Tafsir Ahsanul Bayaan — আন-নামল 27:1 – আল-আনকাবুত 29:69
Contents
- আন-নামল 27:1
- আন-নামল 27:2
- আন-নামল 27:3
- আন-নামল 27:4
- আন-নামল 27:5
- আন-নামল 27:6
- আন-নামল 27:7
- আন-নামল 27:8
- আন-নামল 27:9
- আন-নামল 27:10
- আন-নামল 27:11
- আন-নামল 27:12
- আন-নামল 27:13
- আন-নামল 27:14
- আন-নামল 27:15
- আন-নামল 27:16
- আন-নামল 27:17
- আন-নামল 27:18
- আন-নামল 27:19
- আন-নামল 27:20
- আন-নামল 27:21
- আন-নামল 27:22
- আন-নামল 27:23
- আন-নামল 27:24
- আন-নামল 27:25
- আন-নামল 27:26
- আন-নামল 27:27
- আন-নামল 27:28
- আন-নামল 27:29
- আন-নামল 27:30
- আন-নামল 27:31
- আন-নামল 27:32
- আন-নামল 27:33
- আন-নামল 27:34
- আন-নামল 27:35
- আন-নামল 27:36
- আন-নামল 27:37
- আন-নামল 27:38
- আন-নামল 27:39
- আন-নামল 27:40
- আন-নামল 27:41
- আন-নামল 27:42
- আন-নামল 27:43
- আন-নামল 27:44
- আন-নামল 27:45
- আন-নামল 27:46
- আন-নামল 27:47
- আন-নামল 27:48
- আন-নামল 27:49
- আন-নামল 27:50
- আন-নামল 27:51
- আন-নামল 27:52
- আন-নামল 27:53
- আন-নামল 27:54
- আন-নামল 27:55
- আন-নামল 27:56
- আন-নামল 27:57
- আন-নামল 27:58
- আন-নামল 27:59
- আন-নামল 27:60
- আন-নামল 27:61
- আন-নামল 27:62
- আন-নামল 27:63
- আন-নামল 27:64
- আন-নামল 27:65
- আন-নামল 27:66
- আন-নামল 27:67
- আন-নামল 27:68
- আন-নামল 27:69
- আন-নামল 27:70
- আন-নামল 27:71
- আন-নামল 27:72
- আন-নামল 27:73
- আন-নামল 27:74
- আন-নামল 27:75
- আন-নামল 27:76
- আন-নামল 27:77
- আন-নামল 27:78
- আন-নামল 27:79
- আন-নামল 27:80
- আন-নামল 27:81
- আন-নামল 27:82
- আন-নামল 27:83
- আন-নামল 27:84
- আন-নামল 27:85
- আন-নামল 27:86
- আন-নামল 27:87
- আন-নামল 27:88
- আন-নামল 27:89
- আন-নামল 27:90
- আন-নামল 27:91
- আন-নামল 27:92
- আন-নামল 27:93
- আল-কাসাস 28:1
- আল-কাসাস 28:2
- আল-কাসাস 28:3
- আল-কাসাস 28:4
- আল-কাসাস 28:5
- আল-কাসাস 28:6
- আল-কাসাস 28:7
- আল-কাসাস 28:8
- আল-কাসাস 28:9
- আল-কাসাস 28:10
- আল-কাসাস 28:11
- আল-কাসাস 28:12
- আল-কাসাস 28:13
- আল-কাসাস 28:14
- আল-কাসাস 28:15
- আল-কাসাস 28:16
- আল-কাসাস 28:17
- আল-কাসাস 28:18
- আল-কাসাস 28:19
- আল-কাসাস 28:20
- আল-কাসাস 28:21
- আল-কাসাস 28:22
- আল-কাসাস 28:23
- আল-কাসাস 28:24
- আল-কাসাস 28:25
- আল-কাসাস 28:26
- আল-কাসাস 28:27
- আল-কাসাস 28:28
- আল-কাসাস 28:29
- আল-কাসাস 28:30
- আল-কাসাস 28:31
- আল-কাসাস 28:32
- আল-কাসাস 28:33
- আল-কাসাস 28:34
- আল-কাসাস 28:35
- আল-কাসাস 28:36
- আল-কাসাস 28:37
- আল-কাসাস 28:38
- আল-কাসাস 28:39
- আল-কাসাস 28:40
- আল-কাসাস 28:41
- আল-কাসাস 28:42
- আল-কাসাস 28:43
- আল-কাসাস 28:44
- আল-কাসাস 28:45
- আল-কাসাস 28:46
- আল-কাসাস 28:47
- আল-কাসাস 28:48
- আল-কাসাস 28:49
- আল-কাসাস 28:50
- আল-কাসাস 28:51
- আল-কাসাস 28:52
- আল-কাসাস 28:53
- আল-কাসাস 28:54
- আল-কাসাস 28:55
- আল-কাসাস 28:56
- আল-কাসাস 28:57
- আল-কাসাস 28:58
- আল-কাসাস 28:59
- আল-কাসাস 28:60
- আল-কাসাস 28:61
- আল-কাসাস 28:62
- আল-কাসাস 28:63
- আল-কাসাস 28:64
- আল-কাসাস 28:65
- আল-কাসাস 28:66
- আল-কাসাস 28:67
- আল-কাসাস 28:68
- আল-কাসাস 28:69
- আল-কাসাস 28:70
- আল-কাসাস 28:71
- আল-কাসাস 28:72
- আল-কাসাস 28:73
- আল-কাসাস 28:74
- আল-কাসাস 28:75
- আল-কাসাস 28:76
- আল-কাসাস 28:77
- আল-কাসাস 28:78
- আল-কাসাস 28:79
- আল-কাসাস 28:80
- আল-কাসাস 28:81
- আল-কাসাস 28:82
- আল-কাসাস 28:83
- আল-কাসাস 28:84
- আল-কাসাস 28:85
- আল-কাসাস 28:86
- আল-কাসাস 28:87
- আল-কাসাস 28:88
- আল-আনকাবুত 29:1
- আল-আনকাবুত 29:2
- আল-আনকাবুত 29:3
- আল-আনকাবুত 29:4
- আল-আনকাবুত 29:5
- আল-আনকাবুত 29:6
- আল-আনকাবুত 29:7
- আল-আনকাবুত 29:8
- আল-আনকাবুত 29:9
- আল-আনকাবুত 29:10
- আল-আনকাবুত 29:11
- আল-আনকাবুত 29:12
- আল-আনকাবুত 29:13
- আল-আনকাবুত 29:14
- আল-আনকাবুত 29:15
- আল-আনকাবুত 29:16
- আল-আনকাবুত 29:17
- আল-আনকাবুত 29:18
- আল-আনকাবুত 29:19
- আল-আনকাবুত 29:20
- আল-আনকাবুত 29:21
- আল-আনকাবুত 29:22
- আল-আনকাবুত 29:23
- আল-আনকাবুত 29:24
- আল-আনকাবুত 29:25
- আল-আনকাবুত 29:26
- আল-আনকাবুত 29:27
- আল-আনকাবুত 29:28
- আল-আনকাবুত 29:29
- আল-আনকাবুত 29:30
- আল-আনকাবুত 29:31
- আল-আনকাবুত 29:32
- আল-আনকাবুত 29:33
- আল-আনকাবুত 29:34
- আল-আনকাবুত 29:35
- আল-আনকাবুত 29:36
- আল-আনকাবুত 29:37
- আল-আনকাবুত 29:38
- আল-আনকাবুত 29:39
- আল-আনকাবুত 29:40
- আল-আনকাবুত 29:41
- আল-আনকাবুত 29:42
- আল-আনকাবুত 29:43
- আল-আনকাবুত 29:44
- আল-আনকাবুত 29:45
- আল-আনকাবুত 29:46
- আল-আনকাবুত 29:47
- আল-আনকাবুত 29:48
- আল-আনকাবুত 29:49
- আল-আনকাবুত 29:50
- আল-আনকাবুত 29:51
- আল-আনকাবুত 29:52
- আল-আনকাবুত 29:53
- আল-আনকাবুত 29:54
- আল-আনকাবুত 29:55
- আল-আনকাবুত 29:56
- আল-আনকাবুত 29:57
- আল-আনকাবুত 29:58
- আল-আনকাবুত 29:59
- আল-আনকাবুত 29:60
- আল-আনকাবুত 29:61
- আল-আনকাবুত 29:62
- আল-আনকাবুত 29:63
- আল-আনকাবুত 29:64
- আল-আনকাবুত 29:65
- আল-আনকাবুত 29:66
- আল-আনকাবুত 29:67
- আল-আনকাবুত 29:68
- আল-আনকাবুত 29:69
আন-নামল 27:1
ত্ব-সীন; এগুলি কুরআন ও সুস্পষ্ট গ্রন্থের বাক্য;
আন-নামল 27:2
বিশ্বাসীদের জন্য (তা) পথ-নির্দেশক এবং সুসংবাদ বিশেষ।
আন-নামল 27:3
যারা যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত দেয় ও পরলোকে নিশ্চিত বিশ্বাসী। [১]
[১] এ বিষয়টি বিভিন্ন স্থানে কয়েকবার আলোচিত হয়েছে যে, কুরআন কারীম এমনিতে বিশ্ব মানবতার পথ নির্দেশিকা হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু তা হতে সত্যিকার পথ ওরাই পায়, যারা পথ অন্বেষণকারী। যারা নিজেদের অন্তর ও মস্তিষ্কর জানালাগুলি সত্য দেখার ও শোনার জন্য বন্ধ রাখে বা যাদের অন্তরাত্মা পাপের অন্ধকারে নিমজ্জিত, তাদেরকে কুরআন কিরূপে পথের দিশা দিতে পারে? এর উদাহরণ সেই (ঘুমন্ত বা) অন্ধ ব্যক্তিদের ন্যায় যারা সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত; যদিও সূর্য সারা বিশ্বকে আলোকিত করে।
আন-নামল 27:4
নিশ্চয় যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকে আমি শোভন করেছি, [১] ফলে ওরা বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়; [২]
[১] এটি পাপের পরিণাম ও তার বদলা যে, পাপ তাদেরকে ভাল মনে হয়। আর এর মূল কারণ হল পরকালে অবিশ্বাস। শোভন করার সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে, যেহেতু প্রতিটি জিনিস তার ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। তাছাড়া এর মধ্যে আল্লাহর সেই নীতি কার্যকর থাকে, যাতে তিনি সৎ লোকদের জন্য পুণ্যের এবং অসৎ লোকদের জন্য পাপের রাস্তা সহজ করে থাকেন। কিন্তু এই উভয়ের মধ্যে একটি রাস্তা বেছে নেওয়া মানুষের নিজের এখতিয়ারভুক্ত।
[২] অর্থাৎ, ভ্রষ্টতার যে রাস্তায় তারা চলতে থাকে তার বাস্তবিকতা তাদের অজানা থাকে এবং সঠিক রাস্তার দিশা পায় না।
আন-নামল 27:5
এদের জন্য আছে নিকৃষ্ট শাস্তি এবং এরাই পরকালে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
আন-নামল 27:6
নিশ্চয় তোমাকে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে কুরআন দেওয়া হচ্ছে।
আন-নামল 27:7
স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন মূসা তার পরিবারবর্গকে বলেছিল, ‘আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবতঃ আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কোন খবর আনতে পারব, অথবা তোমাদের জন্য আনতে পারব জ্বলন্ত কাষ্ঠখন্ড; যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পার।’ [১]
[১] এটি ঐ সময়কার ঘটনা যখন মূসা (আঃ) নিজ স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফিরছিলেন। রাতের অন্ধকারে রাস্তা নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আর শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য আগুনেরও প্রয়োজন ছিল।
আন-নামল 27:8
অতঃপর সে যখন আগুনের নিকট এল তখন তাকে ডেকে বলা হল, ‘যে (এই) আগুনে এবং যারা ওর চারিপাশে আছে তারা বরকতপ্রাপ্ত, [১] বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমার্নিত।[২]
[১] দূর হতে যেখানে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল, সেখানে পৌঁঁছলেন অর্থাৎ, ত্বুর পাহাড়ে এবং দেখলেন এক সবুজ গাছ হতে আগুনের শিখা উপরে উঠছে। এটি বাস্তবে আগুন ছিল না; বরং আল্লাহর নূর ছিল। যার আলো আগুনের মত মনে হচ্ছিল। مَنْ فِي النَّار (যে আগুনে আছে) বলতে মহান আল্লাহ। আর نار (আগুন) বলতে তাঁর নূরকে বুঝানো হয়েছে। আর وَمَنْ حَوْلَهَا (যারা ওর চারিপাশে আছে) বলতে মূসা (আঃ) ও ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসে মহান আল্লাহর পর্দাকে نور (জ্যোতি) আর এক অন্য বর্ণনায় نار (আগুন) বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে যে, তিনি যদি নিজেকে পর্দা থেকে প্রকাশ করে দেন তাহলে তাঁর প্রতাপ সমস্ত সৃষ্টিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
(মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়, বিস্তারিত দেখার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ ৫/৪৬৪- ৪৫৯)
[২] এখানে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনার অর্থ এই যে, ঐ অদৃশ্য ডাক হতে কেউ যেন এটা মনে না করে যে, আল্লাহ ঐ গাছ বা আগুনে প্রবেশ করে আছেন; যেমন অনেক মুশরিকরা ধারণা করে থাকে। বরং এটি সত্য দর্শনের একটি পদ্ধতি যার দ্বারা প্রত্যেক নবীকে নবুঅতের শুরুতে সম্মানিত করা হয়। কখনো ফিরিশতার মাধ্যমে, আবার কখনো বা স্বয়ং আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করে এবং সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে; যেমন, এখানে মূসা (আঃ)-এর সাথে ঘটেছে।
আন-নামল 27:9
হে মূসা! আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১]
[১] গাছ হতে ডাক আসা মূসা (আঃ)-এর জন্য আশ্চর্যজনক ছিল। আল্লাহ তাআলা বললেন, মূসা! আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আমিই আল্লাহ।
আন-নামল 27:10
তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।’ অতঃপর যখন সে ওকে সাপের মত ছুটাছুটি করতে দেখল তখন পিছনে না তাকিয়ে সে বিপরীত দিকে ছুটতে লাগল। (আমি বললাম,) ‘হে মূসা! ভয় পেয়ো না; [১] আমার কাছে তো রসূলরা ভয় পায় না।
[১] এখান হতে জানা যায় যে, নবীরা অদৃশ্যের (গায়বের) সংবাদ জানতেন না। তাছাড়া মূসা (আঃ) নিজের হাতের লাঠি হতে ভয় পেতেন না। দ্বিতীয়তঃ প্রকৃতিগত ভয় নবীদেরও হয় যেহেতু তাঁরাও ছিলেন মানুষ।
আন-নামল 27:11
তবে যে সীমালংঘন করে,[১] অতঃপর মন্দ কাজের পরিবর্তে ভালো কাজ করে; নিশ্চয় (তার প্রতি) আমি চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [২]
[১] অর্থাৎ, অত্যাচারীর এই ভয় থাকা উচিত যে, আল্লাহ যেন তাকে পাকড়াও না করে বসেন।
[২] অর্থাৎ, আমি অত্যাচারীর তওবাও কবুল করে থাকি।
আন-নামল 27:12
আর তুমি তোমার হাত নিজ জামার বুকের উন্মুক্ত অংশে প্রবেশ করাও। তা ত্রুটিমুক্ত[১] উজ্জ্বল হয়ে বেরিয়ে আসবে। এ হবে ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের নিকট আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত।[২] ওরা তো সত্যতাগী সম্প্রদায়।’
[১] অর্থাৎ, কুষ্ঠব্যাধি বা অন্য কোন রোগজনিত ত্রুটি ছাড়াই। লাঠির সাথে এটি ছিল দ্বিতীয় মু'জিযা।[২] فِي تِسْعِ آيَاتٍ অর্থাৎ, এই দুই মু'জিযা ঐ নয় নিদর্শনের অন্তর্গত যার দ্বারা আমি তোমার সাহায্য করেছি। এই মু'জিযা নিয়ে তুমি ফিরআউন ও তার জাতির নিকট যাও। উক্ত নয়টি নিদর্শন সম্পর্কে জানার জন্য সূরা বনী-ঈস্রাঈল ১৭:১০১ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।
আন-নামল 27:13
অতঃপর যখন ওদের নিকট আমার উজ্জ্বল[১] নিদর্শনসমূহ এল, তখন ওরা বলল, ‘এ সুস্পষ্ট যাদু।’
[১] مُبْصِرَة অর্থাৎ, সুস্পষ্ট, উজ্জ্বল অথবা এটি কর্তৃকারক কর্মকারকের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। (সুস্পষ্টকারী = সুস্পষ্ট)
আন-নামল 27:14
ওরা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে[১] নিদর্শনগুলি প্রত্যাখ্যান করল, যদিও ওদের অন্তর এগুলিকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল?
[১] অর্থাৎ, জানা সত্ত্বেও তারা তা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করল, এর কারণ তাদের ঔদ্ধত্য ও অহংকার।
আন-নামল 27:15
আমি অবশ্যই দাঊদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম[১] এবং তারা বলেছিল, ‘প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে তাঁর বহু বিশ্বাসী দাসের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।’
[১] সূরার প্রথম দিকে বলা হয়েছে যে, এ কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে নবী (সাঃ)-কে শিখানো হচ্ছে। আর তার প্রমাণস্বরূপ মূসার ঘটনা সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হল। এখন দ্বিতীয় প্রমাণ দাঊদ ও সুলাইমান (আলাইহিমাস সালাম) এর এই ঘটনা। নবীদের এ সমস্ত ঘটনাবলীর বিবরণ এই কথারই প্রমাণ বহন করে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্য রসূল। এখানে জ্ঞান বলতে নবুঅতের জ্ঞান ছাড়া দাঊদ ও সুলাইমান (আলাইহিমাস সালাম)-কে বিশেষভাবে যে জ্ঞান দান করা হয়েছিল তাকে বুঝানো হয়েছে। যেমন দাঊদ (আঃ)-কে লোহা থেকে বিভিন্ন জিনিস তৈরী করার জ্ঞান এবং সুলাইমান (আঃ)-কে জীব-জন্তুর ভাষা বা বুলি বুঝার জ্ঞান দান করা হয়েছিল। এই দুই পিতা-পুত্রকে আরো অনেক কিছু দান করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে শুধু জ্ঞানের কথা উল্লেখ হয়েছে। যাতে বুঝা যাচ্ছে যে, জ্ঞান হল আল্লাহর সব চেয়ে বড় নিয়ামত।
আন-নামল 27:16
সুলাইমান ছিল দাঊদের উত্তরাধিকারী[১] এবং সে বলেছিল, ‘হে লোক সকল! আমাকে পাখির বুলি শিখানো হয়েছে[২] এবং আমাকে সর্বপ্রকার বস্তু প্রদান করা হয়েছে।[৩] এ অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’
[১] এ থেকে নবুঅত ও রাজ্যের উত্তরাধিকার বুঝানো হয়েছে। যার উত্তরাধিকারী শুধুমাত্র সুলাইমানের ভাগ্যেই জোটে। নচেৎ দাঊদ (আঃ)-এর আরো সন্তান ছিল; যারা এর থেকে বঞ্চিত হয়। এমনিতে নবীগণের উত্তরাধিকারের সম্পদ জ্ঞানই হয়ে থাকে। তাঁরা যেসব ধন-সম্পদ ছেড়ে যান তা সাদকাহ বলে গণ্য হয়। যেমন, নবী (সাঃ) বলেছেন। (বুখারীঃ ফারায়েয অধ্যায়, মুসলিম জিহাদ অধ্যায়)
[২] সমস্ত জীব-জন্তুর ভাষাই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখানে শুধু পাখীদের কথা বিশেষ করে এই জন্য বর্ণনা করা হয়েছে, যেহেতু তাঁকে ছায়া করার জন্য পাখীরা সব সময় তাঁর সাথে থাকত। আবার কেউ কেউ বলেন, কেবল পাখীর ভাষাই তাঁকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। আর পিপীলিকাও পাখীর মধ্যে পরিগণিত। (ফাতহুল কাদীর)
[৩] যে সবের তাঁর প্রয়োজন ছিল যেমন, জ্ঞান, নবুঅত, প্রজ্ঞা, ধন-সম্পদ এবং মানব-দানব ও পশু-পক্ষীর আনুগত্য ইত্যাদি।
আন-নামল 27:17
সুলাইমানের সম্মুখে তার সমস্ত বাহিনী; জীন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে সমবেত করা হল;[১] তাদেরকে (এক এক) দলে বিন্যস্ত করা হল। [২]
[১] এখানে সুলাইমান (আঃ)-এর ব্যক্তিগত বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে; যাতে তিনি পুরো মানব ইতিহাসে একক। আর তা হল তাঁর আধিপত্য কেবলমাত্র মানুষের উপর ছিল না; বরং জীন, জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর উপরেও ছিল। এমনকি বাতাসও তাঁর অধীনস্থ ছিল। এখানে বলা হয়েছে যে, সুলাইমান (আঃ) কোথাও যাবার জন্য সমস্ত সৈন্যদেরকে, অর্থাৎ জীন, মানুষ ও পাখীদেরকে জমায়েত করলেন।[২] এই অনুবাদ تَوزِيع এর অর্থ تَفرِيق হিসাবে করা হয়েছে। অর্থাৎ, সকলকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করা হল। যেমন মানুষের একটি দল, জিনের একটি দল, পশুর একটি দল, পক্ষীর একটি দল ইত্যাদি। দ্বিতীয় অর্থ হল, তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া হত। অর্থাৎ, এই সেনাদল এত বিশাল হত যে, পথে থামিয়ে তা সুবিন্যস্ত করা হত। যাতে করে শাহী সেনা অসংগঠিত ও ছিন্ন-ভিন্ন না হয়ে পড়ে। এই অর্থ وَزَع يَزَع থেকে আসবে। যার অর্থ থামানো। এই শব্দের সাথে একটি আলিফ বাড়িয়ে দিয়ে أَوزِعنِي করা হয়েছে যেমন, এই সূরার ২৭:১৯ নং আয়াতে আসছে। যার অর্থঃ আমার নিকট হতে এমন জিনিস দূর করে দাও, যা তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা করতে বাধা দিয়ে থাকে।
আন-নামল 27:18
যখন ওরা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল, তখন এক পিপীলিকা বলল, ‘হে পিপীলিকাদল! তোমরা তোমাদের বাসায় প্রবেশ কর, নচেৎ সুলাইমান এবং তার বাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষে ফেলবে।’ [১]
[১] এখান হতে জানা গেল যে, জীব-জন্তুরও এক বিশেষ বুঝশক্তি আছে, যা মানুষের থেকে অনেক কম ও ভিন্নতর। দ্বিতীয়তঃ সুলাইমান (আঃ) এত মহত্ত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও গায়বের খবর জানতেন না। সেই জন্যই তো পিপীলিকার এই ভয় হল যে, তাঁদের অজান্তে আমরা যেন তাঁদের পদপিষ্ট না হয়ে পড়ি। তৃতীয়তঃ জীব-জন্তুরাও এই শুদ্ধ আকীদায় বিশ্বাসী যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানেন না। চতুর্থতঃ সুলাইমান (আঃ) পাখী ছাড়া অন্য জীবের ভাষাও বুঝতেন। এই জ্ঞান মহান আল্লাহ মু'জিযাস্বরূপ তাঁকে প্রদান করেছিলেন। যেমন জীনদের তাঁর অধীনস্থ করে দেওয়াও ছিল এক মু'জিযা।
আন-নামল 27:19
(সুলাইমান) ওর উক্তিতে মৃদু হাসল এবং বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি -- আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করেছ[১] তার জন্য এবং যাতে আমি তোমার পছন্দমত সৎকাজ করতে পারি। আর তুমি নিজ করুণায় আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ দাসদের শ্রেণীভুক্ত করে নাও।’[২]
[১] পিঁপড়ের মত ছোট একটি জীবের কথা শুনে বুঝার জন্য সুলাইমানের মনে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার অনুভূতি জাগল যে, আল্লাহ আমার উপর কত অনুগ্রহ করেছেন!
[২] এখান হতে জানা গেল জান্নাত মু'মিনদের বাসস্থান। যেখানে আল্লাহর বিনা অনুগ্রহে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। এই জন্যই হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, "সরল ও সত্যের নিকটবর্তী থাক, আর এ কথা জেনে রাখো যে, কোন ব্যক্তি নিজ আমলের জোরে জান্নাতে যেতে পারবে না।" সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনিও না?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ! আমিও না, যতক্ষণ আমার উপর আল্লাহর রহমত না হবে।" (বুখারী ৬৪৬৭নং, মুসলিম ২১৭নং )
আন-নামল 27:20
(সুলাইমান) পক্ষীকুলকে পর্যবেক্ষণ করল এবং বলল, ‘কি ব্যাপার! আমি হুদহুদকে দেখছি না কেন? সে অনুপস্থিত নাকি? [১]
[১] অর্থাৎ, এখানে উপস্থিত আছে, কিন্তু আমি দেখছি না। অথবা এখানে উপস্থিতই নেই।
আন-নামল 27:21
সে উপযুক্ত কারণ না দর্শালে আমি অবশ্যই ওকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা জবাই করব।’
আন-নামল 27:22
অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, ‘আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি[১] এবং সাবা[২] হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।
[১] إحَاطَة অর্থ কোন জিনিসের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান ও অবগতি অর্জন করা। লক্ষণীয় যে, পাখীও জানে, নবী গায়ব জানেন না।
[২] 'সাবা' এক ব্যক্তির নাম, যা পরে এক জাতি ও এক শহরের নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখানে সাবা শহরকে বুঝানো হয়েছে। ইয়ামানের সানআ' হতে তিন দিনের যাত্রাপথ। যা এখন মা'রাবুল ইয়ামান নামে প্রসিদ্ধ। (ফতহুল কাদীর)
আন-নামল 27:23
আমি এক মহিলাকে দেখলাম যে, সে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করছে।[১] তাকে সব কিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। [২]
[১] অর্থাৎ, হুদহুদ পাখীর কাছেও এ কথা আশ্চর্যজনক ছিল যে, সাবায় একজন নারী রাজ্য পরিচালনা করছে। কিন্তু আজ-কাল বলা হচ্ছে যে, নারীরা সব ব্যাপারেই পুরুষদের সমান। যদি পুরুষরা রাজ্য চালাতে পারে, তাহলে নারীরা কেন পারবে না? অথচ এই মতবাদ ইসলামী শিক্ষার বিপরীত। কিছু লোক সাবার রাণী 'বিলকীসের' এই ঘটনা থেকে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, নারীর নেতৃত্ব বৈধ। অথচ কুরআনে তা কেবল একটি ঘটনা হিসাবেই বর্ণিত হয়েছে। এ ঘটনার সাথে নারী-নেতৃত্ব বৈধ-অবৈধতার কোন সম্পর্ক নেই। নারী-নেতৃত্ব অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
[২] কথিত আছে যে, সিংহাসনটি ছিল ৮০ হাত লম্বা আর ৪০ হাত চওড়া ও ৩০ হাত উঁচু। যার মধ্যে ছিল মুক্তা, লাল রঙের পদ্মরাগ ও সবুজ রঙের পান্না ইত্যাদির কারুকার্য। আর আল্লাহই ভালো জানেন। (ফাতহুল কাদীর) তবে মনে হয় এ কথায় অতিরঞ্জন রয়েছে। ইয়ামানে রাণী বিলকীসের প্রাসাদের যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, তার মধ্যে এত বিশাল সিংহাসন সংকুলান হওয়ার জায়গাই নেই।
আন-নামল 27:24
আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদাহ করছে। শয়তান ওদের নিকট ওদের কার্যাবলীকে সুশোভন করেছে এবং ওদেরকে সৎপথ হতে বিরত রেখেছে,[১] ফলে ওরা সৎপথ পায় না।’
[১] এর অর্থ এই যে, পাখীদের এই অনুভব শক্তি রয়েছে যে, গায়বের খবর নবীরা জানতেন না। যেমন, হুদহুদ পাখী নবী সুলাইমান (আঃ)-কে বলল, আমি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এনেছি, যা আপনার জানা নেই। অনুরূপ পাখীরা আল্লাহর একত্ববাদের বুঝশক্তিও রাখে। সেই জন্যই এখানে হুদহুদ বিস্ময়ের সাথে বলেছিল, এই রাণী ও তার প্রজারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যের পূজা করে এবং তারা শয়তানের অনুসরণ করে; যে তাদের জন্য সূর্য-পূজাকে সুশোভন করেছে।
আন-নামল 27:25
(সুশোভন করেছে এই জন্য যে,) যাতে ওরা আল্লাহকে সিজদা না করে, [১] যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর গুপ্ত বস্তুকে প্রকাশ করেন,[২] যিনি জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা ব্যক্ত কর।
[১] أَلاَّ يَسجُدُوا (যাতে ওরা সিজদা না করে) এর সম্পর্কও زَيَّن (সুশোভন করেছে) ক্রিয়ার সঙ্গে। অর্থাৎ শয়তান তাদের সামনে এটিও সুশোভন করেছিল যে, যেন তারা আল্লাহকে সিজদা না করে। অথবা أَلاَّ يَسجُدُوا টি لاَ يَهتَدُون ক্রিয়ার কর্মকারক এবং لاَ অতিরিক্ত। অর্থাৎ তাদের একথা বুঝে আসে না যে, সিজদা কেবলমাত্র আল্লাহকে করা উচিত। (ফাতহুল কাদীর)
[২] আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং মাটি হতে তার গুপ্ত বস্তু; গাছ-পালা, খনিজ সম্পদ ও অন্যান্য জিনিস প্রকাশ করেন। خَبء মাসদার (ক্রিয়ামূল) যা مَخبُوء মাফঊল (কর্মকারক) এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
আন-নামল 27:26
আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি মহা আরশের অধিপতি। [১] (সাজদাহ-৮)
[১] মহান আল্লাহ এ বিশ্বের সকল জিনিসের মালিক। কিন্তু এখানে কেবলমাত্র মহা আরশের মালিক হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমতঃ আরশ বিশ্ব-জাহানের সব থেকে বড় ও শ্রেষ্ঠ জিনিস। দ্বিতীয়তঃ এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য যে, সাবা'র রাণীর সিংহাসন ছিল বিশাল। কিন্তু আল্লাহর মহাসনের তুলনায় তা নিতান্ত নগণ্য। যার উপর আল্লাহ তাঁর মহিমানুসারে সমাসীন আছেন। হুদহুদ যেহেতু একত্ববাদের উপদেশ দিয়েছে, শিরক খন্ডন করেছে এবং আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে, সেহেতু হাদীসে এসেছে যে, চার শ্রেণীর জীবকে হত্যা করবে না; পিঁপড়ে, মৌমাছি, হুদহুদ ও শ্রাইক (শিকারী পাখি বিশেষ)। (আহমাদ ১/৩৩২, আবু দাঊদঃ আদব অধ্যায়, ইবনে মাজাহঃ শিকার অধ্যায়) শ্রাইক পাখী, যার মাথা বড়, পেট সাদা, পিঠ সবুজ ও ছোট ছোট পাখী শিকার করে খায়। (টীকা ইবনে কাসীর)* (এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
আন-নামল 27:27
(সুলাইমান) বলল, ‘আমি দেখব, তুমি কি সত্য বলেছ, না তুমি মিথ্যাবাদী?
