাণের জন্য স্বীয় প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে। এটা তো প্রতিপালকের দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের বদ্দুআ কবুল করেন না। এই বিষয়টাই সূরা ইউনুসের ১০:১১ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে।
আল-ইসরা 17:12
আমি রাত্রি ও দিবসকে করেছি দু’টি নিদর্শন ও রাত্রিকে করেছি আলোকহীন এবং দিবসকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পার।[১] আর আমি সব কিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি। [২]
[১] রাতকে আলোকহীন অর্থাৎ, অন্ধকার বানিয়েছি, যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পার এবং তোমাদের সারা দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আর দিনকে বানিয়েছি আলোক-উজ্জ্বল যাতে তোমরা জীবিকা উপার্জন ও প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান কর। এ ছাড়াও রাত ও দিনের দ্বিতীয় আর এক লাভ হল, এইভাবে সপ্তাহ, মাস এবং বছরের হিসাব তোমরা গণনা করতে পারবে। আর এই হিসাবেরও রয়েছে অসংখ্য উপকারিতা। যদি রাতের পরে দিন এবং দিনের পরে রাত না এসে সব সময়ই রাত অথবা দিন থাকত, তবে তোমরা আরাম ও স্বস্তি লাভের অথবা কাজকর্ম করার কোন সুযোগ পেতে না। অনুরূপ মাস ও বছরের হিসাব করাও সম্ভব হত না।
[২] অর্থাৎ, মানুষের জন্য দ্বীন এবং দুনিয়ার প্রয়োজনীয় সব কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। যাতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে স্বীয় দুনিয়াকে সুন্দর করে এবং আখেরাতকে স্মরণে রেখে তার জন্যও প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আল-ইসরা 17:13
প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি[১] এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।
[১] طَائِرٌ এর অর্থ হল পাখী। আর عُنُقٌ এর অর্থ হল ঘাড়। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) এখানে طَائِرٌ এর অর্থ নিয়েছেন, মানুষের আমল। আর فِي عُنُقِهِ বলতে তার সেই ভাল ও মন্দ আমল, যার ভাল অথবা মন্দ প্রতিদান তাকে দেওয়া হবে। গলার হারের মত তার সাথে থাকবে। অর্থাৎ, তার সমস্ত আমল লিখা হচ্ছে। আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ এই লিখিত জিনিস সুরক্ষিত থাকবে। কিয়ামতের দিন এই অনুযায়ী তার বিচার-ফায়সালা হবে। আর ইমাম শাওকানী طَائِرٌ এর অর্থ করেছেন, মানুষের ভাগ্য। যা মহান আল্লাহ তাঁর জ্ঞানের আলোকে প্রথমেই লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। যার সৌভাগ্যবান ও আল্লাহর অনুগত হওয়ার ছিল, তা আল্লাহর জানা ছিল এবং যার অবাধ্য হওয়ার ছিল, তাও তাঁর জানা ছিল। এই ভাগ্যই (সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য) প্রত্যেক মানুষের সাথে গলার হারের মত লেগে আছে। সেই অনুযায়ী হবে তার আমল এবং কিয়ামতের দিন সেই অনুযায়ীই হবে তার ফায়সালা।
আল-ইসরা 17:14
(তাকে বলা হবে,) ‘তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর; আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট।’
আল-ইসরা 17:15
যারা সৎপথ অবলম্বন করবে, তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে, তারা নিজেদেরই ধ্বংসের জন্যই হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না।[১] আর আমি রসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না। [২]
[১] অবশ্য যে নিজে ভ্রষ্ট এবং অপরকেও ভ্রষ্ট করবে, সে নিজের ভ্রষ্টতার বোঝার সাথে সাথে যাদেরকে সে স্বীয় প্রচেষ্টায় ভ্রষ্ট করেছে, তাদের গুনাহের বোঝাও (তাদের গুনাহতে কোন কমতি না করেই) তাকে বহন করতে হবে। এ কথা কুরআনের অন্য কয়েকটি স্থানে এবং বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আর প্রকৃতপক্ষে এটা হবে তাদেরই গুনাহের বোঝা যা অন্যদেরকে ভ্রষ্ট করে তারা অর্জন করেছে।
[২] কোন কোন মুফাসসির এ থেকে কেবল পার্থিব শাস্তিকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, আখেরাতের আযাব থেকে স্বতন্ত্র হবে না। কিন্তু কুরআনে কারীমের অন্যান্য আয়াত থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে, মহান আল্লাহ মানুষদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, তোমাদের কাছে কি আমার রসূল আসেনি? তারা ইতিবাচক উত্তর দিবে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রসূল প্রেরণ এবং গ্রন্থ অবতরণ ছাড়া তিনি কাউকে আযাব দেবেন না। তবে কোন্ জাতি বা কোন্ ব্যক্তির কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছেনি, সে ফায়সালা কিয়ামতের দিন তিনিই করবেন। সেখানে অবশ্যই কারো সাথে অবিচার করা হবে না। বধির, পাগল, নির্বোধ এবং দুই নবীর মধ্যবর্তী যুগে মৃত্যুবরণকারী (যাদের নিকট দ্বীনের খবর একেবারেই অজানা সেই) ব্যক্তিদের ব্যাপারও অনুরূপ। এদের ব্যাপারে কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাদের প্রতি ফিরিশতা পাঠাবেন এবং ফিরিশতারা তাদেরকে বলবেন যে, 'জাহান্নামে প্রবেশ কর।' অতএব তারা যদি আল্লাহর এই নির্দেশকে মেনে নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করে যায়, তাহলে জাহান্নাম তাদের জন্য ফুল বাগান হয়ে যাবে। অন্যথা তাদেরকে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসনাদ আহমদ ৪/২৪, ইবনে হিব্বান ৯/২২৬, সহীহুল জামে' ৮৮১নং) মুসলিম শিশুরা জান্নাতে যাবে। তবে কাফের ও মুশরিকদের শিশুদের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে নীরব থেকেছেন। কেউ কেউ জান্নাতে যাওয়ার এবং জাহান্নামে যাওয়ার অভিমত পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে কাসীর বলেছেন, হাশরের মাঠে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। যারা আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করবে, তারা জান্নাতে এবং যারা অবাধ্যতা করবে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তিনি (ইবনে কাসীর) এই উক্তিকেই প্রাধান্য দিয়ে বলেন যে, এর ফলে পরস্পর বিরোধী বর্ণনাগুলোর মধ্যে সমবয় সাধন করা যায়। (বিস্তারিত জানার জন্য তাফসীর ইবনে কাসীর দ্রষ্টব্য) তবে সহীহ বুখারীর বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুশরিকদের শিশুরাও জান্নাতে প্রবেশ করবে।
(দ্রষ্টব্যঃ সহীহ বুখারী ৩/২৫৭, ১২/৩৪৮ ফাতহুল বারী সহ)
আল-ইসরা 17:16
যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ওর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, অতঃপর তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; ফলে ওর প্রতি দন্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। [১]
[১] এখানে সেই মূল নীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যার ভিত্তিতে জাতির বিনাশ সাধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর তা হল এই যে, তাদের সচ্ছল ও ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তিরা আল্লাহর আদেশ লংঘন ও নির্দেশাবলী অমান্য করতে আরম্ভ করে এবং এদের দেখাদেখি অন্যরাও তা-ই করতে শুরু করে দেয়, আর এইভাবে এই জাতির মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ব্যাপক হয়ে যায়। ফলে তারা শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হয়।
আল-ইসরা 17:17
নূহের পর আমি কত মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি।[১] তোমার প্রতিপালকই তাঁর দাসদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট।
[১] তারাও ধ্বংসের এই মূল নীতির আওতায় পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
আল-ইসরা 17:18
কেউ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে থাকি, পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি; সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায়। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক দুনিয়া কামনাকারী দুনিয়া পায় না। দুনিয়া কেবল সেই পায়, যাকে আমি দেওয়ার ইচ্ছা করি। আর সেও ততটা দুনিয়া পায় না, যতটা সে চায়, বরং ততটাই সে পায়, যতটা তাকে দেওয়ার ফায়সালা আমি করি। তবে (আখেরাত বর্জন করে) এই দুনিয়া কামনার ফল হবে জাহান্নামের চিরন্তন আযাব ও লাঞ্ছনা ভোগ।
আল-ইসরা 17:19
যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে। [১]
[১] মহান আল্লাহর কাছে মূল্যায়নের জন্য তিনটি জিনিস এখানে বর্ণিত হয়েছে। (ক) আখেরাত কামনা। অর্থাৎ, কর্মে ইখলাস থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। (খ) যথাযথ প্রচেষ্টা করা। অর্থাৎ, সুন্নাহ অনুযায়ী কর্ম করা। (গ) ঈমান থাকা। কেননা, এ ছাড়া কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ, আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানের সাথে সাথে তাতে ইখলাস থাকা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী সে আমল সম্পাদিত হওয়া জরুরী। (অন্য কথায়, প্রত্যেক আমল কবুল হওয়ার ভিত্তি হল ঈমান এবং ইখলাস ও মুহাম্মাদী তরীকা হল তার শর্ত। -সম্পাদক)
আল-ইসরা 17:20
তোমার প্রতিপালক তাঁর দান দ্বারা এদের ও ওদের (পরলোককামী ও ইহলোককামী উভয়কে) সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতিপালকের দান অবারিত। [১]
[১] অর্থাৎ, দুনিয়ার রুযী ও তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোন পার্থক্য ছাড়াই মু'মিন এবং কাফের উভয়কেই দিয়ে থাকি। যে দুনিয়া কামনা করে তাকেও দিই এবং যে আখেরাত কামনা করে তাকেও দিই। আল্লাহর (পার্থিব) নিয়ামত থেকে কাউকেও বঞ্চিত করা হয় না।
আল-ইসরা 17:21
লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে তাদের এক দলকে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। আর নিশ্চয়ই পরকাল মর্যাদায় বৃহত্তর ও মাহাত্ম্যেও শ্রেষ্ঠতর। [১]
[১] তবে দুনিয়ার এই ভোগ-সম্ভার কেউ কম পায়, কেউ বেশী। মহান আল্লাহ স্বীয় কৌশলের ভিত্তিতে এবং ভাল-মন্দের দিক বিবেচনা করে তা বণ্টন করে থাকেন। আখেরাতে কিন্তু মর্যাদার মধ্যে তফাৎ স্পষ্টরূপে বিকশিত হবে। আর তা হবে এইভাবে যে, ঈমানদাররা জান্নাতে এবং কাফেররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আল-ইসরা 17:22
আল্লাহর সাথে অপর কোন উপাস্য স্থির করো না; করলে নিন্দিত ও নিঃসহায় হয়ে যাবে।
আল-ইসরা 17:23
তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের এক জন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে (বিরক্তিসূচক শব্দ) ‘উঃ’ বলো না এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করো না; বরং তাদের সাথে বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। [১]
[১] এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর ইবাদতের পর দ্বিতীয় নম্বরে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের খেদমত করার এবং তাঁদের প্রতি আদব ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার কত যে গুরুত্ব তা পরিষ্কার হয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রতিপালকের প্রতিপালকত্বের দাবীসমূহের সাথে সাথে পিতা-মাতার দাবীসমূহ পূরণ করাও অত্যাবশ্যক। হাদীসসমূহেও এর গুরুত্ব এবং এর প্রতি চরম তাকীদ করা হয়েছে। বিশেষ করে বার্ধক্যে তাঁদেরকে 'উঃ' শব্দটিও বলতে এবং তাঁদেরকে ধমক দিতে নিষেধ করেছেন। কেননা, বার্ধক্যে তাঁরা দুর্বল ও অসহায় হয়ে যান। পক্ষান্তরে সন্তানরা হয় সবল এবং উপার্জন-সক্ষম ও (সংসারের সব কিছুর) ব্যবস্থাপক। এ ছাড়া যৌবনের উন্মাদনাময় উদ্যম এবং বার্ধক্যের ভুক্তপূর্ব স্নিগ্ধ ও উষ্ণ অভিজ্ঞতার মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এই সব অবস্থায় পিতা-মাতার প্রতি আদব ও শ্রদ্ধার দাবীসমূহের খেয়াল রাখার মুহূর্তটা হয় অতীব কঠিন। তাই আল্লাহর কাছে সন্তোষভাজন সেই-ই হবে, যে তাঁদের শ্রদ্ধার দাবী পূরণ ও প্রাপ্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হবে।
আল-ইসরা 17:24
অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো[১] এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।’
[১] পাখী যখন তার বাচ্চাদেরকে নিজ করুণার ছায়ায় রাখতে চায়, তখন তাদের জন্য নিজের ডানাকে নত করে দেয়। অর্থাৎ, তুমিও পিতা-মাতার সাথে ঐরূপ উত্তম এবং করুণাসিক্ত আচরণ কর। আর তাঁদের ঐরূপ সেবাযত্ন কর, যেরূপ তাঁরা তোমার সেবাযত্ন করেছিলেন; যখন তুমি শিশু ছিলে। অথবা এর অর্থ হল, পাখী যখন উড়ার এবং ঊর্ধ্বে যাওয়ার ইচ্ছা করে, তখন তার ডানা দু'টিকে প্রসারিত করে দেয়। আর যখন নীচে অবতরণ করার ইচ্ছা করে, তখন ডানা দু'টি গুটিয়ে নেয়। এই দিক দিয়ে বাজু বিছিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে, পিতা-মাতার সামনে নম্র ও বিনয়ী হয়ে যাও।
আল-ইসরা 17:25
তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমাদের প্রতিপালক অধিক জানেন; তোমরা সৎকর্মপরায়ণ হলে, যারা সর্বদা আল্লাহ অভিমুখী আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল।
আল-ইসরা 17:26
তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।[১] আর কিছুতেই অপব্যয় করো না।
[১] কুরআন কারীমের এই শব্দগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন এবং অভাবী মুসাফিরদের সাহায্য করে তার উপর অনুগ্রহ প্রকাশ করা উচিত নয়। যেহেতু এটা তাদের প্রতি অনুগ্রহ নয়, বরং এটা হল মালের সেই অধিকার, যা মহান আল্লাহ ধনীদের ধন-সম্পদে উল্লিখিত অভাবীদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। ধনী যদি এ অধিকার আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর নিকট অপরাধী গণ্য হবে। অর্থাৎ, এটা হল অধিকার আদায় করা, কারো উপর অনুগ্রহ করা নয়। আর আত্মীয়-স্বজনদের কথা প্রথমে উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের অধিকার বেশী ও প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারসমূহ আদায় এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া (বা জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা) বলা হয়। এর উপর ইসলামের বড়ই তাকীদ রয়েছে।
আল-ইসরা 17:27
নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। [১]
[১] تَبْذِيْرٌ এর মূল ধাতু হল بِذْرٌ (বীজ)। যেমন যমীনে বীজ ফেলার সময় এটা লক্ষ্য করা হয় না যে, তা যথাস্থানে পড়ছে, না যেখানে সেখানে পড়ে যাচ্ছে। বরং চাষী বীজ ফেলেই চলে যায়। تَبْذِيْرٌ (অপব্যয়ে)ও এটাই হয়। মানুষ তার মাল বীজ ফেলার মত ছড়াতে থাকে এবং ব্যয় করার ব্যাপারে শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে। কেউ কেউ বলেছেন, تَبْذِيْر হল, অবৈধ কার্যকলাপে ব্যয় করা, যদিও তা সামান্য হয়। আমাদের জানা মতে উভয় অবস্থাই تَبْذِيْر (অপব্যয়)এর পর্যায়ভুক্ত। আর এটা এত বড় জঘন্য কাজ যে, এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শয়তানের সাথে রয়েছে পূর্ণ সাদৃশ্য। অথচ শয়তানের সাদৃশ্য গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকা মানুষের জন্য ওয়াজেব; যদি তা (শয়তানের) কোন একটি অভ্যাসেও হয়। এ ছাড়া শয়তানকে كَفُوْرٌ (অতিশয় অকৃতজ্ঞ) বলে তার মত না হতে আরো তাকীদ করা হয়েছে। অর্থাৎ, যদি তুমি শয়তানের সাদৃশ্য গ্রহণ কর, তাহলে (তুমি তার ভাই হবে এবং) তুমিও তার মত كَفُوْرٌ (অকৃতজ্ঞ) বিবেচিত হয়ে যাবে। (ফাতহুল কাদীর)
আল-ইসরা 17:28
তুমি নিজেই যখন তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন প্রত্যাশিত করুণা লাভের সন্ধানে থাকো, তখন তাদেরকে যদি বিমুখই কর, তাহলে তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলো। [১]
[১] অর্থাৎ, আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে --যা দূরীভূত হওয়ার এবং রুযীর প্রসারতার তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আশা রাখ-- যদি তোমাকে গরীব আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন এবং অভাবী ব্যক্তিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় অর্থাৎ, (কিছু দিতে না পারার) ওজর পেশ করতে হয়, তবে তাও নরম ও উত্তম পন্থায় পেশ করবে। অর্থাৎ, (দিতে পারব না এ) উত্তরও যেন দেওয়া হয় মমতা ও ভালবাসাপূর্ণ ভঙ্গিমায়। কর্কশ ভাষায় ও অভদ্রতার সাথে নয়; যা সাধারণতঃ ধনীরা ভিক্ষুক ও অভাবী মানুষদের সাথে করে থাকে।
আল-ইসরা 17:29
তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত (নিঃস্ব) হয়ে পড়বে।[১]
[১] পূর্বের আয়াতে ওজর পেশ করার আদবের কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতে ব্যয় করার আদব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আর তা হল, মানুষ এমন কৃপণও হবে না যে, নিজের ও পরিবারবর্গের প্রয়োজনেও ব্যয় করবে না। আর এমন মুক্তহস্তও হবে না যে, নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য না করে বেহিসাব ব্যয় করে অপব্যয় ও নিঃস্বতার শিকার হবে। কৃপণতার ফলে মানুষ তিরস্কৃত ও নিন্দিত গণ্য হবে এবং অপব্যয়ের ফলে অবসাদগ্রস্ত ও অনুতপ্ত হবে। محسور বলা হয় এমন পশুকে যে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। অপব্যয়কারীও পরিশেষে হাত শূন্য করে বসে যায়। 'বদ্ধমুষ্টি হয়ো না' বা 'নিজ হাতকে গর্দানের সাথে বেঁধে রেখো না' অর্থঃ ব্যয়কুণ্ঠ কৃপণ হয়ো না। আর 'একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না' অর্থঃ অপব্যয় করো না। مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا হল لَفُّ نَشْرٍ مُرَتَّبٌ অর্থাৎ, তিরস্কার হল কৃপণতার এবং অনুতাপ হল অপব্যয়ের কুফল।
আল-ইসরা 17:30
তোমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছা তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন; [১] নিশ্চয় তিনি তাঁর দাসদেরকে ভালভাবে জানেন ও দেখেন।
[১] এতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে সান্তনা। তাঁদের কাছে রুযী ও বিলাস-উপকরণের প্রাচুর্য না থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর নিকট তাঁদের সম্মান নেই, বরং রুযীতে প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার সম্পর্ক তো আল্লাহর হিকমত ও কৌশলের সাথে; যার খবর কেবল তিনিই জানেন। তিনি তাঁর শত্রুদেরকে কারূন বানিয়ে দেন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে এতটাই দেন যে, কোন রকমে তাদের চলে যায়। এ সবই তাঁর ইচ্ছার ব্যাপার। অধিক সম্পদ-সম্পত্তির মালিক (ধনী) তাঁর প্রিয় নয় এবং জীবন ধারণের মত সামান্য উপকরণের মালিক (গরীব) তাঁর অপ্রিয় নয়।
(অনুরূপ এর বিপরীত হওয়াও জরুরী নয়। -সম্পাদক)
আল-ইসরা 17:31
তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। [১]
[১] এই নির্দেশ সূরা আনআম ৬:১৫১ নং আয়াতেও উল্লেখ হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ) শিরকের পর যে গুনাহকে সবচেয়ে বড় গণ্য করেছেন, তা হল এই ((أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ خَشْيَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ)) "তোমার নিজ সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করা যে, সে তোমার সাথে খাবে।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরা বাকারা, আদব অধ্যায়, মুসলিমঃ তাওহীদ অধ্যায়) ইদানীং সন্তান হত্যার এই মহাপাপ অতীব সুশৃঙ্খল নিয়মে 'জন্মনিয়ন্ত্রণ'-এর সুন্দর নামে সারা পৃথিবীতে চলছে। পুরুষরা 'উত্তম শিক্ষা ও তরবিয়ত' (বা 'ছোট পরিবার, সুখী সংসার') এর নামে এবং মহিলারা তাদের দেহের 'সুষমা' অক্ষয় রাখার জন্য ব্যাপকহারে ('আমরা দুই আমাদের দুই' শ্লোগান দিয়ে) এই অপরাধ করে চলেছে। أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهُ।
আল-ইসরা 17:32
তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। [১]
[১] ইসলামে ব্যভিচার যেহেতু বড়ই অপরাধমূলক কাজ; এত বড় অপরাধ যে, কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা মহিলার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেলে, ইসলামী সমাজে তার জীবিত থাকার অধিকার থাকে না। আবার তাকে তরবারির এক আঘাতে হত্যা করাও যথেষ্ট হয় না, বরং নির্দেশ হল, পাথর মেরে মেরে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। যাতে সে সমাজে (অন্যদের জন্য) শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায়। সেহেতু এখানে বলা হয়েছে, ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। অর্থাৎ, তাতে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণ থেকেও দূরে থাক। যেমন, 'গায়ের মাহরাম' (যার সাথে বিবাহ হারাম নয় এমন বেগানা) নারীকে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তার সাথে অবাধ মেলামেশার ও কথা বলার পথ সুগম করা। অনুরূপ মহিলাদের সাজ-সজ্জা করে বেপর্দার সাথে বাড়ী থেকে বের হওয়া ইত্যাদি যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা জরুরী। যাতে এই ধরনের অশ্লীলতা থেকে বাঁচা যায়।
আল-ইসরা 17:33
আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না; [১] কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত। [২]
[১] যথার্থ কারণে হত্যাঃ যেমন হত্যার বদলে হত্যা করা। যাকে মানুষের জীবন এবং নিরাপত্তার ও শান্তির কারণ গণ্য করা হয়েছে। অনুরূপ বিবাহিত ব্যভিচারীকে এবং মুরতাদ (ধর্মত্যাগী)-কে হত্যা করার নির্দেশ আছে।
[২] অর্থাৎ, নিহতের উত্তরাধিকারীদের এ অধিকার বা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, তারা হত্যাকারীকে ক্ষমতাসীন শাসক কর্তৃক শরীয়তী ফায়সালার পর খুনের বদলে খুন নিয়ে তাকে হত্যা করবে অথবা তার নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করবে কিংবা তাকে ক্ষমা করে দেবে। আর যদি খুনের বদলে খুনই করতে চায়, তবে তাতে যেন বাড়াবাড়ি না করে। অর্থাৎ, একজনের পরিবর্তে দু'জনকে যেন হত্যা না করে অথবা তার যেন অঙ্গবিকৃতি না ঘটায় অথবা নানা কষ্ট দিয়ে যেন তাকে হত্যা না করে। নিহতের ওয়ারেস 'সাহায্যপ্রাপ্ত' অর্থাৎ, নেতা ও শাসকদেরকে তার সাহায্য করার তাকীদ করা হয়েছে। কাজেই এর জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। বাড়াবাড়ি করে তাঁর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নয়।
আল-ইসরা 17:34
সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না।[১] আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। [২]
[১] অবৈধভাবে কারো জান নষ্ট করতে নিষেধ করার পর এখানে মাল নষ্ট করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আর ইয়াতীমের মালের ব্যাপারটা যেহেতু বেশী গুরুতত্ত্বপূর্ণ তাই বললেন, ইয়াতীমের সাবালক হওয়া পর্যন্ত তার মালকে এমন কাজে লাগাও যাতে তার লাভ হয়। চিন্তা-ভাবনা না করেই এমন ব্যবসায় লাগিয়ে দিও না, যাতে তা (মাল) নষ্ট হয়ে যায় অথবা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কিংবা সাবালক হওয়ার পূর্বেই তার মাল নিঃশেষ হয়ে যায়।
[২] 'প্রতিশ্রুতি' বা অঙ্গীকার বলতে সেই অঙ্গীকার যা আল্লাহ ও বান্দাদের মধ্যে রয়েছে এবং সেই অঙ্গীকারও যা বান্দাগণ আপোসে একে অপরের সাথে করে থাকে। উভয় অঙ্গীকার পূরণ করা জরুরী। পক্ষান্তরে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কাল কিয়ামতে জিজ্ঞাসিত হতে হবে এবং সে ব্যাপারে কৈফিয়ত দিতে হবে।
আল-ইসরা 17:35
মেপে দেয়ার সময় পূর্ণরূপে মাপো এবং সঠিক দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন কর, এটাই উত্তম[১] ও পরিণামে উৎকৃষ্টতম।
[১] নেকীর দিক দিয়ে উত্তম। এ ছাড়াও মানুষের মাঝে বিশ্বস্ততা জন্মানোর জন্য ওজন ও মাপে ঈমানদারী (ব্যবসার জন্য) বড়ই ফলপ্রসূ।
আল-ইসরা 17:36
যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। [১] নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে। [২]
[১] قَفَا يَقْفُوْ এর অর্থ পিছনে পড়া। অর্থাৎ, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পিছনে পড়ো না। আন্দাজে কথা বলো না। অর্থাৎ, কারো প্রতি কুধারণা করো না। কারো ছিদ্রান্বেষণ করো না। অনুরূপ যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার উপর আমলও করো না।
[২] অর্থাৎ, যে জিনিসের পিছনে পড়বে, সে ব্যাপারে কানকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি শুনেছিল? চোখকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি দেখেছিল? এবং অন্তরকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে কি জেনেছিল? কারণ, এই তিনটিই হল জানার মাধ্যম। অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ এই অঙ্গগুলোকে বাকশক্তি দান করবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।
আল-ইসরা 17:37
ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না। [১]
[১] অহংকার ও দাম্ভিকতার সাথে চলা আল্লাহর নিকট অতীব অপছন্দনীয়। এই অপরাধের কারণেই কারূনকে তার প্রাসাদ ও ধন-ভান্ডার সমেত যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। (সূরা কাসাস ২৮:৮১ আয়াত) হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি দু'টি চাদর পরিধান করে অহংকারের সাথে চলছিল। ফলে তাকে যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত ধসেই যেতে থাকবে। (মুসলিমঃ কিতাবুল লিবাস, পরিচ্ছেদঃ দম্ভভরে যমীনে চলা হারাম---) মহান আল্লাহ বিনয় ও নম্রতা পছন্দ করেন।
আল-ইসরা 17:38
এ সবের মধ্যে যেগুলি মন্দ সেগুলি তোমার প্রতিপালকের নিকট ঘৃণ্য। [১]
[১] অর্থাৎ, যে কথাগুলো উল্লেখ করা হল, তার মধ্যে যেগুলো মন্দ ও নিষিদ্ধ তা অপছন্দনীয় ও ঘৃণ্য।
আল-ইসরা 17:39
তোমার প্রতিপালক অহী (প্রত্যাদেশ) দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলি তার অন্তর্ভুক্ত; তুমি আল্লাহর সাথে কোন উপাস্য স্থির করো না, করলে তুমি নিন্দিত ও আল্লাহর অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
আল-ইসরা 17:40
তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে পুত্র সন্তানের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি নিজে ফিরিশতাদেরকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছেন? তোমরা তো নিশ্চয়ই বিরাট কথা বলে থাকো।
আল-ইসরা 17:41
এই কুরআনে বহু কথাই আমি বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত করেছি,[১] যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে; কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।
[১] 'বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত' করার অর্থ, কখনো ওয়াজ ও নসীহত রূপে, কখনো প্রমাণাদি পেশ করে, আশা দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে এবং বহু দৃষ্টান্ত ও উপমা দিয়ে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী উল্লেখ করে বিভিন্নভাবে একই কথা বারবার বিবৃত হয়েছে; যাতে মানুষ বুঝতে ও উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তারা কুফরী ও শিরকের অন্ধকারে এমনভাবে ডুবে আছে যে, তারা সত্যের নিকটবর্তী হওয়ার পরিবর্তে তা হতে আরো দূরে সরে গেছে। কারণ, তারা মনে করে যে, এই কুরআন যাদু, গণকের কথা এবং কবির কাব্যগ্রন্থ। অতএব এই কুরআন থেকে কিভাবে তারা সুপথ পেতে পারে? কেননা, কুরআনের দৃষ্টান্ত হল বৃষ্টির মত। যদি তা (বৃষ্টি) উর্বর ভূমিতে বর্ষায়, তবে তার দ্বারা শস্য-শ্যামল ভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু যদি তা কোন নোংরা ভূমিতে পড়ে, তবে বৃষ্টির কারণে তার দুর্গন্ধ আরো বেড়ে যায়।
আল-ইসরা 17:42
বল, তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে আরো উপাস্য থাকত, তবে তারা আরশ অধিপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার উপায় অন্বেষণ করত। [১]
[১] এর একটি অর্থ হল এই যে, যেভাবে একজন বাদশাহ অন্য বাদশাহর উপর সসৈন্যে আক্রমণ করে তার উপর বিজয় ও আধিপত্য অর্জন করার চেষ্টা করে, ঠিক এইভাবে এই দ্বিতীয় উপাস্যও আল্লাহর উপর জয়যুক্ত হওয়ার পথ অন্বেষণ করত। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ রকম হয়নি। অথচ বহু শতাব্দী ধরে এই উপাস্যগুলোর পূজা হয়ে আসছে। যার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্যই নেই। কোন ক্ষমতাবান সত্তাই নেই। কোন ইষ্টানিষ্টের মালিক নেই। দ্বিতীয় অর্থ হল, তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে নিত এবং এই মুশরিকরা যারা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, এদের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে, এদেরকেও এই উপাস্যগুলো আল্লাহর নৈকট্য দান করত।
আল-ইসরা 17:43
তিনি পবিত্র, মহিমার্নিত এবং তারা যা বলে, তা হতে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রকৃত ব্যাপার হল এই যে, আল্লাহ সম্পর্কে এই লোকেরা যে বলে, তাঁর শরীক আছে, মহান আল্লাহ এই সমস্ত কথাবার্তা থেকে পাক-পবিত্র ও অনেক ঊর্ধ্বে।
আল-ইসরা 17:44
সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং ওদের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু ওদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। [১] নিশ্চয় তিনি অতীব সহনশীল, অত্যন্ত ক্ষমাশীল।
[১] অর্থাৎ, সকলেই তাঁর অনুগত এবং তারা স্ব স্ব নিয়মে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণায় ও প্রশংসায় লিপ্ত আছে। যদিও আমরা তাদের পবিত্রতা ঘোষণা ও প্রশংসা করার কথা বুঝতে পারি না। এর সমর্থন কুরআনের আরো কিছু আয়াত দ্বারাও হয়। যেমন, দাঊদ (আঃ)-এর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,﴿إِنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ﴾ অর্থাৎ, আমি পর্বতসমূহকে তাঁর অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সাথে পবিত্রতা ঘোষণা করত। (সূরা সাদ ৩৮:১৮ আয়াত) কোন কোন পাথরের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ﴾ অর্থাৎ, কোন কোন পাথর আল্লাহর ভয়ে খসে পড়ে। (সূরা বাকারাহ ২:৭৪ আয়াত) কোন কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত যে, তাঁরা রসূল (সাঃ)-এর সাথে খাবার খাওয়ার সময় খাবার থেকে 'তসবীহ' পড়ার ধ্বনি শুনেছেন। (বুখারী, কিতাবুল মানাকিব ৩৫৭৯ নং) অপর একটি হাদীসে এসেছে যে, পিঁপড়েরাও আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। (বুখারী ৩০১৯, মুসলিম ১৭৫৯নং) অনুরূপ খেজুর গাছের যে গুঁড়িতে হেলান দিয়ে রসূল (সাঃ) খুৎবা দিতেন, যখন কাঠের মিম্বর তৈরী হল এবং সেই গুঁড়িকে তিনি ত্যাগ করলেন, তখন তা থেকে শিশুর মত কান্নার শব্দ এসেছিল। (বুখারী ৩৫৮৩ নং) মক্কায় একটি পাথর ছিল, যে রসূল (সাঃ)-কে সালাম দিত। (মুসলিম ১৭৮২ নং) এই আয়াত এবং হাদীসসমূহ হতে স্পষ্ট হয় যে, জড় পদার্থ এবং উদ্ভিদ জিনিসের মধ্যেও এক বিশেষ ধরনের অনুভূতি (জীবন) আছে, যদিও তা আমরা বুঝতে পারি না। তারা কিন্তু এই অনুভূতির ভিত্তিতে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ, প্রামাণ্য তসবীহ। অর্থাৎ, এই জিনিসগুলো প্রমাণ করে যে, সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা এবং সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান কেবল মহান আল্লাহ। وَفِي كُلِّ شَيْءٍ لَهُ آيَةٌ * تَدُلُّ عَلَى أَنَّهُ وَاحِدٌ 'প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে রয়েছে নিদর্শন, যা প্রমাণ করে যে, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। (শুআবুল ঈমান বাইহাকী) তবে সঠিক কথা এটাই যে, 'তসবীহ' তার প্রকৃত ও মূল অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
আল-ইসরা 17:45
তুমি যখন কুরআন পাঠ কর, তখন তোমার ও যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের মধ্যে এক আবরক পর্দা করে দিই। [১]
[১] مَسْتُوْرٌ অর্থ হল سَاتِر (আবরক বা অন্তরাল) অথবা مستور عن الأبصار (চোখের অন্তরালে) তাই তারা তা দেখে না। এ ছাড়াও তাদের ও হিদায়াতের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়।
আল-ইসরা 17:46
আমি তাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়েছি, যেন তারা উপলব্ধি করতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা দিয়েছি। আর যখন তুমি তোমার প্রতিপালকের একত্বের কথা কুরআনে উল্লেখ কর, তখন তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে সরে পড়ে। [১]
[১] أَكِنَّةٌ হল, كِنَانٌ এর বহুবচন। এমন পর্দা, যা অন্তঃকরণে পড়ে। وَقْرٌ কানের এমন বোঝা বা ছিদ্র বন্ধ করার এমন জিনিস যা কুরআন শোনার পথে প্রতিবন্ধক হয়। অর্থাৎ, তাদের অন্তর কুরআন উপলব্ধি করতে অক্ষম এবং কান কুরআন শুনে হিদায়াত লাভ করতে অপারগ। আর আল্লাহর তাওহীদকে তারা এত ঘৃণা করে যে, তা শুনে পালিয়ে যায়। আল্লাহর সাথে এই কাজগুলোর সম্পর্ক কেবল সৃষ্টির দিক দিয়ে, অন্যথা হিদায়াত থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়া তাদেরই অবাধ্যতার ফল।
আল-ইসরা 17:47
যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শোনে, তখন তারা কেন কান পেতে তা শোনে তা আমি ভাল করে জানি এবং এটাও জানি যে, গোপনে আলোচনাকালে সীমালংঘনকারীরা বলে, ‘তোমরা তো এক যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছ।’ [১]
[১] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-কে এরা যাদুগ্রস্ত মনে করে এবং এই মনে করেই কুরআন শোনে ও আপোসে গোপনে আলোচনা করে, ফলে হিদায়াত থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।
আল-ইসরা 17:48
দেখ, তারা তোমার কি উপমা দেয়! তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না। [১]
[১] কখনো যাদুকর, কখনো যাদুগ্রস্ত, কখনো উন্মাদ এবং কখনো জ্যোতিষী বলে আখ্যায়িত করে। আর এইভাবে তারা ভ্রষ্টতায় রয়েছে। সুতরাং হিদায়াতের পথ তারা কিভাবে পেতে পারে?
