Tafsir Ahsanul Bayaan — আর-রূম 30:1 – সাবা 34:54
Contents
- আর-রূম 30:1
- আর-রূম 30:2
- আর-রূম 30:3
- আর-রূম 30:4
- আর-রূম 30:5
- আর-রূম 30:6
- আর-রূম 30:7
- আর-রূম 30:8
- আর-রূম 30:9
- আর-রূম 30:10
- আর-রূম 30:11
- আর-রূম 30:12
- আর-রূম 30:13
- আর-রূম 30:14
- আর-রূম 30:15
- আর-রূম 30:16
- আর-রূম 30:17
- আর-রূম 30:18
- আর-রূম 30:19
- আর-রূম 30:20
- আর-রূম 30:21
- আর-রূম 30:22
- আর-রূম 30:23
- আর-রূম 30:24
- আর-রূম 30:25
- আর-রূম 30:26
- আর-রূম 30:27
- আর-রূম 30:28
- আর-রূম 30:29
- আর-রূম 30:30
- আর-রূম 30:31
- আর-রূম 30:32
- আর-রূম 30:33
- আর-রূম 30:34
- আর-রূম 30:35
- আর-রূম 30:36
- আর-রূম 30:37
- আর-রূম 30:38
- আর-রূম 30:39
- আর-রূম 30:40
- আর-রূম 30:41
- আর-রূম 30:42
- আর-রূম 30:43
- আর-রূম 30:44
- আর-রূম 30:45
- আর-রূম 30:46
- আর-রূম 30:47
- আর-রূম 30:48
- আর-রূম 30:49
- আর-রূম 30:50
- আর-রূম 30:51
- আর-রূম 30:52
- আর-রূম 30:53
- আর-রূম 30:54
- আর-রূম 30:55
- আর-রূম 30:56
- আর-রূম 30:57
- আর-রূম 30:58
- আর-রূম 30:59
- আর-রূম 30:60
- লুকমান 31:1
- লুকমান 31:2
- লুকমান 31:3
- লুকমান 31:4
- লুকমান 31:5
- লুকমান 31:6
- লুকমান 31:7
- লুকমান 31:8
- লুকমান 31:9
- লুকমান 31:10
- লুকমান 31:11
- লুকমান 31:12
- লুকমান 31:13
- লুকমান 31:14
- লুকমান 31:15
- লুকমান 31:16
- লুকমান 31:17
- লুকমান 31:18
- লুকমান 31:19
- লুকমান 31:20
- লুকমান 31:21
- লুকমান 31:22
- লুকমান 31:23
- লুকমান 31:24
- লুকমান 31:25
- লুকমান 31:26
- লুকমান 31:27
- লুকমান 31:28
- লুকমান 31:29
- লুকমান 31:30
- লুকমান 31:31
- লুকমান 31:32
- লুকমান 31:33
- লুকমান 31:34
- আস-সাজদা 32:1
- আস-সাজদা 32:2
- আস-সাজদা 32:3
- আস-সাজদা 32:4
- আস-সাজদা 32:5
- আস-সাজদা 32:6
- আস-সাজদা 32:7
- আস-সাজদা 32:8
- আস-সাজদা 32:9
- আস-সাজদা 32:10
- আস-সাজদা 32:11
- আস-সাজদা 32:12
- আস-সাজদা 32:13
- আস-সাজদা 32:14
- আস-সাজদা 32:15
- আস-সাজদা 32:16
- আস-সাজদা 32:17
- আস-সাজদা 32:18
- আস-সাজদা 32:19
- আস-সাজদা 32:20
- আস-সাজদা 32:21
- আস-সাজদা 32:22
- আস-সাজদা 32:23
- আস-সাজদা 32:24
- আস-সাজদা 32:25
- আস-সাজদা 32:26
- আস-সাজদা 32:27
- আস-সাজদা 32:28
- আস-সাজদা 32:29
- আস-সাজদা 32:30
- আল-আহযাব 33:1
- আল-আহযাব 33:2
- আল-আহযাব 33:3
- আল-আহযাব 33:4
- আল-আহযাব 33:5
- আল-আহযাব 33:6
- আল-আহযাব 33:7
- আল-আহযাব 33:8
- আল-আহযাব 33:9
- আল-আহযাব 33:10
- আল-আহযাব 33:11
- আল-আহযাব 33:12
- আল-আহযাব 33:13
- আল-আহযাব 33:14
- আল-আহযাব 33:15
- আল-আহযাব 33:16
- আল-আহযাব 33:17
- আল-আহযাব 33:18
- আল-আহযাব 33:19
- আল-আহযাব 33:20
- আল-আহযাব 33:21
- আল-আহযাব 33:22
- আল-আহযাব 33:23
- আল-আহযাব 33:24
- আল-আহযাব 33:25
- আল-আহযাব 33:26
- আল-আহযাব 33:27
- আল-আহযাব 33:28
- আল-আহযাব 33:29
- আল-আহযাব 33:30
- আল-আহযাব 33:31
- আল-আহযাব 33:32
- আল-আহযাব 33:33
- আল-আহযাব 33:34
- আল-আহযাব 33:35
- আল-আহযাব 33:36
- আল-আহযাব 33:37
- আল-আহযাব 33:38
- আল-আহযাব 33:39
- আল-আহযাব 33:40
- আল-আহযাব 33:41
- আল-আহযাব 33:42
- আল-আহযাব 33:43
- আল-আহযাব 33:44
- আল-আহযাব 33:45
- আল-আহযাব 33:46
- আল-আহযাব 33:47
- আল-আহযাব 33:48
- আল-আহযাব 33:49
- আল-আহযাব 33:50
- আল-আহযাব 33:51
- আল-আহযাব 33:52
- আল-আহযাব 33:53
- আল-আহযাব 33:54
- আল-আহযাব 33:55
- আল-আহযাব 33:56
- আল-আহযাব 33:57
- আল-আহযাব 33:58
- আল-আহযাব 33:59
- আল-আহযাব 33:60
- আল-আহযাব 33:61
- আল-আহযাব 33:62
- আল-আহযাব 33:63
- আল-আহযাব 33:64
- আল-আহযাব 33:65
- আল-আহযাব 33:66
- আল-আহযাব 33:67
- আল-আহযাব 33:68
- আল-আহযাব 33:69
- আল-আহযাব 33:70
- আল-আহযাব 33:71
- আল-আহযাব 33:72
- আল-আহযাব 33:73
- সাবা 34:1
- সাবা 34:2
- সাবা 34:3
- সাবা 34:4
- সাবা 34:5
- সাবা 34:6
- সাবা 34:7
- সাবা 34:8
- সাবা 34:9
- সাবা 34:10
- সাবা 34:11
- সাবা 34:12
- সাবা 34:13
- সাবা 34:14
- সাবা 34:15
- সাবা 34:16
- সাবা 34:17
- সাবা 34:18
- সাবা 34:19
- সাবা 34:20
- সাবা 34:21
- সাবা 34:22
- সাবা 34:23
- সাবা 34:24
- সাবা 34:25
- সাবা 34:26
- সাবা 34:27
- সাবা 34:28
- সাবা 34:29
- সাবা 34:30
- সাবা 34:31
- সাবা 34:32
- সাবা 34:33
- সাবা 34:34
- সাবা 34:35
- সাবা 34:36
- সাবা 34:37
- সাবা 34:38
- সাবা 34:39
- সাবা 34:40
- সাবা 34:41
- সাবা 34:42
- সাবা 34:43
- সাবা 34:44
- সাবা 34:45
- সাবা 34:46
- সাবা 34:47
- সাবা 34:48
- সাবা 34:49
- সাবা 34:50
- সাবা 34:51
- সাবা 34:52
- সাবা 34:53
- সাবা 34:54
আর-রূম 30:1
আলিফ-লাম-মীম;
আর-রূম 30:2
রোমকগণ পরাজিত হয়েছে--
আর-রূম 30:3
(আরবের) নিকটবর্তী অঞ্চলে। কিন্তু ওরা ওদের এ পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয় লাভ করবে--
আর-রূম 30:4
কয়েক বছরের মধ্যেই, আগের ও পরের সকল সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। সেদিন বিশ্বাসীরা আনন্দিত হবে;
আর-রূম 30:5
আল্লাহর সাহায্যে।[১] তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
[১] নবী (সাঃ)-এর যুগে পারস্য (ইরান) ও রোম দুটি বৃহৎ শক্তি ছিল। পারসীকরা ছিল অগ্নিপূজক মুশরিক এবং রোমানরা ছিল খ্রিষ্টান (আহলে কিতাব)। মক্কার মুশরিকদের সহানুভূতি ছিল পারসীকদের প্রতি; কারণ তারা উভয়েই গায়রুল্লাহর উপাসক ছিল। পক্ষান্তরে মুসলিমদের সহানুভূতি রোমের খ্রিষ্টান রাজ্যের প্রতি ছিল; কারণ খ্রিষ্টানরাও মুসলিমদের মত (আহলে কিতাব) ছিল এবং অহী ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। তাদের উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ-বিবাদ লেগেই থাকত। নবী (সাঃ)-এর নবুঅত প্রাপ্তির কয়েক বছর পর পারসীকরা খ্রিষ্টানদের উপর বিজয়লাভ করার ফলে মুশরিকদের আনন্দ ও মুসলিমদের দুঃখ হয়। সেই সময় কুরআন কারীমের এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়। যাতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, কয়েক বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয়ী হবে এবং বিজয়ীরা পরাজিত ও পরাজিতরা বিজয়ী হয়ে যাবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহর উক্ত বাণীর ফলে মুসলিমদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। যার ফলে আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) আবু জাহলের সাথে বাজি করে ফেলেন যে, পাঁচ বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয়ী হবেই। উক্ত বাজির কথা নবী (সাঃ) জানতে পারলে তিনি বললেন, بِضع (কয়েক) শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা বুঝাতে ব্যবহার হয়। অতএব পাঁচ বছর বাজির সময় কম করে ফেলেছ, এতে আরো সময় বাড়িয়ে নাও। সুতরাং নবী (সাঃ)-এর কথামত আবু বাকর (রাঃ) তাঁর প্রস্তাবিত সময় আরো কিছু বাড়িয়ে দিলেন। ফল এই দাঁড়ালো যে, রোমানরা নয় বছর সময়ের মধ্যেই (সূরা অবতীর্ণ হওয়ার) ঠিক সপ্তম বছরে পুনরায় পারসীকদের উপর জয়যুক্ত হল। যাতে মুসলিমগণ অনেক অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন। (তিরমিযী, তাফসীর সূরা রূম) অনেকে বলেন যে, রোমানদের এই বিজয় ঠিক ঐ সময় হয়েছিল, যখন মুসলিমগণ বদরের যুদ্ধে কাফেরদের উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। মুসলিমগণ নিজেরা জয়ী হওয়ার ফলে আনন্দিত হন। রোমানদের এই বিজয় কুরআন কারীমের সত্যতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ বহন করে। فِي أدنَى الأرض এর অর্থ হলঃ আরব ভূমির নিকটবর্তী এলাকা যেমন শাম, ফিলিস্তীন ইত্যাদি যেখানে খ্রিষ্টানদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
আর-রূম 30:6
এ আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি;[১] আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।
[১] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! আমি তোমাকে সংবাদ দিচ্ছি যে, "অতি সত্বর রোমানরা পারসীকদের উপর পুনরায় বিজয়ী হবে।" এটা আল্লাহ তাআলার সত্য ওয়াদা, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবশ্যই পূর্ণ হবে।
আর-রূম 30:7
ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, অথচ পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা উদাসীন।[১]
[১] অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষেরই পার্থিব বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান আছে। সুতরাং মানুষ পার্থিব বিষয় অর্জনে চাতুর্য ও দক্ষতার প্রদর্শন করে থাকে; যা কিছু দিনের জন্য উপকারী। কিন্তু তারা আখেরাতের বিষয়ে একেবারে উদাসীন। অথচ আখেরাতের উপকারই হচ্ছে চিরস্থায়ী। অর্থাৎ, ইহলৌকিক (সংসার) বিষয়ে তারা সম্যক অবগত, আর পারলৌকিক (দ্বীন) বিষয়ে একেবারে উদাসীন।
আর-রূম 30:8
ওরা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না যে, আল্লাহই আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও ওদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু যথাযথভাবে এবং এক নির্দিষ্ট কালের জন্য সৃষ্টি করেছেন।[১] আর অবশ্যই বহু মানুষ তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাতে অবিশ্বাসী। [২]
[১] অথবা তা এক উদ্দেশ্য ও হকের সাথে সৃষ্টি করা হয়েছে; বিনা উদ্দেশ্যে বেকার সৃষ্টি করা হয়নি। আর সে উদ্দেশ্য হল এই যে, পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের প্রতিদান এবং পাপীদেরকে তাদের পাপের শাস্তি প্রদান। অর্থাৎ, তারা কি নিজেদের অস্তিত্ব ও দেহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না যে, তাদেরকে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে অথচ তাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না এবং ঘৃণ্য এক ফোঁটা পানি দ্বারা তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তারপর এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ঐ লম্বা ও চওড়া বিশাল আকাশ ও পৃথিবী তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া সকল কিছুর জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, 'কিয়ামত দিবস'। যেদিন এ সকল বস্তু ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ, তারা যদি এই সকল বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করত, তাহলে অবশ্যই আল্লাহর অস্তিত্ব, তিনি যে অদ্বিতীয় প্রতিপালক ও একমাত্র উপাস্য এবং তাঁর যে অশেষ ক্ষমতা তা বুঝতে সক্ষম হত এবং তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করত।
[২] সৃষ্টি জগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করাই হচ্ছে এর আসল কারণ। তাছাড়া কিয়ামতের দিনকে অস্বীকার করার পিছনে যুক্তিসঙ্গত কোন ভিত্তিই নেই।
আর-রূম 30:9
ওরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং দেখে না যে,[১] ওদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে?[২] শক্তিতে তারা ছিল ওদের অপেক্ষা প্রবল।[৩] তারা জমি চাষ করত এবং এরা পৃথিবীর যতটা আবাদ করেছে[৪] তার চেয়ে তারা বেশি আবাদ করেছিল।[৫] তাদের নিকট তাদের রসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ এসেছিল।[৬] বস্তুতঃ ওদের প্রতি যুলুম করা আল্লাহর কাজ ছিল না,[৭] বরং ওরা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।[৮]
[১] পূর্ব পুরুষদের পরিণাম, ধ্বংসাবশেষ ঘর-বাড়ি, বসবাস করার প্রকট চিহ্ন ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করার পরও তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করার জন্য কঠোরভাবে ধমক দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, তারা বিভিন্ন জায়গায় সফর ও যাতায়াত করে তা প্রত্যক্ষ করে নিয়েছে।
[২] অর্থাৎ, ঐ সকল কাফেরদের (পরিণাম) যাদেরকে আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরী, সত্যকে অস্বীকার ও রসূলগণকে মিথ্যা মনে করার ফলে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
[৩] অর্থাৎ, মক্কাবাসী এবং কুরাইশ অপেক্ষা।
[৪] অর্থাৎ, মক্কাবাসীরা কৃষিকর্মে অদক্ষ ছিল, কিন্তু পূর্ববর্তী জাতিসমূহ সে কর্মেও তাদের থেকে বেশি অভিজ্ঞ ছিল।
[৫] কারণ, তাদের বয়স, শারীরিক শক্তি ও জীবিকার উপায়-উপকরণও ছিল বেশি। সুতরাং তারা বেশি বেশি অট্টালিকা নির্মাণ, কৃষিকার্য এবং জীবিকা নির্বাহের সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনাও অধিক মাত্রায় করেছিল ।
[৬] তারা তাদের নিকট প্রেরিত রসূলগণের প্রতি ঈমান আনেনি। সুতরাং সব রকম শক্তি, উন্নতি, অবকাশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থাকা সত্ত্বেও ধ্বংসই তাদের ভাগ্যে নির্ধারিত হল।
[৭] অর্থাৎ, এমন ছিল না যে, তাদের কোন পাপ ছাড়াই তিনি তাদেরকে আযাবে পতিত করবেন।
[৮] অর্থাৎ, আল্লাহকে অস্বীকার ও রসূলগণকে অগ্রাহ্য করে (তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল)।
আর-রূম 30:10
অতঃপর যারা মন্দ কাজ করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ;[১] কারণ তারা আল্লাহর বাক্যাবলীকে মিথ্যা মনে করত এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।
[১] سُوآى শব্দটির উৎপত্তি سُوء শব্দ থেকে। এটা فُعلَى -এর ওজনে أَسوَأ -এর স্ত্রী লিঙ্গ, যেমন حُسنَى - أَحسَن -এর স্ত্রী লিঙ্গ। অর্থাৎ, তাদের যে পরিণতি ঘটেছিল তা ছিল নেহাতই মন্দ।
আর-রূম 30:11
আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন,[১] অতঃপর তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। [২]
[১] অর্থাৎ যেমন আল্লাহ তাআলা প্রথমবার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রেখেছেন অনুরূপ মৃত্যুর পর পুনরায় দ্বিতীয়বার তাদেরকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন। কারণ দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা প্রথমবার অপেক্ষা বেশি কঠিন নয়।
[২] অর্থাৎ, জমায়েতের ময়দান ও হিসাবের জায়গায় (কিয়ামতের মাঠে ফিরে যেতে হবে)। যেখানে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে বিচার করা হবে।
আর-রূম 30:12
যেদিন কিয়ামত হবে সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে পড়বে। [১]
[১] إبلاس -এর অর্থ হল নিজের দাবীর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পেশ করতে না পেরে চুপচাপ হয়রান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। যাকে হতাশ হওয়া বলা যায়। এই অর্থে مُبلِس ঐ ব্যক্তিকে বলা হবে, যে হতাশ হয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে ও নিজের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ খুঁজে পায় না। কিয়ামতের দিন কাফের ও মুশরিকদের এই অবস্থা হবে। অর্থাৎ, আল্লাহর আযাব চাক্ষুষ দেখে তারা সকল ব্যাপারে হতাশ হবে এবং কোন প্রমাণ পেশ করতেও অক্ষম হবে। এখানে مُجرِمُون (অপরাধীরা) বলতে কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। পরের আয়াত দ্বারা তা পরিষ্কার বুঝা যায়।
আর-রূম 30:13
ওদের শরীক (উপাস্য)গুলি ওদের জন্য সুপারিশ করবে না[১] এবং ওরা ওদের শরীক (উপাস্য)গুলিকে অস্বীকার করবে। [২]
[১] শরীক বলতে ঐ সকল বাতিল উপাস্যসমূহকে বুঝানো হয়েছে, মুশরিকরা যাদের এই ভেবে ইবাদত করত যে, তারা আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচিয়ে নেবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপনকারীদের জন্য আল্লাহর নিকট কোন সুপারিশকারী হবে না।
[২] অর্থাৎ, সেখানে (কিয়ামতের দিন) ওরা তাদের উপাস্যত্বকে অস্বীকার করবে। কারণ, ওরা বুঝতে পারবে যে, (ওদের বাতিল উপাস্য) কারো কোন উপকার করতে পারবে না। (ফাতহুল ক্বাদীর) এর দ্বিতীয় অর্থ হল, ওদের উক্ত উপাস্যগুলো এই কথা অস্বীকার করবে যে, ওরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করে তাদের ইবাদত করেছিল। কারণ, এই সকল উপাস্য তো ওদের ইবাদত থেকেই বেখবর ছিল।
আর-রূম 30:14
যেদিন কিয়ামত হবে সেদিন মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়বে। [১]
[১] এর অর্থ এ নয় যে, প্রত্যেকে এক অপর থেকে আলাদা হবে; বরং এর অর্থ হল মু'মিন ও কাফের আলাদা হয়ে যাবে। মু'মিনরা জান্নাতে এবং কাফের ও মুশরিকরা জাহান্নামে চলে যাওয়ার পরে এক অপর থেকে চিরদিনের জন্য বিভক্ত ও পৃথক হয়ে যাবে এবং কক্ষনো তারা একত্রিত হবে না। আর তা হবে হিসাবের পর। সুতরাং এই বিভক্ত ও পৃথক হওয়ার কথাই পরের আয়াতগুলিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে।
আর-রূম 30:15
যারা বিশ্বাস করেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা (জান্নাতের) বাগানে আনন্দে থাকবে।[১]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে (জান্নাতে) বিভিন্ন সম্মান ও নিয়ামত দান করা হবে, যা পেয়ে তারা অনেকানেক উৎফুল্ল হবে।
আর-রূম 30:16
এবং যারা অবিশ্বাস করেছে এবং আমার নিদর্শনাবলী ও পরলোকের সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে, তারাই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।[১]
[১] অর্থাৎ, সর্বদা আল্লাহর আযাবে নিমজ্জিত থাকবে।
আর-রূম 30:17
সুতরাং তোমরা সন্ধ্যায় ও ভোর সকালে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর
আর-রূম 30:18
এবং বিকালে ও দুপুরে। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সকল প্রশংসা তাঁরই।[১]
[১] এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজ পবিত্র সত্তার পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা। যার উদ্দেশ্য হল নিজ বান্দাকে পথ প্রদর্শন যে, উক্ত সময়গুলিতে, যা একের পর এক আসতে থাকে এবং যা আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও মহত্ত্ব বুঝায়, তাঁর পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা কর। সন্ধ্যা ও সকাল হল রাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর প্রারম্ভ। এশা খুব অন্ধকার এবং যোহর খুব উজ্জ্বলতার সময় হয়ে থাকে। অতএব ঐ সত্তা অতি পবিত্র যিনি উক্ত সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং যিনি সেই বিভিন্ন সময়ের মধ্যে আলাদা আলাদা উপকারিতা রেখেছেন। অনেকে বলেন, এখানে 'তাসবীহ'র অর্থ হল নামায। উক্ত দুটি আয়াতে যে সময়ের কথা বলা হয়েছে তা হল, পাঁচ অক্ত নামাযের সময়। تُمسُون (সন্ধ্যা) শব্দে মাগরিব-এশা, تُصبِحُون (ভোর) শব্দে ফজর عَشِيًا (বিকাল) শব্দে আসর এবং تُظهِرون (দুপুর) শব্দে যোহর নামাযের সময় উল্লেখ হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর) উক্ত আয়াত দুটি সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার ফযীলত একটি যয়ীফ (দুর্বল) হাদীসে বর্ণনা হয়েছে। আর তা হল এই যে, উক্ত আয়াত দুটি পড়লে দিবা-রাত্রির ছুটে যাওয়া আমল পূরণ হয়ে যায়। (যয়ীফ আবু দাঊদ ১০৮১নং)
আর-রূম 30:19
তিনিই মৃত হতে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটান[১] এবং ভূমির মৃত্যুর পর ওকে পুনর্জীবিত করেন। আর এভাবেই তোমাদেরকেও (মাটি থেকে) বের করা হবে। [২]
[১] যেমন ডিমকে মুরগি থেকে, মুরগিকে ডিম থেকে, মানুষকে বীর্য থেকে, বীর্যকে মানুষ থেকে এবং মু'মিনকে কাফের থেকে, কাফেরকে মু'মিন থেকে সৃষ্টি করেন।
[২] দ্বিতীয়বার জীবিত করে কবর থেকে উঠানো হবে।
আর-রূম 30:20
তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। তারপর এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ।[১]
[১] এখানে إِذَا শব্দটি (হঠাৎ বা সহসা) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এতে ঐ অবস্থাসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা অতিক্রম করে একটি ভ্রূণ পূর্ণ মানুষরূপে গঠিত হয়। যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন কারীমের অন্য স্থানে করা হয়েছে। (সূরা হাজ্জ ২২:৫, মু'মিনূন ২৩:১৪ দ্রঃ) تَنتَشِرُون শব্দটির অর্থ হল জীবিকা অর্জন এবং মানুষের অন্যান্য প্রয়োজনে চলাফেরা করা।
আর-রূম 30:21
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন,[১] যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও[২] এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন।[৩] চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
[১] অর্থাৎ তোমাদেরই মধ্যে থেকে নারী জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তারা তোমাদের স্ত্রী হয় এবং তোমরা এক অপরের সঙ্গী বা জোড়া জোড়া হয়ে যাও। আরবীতে زَوج এর অর্থ হল সঙ্গী বা জোড়া। অতএব পুরুষ নারীর ও নারী পুরুষের সঙ্গী বা জোড়া। নারীদেরকে পুরুষদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করার অর্থ হল, পৃথিবীর প্রথম নারী মা হাওয়াকে আদম (আঃ)-এর বাম পার্শেবর (পাঁজরের) হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাঁদের দুই জন হতে মানুষের জন্মের (স্বাভাবিক) ধারাবাহিকতা আরম্ভ হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, যদি পুরুষ ও নারী আলাদা আলাদা বস্তু হতে সৃষ্টি হত; যেমন যদি নারী জ্বিন অথবা চতুষ্পদ জন্তু থেকে সৃষ্টি হত, তাহলে তাদের উভয়ের একই বস্তু হতে সৃষ্টি হওয়াতে যে সুখ-শান্তি পাওয়া যায় তা কখনই পাওয়া সম্ভব হত না। বরং এক অপরকে অপছন্দ করত ও জন্তু জানোয়ারের ন্যায় ব্যবহার করত। সুতরাং মানুষের প্রতি আল্লাহর অশেষ দয়া যে, তিনি মানুষের জুড়ি ও সঙ্গিনী মানুষকেই বানিয়েছেন।
[৩] مَوَدَّة এর অর্থ হল স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সুমধুর ভালবাসা যা সাধারণত পরিলক্ষিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যেরূপ ভালবাসা সৃষ্টি হয় অনুরূপ ভালবাসা পৃথিবীর অন্য কোন দুই ব্যক্তির মাঝে হয় না। আর رَحمَة (মায়া-মমতা) হল এই যে, স্বামী নিজ স্ত্রীকে সর্বপ্রকার সুখ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশ দান করে থাকে। অনুরূপ স্ত্রীও নিজের সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী স্বামীর সেবা করে থাকে। মহান আল্লাহ উভয়ের উপরেই সে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। বলা বাহুল্য, মানুষ এই শান্তি ও অগাধ প্রেম-ভালবাসা সেই দাম্পত্যের মাধ্যমেই লাভ করতে পারে যার সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। পরন্তু ইসলাম একমাত্র বিবাহসূত্রের মাধ্যমেই সম্পৃক্ত দম্পতিকেই জোড়া বলে স্বীকার করে। অন্যথায় শরীয়ত-বিরোধী দাম্পত্যের (লিভ টুগেদারের) সম্পর্ককে ইসলাম জোড়া বলে স্বীকার করে না। বরং তাদেরকে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করে। আজকাল পাশ্চাত্য সভ্যতার পতাকাবাহী শয়তানরা এই নোংরা প্রচেষ্টায় লিপ্ত যে, পাশ্চাত্য সমাজের মত ইসলামী দেশেও বিবাহকে অপ্রয়োজনীয় স্বীকার করে অনুরূপ (অবৈধ প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ লিভ টুগেদারের) নারী-পুরুষকে জোড়া, যুগল বা দম্পতি (COUPLE) হিসেবে মেনে নেওয়া হোক এবং তাদের জন্য শাস্তির পরিবর্তে ঐ সকল অধিকার দেওয়া ও মেনে নেওয়া হোক, যে অধিকার একজন শরীয়তসম্মত দম্পতি পেয়ে থাকে! (আল্লাহ তাদেরকে সর্বত্রই ধ্বংস করেন।)
আর-রূম 30:22
তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা।[১] এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
[১] পৃথিবীতে নানা ভাষা সৃষ্টিও আল্লাহর কুদরতের এক মহানিদর্শন। আরবী, তুর্কী, ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী, পশতু, ফারসী, সিন্ধী, বেলুচী, ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষা রয়েছে পৃথিবীতে। আবার প্রত্যেক ভাষার ভাব ও উচ্চারণভঙ্গীর (আঞ্চলিক) বিভিন্নতা আছে। সহস্র ও লক্ষ মানুষের মাঝেও একজন মানুষকে তার ভাষা ও উচ্চারণভঙ্গী দ্বারা চিনতে পারা যায় যে, এ ব্যক্তি অমুক দেশের বা অমুক এলাকার। শুধু ভাষাই তার পূর্ণ পরিচয় বলে দেয়। অনুরূপভাবে একই পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া) থেকে জন্মলাভের পরেও রঙ ও বর্ণে এক অপর থেকে পৃথক। কেউ কৃষ্ণকায়, কেউ শ্বেতকায়, কেউ নীলবর্ণের, আবার কেউ শ্যাম ও গৌরবর্ণের। অতঃপর কালো-সাদার মাঝেও এত স্তর রয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষ এই দুই রঙে বিভক্ত হয়েও অনেক ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে এবং এক অপর থেকে একেবারেই ভিন্ন ও পৃথক মনে হয়। অতঃপর মানুষের চেহারার আকারও শ্রী, শরীরের গঠন এবং উচ্চতাতেও এমন পার্থক্য রাখা হয়েছে যে, বিভিন্ন দেশের মানুষকে আলাদাভাবে সহজেই চেনা যায়। একজন অপরজনের সাথে কোন মিল নেই; এমনকি সহোদর ভাই আপন ভাই থেকে আলাদা। এ সত্ত্বেও আল্লাহর কুদরতের পরিপূর্ণতা এই যে, কোন এক দেশের বসবাসকারী অন্য দেশের বসবাসকারী থেকে পৃথক হয়।
আর-রূম 30:23
এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ রাত্রে ও দিবাভাগে তোমাদের নিদ্রা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ।[১] এতে অবশ্যই শ্রবণশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে ।
[১] নিদ্রার কারণে শান্তি ও আরাম হয়; তা রাতেই হোক বা দিনে। আর দিনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কর্ম ইত্যাদি দ্বারা আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করা হয়। এ বিষয়টি কুরআন কারীমের কয়েক জায়গায় আলোচিত হয়েছে।
আর-রূম 30:24
এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ তিনি তোমাদেরকে আশঙ্কা ও আশা স্বরূপ বিদ্যুৎ দেখান[১] এবং আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন ও তা দিয়ে ভূমিকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন; এতে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে ।
[১] অর্থাৎ, আসমানে বিদ্যুৎ চমকায় এবং মেঘের গর্জন শোনা যায়, তখন তোমরা বজ্রপাত হওয়ার এবং অতিবৃষ্টির ফলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করে থাক। আর আশাও করে থাক যে, বৃষ্টি হলে ফসল ভাল হবে।
আর-রূম 30:25
এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ তাঁরই আদেশে আকাশ ও পৃথিবীর স্থিতি। অতঃপর আল্লাহ যখন তোমাদের মাটি হতে ওঠার জন্য আহবান করবেন, তখন তোমরা উঠে আসবে।[১]
[১] অর্থাৎ, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন আকাশ ও পৃথিবীর সকল নিয়ম-শৃঙ্খল; যা বর্তমানে তাঁর আদেশে কায়েম আছে -- সব ভেঙ্গে-চুরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং সমস্ত মৃত পুনরুজ্জীবিত হয়ে কবর থেকে বের হয়ে এসে (হাশরের মাঠে সমবেত হবে)।
আর-রূম 30:26
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তাঁরই; সকলেই তাঁর আজ্ঞাবহ।[১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর সৃষ্টিগত আদেশের সামনে সবকিছু ক্ষমতাহীন ও নিরুপায়। যেমন জীবন-মৃত্যু, সুস্থতা-অসুস্থতা, সম্মান-অসম্মান ইত্যাদি।
আর-রূম 30:27
আর তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি পুনর্বার একে সৃষ্টি করবেন; এ তাঁর জন্য সহজ। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ গুণ তাঁরই[১] এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] অর্থাৎ, এমন পরিপূর্ণ ও সুন্দর গুণগ্রাম এবং পূর্ণ ক্ষমতার অধিপতি যে, তিনি সর্বপ্রকার দৃষ্টান্তের বহু ঊর্ধ্বে।لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তাঁর মত কোন কিছু নেই। (সূরা শূরা ৪২:১১ আয়াত)
আর-রূম 30:28
আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে দৃষ্টান্ত উপস্থিত করছেনঃ তোমাদেরকে আমি যে রুযী দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীগণ কি তাতে অংশীদার? যাতে ওরা তোমাদের সমান হতে পারে[১] এবং তোমরা তোমাদের সমকক্ষদের যেরূপ ভয় কর, তোমরা কি ওদের সেরূপ ভয় কর?[২] এভাবেই আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের নিকট নিদর্শনাবলী বিবৃত করি।[৩]
[১] অর্থাৎ, যখন তোমাদের গোলাম-চাকর তোমাদের মতই মানুষ, অথচ তোমরা তাদেরকে তোমাদের ধন-সম্পদে নিজেদের শরীক ও সমান করতে অপছন্দ কর, তখন আল্লাহর কোন বান্দা; ফিরিশতা, পয়গম্বর, ওলী, নেক ব্যক্তি অথবা বৃক্ষ ও পাথরের তৈরি উপাস্য ইত্যাদি কিভাবে আল্লাহর সমকক্ষ ও শরীক হতে পারে। অথচ এ সকল বস্তু আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁরই দাস বা গোলাম। অর্থাৎ, যেমন (তোমাদের বিচারেই) প্রথম বিষয়টি হয় না, অনুরূপ দ্বিতীয় বিষয়টিও হতে পারে না। অতএব আল্লাহর ইবাদতে অন্যকে শরীক করা এবং তাকেও বিপদ দূরকারী, প্রয়োজন পূরণকারী ভাবা নেহাতই ভ্রষ্টতা।
[২] তোমরা কি নিজেদের অধীনস্থ দাসকে সেরূপ ভয় কর যেরূপ স্বাধীন ব্যক্তিরা এক অপরকে ভয় করে থাকে? অর্থাৎ, যেমন শরীকানার ব্যবসা-বাণিজ্য বা সম্পত্তি ইত্যাদি থেকে খরচ করতে দ্বিতীয় শরীকের জিজ্ঞাসাবাদের আশঙ্কা করে থাক অনুরূপ তোমরা কি আপন দাস থেকে সেই ভয় করে থাক? অর্থাৎ, ভয় কর না। কারণ, তোমরা তাদেরকে তোমাদের ধন-সম্পদে শরীক করে নিজেদের সমমর্যাদা দিতেই চাইবে না, তবে তাদের ব্যাপারে আর ভয় কিসের?
