Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:71 – আল-বাকারা 2:104
Contents
- আল-বাকারা 2:71
- আল-বাকারা 2:72
- আল-বাকারা 2:73
- আল-বাকারা 2:74
- আল-বাকারা 2:75
- আল-বাকারা 2:76
- আল-বাকারা 2:77
- আল-বাকারা 2:78
- আল-বাকারা 2:79
- আল-বাকারা 2:80
- আল-বাকারা 2:81
- আল-বাকারা 2:82
- আল-বাকারা 2:83
- আল-বাকারা 2:84
- আল-বাকারা 2:85
- আল-বাকারা 2:86
- আল-বাকারা 2:87
- আল-বাকারা 2:88
- আল-বাকারা 2:89
- আল-বাকারা 2:90
- আল-বাকারা 2:91
- আল-বাকারা 2:92
- আল-বাকারা 2:93
- আল-বাকারা 2:94
- আল-বাকারা 2:95
- আল-বাকারা 2:96
- আল-বাকারা 2:97
- আল-বাকারা 2:98
- আল-বাকারা 2:99
- আল-বাকারা 2:100
- আল-বাকারা 2:101
- আল-বাকারা 2:102
- আল-বাকারা 2:103
- আল-বাকারা 2:104
আল-বাকারা 2:71
৬৮-৭১ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, দুষ্টামি ও আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে তাদের খুঁটি নাটি প্রশ্নের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাদের উচিত ছিল হুকুম পাওয়া মাত্রই তার উপর আমল করা। কিন্তু তা না করে তারা বার বার প্রশ্ন করতে থাকে। ইবনে জুরাইয (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যদি তারা যে কোন গৰু যবাহ করতো তবে তাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তারা ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকে এবং তার ফলে কার্যে কাঠিন্য বৃদ্ধি পায়। এমন কি যদি তারা ইনশাআল্লাহ’ না বলতো তবে কখনও এ কাঠিন্য দূর হতো না এবং ওটা তাদের কাছে প্রকাশিত হতো না।”তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় যে, ওটা বৃদ্ধও নয় বা একেবারে কম বয়সেরও নয়, বরং মধ্যম বয়সের। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ওর রং বর্ণনা করা হয় যে, ওটা হলদে রঙের সুদৃশ্য একটি গরু। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) গরুটির রং হলদে বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে এখানে অর্থ হচ্ছে কালো রং। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিক। তবে রঙের তীব্রতা ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে গরুটি যে কালো রঙের মত দেখাতো সেটা অন্য কথা। অহাব বিন মুনাব্বাহর (রঃ) বলেনঃ “ওর রং এতো গাঢ় ছিল যে, মনে হতো যেন ওটা থেকে সূর্যের কিরণ উথিত হচ্ছে।" তাওরাতে ওর রং লাল বর্ণনা করা হয়েছে। সম্ভবতঃ যিনি ওকে আরবীতে অনুবাদ করেছেন তিনিই ভুল করেছেন। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ঐ রঙের ও ঐ বয়সের বহু গরু তাদের চোখে পড়তে বলে তারা হযরত মূসা (আঃ) কে বলেঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহকে অন্য কোন নিদর্শনের কথা জিজ্ঞেস করুন যেন আমাদের সন্দেহ কেটে যায়। ইনশাআল্লাহ আমরা এবারে রাস্তা পেয়ে যাবো।" যদি তারা ইনশাআল্লাহ না বলতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত তারা ওরকম গরুর ঠিকানা পেত না। আর যদি তারা প্রশ্নই না করতো তবে তাদের প্রতি এত কঠোরতা অবলম্বন করা হতো না, বরং যে কোন গরু যবাহ্ করলেই যথেষ্ট হতো। এ বিষয়টি একটি মারফু হাদীসেও আছে। কিন্তু ওর সনদটি গরীব। সঠিক কথা এটাই যে, এটা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নিজস্ব কথা। আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশী জানেন। এখন গরুটির বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না বা পানি সেচের কাজেও ওটা ব্যবহৃত হয় না। ওর শরীরে কোন দাগ নেই। ওটা একই রঙের-অন্য কোন রঙের মিশ্রণ মোটেই নেই। ওটা সুস্থ ও সবল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা কাজের গরু নয়। তবে ক্ষেতে কাজ করে থাকে বটে কিন্তু পানি সেচের কাজ করে না। কিন্তু একথাটি ভুল, কেননা (আরবি)-এর তাফসীর এটাই যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না, পানি সেচন করে না এবং ওর শরীরে কোন দাগ নেই। এখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তারা ওর কুরবানী দিতে এগিয়ে গেল। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা ওটা যবাহ করবে বলে মনে হচ্ছিল না। বরং যবাহ না করার জন্যেই তারা টালবাহানা করছিল। কেউ কেউ বলেছেন যে, অপদস্থ হওয়ার ভয়েই তারা ঐরূপ করছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা ওর মূল্য শুনেই ঘাবড়িয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ওর মূল্য লেগেছিল মোট তিনটি স্বর্ণ মুদ্রা। কিন্তু এ বর্ণনাটি এবং গরুর ওজন বরাবর সোনা দেয়ার বর্ণনাটি, এ দুটোই ইসরাঈলী কথা। সঠিক কথা এই যে, তাদের নির্দেশ পালনের ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু এভাবে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে এবং হত্যার মামলার কারণে তাদেরকে ওটা মানতেই হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এ আয়াত দ্বারা এই মাসয়ালার উপরও দলীল নেয়া যেতে পারে যে, জন্তুকে না দেখেও ধার দেয়া জায়েয। কেননা, পূর্ণভাবে এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ক্রেয়া হয়েছে। যেমন হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আওযায়ী , ইমামলায় (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) ও জমহুর উলামার এটাই মাযহাব। এর দলীলরূপে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের নিজের হাদীসটিও আনা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন স্ত্রীলোক যেন তার স্বামীর সামনে অপুর কোন স্ত্রীলোকের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বর্ণনা না করে যেন সে তাকে দেখছে। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলবশতঃ হত্যার এবং স্বেচ্ছায় অনুরূপ হত্যার দিয়্যাতের উটসমূহের বিশেষত্বঃ ও বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) এবং অন্যান্য কুফীগণ ‘বায়-ই-সালামকে সমর্থন করেন না। তারা বলেন যে, জন্তুসমূহের গুণাবলী ও অবস্থা পূর্ণভাবে বর্ণনা করা ছাড়া অবস্থা আয়ত্বে আসতে পারে না। এ ধরনের বর্ণনা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও বর্ণিত হয়েছে।
আল-বাকারা 2:72
৭২-৭৩ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে (আরবি)-এর অর্থ করা হয়েছে তোমরা মতভেদ করলে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। মুসীব বিন রাফে (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি সাতটি ঘরের মধ্যে লুকিয়েও কোন কাজ করে, আল্লাহ তার পুণ্য প্রকাশ করে দেবেন। এ রকমই যদি কোন লোক সাতটি ঘরের মধ্যে ঢুকেও কোন খারাপ কাজ করে, আল্লাহ ওটাও প্রকাশ করে দেবেন। অতঃপর (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। এবানে ঐ চাচা ভাতিজারই ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে, যে কারণে গরু যবাহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বলা হচ্ছে যে, ওর কোন অংশ নিয়ে মৃত ব্যক্তির দেহে আঘাত কর, যদি বলা হয় যে ঐ অংশটি কোন অংশ ছিল। তবে বলা হবে যে, এর বর্ণনা না কুরআন মাজীদের মধ্যে আছে, না কোন সহীহ হাদীসে আছে। এটা জানায় না কোন উপকার আছে বা না জানায় কোন ক্ষতি আছে। যে জিনিসের কোন কর্ণনা নেই তার পিছনে না পড়ার মধ্যেই শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে। 'কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা আযরূকের নরম হাড় ছিল। কেউ বলেন যে, হাড় নয় বরং রানের গোশত। কেউ বলেন যে, ওটা দুই ঘাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের গোশত ছিল। কেউ বলেন যে, ওটা জিহবার গোশত ছিল, আবার কারও মতে ওঠা ছিল লেজের গোশত। কিন্তু আমাদের মঙ্গল ওতেই আছে যে, আল্লাহ ভাআলা যা গুপ্ত রেখেছেন আমরা ও যেন তা গুপ্ত রাখি। ঐ অংশ দ্বারা স্পর্শ করা মাত্রই সে জীবিত হয়ে ওঠে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই ঝগড়ার ফায়সালা ওর দ্বারাই করেন আর কিয়ামতের দিন মৃতেরা যে জীবিত হয়ে উঠবে তার দলীলও একেই করেন। এ সূরার মধ্যে পাঁচ জায়গায় মরার পরে জীবিত হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। প্রথম হচ্ছে নিম্নের আয়াতটির মধ্যে (আরবি) দ্বিতীয় আলোচ্য ঘটনায়, তৃতীয় ঐ লোকদের ঘটনায় যারা হাজার হাজার সংখ্যায় বের হয়েছিল এবং একটি বিধ্বস্ত পল্পী তারা অতিক্রম করেছিল। চতুর্থ হষরত ইবরাহীম (আঃ)-এর চারটি পাখীকে মেরে ফেলার পর জীবিত হওয়ার মধ্যে এবং পঞ্চম হচ্ছে যমীনের মরে যাওয়ার পর বৃষ্টির সাহায্যে পুনর্জীবন দান করাকে মরণ ও জীবনের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যে। . আবু দাউদ তায়ালেসীর একটি হাদীসে আছে যে, আবু রাজীন আকিলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করবেন?” তিনি বলেনঃ “তুমি কোন দিন বৃক্ষলতাহীন প্রান্তরে মধ্যদিয়ে চলেছে কি?” তিনি বলেনঃ হ, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আবার কখনও ওকে সবুজ ও সতেজ দেখেছো কি?' তিনি বলেন, 'হাঁ'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এভাবেই মৃত্যুর পর জীবন লাভ ঘটবে।কুরআন মাজীদের অন্য এক জায়গায় রয়েছে ও তাদের (অবিশ্বাসীদের) জন্যে মৃত ভূমিও একটি নিদর্শন যাকে আমি জীবিত করে থাকি এবং তা হতে শস্য উৎপাদন করে থাকি, তারা তা হতে আহার করে থাকে। আমি তার মধ্যে খেজুর ও আঙ্গুরের বাগানসমূহ করে দিয়েছি এবং তাতে ঝরণাসমূহ প্রবাহিত করেছি, যেন অর ফুলসমূহ হতে ভক্ষণ করতে পারে, তাদের হস্তসমূহ তা তৈরী করেনি, তবুও তারা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না?”কোন আহত ব্যক্তি যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি আমাকে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে হত্যা করেছে তবে তার এ কথাকে সত্য মনে করা হবে। এ জিজ্ঞাস্য বিষয়ের উপর এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয়েছে। এবং হযরত ইমাম মালিক (রঃ)-এর মাযহাবকে এর দ্বারা মজবুত করা হয়েছে। কেননা, নিহত লোকটি জীবিত হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করায়, সে যাকে তার হত্যাকারী বলে, তাকে হত্যা করা হয় এবং নিহত ব্যক্তির কথাকেই বিশ্বাস করা হয়। এটা স্পষ্ট কথা যে, মানুষ মুমূর্ষ অবস্থায় সাধারণতঃ সত্য কথাই বলে থাকে এবং সে সময় তার উপর কোন অপবাদ দেয়া হয় না।হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, এক ইয়াহূদী একটি দাসীর মাথা পাথরের উপরে রেখে অন্য পাথর দ্বারা ভীষণভাবে প্রহার করে এবং তার অলংকার খুলে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেনঃ “ঐ দাসীকে জিজ্ঞেস কর যে তাকে কে মেরেছে?' লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেঃ “তোমাকে অমুক মেরেছে? অমুক মেরেছে?” সে তার মাথার ইশারায় অস্বীকার করতে থাকে। ঐ ইয়াহূদীর নাম করলে সে মাথার ইশারায় সম্মতি জানায়। সুতরাং ইয়াহূদীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাকে বারবার জিজ্ঞেস করায় সে স্বীকার করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দেন যে, তার মাথাকেও এভাবেই দুটি পাথরের মধ্যস্থলে রেখে দলিত করা হোক। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে এটা উত্তেজনার কারণে হলে নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণকে শপথ করাতে হবে। কিন্তু জমহুর এর বিরোধী এবং এক নিহত ব্যক্তির কথাকে এ ব্যাপার প্রমাণরূপে গ্রহণ করেন না।
আল-বাকারা 2:73
৭২-৭৩ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে (আরবি)-এর অর্থ করা হয়েছে তোমরা মতভেদ করলে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। মুসীব বিন রাফে (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি সাতটি ঘরের মধ্যে লুকিয়েও কোন কাজ করে, আল্লাহ তার পুণ্য প্রকাশ করে দেবেন। এ রকমই যদি কোন লোক সাতটি ঘরের মধ্যে ঢুকেও কোন খারাপ কাজ করে, আল্লাহ ওটাও প্রকাশ করে দেবেন। অতঃপর (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। এবানে ঐ চাচা ভাতিজারই ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে, যে কারণে গরু যবাহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বলা হচ্ছে যে, ওর কোন অংশ নিয়ে মৃত ব্যক্তির দেহে আঘাত কর, যদি বলা হয় যে ঐ অংশটি কোন অংশ ছিল। তবে বলা হবে যে, এর বর্ণনা না কুরআন মাজীদের মধ্যে আছে, না কোন সহীহ হাদীসে আছে। এটা জানায় না কোন উপকার আছে বা না জানায় কোন ক্ষতি আছে। যে জিনিসের কোন কর্ণনা নেই তার পিছনে না পড়ার মধ্যেই শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে। 'কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা আযরূকের নরম হাড় ছিল। কেউ বলেন যে, হাড় নয় বরং রানের গোশত। কেউ বলেন যে, ওটা দুই ঘাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের গোশত ছিল। কেউ বলেন যে, ওটা জিহবার গোশত ছিল, আবার কারও মতে ওঠা ছিল লেজের গোশত। কিন্তু আমাদের মঙ্গল ওতেই আছে যে, আল্লাহ ভাআলা যা গুপ্ত রেখেছেন আমরা ও যেন তা গুপ্ত রাখি। ঐ অংশ দ্বারা স্পর্শ করা মাত্রই সে জীবিত হয়ে ওঠে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই ঝগড়ার ফায়সালা ওর দ্বারাই করেন আর কিয়ামতের দিন মৃতেরা যে জীবিত হয়ে উঠবে তার দলীলও একেই করেন। এ সূরার মধ্যে পাঁচ জায়গায় মরার পরে জীবিত হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। প্রথম হচ্ছে নিম্নের আয়াতটির মধ্যে (আরবি) দ্বিতীয় আলোচ্য ঘটনায়, তৃতীয় ঐ লোকদের ঘটনায় যারা হাজার হাজার সংখ্যায় বের হয়েছিল এবং একটি বিধ্বস্ত পল্পী তারা অতিক্রম করেছিল। চতুর্থ হষরত ইবরাহীম (আঃ)-এর চারটি পাখীকে মেরে ফেলার পর জীবিত হওয়ার মধ্যে এবং পঞ্চম হচ্ছে যমীনের মরে যাওয়ার পর বৃষ্টির সাহায্যে পুনর্জীবন দান করাকে মরণ ও জীবনের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যে। . আবু দাউদ তায়ালেসীর একটি হাদীসে আছে যে, আবু রাজীন আকিলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করবেন?” তিনি বলেনঃ “তুমি কোন দিন বৃক্ষলতাহীন প্রান্তরে মধ্যদিয়ে চলেছে কি?” তিনি বলেনঃ হ, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আবার কখনও ওকে সবুজ ও সতেজ দেখেছো কি?' তিনি বলেন, 'হাঁ'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এভাবেই মৃত্যুর পর জীবন লাভ ঘটবে।কুরআন মাজীদের অন্য এক জায়গায় রয়েছে ও তাদের (অবিশ্বাসীদের) জন্যে মৃত ভূমিও একটি নিদর্শন যাকে আমি জীবিত করে থাকি এবং তা হতে শস্য উৎপাদন করে থাকি, তারা তা হতে আহার করে থাকে। আমি তার মধ্যে খেজুর ও আঙ্গুরের বাগানসমূহ করে দিয়েছি এবং তাতে ঝরণাসমূহ প্রবাহিত করেছি, যেন অর ফুলসমূহ হতে ভক্ষণ করতে পারে, তাদের হস্তসমূহ তা তৈরী করেনি, তবুও তারা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না?”কোন আহত ব্যক্তি যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি আমাকে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে হত্যা করেছে তবে তার এ কথাকে সত্য মনে করা হবে। এ জিজ্ঞাস্য বিষয়ের উপর এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয়েছে। এবং হযরত ইমাম মালিক (রঃ)-এর মাযহাবকে এর দ্বারা মজবুত করা হয়েছে। কেননা, নিহত লোকটি জীবিত হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করায়, সে যাকে তার হত্যাকারী বলে, তাকে হত্যা করা হয় এবং নিহত ব্যক্তির কথাকেই বিশ্বাস করা হয়। এটা স্পষ্ট কথা যে, মানুষ মুমূর্ষ অবস্থায় সাধারণতঃ সত্য কথাই বলে থাকে এবং সে সময় তার উপর কোন অপবাদ দেয়া হয় না।হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, এক ইয়াহূদী একটি দাসীর মাথা পাথরের উপরে রেখে অন্য পাথর দ্বারা ভীষণভাবে প্রহার করে এবং তার অলংকার খুলে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেনঃ “ঐ দাসীকে জিজ্ঞেস কর যে তাকে কে মেরেছে?' লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেঃ “তোমাকে অমুক মেরেছে? অমুক মেরেছে?” সে তার মাথার ইশারায় অস্বীকার করতে থাকে। ঐ ইয়াহূদীর নাম করলে সে মাথার ইশারায় সম্মতি জানায়। সুতরাং ইয়াহূদীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাকে বারবার জিজ্ঞেস করায় সে স্বীকার করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দেন যে, তার মাথাকেও এভাবেই দুটি পাথরের মধ্যস্থলে রেখে দলিত করা হোক। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে এটা উত্তেজনার কারণে হলে নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণকে শপথ করাতে হবে। কিন্তু জমহুর এর বিরোধী এবং এক নিহত ব্যক্তির কথাকে এ ব্যাপার প্রমাণরূপে গ্রহণ করেন না।
আল-বাকারা 2:74
এ আয়াতে বানী ইসরাঈলকে ধমকান হচ্ছে যে,এত বড় বড় মুজিযা এবং আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতার নিদর্শনাবলী দেখার পরেও এত তাড়াতাড়ি তাদের অন্তর পাথরের মত শক্ত হয়ে গেল? এজন্যই মুমিনগণকে এরকম শক্তমনা হতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে-“এখনও কি সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর যিকরের দ্বারা এবং যে সত্য তিনি অবতীর্ণ করেছেন তার দ্বারা মুমিনের অন্তর কেঁপে ওঠে? এবং তারা যেন পূর্বের কিতাবীদের মত না হয়ে যায় যাদের অন্তর যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর শক্ত হয়ে গিয়েছিল, এবং তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ঐ নিহত ব্যক্তির ভাতিজাও তার চাচার দ্বিতীয়বার মৃত্যুর পর তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেছিল এবং বলেছিল যে, সে মিথ্যা বলেছে। . কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর বানী ইসরাঈলের অন্তর পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কেননা, পাথর হতেও তো ঝরণা প্রবাহিত হয়। কোন কোন পাথর ফেটে যায় এবং তা হতে পানি বের হয়, যদিও তা প্রবাহিত হওয়ার যোগ্য নয়। কোন কোন পাথর আল্লাহর ভয়ে উপর হতে নীচে গড়িয়ে পড়ে। লাকদের অন্তর নসীহত বা উপদেশে কখনও নরম হয় না।পাথরের মধ্যে বোধশক্তি আছেএখান হতে এটাও জানা যাচ্ছে যে, পাথরের মধ্যেও জ্ঞান বিবেক আছে। কুরআন মাজীদের অন্য স্থানে আছেঃ “সাত আসমান ও যমীন এবং এতদুভয়ের . মধ্যস্থলে যা কিছু আছে সবাই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে ও প্রশংসা কীর্তন করে, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ বুঝ না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সহনশীল ও ক্ষমাশীল।"হযরত আবু ইয়ালা জবাঈ (রঃ) পাথরের আল্লাহর ভয়ে উপর হতে নীচে পড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা করেছেন আকাশ হতে শিলা বৃষ্টি বর্ষণের দ্বারা। কিন্তু এটা সঠিক কথা নয়। ইমাম রাযীও (রঃ) এটাকে বেঠিক বলেছেন এবং আসলেও এ ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কেননা, এর দ্বারা বিনা দলীলে শাব্দিক অর্থকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।নহর প্রবাহিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে খুব বেশী ক্রন্দন করা। ফেটে যাওয়ার ও পানি বের হওয়ার অর্থ হচ্ছে ওর অপেক্ষা কম ক্রন্দন করা এবং নীচে গড়িয়ে পড়ার অর্থ হচ্ছে অন্তরে ভয় করা। কেউ কেউ বলেন যে, এটা রূপক অর্থে নেয়া হয়েছে। যেমন অন্যস্থানে আছেঃ “প্রাচীর পড়ে যেতে চাচ্ছিল।” স্পষ্ট কথা এই যে, এটা রূপক অর্থ। প্রকৃতপক্ষে প্রাচীরের ইচ্ছাই থাকে না। ইমাম রাযী (রঃ) এবং কুরতবী (রঃ) বলেন যে, এরূপ ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা যে জিনিসের মধ্যে যে বিশেষণ দেয়ার ইচ্ছা করেছেন তা তিনি সৃষ্টি করতে পারেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “আমি আমার এ আমানত (অর্থাৎ আমার নির্দেশাবলী) আকাশসমূহ, যমীন ও পর্বতসমূহের সমানে পেশ করে ছিলাম, তখন তারা ঐ আমানত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং ভীত হয়ে যায়। উপরের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, সমস্ত জিনিস আল্লাহর তাসবীহ্ বর্ণনা করে। অন্যস্থানে রয়েছেঃ “তারকা ও বৃক্ষ আল্লাহকে সিজদাহ করে। আর এক জায়গায় আছেঃ “যমীন ও আসমান বলে-আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে হাজির আছি।” আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “তারা (পাপীরা) তাদের চামড়াকে বলবে-তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? তারা বলবে-আমাদেরকে সেই আল্লাহই কথা বলাচ্ছেন যিনি প্রত্যেক জিনিসকে কথা বলার শক্তি দান করে থাকেন।” একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উহুদ পাহাড় সম্পর্কে বলেনঃ “এ পাহাড়টি আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরাও একে ভালবাসি।” আর একটি সহীহ হাদীসে আছে, যে খেজুর গাছের কাণ্ডের উপর হেলান দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবা দিতেন, যখন মেম্বর তৈরী হয় ও কাণ্ডটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তখন কাণ্ডটি অঝোরে কাঁদতে থাকে। সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি মক্কার ঐ পাথরকে চিনি যা আমার নবুওয়াতের পূর্বে আমাকে সালাম করতো। হাজরে আসওয়াদ সম্বন্ধে আছে যে, যে ওকে সত্যের সঙ্গে চুম্বন করবে, কিয়ামতের দিন ওটা তার ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান করবে। এ ধরনের বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে যদ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এসব জিনিসের মধ্যে বিবেক ও অনুভূতি আছে এবং ওগুলো প্রকৃত অর্থেই আছে, রূপক অর্থে নয়।(আরবি) শব্দটি সম্পর্কে কুরতবী (রঃ) এবং ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, এটা ইচ্ছার স্বাধীনতার জন্যে এসেছে। অর্থাৎ তাদের অন্তরকে পাথরের মত শক্ত মনে কর অথবা তার চেয়ে বেশী শক্ত মনে কর। ইমাম রাযী (রঃ) একটি কারণ এও বর্ণনা করেছেন যে, এটা দ্ব্যর্থবোধকের জন্য। সম্বোধিত ব্যক্তির একটি জিনিস সম্পর্কে পর্ণ জ্ঞান থাকা সত্তেও তার সামনে যেন দ’টি জিনিসকে দ্ব্যর্থবোধক হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। কারও কারও কথামত এটার ভাবার্থ এই যে, কতক অস্তর পাথরের মত শক্ত এবং কতক অন্তর তার চেয়েও বেশী শক্ত। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।একথার উপর ইজমা হয়েছে যে, এখানে (আরবি) শব্দটি সন্দেহের জন্যে নয়। অথবা (আরবি) শব্দটি এখানে (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তাদের অন্তর পাথরের মত এবং তার চেয়েও বেশী শক্ত হয়েছে। যেমন (আরবি)এবং (আরবি) এই দু' জায়গায় শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরব কবিদের কবিতায়ও (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে বহুবচনের জন্যে এসেছে। কিংবা এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) অর্থাৎ বরং, যেমন (আরবি) (৪:৭৭) এবং (আরবি) (৩৭:১৪৭) এই দু’স্থানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারও কারও মতে এর ভাবার্থ এই যে, ওটা পাথরের মত কিংবা কঠোরতায় তোমাদের নিকট তার চেয়েও বেশী। কেউ কেউ বলেন যে, এটা সম্বোধিত ব্যক্তির সামনে শুধু দ্ব্যর্থবোধক হিসেবে আনা হয়েছে এবং এটা কবিদের কবিতার মধ্যেও পাওয়া যায়। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা অথবা তোমরা স্পষ্ট সুপথের উপরে অথবা ভ্রান্ত পথের উপরে রয়েছি।” (৩৪:২৪) এটা স্পষ্ট যে, মুসলমানরা সঠিক পথে আছে এবং কাফিরেরা ভ্রান্ত পথে আছে, এটা নিশ্চিত কথা। তথাপি সম্বোধিত ব্যক্তির সামনে অস্পষ্টভাবে কথা বলা হয়েছে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তোমাদের অন্তর দু’টো অবস্থা হতে বাইরে নয়। হয়তো বা এটা পাথরের মত কিংবা ওর চেয়েও কঠিন। এ কথার মত এ কথাগুলোও (আরবি) (২:১৭) আবার বলেছেন অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবি) ভাবার্থ এটাই যে, কিছু এরূপ এবং কিছু ঐরূপ। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।‘তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ এর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর জি ছাড়া বেশী কথা বলো না। এরকম বেশী কথা অন্তরকে শক্ত করে দেয়। আর শক্ত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা হতে বহু দূরে থাকে।” ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং এর একটি পন্থাকে গরীব বলেছেন। মুসনাদ-ই-বাযারের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, চারটি জিনিস দুর্ভাগ্যের অন্তর্গতঃ (১) আল্লাহর ভয়ে চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত না হওয়া।, (২) অত্তর শক্ত হয়ে যাওয়া, (৩) আশা বৃদ্ধি পাওয়া এবং (৪) লোভী হয়ে যাওয়া।
আল-বাকারা 2:75
৭৫-৭৭ নং আয়াতের তাফসীরএই পথভ্রষ্ট ইয়াহুদ সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) ও সাহাবীবর্গকে (রাঃ) নিরাশ করে দিচ্ছেন যে, এসব লোক যখন এত বড় বড় নিদর্শন দেখেও তাদের অন্তরকে শক্ত করে ফেলেছে এবং আল্লাহর কালাম শুনে বুঝার পরেও ওকে পরিবর্তন করে ফেলেছে তখন তোমরা তাদের কাছে আর কিসের আশা করতে পার? ঠিক এরকমই আয়াত অন্য জায়গায় আছেঃ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিশাপ নাযিল করেছি এবং তাদের অন্তরকে শক্ত করে দিয়েছি, এরা আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করে ফেলতো।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কালামকে শুনার কথা বলেছেন। এর দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ঐ সহচরদের বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর কালাম নিজ কানে শুনার জন্যে তার নিকট আবেদন করেছিল। আর তারা পাক-সাফ হওয়ার পর রোযা রেখে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তুর পাহাড়ে গিয়ে সিজদায় পড়ে গেলে আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় কালাম শুনিয়েছিলেন। যখন তারা ফিরে আসে এবং আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর কালাম বানী ইসরাঈলের মধ্যে বর্ণনা করতে আরম্ভ করেন তখন তারা তা পরিবর্তন করতে শুরু করে।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ঐসব লোক তাওরাতের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করেছিল। এই সাধারণ অর্থটিই সঠিক, যার মধ্যে তারাও শামিল হয়ে যাবে এবং এই বদ স্বভাবের অন্যান্য ইয়াহুদীরাও জড়িত থাকবে। কুরআন পাকের এক জায়গায় আছেঃ “মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে তুমি আশ্রয় দান কর যে পর্যন্ত সে আল্লাহর কালাম শ্রবণকরে।”এখানে ভাবার্থ যেমন আল্লাহর কালাম’ নিজের কানে শুনা নয়, তেমনি এখানে আল্লাহর কালাম অর্থে তাওরাত। এ পরিবর্তনকারী ও গোপনকারী ছিল তাদের আলেমেরা। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী তাদের কিতাবে বিদ্যমান। ছিল। ওর মধ্যে তারা মূল ভাব পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এভাবেই তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য করে দিতো। ঘুষ নিয়ে ভুল ফতওয়া দেয়ার অভ্যাস করে ফেলেছিল। তবে হাঁ, ঘুষ না পেলে এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হওয়ার ভয় না থাকলে শিষ্যদের হতে পৃথক থাকার সময় মাঝে মাঝে তারা সত্য কথাও বলে দিতো। মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়ে বলতো-'তোমাদের নবী সত্য। তিনি সত্যই আল্লাহর রাসূল।' কিন্তু যখন তারা পরস্পরে বসতো তখন একে অপরকে বলতো‘তোমরা মুসলমানদেরকে এসব বললে তারা তোমাদেরকেও তাদের ধর্মে টেনে নেবে এবং আল্লাহর কাছেও তোমাদেরকে লা-জবাব করে দেবে। তাদেরকে এর উত্তর দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন যে, এই নির্বোধদের কি এতটুকুও জ্ঞান নেই যে, আল্লাহ তাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কথাই জানেন?একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের কাছে যেন মুমিনরা ছাড়া আর কেউ না আসে।" তখন কাফিরেরা ও ইয়াহূদীরা পরস্পর বলাবলি করে, “তোমরা মুসলমানদের কাছে গিয়ে বল যে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার এখানে যখন আসবে তখন ঐরূপই থাকবে যেমন ছিলে।” সুতরাং ঐসব লোক সকালে এসে ঈমানের দাবী করতো এবং সন্ধ্যায় গিয়ে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতো। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিতাবীদের একটি দল বলে মুমিনদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে ওর উপর দিনের এক অংশে ঈমান আন এবং অপর অংশে কুফরী কর, তা হলে স্বয়ং মুমিনরাও ফিরে আসবে।" এরা এই প্রতারণা দ্বারা মুসলমানদের গোপন তথ্য জেনে নিয়ে তাদের দলের লোকেকে জানিয়ে দিতে চাইতে এবং মুসলমানদেরকেও পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছে করতো। কিন্তু তাদের চতুরতায় কাজ হয়নি। কারণ মহান আল্লাহ তাদের এই গোপন কথা মুমিনদেরকে জানিয়ে দেন। তারা মুসলমানদের কাছে এসে ইসলাম ও ঈমানের কথা প্রকাশ করলে তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কিতাবে কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শুভাগমন ইত্যাদির কথা নেই?” তারা স্বীকার করতো। অতঃপর যখন তারা তাদের বড়দের কাছে যেতো তখন ঐ বড়রা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলতো-“তোমরা কি নিজেদের কথা মুসলমানদেরকে বলে তোমাদের অস্ত্র তাদেরকে দিয়ে দিতে চাও?' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার উপর আক্রমণের দিন ইয়াহুদীদের দুর্গের পাদদেশে দাড়িয়ে বলেনঃ “ও বানর, শূকর ও শয়তানের পূজারীদের ভ্রাতৃমণ্ডলী!” তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকেঃ “তিনি আমাদের ভিতরের কথা কি করে জানলেন। খবরদার! তোমাদের পরস্পরের সংবাদ তাদেরকে দিও না, নচেৎ ওটা আগ্লাহর সামনে দলীল হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা গোপন করলেও আমার কাছে কোন কথা গোপন থাকে না। তোমরা গোপনে গোপনে যে নিজের লোককে বল- তোমরা নিজেদের কথা তাদেরকে বলো না এবং তোমরা যে তোমাদের কিতাবের কথা গোপন করে থাক, আমি তোমাদের এই সমস্ত খারাপ কাজ হতে সম্পূর্ণ সচেতন। আর তোমরা যে বাইরে তোমাদের ঈমানের কথা প্রকাশ করছে, ওটা যে তোমাদের অন্তরের কথা নয় তাও আমি জানি।"
আল-বাকারা 2:76
৭৫-৭৭ নং আয়াতের তাফসীরএই পথভ্রষ্ট ইয়াহুদ সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) ও সাহাবীবর্গকে (রাঃ) নিরাশ করে দিচ্ছেন যে, এসব লোক যখন এত বড় বড় নিদর্শন দেখেও তাদের অন্তরকে শক্ত করে ফেলেছে এবং আল্লাহর কালাম শুনে বুঝার পরেও ওকে পরিবর্তন করে ফেলেছে তখন তোমরা তাদের কাছে আর কিসের আশা করতে পার? ঠিক এরকমই আয়াত অন্য জায়গায় আছেঃ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিশাপ নাযিল করেছি এবং তাদের অন্তরকে শক্ত করে দিয়েছি, এরা আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করে ফেলতো।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কালামকে শুনার কথা বলেছেন। এর দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ঐ সহচরদের বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর কালাম নিজ কানে শুনার জন্যে তার নিকট আবেদন করেছিল। আর তারা পাক-সাফ হওয়ার পর রোযা রেখে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তুর পাহাড়ে গিয়ে সিজদায় পড়ে গেলে আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় কালাম শুনিয়েছিলেন। যখন তারা ফিরে আসে এবং আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর কালাম বানী ইসরাঈলের মধ্যে বর্ণনা করতে আরম্ভ করেন তখন তারা তা পরিবর্তন করতে শুরু করে।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ঐসব লোক তাওরাতের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করেছিল। এই সাধারণ অর্থটিই সঠিক, যার মধ্যে তারাও শামিল হয়ে যাবে এবং এই বদ স্বভাবের অন্যান্য ইয়াহুদীরাও জড়িত থাকবে। কুরআন পাকের এক জায়গায় আছেঃ “মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে তুমি আশ্রয় দান কর যে পর্যন্ত সে আল্লাহর কালাম শ্রবণকরে।”এখানে ভাবার্থ যেমন আল্লাহর কালাম’ নিজের কানে শুনা নয়, তেমনি এখানে আল্লাহর কালাম অর্থে তাওরাত। এ পরিবর্তনকারী ও গোপনকারী ছিল তাদের আলেমেরা। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী তাদের কিতাবে বিদ্যমান। ছিল। ওর মধ্যে তারা মূল ভাব পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এভাবেই তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য করে দিতো। ঘুষ নিয়ে ভুল ফতওয়া দেয়ার অভ্যাস করে ফেলেছিল। তবে হাঁ, ঘুষ না পেলে এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হওয়ার ভয় না থাকলে শিষ্যদের হতে পৃথক থাকার সময় মাঝে মাঝে তারা সত্য কথাও বলে দিতো। মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়ে বলতো-'তোমাদের নবী সত্য। তিনি সত্যই আল্লাহর রাসূল।' কিন্তু যখন তারা পরস্পরে বসতো তখন একে অপরকে বলতো‘তোমরা মুসলমানদেরকে এসব বললে তারা তোমাদেরকেও তাদের ধর্মে টেনে নেবে এবং আল্লাহর কাছেও তোমাদেরকে লা-জবাব করে দেবে। তাদেরকে এর উত্তর দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন যে, এই নির্বোধদের কি এতটুকুও জ্ঞান নেই যে, আল্লাহ তাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কথাই জানেন?একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের কাছে যেন মুমিনরা ছাড়া আর কেউ না আসে।" তখন কাফিরেরা ও ইয়াহূদীরা পরস্পর বলাবলি করে, “তোমরা মুসলমানদের কাছে গিয়ে বল যে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার এখানে যখন আসবে তখন ঐরূপই থাকবে যেমন ছিলে।” সুতরাং ঐসব লোক সকালে এসে ঈমানের দাবী করতো এবং সন্ধ্যায় গিয়ে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতো। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিতাবীদের একটি দল বলে মুমিনদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে ওর উপর দিনের এক অংশে ঈমান আন এবং অপর অংশে কুফরী কর, তা হলে স্বয়ং মুমিনরাও ফিরে আসবে।" এরা এই প্রতারণা দ্বারা মুসলমানদের গোপন তথ্য জেনে নিয়ে তাদের দলের লোকেকে জানিয়ে দিতে চাইতে এবং মুসলমানদেরকেও পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছে করতো। কিন্তু তাদের চতুরতায় কাজ হয়নি। কারণ মহান আল্লাহ তাদের এই গোপন কথা মুমিনদেরকে জানিয়ে দেন। তারা মুসলমানদের কাছে এসে ইসলাম ও ঈমানের কথা প্রকাশ করলে তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কিতাবে কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শুভাগমন ইত্যাদির কথা নেই?” তারা স্বীকার করতো। অতঃপর যখন তারা তাদের বড়দের কাছে যেতো তখন ঐ বড়রা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলতো-“তোমরা কি নিজেদের কথা মুসলমানদেরকে বলে তোমাদের অস্ত্র তাদেরকে দিয়ে দিতে চাও?' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার উপর আক্রমণের দিন ইয়াহুদীদের দুর্গের পাদদেশে দাড়িয়ে বলেনঃ “ও বানর, শূকর ও শয়তানের পূজারীদের ভ্রাতৃমণ্ডলী!” তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকেঃ “তিনি আমাদের ভিতরের কথা কি করে জানলেন। খবরদার! তোমাদের পরস্পরের সংবাদ তাদেরকে দিও না, নচেৎ ওটা আগ্লাহর সামনে দলীল হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা গোপন করলেও আমার কাছে কোন কথা গোপন থাকে না। তোমরা গোপনে গোপনে যে নিজের লোককে বল- তোমরা নিজেদের কথা তাদেরকে বলো না এবং তোমরা যে তোমাদের কিতাবের কথা গোপন করে থাক, আমি তোমাদের এই সমস্ত খারাপ কাজ হতে সম্পূর্ণ সচেতন। আর তোমরা যে বাইরে তোমাদের ঈমানের কথা প্রকাশ করছে, ওটা যে তোমাদের অন্তরের কথা নয় তাও আমি জানি।"
আল-বাকারা 2:77
৭৫-৭৭ নং আয়াতের তাফসীরএই পথভ্রষ্ট ইয়াহুদ সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) ও সাহাবীবর্গকে (রাঃ) নিরাশ করে দিচ্ছেন যে, এসব লোক যখন এত বড় বড় নিদর্শন দেখেও তাদের অন্তরকে শক্ত করে ফেলেছে এবং আল্লাহর কালাম শুনে বুঝার পরেও ওকে পরিবর্তন করে ফেলেছে তখন তোমরা তাদের কাছে আর কিসের আশা করতে পার? ঠিক এরকমই আয়াত অন্য জায়গায় আছেঃ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিশাপ নাযিল করেছি এবং তাদের অন্তরকে শক্ত করে দিয়েছি, এরা আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করে ফেলতো।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কালামকে শুনার কথা বলেছেন। এর দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ঐ সহচরদের বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর কালাম নিজ কানে শুনার জন্যে তার নিকট আবেদন করেছিল। আর তারা পাক-সাফ হওয়ার পর রোযা রেখে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তুর পাহাড়ে গিয়ে সিজদায় পড়ে গেলে আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় কালাম শুনিয়েছিলেন। যখন তারা ফিরে আসে এবং আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর কালাম বানী ইসরাঈলের মধ্যে বর্ণনা করতে আরম্ভ করেন তখন তারা তা পরিবর্তন করতে শুরু করে।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ঐসব লোক তাওরাতের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করেছিল। এই সাধারণ অর্থটিই সঠিক, যার মধ্যে তারাও শামিল হয়ে যাবে এবং এই বদ স্বভাবের অন্যান্য ইয়াহুদীরাও জড়িত থাকবে। কুরআন পাকের এক জায়গায় আছেঃ “মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে তুমি আশ্রয় দান কর যে পর্যন্ত সে আল্লাহর কালাম শ্রবণকরে।”এখানে ভাবার্থ যেমন আল্লাহর কালাম’ নিজের কানে শুনা নয়, তেমনি এখানে আল্লাহর কালাম অর্থে তাওরাত। এ পরিবর্তনকারী ও গোপনকারী ছিল তাদের আলেমেরা। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী তাদের কিতাবে বিদ্যমান। ছিল। ওর মধ্যে তারা মূল ভাব পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এভাবেই তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য করে দিতো। ঘুষ নিয়ে ভুল ফতওয়া দেয়ার অভ্যাস করে ফেলেছিল। তবে হাঁ, ঘুষ না পেলে এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হওয়ার ভয় না থাকলে শিষ্যদের হতে পৃথক থাকার সময় মাঝে মাঝে তারা সত্য কথাও বলে দিতো। মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়ে বলতো-'তোমাদের নবী সত্য। তিনি সত্যই আল্লাহর রাসূল।' কিন্তু যখন তারা পরস্পরে বসতো তখন একে অপরকে বলতো‘তোমরা মুসলমানদেরকে এসব বললে তারা তোমাদেরকেও তাদের ধর্মে টেনে নেবে এবং আল্লাহর কাছেও তোমাদেরকে লা-জবাব করে দেবে। তাদেরকে এর উত্তর দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন যে, এই নির্বোধদের কি এতটুকুও জ্ঞান নেই যে, আল্লাহ তাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কথাই জানেন?একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের কাছে যেন মুমিনরা ছাড়া আর কেউ না আসে।" তখন কাফিরেরা ও ইয়াহূদীরা পরস্পর বলাবলি করে, “তোমরা মুসলমানদের কাছে গিয়ে বল যে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার এখানে যখন আসবে তখন ঐরূপই থাকবে যেমন ছিলে।” সুতরাং ঐসব লোক সকালে এসে ঈমানের দাবী করতো এবং সন্ধ্যায় গিয়ে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতো। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিতাবীদের একটি দল বলে মুমিনদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে ওর উপর দিনের এক অংশে ঈমান আন এবং অপর অংশে কুফরী কর, তা হলে স্বয়ং মুমিনরাও ফিরে আসবে।" এরা এই প্রতারণা দ্বারা মুসলমানদের গোপন তথ্য জেনে নিয়ে তাদের দলের লোকেকে জানিয়ে দিতে চাইতে এবং মুসলমানদেরকেও পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছে করতো। কিন্তু তাদের চতুরতায় কাজ হয়নি। কারণ মহান আল্লাহ তাদের এই গোপন কথা মুমিনদেরকে জানিয়ে দেন। তারা মুসলমানদের কাছে এসে ইসলাম ও ঈমানের কথা প্রকাশ করলে তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কিতাবে কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শুভাগমন ইত্যাদির কথা নেই?” তারা স্বীকার করতো। অতঃপর যখন তারা তাদের বড়দের কাছে যেতো তখন ঐ বড়রা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলতো-“তোমরা কি নিজেদের কথা মুসলমানদেরকে বলে তোমাদের অস্ত্র তাদেরকে দিয়ে দিতে চাও?' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার উপর আক্রমণের দিন ইয়াহুদীদের দুর্গের পাদদেশে দাড়িয়ে বলেনঃ “ও বানর, শূকর ও শয়তানের পূজারীদের ভ্রাতৃমণ্ডলী!” তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকেঃ “তিনি আমাদের ভিতরের কথা কি করে জানলেন। খবরদার! তোমাদের পরস্পরের সংবাদ তাদেরকে দিও না, নচেৎ ওটা আগ্লাহর সামনে দলীল হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা গোপন করলেও আমার কাছে কোন কথা গোপন থাকে না। তোমরা গোপনে গোপনে যে নিজের লোককে বল- তোমরা নিজেদের কথা তাদেরকে বলো না এবং তোমরা যে তোমাদের কিতাবের কথা গোপন করে থাক, আমি তোমাদের এই সমস্ত খারাপ কাজ হতে সম্পূর্ণ সচেতন। আর তোমরা যে বাইরে তোমাদের ঈমানের কথা প্রকাশ করছে, ওটা যে তোমাদের অন্তরের কথা নয় তাও আমি জানি।"
আল-বাকারা 2:78
৭৮-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ভালভাবে লিখতে জানে না। (আরবি)ওর বহু বচন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি বিশেষণ হচ্ছে (আরবি)-কেননা, তিনি ভাল লিখতে জানতেন না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তো এর পূর্বে পড়তেও পারতে না এবং লিখতেও পারতে না, এমন হলে তো এ অসত্যের পূজারীরা কিঞ্চিত সন্দেহ পোষণ করতে পারতো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তো একজন উম্মী’ ও নিরক্ষর লোক, আমি লিখতেও জানি না এবং হিসাবও বুঝি না, মাস কখনও এরকম হয় এবং কখনও ওরকম হয়।” প্রথমবারে তিনি তার দু’হাতের সমস্ত অঙ্গুলি তিনবার নীচের দিকে ঝুঁকিয়ে দেন অর্থাৎ ত্রিশ দিনে এবং দ্বিতীয় বারে দু'বার দু’হাতের সমস্ত অঙ্গুলি কঁকান এবং তৃতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বৃত্ত করে রাখেন, অর্থাৎ উনত্রিশ দিনে। ভাবার্থ এই যে, আমাদের ইবাদত এবং ওর সময় হিসাব নিকাশের উপর নির্ভর করে না। কুরআন মাজীদের এক স্থানে আছেঃ “আল্লাহ তা'আলা নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন।' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আরবের অশিক্ষিত লোককে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে একটি বর্ণনা আছে যে,এখানে উম্মী ওদেরকেই বলা হয়েছে যারা না কোন নবীকে বিশ্বাস করেছিল, না কোন কিতাবকে মেনেছিল। বরং নিজের লিখিত কিতাবকে অন্যদের দ্বারা আল্লাহর কিতাব স্বীকার করিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমতঃ এ কথাটিতো আরবী বাকরীতির উল্টো, দ্বিতীয়তঃ এ কথাটির সনদ ঠিক নয়। (আরবি)এর অর্থ হচ্ছে কথাসমূহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে মিথ্যা আশা ও মনভুলানো কথা। আবার কেউ কেউ এর অর্থ তিলাওয়াত’ বা ‘পাঠ’ও বলেছেন। যেমন কুরআন মাজীদে এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)এখানে ‘পাঠ’ অর্থ স্পষ্ট। কবিদের কবিতায়ও এ শব্দটি পাঠ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।তারা শুধু ধারণার উপরই রয়েছে, অর্থাৎ তারা প্রকৃত ব্যাপারে অবগত নয়; বরং নিরর্থক ধারণা করে থাকে। অতঃপর ইয়াহুদীদের অন্য এক শ্রেণীর লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা লিখা পড়া জানতে ও জনগণকে ভ্রান্ত পথের দিকে আহবান করতো, আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলতে এবং শিষ্যদের নিকট হতে টাকা পয়সা আদায় করার উদ্দেশ্যে ভুল পন্থা অবলম্বন করতো।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে দুর্ভাগ্য’ ও ‘ক্ষতি’-এটা দোযখের একটি গর্তের নামও বটে, যার আগুনে তাপ এত প্রচণ্ড যে, ওর ভিতরে পাহাড় নিক্ষেপ করলেও তা গলে যাবে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দোযখের একটি উপত্যকার নাম অয়েল’ যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পরে ওর তলদেশে সে পৌছবে।” কেননা, এর গভীরতা খুবই বেশী। কিন্তু সনদ হিসেবে এ হাদীসটি গরীব বা দুর্বল। আরও একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম ‘অয়েল’! ইয়াহূদীরা তাওরাতের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করেছিল এবং ওতে কম বেশী করেছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম তা হতে বের করে ফেলেছিল। এজন্যে তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ নাযিল হয়েছিল। আল্লাহ বললেনঃ “যা তারা হাত দ্বারা লিখেছে এবং যা কিছু উপার্জন করেছে তজ্জন্যে তাদের সর্বনাশ হবে। অয়েল এর অর্থ কঠিন শাস্তি, ভীষণ ক্ষতি, ধ্বংস, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদিও হয়ে থাকে (আরবি) এসব শব্দের অর্থ একই। যদিও কেউ কেউ এ শব্দগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থও করেছেন (আরবি) শব্দটির (আরবি) এবং (আরবি) কখনও (আরবি) হতে পারে না। কিন্তু এটা বদ দু'আ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে এটাকে (আরবি)করা হয়েছে। কেউ কেউ ওর উপর (আরবি) দেয়াও বৈধ বলেছেন, কিন্তু (আরবি)-র পঠন নেই। এখানে ইয়াহদী আলেমদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তারা নিজেদের কথাকে আল্লাহর কালাম বলতো এবং নিজেদের লোককে সন্তুষ্ট করে দুনিয়া কামাতে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ “তোমরা কিতাবীদেরকে কোন কিছু জিজ্ঞেস কর কেন? তোমাদের কাছে তো নব প্রেরিত আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান আছে। কিন্ত তো আল্লাহর কিতাবের মধ্যে পরিবর্তন করে ফেলেছে। নিজেদের হস্তলিখিত কথাকেই আত্মাহর দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই তোমাদের নিজস্ব রক্ষিত কিতাব ছেড়ে তাদের পরিবর্তিত কিতাবের কি প্রয়োজন? বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, তারা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করছে না, কিন্তু তোমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে বেড়াচ্ছ।‘অল্প মূল্যের অর্থ হচ্ছে আখেরাতের তুলনায় স্বল্পতা। অর্থাৎ ওর বিনিময়ে সারা দুনিয়া পেলেও আখেরাতের তুলনায় এটা অতি নগণ্য জিনিস। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা যে এভাবে নিজেদের কথাকে আল্লাহর কথা বলে জনগণের কাছে স্বীকৃতি নিচ্ছে এবং ওর বিনিময়ে দুনিয়া কামাচ্ছে,এর ফলে তাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আল-বাকারা 2:79
৭৮-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ভালভাবে লিখতে জানে না। (আরবি)ওর বহু বচন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি বিশেষণ হচ্ছে (আরবি)-কেননা, তিনি ভাল লিখতে জানতেন না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তো এর পূর্বে পড়তেও পারতে না এবং লিখতেও পারতে না, এমন হলে তো এ অসত্যের পূজারীরা কিঞ্চিত সন্দেহ পোষণ করতে পারতো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তো একজন উম্মী’ ও নিরক্ষর লোক, আমি লিখতেও জানি না এবং হিসাবও বুঝি না, মাস কখনও এরকম হয় এবং কখনও ওরকম হয়।” প্রথমবারে তিনি তার দু’হাতের সমস্ত অঙ্গুলি তিনবার নীচের দিকে ঝুঁকিয়ে দেন অর্থাৎ ত্রিশ দিনে এবং দ্বিতীয় বারে দু'বার দু’হাতের সমস্ত অঙ্গুলি কঁকান এবং তৃতীয়বার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বৃত্ত করে রাখেন, অর্থাৎ উনত্রিশ দিনে। ভাবার্থ এই যে, আমাদের ইবাদত এবং ওর সময় হিসাব নিকাশের উপর নির্ভর করে না। কুরআন মাজীদের এক স্থানে আছেঃ “আল্লাহ তা'আলা নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন।' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আরবের অশিক্ষিত লোককে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে একটি বর্ণনা আছে যে,এখানে উম্মী ওদেরকেই বলা হয়েছে যারা না কোন নবীকে বিশ্বাস করেছিল, না কোন কিতাবকে মেনেছিল। বরং নিজের লিখিত কিতাবকে অন্যদের দ্বারা আল্লাহর কিতাব স্বীকার করিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমতঃ এ কথাটিতো আরবী বাকরীতির উল্টো, দ্বিতীয়তঃ এ কথাটির সনদ ঠিক নয়। (আরবি)এর অর্থ হচ্ছে কথাসমূহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে মিথ্যা আশা ও মনভুলানো কথা। আবার কেউ কেউ এর অর্থ তিলাওয়াত’ বা ‘পাঠ’ও বলেছেন। যেমন কুরআন মাজীদে এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)এখানে ‘পাঠ’ অর্থ স্পষ্ট। কবিদের কবিতায়ও এ শব্দটি পাঠ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।তারা শুধু ধারণার উপরই রয়েছে, অর্থাৎ তারা প্রকৃত ব্যাপারে অবগত নয়; বরং নিরর্থক ধারণা করে থাকে। অতঃপর ইয়াহুদীদের অন্য এক শ্রেণীর লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা লিখা পড়া জানতে ও জনগণকে ভ্রান্ত পথের দিকে আহবান করতো, আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলতে এবং শিষ্যদের নিকট হতে টাকা পয়সা আদায় করার উদ্দেশ্যে ভুল পন্থা অবলম্বন করতো।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে দুর্ভাগ্য’ ও ‘ক্ষতি’-এটা দোযখের একটি গর্তের নামও বটে, যার আগুনে তাপ এত প্রচণ্ড যে, ওর ভিতরে পাহাড় নিক্ষেপ করলেও তা গলে যাবে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দোযখের একটি উপত্যকার নাম অয়েল’ যার মধ্যে কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ বছর পরে ওর তলদেশে সে পৌছবে।” কেননা, এর গভীরতা খুবই বেশী। কিন্তু সনদ হিসেবে এ হাদীসটি গরীব বা দুর্বল। আরও একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম ‘অয়েল’! ইয়াহূদীরা তাওরাতের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করেছিল এবং ওতে কম বেশী করেছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম তা হতে বের করে ফেলেছিল। এজন্যে তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ নাযিল হয়েছিল। আল্লাহ বললেনঃ “যা তারা হাত দ্বারা লিখেছে এবং যা কিছু উপার্জন করেছে তজ্জন্যে তাদের সর্বনাশ হবে। অয়েল এর অর্থ কঠিন শাস্তি, ভীষণ ক্ষতি, ধ্বংস, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদিও হয়ে থাকে (আরবি) এসব শব্দের অর্থ একই। যদিও কেউ কেউ এ শব্দগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থও করেছেন (আরবি) শব্দটির (আরবি) এবং (আরবি) কখনও (আরবি) হতে পারে না। কিন্তু এটা বদ দু'আ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে এটাকে (আরবি)করা হয়েছে। কেউ কেউ ওর উপর (আরবি) দেয়াও বৈধ বলেছেন, কিন্তু (আরবি)-র পঠন নেই। এখানে ইয়াহদী আলেমদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তারা নিজেদের কথাকে আল্লাহর কালাম বলতো এবং নিজেদের লোককে সন্তুষ্ট করে দুনিয়া কামাতে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ “তোমরা কিতাবীদেরকে কোন কিছু জিজ্ঞেস কর কেন? তোমাদের কাছে তো নব প্রেরিত আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান আছে। কিন্ত তো আল্লাহর কিতাবের মধ্যে পরিবর্তন করে ফেলেছে। নিজেদের হস্তলিখিত কথাকেই আত্মাহর দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই তোমাদের নিজস্ব রক্ষিত কিতাব ছেড়ে তাদের পরিবর্তিত কিতাবের কি প্রয়োজন? বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, তারা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করছে না, কিন্তু তোমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে বেড়াচ্ছ।‘অল্প মূল্যের অর্থ হচ্ছে আখেরাতের তুলনায় স্বল্পতা। অর্থাৎ ওর বিনিময়ে সারা দুনিয়া পেলেও আখেরাতের তুলনায় এটা অতি নগণ্য জিনিস। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা যে এভাবে নিজেদের কথাকে আল্লাহর কথা বলে জনগণের কাছে স্বীকৃতি নিচ্ছে এবং ওর বিনিময়ে দুনিয়া কামাচ্ছে,এর ফলে তাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আল-বাকারা 2:80
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহুদীরা বলতোঃ “পৃথিবীর মোট সময়কাল হচ্ছে সাত হাজার বছর। প্রতি হাজার বছরের পরিবর্তে আমাদের একদিন শাস্তি হবে। তা হলে আমাদেরকে মাত্র সাত দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। তাদের এ কথাকে খণ্ডন করতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কারও কারও মতে তারা চল্লিশ দিন দোযখে থাকবে বলে ধারণা করতো। কেননা, তাদের পূর্বপুরুষরা চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাছুরের পূজা করেছিল। কারও কারও মতে তাদের এই ধারণা হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাওরাতে আছেঃ “ দোযখের দুই ধারের ‘ যাম' নামক বৃক্ষ পর্যন্ত চল্লিশ দিনের পথ'-তাই তারা বলতো যে, এ সময়ের পরে শাস্তি উঠে যাবে।একটি বর্ণনায় আছে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বলেঃ “চল্লিশ দিন পর্যন্ত আমরা দোযখে অবস্থান করবো, অতঃপর অন্যেরা আমাদের জায়গায় এসে যাবে। অর্থাৎ আপনার উম্মত।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদের মাথায় হাত রেখে বলেনঃ না, বরং তোমরা চিরকাল দোযখে অবস্থান করবে। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, খাইবার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে বিষ মিশ্রিত হাগলের গোশত ‘হাদিয়া স্বরূপ আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের বাপ কে?' তারা বলেঃ “অমুক।' তিনি বলেনঃ “তোমরা মিথ্যা বলছো, তোমাদের বাপ অমুক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে কতকগুলো প্রশ্ন করবো, তোমরা ঠিক ঠিক উত্তর দেবে তো?' তারা বলেঃ ‘হ, হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা যদি মিথ্যে বলি তবে আপনি জেনে ফেলবেন যেমন আমাদের বাপের ব্যাপারে জেনে ফেলেছেন। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা বল তো দোযখী কারা? তারা বলেঃ কিছু দিন তো আমরা দোযখে অবস্থান করবো, অতঃপর আপনার উম্মত আমাদের স্থলে অবস্থান করবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহর শপথ! তখনও আমরা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবো না।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তোমাদেরকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, তোমরা সত্য বলবে তো?' তারা বলেঃ ‘হ, হে। আবুল কাসিম (সঃ)! তিনি বলেনঃ “তোমরা কি এতে (গোশতে) বিষ মিশিয়েছো?' তারা বলেঃ হাঁ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কেন?' তারা বলেঃ ‘এই জন্যে যে, যদি আপনি সত্যবাদী হন তবে এ বিষ আপনার কোন ক্ষতি করবে না, আর যদি মিথ্যেবাদী হন, তবে আমরা আপনা হতে শান্তি লাভ করবো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ, সহীহ বুখারী, সুনান-ই- নাসাঈ)।
আল-বাকারা 2:81
৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীরভাবার্থ এই যে, যার কর্ম সবই মন্দ, যার মধ্যে পুণ্যের লেশ মাত্র নেই সে দোযখী, পক্ষান্তরে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করেছে সে জান্নাতবাসী। যেমন অন্যস্থানে আছেঃ “না তোমাদের কোন অভিসন্ধি চলবে, না আহলে কিতাবের। যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে এবং তার জন্যে আল্লাহ ছাড়া কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। আর মুমিন নর বা নারীর মধ্যে যারা ভাল কাজ করবে তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে এবং বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কাজের অর্থ কুফরী। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এর অর্থ হচ্ছে শিক'। আবু অয়েল (রঃ), আকূল ‘আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) কাতাদাহ (রঃ) এবং রাবী ‘বিন আনাস (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও এটা বর্ণিত আছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মন্দ কাজের অর্থ হচ্ছে কবিরা গুনাহ’ যা স্তর স্তর হয়ে অন্তরের অবস্থা খারাপ করে দেয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ শিরক, যা অন্তরকে অধিকার করে বসে। হযরত রাবী’ বিন খাসিম (রঃ)-এর মতে এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে পাপের অবস্থাতেই মরে এবং তাওবা করার সুযোগ লাভ করে না। মুসনাদ-ই-আহমাদে হাদীস আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা পাপকে ছোট মনে করো না, এগুলো জমা হয়ে মানুষের ধ্বংসের কারণ হবে। তোমরা কি দেখনা যে, কতকগুলো লোক একটি করে খড়ি নিয়ে আসলে খড়ির একটি স্তুপ হয়ে যায়। অতঃপর ওতে আগুন ধরিয়ে দিলে ওটা বড় বড় জিনিসকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়?" অতঃপর ঈমানদারগণের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন যে, তোমাদের মধ্যে যারা কুফরীর মুকাবিলায় ঈমান আনে এবং অসৎ কাজের মুকাবিলায় সকার্য করে, তাদের জন্যে চিরস্থায়ী আরাম ও শান্তি। তারা শান্তিদায়ক বেহেশতের মধ্যে চিরকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ প্রদত্ত শান্তি ও শাস্তি উভয়ই চিরস্থায়ী।
আল-বাকারা 2:82
৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীরভাবার্থ এই যে, যার কর্ম সবই মন্দ, যার মধ্যে পুণ্যের লেশ মাত্র নেই সে দোযখী, পক্ষান্তরে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করেছে সে জান্নাতবাসী। যেমন অন্যস্থানে আছেঃ “না তোমাদের কোন অভিসন্ধি চলবে, না আহলে কিতাবের। যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে এবং তার জন্যে আল্লাহ ছাড়া কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। আর মুমিন নর বা নারীর মধ্যে যারা ভাল কাজ করবে তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে এবং বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কাজের অর্থ কুফরী। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এর অর্থ হচ্ছে শিক'। আবু অয়েল (রঃ), আকূল ‘আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) কাতাদাহ (রঃ) এবং রাবী ‘বিন আনাস (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও এটা বর্ণিত আছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মন্দ কাজের অর্থ হচ্ছে কবিরা গুনাহ’ যা স্তর স্তর হয়ে অন্তরের অবস্থা খারাপ করে দেয়।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ শিরক, যা অন্তরকে অধিকার করে বসে। হযরত রাবী’ বিন খাসিম (রঃ)-এর মতে এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে পাপের অবস্থাতেই মরে এবং তাওবা করার সুযোগ লাভ করে না। মুসনাদ-ই-আহমাদে হাদীস আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা পাপকে ছোট মনে করো না, এগুলো জমা হয়ে মানুষের ধ্বংসের কারণ হবে। তোমরা কি দেখনা যে, কতকগুলো লোক একটি করে খড়ি নিয়ে আসলে খড়ির একটি স্তুপ হয়ে যায়। অতঃপর ওতে আগুন ধরিয়ে দিলে ওটা বড় বড় জিনিসকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়?" অতঃপর ঈমানদারগণের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন যে, তোমাদের মধ্যে যারা কুফরীর মুকাবিলায় ঈমান আনে এবং অসৎ কাজের মুকাবিলায় সকার্য করে, তাদের জন্যে চিরস্থায়ী আরাম ও শান্তি। তারা শান্তিদায়ক বেহেশতের মধ্যে চিরকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ প্রদত্ত শান্তি ও শাস্তি উভয়ই চিরস্থায়ী।
আল-বাকারা 2:83
বানী ইসরাঈলের নিকট হতে কতকগুলো প্রতিশ্রুতি গ্রহণও তার বিস্তারিত বিবরণ বানী ইসরাঈলের উপর যে নির্দেশাবলী রয়েছে এবং তাদের নিকট হতে যে। প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আলোচনা করা হচ্ছে। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর একতুবাদ মেনে নেয় এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা করে। শুধু মাত্র বানী ইসরাঈলই নয়, বরং সমস্ত মাখলুকের প্রতি এ নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “সব রাসূলকেই আমি এ নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন ঘোষণা করে দেয় আমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউই নেই,সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেছেনঃ “এবং আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি (তারা মানুষকে বলেছে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তিনি ছাড়া অন্যান্য বাতিল মাবুদ হতে বেঁচে থাকো।” সবচয়ে বড় হক আল্লাহ তায়ালারই, এবং তার যতগুলো হক আছে তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে এই যে, তারই ইবাদত করা হবে এবং তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না।আল্লাহ তা'আলার হকের পর এখন বান্দাদের হকের কথা বলা হচ্ছে। বান্দাদের মধ্যে মা-বাপের হক সবচেয়ে বড় বলে প্রথমে ওরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং মা-বাপের প্রতিও এহসান কর।” অন্যত্র তিনি বলেনঃ “তোমার প্রভুর সিদ্ধান্ত এই যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাপের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময় মত আদায় করা।” জিজ্ঞেস করেনঃ ‘তার পর কোটি? তিনি বলেনঃ মা-বাপের খিদমত করা।” জিজ্ঞেস করেনঃ “এরপর কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।'আর একটি সহীহ হাদীসে আছে, একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কার সাথে সৎ ব্যবহার করবো?' তিনি বলেনঃ “তোমার মায়ের সঙ্গে। লোকটি জিজ্ঞেস করেনঃ “তারপরে কার সঙ্গে?' তিনি বলেনঃ তোমার মায়ের সঙ্গে। আবার জিজ্ঞেস করেনঃ তারপর কার সঙ্গে?' তিনি বলেনঃ “তোমার বাপের সঙ্গে এবং তারপরে অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে।এ আয়াতে (আরবি) বলেছেন, কেননা (আরবি) অপেক্ষা এতে গুরুত্ব বেশী আছে। কেউ কেউ (আরবি) ও পড়েছেন। হযরত উবাই (রাঃ) এবং হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা (আরবি)পড়েছেন। সেই ছোট ছেলেকে বলা হয় যার পিতা নেই (আরবি) ঐ সব লোককে বলা হয় যারা নিজের ও স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের খাওয়া পরার খরচ চালাতে পারে না। এরপূর্ণ ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ্ সূরা-ই-নিসার মধ্যে এর অর্থের আয়াতে আসবে। অতঃপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ “সর্বসাধারণের সাথে উত্তম রূপে কথা বল”। অর্থাৎ তাদের সাথে নম্রভাবে ও হাসিমুখে কথা বল। তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ দাও ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখ। যেমন হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা ভাল কাজের আদেশ কর ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখ। আর সহনশীলতা, ক্ষমা ও অপরাধ মাফ করার নীতি গ্রহণ কর। এটাই উত্তম চরিত্র যা গ্রহণ করা উচিত।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “ভাল জিনিসকে ঘৃণা করো না, কিছু করতে না পারলেও অন্ততঃ তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ কর”। (মুসনাদ-ইআহমাদ)। সুতরাং আল্লাহ্ প্রথমে তার ইবাদতের নির্দেশ দেন, অতঃপর পিতা মাতার খিদমত করা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের প্রতি সুনজর দেয়া এবং জনসাধারণের সাথে উত্তমরূপে কথা বলা ইত্যাদির নির্দেশ দেন। এরপর কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরও আলোচনা করেন। যেমন বলেনঃ নামায পড়, যাকাত দাও।' তারপর এ সংবাদ দেন যে, তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং অল্প লোক ছাড়া তাদের অধিকাংশই অবাধ্য হয়ে যায়। এ উম্মতকেও এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর,তার সঙ্গে অন্যকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে, আত্মীয়দের সঙ্গে, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সঙ্গে, নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে, দূরবর্তী-প্রতিবেশীর সঙ্গে, সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে, মুসাফিরদের সঙ্গে এবং দাস দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। মনে রেখো যে, আল্লাহ আত্মম্ভরী অহংকারীকে পছন্দ করেন না। এই উম্মত অন্যান্য উম্মতের তুলনায় এ সব নির্দেশ মানার ব্যাপারে এবং ওর উপর আমল করার ব্যাপারে অনেক বেশী দৃঢ় প্রমাণিত হয়েছে। অদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইয়াহূদীও খ্রীষ্টানদেরকে সালাম দিতেন এবং এর দলীল রূপে আল্লাহর এ নির্দেশটি পেশ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমরা জন সাধারণের সাথে উত্তমরূপে কথা বলবে। কিন্তু এ বর্ণনাটি গরীব এবং হাদীসের উল্টো। হাদীসে স্পষ্টরূপে বিদ্যমান আছে যে, তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে প্রথমতঃ (আরবি) বলবে না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:84
৮৪-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর মদীনার দুটি বিখ্যাত গোত্র এবং তাদের পরস্পর শত্রুতামদীনার আনসারদের দুটি গোত্র ছিলঃ (১) আউস ও (২) খাযরা। ইসলামের পূর্বে এই গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কখনও কোন মিল ছিল না। পরস্পর যুদ্ধ গ্রিহ লেগেই থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র ছিলঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বানু নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযা। বানূ কাইনুকা ও বানু নাযীর খাযরাজের পক্ষপাতী ছিল এবং তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল। আর বানু কুরাইযার বন্ধুত্ব ছিল আউসের সঙ্গে। আউস ও খাযরাযের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হতো তখন ইয়াহুদীদের তিনটি দল নিজ নিজ মিত্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দুই পক্ষের ইয়াহূদী স্বয়ং তাদেরই হাতে মারাও পড়তো এবং সুযোগ পেলে একে অপরের ঘর বাড়ী ধ্বংস করতে এবং দেশ থেকে তাড়িয়েও দিতো। ধন-মালও দখল করে নিতে। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে পরাজিত দলের বন্দীদেরকে তারা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে এবং বলতোঃ “আমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ আছে যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ বন্দী হয়ে যায় তবে আমরা যেন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। তারই উত্তরে মহান আল্লাহ্ তাদেরকে বলছেনঃ “এর কারণ কি যে, আমার এ হুকুম তো মানছে, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম তোমরা পরস্পর কাটাকাটি করো না, একে অপরকে বাড়ী হতে বের করে দিও না, তা মাননা কেন? এক হুকুমের উপর ঈমান আনা এবং অন্য হুকুমকে অমান্য করা, এটা আবার কোন ঈমানদারী?" আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিজেদের কুক্ত প্ৰহিত করো না, নিজেদের লোককে তাদের বাড়ী হতে বের করে দিও না। কেননা তোষর এক মাযহাবের লোক এবং সবাই এক আত্মার মত।” হাদীস শরীফেও আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সমস্ত মু'মিন প্রম্পর বন্ধুত্ব, দয়া ও সাহায্য-সহানুভূতি করার ব্যাপারে একটি শরীরে মত। কোন একটি অঙ্গের ব্যথায় সমস্ত শরীর অস্থির হয়ে থাকে, শরীরে জ্বর চলে আসে এবং রাত্রে দ্রিা হারিয়ে যায়। এরকমই একজন সাধারণ মুসলমানের বিপদে সারা বিশ্ব জাহানের মুসলমানদের অস্থির হওয়া উচিত। আব্দ খায়ের (রাঃ) বলেনঃ “আমরা সালমান বিন রাবীর নেতৃত্বে ‘লালজারে’ জিহাদ করছিলাম। ওটা অবরোধের পর আমরা ঐ শহরটি দখল করি। ওর মধ্যে কিছু বন্দীও ছিল। এদের মধ্যে একটি ক্রীতদাসীকে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) সাতশো তে কিনে নেন। রাসূল জালুতের নিকট পৌছে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)তার নিকট গমন করেন এবং তাকে বলেনঃ “দাসীটি তোমার ধর্মের নারী। আমি একে সাত শোর বিনিময়ে কিনেছি। এখন তুমি তাকে কিনি আযাদ করে দাও।" সে বলেঃ খুব ভাল কথা, আমি চৌদ্দশো দিচ্ছি।' তিনি বলেনঃ আমি চার হাজারের কমে একে বেচবো। তখন সে বলেঃ তাহলে আমার কেনার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেনঃ একে ক্রয় কর,নতুবা তোমার ধর্ম চলে যাবে। তাওরাতে লিখিত আছে-বানী ইসরাঈলের কোন একটি লোকও যদি বন্দী হয়ে যায় তবে তাকে কিনে নিয়ে আযাদ করে দাও। সে যদি বন্দী অবস্থায় তোমাদের নিকট আসে তবে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নাও এবং বাস্তুহারা করো না। এখন হয় তাওরাতকে মেনে তাকে ক্রয় কর,আর না হয় তাওরাতকে অস্বীকার কর।' সে বুঝে নেয় এবং বলেঃ তুমি কি আবদুল্লাহ বিন সালাম?' তিনি বলেনঃ হাঁ। সুতরাং সে চার হাজার নিয়ে আসে। তিনি দু'হাজার তাকে ফেরত দেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, রাসূল জালুত কুফায় ছিল। আরবের স্ত্রী লোক ছাড়া সে অন্য কারও মুক্তিপণ দিতো না। কাজেই আবদুল্লাহ বিন সালাম তাকে তাওরাতের এ আয়াতটি শুনিয়ে দেন। মোট কথা, কুরআন মাজীদের এ আয়াতটিতে ইয়াহুদীদেরকে নিন্দে করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী জানা সত্ত্বেও তাকে পৃষ্ঠের পিছনের নিক্ষেপ করেছে। আমানতদারী ও ঈমানদারী তাদের মধ্যে লোপ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী, তার নির্দেশাবলী, তার জন্ম স্থান, তার হিজরতের স্থান ইত্যাদি সব কিছুই তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এ সবগুলোই তারা গোপন করে রেখেছে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরই কারণে তাদের উপর ইহলৌকিক লাঞ্ছনা এসেছে এবং পরকালেও তাদের জন্যে চিরস্থায়ী কঠিন শাস্তি রয়েছে।
আল-বাকারা 2:85
৮৪-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর মদীনার দুটি বিখ্যাত গোত্র এবং তাদের পরস্পর শত্রুতামদীনার আনসারদের দুটি গোত্র ছিলঃ (১) আউস ও (২) খাযরা। ইসলামের পূর্বে এই গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কখনও কোন মিল ছিল না। পরস্পর যুদ্ধ গ্রিহ লেগেই থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র ছিলঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বানু নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযা। বানূ কাইনুকা ও বানু নাযীর খাযরাজের পক্ষপাতী ছিল এবং তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল। আর বানু কুরাইযার বন্ধুত্ব ছিল আউসের সঙ্গে। আউস ও খাযরাযের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হতো তখন ইয়াহুদীদের তিনটি দল নিজ নিজ মিত্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দুই পক্ষের ইয়াহূদী স্বয়ং তাদেরই হাতে মারাও পড়তো এবং সুযোগ পেলে একে অপরের ঘর বাড়ী ধ্বংস করতে এবং দেশ থেকে তাড়িয়েও দিতো। ধন-মালও দখল করে নিতে। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে পরাজিত দলের বন্দীদেরকে তারা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে এবং বলতোঃ “আমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ আছে যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ বন্দী হয়ে যায় তবে আমরা যেন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। তারই উত্তরে মহান আল্লাহ্ তাদেরকে বলছেনঃ “এর কারণ কি যে, আমার এ হুকুম তো মানছে, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম তোমরা পরস্পর কাটাকাটি করো না, একে অপরকে বাড়ী হতে বের করে দিও না, তা মাননা কেন? এক হুকুমের উপর ঈমান আনা এবং অন্য হুকুমকে অমান্য করা, এটা আবার কোন ঈমানদারী?" আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিজেদের কুক্ত প্ৰহিত করো না, নিজেদের লোককে তাদের বাড়ী হতে বের করে দিও না। কেননা তোষর এক মাযহাবের লোক এবং সবাই এক আত্মার মত।” হাদীস শরীফেও আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সমস্ত মু'মিন প্রম্পর বন্ধুত্ব, দয়া ও সাহায্য-সহানুভূতি করার ব্যাপারে একটি শরীরে মত। কোন একটি অঙ্গের ব্যথায় সমস্ত শরীর অস্থির হয়ে থাকে, শরীরে জ্বর চলে আসে এবং রাত্রে দ্রিা হারিয়ে যায়। এরকমই একজন সাধারণ মুসলমানের বিপদে সারা বিশ্ব জাহানের মুসলমানদের অস্থির হওয়া উচিত। আব্দ খায়ের (রাঃ) বলেনঃ “আমরা সালমান বিন রাবীর নেতৃত্বে ‘লালজারে’ জিহাদ করছিলাম। ওটা অবরোধের পর আমরা ঐ শহরটি দখল করি। ওর মধ্যে কিছু বন্দীও ছিল। এদের মধ্যে একটি ক্রীতদাসীকে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) সাতশো তে কিনে নেন। রাসূল জালুতের নিকট পৌছে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)তার নিকট গমন করেন এবং তাকে বলেনঃ “দাসীটি তোমার ধর্মের নারী। আমি একে সাত শোর বিনিময়ে কিনেছি। এখন তুমি তাকে কিনি আযাদ করে দাও।" সে বলেঃ খুব ভাল কথা, আমি চৌদ্দশো দিচ্ছি।' তিনি বলেনঃ আমি চার হাজারের কমে একে বেচবো। তখন সে বলেঃ তাহলে আমার কেনার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেনঃ একে ক্রয় কর,নতুবা তোমার ধর্ম চলে যাবে। তাওরাতে লিখিত আছে-বানী ইসরাঈলের কোন একটি লোকও যদি বন্দী হয়ে যায় তবে তাকে কিনে নিয়ে আযাদ করে দাও। সে যদি বন্দী অবস্থায় তোমাদের নিকট আসে তবে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নাও এবং বাস্তুহারা করো না। এখন হয় তাওরাতকে মেনে তাকে ক্রয় কর,আর না হয় তাওরাতকে অস্বীকার কর।' সে বুঝে নেয় এবং বলেঃ তুমি কি আবদুল্লাহ বিন সালাম?' তিনি বলেনঃ হাঁ। সুতরাং সে চার হাজার নিয়ে আসে। তিনি দু'হাজার তাকে ফেরত দেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, রাসূল জালুত কুফায় ছিল। আরবের স্ত্রী লোক ছাড়া সে অন্য কারও মুক্তিপণ দিতো না। কাজেই আবদুল্লাহ বিন সালাম তাকে তাওরাতের এ আয়াতটি শুনিয়ে দেন। মোট কথা, কুরআন মাজীদের এ আয়াতটিতে ইয়াহুদীদেরকে নিন্দে করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী জানা সত্ত্বেও তাকে পৃষ্ঠের পিছনের নিক্ষেপ করেছে। আমানতদারী ও ঈমানদারী তাদের মধ্যে লোপ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী, তার নির্দেশাবলী, তার জন্ম স্থান, তার হিজরতের স্থান ইত্যাদি সব কিছুই তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এ সবগুলোই তারা গোপন করে রেখেছে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরই কারণে তাদের উপর ইহলৌকিক লাঞ্ছনা এসেছে এবং পরকালেও তাদের জন্যে চিরস্থায়ী কঠিন শাস্তি রয়েছে।
আল-বাকারা 2:86
৮৪-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর মদীনার দুটি বিখ্যাত গোত্র এবং তাদের পরস্পর শত্রুতামদীনার আনসারদের দুটি গোত্র ছিলঃ (১) আউস ও (২) খাযরা। ইসলামের পূর্বে এই গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কখনও কোন মিল ছিল না। পরস্পর যুদ্ধ গ্রিহ লেগেই থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র ছিলঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বানু নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযা। বানূ কাইনুকা ও বানু নাযীর খাযরাজের পক্ষপাতী ছিল এবং তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল। আর বানু কুরাইযার বন্ধুত্ব ছিল আউসের সঙ্গে। আউস ও খাযরাযের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হতো তখন ইয়াহুদীদের তিনটি দল নিজ নিজ মিত্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দুই পক্ষের ইয়াহূদী স্বয়ং তাদেরই হাতে মারাও পড়তো এবং সুযোগ পেলে একে অপরের ঘর বাড়ী ধ্বংস করতে এবং দেশ থেকে তাড়িয়েও দিতো। ধন-মালও দখল করে নিতে। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে পরাজিত দলের বন্দীদেরকে তারা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে এবং বলতোঃ “আমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ আছে যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ বন্দী হয়ে যায় তবে আমরা যেন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। তারই উত্তরে মহান আল্লাহ্ তাদেরকে বলছেনঃ “এর কারণ কি যে, আমার এ হুকুম তো মানছে, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম তোমরা পরস্পর কাটাকাটি করো না, একে অপরকে বাড়ী হতে বের করে দিও না, তা মাননা কেন? এক হুকুমের উপর ঈমান আনা এবং অন্য হুকুমকে অমান্য করা, এটা আবার কোন ঈমানদারী?" আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিজেদের কুক্ত প্ৰহিত করো না, নিজেদের লোককে তাদের বাড়ী হতে বের করে দিও না। কেননা তোষর এক মাযহাবের লোক এবং সবাই এক আত্মার মত।” হাদীস শরীফেও আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সমস্ত মু'মিন প্রম্পর বন্ধুত্ব, দয়া ও সাহায্য-সহানুভূতি করার ব্যাপারে একটি শরীরে মত। কোন একটি অঙ্গের ব্যথায় সমস্ত শরীর অস্থির হয়ে থাকে, শরীরে জ্বর চলে আসে এবং রাত্রে দ্রিা হারিয়ে যায়। এরকমই একজন সাধারণ মুসলমানের বিপদে সারা বিশ্ব জাহানের মুসলমানদের অস্থির হওয়া উচিত। আব্দ খায়ের (রাঃ) বলেনঃ “আমরা সালমান বিন রাবীর নেতৃত্বে ‘লালজারে’ জিহাদ করছিলাম। ওটা অবরোধের পর আমরা ঐ শহরটি দখল করি। ওর মধ্যে কিছু বন্দীও ছিল। এদের মধ্যে একটি ক্রীতদাসীকে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) সাতশো তে কিনে নেন। রাসূল জালুতের নিকট পৌছে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)তার নিকট গমন করেন এবং তাকে বলেনঃ “দাসীটি তোমার ধর্মের নারী। আমি একে সাত শোর বিনিময়ে কিনেছি। এখন তুমি তাকে কিনি আযাদ করে দাও।" সে বলেঃ খুব ভাল কথা, আমি চৌদ্দশো দিচ্ছি।' তিনি বলেনঃ আমি চার হাজারের কমে একে বেচবো। তখন সে বলেঃ তাহলে আমার কেনার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেনঃ একে ক্রয় কর,নতুবা তোমার ধর্ম চলে যাবে। তাওরাতে লিখিত আছে-বানী ইসরাঈলের কোন একটি লোকও যদি বন্দী হয়ে যায় তবে তাকে কিনে নিয়ে আযাদ করে দাও। সে যদি বন্দী অবস্থায় তোমাদের নিকট আসে তবে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নাও এবং বাস্তুহারা করো না। এখন হয় তাওরাতকে মেনে তাকে ক্রয় কর,আর না হয় তাওরাতকে অস্বীকার কর।' সে বুঝে নেয় এবং বলেঃ তুমি কি আবদুল্লাহ বিন সালাম?' তিনি বলেনঃ হাঁ। সুতরাং সে চার হাজার নিয়ে আসে। তিনি দু'হাজার তাকে ফেরত দেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, রাসূল জালুত কুফায় ছিল। আরবের স্ত্রী লোক ছাড়া সে অন্য কারও মুক্তিপণ দিতো না। কাজেই আবদুল্লাহ বিন সালাম তাকে তাওরাতের এ আয়াতটি শুনিয়ে দেন। মোট কথা, কুরআন মাজীদের এ আয়াতটিতে ইয়াহুদীদেরকে নিন্দে করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী জানা সত্ত্বেও তাকে পৃষ্ঠের পিছনের নিক্ষেপ করেছে। আমানতদারী ও ঈমানদারী তাদের মধ্যে লোপ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী, তার নির্দেশাবলী, তার জন্ম স্থান, তার হিজরতের স্থান ইত্যাদি সব কিছুই তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এ সবগুলোই তারা গোপন করে রেখেছে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরই কারণে তাদের উপর ইহলৌকিক লাঞ্ছনা এসেছে এবং পরকালেও তাদের জন্যে চিরস্থায়ী কঠিন শাস্তি রয়েছে।
আল-বাকারা 2:87
এখানে বানী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, অহংকার এবং প্রবৃত্তি পূজার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা আওরাতের পরিবর্তন সাধন করলো, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে তাঁর শরীয়ত নিয়ে অন্য যে সব নবী (আঃ) আসলেন তাদের তারা বিরোধিতা করলো। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে হিদায়াত আছে ও নূর রয়েছে, যা মোতাবেক নবীগণ ও মুসলমানগণ ইয়াহুদীদেরকে নির্দেশ প্রদান করতো এবং তাদের আলেম ও দরবেশগণও তাদেরকে ওটা মানবার নির্দেশ দিতো।মোট কথা-ক্রমান্বয়ে নবীগণ (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্যে আসতে থাকেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করা হয়। এর মধ্যে কতকগুলো নির্দেশ তাওরাতের বিপরীতও ছিল। এজন্যেই তাঁকে নতুন নতুন মু'জিযাও দেয়া হয়েছে। যেমন, আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করা,মাটি দ্বারা পাখী তৈরী করে ওর মধ্যে ফুঁ দিয়ে আল্লাহর হুকুমে তাকে উড়িয়ে দেয়া, আল্লাহর হুকুমে কুষ্ট রোগীকে ভাল করে দেয়া, তার হুকুমে কতকগুলো ভবিষ্যতের সংবাদ প্রদান করা ইত্যাদি। অতঃপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসার সহায়তার জন্যে রূহুল কুদস” অর্থাৎ হযরত জীবরাঈল (আঃ) কে নিযুক্ত করেন। কিন্তু বানী ইসরাঈলের মিথ্যা প্রতিপন্নতা ও অহংকার আরও বেড়ে যায় এবং তারা হিংসা করতে থাকে। আর তারা নবী (আঃ)-এর সঙ্গে অসৎ ব্যবহার করতে থাকে। কোন কোন নবীকে তারা মিথ্যাবাদী বলে, আবার কোন কোন নবীকে তারা হত্যা করে ফেলে। এর কারণ এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে,নবীদের শিক্ষা তাদের প্রবৃত্তি ও মনের উল্টো ছিল। তারা তাদেরকে তাওরাতের ঐ নির্দেশাবলী মেনে চলতে বলতেন, যা তারা পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এজন্যেই তারা তাদের শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে যেতো।হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ), ইসমাঈল বিন খালিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ), আতিয়্যাতুল আওফী (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীবর্গের এটাই অভিমত যে, রূহুল কুদসের ভাবার্থ হচ্ছে হযরত জিবরাঈল (আঃ)। কুরআন মাজীদের এক স্থানে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তা নিয়ে রূহুল আমীন অবতীর্ণ হতো।' (২৬:১৯৩)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত হাসসান কবির (রাঃ) জন্যে মসজিদে একটি মিম্বর রাখেন। তিনি মুশরিকদের ব্যঙ্গ কবিতার উত্তর দিতেন। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে প্রার্থনা করতেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি রূহুল কুদ্স দ্বারা হাসান (রাঃ)-কে সাহায্য করুন। সে আপনার নবীর (সঃ) পক্ষ থেকে উত্তর দিচ্ছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) লিখাফতের আমলে একদা হযরত হাসান (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) কতকগুলো কবিতা পাঠ করছিলেন। হযরত উমার (রাঃ) তাঁর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো ঐ সময়েও এখানে এ কবিতাগুলো পাঠ করতাম, যখন এখানে আপনার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি বিদ্যমান থাকতেন। অতঃপর তিনি হযরত আবু হুরাইরাকে (রাঃ) লক্ষ্য করে বলেনঃ “ হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! আল্লাহর শপথ করে বলুনতো, আপনি কি আল্লাহর রাসূল (সঃ)কে একথা বলতে শুনেননি? হাস্সান (রাঃ) মুশরিকদের কবিতার উত্তর দিয়ে থাকে, হে আল্লাহ! রূহুল কুদুস দ্বারা তাকে সাহায্য করুন? হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি শুনেছি।'কোন কোন বর্ণনায় এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলতেনঃ “হে হাস্সান (রাঃ)! তুমি মুশকিরদেরকে ব্যঙ্গ কর। হযরত জিবরাঈলও (আঃ) তোমার সঙ্গে আছেন।' হযরত হাসানের (রাঃ) কবিতার মধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ)কে রুহুল কুদুস বলা হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কে কুহু সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি যে, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করে বল তো তিনি যে হচ্ছেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)তা কি তোমরা জান না? তারা সবাই তখন বলেঃ হাঁ, নিশ্চয়ই।- (ইবনে ইসহাক)ইবনে হিব্বানের (রঃ) গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জিবরাঈল (আঃ) আমার অন্তরে বলেনঃ “কোন লোকই স্বীয় আহার্য ও জীবন পুরো করা ছাড়া মরে না। আল্লাহকে তোমরা ভয় কর এবং দুনিয়া কামানোর ব্যাপারে দ্বীনের প্রতি লক্ষ্য রেখো’।কেউ কেউ রুহুল কুদুস অর্থ ইসমে আযম ও নিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, রুহুল কুদুস' হচ্ছেন ফেরেশতাদের একজন সরদার ফেরেশতা। কেউ বলেন যে, কুদুস'-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাআলা এবং রূহের অর্থ জিবরাঈল (আঃ)। আবার কেউ বলেছেন যে, কুদুস এর অর্থ রবকত' এবং কেউ বলেছেন ‘পবিত্র'। কেউ কেউ বলেছেন যে, রূহ এর ভাবার্থ হচ্ছে ইঞ্জিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘এভাবেই আমি আমার হুকুম দ্বারা তোমার কাছে ৰূহের ওয়াহী করেছি।' (৪২:৫২) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর স্থির সিদ্ধান্ত এটাই যে, এখানে রুহুল কুদুস' এর ভাবার্থ হযরত জিবরাঈল (আঃ) হবেন। এই আয়াতের রুহুল কুদুস দ্বারা সাহায্য করার বর্ণনার সাথে সাথে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিখানোরও বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ওটা এক জিনিস এবং ওগুলো অন্য জিনিস। রচনা রীতিও এটার অনুকূলে রয়েছে। কুদুস’ এর ভাবার্থ হচ্ছে মুকাদ্দাস, যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে (আরবি) বলার মধ্যে নৈকট্য ও মাহাত্ম্যের একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে। এটা এজন্যও বলা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির ‘রূহ' দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ‘রূহ' অর্থ নিয়েছেন। কেননা, তাঁর রূহ মানুষের পৃষ্ঠদেশ ইত্যাদি হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। অতঃপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ ‘এক দলকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছে ও একটি দলকে হত্যা করছে। মিথ্যাবাদী বলার ব্যাপারে (আরবি)-এর রূপ ব্যবহার করা হয়েছে এবং হত্যার (আরবি) ব্যাপারে এর রূপ ব্যবহৃত হয়েছে। এর কারণ এই যে, আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরও তাদের অবস্থা এরূপই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যু যন্ত্রণার সময় বলেছিলেনঃ “সেই বিষ মিশ্রিত গ্রাস বরাবরই আমার উপর ক্রিয়াশীল ছিল এবং এখনতো এটা আমার গি কেটে দিয়েছে।
আল-বাকারা 2:88
ইয়াহূদীরা এ কথাও বলতো যে, তাদের অন্তরের উপর আচ্ছাদন রয়েছে। অর্থাৎ ওটা জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে, সুতরাং এখন আর তাদের জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। উত্তরে তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, এটা নয়, রবং তাদের অন্তরেরর উপর আল্লাহর লানতের মোহর লেগে গেছে। তাদের ঈমান লাভের সৌভাগ্যই হয় না (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) ও পড়া হয়েছে। অর্থাৎ ইলমের বরতন। কুরআন পাকের অন্য জায়গায় আছেঃ “তোমরা যে জিনিসের দিকে আমাদেরকে আহবান করছে ওটা হতে আমাদের অন্তর পর্দার আড়ালে রয়েছে। ওর উপর মোহর লেগে রয়েছে, ওটা (অন্তর) এটা বুঝে না, ওর প্রতি আসক্তও হয় না, ওকে স্মরণও রাখে না। একটি হাদীসের মধ্যেও আছে যে, কতক অন্তর আচ্ছাদনী যুক্ত রয়েছে, যার উপর আল্লাহর অভিশাপ থাকে, এ রকম অন্তর কাফিরদের হয়ে থাকে।সূরা নিসার মধ্যেও এ অর্থের একটি আয়াত আছে। অল্প ঈমান রাখার একটি অর্থ তো এই যে, তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই ঈমানদার আছে। আর দ্বিতীয় অর্থ এটাও হয় যে, তাদের ঈমান খুবই অল্প। অর্থাৎ যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে তারা কিয়ামত, পুণ্য, শাস্তি ইত্যাদির উপর ঈমান রাখে, তাওরাতকে আল্লাহর কিতাব বলে মেনে থাকে। কিন্তু শেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে তাদের ঈমানকে পূর্ণ করে না, বরং তার সঙ্গে কুফরী করতঃ ঐ অল্প ঈমানকেও নষ্ট করে থাকে।তৃতীয় অর্থ এই যে, তারা সরাসরি বেঈমান। কেননা, আরবী ভাষায় এরূপ স্থলে সম্পূর্ণ না হওয়ার অবস্থাতেও এরকম শব্দ আনা হয়ে থাকে। যেমন আমি এরকম লোক খুব কমই দেখেছি , অর্থাৎ মোটেই দেখিনি। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:89
ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে অপেক্ষমান ছিলযখন ইয়াহুদী ও আরবের মুশরিকদের মধ্যে যুদ্ধ বাধতো তখন ইয়াহূদীরা কাফিরদেরকে বলতোঃ অতি সত্তরই একজন বড় নবী (সঃ) আল্লাহর সত্য কিতাব নিয়ে আবির্ভূত হবেন। আমরা তাঁর অনুসারী হয়ে তোমাদেরকে এমনভাবে হত্যা করবো যে, তোমাদের নাম ও নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতোঃ “হে আল্লাহ! আপনি অতি সত্তরই ঐ নবীকে পাঠিয়ে দিন যার গুণাবলী আমরা তাওরাতে পাচ্ছি, যাতে আমরা তাঁর উপর ঈমান এনে তাঁর সঙ্গ লাভ করতঃ আমাদের বাহু মজবুত করে আপনার শত্রুদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারি। তারা কাফিরদেরকে বলতো যে, ঐ নবীর (সঃ) আগমনের সময় খুবই নিকটবর্তী হয়েছে। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রেরিত হলেন তখন তারা তাঁর মধ্যে সমস্ত নিদর্শন দেখতে পেল, তাঁকে চিনতে পারলো এবং মনে মনে বিশ্বাস করলো। কিন্তু যেহেতু তিনি আরবদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে বসলো। ফলে তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ নেমে আসলো। বরং মদীনার মুশরিকগণ, যারা তাদের মুখেই একথা শুনে আসছিল তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গী হয়ে তারাই ইয়াহুদীদের উপর বিজয় লাভ করেন।একদা হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ), হযরত বাসার বিন বারা' (রাঃ) এবং হযরত দাউদ বিন সালমা রাঃ) মদীনার ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেই ফেলেনঃ ‘তোমরাই তো আমাদের শিরকের অবস্থায় আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নবুওয়াতের আলোচনা করতে; বরং আমাদেরকে ভয়ও দেখাতে, তাঁর যে। গুণাবলী তোমরা বর্ণনা করতে তা সবই তার মধ্যে রয়েছে। তবে স্বয়ং তোমরাই ঈমান আনছো না কেন? তাঁর সঙ্গী হচ্ছে না কেন? তখন সালামা বিন মুশকিম উত্তর দেয়ঃ ‘আমরা তার কথা বলতাম না।' এ আয়াতের মধ্যে তারই বর্ণনা রয়েছে যে, তারা প্রথম হতেই মানতো,অপেক্ষমানও ছিল, কিন্তু তার আগমনের পর হিংসা ও অহংকার বশতঃ এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে।
আল-বাকারা 2:90
অভিশাপের উপর অভিশাপভাবার্থ এই যে,ঐ ইয়াহদীরা-যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকারের পরিবর্তে তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে কুফরী করে, তাকে সাহায্য করার পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতা করে; আর এর কারণে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর যে রোষানলে নিক্ষেপ করেছে তা অত্যন্ত জঘন্য জিনিস, যা তারা উত্তম জিনিসের পরিবর্তে গ্রহণ করেছে। ওর কারণ শুধুমাত্র হিংসা বিদ্বেষ, অহংকার ও অবাধ্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের মধ্য হতে না হয়ে আরবদের মধ্য হতে হয়েছিলেন বলেই তারা মুখ তুলে বসে পড়ে। অথচ আল্লাহর উপরে পরম বিচারক আর কেউ নেই। রিসালাতের হকদার কে তা তিনি ভালভাবেই জানেন। তিনি তার দান ও অনুগ্রহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তাকেই দিয়ে থাকেন। সুতরাং এক তো তাওরাতের নির্দেশাবলী মান্য না করার কারণে তাদের উপর আল্লাহর গযব ছিলই, এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে অস্বীকার করার কারণে তাদের উপর দ্বিতীয় গযব নেমে আসে। কিংবা এটাও হতে পারে যে, প্রথম গযব হয় হযরত ঈসা (আঃ)কে না মানার কারণে এবং দ্বিতীয় গযব হয় হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে না মানার কারণে। অথবা প্রথম গ্যব হয় বাছুর পূজার কারণে এবং দ্বিতীয় গযব হয় হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে।তারা হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছিল এবং এ হিংসা বিদ্বেষের প্রকৃত কারণ তাদের অংহকার। এ জন্যেই তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হয়েছিল, যেন পারে পূর্ণ প্রতিদান হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ “নিশ্চয় যারা আমার ইবাদতের ব্যাপারে অহংকার করে তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন অহংকারী লোকদেরকে মানুষের আকারে পিপড়ার ন্যায় উঠানো হবে, তাদেরকে সমস্ত জিনিস দলিত মথিত করে চলে যাবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধূস' নামক কয়েদখানার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে- যে স্থানের আগুন অন্য আগুন অপেক্ষা অধিক তাপ বিশিষ্ট হবে। আর তাদেরকে জাহান্নামের রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি পান করানো হবে।'
আল-বাকারা 2:91
৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ যখন তাদেরকে কুরআন কারীমের উপর ও শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনতে বলা হয় তখন তারা বলে- তাওরাতের উপর ঈমান আনাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা তাদের এ কথায় মিথ্যাবাদী। কুরআন কারীম তো পূর্বের সমস্ত কিতাবের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর স্বয়ং তাদের কিতাবেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন পবিত্র কুরআনে আছেঃ “আহলে কিতাব তাকে (মুহাম্মদ সঃ কে) এভাবেই চেনে যেমন চেনে তারা তাদের সন্তান সন্ততিকে। সুতরাং তাকে অস্বীকার করার ফলে তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপরও তাদের ঈমান রইল। এ দলীল কায়েম করার পর অন্যভাবে দলীল কায়েম করা হচ্ছে যে, তারা যদি তাদের কথায় সত্যবাদী হয় তবে যে সব নবী নতুন কোন শরীয়ত ও কিতাবনা এনে পূর্ব নবীদেরই অনুসারী হয়ে তাদের নিকট এসেছিলেন, তারা তাদেরকে হত্যা করেছিল কেন? তাহলে প্রমাণিত হলো যে, তাদের ঈমান কুরআন মাজীদের উপরও নেই এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপরও নেই।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) হতে তো তারা বড় বড় মু'জেযা প্রকাশ পেতে দেখেছে, যেমন তুফান, ফড়িং, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি তাঁর বদ দু'আর কারণে প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া লাঠির সাপ হওয়া, হাত উজ্জ্বল চন্দ্রের ন্যায় হওয়া, মেঘের ছায়া করা, মান্না ও সালওয়া' অবতারিত হওয়া এবং পাথর হতে নদী প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি বড় বড় অলৌকিক ঘটনাবলী-যা হযরত মুসার (আঃ) নুবুওয়াতের ও আল্লাহর একত্ববাদের জ্বলন্ত প্রমাণ ছিল এবং ওগুলো তারা স্বচক্ষে দেখেছিল। অথচ হযরত মূসার (আঃ) তূর পাহাড়ে গমনের পরই তারা বাছুরকে তাদের উপাস্য বানিয়ে নেয়। তা হলে তাওরাতের উপর ও স্বয়ং হযরত মূসার (আঃ) উপর তাদের ঈমান থাকলে কোথায়? এসব অসৎ ও অপরাধমূলক কার্যের ফলে তারা কি অনাচারী ও অত্যাচারীরূপে প্রমাণিত হচ্ছে না? (আরবি) হতে ভাবার্থ হচ্ছে হযরত মূসার (আঃ) তুর পাহাড়ে যাওয়ার পর।' যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ মূসার (আঃ) ভূরে যাওয়ার পর তার সম্প্রদায় বাছুরকে তাদের মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছিল এবং ঐ গো পূজার কারণে তারা তাদের নফসের উপর স্পষ্ট জুলুম করেছিল। পরে এ অনুভূতি তাদেরও হয়েছিল। যেমন আল্লাহপাক বলেনঃ যখন তাদের জ্ঞান। ফিরলো তখন তারা লজ্জিত হলো এবং নিজেদের ভ্রান্তি অনুভব করলো। সে সময় তারা বললো- হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদের প্রতি সদয় না হন এবং আমাদের পাপ ক্ষমা না করেন তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।
আল-বাকারা 2:92
৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ যখন তাদেরকে কুরআন কারীমের উপর ও শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনতে বলা হয় তখন তারা বলে- তাওরাতের উপর ঈমান আনাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা তাদের এ কথায় মিথ্যাবাদী। কুরআন কারীম তো পূর্বের সমস্ত কিতাবের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর স্বয়ং তাদের কিতাবেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন পবিত্র কুরআনে আছেঃ “আহলে কিতাব তাকে (মুহাম্মদ সঃ কে) এভাবেই চেনে যেমন চেনে তারা তাদের সন্তান সন্ততিকে। সুতরাং তাকে অস্বীকার করার ফলে তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপরও তাদের ঈমান রইল। এ দলীল কায়েম করার পর অন্যভাবে দলীল কায়েম করা হচ্ছে যে, তারা যদি তাদের কথায় সত্যবাদী হয় তবে যে সব নবী নতুন কোন শরীয়ত ও কিতাবনা এনে পূর্ব নবীদেরই অনুসারী হয়ে তাদের নিকট এসেছিলেন, তারা তাদেরকে হত্যা করেছিল কেন? তাহলে প্রমাণিত হলো যে, তাদের ঈমান কুরআন মাজীদের উপরও নেই এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপরও নেই।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) হতে তো তারা বড় বড় মু'জেযা প্রকাশ পেতে দেখেছে, যেমন তুফান, ফড়িং, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি তাঁর বদ দু'আর কারণে প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া লাঠির সাপ হওয়া, হাত উজ্জ্বল চন্দ্রের ন্যায় হওয়া, মেঘের ছায়া করা, মান্না ও সালওয়া' অবতারিত হওয়া এবং পাথর হতে নদী প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি বড় বড় অলৌকিক ঘটনাবলী-যা হযরত মুসার (আঃ) নুবুওয়াতের ও আল্লাহর একত্ববাদের জ্বলন্ত প্রমাণ ছিল এবং ওগুলো তারা স্বচক্ষে দেখেছিল। অথচ হযরত মূসার (আঃ) তূর পাহাড়ে গমনের পরই তারা বাছুরকে তাদের উপাস্য বানিয়ে নেয়। তা হলে তাওরাতের উপর ও স্বয়ং হযরত মূসার (আঃ) উপর তাদের ঈমান থাকলে কোথায়? এসব অসৎ ও অপরাধমূলক কার্যের ফলে তারা কি অনাচারী ও অত্যাচারীরূপে প্রমাণিত হচ্ছে না? (আরবি) হতে ভাবার্থ হচ্ছে হযরত মূসার (আঃ) তুর পাহাড়ে যাওয়ার পর।' যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ মূসার (আঃ) ভূরে যাওয়ার পর তার সম্প্রদায় বাছুরকে তাদের মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছিল এবং ঐ গো পূজার কারণে তারা তাদের নফসের উপর স্পষ্ট জুলুম করেছিল। পরে এ অনুভূতি তাদেরও হয়েছিল। যেমন আল্লাহপাক বলেনঃ যখন তাদের জ্ঞান। ফিরলো তখন তারা লজ্জিত হলো এবং নিজেদের ভ্রান্তি অনুভব করলো। সে সময় তারা বললো- হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদের প্রতি সদয় না হন এবং আমাদের পাপ ক্ষমা না করেন তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।
আল-বাকারা 2:93
মহান আল্লাহ বানী ইসরাঈলের পাপ, বিরোধিতা, অবাধ্যতা এবং সত্য হতে ফিরে যাওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তুর পাহাড়কে যখন তারা তাদের মাথার উপর দেখলো তখন সব কিছু স্বীকার করে নিলো। কিন্তু যখনই পাহাড় সরে গেল তখনই তারা অস্বীকার করে বসলো। এর তাফসীর পূর্বেই করা হয়েছে। বাছুরের প্রেম তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছেঃ ‘কোন জিনিসের ভালবাসা মানুষকে অন্ধ বধির করে দেয়।হযরত মূসা (আঃ) ঐ বাছুরটিকে কেটে টুকরা টুকরা করে পুড়িয়ে ফেলেন এবং ওর ছাই নদীতে ফেলে দেন। অতঃপর বানী ইসরাঈল নদীর পানি পান করলে তাদের উপর ওর ক্রিয়া প্রকাশ পায়। বাছুরটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয় বটে; কিন্তু তাদের অন্তরের সম্পর্ক ঐ বাতিল মাবুদের সঙ্গে থেকেই যায়। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা কিরূপে ঈমানের দাবি করছে? তারা কি তাদের ঈমানের প্রতি লক্ষ্য করছে না? বার বার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কথা কি তারা ভুলে গেছে? হযরত মূসা (আঃ)-এর সামনে তারা কুফরী করেছে, তার পরবর্তী নবীদের সাথে তারা শয়তানী করেছে, এমনকি সর্বশেষ ও সর্বোত্তম নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতকেও তারা অস্বীকার করেছে। এর চেয়ে বড় কুফরী আর কি হতে পারে?
আল-বাকারা 2:94
৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সব ইয়াহূদীকে বলেনঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসো, আমরা ও তোমরা মিলিত হয়ে আল্লাহর কিট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন, আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকে ধ্বংস করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভবিষ্যদ্বাণী হয় যে, তারা কখনও এতে সম্মত হবে না। আর হলেও তাই। তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসলো না। কারণ তারা অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে ও কুরআন মজীদকে সত্য বলে জানতো। যদি তারা এ ঘোষণা অনুযায়ী মুকাবিলায় আসতো তবে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো এবং দুনিয়ার বুকে একটি ইয়াহূদীও অবশিষ্ট থাকতো না।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, যদি ইয়াহুদীরা মুকাবিলায় আসততা এবং মিথ্যাবাদীদের জন্যে মৃত্যুর প্রার্থনা জানাতো তবে তারা সবাই মরে যেতে এবং নিজ নিজ জায়গা তারা দোযখে দেখে নিতো। অনুরূপভাবে খ্রীষ্টানরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল, তারা যদি মুবাহালার জন্যে প্রস্তুত হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে তাদের পরিবারবর্গের এবং ধনসম্পদের নাম নিশানাও দেখতে পেতো না। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। তাদের দাবী ছিল যে, (আরবি) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়। (৫:১৮) তারা বলতোঃ (আরবি) অথাৎ ইয়াহুদী অথবা খ্রীষ্টান ছাড়া কেউ কখনও বেহেশতে প্রবেশ করবে না।' (২:১১১) এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) বলেনঃ ‘এসো এর ফয়সালা আমরা এভাবে করি যে, আমরা দুটো দল মাঠে বেরিয়ে যাই। অতঃপর আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন আমাদের মধ্যকার মিথ্যাবাদী দলকে ধ্বংস করে দেন। কিন্তু এ দলটির নিজেদের মিথ্যাবাদীতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল বলে তারা এর জন্যে প্রস্তুত হলো না। সুতরাং তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল।অনুরূপভাবে নাজরানের খ্রীষ্টানেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। বহু তর্ক বিতর্কের পর তাদেরকেও বলা হয়ঃ ‘এসো, আমরা নিজ নিজ সন্তান সন্ততি, স্ত্রীলোক ও নিজেরা বেরিয়ে যাই, অতঃপর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন মিথ্যাবাদীদের উপর তার লা'নত নাযিল করেন। কিন্তু তারা পরস্পর বলতে থাকে-এ নবীর সঙ্গে কখনও মুকাবিলা করো না, নতুবা এখনই ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তারা মুকাবিলা হতে বিরত হয় এবং জিযিয়া কর দিতে রাযী হয়ে সন্ধি করে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উবাইদাহ বিন জাররাহকে (রাঃ)আমীর করে তাদের সাথে পাঠিয়ে দেন। এভাবেই আরবের মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ভ্রান্ত পথে রয়েছে, আল্লাহ তার ভ্রান্তি বাড়িয়ে দেন। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বর্ণিত হবে। উপরের আয়াতটির তাফসীরে একটি মত এও আছে যে, যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা নিজেদের জন্যে মৃত যা কর-কেননা, তোমাদের কথা অনুসারে পরকালের সুখ সয়োগ তো শুধু তোমাদের জন্যেই।' তখন তারা তা অস্বীকার করে। কিন্তু এ কথাটি মনে ধরে। কেননা বহু ভাল লোকও বেঁচে থাকতে চায়। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লুহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি যার বয়স বেশী হয় এবং আমল ভাল হয়।' সঠিক তাফসীর ওটাই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, দু'টি দল মিলিত হয়ে মিথ্যাবাদী দলের ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রার্থনা করবে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই ইয়াহুদীরা ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং জনগণের মধ্যে তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে যায়। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী ও সত্য প্রমাণিত হয় যে, তারা কখনও মৃত্যু কামনা করবে না। এ মুবাহালাকে আরবী পরিভাষায় (আরবি) বলা হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক দল বাতিল দলের জন্যে মৃত্যু কামনা করছে। আবার আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা মুশরিকদের চেয়ে ও বেশী দীর্ঘায়ু কামনা করে। কেননা ঐ কাফিরদের জন্যে দুনিয়াটাই বেহেস্ত। সুতরাং তাদের চেষ্টা ও বাসনা এই যে, তারা যেন এখানে বেশী দিন থাকতে পারে।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের ইহলৌকিক জীবনের লালসা কাফিরদের চেয়েও বেশী থাকে। এই ইয়াহুদীরা তো এক হাজার বছরের আয়ু চায়। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ হাজার বছরের আয়ুও তাদেরকে শাস্তি হতে মুক্তি দিতে পারবে না। কাফিরেরা তো পরকালকে বিশ্বাসই করে না, কাজেই তাদের মরণের ভয় কম; কিন্তু ইয়াহুদীদের ওর প্রতি বিশ্বাস ছিল, আবার তারা খারাপ কাজও করতো। এজন্যেই তারা মৃত্যুকে অত্যন্ত ভয় করতো। কিন্তু ইবলীসের সমান বয়স পেলেও কি হবে? শাস্তি হতে তো বাঁচতে পারবে না। আল্লাহ পাক তাদের কাজ হতে বে-খবর নন। সকল বান্দার ভাল মন্দ কাজের তিনি খবর রাখেন এবং প্রত্যেকের কর্ম অনুপাতেই প্রতিদান দেবেন।
আল-বাকারা 2:95
৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সব ইয়াহূদীকে বলেনঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসো, আমরা ও তোমরা মিলিত হয়ে আল্লাহর কিট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন, আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকে ধ্বংস করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভবিষ্যদ্বাণী হয় যে, তারা কখনও এতে সম্মত হবে না। আর হলেও তাই। তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসলো না। কারণ তারা অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে ও কুরআন মজীদকে সত্য বলে জানতো। যদি তারা এ ঘোষণা অনুযায়ী মুকাবিলায় আসতো তবে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো এবং দুনিয়ার বুকে একটি ইয়াহূদীও অবশিষ্ট থাকতো না।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, যদি ইয়াহুদীরা মুকাবিলায় আসততা এবং মিথ্যাবাদীদের জন্যে মৃত্যুর প্রার্থনা জানাতো তবে তারা সবাই মরে যেতে এবং নিজ নিজ জায়গা তারা দোযখে দেখে নিতো। অনুরূপভাবে খ্রীষ্টানরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল, তারা যদি মুবাহালার জন্যে প্রস্তুত হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে তাদের পরিবারবর্গের এবং ধনসম্পদের নাম নিশানাও দেখতে পেতো না। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। তাদের দাবী ছিল যে, (আরবি) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়। (৫:১৮) তারা বলতোঃ (আরবি) অথাৎ ইয়াহুদী অথবা খ্রীষ্টান ছাড়া কেউ কখনও বেহেশতে প্রবেশ করবে না।' (২:১১১) এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) বলেনঃ ‘এসো এর ফয়সালা আমরা এভাবে করি যে, আমরা দুটো দল মাঠে বেরিয়ে যাই। অতঃপর আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন আমাদের মধ্যকার মিথ্যাবাদী দলকে ধ্বংস করে দেন। কিন্তু এ দলটির নিজেদের মিথ্যাবাদীতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল বলে তারা এর জন্যে প্রস্তুত হলো না। সুতরাং তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল।অনুরূপভাবে নাজরানের খ্রীষ্টানেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। বহু তর্ক বিতর্কের পর তাদেরকেও বলা হয়ঃ ‘এসো, আমরা নিজ নিজ সন্তান সন্ততি, স্ত্রীলোক ও নিজেরা বেরিয়ে যাই, অতঃপর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন মিথ্যাবাদীদের উপর তার লা'নত নাযিল করেন। কিন্তু তারা পরস্পর বলতে থাকে-এ নবীর সঙ্গে কখনও মুকাবিলা করো না, নতুবা এখনই ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তারা মুকাবিলা হতে বিরত হয় এবং জিযিয়া কর দিতে রাযী হয়ে সন্ধি করে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উবাইদাহ বিন জাররাহকে (রাঃ)আমীর করে তাদের সাথে পাঠিয়ে দেন। এভাবেই আরবের মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ভ্রান্ত পথে রয়েছে, আল্লাহ তার ভ্রান্তি বাড়িয়ে দেন। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বর্ণিত হবে। উপরের আয়াতটির তাফসীরে একটি মত এও আছে যে, যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা নিজেদের জন্যে মৃত যা কর-কেননা, তোমাদের কথা অনুসারে পরকালের সুখ সয়োগ তো শুধু তোমাদের জন্যেই।' তখন তারা তা অস্বীকার করে। কিন্তু এ কথাটি মনে ধরে। কেননা বহু ভাল লোকও বেঁচে থাকতে চায়। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লুহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি যার বয়স বেশী হয় এবং আমল ভাল হয়।' সঠিক তাফসীর ওটাই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, দু'টি দল মিলিত হয়ে মিথ্যাবাদী দলের ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রার্থনা করবে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই ইয়াহুদীরা ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং জনগণের মধ্যে তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে যায়। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী ও সত্য প্রমাণিত হয় যে, তারা কখনও মৃত্যু কামনা করবে না। এ মুবাহালাকে আরবী পরিভাষায় (আরবি) বলা হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক দল বাতিল দলের জন্যে মৃত্যু কামনা করছে। আবার আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা মুশরিকদের চেয়ে ও বেশী দীর্ঘায়ু কামনা করে। কেননা ঐ কাফিরদের জন্যে দুনিয়াটাই বেহেস্ত। সুতরাং তাদের চেষ্টা ও বাসনা এই যে, তারা যেন এখানে বেশী দিন থাকতে পারে।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের ইহলৌকিক জীবনের লালসা কাফিরদের চেয়েও বেশী থাকে। এই ইয়াহুদীরা তো এক হাজার বছরের আয়ু চায়। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ হাজার বছরের আয়ুও তাদেরকে শাস্তি হতে মুক্তি দিতে পারবে না। কাফিরেরা তো পরকালকে বিশ্বাসই করে না, কাজেই তাদের মরণের ভয় কম; কিন্তু ইয়াহুদীদের ওর প্রতি বিশ্বাস ছিল, আবার তারা খারাপ কাজও করতো। এজন্যেই তারা মৃত্যুকে অত্যন্ত ভয় করতো। কিন্তু ইবলীসের সমান বয়স পেলেও কি হবে? শাস্তি হতে তো বাঁচতে পারবে না। আল্লাহ পাক তাদের কাজ হতে বে-খবর নন। সকল বান্দার ভাল মন্দ কাজের তিনি খবর রাখেন এবং প্রত্যেকের কর্ম অনুপাতেই প্রতিদান দেবেন।
আল-বাকারা 2:96
৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সব ইয়াহূদীকে বলেনঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসো, আমরা ও তোমরা মিলিত হয়ে আল্লাহর কিট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন, আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকে ধ্বংস করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভবিষ্যদ্বাণী হয় যে, তারা কখনও এতে সম্মত হবে না। আর হলেও তাই। তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসলো না। কারণ তারা অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে ও কুরআন মজীদকে সত্য বলে জানতো। যদি তারা এ ঘোষণা অনুযায়ী মুকাবিলায় আসতো তবে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো এবং দুনিয়ার বুকে একটি ইয়াহূদীও অবশিষ্ট থাকতো না।একটি মারফু হাদীসেও রয়েছে যে, যদি ইয়াহুদীরা মুকাবিলায় আসততা এবং মিথ্যাবাদীদের জন্যে মৃত্যুর প্রার্থনা জানাতো তবে তারা সবাই মরে যেতে এবং নিজ নিজ জায়গা তারা দোযখে দেখে নিতো। অনুরূপভাবে খ্রীষ্টানরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল, তারা যদি মুবাহালার জন্যে প্রস্তুত হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে তাদের পরিবারবর্গের এবং ধনসম্পদের নাম নিশানাও দেখতে পেতো না। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। তাদের দাবী ছিল যে, (আরবি) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়। (৫:১৮) তারা বলতোঃ (আরবি) অথাৎ ইয়াহুদী অথবা খ্রীষ্টান ছাড়া কেউ কখনও বেহেশতে প্রবেশ করবে না।' (২:১১১) এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে (ইয়াহূদীদেরকে) বলেনঃ ‘এসো এর ফয়সালা আমরা এভাবে করি যে, আমরা দুটো দল মাঠে বেরিয়ে যাই। অতঃপর আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন আমাদের মধ্যকার মিথ্যাবাদী দলকে ধ্বংস করে দেন। কিন্তু এ দলটির নিজেদের মিথ্যাবাদীতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল বলে তারা এর জন্যে প্রস্তুত হলো না। সুতরাং তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল।অনুরূপভাবে নাজরানের খ্রীষ্টানেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। বহু তর্ক বিতর্কের পর তাদেরকেও বলা হয়ঃ ‘এসো, আমরা নিজ নিজ সন্তান সন্ততি, স্ত্রীলোক ও নিজেরা বেরিয়ে যাই, অতঃপর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই যে, তিনি যেন মিথ্যাবাদীদের উপর তার লা'নত নাযিল করেন। কিন্তু তারা পরস্পর বলতে থাকে-এ নবীর সঙ্গে কখনও মুকাবিলা করো না, নতুবা এখনই ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তারা মুকাবিলা হতে বিরত হয় এবং জিযিয়া কর দিতে রাযী হয়ে সন্ধি করে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উবাইদাহ বিন জাররাহকে (রাঃ)আমীর করে তাদের সাথে পাঠিয়ে দেন। এভাবেই আরবের মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ভ্রান্ত পথে রয়েছে, আল্লাহ তার ভ্রান্তি বাড়িয়ে দেন। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বর্ণিত হবে। উপরের আয়াতটির তাফসীরে একটি মত এও আছে যে, যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা নিজেদের জন্যে মৃত যা কর-কেননা, তোমাদের কথা অনুসারে পরকালের সুখ সয়োগ তো শুধু তোমাদের জন্যেই।' তখন তারা তা অস্বীকার করে। কিন্তু এ কথাটি মনে ধরে। কেননা বহু ভাল লোকও বেঁচে থাকতে চায়। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লুহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি যার বয়স বেশী হয় এবং আমল ভাল হয়।' সঠিক তাফসীর ওটাই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, দু'টি দল মিলিত হয়ে মিথ্যাবাদী দলের ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রার্থনা করবে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই ইয়াহুদীরা ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং জনগণের মধ্যে তাদের মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে যায়। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী ও সত্য প্রমাণিত হয় যে, তারা কখনও মৃত্যু কামনা করবে না। এ মুবাহালাকে আরবী পরিভাষায় (আরবি) বলা হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক দল বাতিল দলের জন্যে মৃত্যু কামনা করছে। আবার আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা মুশরিকদের চেয়ে ও বেশী দীর্ঘায়ু কামনা করে। কেননা ঐ কাফিরদের জন্যে দুনিয়াটাই বেহেস্ত। সুতরাং তাদের চেষ্টা ও বাসনা এই যে, তারা যেন এখানে বেশী দিন থাকতে পারে।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের ইহলৌকিক জীবনের লালসা কাফিরদের চেয়েও বেশী থাকে। এই ইয়াহুদীরা তো এক হাজার বছরের আয়ু চায়। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ হাজার বছরের আয়ুও তাদেরকে শাস্তি হতে মুক্তি দিতে পারবে না। কাফিরেরা তো পরকালকে বিশ্বাসই করে না, কাজেই তাদের মরণের ভয় কম; কিন্তু ইয়াহুদীদের ওর প্রতি বিশ্বাস ছিল, আবার তারা খারাপ কাজও করতো। এজন্যেই তারা মৃত্যুকে অত্যন্ত ভয় করতো। কিন্তু ইবলীসের সমান বয়স পেলেও কি হবে? শাস্তি হতে তো বাঁচতে পারবে না। আল্লাহ পাক তাদের কাজ হতে বে-খবর নন। সকল বান্দার ভাল মন্দ কাজের তিনি খবর রাখেন এবং প্রত্যেকের কর্ম অনুপাতেই প্রতিদান দেবেন।
আল-বাকারা 2:97
৯৭-৯৮ নং আয়াতের তাফসীরইমাম আবু যাফর তাবারী (রঃ) বলেনঃ মুফাসসিরগণ এতে একমত যে, যখন ইয়াহুদীরা হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে তাদের শত্রু এবং হযরত মীকাঈল (আঃ) কে তাদের বন্ধু বলেছিল তখন তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, নবুওয়াতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে তাদের যে কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে তারা একথা বলেছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত সম্বন্ধে তাদের যে বিতর্ক হয়েছিল তাতে তারা এ কথা বলেছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের উপর কতকগুলো প্রমাণহয়রত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহুদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি যার সঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউই দিতে পারে না। আপনি সত্য নবী হলে এর উত্তর দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন কর। কিন্তু অঙ্গীকার কর, যদি আমি ঠিক ঠিক উত্তর দেই তবে তোমরা আমার নবুওয়াতকে স্বীকার করতঃ আমার অনুসারী হবে তো?' তারা অঙ্গীকার করে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর মত আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তাদের নিকট হতে পাকা ওয়াদা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে প্রশ্ন করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা বলেঃ ‘প্রথমে এটা বলুন তো, হযরত ইয়াকুব (আঃ) নিজের উপরে কোন্ জিনিসটি হারাম করেছিলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “শুন! যখন হযরত ইয়াকুব আরকুন সিনা’ রোগে ভীষণভাবে আক্রান্ত হন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা যদি তাকে এ রোগ হতে আরোগ্যদান করেন তবে তিনি উটের গোশত খাওয়া ও উস্ত্রীর দুধ পান করা পরিত্যাগ করবেন। আর এ দুটি ছিল তার খুবই লোভনীয় ও প্রিয় বস্তু।অতঃপর তিনি সুস্থ হয়ে গেলে এ দুটো জিনিস নিজের উপর হারাম করে দেন। তোমাদের উপর সেই আল্লাহর শপথ, যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, সত্য করে বলতো এটা সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। অতঃপর তারা বলেঃ “আচ্ছা বলুন তো, তাওরাতের মধ্যে যে নিরক্ষর নবীর সংবাদ রয়েছে তাঁর বিশেষ নিদর্শন কি? আর তাঁর কাছে কোন্ ফেরেশতা ওয়াহী নিয়ে আসেন?' তিনি বলেনঃ তাঁর বিশেষ নির্দশন এই যে, যখন তার চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে তখন তার অন্তর জাগ্রত থাকে। তোমাদেরকে সেই প্রভুর কসম, যিনি হযরত মূসা (আঃ) এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, বলতো এটা সঠিক উত্তর নয় কি? তারা সবাই কসম করে বলে :আপনি সম্পূর্ণ সঠিক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। তারা বলেঃ ‘এবার আমাদেরকে দ্বিতীয় অংশের উত্তর দিন। এটাই আলোচনার সমাপ্তি। তিনি বলেনঃ ‘আমার বন্ধু জিবরাঈলই (আঃ) আমার নিকট ওয়াহী নিয়ে আসেন এবং তিনিই সমস্ত নবীর নিকট ওয়াহী নিয়ে আসতেন। সত্য করে বল এবং কসম করে বল, আমার এ উত্তরটিও সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ হা, উত্তর সঠিকই বটে; কিন্তু তিনি আমাদের শত্রু। কেননা, তিনি কঠোরতা ও হত্যাকাস্ত্রে কারণসমূহ ইত্যাদি নিয়ে আসেন। এজন্যে আমরা তাঁকে মানি এবং আপনাকেও মানবো না। তবে হাঁ, যদি আপনার নিকট আমাদের বন্ধু হযরত মীকাঈল (আঃ) ওয়াহী নিয়ে আসতেন তবে আমরা আপনার সত্যতা স্বীকার করতঃ আপনার অনুসারী হতাম। তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় এও আছে যে, তারা এটাও প্রশ্ন করেছিল ও বন্ধু কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “তিনি একজন ফেরেশতা। তিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে এদিক ওদিক নিয়ে যান। তারা বলে এ গর্জনের শব্দ কি?' তিনি বলেনঃ ‘এটা ঐ। ফেরেশতারই শব্দ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদি)সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) স্বীয় বাগানে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি ইয়াহুদী ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আগমন সংবাদ শুনেই তিনি তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং বলেনঃ জনাব, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি যার উত্তর নৰী ছাড়া কেউই জানে না। বলুন, কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ কি? জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার কি এবং কোন্ জিনিস সন্তানকে কখনও মায়ের দিকে আকৃষ্ট করে এবং কখনও বাপের দিকে রাসূলুহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনই জিরাঈল (আঃ) আমাকে বলে গেলেন।' আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেনঃ জিবরাঈল তো আমাদের শত্রু।' তখন রাসূলুহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ এই যে, এক আগুন হবে যা জনগণকে পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে নিয়ে জমা করবে। জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। যখন পুরুষের বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আর যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এ উত্তর শুনেই হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম মুসলমান হয়ে যান এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ইয়াহূদীরা খুবই নির্বোধ ও অ িপ্রকৃতির লোক। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করার পূর্বেই যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জেনে নেয় তবে তারা আমার সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করবে (সুতরাং আপনি তাদেরকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করুন)। অতঃপর ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক?' তারা বলেঃ তিনি আমাদের মধ্যে উত্তম লোক ও উত্তম লোকের ছেলে, তিনি আমাদের মধ্যে নেতা ও নেতার ছেলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মত কি?' তারা বলেঃ “আল্লাহ তাঁকে ওটা হতে রক্ষা করুন!' অতঃপর আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বের হয়ে পড়েন। (তিনি এতক্ষণ আড়ালে ছিলেন) এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল। তখনই তারা বলে উঠেঃ সে আমাদের মধ্যে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের ছেলে, সে অত্যন্ত নিম্ন স্তরের লোকে।' হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এই ভয়ই করেছিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে আছে, হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘দাস' এবং (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহ। সুতরাং (আরবি) ইত্যাদির অর্থ দাঁড়ালো আল্লাহর দাস'। কেউ কেউ এর বিপরীত অর্থও করেছেন। তারা বলেন যে, (আরবি) শব্দের অর্থ 'দাস' এবং এর পূর্বের শব্দগুলো হচ্ছে আল্লাহর নাম। যেমন আরবী ভাষায় (আরবি) ইত্যাদি (আরবি) শব্দটি সব জায়গায় একই থাকছে এবং আল্লাহর নাম পরিবর্তিত হচ্ছে। এরকমই (আরবি) প্রত্যেক স্থলে ঠিক আছে, আর আল্লাহর উত্তম নামগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। আরবী ভাষা ছাড়া। অন্যান্য ভাষায় (আরবি) পূর্বে এবং (আরবি) পরে এসে থাকে। এ নিয়ম এখানেও রয়েছে। যেমনঃ (আরবি) ইত্যাদি। এখন মুফাসৃসিরগণের দ্বিতীয় দলের দলীল দেয়া হচ্ছে-যারা বলেন যে, এ আলোচনা হযরত উমারের (রাঃ) সঙ্গে হয়েছিল। শাবি (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) রাওহা নামক স্থানে এসে দেখেন যে, জনগণ দৌড়াদৌড়ি করে একটি পাথরের ঢিবির পার্শ্বে গিয়ে নামায আদায় করছে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি? উত্তর আসে যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায আদায় করেছিলেন। এতে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন যে, যেখানেই সময় হতো সেখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ে নিতেন, তারপরে সেখান হতে চলে যেতেন। এখন ঐ স্থানগুলোকে বরকতময় মনে করে অযথা সেখানে গিয়ে নামায পড়তে কে বলেছে? অতঃপর তিনি অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেনঃ “আমি মাঝে মাঝে ইয়াহুদীদের সভায় যোগদান করতাম এবং দেখতাম যে, কিভাবে কুরআন তাওরাতের ও তাওরাত কুরআনের সত্যতা স্বীকার করে থাকে। ইয়াহুদীরাও আমার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে থাকে এবং প্রায়ই তাদের সাথে আমার আলোচনা হতো। একদিন আমি তাদের সাথে কথা বলছি এমন সময় দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ পথ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। তারা আমাকে বলেঃ “ঐ যে তোমাদের নবী (সঃ) চলে যাচ্ছেন। আমি বলিঃ আচ্ছা আমি যাই। কিন্তু তোমাদের এক আল্লাহর কসম! আল্লাহর সত্যকে স্মরণ করে, আল্লাহর নিয়ামতসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং তোমাদের নিকট যে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে ওর প্রতি খেয়াল করে সেই প্রভুর নামে শপথ করে। বলতো, তোমরা কি মুহাম্মদ (সঃ) কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার কর না? তারা সবাই নীরব হয়ে যায়। তাদের বড় আলেম, যে তাদের মধ্যে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলো এবং তাদের নেতাও ছিল, তাদেরকে সে বলেঃ তোমাদের এরূপ কঠিন কসম দেয়ার পরও তোমরা স্পষ্ট ও সত্য উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা বলেঃ জনাব! আপনি আমাদের প্রধান, সুতরাং আপনিই উত্তর দিন।' পাদরী তখন বলেঃ তাহলে শুনুন জনাব! আপনি খুব বড় কসম দিয়েছেন। এটা তো সত্যিই যে, মুহাম্মদ (সঃ) যে আল্লাহর রাসূল তা আমরা অন্তর থেকেই জানি। আমি বলি, ‘আফসোস! জান তবে মাননা কেন?' সে বলেঃ তার একমাত্র কারণ এই যে, তার নিকট যে বার্তাবাহক আসেন তিনি হচ্ছেন জিবরাঈল (আঃ), তিনি অত্যন্ত কঠোর, সংকীর্ণমনা, কঠিন শাস্তি ও কষ্ঠের ফেরেশতা। তিনি আমাদের শত্রু এবং আমরা তার শক্র। মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যদি হযরত মীকাঈল (আঃ) আসতেন যিনি দয়া, নম্রতা ও শান্তির ফেরেশতা তবে আমরা তাঁকে স্বীকার করতে কোন দ্বিধাবোধ করতাম না। তখন আমি বলি- আচ্ছা বলতো, আল্লাহর নিকট এই দুজনের কোন সম্মান ও মর্যাদা আছে কি?' সে বলেঃ একজন মহান আল্লাহর ডান দিকে আছেন এবং অন্য জন তার বাম দিকে আছেন। আমি বলি- সেই আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া কেউ মাবুদ নেই। যে তাঁদের কোন একজনের শত্রু সে আল্লাহ পাকের শ এবং অপর ফেরেশতারও শক্র। জিবরাঈল (আঃ)-এর শত্রু মীকাঈল (আঃ)-এর বন্ধুত্ব হতে পারে না এবং মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু জিবরাঈল (আঃ) এর বন্ধুত্ব হতে পারে না অথবা তাদের কারও শক্র আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হতে পারে না। তাঁদের দুজনের কেউই আল্লাহ পাকের অনুমতি ছাড়া পৃথিবীতে আসতে পারেন না বা কোন কাজও করতে পারেন না। আল্লাহর শপথ! তোমাদের প্রতি আমার লোভ নেই বা ভয়ও নেই। জেনে রেখো যে, যে আল্লাহর শত্রু এবং তাঁর রাসূলগনের, ফেরেশতাগণের, জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু, এরূপ কাফিরদের স্বয়ং আল্লাহ শক্ত। এ বলেই আমি চলে আসি।আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছলে তিনি আমাকে দেখেই বলেনঃ ‘খাত্তাব তনয়! আমার উপর নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বলি- 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শুনিয়ে দিন। তিনি তখন উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আমি তখন বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বাপ মা আপনার প্রতি কুরবান হোক! এখনই ইয়াহূদীদের সাথে আমার এ কথাগুলো নিয়েই আলোচনা চলছিল। আপনাকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যেই আমি হাজির হয়েছি। কিন্তু আমার আগমনের পূর্বেই সেই সূক্ষ্মদর্শী ও সর্ববিদিত আল্লাহ্ আপনার নিকট সংবাদ পৌছিয়ে দিয়েছেন।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ইত্যাদি)। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুনকাতা এবং মুত্তাসিল নয়। শাবী (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) যুগ পান নি।আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহ তা'আলার একজন বিশ্বস্ত ফেরেশতা। আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি তার বাণী নবীদের (আঃ) নিকট পৌছানোর কার্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ফেরেশতাগণের মধ্যে তিনি আল্লাহর রাসূল। কোন একজন রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী সমস্ত রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী। যেমন একজন রাসূলের উপর ঈমান আনলেই সব রাসূলের উপর ঈমান আনা হয়, অনুরূপভাবে একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানেই সব রাসূলকেই অস্বীকার করা। যারা কোন কোন রাসূলকে অস্বীকার করে থাকে, স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে কাফির বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর সঙ্গে ও তাঁর রাসূলগণের সঙ্গে কূফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করতে চায় আর বলে- আমরা কাউকে মানি ও কাউকে মানি না------।এ সব আয়াতে ঐ ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে কাফির বলা হয়েছে। যে কোন একজন নবীকে অমান্য করে থাকে। এরকমই জিব্রাঈল (আঃ)-এর শত্রুও আল্লাহর শত্রু। কেননা তিনি স্বেচ্ছায় আসেন না। কুরআন পাকে ঘোষিত হচ্ছেঃ ‘আমরা আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া অবতীর্ণ হই না।' অন্যত্র আছেঃ এটা বিশ্ব প্রভ কর্তক অবতারিত যা নিয়ে রূহুল আমীন এসে থাকে, এবং তোমার অন্তরে ঢুকিয়ে দিয়ে থাকে, যেন তুমি ভয় প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হাদীসে কুদসীতে আছেঃ ‘আমার বন্ধুদের প্রতি শত্রুতা পোষনকারী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী।' কুরআন কারীমের এটাও একটা বিশেষত্ব যে, এটা পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকার করে এবং ঈমানদারগণের জন্যে এটা হিদায়াত স্বরূপ, আর তাদের জন্যে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে। রাসূলগণের মধ্যে মানুষ রাসূল ও ফেরেশতা রাসূল সবাই জড়িত রয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ পাক ফেরেশতাগণের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে স্বীয় রাসূল বেছে নেন।' জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ) ফেরেশতাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তথাপি বিশেষভাবে তাদের নাম নেয়ার কারণ হচ্ছে যেন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হযরত জিবরাঈলের (আঃ)শক্র হযরত মীকাঈল (আঃ)-এরও শত্রু, এমনকি আল্লাহরও শত্রু।মাঝে মাঝে হযরত মীকাঈলও (আঃ) নবীগণের (আঃ) কাছে এসেছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে প্রথম প্রথম এসে ছিলেন। কিন্তু ঐ কাজে নিযুক্ত রয়েছেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। যেমন হযরত মীকাঈল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন গাছপালা উৎপাদন ও বৃষ্টি বর্ষণ ইত্যাদি কাজে। আর হযরত ইসরাফীল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন শিঙ্গা ফুঙ্কার কাজে।একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘুম থেকে জেগে নিম্নের দোআটি পাঠ করতেনঃ হে আল্লাহ, হে জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রভু! হে আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়সমূহের জ্ঞাতা! আপনার বান্দাদের মতভেদের ফয়সালা আপনিই করে থাকেন। হে আল্লাহ! মতভেদপূর্ণ বিষয়ে আপনার হুকুমে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আপনি যাকে চান তাকে সরল-সঠিক পথ দেখিয়ে থাকেন। (আরবি) ইত্যাদি শব্দের বিশ্লেষণ এবং অর্থ ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবদুল আযীয ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের মধ্যে হযরত জিবরাঈলের (আঃ) নাম খাদেমুল্লাহ। আয়াতের শেষে এটা বলেননি যে, অল্লাহ্ও ঐ লোকদের শত্রু বরং বলেছেন আল্লাহ কাফিরদের শত্রু। এর দ্বারা এরকম লোকদেরও হুকুম জানা গেল। একে আরবী ভাষায় (আরবি) এর স্থানে (আরবি) বলা হয়। আরবের কথায় এর দৃষ্টান্ত কবিতার মধ্যেও প্রায়ই পাওয়া যায়। যেন এরূপ বলা হচ্ছেঃ যে আল্লাহর বন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা করলো সে আল্লাহর সঙ্গে শত্রুতা করলো এবং যে আল্লাহর শত্রু, আল্লাহও তার শত্রু। আর স্বয়ং আল্লাহ যার শত্রু তার কুফরী ও ধ্বংসের মধ্যে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি? সহীহ বুখারীর হাদীস ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতাকারীর বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করছি।' অন্য হাদীসে আছেঃ “আমি আমার বন্ধুদের প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। আর একটি হাদীসে আছেঃ যার শত্রু স্বয়ং আমি হই তার ধ্বংস অনিবার্য।
আল-বাকারা 2:98
৯৭-৯৮ নং আয়াতের তাফসীরইমাম আবু যাফর তাবারী (রঃ) বলেনঃ মুফাসসিরগণ এতে একমত যে, যখন ইয়াহুদীরা হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে তাদের শত্রু এবং হযরত মীকাঈল (আঃ) কে তাদের বন্ধু বলেছিল তখন তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, নবুওয়াতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে তাদের যে কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে তারা একথা বলেছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত সম্বন্ধে তাদের যে বিতর্ক হয়েছিল তাতে তারা এ কথা বলেছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের উপর কতকগুলো প্রমাণহয়রত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহুদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি যার সঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউই দিতে পারে না। আপনি সত্য নবী হলে এর উত্তর দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন কর। কিন্তু অঙ্গীকার কর, যদি আমি ঠিক ঠিক উত্তর দেই তবে তোমরা আমার নবুওয়াতকে স্বীকার করতঃ আমার অনুসারী হবে তো?' তারা অঙ্গীকার করে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর মত আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তাদের নিকট হতে পাকা ওয়াদা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে প্রশ্ন করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা বলেঃ ‘প্রথমে এটা বলুন তো, হযরত ইয়াকুব (আঃ) নিজের উপরে কোন্ জিনিসটি হারাম করেছিলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “শুন! যখন হযরত ইয়াকুব আরকুন সিনা’ রোগে ভীষণভাবে আক্রান্ত হন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা যদি তাকে এ রোগ হতে আরোগ্যদান করেন তবে তিনি উটের গোশত খাওয়া ও উস্ত্রীর দুধ পান করা পরিত্যাগ করবেন। আর এ দুটি ছিল তার খুবই লোভনীয় ও প্রিয় বস্তু।অতঃপর তিনি সুস্থ হয়ে গেলে এ দুটো জিনিস নিজের উপর হারাম করে দেন। তোমাদের উপর সেই আল্লাহর শপথ, যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, সত্য করে বলতো এটা সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। অতঃপর তারা বলেঃ “আচ্ছা বলুন তো, তাওরাতের মধ্যে যে নিরক্ষর নবীর সংবাদ রয়েছে তাঁর বিশেষ নিদর্শন কি? আর তাঁর কাছে কোন্ ফেরেশতা ওয়াহী নিয়ে আসেন?' তিনি বলেনঃ তাঁর বিশেষ নির্দশন এই যে, যখন তার চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে তখন তার অন্তর জাগ্রত থাকে। তোমাদেরকে সেই প্রভুর কসম, যিনি হযরত মূসা (আঃ) এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, বলতো এটা সঠিক উত্তর নয় কি? তারা সবাই কসম করে বলে :আপনি সম্পূর্ণ সঠিক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। তারা বলেঃ ‘এবার আমাদেরকে দ্বিতীয় অংশের উত্তর দিন। এটাই আলোচনার সমাপ্তি। তিনি বলেনঃ ‘আমার বন্ধু জিবরাঈলই (আঃ) আমার নিকট ওয়াহী নিয়ে আসেন এবং তিনিই সমস্ত নবীর নিকট ওয়াহী নিয়ে আসতেন। সত্য করে বল এবং কসম করে বল, আমার এ উত্তরটিও সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ হা, উত্তর সঠিকই বটে; কিন্তু তিনি আমাদের শত্রু। কেননা, তিনি কঠোরতা ও হত্যাকাস্ত্রে কারণসমূহ ইত্যাদি নিয়ে আসেন। এজন্যে আমরা তাঁকে মানি এবং আপনাকেও মানবো না। তবে হাঁ, যদি আপনার নিকট আমাদের বন্ধু হযরত মীকাঈল (আঃ) ওয়াহী নিয়ে আসতেন তবে আমরা আপনার সত্যতা স্বীকার করতঃ আপনার অনুসারী হতাম। তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় এও আছে যে, তারা এটাও প্রশ্ন করেছিল ও বন্ধু কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “তিনি একজন ফেরেশতা। তিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে এদিক ওদিক নিয়ে যান। তারা বলে এ গর্জনের শব্দ কি?' তিনি বলেনঃ ‘এটা ঐ। ফেরেশতারই শব্দ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদি)সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) স্বীয় বাগানে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি ইয়াহুদী ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আগমন সংবাদ শুনেই তিনি তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং বলেনঃ জনাব, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি যার উত্তর নৰী ছাড়া কেউই জানে না। বলুন, কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ কি? জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার কি এবং কোন্ জিনিস সন্তানকে কখনও মায়ের দিকে আকৃষ্ট করে এবং কখনও বাপের দিকে রাসূলুহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনই জিরাঈল (আঃ) আমাকে বলে গেলেন।' আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেনঃ জিবরাঈল তো আমাদের শত্রু।' তখন রাসূলুহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ এই যে, এক আগুন হবে যা জনগণকে পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে নিয়ে জমা করবে। জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। যখন পুরুষের বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আর যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এ উত্তর শুনেই হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম মুসলমান হয়ে যান এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ইয়াহূদীরা খুবই নির্বোধ ও অ িপ্রকৃতির লোক। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করার পূর্বেই যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জেনে নেয় তবে তারা আমার সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করবে (সুতরাং আপনি তাদেরকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করুন)। অতঃপর ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক?' তারা বলেঃ তিনি আমাদের মধ্যে উত্তম লোক ও উত্তম লোকের ছেলে, তিনি আমাদের মধ্যে নেতা ও নেতার ছেলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মত কি?' তারা বলেঃ “আল্লাহ তাঁকে ওটা হতে রক্ষা করুন!' অতঃপর আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বের হয়ে পড়েন। (তিনি এতক্ষণ আড়ালে ছিলেন) এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল। তখনই তারা বলে উঠেঃ সে আমাদের মধ্যে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের ছেলে, সে অত্যন্ত নিম্ন স্তরের লোকে।' হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এই ভয়ই করেছিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে আছে, হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘দাস' এবং (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহ। সুতরাং (আরবি) ইত্যাদির অর্থ দাঁড়ালো আল্লাহর দাস'। কেউ কেউ এর বিপরীত অর্থও করেছেন। তারা বলেন যে, (আরবি) শব্দের অর্থ 'দাস' এবং এর পূর্বের শব্দগুলো হচ্ছে আল্লাহর নাম। যেমন আরবী ভাষায় (আরবি) ইত্যাদি (আরবি) শব্দটি সব জায়গায় একই থাকছে এবং আল্লাহর নাম পরিবর্তিত হচ্ছে। এরকমই (আরবি) প্রত্যেক স্থলে ঠিক আছে, আর আল্লাহর উত্তম নামগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। আরবী ভাষা ছাড়া। অন্যান্য ভাষায় (আরবি) পূর্বে এবং (আরবি) পরে এসে থাকে। এ নিয়ম এখানেও রয়েছে। যেমনঃ (আরবি) ইত্যাদি। এখন মুফাসৃসিরগণের দ্বিতীয় দলের দলীল দেয়া হচ্ছে-যারা বলেন যে, এ আলোচনা হযরত উমারের (রাঃ) সঙ্গে হয়েছিল। শাবি (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) রাওহা নামক স্থানে এসে দেখেন যে, জনগণ দৌড়াদৌড়ি করে একটি পাথরের ঢিবির পার্শ্বে গিয়ে নামায আদায় করছে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি? উত্তর আসে যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায আদায় করেছিলেন। এতে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন যে, যেখানেই সময় হতো সেখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ে নিতেন, তারপরে সেখান হতে চলে যেতেন। এখন ঐ স্থানগুলোকে বরকতময় মনে করে অযথা সেখানে গিয়ে নামায পড়তে কে বলেছে? অতঃপর তিনি অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেনঃ “আমি মাঝে মাঝে ইয়াহুদীদের সভায় যোগদান করতাম এবং দেখতাম যে, কিভাবে কুরআন তাওরাতের ও তাওরাত কুরআনের সত্যতা স্বীকার করে থাকে। ইয়াহুদীরাও আমার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে থাকে এবং প্রায়ই তাদের সাথে আমার আলোচনা হতো। একদিন আমি তাদের সাথে কথা বলছি এমন সময় দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ পথ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। তারা আমাকে বলেঃ “ঐ যে তোমাদের নবী (সঃ) চলে যাচ্ছেন। আমি বলিঃ আচ্ছা আমি যাই। কিন্তু তোমাদের এক আল্লাহর কসম! আল্লাহর সত্যকে স্মরণ করে, আল্লাহর নিয়ামতসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং তোমাদের নিকট যে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে ওর প্রতি খেয়াল করে সেই প্রভুর নামে শপথ করে। বলতো, তোমরা কি মুহাম্মদ (সঃ) কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার কর না? তারা সবাই নীরব হয়ে যায়। তাদের বড় আলেম, যে তাদের মধ্যে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলো এবং তাদের নেতাও ছিল, তাদেরকে সে বলেঃ তোমাদের এরূপ কঠিন কসম দেয়ার পরও তোমরা স্পষ্ট ও সত্য উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা বলেঃ জনাব! আপনি আমাদের প্রধান, সুতরাং আপনিই উত্তর দিন।' পাদরী তখন বলেঃ তাহলে শুনুন জনাব! আপনি খুব বড় কসম দিয়েছেন। এটা তো সত্যিই যে, মুহাম্মদ (সঃ) যে আল্লাহর রাসূল তা আমরা অন্তর থেকেই জানি। আমি বলি, ‘আফসোস! জান তবে মাননা কেন?' সে বলেঃ তার একমাত্র কারণ এই যে, তার নিকট যে বার্তাবাহক আসেন তিনি হচ্ছেন জিবরাঈল (আঃ), তিনি অত্যন্ত কঠোর, সংকীর্ণমনা, কঠিন শাস্তি ও কষ্ঠের ফেরেশতা। তিনি আমাদের শত্রু এবং আমরা তার শক্র। মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যদি হযরত মীকাঈল (আঃ) আসতেন যিনি দয়া, নম্রতা ও শান্তির ফেরেশতা তবে আমরা তাঁকে স্বীকার করতে কোন দ্বিধাবোধ করতাম না। তখন আমি বলি- আচ্ছা বলতো, আল্লাহর নিকট এই দুজনের কোন সম্মান ও মর্যাদা আছে কি?' সে বলেঃ একজন মহান আল্লাহর ডান দিকে আছেন এবং অন্য জন তার বাম দিকে আছেন। আমি বলি- সেই আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া কেউ মাবুদ নেই। যে তাঁদের কোন একজনের শত্রু সে আল্লাহ পাকের শ এবং অপর ফেরেশতারও শক্র। জিবরাঈল (আঃ)-এর শত্রু মীকাঈল (আঃ)-এর বন্ধুত্ব হতে পারে না এবং মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু জিবরাঈল (আঃ) এর বন্ধুত্ব হতে পারে না অথবা তাদের কারও শক্র আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হতে পারে না। তাঁদের দুজনের কেউই আল্লাহ পাকের অনুমতি ছাড়া পৃথিবীতে আসতে পারেন না বা কোন কাজও করতে পারেন না। আল্লাহর শপথ! তোমাদের প্রতি আমার লোভ নেই বা ভয়ও নেই। জেনে রেখো যে, যে আল্লাহর শত্রু এবং তাঁর রাসূলগনের, ফেরেশতাগণের, জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু, এরূপ কাফিরদের স্বয়ং আল্লাহ শক্ত। এ বলেই আমি চলে আসি।আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছলে তিনি আমাকে দেখেই বলেনঃ ‘খাত্তাব তনয়! আমার উপর নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বলি- 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শুনিয়ে দিন। তিনি তখন উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আমি তখন বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বাপ মা আপনার প্রতি কুরবান হোক! এখনই ইয়াহূদীদের সাথে আমার এ কথাগুলো নিয়েই আলোচনা চলছিল। আপনাকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যেই আমি হাজির হয়েছি। কিন্তু আমার আগমনের পূর্বেই সেই সূক্ষ্মদর্শী ও সর্ববিদিত আল্লাহ্ আপনার নিকট সংবাদ পৌছিয়ে দিয়েছেন।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ইত্যাদি)। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুনকাতা এবং মুত্তাসিল নয়। শাবী (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) যুগ পান নি।আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহ তা'আলার একজন বিশ্বস্ত ফেরেশতা। আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি তার বাণী নবীদের (আঃ) নিকট পৌছানোর কার্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ফেরেশতাগণের মধ্যে তিনি আল্লাহর রাসূল। কোন একজন রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী সমস্ত রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী। যেমন একজন রাসূলের উপর ঈমান আনলেই সব রাসূলের উপর ঈমান আনা হয়, অনুরূপভাবে একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানেই সব রাসূলকেই অস্বীকার করা। যারা কোন কোন রাসূলকে অস্বীকার করে থাকে, স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে কাফির বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর সঙ্গে ও তাঁর রাসূলগণের সঙ্গে কূফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করতে চায় আর বলে- আমরা কাউকে মানি ও কাউকে মানি না------।এ সব আয়াতে ঐ ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে কাফির বলা হয়েছে। যে কোন একজন নবীকে অমান্য করে থাকে। এরকমই জিব্রাঈল (আঃ)-এর শত্রুও আল্লাহর শত্রু। কেননা তিনি স্বেচ্ছায় আসেন না। কুরআন পাকে ঘোষিত হচ্ছেঃ ‘আমরা আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া অবতীর্ণ হই না।' অন্যত্র আছেঃ এটা বিশ্ব প্রভ কর্তক অবতারিত যা নিয়ে রূহুল আমীন এসে থাকে, এবং তোমার অন্তরে ঢুকিয়ে দিয়ে থাকে, যেন তুমি ভয় প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হাদীসে কুদসীতে আছেঃ ‘আমার বন্ধুদের প্রতি শত্রুতা পোষনকারী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী।' কুরআন কারীমের এটাও একটা বিশেষত্ব যে, এটা পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকার করে এবং ঈমানদারগণের জন্যে এটা হিদায়াত স্বরূপ, আর তাদের জন্যে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে। রাসূলগণের মধ্যে মানুষ রাসূল ও ফেরেশতা রাসূল সবাই জড়িত রয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ পাক ফেরেশতাগণের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে স্বীয় রাসূল বেছে নেন।' জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ) ফেরেশতাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তথাপি বিশেষভাবে তাদের নাম নেয়ার কারণ হচ্ছে যেন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হযরত জিবরাঈলের (আঃ)শক্র হযরত মীকাঈল (আঃ)-এরও শত্রু, এমনকি আল্লাহরও শত্রু।মাঝে মাঝে হযরত মীকাঈলও (আঃ) নবীগণের (আঃ) কাছে এসেছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে প্রথম প্রথম এসে ছিলেন। কিন্তু ঐ কাজে নিযুক্ত রয়েছেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। যেমন হযরত মীকাঈল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন গাছপালা উৎপাদন ও বৃষ্টি বর্ষণ ইত্যাদি কাজে। আর হযরত ইসরাফীল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন শিঙ্গা ফুঙ্কার কাজে।একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘুম থেকে জেগে নিম্নের দোআটি পাঠ করতেনঃ হে আল্লাহ, হে জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রভু! হে আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়সমূহের জ্ঞাতা! আপনার বান্দাদের মতভেদের ফয়সালা আপনিই করে থাকেন। হে আল্লাহ! মতভেদপূর্ণ বিষয়ে আপনার হুকুমে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আপনি যাকে চান তাকে সরল-সঠিক পথ দেখিয়ে থাকেন। (আরবি) ইত্যাদি শব্দের বিশ্লেষণ এবং অর্থ ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবদুল আযীয ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের মধ্যে হযরত জিবরাঈলের (আঃ) নাম খাদেমুল্লাহ। আয়াতের শেষে এটা বলেননি যে, অল্লাহ্ও ঐ লোকদের শত্রু বরং বলেছেন আল্লাহ কাফিরদের শত্রু। এর দ্বারা এরকম লোকদেরও হুকুম জানা গেল। একে আরবী ভাষায় (আরবি) এর স্থানে (আরবি) বলা হয়। আরবের কথায় এর দৃষ্টান্ত কবিতার মধ্যেও প্রায়ই পাওয়া যায়। যেন এরূপ বলা হচ্ছেঃ যে আল্লাহর বন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা করলো সে আল্লাহর সঙ্গে শত্রুতা করলো এবং যে আল্লাহর শত্রু, আল্লাহও তার শত্রু। আর স্বয়ং আল্লাহ যার শত্রু তার কুফরী ও ধ্বংসের মধ্যে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি? সহীহ বুখারীর হাদীস ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতাকারীর বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করছি।' অন্য হাদীসে আছেঃ “আমি আমার বন্ধুদের প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। আর একটি হাদীসে আছেঃ যার শত্রু স্বয়ং আমি হই তার ধ্বংস অনিবার্য।
আল-বাকারা 2:99
৯৯-১০৩ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ) আমি এমন এমন নিদর্শনাবলী তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি যা তোমার নবুওয়াতের জন্যে প্রকাশ্য দলীল হতে পারে। ইয়াহুদীদের বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডার তাওরাতের গোপনীয় কথা, তাদের পরিবর্তনকৃত আহকাম ইত্যাদি সব কিছুই আমি এই অলৌকিক কিতাব কুরআন মাজীদের মধ্যে বর্ণনা করেছি। ওটা শুনে প্রত্যেক জীবিত অন্তর তোমার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ইয়াহূদীরা যে হিংসা-বিদ্বেষ বশতঃ মানছে না ওটা অন্য কথা। নতুবা প্রত্যেক লোকই এটা বুঝতে পারে যে, একজন নিরক্ষর লোক কখনও এরকম পবিত্র অলংকার ও নিপুণতাপূর্ণ কথা বানাতে পারে না।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবনে সুরিয়া কাতভীনী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বলেছিল ও ‘আপনি এমন কোন সৌন্দর্য ও দর্শন পূর্ণবাণী আনতে পারেন নি যা দ্বারা আপনার নবুওয়াতের পরিচয় পেতে পারি বা কোন জ্বলন্ত প্রমাণও আপনার নিকট নেই।' তখনই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট শেষ নবী (সঃ)-কে স্বীকার করার উপর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা তারা অস্বীকার করেছিল বলে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করা, এটা তো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অভ্যাস, বরং তাদের অধিকাংশের অন্তর তো ঈমান থেকেই শূন্য।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ফেলে দেয়া। ইয়াহূদীরা আল্লাহর কিতাবকে এবং তার অঙ্গীকারকে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছিল যে, যেন তারা তা ফেলেই দিয়েছিল। এ জন্যেই তাদের নিন্দের ব্যাপারে এ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছেঃ তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা বিদ্যমান পেয়ে থাকে। এখানেও আল্লাহ পাক বলেছেন যে, যখন তাদের একটি দল কিতাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতঃ ওকে এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন সে জানেই না। বরং যাদুর পিছনে লেগে পড়ে। এমনকি মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরও যাদু করে। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)কে এটা জানিয়ে দেন এবং ওর ক্রিয়া নষ্ট করতঃ তাকে আরোগ্য দান করেন। তাওরাতের মাধ্যমে তো তারা তাঁর মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, ওটা তো তার সত্যতা প্রমাণকারী। সুতরাং ওটাকে তারা পরিত্যাগ করতঃ অন্য কিতাব গ্রহণ করে ওর পিছনে লেগে পড়ে। আল্লাহর কিতাবকে তারা এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন তারা ওর সম্বন্ধে কিছু জানতই না। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তারা আল্লাহর কিতাবকে তাদের পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে। এও বলা হয়েছে যে, গান-বাজনা, খেল-তামাশা এবং আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখে এমন প্রত্যেক জিনিসই (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘটনা এবং যাদুর মূল তত্ত্বের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। পায়খানায় গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রী জারাদার নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জ্বীন তার রূপ ধরে তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জ্বীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কার্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তার স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।' হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার বলে তিনি বাতাস ও জ্বীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জ্বীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাঁকে যাদুকর বলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা অস্বীকার করেন এবং আল্লাহর ফরমান জারী হয় যে, যাদু বিদ্যার এ কুফরী শয়তানরা ছড়িয়ে ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক আগমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা হতে আসছো?' সে বলেঃ ইরাক ইতে। তিনি বলেনঃ ইরাকের কোন শহর হতে?' সে বলেঃ কুফা হতে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তথাকার সংবাদ কি?' সে বলেঃ তথায় আলোচনা হচ্ছে যে, হযরত আলী (রাঃ) মারা যাননি; বরং তিনি জীবিত আছেন এবং সত্বরই আসবেন। একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেঁপে উঠেন এবং বলেনঃ ‘এটা সত্য হলে আমরা তাঁর মীরাস বন্টন করতাম না। আর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করতাম। শুন! শয়তানরা আকাশবানী চুরি করে শুনে নিতে এবং তাদের নিজস্ব কথা মিলিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সব পুস্তক জমা করে তার সিংহাসনের নীচে পুঁতে দেন। তার মৃত্যুর পর জ্বীনেরা পুনরায় তা বের করে নেয়। ঐ পুস্তকগুলো ইরাকের মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং ঐ পুস্তকগুলোর কথাই তারা বর্ণনা করছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। সেই যুগে এটাও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, শয়তানরা ভবিষ্যত জানে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই পুস্তকগুলো বাক্সে ভরে পুঁতে ফেলার পর এই নির্দেশ জারী করেন যে, যে একথা বলবে তার মাথা কেটে নেয়া হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর জীনেরা ঐ পুস্তকগুলো তাঁর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে এবং ওর প্রথম পষ্ঠায় লিখে রাখেঃ “এই জ্ঞানভাণ্ডার ‘আসিফ বিন রখিয়া কর্তৃক সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি হযরত সুলাইমান বিন দাউদের (আঃ) প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট পরামর্শ দাতা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।” ইয়াহূদীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) নবী ছিলেন না, বরং যাদুকর ছিলেন। এই কারণেই উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর সত্য নবী (সঃ) অন্য এক সত্য নবীকে (আঃ) কালিমামুক্ত করেন এবং ইয়াহুদীদের বদ-আকীদার অসারতা ঘোষণা করেন। তারা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম নবীদের নামের তালিকাভুক্ত শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠতো। এজন্যেই এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) কষ্টদায়ক প্রাণী হতে কষ্ট না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই তারা কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকতো। অতঃপর জনগণ নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে যাদু মন্ত্র ইত্যাদির সম্বন্ধ হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। ওর অসারতা এই পবিত্র আয়াতে রয়েছে।এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই উত্তম। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, যাদু হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পূর্বেও ছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য কথা। হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত মুসা (আঃ)-এর পর যুগের নবী। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুকরদের বিদ্যমানতা কুরআন মাজীদ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আগমন হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে হওয়াও কুরআন কারীম দ্বারাই প্রকাশ পেয়েছে। হযরত দাউদ (আঃ) ও জালুতের ঘটনায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মূসা (আঃ)-এর পরে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আঃ) (আরবি)-এরও পূর্বে হযরত সালিহ (আঃ)কে তার কওম’ বলেছিলঃঅর্থাৎ তুমি যাদুকৃত লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৬:১৮৫)অতঃপর আল্লাহ বলেন (আরবি) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি না বাচক এবং ওর সংযোগ রয়েছে। (আরবি)-এর উপর। ইয়াহুদীদের আর একটি বদ-আকীদা ছিল এই যে, ফেরেশতাদের উপর যাদু অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতে তাকেই খণ্ডন করা হয়েছে (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। দ্বিবচনের উপরও বহু বচনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন- (আরবি)-এর মধ্যে রয়েছে। কিংবা তাদের অনুসারীদেরকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের দুজনের নাম খুবই অবাধ্যতার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) তো বলেন এটাই সঠিক ভাব। এছাড়া অন্য ভাব নেয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদু আল্লাহু, নাযিল করেননি। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে আয়াতের তরজমা হবে এইঃ ‘ঐ ইয়াহুদীরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করেছে যা শয়তানরা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগে পড়তো। হযরত সুলাইমান (আঃ) কুফরী করেনি, না আল্লাহ তা'আলা ঐ দু' ফেরেশতার উপর যাদু অবতীর্ণ করেছেন; (যেমন-হে ইয়াহুদী! জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈলের (আঃ) প্রতি তোমাদের ধারণা রয়েছে) বরং এ কুফরী ছিল শয়তানদের, যারা বাবেলে জনগণকে যাদু শিখাতো এবং তাদের সরদার ছিল মানুষ, যাদের নাম ছিল হারূত ও মারূত। হযরত আবদুর রহমান বিন আবৃজা (রঃ) নিম্নরূপ পড়তেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দাউদ ও সুলাইমান এই দু'বাদশাহর উপরেও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একে শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)। অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর হারুত ও মারূত দুজন ফেরেশতা। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিক্ষা দিতে ঐ দু'ফেরেশতাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই তারা আল্লাহর সে আদেশ পালন করেছিলেন।একটি দুর্বল মত এও আছে যে, এটা জ্বীনদের দু’টি গোত্র (আরবি) দু'বাদশাহর কিরআতে (আরবি)-এর অর্থ হবে সৃষ্টি করা। যেমন, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্যে। আট প্রকারের চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন।' (৩৯:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি লোহা সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৫) হাদীসের মধ্যেও (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আল্লাহ যতগুলো রোগ সৃষ্টি করেছেন, ওগুলোর ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। উপরোক্ত সব স্থানেই (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; আনা বা অবতীর্ণ করা অর্থে নয়। দ্রুপ এ আয়াতেও। পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীদের মাযহাব এই যে, এই দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। কেউ যেন এ প্রশ্ন উত্থাপন না করেন যে, ফেরেশতাগণ তো নিস্পাপ। তাদের দ্বারা তো পাপকার্য হতেই পারে না। অথচ জনগণকে যাদু শিক্ষা দেয়া, এতো কুফরী? এ প্রশ্ন উখিত হতে পারে না। কেননা, এ দু'জন ফেরেশতা সাধারণ ফেরেশতাগণ হতে পৃথক হয়ে যাবে, যেমন ইবলিস পৃথক হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কাবুল আহবার (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) এবং হযরত কালবী (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতগণ পরস্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোকে এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না-তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; তার পরে দেখা যাক তারা কি করে। তারা তখন হারূত ও মারূতকে হাজির করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি। আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং মদ্যপানও করবে না।তখন তারা দুজন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তাআলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।' তারা উত্তর দেয়ঃ ‘এটা আমাদের দ্বারা হবে না। সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো। তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোকে তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ - করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছে। তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই- আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মূসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হযরত নাফে' (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ যুহরা তারকাটি বের হয়েছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘না’। দুতিন বার প্রশ্নের পর বলেনঃ এখন উদিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) তখন বলেন ' ও যেন খুশিও না হয় এবং ওর আনন্দ লাভও যেন না হয়। হযরত নাফে (রাঃ) তখন তাকে বলেনঃ জনাব, একটি তারকা যা আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে উদিত ও অস্তমিত হয় তাকে আপনি মন্দ বলেন?' তিনি তখন বলেনঃ তবে শুনুন জনাব আমি ঐ কথাই বলছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হতে শুনেছি। অতঃপর উল্লিখিত হাদীসটি শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণনা করেন। কিন্তু এটাও গরীব বা দুর্বল। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সম্ভবতঃ এটা ইসরাঈলী বর্ণনাই হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রাঃ) হতেও এ ধরনের বহু বর্ণনা করা হয়েছে।কেউ কেউ বলেন যে, যুহরা একটি স্ত্রী লোক ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ ' তোমরা আমাকে ঐ দোআটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু বর্ণনায়ও এটা আছে; কিন্তু ওটা মুকার ও বে-ঠিক। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দুজন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবেলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তাতে হত্যা ও অবৈধ মালের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ হুকুমও ছিল যে,তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করে। এও এসেছে যে, তারা তিনজন ফেরেশতা ছিল। কিন্তু একজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে যায়। অতঃপর দু’জনের পরীক্ষা নেয়া হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এখানে বাবেল দ্বারা দুনিয়ায় অন্দের বাবেলকে বুঝান হয়েছে। স্ত্রীলোকটির নাম আরবী ভাষায় ছিল যুহরা’ বানতী ভাষায় ছিল ‘বেদখত্ এবং ফারসী ভাষায় ছিল ‘আনাহীদ'। এ স্ত্রীলোকেটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মোকাদ্দমা এনেছিল। যখন তারা তার সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছে করে তখন সে বলে-যদি আগে আমাকে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ফায়সালা দাও তবে আমি সম্মত আছি। তারা তাই করে। পুনরায় সে বলেঃ ‘তোমরা যা পড়ে আকাশে উঠে থাকো ও পড়ে নীচে নেমে আস ওটাও আমাকে শিখিয়ে দাও। তারা ওটাও তাকে শিখিয়ে দেয়। সে ওটা পাঠ করে আকাশে উঠে যায়। কিন্তু নীচে নেমে আসার দু’আ ভুলে যায়। সেখানেই তার দেহকে তারকায় রূপান্তরিত করা।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) কখনও যুহরা তারকা দেখলে তাকে অভিশাপ দিতেন। যখন এই ফেরেশতারা আকাশে উঠতে চাইলো কিন্তু উঠতে পারলো না। তখন তারা বুঝে নিলো যে, এখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম কিছুদিন তো এই ফেরেশতারা স্থিরই। ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতো এবং সন্ধ্যার পর। আকাশে উঠে যেতো। অতঃপর যুহরাকে দেখে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যুহরা তারকাকে একটি সুন্দরী স্ত্রীর আকৃতিতে তাদের নিকট। পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা, হারুত ও মারূতের এ ঘটনা তাবেঈগণের মধ্যেও বহু লোক বর্ণনা করেছেন। যেমন, মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) প্রভৃতি। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণও নিজ নিজ তাফসীরে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের কিতাবসমূহের উপর নির্ভরশীল। এ অধ্যায়ে কোন সহীহ মারফু মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ঈমান ওর উপরেই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআন মাজীদে আছে ওটাই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে, যাতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরলোক গমনের অল্প দিন পরে দাওমাতুল জানাল’ হতে একটি স্ত্রীলোক তার খোঁজে আগমন করে। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সে উদ্বিগ্ন হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- ব্যাপার কি? সে বলেঃ আমার মধ্যে ও আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় লেগেই থাকতো। একবার সে আমাকে ছেড়ে কোন্ অজানা জায়গায় চলে যায়। একটি বৃদ্ধার নিকট আমি এসব কিছু বর্ণনা করি। সে আমাকে বলে- “তোমাকে যা বলি তাই কর, সে আপনা আপনি চলে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে গেলাম। রাত্রে সে দুটি কুকুর নিয়ে আমার নিকট আগমন করে। একটির উপর সে আরোহণ করে এবং অপরটির উপর আমি আরোহণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা দু'জন বাবেলে চলে যাই। তথায় গিয়ে দেখি যে, দু’টি লোক শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় লটকানো রয়েছে। ঐ বৃদ্ধা আমাকে বলে-তাদের নিকট যাও ও বল-“আমি যাদু শিখতে এসেছি। আমি তাদেরকে একথা বলি। তারা বলে-‘জেনে রেখো, আমরা তো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। তুমি যাদু শিক্ষা করো যাদু শিক্ষা করা কুফরী।' আমি বলি-শিখবো। তারা বলে-“আচ্ছা, তাহলে যাও, ঐ চুল্লীর মধ্যে প্রস্রাব করে চলে এসো। আমি গিয়ে প্রস্রাবের ইচ্ছে করি, কিন্তু আমার অন্তরে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়, সুতরাং আমি ফিরে এসে বলিআমি কাজ সেরে এসেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে -“তুমি কি দেখলে আমি বলি-“কিছুই না। তারা বলে-“তুমি ভুল বলছে। এখন পর্যন্ত তুমি বিপথে চালিত হওনি। তোমার ঈমান ঠিক আছে, তুমি এখনও ফিরে যাও এবং কুফরী করো না। আমি বলি-“আমাকে যে যাদু শিখতেই হৰে। তারা পুনরায় আমাকে বলে-ঐ চুল্লীতে প্রস্রাব করে এসো। আমি আবার যাই। কিন্তু এবারও। মন চায় না, সুতরাং ফিরে আসি। আবার এভাবেই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। পুনরায় আমি চুল্লীর নিকট যাই এবং মনকে শক্ত করে প্রস্রাব করতে বসে পড়ি। আমি দেখি যে, একজন ঘোড়া সওয়ার মুখের উপর পর্দা ফেলে আকাশের উপর উঠে গেল। আমি ফিরে এসে তাদের নিকট এটা বর্ণনা করি। তারা বলে- 'হাঁ, এবার তুমি সত্য বলছে। ওটা তোমার ঈমান ছিল, যা তোমার মধ্য হতে বেরিয়ে গেল। এখন চলে যাও।আমি এসে ঐ বৃদ্ধাকে বলি- ‘তারা আমাকে কিছুই শিক্ষা দেয়নি। সে বলে- যথেষ্ট হয়েছে। তোমার নিকট সবই চলে এসেছে। এখন তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি পরীক্ষামূলকভাবে একটি গমের দানা নিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। অতঃপর বলি- গাছ হও।' ওটা গাছ হয়ে গেল। আমি বলি-- তোমাতে ডাল পাতা গজিয়ে যাক।' তাই হয়ে গেল। তার পর বলি- ‘শুকিয়ে যাও।' ডালপাতা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-‘পৃথক পৃথকভাবে দানা দানা হয়ে যাও। ওটা তাই হয়ে গেল। তারপরে আমি বলি-শুকিয়ে যাও। ওটা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-আটা হয়ে যাও।' আটা হয়ে গেল। আমি বলি-রুটি হয়ে যাও।' রুটি হয়ে গেল। এটা দেখেই আমি লজ্জিত হয়ে যাই এবং বে-ঈমান হয়ে যাওয়ার কারণে আমার খুবই দুঃখ হয়। হে উম্মুল মু'মিনীন! আল্লাহর শপথ! আমি যাদুর দ্বারা কোন কামও নেইনি এবং কারও উপর এটা প্রয়োগও করিনি। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাঁকে পেলাম না। এখন আমি কি করি?একথা বলেই সে পুনরায় কাঁদতে আরম্ভ করে এবং এত কাঁদে যে, সবারই মনে তার প্রতি দয়ার সঞ্চার হয়। তাকে কি ফতওয়া দেয়া যেতে পারে এ ব্যাপারে সাহাবীগণও (রাঃ) খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে তারা বলেন- এখন এ ছাড়া আর কি হবে যে, তুমি এ কাজ করবে না, তাওবা করবে এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর পিতা-মাতার খিদমত করবে। এই ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক।কেউ কেউ বলেন যে, যাদুর বলে প্রকৃত জিনিসই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, না, দর্শকের শুধু এর ধারণা হয়ে থাকে মাত্র, প্রকৃত জিনিস যা ছিল তাই থাকে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ অর্থাৎ তারা মানুষের চোখে যাদু করে দিয়েছে।' (আরবি) (৭:১১৬) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন অর্থাৎ (আরবি) হযরত মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হয়েছে যে, যেন ঐ সাপগুলো তাদের যাদুর বলে চলাফেরা করছে।' (২০:৬৬) এ ঘটনা দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াতে বাবেল’ শব্দ দ্বারা ইরাকের বাবেলকে বুঝানা হয়েছে, দুনিয়া অন্দের’ বাবেল নয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত আলী ইবনে আবূ তাবিল (রাঃ) বাবেলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসরের নামাযের সময় হলে তিনি তথায় নামায আদায় করলেন না, বরং বাবেলের সীমান্ত পার হয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমার প্রিয় রাসূল (সঃ) আমাকে গোরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বাবেলের ভূমিতেও নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এটা অভিশপ্ত ভূমি। সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসের উপর কোন সমালোচনা করেননি। আর যে হাদীসকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাবে নিয়ে আসেন এবং ওর সনদের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন ঐ হাদীস ইমাম সাহেবের মতে হাসান হয়ে থাকে। এর দ্বারা জানা গেল যে, বাবেলের ভূমিতে মামায পড়া মাকরূহ। যেমন সামুদ সম্প্রদায়ের ভূমি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তাদের বাস ভূমিতেও যেয়ো না। যদি ঘটনাক্রমে যেতেই হয়, তবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাও।আল্লাহ তা'আলা হারুত ও মারূতের মধ্যে ভাল-মন্দ, কুফর ও ঈমানের জ্ঞান দিয়ে রেখেছিলেন বলে তারা কুফরীর দিকে গমনকারীদের উপদেশ দিতো। এবং তাদেরকে ওটা হতে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু যখন কোনক্রমেই মানতো না তখন তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিখিয়ে দিতো। ফলে তাদের ঈমানের আলো বিদায় নিতে এবং যাদু চলে আসতো। শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যেতো। ঈমান বিদায় নেয়ার পর আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর নেমে আসতো। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, কাফির ছাড়া আর কেউ যাদু বিদ্যা শিখবার সৎ সাহস রাখতে পারে না (আরবি) শব্দের অর্থ এখানে বিপদ, আজমায়েশ ও পরীক্ষা। এ আয়াতের মাধ্যমে এটাও জানা গেল যে, যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা কুফরী। হাদীসের মধ্যেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহীর সাথে কুফরী করে। ( বার)'। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং-এর সমর্থনে অন্যান্য হাদীসও এসেছে।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, মানুষ হারুত ও মারূতের কাছে গিয়ে যাদু বিদ্যা শিক্ষা করতো। ফলে তারা খারাপ কাজ করতো এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ শয়তান তার সিংহাসনটি পানির উপর রাখে। অতঃপর মানুষকে বিপথে চালানোর জন্যে সে তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়। সেই তার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত যে হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে সবচেয়ে বেড়ে যায়। এরা ফিরে এসে নিজেদের জঘন্যতম কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়। কেউ বলেঃ আমি অমুককে এভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছি। কেউ বলেঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে এ পাপ কার্য করিয়েছি। শয়তান তাদেরকে বলেঃ ‘বো কিছুই করনি। এতো সাধারণ কাজ। অবশেষে একজন এসে বলেঃ আমি একটি নোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, এমনকি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। শয়তান তখন তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলেঃ হ, তুমি বড় কাজ করেছে। সে তাকে পার্শ্বে বসিয়ে নেয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।' যাদুকরও তার যাদুর দ্বারা ঐ কাজই করে থাকে, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি হয়। যেমন তার কাছে স্ত্রীর আকৃতি খারাপ মনে হবে কিংবা তার স্বভাব চরিত্রকে সে ঘৃণা করবে অথবা অন্তরে শত্রুতার ভাব জেগে যাবে ইত্যাদি। আস্তে আস্তে এসব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিচ্ছেদই ঘটে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যাদু দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন ক্ষতি সাধিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি সাধন করা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই নেই। আল্লাহর ভাগ্য লিখন অনুযায়ী তার ক্ষতিও হতে পারে, আবার তার ইচ্ছে হলে যাদু নিষ্ক্রিয়ও হতে পারে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যাদু শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিরই ক্ষতি করে থাকে, যে ওটা লাভ করে ওর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা এমন জিনিস শিক্ষা করে যা তাদের জন্যে শুধু ক্ষতিকারক, যার মধ্যে উপকার মোটেই নেই। ঐ ইয়াহুদীরা জানে যে,যারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) আনুগত্য ছেড়ে যাদুর পিছনে লেগে থাকে তাদের জন্যে আখেরাতের কোনই অংশ নেই। তাদের না আছে আল্লাহর কাছে কোন সম্মান, না তাদেরকে ধর্মভীরু মনে করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তাদের এ মন্দ কাজের অনুভূতি হতো এবং ঈমান এনে খোদাভীরুতা অবলম্বন করতো তবে ওটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। কিন্তু এরা অজ্ঞান ও নির্বোধ।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “জ্ঞানীগণ বলে- তোমাদের জন্যে আফসোস! আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্যে বড়ই উত্তম, কিন্তু ওটা একমাত্র ধর্মশীলগণই পেয়ে থাকে।হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) ও পূর্ব যুগীয় মনীষীদের একটি দল যাদু বিদ্যা শিক্ষার্থীকে কাফির বলেছেন। কেউ কেউ কাফির তো বলেন না, কিন্তু বলেন যে, যাদুকরকে হত্যা করাই হচ্ছে তার উপযুক্ত শাস্তি। হযরত বাজালাহ বিন উবাইদ (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক নির্দেশ নামায় লিখেছিলেনঃ যাদুকর পুরুষ বা স্ত্রীকে তোমরা হত্যা করে দাও।' এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিনজন যাদুকরের গর্দান উড়িয়েছি।'সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) উপর তার দাসী যাদু করেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন যে, তিনজন সাহাবী (রাঃ) হতে যাদুকরকে হত্যা করার ফতওয়া রয়েছে। জামে' উত তিরমিযীর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন মুসলিম দুর্বল। সঠিক কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। কিন্তু তাবরানীর হাদীসের মধ্যে অন্য সনদেও এ হাদীসটি মার' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ' ওয়ালীদ বিন উকবার নিকট একজন যাদুকর ছিল, সে তার যাদু কার্য বাদশাহকে দেখাতো। সে প্রকাশ্যভাবে একটি লোকের মাথা কেটে নিতো। অতঃপর একটা শব্দ করতো, আর তখনই মাথা জোড়া লেগে যেতো মুহাজির সাহাবাগণের (রাঃ) মধ্যে একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী (রাঃ) ওটা দেখেন এবং পরের দিন তরবারি নিয়ে আসেন। যাদুকর খেলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তিনি স্বয়ং যাদুকরেরই মাথা কেটে ফেলেন এবং বলেনঃ “তুমি সত্যবাদী হলে নিজেই জীবিত হয়ে যাও।' অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ “তোমরা যাদুর নিকট যাচ্ছ ও তা দেখছো?' ঐ সাহাবী (রাঃ) ওয়ালীদের নিকট হতে তাকে হত্যা করার অনুমতি নেননি বলে বাদশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) নির্দেশ ও হযরত হাফসার (রাঃ) ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন যে, ঐ হুকুম ঐ সময় কার্যকরী হবে যখন যাদুর মধ্যে শিরক যুক্ত শব্দ থাকবে। মু'তাযিলা সম্প্রদায় যাদুর অস্তিত্বই মানে না। তারা বলে যে,যারা যাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা কাফির। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যাদুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তারা স্বীকার করে যে, যাদুকর তার যাদুর বলে বাতাসে উড়তে পারে, মানুষকে বাহ্যতঃ গাধা ও গাধাকে বাহ্যতঃ মানুষ করে ফেলতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট কথাগুলো মন্ত্রতন্ত্র পড়ার সময় ঐগুলো সৃষ্টিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আকাশকে ও তারকাকে ফলাফল সৃষ্টিকারী মানে না। দার্শনিকেরা, জোতির্বিদেরা এবং বে-দ্বীনেরা তো তারকা ও আকাশকেই ফলাফল সৃষ্টিকারী মেনে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রথম দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ তারা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা। তৃতীয় দলীল হচ্ছে ঐ স্ত্রী লোকটির ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আরও এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, যাদু বিদ্যা লাভ করা দুষনীয় নয়। মাসয়ালা বিশ্লেষণকারীগণের এটাই অভিমত। কেননা, এটাও একটা বিদ্যা। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, এরা কি সমান?’ আর এ জন্যেও যাদু বিদ্যা শিক্ষা দুষণীয় নয় যে, তার দ্বারা মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পূর্ণভাবে পার্থক্য করা যায় এবং মু'জিযার জ্ঞান ওয়াজিব ও ওটা নির্ভর করে যাদু বিদ্যার উপর, যার দ্বারা পার্থক্য বুঝা যায়। সুতরাং যাদু বিদ্যা শিক্ষা করাও ওয়াজিব হয়ে গেল। ইমাম রাযীর (রাঃ) একথা"গোড়া হতে আগা পর্যন্ত ভুল। বিবেক হিসেবে যদি তিনি ওটাকে খারাপ না বলেন তবে মু'তাযিলা সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে, যারা ওকে বিবেক হিসেবেও খারাপ বলে থাকে। আর যদি শরীয়তের দিক দিয়ে খারাপ না বলেন তবে কুরআন মাজীদের এ শারঈ আয়াত ওকে খারাপ বলার জন্যে যথেষ্ট। সহীহ হাদীসে রয়ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন যাদুকর বা গণকের নিকট গমন করে সে কাফির হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম রাযীর (র) উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর একথা বলা যে, মুহাককিকগণের অভিমত এটাই’ এটাও ঠিক নয়। মুহাকিকগণের এরূপ কথা কোথায় আছে? ইসলামের ইমামগণের মধ্যে কে এ কথা বলেছেন? অতঃপর যারা জানে এবং জানে না, তারা কি সমান?' এ আয়াতটিকে দলীলরূপে পেশ করা হঠধমী ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এ আয়াতের ‘ইলম এর ভাবার্থ হচ্ছে ধর্মীয় ‘ইলম। এ আয়াতে শারঈ আলেমগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তার এ কথা বলা যে, এর দ্বারা মু'জিযার ‘ইলম লাভ হয়, এটা একেবারে বাজে কথা। কেননা, আমাদের রাসূল (সঃ)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন, যা বাতিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু তার মু'জিযা জানা যাদু জানার উপর নির্ভরশীল নয়। ঐ সব লোক যাদের যাদুর সঙ্গে দূরের সম্পর্ক নেই তারাও এটাকে মু'জিযা বলে স্বীকার করেছেন। সাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ, ইমামগণ এমনকি সাধারণ মুসলমানগণও একে মু'জিযা মেনে থাকেন। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কখনও যাদু জানা তো দূরের কথা, ওর কাছেই যাননি। তাঁরা ওটা নিজে শিক্ষা করেননি এবং অপরকেও শিক্ষা দেননি। তাঁরা যাদু করেননি এবং করাননি। বরং এসব কাজকে তারা কুফরই বলে এসেছেন। অতঃপর এ দাবী করা যে, মু'জিযা জানা ওয়াজিব এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য যাদুর উপর নির্ভর করে, সুতরাং যাদু শিখাও ওয়াজিব হলো, এটা কতই না অর্থহীন দাবী! যাদু বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে, যা আবু আব্দিল্লাহ রাফী বর্ণনা করেছেন।(১) প্রথম যাদু হচ্ছে তারকা পূজকদের। তারা সাতটি গতিশীল তারকার উপর বিশ্বাস রাখে যে, ভাল-মন্দ ওদের কারণেই হয়ে থাকে। এ জন্যে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট শব্দ পাঠ করতঃ ওদের পূজা করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগমন করেন এবং হিদায়াত করেন। ইমাম রাযী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি বিশিষ্ট পুস্তক রচনা করেছেন এবং ওর নাম (আরবি)রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, পরে তিনি ওটা হতে তাওবা করেছেন।আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি শুধু জানাবার জন্যে এবং তার এই বিদ্যা প্রকাশ করার জন্যেই এ পুস্তক লিখেছেন, এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস নেই। কেননা এটা সরাসরি কুফরী।(২) দ্বিতীয় যাদু হচ্ছে ধারণা শক্তির উপর বিশ্বাসী লোকদের যাদু। ধারণা ও খেয়ালের বড় রকমের প্রভাব রয়েছে। যেমন একটি সংকীর্ণ সাঁকো মাটির উপর রেখে দিলে মানুষ অনায়াসেই তার উপর দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সঁকোটি যদি নদীর উপর হয় তবে মানুষ আর তার উপর দিয়ে চলতে পারে না। কেননা ধারণা হয় যে, এখনই পড়ে যাবে। ধারণার এই দুর্বলতার কারণেই যেটুকু জায়গার উপর দিয়ে মাটিতে চলতে পারছিল, ঐ জায়গার উপর দিয়েই এরকম ভয়ের সময় চলতে পারে না। এ জন্যেই হেকিমগণ ও ডাক্তারগণ ভীত লোককে লাল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখেন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত লোককে খুব বেশী আলোকময় ও দ্রুত গতিসম্প দেখতে নিষেধ করে থাকেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, উপর ধারণার একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। জ্ঞানীগণ এ বিষয়েও একমত যে, ন্যর’ লেগে থাকে। সহীহ হাদীসেও এসেছে যে, নযর’ লাগা সত্য। ভাগ্যের উপর যদি কোন জিনিস প্রাধান্য লাভকারী হতো তবে তা ন্যই ইতো। এখন যদি নাফস্ শক্ত হয় তবে বাহ্যিক সাহায্য ও বাহ্যিক কার্যের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি নাফস ততো শক্ত না হয় তবে ঐ সব যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। নাফসের যে পরিমাণ শক্তি বেড়ে যাবে সেই পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। আর যে পরিমাণ এ শক্তি কম হবে সে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তিও কমে যাবে।এ শক্তি কখনও কখনও খাদ্যের স্বল্পতা এবং জনগণের মেলামেশা ত্যাগ করার মাধ্যমেও লাভ হয়ে থাকে। কখনও তো মানুষ এ শক্তির দ্বারা শরীয়ত। অনুযায়ী পুণ্যের কাজ করে থাকে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘কারামত’ বলে, যাদু বলে না। আবার কখনও কখনও মানুষ এ শক্তি দ্বারা বাতিল ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজ করে থাকে এবং দ্বীন হতে বহু দূরে সরে পড়ে। এ রকম লোকের ঐ অলৌকিক কার্যাবলী দেখে প্রতারিত হয়ে তাকে ওয়ালী বলা কারও উচিত নয়। কেননা, যারা শরীয়তের উল্টো কাজ করে তারা কখনও আল্লাহর ওয়ালী হতে পারে না। তা নাহলে সহীহ হাদীস সমূহে দাজ্জালদেরকে অভিশপ্ত ও দুষ্ট বলা হতো না। অথচ তারা তো বহু অলৌকিক কাজ করে দেখাবে।(৩) তৃতীয় যাদু হচ্ছে জ্বীন প্রভৃতি পার্থিব আত্মসমূহের দ্বারা সহায্য প্রার্থনা করা। দার্শনিকরা ও মুতাযেলীরা এটা স্বীকার করে না। কতগুলো লোক এসব পার্থিব আত্মার মাধ্যমে কতকগুলো শব্দ ও কার্যের দ্বারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। ওকে মোহমন্ত্র ও প্রেতাত্মার যাদুও বলা হয়।(৪) চতুর্থ প্রকারের যাদু হচ্ছে ধারণা বদলিয়ে দেয়া, নযরবন্দ করা এবং প্রতারিত করা,যার ফলে প্রকৃত নিয়মের উল্টো কিছু দেখা যায়। কলাকৌশলের মাধ্যমে কার্য প্রদর্শনকারীকে দেখা যায় যে, সে প্রথমে একটা কাজ আরম্ভ করে, যখন মানুষ একাগ্র চিত্তে ওর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায়, তখন তড়িৎ করে সে আর একটি কাজ আরম্ভ করে দেয়, যা মানুষের দৃষ্টির অন্তারলে থেকে যায়। তা দেখে তারা তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদু এ প্রকারেরই ছিল। এ জন্যেই কুরআন পাকে রয়েছেঃ “তারা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের অন্তরে ভয় বসিয়ে দেয়। অন্য স্থানে রয়েছেঃ মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, ঐ সব লাঠি ও দড়ি যেন সাপ হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এরূপ ছিল না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (৫) পঞ্চম প্রকারের যাদু হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণে একটি জিনিস তৈরী করা এবং এর দ্বারা আশ্চর্যজনক কাজ নেয়া। যেমন, ঘোড়ার আকৃতি তৈরী করে দিল। ওর উপর একজন কৃত্রিম আরোহী বসিয়ে দিল যার হাতে বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। এক ঘন্টা অতিবাহিত হতেই ওর মধ্য হতে শব্দ বের হতে লাগল। অথচ কেউই ওকে বাজাচ্ছে না। এরূপভাবেই এমন নিপুণতার সাথে মানুষের ছবি বানালো যে, মনে হচ্ছে যেন প্রকৃত মানুষই হাসছে বা কাঁদছে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদুও এই প্রকারেরই ছিল। তাদের কৃত্রিম সাপগুলো পারদ জাতীয় দ্রব্য দিয়ে তৈরী ছিল বলে মনে হতো যেন জীবিত সাপ নড়াচড়া করছে। ঘড়ি, ঘন্টা এবং ছোট ছোট জিনিস, যা থেকে বড় বড় জিনিস বেরিয়ে আসে, এসবগুলোই এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে একে যাদু বলা উচিত নয়। কেননা, এটা তো এক প্রকার নির্মাণ ও কারিগরি, যার কারণগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ্য। যে ওটা জানে সে এসব শব্দ দ্বারা একাজ করতে পারে। যে ফন্দি বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টানেরা করতো ওটাও এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। ঐ ফন্দি এই যে, তারা গোপনে গির্জার প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিতো। অতঃপর ওকে গির্জার মাহাত্ম্য বলে প্রচার করতঃ জনগণকে তাদের ধর্মে টেনে আনতো।কতক কারামিয়াহ ও সুফিয়্যাহ সম্প্রদায়েরও ধারণা এই যে, জনগণকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শনের হাদীসগুলো বানিয়ে নিলে কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা চরম ভুল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন দোযখে তার স্থান ঠিক করে নেয়।' তিনি আরও বলেনঃ ‘আমার হাদীসগুলো তোমরা বর্ণনা করতে থাকো; কিন্তু আমার নামে মিথ্যা কথা বলো না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামী।'একজন খ্রীষ্টান পাদরী একদা দেখে যে, পাখীর একটি ছোট বাচ্চা যা উড়তে পারে না, একটি বাসায় বসে আছে। যখন ওটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বর বের করছে তখন অন্যান্য পাখীরা ওর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে যাইতুন ফল এনে ওর বাসায় রেখে দিচ্ছে। ঐ পাদরী কোন জিনিস দিয়ে ঐ আকারেরই একটি পাখী তৈরী করে। ওর নীচের দিক ফাপা রাখে এবং ওর ঠোটের দিকে একটি ছিদ্র রাখে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করে। অতঃপর যখন বাতাস বের হয় তখন ঐ পাখীর মতই শব্দ করে। ওটা নিয়ে গিয়ে সে গির্জার মধ্যে বাতাস মুখো রেখে দেয়। ছাদে একটি ছোট ছিদ্র করে দেয় যেন বাতাস সেখান দিয়ে যাতায়াত করে। এখন যখনই বাতাস বইতে থাকে তখনই ওটা হতে শব্দ বের হতে থাকে। আর এ শব্দ শুনে ঐ প্রকারের পাখী তথায় একত্রিত হয় এবং যাইতুন’ ফল এনে এনে রেখে যায়। ঐ পাদরী তখন প্রচার করতে শুরু করে যে, গির্জার মধ্যে এটা এক অলৌকিক ব্যাপার। এখানে একজন মনীষীর সমাধি রয়েছে এবং এটা তাঁরই কারামত। এখন জনগণ স্বচক্ষে এটা দেখে বিশ্বাস করে নেয়। অতঃপর তারা ঐ কবরের উপর ন্যর-নিয়ায আনতে থাকে এবং এই কারামত বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অথচ ওটা না ছিল কারামত, না ছিল মু'জিযা। বরং শুধুমাত্র ছিল ওটা একটা গোপনীয় বিষয় যা সেই পাদরী; একমাত্র তার পেট পূরণের জন্যেই গোপনীয়ভাবে করে রেখেছিল। আর ঐ অভিশপ্ত দল ওতেই লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।(৬) যাদুর ষষ্ঠ প্রকার হচ্ছে কতকগুলো ওষুধের গোপন কোন বৈশিষ্ঠ্য জেনে ওটা কাজে লাগানো। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে,এতে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :রয়েছে। চুম্বককেই তো দেখা যায় যে, ওটা কিভাবে লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। অধিকাংশ সূফী ও দরবেশই ঐ ফন্দি ফিকিরকেই জনগণেরই মধ্যে কারামত রূপে প্রদর্শন করতঃ তাদেরকে মুরীদ করতে থাকে।(৭) সপ্তম প্রকারের যাদু হচ্ছে কারও মধ্যে একটা বিশেষ প্রভাব ফেলে যা চায় তাই তার দ্বারা করিয়ে নেয়া। যেমন তাকে বলে যে, তার “ইসমে আযম . মনে আছে কিংবা জ্বিনেরা তার তাবে আছে। এখন যদি তার সামনে লোকটি দুর্বল ঈমানের লোক হয় এবং অশিক্ষিত হয় তবে তো সে তাকে বিশ্বাস করে নেবে এবং তার প্রতি তার একটা ভয় ও সম্ভ্রম থাকবে যা তাকে আরও দুর্বল করে দেবে। এখন সে যা চাইবে তাই সে করবে। আর এই প্রভাব সাধারণতঃ স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির উপরই পড়ে থাকে। একেই মুতাবান্নাহ’ বলা হয়। আর অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে জ্ঞানী ও অজ্ঞানকে চিনতে পারে, কাজেই সে নিরেটের উপরই তার ক্রিয়া চাপিয়ে থাকে।(৮) অষ্টম প্রকারের যাদু হচ্ছে চুগলী করা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কারও অন্তরে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং গোপনীয় চতুরতা দ্বারা তাকে বশীভূত করা। এ চুগলী যদি মানুষের মধ্যে শক্রতা সৃষ্টির জন্যে হয় তবে এটা শরীয়ত অনুযায়ী হারাম হবে। আর যদি এটা সংশোধন করার উদ্দেশ্যে হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মিলনের জন্যে হয় কিংবা এর ফলে যদি মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি আগত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং কাফিরদের শক্তি নষ্ট করতঃ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা যায় তবে এটা বৈধ হবে। যেমন হাদীস শরীফে আছে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মঙ্গলের জন্যে এদিক ওদিক কথা নিয়ে যায়। হাদীসে আরও আছে যে, যুদ্ধ হচ্ছে প্রতারণার নাম। হযরত নঈম বিন মাসউদ (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে আরবের কাফির ও ইয়াহূদীদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথার মাধ্যমে বিচ্ছেদ আনয়ন করেছিলেন এবং এরই ফলে মুসলমানদের নিকট তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইমাম রাযী যে যাদুর এই আটটি প্রকার বর্ণনা ; করেছেন তা শুধু শব্দ হিসেবে। কেননা আরবী ভাষায় (আরবি) বা যাদু প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল হয় এবং যার কারণসমূহ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এজন্যেই একটি হাদীসে আছে যে, কোন কোন বর্ণনাও যাদু। আর এ কারণেই সকালের প্রথম ভাগকে ‘সহুর’ বলা হয়। কেননা, ওটা মানুষের চক্ষুর অন্তরালে থাকে। আর ঐ শিরাকের ‘সিহর’ বলে যা আহার্যের স্থানে থাকে। আবু জেহেলও বদরের যুদ্ধে বলেছিল যে, তার খাদ্যের শিরা ভয়ে ফুলে গেছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার সিহর’ ও ‘নাহারের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাহলে সিহূরের অর্থ হচ্ছে খাদ্যের শিরা এবং নাহারের অর্থ হচ্ছে বুক। কুরআন পাকে আছেঃ “তারা (যাদুকরেরা) মানুষের চক্ষু থেকে তাদের কার্যাবলী গোপন রেখেছিল। আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমরা বলি যে, যাদু আছে এবং এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহকে মঞ্জর হলে তিনি যাদুর সময় যা চান তাই ঘটিয়ে থাকেন। যদিও মুতাযিলা, আবু ইসহাক ইসফিরাঈনী এবং ইমাম শফিঈ (রঃ) এটা বিশ্বাস করেন না।' যাদু কখনও হাতের চালাকি দ্বারাও হয়ে থাকে আবার কখনও ভোরা, সুতা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। কখনও আল্লাহর নাম পড়ে ফু দিলেও একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। কখনও শয়তানের নাম নিয়ে শয়তানী কার্যাবলী দ্বারাও লোক যাদু করে থাকে। কখনও ঔষধ ইত্যাদি দ্বারাও যাদু করা হয়।"রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেনঃ কতকগুলো বর্ণনাও যাদু' এর দুটোই ভাবার্থ হতে পারে। হয়তো তিনি এটা বর্ণনাকারীর প্রশংসার জন্যে বলেছেন, কিংবা তার নিন্দে করেও বলে থাকতে পারেন যে, সে তার মিথ্যা কথাকে এমন ভঙ্গিমায় বর্ণনা করছে যে, তা সত্য মনে হচ্ছে। মন্ত্রী আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মদ বিন হাবীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল আশরাফু আ'লা মাযাহিবিল আশরাফে’ এর মধ্যে যাদু অধ্যায়ে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এটা স্বীকার করেননি। যারা যাদু শিক্ষা করে ও ওটা ব্যবহার করে তাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ), এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) কাফির বলেছেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) কয়েকজন শিষ্যের মতে যাদু যদি আত্মরক্ষার জন্যে কেউ শিক্ষা করে তবে সে কাফির হবে না। তবে হ, যারা ওর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ওকে উপকারী মনে করে সে কাফির। অনুরূপ ভাবে যারা ধারণা করে যে, শয়তানরা এ কাজ করে থাকে এবং তারা এরকম ক্ষমতা রাখে, তারাও কাফির।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, যদি তারা বাবেলবাসীদের মত বিশ্বস রাখে এবং সাতটি গতিশীল তারকাকে প্রভাব সৃষ্টিকারীরূপে বিশ্বাস করে তবে তারা কাফির। আর যদি এ না হয়, কিন্তু যাদুকে বৈধ মনে করে তবে তারাও কাফির। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) অভিমত এও আছে যে, যারা যাদু করে এবং ওকে ব্যবহারে লাগায় তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যে পর্যন্ত বারবার না করে কিংবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে নিজে স্বীকার না করে সেই পর্যন্ত হত্যা করা হবে না।তিনজন ইমামই বলেন যে, তার হত্যা হচ্ছে শাস্তির জন্যে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে এ নির্দেশ আছে যে, যাদুকরকে তাওবাও করানো হবে না এবং তার তাওবা করার ফলে তার শাস্তি লোপ পাবে না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মতে তার তাওবা গৃহীত হবে। একটি বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) এ উক্তি আছে। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মতে কিতাবীদের যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য তিনজন ইমামের অভিমত এর উল্টো। লাবীদ বিন আসাম নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করেছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি। যদি কোন মুসলমান মহিলা যাদু করে তবে তার সম্বন্ধে ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মত এই যে, তাকে বন্দী করা হবে। আর অন্যান্য তিনজন ইমামের মতে পুরুষের মত তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন। হযরত যুহরীর (রঃ) মতে মুসলমান যাদুকরকে হত্যা করা হবে,কিন্তু মুশরিক যাদুকরকে হত্যা করা হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি কোন যিম্মীর যাদুর ফলে কেউ মারা যায় তবে যিম্মীকেও মেরে ফেলা হবে। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রথমে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করতঃ ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা ভালই, নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। আবার তার হতে এও বর্ণিত আছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে হত্যা করা হবে।যে যাদুকরের যাদুতে শিরকী শব্দ আছে, চারজন ইমামই তাকে কাফির বলেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের উপর প্রভুত্ব লাভ করার পর যদি সে তাওবা করে তবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন যিন্দীক সম্প্রদায়। তবে যদি তার উপর প্রভুত্ব লাভের পূর্বেই তারা তাওবা করে তা হলে হবে। আর যদি তার যাদুতে কেউ মারা যায় তবে তো তাকে হত্যা করা হবেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি সে বলেঃ আমি মেরে ফেলার জন্যে যাদু করিনি। তবে ভুল করে হত্যার অপরাধে তার নিকট হতে জরিমানা আদায় করা হবে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) যাদুকরের দ্বারা যাদু উঠিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন, যেমন সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। হযরত আমের শা'বীও এটাকে কোন দোষ মনে করেন না। কিন্তু খাজা হাসান বসরী (রঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আপনি যাদু তুলিয়ে নেন না কেন? তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তো আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি লোকের উপর মন্দ খুলিয়ে নিতে ভয় করি।' যাদুর চিকিৎসাহযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, কুলের সাতটি পাতা পাটায় বেটে পানিতে মিশাতে হবে। অতঃপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ওর উপর ফু দিতে হবে এবং যাদুকৃত ব্যক্তিকে তিন ঢাকে পানি পান করাতে হবে এবং অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে। ইনশাআল্লাহ্ যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এ আমল বিশেষভাবে ঐ ব্যক্তির জন্যে খুবই মঙ্গলজনক যাকে তার স্ত্রী থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যাদু ক্রিয়া নষ্ট করার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি) এ সূরাগুলো। হাদীস শরীফে আছে যে, এই সূরাগুলোর চেয়ে বড় রক্ষাকবচ আর কিছু নেই। এরকমই আয়াতুল কুরসীও শয়তানকে দূর করার জন্য বড়ই ফলদায়ক।
আল-বাকারা 2:100
৯৯-১০৩ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ) আমি এমন এমন নিদর্শনাবলী তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি যা তোমার নবুওয়াতের জন্যে প্রকাশ্য দলীল হতে পারে। ইয়াহুদীদের বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডার তাওরাতের গোপনীয় কথা, তাদের পরিবর্তনকৃত আহকাম ইত্যাদি সব কিছুই আমি এই অলৌকিক কিতাব কুরআন মাজীদের মধ্যে বর্ণনা করেছি। ওটা শুনে প্রত্যেক জীবিত অন্তর তোমার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ইয়াহূদীরা যে হিংসা-বিদ্বেষ বশতঃ মানছে না ওটা অন্য কথা। নতুবা প্রত্যেক লোকই এটা বুঝতে পারে যে, একজন নিরক্ষর লোক কখনও এরকম পবিত্র অলংকার ও নিপুণতাপূর্ণ কথা বানাতে পারে না।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবনে সুরিয়া কাতভীনী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বলেছিল ও ‘আপনি এমন কোন সৌন্দর্য ও দর্শন পূর্ণবাণী আনতে পারেন নি যা দ্বারা আপনার নবুওয়াতের পরিচয় পেতে পারি বা কোন জ্বলন্ত প্রমাণও আপনার নিকট নেই।' তখনই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট শেষ নবী (সঃ)-কে স্বীকার করার উপর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা তারা অস্বীকার করেছিল বলে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করা, এটা তো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অভ্যাস, বরং তাদের অধিকাংশের অন্তর তো ঈমান থেকেই শূন্য।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ফেলে দেয়া। ইয়াহূদীরা আল্লাহর কিতাবকে এবং তার অঙ্গীকারকে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছিল যে, যেন তারা তা ফেলেই দিয়েছিল। এ জন্যেই তাদের নিন্দের ব্যাপারে এ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছেঃ তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা বিদ্যমান পেয়ে থাকে। এখানেও আল্লাহ পাক বলেছেন যে, যখন তাদের একটি দল কিতাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতঃ ওকে এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন সে জানেই না। বরং যাদুর পিছনে লেগে পড়ে। এমনকি মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরও যাদু করে। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)কে এটা জানিয়ে দেন এবং ওর ক্রিয়া নষ্ট করতঃ তাকে আরোগ্য দান করেন। তাওরাতের মাধ্যমে তো তারা তাঁর মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, ওটা তো তার সত্যতা প্রমাণকারী। সুতরাং ওটাকে তারা পরিত্যাগ করতঃ অন্য কিতাব গ্রহণ করে ওর পিছনে লেগে পড়ে। আল্লাহর কিতাবকে তারা এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন তারা ওর সম্বন্ধে কিছু জানতই না। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তারা আল্লাহর কিতাবকে তাদের পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে। এও বলা হয়েছে যে, গান-বাজনা, খেল-তামাশা এবং আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখে এমন প্রত্যেক জিনিসই (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘটনা এবং যাদুর মূল তত্ত্বের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। পায়খানায় গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রী জারাদার নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জ্বীন তার রূপ ধরে তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জ্বীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কার্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তার স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।' হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার বলে তিনি বাতাস ও জ্বীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জ্বীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাঁকে যাদুকর বলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা অস্বীকার করেন এবং আল্লাহর ফরমান জারী হয় যে, যাদু বিদ্যার এ কুফরী শয়তানরা ছড়িয়ে ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক আগমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা হতে আসছো?' সে বলেঃ ইরাক ইতে। তিনি বলেনঃ ইরাকের কোন শহর হতে?' সে বলেঃ কুফা হতে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তথাকার সংবাদ কি?' সে বলেঃ তথায় আলোচনা হচ্ছে যে, হযরত আলী (রাঃ) মারা যাননি; বরং তিনি জীবিত আছেন এবং সত্বরই আসবেন। একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেঁপে উঠেন এবং বলেনঃ ‘এটা সত্য হলে আমরা তাঁর মীরাস বন্টন করতাম না। আর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করতাম। শুন! শয়তানরা আকাশবানী চুরি করে শুনে নিতে এবং তাদের নিজস্ব কথা মিলিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সব পুস্তক জমা করে তার সিংহাসনের নীচে পুঁতে দেন। তার মৃত্যুর পর জ্বীনেরা পুনরায় তা বের করে নেয়। ঐ পুস্তকগুলো ইরাকের মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং ঐ পুস্তকগুলোর কথাই তারা বর্ণনা করছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। সেই যুগে এটাও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, শয়তানরা ভবিষ্যত জানে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই পুস্তকগুলো বাক্সে ভরে পুঁতে ফেলার পর এই নির্দেশ জারী করেন যে, যে একথা বলবে তার মাথা কেটে নেয়া হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর জীনেরা ঐ পুস্তকগুলো তাঁর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে এবং ওর প্রথম পষ্ঠায় লিখে রাখেঃ “এই জ্ঞানভাণ্ডার ‘আসিফ বিন রখিয়া কর্তৃক সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি হযরত সুলাইমান বিন দাউদের (আঃ) প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট পরামর্শ দাতা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।” ইয়াহূদীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) নবী ছিলেন না, বরং যাদুকর ছিলেন। এই কারণেই উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর সত্য নবী (সঃ) অন্য এক সত্য নবীকে (আঃ) কালিমামুক্ত করেন এবং ইয়াহুদীদের বদ-আকীদার অসারতা ঘোষণা করেন। তারা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম নবীদের নামের তালিকাভুক্ত শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠতো। এজন্যেই এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) কষ্টদায়ক প্রাণী হতে কষ্ট না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই তারা কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকতো। অতঃপর জনগণ নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে যাদু মন্ত্র ইত্যাদির সম্বন্ধ হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। ওর অসারতা এই পবিত্র আয়াতে রয়েছে।এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই উত্তম। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, যাদু হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পূর্বেও ছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য কথা। হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত মুসা (আঃ)-এর পর যুগের নবী। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুকরদের বিদ্যমানতা কুরআন মাজীদ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আগমন হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে হওয়াও কুরআন কারীম দ্বারাই প্রকাশ পেয়েছে। হযরত দাউদ (আঃ) ও জালুতের ঘটনায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মূসা (আঃ)-এর পরে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আঃ) (আরবি)-এরও পূর্বে হযরত সালিহ (আঃ)কে তার কওম’ বলেছিলঃঅর্থাৎ তুমি যাদুকৃত লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৬:১৮৫)অতঃপর আল্লাহ বলেন (আরবি) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি না বাচক এবং ওর সংযোগ রয়েছে। (আরবি)-এর উপর। ইয়াহুদীদের আর একটি বদ-আকীদা ছিল এই যে, ফেরেশতাদের উপর যাদু অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতে তাকেই খণ্ডন করা হয়েছে (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। দ্বিবচনের উপরও বহু বচনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন- (আরবি)-এর মধ্যে রয়েছে। কিংবা তাদের অনুসারীদেরকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের দুজনের নাম খুবই অবাধ্যতার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) তো বলেন এটাই সঠিক ভাব। এছাড়া অন্য ভাব নেয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদু আল্লাহু, নাযিল করেননি। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে আয়াতের তরজমা হবে এইঃ ‘ঐ ইয়াহুদীরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করেছে যা শয়তানরা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগে পড়তো। হযরত সুলাইমান (আঃ) কুফরী করেনি, না আল্লাহ তা'আলা ঐ দু' ফেরেশতার উপর যাদু অবতীর্ণ করেছেন; (যেমন-হে ইয়াহুদী! জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈলের (আঃ) প্রতি তোমাদের ধারণা রয়েছে) বরং এ কুফরী ছিল শয়তানদের, যারা বাবেলে জনগণকে যাদু শিখাতো এবং তাদের সরদার ছিল মানুষ, যাদের নাম ছিল হারূত ও মারূত। হযরত আবদুর রহমান বিন আবৃজা (রঃ) নিম্নরূপ পড়তেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দাউদ ও সুলাইমান এই দু'বাদশাহর উপরেও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একে শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)। অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর হারুত ও মারূত দুজন ফেরেশতা। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিক্ষা দিতে ঐ দু'ফেরেশতাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই তারা আল্লাহর সে আদেশ পালন করেছিলেন।একটি দুর্বল মত এও আছে যে, এটা জ্বীনদের দু’টি গোত্র (আরবি) দু'বাদশাহর কিরআতে (আরবি)-এর অর্থ হবে সৃষ্টি করা। যেমন, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্যে। আট প্রকারের চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন।' (৩৯:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি লোহা সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৫) হাদীসের মধ্যেও (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আল্লাহ যতগুলো রোগ সৃষ্টি করেছেন, ওগুলোর ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। উপরোক্ত সব স্থানেই (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; আনা বা অবতীর্ণ করা অর্থে নয়। দ্রুপ এ আয়াতেও। পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীদের মাযহাব এই যে, এই দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। কেউ যেন এ প্রশ্ন উত্থাপন না করেন যে, ফেরেশতাগণ তো নিস্পাপ। তাদের দ্বারা তো পাপকার্য হতেই পারে না। অথচ জনগণকে যাদু শিক্ষা দেয়া, এতো কুফরী? এ প্রশ্ন উখিত হতে পারে না। কেননা, এ দু'জন ফেরেশতা সাধারণ ফেরেশতাগণ হতে পৃথক হয়ে যাবে, যেমন ইবলিস পৃথক হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কাবুল আহবার (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) এবং হযরত কালবী (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতগণ পরস্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোকে এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না-তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; তার পরে দেখা যাক তারা কি করে। তারা তখন হারূত ও মারূতকে হাজির করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি। আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং মদ্যপানও করবে না।তখন তারা দুজন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তাআলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।' তারা উত্তর দেয়ঃ ‘এটা আমাদের দ্বারা হবে না। সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো। তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোকে তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ - করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছে। তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই- আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মূসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হযরত নাফে' (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ যুহরা তারকাটি বের হয়েছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘না’। দুতিন বার প্রশ্নের পর বলেনঃ এখন উদিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) তখন বলেন ' ও যেন খুশিও না হয় এবং ওর আনন্দ লাভও যেন না হয়। হযরত নাফে (রাঃ) তখন তাকে বলেনঃ জনাব, একটি তারকা যা আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে উদিত ও অস্তমিত হয় তাকে আপনি মন্দ বলেন?' তিনি তখন বলেনঃ তবে শুনুন জনাব আমি ঐ কথাই বলছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হতে শুনেছি। অতঃপর উল্লিখিত হাদীসটি শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণনা করেন। কিন্তু এটাও গরীব বা দুর্বল। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সম্ভবতঃ এটা ইসরাঈলী বর্ণনাই হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রাঃ) হতেও এ ধরনের বহু বর্ণনা করা হয়েছে।কেউ কেউ বলেন যে, যুহরা একটি স্ত্রী লোক ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ ' তোমরা আমাকে ঐ দোআটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু বর্ণনায়ও এটা আছে; কিন্তু ওটা মুকার ও বে-ঠিক। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দুজন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবেলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তাতে হত্যা ও অবৈধ মালের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ হুকুমও ছিল যে,তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করে। এও এসেছে যে, তারা তিনজন ফেরেশতা ছিল। কিন্তু একজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে যায়। অতঃপর দু’জনের পরীক্ষা নেয়া হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এখানে বাবেল দ্বারা দুনিয়ায় অন্দের বাবেলকে বুঝান হয়েছে। স্ত্রীলোকটির নাম আরবী ভাষায় ছিল যুহরা’ বানতী ভাষায় ছিল ‘বেদখত্ এবং ফারসী ভাষায় ছিল ‘আনাহীদ'। এ স্ত্রীলোকেটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মোকাদ্দমা এনেছিল। যখন তারা তার সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছে করে তখন সে বলে-যদি আগে আমাকে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ফায়সালা দাও তবে আমি সম্মত আছি। তারা তাই করে। পুনরায় সে বলেঃ ‘তোমরা যা পড়ে আকাশে উঠে থাকো ও পড়ে নীচে নেমে আস ওটাও আমাকে শিখিয়ে দাও। তারা ওটাও তাকে শিখিয়ে দেয়। সে ওটা পাঠ করে আকাশে উঠে যায়। কিন্তু নীচে নেমে আসার দু’আ ভুলে যায়। সেখানেই তার দেহকে তারকায় রূপান্তরিত করা।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) কখনও যুহরা তারকা দেখলে তাকে অভিশাপ দিতেন। যখন এই ফেরেশতারা আকাশে উঠতে চাইলো কিন্তু উঠতে পারলো না। তখন তারা বুঝে নিলো যে, এখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম কিছুদিন তো এই ফেরেশতারা স্থিরই। ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতো এবং সন্ধ্যার পর। আকাশে উঠে যেতো। অতঃপর যুহরাকে দেখে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যুহরা তারকাকে একটি সুন্দরী স্ত্রীর আকৃতিতে তাদের নিকট। পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা, হারুত ও মারূতের এ ঘটনা তাবেঈগণের মধ্যেও বহু লোক বর্ণনা করেছেন। যেমন, মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) প্রভৃতি। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণও নিজ নিজ তাফসীরে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের কিতাবসমূহের উপর নির্ভরশীল। এ অধ্যায়ে কোন সহীহ মারফু মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ঈমান ওর উপরেই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআন মাজীদে আছে ওটাই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে, যাতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরলোক গমনের অল্প দিন পরে দাওমাতুল জানাল’ হতে একটি স্ত্রীলোক তার খোঁজে আগমন করে। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সে উদ্বিগ্ন হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- ব্যাপার কি? সে বলেঃ আমার মধ্যে ও আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় লেগেই থাকতো। একবার সে আমাকে ছেড়ে কোন্ অজানা জায়গায় চলে যায়। একটি বৃদ্ধার নিকট আমি এসব কিছু বর্ণনা করি। সে আমাকে বলে- “তোমাকে যা বলি তাই কর, সে আপনা আপনি চলে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে গেলাম। রাত্রে সে দুটি কুকুর নিয়ে আমার নিকট আগমন করে। একটির উপর সে আরোহণ করে এবং অপরটির উপর আমি আরোহণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা দু'জন বাবেলে চলে যাই। তথায় গিয়ে দেখি যে, দু’টি লোক শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় লটকানো রয়েছে। ঐ বৃদ্ধা আমাকে বলে-তাদের নিকট যাও ও বল-“আমি যাদু শিখতে এসেছি। আমি তাদেরকে একথা বলি। তারা বলে-‘জেনে রেখো, আমরা তো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। তুমি যাদু শিক্ষা করো যাদু শিক্ষা করা কুফরী।' আমি বলি-শিখবো। তারা বলে-“আচ্ছা, তাহলে যাও, ঐ চুল্লীর মধ্যে প্রস্রাব করে চলে এসো। আমি গিয়ে প্রস্রাবের ইচ্ছে করি, কিন্তু আমার অন্তরে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়, সুতরাং আমি ফিরে এসে বলিআমি কাজ সেরে এসেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে -“তুমি কি দেখলে আমি বলি-“কিছুই না। তারা বলে-“তুমি ভুল বলছে। এখন পর্যন্ত তুমি বিপথে চালিত হওনি। তোমার ঈমান ঠিক আছে, তুমি এখনও ফিরে যাও এবং কুফরী করো না। আমি বলি-“আমাকে যে যাদু শিখতেই হৰে। তারা পুনরায় আমাকে বলে-ঐ চুল্লীতে প্রস্রাব করে এসো। আমি আবার যাই। কিন্তু এবারও। মন চায় না, সুতরাং ফিরে আসি। আবার এভাবেই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। পুনরায় আমি চুল্লীর নিকট যাই এবং মনকে শক্ত করে প্রস্রাব করতে বসে পড়ি। আমি দেখি যে, একজন ঘোড়া সওয়ার মুখের উপর পর্দা ফেলে আকাশের উপর উঠে গেল। আমি ফিরে এসে তাদের নিকট এটা বর্ণনা করি। তারা বলে- 'হাঁ, এবার তুমি সত্য বলছে। ওটা তোমার ঈমান ছিল, যা তোমার মধ্য হতে বেরিয়ে গেল। এখন চলে যাও।আমি এসে ঐ বৃদ্ধাকে বলি- ‘তারা আমাকে কিছুই শিক্ষা দেয়নি। সে বলে- যথেষ্ট হয়েছে। তোমার নিকট সবই চলে এসেছে। এখন তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি পরীক্ষামূলকভাবে একটি গমের দানা নিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। অতঃপর বলি- গাছ হও।' ওটা গাছ হয়ে গেল। আমি বলি-- তোমাতে ডাল পাতা গজিয়ে যাক।' তাই হয়ে গেল। তার পর বলি- ‘শুকিয়ে যাও।' ডালপাতা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-‘পৃথক পৃথকভাবে দানা দানা হয়ে যাও। ওটা তাই হয়ে গেল। তারপরে আমি বলি-শুকিয়ে যাও। ওটা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-আটা হয়ে যাও।' আটা হয়ে গেল। আমি বলি-রুটি হয়ে যাও।' রুটি হয়ে গেল। এটা দেখেই আমি লজ্জিত হয়ে যাই এবং বে-ঈমান হয়ে যাওয়ার কারণে আমার খুবই দুঃখ হয়। হে উম্মুল মু'মিনীন! আল্লাহর শপথ! আমি যাদুর দ্বারা কোন কামও নেইনি এবং কারও উপর এটা প্রয়োগও করিনি। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাঁকে পেলাম না। এখন আমি কি করি?একথা বলেই সে পুনরায় কাঁদতে আরম্ভ করে এবং এত কাঁদে যে, সবারই মনে তার প্রতি দয়ার সঞ্চার হয়। তাকে কি ফতওয়া দেয়া যেতে পারে এ ব্যাপারে সাহাবীগণও (রাঃ) খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে তারা বলেন- এখন এ ছাড়া আর কি হবে যে, তুমি এ কাজ করবে না, তাওবা করবে এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর পিতা-মাতার খিদমত করবে। এই ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক।কেউ কেউ বলেন যে, যাদুর বলে প্রকৃত জিনিসই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, না, দর্শকের শুধু এর ধারণা হয়ে থাকে মাত্র, প্রকৃত জিনিস যা ছিল তাই থাকে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ অর্থাৎ তারা মানুষের চোখে যাদু করে দিয়েছে।' (আরবি) (৭:১১৬) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন অর্থাৎ (আরবি) হযরত মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হয়েছে যে, যেন ঐ সাপগুলো তাদের যাদুর বলে চলাফেরা করছে।' (২০:৬৬) এ ঘটনা দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াতে বাবেল’ শব্দ দ্বারা ইরাকের বাবেলকে বুঝানা হয়েছে, দুনিয়া অন্দের’ বাবেল নয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত আলী ইবনে আবূ তাবিল (রাঃ) বাবেলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসরের নামাযের সময় হলে তিনি তথায় নামায আদায় করলেন না, বরং বাবেলের সীমান্ত পার হয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমার প্রিয় রাসূল (সঃ) আমাকে গোরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বাবেলের ভূমিতেও নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এটা অভিশপ্ত ভূমি। সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসের উপর কোন সমালোচনা করেননি। আর যে হাদীসকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাবে নিয়ে আসেন এবং ওর সনদের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন ঐ হাদীস ইমাম সাহেবের মতে হাসান হয়ে থাকে। এর দ্বারা জানা গেল যে, বাবেলের ভূমিতে মামায পড়া মাকরূহ। যেমন সামুদ সম্প্রদায়ের ভূমি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তাদের বাস ভূমিতেও যেয়ো না। যদি ঘটনাক্রমে যেতেই হয়, তবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাও।আল্লাহ তা'আলা হারুত ও মারূতের মধ্যে ভাল-মন্দ, কুফর ও ঈমানের জ্ঞান দিয়ে রেখেছিলেন বলে তারা কুফরীর দিকে গমনকারীদের উপদেশ দিতো। এবং তাদেরকে ওটা হতে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু যখন কোনক্রমেই মানতো না তখন তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিখিয়ে দিতো। ফলে তাদের ঈমানের আলো বিদায় নিতে এবং যাদু চলে আসতো। শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যেতো। ঈমান বিদায় নেয়ার পর আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর নেমে আসতো। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, কাফির ছাড়া আর কেউ যাদু বিদ্যা শিখবার সৎ সাহস রাখতে পারে না (আরবি) শব্দের অর্থ এখানে বিপদ, আজমায়েশ ও পরীক্ষা। এ আয়াতের মাধ্যমে এটাও জানা গেল যে, যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা কুফরী। হাদীসের মধ্যেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহীর সাথে কুফরী করে। ( বার)'। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং-এর সমর্থনে অন্যান্য হাদীসও এসেছে।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, মানুষ হারুত ও মারূতের কাছে গিয়ে যাদু বিদ্যা শিক্ষা করতো। ফলে তারা খারাপ কাজ করতো এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ শয়তান তার সিংহাসনটি পানির উপর রাখে। অতঃপর মানুষকে বিপথে চালানোর জন্যে সে তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়। সেই তার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত যে হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে সবচেয়ে বেড়ে যায়। এরা ফিরে এসে নিজেদের জঘন্যতম কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়। কেউ বলেঃ আমি অমুককে এভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছি। কেউ বলেঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে এ পাপ কার্য করিয়েছি। শয়তান তাদেরকে বলেঃ ‘বো কিছুই করনি। এতো সাধারণ কাজ। অবশেষে একজন এসে বলেঃ আমি একটি নোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, এমনকি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। শয়তান তখন তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলেঃ হ, তুমি বড় কাজ করেছে। সে তাকে পার্শ্বে বসিয়ে নেয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।' যাদুকরও তার যাদুর দ্বারা ঐ কাজই করে থাকে, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি হয়। যেমন তার কাছে স্ত্রীর আকৃতি খারাপ মনে হবে কিংবা তার স্বভাব চরিত্রকে সে ঘৃণা করবে অথবা অন্তরে শত্রুতার ভাব জেগে যাবে ইত্যাদি। আস্তে আস্তে এসব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিচ্ছেদই ঘটে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যাদু দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন ক্ষতি সাধিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি সাধন করা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই নেই। আল্লাহর ভাগ্য লিখন অনুযায়ী তার ক্ষতিও হতে পারে, আবার তার ইচ্ছে হলে যাদু নিষ্ক্রিয়ও হতে পারে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যাদু শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিরই ক্ষতি করে থাকে, যে ওটা লাভ করে ওর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা এমন জিনিস শিক্ষা করে যা তাদের জন্যে শুধু ক্ষতিকারক, যার মধ্যে উপকার মোটেই নেই। ঐ ইয়াহুদীরা জানে যে,যারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) আনুগত্য ছেড়ে যাদুর পিছনে লেগে থাকে তাদের জন্যে আখেরাতের কোনই অংশ নেই। তাদের না আছে আল্লাহর কাছে কোন সম্মান, না তাদেরকে ধর্মভীরু মনে করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তাদের এ মন্দ কাজের অনুভূতি হতো এবং ঈমান এনে খোদাভীরুতা অবলম্বন করতো তবে ওটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। কিন্তু এরা অজ্ঞান ও নির্বোধ।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “জ্ঞানীগণ বলে- তোমাদের জন্যে আফসোস! আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্যে বড়ই উত্তম, কিন্তু ওটা একমাত্র ধর্মশীলগণই পেয়ে থাকে।হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) ও পূর্ব যুগীয় মনীষীদের একটি দল যাদু বিদ্যা শিক্ষার্থীকে কাফির বলেছেন। কেউ কেউ কাফির তো বলেন না, কিন্তু বলেন যে, যাদুকরকে হত্যা করাই হচ্ছে তার উপযুক্ত শাস্তি। হযরত বাজালাহ বিন উবাইদ (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক নির্দেশ নামায় লিখেছিলেনঃ যাদুকর পুরুষ বা স্ত্রীকে তোমরা হত্যা করে দাও।' এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিনজন যাদুকরের গর্দান উড়িয়েছি।'সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) উপর তার দাসী যাদু করেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন যে, তিনজন সাহাবী (রাঃ) হতে যাদুকরকে হত্যা করার ফতওয়া রয়েছে। জামে' উত তিরমিযীর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন মুসলিম দুর্বল। সঠিক কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। কিন্তু তাবরানীর হাদীসের মধ্যে অন্য সনদেও এ হাদীসটি মার' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ' ওয়ালীদ বিন উকবার নিকট একজন যাদুকর ছিল, সে তার যাদু কার্য বাদশাহকে দেখাতো। সে প্রকাশ্যভাবে একটি লোকের মাথা কেটে নিতো। অতঃপর একটা শব্দ করতো, আর তখনই মাথা জোড়া লেগে যেতো মুহাজির সাহাবাগণের (রাঃ) মধ্যে একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী (রাঃ) ওটা দেখেন এবং পরের দিন তরবারি নিয়ে আসেন। যাদুকর খেলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তিনি স্বয়ং যাদুকরেরই মাথা কেটে ফেলেন এবং বলেনঃ “তুমি সত্যবাদী হলে নিজেই জীবিত হয়ে যাও।' অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ “তোমরা যাদুর নিকট যাচ্ছ ও তা দেখছো?' ঐ সাহাবী (রাঃ) ওয়ালীদের নিকট হতে তাকে হত্যা করার অনুমতি নেননি বলে বাদশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) নির্দেশ ও হযরত হাফসার (রাঃ) ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন যে, ঐ হুকুম ঐ সময় কার্যকরী হবে যখন যাদুর মধ্যে শিরক যুক্ত শব্দ থাকবে। মু'তাযিলা সম্প্রদায় যাদুর অস্তিত্বই মানে না। তারা বলে যে,যারা যাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা কাফির। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যাদুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তারা স্বীকার করে যে, যাদুকর তার যাদুর বলে বাতাসে উড়তে পারে, মানুষকে বাহ্যতঃ গাধা ও গাধাকে বাহ্যতঃ মানুষ করে ফেলতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট কথাগুলো মন্ত্রতন্ত্র পড়ার সময় ঐগুলো সৃষ্টিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আকাশকে ও তারকাকে ফলাফল সৃষ্টিকারী মানে না। দার্শনিকেরা, জোতির্বিদেরা এবং বে-দ্বীনেরা তো তারকা ও আকাশকেই ফলাফল সৃষ্টিকারী মেনে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রথম দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ তারা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা। তৃতীয় দলীল হচ্ছে ঐ স্ত্রী লোকটির ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আরও এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, যাদু বিদ্যা লাভ করা দুষনীয় নয়। মাসয়ালা বিশ্লেষণকারীগণের এটাই অভিমত। কেননা, এটাও একটা বিদ্যা। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, এরা কি সমান?’ আর এ জন্যেও যাদু বিদ্যা শিক্ষা দুষণীয় নয় যে, তার দ্বারা মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পূর্ণভাবে পার্থক্য করা যায় এবং মু'জিযার জ্ঞান ওয়াজিব ও ওটা নির্ভর করে যাদু বিদ্যার উপর, যার দ্বারা পার্থক্য বুঝা যায়। সুতরাং যাদু বিদ্যা শিক্ষা করাও ওয়াজিব হয়ে গেল। ইমাম রাযীর (রাঃ) একথা"গোড়া হতে আগা পর্যন্ত ভুল। বিবেক হিসেবে যদি তিনি ওটাকে খারাপ না বলেন তবে মু'তাযিলা সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে, যারা ওকে বিবেক হিসেবেও খারাপ বলে থাকে। আর যদি শরীয়তের দিক দিয়ে খারাপ না বলেন তবে কুরআন মাজীদের এ শারঈ আয়াত ওকে খারাপ বলার জন্যে যথেষ্ট। সহীহ হাদীসে রয়ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন যাদুকর বা গণকের নিকট গমন করে সে কাফির হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম রাযীর (র) উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর একথা বলা যে, মুহাককিকগণের অভিমত এটাই’ এটাও ঠিক নয়। মুহাকিকগণের এরূপ কথা কোথায় আছে? ইসলামের ইমামগণের মধ্যে কে এ কথা বলেছেন? অতঃপর যারা জানে এবং জানে না, তারা কি সমান?' এ আয়াতটিকে দলীলরূপে পেশ করা হঠধমী ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এ আয়াতের ‘ইলম এর ভাবার্থ হচ্ছে ধর্মীয় ‘ইলম। এ আয়াতে শারঈ আলেমগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তার এ কথা বলা যে, এর দ্বারা মু'জিযার ‘ইলম লাভ হয়, এটা একেবারে বাজে কথা। কেননা, আমাদের রাসূল (সঃ)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন, যা বাতিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু তার মু'জিযা জানা যাদু জানার উপর নির্ভরশীল নয়। ঐ সব লোক যাদের যাদুর সঙ্গে দূরের সম্পর্ক নেই তারাও এটাকে মু'জিযা বলে স্বীকার করেছেন। সাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ, ইমামগণ এমনকি সাধারণ মুসলমানগণও একে মু'জিযা মেনে থাকেন। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কখনও যাদু জানা তো দূরের কথা, ওর কাছেই যাননি। তাঁরা ওটা নিজে শিক্ষা করেননি এবং অপরকেও শিক্ষা দেননি। তাঁরা যাদু করেননি এবং করাননি। বরং এসব কাজকে তারা কুফরই বলে এসেছেন। অতঃপর এ দাবী করা যে, মু'জিযা জানা ওয়াজিব এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য যাদুর উপর নির্ভর করে, সুতরাং যাদু শিখাও ওয়াজিব হলো, এটা কতই না অর্থহীন দাবী! যাদু বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে, যা আবু আব্দিল্লাহ রাফী বর্ণনা করেছেন।(১) প্রথম যাদু হচ্ছে তারকা পূজকদের। তারা সাতটি গতিশীল তারকার উপর বিশ্বাস রাখে যে, ভাল-মন্দ ওদের কারণেই হয়ে থাকে। এ জন্যে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট শব্দ পাঠ করতঃ ওদের পূজা করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগমন করেন এবং হিদায়াত করেন। ইমাম রাযী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি বিশিষ্ট পুস্তক রচনা করেছেন এবং ওর নাম (আরবি)রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, পরে তিনি ওটা হতে তাওবা করেছেন।আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি শুধু জানাবার জন্যে এবং তার এই বিদ্যা প্রকাশ করার জন্যেই এ পুস্তক লিখেছেন, এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস নেই। কেননা এটা সরাসরি কুফরী।(২) দ্বিতীয় যাদু হচ্ছে ধারণা শক্তির উপর বিশ্বাসী লোকদের যাদু। ধারণা ও খেয়ালের বড় রকমের প্রভাব রয়েছে। যেমন একটি সংকীর্ণ সাঁকো মাটির উপর রেখে দিলে মানুষ অনায়াসেই তার উপর দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সঁকোটি যদি নদীর উপর হয় তবে মানুষ আর তার উপর দিয়ে চলতে পারে না। কেননা ধারণা হয় যে, এখনই পড়ে যাবে। ধারণার এই দুর্বলতার কারণেই যেটুকু জায়গার উপর দিয়ে মাটিতে চলতে পারছিল, ঐ জায়গার উপর দিয়েই এরকম ভয়ের সময় চলতে পারে না। এ জন্যেই হেকিমগণ ও ডাক্তারগণ ভীত লোককে লাল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখেন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত লোককে খুব বেশী আলোকময় ও দ্রুত গতিসম্প দেখতে নিষেধ করে থাকেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, উপর ধারণার একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। জ্ঞানীগণ এ বিষয়েও একমত যে, ন্যর’ লেগে থাকে। সহীহ হাদীসেও এসেছে যে, নযর’ লাগা সত্য। ভাগ্যের উপর যদি কোন জিনিস প্রাধান্য লাভকারী হতো তবে তা ন্যই ইতো। এখন যদি নাফস্ শক্ত হয় তবে বাহ্যিক সাহায্য ও বাহ্যিক কার্যের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি নাফস ততো শক্ত না হয় তবে ঐ সব যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। নাফসের যে পরিমাণ শক্তি বেড়ে যাবে সেই পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। আর যে পরিমাণ এ শক্তি কম হবে সে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তিও কমে যাবে।এ শক্তি কখনও কখনও খাদ্যের স্বল্পতা এবং জনগণের মেলামেশা ত্যাগ করার মাধ্যমেও লাভ হয়ে থাকে। কখনও তো মানুষ এ শক্তির দ্বারা শরীয়ত। অনুযায়ী পুণ্যের কাজ করে থাকে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘কারামত’ বলে, যাদু বলে না। আবার কখনও কখনও মানুষ এ শক্তি দ্বারা বাতিল ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজ করে থাকে এবং দ্বীন হতে বহু দূরে সরে পড়ে। এ রকম লোকের ঐ অলৌকিক কার্যাবলী দেখে প্রতারিত হয়ে তাকে ওয়ালী বলা কারও উচিত নয়। কেননা, যারা শরীয়তের উল্টো কাজ করে তারা কখনও আল্লাহর ওয়ালী হতে পারে না। তা নাহলে সহীহ হাদীস সমূহে দাজ্জালদেরকে অভিশপ্ত ও দুষ্ট বলা হতো না। অথচ তারা তো বহু অলৌকিক কাজ করে দেখাবে।(৩) তৃতীয় যাদু হচ্ছে জ্বীন প্রভৃতি পার্থিব আত্মসমূহের দ্বারা সহায্য প্রার্থনা করা। দার্শনিকরা ও মুতাযেলীরা এটা স্বীকার করে না। কতগুলো লোক এসব পার্থিব আত্মার মাধ্যমে কতকগুলো শব্দ ও কার্যের দ্বারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। ওকে মোহমন্ত্র ও প্রেতাত্মার যাদুও বলা হয়।(৪) চতুর্থ প্রকারের যাদু হচ্ছে ধারণা বদলিয়ে দেয়া, নযরবন্দ করা এবং প্রতারিত করা,যার ফলে প্রকৃত নিয়মের উল্টো কিছু দেখা যায়। কলাকৌশলের মাধ্যমে কার্য প্রদর্শনকারীকে দেখা যায় যে, সে প্রথমে একটা কাজ আরম্ভ করে, যখন মানুষ একাগ্র চিত্তে ওর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায়, তখন তড়িৎ করে সে আর একটি কাজ আরম্ভ করে দেয়, যা মানুষের দৃষ্টির অন্তারলে থেকে যায়। তা দেখে তারা তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদু এ প্রকারেরই ছিল। এ জন্যেই কুরআন পাকে রয়েছেঃ “তারা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের অন্তরে ভয় বসিয়ে দেয়। অন্য স্থানে রয়েছেঃ মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, ঐ সব লাঠি ও দড়ি যেন সাপ হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এরূপ ছিল না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (৫) পঞ্চম প্রকারের যাদু হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণে একটি জিনিস তৈরী করা এবং এর দ্বারা আশ্চর্যজনক কাজ নেয়া। যেমন, ঘোড়ার আকৃতি তৈরী করে দিল। ওর উপর একজন কৃত্রিম আরোহী বসিয়ে দিল যার হাতে বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। এক ঘন্টা অতিবাহিত হতেই ওর মধ্য হতে শব্দ বের হতে লাগল। অথচ কেউই ওকে বাজাচ্ছে না। এরূপভাবেই এমন নিপুণতার সাথে মানুষের ছবি বানালো যে, মনে হচ্ছে যেন প্রকৃত মানুষই হাসছে বা কাঁদছে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদুও এই প্রকারেরই ছিল। তাদের কৃত্রিম সাপগুলো পারদ জাতীয় দ্রব্য দিয়ে তৈরী ছিল বলে মনে হতো যেন জীবিত সাপ নড়াচড়া করছে। ঘড়ি, ঘন্টা এবং ছোট ছোট জিনিস, যা থেকে বড় বড় জিনিস বেরিয়ে আসে, এসবগুলোই এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে একে যাদু বলা উচিত নয়। কেননা, এটা তো এক প্রকার নির্মাণ ও কারিগরি, যার কারণগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ্য। যে ওটা জানে সে এসব শব্দ দ্বারা একাজ করতে পারে। যে ফন্দি বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টানেরা করতো ওটাও এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। ঐ ফন্দি এই যে, তারা গোপনে গির্জার প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিতো। অতঃপর ওকে গির্জার মাহাত্ম্য বলে প্রচার করতঃ জনগণকে তাদের ধর্মে টেনে আনতো।কতক কারামিয়াহ ও সুফিয়্যাহ সম্প্রদায়েরও ধারণা এই যে, জনগণকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শনের হাদীসগুলো বানিয়ে নিলে কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা চরম ভুল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন দোযখে তার স্থান ঠিক করে নেয়।' তিনি আরও বলেনঃ ‘আমার হাদীসগুলো তোমরা বর্ণনা করতে থাকো; কিন্তু আমার নামে মিথ্যা কথা বলো না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামী।'একজন খ্রীষ্টান পাদরী একদা দেখে যে, পাখীর একটি ছোট বাচ্চা যা উড়তে পারে না, একটি বাসায় বসে আছে। যখন ওটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বর বের করছে তখন অন্যান্য পাখীরা ওর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে যাইতুন ফল এনে ওর বাসায় রেখে দিচ্ছে। ঐ পাদরী কোন জিনিস দিয়ে ঐ আকারেরই একটি পাখী তৈরী করে। ওর নীচের দিক ফাপা রাখে এবং ওর ঠোটের দিকে একটি ছিদ্র রাখে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করে। অতঃপর যখন বাতাস বের হয় তখন ঐ পাখীর মতই শব্দ করে। ওটা নিয়ে গিয়ে সে গির্জার মধ্যে বাতাস মুখো রেখে দেয়। ছাদে একটি ছোট ছিদ্র করে দেয় যেন বাতাস সেখান দিয়ে যাতায়াত করে। এখন যখনই বাতাস বইতে থাকে তখনই ওটা হতে শব্দ বের হতে থাকে। আর এ শব্দ শুনে ঐ প্রকারের পাখী তথায় একত্রিত হয় এবং যাইতুন’ ফল এনে এনে রেখে যায়। ঐ পাদরী তখন প্রচার করতে শুরু করে যে, গির্জার মধ্যে এটা এক অলৌকিক ব্যাপার। এখানে একজন মনীষীর সমাধি রয়েছে এবং এটা তাঁরই কারামত। এখন জনগণ স্বচক্ষে এটা দেখে বিশ্বাস করে নেয়। অতঃপর তারা ঐ কবরের উপর ন্যর-নিয়ায আনতে থাকে এবং এই কারামত বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অথচ ওটা না ছিল কারামত, না ছিল মু'জিযা। বরং শুধুমাত্র ছিল ওটা একটা গোপনীয় বিষয় যা সেই পাদরী; একমাত্র তার পেট পূরণের জন্যেই গোপনীয়ভাবে করে রেখেছিল। আর ঐ অভিশপ্ত দল ওতেই লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।(৬) যাদুর ষষ্ঠ প্রকার হচ্ছে কতকগুলো ওষুধের গোপন কোন বৈশিষ্ঠ্য জেনে ওটা কাজে লাগানো। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে,এতে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :রয়েছে। চুম্বককেই তো দেখা যায় যে, ওটা কিভাবে লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। অধিকাংশ সূফী ও দরবেশই ঐ ফন্দি ফিকিরকেই জনগণেরই মধ্যে কারামত রূপে প্রদর্শন করতঃ তাদেরকে মুরীদ করতে থাকে।(৭) সপ্তম প্রকারের যাদু হচ্ছে কারও মধ্যে একটা বিশেষ প্রভাব ফেলে যা চায় তাই তার দ্বারা করিয়ে নেয়া। যেমন তাকে বলে যে, তার “ইসমে আযম . মনে আছে কিংবা জ্বিনেরা তার তাবে আছে। এখন যদি তার সামনে লোকটি দুর্বল ঈমানের লোক হয় এবং অশিক্ষিত হয় তবে তো সে তাকে বিশ্বাস করে নেবে এবং তার প্রতি তার একটা ভয় ও সম্ভ্রম থাকবে যা তাকে আরও দুর্বল করে দেবে। এখন সে যা চাইবে তাই সে করবে। আর এই প্রভাব সাধারণতঃ স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির উপরই পড়ে থাকে। একেই মুতাবান্নাহ’ বলা হয়। আর অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে জ্ঞানী ও অজ্ঞানকে চিনতে পারে, কাজেই সে নিরেটের উপরই তার ক্রিয়া চাপিয়ে থাকে।(৮) অষ্টম প্রকারের যাদু হচ্ছে চুগলী করা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কারও অন্তরে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং গোপনীয় চতুরতা দ্বারা তাকে বশীভূত করা। এ চুগলী যদি মানুষের মধ্যে শক্রতা সৃষ্টির জন্যে হয় তবে এটা শরীয়ত অনুযায়ী হারাম হবে। আর যদি এটা সংশোধন করার উদ্দেশ্যে হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মিলনের জন্যে হয় কিংবা এর ফলে যদি মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি আগত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং কাফিরদের শক্তি নষ্ট করতঃ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা যায় তবে এটা বৈধ হবে। যেমন হাদীস শরীফে আছে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মঙ্গলের জন্যে এদিক ওদিক কথা নিয়ে যায়। হাদীসে আরও আছে যে, যুদ্ধ হচ্ছে প্রতারণার নাম। হযরত নঈম বিন মাসউদ (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে আরবের কাফির ও ইয়াহূদীদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথার মাধ্যমে বিচ্ছেদ আনয়ন করেছিলেন এবং এরই ফলে মুসলমানদের নিকট তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইমাম রাযী যে যাদুর এই আটটি প্রকার বর্ণনা ; করেছেন তা শুধু শব্দ হিসেবে। কেননা আরবী ভাষায় (আরবি) বা যাদু প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল হয় এবং যার কারণসমূহ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এজন্যেই একটি হাদীসে আছে যে, কোন কোন বর্ণনাও যাদু। আর এ কারণেই সকালের প্রথম ভাগকে ‘সহুর’ বলা হয়। কেননা, ওটা মানুষের চক্ষুর অন্তরালে থাকে। আর ঐ শিরাকের ‘সিহর’ বলে যা আহার্যের স্থানে থাকে। আবু জেহেলও বদরের যুদ্ধে বলেছিল যে, তার খাদ্যের শিরা ভয়ে ফুলে গেছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার সিহর’ ও ‘নাহারের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাহলে সিহূরের অর্থ হচ্ছে খাদ্যের শিরা এবং নাহারের অর্থ হচ্ছে বুক। কুরআন পাকে আছেঃ “তারা (যাদুকরেরা) মানুষের চক্ষু থেকে তাদের কার্যাবলী গোপন রেখেছিল। আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমরা বলি যে, যাদু আছে এবং এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহকে মঞ্জর হলে তিনি যাদুর সময় যা চান তাই ঘটিয়ে থাকেন। যদিও মুতাযিলা, আবু ইসহাক ইসফিরাঈনী এবং ইমাম শফিঈ (রঃ) এটা বিশ্বাস করেন না।' যাদু কখনও হাতের চালাকি দ্বারাও হয়ে থাকে আবার কখনও ভোরা, সুতা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। কখনও আল্লাহর নাম পড়ে ফু দিলেও একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। কখনও শয়তানের নাম নিয়ে শয়তানী কার্যাবলী দ্বারাও লোক যাদু করে থাকে। কখনও ঔষধ ইত্যাদি দ্বারাও যাদু করা হয়।"রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেনঃ কতকগুলো বর্ণনাও যাদু' এর দুটোই ভাবার্থ হতে পারে। হয়তো তিনি এটা বর্ণনাকারীর প্রশংসার জন্যে বলেছেন, কিংবা তার নিন্দে করেও বলে থাকতে পারেন যে, সে তার মিথ্যা কথাকে এমন ভঙ্গিমায় বর্ণনা করছে যে, তা সত্য মনে হচ্ছে। মন্ত্রী আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মদ বিন হাবীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল আশরাফু আ'লা মাযাহিবিল আশরাফে’ এর মধ্যে যাদু অধ্যায়ে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এটা স্বীকার করেননি। যারা যাদু শিক্ষা করে ও ওটা ব্যবহার করে তাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ), এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) কাফির বলেছেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) কয়েকজন শিষ্যের মতে যাদু যদি আত্মরক্ষার জন্যে কেউ শিক্ষা করে তবে সে কাফির হবে না। তবে হ, যারা ওর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ওকে উপকারী মনে করে সে কাফির। অনুরূপ ভাবে যারা ধারণা করে যে, শয়তানরা এ কাজ করে থাকে এবং তারা এরকম ক্ষমতা রাখে, তারাও কাফির।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, যদি তারা বাবেলবাসীদের মত বিশ্বস রাখে এবং সাতটি গতিশীল তারকাকে প্রভাব সৃষ্টিকারীরূপে বিশ্বাস করে তবে তারা কাফির। আর যদি এ না হয়, কিন্তু যাদুকে বৈধ মনে করে তবে তারাও কাফির। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) অভিমত এও আছে যে, যারা যাদু করে এবং ওকে ব্যবহারে লাগায় তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যে পর্যন্ত বারবার না করে কিংবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে নিজে স্বীকার না করে সেই পর্যন্ত হত্যা করা হবে না।তিনজন ইমামই বলেন যে, তার হত্যা হচ্ছে শাস্তির জন্যে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে এ নির্দেশ আছে যে, যাদুকরকে তাওবাও করানো হবে না এবং তার তাওবা করার ফলে তার শাস্তি লোপ পাবে না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মতে তার তাওবা গৃহীত হবে। একটি বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) এ উক্তি আছে। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মতে কিতাবীদের যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য তিনজন ইমামের অভিমত এর উল্টো। লাবীদ বিন আসাম নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করেছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি। যদি কোন মুসলমান মহিলা যাদু করে তবে তার সম্বন্ধে ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মত এই যে, তাকে বন্দী করা হবে। আর অন্যান্য তিনজন ইমামের মতে পুরুষের মত তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন। হযরত যুহরীর (রঃ) মতে মুসলমান যাদুকরকে হত্যা করা হবে,কিন্তু মুশরিক যাদুকরকে হত্যা করা হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি কোন যিম্মীর যাদুর ফলে কেউ মারা যায় তবে যিম্মীকেও মেরে ফেলা হবে। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রথমে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করতঃ ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা ভালই, নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। আবার তার হতে এও বর্ণিত আছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে হত্যা করা হবে।যে যাদুকরের যাদুতে শিরকী শব্দ আছে, চারজন ইমামই তাকে কাফির বলেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের উপর প্রভুত্ব লাভ করার পর যদি সে তাওবা করে তবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন যিন্দীক সম্প্রদায়। তবে যদি তার উপর প্রভুত্ব লাভের পূর্বেই তারা তাওবা করে তা হলে হবে। আর যদি তার যাদুতে কেউ মারা যায় তবে তো তাকে হত্যা করা হবেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি সে বলেঃ আমি মেরে ফেলার জন্যে যাদু করিনি। তবে ভুল করে হত্যার অপরাধে তার নিকট হতে জরিমানা আদায় করা হবে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) যাদুকরের দ্বারা যাদু উঠিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন, যেমন সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। হযরত আমের শা'বীও এটাকে কোন দোষ মনে করেন না। কিন্তু খাজা হাসান বসরী (রঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আপনি যাদু তুলিয়ে নেন না কেন? তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তো আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি লোকের উপর মন্দ খুলিয়ে নিতে ভয় করি।' যাদুর চিকিৎসাহযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, কুলের সাতটি পাতা পাটায় বেটে পানিতে মিশাতে হবে। অতঃপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ওর উপর ফু দিতে হবে এবং যাদুকৃত ব্যক্তিকে তিন ঢাকে পানি পান করাতে হবে এবং অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে। ইনশাআল্লাহ্ যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এ আমল বিশেষভাবে ঐ ব্যক্তির জন্যে খুবই মঙ্গলজনক যাকে তার স্ত্রী থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যাদু ক্রিয়া নষ্ট করার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি) এ সূরাগুলো। হাদীস শরীফে আছে যে, এই সূরাগুলোর চেয়ে বড় রক্ষাকবচ আর কিছু নেই। এরকমই আয়াতুল কুরসীও শয়তানকে দূর করার জন্য বড়ই ফলদায়ক।
আল-বাকারা 2:101
৯৯-১০৩ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ) আমি এমন এমন নিদর্শনাবলী তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি যা তোমার নবুওয়াতের জন্যে প্রকাশ্য দলীল হতে পারে। ইয়াহুদীদের বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডার তাওরাতের গোপনীয় কথা, তাদের পরিবর্তনকৃত আহকাম ইত্যাদি সব কিছুই আমি এই অলৌকিক কিতাব কুরআন মাজীদের মধ্যে বর্ণনা করেছি। ওটা শুনে প্রত্যেক জীবিত অন্তর তোমার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ইয়াহূদীরা যে হিংসা-বিদ্বেষ বশতঃ মানছে না ওটা অন্য কথা। নতুবা প্রত্যেক লোকই এটা বুঝতে পারে যে, একজন নিরক্ষর লোক কখনও এরকম পবিত্র অলংকার ও নিপুণতাপূর্ণ কথা বানাতে পারে না।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবনে সুরিয়া কাতভীনী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বলেছিল ও ‘আপনি এমন কোন সৌন্দর্য ও দর্শন পূর্ণবাণী আনতে পারেন নি যা দ্বারা আপনার নবুওয়াতের পরিচয় পেতে পারি বা কোন জ্বলন্ত প্রমাণও আপনার নিকট নেই।' তখনই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট শেষ নবী (সঃ)-কে স্বীকার করার উপর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা তারা অস্বীকার করেছিল বলে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করা, এটা তো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অভ্যাস, বরং তাদের অধিকাংশের অন্তর তো ঈমান থেকেই শূন্য।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ফেলে দেয়া। ইয়াহূদীরা আল্লাহর কিতাবকে এবং তার অঙ্গীকারকে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছিল যে, যেন তারা তা ফেলেই দিয়েছিল। এ জন্যেই তাদের নিন্দের ব্যাপারে এ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছেঃ তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা বিদ্যমান পেয়ে থাকে। এখানেও আল্লাহ পাক বলেছেন যে, যখন তাদের একটি দল কিতাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতঃ ওকে এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন সে জানেই না। বরং যাদুর পিছনে লেগে পড়ে। এমনকি মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরও যাদু করে। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)কে এটা জানিয়ে দেন এবং ওর ক্রিয়া নষ্ট করতঃ তাকে আরোগ্য দান করেন। তাওরাতের মাধ্যমে তো তারা তাঁর মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, ওটা তো তার সত্যতা প্রমাণকারী। সুতরাং ওটাকে তারা পরিত্যাগ করতঃ অন্য কিতাব গ্রহণ করে ওর পিছনে লেগে পড়ে। আল্লাহর কিতাবকে তারা এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন তারা ওর সম্বন্ধে কিছু জানতই না। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তারা আল্লাহর কিতাবকে তাদের পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে। এও বলা হয়েছে যে, গান-বাজনা, খেল-তামাশা এবং আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখে এমন প্রত্যেক জিনিসই (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘটনা এবং যাদুর মূল তত্ত্বের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। পায়খানায় গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রী জারাদার নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জ্বীন তার রূপ ধরে তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জ্বীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কার্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তার স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।' হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার বলে তিনি বাতাস ও জ্বীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জ্বীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাঁকে যাদুকর বলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা অস্বীকার করেন এবং আল্লাহর ফরমান জারী হয় যে, যাদু বিদ্যার এ কুফরী শয়তানরা ছড়িয়ে ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক আগমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা হতে আসছো?' সে বলেঃ ইরাক ইতে। তিনি বলেনঃ ইরাকের কোন শহর হতে?' সে বলেঃ কুফা হতে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তথাকার সংবাদ কি?' সে বলেঃ তথায় আলোচনা হচ্ছে যে, হযরত আলী (রাঃ) মারা যাননি; বরং তিনি জীবিত আছেন এবং সত্বরই আসবেন। একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেঁপে উঠেন এবং বলেনঃ ‘এটা সত্য হলে আমরা তাঁর মীরাস বন্টন করতাম না। আর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করতাম। শুন! শয়তানরা আকাশবানী চুরি করে শুনে নিতে এবং তাদের নিজস্ব কথা মিলিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সব পুস্তক জমা করে তার সিংহাসনের নীচে পুঁতে দেন। তার মৃত্যুর পর জ্বীনেরা পুনরায় তা বের করে নেয়। ঐ পুস্তকগুলো ইরাকের মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং ঐ পুস্তকগুলোর কথাই তারা বর্ণনা করছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। সেই যুগে এটাও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, শয়তানরা ভবিষ্যত জানে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই পুস্তকগুলো বাক্সে ভরে পুঁতে ফেলার পর এই নির্দেশ জারী করেন যে, যে একথা বলবে তার মাথা কেটে নেয়া হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর জীনেরা ঐ পুস্তকগুলো তাঁর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে এবং ওর প্রথম পষ্ঠায় লিখে রাখেঃ “এই জ্ঞানভাণ্ডার ‘আসিফ বিন রখিয়া কর্তৃক সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি হযরত সুলাইমান বিন দাউদের (আঃ) প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট পরামর্শ দাতা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।” ইয়াহূদীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) নবী ছিলেন না, বরং যাদুকর ছিলেন। এই কারণেই উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর সত্য নবী (সঃ) অন্য এক সত্য নবীকে (আঃ) কালিমামুক্ত করেন এবং ইয়াহুদীদের বদ-আকীদার অসারতা ঘোষণা করেন। তারা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম নবীদের নামের তালিকাভুক্ত শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠতো। এজন্যেই এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) কষ্টদায়ক প্রাণী হতে কষ্ট না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই তারা কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকতো। অতঃপর জনগণ নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে যাদু মন্ত্র ইত্যাদির সম্বন্ধ হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। ওর অসারতা এই পবিত্র আয়াতে রয়েছে।এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই উত্তম। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, যাদু হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পূর্বেও ছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য কথা। হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত মুসা (আঃ)-এর পর যুগের নবী। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুকরদের বিদ্যমানতা কুরআন মাজীদ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আগমন হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে হওয়াও কুরআন কারীম দ্বারাই প্রকাশ পেয়েছে। হযরত দাউদ (আঃ) ও জালুতের ঘটনায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মূসা (আঃ)-এর পরে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আঃ) (আরবি)-এরও পূর্বে হযরত সালিহ (আঃ)কে তার কওম’ বলেছিলঃঅর্থাৎ তুমি যাদুকৃত লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৬:১৮৫)অতঃপর আল্লাহ বলেন (আরবি) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি না বাচক এবং ওর সংযোগ রয়েছে। (আরবি)-এর উপর। ইয়াহুদীদের আর একটি বদ-আকীদা ছিল এই যে, ফেরেশতাদের উপর যাদু অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতে তাকেই খণ্ডন করা হয়েছে (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। দ্বিবচনের উপরও বহু বচনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন- (আরবি)-এর মধ্যে রয়েছে। কিংবা তাদের অনুসারীদেরকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের দুজনের নাম খুবই অবাধ্যতার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) তো বলেন এটাই সঠিক ভাব। এছাড়া অন্য ভাব নেয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদু আল্লাহু, নাযিল করেননি। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে আয়াতের তরজমা হবে এইঃ ‘ঐ ইয়াহুদীরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করেছে যা শয়তানরা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগে পড়তো। হযরত সুলাইমান (আঃ) কুফরী করেনি, না আল্লাহ তা'আলা ঐ দু' ফেরেশতার উপর যাদু অবতীর্ণ করেছেন; (যেমন-হে ইয়াহুদী! জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈলের (আঃ) প্রতি তোমাদের ধারণা রয়েছে) বরং এ কুফরী ছিল শয়তানদের, যারা বাবেলে জনগণকে যাদু শিখাতো এবং তাদের সরদার ছিল মানুষ, যাদের নাম ছিল হারূত ও মারূত। হযরত আবদুর রহমান বিন আবৃজা (রঃ) নিম্নরূপ পড়তেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দাউদ ও সুলাইমান এই দু'বাদশাহর উপরেও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একে শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)। অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর হারুত ও মারূত দুজন ফেরেশতা। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিক্ষা দিতে ঐ দু'ফেরেশতাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই তারা আল্লাহর সে আদেশ পালন করেছিলেন।একটি দুর্বল মত এও আছে যে, এটা জ্বীনদের দু’টি গোত্র (আরবি) দু'বাদশাহর কিরআতে (আরবি)-এর অর্থ হবে সৃষ্টি করা। যেমন, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্যে। আট প্রকারের চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন।' (৩৯:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি লোহা সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৫) হাদীসের মধ্যেও (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আল্লাহ যতগুলো রোগ সৃষ্টি করেছেন, ওগুলোর ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। উপরোক্ত সব স্থানেই (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; আনা বা অবতীর্ণ করা অর্থে নয়। দ্রুপ এ আয়াতেও। পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীদের মাযহাব এই যে, এই দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। কেউ যেন এ প্রশ্ন উত্থাপন না করেন যে, ফেরেশতাগণ তো নিস্পাপ। তাদের দ্বারা তো পাপকার্য হতেই পারে না। অথচ জনগণকে যাদু শিক্ষা দেয়া, এতো কুফরী? এ প্রশ্ন উখিত হতে পারে না। কেননা, এ দু'জন ফেরেশতা সাধারণ ফেরেশতাগণ হতে পৃথক হয়ে যাবে, যেমন ইবলিস পৃথক হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কাবুল আহবার (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) এবং হযরত কালবী (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতগণ পরস্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোকে এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না-তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; তার পরে দেখা যাক তারা কি করে। তারা তখন হারূত ও মারূতকে হাজির করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি। আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং মদ্যপানও করবে না।তখন তারা দুজন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তাআলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।' তারা উত্তর দেয়ঃ ‘এটা আমাদের দ্বারা হবে না। সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো। তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোকে তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ - করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছে। তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই- আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মূসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হযরত নাফে' (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ যুহরা তারকাটি বের হয়েছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘না’। দুতিন বার প্রশ্নের পর বলেনঃ এখন উদিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) তখন বলেন ' ও যেন খুশিও না হয় এবং ওর আনন্দ লাভও যেন না হয়। হযরত নাফে (রাঃ) তখন তাকে বলেনঃ জনাব, একটি তারকা যা আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে উদিত ও অস্তমিত হয় তাকে আপনি মন্দ বলেন?' তিনি তখন বলেনঃ তবে শুনুন জনাব আমি ঐ কথাই বলছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হতে শুনেছি। অতঃপর উল্লিখিত হাদীসটি শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণনা করেন। কিন্তু এটাও গরীব বা দুর্বল। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সম্ভবতঃ এটা ইসরাঈলী বর্ণনাই হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রাঃ) হতেও এ ধরনের বহু বর্ণনা করা হয়েছে।কেউ কেউ বলেন যে, যুহরা একটি স্ত্রী লোক ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ ' তোমরা আমাকে ঐ দোআটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু বর্ণনায়ও এটা আছে; কিন্তু ওটা মুকার ও বে-ঠিক। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দুজন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবেলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তাতে হত্যা ও অবৈধ মালের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ হুকুমও ছিল যে,তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করে। এও এসেছে যে, তারা তিনজন ফেরেশতা ছিল। কিন্তু একজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে যায়। অতঃপর দু’জনের পরীক্ষা নেয়া হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এখানে বাবেল দ্বারা দুনিয়ায় অন্দের বাবেলকে বুঝান হয়েছে। স্ত্রীলোকটির নাম আরবী ভাষায় ছিল যুহরা’ বানতী ভাষায় ছিল ‘বেদখত্ এবং ফারসী ভাষায় ছিল ‘আনাহীদ'। এ স্ত্রীলোকেটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মোকাদ্দমা এনেছিল। যখন তারা তার সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছে করে তখন সে বলে-যদি আগে আমাকে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ফায়সালা দাও তবে আমি সম্মত আছি। তারা তাই করে। পুনরায় সে বলেঃ ‘তোমরা যা পড়ে আকাশে উঠে থাকো ও পড়ে নীচে নেমে আস ওটাও আমাকে শিখিয়ে দাও। তারা ওটাও তাকে শিখিয়ে দেয়। সে ওটা পাঠ করে আকাশে উঠে যায়। কিন্তু নীচে নেমে আসার দু’আ ভুলে যায়। সেখানেই তার দেহকে তারকায় রূপান্তরিত করা।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) কখনও যুহরা তারকা দেখলে তাকে অভিশাপ দিতেন। যখন এই ফেরেশতারা আকাশে উঠতে চাইলো কিন্তু উঠতে পারলো না। তখন তারা বুঝে নিলো যে, এখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম কিছুদিন তো এই ফেরেশতারা স্থিরই। ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতো এবং সন্ধ্যার পর। আকাশে উঠে যেতো। অতঃপর যুহরাকে দেখে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যুহরা তারকাকে একটি সুন্দরী স্ত্রীর আকৃতিতে তাদের নিকট। পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা, হারুত ও মারূতের এ ঘটনা তাবেঈগণের মধ্যেও বহু লোক বর্ণনা করেছেন। যেমন, মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) প্রভৃতি। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণও নিজ নিজ তাফসীরে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের কিতাবসমূহের উপর নির্ভরশীল। এ অধ্যায়ে কোন সহীহ মারফু মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ঈমান ওর উপরেই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআন মাজীদে আছে ওটাই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে, যাতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরলোক গমনের অল্প দিন পরে দাওমাতুল জানাল’ হতে একটি স্ত্রীলোক তার খোঁজে আগমন করে। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সে উদ্বিগ্ন হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- ব্যাপার কি? সে বলেঃ আমার মধ্যে ও আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় লেগেই থাকতো। একবার সে আমাকে ছেড়ে কোন্ অজানা জায়গায় চলে যায়। একটি বৃদ্ধার নিকট আমি এসব কিছু বর্ণনা করি। সে আমাকে বলে- “তোমাকে যা বলি তাই কর, সে আপনা আপনি চলে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে গেলাম। রাত্রে সে দুটি কুকুর নিয়ে আমার নিকট আগমন করে। একটির উপর সে আরোহণ করে এবং অপরটির উপর আমি আরোহণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা দু'জন বাবেলে চলে যাই। তথায় গিয়ে দেখি যে, দু’টি লোক শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় লটকানো রয়েছে। ঐ বৃদ্ধা আমাকে বলে-তাদের নিকট যাও ও বল-“আমি যাদু শিখতে এসেছি। আমি তাদেরকে একথা বলি। তারা বলে-‘জেনে রেখো, আমরা তো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। তুমি যাদু শিক্ষা করো যাদু শিক্ষা করা কুফরী।' আমি বলি-শিখবো। তারা বলে-“আচ্ছা, তাহলে যাও, ঐ চুল্লীর মধ্যে প্রস্রাব করে চলে এসো। আমি গিয়ে প্রস্রাবের ইচ্ছে করি, কিন্তু আমার অন্তরে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়, সুতরাং আমি ফিরে এসে বলিআমি কাজ সেরে এসেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে -“তুমি কি দেখলে আমি বলি-“কিছুই না। তারা বলে-“তুমি ভুল বলছে। এখন পর্যন্ত তুমি বিপথে চালিত হওনি। তোমার ঈমান ঠিক আছে, তুমি এখনও ফিরে যাও এবং কুফরী করো না। আমি বলি-“আমাকে যে যাদু শিখতেই হৰে। তারা পুনরায় আমাকে বলে-ঐ চুল্লীতে প্রস্রাব করে এসো। আমি আবার যাই। কিন্তু এবারও। মন চায় না, সুতরাং ফিরে আসি। আবার এভাবেই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। পুনরায় আমি চুল্লীর নিকট যাই এবং মনকে শক্ত করে প্রস্রাব করতে বসে পড়ি। আমি দেখি যে, একজন ঘোড়া সওয়ার মুখের উপর পর্দা ফেলে আকাশের উপর উঠে গেল। আমি ফিরে এসে তাদের নিকট এটা বর্ণনা করি। তারা বলে- 'হাঁ, এবার তুমি সত্য বলছে। ওটা তোমার ঈমান ছিল, যা তোমার মধ্য হতে বেরিয়ে গেল। এখন চলে যাও।আমি এসে ঐ বৃদ্ধাকে বলি- ‘তারা আমাকে কিছুই শিক্ষা দেয়নি। সে বলে- যথেষ্ট হয়েছে। তোমার নিকট সবই চলে এসেছে। এখন তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি পরীক্ষামূলকভাবে একটি গমের দানা নিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। অতঃপর বলি- গাছ হও।' ওটা গাছ হয়ে গেল। আমি বলি-- তোমাতে ডাল পাতা গজিয়ে যাক।' তাই হয়ে গেল। তার পর বলি- ‘শুকিয়ে যাও।' ডালপাতা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-‘পৃথক পৃথকভাবে দানা দানা হয়ে যাও। ওটা তাই হয়ে গেল। তারপরে আমি বলি-শুকিয়ে যাও। ওটা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-আটা হয়ে যাও।' আটা হয়ে গেল। আমি বলি-রুটি হয়ে যাও।' রুটি হয়ে গেল। এটা দেখেই আমি লজ্জিত হয়ে যাই এবং বে-ঈমান হয়ে যাওয়ার কারণে আমার খুবই দুঃখ হয়। হে উম্মুল মু'মিনীন! আল্লাহর শপথ! আমি যাদুর দ্বারা কোন কামও নেইনি এবং কারও উপর এটা প্রয়োগও করিনি। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাঁকে পেলাম না। এখন আমি কি করি?একথা বলেই সে পুনরায় কাঁদতে আরম্ভ করে এবং এত কাঁদে যে, সবারই মনে তার প্রতি দয়ার সঞ্চার হয়। তাকে কি ফতওয়া দেয়া যেতে পারে এ ব্যাপারে সাহাবীগণও (রাঃ) খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে তারা বলেন- এখন এ ছাড়া আর কি হবে যে, তুমি এ কাজ করবে না, তাওবা করবে এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর পিতা-মাতার খিদমত করবে। এই ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক।কেউ কেউ বলেন যে, যাদুর বলে প্রকৃত জিনিসই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, না, দর্শকের শুধু এর ধারণা হয়ে থাকে মাত্র, প্রকৃত জিনিস যা ছিল তাই থাকে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ অর্থাৎ তারা মানুষের চোখে যাদু করে দিয়েছে।' (আরবি) (৭:১১৬) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন অর্থাৎ (আরবি) হযরত মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হয়েছে যে, যেন ঐ সাপগুলো তাদের যাদুর বলে চলাফেরা করছে।' (২০:৬৬) এ ঘটনা দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াতে বাবেল’ শব্দ দ্বারা ইরাকের বাবেলকে বুঝানা হয়েছে, দুনিয়া অন্দের’ বাবেল নয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত আলী ইবনে আবূ তাবিল (রাঃ) বাবেলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসরের নামাযের সময় হলে তিনি তথায় নামায আদায় করলেন না, বরং বাবেলের সীমান্ত পার হয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমার প্রিয় রাসূল (সঃ) আমাকে গোরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বাবেলের ভূমিতেও নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এটা অভিশপ্ত ভূমি। সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসের উপর কোন সমালোচনা করেননি। আর যে হাদীসকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাবে নিয়ে আসেন এবং ওর সনদের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন ঐ হাদীস ইমাম সাহেবের মতে হাসান হয়ে থাকে। এর দ্বারা জানা গেল যে, বাবেলের ভূমিতে মামায পড়া মাকরূহ। যেমন সামুদ সম্প্রদায়ের ভূমি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তাদের বাস ভূমিতেও যেয়ো না। যদি ঘটনাক্রমে যেতেই হয়, তবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাও।আল্লাহ তা'আলা হারুত ও মারূতের মধ্যে ভাল-মন্দ, কুফর ও ঈমানের জ্ঞান দিয়ে রেখেছিলেন বলে তারা কুফরীর দিকে গমনকারীদের উপদেশ দিতো। এবং তাদেরকে ওটা হতে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু যখন কোনক্রমেই মানতো না তখন তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিখিয়ে দিতো। ফলে তাদের ঈমানের আলো বিদায় নিতে এবং যাদু চলে আসতো। শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যেতো। ঈমান বিদায় নেয়ার পর আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর নেমে আসতো। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, কাফির ছাড়া আর কেউ যাদু বিদ্যা শিখবার সৎ সাহস রাখতে পারে না (আরবি) শব্দের অর্থ এখানে বিপদ, আজমায়েশ ও পরীক্ষা। এ আয়াতের মাধ্যমে এটাও জানা গেল যে, যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা কুফরী। হাদীসের মধ্যেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহীর সাথে কুফরী করে। ( বার)'। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং-এর সমর্থনে অন্যান্য হাদীসও এসেছে।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, মানুষ হারুত ও মারূতের কাছে গিয়ে যাদু বিদ্যা শিক্ষা করতো। ফলে তারা খারাপ কাজ করতো এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ শয়তান তার সিংহাসনটি পানির উপর রাখে। অতঃপর মানুষকে বিপথে চালানোর জন্যে সে তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়। সেই তার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত যে হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে সবচেয়ে বেড়ে যায়। এরা ফিরে এসে নিজেদের জঘন্যতম কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়। কেউ বলেঃ আমি অমুককে এভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছি। কেউ বলেঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে এ পাপ কার্য করিয়েছি। শয়তান তাদেরকে বলেঃ ‘বো কিছুই করনি। এতো সাধারণ কাজ। অবশেষে একজন এসে বলেঃ আমি একটি নোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, এমনকি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। শয়তান তখন তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলেঃ হ, তুমি বড় কাজ করেছে। সে তাকে পার্শ্বে বসিয়ে নেয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।' যাদুকরও তার যাদুর দ্বারা ঐ কাজই করে থাকে, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি হয়। যেমন তার কাছে স্ত্রীর আকৃতি খারাপ মনে হবে কিংবা তার স্বভাব চরিত্রকে সে ঘৃণা করবে অথবা অন্তরে শত্রুতার ভাব জেগে যাবে ইত্যাদি। আস্তে আস্তে এসব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিচ্ছেদই ঘটে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যাদু দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন ক্ষতি সাধিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি সাধন করা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই নেই। আল্লাহর ভাগ্য লিখন অনুযায়ী তার ক্ষতিও হতে পারে, আবার তার ইচ্ছে হলে যাদু নিষ্ক্রিয়ও হতে পারে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যাদু শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিরই ক্ষতি করে থাকে, যে ওটা লাভ করে ওর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা এমন জিনিস শিক্ষা করে যা তাদের জন্যে শুধু ক্ষতিকারক, যার মধ্যে উপকার মোটেই নেই। ঐ ইয়াহুদীরা জানে যে,যারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) আনুগত্য ছেড়ে যাদুর পিছনে লেগে থাকে তাদের জন্যে আখেরাতের কোনই অংশ নেই। তাদের না আছে আল্লাহর কাছে কোন সম্মান, না তাদেরকে ধর্মভীরু মনে করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তাদের এ মন্দ কাজের অনুভূতি হতো এবং ঈমান এনে খোদাভীরুতা অবলম্বন করতো তবে ওটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। কিন্তু এরা অজ্ঞান ও নির্বোধ।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “জ্ঞানীগণ বলে- তোমাদের জন্যে আফসোস! আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্যে বড়ই উত্তম, কিন্তু ওটা একমাত্র ধর্মশীলগণই পেয়ে থাকে।হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) ও পূর্ব যুগীয় মনীষীদের একটি দল যাদু বিদ্যা শিক্ষার্থীকে কাফির বলেছেন। কেউ কেউ কাফির তো বলেন না, কিন্তু বলেন যে, যাদুকরকে হত্যা করাই হচ্ছে তার উপযুক্ত শাস্তি। হযরত বাজালাহ বিন উবাইদ (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক নির্দেশ নামায় লিখেছিলেনঃ যাদুকর পুরুষ বা স্ত্রীকে তোমরা হত্যা করে দাও।' এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিনজন যাদুকরের গর্দান উড়িয়েছি।'সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) উপর তার দাসী যাদু করেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন যে, তিনজন সাহাবী (রাঃ) হতে যাদুকরকে হত্যা করার ফতওয়া রয়েছে। জামে' উত তিরমিযীর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন মুসলিম দুর্বল। সঠিক কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। কিন্তু তাবরানীর হাদীসের মধ্যে অন্য সনদেও এ হাদীসটি মার' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ' ওয়ালীদ বিন উকবার নিকট একজন যাদুকর ছিল, সে তার যাদু কার্য বাদশাহকে দেখাতো। সে প্রকাশ্যভাবে একটি লোকের মাথা কেটে নিতো। অতঃপর একটা শব্দ করতো, আর তখনই মাথা জোড়া লেগে যেতো মুহাজির সাহাবাগণের (রাঃ) মধ্যে একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী (রাঃ) ওটা দেখেন এবং পরের দিন তরবারি নিয়ে আসেন। যাদুকর খেলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তিনি স্বয়ং যাদুকরেরই মাথা কেটে ফেলেন এবং বলেনঃ “তুমি সত্যবাদী হলে নিজেই জীবিত হয়ে যাও।' অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ “তোমরা যাদুর নিকট যাচ্ছ ও তা দেখছো?' ঐ সাহাবী (রাঃ) ওয়ালীদের নিকট হতে তাকে হত্যা করার অনুমতি নেননি বলে বাদশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) নির্দেশ ও হযরত হাফসার (রাঃ) ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন যে, ঐ হুকুম ঐ সময় কার্যকরী হবে যখন যাদুর মধ্যে শিরক যুক্ত শব্দ থাকবে। মু'তাযিলা সম্প্রদায় যাদুর অস্তিত্বই মানে না। তারা বলে যে,যারা যাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা কাফির। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যাদুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তারা স্বীকার করে যে, যাদুকর তার যাদুর বলে বাতাসে উড়তে পারে, মানুষকে বাহ্যতঃ গাধা ও গাধাকে বাহ্যতঃ মানুষ করে ফেলতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট কথাগুলো মন্ত্রতন্ত্র পড়ার সময় ঐগুলো সৃষ্টিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আকাশকে ও তারকাকে ফলাফল সৃষ্টিকারী মানে না। দার্শনিকেরা, জোতির্বিদেরা এবং বে-দ্বীনেরা তো তারকা ও আকাশকেই ফলাফল সৃষ্টিকারী মেনে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রথম দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ তারা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা। তৃতীয় দলীল হচ্ছে ঐ স্ত্রী লোকটির ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আরও এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, যাদু বিদ্যা লাভ করা দুষনীয় নয়। মাসয়ালা বিশ্লেষণকারীগণের এটাই অভিমত। কেননা, এটাও একটা বিদ্যা। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, এরা কি সমান?’ আর এ জন্যেও যাদু বিদ্যা শিক্ষা দুষণীয় নয় যে, তার দ্বারা মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পূর্ণভাবে পার্থক্য করা যায় এবং মু'জিযার জ্ঞান ওয়াজিব ও ওটা নির্ভর করে যাদু বিদ্যার উপর, যার দ্বারা পার্থক্য বুঝা যায়। সুতরাং যাদু বিদ্যা শিক্ষা করাও ওয়াজিব হয়ে গেল। ইমাম রাযীর (রাঃ) একথা"গোড়া হতে আগা পর্যন্ত ভুল। বিবেক হিসেবে যদি তিনি ওটাকে খারাপ না বলেন তবে মু'তাযিলা সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে, যারা ওকে বিবেক হিসেবেও খারাপ বলে থাকে। আর যদি শরীয়তের দিক দিয়ে খারাপ না বলেন তবে কুরআন মাজীদের এ শারঈ আয়াত ওকে খারাপ বলার জন্যে যথেষ্ট। সহীহ হাদীসে রয়ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন যাদুকর বা গণকের নিকট গমন করে সে কাফির হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম রাযীর (র) উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর একথা বলা যে, মুহাককিকগণের অভিমত এটাই’ এটাও ঠিক নয়। মুহাকিকগণের এরূপ কথা কোথায় আছে? ইসলামের ইমামগণের মধ্যে কে এ কথা বলেছেন? অতঃপর যারা জানে এবং জানে না, তারা কি সমান?' এ আয়াতটিকে দলীলরূপে পেশ করা হঠধমী ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এ আয়াতের ‘ইলম এর ভাবার্থ হচ্ছে ধর্মীয় ‘ইলম। এ আয়াতে শারঈ আলেমগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তার এ কথা বলা যে, এর দ্বারা মু'জিযার ‘ইলম লাভ হয়, এটা একেবারে বাজে কথা। কেননা, আমাদের রাসূল (সঃ)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন, যা বাতিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু তার মু'জিযা জানা যাদু জানার উপর নির্ভরশীল নয়। ঐ সব লোক যাদের যাদুর সঙ্গে দূরের সম্পর্ক নেই তারাও এটাকে মু'জিযা বলে স্বীকার করেছেন। সাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ, ইমামগণ এমনকি সাধারণ মুসলমানগণও একে মু'জিযা মেনে থাকেন। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কখনও যাদু জানা তো দূরের কথা, ওর কাছেই যাননি। তাঁরা ওটা নিজে শিক্ষা করেননি এবং অপরকেও শিক্ষা দেননি। তাঁরা যাদু করেননি এবং করাননি। বরং এসব কাজকে তারা কুফরই বলে এসেছেন। অতঃপর এ দাবী করা যে, মু'জিযা জানা ওয়াজিব এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য যাদুর উপর নির্ভর করে, সুতরাং যাদু শিখাও ওয়াজিব হলো, এটা কতই না অর্থহীন দাবী! যাদু বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে, যা আবু আব্দিল্লাহ রাফী বর্ণনা করেছেন।(১) প্রথম যাদু হচ্ছে তারকা পূজকদের। তারা সাতটি গতিশীল তারকার উপর বিশ্বাস রাখে যে, ভাল-মন্দ ওদের কারণেই হয়ে থাকে। এ জন্যে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট শব্দ পাঠ করতঃ ওদের পূজা করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগমন করেন এবং হিদায়াত করেন। ইমাম রাযী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি বিশিষ্ট পুস্তক রচনা করেছেন এবং ওর নাম (আরবি)রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, পরে তিনি ওটা হতে তাওবা করেছেন।আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি শুধু জানাবার জন্যে এবং তার এই বিদ্যা প্রকাশ করার জন্যেই এ পুস্তক লিখেছেন, এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস নেই। কেননা এটা সরাসরি কুফরী।(২) দ্বিতীয় যাদু হচ্ছে ধারণা শক্তির উপর বিশ্বাসী লোকদের যাদু। ধারণা ও খেয়ালের বড় রকমের প্রভাব রয়েছে। যেমন একটি সংকীর্ণ সাঁকো মাটির উপর রেখে দিলে মানুষ অনায়াসেই তার উপর দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সঁকোটি যদি নদীর উপর হয় তবে মানুষ আর তার উপর দিয়ে চলতে পারে না। কেননা ধারণা হয় যে, এখনই পড়ে যাবে। ধারণার এই দুর্বলতার কারণেই যেটুকু জায়গার উপর দিয়ে মাটিতে চলতে পারছিল, ঐ জায়গার উপর দিয়েই এরকম ভয়ের সময় চলতে পারে না। এ জন্যেই হেকিমগণ ও ডাক্তারগণ ভীত লোককে লাল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখেন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত লোককে খুব বেশী আলোকময় ও দ্রুত গতিসম্প দেখতে নিষেধ করে থাকেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, উপর ধারণার একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। জ্ঞানীগণ এ বিষয়েও একমত যে, ন্যর’ লেগে থাকে। সহীহ হাদীসেও এসেছে যে, নযর’ লাগা সত্য। ভাগ্যের উপর যদি কোন জিনিস প্রাধান্য লাভকারী হতো তবে তা ন্যই ইতো। এখন যদি নাফস্ শক্ত হয় তবে বাহ্যিক সাহায্য ও বাহ্যিক কার্যের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি নাফস ততো শক্ত না হয় তবে ঐ সব যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। নাফসের যে পরিমাণ শক্তি বেড়ে যাবে সেই পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। আর যে পরিমাণ এ শক্তি কম হবে সে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তিও কমে যাবে।এ শক্তি কখনও কখনও খাদ্যের স্বল্পতা এবং জনগণের মেলামেশা ত্যাগ করার মাধ্যমেও লাভ হয়ে থাকে। কখনও তো মানুষ এ শক্তির দ্বারা শরীয়ত। অনুযায়ী পুণ্যের কাজ করে থাকে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘কারামত’ বলে, যাদু বলে না। আবার কখনও কখনও মানুষ এ শক্তি দ্বারা বাতিল ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজ করে থাকে এবং দ্বীন হতে বহু দূরে সরে পড়ে। এ রকম লোকের ঐ অলৌকিক কার্যাবলী দেখে প্রতারিত হয়ে তাকে ওয়ালী বলা কারও উচিত নয়। কেননা, যারা শরীয়তের উল্টো কাজ করে তারা কখনও আল্লাহর ওয়ালী হতে পারে না। তা নাহলে সহীহ হাদীস সমূহে দাজ্জালদেরকে অভিশপ্ত ও দুষ্ট বলা হতো না। অথচ তারা তো বহু অলৌকিক কাজ করে দেখাবে।(৩) তৃতীয় যাদু হচ্ছে জ্বীন প্রভৃতি পার্থিব আত্মসমূহের দ্বারা সহায্য প্রার্থনা করা। দার্শনিকরা ও মুতাযেলীরা এটা স্বীকার করে না। কতগুলো লোক এসব পার্থিব আত্মার মাধ্যমে কতকগুলো শব্দ ও কার্যের দ্বারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। ওকে মোহমন্ত্র ও প্রেতাত্মার যাদুও বলা হয়।(৪) চতুর্থ প্রকারের যাদু হচ্ছে ধারণা বদলিয়ে দেয়া, নযরবন্দ করা এবং প্রতারিত করা,যার ফলে প্রকৃত নিয়মের উল্টো কিছু দেখা যায়। কলাকৌশলের মাধ্যমে কার্য প্রদর্শনকারীকে দেখা যায় যে, সে প্রথমে একটা কাজ আরম্ভ করে, যখন মানুষ একাগ্র চিত্তে ওর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায়, তখন তড়িৎ করে সে আর একটি কাজ আরম্ভ করে দেয়, যা মানুষের দৃষ্টির অন্তারলে থেকে যায়। তা দেখে তারা তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদু এ প্রকারেরই ছিল। এ জন্যেই কুরআন পাকে রয়েছেঃ “তারা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের অন্তরে ভয় বসিয়ে দেয়। অন্য স্থানে রয়েছেঃ মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, ঐ সব লাঠি ও দড়ি যেন সাপ হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এরূপ ছিল না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (৫) পঞ্চম প্রকারের যাদু হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণে একটি জিনিস তৈরী করা এবং এর দ্বারা আশ্চর্যজনক কাজ নেয়া। যেমন, ঘোড়ার আকৃতি তৈরী করে দিল। ওর উপর একজন কৃত্রিম আরোহী বসিয়ে দিল যার হাতে বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। এক ঘন্টা অতিবাহিত হতেই ওর মধ্য হতে শব্দ বের হতে লাগল। অথচ কেউই ওকে বাজাচ্ছে না। এরূপভাবেই এমন নিপুণতার সাথে মানুষের ছবি বানালো যে, মনে হচ্ছে যেন প্রকৃত মানুষই হাসছে বা কাঁদছে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদুও এই প্রকারেরই ছিল। তাদের কৃত্রিম সাপগুলো পারদ জাতীয় দ্রব্য দিয়ে তৈরী ছিল বলে মনে হতো যেন জীবিত সাপ নড়াচড়া করছে। ঘড়ি, ঘন্টা এবং ছোট ছোট জিনিস, যা থেকে বড় বড় জিনিস বেরিয়ে আসে, এসবগুলোই এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে একে যাদু বলা উচিত নয়। কেননা, এটা তো এক প্রকার নির্মাণ ও কারিগরি, যার কারণগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ্য। যে ওটা জানে সে এসব শব্দ দ্বারা একাজ করতে পারে। যে ফন্দি বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টানেরা করতো ওটাও এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। ঐ ফন্দি এই যে, তারা গোপনে গির্জার প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিতো। অতঃপর ওকে গির্জার মাহাত্ম্য বলে প্রচার করতঃ জনগণকে তাদের ধর্মে টেনে আনতো।কতক কারামিয়াহ ও সুফিয়্যাহ সম্প্রদায়েরও ধারণা এই যে, জনগণকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শনের হাদীসগুলো বানিয়ে নিলে কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা চরম ভুল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন দোযখে তার স্থান ঠিক করে নেয়।' তিনি আরও বলেনঃ ‘আমার হাদীসগুলো তোমরা বর্ণনা করতে থাকো; কিন্তু আমার নামে মিথ্যা কথা বলো না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামী।'একজন খ্রীষ্টান পাদরী একদা দেখে যে, পাখীর একটি ছোট বাচ্চা যা উড়তে পারে না, একটি বাসায় বসে আছে। যখন ওটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বর বের করছে তখন অন্যান্য পাখীরা ওর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে যাইতুন ফল এনে ওর বাসায় রেখে দিচ্ছে। ঐ পাদরী কোন জিনিস দিয়ে ঐ আকারেরই একটি পাখী তৈরী করে। ওর নীচের দিক ফাপা রাখে এবং ওর ঠোটের দিকে একটি ছিদ্র রাখে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করে। অতঃপর যখন বাতাস বের হয় তখন ঐ পাখীর মতই শব্দ করে। ওটা নিয়ে গিয়ে সে গির্জার মধ্যে বাতাস মুখো রেখে দেয়। ছাদে একটি ছোট ছিদ্র করে দেয় যেন বাতাস সেখান দিয়ে যাতায়াত করে। এখন যখনই বাতাস বইতে থাকে তখনই ওটা হতে শব্দ বের হতে থাকে। আর এ শব্দ শুনে ঐ প্রকারের পাখী তথায় একত্রিত হয় এবং যাইতুন’ ফল এনে এনে রেখে যায়। ঐ পাদরী তখন প্রচার করতে শুরু করে যে, গির্জার মধ্যে এটা এক অলৌকিক ব্যাপার। এখানে একজন মনীষীর সমাধি রয়েছে এবং এটা তাঁরই কারামত। এখন জনগণ স্বচক্ষে এটা দেখে বিশ্বাস করে নেয়। অতঃপর তারা ঐ কবরের উপর ন্যর-নিয়ায আনতে থাকে এবং এই কারামত বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অথচ ওটা না ছিল কারামত, না ছিল মু'জিযা। বরং শুধুমাত্র ছিল ওটা একটা গোপনীয় বিষয় যা সেই পাদরী; একমাত্র তার পেট পূরণের জন্যেই গোপনীয়ভাবে করে রেখেছিল। আর ঐ অভিশপ্ত দল ওতেই লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।(৬) যাদুর ষষ্ঠ প্রকার হচ্ছে কতকগুলো ওষুধের গোপন কোন বৈশিষ্ঠ্য জেনে ওটা কাজে লাগানো। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে,এতে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :রয়েছে। চুম্বককেই তো দেখা যায় যে, ওটা কিভাবে লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। অধিকাংশ সূফী ও দরবেশই ঐ ফন্দি ফিকিরকেই জনগণেরই মধ্যে কারামত রূপে প্রদর্শন করতঃ তাদেরকে মুরীদ করতে থাকে।(৭) সপ্তম প্রকারের যাদু হচ্ছে কারও মধ্যে একটা বিশেষ প্রভাব ফেলে যা চায় তাই তার দ্বারা করিয়ে নেয়া। যেমন তাকে বলে যে, তার “ইসমে আযম . মনে আছে কিংবা জ্বিনেরা তার তাবে আছে। এখন যদি তার সামনে লোকটি দুর্বল ঈমানের লোক হয় এবং অশিক্ষিত হয় তবে তো সে তাকে বিশ্বাস করে নেবে এবং তার প্রতি তার একটা ভয় ও সম্ভ্রম থাকবে যা তাকে আরও দুর্বল করে দেবে। এখন সে যা চাইবে তাই সে করবে। আর এই প্রভাব সাধারণতঃ স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির উপরই পড়ে থাকে। একেই মুতাবান্নাহ’ বলা হয়। আর অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে জ্ঞানী ও অজ্ঞানকে চিনতে পারে, কাজেই সে নিরেটের উপরই তার ক্রিয়া চাপিয়ে থাকে।(৮) অষ্টম প্রকারের যাদু হচ্ছে চুগলী করা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কারও অন্তরে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং গোপনীয় চতুরতা দ্বারা তাকে বশীভূত করা। এ চুগলী যদি মানুষের মধ্যে শক্রতা সৃষ্টির জন্যে হয় তবে এটা শরীয়ত অনুযায়ী হারাম হবে। আর যদি এটা সংশোধন করার উদ্দেশ্যে হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মিলনের জন্যে হয় কিংবা এর ফলে যদি মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি আগত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং কাফিরদের শক্তি নষ্ট করতঃ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা যায় তবে এটা বৈধ হবে। যেমন হাদীস শরীফে আছে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মঙ্গলের জন্যে এদিক ওদিক কথা নিয়ে যায়। হাদীসে আরও আছে যে, যুদ্ধ হচ্ছে প্রতারণার নাম। হযরত নঈম বিন মাসউদ (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে আরবের কাফির ও ইয়াহূদীদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথার মাধ্যমে বিচ্ছেদ আনয়ন করেছিলেন এবং এরই ফলে মুসলমানদের নিকট তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইমাম রাযী যে যাদুর এই আটটি প্রকার বর্ণনা ; করেছেন তা শুধু শব্দ হিসেবে। কেননা আরবী ভাষায় (আরবি) বা যাদু প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল হয় এবং যার কারণসমূহ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এজন্যেই একটি হাদীসে আছে যে, কোন কোন বর্ণনাও যাদু। আর এ কারণেই সকালের প্রথম ভাগকে ‘সহুর’ বলা হয়। কেননা, ওটা মানুষের চক্ষুর অন্তরালে থাকে। আর ঐ শিরাকের ‘সিহর’ বলে যা আহার্যের স্থানে থাকে। আবু জেহেলও বদরের যুদ্ধে বলেছিল যে, তার খাদ্যের শিরা ভয়ে ফুলে গেছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার সিহর’ ও ‘নাহারের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাহলে সিহূরের অর্থ হচ্ছে খাদ্যের শিরা এবং নাহারের অর্থ হচ্ছে বুক। কুরআন পাকে আছেঃ “তারা (যাদুকরেরা) মানুষের চক্ষু থেকে তাদের কার্যাবলী গোপন রেখেছিল। আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমরা বলি যে, যাদু আছে এবং এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহকে মঞ্জর হলে তিনি যাদুর সময় যা চান তাই ঘটিয়ে থাকেন। যদিও মুতাযিলা, আবু ইসহাক ইসফিরাঈনী এবং ইমাম শফিঈ (রঃ) এটা বিশ্বাস করেন না।' যাদু কখনও হাতের চালাকি দ্বারাও হয়ে থাকে আবার কখনও ভোরা, সুতা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। কখনও আল্লাহর নাম পড়ে ফু দিলেও একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। কখনও শয়তানের নাম নিয়ে শয়তানী কার্যাবলী দ্বারাও লোক যাদু করে থাকে। কখনও ঔষধ ইত্যাদি দ্বারাও যাদু করা হয়।"রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেনঃ কতকগুলো বর্ণনাও যাদু' এর দুটোই ভাবার্থ হতে পারে। হয়তো তিনি এটা বর্ণনাকারীর প্রশংসার জন্যে বলেছেন, কিংবা তার নিন্দে করেও বলে থাকতে পারেন যে, সে তার মিথ্যা কথাকে এমন ভঙ্গিমায় বর্ণনা করছে যে, তা সত্য মনে হচ্ছে। মন্ত্রী আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মদ বিন হাবীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল আশরাফু আ'লা মাযাহিবিল আশরাফে’ এর মধ্যে যাদু অধ্যায়ে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এটা স্বীকার করেননি। যারা যাদু শিক্ষা করে ও ওটা ব্যবহার করে তাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ), এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) কাফির বলেছেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) কয়েকজন শিষ্যের মতে যাদু যদি আত্মরক্ষার জন্যে কেউ শিক্ষা করে তবে সে কাফির হবে না। তবে হ, যারা ওর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ওকে উপকারী মনে করে সে কাফির। অনুরূপ ভাবে যারা ধারণা করে যে, শয়তানরা এ কাজ করে থাকে এবং তারা এরকম ক্ষমতা রাখে, তারাও কাফির।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, যদি তারা বাবেলবাসীদের মত বিশ্বস রাখে এবং সাতটি গতিশীল তারকাকে প্রভাব সৃষ্টিকারীরূপে বিশ্বাস করে তবে তারা কাফির। আর যদি এ না হয়, কিন্তু যাদুকে বৈধ মনে করে তবে তারাও কাফির। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) অভিমত এও আছে যে, যারা যাদু করে এবং ওকে ব্যবহারে লাগায় তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যে পর্যন্ত বারবার না করে কিংবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে নিজে স্বীকার না করে সেই পর্যন্ত হত্যা করা হবে না।তিনজন ইমামই বলেন যে, তার হত্যা হচ্ছে শাস্তির জন্যে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে এ নির্দেশ আছে যে, যাদুকরকে তাওবাও করানো হবে না এবং তার তাওবা করার ফলে তার শাস্তি লোপ পাবে না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মতে তার তাওবা গৃহীত হবে। একটি বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) এ উক্তি আছে। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মতে কিতাবীদের যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য তিনজন ইমামের অভিমত এর উল্টো। লাবীদ বিন আসাম নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করেছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি। যদি কোন মুসলমান মহিলা যাদু করে তবে তার সম্বন্ধে ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মত এই যে, তাকে বন্দী করা হবে। আর অন্যান্য তিনজন ইমামের মতে পুরুষের মত তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন। হযরত যুহরীর (রঃ) মতে মুসলমান যাদুকরকে হত্যা করা হবে,কিন্তু মুশরিক যাদুকরকে হত্যা করা হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি কোন যিম্মীর যাদুর ফলে কেউ মারা যায় তবে যিম্মীকেও মেরে ফেলা হবে। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রথমে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করতঃ ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা ভালই, নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। আবার তার হতে এও বর্ণিত আছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে হত্যা করা হবে।যে যাদুকরের যাদুতে শিরকী শব্দ আছে, চারজন ইমামই তাকে কাফির বলেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের উপর প্রভুত্ব লাভ করার পর যদি সে তাওবা করে তবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন যিন্দীক সম্প্রদায়। তবে যদি তার উপর প্রভুত্ব লাভের পূর্বেই তারা তাওবা করে তা হলে হবে। আর যদি তার যাদুতে কেউ মারা যায় তবে তো তাকে হত্যা করা হবেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি সে বলেঃ আমি মেরে ফেলার জন্যে যাদু করিনি। তবে ভুল করে হত্যার অপরাধে তার নিকট হতে জরিমানা আদায় করা হবে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) যাদুকরের দ্বারা যাদু উঠিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন, যেমন সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। হযরত আমের শা'বীও এটাকে কোন দোষ মনে করেন না। কিন্তু খাজা হাসান বসরী (রঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আপনি যাদু তুলিয়ে নেন না কেন? তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তো আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি লোকের উপর মন্দ খুলিয়ে নিতে ভয় করি।' যাদুর চিকিৎসাহযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, কুলের সাতটি পাতা পাটায় বেটে পানিতে মিশাতে হবে। অতঃপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ওর উপর ফু দিতে হবে এবং যাদুকৃত ব্যক্তিকে তিন ঢাকে পানি পান করাতে হবে এবং অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে। ইনশাআল্লাহ্ যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এ আমল বিশেষভাবে ঐ ব্যক্তির জন্যে খুবই মঙ্গলজনক যাকে তার স্ত্রী থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যাদু ক্রিয়া নষ্ট করার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি) এ সূরাগুলো। হাদীস শরীফে আছে যে, এই সূরাগুলোর চেয়ে বড় রক্ষাকবচ আর কিছু নেই। এরকমই আয়াতুল কুরসীও শয়তানকে দূর করার জন্য বড়ই ফলদায়ক।
আল-বাকারা 2:102
৯৯-১০৩ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ) আমি এমন এমন নিদর্শনাবলী তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি যা তোমার নবুওয়াতের জন্যে প্রকাশ্য দলীল হতে পারে। ইয়াহুদীদের বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডার তাওরাতের গোপনীয় কথা, তাদের পরিবর্তনকৃত আহকাম ইত্যাদি সব কিছুই আমি এই অলৌকিক কিতাব কুরআন মাজীদের মধ্যে বর্ণনা করেছি। ওটা শুনে প্রত্যেক জীবিত অন্তর তোমার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ইয়াহূদীরা যে হিংসা-বিদ্বেষ বশতঃ মানছে না ওটা অন্য কথা। নতুবা প্রত্যেক লোকই এটা বুঝতে পারে যে, একজন নিরক্ষর লোক কখনও এরকম পবিত্র অলংকার ও নিপুণতাপূর্ণ কথা বানাতে পারে না।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবনে সুরিয়া কাতভীনী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বলেছিল ও ‘আপনি এমন কোন সৌন্দর্য ও দর্শন পূর্ণবাণী আনতে পারেন নি যা দ্বারা আপনার নবুওয়াতের পরিচয় পেতে পারি বা কোন জ্বলন্ত প্রমাণও আপনার নিকট নেই।' তখনই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট শেষ নবী (সঃ)-কে স্বীকার করার উপর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা তারা অস্বীকার করেছিল বলে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করা, এটা তো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অভ্যাস, বরং তাদের অধিকাংশের অন্তর তো ঈমান থেকেই শূন্য।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ফেলে দেয়া। ইয়াহূদীরা আল্লাহর কিতাবকে এবং তার অঙ্গীকারকে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছিল যে, যেন তারা তা ফেলেই দিয়েছিল। এ জন্যেই তাদের নিন্দের ব্যাপারে এ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছেঃ তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা বিদ্যমান পেয়ে থাকে। এখানেও আল্লাহ পাক বলেছেন যে, যখন তাদের একটি দল কিতাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতঃ ওকে এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন সে জানেই না। বরং যাদুর পিছনে লেগে পড়ে। এমনকি মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরও যাদু করে। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)কে এটা জানিয়ে দেন এবং ওর ক্রিয়া নষ্ট করতঃ তাকে আরোগ্য দান করেন। তাওরাতের মাধ্যমে তো তারা তাঁর মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, ওটা তো তার সত্যতা প্রমাণকারী। সুতরাং ওটাকে তারা পরিত্যাগ করতঃ অন্য কিতাব গ্রহণ করে ওর পিছনে লেগে পড়ে। আল্লাহর কিতাবকে তারা এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন তারা ওর সম্বন্ধে কিছু জানতই না। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তারা আল্লাহর কিতাবকে তাদের পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে। এও বলা হয়েছে যে, গান-বাজনা, খেল-তামাশা এবং আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখে এমন প্রত্যেক জিনিসই (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘটনা এবং যাদুর মূল তত্ত্বের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। পায়খানায় গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রী জারাদার নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জ্বীন তার রূপ ধরে তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জ্বীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কার্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তার স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।' হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার বলে তিনি বাতাস ও জ্বীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জ্বীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাঁকে যাদুকর বলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা অস্বীকার করেন এবং আল্লাহর ফরমান জারী হয় যে, যাদু বিদ্যার এ কুফরী শয়তানরা ছড়িয়ে ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক আগমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা হতে আসছো?' সে বলেঃ ইরাক ইতে। তিনি বলেনঃ ইরাকের কোন শহর হতে?' সে বলেঃ কুফা হতে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তথাকার সংবাদ কি?' সে বলেঃ তথায় আলোচনা হচ্ছে যে, হযরত আলী (রাঃ) মারা যাননি; বরং তিনি জীবিত আছেন এবং সত্বরই আসবেন। একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেঁপে উঠেন এবং বলেনঃ ‘এটা সত্য হলে আমরা তাঁর মীরাস বন্টন করতাম না। আর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করতাম। শুন! শয়তানরা আকাশবানী চুরি করে শুনে নিতে এবং তাদের নিজস্ব কথা মিলিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সব পুস্তক জমা করে তার সিংহাসনের নীচে পুঁতে দেন। তার মৃত্যুর পর জ্বীনেরা পুনরায় তা বের করে নেয়। ঐ পুস্তকগুলো ইরাকের মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং ঐ পুস্তকগুলোর কথাই তারা বর্ণনা করছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। সেই যুগে এটাও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, শয়তানরা ভবিষ্যত জানে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই পুস্তকগুলো বাক্সে ভরে পুঁতে ফেলার পর এই নির্দেশ জারী করেন যে, যে একথা বলবে তার মাথা কেটে নেয়া হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর জীনেরা ঐ পুস্তকগুলো তাঁর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে এবং ওর প্রথম পষ্ঠায় লিখে রাখেঃ “এই জ্ঞানভাণ্ডার ‘আসিফ বিন রখিয়া কর্তৃক সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি হযরত সুলাইমান বিন দাউদের (আঃ) প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট পরামর্শ দাতা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।” ইয়াহূদীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) নবী ছিলেন না, বরং যাদুকর ছিলেন। এই কারণেই উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর সত্য নবী (সঃ) অন্য এক সত্য নবীকে (আঃ) কালিমামুক্ত করেন এবং ইয়াহুদীদের বদ-আকীদার অসারতা ঘোষণা করেন। তারা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম নবীদের নামের তালিকাভুক্ত শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠতো। এজন্যেই এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) কষ্টদায়ক প্রাণী হতে কষ্ট না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই তারা কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকতো। অতঃপর জনগণ নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে যাদু মন্ত্র ইত্যাদির সম্বন্ধ হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। ওর অসারতা এই পবিত্র আয়াতে রয়েছে।এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই উত্তম। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, যাদু হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পূর্বেও ছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য কথা। হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত মুসা (আঃ)-এর পর যুগের নবী। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুকরদের বিদ্যমানতা কুরআন মাজীদ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আগমন হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে হওয়াও কুরআন কারীম দ্বারাই প্রকাশ পেয়েছে। হযরত দাউদ (আঃ) ও জালুতের ঘটনায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মূসা (আঃ)-এর পরে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আঃ) (আরবি)-এরও পূর্বে হযরত সালিহ (আঃ)কে তার কওম’ বলেছিলঃঅর্থাৎ তুমি যাদুকৃত লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৬:১৮৫)অতঃপর আল্লাহ বলেন (আরবি) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি না বাচক এবং ওর সংযোগ রয়েছে। (আরবি)-এর উপর। ইয়াহুদীদের আর একটি বদ-আকীদা ছিল এই যে, ফেরেশতাদের উপর যাদু অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতে তাকেই খণ্ডন করা হয়েছে (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। দ্বিবচনের উপরও বহু বচনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন- (আরবি)-এর মধ্যে রয়েছে। কিংবা তাদের অনুসারীদেরকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের দুজনের নাম খুবই অবাধ্যতার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) তো বলেন এটাই সঠিক ভাব। এছাড়া অন্য ভাব নেয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদু আল্লাহু, নাযিল করেননি। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে আয়াতের তরজমা হবে এইঃ ‘ঐ ইয়াহুদীরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করেছে যা শয়তানরা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগে পড়তো। হযরত সুলাইমান (আঃ) কুফরী করেনি, না আল্লাহ তা'আলা ঐ দু' ফেরেশতার উপর যাদু অবতীর্ণ করেছেন; (যেমন-হে ইয়াহুদী! জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈলের (আঃ) প্রতি তোমাদের ধারণা রয়েছে) বরং এ কুফরী ছিল শয়তানদের, যারা বাবেলে জনগণকে যাদু শিখাতো এবং তাদের সরদার ছিল মানুষ, যাদের নাম ছিল হারূত ও মারূত। হযরত আবদুর রহমান বিন আবৃজা (রঃ) নিম্নরূপ পড়তেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দাউদ ও সুলাইমান এই দু'বাদশাহর উপরেও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একে শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)। অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর হারুত ও মারূত দুজন ফেরেশতা। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিক্ষা দিতে ঐ দু'ফেরেশতাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই তারা আল্লাহর সে আদেশ পালন করেছিলেন।একটি দুর্বল মত এও আছে যে, এটা জ্বীনদের দু’টি গোত্র (আরবি) দু'বাদশাহর কিরআতে (আরবি)-এর অর্থ হবে সৃষ্টি করা। যেমন, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্যে। আট প্রকারের চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন।' (৩৯:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি লোহা সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৫) হাদীসের মধ্যেও (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আল্লাহ যতগুলো রোগ সৃষ্টি করেছেন, ওগুলোর ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। উপরোক্ত সব স্থানেই (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; আনা বা অবতীর্ণ করা অর্থে নয়। দ্রুপ এ আয়াতেও। পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীদের মাযহাব এই যে, এই দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। কেউ যেন এ প্রশ্ন উত্থাপন না করেন যে, ফেরেশতাগণ তো নিস্পাপ। তাদের দ্বারা তো পাপকার্য হতেই পারে না। অথচ জনগণকে যাদু শিক্ষা দেয়া, এতো কুফরী? এ প্রশ্ন উখিত হতে পারে না। কেননা, এ দু'জন ফেরেশতা সাধারণ ফেরেশতাগণ হতে পৃথক হয়ে যাবে, যেমন ইবলিস পৃথক হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কাবুল আহবার (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) এবং হযরত কালবী (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতগণ পরস্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোকে এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না-তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; তার পরে দেখা যাক তারা কি করে। তারা তখন হারূত ও মারূতকে হাজির করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি। আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং মদ্যপানও করবে না।তখন তারা দুজন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তাআলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।' তারা উত্তর দেয়ঃ ‘এটা আমাদের দ্বারা হবে না। সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো। তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোকে তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ - করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছে। তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই- আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মূসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হযরত নাফে' (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ যুহরা তারকাটি বের হয়েছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘না’। দুতিন বার প্রশ্নের পর বলেনঃ এখন উদিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) তখন বলেন ' ও যেন খুশিও না হয় এবং ওর আনন্দ লাভও যেন না হয়। হযরত নাফে (রাঃ) তখন তাকে বলেনঃ জনাব, একটি তারকা যা আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে উদিত ও অস্তমিত হয় তাকে আপনি মন্দ বলেন?' তিনি তখন বলেনঃ তবে শুনুন জনাব আমি ঐ কথাই বলছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হতে শুনেছি। অতঃপর উল্লিখিত হাদীসটি শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণনা করেন। কিন্তু এটাও গরীব বা দুর্বল। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সম্ভবতঃ এটা ইসরাঈলী বর্ণনাই হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রাঃ) হতেও এ ধরনের বহু বর্ণনা করা হয়েছে।কেউ কেউ বলেন যে, যুহরা একটি স্ত্রী লোক ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ ' তোমরা আমাকে ঐ দোআটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু বর্ণনায়ও এটা আছে; কিন্তু ওটা মুকার ও বে-ঠিক। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দুজন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবেলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তাতে হত্যা ও অবৈধ মালের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ হুকুমও ছিল যে,তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করে। এও এসেছে যে, তারা তিনজন ফেরেশতা ছিল। কিন্তু একজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে যায়। অতঃপর দু’জনের পরীক্ষা নেয়া হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এখানে বাবেল দ্বারা দুনিয়ায় অন্দের বাবেলকে বুঝান হয়েছে। স্ত্রীলোকটির নাম আরবী ভাষায় ছিল যুহরা’ বানতী ভাষায় ছিল ‘বেদখত্ এবং ফারসী ভাষায় ছিল ‘আনাহীদ'। এ স্ত্রীলোকেটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মোকাদ্দমা এনেছিল। যখন তারা তার সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছে করে তখন সে বলে-যদি আগে আমাকে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ফায়সালা দাও তবে আমি সম্মত আছি। তারা তাই করে। পুনরায় সে বলেঃ ‘তোমরা যা পড়ে আকাশে উঠে থাকো ও পড়ে নীচে নেমে আস ওটাও আমাকে শিখিয়ে দাও। তারা ওটাও তাকে শিখিয়ে দেয়। সে ওটা পাঠ করে আকাশে উঠে যায়। কিন্তু নীচে নেমে আসার দু’আ ভুলে যায়। সেখানেই তার দেহকে তারকায় রূপান্তরিত করা।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) কখনও যুহরা তারকা দেখলে তাকে অভিশাপ দিতেন। যখন এই ফেরেশতারা আকাশে উঠতে চাইলো কিন্তু উঠতে পারলো না। তখন তারা বুঝে নিলো যে, এখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম কিছুদিন তো এই ফেরেশতারা স্থিরই। ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতো এবং সন্ধ্যার পর। আকাশে উঠে যেতো। অতঃপর যুহরাকে দেখে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যুহরা তারকাকে একটি সুন্দরী স্ত্রীর আকৃতিতে তাদের নিকট। পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা, হারুত ও মারূতের এ ঘটনা তাবেঈগণের মধ্যেও বহু লোক বর্ণনা করেছেন। যেমন, মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) প্রভৃতি। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণও নিজ নিজ তাফসীরে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের কিতাবসমূহের উপর নির্ভরশীল। এ অধ্যায়ে কোন সহীহ মারফু মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ঈমান ওর উপরেই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআন মাজীদে আছে ওটাই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে, যাতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরলোক গমনের অল্প দিন পরে দাওমাতুল জানাল’ হতে একটি স্ত্রীলোক তার খোঁজে আগমন করে। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সে উদ্বিগ্ন হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- ব্যাপার কি? সে বলেঃ আমার মধ্যে ও আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় লেগেই থাকতো। একবার সে আমাকে ছেড়ে কোন্ অজানা জায়গায় চলে যায়। একটি বৃদ্ধার নিকট আমি এসব কিছু বর্ণনা করি। সে আমাকে বলে- “তোমাকে যা বলি তাই কর, সে আপনা আপনি চলে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে গেলাম। রাত্রে সে দুটি কুকুর নিয়ে আমার নিকট আগমন করে। একটির উপর সে আরোহণ করে এবং অপরটির উপর আমি আরোহণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা দু'জন বাবেলে চলে যাই। তথায় গিয়ে দেখি যে, দু’টি লোক শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় লটকানো রয়েছে। ঐ বৃদ্ধা আমাকে বলে-তাদের নিকট যাও ও বল-“আমি যাদু শিখতে এসেছি। আমি তাদেরকে একথা বলি। তারা বলে-‘জেনে রেখো, আমরা তো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। তুমি যাদু শিক্ষা করো যাদু শিক্ষা করা কুফরী।' আমি বলি-শিখবো। তারা বলে-“আচ্ছা, তাহলে যাও, ঐ চুল্লীর মধ্যে প্রস্রাব করে চলে এসো। আমি গিয়ে প্রস্রাবের ইচ্ছে করি, কিন্তু আমার অন্তরে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়, সুতরাং আমি ফিরে এসে বলিআমি কাজ সেরে এসেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে -“তুমি কি দেখলে আমি বলি-“কিছুই না। তারা বলে-“তুমি ভুল বলছে। এখন পর্যন্ত তুমি বিপথে চালিত হওনি। তোমার ঈমান ঠিক আছে, তুমি এখনও ফিরে যাও এবং কুফরী করো না। আমি বলি-“আমাকে যে যাদু শিখতেই হৰে। তারা পুনরায় আমাকে বলে-ঐ চুল্লীতে প্রস্রাব করে এসো। আমি আবার যাই। কিন্তু এবারও। মন চায় না, সুতরাং ফিরে আসি। আবার এভাবেই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। পুনরায় আমি চুল্লীর নিকট যাই এবং মনকে শক্ত করে প্রস্রাব করতে বসে পড়ি। আমি দেখি যে, একজন ঘোড়া সওয়ার মুখের উপর পর্দা ফেলে আকাশের উপর উঠে গেল। আমি ফিরে এসে তাদের নিকট এটা বর্ণনা করি। তারা বলে- 'হাঁ, এবার তুমি সত্য বলছে। ওটা তোমার ঈমান ছিল, যা তোমার মধ্য হতে বেরিয়ে গেল। এখন চলে যাও।আমি এসে ঐ বৃদ্ধাকে বলি- ‘তারা আমাকে কিছুই শিক্ষা দেয়নি। সে বলে- যথেষ্ট হয়েছে। তোমার নিকট সবই চলে এসেছে। এখন তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি পরীক্ষামূলকভাবে একটি গমের দানা নিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। অতঃপর বলি- গাছ হও।' ওটা গাছ হয়ে গেল। আমি বলি-- তোমাতে ডাল পাতা গজিয়ে যাক।' তাই হয়ে গেল। তার পর বলি- ‘শুকিয়ে যাও।' ডালপাতা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-‘পৃথক পৃথকভাবে দানা দানা হয়ে যাও। ওটা তাই হয়ে গেল। তারপরে আমি বলি-শুকিয়ে যাও। ওটা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-আটা হয়ে যাও।' আটা হয়ে গেল। আমি বলি-রুটি হয়ে যাও।' রুটি হয়ে গেল। এটা দেখেই আমি লজ্জিত হয়ে যাই এবং বে-ঈমান হয়ে যাওয়ার কারণে আমার খুবই দুঃখ হয়। হে উম্মুল মু'মিনীন! আল্লাহর শপথ! আমি যাদুর দ্বারা কোন কামও নেইনি এবং কারও উপর এটা প্রয়োগও করিনি। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাঁকে পেলাম না। এখন আমি কি করি?একথা বলেই সে পুনরায় কাঁদতে আরম্ভ করে এবং এত কাঁদে যে, সবারই মনে তার প্রতি দয়ার সঞ্চার হয়। তাকে কি ফতওয়া দেয়া যেতে পারে এ ব্যাপারে সাহাবীগণও (রাঃ) খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে তারা বলেন- এখন এ ছাড়া আর কি হবে যে, তুমি এ কাজ করবে না, তাওবা করবে এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর পিতা-মাতার খিদমত করবে। এই ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক।কেউ কেউ বলেন যে, যাদুর বলে প্রকৃত জিনিসই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, না, দর্শকের শুধু এর ধারণা হয়ে থাকে মাত্র, প্রকৃত জিনিস যা ছিল তাই থাকে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ অর্থাৎ তারা মানুষের চোখে যাদু করে দিয়েছে।' (আরবি) (৭:১১৬) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন অর্থাৎ (আরবি) হযরত মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হয়েছে যে, যেন ঐ সাপগুলো তাদের যাদুর বলে চলাফেরা করছে।' (২০:৬৬) এ ঘটনা দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াতে বাবেল’ শব্দ দ্বারা ইরাকের বাবেলকে বুঝানা হয়েছে, দুনিয়া অন্দের’ বাবেল নয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত আলী ইবনে আবূ তাবিল (রাঃ) বাবেলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসরের নামাযের সময় হলে তিনি তথায় নামায আদায় করলেন না, বরং বাবেলের সীমান্ত পার হয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমার প্রিয় রাসূল (সঃ) আমাকে গোরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বাবেলের ভূমিতেও নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এটা অভিশপ্ত ভূমি। সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসের উপর কোন সমালোচনা করেননি। আর যে হাদীসকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাবে নিয়ে আসেন এবং ওর সনদের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন ঐ হাদীস ইমাম সাহেবের মতে হাসান হয়ে থাকে। এর দ্বারা জানা গেল যে, বাবেলের ভূমিতে মামায পড়া মাকরূহ। যেমন সামুদ সম্প্রদায়ের ভূমি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তাদের বাস ভূমিতেও যেয়ো না। যদি ঘটনাক্রমে যেতেই হয়, তবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাও।আল্লাহ তা'আলা হারুত ও মারূতের মধ্যে ভাল-মন্দ, কুফর ও ঈমানের জ্ঞান দিয়ে রেখেছিলেন বলে তারা কুফরীর দিকে গমনকারীদের উপদেশ দিতো। এবং তাদেরকে ওটা হতে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু যখন কোনক্রমেই মানতো না তখন তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিখিয়ে দিতো। ফলে তাদের ঈমানের আলো বিদায় নিতে এবং যাদু চলে আসতো। শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যেতো। ঈমান বিদায় নেয়ার পর আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর নেমে আসতো। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, কাফির ছাড়া আর কেউ যাদু বিদ্যা শিখবার সৎ সাহস রাখতে পারে না (আরবি) শব্দের অর্থ এখানে বিপদ, আজমায়েশ ও পরীক্ষা। এ আয়াতের মাধ্যমে এটাও জানা গেল যে, যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা কুফরী। হাদীসের মধ্যেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহীর সাথে কুফরী করে। ( বার)'। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং-এর সমর্থনে অন্যান্য হাদীসও এসেছে।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, মানুষ হারুত ও মারূতের কাছে গিয়ে যাদু বিদ্যা শিক্ষা করতো। ফলে তারা খারাপ কাজ করতো এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ শয়তান তার সিংহাসনটি পানির উপর রাখে। অতঃপর মানুষকে বিপথে চালানোর জন্যে সে তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়। সেই তার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত যে হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে সবচেয়ে বেড়ে যায়। এরা ফিরে এসে নিজেদের জঘন্যতম কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়। কেউ বলেঃ আমি অমুককে এভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছি। কেউ বলেঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে এ পাপ কার্য করিয়েছি। শয়তান তাদেরকে বলেঃ ‘বো কিছুই করনি। এতো সাধারণ কাজ। অবশেষে একজন এসে বলেঃ আমি একটি নোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, এমনকি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। শয়তান তখন তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলেঃ হ, তুমি বড় কাজ করেছে। সে তাকে পার্শ্বে বসিয়ে নেয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।' যাদুকরও তার যাদুর দ্বারা ঐ কাজই করে থাকে, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি হয়। যেমন তার কাছে স্ত্রীর আকৃতি খারাপ মনে হবে কিংবা তার স্বভাব চরিত্রকে সে ঘৃণা করবে অথবা অন্তরে শত্রুতার ভাব জেগে যাবে ইত্যাদি। আস্তে আস্তে এসব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিচ্ছেদই ঘটে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যাদু দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন ক্ষতি সাধিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি সাধন করা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই নেই। আল্লাহর ভাগ্য লিখন অনুযায়ী তার ক্ষতিও হতে পারে, আবার তার ইচ্ছে হলে যাদু নিষ্ক্রিয়ও হতে পারে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যাদু শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিরই ক্ষতি করে থাকে, যে ওটা লাভ করে ওর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা এমন জিনিস শিক্ষা করে যা তাদের জন্যে শুধু ক্ষতিকারক, যার মধ্যে উপকার মোটেই নেই। ঐ ইয়াহুদীরা জানে যে,যারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) আনুগত্য ছেড়ে যাদুর পিছনে লেগে থাকে তাদের জন্যে আখেরাতের কোনই অংশ নেই। তাদের না আছে আল্লাহর কাছে কোন সম্মান, না তাদেরকে ধর্মভীরু মনে করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তাদের এ মন্দ কাজের অনুভূতি হতো এবং ঈমান এনে খোদাভীরুতা অবলম্বন করতো তবে ওটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। কিন্তু এরা অজ্ঞান ও নির্বোধ।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “জ্ঞানীগণ বলে- তোমাদের জন্যে আফসোস! আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্যে বড়ই উত্তম, কিন্তু ওটা একমাত্র ধর্মশীলগণই পেয়ে থাকে।হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) ও পূর্ব যুগীয় মনীষীদের একটি দল যাদু বিদ্যা শিক্ষার্থীকে কাফির বলেছেন। কেউ কেউ কাফির তো বলেন না, কিন্তু বলেন যে, যাদুকরকে হত্যা করাই হচ্ছে তার উপযুক্ত শাস্তি। হযরত বাজালাহ বিন উবাইদ (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক নির্দেশ নামায় লিখেছিলেনঃ যাদুকর পুরুষ বা স্ত্রীকে তোমরা হত্যা করে দাও।' এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিনজন যাদুকরের গর্দান উড়িয়েছি।'সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) উপর তার দাসী যাদু করেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন যে, তিনজন সাহাবী (রাঃ) হতে যাদুকরকে হত্যা করার ফতওয়া রয়েছে। জামে' উত তিরমিযীর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন মুসলিম দুর্বল। সঠিক কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। কিন্তু তাবরানীর হাদীসের মধ্যে অন্য সনদেও এ হাদীসটি মার' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ' ওয়ালীদ বিন উকবার নিকট একজন যাদুকর ছিল, সে তার যাদু কার্য বাদশাহকে দেখাতো। সে প্রকাশ্যভাবে একটি লোকের মাথা কেটে নিতো। অতঃপর একটা শব্দ করতো, আর তখনই মাথা জোড়া লেগে যেতো মুহাজির সাহাবাগণের (রাঃ) মধ্যে একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী (রাঃ) ওটা দেখেন এবং পরের দিন তরবারি নিয়ে আসেন। যাদুকর খেলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তিনি স্বয়ং যাদুকরেরই মাথা কেটে ফেলেন এবং বলেনঃ “তুমি সত্যবাদী হলে নিজেই জীবিত হয়ে যাও।' অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ “তোমরা যাদুর নিকট যাচ্ছ ও তা দেখছো?' ঐ সাহাবী (রাঃ) ওয়ালীদের নিকট হতে তাকে হত্যা করার অনুমতি নেননি বলে বাদশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) নির্দেশ ও হযরত হাফসার (রাঃ) ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন যে, ঐ হুকুম ঐ সময় কার্যকরী হবে যখন যাদুর মধ্যে শিরক যুক্ত শব্দ থাকবে। মু'তাযিলা সম্প্রদায় যাদুর অস্তিত্বই মানে না। তারা বলে যে,যারা যাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা কাফির। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যাদুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তারা স্বীকার করে যে, যাদুকর তার যাদুর বলে বাতাসে উড়তে পারে, মানুষকে বাহ্যতঃ গাধা ও গাধাকে বাহ্যতঃ মানুষ করে ফেলতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট কথাগুলো মন্ত্রতন্ত্র পড়ার সময় ঐগুলো সৃষ্টিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আকাশকে ও তারকাকে ফলাফল সৃষ্টিকারী মানে না। দার্শনিকেরা, জোতির্বিদেরা এবং বে-দ্বীনেরা তো তারকা ও আকাশকেই ফলাফল সৃষ্টিকারী মেনে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রথম দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ তারা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা। তৃতীয় দলীল হচ্ছে ঐ স্ত্রী লোকটির ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আরও এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, যাদু বিদ্যা লাভ করা দুষনীয় নয়। মাসয়ালা বিশ্লেষণকারীগণের এটাই অভিমত। কেননা, এটাও একটা বিদ্যা। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, এরা কি সমান?’ আর এ জন্যেও যাদু বিদ্যা শিক্ষা দুষণীয় নয় যে, তার দ্বারা মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পূর্ণভাবে পার্থক্য করা যায় এবং মু'জিযার জ্ঞান ওয়াজিব ও ওটা নির্ভর করে যাদু বিদ্যার উপর, যার দ্বারা পার্থক্য বুঝা যায়। সুতরাং যাদু বিদ্যা শিক্ষা করাও ওয়াজিব হয়ে গেল। ইমাম রাযীর (রাঃ) একথা"গোড়া হতে আগা পর্যন্ত ভুল। বিবেক হিসেবে যদি তিনি ওটাকে খারাপ না বলেন তবে মু'তাযিলা সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে, যারা ওকে বিবেক হিসেবেও খারাপ বলে থাকে। আর যদি শরীয়তের দিক দিয়ে খারাপ না বলেন তবে কুরআন মাজীদের এ শারঈ আয়াত ওকে খারাপ বলার জন্যে যথেষ্ট। সহীহ হাদীসে রয়ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন যাদুকর বা গণকের নিকট গমন করে সে কাফির হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম রাযীর (র) উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর একথা বলা যে, মুহাককিকগণের অভিমত এটাই’ এটাও ঠিক নয়। মুহাকিকগণের এরূপ কথা কোথায় আছে? ইসলামের ইমামগণের মধ্যে কে এ কথা বলেছেন? অতঃপর যারা জানে এবং জানে না, তারা কি সমান?' এ আয়াতটিকে দলীলরূপে পেশ করা হঠধমী ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এ আয়াতের ‘ইলম এর ভাবার্থ হচ্ছে ধর্মীয় ‘ইলম। এ আয়াতে শারঈ আলেমগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তার এ কথা বলা যে, এর দ্বারা মু'জিযার ‘ইলম লাভ হয়, এটা একেবারে বাজে কথা। কেননা, আমাদের রাসূল (সঃ)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন, যা বাতিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু তার মু'জিযা জানা যাদু জানার উপর নির্ভরশীল নয়। ঐ সব লোক যাদের যাদুর সঙ্গে দূরের সম্পর্ক নেই তারাও এটাকে মু'জিযা বলে স্বীকার করেছেন। সাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ, ইমামগণ এমনকি সাধারণ মুসলমানগণও একে মু'জিযা মেনে থাকেন। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কখনও যাদু জানা তো দূরের কথা, ওর কাছেই যাননি। তাঁরা ওটা নিজে শিক্ষা করেননি এবং অপরকেও শিক্ষা দেননি। তাঁরা যাদু করেননি এবং করাননি। বরং এসব কাজকে তারা কুফরই বলে এসেছেন। অতঃপর এ দাবী করা যে, মু'জিযা জানা ওয়াজিব এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য যাদুর উপর নির্ভর করে, সুতরাং যাদু শিখাও ওয়াজিব হলো, এটা কতই না অর্থহীন দাবী! যাদু বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে, যা আবু আব্দিল্লাহ রাফী বর্ণনা করেছেন।(১) প্রথম যাদু হচ্ছে তারকা পূজকদের। তারা সাতটি গতিশীল তারকার উপর বিশ্বাস রাখে যে, ভাল-মন্দ ওদের কারণেই হয়ে থাকে। এ জন্যে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট শব্দ পাঠ করতঃ ওদের পূজা করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগমন করেন এবং হিদায়াত করেন। ইমাম রাযী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি বিশিষ্ট পুস্তক রচনা করেছেন এবং ওর নাম (আরবি)রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, পরে তিনি ওটা হতে তাওবা করেছেন।আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি শুধু জানাবার জন্যে এবং তার এই বিদ্যা প্রকাশ করার জন্যেই এ পুস্তক লিখেছেন, এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস নেই। কেননা এটা সরাসরি কুফরী।(২) দ্বিতীয় যাদু হচ্ছে ধারণা শক্তির উপর বিশ্বাসী লোকদের যাদু। ধারণা ও খেয়ালের বড় রকমের প্রভাব রয়েছে। যেমন একটি সংকীর্ণ সাঁকো মাটির উপর রেখে দিলে মানুষ অনায়াসেই তার উপর দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সঁকোটি যদি নদীর উপর হয় তবে মানুষ আর তার উপর দিয়ে চলতে পারে না। কেননা ধারণা হয় যে, এখনই পড়ে যাবে। ধারণার এই দুর্বলতার কারণেই যেটুকু জায়গার উপর দিয়ে মাটিতে চলতে পারছিল, ঐ জায়গার উপর দিয়েই এরকম ভয়ের সময় চলতে পারে না। এ জন্যেই হেকিমগণ ও ডাক্তারগণ ভীত লোককে লাল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখেন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত লোককে খুব বেশী আলোকময় ও দ্রুত গতিসম্প দেখতে নিষেধ করে থাকেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, উপর ধারণার একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। জ্ঞানীগণ এ বিষয়েও একমত যে, ন্যর’ লেগে থাকে। সহীহ হাদীসেও এসেছে যে, নযর’ লাগা সত্য। ভাগ্যের উপর যদি কোন জিনিস প্রাধান্য লাভকারী হতো তবে তা ন্যই ইতো। এখন যদি নাফস্ শক্ত হয় তবে বাহ্যিক সাহায্য ও বাহ্যিক কার্যের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি নাফস ততো শক্ত না হয় তবে ঐ সব যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। নাফসের যে পরিমাণ শক্তি বেড়ে যাবে সেই পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। আর যে পরিমাণ এ শক্তি কম হবে সে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তিও কমে যাবে।এ শক্তি কখনও কখনও খাদ্যের স্বল্পতা এবং জনগণের মেলামেশা ত্যাগ করার মাধ্যমেও লাভ হয়ে থাকে। কখনও তো মানুষ এ শক্তির দ্বারা শরীয়ত। অনুযায়ী পুণ্যের কাজ করে থাকে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘কারামত’ বলে, যাদু বলে না। আবার কখনও কখনও মানুষ এ শক্তি দ্বারা বাতিল ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজ করে থাকে এবং দ্বীন হতে বহু দূরে সরে পড়ে। এ রকম লোকের ঐ অলৌকিক কার্যাবলী দেখে প্রতারিত হয়ে তাকে ওয়ালী বলা কারও উচিত নয়। কেননা, যারা শরীয়তের উল্টো কাজ করে তারা কখনও আল্লাহর ওয়ালী হতে পারে না। তা নাহলে সহীহ হাদীস সমূহে দাজ্জালদেরকে অভিশপ্ত ও দুষ্ট বলা হতো না। অথচ তারা তো বহু অলৌকিক কাজ করে দেখাবে।(৩) তৃতীয় যাদু হচ্ছে জ্বীন প্রভৃতি পার্থিব আত্মসমূহের দ্বারা সহায্য প্রার্থনা করা। দার্শনিকরা ও মুতাযেলীরা এটা স্বীকার করে না। কতগুলো লোক এসব পার্থিব আত্মার মাধ্যমে কতকগুলো শব্দ ও কার্যের দ্বারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। ওকে মোহমন্ত্র ও প্রেতাত্মার যাদুও বলা হয়।(৪) চতুর্থ প্রকারের যাদু হচ্ছে ধারণা বদলিয়ে দেয়া, নযরবন্দ করা এবং প্রতারিত করা,যার ফলে প্রকৃত নিয়মের উল্টো কিছু দেখা যায়। কলাকৌশলের মাধ্যমে কার্য প্রদর্শনকারীকে দেখা যায় যে, সে প্রথমে একটা কাজ আরম্ভ করে, যখন মানুষ একাগ্র চিত্তে ওর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায়, তখন তড়িৎ করে সে আর একটি কাজ আরম্ভ করে দেয়, যা মানুষের দৃষ্টির অন্তারলে থেকে যায়। তা দেখে তারা তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদু এ প্রকারেরই ছিল। এ জন্যেই কুরআন পাকে রয়েছেঃ “তারা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের অন্তরে ভয় বসিয়ে দেয়। অন্য স্থানে রয়েছেঃ মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, ঐ সব লাঠি ও দড়ি যেন সাপ হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এরূপ ছিল না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (৫) পঞ্চম প্রকারের যাদু হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণে একটি জিনিস তৈরী করা এবং এর দ্বারা আশ্চর্যজনক কাজ নেয়া। যেমন, ঘোড়ার আকৃতি তৈরী করে দিল। ওর উপর একজন কৃত্রিম আরোহী বসিয়ে দিল যার হাতে বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। এক ঘন্টা অতিবাহিত হতেই ওর মধ্য হতে শব্দ বের হতে লাগল। অথচ কেউই ওকে বাজাচ্ছে না। এরূপভাবেই এমন নিপুণতার সাথে মানুষের ছবি বানালো যে, মনে হচ্ছে যেন প্রকৃত মানুষই হাসছে বা কাঁদছে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদুও এই প্রকারেরই ছিল। তাদের কৃত্রিম সাপগুলো পারদ জাতীয় দ্রব্য দিয়ে তৈরী ছিল বলে মনে হতো যেন জীবিত সাপ নড়াচড়া করছে। ঘড়ি, ঘন্টা এবং ছোট ছোট জিনিস, যা থেকে বড় বড় জিনিস বেরিয়ে আসে, এসবগুলোই এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে একে যাদু বলা উচিত নয়। কেননা, এটা তো এক প্রকার নির্মাণ ও কারিগরি, যার কারণগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ্য। যে ওটা জানে সে এসব শব্দ দ্বারা একাজ করতে পারে। যে ফন্দি বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টানেরা করতো ওটাও এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। ঐ ফন্দি এই যে, তারা গোপনে গির্জার প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিতো। অতঃপর ওকে গির্জার মাহাত্ম্য বলে প্রচার করতঃ জনগণকে তাদের ধর্মে টেনে আনতো।কতক কারামিয়াহ ও সুফিয়্যাহ সম্প্রদায়েরও ধারণা এই যে, জনগণকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শনের হাদীসগুলো বানিয়ে নিলে কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা চরম ভুল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন দোযখে তার স্থান ঠিক করে নেয়।' তিনি আরও বলেনঃ ‘আমার হাদীসগুলো তোমরা বর্ণনা করতে থাকো; কিন্তু আমার নামে মিথ্যা কথা বলো না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামী।'একজন খ্রীষ্টান পাদরী একদা দেখে যে, পাখীর একটি ছোট বাচ্চা যা উড়তে পারে না, একটি বাসায় বসে আছে। যখন ওটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বর বের করছে তখন অন্যান্য পাখীরা ওর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে যাইতুন ফল এনে ওর বাসায় রেখে দিচ্ছে। ঐ পাদরী কোন জিনিস দিয়ে ঐ আকারেরই একটি পাখী তৈরী করে। ওর নীচের দিক ফাপা রাখে এবং ওর ঠোটের দিকে একটি ছিদ্র রাখে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করে। অতঃপর যখন বাতাস বের হয় তখন ঐ পাখীর মতই শব্দ করে। ওটা নিয়ে গিয়ে সে গির্জার মধ্যে বাতাস মুখো রেখে দেয়। ছাদে একটি ছোট ছিদ্র করে দেয় যেন বাতাস সেখান দিয়ে যাতায়াত করে। এখন যখনই বাতাস বইতে থাকে তখনই ওটা হতে শব্দ বের হতে থাকে। আর এ শব্দ শুনে ঐ প্রকারের পাখী তথায় একত্রিত হয় এবং যাইতুন’ ফল এনে এনে রেখে যায়। ঐ পাদরী তখন প্রচার করতে শুরু করে যে, গির্জার মধ্যে এটা এক অলৌকিক ব্যাপার। এখানে একজন মনীষীর সমাধি রয়েছে এবং এটা তাঁরই কারামত। এখন জনগণ স্বচক্ষে এটা দেখে বিশ্বাস করে নেয়। অতঃপর তারা ঐ কবরের উপর ন্যর-নিয়ায আনতে থাকে এবং এই কারামত বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অথচ ওটা না ছিল কারামত, না ছিল মু'জিযা। বরং শুধুমাত্র ছিল ওটা একটা গোপনীয় বিষয় যা সেই পাদরী; একমাত্র তার পেট পূরণের জন্যেই গোপনীয়ভাবে করে রেখেছিল। আর ঐ অভিশপ্ত দল ওতেই লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।(৬) যাদুর ষষ্ঠ প্রকার হচ্ছে কতকগুলো ওষুধের গোপন কোন বৈশিষ্ঠ্য জেনে ওটা কাজে লাগানো। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে,এতে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :রয়েছে। চুম্বককেই তো দেখা যায় যে, ওটা কিভাবে লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। অধিকাংশ সূফী ও দরবেশই ঐ ফন্দি ফিকিরকেই জনগণেরই মধ্যে কারামত রূপে প্রদর্শন করতঃ তাদেরকে মুরীদ করতে থাকে।(৭) সপ্তম প্রকারের যাদু হচ্ছে কারও মধ্যে একটা বিশেষ প্রভাব ফেলে যা চায় তাই তার দ্বারা করিয়ে নেয়া। যেমন তাকে বলে যে, তার “ইসমে আযম . মনে আছে কিংবা জ্বিনেরা তার তাবে আছে। এখন যদি তার সামনে লোকটি দুর্বল ঈমানের লোক হয় এবং অশিক্ষিত হয় তবে তো সে তাকে বিশ্বাস করে নেবে এবং তার প্রতি তার একটা ভয় ও সম্ভ্রম থাকবে যা তাকে আরও দুর্বল করে দেবে। এখন সে যা চাইবে তাই সে করবে। আর এই প্রভাব সাধারণতঃ স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির উপরই পড়ে থাকে। একেই মুতাবান্নাহ’ বলা হয়। আর অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে জ্ঞানী ও অজ্ঞানকে চিনতে পারে, কাজেই সে নিরেটের উপরই তার ক্রিয়া চাপিয়ে থাকে।(৮) অষ্টম প্রকারের যাদু হচ্ছে চুগলী করা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কারও অন্তরে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং গোপনীয় চতুরতা দ্বারা তাকে বশীভূত করা। এ চুগলী যদি মানুষের মধ্যে শক্রতা সৃষ্টির জন্যে হয় তবে এটা শরীয়ত অনুযায়ী হারাম হবে। আর যদি এটা সংশোধন করার উদ্দেশ্যে হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মিলনের জন্যে হয় কিংবা এর ফলে যদি মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি আগত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং কাফিরদের শক্তি নষ্ট করতঃ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা যায় তবে এটা বৈধ হবে। যেমন হাদীস শরীফে আছে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মঙ্গলের জন্যে এদিক ওদিক কথা নিয়ে যায়। হাদীসে আরও আছে যে, যুদ্ধ হচ্ছে প্রতারণার নাম। হযরত নঈম বিন মাসউদ (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে আরবের কাফির ও ইয়াহূদীদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথার মাধ্যমে বিচ্ছেদ আনয়ন করেছিলেন এবং এরই ফলে মুসলমানদের নিকট তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইমাম রাযী যে যাদুর এই আটটি প্রকার বর্ণনা ; করেছেন তা শুধু শব্দ হিসেবে। কেননা আরবী ভাষায় (আরবি) বা যাদু প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল হয় এবং যার কারণসমূহ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এজন্যেই একটি হাদীসে আছে যে, কোন কোন বর্ণনাও যাদু। আর এ কারণেই সকালের প্রথম ভাগকে ‘সহুর’ বলা হয়। কেননা, ওটা মানুষের চক্ষুর অন্তরালে থাকে। আর ঐ শিরাকের ‘সিহর’ বলে যা আহার্যের স্থানে থাকে। আবু জেহেলও বদরের যুদ্ধে বলেছিল যে, তার খাদ্যের শিরা ভয়ে ফুলে গেছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার সিহর’ ও ‘নাহারের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাহলে সিহূরের অর্থ হচ্ছে খাদ্যের শিরা এবং নাহারের অর্থ হচ্ছে বুক। কুরআন পাকে আছেঃ “তারা (যাদুকরেরা) মানুষের চক্ষু থেকে তাদের কার্যাবলী গোপন রেখেছিল। আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমরা বলি যে, যাদু আছে এবং এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহকে মঞ্জর হলে তিনি যাদুর সময় যা চান তাই ঘটিয়ে থাকেন। যদিও মুতাযিলা, আবু ইসহাক ইসফিরাঈনী এবং ইমাম শফিঈ (রঃ) এটা বিশ্বাস করেন না।' যাদু কখনও হাতের চালাকি দ্বারাও হয়ে থাকে আবার কখনও ভোরা, সুতা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। কখনও আল্লাহর নাম পড়ে ফু দিলেও একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। কখনও শয়তানের নাম নিয়ে শয়তানী কার্যাবলী দ্বারাও লোক যাদু করে থাকে। কখনও ঔষধ ইত্যাদি দ্বারাও যাদু করা হয়।"রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেনঃ কতকগুলো বর্ণনাও যাদু' এর দুটোই ভাবার্থ হতে পারে। হয়তো তিনি এটা বর্ণনাকারীর প্রশংসার জন্যে বলেছেন, কিংবা তার নিন্দে করেও বলে থাকতে পারেন যে, সে তার মিথ্যা কথাকে এমন ভঙ্গিমায় বর্ণনা করছে যে, তা সত্য মনে হচ্ছে। মন্ত্রী আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মদ বিন হাবীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল আশরাফু আ'লা মাযাহিবিল আশরাফে’ এর মধ্যে যাদু অধ্যায়ে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এটা স্বীকার করেননি। যারা যাদু শিক্ষা করে ও ওটা ব্যবহার করে তাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ), এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) কাফির বলেছেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) কয়েকজন শিষ্যের মতে যাদু যদি আত্মরক্ষার জন্যে কেউ শিক্ষা করে তবে সে কাফির হবে না। তবে হ, যারা ওর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ওকে উপকারী মনে করে সে কাফির। অনুরূপ ভাবে যারা ধারণা করে যে, শয়তানরা এ কাজ করে থাকে এবং তারা এরকম ক্ষমতা রাখে, তারাও কাফির।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, যদি তারা বাবেলবাসীদের মত বিশ্বস রাখে এবং সাতটি গতিশীল তারকাকে প্রভাব সৃষ্টিকারীরূপে বিশ্বাস করে তবে তারা কাফির। আর যদি এ না হয়, কিন্তু যাদুকে বৈধ মনে করে তবে তারাও কাফির। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) অভিমত এও আছে যে, যারা যাদু করে এবং ওকে ব্যবহারে লাগায় তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যে পর্যন্ত বারবার না করে কিংবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে নিজে স্বীকার না করে সেই পর্যন্ত হত্যা করা হবে না।তিনজন ইমামই বলেন যে, তার হত্যা হচ্ছে শাস্তির জন্যে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে এ নির্দেশ আছে যে, যাদুকরকে তাওবাও করানো হবে না এবং তার তাওবা করার ফলে তার শাস্তি লোপ পাবে না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মতে তার তাওবা গৃহীত হবে। একটি বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) এ উক্তি আছে। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মতে কিতাবীদের যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য তিনজন ইমামের অভিমত এর উল্টো। লাবীদ বিন আসাম নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করেছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি। যদি কোন মুসলমান মহিলা যাদু করে তবে তার সম্বন্ধে ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মত এই যে, তাকে বন্দী করা হবে। আর অন্যান্য তিনজন ইমামের মতে পুরুষের মত তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন। হযরত যুহরীর (রঃ) মতে মুসলমান যাদুকরকে হত্যা করা হবে,কিন্তু মুশরিক যাদুকরকে হত্যা করা হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি কোন যিম্মীর যাদুর ফলে কেউ মারা যায় তবে যিম্মীকেও মেরে ফেলা হবে। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রথমে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করতঃ ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা ভালই, নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। আবার তার হতে এও বর্ণিত আছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে হত্যা করা হবে।যে যাদুকরের যাদুতে শিরকী শব্দ আছে, চারজন ইমামই তাকে কাফির বলেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের উপর প্রভুত্ব লাভ করার পর যদি সে তাওবা করে তবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন যিন্দীক সম্প্রদায়। তবে যদি তার উপর প্রভুত্ব লাভের পূর্বেই তারা তাওবা করে তা হলে হবে। আর যদি তার যাদুতে কেউ মারা যায় তবে তো তাকে হত্যা করা হবেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি সে বলেঃ আমি মেরে ফেলার জন্যে যাদু করিনি। তবে ভুল করে হত্যার অপরাধে তার নিকট হতে জরিমানা আদায় করা হবে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) যাদুকরের দ্বারা যাদু উঠিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন, যেমন সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। হযরত আমের শা'বীও এটাকে কোন দোষ মনে করেন না। কিন্তু খাজা হাসান বসরী (রঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আপনি যাদু তুলিয়ে নেন না কেন? তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তো আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি লোকের উপর মন্দ খুলিয়ে নিতে ভয় করি।' যাদুর চিকিৎসাহযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, কুলের সাতটি পাতা পাটায় বেটে পানিতে মিশাতে হবে। অতঃপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ওর উপর ফু দিতে হবে এবং যাদুকৃত ব্যক্তিকে তিন ঢাকে পানি পান করাতে হবে এবং অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে। ইনশাআল্লাহ্ যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এ আমল বিশেষভাবে ঐ ব্যক্তির জন্যে খুবই মঙ্গলজনক যাকে তার স্ত্রী থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যাদু ক্রিয়া নষ্ট করার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি) এ সূরাগুলো। হাদীস শরীফে আছে যে, এই সূরাগুলোর চেয়ে বড় রক্ষাকবচ আর কিছু নেই। এরকমই আয়াতুল কুরসীও শয়তানকে দূর করার জন্য বড়ই ফলদায়ক।
আল-বাকারা 2:103
৯৯-১০৩ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ) আমি এমন এমন নিদর্শনাবলী তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি যা তোমার নবুওয়াতের জন্যে প্রকাশ্য দলীল হতে পারে। ইয়াহুদীদের বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডার তাওরাতের গোপনীয় কথা, তাদের পরিবর্তনকৃত আহকাম ইত্যাদি সব কিছুই আমি এই অলৌকিক কিতাব কুরআন মাজীদের মধ্যে বর্ণনা করেছি। ওটা শুনে প্রত্যেক জীবিত অন্তর তোমার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ইয়াহূদীরা যে হিংসা-বিদ্বেষ বশতঃ মানছে না ওটা অন্য কথা। নতুবা প্রত্যেক লোকই এটা বুঝতে পারে যে, একজন নিরক্ষর লোক কখনও এরকম পবিত্র অলংকার ও নিপুণতাপূর্ণ কথা বানাতে পারে না।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবনে সুরিয়া কাতভীনী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বলেছিল ও ‘আপনি এমন কোন সৌন্দর্য ও দর্শন পূর্ণবাণী আনতে পারেন নি যা দ্বারা আপনার নবুওয়াতের পরিচয় পেতে পারি বা কোন জ্বলন্ত প্রমাণও আপনার নিকট নেই।' তখনই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট শেষ নবী (সঃ)-কে স্বীকার করার উপর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা তারা অস্বীকার করেছিল বলে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করা, এটা তো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অভ্যাস, বরং তাদের অধিকাংশের অন্তর তো ঈমান থেকেই শূন্য।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ফেলে দেয়া। ইয়াহূদীরা আল্লাহর কিতাবকে এবং তার অঙ্গীকারকে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছিল যে, যেন তারা তা ফেলেই দিয়েছিল। এ জন্যেই তাদের নিন্দের ব্যাপারে এ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছেঃ তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা বিদ্যমান পেয়ে থাকে। এখানেও আল্লাহ পাক বলেছেন যে, যখন তাদের একটি দল কিতাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতঃ ওকে এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন সে জানেই না। বরং যাদুর পিছনে লেগে পড়ে। এমনকি মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরও যাদু করে। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)কে এটা জানিয়ে দেন এবং ওর ক্রিয়া নষ্ট করতঃ তাকে আরোগ্য দান করেন। তাওরাতের মাধ্যমে তো তারা তাঁর মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, ওটা তো তার সত্যতা প্রমাণকারী। সুতরাং ওটাকে তারা পরিত্যাগ করতঃ অন্য কিতাব গ্রহণ করে ওর পিছনে লেগে পড়ে। আল্লাহর কিতাবকে তারা এমনভাবে ছেড়ে দেয় যে, যেন তারা ওর সম্বন্ধে কিছু জানতই না। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তারা আল্লাহর কিতাবকে তাদের পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে। এও বলা হয়েছে যে, গান-বাজনা, খেল-তামাশা এবং আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখে এমন প্রত্যেক জিনিসই (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘটনা এবং যাদুর মূল তত্ত্বের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। পায়খানায় গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রী জারাদার নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জ্বীন তার রূপ ধরে তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জ্বীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কার্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তার স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।' হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার বলে তিনি বাতাস ও জ্বীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জ্বীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাঁকে যাদুকর বলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা অস্বীকার করেন এবং আল্লাহর ফরমান জারী হয় যে, যাদু বিদ্যার এ কুফরী শয়তানরা ছড়িয়ে ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক আগমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা হতে আসছো?' সে বলেঃ ইরাক ইতে। তিনি বলেনঃ ইরাকের কোন শহর হতে?' সে বলেঃ কুফা হতে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তথাকার সংবাদ কি?' সে বলেঃ তথায় আলোচনা হচ্ছে যে, হযরত আলী (রাঃ) মারা যাননি; বরং তিনি জীবিত আছেন এবং সত্বরই আসবেন। একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেঁপে উঠেন এবং বলেনঃ ‘এটা সত্য হলে আমরা তাঁর মীরাস বন্টন করতাম না। আর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করতাম। শুন! শয়তানরা আকাশবানী চুরি করে শুনে নিতে এবং তাদের নিজস্ব কথা মিলিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সব পুস্তক জমা করে তার সিংহাসনের নীচে পুঁতে দেন। তার মৃত্যুর পর জ্বীনেরা পুনরায় তা বের করে নেয়। ঐ পুস্তকগুলো ইরাকের মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং ঐ পুস্তকগুলোর কথাই তারা বর্ণনা করছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। সেই যুগে এটাও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, শয়তানরা ভবিষ্যত জানে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই পুস্তকগুলো বাক্সে ভরে পুঁতে ফেলার পর এই নির্দেশ জারী করেন যে, যে একথা বলবে তার মাথা কেটে নেয়া হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর জীনেরা ঐ পুস্তকগুলো তাঁর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে এবং ওর প্রথম পষ্ঠায় লিখে রাখেঃ “এই জ্ঞানভাণ্ডার ‘আসিফ বিন রখিয়া কর্তৃক সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি হযরত সুলাইমান বিন দাউদের (আঃ) প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট পরামর্শ দাতা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।” ইয়াহূদীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) নবী ছিলেন না, বরং যাদুকর ছিলেন। এই কারণেই উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর সত্য নবী (সঃ) অন্য এক সত্য নবীকে (আঃ) কালিমামুক্ত করেন এবং ইয়াহুদীদের বদ-আকীদার অসারতা ঘোষণা করেন। তারা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম নবীদের নামের তালিকাভুক্ত শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠতো। এজন্যেই এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) কষ্টদায়ক প্রাণী হতে কষ্ট না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই তারা কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকতো। অতঃপর জনগণ নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে যাদু মন্ত্র ইত্যাদির সম্বন্ধ হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। ওর অসারতা এই পবিত্র আয়াতে রয়েছে।এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই উত্তম। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, যাদু হযরত সুলাইমান (আঃ) এর পূর্বেও ছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য কথা। হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত মুসা (আঃ)-এর পর যুগের নবী। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুকরদের বিদ্যমানতা কুরআন মাজীদ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আগমন হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে হওয়াও কুরআন কারীম দ্বারাই প্রকাশ পেয়েছে। হযরত দাউদ (আঃ) ও জালুতের ঘটনায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মূসা (আঃ)-এর পরে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আঃ) (আরবি)-এরও পূর্বে হযরত সালিহ (আঃ)কে তার কওম’ বলেছিলঃঅর্থাৎ তুমি যাদুকৃত লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৬:১৮৫)অতঃপর আল্লাহ বলেন (আরবি) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি না বাচক এবং ওর সংযোগ রয়েছে। (আরবি)-এর উপর। ইয়াহুদীদের আর একটি বদ-আকীদা ছিল এই যে, ফেরেশতাদের উপর যাদু অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতে তাকেই খণ্ডন করা হয়েছে (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটি (আরবি) হতে (আরবি) হয়েছে। দ্বিবচনের উপরও বহু বচনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন- (আরবি)-এর মধ্যে রয়েছে। কিংবা তাদের অনুসারীদেরকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের দুজনের নাম খুবই অবাধ্যতার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) তো বলেন এটাই সঠিক ভাব। এছাড়া অন্য ভাব নেয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদু আল্লাহু, নাযিল করেননি। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে আয়াতের তরজমা হবে এইঃ ‘ঐ ইয়াহুদীরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করেছে যা শয়তানরা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগে পড়তো। হযরত সুলাইমান (আঃ) কুফরী করেনি, না আল্লাহ তা'আলা ঐ দু' ফেরেশতার উপর যাদু অবতীর্ণ করেছেন; (যেমন-হে ইয়াহুদী! জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈলের (আঃ) প্রতি তোমাদের ধারণা রয়েছে) বরং এ কুফরী ছিল শয়তানদের, যারা বাবেলে জনগণকে যাদু শিখাতো এবং তাদের সরদার ছিল মানুষ, যাদের নাম ছিল হারূত ও মারূত। হযরত আবদুর রহমান বিন আবৃজা (রঃ) নিম্নরূপ পড়তেনঃ (আরবি) অর্থাৎ দাউদ ও সুলাইমান এই দু'বাদশাহর উপরেও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একে শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)। অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর হারুত ও মারূত দুজন ফেরেশতা। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিক্ষা দিতে ঐ দু'ফেরেশতাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই তারা আল্লাহর সে আদেশ পালন করেছিলেন।একটি দুর্বল মত এও আছে যে, এটা জ্বীনদের দু’টি গোত্র (আরবি) দু'বাদশাহর কিরআতে (আরবি)-এর অর্থ হবে সৃষ্টি করা। যেমন, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্যে। আট প্রকারের চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন।' (৩৯:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি লোহা সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৫) হাদীসের মধ্যেও (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আল্লাহ যতগুলো রোগ সৃষ্টি করেছেন, ওগুলোর ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। উপরোক্ত সব স্থানেই (আরবি) শব্দটি সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; আনা বা অবতীর্ণ করা অর্থে নয়। দ্রুপ এ আয়াতেও। পূর্ব যুগীয় অধিকাংশ মনীষীদের মাযহাব এই যে, এই দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। কেউ যেন এ প্রশ্ন উত্থাপন না করেন যে, ফেরেশতাগণ তো নিস্পাপ। তাদের দ্বারা তো পাপকার্য হতেই পারে না। অথচ জনগণকে যাদু শিক্ষা দেয়া, এতো কুফরী? এ প্রশ্ন উখিত হতে পারে না। কেননা, এ দু'জন ফেরেশতা সাধারণ ফেরেশতাগণ হতে পৃথক হয়ে যাবে, যেমন ইবলিস পৃথক হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কাবুল আহবার (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) এবং হযরত কালবী (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতগণ পরস্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোকে এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না-তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; তার পরে দেখা যাক তারা কি করে। তারা তখন হারূত ও মারূতকে হাজির করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি। আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং মদ্যপানও করবে না।তখন তারা দুজন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তাআলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।' তারা উত্তর দেয়ঃ ‘এটা আমাদের দ্বারা হবে না। সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো। তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোকে তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ - করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছে। তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই- আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মূসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হযরত নাফে' (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ যুহরা তারকাটি বের হয়েছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘না’। দুতিন বার প্রশ্নের পর বলেনঃ এখন উদিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) তখন বলেন ' ও যেন খুশিও না হয় এবং ওর আনন্দ লাভও যেন না হয়। হযরত নাফে (রাঃ) তখন তাকে বলেনঃ জনাব, একটি তারকা যা আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমে উদিত ও অস্তমিত হয় তাকে আপনি মন্দ বলেন?' তিনি তখন বলেনঃ তবে শুনুন জনাব আমি ঐ কথাই বলছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হতে শুনেছি। অতঃপর উল্লিখিত হাদীসটি শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণনা করেন। কিন্তু এটাও গরীব বা দুর্বল। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সম্ভবতঃ এটা ইসরাঈলী বর্ণনাই হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রাঃ) হতেও এ ধরনের বহু বর্ণনা করা হয়েছে।কেউ কেউ বলেন যে, যুহরা একটি স্ত্রী লোক ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ ' তোমরা আমাকে ঐ দোআটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু বর্ণনায়ও এটা আছে; কিন্তু ওটা মুকার ও বে-ঠিক। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দুজন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবেলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তাতে হত্যা ও অবৈধ মালের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ হুকুমও ছিল যে,তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করে। এও এসেছে যে, তারা তিনজন ফেরেশতা ছিল। কিন্তু একজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে যায়। অতঃপর দু’জনের পরীক্ষা নেয়া হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এখানে বাবেল দ্বারা দুনিয়ায় অন্দের বাবেলকে বুঝান হয়েছে। স্ত্রীলোকটির নাম আরবী ভাষায় ছিল যুহরা’ বানতী ভাষায় ছিল ‘বেদখত্ এবং ফারসী ভাষায় ছিল ‘আনাহীদ'। এ স্ত্রীলোকেটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মোকাদ্দমা এনেছিল। যখন তারা তার সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছে করে তখন সে বলে-যদি আগে আমাকে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ফায়সালা দাও তবে আমি সম্মত আছি। তারা তাই করে। পুনরায় সে বলেঃ ‘তোমরা যা পড়ে আকাশে উঠে থাকো ও পড়ে নীচে নেমে আস ওটাও আমাকে শিখিয়ে দাও। তারা ওটাও তাকে শিখিয়ে দেয়। সে ওটা পাঠ করে আকাশে উঠে যায়। কিন্তু নীচে নেমে আসার দু’আ ভুলে যায়। সেখানেই তার দেহকে তারকায় রূপান্তরিত করা।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) কখনও যুহরা তারকা দেখলে তাকে অভিশাপ দিতেন। যখন এই ফেরেশতারা আকাশে উঠতে চাইলো কিন্তু উঠতে পারলো না। তখন তারা বুঝে নিলো যে, এখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম কিছুদিন তো এই ফেরেশতারা স্থিরই। ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতো এবং সন্ধ্যার পর। আকাশে উঠে যেতো। অতঃপর যুহরাকে দেখে নিজেদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যুহরা তারকাকে একটি সুন্দরী স্ত্রীর আকৃতিতে তাদের নিকট। পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা, হারুত ও মারূতের এ ঘটনা তাবেঈগণের মধ্যেও বহু লোক বর্ণনা করেছেন। যেমন, মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) প্রভৃতি। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণও নিজ নিজ তাফসীরে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের কিতাবসমূহের উপর নির্ভরশীল। এ অধ্যায়ে কোন সহীহ মারফু মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ঈমান ওর উপরেই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআন মাজীদে আছে ওটাই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে, যাতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরলোক গমনের অল্প দিন পরে দাওমাতুল জানাল’ হতে একটি স্ত্রীলোক তার খোঁজে আগমন করে। তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সে উদ্বিগ্ন হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- ব্যাপার কি? সে বলেঃ আমার মধ্যে ও আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় লেগেই থাকতো। একবার সে আমাকে ছেড়ে কোন্ অজানা জায়গায় চলে যায়। একটি বৃদ্ধার নিকট আমি এসব কিছু বর্ণনা করি। সে আমাকে বলে- “তোমাকে যা বলি তাই কর, সে আপনা আপনি চলে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে গেলাম। রাত্রে সে দুটি কুকুর নিয়ে আমার নিকট আগমন করে। একটির উপর সে আরোহণ করে এবং অপরটির উপর আমি আরোহণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা দু'জন বাবেলে চলে যাই। তথায় গিয়ে দেখি যে, দু’টি লোক শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় লটকানো রয়েছে। ঐ বৃদ্ধা আমাকে বলে-তাদের নিকট যাও ও বল-“আমি যাদু শিখতে এসেছি। আমি তাদেরকে একথা বলি। তারা বলে-‘জেনে রেখো, আমরা তো পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। তুমি যাদু শিক্ষা করো যাদু শিক্ষা করা কুফরী।' আমি বলি-শিখবো। তারা বলে-“আচ্ছা, তাহলে যাও, ঐ চুল্লীর মধ্যে প্রস্রাব করে চলে এসো। আমি গিয়ে প্রস্রাবের ইচ্ছে করি, কিন্তু আমার অন্তরে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়, সুতরাং আমি ফিরে এসে বলিআমি কাজ সেরে এসেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে -“তুমি কি দেখলে আমি বলি-“কিছুই না। তারা বলে-“তুমি ভুল বলছে। এখন পর্যন্ত তুমি বিপথে চালিত হওনি। তোমার ঈমান ঠিক আছে, তুমি এখনও ফিরে যাও এবং কুফরী করো না। আমি বলি-“আমাকে যে যাদু শিখতেই হৰে। তারা পুনরায় আমাকে বলে-ঐ চুল্লীতে প্রস্রাব করে এসো। আমি আবার যাই। কিন্তু এবারও। মন চায় না, সুতরাং ফিরে আসি। আবার এভাবেই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। পুনরায় আমি চুল্লীর নিকট যাই এবং মনকে শক্ত করে প্রস্রাব করতে বসে পড়ি। আমি দেখি যে, একজন ঘোড়া সওয়ার মুখের উপর পর্দা ফেলে আকাশের উপর উঠে গেল। আমি ফিরে এসে তাদের নিকট এটা বর্ণনা করি। তারা বলে- 'হাঁ, এবার তুমি সত্য বলছে। ওটা তোমার ঈমান ছিল, যা তোমার মধ্য হতে বেরিয়ে গেল। এখন চলে যাও।আমি এসে ঐ বৃদ্ধাকে বলি- ‘তারা আমাকে কিছুই শিক্ষা দেয়নি। সে বলে- যথেষ্ট হয়েছে। তোমার নিকট সবই চলে এসেছে। এখন তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি পরীক্ষামূলকভাবে একটি গমের দানা নিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। অতঃপর বলি- গাছ হও।' ওটা গাছ হয়ে গেল। আমি বলি-- তোমাতে ডাল পাতা গজিয়ে যাক।' তাই হয়ে গেল। তার পর বলি- ‘শুকিয়ে যাও।' ডালপাতা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-‘পৃথক পৃথকভাবে দানা দানা হয়ে যাও। ওটা তাই হয়ে গেল। তারপরে আমি বলি-শুকিয়ে যাও। ওটা শুকিয়ে গেল। অতঃপর বলি-আটা হয়ে যাও।' আটা হয়ে গেল। আমি বলি-রুটি হয়ে যাও।' রুটি হয়ে গেল। এটা দেখেই আমি লজ্জিত হয়ে যাই এবং বে-ঈমান হয়ে যাওয়ার কারণে আমার খুবই দুঃখ হয়। হে উম্মুল মু'মিনীন! আল্লাহর শপথ! আমি যাদুর দ্বারা কোন কামও নেইনি এবং কারও উপর এটা প্রয়োগও করিনি। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাঁকে পেলাম না। এখন আমি কি করি?একথা বলেই সে পুনরায় কাঁদতে আরম্ভ করে এবং এত কাঁদে যে, সবারই মনে তার প্রতি দয়ার সঞ্চার হয়। তাকে কি ফতওয়া দেয়া যেতে পারে এ ব্যাপারে সাহাবীগণও (রাঃ) খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে তারা বলেন- এখন এ ছাড়া আর কি হবে যে, তুমি এ কাজ করবে না, তাওবা করবে এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর পিতা-মাতার খিদমত করবে। এই ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক।কেউ কেউ বলেন যে, যাদুর বলে প্রকৃত জিনিসই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, না, দর্শকের শুধু এর ধারণা হয়ে থাকে মাত্র, প্রকৃত জিনিস যা ছিল তাই থাকে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ অর্থাৎ তারা মানুষের চোখে যাদু করে দিয়েছে।' (আরবি) (৭:১১৬) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন অর্থাৎ (আরবি) হযরত মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হয়েছে যে, যেন ঐ সাপগুলো তাদের যাদুর বলে চলাফেরা করছে।' (২০:৬৬) এ ঘটনা দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াতে বাবেল’ শব্দ দ্বারা ইরাকের বাবেলকে বুঝানা হয়েছে, দুনিয়া অন্দের’ বাবেল নয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত আলী ইবনে আবূ তাবিল (রাঃ) বাবেলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসরের নামাযের সময় হলে তিনি তথায় নামায আদায় করলেন না, বরং বাবেলের সীমান্ত পার হয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমার প্রিয় রাসূল (সঃ) আমাকে গোরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বাবেলের ভূমিতেও নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এটা অভিশপ্ত ভূমি। সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসের উপর কোন সমালোচনা করেননি। আর যে হাদীসকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাবে নিয়ে আসেন এবং ওর সনদের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন ঐ হাদীস ইমাম সাহেবের মতে হাসান হয়ে থাকে। এর দ্বারা জানা গেল যে, বাবেলের ভূমিতে মামায পড়া মাকরূহ। যেমন সামুদ সম্প্রদায়ের ভূমি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তাদের বাস ভূমিতেও যেয়ো না। যদি ঘটনাক্রমে যেতেই হয়, তবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাও।আল্লাহ তা'আলা হারুত ও মারূতের মধ্যে ভাল-মন্দ, কুফর ও ঈমানের জ্ঞান দিয়ে রেখেছিলেন বলে তারা কুফরীর দিকে গমনকারীদের উপদেশ দিতো। এবং তাদেরকে ওটা হতে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু যখন কোনক্রমেই মানতো না তখন তাদেরকে যাদু বিদ্যা শিখিয়ে দিতো। ফলে তাদের ঈমানের আলো বিদায় নিতে এবং যাদু চলে আসতো। শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যেতো। ঈমান বিদায় নেয়ার পর আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর নেমে আসতো। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, কাফির ছাড়া আর কেউ যাদু বিদ্যা শিখবার সৎ সাহস রাখতে পারে না (আরবি) শব্দের অর্থ এখানে বিপদ, আজমায়েশ ও পরীক্ষা। এ আয়াতের মাধ্যমে এটাও জানা গেল যে, যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা কুফরী। হাদীসের মধ্যেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহীর সাথে কুফরী করে। ( বার)'। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং-এর সমর্থনে অন্যান্য হাদীসও এসেছে।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, মানুষ হারুত ও মারূতের কাছে গিয়ে যাদু বিদ্যা শিক্ষা করতো। ফলে তারা খারাপ কাজ করতো এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ শয়তান তার সিংহাসনটি পানির উপর রাখে। অতঃপর মানুষকে বিপথে চালানোর জন্যে সে তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়। সেই তার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত যে হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে সবচেয়ে বেড়ে যায়। এরা ফিরে এসে নিজেদের জঘন্যতম কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়। কেউ বলেঃ আমি অমুককে এভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছি। কেউ বলেঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে এ পাপ কার্য করিয়েছি। শয়তান তাদেরকে বলেঃ ‘বো কিছুই করনি। এতো সাধারণ কাজ। অবশেষে একজন এসে বলেঃ আমি একটি নোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, এমনকি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। শয়তান তখন তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলেঃ হ, তুমি বড় কাজ করেছে। সে তাকে পার্শ্বে বসিয়ে নেয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।' যাদুকরও তার যাদুর দ্বারা ঐ কাজই করে থাকে, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি হয়। যেমন তার কাছে স্ত্রীর আকৃতি খারাপ মনে হবে কিংবা তার স্বভাব চরিত্রকে সে ঘৃণা করবে অথবা অন্তরে শত্রুতার ভাব জেগে যাবে ইত্যাদি। আস্তে আস্তে এসব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিচ্ছেদই ঘটে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যাদু দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন ক্ষতি সাধিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি সাধন করা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই নেই। আল্লাহর ভাগ্য লিখন অনুযায়ী তার ক্ষতিও হতে পারে, আবার তার ইচ্ছে হলে যাদু নিষ্ক্রিয়ও হতে পারে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যাদু শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিরই ক্ষতি করে থাকে, যে ওটা লাভ করে ওর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা এমন জিনিস শিক্ষা করে যা তাদের জন্যে শুধু ক্ষতিকারক, যার মধ্যে উপকার মোটেই নেই। ঐ ইয়াহুদীরা জানে যে,যারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) আনুগত্য ছেড়ে যাদুর পিছনে লেগে থাকে তাদের জন্যে আখেরাতের কোনই অংশ নেই। তাদের না আছে আল্লাহর কাছে কোন সম্মান, না তাদেরকে ধর্মভীরু মনে করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তাদের এ মন্দ কাজের অনুভূতি হতো এবং ঈমান এনে খোদাভীরুতা অবলম্বন করতো তবে ওটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। কিন্তু এরা অজ্ঞান ও নির্বোধ।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “জ্ঞানীগণ বলে- তোমাদের জন্যে আফসোস! আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্যে বড়ই উত্তম, কিন্তু ওটা একমাত্র ধর্মশীলগণই পেয়ে থাকে।হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) ও পূর্ব যুগীয় মনীষীদের একটি দল যাদু বিদ্যা শিক্ষার্থীকে কাফির বলেছেন। কেউ কেউ কাফির তো বলেন না, কিন্তু বলেন যে, যাদুকরকে হত্যা করাই হচ্ছে তার উপযুক্ত শাস্তি। হযরত বাজালাহ বিন উবাইদ (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক নির্দেশ নামায় লিখেছিলেনঃ যাদুকর পুরুষ বা স্ত্রীকে তোমরা হত্যা করে দাও।' এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিনজন যাদুকরের গর্দান উড়িয়েছি।'সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) উপর তার দাসী যাদু করেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন যে, তিনজন সাহাবী (রাঃ) হতে যাদুকরকে হত্যা করার ফতওয়া রয়েছে। জামে' উত তিরমিযীর মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন মুসলিম দুর্বল। সঠিক কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। কিন্তু তাবরানীর হাদীসের মধ্যে অন্য সনদেও এ হাদীসটি মার' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ' ওয়ালীদ বিন উকবার নিকট একজন যাদুকর ছিল, সে তার যাদু কার্য বাদশাহকে দেখাতো। সে প্রকাশ্যভাবে একটি লোকের মাথা কেটে নিতো। অতঃপর একটা শব্দ করতো, আর তখনই মাথা জোড়া লেগে যেতো মুহাজির সাহাবাগণের (রাঃ) মধ্যে একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী (রাঃ) ওটা দেখেন এবং পরের দিন তরবারি নিয়ে আসেন। যাদুকর খেলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তিনি স্বয়ং যাদুকরেরই মাথা কেটে ফেলেন এবং বলেনঃ “তুমি সত্যবাদী হলে নিজেই জীবিত হয়ে যাও।' অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ “তোমরা যাদুর নিকট যাচ্ছ ও তা দেখছো?' ঐ সাহাবী (রাঃ) ওয়ালীদের নিকট হতে তাকে হত্যা করার অনুমতি নেননি বলে বাদশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) নির্দেশ ও হযরত হাফসার (রাঃ) ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন যে, ঐ হুকুম ঐ সময় কার্যকরী হবে যখন যাদুর মধ্যে শিরক যুক্ত শব্দ থাকবে। মু'তাযিলা সম্প্রদায় যাদুর অস্তিত্বই মানে না। তারা বলে যে,যারা যাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা কাফির। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যাদুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তারা স্বীকার করে যে, যাদুকর তার যাদুর বলে বাতাসে উড়তে পারে, মানুষকে বাহ্যতঃ গাধা ও গাধাকে বাহ্যতঃ মানুষ করে ফেলতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট কথাগুলো মন্ত্রতন্ত্র পড়ার সময় ঐগুলো সৃষ্টিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আকাশকে ও তারকাকে ফলাফল সৃষ্টিকারী মানে না। দার্শনিকেরা, জোতির্বিদেরা এবং বে-দ্বীনেরা তো তারকা ও আকাশকেই ফলাফল সৃষ্টিকারী মেনে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রথম দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ তারা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা। তৃতীয় দলীল হচ্ছে ঐ স্ত্রী লোকটির ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আরও এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, যাদু বিদ্যা লাভ করা দুষনীয় নয়। মাসয়ালা বিশ্লেষণকারীগণের এটাই অভিমত। কেননা, এটাও একটা বিদ্যা। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, এরা কি সমান?’ আর এ জন্যেও যাদু বিদ্যা শিক্ষা দুষণীয় নয় যে, তার দ্বারা মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পূর্ণভাবে পার্থক্য করা যায় এবং মু'জিযার জ্ঞান ওয়াজিব ও ওটা নির্ভর করে যাদু বিদ্যার উপর, যার দ্বারা পার্থক্য বুঝা যায়। সুতরাং যাদু বিদ্যা শিক্ষা করাও ওয়াজিব হয়ে গেল। ইমাম রাযীর (রাঃ) একথা"গোড়া হতে আগা পর্যন্ত ভুল। বিবেক হিসেবে যদি তিনি ওটাকে খারাপ না বলেন তবে মু'তাযিলা সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে, যারা ওকে বিবেক হিসেবেও খারাপ বলে থাকে। আর যদি শরীয়তের দিক দিয়ে খারাপ না বলেন তবে কুরআন মাজীদের এ শারঈ আয়াত ওকে খারাপ বলার জন্যে যথেষ্ট। সহীহ হাদীসে রয়ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন যাদুকর বা গণকের নিকট গমন করে সে কাফির হয়ে যায়। সুতরাং ইমাম রাযীর (র) উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর একথা বলা যে, মুহাককিকগণের অভিমত এটাই’ এটাও ঠিক নয়। মুহাকিকগণের এরূপ কথা কোথায় আছে? ইসলামের ইমামগণের মধ্যে কে এ কথা বলেছেন? অতঃপর যারা জানে এবং জানে না, তারা কি সমান?' এ আয়াতটিকে দলীলরূপে পেশ করা হঠধমী ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এ আয়াতের ‘ইলম এর ভাবার্থ হচ্ছে ধর্মীয় ‘ইলম। এ আয়াতে শারঈ আলেমগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তার এ কথা বলা যে, এর দ্বারা মু'জিযার ‘ইলম লাভ হয়, এটা একেবারে বাজে কথা। কেননা, আমাদের রাসূল (সঃ)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন, যা বাতিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু তার মু'জিযা জানা যাদু জানার উপর নির্ভরশীল নয়। ঐ সব লোক যাদের যাদুর সঙ্গে দূরের সম্পর্ক নেই তারাও এটাকে মু'জিযা বলে স্বীকার করেছেন। সাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ, ইমামগণ এমনকি সাধারণ মুসলমানগণও একে মু'জিযা মেনে থাকেন। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কখনও যাদু জানা তো দূরের কথা, ওর কাছেই যাননি। তাঁরা ওটা নিজে শিক্ষা করেননি এবং অপরকেও শিক্ষা দেননি। তাঁরা যাদু করেননি এবং করাননি। বরং এসব কাজকে তারা কুফরই বলে এসেছেন। অতঃপর এ দাবী করা যে, মু'জিযা জানা ওয়াজিব এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য যাদুর উপর নির্ভর করে, সুতরাং যাদু শিখাও ওয়াজিব হলো, এটা কতই না অর্থহীন দাবী! যাদু বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে, যা আবু আব্দিল্লাহ রাফী বর্ণনা করেছেন।(১) প্রথম যাদু হচ্ছে তারকা পূজকদের। তারা সাতটি গতিশীল তারকার উপর বিশ্বাস রাখে যে, ভাল-মন্দ ওদের কারণেই হয়ে থাকে। এ জন্যে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট শব্দ পাঠ করতঃ ওদের পূজা করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আগমন করেন এবং হিদায়াত করেন। ইমাম রাযী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি বিশিষ্ট পুস্তক রচনা করেছেন এবং ওর নাম (আরবি)রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, পরে তিনি ওটা হতে তাওবা করেছেন।আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি শুধু জানাবার জন্যে এবং তার এই বিদ্যা প্রকাশ করার জন্যেই এ পুস্তক লিখেছেন, এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস নেই। কেননা এটা সরাসরি কুফরী।(২) দ্বিতীয় যাদু হচ্ছে ধারণা শক্তির উপর বিশ্বাসী লোকদের যাদু। ধারণা ও খেয়ালের বড় রকমের প্রভাব রয়েছে। যেমন একটি সংকীর্ণ সাঁকো মাটির উপর রেখে দিলে মানুষ অনায়াসেই তার উপর দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সঁকোটি যদি নদীর উপর হয় তবে মানুষ আর তার উপর দিয়ে চলতে পারে না। কেননা ধারণা হয় যে, এখনই পড়ে যাবে। ধারণার এই দুর্বলতার কারণেই যেটুকু জায়গার উপর দিয়ে মাটিতে চলতে পারছিল, ঐ জায়গার উপর দিয়েই এরকম ভয়ের সময় চলতে পারে না। এ জন্যেই হেকিমগণ ও ডাক্তারগণ ভীত লোককে লাল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখেন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত লোককে খুব বেশী আলোকময় ও দ্রুত গতিসম্প দেখতে নিষেধ করে থাকেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, উপর ধারণার একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। জ্ঞানীগণ এ বিষয়েও একমত যে, ন্যর’ লেগে থাকে। সহীহ হাদীসেও এসেছে যে, নযর’ লাগা সত্য। ভাগ্যের উপর যদি কোন জিনিস প্রাধান্য লাভকারী হতো তবে তা ন্যই ইতো। এখন যদি নাফস্ শক্ত হয় তবে বাহ্যিক সাহায্য ও বাহ্যিক কার্যের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি নাফস ততো শক্ত না হয় তবে ঐ সব যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। নাফসের যে পরিমাণ শক্তি বেড়ে যাবে সেই পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। আর যে পরিমাণ এ শক্তি কম হবে সে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তিও কমে যাবে।এ শক্তি কখনও কখনও খাদ্যের স্বল্পতা এবং জনগণের মেলামেশা ত্যাগ করার মাধ্যমেও লাভ হয়ে থাকে। কখনও তো মানুষ এ শক্তির দ্বারা শরীয়ত। অনুযায়ী পুণ্যের কাজ করে থাকে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘কারামত’ বলে, যাদু বলে না। আবার কখনও কখনও মানুষ এ শক্তি দ্বারা বাতিল ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজ করে থাকে এবং দ্বীন হতে বহু দূরে সরে পড়ে। এ রকম লোকের ঐ অলৌকিক কার্যাবলী দেখে প্রতারিত হয়ে তাকে ওয়ালী বলা কারও উচিত নয়। কেননা, যারা শরীয়তের উল্টো কাজ করে তারা কখনও আল্লাহর ওয়ালী হতে পারে না। তা নাহলে সহীহ হাদীস সমূহে দাজ্জালদেরকে অভিশপ্ত ও দুষ্ট বলা হতো না। অথচ তারা তো বহু অলৌকিক কাজ করে দেখাবে।(৩) তৃতীয় যাদু হচ্ছে জ্বীন প্রভৃতি পার্থিব আত্মসমূহের দ্বারা সহায্য প্রার্থনা করা। দার্শনিকরা ও মুতাযেলীরা এটা স্বীকার করে না। কতগুলো লোক এসব পার্থিব আত্মার মাধ্যমে কতকগুলো শব্দ ও কার্যের দ্বারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। ওকে মোহমন্ত্র ও প্রেতাত্মার যাদুও বলা হয়।(৪) চতুর্থ প্রকারের যাদু হচ্ছে ধারণা বদলিয়ে দেয়া, নযরবন্দ করা এবং প্রতারিত করা,যার ফলে প্রকৃত নিয়মের উল্টো কিছু দেখা যায়। কলাকৌশলের মাধ্যমে কার্য প্রদর্শনকারীকে দেখা যায় যে, সে প্রথমে একটা কাজ আরম্ভ করে, যখন মানুষ একাগ্র চিত্তে ওর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায়, তখন তড়িৎ করে সে আর একটি কাজ আরম্ভ করে দেয়, যা মানুষের দৃষ্টির অন্তারলে থেকে যায়। তা দেখে তারা তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদু এ প্রকারেরই ছিল। এ জন্যেই কুরআন পাকে রয়েছেঃ “তারা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের অন্তরে ভয় বসিয়ে দেয়। অন্য স্থানে রয়েছেঃ মূসার (আঃ) মনে এ ধারণা দেয়া হচ্ছে যে, ঐ সব লাঠি ও দড়ি যেন সাপ হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এরূপ ছিল না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (৫) পঞ্চম প্রকারের যাদু হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণে একটি জিনিস তৈরী করা এবং এর দ্বারা আশ্চর্যজনক কাজ নেয়া। যেমন, ঘোড়ার আকৃতি তৈরী করে দিল। ওর উপর একজন কৃত্রিম আরোহী বসিয়ে দিল যার হাতে বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। এক ঘন্টা অতিবাহিত হতেই ওর মধ্য হতে শব্দ বের হতে লাগল। অথচ কেউই ওকে বাজাচ্ছে না। এরূপভাবেই এমন নিপুণতার সাথে মানুষের ছবি বানালো যে, মনে হচ্ছে যেন প্রকৃত মানুষই হাসছে বা কাঁদছে। ফিরআউনের যাদুকরদের যাদুও এই প্রকারেরই ছিল। তাদের কৃত্রিম সাপগুলো পারদ জাতীয় দ্রব্য দিয়ে তৈরী ছিল বলে মনে হতো যেন জীবিত সাপ নড়াচড়া করছে। ঘড়ি, ঘন্টা এবং ছোট ছোট জিনিস, যা থেকে বড় বড় জিনিস বেরিয়ে আসে, এসবগুলোই এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে একে যাদু বলা উচিত নয়। কেননা, এটা তো এক প্রকার নির্মাণ ও কারিগরি, যার কারণগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ্য। যে ওটা জানে সে এসব শব্দ দ্বারা একাজ করতে পারে। যে ফন্দি বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টানেরা করতো ওটাও এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। ঐ ফন্দি এই যে, তারা গোপনে গির্জার প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিতো। অতঃপর ওকে গির্জার মাহাত্ম্য বলে প্রচার করতঃ জনগণকে তাদের ধর্মে টেনে আনতো।কতক কারামিয়াহ ও সুফিয়্যাহ সম্প্রদায়েরও ধারণা এই যে, জনগণকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শনের হাদীসগুলো বানিয়ে নিলে কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা চরম ভুল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন দোযখে তার স্থান ঠিক করে নেয়।' তিনি আরও বলেনঃ ‘আমার হাদীসগুলো তোমরা বর্ণনা করতে থাকো; কিন্তু আমার নামে মিথ্যা কথা বলো না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামী।'একজন খ্রীষ্টান পাদরী একদা দেখে যে, পাখীর একটি ছোট বাচ্চা যা উড়তে পারে না, একটি বাসায় বসে আছে। যখন ওটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বর বের করছে তখন অন্যান্য পাখীরা ওর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে যাইতুন ফল এনে ওর বাসায় রেখে দিচ্ছে। ঐ পাদরী কোন জিনিস দিয়ে ঐ আকারেরই একটি পাখী তৈরী করে। ওর নীচের দিক ফাপা রাখে এবং ওর ঠোটের দিকে একটি ছিদ্র রাখে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করে। অতঃপর যখন বাতাস বের হয় তখন ঐ পাখীর মতই শব্দ করে। ওটা নিয়ে গিয়ে সে গির্জার মধ্যে বাতাস মুখো রেখে দেয়। ছাদে একটি ছোট ছিদ্র করে দেয় যেন বাতাস সেখান দিয়ে যাতায়াত করে। এখন যখনই বাতাস বইতে থাকে তখনই ওটা হতে শব্দ বের হতে থাকে। আর এ শব্দ শুনে ঐ প্রকারের পাখী তথায় একত্রিত হয় এবং যাইতুন’ ফল এনে এনে রেখে যায়। ঐ পাদরী তখন প্রচার করতে শুরু করে যে, গির্জার মধ্যে এটা এক অলৌকিক ব্যাপার। এখানে একজন মনীষীর সমাধি রয়েছে এবং এটা তাঁরই কারামত। এখন জনগণ স্বচক্ষে এটা দেখে বিশ্বাস করে নেয়। অতঃপর তারা ঐ কবরের উপর ন্যর-নিয়ায আনতে থাকে এবং এই কারামত বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অথচ ওটা না ছিল কারামত, না ছিল মু'জিযা। বরং শুধুমাত্র ছিল ওটা একটা গোপনীয় বিষয় যা সেই পাদরী; একমাত্র তার পেট পূরণের জন্যেই গোপনীয়ভাবে করে রেখেছিল। আর ঐ অভিশপ্ত দল ওতেই লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।(৬) যাদুর ষষ্ঠ প্রকার হচ্ছে কতকগুলো ওষুধের গোপন কোন বৈশিষ্ঠ্য জেনে ওটা কাজে লাগানো। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে,এতে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :রয়েছে। চুম্বককেই তো দেখা যায় যে, ওটা কিভাবে লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। অধিকাংশ সূফী ও দরবেশই ঐ ফন্দি ফিকিরকেই জনগণেরই মধ্যে কারামত রূপে প্রদর্শন করতঃ তাদেরকে মুরীদ করতে থাকে।(৭) সপ্তম প্রকারের যাদু হচ্ছে কারও মধ্যে একটা বিশেষ প্রভাব ফেলে যা চায় তাই তার দ্বারা করিয়ে নেয়া। যেমন তাকে বলে যে, তার “ইসমে আযম . মনে আছে কিংবা জ্বিনেরা তার তাবে আছে। এখন যদি তার সামনে লোকটি দুর্বল ঈমানের লোক হয় এবং অশিক্ষিত হয় তবে তো সে তাকে বিশ্বাস করে নেবে এবং তার প্রতি তার একটা ভয় ও সম্ভ্রম থাকবে যা তাকে আরও দুর্বল করে দেবে। এখন সে যা চাইবে তাই সে করবে। আর এই প্রভাব সাধারণতঃ স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির উপরই পড়ে থাকে। একেই মুতাবান্নাহ’ বলা হয়। আর অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে জ্ঞানী ও অজ্ঞানকে চিনতে পারে, কাজেই সে নিরেটের উপরই তার ক্রিয়া চাপিয়ে থাকে।(৮) অষ্টম প্রকারের যাদু হচ্ছে চুগলী করা। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কারও অন্তরে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং গোপনীয় চতুরতা দ্বারা তাকে বশীভূত করা। এ চুগলী যদি মানুষের মধ্যে শক্রতা সৃষ্টির জন্যে হয় তবে এটা শরীয়ত অনুযায়ী হারাম হবে। আর যদি এটা সংশোধন করার উদ্দেশ্যে হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মিলনের জন্যে হয় কিংবা এর ফলে যদি মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি আগত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং কাফিরদের শক্তি নষ্ট করতঃ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা যায় তবে এটা বৈধ হবে। যেমন হাদীস শরীফে আছে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মঙ্গলের জন্যে এদিক ওদিক কথা নিয়ে যায়। হাদীসে আরও আছে যে, যুদ্ধ হচ্ছে প্রতারণার নাম। হযরত নঈম বিন মাসউদ (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে আরবের কাফির ও ইয়াহূদীদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথার মাধ্যমে বিচ্ছেদ আনয়ন করেছিলেন এবং এরই ফলে মুসলমানদের নিকট তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইমাম রাযী যে যাদুর এই আটটি প্রকার বর্ণনা ; করেছেন তা শুধু শব্দ হিসেবে। কেননা আরবী ভাষায় (আরবি) বা যাদু প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল হয় এবং যার কারণসমূহ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এজন্যেই একটি হাদীসে আছে যে, কোন কোন বর্ণনাও যাদু। আর এ কারণেই সকালের প্রথম ভাগকে ‘সহুর’ বলা হয়। কেননা, ওটা মানুষের চক্ষুর অন্তরালে থাকে। আর ঐ শিরাকের ‘সিহর’ বলে যা আহার্যের স্থানে থাকে। আবু জেহেলও বদরের যুদ্ধে বলেছিল যে, তার খাদ্যের শিরা ভয়ে ফুলে গেছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার সিহর’ ও ‘নাহারের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাহলে সিহূরের অর্থ হচ্ছে খাদ্যের শিরা এবং নাহারের অর্থ হচ্ছে বুক। কুরআন পাকে আছেঃ “তারা (যাদুকরেরা) মানুষের চক্ষু থেকে তাদের কার্যাবলী গোপন রেখেছিল। আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমরা বলি যে, যাদু আছে এবং এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহকে মঞ্জর হলে তিনি যাদুর সময় যা চান তাই ঘটিয়ে থাকেন। যদিও মুতাযিলা, আবু ইসহাক ইসফিরাঈনী এবং ইমাম শফিঈ (রঃ) এটা বিশ্বাস করেন না।' যাদু কখনও হাতের চালাকি দ্বারাও হয়ে থাকে আবার কখনও ভোরা, সুতা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। কখনও আল্লাহর নাম পড়ে ফু দিলেও একটা বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। কখনও শয়তানের নাম নিয়ে শয়তানী কার্যাবলী দ্বারাও লোক যাদু করে থাকে। কখনও ঔষধ ইত্যাদি দ্বারাও যাদু করা হয়।"রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেনঃ কতকগুলো বর্ণনাও যাদু' এর দুটোই ভাবার্থ হতে পারে। হয়তো তিনি এটা বর্ণনাকারীর প্রশংসার জন্যে বলেছেন, কিংবা তার নিন্দে করেও বলে থাকতে পারেন যে, সে তার মিথ্যা কথাকে এমন ভঙ্গিমায় বর্ণনা করছে যে, তা সত্য মনে হচ্ছে। মন্ত্রী আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মদ বিন হাবীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল আশরাফু আ'লা মাযাহিবিল আশরাফে’ এর মধ্যে যাদু অধ্যায়ে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এটা স্বীকার করেননি। যারা যাদু শিক্ষা করে ও ওটা ব্যবহার করে তাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ), এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) কাফির বলেছেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) কয়েকজন শিষ্যের মতে যাদু যদি আত্মরক্ষার জন্যে কেউ শিক্ষা করে তবে সে কাফির হবে না। তবে হ, যারা ওর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ওকে উপকারী মনে করে সে কাফির। অনুরূপ ভাবে যারা ধারণা করে যে, শয়তানরা এ কাজ করে থাকে এবং তারা এরকম ক্ষমতা রাখে, তারাও কাফির।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, যদি তারা বাবেলবাসীদের মত বিশ্বস রাখে এবং সাতটি গতিশীল তারকাকে প্রভাব সৃষ্টিকারীরূপে বিশ্বাস করে তবে তারা কাফির। আর যদি এ না হয়, কিন্তু যাদুকে বৈধ মনে করে তবে তারাও কাফির। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) অভিমত এও আছে যে, যারা যাদু করে এবং ওকে ব্যবহারে লাগায় তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যে পর্যন্ত বারবার না করে কিংবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে নিজে স্বীকার না করে সেই পর্যন্ত হত্যা করা হবে না।তিনজন ইমামই বলেন যে, তার হত্যা হচ্ছে শাস্তির জন্যে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে এ নির্দেশ আছে যে, যাদুকরকে তাওবাও করানো হবে না এবং তার তাওবা করার ফলে তার শাস্তি লোপ পাবে না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মতে তার তাওবা গৃহীত হবে। একটি বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) এ উক্তি আছে। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মতে কিতাবীদের যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য তিনজন ইমামের অভিমত এর উল্টো। লাবীদ বিন আসাম নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করেছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি। যদি কোন মুসলমান মহিলা যাদু করে তবে তার সম্বন্ধে ইমাম আবু হানীফার (রঃ) মত এই যে, তাকে বন্দী করা হবে। আর অন্যান্য তিনজন ইমামের মতে পুরুষের মত তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন। হযরত যুহরীর (রঃ) মতে মুসলমান যাদুকরকে হত্যা করা হবে,কিন্তু মুশরিক যাদুকরকে হত্যা করা হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি কোন যিম্মীর যাদুর ফলে কেউ মারা যায় তবে যিম্মীকেও মেরে ফেলা হবে। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রথমে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করতঃ ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা ভালই, নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। আবার তার হতে এও বর্ণিত আছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে হত্যা করা হবে।যে যাদুকরের যাদুতে শিরকী শব্দ আছে, চারজন ইমামই তাকে কাফির বলেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের উপর প্রভুত্ব লাভ করার পর যদি সে তাওবা করে তবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন যিন্দীক সম্প্রদায়। তবে যদি তার উপর প্রভুত্ব লাভের পূর্বেই তারা তাওবা করে তা হলে হবে। আর যদি তার যাদুতে কেউ মারা যায় তবে তো তাকে হত্যা করা হবেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি সে বলেঃ আমি মেরে ফেলার জন্যে যাদু করিনি। তবে ভুল করে হত্যার অপরাধে তার নিকট হতে জরিমানা আদায় করা হবে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) যাদুকরের দ্বারা যাদু উঠিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন, যেমন সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। হযরত আমের শা'বীও এটাকে কোন দোষ মনে করেন না। কিন্তু খাজা হাসান বসরী (রঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আপনি যাদু তুলিয়ে নেন না কেন? তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তো আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি লোকের উপর মন্দ খুলিয়ে নিতে ভয় করি।' যাদুর চিকিৎসাহযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, কুলের সাতটি পাতা পাটায় বেটে পানিতে মিশাতে হবে। অতঃপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ওর উপর ফু দিতে হবে এবং যাদুকৃত ব্যক্তিকে তিন ঢাকে পানি পান করাতে হবে এবং অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে। ইনশাআল্লাহ্ যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এ আমল বিশেষভাবে ঐ ব্যক্তির জন্যে খুবই মঙ্গলজনক যাকে তার স্ত্রী থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যাদু ক্রিয়া নষ্ট করার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি) এ সূরাগুলো। হাদীস শরীফে আছে যে, এই সূরাগুলোর চেয়ে বড় রক্ষাকবচ আর কিছু নেই। এরকমই আয়াতুল কুরসীও শয়তানকে দূর করার জন্য বড়ই ফলদায়ক।
আল-বাকারা 2:104
১০৪-১০৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে তার মুমিন বান্দাগণকে কাফিরদের কথা বার্তা এবং তাদের কাজের সাদৃশ্য হতে বিরত রাখছেন। ইয়াহূদীরা কতকগুলো শব্দ জিহবা বাঁকা করে বলতো এবং ওটা দ্বারা খারাপ অর্থ নিতো। যখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলতেনঃ ‘আমার কথা শোনো তখন তারা বলতোঃ (আরবি) এবং এর ভাবার্থ নিতে (আরবি) অর্থাৎ অবাধ্যতা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “ইয়াহূদীদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা কথাকে প্রকৃত শব্দ হতে সরিয়ে দেয় এবং বলে আমরা শুনি, কিন্তু মানি না। তারা ধর্মকে বিদ্রুপ করার জন্যে জিহ্বাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে (আরবি) বলে। যদি তারা বলতো আমরা শুনলাম এবং মানলাম, আমাদের কথা শুনুন এবং আমাদের প্রতি মনোযোগ দিন, তবে এটাই তাদের জন্যে উত্তম ও উচিত হতো, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, তাদের মধ্যে ঈমান খুব কমই রয়েছে।”হাদীসসমূহে এটাও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এরা যখন সালাম করতো তখন (আরবি) বলতো। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। সুতরাং তোমরা তার উত্তরে (আরবি) বল। তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হবে কিন্তু আমাদের ব্যাপারে তাদের দু’আ কবুল হবে না।” মোটকথা, কথা ও কাজে তাদের সাথে সাদৃশ্য নিষিদ্ধ।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে হযরত আবু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তরবারীর সঙ্গে প্রেরিত হয়েছি। আল্লাহ তা'আলা আমার আহার্য আমার বর্শার ছায়ার নীচে রেখেছেন এবং লাঞ্ছনা ও হীনতা ঐ ব্যক্তির জন্যে-যে আমার নির্দেশের উল্টো করে। আর যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের (অমুসলিমের) সঙ্গে সাদৃশ্য আনয়ন করে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এই পরের হাদীসটি বর্ণিত আছে। এই আয়াত ও হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হলো যে, কাফিরদের কথা, কাজ, পোশাক, ঈদ ও ইবাদতের সহিত সাদৃশ্য স্থাপন করা চরমভাবে নিষিদ্ধ। শরীয়তে ওর ওপর শাস্তির ধমক রয়েছে এবং চরমভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে।হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ 'যখন তোমরা (আরবি) শুনতে পাও তখন কান লাগিয়ে দাও এবং ওর প্রতি মনঃসংযোগ কর, হয়তো কোন ভাল কাজের নির্দেশ দেয়া হবে কিংবা কোন মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা হবে।' হযরত খাইসুমা (রঃ) বলেনঃ তাওরাতে বানী ইসরাঈলকে আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করে বলেছেনঃ (আরবি) কিন্তু মুহাম্মদ (সঃ) এর উম্মতকে সম্মানজনক সম্বোধন করে (আরবি) বলেছেন।' (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে আমাদের দিকে কান লাগিয়ে দাও।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “এর অর্থ হচ্ছে ‘বিপরীত। অর্থাৎ ‘বিপরীত’ এ কথা বলো না।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘আপনি আমাদের কথা শুনুন এবং আমরা আপনার কথা শুনি’ আনসারগণও (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে এ কথাই বলতে আরম্ভ করেছিলেন, যা থেকে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিষেধ করেছেন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) বলা হয় বিদ্রুপ ও উপহাসকে। অর্থাৎ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাকে ও ইসলামকে বিদ্রুপ করো না। আবূ সাখর (রঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চলতে থাকেন তখন কারও কিছু বলার থাকলে বলতো-‘আমার দিকে কান লাগিয়ে দিন। এ বেয়াদবীর কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে একথা বলতে নিষেধ করেন এবং স্বীয় নবীর (সঃ) সম্মান করার শিক্ষা দেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, রিফাআ' বিন ইয়াযীদ নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে কথা বলার সময় একথাটি বলতো। মুসলমানরা এ কথাটি সম্মানজনক মনে করে এটাই নবী (সঃ)কে বলতে আরম্ভ করেন। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এটা নিষেধ করেন। যেমন সূরা-ই-নিসার মধ্যেও আছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা এ কথাটিকে খারাপ জেনেছেন এবং মুসলমানদেরকে এটা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ তোমরা আঙ্গুরকে করম' এবং গোলামকে ‘আব্দ' বলো না ইত্যাদি। এখন আল্লাহ তা'আলা মন্দ অন্তর বিশিষ্ট লোকদের হিংসা ও বিদ্বেষ সম্পর্কে মুসলমানদেরকে বলেছেন যে, তারা যে একজন পূর্ণাঙ্গ নবীর (সঃ) মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত লাভ করেছে এজন্যে তারা জ্বলে পুড়ে মরছে। তাদের এটা জানা উচিত যে, এটাতো আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ। তিনি যাকে চান তার উপরই অনুগ্রহ বর্ষণ করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।