আল-ইসরা 17:49
তারা বলে, ‘আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?’
আল-ইসরা 17:50
বল, ‘তোমরা হয়ে যাও পাথর অথবা লোহা। [১]
[১] যা মাটি ও হাড় থেকেও শক্ত; যাতে জীবন সঞ্চার করা অতি কঠিন।
আল-ইসরা 17:51
অথবা এমন কোন সৃষ্টি যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন।’[১] তারা বলবে, ‘কে আমাদেরকে পুনরুত্থিত করবে?’ বল, ‘তিনিই যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।’ অতঃপর তারা তোমার সামনে মাথা নাড়বে[২] ও বলবে, ‘ওটা কবে?’ বল, ‘সম্ভবতঃ তা নিকটেই।[৩]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের জানা মতে এর থেকেও অধিক শক্ত জিনিস হয়ে যাও এবং তারপর জিজ্ঞাসা কর যে, কে জীবিত করবে?
[২] أَنْغَضَ يُنْغِضُ এর অর্থ হল, মাথা নাড়া। অর্থাৎ, বিদ্রূপ স্বরূপ মাথা নেড়ে তারা বলবে, পুনর্জীবন কখন হবে?
[৩] নিকটেই বলতে যা সংঘটিত হবেই। যেহেতু كُلُّ مَا هُوَ آتٍ فَهُوَ قَرِيْبٌ ঘটবে এমন প্রত্যেকটি জিনিসই নিকটে। عَسى (সম্ভবতঃ) শব্দটিও কুরআনে নিশ্চিত ও অবশ্যম্ভাবীর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটন সুনিশ্চিত ও অবশ্যম্ভাবী।
আল-ইসরা 17:52
যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহবান করবেন[১] এবং তোমরা প্রশংসার সাথে তাঁর আহবানে সাড়া দিবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে?’ [২]
[১] 'আহবান করবেন' এর অর্থ, কবর থেকে জীবিত করে তাঁর সমীপে উপস্থিত করবেন। তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তাঁর আজ্ঞা পালন করবে অথবা তাঁকে তোমরা চিনে নিয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে যাবে।[২] সেখানে দুনিয়ার এই জীবন-কাল অতি অল্প মনে হবে। ﴿كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا﴾ "যেদিন তারা কিয়ামত দেখবে, সেদিন মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছিল।" (সূরা নাযিআত ৭৯:৪৬) এই বিষয়কে অন্যান্য আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, সূরা ত্বহার ২০:১০২-১০৪ নং, সূরা রূমের ৩০:৫৫ নং এবং সূরা মু'মিনূনের ২৩:১১২-১১৪ নং আয়াতে। কেউ কেউ বলেছেন যে, প্রথমবার ফুঁ মারা হবে, তখন সমস্ত মৃত কবরসমূহে জীবিত হয়ে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় ফুঁ মারা হলে, হিসাব-নিকাশের জন্য হাশরের মাঠে একত্রিত হয়ে যাবে। উভয় ফুঁকের মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান হবে। আর এই দিনগুলোতে তাদেরকে আযাব দেওয়া হবে না। তখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে। দ্বিতীয় ফুঁকে উঠে বলবে, "হায় আমাদের দুর্ভোগ, কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫২) (ফাতহুল কাদীর) তবে প্রথম কথাটিই বেশী সঠিক।
আল-ইসরা 17:53
আমার দাসদেরকে বল, তারা যেন সেই কথা বলে যা উত্তম।[১] নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; [২] নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শক্র ।
[১] অর্থাৎ, আপোসে কথোপকথনের সময় জিহ্বাকে যেন সাবধানে ব্যবহার করে। যেন ভালো কথা বলে। অনুরূপ কাফের, মুশরিক এবং কিতাবধারীদেরকে সম্বোধন করার প্রয়োজন দেখা দিলে, তাদের সাথে করুণাসিক্ত কণ্ঠে ও নরমভাবে কথা বলবে।
[২] তোমাদের প্রকাশ্য ও চিরশত্রু শয়তান তোমাদের জিভের সামান্যতম বিচ্যুতি দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করতে পারে অথবা কাফের ও মুশরিকদের অন্তরে তোমাদের প্রতি আরো বেশী বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভরে দিতে পারে। হাদীসে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যেন তার কোন ভাই (মুসলমান)এর প্রতি অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত না করে। কেননা, সে জানে না, হতে পারে শয়তান তার হাত দ্বারা সেই অস্ত্র চালিয়ে দেবে। (এবং তা সেই মুসলিম ভাইকে গিয়ে লাগবে এবং এতে তার মৃত্যু হয়ে যাবে।) আর এর কারণে সে জাহান্নামের গহ্বরে গিয়ে পড়বে।" (বুখারীঃ কিতাবুল ফিতান, মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র্)
আল-ইসরা 17:54
তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে ভালোভাবে জানেন; ইচ্ছা করলে তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন এবং ইচ্ছা করলে তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন।[১] আর আমি তোমাকে তাদের উপর দায়িত্বশীল করে পাঠাইনি। [২]
[১] যদি সম্বোধন মুশরিকদেরকে করা হয়ে থাকে, তবে 'দয়া করা'র অর্থ হবে, ইসলাম গ্রহণের তওফীক দান। আর শাস্তি বলতে, মৃত্যু শিরকের উপর হওয়া, যার কারণে মানুষ শাস্তিযোগ্য গণ্য হয়। আর যদি সম্বোধন মু'মিনদের করা হয়ে থাকে, তাহলে 'দয়া করা'র অর্থ হবে, তিনি কাফেরদের থেকে তোমাদেরকে হিফাযত করবেন। আর শাস্তি দেওয়ার অর্থ হবে, কাফেরদেরকে মুসলিমদের উপর বিজয় ও আধিপত্য দান করা।
[২] যাতে তুমি তাদেরকে অবশ্যই কুফরীর পঙ্কিলতা থেকে বের করবে অথবা তাদের কুফরীর উপর অটল থাকার ফলে সে ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
আল-ইসরা 17:55
যারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে আছে তাদেরকে তোমার প্রতিপালক ভালভাবে জানেন। আমি তো নবীদের কতককে কতকের উপর মর্যাদা দিয়েছি। [১] আর দাঊদকে আমি যাবূর দিয়েছি।
[১] এই বিষয়টা ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ﴾ (البقرة: ২৫৩) আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। এখানে মক্কার কাফেরদের উত্তরে বিষয়টার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। তারা বলত যে, আল্লাহ কি তাঁর রিসালতের জন্য এই মুহাম্মাদকেই পেয়েছেন? তখন মহান আল্লাহ তাদের উত্তরে বললেন, কাউকে রিসালাতের জন্য নির্বাচন করা এবং কোন এক নবীকে অপর নবীর উপর প্রাধান্য দেওয়া এ সব কেবল তাঁরই এখতিয়ারাধীন।
আল-ইসরা 17:56
বল, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে উপাস্য মনে কর, তাদেরকে আহবান কর; করলে দেখবে তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করবার অথবা পরিবর্তন করবার শক্তি তাদের নেই।
আল-ইসরা 17:57
তারা যাদেরকে আহবান করে, তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকট হতে পারে, তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে; [১] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ।
[১] উল্লিখিত আয়াতে مِنْ دُوْنِ اللهِ বলতে, ফিরিশতা এবং বড়দের সেই নির্মিত ও অঙ্কিত মূর্তি, যাদের তারা ইবাদত করত। অথবা উযায়ের ও ঈসা (আঃ) যাঁদেরকে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানরা আল্লাহর পুত্র ভাবত এবং তাঁদেরকে আল্লাহর গুণাবলীর অধিকারী মনে করত। কিংবা সেই জীনরা যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং মুশরিকরা যাদের পূজা করত। কারণ, এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, এরা নিজেরাই তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের খোঁজে থাকে, তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে। আর এই গুণ জড়পদার্থের (পাথরের) হতে পারে না। এই আয়াত থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, مِنْ دُوْنِ اللهِ (আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা করা হত) তারা কেবল পাথরের মূর্তিই ছিল না। বরং আল্লাহর বান্দারাও ছিল। তাদের মধ্যে কিছু ছিলেন ফিরিশতাগণ, কিছু সৎলোকগণ, কিছু নবীগণ এবং কিছু জীন। মহান আল্লাহ সকলের ব্যাপারে বললেন যে, তারা কিছুই করতে পারে না; না কারো কষ্ট দূর করতে পারে, আর না কারো অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। "তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে" অর্থাৎ, সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য খোঁজ করে। এটাই হল অসীলা (মাধ্যম), যা অনুসন্ধান করতে কুরআন আদেশ করেছে। সেটা অসীলা নয়, যা কবর পূজারীরা বয়ান করে যে, (পীর ধর, উকিল ধর), (মৃত) আওলিয়ার নামে নজরানা দাও, তাদের কবরে চাদর চড়াও, উরস কর, মেলা বসাও, তাদের কাছে সাহায্য চাও ও ফরিয়াদ কর। কেননা, এ সব অসীলা নয়, বরং তাদের ইবাদত যা শিরক। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলিমকে এ থেকে রক্ষা করুন!
আল-ইসরা 17:58
এমন কোন জনপদ নেই, যা আমি কিয়ামতের দিনের পূর্বে ধ্বংস করব না অথবা যাকে কঠোর শাস্তি দেব না; এটা তো কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। [১]
[১] 'কিতাব' বলতে লাওহে মাহফুযকে বুঝানো হয়েছে। অর্থ হল, আল্লাহর পক্ষ হতে এ কথা নির্ধারিত যা লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ যে, আমি কাফেরদের প্রত্যেক বস্তিকে মৃত্যুর মাধ্যমে ধ্বংস করব। আর 'জনপদ' বলতে জনপদবাসীরা উদ্দেশ্য। আর তাদের ধ্বংসের কারণ হবে তাদের কুফরী, শিরক, অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন। আর সে ধ্বংস সাধিত হবে কিয়ামতের পূর্বেই। নচেৎ কিয়ামতের দিন তো নির্বিশেষে প্রত্যেক বস্তিই ধ্বংসের শিকার হবে।
আল-ইসরা 17:59
পূর্ববর্তিগণ কর্তৃক নিদর্শন মিথ্যাজ্ঞান করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হতে বিরত রাখে।[১] আর আমি স্পষ্ট নিদর্শনস্বরূপ সামূদকে উটনী দিয়েছিলাম; কিন্তু তারা তার প্রতি যুলুম করেছিল।[২] আসলে আমি ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি।
[১] এই আয়াত তখন অবতীর্ণ হয়, যখন মক্কার কাফেররা দাবী করল যে, সাফা পাহাড়কে সোনার পাহাড় বানিয়ে দেওয়া হোক অথবা মক্কার পাহাড়গুলোকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক যাতে সেখানে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। এরই উত্তরে মহান আল্লাহ জিবরীল (আঃ)-এর মাধ্যমে বার্তা পাঠালেন যে, আমি তাদের সমস্ত দাবী পূরণ করার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু এর পরও যদি তারা ঈমান না আনে, তবে তাদের ধ্বংস সুনিশ্চিত। এর পর তাদেরকে আর অবকাশ দেওয়া হবে না। নবী করীম (সাঃ) এ কথা পছন্দ করলেন যে, তাদের দাবীগুলো পূরণ না করা হোক। যাতে তারা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে যায়। (আহমাদ ১/২৫৮) এই আয়াতেও আল্লাহ তাআলা এই বিষয়টাকেই বর্ণনা করে বলেন যে, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নিদর্শনসমূহ অবতীর্ণ করা আমার জন্য কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু আমি তা করা থেকে এই জন্য বিরত থাকি যে, পূর্বের জাতিরাও তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নিদর্শনসমূহ দাবী করেছিল যা তাদেরকে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা মিথ্যা ভেবে ঈমান আনেনি। যার ফলস্বরূপ তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
[২] সামুদ সম্প্রদায়কে দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, তাদের চাহিদা মোতাবেক শক্ত পাথর থেকে উটনী বের করে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু এই অত্যাচারীরা ঈমান আনার পরিবর্তে সেই উটনীকে হত্যা করে দেয়। যার কারণে তিনদিন পর তাদের উপর সর্বনাশী আযাব আসে।
আল-ইসরা 17:60
(স্মরণ কর,) যখন আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন।[১] আর আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ শুধু মানুষের পরীক্ষার জন্যই।[২] আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের তীব্র অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে। [৩]
[১] অর্থাৎ, মানুষ আল্লাহর আধিপত্য ও তাঁর আয়ত্তাধীনে রয়েছে এবং তিনি যা চাইবেন, তা-ই হবে। তারা যা চাইবে, তা নয়। অথবা এ থেকে মক্কাবাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে যে, তারা আল্লাহর অধীনস্থ। তুমি কোন প্রকার ভয় না করে রিসালাতের দাওয়াত দিয়ে যাও। তারা তোমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আমি তাদের হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করব। কিংবা এখানে বদর যুদ্ধে এবং মক্কা বিজয়ের দিন মক্কার কাফেররা যে শিক্ষামূলক পরাজয়ের শিকার হয়েছিল, সেটাকেই তুলে ধরা হয়েছে।[২] সাহাবা ও তাবেঈনগণ এই দৃশ্যের ব্যাখ্যা করেছেন, চাক্ষুষ দর্শন এবং এ থেকে মি'রাজের ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। এ ঘটনা অনেক দুর্বল ঈমানের লোকদের জন্য ফিতনার কারণ হয়েছে এবং তারা মুরতাদ হয়ে গেছে। আর 'বৃক্ষ' বলতে যাক্কুম গাছ, যা মি'রাজের রাতে রসূল (সাঃ) জাহান্নামে দেখেছেন। المَلْعُوْنَةَ (অভিশপ্ত) বলতে, ভক্ষণকারী। অর্থাৎ, সেই গাছ যা অভিশপ্ত জাহান্নামীরা ভক্ষণ করবে। যেমন, অন্যত্র এসেছে, {إِنَّ شَجَرَةَ الزَّقُّومِ* طَعَامُ الْأَثِيمِ} "অবশ্যই যাক্কুম বৃক্ষ পাপীর খাদ্য হবে।" (সূরা দুখান ৪৪:৪৩-৪৪ আয়াত)[৩] অর্থাৎ, যেহেতু কাফেরদের অন্তরে কূটবুদ্ধি ও শত্রুতা রয়েছে, যার কারণে নিদর্শনসমূহ দেখা সত্ত্বেও ঈমান আনার পরিবর্তে তাদের অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন আরো বেড়ে যায়।
আল-ইসরা 17:61
(স্মরণ কর,) যখন আমি ফিরিশতাদেরকে বললাম, ‘আদমের প্রতি সিজদাবনত হও’; তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদাবনত হল; সে বলল, ‘আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে তুমি কাদা-মাটি হতে সৃষ্টি করেছ?’
আল-ইসরা 17:62
সে (আরো) বলল, ‘বল, এই যাকে তুমি আমার উপর মর্যাদা দান করলে, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দাও, তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরকে অবশ্যই আয়ত্তে করে নেব।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে নেব এবং যেভাবে চাইব তাদেরকে ভ্রষ্ট করব। অবশ্য কিছু লোক আমার ধোঁকা থেকে বেঁচে যাবে। (এর দ্বিতীয় অর্থঃ তাদেরকে সমূলে নষ্ট করে ফেলব।) আদম (আঃ) ও ইবলীসের এই ঘটনা ইতিপূর্বে সূরা বাকারাহ, আ'রাফ এবং সূরা হিজরে অতিবাহিত হয়েছে। এখানে চতুর্থবার সেটাকে উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সূরা কাহ্ফ, ত্বহা , এবং সূরা সা'দেও এর উল্লেখ হবে।
আল-ইসরা 17:63
আল্লাহ বললেন, ‘যাও! তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, তাদের ও তোমাদের সকলের জন্য জাহান্নামই হল পরিপূর্ণ শাস্তি।
আল-ইসরা 17:64
তোমার আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্যে যাকে পার সত্যচ্যুত কর, [১] তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর[২] এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যাও[৩] ও তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও।[৪] আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনা মাত্র। [৫]
[১] 'আওয়াজ' বলতে প্রতারণামূলক আহবান অথবা গান-বাজনা ও রঙ-তামাশার আরো অন্যান্য শব্দ। যার মাধ্যমে শয়তান অধিকহারে লোকদেরকে ভ্রষ্ট করছে।
[২] এই বাহিনী বলতে, মানুষ ও জীনদের মধ্য থেকে সেই অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী যারা শয়তানের চেলা ও তার অনুসারী। এরাও শয়তানের মত মানুষকে ভ্রষ্ট করে। অথবা এর অর্থ, প্রত্যেক সম্ভাব্য উপায়-উপকরণ যা শয়তান ভ্রষ্ট করার কাজে ব্যবহার করে।
[৩] ধন-মালে শয়তানের অংশ গ্রহণের অর্থ হল, অবৈধ পন্থায় মাল উপার্জন করা এবং হারাম পথে তা ব্যয় করা। অনুরূপ মূর্তির নামে পশু উৎসর্গ করা। যেমন, বুহায়রা, সায়েবাহ ইত্যাদি। সন্তান-সন্ততিতে শরীক হওয়ার অর্থ, ব্যভিচার করা, আব্দুল লাত, আব্দুল উয্যা প্রভৃতি নাম রাখা, অনৈসলামী আদব-কায়দায় তাদের লালন-পালন করা, যাতে তারা দুশ্চরিত্র হয়, অভাবের ভয়ে তাদেরকে হত্যা করা অথবা জীবন্ত প্রোথিত করা, সন্তানদেরকে অগ্নিপূজক, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ইত্যাদি অমুসলিম (বা বেদ্বীন) বানানো এবং মাসনুন দু'আ না পড়েই স্ত্রী-সহবাস করা ইত্যাদি।
[৪] প্রতিশ্রুতি দাও যে, জান্নাত ও জাহান্নাম বলে কিছু নেই। অথবা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন নেই ইত্যাদি।
[৫] غُرُوْرٌ (ছলনা) এর অর্থ হল, মন্দ কাজকে এমন চমৎকার শোভনীয় করে তুলে ধরা যে, দেখে তা ভাল মনে হয়।
আল-ইসরা 17:65
আমার দাসদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই।[১] আর কর্মবিধায়ক হিসাবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।’ [২]
[১] বান্দাদেরকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন তাদের মর্যাদা ও সম্মান প্রকাশের উদ্দেশ্যে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর বিশেষ বান্দাদেরকে শয়তান ধোকায় ফেলতে সফল হয় না।
[২] অর্থাৎ, যে প্রকৃতার্থে আল্লাহর বান্দা হয়ে যায়, তাঁরই উপর ভরসা ও আস্থা রাখে, আল্লাহও তার বন্ধু ও সাহায্যকারী হয়ে যান।
আল-ইসরা 17:66
তোমাদের প্রতিপালক তিনিই, যিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রে জলযান পরিচালিত করেন, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার; তিনি তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। [১]
[১] এটা তাঁর দয়া ও রহমত যে, তিনি সমুদ্রকে মানুষের আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন। তারা তার পৃষ্ঠে নৌকা ও জাহাজ চালিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। অনুরূপ তিনি এমন সব জিনিসের প্রতি (মানুষের) দিকনির্দেশনাও করেছেন, যাতে বান্দাদের জন্য আছে অজস্র লাভ ও উপকারিতা।
আল-ইসরা 17:67
সমুদ্রে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন শুধু তিনি ছাড়া অপর যাদেরকে তোমরা আহবান করে থাক, তারা অদৃশ্য হয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তোমাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।[১]
[১] এ বিষয়টা পূর্বেও কয়েক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে।
আল-ইসরা 17:68
তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, তিনি তোমাদেরকে স্থলে কোথাও ভূগর্ভস্থ করবেন না অথবা তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী ঝড় পাঠাবেন না?[১] আর তখন তোমরা তোমাদের কোন কর্মবিধায়ক পাবে না।
[১] অর্থাৎ, সমুদ্র থেকে (নিরাপদে) উত্তীর্ণ হওয়ার পর তোমরা যে আল্লাহকে ভুলে যাও, তোমরা কি জান না যে, তিনি স্থলেও তোমাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন? তিনি তোমাদেরকে যমীনে ধসিয়ে দিতে পারেন অথবা পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করে তোমাদের বিনাশ সাধন করতে পারেন; যেভাবে পূর্বের কিছু জাতিকে তিনি ধ্বংস করে দিয়েছেন।
আল-ইসরা 17:69
অথবা তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, তোমাদেরকে আর একবার সমুদ্রে নিয়ে যাবেন না এবং তোমাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঝটিকা পাঠাবেন না, অতঃপর প্রত্যাখ্যান করার জন্য তোমাদেরকে নিমজ্জিত করবেন না? আর তখন তোমরা এ বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে কোন সাহায্যকারী পাবে না। [১]
[১] قَاصِفٌ সমুদ্রের এমন প্রবল ঝটিকা যা জাহাজগুলোকে চুরমার করে ডুবিয়ে দেয়। تَبِيْعًا প্রতিশোধ গ্রহণকারী, কৈফিয়ত-তলবকারী বা সাহায্যকারী। অর্থাৎ, এমন কাউকে পাবে না, যে তোমাদের সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার পর আমাকে জিজ্ঞেস করবে যে, তুমি আমার ভক্তদেরকে কেন ডুবালে? তাছাড়া একবার সমুদ্র থেকে ভালোর সাথে রক্ষা পাওয়ার পর পুনরায় সমুদ্রে সফর করার প্রয়োজন তোমাদের হবে না কি? এবং সেখানে তোমাদেরকে পানির ঘূর্ণাবর্তের বিপদে ফাঁসাতে পারবেন না কি?
আল-ইসরা 17:70
আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি,[১] স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি;[২] তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছি[৩] এবং যাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের উপর তাদেরকে যথেষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। [৪]
[১] এই মর্যাদা ও অনুগ্রহ মানুষ হিসাবে প্রত্যেক মানুষ পেয়েছে; তাতে সে মুমিন হোক অথবা কাফের। কেননা, এ মর্যাদা অন্য সৃষ্টিকুল, জীবজন্তু, জড়পদার্থ ও উদ্ভিদ ইত্যাদির তুলনায়। আর এ মর্যাদা বিভিন্ন দিক দিয়ে। যে আকার-আকৃতি, এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক গঠন ও ধরন মহান আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন, তা অন্য কোন সৃষ্টি পায়নি। যে জ্ঞান মানুষকে দেওয়া হয়েছে, যার দ্বারা তারা নিজেদের আরাম ও আয়েশের জন্য অসংখ্য জিনিস আবিষ্কার করেছে, জীবজন্তু ইত্যাদি তা থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া এই জ্ঞান দ্বারা তারা ঠিক-বেঠিক, উপকারী-অপকারী এবং ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম। এই জ্ঞান দ্বারা তারা আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিকুল থেকে উপকৃত হয় এবং তাদেরকে নিজেদের বশে রাখে। এই জ্ঞান ও মেধারই মাধ্যমে তারা এমন অট্টালিকা নির্মাণ করে, এমন পোশাক আবিষ্কার করে এবং এমন সব জিনিস বানায় যা তাদেরকে গ্রীষ্মের তাপ, শীতের ঠান্ডা এবং মৌসুমের অন্যান্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। অনুরূপ বিশ্বজাহানের সমস্ত জিনিসকে মহান আল্লাহ মানুষের সেবায় লাগিয়ে রেখেছেন। চাঁদ, সূর্য, হাওয়া, পানি এবং অন্যান্য অসংখ্য জিনিস রয়েছে যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
[২] স্থলে ঘোড়া, খচ্চর, গাধা, উট এবং নিজেদের তৈরী করা (ট্রেন, মোটরগাড়ী, উড়োজাহাজ, সাইকেল এবং মোটর সাইকেল ইত্যাদি) বাহনে আরোহণ করে এবং সমুদ্রে রয়েছে নৌকা ও জলজাহাজ যাতে তারা আরোহণ করে এবং পণ্যসামগ্রী আমদানি-রফতানি করে।
[৩] মানুষের পানাহারের জন্য যেসব খাদ্য জাতীয় দ্রব্য শস্য ও ফল-মূলাদি তিনি উৎপন্ন করেছেন এবং তাতে যে স্বাদ, তৃপ্তি এবং শক্তি নিহিত রেখেছেন, রকমারি এই খাদ্য, সুস্বাদু ও মজাদার ফলমূল, শক্তিবর্ধক ও পরিতৃপ্তিকর উপাদেয় নানা যৌগিক খাদ্য ও পানীয়, চূর্ণিত, পিষ্ট ও খামির জাতীয় কত শত রকমের খাবার মানুষ ব্যতীত অন্য আর কোন্ সৃষ্টি পেয়েছে?