[৩] কারণ, তারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি ব্যবহার করে অবতীর্ণকৃত আয়াত ও সৃষ্টিজগতের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপকৃত হয়। আর যারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না, তওহীদের মত সাফ ও পরিষ্কার বিষয়ও তাদের জন্য বোঝা অসম্ভব।
আর-রূম 30:29
অজ্ঞানতাবশতঃ সীমালংঘনকারীরা তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে থাকে;[১] সুতরাং আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন কে তাকে সৎপথে পরিচালিত করবে?[২] তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।[৩]
[১] অর্থাৎ, তারা এ প্রকৃতত্ব সম্বন্ধে অবগতই নয় যে, তারা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। আর এই অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার কারণে তারা নিজেদের বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয় না এবং নিজেদের প্রবৃত্তি ও বাতিল মতের অনুসারী হয়ে থাকে।
[২] কারণ, আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত তাদেরই ভাগ্যে জোটে যারা হিদায়াত অনুসন্ধানী ও তার আকাঙ্ক্ষী হয়। পক্ষান্তরে যারা তার সত্য অনুসন্ধিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাকে ভ্রষ্টতার মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয় ।
[৩] অর্থাৎ, সেই সকল পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের কোন এমন সাহায্যকারী হবে না, যে তাদেরকে হিদায়াত দেবে অথবা তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করবে।
আর-রূম 30:30
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ।[১] আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।[২] আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।[৩] এটিই সরল ধর্ম; [৪] কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। [৫]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর একত্ব ও তাঁর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং বাতিল ধর্মসমূহের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করো না।
[২] فطرت শব্দের মৌলিক অর্থ হল সৃষ্টি। এখানে আল্লাহর সৃষ্টি বা প্রকৃতি বলে ইসলাম ও তওহীদকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ তাআলা মু'মিন-কাফের প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম ও তওহীদের প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য তওহীদ মানুষের প্রকৃতি অর্থাৎ সহজাত ও স্বভাব-ধর্ম। যেমন যে সময় আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মা সৃষ্টি করেন তখন বলেন, 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?' তার উত্তরে মানুষ বলেছিল, অবশ্যই। এ থেকেও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মানুষের আসল ধর্ম হল একত্ব। পরে অবশ্য বিভিন্ন খারাপ পরিবেশ অথবা অন্য কোন প্রতিবন্ধক অনেককে সেই প্রকৃতি (ইসলামে) প্রতিষ্ঠিত থাকতে বাধা দান করে; ফলে তারা কাফের হয়েই থাকে। যেমন নবী (সাঃ) হাদীসে বলেছেন, "প্রত্যেক শিশু (ইসলামের) প্রকৃতির উপর জন্ম নেয়। কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরা রূম, মুসলিমঃ কিতাবুল ক্বাদার)
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহর সেই সৃষ্টি বা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করো না; বরং সঠিক তরবিয়ত দিয়ে তার লালন-পালন ও বড় কর। যাতে ঈমান ও তওহীদ কচি-কাঁচা শিশুদের মনে-প্রাণে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এখানে বাক্যটি খবর স্বরূপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার হয়েছে আজ্ঞার অর্থে। অর্থাৎ, নেতিবাচক বাক্য নিষেধাজ্ঞার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ('আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই' অর্থাৎ, 'আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন করো না।')
[৪] অর্থাৎ, যে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে বলা হয়েছে অথবা যে দ্বীন মানুষের প্রকৃতিগত, সেটাই হচ্ছে সরল ও সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।
[৫] এই জন্যই তারা ইসলাম ও তওহীদের ব্যাপারে অজ্ঞ থেকে যায়।
আর-রূম 30:31
তোমরা বিশুদ্ধ-চিত্তে তাঁর অভিমুখী হও; তাঁকে ভয় কর। যথাযথভাবে নামায পড় এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; [১]
[১] অর্থাৎ, ঈমান, আল্লাহর ভয় (তাকওয়া ও পরহেযগারী) এবং নামায ত্যাগ করে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না।
আর-রূম 30:32
যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে;[১] প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।[২]
[১] অর্থাৎ, সত্য ধর্ম পরিত্যাগ করে অথবা তাতে নিজেদের মনমত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন কেউ ইয়াহুদী, কেউ খ্রিষ্টান, কেউ অগ্নিপূজক ইত্যাদি।
[২] অর্থাৎ, প্রত্যেক দল ধারণা করে যে, তারাই সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত আছে, আর অন্যেরা আছে ভ্রান্ত পথে। আর যে যুক্তি তারা খাড়া করে রেখেছে এবং যাকে তারা প্রমাণ বলে আখ্যায়িত করে, তা নিয়ে তারা হর্ষোৎফুল্ল ও সন্তুষ্ট আছে। দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থাও অনুরূপ হয়ে পড়েছে। তারাও বিভিন্ন মযহাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং প্রত্যেক মযহাব ঐ বাতিল ধারণা অনুযায়ী নিজেকে হকপন্থী মনে করে খোশ আছে। অথচ হকপন্থী শুধুমাত্র একটি দলই আছে; যার পরিচয় দিয়ে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "তারা আমার ও আমার সাহাবার তরীকার অনুসারী হবে।" (তিরমিযী প্রমুখ)
আর-রূম 30:33
মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে, তখন ওরা বিশুদ্ধ-চিত্তে ওদের প্রতিপালককে ডাকে; অতঃপর তিনি যখন ওদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, তখন ওদের একদল ওদের প্রতিপালকের সাথে অংশী স্থাপন করে থাকে।
আর-রূম 30:34
ওদেরকে আমি যা দিয়েছি, তা অস্বীকার করার জন্য।[১] সুতরাং তোমরা ভোগ করে নাও, অতঃপর শীঘ্রই জানতে পারবে।
[১] এখানে সেই বিষয় আলোচিত হয়েছে, যে বিষয় সূরা আনকাবুতের শেষে ২৯:৬৫-৬৬ নং আয়াতে বর্ণিত হয়ে গেছে।
আর-রূম 30:35
আমি কি ওদের নিকট এমন কোন দলীল অবতীর্ণ করেছি, যা ওদেরকে আমার কোন অংশী স্থাপন করতে বলে? [১]
[১] এটা অস্বীকৃতিমূলক জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ, এরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করে তাদের ইবাদত করে, তা প্রমাণ ছাড়াই করে। আল্লাহ তাআলা তার কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তাছাড়া ঐ আল্লাহ যিনি শিরক উচ্ছেদ ও তওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকল পয়গম্বরগণকে প্রেরণ করেছেন, তিনি কিভাবে শিরক বৈধ হওয়ার প্রমাণ অবতীর্ণ করতে পারেন? সুতরাং সকল পয়গম্বর সর্বপ্রথম নিজ নিজ সম্প্রদায়কে তওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। আর বর্তমানে তওহীদের দাবীদার বহু মুসলিমদের কাছে তওহীদ ও সুন্নতের ওয়ায-নসীহত করতে হচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ মুসলমান শিরক ও বিদআতে নিমজ্জিত। (আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত করুন।)
আর-রূম 30:36
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহ আস্বাদ করাই, তখন ওরা তাতে উৎফুল্ল হয় এবং নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। [১]
[১] এটাও ঐ একই বিষয়, যা সূরা হূদের ১১:৯-১০ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষের অভ্যাস এই যে, সুখের সময় তারা গর্বিত হয় এবং দুর্দশার সময় হতাশ হয়ে পড়ে। তবে মু'মিনগণ এ ব্যাপারে পৃথক। তারা দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণ করে এবং সুখের সময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অর্থাৎ নেক আমল করে। অবশ্য তাদের জন্য উভয় অবস্থাই মঙ্গল ও নেকী উপার্জনের কারণ হয়ে যায়।
আর-রূম 30:37
ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন অথবা তা হ্রাস করেন। [১] এতে অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে ।
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ নিজ হিকমত ও সুকৌশল অনুযায়ী ধন-সম্পদ কাউকে বেশি এবং কাউকে কম দিয়ে থাকেন। এমনকি অনেক সময় জ্ঞান-বুদ্ধি ও বাহ্যিক উপায়-উপকরণে দুই ব্যক্তিকে একই রকম মনে হয়, একই ধরণের ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করে। কিন্তু একজন ব্যবসায় বড় উন্নতি লাভ করে এবং অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়। আর দ্বিতীয়জনের ব্যবসা-বাণিজ্য সীমাবদ্ধ অবস্থাতেই থেকে যায় এবং তার আয়-উন্নতি বেশী হয় না। তাহলে এমন কোন সত্তা আছে, যার হাতে সকল এখতিয়ার রয়েছে এবং যিনি এই রকম পৃথক পৃথক ব্যবস্থা করে থাকেন? এ ছাড়া তিনি কখনো অনেক ধন-সম্পদের মালিককে ভিখারী, আর ভিখারীকে ধনী করেন। এ সব সেই মহান আল্লাহর হাতে আছে, যাঁর কোন অংশীদার নেই।
আর-রূম 30:38
অতএব আত্মীয়-স্বজনকে, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরকে তাদের প্রাপ্য দান কর। [১] এ যারা আল্লাহর মুখমন্ডল (দর্শন[২] বা সন্তুষ্টি) কামনা করে, তাদের জন্য শ্রেয় এবং তারাই সফলকাম।
[১] রুযীর ব্যাপারটা যখন সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে এবং তিনি যার জন্য ইচ্ছা রুযী বর্ধিত করেন, তখন ধনীদের উচিত, আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ থেকে ঐ সকল হক আদায় করবে, যা আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য রাখা হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের অধিকার বেশি থাকার কারণে তাদের উল্লেখ প্রথমে করা হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "গরীব আত্মীয়-স্বজনকে দান করলে দ্বিগুণ নেকী পাওয়া যায়; এক তো দানের নেকী, দ্বিতীয় আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখার নেকী।" এ ছাড়া 'হক, অধিকার বা প্রাপ্য' বলে এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, দান করে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করছ না; বরং প্রাপকের প্রাপ্য অধিকার আদায় করছ মাত্র।
[২] অর্থাৎ, জান্নাতে আল্লাহর চেহারা দর্শন কামনা করে।
আর-রূম 30:39
লোকের ধন বৃদ্ধি পাবে এ উদ্দেশ্যে তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা বৃদ্ধি হয় না;[১] কিন্তু তোমরা আল্লাহর মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য যে যাকাত দিয়ে থাক, তাই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে; সুতরাং ওরাই সমৃদ্ধিশালী।[২]
[১] অর্থাৎ, সূদ বাহ্য দৃষ্টিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও প্রচুর মনে হয়, আসলে কিন্তু তা নয়। বরং তার অভিশাপ ইহ-পরকালে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে আব্বাস এবং আরো অনেক সাহাবা (রাঃ) ও তাবেঈনগণের নিকট এই আয়াতে বর্ণিত 'রিবা' শব্দটির অর্থ সূদ নয়; বরং তা হল ঐ সকল উপহার-উপঢৌকন যা কোন গরীব ব্যক্তি ধনী ব্যক্তিকে অথবা কোন প্রজা রাজাকে এবং কোন চাকর তার প্রভুকে এই নিয়তে পেশ করে থাকে যে, এর পরিবর্তে সে তার থেকে বেশি পাবে। দেওয়ার সময় বেশি পাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে তাই তাকে 'রিবা' (সূদ) বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। যদিও এই রকম করাটা বৈধ কর্ম, তবুও আল্লাহর নিকট এর কোন সওয়াব নেই। فَلاَ يَربُوا عِندَ الله (আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি হয় না) দ্বারা আখেরাতে সওয়াব দেওয়া হবে না বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় আয়াতের অর্থ হবেঃ 'যে উপঢৌকন তোমরা অধিক পাওয়ার আশায় দিয়ে থাক, আল্লাহর নিকট তার কোন সওয়াব নেই।' (ইবনে কাসীর,আইসারুত তাফাসীর)
[২] যাকাত ও দান-খয়রাতে প্রথমতঃ দাতার ধনে এক প্রকার আধ্যাত্মিক ও নিগূঢ় বৃদ্ধি লাভ হয়, অর্থাৎ অবশিষ্ট ধন-সম্পদে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ কিয়ামতের দিন তার সওয়াব ও নেকী বহুগুণ পাওয়া যাবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর সমতুল্য দান বৃদ্ধি হয়ে উহুদ পর্বত ন্যায় হয়ে যায়।" (সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যাকাত)
আর-রূম 30:40
আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদেরকে রুযী দিয়েছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং পরে তোমাদেরকে জীবিত করবেন। তোমাদের শরীকদের এমন কেউ আছে কি, যে এ সমস্তের কোন একটি করতে পারে? ওরা যাদেরকে শরীক স্থাপন করে, আল্লাহ তা হতে পবিত্র, মহান।
আর-রূম 30:41
মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; যাতে ওদের কোন কোন কর্মের শাস্তি ওদেরকে আস্বাদন করানো হয়। যাতে ওরা (সৎপথে) ফিরে আসে। [১]
[১] 'স্থল' বলতে মানুষের বাসভূমি এবং জল বলতে সমুদ্র, সামুদ্রিক পথ এবং সমুদ্র-উপকূলে বসবাসের স্থান বুঝানো হয়েছে। 'ফাসাদ' (বিপর্যয়) বলতে ঐ সকল আপদ-বিপদকে বুঝানো হয়েছে, যার দ্বারা মনুষ্য-সমাজে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট হয় এবং মানুষের শান্তিময় জীবন-যাত্রা ব্যাহত হয়। এই জন্য এর অর্থ গোনাহ ও পাপাচরণ করাও সঠিক। অর্থাৎ, মানুষ এক অপরের উপর অত্যাচার করছে, আল্লাহর সীমা লংঘন করছে এবং নৈতিকতার বিনাশ সাধন করছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়েছে। অবশ্য 'ফাসাদ'-এর অর্থ আকাশ-পৃথিবীর ঐ সকল বিপর্যয় নেওয়াও সঠিক, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি ও সতর্কতা স্বরূপ প্রেরণ করা হয়। যেমন দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অনিরাপত্তা, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি। উদ্দেশ্য এই যে, যখন মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নেয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিফল স্বরূপ তাদের কর্মপ্রবণতা মন্দের দিকে ফিরে যায় এবং তার ফলে পৃথিবী নানা বিপর্যয়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সুখ-শান্তি বিলীন হয় এবং তার পরিবর্তে ভয়-ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, ছিন্তাই-ডাকাতি, লড়াই ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। তার সাথে সাথে কখনো আকাশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন আপদ-বিপদ (প্রাকৃতিক দুর্যোগ)ও প্রেরিত হয়। আর তাতে উদ্দেশ্য এই থাকে যে, ঐ সর্বনাশী বিপর্যয় ও আপদ-বিপদ দেখে সম্ভবত মানুষ পাপকর্ম থেকে বিরত হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করে পুনরায় তাঁর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসবে। এর বিপরীত যে সমাজের রীতি-নীতি ও চাল-চলন আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যে সমাজে আল্লাহর 'হদ্দ' (দন্ডবিধি) কায়েম হয়, অত্যাচারের জায়গায় ন্যায়পরায়ণতা বিরাজ করে, সে সমাজে সুখ-শান্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মঙ্গল ও বরকত দেওয়া হয়। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার একটি 'হদ্দ' কায়েম করা সেখানকার মানুষের জন্য চল্লিশ দিনের বৃষ্টি থেকেও উত্তম।" (নাসাঈ, ইবনে মাজা) অনুরূপ একটি হাদীসে এসেছে, "যখন একটি পাপাচারী মারা যায়, তখন শুধু মানুষই নয়; বরং গ্রাম-শহর, গাছপালা এবং প্রাণীরাও পর্যন্ত শান্তিলাভ করে।" (বুখারীঃ কিতাবুর রিক্বাক, মুসলিমঃ কিতাবুল জানাইয)
আর-রূম 30:42
বল, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে দেখ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে। ওদের অধিকাংশই ছিল অংশীবাদী।’[১]
[১] এখানে বিশেষ করে অংশীবাদী ও মুশরিকদের কথা উল্লেখ হয়েছে। যেহেতু শিরক হল সবচাইতে বড় গোনাহ। এ ছাড়াও এতে অন্যান্য পাপাচার ও অবাধ্যতাও এসে যায়। কারণ, অন্যান্য পাপও মানুষ নিজের প্রবৃত্তি-পূজার ফলেই করে থাকে। এই জন্য অনেকেই পাপ ও অবাধ্যাচরণকে আমলগত শিরক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আর-রূম 30:43
যে দিবস অনিবার্য,[১] আল্লাহর নির্দেশে তা উপস্থিত হওয়ার পূর্বে তুমি স্থিতিশীল ধর্মে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কর; সেদিন মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়বে। [২]
[১] অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সংঘটিত হওয়াকে কেউ নিবারণ করতে বা বাধা দিতে পারবে না। অতএব তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর আনুগত্যের পথ বেছে নিয়ে সৎকর্ম করে পুণ্য সঞ্চয় করে নাও।
[২] অর্থাৎ, দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে; এক দল মু'মিন, অপর দল কাফের।
আর-রূম 30:44
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সে-ই দায়ী। আর যারা সৎকাজ করে, তারা নিজেদেরই জন্য সুখশয্যা রচনা করে। [১]
[১] مهد এর অর্থ রাস্তা সমান করা, বিছানা বিছানো। অর্থাৎ তারা নেক আমল দ্বারা জান্নাত যাওয়া এবং জান্নাতে উচ্চস্থান অর্জন করার নিমিত্তে রাস্তা নির্মাণ ও সুখশয্যা রচনা করে।
আর-রূম 30:45
কারণ, যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন।[১] নিশ্চয় তিনি অবিশ্বাসীদেরকে ভালবাসেন না।
[১] অর্থাৎ, জান্নাত অর্জনের জন্য শুধু নেকীই ততক্ষণ পর্যন্ত যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সাথে আল্লাহর অনুগ্রহ শামিল হবে। সুতরাং তিনি স্বীয় অনুগ্রহে এক এক নেকীর বিনিময় দশ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেবেন।
আর-রূম 30:46
আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি এই যে, তিনি সুসংবাদবাহীরূপে[১] বায়ু প্রেরণ করেন; যাতে তিনি তোমাদেরকে নিজ অনুগ্রহ আস্বাদন করান[২] এবং যাতে তাঁর নির্দেশে জলযানগুলি বিচরণ করে,[৩] আর যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার[৪] এবং তাঁর কৃতজ্ঞ হতে পার।[৫]
[১] অর্থাৎ, বৃষ্টির সুসংবাদবাহীরূপে।
[২] অর্থাৎ, বৃষ্টিদানে তোমাদেরকে আনন্দিত করেন এবং ক্ষেতের ফসলও সবুজ হয়ে মেতে ওঠে।
[৩] অর্থাৎ, সেই বায়ু দ্বারা নৌকা চলাচল করে; উদ্দেশ্য পাল-তোলা নৌকা। বর্তমানে মানুষ আল্লাহর দেওয়া বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রচালিত জলজাহাজ, নৌকা ইত্যাদি তৈরি করেছে। তারপরেও তার জন্য অনুকূল বায়ুর প্রয়োজন। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা তাকে তুফানী ঢেউ দ্বারা সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
[৪] অর্থাৎ, তার সাহায্যে বিভিন্ন দেশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা (তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার)।
[৫] ঐ সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অগণিত অনুগ্রহ ও নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হতে পার। অর্থাৎ, এই সকল অনুগ্রহ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এই জন্য প্রদান করে থাকেন, যাতে তোমরা নিজেদের জীবন-যাত্রায় তার দ্বারা উপকৃত হও এবং আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য কর।
আর-রূম 30:47
আমি তো তোমার পূর্বে রসূলদেরকে তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম, তারা ওদের নিকট সুস্পষ্ট বহু নিদর্শন এনেছিল; অতঃপর আমি অপরাধীদের শাস্তি দিয়েছিলাম। আর বিশ্বাসীদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।[১]
[১] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! যেমন আমি তোমাকে তোমার সম্প্রদায়ের নিকট রসূল করে প্রেরণ করেছি, অনুরূপ তোমার পূর্বের রসূলগণকে তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। তাদের সাথে যথাযথ প্রমাণ ও অলৌকিক নিদর্শনাবলী ছিল। কিন্তু তাদের সম্প্রদায়রা তাদেরকে মিথ্যা মনে করেছিল এবং তাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করেনি। অবশেষে তাদের মিথ্যাজ্ঞান ও অবাধ্যতার পাপের ফলে আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি এবং আমার কর্তব্য হিসাবে মু'মিনদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছি। এটা আসলে নবী (সাঃ) ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী মুসলিমদের জন্য সান্ত্বনা যে, কাফের ও মুশরিকদের মিথ্যাজ্ঞান করাতে ভয়ের কোন কারণ নেই। যেহেতু এটা কোন নতুন কথা নয়; বরং প্রত্যেক নবীর সাথে তাঁর জাতি একই রকম ব্যবহার প্রদর্শন করেছে। অনুরূপ এটা কাফেরদের জন্য সতর্কবাণী যে, যদি তারা ঈমান আনয়ন না করে, তাহলে তাদেরও শেষ ফল তাই হবে, যা পূর্ববর্তী জাতিদের হয়েছে। কারণ আল্লাহর সাহায্য তো পরিশেষে মু'মিনদের জন্যই আসে; যাতে পয়গম্বর ও মু'মিনগণ সকলেই শামিল থাকেন। حَقاًّ শব্দটি كان এর খবর হিসেবে ব্যবহার হয়েছে এবং তা তার ইসম (বিশেষ্য)র পূর্বে ব্যবহার হয়েছে, আর তা হল نَصرُ المُؤمِنِين ।
আর-রূম 30:48
আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, ফলে তা (বায়ু) মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে;[১] অতঃপর তিনি একে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন,[২] পরে একে খন্ড-বিখন্ড করেন[৩] এবং তুমি দেখতে পাও, তা থেকে বারিধারা নির্গত হয়।[৪] অতঃপর যখন তিনি তাঁর দাসদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা তা দান করেন; তখন ওরা হর্ষোৎফুল্ল হয়।
[১] অর্থাৎ, সে মেঘমালা যেখানেই থাকুক, সেখান থেকে বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
[২] কখনো চালিয়ে, কখনো স্থির রেখে, কখনো থাক-থাক ঘনীভূত করে, কখনো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ করে। এইভাবে আকাশে মেঘমালার বিভিন্ন রূপ হয়ে থাকে।
[৩] অর্থাৎ, মেঘমালাকে আকাশে ছড়িয়ে দেওয়ার পর কখনো তাকে বিভিন্ন খন্ডে বিভক্ত করে দেন।
[৪] وَدَق এর অর্থ বৃষ্টি। অর্থাৎ ঐ সকল মেঘমালা থেকে আল্লাহ যখন চান বৃষ্টি বর্ষণ হয়। যাতে বৃষ্টির প্রয়োজন বোধকারিগণ আনন্দিত হয়।
আর-রূম 30:49
ওরা অবশ্যই ওদের প্রতি বৃষ্টি প্রেরিত হওয়ার পূর্বে নিরাশ থাকে।
আর-রূম 30:50
সুতরাং তুমি আল্লাহর করুণার চিহ্ন লক্ষ্য কর, কিভাবে তিনি ভূমির মৃত্যুর পর একে পুনর্জীবিত করেন। নিঃসন্দেহে তিনি মৃতকে জীবিত করবেন[১] এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
[১] 'করুণার চিহ্ন' বলতে ঐ সকল ফল-ফসলকে বুঝানো হয়েছে, যা বৃষ্টির পানিতে উৎপন্ন হয় এবং মানুষের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের কারণ হয়। এখানে লক্ষ্য করা বা দেখার অর্থ হল, শিক্ষা গ্রহণের চোখে দেখা, যাতে মানুষ আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা এবং কিয়ামতের দিন তিনি যে মৃতকে জীবিত করবেন, সে কথা স্বীকার করে নেয়।
আর-রূম 30:51
আমি যদি এমন বায়ু প্রেরণ করি, যার ফলে ওরা দেখে শস্য পীতবর্ণ ধারণ করেছে, তাহলে তখন তো ওরা অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে।[১]
[১] অর্থাৎ, ঐ সকল ভূখন্ড, যা আমি বৃষ্টির পানি দ্বারা শস্য-শ্যামল করেছিলাম। এখন যদি অতি গরম বা ঠান্ডা বায়ু দিয়ে তার সেই শ্যামলতাকে হলুদ করে দেওয়া হয়; অর্থাৎ, তাদের তৈরি ফসলকে নষ্ট করে দেওয়া হয়, তাহলে বৃষ্টি পেয়ে ঐ সকল আনন্দিত ব্যক্তিরা আল্লাহর অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবে। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহকে অমান্যকারীরা ধৈর্য ও মনোবল থেকে বঞ্চিত হয়। এরা সামান্য সুখবরে আনন্দে আটখানা হয়, আবার সামান্য কষ্টভোগের দরুন হতাশ হয়ে পড়ে। মু'মিনগণ দুই অবস্থাতেই এদের থেকে আলাদা। তার বিস্তারিত বিবরণ পূর্বে গত হয়েছে।
আর-রূম 30:52
নিশ্চয় তুমি মৃতকে তোমার কথা শোনাতে পারবে না[১] এবং বধিরকেও তোমার আহবান শোনাতে পারবে না;[২] যখন ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। [৩]
[১] অর্থাৎ, যেমন মৃত ব্যক্তি কিছু বুঝতে অপারগ, অনুরূপ এরাও নবী (সাঃ)-এর দাওয়াত বুঝতে ও গ্রহণ করতে অপারগ।
[২] অর্থাৎ, তুমি যেমন কোন বধির বা কালা ব্যক্তিকে নিজের কথা শোনাতে পারবে না, তেমনি তোমার ওয়ায-নসীহত ওদের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলবে না।
[৩] এটা তাদের বৈমুখ্য ও সত্যচ্যুত হওয়ার আরো বিস্তারিত বর্ণনা যে, তারা মৃত ও বধির সদৃশ হওয়ার সাথে সাথে তারা পিঠ ফিরিয়ে পলায়নকারীও। সুতরাং সত্যের আহবান তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছবে কিভাবে এবং কিভাবে তা তাদের মন-মস্তিষ্ক আশ্রয় গ্রহণ করবে?
আর-রূম 30:53
আর অন্ধকেও ওদের পথভ্রষ্টতা হতে পথে আনতে পারবে না।[১] যারা আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস করে, শুধু তাদেরকেই তোমার কথা শোনাতে পারবে,[২] কারণ তারা আত্মসমর্পণকারী। [৩]
[১] এই জন্য যে, তারা চক্ষু দ্বারা যথাযথ উপকারিতা অর্জন অথবা অন্তর্দৃষ্টির দর্শন থেকে বঞ্চিত। তারা ভ্রষ্টতার যে ঘূর্ণিপাকে নিমজ্জিত, তা হতে কিভাবে বের হবে?
[২] অর্থাৎ, এরা শ্রবণ করা মাত্র ঈমান আনয়ন করে। কারণ এরা হল চিন্তাশীল ব্যক্তি; এরা অসীম ক্ষমতার প্রভাব দেখে প্রকৃত প্রভাবশালীর পরিচয় অর্জন করতে পারে।
[৩] অর্থাৎ, হকের কাছে আত্মসমর্পণ করে, ন্যায়কে স্বীকার করে নেয় এবং তা মেনে চলে।
আর-রূম 30:54
আল্লাহ তিনি তোমাদেরকে দুর্বলরূপে সৃষ্টি করেন,[১] অতঃপর দুর্বলতার পর তিনি শক্তি দান করেন,[২] শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।[৩] তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন[৪] এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ।
[১] এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় অসীম ক্ষমতার আরো একটি পরিপূর্ণতার কথা বর্ণনা করছেন। আর তা হল, মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর। দুর্বলতার অর্থ হল, পানির ফোঁটা (বীর্যবিন্দু) অথবা শিশু অবস্থা।
[২] অর্থাৎ, যৌবনকাল, যাতে দৈহিক ও জ্ঞান-বুদ্ধির শক্তি পরিপূর্ণতা লাভ করে।
[৩] দুর্বলতা বলতে বার্ধক্যকালকে বুঝানো হয়েছে, যে কালে জ্ঞান-বুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি কম হতে শুরু করে। আর বার্ধক্য বলতে বৃদ্ধ বয়সের ঐ অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে, যখন মানুষ অতি দুর্বল হয়ে পড়ে, মনোবল ক্ষীণ হয়ে যায়, অস্থি ও হাত-পায়ের সঞ্চালন ও ধারণ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, চুল সাদা হয় এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক সকল হুলিয়ার পরিবর্তন ঘটে। কুরআন মনুষ্য-জীবনের এই চারটি বড় বড় স্তরের কথা উল্লেখ করেছে। কিছু আলেমগণ তার অন্যান্য ছোট ছোট স্তরের কথাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন; যা কুরআনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ব্যাখ্যা। যেমন ইবনে কাসীর বলেন, মানুষ একের পর এক ঐ সকল অবস্থা ও স্তরে উপনীত হয়। তার মূল উপাদান হল মাটি -- অর্থাৎ, তার পিতা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি মাটি থেকে হয়েছে অথবা মানুষ যে খাবার খায় এবং তাতে যে বীর্য তৈরী হয়, যে বীর্য মায়ের গর্ভাশয়ে স্থান পেয়ে মানুষের জন্ম হয়, তা আসলে মাটি থেকেই উৎপাদিত। তারপর তা বীর্য, বীর্য থেকে রক্তপিন্ড, অতঃপর গোশতপিন্ড, অতঃপর গোশতপিন্ডকে পরিণত করা হয় অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে ঢেকে দেওয়া হয় গোশত দ্বারা, অতঃপর তাতে 'রূহ' সঞ্চার করা হয়। তারপর মাতৃগর্ভ থেকে অতি ছোট, দুর্বল ও কোমল অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করে। তারপর ধীরে ধীরে সে বাড়তে থাকে, শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকালে পদার্পণ করে, তারপর শুরু হয় দুর্বলতার দিকে ফিরে যাওয়ার পালা। তারপর বার্ধক্যের আরম্ভ, অতঃপর স্থবিরতা এবং পরিশেষে মৃত্যু তাকে নিজের কোলে টেনে নেয়।
[৪] অর্থাৎ, সকল প্রকার সৃষ্টি তিনি করতে পারেন। তার মধ্যে দুর্বলতা ও সবলতাও; যা মানুষের জীবনে অতিবাহিত হয়ে থাকে এবং যার বিস্তারিত আলোচনা বর্ণনা করা হল।
আর-রূম 30:55
যেদিন কিয়ামত হবে,[১] সেদিন অপরাধীরা শপথ করে বলবে যে, তারা (পৃথিবীতে) মুহূর্তকালের বেশী অবস্থান করেনি।[২] এভাবেই তারা সত্য বিমুখ হত। [৩]
[১] سَاعَة এর অর্থ হল সময়, কাল, মুহূর্ত। উদ্দেশ্য হল মহাকাল কিয়ামতের দিন। سَاعَة এই জন্য বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যখনই চাইবেন তা মুহূর্তের মধ্যে সাথে সাথে প্রতিষ্ঠিত হবে অথবা এই জন্য বলা হয়েছে যে, তা যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনকার সময়টা হবে পৃথিবীর সর্বশেষ সময়।
[২] পৃথিবীতে অথবা কবরে। তারা নিজেদের অভ্যাস মত মিথ্যা কসম খাবে। কারণ তারা পৃথিবীতে যতদিন অবস্থান করেছে তা তো তাদের জানা। আর যদি উদ্দেশ্য কবরের জীবন হয়, তবে তাদের কসম অজ্ঞতাবশতঃ হবে। কারণ কবরের অবস্থানের সময় তাদের অজানা। অনেকে বলেন যে, কিয়ামতের কঠিনতা ও ভয়াবহতা (বা দীর্ঘতা)র কারণে পৃথিবীর জীবন তাদেরকে সামান্য ক্ষণ বা মুহূর্তকাল মনে হবে।
[৩] أَفَكَ الرَّجُلُ এর অর্থ হল 'সত্যবিমুখ হয়ে গেছে' উদ্দেশ্য তারা পৃথিবীতে সত্য থেকে বিমুখ ছিল।
আর-রূম 30:56
কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান ও বিশ্বাস দেওয়া হয়েছে তারা বলবে,[১] ‘তোমরা তো আল্লাহর বিধানে[২] পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করেছ।[৩] এটিই তো পুনরুত্থান দিবস; কিন্তু তোমরা জানতে না।’ [৪]
[১] যেমন তারা পৃথিবীতেও বুঝিয়েছিল।
[২] كتاب الله (আল্লাহর বিধান) বলতে আল্লাহর ইলম ও তাঁর ফায়সালা, অর্থাৎ 'লাওহে মাহফূয' উদ্দেশ্য।
[৩] অর্থাৎ, জন্মদিন হতে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত।
[৪] তোমরা জানতে না যে, কিয়ামত আসবে বরং ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও মিথ্যাজ্ঞান করে তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দাবী করতে।
আর-রূম 30:57
সেদিন সীমালংঘনকারীদের ওজর-আপত্তি ওদের কাজে আসবে না এবং ওদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের সুযোগও দেওয়া হবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে পৃথিবীতে পুনরায় প্রেরণ করে তওবা ও আনুগত্য করে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন সুযোগ দেওয়া হবে না।
আর-রূম 30:58
আমি তো মানুষের জন্য এ কুরআনে সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত দিয়েছি,[১] তুমি যদি ওদের নিকট কোন নিদর্শনও উপস্থিত কর,[২] তাহলে অবিশ্বাসীরা অবশ্যই বলবে, ‘তোমরা তো মিথ্যাশ্রয়ী।’[৩]
[১] যাতে আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ এবং রসূলগণের সত্যবাদিতার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। অনুরূপ শিরকের খন্ডন ও তার অসারতার কথাও পরিষ্কার করা হয়েছে।
[২] তা কুরআনে বর্ণিত কোন প্রমাণ হোক অথবা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কোন অলৌকিক ঘটনা ইত্যাদি হোক।
[৩] অর্থাৎ, যাদু ইত্যাদির অনুসারী। উদ্দেশ্য এই যে, যত বড়ই নিদর্শন এবং যত উজ্জ্বল প্রমাণই তারা প্রত্যক্ষ করুক না কেন, তবুও ঈমান আনবে না? তার কারণ পরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন। যা এই কথারই নিদর্শন যে, তাদের কুফরী ও অবাধ্যতা এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যার পরে সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সকল পথ তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
আর-রূম 30:59
আল্লাহ এভাবে যাদের জ্ঞান নেই, তাদের হৃদয়ে মোহর করে দেন।
আর-রূম 30:60
অতএব তুমি ধৈর্য ধর,[১] নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। যারা দৃঢ় বিশ্বাসী নয় তারা যেন অবশ্যই তোমাকে বিচলিত করতে না পারে।[২]
[১] অর্থাৎ, তাদের বিরোধিতা ও শত্রুতা এবং তাদের কষ্টদায়ক কথার উপর ধৈর্য ধর। কারণ আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অবশ্যই সত্য এবং তা যেভাবেই হোক পূর্ণ হবে।
[২] অর্থাৎ, তোমাকে ক্রোধান্বিত করে ধৈর্য-সহ্য ত্যাগ করতে অথবা নমনীয়তা অবলম্বন করতে বাধ্য না করে ফেলে। বরং তুমি তোমার নিজ কর্তব্যে অবিচলিত থাকবে এবং তা হতে এতটুকুও বিচ্যুত হবে না।
লুকমান 31:1
আলিফ, লাম, মীম ; [১]
[১] এই সূরার শুরুতেও 'হরূফে মুক্বাত্ত্বাআত' (বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা) আছে। যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ অবগত নয়। এর পরেও কোন কোন মুফাস্সির এর দুটো বড় গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিকতা বর্ণনা করেছেন। প্রথম এই যে, এই কুরআন এই শ্রেণীরই বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা সুবিন্যস্ত ও লিপিবদ্ধ, যার অনুরূপ কোন লিপি পেশ করতে আরববাসীরা অসমর্থ হয়েছে। সুতরাং এ কথা প্রমাণ দেয় যে, এই কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণ করা একটি গ্রন্থ এবং যার প্রতি তা অবতীর্ণ করা হয়েছে তিনি সত্যই রসূল। তিনি যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন মানুষ তার মুখাপেক্ষী এবং মানুষের পরিশুদ্ধি ও সৌভাগ্যের পরিপূর্ণতা একমাত্র এই শরীয়ত দ্বারাই সম্ভব। দ্বিতীয় এই যে, কাফেররা নিজেদের সাথীদেরকে এই কুরআন শ্রবণ করা থেকে বিরত রাখত এই ভয়ে যে, তারা তা শ্রবণ করে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সূরা বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা আরম্ভ করেছেন, যাতে তারা তা শ্রবণ করতে বাধ্য হয়। কারণ এই বর্ণনা-ভঙ্গি অভিনব ও নতুন ছিল। (আইসারুত তাফাসীর) আর আল্লাহই অধিক জানেন।
লুকমান 31:2
এগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থের বাক্য,
লুকমান 31:3
সৎকর্মপরায়ণদের[১] জন্য পথনির্দেশ ও করুণা স্বরূপ;
[১] مُحسِن এক অর্থ হল, পিতা-মাতা, আত্মীয়, হকদার ও অভাবীদের সাথে সদ্ব্যবহারকারী। দ্বিতীয় অর্থ হল, সৎকর্মপরায়ণ; অর্থাৎ অসৎকর্ম থেকে দূরে থেকে সৎকর্ম সম্পাদনকারী। তৃতীয় অর্থ হল, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে ইখলাস (আন্তরিকতা) ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী। যেমন হাদীসে জিবরীলে বর্ণনা হয়েছে; 'ইহসান' হল এমনভাবে ইবাদত করা, যাতে মনে হয়, যেন আল্লাহকে দেখছি অথবা তিনি আমাকে দেখছেন। প্রকৃতপক্ষে কুরআন সারা পৃথিবীর জন্য করুণা ও পথপ্রদর্শক; কিন্তু তা হতে প্রকৃত উপকৃত হয়ে থাকে শুধুমাত্র পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণগণই, তাই এখানে তাঁদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
লুকমান 31:4
যারা যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত দেয় ও পরলোকে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। [১]
[১] নামায ও যাকাত আদায় এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস এই তিনটিই অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তাই বিশেষ করে এইগুলোকে (পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণদের কর্মরূপে) উল্লেখ করা হয়েছে। নচেৎ তাঁরা তো আসলে সকল ফরয ও সুন্নত বরং মুস্তাহাব কর্মাবলীকেও যথাযথভাবে মেনে চলেন।
লুকমান 31:5
ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম। [১]
[১] فَلاح (সফলতা)র অর্থ জানার জন্য সূরা বাক্বারাহ ২:৫নং ও সূরা মু'মিনূনের ১নং আয়াতের তফসীর দেখুন।
লুকমান 31:6
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞ লোকদের আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে[১] এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।[২] ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। [৩]
[১] সৌভাগ্যবান মানুষরা আল্লাহর কিতাব দ্বারা পথপ্রাপ্ত হন এবং তা শ্রবণ করে উপকৃত হন। তাঁদের কথা উল্লেখের পর ঐ সকল দুর্ভাগ্যবানদের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যারা আল্লাহর কুরআন শ্রবণ করা থেকে দূরে থাকে, বরং গান-বাজনা ইত্যাদি খুব একাগ্রতার সাথে শোনে এবং তাতে বড় আগ্রহী হয়। এখানে 'ক্রয় করা'র অর্থ হচ্ছে, গান-বাজনার সামগ্রী (ক্রয় করে) নিজেদের ঘরে নিয়ে আসে এবং তৃপ্তি সহকারে তার সুর ও ঝংকার উপভোগ করে। لَهوَ الحَدِيث (অসার বাক্য) বলতে গান-বাজনা ও তার সামগ্রী, বাঁশি এবং ঐ সকল যন্ত্র যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাস করে দেয়। কেচ্ছা-কাহিনী, রূপকথা, উপকথা, নাটক, উপন্যাস, অশ্লীল ও সেক্সী পত্র-পত্রিকা এবং বর্তমানের রেডিও, অডিও, টিভি, সিডি, ভিসিয়ার, ভিসিপি, ডিভিডি এবং ভিডিও ফিল্ম ইত্যাদিও এর মধ্যে পড়ে। নবী (সাঃ)-এর যুগে অনেকে গায়িকা ক্রীতদাসী এই উদ্দেশ্যে ক্রয় করত যে, যাতে সে গান শুনিয়ে লোকেদের মন জয় করতে এবং কুরআন ও ইসলাম থেকে দূরে রাখতে পারে। এই অর্থে গায়ক-গায়িকা ও নায়ক-নায়িকাও এসে যায়। বর্তমানে যাদেরকে শিল্পী, ফিল্মী তারকা, সাংস্কৃতিক, না জানি আরো কত রকম সভ্য, চিত্তাকর্ষী এবং মন-মাতানো নামে অভিহিত করা হয়!
