Lafzullah

Tafsir Ahsanul Bayaan — আল-হাদীদ 57:1 – আল-মুলক 67:30

Author / source: Bayaan Foundation

Contents
  1. আল-হাদীদ 57:1
  2. আল-হাদীদ 57:2
  3. আল-হাদীদ 57:3
  4. আল-হাদীদ 57:4
  5. আল-হাদীদ 57:5
  6. আল-হাদীদ 57:6
  7. আল-হাদীদ 57:7
  8. আল-হাদীদ 57:8
  9. আল-হাদীদ 57:9
  10. আল-হাদীদ 57:10
  11. আল-হাদীদ 57:11
  12. আল-হাদীদ 57:12
  13. আল-হাদীদ 57:13
  14. আল-হাদীদ 57:14
  15. আল-হাদীদ 57:15
  16. আল-হাদীদ 57:16
  17. আল-হাদীদ 57:17
  18. আল-হাদীদ 57:18
  19. আল-হাদীদ 57:19
  20. আল-হাদীদ 57:20
  21. আল-হাদীদ 57:21
  22. আল-হাদীদ 57:22
  23. আল-হাদীদ 57:23
  24. আল-হাদীদ 57:24
  25. আল-হাদীদ 57:25
  26. আল-হাদীদ 57:26
  27. আল-হাদীদ 57:27
  28. আল-হাদীদ 57:28
  29. আল-হাদীদ 57:29
  30. আল-মুজাদালা 58:1
  31. আল-মুজাদালা 58:2
  32. আল-মুজাদালা 58:3
  33. আল-মুজাদালা 58:4
  34. আল-মুজাদালা 58:5
  35. আল-মুজাদালা 58:6
  36. আল-মুজাদালা 58:7
  37. আল-মুজাদালা 58:8
  38. আল-মুজাদালা 58:9
  39. আল-মুজাদালা 58:10
  40. আল-মুজাদালা 58:11
  41. আল-মুজাদালা 58:12
  42. আল-মুজাদালা 58:13
  43. আল-মুজাদালা 58:14
  44. আল-মুজাদালা 58:15
  45. আল-মুজাদালা 58:16
  46. আল-মুজাদালা 58:17
  47. আল-মুজাদালা 58:18
  48. আল-মুজাদালা 58:19
  49. আল-মুজাদালা 58:20
  50. আল-মুজাদালা 58:21
  51. আল-মুজাদালা 58:22
  52. আল-হাশর 59:1
  53. আল-হাশর 59:2
  54. আল-হাশর 59:3
  55. আল-হাশর 59:4
  56. আল-হাশর 59:5
  57. আল-হাশর 59:6
  58. আল-হাশর 59:7
  59. আল-হাশর 59:8
  60. আল-হাশর 59:9
  61. আল-হাশর 59:10
  62. আল-হাশর 59:11
  63. আল-হাশর 59:12
  64. আল-হাশর 59:13
  65. আল-হাশর 59:14
  66. আল-হাশর 59:15
  67. আল-হাশর 59:16
  68. আল-হাশর 59:17
  69. আল-হাশর 59:18
  70. আল-হাশর 59:19
  71. আল-হাশর 59:20
  72. আল-হাশর 59:21
  73. আল-হাশর 59:22
  74. আল-হাশর 59:23
  75. আল-হাশর 59:24
  76. আল-মুমতাহিনা 60:1
  77. আল-মুমতাহিনা 60:2
  78. আল-মুমতাহিনা 60:3
  79. আল-মুমতাহিনা 60:4
  80. আল-মুমতাহিনা 60:5
  81. আল-মুমতাহিনা 60:6
  82. আল-মুমতাহিনা 60:7
  83. আল-মুমতাহিনা 60:8
  84. আল-মুমতাহিনা 60:9
  85. আল-মুমতাহিনা 60:10
  86. আল-মুমতাহিনা 60:11
  87. আল-মুমতাহিনা 60:12
  88. আল-মুমতাহিনা 60:13
  89. আস-সফ 61:1
  90. আস-সফ 61:2
  91. আস-সফ 61:3
  92. আস-সফ 61:4
  93. আস-সফ 61:5
  94. আস-সফ 61:6
  95. আস-সফ 61:7
  96. আস-সফ 61:8
  97. আস-সফ 61:9
  98. আস-সফ 61:10
  99. আস-সফ 61:11
  100. আস-সফ 61:12
  101. আস-সফ 61:13
  102. আস-সফ 61:14
  103. আল-জুমুআ 62:1
  104. আল-জুমুআ 62:2
  105. আল-জুমুআ 62:3
  106. আল-জুমুআ 62:4
  107. আল-জুমুআ 62:5
  108. আল-জুমুআ 62:6
  109. আল-জুমুআ 62:7
  110. আল-জুমুআ 62:8
  111. আল-জুমুআ 62:9
  112. আল-জুমুআ 62:10
  113. আল-জুমুআ 62:11
  114. আল-মুনাফিকুন 63:1
  115. আল-মুনাফিকুন 63:2
  116. আল-মুনাফিকুন 63:3
  117. আল-মুনাফিকুন 63:4
  118. আল-মুনাফিকুন 63:5
  119. আল-মুনাফিকুন 63:6
  120. আল-মুনাফিকুন 63:7
  121. আল-মুনাফিকুন 63:8
  122. আল-মুনাফিকুন 63:9
  123. আল-মুনাফিকুন 63:10
  124. আল-মুনাফিকুন 63:11
  125. আত-তাগাবুন 64:1
  126. আত-তাগাবুন 64:2
  127. আত-তাগাবুন 64:3
  128. আত-তাগাবুন 64:4
  129. আত-তাগাবুন 64:5
  130. আত-তাগাবুন 64:6
  131. আত-তাগাবুন 64:7
  132. আত-তাগাবুন 64:8
  133. আত-তাগাবুন 64:9
  134. আত-তাগাবুন 64:10
  135. আত-তাগাবুন 64:11
  136. আত-তাগাবুন 64:12
  137. আত-তাগাবুন 64:13
  138. আত-তাগাবুন 64:14
  139. আত-তাগাবুন 64:15
  140. আত-তাগাবুন 64:16
  141. আত-তাগাবুন 64:17
  142. আত-তাগাবুন 64:18
  143. আত-তালাক 65:1
  144. আত-তালাক 65:2
  145. আত-তালাক 65:3
  146. আত-তালাক 65:4
  147. আত-তালাক 65:5
  148. আত-তালাক 65:6
  149. আত-তালাক 65:7
  150. আত-তালাক 65:8
  151. আত-তালাক 65:9
  152. আত-তালাক 65:10
  153. আত-তালাক 65:11
  154. আত-তালাক 65:12
  155. আত-তাহরীম 66:1
  156. আত-তাহরীম 66:2
  157. আত-তাহরীম 66:3
  158. আত-তাহরীম 66:4
  159. আত-তাহরীম 66:5
  160. আত-তাহরীম 66:6
  161. আত-তাহরীম 66:7
  162. আত-তাহরীম 66:8
  163. আত-তাহরীম 66:9
  164. আত-তাহরীম 66:10
  165. আত-তাহরীম 66:11
  166. আত-তাহরীম 66:12
  167. আল-মুলক 67:1
  168. আল-মুলক 67:2
  169. আল-মুলক 67:3
  170. আল-মুলক 67:4
  171. আল-মুলক 67:5
  172. আল-মুলক 67:6
  173. আল-মুলক 67:7
  174. আল-মুলক 67:8
  175. আল-মুলক 67:9
  176. আল-মুলক 67:10
  177. আল-মুলক 67:11
  178. আল-মুলক 67:12
  179. আল-মুলক 67:13
  180. আল-মুলক 67:14
  181. আল-মুলক 67:15
  182. আল-মুলক 67:16
  183. আল-মুলক 67:17
  184. আল-মুলক 67:18
  185. আল-মুলক 67:19
  186. আল-মুলক 67:20
  187. আল-মুলক 67:21
  188. আল-মুলক 67:22
  189. আল-মুলক 67:23
  190. আল-মুলক 67:24
  191. আল-মুলক 67:25
  192. আল-মুলক 67:26
  193. আল-মুলক 67:27
  194. আল-মুলক 67:28
  195. আল-মুলক 67:29
  196. আল-মুলক 67:30

আল-হাদীদ 57:1

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।[১] তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১] এই তসবীহ পাঠ 'যবানে হাল' (অবস্থার ভাষা) দ্বারা নয়, বরং 'যবানে ক্বাল' মুখের ভাষা দ্বারা। আর এই জন্যই বলা হয়েছে, {وَلَكِنْ لاَ تَفْقَهُوْنَ تَسْبِيْحَهُمْ} "তোমরা তাদের তসবীহ পাঠ অনুধাবন করতে পার না।" (বানী ইস্রাঈল ১৭:৪৪ আয়াত) দাউদ (আঃ) সম্পর্কে এসেছে যে, তাঁর সাথে পাহাড়ও তসবীহ পাঠ করত। (সূরা আম্বিয়া ২১:৭৯ আয়াত) যদি এই তসবীহ পাঠ অবস্থাগত বা ভাবগত হত, তাহলে দাউদ (আঃ)-এর সাথে এটাকে নির্দিষ্ট করার কোন প্রয়োজনই ছিল না।

আল-হাদীদ 57:2

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই;[১] তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান; তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [১] তাই তিনি যেভাবে চান এগুলোর মধ্যে কর্তৃত্ব চালান। তিনি ব্যতীত এগুলোতে অন্য কারো নির্দেশ ও কর্তৃত্ব চলে না। অথবা অর্থ হল, বৃষ্টি, উদ্ভিদ ও রুযীর সমস্ত ভান্ডার তাঁরই মালিকানাধীন।

আল-হাদীদ 57:3

তিনিই আদি, অন্ত, ব্যক্ত ও গুপ্ত[১] এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। [১] তিনিই আদি বা প্রথম; তাঁর পূর্বে কিছু ছিল না। তিনিই অন্ত বা সর্বশেষ; তাঁরপর কিছু থাকবে না। তিনি ব্যক্ত বা প্রকাশমান। অর্থাৎ, তিনি সবার উপর জয়ী, তাঁর উপর কেউ জয়ী নয়। তিনি গুপ্ত বা অপ্রকাশমান। অর্থাৎ, যাবতীয় গোপন খবর একমাত্র তিনিই জানেন। অথবা তিনি মানুষের দৃষ্টি ও জ্ঞানের অন্তরালে। (ফাতহুল ক্বাদীর) নবী করীম (সাঃ) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) কে এই দু'আটি পাঠ করতে তাকীদ করেছিলেনঃ اَللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَيْءٍ، مُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ، أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنِّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنِا مِنْ الْفَقْرِ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! হে আকাশ মন্ডলী, পৃথিবী ও মহা আরশের অধিপতি। হে আমাদের ও সকল বস্তুর প্রতিপালক! হে শস্যবীজ ও আঁটির অঙ্কুরোদয়কারী! হে তাওরাত, ইনজীল ও ফুরকানের অবতারণকারী! আমি তোমার নিকট প্রত্যেক অনিষ্টকারীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি- যার ললাটের কেশগুচ্ছ তুমি ধারণ করে আছ। হে আল্লাহ! তুমিই আদি তোমার পূর্বে কিছু নেই। তুমিই অন্ত তোমার পরে কিছু নেই। তুমিই ব্যক্ত (অপরাজেয়), তোমার ঊর্ধ্বে কিছু নেই এবং তুমিই (সৃষ্টির গোচরে) অব্যক্ত, তোমার নিকট অব্যক্ত কিছু নেই। আমাদের তরফ থেকে আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দাও এবং আমাদেরকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল (অভাবশূন্য) করে দাও। (মুসলিমঃ যিকর ও দু'আ অধ্যায়) ঋণ পরিশোধের জন্য পঠনীয় এই দু'আর মধ্যে 'আওয়াল', 'আখির' এবং 'যাহির' ও 'বাতিন'এর ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে।

আল-হাদীদ 57:4

তিনিই ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন।[১] তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে[২] ও যা কিছু তা হতে বের হয়[৩] এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে[৪] ও আকাশে যা কিছু উত্থিত হয়।[৫] তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন,[৬] তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন। [১] এই অর্থেরই কিছু আয়াত সূরা আ'রাফ ৭:৫৪, সূরা ইউনুস ১০:৩ এবং সূরা সাজদাহ ৩২:৪ প্রভৃতি স্থানে রয়েছে। সেগুলোর টীকা দ্রষ্টব্য।[২] অর্থাৎ, যমীনে বৃষ্টির যে ফোঁটাগুলো এবং শস্য ও ফল-মূলের যে বীজগুলো প্রবেশ করে, তার পরিমাণ-মাত্রা এবং ধরণ-গঠন তিনিই জানেন।[৩] যে গাছ-পালা, চাহে তা ফলের হোক বা শস্যাদির হোক কিংবা সৌন্দর্য ও সাজের গাছ বা সুগন্ধ ফুলের গাছ হোক, এগুলো যত পারিমাণে ও যেভাবে বের হয়ে আসে, সব কিছুই আল্লাহর জ্ঞানে থাকে। যেমন, অন্যত্র বলেছেন,{وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لاَ يَعْلَمُهَا إِلاَّ هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلاَّ يَعْلَمُهَا وَلاَ حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الأَرْضِ وَلاَ رَطْبٍ وَلاَ يَابِسٍ إِلاَّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ}অর্থাৎ, তাঁরই নিকট অদৃশ্যের চাবি রয়েছে; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে (বৃক্ষের) একটি পাতাও পড়ে না, মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণা অথবা রসযুক্ত কিম্বা শুষ্ক এমন কোন বস্তু পড়ে না, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। (সূরা আনআম ৬:৫৯)[৪] বজ্র, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, বরফ, বরকত, ভাগ্য এবং সেই সব বিধানাবলী, যা ফিরিশতাগণ নিয়ে অবতরণ করেন।[৫] অর্থাৎ, ফিরিশতাগণ মানুষের যে আমল নিয়ে ওপরে ওঠেন। যেমন হাদীসে আছে যে, "রাতের আমল দিনের পূর্বে এবং দিনের আমল রাতের পূর্বে আল্লাহর নিকট উঠে যায়।"(মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)[৬] অর্থাৎ, তোমরা স্থলে থাক বা জলে, রাত হোক অথবা দিন, গৃহে থাক অথবা মরুভূমিতে, প্রত্যেক স্থানে সদা-সর্বদা তিনি তাঁর জ্ঞান ও দর্শন দ্বারা তোমাদের সঙ্গে থাকেন। অর্থাৎ, তোমাদের প্রতিটি কাজকে তিনি দেখেন। তোমাদের প্রতিটি কথা তিনি জানেন ও শোনেন। এই বিষয়টা সূরা হূদ ১১:৫ নং এবং সূরা রা'দ ১৩:১০ নং আয়াত সহ অন্যান্য আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে।

আল-হাদীদ 57:5

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই, আর আল্লাহরই দিকে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।

আল-হাদীদ 57:6

তিনিই রাত্রিকে প্রবেশ করান দিনে এবং দিনকে প্রবেশ করান রাত্রিতে।[১] আর তিনি অন্তর্যামী। [১] অর্থাৎ, সমস্ত জিনিসের মালিক তিনিই। তিনি যেভাবে চান তাতে কর্তৃত্ব করেন। তাঁর নির্দেশে কখনো রাত বড় ও দিন ছোট হয়। আবার কখনো এর বিপরীত দিন বড় ও রাত ছোট হয়। কখনো রাত ও দিন সমান সমান হয়। অনুরূপ কখনো শীত, কখনো গ্রীষ্ম, কখনো বসন্ত ও কখনো হেমন্তকাল, নানা অবস্থার রূপান্তর ও ঋতুর পরিবর্তনও তাঁর নির্দেশ ও ইচ্ছায় ঘটে।

আল-হাদীদ 57:7

আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী[১] করেছেন তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার। [১] অর্থাৎ, এই ধন এর পূর্বে অন্য কারো নিকটে ছিল। এতে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ ধন তোমার নিকটেও থাকবে না। অপর কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে। তোমরা যদি এ মালগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় না কর, তবে পরে যারা এগুলোর মালিক হবে, তারা আল্লাহর পথে সেগুলো ব্যয় করে তোমাদের চাইতেও বেশী সৌভাগ্য লাভ করতে পারবে। আর তারা যদি এগুলোকে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে ব্যয় করে, তবে তোমরাও অসৎকার্যে সাহায্য করার অপরাধে ধরা খেতে পার। (ইবনে কাসীর) হাদীসে এসেছে যে, "মানুষ বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল প্রথমতঃ সেটা, যেটা তুমি খেয়ে শেষ করেছ। দ্বিতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি পরিধান করে নষ্ট করেছ এবং তৃতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করে পরকালের জন্য সঞ্চয় করেছ। এ ছাড়া যা কিছু থাকবে, তা সবই অন্যদের ভাগে আসবে।" (মুসলিমঃ যুহুদ অধ্যায়, মুসনাদ আহমাদ ৪/২৪)

আল-হাদীদ 57:8

তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন কর না? অথচ রসূল তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে আহবান করছে এবং তিনি (আল্লাহ) তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন; তোমরা যদি বিশ্বাসী হও।[১] [১] ইবনে কাসীর (রঃ) أخذ ক্রিয়ার 'ফা-য়েল' (কর্তৃপদ বা তিনি বলতে) রসূলকে বুঝিয়েছেন এবং অর্থ নিয়েছেন, সেই বায়আত বা অঙ্গীকার, যা রসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দের নিকট থেকে নিতেন। আর তা হল, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তাঁর কথা শুনতে ও মানতে হবে। ইমাম ইবনে জারীরের নিকট এর 'ফা-য়েল' হল আল্লাহ। অর্থ হল, সেই অঙ্গীকার, যা মহান আল্লাহ সকল মানুষের কাছ থেকে তখন নিয়েছিলেন, যখন তাদেরকে আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছিলেন। যেটাকে عهد أَلَسْتُ বলা হয়; যার আলোচনা সূরা আ'রাফ ৭:১৭২ নং আয়াতে রয়েছে।

আল-হাদীদ 57:9

তিনিই তাঁর বান্দাদের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোকে আনার জন্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়; পরম দয়ালু।

আল-হাদীদ 57:10

তোমরা আল্লাহর পথে কেন ব্যয় করবে না? অথচ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মালিকানা তো আল্লাহরই। তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও সংগ্রাম করেছে (তারা এবং পরবর্তীরা) সমান নয়।[১] তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাদের অপেক্ষা, যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে ও সংগ্রাম করেছে।[২] তবে আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [৩] আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। [১] فَتْحٌ (বিজয়) থেকে অধিকাংশ মুফাসসির বুঝিয়েছেন মক্কা বিজয়। কারো কারো মতে হুদাইবিয়ার সন্ধিই যেহেতু সুস্পষ্ট বিজয়, তাই এ থেকে হুদাইবিয়ার সন্ধি বুঝিয়েছেন। যাই হোক হুদাইবিয়ার সন্ধি বা মক্কা বিজয়ের পূর্বকালে মুসলিমরা সংখ্যা ও ক্ষমতার দিক থেকেও কম ছিলেন এবং মুসলিমদের আর্থিক অবস্থাও অনেক দুর্বল ছিল। এই প্রতিকূল অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করা ও জিহাদে অংশ গ্রহণ করা উভয় কাজই ছিল অতীব কঠিন এবং বড়ই দুঃসাধ্য। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায়। মুসলিমদের শক্তি ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁদের আর্থিক অবস্থাও আগের তুলনায় অনেক ভাল হয়ে যায়। তাই আল্লাহ এই আয়াতে উভয় কালের মুসলিমদের সম্পর্কে বললেন যে, এরা পুণ্যে সমান হতে পারে না। [২] কেননা, পূর্বের লোকদের ব্যয় ও যুদ্ধ দু'টোই অতীব কঠিন অবস্থায় হয়েছে। এ থেকে বুঝা গেল যে, মর্যাদাসম্পন্ন ও কৃতী লোকদেরকে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই জন্যই আহলে সুন্নাহর নিকট সম্মান ও মর্যাদায় আবু বাকার (রাঃ) সবার ঊর্ধ্বে। কেননা, প্রথম মু'মিন তিনিই, প্রথম আল্লাহর পথে ব্যয়কারীও তিনিই এবং প্রথম মুজাহিদও তিনিই। আর এই জন্য রসূল (সাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় ও উপস্থিতিতে সিদ্দীকে আকবার (রাঃ) কে নামাযের জন্য আগে বাড়ান এবং এরই ভিত্তিতে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাঁকে প্রথম খলীফা হওয়ার যোগ্যরূপে প্রাধান্য দেন। رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ। [৩] এতে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দের মধ্যে মান-মর্যাদায় পার্থক্য তো অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু মান-মর্যাদায় পার্থ্যকের অর্থ এই নয় যে, পরে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ঈমান ও চারিত্রিক দিক থেকে একেবারে নিম্নস্তরের ছিলেন। যেমন, অনেকে মুআবিয়া (রাঃ) ও তাঁর পিতা আবূ সুফিয়ান (রাঃ) এবং আরো অনেক মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবাদের ব্যাপারে আজে-বাজে কথা বলে অথবা তাঁদেরকে (মক্কাবিজয়ের দিন ঘোষিত) 'মুক্ত' মানুষ বলে তাঁদেরকে হেয় প্রতিপন্ন ও তুচ্ছজ্ঞান করে থাকে। নবী করীম (সাঃ) সমস্ত সাহাবা (রাঃ) সম্পর্কে বলেছেন যে, ((لاَ تَسُبُّوْا أَصْحَابِيْ)) "তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর পথে উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ সোনা ব্যয় করে, তবুও তা আমার সাহাবাদের ব্যয়কৃত এক 'মুদ্দ্' (প্রায় ৬২৫ গ্রাম) বরং অর্ধ 'মুদ্দ্' এর সমানও হবে না।" (বুখারী, মুসলিমঃ সাহাবাদের ফযীলত অধ্যায়)

আল-হাদীদ 57:11

কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি তা বহুগুণে তার জন্য বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। [১] [১] আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেওয়ার অর্থ তাঁর পথে দান-খয়রাত করা। এই মাল যা মানুষ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তা আল্লাহরই দেওয়া। তা সত্ত্বেও সেটাকে ঋণ বলে আখ্যায়িত করা আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ বৈ কিছু নয়। তিনি এর প্রতিদান অবশ্যই দেবেন, যেমন ঋণ পরিশোধ করা অত্যাবশ্যক হয়।

আল-হাদীদ 57:12

সেদিন তুমি বিশ্বাসী নর-নারীদেরকে দেখবে, তাদের সামনে ও ডানে তাদের আলো প্রবাহিত হবে।[১] (বলা হবে,) ‘আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের; যার নিম্নে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।’ [২] [১] এটা হাশরের ময়দানে পুলসিরাতে হবে। এই জ্যোতি তাদের ঈমান ও সৎকর্মের প্রতিদান হবে। এরই আলোতে তারা (জাহান্নামের উপর স্থাপিত পুলে) জান্নাতের পথ অতি সহজে অতিক্রম করে নেবে। ইবনে কাসীর ও ইবনে জারীর প্রভৃতি ইমামগণ وَبِأَيْمَانِهِمْ এর অর্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, তাদের ডান হাতে থাকবে তাদের আমলনামা। [২] এ কথা বলবেন সেই ফিরিশতাগণ, যাঁরা তাদের অভ্যর্থনার জন্য সেখানে উপস্থিত থাকবেন।

আল-হাদীদ 57:13

সেদিন মুনাফিক (কপট) পুরুষ ও মুনাফিক নারী বিশ্বাসীদেরকে বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের আলো কিছু গ্রহণ করতে পারি।’[১] বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও[২] ও আলোর সন্ধান কর।’ অতঃপর উভয়ের মাঝামাঝি[৩] স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, ওর অভ্যন্তরে থাকবে করুণা[৪] এবং বহির্ভাগে থাকবে শাস্তি। [৫] [১] মুনাফিকরা কিছু দূর পর্যন্ত ঈমানদারদের সাথে তাদের আলোতে চলবে। অতঃপর মহান আল্লাহ মুনাফিকদের জন্য তাদের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেবেন। তখন তারা মু'মিনদেরকে এ কথা বলবে। [২] এর অর্থ হল, দুনিয়াতে গিয়ে এই ধরনের ঈমান ও সৎকর্মের পুঁজি নিয়ে এসো, যেমন আমরা নিয়ে এসেছি। অথবা বিদ্রূপের ছলে ঈমানদাররা বলবে যে, পিছনে যেখান থেকে আমরা এই জ্যোতি নিয়ে এসেছি, সেখানে গিয়ে তোমরাও তার খোঁজ কর। [৩] অর্থাৎ, মু'মিন ও মুনাফিকদের মাঝামাঝি। [৪] অর্থাৎ, জান্নাত; যেখানে ঈমানদারগণ প্রবেশ করবেন। [৫] অর্থাৎ, জাহান্নাম থাকবে।

আল-হাদীদ 57:14

মুনাফিকরা বিশ্বাসীদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে, ‘আমরা কি (দুনিয়ায়) তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?’[১] তারা বলবে, ‘অবশ্যই, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ,[২] তোমরা প্রতীক্ষা করেছিলে,[৩] সন্দেহ পোষণ করেছিলে[৪] এবং আল্লাহর হুকুম (মৃত্যু) আসা[৫] পর্যন্ত অলীক আশা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল;[৬] আর আল্লাহ সম্পর্কে মহাপ্রতারক (শয়তান) তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। [৭] [১] অর্থাৎ, প্রাচীর খাড়া হয়ে যাওয়ার পর মুনাফিকরা মু'মিনদেরকে বলবে, 'দুনিয়ায় কি আমরা তোমাদের সাথে নামায পড়তাম না এবং জিহাদ ইত্যাদিতে অংশ গ্রহণ করতাম না?' [২] তোমরা তোমাদের অন্তরে কুফরী ও মুনাফিক্বী গুপ্ত রেখেছিলে। [৩] যে, মুসলিমরা কোন আপদ-বিপদের সম্মুখীন হোক। [৪] দ্বীনের ব্যাপারসমূহে। তাই তোমরা না কুরআনকে মেনেছ, আর না দলীলাদি ও মু'জিযাকে। [৫] অর্থাৎ, তোমাদের মৃত্যু আসা পর্যন্ত। অথবা শেষ পর্যন্ত মুসলিমরাই জয়ী থাকল এবং তোমাদের আশার বাসা ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল। [৬] যাতে শয়তান তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল। [৭] অর্থাৎ, আল্লাহর সহিষ্ণুতা ও তাঁর অবকাশদানের নীতির ফলে শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণায় ফেলে রেখেছিল।

আল-হাদীদ 57:15

আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা অবিশ্বাস করেছিল তাদের নিকট হতেও নয়। তোমাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, এটাই তোমাদের চিরসঙ্গী।[১] আর কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম!’ [১] এক অর্থে مَولى মতোয়াল্লীকে বলা হয়, যে অপরের কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। অর্থাৎ, এখন জাহান্নামের এই দায়িত্ব যে, তাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি আস্বাদন করাবে। কেউ বলেছেন, সর্বদা সাথে থাকে তাকেও 'মাওলা' বলা হয়। অর্থাৎ, এখন জাহান্নামের আগুনই তাদের চিরসাথী ও চিরসঙ্গী হবে। কেউ বলেছেন, মহান আল্লাহ জাহান্নামকেও জ্ঞান ও বোধশক্তি দান করবেন। তাই সে কাফেরদের উপর রাগ ও ক্রোধ প্রকাশ করবে। অর্থাৎ, সে তাদের তত্ত্বাবধায়ক হবে এবং তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতে থাকবে।

আল-হাদীদ 57:16

যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদের সময় কি আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের হৃদয় ভক্তি-বিগলিত হবে?[১] এবং পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের মত তারা হবে না?[২] বহুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে যাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়েছিল।[৩] আর তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী। [৪] [১] এই সম্বোধন মু'মিনদেরকে করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য তাদেরকে আল্লাহর স্মরণের দিকে আরো বেশী মনোযোগী করা এবং পবিত্র কুরআন থেকে নির্দেশনা গ্রহণের প্রেরণা দেওয়া। خشوع এর অর্থ নরম অন্তরে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়া। حَقّ (সত্য) বলতে কুরআন কারীম। [২] যেমন ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা। অর্থাৎ, তোমরা তাদের মত হয়ে যেয়ো না। [৩] সুতরাং তারা আল্লাহর কিতাবে পরিবর্তন ঘটাল। এর বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ও তুচ্ছ সম্পদ সঞ্চয় করাকে তারা নিজেদের পেশায় পরিণত করেছিল। তার (কিতাবের) বিধি-বিধানকে তারা পশ্চাতে ফেলে দিয়েছিল। আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে বড়দের অন্ধ অনুকরণ আরম্ভ করেছিল এবং তাদেরকেই নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা এ রকম কাজ করো না। নচেৎ তোমাদের অন্তরও শক্ত হয়ে যাবে এবং তার ফলে ঐ কাজগুলো যা তাদের জন্য আল্লাহর অভিশাপের কারণ হয়েছিল, তোমাদেরকেও ভাল লাগবে। [৪] অর্থাৎ, তাদের অন্তর খারাপ ও তাদের কাজ-কর্ম বাতিল। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَنَسُواْ حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا} (المائدة: ১৩)

আল-হাদীদ 57:17

তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহই পৃথিবীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি; যাতে তোমরা বুঝতে পার।

আল-হাদীদ 57:18

দানশীল পুরুষগণ ও দানশীল নারিগণ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে, তাদেরকে দেওয়া হবে বহুগুণ বেশী[১] এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। [২] [১] অর্থাৎ, একের পরিবর্তে কমপক্ষে দশগুণ এবং তার চাইতেও বেশী সাতশতগুণ বরং তার থেকেও অধিক মাত্রায়। এই বর্ধন নিয়তের ঐকান্তিকতা, প্রয়োজন এবং স্থান-কালের ভিত্তিতে হতে পারে। যেমন, পূর্বে আলোচনা হল যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয়কারীদের পুণ্য ও সওয়াব তার পরে ব্যয়কারীদের তুলনায় বেশী হবে। [২] অর্থাৎ, জান্নাত ও তার নিয়ামতসমূহ; যা কখনো শেষ ও ধ্বংস হবার নয়। আয়াতে مُصِّدِّقِيْنَ শব্দটি আসলে مُتَصَدِّقِيْنَ ছিল। 'তা' হরফটিকে স্বাদ এর মধ্যে সন্ধি ঘটানো হয়েছে।

আল-হাদীদ 57:19

যারা আল্লাহ ও তাঁর সমস্ত রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করে, তারাই তাদের প্রতিপালকের নিকট সিদ্দীক[১] (সত্যনিষ্ঠ) ও শহীদ। তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি। আর যারা অবিশ্বাস করেছে ও আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। [১] কোন কোন মুফাসসির এখানে 'ওয়াকফ' (স্টপ) করেছেন বা থেমেছেন এবং পরের শব্দ وَالشُّهَدَآءُ কে পৃথক বাক্য গণ্য করেছেন। صِدِّيق (সিদ্দীক) পূর্ণ ঈমান এবং পূর্ণ ও নির্মল সত্যবাদিতার অধিকারীকে বলে। (যিনি সত্য বলেন এবং সত্যকে সত্য বলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন।) হাদীসে এসেছে যে, "মানুষ সর্বদা সত্য বলে এবং সত্যের অনুসন্ধান ও প্রচেষ্টায় থাকে, এমনকি আল্লাহর নিকটেও তাকে (সিদ্দীক) সত্যবাদী বলে লিখে দেওয়া হয়।" (বুখারী-মুসলিম) অপর একটি হাদীসে সত্য স্বীকারকারীদের এমন মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে, যা তাঁরা জান্নাতে লাভ করবেন। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "জান্নাতীরা তাদের উপরের বালাখানার লোকদেরকে ঐভাবে দেখবে, যেভাবে তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম প্রান্তে উদ্দীপ্ত নক্ষত্ররাজিকে দেখ।" অর্থাৎ, তাঁদের পারস্পরিক মর্যাদায় এরূপ পার্থক্য হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি নবীদের মর্যাদা হবে; যা অন্যরা লাভ করতে পারবে না? তিনি (সাঃ) বললেন, "না, সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! সেটা তাদের স্থান যারা আল্লাহর উপরে ঈমান এনেছে এবং নবীদেরকে যথাযথভাবে সত্য জেনেছে।" (সহীহ বুখারীঃ সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়)

