Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:105 – আল-বাকারা 2:127

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-বাকারা 2:105
  2. আল-বাকারা 2:106
  3. আল-বাকারা 2:107
  4. আল-বাকারা 2:108
  5. আল-বাকারা 2:109
  6. আল-বাকারা 2:110
  7. আল-বাকারা 2:111
  8. আল-বাকারা 2:112
  9. আল-বাকারা 2:113
  10. আল-বাকারা 2:114
  11. আল-বাকারা 2:115
  12. আল-বাকারা 2:116
  13. আল-বাকারা 2:117
  14. আল-বাকারা 2:118
  15. আল-বাকারা 2:119
  16. আল-বাকারা 2:120
  17. আল-বাকারা 2:121
  18. আল-বাকারা 2:122
  19. আল-বাকারা 2:123
  20. আল-বাকারা 2:124
  21. আল-বাকারা 2:125
  22. আল-বাকারা 2:126
  23. আল-বাকারা 2:127

আল-বাকারা 2:105

১০৪-১০৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে তার মুমিন বান্দাগণকে কাফিরদের কথা বার্তা এবং তাদের কাজের সাদৃশ্য হতে বিরত রাখছেন। ইয়াহূদীরা কতকগুলো শব্দ জিহবা বাঁকা করে বলতো এবং ওটা দ্বারা খারাপ অর্থ নিতো। যখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলতেনঃ ‘আমার কথা শোনো তখন তারা বলতোঃ (আরবি) এবং এর ভাবার্থ নিতে (আরবি) অর্থাৎ অবাধ্যতা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “ইয়াহূদীদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা কথাকে প্রকৃত শব্দ হতে সরিয়ে দেয় এবং বলে আমরা শুনি, কিন্তু মানি না। তারা ধর্মকে বিদ্রুপ করার জন্যে জিহ্বাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে (আরবি) বলে। যদি তারা বলতো আমরা শুনলাম এবং মানলাম, আমাদের কথা শুনুন এবং আমাদের প্রতি মনোযোগ দিন, তবে এটাই তাদের জন্যে উত্তম ও উচিত হতো, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, তাদের মধ্যে ঈমান খুব কমই রয়েছে।”হাদীসসমূহে এটাও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এরা যখন সালাম করতো তখন (আরবি) বলতো। আর (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। সুতরাং তোমরা তার উত্তরে (আরবি) বল। তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হবে কিন্তু আমাদের ব্যাপারে তাদের দু’আ কবুল হবে না।” মোটকথা, কথা ও কাজে তাদের সাথে সাদৃশ্য নিষিদ্ধ।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে হযরত আবু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তরবারীর সঙ্গে প্রেরিত হয়েছি। আল্লাহ তা'আলা আমার আহার্য আমার বর্শার ছায়ার নীচে রেখেছেন এবং লাঞ্ছনা ও হীনতা ঐ ব্যক্তির জন্যে-যে আমার নির্দেশের উল্টো করে। আর যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের (অমুসলিমের) সঙ্গে সাদৃশ্য আনয়ন করে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এই পরের হাদীসটি বর্ণিত আছে। এই আয়াত ও হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হলো যে, কাফিরদের কথা, কাজ, পোশাক, ঈদ ও ইবাদতের সহিত সাদৃশ্য স্থাপন করা চরমভাবে নিষিদ্ধ। শরীয়তে ওর ওপর শাস্তির ধমক রয়েছে এবং চরমভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে।হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ 'যখন তোমরা (আরবি) শুনতে পাও তখন কান লাগিয়ে দাও এবং ওর প্রতি মনঃসংযোগ কর, হয়তো কোন ভাল কাজের নির্দেশ দেয়া হবে কিংবা কোন মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা হবে।' হযরত খাইসুমা (রঃ) বলেনঃ তাওরাতে বানী ইসরাঈলকে আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করে বলেছেনঃ (আরবি) কিন্তু মুহাম্মদ (সঃ) এর উম্মতকে সম্মানজনক সম্বোধন করে (আরবি) বলেছেন।' (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে আমাদের দিকে কান লাগিয়ে দাও।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “এর অর্থ হচ্ছে ‘বিপরীত। অর্থাৎ ‘বিপরীত’ এ কথা বলো না।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘আপনি আমাদের কথা শুনুন এবং আমরা আপনার কথা শুনি’ আনসারগণও (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে এ কথাই বলতে আরম্ভ করেছিলেন, যা থেকে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিষেধ করেছেন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) বলা হয় বিদ্রুপ ও উপহাসকে। অর্থাৎ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাকে ও ইসলামকে বিদ্রুপ করো না। আবূ সাখর (রঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) চলতে থাকেন তখন কারও কিছু বলার থাকলে বলতো-‘আমার দিকে কান লাগিয়ে দিন। এ বেয়াদবীর কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে একথা বলতে নিষেধ করেন এবং স্বীয় নবীর (সঃ) সম্মান করার শিক্ষা দেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, রিফাআ' বিন ইয়াযীদ নামক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে কথা বলার সময় একথাটি বলতো। মুসলমানরা এ কথাটি সম্মানজনক মনে করে এটাই নবী (সঃ)কে বলতে আরম্ভ করেন। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এটা নিষেধ করেন। যেমন সূরা-ই-নিসার মধ্যেও আছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা এ কথাটিকে খারাপ জেনেছেন এবং মুসলমানদেরকে এটা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ তোমরা আঙ্গুরকে করম' এবং গোলামকে ‘আব্দ' বলো না ইত্যাদি। এখন আল্লাহ তা'আলা মন্দ অন্তর বিশিষ্ট লোকদের হিংসা ও বিদ্বেষ সম্পর্কে মুসলমানদেরকে বলেছেন যে, তারা যে একজন পূর্ণাঙ্গ নবীর (সঃ) মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত লাভ করেছে এজন্যে তারা জ্বলে পুড়ে মরছে। তাদের এটা জানা উচিত যে, এটাতো আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ। তিনি যাকে চান তার উপরই অনুগ্রহ বর্ষণ করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।

আল-বাকারা 2:106

১০৬-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর‘নখ’ এর মূলতত্ত্বঃহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নস’ এর অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সরিয়ে দেয়া, যা লিখার সময় (কখনও) অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু হুকুম পরিবর্তন হয়ে যায়। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ বিন কাব কার্যীও (রঃ) এ রকমই বর্ণনা করেছেন। যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভুলিয়ে দেয়া। আতা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ ছেড়ে দেয়া। সুদী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ উঠিয়ে নেয়া। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি) ব্যভিচারী বৃদ্ধ ব্যভিচারিণী বৃদ্ধাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা।' আরও একটি আয়াতঃ (আরবি) অর্থাৎ যদি বানী আদমের জন্যে স্বর্ণের দুইটি উপত্যকা হয় তবে সে অবশ্যই তৃতীয়টি অনুসন্ধান করবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা আয়াতের হুকুম পরিবর্তন করে থাকেন। যেমন হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, জায়েযকে নাজায়েয এবং নাজায়েযকে জায়েয ইত্যাদি নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা, বাধা ও অনুমতি এবং বৈধ ও অবৈধ কাজে নস’ হয়ে থাকে। তবে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে বা যে ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে তাতে রদবদল এবং নাসিখ ও মানসূখ হয় না। নস’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে নকল করা। যেমন একটি পুস্তক থেকে আর একটি পুস্তক নকল করা হয়। এরকমই এখানেও যেহেতু একটি নির্দেশের পরিবর্তে আর একটি নির্দেশ দেয়া হয় এ জন্যে একে নসখ বলে। ওটা হয় নির্দেশের পরিবর্তন হোক বা শব্দের পরিবর্তন হোক।‘নস’ এর মূলতত্ত্বের উপর মূলনীতির পণ্ডিতগণের অভিমতএ জিজ্ঞাস্য বিষয়ে ধর্মীয় মূলনীতির পণ্ডিতগণের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপ হলেও অর্থ হিসেবে সবগুলো প্রায় একই। নস’ এর অর্থ হচ্ছে-কোন শরঈ নির্দেশ পরবর্তী দলীলের ভিত্তিতে সরে যাওয়া। কখনও সহজের পরিবর্তে কঠিন এবং কখনও কঠিনের পরিবর্তে সহজ হয়, আবার কখনও বা কোন পরিবর্তনই হয় না। তাবরানীর (রঃ) হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস আছে যে, দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে একটি সূরা মুখস্থ করেছিলেন। সূরাটি তারা পড়তেই থাকেন। একদা রাত্রির নামাযে সূরাটি তারা পড়ার ইচ্ছে করেন কিন্তু কোনক্রমেই স্মরণ করতে পারেন না। হতবুদ্ধি হয়ে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন এবং ওটা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “এটা মানসূখ হয়ে গেছে এবং এর পরিবর্তে উত্তম দেয়া হয়েছে। তোমাদের অন্তর হতে ওটা বের করে নেয়া হয়েছে। দুঃখ করো না, নিশ্চিন্ত থাক।'হযরত যুহরী (রঃ) (আরবি) পেশ এর সঙ্গে পড়তেন। এর, একজন বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন রাকিম দুর্বল। আবু বকর আম্বারীও (রঃ) অন্য সনদে মারফুরূপে এটাকে বর্ণনা করেছেন, যেমন কুরতুবীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে (আরবি) কে (আরবি) ও (আরবি) পড়া হয়েছে (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পিছনে সরিয়ে দেয়া। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর তাফসীরে বর্ণনা করেনঃ অর্থাৎ আমি ওকে ছেড়ে দেই, মানসূখ করি না। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমি ওর শব্দ ঠিক রেখে হুকুম পরিবর্তন করে দেই।' আবৃদ বিন উমাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে অর্থাৎ আমি ওকে পিছনে সরিয়ে দেই। আতিয়া আওফী (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ মানসূখ করি।' সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসও (রঃ) এটাই বলেন। যহহাক (রঃ) বলেনঃ “অর্থাৎ নাসিখকে মানসূখের পিছনে রাখি। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমার নিকট ওটা টেনে নেই।' হযরত উমার (রাঃ) খুত্বায় পড়েছেন এবং এর অর্থ ‘পিছনে হওয়া বর্ণনা করেছেন (আরবি) পড়লে ওর ভাবার্থ হবে ‘আমি ওটা ভুলিয়ে দেই। আল্লাহ তা'আলা যে হুকুম উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করতেন ওটা নবী (সঃ) কে ভুলিয়ে দিতেন। এভাবেই ঐ আয়াতটি উঠে। যেতে।হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) (আরবি) পড়তেন। এতে তাঁকে হযরত কাসিম বিন আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) তো একে (আরবি) পড়তেন। তখন তিনি বলেন যে, সাঈদের (রঃ) উপর কিংবা তাঁর বংশের উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে অতি সত্বরই পড়িয়ে দিবো, অতঃপর তুমি ভুলবে না। (৮৭:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তুমি ভুলে যাবে তখন তোমার প্রভুকে স্মরণ কর।' (১৮:২৪) হযরত উমারের (রাঃ) ঘোষণা রয়েছেঃ “হযরত আলী (রাঃ) উত্তম ফায়সালাকারী এবং হযরত উবাই (রাঃ) সবচেয়ে বেশী কুরআনের পাঠক। আমরা হযরত উবাই (রাঃ)-এর কথা ছেড়ে দেই। কেননা, তিনি বলেন, 'আমি যা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) মুখে শুনেছি তা ছাড়বো না, অথচ আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি যা মানসূখ করি বা ভুলিয়ে দেই, তা হতে উত্তম বা তারই মত আনয়ন করি।' (সহীহ বুখারী ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)।‘তা হতে উত্তম হয় অর্থাৎ বান্দাদের জন্যে সহজ ও তাদের আরাম হিসেবে, কিংবা ‘তারই মত হয়। কিন্তু আল্লাহ পাকের দূরদর্শিতা তার পরেরটাতেই রয়েছে। সৃষ্টজীবের হেরফেরকারী এবং সৃষ্টি ও হুকুমের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে যেভাবে চান সেভাবেই গঠন করেন। তিনি যাকে চান ভাগ্যবান করেন এবং যাকে চান হতভাগ্য করেন। যাকে চান সুস্থতা প্রদান করেন এবং যাকে চান রোগাক্রান্ত করেন। যাকে চান ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যাকে চান দুর্ভাগা করেন। বান্দাদের মধ্যে তিনি যে হুকুম জারী করতে চান। তাই জারী করেন। যা চান হারাম করেন, যা চান হালাল করেন, যা চান অনুমতি দেন এবং যা চান নিষেধ করেন। তিনি ব্যাপক বিচারপতি। তিনি যা চান সেই আহকামই জারী করেন,তার হুকুম কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেনা। তিনি যা চান তাই করেন। কেউই তাকে বাধা দান করতে পারে না। তিনি বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন এবং দেখেন যে, তারা নবী ও রাসূলদের কিরূপ অনুসারী হয়। তিনি কোন যৌক্তিকতার কারণে নির্দেশ দেন, আর কোন যৌক্তিকতার কারণে ঐ হুকুমকেই সরিয়ে দেন। তখন পরীক্ষা হয়ে যায়। ভাল লোকেরা তখনও আনুগত্যে প্রস্তুত ছিল এবং এখনও আছে কিন্তু যাদের অন্তর খারাপ, তারা তখন সমালোচনা শুরু করে দেয় এবং নাক মুখ চড়িয়ে থাকে। অথচ সমস্ত সৃষ্টজীবের সৃষ্টিকর্তার সমস্ত কথাই মেনে নেয়া উচিত এবং সর্বাবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি যা বলেন তাই সত্য জেনে পালন করা এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। এস্থলেও ইয়াহুদীদের কথাকে চরমভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং তাদের কুফরীর বর্ণনা রয়েছে। তারা নসখ’কে স্বীকার করতো না। কেউ কেউ বলেন যে, বিবেক অনুসারেও এতে অসুবিধে রয়েছে। আবার কেউ কেউ শরীয়তের দৃষ্টিতে একে অসুবিধাজনক মনে করে থাকেন। এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃত পক্ষে এটা ইয়াহূদীদের কথার প্রতিবাদেই বলা হয়েছে। তারা ইঞ্জীল ও কুরআনকে মানতো না। কারণ এই যে, এ দুটির মধ্যে তাওরাতের কতকগুলো হুকুম পরিবর্তন করা হয়েছে। আর এই একই কারণে তারা এই নবীগণকেও স্বীকার করতো না। এটা শুধু অবাধ্যতা ও অহংকারই বটে। নচেৎ বিবেক হিসেবে তা নসখ’ অসম্ভব নয়। কেননা, মহান আল্লাহ স্বীয় কার্যে সর্বাধিকারী। তিনি যা চান ও যখন চান সৃষ্টি করে থাকেন। যা চান, যেভাবে চান সে ভাবে রাখেন। এভাবেই যা চান এবং যখন চান হুকুম করে দেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, তার হুকুমের উপর কারও হুকুম বের হতে পারে না। এভাবেই শরীয়তের ভিত্তিতেও এটা প্রমাণিত বিষয়। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ ও শরীয়তসমূহে এটা বিদ্যমান রয়েছে। হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানেরা পরস্পর ভাই বোন হতো। কিন্তু তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ ছিল। অতঃপর পরবর্তী যুগে এটা হারাম করে দেয়া হয়েছে। হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকায় উঠছেন তখন সমুদয় প্রাণীর গোশত বৈধ রাখা হয়েছে। কিন্তু পরে কতকগুলোর গোশত অবৈধ ঘোষণা করা হয়। দুই বোনকে এক সঙ্গে বিয়ে করা হযরত ইসরাঈল (আঃ) এবং তাঁর সন্তানদের জন্যে বৈধ ছিল। অতঃপর তাওরাতে এবং তার পরেও অবৈধ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীমকে তার পুত্র ইসমাঈলের (আঃ) কুরবানীর নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরবানীর পূর্বেই এই হুকুম মানসূখ করে দেয়া হয়। বানী ইসরাঈলকে হুকুম দেয়া হয়েছিল যে, যারা বাছুর পূজা করেছিল তাদেরকে যেন তারা হত্যা করে; অথচ অনেক বাকি থাকতেই এ হুকুম উঠিয়ে নেয়া হয়। এরকম আরও বহু ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। আর স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ওটা স্বীকার করে। কিন্তু তথাপিও তারা কুরআন মাজীদকে ও শেষ নবীকে (সঃ) এ বলে মানছে না যে, আল্লাহর কালামের পরিবর্তন অপরিহার্য হচ্ছে এবং এটা অসম্ভব। এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তাআলা নখের বৈধতা বর্ণনা করতঃ ঐ অভিশপ্ত দলের দাবী খণ্ডন করেছেন। সূরা-ই-আলে-ইমরানের মধ্যেও-যার প্রারম্ভে বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে, নসখ’ সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা বিদ্যমান। রয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেক খাদ্য বানী ইসরাঈলের উপর হালাল ছিল, কিন্তু ইসরাঈল (আঃ) তার উপর যে জিনিস হারাম করে নিয়েছিল (ওটা তাদের উপর ও হারাম করা হয়েছে)। এর বিস্তারিত তাফসীর ইনশাআল্লাহ ওর স্থানে আসবে। সব মুসলমানই এতে একমত যে, আল্লাহর আহকামের মধ্যে নখ’ হওয়া বৈধ, বরং সংঘটিত হয়ে গেছে এবং ওতেই আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ নৈপূণ্য প্রকাশ পেয়েছে। মুফাসির আবু মুসলিম ইস্পাহানী লিখেছেন যে, কুরআনের মধ্যে নসখ’ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তার এই কথা দুর্বল। কুরআন মাজীদের যেখানে যেখানে নসখ’ বিদ্যমান রয়েছে ওর উত্তর দিতে গিয়ে যদিও তিনি বহু পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু সবই বিফল হয়েছে। যে স্ত্রী লোকের স্বামী মারা যায় তার অন্যত্র বিয়ে সিদ্ধ হওয়ার জন্যে পূর্বে সময়কাল ছিল এক বছর। কিন্তু পরে এর জন্যে সময় করা হয়েছে চার মাস দশ দিন। এ দুটো আয়াতই কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে কিবলাহ ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস। কিন্তু পরে পবিত্র কাবাকে কিবলাহ করা হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটি স্পষ্ট এবং প্রথম আয়াতটিও আনুষঙ্গিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। পূর্বে মুসলমানদের উপর এই নির্দেশ ছিল যে,তারা এক একজন মুসলমান দশ জন কাফিরের মুকাবিলা করবে এবং পিছনে সরে আসবে না; কিন্তু পরে এ হুকুম মানসূখ হয়ে গিয়ে একজন মুসলমানকে দু’জন কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং দুটি আয়াতই আল্লাহ তা'আলার কালামে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে আলাপ করার আগে কিছু সাদকা করার নির্দেশ ছিল। পরে এটা মানসূখ করে দেয়া হয়। আর এ দুটি আয়াতই কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।'

আল-বাকারা 2:107

১০৬-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর‘নখ’ এর মূলতত্ত্বঃহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নস’ এর অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সরিয়ে দেয়া, যা লিখার সময় (কখনও) অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু হুকুম পরিবর্তন হয়ে যায়। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ বিন কাব কার্যীও (রঃ) এ রকমই বর্ণনা করেছেন। যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভুলিয়ে দেয়া। আতা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ ছেড়ে দেয়া। সুদী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ উঠিয়ে নেয়া। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি) ব্যভিচারী বৃদ্ধ ব্যভিচারিণী বৃদ্ধাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা।' আরও একটি আয়াতঃ (আরবি) অর্থাৎ যদি বানী আদমের জন্যে স্বর্ণের দুইটি উপত্যকা হয় তবে সে অবশ্যই তৃতীয়টি অনুসন্ধান করবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা আয়াতের হুকুম পরিবর্তন করে থাকেন। যেমন হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, জায়েযকে নাজায়েয এবং নাজায়েযকে জায়েয ইত্যাদি নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা, বাধা ও অনুমতি এবং বৈধ ও অবৈধ কাজে নস’ হয়ে থাকে। তবে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে বা যে ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে তাতে রদবদল এবং নাসিখ ও মানসূখ হয় না। নস’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে নকল করা। যেমন একটি পুস্তক থেকে আর একটি পুস্তক নকল করা হয়। এরকমই এখানেও যেহেতু একটি নির্দেশের পরিবর্তে আর একটি নির্দেশ দেয়া হয় এ জন্যে একে নসখ বলে। ওটা হয় নির্দেশের পরিবর্তন হোক বা শব্দের পরিবর্তন হোক।‘নস’ এর মূলতত্ত্বের উপর মূলনীতির পণ্ডিতগণের অভিমতএ জিজ্ঞাস্য বিষয়ে ধর্মীয় মূলনীতির পণ্ডিতগণের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপ হলেও অর্থ হিসেবে সবগুলো প্রায় একই। নস’ এর অর্থ হচ্ছে-কোন শরঈ নির্দেশ পরবর্তী দলীলের ভিত্তিতে সরে যাওয়া। কখনও সহজের পরিবর্তে কঠিন এবং কখনও কঠিনের পরিবর্তে সহজ হয়, আবার কখনও বা কোন পরিবর্তনই হয় না। তাবরানীর (রঃ) হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস আছে যে, দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে একটি সূরা মুখস্থ করেছিলেন। সূরাটি তারা পড়তেই থাকেন। একদা রাত্রির নামাযে সূরাটি তারা পড়ার ইচ্ছে করেন কিন্তু কোনক্রমেই স্মরণ করতে পারেন না। হতবুদ্ধি হয়ে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন এবং ওটা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “এটা মানসূখ হয়ে গেছে এবং এর পরিবর্তে উত্তম দেয়া হয়েছে। তোমাদের অন্তর হতে ওটা বের করে নেয়া হয়েছে। দুঃখ করো না, নিশ্চিন্ত থাক।'হযরত যুহরী (রঃ) (আরবি) পেশ এর সঙ্গে পড়তেন। এর, একজন বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন রাকিম দুর্বল। আবু বকর আম্বারীও (রঃ) অন্য সনদে মারফুরূপে এটাকে বর্ণনা করেছেন, যেমন কুরতুবীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে (আরবি) কে (আরবি) ও (আরবি) পড়া হয়েছে (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পিছনে সরিয়ে দেয়া। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর তাফসীরে বর্ণনা করেনঃ অর্থাৎ আমি ওকে ছেড়ে দেই, মানসূখ করি না। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমি ওর শব্দ ঠিক রেখে হুকুম পরিবর্তন করে দেই।' আবৃদ বিন উমাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে অর্থাৎ আমি ওকে পিছনে সরিয়ে দেই। আতিয়া আওফী (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ মানসূখ করি।' সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসও (রঃ) এটাই বলেন। যহহাক (রঃ) বলেনঃ “অর্থাৎ নাসিখকে মানসূখের পিছনে রাখি। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমার নিকট ওটা টেনে নেই।' হযরত উমার (রাঃ) খুত্বায় পড়েছেন এবং এর অর্থ ‘পিছনে হওয়া বর্ণনা করেছেন (আরবি) পড়লে ওর ভাবার্থ হবে ‘আমি ওটা ভুলিয়ে দেই। আল্লাহ তা'আলা যে হুকুম উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করতেন ওটা নবী (সঃ) কে ভুলিয়ে দিতেন। এভাবেই ঐ আয়াতটি উঠে। যেতে।হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) (আরবি) পড়তেন। এতে তাঁকে হযরত কাসিম বিন আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) তো একে (আরবি) পড়তেন। তখন তিনি বলেন যে, সাঈদের (রঃ) উপর কিংবা তাঁর বংশের উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে অতি সত্বরই পড়িয়ে দিবো, অতঃপর তুমি ভুলবে না। (৮৭:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তুমি ভুলে যাবে তখন তোমার প্রভুকে স্মরণ কর।' (১৮:২৪) হযরত উমারের (রাঃ) ঘোষণা রয়েছেঃ “হযরত আলী (রাঃ) উত্তম ফায়সালাকারী এবং হযরত উবাই (রাঃ) সবচেয়ে বেশী কুরআনের পাঠক। আমরা হযরত উবাই (রাঃ)-এর কথা ছেড়ে দেই। কেননা, তিনি বলেন, 'আমি যা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) মুখে শুনেছি তা ছাড়বো না, অথচ আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি যা মানসূখ করি বা ভুলিয়ে দেই, তা হতে উত্তম বা তারই মত আনয়ন করি।' (সহীহ বুখারী ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)।‘তা হতে উত্তম হয় অর্থাৎ বান্দাদের জন্যে সহজ ও তাদের আরাম হিসেবে, কিংবা ‘তারই মত হয়। কিন্তু আল্লাহ পাকের দূরদর্শিতা তার পরেরটাতেই রয়েছে। সৃষ্টজীবের হেরফেরকারী এবং সৃষ্টি ও হুকুমের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে যেভাবে চান সেভাবেই গঠন করেন। তিনি যাকে চান ভাগ্যবান করেন এবং যাকে চান হতভাগ্য করেন। যাকে চান সুস্থতা প্রদান করেন এবং যাকে চান রোগাক্রান্ত করেন। যাকে চান ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যাকে চান দুর্ভাগা করেন। বান্দাদের মধ্যে তিনি যে হুকুম জারী করতে চান। তাই জারী করেন। যা চান হারাম করেন, যা চান হালাল করেন, যা চান অনুমতি দেন এবং যা চান নিষেধ করেন। তিনি ব্যাপক বিচারপতি। তিনি যা চান সেই আহকামই জারী করেন,তার হুকুম কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেনা। তিনি যা চান তাই করেন। কেউই তাকে বাধা দান করতে পারে না। তিনি বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন এবং দেখেন যে, তারা নবী ও রাসূলদের কিরূপ অনুসারী হয়। তিনি কোন যৌক্তিকতার কারণে নির্দেশ দেন, আর কোন যৌক্তিকতার কারণে ঐ হুকুমকেই সরিয়ে দেন। তখন পরীক্ষা হয়ে যায়। ভাল লোকেরা তখনও আনুগত্যে প্রস্তুত ছিল এবং এখনও আছে কিন্তু যাদের অন্তর খারাপ, তারা তখন সমালোচনা শুরু করে দেয় এবং নাক মুখ চড়িয়ে থাকে। অথচ সমস্ত সৃষ্টজীবের সৃষ্টিকর্তার সমস্ত কথাই মেনে নেয়া উচিত এবং সর্বাবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি যা বলেন তাই সত্য জেনে পালন করা এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। এস্থলেও ইয়াহুদীদের কথাকে চরমভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং তাদের কুফরীর বর্ণনা রয়েছে। তারা নসখ’কে স্বীকার করতো না। কেউ কেউ বলেন যে, বিবেক অনুসারেও এতে অসুবিধে রয়েছে। আবার কেউ কেউ শরীয়তের দৃষ্টিতে একে অসুবিধাজনক মনে করে থাকেন। এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃত পক্ষে এটা ইয়াহূদীদের কথার প্রতিবাদেই বলা হয়েছে। তারা ইঞ্জীল ও কুরআনকে মানতো না। কারণ এই যে, এ দুটির মধ্যে তাওরাতের কতকগুলো হুকুম পরিবর্তন করা হয়েছে। আর এই একই কারণে তারা এই নবীগণকেও স্বীকার করতো না। এটা শুধু অবাধ্যতা ও অহংকারই বটে। নচেৎ বিবেক হিসেবে তা নসখ’ অসম্ভব নয়। কেননা, মহান আল্লাহ স্বীয় কার্যে সর্বাধিকারী। তিনি যা চান ও যখন চান সৃষ্টি করে থাকেন। যা চান, যেভাবে চান সে ভাবে রাখেন। এভাবেই যা চান এবং যখন চান হুকুম করে দেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, তার হুকুমের উপর কারও হুকুম বের হতে পারে না। এভাবেই শরীয়তের ভিত্তিতেও এটা প্রমাণিত বিষয়। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ ও শরীয়তসমূহে এটা বিদ্যমান রয়েছে। হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানেরা পরস্পর ভাই বোন হতো। কিন্তু তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ ছিল। অতঃপর পরবর্তী যুগে এটা হারাম করে দেয়া হয়েছে। হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকায় উঠছেন তখন সমুদয় প্রাণীর গোশত বৈধ রাখা হয়েছে। কিন্তু পরে কতকগুলোর গোশত অবৈধ ঘোষণা করা হয়। দুই বোনকে এক সঙ্গে বিয়ে করা হযরত ইসরাঈল (আঃ) এবং তাঁর সন্তানদের জন্যে বৈধ ছিল। অতঃপর তাওরাতে এবং তার পরেও অবৈধ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীমকে তার পুত্র ইসমাঈলের (আঃ) কুরবানীর নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরবানীর পূর্বেই এই হুকুম মানসূখ করে দেয়া হয়। বানী ইসরাঈলকে হুকুম দেয়া হয়েছিল যে, যারা বাছুর পূজা করেছিল তাদেরকে যেন তারা হত্যা করে; অথচ অনেক বাকি থাকতেই এ হুকুম উঠিয়ে নেয়া হয়। এরকম আরও বহু ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। আর স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ওটা স্বীকার করে। কিন্তু তথাপিও তারা কুরআন মাজীদকে ও শেষ নবীকে (সঃ) এ বলে মানছে না যে, আল্লাহর কালামের পরিবর্তন অপরিহার্য হচ্ছে এবং এটা অসম্ভব। এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তাআলা নখের বৈধতা বর্ণনা করতঃ ঐ অভিশপ্ত দলের দাবী খণ্ডন করেছেন। সূরা-ই-আলে-ইমরানের মধ্যেও-যার প্রারম্ভে বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে, নসখ’ সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা বিদ্যমান। রয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেক খাদ্য বানী ইসরাঈলের উপর হালাল ছিল, কিন্তু ইসরাঈল (আঃ) তার উপর যে জিনিস হারাম করে নিয়েছিল (ওটা তাদের উপর ও হারাম করা হয়েছে)। এর বিস্তারিত তাফসীর ইনশাআল্লাহ ওর স্থানে আসবে। সব মুসলমানই এতে একমত যে, আল্লাহর আহকামের মধ্যে নখ’ হওয়া বৈধ, বরং সংঘটিত হয়ে গেছে এবং ওতেই আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ নৈপূণ্য প্রকাশ পেয়েছে। মুফাসির আবু মুসলিম ইস্পাহানী লিখেছেন যে, কুরআনের মধ্যে নসখ’ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তার এই কথা দুর্বল। কুরআন মাজীদের যেখানে যেখানে নসখ’ বিদ্যমান রয়েছে ওর উত্তর দিতে গিয়ে যদিও তিনি বহু পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু সবই বিফল হয়েছে। যে স্ত্রী লোকের স্বামী মারা যায় তার অন্যত্র বিয়ে সিদ্ধ হওয়ার জন্যে পূর্বে সময়কাল ছিল এক বছর। কিন্তু পরে এর জন্যে সময় করা হয়েছে চার মাস দশ দিন। এ দুটো আয়াতই কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে কিবলাহ ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস। কিন্তু পরে পবিত্র কাবাকে কিবলাহ করা হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটি স্পষ্ট এবং প্রথম আয়াতটিও আনুষঙ্গিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। পূর্বে মুসলমানদের উপর এই নির্দেশ ছিল যে,তারা এক একজন মুসলমান দশ জন কাফিরের মুকাবিলা করবে এবং পিছনে সরে আসবে না; কিন্তু পরে এ হুকুম মানসূখ হয়ে গিয়ে একজন মুসলমানকে দু’জন কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং দুটি আয়াতই আল্লাহ তা'আলার কালামে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে আলাপ করার আগে কিছু সাদকা করার নির্দেশ ছিল। পরে এটা মানসূখ করে দেয়া হয়। আর এ দুটি আয়াতই কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।'

আল-বাকারা 2:108

অধিক আবেদন ও জিজ্ঞাসাবাদ হতে নিষেধাজ্ঞা।এ পবিত্র আয়াতে মহান আল্লাহ ঈমানদারগণকে কোন ঘটনা ঘটার পূর্বে তাঁর রাসূল (সঃ) কে বাজে প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছেন। এ অধিক প্রশ্নের অভ্যাস খুবই জঘন্য। অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “হে মুমিনগণ! ঐ সব বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করো না যে, যদি ওটা প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তোমাদের খারাপ লাগবে এবং যদি কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হওয়ার যুগে এসব প্রশ্ন করতে থাকো তবে এসব বিষয় প্রকাশ করে দেয়া হবে। কোন জিনিস ঘটে যাওয়ার পূর্বে ওটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ ভয় রয়েছে যে, প্রশ্ন করার দরুন না জানি ওটা হারাম হয়ে যায়।'সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী ঐ ব্যক্তি, যে এমন জিনিস সম্পর্কে প্রশ্ন করে যা হারাম ছিল না, কিন্তু তার প্রশ্নের কারণে তা হারাম হয়ে যায়। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে কেউ জিজ্ঞেস করে যে, যদি কোন লোক তার স্ত্রীর কাছে অপর কোন লোককে পায় তবে সে কি করবে? যদি জনগণকে সংবাদ দেয় তবে তো বড় লজ্জার কথা হবে, আর যদি চুপ থাকে তবে ওটাও নির্লজ্জের মত কাজ হবে। এ প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খুবই খারাপ মনে হলো। ঘটনাক্রমে ঐ লোকটিরই এ ঘটনা ঘটে গেল এবং লি’আনের হুকুম নাযিল হয়ে গেল।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাজে কথা, সম্পদ নষ্ট করা এবং বেশী প্রশ্ন করা হতে নিষেধ করেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যতক্ষণ কিছু না বলি ততক্ষণ তোমরাও কিছুই আমাকে জিজ্ঞেস করো না। তোমাদের পূর্ববর্তী লোককে এই বদঅভ্যাসই ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা খুব বেশী প্রশ্ন করতে এবং তাদের নবীদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতো। আমি যদি তোমাদেরকে কিছু নির্দেশ দেই তবে সাধ্যানুসারে তা পালন কর।' এ কথা তিনি ঐ সময় বলেছিলেন যখন তিনি জনগণকে বলেছিলেনঃ “তোমাদের উপর আল্লাহ তা'আলা হজ্ব ফরয করেছেন।' তখন কেউ বলেছিলঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) প্রতি বছরই কি. তিনি নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করেছিল; কিন্তু তিনি কোন উত্তর দেননি। সে ততীয় বার এ প্রশ্নই করলে তিনি বলেছিলেনঃ ‘প্রতি বছর নয়; কিন্তু যদি আমি হা করে দিতাম তবে ওটা প্রতি বছরই ফরয হয়ে যেতো। অতঃপর তোমরা ওটা পালন করতে পারতে না।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ যখন থেকে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হতে বিরত রাখা হয় তখন থেকে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে কোন প্রশ্ন করতে খুবই ভয় কবতায় যান করতাম। আমরা ইচ্ছে পোষণ করতাম যে, কোন গ্রাম্য অশিক্ষিত বেদুঈন জিজ্ঞেস করলে আমরা শুনতে পেতাম। হযরত বারা’ বিন আযিব (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করতাম, বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়ে যেতো, কিন্তু আমি ভয়ে জিজ্ঞেস করতে সাহস করতাম না, আশা পোষণ করতাম কোন বেদুঈন এসে প্রশ্ন করতো তবে আমরাও শুনতে পেতাম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) হতে উত্তম দল আর নেই। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে শুধুমাত্র বারোটি প্রশ্ন করেছিলেন। ঐ সব প্রশ্ন ও উত্তর কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন মদ্য ইত্যাদির প্রশ্ন, হারাম মাসগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন, পিতৃহীন বালকদের সম্পর্কে প্রশ্ন ইত্যাদি। এখানে (আরবি) শব্দটি হয়তো বা (আরবি) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা স্বীয় মূল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নের ব্যাপারে, যা এখানে অস্বীকৃতি সূচক। এ নির্দেশ মুমিন ও কাফির সবারই জন্যে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালত সবার জন্যেই ছিল। কুরআন মাজীদের অন্য স্থানে আছেঃ “আহলে কিতাব তোমার নিকট আবেদন করে যে, তুমি তাদের উপর কোন আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করবে, মূসার (আঃ) নিকট তো এর চেয়ে বড় আবেদন জানানো হয়েছিল, (তা হচ্ছে) আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে চাই, ঐ অত্যাচারের কারণে। তাদেরকে একটা ভয়ানক শব্দের দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়।'রাফে’ বিন হুরাইমালা এবং জাহার বিন ইয়াযীদ বলেছিলঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আসমানী কিতাব আমাদের উপর অবতীর্ণ করুন যা আমরা আমাদের শহরে প্রচার করবো, তাহলে আমরা মানবো।' এতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বানী ইসরাঈলের পাপ মোচন যেমনভাবে হয়েছিল ঐভাবেই যদি আমাদের পাপ মোচন হতো তবে কতই না ভাল হতো! এটা শুনা মাত্রই তিনি আল্লাহর দরবারে আরয করেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা এটা চাইনে।' অতঃপর বলেনঃ ‘বানী ইসরাঈল যেখানে কোন পাপ কার্য করতো তা ওর দরজার উপর লিখিত পাওয়া যেতো এবং সঙ্গে সঙ্গে ওটা মোচনের মাধ্যম লিখে দেয়া হতো। এখন হয় তারা দুনিয়ার লাঞ্ছনা। মঞ্জুর করতঃ কাফফারা আদায় করবে এবং গোপন পাপ প্রকাশ করবে, কিংবা কাফফারা আদায় না করে পারলৌকিক শাস্তি মঞ্জুর করবে। কিন্তু তোমাদের সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ যার দ্বারা কোন খারাপ কাজ হয়ে যায় কিংবা সে স্বীয় নাফসের উপর অত্যাচার করে বসে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে বড় ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে।' এরকমই এক নামায অন্য নামায পর্যন্ত ক্ষমার কারণ হয়ে যায়, আবার এক জুমআ দ্বিতীয় জুম'আ পর্যন্ত পাপ কার্যের কাফফারা হয়ে থাকে। জেনে রেখো, যে ব্যক্তি খারাপ কাজের ইচ্ছে করে কিন্তু তা করে বসে না, ওর পাপ লিখা হয় না; আর যদি করে বসে তবে এটাই পাপ লিখা হয়। আর যদি কোন ভাল কাজের ইচ্ছে করে কিন্তু করে না ফেলে, তবে ওর জন্যে একটি পুণ্য লিখা হয় এবং যদি করে ফেলে তবে ওর জন্যে দশটি পুণ্য লিখা হয়। আচ্ছা তা হলে বলতো, তোমরা ভাল হলে, না বানী ইসরাঈল ভাল হলো? না, না, বানী ইসরাঈল অপেক্ষা তোমাদের উপর বহু সহজ করা হয়েছে। এতে দয়া ও মেহেরবানীর পরেও যদি তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও তবে বুঝতে হবে যে, তোমরা নিজে নিজেই ধ্বংস হয়েছে। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছিলোঃ সাফা পাহাড়টি যদি সোনার হয়ে যায় তবে আমরা ঈমান আনবো।' তিনি বলেনঃ তা হলে তোমাদের পরিণাম মায়েদাহ্ (আসমানী আহাৰ্য)-এর জন্যে আবেদনকারীদের মতই হয়ে যাবে। তখন তারা এ আবেদন প্রত্যাহার করে। ভাবার্থ এই যে, অহংকার, অবাধ্যতা এবং দুষ্টামির সাথে নবীগণকে প্রশ্ন করা অত্যন্ত জঘন্য কাজ।যে ঈমানের পরিবর্তে কুফরীকে এবং সহজের পরিবর্তে কঠিনকে গ্রহণ করে নেয়, সে সরল পথ থেকে সরে গিয়ে মুখতা ও ভ্রান্তির পথে পড়ে যায়। অনুরূপভাবে বিনা প্রয়োজনে যারা প্রশ্ন করে তাদের অবস্থাও তাই। কুরআন পাকের মধ্যে এক জায়গায় আছেঃ “তোমরা কি ঐ লোকদেরকে দেখনি, যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফরী দ্বারা বদলিয়ে নেয় এবং স্বীয় সম্প্রদায়কে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে? সে দোযখে প্রবেশ করবে এবং ওটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান।

আল-বাকারা 2:109

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীরশান-ই-নুকূলহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হুহাই বিন আখতাব এবং ইয়াসির বিন আখতাব এই দু'জন ইয়াহুদী মুসলমানদের প্রতি সর্বাপেক্ষা বেশী হিংসা পোষণ করতো। তারা জনগণকে ইসলাম থেকে সরিয়ে রাখতো। তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। কা'ব বিন আশরাফ ইয়াহূদীও এ কাজেই লিপ্ত থাকতো।ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি কা'ব বিন আশরাফের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। সে কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করতো। যদিও তাদের কিতাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান ছিল এবং সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে সম্যক অবগত ছিল ও তাকে ভালভাবেই চিনতো, আবার যদিও সে এও স্বচক্ষে দেখছিল যে, কুরআন মাজীদ তাদের কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করছে এবং এও লক্ষ্য করছিল যে, একজন নিরক্ষর লোক এ কিতাব পাঠ করছেন, যা সরাসরি মুজিযা তথাপি তিনি যে আরবে প্রেরিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র এ কারণেই হিংসার বশবর্তী হয়ে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও কুরআন পাককে অস্বীকার করেছিল এবং জনগণকে পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করেছিল। সেই সময় গভীর পরিণামদর্শিতার ভিত্তিতে মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন ঐ সব ইয়াহূদীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে এবং আল্লাহ তাআলার ফায়সালার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমাদেরকে মুশরিক ও কিতাবীদের বহু অপছন্দনীয় কথা শুনতে হবে।অবশেষে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার অনুমতি প্রদান করেন। হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীবর্গ (রাঃ) এ আয়াতের উপর অমিল করতঃ মুশরিক ও আহলে কিতাবকে ক্ষমা করতেন এবং তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করতেন। অতঃপর অন্য আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তার ফলে পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এখন তাদেরকে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণ ও আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। আর বদর প্রান্তরে যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাতেই মুশরিকরা ভীষণভাবে পরাজিত হয় এবং তাদের বড় বড় নেতৃবৃন্দের মৃত দেহে ময়দান ভর্তি হয়ে যায়।.এখন মু'মিনদেরকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে যে, যদি তারা নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদত সঠিকভাবে পালন করে তবে তাদের পরকালের শাস্তির রক্ষাকবচ ছাড়াও দুনিয়াতেও মুশরিক ও কাফিরদের উপর জয়যুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে যাবে। এরপর মুমিনদেরকে বলা হচ্ছে যে, তাদের ভাল কাজের প্রতিদান উভয় জগতেই দেয়া হবে। তার নিকট ছোট, বড়, প্রকাশ্য, গোপনীয়, ভাল ও মন্দ কোন কাজই গোপন থাকে না। মুমিনদেরকে তার আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যে এবং তাঁর অবাধ্যতা হতে রক্ষার জন্যেই মহান আল্লাহ এটা বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এর পরিবর্তে (আরবি) বলেছেন, যেমন (আরবি)-এর পরিবর্তে (আরবি) এবং (আরবি)-এর পরিবর্তে বলেছেন। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) কর্তৃক সংকলিত হাদীসসমূহের একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতে (আরবি) পড়তেন এবং বলতেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বস্তুকেই দেখে থাকেন।