আন-নামল 27:28
তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং তাদের নিকট অর্পণ কর; অতঃপর তাদের নিকট হতে সরে পড় এবং দেখ, তারা কি উত্তর দেয়।’[১]
[১] অর্থাৎ, একদিকে সরে গিয়ে লুকিয়ে পড় এবং দেখ যে, তারা আপোসে কি কথাবার্তা বলে।
আন-নামল 27:29
(সাবা’র রানী বিল্কীস) বলল, ‘হে পারিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেওয়া হয়েছে;
আন-নামল 27:30
এ সুলাইমানের নিকট হতে এবং তা এইঃ অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।
আন-নামল 27:31
তোমরা অহমিকাবশে আমাকে অমান্য করো না এবং আত্মসমর্পণ করে (মুসলমান হয়ে) আমার নিকট উপস্থিত হও।’[১]
[১] যেমন, নবী (সাঃ) বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদেরকে পত্র দিয়েছিলেন, যাতে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। অনুরূপ সুলাইমান (সাঃ) বিলকীসকে পত্র দ্বারা ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আজ-কাল প্রাপকের নাম আগে লেখা হয়। কিন্তু সালাফদের নিয়ম ছিল, প্রেরকের নাম আগে লেখা; যেমন সুলাইমান (আঃ) লিখলেন।
আন-নামল 27:32
(বিলকীস) বলল, ‘হে পারিষদবর্গ! আমার এ সমস্যায় তোমাদের অভিমত দাও। আমি যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তা তো তোমাদের উপস্থিতিতেই করি।’
আন-নামল 27:33
ওরা বলল, ‘আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা;[১] তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কি আদেশ করবেন, তা আপনি ভেবে দেখুন।’ [২]
[১] অর্থাৎ, আমাদের শক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্র রয়েছে এবং যুদ্ধের সময় আমরা বীরত্বের সাথে লড়ার ক্ষমতাও রাখি। এই জন্য নতি স্বীকার করা ও দমিত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
[২] যেহেতু, আমরা আপনার অনুগত, আপনি যে আদেশ করবেন, আমরা তা মান্য করব।
আন-নামল 27:34
সে বলল, ‘রাজা-বাদশারা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে,[১] তখন ওকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অপদস্থ করে; [২] এরাও এরূপই করবে। [৩]
[১] অর্থাৎ, শক্তি দ্বারা বিজয়ী হয়ে।
[২] অর্থাৎ হত্যা, লুটতরাজ ও বন্দী করার মাধ্যমে।
[৩] কোন কোন তফসীরকারের মতে এটি আল্লাহর উক্তি, যা সাবা'-রাণীর সমর্থনে বলা হয়েছে। আবার কারো কারো মতে, এটি বিলকীসেরই কথা ও তার শেষাংশ। আর এ মতই বাগধারার বেশী নিকটবর্তী।
আন-নামল 27:35
আমি তার নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি, দূতেরা কি উত্তর আনে।’ [১]
[১] এর দ্বারা অনুমান করা যাবে যে, তিনি পৃথিবীর নিছক কোন রাজা-বাদশা, নাকি আল্লাহর প্রেরিত রসূল। যাঁর উদ্দেশ্য আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। পক্ষান্তরে যদি উপহার গ্রহণ না করেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তাঁর উদ্দেশ্য দ্বীনের প্রচার-প্রসার। তখন আমাদের তাঁর অনুসরণ করা ছাড়া অন্য উপায় থাকবে না।
আন-নামল 27:36
দূত সূলাইমানের নিকট এলে (সুলাইমান) বলল, ‘তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করতে চাও?[১] আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা হতে শ্রেষ্ঠ। বরং তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে খোশ হও। [২]
[১] তোমরা কি প্রত্যক্ষ করো না যে, মহান আল্লাহ আমাকে সমস্ত কিছু দান করেছেন। সুতরাং এ সব উপহার দিয়ে আমার ধন দৌলতে কি এমন বৃদ্ধি সাধন করতে পার? এটি অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্ন। অর্থাৎ, কিছুই বৃদ্ধি করতে পার না।
[২] এটি তিরস্কার স্বরূপ বলা হয়েছে যে, তোমরাই এই সব উপহার নিয়ে গর্ব কর ও আনন্দ উপভোগ কর। আমি তো এ নিয়ে আনন্দিত হতে পারি না। কারণ প্রথমতঃ পার্থিব সম্পদ আমার উদ্দেশ্যই নয়। দ্বিতীয়তঃ মহান আল্লাহ আমাকে এমন কিছু দিয়েছেন, যা পৃথিবীর অন্য কাউকেই দেননি। তৃতীয়তঃ আমাকে নবুঅতের সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে।
আন-নামল 27:37
ওদের নিকট তুমি ফিরে যাও,[১] আমি অবশ্যই ওদের বিরুদ্ধে এমন এক সৈন্য বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হব, যার মুকাবিলা করার শক্তি ওদের নেই। আমি অবশ্যই ওদেরকে সেখান থেকে লাঞ্ছিতভাবে বহিষ্কৃত করব এবং ওরা হবে অবনমিত।’ [২]
[১] এখানে একবচন ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও এর আগে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, কখনো পুরো দলকে সম্বোধন করা হয়েছে। আবার কখনো কেবল তাদের নেতাকে।
[২] সুলাইমান (আঃ) কেবলমাত্র সম্রাট ছিলেন না বরং নবীও ছিলেন। সেই কারণে তাঁর পক্ষ হতে মানুষকে ছোট করে লাঞ্ছিত করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের পরিণাম এই হয়ে থাকে। কারণ, যুদ্ধ হচ্ছে হত্যা, রক্তপাত ও বন্দী করারই নাম। অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা বলতে তাই বুঝানো হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহর কোন নবী মানুষকে শুধু শুধু অপমান করতে পারেন না। যেমন, যুদ্ধের সময় মহানবী (সাঃ)-এর সুন্দর নীতি ও উত্তম আদর্শ ছিল।
আন-নামল 27:38
(সুলাইমান) বলল, ‘হে আমার পারিষদবর্গ! তারা আমার নিকট আত্মসমর্পণ করে (মুসলমান হয়ে) আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?’ [১]
[১] সুলাইমান (আঃ)-এর উত্তরে রাণী অনুমান করতে পারলেন যে, তিনি সুলাইমানের মুকাবিলা করতে পারবেন না। অতএব তিনি বশ্যতা স্বীকার করে অনুগত হয়ে আসার প্রস্তুতি শুরু করলেন। সুলাইমান (আঃ)ও তাঁর আগমন সংবাদ পেয়ে তাঁকে নিজ নবীসুলভ মু'জিযা (অলৌকিক শক্তি) দেখানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং তাঁর পৌঁছনোর পূর্বেই তাঁর সিংহাসন নিজের কাছে আনার ব্যবস্থা করলেন।
আন-নামল 27:39
এক শক্তিশালী জীন বলল, ‘আপনি আপনার বৈঠক[১] হতে উঠবার পূর্বে আমি তা এনে দেব[২] এবং এ ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান, বিশ্বস্ত।’ [৩]
[১] এখানে বৈঠক বা সভা বলতে বিচার সভাকে বুঝানো হয়েছে, যা বিচারের জন্য সকাল হতে দুপুর পর্যন্ত চলত।
[২] এখান হতে বুঝা গেল যে, সে নিশ্চিতভাবে এক জীন ছিল। যাদেরকে মহান আল্লাহ মানুষের তুলনায় অসাধারণ শক্তি দান করেছেন। কেননা, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, কোন মানুষের পক্ষে এ সম্ভব নয় যে, বায়তুল মাকদিস হতে ইয়ামানের সাবা' বা মা'রাব গিয়ে সিংহাসন তুলে আনবে এবং আসা-যাওয়ার তিন হাজার মাইল পথ ৩/৪ ঘণ্টার ভিতরে অতিক্রম করে নেবে। একজন মানুষ সে যতই শক্তির অধিকারী হোক না কেন, এত বিশাল সিংহাসন উঠানো সম্ভব নয়। আর যদি কোন কিছুর সাহায্যে উঠানো সম্ভব হয়েও থাকে, তবুও এত অল্প সময়ে এত দূর পথ অতিক্রম করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়।
[৩] অর্থাৎ, আমি উঠিয়ে আনতেও সক্ষম এবং ওর মধ্যে কোন কিছু রদ্-বদলও করব না।
আন-নামল 27:40
গ্রন্থের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, ‘আপনি চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা এনে দেব।’[১] সুতরাং সুলাইমান যখন তা সম্মুখে উপস্থিত দেখল, তখন সে বলল, ‘এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ; যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে পারেন, আমি কৃতজ্ঞ, না অকৃতজ্ঞ। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তা নিজের কল্যাণের জন্য করে এবং যে অকৃতজ্ঞ, সে জেনে রাখুক যে, নিশ্চয় আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, মহানুভব।’
[১] যে এ কথা বলল, সে কে ছিল? কিতাব কি ছিল? আর জ্ঞানই বা কি ছিল? যার জোরে সে এ দাবী করেছিল? এ ব্যাপারে তফসীরকারদের মাঝে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। এই তিনের বাস্তব একমাত্র আল্লাহই জানেন। এখানে কুরআনের শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা হল, সে ছিল মানুষ। তার নিকট ছিল আল্লাহর কোন কিতাবের জ্ঞান। আল্লাহ তাকে কারামত বা মু'জিযাস্বরূপ এ শক্তি দান করলেন এবং চোখের পলকে সিংহাসন এনে উপস্থিত করল। কারামত বা মু'জিযা নামই এমন কাজের যা বাহ্যিক কারণ ও নৈসর্গিক কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। আর তা একমাত্র আল্লাহর কুদরত ও ইচ্ছায় প্রকাশ পেয়ে থাকে। এই জন্য ঐ ব্যক্তির শক্তিতে বিস্ময় প্রকাশের কিছু নেই এবং তার ঐ কিতাবী জ্ঞান কি ছিল তা নিয়ে গবেষণারও কোন প্রয়োজন নেই; যা এখানে বর্ণিত হয়েছে। কেননা, এ ছিল সেই ব্যক্তির পরিচয় যার দ্বারা এই কাজ সম্পাদিত হয়েছে। তাছাড়া বাস্তবে এ শুধু আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন, যিনি চোখের পলকে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। সুলাইমান (আঃ)ও এ ব্যাপারে অবহিত ছিলেন। সেই জন্য তিনি যখন দেখলেন যে, সিংহাসন উপস্থিত, তখন তিনি এ ঘটনাকে প্রভুর অনুগ্রহ ও কৃপা বলেই ব্যক্ত করলেন।
আন-নামল 27:41
(সুলাইমান) বলল, ‘তার সিংহাসনের আকৃতি বদলে দাও;[১] দেখি সে সঠিক চিনতে পারে, নাকি সে বিভ্রান্ত হয়?’ [২]
[১] অর্থাৎ, তার রং, রূপ বা আকারে পরিবর্তন করে দাও।
[২] অর্থাৎ, দেখি সে জানতে পারে যে, সিংহাসনটি তার, নাকি জানতে পারে না। দ্বিতীয় অর্থ, সে হিদায়াত পায় কি, পায় না। অর্থাৎ এত বড় মু'জিযা দেখার পরও সে সঠিক (ঈমানের) পথ পায়, না পায় না।
আন-নামল 27:42
(বিলকীস) যখন পৌঁছল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘তোমার সিংহাসন কি এরূপই?’ সে বলল, ‘এটা যেন সেটাই![১] আমরা ইতিপূর্বেই সমস্ত কিছুই অবগত হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) হয়েছি।’ [২]
[১] পরিবর্তনের পর যেহেতু তার আকৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসে গিয়েছিল, সেহেতু তিনি পরিষ্কার ভাষায় আমার বলে দাবীও করলেন না। আবার পরিবর্তনের পরেও যেহেতু মানুষ তার নিজের জিনিস চিনতে পারে বলে তিনি 'আমার নয় বলে' খন্ডনও করলেন না। তিনি বললেন, বোধ হয় ঐটিই। এতে দাবী ও খন্ডন কোনটিই নেই; বরং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উত্তর দেওয়া হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, এখানে আসার পূর্বেই আমি জানতে পেরেছিলাম যে, আপনি আল্লাহর নবী এবং আমি আপনার অনুগত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর ও শওকানী (রঃ) উক্ত বাক্যকে সুলাইমানের উক্তি বলে ব্যক্ত করেছেন যে, আমাকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সাবার রাণী অনুগত হয়ে উপস্থিত হবে।
আন-নামল 27:43
আল্লাহর পরিবর্তে সে যার পূজা করত, তাই তাকে সত্য হতে নিবৃত্ত করেছিল, সে ছিল সত্য প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।[১]
[১] এটি আল্লাহর কথা। আর صَدَّها এর কর্তা مَا كَانَتْ تَعْبُد অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতই তাকে আল্লাহর ইবাদত হতে দূরে রেখেছিল। আর তার কারণ, তার সম্পর্ক ছিল কাফের জাতির সঙ্গে। সেই জন্য তাওহীদের বাস্তবিকতা থেকে সে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। কেউ কেউ صَدَّها এর কর্তা মহান আল্লাহ আবার কেউ সুলাইমানকে বলেছেন। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ অথবা আল্লাহর নির্দেশক্রমে সুলাইমান (আঃ) তাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করতে বাধা দিলেন। কিন্তু প্রথমোক্ত মতটি অধিক সঠিক। (ফাতহুল কাদীর)
আন-নামল 27:44
তাকে বলা হল, ‘এ প্রাসাদে প্রবেশ কর।’ যখন সে ওর প্রতি দৃষ্টিপাত করল, তখন তার মনে হল এ এক স্বচ্ছ জলাশয় এবং সে তার কাপড় টেনে হাঁটু পর্যন্ত তুলে ধরল।[১] (সুলাইমান) বলল, ‘এ তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ।’ (বিলকীস) বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি যুলুম করেছিলাম, (এখন) আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম (মুসলমান হলাম)।’ [২]
[১] এই প্রাসাদটি ছিল কাঁচের। যার মেঝেও ছিল কাঁচের। لُجَّة গভীর পানি অথবা হওয। সুলাইমান (আঃ) নিজ নবুঅতের মু'জিযা (অলৌকিক ঘটনা) দেখানোর পর পার্থিব শান-শওকতের কিছু নমুনা দেখানো উচিৎ মনে করলেন, যা মানব ইতিহাসে বিশেষ করে তাঁকে আল্লাহ দান করেছিলেন। অতঃপর সেই প্রাসাদে প্রবেশের আদেশ দেওয়া হল। যখন তিনি প্রবেশ হতে লাগলেন তখন পায়ের লেবাস একটু উপরে তুলে নিলেন। (যাতে তাঁর পদনালী বের হয়ে গেল।) স্বচ্ছ কাঁচের মেঝে তাঁর নিকট পানি বলে মনে হল। তাই ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় কাপড় কিছুটা গুটিয়ে পায়ের রলার উপর তুলে নিলেন।
[২] অর্থাৎ, যখন মেঝের বাস্তবিকতা জানতে পারলেন, তখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। অতঃপর নিজের ভুল-ত্রুটি অনুভব ও স্বীকার করে মুসলমান হওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। স্বচ্ছ পরিষ্কার খোদাই করা পাথরকে مُمَرَّد (স্ফটিক) বলা হয়। এখান হতেই أمرَد শব্দ এমন সুদর্শন কিশোরের জন্য ব্যবহার হয় যার (মসৃণ গালে) দাড়ি-মোছ এখনও বের হয়নি। যে গাছের পাতা সম্পূর্ণ ঝড়ে গেছে তাকে شجرة مرداء বলা হয়। (ফাতহুল কাদীর) কিন্তু এখানে নির্মাণ বা জুড়ে দেওয়ার (গিল্টি করা) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থ স্ফটিক নির্মিত বা কাঁচের গিল্টি করা প্রাসাদ।
নোটঃ রাণী বিলকীস মুসলমান হবার পর তাঁর কি হল? কুরআন বা সহীহ হাদীসে এর কোন বিস্তারিত আলোচনা নেই। অবশ্য তাফসীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, সুলাইমান (আঃ)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু কুরআন ও হাদীস এ ব্যাপারে নিশ্চুপ, সেহেতু আমাদেরও চুপ থাকাটাই শ্রেয়। والله أعلم بالصواب
আন-নামল 27:45
আমি অবশ্যই সামূদ সম্প্রদায়ের নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম, এ আদেশসহ যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর। কিন্তু ওরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বিতর্কে লিপ্ত হল। [১]
[১] এ থেকে মু'মিন ও কাফের উভয়কে বুঝানো হয়েছে। আর বিতর্কের অর্থ, প্রত্যেক দলের দাবী যে তারাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
আন-নামল 27:46
সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ?[১] কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছ না; যাতে তোমরা করুণার পাত্র হতে পার?’
[১] অর্থাৎ, ঈমান আনার পরিবর্তে তোমরা কেন কুফরীর উপর চলতে চাচ্ছ; যা আযাবের কারণ হবে? এ ছাড়া তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের কারণে তারা বলত, আমাদের উপর আযাব নিয়ে এসো। যার উত্তরে সালেহ এ কথাগুলি বললেন।
আন-নামল 27:47
ওরা বলল, ‘তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা আছে, তাদেরকে আমরা অমঙ্গলের কারণ মনে করি।’[১] (সালেহ) বলল, ‘তোমাদের শুভাশুভ আল্লাহর এখতিয়ারে,[২] বস্তুতঃ তোমরা এমন এক সম্প্রদায় যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। [৩]
[১] اطَّيَّرنا আসলে تَطَيَّرنا ছিল এর ধাতু হল طَير যার অর্থ ওড়া। আরবে ইসলামের পূর্বে লোকেরা কোন কাজ করতে বা সফরে যেতে মনস্থ করলে পাখী উড়াত, যদি পাখীটি ডান দিক দিয়ে উড়ে যেত, তাহলে তারা সে কাজ বা সফর শুভ মনে করত। আর যদি বাম দিকে উড়ে যেত, তাহলে অশুভ মনে করে সেই কাজ বা সফর থেকে বিরত থাকত। (ফাতহুল কাদীর) ইসলামে কোন জিনিসে শুভ-অশুভ ধারণা করা বৈধ নয়। তবে কোন কিছুতে আশাবাদী হওয়া বৈধ। (অর্থাৎ, কোন সুন্দর বা ভাল কথা শুনে তা থেকে ভাল আশা করা বৈধ।)
[২] অর্থাৎ, মুমিনরা কোন অশুভ, অপয়া বা অমঙ্গল কিছুরই কারণ নয়; যেমন তোমরা মনে কর। বরং তার আসল কারণ আল্লাহর নিকটে। কারণ অদৃষ্ট বা ভাগ্য তাঁরই এখতিয়ারে। অর্থ এই যে, তোমাদের যে অশুভ অবস্থা (অনাবৃষ্টি ইত্যাদি) এসেছে, তা আল্লাহর পক্ষ হতে। আর তার কারণ তোমাদের কুফরী করা। (ফাতহুল কাদীর)
[৩] অথবা তোমাদের ভ্রষ্টতায় অবকাশ দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
আন-নামল 27:48
আর সে শহরে ছিল নয় জন এমন ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করত না।
আন-নামল 27:49
ওরা বলল, ‘তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ কর যে, আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে অবশ্যই হত্যা করব;[১] অতঃপর তার দাবিদারকে নিশ্চয় বলব, তার পরিবার-পরিজনকে হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’ [২]
[১] অর্থাৎ, সালেহ (আঃ) ও তাঁর বাড়ির লোককে হত্যা করব। এই শপথ তারা তখন নিয়েছিল, যখন উট হত্যার পর সালেহ (আঃ) তাদেরকে বললেন, তিন দিন পর তোমাদের উপর আযাব আসবে। তারা বলল, আযাব আসার পূর্বেই আমরা সালেহ ও তাঁর পরিবারকে ধ্বংস করে ফেলব।
[২] অর্থাৎ, তাদেরকে হত্যার সময় আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। অথবা হত্যাকারী কে --তাও আমরা জানি না।
আন-নামল 27:50
ওরা চক্রান্ত করেছিল[১] এবং আমিও চক্রান্ত করলাম, [২] কিন্তু ওরা বুঝতে পারেনি। [৩]
[১] তাদের এটিই ছিল চক্রান্ত। তারা আপোসে শপথ গ্রহণ করল যে, রাত্রের অন্ধকারে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করব। আর তিন দিন পূর্ণ হবার আগেই সালেহ ও তাঁর পরিবারকে শেষ করে দেব।
[২] অর্থাৎ, আমি তাদেরকে তাদের ঐ ষড়যন্ত্রের বদলা দিলাম এবং তাদেরকে ধ্বংস করলাম। 'আমিও চক্রান্ত করলাম' কর্মের অনুরূপ শাস্তিদানের নীতি হিসাবে বলা হয়েছে।
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহর ঐ চক্রান্তকে তারা বুঝতেই পারেনি।
আন-নামল 27:51
অতএব দেখ ওদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছে; আমি অবশ্যই ওদেরকে এবং ওদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি। [১]
[১] অর্থাৎ, আমি উক্ত ৯ জন নেতাকেই নয় বরং পুরো জাতিকেই ধ্বংস করেছি। কারণ কুফরী ও সত্যপ্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে পুরো জাতি তাদের সাথে ছিল। যদিও কার্যক্ষেত্রে হত্যার পরিকল্পনায় তাদের সাথে ছিল না। কারণ, সে পরিকল্পনা ছিল গোপনে। কিন্তু তা ছিল তাদের ইচ্ছা ও আন্তরিক চাহিদার অনুকূল। সেই জন্য তারাও যেন তাদের চক্রান্তে শামিল ছিল; যা ৯ জন ব্যক্তি সালেহ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করেছিল। সেই জন্য পুরো জাতিই ধ্বংসের যোগ্য বলে বিবেচিত হল।
আন-নামল 27:52
এই তো তাদের বাড়ী-ঘর; তাদের সীমালংঘন হেতু তা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
আন-নামল 27:53
এবং যারা বিশ্বাসী ও সাবধানী ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি।
আন-নামল 27:54
(স্মরণ কর) লূতের কথা,[১] সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা কি জেনে-শুনে অশ্লীল কাজ করবে? [২]
[১] অর্থাৎ, লূত (আঃ)-এর ঘটনা স্মরণ কর, যখন তিনি বললেন। লূত জাতি আম্মূরাহ ও সাদূম শহরে বসবাস করত।
[২] تُبصِرُون অর্থাৎ, এ কথা দর্শন করছ যে, তা অশ্লীলতা। এখানে দর্শন বলতে জ্ঞান চক্ষু দ্বারা দর্শন। আর যদি চর্মচক্ষুর দর্শন উদ্দেশ্য হয়, তাহলে অর্থ দাঁড়াবে যে, তোমরা এক অপরের চোখের সামনে এ কাজ করছ? অর্থাৎ, তোমাদের ধৃষ্টতা এত বেড়ে গেছে যে, এ কুকর্ম করার সময় লুকানোর চেষ্টাও কর না!
আন-নামল 27:55
তোমরা কি কাম-তৃপ্তির জন্য নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? [১] তোমরা তো এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।’ [২]
[১] এটি অশ্লীলতার ব্যাখ্যা যে, তা সেই সমকামিতাই, যা তোমরা নারীদেরকে বাদ দিয়ে পুরুষদের সাথে অস্বাভাবিকভাবে নিজেদের যৌন-বাসনা পূর্ণ করার জন্য করছ।
[২] অথবা এ কাজের অবৈধতা বা এই পাপের শাস্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ। নচেৎ সম্ভবতঃ তোমরা এ কাজ করতে না।
আন-নামল 27:56
উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, ‘লূত-পরিবারকে তোমাদের জনপদ হতে বহিষ্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র সাজতে চায়।’ [১]
[১] এ কথা তারা কটাক্ষ ও উপহাসছলে বলল।
আন-নামল 27:57
অতঃপর তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত তার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করলাম। তার স্ত্রীর জন্য অবশিষ্ট লোকদের ভাগ্য নির্ধারণ করলাম।[১]
[১] অর্থাৎ, প্রথমেই তার ব্যাপারে তার ভাগ্য-লিপিতে এটি লিখা ছিল যে, সে ঐ সমস্ত পিছনে থাকা অবশিষ্ট লোকেদের মধ্যে গণ্য হবে; যাদের উপর আযাব আসবে।
আন-নামল 27:58
তাদের উপর বিশেষ ধরনের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম;[১] যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তাদের জন্য এই বর্ষণ ছিল কত মারাত্মক![২]
[১] তাদের উপর যে আযাব আপতিত হয়েছিল তার বিস্তারিত আলোচনা এর পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। আর তা হল, তাদের গ্রামকে তাদের উপর উল্টে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাদের উপর পাথর বর্ষণ করা হয়েছিল।
[২] অর্থাৎ, যাদেরকে আম্বিয়া দ্বারা সতর্ক করা হয়েছিল ও যাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়েছিল, তা সত্ত্বেও তারা মিথ্যা ও সত্যপ্রত্যাখ্যানের পথ পরিহার করেনি, তাদের জন্য এই বর্ষণ ছিল কত মারাত্মক!
আন-নামল 27:59
বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই এবং তার মনোনীত দাসদের প্রতি শান্তি![১] আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, নাকি ওরা যাদেরকে শরীক করে তারা?’ [২]
[১] যাদেরকে আল্লাহ বাণীবাহক ও মানুষের পথ-প্রদর্শকরূপে নির্বাচিত করেছেন; যাতে মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে।
[২] এখানে প্রশ্ন স্বীকৃতিসূচক। অর্থাৎ, আল্লাহই উত্তম। যখন তিনিই সৃষ্টিকর্তা, রুযীদাতা ও মালিক তখন তিনি ছাড়া অন্য কেউ কি শ্রেষ্ঠ হতে পারে, যে না সৃষ্টিকর্তা, না রুযীদাতা, আর না মালিক? خَير (শ্রেষ্ঠতর) যদিও 'ইসমে তাফয্বীল' যা দুই বা ততোধিক জিনিসের মধ্যে তুলনামূলক আধিক্য ও উৎকর্ষ বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়। কিন্তু এখানে তা 'শ্রেষ্ঠ' অর্থে ব্যবহার হয়েছে কোন তুলনা ছাড়াই। কারণ, বাতিল মা'বূদদের মধ্যে কোন প্রকার خَير (শ্রেষ্ঠত্ব)ই নেই।
আন-নামল 27:60
অথবা তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং আকাশ হতে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন; অতঃপর তা দিয়ে মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করেন। ওর বৃক্ষাদি উদগত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই।[১] আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? [২] তবুও ওরা এমন এক সম্প্রদায় যারা সত্য বিচ্যুত হয়। [৩]
[১] এখানে পূর্বের বাক্যের ব্যাখ্যা ও তার প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে যে, সেই আল্লাহই সৃষ্টি, রুযী তথা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে একক; তাঁর কোন শরীক নেই। বলছেন যে, আকাশকে এত উঁচু ও সুন্দর করে সৃষ্টিকারী ও চলমান গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টিকারী অনুরূপ পৃথিবী ও তার মাঝে পাহাড়, নদ-নদী, সমুদ্র, গাছ-পালা, ফল-ফসল, নানা প্রকারের পশু-পক্ষী সৃষ্টিকারী, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে সুন্দর বাগান উৎপাদনকারী কে? তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, কেবলমাত্র পৃথিবী হতে গাছ সৃষ্টি করতে পারে? এ সবের উত্তরে মুশরিকরাও বলত এবং স্বীকার করত যে, এ সব কিছুর কর্তা একমাত্র আল্লাহ। যেমন, এ কথা কুরআনের অন্য জায়গায়ও রয়েছে। (সূরা আনকাবূত ২৯:৬৩ নং আয়াত)[২] এ সকল বাস্তবতার পরেও আল্লাহর সাথে এমন কোন্ সত্তা আছে, যে ইবাদতের যোগ্য? বা কেউ উক্ত জিনিসগুলির মধ্যে কোন একটিকে সৃষ্টি করেছে? অর্থাৎ, কেউ এমন নেই যে, সে কিছু সৃষ্টি করেছে বা ইবাদতের যোগ্য। এই সব আয়াতে أَمَّن এর অর্থ হল যে, সেই সত্তা যিনি ঐ সকল জিনিসের সৃষ্টিকর্তা, তিনি কি ওর মত, যে এর মধ্যে কোন জিনিস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না? (ইবনে কাসীর)[৩] يَعدِلُون এর অন্য এক অনুবাদ হল যে, তারা আল্লাহর সমকক্ষ ও সমতুল্য স্থির করে?
আন-নামল 27:61
কিংবা তিনি, যিনি পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন[১] এবং ওর মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদীমালা এবং ওতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং দুই সাগরের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়। [২] আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং ওদের অনেকেই তা জানে না।
[১] অর্থাৎ, স্থির ও অটল। না নড়ে-চড়ে, আর না দোল খায়। যদি এ রকম না হত তাহলে পৃথিবীতে বসবাস করা অসম্ভব হত। পৃথিবীতে বিশাল বিশাল পাহাড় সৃষ্টি এই উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে, যাতে পৃথিবী নড়া-চড়া না করতে পারে।[২] এর ব্যাখ্যার জন্য দেখুন সূরা ফুরকানের ২৫:৫৩ নং আয়াতের টীকা।
আন-নামল 27:62
অথবা তিনি, যিনি আর্তের আহবানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন[১] এবং তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেন।[২] আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাক।
[১] আল্লাহ তাআলা তো তিনিই যাঁকে সংকট মুহূর্তে ডাকা হয়। বিপদাপদে যাঁর প্রতি মন আশান্বিত থাকে। বিপদগ্রস্ত অসহায় যাঁর দিকে রুজু করে এবং বালা-বিপদ তিনিই দূর করেন। অধিক জানার জন্য সূরা ইসরা ১৭:৬৭ নং ও সূরা নামলের ২৭:৫৩ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।[২] অর্থাৎ, এক উম্মতের পর আর এক উম্মত, এক জাতির পর আর এক জাতি, এক প্রজন্মের পর আর এক প্রজন্ম সৃষ্টি করেন। নচেৎ একই সময়ে সকলকে সৃষ্টি করলে পৃথিবী সংকীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। উপার্জনের ক্ষেত্রেও নানান সমস্যা দেখা দিত এবং সকলেই পরস্পর ক্ষতিগ্রস্ত হত। মোটকথা, একের পর অন্যকে সৃষ্টি করা এবং একের স্থলে অন্যকে স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি করার মধ্যে মহান আল্লাহর পূর্ণ কৃপারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
আন-নামল 27:63
কিংবা তিনি, যিনি তোমাদেরকে জলে ও স্থলের অন্ধকারে পথ প্রদর্শন করেন[১] এবং যিনি স্বীয় করুণার প্রাক্কালে (বৃষ্টির পূর্বে) সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। [২] আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? ওরা যাকে অংশী করে, আল্লাহ তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে ।
[১] অর্থাৎ, আকাশে তারকারাজিতে উজ্জ্বলতা সৃষ্টিকারী কে, যার দ্বারা তোমরা সমুদ্র ও স্থল-সফরে অন্ধকারে পথের দিশা পাও? পাহাড় ও উপত্যকার সৃষ্টিকর্তা কে, যা পাশাপাশি দেশের মধ্যে সীমারেখার কাজ দেয় এবং পথের দিশাও।
[২] বৃষ্টির পূর্বে ঠান্ডা হাওয়া যা শুধু বৃষ্টির সুসংবাদই নয়; বরং তা অনাবৃষ্টি কবলিত মানুষের মনে-প্রাণে আনন্দের জোয়ার এনে দেয়।
আন-নামল 27:64
অথবা তিনি, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন[১] এবং যিনি তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী হতে রুযী দান করেন।[২] আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বল, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।’
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করবেন।
[২] আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে পৃথিবীর মাটির নীচে লুক্কায়িত সম্পদ (ফসলাদি) উৎপন্ন করেন। আর এভাবে আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দরজাগুলি উন্মুক্ত করেন।
আন-নামল 27:65
বল, ‘আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না[১] এবং ওরা কখন পুনরুত্থিত হবে (তাও) ওরা জানে না।’
[১] যেমন উক্ত সব বিষয়ে মহান আল্লাহ একক, তাঁর কোন শরীক নেই। অনুরূপ গায়েব জানার ব্যাপারেও তিনি একক। তিনি ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না। নবী ও রসূলের গায়েবের সংবাদ অতটুকুই জানা থাকে যতটুকু মহান আল্লাহ অহী ও ইলহাম দ্বারা জানিয়ে দেন। আর যে জ্ঞান কারো জানানোর ফলে (কোন অসীলার মাধ্যমে) অর্জিত হয় সেই জানাকে গায়েব জানা বলা হয় না এবং এ রকম জাননে-ওয়ালাকে গায়েব জাননে-ওয়ালাও বলা হয় না। গায়েবের জ্ঞানী তো তিনিই যিনি বিনা কোন মাধ্যম ও সাহায্যে স্বয়ং প্রত্যেক বস্তুর জ্ঞান রাখেন, প্রত্যেক বাস্তবিকতার ব্যাপারে অবগত এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিসও তার জ্ঞানের পরিধির বাহিরে নয়। এ গুণ কেবলমাত্র আর একমাত্র মহান আল্লাহর। সেই জন্য একমাত্র তিনিই 'আ-লিমুল গাইব'। তিনি ছাড়া এ বিশ্বে আর কেউ গায়েব জানে না। আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই ধারণা পোষণ করে যে, নবী (সাঃ) ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা জানতেন, সে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। কারণ, তিনি বলেন, "আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।" (বুখারী ৪৮৫৫, মুসলিম ২৮৭, তিরমিযী ৩০৬৮নং) ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেন, মহান আল্লাহ তারকারাজিকে তিনটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। একঃ আকাশের সৌন্দর্য, দুইঃ পথ নির্দেশনা এবং তিনঃ শয়তানকে চাবুক মারা। কিন্তু আল্লাহর আদেশের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ মানুষ ওর থেকে গায়েবের খবর জানার জন্য একটি মনগড়া পদ্ধতি (জ্যোতির্বিদ্যা) বের করেছে। যেমন, তারা বলে থাকে অমুক অমুক দিনে বিবাহ করলে এই এই হবে বা অমুক অমুক নক্ষত্রের সময় সফর করলে এ রকম এ রকম হবে বা অমুক অমুক গ্রহের সময় কারো জন্ম হলে এই এই হবে ইত্যাদি। এ সমস্ত কথা ধাপ্পাবাজি। তাদের অনুমান প্রসূত কথার বিপরীতই অধিক ঘটে থাকে। গ্রহ-নক্ষত্র ও পশু-পক্ষী দ্বারা কিভাবে গায়েবের সংবাদ পাওয়া যেতে পারে? অথচ আল্লাহর ফায়সালা ও ঘোষণা এই যে, "আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই গায়বের জ্ঞান রাখে না।" (ইবনে কাসীর)
আন-নামল 27:66
বরং পরলোক সম্পর্কে তো ওদের জ্ঞান নিঃশেষ হয়েছে;[১] বরং ওরা তো এ বিষয়ে সন্দিগ্ধ, বরং এ বিষয়ে ওরা অন্ধ। [২]
[১] অর্থাৎ, তাদের জ্ঞান পরলোক কখন হবে তা জানতেও অক্ষম। বা তাদের জ্ঞান আখেরাতের ব্যাপারে অন্যদের সমান। যেমন নবী (সাঃ) জিবরীলের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন যে, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসক অপেক্ষা বেশী জানে না। অথবা এর অর্থ এই যে, তাদের কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞান পূর্ণ হয়ে গেছে। কারণ তারা কিয়ামতের ব্যাপারে কৃত ওয়াদা নিজ চোখে দেখে নিয়েছে; যদিও এ জ্ঞান তাদের কোন উপকার দেবে না। কারণ পৃথিবীতে তারা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,{أَسْمِعْ بِهِمْ وَأَبْصِرْ يَوْمَ يَأْتُونَنَا لَكِنِ الظَّالِمُونَ الْيَوْمَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ} অর্থাৎ, তারা যেদিন আমার নিকট আসবে সেদিন তারা কত স্পষ্ট শুনবে ও দেখবে! কিন্তু সীমালংঘনকারীগণ আজ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে। (সূরা মারয়্যাম ১৯:৩৮ আয়াত)[২] অর্থাৎ, পৃথিবীতে আখেরাত সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করে; বরং তারা অন্ধ। যেহেতু জ্ঞান ও বুদ্ধি-ভ্রষ্টতার কারণে তারা আখেরাতের বিশ্বাস হতে বঞ্চিত।
আন-নামল 27:67
অবিশ্বাসীরা বলে, ‘আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষেরা মাটিতে পরিণত হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে?