আল-হাদীদ 57:20

তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে[১] চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয়[২] এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি[৩] এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি।[৪] আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।[৫] [১] كُفَّارٌ (কাফের) এখানে কৃষক বা চাষীদেরকে বলা হয়েছে। কারণ, তার আভিধানিক অর্থ হল, গোপনকারী। কাফেররা অন্তরে আল্লাহ ও পরকালের অস্বীকৃতি গোপন রাখে, তাই তাদেরকে কাফের বলা হয়। আর কৃষকদের ক্ষেত্রে এই শব্দ এই জন্য ব্যবহার করা হয়েছে যে, তারা জমিতে বীজ বপন করে। অর্থাৎ, তা মাটির তলায় গোপন করে থাকে। (ওরা অস্বীকার দ্বারা সত্য ঢাকে, আর এরা মাটি দ্বারা বীজ ঢাকে।) [২] এখানে পার্থিব জীবনকে সত্বর ক্ষয় হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ফসলের সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যেভাবে ফসল শ্যামল ও সবুজবর্ণ হয়ে উঠলে, দেখতে বড়ই চমৎকার লাগে, কৃষকরা তা দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়। কিন্তু তা শীঘ্রই শুকিয়ে পীতবর্ণ হয়ে খড়কুটায় পরিণত হয়, ঠিক এইভাবে দুনিয়ার সাজ-সজ্জা, সন্তান-সন্ততি এবং অন্যান্য সমস্ত জিনিস মানুষের অন্তরকে খুশীতে ভরে দেয়। কিন্তু নশ্বর এ জীবন কিছু দিনের জন্য; এর স্থায়িত্ব নেই। [৩] অর্থাৎ, কাফের ও অবাধ্যজনদের জন্য; যারা দুনিয়ার ক্রীড়া-কৌতুকেই মগ্ন থাকে এবং এটাকেই তারা জীবনের আসল লক্ষ্য মনে করে। [৪] অর্থাৎ, ঈমানদার ও অনুগত বান্দাদের জন্য। যারা দুনিয়াকেই সবকিছু ভাবে না, বরং তাকে অস্থায়ী, ধ্বংসশীল এবং পরীক্ষাগার ভেবে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী জীবন-যাপন করে। [৫] তার জন্য, যে এর প্রতারণায় পড়ে থাকে এবং পরকালের জন্য কিছুই সঞ্চয় করে না। পক্ষান্তরে যে দুনিয়ার এই জীবনকে আখেরাত অর্জনের জন্য ব্যবহার করে, তার জন্য এই দুনিয়াই এর থেকেও উত্তম জীবন লাভের মাধ্যম হয়।

আল-হাদীদ 57:21

তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা[১] ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মত,[২] যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। [৩] আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। [৪] [১] অর্থাৎ, সৎকর্ম ও নিষ্ঠাপূর্ণ তওবার দিকে অগ্রণী হও। কেননা, এ জিনিসগুলোই প্রতিপালকের ক্ষমা লাভের মাধ্যম ও উপকরণ। [২] আর যার প্রশস্ততা বা প্রস্থ এত, তার দৈর্ঘ্যের পরিমাপ কত হবে? কেননা, দৈর্ঘ্য প্রস্থের তুলনায় সাধারণতঃ বেশীই হয়। [৩] আর এ কথা পরিষ্কার যে, তিনি তারই জন্য ইচ্ছা করেন, যে কুফরী ও পাপাচার থেকে তওবা করে ঈমান ও সৎকর্মের জীবন গড়ে তুলে। সুতরাং তিনি এই ধরনের লোকদেরকে ঈমান গ্রহণ ও সৎকর্ম করার তওফীক দানে ধন্য করেন। [৪] তিনি যাকে চান, তাকে স্বীয় অনুগ্রহ দান করেন। যাকে তিনি কিছু দিতে চান, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর যা তিনি রোধ করে নেন, তা কেউ দিতে পারে না। যাবতীয় কল্যাণ তাঁরই হাতে। তিনিই এমন অনুকম্পাশীল এবং প্রকৃত মহাদাতা যে, তাঁর মাঝে কৃপণতা কল্পনাই করা যায় না।

আল-হাদীদ 57:22

পৃথিবীতে[১] অথবা ব্যক্তিগতভাবে[২] তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে, আমার তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে,[৩] নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে তা খুবই সহজ। [১] যেমন দুর্ভিক্ষ, প্লাবন, ঝড়-তুফান এবং অন্যান্য আকাশ ও পৃথিবীর বিপদাপদ। [২] যেমন, রোগ-ব্যাধি, কষ্ট-ক্লেশ এবং অভাব-অনটন ইত্যাদি। [৩] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর জ্ঞানানুসারে সমস্ত সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পূর্বেই যাবতীয় বিষয়াদি লিখে দিয়েছেন। যেমন, হাদীসে আছে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "মহান আল্লাহ আকাশ-পৃথিবী সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই সৃষ্টি ভাগ্য লিখে দিয়েছেন।" (মুসলিমঃ তাকদীর অধ্যায়)

আল-হাদীদ 57:23

এটা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও।[১] গর্বিত ও অহংকারীদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। [১] এখানে যে দুঃখ ও আনন্দ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, তা হল এমন দুঃখ ও আনন্দ, যা মানুষকে অবৈধ কাজ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তাছাড়া কোন কষ্টে দুঃখিত এবং কোন সুখে আনন্দিত হওয়া তো মানুষের একটি প্রকৃতিগত ব্যাপার। তবে মু'মিন বিপদে এই মনে করে ধৈর্য ধারণ করে যে, এটা আল্লাহর ইচ্ছা ও ভাগ্যের লিখন (যা পরীক্ষা অথবা পাপফল)। আর্তনাদ ও হা-হুতাশ করে এতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অনুরূপ মু'মিন সুখের দিন পেলে তাতে গর্ব ও অহংকার প্রদর্শন করে না। বরং এর জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর এ কথা মনে করে না যে, এ সুখ তার প্রাপ্য, এ শুধু তার পরিশ্রমেরই ফল। বরং বিশ্বাস রাখে যে, এ হল মহান আল্লাহর অনুগ্রহ, তাঁর দয়া ও কৃপা।

আল-হাদীদ 57:24

যারা কার্পণ্য করে এবং মানুষকে কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়; যে মুখ ফিরিয়ে নেয়[১] (সে জেনে রাখুক যে), নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। [১] অর্থাৎ, আল্লাহর পথে ব্যয় করা থেকে। কেননা, প্রকৃত কার্পণ্য তো এটাই।

আল-হাদীদ 57:25

নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি);[১] যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি;[২] যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি[৩] ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ,[৪] আর যাতে আল্লাহ জানতে পারেন যে, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে।[৫] নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [৬] [১] ميزان (তুলাদন্ড) বলতে ন্যায়নীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আমি লোকদেরকে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়েছি। কেউ কেউ এর অনুবাদ করেছেন দাঁড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করার অর্থ হল, আমি দাঁড়িপাল্লার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছি যে, এর দ্বারা ওজন করে মানুষকে পুরো পুরো প্রাপ্য দিয়ে দাও। [২] এখানে অবতীর্ণ করার অর্থ সৃষ্টি করা ও তার শিল্পকাজ শিখানো। লোহা থেকে অসংখ্য জিনিস তৈরী হয়। এসব আল্লাহর প্রেরণা দান ও তাঁর দিগ্দর্শনের ফল; যা তিনি মানুষের প্রতি করেছেন। [৩] অর্থাৎ, লোহা থেকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরী হয়। যেমন, তরবারি, বর্শা, বন্দুক এবং আধুনিক এ্যাটম বোম, তোপ-কামান, যুদ্ধ-বিমান, ডুবোজাহাজ, রকেট ও ট্যাঙ্ক ইত্যাদি অনেক জিনিস। যার দ্বারা শত্রুর উপর আক্রমণও করা যায় এবং নিজেদের প্রতিরক্ষাও করা যায়। [৪] অর্থাৎ, যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া লোহা থেকে আরো এমন অনেক জিনিষ তৈরী হয়, যা বাড়িতেও বিভিন্ন সাংসারিক কাজে আসে। যেমন, ছুরি, চাকু, কাঁচি, হাতুড়ি, সূচ, অনুরূপ চাষী, ছুতার ও রাজমিস্ত্রীর কাজের আসবাব-পত্র সহ ছোট-বড় অসংখ্য মেশিন ও জিনিস-পত্র। (এই লোহা থেকে গাড়ি তৈরী হয় এবং তারই উপর তা চলে।) [৫] এর সংযোগ হল لِيَقُوْمَ এর সাথে। অর্থাৎ, রসূলদেরকে এই জন্য প্রেরণ করেছেন যে, যাতে তিনি জেনে নেন কে তাঁর রসূলদের উপর আল্লাহকে না দেখেই ঈমান নিয়ে আসে এবং তাঁদের সাহায্য করে। [৬] তাঁর এর প্রয়োজন নেই যে, মানুষ তাঁর দ্বীনের এবং তাঁর রসূলগণের সাহায্য করুক। বরং তিনি চাইলে কারো সাহায্য ছাড়াই তাঁদেরকে জয়ী করতে পারেন। কিন্তু মানুষদেরকে তিনি তাঁদের সাহায্য করার নির্দেশ কেবল তাদেরই মঙ্গলার্থে দিয়েছেন। এইভাবে যাতে তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে তাঁর ক্ষমা ও করুণার অধিকারী হয়ে যায়।

আল-হাদীদ 57:26

অবশ্যই আমি নূহ ও ইব্রাহীমকে রসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং আমি তাদের বংশধরদের জন্য স্থির করেছিলাম নবুঅত ও কিতাব, কিন্তু তাদের কিছু সংখ্যক সৎপথ অবলম্বন করেছিল এবং বহু সংখ্যক ছিল সত্যত্যাগী।

আল-হাদীদ 57:27

অতঃপর আমি তাদের অনুগামী করেছিলাম আমার রসূলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারয়্যাম তনয় ঈসাকে, আর তাকে দিয়েছিলাম ইঞ্জীল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া;[১] কিন্তু সন্ন্যাসবাদ এটা তো তারা নিজেরা প্রবর্তন করেছিল,[২] আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বিধান ছাড়া[৩] আমি তাদেরকে এ (সন্ন্যাসবাদে)র বিধান দিইনি;[৪] অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি।[৫] সুতরাং তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তাদেরকে আমি তাদের পুরস্কার দিয়েছিলাম।[৬] আর তাদের অনেকেই সত্যত্যাগী। [১] رَأْفَةٌএর অর্থ নম্রতা, করুণা এবং رَحْمَةٌ এর অর্থ দয়া-দাক্ষিণ্য। অনুসারীদের বলতে ঈসা (আঃ)-এর 'হাওয়ারী' (শিষ্যগণ)। অর্থাৎ, তাদের অন্তরে পরস্পরের জন্য প্রেম-প্রীতির প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম। যেমন, সাহাবাবায়ে কিরাম (রাঃ) একে অপরের প্রতি দয়াশীল ও হিতার্থী ছিলেন। رُحْمَاءُ بَيْنَهُمْ ইয়াহুদীরা আপোসে এ রকম একে অপরের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী ও দরদী নয়, যে রকম ঈসা (আঃ)-এর অনুসারীরা ছিলেন। [২] رَهْبَانِيَّةٌ হল رَهْبٌ (ভয়) ধাতু থেকে। অথবা رُهْبَانٌ (সন্ন্যাসী) এর সাথে সম্বদ্ধ। এই ক্ষেত্রে 'রা' হরফটির উপর পেশ হবে। কিংবা এটাকে رهبنة এর সাথে সম্বদ্ধ ধরে নেওয়া যায়। তবে এই ক্ষেত্রে 'রা' এর উপর যবর হবে। رَهبانية এর অর্থ হল, (বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদ) সংসার ত্যাগ করা (ফকীরী নেওয়া)। অর্থাৎ, দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোন জঙ্গলে বা মরুভূমিতে গিয়ে নির্জনে আল্লাহর উপাসনা-আরাধনা করা। এর পটভূমিকা হল, ঈসা (আঃ) এর পর এমন রাজাদের আগমন ঘটে, যারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে বহু পরিবর্তন সাধন করে। যে কাজকে একটি দল মেনে নিতে পারেনি। উক্ত দল রাজাদের ভয়ে পাহাড়ের চূড়া ও গুহায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। এখান থেকেই তার সূচনা হয়। যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল পরিস্থিতির চাপে পড়ে। কিন্তু তাদের পরে আগত অনেক মানুষ তাদের বড়দের অন্ধ অনুকরণে দেশ ত্যাগ করাকে ইবাদতের একটি তরীকা বানিয়ে নেয় এবং নিজেকে গির্জা ও উপাসনালয়ে আবদ্ধ করে নেয়। আর এর জন্য দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে অত্যাবশ্যক গণ্য করে। এটাকেই আল্লাহ ابتداع (মনগড়া) বলে আখ্যায়িত করেছেন। [৩] অর্থাৎ, আমি তো তাদের উপর কেবল আমার সন্তুষ্টি লাভের পথ খোঁজ করা অপরিহার্য করেছিলাম। এর দ্বিতীয় অনুবাদ হল, তারা এ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ পরিষ্কার করে বলে দিলেন যে, দ্বীনে নিজের পক্ষ হতে বিদআত রচনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায় না। তাতে তা (এই বিদআত) দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি একমাত্র তাঁর আনুগত্যেই অর্জন হতে পারে। [৪] এটা পূর্বের কথারই তাকীদ স্বরূপ বলা হচ্ছে যে, এই বৈরাগ্য তাদের নিজেরই আবিষ্কার করা, আমি এর নির্দেশ দিইনি। [৫] অর্থাৎ, যদিও তারা উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই বলেছিল, কিন্তু তারা যথাযথভাবে তা পালন করেনি। যথাযথ তা পালন করলে বিদআত আবিষ্কার করার পরিবর্তে অনুসরণের পথ অবলম্বন করত। (এর দ্বিতীয় অনুবাদঃ কিন্তু সন্ন্যাসবাদ এটা তো তারা নিজেরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল, আমি তাদেরকে এর বিধান দিইনি অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি।) [৬] এরা হল সেই লোক, যারা ঈসা (আঃ)-এর ধর্মে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আল-হাদীদ 57:28

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; তিনি তোমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দ্বিগুণ দান করবেন[১] এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলাফেরা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] এই দ্বিগুণ প্রতিদান সেই ঈমানদাররা লাভ করবেন, যাঁরা নবী (সাঃ)-এর পূর্বে কোন রসূলের উপর ঈমান রাখতেন। অতঃপর নবী করীম (সাঃ)-এর উপরেও ঈমান আনয়ন করেন। যেমন, এ কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারীঃ ইলম অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) অন্য এক ব্যাখ্যানুযায়ী জানা যায় যে, যখন কিতাবধারীরা এ কথার উপর অহংকার প্রদর্শন করল যে, তারা দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবে, তখন মহান আল্লাহ মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য, তাফসীর ইবনে কাসীর)

আল-হাদীদ 57:29

এটা এ জন্য যে,[১] আহলে কিতাবগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরও তাদের কোন অধিকার নেই এবং অনুগ্রহ আল্লাহরই হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করে থাকেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। [১] لِئَلاَّ এতে 'লা' অক্ষরটি অতিরিক্ত এবং অর্থ হল, (لِيَعْلَمَ أَهْلُ الْكِتَابِ أَنَّهُمْ لاَ يَقْدِرُوْنَ عَلَى أَن يَّنَالُوْا شَيْئًا مِّنْ فَضْلِ اللهِ) (ফাতহুল ক্বাদীর)

আল-মুজাদালা 58:1

(হে রসূল!) অবশ্যই আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন।[১] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [১] এখানে খাওলা বিনতে মালেক বিন সা'লাবা (রাঃ) র ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাঁর স্বামী তাঁর সাথে 'যিহার' করেছিল। 'যিহার' মানে স্ত্রীকে এই বলা যে, 'তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত।' জাহেলী যুগে যিহারকে তালাক গণ্য করা হত। সুতরাং খাওলা (রাঃ) বড়ই অস্থির হয়ে পড়েন। আর তখন যিহারের ব্যাপারে কোন বিধান অবতীর্ণ হয়নি। ফলে তিনি রসূল (সাঃ)-এর কাছে এলেন। তিনিও এ ব্যাপারে একটু নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং খাওলা (রাঃ) তাঁর সাথে বাদানুবাদ করেই যাচ্ছিলেন। ঠিক এ সময়ই এই আয়াতগুলো নাযিল হয়। এতে যিহারের মাসআলা, তার বিধান এবং তার কাফফারার কথা বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে। (আবূ দাউদ তালাক অধ্যায়ঃ যিহার পরিচ্ছেদ) আয়েশা (রাঃ) বলেন, মহান আল্লাহ কিভাবে মানুষের কথা শুনে থাকেন যে, একটি মহিলা রসূল (সাঃ)-এর সাথে বাদানুবাদ করছিল এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করছিল। আমি তার কথা শুনতে পাইনি, কিন্তু মহান আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার কথা শুনে নিয়েছেন। (ইবনে মাজাহঃ ভূমিকা, বুখারীতেও বিনা সনদে সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদ অধ্যায়ে এ বর্ণনা রয়েছে)

আল-মুজাদালা 58:2

তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে (তারা জেনে রাখুক যে,) তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে, শুধু তারাই তাদের মাতা,[১] তারা তো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল। [২] [১] এখানে যিহারের বিধান এই বর্ণনা হল যে, মুখে 'মা' বলে দিলেই স্ত্রী মা হয়ে যায় না। পক্ষান্তরে যদি কেউ তার স্ত্রীকে মায়ের পরিবর্তে নিজের মেয়ে অথবা নিজের বোনের পিঠের মত বলে দেয়, তাহলে তা যিহার গণ্য হবে কি না? ইমাম মালিক এবং ইমামা আবূ হানীফা (রঃ) এটাকেও যিহার গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য উলামাগণ এটাকে যিহার গণ্য করেন না। (প্রথম উক্তিটাই বেশী সঠিক মনে হচ্ছে।) অনুরূপভাবে এ ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে যে, যদি কেউ বলে যে, 'তুমি আমার মায়ের মত' এবং পিঠের কথা উল্লেখই না করে। তাহলে এ ব্যাপারে আলেমগণ বলেন, যদি যিহারের নিয়তে উক্ত শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে তা যিহার হবে, অন্যথা হবে না। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) বলেন, যদি এমন কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করে, যা দেখা জায়েয, তবে তা যিহার হবে না। ইমাম শাফেয়ী (রঃ)র কথা হল, কেবল পিঠের সাথে তুলনা করলে যিহার হবে (নচেৎ না)। (ফাতহুল ক্বাদীর) [২] এই জন্যই তিনি ঐ গর্হিত ও মিথ্যা কথার পাপ থেকে ক্ষমা লাভের উপায়স্বরূপ কাফফারার (প্রায়শ্চিত্ত ও জরিমানার) বিধান দিয়েছেন।

আল-মুজাদালা 58:3

যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে,[১] তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে[২] একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। [১] এখন এই বিধানকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। রুজু' বা প্রত্যাহার করা মানেঃ স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে চাওয়া। [২] অর্থাৎ, সহবাস করার পূর্বে কাফফারা আদায় করবে। (ক) একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করবে। (খ) তা না পারলে লাগাতার কোন বিরতি ছাড়াই দু' মাস রোযা রাখবে। যদি রাখতে রাখতে মধ্যখানে কোন শরীয়তী কারণ ছাড়াই রোযা বন্ধ করে দেয়, তাহলে পুনরায় আবার নতুনভাবে প্রথম থেকে দু' মাসের রোযা পূর্ণ করতে হবে। আর শরীয়তী কারণ বলতে যেমন, অসুস্থতা বা সফরে যাওয়া ইত্যাদি। (গ) যদি লাগাতার দু'মাস রোযা রাখতে না পারে, তবে ষাটজন মিসকীনকে (এক বেলা) আহার করাবে। কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ্দ (অর্ধসা' অর্থাৎ, সওয়া এক কিলো), আবার কেউ বলেন, এক মুদ্দ (গম বা চাল) দিলেই যথেষ্ট হবে। তবে কুরআনের আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খাবার পেটপুরে খাওয়াতে হবে অথবা পেট ভরে যায় এতটা পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে। অনুরূপ সকল মিসকীনকে একই সাথে খাওয়ানোও জরুরী নয়, বরং একাধিক কিস্তীর মাধ্যমে এ সংখ্যা পূরণ করা যেতে পারে। (ফাতহুল ক্বাদীর) তবে এটা জরুরী যে, যতক্ষণ না নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস করা জায়েয হবে না।

আল-মুজাদালা 58:4

কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, (তার প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা পালন। যে তাতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। এটা এই জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন কর। এ হল আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি-বিধান। আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।

আল-মুজাদালা 58:5

যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদেরকে অপদস্থ করা হবে,[১] যেমন অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।[২] অবশ্যই আমি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছি। আর অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [১] كُبِتُوا কর্মবাচ্যসূচক ক্রিয়াপদ। ভবিষ্যতে ঘটবে এমন ঘটনাবলীকে অতীত কালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তার ঘটা ও বাস্তবায়ন এত সুনিশ্চিত যে, যেন তা হয়েই গেছে। বাস্তবে হলও তাই। মক্কার এই মুশরিকরা বদরের দিন লাঞ্ছিত হল। কিছুকে হত্যা এবং কিছুকে বন্দী করা হল। মুসলিমরা তাদের উপর জয়লাভ করলেন। মুসলিমদের বিজয়ই ছিল তাদের জন্য বড় লাঞ্ছনাদায়ক ব্যাপার। [২] অর্থাৎ অতীতের উম্মতদেরকে এই বিরোধিতার কারণেই অপদস্থ, লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করা হয়েছে।

আল-মুজাদালা 58:6

যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে একত্রে পুনরুত্থিত করবেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তারা করত; আল্লাহ ওর হিসাব রেখেছেন, আর তারা তা ভুলে গেছে। [১] আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। [২] [১] এটা মস্তিষ্কে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান। অর্থাৎ, পাপ এত প্রচুর এবং এত প্রকারের যে, তা গণনা করা বাহ্যিকভাবে অসম্ভব মনে হচ্ছে। মহান আল্লাহ বললেন, তোমাদের জন্য তা অবশ্যই অসম্ভব, বরং তোমাদের তো নিজেদের কৃতকর্মও স্মরণে থাকবে না। কিন্তু আল্লাহর জন্য এটা কোন সমস্যার ব্যাপার নয়। তিনি প্রত্যেকের আমলকে হিসাব করে সুরক্ষিত রেখেছেন। [২] তাঁর কাছে কোন জিনিস গুপ্ত নয়। পরের আয়াতে এ কথার আরো তাকীদ স্বরূপ বলা হয়েছে যে, তিনি সব কিছুই জানেন।

আল-মুজাদালা 58:7

তুমি কি অনুধাবন কর না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসাবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যে ষষ্ঠজন হিসাবে তিনি থাকেন না; তারা এ অপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক[১] এবং যেখানেই থাকুক না কেন,[২] তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন জানিয়ে দেবেন তারা যা করে।[৩] নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [১] অর্থাৎ, উক্ত সংখ্যাগুলোকে বিশেষ করে উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, তার থেকে কম বা তার থেকে বেশী সংখ্যক লোকের মাঝে হওয়া কথাবার্তা তিনি জানতে পারেন না, বরং এ সংখ্যা কেবল দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হল এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, সংখ্যা কম হোক অথবা বেশী, তিনি সকলের সাথে আছেন এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য প্রতিটি কথার খবর রাখেন। [২] নির্জন স্থানে হোক অথবা লোকালয়ে, শহরে হোক অথবা জঙ্গল-মরুভূমিতে, আবাদ-জনপদে হোক অথবা জনশূন্য পাহাড়, প্রান্তর বা গুহাতে, যেখানেই হোক না কেন তাঁর দৃষ্টি ও জ্ঞান থেকে গোপন থাকতে পারবে না। [৩] অর্থাৎ, সেই অনুযায়ী প্রত্যেককে প্রতিদান দেবেন। নেককারদেরকে তাদের নেকীর প্রতিদান এবং বদকারদেরকে তাদের বদীর প্রতিফল দেবেন।

আল-মুজাদালা 58:8

তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য কর না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে[১] এবং পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে।[২] তারা যখন তোমাকে এমন শব্দ দ্বারা অভিবাদন জানায়, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি।[৩] তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেয় না কেন?’[৪] জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি; সেখানে তারা প্রবেশ করবে। [৫] সুতরাং কত নিকৃষ্ট সেই আবাস! [১] এ থেকে উদ্দেশ্য মদীনার ইয়াহুদী এবং মুনাফিকবরা। যখন মুসলিমরা তাদের পাশ দিয়ে পেরিয়ে যেতেন, তখন তারা আপোসে মাথায় মাথা লাগিয়ে এমনভাবে চুপে চুপে কানাকানি করত যে, মুসলিমরা মনে করতেন তারা মনে হয় তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করছে অথবা মুসলিমদের কোন সৈন্য দলের উপর শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে তাদের ক্ষতি সাধন করেছে, যার খবর এদের কাছে পৌঁঁছে গেছে। এতে মুসলিমরা ভয় পেয়ে যেতেন। তাই রসূল (সাঃ) তাদেরকে কানাকানি করতে নিষেধ করে দিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর তারা পুনরায় এই নিন্দনীয় কাজের পুনরাবৃত্তি করল। আয়াতে তাদের এই নিন্দনীয় কাজের কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে। [২] অর্থাৎ, তাদের কানাকানি কোন সৎকর্ম বা আল্লাহভীরুতার ব্যাপারে হত না; বরং তা হত পাপ, সীমালঙ্ঘন ও রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতামূলক কাজে। যেমন, কারো গীবত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অশ্লীল কথা-বার্তা এবং একে অপরকে রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতা করার উপর উস্কানি দেওয়া ইত্যাদি। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অভিবাদন জানানো বা সালাম দেওয়ার তরীকা এইভাবে শিখিয়েছেন যে, তোমরা বলবে, السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ কিন্তু এই ইয়াহুদীরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে উক্ত সালামের পরিবর্তে বলত, السَّامُ عَلَيْكُمْ অথবা السَّامُ عَلَيْكَ (তোমার উপর মৃত্যু আসুক)। তাই রসূল (সাঃ) তাদের সালামের উত্তরে কেবল বলতেন, وَعَلَيْكُمْ অথবা وَعَلَيْكَ (আর তোমারদের উপরেও) এবং মুসলিমদেরকেও তাকীদ করলেন যে, আহলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম করলে, তোমরা উত্তরে কেবল বলবে, وَعَلَيْكَ। (মুসলিম, আদব অধ্যায়) [৪] অর্থাৎ, তারা আপোসে অথবা মনে মনে বলত যে, যদি মুহাম্মাদ সত্য নবী হত, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের এই জঘন্য আচরণের কারণে আমাদেরকে অবশ্যই পাকড়াও করত। [৫] আল্লাহ বলেন, যদি আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা ও পূর্ণ কৌশলের ভিত্তিতে দুনিয়াতে তাদেরকে সত্বর পাকড়াও না করেন, এ জন্য কি তারা জাহান্নামের আযাব থেকেও বেঁচে যাবে? না, কক্ষনো না। জাহান্নাম তাদের অপেক্ষায় আছে, যাতে তারা প্রবেশ করবে।

আল-মুজাদালা 58:9

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন গোপন পরামর্শ কর, সে পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়।[১] তোমরা কল্যাণমূলক কাজ ও আল্লাহভীরুতা অবলম্বনের পরামর্শ কর।[২] আর সেই আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নিকট তোমরা সমবেত হবে। [১] যেমন ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের স্বভাব। এটা ঈমানদারদেরকে তরবিয়ত দান ও তাঁদের চরিত্র গঠনের জন্য বলা হচ্ছে যে, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্য হও, তাহলে তোমাদের কানাকানি ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের মত পাপ ও অন্যায়ের জন্য হওয়া উচিত নয়। [২] অর্থাৎ, যে কাজে মঙ্গলই মঙ্গল আছে, যার বুনিয়াদ হয় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের উপর। কেননা, এটাই হল কল্যাণমূলক ও আল্লাহভীরুতার কাজ।

আল-মুজাদালা 58:10

এই গোপন পরামর্শ তো শয়তানেরই প্ররোচনা, যাতে বিশ্বাসীরা দুঃখ পায়।[১] তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান তাদের সামান্যতমও ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়। আর বিশ্বাসীদের কর্তব্য আল্লাহর উপরই নির্ভর করা। [২] [১] অর্থাৎ, পাপাচার, সীমালঙ্ঘন এবং রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করা হল শয়তানের কাজ। কারণ, শয়তানই এ কাজ করতে উস্কানি দেয় এবং এর মাধ্যমে সে মু'মিনদেরকে মনঃকষ্ট ও দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়। [২] তবে এ সব কানাকানি এবং শয়তানী কার্যকলাপ মু'মিনদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যদি আল্লাহর ইচ্ছা না থাকে। কাজেই তোমরা শত্রুদের এই নিকৃষ্ট আচরণে চিন্তিত না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। কেননা, যাবতীয় বিষয়ের একচ্ছত্র এখতিয়ার ও ক্ষমতা কেবল তাঁরই হাতে এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাশীল। ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের হাতে কিছুই নেই; যারা তোমাদের সর্বনাশ করতে চায়। কানাকানি করার ব্যাপারেই মুসলিমদেরকে একটি নৈতিক শিক্ষা এও দেওয়া হয়েছে যে, যখন তোমরা তিনজন একত্রে থাকবে, তখন তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে বাদ দিয়ে দু'জনে আপোসে কানাকানি করবে না। কারণ, এ কাজ ঐ একজনের মনে দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করবে। (বুখারীঃ অনুমতি অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) অবশ্য তার সম্মতি ও অনুমতি থাকলে এমন করা জায়েয হবে। কেননা, এই ক্ষেত্রে দুই ব্যক্তির কানাকানি করা কারো জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

আল-মুজাদালা 58:11

হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, ‘মজলিসে স্থান প্রশস্ত কর’, [১] তখন তোমরা প্রশস্ত করে দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দেবেন। [২] আর যখন বলা হয়, ‘উঠে যাও’, তখন তোমরা উঠে যাও। [৩] তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। [৪] আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। [১] এখানে মুসলিমদেরকে মজলিসের আদব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। মজলিস একটি সাধারণ শব্দ যা এমন সকল মজলিসকেই বুঝানো হয়েছে, যেখানে মুসলিম কল্যাণ ও পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। তাতে তা ওয়ায-নসীহতের মজলিস (জলসা) হোক বা জুমআর মজলিস। (তাফসীর ক্বুরত্বুবী) 'প্রশস্ত কর' মানে (নড়ে-সরে বসে) মজলিসের জায়গা প্রশস্ত কর, যাতে পরে আগত ব্যক্তিদের জন্য বসার জায়গা থাকে। মজলিসের জায়গা এমন সংকীর্ণ করে রেখো না, যাতে পরে আগত ব্যক্তিদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অথবা কোন বসা মানুষকে উঠিয়ে বসতে হয়। আর এ দু'টি জিনিসই নৈতিকতার বিপরীত। যেহেতু রসূল (সাঃ) বলেছেন, "কোন ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তিকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে সেখানে না বসে। বরং মজলিসের জায়গাকে প্রশস্ত করে নাও।" (বুখারীঃ জুমুআহ অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) [২] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ এর প্রতিদান স্বরূপ তোমাদেরকে জান্নাতে অতীব প্রশস্ত স্থান দান করবেন অথবা যেখানেই তোমরা প্রশস্ততা কামনা করবে, সেখানেই তিনি তা দান করবেন। যেমন, বাড়ীতে প্রশস্ততা, রুযীতে প্রশস্ততা এবং কবরে প্রশস্ততা। সব জায়গাতেই তোমাদেরকে প্রশস্ততা দান করবেন। [৩] অর্থাৎ, জিহাদের জন্য, নামাযের জন্য অথবা যে কোন ভাল কাজের জন্য। অথবা অর্থ হল, যখন মজলিস থেকে উঠে চলে যেতে বলা হবে, তখন সত্বর উঠে চলে যাও। মুসলিমদেরকে এ নির্দেশ এ জন্য দেওয়া হল যে, সাহাবায়ে কেরাম নবী (সাঃ)-এর মজলিস থেকে উঠে যাওয়া পছন্দ করতেন না। আর এতে এমন লোকদের অসুবিধা হত, যাঁরা নবী (সাঃ)-এর সাথে নির্জনে কোন কথা বলতে চাইতেন। [৪] অর্থাৎ, ঈমানদারদের মর্যাদা বেঈমানদারদের উপরে এবং (ঈমানদার) শিক্ষিতদের মর্যাদা (অশিক্ষিত) সাধারণ ঈমানদারদের থেকে অনেক উচ্চ করবেন। যার অর্থ হল, ঈমানের সাথে দ্বীনী জ্ঞান ও শিক্ষা থাকা অধিক মর্যাদা লাভের কারণ।