আল-বাকারা 2:110

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীরশান-ই-নুকূলহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হুহাই বিন আখতাব এবং ইয়াসির বিন আখতাব এই দু'জন ইয়াহুদী মুসলমানদের প্রতি সর্বাপেক্ষা বেশী হিংসা পোষণ করতো। তারা জনগণকে ইসলাম থেকে সরিয়ে রাখতো। তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। কা'ব বিন আশরাফ ইয়াহূদীও এ কাজেই লিপ্ত থাকতো।ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি কা'ব বিন আশরাফের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। সে কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করতো। যদিও তাদের কিতাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান ছিল এবং সে মুহাম্মদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে সম্যক অবগত ছিল ও তাকে ভালভাবেই চিনতো, আবার যদিও সে এও স্বচক্ষে দেখছিল যে, কুরআন মাজীদ তাদের কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করছে এবং এও লক্ষ্য করছিল যে, একজন নিরক্ষর লোক এ কিতাব পাঠ করছেন, যা সরাসরি মুজিযা তথাপি তিনি যে আরবে প্রেরিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র এ কারণেই হিংসার বশবর্তী হয়ে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও কুরআন পাককে অস্বীকার করেছিল এবং জনগণকে পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করেছিল। সেই সময় গভীর পরিণামদর্শিতার ভিত্তিতে মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন ঐ সব ইয়াহূদীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে এবং আল্লাহ তাআলার ফায়সালার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমাদেরকে মুশরিক ও কিতাবীদের বহু অপছন্দনীয় কথা শুনতে হবে।অবশেষে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার অনুমতি প্রদান করেন। হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীবর্গ (রাঃ) এ আয়াতের উপর অমিল করতঃ মুশরিক ও আহলে কিতাবকে ক্ষমা করতেন এবং তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করতেন। অতঃপর অন্য আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তার ফলে পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এখন তাদেরকে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণ ও আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। আর বদর প্রান্তরে যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাতেই মুশরিকরা ভীষণভাবে পরাজিত হয় এবং তাদের বড় বড় নেতৃবৃন্দের মৃত দেহে ময়দান ভর্তি হয়ে যায়।.এখন মু'মিনদেরকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে যে, যদি তারা নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদত সঠিকভাবে পালন করে তবে তাদের পরকালের শাস্তির রক্ষাকবচ ছাড়াও দুনিয়াতেও মুশরিক ও কাফিরদের উপর জয়যুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে যাবে। এরপর মুমিনদেরকে বলা হচ্ছে যে, তাদের ভাল কাজের প্রতিদান উভয় জগতেই দেয়া হবে। তার নিকট ছোট, বড়, প্রকাশ্য, গোপনীয়, ভাল ও মন্দ কোন কাজই গোপন থাকে না। মুমিনদেরকে তার আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যে এবং তাঁর অবাধ্যতা হতে রক্ষার জন্যেই মহান আল্লাহ এটা বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এর পরিবর্তে (আরবি) বলেছেন, যেমন (আরবি)-এর পরিবর্তে (আরবি) এবং (আরবি)-এর পরিবর্তে বলেছেন। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) কর্তৃক সংকলিত হাদীসসমূহের একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতে (আরবি) পড়তেন এবং বলতেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বস্তুকেই দেখে থাকেন।

আল-বাকারা 2:111

১১১-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর ইয়াহূদীদের প্রতারণা, আমিত্ব এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তার উপর ভীষণ সতর্কতা এখানে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেও কিছুই মনে করতো না এবং স্পষ্টভাবে বলতো যে, তারা ছাড়া অন্য কেউ বেহেশতে যাবে না। সূরা মায়েদায় তাদের নিম্নরূপ একটা উক্তিও বর্ণিত হয়েছেঃ আমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান এবং তাঁর প্রিয়। তাদের এ কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছেঃ তা হলে কিয়ামতের দিন তোমাদের উপর শাস্তি হবে কেন?’ অনুরূপভাবে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের উক্তি নিম্নরূপও ছিলঃ “আমরা কয়েকটা দিন দোযখে অবস্থান করবে। তাদের একথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তাদের এই দাবীও দলীল বিহীন। এভাবেই এখানেও তিনি তাদের একটা দাবী খণ্ডন করতঃ বলেনঃ ‘দলীল উপস্থিত কর দেখি? তাদের অপারগতা সাব্যস্ত করে পুনরায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হাঁ, যে কেউই আল্লাহ তা'আলার অনুগত হয়ে ইখলাসের সাথে সল্কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে, সে পূর্ণভাবে তার প্রতিদান লাভ করবে। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “তারা যদি ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও আমি এবং আমার অনুসারীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ করেছি।'মোট কথা, অন্তরের বিশুদ্ধতা ও সুন্নাতের অনুসরন প্রত্যেক আমল গ্রহণ যোগ্য হওয়ার জন্যে শর্ত। তাহলে (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সুন্নাতের অনুসরণ। শুধু মাত্র বিশুদ্ধ অন্তঃকরণই আমলকে গ্রহণযোগ্য করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে সুন্নাতের প্রতি অনুগত থাকে। হাদীস শরীফে উল্লিখিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা গ্রহণীয় নয়' (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘সংসার ত্যাগ' কাজটি বিশুদ্ধ অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সুন্নাতের উল্টো বলে গ্রহণীয় নয়। তদ্রুপ আমল সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা যা আমল করেছিল আমি তা সবই অগ্রাহ্য করেছি।' (২৫:২৩) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ কাফিরদের আমল বালুর চকে চকে মরীচিকার মত, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না। অন্য স্থানে রয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন বহু মুখমণ্ডলের উপর অপমানের কালিমা নেমে আসবে, তারা কাজ করতেও কষ্ট উঠাতে থাকবে এবং জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে, আর তাদেরকে গরম পানি পান করতে দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এর ভাবার্থ নিয়েছেন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের আলেম ও আবেদগণ। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, বাহ্যতঃ কোন কাজ সুন্নাতের অনুরূপ হলেও ঐ আমলে অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য না থাকার কারণে উক্ত আমলও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে। কপট ও মুনাফিকদের অবস্থাও এরূপই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘মুনাফিকরা আল্লাহ তা'আলাকে ধোকা দেয়, তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন; যখন তারা নামাযে দাড়ায় তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়, তারা মানুষকে দেখাবার জন্যেই শুধু আমল করে থাকে।' তিনি আরো বলেনঃ ‘ঐ সব নামাযীর জন্যে ধ্বংস ও বিধ্বস্তি রয়েছে যারা নামাযে উদাসীন থাকে এবং যারা শুধু লোক দেখানোর জন্যে নামায পড়ে, আর যাকাত দেয়া হতে বিরত থাকে।' অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ সুতরাং যে ব্যক্তি স্বীয় প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভের আকাংখা রাখে সে যেন সকাজ করতে থাকে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার না করে। আরও বলেছেনঃ “তাদেরকে তাদের প্রভু পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং ভয় ও সন্ত্রাস হতে রক্ষা করবেন। পরকালে তাদের কোন ভয় নেই এবং দুনিয়া ত্যাগ করতে তাদের কোন দুঃখ নেই।'অতঃপর আল্লাহ পাক ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতার বর্ণনা দেন। নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিরা যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে তখন ইয়াহুদী পণ্ডিতেরাও আসে। অতঃপর তারা একদল অপর দলকে পথভ্রষ্ট আখ্যায় আখ্যায়িত করে। অথচ উভয় দলই আহলে কিতাব। তাওরাতের মধ্যে ইঞ্জীলের এবং ইঞ্জীলের মধ্যে তাওরাতের সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তাদের এসব কথা একেবারেই বাজে ও ভিত্তিহীন।পূর্ববর্তী ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা সত্য ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু পরে তারা বিদআত ও ফিতনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ায় ধর্ম তাদের হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়; অতঃপর ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান কেউই আর সঠিক পথের উপর ছিল না তার পরে মহান আল্লাহ বলেনঃ মুখ ও নিরক্ষরেরাও এরূপ কথাই বলে। এতেও ইঙ্গিত তাদের দিকেই রয়েছে।আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পূর্বেকার লোক। কেউ কেউ আবার ‘আরবের লোক’ ভাবার্থ নিয়েছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর দ্বারা সাধারণ ভাবার্থ নিয়েছেন, যার মধ্যে সবাই জড়িত রয়েছে আর এটাই সঠিক। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ পাক তাদের মতবিরোধের ফায়সালা কিয়ামতের দিন করবেন, যেদিন কোন অত্যাচার ও বল প্রয়োগ থাকবে না। অন্য স্থানেও এ বিষয়টি আনা হয়েছে। সূরা-ই-হাজ্জ-এর মধ্যে এরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন মুমিন, ইয়াহূদী, সাবেঈ, খ্রীষ্টান, মাজুস এবং মুশরিকদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী আছেন।' আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওআমাদের প্রভু আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ন্যায় সঙ্গতভাবে ফায়সালা করবেন, তিনি বড় ফায়সালাকারী ও সর্বজ্ঞাত।

আল-বাকারা 2:112

১১১-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর ইয়াহূদীদের প্রতারণা, আমিত্ব এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তার উপর ভীষণ সতর্কতা এখানে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেও কিছুই মনে করতো না এবং স্পষ্টভাবে বলতো যে, তারা ছাড়া অন্য কেউ বেহেশতে যাবে না। সূরা মায়েদায় তাদের নিম্নরূপ একটা উক্তিও বর্ণিত হয়েছেঃ আমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান এবং তাঁর প্রিয়। তাদের এ কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছেঃ তা হলে কিয়ামতের দিন তোমাদের উপর শাস্তি হবে কেন?’ অনুরূপভাবে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের উক্তি নিম্নরূপও ছিলঃ “আমরা কয়েকটা দিন দোযখে অবস্থান করবে। তাদের একথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তাদের এই দাবীও দলীল বিহীন। এভাবেই এখানেও তিনি তাদের একটা দাবী খণ্ডন করতঃ বলেনঃ ‘দলীল উপস্থিত কর দেখি? তাদের অপারগতা সাব্যস্ত করে পুনরায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হাঁ, যে কেউই আল্লাহ তা'আলার অনুগত হয়ে ইখলাসের সাথে সল্কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে, সে পূর্ণভাবে তার প্রতিদান লাভ করবে। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “তারা যদি ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও আমি এবং আমার অনুসারীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ করেছি।'মোট কথা, অন্তরের বিশুদ্ধতা ও সুন্নাতের অনুসরন প্রত্যেক আমল গ্রহণ যোগ্য হওয়ার জন্যে শর্ত। তাহলে (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সুন্নাতের অনুসরণ। শুধু মাত্র বিশুদ্ধ অন্তঃকরণই আমলকে গ্রহণযোগ্য করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে সুন্নাতের প্রতি অনুগত থাকে। হাদীস শরীফে উল্লিখিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা গ্রহণীয় নয়' (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘সংসার ত্যাগ' কাজটি বিশুদ্ধ অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সুন্নাতের উল্টো বলে গ্রহণীয় নয়। তদ্রুপ আমল সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা যা আমল করেছিল আমি তা সবই অগ্রাহ্য করেছি।' (২৫:২৩) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ কাফিরদের আমল বালুর চকে চকে মরীচিকার মত, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না। অন্য স্থানে রয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন বহু মুখমণ্ডলের উপর অপমানের কালিমা নেমে আসবে, তারা কাজ করতেও কষ্ট উঠাতে থাকবে এবং জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে, আর তাদেরকে গরম পানি পান করতে দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এর ভাবার্থ নিয়েছেন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের আলেম ও আবেদগণ। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, বাহ্যতঃ কোন কাজ সুন্নাতের অনুরূপ হলেও ঐ আমলে অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য না থাকার কারণে উক্ত আমলও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে। কপট ও মুনাফিকদের অবস্থাও এরূপই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘মুনাফিকরা আল্লাহ তা'আলাকে ধোকা দেয়, তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন; যখন তারা নামাযে দাড়ায় তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়, তারা মানুষকে দেখাবার জন্যেই শুধু আমল করে থাকে।' তিনি আরো বলেনঃ ‘ঐ সব নামাযীর জন্যে ধ্বংস ও বিধ্বস্তি রয়েছে যারা নামাযে উদাসীন থাকে এবং যারা শুধু লোক দেখানোর জন্যে নামায পড়ে, আর যাকাত দেয়া হতে বিরত থাকে।' অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ সুতরাং যে ব্যক্তি স্বীয় প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভের আকাংখা রাখে সে যেন সকাজ করতে থাকে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার না করে। আরও বলেছেনঃ “তাদেরকে তাদের প্রভু পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং ভয় ও সন্ত্রাস হতে রক্ষা করবেন। পরকালে তাদের কোন ভয় নেই এবং দুনিয়া ত্যাগ করতে তাদের কোন দুঃখ নেই।'অতঃপর আল্লাহ পাক ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতার বর্ণনা দেন। নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিরা যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে তখন ইয়াহুদী পণ্ডিতেরাও আসে। অতঃপর তারা একদল অপর দলকে পথভ্রষ্ট আখ্যায় আখ্যায়িত করে। অথচ উভয় দলই আহলে কিতাব। তাওরাতের মধ্যে ইঞ্জীলের এবং ইঞ্জীলের মধ্যে তাওরাতের সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তাদের এসব কথা একেবারেই বাজে ও ভিত্তিহীন।পূর্ববর্তী ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা সত্য ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু পরে তারা বিদআত ও ফিতনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ায় ধর্ম তাদের হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়; অতঃপর ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান কেউই আর সঠিক পথের উপর ছিল না তার পরে মহান আল্লাহ বলেনঃ মুখ ও নিরক্ষরেরাও এরূপ কথাই বলে। এতেও ইঙ্গিত তাদের দিকেই রয়েছে।আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পূর্বেকার লোক। কেউ কেউ আবার ‘আরবের লোক’ ভাবার্থ নিয়েছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর দ্বারা সাধারণ ভাবার্থ নিয়েছেন, যার মধ্যে সবাই জড়িত রয়েছে আর এটাই সঠিক। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ পাক তাদের মতবিরোধের ফায়সালা কিয়ামতের দিন করবেন, যেদিন কোন অত্যাচার ও বল প্রয়োগ থাকবে না। অন্য স্থানেও এ বিষয়টি আনা হয়েছে। সূরা-ই-হাজ্জ-এর মধ্যে এরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন মুমিন, ইয়াহূদী, সাবেঈ, খ্রীষ্টান, মাজুস এবং মুশরিকদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী আছেন।' আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওআমাদের প্রভু আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ন্যায় সঙ্গতভাবে ফায়সালা করবেন, তিনি বড় ফায়সালাকারী ও সর্বজ্ঞাত।

আল-বাকারা 2:113

১১১-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর ইয়াহূদীদের প্রতারণা, আমিত্ব এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তার উপর ভীষণ সতর্কতা এখানে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেও কিছুই মনে করতো না এবং স্পষ্টভাবে বলতো যে, তারা ছাড়া অন্য কেউ বেহেশতে যাবে না। সূরা মায়েদায় তাদের নিম্নরূপ একটা উক্তিও বর্ণিত হয়েছেঃ আমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান এবং তাঁর প্রিয়। তাদের এ কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছেঃ তা হলে কিয়ামতের দিন তোমাদের উপর শাস্তি হবে কেন?’ অনুরূপভাবে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের উক্তি নিম্নরূপও ছিলঃ “আমরা কয়েকটা দিন দোযখে অবস্থান করবে। তাদের একথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তাদের এই দাবীও দলীল বিহীন। এভাবেই এখানেও তিনি তাদের একটা দাবী খণ্ডন করতঃ বলেনঃ ‘দলীল উপস্থিত কর দেখি? তাদের অপারগতা সাব্যস্ত করে পুনরায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হাঁ, যে কেউই আল্লাহ তা'আলার অনুগত হয়ে ইখলাসের সাথে সল্কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে, সে পূর্ণভাবে তার প্রতিদান লাভ করবে। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “তারা যদি ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও আমি এবং আমার অনুসারীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ করেছি।'মোট কথা, অন্তরের বিশুদ্ধতা ও সুন্নাতের অনুসরন প্রত্যেক আমল গ্রহণ যোগ্য হওয়ার জন্যে শর্ত। তাহলে (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সুন্নাতের অনুসরণ। শুধু মাত্র বিশুদ্ধ অন্তঃকরণই আমলকে গ্রহণযোগ্য করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে সুন্নাতের প্রতি অনুগত থাকে। হাদীস শরীফে উল্লিখিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা গ্রহণীয় নয়' (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘সংসার ত্যাগ' কাজটি বিশুদ্ধ অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সুন্নাতের উল্টো বলে গ্রহণীয় নয়। তদ্রুপ আমল সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা যা আমল করেছিল আমি তা সবই অগ্রাহ্য করেছি।' (২৫:২৩) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ কাফিরদের আমল বালুর চকে চকে মরীচিকার মত, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না। অন্য স্থানে রয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন বহু মুখমণ্ডলের উপর অপমানের কালিমা নেমে আসবে, তারা কাজ করতেও কষ্ট উঠাতে থাকবে এবং জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে, আর তাদেরকে গরম পানি পান করতে দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এর ভাবার্থ নিয়েছেন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের আলেম ও আবেদগণ। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, বাহ্যতঃ কোন কাজ সুন্নাতের অনুরূপ হলেও ঐ আমলে অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য না থাকার কারণে উক্ত আমলও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে। কপট ও মুনাফিকদের অবস্থাও এরূপই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘মুনাফিকরা আল্লাহ তা'আলাকে ধোকা দেয়, তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন; যখন তারা নামাযে দাড়ায় তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়, তারা মানুষকে দেখাবার জন্যেই শুধু আমল করে থাকে।' তিনি আরো বলেনঃ ‘ঐ সব নামাযীর জন্যে ধ্বংস ও বিধ্বস্তি রয়েছে যারা নামাযে উদাসীন থাকে এবং যারা শুধু লোক দেখানোর জন্যে নামায পড়ে, আর যাকাত দেয়া হতে বিরত থাকে।' অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ সুতরাং যে ব্যক্তি স্বীয় প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভের আকাংখা রাখে সে যেন সকাজ করতে থাকে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার না করে। আরও বলেছেনঃ “তাদেরকে তাদের প্রভু পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং ভয় ও সন্ত্রাস হতে রক্ষা করবেন। পরকালে তাদের কোন ভয় নেই এবং দুনিয়া ত্যাগ করতে তাদের কোন দুঃখ নেই।'অতঃপর আল্লাহ পাক ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতার বর্ণনা দেন। নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিরা যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে তখন ইয়াহুদী পণ্ডিতেরাও আসে। অতঃপর তারা একদল অপর দলকে পথভ্রষ্ট আখ্যায় আখ্যায়িত করে। অথচ উভয় দলই আহলে কিতাব। তাওরাতের মধ্যে ইঞ্জীলের এবং ইঞ্জীলের মধ্যে তাওরাতের সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তাদের এসব কথা একেবারেই বাজে ও ভিত্তিহীন।পূর্ববর্তী ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা সত্য ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু পরে তারা বিদআত ও ফিতনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ায় ধর্ম তাদের হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়; অতঃপর ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান কেউই আর সঠিক পথের উপর ছিল না তার পরে মহান আল্লাহ বলেনঃ মুখ ও নিরক্ষরেরাও এরূপ কথাই বলে। এতেও ইঙ্গিত তাদের দিকেই রয়েছে।আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পূর্বেকার লোক। কেউ কেউ আবার ‘আরবের লোক’ ভাবার্থ নিয়েছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর দ্বারা সাধারণ ভাবার্থ নিয়েছেন, যার মধ্যে সবাই জড়িত রয়েছে আর এটাই সঠিক। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ পাক তাদের মতবিরোধের ফায়সালা কিয়ামতের দিন করবেন, যেদিন কোন অত্যাচার ও বল প্রয়োগ থাকবে না। অন্য স্থানেও এ বিষয়টি আনা হয়েছে। সূরা-ই-হাজ্জ-এর মধ্যে এরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন মুমিন, ইয়াহূদী, সাবেঈ, খ্রীষ্টান, মাজুস এবং মুশরিকদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী আছেন।' আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওআমাদের প্রভু আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ন্যায় সঙ্গতভাবে ফায়সালা করবেন, তিনি বড় ফায়সালাকারী ও সর্বজ্ঞাত।

আল-বাকারা 2:114

এ আয়াতের তাফসীরে দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানকে বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তিতে ভাবার্থ হচ্ছে মুশরিক। খ্রীষ্টানেরাও বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে অপবিত্র জিনিস নিক্ষেপ করতো এবং জনগণকে তার ভিতরে নামায পড়তে বাধা প্রদান করতো। বাখতে নসর যখন বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করার জন্য আক্রমণ চালায় তখন খ্রীষ্টানেরা তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এবং তাকে সর্বপ্রকার সাহায্য করেছিল। বাখতে নসরের ইতিহাস এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের উপর তার ভয়াবহ আক্রমণবাখতে নসর ছিল বাবেলের অধিবাসী এবং জাতিতে সে মাজুস ছিল। বানী ইসরাঈলের প্রতি হিংসা বশতঃ এবং তারা হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়াকে (আঃ) হত্যা করেছিল বলে খ্রীষ্টানেরাও তার সাথে যোগ দিয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির বছর মুশরিকরাও রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে কা'বা শরীফে যেতে বাধা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে যি তাওয়া নামক স্থানে কুরবানী করতে হয়েছিল। মুশরিকদের সঙ্গে সন্ধি করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফিরে এসেছিলেন। অথচ ওটা একটা নিরাপদ স্থান ছিল। পিতা-ভ্রাতার হত্যাকারীকেও কেউ তথায় স্পর্শ করতো না। তাদেরও এক মাত্র উদ্দেশ্য ছিল ওটাকে ধ্বংস করা এবং আল্লাহর যিকর হতে ও হজ্জ এবং উমরাব্রত পালনকারী মুসলিম দলকে বাধা দেয়া। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এটাই উক্তি। ইবনে জারীর (রাঃ) প্রথম উক্তিকেই সঠিক বলেছেন এবং যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মুশরিকরা (রঃ) কা'বা শরীফ ধ্বংস করার চেষ্টা করতো না, বরং খ্রীষ্টানেরাই বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় উক্তিটিই সঠিক। ইবনে যায়েদ (রঃ) ও হযরত আব্বাসেরও (রাঃ) এটাই উক্তি।এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, যখন খ্রীষ্টানেরা ইয়াহুদীদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করতে বাধা দেয় তখন ইয়াহুদীরাও বে-দ্বীন হয়ে পড়ছিল। তাদের উপর তো হযরত দাউদ (আঃ) এবং হযরত ঈসার (আঃ) বদ-দু'আ ছিল। তারা অবাধ্য ও সীমা অতিক্রমকারী হয়ে গিয়েছিল। বরং খ্রীষ্টানেরাই হযরত ঈসার (আঃ) ধর্মের উপর ছিল।এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াত দ্বারা মক্কার মুশরিকদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তা ছাড়া এ ভাবার্থ নেওয়ার এটাও একটা কারণ যে, উপরে ইয়াহুদী ও খ্রষ্টানদের নিন্দের কথা বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে আরবের মুশকিরদের বদ অভ্যাসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে এবং তার সহচরবৃন্দকে (রাঃ) মক্কা থেকে বের করে দেয় এবং হজব্রত ও উমরাব্রত পালন। করতে বাধা দেয়। বায়তুল্লাহ শরীফের বিধ্বস্তির একটা নতুন বর্ণনাক্রমিক তালিকাইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) মক্কার মুশরিকেরা বায়তুল্লাহর বিধ্বস্তির চেষ্টা করেনি' এই উক্তির উত্তর এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবৃন্দকে (রাঃ) মক্কা হতে বিতাড়িত করা এবং পবিত্র কা'বার মধ্যে মূর্তি স্থাপন করার চাইতে বড় ধ্বংস আর কি হতে পারে? স্বয়ং কুরআন পাকে ঘোষিত হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা মসজিদ-ই-হারাম হতে বাধা প্রদান করে।' (৮:৩৪) অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘এসব লোক মাসজিদ-ই-হারাম হতে বাধা দিয়ে থাকে। অন্যত্র বলেনঃ ‘মুশরিকদের দ্বারা আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ হতে পারে না, তারা নিজেরাই তাদের কুফরীর উপর সাক্ষী, তাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে, তারা চিরকালের জন্যে দোযখী। মসজিদসমূহের আবাদ ঐ সব লোকে দ্বারা হয়ে থাকে, যারা আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামায প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত আদায় করে ও শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে, এরাই সঠিক পথ প্রাপ্ত।' আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ “ঐ সব লোক কুফরীও করেছে এবং তোমাদেরকে (মুসলমানদেরকে) মসজিদ-ই-হারাম হতে বাধাও দিয়েছে কুরবানীর পশুগুলোকে যবাহ হওয়ার স্থান পর্যন্ত পৌছুতেও দেয়নি, আমি ঐসব নর ও নারীর প্রতি যদি লক্ষ্য না করতাম যারা দুর্বলতা ও শক্তিহীনতার কারণে মক্কা হতে বের হতে পারে না, তবে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিতাম যে, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, কিন্তু এই নিস্পাপ মুসলমানেরা নিষ্পেষিত হয়ে যাবে বলে আমি সরাসরি এ হুকুম দেইনি; কিন্তু যদি এ কাফিরেরা তাদের দুষ্টামি থেকে বিরত না হয় তবে ঐ সময় দূরে নেই যখন আমার বেদনাদায়ক শাস্তি তাদের প্রতি নিপতিত হবে। সুতরাং ঐ সব মুসলমানকে যখন মসজিদসমূহে প্রবেশ হতে বিরত রাখা হয়েছে, যাদের দ্বারা মসজিদসমূহ আবাদ হয়ে থাকে, তখন মসজিদগুলো ধ্বংস করতে আর বাকি রাখলো কি? মসজিদের আবাদ শুধুমাত্র বাহ্যিক রং ও চাকচিক্যের দ্বারা হয় না; বরং ওর মধ্যে আল্লাহ তা'আলার যি হওয়া, শরীয়তের কার্যাবলী চালু থাকা, শিরূক ও বাহ্যিক ময়লা হতে পবিত্র রাখাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে মসজিদকে আবাদ করা।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, মসজিদের মধ্যে নির্ভীকভাবে প্রবেশ করা মুশরিকদের জন্যে মোটেই শোভা পায় না। ভাবার্থ এই যে, হে মুসলমানগণ! তোমরা মুশরিকদেরকে নিউকি চিত্তে আল্লাহর ঘরে (কাবা শরীফে) প্রবেশ করতে দেবে না, আমি যখন তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবো তখন তোমাদেরকে এ কাজই করতে হবে।' অতঃপর মক্কা বিজয়ের পরবর্তী বছরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেনঃ “এ বছরের পরে যেন কোনও মুশরিক হজ্জ করতে না আসে এবং কেউই যেন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ উলঙ্গ হয়ে না করে। যে সব লোকের মধ্যে সন্ধির সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে তা ঠিকই থাকবে।' প্রকৃতপক্ষে এই নির্দেশ নিম্নের এই আয়াতেরই সত্যতা প্রমাণ করছে ও তার উপর আমল করছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে মু'মিনগণ! নিশ্চয় মুশরিকরা অপবিত্র,সুতরাং তারা যেন এ বছরের পর হতে আর মাসজিদ-ই হারাম’-এর নিকটবর্তী না হয়।' (৯:২৮) অন্য অর্থও বর্ণনা করা হয়েছেঃ মুশরিকদের জন্যে তো এটাই উচিত ছিল যে, তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করে, কিন্তু এটা না করে তারা সম্পূর্ণ উল্টো করছে অর্থাৎ তারা মুসলমানদেরকে মসজিদে প্রবেশ করতে বাধা প্রদান করছে।' এর ভার্থ এও হতে পারেঃ এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরুকে সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি অতি সত্বরই মমিনদেরকে মুশরিকদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং তার ফলে এই মুশরিকরা মসজিদের দিকে মুখ করতেও থর থর করে কাঁপতে থাকবে- আর হলোও তাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানুদেরকে উপদেশ দেন যে, আরব উপদ্বীপে দু’টি ধর্ম থাকতে পারে না এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে তথা হতে বের করে দেয়া হবে। এই উম্মতের ঐ মহান ব্যক্তিগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ উপদেশ কার্যে পরিণত করে দেখিয়ে দেন। এর দ্বারা মসজিদসমূহের মর্যাদাও সাব্যস্ত হলো। বিশেষ করে ঐ স্থানের মসজিদের মর্যাদা সাব্যস্ত হলো যেখানে দানব ও মানব সবারই জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন।ঐ কাফিরদের উপর দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও অপমানও এসে গেল এবং যেমন তারা মুসলমানদেরকে বাধা দিয়েছিল ও দেশ হতে বিতাড়িত করেছিল, ঠিক তেমনই তাদের উপর পূর্ণ প্রতিশোধ নেয়া হলো। তাদেরকেও বাধা দেয়া হলো, আর পরকালের শাস্তি তো অবশিষ্ট থাকলই। কেননা, তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে, মহান আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের নিকট প্রার্থনা করা শুরু করে দিয়েছে, উলঙ্গ হয়ে তারা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেছে ইত্যাদি। আর যদি এর ভাবার্থ খ্রীষ্টানদেৱকে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্ট কথা যে, তারাও বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে আতংক সৃষ্টিকারীরূপে এসেছে, বিশেষ করে ঐ পাথরের তারা অমর্যাদা করেছে যেই দিকে ইয়াহুদীরা নামায পড়তো। এভাবেই ইয়াহূদীরাও অমর্যাদা করেছে এবং খ্রীষ্টানদের অপেক্ষা অনেক বেশী করেছে। কাজেই অপমান ও লাঞ্ছনাও তাদের উপর খ্রীষ্টানদের অপেক্ষা বেশী এসেছে। দুনিয়ার অপমানের অর্থ হচ্ছে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর যুগের অপমান এবং মুসলমানদেরকে জিযিয়া কর দিতে বাধ্য হওয়ার অপমানও বটে। হাদীসে একটি দু'আ এসেছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের সমস্ত কাজের পরিণাম ভাল করুন এবং আমাদেরকে দুনিয়ার অপমান ও আখেরাতের শাস্তি হতে মুক্তি দান করুন।' এ হাদীসটি হাসান। এটা মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের মধ্যে এটা নেই। এর একজন বর্ণনাকারী হযরত বাশার বিন ইরত একজন সাহাবী। এই সাহাবী (রাঃ) হতে এই একটি হাদীস বর্ণিত আছে। দ্বিতীয় ঐ হাদীসটি বর্ণিত আছে যার মধ্যে রয়েছে যে, যুদ্ধে হাত কাটা হয় না।

আল-বাকারা 2:115

অবতীর্ণ হওয়ার কারণএ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এবং তাঁর সাহাবীবর্গকে (রাঃ) সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে, যাদেরকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ও তাঁর মসজিদে প্রবেশ করা হতে বিরত রাখা হয়েছে। মক্কায় অবস্থান কালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। তখন কাবা শরীফও সামনে থাকতো। মদীনায় আগমনের পর ১৬/১৭ মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করেই তারা নামায পড়েন। কিন্তু পরে আল্লাহ পাক কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দেন। কুরআন মাজীদে সর্বপ্রথম রহিতকৃত (মানসূখ) হুকুমইমাম আবু আবীদ কাসিম বিন সালাম (রঃ) স্বীয় পুস্তক নাসিখ ওয়াল মানসূখ’ এর মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বপ্রথম মানসূখ হুকুম হচ্ছে এই কিবলাহই অর্থাৎ উপরোক্ত আয়াতটিই। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তে থাকেন। অতঃপর নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি) অর্থাৎ যেখান হতেই তুমি বাইরে যাবে, স্বীয় মুখ মণ্ডল মাসজিদ-ইহারামের দিকে রাখবে।' (২ ১৪৯) তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়তে শুরু করেন। মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তে থাকলে ইয়াহুদীরা খুবই খুশী হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরে যখন এই হুকুম মানসূখ হয়ে যায় এবং তার আকাংখা ও প্রার্থনা অনুযায়ী বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে নামায পড়ার জন্যে আদিষ্ট হন তখন ঐ ইয়াহূদীরাই তাঁকে বিদ্রুপ করে বলতে থাকে যে, কিবলাহ্ পরিবর্তিত হলো কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ইয়াহুদীদেরকে যেন বলা হচ্ছে যে, এ প্রতিবাদ কেন? যে দিকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হবে সে দিকেই ফিরে যেতে হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর অর্থ হচ্ছে ‘পূর্ব ও পশ্চিম যেখানেই থাকে না কেন মুখ কাবা শরীফের দিকে কর। কয়েকজন মনীষীর বর্ণনা আছে যে, এ আয়াতটি কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দেয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ভাবার্থ এই যে, পূর্ব ও পশ্চিম যে দিকেই চাও মুখ ফিরিয়ে নাও, সব দিকই আল্লাহ তা'আলার এবং সব দিকেই তিনি বিদ্যমান রয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা হতে কোন জায়গা শূন্য নেই। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘অল্প বেশী যাই হোক না কেন, যেখানেই হোক না কেন, আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন।' (৫৮:৭) অতঃপর এই নির্দেশ উঠে গিয়ে কাবা শরীফের দিকে মুখ করা ফরয হয়ে যায়। এ উক্তির মধ্যে রয়েছে যেঃ “আল্লাহ তা'আলা হতে কোন জায়গা শূন্য নেই’ এর ভাবার্থ যদি আল্লাহ তা'আলার ইলম বা অবগতি হয় তবে তো অর্থ। সঠিকই হবে যে, কোন স্থানই আল্লাহ পাকের ইলম হতে শূন্য নেই। আর যদি এর ভাবার্থ হয় ‘আল্লাহ আ'আলার সত্তা’ তবে এটা সঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহ রাব্বল আলামীন যে তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্য হতে কোন জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন তা থেকে তার পবিত্র সত্তা বহু ঊর্ধে। এ আয়াতটির ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ নির্দেশ হচ্ছে সফরে দিক ভুলে যাওয়ার সময় ও ভয়ের সময়ের জন্যে। অর্থাৎ এ অবস্থায় নফল নামায যে কোন দিকে মুখ করে পড়লেই চলবে।হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর উস্ত্রীর মুখ যে দিকেই থাকতো তিনি সেই দিকেই ফিরে নামায পড়ে নিতেন এবং বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিয়ম এটাই ছিল। সুতরাং এ আয়াতের ভাবার্থ এটাও হতে পারে। আয়াতের উল্লেখ ছাড়াই এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী, সুনান-ই- নাসাঈ, মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই ইত্যাদির মধ্যেও বর্ণিত আছে এবং মূল সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছে। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) কে যখন ভয়ের সময়ের নামায পড়া সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হতো.তখন ভয়ের নামাযের বর্ণনা করতেন এবং বলতেনঃ ‘এর চেয়েও বেশী ভয় হলে পায়ে চলা অবস্থায় এবং আরোহণের অবস্থায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়ে নিও-মুখ কিবলার দিকে হোক আর নাই হোক।'হযরত নাফে' (রঃ) বর্ণনা করেনঃ “আমার ধারণায় হযরত আবদুল্লাহ বিন। উমার (রাঃ) ওটা মারফু রূপে বর্ণনা করতেন। ইমাম শাফিঈর (রঃ) প্রসিদ্ধ উক্তি এবং ইমাম আবু হানীফার (রঃ) উক্তি রয়েছে যে, সফরে সওয়ারীর উপর নফল নামায পড়া জায়েয, সেই সফর নিরাপদেরই হোক বা ভীতি পূর্ণই হোক বা যুদ্ধেরই হোক। ইমাম মালিক (রঃ) এবং তাঁর দল এর উল্টো বলেন। ইমাম আবু ইউসুফ এবং আবু সাঈদ ইসতাখারী (রঃ) সফর ছাড়া অন্য সময়েও নফল নামায সওয়ারীর উপর পড়া জায়েয বলে থাকেন। হযরত আনাস (রাঃ) এটা বর্ণনা করেছেন।ইমাম আবু জাফর তাবারীও (রঃ) এটা পছন্দ করেছেন। এমনকি তিনি তো পায়ে চলা অবস্থায়ও এটা বৈধ বলেছেন। কোন মুফাসৃসিরের মতে এ আয়াতটি ঐ সব লোকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা কিবলাহ্ সম্পর্কে অবহিত ছিল না এবং নিজ নিজ ধারণা মতে বিভিন্ন দিকে মুখ করে নামায পড়েছিল। এ আয়াতের দ্বারা তাদের নামাযকে সিদ্ধ বলা হয়েছে।হযরত রাবেআহ্ (রাঃ) বলেন-“আমরা এক সফরে নবী (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এক মনযিলে আমরা অবতরণ করি। রাত্রি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। জনগণ পাথর নিয়ে নিয়ে প্রতীক রূপে কিবলাহর দিকে রেখে নামায পড়তে আরম্ভ করে দেন। সকাল হলে দেখা যায় যে, কিবলাহর দিকে মুখ করে নামায আদায় হয়নি। আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।' এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন। এর দু'জন বর্ণনাকারী দুর্বল। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, সেই সময় মেঘে অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিল এবং আমরা নামায পড়ে নিজ নিজ সামনে রেখা টেনে দেই যেন সকালের আলোতে জানা যায় যে, নামায কিবলার দিকে হয়েছে কি হয় নি। সকালে জানা যায় যে, আমরা কিবলাহ ভুল করেছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ঐ নামায পুনর্বার আদায় করার নির্দেশ দেননি। সেই সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাতেও দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। এ বর্ণনাটি দারকুতনীর হাদীস গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছিলেন না। সনদ হিসেব এটাও দুর্বল। এরূপ নামায পুনরায় পড়তে হবে কিনা এ ব্যাপারে আলেমগণের দু'টি উক্তি রয়েছে। সঠিক উক্তি এটাই যে, এ নামায দ্বিতীয় বার পড়তে হবে না। আর এ উক্তিরই সমর্থনে ঐ হাদীসগুলো এসেছে, যে গুলো উপরে বর্ণিত হলো।কোন কোন মুফাসসিরের মতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিলেন নাজ্জাসী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা তার গায়েবী জানাযার নামায আদায় কর।' তখন কেউ কেউ বলেন যে, তিনি তো মুসলমান ছিলেন না; বরং খ্রীষ্টান ছিলেন। সেই সময় নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ ‘কোন কোন আহলে কিতাব আল্লাহর উপর ঐ কিতাবের উপর যা তোমাদের উপর (মুসলমানদের) অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তোমাদের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল (এ সবের উপর) ঈমান এনে থাকে ও আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে থাকে। তখন তারা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তিনি তো কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন না। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু হাদীসের সংজ্ঞা হিসেবে এ বর্ণনাটি গরীব। এর অর্থ এটাও বলা হয়েছে যে, নাজ্জাসী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন, কারণ তিনি জানতেন না যে, ওটা মানসূখ হয়েছে। ইমাম কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তার জানাযার নামায পড়েছিলেন। গায়েবী জানাযার নামায পড়া যে উচিত এটা তার একটি দলিল। কিন্তু যারা এটা স্বীকার করেন না তাঁরা এটাকে বিশিষ্ট মনে করে থাকেন এবং এর তিনটি ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। প্রথম এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর জানাযা দেখতে পেয়েছিলেন, কারণ ভূমিকে তার জন্যে গুটিয়ে দেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় এই যে, তথায় নাজ্জাসীর জন্যে জানাযা পড়ার কোন লোক ছিল না বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর গায়েবী জানাযার নামায পড়েছিলেন। ইবনে আরাবী (রঃ) এই উত্তরই পছন্দ করেছেন। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, একজন বাদশাহ্ মুসলমান হবে আর তার পাশে তার কওমের কোন লোক মুসলমান থাকবে না, এটা অসম্ভব কথা। ইবনে আরাবী (রঃ) এর উত্তরে বলেন যে, শরীয়তে জানাযার নামাযের যে ব্যবস্থা রয়েছে এটা হয়তো তারা জানতো না। এ উত্তর খুবই চমৎকার। তৃতীয় এই যে, তার গায়েবী জানাযার নামায পড়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল অন্যদের আগ্রহ উৎপাদন করা এবং অন্যান্য বাদশাহদেরকে ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মদীনা, সিরিয়া এবং ইরাকবাসীদের কিবলাহ হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থান। এ বর্ণনাটি জামেউত তিরমিযীর মধ্যেও অন্য শব্দের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এর একজন বর্ণনাকারী আবু মাশারের স্মরণ শক্তি সম্পর্কে কোন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি সমালোচনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) অন্য একটি সনদেও এ হাদীসটি নকল করেছেন এবং একে হাসান সহীহ বলেছেন। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ), হযরত আলী বিন আবি তালিব (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত হয়েছে।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ যখন তুমি পশ্চিমকে তোমার ডান দিকে ও পূর্বকে বাম দিকে করবে, তখন তোমার সামনের দিকই কিবলাহ্ হয়ে যাবে।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও উপরের মতই আয় একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থান হচ্ছে কিবলাহ্।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের ভাবার্থ এটাও হতে পারে যে, আল্লাহ পাক যেন বলেছেনঃ “প্রার্থনা জানানোর সময় তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল যে দিকেই করবে সে দিকেই আমাকে পাবে এবং আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করবো।" হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) অর্থাৎ “যখন তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করবো” (৪০:৬০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন জনগণ বলেনঃ “আমরা কোন্ দিকে প্রার্থনা করবো?” তাঁদের এ কথার উত্তরে (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি পরিবেষ্টনকারী ও পূর্ণ জ্ঞানবান, যার দান দয়া এবং অনুগ্রহ সমস্ত সৃষ্টজীবকে ঘিরে রেখেছে, তিনি সমস্ত কিছু জানেনও বটে। কোন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম জিনিসও তার জ্ঞানের বাইরে নেই।