আন-নামল 27:68
আমাদেরকে এবং পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকেও অবশ্যই এ বিষয়ে ভীতি-প্রদর্শন করা হয়েছে। এ তো সে কালের উপকথা ব্যতীত আর কিছু নয়।’ [১]
[১] অর্থাৎ, এর মধ্যে কোন বাস্তবতা নেই। বাস্! এক অপরের নিকট থেকে শুনে শুনে বলে আসছে।
আন-নামল 27:69
বল, ‘পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ অপরাধীদের পরিণাম কি হয়েছে?’ [১]
[১] এটি কাফেরদের উক্ত কথার উত্তর যে, পূর্ববর্তী জাতিদের কথা ভেবে দেখ, তাদের উপর কি আল্লাহর আযাব আসেনি? যা নবীদের সত্যতারই প্রমাণ। অনুরূপ কিয়ামত ও পরকাল সম্পর্কে আমার রসূল যা বলেন, তা নিশ্চিত সত্য।
আন-নামল 27:70
ওদের আচরণে তুমি দুঃখ করো না এবং ওদের ষড়যন্ত্রে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না ।
আন-নামল 27:71
ওরা বলে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল, এ প্রতিশ্রুতি কখন পূর্ণ হবে?’
আন-নামল 27:72
বল, ‘তোমরা যে বিষয়ে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ, সম্ভবতঃ তার কিছু শীঘ্রই তোমাদের উপর এসে পড়বে।’ [১]
[১] এখানে বদরের যুদ্ধের ঐ শাস্তি যা হত্যা ও বন্দীরূপে কাফেরদেরকে দেওয়া হয়েছিল তা বুঝানো হয়েছে। অথবা কবরের আযাবকে বুঝানো হয়েছে। رَدِفَ অর্থঃ নিকটে। যেমন বাহনে সওয়ারীর পিছনে (নিকটে) যে বসে তাকে رَدِيف বলা হয়।
আন-নামল 27:73
নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু ওদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ। [১]
[১] অর্থাৎ, আযাব দিতে দেরী করাও আল্লাহর দয়া ও কৃপার একটি অংশ। কিন্তু মানুষ তা সত্ত্বেও আল্লাহ হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাঁর অকৃতজ্ঞতা করছে।
আন-নামল 27:74
ওদের অন্তর যা গোপন করে এবং ওরা যা প্রকাশ করে, তা তোমার প্রতিপালক অবশ্যই জানেন।
আন-নামল 27:75
আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন রহস্য নেই যা সুস্পষ্ট গ্রন্থে লিপিবদ্ধ নেই। [১]
[১] 'সুস্পষ্ট গ্রন্থ' বলতে 'লওহে মাহ্ফূয'কে বুঝানো হয়েছে। সমূহ অদৃশ্যের সংবাদের মধ্যে আযাবের জ্ঞানও শামিল যার ব্যাপারে কাফেররা তাড়াহুড়া করছে। কিন্তু তার সময়ও লওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ আছে। যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন। আর যখন সে সময় এসে পড়ে, যা তিনি কোন জাতির ধ্বংসের জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন তখন সে জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। অতএব নির্দিষ্ট সময়ের আগে তারা কেন তাড়াহুড়া করছে?
আন-নামল 27:76
এবং নিশ্চয়ই এ বিশ্বাসীদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা। [১]
[১] মু'মিন ও বিশ্বাসীদেরকে এই জন্য খাস করা হয়েছে, কারণ তারাই কুরআন দ্বারা উপকৃত হয়। আর তাদের মধ্যে ঐ সকল বানী ইস্রাঈলও শামিল যারা ঈমান এনেছিল।
আন-নামল 27:77
এবং নিশ্চয়ই এ বিশ্বাসীদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা। [১]
[১] মু'মিন ও বিশ্বাসীদেরকে এই জন্য খাস করা হয়েছে, কারণ তারাই কুরআন দ্বারা উপকৃত হয়। আর তাদের মধ্যে ঐ সকল বানী ইস্রাঈলও শামিল যারা ঈমান এনেছিল।
আন-নামল 27:78
তোমার প্রতিপালক অবশ্যই নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।[১] তিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ।
[১] কিয়ামত দিবসে ওদের মতভেদের ফায়সালা করে দিয়ে ন্যায় ও অন্যায়কে পৃথক করে দেবেন। আর সেই অনুযায়ী শান্তি ও শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। অথবা তারা তাদের কিতাবে যেসব পরিবর্তন ও হেরফের করেছে তা পৃথিবীতেই প্রকাশ করে দিয়ে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন।
আন-নামল 27:79
অতএব আল্লাহর উপর নির্ভর কর; নিঃসন্দেহে তুমি স্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। [১]
[১] তুমি তোমার সমস্ত ব্যাপার তাঁকে সোপর্দ কর ও তাঁরই উপর ভরসা কর। তিনিই তোমার সাহায্যকারী। প্রথমতঃ এইজন্য যে, তুমি সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর দ্বিতীয় কারণ আগে আসছে।
আন-নামল 27:80
মৃতকে তুমি শোনাতে পারবে না, আর বধিরকেও তোমার আহবান শোনাতে পারবে না;[১] যখন ওরা পিছন ফিরে চলে যায়। [২]
[১] এটি ঐ সব কাফেরদের পরোয়া না করা এবং শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করার দ্বিতীয় কারণ। আর তা হল তারা মৃত; যারা কিছু শুনে উপকৃত হতে সক্ষম নয়। অথবা বধির; যারা শুনতেও পায় না, বুঝেও না এবং পথও খুঁজে পায় না। অর্থাৎ, কাফেরদেরকে মৃতদের সাথে তুলনা করা হয়েছে; যাদের মধ্যে না কোন অনুভূতি থাকে, আর না জ্ঞান। অথবা বধিরদের সাথে তুলনা করা হয়েছে; যারা না উপদেশ ও নসীহত শোনে, আর না আল্লাহর দাওয়াত কবুল করে।
[২] অর্থাৎ, তারা পুরোপুরি সত্য হতে বৈমুখ ও বীতশ্রদ্ধ। কারণ বধির ব্যক্তি সামনা-সামনিই কোন কথা শুনতে সক্ষম নয়। সুতরাং মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ার সময় তারা কিভাবে শুনতে সক্ষম হবে? কুরআন কারীমের এই আয়াত হতে এটাও জানা গেল যে, মৃতরা শুনতে পায় -এই বিশ্বাস করা কুরআনের পরিপন্থী। মৃতরা কারো কথা শুনতে পায় না। অবশ্য ঐ সব অবস্থার কথা স্বতন্ত্র; যে অবস্থায় তাদের শোনার ব্যাপারে শরীয়তের স্পষ্ট দলীল আছে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, যখন মানুষ মৃতকে দাফন করার পর ফিরে যায়, তখন তারা তাদের জুতোর শব্দ শুনতে পায়। (বুখারী ৩৩৮, মুসলিম ২২০নং) অনুরূপ বদর যুদ্ধের পর যখন কাফেরদের মৃত লাশগুলোকে এক পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দেওয়া হল, তখন নবী (সাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বললেন। সাহাবাগণ বললেন, 'আপনি প্রাণহীন দেহের সঙ্গে কথা বলছেন?' তিনি বললেন, "তোমাদের থেকে তারা আমার কথা বেশি ভালোভাবে শুনছে।" অর্থাৎ, মু'জিযাস্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁর কথা মৃতদেরকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন। (বুখারী ১৩০৭নং)
আন-নামল 27:81
তুমি অন্ধদেরকে ওদের পথভ্রষ্টতা হতে পথে আনতে পারবে না।[১] যারা আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস করে শুধু তাদেরকেই তুমি শোনাতে পারবে। সুতরাং তারাই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যাদেরকে সত্য দেখা হতে অন্ধ বানিয়েছেন। তুমি তাদেরকে কিভাবে তাদের লক্ষ্যে; অর্থাৎ ঈমান পর্যন্ত পৌঁছাতে পার?
আন-নামল 27:82
যখন ঘোষিত শাস্তি ওদের নিকট আসবে[১] তখন আমি ভূগর্ভ হতে এক (প্রকার) জন্তু নির্গত করব যা মানুষের সাথে কথা বলবে। [২] বস্তুতঃ ওরা আমার নিদর্শনে ছিল অবিশ্বাসী। [৩]
[১] অর্থাৎ, যখন সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করার মত কেউ থাকবে না।
[২] এই জন্তু হল তাই, যা কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিদর্শন। যেমন হাদীসে এসেছে নবী (সাঃ) বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দশটি নিদর্শন তোমরা না দেখবে। তার মধ্যে একটি হল উক্ত জন্তুর আবির্ভাব। (মুসলিম ফিতনা অধ্যায়) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে সর্বপ্রথম নিদর্শন যা প্রকাশ পাবে, তা হল সূর্যের পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়া এবং তার পর উক্ত জীবের আবির্ভাব হওয়া। এই দুয়ের মধ্যে যেটি প্রথম প্রকাশ পাবে তার পরপরই দ্বিতীয়টিও প্রকাশিত হবে। (মুসলিম, দাজ্জাল বের হওয়ার অধ্যায়)
[৩] এটি উক্ত জন্তুর বের হওয়ার কারণ। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর এই নিদর্শন এই কারণে দেখাবেন, যেহেতু মানুষ আল্লাহর নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে না। কেউ কেউ বলেন, উক্ত বাক্য জন্তুটি নিজ মুখে বলবে। পক্ষান্তরে উক্ত জন্তুর মানুষের সাথে কথা বলার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কারণ কুরআন তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
আন-নামল 27:83
(স্মরণ কর সেদিনের কথা,) যেদিন আমি এক একটি দলকে সে সমস্ত সম্প্রদায় হতে সমবেত করব, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করত এবং ওদেরকে বিভিন্ন সারিতে বিন্যস্ত করা হবে। [১]
[১] অথবা ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেওয়া হবে। যেমন ব্যভিচারীদের দল, মদ্যপায়ীদের দল ইত্যাদি। অথবা এর অর্থ তাদেরকে বাধা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, তাদেরকে এদিক-ওদিক আগে-পিছে হওয়া হতে বাধা দেওয়া হবে। আর তাদের সকলকে একের পর এক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আন-নামল 27:84
পরিশেষে যখন ওরা সমাগত হবে, তখন আল্লাহ ওদেরকে বলবেন, ‘তোমরা কি আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিলে; অথচ তা তোমরা জ্ঞানায়ত্ত করতে পারনি? [১] অথবা তোমরা কি করছিলে?’[২]
[১] অর্থাৎ, তোমরা আমার তাওহীদ ও দাওয়াতের প্রমাণগুলি বুঝার চেষ্টা করনি। বরং বুঝার চেষ্টা না করেই আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করেছ।
[২] যার কারণে তোমরা আমার কথাগুলো চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ পাওনি।
আন-নামল 27:85
সীমালংঘন হেতু ওদের ওপর ঘোষিত শাস্তি এসে পড়বে; ফলে ওরা কথা বলতে পারবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদের কাছে এমন কোন ওজর থাকবে না, যা তারা পেশ করতে পারবে। অথবা কিয়ামতের ভয়াবহতার কারণে বলার শক্তি হতে তারা বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে কারো নিকট এখানে ঐ সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যখন তাদের মুখে মোহর মেরে দেওয়া হবে।
আন-নামল 27:86
তারা কি দেখে না যে, ওদের বিশ্রামের জন্য আমি রাতকে সৃষ্টি করেছি এবং দিনকে করেছি আলোকোজ্জ্বল। [১] এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
[১] যাতে করে তারা জীবিকার খোঁজে চেষ্টা-চরিত্র করতে পারে।
আন-নামল 27:87
যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে সেদিন আল্লাহ যাদের ভীতিগ্রস্ত করতে চাইবেন না তারা ব্যতীত[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই ভীতবিহব্বল হয়ে পড়বে[২] এবং সকলেই তাঁর নিকট লাঞ্ছিত অবস্থায় উপস্থিত হবে।
[১] এখানে যাঁদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁরা কারা? কেউ কেউ বলেন, তাঁরা নবী ও শহীদগণ। কেউ বলেন, ফিরিশতাগণ। আবার কেউ বলেন, সকল মু'মিনগণ। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, হতে পারে এখানে উল্লিখিত সকলেই শামিল। কারণ সত্যিকার ঈমানদারগণ ভয় হতে সুরক্ষিত থাকবে। (যেমন, এর বর্ণনা পরে আসছে)
[২] صُور (সূর) বলতে ঐ শিঙ্গাকে বুঝানো হয়েছে, যাতে ইস্রাফীল (আঃ) আল্লাহর আদেশক্রমে ফুৎকার দেবেন। আর এই ফুৎকার দুই বা তার অধিক হবে। প্রথম ফুৎকারে পৃথিবীর সকল জীব ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। দ্বিতীয় ফুৎকারে সবাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আর তৃতীয় ফুৎকারে সমস্ত মানুষ কবর হতে উঠে পড়বে। কেউ কেউ বলেন, চতুর্থবার ফুৎকার দেওয়া হবে, যাতে সবাই হাশরের মাঠে জমা হয়ে যাবে। এখানে কোন্ ফুৎকারের কথা বলা হয়েছে? ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, প্রথম ফুৎকার এবং ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, তৃতীয় ফুৎকারের কথা; যখন মানুষ কবর হতে উঠবে।
আন-নামল 27:88
তুমি পর্বতমালা দেখে অচল মনে করছ; কিন্তু (সেদিন) ওরা হবে মেঘপুঞ্জের মত চলমান।[১] এ আল্লাহরই সৃষ্টি-নিপুণতা যিনি সমস্ত কিছুকে করেছেন সুষম।[২] তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে নিঃসন্দেহে তিনি সম্যক অবগত।
[১] এটি কিয়ামত দিবসে হবে। পাহাড় নিজ স্থানে থাকবে না বরং মেঘের মত চলতে ও উড়তে থাকবে।
[২] এটি হবে আল্লাহর বিশাল ক্ষমতার কারণে। যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে সুষম ও মজবুত বানিয়েছেন। কিন্তু তিনি ঐ সমস্ত মজবুত জিনিসগুলিকে ধূনিত তুলার ন্যায় করারও ক্ষমতা রাখেন।
আন-নামল 27:89
যে কেউ সৎকাজ নিয়ে উপস্থিত হবে সে উৎকৃষ্টতর প্রতিদান পাবে এবং সেদিন ওরা শঙ্কা হতে নিরাপদ থাকবে। [১]
[১] অর্থাৎ, বাস্তবিক ও মহা শঙ্কা থেকে ওরা নিরাপদ থাকবে।{لاَ يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ}(সূরা আম্বিয়া ২১:১০৩ নং আয়াত)
আন-নামল 27:90
আর যে কেউ মন্দকাজ নিয়ে উপস্থিত হবে তাকে অধোমুখে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে (এবং ওদেরকে বলা হবে), তোমরা যা করতে কেবল তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করবে।
আন-নামল 27:91
আমি তো এ নগরীর প্রতিপালকের উপাসনা করতে আদিষ্ট হয়েছি, যিনি একে সম্মানিত করেছেন।[১] সমস্ত কিছু তাঁরই। আমি আরও আদিষ্ট হয়েছি, যেন আমি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের একজন হই।
[১] এ থেকে মক্কা নগরীকে বুঝানো হয়েছে। এখানে তা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেহেতু ওর মধ্যে রয়েছে কা'বা ঘর। আর এই নগরীই নবী (সাঃ)-এর (মাতৃভূমি, জন্মস্থান) সবার চেয়ে প্রিয় ছিল। حَرَّمَها অর্থাৎ, একে হারাম, (হেরেম), নিষিদ্ধ বা সম্মানিত করেছেন। সুতরাং এখানে যুদ্ধ বা খুনোখুনি করা, অত্যাচার করা, শিকার করা, গাছ-পালা কাটা এমন কি কাঁটাদার গাছ নষ্ট করাও নিষিদ্ধ। (বুখারীঃ জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ হজ্জ্ব অধ্যায় মক্কার হারাম হওয়া ও তাতে কোন শিকার করা পরিচ্ছেদ।)
আন-নামল 27:92
আরও আদিষ্ট হয়েছি কুরআন আবৃত্তি করতে; অতএব যে ব্যক্তি সৎপথ অনুসরণ করে, সে তা করে নিজেরই কল্যাণের জন্য এবং কেউ ভ্রান্তপথ অবলম্বন করলে তুমি বল, ‘আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমার কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। আমার দাওয়াত ও তবলীগে যারা মুসলমান হবে, উপকার তাদেরই হবে। কারণ, তারা আল্লাহর শাস্তি হতে বেঁচে যাবে। আর যারা আমার দাওয়াত গ্রহণ করবে না, এতে আমার কোন ক্ষতি হবে না। মহান আল্লাহ নিজে তাদের হিসাব নেবেন ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবেন।
আন-নামল 27:93
বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই,[১] তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন দেখাবেন; তখন তোমরা তা চিনতে পারবে।[২] আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক অনবহিত নন।’ [৩]
[১] যেহেতু তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকেই আযাব দেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না হুজ্জত কায়েম করেন।[২] তিনি অন্যত্র বলেছেন,{سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ} অর্থাৎ, আমি ওদের জন্য আমার নিদর্শনাবলী বিশ্বজগতে ব্যক্ত করব এবং ওদের নিজেদের মধ্যেও; ফলে ওদের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এ (কুরআন) সত্য। (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫৩ আয়াত) যদি জীবিতকালে উক্ত নিদর্শনাবলী দেখেও তারা ঈমান আনয়ন না করে, তাহলে মৃত্যুর সময় অবশ্যই ওই সমস্ত নিদর্শন দেখে সত্য চিনে নেবে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়।[৩] বরং তিনি প্রতিটি জিনিসকেই প্রত্যক্ষ করছেন। এতে রয়েছে কাফেরদের জন্য কঠিন ভীতি প্রদর্শন ও বিরাট সতর্কীকরণ।
আল-কাসাস 28:1
ত্ব-সীম্-মীম;
আল-কাসাস 28:2
এগুলি সুস্পষ্ট গ্রন্থের বাক্য ।
আল-কাসাস 28:3
আমি তোমার নিকট বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে মূসা ও ফিরআউনের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে বিবৃত করছি। [১]
[১] মূসা (আঃ)-এর বৃত্তান্ত-বিবরণ এই কথারই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন আল্লাহর সত্য রসূল। কারণ, আল্লাহর অহী ছাড়া বহু শতাব্দী পূর্বের ঘটনা হুবহু যেরূপ ঘটেছিল সেরূপ বর্ণনা করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও এর দ্বারা উপকার ঈমানদার ব্যক্তিদেরই হবে। কারণ, তারাই নবী (সাঃ)-এর কথা বিশ্বাস করবে।
আল-কাসাস 28:4
ফিরআউন আপন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল[১] এবং সেখানকার অধিবাসীবৃন্দকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে[২] ওদের একটি শ্রেণীকে সে হীনবল করেছিল;[৩] সে ওদের পুত্রদেরকে হত্যা করত[৪] এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। নিঃসন্দেহে সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।
[১] যুলুম ও অত্যাচারের বাজার গরম করে রেখেছিল, আর সে নিজেকে বড় উপাস্য বলে ঘোষণা করেছিল।
[২] যাদের উপর ভিন্ন ভিন্ন কাজ ও কর্তব্য ন্যস্ত ছিল।
[৩] এ থেকে বানী ইস্রাঈলদেরকে বুঝানো হয়েছে; যারা ছিল সে কালের সর্বোত্তম জাতি। কিন্তু আল্লাহর পরীক্ষা স্বরূপ তারা ফিরআউনের দাসে ও তার অত্যাচারের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
[৪] যার কারণ হল, কিছু জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, বানী ইস্রাঈলদের মধ্যে এমন এক সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে, যার হাতে ফিরআউন ও তার রাজত্ব ধ্বংস হবে। যার প্রতিকার ছিল তার নিকট এই যে, তাদের মধ্যে প্রতিটি নবজাত পুত্র-সন্তানকে হত্যা করে দেওয়া হবে। অথচ সে নির্বোধ এ চিন্তা করেনি যে, যদি জ্যোতিষী সত্যবাদী হয়, তাহলে তা হবেই; যদিও সে সন্তানদের হত্যা করতে থাকে। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে সন্তান হত্যার আদেশের কোনই প্রয়োজন ছিল না। (ফাতহুল কাদীর) কেউ কেউ বলেন, ইবরাহীম (আঃ) হতে এ সুসংবাদ প্রচার হয়ে আসছিল যে, তাঁরই বংশে এক সন্তান জন্ম-গ্রহণ করবে, যার হাতে মিসর রাজ্য ধ্বংস হবে। কিবত্বীরা এ সংবাদ বানী ইস্রাঈলদের নিকট হতে শোনার পর তা ফিরআউনের নিকট পৌঁছে দেয়। যার জন্য সে বানী ইস্রাঈলদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করতে শুরু করে। (ইবনে কাসীর)
আল-কাসাস 28:5
সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা ও দেশের উত্তরাধিকারী করতে ইচ্ছা করলাম। [১]
[১] অতঃপর এই রকমই হল। মহান আল্লাহ সেই দুর্বল ও দাস জাতিকে পূর্ব পশ্চিমের মালিক বানিয়ে দিলেন। (সূরা আ'রাফ ৭:১৩৭ আয়াত) সেই সঙ্গে তাদেরকে ধর্মীয় নেতা ও ইমাম বানিয়ে দিলেন।
আল-কাসাস 28:6
ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে[১] এবং ফিরআউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত। [২]
[১] এখানে 'দেশ' বলতে শাম দেশকে বুঝানো হয়েছে; যেখানে তারা কিনআনীদের দেশের উত্তরাধিকারী হল। কারণ, বানী ইস্রাঈলদের মিসর হতে বের হবার পর পুনরায় সেখানে ফিরে যায়নি। والله أعلم
[২] অর্থাৎ, তাদের যে আশংকা ছিল যে, একজন ইস্রাঈলীর হাতে ফিরআউন, তার দেশ ও তার সৈন্য-সামন্ত সব ধ্বংস হবে, আমি তাদের সেই আশংকাকে সত্যে পরিণত করলাম।
আল-কাসাস 28:7
মূসার জননীর কাছে অহী পাঠালাম,[১] শিশুটিকে স্তন্যদান কর। যখন তুমি এর সম্পর্কে কোন আশংকা করবে, তখন একে (নীল) দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না।[২] নিশ্চয় আমি একে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেব[৩] এবং একে একজন রসূল করব।
[১] এখানে 'অহী' বলতে অন্তরে কোন কথার উদ্রেক করা, অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ দেওয়া বা প্রক্ষিপ্ত করা। 'অহী' বলতে সেই অহী বুঝানো হয়নি, যা জিবরীল ফিরিশতা দ্বারা নবী-রসূলদের নিকট অবতীর্ণ হয়। আর যদি ফিরিশতা দ্বারা উক্ত অহী এসেও থাকে তবুও একটি অহী দ্বারা মূসা (আঃ)-এর মায়ের নবী হওয়ার কথা সাব্যস্ত হয় না। কারণ, কখনো কখনো ফিরিশতাদের আগমন সাধারণ মানুষের কাছেও ঘটে থাকে। যেমন, হাদীসে টাক-ওয়ালা, অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর নিকট ফিরিশতাদের আগমন ও কথাবার্তা প্রমাণিত। (বুখারী, মুসলিম)
[২] অর্থাৎ, নদীতে ডুবে অথবা মরে যাওয়ার ভয় করবে না। আর তার বিরহে দুঃখও করবে না।
[৩] অর্থাৎ, এমনভাবে যে, তার পরিত্রাণ সুনিশ্চিত। কথিত আছে যে, সন্তান হত্যার এই ধারা যখন অনেক লম্বা হয়ে গেল, তখন ফিরআউন জাতির এই আশংকা বোধ হল, যদি এভাবে বানী ইস্রাঈল জাতিই নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমসাধ্য কঠিন কাজগুলি আমাদেরকেই করতে হবে। এই আশংকার কথা তারা ফিরআউনের কাছে ব্যক্ত করলে সে এক নতুন আইন জারী করল যে, এক বছর নবজাত সন্তান হত্যা করা হোক আর এক বছর বাদ দেওয়া হোক। যে বছর সন্তান হত্যা না করার কথা সে বছর হারুন (আঃ)-এর জন্ম হয়। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর জন্ম হয় হত্যার বছরে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর পরিত্রাণের ব্যবস্থা এইভাবে করলেন যে, প্রথমতঃ মূসা (আঃ)-এর মায়ের গর্ভাবস্থার লক্ষণ এমনভাবে প্রকাশ করলেন না, যাতে ফিরআউনের ছেড়ে রাখা ধাত্রীদের চোখে পড়ে। সেই জন্য গর্ভের এই মাসগুলি নিশ্চিন্তে পার হয়ে গেল এবং এই ঘটনা সরকারের পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্বশীলদেরও জানা হল না। কিন্তু জন্মের পর তাঁকে হত্যা করার আশংকা বিদ্যমান ছিল। যার সমাধান মহান আল্লাহ নিজেই ইলহামের মাধ্যমে মূসা (আঃ)-এর মাতাকে বুঝিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে একটি কফিনে (কাঠের বাক্সে) পুরে নীল নদে ভাসিয়ে দিলেন। (ইবনে কাসীর)
আল-কাসাস 28:8
অতঃপর ফিরআউনের লোকজন মূসাকে উঠিয়ে নিল।[১] পরিণামে সে ওদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হল।[২] নিশ্চয় ফিরআউন, হামান ও ওদের বাহিনী ছিল অপরাধী। [৩]
[১] সেই ব্যাক্তি ভাসতে ভাসতে ফিরআউনের প্রাসাদের নিকট পৌঁছল যা ছিল নদীর উপকূলে। ফিরআউনের কর্মচারীরা সেটি নদী থেকে তুলে নিয়ে এল।
[২] لِيَكُونَ এর লামটি পরিণামবাচক। অর্থাৎ, সে তো তাঁকে নিজ সন্তান ও চক্ষুশীতলতা স্বরূপ গ্রহণ করেছিল; শত্রু মনে করে নয়। কিন্তু তার এই কাজের পরিণাম এই হল যে, সে তার শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
[৩] এখানে পূর্বোক্ত কথার কারণ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, মূসা (আঃ) তার শত্রু কেন প্রমাণিত হলেন? কারণ তারা ছিল সকলেই আল্লাহর অবাধ্য ও অপরাধী। আল্লাহ তাআলা শাস্তিস্বরূপ তাদের নিকট পালিত ব্যক্তিকেই তাদের ধ্বংসের কারণ বানালেন।
আল-কাসাস 28:9
ফিরআউনের স্ত্রী বলল, ‘এ শিশু আমার এবং তোমার নয়ন-প্রীতিকর। তোমরা একে হত্যা করো না।[১] সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করব।’[২] প্রকৃতপক্ষে ওরা এর পরিণাম বুঝতে পারেনি। [৩]
[১] এ কথাটি তখন বলেছিল, যখন কাঠের বাক্সের ভিতর সুন্দর শিশু (মূসা)-কে দেখেছিল। আবার কারো নিকট এটি ঐ সময়ের কথা, যখন মূসা (আঃ) (শৈশবে) ফিরআউনের দাড়ি ধরে টান দিয়েছিলেন। ফলে ফিরআউন তাঁকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল। (আইসারুত তাফাসীর) "তোমরা একে হত্যা করো না" বহুবচন শব্দ ফিরআউন একা হলেও তার সম্মানার্থে ব্যবহার হয়েছে অথবা সেখানে কিছু তার পরিষদের লোকও থেকে থাকতে পারে, যার জন্য বহুবচন ব্যবহূত হয়েছে।
[২] কারণ ফিরআউন সন্তান হতে বঞ্চিত ছিল।
[৩] যে, এ সেই শিশু যাকে আজ সে নিজ সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেছে। যাকে মারার জন্য হাজার হাজার শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আল-কাসাস 28:10
মূসা-জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিল।[১] যাতে সে আস্থাশীল হয় সেজন্য তার হৃদয়কে আমি সুদৃঢ় করে না দিলে, সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিত। [২]
[১] فَارِغ মানে শূন্য বা খালি। অর্থাৎ, তাঁর অন্তর প্রত্যেক বস্তুর চিন্তা হতে খালি হয়ে গিয়ে শুধুমাত্র মূসার চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছিল। যাকে অস্থির বা ব্যাকুল হওয়া বলা যেতে পারে।
[২] অর্থাৎ, দুঃখের কারণে এ কথা প্রকাশ করে দিতেন যে, এ শিশু আমার। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর অন্তরকে সুদৃঢ় রাখলেন। সুতরাং তিনি ধৈর্যধারণ করলেন আর বিশ্বাস রাখলেন যে, আল্লাহ মূসাকে সকুশল ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অবশ্যই পূর্ণ হবে।
আল-কাসাস 28:11
সে মূসার ভগিনীকে[১] বলল, ‘এর পিছনে পিছনে যাও।’ সুতরাং সে ওদের অজ্ঞাতসারে দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল। [২]
[১] মূসা (আঃ)-এর ভগ্নির নাম ছিল মারয়্যাম বিন্তে ইমরান। যেমন, ঈসার মাতার নামও ছিল মারয়্যাম বিন্তে ইমরান। উভয়ের নামে ও পিতার নামে ছিল অভিন্নতা।
[২] অতএব তিনি নদীর ধারে ধারে দেখতে দেখতে যাচ্ছিলেন। পরিশেষে তিনি দেখতে পেলেন যে, তাঁর ভাই ফিরআউনের প্রাসাদে পৌঁছে গেল।
আল-কাসাস 28:12
আমি পূর্ব হতেই ধাত্রীস্তন্য পানে তাকে বিরত রেখেছিলাম।[১] মূসার ভগিনী বলল, ‘তোমাদেরকে কি আমি এমন পরিবারের কথা বলব, যারা তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর হিতাকাঙ্ক্ষী হবে?’ [২]
[১] অর্থাৎ, আমি আমার কুদরতে ও সৃষ্টিগত নির্দেশে মূসাকে তাঁর মাতা ছাড়া অন্য সব ধাত্রীর দুধ পান করা নিষেধ করেছিলাম। সুতরাং বহু চেষ্টা-চরিত্র করার পর কোন ধাত্রী তাঁকে দুধ পান করাতে ও চুপ করাতে সফল হল না।
[২] এ সকল দৃশ্য তাঁর বোন চুপি চুপি প্রত্যক্ষ করছিলেন। পরিশেষে বলে ফেললেন যে, 'আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি পরিবারের কথা বলব, যারা এই শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে?'
