Tafsir Ahsanul Bayaan — আয-যুখরুফ 43:1 – আল-ফাতহ 48:29
Contents
- আয-যুখরুফ 43:1
- আয-যুখরুফ 43:2
- আয-যুখরুফ 43:3
- আয-যুখরুফ 43:4
- আয-যুখরুফ 43:5
- আয-যুখরুফ 43:6
- আয-যুখরুফ 43:7
- আয-যুখরুফ 43:8
- আয-যুখরুফ 43:9
- আয-যুখরুফ 43:10
- আয-যুখরুফ 43:11
- আয-যুখরুফ 43:12
- আয-যুখরুফ 43:13
- আয-যুখরুফ 43:14
- আয-যুখরুফ 43:15
- আয-যুখরুফ 43:16
- আয-যুখরুফ 43:17
- আয-যুখরুফ 43:18
- আয-যুখরুফ 43:19
- আয-যুখরুফ 43:20
- আয-যুখরুফ 43:21
- আয-যুখরুফ 43:22
- আয-যুখরুফ 43:23
- আয-যুখরুফ 43:24
- আয-যুখরুফ 43:25
- আয-যুখরুফ 43:26
- আয-যুখরুফ 43:27
- আয-যুখরুফ 43:28
- আয-যুখরুফ 43:29
- আয-যুখরুফ 43:30
- আয-যুখরুফ 43:31
- আয-যুখরুফ 43:32
- আয-যুখরুফ 43:33
- আয-যুখরুফ 43:34
- আয-যুখরুফ 43:35
- আয-যুখরুফ 43:36
- আয-যুখরুফ 43:37
- আয-যুখরুফ 43:38
- আয-যুখরুফ 43:39
- আয-যুখরুফ 43:40
- আয-যুখরুফ 43:41
- আয-যুখরুফ 43:42
- আয-যুখরুফ 43:43
- আয-যুখরুফ 43:44
- আয-যুখরুফ 43:45
- আয-যুখরুফ 43:46
- আয-যুখরুফ 43:47
- আয-যুখরুফ 43:48
- আয-যুখরুফ 43:49
- আয-যুখরুফ 43:50
- আয-যুখরুফ 43:51
- আয-যুখরুফ 43:52
- আয-যুখরুফ 43:53
- আয-যুখরুফ 43:54
- আয-যুখরুফ 43:55
- আয-যুখরুফ 43:56
- আয-যুখরুফ 43:57
- আয-যুখরুফ 43:58
- আয-যুখরুফ 43:59
- আয-যুখরুফ 43:60
- আয-যুখরুফ 43:61
- আয-যুখরুফ 43:62
- আয-যুখরুফ 43:63
- আয-যুখরুফ 43:64
- আয-যুখরুফ 43:65
- আয-যুখরুফ 43:66
- আয-যুখরুফ 43:67
- আয-যুখরুফ 43:68
- আয-যুখরুফ 43:69
- আয-যুখরুফ 43:70
- আয-যুখরুফ 43:71
- আয-যুখরুফ 43:72
- আয-যুখরুফ 43:73
- আয-যুখরুফ 43:74
- আয-যুখরুফ 43:75
- আয-যুখরুফ 43:76
- আয-যুখরুফ 43:77
- আয-যুখরুফ 43:78
- আয-যুখরুফ 43:79
- আয-যুখরুফ 43:80
- আয-যুখরুফ 43:81
- আয-যুখরুফ 43:82
- আয-যুখরুফ 43:83
- আয-যুখরুফ 43:84
- আয-যুখরুফ 43:85
- আয-যুখরুফ 43:86
- আয-যুখরুফ 43:87
- আয-যুখরুফ 43:88
- আয-যুখরুফ 43:89
- আদ-দুখান 44:1
- আদ-দুখান 44:2
- আদ-দুখান 44:3
- আদ-দুখান 44:4
- আদ-দুখান 44:5
- আদ-দুখান 44:6
- আদ-দুখান 44:7
- আদ-দুখান 44:8
- আদ-দুখান 44:9
- আদ-দুখান 44:10
- আদ-দুখান 44:11
- আদ-দুখান 44:12
- আদ-দুখান 44:13
- আদ-দুখান 44:14
- আদ-দুখান 44:15
- আদ-দুখান 44:16
- আদ-দুখান 44:17
- আদ-দুখান 44:18
- আদ-দুখান 44:19
- আদ-দুখান 44:20
- আদ-দুখান 44:21
- আদ-দুখান 44:22
- আদ-দুখান 44:23
- আদ-দুখান 44:24
- আদ-দুখান 44:25
- আদ-দুখান 44:26
- আদ-দুখান 44:27
- আদ-দুখান 44:28
- আদ-দুখান 44:29
- আদ-দুখান 44:30
- আদ-দুখান 44:31
- আদ-দুখান 44:32
- আদ-দুখান 44:33
- আদ-দুখান 44:34
- আদ-দুখান 44:35
- আদ-দুখান 44:36
- আদ-দুখান 44:37
- আদ-দুখান 44:38
- আদ-দুখান 44:39
- আদ-দুখান 44:40
- আদ-দুখান 44:41
- আদ-দুখান 44:42
- আদ-দুখান 44:43
- আদ-দুখান 44:44
- আদ-দুখান 44:45
- আদ-দুখান 44:46
- আদ-দুখান 44:47
- আদ-দুখান 44:48
- আদ-দুখান 44:49
- আদ-দুখান 44:50
- আদ-দুখান 44:51
- আদ-দুখান 44:52
- আদ-দুখান 44:53
- আদ-দুখান 44:54
- আদ-দুখান 44:55
- আদ-দুখান 44:56
- আদ-দুখান 44:57
- আদ-দুখান 44:58
- আদ-দুখান 44:59
- আল-জাসিয়া 45:1
- আল-জাসিয়া 45:2
- আল-জাসিয়া 45:3
- আল-জাসিয়া 45:4
- আল-জাসিয়া 45:5
- আল-জাসিয়া 45:6
- আল-জাসিয়া 45:7
- আল-জাসিয়া 45:8
- আল-জাসিয়া 45:9
- আল-জাসিয়া 45:10
- আল-জাসিয়া 45:11
- আল-জাসিয়া 45:12
- আল-জাসিয়া 45:13
- আল-জাসিয়া 45:14
- আল-জাসিয়া 45:15
- আল-জাসিয়া 45:16
- আল-জাসিয়া 45:17
- আল-জাসিয়া 45:18
- আল-জাসিয়া 45:19
- আল-জাসিয়া 45:20
- আল-জাসিয়া 45:21
- আল-জাসিয়া 45:22
- আল-জাসিয়া 45:23
- আল-জাসিয়া 45:24
- আল-জাসিয়া 45:25
- আল-জাসিয়া 45:26
- আল-জাসিয়া 45:27
- আল-জাসিয়া 45:28
- আল-জাসিয়া 45:29
- আল-জাসিয়া 45:30
- আল-জাসিয়া 45:31
- আল-জাসিয়া 45:32
- আল-জাসিয়া 45:33
- আল-জাসিয়া 45:34
- আল-জাসিয়া 45:35
- আল-জাসিয়া 45:36
- আল-জাসিয়া 45:37
- আল-আহকাফ 46:1
- আল-আহকাফ 46:2
- আল-আহকাফ 46:3
- আল-আহকাফ 46:4
- আল-আহকাফ 46:5
- আল-আহকাফ 46:6
- আল-আহকাফ 46:7
- আল-আহকাফ 46:8
- আল-আহকাফ 46:9
- আল-আহকাফ 46:10
- আল-আহকাফ 46:11
- আল-আহকাফ 46:12
- আল-আহকাফ 46:13
- আল-আহকাফ 46:14
- আল-আহকাফ 46:15
- আল-আহকাফ 46:16
- আল-আহকাফ 46:17
- আল-আহকাফ 46:18
- আল-আহকাফ 46:19
- আল-আহকাফ 46:20
- আল-আহকাফ 46:21
- আল-আহকাফ 46:22
- আল-আহকাফ 46:23
- আল-আহকাফ 46:24
- আল-আহকাফ 46:25
- আল-আহকাফ 46:26
- আল-আহকাফ 46:27
- আল-আহকাফ 46:28
- আল-আহকাফ 46:29
- আল-আহকাফ 46:30
- আল-আহকাফ 46:31
- আল-আহকাফ 46:32
- আল-আহকাফ 46:33
- আল-আহকাফ 46:34
- আল-আহকাফ 46:35
- মুহাম্মাদ 47:1
- মুহাম্মাদ 47:2
- মুহাম্মাদ 47:3
- মুহাম্মাদ 47:4
- মুহাম্মাদ 47:5
- মুহাম্মাদ 47:6
- মুহাম্মাদ 47:7
- মুহাম্মাদ 47:8
- মুহাম্মাদ 47:9
- মুহাম্মাদ 47:10
- মুহাম্মাদ 47:11
- মুহাম্মাদ 47:12
- মুহাম্মাদ 47:13
- মুহাম্মাদ 47:14
- মুহাম্মাদ 47:15
- মুহাম্মাদ 47:16
- মুহাম্মাদ 47:17
- মুহাম্মাদ 47:18
- মুহাম্মাদ 47:19
- মুহাম্মাদ 47:20
- মুহাম্মাদ 47:21
- মুহাম্মাদ 47:22
- মুহাম্মাদ 47:23
- মুহাম্মাদ 47:24
- মুহাম্মাদ 47:25
- মুহাম্মাদ 47:26
- মুহাম্মাদ 47:27
- মুহাম্মাদ 47:28
- মুহাম্মাদ 47:29
- মুহাম্মাদ 47:30
- মুহাম্মাদ 47:31
- মুহাম্মাদ 47:32
- মুহাম্মাদ 47:33
- মুহাম্মাদ 47:34
- মুহাম্মাদ 47:35
- মুহাম্মাদ 47:36
- মুহাম্মাদ 47:37
- মুহাম্মাদ 47:38
- আল-ফাতহ 48:1
- আল-ফাতহ 48:2
- আল-ফাতহ 48:3
- আল-ফাতহ 48:4
- আল-ফাতহ 48:5
- আল-ফাতহ 48:6
- আল-ফাতহ 48:7
- আল-ফাতহ 48:8
- আল-ফাতহ 48:9
- আল-ফাতহ 48:10
- আল-ফাতহ 48:11
- আল-ফাতহ 48:12
- আল-ফাতহ 48:13
- আল-ফাতহ 48:14
- আল-ফাতহ 48:15
- আল-ফাতহ 48:16
- আল-ফাতহ 48:17
- আল-ফাতহ 48:18
- আল-ফাতহ 48:19
- আল-ফাতহ 48:20
- আল-ফাতহ 48:21
- আল-ফাতহ 48:22
- আল-ফাতহ 48:23
- আল-ফাতহ 48:24
- আল-ফাতহ 48:25
- আল-ফাতহ 48:26
- আল-ফাতহ 48:27
- আল-ফাতহ 48:28
- আল-ফাতহ 48:29
আয-যুখরুফ 43:1
হা-মীম।
আয-যুখরুফ 43:2
সুস্পষ্ট গ্রন্থের শপথ।
আয-যুখরুফ 43:3
আমি এ অবতীর্ণ করেছি কুরআনরূপে আরবী ভাষায়, [১] যাতে তোমরা বুঝতে পার।
[১] যেহেতু তা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম ভাষা। দ্বিতীয়তঃ প্রাথমিক পর্যায়ে সম্বোধন আরবদেরকেই করা হয়েছে। তাই তাদের ভাষাতেই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। যাতে তারা বুঝতে চাইলে যেন সহজে বুঝতে পারে।
আয-যুখরুফ 43:4
নিশ্চয় এ আমার নিকট মূল গ্রন্থে (লাওহে মাহফূযে সুরক্ষিত) মহান, প্রজ্ঞাময়।[১]
[১] এখানে কুরআন কারীমের সেই মাহাত্ম্য ও মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, যা ঊর্ধ্ব জগতে (মহান আল্লাহর) নিকট রয়েছে। যাতে নিম্ন জগদ্বাসীরাও এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রতি খেয়াল রেখে প্রকৃতার্থে যেন তার প্রতি গুরুত্ব দেয় এবং তা থেকে হিদায়াতের সেই উদ্দেশ্য সাধন করে, যার জন্য তাকে দুনিয়াতে অবতীর্ণ করা হয়েছে। أُمُّ الْكِتَابِ বলতে 'লাওহে মাহফূয'কে বুঝানো হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:5
তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় বলে কি আমি তোমাদের নিকট হতে উপদেশ-বাণী (কুরআন) প্রত্যাহার করে নেব? [১]
[১] এর বিভিন্ন অর্থ করা হয়েছে। যেমন, (ক) তোমরা যেহেতু পাপসমূহে একেবারে মেতে আছ এবং অব্যাহতভাবে তা করেই যাচ্ছ বলে কি তোমরা ভেবে নিয়েছ যে, আমি তোমাদেরকে ওয়ায-নসীহত করা ছেড়ে দেব? (খ) অথবা তোমাদের কুফরী ও সীমাতিক্রম করার জন্য আমি তোমাদেরকে কিছুই বলব না এবং আমি তোমাদেরকে এমনিই ছেড়ে দেব। (গ) আমি তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেব এবং তোমাদেরকে না কোন জিনিসের নির্দেশ দেব, আর না কোন জিনিস থেকে নিষেধ করব। (ঘ) তোমরা যেহেতু কুরআনের উপর ঈমান আনছ না, তাই আমি কুরআন অবতীর্ণ করার ধারাই বন্ধ করে দেব। প্রথম অর্থকে ইমাম ত্বাবারী এবং শেষোক্ত অর্থকে ইমাম ইবনে কাসীর পছন্দ করে বলেন যে, এটা আল্লাহর অপার অনুগ্রহ যে, তিনি কল্যাণ ও 'যিকর হাকীম' (কুরআন) এর প্রতি দাওয়াত দেওয়ার ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেননি, যদিও তারা বিমুখ হওয়া এবং অস্বীকার করার ব্যাপারে সীমাতিক্রম করছিল। যাতে যার ভাগ্যে হিদায়াত নির্ধারিত আছে, সে যেন তার মাধ্যমে হিদায়াত গ্রহণ করে নেয় এবং যাদের ভাগ্যে দুর্দশা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে, তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়।
আয-যুখরুফ 43:6
পূর্ববর্তীদের নিকট আমি বহু রসূল প্রেরণ করেছি।
আয-যুখরুফ 43:7
এবং যখনই ওদের নিকট কোন নবী এসেছে, তখন ওরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে।
আয-যুখরুফ 43:8
ওদের মধ্যে যারা এদের অপেক্ষা শক্তিতে প্রবল ছিল[১] তাদেরকে আমি ধ্বংস করেছিলাম; আর পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত ঘটে গেছে। [২]
[১] অর্থাৎ, মক্কাবাসীদের থেকেও বেশী শক্তিশালী ছিল। যেমন, অন্যত্র বলেছেন, {كَانُوْا أَكْثَرَ مِنْهُمْ وَأَشَدَّ قُوَّةً} "তারা এদের চেয়েও সংখ্যায় ও শক্তিতে অনেক বেশী ছিল।" (সূরা মু'মিন ৪০:৮২ আয়াত)[২] অর্থাৎ, কুরআন মাজীদে সেই সম্প্রদায়দের কথা অথবা তাদের গুণাবলী একাধিকবার উল্লিখিত হয়েছে। এতে মক্কাবাসীদের জন্য এইভাবে ধমক দেওয়া হয়েছে যে, পূর্বের জাতিরা রসূলদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। এরাও যদি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতকে মিথ্যা মনে করাতে অটল থাকে, তবে তাদের ন্যায় এরাও ধ্বংস হয়ে যাবে।
আয-যুখরুফ 43:9
তুমি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? ওরা অবশ্যই বলবে, এগুলিকে সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ (আল্লাহ)।’ [১]
[১] কিন্তু এই স্বীকারোক্তির পরেও ঐ সৃষ্ট ব্যক্তি-বস্তুরই মধ্য হতে অনেককেই এই মূর্খরা আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিয়েছে। এতে তাদের অপরাধ যে বড়ই সাংঘাতিক ও জঘন্য ছিল সে কথা বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের নির্বুদ্ধিতা ও মুর্খতার কথাও প্রকাশ হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:10
যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন শয্যাস্বরূপ[১] এবং ওতে করেছেন তোমাদের চলার পথ, যাতে তোমরা সঠিক পথ লাভ করতে পার। [২]
[১] এমন শয্যা বা বিছানা যা স্থির ও স্থিতিশীল। তোমরা এর উপর চলাফেরা কর, দন্ডায়মান হও, নিদ্রা যাও এবং যেখানে ইচ্ছা যাতায়াত কর। তিনি এটাকে পর্বতমালা দ্বারা সুদৃঢ় করে দিয়েছেন; যাতে তা নড়াচড়া না করে।
[২] অর্থাৎ, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতের জন্য রাস্তা বানিয়ে দিয়েছেন। যাতে কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তোমরা যাওয়া-আসা করতে পার।
আয-যুখরুফ 43:11
যিনি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে[১] অতঃপর তা দিয়ে আমি সঞ্জীবিত করি নির্জীব ভূখন্ডকে। এভাবেই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। [২]
[১] অর্থাৎ, যতটায় তোমাদের প্রয়োজন পূরণ হয়। কারণ, প্রয়োজনের কম বৃষ্টি হলে তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হত না এবং বেশী হলে তা বন্যায় পরিণত হবে, যাতে তোমাদের ডুবে যাওয়ার ও ধ্বংস হওয়ার ভয় আছে।
[২] অর্থাৎ, যেভাবে বৃষ্টির পানিতে মৃত ভূমি সজীব হয়ে ওঠে, অনুরূপ কিয়ামতের দিন তোমাদেরকেও জীবিত করে কবর থেকে বের করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:12
যিনি সমস্ত জোড়াসমূহকে সৃষ্টি করেছেন[১] এবং তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন জলযান ও পশু, যাতে তোমরা আরোহণ কর।
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া বানিয়েছেন; নর ও নারী। যাবতীয় উদ্ভিদ, শস্য, ফল-মূল এবং জীবজন্তু সবেই রয়েছে পুং-স্ত্রীর এই ধারা। কেউ কেউ বলেছেন, এ থেকে পরস্পর বিপরীত জিনিসগুলোকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, আলো-আঁধার, সুস্থতা-অসুস্থতা, সুবিচার-অবিচার, ভাল-মন্দ, ঈমান-কুফর, কোমলতা-কঠোরতা ইত্যাদি। কেউ বলেছেন, এখানে أزواج (জোড়া) মানে বিভিন্ন প্রকার। অর্থাৎ, সমস্ত প্রকার বস্তুর স্রষ্টা আল্লাহ।
আয-যুখরুফ 43:13
যাতে তোমরা ওর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার[১] অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সম্পদ স্মরণ কর ও বল, ‘পবিত্র ও মহান তিনি যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন; যদিও আমরা একে বশীভূত করতে সমর্থ ছিলাম না। [২]
[১] لِتَسْتَوُوْا এর অর্থ, لِتَسْتَقِرُّوْا অথবা لِتَسْتَعْلُوْا স্থির হয়ে বসতে পার অথবা সওয়ার হতে পার। ظُهُوْرِهِ তে 'য্বমীর' (সর্বনাম) একবচন ব্যবহার হয়েছে 'জিনস' (শ্রেণী) এর দিকে লক্ষ্য করে।
[২] অর্থাৎ, যদি এই পশুগুলোকে আমাদের অনুগত ও বশীভূত না করে দিতেন, তবে আমরা তাদেরকে আমাদের আয়ত্তে এনে তাদেরকে বাহন ও বোঝ বহনের জন্য এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারতাম না। مُقْرِنِيْنَ অর্থ, مُطِيْقِيْنَ বশীকরণে সমর্থ।
আয-যুখরুফ 43:14
আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করব।’ [১]
[১] নবী করীম (সাঃ) যখন বাহনে আরোহণ করতেন, তখন তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন এবং سُبْحَانَ الَّذِي থেকে لَمُنْقَلِبُوْنَ পর্যন্ত আয়াতের অংশটুকু পড়তেন। এ ছাড়াও কল্যাণ ও নিরাপত্তা চেয়ে দু'আ করতেন। দু'আগুলো দু'আর বইগুলোতে দ্রষ্টব্য। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হাজ্জ)
আয-যুখরুফ 43:15
ওরা তাঁর দাসদের মধ্য হতে (কিছুকে) তাঁর সত্তার অংশ গণ্য করে।[১] মানুষ তো স্পষ্টই অকৃতজ্ঞ।
[১] عِبَادٌ বলতে ফিরিশতাগণ। আর جُزْءٌ বলতে কন্যাগণ; অর্থাৎ, ফিরিশতাগণ যাঁদেরকে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করে তাঁদের ইবাদত করত। এইভাবে তারা সৃষ্টিকে আল্লাহর শরীক এবং তাঁর অংশ মনে করত। অথচ তিনি এ সব থেকে পাক ও পবিত্র। কেউ কেউ جزء বলতে সেই সব পশুকে বুঝিয়েছেন, যার এক অংশকে নযর-নিয়ায স্বরূপ মুশিরকরা আল্লাহর নামে এবং আর এক অংশকে মূর্তিদের নামে বের করত। এর উল্লেখ সূরা আনআম ৬:১৩৬ নং আয়াতে হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:16
তিনি কি তাঁর সৃষ্টি হতে নিজে কন্যা-সন্তান গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন পুত্র সন্তান? [১]
[১] এতে তাদের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার কথা উল্লেখ হয়েছে যে, তারা আল্লাহর জন্য এমন সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করেছে যা তাদের নিজেদেরও পছন্দ নয়। অথচ আল্লাহর যদি সন্তান-সন্ততি হত, তাহলে কি এ রকম হত যে, তিনি নিজের জন্য কন্যা-সন্তান নিতেন, আর তোমাদেরকে পুত্র-সন্তান দিয়ে ধন্য করতেন?
আয-যুখরুফ 43:17
ওরা পরম দয়াময় আল্লাহর প্রতি যে কন্যা-সন্তান আরোপ করে, ওদের কাউকেও সে কন্যা সন্তানের সংবাদ দেওয়া হলে তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।
আয-যুখরুফ 43:18
(ওরা কি আল্লাহর প্রতি এমন সন্তান আরোপ করে,) যে অলংকারে লালিত-পালিত হয় এবং তর্ক-বিতর্ক কালে স্পষ্ট যুক্তি দানে অসমর্থ ? [১]
[১] يُنَشَّؤُ শব্দ نُشُوءٌ থেকে গঠিত। অর্থ, তরবিয়ত ও লালন-পালন। মহিলাদের দু'টি গুণ বিশেষ করে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। (ক) এদের লালন-পালন হয় অলংকারে ও সাজ-সজ্জায়। অর্থাৎ, সাবালিকা হওয়ার সাথে সাথেই সুন্দর ও মনোরম জিনিসের প্রতি তাদের মনের আকর্ষণ সৃষ্টি হয় (এবং নিজ দেহের সৌনদর্য ও সাজ-সজ্জা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আর তাদের ভরণ-পোষণ করতে হয় পুরুষকে)। এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যাদের অবস্থা হল এই, তারা তো তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারও ঠিক করে নেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। (খ) যদি কারো সাথে তর্ক-বিতর্ক হয়ে যায়, তবে তারা না তাদের কথা (প্রকৃতিগত পর্দা; কোমলতা ও লজ্জাশীলতার কারণে) ভালভাবে ব্যক্ত করতে পারে, আর না বিপক্ষের দলীলাদির খন্ডন করতে পারে। এই হল মহিলাদের দু'টি স্বভাবগত দুর্বলতা যার কারণে তাদের উপর পুরুষদের একধাপ বেশী শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আলোচ্য আয়াতের পূর্বাপর বাগধারা থেকেও এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা পরিষ্কার হয়। কারণ, আলোচনা এই ব্যাপারেই হচ্ছে। অর্থাৎ, পুরুষ ও মহিলার মধ্যে স্বভাবগত এই তফাতের কারণেই মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের জন্মকে বেশী পছন্দ করা হয়।
আয-যুখরুফ 43:19
ওরা দয়াময় আল্লাহর ফিরিশতাদেরকে নারী বলে স্থির করে, ওরা কি তাদের সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করেছিল? ওদের উক্তি লিপিবদ্ধ করা হবে এবং ওদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।[১]
[১] অর্থাৎ, প্রতিদানের জন্য। কারণ, ফিরিশতাদের আল্লাহর বেটি হওয়ার কোন দলীল তাদের কাছে বিদ্যমান নেই।
আয-যুখরুফ 43:20
ওরা বলে, ‘পরম দয়াময় ইচ্ছা না করলে আমরা এদের পূজা করতাম না।’ এ বিষয়ে ওদের কোন জ্ঞান নেই;[১] ওরা তো কেবল অনুমান-ভিত্তিক কথাই বলে।
[১] অর্থাৎ, নিজেদের কার্যকলাপের উপর আল্লাহর ইচ্ছার দোহাই দেয়। এটাই তাদের সব থেকে বড় দলীল। কেননা, বাহ্যিকভাবে এ কথা ঠিক যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কাজ না হয়, আর না হতে পারে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে অজ্ঞ যে, তাঁর ইচ্ছা তাঁর সন্তুষ্টি থেকে পৃথক জিনিস। অবশ্যই প্রতিটি কাজ তাঁর ইচ্ছায় হয়, কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট সেই কাজগুলোতেই হন, যার তিনি নির্দেশ দিয়েছেন; প্রত্যেক সেই কাজেই তিনি সন্তুষ্ট নন, যা মানুষ তাঁর (আল্লাহর) ইচ্ছার আওতায় করে থাকে। মানুষ চুরি, ব্যভিচার এবং অত্যাচার ও বড় বড় পাপ করে। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে কাউকেই এ সব করার সামর্থ্য দেবেন না। সত্বর তার হাত ধরে নিবেন, পায়ের চলা বন্ধ করে দিবেন এবং চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিবেন। কিন্তু এটা হবে বাধ্য করার ব্যাপার। অথচ তিনি মানুষকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন। যাতে তাকে পরীক্ষা করা যায়। আর এরই কারণে তিনি দুই প্রকারের কাজগুলোকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন; যেগুলোতে তিনি সন্তুষ্ট হন, সেগুলোও এবং যেগুলোতে তিনি সন্তুষ্ট নন, সেগুলোও। এই উভয় প্রকার কাজগুলোর মধ্য থেকে মানুষ যে কাজই করবে, আল্লাহ তার হাত ধরবেন না। হ্যাঁ, সে কাজ যদি অন্যায় ও পাপাচার হয়, তবে তিনি অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবেন। কেননা, সে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছে। আর দুনিয়াতে এই এখতিয়ার তার কাছ থেকে ছিনিয়েও নেবেন না। তবে কিয়ামতে এর শাস্তি অবশ্যই দেবেন।
আয-যুখরুফ 43:21
আমি কি ওদেরকে এ (কুরআনের) পূর্বে কোন গ্রন্থ দান করেছি যা ওরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে আছে? [১]
[১] অর্থাৎ, কুরআনের পূর্বে কোন কিতাব বা গ্রন্থ, যাতে এদেরকে গায়রুল্লাহর ইবাদত করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে এবং যেটাকে ওরা শক্ত করে ধরে আছে? অর্থাৎ, ব্যাপার এ রকম নয়, বরং তাদের কাছে পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ ব্যতীত কোন দলীল নেই।
আয-যুখরুফ 43:22
বরং ওরা বলে, ‘আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে পথপ্রাপ্ত।’
আয-যুখরুফ 43:23
এভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখনই ওদের মধ্যে যারা বিত্তশালী ছিল তারা বলত, ‘আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।’
আয-যুখরুফ 43:24
(প্রত্যেক সতর্ককারী) বলত, ‘তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষগণকে যার অনুসারী পেয়েছ, আমি যদি তোমাদের জন্য তা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পথনির্দেশ আনয়ন করি, তবুও কি তোমরা তাদের পদাংক অনুসরণ করবে?’ (প্রত্যুত্তরে) তারা বলত, ‘তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।’[১]
[১] অর্থাৎ, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণে এত শক্ত ছিল যে, পয়গম্বরের (সুপথের জন্য) আলোকপাত ও দলীল তাদেরকে তা থেকে ফিরাতে পারেনি। এই আয়াত অন্ধ অনুকরণ বাতিল হওয়ার এবং তার নিন্দাবাদের অনেক বড় দলীল। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ইমাম শাওকানীর ফাতহুল ক্বাদীর)
আয-যুখরুফ 43:25
সুতরাং আমি ওদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম। অতএব দেখ, মিথ্যাচারীদের পরিণাম কি হয়েছে?