আল-মুজাদালা 58:12

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রসূলের সাথে চুপিচুপি কথা বলতে চাইলে তার পূর্বে কিছু সাদকা প্রদান কর।[১] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পবিত্রতর;[২] যদি তাতে অক্ষম হও, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] প্রত্যেক মুসলিম নবী (সাঃ)-এর সাথে নির্জনে কথা বলার আশা রাখত। এতে রসূল (সাঃ)-এর বেশ কষ্ট হত। কেউ কেউ বলেন, মুনাফিকবরা খামখা নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে চুপিচুপি কথোপকথনে ব্যস্ত থাকত; যাতে মুসলিমরা কষ্ট অনুভব করতেন। এই জন্য মহান আল্লাহ এই নির্দেশ অবতীর্ণ করলেন। যাতে নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে চুপিচুপি কথা বলার প্রবণতা শেষ হয়ে যায়। [২] শ্রেয় ও উত্তম এই জন্য যে, সাদকায় তোমাদেরই অন্যান্য গরীব মুসলিম ভাইদের উপকার হয়। আর পবিত্রতর এই জন্য যে, এটা হল এক সৎকর্ম এবং আল্লাহর আনুগত্য, যার দ্বারা মানুষের আত্মা পরিশুদ্ধ হয়। এ থেকে এটাও জানা গেল যে, এ নির্দেশ ছিল 'মুস্তাহাব' (যা করা ভাল, না করলে কোন দোষ হয় না)এর পর্যায়ভুক্ত, ওয়াজেব ছিল না।

আল-মুজাদালা 58:13

তোমরা কি চুপে চুপে কথা বলার পূর্বে সাদকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর? যখন তোমরা তা পারলে না, আর আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন; [১] তখন তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর। [২] আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সম্যক অবগত। [১] এই নির্দেশ 'মুস্তাহাব'-এর পর্যায়ভুক্ত হলেও তা মুসলিমদের জন্য কষ্টকর ছিল। তাই মহান আল্লাহ সত্বর এটাকে রহিত করে দিলেন। [২] অর্থাৎ, ফরয কাজগুলো আদায় করলে এবং সমস্ত বিধি-বিধানের প্রতি যত্নবান হলে এটাই সেই সাদাকার পরিবর্তে যথেষ্ট হয়ে যাবে, যাকে আল্লাহ তোমাদের কষ্ট হবে বলে মাফ করে দিয়েছেন।

আল-মুজাদালা 58:14

তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে, যাদের প্রতি আল্লাহ রাগান্বিতত?[১] তারা (মুনাফিকগণ) তোমাদের দলভুক্ত নয়, তাদেরও দলভুক্ত নয়।[২] আর তারা জেনে-শুনে মিথ্যা শপথ করে।[৩] [১] 'যাদের প্রতি আল্লাহ রাগান্বিত' কুরআনের স্পষ্ট উক্তি মুতাবেক তারা হল ইয়াহুদী। আর তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করেছিল, তারা ছিল মুনাফিক। এই আয়াতগুলি সেই সময় নাযিল হয়, যখন মদীনাতে মুনাফিকদেরও বড় দাপট ছিল এবং ইয়াহুীদের ষড়যন্ত্রও বহু শীর্ষে উঠেছিল। আর তখনও তাদেরকে (মদীনা থেকে) বহিষ্কার করা হয়নি। [২] অর্থাৎ, মুনাফিকবরা না মুসলিম ছিল, আর না ধর্মের দিক দিয়ে তারা ইয়াহুদী ছিল। তা সত্ত্বেও তারা ইয়াহুদীদের সাথে বন্ধুত্ব কেন করত? শুধু এই কারণে যে, তারা নবী করীম (সাঃ) এবং ইসলামের সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে ইয়াহুদীদের সমানভাবে শরীক ছিল। [৩] অর্থাৎ, কসম খেয়ে মুসলিমদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করে যে, আমরাও তোমাদের মত মুসলিম। অথবা (বুঝাতে চায় যে,) ইয়াহুদীদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।

আল-মুজাদালা 58:15

আল্লাহ তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। [১] নিশ্চয় তারা যা করে, তা মন্দ! [১] অর্থাৎ, ইয়াহুদীদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক রাখার এবং মিথ্যা কসম খাওয়ার কারণে।

আল-মুজাদালা 58:16

তারা তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে, [১] (এভাবে) তারা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে।[২] সুতরাং তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [১] أَيْمَانٌ হল يَمِيْنٌ এর বহুবচন। অর্থ, কসম। অর্থাৎ, যেভাবে ঢাল দ্বারা শত্রুর আক্রমণকে রোধ করে নিজেকে বাঁচিয়ে নেওয়া হয়, অনুরূপ তারাও নিজেদের কসমকে মুসলিমদের তরবারির আঘাত থেকে বাঁচার জন্য ঢাল বানিয়ে রেখেছিল। [২] অর্থাৎ, মিথ্যা কসম খেয়ে এরা নিজেদেরকে মুসলমান প্রকাশ করে। ফলে বহু মানুষ তাদের প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে অবহিত হতে না পারার কারণে তাদের ধোঁকার জালে বন্দী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করা হতে বঞ্চিত থেকে যায়। আর এইভাবে তারা মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার অপরাধ করে।

আল-মুজাদালা 58:17

আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোন কাজে আসবে না, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।

আল-মুজাদালা 58:18

যেদিন আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন তাদের সকলকে, সেদিন তারা তাঁর নিকট সেইরূপ শপথ করবে, যেরূপ শপথ তোমাদের নিকট করে[১] এবং তারা মনে করবে যে, তারা কোন (দলীলের) উপর প্রতিষ্ঠিত।[২] জেনে রেখো যে, নিশ্চয় তারাই হল মিথ্যাবাদী। [১] অর্থাৎ, তারা এত বড় হতভাগা ও কঠোর-হৃদয় যে, কিয়ামতের দিন যেখানে কোন জিনিস গুপ্ত থাকবে না, সেখানেও আল্লাহর সামনে মিথ্যা কসম খাওয়ার লজ্জাহীন দুঃসাহস প্রদর্শন করবে। [২] অর্থাৎ, যেভাবে তারা মিথ্যা কসম খেয়ে দুনিয়াতে সাময়িকভাবে কিছু উপকৃত হয়েছে, সেখানেও মনে করবে যে, তাদের এই মিথ্যা কসমগুলো তাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে।

আল-মুজাদালা 58:19

শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে,[১] ফলে তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর স্মরণ।[২] তারা হল শয়তানের দল। জেনে রেখো যে, নিশ্চয় শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত। [৩] [১] اسْتَحْوَذَ এর অর্থ হল, ঘিরে নিয়েছে, বেষ্টন করে নিয়েছে, একত্রিত করে নিয়েছে। এই জন্য এর অনুবাদ করা হয় প্রভুত্ব বা আধিপত্য বিস্তার করেছে। কারণ, এর মধ্যে সব অর্থই চলে আসে। [২] অর্থাৎ, তিনি তাদেরকে যেসব কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা থেকে শয়তান তাদেরকে উদাসীন করে দেয় এবং যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন, সে কাজগুলো শয়তান তাদের দিয়ে করিয়ে নেয়। কাজগুলো তাদের সামনে সুশোভিত রূপে তুলে ধরে অথবা তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে কিংবা বহু আশা ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পতিত করে (এ সব কাজ করিয়ে নেয়)। [৩] অর্থাৎ, পরিপূর্ণ ক্ষতি তাদের ভাগ্যেই জুটবে। যেন অন্যরা তাদের তুলনায় কোন ক্ষতির মধ্যেই নেই। কারণ, তারা জান্নাতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা ক্রয় করেছে। আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে মিথ্যা কসম খেয়েছে।

আল-মুজাদালা 58:20

নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে,[১] তারা হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত।[২] [১] مُحَادَّةٌ এমন কঠিন বিরোধিতা, বিদ্বেষ এবং ঝগড়াকে বলা হয়, যাতে বিবদমান উভয় গোষ্ঠীর আপোসে মিলন বড়ই কঠিন হয়। যেন পরস্পর বিরোধী দু'টি দল দুই হদ্দ্ (প্রান্ত বা সীমানায়) থাকে। আর এ থেকে এটা 'বারণ' অর্থেও ব্যবহার হয়। আর এই জন্যই দারোয়ান ও প্রহরীকেও 'হাদ্দাদ' বলা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) [২] অর্থাৎ, যেভাবে অতীত উম্মতের মধ্য থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধীদেরকে লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করা হয়েছে, সেইভাবে এরাও ঐ লাঞ্ছিতদের দলভুক্ত হবে এবং এদের ভাগ্যেও দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্ছনা ও অপমান ব্যতীত কিছুই জুটবে না।

আল-মুজাদালা 58:21

আল্লাহ লিপিবদ্ধ করেছেন[১] যে, আমি এবং আমার রসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [২] [১] অর্থাৎ, তকদীর ও লওহে মাহফূযে; যাতে কোন পরিবর্তন হতে পারে না। এ বিষয়টি সূরা মু'মিন ৪০:৫১-৫২ নং আয়াতেও আলোচিত হয়েছে।[২] এ কথার লেখক যখন শক্তিমান পরাক্রমশালী, তখন অন্য আবার কে আছে যে এই ফয়সালা পরিবর্তন করতে পারবে?

আল-মুজাদালা 58:22

তুমি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় পাবে না,[১] যারা ভালবাসে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে; হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জাতি-গোত্র।[২] তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন[৩] এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ (জ্যোতি ও বিজয়) দ্বারা।[৪] তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।[৫] তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম। [৬] [১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমানে এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসে পরিপূর্ণ হয়, সে আল্লাহ এবং রসূলের শত্রুদের সাথে ভালবাসা এবং আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। অর্থাৎ, ঈমান এবং আল্লাহ ও রসূল (সাঃ)-এর শত্রুদের প্রতি ভালবাসা ও সহযোগিতা কোন একটি অন্তরে একত্রিত হতে পারে না। এই বিষয়টিকে কুরআন মাজীদের আরো কয়েকটি জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, সূরা আলে ইমরান ৩:২৮ ও সূরা তওবার ৯:২৪ নং আয়াত ইত্যাদিতে।[২] কারণ, এদের ঈমান এদেরকে তাদের সাথে ভালবাসা রাখতে বাধা দেয়। আর ঈমানের প্রতি যত্ন, মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং ভাই-বোন ও জাতি-গোত্রের ভালবাসা ও যত্ন অপেক্ষা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী। সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম বাস্তবে তা করে দেখিয়েছেন। একজন মুসলিম সাহাবী তাঁর নিজের বাপ, বেটা, ভাই, চাচা এবং মামা ও অন্যান্য আত্মীয়দেরকে হত্যা করতে পিছপা হননি, যখন তারা কুফরীর সমর্থনে কাফেরদের স্বপক্ষে যুদ্ধে শামিল হয়েছে। এই ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে বদর যুদ্ধের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য; যখন যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ হল যে, তাদেরকে বিনিময় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া যাবে, না হত্যা করা হবে? তখন উমার (রাঃ)-এর পরামর্শ ছিল যে, কাফের বন্দীদের মধ্য হতে প্রত্যেক বন্দীকে তার আত্মীয়ের হাতে তুলে দেওয়া হোক, সে নিজ হাতে তাকে হত্যা করবে। আর মহান আল্লাহ উমার (রাঃ)-এর পরামর্শকেই পছন্দ করেছিলেন। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ সূরা আনফাল ৮:৬৭ নং আয়াতের টীকা)[৩] অর্থাৎ, মজবুত ও সুদৃঢ় করেছেন।[৪] 'রূহ' অর্থ তাঁর বিশেষ সাহায্য অথবা ঈমানের জ্যোতি যা তাঁরা তাদের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের বদৌলতে লাভ করেছেন।[৫] অর্থাৎ, যখন অগ্রণী মুসলিমগণ, সাহাবা (রাঃ)গণ ঈমানের ভিত্তিতে নিজেদের প্রিয়জন এবং আত্মীয়-স্বজন থেকে অসন্তুষ্ট হয়ে গেলেন, এমন কি তাদেরকে নিজ হাতে হত্যা করতেও কোন দ্বিধা করেননি, তখন এরই প্রতিদান স্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি দানে ধন্য করলেন এবং তাঁদেরকে এমনভাবে পুরস্কৃত করলেন যে, তাঁরা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন। এই জন্য আয়াতে বর্ণিত ﴿ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ এই সম্মান বিশেষ করে সাহাবাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ না হলেও তাঁরাই সর্বপ্রথম ও পরিপূর্ণরূপে এই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। কাজেই এর ভাষাগত অর্থের দিক দিয়ে উল্লিখিত গুণে গুণান্বিত প্রত্যেক মুসলিমই رَضِيَ اللهُ عَنه দু'আ লাভের যোগ্য হতে পারে। যেমন, ভাষাগত অর্থের দিক দিয়ে প্রত্যেক মুসলিমের ক্ষেত্রে عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ (দু'আর বাক্যস্বরূপ ) বলা যেতে পারে। তবে আহলে-সুন্নাহ এর ভাষাগত অর্থকে দৃষ্টিচ্যুত করে (বিশেষ পরিভাষারূপে) তা (রায্বিয়াল্লাহু আনহু এবং আলাইহিসসালাম) সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এবং আম্বিয়া (আলাইহিমুস্ সালাম) ব্যতীত অন্যদের ক্ষেত্রে বলা ও লেখা বৈধ গণ্য করেননি। অর্থাৎ, এটা যেন তাঁদের একটি প্রতীক বা নিদর্শনে পরিণত হয়ে গেছে; رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ সাহাবাদের ক্ষেত্রে এবং عَلَيْهِمُ الصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ নবীদের ক্ষেত্রে। এটা ঠিক ঐ রকম, যে রকম رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ (তাঁর উপর আল্লাহর রহমত হোক অথবা আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন) এর ব্যবহার ভাষাগত অর্থের দিক দিয়ে জীবিত এবং মৃত উভয়ের জন্য হতে পারে। কেননা, এটা একটি দু'আর বাক্য। এর মুখাপেক্ষী জীবিত এবং মৃত উভয়েই। কিন্তু এর ব্যবহার মৃতদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তাই এটাকে জীবিতদের জন্য ব্যবহার করা হয় না।[৬] অর্থাৎ, মু'মিনদের এই দলই সাফল্য লাভ করবে। এঁদের তুলনায় অন্যদের অবস্থা এমন হবে যে, যেন তারা সাফল্য লাভ হতে একেবারে বঞ্চিত। আর আখেরাতে বাস্তবিকই তারা সাফল্য লাভ থেকে বঞ্চিত হবে।

আল-হাশর 59:1

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

আল-হাশর 59:2

তিনিই আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছেন।[১] তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে রক্ষা করবে;[২] কিন্তু আল্লাহ (এর শাস্তি) তাদের এমন এক দিক হতে এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে[৩] এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল।[৪] তারা তাদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস করছিল নিজেদের হাতে[৫] এবং মুমিনদের হাতেও।[৬] অতএব হে চক্ষুষমান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। [৭] [১] মদীনার উপকণ্ঠে ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র বসবাস করত। বানু-নায্বীর, বানু-কুরাইযা এবং বানু-ক্বাইনুক্বা। মদীনায় হিজরতের পর নবী (সাঃ) এদের সাথে সন্ধিচুক্তিও করেছিলেন। কিন্তু এরা গোপনে ষড়যন্ত্র করত এবং মক্কার কাফেরদের সাথেও তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্পর্ক রেখেছিল। এমনকি, একদা যখন নবী (সাঃ) তাদের কাছে গিয়েছিলেন, বানু-নাযবীর গোত্রের লোকেরা উপর থেকে রসূল (সাঃ)-এর উপর একটি ভারী পাথর ফেলে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে রেখেছিল। যথা সময়ে অহীর মাধ্যমে এ ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করে দেওয়া হয়। তিনি নিরাপদে সেখান থেকে চলে আসেন এবং তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে রসূল (সাঃ) তাদের উপর সসৈন্যে আক্রমণ করেন। এরা কিছু দিন তাদের দুর্গে অবরুদ্ধ থেকে অবশেষে প্রাণভিক্ষা স্বরূপ দেশত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আর রসূল (সাঃ) তা গ্রহণ করেন। এ ঘটনাকে أَوَّل الحَشْر (প্রথম সমাবেশ) বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, এটা ছিল তাদের নির্বাসন। আর এটা হয়েছিল মদীনা থেকে। এখান থেকে তারা খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। এখান হতে উমার (রাঃ) তাদেরকে পুনরায় বহিষ্কার করে শাম (সিরিয়ার) দিকে বিতাড়িত করেন। যার ব্যাপারে বলা হয় যে, এখানেই প্রত্যেক মানুষের সর্বশেষ হাশর (সমাবেশ তথা কিয়ামত-কোর্ট) হবে। [২] কারণ, তারা অতি মজবুত দুর্গ নির্মাণ করে রেখেছিল। আর এ নিয়ে তাদের গর্বও ছিল এবং মুসলিমরাও মনে করতেন যে, অতি সহজে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব হবে না। [৩] আর তা এই ছিল যে, রসূল (সাঃ) তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছিলেন যা তাদের ধারণা ও চিন্তার বাইরে ছিল। [৪] এই ত্রাস ও ভীতির কারণেই তারা বহিষ্কার হতে প্রস্তুত হয়েছিল। তা না হলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই (মুনাফিকদের সর্দার) এবং অন্যান্য লোকেরা তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ছিল যে, তোমরা মুসলিমদের সামনে নতি স্বীকার করবে না, আমরা তোমাদের সাথে আছি। এ ছাড়া মহান আল্লাহ নবী করীম (সাঃ)-কে এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, এক মাসের দূরত্বে অবস্থিত শত্রুর মধ্যেও তাঁর ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত। ফলে তাদের মধ্যে কঠিন আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে গেল এবং সব রকমের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে কেবল এই শর্তটা মুসলিমদেরকে মেনে নিতে বলল যে, যতটা পরিমাণ জিনিসপত্র তারা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, ততটা পরিমাণ জিনিসপত্র তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। সুতরাং এই অনুমতি পাওয়ার পর বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নিজেদের বাড়ীর দরজা পর্যন্ত তুলে ফেলে! [৫] অর্থাৎ, যখন তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, দেশ থেকে বহিষ্কার হতেই হবে, তখন তারা অবরোধ অবস্থায় ভিতর থেকেই নিজেদের বাড়ীগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে দিল। যাতে তা মুসলমানদেরও যেন কোন কাজে না আসে। অথবা অর্থ হল, আসবাব-পত্র নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থেকে পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য নিজেদের উটগুলোতে সাধ্যমত আসবাব বোঝাই করার জন্য নিজেদের ঘরগুলোকেও ভেঙ্গে-চুরে যা নেওয়ার তা নিয়ে উটের উপর রেখে নিল। [৬] বাইরে থেকে মুসলিমরাও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার কাজে লেগে ছিলেন, যাতে তাদেরকে গ্রেফতার করা সহজ হয়। অথবা অর্থ হল, তাদের ভাঙ্গা-চোরা ঘরগুলো থেকে অবশিষ্ট আসবাব বের করার এবং তা সংগ্রহ করার জন্য মুসলিমদেরকে আরো অনেক কিছুই নষ্ট করতে হয়। [৭] এ থেকে যে, কিভাবে আল্লাহ তাদের অন্তরে মুসলিমদের ভয় ঢুকিয়ে দেন। অথচ তারা এক শক্তিশালী এবং বহু উপায়-উপকরণের অধিকারী (রণকুশল) গোত্র ছিল। কিন্তু যখন মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত অবকাশ শেষ হয়ে গেল এবং তিনি তাদেরকে নিজ পাকড়াও-এর পঞ্জার মধ্যে করার চূড়ান্ত ফায়সালা করে নিলেন, তখন না তাদের শক্তি-সামর্থ্য এবং উপায়-উপকরণ কোন কাজে এল, আর না অন্য কোন সাহায্যকারীরা তাদের কোন সাহায্য করতে পারল।

আল-হাশর 59:3

আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে, অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে (অন্য) শাস্তি দিতেন;[১] আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। [১] অর্থাৎ, পূর্ব থেকেই যদি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যে তাদের দেশ ত্যাগ করার কথা লেখা না থাকত, তাহলে তাদেরকে দুনিয়াতেই কঠিন আযাবের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া হত। যেমন, পরবর্তীতে তাদের ভাই ইয়াহুদীদের অপর এক গোত্র (বানু-কুরাইযা)-কে এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া হয় যে, তাদের যুবক পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়, অন্যদের বন্দী করা হয় এবং তাদের বিষয়-সম্পত্তিকে মুসলিমদের জন্য 'মালে গনীমত' বানিয়ে দেওয়া হয়।

আল-হাশর 59:4

এটা এ জন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর।

আল-হাশর 59:5

তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করেন। [১] [১] لِيْنَة এক প্রকার খেজুর। যেমন, আজওয়া, বারনী প্রভৃতি খেজুরের প্রকার। অথবা এর অর্থ, সাধারণ খেজুর গাছ। অবরোধকালীন সময়ে নবী (সাঃ)-এর নির্দেশক্রমে মুসলিমরা বানী-নায্বীরের খেজুর বাগানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিছু গাছ কেটে দিয়েছিলেন এবং কিছু গাছ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ রকম করার লক্ষ্য ছিল, শত্রুর আড়কে ভেঙ্গে দেওয়া এবং এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, মুসলিমরা এখন তোমাদের উপর সম্পূর্ণরূপে জয়যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা এখন যেভাবে চাইবেন সেভাবেই তোমাদের ধন-সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। মহান আল্লাহও মুসলিমদের এই কৌশলভিত্তিক কাজকে সঠিক বলে অনুমোদন করেন এবং এটাকে ইয়াহুদীদের লাঞ্ছনার মাধ্যম বানিয়ে দেন।

আল-হাশর 59:6

আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে (বিনা যুদ্ধে) যে সম্পদ তাঁর রসূলকে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া ছুটাওনি এবং উটও নয়। কিন্তু আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা তাঁর রসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করেন।[১] আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [১] বানু-নায্বীরের এই এলাকা যা মুসলিমদের দখলে এসেছিল, তা মদীনা হতে তিন-চার মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল। অর্থাৎ, মুসলিমদেরকে তার জন্য সুদীর্ঘ সফর করার প্রয়োজন হয়নি এবং এর জন্য মুসলিমদেরকে উট ও ঘোড়া দৌড়াতে হয়নি। অনুরূপ যুদ্ধ করারও প্রয়োজন পড়েনি। বরং সন্ধির মাধ্যমে এই এলাকা জয় হয়ে যায়। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর রসূল (সাঃ)-কে বিনা যুদ্ধেই তাদের উপর জয়যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর এই জন্য এখান থেকে প্রাপ্ত মালকে 'মালে ফাই' গণ্য করা হয়। এই মালের বিধান গনীমতের মালের বিধান থেকে আলাদা। অর্থাৎ, فَيْءٌ সেই মালকে বলা হয়, যা বিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে যায় অথবা যা সন্ধির মাধ্যমে লাভ হয়। পক্ষান্তরে যে মাল দস্তরমত যুদ্ধ করে জয়যুক্ত হয়ে অর্জিত হয় তাকে 'মালে গনীমত' বলা হয়।

আল-হাশর 59:7

আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রসূলকে (বিনা যুদ্ধে) যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রসূলের, (তাঁর) আত্মীয়গণের এবং ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য, যাতে তোমাদের মধ্যে যারা ধনবান শুধু তাদের মধ্যেই ধন-মাল আবর্তন না করে। আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।

আল-হাশর 59:8

(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজির (ধর্মের জন্য স্বদেশত্যাগী)দের জন্য, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ী ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত হয়েছে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। [১] [১] এই আয়াতে 'মালে ফাই' কোথায় ব্যয় করা হবে তার সঠিক দিক নির্দেশনা করা হয়েছে। অনুরূপ মুহাজির সাহাবীদের ফযীলত, তাঁদের ঐকান্তিকতা এবং তাঁদের সততার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর পরেও তাঁদের ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা কুরআনকে অস্বীকার করার নামান্তর।

আল-হাশর 59:9

আর তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা)তে বসবাস করেছে[১] ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না,[২] বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।[৩] আর যাদেরকে নিজ আত্মার কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [৪] [১] এ থেকে আনসারী সাহাবাদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাঁরা মুহাজির সাহাবাদের মদীনা আসার পূর্ব থেকেই মদীনার বাসিন্দা ছিলেন এবং মুহাজিরদের হিজরত করে মদীনা আসার পূর্বেই তাঁদের অন্তরে ঈমান প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পূর্বেই আনসারী সাহাবাগণ ঈমান এনেছিলেন। কেননা, তাঁদের অধিকাংশই মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পর ঈমান এনেছেন। অর্থাৎ, مِنْ قَبْلِهِمْ (তাদের পূর্বে)এর অর্থ, مِنْ قَبْلِ هِجْرَتِهِمْ (তাঁদের হিজরত করার পূর্বে)। আর الدَارٌ বলতে دَارُ الْهِجْرَةِ অর্থাৎ, মদীনাকে বুঝানো হয়েছে।[২] অর্থাৎ, মুহাজির সাহাবীদেরকে আল্লাহর রসূল (সাঃ) যা কিছু দিতেন তাতে তাঁরা না হিংসা করতেন, আর না মনে কোন প্রকার সংকীর্ণতা অনুভব করতেন। যেমন, 'মালে ফাই' পাওয়ার প্রথম অধিকারী তাঁদেরকেই গণ্য করা হয়। এতে আনসার সাহাবীগণ কিছুই মনে করেননি।[৩] অর্থাৎ, নিজেদের তুলনায় মুহাজিরদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকতেন, কিন্তু মুহাজিরদেরকে খাওয়াতেন। যেমন, হাদীসে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একদা নবী (সাঃ)-এর নিকট একজন মেহমান এল। কিন্তু রসূল (সাঃ)-এর ঘরে কিছুই ছিল না। সুতরাং একজন আনসারী সাহাবী তাঁকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে জানালে স্ত্রী বললেন, 'ঘরে তো কেবল ছেলেদের খাবার মত সামান্য কিছু আছে।' পরে উভয়ে পরামর্শ করলেন যে, ছেলেদেরকে আজ (ভুলিয়ে-ভালিয়ে) ক্ষুধার্ত রেখেই ঘুম পাড়িয়ে দাও এবং আমরা নিজেরাও কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে যাব। তবে মেহমানকে খাওয়ানোর সময় (ছল করে) বাতিটা নিভিয়ে দেবে, যাতে সে আমাদের ব্যাপারে জানতে না পারে যে, আমরা তার সাথে খাবার খাচ্ছি না। সকালে যখন এই সাহাবী রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন যে, মহান আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। ﴿وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ﴾ (সহীহ বুখারী, সূরা হাশরের তফসীর) তাঁদের ত্যাগের একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত এও যে, একজন আনসারী সাহাবীর নিকট দু'জন স্ত্রী ছিল। তিনি তাঁর মুহাজির ভাইকে প্রস্তাব দিলেন যে, আমি তোমার জন্য আমার একজন স্ত্রীকে তালাক দেব। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর তুমি তাকে বিবাহ করে নেবে! (বুখারী, বিবাহ অধ্যায়)[৪] হাদীসে আছে যে, কৃপণতা হতে দূরে থাক। কারণ, এই কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই কৃপণতাই তাদেরকে নিজেদের রক্তপাত করতে এবং হারামকে হালাল করে নিতে প্ররোচিত করেছিল। (মুসলিমঃ নেকী অধ্যায়, পরিচ্ছেদঃ অত্যাচার করা হারাম)

আল-হাশর 59:10

যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না।[১] হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।’ [১] এরা হল 'মালে ফাই' পাওয়ার তৃতীয় অধিকারী দল। অর্থাৎ, সাহাবীদের পর আগত এবং তাঁদের অনুসরণকারী। এতে তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল ঈমানদার ও আল্লাহভীরু শামিল। তবে শর্ত হল, তাদেরকে আনসার ও মুহাজিরদেরকে মু'মিন জেনে তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাকারী হতে হবে। তাঁদের ঈমানে সন্দেহ পোষণকারী, তাঁদেরকে গালি-মন্দকারী এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নিজেদের অন্তরে বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী হলে হবে না। ইমাম মালেক (রঃ) এই আয়াত থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে বলেছেন যে, 'রাফেযী (শিয়া), যে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দেরকে গাল-মন্দ করে, সে 'মালে ফাই' থেকে কোন অংশ পাবে না। কেননা, মহান আল্লাহ সাহাবীদের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু রাফেযী তাঁদের নিন্দা গেয়ে বেড়ায়। (ইবনে কাসীর) আয়েশা (রাঃ) বলেন, তোমাদেরকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তোমরা তাঁদেরকে গালি দিলে! আমি তোমাদের নবীকে বলতে শুনেছি যে, "এই জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংস হবে না, যতক্ষণ না তাদের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকেদেরকে অভিসম্পাত করবে।" (বাগবী)

আল-হাশর 59:11

তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি? তারা আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের সেই ভাইদেরকে বলে, ‘তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগী হব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনো কারো কথা মানব না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’[১] কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। [২] [১] যেমন পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, মুনাফিকরা বানু-নায্বীরের কাছে এই বার্তা পাঠিয়েছিল। [২] তাদের মিথ্যাবাদিতা পরিষ্কার হয়ে সামনে এসে গেল। বানু-নায্বীর দেশত্যাগ করতে বাধ্য হল। এরা না তাদের সাহায্যে এগিয়ে এল, আর না তাদের সমর্থনে মদীনা ছাড়ার আগ্রহ দেখাল।

আল-হাশর 59:12

বস্তুতঃ তারা বহিষ্কৃত হলে, (মুনাফিকরা) তাদের সাথে দেশ ত্যাগ করবে না এবং তারা আক্রান্ত হলে, তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না[১] এবং তারা সাহায্য করতে এলেও[২] অবশ্যই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে,[৩] অতঃপর তারা কোন সাহায্যই পাবে না। [৪] [১] এটা মুনাফিকদের পূর্বের মিথ্যা অঙ্গীকারের অতিরিক্ত কিছু ব্যাখ্যা। হলও তা-ই। বানু-নায্বীর নির্বাসিত হল এবং বানু-কুরাইযাকে হত্যা ও বন্দী করা হল। কিন্তু মুনাফিকরা তাদের কারো সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল না। [২] এটা একটি আপাত স্বীকার্য কথা। কারণ, যে জিনিস না হওয়ার কথা মহান আল্লাহ বলে দিয়েছেন, তার অস্তিত্ব কিভাবে সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, তারা ইয়াহুদীদের সাহায্য করার ইচ্ছা করলেও। [৩] অর্থাৎ, পরাজিত হয়ে। [৪] উদ্দেশ্য ইয়াহুদী। অর্থাৎ, যখন তাদের সাহায্যকারী মুনাফিকরাই পরাজিত হয়ে যাবে, তখন ইয়াহুদীরা কিভাবে সাহায্য পাবে ও সফলকাম হবে? কেউ কেউ এ থেকে মুনাফিকদেরকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, তাদেরকে কোন সাহায্য করা হবে না, বরং আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন এবং তাদের মুনাফিক্বী অভ্যাস তাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না।