আল-কাসাস 28:13
অতঃপর আমি তাকে তার জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম,[১] যাতে তার চক্ষু জুড়ায়, সে দুঃখ না পায় এবং জানতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।[২] কিন্তু ওদের অধিকাংশই এ জানে না। [৩]
[১] অতঃপর তারা মূসার বোনকে বলল, 'যাও! সেই মহিলাকে ডেকে আনো।' সুতরাং তিনি দ্রুত গিয়ে নিজ মা (যিনি মূসারও মা ছিলেন তাঁকে) ডেকে নিয়ে এলেন।[২] মূসা (আঃ) যখন নিজ মায়ের দুধ পান করে ফেললেন তখন ফিরআউন মূসা (আঃ)-এর মাতাকে রাজ-প্রাসাদে থাকার আহবান জানাল, যাতে সঠিকভাবে শিশুর লালন-পালন ও দেখাশোনা হয়। কিন্তু তিনি বললেন, আমি স্বামী ও অন্য সন্তানদেরকে ছেড়ে থাকতে পারি না। শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক হল যে, তিনি শিশুকে নিজ ঘরে নিয়ে যাবেন ও সেখানেই লালন-পালন করবেন এবং রাজকোষ হতে তার মজুরী ও পারিশ্রমিক তাঁকে দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর কি অপার মহিমা! তিনি নিজ সন্তানকে দুধ পান করাবেন, আর পারিশ্রমিক (দুশমন) ফিরআউন হতে পাবেন! মহান আল্লাহ মূসাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কি সুন্দরভাবেই না পূর্ণ করলেন।{فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ} একটি মুরসাল হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যে কারিগর নিজ তৈরী জিনিসের মধ্যে নেকী ও কল্যাণের নিয়ত রাখে, তার উদাহরণ মূসার মায়ের মত; যে নিজ সন্তানকে দুধ পান করায়, উপরন্তু তার উপর পারিশ্রমিকও লাভ করে! (মারাসীলে আবী দাউদ)[৩] এমন বহু কাজ আছে যার বাস্তব পরিণামের কথা অধিকাংশ লোকের অজানা থাকে। কিন্তু আল্লাহর নিকট রয়েছে তার শুভ পরিণামের জ্ঞান। সেই জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা যা অপছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারাহ ২:২১৬ আয়াত) অন্যত্র বলেছেন, "এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ।" (সূরা নিসা ৪:১৯ আয়াত) এই কারণে মানুষের উচিত, নিজ পছন্দ-অপছন্দ দৃষ্টিচ্যুত করে প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করা। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও শুভ পরিণাম।
আল-কাসাস 28:14
যখন মূসা পূর্ণ যৌবনে ও পরিণত বয়সে উপনীত হল, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম; [১] এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
[১] 'প্রজ্ঞা ও জ্ঞান' বলতে যদি নবুঅত বুঝানো হয়, তাহলে এই মর্যাদায় তিনি কিভাবে পৌঁছলেন তার বিবরণ পরে আসছে। আবার কিছু ব্যাখ্যাদাতার নিকট এর অর্থ নবুঅত নয়; বরং সাধারণ জ্ঞান যা তিনি পারিবারিক পরিবেশে থেকে শিখেছিলেন।
আল-কাসাস 28:15
সে নগরীতে প্রবেশ করল এমন এক সময়ে যখন এর অধিবাসীরা অসতর্ক অবস্থায় ছিল,[১] সেখানে সে দু’টি লোককে মারামারি করতে দেখল; একজন তার নিজ দলের এবং অপরজন তার শত্রু দলের।[২] মূসার দলের লোকটি তার শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা ওকে ঘুষি মারল; এভাবে সে তাকে হত্যা করে বসল। মূসা বলল, ‘এ তো শয়তানের কাজ।[৩] নিশ্চয় সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।’ [৪]
[১] এ অবস্থাকে কিছু লোক মাগরেব ও এশার মধ্যকার সময়, আবার কেউ কেউ দুপুরের সময় মনে করেছেন, যখন মানুষ বিশ্রাম নেয়।
[২] অর্থাৎ, ফিরআউনের সম্প্রদায়ভুক্ত কিবত্বীদের একজন ছিল।
[৩] একে 'শয়তানের কাজ' এই কারণে বলা হয়েছে, যেহেতু হত্যা একটি জঘন্যতম অপরাধ; যদিও মূসা (আঃ)-এর ইচ্ছা হত্যা করা ছিল না।
[৪] মানুষের সঙ্গে যার শত্রুতা সুস্পষ্ট এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করার যে চেষ্টা সে করে থাকে, তাও কারো নিকট অস্পষ্ট নয়।
আল-কাসাস 28:16
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর।’[১] অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] এই অনিচ্ছাকৃত আকস্মিক হত্যা যদিও কাবীরাহ গোনাহ ছিল না (কারণ মহান আল্লাহ নবীগণকে তা হতে সুরক্ষা করেন) তা সত্ত্বেও তিনি এই গোনাহকে এমন ভাবলেন, যার ফলে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরী মনে করলেন। দ্বিতীয়তঃ এ আশঙ্কাও তাঁর ছিল যে, ফিরআউন যদি জানতে পারে, তাহলে তার বদলা নিতে সে হয়তো তাঁকেও হত্যা করবে।
আল-কাসাস 28:17
সে আরও বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ, সুতরাং আমি কখনও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক হব না।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তুমি যে অনুগ্রহ আমার প্রতি করেছ তার ফলে আমি সেই ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষক হব না, যে কাফের এবং তোমার বিধানের বিরোধী।
আল-কাসাস 28:18
অতঃপর ভীত-সতর্ক অবস্থায়[১] সে নগরীতে তার প্রভাত হল। হঠাৎ সে শুনতে পেল, গতকাল যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল, সে তার সাহায্যের জন্য চীৎকার করছে। মূসা তাকে বলল, ‘নিশ্চয় তুমি একজন সুস্পষ্ট বিভ্রান্ত ব্যক্তি।’ [২]
[১] خَائِفًا ভয়ে ভয়ে يَتَرَقّب এদিক-ওদিক দেখে আর নিজের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে। অর্থাৎ, ভীত-সতর্ক অবস্থায়।
[২] অর্থাৎ, মূসা (আঃ) তাকে ধমক দিয়ে বললেন, তোমাকে গত কাল একজনের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেছিলাম আবার আজও একজনের সাথে ঝগড়া করছ? 'তুমি একজন সুস্পষ্ট বিভ্রান্ত ব্যক্তি' কথার অর্থঃ সত্যই তুমি একজন ঝগড়াটে মানুষ।
আল-কাসাস 28:19
অতঃপর মূসা যখন উভয়ের শত্রুকে পাকড়াও করতে উদ্যত হল,[১] তখন সে ব্যক্তি বলে উঠল, ‘হে মূসা! গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে কেবল স্বেচ্ছাচারী হতে চাও এবং শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না!’ [২]
[১] মূসা (আঃ) কিবতীকে ধরে নিতে চাইলেন। কারণ সেই ছিল মূসা ও ইস্রাঈলীর শত্রু, যাতে ঝগড়া না বাড়তে পায়।
[২] সাহায্যপ্রার্থী (ইস্রাঈলী) মনে করল, হয়তো মূসা (আঃ) তাকেও পাকড়াও করবেন, এই ভয়ে সে বলে উঠল, "হে মূসা! গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি হত্যা করতে চাও?" যার ফলে কিবতী জানতে পারে, গতকাল যে হত্যা হয়েছিল তার হত্যাকারী মূসা। সে গিয়ে ফিরআউনকে এ কথা বলে দেয়। যার জন্য ফিরআউন বদলাস্বরূপ মূসাকে হত্যা করার মনস্থ করে। (মতান্তরে উক্ত উক্তি কিবতীর; যেমন বাহ্যার্থে স্পষ্ট। আর কিবতী কোন ইস্রাঈলীর নিকট থেকে মূসা (আঃ)-এর হত্যা করার কথা আগেই শুনেছিল।)
আল-কাসাস 28:20
নগরীর দূরপ্রান্ত হতে এক ব্যক্তি ছুটে এল ও বলল,[১] ‘হে মূসা! (ফিরআউনের) পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্র করছে। সুতরাং তুমি বাইরে চলে যাও, আমি অবশ্যই তোমার মঙ্গলকামী।’
[১] এ ব্যক্তি কে ছিল? কেউ কেউ বলেন, সে ছিল ফিরআউনের জাতিভুক্তই একটি লোক; কিন্তু সে গোপনভাবে মূসা (আঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী ছিল। আর এ কথা স্পষ্ট যে, শত্রুপক্ষের গুপ্ত ষড়্যন্ত্রের সংবাদ এই রকম লোক দ্বারা আসাটা অসম্ভব নয়। আবার কেউ বলেন, এ ব্যক্তি ছিল মূসা (আঃ)-এর এক ইস্রাঈলী নিকটাত্মীয়। 'নগরীর দূর প্রান্ত হতে' বলতে 'মানাফ'কে বুঝানো হয়েছে যেখানে ছিল ফিরআউনের রাজ প্রাসাদ ও রাজধানী, যা ছিল নগরীর শেষ প্রান্তে।
আল-কাসাস 28:21
ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সন্তর্পণে সে সেখান হতে বের হয়ে পড়ল[১] এবং বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায় হতে আমাকে রক্ষা কর।’ [২]
[১] যখন মূসা (আঃ) একথা জানতে পারলেন, তখন সেখান থেকে পলায়ন করলেন, যাতে ফিরআউন তাঁকে বন্দী করতে না পারে।
[২] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার পারিষদের কবল হতে, যারা আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। কথিত আছে যে, মূসা (আঃ)-এর জানাই ছিল না যে, তাঁকে কোথায় যেতে হবে? কারণ, মিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার এ ঘটনা ছিল আকস্মিক; পূর্ব হতে কোন পরিকল্পনা ছিল না। মহান আল্লাহ ঘোড়-সওয়ার এক ফিরিশতাকে পাঠালেন। তিনিই তাঁকে পথ নির্দেশ করেছিলেন। والله أعلم (ইবনে কাসীর)
আল-কাসাস 28:22
যখন মূসা মাদ্য়্যান অভিমুখে যাত্রা করল, তখন বলল, ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’ [১]
[১] মহান আল্লাহ তাঁর এই দু'আ কবুল করলেন এবং এমন এক সোজা রাস্তা প্রদর্শন করলেন, যাতে তাঁর ইহকাল ও পরকাল উভয় সফল হল। তিনি হলেন নিজে সুপথপ্রাপ্ত ও অন্যদের পথপ্রদর্শক।
আল-কাসাস 28:23
যখন সে মাদ্য়্যানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছে[১] এবং তাদের পশ্চাতে দু’জন রমণী তাদের পশুগুলিকে আগলে আছে। মূসা বলল, ‘তোমাদের কি ব্যাপার?’ [২] ওরা বলল, ‘রাখালেরা ওদের পশুগুলিকে নিয়ে সরে না গেলে আমরা আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাতে পারি না।[৩] আর আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ মানুষ।’[৪]
[১] যখন মাদয়্যান গিয়ে পৌঁছলেন তখন সেখানে এক কুয়ার নিকট কিছু মানুষের ভিড় দেখলেন, যারা তাদের পশুদেরকে পানি পান করাচ্ছিল। মাদয়্যান একটি গোত্রের নাম, এরা ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিল। আর মূসা (আঃ) ছিলেন ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধর; যিনি (ইয়াকূব) ইবরাহীম (আঃ)-এর পৌত্র ও ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ছিলেন। এই হিসাবে মাদয়্যানবাসী ও মূসা (আঃ)-এর মধ্যে বংশগত একটি সম্পর্ক ছিল। (আইসারুত তাফাসীর) আর এটিই ছিল শুআইব (আঃ)-এর বাসস্থান ও নবুঅতের এলাকা।
[২] দু'টি মেয়েকে তাদের ছাগল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মূসা (আঃ)-এর মনে দয়ার সঞ্চার হল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কেন তোমাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছ না?
[৩] যাতে পুরুষদের সাথে আমাদের সহ (মিশ্র) অবস্থান না ঘটে। رِعَاء শব্দটি رَاعٍ শব্দের বহুবচন।
[৪] সেই জন্য তিনি নিজে পানি পান করানোর জন্য এখানে আসতে পারেন না। (ফলে মেয়ে হয়েও আমরা আসতে বাধ্য হই।)
আল-কাসাস 28:24
মূসা তখন ওদের পশুগুলিকে পানি পান করাল। তারপর সে ছায়ার নীচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ অবতীর্ণ করবে, নিশ্চয় আমি তার মুখাপেক্ষী।’ [১]
[১] মূসা (আঃ) এত দূর সফর করে মিসর থেকে মাদয়্যান পৌঁছলেন, খাওয়া ও পান করার মত সঙ্গে কিছু ছিল না। দীর্ঘ সফরের ফলে ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত। সেই জন্য তাদের পশুগুলিকে পানি পান করানোর পর একটি গাছের ছায়ার আশ্রয় নিয়ে দু'আয় মগ্ন হলেন। خَير (কল্যাণ) শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহার হয়; যেমন, খাদ্য, কল্যাণময় কর্ম ও ইবাদত, শক্তি-সামর্থ্য এবং ধন-মাল ইত্যাদি। (আয়সারুত তাফাসীর) এখানে উক্ত শব্দটি খাদ্যের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আমার এখন খাবারের প্রয়োজন।
আল-কাসাস 28:25
তখন রমণী দু’জনের একজন লজ্জা-জড়িত পদক্ষেপে তার নিকট এল[১] এবং বলল, ‘আপনি যে আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করিয়েছেন, তার পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন।’[২] অতঃপর মূসা তার নিকট এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে সে বলল, ‘ভয় করো না। তুমি যালিম সম্প্রদায়ের কবল হতে বেঁচে গেছ।’ [৩]
[১] আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর দু'আ কবুল করলেন এবং দুটি মেয়ের মধ্যে একজন তাঁকে ডাকতে এল। কুরআন বিশেষভাবে মেয়েটির লজ্জার কথা বর্ণনা করেছে। যেহেতু লজ্জাই হল নারীর ভূষণ। পক্ষান্তরে নারীর জন্য পুরুষদের মত লজ্জা ও পর্দার পরোয়া না করে নির্লজ্জ ও বেপর্দা হওয়া শরীয়তে অবৈধ ও ঘৃণিত।
[২] মেয়ে দু'টির পিতা কে ছিলেন কুরআনে স্পষ্টভাবে তার পরিচয় বা নাম উল্লেখ করা হয়নি। অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারিগণ শুআইব (আঃ) মনে করেছেন। যিনি মাদয়্যানবাসীদের প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) এই মতটিকেই সমর্থন করেছেন। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, শুআইব (আঃ)-এর যুগ মূসা (আঃ)-এর নবুঅতের আগে ছিল। সুতরাং তিনি শুআইব (আঃ)-এর কোন ভায়ের ছেলে অথবা তাঁর জাতির কোন লোক হবেন। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন। যাই হোক, মূসা (আঃ) মেয়ে দুটির প্রতি যে সহানুভূতি প্রদর্শন ও উপকার করলেন তা তারা বাড়ি ফিরে বৃদ্ধ পিতার নিকট খুলে বলল। যার ফলে তাঁর অন্তরেও উপকারের বদলা দেওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হল। অথবা তাঁর পরিশ্রমের পারিশ্রমিক দেওয়া কর্তব্য মনে করলেন।
[৩] অর্থাৎ, মিসরের ঘটনাবলী ও ফিরআউনের অত্যাচার-কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনা করলেন। বৃত্তান্ত শুনে তিনি বললেন, এই এলাকা ফিরআউনের রাজ্য-সীমার বাইরে। অতএব ভয়ের কোন কারণ নেই। আল্লাহ তোমাকে অত্যাচারী হতে পরিত্রাণ দিয়েছেন।
আল-কাসাস 28:26
ওদের একজন বলল, ‘হে আব্বা! আপনি এঁকে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসাবে নিশ্চয় সে (ব্যক্তি) উত্তম হবে, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।’ [১]
[১] কোন কোন মুফাসসির লিখেছেন যে, পিতা মেয়েদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কিভাবে জানলে যে, লোকটি শক্তিশালী ও আমানতদার?' উত্তরে মেয়েরা বলল, 'তিনি যে কুয়া হতে আমাদের পশুদেরকে পানি পান করালেন সেই কুয়াটি এমন একটি বড় পাথর দিয়ে ঢাকা, যা দশজনের পক্ষে উঠানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, তিনি একাই সেই পাথরটিকে সরিয়েছেন এবং পরে ঢাকাও দিয়েছেন একাই। অনুরূপ আমি যখন তাঁকে এখানে আসার জন্য ডাকতে গিয়েছিলাম, রাস্তা যেহেতু আমারই জানা, সেই জন্য আমি আগে আগে চলতে শুরু করলাম আর তিনি পিছনে। কিন্তু বাতাসে আমার চাদর উড়তে থাকে, ফলে তিনি আমাকে তাঁর পিছনে চলতে বললেন; যাতে আমার দেহের কোন অংশ তাঁর দৃষ্টিতে না পড়ে। আর রাস্তা ভুল হলে পাথর ছুঁড়ে জানিয়ে দিতে বলেন।' এ সব কথার সত্যতা আল্লাহই ভাল জানেন। (ইবনে কাসীর)
আল-কাসাস 28:27
সে মূসাকে বলল, ‘আমি আমার এ কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই[১] এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার মজুরি খাটবে;[২] অতঃপর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, তবে সে তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।[৩] ইন শাআল্লাহ (আল্লাহর ইচ্ছায়) তুমি আমাকে সদাচারী পাবে।’ [৪]
[১] আমাদের দেশে কন্যা পক্ষ হতে বিবাহের পয়গাম দেওয়া লজ্জার ব্যাপার মনে করা হয়। কিন্তু আল্লাহর শরীয়তে তা নিন্দনীয় নয়। সুন্দর চরিত্রবান যুবকের সন্ধান মিললে সরাসরি তার সাথে বা তার পরিবারের কারো সাথে নিজ কন্যার বিবাহের ব্যাপারে কথা-বার্তা বলা দোষের নয়; বরং তা প্রশংসনীয়। নবী (সাঃ) ও সাহাবা (রাঃ)-দের যুগেও এই প্রথাই প্রচলিত ছিল।
[২] এখান থেকে উলামাগণ মজদুরী ও মজুরীর বৈধতা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ, মজুরী বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন পুরুষ দ্বারা কাজ নেওয়া বৈধ।
[৩] অতিরিক্ত দু' বছর কাজ করা যদি কষ্টকর মনে হয়, তাহলে আট বছর পর যাওয়ার অনুমতি থাকবে।
[৪] ঝগড়া-বিবাদ করব না, কোন কষ্টও দেব না এবং তোমার প্রতি কঠোরও হব না।
আল-কাসাস 28:28
মূসা বলল, ‘আপনার ও আমার মধ্যে এ চুক্তিই রইল। এ দুটি মেয়াদের কোন একটি আমি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না।[১] আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি আল্লাহ তার সাক্ষী।’ [২]
[১] অর্থাৎ, আট বছর বা দশ বছর পর আমি যেতে চাইলে অধিক থাকার দাবী করা যাবে না।
[২] কেউ কেউ বলেন, এটি শুআইব বা শুআইবের ভাইপোর উক্তি। আবার কেউ বলেন, এটি মূসা (আঃ)-এর কথা। হয়তো বা উভয়ের কথা; যেহেতু বহুবচন শব্দ ব্যবহার হয়েছে। মনে হয় এ ব্যাপারে দুজনেই আল্লাহকে সাক্ষী রাখলেন। আর এই কথার সাথে সাথেই তাঁর কন্যা ও মূসা (আঃ)-এর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেল। মহান আল্লাহ অন্য কথা বিস্তারিত আলোচনা করেননি। ইসলামী শরীয়তে উভয় পক্ষের সম্মতির সাথে সাথে বিবাহ-বন্ধনের সময় দু'জন মুসলমান সাক্ষী থাকা আবশ্যক।
আল-কাসাস 28:29
মূসা যখন তার মেয়াদ[১] পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করল,[২] তখন সে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পেল। সে তার পরিজনবর্গকে বলল, ‘তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবতঃ আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কোন খবর আনতে পারব অথবা একখন্ড জ্বলন্ত আঙ্গার আনতে পারব, যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পার।’
[১] ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এখানে মেয়াদ বলতে দশ বছরের মেয়াদ অর্থ নিয়েছেন। কারণ, এই মেয়াদই মূসা (আঃ)-এর শ্বশুরের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল। আর মূসা (আঃ)-এর সুন্দর চরিত্র-ব্যবহার নিজ বৃদ্ধ শ্বশুরের ইচ্ছার বিপরীত করতে পছন্দ করল না।
[২] এখান থেকে প্রমাণিত হল যে, স্বামী নিজ স্ত্রীকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারে।
আল-কাসাস 28:30
যখন মূসা আগুনের নিকট পৌঁছল, তখন উপত্যকার ডান পাশে পবিত্র ভূমির এক বৃক্ষ হতে[১] তাকে আহবান করে বলা হল, ‘হে মূসা! নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক। [২]
[১] অর্থাৎ, আওয়াজ উপত্যকার এক প্রান্ত থেকে এল; যা পশ্চিম দিক হতে পাহাড়ের ডান দিক ছিল। এখানে গাছ হতে আগুনের শিখা বের হচ্ছিল, যা আসলে মহান আল্লাহর নূর (জ্যোতি) ছিল।
[২] অর্থাৎ, হে মূসা! এখন তোমার সঙ্গে যে কথা বলছে সে, আমিই আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
আল-কাসাস 28:31
তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।’ অতঃপর যখন সে একে সাপের মত ছুটাছুটি করতে দেখল, তখন পিছনে না তাকিয়ে সে বিপরীত দিকে ছুটতে লাগল। (তাকে বলা হল,) ‘হে মূসা! অগ্রসর হও, ভয় করো না; নিশ্চয়ই তুমি নিরাপদে রয়েছ। [১]
[১] এটি সেই মু'জিযা যা মূসা (আঃ) নবুওত প্রাপ্তির পর প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু মু'জিযা অস্বাভাবিক জিনিসকে বলা হয়, যা স্বাভাবিকতার বিপরীত ও কর্মকারণশূন্য। আর যেহেতু এসব জিনিস (মু'জিযা) কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশক্রমেই প্রকাশ পায়; কোন মানুষের এখতিয়ারভুক্ত নয় -- যদিও হোক সে কোন মহান পয়গম্বর ও নৈকট্যপ্রাপ্ত নবী -- সেহেতু মূসা (আঃ)-এর হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর একটি জীবন্ত সাপ হয়ে গেল তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। আবার যখন আল্লাহ তার প্রকৃতত্বের কথা জানিয়ে অভয় দান করলেন, তখন তাঁর ভয় দূর হল এবং তাঁর নিকট এ কথা স্পষ্ট হল যে, মহান আল্লাহ তাঁর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ এই মু'জিযা দান করেছেন।
আল-কাসাস 28:32
তোমার হাত নিজ জামার বুকের উন্মুক্ত অংশে প্রবেশ করাও, তা নির্মল উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে।[১] ভয় দূর করবার জন্য তোমার হাতকে বুকের উপর চেপে ধর।[২] এ দুটি ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য তোমার প্রতিপালক-প্রদত্ত প্রমাণ। ওরা অবশ্যই সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।’ [৩]
[১] يَدٌ بَيضَاء (উজ্জ্বল হাত) এটি ছিল দ্বিতীয় মু'জিযা, যা তাঁকে দান করা হয়েছিল।
[২] লাঠি সাপ হয়ে যাওয়ার ফলে মূসা (আঃ)-এর মনে যে ভয় সঞ্চারিত হয়েছিল তা দূর করার এক পদ্ধতি বলে দেওয়া হল। নিজের বাজু (হাত) শরীরে রেখে নাও, তাতে ভয় দূর হয়ে যাবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এটি সকল মানুষ ও সকল প্রকার ভয় দূর করার জন্য প্রযোজ্য। যখনই কেউ কোন কিছু হতে ভয় পাবে তখনই এ রকম করলে তার ভয় দূর হয়ে যাবে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, যে কোন ব্যক্তি মূসা (আঃ)-এর অনুকরণে ভয়ের সময় নিজ হাত হৃদয়ের উপর রাখলে তার হৃদয় হতে ভয় বিলকুল দূর হয়ে যাবে, নতুবা কমসে কম সে ভয় কিছু হাল্কা হবে -- ইন শাআল্লাহ।
[৩] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার জাতির সামনে এই দুই মু'জিযা নিজের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ পেশ কর। এরা আল্লাহর আনুগত্য হতে দূরে সরে গেছে এবং এরা আল্লাহর দ্বীন-বিরোধী।
আল-কাসাস 28:33
মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো ওদের একজনকে হত্যা করেছি, ফলে আমি আশংকা করছি যে, ওরা আমাকে হত্যা করবে। [১]
[১] এ ছিল সেই আশঙ্কা যা বাস্তবে মূসা (আঃ)-এর প্রাণে ছিল। কারণ, তাঁর হাতে এক কিবত্বী খুন হয়ে গিয়েছিল।
আল-কাসাস 28:34
আমার ভাই হারূন আমার থেকে বাগ্মী; অতএব তাকে আমার সহযোগীরূপে প্রেরণ কর,[১] সে আমাকে সমর্থন করবে। নিশ্চয় আমি আশংকা করি যে, ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।’
[১] ইস্রাঈলী বর্ণনা মতে মূসা (আঃ) ছিলেন তোতলা। যার কারণ এই বলা হয়ে থাকে যে, শিশু মূসার সামনে আগুনের আঙ্গার ও খেজুর অথবা মুক্তা রাখা হয়েছিল। তিনি আগুনের আঙ্গার তুলে মুখে পুরে নিয়েছিলেন, যার জন্য তাঁর জিহ্বা পুড়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা বা যুক্তি ঠিক হোক অথবা ভুল, কুরআনের এই আয়াত হতে প্রমাণিত হয় যে, মূসা (আঃ)-এর তুলনায় হারূন (আঃ) বেশি বাকপটু ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। আর মূসা (আঃ)-এর মুখে ছিল আড়ষ্টতা ও জড়তা। যা দূর করার জন্য তিনি নবুঅত প্রাপ্তির পর দু'আ করেছিলেন। رِدء এর অর্থ সহায়ক, সহযোগী, সমর্থক। অর্থাৎ, হারূন নিজ বাকপটুতায় আমার সাহায্য ও সহযোগিতা করবে।
আল-কাসাস 28:35
আল্লাহ বললেন, ‘আমি তোমার ভাই দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করব[১] এবং তোমাদের উভয়কে আধিপত্য দান করব। ওরা তোমাদের নিকট পৌঁছতে পারবে না।[২] তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শন বলেই ওদের উপর বিজয়ী হবে।’ [৩]
[১] মূসা (আঃ)-এর দু'আ মঞ্জুর করা হল আর তার আশানুরূপ হারূন (আঃ)-কেও নবুঅত প্রদান করে তাঁর সঙ্গী ও সহযোগী বানানো হল।[২] অর্থাৎ, আমি তোমাদের সুরক্ষা করব। ফিরআউন ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।[৩] এটা সেই বিষয় যা কুরআনে বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সূরা মায়িদাহ ৫:৬৭ নং, আহযাব ৩৩:৩৯ নং, মুজাদিলাহ ৫৮:২১ নং, মু'মিন ৪০:৫১-৫২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
আল-কাসাস 28:36
সুতরাং মূসা যখন ওদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সহ উপস্থিত হল, তখন ওরা বলল, ‘এ তো অলীক যাদু মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষকালে কখনও এরূপ ঘটতে শুনিনি।’ [১]
[১] অর্থাৎ, এই দাওয়াত যে, বিশ্ব-জাহানে একমাত্র আল্লাহই ইবাদতের যোগ্য এটি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কথা। এ কথা না আমরা শুনেছি আর না আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই তাওহীদ সম্পর্কে অবহিত ছিল। মক্কার মুশরিকরাও নবী (সাঃ) সম্পর্কে বলেছিল,{أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ} অর্থাৎ, সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? এ তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। (সূরা সা'দ ৩৮:৫ আয়াত)
আল-কাসাস 28:37
মূসা বলল, আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তাঁর নিকট থেকে পথনির্দেশ এনেছে[১] এবং (পরকালে) কার পরিণাম শুভ হবে।[২] নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হবে না। [৩]
[১] অর্থাৎ, তোমার ও আমার চেয়ে আল্লাহই হিদায়াতের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। অতএব যে কথা আল্লাহর পক্ষ হতে আসবে সে কথা সত্য হবে, নাকি তোমাদের ও তোমাদের বাপ-দাদাদের কথা?