আয-যুখরুফ 43:26
(স্মরণ কর,) যখন ইব্রাহীম তার পিতা এবং সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা যাদের পূজা কর, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই;
আয-যুখরুফ 43:27
সম্পর্ক আছে শুধু তাঁরই সাথে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। [১]
[১] অর্থাৎ, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে তাঁর দ্বীনের হিদায়াত দিয়ে তাতে সুদৃঢ়ও রাখবেন। আমি কেবল তাঁরই ইবাদত করব।
আয-যুখরুফ 43:28
এ ঘোষণাকে সে চিরন্তন বাণীরূপে তার পরবর্তীদের জন্য রেখে গেছে;[১] যাতে ওরা (সৎপথে) প্রত্যাবর্তন করে।[২]
[১] অর্থাৎ, এই কালেমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র অসিয়ত তাঁর সন্তানদেরকে করে গেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, {وَوَصَّى بِهَآ اِبْرَهِِيْمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوْبُ} (البقرة: ১৩২) কেউ কেউ جَعَلَهَا (ক্রিয়া)এর ফায়েল (কর্তৃকারক) আল্লাহকে বানিয়েছেন। অর্থাৎ, আল্লাহ এই কালেমাকে ইবরাহীম (আঃ)-এর পর তাঁর সন্তানদের মধ্যেও বাকী রাখেন এবং তা হল, তারা যেন কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করে।
[২] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে তাওহীদবাদীদের এই দল এই জন্য সৃষ্টি করেন যে, এঁদের তাওহীদের নসীহতে মানুষ শিরক থেকে ফিরে আসবে। لَعَلَّهُمْ এর সর্বনামের লক্ষ্য মক্কাবাসী। অর্থাৎ, হতে পারে মক্কাবাসী সেই দ্বীনের প্রতি ফিরে আসবে, যে দ্বীন ছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর এবং যে দ্বীনের ভিত্তি ছিল তাওহীদের উপর, শিরকের উপর নয়।
আয-যুখরুফ 43:29
বস্তুতঃ আমিই ওদেরকে এবং ওদের পূর্বপুরুষদেরকে উপভোগের সুযোগ দিয়েছিলাম[১] যতক্ষণ না ওদের কাছে সত্য ও স্পষ্ট প্রচারক রসূল এল। [২]
[১] এখানে আবারও সেই সমস্ত নিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যা মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করেছিলেন এবং নিয়ামতগুলো দেওয়ার পর আযাব প্রেরণ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা হয়নি, বরং তাদেরকে পূর্ণ অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। যার কারণে তারা ধোকায় পতিত হয়ে নিজেদের প্রবৃত্তির বান্দা বনে গিয়েছিল।
[২] 'হক' বা 'সত্য' বলতে কুরআন, আর 'রসূল' বলতে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। مُبِيْنٌ হল রসূলের 'সিফাত' (বিশেষণ)। স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে বর্ণনাকারী অথবা যাঁর রিসালাত একেবারে স্পষ্ট উজ্জ্বল। তাতে কোন প্রকারের অস্পষ্টতা ও প্রচ্ছন্নতা নেই।
আয-যুখরুফ 43:30
যখন ওদের কাছে সত্য এল, তখন ওরা বলল, ‘এ তো যাদু এবং আমরা এ প্রত্যাখ্যান করি।’[১]
[১] ওরা কুরআনকে যাদু গণ্য করে তা অস্বীকার করেছে। আর পরের শব্দগুলি দ্বারা নবী করীম (সাঃ)-কে তুচ্ছ ও হেয় গণ্য করেছে।
আয-যুখরুফ 43:31
ওরা বলে, ‘এ কুরআন কেন অবতীর্ণ করা হল না দু’টি জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির ওপর?’ [১]
[১] দু'টি জনপদ বলতে মক্কা ও তায়েফকে বুঝানো হয়েছে। আর প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি বলতে অধিকাংশ মুফাসসিরের নিকট মক্কার অলীদ বিন মুগীরা এবং তায়েফের উরওয়া বিন মাসউদ সাক্বাফীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেউ কেউ আরো কিছু নাম উল্লেখ করেছেন। তবে এর উদ্দেশ্য হল, এমন দু'টি ব্যক্তিত্বের নির্বাচন, যারা হবে পূর্ব থেকেই মহা সম্মান ও পদের অধিকারী, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিত্তশালী এবং সব-সব গোত্রে গণ্যমান্য। অর্থাৎ, কুরআন যদি অবতীর্ণ হত, তবে দু'টি শহরের মধ্য থেকে এ রকম কোন ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হত, ঐ মুহাম্মাদের উপর নয়, যার ঘর পার্থিব ধন-সম্পদ থেকে শূন্য এবং যে তার জাতির নেতৃত্ব ও সর্দারির পদেও প্রতিষ্ঠিত নয়।
আয-যুখরুফ 43:32
এরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বণ্টন করে![১] আমিই ওদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করেছি ওদের পার্থিব জীবনে এবং এককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছি; যাতে ওরা একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে[২] এবং ওরা যা জমা করে, তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর। [৩]
[১] 'রহমত' বা অনুগ্রহ-এর মানে নিয়ামত, সম্পদ। আর এখানে এর অর্থ নবুঅত; যা সবচেয়ে বড় নিয়ামত। 'ইস্তিফহাম' (প্রশ্ন) এখানে 'ইনকার' (অস্বীকৃতি) এর অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, এ কাজ তাদের নয় যে, তারা প্রতিপালকের নিয়ামতকে -- বিশেষ করে নবুঅতের মত নিয়ামতকে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী বণ্টন করবে। বরং এ কাজ কেবল প্রতিপালকের। কারণ, তিনিই সব কিছুর জ্ঞান রাখেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সমস্ত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত। তিনিই ভাল বুঝেন যে, মানুষের মধ্য থেকে নবুঅতের মুকুট কার মাথায় অধিক শোভনীয় হবে এবং স্বীয় অহী ও রিসালাত দানে কাকে ধন্য করতে হবে।
[২] অর্থাৎ, ধনে-মালে, পদমর্যাদায় এবং বুদ্ধি-জ্ঞানে আমি মানুষের মাঝে এই পার্থক্য ও তফাৎ এই জন্য রেখেছি যে, যাতে বেশী মালের অধিকারী ব্যক্তি স্বল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির কাছ থেকে, উচ্চ পদের মালিক তার চাইতে নিম্ন পদের মালিকের কাছ থেকে এবং অনেক বেশী জ্ঞান-বুদ্ধির মালিক তার চাইতে কম জ্ঞান-বুদ্ধির মালিকের কাছ থেকে কাজ নিতে পারে। মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ এই কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বজাহানের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যথা সকলেই যদি ধন-মালে, মান-সম্মানে, জ্ঞান-গরিমায় এবং বুদ্ধি-বিবেচনা ও অন্যান্য পার্থিব উপায়-উপকরণে সমান হত, তবে কেউ কারো কাজ করার জন্য প্রস্তুত হত না। অনুরূপ ছোট মানের ও তুচ্ছ মনে করা হয় এমন কাজও কেউ করত না। এ হল মানুষেরই প্রয়োজনীয় বিষয়; যা মহান আল্লাহ প্রত্যেককে পার্থক্য ও তফাতের মাঝে রেখেছেন এবং যার কারণে প্রত্যেক মানুষ অপর মানুষের মুখাপেক্ষী হয়। মানবিক সমস্ত প্রয়োজন কোন একজন মানুষ --তাতে সে যদি কোটিপতিও হয় তবুও --অন্য মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা না নিয়েই সে একাকী পূরণ করতে চাইলেও তা কোন দিন পারবে না।
[৩] এই রহমত বা অনুগ্রহ থেকে আখেরাতের সেই সব নিয়ামতকে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন।
আয-যুখরুফ 43:33
সত্যপ্রত্যাখ্যানে মানুষ এক মতাবম্বী হয়ে পড়বে[১] এ আশংকা না থাকলে পরম দয়াময়কে যারা অস্বীকার করে, তাদেরকে তিনি দিতেন ওদের গৃহের জন্য রৌপ্যনির্মিত ছাদ এবং সিঁড়ি; যাতে তারা আরোহণ করত।
[১] অর্থাৎ, দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও উপায়-উপকরণের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণে কেবল দুনিয়াকামীই হয়ে যাবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাত চাওয়া সব ভুলে যাবে --এ আশঙ্কা।
আয-যুখরুফ 43:34
দিতেন তাদের গৃহের জন্য রৌপ্যনির্মিত দরজা, বিশ্রামের জন্য পালঙ্ক,
আয-যুখরুফ 43:35
এবং স্বর্ণালংকার।[১] কিন্তু এ সব তো পার্থিব জীবনের ভোগসম্ভার। আর সাবধানীদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে পরকাল। [২]
[১] অর্থাৎ, কিছু জিনিস রূপার ও কিছু জিনিস সোনার। কেননা, রকমারি হলে আরো বেশী সুন্দর দেখায়। উদ্দেশ্য হল, দুনিয়ার ধন-মাল আমার দৃষ্টিতে এত তুচ্ছ যে, যদি উল্লিখিত আশঙ্কা না থাকত, তবে আল্লাহর সকল অস্বীকারকারীকে প্রচুর ধন-দৌলত দেওয়া হত। কিন্তু এতে বিপদ এই ছিল যে, সকল মানুষ দুনিয়ার পূজারী হয়ে যেত। দুনিয়া যে অতি তুচ্ছ তা এই হাদীস দ্বারাও পরিষ্কার হয়ে যায়। বলা হয়েছে, "যদি আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য একটি মশার ডানার সমানও হত, তবে মহান আল্লাহ কোন কাফেরকে এই দুনিয়া থেকে এক আঁচলা পানিও পান করতে দিতেন না।" (তিরমিযী, ইবনে মাজাহঃ যুহ্দ অধ্যায়)
[২] যারা শিরক ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর আনুগত্য করে, তাদের জন্য হল আখেরাত এবং জান্নাতের এমন সব নিয়ামত, যা ধ্বংসশীল ও শেষ হওয়ার নয়।
আয-যুখরুফ 43:36
যে ব্যক্তি পরম দয়াময় আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হয়[১] তিনি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করেন, অতঃপর সে হয় তার সহচর। [২]
[১] عَشَا يَعْشُو এর অর্থ হল, চোখের রোগ রাতকানা অথবা তার কারণে যে অন্ধত্ব আসে। অর্থাৎ, যে আল্লাহর যিকর থেকে অন্ধ (বা উদাসীন) হয়ে যায়।
[২] এই শয়তান আল্লাহর যিকর থেকে উদাসীন ব্যক্তির সাথী হয়ে যায়। সে সব সময় তার সাথে থেকে তাকে সমস্ত নেকীর কাজে বাধা দেয়। অথবা মানুষ নিজেই এই শয়তানের সঙ্গী হয়ে যায় এবং তার নিকট থেকে কোন সময় পৃথক হয় না, বরং সমস্ত কার্যকলাপে তারই অনুসরণ করে এবং তার যাবতীয় কুমন্ত্রণায় তার আনুগত্য করে।
আয-যুখরুফ 43:37
শয়তানেরাই মানুষকে সৎপথ হতে বিরত রাখে। আর মানুষ মনে করে, তারা সৎপথপ্রাপ্ত।[১]
[১] অর্থাৎ, এই শয়তান তার সত্যের পথে বাধা হয়ে তা থেকে তাকে বিরত রাখে এবং সব সময় তাকে বুঝায় যে, তুমি সত্যের উপর আছ। ফলে সে আসলেই নিজের ব্যাপারে এই ধারণা করতে লাগে যে, সে সত্যের উপর রয়েছে। অথবা কাফের শয়তানদেরকে সৎপথপ্রাপ্ত মনে করে এবং তাদের আনুগত্য করে চলে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আয-যুখরুফ 43:38
অবশেষে যখন সে আমার নিকট উপস্থিত হবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, ‘হায়! আমার ও তোমার মাঝে যদি পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান থাকত।’ সুতরাং কত নিকৃষ্ট সহচর সে! [১]
[১] مَشْرِقَيْنِ (দ্বিবচনঃ দুই পূর্ব) থেকে পূর্ব ও পশ্চিমকে বুঝানো হয়েছে। فَبِئْسَ الْقَرِيْنُ এর 'মাখসূস বিযযাম্ম' (নিন্দিত) ঊহ্য আছেঃ أَنْتَ أَيُّهَا الشَّيْطَانُ! হে শয়তান, তুমি অতীব নিকৃষ্ট সাথী। এটা কাফের কিয়ামতের দিন বলবে। কিন্তু সেদিন এই স্বীকৃতির লাভ কি হবে?
আয-যুখরুফ 43:39
ওদেরকে বলা হবে, ‘তোমরা সীমালংঘন করেছিলে; আজ তোমাদের এ অনুতাপ তোমাদের কোন কাজে আসবে না। নিশ্চয় তোমরা সকলেই শাস্তির ভাগী হবে।’
আয-যুখরুফ 43:40
তুমি কি বধিরকে শোনাতে পারবে? অথবা যে অন্ধ এবং যে ব্যক্তি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে তাকে কি পারবে সৎপথে পরিচালিত করতে? [১]
[১] অর্থাৎ, যার ব্যাপারে অনন্তকালের জন্য দুর্ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সে ওয়ায-নসীহত শোনার ব্যাপারে কানা ও কালা। তোমার দাওয়াত ও তবলীগে সে সঠিক পথে আসতে পারবে না। এখানে 'ইস্তিফহাম' (জিজ্ঞাসা) 'ইনকার' (অস্বীকৃতি) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যেভাবে বধির (কালা) শোনা হতে এবং অন্ধ দেখা থেকে বঞ্চিত, অনুরূপ প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় পতিত ব্যক্তিও সত্যের দিকে আসা থেকে বঞ্চিত। এতে নবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। যাতে এই ধরনের লোকদের কুফরীর কারণে তিনি বেশী অস্থিরতা অনুভব না করেন।
আয-যুখরুফ 43:41
আমি যদি তোমার মৃত্যু ঘটাই[১] তবুও আমি ওদের নিকট থেকে অবশ্যই প্রতিশোধ নেব;[২]
[১] অর্থাৎ, এদের উপর আযাব আসার পূর্বে যদি আমি তোমার মৃত্যু ঘটাই অথবা তোমাকে মক্কা থেকে বের করে নিই।
[২] দুনিয়াতেই, যদি আমার ইচ্ছা এর দাবী করে (তবেই), অন্যথায় আখেরাতের আযাব থেকে তো তারা কোনভাবেই বাঁচতে পারবে না।
আয-যুখরুফ 43:42
অথবা আমি ওদেরকে যে (শাস্তির) অঙ্গীকার করেছি, তোমাকে তা দেখিয়ে দেব।[১] নিশ্চয় ওদের ওপর আমার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।[২]
[১] অর্থাৎ, তোমার মৃত্যুর পূর্বেই অথবা মক্কাতেই তোমার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তাদের উপর আযাব প্রেরণ করে।
[২] অর্থাৎ, আমার যখন ইচ্ছা তাদের উপর আযাব প্রেরণ করতে পারি। কারণ, আমি তাদের উপর শক্তিশালী। সুতরাং রসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় বদরের যুদ্ধে কাফেররা শিক্ষামূলক পরাজয় এবং লাঞ্ছনার শিকার হয়।
আয-যুখরুফ 43:43
সুতরাং তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে তা দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর।[১] অবশ্যই তুমি তো সরল পথেই রয়েছ। [২]
[১] অর্থাৎ, কুরআন কারীমকে। তাতে অন্য যে কেউ তাকে মিথ্যা ভাবুক না কেন।
[২] এটা হল فَاسْتَمْسِكْ (কুরআন দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর)এর কারণ।
আয-যুখরুফ 43:44
নিশ্চয় তা তোমার এবং তোমার সম্প্রদায়ের জন্য উপদেশ;[১] আর অচিরেই তোমাদেরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে।
[১] এই নির্দিষ্টীকরণের অর্থ এই নয় যে, অন্যদের জন্য উপদেশ নয়। বরং সর্বপ্রথম সম্বোধন যেহেতু কুরাইশদেরকেই করা হয়েছে সেহেতু তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নচেৎ কুরআন তো সারা বিশ্বের জন্য উপদেশ। মহান আল্লাহ বলেন, {وَمَا هُوَ إِلاَّ ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِيْنَ} (সূরা কলম ৬৮:৫২ আয়াত) যেমন, রসূল (সাঃ)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, {وَاَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْاَقْرَبِيْنَ} অর্থাৎ, তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দেরকে সতর্ক কর। (সূরা শুআরা ২৬:২১৪ আয়াত) এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর পয়গাম কেবল আত্মীয়দের কাছেই পৌঁছাতে হবে। বরং এর অর্থ হল, তবলীগের কাজ শুরু হবে নিজের আত্মীয়দের থেকেই। কেউ কেউ 'যিকর' অর্থ এখানে 'সম্মান' করেছেন। অর্থাৎ, এই কুরআন তোমার জন্য ও তোমার জাতির জন্য সম্মানের উৎস। এই কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এটাকে তারাই বেশী বুঝত এবং এরই মাধ্যমে তারা সারা বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা পেতে পারে। কাজেই এদের উচিত এটাকে গ্রহণ করে এর দাবী অনুযায়ী সর্বাধিক আমল করা।
আয-যুখরুফ 43:45
তোমার পূর্বে আমি যে সব রসূল প্রেরণ করেছিলাম, তাদেরকে তুমি জিজ্ঞাসা কর,[১] পরম দয়াময় কি তিনি ব্যতীত ওদের জন্য কোন দেবতা স্থির করেছিলেন, যার উপাসনা করা হত?[২]
[১] নবীদেরকে এ প্রশ্ন হয়তো ইসরা ও মি'রাজের সময় বায়তুল মুক্বাদ্দাসে অথবা আসমানে করা হয়েছিল, যেখানে সমস্ত নবীদের সাথে রসূল (সাঃ)-এর সাক্ষাৎ হয়েছিল। অথবা এখানে أَتْبَاعَ শব্দ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, তাঁদের অনুসারীদের (ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের)-কে জিজ্ঞাসা কর। কেননা, তারা তাঁদের যাবতীয় শিক্ষা সম্পর্কে অবগত আছে এবং তাঁদের উপর অবতীর্ণকৃত কিতাবগুলোও তাদের কাছে বিদ্যমান।
[২] উত্তর অবশ্যই নেতিবাচক হবে। আল্লাহ কোন নবীকেই এই নির্দেশ দেননি। বরং এর বিপরীত প্রত্যেক নবীকে তাওহীদের প্রতি আহবান করারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:46
অবশ্যই মূসাকে আমি আমার নিদর্শনাবলীসহ ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট পাঠিয়েছিলাম; সে বলেছিল, ‘আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক কর্তৃক প্রেরিত।’[১]
[১] মক্কার কুরাইশরা বলেছিল যে, আল্লাহ যদি কাউকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করতেন, তবে মক্কা ও তায়েফের কোন এমন ব্যক্তিকে প্রেরণ করতেন, যে হত প্রতিপত্তি ও বিত্তশালী এবং সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী। যেমন, ফিরআউন মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলেছিল, "আমি মূসা অপেক্ষা উত্তম। এ তো আমার থেকে (মর্যাদায়) অনেক কম। এ তো পরিষ্কারভাবে কথা বলতেও পারে না।" যে কথা পরে আসছে। সম্ভবতঃ উভয় অবস্থার মধ্যে সাদৃশ্য থাকার কারণে এখানে মূসা (আঃ) ও ফিরআউনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া এতে নবী কারীম (সাঃ)-এর জন্য সান্ত্বনারও একটি দিক রয়েছে যে, মূসা (আঃ)-কেও বহু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। সে ধৈর্য ও দৃঢ় সংকল্প অবলম্বন করেছিল। অনুরূপ তুমিও মক্কার কাফেরদের দেওয়া কষ্ট ও অভদ্র ব্যবহারে দুঃখিত না হয়ে ধৈর্য ও হিম্মত বজায় রাখ। পরিশেষে তুমিও মূসা (আঃ)-এর মত বিজয়ী ও সফল হবে। আর মক্কাবাসীরা ফিরআউনের মতই ব্যর্থ ও অসফল হবে।
আয-যুখরুফ 43:47
সে ওদের নিকট আমার নিদর্শনাবলীসহ আসা মাত্র ওরা তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে লাগল।[১]
[১] অর্থাৎ, মূসা (আঃ) যখন ফিরআউন ও তার সভাসদদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন, তখন তারা তাঁর রসূল হওয়ার দলীল তলব করল। তিনি তখন সেই সব দলীল ও মু'জিযাগুলি পেশ করলেন, যা আল্লাহ তাঁকে দিয়ে ছিলেন। সেগুলো দেখে তারা উপহাস ও বিদ্রূপ করল এবং বলল যে, এগুলো কি এমন জিনিস? এগুলো তো যাদুর মাধ্যমে আমরাও পেশ করতে পারি।
আয-যুখরুফ 43:48
আমি ওদেরকে যে নিদর্শন দেখিয়েছি তার প্রত্যেকটি ছিল ওর পূর্ববর্তী নিদর্শন অপেক্ষা বৃহত্তর।[১] আমি ওদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম; যাতে ওরা সৎপথে প্রত্যাবর্তন করে।[২]
[১] এই নিদর্শনগুলো হল সেই নিদর্শন, যা তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ এবং রক্ত ইত্যাদির আকারে একের পর এক তাদেরকে দেখানো হয়েছিল। যার উল্লেখ সূরা আ'রাফ ৭:১৩৩-১৩৫ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। পরে আগত প্রত্যেক নিদর্শন পূর্বের চেয়ে আরো বৃহত্তর ছিল এবং এর ফলে মূসা (আঃ)-এর সত্যতা আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে যেত।[২] এই নিদর্শনসমূহ অথবা আযাব দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা নবীকে মিথ্যা মনে করা থেকে বিরত হয়।
আয-যুখরুফ 43:49
ওরা বলেছিল, ‘হে যাদুকর![১] তোমার প্রতিপালক[২] তোমার প্রতি যে অঙ্গীকার করেছেন[৩] তুমি তাঁর নিকট আমাদের জন্য তা প্রার্থনা কর; (অঙ্গীকার পূর্ণ করলে) আমরা অবশ্যই সৎপথ অবলম্বন করব।’ [৪]
[১] বলা হয় যে, সে যুগে যাদু কোন নিন্দনীয় জিনিস ছিল না। বড় জ্ঞানীদেরকে সম্মানার্থে 'যাদুকর' বলে সম্বোধন করা হত। এ ছাড়া সমস্ত মু'জিযা এবং নিদর্শনের ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল যে, এ সব হল মূসা (আঃ)-এর যাদুর ভেলকি। তাই তারা তাঁকে 'যাদুকর' বলে সম্বোধন করল।
[২] "তোমার প্রতিপালক" এ কথা তারা তাদের শিরকীয় ধারণার ভিত্তিতে বলেছিল। কারণ, মুশরিকদের বিভিন্ন প্রতিপালক ও উপাস্য হত। অর্থাৎ, ওহে মূসা! তোমার প্রতিপালক দ্বারা এ কাজ করিয়ে নাও!
[৩] অর্থাৎ, আমরা ঈমান আনলে আযাব প্রত্যাহার করার অঙ্গীকার।
[৪] যদি এ আযাব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তবে আমরা তোমাকে সত্য রসূল বলে মেনে নেব এবং তোমার প্রতিপালকেরই ইবাদত করব। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা নিজেদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করত। যেমন, পরের আয়াতে এসেছে এবং সূরা আ'রাফেও এ কথা উল্লিখিত হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:50
অতঃপর যখন আমি ওদের ওপর হতে শাস্তি বিদূরিত করলাম, তখনই ওরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করল।
আয-যুখরুফ 43:51
ফিরআউন তার সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বলেছিল,[১] ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি কি মিশরের অধিপতি নই? এই নদীগুলি আমার নিম্নদেশে প্রবাহিত, [২] তোমরা কি দেখ না?
[১] যখন মূসা (আঃ) এমন কয়েকটি নিদর্শন পেশ করেছিলেন, যার পরেরটি ছিল প্রথমটির চেয়ে আরো বৃহত্তর, তখন ফিরআউন নিজ জাতির মূসা (আঃ)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কা বোধ করল। তাই সে তার পরাজয়ের গ্লানিকে ঢাকার জন্য এবং অব্যাহতভাবে স্বীয় জাতিকে ধোকায় পতিত রাখার জন্য নতুন ফন্দি এই আঁটল যে, স্বীয় সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে মূসা (আঃ)-এর অমর্যাদা ও অপদস্থতাকে প্রকাশ করা হোক, যাতে জাতি তার প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ভয় করে।
[২] এ থেকে বুঝানো হয়েছে নীল-নদ অথবা তার কিছু শাখা-প্রশাখা (অববাহিকা) যা ফিরআউনের মহলের নীচে দিয়ে অতিক্রম করত।
আয-যুখরুফ 43:52
আমি যে এ ব্যক্তি হতে শ্রেষ্ঠ, যে নীচ[১] এবং স্পষ্ট কথা বলতেও অক্ষম? [২]
[১] أَمْ এখানে 'ইযরাব' অর্থাৎ, بَلْ (বরং) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আবার কারো নিকট أَمْ 'ইস্তিফহামিয়া' (প্রশ্নবোধক) শব্দ।[২] এখানে মূসা (আঃ)-এর তোতলা হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর এ কথা সূরা ত্বাহা ২০:২৭ আয়াতেও আলোচিত হয়েছে।
আয-যুখরুফ 43:53
সে নবী হলে তাকে স্বর্ণের বালা দেওয়া হল না কেন[১] অথবা তার সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণ এল না কেন?’ [২]
[১] সে যুগে মিসর ও পারস্যের বাদশাহরা (জনসাধারণের উপর) পৃথক মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানকে বিকশিত করার জন্য সোনার বালা পরিধান করত। অনুরূপ গোত্রের সর্দারদের হাতেও সোনার বালা এবং গলায় সোনার হার ও চেন পরিয়ে দেওয়া হত। আর এগুলোকে তাদের সর্দারির নিদর্শন মনে করা হত। এই জন্যই ফিরআউন মূসা (আঃ) সম্পর্কে বলল যে, যদি তাঁর কোন মর্যাদা ও পৃথক কোন বৈশিষ্ট্য থাকত, তবে তাঁর হাতে সোনার বালা থাকা উচিত ছিল।
[২] যাঁরা এ কথার সত্যায়ন করতেন যে, এ (মূসা) হলেন আল্লাহর রসূল। অথবা বাদশাহদের মত তাঁর মান-মর্যাদাকে প্রকাশ করার জন্য তাঁর সাথে থাকতেন।
আয-যুখরুফ 43:54
এভাবে সে তার সম্প্রদায়কে বেওকুফ বানাল। আর ওরা তার কথা মেনে নিল।[১] ওরা তো ছিল এক সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।
[১] اِستَخَفَّ قَومَه অর্থাৎ, اسْتَخَفَّ عُقُوْلَهُمْ সে তার জাতির জ্ঞানকে অতি তুচ্ছ ভাবল (তাদেরকে বেঅকুফ বানাল) অথবা তাদেরকে বোকা বানিয়ে তাদের মূর্খতা ও ভ্রষ্টতায় অটল থাকতে তাকীদ করল এবং জাতিও তার কথা মেনে নিল।
আয-যুখরুফ 43:55
যখন ওরা আমাকে ক্রোধান্বিত করল, আমি ওদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম এবং ওদের সকলকে ডুবিয়ে মারলাম।
আয-যুখরুফ 43:56
পরবর্তীদের জন্য আমি ওদেরকে অতীত নমুনা ও দৃষ্টান্ত করে রাখলাম। [১]
[১] آسَفُونَا এর অর্থ أَسْخَطُوْنَا অথবা أَغْضَبُونَا আর سَلَفٌ হল سَالِفٌ এর বহুবচন। যেমন, خَدَمٌ হল خاَدِمٌ এর এবং حَرَسٌ হল حَارِسٌ এর বহুবচন। 'সালাফ'এর অর্থ হল, যে জিনিস স্বীয় অস্তিত্বে অন্যের পূর্বে হয় (পূর্ববর্তী)। অর্থাৎ, তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় উপদেশ ও দৃষ্টান্ত বানিয়ে দিলাম। যাতে এই প্রজন্মের মানুষরা ফিরআউনের মত কুফরী, যুলুম, সীমালঙ্ঘন এবং ফাসাদ না করে। তাহলে তারা সেই রকম শিক্ষামূলক অবস্থার সম্মুখীন হওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকবে, যার সম্মুখীন হয়েছিল ফিরআউন।
আয-যুখরুফ 43:57
যখন মারয়্যাম-তনয় (ঈসা)র দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শোরগোল আরম্ভ করে দেয়,
আয-যুখরুফ 43:58
এবং বলে, ‘আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা?’ এরা কেবল বিতর্কের উদ্দেশ্যেই তোমাকে এ কথা বলে। বস্তুতঃ এরা তো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়। [১]
[১] পৌত্তলিকতা ও শিরকের খন্ডন এবং মিথ্যা উপাস্যগুলোর অসহায়তার কথা পষ্কিারভাবে তুলে ধরার জন্য মক্কার মুশরিকদেরকে বলা হত যে, তোমাদের সাথে তোমাদের উপাস্যগুলোও জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর লক্ষ্য হত, পাথরের সেই মূর্তিগুলো, যার তারা পূজা করত। এ থেকে লক্ষ্য কিন্তু সেই সৎলোক (নবী-অলী)গণ নন, যাঁরা তাঁদের জীবদ্দশায় মানুষদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। অতঃপর তাঁদের মৃত্যুর পর ভক্তরা তাঁদেরকেও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদের ব্যাপারে কুরআন কারীমে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবে। {إِنَّ الَّذِيْنَ سَبَقَتْ لَهُمْ مِّنَّا الْحُسْنَى اُولَئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُوْنَ} (الأنبياء: ১০১) কারণ, এতে তাঁদের কোন দোষ নেই। আর এই জন্যই কুরআন এই মূর্তিগুলোর ব্যাপারে مَا শব্দ ব্যবহার করেছে; যা জ্ঞানহীন প্রাণী বা বস্তুর জন্য ব্যবহার হয়। সুতরাং এ থেকে আম্বিয়া ও সৎলোকেরা বের হয়ে যান; যাঁদেরকে লোকেরা নিজে থেকেই উপাস্য বানিয়ে রেখেছিল। অর্থাৎ, এটা হতে পারে যে, অন্যান্য মূর্তিদের সাথে তাঁদের আকৃতিতে বানানো মূর্তিগুলোকেও আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, কিন্তু এ লোকগুলো তো অবশ্যই জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবেন। মুশরিকরা নবী (সাঃ)-এর পবিত্র জবানে ঈসা (আঃ)-এর সুনাম শুনে এই অসার তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হত যে, যদি ঈসা প্রশংসার যোগ্য হন অথচ খ্রিষ্টানরা তাঁকে উপাস্য বানিয়েছে, তবে আবার আমাদের উপাস্যগুলো নিন্দিত হল কিভাবে? এরাও কি উত্তম নয়? কিংবা আমাদের উপাস্যগুলো যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে ঈসা ও উযায়েরও জাহান্নামে যাবেন। মহান আল্লাহ এখানে বললেন, আনন্দে তাদের শোরগোল করা তাদের বিতর্ক বৈ কিছুই নয়। তাছাড়া তর্কের অর্থই এই হয় যে, বিতর্ককারীর কাছে কোন দলীল থাকে না। কিন্তু নিজের মত বহাল রাখার জন্য অযথা কথা কাটাকাটি করে।
আয-যুখরুফ 43:59
সে তো ছিল আমারই এক দাস, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনী ইস্রাঈলের জন্য নিদর্শনস্বরূপ।[১]
[১] প্রথমতঃ এই দিক দিয়ে যে, পিতা ছাড়াই তাঁর জন্ম হয়। দ্বিতীয়তঃ স্বয়ং তাঁকে মৃতকে জীবন দান ইত্যাদি যে সকল মু'জিযা দেওয়া হয়েছিল, সেই দিক দিয়েও।
আয-যুখরুফ 43:60
আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের পরিবর্তে ফিরিশতাদেরকে পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করতে পারতাম।[১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদেরকে শেষ করে তোমাদের স্থানে ফিরিশতাদেরকে আবাদ করতাম। তারা তোমাদেরই মত পরস্পরের প্রতিনিধিত্ব করত। অর্থাৎ, ফিরিশতাদের আসমানে থাকা এমন কোন মর্যাদার ব্যাপার নয় যে, তাদের ইবাদত করা হবে। এটা কেবল আমি আমার ইচ্ছা ও ফায়সালায় ফিরিশতাদেরকে আসমানে এবং মানুষদেরকে যমীনে আবাদ করেছি। আমি ইচ্ছা করলে ফিরিশতাদেরকেও যমীনে আবাদ করতে পারি।
আয-যুখরুফ 43:61
নিশ্চয় ঈসা কিয়ামতের একটি নিদর্শন;[১] সুতরাং তোমরা কিয়ামতে অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমার অনুসরণ কর। এটিই সরল পথ।
[১] عِلْمٌ এর অর্থ নিদর্শন। অধিকাংশ মুফাসসেরের নিকট এর অর্থ হল, কিয়ামতের নিকটতম সময়ে তাঁর আসমান থেকে অবতরণ হবে। এ কথা অনেক সহীহ ও বহুধা সূত্রে বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এই অবতরণ এ কথার নিদর্শন হবে যে, কিয়ামত অতি নিকটে। এই জন্যই কেউ কেউ এটাকে আ'য়ন এবং লামে যবর দিয়ে (عَلَمٌ) পড়েছেন। যার অর্থ হয়, নিদর্শন। আবার কারো নিকট তাঁকে কিয়ামতের নিদর্শন গণ্য করা হয়েছে তাঁর জন্মের অলৌকিকতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যেভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বিনা পিতায় সৃষ্টি করেছেন, তাঁর এই জন্ম প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন। সুতরাং আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতার দিকে লক্ষ্য করলে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না। إِنَّهُ তে সর্বনাম থেকে উদ্দিষ্ট হলেন ঈসা (আঃ)।
আয-যুখরুফ 43:62
শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই এ হতে নিবৃত্ত না করে, সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আয-যুখরুফ 43:63
ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এল, তখন সে বলেছিল, ‘আমি তো তোমাদের নিকট প্রজ্ঞাসহ এসেছি; তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ, তা স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য।[১] সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর।
[১] এর জন্য দেখুন, সূরা আল ইমরানের ৩:৫নং আয়াতের টীকা।
আয-যুখরুফ 43:64
নিশ্চয় আল্লাহই আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক, অতএব তাঁর উপাসনা কর, এটিই সরল পথ।’
আয-যুখরুফ 43:65
অতঃপর ওদের বিভিন্ন দল নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল;[১] সুতরাং সীমালংঘনকারীদের জন্য দুর্ভোগ মর্মন্তুদ দিনের শাস্তির।
[১] এ থেকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বুঝানো হয়েছে। ইয়াহুদীরা তো ঈসা (আঃ)-এর মর্যাদা ক্ষুন্ন করে তাঁকে --নাউযুবিল্লাহ -- জারজ সন্তান গণ্য করে। আর খ্রিষ্টানরা তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে তাঁকে উপাস্য বানিয়ে নেয়। অথবা এ থেকে খ্রিষ্টানদেরই বিভিন্ন দলকে বুঝানো হয়েছে। এরা আপোসে ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে কঠোর পরস্পর-বিরোধী মত পোষণ করে। একদল তাঁকে আল্লাহর পুত্র, অন্যদল তাঁকে আল্লাহ ও তিনের মধ্যে একজন মনে করে এবং আর একদল তাঁকে মুসলিমদের মত আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল গণ্য করে।
আয-যুখরুফ 43:66
ওরা তো ওদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে কিয়ামত আসারই অপেক্ষা করছে।
আয-যুখরুফ 43:67
বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হয়ে পড়বে, তবে সাবধানীরা নয়। [১]
[১] কেননা, কাফেরদের বন্ধুত্ব কেবল কুফরী ও পাপাচারের ভিত্তিতে হয় এবং এই কুফরী ও পাপাচারই তাদের আযাবের কারণ হবে। আর এরই কারণে তারা একে অপরকে দোষারোপ করবে এবং পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে ঈমানদার ও আল্লাহভীরু লোকদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও ভালবাসা যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ভিত্তিতে হয়, আর এই দ্বীন ও ঈমানই হল কল্যাণ ও সওয়াব লাভের মাধ্যম, সেহেতু তাঁদের এই বন্ধুত্বে কোন বিচ্ছেদ ঘটবে না। আখেরাতেও তাঁদের এই বন্ধুত্ব অটুট থাকবে, যেমন দুনিয়াতে ছিল।
আয-যুখরুফ 43:68
হে আমার দাসগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। [১]
[১] এটা কিয়ামতের দিন সেই আল্লাহভীরুদেরকে বলা হবে, যাঁরা দুনিয়াতে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা রাখত। বহু হাদীসেও এর ফযীলতের কথা এসেছে। এমন কি আল্লাহর নিমিত্তে ভালবাসা রাখা এবং তাঁরই নিমিত্তে বিদ্বেষ পোষণ করাকে ঈমান পরিপূর্ণতার বুনিয়াদ বলা হয়েছে। মহানবী (সাঃ) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ঘৃণা করে, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দান করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই কিছু দান করা হতে বিরত থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী।" (সহীহ আবূ দাঊদ ৩৯১০ নং) আর এমন দুই বন্ধু কিয়ামতের দিনে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, যেদিন সেই ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না।
আয-যুখরুফ 43:69
যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিলে এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) ছিলে।
আয-যুখরুফ 43:70
তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। [১]
[১] أَزْوَاجُكُمْ থেকে কেউ মু'মিন (পার্থিব) স্ত্রীগণ, কেউ মু'মিন বন্ধু এবং কেউ জান্নাতের স্ত্রী হুরগণ অর্থ নিয়েছেন। আর সব অর্থই সঠিক। কারণ, এরা সকলেই জান্নাতে যাবে। تُحْبَرُوْنَ শব্দ حَبْرٌ থেকে গঠিত। অর্থাৎ, সেই আনন্দ ও প্রফুল্লতা যা তাঁরা জান্নাতের নিয়ামত ও সম্মানের কারণে অনুভব করবে।
আয-যুখরুফ 43:71
স্বর্ণের থালা ও পান পাত্র নিয়ে ওদের মাঝে ফিরানো হবে,[১] সেখানে রয়েছে এমন সমস্ত কিছু, যা মন চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে।
[১] صِحَافٌ হল صَحْفَةٌ এর বহুবচন। এর অর্থ থালা বা প্লেট। সব চেয়ে বড় পাত্রকে جُفْنَةٌ বলা হয়। তার থেকে ছোটকে قَصْعَةٌ (যাতে দশজন মানুষ পেট ভরে খেতে পারবে।) এর থেকে ছোটকে صَحْفَةٌ (যা قَصْعَةٌ এর অর্ধেক) এবং তার থেকে ছোটকে مَكِيْلَةٌ বলা হয়। অর্থাৎ, জান্নাতীরা জান্নাতে যে খাদ্য লাভ করবে তা সোনার প্লেটে দেওয়া হবে।
আয-যুখরুফ 43:72
এটিই জান্নাত, তোমরা তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ যার অধিকারী হয়েছ।[১]
[১] অর্থাৎ, যেভাবে একজন ওয়ারেস (উত্তরাধিকারী) মীরাসের মালিক হয়, অনুরূপ জান্নাতও একটি মীরাস; যার ওয়ারিস হবে তারা, যারা দুনিয়াতে ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে জীবন-যাপন করেছে।
আয-যুখরুফ 43:73
সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা থেকে তোমরা আহার করবে।
আয-যুখরুফ 43:74
নিশ্চয় অপরাধীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে,
আয-যুখরুফ 43:75
ওদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং ওরা তাতে (শাস্তি ভোগ করতে করতে) হতাশ হয়ে পড়বে। [১]
[১] অর্থাৎ, মুক্তি পাওয়া থেকে হতাশ ও নিরাশ।
আয-যুখরুফ 43:76
আমি ওদের প্রতি অন্যায় করিনি, কিন্তু ওরা নিজেরাই নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছে।
আয-যুখরুফ 43:77
ওরা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালেক (দোযখের অধিকর্তা)![১] তোমার প্রতিপালক আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিন।’[২] সে বলবে, ‘তোমরা তো (চিরকাল) অবস্থান করবে।’[৩]
[১] জাহান্নামের দারোগার নাম।
[২] অর্থাৎ, আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন, যাতে আযাব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যাই।
[৩] অর্থাৎ, সেখানে মৃত্যু আবার কোথায়? শাস্তির এই জীবন মৃত্যু অপেক্ষা আরো নিকৃষ্টতর হবে। আর এ ছাড়া তো অন্য কোন উপায়ও থাকবে না।
আয-যুখরুফ 43:78
(আল্লাহ বলবেন,) আমি তো তোমাদের নিকট সত্য পৌঁছে দিয়েছিলাম; কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই তো সত্যবিমুখ ছিলে।[১]
[১] এটা আল্লাহ তাআলার উক্তি অথবা ফিরিশতাগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে বলবেন। যেমন কোন বড় অফিসার প্রশাসন বা সরকারের তরফ থেকে 'আমরা' শব্দ ব্যবহার করে। এখানে أكثر (অধিকাংশ) অর্থ সবাই। অর্থাৎ, সমস্ত জাহান্নামী। অথবা أكثر বলতে নেতা ও সর্দারদেরকে বুঝানো হয়েছে। অন্যান্য জাহান্নামীরা তাদের অনুসারী হওয়ার দরুন তাদের মধ্যেই শামিল থাকবে। حَقّ (সত্য) বলতে সেই দ্বীন ও পয়গাম, যা পয়গম্বরগণের মাধ্যমে মানুষের মাঝে পাঠিয়েছেন। আর সর্বশেষ حق (সত্য) হল কুরআন ও ইসলাম।
আয-যুখরুফ 43:79
ওরা কি কোন কিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে? আমিও তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। [১]
[১] إِبْرَامٌ এর অর্থ হল, সুদৃঢ়, চূড়ান্ত, পাকাপোক্ত ও মজবুত করা। أَمْ এখানে بَلْ অর্থে ব্যবহূত। অর্থাৎ, এই জাহান্নামীরা সত্যকে কেবল অপছন্দই করেনি, বরং তার বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত সংগঠিত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তও করেছে। তাদের জওয়াবে আমিও চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলাম। আর আমার থেকে অধিক বলিষ্ঠ ব্যবস্থা কে গ্রহণ করতে পারে? এই অর্থেরই আয়াত হল এইটাঃ {اَمْ يُرِيْدُوْنَ كَيْدًا فَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا هُمُ الْمَكِيْدُوْنَ} (الطور: ৪২)
আয-যুখরুফ 43:80
ওরা কি মনে করে যে, আমি ওদের গোপন বিষয় ও গোপন পরামর্শের খবর রাখি না? অবশ্যই (রাখি)।[১] আমার দূতগণ তো ওদের কাছে থেকে সব লিপিবদ্ধ করে। [২]
[১] অর্থাৎ, গুপ্ত কথাবার্তা যা তারা নিজেদের অন্তরে লুকিয়ে রাখে অথবা নির্জনে চুপেচুপে বলে কিংবা আপোসে যে কানাকানি করে, তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের এ সব কিছু শুনি না? অর্থাৎ, আমি সব শুনি ও জানি।
[২] অর্থাৎ, অবশ্যই শুনি। এ ছাড়া আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ পৃথক পৃথকভাবে তাদের সমস্ত কথাবার্তা লিখে রাখে।
আয-যুখরুফ 43:81
বল, ‘পরম দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান থাকলে আমিই হতাম তার উপাসকগণের অগ্রণী।’[১]
[১] কেননা, আমি আল্লাহর বাধ্য ও তাঁর অনুগত বান্দা। যদি সত্যিকারই তাঁর সন্তান-সন্ততি হত, তবে সর্বপ্রথম আমিই তাদের ইবাদত ও উপাসনা করতাম। আসলে মুশরিকদের বিশ্বাসকে বাতিল ও খন্ডন করা হয়েছে; যারা আল্লাহর সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করে।
আয-যুখরুফ 43:82
ওরা যা আরোপ করে তা হতে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী পবিত্র ও মহান।[১]
[১] এটা আল্লাহর উক্তি, যাতে তিনি তাঁর (সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে) মুক্ত ও পবিত্রতা হওয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছেন। অথবা রসূল (সাঃ)-এর কথা, তিনিও আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে সেই সব জিনিস থেকে মুক্ত এবং পাক ও পবিত্র হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর সাথে মুশরিকরা আল্লাহকে সম্পৃক্ত করে।
আয-যুখরুফ 43:83
অতএব ওদেরকে যে দিনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে[১] তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ওদেরকে সমালোচনা ও খেল-তামাশা করতে দাও। [২]
[১] অর্থাৎ, এখন যদি ওরা হিদায়াতের পথ অবলম্বন না করে, তবে তুমি তাদেরকে নিজ অবস্থাতেই ছেড়ে দাও এবং দুনিয়ার খেলা-ধূলায় মেতে থাকতে দাও। এটা হল ধমক ও হুঁশিয়ারি।
[২] তাদের চোখ সেই দিনই খুলবে, যেদিন তাদের এই আচরণের পরিণাম তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়ে যাবে।
আয-যুখরুফ 43:84
তিনিই উপাস্য নভোমন্ডলে, তিনিই উপাস্য ভূমন্ডলে[১] এবং তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
[১] এ রকম নয় যে, আকাশের উপাস্য অন্য একজন এবং পৃথিবীর উপাস্য আর একজন। বরং যেমন এই উভয়েরই সৃজনকর্তা একজনই, অনুরূপ উপাস্যও একজনই। এই অর্থেরই আয়াত হল এটা, {وَهُوَ اللهُ فِي السَّمَوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ يَعْلَمُ سِرَّكُمْ وَجَهْرَكُمْ وَيَعْلَمُ مَا تَكْسِبُوْنَ} (الأنعام: ৩) অর্থাৎ, তিনিই আল্লাহ আসমানে এবং যমীনে। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য জানেন এবং তোমরা যা কর, তাও অবগত। (আনআমঃ ৩)
আয-যুখরুফ 43:85
কত মহান তিনি যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং ওদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর সার্বভৌম অধিপতি।[১] কিয়ামতের জ্ঞান কেবল তাঁরই আছে[২] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [৩]
[১] এমন সত্তা যিনি সমস্ত এখতিয়ারের মালিক এবং আকাশ-পৃথিবীর রাজত্ব যাঁর হাতে, তাঁর সন্তান-সন্ততির কিসের প্রয়োজন?