[৪] উল্লিখিত আলোচনা থেকে বহু সৃষ্টির উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা পরিষ্কার হয়ে যায়।
আল-ইসরা 17:71
(স্মরণ কর,) যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতা সহ[১] আহবান করব। যাদেরকে ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরের আঁটির ফাটলে সুতো বরাবর (সামান্য পরিমাণ)ও যুলুম করা হবে না। [২]
[১] إِمَامٌ এর অর্থ, পথপ্রদর্শক, নেতা ও পরিচালক। এখানে ইমাম বলতে কি বুঝানো হয়েছে? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, এ থেকে পয়গম্বর বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেক উম্মতকে তাদের নবীর মাধ্যমে ডাকা হবে। কেউ বলেন, এ থেকে আসমানী কিতাব বুঝানো হয়েছে যা নবীদের সাথে অবতীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ, হে তাওরাতধারী! হে ইঞ্জীলধারী! হে কুরআনধারী! ইত্যাদি বলে ডাকা হবে। কেউ বলেন, এখানে 'ইমাম' অর্থ, আমলনামা। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যখন ডাকা হবে, তখন তার আমলনামা তার সাথে থাকবে এবং সেই অনুযায়ী তার ফায়সালা হবে। এই উক্তিকে ইমাম ইবনে কাসীর এবং ইমাম শাওকানী প্রাধান্য দিয়েছেন।
[২] فَتِيْلٌ খেজুরের আঁটির ফাটলে অতি সূক্ষ্ণ ও পাতলা যে সুতো থাকে তাকেই 'ফাতীল' বলা হয়। উদ্দেশ্য, অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।
আল-ইসরা 17:72
যে লোক ইহলোকে অন্ধ, সে লোক পরলোকেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট। [১]
[১] أَعْمَى (অন্ধ) বলতে অন্তরের অন্ধ। অর্থাৎ, যে দুনিয়াতে সত্য দেখা হতে, বুঝা হতে এবং কবুল করা হতে বঞ্চিত থাকে, সে আখেরাতে অন্ধ হবে এবং প্রতিপালকের বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া থেকে বঞ্চিত থাকবে।
আল-ইসরা 17:73
আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি, তা হতে তারা তোমার পদস্খলন প্রায় ঘটিয়েই ফেলেছিল, যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে ওর বিপরীত কিছু মিথ্যা উদ্ভাবন কর; আর তা করলে, তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত।
আল-ইসরা 17:74
আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে তুমি তাদের দিকে কিছুটা প্রায় ঝুঁকে পড়তে। [১]
[১] এখানে সেই সুরক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ হতে নবীগণ লাভ করে থাকেন। এ থেকে জানা গেল যে, মুশরিকরা যদিও নবী (সাঃ)-কে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল, কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে তাদের আকর্ষণ থেকে বাঁচিয়ে নেন। ফলে তিনি সামান্য পরিমাণও তাদের প্রতি ঝুঁকে যাননি।
আল-ইসরা 17:75
তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে ইহজীবনে ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম,[১] আর তখন আমার বিরুদ্ধে তোমার জন্য কোন সাহায্যকারী পেতে না।
[১] এ থেকে জানা গেল যে, শাস্তির ভারও মান-মর্যাদা অনুযায়ী অধিক হয়।
আল-ইসরা 17:76
তারা তোমাকে স্বদেশ থেকে প্রায় উচ্ছেদ করেই ফেলেছিল সেথা হতে বহিস্কার করার জন্য; [১] তা করলে তোমার পর তারাও সেথায় অল্পকালই টিঁকে থাকত। [২]
[১] এতে সেই ষড়্যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা নবী (সাঃ)-কে মক্কা থেকে বহিষ্কার করার জন্য মক্কার কুরাইশরা করেছিল এবং যা থেকে মহান আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলেন।
[২] অর্থাৎ, নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি এরা তোমাকে মক্কা থেকে বের করে দিত, তবে এরাও তার পরে বেশী দিন (মক্কায়) থাকত না। অর্থাৎ, তারা সত্ত্বর আল্লাহর আযাবের হাতে ধরা খেত।
আল-ইসরা 17:77
আমার রসূলদের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদেরকে আমি পাঠিয়েছিলাম, তাদের ক্ষেত্রেও ছিল অনুরূপ নিয়ম। [১] আর তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন পাবে না। [২]
[১] অর্থাৎ, এই নিয়ম পূর্ব থেকেই চলে আসছে। তোমার পূর্ববর্তী রসূলদের ক্ষেত্রেও এই নিয়মই প্রয়োগ করা হয়েছে। যখন তাঁদের সম্প্রদায়রা তাঁদেরকে তাঁদের দেশ থেকে বের করে দিল অথবা বের হতে বাধ্য করল, তখন সেই জাতিরাও আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পায়নি।
[২] সুতরাং মক্কাবাসীদের সাথেও এটাই হয়েছে। রসূল (সাঃ)-এর হিজরতের দেড় বছর পরেই বদর প্রান্তে তারা শিক্ষামূলক লাঞ্ছনা ও পরাজয়ের শিকার হয় এবং ছয় বছর পর হিজরী ৮ম সনে মক্কাই বিজয় হয়ে যায়। আর এই লাঞ্ছনা ও পরাজয়ের পর তাদের আর মাথা তোলার মত কোন ক্ষমতা থাকল না।
আল-ইসরা 17:78
সূর্য হেলে পড়বার পর হতে রাত্রির ঘন অন্ধকার[১] পর্যন্ত নামায কায়েম কর এবং (কায়েম কর) ফজরের কুরআন (নামায); নিশ্চয় ফজরের কুরআন (নামায) পরিলক্ষিত হয় বিশেষভাবে। [২]
[১] دُلُوْكٌ এর অর্থ, ঢলা (সূর্যঢলা) এবং غسق এর অর্থ, অন্ধকার। সূর্য ঢলার পর যোহর ও আসরের নামায এবং রাতের অন্ধকার পর্যন্ত বলতে মাগরেব ও এশার নামায উদ্দেশ্য। আর قرآن الفجر বলতে ফজরের নামায। এখানে কুরআন অর্থ নামায। ফজরের নামাযকে কুরআন বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, ফজরে কিরাআত পাঠ লম্বা হয়। এইভাবে এই আয়াতে পাঁচঅক্ত নামাযের কথা মোটামুটিভাবে এসে যায়। আর এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা হাদীসসমূহে পাওয়া যায় এবং তা বহুধাসূত্রে বর্ণিত উম্মতের পরম্পরাগত আমল দ্বারাও সাব্যস্ত।[২] অর্থাৎ, এই সময় ফিরিশতাগণ উপস্থিত হন; বরং (এ সময়) দিনের ও রাতের ফিরিশতাগণ একত্রে মিলিত হন। যেমন, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী, সূরা বনী ইস্রাইলের তাফসীর) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাতের ফিরিশতাগণ যখন আল্লাহর নিকট যান, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেন -- অথচ তিনি ভালভাবে তা জানেন -- "তোমরা আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছ?" ফিরিশতাগণ বলেন, 'যখন আমরা তাদের কাছে গিয়েছিলাম, তখনও তারা নামাযে রত ছিল এবং যখন আমরা তাদের কাছ থেকে ফিরে এলাম, তখনও তারা নামাযে রত ছিল।'(বুখারী, কিতাবুল মাওয়াকীত, মুসলিম, পরিচ্ছেদঃ আসর ও ফজরের নামাযের ফযীলত---)
আল-ইসরা 17:79
আর রাত্রির কিছু অংশে তা দিয়ে[১] তাহাজ্জুদ[২] পড়; এটা তোমার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য।[৩] আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে। [৪]
[১] অর্থাৎ, কুরআন পড়ার মাধ্যমে।
[২] কেউ কেউ বলেন, تهجد শব্দটি সেই শ্রেণীভুক্ত শব্দ, যাতে বিপরীতমুখী দু' রকম অর্থ পাওয়া যায়। এর অর্থ ঘুমানোও হয়, আবার ঘুম থেকে জাগাও হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থেই ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, রাতে ঘুম থেকে ওঠো এবং নফল নামায পড়। কেউ বলেন, هجود এর প্রকৃত অর্থই হল, রাতে ঘুমানো। কিন্তু باب تفعُّل এর ছাঁচে পড়ে তাতে تجنب (বেঁচে থাকা) এর অর্থ সৃষ্টি হয়ে যায়। যেমন, إثم মানে পাপ, কিন্তু ঐ ছাঁচে পড়ে تَأَثُّم এর অর্থ হয়, পাপ থেকে বিরত বা বেঁচে থাকা। অনুরূপ تهجد এর অর্থ হবে, ঘুম থেকে বিরত বা বেঁচে থাকা। আর مُتَهَجِّدٌ হবে সে, যে রাতে না ঘুমিয়ে কিয়াম করে। মোট কথা তাহাজ্জুদের অর্থ হল, রাতের শেষ প্রহরে উঠে নফল নামায পড়া। সারা রাত قيام الليل (নামায) পড়া সুন্নতের বিপরীত। নবী (সাঃ) রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন এবং শেষাংশে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। আর এটাই হল সুন্নতী তরীকা।
[৩] কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, এটা একটি অতিরিক্ত ফরয, যা নবী (সাঃ)-এর জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এইভাবে তারা বলেন যে, নবী (সাঃ)-এর উপর তাহাজ্জুদের নামাযও ঐরূপ ফরয ছিল, যেমন পাঁচ অক্ত নামায ফরয ছিল। অবশ্য উম্মতের জন্য তাহাজ্জুদের নামায ফরয নয়। কেউ কেউ বলেন যে, نَافِلَةً (অতিরিক্ত) এর অর্থ হল, তাহাজ্জুদের এই নামায রসূল (সাঃ)-এর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত জিনিস। কারণ, তিনি হলেন, مغفور الذنب (পাপ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত)। পক্ষান্তরে উম্মতের জন্য উক্ত আমল এবং অন্যান্য সমস্ত নেক আমল পাপসমূহের কাফফারা হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, نَافِلَةً মানে নফলই। অর্থাৎ, এ নামায না রসূল (সাঃ)-এর উপর ফরয ছিল, আর না তাঁর উম্মতের উপর। এটি একটি অতিরিক্ত নফল ইবাদত, যার ফযীলত অবশ্যই অনেক। এই সময়ে আল্লাহ তাঁর ইবাদতে বড়ই সন্তুষ্ট হন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন, "রমযানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোযা হল আল্লাহর মাস মুহার্রমের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামায হল রাতের (তাহাজ্জুদের) নামায।" (মুসলিম ১১৬৩নং, আবু দাঊদ তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে খুযাইমাহ) তিনি বলেন, "জান্নাতের মধ্যে এমন একটি কক্ষ আছে, যার বাহিরের অংশ ভিতর থেকে এবং ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে।" তা শুনে আবু মালেক আশআরী (রাঃ) বললেন, 'সে কক্ষ কার জন্য হবে, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "যে ব্যক্তি উত্তম কথা বলে, অন্নদান করে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাযে রত হয়; তার জন্য।" (ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৬১১নং) তিনি বলেন, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যহ রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে নীচের আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, 'কে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার নিকট কিছু চাইবে? আমি তাকে দান করব। এবং কে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।" (বুখারী, মুসলিম, সুনান আরবাআহ, মিশকাত ১২২৩নং) তিনি বলেন, "তোমরা তাহাজ্জুদের নামাযে অভ্যাসী হও। কারণ, তা তোমাদের পূর্বতন নেক বান্দাদের অভ্যাস; তা তোমাদের প্রভুর নৈকট্যদানকারী ও পাপক্ষালনকারী এবং গোনাহ হতে বিরতকারী আমল।" (তিরমিযী, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৬১৮ নং)
[৪] এটা হল সেই স্থান, যা কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ নবী (সাঃ)-কে দান করবেন এবং সেই স্থানে সিজদায় পড়ে আল্লাহর অসীম প্রশংসা বর্ণনা করবেন। অতঃপর আল্লাহ জাল্লা শানুহ বলবেন, 'হে মুহাম্মাদ! মাথা তোল, কি চাও বল, তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, মঞ্জুর করা হবে।' তখন তিনি সেই বড় সুপারিশটি করবেন, যার পর লোকদের হিসাব-নিকাশ আরম্ভ হবে। (আশা এখানে নিশ্চিতের অর্থে।)
আল-ইসরা 17:80
বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে কল্যাণ সহ প্রবেশ করাও এবং কল্যাণ সহ বের কর। আর তোমার নিকট হতে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি।’ [১]
[১] কেউ কেউ বলেন, এটা হিজরতের সময় অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন নবী (সাঃ)-এর মক্কা থেকে বের হওয়ার এবং মদীনাতে প্রবেশ করার সময় উপস্থিত হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হল, সত্যের উপর আমার মৃত্যু দিও এবং সত্যের উপর আমাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করো। আবার কেউ কেউ বলেন, সত্যতার সাথে আমাকে কবরে প্রবিষ্ট করো এবং কিয়ামতের দিন সত্যতার সাথে আমাকে কবর থেকে বের করো ইত্যাদি। ইমাম শাওকানী বলেন, এটা যেহেতু দু'আ, বিধায় এর ব্যাপকতায় উল্লিখিত সব কথাই এসে যায়।
আল-ইসরা 17:81
আর বল, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলীন হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলীয়মান।’ [১]
[১] হাদীসে এসেছে যে, মক্কা বিজয়ের পর যখন নবী (সাঃ) কা'বাগৃহে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে তিনশ' ষাটটি মূর্তি রাখা ছিল। নবী (সাঃ)-এর হাতে ছিল একটি কাষ্ঠখন্ড বা লাঠি। তিনি তার ডগা দিয়ে মূর্তিগুলোকে খোঁচা দিচ্ছিলেন আর ﴿جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ﴾..। এবং ﴿ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ﴾ পড়ে যাচ্ছিলেন। (বুখারীঃ কিতাবুল মাযালিম, মুসলিমঃ কিতাবুল জিহাদ)
আল-ইসরা 17:82
আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। [১]
[১] এই অর্থই সূরা ইউনুসের ১০:৫৭ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। তার টীকা দ্রষ্টব্য।
আল-ইসরা 17:83
যখন আমি মানুষকে সম্পদ দান করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অহংকারে দূরে সরে যায়। আর তাকে অমঙ্গল স্পর্শ করলে সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে। [১]
[১] এতে মানুষের সেই বাস্তব অবস্থা ও পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যাতে তারা সাধারণতঃ সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতার সময় শিকার হয়ে থাকে। সচ্ছলতার সময় তারা আল্লাহকে ভুলে যায় এবং অসচ্ছল অবস্থায় তারা নিরাশ হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে ঈমানদারদের ব্যাপার এই উভয় অবস্থাতেই তাদের থেকে একেবারে ভিন্ন হয়। সূরা হূদের ১১:৯-১১ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।
আল-ইসরা 17:84
বল, ‘প্রত্যেকেই নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করে থাকে। অতঃপর যে পরিপূর্ণরূপে সৎপথপ্রাপ্ত তার সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক সম্যক্ অবগত আছেন।’ [১]
[১] এতে রয়েছে মুশরিকদের জন্য ধমক ও তিরস্কার। আর সূরা হূদের ১১:১২১-১২২ নং আয়াতের যে অর্থ, এরও সেই একই অর্থ। ﴿وَقُلْ لِلَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنَّا عَامِلُونَ﴾ আর شَاكِلَةٌ এর অর্থ, নিয়ত, দ্বীন, তরীকা, অভ্যাস, স্বভাব, প্রকৃতি ইত্যাদি। কেউ কেউ বলেন যে, এতে রয়েছে কাফেরদের নিন্দার এবং মু'মিনদের প্রশংসার দিক। কারণ, এর অর্থ হল, প্রত্যেক মানুষ তার স্বভাবগত অভ্যাস অনুযায়ী এমন কাজ করে, যার উপর গড়ে উঠে তার আখলাক-চরিত্র।
আল-ইসরা 17:85
তোমাকে তারা আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বল, ‘আত্মা আমার প্রতিপালকের আদেশ বিশেষ; আর তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।’ [১]
[১] روح (রূহ বা আত্মা) এমন অশরীরী বস্তু যা কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু প্রত্যেক প্রাণীর শক্তি ও সামর্থ্য এই রূহের মধ্যেই লুক্কায়িত। এর প্রকৃত স্বরূপ কি? তা কেউ জানে না। ইয়াহুদীরাও একদা নবী করীম (সাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (বুখারীঃ বনী ইস্রাঈলের তাফসীর, মুসলিমঃ কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ--) আয়াতের অর্থ হল, তোমাদের জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় অনেক কম। আর এই রূহ (আত্মা), যে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসা করছ, তার জ্ঞান আল্লাহ তাঁর আম্বিয়া সহ অন্য কাউকেও দেননি। কেবল এতটুকু জেনে নাও যে, এটা আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র। অথবা এটা আমার প্রতিপালকেরই খাস ব্যাপার; যার প্রকৃতত্ব কেবল তিনিই জানেন।
আল-ইসরা 17:86
ইচ্ছা করলে আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি, তা অবশ্যই প্রত্যাহার করতে পারতাম;[১] অতঃপর তুমি এ বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে কোন কর্মবিধায়ক পেতে না।[২]
[১] অর্থাৎ, অহী মারফৎ সামান্য যে জ্ঞান তোমাকে দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সেটুকুও ছিনিয়ে নিতে পারতেন। অর্থাৎ, তোমার অন্তর অথবা কিতাব থেকেই তা মিটিয়ে দিতে পারতেন।
[২] যে পুনরায় এই অহীকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিত।
আল-ইসরা 17:87
(এটা প্রত্যাহার না করা) তোমার প্রতিপালকের দয়ামাত্র;[১] নিশ্চয় তোমার প্রতি আছে তাঁর মহা অনুগ্রহ।
[১] যে, তিনি অবতীর্ণ অহীকে ছিনিয়ে নেননি অথবা তিনি তাঁর অহী দ্বারা তোমাকে সম্মানিত করেছেন।
আল-ইসরা 17:88
বল, ‘যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জীন সমবেত হয় ও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।’ [১]
[১] কুরআন মাজীদের ব্যাপারে এই ধরনের চ্যালেঞ্জ ইতিপূর্বেও কয়েকটি স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ আজও পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং তার জবাবের পিপাসা আজও পর্যন্ত অনিবৃত্তই আছে।
আল-ইসরা 17:89
আমি অবশ্যই মানুষের জন্য এই কুরআনে সর্বপ্রকার উপমা বিশদভাবে বর্ণনা করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সত্য প্রত্যাখ্যান ব্যতীত ক্ষান্ত হল না। [১]
[১] এই অর্থ এই সূরার ১৭:৪১ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে।
আল-ইসরা 17:90
আর তারা বলল,[১] ‘কখনই আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে ।
[১] ঈমান আনার জন্য মক্কার কুরাইশরা এই দাবীগুলো পেশ করেছিল।
আল-ইসরা 17:91
অথবা তোমার খেজুরের কিংবা আঙ্গুরের এক বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করে দেবে নদী-নালা ।
আল-ইসরা 17:92
অথবা তুমি যেমন বলে থাকো, সেই অনুযায়ী আকাশকে খন্ড-বিখন্ড করে আমাদের উপর ফেলবে অথবা আল্লাহ ও ফিরিশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে। [১]
[১] অর্থাৎ, আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাবেন আর আমরা তাঁদেরকে স্বচক্ষে দেখে নিব।
আল-ইসরা 17:93
অথবা তোমার একটি স্বর্ণনির্মিত গৃহ হবে,[১] অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে; কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণ আমরা কখনো বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ না করবে; যা আমরা পাঠ করব।’[২] বল, ‘পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক! আমি তো শুধু একজন মানুষ, একজন রসূল মাত্র।’[৩]
[১] زُخْرُفٌ এর প্রকৃত অর্থ, সৌন্দর্য। مُزَخْرَفٌ সৌন্দর্যখচিত জিনিসকে বলা হয়। তবে এখানে তার অর্থ হল, স্বর্ণনির্মিত।
[২] অর্থাৎ, আমাদের প্রত্যেকেই তা পরিষ্কারভাবে পড়তে পারবে।
[৩] অর্থাৎ, আমার প্রতিপালকের আছে সব রকমের শক্তি। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সমূহ দাবীকে এক মুহূর্তে كُنْ (হও) শব্দ দ্বারা পূরণ করে দিবেন। কিন্তু আমার ব্যাপারটা হল, আমি (তোমাদেরই মত) একজন মানুষ। কোন মানুষ এ জিনিসগুলো করার শক্তি রাখে কি, যা আমার কাছে তোমরা দাবী করছ? হ্যাঁ, মানুষ হওয়ার সাথে সাথে আমি আল্লাহর একজন রসূলও বটি। তবে রসূলের কাজ শুধু আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। আর তা আমি পৌঁছে দিয়েছি এবং পৌঁছাতে আছি। মানুষের দাবী অনুযায়ী মু'জিযা প্রদর্শন করা রিসালাতের কোন অংশ নয়। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছায় রিসালাতের সত্যতা প্রমাণের জন্য এক-আধটা মু'জিযা প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু মানুষের চাহিদা মত মু'জিযা দেখানো শুরু করে দিলে এর গতি কোথাও গিয়ে থামবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ চাহিদা মোতাবেক নতুন মু'জিযা দেখার আকাঙ্ক্ষী হবে এবং এর ফলে রসূল কেবল এই কাজেই লেগে থাকবেন। তবলীগ ও দাওয়াতের আসল কাজেই মন্দা পড়ে যাবে। সুতরাং মু'জিযার বিকাশ কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটা সম্ভব। আর তাঁর ইচ্ছা সেই কৌশল ও ভাল-মন্দের দিক বিচার অনুযায়ী হয়, যার জ্ঞান তিনি ব্যতীত আর কারো কাছে নেই। আর আমার জন্যও তাঁর ইচ্ছার মধ্যে হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়।
আল-ইসরা 17:94
যখন মানুষের নিকট পথ-নির্দেশ এল, তখন তাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন হতে এই উক্তিই বিরত রাখল যে, ‘আল্লাহ কি একজন মানুষকে রসূল করে পাঠিয়েছেন?’[১]
[১] অর্থাৎ, কোন মানুষের রসূল হওয়া, কাফের ও মুশরিকদের জন্য বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল। তারা মানতই না যে, আমাদের মত মানুষ; যে আমাদের মত চলাফেরা করে, আমাদের মতই পানাহার করে এবং আমাদের মতই আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তি রসূল হতে পারেন। আর এই আশ্চর্যবোধই তাদের ঈমান আনার পথে বাধা ছিল।
আল-ইসরা 17:95
বল, ‘ফিরিশতারা যদি নিশ্চিত হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করত, তাহলে অবশ্যই আমি আকাশ হতে ফিরিশতাকেই তাদের নিকট রসূল করে পাঠাতাম।’ [১]
[১] আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন পৃথিবীতে মানুষই বসবাস করে, তখন তাদের হিদায়াতের জন্য রসূলও মানুষ হবে। মানুষ ব্যতীত অন্য কেউ রসূল হলে মানুষের হিদায়াতের দায়িত্ব পালন করতেই পারবে না। হ্যাঁ, যদি পৃথিবীর বুকে ফিরিশতা বসবাস করত, তবে তাদের হিদায়াতের জন্য রসূল অবশ্যই ফিরিশতা হত।
আল-ইসরা 17:96
বল, ‘আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট,[১] নিশ্চয় তিনি তাঁর দাসদেরকে সবিশেষ জানেন ও দেখেন।’
[১] অর্থাৎ, দাওয়াত ও তবলীগের যে কাজ আমার দায়িত্বে ছিল, তা আমি পালন করেছি। এ ব্যাপারে আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হওয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। কারণ, প্রত্যেক জিনিসের ফায়সালা তিনিই করবেন।
আল-ইসরা 17:97
আল্লাহ যাদেরকে পথ-নির্দেশ করেন, তারা তো পথপ্রাপ্ত এবং যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনই তাঁকে ব্যতীত অন্য কাউকেও তাদের অভিভাবক পাবে না।[১] আর কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়; [২] কানা, বোবা ও কালা করে।[৩] তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; যখনই তা স্তিমিত হবে, তখনই আমি তাদের জন্য অগ্নি বৃদ্ধি করে দেব।
[১] আমার দাওয়াত ও তবলীগে কে ঈমান আনবে, আর কে আনবে না, সেটাও আল্লাহরই এখতিয়ারাধীন। আমার কাজ কেবল পৌঁছে দেওয়া।
[২] হাদীসে এসেছে যে, একদা সাহাবাগণ আশ্চর্য হন যে, মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় কিভাবে হাশর হবে? নবী (সাঃ) বললেন, "যে আল্লাহ তাদেরকে পায়ে ভর দিয়ে চলার ক্ষমতা দান করেছেন, তিনি তাদেরকে মুখে ভর দিয়ে চলানোরও ক্ষমতা রাখেন।"
(বুখারীঃ সূরা ফুরকানের তফসীর, মুসলিমঃ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ)
[৩] অর্থাৎ, যেভাবে তারা দুনিয়াতে সত্যের ব্যাপারে কানা, বোবা ও কালা হয়ে ছিল, কিয়ামতের দিনও শাস্তিস্বরূপ কানা, বোবা ও কালা হবে।
আল-ইসরা 17:98
এটাই তাদের প্রতিফল। কারণ তারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছিল ও বলেছিল, ‘আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?’ [১]
[১] অর্থাৎ, জাহান্নামের এই আযাব তাদেরকে এই জন্য দেওয়া হবে যে, তারা আমার নাযিলকৃত আয়াতসমূহকে সত্য বলে স্বীকার করেনি এবং বিশ্বজাহানে ছড়িয়ে থাকা নিদর্শনাবলীর ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণা করেনি। যার কারণে তারা কিয়ামত সংঘটিত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করেছিল এবং বলেছিল যে, অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর আমরা আবার নতুনভাবে কি করে সৃজিত হতে পারি?
আল-ইসরা 17:99
তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে ক্ষমতাবান?[১] তিনি তাদের জন্য স্থির করেছেন এক নির্দিষ্ট কাল, যাতে কোন সন্দেহ নেই।[২] তথাপি সীমালংঘনকারীরা সত্য প্রত্যাখ্যান করা ব্যতীত ক্ষান্ত হল না।
[১] আল্লাহ এদের উত্তরে বললেন, যে আল্লাহ আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তিনি এদের মত সৃষ্টিকে পুনরায় সৃষ্টি করার অথবা পুনরায় জীবন দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কেননা, এদেরকে সৃষ্টি করা আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার চেয়ে সহজতর। ﴿لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ﴾ অর্থাৎ, আসমান ও যমীন সৃষ্টি করা মানুষ সৃষ্টির তুলনায় কঠিনতর। (সূরা মু'মিন ৪০:৫৭ আয়াত) এই বিষয়টাকে আল্লাহ তাআলা সূরা আহক্বাফের ৪৬:৩৩ নং এবং সূরা ইয়াসীনের ৩৬:৮১-৮২ নং আয়াতেও উল্লেখ করেছেন।[২] এই أجل (নির্দিষ্ট কাল) বলতে মৃত্যু অথবা কিয়ামতকে বুঝানো হয়েছে। এখানে প্রাসঙ্গিকতার দিকে লক্ষ্য করে কিয়ামত অর্থ নেওয়াই বেশী সঠিক। অর্থাৎ, আমি তাদেরকে পুনরায় জীবিত করে কবর থেকে উঠানোর জন্য একটি সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছি। ﴿وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ﴾ "আর আমি ওটা নির্দিষ্ট একটি কালের জন্যই বিলম্বিত করছি।" (সূরা হূদ ১১:১০৪)
আল-ইসরা 17:100
বল, ‘যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভান্ডারের অধিকারী হতে, তবুও তোমরা ব্যয় করে (নিঃস্ব) হয়ে যাবে এই আশংকায় তা ধরে রাখতে। আসলে মানুষ তো অতিশয় কৃপণ।’ [১]
[১] خَشْيَةَ الإِنْفَاقِ এর অর্থ, خَشْيَةَ أَنْ يُنْفِقُوْا فَيَفْتَقِرُوْا "এই ভয়ে যে, দান করলে ধন শেষ হয়ে যাবে এবং পরিশেষে নিঃস্ব হয়ে যাবে।" অথচ, এটা আল্লাহর ধন-ভান্ডার যা শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু মানুষ সংকীর্ণ চিত্তের অধিকারী হওয়ায় কার্পণ্য করে। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ﴿أَمْ لَهُمْ نَصِيبٌ مِنَ الْمُلْكِ فَإِذًا لا يُؤْتُونَ النَّاسَ نَقِيرًا﴾ অর্থাৎ, "এরা যদি আল্লাহর রাজত্বের কিছু অংশ পেয়ে যায়, তবে এরা মানুষদেরকে একটি তিল পরিমাণও কিছু দেবে না।" (সূরা নিসা ৪:৫৩ আয়াত) খেজুরের আঁটির পিঠে যে বিন্দু থাকে সেটাকে 'নাক্বীর' বলা হয়। অর্থাৎ, সামান্য পরিমাণও কিছুই দেবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া যে, তিনি তাঁর ধন-ভান্ডারের মুখ মানুষের জন্য খুলে রেখেছেন। যেমন, হাদীসে আছে, "আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ। তিনি রাত-দিন ব্যয় করেন, তবুও তা থেকে কিছুই কমে না। লক্ষ্য কর, যখন থেকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তখন থেকে তিনি কতই না ব্যয় করেই যাচ্ছেন, তা সত্ত্বেও তাঁর হাতে যা কিছু আছে তা থেকে কিছুই কমে যায়নি।"
(বুখারীঃ কিতাবুত্ তাওহীদ, মুসলিমঃ কিতাবুয্ যাকাত)
আল-ইসরা 17:101
অবশ্যই আমি মূসাকে ন’টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম;[১] সুতরাং তুমি বানী ইসরাঈলকে জিজ্ঞাসা করে দেখ। যখন সে তাদের নিকট এসেছিল, তখন ফিরআউন তাকে বলেছিল, ‘হে মূসা! আমি তো মনে করি, তুমি নিশ্চয়ই যাদুগ্রস্ত।’
[১] নয়টি মু'জিযা (অলৌকিক ঘটনা) হল; শুভ্র হাত, লাঠি, অনাবৃষ্টি, ফল-ফসলে কমি, তুফান, পঙ্গপাল, উকুন (ছারপোকা), ব্যাঙ এবং রক্ত। ইমাম হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, অনাবৃষ্টি এবং ফল-ফসলে কমি একই জিনিস। আর নবম মু'জিযা ছিল লাঠির যাদুকরদের ভেল্কিকে গিলে ফেলা। এ ছাড়াও মূসা (আঃ)-কে আরো মু'জিযা দেওয়া হয়েছিল। যেমন, লাঠিকে পাথরে মারলে তা থেকে ১২টি ঝরনা প্রবাহিত হয়েছিল। মেঘের ছায়া করা এবং মান্ন্ ও সালওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এখানে ৯টি নিদর্শন বলতে কেবল সেই ৯টি মু'জিযাকেই বুঝানো হয়েছে, যেগুলো ফিরআউন ও তার সম্প্রদায় দর্শন করেছিল। এই জন্য ইবনে আব্বাস (রাঃ) সমূদ্র বিদীর্ণ হয়ে পথ তৈরী হয়ে যাওয়াকেও সেই ৯টি মু'জিযার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন এবং অনাবৃষ্টি ও ফল-ফসলে কমি এই উভয়কে একটি গণ্য করেছেন। তিরমিযীর একটি বর্ণনায় নয়টি নিদর্শনের ব্যাখ্যা এর বিপরীত করা হয়েছে। তবে সনদের দিক দিয়ে এ হাদীস দুর্বল। অতএব ন'টি স্পষ্ট নিদর্শন বলতে উল্লিখিত মু'জিযাগুলিই উদ্দেশ্য।
আল-ইসরা 17:102
মূসা বলেছিল, ‘তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, এই সমস্ত স্পষ্ট নিদর্শনাবলী আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বরূপ; হে ফিরআউন! আমি তো দেখছি যে, তুমি ধ্বংস হয়ে গেছ।’
আল-ইসরা 17:103
অতঃপর ফিরআউন তাদেরকে দেশ হতে উচ্ছেদ করবার ইচ্ছা করল; তখন আমি ফিরআউন ও তার সঙ্গীগণ সকলকে নিমজ্জিত করলাম ।
আল-ইসরা 17:104
এরপর আমি বানী ইস্রাঈলকে বললাম, ‘তোমরা এই দেশে বসবাস কর।[১] অতঃপর যখন কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে, তখন তোমাদের সকলকেই আমি একত্রিত করে উপস্থিত করব।’
[১] বাহ্যিকভাবে 'এই দেশে' বলতে মিসরই উদ্দেশ্য; যেখান থেকে ফিরআউন মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে বের করে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু বানী-ইস্রাঈলের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তারা মিসর থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় মিসর যায়নি। বরং চল্লিশ বছর 'তীহ' প্রান্তরে থাকার পর ফিলিস্তীনে প্রবেশ করে। আর এই সাক্ষ্য সূরা আ'রাফ ইত্যাদিতে কুরআনের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়। কাজেই সঠিক উক্তি হল, এ দেশ থেকে ফিলিস্তীনকে বুঝানো হয়েছে।
আল-ইসরা 17:105
আমি সত্যসহই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং সত্যসহই তা অবতীর্ণ হয়েছে;[১] আমি তো তোমাকে শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। [২]
[১] অর্থাৎ, সুরক্ষিত অবস্থায় তোমার কাছে পৌঁছে গেছে। পথে এর মধ্যে কোন প্রকারের কম-বেশী এবং কোন প্রকারের পরিবর্তন ও (এর সাথে) কোন কিছুর মিশ্রণ ঘটেনি। কারণ, এটাকে নিয়ে আগমনকারী ফিরিশতা হলেন, شَدِيْدُ الْقُوَى، الأَمِيْنُ، المَكِيْنُ، المُطَاعُ فِي الْمَلاءِ الأَعْلَى (অর্থাৎ, চরম শক্তিশালী বিশ্বস্ত-আমানতদার, মর্যাদাপ্রাপ্ত, ফিরিশতার মাঝে তাঁর আনুগত্য করা হয়। তিনি হলেন ফিরিশতাদের সর্দার ও মান্যবর) এগুলি এমন গুণাবলী, যা জিবরীল (আঃ)-এর ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
[২] সুসংবাদদাতা আনুগত্যশীল মু'মিনদের জন্য এবং সতর্ককারী অবাধ্যজনদের জন্য।
আল-ইসরা 17:106
আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি খন্ড-খন্ডভাবে[১] যাতে তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ক্রমে ক্রমে এবং আমি তা যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি।
[১] فَرَقْنَاهُ এর দ্বিতীয় এক অর্থ, بَيَّنَّاهُ وَأَوْضَحْنَاهُ (এটাকে আমি খুলে খুলে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি)ও করা হয়েছে।
আল-ইসরা 17:107
তুমি বল, ‘তোমরা কুরআনে বিশ্বাস কর অথবা না কর, যাদেরকে এর পূর্বে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের নিকট যখন এটা পাঠ করা হয়, তখনই তারা চেহারা লুটিয়ে সিজদায় পড়ে।[১]
[১] অর্থাৎ, সেই আলেমগণ যাঁরা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বিগত কিতাবগুলো পড়েছেন এবং তাঁরা অহীর প্রকৃতত্ব ও রিসালাতের নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন, তাঁরা এ ব্যাপারে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সিজদায় পড়ে যান যে, তিনি তাঁদেরকে শেষ রসূল (সাঃ)-কে চেনার তওফীক দিয়েছেন এবং কুরআন ও রিসালাতের উপর ঈমান আনার সৌভাগ্য দান করেছেন।
আল-ইসরা 17:108
এবং বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, মহান! অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েই থাকে। [১]
[১] অর্থাৎ, মক্কার এই কাফেররা যারা প্রত্যেক বিষয়ে অজ্ঞ, তারা যদি ঈমান না আনে, তবে তুমি কোন পরোয়া করো না। কারণ, যারা জ্ঞানী এবং অহী ও রিসালাতের প্রকৃতত্ব যারা বোঝে, তারা ঈমান এনেছে। এমন কি কুরআন শুনে আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেছে। আর তারা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং প্রতিপালকের অঙ্গীকারসমূহের উপর পূর্ণ বিশ্বাসও রাখে।
আল-ইসরা 17:109
আর তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে চেহারা লুটিয়ে (সিজদা) দেয় এবং এ (কুরআন) তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।’ [১] (সিজদাহ-৪)
[১] চেহারা লুটিয়ে সিজদায় পড়ে যাওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। কারণ, প্রথম সিজদা ছিল আল্লাহর মাহাত্ম্য, তাঁর পবিত্রতার বর্ণনা এবং কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এবং কুরআন শুনে যে ভীতি ও বিনয়ভাব তাদের মধ্যে জন্ম নেয় এবং কুরআনের আকর্ষণ ও চমৎকারিত্বে এত বেশী তারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে যে, তা পুনরায় তাদেরকে সিজদায় পতিত করে। (এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
আল-ইসরা 17:110
বল, তোমরা ‘আল্লাহ’ নামে আহবান কর অথবা ‘রহমান’ নামে আহবান কর, তোমরা যে নামেই আহবান কর, সকল সুন্দর নামাবলী তাঁরই।[১] আর তুমি নামাযে তোমার স্বর উচ্চ করো না এবং অতিশয় ক্ষীণও করো না; বরং এই দুই-এর মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন কর।[২]
[১] যেমন পূর্বেও অতিবাহিত হয়েছে যে, মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর গুণবাচক নাম 'রাহমান' ও 'রাহীম'এর সাথে পরিচিত ছিল না। আর কোন 'আষার' (সাহাবীর উক্তি)-তে এসেছে যে, মুশরিকদের কেউ কেউ যখন নবী (সাঃ)-এর পবিত্র মুখ থেকে 'ইয়া রাহমান, ইয়া রাহীম' শব্দ শুনল, তখন বলে উঠল যে, এই লোক তো আমাদেরকে বলে যে, কেবল এক আল্লাহকেই ডাক, আর সে নিজে দু'জন উপাস্যকে ডাকছে! তাদের এই কথার জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়। (ইবনে কাসীর)[২] এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন যে, মক্কায় রসূল (সাঃ) আত্মগোপন করে থাকতেন। যখন তিনি তাঁর সাহাবীদের নামায পড়াতেন, তখন শব্দ একটু উঁচু করতেন। মুশকিরা কুরআন শুনে কুরআনকে এবং আল্লাহকে গালি-গালাজ করত। তাই মহান আল্লাহ বললেন, তোমার আওয়াজ এতটা উঁচু করো না যে, মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি-গালাজ করে। আর এত আস্তেও পড়ো না যে, সাহাবীগণ তা শুনতেই না পায়। (বুখারীঃ তাওহীদ অধ্যায়, মুসলিমঃ নামায অধ্যায়) স্বয়ং নবী (সাঃ)-এর ঘটনা যে, কোন এক রাতে তিনি আবূ বাকর (রাঃ)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, আবূ বাকর (রাঃ) খুব মৃদু আওয়াজে নামায পড়ছেন। অতঃপর উমার (রাঃ)-কেও দেখলেন যে, তিনি উঁচু শব্দে নামায পড়ছেন। তিনি তাঁদের উভয়কে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আবূ বাকার (রাঃ) বললেন, আমি যাঁর সাথে মুনাজাতে ব্যস্ত ছিলাম, তিনি আমার শব্দ শুনছিলেন। আর উমার (রাঃ) উত্তরে বললেন, আমার উদ্দেশ্য ঘুমন্তদেরকে জাগানো এবং শয়তানকে ভাগানো। তিনি আবূ বাকার (রাঃ)-কে বললেন যে, তুমি তোমার শব্দ একটু উঁচু করে নিও এবং উমর (রাঃ)-কে বললেন যে, তুমি তোমার শব্দ একটু নীচু করে নিও। (আবূ দাউদ ও তিরমিযী) আয়েশা (রাঃ) বলেন, এই আয়াতটি দু'আ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম- ফাতহুল কাদীর)
আল-ইসরা 17:111
বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নেই এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না; যে কারণে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন হতে পারে।’ আর সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর।
আল-কাহফ 18:1
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে তিনি কোন প্রকার বক্রতা রাখেননি।[১]
[১] 'বক্রতা' অর্থাৎ, অসঙ্গতি, পরস্পরবিরোধিতা, মতবিরোধিতা বা জটিলতা রাখেননি। অথবা এতে (যে পথ নির্দেশিত হয়েছে তার মধ্যে) কোন বক্রতা রাখেননি এবং মধ্যম পন্থা হতে বিচ্যুতি ঘটার কোন কিছু এতে নেই। বরং এটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত, সরল ও সোজা রাখা হয়েছে। অথবা قَيِّم অর্থ, এমন কিতাব, যাতে বান্দাদের সেই সব ব্যাপারের প্রতি খেয়াল রাখা ও যত্ন নেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার মঙ্গল নিহিত আছে।
আল-কাহফ 18:2
তিনি একে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত; যাতে ওটা তাঁর নিকট হতে (অবতীর্ণ)[১] কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সৎকর্মশীল বিশ্বাসীগণ এই সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য আছে উত্তম পুরস্কার (জান্নাত);
[১] مِنْ لَّدُنْهُ (তাঁর নিকট হতে) অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
আল-কাহফ 18:3
যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
আল-কাহফ 18:4
এবং তাদেরকেও সতর্ক করে, যারা বলে যে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’[১]
[১] যেমন, ইয়াহুদীরা বলে, 'উযাইর আল্লাহর বেটা', খ্রিষ্টানরা বলে, 'ঈসা আল্লাহর বেটা' এবং কোন কোন মুশরিকদল বলে থাকে, 'ফিরিশতাগণ আল্লাহর বেটী!'