[২] শুভ-পরিণাম বলতে পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দয়া এবং ক্ষমার যোগ্য হওয়া। আর এ যোগ্যতা একমাত্র তওহীদপন্থীদেরই লাভ হবে।
[৩] ظَالِم (সীমালংঘনকারী) বলতে কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারণ আরবীতে ظلم এর অর্থ وضع الشيء في غير محله কোন জিনিসকে তার নিজের জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় রাখা। মুশরিক যেহেতু আল্লাহর জায়গায় এমন কিছুকে মাবূদ বানিয়ে দেয় যারা ইবাদতের যোগ্য নয়। অনুরূপ কাফেররাও প্রতিপালকের আসল স্থান সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ থাকে। সেই জন্য এরাই সব থেকে বড় সীমালংঘনকারী, অনাচারী ও অত্যাচারী। আর এরা পরকালে সফলতা হতে; অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমা হতে বঞ্চিত হবে। এই আয়াত থেকেও জানা গেল যে, সব চেয়ে বড় সফলতা পরকালের সফলতা। পৃথিবীর সুখ-শান্তি, ধন-সম্পদের আধিক্য সত্যিকার সফলতা নয়। কারণ, এ সাময়িক সফলতা পৃথিবীতে মুশরিক-কাফের সকলের ভাগ্যেই জোটে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের সফলতার কথা খন্ডন করেছেন, যাতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, সত্যিকার সফলতা পরকালের চিরস্থায়ী সফলতা; পৃথিবীর কয়েক দিনের অস্থায়ী সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদ প্রকৃত সফলতা নয়।
আল-কাসাস 28:38
ফিরআউন বলল, ‘হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে জানি না! হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও[১] এবং এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর; হয়তো আমি এতে মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি।[২] তবে আমি অবশ্যই মনে করি, সে মিথ্যাবাদী।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, মাটিকে পুড়িয়ে ইট তৈরী কর। হামান ছিল ফিরআউনের মন্ত্রী, পরামর্শদাতা ও তার রাজকার্যের দায়িত্বশীল ব্যক্তি।
[২] অর্থাৎ, একটি উঁচু ও সুদৃঢ় প্রাসাদ তৈরী কর। যার উপর চড়ে আকাশে গিয়ে আমি দেখতে পারি যে, সেখানে আমি ছাড়া অন্য কোন রব (প্রতিপালক) আছে কি না?
[৩] অর্থাৎ, মূসার দাবী যে, আসমানে একজন রব রয়েছে, যে সারা বিশ্বের পালনকর্তা, আমি তাকে এ দাবীতে মিথ্যাবাদী মনে করি।
আল-কাসাস 28:39
ফিরআউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করেছিল[১] এবং ওরা মনে করেছিল যে, ওরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না ।
[১] এখানে পৃথিবী, যমীন বা দেশ বলতে 'মিসর'কে বুঝানো হয়েছে, যেখানে ফিরআউন রাজত্ব করত। অহংকার অর্থ, অকারণে নাহক নিজেকে বড় মনে করা। অর্থাৎ তার নিকট কোন প্রমাণ ছিল না যার দ্বারা মূসা (আঃ)-এর প্রমাণ ও মু'জিযাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারত। কিন্তু সে অহংকার ও শত্রুতাবশতঃ অস্বীকার করার রাস্তা অবলম্বন করল।
আল-কাসাস 28:40
অতএব আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম।[১] সুতরাং দেখ, সীমালংঘনকারীদের পরিণাম কি ছিল!
[১] যখন তার অবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্য সীমা অতিক্রম করল এবং কোনক্রমেই ঈমান আনতে প্রস্তুত হল না, তখন শেষ পর্যন্ত এক সকালে আমি তার সলিল সমাধি ঘটালাম।(যার বিস্তারিত আলোচনা সূরা শুআরায় ২৬:১০-৬৮ আয়াতে উল্লেখ হয়েছে।)
আল-কাসাস 28:41
ওদেরকে আমি নেতা করেছিলাম; ওরা লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে আহবান করত।[১] কিয়ামতের দিন ওরা কিছু মাত্র সাহায্য পাবে না।
[১] অর্থাৎ, তাদের পরে যে কোন ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদ বা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করবে, ফিরআউনীরা তার পথিকৃৎ নেতা ও অগ্রগামী গণ্য হবে, যারা ছিল জাহান্নামের দিকে আহবানকারী।
আল-কাসাস 28:42
এ পৃথিবীতে আমি তাদেরকে অভিশপ্ত করেছিলাম এবং কিয়ামতের দিন ওরা হবে ঘৃণিত! [১]
[১] অর্থাৎ, ইহকালে তারা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে, আর পরকালেও তারা ঘৃণিত ও কুৎসিত হবে। অর্থাৎ, মুখ হবে কালো আর চোখ হবে নীল; যেমন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বর্ণনায় এসেছে।
আল-কাসাস 28:43
আমি অবশ্যই পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর মূসাকে গ্রন্থ দিয়েছিলাম[১] মানব-জাতির জন্য আলোক-বর্তিকা, পথনিদের্শ ও করুণাস্বরূপ;[২] যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। [৩]
[১] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার জাতি অথবা নূহ জাতি, আদ ও সামূদ জাতির ধ্বংসের পর মূসা (আঃ)-কে (তাওরাত) কিতাব দান করা হয়েছে।
[২] যাতে মানুষ সত্য চিনতে ও গ্রহণ করতে পারে এবং আল্লাহর কৃপার উপযুক্ত হয়।
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা করে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং তাঁর প্রেরিত নবীদের আনুগত্য করে, যাঁরা তাদেরকে মঙ্গল, সুপথ ও সত্যিকার সফলতার দিকে আহবান করেন।
আল-কাসাস 28:44
মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়েছিলাম, তখন তুমি পর্বতের পশ্চিম পাশে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। [১]
[১] অর্থাৎ, যখন আমি তূর পর্বতে মূসার সাথে কথোপকথন করেছিলাম ও তাঁকে অহী ও নবুঅত দ্বারা সম্মানিত করেছিলাম। তখন (হে মুহাম্মাদ!) তুমি সেখানে উপস্থিত ও প্রত্যক্ষদর্শী ছিলে না; বরং এটি এমন অদৃশ্যের সংবাদ যা আমি অহী দ্বারা তোমাকে অবহিত করেছি, আর তা এ কথার প্রমাণ যে, তুমি সত্য নবী। কারণ, না তুমি এ কথা কারো নিকটে শুনেছ, আর না তুমি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছ। এ বিষয়টি আরো বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরা আলে-ইমরান ৩:৪৪, হূদ ১১:৪৯, ১১:১০০, ইউসুফ ১২:১০২, ত্বহা ২০:৯৯ নং আয়াত ইত্যাদি দ্রষ্টব্য।
আল-কাসাস 28:45
বস্তুতঃ (মূসার পর) অনেক মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটিয়েছিলাম;[১] অতঃপর ওদের বহু যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে।[২] তুমি তো মাদ্য়্যানবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না[৩] ওদের নিকট আমার বাক্য আবৃত্তি করার জন্য । কিন্তু আমিই ছিলাম রসূলপ্রেরণকারী। [৪]
[১] قُرُون শব্দটি قَرن শব্দের বহুবচন, যার অর্থ যুগ বা শতাব্দী। কিন্তু এখানে সম্প্রদায় বা জাতির অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! তোমার ও মূসার মাঝে যে সকল যুগ অতিবাহিত হয়েছে তাতে আমি বেশ কিছু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি।
[২] অর্থাৎ, কালের আবর্তনে ধর্মের বিধি-বিধান পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং মানুষ ধর্ম ভুলে বসেছে। যার কারণে তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী বর্জন করে এবং তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভুলে বসে। সুতরাং এক নতুন নবী প্রেরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। অথবা এর অর্থ এই যে, সময়ের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণে আরবের লোকেরা নবুঅত ও রিসালাত সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃত হয়। যার কারণে ওরা তোমার নবুঅতের ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করে এবং তোমাকে নবী বলে মেনে নিতে প্রস্তুত হয় না।
[৩] যার ফলে তুমি নিজে এই ঘটনার বিস্তারিত সব কিছু জানতে পারতে।
[৪] আর সেই নিয়মানুসারেই আমি তোমাকে রসূলরূপে প্রেরণ করেছি এবং পূর্বের অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করেছি।
আল-কাসাস 28:46
মূসাকে যখন আমি আহবান করেছিলাম, তখন তুমি ত্বুর পর্বত-পার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না।[১] বস্তুতঃ এ সংবাদ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে করুণাস্বরূপ,[২] যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি;[৩] যেন ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।
[১] অর্থাৎ, যদি তুমি সত্য রসূল না হতে, তাহলে মূসার এই ঘটনা তোমার জানার কথা নয়।
[২] অর্থাৎ, তোমার এই জ্ঞান সরাসরি প্রত্যক্ষ ও পরিদর্শন করার ফল নয়; বরং তা তোমার প্রতিপালকের কৃপা যে, তিনি তোমাকে নবী করে প্রেরণ করেছেন এবং অহী দ্বারা সম্মানিত করেছেন।
[৩] এ সম্প্রদায় বলতে মক্কা ও আরববাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাদের নিকট নবী (সাঃ)-এর পূর্বে কোন নবীর আগমন ঘটেনি। কারণ, ইবরাহীম (আঃ)-এর পর নবুঅতের ধারা তাঁরই বংশেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং তাঁদেরকে বানী ইস্রাইলের দিকেই প্রেরণ করা হয়। ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে অর্থাৎ, আরবের জন্য নবী (সাঃ) ছিলেন প্রথম নবী ও নবীদের সর্বশেষ নবী ছিলেন। এদের নিকট নবী প্রেরণের প্রয়োজন এই জন্যই বোধ করা হয়নি, যেহেতু অন্যান্য নবীদের আহবান ও তাঁদের বাণী তাদের নিকট পৌঁছেছিল। নচেৎ তাদের কুফর ও শিরকের উপর অব্যাহত থাকার ওজর থাকত। অথচ আল্লাহ তাআলা এ রকম ওজর কারোও জন্য অবশিষ্ট রাখেননি।
আল-কাসাস 28:47
রসূল না পাঠালে ওদের কৃতকর্মের জন্য ওদের কোন বিপদ হলে ওরা বলত, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট কোন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে, আমরা তোমার আয়াতসমূহ মেনে চলতাম এবং আমরা বিশ্বাসী হতাম।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তাদের উক্ত ওজর শেষ করার জন্য আমি তোমাকে তাদের নিকট নবী করে পাঠালাম। কারণ, সময়ের সুদীর্ঘ ব্যবধানের ফলে অতীত নবীদের শিক্ষা মুছে গিয়েছিল এবং তাদের আহবান মানুষ ভুলে বসেছিল। আর এই পরিস্থিতিই নতুন নবী প্রেরণের দাবিদার ছিল। এই কারণেই সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর শিক্ষা (কুরআন-হাদীস)-কে মিটে যাওয়া ও রদ্দ্বদল হওয়া থেকে সুরক্ষা দান করেছেন। আর এমন সৃষ্টিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, যাতে তাঁর দাওয়াত পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে এবং এখনও পৌঁছচ্ছে, (পৃথিবী এখন একটি শহরের মত অথবা চারিদিকে আয়না বসানো একটি রুমের মত হয়ে গেছে।) যাতে আর কোন নতুন নবী প্রেরণের প্রয়োজনই না পড়ে। সুতরাং যে ব্যক্তি সেই 'প্রয়োজনীয়তা'র দাবী করে নবুঅতের সঙ্ সাজে, সে মিথ্যুক দাজ্জাল বৈ অন্য কিছু নয়।
আল-কাসাস 28:48
অতঃপর যখন আমার নিকট হতে ওদের নিকট সত্য আগমন করল, তখন ওরা বলতে লাগল, ‘মূসাকে যেরূপ দেওয়া হয়েছিল ও (মুহাম্মাদ)কে সেরূপ দেওয়া হল না কেন?’[১] কিন্তু পূর্বে মূসাকে যা দেওয়া হয়েছিল, তা কি ওরা অস্বীকার করেনি? [২] ওরা বলেছিল, ‘উভয়ই যাদু, একটি অপরটির সমর্থক।’ এবং বলেছিল, ‘আমরা উভয়কে প্রত্যাখ্যান করি।’[৩]
[১] অর্থাৎ, মূসার মত মু'জিযা দেওয়া হল না কেন? যেমন, লাঠির সাপ হয়ে যাওয়া ও হাতের উজ্জ্বল সাদা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
[২] অর্থাৎ, তাদের চাহিদানুসারে মু'জিযা যদি দেখিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও লাভ কি? কারণ যারা ঈমান গ্রহণ করবে না, তারা বিভিন্ন ধরনের নিদর্শন দেখার পরও ঈমান হতে বঞ্চিত থাকবে। মূসার উক্ত মু'জিযা দেখে কি ফিরআউনীরা মুসলমান হয়েছিল? তারা কি কুফরে অটল থাকেনি? অথবা يكفُرُوا এর সর্বনাম দ্বারা মক্কার কুরাইশদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা কি নবী মুহাম্মাদের আগে মূসার সঙ্গে কুফরী করেনি?
[৩] উপরোক্ত প্রথম ভাবার্থের দিক দিয়ে 'উভয়ই' বলতে মূসা ও হারূন (আলাইহিমাস সালাম)-কে বুঝানো হয়েছে। আর سِحرَان শব্দটি سَاحِرَان এর অর্থ হবে। আর দ্বিতীয় ভাবার্থে 'উভয়ই' বলতে কুরআন ও তাওরাত বুঝাবে। অর্থাৎ, উভয়ই যাদু যা এক অপরের সমর্থক। আর আমরা প্রত্যেককে অর্থাৎ, মুহাম্মাদ ও মূসাকে অস্বীকার করি। (ফাতহুল কাদীর)
আল-কাসাস 28:49
বল, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে আল্লাহর নিকট হতে এক গ্রন্থ আনয়ন কর যা পথনির্দেশে এ দু’টি হতে উৎকৃষ্ট হবে; আমি সে গ্রন্থ অনুসরণ করব।’ [১]
[১] যদি তোমরা নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হও যে, কুরআন ও তাওরাত উভয়ই যাদু, তাহলে তোমরা অন্য এক আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থ পেশ কর; যা উক্ত উভয়ের তুলনায় বেশি সুপথ-নির্দেশক, আমি তার অনুসরণ করব। কারণ, আমি তো সুপথের অনুসন্ধানকারী ও অনুসরণকারী।
আল-কাসাস 28:50
অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়,[১] তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে?[২] নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না। [৩]
[১] অর্থাৎ, কুরআন ও তাওরাতের চেয়ে বেশি হিদায়াতদানকারী কোন গ্রন্থ তারা পেশ করতে না পারে -- আর নিঃসন্দেহে তারা পারবেও না -- তাহলে জানবে---।
[২] আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াতকে ছেড়ে দিয়ে নিজের প্রবৃত্তির পূজা করা সব থেকে বড় ভ্রষ্টতা। আর এই দিক দিয়ে মক্কার কুরাইশরা সব চেয়ে বড় বিভ্রান্ত। কারণ, ওরা এই পথেরই পথিক।
[৩] এখানে আল্লাহর সেই নিয়মের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যাচারীদের জন্য তাঁর কাছে নির্ধারিত আছে; আর তা এই যে, তারা হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকে। কারণ, নবীদেরকে মিথ্যা ভাবা, আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং নিরন্তর কুফরী ও বিদ্বেষ এমন অপরাধ, যাতে সত্য গ্রহণের যোগ্যতা ও তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপর মানুষ যুলুম, পাপ, কুফর ও শিরকের অন্ধকারে হাবুডুবু খেতে থাকে। ঈমানের আলো তার ভাগ্যে আর জোটে না।
আল-কাসাস 28:51
আর আমি অবশ্যই ওদের নিকট বার বার আমার বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছি;[১] যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। [২]
[১] অর্থাৎ, রসূলের পর রসূল, কিতাবের পর কিতাব আমি প্রেরণ করেছি আর এভাবে ধারাবাহিকরূপে আমি আমার বাণী মানুষের নিকট পৌঁছাতে থেকেছি।
[২]অর্থাৎ এর উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অশুভ পরিণতিকে ভয় করে এবং আমার উপদেশ গ্রহণ করে ঈমান আনবে।
আল-কাসাস 28:52
এর পূর্বে আমি যাদেরকে গ্রন্থ দিয়েছিলাম, তারাও এতে বিশ্বাস করে। [১]
[১] এখানে ঐ সকল ইয়াহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যেমন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) ইত্যাদি। অথবা ঐ সকল খ্রিষ্টান যারা হাবশা হতে নবী (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিল এবং তাঁর পবিত্র মুখে কুরআনের বাণী শুনে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। (ইবনে কাসীর)
আল-কাসাস 28:53
যখন তাদের নিকট এ আবৃত্তি করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা এতে বিশ্বাস করি, এ আমাদের প্রতিপালক হতে আগত সত্য। অবশ্যই আমরা পূর্ব হতেই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) ছিলাম।’[১]
[১] এখানে ঐ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যা কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আর তা এই যে, যুগে যুগে আল্লাহর প্রেরিত নবীগণ যে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন তা হল ইসলাম। ঐ সব নবীদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে 'মুসলিম' বলা হত। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান প্রভৃতি পরিভাষা মানব-রচিত; যা পরবর্তীতে আবিষ্কার হয়েছে। এই হিসাবেই নবী (সাঃ)-এর প্রতি যেসব ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা ঈমান এনেছিল তারা বলেছিল, আমরা তো আগে হতেই মুসলিম ছিলাম। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী নবীদের মান্যকারী ও তাঁদের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী (এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী) ছিলাম।
আল-কাসাস 28:54
ওদেরকে দু’বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল।[১] ওরা ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে[২] এবং আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।
[১] 'ধৈর্যশীলতা' বলতে সর্বাবস্থায় আম্বিয়া ও আল্লাহর কিতাবের উপর ঈমান আনা এবং তার উপর দৃঢ়তার সাথে অবিচলিত থাকা। যারা পূর্ববর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান এনেছেন এবং তারপর পরবর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান আনেন, তাঁদের জন্য রয়েছে ডবল পুরস্কার। হাদীসেও তাঁদের এই মর্যাদা বর্ণনা করে নবী (সাঃ) বলেছেন, "তিন শ্রেণীর লোককে দ্বিগুণ সওয়াব দান করা হবে। ওদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হল, সেই ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান; যে নিজ নবীর উপর ঈমান এনেছিল, তারপর আমার উপর ঈমান আনল।
(বুখারীঃ শিক্ষা অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
[২] অর্থাৎ, অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণে অন্যায় করে না (ইট খেয়ে পাটকেল ছুঁড়ে না); বরং ক্ষমা করে দেয় ও উপেক্ষা করে চলে।
আল-কাসাস 28:55
ওরা যখন অসার বাক্য[১] শ্রবণ করে, তখন ওরা তা পরিহার করে চলে এবং বলে, আমাদের কাজের জন্য আমরা দায়ী এবং তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী; তোমাদের প্রতি সালাম।[২] আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।
[১] এখানে 'অসার বাক্য' বলতে উদ্দেশ্য সেই গাল-মন্দ ও দ্বীনের সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ যা মুশরিকরা করত।
[২] এখানে 'সালাম' বলতে অভিবাদন বা সাক্ষাতের সালাম নয়; বরং বিদায় বা সঙ্গ ত্যাগ করার সালাম বুঝানো হয়েছে। যার অর্থ আমরা তোমাদের মত মূর্খদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করার লোক নই। যেমন বলা হয়, 'দুর্জনেরে পরিহারি, দূরে থেকে সালাম করি।' অর্থাৎ তার সঙ্গে কথাবার্তা না বলা, তাকে পরিহার, বর্জন ও উপেক্ষা করা।
আল-কাসাস 28:56
কাকেও প্রিয় মনে করলে তুমি তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎপথের অনুসারী। [১]
[১] এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সাঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। তখন তিনি চেষ্টা করলেন যাতে চাচা একবার নিজ মুখে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাণী উচ্চারণ করুক, যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু সেখানে কুরাইশ নেতাদের উপস্থিতির কারণে আবূ তালেব ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থাকে এবং কুফরের উপরই তার মৃত্যু হয়। নবী (সাঃ) এর জন্য অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। এই সময় মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, তোমার কাজ কেবলমাত্র পৌঁছিয়ে দেওয়া ও আহবান করা। আর হিদায়াত দান করা আমার কাজ। হিদায়াত সেই ব্যক্তিই লাভ করে থাকে, যাকে আমি হিদায়াত দান করি। তুমি যাকে হিদায়াতের উপর দেখতে পছন্দ কর, সে হিদায়াত পায় না। (বুখারীঃ সূরা কাস্বাসের তাফসীর পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
আল-কাসাস 28:57
ওরা বলে, ‘আমরা যদি তোমার পথ ধরি, তবে আমাদের দেশ হতে আমাদেরকে উৎখাত করা হবে।’[১] আমি কি ওদেরকে (মক্কায়) এক নিরাপদ হারামে (পবিত্র স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করিনি;[২] যেখানে আহারের জন্য আমার নিকট থেকে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয়?[৩] কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না।
[১] অর্থাৎ, আমরা যেখানে বসবাস করছি সেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে দেওয়া হবে না এবং আমাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট অথবা বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। এ ছিল কিছু কাফেরদের ঈমান না আনার খোঁড়া ওজর। আল্লাহ তাদের উত্তরে বললেন, "আমি কি---।"
[২] অর্থাৎ, তাদের এই ওজর যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ, যে শহরে তারা বাস করে, সে শহরকে আল্লাহ নিরাপত্তা ও শান্তির শহর বানিয়েছেন। যদি এই শহর তাদের কুফরী ও শিরক সত্ত্বেও শান্তির হয়ে থাকে, তাহলে ঈমান আনার পর কি এই শহর শান্তির থাকবে না?
[৩] এটি মক্কার এমন এক বৈশিষ্ট্য; যা লক্ষ লক্ষ হজ্জ ও উমরাহ আদায়কারীগণ প্রত্যক্ষ করে থাকেন। মক্কায় উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত রকমের ফলমূল ও পৃথিবীর নানান আসবাব-পত্র সেখানে পাওয়া যায়।
আল-কাসাস 28:58
কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা নিজেদের ভোগ-সম্পদের জন্য গর্বিত ছিল। এগুলিই তো ওদের ঘরবাড়ী; ওদের পর এগুলিতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে।[১] আর আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী! [২]
[১] এখানে মক্কাবাসীদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে যারা তার কৃতজ্ঞতা করেনি, তাদের পরিণতি কি হয়েছে? আজ-কাল তাদের অধিকাংশ আবাদী ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে বা তাদের নাম শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে। এখন কোন যাত্রী তার যাত্রাপথে সেই সব জায়গায় হয়তো একটু জিরিয়ে নেয়। কিন্তু অশুভ পরিণামের কারণে সেখানে কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায় না।
[২] অর্থাৎ, তাদের কেউ বেঁচে ছিল না, যে তাদের ঘর-বাড়ি ও ধন সম্পদের উত্তরাধিকারী হত।
আল-কাসাস 28:59
তোমার প্রতিপালক তাঁর বাক্য আবৃত্তি করার জন্য প্রধান জনপদে রসূল প্রেরণ না করে জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না[১] এবং তিনি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করেন যখন এর অধিবাসীরা সীমালংঘন করে। [২]
[১] অর্থাৎ, প্রমাণ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে কাউকেও ধ্বংস করি না। أُمِّهَا (প্রধান) শব্দ দ্বারা জানা গেল যে, সমস্ত ছোট-বড় এলাকায় নবী আসেননি; বরং এলাকার প্রধান শহরে নবী আসতেন এবং ছোট ছোট এলাকার জনপদ তার অধীনস্থ হত।[২] নবী পাঠানোর পর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান না আনত এবং কুফরী ও শিরকের উপর অটল থাকত, তাহলে তাদেরকে ধ্বংস করা হত। এ কথা সূরা হূদের ১১:১১৭ নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।
আল-কাসাস 28:60
তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য এবং যা আল্লাহর নিকট আছে, তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না? [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের এই বাস্তবিকতা কি অজানা যে, এই পৃথিবী ও তার চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী ও তুচ্ছ। আর মহান আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য এমন নিয়ামত ও সুখ-শান্তি রেখেছেন যা চিরস্থায়ী ও উত্তম। হাদীসে এসেছে, "আল্লাহর শপথ! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার মূল্য এমন যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে বের করে নিয়ে দেখুক সমুদ্রের তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটা পানি লেগেছে। (মুসলিমঃ জান্নাতের বিবরণ অধ্যায়, দুনিয়া ধ্বংস ও হাশরের বর্ণনা পরিচ্ছেদ)
আল-কাসাস 28:61
যাকে আমি উত্তম (পুরস্কারের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যা সে লাভ করবে, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগসম্ভার দিয়েছি, যাকে পরে কিয়ামতের দিন (অপরাধীরূপে) উপস্থিত করা হবে?[১]
[১] অর্থাৎ, শাস্তি ও আযাবের যোগ্য হবে। ঈমানদার লোক আল্লাহর প্রতিশ্রুতি মত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে এবং অবাধ্য লোক শাস্তি ও আযাবগ্রস্ত হবে। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে?
আল-কাসাস 28:62
এবং সেদিন ওদেরকে আহবান করে বলা হবে, ‘তোমরা যাদেরকে আমার শরীক ধারণা করতে, তারা কোথায়?’ [১]
[১] অর্থাৎ, মূর্তি বা ব্যক্তি যাদেরকে পৃথিবীতে আমার ইবাদতে শরীক করা হত, যাদেরকে সাহায্যের জন্য আহবান করা হত এবং যাদের নামে নযর-নিয়ায পেশ করা হত, তারা আজ কোথায়? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে এবং আমার আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে? মহান আল্লাহ এ কথাগুলি তাদেরকে তিরস্কার ও ধমক স্বরূপ বলবেন। নচেৎ সেখানে আল্লাহর সামনে লেজ হিলাবার ক্ষমতা কার হবে? এ বিষয়টি সূরা আনআমের ৬:৯৪ নং আয়াত ছাড়াও অন্যান্য আরো আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
আল-কাসাস 28:63
যাদের জন্য শাস্তি অবধারিত হয়েছে তারা বলবে,[১] ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যাদেরকে আমরা পথভ্রান্ত করেছিলাম --এরা তারা।[২] এদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম যেমন আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম।[৩] এদের জন্য আমরা দায়ী নই।[৪] এরা আমাদের পূজা করত না।’ [৫]
[১] অর্থাৎ, যারা আল্লাহর আযাবের যোগ্য বিবেচিত হবে যেমন, বড় বড় অবাধ্য শয়তান এবং কুফরী ও শিরকের দিকে আহবানকারী নেতা প্রভৃতিরা বলবে।[২] এখানে ঐ সকল মূর্খ জনসাধারণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাদেরকে শয়তান এবং কুফরী ও শিরকের দিকে আহবানকারী নেতারা পথভ্রষ্ট করেছিল।[৩] অর্থাৎ, আমরা তো পথভ্রষ্ট ছিলামই; কিন্তু তাদেরকেও নিজেদের সঙ্গে পথভ্রষ্ট করেছিলাম। উদ্দেশ্য এই যে, আমরা তাদের প্রতি কোন প্রকার জোর-জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করিনি; বরং আমাদের সামান্যতম ইশারাতেই তারা আমাদের মতই ভ্রষ্ট পথ অবলম্বন করেছিল।[৪] আমরা তাদের সাথে সম্পর্কহীন ও তাদের থেকে পৃথক। তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। মোটকথা, দুনিয়ায় অনুসারী ও অনুসৃত বা গুরু-শিষ্য কিয়ামতে এক অপরের শত্রু হয়ে যাবে।[৫] বরং বাস্তবে তারা নিজেদের প্রবৃত্তির পূজা ও দাসত্ব করত। অর্থাৎ, আজ পৃথিবীতে যাদের ইবাদত, দাসত্ব ও পূজা হচ্ছে তারা সকলে নিজেদের ইবাদত, দাসত্ব ও পূজার কথা অস্বীকার করবে। এই বিষয়টি কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। যেমনঃ সূরা বাক্বারাহ ২:১৬৬-১৬৭, সূরা আনআম ৬:৪৯, সূরা মারয়্যাম ১৯:৮১-৮২, সূরা আহক্বাফ ৪৬:৫-৬, সূরা আনকাবূত ২৯:২৫ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
আল-কাসাস 28:64
ওদেরকে বলা হবে, ‘তোমাদের দেবতাগুলিকে আহবান কর।’[১] তখন ওরা ওদেরকে আহবান করবে; কিন্তু ওরা ওদের আহবানে সাড়া দেবে না। ওরা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।[২] হায়, ওরা যদি সৎপথ অনুসরণ করত (তাহলে তা প্রত্যক্ষ করত না)। [৩]
[১] অর্থাৎ, তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর, যেমন পৃথিবীতে করতে। দেখ, তারা তোমাদেরকে কোন প্রকার সাহায্য করে কি না? অতঃপর তারা তাদেরকে আহবান করবে; কিন্তু সেখানে কার সাহস হবে যে, সে বলবে, আমি তোমার সাহায্য করব।[২] অর্থাৎ, নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করে নেবে যে, আমরা সকলে জাহান্নামের জ্বালানী হব।[৩] অর্থাৎ,আযাব দেখে নেওয়ার পর তারা আশা করবে, হায়! যদি পৃথিবীতে হিদায়াতের পথ ধরতাম, তাহলে আজ এই পরিণাম হতে বেঁচে যেতাম। সূরা কাহফের ১৮:৫২-৫৩ নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
আল-কাসাস 28:65
সেদিন আল্লাহ ওদেরকে ডেকে বলবেন, ‘তোমরা রসূলগণকে কি জবাব দিয়েছিলে?’ [১]
[১] পূর্বের আয়াতসমূহে তাওহীদ সম্বন্ধে প্রশ্ন ছিল। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন রিসালাত সম্পর্কে করা হবে। অর্থাৎ, আমি তোমাদের নিকট রসূল পাঠিয়েছিলাম, তোমরা তাঁদের সাথে কিরূপ আচরণ প্রদর্শন করেছ? তোমরা তাঁদের আহবানে সাড়া দিয়েছিলে কি না? যেমন কবরে প্রশ্ন করা হবে, তোমার নবী কে? তোমার ধর্ম কি? সুতরাং মু'মিন হলে সঠিক উত্তর দেবে। কিন্তু কাফের বলবে 'হাহ হাহ লা আদরী' হায় আফসোস! আমি তো কিছুই জানি না। অনুরূপ কিয়ামত দিবসেও উক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। সেই জন্য পরবর্তীতে বলা হয়েছে, "সেদিন তাদের সকল খবর বিলুপ্ত হয়ে যাবে।" অর্থাৎ, কোন প্রকার দলীল-প্রমাণ বুঝে আসবে না, যা তারা পেশ করতে পারে। এখানে দলীলকে 'খবর' বলে ব্যক্ত করে এই কথার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাদের বাতিল বিশ্বাসের স্বপক্ষে তাদের নিকট কোন দলীলই নেই। বরং তাদের নিকট আছে গল্প ও কাহিনী; যেমন আজ-কাল কবর পূজারীদের কাছেও কারামতির বানানো গল্পগুচ্ছ ছাড়া আর কিছুই থাকে না।
আল-কাসাস 28:66
সেদিন তাদের সকল খবর বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। [১]
[১] কেননা, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, তারা সকলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আল-কাসাস 28:67
তবে যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে অবশ্যই সফলকাম হবে।
আল-কাসাস 28:68
তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন এখতিয়ার নেই।[১] আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং ওরা যাকে অংশী করে তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।
[১] অর্থাৎ, সমস্ত এখতিয়ার আল্লাহ তাআলার হাতে। তাঁর এখতিয়ারের প্রতিকূলে কারো কোন এখতিয়ারই নেই; সকল এখতিয়ারের মালিক হওয়া তো বহু দূরের কথা।
আল-কাসাস 28:69
ওদের অন্তর যা গোপন করে এবং ওরা যা ব্যক্ত করে, তোমার প্রতিপালক তা জানেন।
আল-কাসাস 28:70
তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, ইহকাল ও পরকালে সকল প্রশংসা তাঁরই এবং বিধান তাঁরই; তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।
আল-কাসাস 28:71
বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি রাত্রির অন্ধকারকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া এমন কোন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের দিবালোক দান করতে পারে? তবুও কি তোমরা কর্ণপাত করবে না?’
আল-কাসাস 28:72
বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি দিনকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া এমন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাবে; যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার। তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?’