আল-বাকারা 2:116

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর মহান আল্লাহর সন্তান-সন্ততি নেই একথার যথার্থতারউপর কতকগুলো দলীল। এ আয়াত দ্বারা এবং এর সঙ্গীয় আয়াতগুলো দ্বারা খ্রীষ্টান, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের কথাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সন্তানাদি সাব্যস্ত করেছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, আকাশ, পৃথিবী ইত্যাদি সমুদয় বস্তুর তিনি মালিক তো বটেই, ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা, আহার দাতা, তাদের ভাগ্য, নির্ধারণকারী, তাদেরকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আনয়নকারী, তাদের মধ্যে হেরফেরকারী একমাত্র তিনিই। তাহলে তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর সন্তান কিরূপে হতে পারে? হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হতে পারেন না, যেমন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা ধারণা করতো। ফেরেশতাগণও আল্লাহ তাআলার কন্যা হতে পারে না, যেমন আরবের মুশরিকরা মনে করতো। কেননা, পরস্পর সমান সম্বন্ধযুক্ত দু’টি বস্তু থেকে সন্তান হতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা তো তুলনা বিহীন। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। তিনিই তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, সুতরাং তার সন্তান হবে কি রূপে? তার কোন সহধর্মিনীও নেই। তিনিই প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই প্রত্যেক জিনিসের পরিচয় অবগত আছেন।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা বলে- আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, তোমরা এটা একটা গুরুতর বিষয় উদ্ভাবন করেছে, যদ্দরুণ অসম্ভব নয় যে, আকাশ ফেটে যাবে এবং যমীন খণ্ড বিখণ্ড হয়ে উড়ে যাবে, আর পর্বত ভেঙ্গে পড়বে-এজন্যে যে, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তানের সম্বন্ধ আরোপ করেছে, অথচ আল্লাহর শান এ নয় যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করেন। আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যত কিছুই আছে, সমস্তই আল্লাহর সম্মুখে দাসরূপে উপস্থিত হবে। তিনি সকলকে বেষ্টন করে আছেন এবং সকলকে গণনা করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন তারা সবাই তার সমীপে একা একা উপস্থিত হবে। সুতরাং দাস সন্তান হতে পারে না। মনিব ও সন্তান এ দুটো বিপরীত মুখী ও পরস্পর বিরোধী। অন্য স্থানে একটি পূর্ণ সূরায় আল্লাহ তা'আলা একে নাকচ করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে তুমি বলে দাও যে, তিনি (আল্লাহ) এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন সন্তান-সন্ততি নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। এই আয়াতসমূহে এবং এরকম আরও বহু আয়াতে সেই বিশ্ব প্রভু স্বীয় পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন, তিনি যে তুলনা ও নবীর বিহীন এবং অংশীদার বিহীন তা সাব্যস্ত করেছেন, আর মুশরিকদের এ জঘন্য বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। তিনি তো সবারই সৃষ্টিকর্তা ও সবারই প্রভু। সুতরাং তার সন্তান-সন্ততি ও ছেলে-মেয়ে হবে কোথেকে?সূরা বাকারার এ আয়াতের তাফসীরে সহীহ বুখারীর একটি হাদীস-ইকুদসীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আদম সন্তান আমাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে, অথচ এটা তাদের জন্য উচিত ছিল না, তারা আমাকে গালি দেয় তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না। তাদের মিথ্যা প্রতিপাদন তো এটাই যে, তাদের ধারণায় আমি তাদেরকে মেরে ফেলার পর পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নই; এবং তাদের গালি দেয়া এই যে, তারা আমার সন্তান গ্রহণ করা সাব্যস্ত করে, অথচ আমার স্ত্রী ও সন্তানাদি হওয়া থেকে আমি সম্পূর্ণ পবিত্র ও তা হতে বহু ঊর্ধে। এই হাদীসটিই অন্য সনদে এবং অন্যান্য কিতাবেও শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণিত হয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘মন্দ কথা শ্রবণ করে বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা আর কেউ নেই। মানুষ তার সন্তান সাব্যস্ত করছে, অথচ তিনি তাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন। এবং নিরাপদে রাখছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ প্রত্যেক জিনিসই তার অনুগত, তাঁকে খাটি অন্তরে মেনে থাকে, কিয়ামতের দিন সবই তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াবে, দুনিয়ার সবাই তার উপাসানায়রত আছে। যাকে তিনি বলেন এ রকম হও, এভাবে নির্মিত হও তা ঐ রকমই হয়ে যায় এবং ঐভাবেই নির্মিত হয়। এরকমই প্রত্যেকে তাঁর সামনে বিনীত ও বাধ্য। কাফিরদের ইচ্ছা না থাকলেও তাদের ছায়া আল্লাহ তাআলার সামনে ঝুঁকেই থাকে। কুরআন মাজীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ ‘আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আল্লাহকে সিজদাহ করে থাকে, সকাল সন্ধ্যায় তাদের ছায়া ঝুঁকে থাকে। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবি) শব্দ রয়েছে সেখানেই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য। কিন্তু এর মারফু হওয়া সঠিক নয়। সম্ভবত এটা কোন সাহাবী (রাঃ) বা অন্য কারও কথা হবে। এ সনদে অন্যান্য আয়াতের তাফসীরও মারফু রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু স্মরণ রাখা উচিত যে, এটা দুর্বল। কোন ব্যক্তি যেন এতে প্রতারণায় না পড়ে।পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল নাএরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল , প্রথম বারই তিনি এই দুই এর সৃষ্টিকর্তা। (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টি করা।' হাদীসে রয়েছেঃ প্রত্যেক নব-সৃষ্টি হচ্ছে বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।' এততা হলো শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত। কখনো কখনো (আরবি) শব্দের প্রয়োগ শুধুমাত্র আভিধানিক অর্থেই হয়ে থাকে। তখন শরীয়তের ‘বিদআত বুঝায় না। হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তারাবীর নামাযে একত্রিত করে বলেনঃ “এটা ভাল বিদআত।” (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে ফিরানো হয়েছে। যেমন (আরবি) হতে (আরবি) এবং (আরবি) হতে (আরবি) ইত্যাদি। -এর অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টিকারী। অর্থাৎ বিনা দৃষ্টান্তে বিনা নমুনায় এবং পূর্বের সৃষ্টি ছাড়াই সৃষ্টিকারী। বিদআত পন্থীদেরকে ‘বিদআতী' বলার কারণও এই যে, তারাও আল্লাহ তা'আলার দ্বীনের মধ্যে ঐ কাজ বা নিয়ম আবিষ্কার করে যা তার পূর্বে শরীয়তের মধ্যে ছিল না। অনুরূপভাবে কোন নতুন কথা উদ্ভাবনকারীকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) মতে এর ভাবার্থ এই যে, মহান আল্লাহ সন্তানাদি হতে পবিত্র। তিনি গগন ও ভূবনের সমস্ত জিনিসের মালিক। প্রত্যেক জিনিসই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য বহন করে। সব কিছুই তাঁর অনুগত। সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, স্থপয়িতা, মূল ও নমুনা ছাড়াই ঐ সবকে অস্তিত্বে আনয়নকারী একমাত্র সেই বিশ্বভু আল্লাহ তা'আলাই। স্বয়ং হযরত ঈসা (আঃ) এর সাক্ষী ও বর্ণনাকারী। যে প্রভু এসব জিনিস বিনা মূলে ও নমুনায় সৃষ্টি করেছেন। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) কে পিতা ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছেন। সেই আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এতো বেশী যে, তিনি যে জিনিসকে যে প্রকারের সৃষ্টি ও নির্মাণ করতে চান তাকে বলেন- ‘এভাবে হও এবং এরকম হও' আর তেমনই সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তিনি কোন জিনিসের (সৃষ্টি করার) ইচ্ছে করেন, তখন তাঁর রীতি এই যে, ঐ বস্তুকে বলেন- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।' (৩৬:৮২) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আমি কোন বস্তু (সৃষ্টির) ইচ্ছে করি তখন আমার কথা এই যে, আমি তাকে বলি- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।” (১৬:৪০) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “চোখের উঁকি দেয়ার মত আমার একটি আদেশ মাত্র।" (৫৪:৫০) কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বস্তুর (সৃষ্টির) ইচ্ছে করেন তখন তাকে বলেন- 'হও' তেমনই হয়ে যায়।”উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) কেও আল্লাহ তা'আলা শব্দের দ্বারাই সৃষ্টি করেছেন। এক জায়গায় আল্লাহ পাক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ঈসার (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থার ন্যায়, তাকে তিনি মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেন, তৎপর তাকে (তার কালকে) বলেন-“হও’ তখনই সে (সজীব) হয়ে যায়।” (৩:৫৯)

আল-বাকারা 2:117

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর মহান আল্লাহর সন্তান-সন্ততি নেই একথার যথার্থতারউপর কতকগুলো দলীল। এ আয়াত দ্বারা এবং এর সঙ্গীয় আয়াতগুলো দ্বারা খ্রীষ্টান, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের কথাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সন্তানাদি সাব্যস্ত করেছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, আকাশ, পৃথিবী ইত্যাদি সমুদয় বস্তুর তিনি মালিক তো বটেই, ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা, আহার দাতা, তাদের ভাগ্য, নির্ধারণকারী, তাদেরকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আনয়নকারী, তাদের মধ্যে হেরফেরকারী একমাত্র তিনিই। তাহলে তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর সন্তান কিরূপে হতে পারে? হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হতে পারেন না, যেমন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা ধারণা করতো। ফেরেশতাগণও আল্লাহ তাআলার কন্যা হতে পারে না, যেমন আরবের মুশরিকরা মনে করতো। কেননা, পরস্পর সমান সম্বন্ধযুক্ত দু’টি বস্তু থেকে সন্তান হতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা তো তুলনা বিহীন। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। তিনিই তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, সুতরাং তার সন্তান হবে কি রূপে? তার কোন সহধর্মিনীও নেই। তিনিই প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই প্রত্যেক জিনিসের পরিচয় অবগত আছেন।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা বলে- আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, তোমরা এটা একটা গুরুতর বিষয় উদ্ভাবন করেছে, যদ্দরুণ অসম্ভব নয় যে, আকাশ ফেটে যাবে এবং যমীন খণ্ড বিখণ্ড হয়ে উড়ে যাবে, আর পর্বত ভেঙ্গে পড়বে-এজন্যে যে, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তানের সম্বন্ধ আরোপ করেছে, অথচ আল্লাহর শান এ নয় যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করেন। আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যত কিছুই আছে, সমস্তই আল্লাহর সম্মুখে দাসরূপে উপস্থিত হবে। তিনি সকলকে বেষ্টন করে আছেন এবং সকলকে গণনা করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন তারা সবাই তার সমীপে একা একা উপস্থিত হবে। সুতরাং দাস সন্তান হতে পারে না। মনিব ও সন্তান এ দুটো বিপরীত মুখী ও পরস্পর বিরোধী। অন্য স্থানে একটি পূর্ণ সূরায় আল্লাহ তা'আলা একে নাকচ করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে তুমি বলে দাও যে, তিনি (আল্লাহ) এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন সন্তান-সন্ততি নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। এই আয়াতসমূহে এবং এরকম আরও বহু আয়াতে সেই বিশ্ব প্রভু স্বীয় পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন, তিনি যে তুলনা ও নবীর বিহীন এবং অংশীদার বিহীন তা সাব্যস্ত করেছেন, আর মুশরিকদের এ জঘন্য বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। তিনি তো সবারই সৃষ্টিকর্তা ও সবারই প্রভু। সুতরাং তার সন্তান-সন্ততি ও ছেলে-মেয়ে হবে কোথেকে?সূরা বাকারার এ আয়াতের তাফসীরে সহীহ বুখারীর একটি হাদীস-ইকুদসীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আদম সন্তান আমাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে, অথচ এটা তাদের জন্য উচিত ছিল না, তারা আমাকে গালি দেয় তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না। তাদের মিথ্যা প্রতিপাদন তো এটাই যে, তাদের ধারণায় আমি তাদেরকে মেরে ফেলার পর পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নই; এবং তাদের গালি দেয়া এই যে, তারা আমার সন্তান গ্রহণ করা সাব্যস্ত করে, অথচ আমার স্ত্রী ও সন্তানাদি হওয়া থেকে আমি সম্পূর্ণ পবিত্র ও তা হতে বহু ঊর্ধে। এই হাদীসটিই অন্য সনদে এবং অন্যান্য কিতাবেও শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণিত হয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘মন্দ কথা শ্রবণ করে বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা আর কেউ নেই। মানুষ তার সন্তান সাব্যস্ত করছে, অথচ তিনি তাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন। এবং নিরাপদে রাখছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ প্রত্যেক জিনিসই তার অনুগত, তাঁকে খাটি অন্তরে মেনে থাকে, কিয়ামতের দিন সবই তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াবে, দুনিয়ার সবাই তার উপাসানায়রত আছে। যাকে তিনি বলেন এ রকম হও, এভাবে নির্মিত হও তা ঐ রকমই হয়ে যায় এবং ঐভাবেই নির্মিত হয়। এরকমই প্রত্যেকে তাঁর সামনে বিনীত ও বাধ্য। কাফিরদের ইচ্ছা না থাকলেও তাদের ছায়া আল্লাহ তাআলার সামনে ঝুঁকেই থাকে। কুরআন মাজীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ ‘আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আল্লাহকে সিজদাহ করে থাকে, সকাল সন্ধ্যায় তাদের ছায়া ঝুঁকে থাকে। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবি) শব্দ রয়েছে সেখানেই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য। কিন্তু এর মারফু হওয়া সঠিক নয়। সম্ভবত এটা কোন সাহাবী (রাঃ) বা অন্য কারও কথা হবে। এ সনদে অন্যান্য আয়াতের তাফসীরও মারফু রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু স্মরণ রাখা উচিত যে, এটা দুর্বল। কোন ব্যক্তি যেন এতে প্রতারণায় না পড়ে।পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল নাএরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল , প্রথম বারই তিনি এই দুই এর সৃষ্টিকর্তা। (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টি করা।' হাদীসে রয়েছেঃ প্রত্যেক নব-সৃষ্টি হচ্ছে বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।' এততা হলো শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত। কখনো কখনো (আরবি) শব্দের প্রয়োগ শুধুমাত্র আভিধানিক অর্থেই হয়ে থাকে। তখন শরীয়তের ‘বিদআত বুঝায় না। হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তারাবীর নামাযে একত্রিত করে বলেনঃ “এটা ভাল বিদআত।” (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে ফিরানো হয়েছে। যেমন (আরবি) হতে (আরবি) এবং (আরবি) হতে (আরবি) ইত্যাদি। -এর অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টিকারী। অর্থাৎ বিনা দৃষ্টান্তে বিনা নমুনায় এবং পূর্বের সৃষ্টি ছাড়াই সৃষ্টিকারী। বিদআত পন্থীদেরকে ‘বিদআতী' বলার কারণও এই যে, তারাও আল্লাহ তা'আলার দ্বীনের মধ্যে ঐ কাজ বা নিয়ম আবিষ্কার করে যা তার পূর্বে শরীয়তের মধ্যে ছিল না। অনুরূপভাবে কোন নতুন কথা উদ্ভাবনকারীকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) মতে এর ভাবার্থ এই যে, মহান আল্লাহ সন্তানাদি হতে পবিত্র। তিনি গগন ও ভূবনের সমস্ত জিনিসের মালিক। প্রত্যেক জিনিসই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য বহন করে। সব কিছুই তাঁর অনুগত। সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, স্থপয়িতা, মূল ও নমুনা ছাড়াই ঐ সবকে অস্তিত্বে আনয়নকারী একমাত্র সেই বিশ্বভু আল্লাহ তা'আলাই। স্বয়ং হযরত ঈসা (আঃ) এর সাক্ষী ও বর্ণনাকারী। যে প্রভু এসব জিনিস বিনা মূলে ও নমুনায় সৃষ্টি করেছেন। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) কে পিতা ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছেন। সেই আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এতো বেশী যে, তিনি যে জিনিসকে যে প্রকারের সৃষ্টি ও নির্মাণ করতে চান তাকে বলেন- ‘এভাবে হও এবং এরকম হও' আর তেমনই সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তিনি কোন জিনিসের (সৃষ্টি করার) ইচ্ছে করেন, তখন তাঁর রীতি এই যে, ঐ বস্তুকে বলেন- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।' (৩৬:৮২) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আমি কোন বস্তু (সৃষ্টির) ইচ্ছে করি তখন আমার কথা এই যে, আমি তাকে বলি- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।” (১৬:৪০) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “চোখের উঁকি দেয়ার মত আমার একটি আদেশ মাত্র।" (৫৪:৫০) কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বস্তুর (সৃষ্টির) ইচ্ছে করেন তখন তাকে বলেন- 'হও' তেমনই হয়ে যায়।”উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) কেও আল্লাহ তা'আলা শব্দের দ্বারাই সৃষ্টি করেছেন। এক জায়গায় আল্লাহ পাক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ঈসার (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থার ন্যায়, তাকে তিনি মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেন, তৎপর তাকে (তার কালকে) বলেন-“হও’ তখনই সে (সজীব) হয়ে যায়।” (৩:৫৯)

আল-বাকারা 2:118

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাফে' বিন হুরাইমালা নামক একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আপনি যদি সত্যই আল্লাহর (রাসূল) হন তবে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং আমাদেরকে বলেন না কেন? তাহলে স্বয়ং আমরা তাঁর কথা শুনতে পাই” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, একথা খ্রীষ্টানেরা বলেছিল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে সঠিক বলেছেন। কেননা, এ আলোচনা তাদের সম্পর্কেই; কিন্তু এ উক্তিও খুব বেশী নির্ভরযোগ্য নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, তারা বলেছিলঃ * হে মুহাম্মদ (সঃ)! আপনার নবুওয়াতের সংবাদ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দেন না কেন?' বাহ্যতঃ এটাই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য কয়েকজন মুফাসির বলেন যে, একথা আরবের কাফিরেরা বলেছিল। তারপরে যে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এরকম উক্তি তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও করেছিল” এর দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলে- আমরা মানব না, যে পর্যন্ত না আমাদেরকে ঐ জিনিস দেয়া হয় যা রাসূলগণকে (আঃ) দেয়া হয়েছে। অন্যত্র বলেছেনঃ “তারা বলে আমরা কখনও আপনার উপর। ঈমান আনবো না, যে পর্যন্ত না আপনি আমাদের জন্যে ঝরণা প্রবাহিত করেন।" আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না তারা বলে আমাদের উপর ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় না কেন কিংবা আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাই না কেন?" অন্যত্র রয়েছেঃ “তাদের প্রত্যেকেই চাচ্ছে যে,তাদেরকে কোন কিতাব দেয়া হোক।" এ সব আয়াত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে যে, আরবের মুশরিকরা শুধুমাত্র অহংকার ও অবাধ্যতার বশবর্তী হয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসব জিনিস চেয়েছিল। এভাবে এ দাবীও মুশরিকদেরই ছিল। তাদের পূর্বে আহলে কিতাবও এরকম বাজে প্রার্থনা জানিয়েছিল। যেমন ইরশাদ হচ্ছেঃ “আহলে কিতাব তোমার নিকট চাচ্ছে যে, তুমি তাদের উপর আকাশ হতে কোন কিতাব অবতীর্ণ করবে, তারা তো মূসার (আঃ) নিকট এর চেয়ে বড় প্রার্থনা জানিয়েছিল, তারা তাঁকে বলেছিল-“আল্লাহকে আমাদের সামনে এনে দেখাও।' আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “যখন তোমরা বলেছিলে (বানী ইসরাঈল)- হে মূসা (আঃ)! আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না তুমি তোমার প্রভুকে আমাদের সামনে এনে দেখাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এদের অন্তর ও ওদের অন্তর সাদৃশ্য পূর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ এই মুশরিকদের অন্তর পূর্বযুগের কাফিরদের মত হয়ে গেছে।' অপর এক জায়গায় আছেঃ পূর্বযুগের লোকেরাও তাদের নবীগণকে যাদুকর ও পাগল বলেছিল এবং এরাও তাদের অনুকরণ করছে।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্যে নিদর্শনাবলী বর্ণনা করেছি যেগুলো দ্বারা রাসূলের (সঃ) সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। অন্য কোন জিনিস চাওয়ার প্রয়োজন বাকী নেই। ঈমান আনয়নের জন্যে এই নিদর্শনগুলোই যথেষ্ট। তবে যাদের অন্তরের উপর মোহর লাগানো রয়েছে তাদের জন্যে কোন আয়াতই ফলদায়ক হবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে,তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের নিকট সমস্ত নিদর্শন এসে যায়,যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি দেখে নেয়।

আল-বাকারা 2:119

একটি জ্ঞাতব্য বিষয়হাদীস শরীফে আছে যে, সুসংবাদ জান্নাতের এবং ভয় প্রদর্শন দোযখ হতে। (আরবি)-এর আর একটি পঠন (আরবি)-ও রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) পঠনে (আরবি)-ও এসেছে। অর্থাৎ ' (হে নবী সঃ)! তুমি কাফিরদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব নেয়ার দায়িত্ব আমার।' (১৩:৪০) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তুমি উপদেশ দিতে থাক, তুমি শুধু উপদেষ্টা মাত্র। তুমি তাদের উপর দায়গ্রস্ত অধিকারী নও।' (৮৮:২১-২২) আল্লাহপাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা যা কিছু বলছে, আমি খুব অবগত আছি, তুমি তাদের উপর বল প্রয়োগকারী নও। অতএব তুমি কুরআনের মাধ্যমে ঐ লোকদেরকে উপদেশ দিতে থাক যারা আমার সতর্কবাণীকে ভয় করে চলে।' (৫০:৪৫) এ বিষয়ের আরও বহু আয়াত রয়েছে। এর একটি পঠন (আরবি)এসেছে। অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি ঐ দোযখবাসীদের সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞেস করো না।'মুহাম্মদ বিন কা'বুল কারাযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি আমি আমার পিতা-মাতার অবস্থা জানতে পারতাম! যদি আমি আমার পিতা-মাতার অবস্থা জানতে পারতাম! যদি আমি আমার পিতা-মাতার অবস্থা জানতে পারতাম! যদি আমি আমার পিতা মাতার অবস্থা জানতে পারতাম!' তখন এ নির্দেশনামা অবতীর্ণ হয়। অতঃপর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার পিতা-মাতার কথা উল্লেখ করেননি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) মূসা বিন উবাইদার (রঃ) বর্ণনায় এটা এনেছেন। কিন্তু বর্ণনাকারী সম্বন্ধে সমালোচনা রয়েছে। কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, যাদের অবস্থা এরূপ খারাপ ও জঘন্য তাদের সম্বন্ধে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেন।‘তাযুকিরাহ' নামক কিতাবে কুরতুবী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জনক জননীকে জীবিত করা হয় এবং তারা তার উপর ঈমান আনেন। সহীহ মুসলিমের যে হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ “আমার পিতা ও তোমার পিতা দোযখে রয়েছে এর উত্তরও তথায় রয়েছে। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা-মাতাকে জীবিত করার হাদীসটি ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস ইত্যাদির মধ্যে নেই এবং এর ইসনাদও দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের একটি মুরসাল হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একদা জিজ্ঞেস করেন- “আমার বাপ-মায়ের কবর কোথায় আছে?' সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা খণ্ডন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁর পিতা-মাতা সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করা অসম্ভব। প্রথম কিরআতটিই সঠিক। কিন্তু আমরা ইমাম জারীরের (রঃ) উপর বিস্মিত হচ্ছি যে, কি করে তিনি এটাকে অসম্ভব বললেন! সম্ভবতঃ এ ঘটনা ঐ সময়ের হবে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পিতা-মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং এর পরিণাম সম্বন্ধে তিনি হয়তো অবহিত ছিলেন না। অতঃপর তিনি যখন তাদের অবস্থা জেনে নেন তখন তিনি এ কাজ হতে বিরত থাকেন এবং তাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং স্পষ্টভাবে বলে দেন যে, তারা দুজনই জাহান্নামী। যেমন বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ) কে হযরত আতা' বিন ইয়াসার (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তাওরাতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গুণাবলী ও প্রশংসা কি রয়েছে? তখন তিনি বলেনঃ হাঁ! তাঁর যে গুণাবলী কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে, ঐগুলোই তাওরাতের মধ্যেও রয়েছে। তাওরাতের মধ্যে আছে -“হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা, ভয় প্রদর্শক এবং মুখদের রক্ষক করে পাঠিয়েছি। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াক্কিল’ (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কর্কশ ভাষীও নও তোমার হৃদয় কঠোরও নয়। তুমি দুশ্চরিত্রও নও। তুমি বাজারে গঞ্জে গণ্ডগোল সৃষ্টিকারীও নও। তিনি মন্দের বিনিময়ে মন্দ করেন না, বরং ক্ষমা করে থাকেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দুনিয়া হতে উঠাবেন না যে পর্যন্ত তিনি বক্র ধর্মকে তার দ্বারা সোজা না করেন, মানুষ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কে স্বীকার করে না নেয়, অন্ধ চক্ষু খুলে না যায়, তাদের বধির কর্ণ শুনতে না থাকে এবং মরিচা ধরা অন্তর পরিষ্কার হয়ে না যায়।সহীহ বুখারী শরীফের (আরবি)-এর মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে এবং (আরবি) এর মধ্যেও বর্ণিত হয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে এ বর্ণনার পরে এটুকু বেশী রয়েছেঃ “আমি আবার হযরত কা'ব (রাঃ)কেও এ প্রশ্নই করেছি এবং তিনিও ঠিক এ উত্তরই দিয়েছেন।'

আল-বাকারা 2:120

১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সান্ত্বনা প্রদানউপরোক্ত আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) এ সব ইয়াহুদী ও নাসারা কখনও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। সুতরাং তুমিও তাদের পরিত্যাগ কর এবং তোমার প্রভুর সন্তুষ্টির পিছনে লেগে যাও। তাদের প্রতি রিসালাতের দাওয়াত পৌছিয়ে দাও সত্য ধর্ম ওটাই যা আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রদান করেছেন। ওটাকে আঁকড়ে ধরে থাক।' হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকবে এবং বিজয় লাভ করবে। অবশেষে কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নবীকে (সঃ) ধমকের সুরে বলেনঃ “হে নবী (স)! কখনও তুমি তাদের। সন্তুষ্টির জন্যে ও তাদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে স্বীয় ধর্মকে দুর্বল করে দিও না, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না এবং তাদেরকে মেনে নিও না।" এ আয়াত থেকে ধর্মশাস্ত্রবিদগণ এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কুফরী একটিই ধর্ম। ওটা ইয়াহুদী ধর্মই হোক বা খ্রীষ্টান ধর্মই হোক অথবা অন্য কোন ধর্মই হোক না কেন। কেননা (আরবি) শব্দটিকে এখানে এক বচনেই এনেছেন। যেমন এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে তোমাদের ধর্ম আর আমার জন্যে আমার ধর্ম।”এই দলীলের উপর এই ধর্মীয় নীতির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে যে, মুসলমান ও কাফির পরম্পর উত্তরাধিকারী হতে পারে না এবং কাফিরেরা পরস্পর একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে। তারা দুজন একই শ্রেণীর কাফিরই হোক বা বিভিন্ন শ্রেণীর কাফিরই হোক না কেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) একটি বর্ণনায় এই উক্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম মালিকের এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে, দুই বিভিন্ন মাযহাবের কাফির একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসেও এটাই রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা সত্যভাবে বুঝবার মত করে পাঠ করে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বুঝান হয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরবৃন্দকে (রাঃ) বুঝান হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, সত্য ভাবে পাঠ করার অর্থ হচ্ছে জান্নাতের বর্ণনার সময় জান্নাতের প্রার্থনা এবং জাহান্নামের বর্ণনার সময় জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করা। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, স্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করা ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনা এবং কঠিন বিষয়গুলো আলেমদের কাছে পেশ করাই হচ্ছে। তিলাওয়াতের হক আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর ভাবার্থ সত্যের অনুসরণ’ও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তিলাওয়াতের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। যেমন (আরবি) (৯১:২) এর মধ্যে। একটি মারফু হাদীসেও এর এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ সঠিক হলেও এর কোন কোন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের অনুসরণকারী জান্নাতের উদ্যানে অবতরণকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাঠের নিয়মহযরত উমারের (রাঃ) তাফসীর অনুসারে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রহমতের বর্ণনাযুক্ত কোন আয়াত পাঠ করতেন তখন থেমে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট রহমত চাইতেন আর যখন কোন শাস্তির আয়াত পড়তেন তখন থেমে গিয়ে তার নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।তারপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ সব লোকেই বিশ্বাস স্থাপন করছে', অর্থাৎকিতাবীদের মধ্যে যারা নিজেদের কিতাব বুঝে পাঠ করে তারা কুরআন মাজীদের উপর ঈমান আনতে বাধ্য হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি জরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর এবং তাদের প্রভুর পক্ষ হতে তাদের উপর অবতারিত কিতাবের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতো তবে তারা তাদের উপর হতে এবং পায়ের নীচে হতে আহার্য পেতো।'আল্লাহ রাব্বল আলামীন অন্যত্র বলেনঃ হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে তোমাদের উপর অবতারিত কিতাবকে প্রতিষ্ঠিত না করো সে পর্যন্ত তোমরা কোন কিছুর উপরই নও।' অর্থাৎ তোমাদের অবশ্য কর্তব্য এই যে, তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআন কারীমের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ওগুলোর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবগুলোকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর গুণাবলীর বর্ণনা, তার অনুসরণের নির্দেশ এবং তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করার বর্ণনা ইত্যাদি সব কিছুই ঐ সব কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্য স্বীকার করে, যার বর্ণনা ও সত্যতা তারা তাদের কিতাব তাওরাত' ও ইঞ্জীল’-এর মধ্যেও লিখিত দেখতে পায়। আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “হে নবী সঃ তুমি বল অেমরা এর উপর (কুরআন কারীমের উপর) বিশ্বাস স্থাপন কর কিংবা নাই কর (কোন ক্ষতি নাই); এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, যখন এ কুরআন মজীদ তাদের সামনে পঠিত হতে থাকে, তখন তারা চিবুকের উপর সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে-আমাদের প্রভু পবিত্র! নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে থাকে। অন্যত্র ঘোষিত হয়েছেঃ “যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছি তারা এর উপরও ঈমান এনে থাকে। যখন তাদের উপর এ কিতাব পাঠ করা হয় তখন তারা তাদের ঈমানের স্বীকারোক্তি কবুতঃ বলে আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য, আমরা এর পূর্ব হতেই মুসলমান ছিলাম। এদেরকেই দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, ভাল দ্বারা মন্দকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং আমার প্রদত্ত আহার্য হতে দান করেছিল।আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “কিতাব প্রাপ্তদেরকে বলে দাও-তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করছো? যদি তারা মেনে নেয় তবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়েছে, আর ফদি না মানে তবে তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌঁছিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেছেন যে, একে অমান্যকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউই এর সাথে কুফরী করবে তার প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (১১:১৭) বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার আয়ত্বাধীনে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যে কেউই ইয়াহূদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক আমার কথা শুনার পরেও আমার উপর ঈমান আনে না সে দোযখে প্রবেশ করবে।'

আল-বাকারা 2:121

১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সান্ত্বনা প্রদানউপরোক্ত আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) এ সব ইয়াহুদী ও নাসারা কখনও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। সুতরাং তুমিও তাদের পরিত্যাগ কর এবং তোমার প্রভুর সন্তুষ্টির পিছনে লেগে যাও। তাদের প্রতি রিসালাতের দাওয়াত পৌছিয়ে দাও সত্য ধর্ম ওটাই যা আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রদান করেছেন। ওটাকে আঁকড়ে ধরে থাক।' হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকবে এবং বিজয় লাভ করবে। অবশেষে কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নবীকে (সঃ) ধমকের সুরে বলেনঃ “হে নবী (স)! কখনও তুমি তাদের। সন্তুষ্টির জন্যে ও তাদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে স্বীয় ধর্মকে দুর্বল করে দিও না, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না এবং তাদেরকে মেনে নিও না।" এ আয়াত থেকে ধর্মশাস্ত্রবিদগণ এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কুফরী একটিই ধর্ম। ওটা ইয়াহুদী ধর্মই হোক বা খ্রীষ্টান ধর্মই হোক অথবা অন্য কোন ধর্মই হোক না কেন। কেননা (আরবি) শব্দটিকে এখানে এক বচনেই এনেছেন। যেমন এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে তোমাদের ধর্ম আর আমার জন্যে আমার ধর্ম।”এই দলীলের উপর এই ধর্মীয় নীতির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে যে, মুসলমান ও কাফির পরম্পর উত্তরাধিকারী হতে পারে না এবং কাফিরেরা পরস্পর একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে। তারা দুজন একই শ্রেণীর কাফিরই হোক বা বিভিন্ন শ্রেণীর কাফিরই হোক না কেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) একটি বর্ণনায় এই উক্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম মালিকের এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে, দুই বিভিন্ন মাযহাবের কাফির একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসেও এটাই রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা সত্যভাবে বুঝবার মত করে পাঠ করে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বুঝান হয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরবৃন্দকে (রাঃ) বুঝান হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, সত্য ভাবে পাঠ করার অর্থ হচ্ছে জান্নাতের বর্ণনার সময় জান্নাতের প্রার্থনা এবং জাহান্নামের বর্ণনার সময় জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করা। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, স্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করা ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনা এবং কঠিন বিষয়গুলো আলেমদের কাছে পেশ করাই হচ্ছে। তিলাওয়াতের হক আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর ভাবার্থ সত্যের অনুসরণ’ও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তিলাওয়াতের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। যেমন (আরবি) (৯১:২) এর মধ্যে। একটি মারফু হাদীসেও এর এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ সঠিক হলেও এর কোন কোন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের অনুসরণকারী জান্নাতের উদ্যানে অবতরণকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাঠের নিয়মহযরত উমারের (রাঃ) তাফসীর অনুসারে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রহমতের বর্ণনাযুক্ত কোন আয়াত পাঠ করতেন তখন থেমে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট রহমত চাইতেন আর যখন কোন শাস্তির আয়াত পড়তেন তখন থেমে গিয়ে তার নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।তারপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ সব লোকেই বিশ্বাস স্থাপন করছে', অর্থাৎকিতাবীদের মধ্যে যারা নিজেদের কিতাব বুঝে পাঠ করে তারা কুরআন মাজীদের উপর ঈমান আনতে বাধ্য হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি জরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর এবং তাদের প্রভুর পক্ষ হতে তাদের উপর অবতারিত কিতাবের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতো তবে তারা তাদের উপর হতে এবং পায়ের নীচে হতে আহার্য পেতো।'আল্লাহ রাব্বল আলামীন অন্যত্র বলেনঃ হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে তোমাদের উপর অবতারিত কিতাবকে প্রতিষ্ঠিত না করো সে পর্যন্ত তোমরা কোন কিছুর উপরই নও।' অর্থাৎ তোমাদের অবশ্য কর্তব্য এই যে, তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআন কারীমের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ওগুলোর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবগুলোকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর গুণাবলীর বর্ণনা, তার অনুসরণের নির্দেশ এবং তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করার বর্ণনা ইত্যাদি সব কিছুই ঐ সব কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্য স্বীকার করে, যার বর্ণনা ও সত্যতা তারা তাদের কিতাব তাওরাত' ও ইঞ্জীল’-এর মধ্যেও লিখিত দেখতে পায়। আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “হে নবী সঃ তুমি বল অেমরা এর উপর (কুরআন কারীমের উপর) বিশ্বাস স্থাপন কর কিংবা নাই কর (কোন ক্ষতি নাই); এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, যখন এ কুরআন মজীদ তাদের সামনে পঠিত হতে থাকে, তখন তারা চিবুকের উপর সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে-আমাদের প্রভু পবিত্র! নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে থাকে। অন্যত্র ঘোষিত হয়েছেঃ “যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছি তারা এর উপরও ঈমান এনে থাকে। যখন তাদের উপর এ কিতাব পাঠ করা হয় তখন তারা তাদের ঈমানের স্বীকারোক্তি কবুতঃ বলে আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য, আমরা এর পূর্ব হতেই মুসলমান ছিলাম। এদেরকেই দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, ভাল দ্বারা মন্দকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং আমার প্রদত্ত আহার্য হতে দান করেছিল।আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “কিতাব প্রাপ্তদেরকে বলে দাও-তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করছো? যদি তারা মেনে নেয় তবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়েছে, আর ফদি না মানে তবে তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌঁছিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেছেন যে, একে অমান্যকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউই এর সাথে কুফরী করবে তার প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (১১:১৭) বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার আয়ত্বাধীনে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যে কেউই ইয়াহূদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক আমার কথা শুনার পরেও আমার উপর ঈমান আনে না সে দোযখে প্রবেশ করবে।'

আল-বাকারা 2:122

এরূপ আয়াত পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে এবং এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে। এখানে শুধুমাত্র গুরুত্ব আরোপের জন্যেই বর্ণিত হয়েছে। তাদেরকে সেই নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্যের উৎসাহ দেয়া হয়েছে, যার গুণাবলীর বিবরণ তারা তাদের কিতাবে পেয়েছে। তার নাম ও কার্যাবলীর বর্ণনাও তাতে রয়েছে। এমনকি তাঁর উম্মতের বর্ণনাও তাতে বিদ্যমান আছে। সুতরাং তাদেরকে তা গোপন করা হতে এবং অন্যান্য নিয়ামতের কথা ভুলে যাওয়া হতে ভয় প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাদেরকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে বলা হচ্ছে এবং আরবের বংশ পরম্পরায় যিনি তাদের চাচাতো ভাই হচ্ছেন, তাঁকে যে শেষ নবী করে পাঠান হয়েছে, এজন্যে তারা যেন তাঁর প্রতি হিংসা পোষণ করতঃ তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন না করে এবং তাঁর বিরোধিতা না করে তাদেরকে এরই উপদেশ দেয়া হচ্ছে।

আল-বাকারা 2:123

এরূপ আয়াত পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে এবং এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে। এখানে শুধুমাত্র গুরুত্ব আরোপের জন্যেই বর্ণিত হয়েছে। তাদেরকে সেই নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্যের উৎসাহ দেয়া হয়েছে, যার গুণাবলীর বিবরণ তারা তাদের কিতাবে পেয়েছে। তার নাম ও কার্যাবলীর বর্ণনাও তাতে রয়েছে। এমনকি তাঁর উম্মতের বর্ণনাও তাতে বিদ্যমান আছে। সুতরাং তাদেরকে তা গোপন করা হতে এবং অন্যান্য নিয়ামতের কথা ভুলে যাওয়া হতে ভয় প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাদেরকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে বলা হচ্ছে এবং আরবের বংশ পরম্পরায় যিনি তাদের চাচাতো ভাই হচ্ছেন, তাঁকে যে শেষ নবী করে পাঠান হয়েছে, এজন্যে তারা যেন তাঁর প্রতি হিংসা পোষণ করতঃ তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন না করে এবং তাঁর বিরোধিতা না করে তাদেরকে এরই উপদেশ দেয়া হচ্ছে।