আল-হাশর 59:13

প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে[১] আল্লাহ অপেক্ষা তোমরাই অধিকতর ভয়ংকর; এটা এই জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। [২] [১] ইয়াহুদীদের অথবা মুনাফিকদের কিংবা ওদের সকলের অন্তরে। [২] অর্থাৎ, তোমাদের এই ভয় তাদের অন্তরে প্রবেশ করার কারণ হল তাদের নির্বুদ্ধিতা। কেননা, তাদের যদি জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত, তাহলে বুঝে নিত যে, মুসলিমদের জয় ও আধিপত্য মহান আল্লাহর পক্ষ হতে। কাজেই ভয় করতে হলে আল্লাহকেই করতে হয়, মুসলিমদেরকে নয়।

আল-হাশর 59:14

কেবলমাত্র সুরক্ষিত জনপদের অভ্যন্তরে অথবা দুর্গ-প্রাচীরের আড়ালে থেকে ছাড়া তারা সবাই সমবেতভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবে না।[১] পরস্পরের মধ্যে তাদের যুদ্ধ প্রচন্ড।[২] তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের মনগুলি ভিন্ন ভিন্ন। [৩] এটা এ জন্য যে, ওরা হল নির্বোধ সম্প্রদায়।[৪] [১] অর্থাৎ, এই মুনাফিক ও ইয়াহুদীরা আপোসে মিলিত হয়েও উবমুক্ত ময়দানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার হিম্মত রাখে না। অবশ্য দুর্গে আবদ্ধ হয়ে অথবা দেওয়ালের পিছনে লুকিয়ে তোমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে। আর এ থেকে পরিষ্কার যে, এরা অত্যধিক ভীরু এবং তোমাদের ভয়ে কম্পমান। [২] অর্থাৎ, আপোসে এরা একে অপরের ঘোর বিরোধী। তাই এদের আপোসের গালি-গালাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ একটি সাধারণ ব্যাপার। [৩] এই হল মুনাফিকদের আপোসের অন্তরের অবস্থা অথবা ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের অবস্থা কিংবা মুশরিক ও কিতাবধারীদের অবস্থা। অর্থাৎ, সত্যের বিরোধিতায় তাদেরকে দেখে লাগে এক রকম। কিন্তু আসলে তাদের অন্তর এক রকম নয়। তারা একে অপর থেকে ভিন্ন এবং তাদের অন্তঃকরণ একে অপরের বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। [৪] অর্থাৎ, এই বিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণ হল তাদের নির্বুদ্ধিতা। যদি তাদের বুঝার মত জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত, তাহলে তারা সত্যকে জেনে নিয়ে তা গ্রহণ করে নিত।

আল-হাশর 59:15

(ওরা) তাদের মত, যারা তাদের অব্যবহিত পূর্বে গত হয়েছে, যারা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করেছে।[১] আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [২] [১] এ থেকে কেউ কেউ মক্কার মুশরিকদেরকে বুঝিয়েছেন। যারা বানু-নায্বীর যুদ্ধের কিছু দিন পূর্বে বদর যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এরাও পরাজয় ও লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার ব্যাপারে মুশরিকদের মতনই, যাদের যামানা অতি নিকটেই অতিবাহিত হয়েছে। কেউ কেউ ইয়াহুদীদের দ্বিতীয় গোত্র বানু-ক্বাইনুক্বা'কে বুঝিয়েছেন। যাদেরকে বানু-নায্বীরদের পূর্বে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং যারা কাল ও স্থান উভয় দিক দিয়েই এদের কাছাকাছি ছিল।(ইবনে কাসীর) [২] এই যে শাস্তি তারা ভোগ করল এটা তো দুনিয়ার শাস্তি। এ ছাড়াও তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের শাস্তি; যা হবে অতীব যন্ত্রণাদায়ক।

আল-হাশর 59:16

(ওরা) শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে, অবিশ্বাস কর। অতঃপর যখন সে অবিশ্বাস করে, তখন শয়তান বলে, ‘তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, [১] নিশ্চয় আমি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ [২] [১] এখানে ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের আর একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। মুনাফিকরা ইয়াহুদীদের কোনই সাহায্য না করে যেমন অসহায় ছেড়ে দিয়েছিল, অনুরূপ আচরণ শয়তানও করে মানুষের সাথে। প্রথমে সে মানুষকে ভ্রষ্ট করে। সুতরাং সে যখন তার অনুসরণ করে কুফরী করে বসে, তখন সে (শয়তান) তার সাথে সম্পর্ক-ছিন্নতার কথা ঘোষণা করে। [২] শয়তান তার এই কথায় সত্যবাদী নয়। উদ্দেশ্য কেবল সেই কুফরী থেকে স্বতন্ত্রতা ও সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেওয়া, যা মানুষ তার চক্রান্তে করে থাকে।

আল-হাশর 59:17

ফলে উভয়ের পরিণাম হবে জাহান্নাম। সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটাই সীমালংঘনকারীদের কর্মফল। [১] [১] অর্থাৎ, خلود في النار জাহান্নামের চিরন্তন শাস্তি।

আল-হাশর 59:18

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। [১] আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামী কালের (কিয়ামতের) জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। [২] তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। [৩] [১] এখানে ঈমানদারদেরকে সম্বোধন করে তাদেরকে নসীহত করা হচ্ছে। আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হল, তিনি যে সমস্ত কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা সম্পাদন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা করো না। আয়াতে এই কথাটা তাকীদ স্বরূপ দু'বার বলা হয়েছে। কারণ এই তাকওয়া (আল্লাহর ভয়)ই মানুষকে সৎকর্ম করতে এবং অসৎকর্ম থেকে বাঁচাতে উৎসাহ দান করে। [২] কিয়ামতকে 'আগামী কাল' বলে আখ্যায়িত করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এর সংঘটন কাল বেশী দূরে নয়, বরং অতি নিকটে। [৩] সুতরাং তিনি সকলকে তার আমলের প্রতিদান দেবেন। নেককারদেরকে তাদের নেক কাজের বদলা এবং পাপীদেরকে তাদের পাপের বদলা।

আল-হাশর 59:19

আর তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। [১] তারাই তো পাপাচারী। [১] অর্থাৎ, আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে এমন করে দিলেন যে, তারা এমন সব কাজ করা থেকে উদাসীন হয়ে গেল যাতে ছিল তাদের উপকার এবং যার দ্বারা তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে পারত। এইভাবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে আসলে নিজেকেই ভুলে যায়। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা করে না। চোখ দু'টি তাকে সঠিক পথ দেখায় না এবং তার কান সত্য কথা শুনতে বধির হয়ে যায়। ফলে তার দ্বারা এমন কাজ হয়ে যায়, যাতে থাকে তার নিজেরই ধ্বংস ও বিনাশ।

আল-হাশর 59:20

জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। [১] জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম। [২] [১] যারা আল্লাহকে ভুলে এ কথাও ভুলে গেছে যে, তারা এইভাবে নিজেদেরই উপর অত্যাচার করছে এবং এক দিন এমন আসবে যে, এর ফলস্বরূপ তাদের এই দেহ, যার জন্যে তারা দুনিয়াতে বহু কষ্ট ও অনেক দৌড়-ঝাঁপ করছে, তা জাহান্নামের আগুনের জ্বালানী হবে। আর এদের বিপরীত কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহকে স্মরণে রাখে। তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে। এক দিন আসবে, যেদিন আল্লাহ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং স্বীয় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেখানে তাদের আরাম ও শান্তির জন্য সব রকমের নিয়ামত ও সুখ-সুবিধা থাকবে। এই উভয় দল অর্থাৎ, জান্নাতী ও জাহান্নামী সমান হবে না। আর উভয় দল সমান কিভাবেই বা হতে পারে? এক দল নিজের পরিণামকে স্মরণে রেখে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দল নিজের পরিণাম থেকে ছিল উদাসীন। তাই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার ব্যাপারে অপরাধমূলক উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। [২] যেমন, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী সফলকাম হয় এবং ভিন্নজন অসফল হয়, অনুরূপ আল্লাহভীরু মু'মিন জান্নাত লাভের সফলতা অর্জন করবে। কারণ, এর জন্য সে দুনিয়াতে সৎকর্মের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, দুনিয়া হল কর্মক্ষেত্র ও পরীক্ষালয়। যে এই বাস্তবতাকে বুঝে নেবে এবং পরিণাম থেকে উদাসীন হয়ে জীবন-যাপন করবে না, সে সফলতা অর্জন করবে। পক্ষান্তরে যে পার্থিব জীবনের বাস্তবতাকে বুঝতে না পেরে পরিণাম থেকে উদাসীন হয়ে অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত থাকবে, সে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসফল হবে। اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْفَائْزِيْنَ

আল-হাশর 59:21

যদি আমি এই কুরআন পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম,[১] তাহলে তুমি দেখতে যে, ওটা আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।[২] আমি এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। [৩] [১] এবং পাহাড়ের মধ্যে যদি ঐরূপ বোধ ও অনুধাবনের যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিতাম, যেরূপ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। [২] অর্থাৎ, কুরআন কারীমে আমি ভাষা-অলঙ্কার ও সাহিত্য-শৈলী, আকর্ষণশক্তি, বলিষ্ঠ প্রমাণাদি এবং নসীহত ও উপদেশের এমন এমন দিক তুলে ধরেছি যে, তা শুনে পাহাড় অতি কঠিনতা, বিশালতা ও উচ্চতা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। এ কথা বলে মানুষকে বুঝানো ও ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তোমাকে বুঝার ও অনুধাবন করার যোগ্যতা দেওয়া হয়েছে, তা সত্ত্বেও যদি কুরআন শুনে তোমার অন্তরে কোন প্রভাব সৃষ্টি না হয়, তাহলে তোমার পরিণাম ভাল হবে না। [৩] যাতে কুরআনে বর্ণিত নসীহত থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তিরস্কার ও ধমক শুনে যাবতীয় অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। কেউ কেউ বলেছেন, এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, আমি এই কুরআনকে তোমার উপর নাযিল করেছি, যা এমন মাহাত্ম্যের অধিকারী; যদি তা আমি কোন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তা টুকরো টুকরো হয়ে যেত। কিন্তু এটা তোমার উপর আমার অনুগ্রহ যে, আমি তোমাকে এই কুরআনের ভার বরদাস্ত করার মত বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় বানিয়ে দিয়েছি। সুতরাং তুমি সেই ভার বরদাস্ত করেছ, অথচ তা বরদাস্ত করার শক্তি পাহাড়েরও নেই। (ফাতহুল ক্বাদীর) এর পর মহান আল্লাহ তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করছেন। যার উদ্দেশ্য তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরকের খন্ডন।

আল-হাশর 59:22

তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি অদৃশ্য[১] এবং দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনিই অতি দয়াময়, পরম দয়ালু। [১] গায়েব (অদৃশ্য) সৃষ্টিকুলের জন্য। নচেৎ আল্লাহর জন্য কোন জিনিস গায়েব বা অদৃশ্য নয়। অর্থাৎ, (তাঁর কাছে সবই দৃশ্য।) তিনি পৃথিবীর সমস্ত জিনিস সম্পর্কে অবগত; তাতে তা আমাদের দৃশ্য হোক অথবা অদৃশ্য। এমনকি তিনি অন্ধকারে চলমান কালো পিঁপড়েরও খবর রাখেন।

আল-হাশর 59:23

তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, পবিত্র, নিরবদ্য, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, গর্বের অধিকারী। যারা তার শরীক স্থির করে, আল্লাহ তা হতে পবিত্র মহান।

আল-হাশর 59:24

তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা,[১] রূপদাতা। সকল উত্তম নাম তাঁরই।[২] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।[৩] আর তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [৪] [১] বলা হয় যে, خلق 'খালক্ব' এর অর্থ, স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী আন্দাজ ও অনুমান করা। আর برأ 'বারাআ' অর্থ, সেটাকে সৃষ্টি করা, গড়া এবং অস্তিত্বে নিয়ে আসা।[২] 'আসমায়ে হুসনা' (সুন্দর নামাবলী) এর আলোচনা সূরা আ'রাফ ৭:১৮০ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে।[৩] অবস্থার ভাষায় এবং কথ্য ভাষাতেও। যেমন, পূর্বে বর্ণনা হয়েছে।[৪] যে জিনিসেরই তিনি ফায়সালা করেন, তা হিকমত, কৌশল ও প্রজ্ঞা হতে শূন্য থাকে না।

আল-মুমতাহিনা 60:1

হে বিশ্বাসীগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।[১] তোমরা তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও,[২] অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে, রসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর।[৩] যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাক (তাহলে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না)।[৪] তোমরা গোপনে তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমরা যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের যে কেউ এটা করে, সে তো সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়। [৫] [১] মক্কার কাফেরগণ এবং নবী (সাঃ)-এর মাঝে হুদাইবিয়াতে যে সন্ধিচুক্তি হয়েছিল, মক্কার কাফেররা তা ভঙ্গ করল। এই জন্য নবী (সাঃ)ও গোপনে মুসলিমদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। হাত্বেব ইবনে আবী বালতাআ' (রাঃ) বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী একজন মুহাজির সাহাবী ছিলেন। কুরাইশদের সাথে তাঁর কোন আত্মীয়তা ছিল না। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি মক্কাতেই ছিল। তিনি ভাবলেন যে, মক্কার কুরাইশদেরকে যদি নবী (সাঃ)-এর প্রস্তুতি সম্পর্কে জানিয়ে দিই, তাহলে এই অনুগ্রহের বদলায় তারা আমার সন্তান-সন্ততি ও মাল-ধনের হিফাযত করবে। তাই তিনি এই সংবাদটা লিখিত আকারে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কাফেরদের নিকট প্রেরণ করলেন। এদিকে অহীর মাধ্যমে নবী করীম (সাঃ)-কে ব্যাপারটা জানিয়ে দেওয়া হয়। তাই তিনি আলী, মিকদাদ এবং যুবায়ের (রাঃ)-দেরকে বললেন, "যাও, 'রওয্বাতু খাখ' নামক স্থানে মক্কাগামিনী একজন মহিলাকে পাবে; তার কাছে আছে একটি পত্র, সেটি উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।" তাঁরা গিয়ে তাঁর কাছ থেকে পত্র উদ্ধার করে নিয়ে এলেন, যা সে তার মাথার চুলের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। তিনি হাত্বেব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন যে, "তুমি এ কাজ কেন করেছ?" তিনি বললেন, 'আমি এ কাজ কুফরী এবং দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যাওয়ার কারণে করিনি, বরং অন্যান্য মুহাজির সাহাবীদের আত্মীয়-স্বজন মক্কাতে বিদ্যমান থাকায় তারা এঁদের (মুহাজির সাহাবীদের) সন্তান-সন্ততির হিফাযত করে। আমার সেখানে কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই আমি চিন্তা করলাম যে, আমি যদি তাদের কিছু জানিয়ে দিই, তবে তারা আমার অনুগ্রহের মূল্য দিয়ে আমার সন্তানদের হিফাযত করবে।' রসূল (সাঃ) এ কথা সত্য জেনে তাঁকে কিছুই বললেন না। তবুও আল্লাহ সতর্কতা স্বরূপ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। যাতে আগামীতে কোন মু'মিন কোন কাফেরের সাথে যেন এই ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখে। (বুখারী সূরা মুমতাহিনার তাফসীর, মুসলিম ফাযায়েলে সাহাবা অধ্যায়)[২] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-এর এই প্রস্তুতির খবর তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপন করতে চাও?[৩] যখন তাদের তোমাদের সাথে এবং সত্যের সাথে এই ধরনের আচরণ, তখন তোমাদের জন্য কি এটা উচিত যে, তোমরা তাদের সাথে ভালবাসা রাখবে ও সহানুভূতি দেখাবে?[৪] বন্ধনীর মাঝে এটা শর্তের জওয়াব; যা আয়াতে ঊহ্য আছে।[৫] অর্থাৎ, আমার এবং তোমাদের শত্রুদের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক জুড়া এবং তাদের কাছে গোপনে পত্র ও বার্তা প্রেরণ করা হল ভ্রষ্টতার পথ, যা অবলম্বন করা কোন মুসলিমের উচিত নয়।

আল-মুমতাহিনা 60:2

তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে, তারা তোমাদের শত্রু হবে এবং হস্ত ও রসনা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরা অবিশ্বাসী হয়ে যাও। [১] [১] অর্থাৎ, তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে বিরাজ করছে এই ধরনের হিংসা ও বিদ্বেষ, আর তোমরা তাদের উপর ভালবাসার ফুল বর্ষণ করতে চাও?

আল-মুমতাহিনা 60:3

তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোনই কাজে আসবে না।[১] আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। [২] আর তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন। [১] অর্থাৎ, যে সন্তান-সন্ততিদের জন্য তোমরা কাফেরদের প্রতি ভালবাসা দেখাচ্ছ তারা তো তোমাদের কোন উপকারে আসবে না। তাহলে তাদের জন্য কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট কেন করছ? কিয়ামতের দিন যে জিনিস উপকারে আসবে, তা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য। অতএব এর প্রতি যত্নবান হও। [২] এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ তোমাদেরকে পৃথক পৃথক করে দেবেন। অর্থাৎ, আনুগত্যকারীদেরকে জান্নাতে এবং অবাধ্যজনদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। কেউ কেউ বলেন, পৃথক হওয়ার অর্থ হল, এক অপরের কাছ থেকে পালাবে। যেমন, আল্লাহ বলেন, ﴿يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ﴾ যেদিন (কঠিন ভয়াবহতার কারণে) ভাই ভাই থেকে পালাবে। (আবাসাঃ ৩৪)

আল-মুমতাহিনা 60:4

অবশ্যই তোমাদের জন্য ইব্রাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ;[১] তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার উপাসনা কর, তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।[২] আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য সৃষ্টি হল শত্রুতা ও বিদ্বেষ, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ।’[৩] তবে ব্যতিক্রম তার পিতার প্রতি ইব্রাহীমের উক্তি,[৪] ‘আমি নিশ্চয়ই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং তোমার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট কোন অধিকার রাখি না।’ (ইব্রাহীম ও তাঁর অনুসারিগণ বলেছিল,) ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো তোমারই উপর নির্ভর করেছি,[৫] তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন তো তোমারই নিকট। [১] কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না করার বিষয়কে আরো স্পষ্ট করার জন্য ইবরাহীম (আঃ)-এর উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে। أُسْوَةٌ এর অর্থ হল, এমন উত্তম নমুনা ও আদর্শ যার অনুসরণ করা যায়।[২] অর্থাৎ, শিরকের কারণে আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া আল্লাহর উপাসকদের সাথে গায়রুল্লাহর পূজারীদের কি সম্পর্ক থাকতে পারে?[৩] অর্থাৎ, এই বিচ্ছেদ ও বিদ্বেষ ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না তোমরা কুফরী ও শিরক ত্যাগ করে তাওহীদকে অবলম্বন করেছ। যখন তোমরা এক আল্লাহর অনুসারী হয়ে যাবে, তখন এ শত্রুতা বন্ধুত্বে এবং বিদ্বেষ সম্প্রীতিতে পরিবর্তন হয়ে যাবে।[৪] فِي ابراهيم এর মধ্যে সম্বন্ধসূচক যে শব্দ ঊহ্য আছে তা থেকে এটা ব্যতিক্রান্ত। অর্থাৎ, {قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي مَقَالاَتِ إِبْرَاهِيْمَ إلاَّ قَوْلَهُ لِأَبِيْه}ِ অথবা أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ থেকে ব্যতিক্রান্ত। কারণ তাঁর কথাগুলো সবই আদর্শ। যেন বলা হয়েছে যে, {قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيْمَ فِي جَمِيْعِ أَقْوَالِهِ وأَفْعَالِهِ إِلاَّ قَوْلَهُ لِأَبِيْه}ِ (فتح القدير) অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর পুরো জীবনটাই এক অনুসরণীয় আদর্শ। তবে তাঁর (মুশরিক) পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এমন একটি কাজ, যাতে তাঁর অনুসরণ করা উচিত নয়। কেননা, তাঁর এই কাজটা ছিল তখনকার, যখন তিনি নিজ পিতার ব্যাপারটা জানতেন না। সুতরাং যখন তিনি অবগত হলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্নতার কথা ঘোষণা করলেন। যেমন, সূরা তাওবার ৯:১১৪ নং আয়াতে রয়েছে।[৫] 'তাওয়াক্কুল' (নির্ভর, ভরসা) করার অর্থ হল, সাধ্যমত বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার সাথে সাথে ব্যাপারকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অবলম্বন না করেই আল্লাহর উপর ভরসা প্রকাশ করা হোক। এ থেকে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই 'তাওয়াক্কুল' এর এই (উপায়-উপকরণ গ্রহণ না করেই ভরসা করা) অর্থ ভুল হবে। নবী (সাঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হল এবং তার উটকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। তিনি তাকে (উটের কথা) জিজ্ঞাসা করলে, সে বলল, 'আমি উটকে আল্লাহর ভরসায় রেখে এসেছি।' তিনি (সাঃ) বললেন, (اعْقِلْها وَتَوَكَّلْ) "প্রথমে একে বাঁধ, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।" (তিরমিযী) إنابة অর্থ হল, আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন করা, আল্লাহর অভিমুখী হওয়া।

আল-মুমতাহিনা 60:5

হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে অবিশ্বাসীদের জন্য ফিতনার কারণ করো না,[১] হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ [১] অর্থাৎ কাফেরদেরকে আমাদের উপর বিজয় ও কর্তৃত্ব দান করো না। এতে তারা মনে করবে যে, তারাই সত্যের উপর আছে। এইভাবে আমরা কাফেরদের জন্য ফিতনা ও পরীক্ষার কারণ হয়ে যাব। অথবা অর্থ হল, তাদের হাতে কিংবা তোমার পক্ষ হতে আমাদেরকে কোন শাস্তির মধ্যে ফেলো না। এতেও আমাদের অস্তিত্ব তাদের জন্য ফিতনার কারণ হবে। কারণ তারা বলবে যে, যদি এরা হকপন্থী হত, তাহলে তাদের উপর এই কষ্ট কি আসত?

আল-মুমতাহিনা 60:6

নিশ্চয়ই তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রত্যাশা কর,[১] তাদের জন্য তাদের মধ্যে[২] রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে[৩] সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ। [১] কেননা, এই ধরনের লোকরাই আল্লাহকে এবং আখেরাতের আযাবকে ভয় করে। এরাই অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। [২] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ) এবং তাঁর অনুসারী সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে। এর পুনরাবৃত্তি তাকীদ স্বরূপ করা হয়েছে। [৩] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর আদর্শ হতে মুখ ফিরিয়ে নিলে।

আল-মুমতাহিনা 60:7

যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে, সম্ভবতঃ আল্লাহ তাদের ও তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। [১] আর আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] অর্থাৎ, তাদেরকে মুসলমান করে তোমাদের ভাই ও সাথী বানিয়ে দেবেন। যার ফলে তোমাদের মাঝের শত্রুতা ও বিদ্বেষ বন্ধুত্ব ও ভালবাসায় পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর হলও তা-ই। মক্কা বিজয়ের পর মানুষ দলে দলে মুসলমান হতে শুরু করল। আর তাদের মুসলিম হওয়ার সাথে সাথেই আপোসের বিদ্বেষ ভালবাসায় পরিবর্তন হয়ে গেল। যারা মুসলমানদের রক্ত-পিপাসু ছিল, তারা পরস্পরের সাহায্যকারীতে পরিণত হয়ে গেল।

আল-মুমতাহিনা 60:8

দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি[১] এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি,[২] তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না।[৩] নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। [৪] [১] এখানে এমন কাফেরদের সাথে পার্থিব লেনদেন ও আচার-ব্যবহার বিষয়ক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যারা দ্বীন ইসলামের কারণে মুসলিমদের সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতা রাখে না এবং এর ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। এটা প্রথম শর্ত। [২] অর্থাৎ, তোমাদের সাথে এমন আচরণও করে না যে, তোমরা হিজরত করতে বাধ্য হয়ে যাও। এটা দ্বিতীয় শর্ত। পরের আয়াত থেকে তৃতীয় আর একটি শর্তও পরিষ্কার হয়ে যায়। আর তা হল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্যান্য কাফেরদেরকে কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতাও করে না; না পরামর্শ দিয়ে, আর না অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে। [৩] অর্থাৎ, এই ধরনের কাফেরদের সাথে অনুগ্রহ প্রদর্শন এবং সুবিচারপূর্ণ আচরণ করা নিষেধ নয়। যেমন, আসমা বিনতে আবী বাকর (রাঃ) তাঁর মুশরিক মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা সম্পর্কে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বললেন, صِلِىْ أُمَّكِ "তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কর।" (বুখারীঃ আদব অধ্যায় ২৬২০নং, মুসলিমঃ যাকাত অধ্যায়ঃ ১০০৩নং) [৪] এতে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি, কাফেরদের সাথেও। হাদীস শরীফে ন্যায়পরায়ণ ও সুবিচারকারীদের ফযীলত এইভাবে বর্ণিত হয়েছে, "আল্লাহর নিকট যারা ন্যায়পরায়ণ তারা দয়াময়ের ডান পার্শ্বে জ্যোতির মিম্বরের উপর অবস্থান করবে। আর তাঁর উভয় হস্তই ডান। (ঐ ন্যায়পরায়ণ তারা) যারা তাদের বিচারে, পরিবারে এবং তার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে ন্যায়নিষ্ঠ।" (মুসলিম ১৮২৭ নং)

আল-মুমতাহিনা 60:9

আল্লাহ শুধু তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্করণে সহযোগিতা করেছে। তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে,[১] তারাই তো অত্যাচারী।[২] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার বাণী ও তাঁর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।[২] কেননা, তারা এমন লোকের সাথে ভালবাসা রাখে, যারা ভালবাসার পাত্র নয়। আর এইভাবে তারা নিজেদের নাফসের প্রতি যুলুম করে। কেননা, তাকে আল্লাহর আযাবের জন্য পেশ করে থাকে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاء بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা মাইদাহ ৫:৫১ আয়াত)

আল-মুমতাহিনা 60:10

হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের নিকট বিশ্বাসী নারীরা দেশত্যাগ করে আসলে, তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা কর। [১] আল্লাহ তাদের ঈমান (বিশ্বাস) সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা বিশ্বাসীনী,[২] তবে তাদেরকে অবিশ্বাসীদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিয়ো না। বিশ্বাসী নারীরা অবিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয় এবং অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসী নারীদের জন্য বৈধ নয়।[৩] অবিশ্বাসীরা যা ব্যয় করেছে, তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও।[৪] অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিবাহ করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না;[৫] যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও। তোমরা অবিশ্বাসী নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না।[৬] তোমরা যা ব্যয় করেছ,[৭] তা ফেরত চেয়ে নাও এবং অবিশ্বাসীরা ফেরত চেয়ে নিক, যা তারা ব্যয় করেছে।[৮] এটাই আল্লাহর ফায়সালা। তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করছেন।[৯] আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [১] হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্রে একটি শর্ত এও ছিল যে, মক্কা থেকে কোন ব্যক্তি মুসলিমদের নিকট চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাতে পুরুষ বা মহিলা বলে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ ছিল না। তবে বাহ্যিকভাবে (أَحَدٌ) এর মধ্যে উভয়েই শামিল। কিছু দিন পর কোন কোন মহিলা মক্কা থেকে হিজরত করে মুসলমানদের কাছে চলে গেলে কাফেররা তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী করে। ফলে এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুসলমানদের পথ প্রদর্শন করলেন এবং এই নির্দেশ দিলেন। পরীক্ষা করার অর্থ, এ ব্যাপারে যাচাই করে নাও যে, হিজরত করে আগমনকারিণী যে মহিলারা ঈমান আনার কথা প্রকাশ করছে, তারা তাদের স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে অথবা কোন মুসলিমের প্রেমে পড়ে কিংবা অন্য কোন স্বার্থের কারণে তো চলে আসেনি? কেবল আশ্রয় গ্রহণের জন্য ঈমান আনার দাবী করছে না তো? [২] অর্থাৎ, যাচাই করার পর যখন তোমরা এই ফলাফলে পৌঁছবে এবং প্রবল ধারণা এই সৃষ্টি হবে যে, বাস্তবিকই এ মু'মিনা। [৩] এটা হল তাদেরকে তাদের কাফের স্বামীদের নিকট ফিরিয়ে না পাঠানোর কারণ। আর তা হল, এখন আর কোন মু'মিন মহিলা কোন কাফেরের জন্য হালাল নয়, যেমন ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এটা জায়েয ছিল। তাই তো নবী করীম (সাঃ)-এর কন্যা যায়নাব (রায্বিয়াল্লাহু আনহার) বিবাহ আবূল আ'স ইবনে রাবী'র সাথে হয়েছিল, অথচ সে মুসলিম ছিল না। আয়াতে আগামীতে এ রকম করতে নিষেধ করা হল। আর এই কারণেই এখানে বলা হল যে, তারা একে অপরের জন্য হালাল নয়। সুতরাং তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দিও না। হ্যাঁ, স্বামীও যদি মুসলিম হয়ে যায়, তবে তাদের বিবাহ বন্ধন প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে, যদিও স্বামী তার স্ত্রীর পরে (ইদ্দতের মধ্যে) হিজরত করে আসে। [৪] অর্থাৎ, তাদের কাফের স্বামীরা তাদেরকে যে মোহর দিয়েছিল, তা তোমরা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। [৫] এ কথা মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে যে, যে নারীরা ঈমানের কারণে তাদের কাফের স্বামীদেরকে ত্যাগ করে তোমাদের কাছে এসে গেছে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে পার। তবে শর্ত হল, তাদের প্রাপ্য মোহর তাদেরকে দিয়ে দেবে। তবে এ বিয়েও যথানিয়মে হবে। অর্থাৎ, প্রথমতঃ ইদ্দত পূরণ হওয়ার পর হবে। দ্বিতীয়তঃ এতে অভিভাবকের সম্মতি ও অনুমতি ও দু'জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিও আবশ্যক। অবশ্য যে মহিলার সাথে তার স্বামীর কোন সম্পর্ক (মিলন) হয়নি, তার সাথে ইদ্দত ছাড়াই সত্বর বিবাহ জায়েয। [৬] عِصَمٌ হল, عِصْمَةٌ এর বহুবচন। এখানে এর অর্থ, দাম্পত্য সম্পর্ক। অর্থাৎ, যদি স্বামী মুসলিম হয়ে যায় এবং স্ত্রী কাফের ও মুশরিক রয়ে যায়, তাহলে এ রকম মুশরিক মহিলাকে স্বীয় বিবাহ বন্ধনে রাখা বৈধ নয়। স্বামী তাকে সত্বর তালাক দিয়ে নিজের কাছ থেকে পৃথক করে দেবে। সুতরাং এই নির্দেশের পর উমার (রাঃ) তাঁর দু'জন মুশরিক স্ত্রীকে এবং ত্বালহা ইবনে উবায়দুল্লাহও তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। (ইবনে কাসীর) তবে স্ত্রী যদি কিতাবিয়া (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান) হয়, তাহলে তাকে তালাক দেওয়া জরুরী নয়। কেননা, তাদের সাথে বিবাহ বৈধ। কাজেই সে (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান স্ত্রী) যদি প্রথম থেকেই স্ত্রীরূপে স্বামীর কাছে থেকে থাকে, তবে ইসলাম কবুল করার পর তাকে বিচ্ছিন্ন করার কোন প্রয়োজন নেই। [৭] অর্থাৎ, সেই মহিলাদের উপর, যারা কুফরীতে অবিচল থাকার কারণে কাফেরদের নিকট চলে গেছে। [৮] অর্থাৎ, সেই মহিলাদের উপর, যারা মুসলিম হয়ে হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছে। [৯] অর্থাৎ, উভয়েরই একে অপরকে মোহরের পাওনা আদায় করার, বরং চেয়ে নেওয়ার উল্লিখিত বিধান হল আল্লাহর বিধান। ইমাম ক্বুরত্বুবী বলেন, এ বিধান সেই যুগের সাথেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ব্যাপারে সকল মুসলিমের ঐকমত্য রয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর) আর এর কারণ হল সেই চুক্তি, যা সেই সময় উভয় দলের মাঝে হয়েছিল। এই ধরনের চুক্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতেও উক্ত বিধানের উপর আমল করা জরুরী হবে। অন্যথা হবে না।