আল-কাসাস 28:73
তিনিই নিজ করুণায় তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন; যাতে রাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার এবং দিনে তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার [১] এবং যাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [২]
[১] দিন-রাত্রি মহান আল্লাহর দু'টি বড় নিয়ামত। রাত্রিকে অন্ধকারময় করছেন, যাতে মানুষ বিশ্রাম নিতে পারে। এই অন্ধকারের ফলে (একই এলাকাভুক্ত প্রায়) সকল জীব ঘুমাতে ও বিশ্রাম নিতে বাধ্য হয়। নচেৎ যদি ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়ার জন্য প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সময় হত, তাহলে কেউই ভালভাবে ঘুমাতে পেত না। অথচ জীবিকার খোঁজে দৌড়াদৌড়ি ও কাজ-কারবারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ঘুম ছাড়া শরীরের শক্তি বহাল থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং যদি কিছু লোক ঘুমাত ও কিছু লোক কাজ-কারবারে ব্যস্ত থাকত, তাহলে ঘুমিয়ে থাকা লোকেদের ঘুম ও আরামে ব্যাঘাত ঘটত। অনুরূপ মানুষ এক অপরের সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হত; অথচ এ সংসারের কর্ম-নীতি এক অপরের সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। সেই জন্য মহান আল্লাহ রাত্রিকে অন্ধকার বানিয়েছেন, যাতে সকল মানুষ একই সময়ে বিশ্রাম নিতে পারে এবং কারো বিশ্রামে বাধা ও ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। অনুরূপ মহান আল্লাহ দিনকে আলোময় করেছেন, যাতে মানুষ দিনের আলোয় নিজেদের কাজ-কারবার সুন্দরভাবে করতে পারে। দিনের আলো না থাকলে মানুষকে যেসব অসুবিধায় পড়তে হত তা প্রত্যেকেরই জানা।
মহান আল্লাহ উক্ত সকল নিয়ামতের মাধ্যমে নিজ একত্ববাদ প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বল যদি মহান আল্লাহ দিন-রাত্রির এই ব্যবস্থা শেষ করে দিয়ে তোমাদের উপর শুধু রাত্রির অন্ধকার বহাল করে দেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কোন মাবূদ আছে কি, যে তোমাদের জন্য দিনের আলো এনে দিতে পারে? অথবা যদি তিনি কেবলমাত্র দিনের আলো তোমাদের উপর বহাল করেন, তাহলে কেউ কি তোমাদের জন্য রাতের অন্ধকার এনে দিতে সক্ষম; যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারবে? নিঃসন্দেহে কেউ নেই। এটা তো আল্লাহর পরিপূর্ণ অনুগ্রহ যে, তিনি দিন-রাত্রির এমন এক নিয়ম তৈরী করেছেন যে, রাত্রির আগমনে দিনের আলো শেষ হয়ে যায়, ফলে (নির্দিষ্ট এলাকার) সকল সৃষ্টি বিশ্রাম গ্রহণ করে। আর রাত্রি পোহালে দিনের আলো সারা এলাকাকে উদ্ভাসিত করে, ফলে মানুষ কাজ-কারবারের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকা অনুসন্ধান করে।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা কর। (এটি মৌখিক কৃতজ্ঞতা।) আর আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ শক্তি-সামর্থ্য ও যোগ্যতা তার আদেশ ও নির্দেশ অনুসারে ব্যয় কর। (এটি হল কর্মগত কৃতজ্ঞতা।)
আল-কাসাস 28:74
সেদিন ওদেরকে আহবান করে বলা হবে, ‘তোমরা যাদেরকে আমার অংশী মনে করতে তারা কোথায়?’
আল-কাসাস 28:75
প্রত্যেক জাতি হতে আমি একজন সাক্ষী বের করব [১] এবং বলব, ‘তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।’[২] তখন ওরা জানতে পারবে (উপাস্য হওয়ার) অধিকার আল্লাহরই [৩] এবং তারা যা উদ্ভাবন করেছিল তা তাদের নিকট হতে উধাও হয়ে যাবে। [৪]
[১] এখানে সাক্ষী বলতে নবীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেক নবীকে তার জাতি হতে আলাদা করে দাঁড় করানো হবে।
[২] অর্থাৎ, পৃথিবীতে আমার নবীদের তওহীদের বাণী পৌঁছে দেওয়ার পরও তোমরা আমার শরীক স্থাপন করতে এবং আমার ইবাদতের সাথে তাদেরও ইবাদত করতে। তার প্রমাণ পেশ কর।
[৩] অর্থাৎ, তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে, কোন প্রমাণ তারা দিতে পারবে না।
[৪] অর্থাৎ, তাদের কোন কাজে আসবে না।
আল-কাসাস 28:76
কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল।[১] আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল।[২] স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, ‘দম্ভ করো না,[৩] আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। [৪]
[১] তার নিজ সম্প্রদায় বানী ইস্রাঈলের উপর যুলুম এই ছিল যে, সে ধন-সম্পদের আধিক্য-গর্বে তাদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করত। আবার কেউ কেউ বলেন, সে ফিরআউনের পক্ষ থেকে বানী ইস্রাঈলের উপর গভর্নর নিযুক্ত ছিল এবং সে তাদের উপর অত্যাচার করত।
[২] تَنُوء এর অর্থ হল تَمِيل (ঝুঁকে পড়া)। যেমন কোন মানুষ যদি কোন ভার বহন করে, তাহলে ভারের কারণে সে এদিক ওদিক ঝুঁকে পড়ে, তেমনি তার চাবির বোঝার ভারও এত বেশি ছিল যে, এক শক্তিশালী দল ঐসব চাবি বহন করতে কষ্ট অনুভব করত।
[৩] অর্থাৎ, ধন-সম্পদ নিয়ে ফখর ও গর্ব করো না। আবার কেউ বলেন, কার্পণ্য করো না।
[৪] অর্থাৎ, গর্বিত দাম্ভিকদেরকে অথবা কৃপণদেরকে তিনি ভালবাসেন না।
আল-কাসাস 28:77
আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর।[১] আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না।[২] তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন [৩] এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।[৪] আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।’
[১] অর্থাৎ, নিজের মাল এমন জায়গায় খরচ কর, যেখানে খরচ করা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন।
[২] অর্থাৎ, পৃথিবীর বৈধ জিনিসেও মধ্যপন্থায় খরচ কর। পৃথিবীর বৈধ জিনিস বলতে কি? খাদ্য, পানি, পোশাক ও বিবাহ ইত্যাদি। এর অর্থ হল, যেমন তোমার উপর তোমার প্রভুর হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর তোমার নিজের, তোমার স্ত্রী-সন্তান এবং মেহমানেরও হক রয়েছে। তুমি তাদের প্রত্যেকের হক আদায় কর।
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়ে তোমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। অতএব তুমি তা অন্যদের জন্য খরচ করে তাদের উপর অনুগ্রহ কর।
[৪] অর্থাৎ, তোমার উদ্দেশ্য যেন পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা না হয়। যেমন সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অসৎ ব্যবহার করো না এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়ো না; কারণ, এ সবে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়ে থাকে।
আল-কাসাস 28:78
সে বলল, ‘এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।’ [১] সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী?[২] আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না।[৩]
[১] এই সব উপদেশের জবাবে সে এ কথা বলেছিল। যার অর্থ হল, উপার্জন ও ব্যবসার যে দক্ষতা আমার রয়েছে এ সম্পদ তো তারই ফসল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কি? এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ আমাকে এই সম্পদ দিয়েছেন, যেহেতু তিনি জানেন যে, আমি এর উপযুক্ত। আর তিনি আমার জন্য এটি পছন্দ করেছেন। যেমন, অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ মানুষের অন্য একটি কথা উল্লেখ করেছেন, "মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহবান করে; অতঃপর যখন আমি তাকে অনুগ্রহ প্রদান করি তখন সে বলে, 'আমি তো এ আমার জ্ঞানের মাধ্যমে লাভ করেছি।' বস্তুতঃ এ এক পরীক্ষা, কিন্তু ওদের অধিকাংশই জানে না।" (সূরা যুমার ৩৯:৪৯ আয়াত) অর্থাৎ, আমাকে এই অনুগ্রহ এই জন্যই দান করা হয়েছে যেহেতু আল্লাহর জ্ঞানে আমি এর উপযুক্ত ছিলাম। অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, "দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর যখন আমি তাকে অনুগ্রহের আস্বাদ দিই, তখন সে বলেই থাকে, 'এ আমার প্রাপ্য।" (সূরা হা-মী-ম সাজদাহ ৪১:৫০ আয়াত) অর্থাৎ, আমি তো এর উপযুক্ত। কেউ কেউ বলেন, কারূন 'কিমিয়া' (সোনা তৈরী করার বিদ্যা) জানত। (তার কাছে পরশমণি পাথর ছিল।) এখানে এই অর্থ বুঝানো হয়েছে। এই বিদ্যার ফলেই সে এত বিশাল ধনী হয়েছিল। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, এই বিদ্যার কথা মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি। কারণ, কোন মানুষ কোন জিনিসের আসলত্ব পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। সেই জন্য কারূনের জন্যও এটি সম্ভব ছিল না যে, অন্য ধাতুকে সোনায় পরিণত করবে এবং এভাবে সে ধনরাশি জমা করবে।[২] অর্থাৎ, শক্তি ও ধনের আধিক্য মান-মর্যাদার মাপকাঠি হতে পারে না। যদি তাই হত তাহলে পূর্বের জাতিরা ধ্বংস হত না। সেই জন্য কারূনের নিজ সম্পদের উপর গর্ব-অহংকার করা আর এটিকে সম্মানের কারণ মনে করার কোন কিছুই নেই।[৩] অর্থাৎ, পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং যার কারণে পাপী আযাবের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তখন তাকে পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় না। বরং তাকে পাকড়াও করা হয়।
আল-কাসাস 28:79
কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। [১] যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল,[২] ‘আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।’
[১] অর্থাৎ, শোভা-সৌন্দর্য, সাজ-সজ্জা ও চাকর-বাকরসহ।
[২] এ কথা কারা বলেছিল? কেউ কেউ বলেন, ঈমানদার লোকেরাই কারূনের আধিপত্য ও ধন-সম্পদে প্রভাবিত হয়ে এ কথা বলেছিল। আবার কেউ বলেন, এ কথা বলেছিল কাফেররা।
আল-কাসাস 28:80
আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ‘ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ।[১] আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।’[২]
[১] অর্থাৎ, যাদের নিকট ধর্মীয় জ্ঞান ছিল এবং পৃথিবীর বাহ্যিক চাকচিক্য ও তার আসল স্বরূপ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল, তারা বলল, এটা কি? এটা তো কিছুই না। আল্লাহ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্য যে প্রতিদান ও পুণ্য রেখেছেন তা এর তুলনায় অনেকগুণ শ্রেয়। যেমন হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, "আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি এবং কারো কল্পনাতেও তা আসেনি।"
(বুখারীঃ তাওহীদ অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
[২] يَلَقَّاهَا এর هَا (তা) সর্বনাম দ্বারা পূর্বের বাক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর এটি আল্লাহর উক্তি। অন্যথা যদি এটিকে জ্ঞানীদের কথার শেষাংশ ধরে নেওয়া যায়, তাহলে 'তা' বলতে জান্নাত বুঝানো হবে। অর্থাৎ, জান্নাতের অধিকারী ঐ সকল ধৈর্যশীলরাই হবে, যারা পৃথিবীর ভোগ-বিলাস হতে দূরে থেকে কেবলমাত্র আখেরাতের জীবনের প্রতি আগ্রহী থাকে।
আল-কাসাস 28:81
অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম।[১] তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না।
[১] অর্থাৎ, কারূনকে তার অহংকারের ফলে প্রাসাদ ও সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলাম। হাদীসে আছে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "এক ব্যক্তি তার লুঙ্গি মাটিতে ছেঁচড়ে চলছিল। (আল্লাহর নিকট তার এই অহংকার ঘৃণিত ছিল।) ফলে তিনি তাকে ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলেন; সে কিয়ামত পর্যন্ত মাটিতে ধসতেই থাকবে।" (বুখারী পোষাক অধ্যায়)
আল-কাসাস 28:82
পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল,[১] ‘দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন।[২] দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।’ [৩]
[১] مَكَان বলতে পার্থিব সম্মান ও মান-মর্যাদা, যা কোন ব্যক্তিকে পৃথিবীতে সাময়িকভাবে দেওয়া হয়ে থাকে; যেমন কারূনকে দেওয়া হয়েছিল। أَمْس গতকালকে বলা হয়। কিন্তু এখানে নিকটবর্তী সময় বুঝানো হয়েছে। وَيكَأَنَّ আসলে وَيلَكَ اعلَمُ أَنَّ ছিল। অর্থাৎ, আফসোস বা আশ্চর্য! তোমার জানা উচিত ছিল। কেউ কেউ বলেন, এটি أَلَم تَرَ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। (ইবনে কাসীর) এর পূরো অর্থ হল কারূনের মত ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার অভিলাষী ব্যক্তিরা যখন কারূনের শিক্ষণীয় করুণ পরিণতি দেখল, তখন তারা বলল, ধন-দৌলত এই কথার প্রমাণ নয় যে, ধনবান ব্যক্তির উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট। তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ কাউকে মাল বেশি দেন, আবার কাউকেও কম। এর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার ও হিকমতের সাথে যা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। মালের আধিক্য তাঁর সন্তুষ্টির ও মাল না থাকা তাঁর অসন্তুষ্টির প্রমাণ বহন করে না। যেমন এসব মান-ইজ্জতের মাপকাঠিও নয়।
[২] অর্থাৎ, আমাদের পরিণাম ঐরূপ হত, যেরূপ কারূনের হয়েছিল।
[৩] অর্থাৎ, কারূন সম্পদ পেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞ না হয়ে অকৃতজ্ঞতা ও পাপের পথ অবলম্বন করল। সুতরাং দেখ তার পরিণাম কি হল?
আল-কাসাস 28:83
এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। [১]
[১] عُلُوّ এর অর্থ যুলুম ও ঔদ্ধত্য করা, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, গর্ব ও অহংকার করা। আর فَسَاد এর অর্থঃ অন্যায়ভাবে অন্যের মাল নিয়ে নেওয়া, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। এই দু'টি কারণে পৃথিবীতে ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আর যারা পরহেযগার ও সাবধানী তাদের কর্ম ও চরিত্র উক্ত সকল পাপ হতে পবিত্র থাকে। তাদের চরিত্র অহংকারের পরিবর্তে বিনয় ও পাপাচারের বদলে আল্লাহর আনুগত্যে পরিপূর্ণ থাকে। আর আখেরাতের ঘরঃ অর্থাৎ, জান্নাত ও শুভ পরিণাম তাদেরই ভাগ্যে জুটবে।
আল-কাসাস 28:84
যে কেউ সৎকাজ করে, সে তার কর্ম অপেক্ষা অধিক ফল পাবে [১] আর যে মন্দ কাজ করে, সে তো কেবল তার কর্মের অনুপাতে শাস্তি পাবে। [২]
[১] প্রত্যেক নেকীর বদলা কম পক্ষে দশগুণ পাওয়া যাবে। আর আল্লাহ যার জন্য চাইবেন, তাকে এর চেয়ে অনেক অনেকগুণ বেশি দান করবেন।
[২] পুণ্যের বদলা বেশি দেওয়া হবে, কিন্তু পাপের বদলা পাপের সমানই দেওয়া হবে। অর্থাৎ, পুণ্যের প্রতিদানে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপা এবং পাপের প্রতিফল দানে তাঁর ন্যায় বিচারের প্রকাশ ঘটবে।
আল-কাসাস 28:85
যিনি তোমার জন্য কুরআন (অবতীর্ণ) অপরিহার্য করেছেন[১] তিনি তোমাকে অবশ্যই স্বদেশে ফিরিয়ে আনবেন।[২] বল, ‘আমার প্রতিপালক ভাল জানেন কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।’ [৩]
[১] অথবা তার তিলাঅত ও প্রচার তোমার উপর আবশ্যিক করেছেন।
[২] অর্থাৎ, তোমার জন্মস্থান মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন, যেখান হতে তুমি বের হতে বাধ্য হয়েছিলে। সহীহ বুখারীতে ইবনে আববাস (রাঃ) হতে এই ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং হিজরতের আট বছর পর আল্লাহর উক্ত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছিল। তিনি অষ্টম হিজরীতে বিজয়ীর বেশে মক্কায় দ্বিতীয়বার প্রবেশ করেন। কেউ কেউ مَعَاد এর অর্থ কিয়ামত নিয়েছেন। অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তিনি তাঁর নিকটে তোমাকে ফিরিয়ে আনবেন এবং রিসালাত ও কুরআন প্রচারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।
[৩] মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে পূর্ব-পুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করার জন্য পথভ্রষ্ট মনে করত। তারই উত্তর এই বাক্যে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমার প্রভু খুব ভাল জানেন যে, পথভ্রষ্ট আমি, যে আল্লাহর নিকট হতে সুপথ নিয়ে এসেছে, নাকি তোমরা, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সুপথ গ্রহণ কর না।
আল-কাসাস 28:86
তুমি আশা করনি যে, তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হবে।[১] এ তো কেবল তোমার প্রতিপালকের করুণা।[২] সুতরাং তুমি কখনও অবিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষক হয়ো না। [৩]
[১] অর্থাৎ, নবুঅত প্রাপ্তির আগে তোমার ধারণাও ছিল না যে, তোমাকে রিসালাতের জন্য নির্বাচিত করা হবে এবং তোমার উপর আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হবে।
[২] অর্থাৎ, নবুঅত ও কিতাব দান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফল যা তোমার উপর করা হয়েছে। এখান হতে জানা গেল যে, নবুঅত কোন উপার্জন-লভ্য জিনিস নয়, যা চেষ্টা-চরিত্র ও শ্রম ব্যয়ের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। বরং এটি সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত জিনিস, আল্লাহ তাআলা নিজের বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চেয়েছেন তাকে নবুঅত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন। পরিশেষে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে উক্ত ধারার শেষ নবী ঘোষণা করে নবুয়তের দ্বার চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন।
[৩] এখন এই নিয়ামত ও ইলাহী অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা এইভাবে আদায় কর যে, কাফেরদের সাহায্য করবে না এবং তাদের পক্ষ অবলম্বন করবে না।
আল-কাসাস 28:87
তোমার প্রতি আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ করার পর ওরা যেন তোমাকে কিছুতেই সেগুলি হতে বিমুখ না করে ফেলে।[১] তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে আহবান কর এবং কিছুতেই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
[১] অর্থাৎ, কাফেরদের কথা-বার্তা, তাদের অত্যাচার উৎপীড়ন, দাওয়াত ও তবলীগের রাস্তায় তাদের বাধা দান যেন তোমাকে কুরআন পাঠ ও তার বাণী প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি না করে। বরং তুমি পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে যাও।
আল-কাসাস 28:88
তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডেকো না,[১] তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাঁর মুখমন্ডল[২] ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই [৩] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [৪]
[১] অর্থাৎ, অন্য কারো ইবাদত করো না। না দু'আর মাধ্যমে, না নযর-মানতের মাধ্যমে আর না কুরবানীর মাধ্যমে। কারণ, এগুলি ইবাদত বলে গণ্য, যা কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করাকে কুরআনের ভাষায় 'আহবান করা' বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হল এ কথা স্পষ্ট করা যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যকে --যা করার তার ক্ষমতা নেই তার জন্য-- ডাকা, সাহায্য প্রার্থনা করা, তার নিকট দু'আ করা, বিনয়-নম্র হওয়া --এ সব করাই হল তার ইবাদত করা। যার কারণে মানুষ মুশরিকে পরিণত হয়।[২] وَجهَه (তাঁর মুখমন্ডল) বলতে স্বয়ং আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেক বস্তুই নশ্বর।{كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ} অর্থাৎ, ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)। (সূরা রাহমান ৫৫:২৬-২৭ আয়াত)[৩] অর্থাৎ, তিনি যা চান সেই ফায়সালাই মান্য হয় এবং তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর আদেশ বলবৎ হয়।[৪] যাতে তিনি সৎকর্মশীলদের সৎকর্মের ও অসৎ কর্মশীলদের অসৎ কর্মের প্রতিদান দেন।
আল-আনকাবুত 29:1
আলিফ-লাম-মীম;
আল-আনকাবুত 29:2
মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি’ এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [১]
[১] অর্থাৎ, মৌখিকভাবে ঈমান আনার পর তাদের কোন পরীক্ষা না নিয়েই এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে --এই ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। বরং তাদের জান-মালে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং অন্যান্য সমস্যা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাতে আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা এবং মু'মিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়।
আল-আনকাবুত 29:3
আমি অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম;[১] সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী।
[১] অর্থাৎ, এটি হল আল্লাহর একটি নিয়ম যা আদি কাল হতে চলে আসছে। সেই জন্য তিনি এই জাতির মু'মিনদেরও পরীক্ষা নেবেন; যেমন পূর্ববর্তী জাতির নেওয়া হয়েছে। এই সকল আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে যে বর্ণনা রয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে, সাহাবা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট মক্কার কাফেরদের অত্যাচার ও উৎপীড়নের কথা অভিযোগ করে দু'আর আবেদন জানালেন, যাতে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন। তিনি বললেন, দুখঃ-কষ্ট ভোগ করা ঈমানদারদের ইতিহাসের একটি অংশ। তোমাদের পূর্বের কোন কোন মু'মিনকে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে করাত দিয়ে তাকে দু'ফাঁক করে দেওয়া হয়েছে। অনুরূপ লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের শরীর হতে গোশত আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত অত্যাচার তাদেরকে হক পথ হতে ফেরাতে পারেনি। (বুখারীঃ আম্বিয়ার হাদীস অধ্যায়) আম্মার, তাঁর মাতা সুমাইয়্যাহ ও পিতা ইয়াসির, সুহায়েব, বিলাল ও মিকদাদ (রাঃ) ইত্যাদি সাহাবাদের উপর ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে যে অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গা হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত আছে। এই পরিস্থিতি ও ঘটনাবলীই এসব আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। পরন্তু আয়াতের সাধারণ অর্থের দিক দিয়ে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সকল ঈমানদারও এতে শামিল।
আল-আনকাবুত 29:4
যারা মন্দ কাজ করে, তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে?[১] তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! [২]
[১] অর্থাৎ, আমার নিকট থেকে পালিয়ে যাবে এবং আমার পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর ব্যাপারে তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যখন তিনি সর্বশক্তিমান ও প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে অবগত, তখন তাঁর অবাধ্য হয়ে তাঁর পাকড়াও এবং আযাব হতে বাঁচা কিভাবে সম্ভব?
আল-আনকাবুত 29:5
যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে (সে জেনে রাখুক,) আল্লাহর নির্ধারিত কাল নিশ্চয় আসবে।[১] আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।[২]
[১] অর্থাৎ, যারা পরকালে বিশ্বাস করে এবং নেকী ও পুণ্যের আশায় সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের আশা পূর্ণ করবেন। তাদেরকে তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দান করবেন। কেননা কিয়ামত অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে এবং তাঁর ন্যায় বিচার নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত হবে।
[২] তিনি বান্দার কথা ও দু'আ শ্রবণকারী এবং গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল কর্ম সম্পর্কে অবগত। তিনি সেই অনুযায়ী ফলাফল অবশ্যই দান করবেন।
আল-আনকাবুত 29:6
যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন। [১]
[১] এর অর্থ {مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاء فَعَلَيْهَا} এর মত। (সূরা জাসিয়াহ ৪৫:১৫ আয়াত) অর্থাৎ, যে ভাল কাজ করবে তার ফল সে নিজেই ভোগ করবে। তাছাড়া আল্লাহ বান্দাদের কোন কাজের মুখাপেক্ষী নন। যদি পৃথিবীর সবাই আল্লাহর পরহেযগার বান্দা হয়ে যায়, তাহলে তার ফলে তাঁর রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি হবে না। আর যদি সকল মানুষই আল্লাহর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে যায়, তাহলেও তাঁর রাজ্যে কোন প্রকার কমি আসবে না। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এতে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদও শামিল। কারণ, এটিও অন্যতম সৎকর্ম।
আল-আনকাবুত 29:7
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের দোষত্রুটিসমূহকে মার্জনা করে দেব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের উত্তম ফলদান করব। [১]
[১] মহান আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টি হতে অমুখাপেক্ষী। কিন্তু তিনি কেবল কৃপা ও অনুগ্রহ করে ঈমানদারদের উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং এক একটি পুণ্যের কয়েক গুণ বেশি সওয়াব দান করবেন।
আল-আনকাবুত 29:8
আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি,[১] তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে অংশী করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না।[২] আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা কিছু করেছ, আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।
[১] কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তাঁর একত্ববাদের ও ইবাদতের আদেশ দানের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করারও আদেশ দিয়েছেন। যাতে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর প্রতিপালকত্ব ও উপাস্যত্বের চাহিদা তারাই সঠিকভাবে বুঝতে ও পূরণ করতে পারে, যারা পিতা-মাতার আনুগত্য ও খিদমতের চাহিদাকে বুঝে ও পূরণ করে থাকে। যে ব্যক্তি এ কথা বুঝতে অক্ষম যে, পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব তার মাতা-পিতার মিলনের একান্ত ফল এবং তার লালন-পালন তাদের সীমাহীন করুণা ও মায়া-মমতার ফসল। অতএব তাদের খিদমতে কোন প্রকার অনীহা ও তাদের কথার কোন প্রকার অবাধ্যতা প্রকাশ করা কোনক্রমেই সন্তানের উচিত নয়। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান অবশ্যই সৃষ্টিকূলের সৃষ্টিকর্তাকে বুঝতে এবং তাঁর একত্ববাদ ও ইবাদতের চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। এই কারণেই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ হাদীসেও এসেছে। এক হাদীসে মাতা-পিতার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলা হয়েছে। (সূরা ইসরা ১৭:২৩-২৪ আয়াত দ্রষ্টব্য)[২] অর্থাৎ, মাতা-পিতা যদি শিরক করতে (অনুরূপ অন্যান্য পাপ করতে) আদেশ করে এবং এর জন্য তারা যদি চাপ সৃষ্টি করে, তবুও তাদের আনুগত্য করা চলবে না। কেননা, لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন ব্যক্তির আনুগত্য চলবে না। (আহমাদ ৫/৬৬, হাকেম, সহীহুল জামে' ৭৫২০নং) এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে সা'দ বিন আবী অক্কাস (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়। কারণ যখন তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন, তখন তাঁর মাতা শপথ করেছিলেন যে, আমি আমরণ পানাহার করব না; যদি না তুমি মুহাম্মাদের নবুঅতকে অস্বীকার করেছ! শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর মাতার মুখে জোরপূর্বক খাবার পুরে দিয়েছিলেন। যার জন্য উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।(মুসলিম, তিরমিযীঃ সূরা আনকাবূতের ব্যাখ্যা পরিচ্ছেদ)
আল-আনকাবুত 29:9
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব। [১]
[১] অর্থাৎ, যদি কারো পিতা-মাতা মুশরিক হয়, তাহলে তার মুসলিম পুত্র সৎ লোকদের সঙ্গী হবে, পিতা-মাতার সঙ্গী নয়; যদিও সে তার সংসার জীবনে মাতা-পিতার বেশি নিকটবর্তী ছিল। কিন্তু তার ভালবাসা ছিল কেবলমাত্র মুসলিমদের জন্য, সেই হিসাবে المَرْءُ مَع مَن أَحَبّ এর ভিত্তিতে সে সৎকর্মশীলদেরই দলভুক্ত হবে।
আল-আনকাবুত 29:10
মানুষের মধ্যে কিছু লোক বলে, ‘আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি’; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন ওদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়, তখন ওরা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে।[১] আর তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য এলে[২] অবশ্যই ওরা বলতে থাকে, ‘আমরা তো তোমাদেরই সঙ্গী।’[৩] বিশ্ববাসী (মানুষের) অন্তরে যা কিছু আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? [৪]
[১] এখানে মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের লোকদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যখন ঈমান আনার কারণে কোন আপদ-বিপদ আসে, তখন তা আল্লাহর আযাবের মতই তাদের অসহনীয় হয়ে ওঠে। যার ফলে সে ঈমান হতে ফিরে যায় এবং সাধারণের ধর্মকে বেছে নেয়।
[২] অর্থাৎ, যদি মুসলিমরা বিজয় ও আধিপত্য লাভ করে।
[৩] অর্থাৎ, তোমাদের দ্বীনী ভাই। এ কথাটি অন্যত্র এভাবে বর্ণিত হয়েছে, "যারা তোমাদের (শুভাশুভ পরিণতির) প্রতীক্ষায় থাকে; সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহে তোমাদের বিজয় লাভ হলে তারা (তোমাদেরকে) বলে, 'আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?' আর যদি অবিশ্বাসীদের আংশিক বিজয় লাভ হয়, তাহলে তারা (তাদেরকে) বলে, 'আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে জয়ী ছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে বিশ্বাসীদের হাত থেকে রক্ষা করিনি?' (সূরা নিসা ৪:১৪১আয়াত)
[৪] অর্থাৎ, আল্লাহ কি তোমাদের অন্তরের কথা সম্পর্কে অবগত নন এবং তোমাদের হৃদয়ের গোপন খবর জানেন না? অর্থাৎ, তোমরা মৌখিকভাবে মুসলিমদের সাথী হওয়ার কথা প্রকাশ করছ।
আল-আনকাবুত 29:11
আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা বিশ্বাসী এবং কারা মুনাফিক (কপট)।[১]
[১] এর অর্থ হল যে, মহান আল্লাহ সুখ ও দুঃখ দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন, যাতে মু'মিন ও মুনাফিকের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়। যে উভয় অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য করবে সে মু'মিন, আর যে কেবলমাত্র সুখে-সম্পদে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে আসলে নিজ প্রবৃত্তির অনুগত; আল্লাহর নয়। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,{وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ} অর্থাৎ, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব; যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি। (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩১ আয়াত) যে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদেরকে ভীষণ পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়েছিল, তার পরবর্তীকালে মহান আল্লাহ বলেন,{مَّا كَانَ اللّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىَ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ}অর্থাৎ, অপবিত্র (মুনাফিক)-কে পবিত্র (মু'মিন) হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ আল্লাহ সে অবস্থায় বিশ্ববাসিগণকে ছেড়ে দিতে পারেন না। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৯ আয়াত)
আল-আনকাবুত 29:12
অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, ‘তোমরা আমাদের পথ ধর; আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব!’[১] কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।[২]
[১] অর্থাৎ, তোমরাও পূর্ব-পুরুষদের ঐ ধর্মে ফিরে এস, যে ধর্মের আমরা অনুসারী। কারণ, এটিই সত্য ধর্ম। যদি প্রচলিত ধর্ম পালনের জন্য তোমাদের কোন পাপ হয়, তাহলে তার গুরুভার আমরা বহন করব এবং তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের।[২] মহান আল্লাহ বলেন, ওরা নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। কিয়ামতের দিন এমন হবে যে, সেদিন কেউ কারো বোঝা বহন করবে না। এমনকি আত্মীয়রাও এক অপরের বোঝা বইবে না।{وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِن تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى} (সূরা ফাত্বির ৩৫:১৮ আয়াত) সেখানে এক বন্ধু অপর বন্ধুর খোঁজ নেবে না। তাদের মধ্যে পৃথিবীতে যতই বন্ধুত্ব থাকুক না কেন।{وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيمًا} এখানেও উক্ত বোঝা বহনের কথা খন্ডন করা হয়েছে।
আল-আনকাবুত 29:13
ওরা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং তার সঙ্গে আরও কিছু পাপের বোঝা[১] এবং ওরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
[১] অর্থাৎ, কুফরের নেতারা ও ভ্রষ্টতার দিকে আহবানকারীরা নিজেরা শুধু নিজেদের বোঝাই বইবে না; বরং তার সাথে ঐ সকল লোকেদের পাপের বোঝাও তাদের উপর হবে, যারা তাদের চেষ্টায় পথভ্রষ্ট হয়েছিল। এ বিষয়টি সূরা নাহল ১৬:২৫ নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের মধ্যে আছে, "যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে আহবান করে (দাওয়াত দেয়) সে ব্যক্তির ঐ পথের অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ হবে। এতে তাদের সওয়াব থেকে কিছু মাত্র কম হবে না। আর যে ব্যক্তি অসৎ পথের দিকে আহবান করে সেই ব্যক্তির ঐ পথের অনুসারীদের সমপরিমাণ গোনাহর ভাগী হবে। এতে তাদের গোনাহ থেকে কিছুমাত্র কম হবে না।" (মুসলিম ২৬৭৪নং প্রমুখ) এই নিয়মানুসারে কিয়ামত পর্যন্ত অন্যায়ভাবে যত হত্যা হবে তাদের পাপের একটি অংশ আদমের পুত্র কাবীলের উপর বর্তাবে। কারণ, মানুষের ইতিহাসে সেই প্রথম অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল। (মুসনাদে আহমাদ)
আল-আনকাবুত 29:14
আমি অবশ্যই নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম; সে ওদের মধ্যে অবস্থান করেছিল সাড়ে ন’শ বছর।[১] অতঃপর বন্যা ওদেরকে গ্রাস করল; কারণ ওরা ছিল সীমালংঘনকারী।
[১] কুরআনের শব্দাবলীতে এ কথা জানা যায় যে, এটি ছিল তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের বয়স। তাঁর পূর্ণ বয়স কত ছিল তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেন, নবুঅতের পূর্বে ৪০ বছর ও বন্যার পর ৬০ বছর ঐ সংখ্যায় পরিগণিত। এছাড়া আরো অন্য উক্তিও আছে। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন।
আল-আনকাবুত 29:15
অতঃপর আমি তাকে এবং পানি-জাহাজের আরোহীদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্ব-জগতের জন্য একে করলাম একটি নিদর্শন।
আল-আনকাবুত 29:16
স্মরণ কর ইব্রাহীমের কথা, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর এবং তাঁকে ভয় কর; তোমাদের জন্য এটিই শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।
আল-আনকাবুত 29:17
তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত কেবল প্রতিমার উপাসনা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ;[১] তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর, তারা তোমাদের রুযী দানে অক্ষম। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকটেই রুযী কামনা কর এবং তাঁর উপাসনা ও কৃতজ্ঞতা কর।[২] তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।[৩]
[১] أَوثَان শব্দটি وَثَن এর বহুবচন। যেমন, أَصنَام শব্দটি صَنَم এর বহুবচন। দুয়েরই অর্থ হল প্রতিমা। কেউ কেউ বলেন, স্বর্ণ-রৌপ্য, পিতল ও পাথরের তৈরী মূর্তিকে صَنَم বলা হয়। আর وَثَن মূর্তি এবং চুন-পাথর নির্মিত আস্তানাকেও বলা হয়। تَخلُقُون إِفكًا এর অর্থ تَكذِبُونَ كَذِبًا (মিথ্যা উদ্ভাবন করা)। এর অন্য একটি অর্থ হল, تَعمَلُونها وتَنحِتُونَها لِلإفْك (মিথ্যা উদ্দেশ্য লাভের আশায় তা গড় ও নির্মাণ কর।) ভাবার্থের দিক দিয়ে উভয়ই অর্থ সঠিক। অর্থাৎ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ইবাদত করছ, তারা তো পাথর-নির্মিত মূর্তি মাত্র; না তারা শুনতে পায়, আর না দেখতে, তারা না উপকার করতে পারে, না অপকার। তোমরা নিজেরাই তাদেরকে বানিয়েছ। তাদের সত্য হওয়ার প্রমাণ তো কোন কিছুই তোমাদের নিকট নেই। অথবা এ সকল মূর্তি, যা তোমরা নিজ হাতে তৈরী কর, যখন তা বিশেষ একটি গঠন ও রূপ লাভ করে, তখন তোমরা মনে কর যে, ওর মধ্যে ইলাহী ক্ষমতা এসে গেছে। ফলে তোমরা ওর নিকটে নানা আশা ও কামনা করে থাক। তাদেরকে বিপত্তারণ ও সংকট মোচনকারী হিসাবে মান্য করতে শুরু কর!