[২] এই সকল বস্তুর মাধ্যমে অবশ্যই মানুষ আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং দ্বীনকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের নিশানা বানায়।
[৩] এ সবের পৃষ্ঠপোষক ও উৎসাহদাতা সরকার, প্রতিষ্ঠান বা কারখানার মালিক, পত্র-পত্রিকার সম্পাদক, লেখক বা রচয়িতা এবং সংযোজক ও পরিচালকরাও এই কঠোর শাস্তির ভাগী হবে। (আল্লাহ আমাদের তা থেকে পরিত্রাণ দিন।)
লুকমান 31:7
যখন ওদের নিকট আমার বাক্য আবৃত্তি করা হয়, তখন ওরা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়; যেন ওরা তা শুনতে পায়নি; যেন ওদের কান দু’টি বধির।[১] অতএব ওদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।
[১] এটা ঐ সকল মানুষদের অবস্থা, যারা উল্লিখিত অসার ও মন উদাসকারী বস্তুসমূহ নিয়ে মগ্ন থাকে। কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহ ও রসূলের কথা শুনতে তারা বধির হয়ে যায় অথচ তারা বধির (বা কালা) নয়। তারা অন্য দিকে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঠিক যেন তারা শুনতেই পায়নি। কারণ তা শুনতে তারা কষ্ট অনুভব করে। এই জন্য তা শোনাতে তাদের কোন উপকারও হয় না। وَقر এর অর্থ কানের মধ্যে এমন বোঝা, যার ফলে কিছু শোনা যায় না।
লুকমান 31:8
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে সুখের উদ্যানরাজি;
লুকমান 31:9
সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।[১] আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] অর্থাৎ, তা নিঃসন্দেহে পূর্ণ হবে। কারণ এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি। আর আল্লাহ নিজ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
লুকমান 31:10
তিনি আকাশমন্ডলীকে স্তম্ভবিহীন নির্মাণ করেছেন; তোমরা তা দেখছ।[১] তিনিই পৃথিবীতে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়[২] এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জীবজন্তু।[৩] আর আমি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে, তাতে সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ উদ্গত করেছি। [৪]
[১] تَرَونَهَا যদি عَمَد শব্দটির বিশেষণ হয়, তাহলে অর্থ হবেঃ তিনি আকাশমন্ডলীকে এমন স্তম্ভ ছাড়াই নির্মাণ করেছেন; যা তোমরা দেখতে পাও। অর্থাৎ, আসমানের স্তম্ভ আছে; কিন্তু তা এমন যা, তোমরা দেখতে পাও না।
[২] رَوَاسِي শব্দটি رَاسِيَة এর বহুবচন। যার অর্থঃ স্থিতিশীল। অর্থাৎ, পর্বতমালাকে পৃথিবীর উপর ভারী বোঝা করে রাখা হয়েছে যাতে পৃথিবী স্থির থাকে এবং নড়া-চড়া না করে। এই জন্য পরে বলা হয়েছে, أَن تَمِيدَ بِكُم অর্থাৎ, এই কথা অপছন্দ করে যে, পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত হবে অথবা এই জন্য যে, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক না দোলে। যেমন সমুদ্র তীরে সামুদ্রিক জাহাজগুলোকে বড় বড় নঙ্গর গেড়ে বেঁধে দেওয়া হয় যাতে জাহাজ সরে না যায়। পৃথিবীর জন্য পর্বতমালাও অনুরূপ নঙ্গর স্বরূপ।
[৩] অর্থাৎ, বিভিন্ন প্রকার জীব-জন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কিছু মানুষ ভক্ষণ করে থাকে, কিছু সওয়ারীরূপে ব্যবহার করে, কিছুকে জমি চাষাবাদের কাজে লাগায় এবং কিছুকে সৌন্দর্য স্বরূপ নিজের কাছে রাখে।
[৪] زَوج শব্দটি এখানে صِنف (প্রকার বা শ্রেণী)এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বপ্রকার শস্য, ফলমূল ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন। তার বিশেষণ كَريم শব্দ ব্যবহার করে তার সুন্দর রং ও তার বিবিধ উপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে ।
লুকমান 31:11
এ আল্লাহর সৃষ্টি![১] তিনি ব্যতীত অন্যেরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও তো।[২] বরং সীমালংঘনকারীরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
[১] هٰذَا (এ) শব্দ দ্বারা আল্লাহর ঐ সকল সৃষ্টিকৃত বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যার উল্লেখ পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রয়েছে।
[২] যাদের তোমরা ইবাদত কর এবং সাহায্যের জন্য যাদেরকে ডেকে থাকো তারা আকাশ ও পৃথিবীর কোন্ বস্তুটি সৃজন করেছে? তাদের সৃজনকৃত একটি বস্তুও দেখাও তো। অতএব যখন সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা, তখন ইবাদতের একমাত্র অধিকারীও তিনিই। তিনি ছাড়া বিশ্বজগতে আর এমন কেউ নেই, যে ইবাদতের যোগ্য হতে পারে এবং তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।
লুকমান 31:12
আমি লুকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম[১] (আর বলেছিলাম), ‘তুমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।[২] যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তা নিজেরই জন্য করে এবং কেউ অকৃতজ্ঞতা করলে নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।’
[১] লুকমান আল্লাহর একজন নেক বান্দা ছিলেন, যাঁকে আল্লাহ তাআলা হিকমত অর্থাৎ, সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি এবং দ্বীনী ইলমে উচ্চ স্থান দান করেছিলেন। একদা তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করল যে, 'আপনি এই জ্ঞান-বুদ্ধি কিভাবে অর্জন করলেন?' তার উত্তরে তিনি বললেন, 'সত্যবাদিতা ব্যবহার করে, আমানত রক্ষা করে, বাজে কথা থেকে দূরে থেকে এবং নীরবতা অবলম্বন করে।' তাঁর প্রজ্ঞা ও হিকমত পূর্ণ একটি ঘটনা এ রকমও প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি একজন দাস ছিলেন। একদা তাঁকে তাঁর মালিক বললেন, 'ছাগল যবেহ করে তার মধ্য হতে সর্বোৎকৃষ্ট দুই টুকরো কেটে নিয়ে এস।' সুতরাং তিনি জিভ ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে এসে দিলেন। অন্য এক দিন তাঁর মালিক তাঁকে ছাগল যবেহ করে তার মধ্য হতে সব থেকে নিকৃষ্ট দুই টুকরো নিয়ে আসার আদেশ করলে তিনি পুনরায় জিভ ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে উপস্থিত হলেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, 'জিভ ও হৃৎপিণ্ড যদি ঠিক থাকে, তাহলে তা সর্বোৎকৃষ্ট জীব। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার চেয়ে নিকৃষ্ট জীব আর কিছু হতে পারে না। (ইবনে কাসীর)
[২] কৃতজ্ঞতা বা শুক্র এর অর্থ হল, আল্লাহর নিয়ামতের উপর তাঁর প্রশংসা করা এবং তাঁর আদেশ মেনে চলা।
লুকমান 31:13
(স্মরণ কর) যখন লুকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিল, ‘হে বৎস! আল্লাহর কোন অংশী করো না।[১] আল্লাহর অংশী করা তো চরম অন্যায়।’ [২]
[১] আল্লাহ্ তাআলা লুকমান হাকীমের সর্বপ্রথম অসিয়ত এই উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নিজ ছেলেকে শিরক করতে নিষেধ করেছিলেন। যাতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পিতা-মাতার কর্তব্য হল, নিজেদের সন্তানদেরকে শিরক থেকে বাঁচানোর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক বেশী চেষ্টা করা।
[২] অনেকের নিকট এ বাক্যাংশটি লুকমান হাকীমের উক্তি। আবার অনেকে এটিকে আল্লাহর উক্তি বলেছেন এবং তার সমর্থনে (الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ) আয়াতটি অবতীর্ণ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। যাতে সাহাবাগণ বললেন, 'আমাদের কে আবার যুলম করে না?' সুতরাং তারই পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হল, (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ) (বুখারী ৪৭৭৬নং) কিন্তু আসলে এতে ঐ কথা আল্লাহর উক্তি হওয়ার বা না হওয়ার কোন প্রমাণ হয় না। পক্ষান্তরে অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবাগণ তা বড় কঠিন মনে করে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং তিনি তার উত্তরে বললেন, "তোমরা যা ধারণা করছ, তা নয়। এখানে যুলম বলতে সেই যুলমকে বুঝানো হয়েছে, যার কথা লুকমান তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, (يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ) (বুখারী) এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ উক্তি লুকমান হাকীমেরই ছিল।
লুকমান 31:14
আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি।[১] জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে[২] এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দু বছর অতিবাহিত হয়।[৩] সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই নিকট (সকলের) প্রত্যাবর্তন।
[১] তাওহীদ গ্রহণ (শিরক বর্জন) ও আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদপূর্ণ আদেশের জন্য উক্ত নসীহতের গুরুত্ব স্পষ্ট।
[২] উদ্দেশ্য এই যে, মাতৃগর্ভে বাচ্চা যত বাড়ে, মায়ের উপর কষ্টের বোঝা তত বাড়তে থাকে, যার ফলে মা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পিতা-মাতার অধিকার আদায় করার সময় মাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন হাদীসেও সে কথা বর্ণিত হয়েছে।
[৩] এতে বুঝা যায় যে, শিশুকে দুধ পান করানোর সময় হল দুই বছর, তার অধিক নয়।
লুকমান 31:15
তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর,[১] অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। [২]
[১] অর্থাৎ, (বিশ্বাসী) মুমিনের পথ।
[২] অর্থাৎ, আমার অভিমুখী বিশ্বাসীর পথ অনুসরণ এই জন্য করবে যে, অবশেষে তোমাদের সকলকেই আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে এবং আমারই পক্ষ থেকে সকলকেই তার ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। যদি তোমরা আমার পথ অনুসরণ কর এবং আমাকে স্মরণ রেখে নিজেদের জীবন পরিচালিত কর, তাহলে কিয়ামতের দিন আমার বিচারালয়ে তোমাদের মুখ উজ্জ্বল হওয়ার আশা করা যায়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত কর্মে আমার আযাবে গ্রেফতার হবে। কথা লুকমান হাকীমের অসিয়ত প্রসঙ্গে চলছিল। সামনে পুনরায় সেই অসিয়ত বর্ণনা করা হচ্ছে, যা তিনি আপন বৎসকে করেছিলেন। মাঝের দুটি আয়াতে পৃথকভাবে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। যার প্রথম কারণ এই বলা হয়েছে যে, লুকমান উক্ত অসিয়ত তাঁর ছেলেকে করেননি। কারণ, এতে তাঁর নিজস্ব স্বার্থ ছিল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, যাতে এটা পরিষ্ফুটিত হয়ে যায় যে,আল্লাহর একত্ব ও ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সেবা করা জরুরী। তৃতীয় কারণ এই যে, শিরক করা এত বড় পাপ যে, যদি পিতা-মাতা তা করার আদেশ করেন, তাহলে তাঁদের কথা মানা চলবে না।
লুকমান 31:16
‘হে বৎস ! কোন (পাপ অথবা পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়[১] এবং তা যদি কোন পাথরের ভিতরে অথবা আকাশমন্ডলীতে অথবা মাটির নীচে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সকল বিষয়ে অবগত।
[১] هَا সর্বনামের ইঙ্গিত যদি خَطِيئَة এর দিকে হয়, তাহলে তার অর্থ হবে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপকর্ম। আর যদি خَصلَة এর দিকে হয়, তাহলে তার অর্থ হবে ভাল অথবা মন্দের যে কোন অভ্যাস। উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ ভাল অথবা মন্দ কর্ম যতই গোপনে করুক না কেন, তা আল্লাহর কাছে লুক্কায়িত থাকতে পারে না; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তা উপস্থিত করে নেবেন। অর্থাৎ, তার যথাযথভাবে ভাল আমলের ভাল প্রতিদান ও মন্দ আমলের মন্দ প্রতিফল দেবেন। সরিষা দানার উদাহরণ এই জন্য দিয়েছেন যে,তা এত ছোট হয়, যার না ওজন বুঝা যায় আর না দাঁড়িপাল্লাকে ঝুঁকাতে পারে। অনুরূপ পাথর (সাধারণত বসবাসের স্থান থেকে দূরে জঙ্গল বা পাহাড়ে) একান্ত গুপ্ত ও সুরক্ষিত স্থান। এই অর্থ হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "যদি কোন ব্যক্তি এমন ছিদ্রহীন পাথরেও কোন আমল করে, যার কোন দরজা বা জানালা নেই, তাহলেও আল্লাহ্ তাআলা তাও মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন সে আমল যে ধরনেরই হোক না কেন।" (আহমদ ৩ /২৮) এই জন্য যে, আল্লাহ তাআলা সূক্ষ্মদর্শী; তিনি অতি সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন। নিতান্ত গুপ্ত বস্তুও তাঁর জ্ঞান বহির্ভূত নয় এবং তিনি সর্বজ্ঞ; রাতের অন্ধকারে পিঁপড়ের চলা-ফেরা করার খবরও তিনি রাখেন।
লুকমান 31:17
হে বৎস ! যথারীতি নামায পড়, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজে বাধা দান কর এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ কর। [১] নিশ্চয়ই এটিই দৃঢ় সংকল্পের কাজ। [২]
[১] নামায প্রতিষ্ঠা, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান এবং মুসীবতে ধৈর্যধারণ করার কথা উল্লেখ এই জন্য করা হয়েছে যে, উক্ত তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ভাল কাজের মূল বা ভিত্তি।
[২] অর্থাৎ, পূর্বে আলোচিত কথাগুলি ঐ সকল কর্মের অন্তর্ভুক্ত, যে বিষয়ে আল্লাহ্ তাআলা তাকীদ করেছেন এবং বান্দার উপর তা ফরয করেছেন। অথবা এ হল শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত সৃষ্টি করার জন্য উদ্বুদ্ধকারী। কারণ শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত ছাড়া উল্লিখিত নির্দেশাবলীর উপর আমল অসম্ভব। কোন কোন মুফাসসিরের মতে ذلك (এটি) বলে ধৈর্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের অসিয়ত করা হয়েছে। যেহেতু সে পথে বিভিন্ন কষ্ট ও মানুষের কথার খোঁচা ইত্যাদি হওয়াটা স্বাভাবিক সেহেতু তার পরেই ধৈর্যধারণের কথা বলে পরিষ্কার বুঝানো হয়েছে যে, ধৈর্যধারণ করবে। কেননা, তা শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মতের কাজ। আর তা শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত পোষণকারী সংকল্পবদ্ধ মানুষদের জন্য একটা বড় হাতিয়ার; যে হাতিয়ার ছাড়া তবলীগের কাজ করা সম্ভব নয়।
লুকমান 31:18
মানুষের জন্য নিজের গাল ফুলায়ো না[১] এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না;[২] কারণ আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালবাসেন না।
[১] অর্থাৎ, (অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না।) এমন অহংকার করো না, যাতে তুমি মানুষকে তুচ্ছ ভাবো ও তাকে ঘৃণা কর এবং কোন মানুষ তোমার সাথে কথা বললে তার থেকে বৈমুখ হও অথবা কথোপকথনের সময় নিজ মুখমন্ডলকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখো। صعر এক প্রকার ব্যাধি, যা উটের মাথা অথবা ঘাড়ে হয় এবং যার ফলে সেই উটের ঘাড় বাঁকা হয়ে যায়। এখানে অহংকার হেতু মুখ ফিরিয়ে নেওয়া (বা মুখ বাঁকানো)র অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, এমন বিচরণ ও চালচলন, যাতে ধন-সম্পদ, পদ বা বংশ মর্যাদা অথবা শক্তিমত্তা, ক্ষমতার বড়াই ও অহংকার ফুটে ওঠে, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। কারণ মানুষ একজন অক্ষম ও নগণ্য বান্দা মাত্র। তাই আল্লাহ তাআলা এটাই পছন্দ করেন যে, সে নিজের মান ও অবস্থা অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা বজায় রাখবে এবং তা অতিক্রম করে অহংকার প্রদর্শন করবে না। কারণ গর্ব ও অহংকার শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই শোভনীয়; যিনি সকল এখতিয়ারের মালিক এবং সকল গুণের অধিকারী। এই জন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, "আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ বলেন, গৌরব ও গর্ব খাস আমার গুণ। সুতরাং যে তাতে আমার অংশী হতে চাইবে, আমি তাকে শাস্তি দেব।" (মুসলিম ২৬২০নং) "ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণ অহংকার আছে।" (আহমাদ ১/৪১২, তিরমিযী) "যে ব্যক্তি অহংকার হেতু নিজ (পরনের) কাপড় (মাটিতে) ছেঁচড়ে চলাফেরা করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে তাকিয়ে দেখবেন না।" (আহমাদ ৫/১০৯, বুখারীঃ কিতাবুল লিবাস) তা সত্ত্বেও অহংকার প্রকাশ না করে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ বা ভাল পোশাক পরা ও উত্তম খাবার খাওয়া ইত্যাদি অবৈধ নয়। (বরং অহংকার প্রকাশ না করে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ করাই উত্তম।)
লুকমান 31:19
তুমি তোমার চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর[১] এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু কর;[২] স্বরের মধ্যে গাধার সবরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’
[১] অর্থাৎ চলন যেন এমন ধীর গতির না হয়, যাতে দেখে অসুস্থ মনে হয় এবং এমন দ্রুত গতিরও না হয়, যা সম্ভ্রম ও গাম্ভীর্যের পরিপন্থী হয়। এ কথাকে অন্য জায়গায় এভাবে বলা হয়েছে, ( يَمْشُوْنَ عَلَى الاَرْضِ هَوْنًا) "(আল্লাহর বান্দাগণ) পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।" (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩ আয়াত)
[২] অর্থাৎ, উচ্চ স্বরে (চিৎকার করে) কথা বলবে না। কারণ বেশি চিৎকার করে কথা বলা যদি পছন্দনীয় হতো, তাহলে গাধার আওয়াজ সব থেকে উত্তম গণ্য হতো। কিন্তু তা হয় না, বরং গাধার আওয়াজ সর্বনিকৃষ্ট ও সকলের কাছে অপছন্দনীয়। এই জন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "গাধার চিৎকার শুনলে শয়তান থেকে (আল্লাহর নিকট) আশ্রয় প্রার্থনা করো।" (বুখারীঃ বাদউল খালক অধ্যায়, মুসলিম ইত্যাদি)
লুকমান 31:20
তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন[১] এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?[২] মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে; তাদের না আছে জ্ঞান, না আছে পথনির্দেশ এবং না আছে কোন দীপ্তিমান গ্রন্থ।[৩]
[১] تسخير এর অর্থ হল উপকার নেওয়া। এখানে তাকে কাজে লাগানো, অধীন করা বা সেবায় নিয়োজিত করার অর্থ করা হয়েছে। যেমন সৌরজগৎ; চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সকল বস্তুকে আল্লাহ তাআলা এমন নিয়মের অধীন করে দিয়েছেন যে, তারা মানুষের উপকারার্থে অবিরাম কাজ করে চলেছে এবং মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। এর দ্বিতীয় অর্থ হলঃ অধীন করে দেওয়া। সুতরাং এ পৃথিবীর বহু সৃষ্টিকে মানুষের অধীনস্থ করে দেওয়া হয়েছে; যা মানুষ নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করে থাকে। যেমন মাটি, উদ্ভিদ, জীব-জন্তু ইত্যাদি। অতএব تسخير এর অর্থ এই হল যে, আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তু মানুষের উপকারে নিয়োজিত। তাতে তা মানুষের অধীনে হোক বা মানুষের অধীনের বাইরে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] প্রকাশ্য নিয়ামত ও অনুগ্রহের অর্থ হল, যা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়। আর অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ ও নিয়ামত হল, যা মানুষের অনুভূতির বাইরে। এই উভয় প্রকার নিয়ামত এতই অসংখ্য ও বেশি যে, মানুষ তা গণনা করতে অক্ষম।
[৩] অর্থাৎ, এর পরেও মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক-ঝগড়া করে; কেউ তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে, কেউ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করা নিয়ে এবং কেউ তাঁর শরীয়ত ও আহকাম নিয়ে।
লুকমান 31:21
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর’, তখন তারা বলে, ‘আমাদের বাপ-দাদাকে যাতে পেয়েছি আমরা তো তাই মেনে চলব।’[১] যদিও শয়তান তাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণার দিকে আহবান করে (তবুও কি তারা বাপ-দাদারই অনুসরণ করবে)?
[১] অর্থাৎ, আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, তাদের নিকট না কোন জ্ঞান ও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ আছে, না কোন পথ প্রদর্শকের পথ-নির্দেশনা এবং না কোন আসমানী গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণ। ঠিক যেন তারা যুদ্ধ করে অথচ তাদের হাতে কোন তরবারিও নেই।
লুকমান 31:22
যে কেউ সৎকর্মপরায়ণ হয়ে[১] আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে,[২] সে আসলে এক মজবুত হাতল ধারণ করে।[৩] আর যাবতীয় কার্যের পরিণাম আল্লাহর অধীনে।
[১] অর্থাৎ, যাবতীয় আদেশ পালন করে এবং যাবতীয় নিষিদ্ধ বর্জন করে।
[২] অর্থাৎ, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমল করে এবং তাঁর আদেশ পালন ও তাঁর বিধান মান্য করে।
[৩] অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিকট পাক্কা প্রতিশ্রুতি নেয় যে, তিনি তাকে শাস্তি দেবেন না।
লুকমান 31:23
কেউ অবিশ্বাসী হলে তার অবিশ্বাস যেন তোমাকে দুঃখিত না করে।[১] আমারই নিকট ওদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর ওরা যা করেছে, আমি ওদেরকে তা অবহিত করব।[২] অবশ্যই অন্তরে যা রয়েছে, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [৩]
[১] কারণ, ঈমান লাভের সৌভাগ্য তাদের নেই। তোমার প্রচেষ্টা স্বস্থানে ঠিকই আছে এবং তোমার আকাঙ্ক্ষাও কদর পাওয়ার যোগ্য; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে।
[২] অর্থাৎ, তাদের কর্মের প্রতিফল দেব।
[৩] সুতরাং তাঁর নিকট কোন কিছু গোপন নেই।
লুকমান 31:24
আমি স্বল্পকালের জন্য ওদেরকে উপভোগ করতে দেব। অতঃপর ওদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। [১]
[১] অর্থাৎ, আর কতদিন পৃথিবীর সংসার অবশিষ্ট থাকবে এবং তার বিলাস-সামগ্রী ও নিয়ামত উপভোগ করতে থাকবে? এই সংসার ও তার সুখসামগ্রী তো কিছু দিনের জন্য মাত্র। তার পরে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি আর শাস্তি।
লুকমান 31:25
তুমি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন?’ তাহলে ওরা নিশ্চয় বলবে, ‘আল্লাহ।’[১] বল, ‘সর্বপ্রশংসা আল্লাহরই’; [২] কিন্তু ওদের অধিকাংশই জানে না।
[১] অর্থাৎ, তারা স্বীকার করে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ; ঐ সকল বাতিল উপাস্য নয়, যাদের তারা উপাসনা করে থাকে।
[২] যেহেতু তাদের স্বীকারোক্তিতে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে গেছে।
লুকমান 31:26
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা আল্লাহরই।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত,[২] প্রশংসার্হ। [৩]
[১] অর্থাৎ, সে সবের সৃষ্টিকর্তাও তিনি, মালিকও তিনি এবং বিশ্ব-জগতের পরিচালকও তিনি।
[২] সকল কিছু হতে অমুখাপেক্ষী। অর্থাৎ, সকল সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।
[৩] তাঁর সকল প্রকার সৃষ্ট বস্তুতে। সুতরাং তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং যে আহ্কাম অবতীর্ণ করেছেন, তার উপর আকাশ ও পৃথিবীর সকল প্রশংসার অধিকারী একমাত্র তিনিই।
লুকমান 31:27
পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এ যে সমুদ্র এর সাথে যদি আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণী (লিখে) শেষ হবে না।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] এই আয়াতে আল্লাহর মহত্ত্ব, গর্ব, প্রতাপ, তাঁর সুন্দর নামাবলী ও সুউচ্চ গুণাবলী এবং তাঁর মহত্ত্বের প্রতি ইঙ্গিত বহনকারী সেই অফুরন্ত বাণীর কথা উল্লেখ হয়েছে; যা কেউ পরিপূর্ণরূপে গণনা করতে, জানতে বা তার প্রকৃতত্বের গভীরতায় পৌঁছতে সক্ষম নয়। যদি কেউ তাঁর সেই বাণী গণনা করতে বা লিখতে চায়, তাহলে সারা পৃথিবীর সমস্ত গাছপালার তৈরী কলম ক্ষয় হয়ে যাবে, সাগরসমূহের পানির তৈরী কালি শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু মহান আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান, তাঁর সৃষ্টি ও কারিগরির বিস্ময়কর নিপুণতা এবং তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদার কথা লিপিবদ্ধ করে শেষ করা সম্ভব নয়। সাত সমুদ্র অতিশয়োক্তি হিসাবে বলা হয়েছে, নচেৎ নির্দিষ্ট সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়। কারণ আল্লাহর বাণী ও নিদর্শনাবলী গণনা করে শেষ করা সম্ভবই নয়। (ইবনে কাসীর) এই একই বিষয়ীভুক্ত আয়াতের তফসীর সূরা কাহফের শেষাংশে করা হয়েছে।
লুকমান 31:28
তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি মাত্র প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই মত।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
[১] অর্থাৎ, তাঁর ক্ষমতা এত বিশাল যে, তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা বা কিয়ামতের দিন পুনর্জীবিত করা একটি মাত্র আত্মা বা প্রাণীকে জীবিত করা বা সৃষ্টি করার মতই। কারণ তিনি যা চান, তা كُن (হয়ে যাও) বলতেই চোখের পলকে অস্তিত্ব লাভ করে।
লুকমান 31:29
তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান?[১] তিনি চন্দ্রসূর্যকে নিয়মাধীন করেছেন, প্রত্যেকে এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত আপন পথে আবর্তন করে;[২] নিশ্চয় আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে অবহিত।
[১] অর্থাৎ, রাতের কিছু অংশ নিয়ে দিনে ঢুকিয়ে দেন, যার ফলে দিন বড় ও রাত ছোট হয়; যেমন গ্রীষ্মকালে ঘটে থাকে এবং দিনের কিছু অংশ নিয়ে রাতে ঢুকিয়ে দেন, ফলে রাত বড় ও দিন ছোট হয় যেমন; শীতকালে ঘটে।
[২] 'নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত' উদ্দেশ্য কিয়ামত পর্যন্ত। অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়ার যে প্রাত্যহিক নিয়ম আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত করেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত অনুরূপই বিদ্যমান থাকবে। এর দ্বিতীয় অর্থ হল যে, "এক নির্দিষ্ট কক্ষ পর্যন্ত" অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা উভয়ের চলাফেরার জন্য এক নির্দিষ্ট স্থান ও কক্ষপথ নির্ধারণ করে দিয়েছেন যেখানে তাদের সফর শেষ হয় এবং দ্বিতীয় দিন পুনরায় সেখান থেকে আরম্ভ করে প্রথম স্থানে এসে যায়। একটি হাদীস দ্বারাও এই অর্থেরই সমর্থন হয়; একদা নবী (সাঃ) আবু যার্র (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি জানো এই সূর্য কোথায় অস্ত যায়? উত্তরে আবূ যার্র বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল ভাল জানেন।' তিনি বললেন, আল্লাহর আরশ হল তার শেষ স্থান। সেখানে যায় এবং আরশের নিচে সিজদা করে এবং নিজ প্রতিপালকের কাছে পুনরায় সেখান থেকে উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। এমন সময় আসবে যখন তাকে বলা হবে, 'তুমি যে দিক থেকে এসেছ ঐ দিকেই ফিরে যাও।' তখন সে পূর্ব দিক থেকে উদিত না হয়ে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।" যেমন কিয়ামতের নিকটবর্তী নিদর্শনাবলীর ব্যাপারে বলা হয়েছে। (বুখারীঃ তাওহীদ অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'সূর্য চরকার মত, দিনের বেলায় আকাশে আপন কক্ষপথে চলে, অতঃপর যখন অস্তমিত হয়, তখন রাতের বেলায় পৃথিবীর নিচে (অপর প্রান্তে) আপন কক্ষপথে চলতে থাকে এবং পুনরায় পূর্ব থেকে উদিত হয়। চাঁদের ব্যাপারও অনুরূপ।' (ইবনে কাসীর)
লুকমান 31:30
এগুলি প্রমাণ করে যে, আল্লাহই ধ্রুব সত্য এবং ওরা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে, তা মিথ্যা।[১] আর নিশ্চয় আল্লাহ তিনিই সুউচ্চ, সুমহান। [২]
[১] অর্থাৎ, এ সকল ব্যবস্থাপনা ও নিদর্শন আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের পরিচালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। যার আদেশ ও ইচ্ছায় এ সব কিছু নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে এবং তিনি ছাড়া সব উপাস্যই বাতিল। অর্থাৎ তাদের কারোর নিকট কোন এখতিয়ার বা শক্তিই নেই; বরং সকলে তাঁর মুখাপেক্ষী। কারণ সবই তাঁর সৃষ্টি ও সবাই তাঁর অধীনস্থ। তাদের মধ্যে কেউ অণু পরিমাণও কিছু নড়াবার ক্ষমতা রাখে না।
[২] না তাঁর তুলনায় বড় মর্যাদাবান কেউ আছে এবং না তাঁর মত মহান কেউ আছে। বরং তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও মহত্ত্বের সামনে সব কিছু তুচ্ছ ও হীন।
লুকমান 31:31
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহর অনুগ্রহে জলযানগুলি সমুদ্রে বিচরণ করে তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখাবার জন্য?[১] অবশ্যই এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির[২] জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, সাগরে জলজাহাজ চলাচলও তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁর অধীনস্থ করার ক্ষমতার একটি নমুনা। তিনি পানি ও হাওয়া উভয়কে এমন অনুকূল অবস্থায় রাখেন, যাতে সমুদ্রের বুকে জাহাজ চলাচল করতে পারে। তাছাড়া তিনি যদি চান, তাহলে হাওয়ার প্রবলতা ও ঢেউয়ের উত্তালে জাহাজ চলাচল অসম্ভব হয়ে যাবে।
[২] অর্থাৎ, কষ্টে ধৈর্যধারণকারী এবং সুখ ও খুশির সময় আল্লাহর শুকরকারী ব্যক্তির জন্য।
লুকমান 31:32
পর্বত (বা মেঘ)মালা সম তরঙ্গমালা যখন ওদেরকে ঢেকে নিতে চায়, তখন ওরা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাকে।[১] কিন্তু তিনি যখন ওদেরকে কূলে ভিড়িয়ে উদ্ধার করেন, তখন ওদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে।[২] কেবল বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।[৩]
[১] অর্থাৎ, যখন তাদের জলজাহাজকে মেঘ ও পাহাড়ের মত ঢেউ এসে ঘিরে নেয় এবং মৃত্যুর পঞ্জা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে মনে হয়, তখন পৃথিবীর সকল উপাস্য তাদের মন থেকে মুছে যায় এবং একমাত্র আসমানী উপাস্যকে তারা ডাকতে শুরু করে, যিনি প্রকৃত ও বাস্তব উপাস্য।
[২] কেউ কেউ (مقتصدٌ) এর অর্থ 'অঙ্গীকার পালনকারী' বলেছেন। অর্থাৎ অনেকে ঈমান, তাওহীদ ও আনুগত্যের যে অঙ্গীকার সামুদ্রিক তুফানী ঢেউয়ের সময় করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাদের নিকট উক্ত বাক্যে কিছু শব্দ ঊহ্য আছে, আর তা হল, (فمنهم مقتصدٌ ومنهم كافرٌ) অর্থাৎ, তখন ওদের মধ্যে কেউ বিশ্বাসী হয় এবং কেউ অবিশ্বাসী হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) অন্য মুফাসসিরদের নিকট এর অর্থ হল 'মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী' আর তা আপত্তি স্বরূপ বলা হয়েছে। অর্থাৎ এমন সঙ্কটময় অবস্থা ও আল্লাহর এমন বৃহৎ নিদর্শন চাক্ষুষ দর্শন করে এবং পরিত্রাণরূপ আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার পরেও মানুষ এখনো আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদত ও আনুগত্য করে না; বরং মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করে? অথচ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন সে হয়েছিল, তাতে পরিপূর্ণ ইবাদতে রত হওয়ার কথা ছিল; মধ্যবর্তী ইবাদতে রত হওয়ার কথা নয়। (ইবনে কাসীর) তবে প্রথমোক্ত অর্থটিই পূর্বাপর বাগধারার সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল।
[৩] ختاَّر এর অর্থ হল বিশ্বাসঘাতক, চুক্তি ভঙ্গকারী, كَفُوْر অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি।
লুকমান 31:33
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর এবং সেদিনকে ভয় কর, যেদিন পিতা সন্তানের কোন উপকারে আসবে না, সন্তানও তার পিতার কোন উপকারে আসবে না।[১] আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং শয়তান যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে।
[১] جازٍ ইসমে ফায়েল (কর্তৃকারক)। এর উৎপত্তি হল جزى يجزي থেকে। এর অর্থ বদলা দেওয়া। উদ্দেশ্য এই যে, যদি পিতা ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তার পরিবর্তে নিজেকে অথবা ছেলে পিতার পরিবর্তে নিজেকে মুক্তিপণরূপে পেশ করতে চায়, তবুও সেখানে তা অসম্ভব হবে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আপন কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। যখন পিতা-পুত্র এক অপরের কোন কাজে আসবে না, তখন অন্যান্য আত্মীয়দের আর কি ক্ষমতা? তারা কিভাবে একে অপরকে উপকৃত করতে পারবে? (ইবরাহীম (আঃ) নিজ পিতা এবং নূহ (আঃ) নিজ ছেলের কি কোন উপকার করতে পারবেন? নূহ (আঃ) ও লূত (আঃ) কি নিজ নিজ স্ত্রীর কোন কাজে আসবেন? কোন নবী কি কোন বেঈমান মুশরিক আত্মীয়র উপকার করতে পারবেন? তাহলে যাদের সাথে কোন আত্মীয়তাই নেই তারা কিভাবে মুশরিকদের উপকার সাধন করতে পারবে?
লুকমান 31:34
নিশ্চয় আল্লাহর নিকটেই আছে কিয়ামত (সংঘটিত হওয়ার) জ্ঞান, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন জরায়ুতে যা আছে। কেউ জানে না আগামী কাল সে কি অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ দেশে তার মৃত্যু ঘটবে।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।
[১] হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, গায়েবের চাবিকাঠি হল পাঁচটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ অবগত নন। (বুখারীঃ সূরা লুকমানের তফসীর, ইস্তিস্কা অধ্যায়) (ক) কিয়ামত কখন হবে? কিয়ামতের নিকটবর্তী কিছু নিদর্শন নবী (সাঃ) বলেছেন; কিন্তু কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঠিক সময় নিশ্চিতরূপে একমাত্র আল্লাহই জানেন, তা কোন ফিরিশতা জানেন না এবং কোন প্রেরিত নবীও না। (খ) বৃষ্টি কখন কোথায় হবে? মেঘের চিহ্ন ও অনুকূল হাওয়া দেখে আন্দাজ লাগানো হয় বা লাগানো যায় যে, অমুক এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এ কথা সকলে জানে যে, এই আন্দাজ কখনো সঠিক হয় আবার কখনো বেঠিক। এমনকি আবহাওয়া দফতরের প্রচারিত খবর অনেক সময় সঠিক হয় না। যাতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, বৃষ্টি কোথায় কখন হবে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (গ) মাতৃগর্ভে কি আছে? বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে সম্ভবতঃ অসম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে যে, তা ছেলে না মেয়ে। কিন্তু মাতৃগর্ভের এই বাচ্চা সৎ না অসৎ, সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান, পূর্ণ না অপূর্ণ, বিকলাঙ্গ না অবিকলাঙ্গ, সুশ্রী না কুশ্রী হবে ইত্যাদি বিষয়ক জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। (ঘ) মানুষ আগামী কাল কি করবে? তা দ্বীনী বিষয় হোক বা পার্থিব বিষয়, কেউ আগামী কালের বিষয়ে জ্ঞান রাখে না যে, আগামী কাল পর্যন্ত তার জীবন থাকবে কি না? আর যদি থাকে, তাহলে সে তাতে কি আমল করবে? (ঙ) মৃত্যু কোথায় হবে? ঘরে না বাইরে, স্বদেশে না বিদেশে, যুবক অবস্থায় না বৃদ্ধাবস্থায়, নিজের আশা ও চাহিদা পূর্ণ হওয়ার পর নাকি তার পূর্বে? এ সব কেউ জানে না।
আস-সাজদা 32:1
আলিফ, লাম, মীম;
আস-সাজদা 32:2
বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে এ গ্রন্থ অবতীর্ণ, এতে কোন সন্দেহ নেই।[১]
[১] উদ্দেশ্য এই যে, এই কুরআন মিথ্যা কথা, যাদুকর বা গণৎকারের কথা অথবা মনগড়া কল্পনাপ্রসূত কোন গল্প-কাহিনীর গ্রন্থ নয়; বরং তা সৃষ্টি জগতের পালনকর্তার পক্ষ হতে পথপ্রদর্শক গ্রন্থ।
আস-সাজদা 32:3
তবে কি ওরা বলে, এ তো তার নিজের রচনা?[১] বরং এ তোমার প্রতিপালক হতে আগত সত্য; যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি।[২] হয়তো ওরা সৎপথে চলবে।
[১] এটা ধমক ও তিরস্কার স্বরূপ বলা হয়েছে যে, সৃষ্টি জগতের পালনকর্তার অবতীর্ণকৃত সাহিত্য-অলঙ্কারপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ওরা বলে, তা মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজেই রচনা করেছে?!