[২] যা তিনি যথাসময়েই প্রকাশ করবেন।
[৩] যেখানে তিনি প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেবেন।
আয-যুখরুফ 43:86
আল্লাহর পরিবর্তে ওরা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের অধিকার তাদের নেই।[১] তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর (সত্যের) সাক্ষ্য দেয় তাদের কথা স্বতন্ত্র। [২]
[১] অর্থাৎ, দুনিয়াতে যে বাতিল উপাস্যগুলোর এরা পূজা-অর্চনা করে এই মনে করে যে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করবে। তাদের সুপারিশ করার মোটেই কোন এখতিয়ার ও যোগ্যতা নেই।
[২] হক বা সত্য বলতে বুঝানো হয়েছে, তাওহীদের কালেমা 'লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ'কে। এর স্বীকৃতি ও সাক্ষ্য জ্ঞান ও উপলব্ধির ভিত্তিতে হবে। (এর অর্থ না বুঝে) কেবল প্রথাগত ও (অন্যের) দেখাদেখির ভিত্তিতে যেন না হয়। অর্থাৎ, মৌখিকভাবে কালেমা তাওহীদের ঘোষণাদাতাকে জেনে রাখতে হবে যে, এতে কেবল এককভাবে আল্লাহর উপাস্যত্বকেই সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং অন্যান্য সমস্ত উপাস্যের উপাস্যত্ব নাকচ করা হয়েছে। অতঃপর (আন্তরিকভাবে) এই অনুযায়ী হবে তার আমল। এ রকম লোকের ব্যাপারে সুপারিশকারীদের সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে। অথবা অর্থ হল, সুপারিশ করার অধিকার কেবল তাঁরাই লাভ করবেন, যাঁরা সত্যকে স্বীকার করবেন। অর্থাৎ, আম্বিয়া, নেকলোক এবং ফিরিশতাগণ এই অধিকার লাভ করবেন। সেই বাতিল উপাস্যরা নয়, যাদেরকে মুশরিকরা মনগড়াভাবে নিজেদের সুপারিশকারী মনে করে থাকে।
আয-যুখরুফ 43:87
যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘কে ওদেরকে সৃষ্টি করেছে?’ ওরা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ তবুও ওরা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?
আয-যুখরুফ 43:88
আর রসূলের উক্তি,[১] ‘হে আমার প্রতিপালক! এরা তো সেই সম্প্রদায় যারা বিশ্বাস করবে না।’ (এর জ্ঞান কেবল তাঁরই আছে।)
[১] وَقِيْلِهِ এর সংযোগ হল وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ এর সাথে। অর্থাৎ, وَعِلْمُ قِيْلِهِ আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান এবং স্বীয় পয়গম্বরের অভিযোগের জ্ঞান।
আয-যুখরুফ 43:89
সুতরাং তুমি ওদেরকে উপেক্ষা কর এবং বল, ‘শান্তির সম্ভাষণ (সালাম)।’[১] ওরা শীঘ্রই (এর শেষ ফল) জানতে পারবে।
[১] এ সালাম হল সম্পর্কচ্ছেদ করার সালাম। যেমন, সূরা ক্বাসাস ২৮:৫৫ আয়াত {سَلاَمٌ عَلَيْكُنمْ لاَ نَبْتَغِيْ الْجَاهِلِيْنَ} এবং সূরা ফুরকান ২৫:৬৩ আয়াত {قَالُوْا سَلاَمًا} -এ রয়েছে। অর্থাৎ, দ্বীনের ব্যাপারে আমার ও তোমাদের পথ ভিন্ন ভিন্ন। তোমরা যদি ফিরে না এসো তো ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও, আমিও আমার কাজ করে যাচ্ছি। অতঃপর অতি সত্বর জেনে নেবে যে, কে সত্যবাদী, আর কে মিথ্যাবাদী।
আদ-দুখান 44:1
হা-মীম,
আদ-দুখান 44:2
সুস্পষ্ট গ্রন্থের শপথ!
আদ-দুখান 44:3
নিশ্চয় আমি এ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় (আশিসপূত শবেকদর) রাতে;[১] নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। [২]
[১] (لَيْلَةٌ مُبَارَكَةٌ) বরকতময় বা আশিসপূত রাত বলতে (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) কদরের রাত (শবেক্বদরকে) বুঝানো হয়েছে। যেমন, অন্যত্র পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, {اِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ} অর্থাৎ, আমি এ কুরআন শবেক্বদরে (মহিয়সী রাতে) অবতীর্ণ করেছি। (সূরা কদর) আর এই শবেক্বদর রমযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে কোন একটি রাত; যেমন হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সুতরাং কুরআন অবতীর্ণ হয় রমযান মাসে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, {شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ} অর্থাৎ, রমযান মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা বাক্বারাহ ২:১৮৫) এই আয়াতে কদরের এই রাতকে বরকতময় রাত গণ্য করা হয়েছে। আর এই বরকতময় হওয়াতে সন্দেহই বা কি? প্রথমতঃ এ রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এ রাতে বহু ফিরিশতা সহ জিবরীল আমীনও অবতরণ করেন। তৃতীয়তঃ সারা বছরে সংঘটিত হবে এমন ঘটনাবলীর ফায়সালা করা হয়। (যে কথা পরে আসছে।) চতুর্থতঃ এই রাতের ইবাদত হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) এর ইবাদতের থেকেও উত্তম। শবেকদর বা বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার অর্থ হল, এই রাত থেকে নবী (সাঃ)-এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হয়। অর্থাৎ, সর্বপ্রথম এই রাতেই তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়। অথবা অর্থ হল, এই রাতে 'লাওহে মাহফুয' থেকে কুরআনকে 'বায়তুল ইয্যাহ'তে অবতীর্ণ করা হয়, যা নিকটতম আসমানে অবস্থিত। অতঃপর সেখান থেকে প্রয়োজন ও ঘটনাঘটনের চাহিদা অনুযায়ী ২৩ বছরের বিভিন্ন সময়ে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করা হয়। কেউ কেউ لَيلَة مُبارَكَة 'বরকতময় রাত' বলতে শা'বান মাসের ১৫ তারীখের রাত (শবেবরাত)-কে বুঝিয়েছেন। কিন্তু এ কথা সঠিক নয়। যখন কুরআনের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা এ কথা সুসাব্যস্ত যে, কুরআন শবেক্বদরে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন এ থেকে শবেবরাত অর্থ নেওয়া কোনভাবেই ঠিক নয়। তাছাড়া শবেবরাত (শা'বান মাসের ১৫ তারীখের রাত) এর ব্যাপারে যতগুলো বর্ণনা এসেছে, যাতে এ রাতের মাহাত্ম্য ও ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে অথবা যাতে এ রাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা হয়েছে, সে সমস্ত বর্ণনাগুলো সনদের দিক দিয়ে জাল অথবা দুর্বল। অতএব সে (বর্ণনা)গুলো কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনার মোকাবেলা কিভাবে করতে পারে?[২] অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য হল, মানুষকে শরয়ী উপকার-অপকার সম্পর্কে অবহিত ও সতর্ক করা, যাতে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়।
আদ-দুখান 44:4
এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। [১]
[১] يُفْرَقُ، يُفَصَلُ وَيُبَيَّنُ ফায়সালা করা হয় এবং এ কাজকে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ফিরিশতাকে সোপর্দ করে দেওয়া হয়। حَكِيْمٍ হিকমতে পরিপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর প্রতিটি কাজই হিকমতে পরিপূর্ণ হয়। অথবা অর্থ, مُحْكَمٍ (মজবুত, পাকাপোক্ত) যাতে কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। সাহাবা ও তাবেঈন থেকে এর ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়েছে যে, এই রাতে আগামী বছরের জীবন-মরণ ও জীবিকার উপায়-উপকরণের ফায়সালা লাওহে মাহফূয থেকে অবতীর্ণ করে ফিরিশতাদেরকে সোপর্দ করা হয়। (ইবনে কাসীর)
আদ-দুখান 44:5
আমার আদেশক্রমে, [১] আমি তো রসূল প্রেরণ করে থাকি।
[১] অর্থাৎ, সমস্ত ফায়সালা আমার নির্দেশ, অনুমতি এবং আমার নির্ধারিত ভাগ্য ও ইচ্ছা অনুসারে হয়।
আদ-দুখান 44:6
এ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে করুণা;[১] নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
[১] অর্থাৎ, গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করার সাথে সাথে রসূলগণকে প্রেরণ করা আমার করুণা ও রহমতেরই একটি অংশ। যাতে তারা আমার অবতীর্ণকৃত গ্রন্থগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে এবং আমার যাবতীয় বিধি-বিধান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এইভাবে মানুষের আধিভৌতিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে আমি আমার রহমতে মানুষের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন পূরণ হওয়ারও সুব্যবস্থা করেছি।
আদ-দুখান 44:7
আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও ওদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালকের নিকট হতে। যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।
আদ-দুখান 44:8
তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতিপালক। [১]
[১] এই আয়াতগুলোও সূরা আ'রাফ ৭:১৫৮নং আয়াতের মত {قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ اِنِّي رَسُوْلُ اللهِ اِلَيْكُمْ جَمِيْعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ يُحْيِ وَيُمِيْتُ}
আদ-দুখান 44:9
বস্তুতঃ ওরা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে খেল-তামাশা করছে। [১]
[১] অর্থাৎ, সত্য ও তার দলীলসমূহ তাদের কাছে এসে গেছে, কিন্তু তারা তার উপর ঈমান আনার পরিবর্তে সন্দেহে পড়ে রয়েছে এবং এই সন্দেহের সাথে সাথে বিদ্রূপ করায় ও খেল-তামাশায় মত্ত রয়েছে।
আদ-দুখান 44:10
অতএব তুমি অপেক্ষা কর সে দিনের, যেদিন আকাশ স্পষ্ট ধূমাচ্ছন্ন হবে। [১]
[১] এতে কাফেরদেরকে ধমক দিয়ে বলা হচ্ছে যে, ঠিক আছে (হে নবী) তুমি ঐ দিনের অপেক্ষা কর, যখন আকাশে ধোঁয়ার আবির্ভাব ঘটবে। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয় যে, মক্কাবাসীদের বিদ্বেষমূলক আচরণে বিরক্ত হয়ে নবী করীম (সাঃ) তাদের উপর অনাবৃষ্টির বদ্দুআ করলেন। যার ফলে তাদের উপর অনাবৃষ্টির শাস্তি নেমে এল। এমন কি খাদ্যাভাবে তারা হাড়, চামড়া এবং মৃত ইত্যাদি খেতে বাধ্য হয়ে পড়ল। আকাশের দিকে তাকালে কঠিন ক্ষুধা ও দুর্বলতার কারণে তারা কেবল ধোঁয়া দেখত। পরিশেষে অতিষ্ঠ হয়ে তারা নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আযাব দূরীভূত হলে ঈমান আনার অঙ্গীকার করে। কিন্তু এই অবস্থা দূর হয়ে গেলে তারা পুনরায় কুফরী ও অবাধ্যতায় ফিরে আসে। তাই তো বদর যুদ্ধে তাদেরকে আবার কঠোরভাবে পাকড়াও করা হয়। (বুখারীঃ তাফসীর অধ্যায়) কেউ কেউ বলেন, কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার দশটি বড় বড় নিদর্শনাবলীর একটি নিদর্শন ধোঁয়াও। চল্লিশ দিন যাবৎ এ ধোঁয়া বিদ্যমান থেকে কাফেরদের শ্বাসরোধ করবে। আর মু'মিনদের অবস্থা সর্দি লাগার মত হবে। আয়াতে এই ধোঁয়ার কথাই বলা হয়েছে। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এই নিদর্শন কিয়ামতের নিকটতম পূর্ব সময়ে প্রকাশ হবে। আর প্রথম ব্যাখার ভিত্তিতে এটা প্রকাশ হয়ে গেছে। ইমাম শাওকানী বলেন, উভয় ব্যাখ্যাই স্ব-স্ব স্থানে সঠিক। আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে এ ঘটনা ঘটে গেছে, যা সঠিক সূত্রে প্রমাণিত। এ দিকে কিয়ামতের নিদর্শনসমূহের যে তালিকা বহু সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তাতেও এই ধোঁয়ার কথা উল্লেখ আছে। কাজেই ওটাও এর পরিপন্থী নয়, বরং তখনও তার আবির্ভাব ঘটবে।
আদ-দুখান 44:11
এবং মানবজাতিকে তা আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এ হবে মর্মান্তিক শাস্তি।
আদ-দুখান 44:12
তখন ওরা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর হতে শাস্তি দূর কর, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করব।’ [১]
[১] প্রথম ব্যাখ্যা অনুপাতে এ কথা মক্কার কাফেররা বলেছে। আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুপাতে এ কথা কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ের কাফেররা বলবে।
আদ-দুখান 44:13
ওরা উপদেশ গ্রহণ করবে কি করে? ওদের নিকট তো স্পষ্ট ব্যাখ্যাদাতা এক রসূল এসেছিল।
আদ-দুখান 44:14
অতঃপর ওরা তাকে অমান্য করে বলেছিল, ‘(সে তো) শিক্ষণপ্রাপ্ত একজন পাগল।’
আদ-দুখান 44:15
আমি তোমাদের শাস্তি কিছু কালের জন্য দূর করলে, তোমরা তো তোমাদের পূর্বাবস্থায় আবার ফিরে যাবে।
আদ-দুখান 44:16
যেদিন আমি তোমাদেরকে প্রবলভাবে পাকড়াও করব[১] (সেদিন) আমি অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করব।
[১] এখানে পাকড়াও বলতে বদর যুদ্ধের দিন পাকড়াও করার কথা বলা হয়েছে। সেদিন ৭০ জন কাফের মারা গিয়েছিল এবং ৭০ জনকে বন্দী করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুপাতে কঠোরভাবে এই পাকড়াও কিয়ামতের দিন করা হবে। ইমাম শাওকানী বলেন, এখানে সেই পাকড়াও এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বদর যুদ্ধে হয়েছিল। কেননা, কুরাইশ প্রসঙ্গের আলোচনাতেই এর উল্লেখ আছে। যদিও কিয়ামতের দিনেও মহান আল্লাহ কঠোরভাবে পাকড়াও করবেন। তবে সে পাকড়াও এত ব্যাপক হবে যে, তাতে সকল শ্রেণীর অবাধ্য শামিল থাকবে।
আদ-দুখান 44:17
এদের পূর্বে আমি তো ফিরআউন সম্প্রদায়কেও পরীক্ষা করেছিলাম[১] এবং ওদের নিকট এক মহান রসূল (মূসা) এসেছিল।
[১] পরীক্ষা করার অর্থ হল, আমি তাদেরকে পার্থিব সুখ-শান্তি, এবং স্বাচ্ছন্দ্য দানে ধন্য করেছিলাম এবং আমার এক সম্মানিত নবীকে তাদের প্রতি প্রেরণ করলাম। কিন্তু তারা না তাদের প্রতিপালকের নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল, আর না নবীর উপর ঈমান আনল।
আদ-দুখান 44:18
(সে বলল,) আল্লাহর দাসদের (বনী ইস্রাঈলদের)কে আমার নিকট ফিরিয়ে দাও।[১] নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল। [২]
[১] عِبَادَ اللهِ থেকে এখানে মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় বানী-ইস্রাঈলকে বুঝানো হয়েছে; যাদেরকে ফিরআউন দাস বানিয়ে রেখেছিল। মূসা (আঃ) নিজ জাতির স্বাধীনতা দাবী করল।
[২] আল্লাহর বার্তা পৌঁছানোর ব্যাপারে আমি বিশ্বস্ত।
আদ-দুখান 44:19
এবং তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে উদ্ধত হয়ো না,[১] আমি তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করছি। [২]
[১] অর্থাৎ, তাঁর রসূলের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে আল্লাহর সামনে তোমরা ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতা প্রকাশ করো না।
[২] এটা হল পূর্বোক্ত কথার কারণ। অর্থাৎ, আল্লাহর বিরুদ্ধে উদ্ধত হয়ো না। কারণ আমি এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছি, যাকে অস্বীকার করার কোনই অবকাশ নেই।
আদ-দুখান 44:20
তোমরা যাতে আমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা না করতে পার, তার জন্য আমি আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। [১]
[১] এই দাওয়াত ও তবলীগের উত্তরে ফিরআউন মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার হুমকি দেয়। তাই তিনি নিজ প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় কামনা করেন।
আদ-দুখান 44:21
যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না কর, তবে তোমরা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাও। [১]
[১] অর্থাৎ, যদি আমার প্রতি ঈমান না আনো, তো ঠিক আছে আনতে হবে না, তবে আমাকে হত্যা করার অথবা কোন কষ্ট দেওয়ার প্রচেষ্টা করো না।
আদ-দুখান 44:22
অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট নিবেদন করল, নিশ্চয় ওরা এক অপরাধী সম্প্রদায়।[১]
[১] অর্থাৎ, যখন তিনি দেখলেন যে, দাওয়াতের কোন প্রভাব তাদের উপর পড়ছে না, বরং তাদের কুফরী ও ধৃষ্টতা আরো বেড়ে যাচ্ছে, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে তাদের অবস্থা জানিয়ে দু'আ করলেন।
আদ-দুখান 44:23
সুতরাং (আমি বললাম,) তুমি আমার দাসদেরকে নিয়ে রাতারাতি বের হয়ে পড়, তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। [১]
[১] আল্লাহ তাঁর দু'আ কবুল করলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন যে, বানী-ইস্রাঈলদেরকে নিয়ে রাতারাতি এখান থেকে বেরিয়ে পড়। আর হ্যাঁ, ভয় পেয়ো না, ওরা তোমাদের পিছে ধাওয়া করবে।
আদ-দুখান 44:24
সমুদ্রকে শান্ত থাকতে দাও,[১] ওরা এমন এক বাহিনী যা ডুবে মরবে।
[১] رَهْوًا এর অর্থ স্থির, শান্ত অথবা শুষ্ক। অর্থাৎ, তোমার লাঠি মারলে সমুদ্র অলৌকিকভাবে স্থির বা শুকনো হয়ে যাবে এবং তাতে পথের সৃষ্টি হবে। অতঃপর তোমরা সমুদ্র পার হয়ে যাওয়ার পর তাকে ঐ অবস্থাতেই ছেড়ে দেবে, যাতে ফিরআউন ও তার সৈন্যরা সমুদ্র পার হওয়ার জন্য তাতে প্রবেশ করে এবং আমি তাদেরকে ওখানেই ডুবিয়ে দিই। আর হলও তাই; যার বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। (সূরা ক্বাস্বাস ২৮:৪০ নং আয়াত দ্রঃ)
আদ-দুখান 44:25
ওরা পশ্চাতে রেখে গিয়েছিল কত বাগান ও ঝরনা, [১]
[১] كَمْ 'খাবরিয়্যাহ' (খবরসূচক) যা আধিক্য বুঝাতে ব্যবহার হয়। নীল-নদের উভয় পাশের্ব পর্যাপ্ত পরিমাণে বাগান, ক্ষেত এবং উঁচু উঁচু অট্টালিকা ও প্রতিপত্তির বহু নিদর্শন ছিল। সব কিছুই এই দুনিয়াতেই থেকে গেল এবং শিক্ষা ও উপদেশ স্বরূপ কেবল ফিরআউন ও তার জাতির নাম রয়ে গেল।
আদ-দুখান 44:26
কত শস্যক্ষেত ও সুরম্য প্রাসাদ,
আদ-দুখান 44:27
কত বিলাস-সামগ্রী, যাতে ওরা আনন্দিত ছিল!