আল-কাহফ 18:5
এই বিষয়ে তাদের কোনই জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না; তাদের মুখনিঃসৃত বাক্য[১] কি সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।
[১] সেই 'বাক্য' এই যে, আল্লাহর সন্তান-সন্ততি আছে। যা একেবারে মনগড়া মিথ্যা।
আল-কাহফ 18:6
তারা এই বাণী[১] বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
[১] بِهَذَا الْحَدِيْثِ (এই বাণী) বলতে কুরআন করীম। কাফেরদের ঈমান আনার ব্যাপারে রসূল (সাঃ) যে অতীব উদগ্রীব ছিলেন এবং (ঈমান আনা থেকে) তাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে যে তিনি কঠিন কষ্ট বোধ করতেন, এই আয়াতে তাঁর সেই মানসিক অবস্থা ও অভিপ্রায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
আল-কাহফ 18:7
পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে[১] আমি সেগুলিকে ওর শোভা করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করবার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।
[১] ভূ-পৃষ্ঠে জীব-জন্তু, উদ্ভিদ, জড় ও খনিজপদার্থ এবং মটির নীচে লুক্কায়িত অন্যান্য গুপ্তধন, এ সবই হল দুনিয়ার শোভা-সৌন্দর্য ও তার চাকচিক্য।
আল-কাহফ 18:8
ওর উপর যা কিছু আছে তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য ময়দানে পরিণত করব।[১]
[১] صَعِيْدًا পরিষ্কার ময়দান। جُرُزٌ একেবারে সমতল, যাতে কোন গাছ-পালা থাকে না। অর্থাৎ, এমন এক দিন আসবে, যেদিন এ দুনিয়া তার যাবতীয় সৌন্দর্য ও চাকচিক্য সহ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ভূ-পৃষ্ঠ একটি গাছ-পালাহীন সমতল ময়দানে পরিণত হবে। অতঃপর আমি নেককার ও বদকারদেরকে তাদের আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেব।
আল-কাহফ 18:9
তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? [১]
[১] অর্থাৎ, এই একটাই বৃহৎ ও বিস্ময়কর নিদর্শন নয়, বরং আমার প্রতিটি নিদর্শনই বিস্ময়কর। আসমান ও যমীনের এই সৃষ্টি, তার ব্যবস্থাপনা, সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রকে আয়ত্তাধীন করা এবং রাত ও দিনের পরিবর্তন ও অন্যান্য অসংখ্য নিদর্শন কি কম বিস্ময়কর? كَهْفٌ সেই গুহাকে বলা হয় যা পাহাড়ে থাকে। رَقِيم (রাকীম) কারো নিকট সেই গ্রামের নাম, যেখান থেকে এই যুবকরা গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কেউ বলেছেন, সেই পাহাড়ের নাম, যাতে ঐ গুহা ছিল। অনেকের মতে, رَقِيْمٌ মানে مَرْقُوْمٌ অর্থাৎ, লোহা অথবা সীসার তৈরী তক্তি যাতে গুহার অধিবাসীদের নাম অঙ্কিত ছিল। এটাকে رَقِيم (অঙ্কিত বা লিপিবদ্ধ)এ জন্য বলা হয় যে, এতে নাম লিপিবদ্ধ ছিল। বর্তমান তত্ত্ব-গবেষণা দ্বারা জানা যায় যে, প্রথম কথাটাই বেশী সঠিক। কারণ, যে পাহাড়ে এই গুহা রয়েছে, তার সন্নিকটেই রয়েছে একটি জনপদ, যেটাকে এখন الرقيب (আররাকীব) বলা হয়। বহুকাল অতিবাহিত হওয়ার কারণে الرقيم এর বিকৃত রূপ হয়েছে الرقيب (আররাক্বীব)।
আল-কাহফ 18:10
যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি নিজের তরফ থেকে আমাদেরকে করুণা দান কর এবং আমাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর।’[১]
[১] এরা হল সেই যুবকদল, যাদেরকে 'আসহাবে কাহ্ফ'(গুহার অধিবাসী) বলা হয়েছে। (বিস্তারিত আলোচনা ১৪৮নং টীকায় আসছে।) তারা যখন নিজেদের দ্বীনের রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল, তখন এই প্রার্থনা করেছিল। আসহাবে কাহ্ফদের এই ঘটনায় যুবকদের জন্য রয়েছে গুরুতত্ত্বপূর্ণ শিক্ষা। বর্তমানে যুবকদের বেশীর ভাগ সময় নষ্ট হয় অনর্থক কার্যকলাপে তথা আল্লাহর প্রতি তাদের তেমন কোন ভ্রূক্ষেপ থাকে না। আজকের মুসলিম যুবকেরা যদি তাদের যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করত, তাহলে কতই না ভাল হত!
আল-কাহফ 18:11
অতঃপর আমি গুহায় কয়েক বছর তাদের কানে পর্দা দিয়ে রাখলাম।[১]
[১] অর্থাৎ, কানে পর্দা সৃষ্টি করে তা বন্ধ করে দিলাম। যাতে বাইরের শব্দের কারণে তাদের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। অর্থাৎ, আমি তাদেরকে গভীরভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম।
আল-কাহফ 18:12
পরে আমি তাদেরকে জাগরিত করলাম এই জানবার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোনটি তাদের অবস্থানকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।[১]
[১] এই দু'টি দল বলতে তারা, যারা মতবিরোধ করেছিল। এরা হয়তো সেই যুগেরই মানুষ ছিল, যাদের মধ্যে এদের ব্যাপারে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। অথবা নবী (সাঃ)-এর যুগের মু'মিন ও কাফেররা। আবার কেউ বলেছেন, এরা ছিল গুহারই অধিবাসী। তাদের মধ্যে দু'টি দল হয়ে গিয়েছিল। একদল বলল, আমরা এত দিন এখানে ঘুমিয়ে ছিলাম। অন্য দল এ কথা অস্বীকার করে প্রথম দলের চেয়ে কিছু কম-বেশী সময়-কাল বলল।
আল-কাহফ 18:13
আমি তোমার কাছে তাদের সঠিক বৃত্তান্ত বর্ণনা করছিঃ তারা ছিল কয়েকজন যুবক,[১] তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম ।
[১] সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এখন বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে। এই যুবকদের ব্যাপারে কেউ কেউ বলে, তারা খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিল। কেউ বলে, তাদের যুগ হল ঈসা (আঃ)-এর পূর্বের যুগ। হাফেয ইবনে কাসীর এ কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, দাকয়ানুস নামে একজন রাজা ছিল। সে লোকদেরকে মূর্তিপূজা করতে এবং তাদের নামে নজরানা পেশ করতে উদ্বুদ্ধ করত। মহান আল্লাহ এই যুবকদের অন্তরে এ কথা প্রক্ষিপ্ত করলেন যে, ইবাদতের যোগ্য তো একমাত্র সেই আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা এবং বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। فِتْيَةٌ হল 'জাময়ে কিল্লাত' (স্বল্প সংখ্যাবোধক বহুবচন)। এ (فِتْيَةٌ) থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তারা সংখ্যায় ৯জন ছিল অথবা তার থেকেও কম ছিল। এরা (লোকালয়) থেকে পৃথক হয়ে কোন এক স্থানে এক আল্লাহর ইবাদত করত। ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে তাদের আকীদা তাওহীদের চর্চা হতে লাগল। পরিশেষে রাজার নিকট পর্যন্ত তাদের কথা পৌঁছে গেলে সে তাদেরকে নিজ দরবারে ডেকে এনে ঘটনা জিজ্ঞাসা করল। সেখানে তারা পরিষ্কারভাবে আল্লাহর তাওহীদের কথা বর্ণনা করল। শেষ পর্যায়ে রাজা এবং মুশরিক জাতির ভয়ে নিজেদের দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য লোকালয় থেকে বেরিয়ে এক পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করল। সেখানে মহান আল্লাহ তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন এবং ৩০৯ বছর পর্যন্ত তারা ঘুমিয়ে থাকল।
আল-কাহফ 18:14
আর আমি তাদের অন্তরকে সুদৃঢ় করেছিলাম;[১] তারা যখন উঠে দাঁড়াল[২] তখন বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক; আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না; যদি করে বসি তাহলে তা অতিশয় গর্হিত হবে। [৩]
[১] অর্থাৎ, হিজরত করার কারণে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন থেকে পৃথক এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ধাক্কা যেহেতু তাদের উপর আসছে, তাই আল্লাহ তাদের অন্তরকে সুদৃঢ় করে দিলেন। যাতে তারা তাদের জীবনের বিপদ-আপদকে খুশী মনে বরণ করে নিতে পারে। অনুরূপ হক বলার দায়িত্বকেও যেন সাহস ও উৎসাহের সাথে পালন করতে পারে।
[২] এই দাঁড়ানো অধিকাংশ মুফাসসিরের নিকট রাজার দরবারে ছিল, তারা রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তাওহীদের ওয়ায করেছিল। কেউ কেউ বলেন, শহর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আপোসে একে অপরকে তাওহীদের সেই কথা শুনাতে লাগলেন, যা এক এক করে প্রত্যেকের অন্তরে ভরে দেওয়া হয়েছিল এবং এইভাবে তারা আপোসে একত্রিত হয়ে গেল।
[৩] شَطَطًا অর্থ, মিথ্যা অথবা সীমালঙ্ঘন করা।
আল-কাহফ 18:15
আমাদেরই এই স্বজাতিরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এসব উপাস্য সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক সীমালংঘনকারী আর কে?
আল-কাহফ 18:16
তোমরা যখন তাদের ও তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করে তাদের সংস্পর্শ হতে বিচ্ছিন্ন হলে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর;[১] তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করবার ব্যবস্থা করবেন।’
[১] অর্থাৎ, তোমরা যখন তোমাদের জাতির বাতিল উপাস্যসমূহ থেকে (মানসিকভাবে) পৃথক হয়েছ, তখন এবার দৈহিকভাবেও তাদের নিকট থেকে পৃথক হয়ে যাও। এ কথা গুহার অধিবাসীরা আপোসে বলল। তাই তারা এরপর এক গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করল। এদিকে যখন তাদের নিখোঁজ হওয়ার কথা প্রচার হয়ে গেল, তখন তাদের খোঁজ করা হল। কিন্তু তারা ঐরূপ ব্যর্থ হল, যেরূপ নবী (সাঃ)-এর খোঁজে মক্কার কাফেররা সেই 'সওর গুহা' পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও তাঁর সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়েছিল, যেখানে তিনি (সাঃ) আবূ বাকর সহ লুকিয়ে ছিলেন।
আল-কাহফ 18:17
তোমরা যখন তাদের ও তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করে তাদের সংস্পর্শ হতে বিচ্ছিন্ন হলে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর;[১] তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করবার ব্যবস্থা করবেন।’
[১] অর্থাৎ, তোমরা যখন তোমাদের জাতির বাতিল উপাস্যসমূহ থেকে (মানসিকভাবে) পৃথক হয়েছ, তখন এবার দৈহিকভাবেও তাদের নিকট থেকে পৃথক হয়ে যাও। এ কথা গুহার অধিবাসীরা আপোসে বলল। তাই তারা এরপর এক গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করল। এদিকে যখন তাদের নিখোঁজ হওয়ার কথা প্রচার হয়ে গেল, তখন তাদের খোঁজ করা হল। কিন্তু তারা ঐরূপ ব্যর্থ হল, যেরূপ নবী (সাঃ)-এর খোঁজে মক্কার কাফেররা সেই 'সওর গুহা' পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও তাঁর সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়েছিল, যেখানে তিনি (সাঃ) আবূ বাকর সহ লুকিয়ে ছিলেন।
আল-কাহফ 18:18
তুমি মনে করতে, তারা জাগ্রত; কিন্তু আসলে তারা নিদ্রিত।[১] আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে ও বামে[২] এবং তাদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে; তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছনে ফিরে পালিয়ে যেতে ও তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।[৩]
[১] أَيْقَاظٌ হল, يَقِظٌ (জাগ্রত) এর বহুবচন। আর رُقُوْدٌ হল, رَاقِدٌ (নিদ্রিত)এর বহুবচন। তারা জাগ্রত এই জন্য মনে হচ্ছিল যে, তাদের চোখগুলো জাগ্রত ব্যক্তির মত খোলা ছিল। কেউ কেউ বলেন, খুব বেশী পার্শ্ব পরিবর্তন করার কারণে তাদেরকে জাগ্রত মনে হত।
[২] যাতে তাদের দেহকে মাটিতে খেয়ে না নেয়। (উই ধরে না যায়।)
[৩] তাদের হেফাযতের জন্য এ ছিল আল্লাহ কর্তৃক ব্যবস্থাপনা। যাতে কেউ যেন তাদের নিকটে যেতে না পারে।
আল-কাহফ 18:19
এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম,[১] যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে; তাদের একজন বলল, ‘তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ?’ তাদের কেউ কেউ বলল, ‘একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ।’[২] তাদের কেউ কেউ বলল, ‘তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভাল জানেন।[৩] এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য উত্তম[৪] ও তা হতে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন সতর্কতা ও নম্রতার সাথে কাজ করে এবং কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকেও কিছু জানতে না দেয়। [৫]
[১] অর্থাৎ, যেভাবে আমি তাদেরকে আমার নিজ কুদরতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেইভাবে ৩০৯ বছর পর আমি তাদেরকে উঠালাম এবং এমনভাবে উঠালাম যে, তাদের শারীরিক অবস্থা ঐ রকমই সুস্থ ছিল, যেমন ৩০০ বছর পূর্বে শোয়ার সময় ছিল। এই জন্য আপোসে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করল।
[২] হতে পারে যখন তারা গুহায় প্রবেশ করেছিল, তখন দিনের প্রথম প্রহর ছিল এবং যখন জাগ্রত হয়, তখন দিনের শেষ প্রহর ছিল। এইভাবে তারা মনে করল যে, মনে হয় আমরা একদিন অথবা তার থেকেও কম, দিনের কিছু অংশ এখানে ঘুমিয়ে থেকেছি।
[৩] দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে থাকার কারণে তারা বড়ই দ্বিধা-দন্দ্বে ভুগছিল। পরিশেষে এই বলে বিষয়কে আল্লাহর সোপর্দ করে দিল যে, তিনিই সঠিক জানেন কতকাল আমরা এখানে ছিলাম।
[৪] জাগ্রত হওয়ার পর খাদ্য যা মানুষের সর্বাধিক প্রয়োজনের জিনিস, তারই ব্যবস্থাপনার চিন্তা দেখা দিল।
[৫] সতর্ক হওয়ার ও নম্রতা প্রদর্শন করার তাকীদ সেই আশঙ্কার ভিত্তিতেই করেছিল, যার কারণে তারা লোকালয় থেকে বেরিয়ে নির্জন গুহায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল। তাকে তাকীদ করল যে, তার আচরণে যেন শহরের লোকেরা আমাদের ব্যাপারে টের না পেয়ে যায় এবং আমাদের উপর নতুন কোন বিপদ এসে না পড়ে। যে কথা পরের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
আল-কাহফ 18:20
তারা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে, তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। আর সে ক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।’[১]
[১] অর্থাৎ, আখেরাতের যে সফলতার জন্য আমরা এত কঠিনতা ও কষ্ট সহ্য করলাম, পরিষ্কার কথা যে, শহরের লোকেরা যদি পুনরায় আমাদেরকে পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে যেতে বাধ্য করে, তাহলে আমাদের আসল উদ্দেশ্যই বিনষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের পরিশ্রমও বরবাদে যাবে এবং আমরা না দ্বীন পাব, আর না দুনিয়া।
আল-কাহফ 18:21
এভাবে আমি লোকেদেরকে তাদের বিষয় জানিয়ে দিলাম,[১] যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতে কোন সন্দেহ নেই।[২] যখন তারা তাদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিল[৩] তখন অনেকে বলল, ‘তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর।’[৪] তাদের প্রতিপালক তাদের বিষয়ে ভাল জানেন।[৫] তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল, ‘আমরা তো নিশ্চয়ই তাদের উপর মসজিদ নির্মাণ করব।’[৬]
[১] অর্থাৎ, যেভাবে আমি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়েছি ও জাগিয়েছি, অনুরূপভাবে মানুষদেরকেও তাদের ব্যাপারে অবহিত করিয়েছি। কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী এই অবহিত করণ এইভাবে সুসম্পন্ন হয় যে, যখন গুহা অধিবাসীদের একজন রূপার সেই মুদ্রা নিয়ে শহরে গেল, যা ৩০০ বছর পূর্বের রাজা দাকয়ানুসের আমলে প্রচলিত ছিল এবং সেই মুদ্রা সে একজন দোকানদারকে দিল, তখন সে বিস্মিত হল। সে পাশের দোকানদারকেও দেখাল। তারাও আশ্চর্যানিত হল। এদিকে এ লোক তাদেরকে বলছিল যে, আমি এই শহরেরই অধিবাসী, গত কালই এখান থেকে গেছি। কিন্তু এই 'কাল'এর যে তিন শতাব্দি অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব মানুষ কিভাবে তার কথা মেনে নিবে? লোকদের এই সন্দেহ হল যে, হতে পারে এ লোক কোন গুপ্ত ধন-ভান্ডার পেয়েছে। পরিশেষে ধীরে ধীরে এ কথা রাজা বা শাসক পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সে (গুহা অধিবাসীদের) এই সঙ্গীর সাহায্যে গুহা পর্যন্ত যায় এবং তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে। পরে মহান আল্লাহ পুনরায় তাদেরকে সেখানেই মৃত্যু দেন। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, গুহার অধিবাসীদের এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার এবং মৃত্যুর পর আল্লাহর পুনরুত্থানের ওয়াদা সত্য। অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে এই ঘটনার মধ্যে আল্লাহর মহাশক্তির এক নিদর্শন।
[৩] إِذْ হয় أَعْثَرْنَا (ক্রিয়াপদের) এর 'যারফ' (যার দ্বারা সময়-কাল বুঝানো হয়)। অর্থাৎ, আমি তাদেরকে সেই সময় এদের ব্যাপারে জানালাম, যখন তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আপোসে বিতর্কে লিপ্ত ছিল। অথবা এখানে أذْكُرْ ক্রিয়া ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন তারা আপোসে বিতর্ক করছিল।
[৪] এ কথা কে বলেছিল? কেউ বলেন, সেই যুগের ঈমানদাররা। কেউ বলেন, বাদশাহ ও তার সাথের লোকেরা যখন সেখানে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করল এবং এরপর আল্লাহ তাদেরকে পুনরায় ঘুম পাড়িয়ে দিলেন, তখন বাদশাহ ও তার সাথীরা বলল যে, এদের হেফাযতের জন্য একটি অট্টালিকা নির্মাণ করে দেওয়া যাক।
[৫] বিতর্ককারীদেরকে মহান আল্লাহ বললেন যে, তাদের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান কেবল আল্লাহই রাখেন।
[৬] এই প্রবল দলটি ঈমানদারদের ছিল, না কাফের ও মুশরিকদের? ইমাম শওকানী প্রথম মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং ইমাম ইবনে কাসীর দ্বিতীয় মতকে। কারণ, নেক লোকদের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা আল্লাহর পছন্দ নয়। রসূল (সাঃ) বলেছেন, ((لَعَنَ اللهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ)) "ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের আম্বিয়াদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে।" (বুখারীঃ জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ মাসাজিদ অধ্যায়) উমার (রাঃ)-এর খেলাফত কালে ইরাকে দানিয়াল (আঃ)-এর কবর পাওয়া গেল। তিনি নির্দেশ দিলেন যে, গোপনে সেটাকে সাধারণ কবরে পরিণত করা হোক। যাতে মানুষ যেন জানতে না পারে যে, এটা কোন নবীর কবর। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
আল-কাহফ 18:22
অচিরেই তারা বলবে,[১] ‘তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর।’ কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন; তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর।’ ওরা অজানা বিষয়ে অনুমান (তীর) চালায়।[২] আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাতজন; তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর।’[৩] বল, ‘তাদের সংখ্যা আমার প্রতিপালকই ভাল জানেন; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে।’ [৪] সুতরাং সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করো না[৫] এবং তাদের কাউকেও তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করো না।[৬]
[১] এ কথার বক্তা এবং বিভিন্ন সংখ্যার ব্যাপারে বিভিন্ন উক্তি পেশকারীরা ছিল নবী (সাঃ)-এর যুগের মু'মিন ও কাফেররা। বিশেষ করে কিতাবধারীরা, যারা যাবতীয় আসমানী কিতাব সম্পর্কে অবগতি ও জ্ঞানের দাবী করত।
[২] অর্থাৎ, জ্ঞান এদের মধ্যে কারো কাছে নেই। যেমন, লক্ষ্যবস্তু না দেখেই কেউ তীর ছুঁড়ে, এরাও অনুরূপ অনুমানের তীর চালিয়ে যাচ্ছে।
[৩] মহান আল্লাহ কেবল তিনটি উক্তি বর্ণনা করেছেন। প্রথম দু'টি উক্তিকে رَجْمًا بِالْغَيْبِ (অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমান করা) বলে দুর্বল উক্তি গণ্য করেছেন। এর পর তৃতীয় উক্তির উল্লেখ করেছেন। এ থেকে মুফাসসিরগণ প্রমাণ করেছেন যে, এই অনুমান সঠিক। আর বাস্তবিকই তাদের সংখ্যা এটাই ছিল। (ইবনে কাসীর)
[৪] কোন কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলতেন, আমিও সেই অল্প লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা গুহার অধিবাসী কতজন ছিল তা জানে। তারা ছিল মাত্র সাতজন। যেমন, তৃতীয় উক্তিতে বলা হয়েছে। (ইবনে কাসীর)
[৫] অর্থাৎ, এই কথাগুলোর উপরেই ক্ষান্ত থাক, যা তোমাকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথবা সংখ্যা নির্দিষ্টীকরণের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক করো না। কেবল এতটা বলে দাও যে, এই নির্দিষ্টীকরণের কোন দলীল নেই।
[৬] অর্থাৎ, বিতর্ককারীদেরকে কিছুই জিজ্ঞাসা করো না। কারণ, যাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার জ্ঞান জিজ্ঞাসাকারীর চেয়েও অধিক থাকা উচিত। আর এখানে তো ব্যাপার উল্টা। তোমার কাছে তবুও নিশ্চিত জ্ঞানের একটি মাধ্যম -- অহী -- রয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যদের কাছে অনুমান ও ধারণা ব্যতীত কিছুই নেই।
আল-কাহফ 18:23
কখনই তুমি কোন বিষয়ে বলো না যে, ‘আমি ওটা আগামীকাল করব’--
আল-কাহফ 18:24
ইন শাআল্লাহ (আল্লাহ ইচ্ছা করলে) এই কথা না বলে;[১] যদি ভুলে যাও, তবে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করো[২] ও বলো, ‘সম্ভবতঃ আমার প্রতিপালক আমাকে এ অপেক্ষা সত্যের নিকটতম পথ নির্দেশ করবেন।’[৩]
[১] মুফাসসিরগণ বলেন যে, ইয়াহুদীরা নবী (সাঃ)-কে তিনটি কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আত্মার স্বরূপ কি এবং গুহার অধিবাসী ও যুল-কারনাইন কে ছিল? তাঁরা বলেন যে, এই প্রশ্নগুলোই ছিল এই সূরা অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। নবী (সাঃ) বললেন, আমি তোমাদেরকে আগামী কাল উত্তর দেব। কিন্তু এর পর ১৫ দিন পর্যন্ত জিবরীল (আঃ) অহী নিয়ে এলেন না। অতঃপর যখন এলেন, তখন মহান আল্লাহ 'ইন শা-আল্লাহ' বলার নির্দেশ দিলেন। আয়াতে غَدًا (আগামী কাল) বলতে ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, অদূর ভবিষ্যতে বা দূর ভবিষ্যতে কোন কাজ করার সংকল্প করলে, 'ইন শা-আল্লাহ' অবশ্যই বলে নিও। কেননা, মানুষ তো জানেই না যে, যা করার সে সংকল্প করে, তা করার তাওফীক সে আল্লাহর ইচ্ছা থেকে পাবে, না পাবে না?
[২] অর্থাৎ, বাক্যালাপ অথবা অঙ্গীকার করার সময় যদি 'ইনশা-আল্লাহ' বলতে ভুলে যাও, তবে যখনই স্মরণ হবে তখনই তা বলে নাও। অথবা প্রতিপালককে স্মরণ করার অর্থ, তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর, তাঁর প্রশংসা কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।
[৩] অর্থাৎ, আমি যা করার সংকল্প করছি, হতে পারে মহান আল্লাহর তার থেকেও উত্তম এবং ফলপ্রসূ কাজের প্রতি আমার দিক নির্দেশনা করবেন।
আল-কাহফ 18:25
তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ’ বছর, অতিরিক্ত আরো নয় বছর। [১]
[১] অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এটাকে আল্লাহর উক্তি গণ্য করেছেন। সৌর মাস হিসাবে ৩০০ এবং চান্দ্র মাস হিসাবে ৩০৯ বছর হয়। কোন কোন আলেমের ধারণা হল, এটা তাদেরই কথা, যারা তাদের সংখ্যার ব্যাপারে বিভিন্ন মত পেশ করছিল। আর এর দলীল হল আল্লাহর এই বাণী, "তুমি বল, তারা কত কাল ছিল, তা আল্লাহই ভাল জানেন।" বলা বাহুল্য তাঁরা এরই ভিত্তিতে (আয়াতে) উল্লিখিত মেয়াদের খন্ডন করার অর্থ নিয়ে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরদের তফসীর অনুযায়ী এর অর্থ এই যে, আহলে-কিতাব অথবা অন্য কেউ যদি (আয়াতে) বর্ণিত এই সময়-কালের ব্যাপারে বিরোধিতা করে, তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ? তিনি যখন ৩০৯ বছরের কথা বলেছেন, তখন এটাই সঠিক। কেননা, তিনিই জানেন তারা কত বছর গুহায় ছিল?
আল-কাহফ 18:26
তুমি বল, ‘তারা কত কাল ছিল, তা আল্লাহই ভাল জানেন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই; তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা! [১] তিনি ছাড়া তাদের অন্য কোন অভিভাবক নেই; তিনি কাউকেও নিজ কর্তৃত্বের শরীক করেন না।’
[১] এটা হল আল্লাহর সবকিছু জানার ও খবর রাখার গুণেরই অধিক আলোকপাত।
আল-কাহফ 18:27
তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট তোমার প্রতিপালকের কিতাব আবৃত্তি কর; [১] তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউই নেই। আর তুমি কখনই তিনি ব্যতীত অন্য কোন আশ্রয়স্থল পাবে না। [২]
[১] যদিও এই নির্দেশ এই দিক দিয়ে সাধারণ যে, যে জিনিসেরই অহী তোমার প্রতি করা হয়, তা তেলাঅত কর এবং লোকদেরকে তা শিক্ষা দাও, তবুও গুহা অধিবাসীদের ঘটনার শেষে এই নির্দেশের অর্থ এও হতে পারে যে, তাদের ব্যাপারে লোকেরা যা ইচ্ছা তাই বলুক, কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে তাদের ব্যাপারে যা এবং যতটা বলেছেন, সেটাই হচ্ছে সঠিক। সুতরাং তাই মানুষদেরকে পড়ে শুনিয়ে দাও এবং এর অধিক বর্ণিত অন্যান্য কথা-বার্তার প্রতি আদৌ ভ্রূক্ষেপ করো না।
[২] অর্থাৎ, যদি এর (অহীর) প্রচার না কর এবং এ থেকে বিমুখতা অবলম্বন কর অথবা তার (অহীর) বাক্যাবলীতে কোন হেরফের করার প্রচেষ্টা কর, তবে আল্লাহর হাত থেকে তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সম্বোধন রসূল (সাঃ)-কে করা হলেও এর প্রকৃত লক্ষ্য হল উম্মত।
আল-কাহফ 18:28
তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে[১] তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না।[২] আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে। [৩]
[১] এটা হল সেই নির্দেশই, যা সূরা আনআমের ৬:৫২ নং আয়াতে অতিবাহিত হয়েছে। এখানে লক্ষ্য সেই সাহাবায়ে কেরাম, যাঁরা গরীব ও দুর্বল ছিলেন। কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত লোকেরা যাঁদের সাথে ওঠা-বসা করতে পছন্দ করত না। সা'দ ইবনে আবী অক্কাস বলেন, আমরা ছয়জন সাহাবী রসূল (সাঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমাদের সাথে বিলাল, ইবনে মাসউদ, এবং একজন হুযালী ও দু'জন অন্য সাহাবীও ছিলেন। মক্কার কুরাইশগণ রসূল (সাঃ)-এর কাছে এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করল যে, যদি তুমি ঐ লোকদেরকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে দাও, তাহলে আমরা তোমার কাছে উপস্থিত হয়ে তোমার কথা শুনব। নবী করীম (সাঃ)-এর অন্তরে এই খেয়াল জাগল যে, হতে পারে আমার কথা শুনে তাদের মনের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে এ রকম করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন। (মুসলিমঃ ফাযায়েলে সাহাবা)[২] অর্থাৎ, এদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে এই সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালীদেরকে নিজের কাছে টেনে নিও না।[৩] فُرُطًا যদি إفراط থেকে হয়, তবে অর্থ হবে, যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে। আর যদি تفريط থেকে হয়, তবে অর্থ হবে, যার কার্যকলাপ অবহেলাপূর্ণ; যার পরিণাম হল বিনাশ ও ধ্বংস।
আল-কাহফ 18:29
বল, ‘সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সমাগত; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক ও যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।’ আমি সীমালংঘনকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি অগ্নি, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়; যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে; কত নিকৃষ্ট সেই পানীয় এবং কত নিকৃষ্ট সেই (অগ্নির) আশ্রয়স্থল।
আল-কাহফ 18:30
যারা বিশ্বাস রাখে ও সৎকর্ম করে, আমি তাদেরকে পুরস্কৃত করি। যে ভালো কর্ম করে, আমি তার কর্মফল নষ্ট করি না। [১]
[১] কুরআনের বর্ণনা-রীতি অনুযায়ী জাহান্নামীদের পর জান্নাতীদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। যাতে মানুষের মধ্যে জান্নাত লাভের প্রেরণা ও উৎসাহ সৃষ্টি হয়।
আল-কাহফ 18:31
তাদেরই জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেথায় তাদেরকে স্বর্ণ-কঙ্কণে অলঙ্কৃত করা হবে,[১] তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ণ ও স্থূ্ল রেশমের সবুজ বস্ত্র[২] ও সমাসীন হবে সুসজ্জিত আসনে; কত সুন্দর সে পুরস্কার ও কত উত্তম সে আশ্রয়স্থল।
[১] কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার যুগে এবং তারও পূর্বে প্রথা ছিল যে, বাদশাহ, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং গোত্রের সর্দাররা তাদের হাতে সোনার বালা পরিধান করত। যার দ্বারা তারা যে পৃথক মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ, সে কথা ফুটে উঠত। জান্নাতবাসীদেরকেও আল্লাহ জান্নাতে সোনার বালা পরাবেন।[২] سُنْدُسٍ পাতলা বা মিহি রেশম। এবং اِسْتَبْرَقٍ মোটা রেশম। দুনিয়াতে পুরুষের জন্য সোনা এবং রেশমের পোশাক পরিধান করা নিষেধ। যারা এই নির্দেশের উপর আমল করে দুনিয়াতে এই সব হারাম থেকে বিরত থাকবে, তারা জান্নাতে এ সব জিনিস লাভ করবে। সেখানে কোন জিনিসই নিষিদ্ধ হবে না, বরং জান্নাতবাসী যা চাইবে, তা-ই সেখানে বিদ্যমান পাবে। ﴿وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ﴾ "সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবী কর।" (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৩১ আয়াত)
আল-কাহফ 18:32
তুমি তাদের কাছে পেশ কর দুই ব্যক্তির একটি উপমা;[১] তাদের একজনকে আমি দিয়েছিলাম দু’টি আঙ্গুর বাগান এবং সে দু’টিকে আমি খেজুর বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত করেছিলাম।[২] আর এই দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানকে করেছিলাম শস্যক্ষেত্র। [৩]
[১] এই দুই ব্যক্তি কারা ছিল এ ব্যাপারে মুফাসসিরদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। মহান আল্লাহ কেবল বুঝানোর জন্য তাদের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, না বাস্তবিকই দু'জন এ রকম ছিল? যদি ছিল, তবে তারা বানী-ইস্রাঈলদের মধ্যে ছিল, না মক্কাবাসীদের মধ্যে? এদের মধ্যে একজন মু'মিন এবং দ্বিতীয়জন কাফের ছিল।
[২] যেভাবে চতুর্দিকে দেওয়াল দিয়ে হেফাযত করা হয়, অনুরূপভাবে এই বাগানগুলোর চতুর্দিকে খেজুরের গাছ ছিল। যা আড় ও দেওয়ালের কাজ দিত।
[৩] অর্থাৎ, উভয় বাগানের মধ্যস্থলে ক্ষেত ছিল, যাতে ফসলাদি উৎপন্ন হত। আর এইভাবে উভয় বাগানে ছিল শস্য ও ফল-ফসলের সমাবেশ।
আল-কাহফ 18:33
উভয় বাগানই ফল দান করত এবং এতে কোন ত্রুটি করত না।[১] আর উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত করেছিলাম নদী। [২]
[১] অর্থাৎ, ফল-ফসল উৎপাদনে কোন কমি না করে পরিপূর্ণরূপে ফসল দান করত।
[২] যাতে বাগানের সেচের ব্যাপারে যেন কোন বাধা সৃষ্টি না হয় অথবা বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল অঞ্চলের মত যেন বৃষ্টির মুখাপেক্ষী না হয়।
আল-কাহফ 18:34
তার প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। অতঃপর কথা প্রসঙ্গে সে তার বন্ধুকে বলল,[১] ‘ধন-সম্পদে তোমার তুলনায় আমি শ্রেষ্ঠ এবং জনবলে[২] তোমার তুলনায় আমি বেশী শক্তিশালী।’
[১] অর্থাৎ, বাগানের মালিক যে কাফের ছিল সে তার মু'মিন সাথীকে বলল।
[২] نَفَرٌ (দল, জনবল) বলতে সন্তান-সন্ততি ও ভৃত্য-চাকর।
আল-কাহফ 18:35
এভাবে নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার বাগানে প্রবেশ করল। সে বলল, ‘আমি মনে করি না যে, এটা কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে।
আল-কাহফ 18:36
আমি মনে করি না যে, কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবৃত্ত হই-ই, তাহলে আমি অবশ্যই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব। [১]
[১] অর্থাৎ, সেই কাফের কেবল তার অহংকার ও দাম্ভিকতাতেই পতিত ছিল না, বরং তার উন্মত্ততা ও ভবিষ্যতের সৌন্দর্যময় ও সুদীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে আল্লাহর পাকড়াও এবং কুকর্মের প্রতিফল পাওয়ার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন করে রেখেছিল। এমন কি সে কিয়ামতকেও অস্বীকার করল এবং বড়ই ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে বলল যে, কিয়ামত যদি সংঘটিত হয়ও, তবে সেখানেও আমার ভাগ্যে জুটবে উত্তম পরিণাম। যার কুফরী ও অবাধ্যতা সীমা অতিক্রম করে যায়, সে মাতালের মত এই ধরনের অহংকারমূলক দাবী করে। যেমন, অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَلَئِنْ رُجِعْتُ إِلَى رَبِّي إِنَّ لِي عِنْدَهُ لَلْحُسْنَى﴾ (فصلت: ৫০) "আমি যদি আমার পালনকর্তার কাছে যাই, তবে অবশ্যই তাঁর কাছে আমার জন্য কল্যাণ রয়েছে।" (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৫০ আয়াত) ﴿أَفَرَأَيْتَ الَّذِي كَفَرَ بِآياتِنَا وَقَالَ لَأُوتَيَنَّ مَالًا وَوَلَدًا﴾ (مريم:৭৭) "তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে আমার নিদর্শনাবলীতে অবিশ্বাস করে এবং বলে, আমাকে অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অবশ্যই দেওয়া হবে।" (সূরা মারয়্যাম ১৯:৭৭ আয়াত)
আল-কাহফ 18:37
উত্তরে তাকে তার বন্ধু বলল, ‘তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছ, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে ও পরে বীর্য হতে এবং তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন মনুষ্য আকৃতিতে? [১]
[১] তার এই ধরনের কথা-বার্তা শুনে তার মু'মিন সাথী তাকে ওয়ায ও নসীহতের ভঙ্গিমায় বুঝাতে লাগল যে, তুমি তোমার সেই স্রষ্টার সাথে কুফরী করছ, যিনি তোমাকে মাটি ও এক ফোঁটা পানি (বীর্যবিন্দু) থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানবকুলের পিতা আদম (আঃ)-কে যেহেতু মাটি থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছিল, তাই মানুষের মূল হল মাটিই। অতঃপর সৃষ্টির উপাদান হয়েছে বীর্য যা পিতার পৃষ্ঠদেশ থেকে স্খলিত হয়ে মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে স্থির হয়। সেখানে আল্লাহ নয় মাস পর্যন্ত তার লালন-পালন করেন। অতঃপর তাকে সম্পূর্ণ একজন মানুষরূপে মায়ের পেট থেকে বের করেন। কারো কারো নিকট মাটি থেকে সৃষ্টি হওয়ার অর্থ হল, মানুষ যে খাবার খায়, তা সবই যমীন অর্থাৎ, মাটি থেকে অর্জিত। এই খাবার হতেই সেই বীর্য তৈরী হয়, যা মহিলার গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির মাধ্যম হয়। এইভাবে প্রত্যেক মানুষের মূল উপাদান মাটিই বিবেচিত হয়। অকৃতজ্ঞ মানুষকে তার (সৃষ্টির) মূল সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার স্রষ্টা এবং প্রতিপালকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানো হচ্ছে যে, তুমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ এবং মৌলিক উপাদানের ব্যাপারে চিন্তা কর। তাঁর এই সমস্ত অনুগ্রহের প্রতি লক্ষ্য কর যে, তিনি তোমাকে কি থেকে কি বানিয়ে দিয়েছেন। এই সৃষ্টি করার কাজে কেউ তাঁর শরীক ও সাহায্যকারী নেই। এ সব কিছুই করেছেন কেবল সেই মহান আল্লাহ, যাঁকে মানতে তুমি প্রস্তুত নও। হায় আফসোস! কত অকৃতজ্ঞ এই মানুষ!