আল-মুমতাহিনা 60:11

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাত ছাড়া হয়ে অবিশ্বাসীদের নিকট চলে যায় এবং তোমাদের যদি প্রতিশোধ নেওয়ার কোন সুযোগ আসে,[১] তাহলে যাদের স্ত্রীরা হাত ছাড়া হয়ে গেছে তাদেরকে, তারা যা ব্যয় করেছে তার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান কর, আর তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী। [১] فَعَاقَبْتُمْ (তোমরা শাস্তি দাও অথবা প্রতিশোধ নাও) এর একটি অর্থ হল, মুসলিম হয়ে আগমনকারী মহিলাদের প্রাপ্য মোহর যা তোমাদেরকে তাদের কাফের স্বামীদেরকে দিতে হত, সেটা তোমরা সেই মুসলিমদেরকে দিয়ে দাও, যাদের স্ত্রীরা কাফের হওয়ার কারণে কাফেরদের কাছে চলে গেছে এবং মুসলিমদের মোহরের পাওনা ফেরত দেয়নি। (অর্থাৎ, এটাও এক প্রকার সাজা।) দ্বিতীয় অর্থ হল, তোমরা কাফেরদের সাথে জিহাদ কর। অতঃপর যে গনীমতের মাল অর্জন কর, তা থেকে বণ্টনের পূর্বে প্রথমে যে মুসলিমদের স্ত্রীরা চলে গিয়ে কাফেরদের দলে মিলিত হয়েছে। তাদের ব্যয়কৃত অর্থের সমপরিমাণ তাদেরকে দিয়ে দাও। অর্থাৎ, গনীমতের মাল থেকে মুসলিমদের ক্ষতি পূরণ করা এটাও এক প্রকার শাস্তি বা প্রতিশোধ। (আইসারুত তাফাসীর ও ইবনে কাসীর) যদি গনীমতের মাল থেকে ক্ষতি পূরণ সম্ভব না হয়, তাহলে বাইতুল মাল থেকে সাহায্য করা হবে। (আইসারুত তাফাসীর)

আল-মুমতাহিনা 60:12

হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর[১] এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] এই 'বায়আত' সেই সময় নেওয়া হত, যখন মহিলারা হিজরত করে আসত। যেমন, সহীহ বুখারীতে সূরা মুমতাহিনার তফসীরে এসেছে। এ ছাড়া মক্কা বিজয়ের দিনেও নবী (সাঃ) কুরাইশ মহিলাদের কাছ থেকে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। বায়আত নেওয়ার সময় তিনি কেবল মৌখিকভাবে তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিতেন। কোন মহিলার হাত তিনি স্পর্শ করতেন না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! বায়আত গ্রহণকালে নবী করীম (সাঃ)-এর হাত কখনোও কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। বায়আত নেওয়ার সময় তিনি কেবল বলতেন, "আমি এই কথার উপর তোমার কাছে বায়আত গ্রহণ করলাম।" (বুখারী, সূরা মুমতাহিনার তাফসীর পরিচ্ছেদ) বায়আতে তিনি মহিলাদের কাছ থেকে এ প্রতিশ্রুতিও নিতেন যে, তারা শোকে রোদন করবে না, বুকের কাপড় ছিঁড়ে মাতম করবে না। মাথার চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করবে না এবং জাহেলী যুগের মহিলাদের মত ডাক পাড়বে না। (বুখারী ও মুসলিম প্রভৃতি) এই বায়আতে নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত ইত্যাদির কথা উল্লেখ নেই। কারণ, এগুলো ইসলামের রুকন এবং দ্বীনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ আচার, বিধায় তার বর্ণনার প্রয়োজন হয় না। তিনি বিশেষ করে সেই জিনিসগুলোর বায়আত নেন, সাধারণতঃ যেগুলো মহিলাদের দ্বারা বেশী হয়ে থাকে। যাতে তারা দ্বীনের রুকনগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়ার সাথে সাথে এই জিনিসগুলো থেকেও বিরত থাকে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উলামা, দ্বীনের প্রতি আহবানকারী এবং বক্তাগণ যেন তাঁদের বক্তব্যকে কেবল আরকানে দ্বীন বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রাখেন। কেননা, এগুলো তো পূর্ব থেকেই স্পষ্ট। বরং তাঁদের উচিত সেই সব অন্যায়-অনাচার, অনিসলামী রসম-রেওয়াজ, কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদ জানানো, যা সমাজে ব্যাপকভাবে চলছে এবং যা থেকে নামায-রোযার প্রতি যত্নবান ব্যক্তিরাও অনেক সময় দূরে থাকে না।

আল-মুমতাহিনা 60:13

হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের প্রতি রুষ্ট তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না, [১] তারা তো পরকাল সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছে, যেমন হতাশ হয়েছে অবিশ্বাসীরা কবরবাসীদের বিষয়ে। [২] [১] এ থেকে কেউ ইয়াহুদীদের, কেউ মুনাফিকদের এবং কেউ সমস্ত কাফেরদেরকে বুঝিয়েছেন। আর এই শেষের উক্তিটাই বেশী সঠিক মনে হচ্ছে। কেননা, এতে ইয়াহুদী ও মুনাফিকরাও এসে যায়। এ ছাড়া সমস্ত কাফেররা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হওয়ারই যোগ্য। অতএব অর্থ হবে, কোন কাফেরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখো না। যেমন, কুরআনের আরো কয়েকটি স্থানে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। [২] পরকাল সম্পর্কে হতাশ হওয়ার অর্থ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা অস্বীকার করা। কবরবাসী থেকে নিরাশ হওয়ার অর্থও এটাই যে আখেরাতে পুনরায় তাদেরকে উঠানো হবে না। এর দ্বিতীয় অর্থ এও করা হয়েছে যে, কবরস্থ কাফের সর্বপ্রকার মঙ্গল থেকে নিরাশ। কেননা, মৃত্যুবরণ করার পর সে তার কুফরীর পরিণাম দেখে নিয়েছে। অতএব সে মঙ্গলের কি আর আশা করতে পারে? (ইবনে জারীর ত্বাবারী)

আস-সফ 61:1

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

আস-সফ 61:2

হে বিশ্বাসীগণ! [১] তোমরা যা কর না, তা বল কেন? [১] এখানে সম্বোধন যদিও ব্যাপক, তবুও প্রকৃতপক্ষে সেই মু'মিনদেরকেই লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, যাঁরা বলাবলি করছিলেন যে, আমরা যদি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কি জানতে পারি, তাহলে আমরা তা করব। কিন্তু যখন তাদেরকে সেই প্রিয় কাজটা বলে দেওয়া হল, তখন তারা অলস হয়ে গেল। তাই তাদেরকে ধমক দেওয়া হচ্ছে যে, কল্যাণকর যেসব কথা বল, তা কর না কেন? যে কথা মুখে বল, তা কাজে কর না কেন? যা জবান দিয়ে বল, তা রক্ষা কর না কেন?

আস-সফ 61:3

তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক। [১] [১] এখানে আরো তাকীদ করে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ চরম অসন্তুষ্ট হন।

আস-সফ 61:4

যারা আল্লাহর পথে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।[১] [১] এখানে জিহাদকে একটি বড় মাহাত্ম্যপূর্ণ নেক কাজ বলা হয়েছে; যা আল্লাহর নিকট অনেক প্রিয় আমল।

আস-সফ 61:5

(স্মরণ কর,) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের প্রতি (প্রেরিত) আল্লাহর রসূল?’ [১] অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন।[২] আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [১] মূসা (আঃ) আল্লাহর সত্য রসূল --এ কথা জানা সত্ত্বেও বনী ইস্রাঈল তাঁকে তাদের জবান দ্বারা কষ্ট দিত। এমনকি, তাঁর ব্যাপারে দৈহিক কিছু ত্রুটির কথাও তারা বলে বেড়াত, অথচ সে ত্রুটি ও ব্যাধি তাঁর মধ্যে ছিল না। [২] অর্থাৎ, জানা সত্ত্বেও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। হকের পরিবর্তে বাতিল, ভালোর পরিবর্তে মন্দ এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর পথ অবলম্বন করল। ফলে মহান আল্লাহ শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তরকে সব সময়ের জন্য হিদায়াত থেকে ফিরিয়ে দিলেন। কেননা, এটাই হল আল্লাহর চিরাচরিত বিধান। অব্যাহতভাবে কুফরী ও ভ্রষ্টতার উপর অবিচল থাকলে, তা অন্তঃকরণে মোহর লেগে যাওয়ার কারণ হয়। অতঃপর অন্যায়, কুফরী এবং যুলুম-অত্যাচার করা তার সবভাবে পরিণত হয়ে যায়। যা কেউ পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। এই কারণে আয়াতের শেষাংশে বললেন যে, আল্লাহ কোন পাপাচারী অবাধ্যজনকে হিদায়াত দান করেন না। কারণ, এই ধরনের লোকদেরকে আল্লাহ তাঁর চিরাচরিত বিধান অনুযায়ী ভ্রষ্ট করে থাকেন। এখন তাকে কে পথ দেখাতে পারে, যাকে এই পথ থেকে আল্লাহই ভ্রষ্ট করে দিয়েছেন?

আস-সফ 61:6

(স্মরণ কর,) যখন মারয়্যাম তনয় ঈসা বলেছিল, ‘হে বানী ইস্রাঈল! আমি তোমাদের প্রতি (প্রেরিত) আল্লাহর রসূল এবং আমার পূর্ব হতে (তোমাদের নিকট) যে তাওরাত রয়েছে, আমি তার সমর্থক[১] এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রসূল আসবেন, আমি তাঁর সুসংবাদদাতা।’[২] পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ তাদের নিকট আগমন করল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘এটা তো এক স্পষ্ট যাদু।’ [৩] [১] ঈসা (আঃ)-এর ঘটনা এই জন্য বর্ণনা করলেন যে, বানী ইস্রাঈলরা যেমন মূসা (আঃ)-এর অবাধ্যতা করেছিল, অনুরূপ তারা ঈসা (আঃ)-কেও অস্বীকার করেছিল। এতে নবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, এই ইয়াহুদীরা কেবল তোমার সাথেই এইরূপ আচরণ করেনি, বরং তাদের সম্পূর্ণ ইতিহাসই নবীদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করাতে ভরপুর। 'তাওরাত'-এর সত্যায়ন বা সমর্থন করার অর্থ হল, আমি যে দাওয়াত দিচ্ছি, সেটা ঐ দাওয়াতই, যা তাওরাতে ছিল। আর এটা প্রমাণ করে যে, যে পয়গম্বর আমার পূর্বে তাওরাত নিয়ে এসেছিলেন এবং আমি ইঞ্জীল নিয়ে এসেছি, আমাদের উভয়েরই মূলসূত্র একটাই। কাজেই যেভাবে তোমরা মুসা, হারূন, দাউদ ও সুলাইমান (আলাইহিমুস্ সালাম) এর উপর ঈমান এনেছ, অনুরূপ আমার উপরেও ঈমান আন। কারণ, আমি তো তাওরাতের সত্যায়ন করছি, তার খন্ডন ও মিথ্যায়ন করছি না। [২] এ বলে ঈসা (আঃ) তাঁর পর আগমনকারী শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়েছেন। যেমন নবী (সাঃ) বলতেন, (( أَنَا دَعْوَةُ أَبِي إِبْرَاهِيْمَ وَبَشَارَةُ عِيْسَى "আমি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ এবং ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদের বাস্তব রূপ।" (আহমাদ) 'আহমাদ' শব্দটি যদি 'ইসমে ফায়েল' (কর্তৃপদ) থেকে মুবালাগার সীগা (যার দ্বারা কোন কিছুর আধিক্য বর্ণনা করা হয় তা) হয়, তবে এর অর্থ হবে, অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে আল্লাহর অধিক প্রশংসাকারী। আর যদি এটা 'ইসম মাফউল' (কর্মপদ) থেকে হয়, তবে অর্থ হবে, (প্রশংসিত) সুন্দর গুণাবলী এবং বহুমুখী পরিপূর্ণতার অধিকারী হওয়ার কারণে যত প্রশংসা তাঁর করা হয়েছে, এত প্রশংসা অন্য কারো করা হয়নি। (ফাতহুল ক্বাদীর) [৩] অর্থাৎ, ঈসা (আঃ)-এর পেশ করা সমস্ত 'মু'জিযা' (অলৌকিক ঘটনাবলী)-কে যাদু বলে আখ্যায়িত করল। পূর্ববর্তী জাতিরাও তাদের নবীদেরকে এই কথাই বলেছিল। কেউ কেউ এ থেকে নবী (সাঃ)-কে বুঝিয়েছেন এবং قَالُوا ক্রিয়ার 'ফায়েল' (কর্তৃপদ) মক্কার কাফেরদেরকে বানিয়েছেন।

আস-সফ 61:7

যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে,[১] তার অপেক্ষা অধিক যালেম আর কে? অথচ তাকে ইসলামের[২] দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [১] অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করে। অথবা যে পশুগুলোকে তিনি হারাম বলেননি, সেগুলোকে হারাম সাব্যস্ত করে। [২] অর্থাৎ, যা সমস্ত দ্বীনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মহান দ্বীন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দ্বীনের প্রতি আহূত হয়, তার জন্য তো শোভনীয়ই নয় যে, সে কারো ব্যাপারে মিথ্যা গড়বে। তাহলে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা গড়া কি তার জন্য কখনও শোভনীয় হতে পারে?

আস-সফ 61:8

তারা আল্লাহর জ্যোতিকে তাদের মুখ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়,[১] কিন্তু আল্লাহ তাঁর জ্যোতিকে পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন; [২] যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করে। [১] আল্লাহর 'নূর' (জ্যোতি) অর্থঃ কুরআন, ইসলাম, মুহাম্মাদ (সাঃ) কিংবা দলীল-প্রমাণাদি। 'মুখ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া' মানে তাদের সেই সব কটূক্তি ও নিন্দনীয় কথাবার্তা যা তাদের মুখ থেকে বের হয়, তা দিয়ে তারা ঐ জ্যোতিকে প্রতিহত করতে চায়! [২] অর্থাৎ, আল্লাহ সারা বিশ্বে তার প্রসার ঘটাবেন এবং অন্য সমস্ত ধর্মের উপর তাকে জয়যুক্ত করবেন। দলীল-প্রমাণের দিক দিয়ে অথবা পার্থিব জয়ের দিক দিয়ে কিংবা উভয় দিক দিয়ে।

আস-সফ 61:9

তিনিই তাঁর রসূলকে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ এবং সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্য; [১] যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। [২] [১] এটা পূর্বের কথার তাকীদস্বরূপ। বিষয়ের গুরুত্বের দিকে লক্ষ্য করে তার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। [২] তবুও এটা হবেই।

আস-সফ 61:10

হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দেব না, [১] যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? [১] এই আমল (অর্থাৎ, ঈমান ও জিহাদ)-কে বাণিজ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ এতেও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মত লাভ হবে। আর সে লাভ কি? জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ। এ থেকে বড় লাভ আর কি হতে পারে? এই লাভকে আল্লাহ অন্যত্র এইভাবে বর্ণনা করেছেন, ﴿إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ﴾ "অবশ্যই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মু'মিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মালকে জান্নাতের বিনিময়ে।" (সূরা তাওবাহ ৯:১১১)

আস-সফ 61:11

(তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।

আস-সফ 61:12

আল্লাহ তোমাদের পাপরাশিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য।

আস-সফ 61:13

আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরো একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়।[১] আর বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। [২] [১] অর্থাৎ, যখন তোমরা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করবে এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্য করবে, তখন তিনি তোমাদেরকে জয় ও সাহায্য দানে ধন্য করবেন। ﴿إِنْ تَنْصُرُوا اللهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ﴾ অর্থাৎ, যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন, এবং তোমাদের পা দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৭ আয়াত) ﴿وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। (সূরা হাজ্জ ২২:৪০ আয়াত) আখেরাতের নিয়ামতের তুলনায় এটাকে আসন্ন বিজয় গণ্য করেছেন। আর এ থেকে মক্কা বিজয় বুঝানো হয়েছে। আর কেউ কেউ প্রতাপশালী পারস্য ও রোমক রাজ্যদ্বয় মুসলিমদের জয়লাভ করাকে এরই বাস্তব চিত্র গণ্য করেছেন; যা খেলাফতে রাশেদার যুগে মুসলিমরা লাভ করেন।[২] অর্থাৎ, মৃত্যুর পর জান্নাতের এবং দুনিয়াতে বিজয় ও সাহায্যের। তবে শর্ত হল, ঈমানদারদেরকে ঈমানের দাবীসমূহ পূরণ করতে হবে। ﴿وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯ আয়াত) পরের আয়াতে মহান আল্লাহ মু'মিনদেরকে দ্বীনের সাহায্যের প্রতি আরো তাকীদ করছেন।

আস-সফ 61:14

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও,[১] যেমন মারয়্যাম তনয় ঈসা তার শিষ্যদেরকে বলেছিল, ‘আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?’ শিষ্যগণ বলেছিল, ‘আমরাই তো আল্লাহর সাহায্যকারী।’[২] অতঃপর বানী ইস্রাঈলের একদল বিশ্বাস করল এবং একদল অবিশ্বাস করল। [৩] পরে আমি বিশ্বাসীদেরকে তাদের শত্রুদের মুকাবিলায় শক্তিশালী করলাম; ফলে তারা বিজয়ী হল। [৪] [১] সর্বাস্থায়; নিজেদের কথা ও কাজের মাধ্যমে এবং জান ও মালের মাধ্যমেও। যখনই যে সময়ে এবং যে অবস্থাতেই তোমাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল দ্বীনের জন্য ডাক দেবেন, তখনই তোমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বলবে, 'লাব্বায়িক' (আমরা হাজির)। যেভাবে ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যরা তাঁর ডাকে 'লাববায়িক' বলেছিলেন। [২] অর্থাৎ, যে দ্বীনের প্রচার-প্রসারের নির্দেশ মহান আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন, সেই দ্বীনের প্রচার-প্রসারের কাজে আমরা হব আপনার সাহায্যকারী। এইভাবে রসূল (সাঃ) হজ্জের মৌসুমে বলতেন, "কে আছে এমন যে আমাকে আশ্রয় দিবে, যাতে আমি মানুষের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিতে পারি। কারণ, কুরাইশরা আমাকে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে দিচ্ছে না।" নবী করীম (সাঃ)-এর এই ডাকে মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাঁর হাতে তাঁরা বায়আত করে তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনুরূপ তাঁরা তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, যদি আপনি হিজরত করে মদীনায় আসেন, তবে আমরাই আপনার হিফাযতের দায়িত্ব গ্রহণ করছি। সুতরাং যখন তিনি হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁরাই তাঁর এবং তাঁর সমস্ত সঙ্গী-সাথীর পরিপূর্ণ সাহায্য করেছিলেন। এমন কি আল্লাহ এবং তাঁর রসূল (সাঃ) তাঁদের নামই রেখে দিলেন, 'আনসার'। আর এই নামই তাঁদের পরিচয় হয়ে রইল। رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وأَرْضَاهُمْ (ইবনে কাসীর) [৩] এরা ছিল সেই ইয়াহুদী, যারা ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতকে কেবল অস্বীকারই করেনি, বরং তাঁর এবং তাঁর মায়ের উপর মিথ্যা অপবাদও দিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, এই বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলি তখন সৃষ্টি হয়, যখন ঈসা (আঃ)-কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হল। এক দল বলল, মহান আল্লাহই ঈসা (আঃ)-এর আকার নিয়ে যমীনে অবতরণ করেছিলেন। এখন তিনি আবার আসমানে চলে গেছেন। এদেরকে 'য়্যা'কূবিয়্যাহ' ফির্কা বলা হয়। 'নাসত্বুরিয়্যাহ' ফির্কাদের বক্তব্য হল, তিনি 'ইবনুল্লাহ' (আল্লাহর বেটা) ছিলেন। পিতা পুত্রকে আসমানে ডেকে নিয়েছেন। তৃতীয় ফির্কা বলল, তিনি আল্লাহর বান্দাহ এবং তাঁর রসূল ছিলেন। বলা বাহুল্য, এটাই হল হকপন্থী ফির্কা। [৪] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-কে প্রেরণ করে আমি এই শেষোক্ত ফির্কাটিকে অন্য ভ্রষ্ট ফির্কার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছি। তাই সঠিক আকীদার অধিকারী এই দলটি নবী (সাঃ)-এর উপরও ঈমান আনল। আর এইভাবে আমি দলীল-প্রমাণের দিক দিয়েও সমস্ত কাফেরদের উপর এদেরকে জয়যুক্ত করলাম এবং শক্তি ও রাজত্বের দিক দিয়েও। আর এই জয়ের সর্ব শেষ বিকাশ ঘটবে তখন, যখন কিয়ামতের পূর্বকালে ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। যেমন, এই অবতরণ ও বিজয়ের কথা স্পষ্টরূপে বহু সহীহ হাদীসে বহুধাসূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

আল-জুমুআ 62:1

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে আল্লাহর, যিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, পূত-পবিত্র, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

আল-জুমুআ 62:2

তিনিই নিরক্ষরদের[১] মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রসূলরূপে, যে তাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা, যদিও ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে। [১] أُمِّيِّيْنَ (নিরক্ষর) থেকে এমন আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের অধিকাংশ লেখাপড়া জানত না। এদেরকে বিশেষ করে উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, রসূল (সাঃ)-এর রিসালাত অন্যদের জন্য ছিল না। কিন্তু সর্বপ্রথম যেহেতু সম্বোধন তাদেরকেই করা হয়েছে, তাই তাদের উপর ছিল আল্লাহর বেশী অনুগ্রহ।

আল-জুমুআ 62:3

আর তাদের অন্যান্যদের জন্যও (রসূল পাঠিয়েছেন), যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি।[১] আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১] এর সংযোগ হল أُمِّيِّيْنَ এর সাথে। অর্থাৎ, بَعَثَ فِي آخَرِيْنَ مِنْهُمْ আর آخَرِيْنَ বলতে পারসীক এবং অন্যান্য অনারব লোক, যারা কিয়ামত পর্যন্ত রসূল (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করবে। কেউ কেউ বলেন, আরব ও অনারবদের সেই সমস্ত লোক, যারা সাহাবাদের যামানার পর কিয়ামত পর্যন্ত আসতে থাকবে। এতে পারস্য, রোম, বর্বর, সুডান, তুর্কিস্তান, মোগল, কুর্দিস্তান এবং চিন ও ভারত ইত্যাদি দেশের সমস্ত বাসিন্দা (বিশ্ববাসী)রা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, রসূল (সাঃ)-এর নবুঅত সবার জন্য। তাই এরা সবাই তাঁর উপর ঈমান আনে। আর ইসলাম গ্রহণ করার পর এরা সবাই مِنْهُمْ (তাদের অন্যান্য) এর দলে শামিল হয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীরা أُمِّيِّيْن এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা, সমস্ত মুসলমান হল একই উম্মত। এই (তাদের) সর্বনামের কারণে কেউ কেউ বলেন, 'অন্যান্য' বলতে পরে আগমনকারী আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, 'তাদের' সর্বনাম দ্বারা (আরব) 'নিরক্ষরদের' প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আল-জুমুআ 62:4

এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, [১] যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আর আল্লাহ তো মহা অনুগ্রহশীল। [১] 'এটা'র ইঙ্গিত নবী (সাঃ)-এর নবুঅতের প্রতি অথবা ইসলাম, অহী, অথবা আরব-অনারব একীভূত করার প্রতি।

আল-জুমুআ 62:5

যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তা তারা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত পুস্তক বহনকারী গর্দভ।[১] কত নিকৃষ্ট সেই সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আর আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [১] أَسْفَارٌ হল سِفْرٌ এর বহুবচন। অর্থ হল, বড় কিতাব। কিতাব পাঠ করা হয়, তখন মানুষ তার অর্থসমূহে সফর করে। এই জন্য কিতাবকেও সিফ্র বা সফর বলা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) এখানে আমলবিহীন ইয়াহুদীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যেমন গাধা; তার পিঠে যে কিতাবগুলো বোঝাই করা আছে তাতে কি লেখা আছে অথবা তার উপর যা বোঝাই করা হয়েছে তা কিতাব, না ঘাস-ভুসি তা জানে না। অনুরূপ এই ইয়াহুদীরাও; তাদের কাছে তওরাত আছে। তা পড়া ও মুখস্থ করার দাবীও করে, কিন্তু তারা না তা বোঝে, আর না তার নির্দেশ অনুযায়ী আমল করে। বরং তার অপব্যাখ্যা এবং তাতে হেরফের, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করে। কাজেই প্রকৃতপক্ষে এরা গাধার থেকেও বেশী নিকৃষ্ট। কারণ, গাধা জন্মগতভাবেই বিবেক ও বোধশক্তি থেকে বঞ্চিত হয়, আর এদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি বিদ্যমান, কিন্তু এরা তার সঠিক ব্যবহার করে না। এই জন্য পরে বলা হয়েছে যে, এদের দৃষ্টান্ত বড়ই নিকৃষ্ট। অনুরূপ যারা তাদের অন্তর, চক্ষু ও কর্ণের সঠিক ব্যবহার করে না, তাদের সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলেছেন, ﴿أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ﴾ "এরা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্টতর।" (সূরা আ'রাফ ৭:১৭৯ আয়াত) হুবহু দৃষ্টান্ত সেই মুসলিমদের, বিশেষ করে আলেমদেরও যারা কুরআন পড়ে ও মুখস্থ করে, কিন্তু তার নির্দেশ অনুযায়ী আমল করে না। (যেমন যে কিতাব বর্জন করে, তাকে সেই কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যাকে তাড়া করলে সে জিভ বের করে হাঁপায় এবং এমনি ছেড়ে দিলেও সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে। (সূরা আ'রাফ ৭:১৭৬ আয়াত)

আল-জুমুআ 62:6

বল, ‘হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানবগোষ্ঠী নয়, [১] তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা কর; [২] যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ [৩] [১] যেমন, তারা বলত যে, 'আমরা আল্লাহর বেটা এবং তাঁরই প্রিয় বান্দা।' (সূরা মায়িদাহ ৫:১৮) এবং দাবী করত যে, 'জান্নাতে কেবল তারাই প্রবেশ করবে যারা ইয়াহুদী এবং খ্রিষ্টান হবে।' (সূরা বাক্বারাহ ২:১১১ আয়াত)[২] যাতে তোমরা সেই মর্যাদা-সম্মান অর্জন করতে পার, যা তোমাদের ধারণা অনুযায়ী তোমাদের জন্য হওয়া উচিত।[৩] কারণ, যে এ ব্যাপারে প্রত্যয়ী হয় যে, মরার পর তার জন্য রয়েছে জান্নাত, সে সেখানে সত্বর পৌঁছতে চায়। হাফেয ইবনে কাসীর এর তফসীর করেছেন, 'মুবাহালা'র জন্য আহবান করা। অর্থাৎ, তাদেরকে বলা হল যে, তোমরা যদি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতকে অস্বীকার করার ব্যাপারে এবং এবং আল্লাহর প্রিয় ও বন্ধু হওয়ার দাবীতে সত্যবাদী হও, তবে মুসলিমদের সাথে 'মুবাহালা' কর। অর্থাৎ, মুসলিম ও ইয়াহুদী উভয়ে মিলে আল্লাহর কাছে দু'আ করবে যে, 'হে আল্লাহ! আমাদের উভয়ের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, তাকে মৃত্যু দান কর।' (সূরা বাক্বারার ২:৯৪ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্যঃ)

আল-জুমুআ 62:7

কিন্তু তারা তাদের হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার কারণে কখনো মৃত্যু কামনা করবে না।[১] আর আল্লাহ যালেমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত। [১] অর্থাৎ, কুফরী, পাপ এবং আল্লাহর কিতাবে হেরফের ও পরিবর্তন ইত্যাদি করার কারণে কখনও এরা মৃত্যু কামনা করবে না।

আল-জুমুআ 62:8

বল, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর, সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের অবশ্যই সাক্ষাৎ হবে। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা (আল্লাহ)র নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে, যা তোমরা করতে।

আল-জুমুআ 62:9

হে বিশ্বাসীগণ! জুমুআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। [১] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। [১] এই আযান কিভাবে দেওয়া হবে, তার শব্দাবলী কি হবে? কুরআন মাজীদে কোথাও তার উল্লেখ নেই। অবশ্য হাদীসে আছে। এ থেকে জানা যায় যে, হাদীস ছাড়া কুরআন বোঝাও সম্ভব নয় এবং তার উপর আমল করাও সম্ভব নয়। 'জুমআহ'কে জুমআহ এই জন্য বলা হয় যে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা সমস্ত বস্তুর সৃষ্টির কাজ সমাপ্ত করেন। যেন সকল সৃষ্টি এই দিন 'জমা' (একত্রিত) হয়েছে। অথবা নামাযের জন্য মানুষ জমা ও সমবেত হয়, তাই এই দিনকে জুমআহর দিন বলা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) فَاسْعَوْا (ধাবিত হও) এর অর্থ এই নয় যে, দৌড়ে এস। বরং অর্থ হল, আযানের পর সত্বর চলে এস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ কর। কেননা, হাদীসে নামাযের জন্য দৌড়ে আসতে নিষেধ এবং ধীর-স্থিরতার সাথে আসতে তাকীদ করা হয়েছে। (বুখারী, আযান অধ্যায়, মুসলিমঃ মাসজিদ অধ্যায়) কেউ কেউ وَذَرُوا الْبَيِعَ (ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর বা কেনাবেচা বন্ধ কর)-কে দলীল বানিয়ে বলেছেন যে, জুমআহ কেবল শহরেই ফরয, গ্রামবাসীদের উপর ফরয নয়। কেননা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় কেবল শহরেই হয়, গ্রাম-গঞ্জে হয় না। অথচ প্রথমতঃ দুনিয়াতে কোন গ্রাম এমন নেই, যেখানে কেনাবেচা এবং কোন ব্যবসা হয় না। অতএব এ দাবীই হল বাস্তবতার বিপরীত। দ্বিতীয়তঃ বেচাকেনা ও ব্যবসা বলতে বুঝানো হয়েছে, যাবতীয় পার্থিব ব্যস্ততাকে; তা যেমন এবং যে প্রকারেরই হোক না কেন, জুমআর আযানের পর তা ত্যাগ করতে হবে। গ্রামবাসীদের বৈষয়িক ব্যস্ততা থাকে না কি? চাষাবাদ, ঘর-সংসারের নানা ব্যস্ততা দুনিয়া থেকে ভিন্ন জিনিস নাকি?

আল-জুমুআ 62:10

অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর[১] ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। [১] এর অর্থ বৈষয়িক কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থাৎ, জুমআর নামায শেষ করার পর তোমরা পুনরায় নিজ নিজ কাজে-কামে এবং দুনিয়ার ব্যস্ততায় লেগে যাও। এ থেকে উদ্দেশ্য হল এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, জুমআর দিন কাজ-কর্ম বন্ধ রাখা জরুরী নয়। কেবল নামাযের জন্য তা বন্ধ রাখা জরুরী।

আল-জুমুআ 62:11

যখন তারা কোন ব্যবসা বা খেল-তামাশা দেখে, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে ওর দিকে ছুটে যায়।[১] বল, ‘আল্লাহর নিকট যা আছে[২] তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।[৩] আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রুযীদাতা।’ [৪] [১] একদা নবী (সাঃ) জুমআর দিন খুৎবা দিচ্ছিলেন, ইত্যবসরে এক বাণিজ্য-কাফেলা এসে উপস্থিত হল। লোকেরা জানতে পারার সাথে সাথেই খুৎবা (শোনা) বাদ দিয়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বাইরে বেচা-কেনার জন্য চলে গেল। মসজিদে কেবল ১২ জন রয়ে গেল। এ ব্যাপারেই এই আয়াত নাযিল হয়। (বুখারীঃ সুরা জুমআর তফসীর, মুসলিমঃ জুমআহ অধ্যায়) انْفِضَاضٌ এর অর্থ হল, ঝুঁকে পড়া, মনোযোগী হওয়া, দৌড়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া। إِلَيْهَا (ওর দিকে)এর মধ্যে 'ওর' সর্বনাম দিয়ে تِجَارَةً (ব্যবসা)এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে কেবল ব্যবসার প্রতি ইঙ্গিতকেই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। কেননা, ব্যবসা বৈধ ও জরুরী হওয়া সত্ত্বেও যদি তা খুৎবা চলাকালীন অবস্থায় নিন্দিত হয়, তাহলে খেলা-ধূলা ইত্যাদির নিন্দিত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি? قَائِمًا থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জুমআর খুৎবা দাঁড়িয়ে দেওয়া সুন্নত। হাদীসেও এসেছে যে, রসূল (সাঃ)-এর খুৎবা দুটো হত। উভয় খুৎবার মধ্যে তিনি একবার বসতেন। খুৎবায় তিনি কুরআন পড়তেন এবং লোকদের ওয়ায-নসীহত করতেন। (মুসলিম, জুমআহ অধ্যায়) [২] অর্থাৎ, আল্লাহ ও রসূলের যাবতীয় বিধি-বিধানের আনুগত্য করার যে মহা প্রতিদান আছে। [৩] যার প্রতি তোমরা মসজিদ থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলে এবং জুমআর খুৎবাও শুনলে না। [৪] অতএব তাঁরই কাছে রুযী চাও এবং আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের অসীলা অবলম্বন কর। তাঁর আনুগত্য এবং তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তন রুযী লাভের অনেক বড় মাধ্যম।

আল-মুনাফিকুন 63:1

যখন মুনাফিক (কপট)রা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল।’[১] আল্লাহ জানেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তাঁর রসূল[২] এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। [৩] [১] 'মুনাফিক্বীন' (কপটদল) বলতে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সাথীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এরা যখন রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হত, তখন শপথ করে বলত যে, 'আপনি আল্লাহর রসূল।' [২] এ বাক্যটি পূর্বের বাক্য থেকে বিচ্ছিন্ন একটি বাক্য, যা পূর্বের বিষয়ের তাকীদ স্বরূপ এসেছে এবং যার প্রকাশ মুনাফিকবরা মুনাফিক্ব হিসাবে করত। মহান আল্লাহ বললেন, এ কথা তারা কেবল মুখেই বলে, তাদের অন্তর এই বিশ্বাস থেকে শূন্য। তবে আমি জানি যে, তুমি সত্যই আল্লাহর রসূল। [৩] অন্তর থেকে তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারে। অর্থাৎ, ওরা অন্তর থেকে এ সাক্ষ্য দেয় না। কেবল প্রতারিত করার জন্য মুখে বলে।

আল-মুনাফিকুন 63:2

তারা তাদের শপথগুলোকে ঢালরূপে ব্যবহার করে, [১] আর তারা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে বিরত রাখে।[২] তারা যা করছে তা কত মন্দ! [১] অর্থাৎ, তারা যে কসম খেয়ে বলে, তারা তোমাদের মতই মুসলিম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রসূল। আসলে তারা তাদের এই কসমকে নিজেদের ঢাল বানিয়ে রেখেছে। এর মাধ্যমে তারা তোমাদের হাত থেকে বেঁচে যায় এবং কাফেরদের মত তারা তোমাদের তরবারির আওতায় পড়ে না। [২] এর দ্বিতীয় অর্থ হল, তারা সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করে মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেয়।

আল-মুনাফিকুন 63:3

এটা এ জন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করেছে,[১] ফলে তাদের হৃদয় মোহর করে দেওয়া হয়েছে, সুতরাং তারা বুঝবে না। [১] এ থেকে জানা গেল যে, মুনাফিকরা পরিষ্কার কাফের।

আল-মুনাফিকুন 63:4

তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও, তখন তাদের দেহাকৃতি তোমাকে মুগ্ধ করে[১] এবং তারা যখন কথা বলে, তখন তুমি সাগ্রহে তা শ্রবণ কর;[২] তারা যেন দেওয়ালে ঠেকানো কাঠের খুঁটি,[৩] তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।[৪] তারাই শত্রু অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে? [১] অর্থাৎ, তাদের সৌন্দর্য, লাবণ্য, সজীবতার কারণে। [২] অর্থাৎ, ভাষার বিশুদ্ধতা এবং বাকপটুতার কারণে। [৩] অর্থাৎ, তারা তাদের দেহের উচ্চতা, সৌন্দর্য ও শ্রীতে এবং বোধহীনতা ও কল্যাণ স্বল্পতায় ঐরূপ, যেরূপ দেওয়ালে ঠেকানো কাঠ। দর্শককে তা দেখতে ভাল লাগে, কিন্তু কারো কোন উপকারে আসে না। অথবা এটা 'মুবতাদা মাহযুফ' (ঊহ্য উদ্দেশ্য) এর বিধেয়পদ। অর্থ হল, এরা রসূল (সাঃ)-এর মজলিসে ঐভাবে বসে, যেমন প্রাচীরে ঠেকানো কাঠ। এরা না কোন কথা শোনে, না বোঝে। (ফাতহুল ক্বাদীর) [৪] অর্থাৎ, এরা এত ভীরু যে, কোন শোরগোল বা হট্টগোল শুনলেই মনে করে, তাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ছে। কিংবা এই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে যে, হয়তো তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। যেমন, চোর ও অপরাধীদের মন অভ্যন্তরীণভাবে সব সময় ধুক্পুক্ করতে থাকে। 'চোরের মন পুলিশ পুলিশ!'

আল-মুনাফিকুন 63:5

যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা এসো, আল্লাহর রসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন’, তখন তারা মাথা ফিরিয়ে নেয়[১] এবং তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা দম্ভভরে ফিরে যায়।[২] [১] অর্থাৎ, ক্ষমা প্রার্থনা (অপ্রয়োজনীয় মনে করে) বৈমুখ হয়ে নিজেদের মাথা ঘুরিয়ে নেয়। [২] অর্থাৎ, যে তাদেরকে বলে তার নিকট থেকে অথবা রসূল (সাঃ) নিকট থেকে (নাক সিটকে) ফিরে যায়।

আল-মুনাফিকুন 63:6

তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান।[১] আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না।[২] আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [১] মুনাফিক্বী অভ্যাস এবং কুফরীর উপর অটল থাকার কারণে তারা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ও না করা উভয়ই সমান। [২] যদি এই মুনাফিক্বী অবস্থায় মারা যায়। তবে যদি কেউ জীবিত অবস্থায় কুফরী ও মুনাফিক্বী থেকে তওবা করে নেয়, তাহলে সে কথা ভিন্ন। এই অবস্থায় তার ক্ষমালাভ সম্ভব।

আল-মুনাফিকুন 63:7

তারাই বলে, ‘আল্লাহর রসূলের কাছে যারা আছে তাদের জন্য ব্যয় করো না; যতক্ষণ না তারা সরে পড়ে।’[১] বস্তুতঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ধন-ভান্ডার তো আল্লাহরই।[২] কিন্তু মুনাফিক (কপট)রা তা বুঝে না। [৩] [১] এক যুদ্ধে (যাকে ঐতিহাসিকগণ 'মুরাইসী' অথবা 'বানী মুসত্বালাক' বলেন) একজন মুহাজির এবং একজন আনসার সাহাবীর মাঝে ঝগড়া বেধে যায়। উভয়েই নিজের নিজের সাহায্যের জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীদেরকে ডাকাডাকি শুরু করেন। এটাকে কেন্দ্র করে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই (মুনাফিক) আনসারদেরকে বলল যে, 'তোমরা মুহাজিরদেরকে সাহায্য করেছ এবং তাঁদেরকে নিজেদের সাথে রেখেছ। এখন দেখ তার ফল কি সামনে আসছে। অর্থাৎ, তোমাদেরই খেয়ে তোমাদেরকেই দাঁত দেখাচ্ছে! (তোমরা আসলে দুধ-কলা দিয়ে কাল সাপ পুষছ!) আর এর চিকিৎসা হল এই যে, তাঁদের জন্য ব্যয় করা বন্ধ করে দাও। দেখবে তাঁরা আপনা-আপনিই কেটে পড়বে।' সে (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই) এ কথাও বলেছিল যে, 'আমরা (যারা সম্মানী লোক তারা) এই হীন (মুহাজির) লোকগুলোকে মদীনা থেকে বহিষ্কার করে দেব।' যায়েদ ইবনে আরক্বাম (রাঃ) তার এই জঘন্য কথাবার্তা শুনে নেন এবং রসূল (সাঃ)-কে তা জানিয়ে দেন। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে সে পরিষ্কার অস্বীকার করে দেয়। ফলে যায়েদ ইবনে আরক্বাম (রাঃ) চরমভাবে ব্যথিত হন। মহান আল্লাহ যায়েদ ইবনে আরক্বাম (রাঃ)-এর সত্যবাদিতা প্রমাণের জন্য সূরা মুনাফিক্বুন অবতীর্ণ করেন এবং এর দ্বারা ইবনে উবায়ের নোংরা চরিত্রের মুখোশ পূর্ণরূপে খুলে দেন। (বুখারী, সূরা মুনাফিকূনের তফসীর পরিচ্ছেদ)[২] অর্থাৎ, মুহাজিরদের রুযীর মালিক তো আল্লাহ। কারণ, সকল প্রকার রুযীর ভান্ডার তাঁরই কাছে। তিনি যাকে চান তা দান করেন এবং যাকে চান না বঞ্চিত করেন।[৩] মুনাফিকরা এই বাস্তবতাকে জানে না। তাই তারা মনে করে যে, আনসাররা যদি মুহাজিরদের প্রতি সাহায্যের হাত না বাড়ায়, তাহলে তাঁরা না খেয়ে মারা যাবেন।

আল-মুনাফিকুন 63:8

তারা বলে, ‘আমরা মদীনায় ফিরে গেলে সেখান হতে সম্মানী অবশ্যই হীনকে বহিষ্কার করবে।’[১] বস্তুতঃ যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের।[২] কিন্তু মুনাফিক (কপট)রা তা জানে না। [৩] [১] এ কথা মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলেছিল। 'সম্মানী' বলতে তার লক্ষ্য ছিল, সে নিজে এবং তার সাথী-সঙ্গীরা। আর 'হীন' বলতে সে বুঝাতে চেয়েছিল, (নাউযু বিল্লাহ) রসূল (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদেরকে! [২] অর্থাৎ, সম্মান ও আধিপত্য কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। অতঃপর তিনি নিজের পক্ষ হতে যাকে চান সম্মান ও আধিপত্য দান করেন। আর তিনি তো তাঁর রসূলদের এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে সম্মান ও উচ্চ মর্যাদা দান করেন। এ সম্মান তাদেরকে দান করেন না, যারা তাঁর অবাধ্য। এখানে মুনাফিকদের কথা খন্ডন করে বলা হয়েছে যে, সমস্ত ইজ্জতের মালিক বা অধিকারী কেবলমাত্র মহান আল্লাহ এবং সম্মানিত কেবল সে-ই, যাকে তিনি সম্মান দান করেন। সে নয়, যে নিজেকে সম্মানী মনে করে বা যাকে বিশ্ববাসী সম্মানী মনে করে। আর আল্লাহর নিকট সম্মান লাভ কেবল ঈমানদাররাই করবেন; কাফের ও মুনাফিকরা নয়। [৩] এই জন্য এমন কাজ করে না, যা তাদের জন্য উপকারী হবে এবং সেই সব বস্তু থেকে বিরত থাকে না, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর।

আল-মুনাফিকুন 63:9

হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ধন-সম্পত্তি ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন না করে,[১] যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। [১] অর্থাৎ, মাল এবং সন্তান-সন্ততির ভালবাসা তোমাদের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার না করে ফেলে যে, তোমরা আল্লাহ কর্তৃক আরোপিত যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাবলী থেকে উদাসীন হয়ে যাও এবং তাঁরই নির্ধারিত হালাল ও হারামের সীমালংঘনের ব্যাপারেও একেবারে বেপরোয়া হয়ে যাও। মুনাফিকদের আলোচনার পরে পরেই এই সতর্কতার উদ্দেশ্য হল, এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, এটা হল মুনাফিকদের চরিত্র যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঈমানদারদের চরিত্র এর বিপরীত। আর তা হল, তাঁরা সব সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখেন। অর্থাৎ, তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান ও অত্যাবশ্যকীয় কার্যাবলীর প্রতি যত্ন নেন এবং হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য খেয়াল করেন।

আল-মুনাফিকুন 63:10

আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তোমরা তা হতে ব্যয় কর[১] তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে (অন্যথা মৃত্যু আসলে সে বলবে,) ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? [২] তাহলে আমি সাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ [১] ব্যয় করার অর্থ, যাকাত আদায় করা এবং অন্যান্য কল্যাণকর পথে দান করা। [২] এ থেকে জানা গেল যে, যাকাত আদায়, আল্লাহর পথে ব্যয় এবং হজ্জ করার সামর্থ্য হলে তা সম্পাদন করার ব্যাপারে বিলম্ব করা কোনমতেই ঠিক নয়। কারণ, মৃত্যু কখন এসে পড়বে, তার কোন ঠিক নেই? ফলে এই ফরয কাজগুলো আদায় করতে না পারলে তার উপর তা অনাদায় রয়ে যাবে। আর মৃত্যুর সময় তা আদায়ের আশা করায় কোন লাভ হবে না।

আল-মুনাফিকুন 63:11

কিন্তু নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দেবেন না। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

আত-তাগাবুন 64:1

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, [১] সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই, [২] তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [১] অর্থাৎ, আসমান ও যমীনে বিদ্যমান সকল সৃষ্টিকুল মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে; অবস্থার ভাষায় এবং মুখের ভাষাতেও। এ কথা পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে। [২] অর্থাৎ, এই উভয় বৈশিষ্ট্যই কেবল তাঁরই জন্য। যদি কারো কোন এখতিয়ার থাকে, তবে তা তাঁরই প্রদত্ত এবং তা ক্ষণস্থায়ী। কেউ যদি কোন সৌন্দর্য ও পূর্ণতা লাভ করে থাকে, তবে তাও তাঁরই করুণার ভান্ডার থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ লাভ করে। কাজেই প্রকৃতপক্ষে প্রশংসা পাওয়ার অধিকারী একমাত্র তিনিই।

আত-তাগাবুন 64:2

তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় অবিশ্বাসী এবং কেউ বিশ্বাসী। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। [১] [১] অর্থাৎ, মানুষের জন্য ভাল-মন্দ, নেকী-বদী এবং কুফরী ও ঈমানের রাস্তাসমূহ পরিক্ককার বাতলে দেওয়ার পর মহান আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তারই ভিত্তিতে কেউ কুফরী এবং কেউ ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে। তিনি কাউকে কোন কিছুর উপর বাধ্য করেননি। তিনি বাধ্য করলে, কোন ব্যক্তি কুফরী ও অবাধ্যতার রাস্তা অবলম্বন করতে সক্ষম হত না। কিন্তু এইভাবে মানুষকে পরীক্ষা করা সম্ভব হত না। অথচ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হল মানুষকে পরীক্ষা করা। ﴿الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا﴾ (الملك: ২) অতএব যেমন কাফেরের স্রষ্টা আল্লাহ, তেমনি কুফরীর স্রষ্টাও তিনিই। কিন্তু এই কুফরী এই কাফেরের নিজের উপার্জিত। সে স্বেচ্ছায় তা অবলম্বন করেছে। অনুরূপ মু'মিন ও ঈমানের স্রষ্টা আল্লাহই, কিন্তু ঈমান এই মু'মিনের নিজের উপার্জন করা জিনিস। সে স্বেচ্ছায় এটা অবলম্বন করছে। আর এই উপার্জনের ভিত্তিতে উভয়কেই তাদের আমল অনুযায়ী বদলাও দেওয়া হবে। কারণ, তিনি সবারই আমল দেখছেন।

আত-তাগাবুন 64:3

তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন।[১] তিনি তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন এবং তোমাদের আকৃতি সুন্দর করেছেন। [২] আর প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। [৩] [১] অর্থাৎ, তা তিনি অযথা সৃষ্টি করেননি। বরং এর সৃষ্টির পিছনে ন্যায়পরায়ণতা ও যুক্তি আছে। আর তার দাবী হল, নেককারকে তার নেকীর এবং বদকারকে তার বদীর বদলা দেওয়া হোক। সুতরাং তিনি এই ন্যায়পরায়ণতার (দাবীর) পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটাবেন কিয়ামতের দিন।[২] তোমাদের আকৃতি, শারীরিক গঠন এবং চেহারার আকৃতি এত সুন্দর বানিয়েছেন যে, আল্লাহর অন্য সৃষ্টিকুল এ থেকে বঞ্চিত। যেমন, সূরা ইনফিত্বার ৮২:৬-৮ এবং সূরা মু'মিন ৪০:৬৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ﴿يَا أَيُّهَا الْأِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ * الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ* فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ﴾ (الانفطار:৬-৮)﴿وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ ﴾ (المؤمن:৬৪)[৩] অন্য কারো কাছে নয় যে, আল্লাহর পাকড়াও ও হিসাব-নিকাশ হতে বেঁচে যাবে।

আত-তাগাবুন 64:4

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং আল্লাহ অন্তর্যামী। [১] [১] অর্থাৎ, তাঁর জ্ঞান আসমান ও যমীনে সারা বিশ্বেই পরিব্যাপ্ত। বরং তোমাদের অন্তরের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত। ইতিপূর্বে যেসব প্রতিশ্রুতি ও ধমকের কথা বর্ণিত হয়েছে এটা হচ্ছে তারই তাকীদ স্বরূপ।

আত-তাগাবুন 64:5

তোমাদের নিকট কি পূর্ববর্তী অবিশ্বাসীদের বৃত্তান্ত পৌঁছেনি? তারা তাদের কর্মের মন্দফল আস্বাদন করেছিল[১] এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [২] [১] এখানে বিশেষ করে মক্কাবাসী এবং সাধারণভাবে আরবের কাফেরদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর পূর্বের কাফের বলতে নূহ (আঃ)-এর জাতি, আ'দ সম্প্রদায় এবং সামুদ সম্প্রদায় ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। যাদেরকে তাদের কুফরী ও অবাধ্যতার কারণে দুনিয়াতে আযাব দিয়ে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। [২] অর্থাৎ, দুনিয়ার আযাব ছাড়াও আখেরাতের আযাবও তাদের জন্য প্রস্তুত আছে।

আত-তাগাবুন 64:6

তা এ জন্য যে,[১] তাদের নিকট তাদের রসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ আসত, তখন তারা বলত, ‘মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দেবে?’[২] অতঃপর তারা অবিশ্বাস করল[৩] ও মুখ ফিরিয়ে নিল[৪] এবং আল্লাহও কোন পরোয়া করলেন না।[৫] আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, [৬] প্রশংসার্হ। [৭] [১] ذَلِكَ এ থেকে ইঙ্গিত হল সেই আযাবের প্রতি যা দুনিয়াতে তারা পেয়েছে। আর আখেরাতেও তা পাবে। [২] এটা হল তাদের কুফরী করার কারণ। তারা এই কুফরী যা তাদের ইহকাল ও পরকালের আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়াল তা এই জন্য অবলম্বন করেছিল যে, তারা একজন মানুষকে তাদের পথপ্রদর্শক মানতে অস্বীকার করল। অর্থাৎ, একজন মানুষের রসূল হয়ে লোকদের হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য আসার ব্যাপারটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যেমন, আজও বিদআতীদের কাছে রসূলকে মানুষ মনে করা বড়ই কষ্টকর মনে হয়। هَدَاهُمُ اللهُ تَعَالَى। [৩] সুতরাং উক্ত কারণে তারা রসূলদেরকে 'রসূল' বলে মেনে নিতে এবং তাঁদের উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করল। [৪] অর্থাৎ, তাঁদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং যে দাওয়াত তাঁরা পেশ করতেন, সে ব্যাপারে তারা ভাবনা-চিন্তা করেও দেখল না। [৫] অর্থাৎ, তাদের ঈমান ও ইবাদতের। [৬] কারো ইবাদতে তাঁর লাভ কি এবং কেউ তাঁর ইবাদত না করলে তাঁর ক্ষতিই বা কি? [৭] অর্থাৎ, তিনি সকল সৃষ্টির কাছে প্রশংসনীয়। অর্থাৎ, সকল সৃষ্টিকুলের জবান সদা-সর্বদা তাঁর প্রশংসায় সিক্ত থাকে।

আত-তাগাবুন 64:7

অবিশ্বাসীরা ধারণা করে যে, তারা কখনোই পুনরুত্থিত হবে না।[১] তুমি বল, ‘অবশ্যই হবে, আমার প্রতিপালকের কসম! তোমরা অবশ্য-অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।[২] অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে।[৩] আর এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।’ [৪] [১] অর্থাৎ, এই বিশ্বাস রাখে যে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে না। এটা কাফেরদের কেবল ধারণা ছিল। যে ধারণার পিছনে তাদের কোন দলীল নেই। ধারণা শব্দের প্রয়োগ মিথ্যার উপরেও হয়ে থাকে।[২] কুরআন মাজীদের তিন জায়গায় মহান আল্লাহ তাঁর রসূলকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুমি তোমার প্রতিপালকের কসম খেয়ে ঘোষণা দাও যে, মহান আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করবেন। তার মধ্যে একটি জায়গা হল এই আয়াতে। দ্বিতীয়টি হল সূরা ইউনুস ১০:৫৩ নং আয়াতে এবং তৃতীয়টি হল, সূরা সাবা ৩৪:৩ নং আয়াতে।[৩] এটা হল কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার যৌক্তিকতা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ মানুষকে পুনরায় জীবিত এই জন্য করবেন যে, যাতে সেখানে প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের বদলা দেওয়া যায়। কেননা, দুনিয়াতে আমরা দেখি যে, এই বদলা পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না। না নেককার পায়, না বদকার। এখন কিয়ামতেও যদি পূর্ণ প্রতিদানের কোন ব্যবস্থা না থাকে, তবে দুনিয়া খেলোয়াড়দের খেলার স্থান এবং একটি অনর্থক জিনিসই বিবেচিত হবে। অথচ মহান আল্লাহর সত্তা এ সব থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর তো কোন কাজই অনর্থক নয়। তাহলে জ্বিন ও ইনসানের সৃষ্টি বিনা উদ্দেশ্যে কেবল এক প্রকার খেল-তামাশা কিভাবে হতে পারে? تَعَالَى اللهُ عَنْ ذَلِكَ عُلُوًّا كَبِيْرًا[৪] এই দ্বিতীয়বার জীবিত করা মানুষদের কাছে যতই কঠিন অথবা অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা অতি সহজ ব্যাপার।

আত-তাগাবুন 64:8

অতএব[১] তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও যে জ্যোতি আমি অবতীর্ণ করেছি, তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর।[২] তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [১] فَآمِنُوا তে 'ফা' অক্ষরটিকে বলা হয় 'ফা ফাসীহাহ' (যার অর্থঃ অতএব, সুতরাং, তাহলে) যা প্রমাণ করছে যে, এর পূর্বে কোন শর্ত ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, ব্যাপার যখন এই রকমই যা বর্ণিত হয়েছে, সুতরাং তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের উপর ঈমান আন এবং তাঁকে সত্য বলে মানো। [২] নবী (সাঃ)-এর সাথে যে নূর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা হল এই কুরআন মাজীদ। যার দ্বারা ভ্রষ্টতার অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং ঈমানের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়।

আত-তাগাবুন 64:9

(স্মরণ কর,) যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিবসে[১] সেদিন হবে হার-জিতের দিন।[২] যে ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করবে এবং সৎকর্ম করবে, তিনি তার পাপরাশি মোচন করবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য। [১] কিয়ামতকে (সমাবেশ-দিবস বা একত্রিত হওয়ার দিন) এই কারণে বলা হয় যে, সেদিন পূর্বাপর সকলেই একই ময়দানে একত্রিত হবে। ফিরিশতা ডাক পাড়লে সকলেই তাঁর ডাকের শব্দ শুনতে পাবে। প্রত্যেকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মধ্যে কোন জিনিসের আড়াল থাকবে না। যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌمَشْهُودٌأَيْ: إِذَا كَانَ الأَمْرُ هَكَذَا فَصَدِّقُوْا بِاللهِ الجَمْع﴾ "এটা এমন একদিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে, সেদিনটি হাজিরের দিন।" (সূরা হুদ ১১:১০৩ আয়াত)﴿قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ* لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ﴾ অর্থাৎ, বল, অবশ্যই পূর্ববর্তিগণ ও পরবর্তিগণ; সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে। (সূরা ওয়াক্বিআহ ৫৬;৪৯-৫০ আয়াত)[২] অর্থাৎ, একটি দল তো সাফল্য লাভ করবে আর একটি দল হবে ব্যর্থ। হকপন্থীরা বাতিলপন্থীদের উপর, ঈমানদাররা কাফেরদের উপর এবং আনুগত্যশীলরা অবাধ্যজনদের উপর জয়লাভ করবে। ঈমানদারদের সব থেকে বড় জিত এই হবে যে, তাঁরা জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং সেখানে সেই বাসস্থানগুলোও তাঁদের অধিকারে চলে আসবে, যেগুলো জাহান্নামীদের জন্য ছিল, যদি তারা জাহান্নামে যাওয়ার মত কাজ না করত। আর জাহান্নামীদের সব চেয়ে বড় হার হল, তাদের জাহান্নামে প্রবেশ করা। জাহান্নামীরা ভালকে মন্দ দ্বারা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট জিনিস দ্বারা এবং নিয়ামতসমূহকে আযাব দ্বারা পরিবর্তন করে নিয়েছে। غَبن অর্থ নোকসান ও ক্ষতি। অর্থাৎ, নোকসানের দিন। সেদিন কাফেরদের তো নোকসানের অনুভূতি হবেই, ঈমানদাররাও এই দিক দিয়ে নোকসান অনুভব করবেন যে, তাঁরা আরো অধিক সৎকর্ম করে আরো বেশী মর্যাদা কেন অর্জন করলেন না।

আত-তাগাবুন 64:10

আর যারা কুফরী করবে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ ঐ প্রত্যাবর্তনস্থল!

আত-তাগাবুন 64:11

আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন বিপদই আপতিত হয় না।[১] আর যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন।[২] আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [১] অর্থাৎ, প্রত্যেক বিপদই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং তাঁরই ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এই আয়াত অবতীর্ণের কারণ হল কাফেরদের এই উক্তি, যদি মুসলমানরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে দুনিয়াতে কোন বালা-মুসীবত তাদের উপর আসত না। (ফাতহুল ক্বাদীর) [২] অর্থাৎ, সে জেনে নেয় যে, তার উপর যে বিপদই এসেছে, তা আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তাঁর নির্দেশে এসেছে। ফলে সে ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তার অন্তরে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে দেন। ফলে সে জেনে যায় যে, তার উপর যে বিপদ আসার আছে, তা টলতে পারে না এবং যা তার উপর আসার নয়, তা আসতে পারে না।(ইবনে কাসীর)

আত-তাগাবুন 64:12

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য কর। কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমার রসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা। [১] [১] অর্থাৎ, আমার রসূলের তাতে কিছু এসে যাবে না। কেননা, তাঁর কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন, আল্লাহর কাজ রসূল প্রেরণ করা। আর রসূলের কাজ পৌঁছে দেওয়া। মানুষের কাজ তা মান্য করা। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আত-তাগাবুন 64:13

আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং বিশ্বাসীরা যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে।[১] [১] অর্থাৎ, সমস্ত বিষয় তাঁকেই সোপর্দ করে, তাঁরই উপর ভরসা করে এবং শুধুমাত্র তাঁরই কাছে প্রার্থনা ও আশ্রয় কামনা করে। কেননা, তিনি ব্যতীত কেউ প্রয়োজন পূরণকারীও নেই এবং মুসীবত দূরকারীও নেই। (বিপত্তারণ ও পতিতপাবন একমাত্র তিনিই।)

আত-তাগাবুন 64:14

হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু,[১] অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো।[২] আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [৩] [১] অর্থাৎ, যারা তোমাদের নেক কাজ ও আনুগত্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে, জেনে নিও তারা তোমার কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী নয়, বরং শত্রু। [২] অর্থাৎ, তুমি তাদের পিছনে পড়ো না, বরং তাদেরকে তোমার পিছনে লাগাও, যাতে তারাও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে নেয়। তুমি তাদের পিছনে পড়ে নিজের পরিণাম মন্দ করো না। [৩] এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয় যে, মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে মদীনা আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারণ, তখন হিজরত করার নির্দেশ বড়ই তাকীদের সাথে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিরা হিজরতের পথে বাধা সৃষ্টি করে তাঁদেরকে হিজরত করতে দিল না। পরে যখন তাঁরা রসূল (সাঃ)-এর নিকট এসে পড়লেন, তখন দেখলেন যে, তাঁদের পূর্বে আসা লোকেরা ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছুই শিখে নিয়েছেন। তখন তাঁরা তাঁদের সেই স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের প্রতি রাগাম্বিত হলেন, যারা তাঁদেরকে হিজরত করতে বাধা দিয়েছিল। সুতরাং তাঁরা তাদেরকে সাজা দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাঁদেরকে মার্জনা এবং উপেক্ষা করার কথা শিক্ষা দিলেন। (সুনানে তিরমিযী সূরা তাগাবুনের তাফসীর পরিচ্ছেদ)

আত-তাগাবুন 64:15

তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ।[১] আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার।[২] [১] যারা তোমাদেরকে হারাম উপার্জন করতে প্ররোচিত করে এবং আল্লাহর অধিকার আদায় করতে বাধা দেয়। আর এই পরীক্ষায় তোমরা তখনই সফল হতে পারবে, যখন আল্লাহর অবাধ্যাচরণে তাদের আনুগত্য করবে না। অর্থাৎ, মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর নিয়ামতও বটে এবং তা মানুষের পরীক্ষার মাধ্যমও বটে। আল্লাহ দেখতে চান যে, তাঁর অনুগত কে এবং অবাধ্য কে? [২] অর্থাৎ, সেই ব্যক্তির জন্য, যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততির ভালবাসার মোকাবেলায় আল্লাহর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয় এবং তাঁর অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত থাকে।

আত-তাগাবুন 64:16

তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর[১] ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে।[২] আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম। [১] অর্থাৎ, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের কথাগুলোকে মনোযোগ ও ধ্যান দিয়ে শোনো এবং তার উপর আমল কর। কেননা, কেবল শুনে নেওয়া কোন উপকারে আসবে না, যতক্ষণ না আমল হবে। [২] خَيْرًا أَيْ: إِنْفَاقًا خَيْرًا، يَكُن الإِنْفَاقُ خَيْرًا 'ব্যয় কর' শব্দটি ব্যাপকার্থবোধক শব্দ, যা ওয়াজেব ও নফল উভয় প্রকার সাদাকাই শামিল।

আত-তাগাবুন 64:17

যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর,[১] তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। [২] আর আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল।[৩] [১] অর্থাৎ, খালেস নিয়তে (আন্তরিকতার সাথে) এবং সন্তুষ্ট মনে যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর। (তাহলে তা তোমাদের বৃথা যাবে না। বরং তা ঋণের মত পরিশোধ করা হবে।) [২] অর্থাৎ, তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে পরিশোধ করার সাথে সাথে তিনি তোমাদের গোনাহসমূহকেও মার্জনা করে দেবেন। [৩] তিনি গুণগ্রাহীঃ তিনি তাঁর অনুগতদেরকে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً বহুগুণ সওয়াব দানে ধন্য করেন। তিনি সহনশীলঃ তিনি অবাধ্যদেরকে সত্বর পাকড়াও করেন না।