আল-বাকারা 2:124

একত্ববাদের সবচেয়ে বড় আহবায়কএ আয়াতে আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হচ্ছে, যিনি তাওহীদের ব্যাপারে পৃথিবীর ইমাম পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। যিনি বহু কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনে অটলতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “ হে নবী (সঃ)! যেসব মুশরিক ও আহলে কিতাব হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর ধর্মের উপর থাকার দাবী করছে তাদেরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আল্লাহর আদেশ পালন ও তার প্রতি আনুগত্যের ঘটনাবলী শুনিয়ে দাও তো, তা হলে তারা বুঝতে পারবে যে, একমুখী ধর্ম ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আদর্শের উপর কারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে; তারা না তুমি ও তোমার সহচরবৃন্দ?' কুরআন মাজীদের মধ্যে এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ইবরাহীম সেই যে পূর্ণ বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করেছে।' (৫৩:৩৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ ইবরাহীম জনগণের নেতা, আল্লাহ তাআলার অনুগত, খাটি অন্তঃরকণ বিশিষ্ট এবং কৃতজ্ঞ বান্দা ছিল। তাকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করতঃ সঠিক পথে চালিত করেছেন। ইহকালেও আমি তাকে পুণ্য প্রদান করবো এবং পরকালেও সে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অতঃপর আমি তোমার নিকট অবতীর্ণ ওয়াহী করেছি যে, তুমিও সরলপন্থী ইবরহীমের অনুসরণ কর, যে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।কুরআন কারীমের অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছেঃ ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিল না, খ্রীষ্টানও ছিল না। কিন্তু সে সুদৃঢ় মুসলমান ছিল এবং সে অংশীবাদীদের অন্তর্গত ছিল না। নিশ্চয় ঐ সব লোক ইবরাহীমের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা অধিক বৈশিষ্ট্য রক্ষাকারী যারা তার অনুসরণ করেছিল, আর এই নবী (মুহাম্মদ সঃ) এবং এই মু'মিনগণ এবং আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক।' (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে আমায়েশ বা পরীক্ষা। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরীক্ষা, (আরবি) শব্দের তাফসীর এবং পরীক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর কৃতকার্যতার সংবাদ(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে শরীয়ত' ‘আদেশ’ ‘নিষেধ’ ইত্যাদি (আরবি) শব্দের ভাবার্থ (আরবি) ও হয়। যেমন হযরত মরিয়ম (আঃ) সম্বন্ধে ইরশাদ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ সে তার প্রভুর -এর সত্যতা স্বীকার করে। (৬৬:১২) আবার (আরবি)-এর ভাবার্থ (আরবি) ও হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে পুরো হয়েছে।' (৬:১১৫) এই (আরবি) গুলো হয়তো বা সত্য সংবাদ, অথবা সুবিচার সন্ধান। মোট কথা এই বাক্যগুলো পুরো করার প্রতিদান স্বরূপ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইমামতির পদ লাভ করেন। এ কালেমাগুলো সম্বন্ধে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন হজ্বের নির্দেশাবলী, গোঁফ ছোট করা, কুলকুচা করা, নাক পরিষ্কার কর, মিসওয়াক করা, মাথার চুল মুণ্ডন করা বা বড় বড় করে রাখা, সিঁথি বের করা, নখ কাটা, নাভির নীচের চুল মুণ্ডন করা, খাৎনা করা, বগলের চুল উঠিয়ে ফেলা, পায়খানা ও প্রস্রাবের পর শৌচ করা, জুমআর দিন গোসল করা, বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা, সাফা মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়ান, কংকর নিক্ষেপ করা এবং তাওয়াফে ইফাযা করা।হযরত আবদুল্লাহ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে পুরো ইসলাম। এর তিনটি অংশ রয়েছে। দশটির বর্ণনা আছে সূরা-ই-বারাআতের মধ্যে (আরবি) পর্যন্ত (আরবি) অর্থাৎ তাওবা করা, ইবাদত করা, প্রশংসা করা,আল্লাহর পথে দৌড়ান, রুকু করা, সিজদাহ করা, ভাল কাজের আদেশ করা, মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা, আল্লাহর সীমার রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং ঈমান আনা। দশটির বর্ণনা রয়েছে সূরা-ই-মুমিনুন-এর (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত এরই মধ্যে এবং সুরা-ই-মাআরিজ এর মধ্যেও রয়েছে। অর্থাৎ বিনয় ও নমতার সাথে নামায আদায় করা, বাজে কথা ও কাজ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, যাকাত প্রদান করা, লজ্জা স্থানকে রক্ষা করা, অঙ্গীকার পুরো করা, নামাযের উপর সদা লেগে থাকা ও তার হিফাযত করা, কিয়ামতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, শাস্তিকে ভয় করতে থাকা এবং সত্য সাক্ষ্যের উপর অটল থাকা।দশটির বর্ণনা সূরা-ই- আহযাবের (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত এর মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করা, ঈমান রাখা, কুরআন মাজীদ পাঠ করা, সত্য কথা বলা, ধৈর্য ধারণ করা, বিনয়ী হওয়া, রোযা রাখা, ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাকা,আল্লাহ তা'আলাকে সদা স্মরণ করা। এই ত্রিশটি নির্দেশ যে পালন করবে সেই পুরোপুরি ইসলামের অনুসারী হবে এবং আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাবে।হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর (আরবি)-এর মধ্যে তাঁর স্বীয় গোত্র হতে পৃথক হওয়া, তদানীন্তন বাদশাহ্ হতে নির্ভয় হয়ে থাকা ও তাবলীগ করা, অতঃপর আল্লাহর পথে যে বিপদ এসেছে তাতে ধৈর্য ধারণ করা, তার পর দেশ ও ঘর বাড়ী আল্লাহ তাআলার পথে ছেড়ে দিয়ে হিজরত করা, অতিথির সেবা করা, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জীবনের ও ধন মালের বিপদাপদ সহ্য করা এমনকি নিজের ছেলেকে নিজের হাতে আল্লাহ তা'আলার পথে কুরবানী করা। আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এই সমুদয় নির্দেশই পালন করেছিলেন। সূর্য, চন্দ্র, ও তারকারাজির দ্বারাও তার পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। ইমামতি, আল্লাহ তা'আলার ঘর নির্মাণের নির্দেশ, হজ্বের নির্দেশাবলী, মাকামে ইবরাহীম, বায়তুল্লাহ শরীফে অবস্থানকারীদের আহাৰ্য্য এবং মুহাম্মদ (সঃ)কে তার ধর্মের উপর প্রেরণ ইত্যাদির মাধ্যমেও তার পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল।আল্লাহ তা'আলা তাকে বলেনঃ হে প্রিয়! তোমাকে আমি পরীক্ষা করছি, কি হয় তাই দেখছি।' তখন তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রভু! আমাকে জনগণের ইমাম বানিয়ে দিন। এই কাবাকে মানুষের জন্যে পূণ্য ও মিলন কেন্দ্রে পরিণত করুন। এখানকার অধিবাসীদের নিরাপত্তা দান করুন। আমাদেরকে মুসলমান ও অনুগত বান্দা করে নিন। আমার বংশধরের মধ্যে আপনার অনুগত একটি দল রাখুন। এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। এই সমুদয়ই আল্লাহ তা'আলা পুরো করেন এবং সবই তাঁকে দান করেন। শুধুমাত্র তাঁর একটি আশা আল্লাহ তা'আলা পুরো করেননি। তা হচ্ছে এই যে, তিনি আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা জানিয়ে ছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার সন্তানদেরকে ইমামতি দান করুন। এর উত্তরে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমার এ বিরাট দায়িত্ব অত্যাচারীদের উপর অর্পিত হতে পারে না।' (আরবি) -এর ভাবার্থ এর সঙ্গীয় আয়াতসমূহও হতে পারে। মুআত্তা' ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, সর্বপ্রথম যাত্রার প্রচলনকারী, অতিথি সেবাকারী, নখ কর্তনের প্রথা চালুকারী, গোঁফ ছাঁটার নিয়ম প্রবর্তনকারী এবং সাদা চুল দর্শনকারী হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। সাদা চুল দেখে তিনি মহান আল্লাহুকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ হে প্রভু! এটা কি আল্লাহ্ তা'আলা উত্তরে বলেছিলেনঃ এ হচ্ছে সম্মান ও পদ মর্যাদা। তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাহলে এটা আরও বেশী করুন। সর্বপ্রথম মিম্বরের উপর ভাষণ দানকারী, দূত প্রেরণকারী, তরবারী চালনাকারী, মিসওয়াককারী, পানি দ্বারা শৌচ ক্রিয়া সম্পাদনকারী এবং পায়জামা পরিধানকারীও হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। একটি দুর্বল এবং মাওয় হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেছেন। ‘আমি যদি মিম্বর নির্মাণ করি তবে আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো তা নির্মাণ করেছিলেন। আমি যদি হাতে ছড়ি রাখি তবে এটাও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এরই সুন্নাত। [ সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ দশটি কাজ হচ্ছে প্রকৃত ও ধর্মের মূলঃ (১) গোঁফ ছাঁটা, (২) শত্রু লম্বা করা, (৩) মেসওয়াক করা, (৪) নাকে পানি দেয়া, (৫) নখ কাটা (৬) অঙ্গুলির পোরগুলো ধৌত করা, (৭) বগলের লোম উঠিয়ে ফেলা, (৮) নাভির নীচের লোম কেটে ফেলা, (৯) শৌচ ক্রিয়া সম্পাদন করা; বর্ণনাকারী বলেনঃ দশমটি আমি ভুলে গিয়েছি। (১০) সম্ভবতঃ তা কুলকুচা করাই হবে।'সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-চটি কাজ প্রকৃতির অন্তর্গত। (১) খান্না করা, (২) নাভির নীচের লোম উঠিয়ে ফেলা, (৩) গোঁফ ছোট করা, (৪) নখ কর্তন করা এবং (৫) বগলের লোম উঠিয়ে ফেলা।'একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্বন্ধে (আরবি) অর্থাৎ সেই ইবরাহীম যে বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করেছে’ (৫৭:৩৭);কেন বলেছেন তা তোমাদেরকে বলব কি? তার কারণ এই যে, তিনি প্রত্যহ সকাল সন্ধ্যায় পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সন্ধ্যা ও সকালে আল্লাহরই পবিত্রতা ঘোষিত হয়। গগনে ও ভূমণ্ডলে সমুদয় প্রশংসা তারই এবং রাত্রের ও যোহরের সময়ে প্রশংসা তারই জন্যে। তিনি জীবিতকে মৃত হতে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত হতে বের করেন, আর তিনি যমীন মরে যাওয়ার পর তাকে পুনর্জীবিত করেন এবং এইরূপেই তোমাদেরকেও বের করা হবে।' (৩০:১৭-১৯)একটি বর্ণনায় রয়েছে যে,তিনি প্রত্যহ চার রাকাআত নামায পড়তেন। কিন্তু এ দু'টি হাদীসই দুর্বল এবং এগুলোর মধ্যে কোন কোন বর্ণনাকারী দুর্বল। এগুলো দুর্বল হওয়ার বহু কারণ রয়েছে বরং দুর্বলতার কথা উল্লেখ না করে এগুলোর বর্ণনা করাই জায়েয নয়। রচনারীতি দ্বারাও এগুলোর দুর্বলতা প্রমাণিত হচ্ছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর ইমামতির সুসংবাদ শুনা মাত্রই তাঁর সন্তানদের জন্যে এই প্রার্থনা জানান এবং তা গৃহীতও হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বলা হয় যে, তাঁর সন্তানদের মধ্যে অনেকে অবাধ্য হবে, তাদের উপর তাঁর অঙ্গীকার পৌছবে না এবং তাদেরকে ইমাম করা হবে না। সূরাই-আনকাবুতে এ আয়াতের ভাবার্থ পরিষ্কার হয়েছে। ইবরাহীম (আঃ)-এর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়। তথায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াতের ও কিতাবের ক্রমধারা চালু রেখেছি। (২৯:২৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে যত রাসূল (আঃ) এসেছেন সবাই তার বংশধর ছিলেন এবং যত আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে সবই তাঁর সন্তানদের উপরই হয়েছে। এখানেও এ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর সন্তানদের মধ্যে অনেকে অত্যাচারীও হবে। মুজাহিদ (সঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করেনঃ আমি অত্যাচারীকে ইমাম নিযুক্ত করবো না। ‘যালিম' এর ভাবার্থ কেউ কেউ মুশরিকও নিয়েছেন। (আরবি)-এর ভাবার্থ নির্দেশ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যালিমকে কোন কিছুর ওয়ালী ও নেতা নিযুক্ত করা উচিত নয়, যদিও সে হযরত ইবরাহীম (আঃ) -এর বংশধর হয়। তাঁর প্রার্থনা তাঁর সন্তানদের মধ্য হতে সৎ লোকদের ব্যাপারে গৃহীত হয়েছিল। এর অর্থ এটাও করা হয়েছে যে, যালিমের কাছে কোন অঙ্গীকার করলে তা পুরো করা হবে না, বরং ভেঙ্গে দেয়া হবে। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার মঙ্গলের অঙ্গীকার তার উপর প্রযোজ্য নয়। দুনিয়ায় সে সুখে শান্তিতে আছে তা থাক; কিন্তু পরকালে তার কোন অংশ নেই। (আরবি)-এর অর্থ ‘ধর্ম’ করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমার সমস্ত সন্তান ধর্মভীরু হবে না।' কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদের উভয়ের (ইবরাহীম আঃ ও ইসহাক আঃ) বংশে কতক সৎ লোকও রয়েছে এবং কতক এমনও রয়েছে যে, তারা প্রকাশ্য ভাবে নিজেদের ক্ষতি সাধন করছে। (৩৭:১১৩) (আরবি) -এর অর্থ আনুগত্যও নেয়া হয়েছে। আনুগত্য শুধুমাত্র ভাল কাজেই হয়ে থাকে। আবার (আরবি) -এর অর্থ নবুওয়াতও এসেছে। ইবনে খুরাইয মান্দাদুল মালিকী (রঃ) বলেন যে, অত্যাচারী ব্যক্তি খলীফা, বিচারক, মুফতী, সাক্ষী এবং বর্ণনাকারী হতে পারে না।