আদ-দুখান 44:28
এরূপই ঘটেছিল[১] এবং আমি এ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকারী করলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। [২]
[১] كذلك অর্থাৎ, এ ব্যাপারটা ঐভাবেই ঘটেছে, যেভাবে বর্ণনা করা হল।
[২] কারো কারো নিকট এ থেকে লক্ষ্য হল বানী-ইস্রাঈল। তবে কারো কারো নিকট বানী-ইস্রাঈলের পুনরায় মিশর ফিরে আসার কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। অতএব মিশর রাজ্যের উত্তরাধিকারী অন্য কোন জাতি হয়ে থাকবে, বানী-ইস্রাঈল নয়।
আদ-দুখান 44:29
আকাশ ও পৃথিবী কেউই ওদের জন্যে অশ্রুপাত করেনি[১] এবং ওদেরকে অবকাশও দেওয়া হয়নি।
[১] অর্থাৎ, এই ফিরআউনীদের কোন নেক আমলই ছিল না যে, তা আকাশে চড়ত এবং তার ধারাবাহিকতা ছিন্ন হওয়ার ফলে আকাশ কাঁদত। আর না তারা পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত করেছে যে, তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে পৃথিবী কাঁদত। অর্থাৎ, তাদের ধ্বংসের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে কাঁদার কেউ ছিল না। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আদ-দুখান 44:30
নিশ্চয় আমি উদ্ধার করেছিলাম বনী-ইস্রাঈলকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি হতে,
আদ-দুখান 44:31
(উদ্ধার করেছিলাম) ফিরআউন হতে; নিশ্চয় সে ছিল সীমালংঘনকারীদের মধ্যে উদ্ধত।
আদ-দুখান 44:32
আমি জেনে-শুনেই ওদেরকে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম, [১]
[১] বিশ্ব বলতে বানী-ইস্রাঈলের যুগের বিশ্বকে বুঝানো হয়েছে। সাধারণভাবে সর্ব যুগের বিশ্ব নয়। কারণ, কুরআনে উম্মতে মুহাম্মাদকে كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ (সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি) উপাধি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বানী-ইস্রাঈলকে তাদের যুগের বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছিল। তাদেরকে এই শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য কি কারণে দেওয়া হয়েছিল, তা কেবল আল্লাহই জানেন।
আদ-দুখান 44:33
এবং ওদেরকে দিয়েছিলাম নিদর্শনাবলী; যাতে ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা। [১]
[১] নিদর্শনাবলী বলতে, সেই মু'জিযাসমূহকে বুঝানো হয়েছে, যা মূসা (আঃ)-কে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোতে পরীক্ষার দিক এই ছিল যে, মহান আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন, তারা কিভাবে আমল করে? অথবা নিদর্শনাবলী বলতে সেই সব অনুগ্রহকে বুঝানো হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের প্রতি করেছিলেন। যেমন, ফিরআউনীদেরকে ডুবিয়ে মেরে তাদেরকে রক্ষা করা, তাদের জন্য সমুদ্র চিরে পথ বানিয়ে দেওয়া, মেঘ দ্বারা ছায়ার ব্যবস্থা করা, মান্ন ও সালওয়া অবতরণ করা ইত্যাদি। এতে পরীক্ষা এই ছিল যে, এই জাতি এইসব অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করছে, নাকি তার অকৃতজ্ঞতা করে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার রাস্তা অবলম্বন করছে --তা দেখা।
আদ-দুখান 44:34
নিশ্চয় ওরা বলে থাকে, [১]
[১] এ ইঙ্গিত মক্কার কাফেরদের প্রতি। কারণ, আলোচনার প্রসঙ্গ তাদের সাথেই সম্পৃক্ত। মধ্যভাগে ফিরআউনের ঘটনা তাদেরকে এই কথার উপর সতর্ক করার জন্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, ফিরআউনও তাদের মত কুফরীতে অটল ছিল। তাদের দেখা উচিত, তার কি পরিণাম হয়েছে। যদি তারাও কুফরী ও শিরকের উপর অটল থাকে, তবে তাদেরও পরিণাম ফিরআউন ও তার অনুসারীদের থেকে ভিন্ন হবে না।
আদ-দুখান 44:35
‘আমাদের প্রথম মৃত্যুই একমাত্র মৃত্যু এবং আমরা আর পুনরুত্থিত হবো না। [১]
[১] অর্থাৎ, পার্থিব এই জীবনই শেষ জীবন। এর পর পুনরায় জীবিত হওয়া এবং হিসাব-নিকাশ হওয়া সম্ভবই নয়।
আদ-দুখান 44:36
অতএব তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে উপস্থিত কর।’ [১]
[১] এ কথা নবী (সাঃ) ও মুসলিমদেরকে কাফেরদের পক্ষ হতে বলা হচ্ছে যে, যদি তোমাদের এই বিশ্বাস বাস্তবেই সঠিক হয় যে, পুনরায় জীবিত হতে হবে, তবে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে জীবিত করে দেখিয়ে দাও। এটা ছিল তাদের অমূলক তর্ক ও অসার কথাবার্তা। কেননা, পুনরায় জীবিত হওয়ার আকীদা ও বিশ্বাস হল কিয়ামতের সাথে সম্পৃক্ত। কিয়ামত ঘটার পূর্বেই দুনিয়াতে জীবিত হওয়া বা করার ব্যাপার নয়।
আদ-দুখান 44:37
ওরা কি শ্রেষ্ঠ, না তুব্বা’ সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীরা; আমি ওদেরকে ধ্বংস করেছিলাম, নিশ্চয় ওরা ছিল অপরাধী। [১]
[১] অর্থাৎ, মক্কার এই কাফেররা তুববা' এবং তাদের পূর্বের সম্প্রদায় আ'দ ও সামুদ ইত্যাদিদের থেকেও বেশী শ্রেষ্ঠ নাকি? যখন আমি তাদেরকে তাদের পাপের কারণে এদের থেকেও বেশী শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও ধ্বংস করে দিয়েছি, তখন এরা আবার কি এমন মর্যাদা রাখে? তুব্বা' বলতে সাবা' সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। সাবা'য় হিময়ার নামক এক গোত্র ছিল। এরা তাদের বাদশাহকে তুব্বা' বলত। যেমন, রোমক রাজাদেরকে কায়সার, পারস্যের রাজাদেরকে কিসরা, মিশরের শাসকদেরকে ফিরআউন এবং হাবশার রাজাদেরকে নাজাশী বলা হত। ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে একমত যে, তুব্বা'দের মধ্যে কোন কোন তুব্বা' বড় বিজয়-আধিপত্য অর্জন করে। কোন কোন ঐতিহাসিক তো এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, তারা দেশসমূহ জয় করতে করতে সমরকন্দ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এইভাবে আরো কয়েকজন প্রতাপশালী বাদশাহ এই জাতির মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে এবং তারা তাদের যুগের এক বৃহত্তম সম্প্রদায় ছিল; যারা শক্তি-ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিক দিয়ে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। কিন্তু যখন এ জাতিও নবীদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করল, তখন তাদেরকেও ধ্বংস করে শেষ করে দেওয়া হল। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য, সূরা সাবা'র এ ব্যাপারে আলোচনার আয়াতসমূহ) হাদীসে এক তুব্বা'র ব্যাপারে এসেছে যে, সে মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। তাকে গালিগালাজ করো না। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/১৪৫, সহীহুল জা'মে ১৩১৯নং) তবে তাদের অধিকাংশরাই ছিল অবাধ্য; যার ফলে তাদের ভাগ্যে নেমে এসেছিল ধ্বংস।
আদ-দুখান 44:38
আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং ওদের মধ্যে কোন কিছুই খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি; [১]
[১] এই বিষয়টাই ইতিপূর্বে সূরা স্বাদ-এর ৩৮:২৭ নং, সূরা মু'মিনূন ২৩:১১৫-১১৬ নং এবং সূরা হিজর ১৫:৮৫ নং ইত্যাদি আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আদ-দুখান 44:39
আমি এ দুটিকে যথার্থরূপেই সৃষ্টি করেছি; [১] কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না। [২]
[১] যথাযথ বা যথার্থ উদ্দেশ্য এটাই যে, মানুষকে পরীক্ষা করা হবে এবং সৎলোকদেরকে তাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং অসৎ লোকদেরকে তাদের অসৎ কর্মের শাস্তি দেওয়া হবে।
[২] অর্থাৎ, এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ব্যাপারে তারা উদাসীন ও বেখবর। যার কারণে আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার ব্যাপারে বেপরোয়া এবং পার্থিব সুখ-সামগ্রীর খোঁজেই সদা ব্যস্ত।
আদ-দুখান 44:40
সকলের জন্য ওদের বিচার দিন নির্ধারিত রয়েছে। [১]
[১] এটাই হল সেই আসল উদ্দেশ্য, যার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকেও।
আদ-দুখান 44:41
সেদিন এক বন্ধু অপর বন্ধুর কোন কাজে আসবে না এবং ওরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। [১]
[১] যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿فَإِذَ نُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَلآ أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ﴾ অর্থাৎ, যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরের খোঁজ-খবরও নিবে না। (সূরা মু'মিনূন ২৩:১০১) তিনি আরো বলেছেন, ﴿وَلاَ يُسْئَلُ حَمِيْمٌ حَمِيْمًا﴾ অর্থাৎ, সুহূদ সৃহূদের খবর নিবে না। (সূরা মাআরিজ ৭০:১০ আয়াত)
আদ-দুখান 44:42
তবে আল্লাহ যার প্রতি দয়া করেন, তার কথা স্বতন্ত্র। নিশ্চয়, আল্লাহ পরাক্রমশালী, দয়াময়।
আদ-দুখান 44:43
নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে
আদ-দুখান 44:44
পাপীর খাদ্য;
আদ-দুখান 44:45
গলিত তামার মত[১] তা পেটের ভিতর ফুটতে থাকবে,
[১] مُهْلٌ গলিত তামা, আগুনে গলিত জিনিস। অথবা তৈলকিট্ট; যা তেলপাত্রের তলে ঘোলাটে মাটির মত পড়ে থাকে।
আদ-দুখান 44:46
গরম পানি ফুটার মত। [১]
[১] সেই যাক্কুম খাদ্য ফুটন্ত পানির মত পেটে ফুটতে থাকবে।
আদ-দুখান 44:47
(আমি বলব,) ওকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। [১]
[১] এ কথা জাহান্নামে নিযুক্ত ফিরিশতাকে বলা হবে। سواء অর্থ মধ্যস্থলে।
আদ-দুখান 44:48
অতঃপর ওর মাথায় ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়ে শাস্তি দাও--
আদ-দুখান 44:49
(এবং বল,) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত। [১]
[১] অর্থাৎ, দুনিয়াতে তুমি নিজেকে বড়ই ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী ভেবে ঘোরাফেরা করতে এবং ঈমানদারদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করতে।
আদ-দুখান 44:50
এটা তো সেই (শাস্তি) যার সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করতে।
আদ-দুখান 44:51
নিশ্চয় সাবধানীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে--
আদ-দুখান 44:52
বাগানসমূহে ও ঝরনারাজিতে,
আদ-দুখান 44:53
ওরা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। [১]
[১] কাফের ও ফাসেক লোকদের মোকাবেলায় ঈমানদার ও আল্লাহভীরুদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যাঁরা তাদের নিজেদেরকে কুফরী ও পাপাচার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। أمِين এমন স্থানকে বলা হয়, যেখানে সর্বপ্রকার ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকা যায়।
আদ-দুখান 44:54
এরূপই ঘটবে ওদের;[১] আর আয়তলোচনা হুরদের সাথে তাদের বিবাহ দেব। [২]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহভীরুদের সাথে অবশ্যই এই ধরনের আচরণ করা হবে।
[২] حُوْرٌ হল حَوْرَآءُ এর বহুবচন। এর উৎপত্তি حَوَرٌ থেকে। যার অর্থ, চোখের সাদা অংশের অত্যধিক সাদা এবং কালো অংশের অত্যধিক কালো হওয়া। حَوْرَآءُ (হুর) এই জন্য বলা হয় যে, দৃষ্টি তাদের রূপ ও সৌন্দর্যকে দেখে হয়রান (মুগ্ধ) হয়ে যাবে। عَيْنٌ হল, عَيْنَآءُ এর বহুবচন। আয়তলোচনঃ প্রশস্ত বা ডাগর চোখ; যেমন হয় হরিণের চোখ। পূর্বেই আলোচনা হয়েছে যে, প্রত্যেক জান্নাতী কমসে কম দু'টি হুর অবশ্যই পাবে। যারা রূপ ও সৌন্দর্যের দিক দিয়ে যেন চাঁদ ও সূর্যের মত উজ্জ্বল হবে। অবশ্য তিরমিযীর একটি সহীহ বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক শহীদ বিশেষ করে ৭২টি করে হুর পাবেন। (জিহাদের ফযীলতের পরিচ্ছেদসমূহ)
আদ-দুখান 44:55
সেখানে তারা নিশ্চিন্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে। [১]
[১] آمِنِيْنَ (নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে) এর অর্থ হল, না তা শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে, আর না তা খেয়ে কোন রোগ ইত্যাদি হওয়ার ভয় থাকবে। অথবা না মৃত্যু, ক্লান্তি এবং শয়তানের কোন ভয় থাকবে।
আদ-দুখান 44:56
(ইহকালে) প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না।[১] আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন।
[১] অর্থাৎ, দুনিয়াতে তাদের যে মৃত্যু এসেছে, সেই মৃত্যুর পর তাদেরকে আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে না। যেমন হাদীসে এসেছে যে, "মৃত্যুকে একটি ভেড়ার আকৃতিতে এনে জাহান্নাম এবং জান্নাতের মাঝখানে জবাই করে দেওয়া হবে এবং ঘোষণা করা হবে যে, হে জান্নাতবাসীগণ! তোমাদের জন্য জান্নাতের জীবন হল চিরন্তন। আর তোমাদের মৃত্যু আসবে না। এবং হে জাহান্নামীরা, তোমাদের জন্য জাহান্নামের জীবন হল চিরন্তন। আর মৃত্যু নেই।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরা মারয়্যাম, মুসলিমঃ জান্নাত অধ্যায়) অপর হাদীসের শব্দে এসেছে, "হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা এবার সব সময় সুস্থ-সবল থাকবে, কখনোও অসুস্থ হবে না। তোমাদের জন্য এখন শুধু জীবন আর জীবন, আর মৃত্যু নেই। তোমাদের জন্য কেবল নিয়ামত আর নিয়ামত, এতে কোন কমতি হবে না। আর তোমরা সদা যুবক থাকবে, কখনোও বৃদ্ধ হবে না।" (বুখারীঃ কিতাবুর রিক্বাক)
আদ-দুখান 44:57
(এ প্রতিদান) তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহস্বরূপ।[১] এটিই তো মহাসাফল্য।
[১] যেমন হাদীসেও আছে, রসূল (সাঃ) বলেছেন, "এ কথা জেনে নাও যে, তোমাদের মধ্যে কাউকেও তার আমল জান্নাতে নিয়ে যাবে না।" সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকেও? বললেন, "হ্যাঁ, আমাকেও। তবে আল্লাহ আমাকে তাঁর অনুগ্রহ ও দয়ায় আচ্ছাদিত করে নিবেন।" (বুখারীঃ কিতাবুর রিক্বাক, মুসলিম)
আদ-দুখান 44:58
আমি তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।
আদ-দুখান 44:59
সুতরাং তুমি প্রতীক্ষা কর, নিশ্চয় ওরাও প্রতীক্ষা করছে।[১]
[১] যদি এরা ঈমান না আনে, তবে তুমি আল্লাহর আযাবের অপেক্ষা কর। এরা তো এই অপেক্ষায় আছে যে, হতে পারে ইসলামের জয়লাভ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির পূর্বেই তোমার মৃত্যু হয়ে যাবে।
আল-জাসিয়া 45:1
হা-মীম,
আল-জাসিয়া 45:2
এ গ্রন্থ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।
আল-জাসিয়া 45:3
নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
আল-জাসিয়া 45:4
তোমাদের সৃষ্টিতে এবং জীব-জন্তুর বংশবিস্তারে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে,
আল-জাসিয়া 45:5
বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য রাত ও দিনের পরিবর্তনে, যে বৃষ্টি বর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর তিনি পুনর্জীবিত করেন তাতে[১] এবং বায়ুর পরিবর্তনে। [২]
[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং মানুষ ও জীব-জন্তুর সৃষ্টিতে, দিবারাত্রির আগমন-প্রত্যাগমনে এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে মৃত ভূমিকে পুনরায় জীবিত করে তোলা ইত্যাদি সহ সারা বিশ্বজাহানে এমন অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যা আল্লাহর একত্ব ও তাঁর প্রতিপালকত্বকে প্রমাণ করে।[২] অর্থাৎ, কখনো হাওয়া উত্তর ও দক্ষিণমুখী হয়, কখনো পূর্ব ও পশ্চিমমুখী, কখনো সমুদ্রের হাওয়া আবার কখনো মরুর লু হাওয়া, কখনো হাওয়া রাতে চলে আবার কখনো দিনে, কোন হাওয়া বৃষ্টিবাহী, কোন হাওয়া ফলপ্রসূ, কোন হাওয়া আত্মার খোরাক (অক্সিজেন)। আবার কোন হাওয়া সব কিছুকে ঝলসে দেয়, কোন হাওয়া শুধু ধুলোবালির ঝড় বয়ে আনে। এত প্রকারের হাওয়াও প্রমাণ করে যে, এই বিশ্বজাহানের কেউ পরিচালক আছেন এবং তিনি একজনই। দু'জন বা তার অধিক নন। সমস্ত এখতিয়ারের মালিক তিনি একাই। এতে তাঁর কোন শরীক নেই। সর্বপ্রকার কর্তৃত্ব কেবল তাঁরই হাতে। অন্য কারো হাতে সামান্য পরিমাণও কিছুর এখতিয়ার নেই। এই অর্থেরই আয়াত হল সূরা বাক্বারার ২:১৬৪ নং আয়াতটি।
আল-জাসিয়া 45:6
এগুলি আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি, সুতরাং আল্লাহর আয়াতের পরিবর্তে ওরা আর কোন্ বাণীতে বিশ্বাস করবে? [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর নাযিল করা এই কুরআন, যাতে রয়েছে তাঁর একত্ববাদের বহু প্রমাণাদি, যদি তারা এর উপরও ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর কথাকে বাদ দিয়ে কার কথার উপর এবং তাঁর নিদর্শনাবলীকে ছেড়ে আর কোন্ এমন নিদর্শন আছে যার উপর তারা ঈমান আনবে? بَعْدَ اللهِ অর্থ, بَعْدَ حَدِيْثِ اللهِ وَبَعْدَ آيَاتِهِ এখানে কুরআনকে হাদীস আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন, ﴿اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ﴾ (الزمر: ২৩) আয়াতে এসেছে।
আল-জাসিয়া 45:7
দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী মহাপাপীর, [১]
[১] أَفَّاكٍ অর্থ, كَذَّابٍ (চরম মিথ্যুক) আর أَثِيْمٍ অর্থ, বড় পাপী। وَيْلٌ মানে ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।
আল-জাসিয়া 45:8
যে আল্লাহর আয়াতের আবৃত্তি শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে (নিজ মতবাদে) অটল থাকে; যেন সে তা শোনেইনি।[১] সুতরাং ওকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।
[১] অর্থাৎ, কুফরীর উপর অটল থাকে এবং সত্যের মোকাবেলায় নিজেদের জ্ঞানকে বড় মনে করে এবং এই অহংকারের কারণে শোনা সত্ত্বেও তারা এমন ভান করে, যেন শোনেইনি।
আল-জাসিয়া 45:9
যখন আমার কোন আয়াত সে অবগত হয়, তখন তা নিয়ে সে পরিহাস করে।[১] ওদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।
[১] অর্থাৎ, একে তো তারা কুরআনকে মন দিয়ে শোনেই না এবং (শোনার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও) যদি কোন কথা তাদের কানে পড়ে যায় অথবা কোন কথা তাদের জ্ঞানে এসে যায়, তবে সেটাকে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় বানিয়ে নেয়। আর এটা করে তাদের ছোট জ্ঞান ও অবুঝ হওয়ার কারণে অথবা কুফরী ও অবাধ্যতার উপর অটল থাকার কারণে অথবা অহংকারের কারণে।
আল-জাসিয়া 45:10
ওদের পশ্চাতে রয়েছে জাহান্নাম;[১] ওদের কৃতকর্ম ওদের কোন কাজে আসবে না [২] এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে অভিভাবক স্থির করেছে, তারাও নয়।[৩] আর ওদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
[১] অর্থাৎ, যারা এই আচরণের মানুষ, তাদের জন্য কিয়ামতে রয়েছে জাহান্নাম।
[২] অর্থাৎ, দুনিয়াতে যে মাল তারা অর্জন করেছে, যে সন্তান-সন্ততি এবং দল-বলের জন্য তারা অহংকার প্রদর্শন করে থাকে, এ সব কিছুই কিয়ামতের দিন তাদের কোনই উপকারে আসবে না।
[৩] যাদেরকে দুনিয়াতে নিজেদের আলিয়া, অভিভাবক, বন্ধু, সাহায্যকারী এবং উপাস্য বানিয়ে রেখেছিল, সেদিন তারা তাদের নজরেই পড়বে না। তারা সাহায্য আর কি করবে?
আল-জাসিয়া 45:11
এ (কুরআন)[১] সৎপথের দিশারী। যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্য রয়েছে অতিশয় কষ্টদায়ক শাস্তি। [২]
[১] هٰذَا (এ) অর্থাৎ, কুরআন সৎপথের দিশারী। কারণ, এর অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে কুফরী ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে ঈমানের আলোয় নিয়ে আসা। তাই এটা যে পূর্ণ হিদায়াত ও সৎপথের দিশারী গ্রন্থ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এ থেকে হিদায়াত তো সে-ই পাবে, যে এর জন্য স্বীয় বক্ষকে উন্মুক্ত করে দেবে। অন্যথা সে ব্যক্তি কিভাবে পথ পাবে, যে পথের খোঁজই করে না?
[২] أَلِيْمٌ হল عَذَابٌ এর 'সিফাত' (বিশেষণ)। কেউ কেউ একে رِجْزٌ এর সিফাত বলেছেন। رِجْزٌ মানে عَذَابٌ شَدِيْدٌ (কঠিন শাস্তি)।
আল-জাসিয়া 45:12
আল্লাহ তো সাগরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন,[১] যাতে তাঁর আদেশে তাতে জলযানসমূহ চলাচল করতে পারে[২] এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার[৩] এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। [৪]
[১] অর্থাৎ, তাকে এমন বানিয়ে দিয়েছেন যেন তার উপর দিয়ে তোমরা নৌকা ও জল-জাহাজের মাধ্যমে সফর করতে পার।
[২] অর্থাৎ, সমুদ্রে নৌকা ও জাহাজসমূহের গমনাগমন তোমাদের কৃতিত্ব ও দক্ষতার ফল নয়, বরং এটা চলে আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর ইচ্ছায়। তা নাহলে তিনি ইচ্ছা করলে সমুদ্র-তরঙ্গে এমন উত্তাল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন যে, কোন নৌকা ও জাহাজ তার পৃষ্ঠে স্থির থাকতে পারবে না। যেমন কখনো কখনো তিনি তাঁর মহাশক্তির (কিঞ্চিৎ) বিকাশ ঘটানোর জন্য এ রকম করে থাকেন। যদি অব্যাহতভাবে তরঙ্গ উত্তাল অবস্থায় থাকে, তবে তোমরা কখনোও সমুদ্রে সফর করার সুযোগই পাবে না।
[৩] অর্থাৎ, সমুদ্র-পথে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে, সমুদ্রে ডুব মেরে মুক্তা-প্রবালাদি ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস বের করে এবং সমুদ্রস্থিত প্রাণী (মাছ ইত্যাদি) শিকার করে।
[৪] এ সব কিছুই এই জন্য করেছেন যে, যাতে তোমরা এই নিয়ামতসমূহের উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর, যে নিয়ামতসমূহ সমুদ্রকে তোমাদের আয়ত্তে করে দেওয়ার ফলে অর্জিত হয়।
আল-জাসিয়া 45:13
তিনি তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজের পক্ষ হতে,[১] চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে বহু নিদর্শন।
[১] 'অধীন' করার অর্থ হল, সেগুলোকে তোমাদের সেবায় নিযুক্ত করে রেখেছেন। তোমাদের জন্য যাবতীয় মঙ্গল ও উপকারিতা এবং তোমাদের জীবন ও জীবিকা সব কিছুই এরই সাথে সম্পৃক্ত। যেমন, চাঁদ-সূর্য, উজ্জ্বল তারকারাজি, মেঘ-বৃষ্টি এবং হাওয়া ইত্যাদি। আর 'নিজের পক্ষ হতে' মানে স্বীয় বিশেষ রহমতে ও অনুগ্রহে।
আল-জাসিয়া 45:14
বিশ্বাসীদের বল, তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে; যারা আল্লাহর দিনগুলির আশা করে না।[১] যাতে আল্লাহ এক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেন। [২]
[১] অর্থাৎ, যারা এই ভয় রাখে না যে, আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সাহায্য করার এবং তাঁর শত্রুদের ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখেন। উদ্দেশ্য হল কাফের ও অবিশ্বাসীরা। أيَّام الله (আল্লাহর দিনগুলি) বলতে ঘটনাঘটন (আযাব-শাস্তি ইত্যাদি) যেমন, {وَذَكِّرْهُمْ بأَيَّامِ اللهِ} (إبراهيم: ৫) আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ, সেই কাফেরদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর, যারা আল্লাহর আযাব এবং তাঁর পাকড়াও থেকে বেপরোয়া। এ নির্দেশ প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদেরকে দেওয়া হয়েছিল। পরে যখন তারা মোকাবেলা করার যোগ্য হয়ে গেল, তখন তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (জিহাদ) করার নির্দেশ দেওয়া হল।
[২] অর্থাৎ, যখন তোমরা তাদের দেওয়া যাবতীয় কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবে এবং তাদের যুলুম-অত্যাচারকে ক্ষমা করবে, তখন এই সমস্ত পাপ তাদের ঘাড়ে থাকবে, যার শাস্তি কিয়ামতের দিন তাদেরকে দেওয়া হবে।
আল-জাসিয়া 45:15
যে সৎকাজ করে, সে নিজ কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে ওর প্রতিফল সেই ভোগ করবে।[১] অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। [২]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক দল ও ব্যক্তির কর্ম, ভাল হোক অথবা মন্দ, তার লাভ ও ক্ষতি স্বয়ং কর্তারই; অন্য কারো নয়। এতে সৎকর্মের প্রতি উৎসাহিতও করা হয়েছে এবং অসৎকর্ম থেকে ভীতিপ্রদর্শনও।
[২] তিনি সকলকে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন। ভালো লোককে ভালো এবং মন্দলোককে মন্দ।
আল-জাসিয়া 45:16
আমি তো বনী-ইস্রাঈলকে গ্রন্থ, কর্তৃত্ব[১] ও নবুঅত দান করেছিলাম এবং ওদেরকে উত্তম জীবিকা দিয়েছিলাম[২] এবং বিশ্বজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম। [৩]
[১] এখানে كتاب (গ্রন্থ) বলতে তাওরাত। আর حُكم (কর্তৃত্ব) থেকে রাজত্ব ও শাসন-ক্ষমতা অথবা বিবেক ও বিচার করার এমন যোগ্যতা, যা বিবাদ মিটানোর এবং মানুষের মাঝে মীমাংসা করার জন্য জরুরী হয়।
[২] সেই সব উত্তম রুযী ও জীবিকা, যা তাদের জন্য হালাল ছিল এবং এগুলোরই মধ্যে ছিল মান্ন্ ও সালওয়ার অবতরণ।
[৩] অর্থাৎ, তদানীন্তন বিশ্বে।
আল-জাসিয়া 45:17
ধর্ম সম্পর্কে ওদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণ[১] দান করেছিলাম। জ্ঞান আসার পর ওরা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ মতবিরোধ করেছিল।[২] ওরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করত, তোমার প্রতিপালক কিয়ামতের দিন ওদের মধ্যে সে বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন। [৩]
[১] অর্থাৎ, হালাল ও হারাম বিবৃত স্পষ্ট বিধান। অথবা মু'জিযা ও অলৌকিক ঘটনাবলী। কিংবা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জ্ঞান। তাঁর নবী হওয়ার প্রমাণাদি এবং নির্দিষ্টভাবে সেই স্থানের জ্ঞান, যেখানে তিনি হিজরত করে যাবেন।
[২] بَغْيًا بَيْنَهُمْ এর অর্থ, আপোসে একে অপরের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষবশতঃ অথবা খ্যাতি ও পদমর্যাদা লাভের জন্য জ্ঞান আসার পর তারা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে মতবিরোধ অথবা রসূল (সাঃ)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করল।
[৩] হকপন্থীদেরকে উত্তম প্রতিদান এবং বাতিলপন্থীদেরকে মন্দ বদলা দিবেন।
আল-জাসিয়া 45:18
এরপর আমি তোমাকে ধর্মের বিশেষ বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি;[১] সুতরাং তুমি ওর অনুসরণ কর এবং অজ্ঞদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। [২]
[১] شَرِيعَة শরীয়তের আভিধানিক অর্থ হলঃ রাস্তা, ধর্মাদর্শ, বিধান এবং নিয়ম-পদ্ধতি। রাজপথ বা 'মেনরোড'কেও شَارع 'শারে' বলা হয়। কারণ, তা গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেয়। তাই শরীয়ত বলতে এখানে সেই দ্বীনের বিধানকে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। যাতে মানুষ সে পথে চলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। আয়াতের অর্থ হল, আমি তোমাকে একটি সুস্পষ্ট রাস্তায় বা তরীকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, যা তোমাকে সত্য পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
[২] যারা আল্লাহর তাওহীদ এবং তাঁর শরীয়তের ব্যাপারে অজ্ঞ। এ থেকে উদ্দেশ্য হল, মক্কার কাফের ও তাদের সাথীরা।
আল-জাসিয়া 45:19
আল্লাহর কাছে অবশ্যই ওরা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না; নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ সাবধানীদের বন্ধু।
আল-জাসিয়া 45:20
এ (কুরআন) মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলীল[১] এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা। [২]
[১] অর্থাৎ, সেই দলীল-সমষ্টি যা দ্বীনের বিধি-বিধান সংবলিত এবং যার সাথে মানুষের যাবতীয় চাহিদা ও প্রয়োজনাদি সম্পৃক্ত। (এটি মানুষের জন্য একটি গাইডবুক ও জীবন-সংবিধান।)
[২] অর্থাৎ, ইহকালে সৎপথ দেখায় এবং পরকালে আল্লাহর করুণার অধিকারী বানায়।
আল-জাসিয়া 45:21
দুষ্ককৃতকারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে ওদেরকে তাদের সমান গণ্য করব, যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকাজ করে? [১] ওদের ফায়সালা কত নিকৃষ্ট।
[১] অর্থাৎ, ইহকালে ও পরকালে উভয়ের মধ্যে যেন কোন পার্থক্য করব না। এ রকম কখনও হতে পারে না। অথবা অর্থ হল, যেভাবে দুনিয়াতে ওরা সমান সমান ছিল, অনুরূপ আখেরাতেও সমান সমান থাকবে। মরে এরাও শেষ হয়ে যাবে এবং ওরাও? না দুষ্ককৃতকারীদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে, আর না বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করা হবে। এ রকম হবে না। এই জন্য পরে বলেছেন, ওদের ফায়সালা কতই না মন্দ!
আল-জাসিয়া 45:22
আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [১]
[১] আর এটাই সুবিচার যে, কিয়ামতের দিন কোন পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ফায়সালা হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমল অনুযায়ী ভাল অথবা মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। এ রকম হবে না যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয়ের সাথে একই ধরনের আচরণ করবেন; যেমন কাফেরদের ভ্রান্ত ধারণা। তাদের এই ধারণার খন্ডন পূর্বের আয়াতেও করা হয়েছে। কেননা, উভয়কে সমান সমান অবস্থায় রাখা যুলুম; অর্থাৎ, সুবিচারের বিপরীত এবং স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বস্বীকৃত বিষয় তথা বাস্তব-বিরোধীও বটে। তাই যেমন নিমগাছ লাগিয়ে আঙ্গুর ফল অর্জন করা যায় না, অনুরূপ অন্যায় কাজ সম্পাদন করে সেই মর্যাদা লাভ করা যাবে না, যা আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন।
আল-জাসিয়া 45:23
তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের উপাস্য করে নিয়েছে?[১] আল্লাহ জেনেশুনেই ওকে বিভ্রান্ত করেছেন[২] এবং ওর কর্ণ ও হৃদয় মোহর করে দিয়েছেন[৩] এবং ওর চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা।[৪] অতএব, আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে?[৫] তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? [৬]
[১] তাই সেটাকেই সে ভাল মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি ভাল মনে করে এবং সেটাকেই সে মন্দ মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি মন্দ মনে করে। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের যাবতীয় বিধি-বিধানের উপর স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য এবং তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ জ্ঞান-বুদ্ধিও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অথবা স্বার্থপরতার শিকার হয়ে প্রবৃত্তির মত ভুল ফায়সালাও করতে পারে। একটি অর্থ এর এই করা হয়েছে; যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণকৃত পথনির্দেশ ও দলীল ছাড়াই স্বীয় মনমর্জির দ্বীন অবলম্বন করে। আর কেউ কেউ বলেছেন, এ থেকে এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে পাথর পূজা করত। যখন তুলনামূলক কোন সুন্দর পাথর পেয়ে যেত, তখন সে পূর্বের পাথরকে ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় পাথরটিকে উপাস্য বানিয়ে নিত। (ফাতহুল ক্বাদীর)[২] অর্থাৎ, তিনি জানেন যে, সে এই ভ্রষ্টতার উপযুক্ত। অথবা অর্থ এই যে, জ্ঞান এসে যাওয়া এবং হুজ্জত কায়েম হয়ে যাওয়ার পরও (জেনেশুনে) সে ভ্রষ্টতার পথ অবলম্বন করে। যেমন, নিজেকে বড় জ্ঞানী মনে করে এমন বহু অহংকারী ভ্রষ্ট আলেমদের অবস্থা; তারা ভ্রষ্ট হয়। মতামত তাদের ভিত্তিহীন হয়, কিন্তু 'আমার মত বড় পন্ডিত কেউ নেই' মনে করার এই অহমিকায় তারা নিজেদের দলীলাদিকে এমন মনে করে, যেন তা আসমান থেকে পেড়ে আনা তারকা। এইভাবে জেনেশুনে তারা কেবল নিজেরাই ভ্রষ্ট হয় না, বরং অন্যদেরকেও ভ্রষ্ট করে গর্ববোধ করে। نَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ هَذَا الْعِلْمِ الضَّالِّ وَالْفَهْمِ السَّقِيْمِ وَالْعَقْلِ الزَّائِغِ।[৩] যার কারণে ভালো কথা শোনা থেকে তার কান এবং হিদায়াত গ্রহণ করা হতে তার অন্তর বঞ্চিত হয়ে গেছে।[৪] তাই সে সত্য দেখতেও পায় না।[৫] যেমন বলেছেন, ﴿مَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَلاَ هَادِيَ لَهُ وَيَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ﴾ (الأعراف: ১৮৬)[৬] অর্থাৎ, চিন্তা-ভাবনা করবে না? যাতে প্রকৃত ব্যাপার তোমাদের কাছে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায়।
আল-জাসিয়া 45:24
ওরা বলে, ‘একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, এখানেই আমরা মরি ও বাঁচি; মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে।’[১] বস্তুতঃ এ ব্যাপারে ওদের কোন জ্ঞান নেই, ওরা তো কেবল ধারণা করে মাত্র।
[১] এটা হল নাস্তিকদের এবং তাদেরই মত মক্কার মুশরিকদের উক্তি, যারা পুনর্জীবন ও পরকালকে অস্বীকার করত। তারা বলত যে, পার্থিব এই জীবনই হল প্রথম ও শেষ জীবন। এর পর আর কোন জীবন নেই এবং এতে জীবন ও মরণের যে ধারাবাহিকতা চলে আসছে, তা কেবল (প্রাকৃতিক নিয়ম বা) কাল-বিবর্তনের ফল। যেমন, দার্শনিকদের একটি দল বলে যে, প্রত্যেক ছত্রিশ হাজার বছর পর প্রতিটি জিনিস পুনরায় তার অবস্থায় ফিরে আসে। আর এই ধারাবাহিকতা কোন স্রষ্টা ও পরিচালক ছাড়াই অব্যাহত আছে এবং থাকবে। না তার কোন শুরু আছে, আর না শেষ। এ দলকে 'দাহরিয়া' বলা হয়। (ইবনে কাসীর) পরিষ্কার কথা যে, এ মতবাদ জ্ঞান ও যুক্তির পরিপন্থী এবং তা বর্ণিত (হাদীস ও কুরআনের) উক্তিরও বিপরীত। হাদীসে কুবদসীতে আছে মহান আল্লাহ বলেন, "আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়; তারা কালকে গালি দেয় (অর্থাৎ, তার প্রতি কার্যসমূহের সম্পর্ক জুড়ে তাকে গালি-গালাজ করে) অথচ (কাল স্বয়ং কিছুই নয়) আমিই হলাম কাল। আমার হাতেই (কালের) সমস্ত এখতিয়ার। আমিই রাত ও দিনের আগমন-প্রত্যাগমন ঘটাই।"(বুখারীঃ তাফসীর সূরাতুল জাসিয়াহ, মুসলিমঃ কিতাবুল আলফায)
আল-জাসিয়া 45:25
ওদের নিকট যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয় তখন কেবল এ উক্তি ছাড়া ওদের কোন যুক্তি থাকে না যে, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে উপস্থিত কর।’[১]
[১] এটাই হল তাদের সব চেয়ে বড় দলীল, যা কাট-হুজ্জতি ও অসার তর্ক বৈ কিছুই নয়।
আল-জাসিয়া 45:26
বল, ‘আল্লাহই তোমাদেরকে জীবন দান করেন অতঃপর তোমাদের মৃত্যু ঘটান। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’
আল-জাসিয়া 45:27
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাশ্রয়ীরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আল-জাসিয়া 45:28
আর প্রত্যেক সম্প্রদায়কে দেখবে ভয়ে নতজানু[১] অবস্থায়, প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার আমলনামা দেখতে আহবান করা হবে এবং বলা হবে, ‘তোমরা যা করতে, আজ তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।
[১] جَاثية এই শব্দ থেকে সূরাটির নামকরণ হয়েছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কিয়ামতে প্রত্যেক সম্প্রদায় (চাহে তারা আম্বিয়াগণের অনুসারী হোক অথবা তাঁদের বিরোধী সকলেই) ভয় ও আতঙ্কে নতজানু অবস্থায় বসে থাকবে। (ফাতহুল ক্বাদীর) তারপর তাদেরকে হিসাব-নিকাশের জন্য ডাকা হবে। যেমন, আয়াতের অবশিষ্ট অংশ থেকে তা স্পষ্ট হয়।
আল-জাসিয়া 45:29
আমার (নিকট সংরক্ষিত) এ আমলনামা যা তোমাদের ব্যাপারে সত্য কথা বলবে।[১] তোমরা যা করতে নিশ্চয় আমি তা লিপিবদ্ধ করাতাম।’[২]
[১] كتاب বলতে সেই আমলনামা (রেজিষ্টার)-কে বুঝানো হয়েছে, যাতে মানুষের সমস্ত আমল লেখা থাকবে। ﴿وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِآئَي بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءُ﴾ "আমলনামা সামনে উপস্থিত করা হবে এবং আম্বিয়া ও সাক্ষীগণকে আনা হবে।" (যুমারঃ ৬৯) এই আমলনামা মানুষের জীবনের এমন পরিপূর্ণ লিখিত বিবরণ হবে, যাতে কোন প্রকারের কমবেশী হবে না। মানুষ তা দেখে বলে উঠবে, ﴿مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لاَيُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلاَ كَبِيْرَةً اِلاَّ أَحْصَاهَا﴾ (الكهف: ৪৯) "এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত কিছুর হিসাব রেখেছে!" (কাহ্ফঃ ৪৯)[২] অর্থাৎ, তোমাদের আমল সম্বন্ধে আমার তো জানা আছেই। এ ছাড়াও আমার ফিরিশতাগণ আমার নির্দেশে তোমাদের প্রত্যেকটি কর্মাকর্ম লিপিবদ্ধ করত এবং সুরক্ষিত রাখত।
আল-জাসিয়া 45:30
সুতরাং যারা বিশ্বাস করেছে ও সৎকাজ করেছে[১] তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজ করুণায় প্রবেশ করাবেন।[২] এটিই মহাসাফল্য।
[১] এখানেও বিশ্বাস ও ঈমানের সাথে সৎকাজ ও নেক আমলের কথা উল্লেখ করে তার গুরুত্বকে স্পষ্ট করা হয়েছে। আর নেক আমল বলা হয় সেই সব সৎকর্মসমূহকে যা (একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে) সুন্নত (নবী (সাঃ)-এর তরীকা) অনুযায়ী সম্পাদন করা হয়। সেই সব কর্মসমূহকে নেক আমল বলা হয় না, যা মানুষ তার নিজের বিবেকে ভাল মনে করে অতি যত্নসহকারে ও বড়ই উদ্দীপনার সাথে সম্পাদন করে। যেমন, অনেক বিদআতী কার্যকলাপ বহু মযহাবপন্থী জামাআতগুলোর মধ্যে প্রচলিত আছে। আর এ কাজগুলোর গুরুত্ব এ জামাআতের মধ্যে ওয়াজিব ও ফরয কাজের থেকেও অনেক বেশী। এই জন্য এরা বহু ফরয ও সুন্নত কাজকে ব্যাপকহারে ত্যাগ করে, কিন্তু বিদআতী কার্যকলাপ করার প্রতি এমন যত্ন নেয় যে, এতে কোন প্রকারের শৈথিল্য ও উদাসীনতার কথা ভাবাই যায় না। অথচ নবী (সাঃ) বিদআতকে شَرُّ الأمُور (সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ) গণ্য করেছেন।
[২] 'রহমত' বা করুণা বলতে জান্নাত বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেমন, হাদীসে আছে যে, মহান আল্লাহ জান্নাতকে বলবেন, أَنْتِ رَحْمَتِيْ أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ "তুমি আমার রহমত। তোমার মাধ্যমে (অর্থাৎ, তোমার মধ্যে স্থান দিয়ে) আমি যাকে চাইব রহম করব।" (বুখারী, তাফসীর সূরা ক্বাফ)
আল-জাসিয়া 45:31
আর যারা অবিশ্বাস করেছে (তাদেরকে বলা হবে), ‘তোমাদের নিকট কি আমার আয়াত পাঠ করা হয়নি?[১] কিন্তু তোমরা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলে এবং তোমরা ছিলে এক অপরাধী সম্প্রদায়।’[২]
[১] ধমক স্বরূপ তাদেরকে এ কথা বলা হবে। কেননা, রসূলগণ তাদের কাছে এসেছিলেন। তাঁরা আল্লাহর যাবতীয় বিধি-বিধান তাদেরকে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কোন পরোয়াই করেনি।
[২] অর্থাৎ, সত্যকে গ্রহণ করার ব্যাপারে তোমরা অহংকার প্রদর্শন করেছ এবং ঈমান আননি, আসলে তোমরা পাপীই ছিলে।
আল-জাসিয়া 45:32
আর যখন বলা হত, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামত (সত্য), এতে কোন সন্দেহ নেই’, তখন তোমরা বলতে, ‘কিয়ামত কি? আমরা জানি না; আমরা এ বিষয়ে ধারণা করি মাত্র এবং আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নই।’ [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারটা কেবল ধারণা ও অনুমান। আমরা তো নিশ্চিত নই যে, তা সংঘটিত হবে।
আল-জাসিয়া 45:33
ওদের মন্দ কর্মগুলি ওদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যা নিয়ে ওরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা ওদেরকে পরিবেষ্টন করবে। [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামতের যে আযাবের ব্যাপারে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, অর্থাৎ, ভাবত যে, তা কিছুই নয়, তাতে তারা ধরা খাবে।
আল-জাসিয়া 45:34
ওদেরকে বলা হবে, ‘আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাৎকারকে ভুলে গিয়েছিলে।[১] তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’
[১] যেমন, হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তাঁর কোন কোন বান্দাকে বলবেন, "আমি কি তোমাকে স্ত্রী দান করিনি? আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি? আমি কি ঘোড়া এবং উট ইত্যাদিকে তোমার বশীভূত করে দিইনি? তুমি সর্দারীও করতে এবং করও সংগ্রহ করতে।" সে বলবে, 'হ্যাঁ, এসব ঠিকই তুমি দিয়েছিলে হে আমার প্রতিপালক!' মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, "আমার সাথে সাক্ষাৎ করার বিশ্বাস কি তোমার ছিল?" সে বলবে, 'না।' তখন মহান আল্লাহ বলবেন, (فَالْيَوْمَ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيْتَنِيْ) "আজ আমি তোমাকে (জাহান্নামে নিক্ষেপ করে) ভুলে যাব, যেমন তুমি আমাকে ভুলে ছিলে।" (মুসলিম, কিতাবুয্ যুহদ)
আল-জাসিয়া 45:35
এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ ওদেরকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে না এবং তাদের ওজর-আপত্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর বিধানাদি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এবং পার্থিব প্রতারণা ও ধোঁকায় পড়ে থাকা, এ দু'টি এমন অপরাধ যে, এই অপরাধই তোমাদেরকে জাহান্নামের আযাবের উপযুক্ত বানিয়েছে। এখন আর না এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব, আর না এই আশা আছে যে, কোন সময়ে তোমাদেরকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং তোমরা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহকে রাযী করে নিতে পারবে।
আল-জাসিয়া 45:36
সকল প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশমন্ডলীর প্রতিপালক, পৃথিবীর প্রতিপালক এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
আল-জাসিয়া 45:37
আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাবতীয় গৌরব-গরিমা তাঁরই[১] এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] যেমন, হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ বলেন, "গৌরব ও গর্ব খাস আমার গুণ। সুতরাং যে তাতে আমার অংশী হতে চাইবে আমি তাকে শাস্তি দেব।" (মুসলিম ২৬২০নং)
আল-আহকাফ 46:1
হা- মীম।[১]
[১] সূরার শুরুতে বিচ্ছিন্ন এই অক্ষরগুলো সেই অস্পষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যার জ্ঞান কেবল আল্লাহই রাখেন। কাজেই এগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য জানার পশ্চাতে পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। তথাপি কোন কোন মুফাসসির এগুলোর দু'টি উপকারিতার কথা বর্ণনা করেছেন; যা সূরা লুকমানের শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে।
আল-আহকাফ 46:2
এ কিতাব পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।
আল-আহকাফ 46:3
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুই আমি যথাযথভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য সৃষ্টি করেছি; [১] কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [২]
[১] অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পিছনে রয়েছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য। আর তা হল, মানুষকে পরীক্ষা করা। দ্বিতীয়তঃ তার একটি নির্দিষ্ট সময়ও রয়েছে। প্রতিশ্রুত সে সময় যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন আকাশ ও পৃথিবীর বর্তমান এ সকল নিয়ম-শৃঙ্খলা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। তখন না এই আকাশ থাকবে, আর না এই পৃথিবী। (দেখুনঃ সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৮ আয়াত) ﴿يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ﴾ (ابراهيم: ৪৮)[২] অর্থাৎ ঈমান না আনার কারণে যখন তাদেরকে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদানের ব্যাপারে ভয় দেখানো হয়, তখন তারা তার কোন পরোয়াই করে না। না তারা তার উপর ঈমান আনে, আর না পারলৌকিক শাস্তি হতে বাঁচার কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আল-আহকাফ 46:4
বল, ‘তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক, তাদের কথা ভেবে দেখছ কি? তারা পৃথিবীতে কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও অথবা আকাশমন্ডলীতে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি?[১] এর পূর্ববর্তী কোন কিতাবে অথবা পরম্পরাগত জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার নিকট উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’[২]
[১] أرَأَيْتُمْ এর অর্থ أَخْبِرُوْنِيْ অথবা أَرُوْنِيْ অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব প্রতিমাগুলোর অথবা ব্যক্তিত্বের তোমরা উপাসনা কর, আমাকে বল বা দেখাও দেখি, আকাশ-পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারে তাদের কি কোন অংশ রয়েছে? অর্থাৎ আকাশ-পৃথিবী সৃষ্টির কাজে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং পরিপূর্ণরূপে এই সমস্ত কিছুর স্রষ্টা হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। (ব্যাপার যখন এই) তখন তোমরা অসত্য এই উপাস্যগুলোকে আল্লাহর ইবাদতে শরীক কেন কর?
[২] অর্থাৎ কোন নবীর প্রতি অবতীর্ণ করা কিতাবে অথবা বর্ণিত কোন বর্ণনায় এ কথা লেখা থাকলে তা নিয়ে এসে দেখাও, যাতে তোমাদের সত্যতা পরিষ্কার হয়ে যায়। কেউ أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ এর অর্থ করেছেন, জ্ঞানভিত্তিক স্পষ্ট দলীল। এ ক্ষেত্রে কিতাব অর্থ হবে, বর্ণনাভিত্তিক প্রমাণ, এবং أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ এর অর্থ হবে, জ্ঞানভিত্তিক দলীল। অর্থাৎ কোন যুক্তিসংগত অথবা বর্ণনাগত প্রমাণ পেশ কর। أثر ধাতু হতে গঠিত হওয়ার কারণে তার প্রথম অর্থ রেওয়ায়াত বা বর্ণনা করা হয়েছে অথবা بَقِيَّةٍ مِّنْ عِلْمٍ অর্থাৎ পূর্বের নবীদের শিক্ষার অবশিষ্ট অংশ যা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাতে (তোমাদের) এ কথার উল্লেখ থাকলে (তা আমার কাছে নিয়ে এস)।
আল-আহকাফ 46:5
সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের ডাক সম্বন্ধে অবহিতও নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, এরাই সব চেয়ে বড় ভ্রষ্ট, যারা পাথরের মূর্তিগুলোকে অথবা মৃত ব্যক্তিদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে। তারা তো কিয়ামত পর্যন্ত তাদের ডাকে সাড়া দিতে অক্ষম। আর কেবল অক্ষমই নয়; বরং একেবারে বেখবরও।
আল-আহকাফ 46:6
যখন কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াবে এবং তাদের উপাসনাকে অস্বীকার করবে। [১]
[১] এই বিষয়টি কুরআনের একাধিক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সূরা ইউনুস ১০:২৯ নং আয়াতে, সূরা মারয়্যামের ১৯:৮১-৮২ নং আয়াতে এবং সূরা আনকাবুতের ২৯:২৫ নং আয়াত সহ আরো অন্য আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। দুনিয়াতে দু' প্রকারের উপাস্য বিদ্যমান রয়েছে। এক তো হল, নিষ্প্রাণ জড়পদার্থ, উদ্ভিদ এবং মহান আল্লাহর মহাশক্তির নিদর্শনাবলী (সূর্য, আগুন প্রভৃতি)। আল্লাহ তাআলা এগুলোর মধ্যে প্রাণ এবং বাকশক্তি দান করবেন। ফলে এ জিনিসগুলো মুখের ভাষায় ব্যক্ত করবে যে, এ কথা আমরা আদৌ জানতাম না যে, এরা আমাদের পূজা করত এবং তোমার উপাস্যত্বে আমাদেরকে শরীক করত। কেউ কেউ বলেছেন, বাচনিক জবানে নয়, বরং অবস্থার জবানে তারা নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। দ্বিতীয় প্রকার উপাস্য হল, নবী, ফিরিশতা ও নেক লোক বা সৎব্যক্তিদের মধ্য থেকে। যেমন, ঈসা, উযাইর (আলাইহিমাস্ সালাম) এবং আল্লাহর অন্যান্য নেক বান্দাগণ। এঁরাও আল্লাহর সমীপে সেইরূপই উত্তর দেবেন, যেমন ঈসা (আঃ)-এর উত্তর পবিত্র কুরআনে বর্ণিত রয়েছে। এ ছাড়া শয়তানও অস্বীকার করবে। যেমন সকল শরীকদের উক্তি কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। ﴿ تَبَرَّأْنَا إِلَيْكَ مَا كَانُوا إِيَّانَا يَعْبُدُونَ﴾ (القصص:৬৩) "আমরা তোমার সম্মুখে (আমাদের পূজারীদের সাথে) সম্পর্ক ছিন্নতার কথা ঘোষণা করছি, এরা আমাদের পূজা করত না।" (সূরা কাসাস ২৮:৬৩)
আল-আহকাফ 46:7
যখন তাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, তখন যারা সত্য উপস্থিত হওয়ার পর তা অস্বীকার করে, তারা বলে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট যাদু।’
আল-আহকাফ 46:8
তবে কি তারা বলে যে, ‘সে (মুহাম্মাদ) এটা (কুরআন) উদ্ভাবন করেছে?’ [১] তুমি বল, ‘যদি আমি এটা উদ্ভাবন করে থাকি, তাহলে তোমরা তো আল্লাহর শাস্তি হতে আমাকে কিছুতেই রক্ষা করতে পারবে না।[২] তোমরা যে বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত আছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [৩] আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে তিনিই যথেষ্ট[৪] এবং তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [৫]
[১] এখানে তাদের কাছে আগত 'হক' বা 'সত্য' হল কুরআন। তারা তার অলৌকিকতা ও আকর্ষণ শক্তি দেখে তাকে 'যাদু' বলে আখ্যায়িত করত। আবার এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অথবা যখন এ কথায় কোন ফল বুঝত না বা কোন কাজ হত না, তখন তারা বলত, এটা তো মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিজের উদ্ভাবন করা (স্বরচিত) বাণী।[২] অর্থাৎ, তোমাদের এ কথা যদি সঠিক হয় যে, আমি আল্লাহ-প্রেরিত রসূল নই এবং এ বাণী আমারই রচনা করা, তাহলে তো নিশ্চয় আমি এক বড় অপরাধী। এত বড় মিথ্যা অপরাধে মহান আল্লাহ আমাকে পাকড়াও না করে কিছুতেই ছেড়ে দেবেন না। আর এ ধরনের কোন ধর-পাকড় যদি হয়, তাহলে জেনে নিও যে, আমি মিথ্যুক এবং তোমরা আমার কোন সাহায্যও করো না। বরং এমতাবস্থায় আল্লাহর শাস্তি হতে আমাকে রক্ষা করার তোমাদের কোন এখতিয়ারই থাকবে না। এই বিষয়টিকে অন্যত্র এইভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ﴿وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ، لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ، فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ﴾ (الحاقة:৪৪-৪৭) অর্থাৎ, সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত। তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং কেটে দিতাম তার জীবন-ধমনী। অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তাকে রক্ষা করতে পারত। (সূরা হাক্কাহ ৬৯:৪৪-৪৭)[৩] অর্থাৎ, যত রকম ভাবেই তোমরা এ কুরআনকে মিথ্যাজ্ঞান করছ; কখনো যাদু বলে, কখনো জ্যোতিষীর বাণী বলে, আবার কখনো মস্তিস্ক-প্রসূত (স্বকপোলকল্পিত) বলে, আল্লাহ এসব খুব ভালোভাবেই জানেন। অর্থাৎ, তিনিই তোমাদেরকে তোমাদের এসব জঘন্য কার্যকলাপের বদলা দেবেন।[৪] এই কুরআন যে তাঁরই পক্ষ হতে অবতীর্ণ এ কথার উপর সাক্ষীর জন্য তিনি নিজেই যথেষ্ট এবং তোমাদের মিথ্যাজ্ঞান ও বিরোধিতা করার উপর সাক্ষীও তিনিই। এ কথায় তাদের জন্য কঠিন হুমকি ও ধমক রয়েছে।[৫] তার জন্য, যে তাওবা করে ঈমান আনবে এবং কুরআনকে আল্লাহর সত্য বাণী বলে বিশ্বাস করে নিবে। অর্থাৎ, সময় এখনও আছে। কাজেই তাওবা করে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার অধিকারী হয়ে যাও।
আল-আহকাফ 46:9
বল, ‘আমি তো কোন নতুন রসূল নই।[১] আর আমি জানি না যে, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে;[২] আমি আমার প্রতি যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’
[১] অর্থাৎ, আমি তো কোন প্রথম ও নতুন রসূল নই। বরং আমার পূর্বেও অনেক রসূল এসেছেন।
[২] অর্থাৎ, দুনিয়াতে কী করা হবে, তা আমার অজানা। আমি মক্কাতেই থাকব, না এখান থেকে বহিষ্কার হতে আমাকে বাধ্য হতে হবে, আমার সাধারণ ও স্বাভাবিক মরণ হবে, না তোমাদের হাতে আমাকে হত্যা হতে হবে? তোমরা শীঘ্রই শাস্তির সম্মুখীন হবে, নাকি দীর্ঘকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেওয়া হবে? এ সবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটেই আছে। আমার এটা জানা নেই যে, আগামী কাল আমার অথবা তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে? তবে পরকাল সম্পর্কে আমি নিশ্চিত রূপে বিদিত যে, মু'মিনরা জান্নাতে এবং কাফেররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর হাদীসে যে বর্ণিত হয়েছে, কোন সাহাবীর মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যাপারে সুধারণা প্রকাশ করা হলে নবী (সাঃ) বলতেন, (وَاللهِ مَا أَدْرِيْ- وأَنَا رَسُوْلُ اللهِ- مَا يُفْعَلُ بِيْ وَلاَ بِكُمْ) "আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রসূল হওয়া সত্ত্বেও এ কথা জানি না যে, আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে?" (সহীহ বুখারী, মানাক্বিবুল আনসার) তো এখানে কোন এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুনিশ্চিত পরিণাম সম্বন্ধে অজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। হ্যাঁ! যাঁদের (জান্নাতী হওয়ার) কথা সুস্পষ্ট দলীল দ্বারা সুসাব্যস্ত, তাঁদের ব্যাপার ভিন্ন। যেমন, সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রমুখ সাহাবীগণ।
আল-আহকাফ 46:10
বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি যে, যদি এ (কুরআন) আল্লাহর নিকট হতে (অবতীর্ণ) হয়ে থাকে, আর তোমরা এতে অবিশ্বাস কর, অথচ বানী ইস্রাঈলের একজন এর অনুরূপ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়ে এতে বিশ্বাস স্থাপন করল, আর তোমরা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে,[১] (তাহলে তোমাদের পরিণাম কী হবে?) নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’
[১] বানী-ইস্রাঈলের এই সাক্ষী থেকে কাকে বুঝানো হয়েছে? কেউ বলেন যে, এই শব্দটি জাতি বা সম্প্রদায় অর্থে প্রয়োগ হয়েছে। বানী-ইস্রাঈলের সকল ঈমান আনয়নকারী এর অন্তর্ভুক্ত। কারো মতে সূরাটি মক্কী হওয়ার ফলে মক্কায় অবস্থানকারী কোন এক বানী-ইস্রাঈলী উদ্দিষ্ট হবে। আবার কারো কারো নিকট এ থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে সালামকে বুঝানো হয়েছে এবং তাঁরা এই আয়াতকে মাদানী বলে গণ্য করেন। বুখারী-মুসলিমের বর্ণনা থেকেও এ উক্তির সমর্থন মেলে। (দেখুনঃ সহীহ বুখারী, মানাক্বিবুল আনসার, মুসলিম, ফাযাইলুস সাহাবা) এই কারণে ইমাম শাওকানী এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। عَلَى مِثْلِهِ (এর অনুরূপ সম্পর্কে সাক্ষ্য) এর অর্থ হল, তাওরাতের সাক্ষ্য দেওয়া যা আল্লাহর পক্ষ হতে কুরআনের অবতীর্ণ হওয়ার কথা একান্ত ভাবে প্রমাণ করে। কেননা, কুরআনও তাওহীদ (একত্ব) ও পরকাল সাব্যস্ত করার ব্যাপারে তাওরাতের মতনই। অর্থাৎ, কিতাবধারীদের সাক্ষ্য দেওয়া ও তাদের ঈমান আনার পর এই কুরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ তাতে সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং এরপর আর তোমাদের অস্বীকার ও অহংকার করার কোন বৈধতা থাকে না। তোমাদেরকে তোমাদের এই আচরণের পরিণাম সম্পর্কে ভেবে দেখা উচিত।
আল-আহকাফ 46:11
বিশ্বাসীদের সম্পর্কে অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এটা ভাল হলে তারা এর দিকে আমাদের অগ্রগামী হত না।’ আর যখন তারা এ (কুরআন) দ্বারা পরিচালিত নয়, তখন তারা বলবে যে, ‘এটা তো এক পুরাতন মিথ্যা।’[১]
[১] বিলাল, আম্মার, সুহাইব ও খাব্বাব (রাযিবয়াল্লাহু আনহুম)-এর মত মুসলিমরা ছিলেন মক্কার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতার সৌভাগ্য লাভে তাঁরাই ধন্য হন। এ দেখে মক্কার কাফেররা বলত যে, এই দ্বীনে যদি কোন কল্যাণ থাকত, তবে আমাদের মত সম্মানী ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই সর্বপ্রথম তা গ্রহণ করত, ওরা আমাদের আগে ঈমান আনতে পারত না। (অর্থাৎ তারা নিজেরাই নিজেদের ব্যাপারে ভেবে নিল যে, আল্লাহর নিকট তাদের বিরাট মর্যাদা রয়েছে।) এই দ্বীন যদি আল্লাহর পক্ষ হতে হত, তবে তিনি তা গ্রহণ করার ব্যাপারে আমাদেরকে পিছনে ফেলে রাখতেন না। আর আমাদের তা গ্রহণ না করার অর্থই হল যে, এটা একটি পুরাতন মিথ্যা। অর্থাৎ, কুরআনকে তারা 'পুরাতন মিথ্যা' বলে আখ্যায়িত করল। যেমন এটাকে তারা أَسَاطِيْرُ الأَوَّلِيْنَ (পূর্ববর্তীদের কেচ্ছা-কাহিনী)ও বলত। অথচ দুনিয়াতে কারো ধন-মালের মালিক হওয়া আল্লাহর নিকট গণ্য ব্যক্তি হওয়ার দলীল নয়। (যেমন তাদের ভুল ধারণা ছিল বা শয়তান তাদেরকে এই ভুল ধারণায় ফেলে রেখেছিল।) আল্লাহর নিকট গণ্য হওয়ার জন্য তো ঈমান ও ইখলাসের প্রয়োজন। আর তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এই ঈমান ও ইখলাসের ধন দানে ধন্য করেন। যেমন তিনি পরীক্ষার জন্য যাকে ইচ্ছা তাকে মাল-ধন দিয়ে থাকেন।
আল-আহকাফ 46:12
এর পূর্বে ছিল মূসার গ্রন্থ আদর্শ ও করুণাস্বরূপ। আর এই সমর্থক গ্রন্থ আরবী ভাষায়, যাতে এটা সীমালংঘনকারীদেরকে সতর্ক করে এবং তা সৎকর্মশীলদের জন্য সুসংবাদবাহক।
আল-আহকাফ 46:13
নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’ অতঃপর এই বিশ্বাসে অবিচলিত থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
আল-আহকাফ 46:14
তারাই জান্নাতের অধিবাসী; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। --এটাই তাদের কর্মফল।
আল-আহকাফ 46:15
আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে,[১] তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার জন্য স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস,[২] পরিশেষে যখন সে পূর্ণ শক্তি প্রাপ্ত হয় এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়[৩] তখন বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও,[৪] যাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি; আমার প্রতি আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করেছ, তার জন্য এবং যাতে আমি সৎকার্য করতে পারি যা তুমি পছন্দ কর; আমার জন্য আমার সন্তান-সন্ততিদেরকে সৎকর্মপরায়ণ কর। নিশ্চয় আমি তোমারই অভিমুখী হলাম এবং নিশ্চয় আমি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের অন্তর্ভুক্ত।’
[১] পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশটিকে আরো বেশী জোরদার করার লক্ষ্যে এই দুঃখ-কষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে এও প্রতীয়মান হয় যে, সদ্ব্যবহারের এই আদেশে মা, বাপের উপর প্রাধান্য পাওয়ার দাবী রাখে। তার কারণ, একটানা দীর্ঘ নয় মাস পর্যন্ত গর্ভধারণের কষ্ট এবং প্রসব বেদনা একমাত্র জননী একাই সহ্য করে থাকে। পিতার এতে কোন অংশ থাকে না। তাই হাদীসেও সন্তানের সদ্ব্যবহারের শীর্ষে মাকে রাখা হয়েছে এবং বাপকে রাখা হয়েছে তিন ধাপ নিচে। একদা জনৈক সাহাবী নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাধিক অধিকারী কে?' তিনি উত্তরে বললেন, "তোমার মা।" সাহাবী আবার একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও একই উত্তর দিলেন। তৃতীয় দফায় আবার সাহাবী অনুরূপ জিজ্ঞাসা করলে নবী (সাঃ)ও একই জবাব দিয়ে বললেন, তোমার মা। পুনরায় চতুর্থবারে একই প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি (সাঃ) বললেন, "তোমার বাপ।" (মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র্ অসসিলাহ)[২] فِصَالٌ এর অর্থ দুধ ছাড়ানো। এ থেকে কোন কোন সাহাবী প্রমাণ করেছেন যে, গর্ভধারণের কমসে কম সময়কাল হল ছয় মাস। অর্থাৎ ছয়মাস গর্ভ থাকার পরে কোন নারীর যদি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলে সে ছেলে বৈধ বলেই গণ্য হবে, অবৈধ নয়। কারণ, কুরআনে দুধ পানের সময়কাল বলা হয়েছে দু' বছর (২৪ মাস)। (দেখুনঃ সূরা লুকমান ৩১:১৪, বাক্বারাহ ২:২৩৩ আয়াত) এই হিসাবে গর্ভধারণের সময়কাল ছয় মাসই অবশিষ্ট থাকে।[৩] (أَشُدَّهُ) পূর্ণ শক্তির কাল বলতে, যৌবন কালকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে ১৮ বছর বয়স বলেছেন। এইভাবে বাড়তে বাড়তে সে চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়। এ বয়স হল জ্ঞান ও বিবেক শক্তির পূর্ণতা ও পক্বতার বয়স। এ জন্যেই মুফাসসিরগণের মতে প্রতিটি নবীকে চল্লিশ বছর বয়সের পরেই নবুঅত দানে ধন্য করা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)[৪] أَوْزِعِنِيْ অর্থ হল, أَلْهِمْنِيْ (আমাকে তাওফীক, সামর্থ্য বা প্রেরণা দাও)। এটাকেই দলীল বানিয়ে উলামাগণ বলেছেন যে, এই বয়সের পর থেকে মানুষের উচিত, এই দু'আটি অধিকহারে পড়তে থাকা। অর্থাৎ, رَبِّ أَوْزِعِنِيْ থেকে منَ الْمُسْلِمِيْنَ পর্যন্ত।
আল-আহকাফ 46:16
আমি এদেরই সর্বোৎকৃষ্ট কর্মগুলো গ্রহণ করে থাকি এবং তাদের মন্দ কর্মগুলো ক্ষমা করে দিই, তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। এদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা সত্য প্রমাণিত হবে।
আল-আহকাফ 46:17
আর যে তার মাতা-পিতাকে বলল, ‘আফসোস তোমাদের জন্য![১] তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমাকে পুনরায় জীবিত করা হবে; অথচ আমার পূর্বে বহু পুরুষ গত হয়ে গেছে?’[২] তখন তার মাতা-পিতা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলে, ‘দুর্ভোগ তোমার জন্য! বিশ্বাস স্থাপন কর, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য।’ কিন্তু সে বলে, ‘এটা তো অতীতকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নয়।’ [৩]
[১] উপরোক্ত আয়াতে সৌভাগ্যবান সন্তানদের আলোচনা ছিল। যারা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারও করে এবং তাদের জন্য কল্যাণের দু'আও করে। এখানে তাদের বিপরীত দুর্ভাগা ও অবাধ্য সন্তানদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। যারা পিতা-মাতার সাথে অভদ্র আচরণ করে। أُفٍّ لَّكُمَا আক্ষেপ তোমাদের উপর। أف (উঃ) শব্দটি বিরক্তি বা অসন্তোষ প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ অবাধ্য সন্তানরা পিতার উপদেশমূলক বাণী বা ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি আহবানের দাওয়াতে বিরক্তি ও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে। অথচ সন্তানদের জন্য এ রকম করার মোটেই কোন অনুমতি নেই। এই আয়াতটি ব্যাপক; সকল অবাধ্য সন্তান এই নির্দেশের আওতাধীন।
[২] উদ্দেশ্য হলো, তারা তো পুনরায় জীবিত হয়ে দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে ফিরে আসেনি। অথচ দ্বিতীয়বার জীবিত হওয়ার অর্থ কিয়ামতের দিন জীবিত হওয়া, যার পর হিসাব হবে।
[৩] মা-বাপ মুসলিম এবং সন্তান কাফের হলে, সেখানে এই ধরনের বাদানুবাদ হয়ে থাকে। যার একটি দৃষ্টান্ত এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-আহকাফ 46:18
এদের পূর্বে জ্বিন ও মানুষ সম্প্রদায় গত হয়েছে,[১] তাদের মত এদের প্রতিও আল্লাহর উক্তি সত্য হয়েছে।[২] নিশ্চয় এরা ক্ষতিগ্রস্ত।
[১] অর্থাৎ, এরাও সেই কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মানুষ ও জ্বিনদের মধ্য থেকে কিয়ামতের দিন যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
[২] যা পূর্ব থেকেই আল্লাহর জ্ঞানে ছিল। অথবা শয়তানের জবাবে আল্লাহ যে উক্তি করেছিলেন, ﴿لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكَ وَمِمَّنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ﴾ (ص:৮৫) (তোমার দ্বারা ও ওদের মধ্যে তোমার সকল অনুসারীদের দ্বারা আমি অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।) তা সত্য হয়েছে।
আল-আহকাফ 46:19
প্রত্যেকের মর্যাদা তার কর্মানুযায়ী।[১] তা এই জন্য যে, আল্লাহ সকলের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দান করবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না। [২]
[১] মু'মিন ও কাফের উভয়েরই নিজ নিজ আমল অনুযায়ী আল্লাহর নিকট মর্যাদা নির্ধারিত হবে। মু'মিন উচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হবে। পক্ষান্তরে কাফের জাহান্নামে স্থান লাভ করবে।
[২] পাপীদেরকে তাদের অপরাধের বেশি শাস্তি দেওয়া হবে না এবং নেককারদের প্রতিদানে কমতি করা হবে না। বরং প্রত্যেককে সুখ ও শাস্তি থেকে ততটুকুই দেওয়া হবে, যতটুকু পাওয়ার সে যোগ্য হবে।
আল-আহকাফ 46:20
যেদিন অবিশ্বাসীদেরকে জাহান্নামের সন্নিকটে উপস্থিত করা হবে।[১] (সেদিন তাদেরকে বলা হবে,) ‘তোমরা তো তোমাদের পার্থিব জীবনেই পুণ্যরাশি ভোগ করে নিঃশেষ করেছ। সুতরাং আজ তোমাদেরকে দেওয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি;[২] কারণ তোমরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলে এবং তোমরা ছিলে পাপাচারী। [৩]
[১] অর্থাৎ, সেই সময়কে স্মরণ কর যখন কাফেরদের চোখ থেকে পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং তারা জাহান্নামের আগুন অবলোকন করবে অথবা তার নিকটে অবস্থান করবে। কেউ يُعْرَضُوْنَ এর অর্থ করেছেন, يُعَذِّبُوْنَ (অর্থাৎ, জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে।) আবার কেউ কেউ বলেছেন, বাক্যের মধ্যে قلب (আগাপিছা) রয়েছে। অর্থাৎ, تُعْرَضُ النَّارُ عَلَيْهِمْ যখন আগুন তাদের উপর পেশ করা হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] طَيِّبَاتٍ থেকে বুঝানো হয়েছে সেই সব নিয়ামত, যা মানুষ খুব রুচির সাথে খেয়ে, পান করে এবং ব্যবহার করে তৃপ্তি ও আনন্দ বোধ করে। তবে পরকালের চিন্তা মাথায় নিয়ে এগুলো ব্যবহার করলে ব্যাপার ভিন্ন হয়। যেমন একজন মু'মিন করে থাকে। সে এর সাথে আল্লাহর বিধি-বিধান অনুসরণ করে তাঁর কৃতজ্ঞতার প্রতিও যত্ন নেয়। কিন্তু আখেরাতের চিন্তা-ফিকির মুক্ত অবস্থায় এই নিয়ামতগুলোর ব্যবহার মানুষকে অবাধ্য ও উচ্ছৃঙ্খল বানিয়ে ফেলে। যেমন একজন কাফেরের হয়ে থাকে। আর এইভাবে সে আল্লাহর অকৃতজ্ঞতা করে। সুতরাং মু'মিন বান্দা তো তাঁর কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের ফলে এই নিয়ামতগুলো বরং এর চেয়ে আরো উত্তম নিয়ামতসমূহ আখেরাতে পুনরায় পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফেরদেরকে তা-ই বলা হবে, যা এখানে আয়াতে বর্ণিত হয়েছে ﴿ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ﴾ (অর্থাৎ, তোমরা তো তোমাদের পার্থিব জীবনেই পুণ্যরাশি ভোগ করে নিঃশেষ করেছ।) এর দ্বিতীয় অনুবাদ হল, "পার্থিব জীবনে তোমরা সুখভোগ করে নিয়েছ এবং খুব উপকৃত হয়েছ।"
[৩] তাদের শাস্তির দু'টি কারণ বর্ণনা করেছেন। আর তা হল, অন্যায়ভাবে অহংকার। যার ফলে মানুষ সত্যকে মেনে না নিয়ে তা থেকে পলায়ন করে। আর দ্বিতীয় হল, ফিস্ক তথা নির্ভীকতার সাথে পাপকাজ সম্পাদন। এ দু'টি জিনিস প্রত্যেক কাফেরের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। ঈমানদারদের উচিত, এ আচরণ দু'টি থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখা।
বিঃদ্রঃ- সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-দের ব্যাপারে এসেছে যে, তাঁদের সামনে ভাল কিছু আসলে এই আয়াত তাঁদের মনে পড়ে যেত এবং এই ভয়ে তা বর্জন করে দিতেন যে, যাতে পরকালে আমাদেরকেও যেন এ রকম বলা না হয়, 'তোমরা তো দুনিয়াতেই সুখ ভোগ করে নিয়েছ।' এ ছিল তাঁদের অবস্থা; যা তাঁদের সীমাহীন আল্লাহভীরুতা, বিষয়-বিতৃষ্ণা ও পরহেযগারীর বাস্তব চিত্র। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভাল জিনিস ব্যবহার তাঁরা বৈধ মনে করতেন না।
আল-আহকাফ 46:21
স্মরণ কর, আ’দ সম্প্রদায়ের ভ্রাতার কথা, যার পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারী এসেছিল; সে তার সম্প্রদায় আহক্বাফবাসীকে সতর্ক করেছিল[১] এই বলে যে, ‘আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করো না। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’ [২]
[১] أَحْقَافٌ হল حِقْفٌ এর বহুবচন। বালির উঁচু ও লম্বা পাহাড়। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, পাহাড় ও গুহা। এটা (ইয়ামানের) 'হাযবরা-মাউত'-এর নিকটস্থ হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায় প্রথম আ'দ-এর এলাকার নাম। মক্কার কাফেরদের মিথ্যা ভাবার কারণে নবী (সাঃ)-এর দগ্ধ হৃদয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বিগত নবীদের ঘটনাবলী উল্লেখ করা হচ্ছে।
[২] يوم عظيم (মহাদিন) বলতে কিয়ামতের দিনকে বুঝানো হয়েছে। যার ভয়াবহতার কারণে তাকে যথার্থভাবেই বিরাট দিন বলা হয়েছে।
আল-আহকাফ 46:22
তারা বলেছিল, ‘তুমি আমাদেরকে আমাদের দেবতাগূলোর (পূজা) হতে নিবৃত্ত করতে এসেছ? [১] তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।’
[১] لِتَأْفِكَنَا এর অর্থ لِتَصْرِفَنَا অথবা لِتَمْنَعَنَا বা لِتُزِيْلَنَا সবগুলোরই অর্থ প্রায় কাছাকাছি; যাতে তুমি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের পূজা হতে ফিরিয়ে দাও, থামিয়ে দাও, সরিয়ে দাও, নিবৃত্ত কর।
আল-আহকাফ 46:23
সে বলল, ‘এর জ্ঞান তো শুধু আল্লাহরই নিকট আছে; আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি শুধু তাই তোমাদের নিকট প্রচার করি। [১] কিন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়।’ [২]
[১] অর্থাৎ আযাব কখন আসবে? অথবা তা পৃথিবীতে আসবে, না তোমাদেরকে পরকালে শাস্তি দেওয়া হবে, এ সবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকট। তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ফায়সালা করেন। আমার কাজ কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
[২] এক তো কুফরীর উপর অবিচল থাকছ। আর দ্বিতীয়তঃ আমার নিকট এমন জিনিসের দাবি করছ, যা আমার এখতিয়ারাধীন নয়।
আল-আহকাফ 46:24
অতঃপর যখন তাদের উপত্যকার দিকে তারা মেঘ আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘ওটা তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে।’ [১] (হূদ বলল,) ‘বরং ওটাই তো তা, যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছ;[২] এক ঝড়, যাতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।[৩]
[১] দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওখানে বৃষ্টি হয়নি। আকাশে উত্থিত মেঘমালা দেখে আনন্দিত হল যে, এবার বৃষ্টি হবে। মেঘকে عارض (দিগন্তপ্রসারী) এই কারণে বলা হয় যে, তা আকাশের দিগন্তে প্রসারিত হয়।[২] এ কথা হূদ (আঃ) তাদেরকে বললেন যে, এটা শুধু মেঘ নয়, যেমনটি তোমরা ভাবছ। বরং এটা সেই আযাব, যার সত্বর আসার দাবি তোমরা করছিলে।[৩] অর্থাৎ, যে বাতাস দ্বারা এই জাতির ধ্বংস সাধিত হয়, তা ঐ মেঘের সাথেই উঠেছিল এবং তা সেখান থেকেই বের হয়েছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদেরকে এবং তাদের প্রত্যেক জিনিসকে বিনাশপ্রাপ্ত করে দেওয়া হল। এই জন্য হাদীসে এসেছে যে, একদা আয়েশা (রাঃ) রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা মেঘ দেখে আনন্দিত হয় যে, বৃষ্টি হবে। কিন্তু এর বিপরীত আপনার মুখমন্ডলে চিন্তা ও অস্থিরতার লক্ষণসমূহ লক্ষ্য করা যায়? তিনি বললেন, "আয়েশা! এই মেঘে যে আযাব নেই তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? এক জাতিকে তো বাতাসের আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তারাও তো মেঘ দেখে বলেছিল, এই মেঘ আমাদের উপর বৃষ্টি বষর্ণ করবে।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহক্বাফ, মুসলিমঃ কিতাবুস্ স্বালাত) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, যখন প্রবল হাওয়া চলত, তখন তিনি (সাঃ) এই দু'আ পড়তেন। (اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ) (অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি এর কল্যাণ, এর মধ্যে যা আছে তার কল্যাণ এবং যার সাথে এ প্রেরিত হয়েছে তার কল্যাণ তোমার নিকট প্রার্থনা করছি। আর এর অনিষ্ট, এর মধ্যে যা আছে তার অনিষ্ট এবং যার সাথে এ প্রেরিত হয়েছে তার অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।) আর যখন আকাশে মেঘ ঘন হয়ে যেত, তখন তাঁর রঙ পরিবর্তন হয়ে যেত, তাঁর উপর ভয়ের ভাব সৃষ্টি হত এবং এর ফলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। কখনো বাইরে আসতেন, আবার কখনো ভিতরে প্রবেশ করতেন। কখনো আগে যেতেন, আবার কখনো পিছনে। অতঃপর যখন বৃষ্টি বর্ষণ হত, তখন তিনি স্বস্তি লাভ করতেন। (মুসলিম, উক্ত অধ্যায়)
আল-আহকাফ 46:25
যা তার প্রতিপালকের নির্দেশে সবকিছুকে ধ্বংস করে দেবে।’ অতঃপর তাদের পরিণাম এই হল যে, তাদের বাসগৃহগুলো ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না।[১] এভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি।
[১] অর্থাৎ গৃহবাসী সকলে ধ্বংস হয়ে গেল। কেবল গৃহগুলো উপদেশ গ্রহণের চিহ্ন হিসাবে পড়ে থাকল।
আল-আহকাফ 46:26
নিশ্চয় আমি তাদেরকে (আ’দ সম্প্রদায়কে) যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলাম তোমাদেরকে তা দিইনি; আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়; কিন্তু তাদের কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি,[১] কেননা তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছিল। আর যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তাই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।[২]
[১] এটা মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে যে, তোমরা এমন কি শক্তিমান? তোমাদের পূর্বের জাতিগণ, যাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা তো শক্তি ও প্রতাপে তোমাদের চাইতে অনেক বেশী ছিল। কিন্তু যখন তারা আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা (কান, চোখ ও অন্তর)-কে সত্য শোনার, দেখার ও বুঝার কাজে ব্যবহার করল না, তখন পরিশেষে আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম এবং এ জিনিসগুলো তাদের কোনই উপকারে এল না।
[২] অর্থাৎ, যে শাস্তিকে তারা অসম্ভব মনে করে ঠাট্টাচ্ছলে বলত যে, নিয়ে এস দেখি তোমার আযাব, সে আযাব এসে তাদেরকে এমনভাবে ঘিরে ধরল যে, তা থেকে আর বের হতে পারেনি।
আল-আহকাফ 46:27
আমি তো ধ্বংস করেছিলাম তোমাদের চারিপাশের জনপদসমূহকে,[১] আমি তাদেরকে বিভিন্নভাবে আমার নিদর্শনাবলী বিবৃত করেছিলাম, যাতে তারা (সৎপথে) ফিরে আসে।[২]
[১] 'চতুষ্পাশর্ববর্তী জনপদসমূহ' বলতে আ'দ, সামুদ এবং লূতের ঐ বসতিগুলোকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলো হেজাযের নিকটে অবস্থিত ছিল এবং ইয়ামান, সিরিয়া ও ফিলিস্তীন যাতায়াত পথে সেগুলোর পাশ দিয়েই তারা অতিক্রম করত।
[২] অর্থাৎ, আমি বিভিন্নভাবে এবং বিভিন্ন ধরনের দলীলাদি তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম এই মনে করে যে, হয়তো তারা তাওবা করবে। কিন্তু তারা অটল-অবিচল থাকল।
আল-আহকাফ 46:28
তারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বস্তুতঃ তাদের উপাস্যগুলো তাদের নিকট হতে উধাও হয়ে গেল। আর এ হল তাদের মিথ্যা ও অলীক উদ্ভাবনের পরিণাম। [১]
[১] অর্থাৎ, যে উপাস্যগুলোকে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করত, তারা তাদের কোন সাহায্য করল না, বরং তারা সেই মুহূর্তে আসেইনি, তাদের কোন পাত্তাই ছিল না। এ থেকেও জানা গেল যে, মক্কার মুশরিকরা মূর্তিগুলোকে প্রকৃত উপাস্য মনে করত না, বরং তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম ও অসীলা মনে করত। মহান আল্লাহ এই অসীলাগুলোকে 'ইফক' (মিথ্যা) এবং 'ইফতিরা' (মনগড়া উদ্ভাবন) সাব্যস্ত করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, এটা অবৈধ ও হারাম।
আল-আহকাফ 46:29
স্মরণ কর, আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম একদল জ্বিনকে, যারা কুরআন পাঠ শুনছিল, যখন তারা তার (নবীর) নিকট উপস্থিত হল, তারা একে অপরকে বলতে লাগল, ‘চুপ করে শ্রবণ কর।’[১] যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল,[২] তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।
[১] সহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই ঘটনা মক্কার নিকটস্থ 'নাখলা' নামক উপত্যকায় সংঘটিত হয়েছিল। যেখানে রসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-দেরকে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন। জ্বিনরা এই অনুসন্ধানে ছিল যে, আসমানে আমাদের উপর অত্যধিক কড়াকড়ি করে দেওয়া হয়েছে এবং এখন সেখানে আমাদের যাওয়া প্রায় অসম্ভব করে দেওয়া হয়েছে। কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে থাকবে যার কারণে এ রকম হয়েছে। তাই পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন দিকে জ্বিনদের দল ঘটনার অনুসন্ধানে ছড়িয়ে পড়ল। তাদেরই একটি অনুসন্ধানী দল এই কুরআন শুনে বুঝে নেয় যে, নবী করীম (সাঃ)-এর প্রেরণের এই ঘটনাই হল আমাদের আসমান প্রবেশের প্রতিবন্ধকতার কারণ। জ্বিনদের এই দলটি নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং ফিরে গিয়ে তাদের জাতিকেও এ কথা শোনায়। (মুসলিম, সালাত অধ্যায়) সহীহ বুখারীতেও কিছু কথার উল্লেখ আছে। (মানাক্বিবুল আনসার অধ্যায়) কিছু অন্যান্য বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি এই ঘটনার পর জ্বিনদের দাওয়াতে তাদের ওখানে যান এবং তাদেরকে আল্লাহর পায়গাম শুনান। জ্বিনরাও একাধিকবার নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়। (ফাতহুল বারী, তাফসীর ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর পক্ষ হতে কুরআন পাঠ শেষ হয়ে গেল।
আল-আহকাফ 46:30
তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শ্রবণ করেছি, যা অবতীর্ণ করা হয়েছে মূসার পরে, তা ওর পূর্ববতী কিতাবের সত্যায়নকারীরূপে সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে।
আল-আহকাফ 46:31
হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর আহবানে সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর,[১] আল্লাহ তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন। [২]
[১] এখানে জ্বিনরা তাদের জাতিকে নবী করীম (সাঃ)-এর নবুঅতের উপর ঈমান আনার দাওয়াত দেয়। এর পূর্বের আয়াতে কুরআন কারীম সম্পর্কে বলে যে, এটি তাওরাতের পর আরও একটি আসমানী কিতাব যা সঠিক ধর্ম এবং সরল ও সোজা পথের নির্দেশনা দেয়।
[২] এখানে ঈমান আনার দু'টি উপকারিতার কথা বলা হয়েছে, যা তারা পরকালে লাভ করবে। مِنْ ذُنُوْبِكُمْ এ من অক্ষরটি 'তাবঈয' তথা আংশিক অর্থ দেওয়ার জন্যে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ কিছু পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আর এগুলো হবে এমন সব পাপ, যার সম্পর্ক হবে আল্লাহর অধিকারের সাথে। কারণ, বান্দার অধিকার (বান্দা ক্ষমা না করলে) ক্ষমা করা হয় না। এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রতিদান ও শাস্তি এবং আদেশ ও নিষেধাবলীর ব্যাপারে জ্বিনদের বিধানও মানুষদের মতনই। এ ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে যে, মহান আল্লাহ জ্বিনদের মধ্য হতে তাদের জন্য কোন নবী প্রেরণ করেছিলেন, না করেননি? কুরআনের কিছু আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জ্বিনদের মধ্যে কেউ নবী হয়নি। সমস্ত নবী ও রসূল মানুষদের মধ্য হতেই হয়েছেন। {وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ} (النحل: ৪৩) {وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ المُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَيَمْشُونَ فِي الْأَسْوَاقِ} (الفرقان: ২০) কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, যত জনই রসূল হয়েছেন, সকলেই মানুষ ছিলেন। এই জন্য রসূল (সাঃ) যেমন মানুষদের জন্য রসূল ছিলেন এবং আছেন, অনুরূপ জ্বিনদের রসূলও তিনিই। আর তাঁর পয়গামকে জ্বিনদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যেমন, কুরআনের আলোচ্য আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়।
আল-আহকাফ 46:32
কেউ যদি আল্লাহর দিকে আহবানকারীর আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে সে পৃথিবীতে আল্লাহর অভিপ্রায় ব্যর্থ করতে পারবে না[১] এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।[২] তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।’
[১] অর্থাৎ, এমন হতেই পারে না যে, সে সুবিশাল ও সুপ্রসারিত পৃথিবীর কোথাও এমনভাবে আত্মগোপন করে নেবে যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বেঁচে যাবে।
[২] যে তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নেবে। অর্থাৎ, না সে নিজে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে, আর না অন্য কারো সাহায্যে তা সম্ভব হবে।
আল-আহকাফ 46:33
তারা কি দেখে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এ সবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তিবোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবন দান করতেও সক্ষম? কেন নয়? অবশ্যই তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।[১]
[১] أَوَ لَمْ يَرَوا 'তারা কি দেখে না' বলতে অন্তর-দৃষ্টি দ্বারা দেখাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তারা কি জানে না। أَلَمْ يَعْلَمُوْا অথবা أَلَمْ يَتَفَكَّرُوْا অর্থে। অর্থাৎ, যে আল্লাহ সীমাহীন ও প্রান্তহীন বিশাল আকাশ ও সুবিস্তৃত পৃথিবীর স্রষ্টা এবং এগুলোকে সৃষ্টি করে তিনি কলান্ত হননি, তিনি কি মৃতদের পুনরায় জীবিত করতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। কারণ, তিনি عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْر এর গুণে গুণান্বিত।
আল-আহকাফ 46:34
যেদিন অবিশ্বাসীদেরকে উপস্থিত করা হবে জাহান্নামের নিকট, (সেদিন তাদেরকে বলা হবে,) ‘এটা কি সত্য নয়?’ তারা বলবে, ‘আমাদের প্রতিপালকের শপথ! [১] অবশ্যই (এটা সত্য)।’ তিনি (আল্লাহ) বলবেন, ‘সুতরাং তোমরা সত্য প্রত্যাখ্যান করতে, তারই কারণে শাস্তি আস্বাদন কর।’[২]
[১] সেখানে শুধু সত্য বলেই স্বীকারই করবে না, বরং নিজেদের ঐ স্বীকারোক্তির উপর কসম খেয়ে তা সুদৃঢ়ও করবে। তবে সে সময়ে এই স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসবে না। কারণ, প্রত্যক্ষ দেখার পর স্বীকারোক্তির কিই-বা দাম থাকতে পারে? আর স্বচক্ষে দেখার পর স্বীকার না করে কেউ কি অস্বীকার করবে?
[২] কেননা, যখন মানার সময় ছিল, তখন মানোনি। এ শাস্তি হল সেই কুফরী ও অস্বীকারেরই প্রতিফল, যা তোমাদেরকে ভোগ করতেই হবে।
আল-আহকাফ 46:35
অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর, যেমন ধৈর্যধারণ করেছিল দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ রসূলগণ এবং তাদের জন্য (শাস্তি প্রার্থনায়) তাড়াতাড়ি করো না।[১] তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা যেদিন তারা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন দিবসের এক দন্ডের বেশী পৃথিবীতে অবস্থান করেনি।[২] এ হল ঘোষণা।[৩] সত্যত্যাগী সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কাউকেও ধ্বংস করা হবে না। [৪]
[১] এখানে মক্কার কাফেরদের অশালীন আচরণের কারণে নবী করীম (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
[২] কিয়ামতের ভয়াবহ শাস্তি দেখার পর তাদের কাছে পার্থিব জীবনটা এ রকম মনে হবে যে, সেখানে তারা কেবল দিনের একটি মুহূর্ত কাটিয়ে এসেছে।
[৩] بلاغ হল مبتدأ محذوف (ঊহ্য উদ্দেশ্য পদ)এর বিধেয় পদ। অর্থাৎ, أَيْ: هَذَا الَّذِيْ وَعَظْتَهُمْ بِهِ بَلاَغٌ তুমি তাদেরকে যে উপদেশ দিলে, তা হল ঘোষণা।
[৪] এই আয়াতেও ঈমানদারদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ ও উৎসাহবর্ধক বাণী যে, পরকালের ধ্বংস কেবল তাদের ভাগ্যেই আছে, যারা হবে আল্লাহর অবাধ্য ও তাঁর সীমা লঙ্ঘনকারী।
মুহাম্মাদ 47:1
যারা অবিশ্বাস করেছে এবং অপরকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করেছে[১] তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিয়েছেন।[২]
[১] কেউ কেউ এ থেকে কুরাইশ কাফেরদেরকে বুঝিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বুঝিয়েছেন আহলে-কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান)-দেরকে। তবে এটি ব্যাপক, তারা সহ সকল অবিশ্বাসীরাই এর অন্তর্ভুক্ত।
[২] এর একটি অর্থ এই যে, তারা নবী করীম (সাঃ) এর বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র করেছিল, মহান আল্লাহ সেগুলোকে ব্যর্থ করে তা তাদের উপরেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় অর্থ হল, তাদের মধ্যে উত্তম যে কিছু নৈতিকতা ছিল; যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, বন্দীদের মুক্ত করা এবং অতিথি আপ্যায়ন ইত্যাদি অথবা কা'বাগৃহ ও হাজীদের খিদমত করা, এ সবের কোন প্রতিদান তারা আখেরাতে পাবে না। কারণ, ঈমান ব্যতীত আমলের কোন নেকী নির্ধারিত হয় না।
মুহাম্মাদ 47:2
এবং যারা বিশ্বাস করেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস করেছে,[১] আর তা তাদের প্রতিপালক হতে সত্য; তিনি তাদের পাপরাশি ক্ষমা করেছেন[২] এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দিয়েছেন। [৩]
[১] যদিও বিশ্বাস ও ঈমান আনার মধ্যে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি প্রেরিত অহী অর্থাৎ, পবিত্র কুরআনের উপর ঈমান আনাও শামিল, তবুও এর গুরুত্ব ও মর্যাদাকে আরো বেশী সুস্পষ্ট করার জন্য এটাকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ ঈমান আনার পূর্বেকার ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেন। যেমন, নবী করীম (সাঃ)ও বলেছেন, "ইসলাম পূর্বেকার যাবতীয় পাপকে মুছে দেয়।" (সহীহুল জামে', আলবানী)
[৩] بَالَهُمْ এর অর্থ أَمْرَهُمْ، شَأنَهُمْ، حَالَهُمْ এগুলোর অর্থ প্রায় একই ধরণের। অর্থাৎ, তাদেরকে পাপাচার থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ প্রদর্শন করেছেন। আর একজন মু'মিনের জন্য অবস্থা ভালো হওয়ার এটাই সর্বোত্তম চিত্র। এর অর্থ এই নয় যে, ধন-সম্পদের মাধ্যমে তাদের অবস্থা ভালো করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, সকল মু'মিন ধন-সম্পদ পায় না। তাছাড়া পার্থিব ধন-সম্পদ লাভ অবস্থা ভাল হওয়ার সুনিশ্চিত প্রমাণও নয়। বরং এতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশী থাকে। এই জন্য নবী করীম (সাঃ) অধিক মাল পছন্দ করতেন না।
মুহাম্মাদ 47:3
এটা[১] এই জন্য যে, যারা অবিশ্বাস করেছে তারা মিথ্যার অনুসরণ করেছে এবং যারা বিশ্বাস করেছে তারা তাদের প্রতিপালক হতে (আগত) সত্যের অনুসরণ করেছে। এভাবে আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। [২]
[১] ذَلِكَ এটি হয় 'মুবতাদা' (উদ্দেশ্য পদ) কিংবা ঊহ্য উদ্দেশ্য পদের বিধেয় পদ। أَيْ: الأَمْرُ ذَلِكَ এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই সব শাস্তি ও অঙ্গীকারের প্রতি, যা কাফের ও মু'মিনদের জন্য বর্ণিত হয়েছে।
[২] যাতে মানুষ কাফেরদের জন্য বরাদ্দ পরিণাম থেকে দূরে থাকে এবং সেই সরল ও সঠিক পথ অবলম্বন করে; যে পথে চলে ঈমানদারগণ চিরন্তন সফলতা ও সুখ-সমৃদ্ধি লাভে ধন্য হবে।
মুহাম্মাদ 47:4
অতএব যখন তোমরা অবিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধে মোকাবিলা কর, তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর,[১] পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে, তখন তাদেরকে কষে বাঁধবে; [২] অতঃপর হয় অনুগ্রহ, না হয় মুক্তিপণ;[৩] যে পর্যন্ত না যুদ্ধ তার অস্ত্ররাজি নামিয়ে ফেলে।[৪] এটাই বিধান।[৫] আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারতেন,[৬] কিন্তু তিনি চান তোমাদের কিছুকে অপরদের দ্বারা পরীক্ষা করতে।[৭] যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। [৮]
[১] উভয় দলের কথা উল্লেখ করার পর এখন কাফের এবং যে কিতাবধারীদের সাথে কোন চুক্তি হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। হত্যার পরিবর্তে গর্দান কাটার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে রয়েছে কাফেরদের সাথে চরম কঠোরতা প্রদর্শনের নির্দেশ। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] অর্থাৎ, তুমুল যুদ্ধ এবং তাদেরকে অধিকহারে হত্যা করার পর তাদের মধ্যে যারা তোমাদের হাতে ধরা পড়বে, তাদেরকে বন্দী করে শক্তভাবে বেঁধে রাখ। যাতে তারা পালাতে না পারে।
[৩] مَنٌّ এর অর্থ হল, কোন বিনিময় না নিয়ে কেবল অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেওয়া। আর فِدَاء এর অর্থ হল, কিছু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া। যুদ্ধবন্দীদের ব্যপারে এই স্বাধীনতা বা এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে যে, পরিস্থিতি ও অবস্থা অনুপাতে যেটাই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য সর্বাধিক উত্তম হবে, সেটাই অবলম্বন করা যাবে।
[৪] অর্থাৎ কাফেরদের সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। অথবা এর অর্থ এই যে, যুদ্ধরত শত্রু পরাস্ত হয়ে কিংবা সন্ধির আশ্রয় নিয়ে অস্ত্র রেখে দেয় অথবা ইসলাম বিজয়ী হয় এবং কুফরীর সমাপ্তি ঘটে। উদ্দেশ্য হল, এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া অবধি কাফেরদের সাথে তোমাদের যুদ্ধ চলতেই থাকবে। তোমরা তাদেরকে হত্যা করবে এবং যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে উক্ত দু'টি সিদ্ধান্তই (মুক্তিপণ নিয়ে বা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া) তোমাদের এখতিয়ারাধীন থাকবে। কেউ বলেছেন, এই আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে; বিধায় এখন হত্যা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি রহিত নয়, বরং অব্যাহত। সুতরাং শাসকের চারটি জিনিসের এখতিয়ার আছেঃ কাফেরদের হত্যা করবে, না হয় বন্দী। বন্দীদের মধ্যে কাউকে অথবা সবাইকে হয় অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবে, না হয় মুক্তিপণ নিয়ে ছাড়বে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[৫] কিংবা তোমরা এ রকমই করো। افْعَلُوْا ذَلِكَ বা ذَلِكَ حُكْمُ الْكُفَّار
[৬] কাফেরদেরকে বিনাশ করে কিংবা শাস্তি দিয়ে। অর্থাৎ, তোমাদের তাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজনই পড়ত না।
[৭] অর্থাৎ, তোমাদেরকে একে অপরের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে। যাতে তিনি জেনে নেন যে, তোমাদের মধ্যে তাঁর পথে মুজাহিদ কারা? যাতে তিনি তাদেরকে প্রতিদান দেন এবং কাফেরদেরকে তাদের হাতে পরাস্ত করেন।
[৮] অর্থাৎ, তাদের পুণ্য ও পুরস্কার বিনষ্ট করবেন না।
মুহাম্মাদ 47:5
তিনি তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেবেন। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে এমন কাজের তাওফীক দান করবেন, যার ফলে তাদের জান্নাতের পথ সুগম হয়ে যাবে।
মুহাম্মাদ 47:6
তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। [১]
[১] অর্থাৎ, কোন পথ প্রদর্শন ছাড়াই তা চিনে নিবে এবং যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা নিজে নিজেই আপন আপন ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়বে। একটি হাদীস থেকেও এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়; যাতে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন; "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! একজন জান্নাতীর তার জান্নাতের ঘরের পথের জ্ঞান দুনিয়ার ঘরের চেয়েও অনেক বেশী হবে।" (বুখারী, রিক্বাক অধ্যায়ঃ)
মুহাম্মাদ 47:7
হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন[১] এবং তোমাদের পা দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। [২]
[১] আল্লাহর সাহায্য করার অর্থ, আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করা। কারণ, তিনি উপায়-উপকরণ অনুযায়ী তাঁর দ্বীনের সাহায্য তাঁর মু'মিন বান্দাদের দ্বারাই করেন। এই মু'মিন বান্দারা আল্লাহর দ্বীনের সংরক্ষণ ও তার দাওয়াত-তবলীগের কাজ করেন তাই তিনি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। অর্থাৎ, তাঁদেরকে কাফেরদের উপর জয়যুক্ত করেন। যেমন, সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) ও প্রাথমিক শতাব্দীগুলির মুসলিমদের উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে; তাঁরা দ্বীনের (খাদেম) হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে আল্লাহও তাঁদের (সহায়) হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা দ্বীনকে বিজয়ী করলে, আল্লাহও তাঁদেরকে পৃথিবীতে জয়যুক্ত করেছিলেন। যেমন, তিনি অন্যত্র বলেন, {وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَنْصُرُه} (الحج: ৪০) অর্থাৎ, "আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে।" (সূরা হাজ্জ ২২:৪০)[২] এটা যুদ্ধের সময়। تَثْبِيْتُ أَقْدَامٍ এটা যুদ্ধক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতার অর্থেই বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন, ইসলাম অথবা পুলসিরাতের উপর তাদের পা সুদৃঢ় রাখবেন।
মুহাম্মাদ 47:8
যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দেবেন।
মুহাম্মাদ 47:9
এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে।[১] সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিস্ফল করে দেবেন। [২]
[১] অর্থাৎ, কুরআন ও ঈমানকে তারা অপছন্দ করে।
[২] কর্মসমূহ বলতে এমন কর্মসমূহ, যা বাহ্যতঃ কল্যাণকর, কিন্তু তাদের ঈমান না থাকার কারণে তারা আল্লাহর নিকট তার কোন প্রতিদান পাবে না।
মুহাম্মাদ 47:10
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল?[১] আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করেছেন। আর অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে অনুরূপ পরিণাম। [২]
[১] যাদের বহু নিদর্শন তাদের এলাকায় বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় কোন কোন জাতির ধ্বংসাবশেষ চিহ্নসমূহ বিদ্যমান ছিল। এই জন্য তাদেরকে ঘুরে-ফিরে তাদের ভয়ানক পরিণাম দেখতে বলা হয়েছে, যাতে তা দেখে তারা ঈমান নিয়ে আসে।
[২] এখানে মক্কাবাসীদেরকে ভয় দেখানো হয়েছে যে, তোমরা যদি কুফরী থেকে ফিরে না এস, তবে তোমাদের জন্যেও অনুরূপ শাস্তি হতে পারে এবং বিগত বহু কাফের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার ন্যায় তোমাদেরকেও ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে।
মুহাম্মাদ 47:11
এটা এ জন্য যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোন অভিভাবক নেই। [১]
[১] তাই উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের শ্লোগানের উত্তরে মুসলিমরা যে শ্লোগান বলেছিলেন তা আয়াতের বাস্তব রূপ। যেমন কাফেররা বলেছিল, أُعْلُ هُبَل، أُعْلُ هُبَل (হুবালের নাম উচ্চ হোক)। এর উত্তরে মুসলিমগণ বলেছিলেন, اللهُ أَعْلَى وأَجَلُّ (আল্লাহই সর্বোচ্চ ও সর্বমহান)। কাফেরদের আরো একটি শ্লোগান ছিল, لَنَا الْعُزَّى وَلاَ عُزَّى لَكُمْ (আমাদের উয্যা আছে, তোমাদের উয্যা নেই।) উত্তরে মুসলিমগণ বলেছিলেন, اللهُ مَوْلاَنَا وَلاَ مَوْلَى لَكُمْ (আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী, তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই।) (বুখারী)
মুহাম্মাদ 47:12
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে, তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে এবং জন্তু-জানোয়ারের মত উদর-পূর্তি করে। [১] আর তাদের নিবাস হল জাহান্নাম।
[১] অর্থাৎ, যেভাবে জীব-জন্তুদের উদর এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ ছাড়া আর কোন কাজ থাকে না, অনুরূপ অবস্থা হল কাফেরদের। তাদের জীবনের উদ্দেশ্যও (ইহকালে) খাওয়া-পরা ছাড়া আর কিছুই নয়। পরকালের ব্যাপারে তারা একেবারে উদাসীন। এরই ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে খাওয়া যে নিষেধ তাও প্রমাণিত হয়। বর্তমানে বিভিন্ন দাওয়াত অনুষ্ঠানে যার ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেছে। কেননা, এতে রয়েছে জীব-জন্তুর সাদৃশ্য অবলম্বন; যেটা কাফেরদের অভ্যাস। বহু হাদীসে দাঁড়িয়ে পানি পান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আনাস (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে, কোন লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আনাস (রাঃ)-কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, 'এটা তো আরো খারাপ ও আরো নোংরা।" (মুসলিম ২০২৪নং) কাজেই জন্তু-জানোয়ারের মত দাঁড়িয়ে পানাহার করা থেকে বিরত থাকা অতীব প্রয়োজনীয় আচরণ। (দ্রঃ যাদুল মাআ'দ)
মুহাম্মাদ 47:13
তোমার সেই জনপদ; যা তোমাকে বহিষ্কার করেছে, তা অপেক্ষা অতি শক্তিশালী কত জনপদ ছিল, আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদেরকে সাহায্য করার কেউ ছিল না।
মুহাম্মাদ 47:14
যে ব্যক্তি তার প্রতিপালক হতে (আগত) সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, সে কি তার মত, যার নিকট নিজের মন্দ কর্মগুলো শোভনীয় প্রতীয়মান হয় এবং যারা নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে? [১]
[১] 'মন্দ কর্ম' বলতে শিরক ও অবাধ্যতাকে বুঝানো হয়েছে। এর অর্থও তা-ই যা পূর্বে বহু স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। আর তা হল, মু'মিন ও কাফের, মুশরিক ও তাওহীদবাদী এবং সৎলোক ও অসৎলোক সমান হতে পারে না। একজনের জন্যে আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং জান্নাতের নিয়ামতসমূহ। পক্ষান্তরে অপরজনের জন্য রয়েছে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি। পরের আয়াতে উভয়ের পরিণামের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। প্রথমে সেই জান্নাতের বৈশিষ্ট্য ও তার সৌন্দর্যের কথা, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহভীরু পরহেজগার বান্দাদেরকে দেওয়া হয়েছে।
মুহাম্মাদ 47:15
সাবধানীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হলঃ ওতে আছে নির্মল পানির নদীমালা,[১] আছে দুধের নদীমালা যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়,[২] আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নদীমালা,[৩] আছে পরিশোধিত মধুর নদীমালা।[৪] আর সেখানে তাদের জন্য আছে বিবিধ ফল-মূল ও তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা। সাবধানীরা কি তাদের মত, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি; যা তাদের নাড়ী-ভুঁড়ি ছিন্ন-ভিন্ন করে দেবে? [৫]
[১] آسِنٍ এর অর্থঃ পরিবর্তনীয়। غير آسن এর অর্থঃ অপরিবর্তনীয়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে পানি যদি কোন এক স্থানে কিছুক্ষণের জন্য পড়ে থাকে, তবে তার রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তার গন্ধ ও স্বাদে এমন বিকৃতি ঘটে যে, তা সবাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু জান্নাতের পানির এমন বৈশিষ্ট্য হবে যে, তাতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অর্থাৎ, তার গন্ধ ও স্বাদ অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে। যখনই পান করবে, তখনই তা টাটকা, তৃপ্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যকর হবে। পৃথিবীর পানি যেহেতু খারাপ বা নষ্টযোগ্য, তাই এই পানির ব্যাপারে শরীয়তের বিধান হল, ততক্ষণ পর্যন্ত তা পবিত্র বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না তার রঙ বা গন্ধ পরিবর্তন হবে। কেননা, গন্ধ বা রঙের বিকৃতি ঘটলেই পানি নাপাক হয়ে যায়।[২] দুনিয়াতে উট, গাই, মহিষ ও ছাগলের স্তন থেকে দোহানো দুধ কিছুকাল পরে খারাপ হয়ে যায়; কিন্তু জান্নাতের দুধ যেহেতু কোন পশুর স্তন থেকে এইভাবে নির্গত হবে না, বরং তার নহর থাকবে, সেহেতু সে দুধ যেমন সুস্বাদু হবে, তেমনি তা খারাপ হওয়া থেকেও সুরক্ষিত থাকবে।[৩] পৃথিবীতে যে সুরা বা মদ পাওয়া যায়, তা সাধারণতঃ অত্যন্ত ঝাঁঝালো, বদ-মজাদার ও দুর্গন্ধময় হয়। এ ছাড়া তা পান করে মানুষ সাধারণতঃ বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে, আবোল-তাবোল বকে এবং নিজের দেহের ব্যাপারেও কোন খেয়াল থাকে না। কিন্তু জান্নাতের সুরা দেখতে হবে সুন্দর,স্বাদে হবে অতুলনীয় এবং তা হবে অতীব সুবাসিত। তা পান করে না কোন মানুষ জ্ঞানশূন্য হবে, আর না অস্বস্তি বোধ করবে। বরং এমন তৃপ্তি ও আনন্দ বোধ করবে যে, তা এই দুনিয়াতে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। যেমন, মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, {لا فِيهَا غَوْلٌ وَلا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُونَ} (الصافات:৪৭) "ওতে ক্ষতিকর কিছুই থাকবে না এবং ওতে তারা নেশাগ্রস্তও হবে না।" (সূরা সা-ফফা-ত ৩৭:৪৭ আয়াত)(আরো দেখুনঃ সূরা ওয়াকিআহ ৫৬:১৯ আয়াত)[৪] অর্থাৎ, মধুতে সাধারণতঃ যে সব জিনিসের মিশ্রণ ঘটানোর সম্ভাবনা থাকে; যেমন দুনিয়াতে ব্যাপকহারে দেখা যায়, জান্নাতে এ রকম কোন আশঙ্কা থাকবে না। তা একেবারে নির্মল ও স্বচ্ছ হবে। কারণ, এ মধু দুনিয়ার মত মৌমাছি থেকে সংগৃহীত হবে না। বরং তারও খাস নহর হবে। এই জন্য হাদীসে এসেছে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "যখন তোমরা চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কেননা, তা হল মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ জান্নাত। সেখান থেকেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হয় এবং তার উপরে রয়েছে পরম দয়াময়ের আরশ।" (বুখারী, জিহাদ অধ্যায়)[৫] অর্থাৎ, যে জান্নাতে পূর্বে উল্লিখিত সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবে, সে কি এমন জাহান্নামীদের সমান, যাদের এই অবস্থা হবে? পরিষ্কার কথা যে, এমন হবে না। বরং একজন উন্নত মর্যাদায় থাকবে, আর অপরজন থাকবে জাহান্নামে। একজন জান্নাতের নিয়ামতসমূহে আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকবে, আর অপরজন জাহান্নামের শাস্তির কঠিন কষ্ট ভোগ করবে। একজন আল্লাহর অতিথি হবে, যার সম্মানার্থে বিভিন্ন প্রকারের জিনিস প্রস্তুত থাকবে। আর অপরজন আল্লাহর বন্দী হবে, যাকে খেতে দেওয়ার জন্য যাক্কুমের মত তিক্ত ও বদ-মজাদার খাদ্য এবং পান করার জন্য ফুটন্ত পানি দেওয়া হবে।
মুহাম্মাদ 47:16
তাদের মধ্যে কতক তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে জ্ঞানবানদেরকে বলে, ‘এই মাত্র সে কি বলল?’ [১] ওরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে।
[১] এখানে মুনাফিকদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। তাদের নিয়ত যেহেতু ভাল হত না, তাই নবী করীম (সাঃ)-এর কথাগুলোও বুঝতে পারত না। তারা মজলিস থেকে বেরিয়ে এসে সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করত যে, তিনি কি বললেন?
মুহাম্মাদ 47:17
যারা সৎপথ অবলম্বন করে, তাদেরকে আল্লাহ সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে ধর্মভীরু হবার শক্তি দান করেন।[১]
[১] অর্থাৎ, যাদের হিদায়াত অর্জন করার নিয়ত হয়, আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত লাভ করার তওফীকও দান করেন এবং তাদেরকে তার উপর প্রতিষ্ঠিতও রাখেন।
মুহাম্মাদ 47:18
তারা কি শুধু এ জন্য অপেক্ষা করছে যে, কিয়ামত তাদের নিকট আকস্মিকভাবে এসে পড়ুক? কিয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসেই পড়েছে।[১] অতঃপর কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কেমন করে? [২]
[১] অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর নবী হয়ে প্রেরিত হওয়াই কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিদর্শন। যেমন তিনি নিজেও এ কথা বলেছেন, (بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ) "আমার প্রেরিত হওয়ার ও কিয়ামতের মাঝে ব্যবধান হল এই দুই আঙ্গুলের (মাঝে ব্যবধানের) ন্যায়।" (বুখারী) তিনি ইঙ্গিত করে একথা পরিষ্কার করে দিলেন যে, যেভাবে এই আঙ্গুল দু'টি পরস্পর মিলে রয়েছে, অনুরূপ আমার ও কিয়ামতের মধ্যেও কোন ব্যবধান নেই। অথবা একটি আঙ্গুল যেমন অপর আঙ্গুলটির চেয়ে একটু বেশি লম্বা আছে, অনুরূপ কিয়ামতও আমার জীবনকালের একটু পরে সংঘটিত হবে।
[২] অর্থাৎ, কিয়ামত যখন হঠাৎ এসে পড়বে, তখন কাফের কিভাবে উপদেশ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে? অর্থাৎ, সেই সময় সে যদি তওবাও করে, তবুও তা গৃহীত হবে না। কাজেই তওবা করতে চাইলে এটাই সময়। তাছাড়া এমন সময়ও এসে উপস্থিত হতে পারে, যখন তাদের তওবাও ফলপ্রসূ হবে না।
মুহাম্মাদ 47:19
সুতরাং তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন উপাস্য নেই।[১] আর ক্ষমা-প্রার্থনা কর তোমার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য।[২] আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান ক্ষেত্র সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। [৩]
[১] অর্থাৎ, এই বিশ্বাসের উপর অটল ও দৃঢ় থাক। কেননা, এটাই তাওহীদ (একত্ব), আল্লাহর আনুগত্য এবং যাবতীয় কল্যাণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর এ থেকে বিচ্যুতি অর্থাৎ, শিরক ও অবাধ্যতা হল যাবতীয় অকল্যাণের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
[২] এই আয়াতে নবী করীম (সাঃ)-কে তাঁর নিজের জন্যও এবং মু'মিনদের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব ও ফযীলত অনেক। বহু হাদীসেও এর প্রতি বড়ই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তওবা কর। কারণ, আমি দিনে সত্তরবারেরও বেশী তাঁর নিকট তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি।" (বুখারী, দা'ওয়াত অধ্যায়)
[৩] অর্থাৎ, দিনে তোমরা যেখানেই যাও এবং যা কিছু কর এবং রাতে যেখানেই বিশ্রাম নাও ও অবস্থান কর, মহান আল্লাহ তার সবকিছু জানেন। অর্থাৎ, তোমাদের দিবারাত্রির কোন কর্মতৎপরতা আল্লাহর নিকট গুপ্ত নয়।
মুহাম্মাদ 47:20
বিশ্বাসীরা বলে, ‘একটি সূরা অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’[১] অতঃপর যদি সুস্পষ্ট মর্মবিশিষ্ট কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয়[২] এবং তাতে যুদ্ধের কোন নির্দেশ থাকে, তাহলে তুমি দেখবে, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা মৃত্যুভয়ে বিহ্বল মানুষের মত তোমার দিকে তাকাচ্ছে। [৩] সুতরাং তাদের জন্য উত্তম ছিল,
[১] যখন জিহাদের নির্দেশ আসেনি, তখন জিহাদের জন্য উদ্গ্রীব মু'মিনগণ, যাঁরা জিহাদ করার অনুমতির আশা করতেন এবং বলতেন যে, 'এ (জিহাদের) ব্যাপারে কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় না কেন?' অর্থাৎ, এমন সূরা যাতে জিহাদ করার নির্দেশ থাকবে।[২] অর্থাৎ, এমন সূরা যা 'মানসূখ'(রহিত) নয়।[৩] এ হল সেই মুনাফিকদের কথা, যাদের কাছে জিহাদের নির্দেশ বড় কঠিন মনে হত। কিছু দুর্বল শ্রেণীর মু'মিনও কখনো কখনো তাদের দলভুক্ত হয়ে যেত। সূরা নিসার ৪:৭৭ নং আয়াতেও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
মুহাম্মাদ 47:21
আনুগত্য করা ও ন্যায়সঙ্গত কথা বলা।[১] সুতরাং জিহাদের সিদ্ধান্ত হলে[২] যদি তারা আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করত, [৩] তাহলে তাদের জন্য এটা মঙ্গলজনক হত। [৪]
[১] অর্থাৎ, জিহাদের নির্দেশ পেয়ে বিচলিত না হয়ে তাদের জন্য এটাই উত্তম ছিল, শুনে আনুগত্য করার মনোভাব প্রদর্শন করা এবং নবী করীম (সাঃ)-এর ব্যাপারে কোন অসভ্য কথা না বলে উত্তম কথা বলা। أوْلَى শব্দের অর্থ এখানে أَجْدَرُ (উত্তম)। আর এই অর্থকেই ইবনে কাসীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ أولى শব্দটিকে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনমূলক শব্দ অর্থাৎ, বদ্দুআমূলক শব্দ বলে গণ্য করেছেন। مَعْنَاهُ قَارَبَهُ مَا يُهْلِكُهُ (তাদের ধ্বংস অতি নিকটেই) অর্থাৎ, তাদের ভীরুতা ও মুনাফিক্বীই তাদের ধ্বংসের কারণ হবে। এই হিসাবে طَاعَةٌ وَقَوْلٌ مَّعْرُوْفٌ হবে সম্পূর্ণ এক নতুন বাক্য; যার উদ্দেশ্যপদ এটি এবং বিধেয়পদ হবে خَيْرٌ لَكُمْ যা এখানে ঊহ্য আছে। (ফাতহুল ক্বাদীর, আয়সারুত তাফাসীর)
[২] অর্থাৎ, জিহাদের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এবং তার সময় এসে গেলে।
[৩] অর্থাৎ, এখনও যদি তারা মুনাফিক্বী ত্যাগ করে নিজেদের নিয়তকে আল্লাহর জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ করে নিত। অথবা রসূল (সাঃ)-এর সামনে তাঁর সঙ্গী হয়ে জিহাদ করার যে অঙ্গীকার করেছিল, তাতে যদি আল্লাহর নিকট তারা সত্যতার প্রমাণ দিত।
[৪] অর্থাৎ, মুনাফিক্বী ও বিরুদ্ধাচরণের স্থলে তওবা ও আন্তরিকতা প্রদর্শন মঙ্গলজনক হত।
মুহাম্মাদ 47:22
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে[১] এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।
[১] একে অপরকে হত্যা করে। অর্থাৎ এখতিয়ার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) تَوَلَّيْتُمْ এর অর্থ করেছেন, "তোমরা জিহাদ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও"। অর্থাৎ, তোমরা পুনরায় সেই মূর্খতার যুগে ফিরে যাবে এবং পরস্পর খুনোখুনি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। আয়াতে সাধারণভাবে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি এবং বিশেষভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। আর পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হল, মৌখিকভাবে, কর্মের মাধ্যমে এবং মাল-ধন ব্যয় করার মাধ্যমে আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার কর। বহু হাদীসেও এ বিষয়ে বড়ই তাকীদ ও ফযীলতের কথা এসেছে। (ইবনে কাসীর)
মুহাম্মাদ 47:23
ওরা তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশপ্ত করে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন। [১]
[১] অর্থাৎ, এ ধরনের লোকদের কানগুলোকে মহান আল্লাহ (সত্য শোনা থেকে) বধির এবং চোখগুলোকে (সত্য দেখা হতে) অন্ধ করে দেন। আর এটা হল তাদের উল্লিখিত মন্দ কর্মসমূহের ফল।
মুহাম্মাদ 47:24
তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? [১]
[১] যার কারণে কুরআনের অর্থ ও তাৎপর্য তাদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে না।
মুহাম্মাদ 47:25
যারা নিজেদের নিকট সৎপথ ব্যক্ত হবার পর তা পরিত্যাগ করেছে,[১] শয়তান তাদের কাজকে সুশোভিত করে দেখিয়েছে এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দিয়ে রেখেছে। [২]
[১] এ থেকে মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। যারা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের কুফরী এবং দ্বীন পরিহার করার ব্যাপারটা প্রকাশ করে দিয়েছে।
[২] أَملَى (মিথ্যা আশা দিয়ে রেখেছে) এর فاعل (কর্তৃপদ)ও শয়তান। অর্থাৎ, مَدَّ لَهُمْ فِي الْأَمَلِ وَوَعَدَهُمْ طُولَ الْعُمرِ শয়তান তাদেরকে বিরাট আশায় এবং এই প্রতারণায় ফেলে রেখেছে যে, এখনো তোমাদের অনেক বয়স আছে। কেন যুদ্ধে গিয়ে নিজেদের প্রাণ হারাবে? অথবা এর فاعل (কর্তৃপদ) হল আল্লাহ। অর্থাৎ, আল্লাহ তাদেরকে ঢিল ও অবকাশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি তাদেরকে সত্বর পাকড়াও করেননি।
মুহাম্মাদ 47:26
এটা এ জন্য যে,[১] আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, যারা তা অপছন্দ করে তাদেরকে তারা বলে,[২] ‘আমরা কোন কোন বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব।’[৩] আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি অবগত আছেন।[৪]
[১] এখানে 'এটা' বলে তাদের ধর্মত্যাগ করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।[২] অর্থাৎ, মুনাফিকরা মুশরিকদেরকে অথবা ইয়াহুদীদেরকে বলে।[৩] অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ) এবং তার আনীত দ্বীনের বিরোধিতায়।[৪] যেমন অন্যত্র বলেছেন, {وَاللهُ يَكْتُبُ مَا يُبَيِّتُونَ} অর্থাৎ,তারা রাত্রে যা পরামর্শ করে, আল্লাহ তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন। (সূরা নিসা ৪:৮১)
মুহাম্মাদ 47:27
ফিরিশতারা যখন তাদের মুখমন্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে তাদের প্রাণ হরণ করবে, তখন (তাদের দশা) কেমন হবে? [১]
[১] এখানে কাফেরদের সেই সময়কার অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে, যখন ফিরিশতাগণ তাদের আত্মা বের করবেন। মৃত্যুর সময় কাফের ও মুনাফিকদের আত্মা ফিরিশতার হাত থেকে বাঁচার জন্য দেহের মধ্যে লুকোচুরি করতে লাগে এবং এদিক ওদিক পালাবার চেষ্টা করে। সে সময় ফিরিশতাগণ তা কঠোরভাবে ধরে সজোরে টানেন এবং মারেন। এই বিষয়টি ইতিপূর্বে সূরা আনআম ৬:১৯৩ নং আয়াতে এবং সূরা আনফাল ৮:৫০ নং আয়াতেও উল্লিখিত হয়েছে।
মুহাম্মাদ 47:28
এটা এ জন্য যে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে, তারা তার অনুসরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করে, সুতরাং তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দেন।
মুহাম্মাদ 47:29
যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাদের বিদ্বেষ ভাব কখনই প্রকাশ করবেন না? [১]
[১] أَضْغَانٌ হল ضِغْنٌ এর বহুবচন। যার অর্থ হিংসা ও বিদ্বেষ। মুনাফিকদের অন্তরে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষ ছিল। এ ব্যাপারেই বলা হচ্ছে যে, তারা কি মনে করে যে, মহান আল্লাহ তা প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন না?
মুহাম্মাদ 47:30
আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদেরকে দেখিয়ে দিতাম, ফলে তুমি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতে,[১] তবে তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবে।[২] আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত।
[১] অর্থাৎ, এক একজনকে এমনভাবে চিহ্নিত করে দিতাম যে, প্রত্যেক মুনাফিককে প্রকাশ্যে চেনা যেত। কিন্তু সমস্ত মুনাফিকদের জন্য আল্লাহ এ রকম এই জন্য করেননি যে, এটা তাঁর গোপনকারী গুণের বিপরীত। তিনি সাধারণতঃ (মানুষের পাপ-রহস্য) গোপন রাখেন; প্রকাশ করেন না। দ্বিতীয়তঃ তিনি মানুষের বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে বিচার করার এবং গোপনীয় ব্যাপারকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
[২] অবশ্য তাদের কথা বলার ধরণ ও বাচনভঙ্গি এমন হয় যে, তা তাদের মনের খবর প্রকাশ করে দেয়। যার দ্বারা পয়গম্বর তো তাদেরকে অবশ্যই চিনতে পারেন। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, মানুষের অন্তরে যা কিছু হয়, সেটাকে সে যতই গোপন করার চেষ্টা করুক না কেন, তার কথার ঢঙ, হাবভাব, ভাবভঙ্গি, গতিবিধি এবং কোন কোন বিশেষ অবস্থা তার অন্তরের গোপন রহস্যকে উদঘাটন করে দেয়।
মুহাম্মাদ 47:31
আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি। [১]
[১] আল্লাহ তাআলার প্রথম থেকেই জানা আছে। এখানে জানার অর্থ, তা বাস্তবায়িত ও সংঘটিত হওয়া। যাতে অন্যরাও জেনে এবং দেখে নেয়। আর এই জন্য ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) এর অর্থ বর্ণনা করেছেন, حَتَّى نَعْلَمَ وُقُوْعَهُ যাতে আমি তার বাস্তবায়ন জেনে নিই। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ধরনের শব্দের অর্থ করতেন, لِنَرَى যাতে আমি দেখে নিই। (ইবনে কাসীর) আর এই অর্থই বেশী স্পষ্ট।
মুহাম্মাদ 47:32
যারা অবিশ্বাস করে এবং মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং নিজেদের নিকট পথের দিশা ব্যক্ত হবার পর রসূলের বিরোধিতা করে, তারা কখনই আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না।[১] আর তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করবেন। [২]
[১] বরং নিজেদেরই ক্ষতি করবে।
[২] কেননা, আল্লাহর নিকট ঈমান ব্যতীত কোন আমলেরই কোনই মূল্য নেই। ঈমান ও ইখলাসই প্রত্যেক আমলকে আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার যোগ্য বানায়।
মুহাম্মাদ 47:33
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের কর্মসমূহ বিনষ্ট করো না। [১]
[১] অর্থাৎ, মুনাফিক ও মুর্তাদ্দের মত মুনাফিক্বী ও ধর্মত্যাগ করে নিজেদের আমলগুলো নষ্ট করো না। এ বাক্য দ্বারা যেন ইসলামের উপর অবিচল থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ মহাপাপ ও অশ্লীলতা সম্পাদন করাকেও আমলসমূহ নষ্টকারী কর্ম হিসাবে গণ্য করেছেন। আর এই জন্য মু'মিনদের গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণ এও বর্ণিত হয়েছে যে, তারা মহাপাপ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকে। (সূরা নাজম ৫৩:৩২) এই দিক দিয়ে এ আয়াতে মহাপাপ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার তাকীদ এসেছে। এই আয়াত থেকে এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, কোন আমল যতই ভাল মনে হোক না কেন, যদি তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য-গন্ডির বাইরে হয়, তবে তা নিষ্ফল ও অনর্থক।
মুহাম্মাদ 47:34
যারা অবিশ্বাস করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে অতঃপর অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না।
মুহাম্মাদ 47:35
সুতরাং তোমরা হীনবল হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না; যখন তোমরাই প্রবল[১] এবং আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। [২] আর তিনি তোমাদের কর্মফল কখনো নষ্ট করবেন না। [৩]
[১] অর্থ হল, তোমরা যখন সংখ্যা ও শক্তি-সামর্থ্যের দিক দিয়ে শত্রুদের উপর প্রবল ও তাদের থেকে অনেক উন্নত, তখন এমতাবস্থায় কাফেরদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব ও দুর্বলতা প্রদর্শন করো না। বরং কুফরীর উপর এমন কড়া আঘাত হান, যেন আল্লাহর দ্বীন উঁচু হয়ে যায়। প্রবল ও উন্নত থাকা অবস্থায় কুফরীর সাথে সন্ধিতে আসার অর্থ হবে, কুফরীর প্রভাব-প্রতিক্রিয়াকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করা। আর এটা হল অতি বড় অন্যায়। তবে এর অর্থ এও নয় যে, কাফেরদের সাথে সন্ধি করার অনুমতি নেই। এর অনুমতি অবশ্যই আছে, কিন্তু সব সময় নয়। কেবল সেই সময় এর অনুমতি আছে, যখন মুসলিমরা সংখ্যায় এবং উপায়-উপকরণের দিক থেকে দুর্বল হবে। এ রকম অবস্থায় যুদ্ধ করার চেয়ে সন্ধি করাতেই লাভ বেশী। যাতে মুসলিমরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে নেয়। যেমন স্বয়ং নবী করীম (সাঃ)ও মক্কার কাফেরদের সাথে দশ বছরের জন্য যুদ্ধ-বিরতির সন্ধি-চুক্তি করেছিলেন।
[২] এতে রয়েছে মুসলিমদের জন্য শত্রুর উপর জয়যুক্ত হওয়ার ও সাহায্য লাভের বড়ই সুসংবাদ। যার সাথে থাকেন আল্লাহ, তাকে কে পরাজিত করতে পারে?
[৩] বরং তিনি তার পরিপূর্ণ বদলা দেবেন এবং তাতে কোন কমি করবেন না।
মুহাম্মাদ 47:36
পার্থিব জীবন তো শুধু খেল-তামাশা মাত্র।[১] যদি তোমরা বিশ্বাস কর ও আল্লাহ-ভীরুতা অবলম্বন কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে পুরস্কার দেবেন। আর তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ চান না। [২]
[১] অর্থাৎ, একটি ধোঁকা ও প্রতারণা মাত্র। এর কোন জিনিসের না আছে ভিত্তি, না আছে তার স্থায়িত্ব এবং না আছে তার কোন মূল্য।
[২] অর্থাৎ, তিনি তোমাদের ধন-সম্পদের মুখাপেক্ষী নন। আর এ জন্যই তিনি তোমাদের কাছে যাকাত হিসাবে তোমাদের নিকট সমস্ত ধন-সম্পদ চাননি; বরং তা থেকে অতি সামান্যতম অংশ চান। অর্থাৎ শতকরা আড়াই ভাগ মাত্র। আবার তাও এক বছর পূর্ণ হবার পর প্রয়োজনের অতিরিক্ত (নিসাব পরিমাণ) হলে। উপরন্তু এর উদ্দেশ্যও আল্লাহর সেই বান্দাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, যারা তোমাদেরই ভাই। তিনি এ দিয়ে তাঁর রাজত্বের প্রয়োজন পূরণ করেন না।
মুহাম্মাদ 47:37
তোমাদের নিকট হতে তিনি তা চাইলে ও তার জন্যে তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরা তো কার্পণ্য করবে এবং তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দেবেন। [১]
[১] অর্থাৎ, যদি তোমাদের প্রয়োজনের অধিক অবশিষ্ট সমস্ত ধন-সম্পদ চাইতেন, তাও আবার বারবার তাকীদের সাথে ও জোর দিয়ে, তাহলে এটাই মানুষের স্বভাব যে, তোমরা কার্পণ্য করবে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা প্রকাশ করবে। অর্থাৎ, এই পরিস্থিতিতে স্বয়ং ইসলামের বিরুদ্ধে তোমাদের মনে এই শত্রুতার জন্ম নিত যে, এমন ধর্ম কোন ভাল ধর্ম নয়, যে আমাদের পরিশ্রমের সমস্ত উপার্জন নিজের মধ্যেই গুটিয়ে নেয়।
মুহাম্মাদ 47:38
তোমরাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে[১] অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে; যারা কার্পণ্য করে, তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি।[২] আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত।[৩] যদি তোমরা বিমুখ হও,[৪] তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না। [৫]
[১] অর্থাৎ, কিয়দংশ যাকাত হিসেবে এবং কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় কর।
[২] অর্থাৎ, নিজেকেই আল্লাহর পথে ব্যয় করার পুণ্য থেকে বঞ্চিত রাখে।
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে ব্যয় করার উৎসাহ এই কারণে দেন না যে, তিনি তোমাদের ধন-সম্পদের মুখাপেক্ষী। তা আদৌ নয়। তিনি তো ধনী ও অমুখাপেক্ষী। তিনি তোমাদেরই লাভের জন্য তোমাদেরকে এই নির্দেশ দেন। যাতে প্রথমতঃ তোমাদের নাফসের পবিত্রতা সাধন হয়। দ্বিতীয়তঃ তোমাদেরই অভাবী ভাইদের প্রয়োজন পূরণ হয়। আর তৃতীয়তঃ তোমরা শত্রুদের উপর বিজয়ী ও উন্নত থাক। কাজেই আল্লাহর রহমত ও তাঁর সাহায্যের মুখাপেক্ষী তোমরাই। তিনি তোমাদের মুখাপেক্ষী নন।
[৪] অর্থাৎ, ইসলাম থেকে কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন কর।
[৫] বরং তোমাদের চেয়েও বেশী আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যশীল এবং আল্লাহর পথে অনেক ব্যয়কারী হবে। নবী করীম (সাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সালমান ফারসী (রাঃ)-এর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "এ থেকে লক্ষ্য এই (সালমান) এবং তাঁর গোত্রের লোক। শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, যদি ঈমান 'সুরাইয়া' তারকাগুচ্ছের সাথে ঝুলে থাকত, তবুও তা পারস্যের কিছু মানুষ অর্জন করে নিত। (তিরমিযী, আল্লামা আলবানী তাঁর সহীহাতেও উল্লেখ করেছেন।)
আল-ফাতহ 48:1
নিশ্চয়ই (হে রসূল!) আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়।
আল-ফাতহ 48:2
যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন[১] এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন[২] ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। [৩]
[১] মহানবী (সাঃ)-এর 'অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ'-এর অর্থ, এমন সব বিষয়াদি, যা ত্যাগ করাই উত্তম অথবা এমন সব জিনিস, যা তিনি (সাঃ) স্বীয় জ্ঞান, অনুমান ও প্রচেষ্টার আলোকে করেছেন, কিন্তু আল্লাহ তা পছন্দ করেননি। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) ইত্যাদির ঘটনা প্রভৃতি; যার উপর সূরা 'আবাসা' অবতীর্ণ হয়। অনুরূপ আচরণ ও বিষয়গুলি যদিও কোন পাপ এবং তাঁর নিষ্পাপ হওয়ার পরিপন্থী কাজ ছিল না, তবুও তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা হিসাবে এগুলোকেও ত্রুটি ও কমি গণ্য করা হয়েছে এবং এরই উপর ক্ষমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। لِيَغْفِرَ তে ل 'লাম' অক্ষরটি কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, সুস্পষ্ট এই বিজয় দানের তিনটি কারণ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। এটা ত্রুটি মার্জনার কারণ এই জন্য যে, এই সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা বহু বেড়ে যায়। যার ফলে নবী করীম (সাঃ)-এর মহা পুণ্য ও সওয়াব খুব বর্ধিত হয়। আর পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মোচন করে দেয়।[২] এই দ্বীনকে বিজয়ী করে, যার প্রতি তুমি মানুষকে দাওয়াত দাও। অথবা বিজয় ও সাফল্য দিয়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষমা লাভ এবং হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই হল নিয়ামতের পরিপূর্ণতা। (ফাতহুল ক্বাদীর)[৩] অর্থাৎ, তার উপর অবিচল থাকার সৌভাগ্য দান করেন। হিদায়াতের উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদা দানে ধন্য করেন।
আল-ফাতহ 48:3
এবং আল্লাহ তোমাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন।
আল-ফাতহ 48:4
তিনিই বিশ্বাসীদের অন্তরে প্রশান্তি দান করেন, যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে ঈমান (বিশ্বাস) বৃদ্ধি করে নেয়, [১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই[২] এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] অর্থাৎ, সেই অস্থিরতা ও অশান্তির পর, যা হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলীর কারণে মুসলিমদের উপর এসেছিল। মহান আল্লাহ তাদের অন্তরে প্রশান্তি প্রক্ষিপ্ত করেন। যার ফলে তাদের অন্তরে শান্তি, স্বস্তি ও ঈমান আরো বেড়ে যায়। এই আয়াতও প্রমাণ করে যে, ঈমান বাড়ে ও কমে।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহ চাইলে তার যে কোন সৈন্যের (যেমন, ফিরিশতাগণ) দ্বারা কাফেরদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি তাঁর পূর্ণ কৌশলের ভিত্তিতে এ রকম না করে তার পরিবর্তে মু'মিনদেরকে যুদ্ধ ও জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই কারণেই পরে (আয়াতের শেষে) তাঁর সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় হওয়ার গুণ উল্লেখ করেছেন। অথবা অর্থ হল, আকাশ ও পৃথিবীর ফিরিশতাগণ, অনুরূপ অন্যান্য সমস্ত প্রতাপ ও বিক্রমশালী সেনাবাহিনী আল্লাহরই অধীনস্থ। তিনি যেভাবে চান তাদের দ্বারা কাজ নেন। বলার উদ্দেশ্য হল, হে মু'মিনগণ! মহান আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর রসূল এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্যের কাজ যে কোন দল ও সৈন্য দিয়ে নিতে পারেন। (ইবনে কাসীর, আয়সারুত তাফাসীর)
আল-ফাতহ 48:5
এটা এ জন্য যে, তিনি বিশ্বাসী পুরুষদেরকে ও বিশ্বাসী নারীদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে[১] যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, যেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং তিনি তাদের পাপরাশি মোচন করবেন; এটাই আল্লাহর নিকট মহা সাফল্য।
[১] হাদীসে এসেছে যে, মুসলিমরা যখন সূরা ফাত্হের প্রাথমিক অংশ শুনলেন, لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ তখন তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-কে বললেন, আপনাকে মুবারকবাদ! আমাদের জন্য কি রয়েছে? এরই ভিত্তিতে আল্লাহ لِيُدْخِلَ الْمُؤْمِنِيْنَ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন। (বুখারী, হুদাইবিয়া যুদ্ধ পরিচ্ছেদ) কেউ কেউ বলেছেন, এটি لِيَزْدَادُوْا কিংবা يَنْصُرُكَ এর সাথে সম্পৃক্ত।
আল-ফাতহ 48:6
আর কপট (মুনাফেক) পুরুষ ও কপট নারী, অংশীবাদী (মুশরিক) পুরুষ ও অংশীবাদী নারী, যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে,[১] তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র রয়েছে তাদের জন্য,[২] আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন; আর ওটা নিকৃষ্ট আবাস!
[১] অর্থাৎ, আল্লাহকে তাঁর বিচার-ফায়সালা বা তাঁর বিধানাদির উপর অভিযুক্ত ও দোষারোপ করে এবং রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবা (রাঃ)-দের ব্যাপারে এই ধারণা পোষণ করে যে, এরা পরাজিত অথবা নিহত হবে; ফলে দ্বীন ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, ওরা মুসলিমদের জন্য যে দুর্ভাগ্যের ও ধ্বংসের অপেক্ষা করছে, তা তো ওদের ভাগ্যেই জুটবে।
আল-ফাতহ 48:7
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১]
[১] এখানে মুনাফিক ও কাফেরদের আলোচনা প্রসঙ্গে উক্ত কথাটি পুনরায় ব্যক্ত করেছেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর শত্রুদেরকে যে কোনভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। এটা ভিন্ন কথা যে, তিনি তাঁর কৌশল ও ইচ্ছার ভিত্তিতে যতটা চান অবকাশ ও ঢিল দেন।
আল-ফাতহ 48:8
নিশ্চয় আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।
আল-ফাতহ 48:9
যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তাকে সাহায্য কর ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।
আল-ফাতহ 48:10
নিশ্চয় যারা তোমার বায়আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই বায়আত গ্রহণ করে।[১] আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।[২] সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে[৩] এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে,[৪] তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।
[১] এই আয়াতে ঐ বায়আতে রিযওয়ানের কথাই বুঝানো হয়েছে, যে বায়আত নবী করীম (সাঃ) উসমান (রাঃ)-এর শহীদ হওয়ার খবর শুনে তাঁর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ১৪ বা ১৫ শত মুসলিমদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন।
[২] অর্থাৎ, এই বাইয়াত (শপথ) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই। কেননা, তিনিই জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর প্রতিদানও তিনিই দেবেন। যেমন, অন্যত্র বলেছেন, এরা নিজেদের জান ও মালের পরিবর্তে আল্লাহর নিকট জান্নাত ক্রয় করেছে। (সূরা তাওবাহ ৯:১১১) আর এটা ঠিক এই ধরনের যেমন, {مَن يُّطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ اَطَاعَ اللهَ} অর্থাৎ, যে রসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল। (সূরা নিসা ৪:৮০)
[৩] نَكْثٌ (অঙ্গীকার ভঙ্গ করা) থেকে এখানে বাইয়াত ভঙ্গ করা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, শপথ অনুযায়ী যুদ্ধে শরীক না হওয়া। মানে যে ব্যক্তি এ রকম করবে, তার মন্দ পরিণাম তারই উপর আসবে।
[৪] অর্থাৎ, যে আল্লাহর রসূলকে সাহায্য করে। তাঁর সাথে মিলে সেই পর্যন্ত যুদ্ধ করে, যে পর্যন্ত না মহান আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় ও সাফল্য দান করেন।
আল-ফাতহ 48:11
(যুদ্ধ থেকে) পশ্চাতে থাকা মরুবাসীরা তোমাকে বলবে, ‘আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল, অতএব আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।’[১] তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই।[২] তাদেরকে বল, ‘আল্লাহ তোমাদের কারো কোন ক্ষতি[৩] কিংবা মঙ্গল[৪] চাইলে কে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে? বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত। [৫]
[১] এ থেকে মদীনার চতুর্দিকে বসবাসকারী গিফার, মুযাইনা, জুহাইনা, আসলাম এবং দু'আল গোত্রসমূহকে বুঝানো হয়েছে। স্বপ্ন দেখার পর যখন নবী করীম (সাঃ) (যার বিস্তারিত বিবরণ পরে আসবে) উমরাহ করার জন্য মক্কা যাওয়ার সাধারণ ঘোষণা দিলেন, তখন উল্লিখিত গোত্রের লোকেরা ভাবলো যে, বর্তমান পরিস্থিতি তো মক্কা যাওয়ার অনুকূলে নয়। সেখানে এখনও কাফেরদের বিক্রম ও দবদবা রয়েছে এবং মুসলিমরা সেখানে দুর্বল। তাছাড়া মুসলিমগণ উমরাহ করার জন্য সম্পূর্ণরূপে হাতিয়ার খাপবদ্ধ করেও যেতে পারবে না। এ রকম পরিস্থিতিতে যদি কাফেররা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলে, তাহলে তারা শূন্য হাতে তাদের সাথে মোকাবেলা কিভাবে করবে? এ সময় মক্কা যাওয়ার অর্থ হল, নিজেই নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। সুতরাং এই লোকেরা নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে উমরায় গেল না। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলছেন, এরা নানা ব্যস্ততার বাহানা পেশ করে তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করবে।
[২] অর্থাৎ, মুখে তো তারা এটাই বলছে যে, আমাদের ঘর-বাড়ি ও বিবি-বাচ্চাদের দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। তাই আমাদেরকে থাকতে হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের পিছনে থাকার কারণ ছিল মুনাফিকী ও মৃত্যুর আশঙ্কা।
[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ যদি তোমাদের ধন-সম্পদ বিনষ্ট ও পরিবার-পরিজনকে ধ্বংস করার ফায়সালা করে নেন, তবে তোমাদের কেউ কি এই এখতিয়ার রাখে যে, তাঁকে তা করতে দেবে না?
[৪] অর্থাৎ, তোমাদেরকে সাহায্য করতে এবং গণিমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দিতে চাইলে, কেউ রোধ করতে পারবে? মূলতঃ এটা বলা হচ্ছে তাদের প্রতিবাদে, যারা পিছনে রয়ে গিয়েছিল। আর যারা মনে করেছিল যে, তারা যদি নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে না যায়, তবে ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং বহু কল্যাণ লাভে ধন্য হবে। অথচ কল্যাণ ও অকল্যাণের সমস্ত এখতিয়ার তো আল্লাহর হাতে।
[৫] অর্থাৎ, তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।
আল-ফাতহ 48:12
বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, রসূল ও বিশ্বাসীগণ তাদের পরিবার-পরিজনের নিকট কখনই ফিরে আসতে পারবে না এবং এ ধারণা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত হয়েছিল; আর তোমরা মন্দ ধারণা করেছিলে।[১] তোমরা তো ধ্বংসমুখী এক সম্প্রদায়।’ [২]
[১] আর তা এটাই ছিল যে, আল্লাহ তাঁর রসূলকে সাহায্য করবেন না। এটা সেই পূর্বের ধারণাই। কেবল তাকীদের জন্য পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।
[২] بُوْرٌ হল بَآئِرٌ এর বহুবচন। অর্থঃ ধ্বংসমুখী। অর্থাৎ, এরা হল সেই লোক, যাদের অদৃষ্টে ধ্বংস নির্ধারিত হয়ে আছে। দুনিয়াতে তারা আল্লাহর আযাব থেকে বেঁচে গেলেও, আখেরাতে কিন্তু বাঁচতে পারবে না। সেখানে তাদেরকে শাস্তি ভোগ করতেই হবে।
আল-ফাতহ 48:13
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, আমি সেসব অবিশ্বাসীদের জন্য অবশ্যই জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি।
আল-ফাতহ 48:14
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই; তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১]
[১] এখানে পশ্চাতে অবস্থানকারীদের জন্যে তওবা ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করার প্রতি প্রেরণা দেওয়া হয়েছে যে, তারা যদি মুনাফিকী থেকে তওবা করে নেয়, তবে মহান আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।
আল-ফাতহ 48:15
তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন (যুদ্ধ হতে) পশ্চাতে থাকা লোকেরা বলবে, ‘আমাদেরকে তোমাদের সাথে যেতে দাও।’[১] তারা আল্লাহর কথা পরিবর্তন করতে চায়।[২] বল, ‘তোমরা কিছুতেই আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না।’ আল্লাহ পূর্বেই এরূপ বলে রেখেছেন।[৩] তারা বলবে, ‘বরং তোমরা তো আমাদের প্রতি হিংসা করছ।’[৪] বস্তুতঃ তাদের বোধশক্তি সামান্য। [৫]
[১] এই আয়াতে খায়বার যুদ্ধের আলোচনা রয়েছে। যার বিজয়ের সুসংবাদ মহান আল্লাহ হুদাইবিয়াতেই দিয়েছিলেন। অনুরূপ মহান আল্লাহ এ কথাও বলেছিলেন যে, এখান থেকে যুদ্ধলব্ধ সমস্ত সম্পদের অধিকারী হবে কেবল হুদাইবিয়ার বায়আতে অংশগ্রহণকারীরা। তাই হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসার পর ইহুদীদের বারংবার চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে নবী করীম (সাঃ) যখন খায়বারের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন পূর্বে উল্লিখিত পশ্চাতে অবস্থানকারীরা কেবল গনীমতের মাল অর্জনের লোভে সাথে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তবে তা গৃহীত হয়নি। আয়াতে 'যুদ্ধলব্ধ সম্পদ' (গনীমতের মাল) বলতে খায়বারের গনীমতের মালকেই বুঝানো হয়েছে।
[২] 'আল্লাহর কথা' বলতে খায়বারের গনীমতের মালকে হুদাইবিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্দিষ্টীকরণের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। মুনাফিকরা তাতে অংশ গ্রহণ করে 'আল্লাহর কথা' তথা তার প্রতিশ্রুতিকে পরিবর্তন করতে চায়।
[৩] আয়াতে 'নাফী' (নেতিবাচক) বাক্যটি 'নাহী' (নিষেধাজ্ঞা)র অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের সাথে তোমাদের যাওয়ার অনুমতি নেই। মহান আল্লাহর নির্দেশও এটাই।
[৪] অর্থাৎ, এ কথা পশ্চাতে অবস্থানকারীরা বলবে যে, তোমরা কেবল হিংসার বশবর্তী হয়ে আমাদেরকে তোমাদের সাথে নিতে চাচ্ছ না। যাতে আমরা গনীমতের মালে তোমাদের শরীক না হই।
[৫] অর্থাৎ, ব্যাপার এটা নয়, যা তারা ভাবছে। বরং এই নিষেধাজ্ঞা তাদের পশ্চাতে থাকার কারণে। কিন্তু তারা প্রকৃত ব্যাপার বুঝতে পারছে না।
আল-ফাতহ 48:16
(যুদ্ধ হতে) পশ্চাতে থাকা মরুবাসীদেরকে বল, ‘তোমাদেরকে আহবান করা হবে এক প্রবল পরাক্রান্ত জাতির সাথে যুদ্ধ করতে, যতক্ষণ না তারা আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) হয়ে যায়। [১] তোমরা এই নির্দেশ পালন করলে[২] আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কার দান করবেন।[৩] আর তোমরা যদি পূর্বের মত পৃষ্ঠ-প্রদর্শন কর, তাহলে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন।’ [৪]
[১] উক্ত 'প্রবল পরাক্রান্ত জাতি'র নাম নির্ধারণের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন মুফাসসির এ থেকে আরবেরই কোন কোন গোত্রকে বুঝিয়েছেন। যেমন, হাওয়াযিন বা সাক্বীফ গোত্র; যাদের সাথে হুনাইন নামক স্থানে মুসলিমদের লড়াই হয়েছে। অথবা মুসাইলামা কায্যাবের সম্প্রদায় বানু হানীফা গোত্র। আবার কেউ কেউ পারস্য ও রোমের অগ্নিপূজক ও খ্রিষ্টানদের বুঝিয়েছেন। পশ্চাতে অবস্থানকারী বেদুঈনদেরকে বলা হচ্ছে যে, অতি সত্বর এক রণকুশল জাতির সাথে মোকাবেলা করার জন্য তোমাদেরকে আহবান করা হবে। তারা ইসলাম গ্রহণ না করলে, তোমাদের সাথে ওদের লড়াই হবে।
[২] অর্থাৎ, নিষ্ঠাপূর্ণ চিত্তে মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়ে লড়লে।
[৩] অর্থাৎ, দুনিয়াতে গনীমতের মাল এবং আখেরাতে পূর্বের পাপসমূহের ক্ষমা ও জান্নাত লাভ।
[৪] অর্থাৎ, পূর্বে যেরূপ হুদাইবিয়া যাওয়াকালে মুসলিমদের সাথে মক্কা যাওয়া থেকে বিরত ছিলে, অনুরূপ এখনো যদি জিহাদ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর, তাহলে আল্লাহর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তোমাদের জন্য প্রস্তুত আছে।
আল-ফাতহ 48:17
অন্ধের জন্য, খোঁড়ার জন্য, রোগীর জন্য কোন অপরাধ নেই।[১] আর যে কেউই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাঁকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত; কিন্তু যে ব্যক্তি পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে, তিনি তাকে বেদনায়ক শাস্তি দেবেন।
[১] অন্ধ ও খোঁড়া হওয়ার কারণে চলাফেরা করতে অক্ষমতা এ দু'টো চিরস্থায়ী ওজর। এই ওজর-ওয়ালা ব্যক্তিদের অথবা এই ধরনের অক্ষম মানুষদেরকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। حَرَج (অপরাধ) এর অর্থ পাপ। এরা ছাড়া রোগীরাও সাময়িকভাবে অক্ষম। যতক্ষণ পর্যন্ত সে (রোগী) প্রকৃতপক্ষে রোগী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেও জিহাদ থেকে অব্যাহতি লাভ করবে। অতঃপর রোগ বা অসুস্থতা দূর হওয়ার সাথে সাথে সেও অন্য মুসলিমদের সাথে জিহাদের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আল-ফাতহ 48:18
আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহণ করল তখন।[১] তাদের অন্তরে যা ছিল, তা তিনি অবগত ছিলেন;[২] তাদের প্রতি তিনি অবতীর্ণ করলেন প্রশান্তি[৩] এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়[৪]
[১] বাইয়াতে রিযওয়ানে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, এখানে তাঁদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্ট হওয়ার এবং তাঁদের পাকা ও খাঁটি মু'মিন হওয়ার সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা হুদাইবিয়ায় এক গাছের নীচে শপথ গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁরা মক্কার কুরাইশদের সাথে লড়বেন এবং পলায়নের পথ অবলম্বন করবেন না।
[২] অর্থাৎ, তাঁদের অন্তরে যে সত্যতা ও নির্মলতার আবেগ ছিল, সে ব্যাপারেও আল্লাহ অবগত আছেন। এ থেকে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)গণের সেই শত্রুদের কথার খন্ডন হয়ে যায়, যারা বলে যে, 'তাদের ঈমান বাহ্যিক ছিল। আন্তরিকভাবে তারা ছিল মুনাফিক!'
[৩] তাঁরা ছিলেন নিরস্ত্র। যুদ্ধের নিয়তে যেহেতু তাঁরা যাননি, তাই সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে যুদ্ধাস্ত্র ছিল না। তা সত্ত্বেও যখন নবী করীম (সাঃ) উসমান (রাঃ)-এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেন, তখন সামান্য পরিমাণও কোন দ্বিধা না করে সকলেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। অর্থাৎ, তিনি তাঁদের অন্তর থেকে মৃত্যুর আশঙ্কা দূর করে দিলেন এবং তার পরিবর্তে ধৈর্য ও প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন। যার ফলে তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ করার প্রবল উৎসাহ সৃষ্টি হল।
[৪] এ থেকে খায়বারের বিজয়কেই বুঝানো হয়েছে। যেটা ছিল ইয়াহুদীদের গড় এবং হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের অল্পদিন পর মুসলিমরা তা জয় করেছিলেন।
আল-ফাতহ 48:19
এবং বিপুল পরিণাম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যা তারা হস্তগত করবে।[১] আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] এগুলো হল গনীমতের সেই সম্পদাদি যা খায়বার থেকে লব্ধ হয়েছিল। এই অঞ্চলটি বড় উর্বর ও শস্য-শ্যামল অঞ্চল ছিল। এরই ফলে মুসলিমরা সেখান থেকে বিপুল পরিমাণে ধন-সম্পদ অর্জন করেন। যেগুলো কেবল হুদাইবিয়ায় অংশ গ্রহণকারীদের মাঝেই বণ্টন করা হয়।
আল-ফাতহ 48:20
আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুদ্ধলব্ধ বিপুল সম্পদের, যা তোমরা হস্তগত করবে।[১] তিনি তা তোমাদের জন্য ত্বরান্বিত করেছেন[২] এবং তোমাদের (উপর) থেকে মানুষের হাত নিবারিত করেছেন।[৩] আর যাতে তা বিশ্বাসীদের জন্য এক নিদর্শন হয়[৪] এবং আল্লাহ তোমাদেরকে পরিচালিত করেন সরল পথে।[৫]
[১] এটা হল অন্যান্য বিজয়সমূহে অর্জনীয় যুদ্ধলব্ধ সম্পদের শুভ সংবাদ, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমরা অর্জন করতে থাকবে।
[২] অর্থাৎ, খায়বার বিজয় বা হুদাইবিয়ার সন্ধি। কেননা, এ দু'টোই অতি সত্বর মুসলিমরা লাভ করতে সক্ষম হন।
[৩] হুদাইবিয়ায় কাফেরদের হাত এবং খায়বারে ইয়াহুদীদের হাত আল্লাহ নিবারণ ও রোধ করে দেন। অর্থাৎ, তাদের উদ্যম ও মনোবল দমিয়ে দেন; ফলে তারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সাহস করেনি।
[৪] অর্থাৎ, মানুষ এই ঘটনার আলোচনা শুনে ও পড়ে অনুমান করবে যে, সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ কিভাবে মুসলিমদের হিফাযত করেন এবং শত্রুদের উপর তাঁদেরকে বিজয় দান করেন। অথবা এই (শত্রুদের হস্ত) প্রতিহত করে দেওয়াটা হল রসূল (সাঃ) যে সকল প্রতিশ্রুতি দেন, তার সত্যতার একটি নিদর্শন।
[৫] অর্থাৎ, সরল পথের উপর দৃঢ়তা দান করেন কিংবা এই নিদর্শন দ্বারা তোমাদের হিদায়াত আরো বৃদ্ধি করেন।
আল-ফাতহ 48:21
আরো বহু সম্পদ রয়েছে, যা এখনো তোমরা অধিকারভুক্ত করতে পারনি, তা তো আল্লাহর আয়ত্তে আছে।[১] আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
[১] এই আয়াতে পরবর্তীকালের বিজয়সমূহ ও তা থেকে অর্জনীয় গনীমতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেভাবে চতুর্দিক ঘিরে দিয়ে কোন জিনিসকে নিজের দখলে নেওয়া হয় এবং তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, তেমনিভাবে আল্লাহ এই বিজয়সমূহকে নিজ মহাশক্তির বেড়ার আয়ত্তে করে নিয়েছেন। অর্থাৎ, যদিও তোমাদের বিজয়ের সীমা ওখান পর্যন্ত প্রসারিত হয়নি, তবুও মহান আল্লাহ সেগুলোকে তোমাদের জন্য নিজের আয়ত্তে করে রেখেছেন। যখনই তিনি চাইবেন, তখনই সেসব দিয়ে তোমাদেরকে জয়যুক্ত করে দেবেন। আর এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। কারণ, তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। কেউ কেউ أَحَاطَ এর অর্থ করেছেন عَلِمَ অর্থাৎ, তিনি জানেন যে, ঐ এলাকাগুলোও তোমরা জয় করবে।
আল-ফাতহ 48:22
অবিশ্বাসীরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে তারা অবশ্যই পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করত, অতঃপর তারা কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পেত না।[১]
[১] এখানে হুদাইবিয়ার সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে যে, মক্কার এই কুরাইশরা যদি সন্ধি না করে যুদ্ধের পথ অবলম্বন করত, তবে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করত। কেউ তাদের সাহায্যকারী হত না। অর্থাৎ, আমি সেখানে তোমাদেরকে সাহায্য করতাম। আর আমার মোকাবেলায় দাঁড়ানোর ক্ষমতা কার আছে?
আল-ফাতহ 48:23
এটাই আল্লাহর বিধান, যা পূর্ব হতে চলে আসছে;[১] তুমি আল্লাহর এই বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর এ নিয়ম-নীতি পূর্ব থেকেই চলে আসছে যে, যখন কুফরী ও ঈমানের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালাকারী যুদ্ধ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন মহান আল্লাহ ঈমানদারদের সাহায্য করে সত্যকেই শীর্ষস্থান দান করেন। যেমন, আল্লাহর এই রীতি অনুসারে বদর যুদ্ধে তোমাদেরকে সাহায্য করা হয়েছে।
আল-ফাতহ 48:24
তিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাত তাদের হতে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করবার পর।[১] আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।
[১] যখন নবী করীম (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হুদাইবিয়াতে ছিলেন, তখন কাফেররা ৮০ জনের একটি সশস্ত্র বাহিনীকে এই উদ্দেশ্য প্রেরণ করে যে, যদি তারা কোন সুযোগ পেয়ে যায়, তবে অতর্কিতে নবী করীম (সাঃ) এবং সাহাবা (রাঃ)গণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সুতরাং এই সশস্ত্র বাহিনী তানঈম পাহাড়ের নিকট দিয়ে হুদাইবিয়ায় উপস্থিত হল। এ দিকে মুসলিমরাও তাদের এই দুরভিসন্ধির কথা জানতে পারলেন এবং তাঁরা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের সবাইকে বন্দী করে নবী করীম (সাঃ)-এর সামনে উপস্থিত করলেন। তাদের অপরাধ ছিল বড় কঠিন। যে শাস্তিই তাদেরকে দেওয়া হত, তা সঠিক হত। কিন্তু এতে আশঙ্কা এটাই ছিল যে, এতে যুদ্ধ অনিবার্যভাবে বেধে যেত। অথচ নবী (সাঃ) এ সময় যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধি চাচ্ছিলেন। কেননা, এতেই ছিল মুসলিমদের জন্য কল্যাণ। তাই তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে মুক্ত করে দিলেন। (সহীহ মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়) بطن مكة হল হুদাইবিয়া। অর্থাৎ, হুদাইবিয়ায় আমি তোমাদেরকে কাফেরদের সাথে এবং কাফেরদেরকে তোমাদের সাথে লড়াই করা থেকে বিরত রাখি। এই কথাটা মহান আল্লাহ অনুগ্রহ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
আল-ফাতহ 48:25
তারাই তো অবিশ্বাস করেছিল এবং তোমাদেরকে ‘মাসজিদুল হারাম’ হতে নিবৃত্ত করেছিল এবং কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলোকে কুরবানীগাহে পৌঁছতে বাধা দিয়েছিল।[১] যদি এমন কতকগুলো বিশ্বাসী নর ও নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জান না, [২] অর্থাৎ তাদেরকে তোমরা পদদলিত করতে; ফলে তাদের কারণে অজ্ঞাতসারে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে;[৩] (তাহলে তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হত।[৪] কিন্তু তা দেওয়া হয়নি) এ জন্যে যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ করুণায় শামিল করবেন।[৫] যদি তারা পৃথক হত, তাহলে আমি তাদের মধ্যে অবিশ্বাসীদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিতাম। [৬]
[১] هَدْيٌ ঐ পশুকে বলা হয়, যেটাকে হজ্জ বা উমরাহ পালনকারী ব্যক্তি সঙ্গে করে মক্কা নিয়ে যেত। অথবা সেখানে থেকেই ক্রয় করে জবাই করত। مَحِلٌّ (হালাল হওয়ার স্থান) থেকে সেই কুরবানগাহ (কুরবানী করার জায়গা)-কে বুঝানো হয়েছে, যেখানে নিয়ে গিয়ে পশু যবেহ করা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে এ স্থানটি ছিল উমরা আদায়কারীদের জন্য (ক্ষুদ্র) মারওয়া পাহাড়ের পাশে এবং হাজীদের জন্য ছিল মিনা। তবে ইসলামে যবেহ করার জায়গা মক্কা, মিনা এবং সমগ্র হারাম সীমানা। مَعْكُوْفًا শব্দটি হল, 'হাল' (যা পূর্বের অবস্থা বর্ণনা করে)। অর্থাৎ, এই পশুগুলো এই অপেক্ষায় আবদ্ধ ছিল যে, মক্কায় নিয়ে গিয়ে তাদেরকে কুরবানী করা হবে। অর্থ হল, এই কাফেররাই তোমাদেরকেও মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল এবং তোমাদের সাথে যে পশুগুলো ছিল তাদেরকেও কুরবানীগাহে পৌঁছতে দেয়নি।
[২] অর্থাৎ, মক্কায় তারা নিজেদের ঈমান গোপন করে বাস করছিল।
[৩] কাফেরদের সাথে যুদ্ধ বাধলে সম্ভাবনা ছিল যে, এরাও মারা যেত এবং তোমাদের ক্ষতি হত। مَعَرَّةً এর প্রকৃত অর্থ হল, দোষ। কিন্তু উদ্দেশ্য হল, কাফফারা, এমন দোষ ও লজ্জা, যা কাফেরদের পক্ষ থেকে তোমাদের ঘাড়ে চাপত। অর্থাৎ, এক তো ভুলবশতঃ হত্যার দায়ে দিয়্যাত (হত্যার অর্থদন্ড) দিতে হত এবং দ্বিতীয়তঃ কাফেরদের এই তিরস্কার শুনতে হত যে, এরা আপন মুসলিম ভাইদেরও হত্যা করে।
[৪] এটা হল لَوْلاَ (যদি) এর ঊহ্য উত্তর। অর্থাৎ, এ ব্যাপার না হলে, তোমাদেরকে মক্কায় প্রবেশ এবং কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়ে দেওয়া হত।
[৫] বরং মক্কাবাসীদেরকে অবসর দেওয়া হয়। যাতে আল্লাহ যাকে চান, তাকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দেন।
[৬] تَزَيَّلُوْا এর অর্থ تَمَيَّزُوْا অর্থাৎ, মক্কায় অবস্থিত মুসলিমরা যদি কাফেরদের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করত, তবে আমি তোমাদেরকে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দিতাম এবং তোমাদের হাতে তাদেরকে হত্যা করাতাম। আর এইভাবে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। 'মর্মন্তুদ শাস্তি' বলতে এখানে হত্যা, বন্দী ও পরাজিত হওয়াকে বুঝানো হয়েছে।
আল-ফাতহ 48:26
যখন[১] অবিশ্বাসীরা তাদের অন্তরে গোত্রীয় অহমিকা -- অজ্ঞতা যুগের অহমিকা পোষণ করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের উপর স্বীয় প্রশান্তি বর্ষণ করলেন;[২] আর তাদেরকে তাকওয়ার বাক্যে সৃদৃঢ় করলেন[৩] এবং তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আর আল্লাহ সমস্ত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন।
[১] إذ (যখন) অব্যয়টির কাল বিশেষণ হয় لَعَذَّبْنَا ক্রিয়ার। অথবা وَاذْكُرُوْا ক্রিয়া ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, সেই সময়কে স্মরণ করো, যখন অবিশ্বাসীরা ----।
[২] কাফেরদের এই জাহেলী যুগের গোত্রীয় অহমিকা (আভিজাত্যের গর্ব)এর অর্থ হল, মক্কাবাসীদের মুসলিমদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া। তারা বলল যে, এরা আমাদের ছেলে ও বাপদেরকে হত্যা করেছে। লাত-উয্যার শপথ! আমরা এদেরকে কখনই এখানে প্রবেশ করতে দেব না। অর্থাৎ, তারা এটাকে মান-সম্মানের ব্যাপার মনে করে নিল। আর এটাকেই 'অজ্ঞতাযুগের অহমিকা' বলা হয়েছে। কারণ, কা'বা শরীফে ইবাদতের জন্য আগমনকারীদেরকে রোধ করার অধিকার কারো নেই। মক্কার কুরাইশদের শত্রুতামূলক এই আচরণের উত্তরে আশঙ্কা ছিল যে, মুসলিমদের আবেগ-উদ্যমের মধ্যেও উত্তেজনা এসে যেত এবং তাঁরাও এটাকে তাঁদের সম্মানের ব্যাপার মনে করে মক্কায় প্রবেশ করার জন্য জেদ ধরতেন। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে পড়ত। আর এই যুদ্ধ মুসলিমদের ক্ষেত্রে বড়ই বিপজ্জনক ছিল। (যেমন, পূর্বে এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।) এই জন্য মহান আল্লাহ মুসলিমদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করে দিলেন। অর্থাৎ, তাঁদেরকে ধৈর্য-সহ্য তথা উত্তেজনা সংবরণ করার তওফীক দান করলেন। সুতরাং তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হুদাইবিয়াতে থেমে গেলেন এবং আবেগপ্রবণ হয়ে মক্কা যাওয়ার প্রচেষ্টা করলেন না। কেউ কেউ বলেন, মূর্খতাযুগের এই অহমিকা থেকে বুঝানো হয়েছে তাদের সেই আচরণকে, যা সন্ধি ও চুক্তির সময় তারা অবলম্বন করেছিল। তাদের এই আরচণ এবং সন্ধি উভয়টাই বাহ্যতঃ মুসলিমদের জন্য অসহ্যকর ছিল। কিন্তু পরিণতির দিক দিয়ে যেহেতু এতে ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণ ছিল, তাই অতীব অপছন্দনীয় ও কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে তা মেনে নেওয়ার সুমতি দান করলেন। এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ হল এ রকম, যখন রসূল (সাঃ) মক্কার কুরাইশদের প্রেরিত প্রতিনিধিদের এই কথা মেনে নিলেন যে, এ বছর মুসলিমরা উমরার জন্য মক্কায় যাবেন না এবং এখান থেকেই প্রত্যাবর্তন করবেন, তখন তিনি আলী (রাঃ)-কে সন্ধিপত্র লেখার নির্দেশ দিলেন। তিনি (আলী (রাঃ)) রসূল (সাঃ)-এর নির্দেশে 'বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহীম' লিখলেন। তখন তারা প্রতিবাদ করে বলল যে, 'রাহমান' ও 'রাহীম'কে আমরা জানি না। আমরা যে শব্দ ব্যবহার করি -- অর্থাৎ, 'বিসমিকাল্লা-হুম্মা' (হে আল্লাহ! তোমার নাম নিয়ে) তাই দিয়ে শুরু করেন। তাই নবী (সাঃ) ঐভাবেই লিখালেন। তারপর তিনি লিখালেন, "এটা সেই চুক্তিপত্র যাতে আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ মক্কাবাসীদের সাথে সন্ধি করছেন।" তখন কুরাইশদের প্রতিনিধিগণ বলল যে, ঝগড়ার মূল কারণই তো আপনার 'রিসালাত' তথা রসূল হওয়া। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল বলে মেনেই নিতাম, তাহলে এর পর ঝগড়াই-বা আর কি রয়ে যেত? অতঃপর আপনার সাথে যুদ্ধ করার এবং আল্লাহর ঘর থেকে আপনাকে বাধা দেওয়ার প্রয়োজনই কি? অতএব, আপনি এখানে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'র পরিবর্তে 'মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ' লিখুন। সুতরাং তিনি আলী (রাঃ)-কে এ রকমই লিখার নির্দেশ দিলেন। (এটা মুসলিমদের জন্য বড়ই লাঞ্ছনাকর ও উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি ছিল। যদি আল্লাহ তাঁদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ না করতেন, তবে তাঁরা তা কখনই সহ্য করতে পারতেন না।) আলী (রাঃ) তাঁর নিজ হাত দিয়ে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' মিটিয়ে দিতে অস্বীকার করলেন। তখন নবী করীম (সাঃ) বললেন, (আমাকে দেখিয়ে দাও) এ শব্দটি কোথায়? দেখিয়ে দিলে তিনি নিজের হাতে তা মিটিয়ে দিলেন এবং নিজে (মু'জিযাস্বরূপ) সেই স্থানে 'মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ' লিখলেন। এর পর এই চুক্তিপত্রে তিনটি জিনিস লেখা হয়। (ক) মক্কাবাসীদের মধ্যে যে ইসলাম গ্রহণ করে নবী (সাঃ)-এর কাছে আসবে, তাকে (মক্কায়) ফিরিয়ে দেওয়া হবে। (খ) আর কোন মুসলিম মক্কাবাসীদের সাথে মিলিত হলে, (মক্কাবাসীরা) তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না। (গ) মুসলিমগণ আগামী বছর মক্কায় আসবে এবং এখানে তিন দিন অবস্থান করতে পারবে। আর তাদের সাথে কোন অস্ত্র থাকবে না। (বুখারী, মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়) এর সাথে দু'টি কথা আরো লেখা হয়, (ক) এ বছর যুদ্ধ স্থগিত থাকবে। (খ) গোত্রগুলোর মধ্যে যে চায় মুসলিমদের সাথে এবং যে চায় কুরাইশদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে।
[৩] 'তাকওয়ার বাক্য' বলে তাওহীদ ও রিসালাতের বাক্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বুঝানো হয়েছে। যেটাকে হুদাইবিয়ার দিন মুশরিকরা অস্বীকার করেছিল। (ইবনে কাসীর) অথবা সেই ধৈর্য ও সহনশীলতা যা তাঁরা হুদাইবিয়ার দিন প্রদর্শন করেছিলেন। কিংবা সেই অঙ্গীকার পূরণ ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, যা ছিল আল্লাহভীরুতার ফল। (ফাতহুল ক্বাদীর)
আল-ফাতহ 48:27
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রসূল এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে কেউ কেউ মস্তক মুন্ডন করবে, কেউ কেউ কেশ কর্তন করবে, তোমাদের কোন ভয় থাকবে না।[১] আল্লাহ জানেন তোমরা যা জান না।[২] এটা ছাড়াও তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন এক আসন্ন বিজয়। [৩]
[১] হুদাইবিয়ার ঘটনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে স্বপ্নে মুসলিমদের সাথে মাসজিদুল হারাম প্রবেশ করে তাওয়াফ ও উমরাহ করতে দেখানো হয়। নবীর স্বপ্নও অহী (এবং বাস্তব) হয়। তবে এই স্বপ্নে এটা নির্দিষ্ট ছিল না যে, তা এ বছরেই হবে। কিন্তু নবী করীম (সাঃ) এটাকে অতি মহান সুসংবাদ মনে করে উমরাহ করার জন্য সত্বর প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং এর জন্য সাধারণ ঘোষণা দেওয়ালেন ও বেরিয়েও পড়লেন। পরিশেষে হুদাইবিয়ায় পূর্বোল্লেখিত সন্ধি সুসম্পন্ন হয়। তবে আল্লাহর নিকট এই স্বপ্নের তাৎপর্য ছিল আগামী বছর। যেমন, পরের বছরে মুসলিমগণ অতি নিরাপত্তার সাথে উমরাহ আদায় করেন এবং আল্লাহ তাঁর নবীর স্বপ্নকে সত্য করে দেখান।
[২] অর্থাৎ, যদি হুদাইবিয়ায় সন্ধি না হত, তাহলে যুদ্ধে মক্কায় অবস্থিত দুর্বল মুসলিমদের ক্ষতি হত। সন্ধির এই উপকারিতাগুলো আল্লাহই জানেন।
[৩] এ থেকে খায়বার ও মক্কা বিজয় সহ সন্ধির সুফল স্বরূপ অধিকহারে ইসলাম গ্রহণের কথাকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটাও এক প্রকার মহা বিজয়। হুদাইবিয়ার সময় মুসলিমরা ছিলেন দেড় হাজার। এর দু'বছর পর যখন মুসলিমরা বিজয়ী হিসাবে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার।
আল-ফাতহ 48:28
তিনি তাঁর রসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, অপর সমস্ত ধর্মের উপর একে জয়যুক্ত করার জন্য।[১] আর সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।
[১] অন্যান্য ধর্মসমূহের উপর ইসলামের এ বিজয় দলীলাদির দিক দিয়ে তো সব সময়কার জন্য অনস্বীকার্য বটেই, এমন কি পার্থিব ও সৈন্য-সামন্তের দিক দিয়েও প্রথম শতাব্দী এবং তারপর সুদীর্ঘ কাল পর্যন্ত যতক্ষণ তাঁরা দ্বীনের সঠিক অনুসারী ছিলেন, ততক্ষণ তাঁরা জয়যুক্ত ছিলেন এবং আজও পার্থিব বিজয়লাভ সম্ভব; যদি মুসলিমরা প্রকৃত মুসলিম হয়ে যায়। {وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ} (آل عمران: ১৩৯) ইসলাম বিজয়ী হতে এসেছে, পরাজিত হতে আসেনি।
আল-ফাতহ 48:29
মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল; আর তার সহচরগণ অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত অবস্থায় আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করতে দেখবে। তাদের মুখমন্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইঞ্জীলেও।[১] তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারা গাছ, যা নির্গত করে কিশলয়,[২] অতঃপর তাকে শক্ত করে এবং তা পুষ্ট হয় ও দৃঢ়ভাবে কান্ডের উপর দাঁড়িয়ে যায়; যা চাষীদেরকে মুগ্ধ করে।[৩] এভাবে (আল্লাহ বিশ্বাসীদের সমৃদ্ধি দ্বারা) অবিশ্বাসীদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন।[৪] ওদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের। [৫]
[১] 'ইঞ্জীল' শব্দের উপর থামলে অর্থ হবে, তাঁদের এই গুণাবলী যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তা তাওরাত ও ইঞ্জীলেও আলোচিত হয়েছে এবং পরের كَزَرْعٍ শব্দের পূর্বে هُمْ ঊহ্য থাকবে। কেউ কেউ فِي التَّوْرَاةِ এর উপর থামেন। অর্থাৎ, তাদের উল্লিখিত গুণগুলো তাওরাতে আছে। আর {ومَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيْلِ} কে كَزَرْعٍ এর সাথে মিলিয়ে পড়েন। অর্থাৎ, ইঞ্জীলে যার দৃষ্টান্ত, একটি চারাগাছ বা ক্ষেতের মত। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] شَطْأَهُ হল চারা গাছের সেই প্রথম কিশলয় (কচি পাতা); যা মহান আল্লাহর কুদরতে বীজ থেকে নির্গত হয়।
[৩] এখানে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)গণের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। শুরুর দিকে তো তাঁরা স্বল্প ছিলেন। অতঃপর সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়ে শক্তিশালী হন। যেমন, ফসল প্রথমে তো দুর্বল হয়, তারপর দিনের দিন সবল হতে থাকে এবং এইভাবে একদিন শক্ত কান্ডের উপর দাঁড়িয়ে যায়।
[৪] অথবা তারা অন্তর্জ্বালার শিকার হয়। অর্থাৎ, সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-দের দিনের দিন প্রভাব-প্রতিপত্তি, বল ও শক্তি বর্ধমান হওয়া কাফেরদের জন্য অন্তর্জবালার কারণ ছিল। কেননা, এতে ইসলামের পরিধি সম্প্রসারিত এবং কুফরীর পরিসীমা সংকীর্ণ হচ্ছিল। এই আয়াতের ভিত্তিতে কোন কোন ইমাম সাহাবা (রাঃ)-দের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে কাফের গণ্য করেছেন। এ ছাড়াও এই ভ্রান্ত দলের অন্যান্য আকীদা-বিশ্বাসও তাদের কুফরীর কথা প্রমাণ করে।
[৫] এই পূর্ণ আয়াতের প্রত্যেকটি অংশ সাহাবায়ে কিরামদের মাহাত্ম্য, ফযীলত, আখেরাতের ক্ষমা এবং তাঁদের মহান প্রতিদান লাভের কথাকে সুস্পষ্ট করে। এরপরও সাহাবাদের ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী মুসলিম হওয়ার দাবী করলে তাকে তার মুসলিম হওয়ার দাবীতে কিভাবে সত্যবাদী মেনে নেওয়া যেতে পারে?