আল-কাহফ 18:38
কিন্তু আমি বলি, তিনি আল্লাহই আমার প্রতিপালক এবং আমি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরীক করি না। [১]
[১] অর্থাৎ, আমি তোমার মত কথা বলব না। আমি তো আল্লাহর প্রতিপালকত্বে এবং তাঁর একতত্ত্ববাদকে স্বীকার করি। এ থেকেও জানা গেল যে, দ্বিতীয়জন মুশরিকই ছিল।
আল-কাহফ 18:39
তুমি যখন ধনে ও সন্তানে তোমার তুলনায় আমাকে কম দেখলে, তখন তোমার বাগানে প্রবেশ করে তুমি কেন বললে না, ‘‘আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে; আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই।’’[১]
[১] আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার পদ্ধতি জানিয়ে দেওয়ার জন্য বলল যে, বাগানে প্রবেশ করার সময় অবাধ্যতা ও অহংকার প্রদর্শন না করে এইভাবে বললেই ভাল হত, مَا شَآءَ اللهُ لاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ যা কিছু হয় আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি চাইলে তা অবশিষ্ট রাখবেন এবং ইচ্ছা করলে ধ্বংস করে দিবেন। এই জন্যই হাদীসে এসেছে যে, "যাকে কারো মাল, সন্তান-সন্ততি অথবা অবস্থা ভাল লাগে, সে যেন বলে, 'মা শাআল্লাহু লা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' (তাফসীর ইবনে কাসীর, মুসনাদ আবূ ইয়া'লা)
আল-কাহফ 18:40
সম্ভবতঃ আমার প্রতিপালক আমাকে তোমার বাগান অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর কিছু দেবেন[১] এবং তোমার বাগানে আকাশ হতে আগুন বর্ষণ করবেন; যার ফলে তা মসৃণ ময়দানে পরিণত হবে।[২]
[১] দুনিয়াতে অথবা আখেরাতে কিংবা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই।
[২] حُسْبَانٌ হল غُفْرَانٌ এর ওজনে حساب ধাতু থেকে গঠিত শব্দ। অর্থাৎ, এমন আযাব যা কারো কৃতকর্মের পরিণাম স্বরূপ আসে। অর্থাৎ, আসমানের আযাব দ্বারা তিনি তাকে ঘিরে নেবেন এবং এই স্থান যেখানে এখন সবুজ-শ্যামল বাগান বিদ্যমান, সেটা শূন্য ও মসৃণ ভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।
আল-কাহফ 18:41
অথবা ওর পানি ভূ-গর্ভে অন্তর্হিত হবে এবং তুমি কখনো ওকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।’ [১]
[১] অথবা মধ্যস্থলে যে নদী প্রবাহিত, যেটা হল বাগানের শস্য-শ্যামলতার উৎস, তার পানিকে এত গভীরে পাঠিয়ে দেবেন যে, সেখান হতে পানি অর্জন করা অসম্ভব হয়ে যাবে। আর যেখানে পানি অতি গভীরে চলে যায়, পুনরায় সেখান হতে পানি বের করতে বড় বড় অশ্বশক্তিসম্পন্ন পাম্প্-মেশিনও ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়।
আল-কাহফ 18:42
তার ফল-সম্পদ পরিবেষ্টিত হয়ে গেল[১] এবং সে তাতে যা ব্যয় করেছিল, তার জন্য হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল;[২] যখন তা মাচান সহ পড়ে গেল।[৩] সে বলতে লাগল, ‘হায়! আমি যদি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরীক না করতাম।’[৪]
[১] এটা হল ধ্বংস ও বিনাশেরই আভাস। অর্থাৎ, তার পুরো বাগানটাই ধ্বংস করে দেওয়া হল।
[২] অর্থাৎ, বাগান প্রস্তুত ও সংস্কারের কাজে এবং চাষাবাদে যে অর্থ ব্যয় সে করেছিল, তার জন্য আক্ষেপের হাত কচলাতে লাগল। হাত কচলানোর অর্থ, অনুতপ্ত হওয়া।
[৩] অর্থাৎ, যে মাচান ও ছাদ-ছপ্পরের উপর আঙ্গুরের লতা রাখা ছিল, সেগুলো সব যমীনে পড়ে গেল এবং আঙ্গুরের সমস্ত ফসল ধ্বংস হয়ে গেল।
[৪] এখন সে অনুভব করতে পেরেছে যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশী স্থাপন করা, তাঁর যাবতীয় নিয়ামত দ্বারা প্রতিপালিত ও উপকৃত হয়ে তাঁর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করা ও তাঁর অবাধ্যতা করা কোনভাবেই কোন মানুষের জন্য উচিত নয়। তবে এখন আক্ষেপ ও অনুতাপ কোন ফল দেবে না। ধ্বংসের পর আফসোস করলে আর কি হবে?
আল-কাহফ 18:43
আল্লাহ ব্যতীত তাকে সাহায্য করার কোন লোকজন ছিল না[১] এবং সে নিজেও প্রতিকারে সমর্থ হল না।
[১] যে জনবলকে নিয়ে তার গর্ব ছিল, সে জনবল না তার কোন কাজে এল, আর না তারা নিজেরা আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচতে সক্ষম হল।
আল-কাহফ 18:44
এই ক্ষেত্রে সাহায্য করবার অধিকার সত্য আল্লাহরই।[১] পুরস্কারদানে ও পরিণাম নির্ধারণে তিনিই শ্রেষ্ঠ। [২]
[১] وِلاَيَةٌ এর অর্থ, বন্ধুতত্ত্ব ও সাহায্য। অর্থাৎ, এ রকম মুহূর্তে প্রত্যেক মু'মিন ও কাফের অবগত হয়ে যায় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ কারো সাহায্য করতে এবং তাঁর আযাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে সক্ষম নয়। আর এটাই কারণ যে, এ রকম মুহূর্তে বড় বড় অবাধ্য যালেমও ঈমান প্রকাশ করতে বাধ্য হয়ে যায়, যদিও এ সময় ঈমান ফলপ্রসূ ও গৃহীত হয় না। যেমন, কুরআন ফিরআউনের ব্যাপারে উল্লেখ করেছে যে, যখন সে ডুবতে লাগল, তখন বলতে লাগল যে, ﴿آمَنْتُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرائيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾ "যে কথায় বানী ইস্রাঈল বিশ্বাস করেছে, আমিও তাতে বিশ্বাস করলাম যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মাবূদ নেই এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ইউনুস ১০:৯০ আয়াত) অন্য কাফেরদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা যখন আমার আযাব দেখল, তখন বলল, "আমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করলাম এবং যাদের শরীক করতাম, তাদেরকে পরিহার করলাম"। (সূরা মু'মিন ৪০:৮৪) যদি الولاية এর و অক্ষরে জের (الوِلاية) হয়, তাহলে তার অর্থ হবে, শাসন ও এখতিয়ার। (ইবনে কাসীর)[২] তিনি তাঁর বন্ধুদের উৎকৃষ্ট প্রতিদান দেবেন এবং উত্তম পরিণাম দানে ধন্য করবেন।
আল-কাহফ 18:45
তাদের কাছে পেশ কর উপমা পার্থিব জীবনের; এটা পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার দ্বারা ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়। অতঃপর তা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। [১]
[১] এই আয়াতে দুনিয়া যে অস্থায়ী এবং ক্ষণস্থায়ী সে কথা ক্ষেতের একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ক্ষেতের ফসলাদি ও গাছ-পালার উপর যখন আসমান থেকে বৃষ্টির পানি পড়ে, তখন তা গ্রহণ করে ক্ষেত শ্যামল-সবুজ হয়ে ওঠে। ফসলাদি ও গাছপালা নতুন জীবনে মেতে ওঠে। কিন্তু এক সময় আবার এমন আসে, যখন পানি না পাওয়ার অথবা ফসল পেকে যাওয়ার কারণে ক্ষেত শুকিয়ে যায়। অতঃপর বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। বাতাসের এক ঝটকা কখনও তাকে ডান দিকে আবার কখনও বাম দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। পার্থিব জীবনও বাতাসের এক ঝটকা অথবা পানির বুদ্বুদের অথবা ক্ষেতের মত, যা কিছু কাল মনোহারিত্ব দেখিয়ে ধ্বংসের কোলে ঢলে পড়ে। আর এই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ সেই সত্তার হাতে, যিনি একক এবং প্রতিটি জিনিসের উপর সর্বশক্তিমান। মহান আল্লাহ দুনিয়ার এই দৃষ্টান্ত কুরআন মাজীদের কয়েক স্থানে বর্ণনা করেছেন। যেমন, সূরা ইউনুসের ১০:২৪ নং, সূরা যুমারের ৩৯:২১ নং এবং সূরা হাদীদের ৫৭:২০ নং আয়াত সহ আরো বিভিন্ন আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-কাহফ 18:46
ধনোশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।[১] আর সৎকার্য, যার ফল স্থায়ী[২] ওটা তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশা প্রাপ্তির ব্যাপারেও উৎকৃষ্ট।
[১] এতে সেই সব দুনিয়াদার লোকদের খন্ডন করা হয়েছে, যারা পার্থিব ধন-মাল, উপায়-উপকরণ এবং গোত্র ও সন্তান-সন্ততির জন্য গর্ব করে। মহান আল্লাহ বললেন, এই জিনিসগুলো হল ধ্বংসশীল এবং পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য। আখেরাতে এগুলো কোন কাজে আসবে না। এই জন্য পরে বলা হয়েছে যে, আখেরাতে কাজে আসবে স্থায়ী সৎকর্মসমূহ।
[২] بَاقِيَات صَالِحَات (স্থায়ী নেকীসমূহ) কোনটি বা কি কি? কেউ নামাযকে, কেউ তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) এবং তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু) বলাকে এবং কেউ আরো অন্যান্য সৎকর্মাদিকে বুঝিয়েছেন। তবে সঠিক কথা হল, এটা ব্যাপক; যাতে সকল প্রকার নেক কাজ শামিল। যাবতীয় ফরয ও ওয়াজেব এবং সুন্নত ও নফল কাজই হল স্থায়ী নেকীসমূহ। এমন কি নিষিদ্ধ কার্যাদি থেকে বিরত থাকাও এক প্রকার নেক কাজ; এতেও আল্লাহর কাছে নেকী পাওয়া যাবে।
আল-কাহফ 18:47
(স্মরণ কর,) যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত[১] এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কাউকেও অব্যাহতি দেব না। [২]
[১] এখানে কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং তার বড় বড় ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে। পর্বতকে সঞ্চালিত করার অর্থ, পাহাড় তার স্থান থেকে সরে যাবে এবং তা ধূনিত পশমের মত উড়তে থাকবে। ﴿وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ﴾ "এবং পাহাড়গুলো ধূনিত রঙিন পশমের মত হয়ে যাবে।" (সূরা ক্বারেআহ ১০১:৫ আয়াত) আরো দেখুন, সূরা তূরের ৫২:৯-১০, সূরা নাম্লের ২৭:৮৮ এবং সূরা ত্বহা র ২০:১০৫-১০৭ নং আয়াতগুলো। যমীন থেকে এই শক্তিশালী পাহাড়গুলো যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তখন ঘর-বাড়ী, গাছপালা এবং এই ধরনের অন্যান্য জিনিসগুলো কিভাবে সব সব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে? এই জন্যই পরে বলা হয়েছে, "তুমি যমীনকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর।"[২] অর্থাৎ, পূর্বের ও পরের, ছোট ও বড় এবং কাফের ও মু'মিন সকলকেই একত্রিত করব। কেউ যমীনের তলায় পড়ে থাকবে না এবং কবর থেকে বেরিয়ে কোথাও লুকাতে পারবে না।
আল-কাহফ 18:48
আর তাদেরকে তোমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত করা হবে সারিবদ্ধভাবে[১] (এবং বলা হবে), ‘তোমাদেরকে প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ; অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত সময় আমি উপস্থিত করব না?’
[১] এর অর্থ হল, একই সারিতে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে অথবা সারিবদ্ধভাবে আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবে।
আল-কাহফ 18:49
সেদিন (প্রত্যেকের হাতে) রাখা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে ভীত-সন্ত্রস্ত; তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত হিসাব রেখেছে!’ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; আর তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না ।
আল-কাহফ 18:50
(স্মরণ কর,) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’, তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদা করল; সে ছিল জীনদের একজন।[১] সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল;[২] তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে; অথচ তারা তোমাদের শত্রু?[৩] সীমালংঘনকারীদের পরিবর্ত কত নিকৃষ্ট![৪]
[১] কুরআনের স্পষ্ট এই বর্ণনা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, শয়তান ফিরিশতা ছিল না। ফিরিশতা হলে আল্লাহর নির্দেশকে অমান্য করার তার কোনই উপায় থাকত না। কেননা, ফিরিশতাদের গুণ মহান আল্লাহ এইভাবে বর্ণনা করেছেন, ﴿ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ "তাঁরা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন তা অমান্য করেন না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাঁরা তা-ই করেন।" (সূরা তাহরীম ৬৬:৬ আয়াত) এখানে একটি জটিলতা এই থেকে যায় যে, যদি সে ফিরিশতা হয়ে না থাকে, তবে তো সে আল্লাহর সম্বোধনের আওতাভুক্ত ছিল না। কেননা, সম্বোধন তো ফিরিশতাদের করা হয়েছিল। তাঁদেরকেই সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। 'রূহুল মাআনী'র লেখক বলেছেন যে, সে অবশ্যই ফিরিশতা ছিল না, কিন্তু ফিরিশতাদের সাথেই থাকত এবং তাঁদেরই মধ্যে গণ্য হত। কাজেই সেও اسْجُدُوا لِآدَمَ এই আদেশের আওতাভুক্ত ছিল। আদম (আঃ)-কে সিজদা করার নির্দেশে তাকেও যে সম্বোধন করা হয়েছিল এ কথা সুনিশ্চিত। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, ﴿مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ﴾ অর্থাৎ, আমি যখন আদেশ করলাম, তখন তোকে কিসে সিজদা করতে বারণ করল? (সূরা আ'রাফ ৭:১২ আয়াত)[২] فِسْقٌ এর অর্থ হয় বেরিয়ে যাওয়া। ইঁদুর তার গর্ত থেকে বেরিয়ে গেলে বলা হয়, فَسَقَتِ الْفأْرَةُ مِنْ جُحْرِهَا শয়তানও সম্মান ও সম্ভাষণের সিজদাকে অস্বীকার করে প্রতিপালকের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।[৩] অর্থাৎ, তোমাদের জন্য কি এটা ঠিক যে, তোমরা এমন ব্যক্তি ও তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, যে তোমাদের পিতা আদম (আঃ)-এর শত্রু, তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রু এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই শয়তানের আনুগত্য করবে?[৪] দ্বিতীয় একটি অর্থ এই করা হয়েছে যে, "অত্যাচারীরা কতই নিকৃষ্ট পরিবর্ত নির্বাচন করেছে।" অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না করে, শয়তানের আনুগত্য ও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে। আর এটা হল অতি নিকৃষ্টতম পরিবর্ত; যা এই যালেমরা গ্রহণ করেছে।
আল-কাহফ 18:51
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকালে আমি তাদেরকে (উপস্থিত) সাক্ষী রাখিনি এবং তাদের সৃজনকালেও নয়।[১] আর আমি এমনও নই যে, বিভ্রান্তকারীদেরকে সহায়করূপে গ্রহণ করব। [২]
[১] অর্থাৎ, আসমান ও যমীনের সৃষ্টি ও তার পরিচালনার ব্যাপারে, এমন কি এই শয়তানদের সৃষ্টি করার ব্যাপারেও আমি তাদের থেকে বা তাদের মধ্যে হতে কোন একজনের থেকেও কোন সাহায্য গ্রহণ করিনি। এদের তো তখন অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে তোমরা এই শয়তান এবং তার বংশধরের পূজা অথবা আনুগত্য কেন কর? পক্ষান্তরে আমার ইবাদত ও আনুগত্য থেকে তোমরা বিমুখ কেন? অথচ এরা সৃষ্টি, আর আমি এদের সকলের স্রষ্টা।
[২] অসম্ভব সত্ত্বেও যদি আমি কাউকে সাহায্যকারী বানাতামও, তবে এদেরকে কেন, যারা আমার বান্দাদেরকে ভ্রষ্ট করে আমার জান্নাত ও আমার সন্তুষ্টির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
আল-কাহফ 18:52
আর (স্মরণ কর,) যেদিন তিনি বলবেন, ‘তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে তাদেরকে আহবান কর!’ তারা তখন তাদেরকে আহবান করবে; কিন্তু তারা তাদের আহবানে সাড়া দেবে না এবং আমি তাদের উভয়ের মধ্যস্থলে রেখে দেব এক ধ্বংস-গহ্বর। [১]
[১] مَوْبِقٌ এর একটি অর্থ হল, পর্দা ও আড়। অর্থাৎ, তাদের মধ্যে পর্দা ও ব্যবধান করে দেওয়া হবে। কেননা, তাদের মধ্যে আপোসে শত্রুতা হবে। অনুরূপ ব্যবধান এ জন্যও হবে যে, হাশর প্রান্তে পরস্পর সাক্ষাৎ করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেছেন, এটা (موبق) হল জাহান্নামের রক্ত ও পুঁজবিশিষ্ট একটি বিশেষ উপত্যকা। আবার কেউ কেউ এর তরজমা করেছেন, ধ্বংস-গহ্বর; যা তরজমাতে এখতিয়ার করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই মুশরিক এবং তাদের মনগড়া উপাস্যরা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। কারণ, তাদের মাঝে সর্বনাশী সামগ্রী এবং অনেক ভয়াবহ জিনিস থাকবে।
আল-কাহফ 18:53
অপরাধীরা জাহান্নাম দেখে বুঝবে যে, তারা সেখানে পতিত হবে এবং তারা ওটা হতে কোন পরিত্রাণ স্থল পাবে না। [১]
[১] যেমন, হাদীসে আছে যে, কাফের এমন স্থান থেকেই নিশ্চিত হয়ে যাবে যে, তার ঠিকানা হল জাহান্নাম, যার দূরত্ব হল চল্লিশ বছরের পথ। (আহমাদ ৩/৭৫)
আল-কাহফ 18:54
আমি অবশ্যই মানুষের জন্য এই কুরআনে সর্বপ্রকার উপমা বিশদভাবে বর্ণনা করেছি, কিন্তু মানুষ সর্বাধিক বিতর্ক-প্রিয়। [১]
[১] অর্থাৎ, মানুষদেরকে সত্য পথ বুঝানোর জন্য কুরআনে আমি সব রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। ওয়ায-নসীহত করেছি। দৃষ্টান্ত, ঘটনাবলী এবং দলীলাদি পেশ করেছি। আর এগুলো বারংবার বিভিন্ন আকারে বর্ণনা করেছি। কিন্তু যেহেতু মানুষ কঠিন বিতর্ক-প্রিয়, তাই না ওয়ায-নসীহতের তার উপর কোন প্রভাব পড়ে, আর না দলীল-প্রমাণ তার জন্য ফলপ্রসূ হয়।
আল-কাহফ 18:55
যখন মানুষের কাছে পথ-নির্দেশ আসে, তখন এই প্রতীক্ষাই তাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন হতে ও তাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা হতে বিরত রাখে যে, তাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা তাদের নিকট উপস্থিত হবে[১] অথবা উপস্থিত হবে (সরাসরি) বিবিধ শাস্তি। [২]
[১] অর্থাৎ, মিথ্যা ভাবার কারণে এদের উপরও ঐরূপ আযাব আসবে, যেমন পূর্বের লোকদের উপর এসেছে।
[২] অর্থাৎ, মক্কাবাসী ঈমান আনার জন্য এই দু'টি জিনিসের মধ্যে কোন একটির অপেক্ষায় আছে। কিন্তু জ্ঞান-অন্ধদের জানা নেই যে, এর পর ঈমানের কোনই মূল্য নেই অথবা এর পর ঈমান আনার কোন সুযোগই নেই।
আল-কাহফ 18:56
আমি শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই রসূলদেরকে পাঠিয়ে থাকি, কিন্তু সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা মিথ্যা অবলম্বনে বিতন্ডা করে; যাতে তার দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়। আর তারা আমার নিদর্শনাবলী ও যার দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, সে সবকে বিদ্রূপের বিষয়রূপে গ্রহণ করে থাকে। [১]
[১] আল্লাহর আয়াতের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হল, তা মিথ্যাজ্ঞান করার অতীব নিকৃষ্টতম প্রকার। অনুরূপ মিথ্যা ও বাতিল দ্বারা বিতর্ক (অর্থাৎ, বাতিল তরীকা অবলম্বন) করে সত্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার প্রচেষ্টা করাও অতি ঘৃণিত আচরণ। আর এই বাতিল পন্থায় বিতর্ক করার একটি প্রকার হল, কাফেরদের এই বলে রসূলদের রিসালাতকে অস্বীকার করে দেওয়া যে, তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। ﴿ مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا﴾ (يـس: ১৫) অতএব আমরা তোমাদেরকে রসূল কিভাবে মেনে নিতে পারি? دَحَضَ এর প্রকৃত অর্থ হল, স্খলন ঘটা, পিছল কাটা। যেমন বলা হয়, دَحَضَتْ رِجْلُهُ (তার পদস্খলন ঘটেছে)। এখান থেকেই এ শব্দটি কোন জিনিস থেকে সরে যাওয়ার এবং ব্যর্থ হওয়ার অর্থে ব্যবহার হতে লেগেছে। বলা হয় যে, دَحَضَتْ حُجَّتُهُ دُحُوْضًا أي بَطَلَتْ (তার হুজ্জত বাতিল গণ্য হয়েছে।) এই দিক দিয়ে أدْحَضَ يُدْحِضُ এর অর্থ হবে, বাতিল বা ব্যর্থ করা। (ফাতহুল কাদীর)
আল-কাহফ 18:57
কোন ব্যক্তিকে তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর সে যদি তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার কৃতকর্মসমূহ ভুলে যায়, তবে তার অপেক্ষা অধিক সীমালংঘনকারী আর কে? আমি তাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়েছি; যেন তারা কুরআন বুঝতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা সৃষ্টি করেছি। তুমি তাদেরকে সৎপথে আহবান করলেও তারা কখনো সৎপথ পাবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রতিপালকের আয়াতসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মত মহা অন্যায় করার এবং নিজেদের কার্যকলাপ ভুলে থাকার কারণে তাদের অন্তঃকরণের উপর পর্দা রেখে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের কানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বধিরতার বোঝা। যার ফলে কুরআন বুঝা, শোনা এবং তা থেকে হিদায়াত গ্রহণ করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে গেছে। তাদেরকে যতই তুমি হিদায়াতের প্রতি আহবান কর, তারা কখনই হিদায়াতের পথ অবলম্বন করতে প্রস্তুত হবে না।
আল-কাহফ 18:58
তোমার প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল, দয়াবান। তাদের কৃতকর্মের জন্য তিনি তাদেরকে পাকড়াও করলে তিনি তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করতেন; কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে এক প্রতিশ্রুত মুহূর্ত; যা হতে তাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই। [১]
[১] অর্থাৎ এটা তো ক্ষমাশীল রবের দয়া যে, তিনি পাপের দরুন সত্ত্বর পাকড়াও করেন না, বরং অবকাশ দেন। যদি এ রকম না হত, তবে (বদ)আমলের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহর আযাবের শিকলে আবদ্ধ থাকত। হ্যাঁ, এ কথা বাস্তব যে, যখন অবকাশ শেষ হয়ে যায় এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ধ্বংসের সময় এসে যায়, তখন আর পলায়ন করার কোন পথ এবং নিষ্কৃতি পাওয়ার কোন উপায় তাদের জন্য থাকে না। مَوْئِلٌ এর অর্থ, আশ্রয়স্থল, পলায়ন পথ।
আল-কাহফ 18:59
ঐসব জনপদ; তাদের অধিবাসীবৃন্দকে আমি ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল এবং তাদের ধ্বংসের জন্য আমি স্থির করেছিলাম এক নির্দিষ্ট ক্ষণ। [১]
[১] এ থেকে আ'দ, সামুদ এবং শুআইব ও লূত عليهما السلام প্রভৃতিদের সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। যারা হিজাযবাসীদের সন্নিকটে এবং তাদের পথের ধারে আবাদ ছিল। তাদেরকেও তাদের যুলুমের কারণে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ধ্বংস সাধনের পূর্বে তাদেরকে পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর যখন এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তাদের যুলুম ও অবাধ্যতা এমন সীমায় পৌঁছে গেছে, যে সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর হিদায়াতের সমস্ত পথ একেবারে বন্ধ এবং তাদের নিকট থেকে আর কোন কল্যাণের আশা অবর্তমান, তখন তাদের আমলের অবকাশ শেষ হয়ে গেল এবং ধ্বংস আরম্ভ হয়ে গেল। অতঃপর তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল। আর এটাকে বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ গ্রহণের নমুনা বানিয়ে দিলেন। আসলে মক্কাবাসীদেরকে বুঝানো হচ্ছে যে, তোমরা আমার সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ রসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে মিথ্যাবাদী মনে করছ, তা সত্ত্বেও তোমাদেরকে অবকাশ দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করো না যে, তোমাদেরকে কেউ জিজ্ঞাসাবাদ করার নেই, বরং এই অবকাশ ও ঢিল দেওয়া হল আল্লাহর একটি দস্তর। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তি, দল এবং জাতিকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। যখন সে সময় শেষ হয়ে যাবে এবং তোমরা কুফরী ও অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসবে না, তখন তোমাদের অবস্থাও তাদের থেকে ভিন্ন হবে না, যারা তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে।
আল-কাহফ 18:60
(স্মরণ কর,) যখন মূসা তার সঙ্গীকে[১] বলেছিল, ‘দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে[২] না পৌঁছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।’ [৩]
[১] এই যুবক ছিল ইউশা' বিন নূন (আঃ) যিনি মূসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।
[২] কোন নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ স্থানকে নির্দিষ্ট করা যায়নি। তবে অনুমান ও লক্ষণাদির দাবী অনুযায়ী এটা হল সিনাই মরুভূমির দক্ষিণ মাথায়, যেখানে উকবাহ উপসাগর ও সুইজ উপসাগর এক সাথে একত্রিত হয়ে লোহিত সাগরে মিশে গেছে। অন্যান্য যেসব স্থানের কথা মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন তাতে مجمع البحرين (দুই সাগরের মিলনস্থল) এর যে ব্যাখ্যা হয়, তার সাথে মোটেই খাপ খায় না।
[৩] حُقُبٌ এর একটি অর্থ, ৭০ অথবা ৮০ বছর। দ্বিতীয় অর্থ, অনির্দিষ্ট সময়-কাল। এই দ্বিতীয় অর্থই এখানে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যতক্ষণ না আমি مجمع البحرين (দুই সাগরের মিলনস্থল) পর্যন্ত পৌঁছব, ততক্ষণ পর্যন্ত চলতেই থাকব এবং সফর অব্যাহত রাখব। তাতে যতদিন লাগে লাগবে। মূসা (আঃ)-এর এই সফরের প্রয়োজন এই জন্য দেখা দিয়েছিল যে, তিনি একজন প্রশ্নকারীর উত্তরে বলেছিলেন, বর্তমানে আমার থেকে বড় জ্ঞানী আর কেউ নেই। তাঁর এই (গর্ব) কথা মহান আল্লাহর পছন্দ হল না। সুতরাং অহীর মাধ্যমে তাঁকে অবগত করলেন যে, আমার এক বান্দা (খায্বির) তোমার থেকেও বড় জ্ঞানী। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ! তাঁর সাথে সাক্ষাৎ কিভাবে হতে পারে? মহান আল্লাহ বললেন, যেখানে উভয় সাগর এক সাথে মিশে গেছে, সেখানেই আমার সেই বান্দা থাকবে। অনুরূপ এ কথাও বললেন যে, সাথে করে একটি মাছ নিও। যখন এ মাছ তোমার থলি থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখন বুঝে নিও যে, এটাই তোমার গন্তব্যস্থল। (বুখারী, সূরা কাহ্ফ) এই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি একটি মাছ নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে দিলেন।
আল-কাহফ 18:61
তারা যখন উভয় (সমুদ্রে)র সঙ্গম স্থলে পৌঁছল, তখন নিজেদের মাছের কথা ভুলে গেল; অথচ ওটা সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।
আল-কাহফ 18:62
যখন তারা আরো অগ্রসর হল, তখন মূসা তার সঙ্গীকে বলল, ‘আমাদের নাশতা আনো, আমরা তো আমাদের এই সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
আল-কাহফ 18:63
সে বলল, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখন্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই ওর কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল; মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।’ [১]
[১] অর্থাৎ, মাছটি জীবিত হয়ে সমুদ্রের মধ্যে চলে যায় এবং তার জন্য মহান আল্লাহ সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ বানিয়ে দেন। ইউশা' (আঃ) মাছটিকে সমুদ্রে যেতে এবং পথ সৃষ্টি হতে দেখেছিলেন, কিন্তু মূসা (আঃ)-কে এ কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। এমন কি সেখানে বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করে দিয়েছিলেন। এই দিন এবং দিনের পরে রাত সফর করে যখন দ্বিতীয় দিনে মূসা (আঃ) ক্লান্তি ও ক্ষুধা অনুভব করলেন, তখন তিনি তাঁর যুবক সাথীকে বললেন, চল খাবার খেয়ে নিই। তিনি বললেন, যেখানে পাথরে হেলান দিয়ে আমরা বিশ্রাম নিয়েছিলাম, মাছটি সেখানে জীবিত হয়ে সমুদ্রে চলে গেছে এবং সেখানে বিস্ময়করভাবে সে তাঁর পথ বানিয়ে নিয়েছে। আর এ কথা আপনাকে বলতে আমি ভুলে গেছি। আসলে শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে।
আল-কাহফ 18:64
মূসা বলল, ‘আমরা তো সেটারই অনুসন্ধান করছিলাম।’ অতঃপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলতে লাগল। [১]
[১] মূসা (আঃ) বললেন, আল্লাহর বান্দা! যেখানে মাছটি জীবিত হয়ে অদৃশ্য হয়েছে, সেটাই হচ্ছে আমাদের ঐ গন্তব্যস্থল, যার খোঁজে আমরা সফর করছি। তাই নিজেদের পায়ের চিহ্নকে অনুসরণ করে সেদিকেই প্রত্যাবর্তন করলেন, যেদিক থেকে এসেছিলেন এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে ফিরে গেলেন। قَصَصًا এর অর্থ, পিছনে পড়া, পিছে পিছে চলা। অর্থাৎ, পায়ের চিহ্নকে অনুসরণ করে তার পিছনে পিছনে চলতে লাগলেন।
আল-কাহফ 18:65
অতঃপর তারা সাক্ষাৎ পেল আমার দাসদের মধ্যে একজনের;[১] যাকে আমি আমার নিকট হতে অনুগ্রহ[২] দান করেছিলাম ও যাকে আমি আমার নিকট হতে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান। [৩]
[১] এই দাস বা বান্দা হলেন খাযির। বহু সহীহ হাদীসে সুস্পষ্টভাবে এটা বর্ণিত হয়েছে। 'খাযির'-এর অর্থ সবুজ-শ্যামল। তিনি একদা সাদা যমীনের উপর বসলে, যমীনের সেই অংশটুকু তাঁর নীচে দিয়ে সবুজ হয়ে উঠে। এই কারণেই তাঁর নাম হয়ে যায় 'খাযির'। (বুখারীঃ সূরা কাহ্ফের তাফসীর)
[২] رَحْمَةٌ এর অর্থ কোন কোন মুফাসসির নিয়েছেন বিশেষ অনুগ্রহ যা আল্লাহ তাঁর এই বিশিষ্ট বান্দাকে প্রদান করেছিলেন। তবে অধিকাংশ মুফাস্সির এর অর্থ নিয়েছেন নবুঅত।
[৩] এটা মূসা (আঃ)-এর কাছে যে জ্ঞান ছিল সেই নবুঅত ছাড়াও এমন সৃষ্টিগত বিষয়ের এমন জ্ঞান, যে জ্ঞান দানে মহান আল্লাহ কেবল খাযিরকেই ধন্য করেছিলেন এবং মূসা (আঃ)-এর কাছেও এ জ্ঞান ছিল না। এটাকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করে কোন কোন সুফিপন্থীরা দাবী করে যে, আল্লাহ তাআলা নবী নন এমন কোন কোন লোককে, 'ইলমে লাদুন্নী' (বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান) দানে ধন্য করেন। আর এ জ্ঞান কোন শিক্ষক ছাড়াই কেবল আল্লাহর অপার দয়া ও করুণায় লব্ধ হয় এবং এই 'বাতেনী ইলম' (গুপ্ত জ্ঞান) শরীয়তের বাহ্যিক জ্ঞান -- যা কুরআন ও হাদীস আকারে বিদ্যমান তা -- থেকে ভিন্ন হয়, বরং কখনো কখনো তার বিপরীত ও বিরোধীও হয়। কিন্তু এ দলীল এই জন্য সঠিক নয় যে, তাঁকে যে কিছু বিশেষ জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, সে কথা মহান আল্লাহ নিজেই পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। অথচ অন্য কারো জন্য এ ধরনের কথা বলা হয়নি। যদি এটাকে ব্যাপক করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেক যাদুকর-ভেল্কিবাজ এই ধরনের দাবী করতে পারে। তাই তো সুফিবাদীদের মাঝে এই দাবী ব্যাপকহারে বিদ্যমান। তবে এই ধরনের দাবীর কোনই মূল্য নেই।
আল-কাহফ 18:66
মূসা তাকে বলল, ‘সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হতে আমাকে শিক্ষা দেবেন -- এই শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি?’
