Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:128 – আল-বাকারা 2:182
Contents
- আল-বাকারা 2:128
- আল-বাকারা 2:129
- আল-বাকারা 2:130
- আল-বাকারা 2:131
- আল-বাকারা 2:132
- আল-বাকারা 2:133
- আল-বাকারা 2:134
- আল-বাকারা 2:135
- আল-বাকারা 2:136
- আল-বাকারা 2:137
- আল-বাকারা 2:138
- আল-বাকারা 2:139
- আল-বাকারা 2:140
- আল-বাকারা 2:141
- আল-বাকারা 2:142
- আল-বাকারা 2:143
- আল-বাকারা 2:144
- আল-বাকারা 2:145
- আল-বাকারা 2:146
- আল-বাকারা 2:147
- আল-বাকারা 2:148
- আল-বাকারা 2:149
- আল-বাকারা 2:150
- আল-বাকারা 2:151
- আল-বাকারা 2:152
- আল-বাকারা 2:153
- আল-বাকারা 2:154
- আল-বাকারা 2:155
- আল-বাকারা 2:156
- আল-বাকারা 2:157
- আল-বাকারা 2:158
- আল-বাকারা 2:159
- আল-বাকারা 2:160
- আল-বাকারা 2:161
- আল-বাকারা 2:162
- আল-বাকারা 2:163
- আল-বাকারা 2:164
- আল-বাকারা 2:165
- আল-বাকারা 2:166
- আল-বাকারা 2:167
- আল-বাকারা 2:168
- আল-বাকারা 2:169
- আল-বাকারা 2:170
- আল-বাকারা 2:171
- আল-বাকারা 2:172
- আল-বাকারা 2:173
- আল-বাকারা 2:174
- আল-বাকারা 2:175
- আল-বাকারা 2:176
- আল-বাকারা 2:177
- আল-বাকারা 2:178
- আল-বাকারা 2:179
- আল-বাকারা 2:180
- আল-বাকারা 2:181
- আল-বাকারা 2:182
আল-বাকারা 2:128
ওটা প্রথম আল্লাহর ঘরঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বার বার আগমন করা। হজ্বব্রত পালন করে বাড়ী ফিরে গেলেও অন্তর তার সাথে লেগেই থাকে। প্রত্যেক জায়গা হতে লোক দলে দলে এ ঘরের দিকে এসে থাকে। এটাই একত্রিত হবার স্থান, অর্থাৎ সবারই মিলন কেন্দ্র। এটা নিরাপদ জায়গা। এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো হয় না। অজ্ঞতার যুগেও এর আশে পাশে লুটতরাজ হতো বটে; কিন্তু এখানে নিরাপত্তা বিরাজ করতো। কাউকে কেউ গালিও দিত না। এ স্থান সদা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ থেকেছে। সৎ আত্মাগুলো সদা এর দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকে। প্রতি বছর পরিদর্শন করলেও এর প্রতি লোকের আগ্রহ থেকেই যায়। এটা হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর প্রার্থনারই ফল। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি জনগণের অন্তর ওদিকে ঝুঁকিয়ে দিন।' (১৪:৩৭) এখানে কেউ তার ভ্রাতার হন্তাকে দেখলেও নীরব থাকে। সুরা-ই-মায়েদার মধ্যে রয়েছে যে, এটা মানুষের অবস্থান স্থল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি হজ্ব করা ছেড়ে দেয় তবে আকাশকে পৃথিবীর উপর নিক্ষেপ করা হবে। এ ঘরের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে বায়তুল্লাহ শরীফের স্থান ঠিক করে দিলাম, (এবং বলেছিলাম) আমার সাথে কাউকেও অংশীদার স্থাপন করবে।' (২২ ২৬) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি)অর্থাৎ-আল্লাহ তা'আলার প্রথম ঘর রয়েছে মক্কায়, যা বরকতময় ও সারা বিশ্বের হিদায়াত স্বরূপ। তাতে কতকগুলো প্রকাশ্য নিদর্শন রয়েছে যেমন, মাকামে ইবরাহীম (আঃ), যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' (৩:৯৬) মাকামে ইবরাহীম বলতে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ শরীফও বুঝায় বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিশিষ্ট স্থানও বুঝায়। আবার হজ্বের সমুদয় করণীয় কাজের স্থানকেও বুঝায়। যেমন-আরাফাত, মাশআরে হারাম, মিনা, পাথর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ ইত্যাদি। মাকামে ইবরাহীম প্রকৃতপক্ষে ঐ পাথরটি যা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মান কার্য সম্পাদনের জন্যে তাঁর পায়ের নীচে রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ভুল কথা। প্রকৃত পক্ষে এটা ঐ প্রস্তর যার উপরে দাড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত জাবির (রাঃ)-এর একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ) তওয়াফ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ‘এটাই কি আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাকাম?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হাঁ'। তিনি বলেনঃ তাহলে আমরা এটাকে কিবলাহ বানিয়ে নেই না কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের অল্প দিন পরেই এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাই কি মাকামে ইবরাহীম যাকে কিবলাহ্ বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হাঁ এটাই।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমি আমার প্রভুর আনুকূল্য স্বীকার করেছি, অথবা বলেন- তিনটি বিষয়ে আমার প্রভু আমার আনুকূল্য করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছিলেন তাই তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান করে নিতাম! তখন (আরবি) (২:১২৫) অবতীর্ণ হয়। আমি বললাম-হে আল্লাহর রাসূল! সৎ ও অসৎ সবাই আপনার নিকট এসে থাকে, সুতরাং যদি আপনি মু'মিনদের জননীগণকে নিবী (সঃ)-এর সহধর্মিনীগণকে] পর্দার নির্দেশ দিতেন! তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। যখন আমি অবগত হই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোনও কোনও স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তখন তাদের নিকট গিয়ে বলি- যদি আপনারা বিরত না হন (রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দুঃখ দেয়া হতে] তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। তখন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি মুহাম্মদ (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে তবে অতি সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' (৬৬:৫) এ হাদীসটির বহু ইসনাদ রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় বদরের বন্দীদের ব্যাপারেও হযরত উমারের (রাঃ) আনুকূল্যের কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন যে, বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ না নিয়ে বরং তাদেরকে হত্যা করা হোক। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাও তাই ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নামক মুনাফিক যখন মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায আদায় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন আমি বলি আপনি কি এই মুনাফিক কাফিরের জানাযার নামায আদায় করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ধমক দিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে মৃত্যু বরণ করেছে তুমি কখনও তার জন্যে নামায পড়বে না এবং তার সমাধি পার্শ্বে দাঁড়াবে না। (৯:৮৪)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফ সদর্প পদক্ষেপে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং চারবার স্বাভাবিক পদক্ষেপে প্রদক্ষিণ করেন। অতঃপর মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) পিছনে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন এবং (আরবি) পাঠ করেন।' হযরত জাবিরের (রাঃ) হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইব্রাহীমকে (আঃ) তাঁর ও বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যে করেছিলেন। এ হাদীসসমূহের দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) ভাবার্থ ঐ পাথরটি যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর এনে দিতেন এবং তিনি কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যেতেন। যেখানে প্রাচীর উঁচু করার প্রয়োজন হতো সেখানে পাথরটি সরিয়ে নিয়ে যেতেন।এভাবে কা'বার প্রাচীর গাঁথার কাজ সমাপ্ত করেন। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘটনায় আসবে। ঐ পাথরে হ্যরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়েছিল। আরবের অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তা দেখেছিল। আবু তালিব তার প্রশংসাসূচক কবিতায় বলেছিলেন ? (আরবি)অর্থাৎ ‘ঐ পাথরের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন নতুন হয়ে রয়েছে, পদদ্বয় জুতো শূন্য ছিল। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ “আমি মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) উপর হযরত খলীলুল্লাহর (আঃ) পায়ের অঙ্গুলির ও পায়ের পাতার চিহ্ন দেখেছিলাম। অতঃপর জনগণের স্পর্শের কারণে তা মুছে গেছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মাকামে ইবুরাহীমের (আঃ) দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে, তাকে স্পর্শ করার নির্দেশ নেই। এ উম্মতের লোকেরাও পূর্বের উম্মতের ন্যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই কতকগুলো কাজ নিজেদের উপর ফর করে নিয়েছে, যা পরিণামে তাদের ক্ষতির কারণ। হবে। মানুষের স্পর্শের কারণেই ঐ পাথরের পদ চিহ্ন হারিয়ে গেছে। এই মাকামে ইবরাহীম পূর্বে কাবার প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কাবার দরজার দিকে হাজরে আসওয়াদ’র পার্শ্বে দরজা দিয়ে যেতে ডান দিকে একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যমান ছিল যা আজও লোকের জানা আছে। খলীলুল্লাহ (আঃ) হয়তো বা ওটাকে এখানেই রেখেছিলেন কিংবা বাইতুল্লাহ বানানো অবস্থায় শেষ অংশ হয়তো এটাই নির্মাণ করে থাকবেন এবং পাথরটি এখানেই থেকে গেছে। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে ওটাকে পিছনে সরিয়ে দেন। এর প্রমাণ রূপে বহু বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর একবার বন্যার পানিতে এ পাথরটি এখান হতেও সরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা পুনরায় একে পূর্বস্থানে রেখে দেন। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এটাকে মূল স্থান হতে সরানো হয়েছে এবং এর পূর্বে কা'বার প্রাচীর হতে কত দূরে ছিল।” একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পাথরটি তার মূল স্থান হতে সরিয়ে ওখানে রেখেছিলেন যেখানে এখন রয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুরসাল। সঠিক কথা এই যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা পিছনে রেখেছিলেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছি।' পবিত্র রেখো’ অর্থাৎ কা'বা শরীফকে ময়লা, বিষ্ঠা এবং জঘন্য জিনিস হতে পবিত্র রেখো। (আরবি)-এর (আরবি) যদি (আরবি) দ্বারা হয় তবে অর্থ দাঁড়াবে ‘আমি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি এবং প্রথমেই বলে দিয়েছি যে, তোমরা উভয়ে ‘বায়তুল্লাহূকে প্রতিমা থেকে পবিত্র রাখবে, তথায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত হতে দেবে না, বাজে কাজ,অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যে কথা, শিরক , কুফর হাসি রহস্য ইত্যাদি হতে ওকে রক্ষা করবে।' শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে প্রদক্ষিণকারী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘বাহির হতে আগমনকারী’। এ হিসেবে (আরবি) শব্দের অর্থ হবে মক্কার অধিবাসী।' হযরত সাবিত (রঃ) বলেনঃ “আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর (রঃ) কে বলি যে, আমাদের কর্তব্য হবে বাদশাহুকে এ পরামর্শ দেয়া, তিনি যেন জনগণকে বায়তুল্লাহ শরীফে শয়ন করতে নিষেধ করে দেন। কেননা,এমতাবস্থায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে, এবং এরও সম্ভাবনা আছে যে, তারা পরস্পরে বাজে কথা বলতে আরম্ভ করে দেয়। তখন তিনি বলেনঃ এরূপ করো না। কেননা, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা ওরই অধিবাসী।' একটি হাদীসে রয়েছে যে,হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) ছেলে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) শুয়ে থাকতেন, এবং তিনি যুবকও কুমার ছিলেন (আরবি) দ্বারা নামাযীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটা পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখনও মূর্তি পূজা চালু ছিল। বায়তুল্লাহর নামায উত্তম কি তওয়াফ উত্তম এ বিষয়ে ধর্ম শাস্ত্রবিদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে বাইরের লোকদের জন্যে তওয়াফ উত্তম এবং জামহুরের মতে প্রত্যেকের জন্যে নামায উত্তম। তাফসীর এর ব্যাখ্যার জায়গা নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদেরকে জানিয়ে দেয়া এবং তাদের দাবী খণ্ডন করা যে, বায়তুল্লাহ' তো খাস করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। ওর মধ্যে অন্যদের পূজা করা এবং খাটি আল্লাহর পূজারীদেরকে ঐ ঘরে ইবাদত করা হতে বিরত রাখা সরাসরি অন্যায় ও আবচারপূণ কাজ। এজন্যেই কুরআন মাজীদে অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ অত্যাচারীদেরকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো। এভাবে মুশরিকদের দাবীকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করার সাথে সাথে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের দাবীও খণ্ডন করা হয়ে গেল। তারা যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুওয়াতের সমর্থক, তারা যখন জানে ও স্বীকার করে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ ঘর এসব পবিত্র হস্ত দ্বারাই নির্মিত হয়েছে, তারা যখন একথারও সমর্থক যে, এ ঘরটি শুধুমাত্র নামায, তওয়াফ, প্রার্থনা এবং আল্লাহর উপাসনার জন্যেই নির্মিত হয়েছে, হজ্ব, উমরাহ, ইতিকাফ ইত্যাদির জন্যে বিশিষ্ট করা হয়েছে, তখন এই নবীগণের অনুসরণ দাবী সত্ত্বেও কেন তারা হজ্ব ও উমরা করা হতে বিরত রয়েছে? বায়তুল্লাহ শরীফে তারা উপস্থিত হয় না কেন? বরং স্বয়ং হযরত মূসা (আঃ) তো এই ঘরের হজ্ব করেছেন, যেমন হাদীসে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মসজিদগুলো উঁচু করার অনুমতি দিয়েছেন। ওর মধ্যে তাঁর নামের যিক্র করা হবে, ওর মধ্যে সকাল-সন্ধায় তার সৎ বান্দাগণ তাঁর নামের তাসবিহু পাঠ করে থাকে। (২৪:৩৬) হাদীস শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মসজিদসমূহ যে কাজের জন্যে তা ঐ জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আরও বহু হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মসজিদসমূহ পবিত্র রাখার নির্দেশ রয়েছে। বায়তুল্লাহ শরীফের নির্মাণ ও এর সর্বপ্রথম নির্মাতাকেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন। আমি মদীনাকে হারাম করলাম। এর শিকার খাওয়া হবে না, এখানকার বৃক্ষ কর্তন করা হবে না, এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো নিষিদ্ধ। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে যে, জনগণ টাটকা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের খেজুরে, আমাদের শহরে এবং আমাদের ওজনে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) আপনার বান্দা, আপনার দোস্ত এবং আপনার রাসূল ছিলেন। আমিও আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল। তিনি আপনার নিকট মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আমিও আপনার নিকট মদীনার জন্যে প্রার্থনা জানাচ্ছি। যেমন তিনি মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বরং এরকমই আরও একটি। অতঃপর কোন ছোট ছেলেকে ডেকে ঐ খেজুর তাকে দিয়ে দিতেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘তোমাদের ছোট ছোট বালকদের মধ্যে একটি বালককে আমার খিদমতের জন্যে অনুসন্ধান কর। আবূ আলহা (রাঃ) আমাকেই নিয়ে যান। তখন আমি বিদেশে ও বাড়ীতে তাঁর খিদমতেই অবস্থান করতে থাকি। একদা তিনি বিদেশ হতে আসছিলেন। সম্মুখে উহুদ পর্বত দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেনঃ ‘এ পর্বত আমাকে ভালবাসে এবং আমিও এ পর্বতকে ভালবাসি'। মদীনা চোখের সামনে পড়লে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ! আমি এর দু'ধারের মধ্যবর্তী স্থানকে ‘হারাম’ রূপে নির্ধারণ করছি, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ রূপে নির্ধারণ করেছিলেন। হে আল্লাহ! এর মুদ্দ’, ‘সা’ এবং ওজনে বরকত দান করুন।হযরত আনাস (রাঃ) হতেই আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! মক্কায় আপনি যে বরকত দান করেছেন তার দ্বিগুণ বরকত মদীনায় দান করুন। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ বানিয়েছিলেন, আমিও মদীনাকে হারাম’ বানালাম। এখানে কাউকেও হত্যা করা হবে না এবং চারা (পশুর খাদ্য ) ছাড়া বৃক্ষাদির পাতাও ঝরানো হবে না। এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে যদ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মক্কার মত মদীনাও হারাম শরীফ। এখানে এসব হাদীস বর্ণনা করায় আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা শরীফের মর্যাদা ও এখানকার নিরাপত্তার বর্ণনা দেয়া। কেউ কেউতো বলেন যে, প্রথম হতেই এটা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আমল হতে এর মর্যাদা ও নিরাপত্তা সূচীত হয়। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ 'যখন হতে আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন তখন থেকেই এই শহরকে মর্যাদাপূর্ণরূপে বানিয়েছেন। এখন কিয়ামত পর্যন্ত এর মর্যাদা অক্ষুন্নই থাকবে। এখানে যুদ্ধ বিগ্রহ কারও জন্যে বৈধ নয়। আমার জন্যেও শুধুমাত্র আজকের দিনে ক্ষণেকের জন্যে বৈধ ছিল। এর অবৈধতা রয়েই গেল। জেনে রেখো এর কাটা কাটা হবে না। এর শিকার তাড়া করা হবে না। এখানে কারও পতিত হারানো জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে না, কিন্তু যে ওটা (মালিকের নিকট ) পৌছিয়ে দেবে তার জন্যে জায়েযু। এর ঘাস কেটে নেয়া হবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এ হাদীসটি খুত্বায় বর্ণনা করেছিলেন এবং হযরত আব্বাসের (রাঃ) প্রশ্নের কারণে তিনি ইযখার’ নামক ঘাস কাটার অনুমতি দিয়েছিলেন।হযরত আমর বিন সাঈদ (রাঃ) যখন মক্কার দিকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করছিলেন সেই সময়ে হযরত ইবনে শুরাইহ্ আদভী (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমীর! মক্কা বিজয়ের দিন অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে খুত্ব দেন তা আমি নিজ কানে শুনেছি, মনে রেখেছি এবং সেই সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে স্বচক্ষে দেখেছি- আল্লাহ তাআলার প্রশংসার পর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই মক্কাকে হারাম করেছেন, মানুষ করেনি। কোন মুমিনের জন্যে এখানে রক্ত প্রবাহিত করা এবং বৃক্ষাদি কেটে নেয়া বৈধ নয়। যদি কেউ আমার এই যুদ্ধকে প্রমাণরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে বলবে যে, আমার জন্যে শুধুমাত্র আজকের দিন এই মুহূর্তের জন্যেই যুদ্ধ বৈধ ছিল। অতঃপর পুনরায় এ শহরের মর্যাদা ফিরে এসেছে যেমন কাল ছিল। সাবধান! তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছ, তাদের নিকট অঅবশ্যই এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যারা আজ এ সাধারণ জনসমাবেশে নেই। কিন্তু আমার এ হাদীসটি শুনে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেনঃ ‘আমি তোমার চেয়ে এ হাদীসটি বেশী জানি। 'হারাম শরীফ অবাধ্য রক্ত পিপাসুকে এবং ধ্বংসকারীকে রক্ষা করে না।” (বুখারী ও মুসলিম)। কেউ যেন এ দুটো হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে না করেন। এ দুটোর মধ্যে সাদৃশ্য এভাবে হবে যে, মক্কা প্রথম দিন হতেই মর্যাদাপূর্ণ তো ছিলই, কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রচার করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো রাসূল তখন হতেই ছিলেন যখন হযরত আদম (আঃ) এর খামির প্রস্তুত হয়েছিল, বরং সেই সময় হতেই তার নাম শেষ নবী রূপে লিখিত ছিল। কিন্তু তথাপিও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নবুওয়াতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে হতেই একজন রাসূল তাদের মধ্যে প্রেরণ করুন। (২:১২৯) এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তকদীরে লিখিত ঐ কথা প্রকাশিত হয়। একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেন ? ‘আপনার নবুওয়াতের সূত্রের কথা কিছু আলোচনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি নূর বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিলো এবং তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকলো। মক্কা ও মদীনার মধ্যে বেশী উত্তম কোনটি?জামহুরের মতে মদীনার চেয়ে মক্কা বেশী উত্তম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের মাযহাব অনুসারে মক্কা অপেক্ষা মদীনা বেশী উত্তম। এ দু'দলেরই প্রমাণাদি সত্বরই ইনশাআল্লাহ আমরা বর্ণনা করবো। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছেনঃ “হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপদ শহর করে দিন।” অর্থাৎ এখানে অবস্থানকারীদেরকে ভীতি শূন্য রাখুন। আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ হয়ে গেলো। (৩:৯৭) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারাম’কে নিরাপত্তা দানকারী করেছি? ওর আশ পাশ হতে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানে তারা পূর্ণ নিরপত্তা লাভ করছে।' (২৯:৬৭) এ প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় বহু হাদীসও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা শরীফে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ মক্কায় অস্ত্র শস্ত্র উঠাননা কারও জন্যে বৈধ নয়। (সহীহ মুসলিম)' তাঁর এ প্রার্থনা কাবা শরীফ নির্মাণের পূর্বে ছিল, এ জন্যেই বলেছেন, হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপত্তা দানকারী শহর বানিয়ে দিন। সূরা-ই- ইব্রাহীমের মধ্যে এ প্রার্থনাই এভাবে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১২৬) সম্ভবতঃ এটা দ্বিতীয় বারের প্রার্থনা ছিল, যখন বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত হয়ে যায় ও শহর বসে যায় এবং হযরত ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর তিন বছরের ছোট ছিলেন। এজন্যেই এ প্রার্থনার শেষে তার জন্ম লাভের জন্যেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার কথা। কেউ কেউ এটাকেও প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।তখন ভাবার্থ হবে এইঃ কাফিরদেরকেও অল্প দিন শান্তিতে রাখুন, অতঃপর তাদেরকে শাস্তিতে জড়িত করে ফেলুন। আর একে আল্লাহ তা'আলার কালাম বললে ভাবার্থ হবে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানাদির জন্যে ইমামতির প্রার্থনা জানালেন এবং অত্যাচারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা শুনলেন। ও বুঝতে পারলেন যে, তার পরে আগমনকারীদের মধ্যে অনেকে অবাধ্যও হবে, তখন তিনি ভয়ে শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যেই আহার্যের প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ কাফিরদেরকেও দেবেন। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি তোমার প্রভুর দান এদেরকেও দেবো এবং ওদেরকেও দেবো, তোমার প্রভুর দান কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয়। (১৭:২০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় তারা মুক্তি পায় না, তারা দুনিয়ায় কিছুদিন লাভবান হলেও আমার নিকট যখন তারা ফিরে আসবে তখন আমি তাদেরকে কুফরীর প্রতিফল স্বরূপ কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।অন্যস্থানে বলেনঃ “কাফিরদের কুফরী যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, আমার নিকট তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর যে কাজ তারা করেছে তার সংবাদ আমি তাদেরকে দেবো, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পূর্ণ অবগত আছেন। আমি তাদেরকে সামান্য সুখ দেয়ার পর ভীষণ শাস্তির মধ্যে জড়িয়ে ফেলবো।” অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি এটা না হতো যে, (প্রায়) সমস্ত মানুষ একই পথাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাবে, তাহলে যারা দয়াময় (আল্লাহ)-এর সাথে কুফরী করে, আমি তাদের জন্য তাদের গৃহসমূহের ছাদ। রৌপ্যের করে দিতাম এবং সিঁড়িগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর দিয়ে তারা আরোহণ করে; এবং তাদের গৃহের দরজাগুলো ও আসনগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর তারা হেলান দিয়ে বসে আর (এসব) স্বর্ণের ও (করে দিতাম), এবং এগুলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাসের উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়, (শেষে সবই বিলীন হয়ে যাবে) এবং আখেরাত তোমার প্রভুর সমীপে মুত্তাকির জন্যে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন :অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির মধ্যে জড়িত করে ফেলবো এবং ওটা জঘন্য অবস্থান স্থল। অর্থাৎ তাদেরকে অস্থায়ী জগতে সুখে শান্তিতে রাখার পর ভীষণ শাস্তির দিকে টেনে আনবো। এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য অবস্থান স্থল।' এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দেখছেন এবং অবকাশ দিচ্ছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। যেমন তিনি বলেছেন। (আরবি) অর্থাৎ বহু অত্যাচারী গ্রামবাসীকে আমি অবকাশ দিয়েছি, অতঃপর পাকড়াও করেছি, শেষে তো তাদেরকে আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (২২:৪৮) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা বেশী ধৈর্য ধারণকারী আর কেউই নেই। তারা তার সন্তানাদি সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে আহার্যও দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাও দান করেছেন। অন্য সহীহ হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীকে ঢিল দেন, তৎপর হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন- (আরবি)অর্থাৎ তোমার প্রভুর পাকড়াও এরকমই যে, যখন তিনি কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন, তখন নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক। (১১:১০২) এই বাক্যকে হ্যরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করার পঠন খুবই বিরল এবং তা সপ্ত পাঠকের পঠনের বিপরীত। রচনা। রীতিরও এটা উল্টো। কেননা (আরবি) ক্রিয়া পদের (আরবি) টি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু এ বিরল পঠনে এর কর্তা ও উক্তিকারী হযরত ইবরাহীমই (আঃ), হচ্ছেন এবং এটা বাক্যরীতির সম্পূর্ণ উল্টো (আরবি) শব্দটি এর বহুবচন (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে থামের নিম্নতল এবং ভিত্তি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তির সংবাদ দিয়ে দাও।' একটি কিরআতে (আরবি)-এর পরে (আরবি) ও রয়েছে। ওরই প্রমাণ রূপে পরে (আরবি) শব্দটিও এসেছে।আন্তরিক প্রার্থনাহযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) শুভ কাজে লিপ্ত রয়েছেন এবং তা গৃহীত হয় কি না এ ভয়ও তাঁদের রয়েছে। এ জন্যেই তারা মহান আল্লাহর নিকট এটা কবুল করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। হযরত অহীব বিন অরদ (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে খুব ক্রন্দন করতেন এবং বলতেন :‘হায়! আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বন্ধু এবং গৃহীত নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কাজ তাঁর হুকুমেই করছেন, তাঁর ঘর তাঁরই হুকুমে নির্মাণ করছেন, তথাপি ভয় করছেন যে, না জানি আল্লাহর নিকট এটা না মঞ্জুর হয়। মহান আল্লাহ মু'মিনদের অবস্থা এরকমই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে এবং দান খয়রাত করে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে কম্পিত থাকে (এই ভয়ে যে, না-জানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় কি না!)' (২৩:৬০) যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, যা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, অতি সত্বরই তা নিজ স্থানে আসছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে, ভিত্তি উত্তোলন করতেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং প্রার্থনা করতেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, উভয়ই উভয় কাজে অংশীদার ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনা এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি হাদীসও এ ঘটনা সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রী লোকেরা কোমর বন্ধনী বাধার নিয়ম হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মাতার নিকট হতেই শিখেছে। তিনি ওটা বেঁধে ছিলেন যাতে তার পদচিহ্ন মিটিয়ে যায়, ফলে যেন হযরত শারিয়া (রাঃ) তার পদচিহ্ন দেখতে না পান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে এবং তার কলিজার টুকরা একটি মাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে নিয়ে বের হন। সেই সময় এই প্রাণপ্রিয় শিশু দুধ পান করতো। এখন যেখানে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত রয়েছে সে সময় তথায় একটি পাহাড় ছিল এবং বিজন মরুভূমি রূপে পড়েছিল। তখন তথায় কেউই বাস করতো না। এখানে মা ও শিশুকে বসিয়ে তাদের পার্শ্বে সামান্য খেজুর ও এক মশক পানি রেখে যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিট ফিরিয়ে চলে যেতে আরম্ভ করেন, তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বন্ধু! এরকম ভীতিপ্রদ বিজন মরুভূমির মধ্যে যেখানে আমাদের কোন বন্ধু ও সাথী নেই, আমাদেরকে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন উত্তর দেননি, এমনকি ঐ দিকে ফিরেও তাকাননি। হযরত হাজেরা (রাঃ) বারবার বলার পরেও যখন তিনি কোন ক্ষেপ না করেন তখন তিনি বলেন, হে আল্লাহর প্রিয়! আমাদেরকে আপনি কার নিকট সমর্পণ করে গেলেন?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট।' তিনি বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এটা কি আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, 'হা, আমার উপর আল্লাহ তাআলার এটাই নির্দেশ। একথা শুনে হযরত হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনা লাভ করেন এবং বলেন ? তাহলে আপনি যান। আল্লাহ আমাদেরকে কখনও ধ্বংস করবেন না। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করছি এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল।' হযরত হাজেরা (রাঃ) ফিরে আসেন এবং স্বীয় প্রাণের মণি, চক্ষের জ্যোতি, আল্লাহর নবীর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ক্রোড়ে ধারণ করে ঐ জনহীন প্রান্তরে, সেই আল্লাহর জগতে বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে বসে পড়েন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন সানিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন এবং অবগত হন যে, হযরত হাজেরা (রাঃ) পিছনে নেই এবং ওখান হতে এখন পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি কাজ করবে না, তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন :“হে আমার প্রভু! আমার সন্তানাদিকে আপনার পবিত্র ঘরের পার্শ্বে একটি অনাবাদী ভূমিতে ছেড়ে এসেছি। যেন তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করে, আপনি মানুষের অন্তর ওদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং ওদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো প্রার্থনা করে আল্লাহ তাআলার নিদের্শ পালন করতঃ স্বীয় সহধর্মিনী ও ছেলেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে চলে যান, আর এদিকে হযরত হাজেরা (রাঃ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে শিশুকে নিয়েই মনে তৃপ্তি লাভ করছিলেন। ঐ অল্প খেজুর ও সামান্য পানি শেষ হয়ে গেল। এখন কাছে না আছে এক গ্রাস আহার্য বা না আছে এক ঢাকে পানি। নিজেও ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর এবং শিশুও ভুক ও তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। এমন কি সেই নিস্পাপ নবী পুত্রের ফুলের ন্যায় চেহারা মলিন হতে থাকে। মা কখনও নিজের একাকিত্বের ও আশ্রয় হীনতার কথা চিন্তা করছিলেন, আবার কখনও নিজের একমাত্র অবুঝ শিশুর অবস্থা দুশ্চিন্তার সাথে লক্ষ্য করছিলেন এবং সহ্য করে চলছিলেন। এটা জানা ছিল যে, এরকম ভয়াবহ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানুষের গমনাগমন অসম্ভব। বহু মাইল পর্যন্ত আবাদী ভূমির চিহ্নমাত্র নেই। খাবার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিরও ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি উঠে চলে যান। নিকটবর্তী, সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন এবং প্রান্তরের এ নিক্ষেপ করেন যে, কোন লোককে যেতে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু দৃষ্টি নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি সেই পাহাড় হতে নেমে পড়েন এবং অঞ্চল উঁচু করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করেন। ওর উপর চড়েও চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় সেখান হতে অবতরণ করেন। এভাবেই মধ্যবর্তী সামান্য অংশ দৌড়িয়ে অবশিষ্ট অংশ তাড়াতাড়ি অতিক্রম করেন। আবার সাফা পাহাড়ের উপর চড়েন। এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, প্রত্যেক বার শিশুকে দেখেন যে, তার অবস্থা ক্রমে ক্রমেই মন্দের দিকে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাজীরা যে, ‘সাফা' ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়িয়ে থাকেন তার সূচনা এখান থেকেই হয়। সপ্তম বারে যখন হাজেরা (রাঃ) মারওয়ার উপর আসেন তখন একটা শব্দ তার কানে আসে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি এই শব্দের দিকে মনোযোগ দেন। আবার শব্দ তার কানে আসে এবং এবারে স্পষ্টভাবে শুনা যায়। সুতরাং তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান এবং এখন যেখানে যমযম কূপ রয়েছে তথায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দেখতে পান। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কে? তিনি উত্তর দেনঃ আমি হাজেরা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ছেলের মা। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আপনাকে এই নির্জন মরুপ্রান্তরে কার নিকট সপর্দ করেছেন?' তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট। তখন ফেরেশতা বলেনঃ “তা হলে তিনিই যথেষ্ট। হযরত হাজেরা (রাঃ) বলেন, “হে অদৃশ্য ব্যক্তি! শব্দ তো আমি শুনলাম। এটা আমার কোন কাজে আসবে তো?'যমযম্ কূপহযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটির উপর ঘর্ষণ করা মাত্রই তথায় মাটি হতে একটি ঝরণা বইতে থাকে। হযরত হাজেরা (রাঃ) তার হাত দ্বারা পানি উঠিয়ে তার মশক ভর্তি করে নেন। পানি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়বে এ চিন্তা করে ঝরণার চার দিকে মাটির বেষ্টনি দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের উপর সদয় হউন, যদি তিনি এভাবে পানি আটকিয়ে না রাখতেন তবে যম কূপের আকার বিশিষ্ট হতো না, বরং প্রবাহিত নদীর রূপ ধারণ করতো। তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) নিজেও পানি পান করেন এবং শিশুকেও পান করিয়ে দেন। অতঃপর শিশুকে দুধ পান করাতে থাকেন। ফেরেশতা তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ধ্বংস করবেন মহান আল্লাহ এখানে এ ছেলে ও তার পিতার দ্বারা তাঁর একটা ঘর নির্মাণ করাবেন।' হযরত হাজেরা (রাঃ) এখানেই বাস করতে থাকেন, যম্ম্ কূপের পানি পান করেন আর শিশুর মাধ্যমে মনোরঞ্জন লাভ করেন। বর্ষাকালে বন্যার পানিতে চার দিকে প্লাবিত হয়ে যেতো। কিন্তু এই জায়গাটি উচু ছিল বলে পানি এ দিক ওদিক দিয়ে বয়ে যেতো এবং এ স্থানটি নিরাপদ থাকতো। জনহীন উপত্যকায় ‘জারহাম' গোত্রের আগমনকিছুদিন পর ঘটনাক্রমে ‘জারহাম’ গোত্রের লোক ‘কিদার’ পথে যাচ্ছিল। তারা মক্কা শরীফের নিম্নাংশে অবতরণ করে। একটি পানির পক্ষীর প্রতি তাদের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হওয়ায় তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ এটা পানির পাখি এবং এখানে পানি ছিল না আমরা কয়েকবার এখান দিয়ে যাতায়াত করেছি। এটাতো শুষ্ক জঙ্গল ও জনহীন প্রান্তর। এখানে পানি কোথায়? তারা প্রকৃত ঘটনা জানবার জন্যে লোকে পাঠিয়ে দেয়। তারা ফিরে এসে সংবাদ দেয় যে, তথায় বহু পানি রয়েছে। তখন তারা সবাই চলে আসে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট আরয করেঃ আপনি অনুমতি দিলে আমরাও এখানে অবস্থান করি। এটা পানির জায়গা।' তিনি বলেনঃ ‘হা, ঠিক আছে। আপনারা সাগ্রহে অবস্থান করুন। কিন্তু পানির উপর অধিকার আমারই থাকবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গী সাথী জুটে যাক, হযরত হাজেরা (রাঃ) তো তাই চাচ্ছিলেন। সুতরাং এই যাত্রী দল এখানেই বাস করতে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হন। ঐ সব লোকের সাথে তাঁর খুবই ভালুবাসা হয়। অবশেষে তিনি যৌবন প্রাপ্ত হন এবং তাদের মধ্যে তার বিয়েও অনুষ্ঠিত হয়। তাদের কাছে তিনি আরবী ভাষা শিখে নেন। হযরত হাজেরা (আঃ) এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রিয় পুত্রের সাথে প্রথম সাক্ষাৎমহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তথায় আগমন করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁর এ যাতায়াত বুরাকের (স্বর্গীয় বাহন) মাধ্যমে হতো। সিরিয়া হতে তিনি আসতেন এবং আবার ফিরে যেতেন। এখানে এসে তিনি দেখেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়িতে নেই। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সে কোথায় রয়েছে? উত্তর আসেঃ তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের অবস্থা কি?' সে বলেঃ ‘অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।' তিনি বলেনঃ * তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে,সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।' হযরত যাবীহুল্লাহ (আ) ফিরে এসে যেন তিনি কোন মানব আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি? স্ত্রী বলে, “হাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন। তার পরে জিজ্ঞেস করেন, দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে' আমি বলি যে, “আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন অবস্থায় দিন যাপন করছি।” হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলেনঃ ‘আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি? স্ত্রী বলেঃ হাঁ, বলেছেন যে, যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা। তিনি যা বলে গেছেন তার ভাবার্থ এই যে, (যেহেতু তুমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে) আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। যাও, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। তাকে তালাক দিয়ে তিনি ঐ গোত্রেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন।দ্বিতীয় বার সাক্ষাতের চেষ্টাকিছুদিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে পুনরায় এখানে আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল যাবিহুল্লাহর (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন। পুত্রবধূ বলেঃ আপনি বসুন যা কিছু হাজির রয়েছে তাই আহার করুন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ বলতো তোমাদের দিন যাপন কিভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কিরূপ? উত্তর আসেঃ “আলহামদু লিল্লাহ! আমরা ভালই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ 'তোমাদের আহার্য কি? উত্তর আসেঃ ‘গোশত।' জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা পান কর কি?” উত্তর হয়ঃ ‘পানি।' তিনি প্রার্থনা করেন, হে প্রভু! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি শস্য তাদের নিকট থাকতো এবং তারা এটা বলতো তবে হযরত ইবরাহীম খালীল (আঃ) তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিন যাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যে, সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে। এর পরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেনঃ উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি (তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারিণী)। আবার কিছু দিন পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করে এখানে আসেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যমযম কূপের পাশ্বে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে দেখা মাত্রই আদবের সাথে দাড়িয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।কাবা শরীফের নতুন নির্মাণপিতা-পুত্রের মিলন হলে ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।' তিনি বলেনঃ “যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।' তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।' তিনি আরয করেনঃ “আমি হাযির আছি আব্বা!” তিনি বলেনঃ “এ স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।' তিনি বলেনঃ “খুব ভাল কথা, আব্বা!, এখন পিতা ও পুত্র মিলে বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং উঁচু করতে আরম্ভ করেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পাথর এনে দিতেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তা দিয়ে দেয়াল গাঁথতে থাকতেন। দেয়াল কিছুটা উঁচু হলে হযরত যাবিহুল্লাহ (আঃ) এই পাথরটি অর্থাৎ মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি নিয়ে আসেন। ঐ উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা শরীফের পাথর রাখতেন এবং পিতা-পুত্র উভয়ে এই দু'আ করতেনঃ ‘প্রভু হে! আপনি আমাদের এই নগণ্য খিদমত ককূল করুন, আপনি শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।' এই বর্ণনাটি অন্যান্য হাদীসের কিতাবেও রয়েছে। কোথাও বা সংক্ষিপ্তভাবে এবং কোথাও বা বিস্তারিতভাবে। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে এটাও রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী হন তখন তিনি তাঁর মাথার উপরে মেঘের মত একটি জিনিস লক্ষ্য করেন। ওর মধ্য হতে শব্দ আসছিলঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! যত দূর পর্যন্ত এই মেঘের ছায়া রয়েছে তত দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি তুমি বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নাও। কম বেশী যেন না হয়। ঐ বর্ণনায় এও আছে যে,বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ছেড়ে চলে আসেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটিই সঠিক। আর এভাবেই সামঞ্জস্য হতে পারে যে, পূর্বে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু নির্মাণ করেছিলেন পরে, এবং নির্মাণ কার্যে পিতা-পুত্র উভয়েই অংশ নিয়েছিলেন। যেমন কুরআনের শব্দগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে। হযরত আলী (রাঃ) বায়তুল্লাহ নির্মাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন যে, ঐ ঘর কোথায় নির্মাণ করতে হবে এবং কত বড় করতে হবে ইত্যাদি। তখন ‘সাকীনা অবতীর্ণ হয় এবং তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, যেখানেই ওটা থেমে যাবে সেখানেই ঘর নির্মাণ করতে হবে। এবার ঘরের নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। হাজরে আসওয়াদের নিকট পৌছলে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে বলেনঃ বৎস! কোন ভাল পাথর খুঁজে নিয়ে এসো।' তিনি ভাল পাথর খুঁজে আনেন। এসে দেখেন যে,তার আব্বা অন্য পাথর তথায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আব্বা! এটা কে এনেছে?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ পাথর খানা আকাশ হতে নিয়ে এসেছেন। হযরত কা'বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, এখন যেখানে বায়তুল্লাহ রয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তথায় পানির উপর বুন্ধুদের সাথে ফেনা হয়েছিল, এখান হতেই পৃথিবী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, কাবা ঘর নির্মাণের জন্য হযরত ইবরাহীম (আঃ) আরমেনিয়া হতে এসেছিলেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) হাজরে আসওয়াদ' ভারত হতে এনেছিলেন। সেই সময় ওটা সাদা চকচকে ‘ইয়াকুত' (মণি) ছিল। হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে জান্নাত হতে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মানুষের পাপপূর্ণ হস্ত স্পর্শের ফলে ওটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এক বর্ণনায় এটাও রয়েছে। যে, এর ভিত্তি পূর্ব হতেই বিদ্যমান ছিল। ওর উপরেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ কার্য আরম্ভ করেন। মুসনাদে আবদুর রাযযাকের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেছিলেন। সেই সময় তার দেহ দীর্ঘ ছিল। পৃথিবীতে আগমনের পর ফেরেশতাদের তসবীহ, নামায দু’আ ইত্যাদি শুনতে পেতেন। যখন দেহ খাটো হয়ে যায় এবং ঐ সব ভাল শব্দ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তাঁকে মক্কার দিকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি মক্কার দিকে যেতে থাকেন। যেখানে যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়ে সেখানে সেখানে জনবসতি স্থাপিত হয়। এখানে আল্লাহ তা'আলা বেহেশত হতে একটি ইয়াকুত অবতীর্ণ করেন এবং বায়তুল্লাহর স্থানে রেখে দেন, আর ঐ স্থানকেই স্বীয় ঘরের জায়গা হিসাবে নির্ধারণ করেন। হযরত আদম (আঃ) এখানে তওয়াফ করতে থাকেন এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। হযরত নূহ (আঃ)-এর প্লাবনের যুগে এটা উঠে যায় এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যুগে পুনরায় নির্মাণ করিয়ে নেন। হযরত আদম (আঃ) এ ঘরটিকে হেরা, তুর, যীতা, ভূরে সাইনা এবং জুদী এই পাঁচটি পাহাড় দ্বারা নির্মাণ করেন। কিন্তু এই সমুদয় বর্ণনার মধ্যেই স্পষ্টভাবে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে,পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে বায়তুল্লাহর নির্মাণ করা হয়েছিল। বায়তুল্লাহর চিহ্ন ঠিক করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে গিয়েছিলেন। সেই সময় এখানে বন্য বৃক্ষাদি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহু দূরে আমালিক সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এখানে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তার মাকে একটি কুঁড়ে ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বায়তুল্লাহর চারটি স্তম্ভ আছে এবং সপ্তম জমি পর্যন্ত তা নীচে গিয়েছে। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যুলকারনাইন যখন এখানে পৌঁছেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করতে দেখেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি এটা কি করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে আমি তার ঘর নির্মাণ করছি।' যুলকারনাইন। জিজ্ঞেস করেন :এর প্রমাণ কি আছে?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এই নেকড়ে বাঘগুলো সাক্ষ্য দিবে।' পাঁচটি নেকড়ে বাঘ বলেঃ আমার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এরা দুজন নির্দেশ প্রাপ্ত। যুলকারনাইন এতে খুশী হন এবং বলেনঃ “আমি মেনে নিলাম।' ‘আরযাকীর তারীখ-ই মক্কানামক পুস্তকে রয়েছে যে, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সঙ্গে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভিত্তি। এটা (আরবি)শব্দের বহুবচন। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় (আরবি) (২৪:৬০)ও এসেছে। এরও এক বচন হচ্ছে (আরবি) হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ তুমি কি দেখছো না যে, তোমার গোত্র যখন বায়তুল্লাহ নির্মাণ করে, তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি হতে ছোট করে দেয়। আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি ওটা বাড়িয়ে দিয়ে মূল ভিত্তির উপর করে দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘তোমার কওম যদি নতুন ইসলাম গ্রহণকারী না হতো এবং তাদের কুফরীর যুগ যদি নিকটে না থাকতো তবে আমি তাই করতাম।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) এ হাদীসটি জানার পর বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কারণেই ‘হাজরে আসওয়াদের পার্শ্ববর্তী দুটি স্তম্ভকে স্পর্শ করতেন না। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা! যদি তোমার কওমের অজ্ঞতার যুগ নিকটে না হতো তবে আমি অবশ্যই কাবার ধনাগারকে আল্লাহর পথে দান করে দিতাম এবং দরজারকে ভূমির সাথে লাগিয়ে দিতাম এবং ‘হাতীম'কে বায়তুল্লাহর মধ্যে ভরে দিতাম।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এর দ্বিতীয় দরজাও করতাম, একটি আসবার জন্যে এবং অপরটি যাবার জন্যে। ইবনে যুবাইর (রাঃ) তাঁর খিলাফতের যুগে এরকমই করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'আমি একে ভেঙ্গে দিতাম এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি একটি পূর্বমুখী করতাম এবং একটি পশ্চিমমুখী করতাম এবং ৬ হাত হাতীম’কে এর মধ্যে ভরে দিতাম যাকে কুরাইশরা এর বাইরের করে দিয়েছে। নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে কুরাইশরা নতুনভাবে কা'বা ঘর নির্মাণ করেছিল। এই নির্মাণ কার্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) শরীক ছিলেন। যখন তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর, সেই সময় করাইশরা কা'বা শরীফকে নতুনভাবে নির্মাণ করার ইচ্ছে করে। কারণ ছিল এই যে, এর দেয়াল ছিল খুব ছোট এবং ছাদও ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, বায়তুল্লাহর ধনাগার চুরি হয়ে গিয়েছিল, যা ঐ ঘরের মধ্যে একটি গভীর গর্তে রক্ষিত ছিল। এই চোরাই মাল খাযায়েমা গোত্রীয় বানী মালীহ্ বিন আমরের ক্রীতদাস দুয়ায়েক' নামক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভবতঃ চোরেরা ঐ মাল তার ওখানে রেখেছিল। যাহোক, এই চুরির অপরাধে দুয়ায়েকের হাত কেটে দেয়া হয়। তাছাড়া এই ঘর নির্মাণের ব্যাপারে তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিরাট সুযোগ লাভ করেছিল। তা এই যে, রোম রাজ্যের বণিকদের একটি নৌকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জিদ্দার ধারে এসে লেগে যায়। ঐ নৌকায় বহু মূল্যবান কাঠ বোঝাই করা ছিল। এই কাঠগুলো কাবা ঘরের ছাদের কাজে লাগতে পারে এই চিন্তা করে কুরাইশরা ঐ কাঠগুলো কিনে। নেয় এবং কিবতী গোত্রের একজন ছুতারকে কাবার ছাদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করে। এসব প্রস্তুতিতো চলছিল বটে কিন্তু বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে দিতে তারা ভয় পাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলার ইঙ্গিতে এরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। বায়তুল্লাহর কোষাগারে একটি সাপ ছিল। যখনই কোন লোক ওর নিকটে যেতো তখনই সে হাঁ করে তার দিকে বাধিত হতো। এই সর্পটি প্রত্যহ ঐ গর্ত হতে বেরিয়ে বায়তুল্লাহর দেয়ালে এসে বসে থাকতো। একদা ঐ সাপটি ওখানে বসেই ছিল। এমন সময় আল্লাহ তা'আলা একটা বিরাট পাখী পাঠিয়ে দেন। পাখীটি সাপটিকে ধরে নিয়ে উড়ে যায়। কুরাইশরা এবার বুঝতে পারলো যে, তাদের ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার অনুরূপই হয়েছে। কারণ, কাঠও তারা পেয়ে গেছে, মিস্ত্রীও তাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে এবং সাপকেও আল্লাহ তাআলা সরিয়ে দিয়েছেন। এবার তারা কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে নতুনভাবে নির্মাণ করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে।কা'বা শরীফ নির্মাণ ও অদৃশ্য ইঙ্গিতসর্বপ্রথম ইবনে অহাব নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কাবা শরীফের একটি পাথর নামিয়ে নেয়, কিন্তু পাথরখানা তার হাত হতে উড়ে গিয়ে পুনরায় স্বস্থানে বসে যায়। সে সমস্ত কুরাইশকে সম্বোধন করে বলেঃ ‘শুনে রেখো! আল্লাহর ঘর নির্মাণ কার্যে সবাই যেন নিজ নিজ উত্তম ও পবিত্র মালই খরচ করে। এতে ব্যভিচার দ্বারা উপার্জিত সম্পদ সূদের টাকা এবং অত্যাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লাগানো চলবে না। কেউ কেউ বলেন যে, এ পরামর্শ দিয়েছিল ওলীদ বিন মুগীরা নামক ব্যক্তি। এখন বায়তুল্লাহ নির্মাণের অংশ গোত্র সমূহের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, দরজার অংশ নির্মাণ করবে বানু আবদ-ই-মানাফ ও জুহরা গোত্র, হাজরে আসওয়াদ' ও রুকনে ইয়ামানীর অংশ নির্মাণ করবে বানু মাখযুম গোত্র এবং কুরাইশের অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের সঙ্গে কাজ করবে, কা'বা শরীফের পিছনের অংশ নির্মাণ করবে বানু হামীহ্ ও সাহাম' গোত্র এবং হাতীমের পার্শ্ববর্তী অংশ নির্মাণ করবে আবদুদ্দার বিন কুসাই, বানু আসাদ বিন আবদুল উযযা ও বানু আদী বিন কা'ব। এটা নির্ধারণ করার পর পূর্ব নির্মিত ইমারত ভাঙ্গার জন্যে তারা অগ্রসর হয়। কিন্তু প্রথমে ভাঙ্গতে কেউই সাহস করে না। অবশেষে ওলীদ বিন মুগীরা বলেঃ আমিই আরম্ভ করছি।' এ বলে সে কোদাল নিয়ে উপরে উঠে যায় এবং বলে ‘হে আল্লাহ! আপনি খুবই ভাল জানেন যে, আমাদের ইচ্ছা খারাপ নয়, আমরা অপনার ঘর ধ্বংস করতে চাইনে বরং ওটাকে উন্নত করার চিন্তাতেই আছি।' একথা বলে সে দুটি স্তম্ভের দু'ধারের কিছু অংশ ভেঙ্গে দেয়। অতঃপর কুরাইশরা বলেঃ ‘এখন ছেড়ে দাও। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি এ ব্যক্তির উপর কোন শাস্তি নেমে আসে তবে তো এ পাথর ঐ স্থানেই রেখে দেয়া হবে এবং আমাদেরকে একাজ হতে বিরত থাকতে হবে। আর যদি কোন শাস্তি না আসে তবে বুঝে নিতে হবে যে, এটা ভেঙ্গে দেয়া আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ নয়। সুতরাং আগামীকাল আমরা সবাই মিলে এ কাজে লেগে যাবো।' অতঃপর সকাল হয় এবং সবদিক দিয়েই মঙ্গল পরিলক্ষিত হয়। তখন সবাই এসে বায়তুল্লাহ শরীফের পূর্ব ইমারত ভেঙ্গে দেয়। অবশেষে তারা পূর্ব ভিত্তি অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এখানে সবুজ বর্ণের পাথর ছিল এবং যেন একটির সঙ্গে অপরটির সংযোগ ছিল। একটি লোক দুটি পাথরকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ওতে এতো জোরে কোদাল মারে যে, ওটা আন্দোলিত হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত মক্কা ভূমি আন্দোলিত হয়ে উঠে। তখন জনগণ বুঝতে পারে যে, পাথরগুলোকে পৃথক করে ওর স্থানে অন্য পাথর লাগানো আল্লাহ তা'আলার নিকট গৃহীত নয়। কাজেই ওটা তাদের শক্তির বাইরের কাজ। সুতরাং তারা ঐ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ঐ পাথরগুলোকে ঐভাবেই রেখে দেয়। এর পর প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ অংশ অনুযায়ী পাথর সংগ্রহ করে এবং প্রাসাদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়।অবশেষে তারা হাজরে আসওয়াদ' রাখার স্থান পর্যন্ত পৌছে যায়। এখন প্রত্যেক গোত্রই এই মর্যাদায় অংশ নিতে চায়। সুতরাং তারা পরস্পরে ঝগড়া:বিবাদ করতে থাকে, এমনকি নিয়মিতভাবে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। বানু আব্দুদ্দার' এবং বানু আদী’ রক্তপূর্ণ একটি পাত্রে হাত ডুবিয়ে শপথ করে বলেঃ আমরা সবাই কেটে গিয়ে মারা পড়বো এটাও ভাল তথাপি হাজরে আসওয়াদ' কাউকেও রাখতে দেব না।' এভাবেই চার পাঁচ দিন কেটে যায়। অতঃপর কুরাইশরা পরস্পর পরামর্শের জন্যে মসজিদে একত্রিত হয়। আবু উমাইয়া বিন মুগীরা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়ষ্ক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। সে সকলকে সম্বোধন করে বলে, হে জনমণ্ডলী! তোমরা কোন একজনকে সালিশ নির্বাচিত কর এবং সে যা ফয়সালা করে তাই মেনে নাও। সালিশ নির্বাচনের ব্যাপারেও মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, সুতরাং তোমরা এ কাজ কর যে, এখানে সর্বপ্রথম যে সমজিদে প্রবেশ করবে সেই আমাদের সালিশ নির্বাচিত হবে। এ প্রস্তাব সবাই সমর্থন করে। সর্বপ্রথম কে প্রবেশ করে এটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষমান থাকে।‘হাজরে আসওয়াদ' ও আরবের আমীনের (সঃ) মধ্যস্থতাসর্বপ্রথম যিনি আগমন করেন তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তাকে দেখা মাত্রই এসব লোক খুশী হয়ে যায় এবং বলেঃ “তার মধ্যস্থতা আমরা মেনে নিতে রাজী আছি। ইনি তো আমীন! ইনি তো মুহাম্মদ (সঃ)! অতঃপর তারা সবাই তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তিনি বলেনঃ আপনারা একটি বড় ও মোটা চাদর নিয়ে আসুন। তারা তা নিয়ে আসে। তিনি ‘হাজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে এনে স্বহস্তে ঐ চাদরে রেখে দেন এবং বলেনঃ ‘প্রত্যেক গোত্রের নেতা এসে এই চাদরের কোণ ধরে নিন এবং এভাবেই আপনারা সবাই হাজরে আসওয়াদ উঠাবার কাজে শরীক হয়ে যান।' একথা শুনে সমস্ত লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং সমস্ত গোত্রপ্রধান চাদরটি উত্তোলন করে। যখন ওটা রাখার স্থানে পৌছে তখন আল্লাহর নবী (সঃ) ওটা স্বহস্তে উঠিয়ে নিয়ে ওর স্থানে রেখে দেন। এভাবে সেই ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিমেষের মধ্যেই মিটে যায়। আর এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলের (সঃ) হাতে তাঁর ঘরে ঐ বরকতময় পাথরটি স্থাপন করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াহী আসার পূর্বে কুরাইশরা তাঁকে ‘আমীন’ বলতো। এখন উপরের অংশ নির্মিত হয়। এভাবে মহান আল্লাহর ঘরের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগে কা’বা আঠারো হাত লম্বা ছিল। ইয়েমেন দেশীয় ‘কবা’ পর্দা তার উপর চড়ান হতো। পরে ওর উপর চাদর চড়ান হতে থাকে। সর্বপ্রথম হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর রেশমী পর্দা উত্তোলন করেন। কাবা শরীফের এই ইমারতই থাকে। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের (রাঃ) খিলাফতের প্রাথমিক যুগে ষাট বছর পরে এখানে আগুনে লেগে যায়। এর ফলে কা'বা শরীফ পুড়ে যায়। এটা ছিল ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার রাজত্বের শেষ কাল এবং সে ইবনে যুবাইর (রাঃ) কে মক্কায় অবরোধ করে রেখেছিল। কাবা শরীফের ইমারত এবং তার বিভিন্ন যুগের আবর্তনএই সময়ে মক্কার খলীফা হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) স্বীয় খালা হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) নিকট যে হাদীসটি শুনেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনের কথা অনুযায়ী বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর তিনি ওটা নির্মাণ করেন। হাতীমকে ভিতরে ভরে নেন। পূর্ব ও পশ্চিমে দু'টি দরজা রাখেন। একটি ভিতরে আসার জন্য, অপরটি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। দরজা দু’টি মাটির সমান করে রাখেন। তাঁর শাসনামল পর্যন্ত কা'বা এরূপই থাকে। অবশেষে তিনি যালিম হাজ্জাজের হাতে শহীদ হন। তখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশক্রমে হাজ্জাজ কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে পুনরায় পূর্বের মত করে নির্মাণ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, ইয়াযিদ বিন মু'আবিয়ার যুগে যখন সিরিয়াবাসী মক্কা শরীফের উপর আক্রমণ করে এবং যা হবার তা হয়ে যায়, সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বায়তুল্লাহ শরীফকে এরূপ অবস্থাতেই রেখে দেন। হজ্বের মৌসুমে জনগণ একত্রিত হয়। তারা সব কিছু স্বচক্ষে দেখে। এরপুরে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করেনঃ কা'বা শরীফকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে কি নতুনভাবে নির্মাণ করবো, না কি ভাঙ্গা যা আছে তাকেই মেরামত করব? তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার মতে ভাঙ্গাকেই আপনি মেরামত করে দিন, বাকিগুলো পুরাতনই থাক।' তখন তিনি বলেনঃ ‘আচ্ছা বলুন তো, যদি আমাদের কারও বাড়ি পুড়ে যেতো তবে কি সে নতুন বাড়ি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতো? তাহলে মহাসম্মানিত প্রভুর ঘর সম্পর্কে এরূপ মত পেশ করেন কেন? আচ্ছা তিন দিন পর্যন্ত আমি ইস্তেখারা (লক্ষণ দেখে শুভ বিচার) করবে, তার পরে যা বুঝবো তাই করবো।' তিন দিন পরে তাঁর মত এই হলো যে, অবশিষ্ট দেয়ালও ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে। সুতরাং তিনি এই নির্দেশ দিয়ে দেন।কিন্তু কা'বা শরীফ ভাঙ্গতে কেউই সাহস করছিল না। তারা ভয় করছিল যে, যে ব্যক্তি ভাঙ্গার জন্যে চড়বে তার উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হবে। কিন্তু একজন সাহসী ব্যক্তি উপরে চড়ে গিয়ে একটি পাথর ভেঙ্গে দেয়। অন্যেরা যখন দেখে যে, তার কোন ক্ষতি হলো না তখন তারা সবাই ভাঙ্গতে আরম্ভ করে দেয়। এবং ভূমি পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে দেয়। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) চারদিকে স্তম্ভ দাঁড় করিয়ে দেন এবং ওর উপর পর্দা করে দেন। এবারে বায়তুল্লাহ নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) বলেন, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিটক হতে আমি শুনেছি তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“যদি লোকদের কুফরীর সময়টা নিকটে না হতো এবং আমার নিকট নির্মাণের খরচা থাকতো তবে আমি হাতীম' থেকে পাঁচ হাত পর্যন্ত বায়তুল্লাহর মধ্যে নিয়ে নিতাম এবং কা'বার দুটি দরজা করতাম, একটা আসবার দরজা এবং অপরটি বের হওয়ার দরজা।' হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “এখন আর জনগণের কুফরীর যুগ নিকটে নেই, তাদের ব্যাপারে ভয় দূর হয়ে গেছে এবং কোষাগারও পূর্ণ রয়েছে, আমার নিকট যথেষ্ট অর্থ রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনোবাসনা পূর্ণ না করার আমার আর কোন কারণ থাকতে পারে না। সুতরাং তিনি পাঁচ হাত ‘হাতীম' ভিতরে নিয়ে নেন। তখন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তি প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণ তা স্বচক্ষে দেখে নেয়। এরই উপর দেয়াল গাথা হয়। বায়তুল্লাহ শরীফের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো হাত। এখন আরও পাঁচ হাত বৃদ্ধি পায়, ফলে ছোট হয়ে যায়, এজন্যে দৈর্ঘ্যের আর দশ হাত বেড়ে যায়। দু'টি দরজা নির্মিত হয়। একটি ভিতরে আসবার এবং অপরটি বাইরে যাবার। হযরত ইবনে যুবাইরের (রাঃ) শাহাদাতের পর হাজ্জাজ আবদুল মালিকের নিকট পত্র লিখেন এবং তার পরামর্শ চান যে, এখন কি করা যায়? এটাও লিখে পাঠান যে, ঠিক হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর যে কাবা শরীফ নির্মিত হয়েছে এটা মক্কা শরীফের সুবিচারকগণ স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু আবদুল মালিক উত্তর দেনঃ দৈর্ঘ্য ঠিক রাখ কিন্তু হাতীমকে বাইরে করে দাও এবং দ্বিতীয় দরজাটি বন্ধ করে দাও।' হাজ্জাজ আবদুল মালিকের এই নির্দেশক্রমে কাবাকে তেঙ্গে দিয়ে পূর্বের ভিত্তির উপরে নির্মাণ করেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর ভিত্তিকে ঠিক রাখাই সুন্নাতের পন্থা ছিল। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাসনা তো এই ছিল। কিন্তু সেই সময় তার এই ভয় ছিল যে, মানুষ হয়তো খারাপ ধারণা করে বসবে। কারণ তারা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আবদুল মালিক বিন মারওয়ান এ হাদীসটি জানতেন না। এজন্যেই তিনি ওটা ভাঙ্গিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি হাদীসটি জানতে পারেন তখন তিনি দুঃখ করে বলেনঃ ‘হায়! যদি আমি ওটাকে ভেঙ্গে পূর্বাবস্থাতেই রাখতাম।'সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হারিস বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) যখন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের খিলাফত কালে তাঁর নিকট প্রতিনিধি রূপে গমন করেন তখন আবদুল মালিক তাকে বলেন, আমি ধারণা করি যে, আবু হাবীব অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এ হাদীসটি (তার খালা) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেননি। তখন হযরত হারিস বিন উবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ ‘অবশ্যই তিনি শুনেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে স্বয়ং আমিও শুনেছি।' আবদুল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কি শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ “আমি শুনেছি-তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আয়েশা! তোমার কওম’ বায়তুল্লাহকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। যদি তোমার সম্প্রদায়ের শিরকের যুগ নিকটে না হতো তবে নতুনভাবে আমি এর কমতি পূরণ করতাম। এসো, আমি তোমাকে এর প্রকৃত ভিত্তি দেখিয়ে দেই, হয়তো তোমার গোত্র আবার একে এর প্রকৃত ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে পারে। অতঃপর তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কে প্রায় সাত হাত দেখিয়ে দেন এবং বলেনঃ “আমি এর দু’টি দরজা নির্মাণ করতাম, একটি আগমনের ও অপরটি প্রস্থানের; এবং দরজা দু'টি মাটির সমান করে রাখতাম। একটি রাখতাম পূর্বমুখী এবং অপরটি রাখতাম পশ্চিমমুখী। তুমি কি জান যে, তোমার কওম' দরজাকে এত উঁচু করে রেখেছে কেন? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, শুধুমাত্র নিজেদের মর্যাদা প্রকাশের জন্যে। যাকে চাইবে প্রবেশ করতে দেবে এবং যাকে চাইবে না প্রবেশ করতে দেবে না। যখন লোক ভিতরে যেতে চাইতো তখন তারা তাকে উপর হতে ধাক্কা দিতো ফলে সে পড়ে যেতো। আর যাকে তারা প্রবেশ করাবার ইচ্ছে করতো তাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতো।' আবদুল মালিক তখন বলেনঃ “হে হারিস! আপনি কি স্বয়ং এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ’ আমি স্বয়ং শুনেছি। তখন আবদুল মালিক কিছুক্ষণ ধরে লাঠির উপর ভর দিয়ে চিন্তা করেন। অতঃপর বলেনঃ যদি আমি একে ঐ রকমই রেখে দিতাম! সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে আছে যে, আবদুল মালিক বিন মারওয়ান একবার বায়তুল্লাহ তওয়াফ করার সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) কে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, তিনি এ হাদীসটির ব্যাপারে হযরত আয়েশার (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন।' তখন হযরত হারিস (রাঃ) তাকে বাধা দেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, তিনি সত্যবাদীই ছিলেন। আমিও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই হাদীসটি শুনেছি। তখন আবদুল মালিক আফসোস করে বলেনঃ “আমি পূর্ব হতে অবগত থাকলে কখনও ভাঙ্গতাম না।' কাযী আইয়া এবং ইমাম নববী (রঃ) লিখেছেন যে, খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে (রঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আমি কা'বা শরীফকে পুনরায় ইবনে যুবাইর (রাঃ) কর্তৃক নির্মিত আকারে নির্মাণ করে দেই এর কি আপনি অনুমতি দিচ্ছেন?' ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, আপনি এরূপ করবেন না। কারণ এর ফলে হয়তো পবিত্র কাবা বাদশাহদের খেলনায় পরিণত হবে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত ওটাকে ভাঙ্গতে থাকবে।' খলীফা হারুনুর রশীদ তখন তার এই সংকল্প হতে বিরত থাকেন। এটাই সঠিকও মনে হচ্ছে যে, কা'বা শরীফকে বার বার ভেঙ্গে দেয়া উচিত নয়। কাবা শরীফের ধ্বংসলীলাসহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কা'বাকে দু'টি ছোট পা (পায়ের গোছা) বিশিষ্ট একজন হাবশী ধ্বংস করবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি, সেই কৃষ্ণবর্ণের (হাবশী) এক একটি পাথরকে পৃথক পৃথক করে দেবে, ওর আবরণ নিয়ে যাবে এবং এর অর্থ সম্পদও ছিনিয়ে নেবে। সে বাঁকা হাত-পা বিশিষ্ট ও টেকো মাথাওয়ালা হবে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, সে কোদাল মেরে মেরে টুকরো টুকরো করতে রয়েছে। খুব সম্ভব এই দুঃখজনক ঘটনা ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরে ঘটবে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার পরও তোমরা বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্ব ও উমরাহ করবে।' হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাদের প্রার্থনায় বলেছেনঃ “আমাদেরকে মুসলমান করে নিন। অর্থাৎ আমাদেরকে অকৃত্রিম, অনুগত, একত্ববাদী করে নিন এবং আমাদেরকে অংশীবাদী ও রিয়াকারী হতে রক্ষা করুন এবং আমাদিগকে নম্র ও বিনয়ী করুন।' হযরত সালাম বিন মুতী (রঃ) বলেন যে, তারা মুসলমান তো ছিলেনই, কিন্তু এখন ইসলামের উপর দৃঢ় ও অটল থাকার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। এর উত্তরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন (আরবি) অর্থাৎ আমি তোমাদের এই প্রার্থনা কবুল করলাম। আবার তাঁরা তাঁদের সন্তানাদির জন্যে এ দু’আই করছেন এবং তা ককূলও হচ্ছে। বানী ইসরাঈল ও আরব উভয়েই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি দল হক ও ইনসাফের উপর ছিল।' (৭:১৫৯) কিন্তু রচনা রীতি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ প্রার্থনা আরবের জন্যই, যদিও সাধাণভাবে অন্যেরাও জড়িত রয়েছে। কেননা, এই প্রার্থনার পরে অন্য প্রার্থনায় রয়েছে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন এই রাসূল দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে বুঝান হয়েছে। এ প্রার্থনাও গৃহীত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তিনিই এমন যিনি নিরক্ষরদের মধ্য তাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।' (৬২:২) কিন্তু এর দ্বারা তাঁর রিসালাত কারও জন্য বিশিষ্ট হচ্ছে না বরং তাঁর রিসালাত সাধারণ। আরব অনারব সবার জন্যেই তিনি রাসূল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল, হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।' (৭:১৫৮) এ দুজন নবীর প্রার্থনার মত প্রত্যেক খোদা ভীরু লোকেরই প্রার্থনা হওয়া উচিত। যেমন পবিত্র কোরআন মুসলমানকে দু'আ শিখিয়ে দিচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রীগণ এবং আমাদের সন্তানবর্গ হতে চক্ষের শীতলতা (শান্তি) দান করুন এবং আমাদেরকে খোদা ভীরু লোকদের ইমাম বানিয়ে দিন।' (২৫:৭৪) এটাও আল্লাহ তা'আলার প্রেমের দলীল যে, মানুষ কামনা করবে তার মৃত্যুর পরে তার ছেলেরাও যেন আল্লাহ তা'আলার উপাসনায় রত থাকে। অন্য জায়গায় প্রার্থনার শব্দ রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা হতে রক্ষা করুন। (১৪:৩৫) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'মানুষ মরে যাওয়া মাত্র তার কার্যাবলী শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। (১) সাদকাহ, (২) ইলম, যদ্বারা উপকার লাভ করা হয়, (৩) সৎ সন্তান, যারা প্রার্থনা করে (সহীহ মুসলিম)। তার পরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে হজুরে আহকাম শিখিয়ে দিন। কাবা শরীফের ইমারত পূর্ণ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে নিয়ে ‘সাফা' পর্বতে আসেন, অতঃপর মারওয়া পর্বতে যান এবং বলেন যে এগুলোই হচ্ছে আল্লাহর স্মৃতি নিদর্শন। অতঃপর তাঁকে মিনার দিকে নিয়ে যান। উকবাহ’র উপরে একটি গাছের পার্শ্বে শয়তানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে বলেনঃ “তাকবীর' পাঠ করতঃ তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করুন। ইবলিস এখান হতে পালিয়ে গিয়ে জামরা-ই-উকবার পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ায়। এখানেও তিনি তাকে পাথর মারেন। এই কলুষ শয়তান নিরাশ হয়ে চলে যায়। হজ্বের আহকামের মধ্যে সে কিছু গোলমাল সৃষ্টি করতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগ পেলো না এবং সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল। এখান হতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে মাশআরে হারাম’ নিয়ে যান। অতঃপর আরাফাতে পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন, বুঝেছেন' তিনি বলেনঃ ‘হ্যাঁ'। অন্য বর্ণনায় শয়তানকে তিন জায়গায় পাথর মারার কথা বর্ণিত আছে। প্রত্যেক হাজী শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারেন।
আল-বাকারা 2:129
শেষ নবী (সঃ) ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা‘হারাম বাসীদের জন্যে এটা আর একটি দু‘আ যে তাঁর সন্তানদের মধ্যে হতেই যেন একজন নবী তাদের মধ্যে আগমন করেন। এ প্রার্থনাও গৃহীত হয়। মুসনাদই আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তখন থেকেই শেষ নবী যখন হযরত আদম (আঃ) মাটির আকারে ছিলেন। আমি তোমাদেরকে আমার প্রাথমিক কথার সংবাদ দিচ্ছি। আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। নবীদের মায়েরা এরকমই স্বপ্ন দেখে থাকেন। হযরত আবু উমামা। (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নবুওয়াতের সূচনা কিরূপে হয়?' তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, আমার সম্বন্ধে হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ এবং আমার মা স্বপ্ন দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি আলো বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করে দিল। ভাবার্থ এই যে, দুনিয়ায় খ্যাতির মাধ্যম এই জিনিসগুলোই হয়। তাঁর সম্মানিতা মায়ের এ স্বপ্নের কথাও পূর্ব হতেই আরবে ছড়িয়ে ছিল। তারা বলতো যে, আমেনার গর্ভে কোন একজন মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করবেন। বানী ইসরাঈলের শেষ নবী হযরত ঈলা রুহুশ্লাহ (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্যে খুত্ব দেয়ার সময় পরিষ্কারভাবে তার নামও বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল (রূপে প্রেরিত হয়েছি, আমার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতের আমি সত্যতা প্রমাণ করছি এবং আমার পরে আগমনকারী একজন নবীর সংবাদ তোমাদেরকে দিচ্ছি যার নাম আহমদ (সঃ)। এ হাদীসে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। স্বপ্নের মধ্যে নূর দ্বারা সিরয়ার প্রাসাদগুলো আলোকোজ্জ্বল হওয়া ঐ কথার দিকে ইঙ্গিত করছে যে, তথায় দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। বরং বর্ণনাসমূহ দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, শেষ যুগে সিরিয়া ইসলাম ও মুসলমানদের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হবে। সিরিয়ার প্রসিদ্ধ শহর দামেশকেই হযরত ঈসা (আঃ) মিনারার উপর অবতীর্ণ হবেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের বিরুদ্ধবাদিরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলার হুকুম এসে যাবে। সহীহ বুখারীর মধ্যে ওটা সিরিয়ায় হবে' এটুকু বেশী আছে। আবুল আলীয়া হতে নকল করা হয়েছে যে, এই প্রার্থনার উত্তরে বলা হয়ঃ এটাও গৃহীত হলো এবং রাসূল শেষ যুগে প্রেরিত হবে।' ‘কিতাব'-এর অর্থ হচ্ছে কুরআন এবং ‘হিকমত’-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সুন্নাহ'। হযরত হাসান বসরী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) এবং আৰূ মালিক প্রভৃতিও একথাই বলেন। হিকমত’ দ্বারা ধর্ম বোধও বুঝানো হয়েছে। পবিত্র করা অর্থাৎ আনুগত্য ও আন্তরিকতা শিক্ষা দেয়া, ভাল কাজ করানো, মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা, আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে তার সন্তুষ্টি লাভ করা, অবাধ্যতা, হতে বিরত থেকে তাঁর অসন্তুষ্টি হতে বেঁচে থাকা। আল্লাহ ‘আযীয অর্থাৎ যাকে কোন জিনিস অসমর্থ করতে পারে না, যিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর বিজয়ী। তিনি হাকীম' অর্থাৎ তাঁর কোন কথাও কাজ বিজ্ঞান এবং নৈপুণ্য হতে শূন্য নয়। তিনি প্রত্যেক জিনিসকেই তার আপন স্থানে জ্ঞান, ইনসাফ ও ইলমের সঙ্গে রেখেছেন।
আল-বাকারা 2:130
১৩০-১৩২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহেও মুশরিকদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করতো, অথচ তারা পূর্ণ মুশরিক ছিল। আর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো একত্ববাদীদের ইমাম ছিলেন। তিনি তাওহীদকে শিরক হতে পৃথককারী ছিলেন। সারা জীবনে চক্ষুর পলক পরিমাণও আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করেননি। বরং তিনি প্রত্যেক অংশীবাদীকে প্রত্যেক প্রকারের শিককে এবং কৃত্রিম মাবুদকে অন্তরের সাথে ঘৃণা করতেন এবং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই কারণেই তিনি স্বীয় সম্প্রদায় হতে পৃথক হয়ে যান, স্বদেশ ত্যাগ করেন, এমন কি পিতার বিরুদ্ধাচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি পরিষ্কারভাবে বলে দেনঃ ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যে অংশী স্থির করছে আমি তা থেকে বিমুক্ত। নিশ্চয় আমি সুদৃঢ়ভাবে তাঁরই দিকে স্বীয় আনন স্থাপন করলাম যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। অন্য জায়গায় রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে বলেছেনঃ আমি তোমাদের উপাস্যগণ হতে বিমুক্ত রয়েছি, আমি আমার সৃষ্টিকর্তারই বশ্য, তিনিই আমাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন।অন্যস্থানে রয়েছেঃ 'হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার জন্যেও শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকারের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, ইবরাহীম বড়ই তওবাকারী ও সহিষ্ণু। অন্যত্র রয়েছেঃ ইবরাহীম খাটিও অনুগত বান্দা ছিল, কখনও মুশরিক ছিল না; প্রভুর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ছিল, সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, পৃথিবীর উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াতসমূহের ন্যায় এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচারকারী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে ত্যাগ করে থাকে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হিদায়াতের জন্যে মনোনীত করেছিলেন। এবং বাল্যকাল হতেই তাঁকে সত্য অনুধাবনের তওফীক দান করেছিলেন। খালীল’-এর ন্যায় সম্মানিত উপাদি। একমাত্র তাকেই দান করেছিলেন। আখেরাতেও তিনি ভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাঁর পথ ও ধর্মকে ছেড়ে দিয়ে যারা ভ্রান্ত পথ ধারণ করে, তাদের মত নির্বোধ ও অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এই আয়াতে ইয়াহুদীদের দাবীকেও খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিল না, খ্রীষ্টানও ছিল না, মুশরিকও ছিল না, বরং একত্ববাদী মুসলমান এবং খাটি বান্দা ছিল। তার নিকটবর্তী তারাই যারা তাকে মানে এবং এই নবী (সঃ) ও মু'মিনগণ, আর আল্লাহ তা'আলাও মু'মিনদের অভিভাবক।যখন তার প্রভু তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পন কর, তখন সে বলেছিল আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। এই একত্ববাদের মিল্লাতের উপদেশই হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াকুব (আঃ) তাদের সন্তানগণকে দিয়েছিল (আরবি) সর্বনামটির (আরবি) হয়তো বা (আরবি) হবে কিংবা হবে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ (আরবি)হবে। ইসলামের প্রতি তাঁদের প্রেম ও ভালবাসা কত বেশী ছিল যে, তারা নিজেরাতো সারা জীবন তার উপর অটল ছিলেনই, আবার সন্তানদেরকেও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবার উপদেশ দিচ্ছেন। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তা তাদের সন্তানদের মধ্যেও বাকী রেখেছি। (৪৩:২৮) কোন কোন মনীষী এরকমও পড়েছেন। তখন ওটার সংযোগ হবে (আরবি)-এর সঙ্গে। তা হলে অর্থ হবেঃ ইবরাহীম (আঃ) তার সন্তানদেরকে এবং সন্তানদের সন্তান ইয়াকুব (আঃ) কে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উপদেশ দিয়েছিল। কুশাইরী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার এ দাবী ভিত্তিহীন, এর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। বরং স্পষ্টতঃ জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কেননা, কুরআন পাকের আয়াতে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তাকে (হযরত ইবরাহীম আঃ-এর স্ত্রী সারাকে) ইসহাক ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিয়েছি।' (১১:৭১) তাহলে যদি হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান না থাকতেন তবে তার নাম নেয়ার কোন প্রয়োজন থাকতো না। সূরা-ই-আনকাবুতের মধ্যেও রয়েছেঃআমি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ)কে দান করেছি এবং তার সন্তানদের মধ্যে আমি নবুওয়াত ও কিতাব দিয়েছি। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “আমি তাকে ইসহাককে দিয়েছি এবং অতিরিক্ত হিসেবে ইয়াকুবকে দান করেছি। এই সব আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিলেন। পূর্বের কিতাবসমূহেও রয়েছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে’ আগমন করবেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন মসজিদটি সর্বপ্রথম নির্মিত হয়?' তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই- হারাম। আমি বলি- তার পরে কোনটি?' তিনি বলেনঃ বায়তুল মুকাদ্দাস। আমি বলি, ‘এদুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান"কত?' তিনি বলেনঃ চল্লিশ বছর। ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেন যে, এ ব্যবধান হচ্ছে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ) -এর মধ্যে। অথচ এটা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। এই দুই নবীর মধ্যে হাজার বছরেরও বেশী ব্যবধান ছিল। বরং হাদীসটির ভাবার্থ অন্য কিছু হবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) তো ছিলেন বায়তুল মুকাদ্দাসের মেরামতকারী, তিনি ওর নির্মাতা ছিলেন না। এরকমই হযরত ইয়াকুব (আঃ) উপদেশ দিয়েছিলেন, যেমন অতিসত্বরই এর আলোচনা আসছে। তাদের ওসিয়তের ভাবার্থ হচ্ছে এইঃ ‘তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় সৎ কর্মশীল হও এবং ওর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাক, যেন মৃত্যুও ওর উপরেই হয়। সাধারণতঃ যে ইহলৌকিক জীবনে যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে মৃত্যু ওর উপরই হয়ে থাকে, এবং যার উপরে মৃত্যুবরণ করে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তার উত্থান হবে। মহান আল্লাহর বিধান এই যে, যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছে পোষণ করে, তিনি তাকে সেই কাজের তাওফীক প্রদান করে থাকেন এবং ঐ কাজ তার জন্য সহজ করে দেয়া হয় ও তাকে ওরই উপর অটল রাখা হয়। নিঃসন্দেহে এটাও হাদীসে এসেছে যে, মানুষ বেহেশতের কাজ করতে করতে বেহেশত হতে মাত্র এক হাত দূরে থাকে। অতঃপর তার ভাগ্য তার উপর বিজয় লাভ করে। ফলে সে দুখের কাজ করতঃ দুখী হয়ে যায়। আবার কখনও এর বিপরীত হয়ে থাকে। কিন্তু এর ভাবার্থ এই যে, এই ভাল বা মন্দ বাহ্যিক হয়, প্রকৃত পক্ষে তা হয়। কেননা, এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় আছেঃ সে বেহেশতের কাজ করে যা মানুষের নিকট প্রকাশ পায় এবং সে দুযখের কাজ করে যা লোকের নিকট প্রকাশ পায়। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ “যে ব্যক্তি দান করেছে, ভয় করেছে এবং ভাল কথার সত্যতা স্বীকার করেছে আমি তাকে শান্তির উপকরণ (বেহেশত) প্রদান করবো। আর যে কার্পণ্য করেছে এবং বেপরোয়া হয়েছে, আর ভাল কথাকে (সত্য ধর্মকে) অবিশ্বাস করেছে, আমি তাকে ক্লেশদায়ক বস্তু (জাহান্নাম)-এর জন্যে আসবাব প্রদান করবো।
আল-বাকারা 2:131
১৩০-১৩২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহেও মুশরিকদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করতো, অথচ তারা পূর্ণ মুশরিক ছিল। আর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো একত্ববাদীদের ইমাম ছিলেন। তিনি তাওহীদকে শিরক হতে পৃথককারী ছিলেন। সারা জীবনে চক্ষুর পলক পরিমাণও আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করেননি। বরং তিনি প্রত্যেক অংশীবাদীকে প্রত্যেক প্রকারের শিককে এবং কৃত্রিম মাবুদকে অন্তরের সাথে ঘৃণা করতেন এবং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই কারণেই তিনি স্বীয় সম্প্রদায় হতে পৃথক হয়ে যান, স্বদেশ ত্যাগ করেন, এমন কি পিতার বিরুদ্ধাচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি পরিষ্কারভাবে বলে দেনঃ ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যে অংশী স্থির করছে আমি তা থেকে বিমুক্ত। নিশ্চয় আমি সুদৃঢ়ভাবে তাঁরই দিকে স্বীয় আনন স্থাপন করলাম যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। অন্য জায়গায় রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে বলেছেনঃ আমি তোমাদের উপাস্যগণ হতে বিমুক্ত রয়েছি, আমি আমার সৃষ্টিকর্তারই বশ্য, তিনিই আমাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন।অন্যস্থানে রয়েছেঃ 'হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার জন্যেও শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকারের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, ইবরাহীম বড়ই তওবাকারী ও সহিষ্ণু। অন্যত্র রয়েছেঃ ইবরাহীম খাটিও অনুগত বান্দা ছিল, কখনও মুশরিক ছিল না; প্রভুর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ছিল, সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, পৃথিবীর উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াতসমূহের ন্যায় এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচারকারী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে ত্যাগ করে থাকে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হিদায়াতের জন্যে মনোনীত করেছিলেন। এবং বাল্যকাল হতেই তাঁকে সত্য অনুধাবনের তওফীক দান করেছিলেন। খালীল’-এর ন্যায় সম্মানিত উপাদি। একমাত্র তাকেই দান করেছিলেন। আখেরাতেও তিনি ভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাঁর পথ ও ধর্মকে ছেড়ে দিয়ে যারা ভ্রান্ত পথ ধারণ করে, তাদের মত নির্বোধ ও অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এই আয়াতে ইয়াহুদীদের দাবীকেও খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিল না, খ্রীষ্টানও ছিল না, মুশরিকও ছিল না, বরং একত্ববাদী মুসলমান এবং খাটি বান্দা ছিল। তার নিকটবর্তী তারাই যারা তাকে মানে এবং এই নবী (সঃ) ও মু'মিনগণ, আর আল্লাহ তা'আলাও মু'মিনদের অভিভাবক।যখন তার প্রভু তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পন কর, তখন সে বলেছিল আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। এই একত্ববাদের মিল্লাতের উপদেশই হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াকুব (আঃ) তাদের সন্তানগণকে দিয়েছিল (আরবি) সর্বনামটির (আরবি) হয়তো বা (আরবি) হবে কিংবা হবে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ (আরবি)হবে। ইসলামের প্রতি তাঁদের প্রেম ও ভালবাসা কত বেশী ছিল যে, তারা নিজেরাতো সারা জীবন তার উপর অটল ছিলেনই, আবার সন্তানদেরকেও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবার উপদেশ দিচ্ছেন। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তা তাদের সন্তানদের মধ্যেও বাকী রেখেছি। (৪৩:২৮) কোন কোন মনীষী এরকমও পড়েছেন। তখন ওটার সংযোগ হবে (আরবি)-এর সঙ্গে। তা হলে অর্থ হবেঃ ইবরাহীম (আঃ) তার সন্তানদেরকে এবং সন্তানদের সন্তান ইয়াকুব (আঃ) কে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উপদেশ দিয়েছিল। কুশাইরী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার এ দাবী ভিত্তিহীন, এর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। বরং স্পষ্টতঃ জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কেননা, কুরআন পাকের আয়াতে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তাকে (হযরত ইবরাহীম আঃ-এর স্ত্রী সারাকে) ইসহাক ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিয়েছি।' (১১:৭১) তাহলে যদি হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান না থাকতেন তবে তার নাম নেয়ার কোন প্রয়োজন থাকতো না। সূরা-ই-আনকাবুতের মধ্যেও রয়েছেঃআমি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ)কে দান করেছি এবং তার সন্তানদের মধ্যে আমি নবুওয়াত ও কিতাব দিয়েছি। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “আমি তাকে ইসহাককে দিয়েছি এবং অতিরিক্ত হিসেবে ইয়াকুবকে দান করেছি। এই সব আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিলেন। পূর্বের কিতাবসমূহেও রয়েছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে’ আগমন করবেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন মসজিদটি সর্বপ্রথম নির্মিত হয়?' তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই- হারাম। আমি বলি- তার পরে কোনটি?' তিনি বলেনঃ বায়তুল মুকাদ্দাস। আমি বলি, ‘এদুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান"কত?' তিনি বলেনঃ চল্লিশ বছর। ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেন যে, এ ব্যবধান হচ্ছে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ) -এর মধ্যে। অথচ এটা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। এই দুই নবীর মধ্যে হাজার বছরেরও বেশী ব্যবধান ছিল। বরং হাদীসটির ভাবার্থ অন্য কিছু হবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) তো ছিলেন বায়তুল মুকাদ্দাসের মেরামতকারী, তিনি ওর নির্মাতা ছিলেন না। এরকমই হযরত ইয়াকুব (আঃ) উপদেশ দিয়েছিলেন, যেমন অতিসত্বরই এর আলোচনা আসছে। তাদের ওসিয়তের ভাবার্থ হচ্ছে এইঃ ‘তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় সৎ কর্মশীল হও এবং ওর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাক, যেন মৃত্যুও ওর উপরেই হয়। সাধারণতঃ যে ইহলৌকিক জীবনে যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে মৃত্যু ওর উপরই হয়ে থাকে, এবং যার উপরে মৃত্যুবরণ করে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তার উত্থান হবে। মহান আল্লাহর বিধান এই যে, যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছে পোষণ করে, তিনি তাকে সেই কাজের তাওফীক প্রদান করে থাকেন এবং ঐ কাজ তার জন্য সহজ করে দেয়া হয় ও তাকে ওরই উপর অটল রাখা হয়। নিঃসন্দেহে এটাও হাদীসে এসেছে যে, মানুষ বেহেশতের কাজ করতে করতে বেহেশত হতে মাত্র এক হাত দূরে থাকে। অতঃপর তার ভাগ্য তার উপর বিজয় লাভ করে। ফলে সে দুখের কাজ করতঃ দুখী হয়ে যায়। আবার কখনও এর বিপরীত হয়ে থাকে। কিন্তু এর ভাবার্থ এই যে, এই ভাল বা মন্দ বাহ্যিক হয়, প্রকৃত পক্ষে তা হয়। কেননা, এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় আছেঃ সে বেহেশতের কাজ করে যা মানুষের নিকট প্রকাশ পায় এবং সে দুযখের কাজ করে যা লোকের নিকট প্রকাশ পায়। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ “যে ব্যক্তি দান করেছে, ভয় করেছে এবং ভাল কথার সত্যতা স্বীকার করেছে আমি তাকে শান্তির উপকরণ (বেহেশত) প্রদান করবো। আর যে কার্পণ্য করেছে এবং বেপরোয়া হয়েছে, আর ভাল কথাকে (সত্য ধর্মকে) অবিশ্বাস করেছে, আমি তাকে ক্লেশদায়ক বস্তু (জাহান্নাম)-এর জন্যে আসবাব প্রদান করবো।
আল-বাকারা 2:132
১৩০-১৩২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহেও মুশরিকদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করতো, অথচ তারা পূর্ণ মুশরিক ছিল। আর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো একত্ববাদীদের ইমাম ছিলেন। তিনি তাওহীদকে শিরক হতে পৃথককারী ছিলেন। সারা জীবনে চক্ষুর পলক পরিমাণও আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করেননি। বরং তিনি প্রত্যেক অংশীবাদীকে প্রত্যেক প্রকারের শিককে এবং কৃত্রিম মাবুদকে অন্তরের সাথে ঘৃণা করতেন এবং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই কারণেই তিনি স্বীয় সম্প্রদায় হতে পৃথক হয়ে যান, স্বদেশ ত্যাগ করেন, এমন কি পিতার বিরুদ্ধাচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি পরিষ্কারভাবে বলে দেনঃ ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যে অংশী স্থির করছে আমি তা থেকে বিমুক্ত। নিশ্চয় আমি সুদৃঢ়ভাবে তাঁরই দিকে স্বীয় আনন স্থাপন করলাম যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। অন্য জায়গায় রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে বলেছেনঃ আমি তোমাদের উপাস্যগণ হতে বিমুক্ত রয়েছি, আমি আমার সৃষ্টিকর্তারই বশ্য, তিনিই আমাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন।অন্যস্থানে রয়েছেঃ 'হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার জন্যেও শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকারের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, ইবরাহীম বড়ই তওবাকারী ও সহিষ্ণু। অন্যত্র রয়েছেঃ ইবরাহীম খাটিও অনুগত বান্দা ছিল, কখনও মুশরিক ছিল না; প্রভুর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ছিল, সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, পৃথিবীর উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াতসমূহের ন্যায় এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচারকারী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে ত্যাগ করে থাকে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হিদায়াতের জন্যে মনোনীত করেছিলেন। এবং বাল্যকাল হতেই তাঁকে সত্য অনুধাবনের তওফীক দান করেছিলেন। খালীল’-এর ন্যায় সম্মানিত উপাদি। একমাত্র তাকেই দান করেছিলেন। আখেরাতেও তিনি ভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাঁর পথ ও ধর্মকে ছেড়ে দিয়ে যারা ভ্রান্ত পথ ধারণ করে, তাদের মত নির্বোধ ও অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এই আয়াতে ইয়াহুদীদের দাবীকেও খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিল না, খ্রীষ্টানও ছিল না, মুশরিকও ছিল না, বরং একত্ববাদী মুসলমান এবং খাটি বান্দা ছিল। তার নিকটবর্তী তারাই যারা তাকে মানে এবং এই নবী (সঃ) ও মু'মিনগণ, আর আল্লাহ তা'আলাও মু'মিনদের অভিভাবক।যখন তার প্রভু তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পন কর, তখন সে বলেছিল আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। এই একত্ববাদের মিল্লাতের উপদেশই হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াকুব (আঃ) তাদের সন্তানগণকে দিয়েছিল (আরবি) সর্বনামটির (আরবি) হয়তো বা (আরবি) হবে কিংবা হবে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ (আরবি)হবে। ইসলামের প্রতি তাঁদের প্রেম ও ভালবাসা কত বেশী ছিল যে, তারা নিজেরাতো সারা জীবন তার উপর অটল ছিলেনই, আবার সন্তানদেরকেও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবার উপদেশ দিচ্ছেন। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তা তাদের সন্তানদের মধ্যেও বাকী রেখেছি। (৪৩:২৮) কোন কোন মনীষী এরকমও পড়েছেন। তখন ওটার সংযোগ হবে (আরবি)-এর সঙ্গে। তা হলে অর্থ হবেঃ ইবরাহীম (আঃ) তার সন্তানদেরকে এবং সন্তানদের সন্তান ইয়াকুব (আঃ) কে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উপদেশ দিয়েছিল। কুশাইরী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার এ দাবী ভিত্তিহীন, এর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। বরং স্পষ্টতঃ জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কেননা, কুরআন পাকের আয়াতে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তাকে (হযরত ইবরাহীম আঃ-এর স্ত্রী সারাকে) ইসহাক ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিয়েছি।' (১১:৭১) তাহলে যদি হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান না থাকতেন তবে তার নাম নেয়ার কোন প্রয়োজন থাকতো না। সূরা-ই-আনকাবুতের মধ্যেও রয়েছেঃআমি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ)কে দান করেছি এবং তার সন্তানদের মধ্যে আমি নবুওয়াত ও কিতাব দিয়েছি। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “আমি তাকে ইসহাককে দিয়েছি এবং অতিরিক্ত হিসেবে ইয়াকুবকে দান করেছি। এই সব আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিলেন। পূর্বের কিতাবসমূহেও রয়েছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে’ আগমন করবেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন মসজিদটি সর্বপ্রথম নির্মিত হয়?' তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই- হারাম। আমি বলি- তার পরে কোনটি?' তিনি বলেনঃ বায়তুল মুকাদ্দাস। আমি বলি, ‘এদুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান"কত?' তিনি বলেনঃ চল্লিশ বছর। ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেন যে, এ ব্যবধান হচ্ছে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ) -এর মধ্যে। অথচ এটা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। এই দুই নবীর মধ্যে হাজার বছরেরও বেশী ব্যবধান ছিল। বরং হাদীসটির ভাবার্থ অন্য কিছু হবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) তো ছিলেন বায়তুল মুকাদ্দাসের মেরামতকারী, তিনি ওর নির্মাতা ছিলেন না। এরকমই হযরত ইয়াকুব (আঃ) উপদেশ দিয়েছিলেন, যেমন অতিসত্বরই এর আলোচনা আসছে। তাদের ওসিয়তের ভাবার্থ হচ্ছে এইঃ ‘তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় সৎ কর্মশীল হও এবং ওর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাক, যেন মৃত্যুও ওর উপরেই হয়। সাধারণতঃ যে ইহলৌকিক জীবনে যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে মৃত্যু ওর উপরই হয়ে থাকে, এবং যার উপরে মৃত্যুবরণ করে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তার উত্থান হবে। মহান আল্লাহর বিধান এই যে, যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছে পোষণ করে, তিনি তাকে সেই কাজের তাওফীক প্রদান করে থাকেন এবং ঐ কাজ তার জন্য সহজ করে দেয়া হয় ও তাকে ওরই উপর অটল রাখা হয়। নিঃসন্দেহে এটাও হাদীসে এসেছে যে, মানুষ বেহেশতের কাজ করতে করতে বেহেশত হতে মাত্র এক হাত দূরে থাকে। অতঃপর তার ভাগ্য তার উপর বিজয় লাভ করে। ফলে সে দুখের কাজ করতঃ দুখী হয়ে যায়। আবার কখনও এর বিপরীত হয়ে থাকে। কিন্তু এর ভাবার্থ এই যে, এই ভাল বা মন্দ বাহ্যিক হয়, প্রকৃত পক্ষে তা হয়। কেননা, এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় আছেঃ সে বেহেশতের কাজ করে যা মানুষের নিকট প্রকাশ পায় এবং সে দুযখের কাজ করে যা লোকের নিকট প্রকাশ পায়। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ “যে ব্যক্তি দান করেছে, ভয় করেছে এবং ভাল কথার সত্যতা স্বীকার করেছে আমি তাকে শান্তির উপকরণ (বেহেশত) প্রদান করবো। আর যে কার্পণ্য করেছে এবং বেপরোয়া হয়েছে, আর ভাল কথাকে (সত্য ধর্মকে) অবিশ্বাস করেছে, আমি তাকে ক্লেশদায়ক বস্তু (জাহান্নাম)-এর জন্যে আসবাব প্রদান করবো।
আল-বাকারা 2:133
১৩৩-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীরআরবের মুশরিকরা ছিল হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর এবং বানী ইসরাঈলেরা কাফির ছিল এবং তারা ছিল হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধর। তাদের উপর প্রমাণ উপস্থিত করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) অন্তিমকালে স্বীয় সন্তানগণকে বলেছিলেনঃ “আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে?' তারা সবাই উত্তরে বলেছিলঃ আপনার ও আপনার মাননীয় মুরুব্বীগণের যিনি সত্য উপাস্য অর্থাৎ আল্লাহ্, আমরা তাঁরই ইবাদত করবো।' হযরত ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র এবং হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র। হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম বাপ দাদার আলোচনায় বহুল প্রচলন হিসেবে এসে গেছে। তিনি হচ্ছেন হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর চাচা, এবং আরবে এটা প্রচলিত আছে যে, তারা চাচাকে বাপ বলে থাকে। এই আয়াতটিকে প্রমাণ রূপে দাঁড় করে দাদাকেও পিতার হুকুমে রেখে দাদার বিদ্যমানতায় মৃত ব্যক্তির ভ্রাতা ও ভগ্নিকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। হযরত সিদ্দীকে আকবারের (রাঃ) ফায়সালা এটাই। যেমন সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশার (রাঃ) মাযহাব এটাই। হাসান বসরী (রঃ), তাউস (রঃ) এবং আতাও (রঃ) এই বলেন। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আরও বহু গুরুজনেরও মাযহাব এটাই। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফেঈ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় নকল করা হয়েছে যে, তাঁরা ভাই ও বোনদেরকেও উত্তরাধিকারী বলে থাকেন। হযরত উমর (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী একটি দলেরও মাযহাব এই। কাযী আবু ইউসুফ (রঃ) এবং মুহাম্মদ ইবনে হাসানও (রঃ) এটাই বলেন। এঁরা দু'জন হযরত ইমাম আবু হানীফার (রঃ) সুপথ গামী ছাত্র ছিলেন।এ জিজ্ঞাস্য বিষয়কে পরিষ্কার করার জায়গায় এটা নয়। এবং তাফসীরের এটা আলোচ্য বিষয়ও নয়। ঐ সব ছেলে স্বীকার করে যে তারা একই উপাস্যের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অন্য কাউকেও শরীক করবে না এবং তার আনুগত্যে, তার আদেশ পালনে এবং বিনয় ও নম্রতায় সদা নিমগ্ন থাকবে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তাঁর অনুগত, তারই নিকট তোমরা সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। আহকামের ব্যাপারে পার্থক্য থাকলেও সমস্ত নবীর ধর্ম এই ইসলামই ছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তোমার পূর্বে আমি যত নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই নিকট এই ওয়াহী করেছি যে, আমি ছাড়া কেউই উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা সবাই আমারই ইবাদত কর।' (২১:২৫) এ বিষয়ের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ বিষয়ের উপর বহু হাদীসও এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার বৈমাত্রেয় ভাই, আমাদের একই ধর্ম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ওটা একটা দল ছিল যা অতীত হয়ে গেছে, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে তোমাদের কোন উপকার হবে না। তাদের কৃতকর্ম তাদের জন্যে এবং তোমাদের কৃতকর্ম তোমাদের জন্যে। তাদের কার্যাবলী সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না। এ জন্যেই হাদীস শরীফে রয়েছেঃ যার কাজ বিলম্বিত হবে তার বংশ তাকে তুরান্বিত করবে না।' অর্থাৎ যে সকার্যে বিলম্ব করবে তার বংশ মর্যাদা তার কোন উপকারে আসবে না।
আল-বাকারা 2:134