[২] যখন এই সকল মূর্তি তোমাদের জীবিকার বা উপার্জনের কোন প্রকার ক্ষমতা রাখে না; তারা না বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে, আর না পৃথিবীতে কোন প্রকার গাছ-পালা উৎপন্ন করতে পারে, না সূর্যের আলো পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে, আর না তোমাদের এমন শক্তি প্রদানে সক্ষম যার দ্বারা প্রকৃতির ঐ সমস্ত জিনিস হতে উপকৃত হতে পার। সুতরাং তোমরা তোমাদের জীবিকা আল্লাহর নিকটেই কামনা কর এবং তাঁরই ইবাদত কর ও তাঁরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
[৩] অর্থাৎ, মৃত্যুবরণ করার পর পুনর্জীবন লাভ করে যখন তাঁর নিকট ফিরে যেতে হবে, তখন তাকে ছেড়ে অন্যের নিকট নিজের মাথা কেন নত কর? তাঁকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত কেন কর? এবং অন্যকে কেন দুঃখ-কষ্ট নিবারণকারী ও প্রয়োজন পূর্ণকারী মনে কর?
আল-আনকাবুত 29:18
তোমরা যদি আমাকে মিথ্যাবাদী বল, তাহলে (জেনে রাখ,) তোমাদের পূর্ববর্তিগণও নবীদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল।[১] আর (সত্যকে) স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেওয়াই রসূলের দায়িত্ব।’[২]
[১] এটি ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তিও হতে পারে যা তিনি নিজ জাতির উদ্দেশ্যে করেছিলেন। অথবা আল্লাহরও কথা হতে পারে যাতে মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর এতে নবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, যদি মক্কার কাফেররা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তাহলে এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছুই নেই। নবীদের সাথে এই আচরণই করা হয়ে থাকে। পূর্বের জাতিরাও তাদের নবীদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে। আর তার কুফলস্বরূপ তাদেরকে পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন হতে হয়েছে।
[২] অতএব তুমিও প্রচারের কাজ চালিয়ে যাও; কেউ হিদায়াতপ্রাপ্ত হোক বা না-ই হোক। এ দায়িত্ব তোমার নয় এবং এ সম্পর্কে তুমি জিজ্ঞাসিতও হবে না। কারণ, হিদায়াত দান করা একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। যিনি নিজ হিকমত ও নিয়মানুসারে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দানে ধন্য করেন। আর অন্যদেরকে ভ্রষ্ট ও অন্ধকার পথের পথিক বানিয়ে উদভ্রান্ত ছেড়ে দেন।
আল-আনকাবুত 29:19
ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন, অতঃপর তা পুনরায় সৃষ্টি করবেন? [১] নিশ্চয়ই এ আল্লাহর জন্য অতি সহজ। [২]
[১] তাওহীদ (একতত্ত্ববাদে) ও রিসালাতের পর এখানে পরকালের প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে, যা কাফেররা অস্বীকার করত। তিনি বলেছেন, প্রথম যখন তোমাদের কোন অস্তিতত্ত্বই ছিল না, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করলেন। তারপর তোমরা দেখা, শোনা ও বুঝার ক্ষমতা লাভ করলে। পরে যখন আবার তোমরা মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যাবে এবং বাহ্যিক দৃষ্টিতে তোমাদের কোনই নাম-নিশান থাকবে না, তখন মহান আল্লাহ তোমাদেরকে পুনর্বার সৃষ্টি করবেন।
[২] অর্থাৎ, তোমাদের কাছে এ কাজ যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা নিতান্ত সহজ কাজ।
আল-আনকাবুত 29:20
বল, ‘পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ,[১] কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেন, অতঃপর তিনি পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’
[১] বিশ্ব-জাহানে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি লক্ষ্য কর। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখ, তাকে কিভাবে বিছিয়ে দিয়েছেন, তাতে পাহাড়-পর্বত নদ-নদী ও সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে বিভিন্ন প্রকার ফল-ফসল উৎপন্ন করেছেন। এ সব কি এ কথার প্রমাণ বহন করে না যে, এ সব সৃষ্টি করা হয়েছে ও এ সবের সৃষ্টিকর্তা কেউ অবশ্যই আছেন?
আল-আনকাবুত 29:21
তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যার প্রতি ইচ্ছা কৃপা করেন। আর তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। [১]
[১] অর্থাৎ, তিনিই প্রকৃত শাসক ও আদেশদাতা। তাঁকে প্রশ্ন করার বা তাঁর কাছে কৈফিয়ত নেওয়ার কেউ নেই। বরং তিনি যে নিয়ম নির্ধারিত করে রেখেছেন, তাঁর আযাব ও রহমত সেই নিয়মানুসারেই হবে।
আল-আনকাবুত 29:22
তোমরা আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারবে না পৃথিবীতে অথবা আকাশে এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক নেই, সাহায্যকারীও নেই।
আল-আনকাবুত 29:23
যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ এবং তাঁর সাক্ষাৎ অস্বীকার করে, তারাই আমার করুণা হতে নিরাশ হয়।[১] আর তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
[১] পৃথিবীতে আল্লাহর রহমত ও করুণা সকল সৃষ্টির জন্য ব্যাপক। যার দ্বারা মু'মিন-কাফের, মুখলিস-মুনাফিক, (একনিষ্ঠ-নিষ্ঠাহীন), ভাল-মন্দ সকল শ্রেণীর মানুষই উপকৃত হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ সকলকেই জীবন উপকরণ ও ধন-সম্পদ দিয়ে থাকেন। এটি আল্লাহর দয়ার সেই পরিব্যাপ্তি, যার সম্পর্কে তিনি বলেন,{وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ} অর্থাৎ, আমার দয়া প্রত্যেক বস্তুতে পরিব্যাপ্ত। কিন্তু পরকাল যেহেতু প্রতিদান ও প্রতিফল পাওয়ার জন্য; মানুষ দুনিয়াতে যে ফসল বপন করবে, সেই ফসল সে আখেরাতে কর্তন করবে। পৃথিবীতে যে যেমন কাজ করবে সেই অনুপাতে তাকে ফল দেওয়া হবে। সেদিন আল্লাহ পক্ষপাতহীন ফায়সালা দান করবেন। পৃথিবীর ন্যায় পরকালেও যদি মু'মিন-কাফের ও ভাল-মন্দের সাথে একই প্রকার ব্যবহার করা হয়, সবাই যদি আল্লাহর দয়ার যোগ্য হয়, তাহলে প্রথমতঃ আল্লাহর ন্যায় বিচারের উপর প্রশ্ন উঠবে এবং দ্বিতীয়তঃ কিয়ামতের উদ্দেশ্য অর্থহীন হয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ কিয়ামত এই জন্যই অনুষ্ঠিত করবেন যে, যারা সৎকর্মশীল তাদেরকে সুখময় স্থান জান্নাত দান করবেন। আর যারা অসৎকর্মশীল তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক স্থান জাহান্নাম দান করবেন। সেই জন্য কিয়ামত দিবসে আল্লাহর রহমত একমাত্র মু'মিনদের জন্যই হবে। এখানেও উক্ত কথাই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যারা পরকাল ও পুনর্জীবন অস্বীকার করবে, তাদের ভাগ্যে আমার রহমত জুটবে না। উক্ত কথাটি সূরা আ'রাফে এই ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে,{فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ} অর্থাৎ, সুতরাং আমি তা (দয়া পরকালে) তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা পরহেযগার হয়, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে। (সূরা আ'রাফ ৭:১৫৬ আয়াত)
আল-আনকাবুত 29:24
উত্তরে ইব্রাহীমের সম্প্রদায় শুধু এই বলল যে, ‘একে হত্যা কর অথবা পুড়িয়ে মার।’[১] কিন্তু আল্লাহ তাকে আগুন হতে রক্ষা করলেন।[২] এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
[১] এই আয়াতগুলোর পূর্বে ইবরাহীম (আঃ)-এর কথা আলোচনা হচ্ছিল। এখন আবার তার শেষাংশ আলোচনা করা হচ্ছে। মাঝে আনুষঙ্গিকভাবে আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর শক্তি-ক্ষমতা সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এ সমস্তই ইবরাহীম (আঃ)-এর উপদেশের অংশবিশেষ, এতে তিনি একত্ববাদ ও পরকাল প্রমাণে কিছু দলীল পেশ করেছেন। যখন তাঁর জাতি এ সবের কোন উত্তর দিতে সক্ষম হল না, তখন তারা অত্যাচার ও কঠোরতার পথ অবলম্বন করল; যার বর্ণনা এই আয়াতে দেওয়া হয়েছে। আর তা হল, তাঁকে হত্যা কর অথবা পুড়িয়ে মার। অতএব তারা এক বিশাল অগ্নিকুন্ড প্রস্তুত করে 'মিনজানীক' (উৎক্ষেপক) যন্ত্রের সাহায্যে তাতে তাঁকে নিক্ষেপ করল।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আগুনকে শান্তিময় শীতল করে নিজ বান্দাকে রক্ষা করলেন; যেমন সূরা আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে।
আল-আনকাবুত 29:25
(ইবরাহীম) বলল, ‘পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমাগুলিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ;[১] কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরকে অভিশাপ দেবে।[২] আর তোমাদের আবাস হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’
[১] অর্থাৎ, এ সব তোমাদের জাতীয় দেবতা। যা তোমাদের একতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির কারণ। যদি তোমরা তাদের ইবাদত ছেড়ে দাও, তাহলে তোমাদের একতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়বে।
[২] অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তোমরা এক অপরকে অস্বীকার করবে এবং বন্ধুত্ব প্রকাশের পরিবর্তে এক অপরকে অভিশাপ দিতে থাকবে। আর পূজারী পূজিতের নিন্দাবাদ করবে এবং পূজিত পূজারীর সাথে সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করবে।
আল-আনকাবুত 29:26
লূত তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল।[১] (ইব্রাহীম) বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করব।[২] নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
[১] লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর ভাইপো (ভাতিজা) ছিলেন। তিনি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেন এবং পরবর্তীতে তাঁকেও 'সাদূম' এলাকায় নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয়।
[২] এ কথা ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন। আবার কেউ বলেন, এটি লূত (আঃ)-এর কথা। কারো কারো মতে তাঁরা উভয়েই হিজরত করেছিলেন। অর্থাৎ, যখন ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী লূত (আঃ)-এর জন্য নিজ এলাকা (হার্রান যাওয়ার পথে কুফার একটি জনপদ 'কূসা'য় আল্লাহর ইবাদত করা কঠিন হয়ে পড়ল, তখন সেখান থেকে হিজরত করে শাম দেশে চলে গেলেন। তৃতীয় ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী সারাহ সঙ্গে ছিলেন।
আল-আনকাবুত 29:27
আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তার বংশধরদের জন্য স্থির করলাম নবুঅত ও গ্রন্থ[১] এবং আমি তাকে পৃথিবীতে পুরস্কৃত করলাম;[২] পরকালেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম হবে। [৩]
[১] অর্থাৎ, ইসহাক (আঃ) এর ঔরসে ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্ম হয়। (ইয়াকূব (আঃ)-এর অপর নাম ছিল ইস্রাঈল।) যাঁর ঔরসে বানী ইস্রাঈল বংশের সূত্রপাত হয় এবং তাদের মধ্যেই সমস্ত নবী আগমন করেন ও আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়। শেষ পর্যায়ে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে জন্মলাভ করে নবী হন এবং তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়।
[২] এখানে পুরস্কার বা প্রতিদান বলতে পৃথিবীর জীবিকা এবং সুনাম ও সুখ্যাতিও। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল ধর্মের লোক (খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী এমনকি পৌত্তলিকরাও) ইবরাহীম (আঃ)-কে সম্মান ও শ্রদ্ধেয়ভাজন গণ্য করে থাকে। আর মুসলিমরা তো ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মাদর্শের অনুসারী। তিনি তাদের নিকট সম্মানের পাত্র হবেন না কেন?
[৩] অর্থাৎ, পরকালেরও তিনি সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং সৎ লোকদের দলভুক্ত হবেন। এই বিষয়টি অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে,
{وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ} (১৩০) سورة البقرة
{وَآتَيْنَاهُ فِي الْدُّنْيَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ فِي الآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ } (১২২) سورة النحل
আল-আনকাবুত 29:28
স্মরণ কর লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তো এমন অশ্লীল কর্ম করছ,[১] যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি।
[১] এখানে অশ্লীল কর্ম বলতে সমকামিতা (পুরুষে-পুরুষে যৌন-মিলন)-কে বুঝানো হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে লূত (আঃ)-এর জাতিই এ কাজ সর্বপ্রথম শুরু করেছিল; যেমন কুরআন তা স্পষ্ট করেছে।
আল-আনকাবুত 29:29
তোমরা কি পুরুষের সাথে সমকাম করছ,[১] তোমরা পথ অবরোধ করছ[২] এবং নিজেদের মজলিসে ঘৃণ্য কাজ করছ?’[৩] উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল যে,[৪] ‘আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন কর; যদি তুমি সত্যবাদী হও।’
[১] অর্থাৎ, তোমাদের ইন্দ্রিয়-পরায়ণতা এমন সীমায় পৌঁছে গেছে যে, তার জন্য প্রাকৃতিক নিয়ম (যৌনক্ষুধা নিবারণের স্বাভাবিক পদ্ধতি স্ত্রী-মিলন) তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তা চরিতার্থ করার জন্য তোমরা এক অপ্রাকৃতিক রাস্তা বেছে নিয়েছ। মহান আল্লাহ মানুষের যৌন-বাসনা পূর্ণ করার জন্য প্রাকৃতিকরূপে স্ত্রী-মিলনের ব্যবস্থা করেছেন। তা বাদ দিয়ে উক্ত কাজের জন্য পুরুষদের পায়খানা-দ্বার ব্যবহার করা অপ্রাকৃতিক ও অস্বাভাবিক (বৈকৃতকামের) অভ্যাস।
[২] এর একটি ব্যাখ্যা এ রকম করা হয়েছে যে, তোমরা আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের, নবাগত মুসাফির ও পথচারীদেরকে ধরে ধরে জোরপূর্বক তাদের সাথে অশ্লীল কর্ম করছ। যার কারণে মানুষের রাস্তা চলা কঠিন হয়ে পড়েছে ও স্বগৃহে অবস্থান করাকে নিরাপদ মনে করেছে। এর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল, তোমরা পথিকদের সম্পদ লুটে নাও, তাদেরকে হত্যা কর বা তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ কর। তৃতীয় ব্যাখ্যা এই করা হয়েছে যে, তোমরা খোলা রাস্তায় অশ্লীল কর্ম কর, যার কারণে পথচারীদের পথ চলতেও লজ্জাবোধ হয়। আর এই সকল অবস্থায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, (পথ অবরোধের) বিশেষ কোন কারণ নির্ণয় করা কঠিন। তবে তারা এমন কাজ করত যার কারণে রাস্তা অচল হয়ে পড়ত। 'রাস্তা বন্ধ' করার অন্য একটি ব্যাখ্যা বংশ অবরোধ করা হয়েছে; অর্থাৎ, স্ত্রীদের যোনি ব্যবহার ব্যতিরেকে পুরুষদের পায়ুপথ ব্যবহার করে নিজেদের বংশও শেষ করতে বসেছ।
(ফাতহুল কাদীর)
[৩] এই ঘৃণ্য কাজ কি ছিল? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত রয়েছে; যেমন লোককে পাথর ছুঁড়ে মারা, অপরিচিত মুসাফিরদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, ভরা মজলিসে পরস্পর (সশব্দে) বাতকর্ম করা, এক অপরের সামনে সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া, শতরঞ্জ জাতীয় খেলা খেলা, পায়রা উড়িয়ে খেলা, মেহেদি দিয়ে (পুরুষের) হাতের আঙ্গুল রঙানো প্রভৃতি। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, হতে পারে তারা উক্ত সকল পাপেই লিপ্ত হত।
[৪] লূত (আঃ) যখন তাদেরকে ঐ সকল অন্যায় করতে নিষেধ করলেন, তখন তারা উত্তরে বলেছিল।
আল-আনকাবুত 29:30
সে বলল,[১] ‘হে আমার প্রতিপালক! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর।’
[১] অর্থাৎ, যখন লূত (আঃ) নিজ জাতির সংস্কার হতে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন মহান আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করলেন।
আল-আনকাবুত 29:31
যখন আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ সুসংবাদসহ ইব্রাহীমের নিকট এল, তখন তারা বলল, ‘আমরা এ শহরের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব।[১] এর অধিবাসিগণ অবশ্যই সীমালংঘনকারী।’
[১] অর্থাৎ, লূত (আঃ)-এর দু'আ কবুল হল এবং মহান আল্লাহ লূত-জাতিকে ধ্বংস করার জন্য ফিরিশতাও প্রেরণ করলেন। তাঁরা প্রথমে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গেলেন ও তাঁকে ইসহাক ও ইয়াকূব দুই সন্তানের সুসংবাদ দিলেন এবং সেই সঙ্গে এ কথাও শুনিয়ে দিলেন যে, আমরা লূত (আঃ)-এর বস্তি ধ্বংস করতে এসেছি।
আল-আনকাবুত 29:32
ইবরাহীম বলল, ‘এ জনপদে তো লূত রয়েছে।’ ওরা বলল, ‘সেখানে কারা আছে তা আমরা ভাল জানি;[১] আমরা তো লূতকে ও তার পরিজনবর্গকে অবশ্যই রক্ষা করব; তবে তার স্ত্রীকে নয়; সে হবে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ [২]
[১] অর্থাৎ আমার জানা আছে যে, ভালো ও মু'মিন লোক কারা এবং মন্দ লোক কারা।
[২] অর্থাৎ, ঐ সকল পিছনে পড়ে থাকা লোকেদের দলভুক্ত হবে, যাদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করা হবে। কারণ সে মু'মিন মহিলা ছিল না; বরং সে ছিল নিজের জাতির পক্ষ অবলম্বনকারিণী। সেই জন্য তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হল।
আল-আনকাবুত 29:33
যখন আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ লূতের নিকট এল, তখন সে তাদের ব্যাপারে চিন্তিত হল এবং তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল।[১] ওরা বলল, ‘ভয় করো না এবং চিন্তাও করো না; আমরা তোমাকে ও তোমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করব। তবে তোমার স্ত্রীকে নয়; সে তো ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [২]
[১] سِيءَ بِهِم এর অর্থ তাঁর নিকট ফিরিশতা এলে তাঁদেরকে দেখে তাঁর খারাপ লাগল, (তিনি তাঁদের আগমনকে অপছন্দ করলেন, বিষণ্ণ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন) এবং ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ তাঁর নিকট যে সমস্ত ফিরিশতা (সুদর্শন কিশোর) মানুষের রূপ ধরে এসেছিলেন, তাঁদেরকে তিনি মানুষই ভেবেছিলেন। সুতরাং নিজ জাতির বদ অভ্যাস ও উদ্ধত আচরণের জন্য এই ভয় পেলেন যে, যদি তারা এই সকল সুদর্শন মেহমানদের আসার খবর জানতে পারে, তাহলে তারা বলপূর্বক এদের সাথে অশ্লীল কাজ করতে চাইবে, যার কারণে আমি অপমানিত হব। ضَاقَ بِهِم ذَرعًا (তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল) কথায় তাঁর অক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন ضَاقَت يَدُه (হাত সংকীর্ণ হওয়ার) কথা বলে দরিদ্র হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। অর্থাৎ, ঐ সকল সুশ্রী চেহারাবিশিষ্ট মেহমানদেরকে বদ-অভ্যাসে অভ্যাসী জাতির হাত হতে বাঁচানোর যখন কোন রাস্তা খুঁজে পেলেন না, তখন তিনি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হলেন।
[২] ফিরিশতাগণ যখন লূত (আঃ)-এর বিষণ্ণ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কথা অনুভব করলেন, তখন তাঁরা তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন যে, তুমি কোন প্রকার ভয় ও চিন্তা করবে না। আমরা আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতা। আমাদের উদ্দেশ্য তোমার স্ত্রী ব্যতীত তোমাকে ও তোমার পরিবারকে পরিত্রাণ দেওয়া।
আল-আনকাবুত 29:34
আমরা এ জনপদবাসীদের উপর আকাশ হতে আযাব (শাস্তি) অবতীর্ণ করব,[১] কারণ এরা সত্যত্যাগী।’
[১] আকাশের শাস্তি বলতে ঐ শাস্তিকে বুঝানো হয়েছে, যার দ্বারা লূত জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। জিব্রাঈল (আঃ) তাদের জনপদগুলোকে শূন্যে তুলে নিয়ে গিয়ে উল্টে দিলেন। তারপর তাদের উপর পাথর বর্ষণ করা হল এবং ঐ জায়গাটিকে একটি অতি দুর্গন্ধময় উপসাগরে পরিণত করা হল। (ইবনে কাসীর)
আল-আনকাবুত 29:35
আমি এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন ছেড়ে রেখেছি[১] সেই সম্প্রদায়ের জন্য যাদের বোধশক্তি আছে।[২]
[১] অর্থাৎ, সেই পাথরের চিহ্ন যা তাদের উপর বর্ষিত হয়েছিল, কালো দুর্গন্ধময় পানি, উল্টে দেওয়া বসতি এ সকল নিদর্শন ও শিক্ষণীয় বিষয়। কিন্তু কাদের জন্য? যারা বুদ্ধিমান তাদের জন্য।
[২] কারণ, তারাই এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। কারণসমূহ বিশ্লেষণ করে পরিণাম ও প্রভাব লক্ষ্য করে। কিন্তু যারা জ্ঞান-বুদ্ধিহীন তাদের উক্ত বিষয়ের সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। তারা তো ঐ পশুর ন্যায় যাদেরকে যবেহ করার জন্য কসাই খানায় নিয়ে যাওয়া হয়, অথচ তাদের কোন অনুভূতিও থাকে না। এর মাধ্যমে মক্কার মুশরিকদেরকেও সতর্ক করা হয়েছে যে, তারা যে মিথ্যাজ্ঞান ও অস্বীকার করার পথ অবলম্বন করেছে, তা একমাত্র জ্ঞান-বুদ্ধিহীন লোকেদের আচরণ।
আল-আনকাবুত 29:36
আমি মাদ্য়্যানবাসীদের প্রতি[১] তাদের ভাই শুআইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, শেষ দিনকে ভয় কর[২] এবং পৃথিবীতে অশান্তি ঘটিয়ে বেড়ায়ো না।’ [৩]
[১] মাদয়্যান ইবরাহীম (আঃ)-এর এক ছেলের নাম ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, তা ছিল তাঁর পৌত্রের নাম। আর ছেলের নাম ছিল মিদয়ান। তাঁর নামেই এই জাতির নামকরণ করা হয় এবং তারা ছিল তাঁরই বংশধর। উক্ত মাদয়্যান জাতির জন্যই শুআইব (আঃ)-কে নবী হিসাবে পাঠানো হয়। আবার কেউ বলেন, মাদয়্যান ছিল শহরের নাম। এই জাতি বা শহর লূত (আঃ)-এর বসতির নিকটেই বসবাস করত।
[২] আল্লাহর ইবাদতের পর তাদেরকে পরকাল স্মরণ করানো এই জন্য হতে পারে যে, তারা পরকালকে অবিশ্বাস করত কিংবা তারা পরকাল সম্পর্কে উদাসীন ছিল ও বিভিন্ন পাপে ডুবে ছিল। আর যে জাতি পরকালে উদাসীন তারা পাপ করার ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে যায়। যেমন আজ-কালের অধিকাংশ মুসলমানদের অবস্থা।
[৩] মাপে ও ওজনে কম করা ও লোকদের কম দেওয়া ছিল তাদের সাধারণ অভ্যাস। আর পাপ করার ব্যাপারেও ছিল তারা শঙ্কাহীন। যার কারণে পৃথিবী অশান্তি ও বিপর্যয়ে ভরে গিয়েছিল।
আল-আনকাবুত 29:37
কিন্তু ওরা তাকে মিথ্যাবাদী মনে করল; অতঃপর ওরা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল; ফলে ওরা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল। [১]
[১] শুআইব (আঃ)-এর উপদেশে তাদের উপর কোন প্রভাব পড়ল না। শেষ পর্যন্ত মেঘাচ্ছন্ন ছায়াময় দিনে জিবরীল (আঃ)-এর বিকট এক শব্দে মাটিতে কম্পন শুরু হল এবং তারা নিজ নিজ ঘরে নতজানু অবস্থায় সবাই শেষ হয়ে গেল।
আল-আনকাবুত 29:38
আর আমি আ’দ ও সামূদকে ধ্বংস করেছিলাম; ওদের বাড়ি-ঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ।[১] শয়তান ওদের কাজকে ওদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করেছিল এবং ওদেরকে সৎপথ অবম্বনে বাধা দিয়েছিল; যদিও ওরা ছিল বিচক্ষণ। [২]
[১] আ'দ জাতির বসতি আহ্কাফ ইয়ামানের 'হাযরামাওত'-এর নিকটে অবস্থিত ছিল। আর সামূদের বসতি 'হিজর' আজকাল যাকে 'মাদায়েনে সালেহ' বলা হয় এবং যা হিজাজের (মদীনার) উত্তরে অবস্থিত। উক্ত এলাকার উপর দিয়ে আরবের বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াত করত। সেই জন্য ঐ সকল বসতি তাদের অজানা ছিল না। বরং তাদের নিকট পরিচিত ছিল।
[২] অর্থাৎ, তারা জ্ঞানী ও চালাক-চতুর তো ছিল; কিন্ত দ্বীন ও ধর্মের ব্যাপারে তারা নিজেদের জ্ঞান কাজে লাগায়নি। সেই জন্য তাদের জ্ঞান-গরিমা তাদের কোন কাজে আসেনি।
আল-আনকাবুত 29:39
এবং আমি ধ্বংস করেছিলাম কারূন, ফিরআউন ও হামানকে; মূসা ওদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন সহ এসেছিল;[১] তখন তারা দেশে অহংকার প্রদর্শন করল; কিন্তু ওরা আমার শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেনি। [২]
[১] অর্থাৎ, প্রমাণ ও মু'জিযার কোন প্রভাব তাদের উপর হল না। আর তারা অহংকারের পথ পরিহার করল না। অর্থাৎ, ঈমান ও তাকওয়ার রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে রইল।
[২] অর্থাৎ, আমার পাকড়াও হতে বাঁচতে সক্ষম হয়নি; বরং তারা আমার আযাবে পতিত হয়েছে। এর অন্য এক অনুবাদ হল, তাঁরা কুফরীতে অগ্রগামী ছিল না; বরং এর পূর্বে অনেক এমন জাতি পৃথিবীতে এসেছিল যারা অনুরূপ কুফরীর রাস্তা অবলম্বন করেছিল।
আল-আনকাবুত 29:40
সুতরাং ওদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অপরাধের জন্য পাকড়াও করলাম;[১] ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়,[২] কাকেও আঘাত করল মহাগর্জন,[৩] কাকেও আমি মাটির নিচে ধসিয়ে দিলাম[৪] এবং কাকেও মারলাম ডুবিয়ে।[৫] আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।[৬]
[১] অর্থাৎ, উপরোক্ত প্রত্যেককে তার পাপের জন্য পাকড়াও করলাম।
[২] এ ছিল আ'দ জাতি। যাদের উপর কঠিন ঝড় আযাবরূপে এসেছিল। এ ঝড় মাটি হতে কাঁকর উড়িয়ে তাদের উপর বর্ষণ করেছিল এবং তার বেগ ও গতি ছিল এত বেশি যে, তাদেরকে আকাশের উপর উড়িয়ে নিয়ে মাটিতে আছড়ে মেরেছিল। যার ফলে তাদের মাথা ও শরীর আলাদা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তাদেরকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন সারশূন্য খেজুরের কান্ড। (ইবনে কাসীর) কোন কোন মুফাসসির 'পাথর বর্ষণকারী ঝড়' এর শাস্তিপ্রাপ্ত লূতের জাতিকে বলেছেন। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর এটিকে ভুল বলেছেন। আর এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাসের দিকে সম্পৃক্ত উক্তিটিকে সূত্রছিন্ন বলেছেন।
[৩] এরা ছিল সালেহ (আঃ)-এর জাতি সামূদ। তাদেরকে তাদের কথামত পাহাড়ের এক পাথর থেকে একটি উটনী বের করে দেখানো হয়। কিন্তু অনাচারীর দল ঈমান আনার পরিবর্তে উটনীকেই মেরে ফেলে। যার তিনদিন পর তাদের উপর এক কঠিন বিকট শব্দের আযাব আসে; যা তাদেরকে চিরতরের জন্য চুপ করিয়ে দেয়।
[৪] এ ছিল কারূন, যাকে ধন-দৌলতের ভান্ডার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে এই গর্বের শিকার হল যে, এই ধন-দৌলত এই কথার প্রমাণ যে, সে আল্লাহর নিকট সম্মানিত ও প্রিয়পাত্র। আমার মূসার কথা শোনার কি প্রয়োজন? অতঃপর তাকে তার ধন ও প্রাসাদসহ মাটিতে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
[৫] এ ছিল ফিরআউন, মিসর রাজ্যের অধিপতি। কিন্তু সীমালংঘন করে সে নিজে 'রব' হওয়ার কথা দাবী করে বসে। মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনতে ও তাঁর জাতি বানী ইস্রাঈল যাদেরকে সে দাসে পরিণত করেছিল, তাদেরকে মুক্ত করতে অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্তু এক দিন সকালে লোহিত সাগরে তার ও তার পূর্ণ সেনাবাহিনীর সলিল সমাধি ঘটানো হয়।
[৬] আল্লাহর কাজ কারো উপর অত্যাচার করা নয়। এই জন্য পূর্বের যে সকল জাতির উপর আযাব এসেছিল কেবলমাত্র এই জন্যই তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে যে, তারা কুফর ও শিরক, মিথ্যাজ্ঞান ও পাপাচার করে নিজেরা নিজেদের উপরই অত্যাচার করেছিল।
আল-আনকাবুত 29:41
যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সা; যে নিজের জন্য ঘর তৈরী করে। আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো সবচেয়ে দুর্বলতম;[১] যদি ওরা জানত।