আল-কাহফ 18:67
সে বলল, ‘তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবে না।
আল-কাহফ 18:68
যে বিষয় তোমার জ্ঞানায়ত্ত নয়,[১] সে বিষয়ে তুমি ধৈর্যধারণ করবে কেমন করে?’
[১] অর্থাৎ, যে ব্যাপারে তোমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই।
আল-কাহফ 18:69
মূসা বলল, ‘ইন শাআল্লাহ (আল্লাহ চাইলে) আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না।’
আল-কাহফ 18:70
সে বলল, আচ্ছা, ‘তুমি যদি আমার অনুসরণ কর-ই, তাহলে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করো না, যতক্ষণ না আমি সে সম্বন্ধে তোমাকে কিছু বলি।’
আল-কাহফ 18:71
অতঃপর তারা যাত্রা শুরু করল। পরে যখন তারা নৌকায় আরোহণ করল, তখন সে তাতে ছিদ্র করে দিল। মূসা বলল, ‘আপনি কি আরোহীদেরকে ডুবিয়ে দেবার জন্য তাতে ছিদ্র করলেন?! আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।’ [১]
[১] মূসা (আঃ) যেহেতু এই বিশেষ জ্ঞানের খবর রাখতেন না, যে জ্ঞানের ভিত্তিতে খাযির (আঃ) নৌকা ছিদ্র করে দিয়েছিলেন, তাই তিনি ধৈর্য ধারণ করতে না পেরে নিজের জানা ও বুঝার আলোকে এটাকে একটি গুরুতর মন্দ কাজ গণ্য করেন। إِمْرًا এর অর্থ হল, الدَّاهِيَةُ الْعَظِيْمَةُ বড়ই ভয়াবহ কাজ।
আল-কাহফ 18:72
সে বলল, ‘আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবে না?’
আল-কাহফ 18:73
মূসা বলল, ‘আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না ও আমার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমার সাথে সহজ পন্থা অবলম্বন করুন, কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।
আল-কাহফ 18:74
অতঃপর তারা চলতে লাগল; চলতে চলতে তাদের সাথে এক বালকের[১] সাক্ষাৎ হলে সে তাকে হত্যা করল। তখন মূসা বলল, ‘আপিন কি এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন হত্যার অপরাধ ছাড়াই?! আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।’ [২]
[১] 'বালক' বলতে তরুণ, কিশোর অথবা শিশু হতে পারে।
[২] نُكْرًا، فَظِيْعًا مُنْكَرًا لاَ يُعْرَفُ فِي الشَّرْعِ এত বড় অন্যায় কাজ, শরীয়তে যে কাজের কোন বৈধতা নেই। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, أَنْكَرُ مِنَ الأَمْرِ الأَوَّلِ প্রথম কাজ (নৌকা ছিদ্র করার) থেকেও আরো বড় অন্যায়। কারণ, হত্যা এমন কাজ, যার ক্ষতিপূরণ ও সংশোধন সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে নৌকা ছিদ্র করে দেওয়া এমন ক্ষতিকর কাজ, যার ক্ষতিপূরণ ও সংশোধন হতে পারে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, الأَوَّلِ أَقَلُّ مِنَ الأَمْرِ (প্রথম কাজের থেকেও কম অন্যায়) কারণ, একটি প্রাণকে হত্যা করা সমস্ত মানুষকে ডুবিয়ে দেওয়ার তুলনায় লঘু অন্যায়। (ফাতহুল কাদীর) তবে প্রথম অর্থই বেশী সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, মূসা (আঃ) শরয়ী যে জ্ঞান রাখতেন, সেই জ্ঞানের আলোকে এ কাজ অবশ্যই শরীয়ত বিরোধী ছিল। তাই তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন এবং এই কাজগুলোকে অতি গুরুতর অন্যায় বলে গণ্য করেছিলেন।
আল-কাহফ 18:75
সে বলল, ‘আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবে না?’
আল-কাহফ 18:76
মূসা বলল, এর পর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তাহলে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না; আপনার কাছে আমার ওজর-আপত্তি চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে।’[১]
[১] অর্থাৎ এবার যদি প্রশ্ন করি তাহলে আপনি আমাকে সাথে নেওয়ার মর্যাদা হতে বঞ্চিত করবেন; তাতে আমার কোন আপত্তি থাকবে না। যেহেতু এ ব্যাপারে তখন আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য অজুহাত থাকবে।
আল-কাহফ 18:77
অতঃপর উভয়ে চলতে লাগল; চলতে চলতে তারা এক জনপদের অধিবাসীদের নিকট পৌঁছে খাদ্য চাইল; কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল।[১] অতঃপর সেখানে তারা এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেল এবং সে ওটাকে সোজা খাড়া করে দিল। [২] মূসা বলল, ‘আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।’ [৩]
[১] এই গ্রামটি ছিল কৃপণ ও হীন লোকদের যারা অতিথিদের আপ্যায়ন করতে অস্বীকার করল। অথচ মুসাফিরদেরকে খাদ্য দান করা এবং অতিথিদের আতিথেয়তা করা প্রত্যেক ধর্মের সৎচরিত্রতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে পরিচিত। মহানবী (সাঃ)ও মেহমানদের আপ্যায়ন করা ও তাদের সম্মান করা ঈমানের দাবী বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন নিজ মেহমানদের সম্মান করে।" (বুখারী, মুসলিম)
[২] খাযির (আঃ) দেওয়ালটাতে হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন আর আল্লাহর আদেশে অলৌকিকভাবে তা সোজা হয়ে গেল। যেমন সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এ কথা স্পষ্ট হয়।
[৩] মূসা (আঃ) যিনি প্রথম থেকেই গ্রামের মানুষের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন, তিনি খাযির (আঃ)-এর বিনা পারিশ্রমিকে কাজটি করে দেওয়ায় চুপ থাকতে পারলেন না; বরং বলে ফেললেন যে, যারা আমাদের মুসাফিরী অবস্থা, আহারের প্রয়োজনীয়তা, মান-সম্মান প্রভৃতি কিছুরই খেয়াল রাখল না তারা অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্য হয় কি করে?
আল-কাহফ 18:78
সে বলল, ‘এখানেই তোমার ও আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল;[১] (তবে) যে বিষয়ে তুমি ধৈর্যধারণ করতে পারনি আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি; [২]
[১] খাযির (আঃ) বললেন, মূসা তুমি তৃতীয়বারও ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলে না, এবার তোমার কথামত তোমাকে আমি সাথে নিতে অপারগ।
[২] কিন্তু খাযির (আঃ) পৃথক হওয়ার আগে উক্ত তিনটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা জরুরী মনে করলেন। যাতে মূসা (আঃ) বিভ্রান্তির শিকার না হন এবং বুঝতে পারেন যে, নবুঅতের জ্ঞান আলাদা যা তাঁকে দান করা হয়েছে এবং সৃষ্টিগত কিছু বিষয়ের জ্ঞান আলাদা যা আল্লাহর হিকমত ও ইচ্ছায় খাযিরকে দেওয়া হয়েছে। আর সেই অনুযায়ী তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। যার কারণে মূসা (আঃ)ও চুপ থাকতে পারেননি।
উক্ত প্রকার সৃষ্টিগত কর্ম সম্পাদনের কারণেই কিছু বিদ্বানদের ধারণা যে, খাযির মানুষ ছিলেন না। আর এই জন্যই তাঁরা এ বিতর্কের ঝামেলায় যান না, তিনি রসূল ছিলেন, নবী ছিলেন, নাকি ওলী ছিলেন। কারণ এ সকল মর্যাদা কেবল মানুষের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁরা বলেন, তিনি ফিরিশতা ছিলেন। কিন্তু যদি আল্লাহ কোন নবীকে সৃষ্টিগত কিছু বিষয়ের জ্ঞান দান করে ওই শ্রেণীর কোন কাজ করিয়ে নেন, তাহলে তা অসম্ভব কিছুই নয়। যখন অহীপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজেই তা পরিষ্কার করে দেন যে, আমি এটা আল্লাহর আদেশে করেছি। সুতরাং যদিও তা শরীয়ত-বিরোধী বলে মনে হয়, তবুও যেহেতু এর সম্পর্ক সৃষ্টিগত বিষয়ীভূত জ্ঞানের সাথে, সেহেতু জায়েয-নাজায়েযের বিতর্ক ওঠার কথা নয়। যেমন সৃষ্টিগত নিয়মানুসারে কেউ অসুস্থ হয়, কেউ মৃত্যু বরণ করে, কারো ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যায়, কোন জাতির উপর আযাব আসে; এ সবের মধ্যে কিছু কিছু কাজ কোন কোন সময় আল্লাহর আদেশে ফিরিশতারা করে থাকেন। যেভাবে এ সমস্ত কাজ আজ পর্যন্ত কারো শরীয়ত-বিরোধী বলে মনে হয়নি, সেইভাবে খাযির দ্বারা সংঘটিত কাজগুলো শরীয়তের দাঁড়িপাল্লায় মাপা উচিত নয়। তবে বর্তমানে নবুঅত ও অহীর পরম্পরা শেষ হয়ে যাওয়ার পর কারো পক্ষে এ সমস্ত জিনিসের দাবী কোনক্রমেই সত্য বলে মেনে নেওয়ার মত নয়; যেমন খাযির কর্তৃক প্রমাণিত। কারণ খাযিরের কর্মসমূহ কুরআন হতে সাব্যস্ত; আর সেই কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু এখন কেউ এ রকম কর্মকান্ড ঘটালে বা ঘটাবার দাবী করলে তার প্রতিবাদ করা জরুরী। কারণ তার দাবীর প্রমাণে সেই নিশ্চিত সত্য জ্ঞান আজ অবর্তমান; যার দ্বারা তার দাবীর বাস্তবিকতা প্রমাণ হতে পারে ।
আল-কাহফ 18:79
নৌকাটির ব্যাপারে (কথা এই যে,) ওটা ছিল কতিপয় দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে কাজ করত; আমি ইচ্ছা করলাম নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে, কারণ ওদের সম্মুখে ছিল এক রাজা, যে বল প্রয়োগে সকল (নিখুঁত) নৌকা ছিনিয়ে নিত।
আল-কাহফ 18:80
আর বালকটির (কথা এই যে,) তার পিতা-মাতা ছিল বিশ্বাসী। আমি আশংকা করলাম যে, সে বিদ্রোহাচরণ ও অবিশ্বাস দ্বারা তাদেরকে বিব্রত করবে।
আল-কাহফ 18:81
অতঃপর আমি চাইলাম যে, তাদের প্রতিপালক যেন তাদেরকে তার পরিবর্তে (এমন) এক সন্তান দান করেন; যে হবে পবিত্রতায় মহত্তর ও ভক্তি-ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর ।
আল-কাহফ 18:82
আর ঐ প্রাচীরটির (কথা এই যে,) ওটা ছিল নগরবাসী দুই এতীম বালকের, ওর নিম্নদেশে আছে তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং তোমার প্রতিপালক দয়াপূর্বক ইচ্ছা করলেন যে, তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হোক এবং তারা তাদের ধনভান্ডার উদ্ধার করুক; আমি নিজের তরফ থেকে সেসব করিনি। [১] তুমি যে বিষয়ে ধৈর্য ধারণে অপারগ হয়েছিলে, এটাই তার ব্যাখ্যা।’
[১] খাযির (আঃ)-কে যাঁরা নবী বলেন তাঁদের এটি দ্বিতীয় দলীল যা দ্বারা তাঁরা তাঁর নবী হওয়া প্রমাণ করেন । কারণ নবী ব্যতীত কারো নিকট এই শ্রেণীর অহী আসে না, যিনি কোন গায়বী ইশারায় এত বড় বড় কাজ করতে পারেন। আর না নবী ব্যতীত অন্য কারো গায়বী ইঙ্গিতে এ ধরনের কাজ মেনে নেওয়ার মত।
খাযির (আঃ)-এর নবুঅতের মত তাঁর জীবন বিষয়েও কিছু লোকের নিকট মত-পার্থক্য রয়েছে। যাঁরা মনে করেন খাযির (আঃ) এখনও জীবিত, তাঁরা বেশ কিছু লোকের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ প্রমাণ করেন। কিন্তু যেভাবে খাযিরের আজ পর্যন্ত জীবিত থাকার ব্যাপারে শরীয়তের কোন দলীল নেই, ঠিক সেইভাবে খাযিরের সঙ্গে ধ্যানমগ্ন, নিদ্রিত বা জাগ্রত অবস্থায় কারো সাক্ষাৎ লাভের কথাও মানার যোগ্য নয়। যখন তার শরীরের হুলিয়া (গঠনাকৃতি) সঠিক দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়, তখন তাঁকে কিভাবে চেনা সম্ভব? আর কি ভাবেই বা বিশ্বাস করা যায় যে, যাঁরা খাযিরের সাক্ষাৎ লাভের দাবী করেন তাঁরা সত্যি সত্যি মূসা (আঃ) এর সঙ্গী খাযির (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। যেহেতু এমনও হতে পারে যে, খাযিরের নামে তাঁদেরকে অন্য কেউ ধোঁকা দিয়েছে।
আল-কাহফ 18:83
আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে; [১] তুমি বলে দাও, ‘আমি তোমাদের নিকট তার বিষয়ে বর্ণনা করব।’
[১] ইয়াহুদীদের কথামত মুশরিকরা যে তিনটি প্রশ্ন নবী (সাঃ)-কে করেছিল তার মধ্যে এটি তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর। যুলক্বারনাইন এর শাব্দিক অর্থ হল দুই শিংবিশিষ্ট। আর তাঁর নামকরণের কারণঃ যেহেতু তাঁর মাথায় বাস্তবেই দুটি শিং ছিল। কিংবা কারণ এই যে, তিনি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে সূর্যের (উদয়-অস্তের সময় তার) শিং বা কিরণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তাঁর মাথায় শিঙের মত চুলের দুটি ঝুঁটি ছিল। পূর্ববর্তী মুফাসসিরগণের মতানুসারে তিনি হলেন রোমের আলেকজান্ডার, যাঁর রাজত্ব ছিল পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত। কিন্তু আধুনিক যুগের মুফাসসিরগণ অভিনব ঐতিহাসিক তত্তের আলোকেই তাঁদের সাথে একমত নন। বিশেষ করে মওলানা আবুল কালাম আজাদ যিনি যুলক্বারনাইনের স্বরূপ ও প্রকৃতত্ব উদ্ঘাটনের জন্য যে গবেষণা করেছেন তা প্রশংসাযোগ্য।
তার গবেষণার সারমর্ম হলঃ
(ক) যুলক্বারনাইন সম্বন্ধে কুরআন পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তিনি এমন এক বাদশাহ ছিলেন যাকে আল্লাহ প্রচুর পার্থিব উপকরণ ও উপাদান দান করেছিলেন। (খ) পূর্ব ও পশ্চিমের দেশসমূহকে জয় করে এমন এক পাহাড়ী রাস্তায় পৌছলেন যার অন্য দিকে য়্যা'জূজ-মা'জূজ জাতি বাস করে। (গ) সেখানে তিনি য়্যা'জূজ-মা'জুজের রাস্তা বন্ধ করার জন্য একটি মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করেন। (ঘ) তিনি ন্যায়পরায়ণ, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সম্রাট ছিলেন। (ঙ) তিনি প্রবৃত্তিপূজারী ও ধন-সম্পদের লোভী ছিলেন না। মওলানা আজাদ বলেন, এই সমস্ত গুণের অধিকারী একমাত্র পারস্যের সেই সম্রাট যাকে ইউনানী (গ্রীস) ভাষায় সাইরাস, ইবরানী (হিব্রু) ভাষায় খুরাস এবং আরবী ভাষায় কাইখাসরু নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর রাজত্বকাল ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্ব। মওলানা আরো বলেন, ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সাইরাসের একটি মূর্তি পাওয়া গেছে, যাতে তাঁর দেহকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যে, তাঁর শরীরের দু দিকে ঈগলের মত দুটি ডানা এবং ভেড়ার মত মাথায় দুটি শিং রয়েছে। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্যঃ তুরজুমানুল কুরআন ১ম খন্ড ৩৯৯-৪৩০পৃঃ) আর আল্লাহই ভালো জানেন।
আল-কাহফ 18:84
আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ[১] দিয়েছিলাম।
[১] سَبَب এর প্রকৃত অর্থ দড়ি বা রশি। তবে এই শব্দের ব্যবহার ঐ সমস্ত মাধ্যম ও অসীলার জন্যও হয়, যার সাহায্যে মানুষ তার উদ্দেশ্য লাভ করতে পারে। এখানে অর্থ হল, আমি তাকে এমন মাধ্যম ও উপকরণ দান করেছিলাম, যার দ্বারা সে দেশসমূহ জয় করে। শত্রুদের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেয় এবং অত্যাচারী বাদশাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে।
আল-কাহফ 18:85
সে এক পথ অবলম্বন করল।[১]
[১] দ্বিতীয়ত سَبَب এর অর্থঃ পথ করা হয়েছে। কিংবা এর অর্থ হল, আল্লাহ প্রদত্ত মাধ্যম থেকে অতিরিক্ত আরো কিছু মাধ্যম প্রস্তুত করল; যেমন আল্লাহর সৃষ্টি লোহা দিয়ে নানান রকমের অস্ত্র-শস্ত্র ও যন্ত্র তৈরী করা হয় এবং যেভাবে বিভিন্ন ধাতু দিয়ে বিভিন্ন জিনিস-পত্র তৈরী করা হয়।
আল-কাহফ 18:86
চলতে চলতে যখন সে সূর্যের অস্তগমন স্থলে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে এক কর্দমাক্ত ঝরনায় অস্তগমন করতে দেখল[১] এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললাম,[২] ‘হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদের ব্যাপারে সদুপায় অবলম্বন করতে পার।’ [৩]
[১] عَين এর অর্থঃ ঝরনা বা সমুদ্র। حَمِئَة এর অর্থঃ কর্দম, কাদা বা দলদল। وَجَد অর্থঃ পেল, দেখল বা অনুভব করল। অর্থাৎ, যুলক্বারনাইন দেশের পর দেশ জয় করে যখন পশ্চিম প্রান্তে শেষ জনপদে পৌঁছলেন। সেখানে কাদাময় পানির ঝরনা বা সমুদ্র ছিল; যেটা নীচে থেকে কালো মনে হচ্ছিল। তাঁর মনে হল, যেন সূর্য ঐ পানিতে অস্ত যাচ্ছে। সমুদ্র-তীর থেকে বা দূর থেকে সেখানে পানি ব্যতীত আর কিছু দেখা যায় না, সেখানে যারা সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করবে তাদের মনে হবে যেন সূর্য সমুদ্রেই অস্ত যাচ্ছে অথচ সূর্য মহাকাশে স্বস্থানেই অবস্থান করে।
[২] 'আমি বললাম---' অহীর মাধ্যমে। এর দ্বারা কিছু সংখ্যক উলামা তাঁর নবী হবার দলীল গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে যাঁরা তাঁকে নবী বলে স্বীকার করেন না, তাঁরা এর অর্থে বলেন, 'সেই সময়কার নবীর মাধ্যমে আমি তাকে বললাম।'
[৩] অর্থাৎ, আমি তাকে ঐ জাতির উপর বিজয়ী করে পূর্ণ অধিকার দিলাম যে, ইচ্ছা হলে তুমি তাদেরকে হত্যা কর অথবা বন্দী কর অথবা মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে অনুগ্রহ করে মুক্ত করে দাও।
আল-কাহফ 18:87
সে বলল, ‘যে কেউ সীমালংঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেব,[১] অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন।
[১] অর্থাৎ, যারা কুফরী ও শিরকের উপর অটল থাকবে, আমি তাদেরকে শাস্তি দেব। অর্থাৎ, পূর্বেকার পাপগুলোর ব্যাপারে পাকড়াও করব না।
আল-কাহফ 18:88
তবে যে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, তার জন্য প্রতিদান স্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলব।’
আল-কাহফ 18:89
অতঃপর সে (আর) এক পথ অবলম্বন করল। [১]
[১] অর্থাৎ, পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে সফর শুরু করলেন।
আল-কাহফ 18:90
চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল, তখন সে দেখল ওটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে, যাদের জন্য আমি সূর্য থেকে কোনরূপ অন্তরাল সৃষ্টি করিনি। [১]
[১] অর্থাৎ, তিনি এমন জায়গায় পৌঁছলেন যেখানে পূর্ব প্রান্তের শেষ জনপদটি অবস্থিত; এটাকেই সূর্য উদয়ের স্থল বলা হয়েছে। সেখানে এমন এক জাতি প্রত্যক্ষ করলেন যারা ঘরে বাস না করে খোলা জায়গায় মরুভূমিতে বসবাস করছিল, শরীরে কোন পোশাকও ছিল না। এর অর্থ হল সূর্যের এবং তাদের মাঝে কোন বাধা ছিল না বরং সূর্য তাদের উলঙ্গ শরীরের উপর সরাসরি উদিত হত।
আল-কাহফ 18:91
প্রকৃত ঘটনা এটাই, তার (আসল) বৃত্তান্ত আমি সম্যক অবগত আছি। [১]
[১] অর্থাৎ যুলকারনাইন সম্পর্কে যা কিছু বর্ণনা করলাম তা এই যে, সে প্রথমে পশ্চিমে শেষ প্রান্তে ও পরে পূর্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছে। আমি তার যোগ্যতা, সামর্থ্য, উপকরণ ও মাধ্যম বা অন্য সকল কথা সম্পর্কে সম্যক অবহিত।
আল-কাহফ 18:92
আবার সে এক পথ অবলম্বন করল। [১]
[১] অর্থাৎ, এবার তিনি অন্য দিকে যেতে প্রস্তুত হলেন।
আল-কাহফ 18:93
চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত-প্রাচীরের[১] মধ্যবর্তী স্থলে পৌঁছল, তখন সেখানে সে এক সম্প্রদায়কে পেল, যারা তার কথা প্রায় বুঝতেই পারছিল না। [২]
[১] এর অর্থ এমন দু'টি পাহাড়, যা এক অপরের পাশাপাশি যার মাঝে ছিল রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে য়্যা'জূজ-মা'জূজরা বসতি এলাকায় এসে হত্যা ও লুঠতরাজ চালাত।
[২] অর্থাৎ নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্যের ভাষা তারা বুঝত না।
আল-কাহফ 18:94
তারা বলল, ‘হে যুলকারনাইন![১] য়্যা’জূজ ও মা’জূজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে; [২] আমরা কি আপনাকে কর দেব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে এক প্রাচীর গড়ে দেবেন?’
[১] যুলকারনাইনের সাথে তাদের কথোপকথন কোন দোভাষী দ্বারা হয়েছিল। কিংবা আল্লাহ তাআলা তাঁকে যেসব বিশেষ উপকরণ ও মাধ্যম দান করেছিলেন, তার মধ্যে একটি বিভিন্ন ভাষা বুঝাও হতে পারে। সুতরাং তারা সরাসরি তাঁর সাথে কথা বলেছিল।
[২] য়্যা'জূজ ও মা'জূজ দুটি জাতি সহীহ হাদীস মোতাবেক এরা মনুষ্য জাতি। এদের সংখ্যা অন্যান্য জাতির তুলনায় অনেক বেশী হবে এবং তাদেরকে দিয়েই জাহান্নামের বেশী অংশ পূর্ণ করা হবে। (বুখারী, সূরা হাজ্জের তফসীর, মুসলিম ঈমান অধ্যায়)
আল-কাহফ 18:95
সে বলল, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন তাই উৎকৃষ্ট; সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য কর, [১] আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক সুদৃঢ় প্রাচীর গড়ে দেব।
[১] 'শ্রম দ্বারা সাহায্য কর' অর্থঃ তোমরা আমাকে নির্মাণ কাজে ব্যবহার্য সামগ্রী ও শ্রমিক দিয়ে সাহায্য কর।
আল-কাহফ 18:96
তোমরা আমার নিকট লৌহপিন্ডসমূহ আনয়ন কর।’ অতঃপর মধ্যবর্তী শূন্যস্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হল,[১] তখন সে বলল, ‘তোমরা হাপরে দম দিতে থাকো।’ পরিশেষে যখন ওটা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত করল, তখন সে বলল, ‘তোমরা গলিত তামা আনয়ন কর, আমি ওটা ওর উপর ঢেলে দিই।’[২]
[১] بين الصًّدَفَين অর্থাৎ, দুই পর্বত চূড়ার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানকে লৌহস্তূপ বা পাত দিয়ে পূর্ণ করে বন্ধ করে দেওয়া হল।
[২] قِطر গলিত সীসা বা লোহা বা তামা। অর্থাৎ লোহার পাতকে খুব গরম করে ওর উপর গলিত সীসা বা লোহা বা তামা ঢেলে দেওয়ায় সেই পাহাড়ী রাস্তার মাঝের প্রাচীর এত মজবুত হয়ে গেল যে, য়্যা'জূজ-মা'জূজের পক্ষে তা ভেঙ্গে অন্যান্য মানুষের বসতিতে আসা অসম্ভব হয়ে গেল।
আল-কাহফ 18:97
এরপর য়্যা’জূজ ও মা’জূজ তা অতিক্রম করতে পারল না এবং ছেদ করতেও পারল না।
আল-কাহফ 18:98
সে বলল, ‘এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ; অতঃপর যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি এসে পড়বে তখন তিনি ওটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।[১] আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।’
[১] এই প্রাচীর যদিও অত্যন্ত মজবুত করে বানানো হয়েছে; যার উপর চড়ে কিংবা যাতে ছিদ্র করে এদিকে আসা তাদের সম্ভবপর নয়, তবুও আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি যখন এসে যাবে, তখন তিনি সেটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মাটি বরাবর করে ফেলবেন। ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি এসে পড়বে অর্থাৎ কিয়ামতের নিকটবর্তী য়্যা'জূজ-মা'জূজের বের হবার সময় এসে পড়বে; যেমন এ কথা হাদীসে উল্লেখ আছে। একটি হাদীসে এসেছে, নবী (সাঃ) ঐ প্রাচীরের সামান্য ছিদ্রকে ফিতনার নিকটবর্তী সময় বলে উল্লেখ করেছেন। (বুখারী ৩৩৪৬, মুসলিম ২২০৮নং) অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, তারা প্রতিদিন সেই প্রাচীর ভাঙ্গার চেষ্টা করে আর বাকী অংশ কাল ভাঙ্গব বলে ফেলে রাখে। অতঃপর যখন আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের বের হবার সময় হবে তখন তারা বলবে, ইন শাআল্লাহ বাকী অংশ আগামী কাল ভেঙ্গে ফেলব। সুতরাং তার পরের দিন তারা বের হতে সক্ষম হবে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসলীলা চালাবে এমনকি ভয়ে মানুষ দুর্গে গিয়ে আশ্রয় নেবে। এরপর তারা আকাশে তীর ছুঁড়তে শুরু করবে যা রক্ত মাখা অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাদের ঘাড়ে এক প্রকার কীট (পোকা) সৃষ্টি করবেন, যার ফলে তারা সকলেই প্রাণ হারাবে। (আহমাদ ১২/৫১১, তিরমিযী ৩১৫৩নং) সহীহ মুসলিমে নাওয়াস বিন সামআন (রাঃ)-এর হাদীসে আরও পরিষ্কারভাবে এসেছে যে, তারা বের হবে ঈসা (আঃ) অবর্তীণ হবার পর তাঁর বর্তমানে। (ফিতনাহ অধ্যায়) আর এই উক্তি দ্বারা ঐ সমস্ত লোকেদের ধারণার খন্ডন হয় যারা মনে করে যে, মুসলিমদের উপর আক্রমণকারী তাতার অথবা তুর্কী ও মুঘল সম্প্রদায়; যাদের মধ্যে চেঙ্গিস খান একজন, অথবা রুশ বা চীনা জাতিই হল য়্যা'জূজ-মা'জূজ; যাদের প্রকাশ ঘটে গেছে। অনেকের মতে য়্যা'জূজ-মা'জূজ হল পাশ্চাত্য জাতি, যারা আজ সারা পৃথিবীর উপর আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের জাল বিস্তার করে রেখেছে। এ সমস্ত ধারণা ভুল। কারণ য়্যা'জূজ-মা'জূজের আধিপত্য বলতে রাজনৈতিক আধিপত্য উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের হত্যা ও লুঠতরাজের এ জাতীয় সাময়িক আধিপত্য উদ্দেশ্য, মুসলিমরা যার মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে না। অতঃপর আল্লাহ-প্রেরিত মহামারী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সকলেই একই সময়ে মারা যাবে।
আল-কাহফ 18:99
সেই দিন আমি তাদেরকে এক দল অপর দলের উপর তরঙ্গায়িত অবস্থায় ছেড়ে দেব। আর শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে; অতঃপর আমি তাদের সবাইকেই একত্রিত করব।
আল-কাহফ 18:100
সেদিন আমি জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট।
আল-কাহফ 18:101
যাদের চক্ষু ছিল আমার স্মরণ (কুরআন)এর ব্যাপারে অন্ধ এবং যারা শুনতেও ছিল অপারগ।
আল-কাহফ 18:102
যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার পরিবর্তে আমার দাসদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে? আমি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নাম। [১]
[১] حَسب অর্থ ধারণা করা, عِبادي আমার দাস বা বান্দা বলতে ফিরিশতা, ঈসা (আঃ) ও অন্যান্য আওলিয়াগণ যাঁদেরকে সাহায্যকারী, দাতা বা বিপত্তারণ মনে করা হয়। অনুরূপভাবে শয়তান ও জীন যাদের ইবাদত করা হয় তারাও। এখানে প্রশ্নবোধক বাক্য ধমক ও তিরস্কারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত যারা অন্যের ইবাদত (উপাসনা বা পূজা) করে তারা কি মনে করে যে, আমাকে ছেড়ে আমাদের বান্দাদের ইবাদত করলে তারা তাদেরকে আমার আযাব হতে বাঁচিয়ে নেবে? এটা একদম অসম্ভব। আমি তো কাফেরদের জন্য জাহান্নাম তৈরী করে রেখেছি। নিজেদের ত্রাণকর্তা মনে করে যাদের ইবাদত করা হচ্ছে, তারা তাদেরকে জাহান্নামে যাওয়া হতে রক্ষা করতে পারবে না।
আল-কাহফ 18:103
তুমি বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব তাদের যারা কর্মে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত?’