আল-বাকারা 2:125

ওটা প্রথম আল্লাহর ঘরঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বার বার আগমন করা। হজ্বব্রত পালন করে বাড়ী ফিরে গেলেও অন্তর তার সাথে লেগেই থাকে। প্রত্যেক জায়গা হতে লোক দলে দলে এ ঘরের দিকে এসে থাকে। এটাই একত্রিত হবার স্থান, অর্থাৎ সবারই মিলন কেন্দ্র। এটা নিরাপদ জায়গা। এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো হয় না। অজ্ঞতার যুগেও এর আশে পাশে লুটতরাজ হতো বটে; কিন্তু এখানে নিরাপত্তা বিরাজ করতো। কাউকে কেউ গালিও দিত না। এ স্থান সদা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ থেকেছে। সৎ আত্মাগুলো সদা এর দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকে। প্রতি বছর পরিদর্শন করলেও এর প্রতি লোকের আগ্রহ থেকেই যায়। এটা হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর প্রার্থনারই ফল। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি জনগণের অন্তর ওদিকে ঝুঁকিয়ে দিন।' (১৪:৩৭) এখানে কেউ তার ভ্রাতার হন্তাকে দেখলেও নীরব থাকে। সুরা-ই-মায়েদার মধ্যে রয়েছে যে, এটা মানুষের অবস্থান স্থল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি হজ্ব করা ছেড়ে দেয় তবে আকাশকে পৃথিবীর উপর নিক্ষেপ করা হবে। এ ঘরের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে বায়তুল্লাহ শরীফের স্থান ঠিক করে দিলাম, (এবং বলেছিলাম) আমার সাথে কাউকেও অংশীদার স্থাপন করবে।' (২২ ২৬) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি)অর্থাৎ-আল্লাহ তা'আলার প্রথম ঘর রয়েছে মক্কায়, যা বরকতময় ও সারা বিশ্বের হিদায়াত স্বরূপ। তাতে কতকগুলো প্রকাশ্য নিদর্শন রয়েছে যেমন, মাকামে ইবরাহীম (আঃ), যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' (৩:৯৬) মাকামে ইবরাহীম বলতে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ শরীফও বুঝায় বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিশিষ্ট স্থানও বুঝায়। আবার হজ্বের সমুদয় করণীয় কাজের স্থানকেও বুঝায়। যেমন-আরাফাত, মাশআরে হারাম, মিনা, পাথর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ ইত্যাদি। মাকামে ইবরাহীম প্রকৃতপক্ষে ঐ পাথরটি যা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মান কার্য সম্পাদনের জন্যে তাঁর পায়ের নীচে রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ভুল কথা। প্রকৃত পক্ষে এটা ঐ প্রস্তর যার উপরে দাড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত জাবির (রাঃ)-এর একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ) তওয়াফ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ‘এটাই কি আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাকাম?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হাঁ'। তিনি বলেনঃ তাহলে আমরা এটাকে কিবলাহ বানিয়ে নেই না কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের অল্প দিন পরেই এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাই কি মাকামে ইবরাহীম যাকে কিবলাহ্ বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হাঁ এটাই।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমি আমার প্রভুর আনুকূল্য স্বীকার করেছি, অথবা বলেন- তিনটি বিষয়ে আমার প্রভু আমার আনুকূল্য করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছিলেন তাই তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান করে নিতাম! তখন (আরবি) (২:১২৫) অবতীর্ণ হয়। আমি বললাম-হে আল্লাহর রাসূল! সৎ ও অসৎ সবাই আপনার নিকট এসে থাকে, সুতরাং যদি আপনি মু'মিনদের জননীগণকে নিবী (সঃ)-এর সহধর্মিনীগণকে] পর্দার নির্দেশ দিতেন! তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। যখন আমি অবগত হই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোনও কোনও স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তখন তাদের নিকট গিয়ে বলি- যদি আপনারা বিরত না হন (রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দুঃখ দেয়া হতে] তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। তখন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি মুহাম্মদ (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে তবে অতি সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' (৬৬:৫) এ হাদীসটির বহু ইসনাদ রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় বদরের বন্দীদের ব্যাপারেও হযরত উমারের (রাঃ) আনুকূল্যের কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন যে, বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ না নিয়ে বরং তাদেরকে হত্যা করা হোক। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাও তাই ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নামক মুনাফিক যখন মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায আদায় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন আমি বলি আপনি কি এই মুনাফিক কাফিরের জানাযার নামায আদায় করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ধমক দিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে মৃত্যু বরণ করেছে তুমি কখনও তার জন্যে নামায পড়বে না এবং তার সমাধি পার্শ্বে দাঁড়াবে না। (৯:৮৪)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফ সদর্প পদক্ষেপে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং চারবার স্বাভাবিক পদক্ষেপে প্রদক্ষিণ করেন। অতঃপর মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) পিছনে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন এবং (আরবি) পাঠ করেন।' হযরত জাবিরের (রাঃ) হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইব্রাহীমকে (আঃ) তাঁর ও বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যে করেছিলেন। এ হাদীসসমূহের দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) ভাবার্থ ঐ পাথরটি যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর এনে দিতেন এবং তিনি কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যেতেন। যেখানে প্রাচীর উঁচু করার প্রয়োজন হতো সেখানে পাথরটি সরিয়ে নিয়ে যেতেন।এভাবে কা'বার প্রাচীর গাঁথার কাজ সমাপ্ত করেন। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘটনায় আসবে। ঐ পাথরে হ্যরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়েছিল। আরবের অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তা দেখেছিল। আবু তালিব তার প্রশংসাসূচক কবিতায় বলেছিলেন ? (আরবি)অর্থাৎ ‘ঐ পাথরের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন নতুন হয়ে রয়েছে, পদদ্বয় জুতো শূন্য ছিল। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ “আমি মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) উপর হযরত খলীলুল্লাহর (আঃ) পায়ের অঙ্গুলির ও পায়ের পাতার চিহ্ন দেখেছিলাম। অতঃপর জনগণের স্পর্শের কারণে তা মুছে গেছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মাকামে ইবুরাহীমের (আঃ) দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে, তাকে স্পর্শ করার নির্দেশ নেই। এ উম্মতের লোকেরাও পূর্বের উম্মতের ন্যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই কতকগুলো কাজ নিজেদের উপর ফর করে নিয়েছে, যা পরিণামে তাদের ক্ষতির কারণ। হবে। মানুষের স্পর্শের কারণেই ঐ পাথরের পদ চিহ্ন হারিয়ে গেছে। এই মাকামে ইবরাহীম পূর্বে কাবার প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কাবার দরজার দিকে হাজরে আসওয়াদ’র পার্শ্বে দরজা দিয়ে যেতে ডান দিকে একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যমান ছিল যা আজও লোকের জানা আছে। খলীলুল্লাহ (আঃ) হয়তো বা ওটাকে এখানেই রেখেছিলেন কিংবা বাইতুল্লাহ বানানো অবস্থায় শেষ অংশ হয়তো এটাই নির্মাণ করে থাকবেন এবং পাথরটি এখানেই থেকে গেছে। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে ওটাকে পিছনে সরিয়ে দেন। এর প্রমাণ রূপে বহু বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর একবার বন্যার পানিতে এ পাথরটি এখান হতেও সরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা পুনরায় একে পূর্বস্থানে রেখে দেন। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এটাকে মূল স্থান হতে সরানো হয়েছে এবং এর পূর্বে কা'বার প্রাচীর হতে কত দূরে ছিল।” একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পাথরটি তার মূল স্থান হতে সরিয়ে ওখানে রেখেছিলেন যেখানে এখন রয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুরসাল। সঠিক কথা এই যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা পিছনে রেখেছিলেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছি।' পবিত্র রেখো’ অর্থাৎ কা'বা শরীফকে ময়লা, বিষ্ঠা এবং জঘন্য জিনিস হতে পবিত্র রেখো। (আরবি)-এর (আরবি) যদি (আরবি) দ্বারা হয় তবে অর্থ দাঁড়াবে ‘আমি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি এবং প্রথমেই বলে দিয়েছি যে, তোমরা উভয়ে ‘বায়তুল্লাহূকে প্রতিমা থেকে পবিত্র রাখবে, তথায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত হতে দেবে না, বাজে কাজ,অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যে কথা, শিরক , কুফর হাসি রহস্য ইত্যাদি হতে ওকে রক্ষা করবে।' শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে প্রদক্ষিণকারী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘বাহির হতে আগমনকারী’। এ হিসেবে (আরবি) শব্দের অর্থ হবে মক্কার অধিবাসী।' হযরত সাবিত (রঃ) বলেনঃ “আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর (রঃ) কে বলি যে, আমাদের কর্তব্য হবে বাদশাহুকে এ পরামর্শ দেয়া, তিনি যেন জনগণকে বায়তুল্লাহ শরীফে শয়ন করতে নিষেধ করে দেন। কেননা,এমতাবস্থায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে, এবং এরও সম্ভাবনা আছে যে, তারা পরস্পরে বাজে কথা বলতে আরম্ভ করে দেয়। তখন তিনি বলেনঃ এরূপ করো না। কেননা, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা ওরই অধিবাসী।' একটি হাদীসে রয়েছে যে,হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) ছেলে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) শুয়ে থাকতেন, এবং তিনি যুবকও কুমার ছিলেন (আরবি) দ্বারা নামাযীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটা পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখনও মূর্তি পূজা চালু ছিল। বায়তুল্লাহর নামায উত্তম কি তওয়াফ উত্তম এ বিষয়ে ধর্ম শাস্ত্রবিদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে বাইরের লোকদের জন্যে তওয়াফ উত্তম এবং জামহুরের মতে প্রত্যেকের জন্যে নামায উত্তম। তাফসীর এর ব্যাখ্যার জায়গা নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদেরকে জানিয়ে দেয়া এবং তাদের দাবী খণ্ডন করা যে, বায়তুল্লাহ' তো খাস করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। ওর মধ্যে অন্যদের পূজা করা এবং খাটি আল্লাহর পূজারীদেরকে ঐ ঘরে ইবাদত করা হতে বিরত রাখা সরাসরি অন্যায় ও আবচারপূণ কাজ। এজন্যেই কুরআন মাজীদে অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ অত্যাচারীদেরকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো। এভাবে মুশরিকদের দাবীকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করার সাথে সাথে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের দাবীও খণ্ডন করা হয়ে গেল। তারা যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুওয়াতের সমর্থক, তারা যখন জানে ও স্বীকার করে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ ঘর এসব পবিত্র হস্ত দ্বারাই নির্মিত হয়েছে, তারা যখন একথারও সমর্থক যে, এ ঘরটি শুধুমাত্র নামায, তওয়াফ, প্রার্থনা এবং আল্লাহর উপাসনার জন্যেই নির্মিত হয়েছে, হজ্ব, উমরাহ, ইতিকাফ ইত্যাদির জন্যে বিশিষ্ট করা হয়েছে, তখন এই নবীগণের অনুসরণ দাবী সত্ত্বেও কেন তারা হজ্ব ও উমরা করা হতে বিরত রয়েছে? বায়তুল্লাহ শরীফে তারা উপস্থিত হয় না কেন? বরং স্বয়ং হযরত মূসা (আঃ) তো এই ঘরের হজ্ব করেছেন, যেমন হাদীসে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মসজিদগুলো উঁচু করার অনুমতি দিয়েছেন। ওর মধ্যে তাঁর নামের যিক্র করা হবে, ওর মধ্যে সকাল-সন্ধায় তার সৎ বান্দাগণ তাঁর নামের তাসবিহু পাঠ করে থাকে। (২৪:৩৬) হাদীস শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মসজিদসমূহ যে কাজের জন্যে তা ঐ জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আরও বহু হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মসজিদসমূহ পবিত্র রাখার নির্দেশ রয়েছে। বায়তুল্লাহ শরীফের নির্মাণ ও এর সর্বপ্রথম নির্মাতাকেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন। আমি মদীনাকে হারাম করলাম। এর শিকার খাওয়া হবে না, এখানকার বৃক্ষ কর্তন করা হবে না, এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো নিষিদ্ধ। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে যে, জনগণ টাটকা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের খেজুরে, আমাদের শহরে এবং আমাদের ওজনে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) আপনার বান্দা, আপনার দোস্ত এবং আপনার রাসূল ছিলেন। আমিও আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল। তিনি আপনার নিকট মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আমিও আপনার নিকট মদীনার জন্যে প্রার্থনা জানাচ্ছি। যেমন তিনি মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বরং এরকমই আরও একটি। অতঃপর কোন ছোট ছেলেকে ডেকে ঐ খেজুর তাকে দিয়ে দিতেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘তোমাদের ছোট ছোট বালকদের মধ্যে একটি বালককে আমার খিদমতের জন্যে অনুসন্ধান কর। আবূ আলহা (রাঃ) আমাকেই নিয়ে যান। তখন আমি বিদেশে ও বাড়ীতে তাঁর খিদমতেই অবস্থান করতে থাকি। একদা তিনি বিদেশ হতে আসছিলেন। সম্মুখে উহুদ পর্বত দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেনঃ ‘এ পর্বত আমাকে ভালবাসে এবং আমিও এ পর্বতকে ভালবাসি'। মদীনা চোখের সামনে পড়লে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ! আমি এর দু'ধারের মধ্যবর্তী স্থানকে ‘হারাম’ রূপে নির্ধারণ করছি, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ রূপে নির্ধারণ করেছিলেন। হে আল্লাহ! এর মুদ্দ’, ‘সা’ এবং ওজনে বরকত দান করুন।হযরত আনাস (রাঃ) হতেই আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! মক্কায় আপনি যে বরকত দান করেছেন তার দ্বিগুণ বরকত মদীনায় দান করুন। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ বানিয়েছিলেন, আমিও মদীনাকে হারাম’ বানালাম। এখানে কাউকেও হত্যা করা হবে না এবং চারা (পশুর খাদ্য ) ছাড়া বৃক্ষাদির পাতাও ঝরানো হবে না। এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে যদ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মক্কার মত মদীনাও হারাম শরীফ। এখানে এসব হাদীস বর্ণনা করায় আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা শরীফের মর্যাদা ও এখানকার নিরাপত্তার বর্ণনা দেয়া। কেউ কেউতো বলেন যে, প্রথম হতেই এটা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আমল হতে এর মর্যাদা ও নিরাপত্তা সূচীত হয়। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ 'যখন হতে আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন তখন থেকেই এই শহরকে মর্যাদাপূর্ণরূপে বানিয়েছেন। এখন কিয়ামত পর্যন্ত এর মর্যাদা অক্ষুন্নই থাকবে। এখানে যুদ্ধ বিগ্রহ কারও জন্যে বৈধ নয়। আমার জন্যেও শুধুমাত্র আজকের দিনে ক্ষণেকের জন্যে বৈধ ছিল। এর অবৈধতা রয়েই গেল। জেনে রেখো এর কাটা কাটা হবে না। এর শিকার তাড়া করা হবে না। এখানে কারও পতিত হারানো জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে না, কিন্তু যে ওটা (মালিকের নিকট ) পৌছিয়ে দেবে তার জন্যে জায়েযু। এর ঘাস কেটে নেয়া হবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এ হাদীসটি খুত্বায় বর্ণনা করেছিলেন এবং হযরত আব্বাসের (রাঃ) প্রশ্নের কারণে তিনি ইযখার’ নামক ঘাস কাটার অনুমতি দিয়েছিলেন।হযরত আমর বিন সাঈদ (রাঃ) যখন মক্কার দিকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করছিলেন সেই সময়ে হযরত ইবনে শুরাইহ্ আদভী (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমীর! মক্কা বিজয়ের দিন অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে খুত্ব দেন তা আমি নিজ কানে শুনেছি, মনে রেখেছি এবং সেই সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে স্বচক্ষে দেখেছি- আল্লাহ তাআলার প্রশংসার পর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই মক্কাকে হারাম করেছেন, মানুষ করেনি। কোন মুমিনের জন্যে এখানে রক্ত প্রবাহিত করা এবং বৃক্ষাদি কেটে নেয়া বৈধ নয়। যদি কেউ আমার এই যুদ্ধকে প্রমাণরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে বলবে যে, আমার জন্যে শুধুমাত্র আজকের দিন এই মুহূর্তের জন্যেই যুদ্ধ বৈধ ছিল। অতঃপর পুনরায় এ শহরের মর্যাদা ফিরে এসেছে যেমন কাল ছিল। সাবধান! তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছ, তাদের নিকট অঅবশ্যই এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যারা আজ এ সাধারণ জনসমাবেশে নেই। কিন্তু আমার এ হাদীসটি শুনে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেনঃ ‘আমি তোমার চেয়ে এ হাদীসটি বেশী জানি। 'হারাম শরীফ অবাধ্য রক্ত পিপাসুকে এবং ধ্বংসকারীকে রক্ষা করে না।” (বুখারী ও মুসলিম)। কেউ যেন এ দুটো হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে না করেন। এ দুটোর মধ্যে সাদৃশ্য এভাবে হবে যে, মক্কা প্রথম দিন হতেই মর্যাদাপূর্ণ তো ছিলই, কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রচার করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো রাসূল তখন হতেই ছিলেন যখন হযরত আদম (আঃ) এর খামির প্রস্তুত হয়েছিল, বরং সেই সময় হতেই তার নাম শেষ নবী রূপে লিখিত ছিল। কিন্তু তথাপিও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নবুওয়াতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে হতেই একজন রাসূল তাদের মধ্যে প্রেরণ করুন। (২:১২৯) এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তকদীরে লিখিত ঐ কথা প্রকাশিত হয়। একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেন ? ‘আপনার নবুওয়াতের সূত্রের কথা কিছু আলোচনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি নূর বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিলো এবং তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকলো। মক্কা ও মদীনার মধ্যে বেশী উত্তম কোনটি?জামহুরের মতে মদীনার চেয়ে মক্কা বেশী উত্তম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের মাযহাব অনুসারে মক্কা অপেক্ষা মদীনা বেশী উত্তম। এ দু'দলেরই প্রমাণাদি সত্বরই ইনশাআল্লাহ আমরা বর্ণনা করবো। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছেনঃ “হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপদ শহর করে দিন।” অর্থাৎ এখানে অবস্থানকারীদেরকে ভীতি শূন্য রাখুন। আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ হয়ে গেলো। (৩:৯৭) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারাম’কে নিরাপত্তা দানকারী করেছি? ওর আশ পাশ হতে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানে তারা পূর্ণ নিরপত্তা লাভ করছে।' (২৯:৬৭) এ প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় বহু হাদীসও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা শরীফে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ মক্কায় অস্ত্র শস্ত্র উঠাননা কারও জন্যে বৈধ নয়। (সহীহ মুসলিম)' তাঁর এ প্রার্থনা কাবা শরীফ নির্মাণের পূর্বে ছিল, এ জন্যেই বলেছেন, হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপত্তা দানকারী শহর বানিয়ে দিন। সূরা-ই- ইব্রাহীমের মধ্যে এ প্রার্থনাই এভাবে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১২৬) সম্ভবতঃ এটা দ্বিতীয় বারের প্রার্থনা ছিল, যখন বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত হয়ে যায় ও শহর বসে যায় এবং হযরত ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর তিন বছরের ছোট ছিলেন। এজন্যেই এ প্রার্থনার শেষে তার জন্ম লাভের জন্যেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার কথা। কেউ কেউ এটাকেও প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।তখন ভাবার্থ হবে এইঃ কাফিরদেরকেও অল্প দিন শান্তিতে রাখুন, অতঃপর তাদেরকে শাস্তিতে জড়িত করে ফেলুন। আর একে আল্লাহ তা'আলার কালাম বললে ভাবার্থ হবে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানাদির জন্যে ইমামতির প্রার্থনা জানালেন এবং অত্যাচারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা শুনলেন। ও বুঝতে পারলেন যে, তার পরে আগমনকারীদের মধ্যে অনেকে অবাধ্যও হবে, তখন তিনি ভয়ে শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যেই আহার্যের প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ কাফিরদেরকেও দেবেন। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি তোমার প্রভুর দান এদেরকেও দেবো এবং ওদেরকেও দেবো, তোমার প্রভুর দান কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয়। (১৭:২০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় তারা মুক্তি পায় না, তারা দুনিয়ায় কিছুদিন লাভবান হলেও আমার নিকট যখন তারা ফিরে আসবে তখন আমি তাদেরকে কুফরীর প্রতিফল স্বরূপ কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।অন্যস্থানে বলেনঃ “কাফিরদের কুফরী যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, আমার নিকট তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর যে কাজ তারা করেছে তার সংবাদ আমি তাদেরকে দেবো, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পূর্ণ অবগত আছেন। আমি তাদেরকে সামান্য সুখ দেয়ার পর ভীষণ শাস্তির মধ্যে জড়িয়ে ফেলবো।” অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি এটা না হতো যে, (প্রায়) সমস্ত মানুষ একই পথাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাবে, তাহলে যারা দয়াময় (আল্লাহ)-এর সাথে কুফরী করে, আমি তাদের জন্য তাদের গৃহসমূহের ছাদ। রৌপ্যের করে দিতাম এবং সিঁড়িগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর দিয়ে তারা আরোহণ করে; এবং তাদের গৃহের দরজাগুলো ও আসনগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর তারা হেলান দিয়ে বসে আর (এসব) স্বর্ণের ও (করে দিতাম), এবং এগুলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাসের উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়, (শেষে সবই বিলীন হয়ে যাবে) এবং আখেরাত তোমার প্রভুর সমীপে মুত্তাকির জন্যে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন :অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির মধ্যে জড়িত করে ফেলবো এবং ওটা জঘন্য অবস্থান স্থল। অর্থাৎ তাদেরকে অস্থায়ী জগতে সুখে শান্তিতে রাখার পর ভীষণ শাস্তির দিকে টেনে আনবো। এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য অবস্থান স্থল।' এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দেখছেন এবং অবকাশ দিচ্ছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। যেমন তিনি বলেছেন। (আরবি) অর্থাৎ বহু অত্যাচারী গ্রামবাসীকে আমি অবকাশ দিয়েছি, অতঃপর পাকড়াও করেছি, শেষে তো তাদেরকে আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (২২:৪৮) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা বেশী ধৈর্য ধারণকারী আর কেউই নেই। তারা তার সন্তানাদি সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে আহার্যও দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাও দান করেছেন। অন্য সহীহ হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীকে ঢিল দেন, তৎপর হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন- (আরবি)অর্থাৎ তোমার প্রভুর পাকড়াও এরকমই যে, যখন তিনি কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন, তখন নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক। (১১:১০২) এই বাক্যকে হ্যরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করার পঠন খুবই বিরল এবং তা সপ্ত পাঠকের পঠনের বিপরীত। রচনা। রীতিরও এটা উল্টো। কেননা (আরবি) ক্রিয়া পদের (আরবি) টি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু এ বিরল পঠনে এর কর্তা ও উক্তিকারী হযরত ইবরাহীমই (আঃ), হচ্ছেন এবং এটা বাক্যরীতির সম্পূর্ণ উল্টো (আরবি) শব্দটি এর বহুবচন (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে থামের নিম্নতল এবং ভিত্তি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তির সংবাদ দিয়ে দাও।' একটি কিরআতে (আরবি)-এর পরে (আরবি) ও রয়েছে। ওরই প্রমাণ রূপে পরে (আরবি) শব্দটিও এসেছে।আন্তরিক প্রার্থনাহযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) শুভ কাজে লিপ্ত রয়েছেন এবং তা গৃহীত হয় কি না এ ভয়ও তাঁদের রয়েছে। এ জন্যেই তারা মহান আল্লাহর নিকট এটা কবুল করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। হযরত অহীব বিন অরদ (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে খুব ক্রন্দন করতেন এবং বলতেন :‘হায়! আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বন্ধু এবং গৃহীত নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কাজ তাঁর হুকুমেই করছেন, তাঁর ঘর তাঁরই হুকুমে নির্মাণ করছেন, তথাপি ভয় করছেন যে, না জানি আল্লাহর নিকট এটা না মঞ্জুর হয়। মহান আল্লাহ মু'মিনদের অবস্থা এরকমই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে এবং দান খয়রাত করে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে কম্পিত থাকে (এই ভয়ে যে, না-জানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় কি না!)' (২৩:৬০) যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, যা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, অতি সত্বরই তা নিজ স্থানে আসছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে, ভিত্তি উত্তোলন করতেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং প্রার্থনা করতেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, উভয়ই উভয় কাজে অংশীদার ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনা এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি হাদীসও এ ঘটনা সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রী লোকেরা কোমর বন্ধনী বাধার নিয়ম হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মাতার নিকট হতেই শিখেছে। তিনি ওটা বেঁধে ছিলেন যাতে তার পদচিহ্ন মিটিয়ে যায়, ফলে যেন হযরত শারিয়া (রাঃ) তার পদচিহ্ন দেখতে না পান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে এবং তার কলিজার টুকরা একটি মাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে নিয়ে বের হন। সেই সময় এই প্রাণপ্রিয় শিশু দুধ পান করতো। এখন যেখানে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত রয়েছে সে সময় তথায় একটি পাহাড় ছিল এবং বিজন মরুভূমি রূপে পড়েছিল। তখন তথায় কেউই বাস করতো না। এখানে মা ও শিশুকে বসিয়ে তাদের পার্শ্বে সামান্য খেজুর ও এক মশক পানি রেখে যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিট ফিরিয়ে চলে যেতে আরম্ভ করেন, তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বন্ধু! এরকম ভীতিপ্রদ বিজন মরুভূমির মধ্যে যেখানে আমাদের কোন বন্ধু ও সাথী নেই, আমাদেরকে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন উত্তর দেননি, এমনকি ঐ দিকে ফিরেও তাকাননি। হযরত হাজেরা (রাঃ) বারবার বলার পরেও যখন তিনি কোন ক্ষেপ না করেন তখন তিনি বলেন, হে আল্লাহর প্রিয়! আমাদেরকে আপনি কার নিকট সমর্পণ করে গেলেন?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট।' তিনি বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এটা কি আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, 'হা, আমার উপর আল্লাহ তাআলার এটাই নির্দেশ। একথা শুনে হযরত হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনা লাভ করেন এবং বলেন ? তাহলে আপনি যান। আল্লাহ আমাদেরকে কখনও ধ্বংস করবেন না। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করছি এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল।' হযরত হাজেরা (রাঃ) ফিরে আসেন এবং স্বীয় প্রাণের মণি, চক্ষের জ্যোতি, আল্লাহর নবীর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ক্রোড়ে ধারণ করে ঐ জনহীন প্রান্তরে, সেই আল্লাহর জগতে বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে বসে পড়েন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন সানিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন এবং অবগত হন যে, হযরত হাজেরা (রাঃ) পিছনে নেই এবং ওখান হতে এখন পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি কাজ করবে না, তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন :“হে আমার প্রভু! আমার সন্তানাদিকে আপনার পবিত্র ঘরের পার্শ্বে একটি অনাবাদী ভূমিতে ছেড়ে এসেছি। যেন তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করে, আপনি মানুষের অন্তর ওদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং ওদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো প্রার্থনা করে আল্লাহ তাআলার নিদের্শ পালন করতঃ স্বীয় সহধর্মিনী ও ছেলেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে চলে যান, আর এদিকে হযরত হাজেরা (রাঃ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে শিশুকে নিয়েই মনে তৃপ্তি লাভ করছিলেন। ঐ অল্প খেজুর ও সামান্য পানি শেষ হয়ে গেল। এখন কাছে না আছে এক গ্রাস আহার্য বা না আছে এক ঢাকে পানি। নিজেও ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর এবং শিশুও ভুক ও তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। এমন কি সেই নিস্পাপ নবী পুত্রের ফুলের ন্যায় চেহারা মলিন হতে থাকে। মা কখনও নিজের একাকিত্বের ও আশ্রয় হীনতার কথা চিন্তা করছিলেন, আবার কখনও নিজের একমাত্র অবুঝ শিশুর অবস্থা দুশ্চিন্তার সাথে লক্ষ্য করছিলেন এবং সহ্য করে চলছিলেন। এটা জানা ছিল যে, এরকম ভয়াবহ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানুষের গমনাগমন অসম্ভব। বহু মাইল পর্যন্ত আবাদী ভূমির চিহ্নমাত্র নেই। খাবার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিরও ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি উঠে চলে যান। নিকটবর্তী, সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন এবং প্রান্তরের এ নিক্ষেপ করেন যে, কোন লোককে যেতে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু দৃষ্টি নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি সেই পাহাড় হতে নেমে পড়েন এবং অঞ্চল উঁচু করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করেন। ওর উপর চড়েও চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় সেখান হতে অবতরণ করেন। এভাবেই মধ্যবর্তী সামান্য অংশ দৌড়িয়ে অবশিষ্ট অংশ তাড়াতাড়ি অতিক্রম করেন। আবার সাফা পাহাড়ের উপর চড়েন। এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, প্রত্যেক বার শিশুকে দেখেন যে, তার অবস্থা ক্রমে ক্রমেই মন্দের দিকে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাজীরা যে, ‘সাফা' ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়িয়ে থাকেন তার সূচনা এখান থেকেই হয়। সপ্তম বারে যখন হাজেরা (রাঃ) মারওয়ার উপর আসেন তখন একটা শব্দ তার কানে আসে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি এই শব্দের দিকে মনোযোগ দেন। আবার শব্দ তার কানে আসে এবং এবারে স্পষ্টভাবে শুনা যায়। সুতরাং তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান এবং এখন যেখানে যমযম কূপ রয়েছে তথায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দেখতে পান। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কে? তিনি উত্তর দেনঃ আমি হাজেরা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ছেলের মা। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আপনাকে এই নির্জন মরুপ্রান্তরে কার নিকট সপর্দ করেছেন?' তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট। তখন ফেরেশতা বলেনঃ “তা হলে তিনিই যথেষ্ট। হযরত হাজেরা (রাঃ) বলেন, “হে অদৃশ্য ব্যক্তি! শব্দ তো আমি শুনলাম। এটা আমার কোন কাজে আসবে তো?'যমযম্ কূপহযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটির উপর ঘর্ষণ করা মাত্রই তথায় মাটি হতে একটি ঝরণা বইতে থাকে। হযরত হাজেরা (রাঃ) তার হাত দ্বারা পানি উঠিয়ে তার মশক ভর্তি করে নেন। পানি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়বে এ চিন্তা করে ঝরণার চার দিকে মাটির বেষ্টনি দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের উপর সদয় হউন, যদি তিনি এভাবে পানি আটকিয়ে না রাখতেন তবে যম কূপের আকার বিশিষ্ট হতো না, বরং প্রবাহিত নদীর রূপ ধারণ করতো। তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) নিজেও পানি পান করেন এবং শিশুকেও পান করিয়ে দেন। অতঃপর শিশুকে দুধ পান করাতে থাকেন। ফেরেশতা তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ধ্বংস করবেন মহান আল্লাহ এখানে এ ছেলে ও তার পিতার দ্বারা তাঁর একটা ঘর নির্মাণ করাবেন।' হযরত হাজেরা (রাঃ) এখানেই বাস করতে থাকেন, যম্ম্ কূপের পানি পান করেন আর শিশুর মাধ্যমে মনোরঞ্জন লাভ করেন। বর্ষাকালে বন্যার পানিতে চার দিকে প্লাবিত হয়ে যেতো। কিন্তু এই জায়গাটি উচু ছিল বলে পানি এ দিক ওদিক দিয়ে বয়ে যেতো এবং এ স্থানটি নিরাপদ থাকতো। জনহীন উপত্যকায় ‘জারহাম' গোত্রের আগমনকিছুদিন পর ঘটনাক্রমে ‘জারহাম’ গোত্রের লোক ‘কিদার’ পথে যাচ্ছিল। তারা মক্কা শরীফের নিম্নাংশে অবতরণ করে। একটি পানির পক্ষীর প্রতি তাদের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হওয়ায় তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ এটা পানির পাখি এবং এখানে পানি ছিল না আমরা কয়েকবার এখান দিয়ে যাতায়াত করেছি। এটাতো শুষ্ক জঙ্গল ও জনহীন প্রান্তর। এখানে পানি কোথায়? তারা প্রকৃত ঘটনা জানবার জন্যে লোকে পাঠিয়ে দেয়। তারা ফিরে এসে সংবাদ দেয় যে, তথায় বহু পানি রয়েছে। তখন তারা সবাই চলে আসে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট আরয করেঃ আপনি অনুমতি দিলে আমরাও এখানে অবস্থান করি। এটা পানির জায়গা।' তিনি বলেনঃ ‘হা, ঠিক আছে। আপনারা সাগ্রহে অবস্থান করুন। কিন্তু পানির উপর অধিকার আমারই থাকবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গী সাথী জুটে যাক, হযরত হাজেরা (রাঃ) তো তাই চাচ্ছিলেন। সুতরাং এই যাত্রী দল এখানেই বাস করতে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হন। ঐ সব লোকের সাথে তাঁর খুবই ভালুবাসা হয়। অবশেষে তিনি যৌবন প্রাপ্ত হন এবং তাদের মধ্যে তার বিয়েও অনুষ্ঠিত হয়। তাদের কাছে তিনি আরবী ভাষা শিখে নেন। হযরত হাজেরা (আঃ) এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রিয় পুত্রের সাথে প্রথম সাক্ষাৎমহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তথায় আগমন করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁর এ যাতায়াত বুরাকের (স্বর্গীয় বাহন) মাধ্যমে হতো। সিরিয়া হতে তিনি আসতেন এবং আবার ফিরে যেতেন। এখানে এসে তিনি দেখেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়িতে নেই। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সে কোথায় রয়েছে? উত্তর আসেঃ তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের অবস্থা কি?' সে বলেঃ ‘অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।' তিনি বলেনঃ * তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে,সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।' হযরত যাবীহুল্লাহ (আ) ফিরে এসে যেন তিনি কোন মানব আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি? স্ত্রী বলে, “হাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন। তার পরে জিজ্ঞেস করেন, দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে' আমি বলি যে, “আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন অবস্থায় দিন যাপন করছি।” হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলেনঃ ‘আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি? স্ত্রী বলেঃ হাঁ, বলেছেন যে, যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা। তিনি যা বলে গেছেন তার ভাবার্থ এই যে, (যেহেতু তুমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে) আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। যাও, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। তাকে তালাক দিয়ে তিনি ঐ গোত্রেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন।দ্বিতীয় বার সাক্ষাতের চেষ্টাকিছুদিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে পুনরায় এখানে আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল যাবিহুল্লাহর (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন। পুত্রবধূ বলেঃ আপনি বসুন যা কিছু হাজির রয়েছে তাই আহার করুন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ বলতো তোমাদের দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কিরূপ? উত্তর আসেঃ “আলহামদু লিল্লাহ! আমরা ভালই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ 'তোমাদের আহার্য কি? উত্তর আসেঃ ‘গোশত।' জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা পান কর কি?” উত্তর হয়ঃ ‘পানি।' তিনি প্রার্থনা করেন, হে প্রভু! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি শস্য তাদের নিকট থাকতো এবং তারা এটা বলতো তবে হযরত ইবরাহীম খালীল (আঃ) তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিন যাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে, সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে। এর পরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেনঃ উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি (তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারিণী)। আবার কিছু দিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করে এখানে আসেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যমযম কূপের পাশ্বে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে দেখা মাত্রই আদবের সাথে দাড়িয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।কাবা শরীফের নতুন নির্মাণপিতা-পুত্রের মিলন হলে ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।' তিনি বলেনঃ “যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।' তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।' তিনি আরয করেনঃ “আমি হাযির আছি আব্বা!” তিনি বলেনঃ “এ স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।' তিনি বলেনঃ “খুব ভাল কথা, আব্বা!, এখন পিতা ও পুত্র মিলে বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং উঁচু করতে আরম্ভ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পাথর এনে দিতেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তা দিয়ে দেয়াল গাঁথতে থাকতেন। দেয়াল কিছুটা উঁচু হলে হযরত যাবিহুল্লাহ (আঃ) এই পাথরটি অর্থাৎ মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি নিয়ে আসেন। ঐ উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা শরীফের পাথর রাখতেন এবং পিতা-পুত্র উভয়ে এই দু'আ করতেনঃ ‘প্রভু হে! আপনি আমাদের এই নগণ্য খিদমত ককূল করুন, আপনি শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।' এই বর্ণনাটি অন্যান্য হাদীসের কিতাবেও রয়েছে। কোথাও বা সংক্ষিপ্তভাবে এবং কোথাও বা বিস্তারিতভাবে। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে এটাও রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী হন তখন তিনি তাঁর মাথার উপরে মেঘের মত একটি জিনিস লক্ষ্য করেন। ওর মধ্য হতে শব্দ আসছিলঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! যত দূর পর্যন্ত এই মেঘের ছায়া রয়েছে তত দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি তুমি বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নাও। কম বেশী যেন না হয়। ঐ বর্ণনায় এও আছে যে,বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ছেড়ে চলে আসেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটিই সঠিক। আর এভাবেই সামঞ্জস্য হতে পারে যে, পূর্বে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু নির্মাণ করেছিলেন পরে, এবং নির্মাণ কার্যে পিতা-পুত্র উভয়েই অংশ নিয়েছিলেন। যেমন কুরআনের শব্দগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে। হযরত আলী (রাঃ) বায়তুল্লাহ নির্মাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন যে, ঐ ঘর কোথায় নির্মাণ করতে হবে এবং কত বড় করতে হবে ইত্যাদি। তখন ‘সাকীনা অবতীর্ণ হয় এবং তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, যেখানেই ওটা থেমে যাবে সেখানেই ঘর নির্মাণ করতে হবে। এবার ঘরের নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। হাজরে আসওয়াদের নিকট পৌছলে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে বলেনঃ বৎস! কোন ভাল পাথর খুঁজে নিয়ে এসো।' তিনি ভাল পাথর খুঁজে আনেন। এসে দেখেন যে,তার আব্বা অন্য পাথর তথায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আব্বা! এটা কে এনেছে?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ পাথর খানা আকাশ হতে নিয়ে এসেছেন। হযরত কা'বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, এখন যেখানে বায়তুল্লাহ রয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তথায় পানির উপর বুন্ধুদের সাথে ফেনা হয়েছিল, এখান হতেই পৃথিবী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, কাবা ঘর নির্মাণের জন্য হযরত ইবরাহীম (আঃ) আরমেনিয়া হতে এসেছিলেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) হাজরে আসওয়াদ' ভারত হতে এনেছিলেন। সেই সময় ওটা সাদা চকচকে ‘ইয়াকুত' (মণি) ছিল। হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে জান্নাত হতে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মানুষের পাপপূর্ণ হস্ত স্পর্শের ফলে ওটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এক বর্ণনায় এটাও রয়েছে। যে, এর ভিত্তি পূর্ব হতেই বিদ্যমান ছিল। ওর উপরেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। মুসনাদে আবদুর রাযযাকের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেছিলেন। সেই সময় তার দেহ দীর্ঘ ছিল। পৃথিবীতে আগমনের পর ফেরেশতাদের তসবীহ, নামায দু’আ ইত্যাদি শুনতে পেতেন। যখন দেহ খাটো হয়ে যায় এবং ঐ সব ভাল শব্দ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তাঁকে মক্কার দিকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি মক্কার দিকে যেতে থাকেন। যেখানে যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়ে সেখানে সেখানে জনবসতি স্থাপিত হয়। এখানে আল্লাহ তা'আলা বেহেশত হতে একটি ইয়াকুত অবতীর্ণ করেন এবং বায়তুল্লাহর স্থানে রেখে দেন, আর ঐ স্থানকেই স্বীয় ঘরের জায়গা হিসাবে নির্ধারণ করেন। হযরত আদম (আঃ) এখানে তওয়াফ করতে থাকেন এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। হযরত নূহ (আঃ)-এর প্লাবনের যুগে এটা উঠে যায় এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যুগে পুনরায় নির্মাণ করিয়ে নেন। হযরত আদম (আঃ) এ ঘরটিকে হেরা, তুর, যীতা, ভূরে সাইনা এবং জুদী এই পাঁচটি পাহাড় দ্বারা নির্মাণ করেন। কিন্তু এই সমুদয় বর্ণনার মধ্যেই স্পষ্টভাবে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে,পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে বায়তুল্লাহর নির্মাণ করা হয়েছিল। বায়তুল্লাহর চিহ্ন ঠিক করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে গিয়েছিলেন। সেই সময় এখানে বন্য বৃক্ষাদি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহু দূরে আমালিক সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এখানে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তার মাকে একটি কুঁড়ে ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বায়তুল্লাহর চারটি স্তম্ভ আছে এবং সপ্তম জমি পর্যন্ত তা নীচে গিয়েছে। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যুলকারনাইন যখন এখানে পৌঁছেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করতে দেখেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি এটা কি করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে আমি তার ঘর নির্মাণ করছি।' যুলকারনাইন। জিজ্ঞেস করেন :এর প্রমাণ কি আছে?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এই নেকড়ে বাঘগুলো সাক্ষ্য দিবে।' পাঁচটি নেকড়ে বাঘ বলেঃ আমার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এরা দুজন নির্দেশ প্রাপ্ত। যুলকারনাইন এতে খুশী হন এবং বলেনঃ “আমি মেনে নিলাম।' ‘আরযাকীর তারীখ-ই মক্কানামক পুস্তকে রয়েছে যে, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সঙ্গে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভিত্তি। এটা (আরবি)শব্দের বহুবচন। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় (আরবি) (২৪:৬০)ও এসেছে। এরও এক বচন হচ্ছে (আরবি) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ তুমি কি দেখছো না যে, তোমার গোত্র যখন বায়তুল্লাহ নির্মাণ করে, তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি হতে ছোট করে দেয়। আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি ওটা বাড়িয়ে দিয়ে মূল ভিত্তির উপর করে দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘তোমার কওম যদি নতুন ইসলাম গ্রহণকারী না হতো এবং তাদের কুফরীর যুগ যদি নিকটে না থাকতো তবে আমি তাই করতাম।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) এ হাদীসটি জানার পর বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কারণেই ‘হাজরে আসওয়াদের পার্শ্ববর্তী দুটি স্তম্ভকে স্পর্শ করতেন না। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা! যদি তোমার কওমের অজ্ঞতার যুগ নিকটে না হতো তবে আমি অবশ্যই কাবার ধনাগারকে আল্লাহর পথে দান করে দিতাম এবং দরজারকে ভূমির সাথে লাগিয়ে দিতাম এবং ‘হাতীম'কে বায়তুল্লাহর মধ্যে ভরে দিতাম।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এর দ্বিতীয় দরজাও করতাম, একটি আসবার জন্যে এবং অপরটি যাবার জন্যে। ইবনে যুবাইর (রাঃ) তাঁর খিলাফতের যুগে এরকমই করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'আমি একে ভেঙ্গে দিতাম এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি একটি পূর্বমুখী করতাম এবং একটি পশ্চিমমুখী করতাম এবং ৬ হাত হাতীম’কে এর মধ্যে ভরে দিতাম যাকে কুরাইশরা এর বাইরের করে দিয়েছে। নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে কুরাইশরা নতুনভাবে কা'বা ঘর নির্মাণ করেছিল। এই নির্মাণ কার্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) শরীক ছিলেন। যখন তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর, সেই সময় করাইশরা কা'বা শরীফকে নতুনভাবে নির্মাণ করার ইচ্ছে করে। কারণ ছিল এই যে, এর দেয়াল ছিল খুব ছোট এবং ছাদও ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, বায়তুল্লাহর ধনাগার চুরি হয়ে গিয়েছিল, যা ঐ ঘরের মধ্যে একটি গভীর গর্তে রক্ষিত ছিল। এই চোরাই মাল খাযায়েমা গোত্রীয় বানী মালীহ্ বিন আমরের ক্রীতদাস দুয়ায়েক' নামক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভবতঃ চোরেরা ঐ মাল তার ওখানে রেখেছিল। যাহোক, এই চুরির অপরাধে দুয়ায়েকের হাত কেটে দেয়া হয়। তাছাড়া এই ঘর নির্মাণের ব্যাপারে তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিরাট সুযোগ লাভ করেছিল। তা এই যে, রোম রাজ্যের বণিকদের একটি নৌকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জিদ্দার ধারে এসে লেগে যায়। ঐ নৌকায় বহু মূল্যবান কাঠ বোঝাই করা ছিল। এই কাঠগুলো কাবা ঘরের ছাদের কাজে লাগতে পারে এই চিন্তা করে কুরাইশরা ঐ কাঠগুলো কিনে। নেয় এবং কিবতী গোত্রের একজন ছুতারকে কাবার ছাদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করে। এসব প্রস্তুতিতো চলছিল বটে কিন্তু বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে দিতে তারা ভয় পাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলার ইঙ্গিতে এরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। বায়তুল্লাহর কোষাগারে একটি সাপ ছিল। যখনই কোন লোক ওর নিকটে যেতো তখনই সে হাঁ করে তার দিকে বাধিত হতো। এই সর্পটি প্রত্যহ ঐ গর্ত হতে বেরিয়ে বায়তুল্লাহর দেয়ালে এসে বসে থাকতো। একদা ঐ সাপটি ওখানে বসেই ছিল। এমন সময় আল্লাহ তা'আলা একটা বিরাট পাখী পাঠিয়ে দেন। পাখীটি সাপটিকে ধরে নিয়ে উড়ে যায়। কুরাইশরা এবার বুঝতে পারলো যে, তাদের ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার অনুরূপই হয়েছে। কারণ, কাঠও তারা পেয়ে গেছে, মিস্ত্রীও তাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে এবং সাপকেও আল্লাহ তাআলা সরিয়ে দিয়েছেন। এবার তারা কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে নতুনভাবে নির্মাণ করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে।কা'বা শরীফ নির্মাণ ও অদৃশ্য ইঙ্গিতসর্বপ্রথম ইবনে অহাব নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কাবা শরীফের একটি পাথর নামিয়ে নেয়, কিন্তু পাথরখানা তার হাত হতে উড়ে গিয়ে পুনরায় স্বস্থানে বসে যায়। সে সমস্ত কুরাইশকে সম্বোধন করে বলেঃ ‘শুনে রেখো! আল্লাহর ঘর নির্মাণ কার্যে সবাই যেন নিজ নিজ উত্তম ও পবিত্র মালই খরচ করে। এতে ব্যভিচার দ্বারা উপার্জিত সম্পদ সূদের টাকা এবং অত্যাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লাগানো চলবে না। কেউ কেউ বলেন যে, এ পরামর্শ দিয়েছিল ওলীদ বিন মুগীরা নামক ব্যক্তি। এখন বায়তুল্লাহ নির্মাণের অংশ গোত্র সমূহের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, দরজার অংশ নির্মাণ করবে বানু আবদ-ই-মানাফ ও জুহরা গোত্র, হাজরে আসওয়াদ' ও রুকনে ইয়ামানীর অংশ নির্মাণ করবে বানু মাখযুম গোত্র এবং কুরাইশের অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের সঙ্গে কাজ করবে, কা'বা শরীফের পিছনের অংশ নির্মাণ করবে বানু হামীহ্ ও সাহাম' গোত্র এবং হাতীমের পার্শ্ববর্তী অংশ নির্মাণ করবে আবদুদ্দার বিন কুসাই, বানু আসাদ বিন আবদুল উযযা ও বানু আদী বিন কা'ব। এটা নির্ধারণ করার পর পূর্ব নির্মিত ইমারত ভাঙ্গার জন্যে তারা অগ্রসর হয়। কিন্তু প্রথমে ভাঙ্গতে কেউই সাহস করে না। অবশেষে ওলীদ বিন মুগীরা বলেঃ আমিই আরম্ভ করছি।' এ বলে সে কোদাল নিয়ে উপরে উঠে যায় এবং বলে ‘হে আল্লাহ! আপনি খুবই ভাল জানেন যে, আমাদের ইচ্ছা খারাপ নয়, আমরা অপনার ঘর ধ্বংস করতে চাইনে বরং ওটাকে উন্নত করার চিন্তাতেই আছি।' একথা বলে সে দুটি স্তম্ভের দু'ধারের কিছু অংশ ভেঙ্গে দেয়। অতঃপর কুরাইশরা বলেঃ ‘এখন ছেড়ে দাও। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি এ ব্যক্তির উপর কোন শাস্তি নেমে আসে তবে তো এ পাথর ঐ স্থানেই রেখে দেয়া হবে এবং আমাদেরকে একাজ হতে বিরত থাকতে হবে। আর যদি কোন শাস্তি না আসে তবে বুঝে নিতে হবে যে, এটা ভেঙ্গে দেয়া আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ নয়। সুতরাং আগামীকাল আমরা সবাই মিলে এ কাজে লেগে যাবো।' অতঃপর সকাল হয় এবং সবদিক দিয়েই মঙ্গল পরিলক্ষিত হয়। তখন সবাই এসে বায়তুল্লাহ শরীফের পূর্ব ইমারত ভেঙ্গে দেয়। অবশেষে তারা পূর্ব ভিত্তি অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এখানে সবুজ বর্ণের পাথর ছিল এবং যেন একটির সঙ্গে অপরটির সংযোগ ছিল। একটি লোক দুটি পাথরকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ওতে এতো জোরে কোদাল মারে যে, ওটা আন্দোলিত হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত মক্কা ভূমি আন্দোলিত হয়ে উঠে। তখন জনগণ বুঝতে পারে যে, পাথরগুলোকে পৃথক করে ওর স্থানে অন্য পাথর লাগানো আল্লাহ তা'আলার নিকট গৃহীত নয়। কাজেই ওটা তাদের শক্তির বাইরের কাজ। সুতরাং তারা ঐ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ঐ পাথরগুলোকে ঐভাবেই রেখে দেয়। এর পর প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ অংশ অনুযায়ী পাথর সংগ্রহ করে এবং প্রাসাদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়।অবশেষে তারা হাজরে আসওয়াদ' রাখার স্থান পর্যন্ত পৌছে যায়। এখন প্রত্যেক গোত্রই এই মর্যাদায় অংশ নিতে চায়। সুতরাং তারা পরস্পরে ঝগড়া:বিবাদ করতে থাকে, এমনকি নিয়মিতভাবে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। বানু আব্দুদ্দার' এবং বানু আদী’ রক্তপূর্ণ একটি পাত্রে হাত ডুবিয়ে শপথ করে বলেঃ আমরা সবাই কেটে গিয়ে মারা পড়বো এটাও ভাল তথাপি হাজরে আসওয়াদ' কাউকেও রাখতে দেব না।' এভাবেই চার পাঁচ দিন কেটে যায়। অতঃপর কুরাইশরা পরস্পর পরামর্শের জন্যে মসজিদে একত্রিত হয়। আবু উমাইয়া বিন মুগীরা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়ষ্ক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। সে সকলকে সম্বোধন করে বলে, হে জনমণ্ডলী! তোমরা কোন একজনকে সালিশ নির্বাচিত কর এবং সে যা ফয়সালা করে তাই মেনে নাও। সালিশ নির্বাচনের ব্যাপারেও মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, সুতরাং তোমরা এ কাজ কর যে, এখানে সর্বপ্রথম যে সমজিদে প্রবেশ করবে সেই আমাদের সালিশ নির্বাচিত হবে। এ প্রস্তাব সবাই সমর্থন করে। সর্বপ্রথম কে প্রবেশ করে এটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষমান থাকে।‘হাজরে আসওয়াদ' ও আরবের আমীনের (সঃ) মধ্যস্থতাসর্বপ্রথম যিনি আগমন করেন তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাকে দেখা মাত্রই এসব লোক খুশী হয়ে যায় এবং বলেঃ “তার মধ্যস্থতা আমরা মেনে নিতে রাজী আছি। ইনি তো আমীন! ইনি তো মুহাম্মদ (সঃ)! অতঃপর তারা সবাই তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তিনি বলেনঃ আপনারা একটি বড় ও মোটা চাদর নিয়ে আসুন। তারা তা নিয়ে আসে। তিনি ‘হাজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে এনে স্বহস্তে ঐ চাদরে রেখে দেন এবং বলেনঃ ‘প্রত্যেক গোত্রের নেতা এসে এই চাদরের কোণ ধরে নিন এবং এভাবেই আপনারা সবাই হাজরে আসওয়াদ উঠাবার কাজে শরীক হয়ে যান।' একথা শুনে সমস্ত লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং সমস্ত গোত্রপ্রধান চাদরটি উত্তোলন করে। যখন ওটা রাখার স্থানে পৌছে তখন আল্লাহর নবী (সঃ) ওটা স্বহস্তে উঠিয়ে নিয়ে ওর স্থানে রেখে দেন। এভাবে সেই ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিমেষের মধ্যেই মিটে যায়। আর এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলের (সঃ) হাতে তাঁর ঘরে ঐ বরকতময় পাথরটি স্থাপন করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াহী আসার পূর্বে কুরাইশরা তাঁকে ‘আমীন’ বলতো। এখন উপরের অংশ নির্মিত হয়। এভাবে মহান আল্লাহর ঘরের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগে কা’বা আঠারো হাত লম্বা ছিল। ইয়েমেন দেশীয় ‘কবা’ পর্দা তার উপর চড়ান হতো। পরে ওর উপর চাদর চড়ান হতে থাকে। সর্বপ্রথম হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর রেশমী পর্দা উত্তোলন করেন। কাবা শরীফের এই ইমারতই থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের (রাঃ) খিলাফতের প্রাথমিক যুগে ষাট বছর পরে এখানে আগুনে লেগে যায়। এর ফলে কা'বা শরীফ পুড়ে যায়। এটা ছিল ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার রাজত্বের শেষ কাল এবং সে ইবনে যুবাইর (রাঃ) কে মক্কায় অবরোধ করে রেখেছিল। কাবা শরীফের ইমারত এবং তার বিভিন্ন যুগের আবর্তনএই সময়ে মক্কার খলীফা হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) স্বীয় খালা হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) নিকট যে হাদীসটি শুনেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনের কথা অনুযায়ী বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর তিনি ওটা নির্মাণ করেন। হাতীমকে ভিতরে ভরে নেন। পূর্ব ও পশ্চিমে দু'টি দরজা রাখেন। একটি ভিতরে আসার জন্য, অপরটি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। দরজা দু’টি মাটির সমান করে রাখেন। তাঁর শাসনামল পর্যন্ত কা'বা এরূপই থাকে। অবশেষে তিনি যালিম হাজ্জাজের হাতে শহীদ হন। তখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশক্রমে হাজ্জাজ কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে পুনরায় পূর্বের মত করে নির্মাণ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার যুগে যখন সিরিয়াবাসী মক্কা শরীফের উপর আক্রমণ করে এবং যা হবার তা হয়ে যায়, সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বায়তুল্লাহ শরীফকে এরূপ অবস্থাতেই রেখে দেন। হজ্বের মৌসুমে জনগণ একত্রিত হয়। তারা সব কিছু স্বচক্ষে দেখে। এরপুরে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করেনঃ কা'বা শরীফকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে কি নতুনভাবে নির্মাণ করবো, না কি ভাঙ্গা যা আছে তাকেই মেরামত করব? তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার মতে ভাঙ্গাকেই আপনি মেরামত করে দিন, বাকিগুলো পুরাতনই থাক।' তখন তিনি বলেনঃ ‘আচ্ছা বলুন তো, যদি আমাদের কারও বাড়ি পুড়ে যেতো তবে কি সে নতুন বাড়ি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতো? তাহলে মহাসম্মানিত প্রভুর ঘর সম্পর্কে এরূপ মত পেশ করেন কেন? আচ্ছা তিন দিন পর্যন্ত আমি ইস্তেখারা (লক্ষণ দেখে শুভ বিচার) করবে, তার পরে যা বুঝবো তাই করবো।' তিন দিন পরে তাঁর মত এই হলো যে, অবশিষ্ট দেয়ালও ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে। সুতরাং তিনি এই নির্দেশ দিয়ে দেন।কিন্তু কা'বা শরীফ ভাঙ্গতে কেউই সাহস করছিল না। তারা ভয় করছিল যে, যে ব্যক্তি ভাঙ্গার জন্যে চড়বে তার উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হবে। কিন্তু একজন সাহসী ব্যক্তি উপরে চড়ে গিয়ে একটি পাথর ভেঙ্গে দেয়। অন্যেরা যখন দেখে যে, তার কোন ক্ষতি হলো না তখন তারা সবাই ভাঙ্গতে আরম্ভ করে দেয়। এবং ভূমি পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে দেয়। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) চারদিকে স্তম্ভ দাঁড় করিয়ে দেন এবং ওর উপর পর্দা করে দেন। এবারে বায়তুল্লাহ নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) বলেন, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিটক হতে আমি শুনেছি তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“যদি লোকদের কুফরীর সময়টা নিকটে না হতো এবং আমার নিকট নির্মাণের খরচা থাকতো তবে আমি হাতীম' থেকে পাঁচ হাত পর্যন্ত বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নিতাম এবং কা'বার দুটি দরজা করতাম, একটা আসবার দরজা এবং অপরটি বের হওয়ার দরজা।' হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “এখন আর জনগণের কুফরীর যুগ নিকটে নেই, তাদের ব্যাপারে ভয় দূর হয়ে গেছে এবং কোষাগারও পূর্ণ রয়েছে, আমার নিকট যথেষ্ট অর্থ রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনোবাসনা পূর্ণ না করার আমার আর কোন কারণ থাকতে পারে না। সুতরাং তিনি পাঁচ হাত ‘হাতীম' ভিতরে নিয়ে নেন। তখন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তি প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণ তা স্বচক্ষে দেখে নেয়। এরই উপর দেয়াল গাথা হয়। বায়তুল্লাহ শরীফের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো হাত। এখন আরও পাঁচ হাত বৃদ্ধি পায়, ফলে ছোট হয়ে যায়, এজন্যে দৈর্ঘ্যের আর দশ হাত বেড়ে যায়। দু'টি দরজা নির্মিত হয়। একটি ভিতরে আসবার এবং অপরটি বাইরে যাবার। হযরত ইবনে যুবাইরের (রাঃ) শাহাদাতের পর হাজ্জাজ আবদুল মালিকের নিকট পত্র লিখেন এবং তার পরামর্শ চান যে, এখন কি করা যায়? এটাও লিখে পাঠান যে, ঠিক হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর যে কাবা শরীফ নির্মিত হয়েছে এটা মক্কা শরীফের সুবিচারকগণ স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু আবদুল মালিক উত্তর দেনঃ দৈর্ঘ্য ঠিক রাখ কিন্তু হাতীমকে বাইরে করে দাও এবং দ্বিতীয় দরজাটি বন্ধ করে দাও।' হাজ্জাজ আবদুল মালিকের এই নির্দেশক্রমে কাবাকে তেঙ্গে দিয়ে পূর্বের ভিত্তির উপরে নির্মাণ করেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর ভিত্তিকে ঠিক রাখাই সুন্নাতের পন্থা ছিল। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাসনা তো এই ছিল। কিন্তু সেই সময় তার এই ভয় ছিল যে, মানুষ হয়তো খারাপ ধারণা করে বসবে। কারণ তারা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আবদুল মালিক বিন মারওয়ান এ হাদীসটি জানতেন না। এজন্যেই তিনি ওটা ভাঙ্গিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি হাদীসটি জানতে পারেন তখন তিনি দুঃখ করে বলেনঃ ‘হায়! যদি আমি ওটাকে ভেঙ্গে পূর্বাবস্থাতেই রাখতাম।'সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হারিস বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) যখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের খিলাফত কালে তাঁর নিকট প্রতিনিধি রূপে গমন করেন তখন আবদুল মালিক তাকে বলেন, আমি ধারণা করি যে, আবু হাবীব অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি (তার খালা) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেননি। তখন হযরত হারিস বিন উবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ ‘অবশ্যই তিনি শুনেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে স্বয়ং আমিও শুনেছি।' আবদুল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কি শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ “আমি শুনেছি-তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আয়েশা! তোমার কওম’ বায়তুল্লাহকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। যদি তোমার সম্প্রদায়ের শিরকের যুগ নিকটে না হতো তবে নতুনভাবে আমি এর কমতি পূরণ করতাম। এসো, আমি তোমাকে এর প্রকৃত ভিত্তি দেখিয়ে দেই, হয়তো তোমার গোত্র আবার একে এর প্রকৃত ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে পারে। অতঃপর তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কে প্রায় সাত হাত দেখিয়ে দেন এবং বলেনঃ “আমি এর দু’টি দরজা নির্মাণ করতাম, একটি আগমনের ও অপরটি প্রস্থানের; এবং দরজা দু'টি মাটির সমান করে রাখতাম। একটি রাখতাম পূর্বমুখী এবং অপরটি রাখতাম পশ্চিমমুখী। তুমি কি জান যে, তোমার কওম' দরজাকে এত উঁচু করে রেখেছে কেন? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, শুধুমাত্র নিজেদের মর্যাদা প্রকাশের জন্যে। যাকে চাইবে প্রবেশ করতে দেবে এবং যাকে চাইবে না প্রবেশ করতে দেবে না। যখন লোক ভিতরে যেতে চাইতো তখন তারা তাকে উপর হতে ধাক্কা দিতো ফলে সে পড়ে যেতো। আর যাকে তারা প্রবেশ করাবার ইচ্ছে করতো তাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতো।' আবদুল মালিক তখন বলেনঃ “হে হারিস! আপনি কি স্বয়ং এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ’ আমি স্বয়ং শুনেছি। তখন আবদুল মালিক কিছুক্ষণ ধরে লাঠির উপর ভর দিয়ে চিন্তা করেন। অতঃপর বলেনঃ যদি আমি একে ঐ রকমই রেখে দিতাম! সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে আছে যে, আবদুল মালিক বিন মারওয়ান একবার বায়তুল্লাহ তওয়াফ করার সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) কে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, তিনি এ হাদীসটির ব্যাপারে হযরত আয়েশার (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন।' তখন হযরত হারিস (রাঃ) তাকে বাধা দেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, তিনি সত্যবাদীই ছিলেন। আমিও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই হাদীসটি শুনেছি। তখন আবদুল মালিক আফসোস করে বলেনঃ “আমি পূর্ব হতে অবগত থাকলে কখনও ভাঙ্গতাম না।' কাযী আইয়া এবং ইমাম নববী (রঃ) লিখেছেন যে, খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে (রঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আমি কা'বা শরীফকে পুনরায় ইবনে যুবাইর (রাঃ) কর্তৃক নির্মিত আকারে নির্মাণ করে দেই এর কি আপনি অনুমতি দিচ্ছেন?' ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, আপনি এরূপ করবেন না। কারণ এর ফলে হয়তো পবিত্র কাবা বাদশাহদের খেলনায় পরিণত হবে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত ওটাকে ভাঙ্গতে থাকবে।' খলীফা হারুনুর রশীদ তখন তার এই সংকল্প হতে বিরত থাকেন। এটাই সঠিকও মনে হচ্ছে যে, কা'বা শরীফকে বার বার ভেঙ্গে দেয়া উচিত নয়। কাবা শরীফের ধ্বংসলীলাসহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কা'বাকে দু'টি ছোট পা (পায়ের গোছা) বিশিষ্ট একজন হাবশী ধ্বংস করবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি, সেই কৃষ্ণবর্ণের (হাবশী) এক একটি পাথরকে পৃথক পৃথক করে দেবে, ওর আবরণ নিয়ে যাবে এবং এর অর্থ সম্পদও ছিনিয়ে নেবে। সে বাঁকা হাত-পা বিশিষ্ট ও টেকো মাথাওয়ালা হবে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, সে কোদাল মেরে মেরে টুকরো টুকরো করতে রয়েছে। খুব সম্ভব এই দুঃখজনক ঘটনা ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরে ঘটবে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরও তোমরা বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্ব ও উমরাহ করবে।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাদের প্রার্থনায় বলেছেনঃ “আমাদেরকে মুসলমান করে নিন। অর্থাৎ আমাদেরকে অকৃত্রিম, অনুগত, একত্ববাদী করে নিন এবং আমাদেরকে অংশীবাদী ও রিয়াকারী হতে রক্ষা করুন এবং আমাদিগকে নম্র ও বিনয়ী করুন।' হযরত সালাম বিন মুতী (রঃ) বলেন যে, তারা মুসলমান তো ছিলেনই, কিন্তু এখন ইসলামের উপর দৃঢ় ও অটল থাকার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। এর উত্তরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন (আরবি) অর্থাৎ আমি তোমাদের এই প্রার্থনা কবুল করলাম। আবার তাঁরা তাঁদের সন্তানাদির জন্যে এ দু’আই করছেন এবং তা ককূলও হচ্ছে। বানী ইসরাঈল ও আরব উভয়েই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি দল হক ও ইনসাফের উপর ছিল।' (৭:১৫৯) কিন্তু রচনা রীতি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ প্রার্থনা আরবের জন্যই, যদিও সাধাণভাবে অন্যেরাও জড়িত রয়েছে। কেননা, এই প্রার্থনার পরে অন্য প্রার্থনায় রয়েছে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন এই রাসূল দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে বুঝান হয়েছে। এ প্রার্থনাও গৃহীত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তিনিই এমন যিনি নিরক্ষরদের মধ্য তাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।' (৬২:২) কিন্তু এর দ্বারা তাঁর রিসালাত কারও জন্য বিশিষ্ট হচ্ছে না বরং তাঁর রিসালাত সাধারণ। আরব অনারব সবার জন্যেই তিনি রাসূল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল, হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।' (৭:১৫৮) এ দুজন নবীর প্রার্থনার মত প্রত্যেক খোদা ভীরু লোকেরই প্রার্থনা হওয়া উচিত। যেমন পবিত্র কোরআন মুসলমানকে দু'আ শিখিয়ে দিচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রীগণ এবং আমাদের সন্তানবর্গ হতে চক্ষের শীতলতা (শান্তি) দান করুন এবং আমাদেরকে খোদা ভীরু লোকদের ইমাম বানিয়ে দিন।' (২৫:৭৪) এটাও আল্লাহ তা'আলার প্রেমের দলীল যে, মানুষ কামনা করবে তার মৃত্যুর পরে তার ছেলেরাও যেন আল্লাহ তা'আলার উপাসনায় রত থাকে। অন্য জায়গায় প্রার্থনার শব্দ রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা হতে রক্ষা করুন। (১৪:৩৫) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'মানুষ মরে যাওয়া মাত্র তার কার্যাবলী শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। (১) সাদকাহ, (২) ইলম, যদ্বারা উপকার লাভ করা হয়, (৩) সৎ সন্তান, যারা প্রার্থনা করে (সহীহ মুসলিম)। তার পরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে হজুরে আহকাম শিখিয়ে দিন। কাবা শরীফের ইমারত পূর্ণ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে নিয়ে ‘সাফা' পর্বতে আসেন, অতঃপর মারওয়া পর্বতে যান এবং বলেন যে এগুলোই হচ্ছে আল্লাহর স্মৃতি নিদর্শন। অতঃপর তাঁকে মিনার দিকে নিয়ে যান। উকবাহ’র উপরে একটি গাছের পার্শ্বে শয়তানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বলেনঃ “তাকবীর' পাঠ করতঃ তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করুন। ইবলিস এখান হতে পালিয়ে গিয়ে জামরা-ই-উকবার পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ায়। এখানেও তিনি তাকে পাথর মারেন। এই কলুষ শয়তান নিরাশ হয়ে চলে যায়। হজ্বের আহকামের মধ্যে সে কিছু গোলমাল সৃষ্টি করতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগ পেলো না এবং সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল। এখান হতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে মাশআরে হারাম’ নিয়ে যান। অতঃপর আরাফাতে পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন, বুঝেছেন' তিনি বলেনঃ ‘হ্যাঁ'। অন্য বর্ণনায় শয়তানকে তিন জায়গায় পাথর মারার কথা বর্ণিত আছে। প্রত্যেক হাজী শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারেন।