[২] এটা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য। এখান হতে বুঝা যায় যে, (যেমন পূর্বে আলোচনা হয়েছে) আরবদের নিকট তিনি প্রথম নবী ছিলেন, অনেকে শুআইব (আঃ)-কেও আরবদের নিকট প্রেরিত নবী বলেছেন। এই মর্মে আল্লাহই ভাল জানেন। এই হিসাবে 'সম্প্রদায়' বলে কুরাইশ সম্প্রদায় ধরা হবে, যাদের নিকট মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর পূর্বে কোন নবী আসেননি।
আস-সাজদা 32:4
আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং ওদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন।[১] তাঁর বিরুদ্ধে তোমাদের কোন অভিভাবক অথবা সুপারিশকারী নেই;[২] তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?[৩]
[১] এ ব্যাপারে সূরা আ'রাফের ৭:৫৪ নং আয়াতের টীকা দেখুন। এখানে উক্ত বিষয়কে পুনরায় উক্ত করার উদ্দেশ্য এই হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা ও বিস্ময়কর সৃষ্টির কথা শুনে হয়তো বা তারা কুরআন শ্রবণ করবে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে।[২] অর্থাৎ সেখানে এমন কোন বন্ধু হবে না, যে তোমাদের সাহায্য করতে পারবে ও তোমাদের নিকট থেকে আল্লাহর শাস্তিকে দূর করতে পারবে এবং সেখানে এমন কোন সুপারিশকারীও হবে না, যে তোমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবে।[৩] অর্থাৎ, হে গায়রুল্লাহর পূজারী ও আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপর ভরসা স্থাপনকারী! তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
আস-সাজদা 32:5
তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সকল বিষয় পরিচালনা করেন,[১] অতঃপর সমস্ত কিছুই তাঁর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে -- যা তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।[২]
[১] 'আকাশ হতে' যেখানে আল্লাহর আরশ ও 'লাওহে মাহফূয' আছে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে নির্দেশাবলী অবতীর্ণ করেন; অর্থাৎ বিশ্ব পরিচালনা করেন এবং পৃথিবীতে তাঁর হুকুম বাস্তবায়িত হয়। যেমন জীবন-মৃত্যু, সুস্থতা-অসুস্থতা, চাওয়া-পাওয়া, ধনবত্তা-দরিদ্রতা, যুদ্ধ-সন্ধি, সম্মান-অসম্মান ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা আরশের উপর থেকে তাঁর লিখিত ভাগ্য অনুযায়ী এ সব কিছুর তদবীর ও ব্যবস্থাপনা করে থাকেন।[২] অর্থাৎ, তাঁর ঐ সকল ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশাবলী তাঁর নিকট একই দিনে ফিরে আসে যা ফিরিশতাগণ নিয়ে অবতীর্ণ হন। তাঁর দিকে ঊর্ধ্বগামী হতে যে সময় লাগে তা ফিরিশতা ছাড়া অন্যদের জন্য এক হাজার বছর হবে। অথবা এর অর্থ হল, "অতঃপর একদিন সমস্ত কিছুই (বিচারের জন্য) প্রত্যাবর্তিত হবে-- যে দিনের দৈর্ঘ্য হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।" উদ্দেশ্য হল কিয়ামতের দিন; যেদিন মানুষের সকল আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। উক্ত 'দিন' কোন্ দিন তা নির্দিষ্ট করে বলতে ও ব্যাখ্যা করতে মুফাসসিরগণের মাঝে অনেক মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাওকানী (রঃ) এই বিষয়ে ১৫/১৬ টি মত উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে নীরব থাকতে পছন্দ করেছেন এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আয়সারুত তাফাসীরের লেখক বলেন, এ কথা কুরআন মাজীদের তিন জায়গায় এসেছে এবং তিন জায়গাতেই আলাদা আলাদা দিনের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। সূরা হজ্জের ২২:৪৭ নং আয়াতে 'দিন' বলতে আল্লাহর নিকট যে সময় তা বুঝানো হয়েছে এবং সূরা মাআরিজের ৭০:৪ নং আয়াতে দিনের দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাজার বছর বলা হয়েছে। তার উদ্দেশ্য কিয়ামত দিবস। আর এখানে 'দিন' বলতে উদ্দেশ্য হল, দুনিয়ার শেষ দিন; যখন দুনিয়ার সকল ব্যাপার নিঃশেষ হয়ে আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। (অল্লাহু আ'লাম)
আস-সাজদা 32:6
তিনিই দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
আস-সাজদা 32:7
যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে উত্তমরূপে সৃজন করেছেন[১] এবং মাটি হতে মানব-সৃষ্টির সূচনা করেছেন।[২]
[১] অর্থাৎ, যা কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তা যেহেতু আল্লাহর হিকমত ও ইচ্ছা অনুযায়ী সেহেতু প্রতিটি বস্তুতেই এক বিশেষ সৌন্দর্য ও উৎকৃষ্টতা আছে। বলা বাহুল্য, তাঁর সৃষ্টির সকল জিনিসই সুন্দর। অনেকে أَحسَنَ শব্দটিকে أَتقَنَ ও أحكَمَ এর অর্থে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ তিনি যাবতীয় বস্তুকে সুনিপুণ ও মজবুত করে সৃষ্টি করেছেন। অনেকে তাকে أَلهَمَ এর অর্থে মনে করেছেন। অর্থাৎ যাবতীয় সৃষ্টিকে তার প্রয়োজনীয় জিনিসের ইলহাম (জ্ঞানসঞ্চার) করেছেন।
[২] অর্থাৎ, সর্বপ্রথম মানুষ আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যাঁর নিকট থেকে মানব জন্মের সূচনা হয়েছে এবং তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে তাঁর বাম পার্শেবর অস্থি থেকে সৃষ্টি করেছেন; তা হাদীস দ্বারা বুঝা যায়।
আস-সাজদা 32:8
অতঃপর তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে[১] তার বংশ উৎপন্ন করেছেন।
[১] অর্থাৎ বীর্য হতে। উদ্দেশ্য হল যে, মানুষের জোড়া তৈরী করার পর তার বংশ বৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহ এই নিয়ম নির্ধারণ করেছেন যে, পুরুষ ও নারী উভয়ে বিবাহ করবে, অতঃপর তাদের মিলনের ফলে পুরুষের বীর্যের যে ফোঁটা নারীর গর্ভাশয়ে প্রবেশ করবে তার দ্বারা তিনি সুন্দর অবয়বে মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠাতে থাকবেন।
আস-সাজদা 32:9
পরে তিনি ওকে সুঠাম করেছেন এবং তাঁর নিকট হতে ওতে জীবন সঞ্চার করেছেন[১] এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন চোখ, কান ও অন্তর।[২] তোমরা অতি সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।[৩]
[১] অর্থাৎ, মায়ের পেটে ভ্রূণকে বড় করে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরী করে, অতঃপর তাতে রূহ দান করেন।
[২] অর্থাৎ, এই সকল কিছু তিনি তার মধ্যে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তাঁর সৃষ্টি পূর্ণাঙ্গ লাভ করে এবং তোমরা সকল শ্রাব্য শব্দ শ্রবণ করতে পার, দৃশ্য বস্তু দর্শন করতে পার এবং বোধ্য বস্তু বোধ করতে পার।
[৩] অর্থাৎ, এত অনুগ্রহ দানের পরেও মানুষ এমন অকৃতজ্ঞ যে, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা অতি অল্প মাত্রায় স্বীকার করে অথবা কৃতজ্ঞ ব্যক্তি অতি নগণ্য।
আস-সাজদা 32:10
ওরা বলে, ‘আমরা মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা হবে?’ [১] আসলে ওরা ওদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে।
[১] যখন এক বস্তুর উপর অন্য এক বস্তু প্রভাবশালী হয় এবং পূর্বের সমস্ত চিহ্নকে মিটিয়ে দেয়, তখন তাকে ضلالة (নিশ্চিহ্ন হওয়া) বলা হয়। এখানে (ضَلَلْنَا فِي الأَرْضِ) এর অর্থ হবে, মাটিতে মিশে আমাদের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি---।
আস-সাজদা 32:11
বল, ‘মৃত্যুর ফিরিশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে, যাকে তোমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে।[১] অবশেষে তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে আনা হবে।’
[১] অর্থাৎ, তাঁর কাজই এই যে, যখন তোমাদের মৃত্যুর সময় হবে, তখন সে এসে আত্মা হরণ করবে।
আস-সাজদা 32:12
যদি তুমি দেখতে! অপরাধীরা যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে মাথা নত করে[১] বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা দেখলাম ও শুনলাম; [২] এখন তুমি আমাদের পুনরায় (পৃথিবীতে) পাঠিয়ে দাও, আমরা সৎকাজ করব। নিশ্চয়ই আমরা (এখন) দৃঢ় বিশ্বাসী।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, নিজেদের কুফরী, শিরক এবং অবাধ্যতা দরুন লজ্জিত হওয়ার কারণে।
[২] অর্থাৎ, যা মিথ্যা মনে করতাম, তা দেখলাম এবং যা অস্বীকার করতাম, তা শুনলাম। অথবা তোমার শাস্তির হুমকির সত্যতা দেখলাম এবং পয়গম্বরগণের সত্যতা শুনলাম। কিন্তু সেই সময়কার দেখা ও শোনা কোন কাজে আসবে না।
[৩] এখন দৃঢ় বিশ্বাস করলেও লাভ কি? এখন তো আল্লাহর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে, যা ভোগ করতেই হবে।
আস-সাজদা 32:13
আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতাম।[১] কিন্তু আমার এ কথা যথার্থ সত্য যে, আমি নিশ্চয়ই মানব ও দানব উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব। [২]
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে; কিন্তু সে হিদায়াত (সৎপথে পরিচালনা) জোরপূর্বক হতো, যাতে পরীক্ষার সুযোগ হতো না।
[২] অর্থাৎ, মানুষ ও জিনের মধ্যে যারা জাহান্নামে যাবে, তাদের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করার ব্যাপারে আমার কথার সত্যতা প্রমাণ হয়ে গেছে।
আস-সাজদা 32:14
সুতরাং (ওদেরকে বলা হবে,) তোমরা শাস্তি আস্বাদন কর। কারণ, আজকের এ সাক্ষাতের কথা তোমরা ভুলে গিয়েছিলে। আমিও তোমাদেরকে ভুলে গেছি।[১] তোমরা যা করতে তার জন্য তোমরা চিরকালের শাস্তি ভোগ করতে থাক।
[১] অর্থাৎ, যেমন তোমরা পৃথিবীতে আমাকে ভুলে ছিলে, তেমনি আজ আমি তোমাদের সাথে অনুরূপ ব্যবহার করব। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা কিছু ভুলেন না।
আস-সাজদা 32:15
কেবল তারাই আমার আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে,[১] যাদেরকে ওর দ্বারা উপদেশ দেওয়া হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে[২] এবং তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে[৩] এবং অহংকার করে না। [৪]
[১] অর্থাৎ, তা সত্য বলে মানে ও তার দ্বারা উপকৃত হয়।[২] অর্থাৎ আল্লাহর আয়াতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তাঁর প্রতাপ ও শাস্তিকে ভয় করে।[৩] অর্থাৎ, প্রতিপালককে ঐ সকল জিনিস থেকে পবিত্র ঘোষণা করে, যা তাঁর সত্তার জন্য শোভনীয় নয় এবং তার সাথে সাথে তাঁর নিয়ামতের উপর তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করে থাকে; যার মধ্যে সর্ববৃহৎ ও পূর্ণাঙ্গ নিয়ামত হল ঈমানের প্রতি হিদায়াত। অর্থাৎ তারা সিজদাতে (سُبحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه) (سُبحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى وَبِحَمْدِه) ইত্যাদি পড়ে।[৪] অর্থাৎ, আনুগত্য ও মান্য করার পথ অবলম্বন করে; মূর্খ ও কাফেরদের মত অহংকার করে না। কারণ আল্লাহর ইবাদত থেকে অহংকারবশতঃ বিরত থাকা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ) অর্থাৎ, যারা অহংকারে আমার উপাসনায় বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মু'মিন ৪০:৬০ আয়াত) যার ফলে ঈমানদারগণের অবস্থা তাদের বিপরীত হয়ে থাকে; তাঁরা আল্লাহর সামনে সর্বাবস্থায় নিজেকে নগণ্য, ছোট, মিসকীন ও বিনয়ী প্রকাশ করে। ---- (এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
আস-সাজদা 32:16
তারা শয্যা ত্যাগ করে[১] আকাঙ্ক্ষা ও আশংকার সাথে তাদের প্রতিপালককে ডাকে[২] এবং আমি তাদেরকে যে রুযী প্রদান করেছি, তা হতে তারা দান করে। [৩]
[১] অর্থাৎ রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে, তওবা ও ইস্তিগফার করে, আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা এবং দু'আ ও রোদন করে।
[২] অর্থাৎ, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের আশাও রাখে এবং তাঁর ক্রোধ ও শাস্তির ব্যাপারে ভীত-শঙ্কিতও হয়। শুধু আশা আর আশা রাখে না যে, আমলই ত্যাগ করে বসে। (যেমন যারা আমল করে না এবং যারা নোংরা আমল করে তাদের অভ্যাস।) আর তাঁর শাস্তিকে এমন ভয় করে না যে, আল্লাহর রহমত থেকে একেবারে নিরাশ হয়ে যায়। কারণ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াও কুফরী ও ভ্রষ্টতা।
[৩] 'দান করে' বলতে ওয়াজিব স্বাদকা (যাকাত) এবং সাধারণ দান উভয়ই শামিল। ঈমানদারগণ নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী উভয়কেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
আস-সাজদা 32:17
কেউই জানে না তার জন্য তার কৃতকর্মের বিনিময় স্বরূপ[১] নয়ন-প্রীতিকর কি (পুরস্কার) লুকিয়ে রাখা হয়েছে।[২]
[১] এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহর রহমতের অধিকারী হতে হলে নেক আমল অপরিহার্য।
[২] نفسٌ শব্দটি 'নাকিরাহ' যাতে ব্যাপকতার অর্থ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ঐ সকল নিয়ামত যা আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত মু'মিনদের জন্য লুক্কায়িত রেখেছেন, যা দেখে তাঁদের চোখ জুড়িয়ে যাবে, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। এর ব্যাখ্যা নবী (সাঃ) হাদীসে কুদসীতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য ঐ সকল বস্তু প্রস্তুত রেখেছি যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি এবং কোন মানুষের কল্পনায়ও তা আসেনি।"
(সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা সিজদাহ)
আস-সাজদা 32:18
বিশ্বাসী কি সত্যত্যাগীর মতই? [১] ওরা কখনও সমান হতে পারে না।
[১] এটা অস্বীকৃতি বাচক জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ, আল্লাহর নিকট বিশ্বাসী মু'মিন ও সত্যত্যাগী কাফের সমান নয়; বরং তাদের উভয়ের মাঝে বিরাট পার্থক্য ও ব্যবধান হবে। মু'মিন আল্লাহর মেহমান হয়ে সম্মানের পাত্র হবে। আর ফাসেক ও কাফের শাস্তির শিকলে বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে জ্বলতে থাকবে। এ মর্মে অন্য স্থানেও বর্ণনা রয়েছে। যেমন সূরা জাসিয়া ৪৫:১২, সূরা স্বাদ ৩৮:২৮, সূরা হাশর ৫৯:২০ আয়াত ইত্যাদি।
আস-সাজদা 32:19
যারা বিশ্বাস করে সৎকাজ করে, তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাদের আপ্যায়নের জন্য জান্নাত হবে তাদের বাসস্থান।
আস-সাজদা 32:20
আর যারা সত্যত্যাগ করেছে, তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম; যখনই ওরা সেখান থেকে বের হতে চাইবে, তখনই ওদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে[১] এবং ওদেরকে বলা হবে,[২] ‘যে অগ্নি-শাস্তিকে তোমরা মিথ্যা মনে করতে তোমরা তা আস্বাদন কর।’
[১] অর্থাৎ, দোযখের শাস্তির কঠিনতা ও ভয়াবহতা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বাইরে বের হয়ে আসতে চাইবে। তখন দোযখের ফিরিশতাগণ তাদেরকে পুনরায় দোযখের গভীরতায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন।
[২] এটা ফিরিশতাগণ বলবেন বা আল্লাহর পক্ষ থেকে আওয়াজ আসবে। সে যাই হোক, সেখানে মিথ্যাজ্ঞানকারীদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার যে ব্যবস্থা আছে, তা অস্পষ্ট নয়।
আস-সাজদা 32:21
গুরু শাস্তির পূর্বে ওদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি[১] আস্বাদন করাব, যাতে ওরা (আমার পথে) ফিরে আসে। [২]
[১] العَذَاب الأَدنَى (ছোট, লঘু বা নিকটতম শাস্তি) বলে ইহলৌকিক শাস্তি বা বিপদাপদ ও রোগ-ব্যাধিকে বুঝানো হয়েছে। অনেকের নিকট এর অর্থ হল, বদর যুদ্ধে কাফেররা হত্যার মাধ্যমে যে কষ্ট পেয়েছিল সেই শাস্তি। অথবা মক্কাবাসীদের উপর যে দুর্ভিক্ষ এসেছিল তা উদ্দেশ্য। অথবা কবরের আযাবকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, উল্লিখিত সব অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে।
[২] পারলৌকিক বৃহত্তম শাস্তির পূর্বে ক্ষুদ্রতম বা লঘু শাস্তি প্রেরণ করার কারণ হল, সম্ভবতঃ তারা কুফর ও শিরক এবং আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করা থেকে বিরত হবে।
আস-সাজদা 32:22
যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ প্রাপ্ত হয় অতঃপর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার অপেক্ষা অধিক সীমালংঘনকারী আর কে?[১] আমি অবশ্যই অপরাধীদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব।
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর যে আয়াত শ্রবণ করে তার প্রতি ঈমান আনা ও তার অনুসরণ করা ওয়াজেব, সে আয়াত থেকে যে বৈমুখ হয়, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে আছে? অর্থাৎ সেই সব থেকে বড় যালেম।
আস-সাজদা 32:23
আমি তো মূসাকে গ্রন্থ দিয়েছিলাম, অতএব তুমি তার সাক্ষাৎ বিষয়ে সন্দেহ করো না।[১] আমি একে[২] বনী ইস্রাঈলের জন্য পথনির্দেশক করেছিলাম।
[১] বলা হয় যে, এটা মি'রাজের রাত্রে মূসা (আঃ)-এর সাথে নবী (সাঃ)-এর যে সাক্ষাৎ হয়েছিল তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যে সাক্ষাতে মূসা (আঃ) নামায কম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
[২] 'একে' বলতে তাওরাত বা মূসা (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।
আস-সাজদা 32:24
ওরা যেহেতু ধৈর্যশীল ছিল তার জন্য আমি ওদের মধ্য হতে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। ওরা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী। [১]
[১] এই আয়াত দ্বারা 'সবর' বা ধৈর্যের ফযীলত পরিষ্ফুটিত হয়। সবরের অর্থ হল, আল্লাহর আদেশ পালন করতে ও নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকতে এবং আল্লাহর রসূলদেরকে সত্য মনে করে তাঁদের অনুসরণ করাতে যে কষ্ট আসে তা হাসিমুখে বরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের ধৈর্য ও আল্লাহর আয়াতের উপর দৃঢ় বিশ্বাসের ফলে আমি তাদেরকে দ্বীনী নেতৃত্ব পদের জন্য মনোনীত করেছিলাম। কিন্তু যখন তারা তার বিপরীত (আল্লাহর কিতাবে) পরিবর্তন ও হেরফের করতে আরম্ভ করল, তখন তাদের এই সম্মান কেড়ে নেওয়া হল। সুতরাং এর পর তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেল। অতঃপর না তাদের নেক আমল রইল, আর না রইল তাদের সঠিক বিশ্বাস।
আস-সাজদা 32:25
ওরা নিজেদের মধ্যে যে বিষয়ে মতবিরোধ করত, অবশ্যই তোমার প্রতিপালক কিয়ামতের দিন তার ফায়সালা করে দেবেন।[১]
[১] এখানে মতবিরোধ বলতে আহলে কিতাবদের নিজেদের মাঝের মতবিরোধকে বুঝানো হয়েছে। এর মধ্যে মু'মিন ও কাফের, হকপন্থী ও বাতিলপন্থী, তাওহীদবাদী ও অংশীবাদীদের মাঝে পৃথিবীতে যে মতভেদ ছিল ও আছে, তাও আনুষঙ্গিকভাবে এসে যায়। যেহেতু পৃথিবীতে প্রত্যেক দল নিজ যুক্তি-প্রমাণের উপর তুষ্ট এবং নিজ রাস্তার উপর অবিচল থাকে, সেহেতু এই মতভেদসমূহের ফায়সালা আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন করবেন। যার উদ্দেশ্য হল, তিনি হকপন্থীকে জান্নাতে এবং কুফরী ও বাতিলপন্থীদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।
আস-সাজদা 32:26
এ কথা কি তাদেরকে পথনির্দেশ করে না যে, আমি তো এদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি, যাদের বাসভূমিতে এরা বিচরণ করে থাকে,[১] এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে; তবুও কি এরা শুনবে না?
[১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী উম্মত যারা মিথ্যাজ্ঞান করা ও ঈমান না আনার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। এরা কি দেখে না যে, পৃথিবীতে আজ তাদের অস্তিত্বই নেই। অবশ্য তাদের জমি-জায়গাসমূহ আছে, যার তারা ওয়ারেস হয়ে আছে। উদ্দেশ্য মক্কাবাসীদেরকে এই সতর্ক করা যে, যদি তোমরা ঈমান না আনো, তাহলে তোমাদেরও অবস্থা অনুরূপ হবে।
আস-সাজদা 32:27
ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি উদ্ভিদশূন্য ভূমির উপর পানি প্রবাহিত করে ওর সাহায্যে ফসল উদগত করি, যা থেকে ওদের জীবজন্তুসমূহ এবং ওরা নিজেরাও আহার্য গ্রহণ করে।[১] ওরা কি তবুও লক্ষ্য করবে না?
[১] পানি থেকে উদ্দেশ্য হল আকাশের পানি, নদী-নালা, ঝরনা ও উপত্যকার পানি। যা আল্লাহ তাআলা অনাবাদ ভূমির দিকে প্রবাহিত করে নিয়ে যান, ফলে তাতে ঘাস ও ফল-ফসল উৎপন্ন হয়; যা মানুষ ভক্ষণ করে এবং তা তাদের পশুখাদ্যও হয়। এখানে কোন নির্দিষ্ট এলাকা বা ভূমি উদ্দেশ্য নয়। বরং তা সাধারণ (অর্থে ব্যবহার হয়েছে)। যাতে সকল অনাবাদ ও অনুর্বর ভূমি এবং মরুভূমি শামিল আছে।
আস-সাজদা 32:28
ওরা জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে বল, এ বিচার-ফায়সালা কবে হবে?’[১]
[১] উক্ত ফায়সালা বলতে উদ্দেশ্য, আল্লাহর ঐ শাস্তি যা মক্কার কাফেররা নবী (সাঃ)-এর নিকট চাইত এবং (বিদ্রূপ করে) বলত, ওহে মুহাম্মাদ! তোমার আল্লাহর সাহায্য তোমার জন্য কখন আসবে; যে বিষয়ে তুমি আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছ? বর্তমানে আমরা তো দেখছি, তোমার প্রতি ঈমান আনয়নকারিগণ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে!
আস-সাজদা 32:29
বল, ‘বিচার-ফায়সালার দিনে অবিশ্বাসীদের বিশ্বাস ওদের কোন কাজে আসবে না, এবং ওদের অবকাশও দেওয়া হবে না।’ [১]
[১] يوم الفتح এর অর্থ হল শেষ ফায়সালার দিন, কিয়ামতের দিন। যেদিন না ঈমান গ্রহণ করা হবে, না কোন অবকাশ দেওয়া হবে। এখানে 'ফাতহে মক্কা' (মক্কা বিজয়ে)র দিন উদ্দেশ্য নয়। কারণ সেদিন ক্ষমাপ্রাপ্ত মুক্ত মানুষদের ইসলাম গ্রহণ করে নেওয়া হয়েছিল; যারা গণনায় দুই হাজারের মত ছিল। (ইবনে কাসীর) ক্ষমাপ্রাপ্ত মুক্ত মানুষ হল ঐ সকল মক্কাবাসী, যাদেরকে মহানবী (সাঃ) মক্কা বিজয়ের দিন শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং এই কথা বলে তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন যে, আজ তোমাদের পূর্বকৃত যুলমের কোন প্রতিশোধ নেওয়া হবে না। সুতরাং তাদের অধিকাংশই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।
আস-সাজদা 32:30
অতএব তুমি ওদেরকে উপেক্ষা কর[১] এবং অপেক্ষা কর।[২] নিশ্চয় ওরাও অপেক্ষা করছে।[৩]
[১] অর্থাৎ, সেই মুশরিকদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং দাওয়াত ও তবলীগের কাজ আপন গতিতে চালাতে থাক। যে অহী তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ কর। যেমন দ্বিতীয় স্থানে বলা হয়েছে, (اتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ لا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ) অর্থাৎ, তোমার নিকট তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি তারই অনুসরণ করে চল। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। (সূরা আন্আম ৬:১০৬ আয়াত)[২] অর্থাৎ, অপেক্ষা কর যে, আল্লাহর ওয়াদা কখন পূর্ণ হবে এবং তিনি তোমার বিরোধীদের উপর তোমাকে বিজয়ী করবেন। তা নিঃসন্দেহে পূর্ণ হবেই।[৩] অর্থাৎ, এই সকল কাফেররা অপেক্ষায় আছে যে, সম্ভবতঃ পয়গম্বর (সাঃ) নিজেই মুসীবতের শিকার হবেন ও তাঁর দাওয়াত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পৃথিবী দেখে নিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সাঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করেছেন এবং তাঁর উপর মুসীবতের অপেক্ষমাণ বিরোধীদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছেন কিংবা তাদেরকে তাঁর দাস বানিয়ে দিয়েছেন।
আল-আহযাব 33:1
হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর[১] এবং অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।[২]
[১] এই আয়াতে সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি এবং দাওয়াত ও তবলীগের কাজে অটল থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ত্বালক্ব বিন হাবীব বলেন, 'তাকওয়া হল এই যে, তুমি আল্লাহর আনুগত্য আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী করবে ও আল্লাহর কাছে নেকীর আশা রাখবে এবং আল্লাহর অবাধ্যতা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী বর্জন করবে ও আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করবে। (ইবনে কাসীর)
[২] সুতরাং তিনিই আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী। যেহেতু তিনি পরিণাম সম্বন্ধে অবগত আছেন এবং তিনি নিজ কথা ও কাজে হিকমত-ওয়ালা।
আল-আহযাব 33:2
তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার প্রতি যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হচ্ছে তার অনুসরণ কর;[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। [২]
[১] অর্থাৎ, কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ কর। কারণ হাদীসের শব্দ যদিও নবী (সাঃ)-এর বরকতময় মুখনিঃসৃত বাণী, কিন্তু তার অর্থ ও ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। এই জন্য হাদীসকে 'অহী খাফী' বা 'অহী গায়র মাতলু' বলা হয়েছে।
[২] সুতরাং তাঁর নিকটে তোমাদের কোন কথাই গোপন থাকবে না।
আল-আহযাব 33:3
তুমি আল্লাহর ওপর নির্ভর কর,[১] কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট।[২]
[১] সকল ব্যাপারে ও সকল অবস্থাতে।
[২] ঐ সকল মানুষের জন্য যারা তাঁর উপর ভরসা রাখে এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
আল-আহযাব 33:4
আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় সৃষ্টি করেননি;[১] তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা ‘যিহার’ করেছ তাদেরকে তোমাদের মা করেননি[২] এবং পোষ্যপুত্র -- যাদেরকে তোমরা পুত্র বল, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি।[৩] এগুলি তোমাদের মুখের কথা।[৪] আল্লাহই সত্য কথা বলেন[৫] এবং তিনিই পথনির্দেশ করেন।
[১] কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, একজন মুনাফিক দাবী করত যে, তার দু'টি অন্তর আছে। একটি মুসলিমদের সাথে ও অপরটি কুফর ও কাফেরেদের সাথে। (আহমাদ ১২৬৭) উক্ত আয়াত তার কথা খন্ডন করার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, একই অন্তরে আল্লাহর মহববত ও তাঁর শত্রুর আনুগত্য একত্রিত হওয়া অসম্ভব। কেউ কেউ বলেন যে, মক্কার মুশরিকদের মধ্যে জামীল বিন মা'মার ফিহরী নামক এক ব্যক্তি ছিল, সে বড় হুঁশিয়ার, চতুর ও ধোঁকাবাজ ছিল। তার দাবী ছিল যে, আমার দু'টি অন্তর আছে যার দ্বারা আমি চিন্তা ভাবনা করি ও বুঝি। আর মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অন্তর একটি। এই আয়াত তারই রদ স্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছে। (আইসারুত তাফাসীর) পক্ষান্তরে কিছু তফসীরবিদগণ বলেন যে, সামনে যে দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এটা তারই ভূমিকা। অর্থাৎ, যেরূপ এক ব্যক্তির দুই অন্তর হয় না, অনুরূপ যদি কোন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীর সাথে 'যিহার' করে ফেলে; অর্থাৎ বলে ফেলে যে, 'তোমার পিঠ আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত' তাহলে এ কথা বলাতে তার স্ত্রী তার মা হয়ে যাবে না। কারণ একজনের দুই মা হয় না। অনুরূপ কোন ব্যক্তি কাউকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিলে সে তার প্রকৃত পুত্র হয়ে যায় না। বরং সে যার পুত্র তারই থাকে, তার দুই বাপ হতে পারে না। (ইবনে কাসীর)[২] একে 'যিহার' বলা হয়। এর বিস্তারিত বর্ণনা সূরা মুজাদালাহ ৫৮:২-৪ নং আয়াতে আসবে।[৩] এর বিস্তারিত বর্ণনা এই সূরাতেই একটু পরে আসবে ـ أَدْعِيَاءُ دَعِيٌ -এর বহুবচন যার অর্থ পালিত সন্তান, পোষ্যপুত্র, পাতানো ছেলে বা মৌখিক সূত্রে বেটা।[৪] অর্থাৎ, মুখে কাউকে মা বলে সম্বোধন করলে সে প্রকৃত মা হয়ে যাবে না এবং কাউকে বেটা বললে সে আপন বেটা হয়ে যাবে না। অর্থাৎ তাদের উপর মা ও বেটা সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান প্রযোজ্য হবে না।[৫] সুতরাং তাঁরই অনুসরণ কর এবং যিহারকৃত স্ত্রীকে মা এবং পোষ্যপুত্রকে আপন পুত্র বলো না। প্রকাশ থাকে যে, কোন স্নেহভাজনকে আদর করে 'বেটা' বলা এবং পোষ্যপুত্রকে আপন পুত্র মনে করে 'বেটা' বলা একই পর্যায়ের নয়। প্রথমটি বৈধ। এখানে উদ্দেশ্য দ্বিতীয় বিষয়টিকে অবৈধ ঘোষণা করা।
আল-আহযাব 33:5
তোমরা ওদেরকে পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহর দৃষ্টিতে এটিই ন্যায়সঙ্গত,[১] যদি তোমরা ওদের পিতৃপরিচয় না জান, তবে ওদেরকে তোমরা ধর্মীয় ভাই এবং বন্ধুরূপে গণ্য কর।[২] যে বিষয়ে তোমরা ভুল কর, সে বিষয়ে তোমাদের কোন অপরাধ নেই,[৩] কিন্তু তোমাদের আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে (তাতে অপরাধ আছে)।[৪] আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] এই আদেশ দ্বারা সেই প্রচলিত প্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা জাহেলী যুগ থেকে চলে আসছিল এবং ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও প্রচলিত ছিল। আর তা হল পোষ্যপুত্রকে আপন পুত্র ভাবা। সাহাবায়ে কিরামগণ বলেন, আমরা (اُدْعُوْهُمْ لِآبَآئِهِمْ) আয়াত অবতীর্ণ হওয়া পর্যন্ত যায়েদ বিন হারেসাহ (রাঃ)-কে (যাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুক্ত করে বেটা বানিয়ে নিয়েছিলেন) যায়েদ বিন মুহাম্মাদ বলে ডাকতাম। (বুখারীঃ সূরা আহযাবের তফসীর) উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আবু হুযাইফা (রাঃ) যিনি সালেমকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর ঘরে এক সমস্যা দেখা দিল যে, যখন পোষ্যপুত্রকে আপন সন্তান ভাবতে নিষেধ করে দেওয়া হল, তখন তার স্ত্রীর জন্য তার থেকে পর্দা করা অপরিহার্য হয়ে গেল। নবী (সাঃ) আবু হুযাইফার স্ত্রীকে বললেন, "তুমি তাকে দুধ পান করিয়ে দুধ-বেটা বানিয়ে নাও। কারণ এতে তুমি তার জন্য মাহরাম হয়ে যাবে।" সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। (মুসলিমঃ শিশুদের দুধপান অধ্যায়, আবূ দাঊদঃ বিবাহ অধ্যায়) অনেকের মতে, এ সমাধান তাঁর জন্যই খাস।
[২] অর্থাৎ, যাদের আসল পিতার খবর জানো, তাদেরকে অন্যের দিকে সম্বদ্ধ না করে তাদের আসল পিতার দিকে সম্বদ্ধ কর। তবে যাদের পিতার পরিচয় জানা নেই, তোমরা তাদেরকে বেটা নয়; বরং ভাই বা বন্ধু মনে কর।
[৩] কারণ ভুলে গিয়ে বা ভুল করে কৃত অপরাধ ক্ষমার্হ; যেমন হাদীসেও বলা হয়েছে।
[৪] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি জেনেশুনে (পিতা-পুত্রের) সম্পর্ক অন্যের দিকে জুড়বে, সে বড় পাপী হবে। হাদীসে এসেছে, "যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে অন্য পিতার দিকে সম্পৃক্ত করে, সে কুফরী করে।" (বুখারীঃ মানাক্বিব অধ্যায়)
আল-আহযাব 33:6
নবী, বিশ্বাসীদের নিকট তাদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়[১] এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মা-স্বরূপ।[২] আল্লাহর বিধান অনুসারে বিশ্বাসী ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা যারা আত্মীয় তারাই পরস্পরের নিকটতর।[৩] তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতে চাও (তাহলে তা করতে পার)। [৪] এ কথা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।[৫]
[১] নবী (সাঃ) নিজ উম্মতের জন্য যত মঙ্গলকামী ও দয়ালু ছিলেন, তা বর্ণনার মুখাপেক্ষী নয়। আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-এর দয়া ও হিতাকাঙ্ক্ষা দেখে এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে মু'মিনদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়, নবী (সাঃ)-এর ভালোবাসাকে অন্য সকলের ভালোবাসা অপেক্ষা উচ্চতর এবং নবী (সাঃ)-এর আদেশকে তাদের সকল ইচ্ছা ও এখতিয়ার অপেক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছেন। এই জন্য মু'মিনদের জরুরী কর্তব্য যে, নবী (সাঃ) আল্লাহর জন্য তাদের নিকট যে মাল-ধন চাইবেন তারা তাঁকে তা সত্বর প্রদান করবে; যদিও তাদের ঐ মালের আশু প্রয়োজন থাকে। নিজেদের জীবন থেকেও নবী (সাঃ)-এর মহববত অধিক রাখতে হবে। (যেমন উমার (রাঃ)-এর ঘটনা) নবী (সাঃ)-এর আদেশকে অন্য সবার আদেশের উপর প্রাধান্য দিতে হবে এবং তাঁর আনুগত্যকে অন্য সবার আনুগত্য অপেক্ষা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত (فلا وربك لا يؤمنون...) (সূরা নিসা ৪:৬৫ আয়াত)এর নির্দেশ মত নিজেকে গড়ে না তুলতে পারবে, ততক্ষণ কোন মুসলিম প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে না। অনুরূপ যতক্ষণ তাঁর মহব্বত অন্য সকল মহব্বতের উপর বিজয়ী না হবে, ততক্ষণ (لاََيؤُمِنُ أَحْدُكُمْ حُتىَّ أُكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِن وَّالِدِهِ وَوَلَِدِهِ...) এর নির্দেশ অনুযায়ী কেউ প্রকৃত মু'মিন হবে না। ঠিক অনুরূপ রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্যে আলস্য, অবজ্ঞা, অবহেলা বা ত্রুটি প্রদর্শন করলেও সঠিক অর্থে মুসলিম হওয়া যায় না।[২] অর্থাৎ, শ্রদ্ধা ও সম্মানে এবং তাঁদেরকে বিবাহ না করার ব্যাপারে তাঁরা 'উম্মুল মু'মিনীন' বা মু'মিন নারী-পুরুষদের মাতা।[৩] অর্থাৎ, এখন হিজরত, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের বন্ধনের কারণে একে অন্যের ওয়ারেস হবে না; শুধু নিকট আত্মীয়তার কারণেই ওয়ারেস হবে।[৪] অর্থাৎ, আত্মীয় ছাড়া অন্যদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সৌজন্য প্রদর্শন করতে পারো। তাছাড়া তাদের জন্য নিজ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করতে পারো।[৫] অর্থাৎ, লাওহে মাহফূযে আসল হুকুম এটাই লিপিবদ্ধ আছে; যদিও কারণবশতঃ সাময়িকভাবে অন্যদেরকেও ওয়ারিস করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইলমে ছিল যে, তা তিনি মনসূখ (রহিত) করে দেবেন। সুতরাং তা মনসূখ করে দিয়ে পূর্ব আদেশ চালু রাখা হল।
আল-আহযাব 33:7
স্মরণ কর, আমি নবীদের নিকট হতে, তোমার নিকট হতে এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, মারয়্যাম-তনয় ঈসার নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম; গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার;[১]
[১] এই দৃঢ় অঙ্গীকার বলতে কি বুঝানো হয়েছে? অনেকের নিকট এ হল সেই অঙ্গীকার, যা একে অপরের সাহায্যের জন্য আম্বিয়াগণের ('আলাইহিমুস সালাম) নিকট থেকে নেওয়া হয়েছিল। যেমন সূরা আলে ইমরানের ৩:৮১ নং আয়াতে তার বর্ণনা রয়েছে। আবার অনেকের নিকট এ হল ঐ অঙ্গীকার, যার বর্ণনা সূরা শূরার ৪২:১৩ নং আয়াতে রয়েছে এবং তা এই যে, দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে বিভক্ত হয়ো না। উক্ত অঙ্গীকার যদিও সকল আম্বিয়া ('আলাইহিমুস সালাম) থেকে নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এখানে বিশেষভাবে পাঁচজন আম্বিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে তাঁদের গুরুত্ব ও মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়। পরন্তু এতে নবী (সাঃ)-এর উল্লেখ সর্বপ্রথম করা হয়েছে অথচ নবুঅত প্রাপ্তির দিক দিয়ে তিনি সর্বশেষ নবী। সুতরাং এতে যে মহানবী (সাঃ)-এর মহত্ত্ব ও মর্যাদা সবার চেয়ে অধিকরূপে প্রকাশ পাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
আল-আহযাব 33:8
যাতে তিনি সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন।[১] আর তিনি অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
[১] ليسأل তে لام كي ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, এই অঙ্গীকার নেওয়ার কারণ হল, আল্লাহ তাআলা সত্যবাদী নবীগণকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, তাঁরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহর বার্তা সঠিকভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন কি? দ্বিতীয় অর্থ এই যে, আল্লাহ আম্বিয়াগণকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, তোমাদের সম্প্রদায় তোমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছিল কি না? যেমন অন্যত্র তিনি বলেছেন, "অতঃপর যাদের নিকট রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করব এবং অবশ্যই জিজ্ঞাসা করব রসূলগণকেও।" (সূরা আ'রাফ ৭:৬ আয়াত) এতে সত্যের আহবায়কদের জন্য সতর্কবাণী হল যে, তাঁরা যেন দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ পরিপূর্ণভাবে ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে করেন, যাতে আল্লাহর নিকট তাঁদের মুখ উজ্জ্বল হয়। আর ঐ সকল মানুষদের জন্য শাস্তির ধমক রয়েছে, যাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানো হয়, অথচ তারা তা গ্রহণ করে না; তারা আল্লাহর নিকট গুনাহগার এবং শাস্তির উপযুক্ত হবে।
আল-আহযাব 33:9
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি ওদের বিরুদ্ধে ঝড় এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যা তোমরা দেখতে পাওনি।[১] আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার দ্রষ্টা।
[১] উক্ত আয়াতসমূহে পঞ্চম হিজরীতে সংঘটিত আহযাব যুদ্ধের কিছু বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এই যুদ্ধকে 'আহযাব' এই জন্য বলা হয় যে, এই সময় ইসলামের সকল শত্রুবাহিনী একত্রিত হয়ে মুসলিমদের ঘাঁটি 'মদীনার' উপর আক্রমণ করেছিল। 'আহযাব' 'হিযব' শব্দের বহুবচন, যার অর্থ বাহিনী বা দল। একে খন্দকের যুদ্ধও বলা হয়, কারণ মুসলিমগণ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মদীনার একপাশে খাল খনন করেন। যাতে শত্রুবাহিনী মদীনা শহরের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। (খন্দক মানে খাল বা পরিখা।) উক্ত যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এইরূপ যে, ইয়াহুদী গোত্র বানু নায্বীর; যাদেরকে বার বার অঙ্গীকার ভঙ্গ করার ফলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তারা খায়বারে গিয়ে বসবাস শুরু করে। তারা মক্কার কাফেরদেরকে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করার জন্য তৈরী করল। অনুরূপ গাত্বফান ইত্যাদি গোত্র নাজ্দের গোত্রগুলোকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে লড়াইয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করল। সুতরাং ইয়াহুদীরা অনায়াসে ইসলাম ও মুসলিমদের সকল শত্রুদেরকে একত্রিত করে মদীনার উপর আক্রমণ করতে সফল হল। মক্কার মুশরিকদের কমান্ডার ছিল আবু সুফিয়ান। সে উহুদ পর্বতের আশেপাশে শিবির স্থাপন করে প্রায় পুরো মদীনাকে পরিবেষ্টন করে নিল। তাদের সম্মিলিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। আর মুসলিমগণ ছিলেন মাত্র তিন হাজার। এ ছাড়াও মদীনার দক্ষিণ দিকে ইয়াহুদীদের তৃতীয় গোত্র বানু কুরাইযা বাস করত; যাদের সাথে সেই সময় পর্যন্ত মুসলিমদের চুক্তি ছিল এবং তারা মুসলিমদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। কিন্তু বানী নাযবীরের ইয়াহুদী সর্দার হুয়াই বিন আখত্বাব মুসলিমদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে ফুসলিয়ে নিজেদের সাথে করে নিল। এদিকে মুসলিমগণ সর্বদিক দিয়ে শত্রুবাহিনীর পরিবেষ্টনে পড়ে গেলেন। সেই সংকটাবস্থায় সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর পরামর্শে পরিখা খনন করা হল। যার ফলে শত্রু বাহিনী মদীনার ভিতর প্রবেশ করতে সক্ষম হল না; বরং মদীনার বাইরেই থাকতে বাধ্য হল। তারপরেও মুসলিমগণ সেই পরিবেষ্টন ও সম্মিলিত শত্রুবাহিনীর আক্রমণের ভয়ে ভীত ছিলেন। প্রায় এক মাস যাবৎ এই পরিবেষ্টনে মুসলিমগণ কঠিন ভয় ও দুশ্চিন্তায় কালাতিপাত করেন। পরিশেষে মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে গায়বী সাহায্য করলেন। উক্ত আয়াতগুলিতে সেই কঠিন অবস্থা ও গায়বী সাহায্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম جنود থেকে উদ্দেশ্য হল কাফেরদের শত্রুবাহিনী যারা সম্মিলিত হয়ে এসেছিল। 'ঝড়' বলতে ঐ প্রবল হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে, যা তুফানরূপে এসে তাদের তাঁবু উড়িয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল, পশুর দল রশি ছিঁড়ে পালিয়েছিল, ডেগগুলি উল্টে গিয়েছিল এবং তারা সকলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এই ঝড় সম্পর্কে হাদীসে বর্ণনা পাওয়া যায় যে, মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "আমাকে পুবালী হাওয়া দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে এবং আদ সম্প্রদায়কে পশ্চিমী হাওয়া দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে।" (বুখারীঃ ইস্তিস্কা অধ্যায়) (وَجُنُوْدًا لَّمْ تَرَوْهَا) এর অর্থ হল ফিরিশতা; যারা মুসলিমদের সাহায্যের জন্য এসেছিলেন। তাঁরা শত্রুবাহিনীর মনে এমন ভয় ও ত্রাস সঞ্চার করেন যে, তারা সেখান থেকে অবিলম্বে পালিয়ে যাওয়াকেই নিজেদের কল্যাণ মনে করেছিল।
আল-আহযাব 33:10
যখন ওরা তোমাদের বিরুদ্ধে উচ্চ অঞ্চল ও নিমন অঞ্চল হতে সমাগত হয়েছিল,[১] তোমাদের চক্ষু স্থির হয়ে গিয়েছিল, তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করেছিলে।[২]
[১] এর অর্থ এই যে, সর্বদিক থেকে শত্রু এসে পড়েছিল অথবা উচ্চ অঞ্চল থেকে উদ্দেশ্য হল, গাত্বফান, হাওয়াযিন এবং নাজদের অন্যান্য মুশরিকরা এবং নিম্ন অঞ্চল থেকে উদ্দেশ্য কুরাইশ এবং তাদের সাহায্যকারীরা।
[২] এটা মুসলিমদের ঐ অবস্থার বিবরণ, যে অবস্থার সম্মুখীন তাঁরা ঐ সময় হয়েছিলেন।
আল-আহযাব 33:11
তখন বিশ্বাসীদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিলে এবং তারা ভয়ানক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।[১]
[১] অর্থাৎ, মুসলিমদেরকে ভয়, যুদ্ধ, ক্ষুধা এবং অবরোধে রেখে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যাতে মুনাফিকরা আলাদা হয়ে যায়।
আল-আহযাব 33:12
এবং যখন মুনাফিক (কপটচারি)গণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা বৈ কিছুই নয়।’[১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্যের ওয়াদা একটা ধোঁকাবাজি ছিল। প্রায় সত্তর জন মুনাফিক ছিল, যাদের মনের কথা মুখে প্রকাশ হয়ে পড়ে।
আল-আহযাব 33:13
ওদের একদল বলেছিল, ‘হে ইয়াসরিব (মদীনা)বাসিগণ![১] এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই; তোমরা ফিরে চল।’[২] আর ওদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলেছিল, ‘আমাদের বাড়ী-ঘর অরক্ষিত।’[৩] যদিও ওগুলি অরক্ষিত ছিল না। আসলে পলায়ন করাই ছিল ওদের উদ্দেশ্য। [৪]
[১] পুরো একটা এলাকার নাম ছিল ইয়াসরিব, মদীনা তারই একটি অংশ ছিল। যাকে এখানে ইয়াসরিব বলা হয়েছে। কথিত আছে যে, কোন এক যুগে (শাম দেশের আদ বংশের) আমালেকা গোত্রের ইয়াসরিব বিন আমীল নামক এক ব্যক্তি এখানে বসবাস করেছিল। যার ফলে তার নাম ইয়াসরিব পড়ে যায়।[২] অর্থাৎ, মুসলিমদের বাহিনীতে তো থাকা বড় বিপজ্জনক; সুতরাং নিজ নিজ ঘরে ফিরে চল।[৩] অর্থাৎ, বানু কুরাইযার পক্ষ থেকে আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা আছে। সুতরাং ঘরের লোকদের জান, মাল, ইজ্জত-আবরু সবই অরক্ষিত বিপদের মুখে আছে।[৪] অর্থাৎ, তারা যে বিপদের কথা প্রকাশ করছে, তা মিথ্যা। আসলে এরা এই বাহানা দিয়ে (যুদ্ধের ময়দান থেকে) পালিয়ে যেতে চায়। عَورَة এর আভিধানিক ও প্রসিদ্ধ অর্থের জন্য দেখুন সূরা নূর ২৪:৫৮ নং আয়াতের টীকা।
আল-আহযাব 33:14
যদি শত্রুগণ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করত এবং ওদের নিকট ফিতনা চাওয়া হত, তাহলে ওরা অবশ্যই তা করে বসত; ওরা এতে বিলম্ব করত না।[১]
[১] এখানে ফিতনার দুটি অর্থ হতে পারে; প্রথমতঃ শিরক; অর্থাৎ, মদীনা বা ওদের ঘরে যদি চারিদিক থেকে শত্রু বাহিনী প্রবেশ করত এবং তাদের নিকট প্রস্তাব রাখত যে, তোমরা পুনরায় কুফরী ও শিরকের দিকে ফিরে এস, তাহলে ওরা (মুনাফিকরা) সামান্যও দেরী করত না এবং সে সময় ঘর অরক্ষিত হওয়ার কোন ওজর দেখাতো না। বরং অবিলম্বে শিরকের প্রস্তাবকে গ্রহণ করত। উদ্দেশ্য এই যে, কুফর ও শিরকের প্রতি ওরা বড় আসক্ত এবং তার দিকে ওরা সত্বর ধাবিত হয়। দ্বিতীয়তঃ বিদ্রোহ ও অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করে যুদ্ধ; অর্থাৎ, শত্রুবাহিনী প্রবেশ করে ওদের সাথে মিলিত হয়ে ওদেরকে বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করত, তাহলে ওরা অবশ্যই বিদ্রোহ করে বসত।
আল-আহযাব 33:15
এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, এরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না।[১] আল্লাহর সাথে কৃত এ অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে।[২]
[১] বর্ণিত আছে যে, উক্ত মুনাফিকরা বদরের যুদ্ধ পর্যন্ত মুসলমান হয়নি। কিন্তু যখন মুসলিমগণ (বদরে) বিজয়ী হয়ে ও গনীমতের সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন, তখন তারা শুধু ইসলামই প্রকাশ করল না বরং এই অঙ্গীকারও করল যে, আগামীতে যখনই কাফেরদের সাথে যুদ্ধ হবে, তখনই তারা মুসলিমদের স্বপক্ষে থেকে অবশ্যই লড়বে। এখানে তাদেরকে তাদের সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করানো হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, তা পূরণ করার জন্য তাকীদ করা হবে এবং তা পূরণ না করলে শাস্তির উপযুক্ত হবে।
আল-আহযাব 33:16
বল, ‘তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর, তাহলে তাতে তোমাদের কোনই লাভ হবে না এবং তোমরা পলায়নে সক্ষম হলেও তোমাদেরকে সামান্যই উপভোগ করতে দেওয়া হবে।’[১]
[১] অর্থাৎ, মৃত্যু থেকে পালানোর কোন উপায় নেই। যদি যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে এসেই যাও, তবে আর লাভ কি? কিছু দিন পর মৃত্যুর স্বাদ তো গ্রহণ করতেই হবে।
আল-আহযাব 33:17
বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন, তাহলে কে তোমাদেরকে রক্ষা করবে এবং তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে কে তোমাদেরকে বঞ্চিত করবে?’[১] ওরা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
[১] অর্থাৎ, তোমাদেরকে ধ্বংস করতে, রোগ-বালা দিতে, দুর্ভিক্ষগ্রস্ত করতে বা তোমাদের ধন-সম্পদ নষ্ট করতে চান, তাহলে কে এমন আছে, যে তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করবে? অথবা তিনি তোমাদেরকে নিজ অনুগ্রহ ও রহমত প্রদান করতে চাইলে কে বাধা দিতে পারবে?
আল-আহযাব 33:18
আল্লাহ অবশ্যই জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণে বাধা দেয় এবং তাদের ভাইদেরকে বলে, ‘আমাদের সঙ্গে এসো।’[১] আর ওরা অল্পই যুদ্ধ করে থাকে। [২]
[১] এই কথা মুনাফিকরা বলত, যারা নিজেদের অন্য সাথীদেরকে মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করতে বাধা দিত।
[২] কারণ তারা মৃত্যু-ভয়ে পিছনেই থাকে।
আল-আহযাব 33:19
তোমাদের সহযোগিতায় ওরা কুণ্ঠিত,[১] যখন বিপদ আসে, তখন তুমি দেখবে মৃত্যুভয়ে বেহুঁশ ব্যক্তির মত চোখ উলটিয়ে ওরা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।[২] কিন্তু যখন বিপদ চলে যায়, তখন ওরা যুদ্ধলব্ধ ধনের লালসায়[৩] তোমাদের সাথে বাক্চাতুরী করে।[৪] ওরা বিশ্বাসী নয়;[৫] এ জন্য আল্লাহ ওদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন।[৬] আর আল্লাহর জন্য এ সহজ।[৭]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের সাথে খাল খনন করে তোমাদের সাহায্য করতে অথবা আল্লাহর পথে খরচ করতে অথবা তোমাদের সঙ্গী হয়ে লড়াই করতে তারা কুণ্ঠিত।
[২] এটা তাদের কাপুরুষতা ও দুর্বল মনোবলের অবস্থা।
[৩] দ্বিতীয় অর্থ হল, কল্যাণের স্পৃহা তাদের মধ্যে না থাকার ফলে। অর্থাৎ, উল্লিখিত দোষ-ত্রুটি থাকার সাথে সাথে তারা কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত।
[৪] অর্থাৎ, নিজেদের বাহাদুরি, বীরত্ব ও শক্তিমত্তার ব্যাপারে আস্ফালন করে থাকে। অথচ তা একেবারে মিথ্যা আস্ফালন। অথবা গনীমতের মাল ববণ্টনের সময় নিজেদের বাকচাতুরির জোরে লোকেদেরকে প্রভাবান্বিত করে বেশি বেশি মাল অর্জনের অপচেষ্টা করে। কাতাদা (রঃ) বলেন, 'গনীমতের মাল বণ্টনের সময় এরা (মুসলিমদের ব্যাপারে) সব থেকে বেশী কার্পণ্য করে এবং সবচেয়ে বড় ভাগ অর্জন করার চেষ্টা করে। আর যুদ্ধের সময় সব থেকে বেশী কাপুরুষতা প্রদর্শন করে এবং সাথীদেরকে অসহায় রেখে ময়দান ছেড়ে পলায়ন করে।'
[৫] অর্থাৎ, মন থেকে। বরং এরা মুনাফিক, কারণ এদের অন্তর কুফর ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
[৬] কারণ তারা মুশরিক ও কাফেরই। আর কাফের ও মুশরিকদের আমল বাতিল ও পন্ড, যাতে কোন নেকী ও সওয়াব নেই। অথবা أحبط - أظهرএর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ তাদের আমল যে বাতিল, তা আল্লাহ প্রকাশ করে দিয়েছেন। কারণ তাদের এমন আমলই নেই যে, তারা নেকীর দাবীদার হবে অথচ আল্লাহ তাদের আমলকে বাতিল করে দিবেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[৭] অর্থাৎ, তাদের আমল বিনষ্ট করে দেওয়া অথবা তাদের মুনাফিক্বী।
আল-আহযাব 33:20
ওরা মনে করে (শত্রুর সম্মিলিত) বাহিনী চলে যায়নি।[১] (শত্রু) বাহিনী আবার এসে পড়লে ওরা কামনা করবে যে, ভাল হত; যদি ওরা যাযাবর মরুবাসীদের সাথে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত।[২] আর ওরা তোমাদের সঙ্গে অবস্থান করলেও ওরা যুদ্ধ অল্পই করত। [৩]
[১] অর্থাৎ, সেই মুনাফিকদের কাপুরুষতা, দুর্বল মনোবল এবং ভয়-ভীতির এই পরিস্থিতি ছিল যে, যদিও কাফের বাহিনী অসফল ও ব্যর্থ হয়েই পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এরা (মুনাফিকরা) তখনও ভাবছিল যে, তারা এখনও নিজেদের সৈন্য-শিবিরেই অবস্থান করছে।
[২] অর্থাৎ, যদি কাফের বাহিনী পুনরায় যুদ্ধের জন্য এসেই যায়, তাহলে মুনাফিকদের কামনা হবে যে, তারা মদীনা শহর ছেড়ে বাইরে মরুভূমিতে বেদুঈনদের সাথে বসবাস করবে এবং সেখান হতে তোমাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে থাকবে যে, মুহাম্মাদ এবং তার সাথীরা ধ্বংস হয়েছে কি না? অথবা কাফের বাহিনী বিজয়ী না পরাজয়ী?
[৩] শুধু লজ্জার খাতিরে কিংবা একই শহরে সহাবস্থান করার অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের ফলে। এতে তাদের জন্য কঠিন ধমক রয়েছে, যারা জিহাদ থেকে এড়িয়ে থাকতে বা পিছে থাকতে চায়।
আল-আহযাব 33:21
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে[১] তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। [২]
[১] অর্থাৎ হে মুসলিমগণ এবং হে মুনাফিকদল! তোমাদের জন্য রসূল (সাঃ)-এর ব্যক্তিত্বে উত্তম আদর্শ রয়েছে, অতএব তোমরা জিহাদে এবং ধৈর্যশীলতা ও পদদৃঢ়তায় তাঁরই অনুসরণ কর। মহানবী (সাঃ) ক্ষুধার্ত থেকে জিহাদ করেছেন; এমনকি তাঁকে পেটে পাথর বাঁধতে হয়েছে। তাঁর চেহারা মুবারক যখম হয়েছে, তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেছে, তিনি নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন এবং প্রায় এক মাস শত্রু বাহিনীর অবরোধের মুখে সাহসিকতার সাথে মুকাবেলা করেছেন। উক্ত আয়াত যদিও আহযাব যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে যুদ্ধের সময় বিশেষভাবে রসূল (সাঃ)-এর আদর্শকে সামনে রাখা ও তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি একটি ব্যাপক আদেশ। অর্থাৎ নবী (সাঃ)-এর সকল কথা, কাজ ও অবস্থাতে মুসলিমের জন্য তাঁর অনুসরণ আবশ্যিক; তা ইবাদত সম্পর্কিত হোক বা সমাজ সম্পর্কিত, জীবিকা সম্পর্কিত হোক বা রাজনীতি সম্পর্কিত, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁরই নির্দেশ পালন করা একান্ত কর্তব্য। (ومَآاََتَكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ) সূরা হাশরের ৫৯:৭ নং আয়াত এবং (اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ) সূরা আলে ইমরানের ৩:৩১ নং আয়াতের দাবীও তাই।[২] এই আয়াতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, রসূল (সাঃ)-এর আদর্শে ঐ ব্যক্তি আদর্শবান হবে, যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে বিশ্বাসী এবং যে বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান উক্ত দুই গুণ থেকে বঞ্চিত। যার ফলে তাদের অন্তরে রসূল (সাঃ)-এর আদর্শের কোন গুরুত্ব নেই। এদের মধ্যে যারা দ্বীনদার তাদের আদর্শ হল পীর ও বুযুর্গরা। আর যারা দুনিয়াদার বা রাজনৈতিক তাদের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হল পাশ্চাত্যের নেতারা। রসূল (সাঃ)-এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার কথা এরা মুখে খুব দাবী করে, কিন্তু কার্যতঃ তাঁকে নিজেদের আদর্শ, নেতা ও পথপ্রদর্শক মানার ব্যাপারে অধিকাংশই পিছনে। সুতরাং এ বিচার আল্লাহই করবেন।
আল-আহযাব 33:22
বিশ্বাসীরা যখন শত্রুবাহিনীকে দেখল তখন ওরা বলে উঠল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রসূল তো আমাদেরকে এই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল সত্যই বলেছিলেন।’[১] এতে তো তাদের বিশ্বাস ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল। [২]
[১] অর্থাৎ, মুনাফিকরা শত্রুদের বেশি সৈন্য এবং মুসলিমদের সঙ্গিন অবস্থা দেখে বলেছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ওয়াদা ধোঁকাবাজি ছিল। আর এর বিপরীত মু'মিনগণ বলেছিলেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ) যে ওয়াদা করেছেন যে, পরখ ও পরীক্ষার পরে তোমাদেরকে সাহায্য ও বিজয় দান করা হবে --তা সত্য।
[২] অর্থাৎ, কঠিন অবস্থা ও ভীষণ পরিস্থিতি তাদের ঈমানকে বিচলিত করতে পারেনি, বরং তাদের ঈমানে আনুগত্যের স্পৃহা, অনুবর্তিতা ও সন্তোষ আরো বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, মানুষের বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঈমান ও ঈমানী শক্তিতে কম ও বেশি হয়ে থাকে; যেমন মুহাদ্দিসগণ এ কথা বলেন।
আল-আহযাব 33:23
বিশ্বাসীদের মধ্যে কিছু আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূরণ করেছে,[১] ওদের কেউ কেউ নিজ কর্তব্য পূর্ণরূপে সমাধা করেছে[২] এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। ওরা তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করেনি।[৩]
[১] এই আয়াত ঐ সকল সাহাবায়ে-কিরামগণ (রাঃ) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যাঁরা এই সময়ে নিজ নিজ জীবন কুরবানী দেওয়ার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত পেশ করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ঐ সকল সাহাবা (রাঃ)গণও ছিলেন, যাঁরা বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি; কিন্তু তাঁরা এই অঙ্গীকার করে রেখেছিলেন যে, আগামীতে কোন যুদ্ধ উপস্থিত হলে তাতে পূর্ণভাবে অংশ গ্রহণ করবেন। যেমন আনাস বিন নাযর (রাঃ) এবং আরো অনেকে যাঁরা উহুদ যুদ্ধে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। উক্ত আনাসের দেহে তরবারি, ফলা ও তীরের আঘাত জনিত আশির অধিক যখম ছিল। শাহাদত বরণ করার পর তাঁর বোন তাঁকে তাঁর আঙ্গুলের ডগা দেখে চিনেছিলেন। (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ ৪/১৯৩)
[২] نَحْبٌ এর অর্থ অঙ্গীকার, নযর (মানত) এবং মৃত্যু করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, ঐ সকল সত্যবাদী (সাহাবাগণের) মধ্যে অনেকে নিজ অঙ্গীকার ও নযর পূর্ণ করতে গিয়ে শাহাদতের শরবত পান করেছেন।
[৩] এবং দ্বিতীয় ঐ সকল ব্যক্তি যারা এখনো শাহাদতের নববধুর মিলন লাভ করতে পারেননি। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা জিহাদে অংশগ্রহণ করেন এবং শাহাদত বরণের সৌভাগ্য লাভের জন্য উদগ্রীব, তাঁরা তাদের অঙ্গীকার ও নযরে কোন পরিবর্তন করেননি।
আল-আহযাব 33:24
কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করেন এবং তাঁর ইচ্ছা হলে কপটাচারীদেরকে শাস্তি দেন অথবা ওদের তওবা গ্রহণ করেন।[১] নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার তওফীক (সুমতি) দিয়ে দেন।
আল-আহযাব 33:25
আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে ক্রুদ্ধাবস্থায় বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন[১] এবং যুদ্ধে বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হলেন। [২] আর আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।
[১] অর্থাৎ, মুশরিকরা যারা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একত্রিত হয়ে মুসলিমদেরকে সমূলে বিনাশ করে দেওয়ার জন্য এসেছিল, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের ক্রোধ ও বিফলতা সহ ফিরিয়ে দিলেন। না পার্থিব কোন সম্পদ তাদের হাতে এল, আর না আখেরাতে তারা সওয়াব ও নেকীর অধিকারী হবে। তাদের কোন ধরনের লাভ অর্জন হল না।
[২] অর্থাৎ, মুসলিমদেরকে তাদের সাথে লড়াই করার কোন প্রয়োজনই হল না; বরং আল্লাহ তাআলা হাওয়া ও ফিরিশতাদের মাধ্যমে নিজ মু'মিন বান্দাদের জন্য সাহায্যের হাতিয়ার প্রেরণ করলেন। এই জন্য নবী (সাঃ) বলেছেন,(لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه، صَدَقَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَه، وَأَعَزَّ جُنْدَه، وَهَزَمَ الأحْزَابَ وَحْدَه، فَلاَ شَيءَ بَعْدَه) অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা'বূদ নেই, তিনি একক, তিনি স্বীয় অঙ্গীকার পূরণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন, স্বীয় বাহিনীকে জয়যুক্ত করেছেন এবং সকল (শত্রু)বাহিনীকে তিনি একাই পরাজিত করেছেন। তাঁর পর কিছু নেই। (বুখারী, মুসলিম) উক্ত দু'আটি হজ্জ-উমরাহ, জিহাদ এবং সফর থেকে ফিরে আসার সময় পড়া বিধেয়।
আল-আহযাব 33:26
গ্রন্থধারীদের মধ্যে যারা ওদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল তাদেরকে তিনি দুর্গ হতে অবতরণে বাধ্য করলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন; এখন তোমরা ওদের এক দলকে হত্যা করছ এবং এক দলকে বন্দী করছ।
আল-আহযাব 33:27
তিনি তোমাদেরকে ওদের ভূমি, ঘর-বাড়ী ও ধন-সম্পদের এবং এমন এক দেশের উত্তরাধিকারী করলেন[১] যেখানে তোমরা পা রাখনি। [২] আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
[১] এখানে বানী কুরাইযা যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। যেমন পূর্বে বর্ণনা হয়েছে যে, এই গোত্র নিজেদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আহযাব যুদ্ধে মুশরিক এবং অন্য ইয়াহুদীদের সাথে মিলিত হয়েছিল। সুতরাং আহযাব যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সবেমাত্র গোসল সেরেছেন এমতাবস্থায় জিবরীল (আঃ) এসে বললেন, আপনি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন? আমরা (ফিরিশতাদল) তো এখনো হাতিয়ার রাখিনি। চলুন, এখন বানু কুরাইযার হিসাব চুকাতে হবে। আমাকে আল্লাহ তাআলা এই জন্য আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। সুতরাং মহানবী (সাঃ) মুসলিমদের মাঝে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারী করলেন যে, আসরের নামায ঐখানে গিয়ে পড়বে। তাদের বাসস্থান মদীনা হতে কয়েক মাইল দূরে ছিল। তারা আপন কেল্লাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। বাইরে থেকে মুসলিমগণ তাদেরকে ঘিরে ফেলল। এই অবরোধ প্রায় বিশ-পঁচিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকল। পরিশেষে তারা সা'দ বিন মুআযকে নিজেদের বিষয়ে সালিস মেনে নিল যে, তিনি আমাদের ব্যাপারে যে ফায়সালা দেবেন, আমরা তা মেনে নেব। সুতরাং তিনি ফায়সালা দিলেন যে, তাদের মধ্যে যোদ্ধাদেরকে হত্যা এবং নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হবে। আর তাদের সম্পদ মুসলিমদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হবে। নবী (সাঃ) উক্ত ফায়সালা শুনে বললেন, "আকাশের উপর আল্লাহ তাআলার ফায়সালাও এটাই।" এই ফায়সালা অনুযায়ী তাদের যোদ্ধাদের শিরশ্ছেদ করা হল এবং মদীনাকে তাদের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করা হল। (দেখুনঃ সহীহ বুখারী, খন্দক যুদ্ধ) أَنزَل অর্থাৎ কেল্লা থেকে নিচে নামিয়ে দিল। ظاهروهم অর্থাৎ তারা কাফেরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সাহায্য করেছিল।
[২] অনেকে বলেছেন, এ স্থান থেকে উদ্দেশ্য হল খায়বার এলাকা। আহযাবের পরেই ৬ হিজরী সনে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মুসলিমরা খায়বার জয় করেন। অনেকে বলেছেন, মক্কা। অনেকে রোম বা পারস্যের এলাকা উদ্দেশ্য বলেছেন। পক্ষান্তরে অনেকের নিকট আয়াতের উদ্দেশ্য হল, ঐ সকল দেশ ও এলাকা যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমগণ জয়লাভ করবেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আল-আহযাব 33:28
হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের বল, ‘তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তাহলে এস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দিই।
আল-আহযাব 33:29
পক্ষান্তরে তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং পরকাল কামনা করলে, তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’ [১]
[১] বিভিন্ন দেশ জয়লাভ করার পর যখন মুসলিমদের অবস্থা পূর্বের তুলনায় কিছুটা সচ্ছল হল, তখন মুহাজির ও আনসারদের স্ত্রীদের দেখাদেখি মহানবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণও খোরপোষের পরিমাণ বৃদ্ধির দাবী জানালেন। নবী (সাঃ) যেহেতু বিলাসহীন জীবন-যাত্রা পছন্দ করতেন, সেহেতু স্ত্রীদের এই দাবীতে বড় দুঃখিত হলেন এবং এক মাসের জন্য স্ত্রীদের নিকট থেকে আলাদা হয়ে একাকী বাস করলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সর্বপ্রথম তিনি আয়েশা (রাঃ) -কে উক্ত আয়াত শুনিয়ে তাঁকে তাঁর সংসারে থাকা ও না থাকার ব্যাপারে এখতিয়ার দিলেন এবং বললেন, নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পিতা-মাতার পরামর্শ নিয়ে যা করার করবে। আয়েশা (রাঃ) বললেন, আপনার বিষয়ে পরামর্শ করব তা কি করে হয়? বরং আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে পছন্দ করি। অন্য সকল স্ত্রীগণও এই একই মত ব্যক্ত করলেন এবং কেউ নবী (সাঃ)-কে ত্যাগ করে পার্থিব প্রাচুর্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিলেন না। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা আহযাব) সেই সময় নবী (সাঃ)-এর সংসারে নয়জন স্ত্রী ছিলেন; পাঁচজন ছিলেন কুরাইশ বংশের। আয়েশা, হাফস্বা, উম্মে হাবীবা, সাওদা ও উম্মে সালামা (রাঃ) এবং এ ছাড়া বাকি চার জন হলেন; সাফিয়্যা, মাইমুনা, যায়নাব ও জুওয়াইরিয়া (রাঃ) । অনেকে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে পৃথক হয়ে যাওয়ার এখতিয়ারকে ত্বালাক বলে গণ্য করেন। কিন্তু এ কথা সঠিক নয়। সঠিক মাসআলা এই যে, এখতিয়ার দেওয়ার পর যদি স্ত্রী পৃথক হয়ে যাওয়াকে বেছে নেয়, তাহলে অবশ্যই ত্বালাক হয়ে যাবে। (আর তা হবে ত্বালাকে রাজয়ী; ত্বালাকে বায়েনাহ নয়, যেমন কিছু উলামার মত।) আর যদি স্ত্রী পৃথক হয়ে যাওয়াকে বেছে না নেয়, তাহলে ত্বালাক হবে না। যেমন নবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণ পৃথক না হয়ে তাঁর সাথে থাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। অথচ এই বেছে নেওয়াকে ত্বালাক গণ্য করা হয়নি। (বুখারীঃ ত্বালাক অধ্যায়, মুসলিম)
আল-আহযাব 33:30
হে নবী-পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ কোন প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে।[১] আর আল্লাহর জন্য তা সহজ।
[১] কুরআনে 'আলিফ-লাম' যুক্ত অবস্থায় الفَاحِشَةُ শব্দটিকে ব্যভিচারের অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু 'আলিফ-লাম' ছাড়া 'নাকিরাহ' অবস্থায় সাধারণ অশ্লীলতার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে; যেমন এখানে। এখানে এর অর্থ হবেঃ অসভ্য ও অশোভনীয় আচরণ। কারণ নবী (সাঃ)-এর সাথে অসভ্য ও অশোভনীয় আচরণ করার মানে হচ্ছে তাঁকে কষ্ট দেওয়া, আর তা কুফরী। এ ছাড়া নবী (সাঃ)-এর পবিত্র স্ত্রীগণ অনেক উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। আর যাঁরা উচ্চ মর্যাদাবান হন তাঁদের নগণ্য ভুলকেও বড় গণ্য করা হয়। যার জন্য তাঁদেরকে দ্বিগুণ শাস্তির ধমক শোনানো হয়েছে।
আল-আহযাব 33:31
তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের প্রতি অনুগতা হবে ও সৎকাজ করবে, তাকে আমি দ্বিগুণ পুরস্কার দান করব।[১] আর তার জন্য আমি সম্মানজনক জীবিকা প্রস্তুত রেখেছি।
[১] অর্থাৎ, যেমন শাস্তি দ্বিগুণ হবে অনুরূপ পুণ্য বা নেকীও দ্বিগুণ দেওয়া হবে। যেমন নবী (সাঃ) কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إذًا لاَذَقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ অর্থাৎ, "তখন আমি তোমাকে ইহজীবন ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম।" (বানী ইসরাঈল ৭৫ আয়াত)
আল-আহযাব 33:32
হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও;[১] যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।[২] আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)[৩]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা সাধারণ নারীদের মত নয়; বরং আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে রসূল-পত্নী হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন, যার ফলে তোমরা এক উচ্চস্থান ও মর্যাদার অধিকারিণী, তাই রসূল (সাঃ)-এর মত তোমাদেরকেও উম্মতের জন্য আদর্শবতী হতে হবে। এখানে নবী-পত্নীগণকে তাঁদের উচ্চস্থান ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে তাঁদেরকে কিছু নির্দেশ দান করা হচ্ছে। এ সব নির্দেশাবলীতে সম্বোধন যদিও পবিত্রা স্ত্রীগণকে করা হয়েছে, যাঁদের প্রত্যেককে 'উম্মুল মু'মিনীন' (মু'মিনদের মাতা) বলা হয়েছে, তবুও বর্ণনা ভঙ্গীতে প্রকাশ পাচ্ছে যে, উদ্দেশ্য সমগ্র মুসলিম নারীকে বোঝানো ও সতর্ক করা। অতএব উক্ত নির্দেশাবলী সমগ্র মুসলিম নারীর জন্য মান্য ও পালনীয়।
[২] আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন (যা থেকে হেফাযতের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে নারী পুরুষের জন্য ফেতনার কারণ না হয়ে পড়ে।) অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা রেখেছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়।
[৩] অর্থাৎ, এই কর্কশতা ও কঠোরতা শুধু কণ্ঠস্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, অর্থাৎ মুখে এমন বাক্য আনবে না, যা অসঙ্গত ও সচ্চরিত্রতার পরিপন্থী। إِنِ اتَّقَيْتُنَّ (যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর) বলে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেছেন যে, এই কথা এবং অন্যান্য নির্দেশাবলী যা সামনে বর্ণনা করা হবে, তা মুত্তাক্বী নারীদের জন্য (যারা আল্লাহকে ভয় করে)। কারণ তাদেরই আশঙ্কা থাকে যে, যাতে তাদের আখেরাত বরবাদ না হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যাদের হৃদয় আল্লাহর ভয়শূন্য তাদের সাথে এই নির্দেশাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। তারা কখনোও এর পরোয়া করবে না।
আল-আহযাব 33:33
তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর[১] এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না।[২] তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগতা হও;[৩] হে নবী-পরিবার![৪] আল্লাহ তো কেবল তোমাদের মধ্য থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান।
[১] অর্থাৎ, তোমরা ঘরে অবস্থান কর এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বাইরে যেও না। এতে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, নারীদের কর্ম রাজনীতি, দুনিয়া পরিচালনা ও পরিশ্রম-উপার্জন করা নয়। বরং তাদের প্রধান কাজ হল, ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে সুরক্ষিত থেকে গৃহকর্ম দেখাশোনা করা।
[২] এখানে নারীদের ঘর থেকে বের হওয়ার আদব বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে যে, যদি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হতে হয়, তবে তোমরা যেন সাজসজ্জা করে বাইরে না যাও কিংবা এমনভাবে বের না হও, যাতে তোমাদের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। যেমন বেপর্দা হয়ে এমনভাবে বের না হও, যাতে তোমাদের মাথা, চেহারা, ঘাড় ও বুক ইত্যাদি পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বরং সুগন্ধি ব্যবহার না করে সাধারণ পোশাকে আবৃত হয়ে পর্দার সাথে বের হবে। 'تبرج' এর অর্থ হল বেপর্দা হওয়া, সৌন্দর্য প্রকাশ ও প্রদর্শন করা। কুরআন এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, 'تَبَرُّجْ' (পর্দাহীনতা) হল জাহেলী যুগের প্রথা; যা ইসলামের পূর্বে ছিল এবং ভবিষ্যতে যখন তা বেছে নেওয়া হবে, তখন তা জাহেলী প্রথাই গণ্য হবে। তার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই, তাতে তার নাম যতই সুন্দর ও মনলোভা (নারী-স্বাধীনতা, নারী-প্রগতি, সভ্যতা ইত্যাদি) রাখা হোক না কেন।
[৩] পূর্বের নির্দেশগুলি পাপকর্ম থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে ছিল। এই সকল নির্দেশাবলী পুণ্যকর্ম বেছে নেওয়ার ব্যাপারে দেওয়া হচ্ছে।
[৪] 'আহলে বায়ত' (নবী-পরিবার) বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এতে কিছু মতভেদ রয়েছে। অনেকে তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে বুঝিয়েছেন, যেমন এখানে কুরআনের পূর্ব বর্ণনায় প্রকাশ হচ্ছে। কুরআন এ স্থানে তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকেই 'আহলে বায়ত' বলেছে। কুরআনের অন্য স্থানেও নবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণকেই 'আহলে বায়ত' বলা হয়েছে। যেমন সুরা হূদের ৭৩ আয়াতে। সুতরাং তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণের 'আহলে বায়ত' হওয়া কুরআনী দলীল দ্বারা প্রমাণিত। অনেকে হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে 'আহলে বায়ত' বলতে আলী, ফাতেমা এবং হাসান-হুসাইন (রাঃ)-কে ধরেন এবং নবী-পত্নীগণকে তার বাইরে মনে করেন। পক্ষান্তরে পূর্বোক্ত উলামাগণ এই চারজনকে আহলে বায়তের বাইরে মনে করেন। তবে মধ্যপন্থা এই যে, উভয় শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গই 'আহলে বায়ত'। নবী-পত্নীগণ কুরআনের দলীলের ভিত্তিতে এবং মেয়ে-জামাই ও তাঁদের পুত্রগণ সেই সহীহ বর্ণনার ভিত্তিতে 'আহলে বায়ত' যাতে নবী (সাঃ) তাঁদেরকে নিজের চাদরে ঢেকে নিয়ে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়ত।" যার অর্থ হল যে, এরাও আমার আহলে বায়তের মধ্যে শামিল। অথবা তা দু'আ ছিল যে, "হে আল্লাহ! এদেরকেও আমার পত্নীগণের মত আমার আহলে বায়তে শামিল করে নাও।" আর এইভাবে সকল দলীলগুলি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়। (বিস্তারিত জানার জন্য আল্লামা শাওকানীর ফাতহুল ক্বাদীর দ্রষ্টব্য)
আল-আহযাব 33:34
আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয়, তা তোমরা স্মরণ রাখ।[১] নিঃসন্দেহে আল্লাহ সমস্ত গোপন রহস্য জানেন, খবর রাখেন সর্ববিষয়ের।
[১] অর্থাৎ, তার উপর আমল কর। 'حكمة' (জ্ঞানের কথা)র অর্থ হাদীস বা নবী (সাঃ)-এর সুন্নত। উক্ত আয়াত থেকে দলীল নিয়ে অনেকে বলেন যে, কুরআনের মত হাদীসকেও নেকীর উদ্দেশ্যে পড়া যাবে। এ ছাড়া এ আয়াতও নবী-পত্নীগণের 'আহলে বায়ত' হওয়ার কথা প্রমাণ করে। কারণ অহীর অবতরণ, যার বর্ণনা এই আয়াতে হয়েছে, তা নবী-পত্নীগণের গৃহেই হত; বিশেষ করে আয়েশা (রাঃ) -র গৃহে, যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
আল-আহযাব 33:35
নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী,[১] বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী --এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন।
[১] একদা উম্মে সালামা এবং অন্যান্য সাহাবী মহিলাগণ বললেন যে, কি ব্যাপার, আল্লাহ তাআলা সর্বস্থানে মহিলাদেরকে ছেড়ে কেবল পুরুষদেরকেই সম্বোধন করেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হল। (মুসনাদ আহমদ, ৬/৩০১, তিরমিযী ৩২১১নং) এতে মহিলাদের মন জয় করা হয়েছে। তাছাড়া সকল আহ্কামে পুরুষদের সাথে মহিলারাও শামিল, শুধু তাদের কিছু বিশেষ আহকাম ছাড়া যা তাদেরই জন্য নির্দিষ্ট। এই আয়াত ও অন্যান্য আয়াতসমূহ দ্বারা পরিষফুটিত হয় যে, ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্য এবং পরকালের মান-মর্যাদায় পুরুষ ও নারীর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। উভয়ের জন্য একই ভাবে সে ময়দান খোলা আছে এবং উভয়েই বেশি বেশি নেকী ও সওয়াব অর্জন করতে পারে। কেবল জাতিভেদে তাদের মাঝে কোন কম-বেশি করা হবে না। এ ছাড়া মুসলমান ও মু'মিনের পৃথক পৃথক বর্ণনা করাতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, এই দুই-এর মাঝে পার্থক্য আছে। ঈমানের স্থান ইসলামের ঊর্ধ্বে; যেমন কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য দলীল দ্বারা তাই প্রমাণ হয়।
আল-আহযাব 33:36
আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।[১] কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
[১] এই আয়াতটি যয়নাব (রাঃ) -এর বিবাহের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ) যদিও তিনি প্রকৃত পক্ষে আরবী ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে শৈশবকালে জোর করে ধরে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিয়েছিল। নবী (সাঃ)-এর সাথে খাদীজা (রাঃ) -র বিবাহের পর খাদীজা (রাঃ) তাঁকে রসূল (সাঃ)-কে দান করে দেন। তিনি তাঁকে মুক্ত করে আপন পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। একদা নবী (সাঃ) তাঁর বিবাহের জন্য আপন ফুফাতো বোন যয়নাব (রাঃ) -কে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। যাতে তাঁর ও তাঁর ভায়ের বংশ-মর্যাদার ফলে মনে চিন্তা হল যে, যায়েদ (রাঃ) একজন মুক্ত দাস এবং আমাদের সম্পর্ক এক উচ্চ বংশের সাথে। (সুতরাং এ প্রস্তাব কিভাবে গ্রহণ করা যায়?) এই চিন্তা-ভাবনার ফলে উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যার উদ্দেশ্য হল যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ফায়সালার পর কোন মু'মিন পুরুষ ও নারীর এ এখতিয়ার ও অধিকার নেই যে, সে নিজের ইচ্ছামত চলবে। বরং তার জন্য অপরিহার্য যে, সে মাথা নত করে তা মেনে নেবে। সুতরাং এ আয়াত শ্রবণ করার পর যয়নাব ও অন্যান্যরা নিজেদের অসম্মতি প্রত্যাহার করে নিয়ে সম্মত হয়ে যান। অতঃপর বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
আল-আহযাব 33:37
স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলেছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।’ আর তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোককে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত।[১] অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রী যয়নাবের) সাথে বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল,[২] তখন আমি তোমার সাথে তার বিবাহ দিলাম;[৩] যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্রগণ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সে সব রমণীকে বিবাহ করায় তাদের কোন বিঘ্ন না থাকে।[৪] আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।[৫]
[১] কিন্তু যেহেতু তাঁদের মন-মানসিকতায় পার্থক্য ছিল, স্ত্রীর মনে বংশ-মর্যাদা ও আভিজাত্য বাসা বেঁধেই ছিল, অন্য দিকে যায়েদের সমভ্রমে ছিল দাসত্বের দাগ। ফলে তাঁদের আপোসে কলহ লেগেই থাকত, যা যায়েদ (রাঃ) মাঝে মাঝে নবী (সাঃ)-এর নিকট প্রকাশ করতেন এবং ত্বালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কিন্তু নবী (সাঃ) তাঁকে ত্বালাক দিতে নিষেধ করতেন ও কোন রকম ভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য বলতেন। অপর দিকে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-কে অহীর মাধ্যমে এই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছিলেন যে, যায়েদের পক্ষ থেকে ত্বালাক হবে এবং তারপর যয়নাবের সাথে তোমার বিয়ে হবে; যাতে জাহেলিয়াতের পোষ্যপুত্র রাখার প্রথার উপর জোর কুঠারাঘাত হেনে প্রকাশ করে দেওয়া হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে পোষ্যপুত্র আপন পুত্রের মত নয় এবং তার ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ। উক্ত আয়াতে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যায়েদ (রাঃ)-এর উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। আর নবী (সাঃ)-এর তাঁর প্রতি দয়া এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীনী তরবিয়ত দান করেন ও তাঁকে স্বাধীন করে আপন পুত্র বানিয়ে নেন এবং আপন ফুফু উমাইমা বিনতে আব্দুল মুত্তালেবের মেয়ের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অন্তরে গোপন করা কথা তাই ছিল, যা তাঁকে যয়নাবের সাথে তাঁর নিজের বিয়ের ব্যাপারে অহী দ্বারা জানানো হয়েছিল। নবী (সাঃ) এই কথার ভয় করতেন যে, লোকে বলবে, ছেলের স্ত্রীকে (পুত্রবধূকে) বিয়ে করে নিয়েছে। অথচ যখন আল্লাহ তাঁর দ্বারা এই প্রথার মূল উৎপাটন করতে চান, তখন মানুষকে ভয় করার কোন প্রয়োজন ছিল না। নবী (সাঃ)-এর যদিও এটা প্রকৃতিগত ভয় ছিল, তবুও তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ করার অর্থ হল যে, এ বিবাহ হবে, যাতে এ ব্যাপারে সকলে অবগত হয়ে যায়।
[২] অর্থাৎ, বিয়ের পর ত্বালাক দিল এবং যয়নাব ইদ্দত পূর্ণ করল।
[৩] অর্থাৎ, এ বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাকের আদেশে সাধারণ বিয়ে-শাদীর প্রচলিত নিয়ম ও শর্তাবলী থেকে ব্যতিক্রম ভাবে সুসম্পন্ন হয়। অর্থাৎ ঈজাব-কবুল, অলী (অভিভাবক), মোহর এবং কোন সাক্ষী ছাড়াই।
[৪] এটি হল যয়নাবের সাথে নবী (সাঃ)-এর বিয়ের কারণ। আর তা এই যে, আগামীতে কোন মুসলিম যেন এই ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতা বোধ না করে এবং প্রয়োজনে পোষ্যপুত্রের ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারে।
[৫] অর্থাৎ, পূর্ব থেকে তকদীরে লেখা ছিল। যা যে কোন অবস্থাতেই হওয়ার ছিল।
আল-আহযাব 33:38
আল্লাহ নবীর জন্য যা বিধিবদ্ধ করেছেন, তা করতে তার জন্য কোন বাধা নেই।[১] পূর্বে যে সব নবী অতীত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এটিই ছিল আল্লাহর বিধান।[২] আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত।[৩]
[১] এখানে পূর্বোক্ত ঘটনা যয়নাবের বিয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সুতরাং উক্ত বিয়ে তাঁর জন্য হালাল ছিল। যার ফলে তাতে কোন পাপবোধ বা নিজের মাঝে সংকীর্ণতা বোধ করার কোন কারণ নেই ।
[২] অর্থাৎ, পূর্বের নবীগণ সেই কর্মে কোনরূপ সংকীর্ণতা বোধ করতেন না, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদের উপর ফরয করা হত; যদিও তা জাতি ও জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত প্রথার উলটা হত।
[৩] অর্থাৎ, (আল্লাহ তাআলার কাজ) এক বিশেষ হিকমত ও কল্যাণের ভিত্তিতে পূর্ণ হয়, দুনিয়ার রাজা-বাদশাদের মত সাময়িক ও আশু প্রয়োজনের তাকীদে হয় না। অনুরূপ তার সময়ও নির্ধারিত থাকে, যা সেই সময় অনুসারেই সংঘটিত হয়।
আল-আহযাব 33:39
ওরা আল্লাহর বাণী প্রচার করত; ওরা তাঁকে ভয় করত এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাকেও ভয় করত না।[১] আর হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট। [২]
[১] যার ফলে কারোর ভয় বা প্রতাপ তাঁদেরকে আল্লাহর পয়গাম পৌছাতে না বাধা দিতো, আর না কারো মন্তব্য, নিন্দাবাদ, সমালোচনা ইত্যাদির তাঁরা পরোয়া করতেন।
[২] অর্থাৎ, তিনি সর্বত্র তাঁর ইলম ও ক্ষমতা নিয়ে বিদ্যমান, যার ফলে তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্যের জন্য যথেষ্ট এবং আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত-তবলীগে তাঁদের যে সমস্যা আসে তাতে তিনি সাহায্য করেন এবং শত্রুদের নাপাক বাসনা ও সম্মিলিত অসৎ প্রচেষ্টা থেকে তাঁদেরকে রক্ষা করেন।
আল-আহযাব 33:40
মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়,[১] বরং সে আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী।[২] আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
[১] এই জন্য তিনি যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ)-এরও পিতা নন, যার ফলে তাঁকে মন্তব্যের নিশানা বানানো যাবে যে, তিনি আপন পুত্রবধূকে কেন বিয়ে করলেন? বরং শুধু যায়েদ কেন তিনি কোন পুরুষেরই পিতা নন। কারণ যায়েদ তো হারেসার পুত্র ছিলেন। নবী (সাঃ) তো তাঁকে শুধু পোষ্যপুত্র বানিয়েছিলেন এবং জাহেলী নিয়মে তাঁকে যায়েদ বিন মুহাম্মাদ বলা হত মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তিনি নবী (সাঃ)-এর পুত্র ছিলেন না। যার ফলে (اُدْعُوْهُمْ لآبآئِهم) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁকে যায়েদ বিন হারেসা নামেই ডাকা হত। এ ছাড়া খাদীজার গর্ভে নবী (সাঃ)-এর তিন ছেলে; ক্বাসেম, ত্বাহের ও ত্বাইয়েব জন্ম নিয়েছিলেন। আর মারিয়া কিবত্বিয়ার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন ইবরাহীম। কিন্তু সকলেই শিশু অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। তাঁরা কেউ পুরুষত্বের বয়স পাননি। সুতরাং নবী (সাঃ)-এর পুত্রদের কেউ পুরুষ হননি; যাঁর তিনি পিতা ছিলেন। (ইবনে কাসীর)
[২] خَاتَمٌ মোহরকে বলা হয়। আর মোহর সর্বশেষ কর্মকে বলা হয়। (যেমন পত্রের শেষে মোহর মারা হয়।) অর্থাৎ নবী (সাঃ) থেকে নবুঅত ও রিসালাতের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর পর যে কেউ নবী হওয়ার দাবী করবে, সে নবী নয়; বরং মিথ্যুক ও দাজ্জাল বলে পরিগণিত হবে। উক্ত বিষয়ে হাদীস গ্রন্থসমূহে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাতে সকল উম্মত একমত। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ হবে, যা সহীহ ও সূত্রবহুল প্রসিদ্ধ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। তবে তিনি নবী হয়ে আসবেন না; বরং শেষ নবী (সাঃ)-এর উম্মত হয়ে আসবেন। যার ফলে তাঁর অবতরণ হওয়া 'খাতমে নবুঅত'-এর আকীদার পরিপন্থী নয়।
আল-আহযাব 33:41
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর,
আল-আহযাব 33:42
এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।
আল-আহযাব 33:43
তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফিরিশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে; যাতে তিনি অন্ধকার হতে তোমাদেরকে আলোকে আনয়ন করেন। আর তিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম দয়ালু।
আল-আহযাব 33:44
যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে সালাম (শান্তি)। [১] আর তিনি তাদের জন্য সম্মানজনক প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।
[১] অর্থাৎ, জান্নাতে ফিরিশতাগণ মু'মিনদেরকে অথবা মু'মিনগণ আপোসে একজন অপরজনকে সালাম করবেন।
আল-আহযাব 33:45
হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে,[১] সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে,
[১] অনেকে 'شاهد' এর অর্থ হাযের-নাযের (সর্বস্থলে উপস্থিত ও দর্শক) করে থাকেন; যা কুরআনের অর্থ-বিকৃতির নামান্তর। নবী (সাঃ) আপন উম্মতের জন্য সাক্ষ্য দেবেন, তাদের জন্যও সাক্ষ্য দেবেন যাঁরা তাঁর উপর ঈমান এনেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধেও যারা তাঁকে মিথ্যা মনে করেছে। কিয়ামতের দিন তিনি মু'মিনদেরকে তাদের ওযুর উজ্জ্বল স্থান দেখে চিনতে পারবেন। অনুরূপ তিনি অন্যান্য নবীদের জন্য সাক্ষ্য দেবেন যে, তাঁরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ সাক্ষ্য আল্লাহর দেওয়া সুনিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে হবে। এই কারণে নয় যে, তিনি সকল আম্বিয়াগণ (ও তাঁদের কার্যকলাপ)-কে স্বচক্ষে দর্শন করতেন। বলা বাহুল্য, এই বিশ্বাস কুরআনী দলীলের পরিপন্থী।
আল-আহযাব 33:46
আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। [১]
[১] যেমন প্রদীপ দ্বারা অন্ধকার দূর হয়, অনুরূপ নবী (সাঃ) দ্বারা কুফর ও শিরকের অন্ধকার দূর হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানেও যে এ প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে পরিপূর্ণতা ও চিরসুখ লাভে ধন্য হতে চায়, সেও তা অর্জন করতে পারবে। কারণ তাঁর নবুঅতের এই প্রদীপ কিয়ামত পর্যন্ত দেদীপ্যমান থাকবে।
আল-আহযাব 33:47
তুমি বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য আল্লাহর নিকট মহা অনুগ্রহ রয়েছে।
আল-আহযাব 33:48
আর তুমি অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের কথা মান্য করো না ; ওদের নির্যাতন উপেক্ষা কর এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।
আল-আহযাব 33:49
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা বিশ্বাসী রমণীদেরকে বিবাহ করার পর ওদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্য তাদের কোন পালনীয় ইদ্দত নেই।[১] সুতরাং তোমরা ওদেরকে কিছু সামগ্রী প্রদান কর[২] এবং সৌজন্যের সাথে ওদেরকে বিদায় কর।[৩]
[১] বিবাহের পর যে নারীর তার স্বামীর সাথে সঙ্গম হয়েছে ও সে যুবতী আছে, এই অবস্থায় সে তালাকপ্রাপ্তা হলে তার ইদ্দত তিন মাসিক। (সূরা বাক্বারাহ ২:২২৮ আয়াত) এখানে ঐ সকল নারীদের বিধান বর্ণনা করা হচ্ছে যাদের বিয়ে হয়েছে কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গম হয়নি। এমতাবস্থায় যদি তালাক হয়ে যায়, তবে কোন ইদ্দত নেই। অর্থাৎ এই রকম সঙ্গমের পূর্বেই তালাকপ্রাপ্তা নারী কোন ইদ্দত পালন করা ছাড়াই যদি অন্য পুরুষকে বিবাহ করতে চায়, তাহলে সাথে সাথে বিবাহ করতে পারবে। তবে যদি সঙ্গমের পূর্বে স্বামীর মৃত্যু হয়, তবে তাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতেই হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর, ইবনে কাসীর) 'স্পর্শ করা বা হাত লাগানো' বলে সঙ্গমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। نكاح শব্দটি বিশেষ করে সঙ্গম এবং বিবাহ বন্ধন দুই অর্থেই ব্যবহার হয়। এখানে বিবাহ বন্ধনের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। উক্ত আয়াত থেকে দলীল নিয়ে বলা হয়েছে যে, বিবাহের পূর্বে তালাক হয় না। কারণ এখানে তালাকের বর্ণনা বিবাহের বর্ণনার পর এসেছে। সুতরাং যে সকল ফকীহগণ এই কথা বলেন যে, যদি কোন ব্যক্তি বলে যে, 'যদি আমি অমুক নারীকে বিয়ে করি, তবে সে তালাক' তবে তাদের নিকট সেই নারীর সাথে বিয়ে হওয়া মাত্র তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপ অনেকে বলেন যে, যদি সে বলে যে, 'আমি যে নারীকেই বিয়ে করব তাকে তালাক' তবে সে যে কোন নারীকেই বিয়ে করবে তালাক হয়ে যাবে। উক্ত মত দুটি সহীহ নয়। যেহেতু হাদীসে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে, "বিবাহের পূর্বে তালাক নেই।" (ইবনে মাজাহ) "আদম সন্তান যার মালিক নয়, তার তালাক হয় না।" (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, আহমাদ ২১৮৯) এতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, বিয়ের পূর্বে তালাক দেওয়া একটা ফালতু কাজ, শরীয়তে যার কোন স্থান নেই।[২] এই সামগ্রী হল, যদি মোহর ধার্য হয়ে থাকে, তবে তার অর্ধেক মোহর। আর ধার্য্য হয়ে না থাকলে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু প্রদান করা হবে।[৩] অর্থাৎ, কোন প্রকার কষ্ট না দিয়ে, ইজ্জত ও সম্মানের সাথে তাকে বিদায় করে দাও।
আল-আহযাব 33:50
হে নবী! নিশ্চয় আমি তোমার জন্য তোমার স্ত্রীগণকে বৈধ করেছি যাদেরকে তুমি মোহরানা প্রদান করেছ[১] এবং বৈধ করেছি তোমার অধিকারভুক্ত দাসিগণকে যাদেরকে আমি যুদ্ধবন্দিনীরূপে দান করেছি[২] এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি তোমার চাচাতো ভগিনী, ফুফাতো ভগিনী, মামাতো ভগিনী ও খালাতো ভগিনীকে; যারা তোমার সঙ্গে দেশ ত্যাগ করেছে[৩] এবং কোন বিশ্বাসীনী নবীর নিকট নিজেকে নিবেদন করলে এবং নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে (সেও তোমার জন্য বৈধ।)[৪] --এ (বিধান) বিশেষ করে তোমারই জন্য; অন্য বিশ্বাসীদের জন্য নয়;[৫] বিশ্বাসীদের স্ত্রী এবং তাদের দাসিগণ সম্বন্ধে যা নির্ধারিত করেছি তা আমি জানি।[৬] (এ বিধান এ জন্য) যাতে তোমার কোন অসুবিধা না হয়।[৭] আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] শরীয়তে কিছু আহ্কাম নবী (সাঃ)-এর জন্য নির্দিষ্ট, যেগুলিকে নবী (সাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য বলা হয়। যেমন উলামাদের এক দলের মত অনুযায়ী তাহাজ্জুদের নামায তাঁর জন্য ফরয ছিল, সাদাকা তাঁর জন্য হারাম ছিল, অনুরূপ কিছু বিশেষত্বের বর্ণনা কুরআন কারীমের এই স্থানে করা হয়েছে, যা বিবাহ সম্পর্কিত। যে সকল স্ত্রীদের নবী (সাঃ) মোহর আদায় করে দিয়েছেন তাঁরা হালাল তাতে তাঁরা সংখ্যায় যতই হন না কেন। তিনি সাফিয়্যা (রাঃ) ও জুওয়াইরিয়া (রাঃ) -কে স্বাধীন করাকেই তাঁদের মোহর ধার্য করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি সকল স্ত্রীদের মোহর নগদ আদায় করে দিয়েছিলেন; শুধু উম্মে হাবীবা (রাঃ) ছাড়া। কারণ তাঁর মোহর বাদশাহ নাজাশী আদায় করেছিলেন।
[২] সুতরাং সাফিয়্যা (রাঃ) ও জুওয়াইরিয়া (রাঃ) নবী (সাঃ)-এর মালিকানায় এলে তিনি তাঁদেরকে মুক্ত করে বিবাহ করেছিলেন এবং রায়হানা (রাঃ) ও মারিয়া কিবত্বিয়া (রাঃ) ক্রীতদাসী হিসাবেই নবী (সাঃ)-এর নিকট ছিলেন।
[৩] এর অর্থ হল যেমন নবী (সাঃ) হিজরত করেছিলেন, অনুরূপ তাঁরাও মক্কা থেকে মদীনা হিজরত করেছিলেন। যেহেতু নবী (সাঃ)-এর সাথে কোন নারী হিজরত করেননি।
[৪] অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট যদি কোন মহিলা নিজেকে নিবেদন করে এবং তিনি তাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক হন, তাহলে দেনমোহর ছাড়াই তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা তাঁর জন্য হালাল।
[৫] উপরোক্ত বিধান শুধু নবী (সাঃ)-এর জন্য। অন্য মু'মিনদের জন্য আবশ্যিক যে, সে (রীতিমতো) মোহর আদায় করবে, তবেই বিবাহ বৈধ হবে।
[৬] অর্থাৎ, বিবাহ বন্ধনের যে শর্ত ও অধিকারসমূহ যা আমি ফরয করেছি; যেমনঃ কেউ একই সঙ্গে চারের অধিক স্ত্রী বিবাহ বন্ধনে রাখতে পারে না, (মহিলার জন্য) অলী বা অভিভাবকের সম্মতি, সাক্ষী ও মোহর আবশ্যিক। তবে ক্রীতদাসী হলে যতজন ইচ্ছা রাখতে পারা যায়। কিন্তু বর্তমানে ক্রীতদাসীর (দাসত্ব) প্রথাই তো নেই।
[৭] এটা 'إنَّا أحْلَلْنَا' এর সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ উপরি উল্লিখিত সকল মহিলা নবী (সাঃ)-এর জন্য এই কারণে বৈধ, যাতে নবী (সাঃ) অসুবিধা মনে না করেন এবং তিনি তাদের মধ্যে কাউকে বিবাহ করাতে মনে পাপবোধ না করেন।
আল-আহযাব 33:51
তুমি ওদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট হতে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা কাছে স্থান দিতে পার[১] এবং তুমি যাকে দূরে রেখেছ, তাকে কামনা করলে তোমার কোন অপরাধ নেই।[২] এ বিধান এ কথার অধিক নিকটতর যে, ওদের চক্ষু শীতল হবে এবং ওরা দুঃখ পাবে না এবং তুমি যা দেবে তাতে ওদের সকলেই সন্তুষ্ট থাকবে।[৩] তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন।[৪] আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল ।
[১] এখানে নবী (সাঃ)-এর আরো একটি বিশেষত্বের কথা বর্ণনা হয়েছে, আর তা হল এই যে, স্ত্রীদের মাঝে পালা নির্ধারণ করাতে তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি যার পালা চাইবেন বন্ধ রাখতে পারবেন, অর্থাৎ তাকে বিবাহ বন্ধনে রেখে তার সাথে রাত্রিযাপন না করে অন্য যে কোন স্ত্রীর সাথে চাইবেন রাত্রিযাপন করতে পারবেন।
[২] অর্থাৎ, যে সকল স্ত্রীদের পালা বন্ধ রেখেছিলেন, যদি তিনি তাদের সাথে সঙ্গমের সম্পর্ক রাখতে চান, তবে পুনরায় এ সম্পর্ক কায়েম করতে পারেন -- তার অনুমতি আছে।
[৩] অর্থাৎ, নবী (সাঃ) পালা বন্ধ করলে এবং একজনকে অপর জনের উপর প্রাধান্য দিলেও স্ত্রীরা সন্তুষ্ট থাকবেন; দুঃখিত হবেন না। তাঁরা তাঁর নিকট থেকে যা পাবেন তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন। কারণ তাঁরা জানেন যে, নবী (সাঃ) যা কিছু করছেন আল্লাহ তাআলার আদেশেই করছেন সুতরাং সকল স্ত্রীগণ আল্লাহর ফায়সালার উপর সর্বদা সন্তুষ্ট ও খুশি থাকবেন। কেউ কেউ বলেন যে, নবী (সাঃ) এই এখতিয়ার পাওয়ার পরেও তিনি তা ব্যবহার করেননি এবং সওদা (রাঃ) ছাড়া (যেহেতু তিনি আপন পালা নিজেই আয়েশাকে দান করে দিয়েছিলেন) তিনি সকল স্ত্রীদের পালা সমানভাবে নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। যার ফলে তিনি মৃত্যু শয্যায় অন্যান্য স্ত্রীগণ থেকে অনুমতি নিয়ে অসুস্থাবস্থার (পবিত্র জীবনের শেষ) দিনগুলি আয়েশা (রাঃ) -এর নিকট অতিবাহিত করেছিলেন। 'أَنْ تَقَرَّ اَعْيُنُهُنَّ' (ওদের চক্ষু শীতল হবে) এ কথা নবী (সাঃ)-এর উক্ত আমলের সাথে সম্পৃক্ত যে, নবী (সাঃ)-এর জন্য পালা ভাগ করা যদিও অন্যান্য মানুষের মত আবশ্যিক ছিল না, তবুও তিনি পালা ভাগ করাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। যাতে নবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণের চক্ষু শীতল থাকে এবং তাঁর সদ্ব্যবহারে এবং সমতা ও ইনসাফে সন্তুষ্ট হয়ে যান। এই কারণে তিনি নিজের বিশেষত্বকে ব্যবহার না করে তাঁদের মন জয় করাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
[৪] অর্থাৎ, তোমাদের হৃদয়ে যে গুপ্ত প্রেম আছে তা আল্লাহ জানেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মনে সকল স্ত্রীর মহববত এক রকম হয় না। কারণ মন মানুষের ইচ্ছার উপর থাকে না। যার ফলে স্ত্রীদের মাঝে পালা, খরচ-খরচা ও জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে সমতা বজায় রাখা আবশ্যিক, যাতে মানুষ ইনসাফ করতে সচেষ্ট হতে পারে। কিন্তু হৃদয়স্থ ভালোবাসার সমতা বজায় রাখা যেহেতু মানুষের ইচ্ছা ও সাধ্যের বাইরে, তাই আল্লাহ তাআলা তা ধরবেন না। তবে আন্তরিক ভালবাসা যেন কোন একজন স্ত্রীর সাথে বিশেষ ভাল ব্যবহারের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে তিনি ইনসাফের সাথে পালা নির্ধারণ করে বলতেন, "হে আল্লাহ! আমি পালা ভাগ করার মালিক, পালা ভাগ করলাম। কিন্তু আমি যার মালিক নই; বরং তুমি যার মালিক তার ব্যাপারে তুমি আমাকে দোষ দিয়ো না।" (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ আহমাদ ৬/১৪৪) (অর্থাৎ হৃদয় ও তার প্রেম ভাগ করার ক্ষমতা আমার নেই। হৃদয়ের মালিক তো তুমি। কারো প্রতি হৃদয়ের আকর্ষণ বেশী থাকলে তার জন্য আমি দায়ী নই।)
আল-আহযাব 33:52
এরপর তোমার জন্য কোন নারী বৈধ নয় এবং তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয়; যদিও ওদের রূপ-সৌন্দর্য তোমাকে মোহিত করে।[১] তবে তোমার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপারে এ বিধান প্রযোজ্য নয়।[২] আল্লাহ সমস্ত কিছুর উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।
[১] এখতিয়ারের আয়াত নাযিল হওয়ার পর নবী পত্নীগণ দুনিয়ার আয়েশ-আরামের সামগ্রীর পরিবর্তে সানন্দ চিত্তে নবী (সাঃ)-এর সাথে বসবাস করাকে পছন্দ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার বদলা এই দিলেন যে, নবী (সাঃ)-কে সেই স্ত্রীগণ ছাড়া (সে সময় তাঁরা নয় জন ছিলেন) অন্য কোন মহিলাকে বিবাহ করা বা তাঁদের কাউকে তালাক দিয়ে তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে বিবাহ করতে নিষেধ করে দিলেন। অনেকে বলেন, পরে নবী (সাঃ)-কে তার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি আর কোন বিবাহ করেননি। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, ক্রীতদাসী রাখার ব্যাপারে কোন বাধা নেই। অনেকে আয়াতের ব্যাপক নির্দেশ থেকে দলীল নিয়ে বলেন যে, নবী (সাঃ)-কে কাফের ক্রীতদাসী রাখারও অনুমতি দেওয়া ছিল। আবার অনেকে (ولاَ تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ) "তোমরা অবিশ্বাসী নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না" (মুমতাহিনা ১০) আয়াতের ভিত্তিতে বলেন, নবী (সাঃ)-এর জন্য কাফের ক্রীতদাসী হালাল ছিল না। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আল-আহযাব 33:53
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের অনুমতি না দেওয়া হলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্য নবী-গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদেরকে আহবান করা হলে তোমরা প্রবেশ কর এবং ভোজন-শেষে তোমরা চলে যাও; তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। কারণ এ নবীর জন্য কষ্টদায়ক; সে তোমাদেরকে উঠে যাবার জন্য বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না।[১] তোমরা তার পত্নীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও।[২] এ বিধান তোমাদের এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।[৩] তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেওয়া[৪] অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদেরকে বিবাহ করা কখনও সংগত নয়। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে এ ঘোরতর অপরাধ। [৫]
[১] এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, নবী (সাঃ) যয়নাবের ওলীমাতে সাহাবায়ে কিরামগণকে দাওয়াত করেছিলেন। খাওয়ার পরেও কিছু লোক সেখানেই বসে আপোসে কথাবার্তায় লিপ্ত ছিল। যাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিশেষ কষ্ট অনুভব হচ্ছিল। তিনি লজ্জা-সংকোচবশতঃ তাদেরকে চলে যাওয়ার জন্য কিছুই বলতে পারেননি। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহযাব) এই আয়াতে দাওয়াতের কিছু রীতি-নীতি বর্ণনা করা হয়েছে; প্রথম রীতি এই যে, আহার্য প্রস্তুত হওয়ার পর দাওয়াতে যাবে, সময়ের পূর্বে উপস্থিত হয়ে ধরনা দিয়ে বসে থাকবে না। দ্বিতীয় রীতি এই যে, খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র নিজ নিজ গৃহে ফিরে যাবে। সেখানে বসে বসে পরস্পর কথাবার্তা বলতে থাকবে না। খাওয়ার উল্লেখ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে করা হয়েছে। নচেৎ আসল উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদেরকে যখনই ডাকা হবে -- খাওয়ার জন্য হোক বা অন্য কোন কাজের জন্য -- অনুমতি ছাড়া গৃহে প্রবেশ করবে না।[২] এই বিধান উমার (রাঃ)-এর বাসনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার নিকট সৎ-অসৎ হরেক রকমের লোক আসা যাওয়া করে, আপনি আপনার পত্নীগণকে পর্দা করার আদেশ দিলে খুবই ভাল হত। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা এই পর্দার হুকুম নাযিল করেন।(বুখারীঃ কিতাবুস স্বালাহ ও তাফসীর সুরা বাক্বারাহ, মুসলিমঃ বাবু ফাযায়েলে ওমর বিন খাত্তাব)[৩] পর্দা বিধিবদ্ধ হওয়ার হিকমত, যুক্তি ও কারণ এই যে, তার মাধ্যমে পুরুষ ও নারী উভয়েই আন্তরিক কুবাসনা থেকে এবং একে অপরের দ্বারা ফিতনাতে পড়া থেকে পবিত্র থাকবে ও রক্ষা পাবে।[৪] তা যে কোন প্রকারে হতে পারে। নবী (সাঃ)-এর গৃহে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা, তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তাঁর ঘরে বসে থাকা এবং পর্দা ছাড়া সরাসরি পবিত্র নবী-পত্নীগণের সঙ্গে কথা বলা, এ সকল কর্মও তাঁর কষ্টের কারণ। তাই এ সব থেকে দূরে থাকবে।[৫] এই নির্দেশ ঐ সকল পবিত্র নবী-পত্নীগণের জন্য যাঁরা নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর বিবাহ বন্ধনে ছিলেন। পক্ষান্তরে নবী (সাঃ) যে স্ত্রীকে সঙ্গমের পর তালাক দিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন, তিনি এই সাধারণ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না? উক্ত বিষয়ে দ্বিমত আছে। অনেকে তাঁকেও আদেশের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। আবার অনেকে অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না। কিন্তু নবী (সাঃ)-এর এই রকম কোন স্ত্রীই ছিলেন না। অতএব এটা একটা শুধু কল্পিত মাসআলা মাত্র। পক্ষান্তরে ঐ সকল নারীদের এক তৃতীয় শ্রেণী; যাদের সাথে নবী (সাঃ)-এর বিবাহ হয়েছিল; কিন্তু সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিয়ে দিয়েছেন, তাদেরকে অন্য লোক বিবাহ করতে পারে -- এতে কোন মতভেদ নেই। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
আল-আহযাব 33:54
তোমরা কোন বিষয় প্রকাশই কর অথবা গোপনই রাখ --আল্লাহ অবশ্যই সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
আল-আহযাব 33:55
নবী-পত্নীদের জন্য তাদের পিতৃগণ, পুত্রগণ, ভ্রাতৃগণ, ভ্রাতুষ্পুত্রগণ, ভগিনীপুত্রগণ, (বিশ্বাসী) নারীগণ এবং তাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসিগণের ব্যাপারে এ (পর্দা) পালন না করা অপরাধ নয়।[১] (হে নবীপত্নীগণ!) তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করেন।[২]
[১] যখন নারীদের পর্দার আয়াত নাযিল হল, তখন গৃহে থাকা আত্মীয় বা যে সকল আত্মীয়রা সর্বদা গৃহে আসা-যাওয়া করে, তাদের বিষয়ে প্রশ্ন হল যে, তাদের থেকে পর্দা করতে হবে কি না? সুতরাং এই আয়াতে সেই সকল আত্মীয়ের কথা উল্লেখ করে দেওয়া হল, যাদের থেকে পর্দা করা জরুরী নয়। এ মাসআলার বিস্তারিত আলোচনা সূরা নূরের ২৪:৩১ নং (وَلاَ يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ)আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে তা দ্রষ্টব্য।[২] এই স্থানে নারীদেরকে আল্লাহভীতির আদেশ দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যদি তোমাদের অন্তরে আল্লাহভীতি থাকে, তবে পর্দার যে আসল উদ্দেশ্য, (অন্তর ও চক্ষুর পবিত্রতা এবং ইজ্জতের হিফাযত) তা অবশ্যই সাধন হবে। এ ছাড়া শুধু বাহ্যিক পর্দা (যেমন লোক প্রদর্শনী পর্দা, সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে, কাউকে ভয় বা লজ্জা করে, ফ্যাশন মনে করে, পরিবেশ ও পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে পর্দা) তোমাদেরকে পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে না। (যেহেতুঃ সংযমশীলতার লেবাসই সর্বোৎকৃষ্ট। - আ'রাফ ৭:২৬ )
আল-আহযাব 33:56
নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফিরিশতাগণও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর। (দরূদ ও সালাম পেশ কর।) [১]
[১] এই আয়াতে নবী (সাঃ)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা আসমানে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ফিরিশতাগণের নিকট বিদ্যমান। তা এই যে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাগণের নিকট নবী (সাঃ)-এর সুনাম ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণও নবী (সাঃ) এর উচ্চমর্যাদার জন্য দু'আ করেন। তার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীদেরকেও আদেশ করেছেন, যেন তারাও নবী (সাঃ)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করে। যাতে নবী (সাঃ)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন দুই বিশ্ব একত্রিত হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, সাহাবায়ে কিরামগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যু' পড়ি) কিন্তু আমরা দরূদ কিভাবে পড়ব? এর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী -- যা নামাযে পাঠ করা হয় তা বর্ণনা করলেন। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহ্যাব) এ ছাড়া হাদীসে দরূদের আরো অন্য শব্দ বর্ণিত হয়েছে, সেগুলিও পাঠ করা চলবে। সংক্ষেপে (صَلَّى اللهُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ وَسَلَّم) পাঠ করা যাবে। পক্ষান্তরে (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠ করা এই জন্য ঠিক নয় যে, এতে নবী (সাঃ)-কে সরাসরি সম্বোধন করা হয় এবং এই শব্দগুচ্ছ সাধারণ দরূদে নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়নি। আর যেহেতু তাশাহহুদে 'اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّ' শব্দ নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে সেহেতু (তাশাহহুদে তা পাঠ করাতে কোন দোষ নেই। তা ছাড়া (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠকারী এই বাতিল বিশ্বাস নিয়ে পাঠ করে যে, নবী (সাঃ) তা সরাসরি শ্রবণ করেন। এই বাতিল বিশ্বাস কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী। সুতরাং এই আকীদা নিয়েও নিজেদের মনগড়া দরূদ পাঠ করা ঠিক নয়। অনুরূপ আযানের পূর্বে তা পাঠ করাও বিদআত, যাতে সওয়াব নয়; বরং গুনাহ হয়। হাদীসে দরূদের বড় গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। নামাযে তা পাঠ করা ওয়াজেব না সুন্নত? অধিকাংশ উলামাগণ বলেছেন সুন্নত এবং ইমাম শাফেয়ী ও আরো অনেকে তা ওয়াজেব বলেছেন। তবে একাধিক হাদীসে তার ওয়াজেব হওয়ারই সমর্থন পাওয়া যায়। অনুরূপ হাদীস দ্বারা এটাও বোঝা যায় যে, যেমন শেষ তাশাহহুদে দরূদ পড়া ওয়াজেব তেমনই প্রথম তাশাহহুদেও দরূদ পাঠ করা ওয়াজেব।নিম্নে তার কতিপয় দলীল দেওয়া হলঃ-প্রথম প্রমাণ এই যে, মুসনাদে আহমাদে সহীহ সানাদে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যু' পড়ি) কিন্তু আমরা নামাযে দরূদ কিভাবে পড়ব? এর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী শিক্ষা দিলেন (আল ফাতহুর রাববানী ৪/২০-২১)মুসনাদে আহমাদ ছাড়াও উক্ত হাদীস সহীহ ইবনে হিববান, সুনানে কুবরা বায়হাকী, মুস্তাদরাক হাকেম এবং ইবনে খুযায়মাতে বর্ণিত হয়েছে। এতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, যেমন তাশাহহুদে সালাম পড়া হয় অনুরূপ উক্ত প্রশ্নও নামাযের ভিতরে দরূদ পাঠ সম্পর্কে ছিল, উত্তরে নবী (সাঃ) দরূদে ইবরাহিমী পড়ার আদেশ দিয়েছিলেন। যাতে বোঝা যাচ্ছে যে, সালামের সাথে দরূদও পড়া দরকার এবং তা পড়ার স্থান হল তাশাহহুদ। আর হাদীসে তা সাধারণভাবে বর্ণনা হয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় তাশাহহুদের সাথে নির্দিষ্ট করা হয়নি। যার ফলে বলা যায় যে, প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় তাশাহহুদেই সালাম ও দরূদ পড়তে হবে।যে বর্ণনাগুলিতে প্রথম তাশাহহুদ দরূদ ছাড়া উল্লেখ হয়েছে সেগুলিকে সূরা আহযাবের আয়াত 'صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا' অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের ধরা হবে। কিন্তু উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর অর্থাৎ পঞ্চম হিজরীর পর যখন নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কিরামগণের প্রশ্নের উত্তরে দরূদের শব্দও বর্ণনা করে দিলেন, তখন নামাযে সালামের সাথে দরূদ পড়াও জরুরী হয়ে গেল, চাহে তা প্রথম তাশাহহুদ হোক বা দ্বিতীয়।আরো একটি প্রমাণ হল, আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, "নবী (সাঃ) কখনো কখনো রাত্রে নয় রাকআত নামায পড়তেন, আট রাকআতে যখন তাশাহহুদে বসতেন, তখন তাতে তাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন তারপর সালাম না ফিরে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নয় রাকআত পূর্ণ করে পুনরায় তাশাহহুদে বসতেন, তাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন এবং পুনরায় দু'আ করতেন, তারপর সালাম ফিরতেন। (বায়হাকী ২/৭০৪, নাসাঈ ১/২০২, বিস্তারিত দেখুনঃ আল্লামা আলবানীর সিফাতু সালাতিন্নাবী ১৪৫ পৃষ্ঠা) উক্ত বর্ণনায় পরিষ্কার উল্লেখ আছে যে, নবী (সাঃ) তাঁর রাত্রের নামাযে প্রথম ও শেষ উভয় তাশাহহুদে দরূদ পড়েছেন। এটা যদিও নফল নামাযের কথা ছিল; তবুও নবী (সাঃ)-এর উক্ত আমল দ্বারা উল্লিখিত ব্যাপক দলীলসমূহের সমর্থন হয়। যার ফলে তা শুধু নফল নামাযের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়।
আল-আহযাব 33:57
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তো তাদেরকে ইহলোকে ও পরলোকে অভিশপ্ত করেন এবং তিনি তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। [১]
[১] আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেওয়ার অর্থ হল ঐ সকল কাজ করা, যা তিনি অপছন্দ করেন। তাছাড়া আল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা কে রাখে? যেমন মুশরিক, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে। অথবা যেমন হাদীসে কুদসীতে আছে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়, তারা যুগকে গালি দেয়, অথচ আমিই যুগ। দিবারাত্রির আবর্তন আমিই করে থাকি।" (বুখারী, মুসলিম) সুতরাং 'যুগ বড় খারাপ, টেরা রাশিচক্র' ইত্যাদি অনুরূপ কোন কথা বলা ঠিক নয়। কারণ প্রাকৃতিক কর্ম আল্লাহর হাতে, কোন যুগ বা রাশিচক্রের নয়। আর আল্লাহর রসূল (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়ার অর্থ হল, তাঁকে মিথ্যা মনে করা, তাঁকে কবি, মিথ্যুক, যাদুগর ইত্যাদি বলা। এ ছাড়া হাদীসে সাহাবায়ে কিরামগণকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁদের অমর্যাদা করা ও তুচ্ছ ভাবাকেও নবী (সাঃ) নিজের জন্য কষ্ট দেওয়া বলেছেন। অভিশপ্তের অর্থ, আল্লাহর রহমত থেকে দূরীভূত ও বঞ্চিত হওয়া।
আল-আহযাব 33:58
যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।[১]
[১] অর্থাৎ তাঁদের বদনাম করার জন্য তাঁদের উপর অপবাদ দেওয়া, অবৈধ ভাবে তাঁদের অমর্যাদা ও তাচ্ছিল্য করা, যেমন রাফেযা (শিয়া)রা সাহাবায়ে-কিরামগণকে গালি দেয় এবং তাঁদের সাথে এমন কিছু কথা ও কর্ম সম্পৃক্ত করে, যা তাঁরা আদৌও বলেননি বা করেননি। ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন, 'রাফেযারা হল উল্টা অন্তরের; এরা প্রশংসিত মানুষের বদনাম করে, আর বদ লোকের প্রশংসা করে।"
আল-আহযাব 33:59
হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়।[১] এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।[২] আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] جَلاَبِيْبُ শব্দটি جِلْبَابٌএর বহুবচন। তা এমন বড় চাদরকে বলা হয়, যাতে পুরো শরীর ঢেকে যায়। নিজের উপর চাদর টেনে নেওয়ার অর্থ চেহারার উপর এমন ভাবে ঘোমটা নেওয়া যাতে চেহারার অধিকাংশ ঢেকে যায় এবং চক্ষু নিচু করে চলাতে রাস্তাও দেখা যায়। ভারত, পাকিস্তান বা অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে যে বিভিন্ন ধরনের বোরকা প্রচলিত, নবী (সাঃ)-এর যুগে এই ধরনের বোরকা প্রচলিত ছিল না। নবী (সাঃ) ও সাহাবায়ে-কিরাম (রাঃ) ও তাবেয়ীগণের সময়কালে যে আড়ম্বরহীনতা ছিল, পরবর্তী কালের মুসলিম সমাজে সেই আড়ম্বরহীনতা অবশিষ্ট থাকল না। সে যুগের মহিলারা অতি সাদাসিধা লেবাস পরিধান করত। তাদের মাঝে সাজসজ্জা করে বাইরে নিজ সৌন্দর্য প্রকাশ করার মন-মানসিকতা ছিল না। যার ফলে একটি বড় চাদরেই পর্দার আসল উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যেত। কিন্তু পরে উক্ত সাদাসিধা বেশভূষা আর থাকল না। বরং সৌন্দর্যময় (দৃষ্টি-আকর্ষী আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা) তার স্থান দখল করে নিল এবং মহিলাদের মাঝে নানা ফ্যাশন ও মডেলের লেবাস ও অলংকার ব্যাপক হয়ে গেল। যার ফলে চাদর দ্বারা সৌন্দর্য গোপন করে পর্দা করার কাজ বড় মুশকিল হয়ে পড়ল এবং সেই মুশকিল আসান করার মানসে বিভিন্ন রকমের বোরকা ব্যাপকভাবে চালু হয়ে পড়ল। যদিও তাতে অনেক সময় মহিলাদেরকে কষ্ট ভোগ করতে হয়; বিশেষ করে প্রচন্ড গ্রীষেমর সময়ে। কিন্তু এই সামান্য কষ্ট শরীয়তের দাবীর মোকাবেলায় কোন গুরুত্বই রাখে না। এর পরেও যে মহিলা বোরকার পরিবর্তে পর্দার জন্য বড় আকারের (সাদামাঠা) চাদর ব্যবহার করে পুরো শরীর ঢাকে এবং চেহারার উপর ঠিকভাবে ঘোমটা টেনে নেয় সে অবশ্য পর্দার আদেশ মেনে চলে। কারণ বোরকা এমন কোন জরুরী বস্তু নয়, যা পর্দার জন্য শরীয়ত জরুরী করেছে। কিন্তু বর্তমানে মহিলারা চাদরকে বেপর্দা হওয়ার একটা অসীলা বানিয়ে নিয়েছে। প্রথমে তারা বোরকার স্থানে চাদর ঢাকা নেওয়া আরম্ভ করে, পরে সেই চাদরও থাকে না, শুধু ওড়না থেকে যায়। আবার অনেক মহিলার জন্য ওড়না ব্যবহার করাও দুষ্কর মনে হয়। (অনেকে তা থাক করে বুকে-কাঁধে চাপিয়ে রাখে। অনেকে তা জড়িয়েও গলা ও তার নিচের অংশ বের করে রাখে।) এই অবস্থা দেখে বলতে হয় যে, বর্তমানে বোরকা ব্যবহার করাই সঠিক। কারণ যখন থেকে বোরকার স্থান চাদরে দখল করেছে, তখন থেকে বেপর্দা আরো ব্যাপক হয়ে গেছে। বরং মহিলারা অর্ধনগ্ন থাকাকে (সভ্যতা, আধুনিকতা ও প্রগতি ভেবে তা নিয়ে) গর্ব করতে আরম্ভ করেছে! إنا لله وإنا إليه راجعون যাই হোক, এই আয়াতে নবী (সাঃ)-এর স্ত্রী, কন্যা এবং সাধারণ মু'মিন নারীদেরকে গৃহ থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পর্দার আদেশ উলামাদের নিজসব মনগড়া কিছু নয়; যেমন কিছু মানুষ বলে থাকে অথবা তার কোন গুরুত্বই দেয় না। বরং এটা আল্লাহর আদেশ যা কুরআন কারীমের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা প্রমাণিত। তা থেকে বিমুখ থাকা, তা অস্বীকার করা এবং বেপর্দার উপর অটল থাকা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। উক্ত আয়াতে দ্বিতীয় বিষয় এই জানা যায় যে, নবী (সাঃ)-এর মাত্র একটি কন্যা ছিলেন না; যেমন শিয়াদের বিশ্বাস। বরং নবী (সাঃ)-এর একের অধিক কন্যা ছিলেন; যেমন কুরআনের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আসলে তাঁর চার কন্যা ছিলেন; যেমন তারীখ, সীরাত (ইতিহাস) এবং হাদীস গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণিত।
[২] এটা পর্দার হিকমত, যৌক্তিকতা ও উপকারিতার বর্ণনা যে, তার দ্বারা একজন ভদ্র ও লজ্জাশীলা মহিলা এবং নির্লজ্জ ও অসতী মহিলার পরিচয় লাভ হয়। পর্দা করা দেখে বোঝা যাবে যে, এটা ভাল ঘরের মহিলা; যাকে টিপ্পনি কাটার ক্ষমতা কারোর হবে না। আর তার বিপরীত বেপর্দা মহিলা লম্পটদের চোখের তৃপ্তিকর খোরাক এবং কামুক যুবকদের যৌনবাসনার কেন্দ্রস্থল।
আল-আহযাব 33:60
মুনাফিক (কপটাচারি)গণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা নগরে গুজব রটনা করে[১] তারা বিরত না হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করব, এরপর তারা এ নগরীতে অল্প দিনই তোমার প্রতিবেশীরূপে থাকবে।
[১] মুসলমানদেরকে নিরুৎসাহ করার জন্য মুনাফিকরা বিভিন্ন গুজব রটাতো যে, অমুক এলাকায় মুসলমানরা পরাজিত হয়েছে বা বড় শক্র দল হামলা করার জন্য আসছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আল-আহযাব 33:61
অভিশপ্ত হয়ে; ওদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে। [১]
[১] এটা এ আদেশ নয় যে, তাদেরকে ধরে ধরে মেরে ফেলা হবে; বরং এটা বদ্দুআ যে, যদি তারা তাদের মুনাফিক্বী ও তার কীর্তিকলাপ থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাদের কঠিন শিক্ষামূলক পরিণতি হবে। অনেকে বলেন, এটা আদেশ। কিন্তু মুনাফিকরা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নিজেদের মুনাফিক্বী কর্ম থেকে বিরত হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে ঐ আদেশ কার্যকর করা হয়নি, যার আদেশ উক্ত আয়াতে দেওয়া হয়েছিল। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আল-আহযাব 33:62
পূর্বে যারা অতীত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটিই ছিল আল্লাহর বিধান। তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।
আল-আহযাব 33:63
লোকে তোমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বল, ‘এর জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে।’ আর তোমাকে কিসে জানাবে? সম্ভবতঃ কিয়ামত শীঘ্রই হয়ে যেতে পারে।
আল-আহযাব 33:64
আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছেন।
আল-আহযাব 33:65
যেখানে ওরা চিরকালের জন্য স্থায়ী হবে। ওরা কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
আল-আহযাব 33:66
যেদিন অগ্নিতে ওদের মুখমন্ডল উল্টেপাল্টে দগ্ধ করা হবে সেদিন ওরা বলবে, ‘হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রসূলকে মান্য করতাম!’
আল-আহযাব 33:67
তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় বড় লোক (বুযুর্গ)দের আনুগত্য করেছিলাম, সুতরাং ওরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। [১]
[১] অর্থাৎ আমরা তোমার পয়গম্বর ও দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদেরকে বর্জন করে নিজেদের নেতা, বুযুর্গ ও বড়দের কথা মত চলেছিলাম, কিন্তু আজ আমরা বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাদেরকে তোমার পয়গম্বর থেকে দূরে রেখে পথভ্রষ্ট করেছিল। বাপ-দাদাদের প্রথার অনুসরণ ও পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধানুকরণ আজও বহু মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণ। হায়! যদি মুসলিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে সেই মানুষের তৈরী পথ বর্জন করে কুরআন ও হাদীসের সরল পথ অবলম্বন করত, তাহলে তাদের কতই না মঙ্গল হত। কারণ পরিত্রাণ একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণে নিহিত আছে। বুযুর্গ ও বড়দের অন্ধানুকরণে অথবা বাপ-দাদার প্রাচীন পথ অবলম্বনে নয়।
আল-আহযাব 33:68
হে আমাদের প্রতিপালক! ওদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং মহা অভিসম্পাত কর।’
আল-আহযাব 33:69
হে বিশ্বাসীগণ! মূসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মত হয়ো না; ওরা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেছেন।[১] আর আল্লাহর নিকট সে মর্যাদাবান।
[১] এর ব্যাখ্যা হাদীসে এইভাবে এসেছে যে, মূসা (আঃ) অত্যন্ত লজ্জাশীল নবী ছিলেন, সুতরাং তিনি নিজের শরীর কখনো মানুষের সামনে খুলতেন না; বরং ঢেকে রাখতেন। বানী ইস্রাঈলরা বলতে আরম্ভ করল যে, সম্ভবতঃ মূসা (আঃ) এর শরীরে ধবলের দাগ অথবা ঐ ধরনের কোন খুঁত আছে, যার ফলে তিনি সব সময় পোষাক পরে তা ঢেকে রাখেন। এক দিন মুসা (আঃ) নির্জনে কাপড় খুলে পাথরের উপর রেখে একাকী গোসল করতে লাগলেন, (আল্লাহর আদেশে) পাথর তাঁর সেই কাপড় নিয়ে পালাতে লাগল। আর মূসা (আঃ) তার পিছন পিছন দৌড়তে লাগলেন। পরিশেষে বানী ইসরাঈলের এক সমাবেশে পৌঁছে গেলেন। তারা মূসা (আঃ)-কে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে তাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। মূসা (আঃ) একজন সুন্দর এবং সকল প্রকার দাগ ও ত্রুটিমুক্ত ছিলেন। এইভাবে আল্লাহ তাআলা মু'জিযা স্বরূপ পাথর দ্বারা তাঁকে সেই অপবাদ ও সন্দেহ থেকে নির্মল প্রমাণ করলেন, যা বানী ইস্রাঈলদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আরোপ করা হচ্ছিল। (বুখারীঃ কিতাবুল আম্বিয়া) মূসা (আঃ)-এর ঘটনা উল্লেখ করে মু'মিনগণকে বোঝানো হয়েছে যে, তোমরা আমার শেষ পয়গম্বর মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বানী ইস্রাঈলদের মত কষ্ট দিও না এবং তাঁর সম্পর্কে এমন কোন কথা বলো না, যা শুনে তাঁর মনে দুশ্চিন্তা ও কষ্ট হয়। যেমন এক সময় গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) মাল বন্টন করার সময় এক ব্যক্তি বলল যে, এ বন্টন ইনসাফের সাথে করা হয়নি। নবী (সাঃ) এই কথা শুনে এমন রাগান্বিত হলেন যে, তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, "মূসা (আঃ) এর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষণ হোক। তাঁকে এর থেকেও অধিক কষ্ট দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন। (বুখারী ঐ, মুসলিম কিতাবুয যাকাত)
আল-আহযাব 33:70
হে বিশ্বাসীগণ ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।[১]
[১] অর্থাৎ, এমন কথা বল, যাতে কোন টেরামি বা বক্রতা নেই, ধোঁকা ও ধাপ্পা নেই। سَدِيدٌ تَسْدِيْدُ السَّهَمِ থেকে গৃহীত। অর্থাৎ, যেমন তীরকে সোজা করা হয় যাতে সঠিক নিশানার উপর লাগে, অনুরূপ তোমাদের মুখ থেকে বের হওয়া কথা ও তোমাদের কাজ-কারবারও সোজা ও সরল হবে। সঠিকতা ও সত্যতা থেকে এক চুল বরাবর তা যেন বিচ্যুত না হয়।
আল-আহযাব 33:71
তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ক্রটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন।[১] আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।
[১] এটা আল্লাহ-ভীতি ও সরল-সঠিক কথা বলার সুফল যে, তোমাদের আমলের সংশোধন হবে এবং আরো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার মত কর্মের সুমতি দান করা হবে এবং কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গেলে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেবেন।
আল-আহযাব 33:72
নিশ্চয়ই আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত অর্পণ করতে চেয়েছিলাম। ওরা ভয়ে বহন করতে অস্বীকার করল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। [১] নিশ্চয় সে অতিশয় যালেম ও অতিশয় অজ্ঞ। [২]
[১] পূর্বে মহান আল্লাহ আনুগত্যকারীদের প্রাপ্য নেকী এবং অবাধ্যদের শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন, এখন শরয়ী আদেশ ও তার কঠিনতার কথা বর্ণনা করছেন। আমানত বলতে ঐ সকল শরয়ী আদেশ; ফরয ও ওয়াজেব কর্মসমূহকে বুঝানো হয়েছে, যা পালন করলে নেকী ও সওয়াব লাভ হয় এবং তা হতে বৈমুখ হলে বা তা অস্বীকার করলে শাস্তি ভোগ করতে হবে। যখন এই শরীয়তের গুরুভার আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার উপর পেশ করা হল, তখন তারা এর যথাযথ হক আদায় করার ব্যাপারে ভীত হয়ে গেল। কিন্তু যখন মানুষের উপর তা পেশ করা হল, তখন তারা আল্লাহর আমানতের (আনুগত্যের) নেকী ও ফযীলত (প্রতিদান ও মাহাত্ম্য) দেখে সেই কঠিন গুরুভার বহন করতে উদ্বুদ্ধ হয়ে গেল। শরয়ী আহ্কামকে 'আমানত' বলে এই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তা আদায় করা মানুষের উপর ঐ রকম ওয়াজেব যেমন আমানত আদায় করা ওয়াজেব। 'আমানত অর্পণ' করার অর্থ কি? আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালা কিভাবেই বা তার প্রত্যুত্তর দিল এবং মানুষ তা কোন্ সময়ে গ্রহণ বা বহন করল? এ সবের পূর্ণ বিবরণ না আমরা জানতে পারি আর না বর্ণনা করতে পারি। আমাদেরকে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল সৃষ্টির মাঝে বিশেষ অনুভব ও বুঝার শক্তি রেখেছেন; যদিও আমরা তার প্রকৃতত্ব সম্বন্ধে অবগত নই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের কথা বুঝার ক্ষমতা রাখেন। তিনি অবশ্যই সেই আমানতকে (কোন একভাবে) তাদের উপর পেশ করেছিলেন, যা গ্রহণ করতে তারা অস্বীকার করেছে। অবশ্য তারা বিদ্রোহী বা অবাধ্য হয়ে তা অস্বীকার করেনি; বরং তাদের মাঝে এই ভয় ছিল যে, যদি আমরা উক্ত আমানতের দাবী পূর্ণ করতে (সে আমানত যথার্থরূপে রক্ষা করতে) অক্ষম হই, তাহলে তার কঠিন শাস্তি আমাদেরকে ভোগ করতে হবে। মানুষ যেহেতু ত্বরাপ্রবণ, তাই তারা শাস্তির দিকটা না ভেবে প্রতিদান ও পুরস্কার লাভের লোভে উক্ত আমানত কবুল করে নিল।
[২] অর্থাৎ, এই গুরুভার বহন করে নিজের উপর যুলুম করেছে এবং তার দাবী পূরণে বৈমুখ হয়ে অথবা তার মান ও মূল্য সম্বন্ধে উদাসীন থেকে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।
আল-আহযাব 33:73
পরিণামে আল্লাহ কপট পুরুষ ও কপট নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদী নারীকে শাস্তি দেবেন এবং বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীর তওবা কবুল করবেন। [১] আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] এ বাক্যের সম্পর্ক 'বহন করল'-এর সাথে। অর্থাৎ, মানুষকে উক্ত আমানতের যিম্মেদার বানাবার উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মুনাফিক ও মুশরিকদের মুনাফিক্বী ও শিরক এবং মু'মিনদের ঈমান প্রকাশ হয়ে যায় এবং সেই অনুসারে তাদেরকে শাস্তি ও প্রতিদান দেওয়া যায়।
সাবা 34:1
প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্ত কিছুরই মালিক[১] এবং পরলোকেও সকল প্রশংসা তাঁরই।[২] তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্ববিষয়ে অবহিত।
[১] অর্থাৎ, তা তাঁরই মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তাতে তাঁরই ইচ্ছা ও ফায়সালা চলে। মানুষ যে সকল নিয়ামত পেয়েছে, তার সব কিছু তাঁরই সৃষ্টি এবং তা তাঁরই অনুগ্রহ। যার ফলে আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তুর প্রশংসা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহরই ঐ নিয়ামতের উপর প্রশংসা; যা তিনি তাঁর সৃষ্টিকে প্রদান করেছেন।[২] এ প্রশংসা কিয়ামতের দিন মু'মিন ব্যক্তিগণ করবে। যেমন, প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন.......। (সূরা যুমার ৩৯:৭৪ আয়াত) যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই; যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন। (সূরা আ'রাফ ৭:৪৩ আয়াত) সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর; যিনি আমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূরীভূত করেছেন। (সূরা ফাত্বির ৩৫:৩৪ আয়াত) ইত্যাদি। তার পরেও দুনিয়াতে আল্লাহর হামদ্ ও প্রশংসা করা এক প্রকার ইবাদত; যা পালন করতে মানুষকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর আখেরাতে (বেহেশ্তে) তা মু'মিনদের রূহের খোরাক হবে, যাতে তারা আনন্দ ও খুশী উপভোগ করবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
সাবা 34:2
তিনি জানেন যা ভূগর্ভে প্রবেশ করে,[১] যা তা থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ হতে অবতরণ করে[২] ও যা কিছু আকাশে উত্থিত হয়। [৩] তিনিই পরম দয়ালু, চরম ক্ষমাশীল।
[১] যেমন বৃষ্টি, প্রোথিত গুপ্তধন এবং খনিজ-সম্পদ ইত্যাদি।
[২] বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, মেঘগর্জন, বিদ্যুত ও আল্লাহর বরকত, ফিরিশতা এবং আসমানী কিতাব ইত্যাদি।
[৩] অর্থাৎ, ফিরিশতা এবং বান্দাদের আমল।
সাবা 34:3
অবিশ্বাসীরা বলে, ‘আমরা কিয়ামতের সম্মুখীন হব না।’ বল, ‘অবশ্যই তোমাদেরকে তার সম্মুখীন হতেই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ; যিনি অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার থেকে ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু তাঁর অগোচর নয়; [২] ওর প্রত্যেকটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। [৩]
[১] উক্ত বাক্যে মহান আল্লাহ শপথও করেছেন এবং তাকীদের শব্দও ব্যবহার করেছেন এবং তার উপর তাকীদের 'লাম' ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ কিয়ামত কেন সংঘটিত হবে না? তা যে কোন অবস্থায় অবশ্য-অবশ্যই সংঘটিত হবে।
[২] لاَيَعْزُبُ অদৃশ্য, গুপ্ত ও দূর নয়। অর্থাৎ, যখন আকাশ ও পৃথিবীর অণু পরিমাণ কিছু তাঁর দৃষ্টিতে অদৃশ্য ও অগোচর নয়, তখন তোমাদের শরীরের বিক্ষিপ্ত অংশ যা মাটিতে মিশে গেছে তা একত্রিত করে পুনরায় তোমাদেরকে জীবিত করা কেন সম্ভব হবে না?
[৩] অর্থাৎ, তা লাওহে মাহ্ফূযে সংরক্ষিত ও লিপিবদ্ধ আছে।
সাবা 34:4
এ এজন্য যে, যারা বিশ্বাসী ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন।[১] এদেরই জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা রয়েছে।’
[১] এটা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কারণ। অর্থাৎ, কিয়ামত এই জন্য সংঘটিত হবে এবং সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা এই জন্য পুনর্জীবিত করবেন, যাতে তিনি নেককার ব্যক্তিদেরকে তাঁদের নেকীর বদলা দেন। কারণ প্রতিদান দেওয়ার জন্যই তিনি উক্ত দিবস নির্ধারিত রেখেছেন। প্রতিদান দিবস না হওয়ার অর্থই হচ্ছে নেককার ও বদকার সকলেই সমান। আর এই রকম হওয়া অবশ্যই ন্যায় ও ইনসাফের পরিপন্থী। তাতে বান্দাদের -- বিশেষ করে নেক বান্দাদের -- প্রতি যুলুম করা হবে। অথচ আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কোন প্রকার যুলুম করেন না।
সাবা 34:5
যারা আমার বাক্যসমূহকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে[১] তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, আমার ঐ সকল আয়াতকে বাতিল ও মিথ্যা মনে করে, যা আমি আমার পয়গম্বরদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি। مُعَاجِزِيْنَ (ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে) এই ভেবে যে, আমি তাদেরকে পাকড়াও করতে অপারগ। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, মৃত্যুর পর যখন আমরা মাটিতে মিশে যাব, তখন কিভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে কারো সামনে আপন কর্মের জন্য আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে? তাদের এই মনোভাব এ কথারই ঘোষণা ছিল যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাকড়াও করতে সক্ষম নন! অতএব আমাদের কিয়ামতের আর ভয় কি?
সাবা 34:6
যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তারা সুনিশ্চিতভাবে জানে যে, তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা সত্য;[১] এবং তা মানুষকে পরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর পথ নির্দেশ করে। [২]
[১] এখানে يَرَى দেখার অর্থ হল অন্তর-চক্ষু দিয়ে দেখা; শুধু চোখের দেখা নয়। অর্থাৎ, 'ইলমে ইয়াকীন' দ্বারা সুনিশ্চিতরূপে জানে। 'যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে' বলে সাহাবায়ে-কিরামগণ অথবা আহলে কিতাবদের মু'মিন বা সকল মু'মিনদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মু'মিনগণ তা জানেন ও তার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন।
[২] এর সংযোগ 'সত্য' শব্দের সাথে। অর্থাৎ, তারা এটাও জানে যে, এই কুরআন কারীম ঐ পথের দিশা দেয়, যা সেই আল্লাহর পথ, যিনি সৃষ্টি জগতে সকলের উপর প্রতাপশালী এবং আপন সৃষ্টির মাঝে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। সে পথ হল তাওহীদের পথ, যে পথের দিকে সকল পয়গম্বরগণ নিজ নিজ সম্প্রদায়কে দাওয়াত দিয়েছিলেন।
সাবা 34:7
অবিশ্বাসীরা বলে,[১] ‘আমরা কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দেব[২] যে তোমাদেরকে খবর দেয় যে,[৩] তোমাদের দেহ সম্পূর্ণ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তোমরা নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবে? [৪]
[১] এটা মু'মিনদের মোকাবেলায় আখেরাত অস্বীকারকারীদের কথা, যা তারা নিজেদের মাঝে বলাবলি করত।
[২] উদ্দেশ্য মুহাম্মাদ (সাঃ), যিনি তাদের নিকট আল্লাহর নবী হয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন।
[৩] অর্থাৎ, অবিশ্বাস্য, আশ্চর্য ও অদ্ভুত খবর, বুঝে আসে না এমন খবর!
[৪] অর্থাৎ, মৃত্যুর পর যখন তোমরা মাটিতে মিশে ধূলিকণায় পরিণত হয়ে যাবে, তোমাদের দেহের কোন চিহ্নই থাকবে না, অথচ তোমাদেরকে কবর থেকে পুনরায় জীবিত করা হবে এবং পুনরায় পূর্বের আকার-আকৃতি তোমাদেরকে প্রদান করা হবে? এ সকল কথোপকথন তারা আপোসে ঠাট্টা-মজাক হিসাবে করত।
সাবা 34:8
সে কি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে অথবা সে উন্মাদ?’[১] বস্তুতঃ যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তারা শাস্তি এবং ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে। [২]
[১] অর্থাৎ, (তারা বলত,) দু'য়ের এক অবশ্যই হবে, হয় সে মিথ্যা বলছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী ও রিসালাতের দাবী করে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। অথবা তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে এবং পাগলামির জন্য ঐ সব কথা বলছে, যা জ্ঞানে ধরার মত নয়।
[২] আল্লাহ তাআলা বলেন, আসল ব্যাপার তা নয়, যা তারা ধারণা করে। বরং ঘটনা হচ্ছে যে, জ্ঞান করে দেখা ও প্রকৃত বুঝার ক্ষমতা থেকে এরাই বঞ্চিত, যার ফলস্বরূপ তারা পরকালকে বিশ্বাস করার পরিবর্তে তা অস্বীকার করে। যার পরিণাম হল পরকালের চিরস্থায়ী শাস্তি এবং তারা এখন এমন ভ্রষ্টতার শিকার, যা সত্য থেকে অনেক দূরে।
সাবা 34:9
ওরা কি ওদের সম্মুখে ও পশ্চাতে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে, তার প্রতি লক্ষ্য করে না?[১] আমি ইচ্ছা করলে ওদেরকে সহ ভূমি ধসিয়ে দেব অথবা ওদের ওপর আকাশ হতে (আযাবের) কোন অংশ পতিত করব।[২] আল্লাহ-অভিমুখী প্রতিটি দাসের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলেন যে, পরকালকে অস্বীকার আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করার ফল। তাছাড়া যে আল্লাহ বর্ণনাতীত উচ্চ ও প্রশস্ত আকাশের মত বস্তু এবং বিশাল লম্বা-চওড়া পৃথিবীর মত বস্তু সৃষ্টি করতে পারেন, সেই আল্লাহর জন্য তাঁরই সৃষ্টি করা বস্তুকে পুনরায় সৃষ্টি করা এবং তা পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা কি সম্ভব নয়?
[২] উক্ত আয়াতটি দুটি বিষয়ের বর্ণনা দিয়েছে; প্রথমতঃ আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার বর্ণনা, যা এক্ষুনি বর্ণিত হল। দ্বিতীয়তঃ কাফেরদের জন্য সতর্কতা ও ধমক এইভাবে যে, যে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন, উভয়ের উপরে ও মাঝে যা কিছু আছে তার সকল কিছুর উপর তাঁর ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ, তিনি যখন ইচ্ছা তাদের উপর আযাব প্রেরণ করে সকলকে ধ্বংস করতে পারেন। মাটি ধসিয়েও তিনি ধ্বংস করতে পারেন, যেমন কারূনকে ধসিয়ে ছিলেন অথবা আকাশ থেকে কিছু নিক্ষেপ করেও ধ্বংস করতে পারেন, যেমন আইকাবাসীকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
সাবা 34:10
নিশ্চয় আমি দাঊদকে আমার তরফ থেকে অনুগ্রহ প্রদান করেছিলাম।[১] হে পর্বতমালা! তোমরা দাঊদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং হে পক্ষীকুল তোমরাও।[২] আর লৌহকে তার জন্য নম্র করেছিলাম। [৩]
[১] অর্থাৎ নবুঅতের সাথে সাথে বাদশাহী এবং আরো কিছু বিশেষ মর্যাদা দান করেছিলেন।
[২] বিশেষ মর্যাদাসমূহের মধ্যে একটি মর্যাদা সুমধুর কণ্ঠস্বরের নিয়ামত ছিল। যখন তিনি আল্লাহর তসবীহ পাঠ করতেন, তখন তাঁর সাথে পাথরের পাহাড় তসবীহ পাঠে বিভোল হয়ে যেতো, পক্ষীকুল উড়া বন্ধ করে দিত এবং তসবীহর গুনগুন্ আওয়াজ আরম্ভ করত। أَوِّبِيْ এর অর্থ হল তসবীহ পাঠ কর। অর্থাৎ পাহাড় ও পাখিদেরকে আমি বলেছিলাম, সুতরাং এরাও দাঊদ (আঃ)-এর সাথে তসবীহ পাঠে রত হয়ে যেত। وَالطَّيْرَ শব্দটি يَاجِبَالُ এর স্থানের উপর আত্ব্ফ করা হয়েছে বলে শেষে যবর হয়েছে। কারণ جِبَالُ শব্দটিতে আনুমানিক যবরই আছে। মূলতঃ বাক্য এইভাবে হবে نَادَيْنَا الْجِبَالَ وَالطَّيْرَ (আমি পাহাড় ও পক্ষীদের ডাক দিয়ে বললাম,--)। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[৩] অর্থাৎ লোহাকে আগুন দিয়ে গলানো ও হাতুড়ি দিয়ে পিটানো ছাড়াই তা মোম, সানা আটা এবং ভেজা মাটির মত যেভাবে চাইতেন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ইচ্ছামত জিনিস-পত্র তৈরী করতেন।
সাবা 34:11
এবং তাকে বলেছিলাম, তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী কর,[১] ওগুলির কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত কর[২] এবং তোমরা সৎকাজ কর। [৩] তোমরা যা কিছু কর নিশ্চয় আমি তার সম্যক দ্রষ্টা।
[১] سَابِغَاتٍ এর বিশেষ্য ঊহ্য আছে دُرُوْعًا ساَبِغاَتٍ অর্থাৎ পূর্ণ মাপের লম্বা লৌহবর্ম, যা যোদ্ধার পূর্ণ শরীর ঠিকভাবে আবৃত করে এবং তাকে শত্রুর আঘাত থেকে বাঁচাতে পারে।
[২] (কড়াসমূহ যথাযথ সংযুক্ত কর) যাতে ছোট বড় না হয়ে যায়, অথবা টাইট বা ঢিলা না হয়ে যায়। অর্থাৎ কড়াসমূহ সংযুক্ত করতে তার খিলগুলি এমন পাতলা না হয়, যাতে জোড়গুলি নড়াসড়া করতেই থাকে এবং তাতে স্থিরতা না আসে। পরন্তু এমন মোটাও যেন না হয়, যাতে তা ভেঙ্গেই যায় অথবা তা জমে না যায় এবং তা পরাই সম্ভব না হয়। এখানে দাউদ (আঃ)-কে লৌহবর্ম তৈরী করার নিয়ম বলা হয়েছে।
[৩] অর্থাৎ সেই নিয়ামতের বদলে নেক আমল কর, যাতে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হয়। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা যাকে পার্থিব নিয়ামত দান করেছেন তাকে সেই নিয়ামত হিসাবে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দরকার। আর আসল কৃতজ্ঞতা হল, অনুগ্রহকারীকে সন্তুষ্ট করার পূর্ণ চেষ্টা রাখা। অর্থাৎ তাঁর আনুগত্য করা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।
সাবা 34:12
আমি বাতাসকে সুলাইমানের অধীন করেছিলাম, তার সকালের ভ্রমণ একমাসের পথ ছিল এবং সন্ধ্যার ভ্রমণও এক মাসের পথ ছিল।[১] আমি তার জন্য গলিত তামার এক ঝরনা প্রবাহিত করেছিলাম। [২] আল্লাহর অনুমতিক্রমে কিছু সংখ্যক জ্বিন তার সম্মুখে কাজ করত। ওদের মধ্যে যারা আমার নির্দেশ অমান্য করে তাদেরকে আমি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি আস্বাদন করাব। [৩]
[১] অর্থাৎ সুলাইমান (আঃ) সভাসদ ও সৈন্যসহ তক্তায় বসে যেতেন। বাতাস তাঁর আজ্ঞাধীন হয়ে তিনি যেখানে আদেশ করতেন সেখানে তাঁকে এমন গতিতে নিয়ে যেত যে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক মাসের পথ অতিক্রম হয়ে যেত এবং অনুরূপ দুপুর থেকে রাত্রি পর্যন্ত এক মাসের পথ অতিক্রম হয়ে যেত। এইভাবে এক দিনে দুই মাসের পথ অতিক্রম হয়ে যেত।
[২] অর্থাৎ যেমন দাঊদ (আঃ)-এর জন্য লোহা নরম করে দেওয়া হয়েছিল, অনুরূপ সুলাইমান (আঃ)-এর জন্য আমি তামার ঝরনা প্রবাহিত করে দিয়েছিলাম যাতে তামা পদার্থ দ্বারা সে অনায়াসে ইচ্ছামত পাত্র ইত্যাদি বানাতে পারে।
[৩] অধিকাংশ তফসীরবিদের মতে এ শাস্তি কিয়ামতের দিন দেওয়া হবে। কিন্তু কেউ কেউ বলেন, এ শাস্তি হল দুনিয়ার শাস্তি। তাঁরা বলেন, দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর একজন ফিরিশতা নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর হাতে আগুনের চাবুক থাকত। যে জ্বিন সুলাইমান (আঃ)-এর আদেশ অমান্য করত, তাকে ফিরিশতা চাবুক মারতেন; যাতে সে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। (ফাতহুল ক্বাদীর)
সাবা 34:13
ওরা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, প্রতিমা, হওয-সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির ওপর স্থাপিত বৃহদাকার ডেগ নির্মাণ করত।[১] (আমি বলেছিলাম,) ‘হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করতে থাক। আমার দাসদের মধ্যে কৃতজ্ঞ অতি অল্পই।’
[১] مَحَارِيْبَ শব্দটি مِحْرَابٌ এর বহুবচন। অর্থ হল উঁচু জায়গা অথবা সুন্দর অট্টালিকা, উদ্দেশ্য উঁচু উঁচু অট্টালিকা, বিশাল বিশাল বাসভবন বা মসজিদ ও উপাসনালয়। تَمَاثِيْلَ শব্দটি تِمْثاَلٌ এর বহুবচন। অর্থঃ প্রতিমা, মূর্তি। এ মূর্তি অপ্রাণীর হত। অনেকে বলেন, পূর্ববর্তী আম্বিয়া ও নেক লোকেদের মূর্তি মসজিদে নির্মাণ করা হত, যাতে তা দেখে মানুষ (আল্লাহর) ইবাদত করে। তবে এ অর্থ ঐ সময় নেওয়া সঠিক হবে, যখন এটা মেনে নেওয়া যাবে যে, সুলাইমান (আঃ)-এর শরীয়তে মূর্তি নির্মাণ বৈধ ছিল। আর এ কথা সঠিক নয়। পক্ষান্তরে ইসলাম মূর্তি নির্মাণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছে। جِفَانٌ শব্দটি جَفْنَةٌ এর বহুবচন অর্থঃ বিরাট পাত্র, جَواَبٍ শব্দটি جَابِيَةٌ এর বহুবচন ,অর্থঃ হওয, ছোট চৌবাচ্চা, যাতে পানি জমা রাখা হয়। অর্থাৎ চৌবাচ্চার মত বড় বড় পাত্র قُدُوْرٌ ডেগ, رَاسِيَاتٌ অর্থ স্বস্থানে স্থাপিত। বলা হয় যে, এই সকল ডেগ পাথর খোদাই করে নির্মাণ করা হত, যা স্থানান্তর করার যোগ্য ছিল না। যাতে এক সাথে এক হাজার মানুষের খাবার রান্না হত। আর এ সকল কাজ জ্বিনরা করত।
সাবা 34:14
যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন উই পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু বিষয় জানাল; যা সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান মাটিতে পড়ে গেল, তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, ওরা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত, তাহলে ওরা এতকাল লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। [১]
[১] সুলাইমান (আঃ)-এর সময়ে জ্বিনদের বিষয়ে এই খবর প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, জ্বিনরা গায়বের খবর জানে, আল্লাহ তাআলা সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যু দ্বারা সেই আকীদার ভ্রষ্টতা পরিষ্কার করে দিলেন।
সাবা 34:15
সাবা’বাসীদের জন্য ওদের বাসভূমিতে এক নিদর্শন ছিল;[১] দু’টি বাগানঃ একটি ছিল ডান দিকে, অপরটি ছিল বাম দিকে;[২] ওদেরকে বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেওয়া রুযী ভোগ কর[৩] এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।[৪] এ শহর উত্তম[৫] এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল।’ [৬]
[১] سَبَأٍ (সাবা') এক জাতি ছিল, যার রানী সাবা' নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। যিনি সুলাইমান (আঃ)-এর সময় (তাঁরই হাতে) মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। জাতির নামে দেশের নামও সাবা' ছিল। বর্তমানে সে দেশ ইয়ামান নামে প্রসিদ্ধ। উক্ত দেশ বড় সুখী দেশ ছিল। স্থল ও জলপথের বাণিজ্যের জন্যও উত্তম ছিল এবং চাষ-বাস ও ফল-ফসল ইত্যাদিতেও বড় ভাল ছিল। আর বাণিজ্য ও চাষাবাদ উভয়ের উৎকর্ষই যে কোন দেশ ও জাতির সুখের কারণ হয়। এখানে সেই ধন-দৌলতের আতিশয্যকে আল্লাহর বিশাল ক্ষমতার একটি নিদর্শন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
[২] বলা হয়েছে যে, তাদের শহরের দুই দিকে পর্বত ছিল, সেখান থেকে ঝরনা ও নালা বেয়ে পানি শহরে প্রবেশ করত। তাদের শাসকগণ পর্বতের মাঝে বাঁধ নির্মাণ করে দিয়েছিল এবং তার সাথে বহু বাগান লাগিয়ে দিয়েছিল, যাতে নির্দিষ্টভাবে পানি যাওয়ার রাস্তা হয়ে গিয়েছিল এবং বাগানে পানি পৌঁছতে সহজ ও সুবিধা হয়ে গিয়েছিল। সেই বাগানগুলিকে ডানে ও বামে দুটি বাগান বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকে বলেন, جَنَّتَيْنِ এর অর্থ দুটি বাগান নয়; বরং উদ্দেশ্য হল ডান ও বাম পার্শ্ব। আর এ থেকে উদ্দেশ্য এত বাগান যে, যেদিকেই নজর যায় সেদিকেই সবুজ-শ্যামল বাগান আর বাগানই চোখে পড়ে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[৩] এই আদেশ তাদের পয়গম্বরের দ্বারা করা হয়েছিল অথবা উদ্দেশ্য সেই সকল নিয়ামতের বর্ণনা, যা তাদেরকে প্রদান করা হয়েছিল।
[৪] অর্থাৎ, সেই দাতা ও অনুগ্রহকারীর আনুগত্য কর এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাক।
[৫] অর্থাৎ, বাগানসমূহের আধিক্য ও পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূলের কারণে উক্ত শহর উৎকৃষ্ট ছিল। বলা হয় যে, সুন্দর আবহাওয়ার কারণে সেই শহর মশা, মাছি ও অনুরূপ অন্যান্য কষ্টদায়ক জীবজন্তু থেকেও মুক্ত ছিল। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
[৬] অর্থাৎ, যদি তোমরা প্রতিপালকের কৃতজ্ঞতা বর্ণনা করতে থাক, তবে তিনি তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এর অর্থ এও হল যে, যদি মানুষ তওবা করতে থাকে, তাহলে পাপাচরণ ব্যাপক ধ্বংস ও অনুগ্রহ ছিনিয়ে নেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না; বরং আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেবেন।
সাবা 34:16
পরে ওরা আদেশ অমান্য করল। ফলে আমি ওদের ওপর বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং ওদের বাগান দু’টিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দু’টি বাগানে, যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। [১]
[১] অর্থাৎ, তারা পাহাড়ের মাঝে বাঁধ তৈরী করে পানি আটকে রাখার যে ব্যবস্থা করেছিল এবং তা চাষাবাদ ও বাগান সেচ করার কাজে লাগাত, আমি কঠিন বাঁধভাঙ্গা বন্যার দ্বারা সেই বাঁধকে ভেঙ্গে ফেললাম এবং সবুজ ও ফলদার বাগানকে এমন বাগানে পরিবর্তন করে দিলাম যাতে শুধু প্রাকৃতিক ঝাড় জঙ্গল থাকে। যাতে প্রথমতঃ কোন ফল হয় না। আর যদি কোন গাছে হয়, তবে তা তেতো, কষা ও এমন বদমজাদার যা কেউ খেতেই পারবে না। তবে কিছু কুল (বা বরই) গাছ ছিল তাতেও অধিক কাঁটা, আর কুল সামান্যই ছিল। عَرِمٌ -عَرِمَةٌ -এর বহুবচন অর্থ বাঁধ। অর্থাৎ, এমন জোরে পানির স্রোত পাঠালাম যা সেই বাঁধ ভেঙ্গে ফেলল এবং পানি শহরেও প্রবেশ করে গেল। যাতে তাদের ঘর-বাড়ী ডুবে গেল এবং গাছপালা উজাড় করে পতিত জমিতে পরিণত করে দিল। উক্ত বাঁধ সাদ্দু মা'রিব নামে প্রসিদ্ধ।
সাবা 34:17
আমি ওদেরকে এ শাস্তি দিয়েছিলাম ওদের সত্য অকৃতজ্ঞতা (বা অস্বীকারের) জন্য। আর আমি অকৃতজ্ঞ (বা অস্বীকারকারী)কেই শাস্তি দিয়ে থাকি।
সাবা 34:18
ওদের এবং যে সব জনপদে আমি প্রাচুর্য দান করেছিলাম[১] সেগুলির অন্তর্বর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম[২] এবং ঐ সকল জনপদে ভ্রমণকালে বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবধানে বিশ্রামস্থান নির্ধারিত করেছিলাম এবং ওদেরকে বলেছিলাম, ‘তোমরা এ সব জনপদে রাত-দিন নিরাপদে ভ্রমণ কর।’ [৩]
[১] 'যে সব জনপদে আমি প্রাচুর্য দান করেছিলাম' বলে বরকতময় শাম দেশের জনপদকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আমি সাবা' (ইয়ামান) ও শামের মাঝে পথের ধারে ধারে বহু জনবসতি আবাদ করে রেখেছিলাম। অনেকে ظاهرة শব্দটির অর্থ মিলিত করেছেন। অর্থাৎ, এক অপরের সাথে মিলিত ও সংযুক্ত। তাফসীরবিদগণ সেই জনবসতির সংখ্যা চার হাজার সাত শত বলেছেন। এটাই তাদের ব্যবসার প্রধান রাস্তা ছিল, যার সংলগ্নে সাবা' থেকে শাম পর্যন্ত কাছাকাছি জনবসতি প্রতিষ্ঠিত ছিল। যার ফলে প্রথমতঃ তাদের পানাহার ও আরাম করার জন্য পাথেয় সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন হত না। দ্বিতীয়তঃ জনশূন্য হওয়ার ফলে পথে যে চুরি-ডাকাতি, লুট-মার ইত্যাদির আশঙ্কা থাকার কথা, তা ছিল না।
[২] অর্থাৎ, এক জনবসতি থেকে অপর জনবসতি নির্দিষ্ট ও পরিচিত দূরত্বে অবস্থিত ছিল এবং সেই হিসাবে তারা অতি সহজে নিজেদের সফর অতিক্রম করত। যেমন সকালে সফর আরম্ভ করলে ঠিক দুপুর পর্যন্ত কোন গ্রাম বা জনবসতি পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সেখানে খাবারের প্রয়োজন মিটিয়ে দুপুরের আরাম করত এবং পুনরায় সফর আরম্ভ করলে রাত্রি পর্যন্ত অন্য কোন জনপদে পৌঁছে যেত।
[৩] এটা সকল প্রকার ভীতি থেকে সুরক্ষা ও পাথেয়-সামগ্রী বহন করার ব্যাপারে অমুখাপেক্ষিতার বর্ণনা যে, রাত বা দিনের যে কোন সময়ে তোমরা সফর করতে চাও কর, না জান-মালের কোন ভয়, আর না সফরের জন্য সাথে কোন সামগ্রী নেওয়ার প্রয়োজন।
সাবা 34:19
কিন্তু ওরা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের বিশ্রামস্থান দূরে দূরে স্থাপন কর।’[১] এভাবে ওরা নিজেদের প্রতি যুলম করেছিল। ফলে আমি ওদেরকে কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম[২] এবং ওদেরকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিলাম।[৩] নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।
[১] অর্থাৎ, (ভ্রমণে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি বা বিপদ না এলে তাতে কোন মজা নেই --এই কথা স্মরণ করে তারা নিজেরাই প্রার্থনা করল যে,) যেমন মানুষ সফরের কষ্ট, সমস্যা এবং বিভিন্ন মৌসুমের নানা অসুবিধা ইত্যাদির বর্ণনা করে, অনুরূপ আমাদের জন্য ভ্রমণের দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যেন কাছাকাছি জনবসতি না হয়ে মাঝখানে জঙ্গল ও জনহীন প্রান্তর ও মরুভূমি বেয়ে আমাদেরকে পার হতে হয়, গ্রীষ্মের সময় রৌদ্রের কষ্ট এবং শীতের সময় বরফের ন্যায় ঠান্ডা হাওয়া আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তোলে এবং পথে ক্ষুৎ-পিপাসা ও মৌসুমের কঠিনতা থেকে বাঁচার জন্য আমাদেরকে পাথেয়-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে সাথে রাখতে হয়। তাদের এই দু'আ বানী-ইস্রাঈলের অনুরূপ ছিল, যারা কোন কষ্ট ও শ্রম ছাড়াই মান্ন্ ও সালওয়া (ইলাহী খানা) এবং আরো অন্যান্য সুবিধা ভোগ করত। কিন্তু তারা সে সবের পরিবর্তে ডাল ও সবজি তরকারি ইত্যাদি পাওয়ার জন্য দু'আ করেছিল! তাদের এই দু'আ মৌখিক ছিল অথবা তাদের অবস্থা এ কথা বলেছিল।
[২] অর্থাৎ, তাদেরকে (সাবা'বাসীকে) এমনভাবে সর্বস্বান্ত করলাম যে, দুনিয়াতে তাদের বাগান ধ্বংসের কাহিনী প্রসিদ্ধ রয়ে গেল এবং মজলিস ও মহফিলের বক্তব্যের বিষয়রূপে পরিগণিত হল।
[৩] অর্থাৎ, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম ও বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দিলাম। সুতরাং সাবাবাসীর প্রসিদ্ধ গোত্রগুলি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসবাস করতে লাগল, কেউ মদীনা কেউ মক্কা কেউ শাম এলাকায় ইত্যাদি ইত্যাদি।
সাবা 34:20
তাদের উপর ইবলীস তার অনুমান সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করল, ফলে ওদের মধ্যে একটি বিশ্বাসী দল ছাড়া সকলেই তার অনুসরণ করল;
সাবা 34:21
ওদের ওপর শয়তানের কোন আধিপত্য ছিল না। কারা পরকালে বিশ্বাসী এবং কারা ওতে সন্দিহান তা জানাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আর তোমার প্রতিপালক সর্ববিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক।
সাবা 34:22
বল, ‘তোমরা তাদেরকে আহবান কর, আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা (যাদেরকে উপাস্য) মনে কর।[১] ওরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয়[২] এবং এতে ওদের কোন অংশও নেই[৩] এবং ওদের কেউ আল্লাহর কাজে সাহায্যকারীও নয়।’ [৪]
[১] অর্থাৎ, যাদেরকে উপাস্য ধারণা কর। এখানে زَعَمْتُمْ শব্দটির দুটি مفعول (কর্মকারক) ঊহ্য আছে । অর্থাৎ, زَعَمْتُمُوْهُمْ آلِهَةً
[২] অর্থাৎ, তাদের না কোন ভাল-মন্দের এখতিয়ার আছে, না তারা কারোর উপকার করার ক্ষমতা রাখে, আর না কোন ক্ষতি থেকে রক্ষার। এখানে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর উল্লেখ ব্যাপকতা প্রকাশের জন্য করা হয়েছে, কারণ উভয়ই সকল বাহ্যিক বস্তুর অবস্থানক্ষেত্র।
[৩] না সৃষ্টি করায়, না মালিকানায় এবং না নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায়।
[৪] যারা কোন ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য করে থাকে। বরং আল্লাহ তাআলা কোন অংশীদার ছাড়াই সকল এখতিয়ারের একমাত্র মালিক এবং কারোর সাহায্য ছাড়াই তিনি সকল কর্ম নিজেই করে থাকেন।
সাবা 34:23
যাকে অনুমতি দেওয়া হবে সে ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।[১] এমনকি যখন ওদের অন্তর হতে ভয় বিদূরিত হয়, তখন ওরা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে, ‘তোমাদের প্রতিপালক কি হুকুম করেছেন?’ উত্তরে তারা বলে, ‘যা সত্য তিনি তাই বলেছেন।[২] তিনি সুউচ্চ, সুমহান।’
[১] "যাকে অনুমতি দেওয়া হবে"-এর উদ্দেশ্য হল নবী, ফিরিশতাগণ ইত্যাদি। অর্থাৎ এঁরাই সুপারিশ করতে পারবেন, অন্য কেউ নয়। কারণ অন্য কারোর সুপারিশ না তো উপকারে আসবে, আর না তাদেরকে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল, সুপারিশের হকদারগণ অর্থাৎ, আম্বিয়া, ফিরিশতা এবং নেক বান্দাগণ ঐ সকল মানুষের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন যারা সুপারিশ পাওয়ার প্রকৃত হকদার। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরই সুপারিশের জন্য অনুমতি হবে, অন্য কারোর জন্য নয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) উদ্দেশ্য হল যে, আম্বিয়া, ফিরিশতা এবং নেক বান্দাগণ ছাড়া সেখানে অন্য কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর এঁরাও আবার কেবল গোনাহগার মু'মিনদের জন্যই সুপারিশ করতে পারবেন; কোন কাফের, মুশরিক এবং আল্লাহর বিরোধীদের জন্য নয়। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় উক্ত দুই বিষয়ের পরিষ্কার বর্ণনা এসেছে। যেমনঃ "কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?" (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৫ আয়াত) এবং তারা সুপারিশ করে কেবল তাদের জন্য, যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।" (সূরা আম্বিয়া ২১:২৮ আয়াত)[২] এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর (রহঃ) হাদীসের আলোকে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা যখন কোন বিষয়ে অহী করেন, তখন আকাশে অবস্থিত ফিরিশতাগণ ভয়ে কম্পিত ও জ্ঞানশূন্য হয়ে যান। জ্ঞান ফিরে পেলে তাঁরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অতঃপর আরশ বহনকারী ফিরিশতাগণ অন্য ফিরিশতাগণকে এবং তাঁরা তাঁদের নিমেনর ফিরিশতাগণকে খবর করেন। আর এইভাবে প্রথম আসমানের ফিরিশতাদের নিকট সেই খবর পৌঁছে যায়। (ইবনে কাসীর) فُزِّعَ (এর মূল ধাতু হল فَزَعٌ অর্থাৎ ভয় বা আতঙ্ক। باب تفعيل এ এসে নিরাকরণের অর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, যখন আতঙ্ক দূরীভূত করে দেওয়া হয়।
সাবা 34:24
বল, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী হতে কে তোমাদের জীবিকা সরবরাহ করে?’ বল, ‘আল্লাহ। নিশ্চয় আমরা অথবা তোমরা সৎপথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি।’ [১]
[১] পরিষ্কার কথা যে, বিভ্রান্তিতে সেই আছে, যে সেই সকল সৃষ্টিকে উপাস্য মনে করে, যাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে আহার দানের ব্যাপারে কোন অংশই নেই; না তারা বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে, আর না তারা কিছু উৎপন্ন করতে সক্ষম। অতএব নিঃসন্দেহে কেবল তাওহীদবাদীরাই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে, দুই দলই নয়।
সাবা 34:25
বল, ‘আমাদের অপরাধের জন্য তোমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আমাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে না।’
সাবা 34:26
বল, ‘আমাদের প্রতিপালক আমাদের সকলকে একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফায়সালা করে দেবেন,[১] তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী, সর্বজ্ঞ।’
[১] অর্থাৎ, আমল মত বদলা প্রদান করবেন; সৎলোকদেরকে জান্নাত এবং অসৎ লোকদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।
সাবা 34:27
বল, ‘তোমরা যাদেরকে আল্লাহর অংশী স্থির করেছ, তাদেরকে আমাকে দেখাও।’ কক্ষনো না,[১] বরং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] অর্থাৎ, না তাঁর কেউ সমতুল আছে আর না সমকক্ষ, বরং তিনি সকল বস্তুর উপর পরাক্রমশালী এবং তাঁর সকল কর্ম ও কথা যুক্তি ও হিকমতে পরিপূর্ণ ।
সাবা 34:28
আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। [১]
[১] এই আয়াতে প্রথমতঃ আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-এর বিশ্বজনীন রসূল হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন যে, তাঁকে সকল মানুষের হিদায়াতকারী ও পথপ্রদর্শকরূপে প্রেরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এই যে, নবী (সাঃ)-এর কামনা ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনেকেই ঈমান থেকে বঞ্চিত থাকবে। অন্য স্থানেও উক্ত দুই বিষয়ের কথা তিনি বর্ণনা করেছেন। যেমন, নবী (সাঃ)-এর সর্বজনীন রসূল হওয়ার ব্যাপারে বলেছেন, (قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا ) অর্থাৎ, বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর (প্রেরিত) রসূল। (সূরা আ'রাফ ৭:১৫৮ আয়াত) (تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا) অর্থাৎ, কত প্রাচুর্যময় তিনি যিনি তাঁর দাসের প্রতি ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে। (সূরা ফুরকান ২৫:১ আয়াত) এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, "আমাকে এমন পাঁচটি বস্তু প্রদান করা হয়েছে যা আমার পূর্বে কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি। এক মাসের পথ চলার মত দূরত্বেও আমার ভীতি দুশমনদের মনে ঢুকিয়ে দিয়ে আমার সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য সারা পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্র করে দেওয়া হয়েছে; অতএব আমার উম্মত যেখানেই থাকুক নামাযের সময় হয়ে গেলে সেখানেই সে যেন নামায পড়ে নেয়। আমার জন্য (যুদ্ধলব্ধ) গনীমতের সম্পদ বৈধ করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কারোর জন্য বৈধ ছিল না। আমাকে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর অন্য সকল নবীকে নির্দিষ্ট গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল, আর আমাকে সকল মানুষের জন্য নবী করে পাঠানো হয়েছে।" (বুখারীঃ কিতাবুত তায়াম্মুম, মুসলিমঃ কিতাবুল মাসাজিদ) অন্য এক হাদীসে বলেছেন, আমি লাল ও কালো সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছি। (মুসলিমঃ কিতাবুল মাসাজিদ) লাল ও কালো থেকে অনেকে জ্বিন ও মানুষ উদ্দেশ্য নিয়েছেন, আবার অনেকে আরবী ও অনারবী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, উভয় অর্থই সঠিক। অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ অধিকাংশ মানুষের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার কথাও বর্ণনা করেছেন। (وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৩ আয়াত) (وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ) অর্থাৎ, যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে দেবে। (সূরা আনআম ৬:১১৬ আয়াত) মোটকথা বিপথগামীদের সংখ্যাই বেশি।
সাবা 34:29
তারা জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল, এ প্রতিশ্রুতি কখন বাস্তবায়িত হবে?’ [১]
[১] তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ স্বরূপ জিজ্ঞাসা করত, কারণ তা বাস্তবায়িত হওয়া তাদের নিকট সুদূরপরাহত ও অসম্ভব ছিল।
সাবা 34:30
বল, ‘তোমাদের জন্য এক নির্ধারিত দিবস রয়েছে; যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, ত্বরান্বিতও করতে পারবে না।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের একটি দিন নির্ধারিত করে রেখেছেন; যা একমাত্র তিনিই অবগত। যখন সেই নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তকালও আগে-পিছে হবে না। ( (إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لا يُؤَخَّرُ অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে তা বিলম্বিত হয় না। (সূরা নূহ ৭১:৪ আয়াত)
সাবা 34:31
অবিশ্বাসীরা বলে, ‘আমরা এ কুরআনে কখনও বিশ্বাস করব না, এর পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও নয়।’[১] আর তুমি যদি দেখতে, যখন সীমালংঘনকারীদেরকে তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দন্ডায়মান করা হবে, তখন ওরা পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে,[২] যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল তারা দাম্ভিক (অনুসৃত)দেরকে বলবে,[৩] ‘তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই বিশ্বাসী হতাম।’[৪]
[১] যেমন তাওরাত, যাবূর, ইঞ্জীল ইত্যাদি। অনেকে 'بَيْنَ يَدَيْهِ -এর অর্থ আখেরাত নিয়েছেন। এতে কাফেরদের শত্রুতা ও ঔদ্ধত্যের বর্ণনা রয়েছে যে, তারা সর্বপ্রকার প্রমাণ পাওয়ার পরেও কুরআন কারীম ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে অস্বীকার করে।
[২] অর্থাৎ, তারা পৃথিবীতে কুফর ও শিরক করাতে একে অপরের সাহচর্য ও আত্মীয়তার বন্ধনের ফলে আপোসে সম্প্রীতি রাখত। কিন্তু আখেরাতে এরা একে অপরের শত্রু হবে এবং একে অপরকে দোষারোপ করবে।
[৩] অর্থাৎ, পৃথিবীতে ওরা ঐ সকল মানুষ, যারা চিন্তা-ভাবনা না করে অবুঝের মত দশের কথা অনুযায়ী চলা ফেরা করে। ওরা এ কথা ওদের সেই নেতাদেরকে বলবে, পৃথিবীতে ওরা যাদের অনুসরণ করে চলত।
[৪] অর্থাৎ, তোমরাই আমাদেরকে পয়গম্বর ও সত্যের আহবায়কদের অনুসরণ করা থেকে বিরত রেখেছিলে। যদি তোমরা বিরত না রাখতে, তাহলে আমরা অবশ্যই মু'মিন হতাম।
সাবা 34:32
যারা দাম্ভিক (অনুসৃত) ছিল, তারা দুর্বল (অনুসারী)দেরকে বলবে, ‘আমরা কি তোমাদের কাছে সৎপথের উপদেশ আসার পর তা গ্রহণ করতে তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই তো অপরাধী ছিলে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমাদের নিকট এমন কি ক্ষমতা ছিল যে, আমরা তোমাদেরকে হিদায়াতের পথ থেকে বিরত রাখতাম। তোমরা নিজেরাই তার উপর চিন্তা-ভাবনা করনি বরং নিজেদের প্রবৃত্তি-পূজার কারণে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছ এবং এখন আমাদেরকে দোষী বানাচ্ছ? অথচ সব কিছু নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী করেছ। অতএব অপরাধী তোমরা নিজেরাই; আমরা নই।
সাবা 34:33
আর যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল, তারা দাম্ভিক (অনুসৃত)দেরকে বলবে, ‘প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিন-রাত আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর অংশী স্থাপন করি।’ [১] যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন মনে মনে অনুতপ্ত হবে।[২] আমি অবিশ্বাসীদের গলদেশে বেড়ি পরাব।[৩] ওরা যা করত তারই প্রতিফল ওদেরকে দেওয়া হবে। [৪]
[১] অর্থাৎ, আমরা অপরাধী তখনই হতাম, যখন আপন ইচ্ছায় পয়গম্বরদেরকে মিথ্যা মনে করতাম। কিন্তু ঘটনা হল যে, তোমরাই দিবা-রাত্রি আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার এবং আল্লাহর সাথে কুফুরী ও তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তোমাদের অনুসরণ করে আমরা ঈমান থেকে বঞ্চিত থেকেছি।[২] অর্থাৎ, এক অপরকে দোষারোপ তো করবে, কিন্তু উভয় দলই মনে মনে নিজেদের কুফরীর কারণে লজ্জিত হবে। কিন্তু শত্রুর আনন্দ থেকে বাঁচার জন্য তা প্রকাশ করবে না।[৩] অর্থাৎ, এমন বেড়ি যার দ্বারা তাদের হাতকে গলার সাথে বেঁধে দেওয়া হবে।[৪] অর্থাৎ, দুই দলই তাদের নিজ নিজ কর্মের প্রতিফল পাবে। নেতারা তাদের কর্ম অনুসারে এবং তাদের অনুসারীরা নিজেদের কর্ম অনুসারে শাস্তি পাবে। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ বলেন, (لِكُلٍّ ضِعْفٌ وَلَكِنْ لا تَعْلَمُونَ) অর্থাৎ, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে; কিন্তু তোমরা জান না। (সূরা আ'রাফ ৭:৩৮ আয়াত)
সাবা 34:34
যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, ‘তুমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।’ [১]
[১] এখানে নবী করীম (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, মক্কার নেতারা তোমার উপর ঈমান আনছে না এবং তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, এটা এমন কোন নতুন কাজ নয়। প্রত্যেক যুগেই অধিকাংশ ধনী শ্রেণীর মানুষেরা পয়গম্বরদেরকে মিথ্যা মনে করেছে। আর প্রত্যেক পয়গম্বরের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকত গরীব ও দুর্বল শ্রেণীর লোকেরাই। যেমন নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাদের পয়গম্বরকে বলেছিল, (قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الأَرْذَلُونَ) অর্থাৎ, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিচু শ্রেণীর লোকেরা তোমার অনুসরণ করেছে? (শুআরা ২৬:১১১ আয়াত) (وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ) অর্থাৎ, আমরা দেখছি যে, শুধু ঐ লোকেরাই না বুঝে তোমার অনুসরণ করছে, যারা আমাদের মধ্যে নিতান্তই হীন। (হূদ ১১:২৭ আয়াত) অন্য পয়গম্বরদেরকেও তাঁদের সম্প্রদায়রা এই কথাই বলেছিল। দেখুনঃ সূরা আ'রাফ ৭:৭৫ আয়াত, সূরা আনআম ৬:৫৩, ৬:১৩৩ আয়াত, সূরা বানী ইস্রাঈল ১৭:১৬ আয়াত ইত্যাদি। مُتْرَفُوْنَ এর অর্থ হল বিত্তশালী ও সর্দার।
সাবা 34:35
ওরা আরও বলত, ‘আমাদের ধন-জন সবার চেয়ে বেশী; সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেওয়া হবে না।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যখন আমাদেরকে পৃথিবীতে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির আতিশয্য প্রদান করেছেন, তখন কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হলেও আমাদের শাস্তি হবে না। তারা ঠিক যেন কিয়ামতের দিনকেও দুনিয়ার সাথে তুলনা করেছে যে, যেমন পৃথিবীতে কাফের ও মু'মিন সকলকে আল্লাহর নিয়ামত প্রদান করা হচ্ছে, অনুরূপ আখেরাতেও প্রদান করা হবে। অথচ আখেরাত হচ্ছে ফলাফল ক্ষেত্র, সেখানে পৃথিবীতে কৃত নিজ নিজ কর্মের ফল পাওয়া যাবে; ভাল কর্মের ভাল ফল এবং মন্দ কর্মের মন্দ ফল। আর পৃথিবী হচ্ছে পরীক্ষালয়। এখানে আল্লাহ তাআলা পরীক্ষা স্বরূপ সকলকে পার্থিব-সম্পদ প্রদান করেন। অথবা তারা পার্থিব ধন-সম্পদের আতিশয্যকে আল্লাহর সন্তষ্টির বহিঃপ্রকাশ ধরে নিয়েছে; অথচ এই রকম নয়। যদি তাই হত তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে সর্বাধিক ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি প্রদান করতেন।
সাবা 34:36
তুমি বল, ‘আমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন অথবা তা সীমিত করেন;[১] কিন্তু অধিকাংশ লোক এ বোঝে না।’
[১] এই আয়াতে কাফেরদের উক্ত ভুল ধারণা ও সন্দেহ দূর করা হচ্ছে যে, রুযীর প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তার সম্পর্ক আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের সাথে। এই জন্য তিনি সম্পদ যাকে পছন্দ করেন তাকেও দেন এবং যাকে অপছন্দ করেন তাকেও দেন। তিনি যাকে চান ধনী করেন এবং যাকে চান গরীব করেন।
সাবা 34:37
তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আমার নৈকট্য লাভের সহায়ক হবে না। [১] তবে (নৈকট্য লাভ করবে) তারাই যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে[২] এবং তারা তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ পুরস্কার। [৩] আর তারা প্রাসাদসমূহে নিরাপদে বসবাস করবে।
[১] অর্থাৎ, এই ধন-সম্পদ এই কথার প্রমাণ নয় যে, তোমাদের সাথে আমার ভালবাসা আছে এবং আমার নিকট তোমাদের বিশেষ মর্যাদা আছে।
[২] অর্থাৎ, আমার ভালবাসা ও নৈকট্য লাভ করার পন্থাই হচ্ছে ঈমান ও নেক আমল। যেমন হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন "আল্লাহ তাআলা তোমাদের আকার-আকৃতি ও ধন-সম্পদ দেখেন না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখে থাকেন।" (মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র)
[৩] মহান আল্লাহ একটি নেকীর বদলা কমপক্ষে দশ গুণ এবং ঊর্ধ্বপক্ষে সাতশ' গুণ; বরং তার চেয়েও অধিক গুণ বর্ধিত করে থাকেন।
সাবা 34:38
যারা আমার বাক্যকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করবে তাদেরকে শাস্তিতে (চিরকাল) উপস্থিত রাখা হবে।
সাবা 34:39
বল, ‘আমার প্রতিপালক তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার জীবিকা বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন।[১] তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার বিনিময় দেবেন। [২] আর তিনিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।’ [৩]
[১] অতএব তিনি কখনো কাফেরকেও অনেক ধন দেন, কিন্তু কি জন্য? তাকে ঢিল দেওয়ার জন্য এবং কখনো মু'মিনকে অভাবগ্রস্ত রাখেন কি জন্য? তার নেকী বৃদ্ধি করার জন্য। সুতরাং ধন-সম্পদের কম ও বেশি হওয়া তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কারণ বা প্রমাণ নয়। তাকীদের জন্য এ কথার পুনরুক্তি করা হয়েছে।[২] إِخْلاَفٌ -এর অর্থ হল 'বিনিময় বা প্রতিদান দেওয়া। এই বিনিময় ইহকালেও সম্ভব। আর পরকালে তো সুনিশ্চিত। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, "তুমি খরচ কর, আমি তোমার উপর খরচ করব।" (অর্থাৎ তোমার খরচের বিনিময় দেব।) (বুখারীঃ তাফসীর সূরা হূদ) দুইজন ফিরিশতা প্রত্যহ ঘোষণা করেন, তাঁদের একজন বলেন, "হে আল্লাহ! (তোমার রাস্তায়) যারা খরচ করে না তাদের সম্পদ নষ্ট করে দাও।" আর দ্বিতীয় ফিরিশতা বলেন, "হে আল্লাহ! (তোমার রাস্তায়) খরচকারীদেরকে বিনিময় দাও।" (বুখারীঃ যাকাত অধ্যায়)[৩] কারণ, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে কিছু দেয়, তবে তার এই দেওয়াটা হয় আল্লাহ তাআলার তাওফীক, প্রয়াস ও সুমতিদান এবং তার লিখিত ভাগ্যের ফল। প্রকৃতপক্ষে দানকারী কারো রুযীদাতা নয়। যেমন পিতাকে সন্তানদের বা বাদশাহকে তাঁর সৈন্যদের দায়িত্বশীল বা মালিক বলা হয়। আসলে রাজা-প্রজা ছোট-বড় সকলের রুযীদাতা প্রকৃতপক্ষে সেই আল্লাহ তাআলাই, যিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা। অতএব যে ব্যক্তি তার ধন থেকে কাউকে কিছু দান করে, সে আসলে ঐ ধন খরচ করে, যা তাকে আল্লাহ তাআলাই প্রদান করেছেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে রুযীদাতা আল্লাহই হলেন। তারপরেও তাঁর অতিরিক্ত অনুগ্রহ এই যে, তাঁর দেওয়া ধন তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী খরচ করলে তিনি তার বিনিময় ও নেকীও প্রদান করেন।
সাবা 34:40
যেদিন তিনি এদের সকলকে একত্রিত করবেন এবং ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?’ [১]
[১] মুশরিকদেরকে লাঞ্ছিত করার জন্য আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে এ কথা জিজ্ঞাসা করবেন। যেমন ঈসা (আঃ) সম্পর্কেও উল্লেখ হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকেও জিজ্ঞাসা করবেন, "হে মারয়্যাম-তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর?" ঈসা (আঃ) বলবেন, 'তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার জন্য আদৌ শোভনীয় নয়।' (সূরা মাইদাহ ৫:১১৬ আয়াত) অনুরূপ আল্লাহ তাআলা বাতিল উপাস্যগণকেও জিজ্ঞাসা করবেন, যেমন সূরা ফুরক্বানের ২৫:১৭ নং আয়াতে বর্ণনা হয়েছে যে, "তোমরাই কি আমার বান্দাগণকে বিভ্রান্ত করেছিলে, না ওরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিল?"
সাবা 34:41
ফিরিশতারা বলবে, ‘তুমি পবিত্র মহান! আমাদের সম্পর্ক তোমারই সাথে; ওদের সাথে নয়।[১] বরং ওরা তো পূজা করত জ্বিনদের[২] এবং ওদের অধিকাংশই ছিল তাদেরই প্রতি বিশ্বাসী।’
[১] অর্থাৎ, ফিরিশতাগণও ঈসা (আঃ)-এর মত আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে এ ব্যাপারে সম্পর্কহীনতার কথা প্রকাশ করবেন এবং বলবেন যে, আমরা তো তোমার বান্দা এবং তুমি আমাদের অভিভাবক, ওদের সাথে আমাদের কি সম্পর্ক?
[২] জ্বিন বলতে শয়তানকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এরা আসলে শয়তানের পূজারী কারণ সেই তাদেরকে মূর্তিপূজা করাতো এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করত। যেমন অন্য জায়গাতে বলেছেন, (إِنْ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيدًا) অর্থাৎ, তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল দেবীদের পূজা করে এবং তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানের পূজা করে। (সূরা নিসা ৪:১১৭ আয়াত)
সাবা 34:42
(তখন আমি বলব,) আজ তোমাদের একে অন্যের কোন উপকার কিংবা অপকার করবার ক্ষমতা নেই।[১] আর যারা সীমালংঘন করেছিল[২] তাদেরকে বলব, ‘তোমরা যে অগ্নির শাস্তিকে মিথ্যা মনে করতে আজ তা আস্বাদন কর।’
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে তোমরা এই ভেবে এদের ইবাদত করতে যে, এরা তোমাদের উপকার করতে পারবে, তোমাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করবে। (যেমন বর্তমানেও পীর পূজারী ও কবর পূজারীদের অবস্থা।) কিন্তু এখন দেখে নাও যে, এরা কোন উপকারের ক্ষমতা রাখে না।
[২] 'যারা সীমালংঘন করেছিল' (যালেম) বলতে গায়রুল্লাহর উপাসকদের বুঝানো হয়েছে। যেহেতু শিরক হল সবচেয়ে বড় সীমালংঘন ও সবচেয়ে বড় যুলম। আর মুশরিকরা হল সবচেয়ে বড় যালেম ও সীমালংঘনকারী।
সাবা 34:43
এদের নিকট যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, তখন এরা বলে, ‘এ তো সেই ব্যক্তিই,[১] যে তোমাদের পূর্বপুরুষ যার উপাসনা করত, তার উপাসনায় বাধা দিতে চায়।’ এরা আরও বলে, ‘এ (কুরআন) তো মিথ্যা উদ্ভাবন ব্যতীত কিছু নয়।’[২] আর সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট যখন সত্য আসে, তখন তারা বলে, ‘এ তো এক সুস্পষ্ট যাদু।’ [৩]
[১] 'ব্যক্তি' থেকে উদ্দেশ্য হল নবী করীম (সাঃ)। বাপ-দাদার ধর্ম তাদের নিকট সঠিক ধর্ম ছিল। যার ফলে তারা নবী (সাঃ)-এর এই অপরাধ বর্ণনা করেছে যে, এ তোমাদেরকে সেই সকল উপাস্য থেকে বিরত রাখতে চায়, যাদের ইবাদত তোমাদের বাপ-দাদারা করত।
[২] দ্বিতীয় 'هذا' (এ)র উদ্দেশ্য হল কুরআন কারীম। কুরআনকে তারা তৈরী করা (স্বরচিত) বা মনগড়া এবং (আল্লাহর প্রতি) মিথ্যা অপবাদ বলে আখ্যায়িত করেছে।
[৩] কাফেররা কুরআনকে প্রথমে মনগড়া মিথ্যা বলেছে এবং এখানে স্পষ্ট যাদু বলেছে। প্রথম কথার সম্পর্ক কুরআনের অর্থ ও তাৎপর্যের সাথে আর দ্বিতীয় কথা কুরআনের অলৌকিক ছন্দ ও বর্ণনাভঙ্গি এবং সাহিত্য-শৈলী ও শব্দস্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সম্পৃক্ত।
সাবা 34:44
আমি পূর্বে এ (মক্কাবাসী)দেরকে কোন গ্রন্থ দিইনি, যা এরা অধ্যয়ন করতে পারে এবং তোমার পূর্বে এদের নিকট কোন সতর্ককারীও প্রেরণ করিনি। [১]
[১] এই জন্য তারা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত, যেন তাদের নিকটেও কোন পয়গম্বর আসেন এবং আসমানী কোন গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়। কিন্তু যখন তা এসে গেল, তখন তারা অস্বীকার করে বসল।
সাবা 34:45
এদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যা মনে করেছিল। ওদেরকে আমি যা দিয়েছিলাম এরা (মক্কার অধিবাসীরা) তার দশ ভাগের এক ভাগ পর্যন্তও পৌঁছেনি, তবুও ওরা আমার রসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল। সুতরাং কেমন (ভয়ঙ্কর) ছিল আমার প্রতিকার (শাস্তি)! [১]
[১] এখানে মক্কার কাফেরদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা মিথ্যা ও অস্বীকার করার যে পথ অবলম্বন করেছ, তা দারুণ বিপজ্জনক। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরাও সেই পথ অবলম্বন করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অথচ তারা ধন-সম্পদ, বল ও শক্তি এবং বয়সের দিক থেকে তোমাদের থেকে অধিক ছিল, এমন কি তোমরা তাদের দশ ভাগের এক ভাগও পাওনি। কিন্তু তার পরেও তারা আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পায়নি। উক্ত বিষয়কে সূরা আহক্বাফের ৪৬:২৬ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
সাবা 34:46
বল, ‘আমি তোমাদের একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছিঃ তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু’জন করে অথবা একা একা দাঁড়াও এবং চিন্তা করে দেখ, তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মাদ) পাগল নয়।[১] সে তো আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ককারী মাত্র।’ [২]
[১] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে তোমাদের কর্ম-পদ্ধতির ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করছি এবং একটি কথারই উপদেশ দিচ্ছি। আর তা এই যে, তোমরা জেদ ও ঔদ্ধত্য ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে একাকী বা দু'জন করে আমার সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা কর, আমার জীবন তোমাদের মাঝেই অতিবাহিত হয়েছে এবং এখনো যে দাওয়াত আমি তোমাদেরকে দিচ্ছি তাতে কি এমন কোন বিষয় আছে, যাতে এই কথার প্রমাণ হয় যে, আমার মাঝে পাগলামি আছে? তোমরা যদি নিজেদের অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব এবং মনের খেয়াল-খুশী থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তা-ভাবনা কর, তাহলে অবশ্যই তোমরা বুঝতে পারবে যে, তোমাদের সাথীর মাঝে কোন পাগলামি নেই।[২] অর্থাৎ তিনি তো শুধু তোমাদের হিদায়াতের জন্য এসেছেন, যাতে তোমরা সেই কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারো, যা হিদায়াতের পথে না চলার কারণে তোমাদেরকে ভোগ করতে হবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ) একদা সাফা পাহাড়ে চড়ে বললেন, ياصباحاه (সাবধান! সতর্ক হও!) যা শ্রবণ করে কুরাইশরা একত্রিত হয়ে গেল। তিনি তাদেরকে বললেন, "তোমরা বল, যদি আমি সংবাদ দিই যে, শত্রুদল সকাল বা সন্ধ্যায় তোমাদের উপর হামলা করবে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? তারা বলল, 'কেন বিশ্বাস করব না? (আমাদের অভিজ্ঞতায় তুমি তো কখনো মিথ্যা বলনি।) তিনি (সাঃ) বললেন, "তবে তোমরা শুনে নাও যে, আমি তোমাদেরকে (আল্লাহর) কঠিন শাস্তি আসার পূর্বে সতর্ক করছি।" এই কথা শুনে আবু লাহাব বলল تَبًّا لَكَ! أَلِهَذَا جَمَعْتَنَا 'তুমি ধ্বংস হও। এই জন্য তুমি আমাদেরকে একত্রিত করেছিলে?' যার ফলে আল্লাহ তাআলা সূরা تَبَّتْ يَدَآ اَبِيْ لَهَبٍ অবতীর্ণ করেছেন। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা সাবা')
সাবা 34:47
বল, ‘আমি তোমাদের নিকট যে পারিশ্রমিক চেয়েছি তা তোমাদের জন্যই;[১] আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহর নিকট এবং তিনি সর্ববিষয়ে সাক্ষী।’
[১] নবুঅত প্রচারে নবী (সাঃ) নিজের যে কোন লাভ বা স্বার্থ ছিল না এবং তাঁর পার্থিব ধন-সম্পদের যে কোন লোভ ছিল না সে কথা মহান আল্লাহ এই আয়াতে বিশেষভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। যাতে তাদের মনে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে তারা দূরে সরে না যায় যে, উক্ত দাওয়াতের পিছনে তাঁর পার্থিব ধন-সম্পদ উপার্জন উদ্দেশ্য আছে।
সাবা 34:48
বল, ‘আমার প্রতিপালক সত্য অবতারণ করেন;[১] তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা।’
[১] قَََََذَفَ এর অর্থ হল, (নিক্ষেপ করা) তীর চালানো, পাথর ছুঁড়া এবং কথা বলাও হয়। এখানে শেষোক্ত অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ হক কথা বলেন, নিজ রসূলগণের প্রতি অহী অবতীর্ণ করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে মানুষের জন্য হক স্পষ্ট করে থাকেন। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন (يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ) অর্থাৎ, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় আদেশসহ অহী প্রেরণ করেন। (সূরা মু'মিন ৪০:১৫ আয়াত)
সাবা 34:49
বল, ‘সত্য এসেছে এবং অসত্য নতুন কিছু সৃজন করতে পারে না এবং পারে না পুনরাবৃত্তি ঘটাতে।’ [১]
[১] হক বা সত্য হল কুরআন আর বাতিল বা অসত্য হল শিরক ও কুফর। উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর দ্বীন এবং তাঁর কুরআন এসে গেছে, যার দ্বারা বাতিল চূর্ণ-বিচূর্ণ ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এখন আর সে মাথা উঠানোর ক্ষমতা রাখে না। যেমন তিনি বলেছেন, (بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ) অর্থাৎ, বরং আমি সত্য দ্বারা মিথ্যার উপর আঘাত হানি; সুতরাং তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়; ফলে মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। (আম্বিয়া ২১:১৮ আয়াত) হাদীসে বর্ণনা হয়েছে, যেদিন মক্কা বিজয় হয়, নবী (সাঃ) কা'বা শরীফে প্রবেশ করে চারিদিকে যে সব মূর্তি স্থাপন করা ছিল, তিনি ধনুকের ডগা দিয়ে সেই মূর্তিগুলিকে খোঁচা মারছিলেন আর উক্ত আয়াত ও সূরা বানী ইস্রাঈলের ১৭:৮১ আয়াত (وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِل) পড়ছিলেন। (বুখারীঃ জিহাদ অধ্যায়)
সাবা 34:50
বল, ‘আমি বিভ্রান্ত হলে বিভ্রান্তির পরিণাম আমাকেই ভোগ করতে হবে। আর যদি আমি সৎপথে থাকি তবে তা এ জন্য যে, আমার প্রতি আমার প্রতিপালক অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করেন।[১] তিনি সর্বশ্রোতা, সন্নিকটবর্তী।’ [২]
[১] অর্থাৎ সর্বপ্রকার মঙ্গল আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলা যে অহী ও স্পষ্ট সত্য অবতীর্ণ করেছেন, তাতে সঠিক পথ ও হিদায়াত নিহিত আছে। মানুষ তাতেই সঠিক পথের দিশা পায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, তাতে মানুষের নিজের ত্রুটি এবং প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশী থাকে। এই জন্য তার কুফলও তাকেই ভোগ করতে হবে। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) যখন কোন জিজ্ঞাসকের উত্তরে নিজের পক্ষ থেকে কিছু বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, এ ব্যাপারে আমি আমার নিজস্ব রায় বললাম। সুতরাং তা যদি সঠিক হয়, তাহলে তা আল্লাহর তরফ হতে, আর যদি তা বেঠিক হয়, তাহলে তা আমার ও শয়তানের তরফ হতে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল তার সাথে সম্পর্কহীন। (ইবনে কাসীর)
[২] যেমন হাদীসে এসেছে যে, একদা সাহাবীগণ জোরে-শোরে তকবীর পড়তে শুরু করলেন। তখন নবী (সাঃ) বললেন, হে লোক সকল! নিজেদের উপর কৃপা কর। নিশ্চয় তোমরা কোন বধির অথবা কোন (দূরবর্তী) অনুপস্থিতকে আহবান করছ না; বরং তোমরা সর্বশ্রোতা নিকটবর্তীকে আহবান করছ। তিনি (তাঁর ইলমসহ) তোমাদের সঙ্গে আছেন।" (বুখারী ৫/৭৫, মুসলিম ৪/২০৭৬)
সাবা 34:51
তুমি যদি দেখতে যখন এরা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে, তখন এরা কোন প্রকার অব্যাহতি পাবে না[১] এবং এরা অদূরে থেকেই ধৃত হবে।
[১] 'فَلاَ فَوْتَ' কোথাও পালাতে পারবে না, কারণ সে আল্লাহর পাকড়াও-এর আয়ত্তে হবে। এ বর্ণনা হাশরের ময়দানের।
সাবা 34:52
এবং এরা বলবে, ‘আমরা তা বিশ্বাস করলাম।’ কিন্তু এখন এতদূর হতে ওর নাগাল পাবে কিরূপে? [১]
[১] 'تَنَاوُشٌ -এর অর্থ ধরা বা নাগাল পাওয়া। অর্থাৎ, এখন আখেরাতে তারা ঈমানের নাগাল কিভাবে পাবে, অথচ পৃথিবীতে তা থেকে দূরে থাকতো। ঠিক যেন আখেরাত ঈমানের জন্য পৃথিবীর তুলনায় অনেক দূরের জায়গা। যেমন দূর থেকে কোন বস্তুকে ধরা অসম্ভব, তেমনি আখেরাতে ঈমান পাওয়ার কোন সুযোগই নেই।
সাবা 34:53
ওরা তো পূর্বে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল; ওরা (সত্য হতে) দূরে থেকে অদেখা বিষয়ে মন্তব্য করত। [১]
[১] অর্থাৎ, নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলত যে, কিয়ামত ও হিসাব-কিতাব কিচ্ছু হবে না। অথবা কুরআন সম্পর্কে বলত যে, এটা হল জাদু, তৈরী করা মিথ্যা এবং পূর্বযুগীয় উপকথা। অথবা মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে বলত যে, ও একজন জাদুকর, গণক, কবি বা পাগল। অথচ কোন কথারই কোন প্রমাণ তাদের নিকট ছিল না।
সাবা 34:54
এদের এবং এদের কামনার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করা হয়েছে,[১] যেমন করা হয়েছিল এদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে। [২] ওরা ছিল বিভ্রান্তিকর সন্দেহে সন্দিহান। [৩]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তারা চাইবে, তাদের ঈমান গ্রহণ করে নেওয়া হোক, শাস্তি থেকে তাদের পরিত্রাণ হয়ে যাক। কিন্তু তাদের ও তাদের মনোবাঞ্ছার মাঝে পর্দা স্থাপন করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তাদের সেই মনোবাঞ্ছা রদ করা হবে।
[২] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী উম্মতের ঈমানও সেই সময় গ্রহণ করা হয়নি, যখন তারা শাস্তি স্বচক্ষে অবলোকন করার পর ঈমান এনেছিল।
[৩] সুতরাং বর্তমানে শাস্তি অবলোকন করার পর তাদের ঈমান কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? ক্বাতাদা (রঃ) বলেন, 'সন্দেহ থেকে দূরে থাক। কারণ, যে ব্যক্তি সন্দেহ রাখা অবস্থায় ইন্তিকাল করবে, সে সেই অবস্থায় পুনরুত্থান করবে এবং যে ব্যক্তি প্রত্যয় রাখা অবস্থায় ইন্তিকাল করবে, সে কিয়ামতের দিন প্রত্যয় রাখা অবস্থায় পুনরুত্থান করবে।' (ইবনে কাসীর)