আল-কাহফ 18:104
ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পন্ড হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করছে।[১]
[১] অর্থাৎ, তাদের আমলগুলো এমন, যা আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নয়, কিন্তু তাদের ধারণা যে তারা (আল্লাহর পছন্দনীয়) নেক আমলই করছে। এই আয়াতে কাদের কথা বলা হয়েছে? কেউ কেউ বলেন ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের, কেউ বলেন খাওয়ারিজ (রাজদ্রোহী) সম্প্রদায় ও অন্যান্য বিদআতীদের, কেউ বলেন মুশরিকদের। কিন্তু সঠিক কথা হল, এই আয়াতে ব্যাপকভাবে ঐ সমস্ত ব্যক্তি বা দলকে বুঝানো হয়েছে, যাদের মধ্যে উক্ত গুণাবলী বিদ্যমান। পরের আয়াতে এই ধরনের লোকেদের জন্য আরো কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করা হচ্ছে।
আল-কাহফ 18:105
ওরাই তারা যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে;[১] ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য কোন ওজন রাখব না। [২]
[১] آيات ربِّهم 'প্রতিপালকের আয়াত বা নিদর্শনাবলী' বলতে আল্লাহর একতত্ত্ববাদের ঐ সমস্ত দলীল-প্রমাণ যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। অনুরূপভাবে ঐ সমস্ত আয়াতকেও বুঝানো হয়েছে যা তিনি নিজ গ্রন্থসমূহে অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁর নবী ও রসূলগণ তা মানুষের নিকট পৌছে দিয়েছেন। প্রতিপালকের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করা বলতে পরকালের জীবন বা পুনরুত্থানকে বুঝানো হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, আমার নিকট তাদের কোন মূল্যায়ন হবে না। অথবা অর্থ এই যে, ওদের জন্য আমি ওজনের ব্যবস্থাই করব না যাতে তাদের আমলসমূহ ওজন করা যায়। কারণ আমল তো শুধুমাত্র ঐ সমস্ত তাওহীদবাদী মুসলিমদের ওজন করা হবে, যাদের আমল-নামায় পাপ-পুণ্য উভয়ই থাকবে। কিন্তু ওদের আমল-নামা পুণ্য (নেকী) হতে বিলকুল শূন্য থাকবে। যেমন হাদীসের মধ্যে এসেছে যে, কিয়ামতের দিন মোটা-তাজা মানুষ আসবে, কিন্তু আল্লাহর নিকট তার ওজন মাছির ডানা সমতুল্য হবে না। অতঃপর নবী (সাঃ) উক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন। (বুখারী, সূরা কাহফের তাফসীর)
আল-কাহফ 18:106
জাহান্নাম, ওটাই তাদের প্রতিফল, যেহেতু তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমার নিদর্শনাবলী ও রসূলদেরকে গ্রহণ করেছে বিদ্রূপের বিষয়রূপে।
আল-কাহফ 18:107
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তাদের অভ্যর্থনার জন্য আছে ফিরদাউস বেহেশ্ত।[১]
[১] ফিরদাউস জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন স্থানকে বলা হয়। নবী (সাঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ জান্নাত প্রার্থনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা কর। কারণ ওটা হচ্ছে জান্নাতের সর্বোচ্চ অংশ, যেখান হতে জান্নাতের নহর (নদী)সমূহ প্রবাহিত হয়। (বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়)
আল-কাহফ 18:108
সেথায় তারা স্থায়ী হবে; এর পরিবর্তে তারা অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া কামনা করবে না।[১]
[১] অর্থাৎ জানণাতবাসীদের জান্নাত ও জান্নাতের নিয়ামতসমূহ পেয়ে কখনো তাদের মন একঘেয়েমি অনুভব করবে না, যাতে তারা জান্নাত ছেড়ে অন্যত্র যেতে চাইবে।
আল-কাহফ 18:109
তুমি বল, ‘আমার প্রতিপালকের বাণী[১] লিপিবদ্ধ করবার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তাহলে আমার প্রতিপালকের বাণী শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে; সাহায্যার্থে যদিও এর মত আরো একটি সমুদ্র আনয়ন করি।’
[১] كلمات এর অর্থঃ মহান আল্লাহর পরিব্যাপ্ত জ্ঞান, তাঁর হিকমত এবং ঐ সমস্ত দলীল-প্রমাণ যা তাঁর একতত্ত্ববাদকে প্রমাণ করে, যা মানুষের পক্ষে পূর্ণমাত্রায় জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীর সমস্ত গাছপালাকে যদি কলম বানানো যায় এবং সমস্ত সমুদ্র; বরং তার সমপরিমাণ আরো সমুদ্রের পানিকে যদি কালি তৈরী করা যায়, তাহলে কলমসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং সমস্ত কালি নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর বাণী ও হিকমত ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে কখনই শেষ হবে না।
আল-কাহফ 18:110
তুমি বল, ‘আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ; [১] আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য;[২] সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের উপাসনায়[৩] কাউকেও শরীক না করে।’
[১] এই কারণে আমিও প্রতিপালকের বাণী ও কথা পরিপূর্ণরূপে জ্ঞাত হতে সক্ষম নই।
[২] তবে অবশ্যই আমাকে এ বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে যে, আমার নিকট আল্লাহর অহী আসে। সেই অহী দ্বারাই আমি 'আসহাবে কাহফ' (গুহাবাসী) ও যুলক্বারনাইন সম্পর্কে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত কথা তোমাদের সামনে তুলে ধরেছি। যা ইতিহাসের অতল তলে তলিয়ে ছিল বা যার প্রকৃতত্ব রূপকথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া ঐ অহীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতত্ত্বপূর্ণ যে নির্দেশ আমাকে দেওয়া হয়েছে, তা হল তোমাদের মাবূদ (উপাস্য) শুধুমাত্র একজন।
[৩] নেক আমল হল তাই, যা সুন্নাহর মোতাবেক হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে দৃঢ়-বিশ্বাসী প্রথমতঃ তাদের উচিত প্রতিটি কাজ সুন্নাহ (সহীহ হাদীস) মোতাবেক করা, দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর ইবাদতে কাউকেও শরীক না করা। যেহেতু বিদআত ও শিরক; এই দু'টি হল, আমল পন্ড হওয়ার মূল কারণ। আল্লাহ প্রতিটি মুসলিমকে শিরক ও বিদআত হতে দূরে রাখুন।
মারইয়াম 19:1
কা-ফ হা ইয়া আ’ইন স্বা-দ।
মারইয়াম 19:2
এটা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর দাস যাকারিয়ার[১] প্রতি।
[১] যাকারিয়া (আঃ) বানী ইস্রাঈলের একজন নবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ছুতোর এবং এই পেশাই ছিল তাঁর জীবিকার একমাত্র উপায়।
মারইয়াম 19:3
যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করেছিল গোপনে। [১]
[১] গোপনে আহবান বা দু'আ এই জন্যই করেছিলেন যে, প্রথমতঃ এইভাবে দু'আ আল্লাহর নিকট বেশী পছন্দনীয়। কারণ এর মধ্যে কাকুতি-মিনতি বেশী প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়তঃ লোকে যাতে তাকে বোকা না ভাবে যে, এই বৃদ্ধ বয়সে সন্তান চাচ্ছে; যখন সন্তান হওয়ার সকল প্রকার বাহ্যিক সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।
মারইয়াম 19:4
সে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে, আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে;[১] হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহবান করে আমি কখনো ব্যর্থকাম হইনি।[২]
[১] যেভাবে জ্বালানী আগুনে জলে উঠে সেইভাবে আমার মাথা সাদা চুলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এর অর্থঃ বার্ধক্য ও দুর্বলতার প্রকাশ।
[২] সেই জন্যই বাহ্যিক সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও আমি তোমার নিকট সন্তান চাচ্ছি।
মারইয়াম 19:5
নিশ্চয় আমি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের ব্যাপারে আশংকা করি।[১] আর আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে[২] আমাকে দান কর একজন উত্তরাধিকারী।
[১] এই আশংকার অর্থ এই যে, যদি আমার কোন উত্তরাধিকারী আমার ওয়ায ও উপদেশের দায়িত্ব গ্রহণ না করে, তাহলে আমার স্বগোত্রীয় আত্মীয়দের মধ্যে তো কেউ এর যোগ্য নেই। আর এর ফলস্বরূপ হয়তো আমার আত্মীয়রা তোমার রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
[২] 'তোমার নিকট হতে' এর অর্থ যদিও আমার বাহ্যিক সন্তান-সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, তবুও তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে একটি সন্তান দান কর। (যে আমার ওয়ারেস ও উত্তরাধিকারী হবে।)
মারইয়াম 19:6
যে উত্তরাধিকারী হবে আমার এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকূবের বংশের। আর হে আমার প্রতিপালক! তাকে তুমি সন্তোষভাজন কর।’
মারইয়াম 19:7
তিনি বললেন, ‘হে যাকারিয়া! অবশ্যই আমি তোমাকে একজন পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি; তার নাম হবে য়্যাহয়্যা; এই নামে আমি পূর্বে কারো নামকরণ করিনি।’ [১]
[১] আল্লাহ তাআলা শুধু তাঁর দু'আই কবুল করলেন না; বরং সন্তানের নামও ঠিক করে দিলেন।
মারইয়াম 19:8
সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।’ [১]
[১] عاقِر ঐ মহিলাকে বলা হয় যে বার্ধক্যের কারণে সন্তান জন্মাতে সক্ষম নয়, আর ঐ মহিলাকেও বলা যায়, যে প্রথম হতেই বন্ধ্যা। এখানে দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যে কাঠ শুকিয়ে যায় তাকে عِتي বলা হয়। এখানে অর্থ বার্ধক্যের শেষ পর্যায়, যখন শরীরের গোশত শুকিয়ে যায়। বলার উদ্দেশ্য হল, আমার স্ত্রী তো যৌবন কাল হতেই বন্ধ্যা, আর আমিও বৃদ্ধ ব্যক্তি। এখন আমাদের সন্তান হবে কিভাবে? কথিত আছে যাকারিয়া (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম ছিল আশা' বিনতে ফাক্বূদ বিন মীল। ইনি ছিলেন মারয়্যামের মা হান্নার বোন। কিন্তু সঠিক কথা হল আশা'ও মারয়্যামের পিতা ইমরানেরই কন্যা ছিলেন। অতএব (মারয়্যাম ও আশা' দুই বোন এবং) য়্যাহয়্যা (আঃ) ও ঈসা (আঃ) আপোসে খালাতো ভাই। যেমন সহীহ হাদীসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। (ফাতহুল কাদীর)
মারইয়াম 19:9
তিনি বললেন, ‘এই রূপই হবে; তোমার প্রতিপালক বললেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ [১]
[১] ফিরিশতাগণ যাকারিয়া (আঃ)-এর বিস্ময় এই বলে দূর করলেন যে, আল্লাহ তোমাকে পুত্র সন্তান দেওয়ার ব্যাপারে ফায়সালা করে ফেলেছেন এবং তা তিনি অবশ্যই তোমাকে দান করবেন। আর আল্লাহর পক্ষে এটা মোটেই অসম্ভব নয়; কারণ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন যখন তুমি কিছুই ছিলে না, তিনি তোমাকে বাহ্যিক কারণ না থাকা সত্ত্বেও সন্তান দিতে সক্ষম।
মারইয়াম 19:10
যাকারিয়া বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও!’ তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কারো সাথে ক্রমাগত তিন রাত্রি (দিন) বাক্যালাপ করবে না।’ [১]
[১] রাত্রি বলতে দিন-রাত্রি উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। سَوِيَّا অর্থ বিলকুল নীরোগ, সুস্থ। অর্থাৎ তোমার এমন কোন ব্যাধি হবে না, যার ফলে তুমি কথা বলতে পারবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তোমার মুখ দিয়ে কথা না বের হলে তুমি জেনে নিও যে, সুসংবাদের সময় নিকটবর্তী।
মারইয়াম 19:11
অতঃপর সে উপাসনাকক্ষ[১] হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট এল ও ইঙ্গিতে তাদেরকে বলল যে, ‘তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।’ [২]
[১] مِحراب (মিহরাব) অর্থ ঐ ঘর যেখানে তিনি আল্লাহর ইবাদত করতেন, এই শব্দ حرب হতে গঠিত; যার অর্থ যুদ্ধ, যেহেতু উপাসনাকক্ষে আল্লাহর ইবাদত করতে শয়তানের সাথে যুদ্ধ করতে হয়, তাই ঐ কক্ষের নাম মিহরাব।
[২] সকাল-সন্ধ্যায় পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা বা তসবীহ করার অর্থঃ আসরের ও ফজরের নামায পড়া। অথবা এর অর্থঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তসবীহতে বেশী মনোযোগী হও।
মারইয়াম 19:12
(আল্লাহ বললেন,) ‘হে য়্যাহয়্যা! এই কিতাব[১] দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর’; আমি শৈশবেই তাকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা। [২]
[১] আল্লাহ যাকারিয়া (আঃ)-কে পুত্র য়্যাহয়্যা দান করলেন। আর তিনি যখন একটু বড় হলেন, তখন মহান আল্লাহ কিতাবকে শক্ত করে ধারণ করার; অর্থাৎ তার উপর আমল করার আদেশ করলেন। 'কিতাব' বলতে তাওরাতকে বুঝানো হয়েছে। অথবা তাঁকে যে বিশেষ কিতাব দান করা হয়েছিল তা, যা আমাদের অজানা।
[২] حُكم (প্রজ্ঞা)এর অর্থঃ জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, কিতাবে উল্লিখিত দ্বীন সম্পর্কে পান্ডিত্য, ইলম ও আমলের সমষ্টি অথবা নবুঅত হতে পারে। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেছেন যে, এতে কোন বাধা নেই যে, حكم বলতে উক্ত সকল অর্থই শামিল।
মারইয়াম 19:13
এবং আমার নিকট হতে মমতা ও পবিত্রতা। [১] আর সে ছিল একজন সংযমশীল।
[১] حنان মমতা, দয়া। অর্থাৎ আমি তার অন্তরে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দয়া-মমতা করার প্রেরণা এবং কুপ্রবৃত্তি ও সমস্ত পাপ হতে পবিত্রতা দান করেছিলাম।
মারইয়াম 19:14
পিতা-মাতার অনুগত এবং সে উদ্ধত ও অবাধ্য ছিল না। [১]
[১] অর্থাৎ, পিতা-মাতা বা নিজ প্রতিপালকের অবাধ্য ছিলেন না। এর অর্থ হল, যদি আল্লাহ তাআলা কারো অন্তরে পিতা-মাতার প্রতি ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, তাঁদের আনুগত্য ও খিদমত, তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার বা সদাচার করার শক্তি দান করেন তাহলে তা হবে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ। সুতরাং যদি এর বিপরীত চরিত্র কারো মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে তা হল আল্লাহর অনুগ্রহ হতে বঞ্চনার ফল।
মারইয়াম 19:15
তার প্রতি শান্তি তার জন্মদিনে, তার মৃত্যুদিনে এবং তার পুনরুজ্জীবনের দিনে। [১]
[১] মানুষের জন্য তিনটি সময় কঠিন ও ভয়াবহ। (ক) যখন মানুষ মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসে। (খ) যখন মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। এবং (গ) যখন কবর হতে জীবিত করে উঠানো হবে এবং নিজেকে কিয়ামতের ভয়াবহতায় পরিবেষ্টিত দেখবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এই তিন সময়েই তার জন্য থাকবে শান্তি ও নিরাপত্তা। বিদআতীরা এই আয়াত দ্বারা (মহানবীর) জন্মোৎসব (নবীদিবস) পালন করার বৈধতা প্রমাণ করে। কিন্তু তাদের নিকট জিজ্ঞাস্য যে, মৃত্যুর দিনে মৃত্যু-উৎসব পালন করাও তাদের জন্য জরুরী। কেননা জন্ম দিনের জন্য যেমন সালাম (শান্তি) শব্দ ব্যবহার হয়েছে তেমনি মৃত্যুর জন্যও সালাম শব্দ ব্যবহার হয়েছে। শুধু সালাম শব্দ দ্বারা যদি 'ঈদে মীলাদ' (জন্মোৎসব) সাব্যস্ত হয়, তাহলে সালাম শব্দ দ্বারা 'ঈদে ওফাত' (মৃত্যু-উৎসব)ও সাব্যস্ত হবে। কিন্তু এখানে মৃত্যু-উৎসব তো দূরের কথা বরং নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকেই অস্বীকার করা হয়। নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকে অস্বীকার করে কুরআনের আয়াতকে তো অস্বীকার করেই থাকে; উপরন্তু তারা তাদের দলীল গ্রহণের পদ্ধতি অনুসারে আলোচ্য আয়াতের এক অংশের উপর ঈমান রাখে এবং ঐ আয়াতেরই দ্বিতীয় অংশের উপর ঈমান রাখে না। {أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ} অর্থাৎ, তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর ঈমান আনবে, আর কিছুকে অস্বীকার করবে? (বাক্বারাহঃ ৮৫)
মারইয়াম 19:16
(হে রসূল!) তুমি এই কিতাবে (উল্লিখিত) মারয়্যামের কথা বর্ণনা কর; যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।
মারইয়াম 19:17
অতঃপর তাদের হতে সে নিজেকে পর্দা করল;[১] অতঃপর আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল)কে পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানুষ আকারে আত্মপ্রকাশ করল। [২]
[১] লোকালয় হতে পৃথক হয়ে নিরালায় আসা ও পর্দা করা আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে ছিল, যাতে তাঁকে কেউ দেখতে না পায় তথা মনে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। অথবা তা মাসিক হতে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ছিল। আর পূর্ব দিকের স্থান বলতে বায়তুল মাকদিসের পূর্ব দিককে বুঝানো হয়েছে।
[২] রূহ বলতে জিবরীল (আঃ)। যাকে পূর্ণ মনুষ্য আকৃতিতে মারয়্যামের নিকট পাঠানো হয়েছিল। যখন মারয়্যাম দেখলেন যে, এক ব্যক্তি বিনা বাধায় ভিতরে প্রবেশ করে ফেলেছে, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন, হয়তো বা সে কোন অসৎ উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছে। জিবরীল (আঃ) বললেন, আমি তা নই, যা তুমি ধারণা করছ। আমি তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত দূত। আর আমি তোমাকে এই সুসংবাদ দিতে এসেছি যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এক পুত্র-সন্তান দান করবেন। কোন কোন কিরাআতে لِيهَبَ প্রথম পুরুষের শব্দ আছে। কিন্তু (এখানে যেমন আছে) জিবরীল (আঃ) উত্তম পুরুষের শব্দ لأَهَب ব্যবহার করেছেন। যেহেতু বাহ্যিক হেতু স্বরূপ জিবরীল (আঃ) মারয়্যামের কামিসের বুকের উপর খোলা অংশে ফুঁক মেরে দিলেন, আর আল্লাহর হুকুমে তাঁর গর্ভ সঞ্চার হল। এই কারণেই পুত্র দানের সম্বন্ধ নিজের দিকে জুড়েছেন। কিংবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, এ কথাটি স্বয়ং আল্লাহর। জিবরীল (আঃ) শুধু তা হুবহু নকল করেছেন; অর্থাৎ, পরিপূর্ণ বাক্য হবে এইরূপঃ أرسَلَنِي يَقُولُ لَكِ أرسَلتُ رَسُولِي إِلَيكِ لأَهَبَ لَكِ আল্লাহ আমাকে (তোমার নিকট) প্রেরণ করেছেন; তিনি বলেন, আমি আমার দূত তোমার নিকট এই সংবাদ দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছি যে, আমি তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করব। আর এই শ্রেণীর ঊহ্য ও অনুক্ত কথা কুরআনের অনেক স্থানে আছে।
মারইয়াম 19:18
মারয়্যাম বলল, ‘আমি তোমা হতে পরম করুণাময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি; তুমি যদি সংযমশীল হও (তাহলে আমার নিকট থেকে সরে যাও)।’
মারইয়াম 19:19
সে বলল, ‘আমি তো তোমার প্রতিপালক-প্রেরিত (দূত) মাত্র; তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করবার জন্য (আমি প্রেরিত হয়েছি)।’
মারইয়াম 19:20
মারয়্যাম বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হবে! যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি; আর আমি ব্যভিচারিণীও নই।’
মারইয়াম 19:21
সে বলল, ‘এই ভাবেই হবে;[১] তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং তাকে আমি এই জন্য সৃষ্টি করব, যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন[২] ও আমার নিকট হতে এক অনুগ্রহ;[৩] এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার।’ [৪]
[১] অর্থাৎ, এ কথা তো সত্য যে তোমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি বৈধ উপায়ে, আর না অবৈধ উপায়ে। যদিও স্বাভাবিক গর্ভ ধারণের জন্য তা অতি আবশ্যক। তবুও এভাবেই হবে।
[২] অর্থাৎ, আমি স্বাভাবিক হেতুর (মিলন সংসাধনের) মুখাপেক্ষী নই। আমার জন্য এটা অতি সহজ আর তাকে আমি আমার সৃজন-শক্তির এক নির্দশন করতে চাই। এর আগে আমি তোমাদের আদি পিতা আদমকে বিনা পুরুষ ও নারীতে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদের মাতা হাওয়াকেও কেবল পুরুষ হতে সৃষ্টি করেছি। এবার ঈসাকে সৃষ্টি করে চতুর্থ পদ্ধতি সৃষ্টি করার যে ক্ষমতা তা প্রকাশ করতে চাই; আর তা হল শুধু মায়ের গর্ভ হতে বিনা পুরুষের মিলনে সৃষ্টি করা। আমি সৃষ্টির চারটি পদ্ধতিতেই সৃষ্টি করতে সমভাবে ক্ষমতাবান।
[৩] এর অর্থ নবুঅত যা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ তাঁর জন্য এবং ওদের জন্যও যারা তাঁর নবুঅতের উপর ঈমান আনবে।
[৪] এটি জিবরীলের কথারই পরিশিষ্ট; যা তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, মু'জিযামূলক (অস্বাভাবিক) সৃষ্টি আল্লাহর জ্ঞান ও তাঁর মহাশক্তি ও ইচ্ছায় স্থিরীকৃত আছে।
মারইয়াম 19:22
অতঃপর সে গর্ভে সন্তান ধারণ করল ও তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল।
মারইয়াম 19:23
প্রসব বেদনা তাকে এক খেজুর গাছের তলে নিয়ে এল; সে বলল, ‘হায়! এর পূর্বে যদি আমি মারা যেতাম ও লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম।’ [১]
[১] মৃত্যু কামনা এই ভয়ে যে, আমি সন্তানের ব্যাপারে লোকেদেরকে কিভাবে সন্দেহমুক্ত করব; যখন তারা আমার কোন কথাই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তথা এই চিন্তাও ছিল যে, আমি মানুষের নিকট আবেদা-যাহেদা (ইবাদত কারিণী, সংসার-বিরাগিণী) হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছি। কিন্তু এরপর আমি তাদের চোখে একজন ব্যভিচারিণী হিসাবে গণ্য হব।
মারইয়াম 19:24
(জিবরীল) তার নিম্নপাশ হতে আহবান করে তাকে বলল, ‘তুমি দুঃখ করো না, তোমার নিম্নদেশে তোমার প্রতিপালক এক নদী সৃষ্টি করেছেন।
মারইয়াম 19:25
তুমি তোমার দিকে খেজুর গাছের কান্ড হিলিয়ে দাও; ওটা তোমার সামনে সদ্যঃপক্ব তাজা খেজুর ফেলতে থাকবে। [১]
[১] سَري ছোট নদী বা ঝরনাকে বলা হয়। অর্থাৎ মু'জিযা বা কারামত স্বরূপ মারয়্যামের পদতলে পান করার জন্য পানির ছোট নদী এবং খাওয়ার জন্য একটি শুকনো খেজুর গাছ হতে টাটকা পাকা খেজুরের ব্যবস্থা করলেন। আহবানকারী ছিলেন জিবরীল (আঃ) যিনি উপত্যকার নীচে হতে আহবান করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, سَري অর্থ সরদার বা নেতা, আর সে অর্থে ঈসা (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং তিনিই মা মারয়্যামকে নিম্নদেশ হতে আওয়াজ দিয়েছিলেন।
মারইয়াম 19:26
সুতরাং আহার কর, পান কর ও চোখ জুড়াও;[১] মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি তুমি দেখ, তাহলে বল, [২] আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে চুপ থাকার মানত করেছি; সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।’
[১] অর্থাৎ খেজুর খাও, নদী বা ঝরনার পানি পান কর এবং সন্তানকে দেখে চোখ জুড়াও।
[২] এখানে বলার অর্থ ইশারা বা ইঙ্গিতে বলা; মুখের বলা নয়। যেহেতু তাদের শরীয়তে রোযার অর্থই ছিল খাওয়া ও কথা বলা হতে বিরত থাকা।
মারইয়াম 19:27
অতঃপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হল; তারা বলল, ‘হে মারয়্যাম! তুমি তো এক অদ্ভুত কান্ড করে বসেছ।
মারইয়াম 19:28
হে হারূন ভগ্নী![১] তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিণী।
[১] হারূন বলতে মারয়্যামের সহোদর বা বৈমাত্রেয় কোন ভাইকে বুঝানো হয়েছে। অথবা হারূন বলতে মূসা (আঃ)-এর ভাই হারূন (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং আরবের পরিভাষা অনুযায়ী তাঁর প্রতি সম্বদ্ধ করা হয়েছে। যেমন, আরবের লোকেরা বলে থাকে, يَا أخَا تَمِيم! يَا أخَا العَرَب (অর্থাৎ, হে তামীম বংশের লোক, হে আরবের লোক!) অথবা তাকওয়া-পরহেযগারী, পবিত্রতা ও ইবাদতে হারূন (আঃ)-এর মত মনে করে তাঁকে তাঁরই সাদৃশ্যে 'হে হারূনের বোন' বলা হয়েছে। এ ধরনের উদাহরণ কুরআনেও রয়েছে। (আইসারুত তাফাসীর ও ইবনে কাসীর)
মারইয়াম 19:29
অতঃপর মারয়্যাম ইঙ্গিতে সন্তানকে দেখাল। তারা বলল, যে দোলনার শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’
মারইয়াম 19:30
(শিশুটি) বলল, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর দাস; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। [১]
[১] আল্লাহ তাঁর লিখিত তকদীরে আমার ব্যাপারে ফায়সালা করে রেখেছিলেন যে, তিনি আমাকে কিতাব ও নবুঅত দান করবেন।
মারইয়াম 19:31
যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময়[১] করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন আজীবন নামায ও যাকাত আদায় করতে।
[১] বরকত অর্থাৎ, আল্লাহর দ্বীনে দৃঢ়তা, বা প্রত্যেক জিনিসে প্রাচুর্য, উন্নতি ও সফলতা। অথবা মানুষের জন্য উপকারী শিক্ষক বা সৎকাজের আদেশদাতা ও অসৎকাজে বাধাদানকারী। (ফাতহুল কাদীর)
মারইয়াম 19:32
এবং আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকতে।[১] আর তিনি আমাকে করেননি উদ্ধত, হতভাগ্য। [২]
[১] শুধু মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার কথা উল্লেখ হওয়াতেও স্পষ্ট যে, ঈসা (আঃ)-এর পিতা ছিল না। বরং তাঁর জন্ম বিনা পিতায়, এক অলৌকিক মু'জিযার ব্যাপার। অন্যথা তিনিও য়্যাহয়্যা (আঃ)-এর মত بَرًا بوالدَيه (পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী) বলতেন এবং শুধু মাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী বা মাতার অনুগত হিসাবে উল্লেখ করতেন না।
[২] এর মর্মার্থ এই যে, যে ব্যক্তি মাতা-পিতার সেবাকারী ও অনুগত হয় না, তার স্বভাব-চরিত্রে ঔদ্ধত্য এবং ভাগ্যে দুর্ভাগ্যই নির্ধারিত থাকে। ঈসা (আঃ) সমস্ত কথোপকথনের শব্দে অতীত কাল ব্যবহার করেছেন; যদিও এ সমস্ত কথার সম্পর্ক হচ্ছে ভবিষ্যতের সাথে। আর তখন তিনি ছিলেন সবে মাত্র দুধ খাওয়া শিশু। তা এই কারণেই যে, আল্লাহর লিখিত তকদীরের এমন অটল ফায়সালা ছিল যে, যদিও তার কিছু বর্তমানে প্রকাশ পায়নি, তবুও ভবিষ্যতে এ সবের সত্য হয়ে প্রকাশ এমন সুনিশ্চিত ছিল, যেমন অতীত কালের ঘটে যাওয়া ঘটনায় সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না।
মারইয়াম 19:33
আমার প্রতি শান্তি, যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।’
মারইয়াম 19:34
এই হল মারয়্যাম তনয় ঈসা (এর বৃত্তান্ত)। (আমি বললাম) সত্য কথা; যে বিষয়ে তারা সন্দেহ করে।[১]
[১] এ হল সেই সকল গুণাবলী যা ঈসা (আঃ)-এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আর ঐ গুণ তাঁর মধ্যে ছিল না, যে গুণের কথা খৃষ্টানরা তাঁর ব্যাপারে অতিরঞ্জন করে বলে থাকে এবং যা ইয়াহুদীরা তাঁর ব্যাপারে অবজ্ঞা ও ঘৃণা পোষণ করে বলে থাকে। বরং উপরোক্ত বিবরণই হল সত্য, যাতে মানুষ বেকার সন্দেহ পোষণ করছে।
মারইয়াম 19:35
সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নয়। তিনি পবিত্র, মহিমময়; তিনি যখন কিছু স্থির করেন, তখন বলেন, ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়। [১]
[১] যে আল্লাহর মহিমা ও ক্ষমতা এই, তার আবার সন্তানের প্রয়োজন কি? আর এমনিভাবে তার পক্ষে বিনা পিতায় সন্তান জন্ম দেওয়া কোন কঠিন কাজ নয়। সুতরাং যারা আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে ও ঈসার মু'জিযা স্বরূপ অলৌকিকভাবে জন্মের কথা অস্বীকার করে, তারা আসলে আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতাকে অস্বীকার করে।
মারইয়াম 19:36
নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাঁর উপাসনা কর, এটাই হল সরল পথ।
মারইয়াম 19:37
অতঃপর দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল।[১] সুতরাং এক মহান দিবসের আগমনে অবিশ্বাসীদের ভীষণ দুর্দশা রয়েছে। [২]
[১] এখানে الأَحزَاب (দলগুলি) বলতে খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদীদের দলকে বুঝানো হয়েছে; যারা ঈসার ব্যাপারে মতভেদ করেছিল। ইয়াহুদীরা বলেছিল, তিনি জাদুকর ও জারজ সন্তান; অর্থাৎ ইউসুফ (যোসেফ) নাজ্জারের অবৈধ সন্তান। খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রোটেষ্ট্যান্টদের বক্তব্য ঈসা আল্লাহর পুত্র। ক্যাথলিকরা বলে, তিনি তিন আল্লাহর তৃতীয়জন। অর্থোডক্সরা বলে তিনি স্বয়ং আল্লাহ। এভাবে ইয়াহুদীরা তাঁকে হীন জ্ঞান করে, আর খ্রিষ্টানরা তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে।
(আইসারুত তাফাসীর, ফাতহুল কাদীর)
[২] ঐ সমস্ত কাফেরদের জন্য ভীষণ দুর্দশা রয়েছে, যারা ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে মতভেদ এবং অতিরঞ্জন ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। কিয়ামতের দিন যখন উপস্থিত হবে, তখন তারা ধ্বংস হবে।
মারইয়াম 19:38
তারা যেদিন আমার নিকট আসবে সেদিন তারা কত স্পষ্ট শুনবে ও দেখবে![১] কিন্তু সীমালংঘনকারিগণ আজ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
[১] এগুলি বিস্ময়সূচক শব্দ। অর্থাৎ পৃথিবীতে তারা সত্য দেখা হতে ও সত্য শোনা হতে অন্ধ ও বধির ছিল। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা খুব বেশী দেখতে ও শুনতে পাবে; যদিও এই বেশী দেখা ও শোনা তাদের কোনই কাজে লাগবে না।
মারইয়াম 19:39
(হে রসূল!) তুমি তাদেরকে সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিন সম্বন্ধে,[১] যেদিন সকল সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাবে; [২] অথচ (এখন) তারা উদাসীন আছে এবং তারা বিশ্বাস করে না।
[১] কিয়ামতের দিনকে আফসোস তথা অনুতাপের দিন বলার কারণ এই যে, সেদিন সকলেই আফসোস করবে। যারা পাপী তারা এই বলে অনুতাপ করবে যে, 'হায়! যদি আমরা পাপ না করতাম।' আর যারা সৎকর্মপরায়ণ তারা এই জন্য অনুতাপ করবে যে, 'হায়! আরো বেশী সৎকর্ম কেন করিনি?'
[২] অর্থাৎ হিসাব-নিকাশের পর আমল-নামা গুটিয়ে নেওয়া হবে এবং যারা জান্নাতবাসী তারা জান্নাতে ও যারা জাহান্নামবাসী তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। হাদীসে এসেছে যে, সেদিন মৃত্যুকে এক ভেড়ার আকৃতিতে আনা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে রেখে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী সকলকেই জিজ্ঞাসা করা হবে, 'এটা কি?' তারা বলবে, 'এটা হচ্ছে মৃত্যু।' তারপর তাদের সম্মুখেই তাকে যবেহ করে দেওয়া হবে এবং ঘোষণা করা হবে, 'হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা এবার জান্নাতে চিরস্থায়ী বাস করবে; কখনই মৃত্যু আসবে না। আর হে জাহান্নাম বাসীরা! তোমরা চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে। কখনই মৃত্যু আসবে না।' (সহীহ বুখারী, তফসীর সূরা মারয়্যাম, মুসলিম, জান্নাত অধ্যায়)
মারইয়াম 19:40
নিশ্চয় পৃথিবী ও তাতে যা কিছু আছে তার চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী আমিই এবং তারা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।
মারইয়াম 19:41
বর্ণনা কর এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইব্রাহীমের কথা; নিশ্চয় সে ছিল একজন পরম সত্যবাদী নবী। [১]
[১] صِدِّيق শব্দটি صِدق ধাতুর অতিশয়োক্তিমূলক রূপ। সিদ্দীকের অর্থঃ অত্যন্ত বা পরম সত্যবাদী। অর্থাৎ, যাঁর কথায় ও কাজে অত্যন্ত মিল থাকে এবং সত্যবাদিতাই তাঁর প্রতীক হয়। সিদ্দীক বা চরম সত্যবাদিতার এই মর্যাদা নবুঅতের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের। প্রত্যেক নবী ও রসূল নিজ নিজ যুগের সবচেয়ে বেশী সত্যবাদী ও সত্যের প্রতীক ছিলেন। সেই জন্য তিনি নবী হওয়ার সাথে সাথে সিদ্দীকও। তবে প্রত্যেক সিদ্দীক নবী নন। কুরআন কারীমে মারয়্যামকে সিদ্দীকাহ বলা হয়েছে, যার অর্থ হল, তিনি আল্লাহর ভয়, পবিত্রতা (সতীত্ব) ও সত্যবাদিতার উচ্চাসনে আসীন ছিলেন; যদিও তিনি নবী ছিলেন না। মুসলিমদের মধ্যেও সিদ্দীক আছে। তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ); যাঁকে নবীদের পর উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলে মান্য করা হয়েছে।
মারইয়াম 19:42
যখন সে তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা! যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন কাজে আসে না তুমি তার উপাসনা কর কেন?
মারইয়াম 19:43
হে আমার পিতা! আমার নিকট সেই জ্ঞান এসেছে, যা তোমার নিকট আসেনি।[১] সুতরাং তুমি আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব। [২]
[১] যার দ্বারা আমি আল্লাহর পরিচয় ও প্রত্যয় প্রাপ্ত হয়েছি। মরণের পরপারের জীবন এবং আল্লাহ ছাড়া যারা অন্যের ইবাদত করে, তাদের স্থায়ী শাস্তি সম্বন্ধেও অবগত হয়েছি।
[২] যে পথ তোমাকে পরিত্রাণ ও চিরসুখের জীবন দান করবে।
মারইয়াম 19:44
হে আমার পিতা! শয়তানের উপাসনা করো না; নিশ্চয় শয়তান পরম দয়াময়ের অবাধ্য। [১]
[১] অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা ও তার প্রলোভনে পড়ে তুমি এমন সব দেবদেবীর পূজা করছ, যারা না শুনতে ও দেখতে পায়, আর না লাভ-নোকসানের ক্ষমতা রাখে। বাস্তবে এটা তো সেই শয়তানেরই পূজা; যে আল্লাহর অবাধ্য এবং অন্যদেরকে তাঁর অবাধ্য করে নিজের মত করতে চেষ্টা করে।
মারইয়াম 19:45
হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করি, তোমাকে পরম দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে।’[১]
[১] অর্থাৎ, আমার ভয় হয় যে, যদি তুমি নিজ কুফরী ও শির্কে অটল থাকো, আর এই অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু এসে যায়, তাহলে আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। অথবা পৃথিবীতেই তোমার উপর আল্লাহর আযাব এসে পতিত হবে এবং শয়তানের সঙ্গী হয়ে চিরদিনের মত আল্লাহর রহমত হতে বিতাড়িত হয়ে যাবে। ইবরাহীম (আঃ) নিজ পিতার সম্মান-সম্ভ্রম সম্পূর্ণ খেয়াল রেখে অত্যদিক নম্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে তাওহীদের (এক আল্লাহর ইবাদতের) নসীহত শোনালেন। কিন্তু তাওহীদের এই সবক (পাঠ) যতই নরম ভাষা ও মধুর ভঙ্গিমায় বলা হোক না কেন, মুশরিকদের কাছে তা অসহনীয়ই হবে। অতএব মূর্তিপূজক পিতা এই নম্রতা ও ভালবাসা-মাখা সম্বোধনের জবাবে অত্যন্ত কটু ও কঠোর বাক্য দ্বারা একেশ্বরবাদী পুত্রকে বলল, 'যদি তুমি আমার দেবদেবী থেকে বিমুখ হওয়া হতে ফিরে না এসো, তাহলে আমি তোমাকে পাথরের আঘাতে শেষ করে ফেলব।'
মারইয়াম 19:46
পিতা বলল, ‘হে ইব্রাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ হচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তাহলে অবশ্যই আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করব; তুমি দীর্ঘকালের জন্য আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাও।’ [১]
[১] مَلِي অর্থঃ দীর্ঘ সময় ও কাল। এর দ্বিতীয় অর্থ সুস্থ ও অক্ষত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও, যেন আমি তোমার হাত-পা ভেঙ্গে না ফেলি।
মারইয়াম 19:47
ইব্রাহীম বলল, ‘তোমার উপর সালাম; [১] আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, [২] নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।
[১] এই সালাম অভিবাদনের জন্য নয়; যেমন এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে করে থাকে; বরং এটি হল কথা বলা বন্ধ করার ইঙ্গিত। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, "তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।" (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩) অর্থাৎ, তারা চুপ হয়ে যায়। আর এর মধ্যে ঈমানদার ও আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদের আচরণ বর্ণনা করা হয়েছে।[২] ইবরাহীম (আঃ) এ কথা ঐ সময় বলেছিলেন, যখন মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষেধ হওয়া সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না। অতঃপর যখন তিনি জানতে পারলেন, তখন সাথে সাথে প্রার্থনা করা বন্ধ করে দিলেন। (সূরা তাওবা ৯:১১৪)
মারইয়াম 19:48
আমি তোমাদের নিকট হতে ও তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর তাদের নিকট হতে পৃথক হচ্ছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করব। আর আশা করি, আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করে ব্যর্থকাম হব না।’
মারইয়াম 19:49
অতঃপর সে যখন তাদের হতে ও তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা করত সেই সব হতে পৃথক হয়ে গেল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব[১] এবং প্রত্যেককে নবী করলাম।
[১] ইয়াকূব (আঃ) ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর পৌত্র ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর উল্লেখও পুত্রের সাথে পুত্রের মতই করেছেন। তাৎপর্য্য এই যে, যখন ইবরাহীম আল্লাহর একত্ববাদের খাতিরে নিজ পিতা, ঘর ও প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করে পবিত্র ভূমির দিকে হিজরত করল, তখন আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূব প্রদান করলাম; যাতে তাদের স্নেহ-ভালবাসা পিতাকে ছেড়ে আসার শোককে ভুলিয়ে দেয়।
মারইয়াম 19:50
এবং তাদেরকে আমি দান করলাম আমার বহু অনুগ্রহ[১] ও তাদেরকে দিলাম সমুচ্চ খ্যাতি। [২]
[১] অর্থাৎ, নবুঅত ছাড়া আরো অনেক অনুগ্রহ তাকে দান করেছিলাম। যেমন ধন-মাল, অতিরিক্ত সন্তান-সন্ততি, অতঃপর তারই বংশে বহু কাল পর্যন্ত নবুঅতের পরম্পরা বজায় রাখা; যা ছিল সব থেকে বড় অনুগ্রহ যা আমি তার উপর করেছি। আর সেই কারণে ইবরাহীম (আঃ)-কে 'আবুল আম্বিয়া' (নবীদের পিতা) বলা হয়ে থাকে।
[২] لِسَان صِدق অর্থঃ সুনাম ও সুখ্যাতি। لسان (জিহ্বা)র সম্বন্ধ صِدق (সত্য) এর দিকে জুড়ার পর তার বিশেষণ 'সমুচ্চ' উল্লেখের মাধ্যমে এই কথার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষের মুখে তাঁদের যে সুনাম ও সুখ্যাতি আছে, বাস্তবেই তাঁরা তার যোগ্য অধিকারী। সুতরাং আসমানী ধর্মসমূহের সকল অনুসারীগণ এমন কি মুশরিকরা পর্যন্ত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের কথা উত্তম শব্দ দ্বারা ও অত্যধিক আদব ও সম্মানের সাথে আলোচনা করে থাকে। এটি নবুঅত ও সন্তান দানের পর অন্য একটি অনুগ্রহ, যা আল্লাহর পথে হিজরত করার জন্য তিনি প্রাপ্ত হয়েছেন।
মারইয়াম 19:51
এই কিতাবে (উল্লিখিত) মূসার কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন মনোনীত এবং সে ছিল রসূল, নবী।[১]
[১] مُخلَص، مُصطَفى، مُجتَبى، مُختَار চারটি শব্দের অর্থ একই। অর্থাৎ রিসালাত ও নবুঅতের জন্য নির্বাচিত ও মনোনীত ব্যক্তি। রসূল (সংবাদবাহক, দূত) মুরসাল (প্রেরিত)এর অর্থে ব্যবহূত। আর নবীর অর্থঃ যিনি আল্লাহর বাণী মানুষদের নিকট পৌঁছে দেন বা আল্লাহর অহীর সংবাদ দেন। অবশ্য দুয়ের অর্থ প্রায় একই। অর্থাৎ, আল্লাহ যে বান্দাকে মানুষদের পথ প্রদর্শন ও হিদায়াতের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং অহী দ্বারা সম্মানিত করেছেন তাঁকে রসূল বা নবী বলা হয়। প্রাচীন কাল হতে উলামাদের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছে যে, রসূল ও নবীর মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি না? এবং থাকলে তা কি? পার্থক্যকারীগণ সাধারণতঃ বলে থাকেন যে, যাঁকে নতুন শরীয়ত তথা আসমানী কিতাব দান করা হয়েছে তাঁকে রসূল ও নবী দুই বলা হয়। কিন্তু যিনি পূর্ববতী শরীয়ত মোতাবেক মানুষদের কাছে আল্লাহর দ্বীনের কথা পৌঁছে দেন, তাঁকে নবী বলা হয়; রসূল নয়। তা সত্ত্বেও কুরআনে উভয় শব্দই একটি অন্যের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও পাশাপাশি পৃথক পৃথক অর্থেও ব্যবহার হয়েছে। যেমন (সূরা হাজ্জ ২২:৫২ আয়াত) দেখুন।
মারইয়াম 19:52
আমি তাকে আহবান করেছিলাম তূর পর্বতের ডান দিক হতে এবং আমি নিভৃত আলাপ করা অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম।
মারইয়াম 19:53
আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূনকে নবীরূপে।
মারইয়াম 19:54
এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।
মারইয়াম 19:55
সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের নিকট সন্তোষভাজন।
মারইয়াম 19:56
এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইদরীসের কথা বর্ণনা কর; সে ছিল একজন সত্যবাদী নবী।
মারইয়াম 19:57
এবং আমি তাকে সুউচ্চ স্থানে উঠিয়ে নিয়েছিলাম। [১]
[১] কথিত আছে যে, ইদরীস (আঃ) আদম (আঃ)-এর পর প্রথম নবী ছিলেন এবং নূহ (আঃ) বা তাঁর পিতার দাদা ছিলেন। সর্বপ্রথম তিনিই কাপড় সিলাই শুরু করেন। 'সুউচ্চ স্থানে'র তাৎপর্য্য কি? কিছু মুফাসসির মনে করেন যে, ঈসা (আঃ)-এর মত ইদরীস (আঃ)-কেও আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরআনের শব্দ এই অর্থের জন্য পরিষ্কার নয় এবং সহীহ হাদীসেও এ কথার উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য ইস্রাঈলী বর্ণনায় তাঁকে আকাশে তুলে নেওয়ার কথা পাওয়া যায়, যা এ অর্থ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। সেই জন্য সঠিক অর্থ এটাই মনে হয় যে, 'আমি তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলাম।' সেই মর্যাদা ও সম্মান যা তাঁকে নবুঅত দান করার পর দেওয়া হয়েছিল। আর আল্লাহই ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:58
নবীদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এরাই তারা, আদমের ও যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশোদ্ভূত, ইব্রাহীম ও ইস্রাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাদেরকে আমি পথ নির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম তাদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিকট পরম করুণাময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হলে, তারা ক্রন্দন করতে করতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত। [১] (সিজদাহ-৫)
[১] আল্লাহর আয়াত শ্রবণ করে নম্রতা ও কান্নাভাব সৃষ্টি হওয়া ও আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়া আল্লাহর বান্দাদের বিশেষ লক্ষণ। (এই আয়াত পাঠ শেষে তিলাঅতের সিজদাহ করা সুন্নত। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
মারইয়াম 19:59
তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। [১]
[১] আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্ত বান্দাদের বর্ণনার পর ঐ সমস্ত লোকেদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যারা এর বিপরীত আল্লাহর আদেশের অন্যথাচরণ করে ও বিমুখতা অবলম্বন করে। নামায বিনষ্ট করার অর্থ একেবারে নামায না পড়া; যা মূলতঃ কুফরী, অথবা নামাযের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামায আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাযকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামায পড়া। এ সমস্ত নামায বিনষ্ট করার অর্থে শামিল। এ রকম ব্যক্তি অত্যন্ত পাপী এবং আয়াতে বর্ণিত শাস্তির যোগ্য। غَي এর অর্থ ধ্বংস, অমঙ্গল, অশুভ পরিণাম বা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।
মারইয়াম 19:60
কিন্তু তারা নয় যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তওবা করে নামায ত্যাগ ও খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করা হতে ফিরে আসবে এবং ঈমান ও সৎকাজের দাবীসমূহ পূরণ করবে তারা উল্লিখিত অশুভ পরিণাম হতে পরিত্রাণ লাভ করবে এবং জান্নাতের অধিকারী বিবেচিত হবে।
মারইয়াম 19:61
সেই স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি পরম দয়াময় নিজ দাসদেরকে অদৃশ্যভাবে দিয়েছেন; [১] নিশ্চয় তাঁর প্রতিশ্রুত বিষয় অবশ্যম্ভাবী।
[১] অর্থাৎ, এটি তাদের ঈমান ও ইয়াক্বীনের দৃঢ়তা যে, তারা জান্নাত তো দেখেইনি বরং আল্লাহর অদৃশ্যভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে জান্নাত পাওয়ার আশায় ঈমান ও আল্লাহ-ভীতির রাস্তা অবলম্বন করেছে।
মারইয়াম 19:62
সেখানে তারা ‘শান্তি’ ছাড়া কোন অসার বাক্য শুনবে না[১] এবং সেথায় সকাল-সন্ধ্যায় তাদের জন্য থাকবে জীবনোপকরণ। [২]
[১] অর্থাৎ, ফিরিশতারাও চর্তুদিক হতে সালাম করবে এবং জান্নাতীরাও একে অপরকে বেশি বেশি সালাম করবে।
[২] ইমাম আহমাদ (রঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, জান্নাতে দিন-রাত হবে না। জান্নাত সর্বদা আলোয় আলোকিত থাকবে। হাদীসের মধ্যে আছে, জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম দলটির মুখমন্ডল হবে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়। না মুখে থুথু আসবে আর না নাকে পানি, না মল-মূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হবে। (মহিলাদের মাসিক আসবে না।) তাদের বাসনপত্র ও চিরুনী হবে সোনার। তাদের সুরভিত ধোঁয়া হবে সুগন্ধ কাঠের। তাদের শরীরের ঘাম হবে মৃগনাভির ন্যায় সুগন্ধময়। প্রত্যেক জান্নাতীকে দু'জন স্ত্রী দেওয়া হবে; যাদের রূপ-সৌন্দর্য্যের কারণে বাহির হতে পায়ের হাড়ের ভিতরের মগজ দেখা যাবে। আপোসে কোন প্রকার মনোমালিন্য থাকবে না। তাদের অন্তর হবে একটি মানুষের অন্তরের মত। সকাল-সন্ধ্যা তারা আল্লাহর তসবীহ পাঠ করবে। (বুখারী, মুসলিম)
মারইয়াম 19:63
এ হল সেই জান্নাত যার অধিকারী করব আমি আমার দাসদের মধ্যে সংযমশীলকে।
মারইয়াম 19:64
(জিবরীল বলল,) ‘আমরা আপনার প্রতিপালকের আদেশ ব্যতিরেকে অবতরণ করি না;[১] আমাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা আছে ও এই দু-এর অন্তর্বর্তী যা আছে তা তাঁরই। আর আপনার প্রতিপালক ভুলবার নন।’
[১] নবী (সাঃ) একবার জিবরীলের নিকট বেশী বেশী ও সত্বর সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করলে এই আয়াত অবর্তীণ হয়।
মারইয়াম 19:65
তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং উভয়ের অন্তর্বর্তী যা কিছু আছে সবারই প্রতিপালক; সুতরাং তুমি তাঁরই উপাসনা কর এবং তাঁর উপাসনায় ধৈর্যশীলতা অবলম্বন কর; তুমি কি তাঁর সমনাম কাউকেও জান?[১]
[১] অর্থাৎ, জান না। যখন তার সমনাম ও সমতুল্য আর কেউ নেই, তখন তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্যও নেই।
মারইয়াম 19:66
মানুষ[১] বলে, ‘আমার মৃত্যু হলে আমি কি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব?’ [২]
[১] এখানে মানুষ বলতে সাধারণ কাফেরকে বুঝানো হয়েছে; যারা কিয়ামত ও পুনরুত্থানে বিশ্বাসী নয়।
[২] এখানে প্রশ্ন অস্বীকৃতির অর্থে ব্যবহার হয়েছে; অর্থাৎ, আমি মৃত্যুর পর যখন মাটিতে মিশে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব, তখন আমাকে পুনঃ দ্বিতীয়বার কিভাবে সৃষ্টি করা হবে? অর্থাৎ এরূপ সম্ভব নয়।
মারইয়াম 19:67
মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না? [১]
[১] আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন, যখন আমি মানুষকে প্রথমবার বিনা কোন নমুনা ছাড়া সৃষ্টি করেছি, তখন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কেমন করে কঠিন হতে পারে? প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন, না দ্বিতীয়বার? মানুষ কতই না বোকা ও আত্মবিস্মৃত! আর আত্মবিস্মৃতিই মানুষকে আল্লাহবিস্মৃত বানিয়েছে।
মারইয়াম 19:68
সুতরাং শপথ তোমার প্রতিপালকের! আমি অবশ্যই তাদেরকে এবং শয়তানদেরকে সমবেত করব। অতঃপর আমি অবশ্যই তাদেরকে নতজানু অবস্থায় জাহান্নামের চতুর্দিকে উপস্থিত করব।[১]
[১] جِثي শব্দটি جَاثٍ এর বহুবচন, যার উৎপত্তি جَثا يَجثُو থেকে। এর অর্থঃ হাঁটু গেড়ে বসা, নতজানু হওয়া। শব্দটি এখানে অবস্থা বর্ণনার জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ আমি শুধু ওদেরকেই পুনর্জীবিত করব না বরং ঐ সমস্ত শয়তানকেও জীবিত করব যারা তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল বা যাদের তারা ইবাদত করত। অতঃপর তাদের সকলকেই এই অবস্থায় জাহান্নামের নিকট একত্রিত করব যে তারা কিয়ামতের ময়দানের ভয়াবহতা ও জবাবদিহির ভয়ে হাঁটু গেড়ে বসে যাবে। হাদীসে কুদসীতে আছে, মহান আল্লাহ বলেন, "আদম-সন্তান আমাকে মিথ্যাজ্ঞান করে, অথচ তার জন্য এটা সঙ্গত নয়। আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়, অথচ তার জন্য এটা শোভনীয় নয়। আমাকে তার মিথ্যাজ্ঞান করা এই যে, আমার সম্পর্কে সে বলে, 'আল্লাহ যেরূপ আমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন কখনই আমাকে সেইরূপ পুনর্জীবিত করবেন না'; অথচ আমার প্রথমবার সৃষ্টি করা দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার চেয়ে সহজ নয়। (অর্থাৎ যদি সৃষ্টি করা কঠিন হয় তাহলে প্রথমবার হওয়াই উচিত, দ্বিতীয়বার নয়।) আর আমাকে ওর কষ্ট দেওয়া এই যে, সে বলে, আমার সন্তান আছে; অথচ আমি একক, আমি কারো মুখাপেক্ষী নই। না আমি কাউকে জন্ম দিয়েছি, এবং না আমাকে কেউ জন্ম দিয়েছে। আর আমার সমকক্ষ ও সমতুল্য কেউ নেই।" (বুখারী, সূরা ইখলাসের তফসীর)
মারইয়াম 19:69
অতঃপর প্রত্যেক দলের মধ্যে যে পরম দয়াময়ের প্রতি সর্বাধিক অবাধ্য আমি তাকে টেনে অবশ্যই বের করব। [১]
[১] عِتي শব্দটিও عَاتٍٍ এর বহুবচন, যার উৎপত্তি عَتا يَعتُو থেকে। এর অর্থঃ অত্যধিক অবাধ্য, বিদ্রোহী। অর্থাৎ প্রত্যেক ভ্রষ্ট দল হতে বড় বড় নেতা ও বিদ্রোহীদেরকে আলাদা করে নেব এবং একত্রিত করে জাহান্নামে ঠেলে দেব। কেননা এ সব নেতারা অন্য সব জাহান্নামীদের তুলনায় বেশী শাস্তিযোগ্য। যেমন পরবর্তী আয়াতে এ কথা এসেছে।
মারইয়াম 19:70
তারপর আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা জাহান্নাম প্রবেশের অধিকতর যোগ্য তাদের বিষয়ে অধিক অবগত। [১]
[১] صِلِيًا শব্দটি صَلَى يَصلى এর 'মাসদার সাময়ী' (শ্রুত ক্রিয়ামূল) যার অর্থ প্রবেশ করা। অর্থাৎ জাহান্নামে প্রবেশ করায় ও ওতে জ্বলে ভস্ম হওয়ার অধিক যোগ্য কারা, আমি তা ভালোই জানি।
মারইয়াম 19:71
তোমাদের প্রত্যেকেই তাতে প্রবেশ করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।
মারইয়াম 19:72
পরে আমি সাবধানীদেরকে উদ্ধার করব এবং সীমালংঘনকারীদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় বর্জন করব। [১]
[১] এর ব্যাখ্যা সহীহ হাদীসে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, জাহান্নামের উপর সেতু (পুলসিরাত) স্থাপন করা হবে যার উপর দিয়ে প্রত্যেক মুমিন ও মুনাফিককে পার হতে হবে। মুমিনরা নিজ নিজ আমল অনুসারে দ্রুত ও ধীর গতিতে পার হয়ে যাবে; কেউ চোখের পাতা ফেলার গতিতে (পলকের মধ্যে), কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ হাওয়ার গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ বা অন্যান্য যানবাহনের গতিতে, কেউ বা পূর্ণ নিরাপদে, কেউ যখম হয়েও পার হয়ে যাবে। আবার কিছু জাহান্নামে পড়েও যাবে পরে তাদেরকে সুপারিশ দ্বারা বের করে নেওয়া হবে। কিন্তু মুনাফিকদল ঐ পুল পার হতে সফল বা সক্ষম হবে না। বরং সকলেই জাহান্নামে পড়ে যাবে। এর সমর্থন ঐ হাদীস দ্বারাও হয়, যাতে বলা হয়েছে যে, "যার তিন তিনটি সন্তান সাবালক হওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করবে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না; কিন্তু প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য (জাহান্নামের উপর বেয়ে অতিক্রম করবে)।" (বুখারী, মুসলিম) আর সেই প্রতিজ্ঞা, যা উক্ত আয়াতে "এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত" বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং জাহান্নামে প্রবেশ করার অর্থ হবে, শুধুমাত্র পুলসিরাতের উপর বেয়ে পার হওয়া। (বিস্তৃত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ইবনে কাসীর, আইসারুত্ তাফাসীর)
মারইয়াম 19:73
তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে আবৃত্ত হলে অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, ‘দু’দলের মধ্যে কোন্টি মর্যাদায় শ্রেষ্ঠতর ও মজলিস হিসাবে কোনটি উত্তম?’ [১]
[১] মক্কার কাফেররা দরিদ্র মুসলিম ও ধনী কুরাইশ তথা তাদের সভা ও ঘর-বাড়ির মধ্যে তুলনা করে কুরআনী আহবানের মোকাবেলা করে থাকে। মুসলিমদের মধ্যে আম্মার, বিলাল, সুহাইবের মত দরিদ্র মানুষ রয়েছেন। তাঁদের পরামর্শগৃহ (মন্ত্রণালয়) 'দারুল আরকাম'। অন্য দিকে কাফেরদের মধ্যে রয়েছে আবু জাহল, নযর বিন হারিস, উতবা, শাইবা প্রভৃতির মত নেতৃস্থানীয় লোক, তাদের উঁচু উঁচু প্রাসাদ রয়েছে এবং মন্ত্রণাসভার জন্য রয়েছে 'দারুন নাদওয়াহ' যা অতি সুন্দর।
মারইয়াম 19:74
তাদের পূর্বে কত জাতিকে আমি বিনাশ করেছি, যারা তাদের অপেক্ষা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল। [১]
[১] আল্লাহ তাআলা বলেন, দুনিয়ার এই সমস্ত জিনিস এমন নয় যা নিয়ে গর্ব করা যেতে পারে বা হক ও বাতিল (সত্য ও অসত্য) এর মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে। এসব তো পূর্ববর্তী উম্মতের কাছেও ছিল, তা সত্ত্বেও সত্যকে অস্বীকার করার ফলে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর এই ধন-সম্পদ তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারেনি।
মারইয়াম 19:75
বল, ‘যারা বিভ্রান্তিতে আছে, পরম দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দেবেন; পরিশেষে যখন তারা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে তা প্রত্যক্ষ করবে; তা শাস্তি হোক অথবা কিয়ামতই হোক; তখন তারা জানতে পারবে, কে মর্যাদায় নিকৃষ্ট ও কে দলবলে দুর্বল।’ [১]
[১] এ ছাড়াও এসব বস্তু পথভ্রষ্ট ও কাফেরদেরকে অবকাশ ও ঢিল দেওয়ার জন্য দান করা হয়। অতএব তা দেখার বিষয় নয়। মূলতঃ ভাল-মন্দের পার্থক্য ঐ সময় সূচিত হবে, যখন আমলের অবকাশ সময় শেষ হয়ে গিয়ে আল্লাহর আযাব এসে পড়বে বা কিয়ামত এসে পড়বে। কিন্তু ঐ সময়ের জ্ঞান কোন উপকার দেবে না। কারণ ঐ সময় শুধরে নেওয়ার অথবা সংশোধনের কোন সুযোগ থাকবে না।
মারইয়াম 19:76
যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের পথপ্রাপ্তিতে বৃদ্ধি দান করেন;[১] আর স্থায়ী সৎকর্ম তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং প্রতিদান হিসাবেও শ্রেষ্ঠ। [২]
[১] এখানে অন্য এক রীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা এই যে, যেমন কুরআন দ্বারা যাদের অন্তরে কুফরী, শিরক তথা ভ্রষ্টতার ব্যাধি রয়েছে তাদের বদমায়েশি ও ভ্রষ্টতা আরো বৃদ্ধি পায়, তেমনি যারা ঈমানদার তাদের ঈমান ও হিদায়াতে আরো বেশী দৃঢ়তা আসে।
[২] এই আয়াতে দরিদ্র মুসলিমদেরকে সান্তনা দেওয়া হয়েছে যে, কাফের ও মুশরিকরা যে সব ধন-সম্পদ নিয়ে গর্ব, অহংকার করে তা এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তোমরা যে সৎকর্ম করছ তা চিরকাল বাকী থাকবে; যার সওয়াব ও নেকী তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রাপ্ত হবে এবং তার উত্তম প্রতিদান ও উপকারিতা তোমরা সেখানে লাভ করবে।
মারইয়াম 19:77
তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, অবশ্যই আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবে।
মারইয়াম 19:78
সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা পরম দয়াময়ের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে?
মারইয়াম 19:79
কখনই নয়! তারা যা বলে, আমি তা লিখে রাখব এবং তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকব।
মারইয়াম 19:80
সে যার কথা বলে, তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট একাকী আসবে।[১]
[১] এই আয়াতগুলোর অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে বলা হয় যে, আমর বিন আ'স (রাঃ)-এর পিতা আ'স বিন ওয়ায়েল ইসলামের চরম শত্রু ছিল। তার কাছে খাব্বাব বিন আরাত্তের কিছু ঋণ পাওনা ছিল। তিনি লোহার (কামারের) কাজ করতেন। খাব্বাব যখন ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে তাগাদা করলেন, তখন আ'স বলল, 'যতক্ষণ তুমি মুহাম্মাদকে অস্বীকার না করবে ততক্ষণ আমি তোমার ঋণ পরিশোধ করব না।' খাব্বাব বললেন, 'আমি এ কাজ তো তুমি মরে গিয়ে পুনর্জীবিত হওয়ার পরেও করব না।' সে বলল, 'আচ্ছা যখন আমাকে মরার পর আবার জীবিত হতে হবে, তখন আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি দেওয়া হবে, তখন আমি তোমার ঋণ শোধ করে দেব।' (বুখারী, মুসলিম) আল্লাহ বলেন, সে যে এই দাবী করছে, তার কাছে কি গায়বের জ্ঞান আছে যে, ওখানে তাকে ধন ও সন্তান দান করা হবে? অথবা আল্লাহ কি তাকে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? এমন কখনই না। বরং তার কথায় রয়েছে অহংকার ও আল্লাহর আয়াতসমূহের ব্যাপারে উপহাস। এ ব্যক্তি যে মাল ও সন্তানের কথা বলছে তার উত্তরাধিকারী তো আমিই। অর্থাৎ মৃত্যুর পর পর সে সমস্ত হতে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে এবং আমার নিকট একাকী আসবে; তখন সাথে না মাল থাকবে, না সন্তান না কোন সাঙ্গপাঙ্গ। বরং থাকবে আগুনের শাস্তি; যা তার জন্য ও তার মত অন্য লোকদের জন্য আমি বৃদ্ধি করতে থাকব।
মারইয়াম 19:81
তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যদেরকে গ্রহণ করেছে এই জন্য যে, যাতে তারা তাদের সম্মানের কারণ হয়।
মারইয়াম 19:82
কখনই নয়, তারা তাদের উপাসনা অস্বীকার করবে এবং তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।[১]
[১] عِزّ এর মমার্থ হল এই সব উপাস্য (দেবদেবী)রা তাদের ইয্যত-সম্মানের কারণ ও সহায় হবে। আর ضَدّ এর অর্থ হল শত্রু, অস্বীকারকারী, প্রতিবাদী তথা ওদের বিরুদ্ধে অন্যদের সহায়ক হবে। অর্থাৎ এই সব দেবদেবী তাদের ধারণার বিপরীত তাদের পক্ষ অবলম্বন না করে তাদের শত্রু, অস্বীকারকারী, প্রতিপক্ষ ও বিরোধী হিসাবে প্রকাশ পাবে।
মারইয়াম 19:83
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে রেখেছি; তারা তাদেরকে মন্দকর্মে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করে থাকে। [১]
[১] অর্থাৎ পথভ্রষ্ট করে, প্রলোভন ও কুমন্ত্রণা দেয় এবং পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
মারইয়াম 19:84
সুতরাং তাদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি করো না; আমি তো গণনা করছি তাদের নির্ধারিত কাল। [১]
[১] আর যখন সেই অবকাশের নির্ধারিত কাল শেষ হয়ে যাবে, তখন আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। সুতরাং তোমার তাড়াহুড়ো করার কোন প্রয়োজন নেই।
মারইয়াম 19:85
(স্মরণ কর,) যেদিন আমি পরম দয়াময়ের নিকট সাবধানীদেরকে অতিথিরূপে (সওয়ার অবস্থায়) সমবেত করব।
মারইয়াম 19:86
এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব। [১]
[১] وَفد শব্দটি وَافِد শব্দের বহুবচন, যেমন رَكب শব্দটি رَاكِب শব্দের বহুবচন। অর্থ এই যে, সেদিন পরহেযগার ও সাধানীদেরকে উট ও ঘোড়ার উপর চড়িয়ে অত্যন্ত ইয্যত ও সম্মানের সাথে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। وِردًا এর অর্থ পিপাসার্ত। অর্থাৎ, তাঁদের বিপরীত অপরাধীদেরকে ক্ষুধার্ত ও পিপাসিত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।
মারইয়াম 19:87
যে পরম দয়াময়ের নিকট প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে, সে ছাড়া অন্য কারো সুপারিশ করবার ক্ষমতা থাকবে না। [১]
[১] প্রতিশ্রুতির অর্থঃ ঈমান ও আল্লাহর ভয়। অর্থাৎ ঈমানদার ও আল্লাহ-ভীরু বান্দাদের মধ্যে যাঁদেরকে আল্লাহ সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করবেন তাঁরা ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ করার অনুমতিই পাবে না।
মারইয়াম 19:88
তারা বলে, ‘পরম দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন!’
মারইয়াম 19:89
তোমরা তো এক বীভৎস[১] কথার অবতারণা করেছ।
[১] إَدّ এর অর্থঃ ভয়ানক ব্যাপার বা বীভৎস কান্ড। এ বিষয় এর আগেও আলোচিত হয়েছে যে, 'আল্লাহর সন্তান আছে' বলা এত বড় অপরাধ যে, এই অপরাধে আকাশ-পৃথিবী বিদীর্ণ হতে পারে এবং পাহাড়-পর্বত চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে পারে।
মারইয়াম 19:90
এতে যেন আকাশসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে।
মারইয়াম 19:91
যেহেতু তারা পরম দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে।
মারইয়াম 19:92
অথচ সন্তান গ্রহণ করা পরম দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়।
মারইয়াম 19:93
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে পরম দয়াময়ের নিকট দাসরূপে উপস্থিত হবে না। [১]
[১] যখন সবাই আল্লাহর দাস ও অসহায় বান্দা, তখন তাঁর সন্তানের প্রয়োজন কি? আর সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর জন্য শোভনীয়ও নয়।
মারইয়াম 19:94
তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন। [১]
[১] অর্থাৎ, আদম থেকে নিয়ে কিয়ামতের সকাল পর্যন্ত যত মানব ও দানব জন্ম নেবে সকলের পরিসংখ্যান আল্লাহর কাছে রয়েছে। সবাই তাঁর পাকড়াও ও আয়ত্তের অধীনে। কেউ তাঁর দৃষ্টিতে লুক্কায়িত নয়, লুকিয়ে থাকতেও পারে না।
মারইয়াম 19:95
কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়। [১]
[১] অর্থাৎ, কেউ কারো সাহায্যকারী হবে না, আর না মালই কারো কোন কাজে আসবে। {يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ} অর্থাৎ, সেদিন না ধন-মাল কোন কাজ দেবে, আর না সন্তান-সন্ততি। (সূরা শুআরা ২৬:৮৮) প্রত্যেককেই একা একা নিজ হিসাব দিতে হবে। আর মানুষ পৃথিবীতে যাদের জন্য কিয়ামতের দিন সাহায্যকারী ও সহায়ক হবে বলে মনে করে, তারা সবাই অদৃশ্য ও উধাও হয়ে যাবে। কেউ কারো সাহায্যের জন্য উপস্থিত হবে না।
মারইয়াম 19:96
যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে পরম দয়াময় তাদের জন্য (পারস্পরিক) সম্প্রীতি সৃষ্টি করবেন। [১]
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে মানুষের অন্তরে নেকী ও পরহেযগারীর জন্য ভালবাসার সৃষ্টি করবেন। যেমন হাদীসে এসেছে, "যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে নিজের প্রিয় করে নেন, তখন তিনি জিবরীল (আঃ)-কে বলেন যে, আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস। সুতরাং জিবরীল (আঃ)ও তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি সারা আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তোমরাও তাকে ভালবাস। সুতরাং আকাশের সমস্ত ফিরিশতা তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। তারপর পৃথিবীতে তার বরণ ও গ্রহণযোগ্যতা স্থাপন করা হয়। (বুখারী)
মারইয়াম 19:97
আমি তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি;[১] যাতে তুমি তার দ্বারা সাবধানীদেরকে সুসংবাদ দিতে পার এবং বিতর্কপ্রিয় সম্প্রদায়কে[২] সতর্ক করতে পার।
[১] কুরআনকে সহজ করে দেওয়ার অর্থ ঐ ভাষায় অবতীর্ণ করা যা নবী (সাঃ) জানতেন, অর্থাৎ আরবী ভাষায়। এ ছাড়া তার বিষয়-বস্তুর স্পষ্টতা ও সরলতা এই অর্থের শামিল।
[২] لُدّ শব্দটি ألَدّ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ ঝগড়াটে, বিতর্ক-প্রিয়। এখানে কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে।
মারইয়াম 19:98
তাদের পূর্বে আমি কত জাতিকে বিনাশ করেছি! তুমি কি তাদের কারো কিছু অনুভব কর অথবা তাদের ক্ষীণতম শব্দও শুনতে পাও? [১]
[১] تُحسّ এর অর্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা, অর্থাৎ তুমি কি তাদেরকে চোখ দিয়ে দেখতে পাও, হাত দিয়ে ছুঁতে পার? প্রশ্ন অস্বীকৃতির জন্য; অর্থাৎ পৃথিবীতে ওদের অস্তিতত্ত্বই নেই যাকে দেখে ও ছুঁয়ে অনুভব করা যায় অথবা তাদের ক্ষীণতম শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। رِكز এর অর্থঃ ক্ষীণতম শব্দ।