১৩৩-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীরআরবের মুশরিকরা ছিল হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর এবং বানী ইসরাঈলেরা কাফির ছিল এবং তারা ছিল হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধর। তাদের উপর প্রমাণ উপস্থিত করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) অন্তিমকালে স্বীয় সন্তানগণকে বলেছিলেনঃ “আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে?' তারা সবাই উত্তরে বলেছিলঃ আপনার ও আপনার মাননীয় মুরুব্বীগণের যিনি সত্য উপাস্য অর্থাৎ আল্লাহ্, আমরা তাঁরই ইবাদত করবো।' হযরত ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র এবং হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র। হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম বাপ দাদার আলোচনায় বহুল প্রচলন হিসেবে এসে গেছে। তিনি হচ্ছেন হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর চাচা, এবং আরবে এটা প্রচলিত আছে যে, তারা চাচাকে বাপ বলে থাকে। এই আয়াতটিকে প্রমাণ রূপে দাঁড় করে দাদাকেও পিতার হুকুমে রেখে দাদার বিদ্যমানতায় মৃত ব্যক্তির ভ্রাতা ও ভগ্নিকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। হযরত সিদ্দীকে আকবারের (রাঃ) ফায়সালা এটাই। যেমন সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশার (রাঃ) মাযহাব এটাই। হাসান বসরী (রঃ), তাউস (রঃ) এবং আতাও (রঃ) এই বলেন। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আরও বহু গুরুজনেরও মাযহাব এটাই। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফেঈ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় নকল করা হয়েছে যে, তাঁরা ভাই ও বোনদেরকেও উত্তরাধিকারী বলে থাকেন। হযরত উমর (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী একটি দলেরও মাযহাব এই। কাযী আবু ইউসুফ (রঃ) এবং মুহাম্মদ ইবনে হাসানও (রঃ) এটাই বলেন। এঁরা দু'জন হযরত ইমাম আবু হানীফার (রঃ) সুপথ গামী ছাত্র ছিলেন।এ জিজ্ঞাস্য বিষয়কে পরিষ্কার করার জায়গায় এটা নয়। এবং তাফসীরের এটা আলোচ্য বিষয়ও নয়। ঐ সব ছেলে স্বীকার করে যে তারা একই উপাস্যের উপাসনা করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অন্য কাউকেও শরীক করবে না এবং তার আনুগত্যে, তার আদেশ পালনে এবং বিনয় ও নম্রতায় সদা নিমগ্ন থাকবে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তাঁর অনুগত, তারই নিকট তোমরা সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। আহকামের ব্যাপারে পার্থক্য থাকলেও সমস্ত নবীর ধর্ম এই ইসলামই ছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তোমার পূর্বে আমি যত নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই নিকট এই ওয়াহী করেছি যে, আমি ছাড়া কেউই উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা সবাই আমারই ইবাদত কর।' (২১:২৫) এ বিষয়ের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ বিষয়ের উপর বহু হাদীসও এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার বৈমাত্রেয় ভাই, আমাদের একই ধর্ম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ওটা একটা দল ছিল যা অতীত হয়ে গেছে, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে তোমাদের কোন উপকার হবে না। তাদের কৃতকর্ম তাদের জন্যে এবং তোমাদের কৃতকর্ম তোমাদের জন্যে। তাদের কার্যাবলী সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না। এ জন্যেই হাদীস শরীফে রয়েছেঃ যার কাজ বিলম্বিত হবে তার বংশ তাকে তুরান্বিত করবে না।' অর্থাৎ যে সকার্যে বিলম্ব করবে তার বংশ মর্যাদা তার কোন উপকারে আসবে না।
আল-বাকারা 2:135
এক চক্ষু বিশিষ্ট আবদুল্লাহ বিন সুরিয়া নামক একজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছিলঃ “আমরাই সঠিক পথে রয়েছি। তোমরা আমাদের অনুসারী হও তবে তোমরাও সুপথ প্রাপ্ত হবে। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর অনুসারীরাইতো ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুসারী। ইবরাহীম (আঃ) তো ছিলেন সঠিক ধর্মের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি আল্লাহর অকৃত্রিম প্রেমিক, বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মনঃসংযোগকারী, ক্ষমতা থাকার সময় হজ্বকে অবশ্য কর্তব্যরূপে মান্যকারী, আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারকারী, সমস্ত রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী, আল্লাহ ছাড়া কেউই উপাস্য নেই’ একথার সাক্ষ্যদানকারী মা, মেয়ে, খালা ও ফুফুকে হারাম জ্ঞানকারী এবং সমস্ত অবৈধ কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী ছিলেন। বিভিন্ন মনীষী হানীফ' শব্দের এ সব অর্থ বর্ণনা করেছেন।
আল-বাকারা 2:136
আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যা কিছু হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর যেন তারা বিস্তারিতভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং যা তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল ঐগুলোর উপরেও যেন সংক্ষিপ্তভাবে ঈমান আনয়ন করে। ঐ পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে কারও কারও নামও নেয়া হয়েছে এবং অন্যান্য নবীদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। সাথে সাথে মহান আল্লাহ একথাও বলেছেন যে, তারা যেন নবীদের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি না করে। অর্থাৎ তারা যেন কোন নবীকে মানবে এবং কোন কোন নবীকে মানবে না, এরূপ যেন না করে। এরকম অভ্যাস পূর্ববর্তী লোকদের ছিল যে, তারা কাউকে মানতো আবার কাউকে মানতো না। ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)কে মানতো না, খ্রীষ্টানেরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে মানতো না এবং হিজাজে আরব হযরত মূসা (আঃ) হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এই তিনজনকেই স্বীকার করতো না। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘ঐসব লোকে নিশ্চিত রূপেই কাফির। (৪:১৫১) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কিতাবিরা তাওরাতকে ইবরাণী ভাষায় পাঠ করতো। এবং আরবী ভাষায় এর তাফসীর করে মুসলমানদেরকে শুনাতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমরা আহলে কিতাবের সত্যতাও স্বীকার করো না এবং মিথ্যাও প্রতিপন্ন করো না, বরং বল যে, আমরা আল্লাহ তাআলার উপর এবং তার অবতারিত কিতাবসমহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত নামাযের প্রথম রাকআতে নিম্নের এই আয়াতটি (আরবি) (২:১৩৬)সম্পূর্ণ পড়তেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে (আরবি) (৩:৫২)এই আয়াতটি পড়তেন (আরবি) হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর পুত্রগণকে বলা হতো। তাঁরা ছিলেন বারোজন। প্রত্যেকের বংশে বহু লোকের জন্ম হয়। বানী ইসমাঈলকে (আরবি) বলা হতো। এবং বানী ইসরাঈলকে (আরবি) বলা হতো। ইমাম যামাখশারী (রঃ) তাফসীরে কাশশাফে’ লিখেছেন যে, এরা ছিল হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর পৌত্র, যারা তাঁর বারোটি পুত্রের সন্তানাদি ছিল। বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘বানী ইসরাঈল। তাদের মধ্যেও নবী হয়েছিলেন, যাদের উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর উক্তি নকল করেন যা তিনি বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামত স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে বাদশাহ ও নবী করেছেন। অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি তাদের বারোটি দল করে দিয়েছিলাম।' (৭:১৬০) পর্যায়ক্রমে আসাকে (আরবি) বলা হয়। এরাও পর্যায়ক্রমে এসেছিল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে। গাছকে (আরবি) বলা হয়। অর্থাৎ এরা গাছের মত যার শাখা প্রশাখাগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দশজন নবী ছাড়া সমস্ত নবীই বানী ইসরাঈলের মধ্য হতে হয়েছেন। ঐ দশজন নবী হচ্ছেঃ (১) হযরত নূহ (আঃ) (২) হযরত হূদ (আঃ) (৩) হযরত সালেহ্ (আঃ) (৪) হযরত শুয়াইব (আঃ) (৫) হযরত ইবরাহীম (আঃ) (৬) হযরত ইসহাক (আঃ) (৭) হযরত ইয়াকুব (আঃ) (৮) হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং (৯) হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) মূল তাফসীরে দশম নবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি (আরবি) বলা হয় ঐ দল ও গোত্রকে যার মূল ব্যক্তি উপরে গিয়ে একই হয়ে যায়। তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর আমাদের ঈমান আনা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু আমলের জন্যে শুধুমাত্র কোরআন ও হাদীসই যথেষ্ট। মুসনাদই ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, কিন্তু আমলের জন্যে কুরআনই যথেষ্ট।
আল-বাকারা 2:137
১৩৭-১৩৮ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে ঈমানদার সাহাবীবর্গ (রাঃ)! এই সব কাফিরও যদি তোমাদের মত যাবতীয় কিতাব ও রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তবে তারাও সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি দলীল ও প্রমাণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনয়ন হতে বিরত থাকে তবে নিশ্চিত রূপে তারা ন্যায় ও সত্যের উল্টো পথে রয়েছে। সেই সময় হে নবী (সঃ)! তোমাকে তাদের উপর জয়যুক্ত করতঃ আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে তোমাদেরকেই যথেষ্ট করবেন। হযরত নাফে' বিন আবু নাঈম (রাঃ) বলেন যে, কোন একজন খলীফার নিকট হযরত উসমানের (রাঃ) কুরআন মাজীদ পাঠানো হয়। একথা শুনে যিয়াদ নামক এক ব্যক্তি নাফে' বিন আবু নাঈমকে বলেনঃ “জনসাধারণের মধ্যে একথা ছড়িয়ে রয়েছে যে, যখন হযরত উসমানকে (রাঃ) শহীদ করা হয় সেই সময় এই কালামুল্লাহ (কুরআন মাজীদ) তাঁর ক্রোড়ে বিদ্যমান ছিল এবং তাঁর রক্ত ঠিক এই শব্দগুলোর উপর ছিল (আরবি) একথা কি সত্য?' তখন হযরত নাফে' (রাঃ) বলেনঃ ‘এটা সম্পূর্ণ রূপে সঠিক কথা। আমি স্বয়ং এই আয়াতের উপর হযরত উসমান যিনুরাইনের (রাঃ) রক্ত দেখেছিলাম।এখানে রং’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘ধর্ম'। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। কেউ কেউ বলেন যে, এটা (আরবি)হতে (আরবি)হয়েছে যা এর পূর্বে বিদ্যমান রয়েছে। সিবওয়াই (রঃ) বলেন যে, এটা। (আরবি)-এরং (আরবি) এবং কারণে এর উপর (আরবি)হয়েছে। যেমন (আরবি)-এর উপর হয়েছে। একটি মারফু হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বানী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রভুও কি রং করে থাকেন?' তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তা'আলা তখন হযরত মূসা (আঃ) কে ডাক দিয়ে বলেনঃ “তারা কি তোমাকে জিজ্ঞেস করছে যে, তোমার প্রভু কি রং করেন?' তিনি বলেনঃ হাঁ। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, লাল, সাদা, কালো ইত্যাদি সমুদয় রং আল্লাহ তাআলাই সষ্টি করেন। এই আয়াতেরও ভাবার্থ এটাই। কিন্তু হাদীসটি মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা এবং এটাও এর ইসনাদ বিশুদ্ধ হওয়ার উপর নির্ভর করে।
আল-বাকারা 2:138
১৩৭-১৩৮ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ হে ঈমানদার সাহাবীবর্গ (রাঃ)! এই সব কাফিরও যদি তোমাদের মত যাবতীয় কিতাব ও রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তবে তারাও সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি দলীল ও প্রমাণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনয়ন হতে বিরত থাকে তবে নিশ্চিত রূপে তারা ন্যায় ও সত্যের উল্টো পথে রয়েছে। সেই সময় হে নবী (সঃ)! তোমাকে তাদের উপর জয়যুক্ত করতঃ আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে তোমাদেরকেই যথেষ্ট করবেন। হযরত নাফে' বিন আবু নাঈম (রাঃ) বলেন যে, কোন একজন খলীফার নিকট হযরত উসমানের (রাঃ) কুরআন মাজীদ পাঠানো হয়। একথা শুনে যিয়াদ নামক এক ব্যক্তি নাফে' বিন আবু নাঈমকে বলেনঃ “জনসাধারণের মধ্যে একথা ছড়িয়ে রয়েছে যে, যখন হযরত উসমানকে (রাঃ) শহীদ করা হয় সেই সময় এই কালামুল্লাহ (কুরআন মাজীদ) তাঁর ক্রোড়ে বিদ্যমান ছিল এবং তাঁর রক্ত ঠিক এই শব্দগুলোর উপর ছিল (আরবি) একথা কি সত্য?' তখন হযরত নাফে' (রাঃ) বলেনঃ ‘এটা সম্পূর্ণ রূপে সঠিক কথা। আমি স্বয়ং এই আয়াতের উপর হযরত উসমান যিনুরাইনের (রাঃ) রক্ত দেখেছিলাম।এখানে রং’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘ধর্ম'। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। কেউ কেউ বলেন যে, এটা (আরবি)হতে (আরবি)হয়েছে যা এর পূর্বে বিদ্যমান রয়েছে। সিবওয়াই (রঃ) বলেন যে, এটা। (আরবি)-এরং (আরবি) এবং কারণে এর উপর (আরবি)হয়েছে। যেমন (আরবি)-এর উপর হয়েছে। একটি মারফু হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বানী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রভুও কি রং করে থাকেন?' তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তা'আলা তখন হযরত মূসা (আঃ) কে ডাক দিয়ে বলেনঃ “তারা কি তোমাকে জিজ্ঞেস করছে যে, তোমার প্রভু কি রং করেন?' তিনি বলেনঃ হাঁ। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, লাল, সাদা, কালো ইত্যাদি সমুদয় রং আল্লাহ তাআলাই সষ্টি করেন। এই আয়াতেরও ভাবার্থ এটাই। কিন্তু হাদীসটি মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা এবং এটাও এর ইসনাদ বিশুদ্ধ হওয়ার উপর নির্ভর করে।
আল-বাকারা 2:139
১৩৯-১৪১ নং আয়াতের তাফসীরবিশ্ব প্রভু স্বীয় নবী (সঃ)কে মুশরিকদের ঝগড়া বিদুরিত করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা আমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ, অকৃত্রিমতা, আনুগত্য ইত্যাদির ব্যাপারে বিবাদ করছে। কেন? তিনি তো শুধু আমাদের প্রভু নন বরং তোমাদেরও প্রভু। তিনি তো আমাদের ও তোমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং তিনি আমাদের সবারই ব্যবস্থাপক। আমাদের কাজের প্রতিদান আমাদেরকে দেয়া হবে। আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের শিকের প্রতি অসন্তুষ্ট।' কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাওআমার জন্যে আমার কাজ এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ, তোমরা আমার (সৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমিও তোমাদের (অসৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও-আমি ও আমার অনুসারীরা আমাদের মুখমণ্ডল আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিলাম।' হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তার গোত্রের লোককে এ কথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা কি আমার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ঝগড়া করছো?' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “হে নবী (সঃ!) তুমি কি তাকে দেখনি যে ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে তার প্রভুর ব্যাপারে ঝগড়া করছিল? সুতরাং এখানে ঐ বিবাদীদেরকে বলা হচ্ছেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। আমরা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তোমাদের হতে পৃথক হয়ে গেলাম। আমরা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে পড়বো।' অতঃপর ঐ সব লোকের দাবী খণ্ডন করা হচ্ছে যে, ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। কাজেই হে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানের দল! তোমরা এসব কথা বানিয়ে বলছো কেন? বলা হচ্ছে যে, তোমাদের জ্ঞান কি আল্লাহ তাআলার চেয়েও বেড়ে গেল? আল্লাহ তাআলা তো পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহুদীও ছিল না এবং খ্রীষ্টানও ছিল না। বরং সুদৃঢ় মুসলমান ছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (৩:৬৭) আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষ্যকে গোপন করে তাদের বড় অত্যাচার করা এই ছিল যে, তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলা যে কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন তা তারা পড়েছিল এবং জানতে পেরেছিল যে, ইসলামই প্রকৃত ধর্ম ও মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সত্য রাসূল। এটা জেনেও তারা তা গোপন করেছিল। ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক (আঃ), ইয়াকুব (আঃ) প্রভৃতি সবাই ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্ম হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক ছিলেন। কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি। শুধু তাই নয়, বরং এই কথাকেই তারা গোপন করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের কাজ তার নিকট গোপন নেই। তার ইলম' সব জিনিসকেই ঘিরে রয়েছে। তিনি প্রত্যেক ভাল ও মন্দ কাজের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।এই ধমক দেয়ার পর আল্লাহ বলেন যে, ঐ সব মহা মানব তো তাঁর নিকট পৌছে গেছে। এখন যদি তোমরা তাদের পদাংক অনসুরণ না কর, তবে তোমরা তাঁদের বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমাদের কোনই সম্মান নেই। আর তোমাদের অসৎ কাজের বোঝাও তাদেরকে বইতে হবে না। তোমরা যখন এক নবীকে অস্বীকার করছে তখন যেন সমস্ত নবীকেই অস্বীকার করছে। বিশেষ করে তোমরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর যুগে বাস করেও তাকে অস্বীকার করছে। যিনি হচ্ছেন সমস্ত নবীর নেতা। যাকে সমস্ত দানবও মানবের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং তার রিসালাতকে মেনে নেয়া প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। তাঁর উপর ও অন্যান্য সমস্ত নবীর উপরও আল্লাহ তা'আলার দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
আল-বাকারা 2:140
১৩৯-১৪১ নং আয়াতের তাফসীরবিশ্ব প্রভু স্বীয় নবী (সঃ)কে মুশরিকদের ঝগড়া বিদুরিত করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা আমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ, অকৃত্রিমতা, আনুগত্য ইত্যাদির ব্যাপারে বিবাদ করছে। কেন? তিনি তো শুধু আমাদের প্রভু নন বরং তোমাদেরও প্রভু। তিনি তো আমাদের ও তোমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং তিনি আমাদের সবারই ব্যবস্থাপক। আমাদের কাজের প্রতিদান আমাদেরকে দেয়া হবে। আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের শিকের প্রতি অসন্তুষ্ট।' কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাওআমার জন্যে আমার কাজ এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ, তোমরা আমার (সৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমিও তোমাদের (অসৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও-আমি ও আমার অনুসারীরা আমাদের মুখমণ্ডল আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিলাম।' হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তার গোত্রের লোককে এ কথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা কি আমার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ঝগড়া করছো?' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “হে নবী (সঃ!) তুমি কি তাকে দেখনি যে ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে তার প্রভুর ব্যাপারে ঝগড়া করছিল? সুতরাং এখানে ঐ বিবাদীদেরকে বলা হচ্ছেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। আমরা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তোমাদের হতে পৃথক হয়ে গেলাম। আমরা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে পড়বো।' অতঃপর ঐ সব লোকের দাবী খণ্ডন করা হচ্ছে যে, ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। কাজেই হে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানের দল! তোমরা এসব কথা বানিয়ে বলছো কেন? বলা হচ্ছে যে, তোমাদের জ্ঞান কি আল্লাহ তাআলার চেয়েও বেড়ে গেল? আল্লাহ তাআলা তো পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহুদীও ছিল না এবং খ্রীষ্টানও ছিল না। বরং সুদৃঢ় মুসলমান ছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (৩:৬৭) আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষ্যকে গোপন করে তাদের বড় অত্যাচার করা এই ছিল যে, তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলা যে কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন তা তারা পড়েছিল এবং জানতে পেরেছিল যে, ইসলামই প্রকৃত ধর্ম ও মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সত্য রাসূল। এটা জেনেও তারা তা গোপন করেছিল। ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক (আঃ), ইয়াকুব (আঃ) প্রভৃতি সবাই ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্ম হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক ছিলেন। কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি। শুধু তাই নয়, বরং এই কথাকেই তারা গোপন করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের কাজ তার নিকট গোপন নেই। তার ইলম' সব জিনিসকেই ঘিরে রয়েছে। তিনি প্রত্যেক ভাল ও মন্দ কাজের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।এই ধমক দেয়ার পর আল্লাহ বলেন যে, ঐ সব মহা মানব তো তাঁর নিকট পৌছে গেছে। এখন যদি তোমরা তাদের পদাংক অনসুরণ না কর, তবে তোমরা তাঁদের বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমাদের কোনই সম্মান নেই। আর তোমাদের অসৎ কাজের বোঝাও তাদেরকে বইতে হবে না। তোমরা যখন এক নবীকে অস্বীকার করছে তখন যেন সমস্ত নবীকেই অস্বীকার করছে। বিশেষ করে তোমরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর যুগে বাস করেও তাকে অস্বীকার করছে। যিনি হচ্ছেন সমস্ত নবীর নেতা। যাকে সমস্ত দানবও মানবের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং তার রিসালাতকে মেনে নেয়া প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। তাঁর উপর ও অন্যান্য সমস্ত নবীর উপরও আল্লাহ তা'আলার দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
আল-বাকারা 2:141
১৩৯-১৪১ নং আয়াতের তাফসীরবিশ্ব প্রভু স্বীয় নবী (সঃ)কে মুশরিকদের ঝগড়া বিদুরিত করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা আমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ, অকৃত্রিমতা, আনুগত্য ইত্যাদির ব্যাপারে বিবাদ করছে। কেন? তিনি তো শুধু আমাদের প্রভু নন বরং তোমাদেরও প্রভু। তিনি তো আমাদের ও তোমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং তিনি আমাদের সবারই ব্যবস্থাপক। আমাদের কাজের প্রতিদান আমাদেরকে দেয়া হবে। আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের শিকের প্রতি অসন্তুষ্ট।' কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাওআমার জন্যে আমার কাজ এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ, তোমরা আমার (সৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমিও তোমাদের (অসৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও-আমি ও আমার অনুসারীরা আমাদের মুখমণ্ডল আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিলাম।' হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তার গোত্রের লোককে এ কথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা কি আমার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ঝগড়া করছো?' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “হে নবী (সঃ!) তুমি কি তাকে দেখনি যে ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে তার প্রভুর ব্যাপারে ঝগড়া করছিল? সুতরাং এখানে ঐ বিবাদীদেরকে বলা হচ্ছেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। আমরা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তোমাদের হতে পৃথক হয়ে গেলাম। আমরা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে পড়বো।' অতঃপর ঐ সব লোকের দাবী খণ্ডন করা হচ্ছে যে, ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। কাজেই হে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানের দল! তোমরা এসব কথা বানিয়ে বলছো কেন? বলা হচ্ছে যে, তোমাদের জ্ঞান কি আল্লাহ তাআলার চেয়েও বেড়ে গেল? আল্লাহ তাআলা তো পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহুদীও ছিল না এবং খ্রীষ্টানও ছিল না। বরং সুদৃঢ় মুসলমান ছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (৩:৬৭) আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষ্যকে গোপন করে তাদের বড় অত্যাচার করা এই ছিল যে, তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলা যে কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন তা তারা পড়েছিল এবং জানতে পেরেছিল যে, ইসলামই প্রকৃত ধর্ম ও মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সত্য রাসূল। এটা জেনেও তারা তা গোপন করেছিল। ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক (আঃ), ইয়াকুব (আঃ) প্রভৃতি সবাই ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্ম হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক ছিলেন। কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি। শুধু তাই নয়, বরং এই কথাকেই তারা গোপন করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের কাজ তার নিকট গোপন নেই। তার ইলম' সব জিনিসকেই ঘিরে রয়েছে। তিনি প্রত্যেক ভাল ও মন্দ কাজের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।এই ধমক দেয়ার পর আল্লাহ বলেন যে, ঐ সব মহা মানব তো তাঁর নিকট পৌছে গেছে। এখন যদি তোমরা তাদের পদাংক অনসুরণ না কর, তবে তোমরা তাঁদের বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমাদের কোনই সম্মান নেই। আর তোমাদের অসৎ কাজের বোঝাও তাদেরকে বইতে হবে না। তোমরা যখন এক নবীকে অস্বীকার করছে তখন যেন সমস্ত নবীকেই অস্বীকার করছে। বিশেষ করে তোমরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর যুগে বাস করেও তাকে অস্বীকার করছে। যিনি হচ্ছেন সমস্ত নবীর নেতা। যাকে সমস্ত দানবও মানবের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং তার রিসালাতকে মেনে নেয়া প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। তাঁর উপর ও অন্যান্য সমস্ত নবীর উপরও আল্লাহ তা'আলার দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
আল-বাকারা 2:142
১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীরবলা হয় যে, নির্বোধ লোক দ্বারা আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। একটি উক্তিতে ইয়াহূদীদের আলেমগণকে বুঝানো হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিকেরা। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। কা'বা ঘর তাঁর কিবলাহ্ হোক এটাই তাঁর মনের বাসনা ছিল। এর হুকুম প্রাপ্তির পর তিনি ঐদিকে মুখ করে প্রথম আসরের নামায পড়েন। যেসব লোক তাঁর সাথে নামায পড়েছিলেন তাদের মধ্যে একটি লোক মসজিদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তথায় তোক রুকুর অবস্থায় ছিলেন। ঐ লোকটি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি নবী (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি।' একথা শুনামাত্রই ঐসব লোক ঐ অবস্থাতেই কা'বার দিকে ফিরে যান। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের পূর্বে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু লোক শহীদও হয়েছিলেন। তাঁদের নামায সম্বন্ধে কি বলা যায় তা জনগণের জানা ছিল না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না।'সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই বর্ণনাটি অন্যভাবে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করতেন। তখন (আরবি) (২:৪৪) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কা'বা শরীফ কিবলাহ্ রূপে নির্ধারিত হয়। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক বলেনঃ “কিবলাহ’ পরিবর্তনের পূর্বে যারা মারা গেছেন তাদের অবস্থা, যদি আমরা জানতে পারতাম! সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (২:৪৩) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আহলে কিতাবের মধ্যে কয়েকজন নির্বোধ এই কিবলাহ্ পরিবর্তনের উপর আপত্তি আরোপ করে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন তখন বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ করা তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল। এতে ইয়াহূদীরা খুবই খুশী হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) -এর কিবলাহকে পছন্দ করতেন। সুতরাং কিবলাহ্ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হলে ইয়াহূদীরা হিংসা বশতঃ বহু আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। এই ব্যাপারে যথেষ্ট হাদীসও রয়েছে।মোট কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় দুই রুকনের মধ্যবর্তী সাখারাই-বায়তুল মুকাদ্দাসকে সামনে রেখে নামায পড়তেন। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করেন তখন ঐ দুটোকে একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই জন্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নামাযে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই নির্দেশ কুরআন কারীমের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল কি অন্য কিছুর মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এটা তাঁর ইজতিহাদী বিষয় ছিল এবং মদীনায় আগমনের পরে কয়েক মাস পর্যন্ত তিনি ওর উপরই আমল করেন, যদিও তিনি আল্লাহ তা'আলার কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকতেন। অবশেষে তাঁর প্রার্থনা গৃহীত হয় এবং সর্বপ্রথম তিনি ঐদিকে মুখ করে আসরের নামায পড়েন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা যুহরের নামায ছিল। হযরত আবু সাঈদ বিন আলমুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, আমি ও আমার সঙ্গী প্রথমে কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি এবং ওটা যুহরের নামায ছিল। কোন কোন মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ)-এর উপর কিবলাহ পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বানী সালমার’ মসজিদে যুহরের নামায পড়ছিলেন। দু'রাকআত পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন, অবশিষ্ট দু'রাকআত তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে পড়েন। এই কারণেই এই মসজিদের নাম হয়েছে মসজিদুল কিবলাতাইন' অর্থাৎ ‘দুই কিবলার মসজিদ'। হযরত নুওয়াইলা বিনতে মুসলিম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা যুহরের নামাযে ছিলাম এমন সময় আমরা এ সংবাদ পাই, আমরা নামাযের মধ্যেই ঘুরে যাই। পুরুষ লোকেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় এসে পড়ে এবং স্ত্রীলোকেরা পুরুষ লোকদের জায়গায় পৌছে যায়। তবে ‘কুবা' বাসীর নিকট পরদিন ফজরের নামাযের সময় এ সংবাদ পৌছে।' বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মানুষ ‘কুবা’র মসজিদে ফজরের নামায আদায় করছিল, হঠাৎ কোন আগন্তুক বলে যে, রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কুরআন মাজীদের হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবা শরীফের দিকে মুখ করার নির্দেশ হয়ে গেছে। সুতরাং আমরাও সিরিয়ার দিক হতে মুখ সরিয়ে কা'বার দিকে মুখ করে নেই। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, কোন নাসিখের’ হুকুম তখনই অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকে যখন তা জানা যায়, যদিও তা পূর্বেই পৌছে থাকে। কেননা এই মহোদয়গণকে আসর, মাগরিব ও এশার নামায আবার ফিরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি।এখন অন্যায় পন্থী এবং দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিরা বলতে আরম্ভ করে যে, কখনও একে এবং কখনও ওকে কেবলাহ্ বানানোর কারণটা কি? তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, হুকুম ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যেদিকেই মুখ কর না কেন, সব দিকেই তিনি রয়েছেন। মুখ এদিকে ও ঐদিকে করার মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত নেই। প্রকৃত পুণ্যের কারণ হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা যা প্রত্যেক নির্দেশ মানতে বাধ্য করে থাকে। এর দ্বারা যেন মুসলমানদেরকে দ্রতা শিখানো হচ্ছে যে, তাদের কাজ তো শুধু আদেশ পালন। যে দিকেই তাদেরকে মুখ করতে বলা হয় সেদিকেই তারা মুখ করে থাকে। আনুগত্যের অর্থ হচ্ছে তার আদেশ পালন। যদি দিনে একশো বার ঘুরতে বলেন তবুও আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুরে যাবো। আমরা তাঁরই অনুগত এবং তাঁরই সেবক। তিনি যেদিকেই আমাদের ঘুরতে বলবেন, সেই দিকেই আমরা ঘুরে যাবো। মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপরে এটাও একটা বড় অনুগ্রহ যে, তাদেরকে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সেই অংশী বিহীন আল্লাহর নামের উপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং যদ্দ্বারা সমুদয় ফযীলত লাভ হয়ে থাকে। মুসনাদে আহমাদের মধ্যে একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই ব্যাপারে আমাদের উপর ইয়াহূদীদের খুবই হিংসা রয়েছে যে, আমাদেরকে জুম'আর দিনের তাওফীক প্রদান করা হয়েছে এবং তারা তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আর এর উপর যে, আমাদের কিবলাহ এইটি এবং তারা এর থেকে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সজোরে ‘আমীন' বলার উপরেও তাদের বড়ই হিংসা রয়েছে, যা আমরা ইমামের পিছনে বলে থাকি।'অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হে উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)! তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় কিবলার দিকে ফিরাবার কারণ এই যে, তোমরা নিজেও পছন্দনীয় উম্মত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের উপর সাক্ষী স্বরূপ দাঁড়াবে। কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে। (আরবি)-এর অর্থ এখানে ভাল ও উত্তম। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, কুরাইশ বংশ হিসেবে (আরবি) অর্থাৎ আরবের মধ্যে উত্তম। এটাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গোত্রের মধ্যে (আরবি) ছিলেন অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত বংশ সম্পন্ন ছিলেন। (আরবি)অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম নামায, যেটা আসরের নামায, এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মদীই (সঃ) সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়তও দেয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ সরল ও সঠিক পথও দেয়া হয়েছে এবং অতি স্পষ্ট ধর্মও দেয়া হয়েছে। এই জন্যেই মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সেই আল্লাহ তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের ধর্মে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপরে রয়েছ এবং তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান। এর পূর্বেও এবং এর মধ্যেও যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন, আর তোমরা সাক্ষী হও অন্যান্য উম্মতের উপর।' মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হযরত নুহ (আঃ) কে ডাকা হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি কি আমার বার্তা আমার বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলে?' তিনি বলবেনঃ হে প্রভু! হাঁ, আমি পৌছিয়ে দিয়েছি।' অতঃপর তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ নূহ (আঃ) কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিল? তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবে এবং বলবে আমাদের নিকট কোন ভয় প্রদর্শক আসেননি। তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে বলা হবেঃ তোমার উম্মত তো অস্বীকার করছে সুতরাং তুমি সাক্ষী হাযির কর। তিনি বললেনঃ হ, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত আমার সাক্ষী'। (আরবি) আয়াতটির ভাবার্থ এটাই (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আদল’ ও ‘ইনসাফ'। এখন তোমাদেরকে আহবান করা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য প্রদান করবে, আর আমি তোমাদের অনুকূলে সাক্ষ্য দেব (সহীহ বুখারী, জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-নাসায়ী, সুনান ই ইবনে মাজাহ)। মুসনাদে আহমাদের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন নবী আসবেন এবং তার সাথে তাঁর উম্মতের শুধু মাত্র দুটি লোকই থাকবে কিংবা তার চেয়ে বেশী। তাঁর উম্মতকে আহবান করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবেঃ এই নবী কি তোমাদের নিকট ধর্ম প্রচার করে ছিলেন?' তারা অস্বীকার করবে। নবীকে তখন জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি ‘তাবলীগ’ করেছিলে কি? তিনি বলবেন হ’। তাকে বলা হবেঃ তোমার সাক্ষী কে আছে?' তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত।' অতঃপর মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে। তাদেরকে এই প্রশ্নই করা হবে যে, এই নবী প্রচার কার্য চালিয়ে ছিলেন কি? তারা বলবেন হাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ ‘তোমরা কি করে জানলে?' তারা উত্তর দেবেঃ আমাদের নিকট নবী আগমন করেছিলেন এবং তিনিই আমাদেরকে জানিয়ে ছিলেন যে, নবীগণ তাঁদের উম্মতের নিকট প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার (আরবি) এই কথার ভাবার্থ।' মুসনাদে আহমাদের আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ যারা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত।' তাফসীর ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি ও আমার উম্মত উঁচু টিলার উপর অবস্থান করবো এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবো এবং সকলকেই দেখতে থাকবো। সেই দিন সবাই এই আকাংখা পোষণ করবে যে, যদি তারাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত হতো।যে যে নবীকে তাদের কওম’ অবিশ্বাস করেছিল, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো যে, এই সব নবী তাদের রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।' মুস্তাদরিক-ই-হাকিম নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন ‘বানী মাসলামা গোত্রের একটি লোকের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত হন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে ছিলাম। তাদের মধ্যে কোন একটি লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল! এই লোকটি খুবই সৎ, খোদাভীরু পুণ্যবান এবং খাঁটি মুসলমান ছিল। এভাবে সে তার অত্যন্ত প্রশংসা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তুমি একথা কি করে বলছো?' লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গুপ্ত ব্যাপারতো আল্লাহ তাআলাই জানেন। কিন্তু বাহ্যিক ব্যাপার তার এরূপই ছিল। নবী (সঃ) বলেনঃ ‘এটা তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বানু হারিসার একটি জানাযায় উপস্থিত হন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই লোকটি খুবই মন্দ ছিল। সে ছিল খুবই কর্কশ ভাষী এবং মন্দ চরিত্রের অধিকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দুর্নাম শুনে বলেন, 'তুমি কিভাবে একথা বলছছ?' সেই লোকটিও ঐ কথা বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার জন্যে এটা ওয়াজিব হয়ে গেল।হযরত মুসআব বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি শুনে মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) আমাদেরকে বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদে আহমাদ’ নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, আবুল আসওয়াদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একবার মদীনায় আগমন করি। এখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক মরতে থাকে। আমি হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা যেতে থাকে। জনগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করতে আরম্ভ করে। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আর একটি জানাযা বের হয়। লোকেরা তার দুর্নাম করতে শুরু করে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। আমি বলিঃ হে আমিরুল মুমেনিন! কি ওয়াজিব হয়ে গেল?' তিনি বলেনঃ “আমি ঐ কথাই বললাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ চারজন লোক যে মুসলমানের ভাল কাজের সাক্ষ্য প্রদান করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন।' আমরা বলি-'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি তিন ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়? তিনি বলেনঃ “তিন জন দিলেও।' আমরা বলি যদি দুইজন দেয়?' তিনি বলেনঃ ‘দুইজন দিলেও। অতঃপর আমরা আর একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুহাইর সাকাফী (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘অতি সত্বরই তোমরা তোমাদের ভাল ও মন্দ জেনে নেবে। জনগণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে (জানবে)? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ পৃথিবীর উপর তোমরা ভাল ও মন্দ প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর সাক্ষীরূপে গণ্য হচ্ছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘প্রথম কিবলাহ্ শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক ছিল। অর্থাৎ প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ নির্ধারিত করে পরে কা'বা শরীফকে কিবলাহ্ রূপে নির্ধারণ করা শুধু এই জন্যই ছিল যে, এর দ্বারা সত্য অনুসারীর পরিচয় পাওয়া যায়। আর তাকেও চেনা যায় যে এর কারণে ধর্ম হতে ফিরে যায়। এটা বাস্তবিকই কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যানুসারী, যারা বিশ্বাস রাখে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা যা বলেন তা সত্য, যাদের এই বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই করে থাকেন, তিনি বান্দাদের উপর যে নির্দেশ দেয়ার ইচ্ছা করেন সেই নির্দেশই দিয়ে থাকেন এবং যে নির্দেশ উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন তা উঠিয়ে নেন, তাঁর প্রত্যেক কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ, তাদের জন্যে এই নির্দেশ পালন মোটেই কঠিন নয়। তবে যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তাদের কাছে কোন নতুন নির্দেশ এলেই তো তাদের নতুন ব্যথা উঠে পড়ে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ বলে-এর দ্বারা কার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে?’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঈমানদারগণের ঈমান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং তাদের মনের আনন্দও বৃদ্ধি পায়। আর রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অপবিত্রতার মধ্যে আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-ঈমানদারদের জন্যে এটা সুপথ প্রাপ্তি ও রোগ মুক্তির কারণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের কর্ণসমূহে বধিরতা ও চক্ষুসমূহে অন্ধত্ব রয়েছে।' (৪১:৪৪) অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি এমন কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা ঈমানদারদের জন্যে শিফা ও রহমত স্বরূপ, এবং এটা দ্বারা অত্যাচারীদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।' (১৭৪৮২) এ ঘটনাতেও সমস্ত মহান সাহাবী (রাঃ) স্থির ছিলেন। যেসব মুহাজির (রাঃ) ও আনসার (রাঃ) প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন তারা উভয় কিবলাহর দিকে মুখ করেই নামায পড়েছেন। উপরে বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা জানা গেছে যে, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নামাযের মধ্যেই তাঁরা কাবার দিকে ফিরে গেছেন। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা রুকুর অবস্থায় ছিলেন এবং ঐ অবস্থাতেই কাবার দিকে ফিরে যান। এর দ্বারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পাচ্ছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না, অর্থাৎ তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে যেসব নামায আদায় করেছো,ওর পুণ্য থেকে আমি তোমাদেরকে বঞ্চিত করবো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বরং তাদের উচ্চমানের ঈমানদারী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদেরকে দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়ার পুণ্য দেয়া হবে। এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ (সঃ)-কে এবং তাঁর সাথে তোমাদের ঘুরে যাওয়াকে নষ্ট করবেন না। এর পর বলা হচ্ছেঃ নিশ্চয় আল্লাহ মানবগণের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু। সহীহ হাদীসে রয়েছে, একটি বন্দিনী স্ত্রী লোকের শিশু তার থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। এই স্ত্রী লোকটিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেখেন যে, সে উন্মাদিনির ন্যায় শিশুকে খুঁজতে রয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে সে বন্দীদের মধ্যে যে শিশুকেই দেখতে পায় তাকেই গলায় জড়িয়ে ধরে। অবশেষে সে তার শিশুকে পেয়ে যায়। ফলে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোহাগ করতে থাকে এবং মুখে দুধ দেয়। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেন, আচ্ছা বলতো এই স্ত্রী লোকটি কি তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?' তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কখনই না। তিনি তখন বলেনঃ আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর উপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর এর চেয়ে বহু গুণে স্নেহশীল ও দয়ালু।
আল-বাকারা 2:143
১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীরবলা হয় যে, নির্বোধ লোক দ্বারা আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। একটি উক্তিতে ইয়াহূদীদের আলেমগণকে বুঝানো হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিকেরা। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। কা'বা ঘর তাঁর কিবলাহ্ হোক এটাই তাঁর মনের বাসনা ছিল। এর হুকুম প্রাপ্তির পর তিনি ঐদিকে মুখ করে প্রথম আসরের নামায পড়েন। যেসব লোক তাঁর সাথে নামায পড়েছিলেন তাদের মধ্যে একটি লোক মসজিদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তথায় তোক রুকুর অবস্থায় ছিলেন। ঐ লোকটি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি নবী (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি।' একথা শুনামাত্রই ঐসব লোক ঐ অবস্থাতেই কা'বার দিকে ফিরে যান। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের পূর্বে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু লোক শহীদও হয়েছিলেন। তাঁদের নামায সম্বন্ধে কি বলা যায় তা জনগণের জানা ছিল না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না।'সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই বর্ণনাটি অন্যভাবে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করতেন। তখন (আরবি) (২:৪৪) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কা'বা শরীফ কিবলাহ্ রূপে নির্ধারিত হয়। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক বলেনঃ “কিবলাহ’ পরিবর্তনের পূর্বে যারা মারা গেছেন তাদের অবস্থা, যদি আমরা জানতে পারতাম! সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (২:৪৩) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আহলে কিতাবের মধ্যে কয়েকজন নির্বোধ এই কিবলাহ্ পরিবর্তনের উপর আপত্তি আরোপ করে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন তখন বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ করা তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল। এতে ইয়াহূদীরা খুবই খুশী হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) -এর কিবলাহকে পছন্দ করতেন। সুতরাং কিবলাহ্ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হলে ইয়াহূদীরা হিংসা বশতঃ বহু আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। এই ব্যাপারে যথেষ্ট হাদীসও রয়েছে।মোট কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় দুই রুকনের মধ্যবর্তী সাখারাই-বায়তুল মুকাদ্দাসকে সামনে রেখে নামায পড়তেন। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করেন তখন ঐ দুটোকে একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই জন্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নামাযে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই নির্দেশ কুরআন কারীমের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল কি অন্য কিছুর মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এটা তাঁর ইজতিহাদী বিষয় ছিল এবং মদীনায় আগমনের পরে কয়েক মাস পর্যন্ত তিনি ওর উপরই আমল করেন, যদিও তিনি আল্লাহ তা'আলার কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকতেন। অবশেষে তাঁর প্রার্থনা গৃহীত হয় এবং সর্বপ্রথম তিনি ঐদিকে মুখ করে আসরের নামায পড়েন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা যুহরের নামায ছিল। হযরত আবু সাঈদ বিন আলমুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, আমি ও আমার সঙ্গী প্রথমে কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি এবং ওটা যুহরের নামায ছিল। কোন কোন মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ)-এর উপর কিবলাহ পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বানী সালমার’ মসজিদে যুহরের নামায পড়ছিলেন। দু'রাকআত পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন, অবশিষ্ট দু'রাকআত তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে পড়েন। এই কারণেই এই মসজিদের নাম হয়েছে মসজিদুল কিবলাতাইন' অর্থাৎ ‘দুই কিবলার মসজিদ'। হযরত নুওয়াইলা বিনতে মুসলিম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা যুহরের নামাযে ছিলাম এমন সময় আমরা এ সংবাদ পাই, আমরা নামাযের মধ্যেই ঘুরে যাই। পুরুষ লোকেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় এসে পড়ে এবং স্ত্রীলোকেরা পুরুষ লোকদের জায়গায় পৌছে যায়। তবে ‘কুবা' বাসীর নিকট পরদিন ফজরের নামাযের সময় এ সংবাদ পৌছে।' বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মানুষ ‘কুবা’র মসজিদে ফজরের নামায আদায় করছিল, হঠাৎ কোন আগন্তুক বলে যে, রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কুরআন মাজীদের হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবা শরীফের দিকে মুখ করার নির্দেশ হয়ে গেছে। সুতরাং আমরাও সিরিয়ার দিক হতে মুখ সরিয়ে কা'বার দিকে মুখ করে নেই। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, কোন নাসিখের’ হুকুম তখনই অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকে যখন তা জানা যায়, যদিও তা পূর্বেই পৌছে থাকে। কেননা এই মহোদয়গণকে আসর, মাগরিব ও এশার নামায আবার ফিরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি।এখন অন্যায় পন্থী এবং দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিরা বলতে আরম্ভ করে যে, কখনও একে এবং কখনও ওকে কেবলাহ্ বানানোর কারণটা কি? তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, হুকুম ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যেদিকেই মুখ কর না কেন, সব দিকেই তিনি রয়েছেন। মুখ এদিকে ও ঐদিকে করার মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত নেই। প্রকৃত পুণ্যের কারণ হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা যা প্রত্যেক নির্দেশ মানতে বাধ্য করে থাকে। এর দ্বারা যেন মুসলমানদেরকে দ্রতা শিখানো হচ্ছে যে, তাদের কাজ তো শুধু আদেশ পালন। যে দিকেই তাদেরকে মুখ করতে বলা হয় সেদিকেই তারা মুখ করে থাকে। আনুগত্যের অর্থ হচ্ছে তার আদেশ পালন। যদি দিনে একশো বার ঘুরতে বলেন তবুও আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুরে যাবো। আমরা তাঁরই অনুগত এবং তাঁরই সেবক। তিনি যেদিকেই আমাদের ঘুরতে বলবেন, সেই দিকেই আমরা ঘুরে যাবো। মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপরে এটাও একটা বড় অনুগ্রহ যে, তাদেরকে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সেই অংশী বিহীন আল্লাহর নামের উপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং যদ্দ্বারা সমুদয় ফযীলত লাভ হয়ে থাকে। মুসনাদে আহমাদের মধ্যে একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই ব্যাপারে আমাদের উপর ইয়াহূদীদের খুবই হিংসা রয়েছে যে, আমাদেরকে জুম'আর দিনের তাওফীক প্রদান করা হয়েছে এবং তারা তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আর এর উপর যে, আমাদের কিবলাহ এইটি এবং তারা এর থেকে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সজোরে ‘আমীন' বলার উপরেও তাদের বড়ই হিংসা রয়েছে, যা আমরা ইমামের পিছনে বলে থাকি।'অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হে উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)! তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় কিবলার দিকে ফিরাবার কারণ এই যে, তোমরা নিজেও পছন্দনীয় উম্মত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের উপর সাক্ষী স্বরূপ দাঁড়াবে। কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে। (আরবি)-এর অর্থ এখানে ভাল ও উত্তম। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, কুরাইশ বংশ হিসেবে (আরবি) অর্থাৎ আরবের মধ্যে উত্তম। এটাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গোত্রের মধ্যে (আরবি) ছিলেন অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত বংশ সম্পন্ন ছিলেন। (আরবি)অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম নামায, যেটা আসরের নামায, এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মদীই (সঃ) সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়তও দেয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ সরল ও সঠিক পথও দেয়া হয়েছে এবং অতি স্পষ্ট ধর্মও দেয়া হয়েছে। এই জন্যেই মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সেই আল্লাহ তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের ধর্মে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপরে রয়েছ এবং তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান। এর পূর্বেও এবং এর মধ্যেও যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন, আর তোমরা সাক্ষী হও অন্যান্য উম্মতের উপর।' মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হযরত নুহ (আঃ) কে ডাকা হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি কি আমার বার্তা আমার বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলে?' তিনি বলবেনঃ হে প্রভু! হাঁ, আমি পৌছিয়ে দিয়েছি।' অতঃপর তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ নূহ (আঃ) কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিল? তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবে এবং বলবে আমাদের নিকট কোন ভয় প্রদর্শক আসেননি। তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে বলা হবেঃ তোমার উম্মত তো অস্বীকার করছে সুতরাং তুমি সাক্ষী হাযির কর। তিনি বললেনঃ হ, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত আমার সাক্ষী'। (আরবি) আয়াতটির ভাবার্থ এটাই (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আদল’ ও ‘ইনসাফ'। এখন তোমাদেরকে আহবান করা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য প্রদান করবে, আর আমি তোমাদের অনুকূলে সাক্ষ্য দেব (সহীহ বুখারী, জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-নাসায়ী, সুনান ই ইবনে মাজাহ)। মুসনাদে আহমাদের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন নবী আসবেন এবং তার সাথে তাঁর উম্মতের শুধু মাত্র দুটি লোকই থাকবে কিংবা তার চেয়ে বেশী। তাঁর উম্মতকে আহবান করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবেঃ এই নবী কি তোমাদের নিকট ধর্ম প্রচার করে ছিলেন?' তারা অস্বীকার করবে। নবীকে তখন জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি ‘তাবলীগ’ করেছিলে কি? তিনি বলবেন হ’। তাকে বলা হবেঃ তোমার সাক্ষী কে আছে?' তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত।' অতঃপর মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে। তাদেরকে এই প্রশ্নই করা হবে যে, এই নবী প্রচার কার্য চালিয়ে ছিলেন কি? তারা বলবেন হাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ ‘তোমরা কি করে জানলে?' তারা উত্তর দেবেঃ আমাদের নিকট নবী আগমন করেছিলেন এবং তিনিই আমাদেরকে জানিয়ে ছিলেন যে, নবীগণ তাঁদের উম্মতের নিকট প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার (আরবি) এই কথার ভাবার্থ।' মুসনাদে আহমাদের আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ যারা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত।' তাফসীর ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি ও আমার উম্মত উঁচু টিলার উপর অবস্থান করবো এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবো এবং সকলকেই দেখতে থাকবো। সেই দিন সবাই এই আকাংখা পোষণ করবে যে, যদি তারাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত হতো।যে যে নবীকে তাদের কওম’ অবিশ্বাস করেছিল, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো যে, এই সব নবী তাদের রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।' মুস্তাদরিক-ই-হাকিম নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন ‘বানী মাসলামা গোত্রের একটি লোকের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত হন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে ছিলাম। তাদের মধ্যে কোন একটি লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল! এই লোকটি খুবই সৎ, খোদাভীরু পুণ্যবান এবং খাঁটি মুসলমান ছিল। এভাবে সে তার অত্যন্ত প্রশংসা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তুমি একথা কি করে বলছো?' লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গুপ্ত ব্যাপারতো আল্লাহ তাআলাই জানেন। কিন্তু বাহ্যিক ব্যাপার তার এরূপই ছিল। নবী (সঃ) বলেনঃ ‘এটা তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বানু হারিসার একটি জানাযায় উপস্থিত হন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই লোকটি খুবই মন্দ ছিল। সে ছিল খুবই কর্কশ ভাষী এবং মন্দ চরিত্রের অধিকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দুর্নাম শুনে বলেন, 'তুমি কিভাবে একথা বলছছ?' সেই লোকটিও ঐ কথা বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার জন্যে এটা ওয়াজিব হয়ে গেল।হযরত মুসআব বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি শুনে মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) আমাদেরকে বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদে আহমাদ’ নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, আবুল আসওয়াদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একবার মদীনায় আগমন করি। এখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক মরতে থাকে। আমি হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা যেতে থাকে। জনগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করতে আরম্ভ করে। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আর একটি জানাযা বের হয়। লোকেরা তার দুর্নাম করতে শুরু করে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। আমি বলিঃ হে আমিরুল মুমেনিন! কি ওয়াজিব হয়ে গেল?' তিনি বলেনঃ “আমি ঐ কথাই বললাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ চারজন লোক যে মুসলমানের ভাল কাজের সাক্ষ্য প্রদান করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন।' আমরা বলি-'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি তিন ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়? তিনি বলেনঃ “তিন জন দিলেও।' আমরা বলি যদি দুইজন দেয়?' তিনি বলেনঃ ‘দুইজন দিলেও। অতঃপর আমরা আর একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুহাইর সাকাফী (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘অতি সত্বরই তোমরা তোমাদের ভাল ও মন্দ জেনে নেবে। জনগণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে (জানবে)? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ পৃথিবীর উপর তোমরা ভাল ও মন্দ প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর সাক্ষীরূপে গণ্য হচ্ছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘প্রথম কিবলাহ্ শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক ছিল। অর্থাৎ প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ নির্ধারিত করে পরে কা'বা শরীফকে কিবলাহ্ রূপে নির্ধারণ করা শুধু এই জন্যই ছিল যে, এর দ্বারা সত্য অনুসারীর পরিচয় পাওয়া যায়। আর তাকেও চেনা যায় যে এর কারণে ধর্ম হতে ফিরে যায়। এটা বাস্তবিকই কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যানুসারী, যারা বিশ্বাস রাখে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা যা বলেন তা সত্য, যাদের এই বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই করে থাকেন, তিনি বান্দাদের উপর যে নির্দেশ দেয়ার ইচ্ছা করেন সেই নির্দেশই দিয়ে থাকেন এবং যে নির্দেশ উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন তা উঠিয়ে নেন, তাঁর প্রত্যেক কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ, তাদের জন্যে এই নির্দেশ পালন মোটেই কঠিন নয়। তবে যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তাদের কাছে কোন নতুন নির্দেশ এলেই তো তাদের নতুন ব্যথা উঠে পড়ে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ বলে-এর দ্বারা কার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে?’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঈমানদারগণের ঈমান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং তাদের মনের আনন্দও বৃদ্ধি পায়। আর রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অপবিত্রতার মধ্যে আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-ঈমানদারদের জন্যে এটা সুপথ প্রাপ্তি ও রোগ মুক্তির কারণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের কর্ণসমূহে বধিরতা ও চক্ষুসমূহে অন্ধত্ব রয়েছে।' (৪১:৪৪) অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি এমন কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা ঈমানদারদের জন্যে শিফা ও রহমত স্বরূপ, এবং এটা দ্বারা অত্যাচারীদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।' (১৭৪৮২) এ ঘটনাতেও সমস্ত মহান সাহাবী (রাঃ) স্থির ছিলেন। যেসব মুহাজির (রাঃ) ও আনসার (রাঃ) প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন তারা উভয় কিবলাহর দিকে মুখ করেই নামায পড়েছেন। উপরে বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা জানা গেছে যে, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নামাযের মধ্যেই তাঁরা কাবার দিকে ফিরে গেছেন। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা রুকুর অবস্থায় ছিলেন এবং ঐ অবস্থাতেই কাবার দিকে ফিরে যান। এর দ্বারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পাচ্ছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না, অর্থাৎ তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে যেসব নামায আদায় করেছো,ওর পুণ্য থেকে আমি তোমাদেরকে বঞ্চিত করবো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বরং তাদের উচ্চমানের ঈমানদারী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদেরকে দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়ার পুণ্য দেয়া হবে। এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ (সঃ)-কে এবং তাঁর সাথে তোমাদের ঘুরে যাওয়াকে নষ্ট করবেন না। এর পর বলা হচ্ছেঃ নিশ্চয় আল্লাহ মানবগণের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু। সহীহ হাদীসে রয়েছে, একটি বন্দিনী স্ত্রী লোকের শিশু তার থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। এই স্ত্রী লোকটিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেখেন যে, সে উন্মাদিনির ন্যায় শিশুকে খুঁজতে রয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে সে বন্দীদের মধ্যে যে শিশুকেই দেখতে পায় তাকেই গলায় জড়িয়ে ধরে। অবশেষে সে তার শিশুকে পেয়ে যায়। ফলে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোহাগ করতে থাকে এবং মুখে দুধ দেয়। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেন, আচ্ছা বলতো এই স্ত্রী লোকটি কি তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?' তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কখনই না। তিনি তখন বলেনঃ আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর উপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর এর চেয়ে বহু গুণে স্নেহশীল ও দয়ালু।
আল-বাকারা 2:144
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে প্রথম ‘নসখ’ হচ্ছে কিবলাহর হুকুম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসী ছিল ইয়াহূদী। আল্লাহ তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে নামায পড়ার নির্দেশ দেন। ইয়াহুদীরা এতে খুবই খুশী হয়। তিনি কয়েক মাস পর্যন্ত ঐ দিকেই নামায পড়েন। কিন্তু স্বয়ং তাঁর মনের বাসনা ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলাহ্। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানাতেন। প্রায়ই তিনি আকাশের দিকে চক্ষু উত্তোলন করতেন। অবশেষে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে ইয়াহূদীরা বলতে থাকেঃ তিনি এই কিবলাহ্ হতে সরে গেলেন কেন? এর উত্তরে বলা হয় যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “যে দিকেই তোমাদের মুখ হয়-আল্লাহ সেই দিকেই রয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, পূর্ব কিবলাহ ছিল পরীক্ষামূলক। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের পরে স্বীয় মস্তক আকাশের দিকে উত্তোলন করতেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মসজিদে হারামের দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) ইমামতি করেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) মসজিদে হারামে' মীযাবের সামনে বসে এই পবিত্র আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ মীযাব কা'বার দিকে রয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রঃ)-এরও একটি উক্তি এই রয়েছে যে, ঠিক কাবার দিকে মুখ করাই হচ্ছে আসল উদ্দেশ্য। তাঁর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, মুখ কাবার দিকে হওয়াই যথেষ্ট। আবুল আলিয়া (রঃ) মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), প্রভৃতি মণীষীরও উক্তি এটাই। একটি হাদীসের মধ্যেও রয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থানে কিবলাহ্ রয়েছে। ইবনে জুরাইজ-এর গ্রন্থে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মসজিদে হারামের অধিবাসীদের কিবলাহ্ হচ্ছে বায়তুল্লাহ। হারাম’ বাসীদের কিবলাহ হলো মসজিদ'। আর হারাম কিবলাহ্ হচ্ছে সমগ্র পৃথিবী বাসীর। পূর্বেই থাক বা পশ্চিমেই থাক, আমার সমস্ত উম্মতের কিবলাহ্ এটাই। ‘আবু নাঈম’ নামক পুস্তকে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতেরো মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়লেও বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে নামায পড়াই তিনি পছন্দ করতেন। সুতরাং মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আসরেরনামায আদায় করেন। অতঃপর তাঁর সাথে নামায আদায়কারীগণের মধ্যে এক ব্যক্তি অন্য একটি মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ মসজিদে নামাযীরা সেই সময় রুকুতে ছিলেন। ঐ লোকটি তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করে নামায আদায় করেছি।' একথা শুনা মাত্রই তাঁরা যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থাতেই বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে ফিরে যান। আবদুর রাজ্জাকও কিছু হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে এটা বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসায়ীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ বিন মুআল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে ফজরের সময় মসজিদে নব্বীতে (সঃ) যেতাম এবং তথায় কিছু নফল নামায আদায় করতাম। একদিন আমরা গিয়ে দেখি যে, নবী (সঃ) মিম্বারের উপর বসে আছেন। আমি বলি যে আজ নিশ্চয় কোন নতুন কথা হয়েছে। আমিও বসে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। আমি আমার সঙ্গীদেরকে বলি আসুন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বক্তৃতা শেষ করার পূর্বেই এই নতুন নির্দেশকে কার্যে পরিণত করি এবং প্রথমেই আমরা আদেশ মান্যকারী হয়ে যাই। এই বলে আমরা একদিকে চলে যাই এবং সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে নামায আদায় করি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বার হতে নেমে আসেন এবং কিবলাহর দিকে মুখ করে সর্বপ্রথম যুহরের নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবার দিকে মুখ করে সর্বপ্রথম যে নামায আদায় করেন তা যুহরের নামায ছিল। আর এই নামাযই হচ্ছে সালাত-ই-ওসতা। কিন্তু কা'বার দিকে মুখ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্বপ্রথম যে আসরের নামায আদায় করেন এটাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এজন্যেই কুবাবাসী পরের দিন ফজরের নামাযে এই সংবাদ পেয়েছিল। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থে হযরত নুওয়াইলা’ বিনতে মুসলিম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা বানু হারিসার মসজিদে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে যুহর বা আসরের নামায পড়ছিলাম। আমাদের দু'রাকআত নামায পড়া হয়ে গেছে, এমন সময় কে একজন এসে কিবলাহ পরিবর্তনের সংবাদ দেয়। ফলে, আমরা নামাযের মধ্যেই বায়তুল্লাহর দিকে ঘুরে যাই এবং অবশিষ্ট দু'রাকাত ঐ দিকেই মুখ করে আদায় করি। নামাযের মধ্যে এইভাবে ফিরে যাওয়ার ফলে পুরুষ লোকেরা স্ত্রী লোকদের স্থানে এবং স্ত্রী লোকেরা পুরুষ লোকদের স্থানে এসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি খুশি হয়ে বলেনঃ এরাই হচ্ছে অদৃশ্যের উপর ঈমান আনয়নকারী।‘তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ গ্রন্থে হযরত উম্মারাহ্ বিন আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “রুকুর অবস্থায় আমরা কিবলাহ্ পরিবর্তনের সংবাদ পাই এবং আমরা পুরুষ, স্ত্রী ও শিশু সবাই ঐ কিবলাহর দিকেই ফিরে। যাই।' অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ যেখানেই থাকনা কেন, নামাযের সময় তোমরা কাবার দিকে মুখ কর।' তবে সফরে সোয়ারীর উপর যে ব্যক্তি নফল নামায পড়ে সে সোয়ারী যে দিকেই যাবে সে দিকেই মুখ করে নফল নামায আদায় করবে। তার মনের গতি কাবার দিকে থাকলেই যথেষ্ট হবে। এই রকমই যে ব্যক্তি যুদ্ধের মাঠে নামায পড়ে সে যেভাবে পারে এবং যেই দিকে পড়া তার জন্যে সুবিধাজনক হয় সেই দিকেই পড়বে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কিবলাহর দিক ঠিক করতে পারছে না সে অনুমান করে যে দিকেই কিবলাহ হওয়ার ধারণা তার বেশী হবে সে দিকেই সে নামায আদায় করবে। অতঃপর যদি প্রকৃত পক্ষেই তার নামায কিবলার দিকে হয়ে থাকে তবুও সে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা পেয়ে যাবে।জিজ্ঞাস্য বিষয়ঃমালেকীগণ এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নামাযীকে নামাযের অবস্থায় তার দৃষ্টি সামনের দিকে রাখতে হবে, সিজদার জায়গায় নয়। যেমন ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফারও (রঃ) এটাই মযহাব। কেননা আয়াতে রয়েছে, মসজিদে হারামের দিকে মুখ কর’, কাজেই যদি সিজদার জায়গায় মুখ করা যায় তবে কিছু নত হতে হবে এবং এই কৃত্রিমতাপূর্ণ বিনয় ও নম্রতার উল্টো। কোন কোন মালেকিয়্যার এটাও উক্তি রয়েছে যে, দাঁড়ান অবস্থায় স্বীয় বক্ষের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। কাযী শুরাইহ (রঃ) বলেন যে, দাঁড়ান অবস্থায় দৃষ্টি সিজদার স্থানে রাখতে হবে। জমহুর উলামার এটাই উক্তি। কেননা এটাই হচ্ছে পূর্ণ বিনয় ও নম্রতা। অন্য একটি হাদীসেও এ বিষয়টি এসেছে। রুকুর অবস্থায় দৃষ্টি স্বীয় পায়ের স্থানে, সিজদার অবস্থায় নাকের স্থানে এবং (আরবি)-এর সময় ক্রোড়ের প্রতি রাখতে হবে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, ইয়াহুদীরা কথা যতই বানিয়ে বলুক না কেন, তাদের মন বলে যে, কিবলাহ্র পরিবর্তন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়েছে এবং এটা সত্য। কেননা, এটা স্বয়ং তাদের কিতাবেও রয়েছে। কিন্তু এরা একমাত্র কুফর, অবাধ্যতা, অহংকার এবং হিংসার বশবর্তী হয়েই এটা গোপন করছে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম হতে উদাসীন নন।
আল-বাকারা 2:145
এখানে ইয়াহূদীদের কুফর, অবাধ্যতা, বিরোধিতা এবং দুষ্টামির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্বন্ধে তাদের পূর্ণ অবগতি থাকা সত্ত্বেও এবং তাদের নিকট সর্বপ্রকারের দলীল পেশ করা সত্ত্বেও তারা সত্যের অনুসরণ করছে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের কাছে সমস্ত নিদর্শন এসে গেলেও তারা ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি দেখে নেয় (১০:৯৬)। অতঃপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবীর (সঃ) অটলতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যেমন তারা অসত্যের উপর স্থির ও অটল রয়েছে, তারা সেখান হতে সরতে চাচ্ছে না, তেমনি তাদেরও বুঝে নেয়া উচিত যে, তাঁর নবীও (সঃ) কখনও তাদের কথার উপরে আসতে পারেন না। তিনি তো তারই আদেশের অনুসারী। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যা পছন্দ করেন তাই তাঁর নবী (সঃ) পালন করে থাকেন। তিনি কখনও তাদের মিথ্যা প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তার দ্বারা এটা কখনও সম্ভব নয় যে, আল্লাহর নির্দেশ এসে যাওয়ার পর তাদের কিবলার দিকে মুখ করেন। অতঃপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করতঃ প্রকৃতপক্ষে আলেমগণকেই যেন ধমক দিয়ে বলছেন যে, সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর কারও পিছনে লেগে যাওয়া এবং নিজের অথবা অন্যদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করা প্রকাশ্য অত্যাচারই বটে।
আল-বাকারা 2:146
১৪৬-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীরইরশাদ হচ্ছে যে, আহলে কিতাবের আলেমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক আনীত কথাগুলোর সত্যতা সম্বন্ধে এমনই জ্ঞাত রয়েছে যেমন জ্ঞাত রয়েছে পিতা ছেলেদের সম্বন্ধে। এটা একটা দৃষ্টান্ত ছিল যা আরবের লোকেরা পূর্ণ বিশ্বাসের সময় বলে থাকতো। একটি হাদীসে রয়েছে একটি লোকের সঙ্গে ছোট একটি শিশু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি তোমার ছেলে?” সে বলেঃ হাঁ’, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও সাক্ষী থাকুন। তিনি বলেনঃ “সেও তোমার উপর গোপন নেই এবং তুমিও তার উপর গোপন নও।'কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) ইয়াহুদীদের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত হযরত আবদুল্লাহ বিন সালামকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে এমনই চিনেন, যেমন চিনেন আপনার সন্তানদেরকে?' তিনি উত্তরে বলেনঃ 'হাঁ', বরং তার চেয়েও বেশী চিনি। কেননা, আকাশের বিশ্বস্ত ফেরেশতা পৃথিবীর একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হন এবং তিনি তার সঠিক পরিচয় বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ঈসার (আঃ) নিকট আগমন করেন, অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করেন এবং ঐ সবগুলোই তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এর পরে তিনি যে সত্য নবী এতে আমাদের আর কি সন্দেহ থাকতে পারে। তাকে এক নজর দেখেই চিনতে পারবো না কেন? আমাদের বরং আমাদের ছেলেদের সম্বন্ধে সন্দেহ থাকতে পারে কিন্তু তাঁর নবুওয়াত সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না।মোট কথা এই যে, যেমন একটি বিরাট জনসভায় কোন লোক তার ছেলেকে অতি সহজেই চিনে থাকে ঠিক তেমনই আহলে কিতাবও হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত মাত্রই চিনে থাকে। কেননা তাদের কিতাবে নবী (সঃ) সম্বন্ধে যে গুণাবলী বর্ণিত আছে তা সবই তার মধ্যে হুবহু বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সত্য জানা সত্ত্বেও তারা ওটা গোপন করছে। তারপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) ও মুসলমানদেরকে সত্যের উপর অটল ও স্থির থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন সত্যের ব্যাপারে মোটেই সন্দেহ পোষণ না করে।
আল-বাকারা 2:147
১৪৬-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীরইরশাদ হচ্ছে যে, আহলে কিতাবের আলেমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক আনীত কথাগুলোর সত্যতা সম্বন্ধে এমনই জ্ঞাত রয়েছে যেমন জ্ঞাত রয়েছে পিতা ছেলেদের সম্বন্ধে। এটা একটা দৃষ্টান্ত ছিল যা আরবের লোকেরা পূর্ণ বিশ্বাসের সময় বলে থাকতো। একটি হাদীসে রয়েছে একটি লোকের সঙ্গে ছোট একটি শিশু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি তোমার ছেলে?” সে বলেঃ হাঁ’, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও সাক্ষী থাকুন। তিনি বলেনঃ “সেও তোমার উপর গোপন নেই এবং তুমিও তার উপর গোপন নও।'কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) ইয়াহুদীদের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত হযরত আবদুল্লাহ বিন সালামকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে এমনই চিনেন, যেমন চিনেন আপনার সন্তানদেরকে?' তিনি উত্তরে বলেনঃ 'হাঁ', বরং তার চেয়েও বেশী চিনি। কেননা, আকাশের বিশ্বস্ত ফেরেশতা পৃথিবীর একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হন এবং তিনি তার সঠিক পরিচয় বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত ঈসার (আঃ) নিকট আগমন করেন, অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করেন এবং ঐ সবগুলোই তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এর পরে তিনি যে সত্য নবী এতে আমাদের আর কি সন্দেহ থাকতে পারে। তাকে এক নজর দেখেই চিনতে পারবো না কেন? আমাদের বরং আমাদের ছেলেদের সম্বন্ধে সন্দেহ থাকতে পারে কিন্তু তাঁর নবুওয়াত সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না।মোট কথা এই যে, যেমন একটি বিরাট জনসভায় কোন লোক তার ছেলেকে অতি সহজেই চিনে থাকে ঠিক তেমনই আহলে কিতাবও হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত মাত্রই চিনে থাকে। কেননা তাদের কিতাবে নবী (সঃ) সম্বন্ধে যে গুণাবলী বর্ণিত আছে তা সবই তার মধ্যে হুবহু বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সত্য জানা সত্ত্বেও তারা ওটা গোপন করছে। তারপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) ও মুসলমানদেরকে সত্যের উপর অটল ও স্থির থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন সত্যের ব্যাপারে মোটেই সন্দেহ পোষণ না করে।
আল-বাকারা 2:148
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক মযহাবধারীর এক একটি কিবলাহ রয়েছে, কিন্তু সত্য কিবলাহ্ ওটাই যার উপরে মুসলমানরা রয়েছে।' আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ইয়াহুদীদেরও কিবলাহ্ রয়েছে, খ্রীষ্টানদেরও কিবলাহ রয়েছে এবং হে মুসলমানগণ! তোমাদেরও কিবলাহ রয়েছে, কিন্তু হেদায়াত বিশিষ্ট কিবলাহ ওটাই যার উপরে তোমরা (মুসলমানেরা) রয়েছ।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যেসব সম্প্রদায় কা'বা শরীফকে কিবলাহ রূপে মেনে নিয়েছে, পুণ্যের কাজে তারা অগ্রগামী হয়ে থাকে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং ইবনে আমের (রাঃ) (আরবি) পড়েছেন। উল্লেখিত আয়াতটি নিম্নের আয়াতের সাথে মিল রয়েছে। যেমন (আরবি) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যেই আমি আপন আপন দ্বীন ও পথ করে দিয়েছি।' (৫:৪৮) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! তোমাদের শরীর ছিন্ন ভিন্ন হলেও এবং তোমরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়লেও আল্লাহ তাআলা তার পূর্ণ ব্যাপক ক্ষমতার বলে তোমাদের সকলকেই একদিন একত্রিত করবেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সর্ববিষয়ে ব্যাপক ক্ষমতাবান।
আল-বাকারা 2:149
১৪৯-১৫০ নং আয়াতের তাফসীরএখন তিনবার নির্দেশ হচ্ছে যে, সারা জগতের মুসলমানকে নামাযের সময় মসজিদে হারামের দিকে মুখ করতে হবে। তিনবার বলে এই হুকুমের প্রতি বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কেননা, এই পরিবর্তনের নির্দেশ এই প্রথমবারই ঘটেছে। ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী (রঃ)-এর কারণ বর্ণনা করেছেন যে, প্রথম নির্দেশ তো ঐসব লোকদের জন্যে যারা কা'বা শরীফকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় নির্দেশ ওদের জন্যে যারা মক্কায় বাস করে বটে কিন্তু কা'বা তাদের সামনে নেই। তৃতীয় নির্দেশ মক্কার বাইরের লোকদের জন্য। কুরতুবী (রঃ) একটা কারণ এটাও বর্ণনা করেছেন যে, প্রথম নির্দেশ মক্কাবাসীদের জন্যে, দ্বিতীয় নির্দেশ শহর বাসীদের জন্যে এবং তৃতীয় নির্দেশ মুসাফিরদের জন্যে। কেউ কেউ বলেন যে, তিনটি নির্দেশের সম্পর্ক পূর্ব ও পরের রচনার সঙ্গে রয়েছে। প্রথম নির্দেশের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রার্থনা ও তা কবুল হওয়ার বর্ণনা আছে। দ্বিতীয় নির্দেশের মধ্যে এই কথার বর্ণনা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাহিদা আমাদের চাহিদারই অনুরূপ ছিল এবং সঠিক কাজও এটাই ছিল। তৃতীয় নির্দেশের মধ্যে ইয়াহুদীদের দলীলের উত্তর রয়েছে। কেননা তাদের গ্রন্থে প্রথম হতেই এটা বিদ্যমান ছিল যে, মুহাম্মদ (সঃ) -এর কিবলাহ হবে কা'বা শরীফ। সুতরাং এই নির্দেশের ফলে ঐ ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হয়। সাথে সাথে ঐ মুশরিকদের যুক্তিও শেষ হয়ে যায়। কেননা, তারা কাবাকে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করতো আর এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর মনোযোগও ওরই দিকে হয়ে গেল। ইমাম রাযী (রঃ) প্রভৃতি মণীষী এখানে এই হুকুমকে বার বার আনার হিকমত বেশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘যেন তোমাদের উপর আহলে কিতাবের যুক্তি ও বিতর্কের কোন অবকাশ না থাকে। তারা জানতো যে, এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কাবার দিকে নামায পড়া। যখন তারা এই বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে না পাবে তখন তাদের সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই কিবলার দিকে ফিরতে দেখে নিলো তখন তাদের কোন প্রকারের সন্দেহ না থাকারই কথা। আর এটা একটা কারণ যে, যখন তারা মুসলমানদেরকে তাদের (ইয়াহুদীদের) কিবলাহুর দিকে নামায পড়তে দেখবে তখন তারা একটা অজুহাত দেখাবার সুযোগ পেয়ে যাবে। কিন্তু যখন মুসলমানের হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলাহর দিকে নামায পড়বে তখন সেই সুযোগ কাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। হযরত আবু আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ইয়াহূদীদের এই যুক্তি ছিল যে, আজ মুসলমানেরা আমাদের কিবলাহর দিকে ফিরেছে, কাল তারা আমাদের ধর্মও মেনে নেবে। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে প্রকৃত কিবলাহ গ্রহণ করলেন, তাদের আশায় গুড়ে বালি পড়ে যায়।' তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের মধ্যে যারা ঝগড়াটে ও অত্যাচারী রয়েছে তারা ব্যতীত মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমালোচনা করে বলতো যে, এই ব্যক্তি (মুহাম্মদ সঃ) মিল্লাতে ইবরাহীমের (আঃ) দাবী করছেন অথচ তাঁর কিবলার দিকে নামায পড়েন না, এখানে যেন তাদেরকেই উত্তর দেয়া হচ্ছে যে, এই নবী (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অনুসারী। তিনি স্বীয় পূর্ণ বিজ্ঞতা অনুসারে তাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দেন, যা তিনি পালন করেন। অতঃপর তাঁকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) কিবলাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যা তিনি সাগ্রহে পালন করেন। সুতরাং তিনি সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআলার নির্দেশাধীন। অতঃপর আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে বলেন যে, তারা যেন ঐসব অত্যাচারীর সন্দেহের মধ্যে পতিত না হয়। তারা যেন ঐ বিদ্রোহীদের বিদ্রোহকে ভয় না করে। তারা যেন ঐ যালিমদের অর্থহীন সমালোচনার প্রতি মোটেই দৃকপাত না করে। বরং তারা যেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকেই ভয় করে। কিবলাহ পরিবর্তন করার মধ্যে এক মহৎ উদ্দেশ্য ছিল বাতিল পন্থীদের মুখ বন্ধ করা এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেয়া এবং কিবলাহ্র মত তাদের শরীয়তকেও পরিপূর্ণ করা। এর মধ্যে আর একটি রহস্য ছিল যে, যে কিবলাহ হতে পূর্ববর্তী উম্মতেরা ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল মুসলমানেরা ওটা থেকে সরে না পড়ে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই কিবলাহ বিশেষভাবে দান করে সমস্ত উম্মতের উপর তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করেন।
আল-বাকারা 2:150
১৪৯-১৫০ নং আয়াতের তাফসীরএখন তিনবার নির্দেশ হচ্ছে যে, সারা জগতের মুসলমানকে নামাযের সময় মসজিদে হারামের দিকে মুখ করতে হবে। তিনবার বলে এই হুকুমের প্রতি বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কেননা, এই পরিবর্তনের নির্দেশ এই প্রথমবারই ঘটেছে। ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী (রঃ)-এর কারণ বর্ণনা করেছেন যে, প্রথম নির্দেশ তো ঐসব লোকদের জন্যে যারা কা'বা শরীফকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় নির্দেশ ওদের জন্যে যারা মক্কায় বাস করে বটে কিন্তু কা'বা তাদের সামনে নেই। তৃতীয় নির্দেশ মক্কার বাইরের লোকদের জন্য। কুরতুবী (রঃ) একটা কারণ এটাও বর্ণনা করেছেন যে, প্রথম নির্দেশ মক্কাবাসীদের জন্যে, দ্বিতীয় নির্দেশ শহর বাসীদের জন্যে এবং তৃতীয় নির্দেশ মুসাফিরদের জন্যে। কেউ কেউ বলেন যে, তিনটি নির্দেশের সম্পর্ক পূর্ব ও পরের রচনার সঙ্গে রয়েছে। প্রথম নির্দেশের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রার্থনা ও তা কবুল হওয়ার বর্ণনা আছে। দ্বিতীয় নির্দেশের মধ্যে এই কথার বর্ণনা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাহিদা আমাদের চাহিদারই অনুরূপ ছিল এবং সঠিক কাজও এটাই ছিল। তৃতীয় নির্দেশের মধ্যে ইয়াহুদীদের দলীলের উত্তর রয়েছে। কেননা তাদের গ্রন্থে প্রথম হতেই এটা বিদ্যমান ছিল যে, মুহাম্মদ (সঃ) -এর কিবলাহ হবে কা'বা শরীফ। সুতরাং এই নির্দেশের ফলে ঐ ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হয়। সাথে সাথে ঐ মুশরিকদের যুক্তিও শেষ হয়ে যায়। কেননা, তারা কাবাকে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করতো আর এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর মনোযোগও ওরই দিকে হয়ে গেল। ইমাম রাযী (রঃ) প্রভৃতি মণীষী এখানে এই হুকুমকে বার বার আনার হিকমত বেশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘যেন তোমাদের উপর আহলে কিতাবের যুক্তি ও বিতর্কের কোন অবকাশ না থাকে। তারা জানতো যে, এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কাবার দিকে নামায পড়া। যখন তারা এই বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে না পাবে তখন তাদের সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই কিবলার দিকে ফিরতে দেখে নিলো তখন তাদের কোন প্রকারের সন্দেহ না থাকারই কথা। আর এটা একটা কারণ যে, যখন তারা মুসলমানদেরকে তাদের (ইয়াহুদীদের) কিবলাহুর দিকে নামায পড়তে দেখবে তখন তারা একটা অজুহাত দেখাবার সুযোগ পেয়ে যাবে। কিন্তু যখন মুসলমানের হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলাহর দিকে নামায পড়বে তখন সেই সুযোগ কাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। হযরত আবু আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ইয়াহূদীদের এই যুক্তি ছিল যে, আজ মুসলমানেরা আমাদের কিবলাহর দিকে ফিরেছে, কাল তারা আমাদের ধর্মও মেনে নেবে। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে প্রকৃত কিবলাহ গ্রহণ করলেন, তাদের আশায় গুড়ে বালি পড়ে যায়।' তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের মধ্যে যারা ঝগড়াটে ও অত্যাচারী রয়েছে তারা ব্যতীত মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমালোচনা করে বলতো যে, এই ব্যক্তি (মুহাম্মদ সঃ) মিল্লাতে ইবরাহীমের (আঃ) দাবী করছেন অথচ তাঁর কিবলার দিকে নামায পড়েন না, এখানে যেন তাদেরকেই উত্তর দেয়া হচ্ছে যে, এই নবী (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অনুসারী। তিনি স্বীয় পূর্ণ বিজ্ঞতা অনুসারে তাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দেন, যা তিনি পালন করেন। অতঃপর তাঁকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) কিবলাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যা তিনি সাগ্রহে পালন করেন। সুতরাং তিনি সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআলার নির্দেশাধীন। অতঃপর আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে বলেন যে, তারা যেন ঐসব অত্যাচারীর সন্দেহের মধ্যে পতিত না হয়। তারা যেন ঐ বিদ্রোহীদের বিদ্রোহকে ভয় না করে। তারা যেন ঐ যালিমদের অর্থহীন সমালোচনার প্রতি মোটেই দৃকপাত না করে। বরং তারা যেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকেই ভয় করে। কিবলাহ পরিবর্তন করার মধ্যে এক মহৎ উদ্দেশ্য ছিল বাতিল পন্থীদের মুখ বন্ধ করা এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেয়া এবং কিবলাহ্র মত তাদের শরীয়তকেও পরিপূর্ণ করা। এর মধ্যে আর একটি রহস্য ছিল যে, যে কিবলাহ হতে পূর্ববর্তী উম্মতেরা ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল মুসলমানেরা ওটা থেকে সরে না পড়ে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই কিবলাহ বিশেষভাবে দান করে সমস্ত উম্মতের উপর তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করেন।
আল-বাকারা 2:151
১৫১-১৫২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিরাট দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দান হচ্ছে এই যে, তিনি আমাদের মধ্যে আমাদেরই শ্রেণীভুক্ত এমন একজন নবী পাঠিয়েছেন যিনি আল্লাহ তা'আলার উজ্জ্বল গ্রন্থের নিদর্শনাবলী আমাদের সামনে পাঠ করে শুনাচ্ছেন, আমাদেরকে ঘৃণ্য অভাস, আত্মার দুষ্টামি এবং বর্বরোচিত কাজ হতে বিরত রাখছেন। আর আমাদেরকে কুফরের অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাদেরকে গ্রন্থ ও জ্ঞান বিজ্ঞান অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি আমাদের নিকট ঐ সব গুঢ় রহস্য প্রকাশ করে দিচ্ছেন যা আজ পর্যন্ত আমাদের নিকট প্রকাশ পায়নি। সুতরাং তারই কারণে ঐ সমুদয় লোক, যাদের উপর অজ্ঞতা ছেয়ে ছিল, বহু শতাব্দী ধরে যাদেরকে অন্ধকারে ঘিরে রেখেছিল, যাদের উপর দীর্ঘ দিন ধরে মঙ্গলের ছায়া পর্যন্ত পড়েনি, তারাই বড় বড় আল্লামা বনে গেছে। তারা জ্ঞানের গভীরতায়, কৃত্রিমতার স্বল্পতায়, অন্তরের পবিত্রতায় এবং কথার সত্যতায় তুলনা বিহীন খ্যাতি অর্জন করেছে। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্যে এমন একজন রাসূল পাঠিয়েছেন যে তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন এবং তাদেরকে পবিত্র করে থাকেন।' (৩:১৬৪) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে নবী (সঃ) তুমিও কি ওদেরকে দেখনি যারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের পরিবর্তে কুফরী করেছে এবং স্বীয় গোত্রকে ধ্বংসের গর্তে নিক্ষেপ করেছে ?' (১৪:২৮) এখানে আল্লাহর নিয়ামত'-এর ভাবার্থে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এজন্যেই এই আয়াতের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ামতের বর্ণনা দিয়ে মু'মিনদেরকে তাঁর স্মরণের ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো এবং তোমরা আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।' হযরত মূসা (আঃ) মহান আল্লাহর নিকট আরয করছেনঃ “হে আমার প্রভু! কিভাবে আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো?' উত্তর হচ্ছেঃ ‘আমাকে স্মরণ রেখো, ভুলে যেও না, আমাকে স্মরণ করাই হচ্ছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং আমাকে ভুলে যাওয়াই আমার সঙ্গে কুফরী করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এই যে, আল্লাহকে যে স্মরণ করে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীকে তিনি আরও বেশী দান করেন এবং তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞকে তিনি শাস্তি দিয়ে থাকেন। পূর্বের মনীষীগণ হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করার অর্থ হচ্ছে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর বিরুদ্ধাচরণ না করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং অকৃতজ্ঞ না হওয়া। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) জিজ্ঞাসিত হচ্ছেনঃ “ব্যভিচারী, মদখোর, চোর এবং আত্মহত্যাকারীকেও কি আল্লাহ তাআলা স্মরণ করে থাকেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ হ’ অভিশাপের সাথে স্মরণ করেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আমাকে স্মরণ কর’ অর্থাৎ আমার জরুরী নির্দেশাবলী পালন কর। আমি তোমাকে স্মরণ করবো।' অর্থাৎ আমার নিয়ামতসমূহ তোমাকে দান করবো। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করার চাইতে আল্লাহর তোমাদেরকে স্মরণ করা অনেক বড়। একটি কুদসী হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে, আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি এবং যে আমাকে কোন দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমিও তাকে ওর চেয়ে উত্তম দলের মধ্যে স্মরণ করি।'মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, ঐটি হচ্ছে ফেরেশতাদের দল। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদমের সন্তান! যদি তুমি আমার দিকে কনিষ্ঠাঙ্গুলি পরিমিত স্থান অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যদি তুমি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে দুই হাত অগ্রসর হবো, আর যদি তুমি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আস তবে আমি তোমার দিকে দৌড়িয়ে আসবো। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যেও এ হাদীসটি হযরত কাতাদাহ। (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার দয়া এর চেয়েও অধিক নিকটে রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের প্রভু সাধারণভাবে সংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তবে তোমাদেরকে আরো বেশী দেবো, আর যদি কৃতঘ্ন হও তবে জেনে রেখো যে, নিশ্চয় আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।' (১৪:৭) মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইমরান বিন হোসাইন (রাঃ) একদা অতি মূল্যবান ‘হুল্লা” অর্থাৎ লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করে আসেন এবং বলেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা কাউকে কোন পুরস্কার দেন তখন তিনি ওর চিহ তার নিকট দেখতে চান।'
আল-বাকারা 2:152
১৫১-১৫২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিরাট দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দান হচ্ছে এই যে, তিনি আমাদের মধ্যে আমাদেরই শ্রেণীভুক্ত এমন একজন নবী পাঠিয়েছেন যিনি আল্লাহ তা'আলার উজ্জ্বল গ্রন্থের নিদর্শনাবলী আমাদের সামনে পাঠ করে শুনাচ্ছেন, আমাদেরকে ঘৃণ্য অভাস, আত্মার দুষ্টামি এবং বর্বরোচিত কাজ হতে বিরত রাখছেন। আর আমাদেরকে কুফরের অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাদেরকে গ্রন্থ ও জ্ঞান বিজ্ঞান অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি আমাদের নিকট ঐ সব গুঢ় রহস্য প্রকাশ করে দিচ্ছেন যা আজ পর্যন্ত আমাদের নিকট প্রকাশ পায়নি। সুতরাং তারই কারণে ঐ সমুদয় লোক, যাদের উপর অজ্ঞতা ছেয়ে ছিল, বহু শতাব্দী ধরে যাদেরকে অন্ধকারে ঘিরে রেখেছিল, যাদের উপর দীর্ঘ দিন ধরে মঙ্গলের ছায়া পর্যন্ত পড়েনি, তারাই বড় বড় আল্লামা বনে গেছে। তারা জ্ঞানের গভীরতায়, কৃত্রিমতার স্বল্পতায়, অন্তরের পবিত্রতায় এবং কথার সত্যতায় তুলনা বিহীন খ্যাতি অর্জন করেছে। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্যে এমন একজন রাসূল পাঠিয়েছেন যে তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন এবং তাদেরকে পবিত্র করে থাকেন।' (৩:১৬৪) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে নবী (সঃ) তুমিও কি ওদেরকে দেখনি যারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের পরিবর্তে কুফরী করেছে এবং স্বীয় গোত্রকে ধ্বংসের গর্তে নিক্ষেপ করেছে ?' (১৪:২৮) এখানে আল্লাহর নিয়ামত'-এর ভাবার্থে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এজন্যেই এই আয়াতের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ামতের বর্ণনা দিয়ে মু'মিনদেরকে তাঁর স্মরণের ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো এবং তোমরা আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।' হযরত মূসা (আঃ) মহান আল্লাহর নিকট আরয করছেনঃ “হে আমার প্রভু! কিভাবে আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো?' উত্তর হচ্ছেঃ ‘আমাকে স্মরণ রেখো, ভুলে যেও না, আমাকে স্মরণ করাই হচ্ছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং আমাকে ভুলে যাওয়াই আমার সঙ্গে কুফরী করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এই যে, আল্লাহকে যে স্মরণ করে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীকে তিনি আরও বেশী দান করেন এবং তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞকে তিনি শাস্তি দিয়ে থাকেন। পূর্বের মনীষীগণ হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করার অর্থ হচ্ছে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর বিরুদ্ধাচরণ না করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং অকৃতজ্ঞ না হওয়া। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) জিজ্ঞাসিত হচ্ছেনঃ “ব্যভিচারী, মদখোর, চোর এবং আত্মহত্যাকারীকেও কি আল্লাহ তাআলা স্মরণ করে থাকেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ হ’ অভিশাপের সাথে স্মরণ করেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আমাকে স্মরণ কর’ অর্থাৎ আমার জরুরী নির্দেশাবলী পালন কর। আমি তোমাকে স্মরণ করবো।' অর্থাৎ আমার নিয়ামতসমূহ তোমাকে দান করবো। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করার চাইতে আল্লাহর তোমাদেরকে স্মরণ করা অনেক বড়। একটি কুদসী হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে, আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি এবং যে আমাকে কোন দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমিও তাকে ওর চেয়ে উত্তম দলের মধ্যে স্মরণ করি।'মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, ঐটি হচ্ছে ফেরেশতাদের দল। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদমের সন্তান! যদি তুমি আমার দিকে কনিষ্ঠাঙ্গুলি পরিমিত স্থান অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যদি তুমি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে দুই হাত অগ্রসর হবো, আর যদি তুমি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আস তবে আমি তোমার দিকে দৌড়িয়ে আসবো। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যেও এ হাদীসটি হযরত কাতাদাহ। (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার দয়া এর চেয়েও অধিক নিকটে রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের প্রভু সাধারণভাবে সংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তবে তোমাদেরকে আরো বেশী দেবো, আর যদি কৃতঘ্ন হও তবে জেনে রেখো যে, নিশ্চয় আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।' (১৪:৭) মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইমরান বিন হোসাইন (রাঃ) একদা অতি মূল্যবান ‘হুল্লা” অর্থাৎ লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করে আসেন এবং বলেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা কাউকে কোন পুরস্কার দেন তখন তিনি ওর চিহ তার নিকট দেখতে চান।'
আল-বাকারা 2:153
১৫৩-১৫৪ নং আয়াতের তাফসীরশুকরের পর ‘সবর বা ধৈর্যের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং সাথে সাথেই নামাযের বর্ণনা দিয়ে এইসব সৎ কার্যকে মুক্তি লাভের মাধ্যম করে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। এটা স্পষ্ট কথা যে, মানুষ যখন সুখে থাকে তখন সেটা হচ্ছে তার জন্যে শুকরের সময়। হাদীসে রয়েছে যে, মু'মিনের অবস্থা কতই না উত্তম যে, প্রত্যেক কাজে তার জন্যে মঙ্গলই নিহিত রয়েছে। সে শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং এর ফলে সে প্রতিদান পেয়ে থাকে। আর সে কষ্ট পেয়ে ধৈর্য ধারণ করে এবং এরও সে প্রতিদান পেয়ে থাকে। এই আয়াতের মধ্যে এরও বর্ণনা রয়েছে যে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার মাধ্যম ধৈর্য ও নামায। যেমন এর পূর্বে বর্ণিত হয়েছে (আরবি)অর্থাৎ তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং নিশ্চয় ওটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন কাজ।' (২:৪৫) হাদীস শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন কাজ কঠিন চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করতো। তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন।' ‘সবর’ দুই প্রকার। প্রথম সবর হচ্ছে নিষিদ্ধ ও পাপের কাজ ছেড়ে দেয়ার উপর 'সবর'। দ্বিতীয় হচ্ছে আনুগত্য ও পুণ্যের কাজ করার উপর সবর'। এ সবর' প্রথম 'সবর' হতে বড়। আরও এক প্রকারের ধৈর্য আছে, তা হচ্ছে বিপদ ও দুঃখের সময় ধৈর্য। এটাও ওয়াজিব। যেমন দোষ ও পাপ হতে ক্ষমা প্রার্থনা করা ওয়াজিব। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, জীবনের উপর কঠিন হলেও, স্বভাব বিরুদ্ধ হলেও এবং মনে না চাইলেও ধৈর্যের সাথে আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনে লেগে থাকা হচ্ছে একটা সবর। দ্বিতীয় সবর’ হচ্ছে প্রকৃতির ও মনের চাহিদা মোতাবেক হলেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজ হতে বিরত থাকা। ইমাম যায়নুল আবেদীন (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ ধৈর্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন ও বিনা হিসাবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন।' একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেশতের দিকে অগ্রসর হবেন। ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে দেখে জিজ্ঞেস করবেনঃ ‘কোথায় যাচ্ছেন?' তারা বলবেনঃ ‘বেহেস্তে'। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ ‘এখনও তো হিসেব দেয়াই হয়নি? তারা বলবেনঃ “হাঁ, হিসেব দেয়ার পূর্বেই।' ফেরেশতাগণ তখন জিজ্ঞেস করবেনঃ তাহলে আপনারা কি প্রকৃতির লোক? উত্তরে তারা বলবেনঃ ‘আমরা ধৈর্যশীল লোক। আমরা সদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তার অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম। মৃত্যু পর্যন্ত আমরা ওর উপর ধৈর্য ধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি।' তখন ফেরেশতারা বলবেনঃ ‘বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা এরই যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।' কুরআন মাজীদে একথাই ঘোষিত হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ধৈর্যশীলগণকে তাদের পূর্ণ প্রতিদান বে হিসাব দেয়া হবে।' (৩৯১০)হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'সবর'-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দানকে স্বীকার করা, বিপদের প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার নিকট পাওয়ার বিশ্বাস রেখে তার জন্যে পণ্যের প্রার্থনা করা, প্রত্যেক ভয়, উদ্বেগ এবং কাঠিণ্যের স্থলে ধৈর্য ধারণ করা এবং পুণ্যের আশায় ওর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 'আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তিগণকে তোমরা মৃত বলো না। বরং তারা এমন জীবন লাভ করেছে যা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। তারা বারযাখী জীবন (মৃত্যু ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী অবকাশ) লাভ করেছে এবং তথায় তারা আহার্য পাচ্ছে। সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, শহীদগণের আত্মাগুলো সবুজ রঙ্গের পাখীসমূহের দেহের ভিতরে রয়েছে এবং তারা বেহেস্তের মধ্যে যথেচ্ছা চরে ফিরে বেড়ায়, অতঃপর তারা ঐসব প্রদীপের উপর এসে বসে যা ‘আরশের নীচে ঝুলানো রয়েছে। তাদের প্রভু একবার তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “এখন তোমরা কি চাও? তারা উত্তরে বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আপনি তো আমাদেরকে ঐসব জিনিস দিয়ে রেখেছেন যা অন্য কাউকেও দেননি। সুতরাং এখন আর আমাদের কোন্ জিনিসের প্রয়োজন হবে? তাদেরকে পুনরায় এই প্রশ্নই করা হয়। যখন তারা দেখে যে, ছাড়া হচ্ছে না তখন তারা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আপনি পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন। আমরা আপনার পথে আবার যুদ্ধ করে পুনরায় শাহাদাৎ বরণ করতঃ আপনার নিকট ফিরে আসবো। এর ফলে আমরা শাহাদাতের দ্বিগুণ মর্যাদা লাভ করবো। প্রবল প্রতাপান্বিত প্রভু তখন বলেনঃ ‘এটা হতে পারে না। আমি তো এটা লিখেই দিয়েছি যে, কেউই মৃত্যুর পর দুনিয়ায় আর ফিরে যাবে না।' ‘মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, মু'মিনের রূহ একটি পাখী যা বেহেশতের গাছে অবস্থান করে এবং কিয়ামতের দিন সে নিজের দেহে ফিরে আসবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, প্রত্যেক মু'মিনের আত্মা তথায় জীবিত রয়েছে। কিন্তু শহীদগণের আত্মার এক বিশেষ সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
আল-বাকারা 2:154
১৫৩-১৫৪ নং আয়াতের তাফসীরশুকরের পর ‘সবর বা ধৈর্যের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং সাথে সাথেই নামাযের বর্ণনা দিয়ে এইসব সৎ কার্যকে মুক্তি লাভের মাধ্যম করে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। এটা স্পষ্ট কথা যে, মানুষ যখন সুখে থাকে তখন সেটা হচ্ছে তার জন্যে শুকরের সময়। হাদীসে রয়েছে যে, মু'মিনের অবস্থা কতই না উত্তম যে, প্রত্যেক কাজে তার জন্যে মঙ্গলই নিহিত রয়েছে। সে শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং এর ফলে সে প্রতিদান পেয়ে থাকে। আর সে কষ্ট পেয়ে ধৈর্য ধারণ করে এবং এরও সে প্রতিদান পেয়ে থাকে। এই আয়াতের মধ্যে এরও বর্ণনা রয়েছে যে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার মাধ্যম ধৈর্য ও নামায। যেমন এর পূর্বে বর্ণিত হয়েছে (আরবি)অর্থাৎ তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং নিশ্চয় ওটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন কাজ।' (২:৪৫) হাদীস শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন কাজ কঠিন চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করতো। তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন।' ‘সবর’ দুই প্রকার। প্রথম সবর হচ্ছে নিষিদ্ধ ও পাপের কাজ ছেড়ে দেয়ার উপর 'সবর'। দ্বিতীয় হচ্ছে আনুগত্য ও পুণ্যের কাজ করার উপর সবর'। এ সবর' প্রথম 'সবর' হতে বড়। আরও এক প্রকারের ধৈর্য আছে, তা হচ্ছে বিপদ ও দুঃখের সময় ধৈর্য। এটাও ওয়াজিব। যেমন দোষ ও পাপ হতে ক্ষমা প্রার্থনা করা ওয়াজিব। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, জীবনের উপর কঠিন হলেও, স্বভাব বিরুদ্ধ হলেও এবং মনে না চাইলেও ধৈর্যের সাথে আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনে লেগে থাকা হচ্ছে একটা সবর। দ্বিতীয় সবর’ হচ্ছে প্রকৃতির ও মনের চাহিদা মোতাবেক হলেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজ হতে বিরত থাকা। ইমাম যায়নুল আবেদীন (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ ধৈর্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন ও বিনা হিসাবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন।' একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেশতের দিকে অগ্রসর হবেন। ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে দেখে জিজ্ঞেস করবেনঃ ‘কোথায় যাচ্ছেন?' তারা বলবেনঃ ‘বেহেস্তে'। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ ‘এখনও তো হিসেব দেয়াই হয়নি? তারা বলবেনঃ “হাঁ, হিসেব দেয়ার পূর্বেই।' ফেরেশতাগণ তখন জিজ্ঞেস করবেনঃ তাহলে আপনারা কি প্রকৃতির লোক? উত্তরে তারা বলবেনঃ ‘আমরা ধৈর্যশীল লোক। আমরা সদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তার অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম। মৃত্যু পর্যন্ত আমরা ওর উপর ধৈর্য ধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি।' তখন ফেরেশতারা বলবেনঃ ‘বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা এরই যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।' কুরআন মাজীদে একথাই ঘোষিত হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ধৈর্যশীলগণকে তাদের পূর্ণ প্রতিদান বে হিসাব দেয়া হবে।' (৩৯১০)হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'সবর'-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দানকে স্বীকার করা, বিপদের প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার নিকট পাওয়ার বিশ্বাস রেখে তার জন্যে পণ্যের প্রার্থনা করা, প্রত্যেক ভয়, উদ্বেগ এবং কাঠিণ্যের স্থলে ধৈর্য ধারণ করা এবং পুণ্যের আশায় ওর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 'আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তিগণকে তোমরা মৃত বলো না। বরং তারা এমন জীবন লাভ করেছে যা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। তারা বারযাখী জীবন (মৃত্যু ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী অবকাশ) লাভ করেছে এবং তথায় তারা আহার্য পাচ্ছে। সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, শহীদগণের আত্মাগুলো সবুজ রঙ্গের পাখীসমূহের দেহের ভিতরে রয়েছে এবং তারা বেহেস্তের মধ্যে যথেচ্ছা চরে ফিরে বেড়ায়, অতঃপর তারা ঐসব প্রদীপের উপর এসে বসে যা ‘আরশের নীচে ঝুলানো রয়েছে। তাদের প্রভু একবার তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “এখন তোমরা কি চাও? তারা উত্তরে বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আপনি তো আমাদেরকে ঐসব জিনিস দিয়ে রেখেছেন যা অন্য কাউকেও দেননি। সুতরাং এখন আর আমাদের কোন্ জিনিসের প্রয়োজন হবে? তাদেরকে পুনরায় এই প্রশ্নই করা হয়। যখন তারা দেখে যে, ছাড়া হচ্ছে না তখন তারা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আপনি পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন। আমরা আপনার পথে আবার যুদ্ধ করে পুনরায় শাহাদাৎ বরণ করতঃ আপনার নিকট ফিরে আসবো। এর ফলে আমরা শাহাদাতের দ্বিগুণ মর্যাদা লাভ করবো। প্রবল প্রতাপান্বিত প্রভু তখন বলেনঃ ‘এটা হতে পারে না। আমি তো এটা লিখেই দিয়েছি যে, কেউই মৃত্যুর পর দুনিয়ায় আর ফিরে যাবে না।' ‘মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, মু'মিনের রূহ একটি পাখী যা বেহেশতের গাছে অবস্থান করে এবং কিয়ামতের দিন সে নিজের দেহে ফিরে আসবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, প্রত্যেক মু'মিনের আত্মা তথায় জীবিত রয়েছে। কিন্তু শহীদগণের আত্মার এক বিশেষ সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
আল-বাকারা 2:155
১৫৫-১৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অবশ্যই পরীক্ষা করে থাকেন। কখনও পরীক্ষা করেন উন্নতি ও মঙ্গলের দ্বারা, আবার কখনও পরীক্ষা করেন অবনতি ও অমঙ্গল দ্বারা। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করত ধর্মযোদ্ধা এবং ধৈর্যশীলগণকে জেনে নেবে। (৪৭:৩১) অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে ক্ষুধা ও ভয়ের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন। (১৬:১১২) এই সবের ভাবার্থ এই যে, সামান্য ভয়-ভীতি, কিছু ক্ষুধা কিছু ধন-মালের ঘাটতি, কিছু প্রাণের হ্রাস অর্থাৎ নিজের ও অপরের, আত্মীয়-স্বজনের এবং বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু, কখনও ফল এবং উৎপাদিত শস্যের ক্ষতি ইত্যাদি স্করা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন। এতে ধৈর্যধারণকারীদের তিনি উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন এবং অসহিষ্ণু, তাড়াহুড়াকারী এবং নৈরাশ্যবাদীদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আহার্যের ক্ষুধা, মালের হ্রাসের অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায়, প্রাণের হ্রাসের ভাবার্থ হচ্ছে রোগ এবং ফলের অর্থ হচ্ছে সন্তানাদি। কিন্তু এই তাফসীর চিন্তা ও বিবেচনাধীন। এখন বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট যে ধৈর্যশীলদের এই মর্যাদা রয়েছে তারা কি প্রকারের লোক? সুতরাং আল্লাহ পাক বলেন যে, এরা তারাই যারা সংকীর্ণতা ও বিপদের সময় (আরবি) পড়ে থাকে এবং এই কথার দ্বারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকে যে, ওটা আল্লাহ তা'আলারই অধিকারে রয়েছে। তাকে যা পৌছেছে তা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতেই পৌছেছে। তিনি ওর মধ্যে যথেচ্ছা হের ফের করতে পারেন। অতঃপর তার কাছেই এর প্রতিদান রয়েছে যার নিকটে তাকে একদিন ফিরে যেতেই হবে। বান্দার এই উক্তির কারণে তার উপর মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়, সে শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করে এবং সুপথ প্রাপ্ত হয়ে থাকে।আমীরুল মুমেনিন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ ‘সম্মানের দু'টি জিনিস (আরবি) ও (আরবি) এবং একটি মধ্যবর্তী জিনিস রয়েছে অর্থাৎ হিদায়াত এগুলো ধৈর্যশীলেরা লাভ করে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার স্বামী আবূ সালমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবার হতে আমার নিকট আসেন এবং অত্যন্ত খুশী মনে বলেনঃ ‘আজ আমি এমন একটি হাদীস শুনেছি যা শুনে আমি খুবই খুশী হয়েছি। ঐ হাদীসটি এই যে, যখন কোন মুসলমানের উপর কোন কষ্ট ও বিপদ পৌছে এবং সে পড়ে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন' তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই বিনিময় ও প্রতিদান দিয়ে থাকেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এই দু'আটি মুখস্থ করে নেই। অতঃপর হযরত আবূ সালমার (রাঃ) ইন্তেকাল হলে আমি (আরবি) পাঠ করি এবং এই দু'আটিও পড়ে নেই। কিন্তু আমার ধারণা হয় যে, আবু সালমা (রাঃ) অপেক্ষা আর ভাল লোক আমি কাকে পাবো? আমার ইদ্দত’ অতিক্রান্ত হলে আমি একদিন আমার একটি চামড়া সংস্কার করতে থাকি। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আমি চামড়াটি রেখে দিয়ে হাত ধুয়ে নেই এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভিতরে আসার প্রার্থনা জানাই। তাকে একটি নরম আসনে বসতে দেই। তিনি আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের কথা কিন্তু প্রথমতঃ আমিতো একজন লজ্জাবতী নারী। না জানি হয়তো আপনার স্বভাবের উল্টো কোন কাজ আমার দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায় এবং এরই কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আমার শাস্তিই হয় নাকি! দ্বিতীয়তঃ আমি একজন বয়স্কা নারী। তৃতীয়তঃ আমার ছেলে মেয়ে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দেখ! আল্লাহ তাআলা তোমার এই অনর্থক লজ্জা দূর করে দেবেন। আর বয়স আমারও তো কম নয় এবং তোমার ছেলে মেয়ে যেন আমারই ছেলে মেয়ে। আমি একথা শুনে বলি-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। অতঃপর আল্লাহর নবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায় এবং এই দু'আর বরকতে আমার পূর্ব স্বামী অপেক্ষা উত্তম স্বামী অর্থাৎ স্বীয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দান করেন। সুতরাং সমুদয় প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি ভিন্ন শব্দে এসেছে। মুসনাদই-আহমাদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলমানকে বিপদে ঘিরে ফেলে, এর উপর যদি দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, অতঃপর আবার তার স্মরণ হয় এবং সে পুনরায় 'ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করে তবে বিপদে ধৈর্য ধারণের সময় যে পুণ্য সে লাভ করে ছিল ঐ পুণ্য এখনও সে লাভ করবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে হযরত আবু সিনান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি আমার একটি শিশুকে সমাধিস্থ করি। আমি তার কবরেই রয়েছি এমন সময়ে হযরত আবু তালহা খাওলানী (রাঃ) আমাকে হাত ধরে উঠিয়ে নেন এবং বলেনঃ আমি কি আপনাকে একটি সুসংবাদ দেবো না? আমি বলি হা’ তিনি বলেনঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মরণের ফেরেশতা! তুমি আমার বান্দার ছেলে, তার চক্ষুর জ্যোতি এবং কলেজার টুকরোকে ছিনিয়ে নিয়েছো? ফেরেশতা বলেন, হাঁ। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তখন সে কি বলেছে? ফেরেশতা বলেনঃ ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করেছে। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তার জন্যে বেহেশতে একটি ঘর তৈরি কর এবং ওর নাম 'বায়তুল হামদ বা প্রশংসার ঘর রেখে দাও।
আল-বাকারা 2:156
১৫৫-১৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অবশ্যই পরীক্ষা করে থাকেন। কখনও পরীক্ষা করেন উন্নতি ও মঙ্গলের দ্বারা, আবার কখনও পরীক্ষা করেন অবনতি ও অমঙ্গল দ্বারা। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করত ধর্মযোদ্ধা এবং ধৈর্যশীলগণকে জেনে নেবে। (৪৭:৩১) অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে ক্ষুধা ও ভয়ের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন। (১৬:১১২) এই সবের ভাবার্থ এই যে, সামান্য ভয়-ভীতি, কিছু ক্ষুধা কিছু ধন-মালের ঘাটতি, কিছু প্রাণের হ্রাস অর্থাৎ নিজের ও অপরের, আত্মীয়-স্বজনের এবং বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু, কখনও ফল এবং উৎপাদিত শস্যের ক্ষতি ইত্যাদি স্করা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন। এতে ধৈর্যধারণকারীদের তিনি উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন এবং অসহিষ্ণু, তাড়াহুড়াকারী এবং নৈরাশ্যবাদীদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আহার্যের ক্ষুধা, মালের হ্রাসের অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায়, প্রাণের হ্রাসের ভাবার্থ হচ্ছে রোগ এবং ফলের অর্থ হচ্ছে সন্তানাদি। কিন্তু এই তাফসীর চিন্তা ও বিবেচনাধীন। এখন বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট যে ধৈর্যশীলদের এই মর্যাদা রয়েছে তারা কি প্রকারের লোক? সুতরাং আল্লাহ পাক বলেন যে, এরা তারাই যারা সংকীর্ণতা ও বিপদের সময় (আরবি) পড়ে থাকে এবং এই কথার দ্বারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকে যে, ওটা আল্লাহ তা'আলারই অধিকারে রয়েছে। তাকে যা পৌছেছে তা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতেই পৌছেছে। তিনি ওর মধ্যে যথেচ্ছা হের ফের করতে পারেন। অতঃপর তার কাছেই এর প্রতিদান রয়েছে যার নিকটে তাকে একদিন ফিরে যেতেই হবে। বান্দার এই উক্তির কারণে তার উপর মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়, সে শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করে এবং সুপথ প্রাপ্ত হয়ে থাকে।আমীরুল মুমেনিন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ ‘সম্মানের দু'টি জিনিস (আরবি) ও (আরবি) এবং একটি মধ্যবর্তী জিনিস রয়েছে অর্থাৎ হিদায়াত এগুলো ধৈর্যশীলেরা লাভ করে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার স্বামী আবূ সালমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবার হতে আমার নিকট আসেন এবং অত্যন্ত খুশী মনে বলেনঃ ‘আজ আমি এমন একটি হাদীস শুনেছি যা শুনে আমি খুবই খুশী হয়েছি। ঐ হাদীসটি এই যে, যখন কোন মুসলমানের উপর কোন কষ্ট ও বিপদ পৌছে এবং সে পড়ে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন' তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই বিনিময় ও প্রতিদান দিয়ে থাকেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এই দু'আটি মুখস্থ করে নেই। অতঃপর হযরত আবূ সালমার (রাঃ) ইন্তেকাল হলে আমি (আরবি) পাঠ করি এবং এই দু'আটিও পড়ে নেই। কিন্তু আমার ধারণা হয় যে, আবু সালমা (রাঃ) অপেক্ষা আর ভাল লোক আমি কাকে পাবো? আমার ইদ্দত’ অতিক্রান্ত হলে আমি একদিন আমার একটি চামড়া সংস্কার করতে থাকি। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আমি চামড়াটি রেখে দিয়ে হাত ধুয়ে নেই এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভিতরে আসার প্রার্থনা জানাই। তাকে একটি নরম আসনে বসতে দেই। তিনি আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের কথা কিন্তু প্রথমতঃ আমিতো একজন লজ্জাবতী নারী। না জানি হয়তো আপনার স্বভাবের উল্টো কোন কাজ আমার দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায় এবং এরই কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আমার শাস্তিই হয় নাকি! দ্বিতীয়তঃ আমি একজন বয়স্কা নারী। তৃতীয়তঃ আমার ছেলে মেয়ে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দেখ! আল্লাহ তাআলা তোমার এই অনর্থক লজ্জা দূর করে দেবেন। আর বয়স আমারও তো কম নয় এবং তোমার ছেলে মেয়ে যেন আমারই ছেলে মেয়ে। আমি একথা শুনে বলি-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। অতঃপর আল্লাহর নবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায় এবং এই দু'আর বরকতে আমার পূর্ব স্বামী অপেক্ষা উত্তম স্বামী অর্থাৎ স্বীয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দান করেন। সুতরাং সমুদয় প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি ভিন্ন শব্দে এসেছে। মুসনাদই-আহমাদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলমানকে বিপদে ঘিরে ফেলে, এর উপর যদি দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, অতঃপর আবার তার স্মরণ হয় এবং সে পুনরায় 'ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করে তবে বিপদে ধৈর্য ধারণের সময় যে পুণ্য সে লাভ করে ছিল ঐ পুণ্য এখনও সে লাভ করবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে হযরত আবু সিনান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি আমার একটি শিশুকে সমাধিস্থ করি। আমি তার কবরেই রয়েছি এমন সময়ে হযরত আবু তালহা খাওলানী (রাঃ) আমাকে হাত ধরে উঠিয়ে নেন এবং বলেনঃ আমি কি আপনাকে একটি সুসংবাদ দেবো না? আমি বলি হা’ তিনি বলেনঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মরণের ফেরেশতা! তুমি আমার বান্দার ছেলে, তার চক্ষুর জ্যোতি এবং কলেজার টুকরোকে ছিনিয়ে নিয়েছো? ফেরেশতা বলেন, হাঁ। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তখন সে কি বলেছে? ফেরেশতা বলেনঃ ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করেছে। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তার জন্যে বেহেশতে একটি ঘর তৈরি কর এবং ওর নাম 'বায়তুল হামদ বা প্রশংসার ঘর রেখে দাও।
আল-বাকারা 2:157
১৫৫-১৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অবশ্যই পরীক্ষা করে থাকেন। কখনও পরীক্ষা করেন উন্নতি ও মঙ্গলের দ্বারা, আবার কখনও পরীক্ষা করেন অবনতি ও অমঙ্গল দ্বারা। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করত ধর্মযোদ্ধা এবং ধৈর্যশীলগণকে জেনে নেবে। (৪৭:৩১) অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে ক্ষুধা ও ভয়ের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন। (১৬:১১২) এই সবের ভাবার্থ এই যে, সামান্য ভয়-ভীতি, কিছু ক্ষুধা কিছু ধন-মালের ঘাটতি, কিছু প্রাণের হ্রাস অর্থাৎ নিজের ও অপরের, আত্মীয়-স্বজনের এবং বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু, কখনও ফল এবং উৎপাদিত শস্যের ক্ষতি ইত্যাদি স্করা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন। এতে ধৈর্যধারণকারীদের তিনি উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন এবং অসহিষ্ণু, তাড়াহুড়াকারী এবং নৈরাশ্যবাদীদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আহার্যের ক্ষুধা, মালের হ্রাসের অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায়, প্রাণের হ্রাসের ভাবার্থ হচ্ছে রোগ এবং ফলের অর্থ হচ্ছে সন্তানাদি। কিন্তু এই তাফসীর চিন্তা ও বিবেচনাধীন। এখন বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট যে ধৈর্যশীলদের এই মর্যাদা রয়েছে তারা কি প্রকারের লোক? সুতরাং আল্লাহ পাক বলেন যে, এরা তারাই যারা সংকীর্ণতা ও বিপদের সময় (আরবি) পড়ে থাকে এবং এই কথার দ্বারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকে যে, ওটা আল্লাহ তা'আলারই অধিকারে রয়েছে। তাকে যা পৌছেছে তা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতেই পৌছেছে। তিনি ওর মধ্যে যথেচ্ছা হের ফের করতে পারেন। অতঃপর তার কাছেই এর প্রতিদান রয়েছে যার নিকটে তাকে একদিন ফিরে যেতেই হবে। বান্দার এই উক্তির কারণে তার উপর মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়, সে শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করে এবং সুপথ প্রাপ্ত হয়ে থাকে।আমীরুল মুমেনিন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ ‘সম্মানের দু'টি জিনিস (আরবি) ও (আরবি) এবং একটি মধ্যবর্তী জিনিস রয়েছে অর্থাৎ হিদায়াত এগুলো ধৈর্যশীলেরা লাভ করে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার স্বামী আবূ সালমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবার হতে আমার নিকট আসেন এবং অত্যন্ত খুশী মনে বলেনঃ ‘আজ আমি এমন একটি হাদীস শুনেছি যা শুনে আমি খুবই খুশী হয়েছি। ঐ হাদীসটি এই যে, যখন কোন মুসলমানের উপর কোন কষ্ট ও বিপদ পৌছে এবং সে পড়ে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন' তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই বিনিময় ও প্রতিদান দিয়ে থাকেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এই দু'আটি মুখস্থ করে নেই। অতঃপর হযরত আবূ সালমার (রাঃ) ইন্তেকাল হলে আমি (আরবি) পাঠ করি এবং এই দু'আটিও পড়ে নেই। কিন্তু আমার ধারণা হয় যে, আবু সালমা (রাঃ) অপেক্ষা আর ভাল লোক আমি কাকে পাবো? আমার ইদ্দত’ অতিক্রান্ত হলে আমি একদিন আমার একটি চামড়া সংস্কার করতে থাকি। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আমি চামড়াটি রেখে দিয়ে হাত ধুয়ে নেই এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভিতরে আসার প্রার্থনা জানাই। তাকে একটি নরম আসনে বসতে দেই। তিনি আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের কথা কিন্তু প্রথমতঃ আমিতো একজন লজ্জাবতী নারী। না জানি হয়তো আপনার স্বভাবের উল্টো কোন কাজ আমার দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায় এবং এরই কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আমার শাস্তিই হয় নাকি! দ্বিতীয়তঃ আমি একজন বয়স্কা নারী। তৃতীয়তঃ আমার ছেলে মেয়ে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দেখ! আল্লাহ তাআলা তোমার এই অনর্থক লজ্জা দূর করে দেবেন। আর বয়স আমারও তো কম নয় এবং তোমার ছেলে মেয়ে যেন আমারই ছেলে মেয়ে। আমি একথা শুনে বলি-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। অতঃপর আল্লাহর নবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায় এবং এই দু'আর বরকতে আমার পূর্ব স্বামী অপেক্ষা উত্তম স্বামী অর্থাৎ স্বীয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দান করেন। সুতরাং সমুদয় প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি ভিন্ন শব্দে এসেছে। মুসনাদই-আহমাদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলমানকে বিপদে ঘিরে ফেলে, এর উপর যদি দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, অতঃপর আবার তার স্মরণ হয় এবং সে পুনরায় 'ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করে তবে বিপদে ধৈর্য ধারণের সময় যে পুণ্য সে লাভ করে ছিল ঐ পুণ্য এখনও সে লাভ করবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে হযরত আবু সিনান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি আমার একটি শিশুকে সমাধিস্থ করি। আমি তার কবরেই রয়েছি এমন সময়ে হযরত আবু তালহা খাওলানী (রাঃ) আমাকে হাত ধরে উঠিয়ে নেন এবং বলেনঃ আমি কি আপনাকে একটি সুসংবাদ দেবো না? আমি বলি হা’ তিনি বলেনঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মরণের ফেরেশতা! তুমি আমার বান্দার ছেলে, তার চক্ষুর জ্যোতি এবং কলেজার টুকরোকে ছিনিয়ে নিয়েছো? ফেরেশতা বলেন, হাঁ। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তখন সে কি বলেছে? ফেরেশতা বলেনঃ ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ' পাঠ করেছে। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তার জন্যে বেহেশতে একটি ঘর তৈরি কর এবং ওর নাম 'বায়তুল হামদ বা প্রশংসার ঘর রেখে দাও।
আল-বাকারা 2:158
হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে হযরত উরওয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ এ আয়াত দ্বারা এরূপ জানা যাচ্ছে যে, তাওয়াফ না করায় কোন দোষ নেই।' তিনি বলেনঃ হে প্রিয় ভাগনে! তুমি সঠিক বুঝতে পারনি। তুমি যা বুঝেছ ভাবার্থ তাই হলে (আরবি) বলা হতো। বরং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, মাশআল’ নামক স্থানে মানাত' নামে প্রতিমাটি অবস্থিত ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মদীনার আনসারেরা তার পূজা করতো এবং যে তার উপাসনায় দাঁড়াতো সে সাফা ও মারওয়া’ পর্বতদ্বয়ের তাওয়াফকে দূষণীয় মনে করতো। এখন ইসলাম গ্রহণের পর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ‘সাফা' ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের তাওয়াফের দোষ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এতে বলা হয় যে, এই তাওয়াফে কোন দোষ নেই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফ করেন। এ জন্যেই এটা সুন্নাত রূপে পরিগণিত হয়। এখন এই তাওয়াফকে ত্যাগ করা কারও জন্যে উচিত নয়। (বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আবু বকর বিন আবদুর রহমান (রঃ) এই বর্ণনাটি শুনে বলেনঃ “নিঃসন্দেহে এটা একটা ইমী আলোচনা। আমি তো এর পূর্বে এটা শ্রবণই করিনি। কোনো কোনো বিদ্বান ব্যক্তি বলেন যে, হযরত আনসার (রাঃ) বলেছিলেনঃ “আমাদের প্রতি বায়তুল্লাহ শরীফকে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে, সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফের নয়। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতটির শান-ই-নুকূল এ দুটো হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে।হযরত আনাস (রাঃ) বলেন ‘আমরা সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফকে অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ মনে করতাম এবং ইসলামের অবস্থায় এ থেকে বিরত থাকতাম। অবশেষে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই দু'টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থলে বহু প্রতিমা বিদ্যমান ছিল এবং শয়তানেরা সারা রাত ধরে ওর মধ্যে ঘুরাফিরা করতো। ইসলাম গ্রহণের পর জনসাধারণ এখানকার তাওয়াফ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। আসাফ’ মূর্তিটি ছিল ‘সাফা পাহাড়ের উপর এবং নায়েলা মূর্তিটি ছিল মারওয়া পাহাড়ের উপর। মুশরিকরা ঐ দু'টোকে স্পর্শ করতো ও চুম্বন দিতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলমানেরা তাদের থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। কিন্তু এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার ফলে এখানকার তাওয়াফ সাব্যস্ত হয়। সীরাত-ই-মুহাম্মদ বিন ইসহাক' নামক পুস্তকে রয়েছে যে, ‘আসাফ’ ও নায়েলা’ একজন পুরুষ তোক ও অপরজন স্ত্রীলোক ছিল। এই অসৎ ও অসতী দু’জন কা'বা গৃহে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহ তাদের দুজনকে পাথরে পরিণত করেন। কুরাইশরা তাদেরকে কা'বার বাইরে রেখে দেয় যেন জনগণ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কয়েক যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের পূজা আরম্ভ হয়ে যায় এবং তাদেরকে সাফা ও মারওয়া' পাহাড়ে এনে দাড় করিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের তাওয়াফ শুরু হয়ে যায়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে একটি সুদীর্ঘ হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ কার্য সমাপন করেন তখন তিনি রুকন'-কে ছেড়ে বাবুস্ সাফা' দিয়ে বের হন এবং ঐ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ আমিও ওটা থেকেই শুরু করবো যা থেকে আল্লাহ তাআলা শুরু করেছেন।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেনঃ “তোমরা তার থেকেই আরম্ভ কর যার থেকে আল্লাহ তা'আলা আরম্ভ করেছেন। অর্থাৎ সাফা থেকে চলতে আরম্ভ করে মারওয়া পর্যন্ত যাও। হযরত হাবীবা বিনতে আবী তাজবাত (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) দেখেছি, তিনি ‘সাফা মারওয়া তাওয়াফ করছিলেন। জনমণ্ডলী তার আগে আগে ছিল এবং তিনি তাদের পিছনে ছিলেন। তিনি কিছুটা দৌড়িয়ে চলছিলেন এবং এই কারণে তাঁর লুঙ্গি তাঁর জানুর মধ্যে এদিক ওদিক হচ্ছিল। আর তিনি পবিত্র মুখে উচ্চারণ করছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা দৌড়িয়ে চল। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর দৌড়ানো লিখে দিয়েছেন।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। এরকমই অর্থের আরও একটি বর্ণনা রয়েছে। এই হাদীসটি ঐসব লোকের দলীল যারা সাফা ও মারওয়া দৌড়কে হজ্বের রুকন মনে করে থাকেন। যেমন হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মযহাব এটাই। ইমাম আহমাদেরও (রঃ) এরকমই একটি বর্ণনা রয়েছে। ইমাম মালিকেরও (রঃ) প্রসিদ্ধ মযহাব এটাই। কেউ কেউ একে ওয়াজিব বলেন বটে কিন্তু হজ্বের রুকন বলেন না। যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক বা ভুলবশতঃ একে ছেড়ে দেয় তবে তাকে একটি জন্তু জবাহ করতে হবে। ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে একটি বর্ণনা এরকমই বর্ণিত আছে। অন্য একটি দলও এটাই বলে থাকেন। অন্য একটি উক্তিতে একে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ইমাম সাওরী (রঃ) ইমাম শাবী (রঃ) এবং ইবনে সিরিন (রঃ) একথাই বলে থাকেন। হযরত আনাস (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম মালিক (রঃ) ও আতাবিয়্যাহ' নামক পুস্তকে এটা বর্ণনা করেছেন (আরবি) এটিই তার দলীল। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী অগ্রগণ্য। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করেছেন এবং বলেছেন, 'হজ্বের আহকাম আমার নিকট হতে গ্রহণ কর। তিনি তাঁর এই হজ্বে যা কিছু করেছেন তাই ওয়াজিব হয়ে গেছে-তা অবশ্য পালনীয়। কোন কাজ যদি কোন বিশেষ দলীলের মাধ্যমে করণীয় হতে উঠিয়ে দেয়া হয় তবে সেটা অন্য কথা। তা ছাড়া হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর দৌড়ানো কাজ লিখে দিয়েছেন অর্থাৎ ফরজ করেছেন। মোট কথা এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফও আল্লাহ তা'আলার শারঈ আহকামের অন্তর্গত। হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে হজ্বব্রত পালন করবার জন্যে এটা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে হযরত হাজেরার (আঃ) সাত বার প্রদক্ষিণই হচ্ছে সাফা মারওয়া’য় দৌড়ানোর মূল উৎস। যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে তাঁর ছোট শিশুপুত্রসহ এখানে রেখে গিয়েছিলেন এবং তার খানা-পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল ও শিশু ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে পড়েছিল তখন হযরত হাজেরা (আঃ) অত্যন্ত উদ্বেগ এবং দুর্ভাবনার সাথে এই পবিত্র পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্বীয় অঞ্চল ছড়িয়ে দিয়ে মহান আল্লাহর নিকট ভিক্ষা চাচ্ছিলেন। অবশেষে মহান আল্লাহ তার দুঃখ, চিন্তা, কষ্ট ও দুর্ভাবনা সব দূর করে দিয়েছিলেন। এখানে প্রদক্ষিণকারী হাজীগণেরও উচিত যে, তারা যেন অত্যন্ত দারিদ্র ও বিনয়ের সাথে এখানে প্রদক্ষিণ করেন এবং মহান আল্লাহর নিকট নিজেদের অভাব, প্রয়োজন এবং অসহায়তার কথা পেশ করেন ও মনের সংস্কার এবং সুপথ প্রাপ্তির প্রার্থনা জানান, আর পাপ মোচনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাদের দোষ-ক্রটি হতে মুক্ত থাকা এবং অবাধ্যতার প্রতি ঘৃণা থাকা উচিত। তাদের কর্তব্য হবে এই যে, তারা যেন স্থিরতা, পুণ্য, মুক্তি এবং মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করেন ও আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করেন যে, তিনি যেন তাদেরকে অন্যায় ও পাপরূপ সংকীর্ণ পথ হতে সরিয়ে উৎকর্ষতা, ক্ষমা এবং পুণ্যের তাওফীক প্রদান করেন, যেমন তিনি হযরত হাজেরার (আঃ) অবস্থাকে এদিক হতে ওদিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে অর্থাৎ সাতবার প্রদক্ষিণের স্থলে আটবার বা নয়বার প্রদক্ষিণ করে কিংবা নফল হজ্ব এবং উমরার মধ্যে সাফা-মারওয়া’র তাওয়াফ করে। আবার কেউ কেউ একে সাধারণ রেখেছেন অর্থাৎ প্রত্যেক পুণ্যের কাজই অতিরিক্তভাবে করে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি গুণগ্রাহী ও সর্বজ্ঞাত অর্থাৎ আল্লাহ পাক অল্প কাজেই বড় পুণ্য দান করে থাকেন এবং প্রতিদানের সঠিক পরিমাণ তার জানা আছে। তিনি কারও পুণ্য এতটুকুও কম করবেন না, আবার তিনি অনু পরিমাণ অত্যাচারও করবেন না। তবে তিনি পুণ্যের প্রতিদান বৃদ্ধি করে থাকেন, এবং নিজের নিকট হতে বিরাট প্রতিদান প্রদান করে থাকেন। সুতরাং হামদ’ ও ‘শুকর’ আল্লাহ পাকেরই জন্যে।
আল-বাকারা 2:159
১৫৯-১৬২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে ঐসব লোককে ভীষণভাবে ধমক দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার কথাগুলো এবং শরীয়তের বিষয়গুলো গোপন" করতো। কিতাবীরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রশংসা বিষয়ক কথাগুলো গোপন করে রাখতো। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে যে, সত্যকে গোপনকারীরা অভিশপ্ত। যেমন প্রত্যেক জিনিস ঐ আলেমের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যিনি জনসাধারণের মধ্যে আল্লাহ পাকের কথাগুলো প্রচার করে থাকেন। এমন কি পানির মৎসগুলো এবং বাতাসের পক্ষীগুলোও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। অনুরূপভাবে যারা সত্য কথা জেনে শুনে গোপন করে এবং বোকা ও বধির হওয়ার ভান করে তাদের প্রতি প্রত্যেক জিনিসই অভিশাপ দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিষয় সপর্কে জিজ্ঞাসিত হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি না থাকলে আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করে আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সঙ্গে একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘কবরের মধ্যে কাফিরের কপালে এত জোরে হাতুড়ী মারা হয় যে, মানব ও দানব ছাড়া সমস্ত প্রাণী ওর শব্দ শুনতে পায় এবং ওরা সবাই তাঁর প্রতি অভিশাপ দেয়। অভিসম্পাতকারীগণ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকেন এ কথার অর্থ এটাই। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর অভিশাপ তাদের উপর রয়েছে। হযরত আতা’ (রঃ) বলেন (আরবী) শব্দের ভাবার্থে সমুদয় জীবজন্তু এবং সমস্ত দানব ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে বছর ভূমি শুকিয়ে যায় এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় তখন চতুষ্পদ জন্তুরা বলে-'এটা বানী আদমের পাপেরই ফল, আল্লাহ তা'আলা বানী আদমের পাপীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এর দ্বারা ফেরেশতা এবং মুমিনগণকে বুঝানো হয়েছে।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আলেমের জন্যে প্রত্যেক জিনিসই ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে-এমন কি সমুদ্রের মাছও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে), এই আয়াতের মধ্যে রয়েছে যে, যারা ইলম'-কে গোপন করে আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ, সমস্ত মানুষ ও প্রত্যেক অভিসম্পাতকারী অভিসম্পাত করে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক বাকশক্তিহীন (জীব) অভিসম্পাত দান করে থাকে। সেটা ভাষার মাধ্যমেই হউক অথবা ইঙ্গিত দ্বারাই হউক। কিয়ামতের দিনেও সমস্ত জিনিস তাকে অভিসম্পাত দিয়ে থাকবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব মানুষকে অভিশপ্তদের মধ্য হতে বের করে নেন যারা তাদের এই কাজ হতে বিরত হয় এবং সম্পূর্ণরূপে সংশোধিত হয়। আর পূর্বে যা গোপন করেছিল এখন তা প্রকাশ করে দেয়। সেই তওবা কবুলকারী দয়ালু। আল্লাহ এইসব মানুষের তওবা কবূল করে নেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি মানুষকে কুফর ও বিদআতের দিকে আহ্বান করে সেও যদি খাটি অন্তরে তওবা করে তবে তার তওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, পূর্বের উম্মতদের মধ্যে যারা এই রকম বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়তো তাদের তওবা আল্লাহ তা'আলার দরবারে গৃহীত হতো না। কিন্তু তওবা ও দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর আল্লাহ পাকের এটা বিশেষ মেহেরবানী। অতঃপর ঐসব লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা কুফরী ও অন্যায় করেছে এবং তওবা করা তাদের ভাগ্যে জুটেনি। এরা কুফরের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এদের উপর বর্ষিত হয়েছে আল্লাহর-তার ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত। এই অভিশাপ তাদের উপর সংশ্লিষ্ট থাকে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকবে। অবশেষে এই অভিশাপ তাদেরকে নরকের আগুনে নিয়ে যাবে। তারা চিরকাল সেই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। তাদের এই শাস্তি এতটুকুও হ্রাস করা হবে না এবং কখনও তা বন্ধ করা হবে না। বরং চিরকালব্যাপী তাদের উপর ভীষণ শাস্তি হতে থাকবে। আমরা করুণাময় আল্লাহর নিকট তাঁর এই শাস্তি হতে আশ্রয় চাচ্ছি। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন কাফিরকে থামিয়ে রাখা হবে। অতঃপর তার উপর আলাহ। তা'আলা অভিসম্পাত করবেন এবং তারপরে ফেরেশতাগণ ও মানুষ তাকে অভিশাপ দেবে। কাফিরদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের ব্যাপারে কারও কোন মত বিরোধ নেই। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং তার পরের সম্মানিত ইমামগণ সবাই কুনূত' প্রভৃতির মাধ্যমে কাফিরদের উপর অভিশাপ দিতেন। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণের ব্যাপারে উলামা-ইকিরামের একটি দল বলেন যে, এটা জায়েয় নয়। কেননা তার পরিণাম কারও জানা নেই। কুফরির অবস্থায় তার মৃত্যু হলো এ কথাটি এ আয়াতের মধ্যে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট কাফিরকে অভিশাপ না দেয়ার (ব্যাপারে) আল্লাহ তা'আলার এই কথাটি দলীল রূপে পেশ করা যেতে পারে। আলেমদের অন্য একটি দলের মতে নির্দিষ্ট কাফিরের উপরও লানত বর্ষণ করা জায়েয। যেমন ধর্মশাস্ত্রবিদ হযরত আবু বকর বিন আরবী মালিকী (রঃ) এই মত পোষণ করে থাকেন এবং এর দলীল রূপে তিনি একটি দুর্বল হাদীসও পেশ করে থাকেন। কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর যে অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয নয় এর দলীল রূপে কেউ কেউ এই হাদীসটিও এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে একটি লোককে বার বার মাতাল অবস্থায় আনা হয় এবং বার বারই তার উপরে হদ্দ লাগানো হয়। এই সময় এক ব্যক্তি মন্তব্য করে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। কেননা, সে বার বার মদ্যপান করতেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওর উপর লা'নত বর্ষণ করো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সাথে ভালবাসা রাখে না, তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয।
আল-বাকারা 2:160
১৫৯-১৬২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে ঐসব লোককে ভীষণভাবে ধমক দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার কথাগুলো এবং শরীয়তের বিষয়গুলো গোপন" করতো। কিতাবীরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রশংসা বিষয়ক কথাগুলো গোপন করে রাখতো। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে যে, সত্যকে গোপনকারীরা অভিশপ্ত। যেমন প্রত্যেক জিনিস ঐ আলেমের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যিনি জনসাধারণের মধ্যে আল্লাহ পাকের কথাগুলো প্রচার করে থাকেন। এমন কি পানির মৎসগুলো এবং বাতাসের পক্ষীগুলোও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। অনুরূপভাবে যারা সত্য কথা জেনে শুনে গোপন করে এবং বোকা ও বধির হওয়ার ভান করে তাদের প্রতি প্রত্যেক জিনিসই অভিশাপ দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিষয় সপর্কে জিজ্ঞাসিত হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি না থাকলে আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করে আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সঙ্গে একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘কবরের মধ্যে কাফিরের কপালে এত জোরে হাতুড়ী মারা হয় যে, মানব ও দানব ছাড়া সমস্ত প্রাণী ওর শব্দ শুনতে পায় এবং ওরা সবাই তাঁর প্রতি অভিশাপ দেয়। অভিসম্পাতকারীগণ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকেন এ কথার অর্থ এটাই। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর অভিশাপ তাদের উপর রয়েছে। হযরত আতা’ (রঃ) বলেন (আরবী) শব্দের ভাবার্থে সমুদয় জীবজন্তু এবং সমস্ত দানব ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে বছর ভূমি শুকিয়ে যায় এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় তখন চতুষ্পদ জন্তুরা বলে-'এটা বানী আদমের পাপেরই ফল, আল্লাহ তা'আলা বানী আদমের পাপীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এর দ্বারা ফেরেশতা এবং মুমিনগণকে বুঝানো হয়েছে।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আলেমের জন্যে প্রত্যেক জিনিসই ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে-এমন কি সমুদ্রের মাছও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে), এই আয়াতের মধ্যে রয়েছে যে, যারা ইলম'-কে গোপন করে আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ, সমস্ত মানুষ ও প্রত্যেক অভিসম্পাতকারী অভিসম্পাত করে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক বাকশক্তিহীন (জীব) অভিসম্পাত দান করে থাকে। সেটা ভাষার মাধ্যমেই হউক অথবা ইঙ্গিত দ্বারাই হউক। কিয়ামতের দিনেও সমস্ত জিনিস তাকে অভিসম্পাত দিয়ে থাকবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব মানুষকে অভিশপ্তদের মধ্য হতে বের করে নেন যারা তাদের এই কাজ হতে বিরত হয় এবং সম্পূর্ণরূপে সংশোধিত হয়। আর পূর্বে যা গোপন করেছিল এখন তা প্রকাশ করে দেয়। সেই তওবা কবুলকারী দয়ালু। আল্লাহ এইসব মানুষের তওবা কবূল করে নেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি মানুষকে কুফর ও বিদআতের দিকে আহ্বান করে সেও যদি খাটি অন্তরে তওবা করে তবে তার তওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, পূর্বের উম্মতদের মধ্যে যারা এই রকম বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়তো তাদের তওবা আল্লাহ তা'আলার দরবারে গৃহীত হতো না। কিন্তু তওবা ও দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর আল্লাহ পাকের এটা বিশেষ মেহেরবানী। অতঃপর ঐসব লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা কুফরী ও অন্যায় করেছে এবং তওবা করা তাদের ভাগ্যে জুটেনি। এরা কুফরের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এদের উপর বর্ষিত হয়েছে আল্লাহর-তার ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত। এই অভিশাপ তাদের উপর সংশ্লিষ্ট থাকে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকবে। অবশেষে এই অভিশাপ তাদেরকে নরকের আগুনে নিয়ে যাবে। তারা চিরকাল সেই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। তাদের এই শাস্তি এতটুকুও হ্রাস করা হবে না এবং কখনও তা বন্ধ করা হবে না। বরং চিরকালব্যাপী তাদের উপর ভীষণ শাস্তি হতে থাকবে। আমরা করুণাময় আল্লাহর নিকট তাঁর এই শাস্তি হতে আশ্রয় চাচ্ছি। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন কাফিরকে থামিয়ে রাখা হবে। অতঃপর তার উপর আলাহ। তা'আলা অভিসম্পাত করবেন এবং তারপরে ফেরেশতাগণ ও মানুষ তাকে অভিশাপ দেবে। কাফিরদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের ব্যাপারে কারও কোন মত বিরোধ নেই। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং তার পরের সম্মানিত ইমামগণ সবাই কুনূত' প্রভৃতির মাধ্যমে কাফিরদের উপর অভিশাপ দিতেন। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণের ব্যাপারে উলামা-ইকিরামের একটি দল বলেন যে, এটা জায়েয় নয়। কেননা তার পরিণাম কারও জানা নেই। কুফরির অবস্থায় তার মৃত্যু হলো এ কথাটি এ আয়াতের মধ্যে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট কাফিরকে অভিশাপ না দেয়ার (ব্যাপারে) আল্লাহ তা'আলার এই কথাটি দলীল রূপে পেশ করা যেতে পারে। আলেমদের অন্য একটি দলের মতে নির্দিষ্ট কাফিরের উপরও লানত বর্ষণ করা জায়েয। যেমন ধর্মশাস্ত্রবিদ হযরত আবু বকর বিন আরবী মালিকী (রঃ) এই মত পোষণ করে থাকেন এবং এর দলীল রূপে তিনি একটি দুর্বল হাদীসও পেশ করে থাকেন। কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর যে অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয নয় এর দলীল রূপে কেউ কেউ এই হাদীসটিও এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে একটি লোককে বার বার মাতাল অবস্থায় আনা হয় এবং বার বারই তার উপরে হদ্দ লাগানো হয়। এই সময় এক ব্যক্তি মন্তব্য করে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। কেননা, সে বার বার মদ্যপান করতেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওর উপর লা'নত বর্ষণ করো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সাথে ভালবাসা রাখে না, তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয।
আল-বাকারা 2:161
১৫৯-১৬২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে ঐসব লোককে ভীষণভাবে ধমক দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার কথাগুলো এবং শরীয়তের বিষয়গুলো গোপন" করতো। কিতাবীরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রশংসা বিষয়ক কথাগুলো গোপন করে রাখতো। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে যে, সত্যকে গোপনকারীরা অভিশপ্ত। যেমন প্রত্যেক জিনিস ঐ আলেমের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যিনি জনসাধারণের মধ্যে আল্লাহ পাকের কথাগুলো প্রচার করে থাকেন। এমন কি পানির মৎসগুলো এবং বাতাসের পক্ষীগুলোও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। অনুরূপভাবে যারা সত্য কথা জেনে শুনে গোপন করে এবং বোকা ও বধির হওয়ার ভান করে তাদের প্রতি প্রত্যেক জিনিসই অভিশাপ দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিষয় সপর্কে জিজ্ঞাসিত হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি না থাকলে আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করে আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সঙ্গে একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘কবরের মধ্যে কাফিরের কপালে এত জোরে হাতুড়ী মারা হয় যে, মানব ও দানব ছাড়া সমস্ত প্রাণী ওর শব্দ শুনতে পায় এবং ওরা সবাই তাঁর প্রতি অভিশাপ দেয়। অভিসম্পাতকারীগণ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকেন এ কথার অর্থ এটাই। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর অভিশাপ তাদের উপর রয়েছে। হযরত আতা’ (রঃ) বলেন (আরবী) শব্দের ভাবার্থে সমুদয় জীবজন্তু এবং সমস্ত দানব ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে বছর ভূমি শুকিয়ে যায় এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় তখন চতুষ্পদ জন্তুরা বলে-'এটা বানী আদমের পাপেরই ফল, আল্লাহ তা'আলা বানী আদমের পাপীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এর দ্বারা ফেরেশতা এবং মুমিনগণকে বুঝানো হয়েছে।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আলেমের জন্যে প্রত্যেক জিনিসই ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে-এমন কি সমুদ্রের মাছও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে), এই আয়াতের মধ্যে রয়েছে যে, যারা ইলম'-কে গোপন করে আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ, সমস্ত মানুষ ও প্রত্যেক অভিসম্পাতকারী অভিসম্পাত করে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক বাকশক্তিহীন (জীব) অভিসম্পাত দান করে থাকে। সেটা ভাষার মাধ্যমেই হউক অথবা ইঙ্গিত দ্বারাই হউক। কিয়ামতের দিনেও সমস্ত জিনিস তাকে অভিসম্পাত দিয়ে থাকবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব মানুষকে অভিশপ্তদের মধ্য হতে বের করে নেন যারা তাদের এই কাজ হতে বিরত হয় এবং সম্পূর্ণরূপে সংশোধিত হয়। আর পূর্বে যা গোপন করেছিল এখন তা প্রকাশ করে দেয়। সেই তওবা কবুলকারী দয়ালু। আল্লাহ এইসব মানুষের তওবা কবূল করে নেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি মানুষকে কুফর ও বিদআতের দিকে আহ্বান করে সেও যদি খাটি অন্তরে তওবা করে তবে তার তওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, পূর্বের উম্মতদের মধ্যে যারা এই রকম বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়তো তাদের তওবা আল্লাহ তা'আলার দরবারে গৃহীত হতো না। কিন্তু তওবা ও দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর আল্লাহ পাকের এটা বিশেষ মেহেরবানী। অতঃপর ঐসব লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা কুফরী ও অন্যায় করেছে এবং তওবা করা তাদের ভাগ্যে জুটেনি। এরা কুফরের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এদের উপর বর্ষিত হয়েছে আল্লাহর-তার ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত। এই অভিশাপ তাদের উপর সংশ্লিষ্ট থাকে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকবে। অবশেষে এই অভিশাপ তাদেরকে নরকের আগুনে নিয়ে যাবে। তারা চিরকাল সেই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। তাদের এই শাস্তি এতটুকুও হ্রাস করা হবে না এবং কখনও তা বন্ধ করা হবে না। বরং চিরকালব্যাপী তাদের উপর ভীষণ শাস্তি হতে থাকবে। আমরা করুণাময় আল্লাহর নিকট তাঁর এই শাস্তি হতে আশ্রয় চাচ্ছি। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন কাফিরকে থামিয়ে রাখা হবে। অতঃপর তার উপর আলাহ। তা'আলা অভিসম্পাত করবেন এবং তারপরে ফেরেশতাগণ ও মানুষ তাকে অভিশাপ দেবে। কাফিরদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের ব্যাপারে কারও কোন মত বিরোধ নেই। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং তার পরের সম্মানিত ইমামগণ সবাই কুনূত' প্রভৃতির মাধ্যমে কাফিরদের উপর অভিশাপ দিতেন। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণের ব্যাপারে উলামা-ইকিরামের একটি দল বলেন যে, এটা জায়েয় নয়। কেননা তার পরিণাম কারও জানা নেই। কুফরির অবস্থায় তার মৃত্যু হলো এ কথাটি এ আয়াতের মধ্যে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট কাফিরকে অভিশাপ না দেয়ার (ব্যাপারে) আল্লাহ তা'আলার এই কথাটি দলীল রূপে পেশ করা যেতে পারে। আলেমদের অন্য একটি দলের মতে নির্দিষ্ট কাফিরের উপরও লানত বর্ষণ করা জায়েয। যেমন ধর্মশাস্ত্রবিদ হযরত আবু বকর বিন আরবী মালিকী (রঃ) এই মত পোষণ করে থাকেন এবং এর দলীল রূপে তিনি একটি দুর্বল হাদীসও পেশ করে থাকেন। কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর যে অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয নয় এর দলীল রূপে কেউ কেউ এই হাদীসটিও এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে একটি লোককে বার বার মাতাল অবস্থায় আনা হয় এবং বার বারই তার উপরে হদ্দ লাগানো হয়। এই সময় এক ব্যক্তি মন্তব্য করে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। কেননা, সে বার বার মদ্যপান করতেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওর উপর লা'নত বর্ষণ করো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সাথে ভালবাসা রাখে না, তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয।
আল-বাকারা 2:162
১৫৯-১৬২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে ঐসব লোককে ভীষণভাবে ধমক দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার কথাগুলো এবং শরীয়তের বিষয়গুলো গোপন" করতো। কিতাবীরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রশংসা বিষয়ক কথাগুলো গোপন করে রাখতো। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে যে, সত্যকে গোপনকারীরা অভিশপ্ত। যেমন প্রত্যেক জিনিস ঐ আলেমের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যিনি জনসাধারণের মধ্যে আল্লাহ পাকের কথাগুলো প্রচার করে থাকেন। এমন কি পানির মৎসগুলো এবং বাতাসের পক্ষীগুলোও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। অনুরূপভাবে যারা সত্য কথা জেনে শুনে গোপন করে এবং বোকা ও বধির হওয়ার ভান করে তাদের প্রতি প্রত্যেক জিনিসই অভিশাপ দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিষয় সপর্কে জিজ্ঞাসিত হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি না থাকলে আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করে আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সঙ্গে একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘কবরের মধ্যে কাফিরের কপালে এত জোরে হাতুড়ী মারা হয় যে, মানব ও দানব ছাড়া সমস্ত প্রাণী ওর শব্দ শুনতে পায় এবং ওরা সবাই তাঁর প্রতি অভিশাপ দেয়। অভিসম্পাতকারীগণ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকেন এ কথার অর্থ এটাই। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর অভিশাপ তাদের উপর রয়েছে। হযরত আতা’ (রঃ) বলেন (আরবী) শব্দের ভাবার্থে সমুদয় জীবজন্তু এবং সমস্ত দানব ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে বছর ভূমি শুকিয়ে যায় এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় তখন চতুষ্পদ জন্তুরা বলে-'এটা বানী আদমের পাপেরই ফল, আল্লাহ তা'আলা বানী আদমের পাপীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এর দ্বারা ফেরেশতা এবং মুমিনগণকে বুঝানো হয়েছে।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আলেমের জন্যে প্রত্যেক জিনিসই ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে-এমন কি সমুদ্রের মাছও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে), এই আয়াতের মধ্যে রয়েছে যে, যারা ইলম'-কে গোপন করে আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ, সমস্ত মানুষ ও প্রত্যেক অভিসম্পাতকারী অভিসম্পাত করে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক বাকশক্তিহীন (জীব) অভিসম্পাত দান করে থাকে। সেটা ভাষার মাধ্যমেই হউক অথবা ইঙ্গিত দ্বারাই হউক। কিয়ামতের দিনেও সমস্ত জিনিস তাকে অভিসম্পাত দিয়ে থাকবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব মানুষকে অভিশপ্তদের মধ্য হতে বের করে নেন যারা তাদের এই কাজ হতে বিরত হয় এবং সম্পূর্ণরূপে সংশোধিত হয়। আর পূর্বে যা গোপন করেছিল এখন তা প্রকাশ করে দেয়। সেই তওবা কবুলকারী দয়ালু। আল্লাহ এইসব মানুষের তওবা কবূল করে নেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি মানুষকে কুফর ও বিদআতের দিকে আহ্বান করে সেও যদি খাটি অন্তরে তওবা করে তবে তার তওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, পূর্বের উম্মতদের মধ্যে যারা এই রকম বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়তো তাদের তওবা আল্লাহ তা'আলার দরবারে গৃহীত হতো না। কিন্তু তওবা ও দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর আল্লাহ পাকের এটা বিশেষ মেহেরবানী। অতঃপর ঐসব লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা কুফরী ও অন্যায় করেছে এবং তওবা করা তাদের ভাগ্যে জুটেনি। এরা কুফরের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এদের উপর বর্ষিত হয়েছে আল্লাহর-তার ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত। এই অভিশাপ তাদের উপর সংশ্লিষ্ট থাকে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকবে। অবশেষে এই অভিশাপ তাদেরকে নরকের আগুনে নিয়ে যাবে। তারা চিরকাল সেই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। তাদের এই শাস্তি এতটুকুও হ্রাস করা হবে না এবং কখনও তা বন্ধ করা হবে না। বরং চিরকালব্যাপী তাদের উপর ভীষণ শাস্তি হতে থাকবে। আমরা করুণাময় আল্লাহর নিকট তাঁর এই শাস্তি হতে আশ্রয় চাচ্ছি। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন কাফিরকে থামিয়ে রাখা হবে। অতঃপর তার উপর আলাহ। তা'আলা অভিসম্পাত করবেন এবং তারপরে ফেরেশতাগণ ও মানুষ তাকে অভিশাপ দেবে। কাফিরদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের ব্যাপারে কারও কোন মত বিরোধ নেই। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং তার পরের সম্মানিত ইমামগণ সবাই কুনূত' প্রভৃতির মাধ্যমে কাফিরদের উপর অভিশাপ দিতেন। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণের ব্যাপারে উলামা-ইকিরামের একটি দল বলেন যে, এটা জায়েয় নয়। কেননা তার পরিণাম কারও জানা নেই। কুফরির অবস্থায় তার মৃত্যু হলো এ কথাটি এ আয়াতের মধ্যে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট কাফিরকে অভিশাপ না দেয়ার (ব্যাপারে) আল্লাহ তা'আলার এই কথাটি দলীল রূপে পেশ করা যেতে পারে। আলেমদের অন্য একটি দলের মতে নির্দিষ্ট কাফিরের উপরও লানত বর্ষণ করা জায়েয। যেমন ধর্মশাস্ত্রবিদ হযরত আবু বকর বিন আরবী মালিকী (রঃ) এই মত পোষণ করে থাকেন এবং এর দলীল রূপে তিনি একটি দুর্বল হাদীসও পেশ করে থাকেন। কোন নির্দিষ্ট কাফিরের উপর যে অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয নয় এর দলীল রূপে কেউ কেউ এই হাদীসটিও এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে একটি লোককে বার বার মাতাল অবস্থায় আনা হয় এবং বার বারই তার উপরে হদ্দ লাগানো হয়। এই সময় এক ব্যক্তি মন্তব্য করে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। কেননা, সে বার বার মদ্যপান করতেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওর উপর লা'নত বর্ষণ করো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সাথে ভালবাসা রাখে না, তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করা জায়েয।
আল-বাকারা 2:163
অর্থাৎ উপাস্য হওয়ার ব্যাপারে তিনি এক। তার কোন অংশীদার নেই। তার মত কেউই নেই। তিনি একক। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউই নেই। তিনি দাতা ও দয়ালু। সূরা-ই-ফাতিহার প্রারম্ভে এর তাফসীর হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার ইসমে আযম (বড় নাম) দু'টি আয়াতের মধ্যে রয়েছে। একটি এই আয়াতটি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে নিম্নের এই আয়াতটি (আরবি) (৩:১-২) এর পরে আল্লাহ তা'আলা একত্ববাদের প্রমাণস্বরূপ ঘোষণা করছেনঃ
আল-বাকারা 2:164
ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে মানব জাতি! আমি যে একক উপাস্য তার একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে এই আকাশ, যার উচ্চতা, সূক্ষ্মতা ও প্রশস্ততা তোমরা অবলোকন করছে এবং যার গতিহীন ও গতিশীল উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজী তোমাদের চোখের সামনে রয়েছে। আমার একত্বের দ্বিতীয় প্রমাণ। হচ্ছে পৃথিবীর সৃজন। এটা একটা ঘন মোটা বস্তু যা তোমাদের পায়ের নীচে বিছানো রয়েছে। যার উপরে রয়েছে উঁচু উঁচু শিখর বিশিষ্ট গগণচুম্বী পর্বতসমূহ। তার মধ্যে রয়েছে বড় বড় তরঙ্গযুক্ত সমুদ্র। আর যাতে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের সুন্দর সুন্দর লতা ও গুল্ম। যার মধ্যে নানা প্রকারের শস্য উৎপন্ন হয়ে থাকে। যার উপরে তোমরা অবস্থান করছে এবং নিজেদের ইচ্ছামত আরামদায়ক ঘর বাড়ী তৈরী করে সুখ শান্তিতে বসবাস করছে এবং যদ্বারা বহু প্রকারের উপকার লাভ করছে। আল্লাহর একত্বের আর একটি নিদর্শন হচ্ছে দিন রাত্রির আগমন ও প্রস্থান। রাত যাচ্ছে দিন আসছে, আবার দিন যাচ্ছে রাত আসছে। এ নিয়মের ব্যতিক্রম কখনও হচ্ছে না। বরং প্রত্যেকটি আপন আপন নির্ধারিত নিয়মে চলছে। কোন সময় দিন বড় হয়, আবার কোন সময় রাত বড় হয়। কোন সময় দিনের কিছু অংশ রাত্রির মধ্যে যায় এবং কোন সময় রাত্রির কিছু অংশ দিনের মধ্যে আসে। তারপরে তোমরা নৌকাগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত কর যা তোমাদেরকে ও তোমাদের মাল আসবাবপত্র এবং বাণিজ্যিক দ্রব্যাদি নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে এদিক ওদিক চলাচল করছে। এর মাধ্যমে এই দেশবাসী ঐ দেশবাসীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও লেনদেন করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণাঙ্গ করুণা ও দয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। এবং এর ফলে মৃত ভূমিকে পুনর্জীবিত করে থাকেন আর এর দ্বারা জমি কর্ষণের ব্যবস্থা দান করতঃ ওর থেকে উৎপাদন করেন নানা প্রকারের শস্য। এরপর আল্লাহ ভূপৃষ্ঠে ছোট বড় বিভিন্ন প্রকারের প্রয়োজনীয় জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, ওদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন, তাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন, তাদের জন্যে তৈরি করেছেন শু’বার, বসবার এবং চরবার জায়গা। বায়ুকে তিনি চালিত করেছেন পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে ও দক্ষিণে। কখনও ঠাণ্ডা, কখনও গরম এবং কখনও অল্প কখনও বেশী। আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে মেঘমালাকে কাজে লাগিয়েছেন। ওগুলো এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যাচ্ছেন, প্রয়োজনের সময় বর্ষণ করছেন। এগুলো সবই হচ্ছে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শনসমূহ, যদ্দ্বারা জ্ঞানীরা স্বীয় প্রভুর অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ব অনুধাবন করতে পারে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “নিশ্চয় নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃজনে এবং দিবস ও যামিনী পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্যে স্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে। যারা দণ্ডায়মান, উপবেশন ও এলায়িত ভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে যে, হে আমাদের প্রতিপালক। আপনি এটা বৃথা সৃষ্টি করেননি, আপনিই পবিত্রতম-অতএব আমাদেরকে নরকানল হতে রক্ষা করুন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট এসে বলেঃ ‘আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন যে, তিনি যেন সাফা' পাহাড়কে সোনার পাহাড় করে দেন, তাহলে আমরা ওটা দিয়ে ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করতঃ আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো এবং আপনার সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করবো।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা দৃঢ় অঙ্গীকার করছে তো?' তারা বলে হ' আমরা পাকা অঙ্গীকার করলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহ্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেন। ফলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ “আপনার প্রার্থনা তো গৃহীত হয়েছে কিন্তু এইসব লোক যদি এর পরেও ঈমান না আনে তবে তাদের উপর আল্লাহর এমন শাস্তি আসবে যা ইতিপূর্বে আর কারও উপর আসেনি। একথা শুনে তিনি কেঁপে উঠেন এবং আরজ করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে এ অবস্থাতেই ছেড়ে দিন। আমি তাদেরকে আপনার দিকে আহবান করতে থাকবো। একদিন না একদিন তাদের মধ্যে কেউ ঈমান আনবে। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, যদি তারা আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতার নিদর্শনাবলী দেখবার ইচ্ছে করে তবে এই নিদর্শনগুলো কি দেখার মত নয়? এই আয়াতের আর একটি শান-ই-নুকূল এও বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন মুশরিকরা বলে যে, “একজন আহ্বাহ সমগ্র বিশ্বের বন্দোবস্ত কিরূপে করবেন?” তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় যে, তিনি সেই আল্লাহ যিনি এত বড় ক্ষমতাবান। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহ এক একথা শুনে তারা দলীল চাইলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তার ক্ষমতার নিদর্শনাবলী তাদের নিকট প্রকাশ করা হয়।
আল-বাকারা 2:165
১৬৫-১৬৭ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহে মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশীদার স্থাপন করে থাকে এবং অন্যদেরকে তার সদৃশ স্থির করে থাকে। অতঃপর তাদের সাথে এমন আন্তরিক ভালবাসা স্থাপন করে যেমন ভালবাসা আল্লাহ তা'আলার সাথে স্থাপন করা উচিত ছিল। অথচ তিনিই প্রকৃত উপাস্য এবং তিনি এক। তিনি অংশীদার হতে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করি-হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে বড় পাপ কিতিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অথচ সৃষ্টি তিনি একাই করেছেন। অতঃপর আস্লাহ বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার প্রতি মু'মিনদের প্রেম দৃঢ়তর হয়ে থাকে, অর্থাৎ তাদের অন্তর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাথে তাদের এরূপ ভালবাসাও নেই এবং তারা আর কারও কাছে প্রার্থনাও করে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা মস্তক অবনত করে -তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদারও করে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব লোককে শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন যারা শিবুকের মাধ্যমে তাদের আত্মার উপর অত্যাচার করতেছে। যদি তারা শাস্তি অবলোকন করতো তবে তাদের অবশ্যই বিশ্বাস হতো যে, মহা ক্ষমতাবান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই। সমস্ত জিনিস তার অধীনস্থ এবং তাঁরই আজ্ঞাধীন। তার শাস্তিও খুব কঠিন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “সেই দিন তার শাস্তির মত কেউ শাস্তিও দিতে পারে না এবং তাঁর পাকড়াও এর মত কেউ পাকড়াও করতে পারে না। দ্বিতীয় ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যদি ঐ দৃশ্য সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান থাকতো তবে কখনও তারা ‘শিরক ও কুফর'কে আঁকড়ে থাকতো না। দুনিয়ায় যাদেরকে তারা তাদের নেতা মনে করে রেখেছিল, কিয়ামতের দিন ঐ নেতারা তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এরা আমাদের উপাসনা করতো না। হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র এবং আপনিই আমাদের অভিভাবক। বরং এৱা জ্বিনদের উপাসনা করতো। এদের অধিকাংশই ওদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী ছিল। অনুরূপভাবে জ্বিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং পরিষ্কারভাবে তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘অতিসত্ত্বরই তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে এবং তারা তাদের শক্ত হয়ে যাবে।' (১৯৮২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাফিরদের প্রতি যে উক্তি করেছিলেন কুরআন মাজীদে তা নকল করা হয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তির ভালবাসা তোমাদের অন্তরে স্থান দিয়েছে এবং তাদের পূজা অর্চনা শুরু করে দিয়েছো অথচ কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের উপাসনাকে অস্বীকার করে বসবে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি লা'নত বর্ষণ করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী হবে না। এভাবেই অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘অত্যাচারিরা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের পরিচালকদেরকে বলবে-তোমরা না হলে আমরা ঈমানদার হয়ে যেতাম। তারা তখন উত্তরে বলবে আমরা কি তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত হতে বিরত রেখেছিলাম। প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, তোমরা নিজেরাই পাপী ছিলে। তারা বলবে-তোমাদের রাত দিনের প্রতারণা, তোমাদের কুফরীপূর্ণ নির্দেশাবলী এবং তোমাদের শিরকের শিক্ষা আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। এখন তারা শাস্তি দেখার পরে সবাই ভিতরে ভিতরে লজ্জিত হবে এবং তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ তাদের গলদেশে গলাবন্ধ পরিয়ে দেয়া হবে। অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘সেই শয়তানও বলবে, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিলেন। আর আমি তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করেছি অতঃপর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছি, তোমাদের উপর আমার কোন প্রভাবই ছিল না, বরং আমি তোমাদেরকে আহ্বান করেছি আর তোমরা তাতে সাড়া দিয়েছো। সুতরাং তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকে তিরস্কার কর; না আমি তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি, না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহ) অংশীদার সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই অত্যাচারিদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা শাস্তি দেখে নেবে এবং সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পলায়নেরও কোন জায়গা থাকবে না এবং মুক্তিরও কোন পথ চোখে পড়বে না। বন্ধুত্ব কেটে যাবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হবে। বিনা প্রমাণে যারা তাদের পরিচালকদের কথামত চলতো, তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখতো এবং তাদের আনুগত্য স্বীকার করত, পূজা অর্চনা করতো, তারা যখন তাদের পরিচালক ও নেতাদেরকে দেখবে যে, তারা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা অত্যন্ত দুঃখ ও নৈরাশ্যের সাথে বলবে-যদি আমরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম তবে আমরাও ওদেরকে প্রত্যাখ্যান করতাম যেমন এরা আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমরা এদের প্রতি কোন ক্ৰক্ষেপ করতাম না, এদের কথা মানতাম না এবং এদেরকে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতাম না। বরং খাটি অন্তরে এক আল্লাহর ইবাদত করতাম। অথচ প্রকৃতই যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবুও তারা পূর্বে যা করেছিল তাই করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে অবশ্যই তারা ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।' (৬:২৮) এজন্যেই বলা হয়েছে তাদের কৃতকর্মসমূহ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুঃখজনকভাবে প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ তাদের ভাল কর্ম যা কিছু ছিল সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেনঃ তাদের কৃতকর্মের অবস্থা ঐ ছাই এর মত যাঁকে ভীষণ ঝড়ের দিন বায়ু প্রবল বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা কাফির হয়েছে তাদের কার্যাবলী যেন মরুভূমির মরীচিকা-পিপাসার্ত লোক যাকে পানি বলে মনে করে, কিন্তু ওর নিকটে গিয়ে কিছুই পায় না। তারপরে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তারা জাহান্নামের অগ্নি হতে উদ্ধার পাবে না। বরং তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে।
আল-বাকারা 2:166
১৬৫-১৬৭ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহে মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশীদার স্থাপন করে থাকে এবং অন্যদেরকে তার সদৃশ স্থির করে থাকে। অতঃপর তাদের সাথে এমন আন্তরিক ভালবাসা স্থাপন করে যেমন ভালবাসা আল্লাহ তা'আলার সাথে স্থাপন করা উচিত ছিল। অথচ তিনিই প্রকৃত উপাস্য এবং তিনি এক। তিনি অংশীদার হতে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করি-হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে বড় পাপ কিতিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অথচ সৃষ্টি তিনি একাই করেছেন। অতঃপর আস্লাহ বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার প্রতি মু'মিনদের প্রেম দৃঢ়তর হয়ে থাকে, অর্থাৎ তাদের অন্তর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাথে তাদের এরূপ ভালবাসাও নেই এবং তারা আর কারও কাছে প্রার্থনাও করে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা মস্তক অবনত করে -তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদারও করে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব লোককে শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন যারা শিবুকের মাধ্যমে তাদের আত্মার উপর অত্যাচার করতেছে। যদি তারা শাস্তি অবলোকন করতো তবে তাদের অবশ্যই বিশ্বাস হতো যে, মহা ক্ষমতাবান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই। সমস্ত জিনিস তার অধীনস্থ এবং তাঁরই আজ্ঞাধীন। তার শাস্তিও খুব কঠিন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “সেই দিন তার শাস্তির মত কেউ শাস্তিও দিতে পারে না এবং তাঁর পাকড়াও এর মত কেউ পাকড়াও করতে পারে না। দ্বিতীয় ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যদি ঐ দৃশ্য সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান থাকতো তবে কখনও তারা ‘শিরক ও কুফর'কে আঁকড়ে থাকতো না। দুনিয়ায় যাদেরকে তারা তাদের নেতা মনে করে রেখেছিল, কিয়ামতের দিন ঐ নেতারা তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এরা আমাদের উপাসনা করতো না। হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র এবং আপনিই আমাদের অভিভাবক। বরং এৱা জ্বিনদের উপাসনা করতো। এদের অধিকাংশই ওদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী ছিল। অনুরূপভাবে জ্বিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং পরিষ্কারভাবে তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘অতিসত্ত্বরই তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে এবং তারা তাদের শক্ত হয়ে যাবে।' (১৯৮২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাফিরদের প্রতি যে উক্তি করেছিলেন কুরআন মাজীদে তা নকল করা হয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তির ভালবাসা তোমাদের অন্তরে স্থান দিয়েছে এবং তাদের পূজা অর্চনা শুরু করে দিয়েছো অথচ কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের উপাসনাকে অস্বীকার করে বসবে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি লা'নত বর্ষণ করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী হবে না। এভাবেই অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘অত্যাচারিরা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের পরিচালকদেরকে বলবে-তোমরা না হলে আমরা ঈমানদার হয়ে যেতাম। তারা তখন উত্তরে বলবে আমরা কি তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত হতে বিরত রেখেছিলাম। প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, তোমরা নিজেরাই পাপী ছিলে। তারা বলবে-তোমাদের রাত দিনের প্রতারণা, তোমাদের কুফরীপূর্ণ নির্দেশাবলী এবং তোমাদের শিরকের শিক্ষা আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। এখন তারা শাস্তি দেখার পরে সবাই ভিতরে ভিতরে লজ্জিত হবে এবং তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ তাদের গলদেশে গলাবন্ধ পরিয়ে দেয়া হবে। অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘সেই শয়তানও বলবে, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিলেন। আর আমি তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করেছি অতঃপর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছি, তোমাদের উপর আমার কোন প্রভাবই ছিল না, বরং আমি তোমাদেরকে আহ্বান করেছি আর তোমরা তাতে সাড়া দিয়েছো। সুতরাং তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকে তিরস্কার কর; না আমি তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি, না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহ) অংশীদার সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই অত্যাচারিদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা শাস্তি দেখে নেবে এবং সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পলায়নেরও কোন জায়গা থাকবে না এবং মুক্তিরও কোন পথ চোখে পড়বে না। বন্ধুত্ব কেটে যাবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হবে। বিনা প্রমাণে যারা তাদের পরিচালকদের কথামত চলতো, তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখতো এবং তাদের আনুগত্য স্বীকার করত, পূজা অর্চনা করতো, তারা যখন তাদের পরিচালক ও নেতাদেরকে দেখবে যে, তারা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা অত্যন্ত দুঃখ ও নৈরাশ্যের সাথে বলবে-যদি আমরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম তবে আমরাও ওদেরকে প্রত্যাখ্যান করতাম যেমন এরা আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমরা এদের প্রতি কোন ক্ৰক্ষেপ করতাম না, এদের কথা মানতাম না এবং এদেরকে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতাম না। বরং খাটি অন্তরে এক আল্লাহর ইবাদত করতাম। অথচ প্রকৃতই যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবুও তারা পূর্বে যা করেছিল তাই করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে অবশ্যই তারা ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।' (৬:২৮) এজন্যেই বলা হয়েছে তাদের কৃতকর্মসমূহ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুঃখজনকভাবে প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ তাদের ভাল কর্ম যা কিছু ছিল সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেনঃ তাদের কৃতকর্মের অবস্থা ঐ ছাই এর মত যাঁকে ভীষণ ঝড়ের দিন বায়ু প্রবল বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা কাফির হয়েছে তাদের কার্যাবলী যেন মরুভূমির মরীচিকা-পিপাসার্ত লোক যাকে পানি বলে মনে করে, কিন্তু ওর নিকটে গিয়ে কিছুই পায় না। তারপরে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তারা জাহান্নামের অগ্নি হতে উদ্ধার পাবে না। বরং তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে।
আল-বাকারা 2:167
১৬৫-১৬৭ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহে মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশীদার স্থাপন করে থাকে এবং অন্যদেরকে তার সদৃশ স্থির করে থাকে। অতঃপর তাদের সাথে এমন আন্তরিক ভালবাসা স্থাপন করে যেমন ভালবাসা আল্লাহ তা'আলার সাথে স্থাপন করা উচিত ছিল। অথচ তিনিই প্রকৃত উপাস্য এবং তিনি এক। তিনি অংশীদার হতে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করি-হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে বড় পাপ কিতিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অথচ সৃষ্টি তিনি একাই করেছেন। অতঃপর আস্লাহ বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার প্রতি মু'মিনদের প্রেম দৃঢ়তর হয়ে থাকে, অর্থাৎ তাদের অন্তর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাথে তাদের এরূপ ভালবাসাও নেই এবং তারা আর কারও কাছে প্রার্থনাও করে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা মস্তক অবনত করে -তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদারও করে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব লোককে শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন যারা শিবুকের মাধ্যমে তাদের আত্মার উপর অত্যাচার করতেছে। যদি তারা শাস্তি অবলোকন করতো তবে তাদের অবশ্যই বিশ্বাস হতো যে, মহা ক্ষমতাবান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই। সমস্ত জিনিস তার অধীনস্থ এবং তাঁরই আজ্ঞাধীন। তার শাস্তিও খুব কঠিন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “সেই দিন তার শাস্তির মত কেউ শাস্তিও দিতে পারে না এবং তাঁর পাকড়াও এর মত কেউ পাকড়াও করতে পারে না। দ্বিতীয় ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যদি ঐ দৃশ্য সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান থাকতো তবে কখনও তারা ‘শিরক ও কুফর'কে আঁকড়ে থাকতো না। দুনিয়ায় যাদেরকে তারা তাদের নেতা মনে করে রেখেছিল, কিয়ামতের দিন ঐ নেতারা তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এরা আমাদের উপাসনা করতো না। হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র এবং আপনিই আমাদের অভিভাবক। বরং এৱা জ্বিনদের উপাসনা করতো। এদের অধিকাংশই ওদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী ছিল। অনুরূপভাবে জ্বিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং পরিষ্কারভাবে তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘অতিসত্ত্বরই তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে এবং তারা তাদের শক্ত হয়ে যাবে।' (১৯৮২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাফিরদের প্রতি যে উক্তি করেছিলেন কুরআন মাজীদে তা নকল করা হয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তির ভালবাসা তোমাদের অন্তরে স্থান দিয়েছে এবং তাদের পূজা অর্চনা শুরু করে দিয়েছো অথচ কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের উপাসনাকে অস্বীকার করে বসবে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি লা'নত বর্ষণ করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী হবে না। এভাবেই অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘অত্যাচারিরা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের পরিচালকদেরকে বলবে-তোমরা না হলে আমরা ঈমানদার হয়ে যেতাম। তারা তখন উত্তরে বলবে আমরা কি তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত হতে বিরত রেখেছিলাম। প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, তোমরা নিজেরাই পাপী ছিলে। তারা বলবে-তোমাদের রাত দিনের প্রতারণা, তোমাদের কুফরীপূর্ণ নির্দেশাবলী এবং তোমাদের শিরকের শিক্ষা আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। এখন তারা শাস্তি দেখার পরে সবাই ভিতরে ভিতরে লজ্জিত হবে এবং তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ তাদের গলদেশে গলাবন্ধ পরিয়ে দেয়া হবে। অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘সেই শয়তানও বলবে, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিলেন। আর আমি তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করেছি অতঃপর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছি, তোমাদের উপর আমার কোন প্রভাবই ছিল না, বরং আমি তোমাদেরকে আহ্বান করেছি আর তোমরা তাতে সাড়া দিয়েছো। সুতরাং তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকে তিরস্কার কর; না আমি তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি, না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহ) অংশীদার সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই অত্যাচারিদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা শাস্তি দেখে নেবে এবং সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পলায়নেরও কোন জায়গা থাকবে না এবং মুক্তিরও কোন পথ চোখে পড়বে না। বন্ধুত্ব কেটে যাবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হবে। বিনা প্রমাণে যারা তাদের পরিচালকদের কথামত চলতো, তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখতো এবং তাদের আনুগত্য স্বীকার করত, পূজা অর্চনা করতো, তারা যখন তাদের পরিচালক ও নেতাদেরকে দেখবে যে, তারা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা অত্যন্ত দুঃখ ও নৈরাশ্যের সাথে বলবে-যদি আমরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম তবে আমরাও ওদেরকে প্রত্যাখ্যান করতাম যেমন এরা আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমরা এদের প্রতি কোন ক্ৰক্ষেপ করতাম না, এদের কথা মানতাম না এবং এদেরকে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতাম না। বরং খাটি অন্তরে এক আল্লাহর ইবাদত করতাম। অথচ প্রকৃতই যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবুও তারা পূর্বে যা করেছিল তাই করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে অবশ্যই তারা ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।' (৬:২৮) এজন্যেই বলা হয়েছে তাদের কৃতকর্মসমূহ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুঃখজনকভাবে প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ তাদের ভাল কর্ম যা কিছু ছিল সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেনঃ তাদের কৃতকর্মের অবস্থা ঐ ছাই এর মত যাঁকে ভীষণ ঝড়ের দিন বায়ু প্রবল বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা কাফির হয়েছে তাদের কার্যাবলী যেন মরুভূমির মরীচিকা-পিপাসার্ত লোক যাকে পানি বলে মনে করে, কিন্তু ওর নিকটে গিয়ে কিছুই পায় না। তারপরে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তারা জাহান্নামের অগ্নি হতে উদ্ধার পাবে না। বরং তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে।
আল-বাকারা 2:168
১৬৮-১৬৯ নং আয়াতের তাফসীরউপরে যেহেতু তাওহীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে এই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত সৃষ্ট জীবের আহার দাতাও তিনিই। তিনি বলেনঃ “তোমরা আমার এই অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না যে, আমি তোমাদের জন্য উত্তম ও পবিত্র জিনিসগুলো বৈধ করে দিয়েছি যা তোমাদের কাছে খুবই সুস্বাদু ও তৃপ্তি দানকারী। ঐ খাদ্য তোমাদের শরীর, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞান বিবেকের কোন ক্ষতি করে না। আমি তোমাদেরকে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করতে নিষেধ করছি। কেউ কেউ যেমন শয়তানের পথে চলে কতকগুলো হালাল বস্তু তাদের উপর হারাম করে নিয়েছে, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে তোমাদের অবস্থাও দ্রুপই হবে। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি যে মাল-ধন আমার বান্দাদেরকে প্রদান করেছি তা তার জন্য বৈধ করেছি। আমি আমার বান্দাদের একত্ববাদী রূপে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু শয়তান তাদেরকে এই সুদৃঢ় ধর্ম হতে সরিয়ে ফেলেছে এবং আমার বৈধকৃত বস্তুকে তাদের উপর অবৈধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এই আয়াতটি পঠিত হলে হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমারপ্রার্থনা কবুল করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে সাদি (রাঃ)! পবিত্র জিনিস এবং হালাল গ্রাস ভক্ষণ কর, তা হলেই আল্লাহ পাক তোমার প্রার্থনা ম র করবেন। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যে হারাম গ্রাস মানুষ তার পেটের ভিতরে নিক্ষেপ করে,ওরই কুফল স্বরূপ চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার কোন ইবাদত গৃহীত হয় না। হারাম আহার্যের দ্বারা শরীরের যে গোশত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় তা দোযখী।' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে, শয়তান তোমাদের শত্রু। তোমরাও তাকে শত্রু মনে কর। তার ও তার অনুচরদের একমাত্র বাসনাই হচ্ছে তোমাদেরকে শাস্তির দিকে এগিয়ে দেয়া।' অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা কি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমাদের বন্ধু মনে করছো? অথচ প্রকৃতপক্ষে তো তারা তোমাদের শত্রু। অত্যাচারিদের জন্য জঘন্য প্রতিদান রয়েছে।' (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যে কোন আদেশ অমান্যকরণ যাতে শয়তানের প্ররোচনা রয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেনঃ একটি লোক নযর মানে যে, সে তার ছেলেকে যবাহ করবে। হযরত মাসরূকের (রঃ) নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি ফতওয়া দেন যে, সে যেন একটি মেষ যবাহ করে। এই নযর খুতওয়াত-ই- শয়তানের অন্তর্গত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) একদা ছাগীর খুর লবন দিয়ে খাচ্ছিলেন। তার পার্শে উপবিষ্ট এক ব্যক্তি দূরে সরে গিয়ে উপবেশন করে। তিনি (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ) লোকটিকে বলেনঃ ‘এস খাও।' সে বলেঃ আমি খাবো না। তিনি বলেনঃ তুমি কি রোযা রেখেছছ?' সে বলেঃ না, কিন্তু আমি ওটা নিজের উপর হারাম করেছি। তখন তিনি বলেনঃ “এটা শয়তানের পথে চলা হচ্ছে। তোমার কসমের কাফফারা আদায় কর ও ওটা খেয়ে নাও। হযরত আবু রাফি (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হলে সে বলে- তুমি যদি তোমার স্ত্রীকে তালাক না দাও তবে আমি একদিন ইয়াহূদিয়্যাহ, একদিন নাসরানিয়্যাহ এবং আমার সমস্ত গোলাম আযাদ। এখন আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট বিষয়টি জিজ্ঞেস করতে আসি যে, এখন কি করা যায়। তখন তিনি বলেন যে, এটা হচ্ছে শয়তানের পদাংক অনুসরণ। অতঃপর আমি হযরত যয়নাব বিনতে সালমার (রাঃ) নিকট গমন করি। সেই সময় গোটা মদীনা নগরীতে তার মত সুশিক্ষিতা ও জ্ঞানবতী নারী আর একজনও ছিলেন না। আমি তাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তার কাছেও এই উত্তরই পাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) ফতওয়া এই যে, ক্রোধের অবস্থায় যে কসম করা হয় এবং এই অবস্থায় যে নযর মানা হয় ওটা শয়তানের পদাংক অনুসরণ। কসমের কাফফারার সমান কাফফারা আদায় করে দিতে হবে। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদেরকে অসৎ কাজ করতে প্ররোচিত করে। যেমন ব্যভিচার করতে এবং আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে, এমন কথা বলতে প্ররোচিত করে যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। সুতরাং প্রত্যেক কাফির ও বিদআতপন্থী এর অন্তর্ভুক্ত যারা অন্যায় কার্যের নির্দেশ দিয়ে থাকে এবং অসৎ কার্যে উৎসাহ প্রদান করে থাকে।
আল-বাকারা 2:169
১৬৮-১৬৯ নং আয়াতের তাফসীরউপরে যেহেতু তাওহীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে এই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত সৃষ্ট জীবের আহার দাতাও তিনিই। তিনি বলেনঃ “তোমরা আমার এই অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না যে, আমি তোমাদের জন্য উত্তম ও পবিত্র জিনিসগুলো বৈধ করে দিয়েছি যা তোমাদের কাছে খুবই সুস্বাদু ও তৃপ্তি দানকারী। ঐ খাদ্য তোমাদের শরীর, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞান বিবেকের কোন ক্ষতি করে না। আমি তোমাদেরকে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করতে নিষেধ করছি। কেউ কেউ যেমন শয়তানের পথে চলে কতকগুলো হালাল বস্তু তাদের উপর হারাম করে নিয়েছে, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে তোমাদের অবস্থাও দ্রুপই হবে। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি যে মাল-ধন আমার বান্দাদেরকে প্রদান করেছি তা তার জন্য বৈধ করেছি। আমি আমার বান্দাদের একত্ববাদী রূপে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু শয়তান তাদেরকে এই সুদৃঢ় ধর্ম হতে সরিয়ে ফেলেছে এবং আমার বৈধকৃত বস্তুকে তাদের উপর অবৈধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এই আয়াতটি পঠিত হলে হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমারপ্রার্থনা কবুল করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে সাদি (রাঃ)! পবিত্র জিনিস এবং হালাল গ্রাস ভক্ষণ কর, তা হলেই আল্লাহ পাক তোমার প্রার্থনা ম র করবেন। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যে হারাম গ্রাস মানুষ তার পেটের ভিতরে নিক্ষেপ করে,ওরই কুফল স্বরূপ চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার কোন ইবাদত গৃহীত হয় না। হারাম আহার্যের দ্বারা শরীরের যে গোশত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় তা দোযখী।' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে, শয়তান তোমাদের শত্রু। তোমরাও তাকে শত্রু মনে কর। তার ও তার অনুচরদের একমাত্র বাসনাই হচ্ছে তোমাদেরকে শাস্তির দিকে এগিয়ে দেয়া।' অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা কি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমাদের বন্ধু মনে করছো? অথচ প্রকৃতপক্ষে তো তারা তোমাদের শত্রু। অত্যাচারিদের জন্য জঘন্য প্রতিদান রয়েছে।' (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যে কোন আদেশ অমান্যকরণ যাতে শয়তানের প্ররোচনা রয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেনঃ একটি লোক নযর মানে যে, সে তার ছেলেকে যবাহ করবে। হযরত মাসরূকের (রঃ) নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি ফতওয়া দেন যে, সে যেন একটি মেষ যবাহ করে। এই নযর খুতওয়াত-ই- শয়তানের অন্তর্গত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) একদা ছাগীর খুর লবন দিয়ে খাচ্ছিলেন। তার পার্শে উপবিষ্ট এক ব্যক্তি দূরে সরে গিয়ে উপবেশন করে। তিনি (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ) লোকটিকে বলেনঃ ‘এস খাও।' সে বলেঃ আমি খাবো না। তিনি বলেনঃ তুমি কি রোযা রেখেছছ?' সে বলেঃ না, কিন্তু আমি ওটা নিজের উপর হারাম করেছি। তখন তিনি বলেনঃ “এটা শয়তানের পথে চলা হচ্ছে। তোমার কসমের কাফফারা আদায় কর ও ওটা খেয়ে নাও। হযরত আবু রাফি (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হলে সে বলে- তুমি যদি তোমার স্ত্রীকে তালাক না দাও তবে আমি একদিন ইয়াহূদিয়্যাহ, একদিন নাসরানিয়্যাহ এবং আমার সমস্ত গোলাম আযাদ। এখন আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট বিষয়টি জিজ্ঞেস করতে আসি যে, এখন কি করা যায়। তখন তিনি বলেন যে, এটা হচ্ছে শয়তানের পদাংক অনুসরণ। অতঃপর আমি হযরত যয়নাব বিনতে সালমার (রাঃ) নিকট গমন করি। সেই সময় গোটা মদীনা নগরীতে তার মত সুশিক্ষিতা ও জ্ঞানবতী নারী আর একজনও ছিলেন না। আমি তাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তার কাছেও এই উত্তরই পাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) ফতওয়া এই যে, ক্রোধের অবস্থায় যে কসম করা হয় এবং এই অবস্থায় যে নযর মানা হয় ওটা শয়তানের পদাংক অনুসরণ। কসমের কাফফারার সমান কাফফারা আদায় করে দিতে হবে। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদেরকে অসৎ কাজ করতে প্ররোচিত করে। যেমন ব্যভিচার করতে এবং আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে, এমন কথা বলতে প্ররোচিত করে যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। সুতরাং প্রত্যেক কাফির ও বিদআতপন্থী এর অন্তর্ভুক্ত যারা অন্যায় কার্যের নির্দেশ দিয়ে থাকে এবং অসৎ কার্যে উৎসাহ প্রদান করে থাকে।
আল-বাকারা 2:170
১৭০-১৭১ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ কাফির ও মুশরিকদেরকে যখন বলা হয় যে, তারা যেন আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ এবং নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতাকে পরিত্যাগ করে, তখন তারা বলে যে, তারা তাদের বড়দের পথ ধরে রয়েছে। তাদের পিতৃপুরুষ যাদের পূজা অর্চনা করতো তারাও তাদের উপাসনা করছে এবং করতে থাকবে। তাদের উত্তরেই কুরআন ঘোষণা করছে যে, তাদের পিতৃপুরুষদের কোন জ্ঞান ছিল না এবং তারা সুপথগামী ছিল না। এই আয়াতটি ইয়াহূদীদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাদের দৃষ্টান্ত পেশ করছেন যে, যেমন মাঠে বিচরণকারী জন্তুগুলো রাখালের কথা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, শুধুমাত্র শব্দই ওদের কানে পৌঁছে থাকে এবং ওরা কথার ভাল ও মন্দ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ রূপে অজ্ঞাত থাকে, এইসব লোকের অবস্থা ঠিক তদ্রূপ। এই আয়াতের ভাবার্থ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলাকে ছেড়ে এরা যাদের পূজা করে থাকে এবং তাদের প্রয়োজন ও মনস্কামনা পূর্ণ করার প্রার্থনা জানিয়ে থাকে তারা এদের কথা শুনতে পায়, না জানতে পারে, না দেখতে পায়। তাদের মধ্যে না আছে জীবন, না আছে কোন অনুভূতি। কাফিরদের এই দলটি সত্য কথা শুনা হতে বধির, বলা হতে বোবা, সত্য পথে চলা হতে অন্ধ এবং সত্যের অনুধাবন হতেও এরা বহু দূরে রয়েছে। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ ‘আমার আয়াতসমূহে অবিশ্বাসকারীরা বধির, বোবা, তারা অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান সরল ও সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
আল-বাকারা 2:171
১৭০-১৭১ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ কাফির ও মুশরিকদেরকে যখন বলা হয় যে, তারা যেন আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ এবং নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতাকে পরিত্যাগ করে, তখন তারা বলে যে, তারা তাদের বড়দের পথ ধরে রয়েছে। তাদের পিতৃপুরুষ যাদের পূজা অর্চনা করতো তারাও তাদের উপাসনা করছে এবং করতে থাকবে। তাদের উত্তরেই কুরআন ঘোষণা করছে যে, তাদের পিতৃপুরুষদের কোন জ্ঞান ছিল না এবং তারা সুপথগামী ছিল না। এই আয়াতটি ইয়াহূদীদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাদের দৃষ্টান্ত পেশ করছেন যে, যেমন মাঠে বিচরণকারী জন্তুগুলো রাখালের কথা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, শুধুমাত্র শব্দই ওদের কানে পৌঁছে থাকে এবং ওরা কথার ভাল ও মন্দ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ রূপে অজ্ঞাত থাকে, এইসব লোকের অবস্থা ঠিক তদ্রূপ। এই আয়াতের ভাবার্থ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলাকে ছেড়ে এরা যাদের পূজা করে থাকে এবং তাদের প্রয়োজন ও মনস্কামনা পূর্ণ করার প্রার্থনা জানিয়ে থাকে তারা এদের কথা শুনতে পায়, না জানতে পারে, না দেখতে পায়। তাদের মধ্যে না আছে জীবন, না আছে কোন অনুভূতি। কাফিরদের এই দলটি সত্য কথা শুনা হতে বধির, বলা হতে বোবা, সত্য পথে চলা হতে অন্ধ এবং সত্যের অনুধাবন হতেও এরা বহু দূরে রয়েছে। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ ‘আমার আয়াতসমূহে অবিশ্বাসকারীরা বধির, বোবা, তারা অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান সরল ও সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
আল-বাকারা 2:172
১৭২-১৭৩ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলছেন-“তোমরা পবিত্র ও উত্তম দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং আমার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।হালাল গ্রাস দু'আ ও ইবাদত গৃহীত হওয়ার কারণ এবং হারাম গ্রাস তা কবুল না হওয়ার কারণ। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করে থাকেন। তিনি নবীগণকে ও মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা হালাল দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং ভাল কাজ কর, নিশ্চয় তোমরা যা করছে আমি তা জানি।' অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “হে মু'মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা উপজীবিকা স্বরূপ দান করেছি, সেই পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একটি লোক দীর্ঘ সফরে রয়েছে। তার চুলগুলো বিক্ষিপ্ত এবং সে ধূলো-বালিতে আচ্ছন্ন রয়েছে। সে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা করছে এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে আল্লাহকে ডাকছে। কিন্তু তার আহার্য, পানীয়, পোষাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য সবই হারাম। এই জন্যেই তার এই সময়ের প্রার্থনাও গৃহীত হয় না।' হালাল জিনিসের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা হারাম জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে, যে হালাল প্রাণী আপনা আপনিই মরে গেছে এবং শরীয়তের বিধান অনুসারে যবাহ করা হয়নি তা হারাম। হয় ওকে কেউ গলা টিপে মেরে ফেলুক বা লাঠির আঘাতেই মরে যাক, বা কোথাও হতে পড়ে গিয়ে মারা যাক, বা অন্যান্য জন্তু তাকে শিং এর আঘাতে মেরে ফেলুক, এসবগুলোই মৃত এবং হারাম। কিন্তু পানির প্রাণীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। পানির প্রাণী নিজে নিজেই মরে গেলেও হালাল। এর পূর্ণ বর্ণনা (আরবি) (৫:৯৬) এই আয়াতের তাফসীরে দেয়া হবে। সাহাবীদের (রাঃ) আম্বার’ নামক পানির প্রাণীটি মৃত অবস্থায় প্রাপ্তি, তাদের তা ভক্ষণ করা, পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছে যাওয়া এবং তার একে জায়েয বলা ইত্যাদি সব কিছুই হাদীসের মধ্যে রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সমুদ্রের পানি হালাল এবং ওর মৃত প্রাণীও . হালাল।' আরও একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুই মৃত ও দুই রক্ত হালাল। মাছ, ফড়িং, কলিজা ও প্লীহা।' সূরা-ই-মায়েদা'য় ইনশাআল্লাহ এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে।জিজ্ঞাস্যমৃত জন্তুর দুধ ও তার মধ্যস্থিত ডিম অপবিত্র। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। কেননা ওগুলো মৃতেরই এক একটি অংশ বিশেষ। ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা পবিত্র তো বটে; কিন্তু মৃতের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ফলে অপবিত্র হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে মৃতের দাঁতও প্রসিদ্ধ মাযহাবে ঐ গুরুজনদের নিকট অপবিত্র। তবে তাতে মতভেদও রয়েছে। সাহাবীগণের (রাঃ) মাজুসদের ' পনীর ভক্ষণ এখানে প্রতিবাদ রূপে আসতে পারে; কিন্তু কুরতুবী (রঃ) এর উত্তরে বলেছেন যে, দুধ খুবই কম হয়ে থাকে আর এরূপ তরল জাতীয় কোন অপবিত্র জিনিস অল্প পরিমাণে যদি অধিক পরিমাণ যুক্ত কোন পবিত্র জিনিসে পড়ে যায় তবে তাতে কোন দোষ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘি, পনীর এবং বন্য গর্দভ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘হালাল ঐ জিনিস যা আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হালাল করেছেন এবং হারাম ঐ জিনিস যা তিনি স্বীয় কিতাবে হারাম করেছেন আর যেগুলোর বর্ণনা নেই সেগুলো ক্ষমার্হ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, শূকরের মাংসও হারাম। হয় তাকে যবাহ করা হোক বা নিজেই মরে যাক। শূকরের চর্বিরও এটাই নির্দেশ। কেননা, ওর অধিকাংশ মাংসই হয় এবং চর্বি মাংসের সাথেই থাকে। কাজেই মাংস যখন হারাম তখন চর্বিও হারাম। দ্বিতীয়তঃ এই জন্যেও যে, কিয়াসের দাবী এটাই। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যা আল্লাহ ছাড়া অপরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ওটাও হারাম। অজ্ঞতার যুগে কাফিরেরা তাদের বাতিল উপাস্যদের নামে পশু যবাহ করতো। আল্লাহ তা'আলা ওটাকে হারাম বলে ঘোষণা করেন। একবার একজন স্ত্রীলোক কাপড়ের স্ত্রী-পুতুলের বিয়েতে একটি পশু যবাহ করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) ফতওয়া দেন যে, ওটা খাওয়া উচিত নয়। কেননা ওটা একটা ছবির জন্যে যবাহ করা হয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাসিতা হন যে, আযমী বা অনাররা তাদের ঈদে পশু যবাহ করে থাকে এবং তা হতে মুসলমানদের নিকটও হাদিয়া স্বরূপ কিছু পাঠিয়ে থাকে। তাদের ঐ গোত খাওয়া যায় কি? তিনি বলেনঃ “ঐ দিনের সম্মানার্থে যে জীব যবাহ করা হয় তোমরা তা খেয়ো না। তবে তাদের গাছের ফল খেতে পার।এর পরে আল্লাহ তাআলা অভাব ও প্রয়োজনের সময় যখন খাওয়ার জন্যে অন্য কিছুই পাওয়া যায় না তখন ঐ হারাম বস্তুগুলোও খেয়ে নেয়া বৈধ করেছেন এবং বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যাবে এবং অবাধ্য-উচ্ছংখল ও সীমা অতিক্রমকারী না হবে তার জন্যে এই সব জিনিস খাওয়ায় কোন পাপ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল, করুণাময় (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটির তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছে দস্যু, মুসলমান বাদশাহর উপর আক্রমণকারী, ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরোধী এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় ভ্রমণকারী। এদের জন্যে এই রকম নিরুপায় অবস্থাতেও হারাম বস্তু হারামই থাকবে। হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) (আরবি)-এর তাফসীর এটাও করে থাকেন যে, সে ওকে হালাল মনে করে না এবং মনে ওর স্বাদ ও মজা গ্রহণের বাসনা রাখে না। ওকে মুখ রোচক রূপে ভাল করে রেধে খায় না। বরং যেন তেন করে শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই খেয়ে থাকে। আর যদি সঙ্গে বেঁধে নেয়। তবে ততক্ষণ রাখতে পারে যতক্ষণ হালাল আহার্য প্রাপ্ত না হয়। যখনই হালাল আহার্য পেয়ে যাবে তখনই ওগুলোকে ফেলে দিতে হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওগুলো খুব পেট পুরে খাওয়া চলবে না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তিকে ওটা খাওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় এবং তার স্বাধীন ক্ষমতা লোপ পায় তার জন্যেই এই হুকুম। জিজ্ঞাস্যএকটি লোকে ক্ষুধার জ্বালায় খুবই কাতর হয়ে পড়েছে। এমন সময় সে একটি মৃত জীব দেখতে পেয়েছে এবং তার সম্মুখে অপরের একটি হালাল বস্তুও রয়েছে। যেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতারও ভয় নেই এবং কোন কষ্টও নেই, এই অবস্থায় তাকে অপরের জিনিসটিই খেয়ে নিতে হবে, মৃত জীবটি খেতে হবে না। এবারে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, তাকে ঐ জিনিসটির মূল্য আদায় করতে হবে কি হবে না বা ঐ জিনিসটি তার দায়িত্বে থাকবে কি থাকবে? এই ব্যাপারে দু'টো উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি হচ্ছে দায়িত্বে থাকা এবং অপরটি হচ্ছে দায়িত্বে না থাকা। ইবনে মাজাহর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত আব্বাদ বিন শারজাবীল আনাযী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘এক বছর আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। আমি মদীনা গমন করি এবং একটি ক্ষেতে ঢুকে কিছু শিষ ভেঙ্গে নেই ও ছিলে খেতে আরম্ভ করি। আর কিছু শিষ চাদরে বেঁধে নিয়ে চলতে থাকি। ক্ষেতের মালিক দেখে আমাকে ধরে নেয় এবং মেরে পিটে আমার চাদর কেড়ে নেয়। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে তাকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকে বলেনঃ তুমি এই ক্ষুধার্তকে খেতে দিলে, না তার জন্যে অন্য কোন চেষ্টা করলে, না তুমি তাকে বুঝালে বা শেখালে! এই বেচারা তো ক্ষুধার্ত ও মুর্থ ছিল। যাও, তার কাপড় তাকে ফিরিয়ে দাও এবং এক ওয়াসাক বা অধওয়াসাক (এক ওয়াসাকে প্রায় ৪মণ হয়) শস্য দিয়ে দাও।' গাছে লটকে থাকা খেজুর সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘অভাবী লোক যদি এখানে কিছু খায় কিন্তু বাড়ী নিয়ে না যায় তবে তার কোন অপরাধ নয়।' এও বর্ণিত আছে। যে, তিন গ্রাসের চেয়ে যেন বেশী না খায়। মোট কথা, এই অবস্থায় আল্লাহ , পাকের দয়া ও মেহেরবানীর কারণেই তার জন্যে এই হারামকে হালাল করা হয়েছে। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যায় অথচ হারাম জিনিস ভক্ষণ বা পান করে না, অতঃপর মারা-যায় সে দোযখী। এর দ্বারা জানা গেল যে, এরূপ অবস্থায় এরকম জিনিস খাওয়া অবশ্য কর্তব্য, শুধু যে খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে তা নয়; এটাই সঠিক কথা। যেমন রুগ্ন ব্যক্তির রোযা ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি।
আল-বাকারা 2:173
১৭২-১৭৩ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলছেন-“তোমরা পবিত্র ও উত্তম দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং আমার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।হালাল গ্রাস দু'আ ও ইবাদত গৃহীত হওয়ার কারণ এবং হারাম গ্রাস তা কবুল না হওয়ার কারণ। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করে থাকেন। তিনি নবীগণকে ও মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা হালাল দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং ভাল কাজ কর, নিশ্চয় তোমরা যা করছে আমি তা জানি।' অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “হে মু'মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা উপজীবিকা স্বরূপ দান করেছি, সেই পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একটি লোক দীর্ঘ সফরে রয়েছে। তার চুলগুলো বিক্ষিপ্ত এবং সে ধূলো-বালিতে আচ্ছন্ন রয়েছে। সে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা করছে এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে আল্লাহকে ডাকছে। কিন্তু তার আহার্য, পানীয়, পোষাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য সবই হারাম। এই জন্যেই তার এই সময়ের প্রার্থনাও গৃহীত হয় না।' হালাল জিনিসের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা হারাম জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে, যে হালাল প্রাণী আপনা আপনিই মরে গেছে এবং শরীয়তের বিধান অনুসারে যবাহ করা হয়নি তা হারাম। হয় ওকে কেউ গলা টিপে মেরে ফেলুক বা লাঠির আঘাতেই মরে যাক, বা কোথাও হতে পড়ে গিয়ে মারা যাক, বা অন্যান্য জন্তু তাকে শিং এর আঘাতে মেরে ফেলুক, এসবগুলোই মৃত এবং হারাম। কিন্তু পানির প্রাণীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। পানির প্রাণী নিজে নিজেই মরে গেলেও হালাল। এর পূর্ণ বর্ণনা (আরবি) (৫:৯৬) এই আয়াতের তাফসীরে দেয়া হবে। সাহাবীদের (রাঃ) আম্বার’ নামক পানির প্রাণীটি মৃত অবস্থায় প্রাপ্তি, তাদের তা ভক্ষণ করা, পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছে যাওয়া এবং তার একে জায়েয বলা ইত্যাদি সব কিছুই হাদীসের মধ্যে রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সমুদ্রের পানি হালাল এবং ওর মৃত প্রাণীও . হালাল।' আরও একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুই মৃত ও দুই রক্ত হালাল। মাছ, ফড়িং, কলিজা ও প্লীহা।' সূরা-ই-মায়েদা'য় ইনশাআল্লাহ এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে।জিজ্ঞাস্যমৃত জন্তুর দুধ ও তার মধ্যস্থিত ডিম অপবিত্র। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। কেননা ওগুলো মৃতেরই এক একটি অংশ বিশেষ। ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা পবিত্র তো বটে; কিন্তু মৃতের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ফলে অপবিত্র হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে মৃতের দাঁতও প্রসিদ্ধ মাযহাবে ঐ গুরুজনদের নিকট অপবিত্র। তবে তাতে মতভেদও রয়েছে। সাহাবীগণের (রাঃ) মাজুসদের ' পনীর ভক্ষণ এখানে প্রতিবাদ রূপে আসতে পারে; কিন্তু কুরতুবী (রঃ) এর উত্তরে বলেছেন যে, দুধ খুবই কম হয়ে থাকে আর এরূপ তরল জাতীয় কোন অপবিত্র জিনিস অল্প পরিমাণে যদি অধিক পরিমাণ যুক্ত কোন পবিত্র জিনিসে পড়ে যায় তবে তাতে কোন দোষ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘি, পনীর এবং বন্য গর্দভ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘হালাল ঐ জিনিস যা আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হালাল করেছেন এবং হারাম ঐ জিনিস যা তিনি স্বীয় কিতাবে হারাম করেছেন আর যেগুলোর বর্ণনা নেই সেগুলো ক্ষমার্হ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, শূকরের মাংসও হারাম। হয় তাকে যবাহ করা হোক বা নিজেই মরে যাক। শূকরের চর্বিরও এটাই নির্দেশ। কেননা, ওর অধিকাংশ মাংসই হয় এবং চর্বি মাংসের সাথেই থাকে। কাজেই মাংস যখন হারাম তখন চর্বিও হারাম। দ্বিতীয়তঃ এই জন্যেও যে, কিয়াসের দাবী এটাই। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যা আল্লাহ ছাড়া অপরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ওটাও হারাম। অজ্ঞতার যুগে কাফিরেরা তাদের বাতিল উপাস্যদের নামে পশু যবাহ করতো। আল্লাহ তা'আলা ওটাকে হারাম বলে ঘোষণা করেন। একবার একজন স্ত্রীলোক কাপড়ের স্ত্রী-পুতুলের বিয়েতে একটি পশু যবাহ করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) ফতওয়া দেন যে, ওটা খাওয়া উচিত নয়। কেননা ওটা একটা ছবির জন্যে যবাহ করা হয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাসিতা হন যে, আযমী বা অনাররা তাদের ঈদে পশু যবাহ করে থাকে এবং তা হতে মুসলমানদের নিকটও হাদিয়া স্বরূপ কিছু পাঠিয়ে থাকে। তাদের ঐ গোত খাওয়া যায় কি? তিনি বলেনঃ “ঐ দিনের সম্মানার্থে যে জীব যবাহ করা হয় তোমরা তা খেয়ো না। তবে তাদের গাছের ফল খেতে পার।এর পরে আল্লাহ তাআলা অভাব ও প্রয়োজনের সময় যখন খাওয়ার জন্যে অন্য কিছুই পাওয়া যায় না তখন ঐ হারাম বস্তুগুলোও খেয়ে নেয়া বৈধ করেছেন এবং বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যাবে এবং অবাধ্য-উচ্ছংখল ও সীমা অতিক্রমকারী না হবে তার জন্যে এই সব জিনিস খাওয়ায় কোন পাপ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল, করুণাময় (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটির তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছে দস্যু, মুসলমান বাদশাহর উপর আক্রমণকারী, ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরোধী এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় ভ্রমণকারী। এদের জন্যে এই রকম নিরুপায় অবস্থাতেও হারাম বস্তু হারামই থাকবে। হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) (আরবি)-এর তাফসীর এটাও করে থাকেন যে, সে ওকে হালাল মনে করে না এবং মনে ওর স্বাদ ও মজা গ্রহণের বাসনা রাখে না। ওকে মুখ রোচক রূপে ভাল করে রেধে খায় না। বরং যেন তেন করে শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই খেয়ে থাকে। আর যদি সঙ্গে বেঁধে নেয়। তবে ততক্ষণ রাখতে পারে যতক্ষণ হালাল আহার্য প্রাপ্ত না হয়। যখনই হালাল আহার্য পেয়ে যাবে তখনই ওগুলোকে ফেলে দিতে হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওগুলো খুব পেট পুরে খাওয়া চলবে না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তিকে ওটা খাওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় এবং তার স্বাধীন ক্ষমতা লোপ পায় তার জন্যেই এই হুকুম। জিজ্ঞাস্যএকটি লোকে ক্ষুধার জ্বালায় খুবই কাতর হয়ে পড়েছে। এমন সময় সে একটি মৃত জীব দেখতে পেয়েছে এবং তার সম্মুখে অপরের একটি হালাল বস্তুও রয়েছে। যেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতারও ভয় নেই এবং কোন কষ্টও নেই, এই অবস্থায় তাকে অপরের জিনিসটিই খেয়ে নিতে হবে, মৃত জীবটি খেতে হবে না। এবারে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, তাকে ঐ জিনিসটির মূল্য আদায় করতে হবে কি হবে না বা ঐ জিনিসটি তার দায়িত্বে থাকবে কি থাকবে? এই ব্যাপারে দু'টো উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি হচ্ছে দায়িত্বে থাকা এবং অপরটি হচ্ছে দায়িত্বে না থাকা। ইবনে মাজাহর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত আব্বাদ বিন শারজাবীল আনাযী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘এক বছর আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। আমি মদীনা গমন করি এবং একটি ক্ষেতে ঢুকে কিছু শিষ ভেঙ্গে নেই ও ছিলে খেতে আরম্ভ করি। আর কিছু শিষ চাদরে বেঁধে নিয়ে চলতে থাকি। ক্ষেতের মালিক দেখে আমাকে ধরে নেয় এবং মেরে পিটে আমার চাদর কেড়ে নেয়। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে তাকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকে বলেনঃ তুমি এই ক্ষুধার্তকে খেতে দিলে, না তার জন্যে অন্য কোন চেষ্টা করলে, না তুমি তাকে বুঝালে বা শেখালে! এই বেচারা তো ক্ষুধার্ত ও মুর্থ ছিল। যাও, তার কাপড় তাকে ফিরিয়ে দাও এবং এক ওয়াসাক বা অধওয়াসাক (এক ওয়াসাকে প্রায় ৪মণ হয়) শস্য দিয়ে দাও।' গাছে লটকে থাকা খেজুর সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘অভাবী লোক যদি এখানে কিছু খায় কিন্তু বাড়ী নিয়ে না যায় তবে তার কোন অপরাধ নয়।' এও বর্ণিত আছে। যে, তিন গ্রাসের চেয়ে যেন বেশী না খায়। মোট কথা, এই অবস্থায় আল্লাহ , পাকের দয়া ও মেহেরবানীর কারণেই তার জন্যে এই হারামকে হালাল করা হয়েছে। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যায় অথচ হারাম জিনিস ভক্ষণ বা পান করে না, অতঃপর মারা-যায় সে দোযখী। এর দ্বারা জানা গেল যে, এরূপ অবস্থায় এরকম জিনিস খাওয়া অবশ্য কর্তব্য, শুধু যে খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে তা নয়; এটাই সঠিক কথা। যেমন রুগ্ন ব্যক্তির রোযা ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি।
আল-বাকারা 2:174
১৭৪-১৭৬ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ তাওরাতের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্পর্কিত যেসব আয়াত রয়েছে সেগুলো যেসব ইয়াহুদী তাদের রাজত্ব চলে যাওয়ার ভয়ে গোপন করে এবং সাধারণ আরবদের নিকট হতে হাদিয়া ও উপঢৌকন গ্রহণ করতঃ এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার বিনিময়ে তাদের আখেরাতকে খারাপ করে থাকে তাদেরকে এখানে ভয় দেখানো হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার আয়াতগুলো-যা তাওরাতের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে, জনগণের মধ্যে প্রকাশ পায় তবে তারা তার আয়ত্তাধীনে এসে যাবে এবং তাদেরকে পরিত্যাগ করবে-এই ভয়ে তারা হিদায়াত ও মাগফিরাতকে ছেড়ে পথভ্রষ্টতা ও শাস্তির উপরেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। এই কারণেই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। পরকালের লাঞ্ছনা ও অপমান তো প্রকাশমান। কিন্তু এই কালেও জনগণের নিকট তাদের প্রতারণা প্রকাশ পেয়ে গেছে। তাদের দুষ্ট আলেমরা যে আয়াতগুলো গোপন করতে সেগুলোও জনসাধারণের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অলৌকিক ঘটনাবলী এবং তার নিষ্কলুষ চরিত্র মানুষকে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকারের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। হাত ছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়ে যে দলটি হতে তারা আল্লাহর কালামকে গোপন রাখতো শেষে ঐ দলটি তাদের হাত ছাড়া হয়েই যায়। ঐ দলের লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে এবং মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হয়ে ঐ সত্য গোপনকারীদের প্রাণনাশ করতে থাকে এবং নিয়মিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ তাদের এই গোপনীয়তার কথা কোরআন মাজীদের জায়গা জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এখানেও বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কথা গোপন করে তারা যে অর্থ উপার্জন করছে তা প্রকৃতপক্ষে আগুনের অঙ্গার দ্বারা তারা তাদের পেট পূর্ণ করছে। যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণ করে থাকে তাদের সম্বন্ধেও কুরআন কারীম ঘোষণা করেছে যে, তারাও অগ্নি দ্বারা তাদের। পেট পূর্ণ করছে এবং কিয়ামতের দিন তারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে। সহীহ হাদীসের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সোনা-চাদির পাত্রে পানাহার করে সে তার পেটের মধ্যে আগুন ভরে থাকে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কথা পর্যন্ত বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, বরং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে জড়িত থাকবে। কেননা, তাদের কৃতকর্মের কারণে আল্লাহ পাকের ক্রোধ ও অভিশাপ তাদের উপরে বর্ষিত হয়েছে এবং আজ তাদের উপর হতে আল্লাহর করুণা দৃষ্টি অপসারিত হয়েছে। তারা আজ আর প্রশংসার যোগ্য হয়ে নেই বরং তারা শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছে এবং তারা ওর মধ্যেই জড়িত থাকবে। হাদীস শরীফের মধ্যে রয়েছে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ পাক কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হচ্ছে) বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং অহংকারী ভিক্ষুক।' এর পরে আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্ত পথকে গ্রহণ করেছে। তাদের উচিত ছিল তাওরাতের মধ্যে হুজুর (সঃ)-এর সম্বন্ধে যেসব সংবাদ রয়েছে তা অজ্ঞদের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা ওগুলো গোপন করেছে এবং তারা নিজেরাও তাঁকে অস্বীকার করেছে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং ওগুলো প্রকাশ করলে তারা যে নিয়ামত ও ক্ষমা প্রাপ্তির অধিকারী হতো তার পরিবর্তে তারা কষ্ট ও শান্তিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদেরকে এমন বেদনাদায়ক ও বিস্ময়কর শাস্তি দেয়া হবে যা দেখে দর্শকবৃন্দ হতভম্ব হয়ে যাবে। এও অর্থ হবে যে, কোন্ জিনিস তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করতে উত্তেজিত করেছে যে তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, এরা আল্লাহ তাআলার কথাকে খেল-তামাশা মনে করেছে এবং আল্লাহর যে কিতাব সত্য প্রকাশ করার জন্যে ও অসত্য মিটিয়ে দেয়ার জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিল তারা তার বিরোধিতা করেছে, প্রকাশ করার কথাকে গোপন করেছে। আল্লাহর নবীর (সঃ) শত্রুতা করেছে এবং তার গুণাবলী গোপন করেছে, এসব কারণেই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছে। বাস্তবিকই যারা এই কিতাব সম্বন্ধে বিরোধ সৃষ্টি করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণে বহু দূর এগিয়ে গেছে।
আল-বাকারা 2:175
১৭৪-১৭৬ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ তাওরাতের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্পর্কিত যেসব আয়াত রয়েছে সেগুলো যেসব ইয়াহুদী তাদের রাজত্ব চলে যাওয়ার ভয়ে গোপন করে এবং সাধারণ আরবদের নিকট হতে হাদিয়া ও উপঢৌকন গ্রহণ করতঃ এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার বিনিময়ে তাদের আখেরাতকে খারাপ করে থাকে তাদেরকে এখানে ভয় দেখানো হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার আয়াতগুলো-যা তাওরাতের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে, জনগণের মধ্যে প্রকাশ পায় তবে তারা তার আয়ত্তাধীনে এসে যাবে এবং তাদেরকে পরিত্যাগ করবে-এই ভয়ে তারা হিদায়াত ও মাগফিরাতকে ছেড়ে পথভ্রষ্টতা ও শাস্তির উপরেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। এই কারণেই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। পরকালের লাঞ্ছনা ও অপমান তো প্রকাশমান। কিন্তু এই কালেও জনগণের নিকট তাদের প্রতারণা প্রকাশ পেয়ে গেছে। তাদের দুষ্ট আলেমরা যে আয়াতগুলো গোপন করতে সেগুলোও জনসাধারণের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অলৌকিক ঘটনাবলী এবং তার নিষ্কলুষ চরিত্র মানুষকে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকারের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। হাত ছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়ে যে দলটি হতে তারা আল্লাহর কালামকে গোপন রাখতো শেষে ঐ দলটি তাদের হাত ছাড়া হয়েই যায়। ঐ দলের লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে এবং মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হয়ে ঐ সত্য গোপনকারীদের প্রাণনাশ করতে থাকে এবং নিয়মিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ তাদের এই গোপনীয়তার কথা কোরআন মাজীদের জায়গা জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এখানেও বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কথা গোপন করে তারা যে অর্থ উপার্জন করছে তা প্রকৃতপক্ষে আগুনের অঙ্গার দ্বারা তারা তাদের পেট পূর্ণ করছে। যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণ করে থাকে তাদের সম্বন্ধেও কুরআন কারীম ঘোষণা করেছে যে, তারাও অগ্নি দ্বারা তাদের। পেট পূর্ণ করছে এবং কিয়ামতের দিন তারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে। সহীহ হাদীসের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সোনা-চাদির পাত্রে পানাহার করে সে তার পেটের মধ্যে আগুন ভরে থাকে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কথা পর্যন্ত বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, বরং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে জড়িত থাকবে। কেননা, তাদের কৃতকর্মের কারণে আল্লাহ পাকের ক্রোধ ও অভিশাপ তাদের উপরে বর্ষিত হয়েছে এবং আজ তাদের উপর হতে আল্লাহর করুণা দৃষ্টি অপসারিত হয়েছে। তারা আজ আর প্রশংসার যোগ্য হয়ে নেই বরং তারা শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছে এবং তারা ওর মধ্যেই জড়িত থাকবে। হাদীস শরীফের মধ্যে রয়েছে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ পাক কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হচ্ছে) বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং অহংকারী ভিক্ষুক।' এর পরে আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্ত পথকে গ্রহণ করেছে। তাদের উচিত ছিল তাওরাতের মধ্যে হুজুর (সঃ)-এর সম্বন্ধে যেসব সংবাদ রয়েছে তা অজ্ঞদের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা ওগুলো গোপন করেছে এবং তারা নিজেরাও তাঁকে অস্বীকার করেছে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং ওগুলো প্রকাশ করলে তারা যে নিয়ামত ও ক্ষমা প্রাপ্তির অধিকারী হতো তার পরিবর্তে তারা কষ্ট ও শান্তিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদেরকে এমন বেদনাদায়ক ও বিস্ময়কর শাস্তি দেয়া হবে যা দেখে দর্শকবৃন্দ হতভম্ব হয়ে যাবে। এও অর্থ হবে যে, কোন্ জিনিস তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করতে উত্তেজিত করেছে যে তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, এরা আল্লাহ তাআলার কথাকে খেল-তামাশা মনে করেছে এবং আল্লাহর যে কিতাব সত্য প্রকাশ করার জন্যে ও অসত্য মিটিয়ে দেয়ার জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিল তারা তার বিরোধিতা করেছে, প্রকাশ করার কথাকে গোপন করেছে। আল্লাহর নবীর (সঃ) শত্রুতা করেছে এবং তার গুণাবলী গোপন করেছে, এসব কারণেই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছে। বাস্তবিকই যারা এই কিতাব সম্বন্ধে বিরোধ সৃষ্টি করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণে বহু দূর এগিয়ে গেছে।
আল-বাকারা 2:176
১৭৪-১৭৬ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ তাওরাতের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্পর্কিত যেসব আয়াত রয়েছে সেগুলো যেসব ইয়াহুদী তাদের রাজত্ব চলে যাওয়ার ভয়ে গোপন করে এবং সাধারণ আরবদের নিকট হতে হাদিয়া ও উপঢৌকন গ্রহণ করতঃ এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার বিনিময়ে তাদের আখেরাতকে খারাপ করে থাকে তাদেরকে এখানে ভয় দেখানো হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার আয়াতগুলো-যা তাওরাতের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে, জনগণের মধ্যে প্রকাশ পায় তবে তারা তার আয়ত্তাধীনে এসে যাবে এবং তাদেরকে পরিত্যাগ করবে-এই ভয়ে তারা হিদায়াত ও মাগফিরাতকে ছেড়ে পথভ্রষ্টতা ও শাস্তির উপরেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। এই কারণেই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। পরকালের লাঞ্ছনা ও অপমান তো প্রকাশমান। কিন্তু এই কালেও জনগণের নিকট তাদের প্রতারণা প্রকাশ পেয়ে গেছে। তাদের দুষ্ট আলেমরা যে আয়াতগুলো গোপন করতে সেগুলোও জনসাধারণের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অলৌকিক ঘটনাবলী এবং তার নিষ্কলুষ চরিত্র মানুষকে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকারের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। হাত ছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়ে যে দলটি হতে তারা আল্লাহর কালামকে গোপন রাখতো শেষে ঐ দলটি তাদের হাত ছাড়া হয়েই যায়। ঐ দলের লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে এবং মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হয়ে ঐ সত্য গোপনকারীদের প্রাণনাশ করতে থাকে এবং নিয়মিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ তাদের এই গোপনীয়তার কথা কোরআন মাজীদের জায়গা জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এখানেও বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কথা গোপন করে তারা যে অর্থ উপার্জন করছে তা প্রকৃতপক্ষে আগুনের অঙ্গার দ্বারা তারা তাদের পেট পূর্ণ করছে। যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণ করে থাকে তাদের সম্বন্ধেও কুরআন কারীম ঘোষণা করেছে যে, তারাও অগ্নি দ্বারা তাদের। পেট পূর্ণ করছে এবং কিয়ামতের দিন তারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে। সহীহ হাদীসের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সোনা-চাদির পাত্রে পানাহার করে সে তার পেটের মধ্যে আগুন ভরে থাকে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কথা পর্যন্ত বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, বরং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে জড়িত থাকবে। কেননা, তাদের কৃতকর্মের কারণে আল্লাহ পাকের ক্রোধ ও অভিশাপ তাদের উপরে বর্ষিত হয়েছে এবং আজ তাদের উপর হতে আল্লাহর করুণা দৃষ্টি অপসারিত হয়েছে। তারা আজ আর প্রশংসার যোগ্য হয়ে নেই বরং তারা শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছে এবং তারা ওর মধ্যেই জড়িত থাকবে। হাদীস শরীফের মধ্যে রয়েছে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ পাক কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হচ্ছে) বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং অহংকারী ভিক্ষুক।' এর পরে আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্ত পথকে গ্রহণ করেছে। তাদের উচিত ছিল তাওরাতের মধ্যে হুজুর (সঃ)-এর সম্বন্ধে যেসব সংবাদ রয়েছে তা অজ্ঞদের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা ওগুলো গোপন করেছে এবং তারা নিজেরাও তাঁকে অস্বীকার করেছে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং ওগুলো প্রকাশ করলে তারা যে নিয়ামত ও ক্ষমা প্রাপ্তির অধিকারী হতো তার পরিবর্তে তারা কষ্ট ও শান্তিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদেরকে এমন বেদনাদায়ক ও বিস্ময়কর শাস্তি দেয়া হবে যা দেখে দর্শকবৃন্দ হতভম্ব হয়ে যাবে। এও অর্থ হবে যে, কোন্ জিনিস তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করতে উত্তেজিত করেছে যে তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, এরা আল্লাহ তাআলার কথাকে খেল-তামাশা মনে করেছে এবং আল্লাহর যে কিতাব সত্য প্রকাশ করার জন্যে ও অসত্য মিটিয়ে দেয়ার জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিল তারা তার বিরোধিতা করেছে, প্রকাশ করার কথাকে গোপন করেছে। আল্লাহর নবীর (সঃ) শত্রুতা করেছে এবং তার গুণাবলী গোপন করেছে, এসব কারণেই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছে। বাস্তবিকই যারা এই কিতাব সম্বন্ধে বিরোধ সৃষ্টি করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণে বহু দূর এগিয়ে গেছে।
আল-বাকারা 2:177
এই পবিত্র আয়াতে খাটি বিশ্বাস এবং সরল সঠিক পথের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। হযরত আবু যার (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ঈমান কি জিনিস?' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন। তিনি পুনরায় এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি আবার প্রশ্ন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ পুণ্যের প্রতি ভালবাসা এবং পাপের সাথে শত্রুতার নাম হচ্ছে ঈমান (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কিন্তু এই বর্ণনাটির সনদ মুনকাতা'। মুজাহিদ (রঃ) এই হাদীসটি হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অথচ হযরত আবু যার (রাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত সাব্যস্ত হয় না।এক ব্যক্তি হযরত আবূ যার (রাঃ) কে প্রশ্ন করেঃ ঈমান কি?' তখন তিনি এই আয়াটি পাঠ করেন। লোকটি বলেঃ জনাব! আমি আপনাকে মঙ্গল সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করিনি, বরং আমার প্রশ্ন ঈমান সম্বন্ধে।' হযরত আবু যার (রাঃ) তখন বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্নই করেছিল। তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন, ঐ লোকটিও তখন তোমার মতই অসন্তুষ্ট হয়েছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ মু'মিন যখন সৎ কাজ করে তখন তার প্রাণ খুশি হয় এবং সে পুণ্যের আশা করে আর যখন পাপ করে তখন তার অন্তর চিন্তিত হয় এবং সে শাস্তিকে ভয় করতে থাকে {তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এ হাদীসটিও মুনকাতা। মু'মিনদেরকে প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পরে তাদেরকে কাবা শরীফের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এটা কিতাবীদের উপর এবং কতকগুলো মু'মিনের উপর কঠিন ঠেকে। সুতরাং মহান আল্লাহ এর নিপুণতা বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়াই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে যে দিকে মুখ করার নির্দেশ দেবেন সেদিকেই তাদেরকে মুখ করতে হবে। প্রকৃত ধর্মভীরুতা, প্রকৃত পুণ্য এবং পূর্ণ ঈমান এটাই যে, দাস তার মনিবের সমুদয় আদেশ ও নিষেধ শিরোধার্য করে নেবে। যদি কেউ পূর্ব দিকে মুখ করে অথবা পশ্চিম দিকে ফিরে যায় এবং শুটা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ ক্রমে না হয় তবে এর ফলে সে মুমিন হবে না। বরং প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যার মধ্যে এই আয়াতে বর্ণিত গুণাবলী বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন মাজীদের মধ্যে এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তোমাদের কোরবানীর গোশত ও রক্ত আল্লাহর নিকট পৌছে না, বরং তার কাছে ধর্ম ভীরুতা পৌছে থাকে।' (২২:৩৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “তোমরা নামায পড়বে এবং অন্যান্য আমল করবে না এটা কোন পুণ্যের কাজ নয়। এই নির্দেশ ঐ সময় ছিল যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে মদীনার দিকে ফিরে ছিলেন। কিন্তু তারপরে অন্যান্য ফরযসমূহ ও নির্দেশাবলী অবতীর্ণ হয় এবং ওগুলোর উপর আমল করা অবশ্য কর্তব্য রূপে গণ্য করা হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমকে বিশিষ্ট করার কারণ হচ্ছে এই যে, ইয়াহূদীরা পশ্চিম দিকে এবং খ্রীষ্টানেরা পূর্ব দিকে মুখ করতো। সুতরাং উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, এটাতো শুধু ঈমানের বাক্য এবং প্রকৃত ঈমান হচ্ছে আমল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ ‘পুণ্য এই যে, আনুগত্যের মূল অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যায়। অবশ্যকরণীয় কার্যগুলো নিয়মানুবর্তিতার সাথে আদায় করা হয়। সত্য কথা এই যে, যে ব্যক্তি এই আয়াতের উপর আমল করেছে সে পূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মন খুলে সে পুণ্য সংগ্রহ করেছে। মহান আল্লাহর সত্তার উপর তার ঈমান রয়েছে। সে জানে যে, প্রকৃত উপাস্য তিনিই। ফেরেশতাদের অস্তিত্ব এবং এঁরা যে আল্লাহর বাণী তাঁর বিশিষ্ট বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে থাকেন একথা তারা বিশ্বাস করে। তারা সমস্ত আসমানী কিতাবের উপর বিশ্বাস রাখে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, পবিত্র কুরআন শেষ আসমানী কিতাব যা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করে এবং ইহকাল ও পরকালের সুখ ও সৌভাগ্য যার সাথে জড়িত রয়েছে। অনুরূপভাবে প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত নবীর উপরও তাদের ঈমান রয়েছেবিশেষ করে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপরেও তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। মাল ও সম্পদের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও তা তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে থাকে। সহীহ হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম দান এই যে, তুমি এমন অবস্থায় দান করবে যখন তোমার স্বাস্থ্য ভাল থাকে ও মালের প্রতি তোমার ভালবাসা ও লোভ থাকে, তুমি ধনী হওয়ারও আশা রাখ এবং দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ও ভয় কর।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। ইমাম হাকিম (রঃ) তাঁর তাফসীর-ই-মুস্তাদরিক’ নামক হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) পাঠ করতঃ বলেনঃ“এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা সুস্থ অবস্থায় ও মালের প্রতি চাহিদা থাকা অবস্থায় দারিদ্রকে ভয় করে এবং ধনী হওয়ার ইচ্ছা রেখে দান করবে।' (২:১৭৭) কিন্তু হাদীসটি ‘মওকুফ হওয়াই বেশী সঠিক কথা। প্রকৃতপক্ষে এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এরই উক্তি। কুরআন মাজীদেও সুরা-ই-দাহরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা তাঁর (আল্লাহর) প্রতি ভালবাসার জন্যে দরিদ্র, পিতৃহীন ও বশীকে আহার করিয়ে থাকে। (তারা বলে) আমরা তোমাদেরকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আহার করাচ্ছি, আমরা তোমাদের নিকট এর প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা চাচ্ছি না।' (৭৬:৮-৯) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ভালবাসার জিনিস তোমরা (আল্লাহর পথে) খরচ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত পুণ্য অর্জন করতে পারবে না।' (৩:১২) অন্যস্থানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদের অভাব ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যদেরকে তাদের জীবনের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।' (৫৯:৯) সুতরাং এরা বড় মর্যাদার অধিকারী। কেননা, প্রথম প্রকারের লোকেরাতো তাদের ভালবাসা ও পছন্দনীয় জিনিস অন্যদেরকে দান করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের লোকেরা এমন জিনিস অপরকে দিয়েছেন, যে জিনিসের তারা নিজেরাই মুখাপেক্ষী ছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের প্রয়োজন অপেক্ষা অপরের প্রয়োজনকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন (আরবি) আত্মীয়গণকে বলা হয়। দানের ব্যাপারে অন্যদের উপর এদের অগ্রাধিকার রয়েছে।হাদীস শরীফে রয়েছেঃ ‘মিসকীনকে দান করার পুণ্য একগুণ এবং আত্মীয়। (মিসকীন)-কে দান করার পূণ্য দ্বিগুণ। একটি দানের পুণ্য এবং দ্বিতীয়টি আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখার পুণ্য। তোমাদের দান ও খয়রাতের এরাই বেশী হকদার।' কুরআন মাজীদের মধ্যে কয়েক জায়গায় তাদের সাথে সৎ ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। ইয়াতীম' এর অর্থ হচ্ছে ঐ ছোট ছেলে যার পিতা মারা গেছে। তার অন্য কেউ উপার্জনকারী নেই। তার নিজের উপার্জন করারও ক্ষমতা নেই। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর সে আর ইয়াতীম থাকে না। মিসকীন ওদেরকে বলা হয় যাদের নিকট এই পরিমাণ জিনিস নেই যা তাদের খাওয়া পরার ও বসবাসের জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। তাদেরকেও দান করতে হবে যাতে তাদের প্রয়োজন মিটাতে পারে এবং তারা দারিদ্র, ক্ষুধা, সংকীর্ণতা এবং অবমাননাকর অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পারে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে ভিক্ষার জন্যে ঘুরে বেড়ায় এবং দু'একটি খেজুর বা দু' এক গ্লাস খাবার দিয়ে তাকে বিদায় করা হয়, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যার কাছে এই পরিমাণ জিনিস নেই যদদ্বারা তার সমস্ত কাজ চলতে পারে এবং যে তার অবস্থা এমন করতে পারে না। যদদ্বারা মানুষ তার অবস্থা জেনে তাকে কিছু দান করতে পারে। ইবনু সাবীল মুসাফিরকে বলা হয়। এখানে ঐ মুসাফিরকে বুঝানো হয়েছে, যার নিকট সফরের খরচ নেই। তাকে এই পরিমাণ দেয়া হবে যেন সে অনায়াসে তার দেশে পৌঁছতে পারে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে সফরে বেরিয়েছে তাকেও যাতায়াতের খরচ দিতে হবে। অতিথিও এই নির্দেশেরই অন্তর্ভুক্ত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) অতিথিকেও ‘ইবনু সাবীলের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পূর্ববর্তী অন্যান্য মনীষীও এই মতই পোষণ করেছেন। সায়েলীন’ ঐ সব লোককে বলা হয় যারা নিজেদের প্রয়োজন প্রকাশ করতঃ মানুষের নিকট ভিক্ষা করে থাকে। এদেরকেও সাদকা ও যাকাত থেকে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুক ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসলেও তার হক রয়েছে।' (সুনান-ই-আবু দাউদ)। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ক্রীত দাসদেরকে দাসত্ব হতে মুক্ত করা। এরা ঐ ক্রীতদাস যাদেরকে তাদের মনিবেরা বলে দিয়েছে যে, যদি তারা তাদেরকে এত এত অর্থ দিতে পারে তবে তারা মুক্ত হবে। এদেরকে সাহায্য করে মুক্ত করিয়ে নেয়া। এইসব প্রকারের এবং আরও অন্যান্য প্রকারের লোকদের পূর্ণ বর্ণনা। (আরবি) এই আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ দেয়া হবে। হযরত ফাতিমা বিনতে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মালের মধ্যে যাকাত ছাড়া আল্লাহ তা'আলার আরও কিছু হক রয়েছে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পড়ে শুনান। এই হাদীসে আবূ হামযাহ মায়মুন আ’ওয়ার নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা নামাযকে সময়মত পূর্ণ রুকু সিজদাহ, স্থিরতা এবং বিনয়ের সাথে আদায় করে থাকে। অর্থাৎ যে নিয়মে আদায় করার নির্দেশ শরীয়তে রয়েছে ঠিক সেই নিয়মেই আদায় করে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে থাকে। কিংবা এই অর্থ যে, তারা নিজেদের আত্মাকে বাজে কথা এবং জঘন্য চরিত্র থেকে পবিত্র রাখে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আত্মাকে পবিত্রকারী সফলকাম হয়েছে এবং তাকে দমনকারী বিফল মনোরথ হয়েছে।' (৯১:৯-১০) অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মুশরিকদের জন্যে অকল্যাণ, যারা যাকাত আদায় করে না। (৪১:৬-৭) সুতরাং উপরোক্ত আয়াতসমূহে যাকাত’ এর ভাবার্থ হচ্ছে নফস'-কে পবিত্র করা। অর্থাৎ নিজেকে পাপ-পঙ্কিলতা, শিরক এবং কুফর হতে পবিত্র করা। আবার এর অর্থ মালের যাকাতও হতে পারে। তাহলে তখন নফল সাদকার অন্যান্য নির্দেশ বুঝতে হবে। যেমন উপরে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, মালের মধ্যে যাকাত ছাড়া আল্লাহ তা'আলার অন্যান্য হক রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, অঙ্গীকার করলে যারা সেই অঙ্গীকার পূর্ণকারী হয়। যেমন, আল্লাহ পাক অন্য স্থানে বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পুরো করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।' (১৩:২০) অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হচ্ছে মুনাফিকদের অভ্যাস। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছেঃ মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে, (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে এবং (৩) তার নিকট কিছু গচ্ছিত রাখলে তা আত্মসাৎ করে। অন্য একটি হাদীসে আছেঃ ঝগড়ার সময় গালি উচ্চারণ করে। তারপরে আল্লাহ পাক বলেন যে, যারা অভাবে ও ক্লেশে এবং যুদ্ধ কালে ধৈর্যধারণকারী। এই সব কষ্ট ও বিপদের সময় ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সাহায্য করুন"। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করি। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সব গুণবিশিষ্ট মানুষই সত্যপরায়ণ ও খাঁটি ঈমানদার। তাদের ভিতর ও বাহির, কথা ও কাজ একই রূপ। আর তারা ধর্মভীরুও বটে। কেননা, তারা সদা আনুগত্যের উপরেই রয়েছে এবং নির্দিষ্ট বস্তুসমূহ হতে বহু দূরে সরে আছে।
আল-বাকারা 2:178
১৭৮-১৭৯ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে মুসলিমগণ! প্রতিশোধ গ্রহণের সময় ন্যায় পন্থা অবলম্বন করবে। স্বাধীন ব্যক্তির পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তি, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারীকে হত্যা করবে। এই ব্যাপারে সীমালংঘন করবে না। যেমন সীমা লংঘন করেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা। তারা আল্লাহর নির্দেশ পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, অজ্ঞতার যুগে বান্ নাযীর ও বনু কুরাইযা নামক ইয়াহূদীদের দু'টি সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বান্ নাযীর জয় যুক্ত হয়। অতঃপর তাদের মধ্যে এই প্রথা চালু হয় যে, যখন বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করতো তখন প্রতিশোধ রূপে বানূ নাযীরের ঐ লোকটিকে হত্যা করা হতো না। বরং রক্তপণ হিসেবে তার নিকট হতে এক ওয়াসাক (প্রায় চার মণ) খেজুর আদায় করা হতো। আর যখন বান্ কুরাইযার কোন লোক বা নাযীরের কোন লোককে হত্যা করতো তখন প্রতিশোধ রূপে তাকেও হত্যা করা হতো এবং রক্তপণ গ্রহণ করা হলে দ্বিগুণ অর্থাৎ দুই ওয়াসাক খেজুর গ্রহণ করা হতো। সুতরাং মহান আল্লাহ অজ্ঞতা যুগের এই জঘন্য প্রথাকে উঠিয়ে দিয়ে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশ দেন।ইমাম আবু হাতিমের (রঃ) বর্ণনায় এই আয়াতের শান-ই-নুযুল এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, আরবের দুটি গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তারা পরস্পরে প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীদার হয় এবং বলেঃ আমাদের দাসের পরিবর্তে তাদের স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হোক এবং আমাদের নারীর পরিবর্তে তাদের পুরুষকে হত্যা করা হোক। তাদের এই দাবী খণ্ডনে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই হুকুমটিও মানসূখ। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ (আরবি) অর্থাৎ প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ। সুতরাং প্রত্যেক হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির পরিবর্তে হত্যা করা হবে। স্বাধীন দাসকে হত্যা করুক বা এর বিপরীত, পুরুষ নারীকে হত্যা করুক বা এর বিপরীত। সর্বাবস্থায় এই বিধানই চালু থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এরা পুরুষকে নারীর পরিবর্তে হত্যা করতো না। এই কারণেই (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং স্বাধীন লোক সবাই সমান। প্রাণের বদলে প্রাণ নেয়া হবে। হত্যাকারী পুরুষই হোক বা স্ত্রী হোক। অনুরূপভাবে নিহত লোকটি পুরুষই হোক বা স্ত্রীই হোক। যখনই কোন স্বাধীন ব্যক্তি কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করবে তখন তার পরিবর্তে তাকেও হত্যা করা হবে। এরূপভাবে এই নির্দেশ দাস ও দাসীর মধ্যেও চালু থাকবে। যে কেউই প্রাণ নাশের ইচ্ছায় অন্যকে হত্যা করবে, প্রতিশোধ রূপে তাকেও হত্যা করা হবে। হত্যা ছাড়া জখম বা কোন অঙ্গ হানিরও এই নির্দেশই। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এই আয়াতটিকে (আরবি) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বলেছেন। জিজ্ঞাস্যঃইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ), ইমাম আবু লায়লা (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, কোন আযাদ ব্যক্তি যদি কোন গোলামকে হত্যা করে তবে তার পরিবর্তে তাকেও হত্যা করা হবে। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত ইবরাহীম নখঈ (রঃ) হযরত হাকাম (রাঃ)-এরও এই মাযহাব। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ), হযরত আলী বিন মাদীনী (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ)- এরও একটি বর্ণনা অনুসারে হযরত সাওরী (রঃ)-এরও মাযহাব এটাই যে, যদি কোন মনিব তার গোলামকে হত্যা করে তবে তার পরিবর্তে মনিবকেও হত্যা করা হবে। এর দলীল রূপে তারা এই হাদীসটি পেশ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার গোলামকে হত্যা করবে আমরাও তাকে হত্যা করবো, যে তার গোলামের নাক কেটে নেবে আমরাও তার নাক কেটে নেবো এবং যে তার অণ্ডকোষ কেটে নেবে তারও এই প্রতিশোধ নেয়া হবে। কিন্তু জমহুরের মাযহাব এই মনীষীদের উল্টো। তাঁদের মতে। দাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে না। কেননা, দাস এক প্রকারের মাল। সে ভুল বশতঃ নিহত হলে রক্তপণ দিতে হয় না, শুধুমাত্র তার মূল্যআদায় করতে হয়। অনুরূপভাবে তার হাত, পা ইত্যাদির ক্ষতি হলে প্রতিশোধের নির্দেশ নেই। কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে কিনা এ ব্যাপারে জমহুর উলামার মাযহাব তো এই যে, তাকে হত্যা করা হবে।। সহীহ বুখারী শরীফের এই হাদীসটি এর দলীল। (আরবি) অর্থাৎ ‘কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে না। এই হাদীসের উল্টো না কোন সহীহ হাদীস আছে, না এমন কোন ব্যাখ্যা হতে পারে যা এর উল্টো হয়। তথাপি শুধু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে।জিজ্ঞাস্যঃহযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত আত্তার (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, পুরুষকে নারীর পরিবর্তে হত্যা করা হবে না। এর দলীল রূপে তাঁরা উপরোক্ত আয়াতটি পেশ করে থাকেন। কিন্তু ‘জমহুর-ই-উলামা-ই-ইসলাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। কেননা, সূরা-ই-মায়েদার এই আয়াতটি সাধারণ, যার মধ্যে (আরবি) বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া হাদীস শরীফের মধ্যেও রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ মুসলমানদের রক্ত পরস্পর সমান। হযরত লায়েস (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মেরে ফেলে তবে তার পরিবর্তে তাকে (স্বামীকে হত্যা করা হবে না)জিজ্ঞাস্যঃচার ইমাম এবং জমহুর-ই উম্মতের মাযহাব এই যে, কয়েকজন মিলে একজন মুসলমানকে হত্যা করলে তার পরিবর্তে তাদের সকলকেই হত্যা করা হবে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর যুগে সাতজন মিলে একটি লোককে হত্যা করে। তিনি সাতজনকেই হত্যা করে দেন এবং বলেন—যদি সুন' পলীর। সমস্ত লোক এই হত্যায় অংশগ্রহণ করতো তবে আমি প্রতিশোধ রূপে সকলকেই হত্যা করতাম। কোন সাহাবীই তাঁর যুগে তাঁর এই ঘোষণার উল্টো করেননি। সূতরাং এই কথার উপর যেন ইজমা হয়ে গেছে। কিন্তু ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে-তিনি বলেন যে, একজনের পরিবর্তে একটি দলকে হত্যা করা হবে না, বরং একজনের পরিবর্তে একজনকেই হত্যা করা হবে। হযরত মুআয (রাঃ), হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ), আবদুল মালিক বিন মারওয়ান, যুহরী (রঃ), ইবনে সীরীন (রঃ) এবং হাবীব বিন আবি সাবিত (রঃ) হতেও এই উক্তিটি বর্ণিত আছে। ইবনুল মুনযির (রঃ) বলেন যে, এটাই সর্বাপেক্ষা সঠিক মত। একজন নিহত ব্যক্তির পরিবর্তে একটি দলকে হত্যা করার কোন দলীল নেই। হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে সাব্যস্ত আছে যে, তিনি এই মাসআলাটি স্বীকার করতেন না। সুতরাং সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তখন এই মাসআলাটি বিবেচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তির কোন উত্তরাধিকারী যদি হত্যাকারীর কোন অংশ ক্ষমা করে দেয় তবে সেটা অন্য কথা। অর্থাৎ সে হয়তো হত্যার পরিবর্তে রক্তপণ স্বীকার করে কিংবা হয়তো তার অংশের রক্তপণ ছেড়ে দেয় এবং স্পষ্টভাবে ক্ষমা করে দেয়। যদি সে রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে। যায় তবে সে যেন হত্যাকারীর উপর জোর জবরদস্তি না করে, বরং যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা আদায় করে। হত্যাকারীরও কর্তব্য এই যে, সে যেন তা সদ্ভাবে পরিশোধ করে, টালবাহানা যেন না করে। জিজ্ঞাস্যঃইমাম মালিক (রঃ) এর প্রসিদ্ধ মাযহাব, ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তার ছাত্রদের মাযহাব, ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর মাযহাব এবং একটি বর্ণনা অনুসারে ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের ‘কিসাস ছেড়ে দিয়ে রক্তপণের উপর সম্মত হওয়া ঐ সময় জায়েয যখন স্বয়ং হত্যাকারীও তাতে সম্মত হয়। কিন্তু অন্যান্য মনীষীগণ বলেন যে, এতে হত্যাকারীর সম্মতির শর্ত নেই।জিজ্ঞাস্যঃপূর্ববর্তী একটি দল বলেন যে, নারীরা যদি কিসাসকে ক্ষমা করে দিয়ে রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে যায় তবে তার কোন মূল্য নেই। হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ), হযরত ইবনে শিবরামাহ (রঃ), হযরত লায়েস (রঃ) এবং হযরত আওযায়ী (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। কিন্তু অবশিষ্ট উলামা-ই-দ্বীন তাদের বিরোধী। এঁরা বলেন যে, যদি কোন নারীও রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে যায় তবে কিসাস উঠে যাবে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, ইচ্ছাপূর্বক হত্যায় রক্তপণ গ্রহণ, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে লঘু বিধান ও করুণা। পূর্ববর্তী উম্মতদের এই সুযোগ ছিল না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈলের উপর ‘কিসাস’ (হত্যার পরিবর্তে হত্যা) ফরয ছিল। কিসাস’ ক্ষমা করে রক্তপণ গ্রহণের অনুমতি তাদের জন্যে ছিল না। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) উপর আল্লাহ তা'আলার এটাও বড় অনুগ্রহ যে, রক্তপণ গ্রহণও তাদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে। তাহলে এখানে তিনটি জিনিস হচ্ছে। (১) কিসাস’, (২) রক্তপণ, (৩) ক্ষমা। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে শুধুমাত্র ‘কিসাস’ ও ‘ক্ষমা ছিল, কিন্তু দিয়্যাতের বিধান ছিল কেউ কেউ বলেন যে, তাওরাতধারীদের জন্যে শুধু কিসাস ও ক্ষমার বিধান ছিল এবং ইঞ্জীলধারীদের জন্যে শুধু ক্ষমাই ছিল। তারপরে বলা হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি রক্তপণ গ্রহণ বা মেনে নেয়ার পরেও বাড়াবাড়ি করে, তার জন্যে কঠিন বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে। যেমন দিয়্যাত' গ্রহণ করার পরে আবার হত্যার জন্যে খড়গ হস্ত হয়ে গেল ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কোন লোকের যদি কেউ নিহত বা আহত হয় তবে তার তিনটির যে কোন একটি গ্রহণের স্বাধীনতা। রয়েছে। (১) সে প্রতিশোধ গ্রহণ করুক, (২) বা ক্ষমা করে দিক, (৩) অথবা রক্তপণ গ্রহণ করুক। আর যদি সে আরও কিছু করার ইচ্ছে করে তবে তাকে বাধা প্রদান কর। এই তিনটির মধ্যে একটি করার পরেও যে বাড়াবাড়ি করবে সে চিরদিনের জন্যে জাহান্নামী হয়ে যাবে (আহমাদ)'। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- 'যে ব্যক্তি রক্তপণ গ্রহণ করলে, অতঃপর হত্যাকারীকে হত্যা করে দিলো, এখন আমি তার নিকট হতে রক্তপণও নেবো না; বরং তাকে হত্যা করে দেবো।' অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-হে জ্ঞানীরা! তোমরা জেনে রেখো যে, কিসাসের মধ্যে মানব গোষ্ঠীর অমরত্ব রয়েছে। এর মধ্যে বড় দুরদর্শিতা রয়েছে। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে যে, একজনের পরিবর্তে অপরজন নিহত হচ্ছে, সুতরাং দু’জন মারা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যদি অন্তর্দষ্টি দিয়ে দেখা যায় তবে জানা যাবে যে, এটা জীবনেরই কারণ। হত্যা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির স্বয়ং এই ধারণা হবে যে, সে যাকে হত্যা করতে যাচ্ছে তাকে হত্যা করা উচিত হবে না। নতুবা তাকেও নিহত হতে হবে। এই ভেবে সে হত্যার কাজ হতে বিরত থাকবে। তাহলে দু’ব্যক্তি মৃত্যু হতে বেঁচে যাচ্ছে। পূর্বের গ্রন্থসমূহের মধ্যেও তো আল্লাহ তা'আলা এই কথাটি বর্ণনা করেছিলেন যে, (আরবি) অর্থাৎ হত্যা হত্যাকে বাধা দেয়, কিন্তু কুরআন পাকের মধ্যে অত্যন্ত বাকপটুতা ও ভাষালঙ্কারের সাথে এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ এটা তোমাদের বেঁচে থাকার কারণ। প্রথমতঃ তোমরা আল্লাহ পাকের অবাধ্যতা থেকে রক্ষা পাবে। দ্বিতীয়তঃ না কেউ কাউকে হত্যা করবে, না সে নিহত হবে। সুতরাং পৃথিবীর বুকে সর্বত্র নিরাপত্তা ও শান্তি বিরাজ করবে। হচ্ছে প্রত্যেক পুণ্যের কাজ করা এবং প্রত্যেক পাপের কাজ ছেড়ে দেয়ার নাম।
আল-বাকারা 2:179
১৭৮-১৭৯ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে মুসলিমগণ! প্রতিশোধ গ্রহণের সময় ন্যায় পন্থা অবলম্বন করবে। স্বাধীন ব্যক্তির পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তি, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারীকে হত্যা করবে। এই ব্যাপারে সীমালংঘন করবে না। যেমন সীমা লংঘন করেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা। তারা আল্লাহর নির্দেশ পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, অজ্ঞতার যুগে বান্ নাযীর ও বনু কুরাইযা নামক ইয়াহূদীদের দু'টি সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বান্ নাযীর জয় যুক্ত হয়। অতঃপর তাদের মধ্যে এই প্রথা চালু হয় যে, যখন বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করতো তখন প্রতিশোধ রূপে বানূ নাযীরের ঐ লোকটিকে হত্যা করা হতো না। বরং রক্তপণ হিসেবে তার নিকট হতে এক ওয়াসাক (প্রায় চার মণ) খেজুর আদায় করা হতো। আর যখন বান্ কুরাইযার কোন লোক বা নাযীরের কোন লোককে হত্যা করতো তখন প্রতিশোধ রূপে তাকেও হত্যা করা হতো এবং রক্তপণ গ্রহণ করা হলে দ্বিগুণ অর্থাৎ দুই ওয়াসাক খেজুর গ্রহণ করা হতো। সুতরাং মহান আল্লাহ অজ্ঞতা যুগের এই জঘন্য প্রথাকে উঠিয়ে দিয়ে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশ দেন।ইমাম আবু হাতিমের (রঃ) বর্ণনায় এই আয়াতের শান-ই-নুযুল এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, আরবের দুটি গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তারা পরস্পরে প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীদার হয় এবং বলেঃ আমাদের দাসের পরিবর্তে তাদের স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হোক এবং আমাদের নারীর পরিবর্তে তাদের পুরুষকে হত্যা করা হোক। তাদের এই দাবী খণ্ডনে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই হুকুমটিও মানসূখ। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ (আরবি) অর্থাৎ প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ। সুতরাং প্রত্যেক হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির পরিবর্তে হত্যা করা হবে। স্বাধীন দাসকে হত্যা করুক বা এর বিপরীত, পুরুষ নারীকে হত্যা করুক বা এর বিপরীত। সর্বাবস্থায় এই বিধানই চালু থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এরা পুরুষকে নারীর পরিবর্তে হত্যা করতো না। এই কারণেই (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং স্বাধীন লোক সবাই সমান। প্রাণের বদলে প্রাণ নেয়া হবে। হত্যাকারী পুরুষই হোক বা স্ত্রী হোক। অনুরূপভাবে নিহত লোকটি পুরুষই হোক বা স্ত্রীই হোক। যখনই কোন স্বাধীন ব্যক্তি কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করবে তখন তার পরিবর্তে তাকেও হত্যা করা হবে। এরূপভাবে এই নির্দেশ দাস ও দাসীর মধ্যেও চালু থাকবে। যে কেউই প্রাণ নাশের ইচ্ছায় অন্যকে হত্যা করবে, প্রতিশোধ রূপে তাকেও হত্যা করা হবে। হত্যা ছাড়া জখম বা কোন অঙ্গ হানিরও এই নির্দেশই। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এই আয়াতটিকে (আরবি) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বলেছেন। জিজ্ঞাস্যঃইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ), ইমাম আবু লায়লা (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, কোন আযাদ ব্যক্তি যদি কোন গোলামকে হত্যা করে তবে তার পরিবর্তে তাকেও হত্যা করা হবে। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত ইবরাহীম নখঈ (রঃ) হযরত হাকাম (রাঃ)-এরও এই মাযহাব। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ), হযরত আলী বিন মাদীনী (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ)- এরও একটি বর্ণনা অনুসারে হযরত সাওরী (রঃ)-এরও মাযহাব এটাই যে, যদি কোন মনিব তার গোলামকে হত্যা করে তবে তার পরিবর্তে মনিবকেও হত্যা করা হবে। এর দলীল রূপে তারা এই হাদীসটি পেশ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার গোলামকে হত্যা করবে আমরাও তাকে হত্যা করবো, যে তার গোলামের নাক কেটে নেবে আমরাও তার নাক কেটে নেবো এবং যে তার অণ্ডকোষ কেটে নেবে তারও এই প্রতিশোধ নেয়া হবে। কিন্তু জমহুরের মাযহাব এই মনীষীদের উল্টো। তাঁদের মতে। দাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে না। কেননা, দাস এক প্রকারের মাল। সে ভুল বশতঃ নিহত হলে রক্তপণ দিতে হয় না, শুধুমাত্র তার মূল্যআদায় করতে হয়। অনুরূপভাবে তার হাত, পা ইত্যাদির ক্ষতি হলে প্রতিশোধের নির্দেশ নেই। কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে কিনা এ ব্যাপারে জমহুর উলামার মাযহাব তো এই যে, তাকে হত্যা করা হবে।। সহীহ বুখারী শরীফের এই হাদীসটি এর দলীল। (আরবি) অর্থাৎ ‘কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে না। এই হাদীসের উল্টো না কোন সহীহ হাদীস আছে, না এমন কোন ব্যাখ্যা হতে পারে যা এর উল্টো হয়। তথাপি শুধু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, কাফিরের পরিবর্তে মুসলমানকে হত্যা করা হবে।জিজ্ঞাস্যঃহযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত আত্তার (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, পুরুষকে নারীর পরিবর্তে হত্যা করা হবে না। এর দলীল রূপে তাঁরা উপরোক্ত আয়াতটি পেশ করে থাকেন। কিন্তু ‘জমহুর-ই-উলামা-ই-ইসলাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। কেননা, সূরা-ই-মায়েদার এই আয়াতটি সাধারণ, যার মধ্যে (আরবি) বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া হাদীস শরীফের মধ্যেও রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ মুসলমানদের রক্ত পরস্পর সমান। হযরত লায়েস (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মেরে ফেলে তবে তার পরিবর্তে তাকে (স্বামীকে হত্যা করা হবে না)জিজ্ঞাস্যঃচার ইমাম এবং জমহুর-ই উম্মতের মাযহাব এই যে, কয়েকজন মিলে একজন মুসলমানকে হত্যা করলে তার পরিবর্তে তাদের সকলকেই হত্যা করা হবে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর যুগে সাতজন মিলে একটি লোককে হত্যা করে। তিনি সাতজনকেই হত্যা করে দেন এবং বলেন—যদি সুন' পলীর। সমস্ত লোক এই হত্যায় অংশগ্রহণ করতো তবে আমি প্রতিশোধ রূপে সকলকেই হত্যা করতাম। কোন সাহাবীই তাঁর যুগে তাঁর এই ঘোষণার উল্টো করেননি। সূতরাং এই কথার উপর যেন ইজমা হয়ে গেছে। কিন্তু ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে-তিনি বলেন যে, একজনের পরিবর্তে একটি দলকে হত্যা করা হবে না, বরং একজনের পরিবর্তে একজনকেই হত্যা করা হবে। হযরত মুআয (রাঃ), হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ), আবদুল মালিক বিন মারওয়ান, যুহরী (রঃ), ইবনে সীরীন (রঃ) এবং হাবীব বিন আবি সাবিত (রঃ) হতেও এই উক্তিটি বর্ণিত আছে। ইবনুল মুনযির (রঃ) বলেন যে, এটাই সর্বাপেক্ষা সঠিক মত। একজন নিহত ব্যক্তির পরিবর্তে একটি দলকে হত্যা করার কোন দলীল নেই। হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে সাব্যস্ত আছে যে, তিনি এই মাসআলাটি স্বীকার করতেন না। সুতরাং সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তখন এই মাসআলাটি বিবেচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তির কোন উত্তরাধিকারী যদি হত্যাকারীর কোন অংশ ক্ষমা করে দেয় তবে সেটা অন্য কথা। অর্থাৎ সে হয়তো হত্যার পরিবর্তে রক্তপণ স্বীকার করে কিংবা হয়তো তার অংশের রক্তপণ ছেড়ে দেয় এবং স্পষ্টভাবে ক্ষমা করে দেয়। যদি সে রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে। যায় তবে সে যেন হত্যাকারীর উপর জোর জবরদস্তি না করে, বরং যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা আদায় করে। হত্যাকারীরও কর্তব্য এই যে, সে যেন তা সদ্ভাবে পরিশোধ করে, টালবাহানা যেন না করে। জিজ্ঞাস্যঃইমাম মালিক (রঃ) এর প্রসিদ্ধ মাযহাব, ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তার ছাত্রদের মাযহাব, ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর মাযহাব এবং একটি বর্ণনা অনুসারে ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের ‘কিসাস ছেড়ে দিয়ে রক্তপণের উপর সম্মত হওয়া ঐ সময় জায়েয যখন স্বয়ং হত্যাকারীও তাতে সম্মত হয়। কিন্তু অন্যান্য মনীষীগণ বলেন যে, এতে হত্যাকারীর সম্মতির শর্ত নেই।জিজ্ঞাস্যঃপূর্ববর্তী একটি দল বলেন যে, নারীরা যদি কিসাসকে ক্ষমা করে দিয়ে রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে যায় তবে তার কোন মূল্য নেই। হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ), হযরত ইবনে শিবরামাহ (রঃ), হযরত লায়েস (রঃ) এবং হযরত আওযায়ী (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। কিন্তু অবশিষ্ট উলামা-ই-দ্বীন তাদের বিরোধী। এঁরা বলেন যে, যদি কোন নারীও রক্তপণের উপর সম্মত হয়ে যায় তবে কিসাস উঠে যাবে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, ইচ্ছাপূর্বক হত্যায় রক্তপণ গ্রহণ, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে লঘু বিধান ও করুণা। পূর্ববর্তী উম্মতদের এই সুযোগ ছিল না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈলের উপর ‘কিসাস’ (হত্যার পরিবর্তে হত্যা) ফরয ছিল। কিসাস’ ক্ষমা করে রক্তপণ গ্রহণের অনুমতি তাদের জন্যে ছিল না। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) উপর আল্লাহ তা'আলার এটাও বড় অনুগ্রহ যে, রক্তপণ গ্রহণও তাদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে। তাহলে এখানে তিনটি জিনিস হচ্ছে। (১) কিসাস’, (২) রক্তপণ, (৩) ক্ষমা। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে শুধুমাত্র ‘কিসাস’ ও ‘ক্ষমা ছিল, কিন্তু দিয়্যাতের বিধান ছিল কেউ কেউ বলেন যে, তাওরাতধারীদের জন্যে শুধু কিসাস ও ক্ষমার বিধান ছিল এবং ইঞ্জীলধারীদের জন্যে শুধু ক্ষমাই ছিল। তারপরে বলা হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি রক্তপণ গ্রহণ বা মেনে নেয়ার পরেও বাড়াবাড়ি করে, তার জন্যে কঠিন বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে। যেমন দিয়্যাত' গ্রহণ করার পরে আবার হত্যার জন্যে খড়গ হস্ত হয়ে গেল ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কোন লোকের যদি কেউ নিহত বা আহত হয় তবে তার তিনটির যে কোন একটি গ্রহণের স্বাধীনতা। রয়েছে। (১) সে প্রতিশোধ গ্রহণ করুক, (২) বা ক্ষমা করে দিক, (৩) অথবা রক্তপণ গ্রহণ করুক। আর যদি সে আরও কিছু করার ইচ্ছে করে তবে তাকে বাধা প্রদান কর। এই তিনটির মধ্যে একটি করার পরেও যে বাড়াবাড়ি করবে সে চিরদিনের জন্যে জাহান্নামী হয়ে যাবে (আহমাদ)'। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- 'যে ব্যক্তি রক্তপণ গ্রহণ করলে, অতঃপর হত্যাকারীকে হত্যা করে দিলো, এখন আমি তার নিকট হতে রক্তপণও নেবো না; বরং তাকে হত্যা করে দেবো।' অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-হে জ্ঞানীরা! তোমরা জেনে রেখো যে, কিসাসের মধ্যে মানব গোষ্ঠীর অমরত্ব রয়েছে। এর মধ্যে বড় দুরদর্শিতা রয়েছে। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে যে, একজনের পরিবর্তে অপরজন নিহত হচ্ছে, সুতরাং দু’জন মারা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যদি অন্তর্দষ্টি দিয়ে দেখা যায় তবে জানা যাবে যে, এটা জীবনেরই কারণ। হত্যা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির স্বয়ং এই ধারণা হবে যে, সে যাকে হত্যা করতে যাচ্ছে তাকে হত্যা করা উচিত হবে না। নতুবা তাকেও নিহত হতে হবে। এই ভেবে সে হত্যার কাজ হতে বিরত থাকবে। তাহলে দু’ব্যক্তি মৃত্যু হতে বেঁচে যাচ্ছে। পূর্বের গ্রন্থসমূহের মধ্যেও তো আল্লাহ তা'আলা এই কথাটি বর্ণনা করেছিলেন যে, (আরবি) অর্থাৎ হত্যা হত্যাকে বাধা দেয়, কিন্তু কুরআন পাকের মধ্যে অত্যন্ত বাকপটুতা ও ভাষালঙ্কারের সাথে এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ এটা তোমাদের বেঁচে থাকার কারণ। প্রথমতঃ তোমরা আল্লাহ পাকের অবাধ্যতা থেকে রক্ষা পাবে। দ্বিতীয়তঃ না কেউ কাউকে হত্যা করবে, না সে নিহত হবে। সুতরাং পৃথিবীর বুকে সর্বত্র নিরাপত্তা ও শান্তি বিরাজ করবে। হচ্ছে প্রত্যেক পুণ্যের কাজ করা এবং প্রত্যেক পাপের কাজ ছেড়ে দেয়ার নাম।
আল-বাকারা 2:180
১৮০-১৮২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে মা-বাপ ও আত্মীয় স্বজনের জন্যে অসিয়ত করার নির্দেশ হচ্ছে। উত্তরাধিকার বিধানের পূর্বে এটা ওয়াজিব ছিল। সঠিক উক্তি এটাই। কিন্তু উত্তরাধিকারের নির্দেশাবলী এই অসিয়তের হুকুমকে মানসূখ করে দিয়েছে। প্রত্যেক উত্তরাধিকারী তার জন্যে নির্ধারিত অংশ অসিয়ত ছাড়াই নিয়ে নিবে। সুনান' ইত্যাদির মধ্যে হযরত আমর বিন খারেজাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, - তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খুৎবার মধ্যে একথা বলতে শুনেছি-‘আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হকদারের জন্যে তার হক পৌছিয়ে দিয়েছেন। এখন কোন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সূরা-ই-বাকারা পাঠ করেন। এই আয়াতে পৌছলে বলেনঃ এই আয়াতটি মানসূখ' (মুসনাদে আহমাদ)। তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, পূর্বে বাপ-মার সাথে অন্য কেউ উত্তরাধিকারী ছিল না, অন্যদের জন্যে শুধু অসিয়ত করা হতো। অতঃপর উত্তরাধিকারের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করার স্বাধীনতা দেয়া হয়। এই আয়াতের হুকুম মানসূখকারী হচ্ছে (আরবি) এই আয়াতটি। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আবু মূসা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুজাহীদ (রঃ), হযরত আতা (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মুহাম্মদ বিন সীরীন (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত শুরাইহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত যুহরী (রঃ) এরা সবাই এই আয়াতটিকে মানসূখ বলেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ইমাম রাযী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ 'তাফসীরে কাবীর” এর মধ্যে আবু মুসলিম ইস্পাহানী হতে এটা কিরূপে নকল করেছেন যে, এই আয়াতটি মানসূখ নয়। বরং মীরাসের আয়াতটি তো এর তাফসীর। আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, তোমাদের উপর ঐ অসিয়ত ফরয করা হয়েছে যার বর্ণনা(আরবি) (৪:১১) এই আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের এটাই উক্তি। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম উত্তরাধিকারীদের ব্যাপারে মানসূখ হয়েছে। কিন্তু যাদের ‘মীরাস' নির্ধারিত নেই তাদের ব্যাপারে সাব্যস্ত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত মাসরূক (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত যংহাক (রঃ), হযরত মুসলিম বিন ইয়াসার (রঃ) এবং হযরত আলা বিন যিয়াদ (রঃ) এরও মাযহাব এটাই। আমি বলি যে, হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ)ও এই কথাই বলেন। কিন্তু এই মনীষীদের এই কথার উপর ভিত্তি করে পূর্বের ফকীহগণের পরিভাষায় এই আয়াতটি মানসূখ হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে না। কেননা, মীরাসের আয়াত দ্বারা ওরা তো এই হুকুম হতে বিশিষ্ট হয়ে গেছে, যাদের অংশ স্বয়ং শরীয়ত নির্ধারিত করে দিয়েছে এবং ওরাও-যারা এর পূর্বে এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা, আত্মীয় সাধারণ। তাদের উত্তরাধিকার নির্ধারিত থাক আর নাই থাক। তাহলে এখন অসিয়ত ওদের জন্যে রইলো যারা উত্তরাধিকারী নয়; এবং যারা উত্তরাধিকারী তাদের জন্যে রইলো না। এই কথাটি এবং অন্যান্য কয়েকজন মনীষীর এই উক্তি যে, ‘অসিয়তের নির্দেশ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল এবং ওটাও নিয়োজন ছিল। এই দুটোর ভাবার্থ প্রায় একই হয়ে গেল। কিন্তু যারা অসিয়তের এই হুকুমকে ওয়াজিব বলে থাকেন এবং রচনার বাক রীতি দ্বারাও বাহ্যত এটাই বুঝা যাচ্ছে, তাদের নিকট তো এই আয়াতটি মানসূখ হওয়াই সাব্যস্ত হবে, যেমন অধিকাংশ মুফাসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের উক্তি রয়েছে। অতএব, পিতা মাতা ও মীরাস প্রাপক আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে অসিয়ত করা সর্বসম্মতিক্রমেই মানসূখ, এমনকি নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ। তা'আলা প্রত্যেক হকদারকে হক দিয়ে ফেলেছেন, এখন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। মীরাসের আয়াতের হুকুমটি পৃথক এবং আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ওটা ফরয। যেসব উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের উপর হতে এই আয়াতের নির্দেশ সম্পূর্ণরূপে উঠে গেছে। এখন বাকি থাকলো ঐ আত্মীয়গণ যাদের জন্যে কোন উত্তরাধিকার নির্ধারিত নেই। তাদের জন্যে মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করা মুস্তাহাব। এর আংশিক হুকুম তো এই আয়াত দ্বারাও বের হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ হাদীস শরীফে এর হুকুম পরিষ্কারভাবে রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট কিছু জিনিস রয়েছে এবং সে অসিয়ত করতে ইচ্ছে করে তার জন্যে উচিত নয় যে, সে অসিয়ত লিখে না দিয়ে দু’টি রাত্রিও অতিবাহিত করে। হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত উমার ফারূকের পুত্র বলেনঃ এই নির্দেশ শুনার পর বিনা অসিয়তে আমি একটি রাত্রিও কাটাইনি। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা সম্বন্ধে বহু আয়াত এবং হাদীস এসেছে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে যে অর্থ ব্যয় করবে, আমি ওরই কারণে তোমাকে পবিত্র করবো এবং তোমার মৃত্যুর পরেও আমার সৎ বান্দাদের দুআর কারণ করে দেবো। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে এখানে মাল। অধিকাংশ বড় বড় মুফাসির এই তাফসীরই করেছেন।কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, মাল অল্পই হোক বা অধিকই হোক ওর জন্যে শরীয়তে অসিয়তের নির্দেশ রয়েছে। যেমন অল্প ও বেশী উভয় মালেই মীরাস রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম শুধুমাত্র বেশী মালে রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে,একজন কুরায়েশী মারা যায় এবং সে তিন চারশো স্বর্ণ মুদ্রা রেখে যায়। সে কোন অসিয়ত করেনি। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এই মাল অসিয়তের যোগ্যই নয়। আল্লাহ তা'আলা তো (আরবি) বলেছেন। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁর গোত্রের এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যান। তাকে কেউ অসিয়ত করতে বললে হযরত আলী (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘অসিয়ত তো অর্থাৎ অধিক মালে হয়ে থাকে। তুমি তো অল্প মাল ছেড়ে যাচ্ছে। তুমি এ মাল তোমার সন্তানদের জন্য রেখে যাও।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ষাটটি স্বর্ণমুদ্রা ছেড়ে যায়নি সে (আরবি) ছেড়ে যায়নি। অর্থাৎ অসিয়ত করা তার দায়িত্বে নেই। তাউস (রঃ) আশিটি স্বর্ণ মুদ্রার কথা বলেছেন। কাতাদাহ (রঃ) এক হাজারের কথা বলে থাকেন। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে তা এবং অনুগ্রহ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, অসিয়ত করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। অসিয়তের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা উচিত, অন্যায় পন্থা অবলম্বন করা উচিত নয়। যেন উত্তরাধিকারীদের কোন ক্ষতি না হয়। মাত্রাধিক্য ও বাজে খরচ মোটেই শোভনীয় নয়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত সা'দ (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন ধনী লোক এবং আমার উত্তরাধিকারিণী শুধুমাত্র একটি মেয়ে। সুতরাং আপনি আমাকে দুইতৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত করার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘না।' তিনি বলেনঃ ‘অর্ধেকের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “বেশ এক তৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত কর, তবে এটাও বেশী। তোমার উত্তরাধিকারিণীকে তুমি যে দরিদ্র ও অস্বচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের সামনে হাত পাতবে এর চেয়ে বরং তাদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাওয়াই উত্তম। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশকে ছেড়ে এক চতুর্থাংশের উপর আসতো! কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশের অনুমতি প্রদান করতঃ এটাও বলেছেন যে, এক তৃতীয়াংশও বেশী।' মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত হানযালা (রাঃ)-এর দাদা হানীফা (রাঃ) তাঁর বাড়ীতে প্রতিপালিত একটি পিতৃহীন ছেলের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেন। তাঁর সন্তানদের নিকট এটা কঠিন ঠেকে। ব্যাপারটা তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হানীফা (রাঃ) বলেনঃ আমি আমার একটি ইয়াতীমের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেছি। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, না, না। সাদকায় পাঁচটি দাও, নচেৎ দশটি। তা না হলে পনেরটি, তা না হলে বিশটি না হলে পঁচিশটি' না হলে ত্রিশটি তা না হলে পঁয়ত্রিশটি। তুমি যদি আরও বেশী কর তবে চল্লিশটি। দীর্ঘতার সাথে হাদীসটি বর্ণনা করেন। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি অসিয়তকে পরিবর্তন করবে, তাতে কম-বেশী করবে কিংবা তা গোপন করবে, এর পাপের বোঝা সেই পরিবর্তনকারীকেই বইতে হবে। অসিয়তকারীর প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার নিকট সাব্যস্ত হয়েই গেছে। আল্লাহ পাক অসিয়তকারীর অসিয়তের বিশুদ্ধতার কথাও জানেন এবং পরিবর্তনকারীর পরিবর্তনও জানেন। কোন কথা ও রহস্য তাঁর নিকট গোপন থাকে না। (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভুল। যেমন, কোন উত্তরাধিকারীকে কোনও প্রকারে বেশী দেয়ায়ে দেয়া। যেমন বলে যে, অমুক জিনিস অমুকের হাতে এত এত দামে বেচে দেওয়া হোক ইত্যাদি। এটা হয় ভুল বশতঃই হোক বা অত্যধিক ভালবাসার কারণে অনিচ্ছা বশতঃই হোক বা পাপের উপরেই হোক। এরূপ স্থলে অসিয়তকারী যার নিকট অসিয়তের কথা প্রকাশ করে গেল, সে যদি কিছু রদবদল করে তবে কোন পাপ হবে না। অসিয়তকে শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী চালু করা উচিত, যেন মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে পারে, হকদারগণও তাদের হক পেয়ে যায় এবং অসিয়তও শরীয়ত অনুযায়ী পুরো হয়। এই অবস্থায় পরিবর্তনকারীর কোন পাপ হবে না।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জীবনে অত্যাচার করে সাদকা প্রদানকারীর সাদকা ঐ ভাবেই অগ্রাহ্য করা হয়, যেভাবে মৃত্যুর সময় ভুলকারীর অসিয়ত অগ্রাহ্য করা হয়। তাফসীর-ই-ইবনে ‘মিরদুওয়াই' গ্রন্থেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এই হাদীসের বর্ণনাকারী, ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ এতে ভুল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটা উরওয়ার কথা। ওলীদ বিন মুসলিম এটা আওযায়ী হতে বর্ণনা করেছেন এবং উরওয়ার পরে সনদ গ্রহণ করা হয়নি। ইবনে মিরদুওয়াইও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, অসিয়তে কম বেশী করা কবীরা গুনাহ। কিন্তু এই হাদীসটির মারফু হওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষ সত্তর বছর পর্যন্ত ভাল। লোকের কাজের মত কাজ করতে থাকে, কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে অত্যাচার করে, কাজেই পরিণাম খারাপ কাজের উপর হওয়ায় সে জাহান্নামী হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মানুষ সত্তর বছর ধরে অসৎ কাজ করতে থাকে কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ করে, কাজেই তার শেষ আমল ভাল হওয়ায় সে বেহেশতী হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, 'যদি তোমরা চাও তবে কুরআন পাকের এই আয়াতটি পাঠ করে নাও।(আরবি) অর্থাৎ এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা অতিক্রম করো।
আল-বাকারা 2:181
১৮০-১৮২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে মা-বাপ ও আত্মীয় স্বজনের জন্যে অসিয়ত করার নির্দেশ হচ্ছে। উত্তরাধিকার বিধানের পূর্বে এটা ওয়াজিব ছিল। সঠিক উক্তি এটাই। কিন্তু উত্তরাধিকারের নির্দেশাবলী এই অসিয়তের হুকুমকে মানসূখ করে দিয়েছে। প্রত্যেক উত্তরাধিকারী তার জন্যে নির্ধারিত অংশ অসিয়ত ছাড়াই নিয়ে নিবে। সুনান' ইত্যাদির মধ্যে হযরত আমর বিন খারেজাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, - তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খুৎবার মধ্যে একথা বলতে শুনেছি-‘আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হকদারের জন্যে তার হক পৌছিয়ে দিয়েছেন। এখন কোন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সূরা-ই-বাকারা পাঠ করেন। এই আয়াতে পৌছলে বলেনঃ এই আয়াতটি মানসূখ' (মুসনাদে আহমাদ)। তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, পূর্বে বাপ-মার সাথে অন্য কেউ উত্তরাধিকারী ছিল না, অন্যদের জন্যে শুধু অসিয়ত করা হতো। অতঃপর উত্তরাধিকারের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করার স্বাধীনতা দেয়া হয়। এই আয়াতের হুকুম মানসূখকারী হচ্ছে (আরবি) এই আয়াতটি। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আবু মূসা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুজাহীদ (রঃ), হযরত আতা (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মুহাম্মদ বিন সীরীন (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত শুরাইহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত যুহরী (রঃ) এরা সবাই এই আয়াতটিকে মানসূখ বলেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ইমাম রাযী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ 'তাফসীরে কাবীর” এর মধ্যে আবু মুসলিম ইস্পাহানী হতে এটা কিরূপে নকল করেছেন যে, এই আয়াতটি মানসূখ নয়। বরং মীরাসের আয়াতটি তো এর তাফসীর। আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, তোমাদের উপর ঐ অসিয়ত ফরয করা হয়েছে যার বর্ণনা(আরবি) (৪:১১) এই আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের এটাই উক্তি। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম উত্তরাধিকারীদের ব্যাপারে মানসূখ হয়েছে। কিন্তু যাদের ‘মীরাস' নির্ধারিত নেই তাদের ব্যাপারে সাব্যস্ত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত মাসরূক (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত যংহাক (রঃ), হযরত মুসলিম বিন ইয়াসার (রঃ) এবং হযরত আলা বিন যিয়াদ (রঃ) এরও মাযহাব এটাই। আমি বলি যে, হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ)ও এই কথাই বলেন। কিন্তু এই মনীষীদের এই কথার উপর ভিত্তি করে পূর্বের ফকীহগণের পরিভাষায় এই আয়াতটি মানসূখ হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে না। কেননা, মীরাসের আয়াত দ্বারা ওরা তো এই হুকুম হতে বিশিষ্ট হয়ে গেছে, যাদের অংশ স্বয়ং শরীয়ত নির্ধারিত করে দিয়েছে এবং ওরাও-যারা এর পূর্বে এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা, আত্মীয় সাধারণ। তাদের উত্তরাধিকার নির্ধারিত থাক আর নাই থাক। তাহলে এখন অসিয়ত ওদের জন্যে রইলো যারা উত্তরাধিকারী নয়; এবং যারা উত্তরাধিকারী তাদের জন্যে রইলো না। এই কথাটি এবং অন্যান্য কয়েকজন মনীষীর এই উক্তি যে, ‘অসিয়তের নির্দেশ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল এবং ওটাও নিয়োজন ছিল। এই দুটোর ভাবার্থ প্রায় একই হয়ে গেল। কিন্তু যারা অসিয়তের এই হুকুমকে ওয়াজিব বলে থাকেন এবং রচনার বাক রীতি দ্বারাও বাহ্যত এটাই বুঝা যাচ্ছে, তাদের নিকট তো এই আয়াতটি মানসূখ হওয়াই সাব্যস্ত হবে, যেমন অধিকাংশ মুফাসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের উক্তি রয়েছে। অতএব, পিতা মাতা ও মীরাস প্রাপক আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে অসিয়ত করা সর্বসম্মতিক্রমেই মানসূখ, এমনকি নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ। তা'আলা প্রত্যেক হকদারকে হক দিয়ে ফেলেছেন, এখন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। মীরাসের আয়াতের হুকুমটি পৃথক এবং আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ওটা ফরয। যেসব উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের উপর হতে এই আয়াতের নির্দেশ সম্পূর্ণরূপে উঠে গেছে। এখন বাকি থাকলো ঐ আত্মীয়গণ যাদের জন্যে কোন উত্তরাধিকার নির্ধারিত নেই। তাদের জন্যে মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করা মুস্তাহাব। এর আংশিক হুকুম তো এই আয়াত দ্বারাও বের হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ হাদীস শরীফে এর হুকুম পরিষ্কারভাবে রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট কিছু জিনিস রয়েছে এবং সে অসিয়ত করতে ইচ্ছে করে তার জন্যে উচিত নয় যে, সে অসিয়ত লিখে না দিয়ে দু’টি রাত্রিও অতিবাহিত করে। হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত উমার ফারূকের পুত্র বলেনঃ এই নির্দেশ শুনার পর বিনা অসিয়তে আমি একটি রাত্রিও কাটাইনি। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা সম্বন্ধে বহু আয়াত এবং হাদীস এসেছে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে যে অর্থ ব্যয় করবে, আমি ওরই কারণে তোমাকে পবিত্র করবো এবং তোমার মৃত্যুর পরেও আমার সৎ বান্দাদের দুআর কারণ করে দেবো। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে এখানে মাল। অধিকাংশ বড় বড় মুফাসির এই তাফসীরই করেছেন।কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, মাল অল্পই হোক বা অধিকই হোক ওর জন্যে শরীয়তে অসিয়তের নির্দেশ রয়েছে। যেমন অল্প ও বেশী উভয় মালেই মীরাস রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম শুধুমাত্র বেশী মালে রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে,একজন কুরায়েশী মারা যায় এবং সে তিন চারশো স্বর্ণ মুদ্রা রেখে যায়। সে কোন অসিয়ত করেনি। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এই মাল অসিয়তের যোগ্যই নয়। আল্লাহ তা'আলা তো (আরবি) বলেছেন। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁর গোত্রের এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যান। তাকে কেউ অসিয়ত করতে বললে হযরত আলী (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘অসিয়ত তো অর্থাৎ অধিক মালে হয়ে থাকে। তুমি তো অল্প মাল ছেড়ে যাচ্ছে। তুমি এ মাল তোমার সন্তানদের জন্য রেখে যাও।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ষাটটি স্বর্ণমুদ্রা ছেড়ে যায়নি সে (আরবি) ছেড়ে যায়নি। অর্থাৎ অসিয়ত করা তার দায়িত্বে নেই। তাউস (রঃ) আশিটি স্বর্ণ মুদ্রার কথা বলেছেন। কাতাদাহ (রঃ) এক হাজারের কথা বলে থাকেন। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে তা এবং অনুগ্রহ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, অসিয়ত করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। অসিয়তের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা উচিত, অন্যায় পন্থা অবলম্বন করা উচিত নয়। যেন উত্তরাধিকারীদের কোন ক্ষতি না হয়। মাত্রাধিক্য ও বাজে খরচ মোটেই শোভনীয় নয়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত সা'দ (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন ধনী লোক এবং আমার উত্তরাধিকারিণী শুধুমাত্র একটি মেয়ে। সুতরাং আপনি আমাকে দুইতৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত করার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘না।' তিনি বলেনঃ ‘অর্ধেকের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “বেশ এক তৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত কর, তবে এটাও বেশী। তোমার উত্তরাধিকারিণীকে তুমি যে দরিদ্র ও অস্বচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের সামনে হাত পাতবে এর চেয়ে বরং তাদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাওয়াই উত্তম। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশকে ছেড়ে এক চতুর্থাংশের উপর আসতো! কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশের অনুমতি প্রদান করতঃ এটাও বলেছেন যে, এক তৃতীয়াংশও বেশী।' মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত হানযালা (রাঃ)-এর দাদা হানীফা (রাঃ) তাঁর বাড়ীতে প্রতিপালিত একটি পিতৃহীন ছেলের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেন। তাঁর সন্তানদের নিকট এটা কঠিন ঠেকে। ব্যাপারটা তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হানীফা (রাঃ) বলেনঃ আমি আমার একটি ইয়াতীমের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেছি। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, না, না। সাদকায় পাঁচটি দাও, নচেৎ দশটি। তা না হলে পনেরটি, তা না হলে বিশটি না হলে পঁচিশটি' না হলে ত্রিশটি তা না হলে পঁয়ত্রিশটি। তুমি যদি আরও বেশী কর তবে চল্লিশটি। দীর্ঘতার সাথে হাদীসটি বর্ণনা করেন। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি অসিয়তকে পরিবর্তন করবে, তাতে কম-বেশী করবে কিংবা তা গোপন করবে, এর পাপের বোঝা সেই পরিবর্তনকারীকেই বইতে হবে। অসিয়তকারীর প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার নিকট সাব্যস্ত হয়েই গেছে। আল্লাহ পাক অসিয়তকারীর অসিয়তের বিশুদ্ধতার কথাও জানেন এবং পরিবর্তনকারীর পরিবর্তনও জানেন। কোন কথা ও রহস্য তাঁর নিকট গোপন থাকে না। (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভুল। যেমন, কোন উত্তরাধিকারীকে কোনও প্রকারে বেশী দেয়ায়ে দেয়া। যেমন বলে যে, অমুক জিনিস অমুকের হাতে এত এত দামে বেচে দেওয়া হোক ইত্যাদি। এটা হয় ভুল বশতঃই হোক বা অত্যধিক ভালবাসার কারণে অনিচ্ছা বশতঃই হোক বা পাপের উপরেই হোক। এরূপ স্থলে অসিয়তকারী যার নিকট অসিয়তের কথা প্রকাশ করে গেল, সে যদি কিছু রদবদল করে তবে কোন পাপ হবে না। অসিয়তকে শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী চালু করা উচিত, যেন মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে পারে, হকদারগণও তাদের হক পেয়ে যায় এবং অসিয়তও শরীয়ত অনুযায়ী পুরো হয়। এই অবস্থায় পরিবর্তনকারীর কোন পাপ হবে না।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জীবনে অত্যাচার করে সাদকা প্রদানকারীর সাদকা ঐ ভাবেই অগ্রাহ্য করা হয়, যেভাবে মৃত্যুর সময় ভুলকারীর অসিয়ত অগ্রাহ্য করা হয়। তাফসীর-ই-ইবনে ‘মিরদুওয়াই' গ্রন্থেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এই হাদীসের বর্ণনাকারী, ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ এতে ভুল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটা উরওয়ার কথা। ওলীদ বিন মুসলিম এটা আওযায়ী হতে বর্ণনা করেছেন এবং উরওয়ার পরে সনদ গ্রহণ করা হয়নি। ইবনে মিরদুওয়াইও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, অসিয়তে কম বেশী করা কবীরা গুনাহ। কিন্তু এই হাদীসটির মারফু হওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষ সত্তর বছর পর্যন্ত ভাল। লোকের কাজের মত কাজ করতে থাকে, কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে অত্যাচার করে, কাজেই পরিণাম খারাপ কাজের উপর হওয়ায় সে জাহান্নামী হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মানুষ সত্তর বছর ধরে অসৎ কাজ করতে থাকে কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ করে, কাজেই তার শেষ আমল ভাল হওয়ায় সে বেহেশতী হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, 'যদি তোমরা চাও তবে কুরআন পাকের এই আয়াতটি পাঠ করে নাও।(আরবি) অর্থাৎ এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা অতিক্রম করো।
আল-বাকারা 2:182
১৮০-১৮২ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে মা-বাপ ও আত্মীয় স্বজনের জন্যে অসিয়ত করার নির্দেশ হচ্ছে। উত্তরাধিকার বিধানের পূর্বে এটা ওয়াজিব ছিল। সঠিক উক্তি এটাই। কিন্তু উত্তরাধিকারের নির্দেশাবলী এই অসিয়তের হুকুমকে মানসূখ করে দিয়েছে। প্রত্যেক উত্তরাধিকারী তার জন্যে নির্ধারিত অংশ অসিয়ত ছাড়াই নিয়ে নিবে। সুনান' ইত্যাদির মধ্যে হযরত আমর বিন খারেজাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, - তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খুৎবার মধ্যে একথা বলতে শুনেছি-‘আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হকদারের জন্যে তার হক পৌছিয়ে দিয়েছেন। এখন কোন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সূরা-ই-বাকারা পাঠ করেন। এই আয়াতে পৌছলে বলেনঃ এই আয়াতটি মানসূখ' (মুসনাদে আহমাদ)। তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, পূর্বে বাপ-মার সাথে অন্য কেউ উত্তরাধিকারী ছিল না, অন্যদের জন্যে শুধু অসিয়ত করা হতো। অতঃপর উত্তরাধিকারের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করার স্বাধীনতা দেয়া হয়। এই আয়াতের হুকুম মানসূখকারী হচ্ছে (আরবি) এই আয়াতটি। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আবু মূসা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুজাহীদ (রঃ), হযরত আতা (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মুহাম্মদ বিন সীরীন (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত শুরাইহ্ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত যুহরী (রঃ) এরা সবাই এই আয়াতটিকে মানসূখ বলেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ইমাম রাযী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ 'তাফসীরে কাবীর” এর মধ্যে আবু মুসলিম ইস্পাহানী হতে এটা কিরূপে নকল করেছেন যে, এই আয়াতটি মানসূখ নয়। বরং মীরাসের আয়াতটি তো এর তাফসীর। আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, তোমাদের উপর ঐ অসিয়ত ফরয করা হয়েছে যার বর্ণনা(আরবি) (৪:১১) এই আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের এটাই উক্তি। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম উত্তরাধিকারীদের ব্যাপারে মানসূখ হয়েছে। কিন্তু যাদের ‘মীরাস' নির্ধারিত নেই তাদের ব্যাপারে সাব্যস্ত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত মাসরূক (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত যংহাক (রঃ), হযরত মুসলিম বিন ইয়াসার (রঃ) এবং হযরত আলা বিন যিয়াদ (রঃ) এরও মাযহাব এটাই। আমি বলি যে, হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল বিন হাইয়ান (রঃ)ও এই কথাই বলেন। কিন্তু এই মনীষীদের এই কথার উপর ভিত্তি করে পূর্বের ফকীহগণের পরিভাষায় এই আয়াতটি মানসূখ হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে না। কেননা, মীরাসের আয়াত দ্বারা ওরা তো এই হুকুম হতে বিশিষ্ট হয়ে গেছে, যাদের অংশ স্বয়ং শরীয়ত নির্ধারিত করে দিয়েছে এবং ওরাও-যারা এর পূর্বে এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা, আত্মীয় সাধারণ। তাদের উত্তরাধিকার নির্ধারিত থাক আর নাই থাক। তাহলে এখন অসিয়ত ওদের জন্যে রইলো যারা উত্তরাধিকারী নয়; এবং যারা উত্তরাধিকারী তাদের জন্যে রইলো না। এই কথাটি এবং অন্যান্য কয়েকজন মনীষীর এই উক্তি যে, ‘অসিয়তের নির্দেশ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল এবং ওটাও নিয়োজন ছিল। এই দুটোর ভাবার্থ প্রায় একই হয়ে গেল। কিন্তু যারা অসিয়তের এই হুকুমকে ওয়াজিব বলে থাকেন এবং রচনার বাক রীতি দ্বারাও বাহ্যত এটাই বুঝা যাচ্ছে, তাদের নিকট তো এই আয়াতটি মানসূখ হওয়াই সাব্যস্ত হবে, যেমন অধিকাংশ মুফাসির এবং বিশ্বস্ত ফকীহগণের উক্তি রয়েছে। অতএব, পিতা মাতা ও মীরাস প্রাপক আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে অসিয়ত করা সর্বসম্মতিক্রমেই মানসূখ, এমনকি নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ। তা'আলা প্রত্যেক হকদারকে হক দিয়ে ফেলেছেন, এখন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই। মীরাসের আয়াতের হুকুমটি পৃথক এবং আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ওটা ফরয। যেসব উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের উপর হতে এই আয়াতের নির্দেশ সম্পূর্ণরূপে উঠে গেছে। এখন বাকি থাকলো ঐ আত্মীয়গণ যাদের জন্যে কোন উত্তরাধিকার নির্ধারিত নেই। তাদের জন্যে মালের এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত করা মুস্তাহাব। এর আংশিক হুকুম তো এই আয়াত দ্বারাও বের হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ হাদীস শরীফে এর হুকুম পরিষ্কারভাবে রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট কিছু জিনিস রয়েছে এবং সে অসিয়ত করতে ইচ্ছে করে তার জন্যে উচিত নয় যে, সে অসিয়ত লিখে না দিয়ে দু’টি রাত্রিও অতিবাহিত করে। হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত উমার ফারূকের পুত্র বলেনঃ এই নির্দেশ শুনার পর বিনা অসিয়তে আমি একটি রাত্রিও কাটাইনি। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা সম্বন্ধে বহু আয়াত এবং হাদীস এসেছে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে যে অর্থ ব্যয় করবে, আমি ওরই কারণে তোমাকে পবিত্র করবো এবং তোমার মৃত্যুর পরেও আমার সৎ বান্দাদের দুআর কারণ করে দেবো। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে এখানে মাল। অধিকাংশ বড় বড় মুফাসির এই তাফসীরই করেছেন।কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, মাল অল্পই হোক বা অধিকই হোক ওর জন্যে শরীয়তে অসিয়তের নির্দেশ রয়েছে। যেমন অল্প ও বেশী উভয় মালেই মীরাস রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, অসিয়তের হুকুম শুধুমাত্র বেশী মালে রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে,একজন কুরায়েশী মারা যায় এবং সে তিন চারশো স্বর্ণ মুদ্রা রেখে যায়। সে কোন অসিয়ত করেনি। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এই মাল অসিয়তের যোগ্যই নয়। আল্লাহ তা'আলা তো (আরবি) বলেছেন। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁর গোত্রের এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যান। তাকে কেউ অসিয়ত করতে বললে হযরত আলী (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘অসিয়ত তো অর্থাৎ অধিক মালে হয়ে থাকে। তুমি তো অল্প মাল ছেড়ে যাচ্ছে। তুমি এ মাল তোমার সন্তানদের জন্য রেখে যাও।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ষাটটি স্বর্ণমুদ্রা ছেড়ে যায়নি সে (আরবি) ছেড়ে যায়নি। অর্থাৎ অসিয়ত করা তার দায়িত্বে নেই। তাউস (রঃ) আশিটি স্বর্ণ মুদ্রার কথা বলেছেন। কাতাদাহ (রঃ) এক হাজারের কথা বলে থাকেন। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে তা এবং অনুগ্রহ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, অসিয়ত করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। অসিয়তের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা উচিত, অন্যায় পন্থা অবলম্বন করা উচিত নয়। যেন উত্তরাধিকারীদের কোন ক্ষতি না হয়। মাত্রাধিক্য ও বাজে খরচ মোটেই শোভনীয় নয়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত সা'দ (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন ধনী লোক এবং আমার উত্তরাধিকারিণী শুধুমাত্র একটি মেয়ে। সুতরাং আপনি আমাকে দুইতৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত করার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘না।' তিনি বলেনঃ ‘অর্ধেকের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “বেশ এক তৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত কর, তবে এটাও বেশী। তোমার উত্তরাধিকারিণীকে তুমি যে দরিদ্র ও অস্বচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের সামনে হাত পাতবে এর চেয়ে বরং তাদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাওয়াই উত্তম। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশকে ছেড়ে এক চতুর্থাংশের উপর আসতো! কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশের অনুমতি প্রদান করতঃ এটাও বলেছেন যে, এক তৃতীয়াংশও বেশী।' মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত হানযালা (রাঃ)-এর দাদা হানীফা (রাঃ) তাঁর বাড়ীতে প্রতিপালিত একটি পিতৃহীন ছেলের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেন। তাঁর সন্তানদের নিকট এটা কঠিন ঠেকে। ব্যাপারটা তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছিয়ে দেন। অতঃপর হানীফা (রাঃ) বলেনঃ আমি আমার একটি ইয়াতীমের জন্যে একশোটি উট অসিয়ত করেছি। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, না, না। সাদকায় পাঁচটি দাও, নচেৎ দশটি। তা না হলে পনেরটি, তা না হলে বিশটি না হলে পঁচিশটি' না হলে ত্রিশটি তা না হলে পঁয়ত্রিশটি। তুমি যদি আরও বেশী কর তবে চল্লিশটি। দীর্ঘতার সাথে হাদীসটি বর্ণনা করেন। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি অসিয়তকে পরিবর্তন করবে, তাতে কম-বেশী করবে কিংবা তা গোপন করবে, এর পাপের বোঝা সেই পরিবর্তনকারীকেই বইতে হবে। অসিয়তকারীর প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার নিকট সাব্যস্ত হয়েই গেছে। আল্লাহ পাক অসিয়তকারীর অসিয়তের বিশুদ্ধতার কথাও জানেন এবং পরিবর্তনকারীর পরিবর্তনও জানেন। কোন কথা ও রহস্য তাঁর নিকট গোপন থাকে না। (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভুল। যেমন, কোন উত্তরাধিকারীকে কোনও প্রকারে বেশী দেয়ায়ে দেয়া। যেমন বলে যে, অমুক জিনিস অমুকের হাতে এত এত দামে বেচে দেওয়া হোক ইত্যাদি। এটা হয় ভুল বশতঃই হোক বা অত্যধিক ভালবাসার কারণে অনিচ্ছা বশতঃই হোক বা পাপের উপরেই হোক। এরূপ স্থলে অসিয়তকারী যার নিকট অসিয়তের কথা প্রকাশ করে গেল, সে যদি কিছু রদবদল করে তবে কোন পাপ হবে না। অসিয়তকে শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী চালু করা উচিত, যেন মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে পারে, হকদারগণও তাদের হক পেয়ে যায় এবং অসিয়তও শরীয়ত অনুযায়ী পুরো হয়। এই অবস্থায় পরিবর্তনকারীর কোন পাপ হবে না।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জীবনে অত্যাচার করে সাদকা প্রদানকারীর সাদকা ঐ ভাবেই অগ্রাহ্য করা হয়, যেভাবে মৃত্যুর সময় ভুলকারীর অসিয়ত অগ্রাহ্য করা হয়। তাফসীর-ই-ইবনে ‘মিরদুওয়াই' গ্রন্থেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এই হাদীসের বর্ণনাকারী, ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ এতে ভুল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটা উরওয়ার কথা। ওলীদ বিন মুসলিম এটা আওযায়ী হতে বর্ণনা করেছেন এবং উরওয়ার পরে সনদ গ্রহণ করা হয়নি। ইবনে মিরদুওয়াইও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, অসিয়তে কম বেশী করা কবীরা গুনাহ। কিন্তু এই হাদীসটির মারফু হওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষ সত্তর বছর পর্যন্ত ভাল। লোকের কাজের মত কাজ করতে থাকে, কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে অত্যাচার করে, কাজেই পরিণাম খারাপ কাজের উপর হওয়ায় সে জাহান্নামী হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মানুষ সত্তর বছর ধরে অসৎ কাজ করতে থাকে কিন্তু অসিয়তের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ করে, কাজেই তার শেষ আমল ভাল হওয়ায় সে বেহেশতী হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, 'যদি তোমরা চাও তবে কুরআন পাকের এই আয়াতটি পাঠ করে নাও।(আরবি) অর্থাৎ এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা অতিক্রম করো।