[১] অর্থাৎ, যেমন মাকড়সার জাল দুর্বল, ক্ষীণ ও অস্থায়ী হয়; যা হাতের সামান্য ছোঁয়ায় তা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। আল্লাহ ছাড়া অন্যকে মাবূদ (উপাস্য) মানা, দুঃখ-দুর্দশা দূরকারী মনে করা হুবহু মাকড়সার জালের মত, যাতে কোন লাভ নেই। কারণ, তারা কোন উপকার করতে পারে না। এই জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করা মাকড়সার জালের মতই নিষ্ফল। যদি তারা স্থায়ী হত বা কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখত, তাহলে এই সকল মাবূদ পূর্বের জাতিদেরকে ধ্বংসের হাত হতে বাঁচাতে পারত। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ সাক্ষী যে, তারা তাদেরকে বাঁচাতে পারেনি।
আল-আনকাবুত 29:42
ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যা কিছু আহবান করে, আল্লাহ তা জানেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আল-আনকাবুত 29:43
মানুষের জন্য আমি এ সকল দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি,[১] কিন্তু কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা বুঝতে পারে। [২]
[১] অর্থাৎ, তাদের গাফলতির ঘুম হতে জাগানো, শিরকের বাস্তবিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত করানো ও সরল পথ প্রদর্শনের জন্য।
[২] এখানে জ্ঞানী বলতে আল্লাহ, তাঁর শরীয়ত এবং তাঁর আয়াত ও প্রমাণের জ্ঞানের জ্ঞানী। যার উপর চিন্তা-ভাবনা করলে আল্লাহর পরিচয় ও হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া যায়।
আল-আনকাবুত 29:44
আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, [১] এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। [২]
[১] অর্থাৎ, বেকার ও বিনা উদ্দেশ্যে নয়।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর মহাশক্তি, জ্ঞান ও হিকমতের উপর বিশ্বাসীদের জন্য। তারা ঐ প্রমাণ দ্বারা এই পরিণামে পৌঁছতে পারে যে, এ বিশ্ব-জাহানে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মাবূদ নেই, দুঃখ মোচনকারী, প্রয়োজন পূর্ণকারী কেউ নেই।
আল-আনকাবুত 29:45
তোমার প্রতি যে গ্রন্থ অহী করা হয়েছে তা পাঠ কর[১] এবং যথাযথভাবে নামায পড়।[২] নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। [৩] আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ।[৪] তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।
[১] কুরআন কারীম তেলাঅত (বা পাঠ) করার আদেশ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে; নেকী লাভের উদ্দেশ্যে, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার উদ্দেশ্যে, শিক্ষা ও উপদেশ দেওয়া-নেওয়ার উদ্দেশ্যে। তেলাঅতের এই আদেশের মাঝে সব কিছু শামিল আছে।[২] কারণ (প্রকৃত) নামাযের মাধ্যমে মানুষের সাথে আল্লাহর এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যার ফলে মানুষের উপর আল্লাহর সাহায্য আসে। যে সাহায্য তার জীবনের সর্বত্রই সুপ্রতিষ্ঠা ও দৃঢ় মনোভাবের কারণ এবং হিদায়াতের সহায়ক হয়। এই জন্যই কুরআন কারীমে বলা হয়েছে "হে মু'মিনগণ তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।" (সূরা বাক্বারাহ ২:১৫৩ আয়াত) নামায ও ধৈর্য এমন কোন দৃশ্য বস্তু নয় যে, মানুষ তা ধরে বসে সাহায্য অর্জন করবে। এ তো অদৃশ্য বস্তু। উদ্দেশ্য হল, তার মাধ্যমে প্রভুর সাথে মানুষের যে বিশেষ সম্পর্ক কায়েম হয়, সেই সম্পর্ক তার জীবনের পদে পদে সাহায্য ও তাকে পথ প্রদর্শন করে থাকে। যার জন্য মহানবী (সাঃ)-কে রাত্রের অন্ধকারে নির্জনে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছিল। কারণ, নবী (সাঃ)-কে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছিল তাতে তাঁর জন্য আল্লাহর অনেক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। আর এই কারণেই যখন নবী (সাঃ) কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি নামায পড়তেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[৩] অর্থাৎ, অশ্লীল ও মন্দ কর্ম থেকে বিরত থাকার কারণ ও মাধ্যম হয়। যেমন ঔষধের নানা প্রতিক্রিয়া আছে এবং বলাও হয় যে, অমুক ঔষধে অমুক অসুখ ভাল হয়। আর বাস্তবে তা হয়েও থাকে। কিন্তু তা তখনই সম্ভব, যখন দুটি কথা পালন করা হবে, প্রথমতঃ ঔষধ ডাক্তারের পরামর্শ মত নিয়মিত সেবন করতে হবে। আর দ্বিতীয়তঃ এমন সকল জিনিস থেকে পরহেয করতে বা বিরত থাকতে হবে, যা ঔষধের প্রতিক্রিয়া-ক্ষমতাই নষ্ট করে ফেলে। অনুরূপ আল্লাহ তাআলা অবশ্যই নামাযে এমন আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রেখেছেন, যা মানুষকে অশ্লীল এবং মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে। কিন্তু তা তখনই সম্ভব, যখন নামায মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ ও তরীকা অনুযায়ী ঐ সকল আদব ও শর্ত পালন করার সাথে আদায় করা হবে, যা তার শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অপরিহার্য করা হয়েছে। যেমন তার প্রথম হলঃ ইখলাস ও হৃদয়-বিশুদ্ধতা, অর্থাৎ কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া এবং নামাযে আল্লাহ ছাড়া অন্যের দিকে মনোযোগ না হওয়া। দ্বিতীয়ঃ পবিত্রতা, তৃতীয়ঃ নির্দিষ্ট সময় মত জামাআত সহকারে তা আদায় করা। চতুর্থঃ নামাযের আরকান (ক্বিরাআত, রুকূ, কাওমাহ, সিজদাহ ইত্যাদি) পূর্ণরূপে ধীরতা ও স্থিরতার সাথে আদায় করা। পঞ্চমঃ একাগ্রতা এবং বিনয় বজায় রাখা। ষষ্ঠঃ নিয়মনিষ্ঠ হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা আদায় করতে থাকা। সপ্তমঃ হালাল রুযী খাওয়া। বস্তুতঃ আমাদের নামায এই সকল আদব ও শর্তশূন্য, ফলে তার সেই প্রভাব আমাদের জীবনে প্রকাশ পাচ্ছে না, যা কুরআন করীমে বলা হয়েছে। অনেকে এই আয়াতের খবরকে আদেশার্থে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ নামাযীদের জন্য জরুরী যে, তারা অশ্লীল ও মন্দ কর্ম হতে বিরত থাকবে।[৪] অর্থাৎ, অশ্লীল ও মন্দ কর্ম হতে বিরত রাখতে আল্লাহর যিকর (স্মরণ) নামায থেকেও বেশি প্রভাব-ক্ষমতা রাখে । কারণ, মানুষ যতক্ষণ নামাযে থাকে, ততক্ষণ মন্দ কর্ম থেকে বিরত থাকে। কিন্তু পরে তার প্রভাব কম হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সর্বদা আল্লাহর যিকর মানুষকে সর্বক্ষণের জন্য মন্দ কর্মে বাধা দিয়ে থাকে।
আল-আনকাবুত 29:46
সৌজন্যের সাথে ছাড়া তোমরা গ্রন্থধারী (ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টান)দের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করো না;[১] তবে ওদের মধ্যে যারা সীমালংঘনকারী তাদের সাথে (তর্ক) নয়।[২] আর বল, ‘আমাদের প্রতি এবং তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাস করি[৩] এবং আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য তো একই এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।’
[১] কারণ, তারা জ্ঞানী; কথা বুঝার ক্ষমতা ও শক্তি রাখে। সুতরাং তাদের সাথে তর্ক-বিতর্কের সময় কড়া মেজাজ ও রূঢ় ভাষা হওয়া বাঞ্ছিত নয়।
[২] অর্থাৎ, যে তর্ক-বিতর্ক করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করবে, তার সাথে শক্ত ভঙ্গিমায় কথা বলার অনুমতি তোমাদের জন্যও রয়েছে। অনেকে প্রথম দলের অর্থ ঐ সকল আহলে কিতাব নিয়েছেন, যারা মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বিতীয় দলের অর্থ ঐ সকল গ্রন্থধারীরা যারা মুসলমান হয়নি; বরং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মের উপর অটল ছিল। আর অনেকে 'সীমালংঘনকারী'-এর অর্থ ঐ সকল আহলে কিতাব নিয়েছেন, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক মনোভাব রাখত এবং কলহ ও যুদ্ধও করতে থাকত। অর্থাৎ, তাদের সাথে (তর্ক নয় বরং) যুদ্ধ কর, যে পর্যন্ত না তারা মুসলমান হয়ে যায় অথবা জিযিয়া-কর আদায় করে।
[৩] অর্থাৎ, তাওরাত ও ইঞ্জীলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থাৎ, এটাও আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণকৃত এবং তা ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠা এবং মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর বিধান।
আল-আনকাবুত 29:47
এভাবেই আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছিলাম তারা এতে বিশ্বাস করে[১] এবং এদের মধ্যেও কেউ কেউ এতে বিশ্বাস করে।[২] কেবল অবিশ্বাসীরাই আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।
[১] এখানে উদ্দেশ্য, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) প্রমুখগণ। কিতাব বা গ্রন্থ দেওয়ার অর্থ হল, তার উপর আমল করা। আসলে কিতাবের উপর যারা আমল করে না, তাদেরকে যেন কিতাব দেওয়াই হয়নি।
[২] এরা ছিল মক্কাবাসী; যাদের কিছু মানুষ ঈমান এনেছিল।
আল-আনকাবুত 29:48
তুমি তো এর পূর্বে কোন গ্রন্থ পাঠ করতে না[১] এবং তা নিজ হাতে লিখতেও না[২] যে, মিথ্যাবাদীরা (তা দেখে) সন্দেহ পোষণ করবে।[৩]
[১] কারণ, তিনি নিরক্ষর ছিলেন।
[২] কারণ, লেখার জন্যও শিক্ষা আবশ্যিক, যা তিনি কারোর নিকট থেকে অর্জন করেননি।
[৩] অর্থাৎ, যদি তিনি শিক্ষিত ব্যক্তি হতেন বা কোন শিক্ষকের নিকট কিছু শিখতেন, তাহলে লোকে বলত যে, কুরআন মাজীদ অমুকের সাহায্যে (রচিত গ্রন্থ) বা অমুকের নিকট শিক্ষার ফল।
আল-আনকাবুত 29:49
বরং যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাদের অন্তরে এ (কুরআন) স্পষ্ট নিদর্শন।[১] কেবল অনাচারীরাই আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করে।
[১] অর্থাৎ, কুরআন মাজীদ হাফেযগণের বক্ষে সংরক্ষিত আছে। এটা কুরআন মাজীদের এক অলৌকিক শক্তি যে, তা শব্দ সহ বক্ষে সংরক্ষিত হয়ে যায়।
আল-আনকাবুত 29:50
ওরা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার কাছে নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ বল, ‘নিদর্শন তো আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণাধীন।[১] আর আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র।’
[১] অর্থাৎ, এই সকল নিদর্শন কেবল আল্লাহরই হিকমত ও ইচ্ছাধীন। তিনি যার প্রতি অবতীর্ণ করতে চান, তার প্রতি অবতীর্ণ করেন। এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কোন এখতিয়ার নেই।
আল-আনকাবুত 29:51
এ কি ওদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার নিকট কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যা ওদের নিকট পাঠ করা হয়।[১] এতে অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য করুণা ও উপদেশ রয়েছে। [২]
[১] অর্থাৎ, তারা নিদর্শন দেখতে চায়। এই কুরআন যা আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি এবং যার ব্যাপারে তাদের সাথে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এই বলে যে, এইরূপ কুরআন তৈরী করে অথবা একটি সূরা তৈরী করে উপস্থাপন কর, সেই কুরআন তাদের জন্য নিদর্শন হিসাবে যথেষ্ট নয় কি? যখন কুরআনের মু'জিযা দেখার পরেও তারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনছে না, তখন মূসা ও ঈসার মত মু'জিযা দেখানো হলেও তার উপর তারা কি ঈমান নিয়ে আসবে?
[২] অর্থাৎ, ঐ সকল মানুষের জন্য যারা কুরআনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব বলে বিশ্বাস করে। কারণ তারাই তা থেকে লাভবান ও উপকৃত হয়।
আল-আনকাবুত 29:52
বল, ‘আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত এবং যারা অসত্যে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অবিশ্বাস করে[২] তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ [৩]
[১] এই মর্মে যে, আমি আল্লাহর নবী এবং যে কিতাব আমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে উপাসনার যোগ্য মনে করে এবং যে প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য অধিকারী, সেই মহান আল্লাহকে তারা অস্বীকার করে।
[৩] কারণ, এই সকল মানুষই বিকৃত জ্ঞান ও ভুল বুঝের শিকার। যার ফলে তারা যে ব্যবসা করেছে অর্থাৎ ঈমানের পরিবর্তে কুফর ও হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতাকে ক্রয় করেছে, তাতে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।
আল-আনকাবুত 29:53
ওরা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে।[১] যদি শাস্তির কাল নির্ধারিত না থাকত, তাহলে ওদের ওপর শাস্তি এসেই পড়ত।[২] আর নিশ্চয়ই ওদের ওপর আকস্মিকভাবে ওদের অজ্ঞাতসারে তা এসে পড়বে। [৩]
[১] অর্থাৎ, পয়গম্বরের কথা না মেনে তারা বলে যে, 'যদি তুমি সত্য হও, তাহলে আমাদের উপর আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ করাও!'
[২] অর্থাৎ, ওদের কর্ম ও কথা অবশ্যই এর উপযুক্ত যে, তাদেরকে অবিলম্বে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হোক। কিন্তু আমার নিয়ম এই যে, আমি প্রত্যেক জাতিকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ঢিল দিয়ে থাকি। অতঃপর যখন সেই ঢিল দেওয়া সময় শেষ হয়ে যায়, তখন আমার আযাব এসে পড়ে।
[৩] অর্থাৎ, যখন আযাবের নির্ধারিত সময় এসে যাবে তখন হঠাৎ এমনভাবে আযাব এসে যাবে যে, তারা বুঝতেও পারবে না। সেই নির্ধারিত সময় হল যা মক্কাবাসীদের জন্য লিখে রেখেছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে বন্দী ও হত্যা হওয়া। অথবা কিয়ামত কায়েম হওয়া, যার পরে কাফেরদের জন্য থাকবে শাস্তি আর শাস্তি।
আল-আনকাবুত 29:54
ওরা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে। আর জাহান্নাম তো অবিশ্বাসীদেরকে অবশ্যই পরিবেষ্টন করবে। [১]
[১] প্রথম يَسْتَعْجِلُونَكَ খবর রূপে বর্ণিত হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি আশ্চর্য প্রকাশরূপে। অর্থাৎ এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, শাস্তির স্থান জাহান্নাম তাদেরকে আপন পরিবেষ্টনে রেখেছে। এর পরেও তারা শাস্তির জন্য তাড়াতাড়ি করছে? অথচ প্রতিটি জিনিস যা আসবে তা অতি নিকটবর্তীই হয়, তাকে তারা দূরে কেন ভাবছে? অথবা তা তাকীদের জন্য পুনরুক্ত হয়েছে।
আল-আনকাবুত 29:55
সেদিন শাস্তি ওদেরকে গ্রাস করবে ওদের উপর দিক ও নিচের দিক হতে এবং তিনি বলবেন,[১] ‘তোমরা যা করতে তার স্বাদ গ্রহণ কর।’
[১] 'তিনি বলবেন' ক্রিয়াটির কর্তা আল্লাহ অথবা ফিরিশতা। অর্থাৎ, যখন সর্বদিক থেকে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে, তখন তাদেরকে বলা হবে।
আল-আনকাবুত 29:56
হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর।[১]
[১] এখানে এমন জায়গা থেকে হিজরত (স্বদেশ ত্যাগ) করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে আল্লাহর ইবাদত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং দ্বীনের উপর অটল থাকা দুঃসাধ্য হয়। যেমন মুসলিমগণ প্রথমে মক্কা থেকে হাবশায় এবং পরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন।
আল-আনকাবুত 29:57
প্রত্যেক আত্মাই মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে; অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। [১]
[১] অর্থাৎ, হিজরত কর অথবা না কর, মৃত্যুর তিক্ত শরবত সকলকে অবশ্যই পান করতে হবে। সুতরাং তোমাদের স্বদেশ, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে ত্যাগ করাতে কোন কষ্ট না হওয়াই উচিত। তোমরা যেখানেই থাক সেখানেই মৃত্যু আসবেই। অতএব আল্লাহর ইবাদতে রত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে আখেরাতের চিরসুখ অর্জন করতে পারবে। যেহেতু মৃত্যুর পর আল্লাহর নিকটে তো যেতেই হবে।
আল-আনকাবুত 29:58
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদসমূহে স্থান দান করব; যার নিচে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে,[১] সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।[২] সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কার কত উত্তম!
[১] অর্থাৎ, জান্নাতীদের বাসস্থান উঁচু উঁচু প্রাসাদ হবে, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে পানি, শারাব, মধু ও দুধের নহর। এ ছাড়া সেই সব নহরকে যে দিকে ইচ্ছা সে দিকে প্রবাহিত করতে পারবে।
[২] না সুখ-সম্পদ নিঃশেষ হওয়ার ভয় থাকবে, আর না তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকবে। আর না সেখান হতে স্থানান্তরিত হওয়ার কোন ভয় থাকবে।
আল-আনকাবুত 29:59
যারা ধৈর্য অবলম্বন করে[১] ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে। [২]
[১] অর্থাৎ, দ্বীনের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে, হিজরতের কষ্ট বরণ করে, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকার কষ্টকে একমাত্র আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের জন্য মেনে নেয়।
[২] দ্বীন ও দুনিয়ার সকল বিষয়ে এবং সর্বাবস্থায়।
আল-আনকাবুত 29:60
এমন বহু জীব-জন্তু আছে[১] যারা নিজেদের রুযী বহন করে না; [২] আল্লাহই ওদেরকে এবং তোমাদেরকে রুযী দান করেন।[৩] আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।[৪]
[১] كأين শব্দটিতে কাফ (তাশবীহ) সাদৃশ্য বর্ণনার জন্য। এখানে এর অর্থ হল কতক বা অনেক।
[২] কারণ, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাই তাদের নেই, অনুরূপ তারা সঞ্চয় করে রাখতেও পারে না। উদ্দেশ্য হল, রুযী কোন নির্দিষ্ট স্থানে বিশেষভাবে রাখা হয়নি; বরং আল্লাহর রুযী তার সৃষ্টির জন্য ব্যাপক। তাতে সে যেই হোক আর যেখানেই থাক। বরং আল্লাহ তাআলা হিজরতকারী (মুহাজির) সাহাবায়ে কেরামকে পূর্বের চেয়ে অধিক প্রশস্ত ও পবিত্র রুযী প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া অতি অল্প দিন পরেই তাঁদেরকে আরবের বিভিন্ন এলাকার গভর্নর বানিয়ে দিয়েছিলেন। (رضي الله عنهم أجمعين)
[৩] অর্থাৎ, কেউ অক্ষম হোক বা সক্ষম, (রুযী অর্জনের) অসীলা ও উপকরণ প্রাপ্ত হোক অথবা না হোক, স্বদেশে থাক অথবা মুহাজির অবস্থায় বিদেশে, সকলের রুযীর ব্যবস্থাপক সেই আল্লাহ, যিনি পিপীলিকাকে ভূমির বিভিন্ন প্রান্তে, পাখিকে হাওয়াতে ও মাছ ও অন্যান্য জলচর জীব-জন্তুকে সমুদ্রের গভীরে রুযী পৌঁছান। এখানে উদ্দেশ্য হল, দরিদ্রতার ভয় যেন হিজরত করাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ আল্লাহ তাআলা তোমাদের এবং সকল সৃষ্টিকুলের রুযীর দায়িত্ব নিয়েছেন।
[৪] তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক সব কিছু জ্ঞাত আছেন। সুতরাং শুধু তাঁকেই ভয় কর এবং তিনি ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করো না। তাঁরই আনুগত্যে সুখ ও পরিপূর্ণতা আছে এবং তাঁর অবাধ্যতায় আছে দুঃখ ও দুর্দশা।
আল-আনকাবুত 29:61
যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?’ ওরা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।[১] তাহলে ওরা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?’[২]
[১] অর্থাৎ, ঐ সকল মুশরিকরা, যারা শুধু তাওহীদের কারণে মুসলিমগণকে কষ্ট দেয়, তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আকাশ ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে এবং চাঁদ ও সূর্যকে নিজ নিজ কক্ষপথে কে পরিচালনা করে? তবে ঐ স্থানে তাদের এ কথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না যে, এ সবের পরিচালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।
[২] অর্থাৎ, প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির পরেও সত্য-বিমুখ হওয়া এবং সত্য অস্বীকার করা বড় আশ্চর্যের বিষয়।
আল-আনকাবুত 29:62
আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। [২]
[১] এটা মুশরিকদের প্রশ্নের উত্তর, তারা মুসলিমদেরকে প্রশ্ন করেছিল যে, যদি তোমরা হকের উপর আছ, তাহলে তোমরা দরিদ্র ও দুর্বল কেন? আল্লাহ তাআলা তার উত্তরে বলেন যে, রুযীর প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার ব্যাপার আল্লাহর হাতে, তিনি নিজ হিকমত অনুযায়ী যাকে চান কম ও যাকে চান বেশি রুযী দান করেন, তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
[২] এটাও তিনি জ্ঞাত আছেন যে, বেশি রুযী কার জন্য মঙ্গলদায়ক এবং কার জন্য মঙ্গলদায়ক নয়।
আল-আনকাবুত 29:63
যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘ভূমি মৃত হওয়ার পর কে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে ওকে সঞ্জীবিত করে?’ ওরা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।’ কিন্তু ওদের অধিকাংশই জ্ঞান করে না। [১]
[১] কারণ, জ্ঞানী হলে ও জ্ঞান করলে তারা নিজ প্রতিপালকের সাথে সাথে পাথর ও মৃতদেরকেও প্রতিপালক মনে করত না এবং তাদের মাঝে স্ববিরোধিতা থাকত না। যেহেতু আল্লাহ তাআলাকে স্রষ্টা ও প্রতিপালক স্বীকার করার পরেও তারা মূর্তিদেরকে প্রয়োজন পূরণকারী এবং ইবাদতের যোগ্য মনে করত।
আল-আনকাবুত 29:64
এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।[১] আর পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন;[২] যদি ওরা জানত। [৩]
[১] অর্থাৎ যে পার্থিব জীবন তাদেরকে পরকালের জীবন সম্বন্ধে অন্ধ এবং তার জন্য সম্বল সঞ্চয় করার ব্যাপারে উদাসীন করে রেখেছে, তা আসলে এক ধরনের খেলাধূলা অপেক্ষা বেশি মর্যাদা রাখে না। কাফেররা পার্থিব জীবন নিয়ে ব্যাপৃত থাকে, তাতে সুখ অর্জনের জন্য দিবারাত্রি মেহনত করে, কিন্তু যখন মারা যায়, তখন শূন্য হাত হয়ে পরকালের পথে পাড়ি দেয়। যেমন শিশুরা সারা দিন ধুলো-বালির ঘর বানিয়ে খেলা করে এবং পরে বাড়ী ফিরে যাওয়ার সময় খালি হাতে ফিরে যায়, ক্লান্তি ছাড়া তাদের আর কিছুই অর্জন হয় না।
[২] সুতরাং এমন নেক আমল করা প্রয়োজন, যাতে পারলৌকিক জীবন সুন্দর হতে পারে।
[৩] কারণ, যদি তারা এ কথা জানত, তাহলে পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে অমনোযোগী হয়ে ইহলৌকিক জীবন নিয়ে মগ্ন হত না। বলা বাহুল্য, এর ঔষধ হচ্ছে জানা ও শেখা, শরীয়তের জ্ঞান শিক্ষা করা।
আল-আনকাবুত 29:65
ওরা যখন জলযানে আরোহণ করে, তখন ওরা বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন ওদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন ওরা তাঁর অংশী করে।[১]
[১] মুশরিকদের এই স্ববিরোধিতার কথা কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে। আর এই স্ববিরোধিতা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ইকরামা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করার তওফীক পেয়েছিলেন। তাঁর সর্ম্পকে জানা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পর তিনি মক্কা থেকে পালিয়ে যান। যাতে নবী (সাঃ)-এর হাতে বন্দী হওয়া থেকে রেহাই পেতে পারেন। তিনি হাবশাহ যাওয়ার জন্য এক নৌকায় বসেন। নৌকা পানির ঘুর্ণিপাকে ফেঁসে গেলে নৌকার যাত্রীরা একে অপরকে বলল যে, একনিষ্ঠ হয়ে মহান প্রভুর নিকট দু'আ কর। কারণ, এমতাবস্থায় তিনি ছাড়া পরিত্রাণদাতা আর কেউ নেই। ইকরামা (রাঃ) এই কথা শুনে বললেন, যদি এই সমুদ্রের মাঝে তিনি ছাড়া কেউ পরিত্রাণ না দিতে পারে, তাহলে স্থলেও তিনি ছাড়া অন্য কেউ পরিত্রাণ দিতে পারবে না। অতঃপর তিনি ঐ সময় আল্লাহর নিকট অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন যে, যদি আমি এখান থেকে ভালভাবে তীরে পৌঁছতে পারি, তাহলে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর হাতে বায়আত করব; অর্থাৎ মুসলমান হয়ে যাব। সুতরাং সেখান থেকে পরিত্রাণ পেয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রায্বিয়াল্লাহু আনহু। (সীরাত মুহাম্মাদ বিন ইসহাক, ইবনে কাসীর)
আল-আনকাবুত 29:66
ফলে ওরা ওদের প্রতি আমার দান অস্বীকার করে এবং ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে।[১] সুতরাং অচিরেই ওরা জানতে পারবে।
[১] لِيَكفُرُا তে ل অক্ষরটি لامِ كَي যা কারণ বর্ণনা করার জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থাৎ পরিত্রাণ পাওয়ার পর তাদের শিরক এই জন্য যে, তারা আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করবে এবং পৃথিবীতে মজা লুটবে। কারণ যদি তারা অকৃতজ্ঞতা না করত, তাহলে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার উপর অটল থাকত এবং শুধুমাত্র এক আল্লাহকেই সর্বদা ডাকত। অনেকের নিকট এখানে لام পরিণতি বর্ণনার জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, যদিও তাদের কুফরী করার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু পুনরায় শিরক করার পরিণতিই হল কুফরী।
আল-আনকাবুত 29:67
ওরা কি দেখে না যে, আমি (মক্কার) ‘হারাম’কে নিরাপদ স্থানরূপে স্থির করেছি অথচ এর চারপাশে যে সব মানুষ আছে তাদেরকে অপহরণ করা হয়।[১] তবে কি ওরা অসত্যেই বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? [২]
[১] এখানে আল্লাহ তাআলা সেই অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করছেন যা তিনি মক্কাবাসীর উপর করেছিলেন আর তা এই যে, আমি তাদের (মক্কার) হারামকে নিরাপদ জায়গা বানিয়ে দিয়েছি। সেখানে বসবাসকারীরা হত্যা, লুঠ-মার, বন্দীদশা ইত্যাদি থেকে নিরাপদে আছে। অথচ আরবের অন্য এলাকা এই নিরাপত্তা ও শান্তি থেকে বঞ্চিত; হত্যা, লুঠ-মার তাদের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা।
[২] অর্থাৎ, সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা কি এই যে, তারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে এবং মিথ্যা উপাস্য ও মূর্তির পূজা করতে থাকবে? অথচ তাঁর অনুগ্রহের দাবী এই ছিল যে, তারা শুধু এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর পয়গম্বর (সাঃ)-কে সত্য বলে স্বীকার করবে।
আল-আনকাবুত 29:68
যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে[১] অথবা তাঁর নিকট হতে আগত সত্যকে মিথ্যাজ্ঞান করে[২] তার অপেক্ষা অধিক সীমালংঘনকারী আর কে? অবিশ্বাসীদের আশ্রয়স্থল কি জাহান্নামে নয়?
[১] অর্থাৎ, এই দাবী করে যে, আমার প্রতি আল্লাহর প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়; অথচ তা হয় না। অথবা কেউ এই কথা বলে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন আমিও তা অবতীর্ণ করতে সক্ষম। এটাই হল আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা। আর এর দাবীদারই হল মিথ্যারচয়িতা।
[২] এ হল মিথ্যাজ্ঞান করা। আর এতে লিপ্ত ব্যক্তি মিথ্যাজ্ঞানকারী। আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা বা আরোপ করা এবং সত্যকে মিথ্যাজ্ঞান করা উভয়ই কুফরী, যার শাস্তি হল জাহান্নাম।
আল-আনকাবুত 29:69
যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে,[১] আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পরিচালিত করব।[২] আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই থাকেন। [৩]
[১] অর্থাৎ, যারা আমার (সন্তুষ্টির পথে) দ্বীনের উপর আমল করতে কষ্ট, পরীক্ষা এবং সমস্যার সম্মুখীন হয়।
[২] এর অর্থ হল, দুনিয়া ও আখেরাতের ঐ সকল পথ, যে সকল পথে চললে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়।
[৩] 'ইহ্সান'-এর অর্থ হল, 'আমি যেন আল্লাহকে দেখছি অথবা আল্লাহ আমাকে দেখছেন' মনে করে প্রত্যেক সৎ কাজ আন্তরিকতার সাথে সম্পাদন করা। নবী (সাঃ)-এর তরীকা অনুযায়ী সে কাজ সম্পাদন করা। মন্দের প্রতিশোধে মন্দ না করে ভালো ব্যবহার প্রদর্শন করা। নিজের প্রাপ্য অধিকার ছেড়ে দেওয়া এবং অন্যকে তার অধিকার অপেক্ষা অধিক দেওয়া। এই সকল কর্ম 'ইহ্সান' (সৎকর্মপরায়ণতা)র অন্তর্ভুক্ত।