আল-বাকারা 2:126

ওটা প্রথম আল্লাহর ঘরঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বার বার আগমন করা। হজ্বব্রত পালন করে বাড়ী ফিরে গেলেও অন্তর তার সাথে লেগেই থাকে। প্রত্যেক জায়গা হতে লোক দলে দলে এ ঘরের দিকে এসে থাকে। এটাই একত্রিত হবার স্থান, অর্থাৎ সবারই মিলন কেন্দ্র। এটা নিরাপদ জায়গা। এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো হয় না। অজ্ঞতার যুগেও এর আশে পাশে লুটতরাজ হতো বটে; কিন্তু এখানে নিরাপত্তা বিরাজ করতো। কাউকে কেউ গালিও দিত না। এ স্থান সদা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ থেকেছে। সৎ আত্মাগুলো সদা এর দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকে। প্রতি বছর পরিদর্শন করলেও এর প্রতি লোকের আগ্রহ থেকেই যায়। এটা হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর প্রার্থনারই ফল। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি জনগণের অন্তর ওদিকে ঝুঁকিয়ে দিন।' (১৪:৩৭) এখানে কেউ তার ভ্রাতার হন্তাকে দেখলেও নীরব থাকে। সুরা-ই-মায়েদার মধ্যে রয়েছে যে, এটা মানুষের অবস্থান স্থল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি হজ্ব করা ছেড়ে দেয় তবে আকাশকে পৃথিবীর উপর নিক্ষেপ করা হবে। এ ঘরের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে বায়তুল্লাহ শরীফের স্থান ঠিক করে দিলাম, (এবং বলেছিলাম) আমার সাথে কাউকেও অংশীদার স্থাপন করবে।' (২২ ২৬) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি)অর্থাৎ-আল্লাহ তা'আলার প্রথম ঘর রয়েছে মক্কায়, যা বরকতময় ও সারা বিশ্বের হিদায়াত স্বরূপ। তাতে কতকগুলো প্রকাশ্য নিদর্শন রয়েছে যেমন, মাকামে ইবরাহীম (আঃ), যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' (৩:৯৬) মাকামে ইবরাহীম বলতে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ শরীফও বুঝায় বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিশিষ্ট স্থানও বুঝায়। আবার হজ্বের সমুদয় করণীয় কাজের স্থানকেও বুঝায়। যেমন-আরাফাত, মাশআরে হারাম, মিনা, পাথর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ ইত্যাদি। মাকামে ইবরাহীম প্রকৃতপক্ষে ঐ পাথরটি যা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মান কার্য সম্পাদনের জন্যে তাঁর পায়ের নীচে রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ভুল কথা। প্রকৃত পক্ষে এটা ঐ প্রস্তর যার উপরে দাড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত জাবির (রাঃ)-এর একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ) তওয়াফ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ‘এটাই কি আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাকাম?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হাঁ'। তিনি বলেনঃ তাহলে আমরা এটাকে কিবলাহ বানিয়ে নেই না কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের অল্প দিন পরেই এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাই কি মাকামে ইবরাহীম যাকে কিবলাহ্ বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হাঁ এটাই।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমি আমার প্রভুর আনুকূল্য স্বীকার করেছি, অথবা বলেন- তিনটি বিষয়ে আমার প্রভু আমার আনুকূল্য করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছিলেন তাই তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান করে নিতাম! তখন (আরবি) (২:১২৫) অবতীর্ণ হয়। আমি বললাম-হে আল্লাহর রাসূল! সৎ ও অসৎ সবাই আপনার নিকট এসে থাকে, সুতরাং যদি আপনি মু'মিনদের জননীগণকে নিবী (সঃ)-এর সহধর্মিনীগণকে] পর্দার নির্দেশ দিতেন! তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। যখন আমি অবগত হই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোনও কোনও স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তখন তাদের নিকট গিয়ে বলি- যদি আপনারা বিরত না হন (রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দুঃখ দেয়া হতে] তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। তখন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি মুহাম্মদ (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে তবে অতি সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' (৬৬:৫) এ হাদীসটির বহু ইসনাদ রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় বদরের বন্দীদের ব্যাপারেও হযরত উমারের (রাঃ) আনুকূল্যের কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন যে, বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ না নিয়ে বরং তাদেরকে হত্যা করা হোক। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাও তাই ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নামক মুনাফিক যখন মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায আদায় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন আমি বলি আপনি কি এই মুনাফিক কাফিরের জানাযার নামায আদায় করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ধমক দিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে মৃত্যু বরণ করেছে তুমি কখনও তার জন্যে নামায পড়বে না এবং তার সমাধি পার্শ্বে দাঁড়াবে না। (৯:৮৪)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফ সদর্প পদক্ষেপে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং চারবার স্বাভাবিক পদক্ষেপে প্রদক্ষিণ করেন। অতঃপর মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) পিছনে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন এবং (আরবি) পাঠ করেন।' হযরত জাবিরের (রাঃ) হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইব্রাহীমকে (আঃ) তাঁর ও বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যে করেছিলেন। এ হাদীসসমূহের দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) ভাবার্থ ঐ পাথরটি যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর এনে দিতেন এবং তিনি কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যেতেন। যেখানে প্রাচীর উঁচু করার প্রয়োজন হতো সেখানে পাথরটি সরিয়ে নিয়ে যেতেন।এভাবে কা'বার প্রাচীর গাঁথার কাজ সমাপ্ত করেন। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘটনায় আসবে। ঐ পাথরে হ্যরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়েছিল। আরবের অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তা দেখেছিল। আবু তালিব তার প্রশংসাসূচক কবিতায় বলেছিলেন ? (আরবি)অর্থাৎ ‘ঐ পাথরের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন নতুন হয়ে রয়েছে, পদদ্বয় জুতো শূন্য ছিল। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ “আমি মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) উপর হযরত খলীলুল্লাহর (আঃ) পায়ের অঙ্গুলির ও পায়ের পাতার চিহ্ন দেখেছিলাম। অতঃপর জনগণের স্পর্শের কারণে তা মুছে গেছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মাকামে ইবুরাহীমের (আঃ) দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে, তাকে স্পর্শ করার নির্দেশ নেই। এ উম্মতের লোকেরাও পূর্বের উম্মতের ন্যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই কতকগুলো কাজ নিজেদের উপর ফর করে নিয়েছে, যা পরিণামে তাদের ক্ষতির কারণ। হবে। মানুষের স্পর্শের কারণেই ঐ পাথরের পদ চিহ্ন হারিয়ে গেছে। এই মাকামে ইবরাহীম পূর্বে কাবার প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কাবার দরজার দিকে হাজরে আসওয়াদ’র পার্শ্বে দরজা দিয়ে যেতে ডান দিকে একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যমান ছিল যা আজও লোকের জানা আছে। খলীলুল্লাহ (আঃ) হয়তো বা ওটাকে এখানেই রেখেছিলেন কিংবা বাইতুল্লাহ বানানো অবস্থায় শেষ অংশ হয়তো এটাই নির্মাণ করে থাকবেন এবং পাথরটি এখানেই থেকে গেছে। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে ওটাকে পিছনে সরিয়ে দেন। এর প্রমাণ রূপে বহু বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর একবার বন্যার পানিতে এ পাথরটি এখান হতেও সরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা পুনরায় একে পূর্বস্থানে রেখে দেন। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এটাকে মূল স্থান হতে সরানো হয়েছে এবং এর পূর্বে কা'বার প্রাচীর হতে কত দূরে ছিল।” একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পাথরটি তার মূল স্থান হতে সরিয়ে ওখানে রেখেছিলেন যেখানে এখন রয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুরসাল। সঠিক কথা এই যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা পিছনে রেখেছিলেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছি।' পবিত্র রেখো’ অর্থাৎ কা'বা শরীফকে ময়লা, বিষ্ঠা এবং জঘন্য জিনিস হতে পবিত্র রেখো। (আরবি)-এর (আরবি) যদি (আরবি) দ্বারা হয় তবে অর্থ দাঁড়াবে ‘আমি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি এবং প্রথমেই বলে দিয়েছি যে, তোমরা উভয়ে ‘বায়তুল্লাহূকে প্রতিমা থেকে পবিত্র রাখবে, তথায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত হতে দেবে না, বাজে কাজ,অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যে কথা, শিরক , কুফর হাসি রহস্য ইত্যাদি হতে ওকে রক্ষা করবে।' শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে প্রদক্ষিণকারী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘বাহির হতে আগমনকারী’। এ হিসেবে (আরবি) শব্দের অর্থ হবে মক্কার অধিবাসী।' হযরত সাবিত (রঃ) বলেনঃ “আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর (রঃ) কে বলি যে, আমাদের কর্তব্য হবে বাদশাহুকে এ পরামর্শ দেয়া, তিনি যেন জনগণকে বায়তুল্লাহ শরীফে শয়ন করতে নিষেধ করে দেন। কেননা,এমতাবস্থায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে, এবং এরও সম্ভাবনা আছে যে, তারা পরস্পরে বাজে কথা বলতে আরম্ভ করে দেয়। তখন তিনি বলেনঃ এরূপ করো না। কেননা, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা ওরই অধিবাসী।' একটি হাদীসে রয়েছে যে,হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) ছেলে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) শুয়ে থাকতেন, এবং তিনি যুবকও কুমার ছিলেন (আরবি) দ্বারা নামাযীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটা পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখনও মূর্তি পূজা চালু ছিল। বায়তুল্লাহর নামায উত্তম কি তওয়াফ উত্তম এ বিষয়ে ধর্ম শাস্ত্রবিদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে বাইরের লোকদের জন্যে তওয়াফ উত্তম এবং জামহুরের মতে প্রত্যেকের জন্যে নামায উত্তম। তাফসীর এর ব্যাখ্যার জায়গা নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদেরকে জানিয়ে দেয়া এবং তাদের দাবী খণ্ডন করা যে, বায়তুল্লাহ' তো খাস করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। ওর মধ্যে অন্যদের পূজা করা এবং খাটি আল্লাহর পূজারীদেরকে ঐ ঘরে ইবাদত করা হতে বিরত রাখা সরাসরি অন্যায় ও আবচারপূণ কাজ। এজন্যেই কুরআন মাজীদে অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ অত্যাচারীদেরকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো। এভাবে মুশরিকদের দাবীকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করার সাথে সাথে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের দাবীও খণ্ডন করা হয়ে গেল। তারা যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুওয়াতের সমর্থক, তারা যখন জানে ও স্বীকার করে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ ঘর এসব পবিত্র হস্ত দ্বারাই নির্মিত হয়েছে, তারা যখন একথারও সমর্থক যে, এ ঘরটি শুধুমাত্র নামায, তওয়াফ, প্রার্থনা এবং আল্লাহর উপাসনার জন্যেই নির্মিত হয়েছে, হজ্ব, উমরাহ, ইতিকাফ ইত্যাদির জন্যে বিশিষ্ট করা হয়েছে, তখন এই নবীগণের অনুসরণ দাবী সত্ত্বেও কেন তারা হজ্ব ও উমরা করা হতে বিরত রয়েছে? বায়তুল্লাহ শরীফে তারা উপস্থিত হয় না কেন? বরং স্বয়ং হযরত মূসা (আঃ) তো এই ঘরের হজ্ব করেছেন, যেমন হাদীসে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মসজিদগুলো উঁচু করার অনুমতি দিয়েছেন। ওর মধ্যে তাঁর নামের যিক্র করা হবে, ওর মধ্যে সকাল-সন্ধায় তার সৎ বান্দাগণ তাঁর নামের তাসবিহু পাঠ করে থাকে। (২৪:৩৬) হাদীস শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মসজিদসমূহ যে কাজের জন্যে তা ঐ জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আরও বহু হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মসজিদসমূহ পবিত্র রাখার নির্দেশ রয়েছে। বায়তুল্লাহ শরীফের নির্মাণ ও এর সর্বপ্রথম নির্মাতাকেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন। আমি মদীনাকে হারাম করলাম। এর শিকার খাওয়া হবে না, এখানকার বৃক্ষ কর্তন করা হবে না, এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো নিষিদ্ধ। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে যে, জনগণ টাটকা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের খেজুরে, আমাদের শহরে এবং আমাদের ওজনে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) আপনার বান্দা, আপনার দোস্ত এবং আপনার রাসূল ছিলেন। আমিও আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল। তিনি আপনার নিকট মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আমিও আপনার নিকট মদীনার জন্যে প্রার্থনা জানাচ্ছি। যেমন তিনি মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বরং এরকমই আরও একটি। অতঃপর কোন ছোট ছেলেকে ডেকে ঐ খেজুর তাকে দিয়ে দিতেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘তোমাদের ছোট ছোট বালকদের মধ্যে একটি বালককে আমার খিদমতের জন্যে অনুসন্ধান কর। আবূ আলহা (রাঃ) আমাকেই নিয়ে যান। তখন আমি বিদেশে ও বাড়ীতে তাঁর খিদমতেই অবস্থান করতে থাকি। একদা তিনি বিদেশ হতে আসছিলেন। সম্মুখে উহুদ পর্বত দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেনঃ ‘এ পর্বত আমাকে ভালবাসে এবং আমিও এ পর্বতকে ভালবাসি'। মদীনা চোখের সামনে পড়লে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ! আমি এর দু'ধারের মধ্যবর্তী স্থানকে ‘হারাম’ রূপে নির্ধারণ করছি, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ রূপে নির্ধারণ করেছিলেন। হে আল্লাহ! এর মুদ্দ’, ‘সা’ এবং ওজনে বরকত দান করুন।হযরত আনাস (রাঃ) হতেই আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! মক্কায় আপনি যে বরকত দান করেছেন তার দ্বিগুণ বরকত মদীনায় দান করুন। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ বানিয়েছিলেন, আমিও মদীনাকে হারাম’ বানালাম। এখানে কাউকেও হত্যা করা হবে না এবং চারা (পশুর খাদ্য ) ছাড়া বৃক্ষাদির পাতাও ঝরানো হবে না। এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে যদ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মক্কার মত মদীনাও হারাম শরীফ। এখানে এসব হাদীস বর্ণনা করায় আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা শরীফের মর্যাদা ও এখানকার নিরাপত্তার বর্ণনা দেয়া। কেউ কেউতো বলেন যে, প্রথম হতেই এটা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আমল হতে এর মর্যাদা ও নিরাপত্তা সূচীত হয়। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ 'যখন হতে আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন তখন থেকেই এই শহরকে মর্যাদাপূর্ণরূপে বানিয়েছেন। এখন কিয়ামত পর্যন্ত এর মর্যাদা অক্ষুন্নই থাকবে। এখানে যুদ্ধ বিগ্রহ কারও জন্যে বৈধ নয়। আমার জন্যেও শুধুমাত্র আজকের দিনে ক্ষণেকের জন্যে বৈধ ছিল। এর অবৈধতা রয়েই গেল। জেনে রেখো এর কাটা কাটা হবে না। এর শিকার তাড়া করা হবে না। এখানে কারও পতিত হারানো জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে না, কিন্তু যে ওটা (মালিকের নিকট ) পৌছিয়ে দেবে তার জন্যে জায়েযু। এর ঘাস কেটে নেয়া হবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এ হাদীসটি খুত্বায় বর্ণনা করেছিলেন এবং হযরত আব্বাসের (রাঃ) প্রশ্নের কারণে তিনি ইযখার’ নামক ঘাস কাটার অনুমতি দিয়েছিলেন।হযরত আমর বিন সাঈদ (রাঃ) যখন মক্কার দিকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করছিলেন সেই সময়ে হযরত ইবনে শুরাইহ্ আদভী (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমীর! মক্কা বিজয়ের দিন অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে খুত্ব দেন তা আমি নিজ কানে শুনেছি, মনে রেখেছি এবং সেই সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে স্বচক্ষে দেখেছি- আল্লাহ তাআলার প্রশংসার পর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই মক্কাকে হারাম করেছেন, মানুষ করেনি। কোন মুমিনের জন্যে এখানে রক্ত প্রবাহিত করা এবং বৃক্ষাদি কেটে নেয়া বৈধ নয়। যদি কেউ আমার এই যুদ্ধকে প্রমাণরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে বলবে যে, আমার জন্যে শুধুমাত্র আজকের দিন এই মুহূর্তের জন্যেই যুদ্ধ বৈধ ছিল। অতঃপর পুনরায় এ শহরের মর্যাদা ফিরে এসেছে যেমন কাল ছিল। সাবধান! তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছ, তাদের নিকট অঅবশ্যই এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যারা আজ এ সাধারণ জনসমাবেশে নেই। কিন্তু আমার এ হাদীসটি শুনে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেনঃ ‘আমি তোমার চেয়ে এ হাদীসটি বেশী জানি। 'হারাম শরীফ অবাধ্য রক্ত পিপাসুকে এবং ধ্বংসকারীকে রক্ষা করে না।” (বুখারী ও মুসলিম)। কেউ যেন এ দুটো হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে না করেন। এ দুটোর মধ্যে সাদৃশ্য এভাবে হবে যে, মক্কা প্রথম দিন হতেই মর্যাদাপূর্ণ তো ছিলই, কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রচার করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো রাসূল তখন হতেই ছিলেন যখন হযরত আদম (আঃ) এর খামির প্রস্তুত হয়েছিল, বরং সেই সময় হতেই তার নাম শেষ নবী রূপে লিখিত ছিল। কিন্তু তথাপিও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নবুওয়াতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে হতেই একজন রাসূল তাদের মধ্যে প্রেরণ করুন। (২:১২৯) এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তকদীরে লিখিত ঐ কথা প্রকাশিত হয়। একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেন ? ‘আপনার নবুওয়াতের সূত্রের কথা কিছু আলোচনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি নূর বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিলো এবং তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকলো। মক্কা ও মদীনার মধ্যে বেশী উত্তম কোনটি?জামহুরের মতে মদীনার চেয়ে মক্কা বেশী উত্তম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের মাযহাব অনুসারে মক্কা অপেক্ষা মদীনা বেশী উত্তম। এ দু'দলেরই প্রমাণাদি সত্বরই ইনশাআল্লাহ আমরা বর্ণনা করবো। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছেনঃ “হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপদ শহর করে দিন।” অর্থাৎ এখানে অবস্থানকারীদেরকে ভীতি শূন্য রাখুন। আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ হয়ে গেলো। (৩:৯৭) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারাম’কে নিরাপত্তা দানকারী করেছি? ওর আশ পাশ হতে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানে তারা পূর্ণ নিরপত্তা লাভ করছে।' (২৯:৬৭) এ প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় বহু হাদীসও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা শরীফে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ মক্কায় অস্ত্র শস্ত্র উঠাননা কারও জন্যে বৈধ নয়। (সহীহ মুসলিম)' তাঁর এ প্রার্থনা কাবা শরীফ নির্মাণের পূর্বে ছিল, এ জন্যেই বলেছেন, হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপত্তা দানকারী শহর বানিয়ে দিন। সূরা-ই- ইব্রাহীমের মধ্যে এ প্রার্থনাই এভাবে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১২৬) সম্ভবতঃ এটা দ্বিতীয় বারের প্রার্থনা ছিল, যখন বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত হয়ে যায় ও শহর বসে যায় এবং হযরত ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর তিন বছরের ছোট ছিলেন। এজন্যেই এ প্রার্থনার শেষে তার জন্ম লাভের জন্যেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার কথা। কেউ কেউ এটাকেও প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।তখন ভাবার্থ হবে এইঃ কাফিরদেরকেও অল্প দিন শান্তিতে রাখুন, অতঃপর তাদেরকে শাস্তিতে জড়িত করে ফেলুন। আর একে আল্লাহ তা'আলার কালাম বললে ভাবার্থ হবে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানাদির জন্যে ইমামতির প্রার্থনা জানালেন এবং অত্যাচারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা শুনলেন। ও বুঝতে পারলেন যে, তার পরে আগমনকারীদের মধ্যে অনেকে অবাধ্যও হবে, তখন তিনি ভয়ে শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যেই আহার্যের প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ কাফিরদেরকেও দেবেন। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি তোমার প্রভুর দান এদেরকেও দেবো এবং ওদেরকেও দেবো, তোমার প্রভুর দান কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয়। (১৭:২০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় তারা মুক্তি পায় না, তারা দুনিয়ায় কিছুদিন লাভবান হলেও আমার নিকট যখন তারা ফিরে আসবে তখন আমি তাদেরকে কুফরীর প্রতিফল স্বরূপ কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।অন্যস্থানে বলেনঃ “কাফিরদের কুফরী যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, আমার নিকট তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর যে কাজ তারা করেছে তার সংবাদ আমি তাদেরকে দেবো, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পূর্ণ অবগত আছেন। আমি তাদেরকে সামান্য সুখ দেয়ার পর ভীষণ শাস্তির মধ্যে জড়িয়ে ফেলবো।” অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি এটা না হতো যে, (প্রায়) সমস্ত মানুষ একই পথাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাবে, তাহলে যারা দয়াময় (আল্লাহ)-এর সাথে কুফরী করে, আমি তাদের জন্য তাদের গৃহসমূহের ছাদ। রৌপ্যের করে দিতাম এবং সিঁড়িগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর দিয়ে তারা আরোহণ করে; এবং তাদের গৃহের দরজাগুলো ও আসনগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর তারা হেলান দিয়ে বসে আর (এসব) স্বর্ণের ও (করে দিতাম), এবং এগুলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাসের উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়, (শেষে সবই বিলীন হয়ে যাবে) এবং আখেরাত তোমার প্রভুর সমীপে মুত্তাকির জন্যে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন :অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির মধ্যে জড়িত করে ফেলবো এবং ওটা জঘন্য অবস্থান স্থল। অর্থাৎ তাদেরকে অস্থায়ী জগতে সুখে শান্তিতে রাখার পর ভীষণ শাস্তির দিকে টেনে আনবো। এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য অবস্থান স্থল।' এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দেখছেন এবং অবকাশ দিচ্ছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। যেমন তিনি বলেছেন। (আরবি) অর্থাৎ বহু অত্যাচারী গ্রামবাসীকে আমি অবকাশ দিয়েছি, অতঃপর পাকড়াও করেছি, শেষে তো তাদেরকে আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (২২:৪৮) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা বেশী ধৈর্য ধারণকারী আর কেউই নেই। তারা তার সন্তানাদি সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে আহার্যও দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাও দান করেছেন। অন্য সহীহ হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীকে ঢিল দেন, তৎপর হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন- (আরবি)অর্থাৎ তোমার প্রভুর পাকড়াও এরকমই যে, যখন তিনি কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন, তখন নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক। (১১:১০২) এই বাক্যকে হ্যরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করার পঠন খুবই বিরল এবং তা সপ্ত পাঠকের পঠনের বিপরীত। রচনা। রীতিরও এটা উল্টো। কেননা (আরবি) ক্রিয়া পদের (আরবি) টি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু এ বিরল পঠনে এর কর্তা ও উক্তিকারী হযরত ইবরাহীমই (আঃ), হচ্ছেন এবং এটা বাক্যরীতির সম্পূর্ণ উল্টো (আরবি) শব্দটি এর বহুবচন (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে থামের নিম্নতল এবং ভিত্তি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তির সংবাদ দিয়ে দাও।' একটি কিরআতে (আরবি)-এর পরে (আরবি) ও রয়েছে। ওরই প্রমাণ রূপে পরে (আরবি) শব্দটিও এসেছে।আন্তরিক প্রার্থনাহযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) শুভ কাজে লিপ্ত রয়েছেন এবং তা গৃহীত হয় কি না এ ভয়ও তাঁদের রয়েছে। এ জন্যেই তারা মহান আল্লাহর নিকট এটা কবুল করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। হযরত অহীব বিন অরদ (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে খুব ক্রন্দন করতেন এবং বলতেন :‘হায়! আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বন্ধু এবং গৃহীত নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কাজ তাঁর হুকুমেই করছেন, তাঁর ঘর তাঁরই হুকুমে নির্মাণ করছেন, তথাপি ভয় করছেন যে, না জানি আল্লাহর নিকট এটা না মঞ্জুর হয়। মহান আল্লাহ মু'মিনদের অবস্থা এরকমই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে এবং দান খয়রাত করে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে কম্পিত থাকে (এই ভয়ে যে, না-জানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় কি না!)' (২৩:৬০) যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, যা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, অতি সত্বরই তা নিজ স্থানে আসছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে, ভিত্তি উত্তোলন করতেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং প্রার্থনা করতেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, উভয়ই উভয় কাজে অংশীদার ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনা এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি হাদীসও এ ঘটনা সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রী লোকেরা কোমর বন্ধনী বাধার নিয়ম হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মাতার নিকট হতেই শিখেছে। তিনি ওটা বেঁধে ছিলেন যাতে তার পদচিহ্ন মিটিয়ে যায়, ফলে যেন হযরত শারিয়া (রাঃ) তার পদচিহ্ন দেখতে না পান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে এবং তার কলিজার টুকরা একটি মাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে নিয়ে বের হন। সেই সময় এই প্রাণপ্রিয় শিশু দুধ পান করতো। এখন যেখানে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত রয়েছে সে সময় তথায় একটি পাহাড় ছিল এবং বিজন মরুভূমি রূপে পড়েছিল। তখন তথায় কেউই বাস করতো না। এখানে মা ও শিশুকে বসিয়ে তাদের পার্শ্বে সামান্য খেজুর ও এক মশক পানি রেখে যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিট ফিরিয়ে চলে যেতে আরম্ভ করেন, তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বন্ধু! এরকম ভীতিপ্রদ বিজন মরুভূমির মধ্যে যেখানে আমাদের কোন বন্ধু ও সাথী নেই, আমাদেরকে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন উত্তর দেননি, এমনকি ঐ দিকে ফিরেও তাকাননি। হযরত হাজেরা (রাঃ) বারবার বলার পরেও যখন তিনি কোন ক্ষেপ না করেন তখন তিনি বলেন, হে আল্লাহর প্রিয়! আমাদেরকে আপনি কার নিকট সমর্পণ করে গেলেন?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট।' তিনি বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এটা কি আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, 'হা, আমার উপর আল্লাহ তাআলার এটাই নির্দেশ। একথা শুনে হযরত হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনা লাভ করেন এবং বলেন ? তাহলে আপনি যান। আল্লাহ আমাদেরকে কখনও ধ্বংস করবেন না। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করছি এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল।' হযরত হাজেরা (রাঃ) ফিরে আসেন এবং স্বীয় প্রাণের মণি, চক্ষের জ্যোতি, আল্লাহর নবীর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ক্রোড়ে ধারণ করে ঐ জনহীন প্রান্তরে, সেই আল্লাহর জগতে বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে বসে পড়েন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন সানিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন এবং অবগত হন যে, হযরত হাজেরা (রাঃ) পিছনে নেই এবং ওখান হতে এখন পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি কাজ করবে না, তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন :“হে আমার প্রভু! আমার সন্তানাদিকে আপনার পবিত্র ঘরের পার্শ্বে একটি অনাবাদী ভূমিতে ছেড়ে এসেছি। যেন তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করে, আপনি মানুষের অন্তর ওদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং ওদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো প্রার্থনা করে আল্লাহ তাআলার নিদের্শ পালন করতঃ স্বীয় সহধর্মিনী ও ছেলেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে চলে যান, আর এদিকে হযরত হাজেরা (রাঃ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে শিশুকে নিয়েই মনে তৃপ্তি লাভ করছিলেন। ঐ অল্প খেজুর ও সামান্য পানি শেষ হয়ে গেল। এখন কাছে না আছে এক গ্রাস আহার্য বা না আছে এক ঢাকে পানি। নিজেও ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর এবং শিশুও ভুক ও তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। এমন কি সেই নিস্পাপ নবী পুত্রের ফুলের ন্যায় চেহারা মলিন হতে থাকে। মা কখনও নিজের একাকিত্বের ও আশ্রয় হীনতার কথা চিন্তা করছিলেন, আবার কখনও নিজের একমাত্র অবুঝ শিশুর অবস্থা দুশ্চিন্তার সাথে লক্ষ্য করছিলেন এবং সহ্য করে চলছিলেন। এটা জানা ছিল যে, এরকম ভয়াবহ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানুষের গমনাগমন অসম্ভব। বহু মাইল পর্যন্ত আবাদী ভূমির চিহ্নমাত্র নেই। খাবার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিরও ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি উঠে চলে যান। নিকটবর্তী, সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন এবং প্রান্তরের এ নিক্ষেপ করেন যে, কোন লোককে যেতে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু দৃষ্টি নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি সেই পাহাড় হতে নেমে পড়েন এবং অঞ্চল উঁচু করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করেন। ওর উপর চড়েও চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় সেখান হতে অবতরণ করেন। এভাবেই মধ্যবর্তী সামান্য অংশ দৌড়িয়ে অবশিষ্ট অংশ তাড়াতাড়ি অতিক্রম করেন। আবার সাফা পাহাড়ের উপর চড়েন। এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, প্রত্যেক বার শিশুকে দেখেন যে, তার অবস্থা ক্রমে ক্রমেই মন্দের দিকে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাজীরা যে, ‘সাফা' ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়িয়ে থাকেন তার সূচনা এখান থেকেই হয়। সপ্তম বারে যখন হাজেরা (রাঃ) মারওয়ার উপর আসেন তখন একটা শব্দ তার কানে আসে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি এই শব্দের দিকে মনোযোগ দেন। আবার শব্দ তার কানে আসে এবং এবারে স্পষ্টভাবে শুনা যায়। সুতরাং তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান এবং এখন যেখানে যমযম কূপ রয়েছে তথায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দেখতে পান। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কে? তিনি উত্তর দেনঃ আমি হাজেরা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ছেলের মা। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আপনাকে এই নির্জন মরুপ্রান্তরে কার নিকট সপর্দ করেছেন?' তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট। তখন ফেরেশতা বলেনঃ “তা হলে তিনিই যথেষ্ট। হযরত হাজেরা (রাঃ) বলেন, “হে অদৃশ্য ব্যক্তি! শব্দ তো আমি শুনলাম। এটা আমার কোন কাজে আসবে তো?'যমযম্ কূপহযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটির উপর ঘর্ষণ করা মাত্রই তথায় মাটি হতে একটি ঝরণা বইতে থাকে। হযরত হাজেরা (রাঃ) তার হাত দ্বারা পানি উঠিয়ে তার মশক ভর্তি করে নেন। পানি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়বে এ চিন্তা করে ঝরণার চার দিকে মাটির বেষ্টনি দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের উপর সদয় হউন, যদি তিনি এভাবে পানি আটকিয়ে না রাখতেন তবে যম কূপের আকার বিশিষ্ট হতো না, বরং প্রবাহিত নদীর রূপ ধারণ করতো। তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) নিজেও পানি পান করেন এবং শিশুকেও পান করিয়ে দেন। অতঃপর শিশুকে দুধ পান করাতে থাকেন। ফেরেশতা তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ধ্বংস করবেন মহান আল্লাহ এখানে এ ছেলে ও তার পিতার দ্বারা তাঁর একটা ঘর নির্মাণ করাবেন।' হযরত হাজেরা (রাঃ) এখানেই বাস করতে থাকেন, যম্ম্ কূপের পানি পান করেন আর শিশুর মাধ্যমে মনোরঞ্জন লাভ করেন। বর্ষাকালে বন্যার পানিতে চার দিকে প্লাবিত হয়ে যেতো। কিন্তু এই জায়গাটি উচু ছিল বলে পানি এ দিক ওদিক দিয়ে বয়ে যেতো এবং এ স্থানটি নিরাপদ থাকতো। জনহীন উপত্যকায় ‘জারহাম' গোত্রের আগমনকিছুদিন পর ঘটনাক্রমে ‘জারহাম’ গোত্রের লোক ‘কিদার’ পথে যাচ্ছিল। তারা মক্কা শরীফের নিম্নাংশে অবতরণ করে। একটি পানির পক্ষীর প্রতি তাদের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হওয়ায় তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ এটা পানির পাখি এবং এখানে পানি ছিল না আমরা কয়েকবার এখান দিয়ে যাতায়াত করেছি। এটাতো শুষ্ক জঙ্গল ও জনহীন প্রান্তর। এখানে পানি কোথায়? তারা প্রকৃত ঘটনা জানবার জন্যে লোকে পাঠিয়ে দেয়। তারা ফিরে এসে সংবাদ দেয় যে, তথায় বহু পানি রয়েছে। তখন তারা সবাই চলে আসে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট আরয করেঃ আপনি অনুমতি দিলে আমরাও এখানে অবস্থান করি। এটা পানির জায়গা।' তিনি বলেনঃ ‘হা, ঠিক আছে। আপনারা সাগ্রহে অবস্থান করুন। কিন্তু পানির উপর অধিকার আমারই থাকবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গী সাথী জুটে যাক, হযরত হাজেরা (রাঃ) তো তাই চাচ্ছিলেন। সুতরাং এই যাত্রী দল এখানেই বাস করতে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হন। ঐ সব লোকের সাথে তাঁর খুবই ভালুবাসা হয়। অবশেষে তিনি যৌবন প্রাপ্ত হন এবং তাদের মধ্যে তার বিয়েও অনুষ্ঠিত হয়। তাদের কাছে তিনি আরবী ভাষা শিখে নেন। হযরত হাজেরা (আঃ) এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রিয় পুত্রের সাথে প্রথম সাক্ষাৎমহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তথায় আগমন করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁর এ যাতায়াত বুরাকের (স্বর্গীয় বাহন) মাধ্যমে হতো। সিরিয়া হতে তিনি আসতেন এবং আবার ফিরে যেতেন। এখানে এসে তিনি দেখেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়িতে নেই। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সে কোথায় রয়েছে? উত্তর আসেঃ তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের অবস্থা কি?' সে বলেঃ ‘অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।' তিনি বলেনঃ * তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে,সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।' হযরত যাবীহুল্লাহ (আ) ফিরে এসে যেন তিনি কোন মানব আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি? স্ত্রী বলে, “হাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন। তার পরে জিজ্ঞেস করেন, দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে' আমি বলি যে, “আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন অবস্থায় দিন যাপন করছি।” হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলেনঃ ‘আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি? স্ত্রী বলেঃ হাঁ, বলেছেন যে, যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা। তিনি যা বলে গেছেন তার ভাবার্থ এই যে, (যেহেতু তুমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে) আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। যাও, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। তাকে তালাক দিয়ে তিনি ঐ গোত্রেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন।দ্বিতীয় বার সাক্ষাতের চেষ্টাকিছুদিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে পুনরায় এখানে আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল যাবিহুল্লাহর (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন। পুত্রবধূ বলেঃ আপনি বসুন যা কিছু হাজির রয়েছে তাই আহার করুন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ বলতো তোমাদের দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কিরূপ? উত্তর আসেঃ “আলহামদু লিল্লাহ! আমরা ভালই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ 'তোমাদের আহার্য কি? উত্তর আসেঃ ‘গোশত।' জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা পান কর কি?” উত্তর হয়ঃ ‘পানি।' তিনি প্রার্থনা করেন, হে প্রভু! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি শস্য তাদের নিকট থাকতো এবং তারা এটা বলতো তবে হযরত ইবরাহীম খালীল (আঃ) তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিন যাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে, সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে। এর পরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেনঃ উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি (তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারিণী)। আবার কিছু দিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করে এখানে আসেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যমযম কূপের পাশ্বে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে দেখা মাত্রই আদবের সাথে দাড়িয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।কাবা শরীফের নতুন নির্মাণপিতা-পুত্রের মিলন হলে ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।' তিনি বলেনঃ “যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।' তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।' তিনি আরয করেনঃ “আমি হাযির আছি আব্বা!” তিনি বলেনঃ “এ স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।' তিনি বলেনঃ “খুব ভাল কথা, আব্বা!, এখন পিতা ও পুত্র মিলে বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং উঁচু করতে আরম্ভ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পাথর এনে দিতেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তা দিয়ে দেয়াল গাঁথতে থাকতেন। দেয়াল কিছুটা উঁচু হলে হযরত যাবিহুল্লাহ (আঃ) এই পাথরটি অর্থাৎ মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি নিয়ে আসেন। ঐ উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা শরীফের পাথর রাখতেন এবং পিতা-পুত্র উভয়ে এই দু'আ করতেনঃ ‘প্রভু হে! আপনি আমাদের এই নগণ্য খিদমত ককূল করুন, আপনি শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।' এই বর্ণনাটি অন্যান্য হাদীসের কিতাবেও রয়েছে। কোথাও বা সংক্ষিপ্তভাবে এবং কোথাও বা বিস্তারিতভাবে। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে এটাও রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী হন তখন তিনি তাঁর মাথার উপরে মেঘের মত একটি জিনিস লক্ষ্য করেন। ওর মধ্য হতে শব্দ আসছিলঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! যত দূর পর্যন্ত এই মেঘের ছায়া রয়েছে তত দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি তুমি বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নাও। কম বেশী যেন না হয়। ঐ বর্ণনায় এও আছে যে,বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ছেড়ে চলে আসেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটিই সঠিক। আর এভাবেই সামঞ্জস্য হতে পারে যে, পূর্বে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু নির্মাণ করেছিলেন পরে, এবং নির্মাণ কার্যে পিতা-পুত্র উভয়েই অংশ নিয়েছিলেন। যেমন কুরআনের শব্দগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে। হযরত আলী (রাঃ) বায়তুল্লাহ নির্মাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন যে, ঐ ঘর কোথায় নির্মাণ করতে হবে এবং কত বড় করতে হবে ইত্যাদি। তখন ‘সাকীনা অবতীর্ণ হয় এবং তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, যেখানেই ওটা থেমে যাবে সেখানেই ঘর নির্মাণ করতে হবে। এবার ঘরের নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। হাজরে আসওয়াদের নিকট পৌছলে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে বলেনঃ বৎস! কোন ভাল পাথর খুঁজে নিয়ে এসো।' তিনি ভাল পাথর খুঁজে আনেন। এসে দেখেন যে,তার আব্বা অন্য পাথর তথায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আব্বা! এটা কে এনেছে?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ পাথর খানা আকাশ হতে নিয়ে এসেছেন। হযরত কা'বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, এখন যেখানে বায়তুল্লাহ রয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তথায় পানির উপর বুন্ধুদের সাথে ফেনা হয়েছিল, এখান হতেই পৃথিবী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, কাবা ঘর নির্মাণের জন্য হযরত ইবরাহীম (আঃ) আরমেনিয়া হতে এসেছিলেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) হাজরে আসওয়াদ' ভারত হতে এনেছিলেন। সেই সময় ওটা সাদা চকচকে ‘ইয়াকুত' (মণি) ছিল। হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে জান্নাত হতে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মানুষের পাপপূর্ণ হস্ত স্পর্শের ফলে ওটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এক বর্ণনায় এটাও রয়েছে। যে, এর ভিত্তি পূর্ব হতেই বিদ্যমান ছিল। ওর উপরেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। মুসনাদে আবদুর রাযযাকের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেছিলেন। সেই সময় তার দেহ দীর্ঘ ছিল। পৃথিবীতে আগমনের পর ফেরেশতাদের তসবীহ, নামায দু’আ ইত্যাদি শুনতে পেতেন। যখন দেহ খাটো হয়ে যায় এবং ঐ সব ভাল শব্দ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তাঁকে মক্কার দিকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি মক্কার দিকে যেতে থাকেন। যেখানে যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়ে সেখানে সেখানে জনবসতি স্থাপিত হয়। এখানে আল্লাহ তা'আলা বেহেশত হতে একটি ইয়াকুত অবতীর্ণ করেন এবং বায়তুল্লাহর স্থানে রেখে দেন, আর ঐ স্থানকেই স্বীয় ঘরের জায়গা হিসাবে নির্ধারণ করেন। হযরত আদম (আঃ) এখানে তওয়াফ করতে থাকেন এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। হযরত নূহ (আঃ)-এর প্লাবনের যুগে এটা উঠে যায় এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যুগে পুনরায় নির্মাণ করিয়ে নেন। হযরত আদম (আঃ) এ ঘরটিকে হেরা, তুর, যীতা, ভূরে সাইনা এবং জুদী এই পাঁচটি পাহাড় দ্বারা নির্মাণ করেন। কিন্তু এই সমুদয় বর্ণনার মধ্যেই স্পষ্টভাবে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে,পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে বায়তুল্লাহর নির্মাণ করা হয়েছিল। বায়তুল্লাহর চিহ্ন ঠিক করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে গিয়েছিলেন। সেই সময় এখানে বন্য বৃক্ষাদি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহু দূরে আমালিক সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এখানে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তার মাকে একটি কুঁড়ে ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বায়তুল্লাহর চারটি স্তম্ভ আছে এবং সপ্তম জমি পর্যন্ত তা নীচে গিয়েছে। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যুলকারনাইন যখন এখানে পৌঁছেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করতে দেখেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি এটা কি করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে আমি তার ঘর নির্মাণ করছি।' যুলকারনাইন। জিজ্ঞেস করেন :এর প্রমাণ কি আছে?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এই নেকড়ে বাঘগুলো সাক্ষ্য দিবে।' পাঁচটি নেকড়ে বাঘ বলেঃ আমার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এরা দুজন নির্দেশ প্রাপ্ত। যুলকারনাইন এতে খুশী হন এবং বলেনঃ “আমি মেনে নিলাম।' ‘আরযাকীর তারীখ-ই মক্কানামক পুস্তকে রয়েছে যে, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সঙ্গে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভিত্তি। এটা (আরবি)শব্দের বহুবচন। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় (আরবি) (২৪:৬০)ও এসেছে। এরও এক বচন হচ্ছে (আরবি) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ তুমি কি দেখছো না যে, তোমার গোত্র যখন বায়তুল্লাহ নির্মাণ করে, তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি হতে ছোট করে দেয়। আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি ওটা বাড়িয়ে দিয়ে মূল ভিত্তির উপর করে দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘তোমার কওম যদি নতুন ইসলাম গ্রহণকারী না হতো এবং তাদের কুফরীর যুগ যদি নিকটে না থাকতো তবে আমি তাই করতাম।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) এ হাদীসটি জানার পর বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কারণেই ‘হাজরে আসওয়াদের পার্শ্ববর্তী দুটি স্তম্ভকে স্পর্শ করতেন না। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা! যদি তোমার কওমের অজ্ঞতার যুগ নিকটে না হতো তবে আমি অবশ্যই কাবার ধনাগারকে আল্লাহর পথে দান করে দিতাম এবং দরজারকে ভূমির সাথে লাগিয়ে দিতাম এবং ‘হাতীম'কে বায়তুল্লাহর মধ্যে ভরে দিতাম।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এর দ্বিতীয় দরজাও করতাম, একটি আসবার জন্যে এবং অপরটি যাবার জন্যে। ইবনে যুবাইর (রাঃ) তাঁর খিলাফতের যুগে এরকমই করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'আমি একে ভেঙ্গে দিতাম এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি একটি পূর্বমুখী করতাম এবং একটি পশ্চিমমুখী করতাম এবং ৬ হাত হাতীম’কে এর মধ্যে ভরে দিতাম যাকে কুরাইশরা এর বাইরের করে দিয়েছে। নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে কুরাইশরা নতুনভাবে কা'বা ঘর নির্মাণ করেছিল। এই নির্মাণ কার্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) শরীক ছিলেন। যখন তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর, সেই সময় করাইশরা কা'বা শরীফকে নতুনভাবে নির্মাণ করার ইচ্ছে করে। কারণ ছিল এই যে, এর দেয়াল ছিল খুব ছোট এবং ছাদও ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, বায়তুল্লাহর ধনাগার চুরি হয়ে গিয়েছিল, যা ঐ ঘরের মধ্যে একটি গভীর গর্তে রক্ষিত ছিল। এই চোরাই মাল খাযায়েমা গোত্রীয় বানী মালীহ্ বিন আমরের ক্রীতদাস দুয়ায়েক' নামক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভবতঃ চোরেরা ঐ মাল তার ওখানে রেখেছিল। যাহোক, এই চুরির অপরাধে দুয়ায়েকের হাত কেটে দেয়া হয়। তাছাড়া এই ঘর নির্মাণের ব্যাপারে তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিরাট সুযোগ লাভ করেছিল। তা এই যে, রোম রাজ্যের বণিকদের একটি নৌকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জিদ্দার ধারে এসে লেগে যায়। ঐ নৌকায় বহু মূল্যবান কাঠ বোঝাই করা ছিল। এই কাঠগুলো কাবা ঘরের ছাদের কাজে লাগতে পারে এই চিন্তা করে কুরাইশরা ঐ কাঠগুলো কিনে। নেয় এবং কিবতী গোত্রের একজন ছুতারকে কাবার ছাদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করে। এসব প্রস্তুতিতো চলছিল বটে কিন্তু বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে দিতে তারা ভয় পাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলার ইঙ্গিতে এরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। বায়তুল্লাহর কোষাগারে একটি সাপ ছিল। যখনই কোন লোক ওর নিকটে যেতো তখনই সে হাঁ করে তার দিকে বাধিত হতো। এই সর্পটি প্রত্যহ ঐ গর্ত হতে বেরিয়ে বায়তুল্লাহর দেয়ালে এসে বসে থাকতো। একদা ঐ সাপটি ওখানে বসেই ছিল। এমন সময় আল্লাহ তা'আলা একটা বিরাট পাখী পাঠিয়ে দেন। পাখীটি সাপটিকে ধরে নিয়ে উড়ে যায়। কুরাইশরা এবার বুঝতে পারলো যে, তাদের ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার অনুরূপই হয়েছে। কারণ, কাঠও তারা পেয়ে গেছে, মিস্ত্রীও তাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে এবং সাপকেও আল্লাহ তাআলা সরিয়ে দিয়েছেন। এবার তারা কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে নতুনভাবে নির্মাণ করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে।কা'বা শরীফ নির্মাণ ও অদৃশ্য ইঙ্গিতসর্বপ্রথম ইবনে অহাব নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কাবা শরীফের একটি পাথর নামিয়ে নেয়, কিন্তু পাথরখানা তার হাত হতে উড়ে গিয়ে পুনরায় স্বস্থানে বসে যায়। সে সমস্ত কুরাইশকে সম্বোধন করে বলেঃ ‘শুনে রেখো! আল্লাহর ঘর নির্মাণ কার্যে সবাই যেন নিজ নিজ উত্তম ও পবিত্র মালই খরচ করে। এতে ব্যভিচার দ্বারা উপার্জিত সম্পদ সূদের টাকা এবং অত্যাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লাগানো চলবে না। কেউ কেউ বলেন যে, এ পরামর্শ দিয়েছিল ওলীদ বিন মুগীরা নামক ব্যক্তি। এখন বায়তুল্লাহ নির্মাণের অংশ গোত্র সমূহের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, দরজার অংশ নির্মাণ করবে বানু আবদ-ই-মানাফ ও জুহরা গোত্র, হাজরে আসওয়াদ' ও রুকনে ইয়ামানীর অংশ নির্মাণ করবে বানু মাখযুম গোত্র এবং কুরাইশের অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের সঙ্গে কাজ করবে, কা'বা শরীফের পিছনের অংশ নির্মাণ করবে বানু হামীহ্ ও সাহাম' গোত্র এবং হাতীমের পার্শ্ববর্তী অংশ নির্মাণ করবে আবদুদ্দার বিন কুসাই, বানু আসাদ বিন আবদুল উযযা ও বানু আদী বিন কা'ব। এটা নির্ধারণ করার পর পূর্ব নির্মিত ইমারত ভাঙ্গার জন্যে তারা অগ্রসর হয়। কিন্তু প্রথমে ভাঙ্গতে কেউই সাহস করে না। অবশেষে ওলীদ বিন মুগীরা বলেঃ আমিই আরম্ভ করছি।' এ বলে সে কোদাল নিয়ে উপরে উঠে যায় এবং বলে ‘হে আল্লাহ! আপনি খুবই ভাল জানেন যে, আমাদের ইচ্ছা খারাপ নয়, আমরা অপনার ঘর ধ্বংস করতে চাইনে বরং ওটাকে উন্নত করার চিন্তাতেই আছি।' একথা বলে সে দুটি স্তম্ভের দু'ধারের কিছু অংশ ভেঙ্গে দেয়। অতঃপর কুরাইশরা বলেঃ ‘এখন ছেড়ে দাও। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি এ ব্যক্তির উপর কোন শাস্তি নেমে আসে তবে তো এ পাথর ঐ স্থানেই রেখে দেয়া হবে এবং আমাদেরকে একাজ হতে বিরত থাকতে হবে। আর যদি কোন শাস্তি না আসে তবে বুঝে নিতে হবে যে, এটা ভেঙ্গে দেয়া আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ নয়। সুতরাং আগামীকাল আমরা সবাই মিলে এ কাজে লেগে যাবো।' অতঃপর সকাল হয় এবং সবদিক দিয়েই মঙ্গল পরিলক্ষিত হয়। তখন সবাই এসে বায়তুল্লাহ শরীফের পূর্ব ইমারত ভেঙ্গে দেয়। অবশেষে তারা পূর্ব ভিত্তি অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এখানে সবুজ বর্ণের পাথর ছিল এবং যেন একটির সঙ্গে অপরটির সংযোগ ছিল। একটি লোক দুটি পাথরকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ওতে এতো জোরে কোদাল মারে যে, ওটা আন্দোলিত হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত মক্কা ভূমি আন্দোলিত হয়ে উঠে। তখন জনগণ বুঝতে পারে যে, পাথরগুলোকে পৃথক করে ওর স্থানে অন্য পাথর লাগানো আল্লাহ তা'আলার নিকট গৃহীত নয়। কাজেই ওটা তাদের শক্তির বাইরের কাজ। সুতরাং তারা ঐ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ঐ পাথরগুলোকে ঐভাবেই রেখে দেয়। এর পর প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ অংশ অনুযায়ী পাথর সংগ্রহ করে এবং প্রাসাদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়।অবশেষে তারা হাজরে আসওয়াদ' রাখার স্থান পর্যন্ত পৌছে যায়। এখন প্রত্যেক গোত্রই এই মর্যাদায় অংশ নিতে চায়। সুতরাং তারা পরস্পরে ঝগড়া:বিবাদ করতে থাকে, এমনকি নিয়মিতভাবে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। বানু আব্দুদ্দার' এবং বানু আদী’ রক্তপূর্ণ একটি পাত্রে হাত ডুবিয়ে শপথ করে বলেঃ আমরা সবাই কেটে গিয়ে মারা পড়বো এটাও ভাল তথাপি হাজরে আসওয়াদ' কাউকেও রাখতে দেব না।' এভাবেই চার পাঁচ দিন কেটে যায়। অতঃপর কুরাইশরা পরস্পর পরামর্শের জন্যে মসজিদে একত্রিত হয়। আবু উমাইয়া বিন মুগীরা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়ষ্ক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। সে সকলকে সম্বোধন করে বলে, হে জনমণ্ডলী! তোমরা কোন একজনকে সালিশ নির্বাচিত কর এবং সে যা ফয়সালা করে তাই মেনে নাও। সালিশ নির্বাচনের ব্যাপারেও মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, সুতরাং তোমরা এ কাজ কর যে, এখানে সর্বপ্রথম যে সমজিদে প্রবেশ করবে সেই আমাদের সালিশ নির্বাচিত হবে। এ প্রস্তাব সবাই সমর্থন করে। সর্বপ্রথম কে প্রবেশ করে এটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষমান থাকে।‘হাজরে আসওয়াদ' ও আরবের আমীনের (সঃ) মধ্যস্থতাসর্বপ্রথম যিনি আগমন করেন তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাকে দেখা মাত্রই এসব লোক খুশী হয়ে যায় এবং বলেঃ “তার মধ্যস্থতা আমরা মেনে নিতে রাজী আছি। ইনি তো আমীন! ইনি তো মুহাম্মদ (সঃ)! অতঃপর তারা সবাই তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তিনি বলেনঃ আপনারা একটি বড় ও মোটা চাদর নিয়ে আসুন। তারা তা নিয়ে আসে। তিনি ‘হাজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে এনে স্বহস্তে ঐ চাদরে রেখে দেন এবং বলেনঃ ‘প্রত্যেক গোত্রের নেতা এসে এই চাদরের কোণ ধরে নিন এবং এভাবেই আপনারা সবাই হাজরে আসওয়াদ উঠাবার কাজে শরীক হয়ে যান।' একথা শুনে সমস্ত লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং সমস্ত গোত্রপ্রধান চাদরটি উত্তোলন করে। যখন ওটা রাখার স্থানে পৌছে তখন আল্লাহর নবী (সঃ) ওটা স্বহস্তে উঠিয়ে নিয়ে ওর স্থানে রেখে দেন। এভাবে সেই ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিমেষের মধ্যেই মিটে যায়। আর এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলের (সঃ) হাতে তাঁর ঘরে ঐ বরকতময় পাথরটি স্থাপন করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াহী আসার পূর্বে কুরাইশরা তাঁকে ‘আমীন’ বলতো। এখন উপরের অংশ নির্মিত হয়। এভাবে মহান আল্লাহর ঘরের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগে কা’বা আঠারো হাত লম্বা ছিল। ইয়েমেন দেশীয় ‘কবা’ পর্দা তার উপর চড়ান হতো। পরে ওর উপর চাদর চড়ান হতে থাকে। সর্বপ্রথম হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর রেশমী পর্দা উত্তোলন করেন। কাবা শরীফের এই ইমারতই থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের (রাঃ) খিলাফতের প্রাথমিক যুগে ষাট বছর পরে এখানে আগুনে লেগে যায়। এর ফলে কা'বা শরীফ পুড়ে যায়। এটা ছিল ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার রাজত্বের শেষ কাল এবং সে ইবনে যুবাইর (রাঃ) কে মক্কায় অবরোধ করে রেখেছিল। কাবা শরীফের ইমারত এবং তার বিভিন্ন যুগের আবর্তনএই সময়ে মক্কার খলীফা হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) স্বীয় খালা হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) নিকট যে হাদীসটি শুনেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনের কথা অনুযায়ী বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর তিনি ওটা নির্মাণ করেন। হাতীমকে ভিতরে ভরে নেন। পূর্ব ও পশ্চিমে দু'টি দরজা রাখেন। একটি ভিতরে আসার জন্য, অপরটি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। দরজা দু’টি মাটির সমান করে রাখেন। তাঁর শাসনামল পর্যন্ত কা'বা এরূপই থাকে। অবশেষে তিনি যালিম হাজ্জাজের হাতে শহীদ হন। তখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশক্রমে হাজ্জাজ কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে পুনরায় পূর্বের মত করে নির্মাণ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার যুগে যখন সিরিয়াবাসী মক্কা শরীফের উপর আক্রমণ করে এবং যা হবার তা হয়ে যায়, সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বায়তুল্লাহ শরীফকে এরূপ অবস্থাতেই রেখে দেন। হজ্বের মৌসুমে জনগণ একত্রিত হয়। তারা সব কিছু স্বচক্ষে দেখে। এরপুরে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করেনঃ কা'বা শরীফকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে কি নতুনভাবে নির্মাণ করবো, না কি ভাঙ্গা যা আছে তাকেই মেরামত করব? তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার মতে ভাঙ্গাকেই আপনি মেরামত করে দিন, বাকিগুলো পুরাতনই থাক।' তখন তিনি বলেনঃ ‘আচ্ছা বলুন তো, যদি আমাদের কারও বাড়ি পুড়ে যেতো তবে কি সে নতুন বাড়ি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতো? তাহলে মহাসম্মানিত প্রভুর ঘর সম্পর্কে এরূপ মত পেশ করেন কেন? আচ্ছা তিন দিন পর্যন্ত আমি ইস্তেখারা (লক্ষণ দেখে শুভ বিচার) করবে, তার পরে যা বুঝবো তাই করবো।' তিন দিন পরে তাঁর মত এই হলো যে, অবশিষ্ট দেয়ালও ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে। সুতরাং তিনি এই নির্দেশ দিয়ে দেন।কিন্তু কা'বা শরীফ ভাঙ্গতে কেউই সাহস করছিল না। তারা ভয় করছিল যে, যে ব্যক্তি ভাঙ্গার জন্যে চড়বে তার উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হবে। কিন্তু একজন সাহসী ব্যক্তি উপরে চড়ে গিয়ে একটি পাথর ভেঙ্গে দেয়। অন্যেরা যখন দেখে যে, তার কোন ক্ষতি হলো না তখন তারা সবাই ভাঙ্গতে আরম্ভ করে দেয়। এবং ভূমি পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে দেয়। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) চারদিকে স্তম্ভ দাঁড় করিয়ে দেন এবং ওর উপর পর্দা করে দেন। এবারে বায়তুল্লাহ নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) বলেন, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিটক হতে আমি শুনেছি তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“যদি লোকদের কুফরীর সময়টা নিকটে না হতো এবং আমার নিকট নির্মাণের খরচা থাকতো তবে আমি হাতীম' থেকে পাঁচ হাত পর্যন্ত বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নিতাম এবং কা'বার দুটি দরজা করতাম, একটা আসবার দরজা এবং অপরটি বের হওয়ার দরজা।' হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “এখন আর জনগণের কুফরীর যুগ নিকটে নেই, তাদের ব্যাপারে ভয় দূর হয়ে গেছে এবং কোষাগারও পূর্ণ রয়েছে, আমার নিকট যথেষ্ট অর্থ রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনোবাসনা পূর্ণ না করার আমার আর কোন কারণ থাকতে পারে না। সুতরাং তিনি পাঁচ হাত ‘হাতীম' ভিতরে নিয়ে নেন। তখন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তি প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণ তা স্বচক্ষে দেখে নেয়। এরই উপর দেয়াল গাথা হয়। বায়তুল্লাহ শরীফের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো হাত। এখন আরও পাঁচ হাত বৃদ্ধি পায়, ফলে ছোট হয়ে যায়, এজন্যে দৈর্ঘ্যের আর দশ হাত বেড়ে যায়। দু'টি দরজা নির্মিত হয়। একটি ভিতরে আসবার এবং অপরটি বাইরে যাবার। হযরত ইবনে যুবাইরের (রাঃ) শাহাদাতের পর হাজ্জাজ আবদুল মালিকের নিকট পত্র লিখেন এবং তার পরামর্শ চান যে, এখন কি করা যায়? এটাও লিখে পাঠান যে, ঠিক হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর যে কাবা শরীফ নির্মিত হয়েছে এটা মক্কা শরীফের সুবিচারকগণ স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু আবদুল মালিক উত্তর দেনঃ দৈর্ঘ্য ঠিক রাখ কিন্তু হাতীমকে বাইরে করে দাও এবং দ্বিতীয় দরজাটি বন্ধ করে দাও।' হাজ্জাজ আবদুল মালিকের এই নির্দেশক্রমে কাবাকে তেঙ্গে দিয়ে পূর্বের ভিত্তির উপরে নির্মাণ করেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর ভিত্তিকে ঠিক রাখাই সুন্নাতের পন্থা ছিল। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাসনা তো এই ছিল। কিন্তু সেই সময় তার এই ভয় ছিল যে, মানুষ হয়তো খারাপ ধারণা করে বসবে। কারণ তারা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আবদুল মালিক বিন মারওয়ান এ হাদীসটি জানতেন না। এজন্যেই তিনি ওটা ভাঙ্গিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি হাদীসটি জানতে পারেন তখন তিনি দুঃখ করে বলেনঃ ‘হায়! যদি আমি ওটাকে ভেঙ্গে পূর্বাবস্থাতেই রাখতাম।'সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হারিস বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) যখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের খিলাফত কালে তাঁর নিকট প্রতিনিধি রূপে গমন করেন তখন আবদুল মালিক তাকে বলেন, আমি ধারণা করি যে, আবু হাবীব অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি (তার খালা) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেননি। তখন হযরত হারিস বিন উবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ ‘অবশ্যই তিনি শুনেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে স্বয়ং আমিও শুনেছি।' আবদুল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কি শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ “আমি শুনেছি-তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আয়েশা! তোমার কওম’ বায়তুল্লাহকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। যদি তোমার সম্প্রদায়ের শিরকের যুগ নিকটে না হতো তবে নতুনভাবে আমি এর কমতি পূরণ করতাম। এসো, আমি তোমাকে এর প্রকৃত ভিত্তি দেখিয়ে দেই, হয়তো তোমার গোত্র আবার একে এর প্রকৃত ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে পারে। অতঃপর তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কে প্রায় সাত হাত দেখিয়ে দেন এবং বলেনঃ “আমি এর দু’টি দরজা নির্মাণ করতাম, একটি আগমনের ও অপরটি প্রস্থানের; এবং দরজা দু'টি মাটির সমান করে রাখতাম। একটি রাখতাম পূর্বমুখী এবং অপরটি রাখতাম পশ্চিমমুখী। তুমি কি জান যে, তোমার কওম' দরজাকে এত উঁচু করে রেখেছে কেন? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, শুধুমাত্র নিজেদের মর্যাদা প্রকাশের জন্যে। যাকে চাইবে প্রবেশ করতে দেবে এবং যাকে চাইবে না প্রবেশ করতে দেবে না। যখন লোক ভিতরে যেতে চাইতো তখন তারা তাকে উপর হতে ধাক্কা দিতো ফলে সে পড়ে যেতো। আর যাকে তারা প্রবেশ করাবার ইচ্ছে করতো তাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতো।' আবদুল মালিক তখন বলেনঃ “হে হারিস! আপনি কি স্বয়ং এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ’ আমি স্বয়ং শুনেছি। তখন আবদুল মালিক কিছুক্ষণ ধরে লাঠির উপর ভর দিয়ে চিন্তা করেন। অতঃপর বলেনঃ যদি আমি একে ঐ রকমই রেখে দিতাম! সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে আছে যে, আবদুল মালিক বিন মারওয়ান একবার বায়তুল্লাহ তওয়াফ করার সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) কে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, তিনি এ হাদীসটির ব্যাপারে হযরত আয়েশার (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন।' তখন হযরত হারিস (রাঃ) তাকে বাধা দেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, তিনি সত্যবাদীই ছিলেন। আমিও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই হাদীসটি শুনেছি। তখন আবদুল মালিক আফসোস করে বলেনঃ “আমি পূর্ব হতে অবগত থাকলে কখনও ভাঙ্গতাম না।' কাযী আইয়া এবং ইমাম নববী (রঃ) লিখেছেন যে, খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে (রঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আমি কা'বা শরীফকে পুনরায় ইবনে যুবাইর (রাঃ) কর্তৃক নির্মিত আকারে নির্মাণ করে দেই এর কি আপনি অনুমতি দিচ্ছেন?' ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, আপনি এরূপ করবেন না। কারণ এর ফলে হয়তো পবিত্র কাবা বাদশাহদের খেলনায় পরিণত হবে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত ওটাকে ভাঙ্গতে থাকবে।' খলীফা হারুনুর রশীদ তখন তার এই সংকল্প হতে বিরত থাকেন। এটাই সঠিকও মনে হচ্ছে যে, কা'বা শরীফকে বার বার ভেঙ্গে দেয়া উচিত নয়। কাবা শরীফের ধ্বংসলীলাসহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কা'বাকে দু'টি ছোট পা (পায়ের গোছা) বিশিষ্ট একজন হাবশী ধ্বংস করবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি, সেই কৃষ্ণবর্ণের (হাবশী) এক একটি পাথরকে পৃথক পৃথক করে দেবে, ওর আবরণ নিয়ে যাবে এবং এর অর্থ সম্পদও ছিনিয়ে নেবে। সে বাঁকা হাত-পা বিশিষ্ট ও টেকো মাথাওয়ালা হবে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, সে কোদাল মেরে মেরে টুকরো টুকরো করতে রয়েছে। খুব সম্ভব এই দুঃখজনক ঘটনা ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরে ঘটবে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরও তোমরা বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্ব ও উমরাহ করবে।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাদের প্রার্থনায় বলেছেনঃ “আমাদেরকে মুসলমান করে নিন। অর্থাৎ আমাদেরকে অকৃত্রিম, অনুগত, একত্ববাদী করে নিন এবং আমাদেরকে অংশীবাদী ও রিয়াকারী হতে রক্ষা করুন এবং আমাদিগকে নম্র ও বিনয়ী করুন।' হযরত সালাম বিন মুতী (রঃ) বলেন যে, তারা মুসলমান তো ছিলেনই, কিন্তু এখন ইসলামের উপর দৃঢ় ও অটল থাকার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। এর উত্তরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন (আরবি) অর্থাৎ আমি তোমাদের এই প্রার্থনা কবুল করলাম। আবার তাঁরা তাঁদের সন্তানাদির জন্যে এ দু’আই করছেন এবং তা ককূলও হচ্ছে। বানী ইসরাঈল ও আরব উভয়েই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি দল হক ও ইনসাফের উপর ছিল।' (৭:১৫৯) কিন্তু রচনা রীতি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ প্রার্থনা আরবের জন্যই, যদিও সাধাণভাবে অন্যেরাও জড়িত রয়েছে। কেননা, এই প্রার্থনার পরে অন্য প্রার্থনায় রয়েছে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন এই রাসূল দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে বুঝান হয়েছে। এ প্রার্থনাও গৃহীত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তিনিই এমন যিনি নিরক্ষরদের মধ্য তাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।' (৬২:২) কিন্তু এর দ্বারা তাঁর রিসালাত কারও জন্য বিশিষ্ট হচ্ছে না বরং তাঁর রিসালাত সাধারণ। আরব অনারব সবার জন্যেই তিনি রাসূল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল, হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।' (৭:১৫৮) এ দুজন নবীর প্রার্থনার মত প্রত্যেক খোদা ভীরু লোকেরই প্রার্থনা হওয়া উচিত। যেমন পবিত্র কোরআন মুসলমানকে দু'আ শিখিয়ে দিচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রীগণ এবং আমাদের সন্তানবর্গ হতে চক্ষের শীতলতা (শান্তি) দান করুন এবং আমাদেরকে খোদা ভীরু লোকদের ইমাম বানিয়ে দিন।' (২৫:৭৪) এটাও আল্লাহ তা'আলার প্রেমের দলীল যে, মানুষ কামনা করবে তার মৃত্যুর পরে তার ছেলেরাও যেন আল্লাহ তা'আলার উপাসনায় রত থাকে। অন্য জায়গায় প্রার্থনার শব্দ রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা হতে রক্ষা করুন। (১৪:৩৫) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'মানুষ মরে যাওয়া মাত্র তার কার্যাবলী শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। (১) সাদকাহ, (২) ইলম, যদ্বারা উপকার লাভ করা হয়, (৩) সৎ সন্তান, যারা প্রার্থনা করে (সহীহ মুসলিম)। তার পরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে হজুরে আহকাম শিখিয়ে দিন। কাবা শরীফের ইমারত পূর্ণ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে নিয়ে ‘সাফা' পর্বতে আসেন, অতঃপর মারওয়া পর্বতে যান এবং বলেন যে এগুলোই হচ্ছে আল্লাহর স্মৃতি নিদর্শন। অতঃপর তাঁকে মিনার দিকে নিয়ে যান। উকবাহ’র উপরে একটি গাছের পার্শ্বে শয়তানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বলেনঃ “তাকবীর' পাঠ করতঃ তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করুন। ইবলিস এখান হতে পালিয়ে গিয়ে জামরা-ই-উকবার পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ায়। এখানেও তিনি তাকে পাথর মারেন। এই কলুষ শয়তান নিরাশ হয়ে চলে যায়। হজ্বের আহকামের মধ্যে সে কিছু গোলমাল সৃষ্টি করতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগ পেলো না এবং সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল। এখান হতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে মাশআরে হারাম’ নিয়ে যান। অতঃপর আরাফাতে পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন, বুঝেছেন' তিনি বলেনঃ ‘হ্যাঁ'। অন্য বর্ণনায় শয়তানকে তিন জায়গায় পাথর মারার কথা বর্ণিত আছে। প্রত্যেক হাজী শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারেন।