আত-তাগাবুন 64:18

তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

আত-তালাক 65:1

হে নবী! (তোমার উম্মতকে বল,) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর[১] তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে,[২] ইদ্দতের হিসাব রেখো[৩] এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিষ্কার করো না[৪] এবং তারা নিজেও যেন বের না হয়; [৫] যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।[৬] এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। আর যে আল্লাহর সীমা লংঘন করে, সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।[৭] তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন উপায় করে দেবেন।[৮] [১] নবী করীম (সাঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কারণে। নচেৎ এই নির্দেশ উম্মতকে দেওয়া হচ্ছে। অথবা সম্বোধন তাঁকেই করা হয়েছে এবং বহুবচন ক্রিয়া তাঁর সম্মানার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আর উম্মতের জন্য তো তাঁর আদর্শই যথেষ্ট। طَلَّقْتُمْ এর অর্থ হল, যখন তালাক দেওয়ার পাকা ইচ্ছা করে নিবে। (ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা।)[২] এতে তালাক দেওয়ার তরীকা ও তার সময় উল্লেখ করা হয়েছে। لِعِدَّتِهِنَّ তে 'লাম' অক্ষরটি 'তাওক্বীত' (সময় নির্ণয়) এর জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, لأَوَّلِ অথবা لاسْتِقْبَالِ عِدَّتِهِنَّ (ইদ্দতের শুরুতে) তালাক দাও। অর্থাৎ, যখন মহিলা ঋতু (মাসিক) থেকে পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তার সাথে আর সহবাস না করেই তালাক দাও। পবিত্র অবস্থা হল তার ইদ্দতের শুরু। এর অর্থ হল, মাসিক অবস্থায় অথবা পবিত্র অবস্থায় সহবাস করার পর তালাক দেওয়া ভুল তরীকা। এটাকেই ফিকাহ শাস্ত্রের পন্ডিতগণ 'বিদয়ী তালাক' এবং পূর্বের (সঠিক) তরীকাকে 'সুন্নী তালাক' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর সমর্থন হাদীসেও পাওয়া যায়; ইবনে উমার (রাঃ) মাসিক অবস্থায় তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। এতে রসূল (সাঃ) রাগান্বিত হন এবং তাঁকে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে বলার সাথে সাথে পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর এর সমর্থনে তিনি এই আয়াতকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করেন। (বুখারীঃ তালাক অধ্যায়) তবে মাসিক অবস্থায় দেওয়া তালাকও বিদআত হওয়া সত্ত্বেও তা তালাক বলে গণ্য হবে। মুহাদ্দিসগণের এবং অধিকাংশ আলেমগণের এটাই উক্তি। অবশ্য ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বিদয়ী তালাককে তালাক গণ্য করেননি। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ নাইলুল আওতার, তালাক অধ্যায়, পরিচ্ছেদ, মাসিক ও পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া নিষেধ। এ ছাড়া অন্যান্য হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থও দেখুন।)[৩] অর্থাৎ, এর প্রথম ও শেষটার খেয়াল রাখ, যাতে স্ত্রী এর পর দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। অথবা তোমরাই যদি রুজু' (প্রত্যাহার) করতে (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে) চাও, তবে (প্রথম এবং দ্বিতীয় তালাকের পর) ইদ্দতের ভিতরেই যেন রুজু' করতে পার[৪] অর্থাৎ, তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীকে নিজ ঘর থেকে বের করে দিও না, বরং ইদ্দত পর্যন্ত তাকে তোমাদেরই ঘরে থাকতে দাও। ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত তার বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তোমাদের উপরেই থাকবে।[৫] অর্থাৎ, ইদ্দতের দিনগুলোতে স্ত্রীও যেন ঘর হতে বের হওয়া থেকে বিরত থাকে। তবে যদি একান্ত কোন জরুরী কাজে বের হতে হয় তবে সে কথা ভিন্ন।[৬] অর্থাৎ, ব্যভিচার, মুখ-খিস্তি, গালাগালি, ঝগড়া বা চরম অভদ্রতা প্রদর্শন করলে, যা থেকে ঘরের লোকদের কষ্ট হয়। এই অবস্থায় তাকে (বাড়ি থেকে) বের করা জায়েয হবে।[৭] অর্থাৎ, উল্লিখিত সমূহ বিধান হল আল্লাহর কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা। যা অতিক্রম করা নিজের উপর যুলুম করার নামান্তর। কেননা, এই সীমালঙ্ঘনের যাবতীয় ক্ষতি ভোগ করতে হবে সীমালঙ্ঘনকারী নিজেকেই।[৮] অর্থাৎ, পুরুষের অন্তরে তালাকপ্রাপ্তা মহিলার প্রতি চাহিদা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেবেন ফলে সে রুজু করার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে যাবে। কেননা, প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের পর স্বামী ইদ্দতের ভিতরেই ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে। এই জন্য কোন কোন মুফাসসিরদের মত হল, এই আয়াতে আল্লাহ কেবল এক তালাক দেওয়ার আদেশ করেছেন এবং এক সাথে তিন তালাক দিতে নিষেধ করেছেন। কেননা, সে যেদি একই সময়ে তিন তালাক দিয়ে দেয় (আর শরীয়ত যদি তার এই তালাককে বৈধ গণ্য করে কার্যকরী করে দেয়), তবে এ কথা বলার কি কোন অর্থ হবে যে, 'হয়তো আল্লাহ কোন নতুন উপায় বের করে দেবেন।' (ফাতহুল ক্বাদীর) এটাকেই দলীল বানিয়ে ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য উলামাগণ বলেছেন যে, বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের উপর যে তাকীদ করা হয়েছে, তা কেবল সেই মহিলাদের জন্য, যাদেরকে তাদের স্বামীরা প্রথম অথবা দ্বিতীয় তালাক দিয়েছে। কেননা, এতে স্বামীর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার অবশিষ্ট থাকে। আর যে মহিলাকে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে দুই তালাক দেওয়া হয়ে গেছে, তৃতীয় তালাক তার জন্য তালাকে 'বাত্তাহ' অথবা 'বায়েনাহ' (কুবরা; যার পর আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না) গণ্য হবে। তার বাসস্থান এবং ভরণ-পোষণ স্বামীর দায়িত্বে থাকে না। তাকে সত্বর স্বামীর ঘর থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হবে। কেননা, স্বামী আর তাকে ফিরিয়ে নিয়ে তার সাথে সংসার করতে পারে না। ﴿حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ﴾ "যে পর্যন্ত না স্ত্রী কোন অন্য পুরুষকে বিবাহ করেছে।" (অতঃপর সে স্বামী তালাক দিয়েছে বা মারা গেছে তারপর তাকে পুনর্বিবাহ করেছে।) এই জন্য এই স্ত্রীর আর তার স্বামীর কাছে থাকার এবং তার কাছ থেকে খোরপোশ আদায় করার অধিকার থাকে না। এর সমর্থন ফাতিমা বিনতে ক্বাইস (রাঃ) র ঘটনা থেকেও হয় যে, যখন তাঁর স্বামী তাঁকে তৃতীয় তালাকও দিয়ে দিলেন এবং তাঁকে স্বামীর ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য বলা হলে তিনি বের হতে চাইলেন না। পরিশেষে বিষয়টা রসূল (সাঃ)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি ফায়সালা করলেন যে, তাঁর বাসস্থান ও ভরণ-পোষণ নেই। তাকে সত্বর কোন অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়া উচিত। এমন কি কোন কোন বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে এসেছে যে, (إِنَّمَا النَّفَقَةُ وَالسُّكْنَى لِلْمَرْأَةِ عَلَى زَوْجِهَا مَا كَانَتْ لَهُ عَلَيْهَا رَجْعَةٌ) অর্থাৎ, ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান কেবল সেই মহিলার জন্য আছে, যাকে ফিরিয়ে নেওয়া তার স্বামীর অধিকারে আছে। (আহমাদ, নাসাঈ) অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় গর্ভবতী মহিলার জন্যেও বাসস্থান ও খোরপোশের কথার উল্লেখ রয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য নাইলুল আওতার দ্রষ্টব্যঃ) কেউ কেউ এই বর্ণনাগুলোকে কুরআনের উল্লিখিত ﴿لاَ تُخْرِجُوْهُنَّ مِنْ بُيُوْتِهِنَّ﴾ (তোমরা তাদেরকে তাদের ঘর হতে বের করে দিও না) এই নির্দেশের পরিপন্থী মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করেন, যা সঠিক নয়। কেননা, কুরআনের আয়াত তার পূর্বাপর প্রাসঙ্গিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত নির্দেশ রজয়ী তালাক (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে) প্রাপ্তা মহিলার ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে। আর যদি এটাকে ব্যাপক ধরে নেওয়াও যায়, তবে হাদীসের এই বর্ণনাগুলো তার নির্দিষ্টকারী হবে। অর্থাৎ, কুরআনের সাধারণ নির্দেশকে হাদীসের এই বর্ণনাগুলো রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা মহিলার জন্য নির্দিষ্ট করে দিল এবং 'বায়েনাহ' তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে উক্ত সাধারণ হুকুমের আওতা থেকে বের করে নিল।

আত-তালাক 65:2

তাদের ইদ্দত পূরণের কাল আসন্ন হলে তোমরা হয় যথাবিধি তাদেরকে রেখে নাও, না হয় তোমরা তাদেরকে যথাবিধি পরিত্যাগ কর[১] এবং তোমাদের মধ্য হতে দুই জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখ;[২] তোমরা আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দাও।[৩] এটা দ্বারা তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, তাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। [৪] [১] স্বামীর সম্পর্ক কায়েম হয়েছে (যার সাথে সহবাস করা হয়েছে) এমন তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ইদ্দত হল তিন মাসিক পর্যন্ত। যদি ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা হয়, তবে ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই ফিরিয়ে নাও, অন্যথা যথানিয়মে তাকে নিজের কাছ থেকে বিদায় করে দাও। [২] রুজু, প্রত্যাহার বা ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে এবং কোন কোন উলামার নিকট তালাকের ব্যাপারে সাক্ষী রেখে নাও। তবে এই আদেশ ওয়াজেবের জন্য নয়, বরং 'ইস্তিহবাব' এর জন্য। অর্থাৎ, সাক্ষী রেখে নেওয়া ভাল, কিন্তু জরুরী নয়। [৩] এই তাকীদ সাক্ষীদের প্রতি। তারা যেন কারো কোন পরোয়া না করে ও কোন লোভে না পড়ে সঠিক সঠিক সাক্ষ্য দেয়। [৪] অর্থাৎ, যাবতীয় কঠিন সমস্যা ও পরীক্ষা থেকে নিষ্কৃতি লাভের উপায় বের করে দেবেন।

আত-তালাক 65:3

এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করবে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই।[১] আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। [২] [১] অর্থাৎ, তিনি যা করতে চান, তা থেকে তাঁকে কেউ বাধা দিতে পারে না। [২] কষ্টসাধ্য ও সহজসাধ্য সকল কর্মের জন্যই। নির্ধারিত সময়েই উভয় (সহজ ও কঠিন) জিনিসেরই পরিসমাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, মাসিক ও ইদ্দত।

আত-তালাক 65:4

তোমাদের যেসব স্ত্রীদের মাসিক হবার আশা নেই, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যাদের এখনো মাসিক হয়নি তাদেরও।[১] আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।[২] আল্লাহকে যে ভয় করবে, তিনি তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেবেন। [১] এ হল সেই মহিলাদের ইদ্দত, যাদের বার্ধক্যের কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে অথবা যাদের এখনোও মাসিক আরম্ভ হয়নি। জ্ঞাতব্য যে, বিরল হলেও এমনও হয় যে, মেয়ে সাবালিকা হয়ে যায়, অথচ তার মাসিক আসে না।[২] তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যদি গর্ভবতী হয়, তবে তার ইদ্দত হল সন্তান প্রসব করা সময় পর্যন্ত, যদিও সে তালাকের দ্বিতীয় দিনে প্রসব করে তবুও। এ ছাড়া আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক গর্ভবতীর ইদ্দত এটাই; তাতে সে তালাকপ্রাপ্তা হোক অথবা তার স্বামীর মৃত্যু হয়ে থাকুক। বহু হাদীস থেকেও এর সমর্থন হয়। (আরো জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য সুনান গ্রন্থসমূহের তালাক অধ্যায়) গর্ভবতী ছাড়া অন্যান্য যে মহিলাদের স্বামী মৃত্যু বরণ করবে, তাদের ইদ্দত হল ৪ মাস ১০ দিন। (সূরা বাক্বারাহ ২:২৩৪ নং আয়াত)

আত-তালাক 65:5

এটা আল্লাহর বিধান, যা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। আর আল্লাহকে যে ভয় করবে, তিনি তার পাপরাশি মোচন করবেন এবং তাকে দেবেন মহাপুরস্কার।

আত-তালাক 65:6

তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে স্থানে বাস কর, তাদেরকেও সে স্থানে বাস করতে দাও।[১] সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করো না।[২] তারা গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য ব্যয় কর।[৩] অতঃপর যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তাহলে তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক প্রদান কর।[৪] (সন্তানের কল্যাণ সম্পর্কে) তোমরা সঙ্গতভাবে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ কর।[৫] তোমরা যদি নিজ নিজ দাবীতে অনমনীয় হও, তাহলে অন্য নারী তার পক্ষে স্তন্য দান করবে। [৬] [১] অর্থাৎ, রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদেরকে (যাদেরকে তালাক দেওয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ থাকে)। কারণ, 'বায়েনাহ তালাকপ্রাপ্তা' (যাদেরকে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না সেই মহিলা)-দের জন্য বাসস্থান এবং ভরণপোষণ জরুরী নয়। এ কথা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। 'সামর্থ্য অনুযায়ী --- বাস করতে দাও' এর অর্থ হল, যদি বাড়ী এমন প্রশস্ত হয় যাতে কয়েকটি কামরা আছে, তাহলে একটি কামরা নির্দিষ্ট করে দাও। অন্যথা নিজের কামরা তার জন্য খালি করে দাও। এতে যে যৌক্তিকতা ও কৌশলগত দিক রয়েছে তা হল এই যে, যখন সে কাছে থেকে ইদ্দত পালন করবে, তখন হতে পারে স্বামীর অন্তরে দয়া (প্রেম বা যৌনকামনা) সৃষ্টি হবে এবং 'রুজু' করার (ফিরিয়ে নেওয়ার) উৎসাহ তার অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যাবে। বিশেষ করে যদি সন্তানাদি থাকে, তবে ফিরিয়ে নেওয়ার উৎসাহ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অতি প্রবল থাকে। কিন্তু অনুতাপের বিষয় যে, বহু মুসলিম এই নির্দেশ অনুযায়ী আমল করে না। যার কারণে এই নির্দেশের উপকারিতা থেকে এবং তার কৌশলগত সুফল হতে সে বঞ্চিত হয়। আমাদের সমাজে তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই মহিলাকে অচ্ছুত (অস্পৃশ্য) বানিয়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয় (অথবা মহিলা নিজেই দুঃখে অথবা ক্ষোভে গৃহত্যাগ করে) অথবা কখনো মেয়ের পক্ষের কেউ এসে তাকে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। বলাই বাহুল্য যে, এই প্রচলন কুরআন কারীমের স্পষ্ট শিক্ষার পরিপন্থী। [২] অর্থাৎ, খোরপোশ অথবা বাসস্থানের ব্যাপারে তাদের উপর সংকীর্ণতা সৃষ্টি করা এবং তাদের মানহানি করা, যাতে তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। ইদ্দতের মধ্যে এ রকম আচরণ যেন না করা হয়। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, ইদ্দত শেষ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পর্যায়ে তোমরা আবার 'রুজু' করে (ফিরিয়ে) নাও এবং বারংবার এ রকম কর। যেমন, জাহেলিয়াতের যুগে ছিল। সুতরাং সে পথ বন্ধ করার জন্য শরীয়ত তালাক দেওয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে দিল। যাতে আগামীতে কেউ এইভাবে মহিলার উপর সংকীর্ণতার সৃষ্টি না করে। এখন একজন কেবল দু'বার এ রকম করতে পারে। অর্থাৎ, তালাক দিয়ে ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু তৃতীয়বার আবার তালাক দিলে, তার ফিরিয়ে নেওয়ার মোটেই অধিকার থাকবে না। [৩] অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যদি গর্ভবতী হয়, তবে তার ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান দেওয়া জরুরী, যদিও এ তালাক 'বায়েনাহ' (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না তা) হয়। এ কথা পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে। [৪] অর্থাৎ, তালাক দেওয়ার পর তারা যদি তোমাদের শিশুদেরকে দুধ পান করায়, তাহলে তার পারিশ্রমিক তোমাদেরকেই দিতে হবে। (তখন 'সম্পর্ক নেই বলে কোন অর্থ ব্যয় করব না' বলা চলবে না।) [৫] অর্থাৎ, আপোসে পরামর্শ করে পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সমস্ত বিষয় ঠিক করে নেবে। যেমন, শিশুর বাপ প্রচলিত নিয়মে পারিশ্রমিক দেবে এবং বাপের সামর্থ্য অনুযায়ী মা তার পারিশ্রমিক চাইবে ইত্যাদি। [৬] অর্থাৎ, পারিশ্রমিক ইত্যাদির ব্যাপারে যদি তাদের আপোসে মতের মিল না হয়, তবে অন্য কোন দুধ দানকারিণী মহিলার সাথে চুক্তি করে নেবে। সে তার শিশুকে দুধ পান করাবে।

আত-তালাক 65:7

সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে[১] এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত,[২] সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন, তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না।[৩] আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন। [৪] [১] অর্থাৎ, দুগ্ধদাত্রী মহিলাদেরকে পারিশ্রমিক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে। আল্লাহ যদি মাল-ধনে প্রাচুর্য দিয়ে থাকেন, তবে এই প্রাচুর্য অনুযায়ী দুগ্ধদাত্রীকে প্রচুর পারিতোষিক দেওয়া কর্তব্য। [২] অর্থাৎ, আর্থিক দিক দিয়ে যে দুর্বল। [৩] এই জন্য তিনি দরিদ্র ও দুর্বলকে এই নির্দেশ দেন না যে, তারা দুধ দানকারিণীকে বেশী বেশী পারিশ্রমিক দিক। এই নির্দেশাবলীর উদ্দেশ্য হল, শিশুর পিতা-মাতার উচিত এমন পন্থা অবলম্বন করা, যা উভয়ের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তারা যেন একে অপরকে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা না করে এবং তার ফলে শিশুর দুধ পানের ব্যাপারটা যেন জটিল হয়ে না দাঁড়ায়। এই জন্য মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,﴿لا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلا مَوْلُودٌ لَهُ بِوَلَدِهِ﴾ "মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং তাকেও না যার সন্তান।" (সূরা বাক্বারাহ ২:২৩৩ আয়াত) [৪] সুতরাং যারা আল্লাহর উপর আস্থা ও ভরসা রাখে, মহান আল্লাহ তাদেরকে স্বস্তি ও প্রশস্ততা দানে ধন্য করেন।

আত-তালাক 65:8

কত জনপদ দম্ভভরে তাদের প্রতিপালকের ও তাঁর রসূলদের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল,[১] ফলে আমি তাদের নিকট হতে কঠোর হিসাব নিয়েছিলাম এবং তাদেরকে দিয়েছিলাম কঠিন শাস্তি।[২] [১] عَتَت অর্থাৎ, বিদ্রোহ, বিরুদ্ধাচরণ, ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতা প্রদর্শন করেছিল। [২] نُكْرًا، مُنْكَرًا فَظِيْعًا অর্থাৎ, কঠিন ও ভীষণ। হিসাব ও আযাব বলতে পার্থিব পাকড়াও ও শাস্তি। অথবা কারো কারো কথা অনুযায়ী বাক্যকে আগে-পিছে করা হয়েছে। عَذَابًا نُكْرًا সেই আযাব, যা দুনিয়াতে অনাবৃষ্টি, ভূমিধস ও আকৃতি-বিকৃতি ইত্যাদির আকারে তাদের উপর এসেছে। আর حِسَابًا شَدِيْدًا যেটা আখেরাতে হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আত-তালাক 65:9

অতঃপর তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করল, আর ক্ষতিই ছিল তাদের কর্মের পরিণাম।

আত-তালাক 65:10

আল্লাহ তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন উপদেশ।

আত-তালাক 65:11

(প্রেরণ করেছেন) এমন এক রসূল,[১] যে তোমাদের নিকট আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করে, যাতে যারা বিশ্বাসী ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকে বের করে আনে।[২] যে কেউ আল্লাহকে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে,[৩] তিনি তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাকে উত্তম রুযী দান করবেন। [১] رَسُول শব্দটি ذِكْر শব্দের বদল বা তার পরিবর্ত স্বরূপ ব্যবহার হয়েছে। 'মুবালাগা' তথা আধিক্য বুঝানোর জন্য রসূলকে যিকর (উপদেশ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন عَدل মানে ন্যায়পরায়ণতার মূর্তপ্রতীক (তেমনি ذِكر মানে উপদেশের মূর্তপ্রতীক)। অথবা ذِكْر অর্থ কুরআন এবং رسولًا এর পূর্বে أَرسَلْنَا ক্রিয়াপদ ঊহ্য মেনে নিতে হবে। অর্থ দাঁড়াবে, অবতীর্ণ করেছেন উপদেশ (কুরআন) এবং প্রেরণ করেছেন এক রসূল। [২] এখানে রসূলের মর্যাদা ও তাঁর দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, তিনি কুরআনের মাধ্যমে নৈতিকতার অধঃপতন এবং শিরক ও ভ্রষ্টতার অন্ধকার থেকে বের করে ঈমান ও নেক আমলের জ্যোতির দিকে নিয়ে এসেছেন। আর রসূল বলতে এখানে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। [৩] নেক আমলের মধ্যে দু'টি জিনিস শামিল থাকে। যথা, আদেশাবলী ও যাবতীয় ফরয কাজগুলো আদায় করা এবং সকল প্রকার অবাধ্যতা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ, জান্নাতে কেবল সেই ঈমানদাররাই প্রবেশ করবেন, যাঁরা শুধুমাত্র মৌখিকভাবেই ঈমানের দাবী করেননি, বরং তাঁরা ঈমানের দাবীসমূহ অনুযায়ী ফরয কাজগুলো আদায় করেছেন এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকেছেন।

আত-তালাক 65:12

আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও অনুরূপ,[১] ওগুলোর মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ,[২] যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, অবশ্যই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। [৩] [১] أَيْ: خَلَقَ مِنَ الأَرْضِ مِثْلَهُنَّ সাত আসমানের ন্যায় সাত যমীনও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, সাতটি প্রদেশ। তবে এ কথা ঠিক নয়। বরং যেভাবে উপর্যুপরি সাতটি আসমান রয়েছে, অনুরূপ সাতটি যমীনও রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দূরত্ব ও ব্যবধানও আছে এবং প্রত্যেক যমীনে আল্লাহর সৃষ্টি আবাদ রয়েছে। (ক্বুরত্ববী) বহু হাদীস দ্বারা এ কথার সমর্থনও হয়। যেমন, নবী (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি যুলুম করে বিঘত পরিমাণ যমীন আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক যমীনকে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।" (মুসলিম, বাণিজ্য অধ্যায়, যুলুম করা হারাম পরিচ্ছেদ) সহীহ বুখারীর শব্দাবলী হল, (خُسِفَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ) "কিয়ামতের দিন তাকে সপ্ত যমীনের নীচ পর্যন্ত ধসিয়ে দেওয়া হবে। (বুখারী, মাযালিম অধ্যায়, যমীন আত্মসাৎ করার পাপ পরিচ্ছেদ) কেউ কেউ এটাও বলেন যে, প্রত্যেক যমীনে ঐ রকমই পয়গম্বর রয়েছেন, যে রকম পয়গম্বর তোমাদের যমীনে এসেছেন। যেমন, আদমের মত আদম, নূহের মত নূহ। ইবরাহীমের মত ইবরাহীম। ঈসার মত ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)। কিন্তু এ কথা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। [২] যেভাবে, প্রত্যেক আসমানে আল্লাহর বিধান কার্যকরী ও বলবৎ আছে, অনুরূপ প্রত্যেক যমীনে তাঁর নির্দেশ চলে। সপ্ত আকাশের মত সপ্ত পৃথিবীর পরিচালনাও তিনিই করেন। [৩] অতএব কোন জিনিস তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়, চাহে তা যেমনই হোক না কেন।

আত-তাহরীম 66:1

হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন, তুমি তা অবৈধ করছ কেন?[১] তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছ? আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] নবী করীম (সাঃ) যে জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন তা কি ছিল? যার কারণে মহান আল্লাহ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে, যা সহীহ বুখারী ও মুসলিম ইত্যাদিতে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনা হল, তিনি যয়নাব বিনতে জাহশ্ (রাঃ)র কাছে কিছুক্ষণ থাকতেন এবং সেখানে মধু পান করতেন। হাফসা এবং আয়েশা (রায্বিয়াল্লাহু আনহুমা) স্বাভাবিকতার অধিক সময় তাঁর সেখানে থাকার পথ বন্ধ করার জন্য ফন্দি আঁটলেন যে, তাঁদের কারো কাছে যখন তিনি আসবেন, তখন তাঁরা বলবেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি 'মাগাফীর' খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে 'মাগাফীর'এর গন্ধ আসছে। ('মাগাফীর' এক প্রকার গাছের মিষ্ট আঠা, যা খেলে মুখে এক প্রকার গন্ধ সৃষ্টি হয়।) সুতরাং তাঁরা পরিকল্পনা অনুযায়ী তা-ই করলেন। উত্তরে তিনি বললেন, "আমি তো যয়নাবের ঘরে কেবল মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনও তা পান করব না। তবে এ কথা তোমরা অন্য কাউকে বলো না।" (বুখারীঃ সূরা তাহরীমের তফসীর) সুনানে নাসাঈর বর্ণনায় এসেছে যে, তা ছিল একটি ক্রীতদাসী যাকে তিনি নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। (সুনানে নাসায়ী ৩/৮৩) পক্ষান্তরে কিছু অন্য আলেমগণ নাসাঈর এ বর্ণনাকে দুর্বল গণ্য করেছেন। এর বিশদ বর্ণনা অন্যান্য কিতাবে এইভাবে এসেছে যে, তিনি ছিলেন মারিয়া ক্বিবত্বিয়া (রাঃ)। যাঁর গর্ভে নবী করীম (সাঃ)-এর পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একদা হাফসা (রাঃ) র ঘরে এসেছিলেন। তখন হাফসা (রাঃ) ঘরে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের (নবী (সাঃ) ও মারিয়া ক্বিবত্বিয়ার) উপস্থিতিতেই হাফসা (রাঃ) এসে যান। তাঁকে নবী (সাঃ)-এর সাথে নিজের ঘরে নির্জনে দেখে তিনি বড়ই নাখোশ হলেন। নবী (সাঃ)ও এ কথা অনুভব করলেন এবং তিনি হাফসা (রাঃ) কে খোশ করার জন্য কসম খেয়ে মারিয়া ক্বিবত্বিয়া (রাঃ) কে নিজের উপর হারাম করে নিলেন। আর হাফসা (রাঃ) কে তাকীদ করলেন যে, তিনি যেন এ কথা অন্য কাউকে না বলেন। ইমাম ইবনে হাজার প্রথমতঃ বলেন যে, এ ঘটনা বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যা একে অপরকে বলিষ্ঠ করে। দ্বিতীয়তঃ তিনি বলেন যে, হতে পারে একই সময়ে উভয় ঘটনাই এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হয়েছে। (ফাতহুল বারী, সূরা তাহরীমের তাফসীর) ইমাম শওকানীও এ কথার সমর্থন করে উভয় ঘটনাকে সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন। এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আল্লাহর হালাল করা জিনিসকে হারাম করার অধিকার কারো নেই। এমন কি রসূল (সাঃ)-এরও ছিল না।

আত-তাহরীম 66:2

আল্লাহ তোমাদের শপথ হতে অব্যাহতি লাভের ব্যবস্থা করেছেন,[১] আল্লাহ তোমাদের সহায় এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [১] অর্থাৎ, কাফফারা আদায় করে সেই কাজ করার অনুমতি দিলেন, যে কাজ না করার জন্য তিনি কসম খেয়েছিলেন। কসমের এই কাফফারা সূরা মায়েদা ৫:৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তাই নবী (সাঃ)ও কাফফারা আদায় করলেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে যে, কেউ যদি কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তাহলে তার বিধান কি? কোন কোন উলামার নিকট স্ত্রী ছাড়া কোন জিনিসকে হারাম করে নিলে, না সে জিনিস হারাম হবে, আর না তার কাফফারা আদায় করতে হবে। (কিন্তু আলোচ্য আয়াত তাঁদের বিপক্ষে দলীল। যেহেতু এখানে মধু হারাম করার পর কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।) পক্ষান্তরে যদি স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নেয় এবং এতে যদি তার উদ্দেশ্য তালাক হয়, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আর যদি তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে সঠিক উক্তি অনুযায়ী এটা কসম হবে এবং কসমের কাফফারা আদায় করা তার উপর জরুরী হবে। (আইসারুত তাফাসীর)

আত-তাহরীম 66:3

(স্মরণ কর,) নবী তাঁর স্ত্রীদের একজনকে গোপনে কিছু বলেছিলেন। [১] অতঃপর যখন সে তা অন্যকে বলে দিয়েছিল[২] এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তখন নবী এ বিষয়ে কিছু ব্যক্ত করল এবং কিছু অব্যক্ত রাখল,[৩] যখন নবী তা তার সেই স্ত্রীকে জানাল, তখন সে বলল, ‘কে আপনাকে এটা অবহিত করল?’[৪] নবী বলল, ‘আমাকে অবহিত করেছেন তিনি, যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ [৫] [১] সেই গোপন কথা ছিল মধু অথবা মারিয়া (রাঃ) কে হারাম করে নেওয়ার কথা যা তিনি (সাঃ) হাফসা (রাঃ) কে বলেছিলেন। [২] অর্থাৎ, হাফসা (রাঃ) সে কথা আয়েশা (রাঃ)র কাছে গিয়ে বলে দিলেন। [৩] অর্থাৎ, হাফসা (রাঃ) কে বললেন যে, তুমি আমার গোপন কথা প্রকাশ করে দিয়েছ। তবে স্বীয় সম্মান ও মহত্ত্বের দিকে লক্ষ্য করে সমস্ত কথা খুলে বললেন না। [৪] যখন নবী (সাঃ) হাফসাকে বললেন যে, তুমি আমার গোপন কথা প্রকাশ করে দিয়েছ, তখন তিনি (হাফসা) আশ্চর্যান্বিতা হলেন। কারণ, তিনি আয়েশা (রাঃ) ব্যতীত অন্য কাউকেও এ কথা বলেননি এবং আয়েশা (রাঃ) যে এ কথা রসূল (সাঃ)-কে বলে দেবেন সে আশঙ্কাও তাঁর ছিল না। কেননা, তিনিও এই (ফন্দি আঁটার) কাজে তাঁর শরীক ছিলেন। [৫] এ থেকে বুঝা যায় যে, কুরআন ছাড়া অন্য বিষয়ের অহীও তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। (আরো বুঝা যায় যে, তিনি গায়বের খবর জানতেন না।)

আত-তাহরীম 66:4

যদি তোমরা উভয়ে (অনুতপ্ত হয়ে) আল্লাহর নিকট তওবা কর, তাহলে (আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন),[১] নিশ্চয় তোমাদের হৃদয় ঝুঁকে পড়েছে।[২] কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পৃষ্ঠপোষকতা (সাহায্য) কর, তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহই তার বন্ধু এবং জিবরীল ও সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীগণও, এ ছাড়া ফিরিশতাগণও তার সাহায্যকারী। [৩] [১] অথবা তোমাদের তওবা কবুল করে নেওয়া হবে। এখানে শর্ত (إِنْ تَتُوْبَا) এর জওয়াব ঊহ্য আছে। [২] অর্থাৎ, সত্য থেকে সরে গেছে। আর তা হল, তাঁদের এমন জিনিস পছন্দ করা, যা ছিল নবী (সাঃ)-এর কাছে অপছন্দনীয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) [৩] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-এর ব্যাপারে তোমরা ঐক্যবদ্ধ হলেও তাঁর কিছুই বিগড়ে যাবে না। কারণ, তাঁর সাহায্যকারী (মওলা) তো আল্লাহ, মুমিনগণ এবং ফিরিশতাগণও।

আত-তাহরীম 66:5

যদি সে (নবী) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে, তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দেবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্ত্রী;[১] যারা হবে আত্মসমর্পণকারিণী, বিশ্বাসিনী, আনুগত্যশীলা, তওবাকারিণী, উপাসনাকারিণী, রোযা পালনকারিণী, অকুমারী এবং কুমারী। [২] [১] এটা সতর্কতাস্বরূপ নবী (সাঃ)-এর পবিত্রা স্ত্রীদেরকে বলা হচ্ছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে তোমাদের চেয়েও উত্তম স্ত্রী দান করতে পারেন। [২] ثَيِّبَاتٍ শব্দটি হল, ثَيِّبٌ এর বহুবচন। (অর্থ হল ফিরে আসা) অকুমারী পতিহীনা মহিলাকে ثَيِّبٌ এই জন্য বলা হয় যে, সে স্বামী থেকে ফিরে আসে এবং ঐরূপ স্বামীহীনা হয়ে যায়, যেমন সে বিবাহের পূর্বে ছিল। أَبْكَارٌ হল بِكْرٌ এর বহুবচন। অর্থ হল কুমারী মেয়ে। তাকে কুমারী এই জন্য বলা হয় যে, সে এখন পর্যন্ত সেই অবস্থাতেই থাকে, যার উপর তার সৃষ্টি হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, ثَيِّبٌ বলতে আসিয়াহ (ফিরআউনের স্ত্রী)-কে এবং بِكْرٌ বলতে মারয়্যাম (ঈসা (আঃ)-এর মা)-কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জান্নাতে এই উভয় মহিলাকে নবী (সাঃ)-এর স্ত্রী বানিয়ে দেওয়া হবে। এরূপ হতে পারে। কিন্তু এই বর্ণনাগুলোর ভিত্তিতে এ রকম ধারণা পোষণ করা অথবা বর্ণনা করা ঠিক নয়। কেননা, সনদের দিক দিয়ে এই বর্ণনাগুলো নির্ভরযোগ্য নয়।

আত-তাহরীম 66:6

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, [১] যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। [১] এতে মু'মিনদের পালনীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আর তা হল, নিজেদেরকে সংস্কার ও সংশোধন করার সাথে সাথে পরিবারের লোকদেরকেও সংস্কার ও সংশোধন করতে হবে এবং তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা ও তরবিয়ত দেওয়ার প্রতি যত্নবান হতে হবে। যাতে তারা জাহান্নামের জ্বালানী হওয়া থেকে বেঁচে যায়। আর এই কারণেই রসূল (সাঃ) বলেছেন, "শিশুরা যখন সাত বছর বয়সে পৌঁছে যাবে, তখন তাদেরকে নামায পড়ার আদেশ দাও। আর দশ বছর বয়সে পৌঁছে যাওয়ার পর (তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন হলে) তাদেরকে (শিক্ষামূলক) প্রহার কর।" (সুনানে আবূ দাউদ, সুনানে তিরমিযী নামায অধ্যায়) ফক্বীহগণ বলেন, এইভাবে তাদেরকে রোযা রাখারও আদেশ দিতে হবে এবং অন্যান্য শরীয়তী বিধি-বিধানের অনুসরণ করার শিক্ষা তাদেরকে দিতে হবে। যাতে সাবালক হওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে সত্য দ্বীন মানার অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে যায়। (ইবনে কাসীর)

আত-তাহরীম 66:7

হে অবিশ্বাসীগণ! আজ তোমরা দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা যা করতে, তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।

আত-তাহরীম 66:8

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা।[১] সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলোকে মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। সেই দিন আল্লাহ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী দাসদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও ডান পার্শ্বে বিচ্ছুরিত হবে, তারা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর[২] এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয় তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।’ [১] বিশুদ্ধ বা নিষ্ঠাপূর্ণ তওবা হল, (ক) তওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। (খ) যে গুনাহ হতে তওবা করা হচ্ছে, তা সত্বর ত্যাগ করতে হবে। (গ) এই গুনাহ করে ফেলার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। (ঘ) আগামীতে এই গুনাহ 'আর করব না' বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। (ঙ) যদি এই গুনাহের সম্পর্ক কোন বান্দার অধিকারের সাথে হয়, তবে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার সাথে মিটমাট করে নিতে হবে। যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। পক্ষান্তরে কেবল মৌখিক তওবা করার কোন অর্থ হয় না।[২] এই দু'আ মু'মিনরা তখন করবে, যখন মুনাফিকদের জ্যোতি কেড়ে নেওয়া হবে এবং তাদের উপর অন্ধকার নেমে আসবে। এর আলোচনা সূরা হাদীদ ৫৭:১২ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। মু'মিনরা তখন বলবে, জান্নাতে প্রবেশ করা অবধি আমাদের এই জ্যোতিকে অবশিষ্ট রাখ এবং তাতে পূর্ণতা দান কর।

আত-তাহরীম 66:9

হে নবী! অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর[১] এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।[২] তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম, [৩] আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! [১] অর্থাৎ, কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর যুদ্ধের মাধ্যমে এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর তাদের উপর আল্লাহর দন্ডবিধিকে বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে; যদি তারা এমন কাজ করে বসে, যার ফলে দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হয়। [২] অর্থাৎ, দাওয়াত ও তবলীগ এবং শরীয়তের বিধি-বিধানের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন কর। কেননা, লাথির ঢেঁকি চড়ে উঠবে না। এর অর্থ হল, তবলীগের কৌশল কখনো নরম পন্থা অবলম্বন করার দাবী করে এবং কখনো কঠোরতা। প্রত্যেক জায়গাতে নরম পন্থা অবলম্বন করা ফলপ্রসূ নয়; যেমন প্রত্যেক জায়গায় কঠোরতা অবলম্বন করাও উপকারী হয় না। দাওয়াত ও তবলীগের কাজে অবস্থা, পরিস্থিতি এবং কাল-পাত্র-ভেদে কখনো নরম ও কখনো কঠোর পন্থা অবলম্বন করার প্রয়োজন হয়। [৩] অর্থাৎ, কাফের এবং মুনাফিক উভয়েরই ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

আত-তাহরীম 66:10

আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য নূহ ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন; [১] তারা ছিল আমার দাসদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ দাসের অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল,[২] ফলে তারা (নূহ ও লূত) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারল না[৩] এবং তাদেরকে বলা হল, ‘জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর।’[৪] [১] مَثَلٌ (উপমা, উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত) এর অর্থ হল, এমন অবস্থাকে তুলে ধরা, যাতে থাকে বিরলতা ও বিচিত্রতা। যাতে এর দ্বারা অপর আর এক অবস্থার পরিচিতি লাভ হয়, যা বিরলতা ও বিচিত্রতায় তারই মত হয়। অর্থাৎ, এই কাফেরদের অবস্থার জন্য আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তা হল নূহ (আঃ) এবং লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর। [২] এখানে খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা বলতে দাম্পত্যের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, কোন নবীর স্ত্রী ব্যভিচারিণী ছিলেন না। (ফাতহুল ক্বাদীর) খিয়ানত বলতে বুঝানো হয়েছে, এরা তাদের স্বামীদের উপর ঈমান আনেনি। তারা মুনাফিক্বী ও কপটতায় লিপ্ত ছিল এবং নিজেদের কাফের জাতির প্রতি তারা সমবেদনা পোষণ করত। যেমন, নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী নূহ (আঃ)-এর ব্যাপারে লোকদেরকে বলে বেড়াত যে, এ একজন পাগল। আর লূত (আঃ)-এর স্ত্রী তার গোত্রের লোকদেরকে নিজ বাড়ীতে আগত অতিথির সংবাদ পৌঁছে দিত। কেউ কেউ বলেন, এরা উভয়ই তাদের জাতির লোকদের মাঝে নিজ নিজ স্বামীর চুগলি করে বেড়াত। [৩] অর্থাৎ, নূহ (আঃ) এবং লূত (আঃ) তাঁরা উভয়েই ছিলেন আল্লাহর পয়গম্বর, আর পয়গম্বররা আল্লাহর অতি নিকটতম বান্দাদের মধ্যে গণ্য হন, তা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারেননি। [৪] এ কথা তাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হবে অথবা মৃত্যুর সময় তাদেরকে বলা হয়েছে। কাফেরদের এই দৃষ্টান্ত বিশেষ করে এখানে পেশ করার উদ্দেশ্য হল, রসূল (সাঃ)-এর পবিত্রা সহধর্মিনীদেরকে সতর্ক করা যে, অবশ্যই তাঁরা রসূল গৃহের সৌন্দর্য যিনি সমস্ত সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তাঁদের স্মরণে রাখা উচিত যে, যদি তাঁরা রসূলের বিরোধিতা করেন বা তাঁকে কষ্ট দেন, তবে তাঁরাও আল্লাহর কাছে শাস্তি পাবেন। আর যদি এ রকম হয়ে যায়, তাহলে তাঁদেরকে বাঁচাবার মত কেউ থাকবে না।

আত-তাহরীম 66:11

আল্লাহ বিশ্বাসীদের জন্য উপস্থিত করেছেন ফিরআউন পত্নীর দৃষ্টান্ত,[১] যে (প্রার্থনা করে) বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তোমার নিকট জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং আমাকে উদ্ধার কর ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম হতে এবং আমাকে উদ্ধার কর যালেম সম্প্রদায় হতে।’ [১] অর্থাৎ, তাদেরকে উৎসাহ দান, ধর্মে দৃঢ়পদ, দ্বীনে অবিচল থাকার উপর উদ্বুদ্ধ এবং যাবতীয় কঠিন মুহূর্তে ধৈর্য ধারণের উপর অনুপ্রাণিত করার জন্য এ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন। অনুরূপ এ কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্য যে, কুফরীর দাপট ও প্রতাপ ঈমানদারদের কিছুই করতে পারবে না। যেমন ফিরআউনের স্ত্রী সে সময়ের সব চেয়ে বড় কাফেরের অধীনে ছিলেন। কিন্তু সে তার স্ত্রীকে ঈমান আনতে বাধা দিতে পারেনি।

আত-তাহরীম 66:12

আর (তিনি আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ইমরান তনয়া মারয়্যাম,[১] যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে আমার রূহ হতে ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রতিপালকের বাণী[২] ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল; আর সে ছিল অনুগতদের একজন। [৩] [১] মারয়্যাম (আলাইহাস্ সালাম)-কে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, এ কথা বর্ণনা করা যে, তিনি ভ্রষ্ট এক জাতির মধ্যে থাকতেন, তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদা ও সম্মান দানে ধন্য করেন এবং বিশ্বের সমস্ত নারীদের উপর তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দান করেন। [২] 'প্রতিপালকের বাণী' বলতে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানকে বুঝানো হয়েছে। [৩] অর্থাৎ, তিনি এমন লোকদের অথবা এমন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা আনুগত্যে, ইবাদতে এবং নেকীর কাজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখত। হাদীসে বর্ণিত যে, "জান্নাতী মহিলাদের মধ্যে সব থেকে উত্তম হলেন খাদীজা, ফাতেমা, মারয়্যাম এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া।" (রায্বিয়াল্লাহু আনহুন্না।) (আহমাদ ১/২৯৩, মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ ৯/২২৩, আস্স্বাহীহাহ ১৫০৮নং) অপর এক হাদীসে এসেছে, "পুরুষদের মধ্যে পূর্ণতা তো অনেকেই অর্জন করেছে। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে পূর্ণতার অধিকারিণী হয়েছে কেবল, ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া, মারয়্যাম বিনতে ইমরান এবং খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ।" (রায্বিয়াল্লাহু আনহুন্না।) আর সমস্ত মহিলাদের মধ্যে আয়েশা (রায্বিয়াল্লাহু আনহুর)র মর্যাদা ঐরূপ, যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে 'সারীদ' (গোশত মিশ্রিত রুটির পলান্ন) সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে।" (বুখারীঃ সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়, মুসলিমঃ ফাযায়েল অধ্যায়, খাদিজা (রাঃ)র ফযীলত পরিচ্ছেদ)

আল-মুলক 67:1

মহা মহিমান্বিত তিনি সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর হাতে[১] এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [১] تَبَارَكَ শব্দটি بَرَكة থেকে এসেছে। এর শাব্দিক অর্থ হল বর্ধনশীল ও বেশী হওয়া। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, সৃষ্টিকুলের গুণাবলীর বহু ঊর্ধ্বে ও উচ্চে। تَفَاعل এর স্বীগা (আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী) অনেক ও আধিক্য বুঝাতে ব্যবহার হয়। "সর্বময় কর্তৃত্ব বা রাজত্ব যাঁর হাতে" অর্থাৎ, সব রকমের শক্তি এবং আধিপত্য তাঁরই। তিনি যেভাবে চান বিশ্বজাহান পরিচালনা করেন। তাঁর কাজে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি ভিখারীকে বাদশাহ, আর বাদশাহকে ভিখারী, ধনীকে গরীব এবং গরীবকে ধনী বানান। তাঁর কৌশল ও ইচ্ছায় কারো হস্তক্ষেপ চলে না।

আল-মুলক 67:2

যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম?[১] আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল। [১] روح (আত্মা) একটি এমন অদৃশ্যমান বস্তু যে, যে দেহের সাথে তার সম্পর্ক বহাল থাকে, তাকে জীবিত বলা হয়। আর যে দেহ হতে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, তাকে মৃত্যুর শিকার হতে হয়। জীবনের পর রয়েছে মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের ব্যবস্থা এই জন্য করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করতে পারেন যে, এই জীবনের সদ্ব্যবহার কে করে? যে এ জীবনকে ঈমান ও আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং যে এর অন্যথা করবে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।

আল-মুলক 67:3

তিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সাত আকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না;[১] আবার তাকিয়ে দেখ, কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছ কি?[২] [১] অর্থাৎ, তাতে কোন অসামঞ্জস্য, কোন বক্রতা এবং কোন ত্রুটি ও খুঁত নেই। বরং তাকে একেবারে সোজা ও সমতল বানানো হয়েছে; যা এ কথা প্রমাণ করে যে, এ সবের সৃষ্টিকর্তা হলেন কেবল একজন, একাধিক নয়। [২] কখনো কখনো এমন হয় যে, দ্বিতীয়বার ভালভাবে লক্ষ্য করলে কোন ঘাটতি বা দোষ-ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। তাই মহান আল্লাহ আহবান করছেন যে, তোমরা বারবার দৃষ্টিপাত করে দেখ, তাতে কোন ছিদ্র বা ফাটল পাও কি না?

আল-মুলক 67:4

অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। [১] [১] এখানে আবার তাকীদ করার উদ্দেশ্য হল, নিজের মহাশক্তি এবং একত্বকে আরো বেশী স্পষ্ট করা।

আল-মুলক 67:5

আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওগুলোকে করেছি শয়তানদের প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র স্বরূপ[১] এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি। [১] এখানে নক্ষত্র সৃষ্টির দু'টি উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ আসমানের সৌন্দর্যবর্ধন। কেননা, তা প্রদীপের মত দীপ্তিমান সুন্দর দেখা যায়। দ্বিতীয়তঃ শয়তানদল যখন আসমানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন একে উল্কারূপে তাদের উপর নিক্ষেপ করা হয়। এর তৃতীয় উদ্দেশ্য যেটাকে অন্যত্র বর্ণনা করা হয়েছে তা হল, তার দ্বারা সমুদ্রে ও স্থলে পথ ও দিক নির্ণয় করা হয়।

আল-মুলক 67:6

আর যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি, আর তা বড় নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!

আল-মুলক 67:7

যখন তারা তাতে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন জাহান্নামের গর্জন শুনবে, আর তা উদ্বেলিত হবে। [১] [১] شَهِيْقٌ সেই শব্দকে বলা হয়, যা গাধার মুখ থেকে সর্বপ্রথম বের হয়। এটা বড়ই বিদঘুটে আওয়াজ। কিয়ামতের দিন জাহান্নামও গাধার মত চিৎকার করবে এবং আগুনের উপর রাখা ফুটন্ত হাঁড়ির মত উদ্বেলিত হতে থাকবে।

আল-মুলক 67:8

রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে,[১] যখনই তাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তখনই তাদেরকে তার রক্ষীরা জিজ্ঞাসা করবে, ‘তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি?’[২] [১] ক্রোধে ও রাগে তার একাংশ অন্যাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এ জাহান্নাম কাফেরদেরকে দেখে বড় ক্রোধান্বিত হবে। (ক্রোধান্বিত হওয়ার) এই অনুভূতি মহান আল্লাহ তার মধ্যে সৃষ্টি করে দেবেন। আর এ কাজ তাঁর জন্য কঠিন নয়। [২] যার কারণে তোমাদেরকে আজ জাহান্নামের আস্বাদ গ্রহণ করতে হল?

আল-মুলক 67:9

তারা বলবে, ‘অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, কিন্তু আমরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি, তোমরা তো মহা বিভ্রান্তিতে রয়েছ।’[১] [১] অর্থাৎ, আমরা পয়গম্বরদেরকে সত্যজ্ঞান করার পরিবর্তে তাঁদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিলাম। আসমানী কিতাবসমূহকে একেবারে অস্বীকার করেছিলাম। এমনকি আল্লাহর পয়গম্বরদেরকে আমরা বলেছিলাম যে, তোমরা বড়ই ভ্রষ্টতার মধ্যে আছ।

আল-মুলক 67:10

এবং তারা আরো বলবে, ‘যদি আমরা শুনতাম অথবা জ্ঞান করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামীদের দলভুক্ত হতাম না।’[১] [১] অর্থাৎ, যদি আমরা মনোযোগ সহকারে তাঁদের কথা শুনতাম এবং তাঁদের উপদেশ গ্রহণ করতাম, অনুরূপ আল্লাহর দেওয়া বিবেক-বুদ্ধি দিয়েও যদি চিন্তা ও বুঝার চেষ্টা করতাম, তাহলে আজ আমরা জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।

আল-মুলক 67:11

তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে।[১] সুতরাং জাহান্নামীরা (আল্লাহর রহমত হতে) দূর হোক![২] [১] যার কারণে শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হয়েছে; আর তা হল, কুফরী করা এবং নবীদেরকে মিথ্যা ভাবা। [২] অর্থাৎ, তারা এখন আল্লাহ এবং তাঁর রহমত থেকে বহু দূরে সরে যাবে। কেউ কেউ বলেন, سُحْقٌ 'সুহ্ক্ব' জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।

আল-মুলক 67:12

যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।[১] [১] অবিশ্বাসী ও মিথ্যাজ্ঞানকারী কাফেরদের মোকাবেলায় এখন এখানে ঈমানদারদের এবং তাদের সেই নিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যা তাঁরা কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর নিকট লাভ করবেন। بِالْغَيْبِ (না দেখে, অদৃশ্যভাবে) এর একটি অর্থ এই যে, তারা আল্লাহকে তো দেখেনি, কিন্তু নবীদের কথায় বিশ্বাস করে তারা আল্লাহর আযাবকে ভয় করে। দ্বিতীয় অর্থ এও হতে পারে যে, লোকদের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য থেকে। অর্থাৎ, নির্জনেও তারা প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে।

আল-মুলক 67:13

তোমরা তোমাদের কথা গোপনেই বল অথবা প্রকাশ্যে,[১] নিশ্চয় তিনি অন্তর্যামী।[২] [১] এখানে আবারও কাফেরদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে। অর্থাৎ, তোমরা রসূল (সাঃ)-এর ব্যাপারে গোপনে কথা বল অথবা প্রকাশ্যে, সব কিছুই আল্লাহ অবগত আছেন। কোন কথাই তাঁর কাছে গোপন থাকে না। [২] এখানে তাঁর গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানার কারণ বর্ণনা করে বলা হচ্ছে যে, তিনি তো মনের ও অন্তরের গুপ্ত রহস্যসমূহের ব্যাপারেও অবহিত। অতএব তোমাদের কথাসমূহ কিভাবে তাঁর কাছে গোপন থাকতে পারে?

আল-মুলক 67:14

যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না?[১] তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। [২] [১] অর্থাৎ, মন ও অন্তর এবং তাতে উদিত যাবতীয় খেয়ালের সৃষ্টিকর্তা তো মহান আল্লাহই। তিনি কি নিজ সৃষ্টি সম্বন্ধে অনবহিত থাকতে পারেন? এখানে প্রশ্নবাচক শব্দ অস্বীকৃতি সূচক। অর্থাৎ, তিনি অনবহিত নন; তিনি সব জানেন। [২] لَطِيْفٌ এর অর্থ হল সূক্ষ্মদর্শী। الَّذِيْ لَطُفَ عِلْمُهُ بِمَا فِي الْقُلُوْبِ অর্থাৎ, যিনি হৃদয়ের যাবতীয় খবর ও অবস্থা সূক্ষ্মভাবে জানেন ও দেখেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আল-মুলক 67:15

তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন;[১] অতএব তোমরা ওর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর[২] এবং তাঁর দেওয়া রুযী হতে আহার্য গ্রহণ কর। [৩] আর পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট। [১] ذَلُوْلٌ শব্দের অর্থ হল, এমন অনুগত, যে সামনে অবনত হয়ে যায় এবং কোন প্রকার অবাধ্যতা করে না। অর্থাৎ, যমীনকে তোমাদের জন্য নরম ও মোলায়েম করে দেওয়া হয়েছে। তাকে এমন শক্ত বানানো হয়নি যে, তাতে তোমাদের বসবাস ও চলা-ফেরা কষ্টকর হতে পারে। [২] مَنَاكِبَ শব্দটি مَنْكِبٌ এর বহুবচন। এর অর্থ, দিক। এখানে এর অর্থ হল, যমীনের রাস্তা ও তার দিক-দিগন্ত। এখানে আদেশ 'মুবাহ' তথা বৈধ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, তার রাস্তায় বিচরণ কর। [৩] যমীনের উৎপন্ন ফসলাদি আহার কর।

আল-মুলক 67:16

তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধসিয়ে দেবেন না? আর ওটা আকস্মিকভাবে কেঁপে উঠবে। [১] [১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যিনি আসমান অর্থাৎ, আরশের উপর সমাসীন। এখানে কাফেরদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, আসমানের সেই সত্তা যখন ইচ্ছা তখনই তোমাদেরকে যমীনে ধসিয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ, যে যমীন তোমাদের বাসস্থান এবং তোমাদের রুযীর উৎস ও ভান্ডার, সেই শান্ত ও স্থির যমীনের মধ্যে মহান আল্লাহ কম্পন সৃষ্টি করে তা তোমাদের ধ্বংসের কারণ বানাতে পারেন।

আল-মুলক 67:17

অথবা তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী ঝড় প্রেরণ করবেন না?[১] তখন তোমরা জানতে পারবে, কিরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী! [২] [১] যেমন তিনি লূত সম্প্রদায় এবং হস্তীবাহিনীর (আবরাহার হাতি এবং তার সৈন্যের) উপর পাথর বর্ষণ করেছেন। পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করেছেন। [২] কিন্তু সে সময় এই জ্ঞান কোন উপকারে আসবে না।

আল-মুলক 67:18

অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যাজ্ঞান করেছিল; ফলে কেমন (ভয়ঙ্কর) ছিল আমার প্রতিকার (শাস্তি)!

আল-মুলক 67:19

তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের ঊর্ধ্বদেশে পক্ষীকুলের প্রতি, যারা ডানা বিস্তার করে ও সংকুচিত করে?[১] পরম দয়াময়ই তাদেরকে স্থির রাখেন।[২] নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। [১] পাখীরা যখন হাওয়াতে উড়তে থাকে, তখন তারা পাখা মেলে দেয়। কখনো আবার উড়ন্ত অবস্থায় নিজের পাখা গুটিয়ে নেয়। এই পাখা মেলাকে صفّ আর গুটিয়ে নেওয়াকে قَبض বলা হয়। [২] অর্থাৎ, কোন্ সত্তা এই উড়ন্ত পাখীকে (আকাশে) স্থির রাখেন, তাকে যমীনে পড়তে দেন না? এটা দয়াবান আল্লাহর মহাশক্তির এক নিদর্শন।

আল-মুলক 67:20

পরম দয়াময় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন সৈন্যবাহিনী আছে কি, যারা তোমাদের সাহায্য করবে?[১] অবিশ্বাসীরা তো ধোকায় রয়েছে। [২] [১] প্রশ্নবাচক এই উক্তি এখানে ধমকের জন্য এসেছে। جُنْدٌ এর অর্থ হল সৈন্যদল, গোষ্ঠী। অর্থাৎ, কোন সৈন্যদল বা গোষ্ঠী এমন নেই, যে তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে। [২] যে ধোঁকায় শয়তান তাদেরকে ফেলে রেখেছে।

আল-মুলক 67:21

এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে রুযী দান করবে, তিনি যদি তাঁর রুযী বন্ধ করে দেন? [১] বস্তুতঃ তারা অবাধ্যতা ও সত্য বিমুখতায় অবিচল রয়েছে। [২] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ যদি বৃষ্টি বর্ষণ না করেন অথবা যমীনকেই যদি ফসলাদি উৎপন্ন করতে নিষেধ করে দেন কিংবা যদি পাকা ফসলকে নষ্ট করে দেন; যেমন কখনো কখনো তিনি এইরূপ করে থাকেন, যার কারণে তোমাদের জীবিকার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, যদি মহান আল্লাহ এইরূপ করে দেন তাহলে বল, আর এমন কে আছে, যে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত তোমাদের জন্য রুযীর ব্যবস্থা করে দেবে? [২] তাদের উপর ওয়ায-নসীহতের এই কথাগুলোর কোন প্রভাব পড়ে না, বরং তারা সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করেই যাচ্ছে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভ্রষ্টতার দিকে আগে বাড়তেই আছে। না তারা উপদেশ গ্রহণ করে, আর না তারা চিন্তা-ভাবনা করে।

আল-মুলক 67:22

যে ব্যক্তি মুখে ভর দিয়ে চলে, সেই কি অধিক পথপ্রাপ্ত,[১] নাকি সেই ব্যক্তি, যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে? [২] [১] মুখে ভর দিয়ে যে চলে সে ডানে-বামে, আগে-পিছে কিছুই দেখে না এবং সে হোঁচট খাওয়া থেকেও রক্ষা পায় না। এমন মানুষ কি নিজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে? অবশ্যই না। অনুরূপ দুনিয়ায় আল্লাহর নাফরমানীতে ডুবে থাকা ব্যক্তি পরকালে সাফল্য লাভ করা হতে বঞ্চিত থাকবে।[২] যে পথে কোন বক্রতা নেই ও ভ্রষ্টতার আশঙ্কা নেই এবং সে সামনে ও ডানে-বামে দেখতেও পায়। নিশ্চিত যে, এমন ব্যক্তি তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্যের সরল পথ অবলম্বনকারী আখেরাতে বড়ই সৌভাগ্যবান হবে। কেউ কেউ বলেন যে, এটা মুমিন ও কাফের উভয়ের সেই অবস্থার বিবরণ, যা কিয়ামতে তাদের হবে। কাফেরদেরকে মুখের উপর ভর করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আর মুমিনরা সোজা হয়ে নিজের পায়ে হেঁটে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমন, কাফেরদের ব্যাপারে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, {وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ} "আমি তাদেরকে কিয়ামতের দিন মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় সমবেত করব " (সূরা বানী ইস্রাঈল ১৭:৯৭ আয়াত)

আল-মুলক 67:23

বল, ‘তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন[১] এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ।[২] তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক।’[৩] [১] অর্থাৎ, প্রথমবার সৃষ্টিকারী হলেন আল্লাহই। [২] যা দিয়ে তোমরা শুনতে পার, দেখতে পার এবং আল্লাহর সৃষ্টিকুল সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে পার। মহান আল্লাহ তিনটি (ইন্দ্রিয়) শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন; যার দ্বারা মানুষ শ্রাব্য, দৃশ্য ও অনুভবযোগ্য সকল বস্তুর জ্ঞান লাভ করতে পারে। এতে এক দিক দিয়ে হুজ্জত কায়েম করাও হয়েছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত এই নিয়ামতগুলোর উপর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন না করার নিন্দাও করা হয়েছে। এই জন্য আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, "তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক।" [৩] অর্থাৎ, অল্প পরিমাণ অথবা অল্প সময়ব্যাপী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। কিংবা কৃতজ্ঞতার স্বল্পতা উল্লেখ করে তাদের তরফ থেকে পূর্ণ কৃতঘ্নতাকেই বুঝানো হয়েছে।

আল-মুলক 67:24

বল, ‘তিনিই পৃথিবীতে তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।’ [১] [১] অর্থাৎ, মানুষকে সৃষ্টি করে তিনিই তাদেরকে যমীনে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন সকলকেই তাঁরই নিকট উপস্থিত হতে হবে, অন্য কারো নিকট নয়।

আল-মুলক 67:25

তারা বলে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে বল, এই প্রতিশ্রুতি কখন বাস্তবায়িত হবে?’ [১] [১] এ কথা কাফেররা ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করে এবং কিয়ামতকে বহু দূর মনে করে বলত।

আল-মুলক 67:26

তুমি বল, ‘এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই নিকট আছে; [১] আর আমি তো স্পষ্ট সকর্তকারী মাত্র।’ [২] [১] তিনি ব্যতীত তা কেউ জানে না। অন্যত্র তিনি বলেন, {قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي} (لأعراف: ৭:১৮৭) "তুমি বলে দাও, এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে।" (সূরা আরাফ ৭:১৮৭ আয়াত)[২] অর্থাৎ, আমার কাজ হল সেই (মন্দ) পরিণাম থেকে তোমাদেরকে সতর্ক করা, যা আমাকে মিথ্যা ভাবার কারণে তোমরা প্রাপ্ত হবে। ভিন্ন কথায়, আমার কাজ তো ভীতি প্রদর্শন করা, অদৃশ্যের খবর বলা নয়। তবে যে ব্যাপারে আল্লাহ নিজে থেকেই আমাকে বলে দেন (তার কথা ভিন্ন)।

আল-মুলক 67:27

যখন ওটা[১] আসন্ন দেখবে তখন অবিশ্বাসীদের মুখমন্ডল মলিন হয়ে যাবে[২] এবং বলা হবে, ‘এটাই তো সেই জিনিস, যা তোমরা দাবি করছিলে।’ [৩] [১] رَأَوْهُ এর মধ্যে هُ সর্বনাম (ওটা) থেকে অধিকাংশ মুফাসসিরগণ 'প্রতিশ্রুতি' (কিয়ামতের আযাব)এর প্রতি ইঙ্গিত বুঝিয়েছেন।[২] অর্থাৎ, লাঞ্ছনা, ভয়াবহতা এবং আতঙ্কের কারণে তাদের মুখমন্ডল মলিন হয়ে যাবে। এ কথাকে অন্যত্র মুখমন্ডল কালো হয়ে যাবে বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৬ আয়াত)[৩] অর্থাৎ, এই আযাব যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ, তা তো সেই আযাবই, যা তোমরা পৃথিবীতে দ্রুত দেখতে চাচ্ছিলে। যেমন, সূরা স্বাদের ৩৮:১৬ নং আয়াতে এবং সূরা আনফালের ৮:৩২ নং আয়াতে উল্লেখ হয়েছে।

আল-মুলক 67:28

বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি? যদি আল্লাহ আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে ধ্বংস করেন অথবা আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন, তাহলে অবিশ্বাসীদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তি হতে কে রক্ষা করবে?’ [১] [১] অর্থাৎ, চাহে রসূল ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে আল্লাহ মৃত্যু অথবা হত্যা দ্বারা ধ্বংস করে দেন কিংবা তাদেরকে অবকাশ দেন; কিন্তু এই কাফেরদের জন্য তো আল্লাহর আযাব থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। অথবা এর অর্থ হল, আমরা ঈমান আনা সত্ত্বেও ভয় ও আশার মধ্যে চিন্তাগ্রস্ত, তাহলে কুফরী করলে তোমাদেরকে আযাব থেকে কে বাঁচাতে পারবে?

আল-মুলক 67:29

বল, ‘তিনি পরম দয়াময়, আমরা তাতে বিশ্বাস করি[১] ও তাঁরই উপর নির্ভর করি।[২] সুতরাং শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।’[৩] [১] অর্থাৎ, তাঁর একত্ববাদের উপর। এই জন্য তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করি না। [২] অন্য কারোর উপর নয়। আমি আমার যাবতীয় ব্যাপার তাঁকেই সোপর্দ করি, অন্য কাউকে নয়। যেমন মুশরিকরা অন্যকে করে থাকে। [৩] তোমরা, নাকি আমরা? এতে কাফেরদের প্রতি কঠোর ধমক রয়েছে।

আল-মুলক 67:30

বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি? যদি পানি ভূগর্ভে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদেরকে এনে দেবে প্রবহমান পানি?’ [১] [১] غَوْرٌ শব্দের অর্থ হল শুকিয়ে যাওয়া অথবা পানির এত গভীরে চলে যাওয়া যে, সেখান হতে তা বের করা অসম্ভব হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যদি পানি শুকিয়ে দিয়ে তার অস্তিত্বই শেষ করে দেন অথবা মাটির এত গভীরে করে দেন, যেখান থেকে পানি বের করতে সর্বপ্রকার যন্ত্র ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়, তাহলে বল, কে আছে এমন, যে তোমাদের জন্য প্রবহমান ও নির্মল পানির ব্যবস্থা করে দেবে? অর্থাৎ, কেউ নেই। এটা মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ যে, তোমাদের অবাধ্যতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে পানি থেকে বঞ্চিত করেননি।