আল-বাকারা 2:127

ওটা প্রথম আল্লাহর ঘরঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বার বার আগমন করা। হজ্বব্রত পালন করে বাড়ী ফিরে গেলেও অন্তর তার সাথে লেগেই থাকে। প্রত্যেক জায়গা হতে লোক দলে দলে এ ঘরের দিকে এসে থাকে। এটাই একত্রিত হবার স্থান, অর্থাৎ সবারই মিলন কেন্দ্র। এটা নিরাপদ জায়গা। এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো হয় না। অজ্ঞতার যুগেও এর আশে পাশে লুটতরাজ হতো বটে; কিন্তু এখানে নিরাপত্তা বিরাজ করতো। কাউকে কেউ গালিও দিত না। এ স্থান সদা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ থেকেছে। সৎ আত্মাগুলো সদা এর দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকে। প্রতি বছর পরিদর্শন করলেও এর প্রতি লোকের আগ্রহ থেকেই যায়। এটা হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর প্রার্থনারই ফল। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি জনগণের অন্তর ওদিকে ঝুঁকিয়ে দিন।' (১৪:৩৭) এখানে কেউ তার ভ্রাতার হন্তাকে দেখলেও নীরব থাকে। সুরা-ই-মায়েদার মধ্যে রয়েছে যে, এটা মানুষের অবস্থান স্থল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি হজ্ব করা ছেড়ে দেয় তবে আকাশকে পৃথিবীর উপর নিক্ষেপ করা হবে। এ ঘরের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে বায়তুল্লাহ শরীফের স্থান ঠিক করে দিলাম, (এবং বলেছিলাম) আমার সাথে কাউকেও অংশীদার স্থাপন করবে।' (২২ ২৬) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি)অর্থাৎ-আল্লাহ তা'আলার প্রথম ঘর রয়েছে মক্কায়, যা বরকতময় ও সারা বিশ্বের হিদায়াত স্বরূপ। তাতে কতকগুলো প্রকাশ্য নিদর্শন রয়েছে যেমন, মাকামে ইবরাহীম (আঃ), যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' (৩:৯৬) মাকামে ইবরাহীম বলতে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ শরীফও বুঝায় বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিশিষ্ট স্থানও বুঝায়। আবার হজ্বের সমুদয় করণীয় কাজের স্থানকেও বুঝায়। যেমন-আরাফাত, মাশআরে হারাম, মিনা, পাথর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ ইত্যাদি। মাকামে ইবরাহীম প্রকৃতপক্ষে ঐ পাথরটি যা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মান কার্য সম্পাদনের জন্যে তাঁর পায়ের নীচে রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ভুল কথা। প্রকৃত পক্ষে এটা ঐ প্রস্তর যার উপরে দাড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত জাবির (রাঃ)-এর একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ) তওয়াফ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ‘এটাই কি আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাকাম?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হাঁ'। তিনি বলেনঃ তাহলে আমরা এটাকে কিবলাহ বানিয়ে নেই না কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের অল্প দিন পরেই এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাই কি মাকামে ইবরাহীম যাকে কিবলাহ্ বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হাঁ এটাই।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমি আমার প্রভুর আনুকূল্য স্বীকার করেছি, অথবা বলেন- তিনটি বিষয়ে আমার প্রভু আমার আনুকূল্য করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছিলেন তাই তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান করে নিতাম! তখন (আরবি) (২:১২৫) অবতীর্ণ হয়। আমি বললাম-হে আল্লাহর রাসূল! সৎ ও অসৎ সবাই আপনার নিকট এসে থাকে, সুতরাং যদি আপনি মু'মিনদের জননীগণকে নিবী (সঃ)-এর সহধর্মিনীগণকে] পর্দার নির্দেশ দিতেন! তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। যখন আমি অবগত হই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোনও কোনও স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তখন তাদের নিকট গিয়ে বলি- যদি আপনারা বিরত না হন (রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দুঃখ দেয়া হতে] তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। তখন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি মুহাম্মদ (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে তবে অতি সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' (৬৬:৫) এ হাদীসটির বহু ইসনাদ রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় বদরের বন্দীদের ব্যাপারেও হযরত উমারের (রাঃ) আনুকূল্যের কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন যে, বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ না নিয়ে বরং তাদেরকে হত্যা করা হোক। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাও তাই ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নামক মুনাফিক যখন মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায আদায় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন আমি বলি আপনি কি এই মুনাফিক কাফিরের জানাযার নামায আদায় করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ধমক দিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে মৃত্যু বরণ করেছে তুমি কখনও তার জন্যে নামায পড়বে না এবং তার সমাধি পার্শ্বে দাঁড়াবে না। (৯:৮৪)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফ সদর্প পদক্ষেপে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং চারবার স্বাভাবিক পদক্ষেপে প্রদক্ষিণ করেন। অতঃপর মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) পিছনে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন এবং (আরবি) পাঠ করেন।' হযরত জাবিরের (রাঃ) হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইব্রাহীমকে (আঃ) তাঁর ও বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যে করেছিলেন। এ হাদীসসমূহের দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) ভাবার্থ ঐ পাথরটি যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর এনে দিতেন এবং তিনি কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যেতেন। যেখানে প্রাচীর উঁচু করার প্রয়োজন হতো সেখানে পাথরটি সরিয়ে নিয়ে যেতেন।এভাবে কা'বার প্রাচীর গাঁথার কাজ সমাপ্ত করেন। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘটনায় আসবে। ঐ পাথরে হ্যরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়েছিল। আরবের অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তা দেখেছিল। আবু তালিব তার প্রশংসাসূচক কবিতায় বলেছিলেন ? (আরবি)অর্থাৎ ‘ঐ পাথরের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন নতুন হয়ে রয়েছে, পদদ্বয় জুতো শূন্য ছিল। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ “আমি মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) উপর হযরত খলীলুল্লাহর (আঃ) পায়ের অঙ্গুলির ও পায়ের পাতার চিহ্ন দেখেছিলাম। অতঃপর জনগণের স্পর্শের কারণে তা মুছে গেছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মাকামে ইবুরাহীমের (আঃ) দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে, তাকে স্পর্শ করার নির্দেশ নেই। এ উম্মতের লোকেরাও পূর্বের উম্মতের ন্যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই কতকগুলো কাজ নিজেদের উপর ফর করে নিয়েছে, যা পরিণামে তাদের ক্ষতির কারণ। হবে। মানুষের স্পর্শের কারণেই ঐ পাথরের পদ চিহ্ন হারিয়ে গেছে। এই মাকামে ইবরাহীম পূর্বে কাবার প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কাবার দরজার দিকে হাজরে আসওয়াদ’র পার্শ্বে দরজা দিয়ে যেতে ডান দিকে একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যমান ছিল যা আজও লোকের জানা আছে। খলীলুল্লাহ (আঃ) হয়তো বা ওটাকে এখানেই রেখেছিলেন কিংবা বাইতুল্লাহ বানানো অবস্থায় শেষ অংশ হয়তো এটাই নির্মাণ করে থাকবেন এবং পাথরটি এখানেই থেকে গেছে। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে ওটাকে পিছনে সরিয়ে দেন। এর প্রমাণ রূপে বহু বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর একবার বন্যার পানিতে এ পাথরটি এখান হতেও সরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা পুনরায় একে পূর্বস্থানে রেখে দেন। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এটাকে মূল স্থান হতে সরানো হয়েছে এবং এর পূর্বে কা'বার প্রাচীর হতে কত দূরে ছিল।” একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পাথরটি তার মূল স্থান হতে সরিয়ে ওখানে রেখেছিলেন যেখানে এখন রয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুরসাল। সঠিক কথা এই যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা পিছনে রেখেছিলেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছি।' পবিত্র রেখো’ অর্থাৎ কা'বা শরীফকে ময়লা, বিষ্ঠা এবং জঘন্য জিনিস হতে পবিত্র রেখো। (আরবি)-এর (আরবি) যদি (আরবি) দ্বারা হয় তবে অর্থ দাঁড়াবে ‘আমি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি এবং প্রথমেই বলে দিয়েছি যে, তোমরা উভয়ে ‘বায়তুল্লাহূকে প্রতিমা থেকে পবিত্র রাখবে, তথায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত হতে দেবে না, বাজে কাজ,অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যে কথা, শিরক , কুফর হাসি রহস্য ইত্যাদি হতে ওকে রক্ষা করবে।' শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে প্রদক্ষিণকারী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘বাহির হতে আগমনকারী’। এ হিসেবে (আরবি) শব্দের অর্থ হবে মক্কার অধিবাসী।' হযরত সাবিত (রঃ) বলেনঃ “আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর (রঃ) কে বলি যে, আমাদের কর্তব্য হবে বাদশাহুকে এ পরামর্শ দেয়া, তিনি যেন জনগণকে বায়তুল্লাহ শরীফে শয়ন করতে নিষেধ করে দেন। কেননা,এমতাবস্থায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে, এবং এরও সম্ভাবনা আছে যে, তারা পরস্পরে বাজে কথা বলতে আরম্ভ করে দেয়। তখন তিনি বলেনঃ এরূপ করো না। কেননা, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা ওরই অধিবাসী।' একটি হাদীসে রয়েছে যে,হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) ছেলে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) শুয়ে থাকতেন, এবং তিনি যুবকও কুমার ছিলেন (আরবি) দ্বারা নামাযীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটা পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখনও মূর্তি পূজা চালু ছিল। বায়তুল্লাহর নামায উত্তম কি তওয়াফ উত্তম এ বিষয়ে ধর্ম শাস্ত্রবিদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে বাইরের লোকদের জন্যে তওয়াফ উত্তম এবং জামহুরের মতে প্রত্যেকের জন্যে নামায উত্তম। তাফসীর এর ব্যাখ্যার জায়গা নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদেরকে জানিয়ে দেয়া এবং তাদের দাবী খণ্ডন করা যে, বায়তুল্লাহ' তো খাস করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। ওর মধ্যে অন্যদের পূজা করা এবং খাটি আল্লাহর পূজারীদেরকে ঐ ঘরে ইবাদত করা হতে বিরত রাখা সরাসরি অন্যায় ও আবচারপূণ কাজ। এজন্যেই কুরআন মাজীদে অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ অত্যাচারীদেরকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো। এভাবে মুশরিকদের দাবীকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করার সাথে সাথে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের দাবীও খণ্ডন করা হয়ে গেল। তারা যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুওয়াতের সমর্থক, তারা যখন জানে ও স্বীকার করে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ ঘর এসব পবিত্র হস্ত দ্বারাই নির্মিত হয়েছে, তারা যখন একথারও সমর্থক যে, এ ঘরটি শুধুমাত্র নামায, তওয়াফ, প্রার্থনা এবং আল্লাহর উপাসনার জন্যেই নির্মিত হয়েছে, হজ্ব, উমরাহ, ইতিকাফ ইত্যাদির জন্যে বিশিষ্ট করা হয়েছে, তখন এই নবীগণের অনুসরণ দাবী সত্ত্বেও কেন তারা হজ্ব ও উমরা করা হতে বিরত রয়েছে? বায়তুল্লাহ শরীফে তারা উপস্থিত হয় না কেন? বরং স্বয়ং হযরত মূসা (আঃ) তো এই ঘরের হজ্ব করেছেন, যেমন হাদীসে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মসজিদগুলো উঁচু করার অনুমতি দিয়েছেন। ওর মধ্যে তাঁর নামের যিক্র করা হবে, ওর মধ্যে সকাল-সন্ধায় তার সৎ বান্দাগণ তাঁর নামের তাসবিহু পাঠ করে থাকে। (২৪:৩৬) হাদীস শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মসজিদসমূহ যে কাজের জন্যে তা ঐ জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আরও বহু হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মসজিদসমূহ পবিত্র রাখার নির্দেশ রয়েছে। বায়তুল্লাহ শরীফের নির্মাণ ও এর সর্বপ্রথম নির্মাতাকেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন। আমি মদীনাকে হারাম করলাম। এর শিকার খাওয়া হবে না, এখানকার বৃক্ষ কর্তন করা হবে না, এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো নিষিদ্ধ। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে যে, জনগণ টাটকা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের খেজুরে, আমাদের শহরে এবং আমাদের ওজনে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) আপনার বান্দা, আপনার দোস্ত এবং আপনার রাসূল ছিলেন। আমিও আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল। তিনি আপনার নিকট মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আমিও আপনার নিকট মদীনার জন্যে প্রার্থনা জানাচ্ছি। যেমন তিনি মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বরং এরকমই আরও একটি। অতঃপর কোন ছোট ছেলেকে ডেকে ঐ খেজুর তাকে দিয়ে দিতেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘তোমাদের ছোট ছোট বালকদের মধ্যে একটি বালককে আমার খিদমতের জন্যে অনুসন্ধান কর। আবূ আলহা (রাঃ) আমাকেই নিয়ে যান। তখন আমি বিদেশে ও বাড়ীতে তাঁর খিদমতেই অবস্থান করতে থাকি। একদা তিনি বিদেশ হতে আসছিলেন। সম্মুখে উহুদ পর্বত দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেনঃ ‘এ পর্বত আমাকে ভালবাসে এবং আমিও এ পর্বতকে ভালবাসি'। মদীনা চোখের সামনে পড়লে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ! আমি এর দু'ধারের মধ্যবর্তী স্থানকে ‘হারাম’ রূপে নির্ধারণ করছি, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ রূপে নির্ধারণ করেছিলেন। হে আল্লাহ! এর মুদ্দ’, ‘সা’ এবং ওজনে বরকত দান করুন।হযরত আনাস (রাঃ) হতেই আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! মক্কায় আপনি যে বরকত দান করেছেন তার দ্বিগুণ বরকত মদীনায় দান করুন। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ বানিয়েছিলেন, আমিও মদীনাকে হারাম’ বানালাম। এখানে কাউকেও হত্যা করা হবে না এবং চারা (পশুর খাদ্য ) ছাড়া বৃক্ষাদির পাতাও ঝরানো হবে না। এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে যদ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মক্কার মত মদীনাও হারাম শরীফ। এখানে এসব হাদীস বর্ণনা করায় আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা শরীফের মর্যাদা ও এখানকার নিরাপত্তার বর্ণনা দেয়া। কেউ কেউতো বলেন যে, প্রথম হতেই এটা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আমল হতে এর মর্যাদা ও নিরাপত্তা সূচীত হয়। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ 'যখন হতে আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন তখন থেকেই এই শহরকে মর্যাদাপূর্ণরূপে বানিয়েছেন। এখন কিয়ামত পর্যন্ত এর মর্যাদা অক্ষুন্নই থাকবে। এখানে যুদ্ধ বিগ্রহ কারও জন্যে বৈধ নয়। আমার জন্যেও শুধুমাত্র আজকের দিনে ক্ষণেকের জন্যে বৈধ ছিল। এর অবৈধতা রয়েই গেল। জেনে রেখো এর কাটা কাটা হবে না। এর শিকার তাড়া করা হবে না। এখানে কারও পতিত হারানো জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে না, কিন্তু যে ওটা (মালিকের নিকট ) পৌছিয়ে দেবে তার জন্যে জায়েযু। এর ঘাস কেটে নেয়া হবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এ হাদীসটি খুত্বায় বর্ণনা করেছিলেন এবং হযরত আব্বাসের (রাঃ) প্রশ্নের কারণে তিনি ইযখার’ নামক ঘাস কাটার অনুমতি দিয়েছিলেন।হযরত আমর বিন সাঈদ (রাঃ) যখন মক্কার দিকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করছিলেন সেই সময়ে হযরত ইবনে শুরাইহ্ আদভী (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমীর! মক্কা বিজয়ের দিন অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে খুত্ব দেন তা আমি নিজ কানে শুনেছি, মনে রেখেছি এবং সেই সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে স্বচক্ষে দেখেছি- আল্লাহ তাআলার প্রশংসার পর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই মক্কাকে হারাম করেছেন, মানুষ করেনি। কোন মুমিনের জন্যে এখানে রক্ত প্রবাহিত করা এবং বৃক্ষাদি কেটে নেয়া বৈধ নয়। যদি কেউ আমার এই যুদ্ধকে প্রমাণরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে বলবে যে, আমার জন্যে শুধুমাত্র আজকের দিন এই মুহূর্তের জন্যেই যুদ্ধ বৈধ ছিল। অতঃপর পুনরায় এ শহরের মর্যাদা ফিরে এসেছে যেমন কাল ছিল। সাবধান! তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছ, তাদের নিকট অঅবশ্যই এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যারা আজ এ সাধারণ জনসমাবেশে নেই। কিন্তু আমার এ হাদীসটি শুনে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেনঃ ‘আমি তোমার চেয়ে এ হাদীসটি বেশী জানি। 'হারাম শরীফ অবাধ্য রক্ত পিপাসুকে এবং ধ্বংসকারীকে রক্ষা করে না।” (বুখারী ও মুসলিম)। কেউ যেন এ দুটো হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে না করেন। এ দুটোর মধ্যে সাদৃশ্য এভাবে হবে যে, মক্কা প্রথম দিন হতেই মর্যাদাপূর্ণ তো ছিলই, কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রচার করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো রাসূল তখন হতেই ছিলেন যখন হযরত আদম (আঃ) এর খামির প্রস্তুত হয়েছিল, বরং সেই সময় হতেই তার নাম শেষ নবী রূপে লিখিত ছিল। কিন্তু তথাপিও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নবুওয়াতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে হতেই একজন রাসূল তাদের মধ্যে প্রেরণ করুন। (২:১২৯) এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তকদীরে লিখিত ঐ কথা প্রকাশিত হয়। একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেন ? ‘আপনার নবুওয়াতের সূত্রের কথা কিছু আলোচনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি নূর বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিলো এবং তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকলো। মক্কা ও মদীনার মধ্যে বেশী উত্তম কোনটি?জামহুরের মতে মদীনার চেয়ে মক্কা বেশী উত্তম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের মাযহাব অনুসারে মক্কা অপেক্ষা মদীনা বেশী উত্তম। এ দু'দলেরই প্রমাণাদি সত্বরই ইনশাআল্লাহ আমরা বর্ণনা করবো। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছেনঃ “হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপদ শহর করে দিন।” অর্থাৎ এখানে অবস্থানকারীদেরকে ভীতি শূন্য রাখুন। আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ হয়ে গেলো। (৩:৯৭) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারাম’কে নিরাপত্তা দানকারী করেছি? ওর আশ পাশ হতে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানে তারা পূর্ণ নিরপত্তা লাভ করছে।' (২৯:৬৭) এ প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় বহু হাদীসও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা শরীফে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ মক্কায় অস্ত্র শস্ত্র উঠাননা কারও জন্যে বৈধ নয়। (সহীহ মুসলিম)' তাঁর এ প্রার্থনা কাবা শরীফ নির্মাণের পূর্বে ছিল, এ জন্যেই বলেছেন, হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপত্তা দানকারী শহর বানিয়ে দিন। সূরা-ই- ইব্রাহীমের মধ্যে এ প্রার্থনাই এভাবে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১২৬) সম্ভবতঃ এটা দ্বিতীয় বারের প্রার্থনা ছিল, যখন বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত হয়ে যায় ও শহর বসে যায় এবং হযরত ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর তিন বছরের ছোট ছিলেন। এজন্যেই এ প্রার্থনার শেষে তার জন্ম লাভের জন্যেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার কথা। কেউ কেউ এটাকেও প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।তখন ভাবার্থ হবে এইঃ কাফিরদেরকেও অল্প দিন শান্তিতে রাখুন, অতঃপর তাদেরকে শাস্তিতে জড়িত করে ফেলুন। আর একে আল্লাহ তা'আলার কালাম বললে ভাবার্থ হবে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানাদির জন্যে ইমামতির প্রার্থনা জানালেন এবং অত্যাচারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা শুনলেন। ও বুঝতে পারলেন যে, তার পরে আগমনকারীদের মধ্যে অনেকে অবাধ্যও হবে, তখন তিনি ভয়ে শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যেই আহার্যের প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ কাফিরদেরকেও দেবেন। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি তোমার প্রভুর দান এদেরকেও দেবো এবং ওদেরকেও দেবো, তোমার প্রভুর দান কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয়। (১৭:২০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় তারা মুক্তি পায় না, তারা দুনিয়ায় কিছুদিন লাভবান হলেও আমার নিকট যখন তারা ফিরে আসবে তখন আমি তাদেরকে কুফরীর প্রতিফল স্বরূপ কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।অন্যস্থানে বলেনঃ “কাফিরদের কুফরী যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, আমার নিকট তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর যে কাজ তারা করেছে তার সংবাদ আমি তাদেরকে দেবো, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পূর্ণ অবগত আছেন। আমি তাদেরকে সামান্য সুখ দেয়ার পর ভীষণ শাস্তির মধ্যে জড়িয়ে ফেলবো।” অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি এটা না হতো যে, (প্রায়) সমস্ত মানুষ একই পথাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাবে, তাহলে যারা দয়াময় (আল্লাহ)-এর সাথে কুফরী করে, আমি তাদের জন্য তাদের গৃহসমূহের ছাদ। রৌপ্যের করে দিতাম এবং সিঁড়িগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর দিয়ে তারা আরোহণ করে; এবং তাদের গৃহের দরজাগুলো ও আসনগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর তারা হেলান দিয়ে বসে আর (এসব) স্বর্ণের ও (করে দিতাম), এবং এগুলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাসের উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়, (শেষে সবই বিলীন হয়ে যাবে) এবং আখেরাত তোমার প্রভুর সমীপে মুত্তাকির জন্যে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন :অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির মধ্যে জড়িত করে ফেলবো এবং ওটা জঘন্য অবস্থান স্থল। অর্থাৎ তাদেরকে অস্থায়ী জগতে সুখে শান্তিতে রাখার পর ভীষণ শাস্তির দিকে টেনে আনবো। এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য অবস্থান স্থল।' এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দেখছেন এবং অবকাশ দিচ্ছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। যেমন তিনি বলেছেন। (আরবি) অর্থাৎ বহু অত্যাচারী গ্রামবাসীকে আমি অবকাশ দিয়েছি, অতঃপর পাকড়াও করেছি, শেষে তো তাদেরকে আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (২২:৪৮) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা বেশী ধৈর্য ধারণকারী আর কেউই নেই। তারা তার সন্তানাদি সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে আহার্যও দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাও দান করেছেন। অন্য সহীহ হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীকে ঢিল দেন, তৎপর হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন- (আরবি)অর্থাৎ তোমার প্রভুর পাকড়াও এরকমই যে, যখন তিনি কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন, তখন নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক। (১১:১০২) এই বাক্যকে হ্যরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করার পঠন খুবই বিরল এবং তা সপ্ত পাঠকের পঠনের বিপরীত। রচনা। রীতিরও এটা উল্টো। কেননা (আরবি) ক্রিয়া পদের (আরবি) টি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু এ বিরল পঠনে এর কর্তা ও উক্তিকারী হযরত ইবরাহীমই (আঃ), হচ্ছেন এবং এটা বাক্যরীতির সম্পূর্ণ উল্টো (আরবি) শব্দটি এর বহুবচন (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে থামের নিম্নতল এবং ভিত্তি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তির সংবাদ দিয়ে দাও।' একটি কিরআতে (আরবি)-এর পরে (আরবি) ও রয়েছে। ওরই প্রমাণ রূপে পরে (আরবি) শব্দটিও এসেছে।আন্তরিক প্রার্থনাহযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) শুভ কাজে লিপ্ত রয়েছেন এবং তা গৃহীত হয় কি না এ ভয়ও তাঁদের রয়েছে। এ জন্যেই তারা মহান আল্লাহর নিকট এটা কবুল করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। হযরত অহীব বিন অরদ (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে খুব ক্রন্দন করতেন এবং বলতেন :‘হায়! আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বন্ধু এবং গৃহীত নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কাজ তাঁর হুকুমেই করছেন, তাঁর ঘর তাঁরই হুকুমে নির্মাণ করছেন, তথাপি ভয় করছেন যে, না জানি আল্লাহর নিকট এটা না মঞ্জুর হয়। মহান আল্লাহ মু'মিনদের অবস্থা এরকমই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে এবং দান খয়রাত করে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে কম্পিত থাকে (এই ভয়ে যে, না-জানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় কি না!)' (২৩:৬০) যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, যা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, অতি সত্বরই তা নিজ স্থানে আসছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে, ভিত্তি উত্তোলন করতেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং প্রার্থনা করতেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, উভয়ই উভয় কাজে অংশীদার ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনা এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি হাদীসও এ ঘটনা সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রী লোকেরা কোমর বন্ধনী বাধার নিয়ম হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মাতার নিকট হতেই শিখেছে। তিনি ওটা বেঁধে ছিলেন যাতে তার পদচিহ্ন মিটিয়ে যায়, ফলে যেন হযরত শারিয়া (রাঃ) তার পদচিহ্ন দেখতে না পান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে এবং তার কলিজার টুকরা একটি মাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে নিয়ে বের হন। সেই সময় এই প্রাণপ্রিয় শিশু দুধ পান করতো। এখন যেখানে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত রয়েছে সে সময় তথায় একটি পাহাড় ছিল এবং বিজন মরুভূমি রূপে পড়েছিল। তখন তথায় কেউই বাস করতো না। এখানে মা ও শিশুকে বসিয়ে তাদের পার্শ্বে সামান্য খেজুর ও এক মশক পানি রেখে যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিট ফিরিয়ে চলে যেতে আরম্ভ করেন, তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বন্ধু! এরকম ভীতিপ্রদ বিজন মরুভূমির মধ্যে যেখানে আমাদের কোন বন্ধু ও সাথী নেই, আমাদেরকে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন উত্তর দেননি, এমনকি ঐ দিকে ফিরেও তাকাননি। হযরত হাজেরা (রাঃ) বারবার বলার পরেও যখন তিনি কোন ক্ষেপ না করেন তখন তিনি বলেন, হে আল্লাহর প্রিয়! আমাদেরকে আপনি কার নিকট সমর্পণ করে গেলেন?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট।' তিনি বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এটা কি আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, 'হা, আমার উপর আল্লাহ তাআলার এটাই নির্দেশ। একথা শুনে হযরত হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনা লাভ করেন এবং বলেন ? তাহলে আপনি যান। আল্লাহ আমাদেরকে কখনও ধ্বংস করবেন না। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করছি এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল।' হযরত হাজেরা (রাঃ) ফিরে আসেন এবং স্বীয় প্রাণের মণি, চক্ষের জ্যোতি, আল্লাহর নবীর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ক্রোড়ে ধারণ করে ঐ জনহীন প্রান্তরে, সেই আল্লাহর জগতে বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে বসে পড়েন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন সানিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন এবং অবগত হন যে, হযরত হাজেরা (রাঃ) পিছনে নেই এবং ওখান হতে এখন পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি কাজ করবে না, তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন :“হে আমার প্রভু! আমার সন্তানাদিকে আপনার পবিত্র ঘরের পার্শ্বে একটি অনাবাদী ভূমিতে ছেড়ে এসেছি। যেন তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করে, আপনি মানুষের অন্তর ওদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং ওদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো প্রার্থনা করে আল্লাহ তাআলার নিদের্শ পালন করতঃ স্বীয় সহধর্মিনী ও ছেলেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে চলে যান, আর এদিকে হযরত হাজেরা (রাঃ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে শিশুকে নিয়েই মনে তৃপ্তি লাভ করছিলেন। ঐ অল্প খেজুর ও সামান্য পানি শেষ হয়ে গেল। এখন কাছে না আছে এক গ্রাস আহার্য বা না আছে এক ঢাকে পানি। নিজেও ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর এবং শিশুও ভুক ও তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। এমন কি সেই নিস্পাপ নবী পুত্রের ফুলের ন্যায় চেহারা মলিন হতে থাকে। মা কখনও নিজের একাকিত্বের ও আশ্রয় হীনতার কথা চিন্তা করছিলেন, আবার কখনও নিজের একমাত্র অবুঝ শিশুর অবস্থা দুশ্চিন্তার সাথে লক্ষ্য করছিলেন এবং সহ্য করে চলছিলেন। এটা জানা ছিল যে, এরকম ভয়াবহ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানুষের গমনাগমন অসম্ভব। বহু মাইল পর্যন্ত আবাদী ভূমির চিহ্নমাত্র নেই। খাবার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিরও ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি উঠে চলে যান। নিকটবর্তী, সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন এবং প্রান্তরের এ নিক্ষেপ করেন যে, কোন লোককে যেতে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু দৃষ্টি নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি সেই পাহাড় হতে নেমে পড়েন এবং অঞ্চল উঁচু করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করেন। ওর উপর চড়েও চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় সেখান হতে অবতরণ করেন। এভাবেই মধ্যবর্তী সামান্য অংশ দৌড়িয়ে অবশিষ্ট অংশ তাড়াতাড়ি অতিক্রম করেন। আবার সাফা পাহাড়ের উপর চড়েন। এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, প্রত্যেক বার শিশুকে দেখেন যে, তার অবস্থা ক্রমে ক্রমেই মন্দের দিকে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাজীরা যে, ‘সাফা' ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়িয়ে থাকেন তার সূচনা এখান থেকেই হয়। সপ্তম বারে যখন হাজেরা (রাঃ) মারওয়ার উপর আসেন তখন একটা শব্দ তার কানে আসে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি এই শব্দের দিকে মনোযোগ দেন। আবার শব্দ তার কানে আসে এবং এবারে স্পষ্টভাবে শুনা যায়। সুতরাং তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান এবং এখন যেখানে যমযম কূপ রয়েছে তথায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দেখতে পান। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কে? তিনি উত্তর দেনঃ আমি হাজেরা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ছেলের মা। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আপনাকে এই নির্জন মরুপ্রান্তরে কার নিকট সপর্দ করেছেন?' তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট। তখন ফেরেশতা বলেনঃ “তা হলে তিনিই যথেষ্ট। হযরত হাজেরা (রাঃ) বলেন, “হে অদৃশ্য ব্যক্তি! শব্দ তো আমি শুনলাম। এটা আমার কোন কাজে আসবে তো?'যমযম্ কূপহযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটির উপর ঘর্ষণ করা মাত্রই তথায় মাটি হতে একটি ঝরণা বইতে থাকে। হযরত হাজেরা (রাঃ) তার হাত দ্বারা পানি উঠিয়ে তার মশক ভর্তি করে নেন। পানি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়বে এ চিন্তা করে ঝরণার চার দিকে মাটির বেষ্টনি দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের উপর সদয় হউন, যদি তিনি এভাবে পানি আটকিয়ে না রাখতেন তবে যম কূপের আকার বিশিষ্ট হতো না, বরং প্রবাহিত নদীর রূপ ধারণ করতো। তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) নিজেও পানি পান করেন এবং শিশুকেও পান করিয়ে দেন। অতঃপর শিশুকে দুধ পান করাতে থাকেন। ফেরেশতা তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ধ্বংস করবেন মহান আল্লাহ এখানে এ ছেলে ও তার পিতার দ্বারা তাঁর একটা ঘর নির্মাণ করাবেন।' হযরত হাজেরা (রাঃ) এখানেই বাস করতে থাকেন, যম্ম্ কূপের পানি পান করেন আর শিশুর মাধ্যমে মনোরঞ্জন লাভ করেন। বর্ষাকালে বন্যার পানিতে চার দিকে প্লাবিত হয়ে যেতো। কিন্তু এই জায়গাটি উচু ছিল বলে পানি এ দিক ওদিক দিয়ে বয়ে যেতো এবং এ স্থানটি নিরাপদ থাকতো। জনহীন উপত্যকায় ‘জারহাম' গোত্রের আগমনকিছুদিন পর ঘটনাক্রমে ‘জারহাম’ গোত্রের লোক ‘কিদার’ পথে যাচ্ছিল। তারা মক্কা শরীফের নিম্নাংশে অবতরণ করে। একটি পানির পক্ষীর প্রতি তাদের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হওয়ায় তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ এটা পানির পাখি এবং এখানে পানি ছিল না আমরা কয়েকবার এখান দিয়ে যাতায়াত করেছি। এটাতো শুষ্ক জঙ্গল ও জনহীন প্রান্তর। এখানে পানি কোথায়? তারা প্রকৃত ঘটনা জানবার জন্যে লোকে পাঠিয়ে দেয়। তারা ফিরে এসে সংবাদ দেয় যে, তথায় বহু পানি রয়েছে। তখন তারা সবাই চলে আসে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট আরয করেঃ আপনি অনুমতি দিলে আমরাও এখানে অবস্থান করি। এটা পানির জায়গা।' তিনি বলেনঃ ‘হা, ঠিক আছে। আপনারা সাগ্রহে অবস্থান করুন। কিন্তু পানির উপর অধিকার আমারই থাকবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গী সাথী জুটে যাক, হযরত হাজেরা (রাঃ) তো তাই চাচ্ছিলেন। সুতরাং এই যাত্রী দল এখানেই বাস করতে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হন। ঐ সব লোকের সাথে তাঁর খুবই ভালুবাসা হয়। অবশেষে তিনি যৌবন প্রাপ্ত হন এবং তাদের মধ্যে তার বিয়েও অনুষ্ঠিত হয়। তাদের কাছে তিনি আরবী ভাষা শিখে নেন। হযরত হাজেরা (আঃ) এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রিয় পুত্রের সাথে প্রথম সাক্ষাৎমহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তথায় আগমন করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁর এ যাতায়াত বুরাকের (স্বর্গীয় বাহন) মাধ্যমে হতো। সিরিয়া হতে তিনি আসতেন এবং আবার ফিরে যেতেন। এখানে এসে তিনি দেখেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়িতে নেই। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সে কোথায় রয়েছে? উত্তর আসেঃ তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের অবস্থা কি?' সে বলেঃ ‘অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।' তিনি বলেনঃ * তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে,সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।' হযরত যাবীহুল্লাহ (আ) ফিরে এসে যেন তিনি কোন মানব আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি? স্ত্রী বলে, “হাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন। তার পরে জিজ্ঞেস করেন, দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে' আমি বলি যে, “আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন অবস্থায় দিন যাপন করছি।” হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলেনঃ ‘আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি? স্ত্রী বলেঃ হাঁ, বলেছেন যে, যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা। তিনি যা বলে গেছেন তার ভাবার্থ এই যে, (যেহেতু তুমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে) আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। যাও, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। তাকে তালাক দিয়ে তিনি ঐ গোত্রেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন।দ্বিতীয় বার সাক্ষাতের চেষ্টাকিছুদিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে পুনরায় এখানে আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল যাবিহুল্লাহর (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন। পুত্রবধূ বলেঃ আপনি বসুন যা কিছু হাজির রয়েছে তাই আহার করুন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ বলতো তোমাদের দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কিরূপ? উত্তর আসেঃ “আলহামদু লিল্লাহ! আমরা ভালই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ 'তোমাদের আহার্য কি? উত্তর আসেঃ ‘গোশত।' জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা পান কর কি?” উত্তর হয়ঃ ‘পানি।' তিনি প্রার্থনা করেন, হে প্রভু! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি শস্য তাদের নিকট থাকতো এবং তারা এটা বলতো তবে হযরত ইবরাহীম খালীল (আঃ) তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিন যাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে, সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে। এর পরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেনঃ উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি (তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারিণী)। আবার কিছু দিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করে এখানে আসেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যমযম কূপের পাশ্বে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে দেখা মাত্রই আদবের সাথে দাড়িয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।কাবা শরীফের নতুন নির্মাণপিতা-পুত্রের মিলন হলে ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।' তিনি বলেনঃ “যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।' তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।' তিনি আরয করেনঃ “আমি হাযির আছি আব্বা!” তিনি বলেনঃ “এ স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।' তিনি বলেনঃ “খুব ভাল কথা, আব্বা!, এখন পিতা ও পুত্র মিলে বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং উঁচু করতে আরম্ভ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পাথর এনে দিতেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তা দিয়ে দেয়াল গাঁথতে থাকতেন। দেয়াল কিছুটা উঁচু হলে হযরত যাবিহুল্লাহ (আঃ) এই পাথরটি অর্থাৎ মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি নিয়ে আসেন। ঐ উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা শরীফের পাথর রাখতেন এবং পিতা-পুত্র উভয়ে এই দু'আ করতেনঃ ‘প্রভু হে! আপনি আমাদের এই নগণ্য খিদমত ককূল করুন, আপনি শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।' এই বর্ণনাটি অন্যান্য হাদীসের কিতাবেও রয়েছে। কোথাও বা সংক্ষিপ্তভাবে এবং কোথাও বা বিস্তারিতভাবে। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে এটাও রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী হন তখন তিনি তাঁর মাথার উপরে মেঘের মত একটি জিনিস লক্ষ্য করেন। ওর মধ্য হতে শব্দ আসছিলঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! যত দূর পর্যন্ত এই মেঘের ছায়া রয়েছে তত দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি তুমি বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নাও। কম বেশী যেন না হয়। ঐ বর্ণনায় এও আছে যে,বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ছেড়ে চলে আসেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটিই সঠিক। আর এভাবেই সামঞ্জস্য হতে পারে যে, পূর্বে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু নির্মাণ করেছিলেন পরে, এবং নির্মাণ কার্যে পিতা-পুত্র উভয়েই অংশ নিয়েছিলেন। যেমন কুরআনের শব্দগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে। হযরত আলী (রাঃ) বায়তুল্লাহ নির্মাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন যে, ঐ ঘর কোথায় নির্মাণ করতে হবে এবং কত বড় করতে হবে ইত্যাদি। তখন ‘সাকীনা অবতীর্ণ হয় এবং তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, যেখানেই ওটা থেমে যাবে সেখানেই ঘর নির্মাণ করতে হবে। এবার ঘরের নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। হাজরে আসওয়াদের নিকট পৌছলে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে বলেনঃ বৎস! কোন ভাল পাথর খুঁজে নিয়ে এসো।' তিনি ভাল পাথর খুঁজে আনেন। এসে দেখেন যে,তার আব্বা অন্য পাথর তথায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আব্বা! এটা কে এনেছে?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ পাথর খানা আকাশ হতে নিয়ে এসেছেন। হযরত কা'বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, এখন যেখানে বায়তুল্লাহ রয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তথায় পানির উপর বুন্ধুদের সাথে ফেনা হয়েছিল, এখান হতেই পৃথিবী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, কাবা ঘর নির্মাণের জন্য হযরত ইবরাহীম (আঃ) আরমেনিয়া হতে এসেছিলেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) হাজরে আসওয়াদ' ভারত হতে এনেছিলেন। সেই সময় ওটা সাদা চকচকে ‘ইয়াকুত' (মণি) ছিল। হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে জান্নাত হতে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মানুষের পাপপূর্ণ হস্ত স্পর্শের ফলে ওটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এক বর্ণনায় এটাও রয়েছে। যে, এর ভিত্তি পূর্ব হতেই বিদ্যমান ছিল। ওর উপরেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। মুসনাদে আবদুর রাযযাকের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেছিলেন। সেই সময় তার দেহ দীর্ঘ ছিল। পৃথিবীতে আগমনের পর ফেরেশতাদের তসবীহ, নামায দু’আ ইত্যাদি শুনতে পেতেন। যখন দেহ খাটো হয়ে যায় এবং ঐ সব ভাল শব্দ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তাঁকে মক্কার দিকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি মক্কার দিকে যেতে থাকেন। যেখানে যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়ে সেখানে সেখানে জনবসতি স্থাপিত হয়। এখানে আল্লাহ তা'আলা বেহেশত হতে একটি ইয়াকুত অবতীর্ণ করেন এবং বায়তুল্লাহর স্থানে রেখে দেন, আর ঐ স্থানকেই স্বীয় ঘরের জায়গা হিসাবে নির্ধারণ করেন। হযরত আদম (আঃ) এখানে তওয়াফ করতে থাকেন এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। হযরত নূহ (আঃ)-এর প্লাবনের যুগে এটা উঠে যায় এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যুগে পুনরায় নির্মাণ করিয়ে নেন। হযরত আদম (আঃ) এ ঘরটিকে হেরা, তুর, যীতা, ভূরে সাইনা এবং জুদী এই পাঁচটি পাহাড় দ্বারা নির্মাণ করেন। কিন্তু এই সমুদয় বর্ণনার মধ্যেই স্পষ্টভাবে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে,পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে বায়তুল্লাহর নির্মাণ করা হয়েছিল। বায়তুল্লাহর চিহ্ন ঠিক করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে গিয়েছিলেন। সেই সময় এখানে বন্য বৃক্ষাদি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহু দূরে আমালিক সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এখানে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তার মাকে একটি কুঁড়ে ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বায়তুল্লাহর চারটি স্তম্ভ আছে এবং সপ্তম জমি পর্যন্ত তা নীচে গিয়েছে। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যুলকারনাইন যখন এখানে পৌঁছেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করতে দেখেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি এটা কি করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে আমি তার ঘর নির্মাণ করছি।' যুলকারনাইন। জিজ্ঞেস করেন :এর প্রমাণ কি আছে?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এই নেকড়ে বাঘগুলো সাক্ষ্য দিবে।' পাঁচটি নেকড়ে বাঘ বলেঃ আমার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এরা দুজন নির্দেশ প্রাপ্ত। যুলকারনাইন এতে খুশী হন এবং বলেনঃ “আমি মেনে নিলাম।' ‘আরযাকীর তারীখ-ই মক্কানামক পুস্তকে রয়েছে যে, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সঙ্গে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভিত্তি। এটা (আরবি)শব্দের বহুবচন। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় (আরবি) (২৪:৬০)ও এসেছে। এরও এক বচন হচ্ছে (আরবি) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ তুমি কি দেখছো না যে, তোমার গোত্র যখন বায়তুল্লাহ নির্মাণ করে, তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি হতে ছোট করে দেয়। আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি ওটা বাড়িয়ে দিয়ে মূল ভিত্তির উপর করে দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘তোমার কওম যদি নতুন ইসলাম গ্রহণকারী না হতো এবং তাদের কুফরীর যুগ যদি নিকটে না থাকতো তবে আমি তাই করতাম।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) এ হাদীসটি জানার পর বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কারণেই ‘হাজরে আসওয়াদের পার্শ্ববর্তী দুটি স্তম্ভকে স্পর্শ করতেন না। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা! যদি তোমার কওমের অজ্ঞতার যুগ নিকটে না হতো তবে আমি অবশ্যই কাবার ধনাগারকে আল্লাহর পথে দান করে দিতাম এবং দরজারকে ভূমির সাথে লাগিয়ে দিতাম এবং ‘হাতীম'কে বায়তুল্লাহর মধ্যে ভরে দিতাম।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এর দ্বিতীয় দরজাও করতাম, একটি আসবার জন্যে এবং অপরটি যাবার জন্যে। ইবনে যুবাইর (রাঃ) তাঁর খিলাফতের যুগে এরকমই করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'আমি একে ভেঙ্গে দিতাম এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি একটি পূর্বমুখী করতাম এবং একটি পশ্চিমমুখী করতাম এবং ৬ হাত হাতীম’কে এর মধ্যে ভরে দিতাম যাকে কুরাইশরা এর বাইরের করে দিয়েছে। নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে কুরাইশরা নতুনভাবে কা'বা ঘর নির্মাণ করেছিল। এই নির্মাণ কার্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) শরীক ছিলেন। যখন তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর, সেই সময় করাইশরা কা'বা শরীফকে নতুনভাবে নির্মাণ করার ইচ্ছে করে। কারণ ছিল এই যে, এর দেয়াল ছিল খুব ছোট এবং ছাদও ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, বায়তুল্লাহর ধনাগার চুরি হয়ে গিয়েছিল, যা ঐ ঘরের মধ্যে একটি গভীর গর্তে রক্ষিত ছিল। এই চোরাই মাল খাযায়েমা গোত্রীয় বানী মালীহ্ বিন আমরের ক্রীতদাস দুয়ায়েক' নামক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভবতঃ চোরেরা ঐ মাল তার ওখানে রেখেছিল। যাহোক, এই চুরির অপরাধে দুয়ায়েকের হাত কেটে দেয়া হয়। তাছাড়া এই ঘর নির্মাণের ব্যাপারে তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিরাট সুযোগ লাভ করেছিল। তা এই যে, রোম রাজ্যের বণিকদের একটি নৌকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জিদ্দার ধারে এসে লেগে যায়। ঐ নৌকায় বহু মূল্যবান কাঠ বোঝাই করা ছিল। এই কাঠগুলো কাবা ঘরের ছাদের কাজে লাগতে পারে এই চিন্তা করে কুরাইশরা ঐ কাঠগুলো কিনে। নেয় এবং কিবতী গোত্রের একজন ছুতারকে কাবার ছাদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করে। এসব প্রস্তুতিতো চলছিল বটে কিন্তু বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে দিতে তারা ভয় পাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলার ইঙ্গিতে এরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। বায়তুল্লাহর কোষাগারে একটি সাপ ছিল। যখনই কোন লোক ওর নিকটে যেতো তখনই সে হাঁ করে তার দিকে বাধিত হতো। এই সর্পটি প্রত্যহ ঐ গর্ত হতে বেরিয়ে বায়তুল্লাহর দেয়ালে এসে বসে থাকতো। একদা ঐ সাপটি ওখানে বসেই ছিল। এমন সময় আল্লাহ তা'আলা একটা বিরাট পাখী পাঠিয়ে দেন। পাখীটি সাপটিকে ধরে নিয়ে উড়ে যায়। কুরাইশরা এবার বুঝতে পারলো যে, তাদের ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার অনুরূপই হয়েছে। কারণ, কাঠও তারা পেয়ে গেছে, মিস্ত্রীও তাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে এবং সাপকেও আল্লাহ তাআলা সরিয়ে দিয়েছেন। এবার তারা কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে নতুনভাবে নির্মাণ করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে।কা'বা শরীফ নির্মাণ ও অদৃশ্য ইঙ্গিতসর্বপ্রথম ইবনে অহাব নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কাবা শরীফের একটি পাথর নামিয়ে নেয়, কিন্তু পাথরখানা তার হাত হতে উড়ে গিয়ে পুনরায় স্বস্থানে বসে যায়। সে সমস্ত কুরাইশকে সম্বোধন করে বলেঃ ‘শুনে রেখো! আল্লাহর ঘর নির্মাণ কার্যে সবাই যেন নিজ নিজ উত্তম ও পবিত্র মালই খরচ করে। এতে ব্যভিচার দ্বারা উপার্জিত সম্পদ সূদের টাকা এবং অত্যাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লাগানো চলবে না। কেউ কেউ বলেন যে, এ পরামর্শ দিয়েছিল ওলীদ বিন মুগীরা নামক ব্যক্তি। এখন বায়তুল্লাহ নির্মাণের অংশ গোত্র সমূহের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, দরজার অংশ নির্মাণ করবে বানু আবদ-ই-মানাফ ও জুহরা গোত্র, হাজরে আসওয়াদ' ও রুকনে ইয়ামানীর অংশ নির্মাণ করবে বানু মাখযুম গোত্র এবং কুরাইশের অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের সঙ্গে কাজ করবে, কা'বা শরীফের পিছনের অংশ নির্মাণ করবে বানু হামীহ্ ও সাহাম' গোত্র এবং হাতীমের পার্শ্ববর্তী অংশ নির্মাণ করবে আবদুদ্দার বিন কুসাই, বানু আসাদ বিন আবদুল উযযা ও বানু আদী বিন কা'ব। এটা নির্ধারণ করার পর পূর্ব নির্মিত ইমারত ভাঙ্গার জন্যে তারা অগ্রসর হয়। কিন্তু প্রথমে ভাঙ্গতে কেউই সাহস করে না। অবশেষে ওলীদ বিন মুগীরা বলেঃ আমিই আরম্ভ করছি।' এ বলে সে কোদাল নিয়ে উপরে উঠে যায় এবং বলে ‘হে আল্লাহ! আপনি খুবই ভাল জানেন যে, আমাদের ইচ্ছা খারাপ নয়, আমরা অপনার ঘর ধ্বংস করতে চাইনে বরং ওটাকে উন্নত করার চিন্তাতেই আছি।' একথা বলে সে দুটি স্তম্ভের দু'ধারের কিছু অংশ ভেঙ্গে দেয়। অতঃপর কুরাইশরা বলেঃ ‘এখন ছেড়ে দাও। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি এ ব্যক্তির উপর কোন শাস্তি নেমে আসে তবে তো এ পাথর ঐ স্থানেই রেখে দেয়া হবে এবং আমাদেরকে একাজ হতে বিরত থাকতে হবে। আর যদি কোন শাস্তি না আসে তবে বুঝে নিতে হবে যে, এটা ভেঙ্গে দেয়া আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ নয়। সুতরাং আগামীকাল আমরা সবাই মিলে এ কাজে লেগে যাবো।' অতঃপর সকাল হয় এবং সবদিক দিয়েই মঙ্গল পরিলক্ষিত হয়। তখন সবাই এসে বায়তুল্লাহ শরীফের পূর্ব ইমারত ভেঙ্গে দেয়। অবশেষে তারা পূর্ব ভিত্তি অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এখানে সবুজ বর্ণের পাথর ছিল এবং যেন একটির সঙ্গে অপরটির সংযোগ ছিল। একটি লোক দুটি পাথরকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ওতে এতো জোরে কোদাল মারে যে, ওটা আন্দোলিত হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত মক্কা ভূমি আন্দোলিত হয়ে উঠে। তখন জনগণ বুঝতে পারে যে, পাথরগুলোকে পৃথক করে ওর স্থানে অন্য পাথর লাগানো আল্লাহ তা'আলার নিকট গৃহীত নয়। কাজেই ওটা তাদের শক্তির বাইরের কাজ। সুতরাং তারা ঐ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ঐ পাথরগুলোকে ঐভাবেই রেখে দেয়। এর পর প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ অংশ অনুযায়ী পাথর সংগ্রহ করে এবং প্রাসাদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়।অবশেষে তারা হাজরে আসওয়াদ' রাখার স্থান পর্যন্ত পৌছে যায়। এখন প্রত্যেক গোত্রই এই মর্যাদায় অংশ নিতে চায়। সুতরাং তারা পরস্পরে ঝগড়া:বিবাদ করতে থাকে, এমনকি নিয়মিতভাবে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। বানু আব্দুদ্দার' এবং বানু আদী’ রক্তপূর্ণ একটি পাত্রে হাত ডুবিয়ে শপথ করে বলেঃ আমরা সবাই কেটে গিয়ে মারা পড়বো এটাও ভাল তথাপি হাজরে আসওয়াদ' কাউকেও রাখতে দেব না।' এভাবেই চার পাঁচ দিন কেটে যায়। অতঃপর কুরাইশরা পরস্পর পরামর্শের জন্যে মসজিদে একত্রিত হয়। আবু উমাইয়া বিন মুগীরা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়ষ্ক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। সে সকলকে সম্বোধন করে বলে, হে জনমণ্ডলী! তোমরা কোন একজনকে সালিশ নির্বাচিত কর এবং সে যা ফয়সালা করে তাই মেনে নাও। সালিশ নির্বাচনের ব্যাপারেও মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, সুতরাং তোমরা এ কাজ কর যে, এখানে সর্বপ্রথম যে সমজিদে প্রবেশ করবে সেই আমাদের সালিশ নির্বাচিত হবে। এ প্রস্তাব সবাই সমর্থন করে। সর্বপ্রথম কে প্রবেশ করে এটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষমান থাকে।‘হাজরে আসওয়াদ' ও আরবের আমীনের (সঃ) মধ্যস্থতাসর্বপ্রথম যিনি আগমন করেন তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাকে দেখা মাত্রই এসব লোক খুশী হয়ে যায় এবং বলেঃ “তার মধ্যস্থতা আমরা মেনে নিতে রাজী আছি। ইনি তো আমীন! ইনি তো মুহাম্মদ (সঃ)! অতঃপর তারা সবাই তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তিনি বলেনঃ আপনারা একটি বড় ও মোটা চাদর নিয়ে আসুন। তারা তা নিয়ে আসে। তিনি ‘হাজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে এনে স্বহস্তে ঐ চাদরে রেখে দেন এবং বলেনঃ ‘প্রত্যেক গোত্রের নেতা এসে এই চাদরের কোণ ধরে নিন এবং এভাবেই আপনারা সবাই হাজরে আসওয়াদ উঠাবার কাজে শরীক হয়ে যান।' একথা শুনে সমস্ত লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং সমস্ত গোত্রপ্রধান চাদরটি উত্তোলন করে। যখন ওটা রাখার স্থানে পৌছে তখন আল্লাহর নবী (সঃ) ওটা স্বহস্তে উঠিয়ে নিয়ে ওর স্থানে রেখে দেন। এভাবে সেই ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিমেষের মধ্যেই মিটে যায়। আর এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলের (সঃ) হাতে তাঁর ঘরে ঐ বরকতময় পাথরটি স্থাপন করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াহী আসার পূর্বে কুরাইশরা তাঁকে ‘আমীন’ বলতো। এখন উপরের অংশ নির্মিত হয়। এভাবে মহান আল্লাহর ঘরের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগে কা’বা আঠারো হাত লম্বা ছিল। ইয়েমেন দেশীয় ‘কবা’ পর্দা তার উপর চড়ান হতো। পরে ওর উপর চাদর চড়ান হতে থাকে। সর্বপ্রথম হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর রেশমী পর্দা উত্তোলন করেন। কাবা শরীফের এই ইমারতই থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের (রাঃ) খিলাফতের প্রাথমিক যুগে ষাট বছর পরে এখানে আগুনে লেগে যায়। এর ফলে কা'বা শরীফ পুড়ে যায়। এটা ছিল ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার রাজত্বের শেষ কাল এবং সে ইবনে যুবাইর (রাঃ) কে মক্কায় অবরোধ করে রেখেছিল। কাবা শরীফের ইমারত এবং তার বিভিন্ন যুগের আবর্তনএই সময়ে মক্কার খলীফা হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) স্বীয় খালা হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) নিকট যে হাদীসটি শুনেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনের কথা অনুযায়ী বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর তিনি ওটা নির্মাণ করেন। হাতীমকে ভিতরে ভরে নেন। পূর্ব ও পশ্চিমে দু'টি দরজা রাখেন। একটি ভিতরে আসার জন্য, অপরটি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। দরজা দু’টি মাটির সমান করে রাখেন। তাঁর শাসনামল পর্যন্ত কা'বা এরূপই থাকে। অবশেষে তিনি যালিম হাজ্জাজের হাতে শহীদ হন। তখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশক্রমে হাজ্জাজ কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে পুনরায় পূর্বের মত করে নির্মাণ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার যুগে যখন সিরিয়াবাসী মক্কা শরীফের উপর আক্রমণ করে এবং যা হবার তা হয়ে যায়, সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বায়তুল্লাহ শরীফকে এরূপ অবস্থাতেই রেখে দেন। হজ্বের মৌসুমে জনগণ একত্রিত হয়। তারা সব কিছু স্বচক্ষে দেখে। এরপুরে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করেনঃ কা'বা শরীফকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে কি নতুনভাবে নির্মাণ করবো, না কি ভাঙ্গা যা আছে তাকেই মেরামত করব? তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার মতে ভাঙ্গাকেই আপনি মেরামত করে দিন, বাকিগুলো পুরাতনই থাক।' তখন তিনি বলেনঃ ‘আচ্ছা বলুন তো, যদি আমাদের কারও বাড়ি পুড়ে যেতো তবে কি সে নতুন বাড়ি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতো? তাহলে মহাসম্মানিত প্রভুর ঘর সম্পর্কে এরূপ মত পেশ করেন কেন? আচ্ছা তিন দিন পর্যন্ত আমি ইস্তেখারা (লক্ষণ দেখে শুভ বিচার) করবে, তার পরে যা বুঝবো তাই করবো।' তিন দিন পরে তাঁর মত এই হলো যে, অবশিষ্ট দেয়ালও ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে। সুতরাং তিনি এই নির্দেশ দিয়ে দেন।কিন্তু কা'বা শরীফ ভাঙ্গতে কেউই সাহস করছিল না। তারা ভয় করছিল যে, যে ব্যক্তি ভাঙ্গার জন্যে চড়বে তার উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হবে। কিন্তু একজন সাহসী ব্যক্তি উপরে চড়ে গিয়ে একটি পাথর ভেঙ্গে দেয়। অন্যেরা যখন দেখে যে, তার কোন ক্ষতি হলো না তখন তারা সবাই ভাঙ্গতে আরম্ভ করে দেয়। এবং ভূমি পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে দেয়। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) চারদিকে স্তম্ভ দাঁড় করিয়ে দেন এবং ওর উপর পর্দা করে দেন। এবারে বায়তুল্লাহ নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) বলেন, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিটক হতে আমি শুনেছি তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“যদি লোকদের কুফরীর সময়টা নিকটে না হতো এবং আমার নিকট নির্মাণের খরচা থাকতো তবে আমি হাতীম' থেকে পাঁচ হাত পর্যন্ত বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নিতাম এবং কা'বার দুটি দরজা করতাম, একটা আসবার দরজা এবং অপরটি বের হওয়ার দরজা।' হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “এখন আর জনগণের কুফরীর যুগ নিকটে নেই, তাদের ব্যাপারে ভয় দূর হয়ে গেছে এবং কোষাগারও পূর্ণ রয়েছে, আমার নিকট যথেষ্ট অর্থ রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনোবাসনা পূর্ণ না করার আমার আর কোন কারণ থাকতে পারে না। সুতরাং তিনি পাঁচ হাত ‘হাতীম' ভিতরে নিয়ে নেন। তখন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তি প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণ তা স্বচক্ষে দেখে নেয়। এরই উপর দেয়াল গাথা হয়। বায়তুল্লাহ শরীফের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো হাত। এখন আরও পাঁচ হাত বৃদ্ধি পায়, ফলে ছোট হয়ে যায়, এজন্যে দৈর্ঘ্যের আর দশ হাত বেড়ে যায়। দু'টি দরজা নির্মিত হয়। একটি ভিতরে আসবার এবং অপরটি বাইরে যাবার। হযরত ইবনে যুবাইরের (রাঃ) শাহাদাতের পর হাজ্জাজ আবদুল মালিকের নিকট পত্র লিখেন এবং তার পরামর্শ চান যে, এখন কি করা যায়? এটাও লিখে পাঠান যে, ঠিক হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর যে কাবা শরীফ নির্মিত হয়েছে এটা মক্কা শরীফের সুবিচারকগণ স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু আবদুল মালিক উত্তর দেনঃ দৈর্ঘ্য ঠিক রাখ কিন্তু হাতীমকে বাইরে করে দাও এবং দ্বিতীয় দরজাটি বন্ধ করে দাও।' হাজ্জাজ আবদুল মালিকের এই নির্দেশক্রমে কাবাকে তেঙ্গে দিয়ে পূর্বের ভিত্তির উপরে নির্মাণ করেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর ভিত্তিকে ঠিক রাখাই সুন্নাতের পন্থা ছিল। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাসনা তো এই ছিল। কিন্তু সেই সময় তার এই ভয় ছিল যে, মানুষ হয়তো খারাপ ধারণা করে বসবে। কারণ তারা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আবদুল মালিক বিন মারওয়ান এ হাদীসটি জানতেন না। এজন্যেই তিনি ওটা ভাঙ্গিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি হাদীসটি জানতে পারেন তখন তিনি দুঃখ করে বলেনঃ ‘হায়! যদি আমি ওটাকে ভেঙ্গে পূর্বাবস্থাতেই রাখতাম।'সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হারিস বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) যখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের খিলাফত কালে তাঁর নিকট প্রতিনিধি রূপে গমন করেন তখন আবদুল মালিক তাকে বলেন, আমি ধারণা করি যে, আবু হাবীব অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি (তার খালা) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেননি। তখন হযরত হারিস বিন উবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ ‘অবশ্যই তিনি শুনেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে স্বয়ং আমিও শুনেছি।' আবদুল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কি শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ “আমি শুনেছি-তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আয়েশা! তোমার কওম’ বায়তুল্লাহকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। যদি তোমার সম্প্রদায়ের শিরকের যুগ নিকটে না হতো তবে নতুনভাবে আমি এর কমতি পূরণ করতাম। এসো, আমি তোমাকে এর প্রকৃত ভিত্তি দেখিয়ে দেই, হয়তো তোমার গোত্র আবার একে এর প্রকৃত ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে পারে। অতঃপর তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কে প্রায় সাত হাত দেখিয়ে দেন এবং বলেনঃ “আমি এর দু’টি দরজা নির্মাণ করতাম, একটি আগমনের ও অপরটি প্রস্থানের; এবং দরজা দু'টি মাটির সমান করে রাখতাম। একটি রাখতাম পূর্বমুখী এবং অপরটি রাখতাম পশ্চিমমুখী। তুমি কি জান যে, তোমার কওম' দরজাকে এত উঁচু করে রেখেছে কেন? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, শুধুমাত্র নিজেদের মর্যাদা প্রকাশের জন্যে। যাকে চাইবে প্রবেশ করতে দেবে এবং যাকে চাইবে না প্রবেশ করতে দেবে না। যখন লোক ভিতরে যেতে চাইতো তখন তারা তাকে উপর হতে ধাক্কা দিতো ফলে সে পড়ে যেতো। আর যাকে তারা প্রবেশ করাবার ইচ্ছে করতো তাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতো।' আবদুল মালিক তখন বলেনঃ “হে হারিস! আপনি কি স্বয়ং এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ’ আমি স্বয়ং শুনেছি। তখন আবদুল মালিক কিছুক্ষণ ধরে লাঠির উপর ভর দিয়ে চিন্তা করেন। অতঃপর বলেনঃ যদি আমি একে ঐ রকমই রেখে দিতাম! সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে আছে যে, আবদুল মালিক বিন মারওয়ান একবার বায়তুল্লাহ তওয়াফ করার সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) কে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, তিনি এ হাদীসটির ব্যাপারে হযরত আয়েশার (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন।' তখন হযরত হারিস (রাঃ) তাকে বাধা দেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, তিনি সত্যবাদীই ছিলেন। আমিও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই হাদীসটি শুনেছি। তখন আবদুল মালিক আফসোস করে বলেনঃ “আমি পূর্ব হতে অবগত থাকলে কখনও ভাঙ্গতাম না।' কাযী আইয়া এবং ইমাম নববী (রঃ) লিখেছেন যে, খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে (রঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আমি কা'বা শরীফকে পুনরায় ইবনে যুবাইর (রাঃ) কর্তৃক নির্মিত আকারে নির্মাণ করে দেই এর কি আপনি অনুমতি দিচ্ছেন?' ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, আপনি এরূপ করবেন না। কারণ এর ফলে হয়তো পবিত্র কাবা বাদশাহদের খেলনায় পরিণত হবে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত ওটাকে ভাঙ্গতে থাকবে।' খলীফা হারুনুর রশীদ তখন তার এই সংকল্প হতে বিরত থাকেন। এটাই সঠিকও মনে হচ্ছে যে, কা'বা শরীফকে বার বার ভেঙ্গে দেয়া উচিত নয়। কাবা শরীফের ধ্বংসলীলাসহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কা'বাকে দু'টি ছোট পা (পায়ের গোছা) বিশিষ্ট একজন হাবশী ধ্বংস করবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি, সেই কৃষ্ণবর্ণের (হাবশী) এক একটি পাথরকে পৃথক পৃথক করে দেবে, ওর আবরণ নিয়ে যাবে এবং এর অর্থ সম্পদও ছিনিয়ে নেবে। সে বাঁকা হাত-পা বিশিষ্ট ও টেকো মাথাওয়ালা হবে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, সে কোদাল মেরে মেরে টুকরো টুকরো করতে রয়েছে। খুব সম্ভব এই দুঃখজনক ঘটনা ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরে ঘটবে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরও তোমরা বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্ব ও উমরাহ করবে।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাদের প্রার্থনায় বলেছেনঃ “আমাদেরকে মুসলমান করে নিন। অর্থাৎ আমাদেরকে অকৃত্রিম, অনুগত, একত্ববাদী করে নিন এবং আমাদেরকে অংশীবাদী ও রিয়াকারী হতে রক্ষা করুন এবং আমাদিগকে নম্র ও বিনয়ী করুন।' হযরত সালাম বিন মুতী (রঃ) বলেন যে, তারা মুসলমান তো ছিলেনই, কিন্তু এখন ইসলামের উপর দৃঢ় ও অটল থাকার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। এর উত্তরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন (আরবি) অর্থাৎ আমি তোমাদের এই প্রার্থনা কবুল করলাম। আবার তাঁরা তাঁদের সন্তানাদির জন্যে এ দু’আই করছেন এবং তা ককূলও হচ্ছে। বানী ইসরাঈল ও আরব উভয়েই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি দল হক ও ইনসাফের উপর ছিল।' (৭:১৫৯) কিন্তু রচনা রীতি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ প্রার্থনা আরবের জন্যই, যদিও সাধাণভাবে অন্যেরাও জড়িত রয়েছে। কেননা, এই প্রার্থনার পরে অন্য প্রার্থনায় রয়েছে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন এই রাসূল দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে বুঝান হয়েছে। এ প্রার্থনাও গৃহীত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তিনিই এমন যিনি নিরক্ষরদের মধ্য তাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।' (৬২:২) কিন্তু এর দ্বারা তাঁর রিসালাত কারও জন্য বিশিষ্ট হচ্ছে না বরং তাঁর রিসালাত সাধারণ। আরব অনারব সবার জন্যেই তিনি রাসূল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল, হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।' (৭:১৫৮) এ দুজন নবীর প্রার্থনার মত প্রত্যেক খোদা ভীরু লোকেরই প্রার্থনা হওয়া উচিত। যেমন পবিত্র কোরআন মুসলমানকে দু'আ শিখিয়ে দিচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রীগণ এবং আমাদের সন্তানবর্গ হতে চক্ষের শীতলতা (শান্তি) দান করুন এবং আমাদেরকে খোদা ভীরু লোকদের ইমাম বানিয়ে দিন।' (২৫:৭৪) এটাও আল্লাহ তা'আলার প্রেমের দলীল যে, মানুষ কামনা করবে তার মৃত্যুর পরে তার ছেলেরাও যেন আল্লাহ তা'আলার উপাসনায় রত থাকে। অন্য জায়গায় প্রার্থনার শব্দ রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা হতে রক্ষা করুন। (১৪:৩৫) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'মানুষ মরে যাওয়া মাত্র তার কার্যাবলী শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। (১) সাদকাহ, (২) ইলম, যদ্বারা উপকার লাভ করা হয়, (৩) সৎ সন্তান, যারা প্রার্থনা করে (সহীহ মুসলিম)। তার পরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে হজুরে আহকাম শিখিয়ে দিন। কাবা শরীফের ইমারত পূর্ণ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে নিয়ে ‘সাফা' পর্বতে আসেন, অতঃপর মারওয়া পর্বতে যান এবং বলেন যে এগুলোই হচ্ছে আল্লাহর স্মৃতি নিদর্শন। অতঃপর তাঁকে মিনার দিকে নিয়ে যান। উকবাহ’র উপরে একটি গাছের পার্শ্বে শয়তানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বলেনঃ “তাকবীর' পাঠ করতঃ তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করুন। ইবলিস এখান হতে পালিয়ে গিয়ে জামরা-ই-উকবার পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ায়। এখানেও তিনি তাকে পাথর মারেন। এই কলুষ শয়তান নিরাশ হয়ে চলে যায়। হজ্বের আহকামের মধ্যে সে কিছু গোলমাল সৃষ্টি করতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগ পেলো না এবং সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল। এখান হতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে মাশআরে হারাম’ নিয়ে যান। অতঃপর আরাফাতে পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন, বুঝেছেন' তিনি বলেনঃ ‘হ্যাঁ'। অন্য বর্ণনায় শয়তানকে তিন জায়গায় পাথর মারার কথা বর্ণিত আছে। প্রত্যেক হাজী শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারেন।