Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:183 – আল-বাকারা 2:222
Contents
- আল-বাকারা 2:183
- আল-বাকারা 2:184
- আল-বাকারা 2:185
- আল-বাকারা 2:186
- আল-বাকারা 2:187
- আল-বাকারা 2:188
- আল-বাকারা 2:189
- আল-বাকারা 2:190
- আল-বাকারা 2:191
- আল-বাকারা 2:192
- আল-বাকারা 2:193
- আল-বাকারা 2:194
- আল-বাকারা 2:195
- আল-বাকারা 2:196
- আল-বাকারা 2:197
- আল-বাকারা 2:198
- আল-বাকারা 2:199
- আল-বাকারা 2:200
- আল-বাকারা 2:201
- আল-বাকারা 2:202
- আল-বাকারা 2:203
- আল-বাকারা 2:204
- আল-বাকারা 2:205
- আল-বাকারা 2:206
- আল-বাকারা 2:207
- আল-বাকারা 2:208
- আল-বাকারা 2:209
- আল-বাকারা 2:210
- আল-বাকারা 2:211
- আল-বাকারা 2:212
- আল-বাকারা 2:213
- আল-বাকারা 2:214
- আল-বাকারা 2:215
- আল-বাকারা 2:216
- আল-বাকারা 2:217
- আল-বাকারা 2:218
- আল-বাকারা 2:219
- আল-বাকারা 2:220
- আল-বাকারা 2:221
- আল-বাকারা 2:222
আল-বাকারা 2:183
১৮৩-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তারা যেন রোযাব্রত পালন করে। রোযার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনের খাটি নিয়তে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকা। এর উপকারিতা এই যে, এর ফলে মানবাত্মা পাপ ও কালিমা থেকে সম্পূর্ণ রূপে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই রোযার হুকুম শুধুমাত্র তাদের উপরেই হচ্ছে না বরং তাদের পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতিও রোযার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এই বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও যে, উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) যেন এই কর্তব্য পালনে পূর্বের উম্মতদের পিছনে না পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে প্রত্যেকের জন্যে একটা পন্থা ও রাস্তা রয়েছে, আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকেই একই উম্মত করে দিতেন; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন, তোমাদের উচিত যে তোমরা পুণ্যের কাজে অগ্রগামী থাকবে। এই বর্ণনাই এখানেও হচ্ছে যে এই রোযা তোমাদের উপর ঐ রকমই ফরয, যেমন ফরয ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে। রোযার দ্বারা শরীরের পবিত্রতা লাভ হয় এবং শয়তানের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকবৃন্দ! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ রয়েছে সে বিয়ে করবে, আর যার ক্ষমতা নেই সে রোযা রাখবে, এটাই তার জন্যে অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া। অতঃপর রোযার জন্যে দিনের সংখ্যা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এটা কয়েকটি দিন মাত্র যাতে কারও উপর ভারী না হয় এবং কেউ আদায়ে অসমর্থ না হয়ে পড়ে; বরং আগ্রহের সাথে তা পালন করে। প্রথমে প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখার নির্দেশ ছিল। অতঃপর রমযানের রোযার নির্দেশ হয় এবং পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ আসছে। হযরত মু'আয (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আতা’ (রাঃ), হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-এবং হযরত যহ্হাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোযার নির্দেশ ছিল, যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে পরিবর্তিত হয় এবং তাদের উপর এই বরকতময় মাসে রোযা ফরয করা হয়।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও পূর্ণ একমাস রোযা ফরয ছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রমযানের রোযা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয ছিল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতি এই নির্দেশ ছিল যে, এশার নামায আদায় করার পর যখন তারা শুয়ে যেত তখন তাদের উপর পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হয়ে যেতো। পূর্ববর্তী’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে আহলে কিতাব। এর পরে বলা হচ্ছে-‘রামযান মাসে যে ব্যক্তি রুগ্ন হয়ে পড়ে ঐ অবস্থায় তাকে কষ্ট করে রোযা করতে হবে না। পরে যখন সে সুস্থ হবে তখন তা আদায় করে নেবে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে ব্যক্তি সুস্থ থাকতে এবং মুসাফিরও হতো না তার জন্যেও এই অনুমতি ছিল যে, হয় সে রোযা রাখবে বা রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে এবং একজনের বেশী মিসকীনকে খাওয়ানো উত্তম ছিল। কিন্তু মিসকীনকে ভোজ্য দান অপেক্ষা রোযা রাখাই বেশী মঙ্গলজনক কাজ ছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এটাই বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ নামায ও রোযা তিনটি অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। নামাযের তিনটি অবস্থা হচ্ছেঃ (১) মদীনায় এসে মোল সতেরো মাস ধরে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করা; অতঃপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করা হয়। (২) পূর্বে নামাযের জন্যে একে অপরকে ডাকতেন এবং একত্রিত হতেন; অবশেষে এতে তারা অসমর্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আবদ-ই-রব্বিহী (রাঃ) নামক একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্ন দেখার মতই আমি স্বপ্ন দেখেছি; কিন্তু যদি বলি যে, আমি নিদ্রিত ছিলাম না তবে আমার সত্য কথাই বলা হবে। (স্বপ্ন) এই যে, সবুজ রঙ্গের হুল্লা (লুঙ্গি ও চাদর) পরিহিত এক ব্যক্তি কিবলার দিকে মুখ করে বলছেন (আরবি) দু’বার। এভাবে তিনি আযান শেষ করেন। ক্ষণেক বিরতির পর তিনি পূর্বের কথাগুলো আবার উচ্চারণ করেন কিন্তু এবারে (আরবি) কথাটি দু’বার অতিরিক্ত বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন-‘বেলালকে (রাঃ) এটা শিখিয়ে দাও। সে আযান দেবে। সুতরাং সর্বপ্রথম হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) এসে এই স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তার পূর্বেই হযরত যায়েদ (রাঃ) এসে গিয়েছিলেন। (৩) পূর্বে প্রচলন এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়াচ্ছেন, তার কয়েক রাকআত পড়া হয়ে গেছে এমন সময় কেউ আসছেন। কয় রাক'আত পড়া হয়েছে এটা তিনি ইঙ্গিতে কাউকে জিজ্ঞেস করছেন। তিনি বলছেন-“এক রাক'আত বা দু'রাকআত ।তিনি তখন ঐ রাকআতগুলো পড়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হচ্ছেন। একদা হযরত মুআয (রাঃ) আসছেন এবং বলছেন-“আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে অবস্থাতেই পাবো সেই অবস্থাতেই তার সাথে মিলিত হয়ে যাবে এবং যে নামায ছুটে গেছে তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সালাম ফেরাবার পর পড়ে নেবো। সুতরাং তিনি তাই করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর তাঁর ছুটে যাওয়া রাকআতগুলো আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, মুআয (রাঃ) তোমাদের জন্যে উত্তম পন্থা বের করেছেন। তোমরাও এখন হতে এরূপই করবে। এই তো হলো নামাযের তিনটি পরিবর্তন।রোযার তিনটি পরিবর্তন এইঃ (১) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন এবং আশূরার রোযা রাখতেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা (আরবি)অবতীর্ণ করে রমযানের রোযা ফরয করেন। (২) প্রথমতঃ এই নির্দেশ ছিল যে, যে চাইবে রোযা রাখবে এবং যে চাইবে রোযার পরিবর্তে মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি ঐ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বাড়ীতে অবস্থানকারী হয় এবং মুসাফির না হয়, সুস্থ হয় রুগ্ন না হয়, তার উপর রোযা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে রুগ্ন ও মুসাফিরের জন্যে অবকাশ থাকে। আর এমন বৃদ্ধ, যে রোযা রাখার ক্ষমতাই রাখে না সে ‘ফিদইয়াহ' দেয়ার অনুমতি লাভ করে। (৩) পূর্বে রাত্রে দ্রিা যাওয়ার আগে আগে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল বটে; কিন্তু ঘুমিয়ে যাবার পর রাত্রির মধ্যেই জেগে উঠলেও পানাহার ও সহবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। অতঃপর একদা সরমা’ নামক একজন আনসারী (রাঃ) সারাদিন কাজ কর্ম করে ক্লান্ত অবস্থায় রাত্রে বাড়ী ফিরে আসেন এবং এশার নামায আদায় করেই তার ঘুম চলে আসে। পরদিন কিছু পানাহার ছাড়া তিনি রোযা রাখেন। কিন্তু তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি:' তখন তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। এদিকে তার ব্যাপারে তো এই ঘটনা ঘটে আর ওদিকে হযরত উমার (রাঃ) ঘুমিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠে স্ত্রী সহবাস করে বসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে এই দোষ স্বীকার করেন। ফলে (আরবি) (২:১৮৭) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মাগরিব থেকে নিয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত রমযানের রাত্রে পানাহার ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি দেয়া হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পূর্বে আশূরার রোযা রাখা হতো। যখন রমযানের রোযা ফরয করে দেয়া হয় তখন আর আশূরার রোযা বাধ্যতামূলক থাকে না; বরং যিনি ইচ্ছা করতেন, রাখতেন এবং যিনি চাইতেন না, রাখতেন না।(আরবি) (২:১৭৪)-এর ভাবার্থ হযরত মু'আয (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইচ্ছে করলে কেউ রোযা রাখতেন আবার কেউ রাখতেন না। বরং মিসকীনকে ভোজ্য দান করতেন। হযরত সালমা বিন আকওয়া (রাঃ) হতে সহীহ বুখারী শরীফে একটি বর্ণনা এসেছে" যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যে ব্যক্তি ইচ্ছে করতো রোযা ছেড়ে দিয়ে ‘ফিদইয়া দিয়ে দিতে। অতঃপর তার পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এটা ‘মানসূখ’ (রহিত) হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) ও এটাকে মানসূখ বলেছেন। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন যে, এটা মানসূখ নয় বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে বৃদ্ধ পুরুষ বা বৃদ্ধা নারী, যারা রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না। ইবনে আবি লাইলা (রঃ) বলেনঃ “আমি আতা (রঃ)-এর নিকট রমযান মাসে আগমন করি। দেখি যে, তিনি খানা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি আছে যে, এই আয়াতটি পর্বের আয়াতটিকে মানসূখ করে দিয়েছে। এখন এই হুকুম শুধুমাত্র শক্তিহীন, অচল বৃদ্ধদের জন্যে রয়েছে। মোট কথা এই যে, যে ব্যক্তি নিজ আবাসে আছে এবং সুস্থ ও সবল অবস্থায় রয়েছে তার জন্যে এই নির্দেশ নয়। বরং তাকে রোযাই রাখতে হবে। হাঁ, তবে খুবই বয়স্ক, বৃদ্ধ এবং দুর্বল লোক যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা নেই, তারা রোযাও রাখবে না এবং তাদের উপর রোযা কাযাও জরুরী নয়। কিন্তু যদি সে ধনী হয় তবে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে কি হবে না, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি উক্তি তো এই যে, যেহেতু তার রোযা করার শক্তি নেই, সুতরাং সে নাবালক ছেলের মতই। তার উপর যেমন কাফফারা নেই তেমনই এর উপরও নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা কাউকেও ক্ষমতার অতিরিক্ত কষ্ট দেন না। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার দায়িত্বে কাফফারা রয়েছে। অধিকাংশ আলেমেরও সিদ্ধান্ত এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণের তাফসীর হতেও এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ)-এর এটাই পছন্দনীয় মত। তিনি বলেন যে, খুব বেশী বয়স্ক বৃদ্ধ যার রোযা রাখার শক্তি নেই সে ‘ফিদইয়াই দিয়ে দেবে। যেমন হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) শেষ বয়সে অত্যন্ত বার্ধক্য অবস্থায় দু'বছর ধরে রোযা রাখেননি এবং প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি মিসকীনকে গোশত-রুটি আহার করাতেন।মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা' গ্রন্থে রয়েছে যে, যখন হযরত আনাস (রাঃ) রোযা রাখতে অসমর্থ হয়ে পড়েন তখন রুটি ও গোশত তৈরি করে ত্রিশ জন মিসকীনকে আহার করিয়ে দেন। অনুরূপভাবে গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী স্ত্রীলোকেরা যখন তাদের নিজেদের ও সন্তানদের জীবনের ভয় করবে এদের ব্যাপারেও ভীষণ মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা রোযা রাখবে না, বরং ফিদইয়া’ দেবে এবং যখন ভয় দূর হয়ে যাবে তখন রোযাও কাযা করে নেবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, শুধু ফিদইয়া যথেষ্ট, কাযা করার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার বলেন যে, রোযাই রাখবে, ফিদইয়া’ বা কাযা নয়। আমি (ইবনে কাসীর) এই মাসআলাটি স্বীয় পুস্তক কিতাবুস সিয়াম এর মধ্যে বিস্তারিতভাবে লিখেছি।
আল-বাকারা 2:184
১৮৩-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তারা যেন রোযাব্রত পালন করে। রোযার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনের খাটি নিয়তে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকা। এর উপকারিতা এই যে, এর ফলে মানবাত্মা পাপ ও কালিমা থেকে সম্পূর্ণ রূপে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই রোযার হুকুম শুধুমাত্র তাদের উপরেই হচ্ছে না বরং তাদের পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতিও রোযার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এই বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও যে, উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) যেন এই কর্তব্য পালনে পূর্বের উম্মতদের পিছনে না পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে প্রত্যেকের জন্যে একটা পন্থা ও রাস্তা রয়েছে, আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকেই একই উম্মত করে দিতেন; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন, তোমাদের উচিত যে তোমরা পুণ্যের কাজে অগ্রগামী থাকবে। এই বর্ণনাই এখানেও হচ্ছে যে এই রোযা তোমাদের উপর ঐ রকমই ফরয, যেমন ফরয ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে। রোযার দ্বারা শরীরের পবিত্রতা লাভ হয় এবং শয়তানের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকবৃন্দ! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ রয়েছে সে বিয়ে করবে, আর যার ক্ষমতা নেই সে রোযা রাখবে, এটাই তার জন্যে অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া। অতঃপর রোযার জন্যে দিনের সংখ্যা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এটা কয়েকটি দিন মাত্র যাতে কারও উপর ভারী না হয় এবং কেউ আদায়ে অসমর্থ না হয়ে পড়ে; বরং আগ্রহের সাথে তা পালন করে। প্রথমে প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখার নির্দেশ ছিল। অতঃপর রমযানের রোযার নির্দেশ হয় এবং পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ আসছে। হযরত মু'আয (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আতা’ (রাঃ), হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-এবং হযরত যহ্হাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোযার নির্দেশ ছিল, যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে পরিবর্তিত হয় এবং তাদের উপর এই বরকতময় মাসে রোযা ফরয করা হয়।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও পূর্ণ একমাস রোযা ফরয ছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রমযানের রোযা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয ছিল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতি এই নির্দেশ ছিল যে, এশার নামায আদায় করার পর যখন তারা শুয়ে যেত তখন তাদের উপর পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হয়ে যেতো। পূর্ববর্তী’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে আহলে কিতাব। এর পরে বলা হচ্ছে-‘রামযান মাসে যে ব্যক্তি রুগ্ন হয়ে পড়ে ঐ অবস্থায় তাকে কষ্ট করে রোযা করতে হবে না। পরে যখন সে সুস্থ হবে তখন তা আদায় করে নেবে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে ব্যক্তি সুস্থ থাকতে এবং মুসাফিরও হতো না তার জন্যেও এই অনুমতি ছিল যে, হয় সে রোযা রাখবে বা রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে এবং একজনের বেশী মিসকীনকে খাওয়ানো উত্তম ছিল। কিন্তু মিসকীনকে ভোজ্য দান অপেক্ষা রোযা রাখাই বেশী মঙ্গলজনক কাজ ছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এটাই বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ নামায ও রোযা তিনটি অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। নামাযের তিনটি অবস্থা হচ্ছেঃ (১) মদীনায় এসে মোল সতেরো মাস ধরে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করা; অতঃপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করা হয়। (২) পূর্বে নামাযের জন্যে একে অপরকে ডাকতেন এবং একত্রিত হতেন; অবশেষে এতে তারা অসমর্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আবদ-ই-রব্বিহী (রাঃ) নামক একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্ন দেখার মতই আমি স্বপ্ন দেখেছি; কিন্তু যদি বলি যে, আমি নিদ্রিত ছিলাম না তবে আমার সত্য কথাই বলা হবে। (স্বপ্ন) এই যে, সবুজ রঙ্গের হুল্লা (লুঙ্গি ও চাদর) পরিহিত এক ব্যক্তি কিবলার দিকে মুখ করে বলছেন (আরবি) দু’বার। এভাবে তিনি আযান শেষ করেন। ক্ষণেক বিরতির পর তিনি পূর্বের কথাগুলো আবার উচ্চারণ করেন কিন্তু এবারে (আরবি) কথাটি দু’বার অতিরিক্ত বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন-‘বেলালকে (রাঃ) এটা শিখিয়ে দাও। সে আযান দেবে। সুতরাং সর্বপ্রথম হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) এসে এই স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তার পূর্বেই হযরত যায়েদ (রাঃ) এসে গিয়েছিলেন। (৩) পূর্বে প্রচলন এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়াচ্ছেন, তার কয়েক রাকআত পড়া হয়ে গেছে এমন সময় কেউ আসছেন। কয় রাক'আত পড়া হয়েছে এটা তিনি ইঙ্গিতে কাউকে জিজ্ঞেস করছেন। তিনি বলছেন-“এক রাক'আত বা দু'রাকআত ।তিনি তখন ঐ রাকআতগুলো পড়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হচ্ছেন। একদা হযরত মুআয (রাঃ) আসছেন এবং বলছেন-“আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে অবস্থাতেই পাবো সেই অবস্থাতেই তার সাথে মিলিত হয়ে যাবে এবং যে নামায ছুটে গেছে তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সালাম ফেরাবার পর পড়ে নেবো। সুতরাং তিনি তাই করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর তাঁর ছুটে যাওয়া রাকআতগুলো আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, মুআয (রাঃ) তোমাদের জন্যে উত্তম পন্থা বের করেছেন। তোমরাও এখন হতে এরূপই করবে। এই তো হলো নামাযের তিনটি পরিবর্তন।রোযার তিনটি পরিবর্তন এইঃ (১) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন এবং আশূরার রোযা রাখতেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা (আরবি)অবতীর্ণ করে রমযানের রোযা ফরয করেন। (২) প্রথমতঃ এই নির্দেশ ছিল যে, যে চাইবে রোযা রাখবে এবং যে চাইবে রোযার পরিবর্তে মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি ঐ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বাড়ীতে অবস্থানকারী হয় এবং মুসাফির না হয়, সুস্থ হয় রুগ্ন না হয়, তার উপর রোযা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে রুগ্ন ও মুসাফিরের জন্যে অবকাশ থাকে। আর এমন বৃদ্ধ, যে রোযা রাখার ক্ষমতাই রাখে না সে ‘ফিদইয়াহ' দেয়ার অনুমতি লাভ করে। (৩) পূর্বে রাত্রে দ্রিা যাওয়ার আগে আগে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল বটে; কিন্তু ঘুমিয়ে যাবার পর রাত্রির মধ্যেই জেগে উঠলেও পানাহার ও সহবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। অতঃপর একদা সরমা’ নামক একজন আনসারী (রাঃ) সারাদিন কাজ কর্ম করে ক্লান্ত অবস্থায় রাত্রে বাড়ী ফিরে আসেন এবং এশার নামায আদায় করেই তার ঘুম চলে আসে। পরদিন কিছু পানাহার ছাড়া তিনি রোযা রাখেন। কিন্তু তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি:' তখন তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। এদিকে তার ব্যাপারে তো এই ঘটনা ঘটে আর ওদিকে হযরত উমার (রাঃ) ঘুমিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠে স্ত্রী সহবাস করে বসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে এই দোষ স্বীকার করেন। ফলে (আরবি) (২:১৮৭) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মাগরিব থেকে নিয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত রমযানের রাত্রে পানাহার ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি দেয়া হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পূর্বে আশূরার রোযা রাখা হতো। যখন রমযানের রোযা ফরয করে দেয়া হয় তখন আর আশূরার রোযা বাধ্যতামূলক থাকে না; বরং যিনি ইচ্ছা করতেন, রাখতেন এবং যিনি চাইতেন না, রাখতেন না।(আরবি) (২:১৭৪)-এর ভাবার্থ হযরত মু'আয (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইচ্ছে করলে কেউ রোযা রাখতেন আবার কেউ রাখতেন না। বরং মিসকীনকে ভোজ্য দান করতেন। হযরত সালমা বিন আকওয়া (রাঃ) হতে সহীহ বুখারী শরীফে একটি বর্ণনা এসেছে" যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যে ব্যক্তি ইচ্ছে করতো রোযা ছেড়ে দিয়ে ‘ফিদইয়া দিয়ে দিতে। অতঃপর তার পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এটা ‘মানসূখ’ (রহিত) হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) ও এটাকে মানসূখ বলেছেন। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন যে, এটা মানসূখ নয় বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে বৃদ্ধ পুরুষ বা বৃদ্ধা নারী, যারা রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না। ইবনে আবি লাইলা (রঃ) বলেনঃ “আমি আতা (রঃ)-এর নিকট রমযান মাসে আগমন করি। দেখি যে, তিনি খানা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি আছে যে, এই আয়াতটি পর্বের আয়াতটিকে মানসূখ করে দিয়েছে। এখন এই হুকুম শুধুমাত্র শক্তিহীন, অচল বৃদ্ধদের জন্যে রয়েছে। মোট কথা এই যে, যে ব্যক্তি নিজ আবাসে আছে এবং সুস্থ ও সবল অবস্থায় রয়েছে তার জন্যে এই নির্দেশ নয়। বরং তাকে রোযাই রাখতে হবে। হাঁ, তবে খুবই বয়স্ক, বৃদ্ধ এবং দুর্বল লোক যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা নেই, তারা রোযাও রাখবে না এবং তাদের উপর রোযা কাযাও জরুরী নয়। কিন্তু যদি সে ধনী হয় তবে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে কি হবে না, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি উক্তি তো এই যে, যেহেতু তার রোযা করার শক্তি নেই, সুতরাং সে নাবালক ছেলের মতই। তার উপর যেমন কাফফারা নেই তেমনই এর উপরও নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা কাউকেও ক্ষমতার অতিরিক্ত কষ্ট দেন না। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার দায়িত্বে কাফফারা রয়েছে। অধিকাংশ আলেমেরও সিদ্ধান্ত এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণের তাফসীর হতেও এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ)-এর এটাই পছন্দনীয় মত। তিনি বলেন যে, খুব বেশী বয়স্ক বৃদ্ধ যার রোযা রাখার শক্তি নেই সে ‘ফিদইয়াই দিয়ে দেবে। যেমন হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) শেষ বয়সে অত্যন্ত বার্ধক্য অবস্থায় দু'বছর ধরে রোযা রাখেননি এবং প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি মিসকীনকে গোশত-রুটি আহার করাতেন।মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা' গ্রন্থে রয়েছে যে, যখন হযরত আনাস (রাঃ) রোযা রাখতে অসমর্থ হয়ে পড়েন তখন রুটি ও গোশত তৈরি করে ত্রিশ জন মিসকীনকে আহার করিয়ে দেন। অনুরূপভাবে গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী স্ত্রীলোকেরা যখন তাদের নিজেদের ও সন্তানদের জীবনের ভয় করবে এদের ব্যাপারেও ভীষণ মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা রোযা রাখবে না, বরং ফিদইয়া’ দেবে এবং যখন ভয় দূর হয়ে যাবে তখন রোযাও কাযা করে নেবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, শুধু ফিদইয়া যথেষ্ট, কাযা করার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার বলেন যে, রোযাই রাখবে, ফিদইয়া’ বা কাযা নয়। আমি (ইবনে কাসীর) এই মাসআলাটি স্বীয় পুস্তক কিতাবুস সিয়াম এর মধ্যে বিস্তারিতভাবে লিখেছি।
আল-বাকারা 2:185
এখানে রমযান মাসের সম্মান ও মর্যাদার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, এই পবিত্র মাসেই কুরআন কারীম অবতীর্ণ হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সহীফা রমযানের প্রথম রাত্রে, তাওরাত’ ৬ তারিখে, ইঞ্জীল' ১৩ তারিখে এবং কুরআন কারীম ২৪ তারিখে অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যাবুর ১২ তারিখে এবং ইঞ্জীল’ ১৮ তারিখে অবতীর্ণ হয়। পূর্বে সমস্ত ‘সহীফা এবং তাওরাত, ইঞ্জীল’ ও ‘যাবুর' যে যে নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল, একবারই অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু কুরআন কারীম’ বায়তুল ইযাহ’ হতে দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত তো একবারই অবতীর্ণ হয়। অতঃপর মাঝে মাঝে প্রয়োজন হিসেবে পৃথিবীর বুকে অবতীর্ণ হতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ এবং (আরবি) এবং ভাবার্থ এটাই। অর্থাৎ কুরআন কারীমকে একই সাথে প্রথম আকাশের উপরে রমযান মাসের কদরের রাত্রে অবতীর্ণ করা হয় এবং ঐ রাতকে (আরবি) অর্থাৎ বরকতময় রাতও বলা হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী হতে এটাই বর্ণিত আছে। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, কুরআন মাজীদ তো বিভিন্ন বছর অবতীর্ণ হয়েছে, তাহলে রমযান মাসে ও কদরের রাত্রে অবতীর্ণ হওয়ার ভাবার্থ কি: তখন তিনি উত্তরে এই ভাবার্থই বর্ণনা করেন (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই। প্রভৃতি)। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, অর্ধ রমযানে কুরআনে কারীম দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হয় এবং বায়তুল ইয্যায়’ রাখা হয়। অতঃপর প্রয়োজন মত ঘটনাবলী ও প্রশ্নাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হতে থাকে এবং বিশ বছরে পূর্ণ হয়। অনেকগুলো আয়াত কাফিরদের কথার উত্তরেও অবতীর্ণ হয়। তাদের একটা প্রতিবাদ এও ছিল যে, কুরআন কারীম সম্পূর্ণটা একই সাথে অবতীর্ণ হয় না কেন: ওরই উত্তরে বলা হয় (আরবি) অর্থাৎ ‘যেন আমি এর দ্বারা তোমার অন্তরকে দৃঢ় রাখি এবং ওটা আমি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছি।' (২৫:৩২) অতঃপর কুরআন মাজীদের প্রশংসায় বলা হচ্ছে যে, এটা বিশ্ব মানবের জন্যে পথ প্রদর্শক এবং এতে প্রকাশ্য ও উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী রয়েছে। ভাবুক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এর মাধ্যমে সঠিক পথে পৌছতে পারেন। এটা সত্য ও মিথ্যা, হারাম ও হালালের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টিকারী। সুপথ ও কুপথ এবং ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য আনয়নকারী। পূর্ববর্তী কোন একজন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, শুধু রমযান বলা মাকরূহ, (আরবি) অর্থাৎ রমযানের মাস বলা উচিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা রমযান' বলো না। এটা আল্লাহ তাআলার নাম। তোমরা (আরবি) অর্থাৎ রমযানের মাস’ বলতে থাকো।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ বিন সাবিতের (রঃ) মাহযাব এর উল্টো। রামযান’ না বলা সম্বন্ধে একটি মার’ হাদীসও রয়েছে। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা একেবারেই ভিত্তিহীন। ইমাম বুখারীও (রঃ) এর খণ্ডনে ‘অধ্যায় রচনা করে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটিতে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি বিশ্বাস রেখে ও সৎ নিয়্যাতে রমযানের রোযা রাখে তার পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়। মোট কথা। এই আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রমযানের চন্দ্র উদয়ের সময় যে ব্যক্তি বাড়ীতে অবস্থান করবে, মুসাফির হবে না এবং সুস্থ ও সবল থাকবে, তাকে বাধ্যতামূলকভাবেই রোযা রাখতে হবে। পূর্বে এদের জন্যে রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি ছিল; কিন্তু এখন আর অনুমতি রইল না। এটা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা রুগ্ন ও মুসাফিরের জন্যে রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতির কথা বর্ণনা করেন। এদের জন্যে বলা হচ্ছে যে, এরা এই সময় রোযা রাখবে না এবং পরে আদায় করে নেবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তির শরীরে কোন কষ্ট রয়েছে যার ফলে তার পক্ষে রোযা রাখা কষ্টকর হচ্ছে কিংবা সফরে রয়েছে সে রোযা ছেড়ে দেবে এবং এভাবে যে কয়টি রোযা ছুটে যাবে তা পরে আদায় করে নেবে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, এরূপ অবস্থায় রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বড়ই করুণা প্রদর্শন করেছেন এবং ইসলামের নির্দেশাবলী সহজ করে দিয়ে তাঁর বান্দাদেরকে কষ্ট হতে রক্ষা করেছেন। এখানে এই আয়াতের সাথে সম্পর্ক যুক্ত গুটি কয়েক জিজ্ঞাস্য বিষয়ের বর্ণনা। দেয়া হচ্ছেঃ (১) পূর্ববর্তী মনীষীগণের একটি দলের ধারণা এই যে, কোন লোক। বাড়ীতে অবস্থানরত অবস্থায় রমযানের চাঁদ উদয়ের ফলে রমযানের মাস এসে পড়ে অতঃপর মাসের মধ্যেই তাকে সফরে যেতে হয় এই সফরে রোযা ছেড়ে দেয়া তার জন্যে জায়েয নয়। কেননা এরূপ লোকদের জন্যে রোযা রাখার পরিষ্কার নির্দেশ কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। হাঁ, তবে ঐ লোকদের সফরের অবস্থায় রোযা ছেড়ে দেয়া জায়েয, যারা সফরে রয়েছে এমতাবস্থায় রমযান মাস এসে পড়েছে। কিন্তু এই উক্তিটি অসহায়। আবু মুহাম্মদ বিন হাযাম স্বীয় পুস্তক মুহাল্লীর মধ্যে সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈগণের (রঃ) একটি দলের এই মাযহাবই নকল করেছেন। কিন্তু এতে সমালোচনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) রমযানুল মুবারক মাসে মক্কা বিজয় অভিযানে রোযার অবস্থায় রওয়ানা হন। কাদীদ’ নামক স্থানে পৌছে রোযা ছেড়ে দেন এবং সাহাবীগণকেও রোযা ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশ দেন (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। (২) সাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈগণের একটি দল বলেছেন যে, সফরের অবস্থায় রোযা ভেঙ্গে দেয়া ওয়াজিব। কেননা, কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তার জন্যে অপর দিন হতে গণনা করবে। কিন্তু সঠিক উক্তি হচ্ছে জমহূরের মাযহাব। তা হচ্ছে এই যে, তার জন্যে স্বাধীনতা রয়েছে, সে রাখতেও পারে, নাও রাখতে পারে। কেননা, রমযান মাসে সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সফরে বের হতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রোযা রাখতেন আবার কেউ কেউ রাখতেন না। এমতাবস্থায় রোযাদারগণ বে-রোযাদারগণের উপর এবং বে-রোযাদারগণ রোযাদারগণের উপর কোনরূপ দোষারোপ করতেন না। সুতরাং যদি রোযা ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব হতো তবে রোযাদারগণকে অবশ্যই রোযা রাখতে নিষেধ করা হতো। এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সফরের অবস্থায় রোযা রাখা সাব্যস্ত আছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু দারদা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রমযানুল মুবারক মাসে কঠিন গরমের দিনে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। কঠিন গরমের কারণে আমরা মাথায় হাত রেখে রেখে চলছিলাম। আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) ছাড়া আর কেউই রোযাদার ছিলেন না।(৩) ইমাম শাফিঈ (রঃ) সহ আলেমগণের একটি দলের ধারণা এই যে, সফরে রোযা না রাখা অপেক্ষা রোযা রাখাই উত্তম। কেননা, সফরের অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রোযা রাখা সাব্যস্ত আছে। অন্য একটি দলের ধারণা এই যে, রোযা না রাখাই উত্তম। কেননা, এর দ্বারা রুখসাতের’ (অবকাশের) উপর আমল করা হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, সফরে রোযা রাখা সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি রোযা ভেঙ্গে দেয় সে উত্তম কাজ করে এবং যে ভেঙ্গে দেয় না তার উপরে কোন পাপ নেই। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের যে অবকাশ দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর। তৃতীয় দলের উক্তি এই যে, রোযা রাখা ও না রাখা দুটোই সমান। তাঁদের দলীল হচ্ছে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত নিম্নের এই হাদীসটিঃ হযরত হামযা বিন আমর আসলামী (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রায়ই রোযা রেখে থাকি। সুতরাং সফরেও কি আমার রোযা রাখার অনুমতি রয়েছে:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইচ্ছে হলে রাখো, না হলে ছেড়ে দাও (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।' কোন কোন লোকের উক্তি এই যে, যদি রোযা রাখা কঠিন হয় তবে ছেড়ে দেয়াই উত্তম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে দেখেন যে, তাকে ছায়া করা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি: জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটি রোযাদার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ সফরে রোযা রাখা পুণ্য কাজ নয় (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এটা স্মরণীয় বিষয় যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সফরের অবস্থাতেও রোযা। ছেড়ে দেয়া মাকরূহ মনে করে, তার জন্যে রোযা ছেড়ে দেয়া জরুরী এবং রোযা রাখা হারাম। মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদির মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত জাবির (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার অবকাশকে গ্রহণ করে না, আরাফাতের পর্বত সমান তার পাপ হবে। (৪) চতুর্থ জিজ্ঞাস্য হলোঃ কাযা রোযাসমূহ ক্রমাগত রাখাই কি জরুরী না পৃথক পৃথকভাবে রাখলেও কোন দোষ নেই: কতকগুলো লোকের মাযহাব এই যে, কাযা রোযাকে হালী’ রোযার মতই পুরো করতে হবে। একের পরে এক এভাবে ক্রমাগত রোযা রেখে যেতে হবে। অন্য মাযহাব এই যে, ক্রমাগত রোযা রাখা ওয়াজিব নয়। এক সাথেও রাখতে পারে আবার পৃথক পৃথকভাবে অর্থাৎ মাঝে মাঝে ছেড়ে ছেড়েও রাখতে পারে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদেরও এই উক্তিই রয়েছে এবং দলীল প্রমাণাদি দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। রমযান মাসে ক্রমাগতভাবে এজন্যেই (রোযা) রাখতে হয় যে, ওটা সম্পূর্ণ রোযারই মাস। আর রমযানের মাস শেষ হওয়ার পর ওটা শুধুমাত্র গণনা করে পুরো করতে হয়। তা যে কোন দিনেই হতে পারে। এ জন্যেই তো কাযার নির্দেশের পরে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের যে সহজ পন্থা বাতলিয়েছেন, তার এই নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে একটি হাদীসে রয়েছে হযরত আবু উরওয়া (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম এমন সময়ে তিনি আগমন করেন এবং তার মাথা হতে পানির ফোটা টপটপ করে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল যে, সবে মাত্র তিনি অযু বা গোসল করে আসলেন। নামায সমাপনান্তে জনগণ তাকে জিজ্ঞেস করতে আরম্ভ করেঃ হুজুর (সঃ)! অমুক কাজে কোন ক্ষতি আছে কি এবং অমুক কাজে কোন ক্ষতি আছে কি: অবশেষে তিনি বলেনঃ 'আল্লাহর দ্বীন সহজের মধ্যেই রয়েছে। এটাই তিনবার বলেন।‘মুসনাদ-ই-আহমাদ’ এরই আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমরা সহজ কর,কঠিন করো না এবং সান্ত্বনা দান কর, ঘৃণার উদ্রেক করো না।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মুআয (রাঃ) ও হযরত আবু মূসাকে (রাঃ) ইয়ামন পাঠাবার সময় বলেনঃ “তোমরা (জনগণকে) সুসংবাদ প্রদান করবে, ঘৃণা করবে, পরস্পর এক মতের উপর থাকবে, মতভেদ সৃষ্টি করবে না।' সুনান ও মুসনাদ সমূহে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি সুদৃঢ় এবং নরম ও সহজ বিশিষ্ট ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।' হযরত মুহজিন বিন আদরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে নামাযের অবস্থায় দেখেন। তিনি তাকে কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা যুক্ত দৃষ্টির সাথে লক্ষ্য করতে থাকেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তুমি কি মনে কর যে, সে সত্য অন্তঃকরণ নিয়ে নামায পড়ছে: বর্ণনাকারী বলেন ‘আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সমস্ত মদীনাবাসী অপেক্ষা সে বেশী নামাযী।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তাকে শুনায়োনা, না জানি এটা তার ধ্বংসের কারণ হয়ে যায়। তারপরে তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়। আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের উপর সহজের ইচ্ছা করেছেন, তিনি তাদের উপর কঠিনের ইচ্ছে করেননি। সুতরাং আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, রুগ্ন, মুসাফির প্রভৃতিকে অবকাশ দেয়া এবং তাদেরকে অপারগ মনে করার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা তাঁর বান্দাদের প্রতি ওটাই যা তাদের জন্যে সহজ সাধ্য এবং তাদের পক্ষে যা দুঃসাধ্য তার ইচ্ছা আল্লাহ তা'আলা পোষণ করেন না। আর কাযার নির্দেশ হচ্ছে গণনা পুরো করার জন্যে। সুতরাং তাঁর এই দয়া, নিয়ামত এবং সুপথ প্রদর্শনের জন্যে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা তাঁর বান্দাদের উচিত। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা হজ্বব্রত সম্পর্কে বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যখন তোমরা হজ্বের নির্দেশাবলী পুরো করে ফেললা তখন তোমরা আল্লাহর যিক্র করতে থাকো।' (২:২০০)অন্য জায়গায় তিনি জুম'আর নামাযের সম্বন্ধে বলেছেনঃ “যখন নামায পুরো হয়ে যায় তখন তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় ও খাদ্য অনুসন্ধান কর এবং খুব বেশী করে আল্লাহর যিক্র করতে থাকো; যেন তোমরা মুক্তি পেয়ে যাও। অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তুমি সূর্য উদয়ের পূর্বে এবং অস্তমিত হওয়ার পূর্বে তোমার প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা কর।' (৫০:৩৯) এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণীয় পন্থা এই যে, প্রত্যেক ফরয নামাযের পর আল্লাহ তা'আলার হামদ, তাসবীহ এবং তাকবীর পাঠ করতে হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নামাযের সমাপ্তি শুধুমাত্র তাঁর আল্লাহু আকবার' ধ্বনির মাধ্যমেই জানতে পারতাম। এই আয়াতটি এই বিষয়ের দলীল যে, ঈদুল ফিরেও তাকবীর পাঠ করা উচিত।দাউদ বিন আলী ইসবাহানী যাহেরীর (রঃ) মাযহাব এই যে, এই ঈদে তাকবীর পাঠ করা ওয়াজিব। কেননা, এই বিষয়ে আদেশসূচক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবি) অর্থাৎ যেন তোমরা তাকবীর পাঠ কর।' ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এর সম্পূর্ণ উল্টো। তার মাযহাব অনুসারে এই ঈদে তাকবীর পাঠ ‘মাসনূন’ নয়। অবশিষ্ট মনীষীবৃন্দ এটাকে মুসতাহাব বলে থাকেন, যদিও কোন কোন শাখার ব্যাখ্যায় তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী পালন করতঃ তাঁর ফরযগুলো আদায় করে, তার নিষিদ্ধ কাজগুলো হতে বিরত থেকে এবং তার সীমারেখার হিফাযত করে তোমরা তার কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে যাও।
আল-বাকারা 2:186
একজন পল্লীবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের প্রভু কি নিকটে আছেন, না দূরে আছেন: যদি নিকটে থাকেন তবে চুপে চুপে ডাকবো আর যদি দূরে থাকেন তবে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবো। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ -ই-ইবনে আবি হাতিম)। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীদের (রাঃ) ‘আমাদের প্রভু কোথায় রয়েছেন এই প্রশ্নের উত্তরে এটা অবতীর্ণ হয় (ইবনে জারীর)। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবি) (৪০:৬০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' তখন জনগণ জিজ্ঞেস করে, “আমরা কোন সময় প্রার্থনা। করবো:' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (ইবনে জুরাইজ)। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা প্রত্যেকে উঁচু স্থানে উঠার সময় এবং উপত্যকায় অবতরণের সময়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি করতে করতে যাচ্ছিলাম। নবী (সঃ) আমাদের নিকট এসে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! নিজেদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। তোমরুকোন কম শ্রবণকারী ও দূরে অবস্থানকারীকে ডাকছো না। যাকে সব ডাকতে রয়েছে তিনি তোমাদের যানবাহনের স্কন্ধ অপেক্ষাও নিকটে রয়েছেন। হে আবদুল্লাহ বিন কায়েস! তোমাকে কি আমি বেহেশতের কোষাগারসমূহের সংবাদ দেবো না: তা হচ্ছে (আরবি) এই কলেমাটি (মুসনাদই-আহমাদ)।হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার উপর যেরূপ বিশ্বাস রাখে আমিও তার সাথে ঐরূপ ব্যবহার করে থাকি। যখন সে আমার নিকট প্রার্থনা জানায়, আমি তার সঙ্গেই থাকি' (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে এবং আমার যিক্রে তার ওষ্ঠ নড়ে উঠে, তখন আমি তার সাথেই থাকি' (ইমাম আহমাদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)। এই বিষয়ের আয়াত কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষণা হচ্ছে (আরবি)অর্থাৎ যারা খোদাভীরু ও সৎ কর্মশীল নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।' (৩০ ১২৮) হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি তোমাদের দুজনের সাথে রয়েছি, আমি শুনছি ও দেখছি।' উদ্দেশ্য এই যে, মহান আল্লাহ প্রার্থনাকারীদের প্রার্থনা ব্যর্থ করেন না। এরকমও হয় না যে, তিনি বান্দাদের প্রার্থনা হতে উদাসীন থাকেন বা শুনেন না। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা প্রার্থনা করার জন্যে তাঁর বান্দাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং তাদের প্রার্থনা ব্যর্থ না করার অঙ্গীকার করেছেন। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) বলেন যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার কাছে হাত উঁচু করে প্রার্থনা জানায় তখন সেই দয়ালু আল্লাহ তার হাত দু'খানা শূন্য ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘যে বান্দা আল্লাহ তা'আলার নিকট এমন প্রার্থনা করে যার মধ্যে পাপও নেই এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতাও নেই, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি জিনিসের মধ্যে যে কোন একটি দান করে থাকেন। হয়তো বা তার প্রার্থনা তৎক্ষণাৎ কবুল করে নিয়ে তার প্রার্থিত উদ্দেশ্য পুরো করেন, কিংবা তা জমা করে রেখে দেন, এবং পরকালে দান করেন বা ওরই কারণে এমন কোন বিপদ কাটিয়ে দেন, যে বিপদ তার প্রতি আপতিত হতো।' একথা শুনে জনসাধারণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা যখন প্রার্থনা খুব বেশী করে করবো: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার নিকট খুবই বেশী রয়েছে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। হযরত ওবাদাহ বিন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ভূ-পৃষ্ঠের যে মুসলমান মহা সম্মানিত ও মর্যাদাবান আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানায় তা আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করে থাকেন, হয় সে তার প্রার্থিত উদ্দেশ্য লাভ করে অথবা ঐ রকমই তার কোন বিপদ কেটে যায় যে পর্যন্ত না কোন পাপের কাজে বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতার কাজে সে প্রর্থনা করে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যে পর্যন্ত না কোন ব্যক্তি প্রার্থনায় তাড়াতাড়ি করে, তার প্রার্থনা অবশ্যই কবুল হয়। তাড়াতাড়ি করার অর্থ এই যে, সে বলতে আরম্ভ করে-‘আমি সদা প্রার্থনা করতে রয়েছি, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কবুল করছেন না (তাফসীর-ই-মুআত্তা মালিক)। সহীহ বুখারী শরীফের বর্ণনায় এটাও আছে যে,প্রতিদান স্বরূপ তাকে বেহেশত দান করা হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে এও রয়েছে যে, ককূল না হওয়ার ধারণা করে নৈরাশ্যের সাথে সে প্রার্থনা করা পরিত্যাগ করে, এটাই হচ্ছে তাড়াতাড়ি করা। হযরত আবু জাফর তাবারীর (রঃ) তাফসীরে এই উক্তিটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তর বরতনসমূহের ন্যায়, একে অপর হতে বেশী পর্যবেক্ষণকারী হয়ে থাকে। হে জনমণ্ডলী! আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে তো ককূল হওয়ার বিশ্বাস রেখে কর। জেনে রেখো যে, উদাসীনদের প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন না (তাফসীরে মুসনাদ-ই-আহমদ)। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) একবার রাসূলুল্লাহকে (সঃ) এই আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আয়েশার (রাঃ) এই প্রশ্নের উত্তর কি হবে: তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন-এর উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি যে সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হয় এবং খাঁটি নিয়ত ও আন্তরিকতার সাথে আমাকে ডেকে থাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার প্রয়োজন পুরো করে থাকি। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এই হাদীসটি ইসনাদ হিসাবে গরীব দুর্বল বা অসহায়)।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ককূলের অঙ্গীকার করেছেন। আমি হাজির হয়েছি, হে আমার মা'বুদ আমি হাজির হয়েছি, আমি হাজির আছি। হে অংশীদার বিহীন আল্লাহ! আমি উপস্থিত রয়েছি। হামদ, নিয়ামত এবং রাজ্য আপনারই জন্যে। আপনার কোন অংশীদার নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি অতুলনীয়। আপনি এক ও পবিত্র। আপনি স্ত্রী ও সন্তানাদি হতে দূরে রয়েছেন। না আপনার কেউ সঙ্গী রয়েছে। না আপনার কেউ সমকক্ষ রয়েছে, না আপনার মত কেউ রয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার সাক্ষ্য সত্য (তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার ইরশাদ হচ্ছে- হে ইবনে আদম! একটি জিনিস তো তোমার আর একটি জিনিস আমার এবং একটি জিনিস তোমার ও আমার মধ্যস্থলে রয়েছে। খাটি আমার হক তো এটাই যে, তুমি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে আর কাউকেও অংশীদার করবে না। তোমার জন্যে নির্দিষ্ট এই যে, তোমার প্রতিটি কাজের পূর্ণ প্রতিদান আমি তোমাকে অবশ্যই দেবো। তোমার কোন পুণ্যই আমি নষ্ট করবো না। মধ্যবর্তী জিনিসটি এই যে, তুমি প্রার্থনা করবে আর আমি কবুল করবো। তোমার একটি কাজ হচ্ছে প্রার্থনা করা আর আমার একটি কাজ হচ্ছে তা কবুল করা (তাফসীর-ই-বাযযার)। প্রার্থনার এই আয়াতটিকে রোযার নির্দেশাবলীর আয়াতসমূহের মধ্যস্থলে আনয়নের নিপুণতা এই যে, যেন রোযা শেষ করার প্রার্থনার প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মে এবং তারা যেন প্রত্যহ ইফতারের সময় অত্যধিক দু'আ করতে থাকে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রোযাদার ইফতারের সময় যে দু'আ করে আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করে থাকেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) ইফতারের সময় স্বীয় পরিবারের লোককে এবং শিশুদেরকে ডেকে নিতেন ও তাদের সকলকে নিয়ে প্রার্থনা করতেন (সুনান-ই-আবু দাউদ, তায়ালেসী)। সুনান-ই-ইবনে মাজাহর মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে এবং ওর মধ্যে সাহাবীদের (রাঃ) নিম্নের এই দু'আটি নকল করা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনার যে দয়া প্রত্যেক জিনিসকে ঘিরে রয়েছে তা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আপনার নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন!' অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য। হয় না। (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ্ (২) রোযাদার ব্যক্তি যে পর্যন্ত না সে ইফতার করে এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তির দু’আ। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাহার মর্যাদা উচ্চ করিবেন। অত্যাচারিত ব্যক্তির বদ দু'আর কারণে আকাশসমূহের দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘আমার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) জামেউত তিরমিযী, সুনানই-নাসায়ী ও ইবনে মাযাহ)।
আল-বাকারা 2:187
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রোযার ইফতারের পরে এশা পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল। আর যদি কেউ ওর পূর্বেই শুয়ে যেতো তবে নিদ্রা আসলেই তার জন্যে ঐসব হারাম হয়ে যেতো। এর ফলে সাহাবীগণ (রাঃ) কষ্ট অনুভব করছিলেন। ফলে এই রুখসাতে’র আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তারা সহজেই নির্দেশ পেয়ে যান। (আরবি)-এর অর্থ এখানে স্ত্রী সহবাস'। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আতা' (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), তাউস (রঃ), সালেম বিন আব্দুল্লাহ (রঃ), আমর বিন দীনার (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), যুহরী (রঃ), যহহাক (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং মুকাতিল বিন হিব্বানও (রঃ) এটাই বলেছেন। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তা। হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ) এর অর্থ লেপ’ নিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এত গাঢ় যার জন্যে রোযার রাত্রেও তাদেরকে মিলনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণের হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যার মধ্যে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, ইফতারের পূর্বে কেউ ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত্রির মধ্যেই জেগে উঠলেও সে পানাহার এবং স্ত্রী-সহবাস করতে পারতো না। কারণ তখন এই নির্দেশই ছিল। অতঃপর মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে এই নির্দেশ উঠিয়ে নেন। এখন রোযাদার ব্যক্তি মাগরিব থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করতে পারবে। হযরত কায়েস বিন সুরমা (রাঃ) সারাদিন জমিতে কাজ করে সন্ধ্যার সময় বাড়ীতে ফিরে আসেন। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন- কিছু খাবার আছে কি: স্ত্রী বলেন-“কিছুই নেই। আমি যাচ্ছি এবং কোথাও হতে নিয়ে আসছি। তিনি যান, আর এদিকে তাকে ঘুমে পেয়ে বসে। স্ত্রী ফিরে এসে তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে খুবই দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, এখন এই রাত্রি এবং পরবর্তী সারাদিন কিভাবে কাটবে: অতঃপর দিনের অর্ধভাগ অতিবাহিত হলে হযরত কায়েস (রাঃ) ক্ষুধার জ্বালায় চেতনা হারিয়ে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে এর আলোচনা হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং মুসলমানেরা সন্তুষ্ট হয়ে যান। একটি বর্ণনায় এটাও রয়েছে, সাহাবীগণ (রাঃ) সারা রমযানে স্ত্রীদের নিকট যেতেন না। কিন্তু কতক সাহাবী (রাঃ) ভুল করে বসতেন। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এই ভুল কয়েকজন মনীষীর হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে হযরত উমার বিন খাত্তাবও (রাঃ) ছিলেন একজন। যিনি এশা নামাযের পর স্বীয় স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। অতঃপর তিনি নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। ফলে এই রহমতের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) এসে যখন এই ঘটনাটি বর্ননা করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ হে উমার (রাঃ)! তোমার ব্যাপারে তো এটা আশা করা যায়নি। সেই সময়েই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত কায়েস (রাঃ) এশা’র নামাযের পরে ঘুম হতে চেতনা লাভ করে পানাহার করে ফেলেছিলেন। সকালে তিনি নবী (সঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে এই দোষ স্বীকার করেছিলেন। একটি বর্ণনা এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যখন স্ত্রীর সাথে মিলনের ইচ্ছে করেন তখন তাঁর পত্নী বলেন আমার ঘুম এসে গিয়েছিল। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) ওটাকে ভাল মনে করেছিলেন। সে রাত্রে তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে বসেছিলেন এবং অনেক রাত্রে বাড়ি পৌঁছে ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত কাব বিন মালিকও (রাঃ) এরূপ দোষই করেছিলেন ।(আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সন্তানাদি।' কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সহবাস।' আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা কদরের রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। কাতাদাহ (3) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই রুখসাত। এসব উক্তির এভাবে সাদৃশ্য দান করা যেতে পারে যে, সাধারণ ভাবে ভাবার্থ সবগুলোই হবে। সহবাসের অনুমতির পর পানাহারের অনুমতি দেয়া হচ্ছে যে, সুবেহ সাদেক পর্যন্ত এর অনুমতি রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত সাহল বিন সা'দ (রাঃ) বলেনঃ “পূর্বে (আরবি) শব্দটি অবতীর্ণ হয়নি। কাজেই কতকগুলো লোক তাদের পায়ে সাদা ও কালো সূতো বেঁধে নেয় এবং যে পর্যন্ত না সাদা ও কালোর মধ্যে প্রভেদ করা যেতো সে পর্যন্ত তারা পাহানার করতো। অতঃপর এই শব্দটি অবতীর্ণ হয়। ফলে জানা যায় যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে রাত ও দিন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত আদী বিন হাতিম (রাঃ) বলেনঃ আমিও আমার বালিশের নীচে সাদা ও কালো দু’টি সুতো রেখেছিলাম এবং যে পর্যন্ত এই দুই রং এর মধ্যে পার্থক্য না করা যেতো সেই পর্যন্ত পানাহার করতে থাকতাম। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি তখন তিনি বলেনঃ তোমার বালিশ তো খুব লম্বা চওড়া। এর ভাবার্থ তো হচ্ছে রাত্রির কৃষ্ণতা হতে সকালের শুভ্রতা প্রকাশ পাওয়া। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর এই উক্তির ভাবার্থ এই যে, আয়াতের মধ্যে যে দু’টি সুতোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার ভাবার্থ তো হচ্ছে দিনের শুভ্রতা ও রাত্রির কৃষ্ণতা। সুতরাং যদি ঐ লোকটির বালিশের নীচে ঐ দুটো সুতো এসে যায় তবে বালিশের দৈর্ঘ্য যেন পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যেও বর্ণনামূলকভাবে এই তাফসীরটি এসেছে। কোন কোন বর্ণনায় এই শব্দও এসেছে যে, তাহলে তো তুমি বড়ই লম্বা চওড়া স্কন্ধ বিশিষ্ট। কেউ কেউ এর অর্থ ‘সুল বুদ্ধি’ও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই অর্থটি ভুল। বরং উভয় বাকের ভাবার্থ একই। কেননা, বালিশ যখন এত বড় তখন স্কন্ধও এত বড় হবে। হযরত আদির (রাঃ) এই প্রকারের প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই রকম উত্তরের ব্যাখ্যা এটাই। আয়াতের এই শব্দগুলো দ্বারা রোযায় সাহরী খাওয়া মুসতাহাব হওয়াও সাব্যস্ত হচ্ছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলার রুখসাতের উপর আমল করা তাঁর নিকট পছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সাহরী খাবে, তাতে বরকত রয়েছে (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ আমাদের এবং আহলে কিতাবের মধ্যে পার্থক্যই সাহরী খাওয়া (সহীহ মুসলিম)।' আরও বলেছেনঃ ‘সাহরী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে। সুতরাং তোমরা ওটা পরিত্যাগ করো না। যদি কিছুই না থাকে তবে এক ঢোক পানিই যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলা ও তার ফেরেশতাগণ সাহরী ভোজনকারীদের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন। (মুসনাদ-ই- আহমদ)। এই প্রকারের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সাহরী বিলম্বে খাওয়া উচিত, যেন সাহরীর খাওয়ার ক্ষণেক পরেই সুবহে সাদেক হয়ে যায়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ ‘আমরা সাহরী খাওয়া মাত্রই নামাযে দাঁড়িয়ে যেতাম। আযান ও সাহরীর মধ্যে শুধু মাত্র এটুকুই ব্যবধান থাকতো যে, পঞ্চাশটি আয়াত পড়ে নেয়া যায় (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে পর্যন্ত আমার উম্মত ইফতারে তাড়াতাড়ি এবং সাহরীতে বিলম্ব করবে সে পর্যন্ত তারা মঙ্গলে থাকবে (মুসনাদ -ই-আহমাদ)। হাদীস দ্বারা এটাও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নাম বরকতময় খাদ্য রেখেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদির হাদীসে রয়েছে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাহরী খেয়েছি এমন সময়ে যে, যেন সূর্য উদিতই হয়ে যাবে। কিন্তু এই হাদীসের বর্ণনাকারী একজনই এবং তিনি হচ্ছেন আসেম বিন আবু নাজুদ। এর ভাবার্থ হচ্ছে দিন নিকটবর্তী হওয়া। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘ঐ স্ত্রী লোকগুলো যখন তাদের সময়ে পৌছে যায়। ভাবার্থ এই যে, যখন তাদের ইদ্দতের সময় শেষের কাছাকাছি হয়। এই ভাবার্থ এই হাদীসেরও যে, তাঁরা সাহরী খেয়েছিলেন এবং সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়া সম্বন্ধে তাদের নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস ছিল না। বরং এমন সময় ছিল যে, কেউ বলছিলেন, সুবহে সাদিক হয়ে গেছে এবং কেউ বলেছিলেন হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অধিকাংশ সাহাবীর (রাঃ) বিলম্বে সাহরী খাওয়া এবং শেষ সময় পর্যন্ত খেতে থাকা সাব্যস্ত আছে। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ)। তাবেঈদেরও একটি বিরাট দল হতে সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার একেবারে নিকটবর্তী সময়েই সাহরী খাওয়া বর্ণিত আছে। যেমন মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন (রঃ), আবু মুসলিম (রঃ), ইব্রাহীম নাখঈ (রঃ), আবূ যযুহা ও আবু ওয়াইল প্রভৃতি হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্রগণ, আতা' (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), হাকিম বিন উয়াইনা (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), আবুশশাশা (রঃ) এবং জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হযরত আ'মাশ (রঃ) এবং হযরত জাবির বিন রুশদেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। আল্লাহ তাআলা এঁদের সবারই উপর শান্তি বর্ষণ করুন। এঁদের ইসনাদসমূহ আমি আমার একটি পৃথক পুস্তক ‘কিতাবুস্ সিয়ামের মধ্যে বর্ণনা করেছি।ইবনে জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে কতকগুলো লোক হতে এটাও নকল করেছেন যে, সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত পানাহার বৈধ, যেমন সূর্য অস্তমিত হওয়া মাত্রই ইফতার করা বৈধ। কিন্তু কোন জ্ঞানী ব্যক্তিই এই উক্তিটি গ্রহণ, করতে পারেন না। কেননা, এটি কুরআন কারীমের স্পষ্ট কথার সম্পূর্ণ উল্টো। কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) শব্দটি বিদ্যমান রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত বেলালের (রাঃ) আযান শুনে তোমরা সাহরী খাওয়া হতে বিরত হবে না। কেননা তিনি রাত্রি থাকতেই আযান দিয়ে থাকেন। তোমরা খেতে ও পান করতে থাকো যে পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম আযান দেন। ফজর প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আযান দেন না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ওটা ফজর নয় যা আকাশের দিগন্তে লম্বভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফজর হলো লাল রং বিশিষ্ট এবং দিগন্তে প্রকাশমান। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। তাতে রয়েছেঃ “সেই প্রথম ফজরকে দেখে নাও যা প্রকাশিত হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। সেই সময় পানাহার থেকে বিরত হয়ো না বরং খেতে ও পান করতেই থাকো। যে পর্যন্ত না দিগন্তে লালিমা প্রকাশ পায়।অন্য একটি হাদীসে সুবহে কাযিব এবং বেলাল (রাঃ)-এর আযানকে এক সাথেও বর্ণনা করেছেন। অন্য একটি বর্ণনায় সুবহে কাবিকে সকালের থামের মত সাদা বলেছেন। অতঃপর একটি বর্ণনায় যে প্রথম আযানের মুয়াযযিন। ছিলেন হযরত বেলাল (রাঃ) তার কারণ বলেছেন এই যে, ঐ আযান ঘুমন্ত ব্যক্তিদেরকে জাগাবার জন্যে এবং (তাহাজ্জুদের নামাযে) দণ্ডায়মান ব্যক্তিদেরকে ফিরাবার জন্যে দেয়া হয়। ফজর এরূপ এরূপভাবে হয় না যতক্ষণ না এরূপ হয় (অর্থাৎ আকাশের উর্ধ্ব দিকে উঠে যায় না, বরং দিগন্ত রেখার মত প্রকাশমান হয়)। একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, ফজর দু’টো। এক তো হচ্ছে নেকড়ে বাঘের লেজের মত। ওর দ্বারা রোযাদারের উপর কিছুই হারাম হয় না। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ফজর যা দিগন্তে প্রকাশ পায়। এটা হচ্ছে ফজরের নামাযের সময় এবং রোযাদারকে পানাহার থকে বিরত রাখার সময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে শুভ্রতা আকাশের নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যায় তার সাথে নামাযের বৈধতা এবং রোযার অবৈধতার কোন সম্বন্ধ নেই। কিন্তু ঐ ফজর যা পর্বত শিখরে দেদীপ্যমান হয় সেটা পানাহার হারাম করে থাকে। হযরত আতা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আকাশে লম্বভাবে উড্ডীয়মান আলোক না রোযাদারের উপর পানাহার হারাম করে থাকে, না তার দ্বারা নামাযের সময় হয়েছে বলে বুঝা যেতে পারে, না তার দ্বারা হজ্ব ছুটে যায়। কিন্তু যে সকাল পর্বতরাজির শিখরসমূহে ছড়িয়ে পড়ে এটা ঐ সকাল যা রোযাদারের উপর সব কিছুই হারাম করে থাকে। আর নামাযীর জন্যে নামায হালাল করে দেয় এবং হজ্ব ফওত হয়ে যায়। এই দু'টি বর্ণনার সনদ বিশুদ্ধ এবং পূর্ববর্তী বহু মনীষী হতে নকল করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর স্বীয় করুণা বর্ষণ করুন। জিজ্ঞাস্যঃযেহেতু আল্লাহ তা'আলা রোযাদারের জন্যে স্ত্রী সহবাস ও পানাহারের শেষ সময় সুবহে সাদেক নির্ধারণ করেছেন, কাজেই এর দ্বারা এই মাসআলার উপর দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, সকালে যে ব্যক্তি অপবিত্র অবস্থায় উঠলো অতঃপর গোসল করে নিয়ে তার রোযা পুরো করে নিলো, তার উপর কোন দোষ নেই। চার ইমাম এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনদের এটাই মাযহাব। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে সহবাস করে সকালে অপবিত্র অবস্থায় উঠতেন, অতঃপর গোসল করতেন এবং রোযাদার থাকতেন। তাঁর এই অপবিত্রতা স্বপ্নদোষের কারণে হতো না। হযরত উম্মে সালমার (রাঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, এর পরে তিনি রোযা ছেড়েও দিতেন না এবং কাযাও করতেন না।সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ফজরের নামাযের সময় হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি অপবিত্র থাকি, আমি রোযা রাখতে পারি কি: রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “এরূপ ঘটনা স্বয়ং আমারও ঘটে থাকে এবং আমি রোযা রেখে থাকি।' লোকটি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো আপনার মত নই। আপনার তো পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি তো আশা রাখি যে, তোমাদের সবারই অপেক্ষা আল্লাহ তা'আলাকে বেশী ভয় আমিই করি এবং তোমাদের সবারই অপেক্ষা খোদাভীরুতার কথা আমিই বেশী জানি। মুসনাদ-ই -আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যখন ফজরের আযান হয়ে যায় এবং তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অপবিত্র থাকে সে যেন ঐদিন রোযা না রাখে। এই হাদীসটির ইসনাদ খুবই উত্তম এবং এটা ইমাম বুখারী (রাঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর রয়েছে। এই হাদীসটি সহীহ বুখারীর ও মুসলিমের মধ্যেও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ফযল বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন এবং তিনি নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন। সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এই হাদীসটি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) হতে এবং ফযল বিন রাবী হতে বর্ণনা করেছেন এবং মারফু করেননি। এ জন্যেই কোন কোন আলেমের উক্তি এই যে, এই হাদীসটির মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। কেননা এটা মারফু নয়।অন্যান্য কতকগুলো আলেমের মাযহাব এটাই। আবূ হুরাইরা (রাঃ), হযরত সালিম (রাঃ), হযরত আতা (রঃ), হযরত হিসাম বিন উরওয়া (রঃ) এবং হযরত হাসান বসরী ও (রঃ) এ কথাই বলেন। কেউ কেউ বলেন যে, যদি কেউ নাপাক অবস্থায় শুয়ে যায় এবং জেগে উঠে দেখে যে, সুবহে সাদিক হয়ে গেছে তবে তার রোযার কোন ক্ষতি হবে না। হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের ভাবার্থ এটাই। আর যদি সে ইচ্ছাপূর্বক গোসল না করে এবং সকাল হয়ে যায় তবে তার রোযা হবে না। হযরত উরওয়া (রঃ), তাউস (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) এ কথাই বলেন। কেউ কেউ বলেন যে, যদি ফরয রোযা হয় তবে পূর্ণ করে নেবে এবং পরে আবার অবশ্যই কাযা করতে হবে। আর যদি নফল রোযা হয় তবে কোন দোষ নেই। ইবরাহীম নাখঈও (রঃ) এটাই বলেন। খাজা হাসান বসরী (রঃ) হতেও একটি বর্ণনায় এটাই রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস দ্বারা মানসূখ হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ইতিহাসে কোন প্রমাণ নেই যার দ্বারা মানসূখ সাব্যস্ত হতে পারে। হযরত ইবনে হাযাম (রঃ) বলেন যে, ওর নাসিখ’ হচ্ছে কুরআন কারীমের এই আয়াতটিই। কিন্তু এটাও খুব দূরের কথা। কেননা, এই আয়াতটি পরে হওয়ার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং এদিক দিয়ে তো বাহ্যতঃ এই হাদীসটি এই আয়াতটির পরের বলে মনে হচ্ছে। কোন কোন লোকে বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটির মধ্যেকার না বাচক (আরবি) শব্দটি হচ্ছে কামাল। বা পূর্ণতার জন্যে। অর্থাৎ ঐ লোকটির পূর্ণ রোযা হয় না। কেননা হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস দ্বারা রোযার বৈধতা স্পষ্ট রূপে সাব্যস্ত হয়েছে। আর এটাই সঠিক পন্থাও বটে এবং সমুদয় উক্তির মধ্যে এই উক্তিটিই উত্তম। তাছাড়া এটা বলাতে দু'টি বর্ণনার মধ্যে সাদৃশ্যও এসে যাচ্ছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাত্রি সমাগম পর্যন্ত তোমরা রোযা পূর্ণ কর। এর দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, সূর্য অস্তমিত হওয়া মাত্রই ইফতার করা উচিত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন এদিক দিয়ে রাত্রি আগমন করে এবং ওদিক দিয়ে দিন বিদায় নেয় তখন যেন রোযাদার ইফতার করে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত সাহল বিন সা’দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে পর্যন্ত মানুষ ইফতারে তাড়াতাড়ি করবে সে পর্যন্ত মঙ্গল থাকবে। মুসনাদ-ই আহমাদের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আমার নিকট ঐ বান্দাগণ সবচেয়ে প্রিয় যারা ইফতারে তাড়াতাড়ি করে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে ‘হাসান গরীব বলেছেন। তাফসীর-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত বাশীর বিন খাসাসিয়্যাহর (রাঃ) সহধর্মিনী হযরত লাইলা (রাঃ) বলেনঃ “আমি ইফতার ছাড়াই দু’টি রোযাকে মিলিত করতে ইচ্ছে করি। তখন আমার স্বামী আমাকে নিষেধ করেন এবং বলেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওটা হতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ এটা খ্রীষ্টানদের কাজ। তোমরা তো রোযা এভাবেই রাখবে যেভাবে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, (তা হচ্ছে এই যে,) তোমরা রাত্রে ইফতার করে নাও। এক রোযাকে অন্য রোযার সাথে মিলানো নিষিদ্ধ হওয়া সম্বন্ধে আরও বহু হাদীস রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা রোযাকে রোযার সাথে মিলিত করো না।' তখন জনগণ বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বয়ং আপনি তো মিলিয়ে থাকেন। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের মত নই। আমি রাত্রি অতিবাহিত করি, আমার প্রভু আমাকে আহার করিয়ে ও পানি পান করিয়ে থাকেন। কিন্তু লোক তবুও ঐ কাজ হতে বিরত হয় না। তখন তিনি তাদের সাথে দু’দিন ও দু'রাতের রোযা বরাবর রাখতে থাকেন। অতঃপর চাঁদ দেখা দেয় তখন তিনি বলেনঃ ‘যদি চাদ উদিত না হতো তবে আমি এভাবেই রোযাকে মিলিয়ে যেতাম।' যেন তিনি তাদের অপারগতা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে এবং এভাবেই রোযাকে ইফতার করা ছাড়াই এবং রাত্রে কিছু খেয়েই অন্য রোযার সাথে মিলিয়ে নেয়ার নিষিদ্ধতার ব্যাপারে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) হতেও মারফু হাদীসসমূহ বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, এটা উম্মতের জন্যে নিষিদ্ধ; কিন্তু তিনি স্বয়ং তাদের হতে বিশিষ্ট ছিলেন। তার এর উপরে ক্ষমতা ছিল এবং এর উপরে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাকে সাহায্য করা হতো। এটাও মনে রাখা উচিত যে, তিনি যে বলেছেন-“আমার প্রভু আমাকে পানাহার করিয়ে থাকেন’ এর ভাবার্থ প্রকৃত খাওয়ানো ও পান করানো নয়। কেননা এরূপ হলে তো এক রোযার সাথে অন্য রোযাকে মিলানো হচ্ছে না। কাজেই এটা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক সাহায্য। যেমন একজন আরব কবির নিম্নের এই কবিতার মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমার কথা ও তোমার আলোচনা তার নিকট এত চিত্তাকর্ষক যে তাকে পানাহার থেকে সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়ে রাখে।' হাঁ, তবে কোন ব্যক্তি যদি দ্বিতীয় সাহরী পর্যন্ত বিরত থাকে তবে এটা জায়েয। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিতে রয়েছেঃ ‘মিলিত কারো না, যদি একান্তভাবে করতেই চাও তবে সাহরী পর্যন্ত কর।' জনগণ বলেঃ আপনি তো মিলিয়ে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তোমাদের মত নই। আমাকে তো রাত্রেই আহারদাতা আহার করিয়ে থাকেন এবং পানীয় দাতা পান করিয়ে থাকেন।' (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একজন সাহাবীয়্যাহ স্ত্রীলোক নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। সেই সময় তিনি সাহরী খাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘এসো তুমিও খেয়ে নাও।' স্ত্রী লোকটি বলেনঃ “আমি রোযা অবস্থায় রয়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কিরূপে রোযা রেখে থাকো:' সে তখন বর্ণনা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তুমি মুহাম্মদ (সঃ)-এর মত এক সাহরীর সময় থেকে নিয়ে দ্বিতীয় সাহরীর সময় পর্যন্ত মিলিত রোযা রাখো না কেন: (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সাহরী হতে দ্বিতীয় সহিরী পর্যন্ত মিলিত রোযা রাখতেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) প্রভৃতি পূর্বের মনীষীগণ হতে বর্ণিত আছে যে, তারা ক্রমাগত কয়েকদিন পর্যন্ত কিছু না খেয়েই রোযা রাখতেন। কেউ কেউ বলেন যে, ওটা উপাসনা হিসেবে ছিল না, বরং আত্মাকে দমন ও আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে ছিল। আবার এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাদের ধারণায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই নিষেধ ছিল দয়া ও স্নেহ হিসেবে, অবৈধ বলে দেয়া হিসেবে নয়। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনসাধারণের প্রতি দয়া পরবশ হয়েই এর থেকে নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং ইবনে যুবাইর (রাঃ) তাঁর পুত্র আমের (রাঃ) এবং তাঁর পদাংক অনুসরণকারীগণ তাদের আত্মায় শক্তি লাভ করতেন এবং রোযার উপর রোযা রেখে যেতেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, যখন তারা ইফতার করতেন তখন সর্ব প্রথম ঘি ও তিক্ত আঠা খেতেন, যাতে প্রথমেই খাদ্য পৌছে যাওয়ার ফলে নাড়ি জ্বলে না যায়। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) ক্রমাগত সাতদিন ধরে রোযা রেখে যেতেন এবং এর মধ্যকালে দিনে বা রাতে কিছুই খেতেন না। অথচ সপ্তম দিনে তাকে খুবই সুস্থ এবং সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রূপে দেখা যেতো।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দিনের রোযা ফরয করে দিয়েছেন। এখন বাকি রইলো রাত্রি; তবে যে চাইবে খাবে এবং যার ইচ্ছে হয় সে খাবে না। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-ই'তিকাফের অবস্থায় তোমরা প্রেমালাপ করো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি মসজিদে ই'তেকাফে বসেছে, হয় রমযান মাসেই হোক বা অন্য কোন মাসেই হোক, ই'তিকাফ পুরো না হওয়া পর্যন্ত তার জন্যে দিবস ও রজনীতে স্ত্রী সহবাস হারাম। হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, পূর্বে মানুষ ই'তেকাফের অবস্থাতেও স্ত্রী সহবাস করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং মসজিদে ই'তেকাফের অবস্থায় অবস্থানের সময় এটা হারাম করে দেয়া হয়। মুজাহিদ (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) এ কথাই বলেন। সুতরাং আলেমগণের সর্বসম্মত ফতওয়া এই যে, যদি ই'তেকাফকারী খুবই প্রয়োজন বশতঃ বাড়ীতে যায়, যেমন প্রশ্রাব-পায়খানার জন্যে বা খাদ্য খাবার জন্যে, তবে ঐ কার্য শেষ করার পরেই তাকে মসজিদে চলে আসতে হবে। তথায় অবস্থান জায়েয নয়। স্ত্রীকে চুম্বন-আলিঙ্গন ইত্যাদিও বৈধ নয়। ই'তেকাফ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়াও জায়েয নয়। তবে হাঁটতে হাঁটতে যদি কিছু জিজ্ঞেস করে নেয় সেটা অন্য কথা। ই'তেকাফের আরও অনেক আহকাম রয়েছে। কতকগুলো আহকামের মধ্যে মতভেদও রয়েছে। এগুলো আমি আমার পৃথক পুস্তক ‘কিতাবুস সিয়াম’র শেষে বর্ণনা করেছি। এই জন্য অধিকাংশ গ্রন্থকারও নিজ নিজ পুস্তকে রোযার পর পরই ই'তেকাফের নির্দেশাবলীর বর্ণনা দিয়েছেন। এতে এ কথার দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, ই'তেকাফ রোযার অবস্থায় করা কিংবা রমযানের শেষ ভাগে করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) রমযান মাসের শেষ দশ দিনে ই'তেকাফ করতেন, যে পর্যন্ত না তিনি এই নশ্বর জগৎ হতে বিদায় গ্রহণ করেন। তাঁর পরলোক গমনের পর তাঁর সহধর্মিণীগণ উম্মাহাতুল মু'মেনীন (রাঃ) ই'তেকাফ করতেন।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত সুফিয়া বিন্তে হাই (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফের অবস্থায় তার খিদমতে উপস্থিত হতেন এবং কোন প্রয়োজনীয় কথা জিজ্ঞেস করার থাকলে তা জিজ্ঞেস করে চলে যেতেন। একদা রাত্রে যখন তিনি চলে যাচ্ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বাড়ীতে পৌছিয়ে দেয়ার জন্যে তার সাথে সাথে যান। কেননা, তার বাড়ী মসজিদে নববী (সঃ) হতে দূরে অবস্থিত ছিল। পথে দু’জন আনসারী সাহাবীর (রাঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাঁর সহধর্মীণীকে দেখে তারা লজ্জিত হন এবং দ্রুত পদক্ষেপে চলতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা থামো এবং জেনে রেখো যে, এটা আমার স্ত্রী সুফিয়া বিনতে হাই (রাঃ)। তখন তাঁরা বলেনঃ 'সুবহানাল্লাহ (অর্থাৎ আমরা অন্য কোন ধারণা কি করতে পারি)!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘শয়তান মানুষের শিরায় শিরায় রক্তের ন্যায় চলাচল করে থাকে। আমার ধারণা হলো যে, সে তোমাদের অন্তরে কোন কু-ধারণা সৃষ্টি করে দেয় কি না!' হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) তাঁর এই নিজস্ব ঘটনা হতে তাঁর উম্মতবর্গকে শিক্ষা গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা যেন অপবাদের স্থান থেকে দূরে থাকে। নতুবা এটা অসম্ভব কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মহান সাহাবীবর্গ তার সম্বন্ধে কোন কু-ধারণা অন্তরে পোষণ করতে পারেন এবং এটাও অসম্ভব যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের সম্বন্ধে এরূপ ধারণা রাখতে পারেন।উল্লিখিত আয়াতে (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে স্ত্রীর সাথে মিলন এবং তার কারণসমূহ। যেমন চুম্বন, আলিঙ্গন ইত্যাদি। নচেৎ কোন জিনিস লেন-দেন ইত্যাদি সব কিছুই জায়েয। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) ই'তিকাফের অবস্থায় আমার দিকে মাথা নোয়ায়ে দিতেন এবং আমি তার মাথায় চিরুনী করে দিতাম। অথচ আমি মাসিক বা ঋতুর অবস্থায় থাকতাম। তিনি মানবীয় প্রয়োজন পুরো করার উদ্দেশ্য ছাড়া বাড়ীতে আসতেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “ই'তিকাফের অবস্থায় আমি তো চলতে চলতেই বাড়ীর রুগীকে পরিদর্শন করে থাকি। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই হচ্ছে আমার বর্ণনাকৃত কথা, ফরযকৃত নির্দেশাবলী এবং নির্ধারিত সীমা। যেমন রোযার নির্দেশাবলী ও তার জিজ্ঞাস্য বিষয়সমূহ, তার মধ্যে যা কিছু বৈধ এবং যা কিছু অবৈধ ইত্যাদি। মোটকথা এই সব হচ্ছে আমার সীমারেখা। সাবধান! তোমরা তার নিকটেও যাবে না এবং তা অতিক্রম করবে না। কেউ কেউ বলেন। যে, এই সীমা হচ্ছে ই'তিকাফের অবস্থায় স্ত্রী-মিলন হতে দূরে থাকা। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এই আয়াতগুলোর মধ্যে চারটি নির্দেশকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে এবং তা পাঠ করেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘যে ভাবে আমি রোযা ও তার নির্দেশাবলী, তার জিজ্ঞাস্য বিষয়সমূহ এবং তার ব্যখ্যা বর্ণনা করেছি, অনুরূপভাবে অন্যান্য নির্দেশাবলীও আমি আমার বান্দা ও রাসূল (সঃ)- এর মাধ্যমে সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্যে বর্ণনা করেছি যেন তারা জানতে পারে যে, হিদায়াত কি এবং আনুগত্য (আরবি)কাকে বলে এবং এর ফলে যেন তারা খোদাভীরু হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ অর্থাৎ তিনি সেই আল্লাহ যিনি তাঁর বান্দার উপর উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ করেছেন যেন তিনি তোমাদেরকে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু।' (৫৭:৯)
আল-বাকারা 2:188
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছে যার নিকট অপরের ধন-সম্পদ রয়েছে এবং ঐ হকদার ব্যক্তির নিকট কোন প্রমাণ নেই। তখন ঐ লোকেটি অস্বীকার করতঃ বিচারকের নিকট গিয়ে নিজেকে মুক্তরূপে সাব্যস্ত করছে, অথচ সে জানছে যে, ঐ দাবীদারের মাল তার নিকট রয়েছে। সুতরাং সে হারাম খাচ্ছে এবং নিজেকে পাপীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) হযরত ইকরামা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (র), হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ), এবং হযরত আবদুর রহমান বিন জায়েদ বিন আসলামও (রঃ) এই কথাই বলেন যে, ঐ ব্যক্তি যে অত্যাচারী এটা সে নিজে জানা সত্ত্বেও তার বিবাদ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি একজন মানুষ। লোক আমার নিকট বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়ে থাকে। সম্ভবতঃ একজন অপরজন অপেক্ষা বেশি যুক্তিবাদী। তার যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে আমি হয়তো তারই স্বপক্ষে ফায়সালা করে থাকি (অথচ ফায়সালা প্রকৃত ঘটনার বিপরীত)। তবে জেনে রেখো, যে ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ফায়সালা করার ফলে কোন মুসলমানের হক আমি তাকে দিয়ে দেই, ওটা হচ্ছে আগুনের টুকরো। সুতরাং হয় সে ওটা উঠিয়ে নেবে, না হয় ছেড়ে দেবে। আমি বলি যে, এই আয়াত এবং এই হাদীস এই বিষয়ের উপর দলীল যে, বিচারকের বিচার কোন মামলার মূলকে শরীয়তের নিকট পরিবর্তন করে না। প্রকৃত পক্ষে যা হারাম তা কাযীর ফায়সালায় হালাল হয়ে যায় না এবং যা হালাল তা হারাম হয় না।কাযীর ফায়সালা শুধুমাত্র বাহ্যিকের উপর হয়ে থাকে, অভ্যন্তরে তা পূর্ণ হয়। কাযী সাহেবের ফায়সালা যদি প্রকৃত ব্যাপারের সাথে মিলে যায় তবে তো ভালই, নচেৎ কাযী সাহেব তো প্রতিদান পেয়ে যাবেন। কিন্তু ঐ মীমাংসার উপর ভিত্তি করে হককে না হক এবং না হককে হকে পরিণতকারী আল্লাহ তা'আলার নিকট অপরাধী বলে বিবেচিত হবে এবং তার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হবে-যার উপর উপরোক্ত আয়াতটি সাক্ষী রয়েছে। যেখানে বলা হচ্ছে যে, তোমরা নিজেদের দাবীর অসারতা জেনে শুনে জনগণের মাল ভক্ষণের উদ্দেশ্যে মিথ্যা মোকদ্দমা সাজিয়ে এবং মিথ্যা সাক্ষী ঠিক করে অবৈধ পন্থার মাধ্যমে বিচারকগণকে ভুল বুঝিয়ে দিয়ে নিজেদের দাবীকে সাব্যস্ত করো না।' হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “হে জন মণ্ডলী! জেনে রেখো যে, বিচারকের মীমাংসা তোমার জন্য হারামকে হালাল এবং অন্যায়কে ন্যায় করতে পারে না। কাযী তো নিজের বিবেকের মাধ্যমে সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুসারে বাহ্যিক অবস্থা দেখে বিচারের রায় দিয়ে থাকেন। তা ছাড়া তিনি তো মানুষ, সুতরাং তার দ্বারা ভুল হওয়াও সম্ভব এবং তার ভুল থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব। তাহলে জেনে নাও যে, কাযীর ফায়সালা যদি সত্য ঘটনার উল্টো হয় তাহলে শুধুমাত্র কাযীর মীমাংসা বলেই ওকে বৈধ মাল মনে করো না। এই বিবাদ থেকেই গেল। কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ দু’জনকেই একত্রিত করবেন এবং অন্যায়কারীদের উপর হকদারদেরকে বিজয়ী করে তাদের হক অন্যায়কারীদের নিকট হতে আদায় করিয়ে দেবেন এবং দুনিয়ায় যে মীমাংসা করা হয়েছিল তার বিপরীত মীমাংসা করে তার পুণ্যসমূহ হতে হকদারকে ওর বিনিময় দেয়াইয়ে দেবেন।
আল-বাকারা 2:189
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চন্দ্র সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, ফলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, এর দ্বারা ঋণ ইত্যাদির অঙ্গীকারের সময়কাল, স্ত্রীলোকদের ইদ্দতের এবং হজ্বের সময় জানা যায়। মুসলমানদের রোযা-ইফতারের সম্পর্কও এর সঙ্গে। মুসনাদই-আবদুর রাযযাকের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মানুষের সময় নিরূপণের জন্যে চাঁদ তৈরী করেছেন। ওটা দেখে রোযা রাখ, ওটা দেখে ঈদ পর্ব উদযাপন কর। যদি মেঘের কারণে চাঁদ দেখতে না পাও তবে পূর্ণ ত্রিশ দিন গণনা করে নাও। এই বর্ণনাটিকে ইমাম হাকীম (রঃ) সঠিক বলেছেন। এই হাদীসটি অন্য সনদেও বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতে একটি মাওকুফ বর্ণনায় এই বিষয়টি এসেছে। সম্মুখে বেডে বলা হচ্ছে-ঘরের পিছন দিয়ে আগমনে পুণ্য নেই। বরং খোদাভীরুতার মধ্যেই পুণ্য রয়েছে। তোমরা গৃহের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হাদীস রয়েছে-‘অজ্ঞতার যুগে প্রথা ছিল যে, মানুষ ইহরামের অবস্থায় থাকলে বাড়ীতে পিছন দিক দিয়ে প্রবেশ করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আবু দাউদ ও তায়ালেসীর হাদীস গ্রন্থেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। মদীনার আনসারদের সাধারণ প্রথা এই ছিল যে, সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তারা বাড়ীতে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতো না। প্রকৃতপক্ষে অজ্ঞতার যুগের কুরাইশরা নিজেদের জন্যে এটাও একটা স্বাতন্ত্র্য স্থাপন করেছিল যে, তারা নিজেদের নাম ‘হুমুস’ রেখেছিল। ইহরামের অবস্থায় এরা সোজা পথে গৃহে প্রবেশ করতে পারতো; কিন্তু বাকি লোকেরা এভাবে যেতো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বাগানে অবস্থান করছিলেন। ওখান থেকে তিনি ওটার দরজা দিয়ে বের হন। হযরত কুতবাহ বিন আমর (রাঃ) নামক তাঁর একজন আনসারী সাহাবীও তাঁর সাথে ঐ দরজা দিয়েই বের হন। তখন জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ইনিতো একজন ব্যবসায়ী মানুষ। ইনি আপনার সাথে আপনার মতই দরজা দিয়ে বের হলেন কেন:' তখন হযরত কুতবাহ বিন আমের (রাঃ) উত্তর দেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যা করতে দেখেছি তাই করেছি। আমি স্বীকার করি যে, তিনি হুমুসের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আমিও তো তাঁর ধর্মের উপরে রয়েছি।' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেনঃ ‘অজ্ঞতার যুগে বহু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথা চালু ছিল যে, যখন তারা সফরের উদ্দেশ্যে বের হতো তখন যদি কোন কারণবশতঃ সফরকে অর্ধ সমাপ্ত অবস্থায় ছেড়ে ফিরে আসতো তবে তারা দরজা দিয়ে গৃহে প্রবেশ করতো না, বরং পিছনের দিক দিয়ে আসতো। এই আয়াত দ্বারা তাদেরকে ঐ কুপ্রথা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেন যে, ইতিফাকের অবস্থাতেও এই প্রথাই ছিল। ইসলাম তা উঠিয়ে দিয়েছে। আতা (রঃ) বলেন যে,মদীনাবাসীর ঈদসমূহেও এই প্রথাই চালু ছিল। ইসলাম তা বিলুপ্ত করেছে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন করা, তাঁর নিষিদ্ধ কার্যাবলী হতে বিরত থাকা, অন্তরে তার ভয় রাখা, এগুলো প্রকৃতপক্ষে ঐ দিন কাজে আসবে যেদিন প্রত্যেকে আল্লাহ তা'আলার সামনে উপস্থিত হবে এবং তাদেরকে পূর্ণভাবে প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে।
আল-বাকারা 2:190
১৯০-১৯৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মদীনা শরীফে জিহাদের হুকুম এটাই প্রথম অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র ঐ লোকদের সাথে যুদ্ধ করতেন যারা তার সাথে যুদ্ধ করতো। যারা তার সাথে যুদ্ধ করতে না তিনিও তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন না। অবশেষে সূরা-ই-বারাআত অবতীর্ণ হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ আসলাম (রঃ) একথা পর্যন্ত বলেন যে, এই আয়াতটি রহিত। এটাকে রহিত করার আয়াত হচ্ছে।(আরবি) (৯:৫) এই আয়াতটি। অর্থাৎ ‘মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।' কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। কেননা এটা তো শুধু মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা যে, তারা তাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ করছে না কেন যারা তাদের ও তাদের ধর্মের প্রকাশ্য শত্রু: ঐ মুশরিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছে তেমনই মুসলমানদেরও উচিত তাদের সাথে যুদ্ধ করা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা সমবেতভাবে মুশরিকদের সাথে সংগ্রাম কর যেমন তোমাদের সাথে তারা সমবেত ভাবে যুদ্ধ করে।' (৯:৩৬) এখানেও বলা হয়েছে তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেখান হতে বের করে দাও যেখান হতে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। ভাবার্থ এই যে, হে মুসলমানগণ! তাদের উদ্দেশ্য যেমন তোমাদেরকে হত্যা করা ও নির্বাসন দেয়া তেমনই এর প্রতিশোধ হিসেবে তোমাদেরও এরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, সীমা অতিক্রমকারীদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন না। অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণ করো না। নাক, কান ইত্যাদি কেটো না, বিশ্বাসঘাতকতা ও চুরি করো না এবং শিশুদেরকে হত্যা করো না। ঐ বুড়োদেরকেও হত্যা করো না যাদের যুদ্ধ করার যোগ্যতা নেই এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। সংসার ত্যাগীদেরকেও হত্যা করো না। বিনা কারণে তাদের বৃক্ষাদি কেটে ফেলোনা এবং তাদের জীব-জন্তুগুলো ধ্বংস করো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এই আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, চুক্তি ভঙ্গ হতে বিরত থাকবে, নাক কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেবে না, শিশুদেরকে ও সংসার বিরাগীদেরকে হত্যা করবে না যারা উপাসনা গৃহে পড়ে থাকে।মুসনাদ-ই-আহমাদে একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ আল্লাহ তা'আলার নামে বেরিয়ে যাও, বাড়াবাড়ি করো না, প্রতারণা করো না শত্রুদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেটো না, দরবেশদেরকে হত্যা করো না।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,একবার এক যুদ্ধে একটি স্ত্রী লোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটাকে অত্যন্ত খারাপ মনে করেন এবং স্ত্রী লোক ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে দেন। মুসনাদ-ই আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক, দুই, তিন, পাঁচ, সাত, নয় এবং এগারোটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। একটি প্রকাশ করেন এবং অন্যগুলো ছেড়ে দেন। তিনি বলেনঃ কতকগুলো লোক দুর্বল ও দরিদ্র ছিল। শক্তিশালী ও ধনবান শক্ররা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। আল্লাহ তা'আলা ঐ দুর্বলদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদেরকে ঐ শক্তিশালীদের উপর জয়যুক্ত করেন। এখন এই লোকগুলো তাদের উপর অত্যাচারও বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর রাগান্বিত হবেন। এই হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ। ভাবার্থ এই যে, এই দুর্বল সম্প্রদায় যখন বিজয়ী হয়ে যায় তখন তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে গ্রাহ্য না করে অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। এই সম্বন্ধে বহু হাদীস রয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার ভাবে প্রকাশ পেলো যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচার ও সীমা অতিক্রমকে ভালবাসেন না এবং এই প্রকার লোকের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হন। যেহেতু জিহাদের নির্দেশাবলীর মধ্যে বাহ্যত হত্যা ও রক্তারক্তি রয়েছে, এজন্যেই তিনি বলেন যে, এদিকে যদি খুনাখুনি ও কাটাকাটি থাকে তবে ঐদিকে রয়েছে শিরক ও কুফর এবং সেই মালিকের পথ থেকে তাঁর সৃষ্ঠজীবকে বিরত রাখা এবং এটা হচ্ছে সরাসরি অশান্তি সৃষ্টি করা, আর হত্যা অপেক্ষা অশান্তি সৃষ্টিই হচ্ছে বেশী গুরুতর। আৰূ মালিক (রঃ) বলেন-“তোমাদের এইসব পাপ কর্ম হত্যা অপেক্ষাও বেশী বিশ্রী।'অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ তাআলার ঘরের মধ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করো যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা মর্যাদা সম্পন্ন শহর। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সম্মানিত শহর হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকবে। শুধু সামান্য সময়ের জন্যে ওটাকে আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যে হালাল করেছিলেন। কিন্তু এটা আজ এসময়েও মহা সম্মানিতই রয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর এই সম্মান অবশিষ্ট থাকবে। এর বৃক্ষরাজি কাটা হবে না, এর কাঁটাসমূহ উপড়িয়ে ফেলা হবে না। যদি কোন ব্যক্তি এর মধ্যে যুদ্ধকে বৈধ বলে এবং আমার যুদ্ধকে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে তবে তাকে বলে দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর রাসূলের (সঃ) জন্যে অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তোমাদের জন্যে কোন অনুমতি নেই। তাঁর এই নির্দেশের ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা বিজয়ের দিন। কতকগুলো আলেম কিন্তু একথাও বলেন যে, মক্কা বিজয় সন্ধির মাধ্যমে হয়েছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি তার দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ, যে মসজিদে চলে যাবে সেও নিরাপদ, যে আবু সুফইয়ানের গৃহে চলে যাবে সেও নিরাপদ। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা যদি এখানে (বায়তুল্লাহ শরীফে) তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তবে তোমাদেরকেও অনুমতি দেয়া হচ্ছে যে, তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যাতে এ অত্যাচার দূর হতে পারে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হুদায়বিয়ায় স্বীয় সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট যুদ্ধের বায়'আত গ্রহণ করেন, যখন কুরাইশরা এবং তাদের সঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বৃক্ষের নীচে সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট বায়'আত নিয়েছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ এই যুদ্ধ প্রতিহত করেন। এই নিয়ামতের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের এই আয়াতে দিয়েছেন।(আরবি)অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মক্কার অভ্যন্তরে তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করার পরে তাদের হাতগুলোকে তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাতগুলোকে তাদের হতে বিরত রাখেন।' (৪৮:২৪)অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যদি এই কাফেররা বায়তুল্লাহ শরীফে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় তবে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। যদিও তারা মুসলমানদেরকে হারাম শরীফে হত্যা করেছে তবুও আল্লাহ তা'আলা এত বড় পাপকেও ক্ষমা করে দেবেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তার পরে নির্দেশ হচ্ছে-ঐ মুশরিকদের সাথে জিহাদ চালু রাখতে। যাতে এই শিরকের অশান্তি দূরীভূত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয় ও সমস্ত ধর্মের উপর প্রভুত্ব লাভ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছ, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখাবার জন্যে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার জন্যে ও জেদের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে এবং এক ব্যক্তি শুধু মানুষকে দেখাবার জন্যে জিহাদ করে, তবে এদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কে: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদকারী শুধু ঐ ব্যক্তি যে এই জন্যেই যুদ্ধ করে যে,যেন তার কথা সুউচ্চ হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যে পর্যন্ত না তারা (আরবি) বলে। যখন তারা এটা বলবে তখন তারা ইসলামের হক ছাড়া তাদের রক্ত ও সম্পদ আমা হতে বাঁচিয়ে নেবে এবং তাদের (ভিতরের) হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি এই কাফিরেরা শিরক ও কুফর হতে এবং তোমাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকে তবে তোমরা তাদের থেকে বিরত থাক। এর পর যে যুদ্ধ করবে সে অত্যাচারী হবে এবং অত্যাচারীদেরকে অত্যাচারের প্রতিদান দেয়া অবশ্য কর্তব্য। হযরত মুজাহিদের (রঃ) যে যুদ্ধ করে শুধু তার সাথেই যুদ্ধ করতে হবে’-এই উক্তির ভাবার্থ এটাই। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে,যদি তারা এসব কাজ হতে বিরত থাকে তবে তো তারা যুলুম ও শিরুক থেকে বিরত থাকলো। সুতরাং তাদের সাথে যুদ্ধ করার আর কোন কারণ নেই। এখানে (আরবি) শব্দটি শক্তি প্রয়োগের অর্থে এসেছে। তবে এটা শক্তি প্রয়োগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি প্রয়োগ। প্রকৃতপক্ষে এটা শক্তি প্রয়োগ নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যারা তোমাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে তবে তোমরাও তাদের সঙ্গে সেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি কর যেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি তারা তোমাদের উপর করেছে।' (২:১৯৪) অন্য জায়গায় আছে (আরবি) অর্থাৎ অন্যায়ের বিনিময় হচ্ছে ঐ পরিমাণই অন্যায়।' (৪২:৪০) অন্য স্থানে আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি তোমরা শাস্তি প্রদান কর তবে সেই পরিমাণই শাস্তি প্রদান কর, যে পরিমাণ শাস্তি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।' (১৬:১২৬) সুতরাং এই তিন জায়গায় বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তির কথা বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে, নচেৎ প্রকৃতপক্ষে ওটা বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তি নয়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রকৃত অত্যাচারী ঐ ব্যক্তি যে (আরবি) এই কালেমাকে অস্বীকার করে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর উপর জনগণ আক্রমণ চালিয়েছিল সেই সময় দুই ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে বলেনঃ ‘মানুষতো কাটাকাটি মারামরি করতে রয়েছে। আপনি। হযরত উমারের (রাঃ) পুত্র এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী। আপনি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন না কেন:' তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমান ভাইয়ের রক্ত হারাম করে দিয়েছেন। তারা বলেনঃ “এই নির্দেশ কি আল্লাহ তা'আলার নয় যে, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো যে পর্যন্ত অশান্তি অবশিষ্ট থাকে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমরা তো যুদ্ধ করতে থেকেছি, শেষ পর্যন্ত অশান্তি দূর হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তা'আলার পছন্দনীয় ধর্ম জয়যুক্ত হয়েছে। এখন তোমরা চাচ্ছ যে, তোমরা যুদ্ধ করতে থাকবে যেন আবার অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য ধর্মগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কোন একজন লোক তাকে বলেনঃ হে আবু আব্দির রহমান! আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছেন কেন: আপনি এই পন্থা গ্রহণ করেছেন যে,হজ্বের পর হজ্ব করে চলেছেন, প্রতি দ্বিতীয় বছরে হজ্ব করে থাকেন, অথচ হজ্বের ফযীলত আপনার নিকট গোপনীয় নয়। তখন তিনি বলেনঃ “ হে ভ্রাতুস্পুত্র! জেনে রেখো যে, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি (১) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান আনয়ন করা (২) পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রতিষ্ঠিত করা (৩) রমযানের রোযা রাখা (৪) যাকাত প্রদান করা (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব করা।তখন লোকটি বলেনঃ আপনি কি কুরআন পাকের এই নির্দেশ শুনেননি মুসলমানদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। অতঃপর এর পরেও যদি একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তবে তোমরা বিদ্রোহী দলটির সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা পুনরায় আল্লাহর বাধ্য হয়ে যায়। অন্য জায়গায় রয়েছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না অশান্তি দূরীভূত হয়।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে আমরা এর উপর আমল করেছি। তখন ইসলাম দুর্বল ছিল এবং মুসলমানদের সংখ্যা অল্প ছিল। যে ইসলাম গ্রহণ করতো তার উপর অশান্তি এসে পড়তো। তাকে হয় হত্যা করা হতো না হয় কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। অবশেষে এই পবিত্র ধর্ম বিস্তার লাভ করেছে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে ও অশান্তি সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে।' লোকটি তখন বলেন, “আচ্ছা তাহলে বলুন যে, হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি: তিনি বলেনঃ হযরত উসমানকে (রাঃ) তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেছেন, যদিও তোমরা এটা পছন্দ কর না। আর হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর আপন চাচাতো ভাই ও তার জামাতা ছিলেন, অতঃপর অঙ্গুলির ইশারায় বলেন এই হচ্ছে তার বাড়ী যা তোমাদের সামনে রয়েছে।'
আল-বাকারা 2:191
১৯০-১৯৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মদীনা শরীফে জিহাদের হুকুম এটাই প্রথম অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র ঐ লোকদের সাথে যুদ্ধ করতেন যারা তার সাথে যুদ্ধ করতো। যারা তার সাথে যুদ্ধ করতে না তিনিও তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন না। অবশেষে সূরা-ই-বারাআত অবতীর্ণ হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ আসলাম (রঃ) একথা পর্যন্ত বলেন যে, এই আয়াতটি রহিত। এটাকে রহিত করার আয়াত হচ্ছে।(আরবি) (৯:৫) এই আয়াতটি। অর্থাৎ ‘মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।' কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। কেননা এটা তো শুধু মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা যে, তারা তাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ করছে না কেন যারা তাদের ও তাদের ধর্মের প্রকাশ্য শত্রু: ঐ মুশরিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছে তেমনই মুসলমানদেরও উচিত তাদের সাথে যুদ্ধ করা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা সমবেতভাবে মুশরিকদের সাথে সংগ্রাম কর যেমন তোমাদের সাথে তারা সমবেত ভাবে যুদ্ধ করে।' (৯:৩৬) এখানেও বলা হয়েছে তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেখান হতে বের করে দাও যেখান হতে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। ভাবার্থ এই যে, হে মুসলমানগণ! তাদের উদ্দেশ্য যেমন তোমাদেরকে হত্যা করা ও নির্বাসন দেয়া তেমনই এর প্রতিশোধ হিসেবে তোমাদেরও এরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, সীমা অতিক্রমকারীদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন না। অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণ করো না। নাক, কান ইত্যাদি কেটো না, বিশ্বাসঘাতকতা ও চুরি করো না এবং শিশুদেরকে হত্যা করো না। ঐ বুড়োদেরকেও হত্যা করো না যাদের যুদ্ধ করার যোগ্যতা নেই এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। সংসার ত্যাগীদেরকেও হত্যা করো না। বিনা কারণে তাদের বৃক্ষাদি কেটে ফেলোনা এবং তাদের জীব-জন্তুগুলো ধ্বংস করো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এই আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, চুক্তি ভঙ্গ হতে বিরত থাকবে, নাক কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেবে না, শিশুদেরকে ও সংসার বিরাগীদেরকে হত্যা করবে না যারা উপাসনা গৃহে পড়ে থাকে।মুসনাদ-ই-আহমাদে একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ আল্লাহ তা'আলার নামে বেরিয়ে যাও, বাড়াবাড়ি করো না, প্রতারণা করো না শত্রুদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেটো না, দরবেশদেরকে হত্যা করো না।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,একবার এক যুদ্ধে একটি স্ত্রী লোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটাকে অত্যন্ত খারাপ মনে করেন এবং স্ত্রী লোক ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে দেন। মুসনাদ-ই আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক, দুই, তিন, পাঁচ, সাত, নয় এবং এগারোটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। একটি প্রকাশ করেন এবং অন্যগুলো ছেড়ে দেন। তিনি বলেনঃ কতকগুলো লোক দুর্বল ও দরিদ্র ছিল। শক্তিশালী ও ধনবান শক্ররা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। আল্লাহ তা'আলা ঐ দুর্বলদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদেরকে ঐ শক্তিশালীদের উপর জয়যুক্ত করেন। এখন এই লোকগুলো তাদের উপর অত্যাচারও বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর রাগান্বিত হবেন। এই হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ। ভাবার্থ এই যে, এই দুর্বল সম্প্রদায় যখন বিজয়ী হয়ে যায় তখন তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে গ্রাহ্য না করে অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। এই সম্বন্ধে বহু হাদীস রয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার ভাবে প্রকাশ পেলো যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচার ও সীমা অতিক্রমকে ভালবাসেন না এবং এই প্রকার লোকের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হন। যেহেতু জিহাদের নির্দেশাবলীর মধ্যে বাহ্যত হত্যা ও রক্তারক্তি রয়েছে, এজন্যেই তিনি বলেন যে, এদিকে যদি খুনাখুনি ও কাটাকাটি থাকে তবে ঐদিকে রয়েছে শিরক ও কুফর এবং সেই মালিকের পথ থেকে তাঁর সৃষ্ঠজীবকে বিরত রাখা এবং এটা হচ্ছে সরাসরি অশান্তি সৃষ্টি করা, আর হত্যা অপেক্ষা অশান্তি সৃষ্টিই হচ্ছে বেশী গুরুতর। আৰূ মালিক (রঃ) বলেন-“তোমাদের এইসব পাপ কর্ম হত্যা অপেক্ষাও বেশী বিশ্রী।'অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ তাআলার ঘরের মধ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করো যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা মর্যাদা সম্পন্ন শহর। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সম্মানিত শহর হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকবে। শুধু সামান্য সময়ের জন্যে ওটাকে আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যে হালাল করেছিলেন। কিন্তু এটা আজ এসময়েও মহা সম্মানিতই রয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর এই সম্মান অবশিষ্ট থাকবে। এর বৃক্ষরাজি কাটা হবে না, এর কাঁটাসমূহ উপড়িয়ে ফেলা হবে না। যদি কোন ব্যক্তি এর মধ্যে যুদ্ধকে বৈধ বলে এবং আমার যুদ্ধকে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে তবে তাকে বলে দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর রাসূলের (সঃ) জন্যে অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তোমাদের জন্যে কোন অনুমতি নেই। তাঁর এই নির্দেশের ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা বিজয়ের দিন। কতকগুলো আলেম কিন্তু একথাও বলেন যে, মক্কা বিজয় সন্ধির মাধ্যমে হয়েছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি তার দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ, যে মসজিদে চলে যাবে সেও নিরাপদ, যে আবু সুফইয়ানের গৃহে চলে যাবে সেও নিরাপদ। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা যদি এখানে (বায়তুল্লাহ শরীফে) তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তবে তোমাদেরকেও অনুমতি দেয়া হচ্ছে যে, তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যাতে এ অত্যাচার দূর হতে পারে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হুদায়বিয়ায় স্বীয় সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট যুদ্ধের বায়'আত গ্রহণ করেন, যখন কুরাইশরা এবং তাদের সঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বৃক্ষের নীচে সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট বায়'আত নিয়েছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ এই যুদ্ধ প্রতিহত করেন। এই নিয়ামতের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের এই আয়াতে দিয়েছেন।(আরবি)অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মক্কার অভ্যন্তরে তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করার পরে তাদের হাতগুলোকে তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাতগুলোকে তাদের হতে বিরত রাখেন।' (৪৮:২৪)অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যদি এই কাফেররা বায়তুল্লাহ শরীফে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় তবে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। যদিও তারা মুসলমানদেরকে হারাম শরীফে হত্যা করেছে তবুও আল্লাহ তা'আলা এত বড় পাপকেও ক্ষমা করে দেবেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তার পরে নির্দেশ হচ্ছে-ঐ মুশরিকদের সাথে জিহাদ চালু রাখতে। যাতে এই শিরকের অশান্তি দূরীভূত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয় ও সমস্ত ধর্মের উপর প্রভুত্ব লাভ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছ, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখাবার জন্যে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার জন্যে ও জেদের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে এবং এক ব্যক্তি শুধু মানুষকে দেখাবার জন্যে জিহাদ করে, তবে এদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কে: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদকারী শুধু ঐ ব্যক্তি যে এই জন্যেই যুদ্ধ করে যে,যেন তার কথা সুউচ্চ হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যে পর্যন্ত না তারা (আরবি) বলে। যখন তারা এটা বলবে তখন তারা ইসলামের হক ছাড়া তাদের রক্ত ও সম্পদ আমা হতে বাঁচিয়ে নেবে এবং তাদের (ভিতরের) হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি এই কাফিরেরা শিরক ও কুফর হতে এবং তোমাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকে তবে তোমরা তাদের থেকে বিরত থাক। এর পর যে যুদ্ধ করবে সে অত্যাচারী হবে এবং অত্যাচারীদেরকে অত্যাচারের প্রতিদান দেয়া অবশ্য কর্তব্য। হযরত মুজাহিদের (রঃ) যে যুদ্ধ করে শুধু তার সাথেই যুদ্ধ করতে হবে’-এই উক্তির ভাবার্থ এটাই। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে,যদি তারা এসব কাজ হতে বিরত থাকে তবে তো তারা যুলুম ও শিরুক থেকে বিরত থাকলো। সুতরাং তাদের সাথে যুদ্ধ করার আর কোন কারণ নেই। এখানে (আরবি) শব্দটি শক্তি প্রয়োগের অর্থে এসেছে। তবে এটা শক্তি প্রয়োগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি প্রয়োগ। প্রকৃতপক্ষে এটা শক্তি প্রয়োগ নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যারা তোমাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে তবে তোমরাও তাদের সঙ্গে সেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি কর যেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি তারা তোমাদের উপর করেছে।' (২:১৯৪) অন্য জায়গায় আছে (আরবি) অর্থাৎ অন্যায়ের বিনিময় হচ্ছে ঐ পরিমাণই অন্যায়।' (৪২:৪০) অন্য স্থানে আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি তোমরা শাস্তি প্রদান কর তবে সেই পরিমাণই শাস্তি প্রদান কর, যে পরিমাণ শাস্তি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।' (১৬:১২৬) সুতরাং এই তিন জায়গায় বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তির কথা বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে, নচেৎ প্রকৃতপক্ষে ওটা বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তি নয়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রকৃত অত্যাচারী ঐ ব্যক্তি যে (আরবি) এই কালেমাকে অস্বীকার করে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর উপর জনগণ আক্রমণ চালিয়েছিল সেই সময় দুই ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে বলেনঃ ‘মানুষতো কাটাকাটি মারামরি করতে রয়েছে। আপনি। হযরত উমারের (রাঃ) পুত্র এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী। আপনি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন না কেন:' তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমান ভাইয়ের রক্ত হারাম করে দিয়েছেন। তারা বলেনঃ “এই নির্দেশ কি আল্লাহ তা'আলার নয় যে, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো যে পর্যন্ত অশান্তি অবশিষ্ট থাকে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমরা তো যুদ্ধ করতে থেকেছি, শেষ পর্যন্ত অশান্তি দূর হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তা'আলার পছন্দনীয় ধর্ম জয়যুক্ত হয়েছে। এখন তোমরা চাচ্ছ যে, তোমরা যুদ্ধ করতে থাকবে যেন আবার অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য ধর্মগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কোন একজন লোক তাকে বলেনঃ হে আবু আব্দির রহমান! আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছেন কেন: আপনি এই পন্থা গ্রহণ করেছেন যে,হজ্বের পর হজ্ব করে চলেছেন, প্রতি দ্বিতীয় বছরে হজ্ব করে থাকেন, অথচ হজ্বের ফযীলত আপনার নিকট গোপনীয় নয়। তখন তিনি বলেনঃ “ হে ভ্রাতুস্পুত্র! জেনে রেখো যে, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি (১) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান আনয়ন করা (২) পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রতিষ্ঠিত করা (৩) রমযানের রোযা রাখা (৪) যাকাত প্রদান করা (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব করা।তখন লোকটি বলেনঃ আপনি কি কুরআন পাকের এই নির্দেশ শুনেননি মুসলমানদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। অতঃপর এর পরেও যদি একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তবে তোমরা বিদ্রোহী দলটির সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা পুনরায় আল্লাহর বাধ্য হয়ে যায়। অন্য জায়গায় রয়েছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না অশান্তি দূরীভূত হয়।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে আমরা এর উপর আমল করেছি। তখন ইসলাম দুর্বল ছিল এবং মুসলমানদের সংখ্যা অল্প ছিল। যে ইসলাম গ্রহণ করতো তার উপর অশান্তি এসে পড়তো। তাকে হয় হত্যা করা হতো না হয় কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। অবশেষে এই পবিত্র ধর্ম বিস্তার লাভ করেছে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে ও অশান্তি সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে।' লোকটি তখন বলেন, “আচ্ছা তাহলে বলুন যে, হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি: তিনি বলেনঃ হযরত উসমানকে (রাঃ) তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেছেন, যদিও তোমরা এটা পছন্দ কর না। আর হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর আপন চাচাতো ভাই ও তার জামাতা ছিলেন, অতঃপর অঙ্গুলির ইশারায় বলেন এই হচ্ছে তার বাড়ী যা তোমাদের সামনে রয়েছে।'
আল-বাকারা 2:192
১৯০-১৯৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মদীনা শরীফে জিহাদের হুকুম এটাই প্রথম অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র ঐ লোকদের সাথে যুদ্ধ করতেন যারা তার সাথে যুদ্ধ করতো। যারা তার সাথে যুদ্ধ করতে না তিনিও তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন না। অবশেষে সূরা-ই-বারাআত অবতীর্ণ হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ আসলাম (রঃ) একথা পর্যন্ত বলেন যে, এই আয়াতটি রহিত। এটাকে রহিত করার আয়াত হচ্ছে।(আরবি) (৯:৫) এই আয়াতটি। অর্থাৎ ‘মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।' কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। কেননা এটা তো শুধু মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা যে, তারা তাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ করছে না কেন যারা তাদের ও তাদের ধর্মের প্রকাশ্য শত্রু: ঐ মুশরিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছে তেমনই মুসলমানদেরও উচিত তাদের সাথে যুদ্ধ করা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা সমবেতভাবে মুশরিকদের সাথে সংগ্রাম কর যেমন তোমাদের সাথে তারা সমবেত ভাবে যুদ্ধ করে।' (৯:৩৬) এখানেও বলা হয়েছে তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেখান হতে বের করে দাও যেখান হতে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। ভাবার্থ এই যে, হে মুসলমানগণ! তাদের উদ্দেশ্য যেমন তোমাদেরকে হত্যা করা ও নির্বাসন দেয়া তেমনই এর প্রতিশোধ হিসেবে তোমাদেরও এরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, সীমা অতিক্রমকারীদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন না। অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণ করো না। নাক, কান ইত্যাদি কেটো না, বিশ্বাসঘাতকতা ও চুরি করো না এবং শিশুদেরকে হত্যা করো না। ঐ বুড়োদেরকেও হত্যা করো না যাদের যুদ্ধ করার যোগ্যতা নেই এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। সংসার ত্যাগীদেরকেও হত্যা করো না। বিনা কারণে তাদের বৃক্ষাদি কেটে ফেলোনা এবং তাদের জীব-জন্তুগুলো ধ্বংস করো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এই আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, চুক্তি ভঙ্গ হতে বিরত থাকবে, নাক কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেবে না, শিশুদেরকে ও সংসার বিরাগীদেরকে হত্যা করবে না যারা উপাসনা গৃহে পড়ে থাকে।মুসনাদ-ই-আহমাদে একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ আল্লাহ তা'আলার নামে বেরিয়ে যাও, বাড়াবাড়ি করো না, প্রতারণা করো না শত্রুদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেটো না, দরবেশদেরকে হত্যা করো না।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,একবার এক যুদ্ধে একটি স্ত্রী লোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটাকে অত্যন্ত খারাপ মনে করেন এবং স্ত্রী লোক ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে দেন। মুসনাদ-ই আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক, দুই, তিন, পাঁচ, সাত, নয় এবং এগারোটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। একটি প্রকাশ করেন এবং অন্যগুলো ছেড়ে দেন। তিনি বলেনঃ কতকগুলো লোক দুর্বল ও দরিদ্র ছিল। শক্তিশালী ও ধনবান শক্ররা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। আল্লাহ তা'আলা ঐ দুর্বলদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদেরকে ঐ শক্তিশালীদের উপর জয়যুক্ত করেন। এখন এই লোকগুলো তাদের উপর অত্যাচারও বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর রাগান্বিত হবেন। এই হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ। ভাবার্থ এই যে, এই দুর্বল সম্প্রদায় যখন বিজয়ী হয়ে যায় তখন তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে গ্রাহ্য না করে অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। এই সম্বন্ধে বহু হাদীস রয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার ভাবে প্রকাশ পেলো যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচার ও সীমা অতিক্রমকে ভালবাসেন না এবং এই প্রকার লোকের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হন। যেহেতু জিহাদের নির্দেশাবলীর মধ্যে বাহ্যত হত্যা ও রক্তারক্তি রয়েছে, এজন্যেই তিনি বলেন যে, এদিকে যদি খুনাখুনি ও কাটাকাটি থাকে তবে ঐদিকে রয়েছে শিরক ও কুফর এবং সেই মালিকের পথ থেকে তাঁর সৃষ্ঠজীবকে বিরত রাখা এবং এটা হচ্ছে সরাসরি অশান্তি সৃষ্টি করা, আর হত্যা অপেক্ষা অশান্তি সৃষ্টিই হচ্ছে বেশী গুরুতর। আৰূ মালিক (রঃ) বলেন-“তোমাদের এইসব পাপ কর্ম হত্যা অপেক্ষাও বেশী বিশ্রী।'অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ তাআলার ঘরের মধ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করো যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা মর্যাদা সম্পন্ন শহর। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সম্মানিত শহর হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকবে। শুধু সামান্য সময়ের জন্যে ওটাকে আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যে হালাল করেছিলেন। কিন্তু এটা আজ এসময়েও মহা সম্মানিতই রয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর এই সম্মান অবশিষ্ট থাকবে। এর বৃক্ষরাজি কাটা হবে না, এর কাঁটাসমূহ উপড়িয়ে ফেলা হবে না। যদি কোন ব্যক্তি এর মধ্যে যুদ্ধকে বৈধ বলে এবং আমার যুদ্ধকে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে তবে তাকে বলে দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর রাসূলের (সঃ) জন্যে অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তোমাদের জন্যে কোন অনুমতি নেই। তাঁর এই নির্দেশের ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা বিজয়ের দিন। কতকগুলো আলেম কিন্তু একথাও বলেন যে, মক্কা বিজয় সন্ধির মাধ্যমে হয়েছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি তার দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ, যে মসজিদে চলে যাবে সেও নিরাপদ, যে আবু সুফইয়ানের গৃহে চলে যাবে সেও নিরাপদ। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা যদি এখানে (বায়তুল্লাহ শরীফে) তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তবে তোমাদেরকেও অনুমতি দেয়া হচ্ছে যে, তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যাতে এ অত্যাচার দূর হতে পারে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হুদায়বিয়ায় স্বীয় সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট যুদ্ধের বায়'আত গ্রহণ করেন, যখন কুরাইশরা এবং তাদের সঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বৃক্ষের নীচে সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট বায়'আত নিয়েছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ এই যুদ্ধ প্রতিহত করেন। এই নিয়ামতের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের এই আয়াতে দিয়েছেন।(আরবি)অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মক্কার অভ্যন্তরে তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করার পরে তাদের হাতগুলোকে তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাতগুলোকে তাদের হতে বিরত রাখেন।' (৪৮:২৪)অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যদি এই কাফেররা বায়তুল্লাহ শরীফে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় তবে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। যদিও তারা মুসলমানদেরকে হারাম শরীফে হত্যা করেছে তবুও আল্লাহ তা'আলা এত বড় পাপকেও ক্ষমা করে দেবেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তার পরে নির্দেশ হচ্ছে-ঐ মুশরিকদের সাথে জিহাদ চালু রাখতে। যাতে এই শিরকের অশান্তি দূরীভূত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয় ও সমস্ত ধর্মের উপর প্রভুত্ব লাভ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছ, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখাবার জন্যে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার জন্যে ও জেদের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে এবং এক ব্যক্তি শুধু মানুষকে দেখাবার জন্যে জিহাদ করে, তবে এদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কে: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদকারী শুধু ঐ ব্যক্তি যে এই জন্যেই যুদ্ধ করে যে,যেন তার কথা সুউচ্চ হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যে পর্যন্ত না তারা (আরবি) বলে। যখন তারা এটা বলবে তখন তারা ইসলামের হক ছাড়া তাদের রক্ত ও সম্পদ আমা হতে বাঁচিয়ে নেবে এবং তাদের (ভিতরের) হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি এই কাফিরেরা শিরক ও কুফর হতে এবং তোমাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকে তবে তোমরা তাদের থেকে বিরত থাক। এর পর যে যুদ্ধ করবে সে অত্যাচারী হবে এবং অত্যাচারীদেরকে অত্যাচারের প্রতিদান দেয়া অবশ্য কর্তব্য। হযরত মুজাহিদের (রঃ) যে যুদ্ধ করে শুধু তার সাথেই যুদ্ধ করতে হবে’-এই উক্তির ভাবার্থ এটাই। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে,যদি তারা এসব কাজ হতে বিরত থাকে তবে তো তারা যুলুম ও শিরুক থেকে বিরত থাকলো। সুতরাং তাদের সাথে যুদ্ধ করার আর কোন কারণ নেই। এখানে (আরবি) শব্দটি শক্তি প্রয়োগের অর্থে এসেছে। তবে এটা শক্তি প্রয়োগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি প্রয়োগ। প্রকৃতপক্ষে এটা শক্তি প্রয়োগ নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যারা তোমাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে তবে তোমরাও তাদের সঙ্গে সেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি কর যেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি তারা তোমাদের উপর করেছে।' (২:১৯৪) অন্য জায়গায় আছে (আরবি) অর্থাৎ অন্যায়ের বিনিময় হচ্ছে ঐ পরিমাণই অন্যায়।' (৪২:৪০) অন্য স্থানে আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি তোমরা শাস্তি প্রদান কর তবে সেই পরিমাণই শাস্তি প্রদান কর, যে পরিমাণ শাস্তি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।' (১৬:১২৬) সুতরাং এই তিন জায়গায় বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তির কথা বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে, নচেৎ প্রকৃতপক্ষে ওটা বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তি নয়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রকৃত অত্যাচারী ঐ ব্যক্তি যে (আরবি) এই কালেমাকে অস্বীকার করে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর উপর জনগণ আক্রমণ চালিয়েছিল সেই সময় দুই ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে বলেনঃ ‘মানুষতো কাটাকাটি মারামরি করতে রয়েছে। আপনি। হযরত উমারের (রাঃ) পুত্র এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী। আপনি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন না কেন:' তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমান ভাইয়ের রক্ত হারাম করে দিয়েছেন। তারা বলেনঃ “এই নির্দেশ কি আল্লাহ তা'আলার নয় যে, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো যে পর্যন্ত অশান্তি অবশিষ্ট থাকে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমরা তো যুদ্ধ করতে থেকেছি, শেষ পর্যন্ত অশান্তি দূর হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তা'আলার পছন্দনীয় ধর্ম জয়যুক্ত হয়েছে। এখন তোমরা চাচ্ছ যে, তোমরা যুদ্ধ করতে থাকবে যেন আবার অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য ধর্মগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কোন একজন লোক তাকে বলেনঃ হে আবু আব্দির রহমান! আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছেন কেন: আপনি এই পন্থা গ্রহণ করেছেন যে,হজ্বের পর হজ্ব করে চলেছেন, প্রতি দ্বিতীয় বছরে হজ্ব করে থাকেন, অথচ হজ্বের ফযীলত আপনার নিকট গোপনীয় নয়। তখন তিনি বলেনঃ “ হে ভ্রাতুস্পুত্র! জেনে রেখো যে, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি (১) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান আনয়ন করা (২) পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রতিষ্ঠিত করা (৩) রমযানের রোযা রাখা (৪) যাকাত প্রদান করা (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব করা।তখন লোকটি বলেনঃ আপনি কি কুরআন পাকের এই নির্দেশ শুনেননি মুসলমানদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। অতঃপর এর পরেও যদি একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তবে তোমরা বিদ্রোহী দলটির সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা পুনরায় আল্লাহর বাধ্য হয়ে যায়। অন্য জায়গায় রয়েছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না অশান্তি দূরীভূত হয়।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে আমরা এর উপর আমল করেছি। তখন ইসলাম দুর্বল ছিল এবং মুসলমানদের সংখ্যা অল্প ছিল। যে ইসলাম গ্রহণ করতো তার উপর অশান্তি এসে পড়তো। তাকে হয় হত্যা করা হতো না হয় কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। অবশেষে এই পবিত্র ধর্ম বিস্তার লাভ করেছে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে ও অশান্তি সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে।' লোকটি তখন বলেন, “আচ্ছা তাহলে বলুন যে, হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি: তিনি বলেনঃ হযরত উসমানকে (রাঃ) তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেছেন, যদিও তোমরা এটা পছন্দ কর না। আর হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর আপন চাচাতো ভাই ও তার জামাতা ছিলেন, অতঃপর অঙ্গুলির ইশারায় বলেন এই হচ্ছে তার বাড়ী যা তোমাদের সামনে রয়েছে।'
আল-বাকারা 2:193
১৯০-১৯৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মদীনা শরীফে জিহাদের হুকুম এটাই প্রথম অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র ঐ লোকদের সাথে যুদ্ধ করতেন যারা তার সাথে যুদ্ধ করতো। যারা তার সাথে যুদ্ধ করতে না তিনিও তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন না। অবশেষে সূরা-ই-বারাআত অবতীর্ণ হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ আসলাম (রঃ) একথা পর্যন্ত বলেন যে, এই আয়াতটি রহিত। এটাকে রহিত করার আয়াত হচ্ছে।(আরবি) (৯:৫) এই আয়াতটি। অর্থাৎ ‘মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।' কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। কেননা এটা তো শুধু মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা যে, তারা তাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ করছে না কেন যারা তাদের ও তাদের ধর্মের প্রকাশ্য শত্রু: ঐ মুশরিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছে তেমনই মুসলমানদেরও উচিত তাদের সাথে যুদ্ধ করা। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা সমবেতভাবে মুশরিকদের সাথে সংগ্রাম কর যেমন তোমাদের সাথে তারা সমবেত ভাবে যুদ্ধ করে।' (৯:৩৬) এখানেও বলা হয়েছে তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেখান হতে বের করে দাও যেখান হতে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। ভাবার্থ এই যে, হে মুসলমানগণ! তাদের উদ্দেশ্য যেমন তোমাদেরকে হত্যা করা ও নির্বাসন দেয়া তেমনই এর প্রতিশোধ হিসেবে তোমাদেরও এরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, সীমা অতিক্রমকারীদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন না। অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণ করো না। নাক, কান ইত্যাদি কেটো না, বিশ্বাসঘাতকতা ও চুরি করো না এবং শিশুদেরকে হত্যা করো না। ঐ বুড়োদেরকেও হত্যা করো না যাদের যুদ্ধ করার যোগ্যতা নেই এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। সংসার ত্যাগীদেরকেও হত্যা করো না। বিনা কারণে তাদের বৃক্ষাদি কেটে ফেলোনা এবং তাদের জীব-জন্তুগুলো ধ্বংস করো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এই আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, চুক্তি ভঙ্গ হতে বিরত থাকবে, নাক কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেবে না, শিশুদেরকে ও সংসার বিরাগীদেরকে হত্যা করবে না যারা উপাসনা গৃহে পড়ে থাকে।মুসনাদ-ই-আহমাদে একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ আল্লাহ তা'আলার নামে বেরিয়ে যাও, বাড়াবাড়ি করো না, প্রতারণা করো না শত্রুদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেটো না, দরবেশদেরকে হত্যা করো না।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,একবার এক যুদ্ধে একটি স্ত্রী লোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটাকে অত্যন্ত খারাপ মনে করেন এবং স্ত্রী লোক ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে দেন। মুসনাদ-ই আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক, দুই, তিন, পাঁচ, সাত, নয় এবং এগারোটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। একটি প্রকাশ করেন এবং অন্যগুলো ছেড়ে দেন। তিনি বলেনঃ কতকগুলো লোক দুর্বল ও দরিদ্র ছিল। শক্তিশালী ও ধনবান শক্ররা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। আল্লাহ তা'আলা ঐ দুর্বলদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদেরকে ঐ শক্তিশালীদের উপর জয়যুক্ত করেন। এখন এই লোকগুলো তাদের উপর অত্যাচারও বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর রাগান্বিত হবেন। এই হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ। ভাবার্থ এই যে, এই দুর্বল সম্প্রদায় যখন বিজয়ী হয়ে যায় তখন তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে গ্রাহ্য না করে অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। এই সম্বন্ধে বহু হাদীস রয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার ভাবে প্রকাশ পেলো যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচার ও সীমা অতিক্রমকে ভালবাসেন না এবং এই প্রকার লোকের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হন। যেহেতু জিহাদের নির্দেশাবলীর মধ্যে বাহ্যত হত্যা ও রক্তারক্তি রয়েছে, এজন্যেই তিনি বলেন যে, এদিকে যদি খুনাখুনি ও কাটাকাটি থাকে তবে ঐদিকে রয়েছে শিরক ও কুফর এবং সেই মালিকের পথ থেকে তাঁর সৃষ্ঠজীবকে বিরত রাখা এবং এটা হচ্ছে সরাসরি অশান্তি সৃষ্টি করা, আর হত্যা অপেক্ষা অশান্তি সৃষ্টিই হচ্ছে বেশী গুরুতর। আৰূ মালিক (রঃ) বলেন-“তোমাদের এইসব পাপ কর্ম হত্যা অপেক্ষাও বেশী বিশ্রী।'অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ তাআলার ঘরের মধ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করো যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা মর্যাদা সম্পন্ন শহর। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সম্মানিত শহর হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকবে। শুধু সামান্য সময়ের জন্যে ওটাকে আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যে হালাল করেছিলেন। কিন্তু এটা আজ এসময়েও মহা সম্মানিতই রয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর এই সম্মান অবশিষ্ট থাকবে। এর বৃক্ষরাজি কাটা হবে না, এর কাঁটাসমূহ উপড়িয়ে ফেলা হবে না। যদি কোন ব্যক্তি এর মধ্যে যুদ্ধকে বৈধ বলে এবং আমার যুদ্ধকে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে তবে তাকে বলে দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর রাসূলের (সঃ) জন্যে অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তোমাদের জন্যে কোন অনুমতি নেই। তাঁর এই নির্দেশের ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা বিজয়ের দিন। কতকগুলো আলেম কিন্তু একথাও বলেন যে, মক্কা বিজয় সন্ধির মাধ্যমে হয়েছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি তার দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ, যে মসজিদে চলে যাবে সেও নিরাপদ, যে আবু সুফইয়ানের গৃহে চলে যাবে সেও নিরাপদ। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা যদি এখানে (বায়তুল্লাহ শরীফে) তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তবে তোমাদেরকেও অনুমতি দেয়া হচ্ছে যে, তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যাতে এ অত্যাচার দূর হতে পারে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হুদায়বিয়ায় স্বীয় সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট যুদ্ধের বায়'আত গ্রহণ করেন, যখন কুরাইশরা এবং তাদের সঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বৃক্ষের নীচে সাহাবীগণের (রাঃ) নিকট বায়'আত নিয়েছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ এই যুদ্ধ প্রতিহত করেন। এই নিয়ামতের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের এই আয়াতে দিয়েছেন।(আরবি)অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মক্কার অভ্যন্তরে তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করার পরে তাদের হাতগুলোকে তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাতগুলোকে তাদের হতে বিরত রাখেন।' (৪৮:২৪)অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যদি এই কাফেররা বায়তুল্লাহ শরীফে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় তবে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। যদিও তারা মুসলমানদেরকে হারাম শরীফে হত্যা করেছে তবুও আল্লাহ তা'আলা এত বড় পাপকেও ক্ষমা করে দেবেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তার পরে নির্দেশ হচ্ছে-ঐ মুশরিকদের সাথে জিহাদ চালু রাখতে। যাতে এই শিরকের অশান্তি দূরীভূত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয় ও সমস্ত ধর্মের উপর প্রভুত্ব লাভ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছ, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখাবার জন্যে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার জন্যে ও জেদের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে এবং এক ব্যক্তি শুধু মানুষকে দেখাবার জন্যে জিহাদ করে, তবে এদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কে: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদকারী শুধু ঐ ব্যক্তি যে এই জন্যেই যুদ্ধ করে যে,যেন তার কথা সুউচ্চ হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যে পর্যন্ত না তারা (আরবি) বলে। যখন তারা এটা বলবে তখন তারা ইসলামের হক ছাড়া তাদের রক্ত ও সম্পদ আমা হতে বাঁচিয়ে নেবে এবং তাদের (ভিতরের) হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এর পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি এই কাফিরেরা শিরক ও কুফর হতে এবং তোমাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকে তবে তোমরা তাদের থেকে বিরত থাক। এর পর যে যুদ্ধ করবে সে অত্যাচারী হবে এবং অত্যাচারীদেরকে অত্যাচারের প্রতিদান দেয়া অবশ্য কর্তব্য। হযরত মুজাহিদের (রঃ) যে যুদ্ধ করে শুধু তার সাথেই যুদ্ধ করতে হবে’-এই উক্তির ভাবার্থ এটাই। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে,যদি তারা এসব কাজ হতে বিরত থাকে তবে তো তারা যুলুম ও শিরুক থেকে বিরত থাকলো। সুতরাং তাদের সাথে যুদ্ধ করার আর কোন কারণ নেই। এখানে (আরবি) শব্দটি শক্তি প্রয়োগের অর্থে এসেছে। তবে এটা শক্তি প্রয়োগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি প্রয়োগ। প্রকৃতপক্ষে এটা শক্তি প্রয়োগ নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যারা তোমাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে তবে তোমরাও তাদের সঙ্গে সেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি কর যেই পরিমাণ বাড়াবাড়ি তারা তোমাদের উপর করেছে।' (২:১৯৪) অন্য জায়গায় আছে (আরবি) অর্থাৎ অন্যায়ের বিনিময় হচ্ছে ঐ পরিমাণই অন্যায়।' (৪২:৪০) অন্য স্থানে আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি তোমরা শাস্তি প্রদান কর তবে সেই পরিমাণই শাস্তি প্রদান কর, যে পরিমাণ শাস্তি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।' (১৬:১২৬) সুতরাং এই তিন জায়গায় বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তির কথা বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে, নচেৎ প্রকৃতপক্ষে ওটা বাড়াবাড়ি, অন্যায় এবং শাস্তি নয়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রকৃত অত্যাচারী ঐ ব্যক্তি যে (আরবি) এই কালেমাকে অস্বীকার করে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর উপর জনগণ আক্রমণ চালিয়েছিল সেই সময় দুই ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে বলেনঃ ‘মানুষতো কাটাকাটি মারামরি করতে রয়েছে। আপনি। হযরত উমারের (রাঃ) পুত্র এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী। আপনি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন না কেন:' তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমান ভাইয়ের রক্ত হারাম করে দিয়েছেন। তারা বলেনঃ “এই নির্দেশ কি আল্লাহ তা'আলার নয় যে, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো যে পর্যন্ত অশান্তি অবশিষ্ট থাকে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমরা তো যুদ্ধ করতে থেকেছি, শেষ পর্যন্ত অশান্তি দূর হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তা'আলার পছন্দনীয় ধর্ম জয়যুক্ত হয়েছে। এখন তোমরা চাচ্ছ যে, তোমরা যুদ্ধ করতে থাকবে যেন আবার অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য ধর্মগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কোন একজন লোক তাকে বলেনঃ হে আবু আব্দির রহমান! আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছেন কেন: আপনি এই পন্থা গ্রহণ করেছেন যে,হজ্বের পর হজ্ব করে চলেছেন, প্রতি দ্বিতীয় বছরে হজ্ব করে থাকেন, অথচ হজ্বের ফযীলত আপনার নিকট গোপনীয় নয়। তখন তিনি বলেনঃ “ হে ভ্রাতুস্পুত্র! জেনে রেখো যে, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি (১) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) উপর ঈমান আনয়ন করা (২) পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রতিষ্ঠিত করা (৩) রমযানের রোযা রাখা (৪) যাকাত প্রদান করা (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব করা।তখন লোকটি বলেনঃ আপনি কি কুরআন পাকের এই নির্দেশ শুনেননি মুসলমানদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। অতঃপর এর পরেও যদি একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তবে তোমরা বিদ্রোহী দলটির সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা পুনরায় আল্লাহর বাধ্য হয়ে যায়। অন্য জায়গায় রয়েছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না অশান্তি দূরীভূত হয়।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে আমরা এর উপর আমল করেছি। তখন ইসলাম দুর্বল ছিল এবং মুসলমানদের সংখ্যা অল্প ছিল। যে ইসলাম গ্রহণ করতো তার উপর অশান্তি এসে পড়তো। তাকে হয় হত্যা করা হতো না হয় কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। অবশেষে এই পবিত্র ধর্ম বিস্তার লাভ করেছে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে ও অশান্তি সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে।' লোকটি তখন বলেন, “আচ্ছা তাহলে বলুন যে, হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি: তিনি বলেনঃ হযরত উসমানকে (রাঃ) তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেছেন, যদিও তোমরা এটা পছন্দ কর না। আর হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর আপন চাচাতো ভাই ও তার জামাতা ছিলেন, অতঃপর অঙ্গুলির ইশারায় বলেন এই হচ্ছে তার বাড়ী যা তোমাদের সামনে রয়েছে।'
আল-বাকারা 2:194
ষষ্ঠ হিজরীর যীলকদ মাসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণ (রাঃ) সমভিব্যহারে উমরা (ছোট হজ্ব) করার জন্যে মক্কা শরীফের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু মুশরিকরা তাদেরকে হুদায়বিয়া’ প্রান্তরে বাধা দিতে এগিয়ে আসে। অবশেষে এই শর্তের উপর তাদের সাথে সন্ধি হয় যে, তারা আগামী বছর উমরা করবেন এবং এ বছর ফিরে যাবেন। যুকা'দাহ্ও নিষিদ্ধ মাস ছিল বলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধ করতেন না। তবে যদি তার উপর কেউ আক্রমণ করতে তাহলে সেটা অন্য কথা। এমনকি যুদ্ধ করতে করতে নিষিদ্ধ মাস এসে পড়লে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করে দিতেন। হুদায়বিয়ার প্রান্তরেও যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, হযরত উসমান (রাঃ)-কে মুশরিকরা শহীদ করে ফেলেছে যিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী নিয়ে মক্কায় গিয়েছিলেন; তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর চৌদ্দশো সাহাবী (রাঃ)-এর নিকট একটি বৃক্ষের নীচে মুশরিকদের সাথে জিহাদ করার বায়'আত গ্রহণ করেন। অতঃপর যখন তিনি জানতে পারেন যে, ওটা ভুল সংবাদ তখন তিনি তাঁর ইচ্ছা স্থগিত রাখেন এবং সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর পরে যা ঘটবার তা ঘটেছিল। অনুরূপভাবে ‘হাওয়াযিন গোত্রের সাথে হুনায়েনের যুদ্ধ হতে যখন তিনি অবকাশ লাভ করেন তখন মুশরিকরা তায়েফে গিয়ে দুর্গের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত এই অবরোধ স্থায়ী হয়। অবশেষে কয়েকজন সাহাবীর (রাঃ) শাহাদাতের পর এই অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার দিকে ফিরে যান। জাআররানা’ নামক স্থান হতে তিনি উমরাহর ইহরাম বাঁধেন। এখানে যুদ্ধ লব্ধ দ্রব্য বন্টন করেন। তাঁর এই উমরাহ যুকা’দাহ মাসে সংঘটিত হয়। এটা ছিল হিজরী অষ্টম সনের ঘটনা। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যারা তোমাদের প্রতি অত্যাচার করে তোমরাও তাদের প্রতি ঐ পরিমাণই অত্যাচার কর। অর্থাৎ মুশরিকদের ব্যাপারেও ন্যায়ের প্রতি খেয়াল রেখো। এখানেও অত্যাচারের বিনিময় অত্যাচার দ্বারাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন অন্যান্য জায়গায় শাস্তির বিনিময়কেও শাস্তি' শব্দের দ্বারাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং অন্যায়ের বিনিময়কে অন্যায় দ্বারাই বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, এই আয়াতটি মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়, যেখানে মুসলমানদের কোন মর্যাদা বা সম্মান ছিল না। সেখানে তাদের প্রতি জিহাদেরও নির্দেশ ছিল না। অতঃপর এই আয়াতটি মদীনা শরীফের জিহাদ সম্পৰ্কীয় নির্দেশের দ্বারা রহিত হয়। কিন্তু ইবনে জারীর (রঃ) এটা অগ্রাহ্য করেছেন এবং বলেছেন যে, এই আয়াতটি মাদানী যা উমরাহ পুরো করার পর অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত মুজাহিদেরও (রঃ) উক্তি এটাই। অতঃপর বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার কর ও তাঁকে ভয় কর এবং জেনে রেখো যে, এরূপ লোকের উপরেই ইহকালে ও পরকালে আল্লাহ তা'আলার সহায়তা ও সাহায্য রয়েছে।
আল-বাকারা 2:195
হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয়কারীদের সম্বন্ধে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (সহীহ বুখারী)। মনীষীগণও এই আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেছেন। হযরত আবু ইমরান (রঃ) বর্ণনা করেন যে, মুহাজিরগণের একব্যক্তি কনস্টান্টিনোপলের যুদ্ধে কাফিরদের সৈন্য বাহিনীর উপর বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ চালান এবং তাদের ব্যুহ ভেদ করে শত্রু সৈন্যদের মধ্যে ঢুকে পড়েন। তখন কতকগুলো লোক পরস্পর বলাবলি করে, দেখ! এই ব্যক্তি স্বীয় হস্তদ্বয় ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করছে।' হযরত আবু আইউব (রঃ) একথা শুনে বলেনঃ “এই আয়াতের সঠিক ভাবার্থ আমরাই ভাল জানি। জেনে রেখো যে, এই আয়াতটি আমাদের সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়। আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহচর্যে থেকেছি, তার সাথে যুদ্ধ জিহাদেও অংশগ্রহণ করেছি এবং সদা তার সাহায্যের কাজেই থেকেছি। অবশেষে ইসলাম বিজয়ীর বেশে প্রকাশিত হয় এবং মুসলমানেরা জয় লাভ করে। তখন আমরা আনসারগণ একদা একত্রিত হয়ে এই পরামর্শ করি যে, মহান আল্লাহ তাঁর নবীর (সঃ) সাহচর্যের মাধ্যমে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আমরা তাঁর সেবার কার্যে নিযুক্ত থেকেছি এবং তার সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছি। এখন আল্লাহর ফলে ইসলাম বিস্তারলাভ করেছে, মুসলমানগণ বিজয়ী হয়েছেন এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। এতদিন ধরে না আমরা আমাদের সন্তানাদির খবরা-খবর নিতে পেরেছি, না মাল-ধন, জমি-জমা ও বাগ-বাগিচার দেখাশুনা করতে পেরেছি। সুতরাং এখন আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া উচিত। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং জিহাদ ছেড়ে দিয়ে ছেলে-মেয়ে ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি মনোযোগ দেয়া যেন নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ারই শামিল। (সুনান-ই-আবু দাউদ, তিরমিযী, সুনান-ই-নাসায়ী ইত্যাদি)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কনস্টান্টিনোপলের যুদ্ধের সময় মিশরীয়দের নেতা ছিলেন হযরত উকবা বিন আমের এবং সিরীয়দের নেতা ছিলেন হযরত ইয়াযীদ বিন ফুযালাহ বিন উবাইদ। হযরত বারা' বিন আযীব (রাঃ) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ যদি আমি একাকী শত্রু সারির মধ্যে ঢুকে পড়ি এবং তথায় শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ি ও নিহত হয়ে যাই তবে কি এই আয়াত অনুসারে আমি নিজের জীবনকে নিজেই ধ্বংসকারীরূপে পরিগণিত হবো: তিনি উত্তরে বলেনঃ না না; আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর, তুমি শুধু তোমার জীবনেরই মালিক; সুতরাং শুধুমাত্র তোমার জীবনকেই কষ্ট দেয়া হবে।' বরং ঐ আয়াতটি তো তাদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল যারা আল্লাহ তাআলার পথে খরচ করা হতে বিরত রয়েছিল (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই ইত্যাদি)। জামেউত্ তিরমিযীর অন্য একটি বর্ণনায় এটুকু বেশীও রয়েছে যে, মানুষের পাপের উপর পাপ কাজ করে যাওয়া এবং তওবা না করাই হচ্ছে নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংস করা। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, মুসলমানগণ দামেস্ক অবরোধ করেন। ইদিশনাওআহ্' নামক গোত্রের এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখিয়ে শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং তাদের ব্যুহ ভেদ করে ভিতরে চলে যায়। জনগণ তাকে খারাপ মনে করে এবং হযরত আমর বিন আল আসের (রাঃ) নিকট অভিযোগ পেশ করে। হযরত আমর (রাঃ) তাকে ডেকে নেন এবং বলেনঃ কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে-‘নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন ‘যুদ্ধের মধ্যে এইরূপ বীরত্ব দেখানো জীবনকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করা নয় বরং আল্লাহর পথে মাল খরচ না করাই হচ্ছে ধ্বংসের মধ্যে পতিত হওয়া। হযরত যহ্হাক বিন আবু জাবিরাহ (রঃ)বলেন যে, আনসারগণ নিজেদের ধন-মাল আল্লাহ তাআলার পথে খরচ করতে থাকতেন। কিন্তু এই বছর দুর্ভিক্ষ হওয়ায় তারা খরচ হতে বিরত থাকেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে কার্পণ্য করা। হযরত নুমান বিন বাশীর (রঃ) বলেন যে, পাপীদের আল্লাহর দয়া হতে নিরাশ হওয়াই হচ্ছে ধ্বংস হওয়া। আর মুফাসসিরগণও বলেন যে, পাপ করার পর ক্ষমা হতে নিরাশ হয়ে গিয়ে পুনরায় পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়াই হচ্ছে স্বীয় হস্তগুলোকে ধ্বংস করা।(আরবি) শব্দের ভাবার্থ আল্লাহর শাস্তিও বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত কারাযী। (রঃ) প্রভৃতি মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে যুদ্ধে যেতো এবং সাথে কোন খরচ নিয়ে যেতো না। তখন হয় তারা ক্ষুধায় মারা যাবে না হয় তাদের বোঝা অন্যদের ঘাড়ে চেপে বসবে। তাই এই আয়াতে তাদেরকে বলা হচ্ছে-আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন। তা হতে তাঁর পথে খরচ কর এবং তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। যে ক্ষুধা পিপাসায় বা পায়ে হেঁটে হেঁটে মরে যাবে। এর সাথে সাথে যাদের কাছে কিছু রয়েছে তাদেরকেও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, তোমরা মানুষের হিতসাধন করতে থাকো তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ভালবাসবেন। তোমরা পুণ্যের প্রত্যেক কাজে খরচ করতে থাকো। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় আল্লাহর পথে খরচ করা হতে বিরত থেকো না, এটা প্রকৃতপক্ষে তোমাদেরই ধ্বংস টেনে আনবে। সুতরাং হিতসাধন করা হচ্ছে বড় রকমের আনুগত্য যার নির্দেশ এখানে হচ্ছে যে, হিতসাধনকারীগণ আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।
আল-বাকারা 2:196
পূর্বে যেহেতু রোযার বর্ণনা হয়েছিল অতঃপর জিহাদের বর্ণনা হয়েছে এখানে হজ্বের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে পূর্ণ কর।' বাহ্যিক শব্দ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হজ্ব ও উমরাহ আরম্ভ করার পর সে গুলো পূর্ণ করা উচিত। সমস্ত আলেম এ বিষয়ে একমত যে, হজ্বব্রত ও উমরাহ ব্রত আরম্ভ করার পর ওগুলো পূর্ণ করা অবশ্য কর্তব্য যদিও উমরাহব্রত ওয়াজিব ও মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে দু'টি উক্তি রয়েছে, যেগুলো আমি ‘কিতাবুল আহকামের মধ্যে পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ‘পূর্ণ করার অর্থ এই যে, তোমরা নিজ নিজ বাড়ী হতে ইহরাম বাঁধবে। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এগুলো পূর্ণ করার অর্থ এই যে, তোমরা নিজ নিজ বাড়ী হতে ইহরাম বাঁধবে। তোমাদের এই সফর হবে হজ্ব ও উমরাহর উদ্দেশ্যে। মীকাতে' (যেখান হতে ইহরাম বাঁধতে হয়) পৌছে উচ্চৈঃস্বরে ‘লাব্বায়েক পাঠ আরম্ভ করবে। তোমাদের অভিপ্রায় ব্যবসা বাণিজ্য বা অন্য কোন ইহলৌকিক কার্য সাধনের জন্যে হবে না। তোমরা হয়তো বেরিয়েছো নিজের কাজে মক্কার নিকটবর্তী হয়ে তোমাদের খেয়াল হলো যে, এসো আমরা হজ্ব ও উমরাহব্রত পালন করে নেই। এভাবেও হজ্ব ও উমরাহ আদায় হয়ে যাবে বটে কিন্তু পূর্ণ হবে না। পূর্ণ করা এই যে, শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই বাড়ী হতে বের হবে। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, ওগুলো পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে ওগুলো মীকাত’ হতে আরম্ভ করা।হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, ওগুলো পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে ওদুটো পৃথক পৃথকভাবে আদায় করা এবং উমরাহকে হজ্বের মাসে আদায় না করা। কেননা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ হজ্বের মাসগুলো নির্দিষ্ট।' (২:১৯৭) হ্যরত কাসিম বিন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন যে, হজ্বের মাস গুলোতে উমরাহ পালন করা পূর্ণ হওয়া নয়। তিনি জিজ্ঞাসিত হন যে, মুহাররম মাসে উমরাহ করা কিরূপ: তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘মানুষ ওকেতো পূর্ণই বলতেন। কিন্তু এই উক্তিটি সমালোচনার যোগ্য। কেননা,এটা প্রমাণিত বিষয়। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চারটি উমরাহ করেন এবং চারটিই করেন যুকিাদা মাসে। প্রথমটি হচ্ছে ‘উমরাতুল হুদায়বিয়া' হিজরী ৬ষ্ঠ সনের যু’কাদা মাসে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘উমরাতুল কাযা' হিজরী সপ্তম সনের যু'কাদা মাসে। তৃতীয়টি হচ্ছে ‘উমরাতুল জা'আররানা’ হিজরী অষ্টম সনের যু'কাদা মাসে এবং চতুর্থটি হচ্ছে ঐ উমরাহ যা তিনি হিজরী দশম সনে বিদায় হজ্বের সাথে যুকাদা মাসে আদায় করেন। এই চারটি উমরাহ ছাড়া হিজরতের পরে রাসূলুল্লাহ' (সঃ) আর কোন উমরাহ পালন করেননি। হাঁ, তবে তিনি হযরত উম্মে হানী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ রমযান মাসে উমরাহ করা আমার সাথে হজ্ব করার সমান (পুণ্য)। একথা তিনি তাঁকে এজন্যেই বলেছিলেন যে, তাঁর সাথে হজে যাওয়ার তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) যানবাহনের অভাবে তাঁকে সাথে নিতে পারেননি। যেমন সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এই ঘটনাটি পূর্ণভাবে নকল করা হয়েছে। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) তো পরিষ্কারভাবে বলেন যে, এটা হযরত উম্মে হানীর (রাঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম বাঁধার পর ওদু’টো পূর্ণ না করেই ছেড়ে দেয়া জায়েয নয়। হজ্ব ঐ সময় পূর্ণ হয় কুরবানীর দিন (দশই জিলহজ্বে) যখন জামারা-ই-উকবাকে পাথর মারা হয়, বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করা হয় এবং সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যস্থলে দৌড়ান হয়। এখন হজ্ব পূর্ণ হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ ‘আরাফার নাম এবং উমরাহ হচ্ছে তাওয়াফের নাম। হযরত আবদুল্লাহর (রঃ) কিরআত হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পূর্ণ কর।' সুতরাং বায়তুল্লাহ পর্যন্ত গেলেই উমরাহ পূর্ণ হয়ে যায়। হযরত সাঈদ বিন যুবাইরের (রঃ) নিকট এটা আলোচিত হলে তিনি বলেন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কিরআতও এটাই ছিল। হযরত শা’বীর (রঃ) পঠনে ‘ওয়াল উমরাতু’ রয়েছে। তিনি বলেন যে, উমরাহ ওয়াজিব নয়। তবে তিনি এর বিপরীতও বর্ণনা করেছেন। বহু হাদীসে কয়েকটি সনদসহ হযরত আনাস (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীদের (রাঃ) একটি দল হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হজ্ব ও উমরাহ এ দু'টোকেই একত্রিত করেছেন এবং বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেছেনঃ যার নিকট কুরবানীর জন্তু রয়েছে সে যেন হজ্ব ও উমরাহর একই সাথে ইহরাম বাঁধে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামত পর্যন্ত উমরাহ হজ্বের মধ্যে প্রবেশ লাভ করেছে। আবু মুহাম্মদ বিন আবি হাতীম (রঃ) স্বীয় কিতাবের মধ্যে একটি বর্ণনা এনেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তার নিকট হতে যাফরানের সুগন্ধি আসছিল। সে জুব্বা পরিহিত ছিল। সে জিজ্ঞেস করে ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার ইহরামের ব্যাপারে নির্দেশ কি:' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘প্রশ্নকারী কোথায়: সে বলে-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি বিদ্যমান রয়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, 'যাফরানযুক্ত কাপড় খুলে ফেলল এবং শরীরকে খুব ভাল করে ঘর্ষণ করে গগাসল করে এসো ও যা তুমি তোমার হজ্বের জন্যে করে থাকো তাই উমরাহর জন্যেও কর।' এই হাদীসটি গরীব। কোন কোন বর্ণনায় গোসল করার ও এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ নেই। একটি বর্ণনায় তার নাম লায়লা বিন উমাইয়া (রাঃ) এসেছে। অন্য বর্ণনায় সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রাঃ) রয়েছে।অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যদি বাধা প্রাপ্ত হও তবে যা সহজ প্রাপ্য হয় তাই উৎসর্গ কর। মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেছেন যে,এই আয়াতটি হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদায়বিয়ার প্রান্তরে অবতীর্ণ হয়, যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মক্কা যেতে বাধা দিয়েছিল এবং ঐ সম্বন্ধেই পূর্ণ একটি সূরা আল ফাত্হ্ অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) অনুমতি লাভ করেন যে, তারা যেন সেখানেই তাদের কুরবানীর জন্তুগুলো যবাহ্ করে দেন। ফলে সত্তরটি উষ্ট্র যবাহ করা হয়, মস্তক মুণ্ডন করা হয় এবং ইহরাম ভেঙ্গে দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশ শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) প্রথমে কিছুটা সংকোচবোধ করেন। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন যে, সম্ভবতঃ এই নির্দেশকে রহিতকারী কোন নির্দেশ অবতীর্ণ হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং বাইরে এসে মস্তক মুণ্ডন করেন, তার দেখাদেখি সবাই এ কাজে অগ্রসর হন। কতকগুলো লোক মস্তক মুণ্ডন করেন এবং কতকগুলো লোক চুল ছেঁটে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মস্তক মুণ্ডনকারীদের উপর আল্লাহ তা'আলা করুণা বর্ষণ করুন। জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা চুল হেঁটেছেন তাদের জন্যেও প্রার্থনা করুন।' তিনি পুনরায় মুণ্ডনকারীদের জন্যে ও প্রার্থনা করেন। তৃতীয়বারে চুল ছোটকারীদের জন্যেও তিনি প্রার্থনা করেন। এক একটি উষ্ট্রে সাতজন করে লোক অংশীদার ছিলেন। সাহাবীদের (রাঃ) মোট সংখ্যা ছিল চৌদ্দশো। তাঁরা হুদায়বিয়া প্রান্তরে অবস্থান করেছিলেন যা হারাম শরীফের সীমা বহির্ভূত ছিল। তবে এটাও বর্ণিত আছে যে, ওটা হারাম শরীফের সীমান্তে অবস্থিত ছিল। আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, যারা শত্রু কর্তৃক বাধা প্রাপ্ত হবে শুধু তাদের জন্যেই কি এই নির্দেশ, না যারা রোগের কারণে বাধ্য হয়ে পড়েছে তাদের জন্যেও এই অনুমতি রয়েছে যে, তারা ঐ জায়গাতেই ইহরাম ভেঙ্গে দেবে, মস্তক মুণ্ডন করবে এবং কুরবানী করবে: হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতে তো শুধুমাত্র প্রথম প্রকারের লোকদের জন্যেই এই অনুমতি রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), তাউস (রঃ), যুহরী (রঃ) এবং যায়েদ বিন আসলামও (রঃ) এ কথাই বলেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মার’ হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তির হাত পা ভেঙ্গে গেছে কিংবা সে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। বা খোড়া হয়ে গেছে সে ব্যক্তি হালাল হয়ে গেছে। সে আগামী বছর হজ্ব করে নেবে। হাদীসের বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমি এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) নিকটও বর্ণনা করেছি। তারাও বলেছেন-এটা সত্য।' সুনান-ই-আরবা'আর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ), আলকামা (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), আতা (রঃ) এবং মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, রুগ্ন হয়ে পড়া এবং খোড়া হয়ে যাওয়াও এ রকমই ওজর। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) প্রত্যেক বিপদ ও কষ্টকেই এ রকমই ওজর বলে থাকেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত যুবাইর বিন আবদুল্লাহর (রাঃ) কন্যা যবাআহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন,-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার হজ্ব করবার ইচ্ছে হয়; কিন্তু আমি রুগ্ন থাকি। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ হজ্বে চলে যাও এবং শর্ত কর যে, (তোমার) ইহরাম সমাপনের ওটাই স্থান যেখানে তুমি রোগের কারণে থেমে যেতে বাধ্য হয়ে পড়বে। এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই কোন কোন আলেম বলেন যে, হজ্ব শর্ত করা জায়েয। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, 'যদি এই হাদীসটি সঠিক হয় তবে আমারও উক্তি তাই।' ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও হাফিযদের মধ্যে অন্যান্যগণ বলেন যে, এই হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যা সহজ প্রাপ্য হয় তাই কুরবানী করবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, উষ্ট্র-উষ্ট্ৰী, বলদ-গাভী, ছাগ-ছাগী এবং ভেড়া-ভেড়ী এই আট প্রকারের মধ্য হতে ইচ্ছে মত যবাহ করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুধু ছাগীও বর্ণিত আছে এবং আরও বহু মুফাসসিরও এটাই বলেছেন। ইমাম চতুষ্টয়েরও এটাই মাযহাব। হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন যে, এর ভাবার্থ শুধুমাত্র উষ্ট্র ও গাভী। খুব সম্ভব তাদের দলীল হুদায়বিয়ার ঘটনাই হবে। তথায় কোন সাহাবী হতে ছাগ-ছাগী যবাহ করা বর্ণিত হয়নি। তারা একমাত্র গরু ও উটই কুরবানী দিয়েছিলেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তাঁরা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমরা সাত জন করে মানুষ এক একটি গরু ও উটে শরীক হয়ে যাবো।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, যার যে জন্তু যবাহ করার ক্ষমতা রয়েছে সে তাই যবাহ করবে। যদি ধনী হয় তবে উট, যদি এর চেয়ে কম ক্ষমতাবান হয় তবে গরু, এর চেয়েও কম ক্ষমতা রাখলে ছাগল যবাহ করবে। হযরত উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা মূল্যের আধিক্য ও স্বল্পতার উপর নির্ভর করে। জমহুরের কথা মত ছাগ-ছাগী দেয়াই যথেষ্ট। তাদের দলীল হচ্ছে এই যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে সহজলভ্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ কমপক্ষে ঐ জিনিষ যাকে কুরবানী বলা যেতে পারে। আর কুরবানীর জন্তু হচ্ছে উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া। যেমন জ্ঞানের সমুদ্র কুরআন পাকের ব্যাখ্যাতা এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতৃব্য পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার ছাগলের কুরবানী দিয়েছিলেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যে পর্যন্ত কুরবানীর জন্তু তার স্বস্থানে না পৌছে সে পর্যন্ত তোমরা তোমাদের মস্তক মুণ্ডন করো না। এর সংযোগ। (আরবি)-এর সঙ্গে রয়েছে, (আরবি)-এর সঙ্গে নয়। ইবনে জারিরের (রঃ) এখানে ত্রুটি হয়ে গেছে। কারণ এই যে, হুদায়বিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ও তাঁর সহচরবৃন্দকে যখন হারাম শরীফে যেতে বাধা প্রদান করা হয়, তখন তারা সবাই হারামের বাইরেই মস্তক মুণ্ডন এবং কুরবানীও করেন কিন্তু শান্তি ও নিরাপত্তার সময় এটা জায়েয নয়। যে পর্যন্ত না কুরবানীর প্রাণী যবাহর স্থানে পৌছে যায় এবং হাজীগণ তাদের হজ্ব ও উমরাহর যাবতীয় কার্য হতে অবকাশ লাভ করেন-যদি তারা একই সাথে দুটোরই ইহরাম বেঁধে থাকেন। কিংবা ঐ দুটোর একটি কার্য হতে অবকাশ লাভ করেন, যদি তারা শুধুমাত্র হজ্বেরই। ইহরাম বেঁধে থাকেন বা হজ্বে তামাত্তোর নিয়্যাত করে থাকেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন,-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবাই তো ইহরাম ভেঙ্গে দিয়েছে; কিন্তু আপনি যে ইহরামের অবস্থাতেই রয়েছেন:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হাঁ, আমি আমার মাথাকে আঠা যুক্ত করেছি এবং আমার কুরবানীর প্রাণীর গলদেশে চিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছি। সুতরাং যে পর্যন্ত না এটা যবাহ্ করার স্থানে পৌছে যায় সে পর্যন্ত আমি ইহরাম ভেঙ্গে দেবো না।'এরপরে নির্দেশ হচ্ছে যে, রুগ্ন ও মস্তক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ‘ফিদিয়া দেবে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাকাল (রঃ) বলেনঃ “আমি কুফার মসজিদে হযরত কা'ব বিন আজরার (রাঃ) পাশে বসে ছিলাম। তাকে আমি এই আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, ‘আমাকে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই সময় আমার মুখের উপর উকুন বয়ে চলছিল। আমাকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমার অবস্থা যে এতোদূর পর্যন্ত পৌছে যাবে আমি তা ধারণাই করিনি। তুমি কি একটি ছাগী যবাহ করারও ক্ষমতা রাখো না:' আমি বলি-আমি তো দরিদ্র লোক। তিনি বলেনঃ যাও মস্তক মুণ্ডন কর এবং তিনটি রোযা রাখ বা ছ’জন মিসকীনকে অর্ধ সা' (প্রায় সোয়া সের সোয়া ছটাক) করে খাদ্য দিয়ে দাও।' ' সুতরাং এই আয়াতটি আমারই সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং নির্দেশ হিসেবে এ রকম প্রত্যেক ওজরযুক্ত লোকের জন্যেই প্রযোজ্য।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত কা'ব বিন আজরা (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাঁড়ির নীচে জ্বাল দিচ্ছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন। সে সময় আমার মুখের উপর দিয়ে উকুন বয়ে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এ অবস্থায় দেখে এ মাসআলাটি আমাকে বলে দেন। অন্য আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত কা'ব বিন আজরা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাথে হুদায়বিয়ায় ছিলাম। সে সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম এবং মুশরিকরা আমাদেরকে বাধা প্রদান করেছিল। আমার মাথায় বড় বড় চুল ছিল যাতে অত্যধিক উকুন হয়ে গিয়েছিল। উকুনগুলো আমার মুখের উপর দিয়ে বয়ে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করার সময় আমাকে বলেন-“উকুন কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, না তোমার মাথাকে: অতঃপর তিনি মস্তক মুণ্ডনের নির্দেশ দেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর বর্ণনায় রয়েছে, ‘অতঃপর আমি মস্তক মুণ্ডন করি ও একটি ছাগী কুরবানী দেই।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন (আরবি) অর্থাৎ কুরবানী হচ্ছে একটি ছাগী। আর রোযা রাখলে তিন দিন এবং সাদকা করলে এক ফরক (পায়মান বা পরিমাপ যন্ত্র) মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করা।' হযরত আলী (রাঃ), মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ), আলকামা (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী বিন আনাসেরও (রঃ) ফতওয়া এটাই। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত কা'ব বিন আজরাকে (রঃ) তিনটি মাসআলা জানিয়ে দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘এ তিনটির মধ্যে যে কোন একটির উপর তুমি আমল করলেই যথেষ্ট হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেখানে , শব্দ দিয়ে দু-তিনটি রূপ বর্ণনা করা হয় সেখানে যে কোন একটিকে গ্রহণ করার অধিকার থাকে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), আতা' (রঃ), তাঊস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), হামিদ আ'রাজ (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং যহাক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম চতুষ্টয় এবং অধিকাংশ আলেমেরও এটাই মাযহাব যে, ইচ্ছে করলে এক ফরক অর্থাৎ তিন সা' (সাড়ে সাত সের) ছ’জন মিসকীনের মধ্যে বন্টন করতে হবে এবং কুরবানী করলে। একটি ছাগী কুরবানী করতে হবে। এই তিনটির মধ্যে যেটি ইচ্ছে হয় পালন করতে হবে।পরম করুণাময় আল্লাহ এখানে যেহেতু অবকাশ দিতেই চান এজন্যেই সর্বপ্রথম রোযার বর্ণনা দিয়েছেন, যা সর্বাপেক্ষা সহজ। অতঃপর সাদকার কথা বলেছেন এবং সর্বশেষে কুরবানীর বর্ণনা দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহর (সঃ) যেহেতু সর্বোত্তমের উপর আমল করবার ইচ্ছা, তাই তিনি সর্বপ্রথম ছাগল কুরবানীর বর্ণনা দিয়েছেন, অতঃপর ছ'জন মিসকীনকে খাওয়ানোরে কথা বলেছেন এবং সর্বশেষে তিনটি রোযার উল্লেখ করেছেন। সুতরাং শৃংখলা হিসেবে দু’টোরই অবস্থান অতি চমৎকার। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) এই আয়াতের ভাবার্থ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ তার উপর খাদ্যের নির্দেশ দেয়া হবে। যদি তার কাছে তা বিদ্যমান থাকে তবে তা দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করবে। নচেৎ রৌপ্য মুদ্রা দ্বারা ছাগলের মূল্য নির্ণয় করবে এবং তা দিয়ে খাদ্য ক্রয় করবে, অতঃপর তা সাদকা করে দেবে। নতুবা অর্ধ সা এর পরিবর্তে একটা রোযা রাখবে। হযরত হাসান বসরীর (রঃ) মতে যখন মুহরিমের মস্তকে কোন রোগ হয় তখন সে মস্তক মুণ্ডন করবে এবং নিম্নলিখিত তিনটির মধ্যে যে কোন একটি দ্বারা ফিদইয়াহ আদায় করবেঃ (১) রোযা দশদিন। (২) দশজন মিসকীনকে আহার করান, প্রত্যেক মিসকীনকে এক ‘মাকুক’ খেজুর ও এক মাকুক’ গম দিতে হবে। (৩) একটি ছাগল কুরবানী করা। হযরত ইকরামাও (রঃ) দশ মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর কথাই বলেন। কিন্তু এই উক্তিটি সঠিক নয়। কেননা, মারফু হাদীসে এসেছে যে, রোযা তিনটি, ছ’জন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো ও একটি ছাগল কুরবানী করা। এই তিনটির যে কোন একটি গ্রহণ করার ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে। বলা হচ্ছে যে, ছাগল কুরবানী করবে বা তিনটি রোযা রাখবে অথবা ছ’জন মিসকীনকে আহার করাবে। হাঁ, এই শৃংখলা রয়েছে ইহরামের অবস্থায় শিকারকারীর জন্যেও। যেমন কুরআন কারীমের শব্দ রয়েছে এবং ধর্মশাস্ত্রবিদগণের ইজমাও রয়েছে। কিন্তু এখানে শৃংখলার প্রয়োজন নেই। বরং ইচ্ছাধীন রাখা হয়েছে। তাউস (রঃ) বলেন যে, এই কুরবানী ও সাদকা মক্কাতেই করতে হবে। তবে রোযা যেখানে। ইচ্ছা সেখানেই করতে পারে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে জাফরের (রাঃ) গোলাম হযরত আবু আসমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ)হজে বের হন। তার সাথে হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত হুসাইন (রাঃ) ছিলেন। আমি ইবনে জাফরের সঙ্গে ছিলাম। আমরা দেখি যে, একটি লোক ঘুমিয়ে রয়েছেন এবং তার উস্ত্রী তার শিয়রে বাঁধা রয়েছে। আমি তাঁকে জাগিয়ে দেখি যে, তিনি হযরত হুসাইন বিন আলী (রাঃ)। হযরত ইবনে জাফর (রাঃ) তাঁকে উঠিয়ে নেন। অবশেষে আমরা সাকিয়া নামক স্থানে পৌছি। তথায় আমরা বিশ দিন পর্যন্ত তার সেবায় নিয়োজিত থাকি। একদা হযরত আলী (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, অবস্থা কেমন:' হযরত হুসাইন (রাঃ) তাঁর মস্তকের প্রতি ইঙ্গিত করেন। হযরত আলী (রাঃ তাকে মস্তক মুণ্ডনের নির্দেশ দেন। অতঃপর উট যবাহ করেন। তাহলে যদি তাঁর এই উট কুরবানী করা ইহরাম হতে হালাল হওয়ার জন্যে হয়ে থাকে তবে তো ভাল কথা। আর যদি এটা ফিদইয়ার জন্যে হয়ে থাকে তবে এটা স্পষ্ট কথা যে, এই কুরবানী মক্কার বাইরে করা হয়েছিল।এরপরে ইরশাদ হচ্ছে যে,যে ব্যক্তি হজ্বে তামাত্তু করে সেও কুরবানী করবে, সে হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম এক সাথে বেঁধে থাকুক অথবা প্রথমে উমরাহর ইহরাম বেঁধে ওর কার্যাবলী শেষ করার পর হজের ইহরাম বেঁধে থাকুক। শেষেরটাই প্রকৃত ‘তামাতু এবং ধর্মশাস্ত্রবিদদের উক্তিতে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তবে সাধারণ তামাত্তু বলতে দু’টোকেই বুঝায়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন বর্ণনাকারী তো বলেন যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ও (সঃ) হজে তামাত্ত করেছিলেন। অন্যান্যগণ বলেন যে, তিনি হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম এক সাথে বেঁধে ছিলেন। তাঁরা সবাই বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সাথে কুরবানীর জন্তু ছিল। সুতরাং আয়াতটিতে এই নির্দেশ রয়েছে যে, হজ্বে তামাতুকারী যে কুরবানীর উপর সক্ষম হবে তাই করবে। এর সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে একটি ছাগল কুরবানী করা। গরুর কুরবানীও করতে পারে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহও (সঃ) তাঁর সহধর্মিণীগণের পক্ষ হতে গরু কুরবানী করেছিলেন, তাঁরা সবাই হজ্বে তামাত্তু করেছিলেন। (তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এর দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে তামাতুর ব্যবস্থা শরীয়তে রয়েছে। হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) বলেন, কুরআন মাজীদে তামাতুর আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে হজ্বে তামাত্ত্ব করেছি। অতঃপর কুরআন কারীমেও এর নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হয়নি এবং রাসূলুল্লাহও (সঃ) এটা হতে বাধা দান করেননি। জনগণ নিজেদের মতানুসারে এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।' ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের মতে ইমাম বুখারীর এই কথা সম্পূর্ণরূপেই সঠিক। হযরত উমার (রাঃ) হতে নকল করা হয়েছে যে, তিনি জনগণকে এটা হতে বাধা দিতেন এবং বলতেন, “আমরা যদি আল্লাহ তা'আলার কিতাবকে গ্রহণ করি তবে ওর মধ্যে হজ্ব ও উমরাহকে পুরো করার নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। যেমন বলা হয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে আল্লাহর জন্যে পুরো কর।' (২:১৯৬) তবে এটা মনে রাখা দরকার যে, হযরত উমারের (রাঃ) এই বাধা প্রদান হারাম হিসেবে ছিল না। বরং এ জন্যেই ছিল যে, যেন মানুষ খুব বেশী করে হজ্ব ও উমরাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ শরীফের যিয়ারত করে।এরপরে বলা হচ্ছে-যে ব্যক্তি প্রাপ্ত না হয় সে হজ্বের মধ্যে তিনটি রোযা রাখবে এবং হজ্বব্রত সমাপ্ত করে প্রত্যাবর্তনের সময় আর সাতটি রোযা রাখবে। সুতরাং পূর্ণ দশটি রোযা হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুরবানীর উপর সক্ষম না হবে সে রোযা রাখবে। তিনটি রোযা হজ্বের দিনগুলোতে রাখবে। আলেমদের মতে এই রোযাগুলো আরাফার দিনের অর্থাৎ ৯ই জিল হজ্ব তারিখের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে রাখাই উত্তম। হযরত আতা (রঃ)-এর উক্তি এটাই। কিংবা ইহরাম বাঁধা মাত্রই রাখবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই। কেননা, কুরআন মাজীদে (আরবি) শব্দ রয়েছে। হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষী এটাও বলেন যে, শাওয়াল মাসের প্রথম দিকেই এই রোযাগুলো রাখা বৈধ। হযরত শা'বী (রঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন যে, এই রোযাগুলোর মধ্যে যদি আরাফার দিনের রোযা সংযোজিত করে শেষ করে তবুও চলবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও নকল করা হয়েছে যে, আরাফার দিনের পূর্বে যদি দু’দিনের দু’টো রোযা রাখে এবং তৃতীয় দিন আরাফার দিন হয় তবে এও জায়েয হবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) একথাই বলেন। হযরত আলীরও (রাঃ) উক্তি এটাই।যদি কোন ব্যক্তির এই তিনটি রোযা বা দু'একটি রোযা ছুটে যায় এবং ‘আইয়্যামে তাশরীক' অর্থাৎ ঈদুল আযহার পরবর্তী তিনদিন এসে পড়ে তবে হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) উক্তি এই যে, এই ব্যক্তি এ দিনগুলোতেও এই রোযাগুলো রাখতে পারে (সহীহ বুখারী)। ইমাম শাফিঈরও (রাঃ) প্রথম উক্তি এটাই। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। তাদের দলীল এই যে, (আরবি) শব্দটি সাধারণ। সুতরাং এই দিনগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা, সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, আইয়্যামে তাশরীক’ হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহ তাআলার যিকির করার দিন।অতঃপর সাতটি রোযা রাখতে হবে হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পর। এর ভাবার্থ এক তো এই যে, ফিরে যখন স্বীয় অবস্থান স্থলে পৌছে যাবে। সুতরাং ফিরবার সময় পথেও এই রোযাগুলো রাখতে পারে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আতা' (রাঃ) একথাই বলেন। কিংবা এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বদেশে পৌঁছে যাওয়া। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এটাই বলেন। আরও বহু তাবেঈনের মাযহাব এটাই। এমনকি হযরত ইবনে জাবিরের (রঃ) মতে এর উপরে ইজমা হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, ‘হাজ্বাতুল বিদা’য় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমরার সাথে হজ্বে তামাতু’ করেন এবং যুলহুলায়ফায়’ কুরবানী দেন। তিনি কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়েছিলেন। তিনি উমরাহ করেন অতঃপর হজ্ব করেন। জনগণও তাঁর সাথে হজ্বে তামাত্ত্ব করেন। কতকগুলো লোক কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়েছিলেন; কিন্তু কতকগুলো লোকের সাথে কুরবানীর জন্তু ছিল না। মক্কায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেন, যাদের নিকট কুরবানীর জন্তু রয়েছে তারা হজ্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইহরামের অবস্থাতেই থাকবে। আর যাদের কাছে কুরবানীর জন্তু নেই তারা বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতঃ সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়িয়ে ইহরাম ভেঙ্গে দেবে। মস্তক মুন্ডন করবে অথবা হেঁটে দেবে।' অতঃপর হজ্বের ইহরাম বেঁধে নেবে। কুরবানী দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে হজ্বের মধ্যে তিনটি রোযা রাখবে এবং সাতটি রোযা স্বদেশে ফিরে গিয়ে রাখবে।' (সহীত বুখারী ও মুসলিম)। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, এই সাতটি রোযা স্বদেশে ফিরে গিয়ে রাখতে হবে। অতঃপর বলা হচ্ছে-‘এই পূর্ণ দশ দিন।' এই কথাটি জোর দেয়ার জন্যে বলা হয়েছে। যেমন আরবী ভাষায় বলা হয়ে থাকে, ‘আমি স্বচক্ষে দেখেছি, কানে শুনেছি এবং হাতে লিখেছি। কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ না কোন পাখী যা তার দু'পাখার সাহায্যে উড়ে থাকে।' (৬:৩৮) অন্য স্থানে রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তুমি, তোমার ডান হাত দ্বারা লিখ না।' (২৯:৪৮) আর এক জায়গায় রয়েছে-‘আমি মূসার (আঃ) সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছি এবং আরও দশ দিয়ে তা পূর্ণ করেছি। অতঃপর তার প্রভুর নির্দিষ্ট চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ হলো। অতএব এসব জায়গায় যেমন শুধু জোর দেয়ার জন্যেই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তেমনই এই বাক্যটিও জোর দেয়ার জন্যেই আনা হয়েছে। আবার এও বলা হয়েছে যে, এটা হচ্ছে পূর্ণ করার নির্দেশ। (আরবি) শব্দটির ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটা কুরবানীর পরিবর্তে যথেষ্ট। এরপরে বলা হচ্ছে যে, এই নির্দেশ ঐসব লোকের জন্যে যাদের পরিবার পরিজন ‘মসজিদে হারামে’ অবস্থানকারী না হয়। হারামবাসী যে হজ্বে তামাত্ত্ব করতে পারে না এর উপর তো ইজমা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাই বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলতেন“হে মক্কাবাসী! তোমরা হজ্বে তামাতু করতে পার না। তামাতু বিদেশী লোকদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে। তোমাদেরকে তো সামান্য দূর যেতে হয়। অল্প দূর গিয়েই তোমরা উমরাহর ইহরাম বেঁধে থাকো।' হযরত তাউসেরও (রঃ) ব্যাখ্যা এটাই। কিন্তু হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, যারা মীকাতের (ইহরাম বাঁধার স্থানসমূহ) মধ্যে রয়েছে তাদের জন্যেও এই নির্দেশ। তাদের জন্যেও তামাত্ত জায়েয নয়। মাকহুলও (রাঃ) একথাই বলেন। তাহলে আরাফা, মুদালাফা, আরনা এবং রাজী’র অধিবাসীদের জন্যেও এই নির্দেশ। যুহরী (রঃ) বলেন যে, যারা মক্কা শরীফ হতে একদিনের পথের বা তার চেয়ে কম পথের ব্যবধানের উপর রয়েছে, তারা হজ্বে তামাত্ত্ব করতে পারে, অন্যেরা পারে না। হযরত আতা (রঃ) দু’দিনের কথাও বলেছেন।ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, হারামের অধিবাসী এবং যারা এরূপ দূরবর্তী জায়গায় রয়েছে যেখানে মক্কাবাসীদের জন্যে নামায কসর করা জায়েয নয় এদের সবারই জন্যেই এই নির্দেশ। কেননা, এদেরকেও মক্কার অধিবাসীই বলা হবে। এদের ছাড়া অন্যান্য সবাই মুসাফির। সুতরাং তাদের সবারই জন্যে হজ্বের মধ্যে তামাত্তু করা জায়েয। অতঃপর বলা হচ্ছে-“আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চল এবং যেসব কাজের উপর তিনি নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন তা থেকে বিরত থাক। জেনে রেখো যে, তার অবাধ্যদেরকে তিনি কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকেন।
আল-বাকারা 2:197
আরবী ভাষাবিদগণ বলেন যে, প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছে-হজ্ব হলো ঐ মাসগুলোর হজ্ব যা সুবিদিত ও নির্দিষ্ট। সুতরাং হজ্বের মাসগুলোতে ইহরাম বাঁধা অন্যান্য মাসে ইহরাম বাঁধা হতে বেশী পূর্ণতা প্রদানকারী। তবে অন্যান্য মাসের ইহরামও সঠিক। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রাঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবরাহীম নাখঈ (রাঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) ও ইমাম লায়েস (রঃ) বলেন যে, বছরের যে কোন মাসে ইহরাম বাঁধা যেতে পারে। তাদের দলীল (আরবি) এই আয়াতটি। অর্থাৎ '(হে নবী সঃ!) তারা তোমাকে নব চন্দ্ৰসমূহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বল-এগুলো হচ্ছে জনসমাজের উপকারের জন্যে ও হজ্বের জন্যে সময় নিরূপক। (২:১৮৯) (আরবি) তাঁদের দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে এই যে, হজ্ব ও উমরাহ এ দু’টোকেই বলা হয়েছে, আর উমরাহর ইহরাম প্রত্যেক মাসেই বাঁধা যায়; সুতরাং হজ্বের ইহরামও প্রত্যেক মাসেই বাঁধা যাবে। তবে হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, হজ্বের ইহরাম শুধুমাত্র হজ্বের মাসগুলোতেই বাঁধতে হবে এবং অন্যান্য মাসে ইহরাম বাধলৈ তা সঠিক হবে না। কিন্তু ওর দ্বারা উমরাহও হতে পারে কিনা এ সম্বন্ধে তার দুটি উক্তি রয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত জাবির (রাঃ), হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত মুজাহিদেরও (রঃ) এটাই মাযহাব যে, হজ্বের ইহরাম হজের মাস ছাড়া অন্যান্য মাসে বাধা সঠিক নয়। তাদের দলীল হচ্ছে (আরবি) এই আয়াতটি। আরবী ভাষাবিদগণের আর একটি দলের মতে আয়াতটির এই শব্দগুলোর ভাবার্থ এই যে, হজ্বের সময় হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এই মাসগুলোর পূর্বে ইহরাম বাঁধা ঠিক হবে না। যেমন নামাযের সময়ের পূর্বে কেউ নামায পড়ে নিলে নামায ঠিক হয় না। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, আমাকে মুসলিম বিন খালিদ সংবাদ দিয়েছেন, তিনি ইবনে জুরাইজের নিকট হতে শুনেছেন, তাঁকে উমার বিন আতা’ বলেছেন, তাঁর কাছে ইকরামা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন কোন ব্যক্তির জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্য মাসে হজ্বের ইহরাম বাঁধে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন(আরবি) অর্থাৎ হজ্বের মাসগুলো সুবিদিত।' এই বর্ণনাটির আরও বহু সনদ রয়েছে। একটি সনদে আছে যে, এটাই সুন্নাত।সহীহ ইবনে খুজাইমার মধ্যেও এই বর্ণনাটি নকল করা হয়েছে। উসূলের গ্রন্থসমূহেও এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টির এভাবে নিস্পত্তি করা হয়েছে যে, এটা সাহাবীর (রাঃ) উক্তি এবং তিনি সেই সাহাবী যিনি কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাতা। সুতরাং এ উক্তি যেন রাসূলুল্লাহরই (সঃ) উক্তি। তাছাড়া তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হজ্বের মাস ছাড়া অন্য মাসে ইহরাম বাঁধা কারও জন্যে উচিত নয়।' এর ইসনাদও উত্তম। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ), তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, হজ্বের মাসগুলোর পূর্বে হজ্বের ইহরাম বাঁধা যেতে পারে কি: তিনি উত্তরে বলেন, 'না।' হাদীসটি মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) সুন্নাত এটাই’-এই উক্তি দ্বারা সাহাবীর (রাঃ) এই ফতওয়ার গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে।(আরবি)-এর ভাবার্থ হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার বর্ণনা করেন, শাওয়াল, যুলকা'দা এবং যিলহজ্ব মাসের দশদিন (সহীহ বুখারী)।' এই বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে জারীর এবং তাফসীর-ই-মুস্তাদরিক-ই-হাকিম এর মধ্যেও রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ্ বিন যুবাইর (রাঃ) এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত আতা' (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবরাহিম নাখঈ (রঃ), হযরত শা'বী (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত মাকহুল (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যহাক বিন মাযাহিম (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যহ্হাক বিন মাযাহিম (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল বিন হিব্বানও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) এবং আবু সাউরেরও (রঃ) মাযহাব এটাই। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। (আরবি) শব্দটি বহুবচন। এর ব্যবহার পূর্ণ দু'মাস এবং তৃতীয় মাসের কিছু অংশের উপরেও হতে পারে। যেমন বলা হয়-“আমি এই বছর বা আজকে তাকে দেখেছি। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সারা বছর ধরে বা সারা দিন ধরে তো তাকে দেখেনি। বরং দেখার সময় অল্পই হয়ে থাকে। কিন্তু প্রায়ই এ কথাই বলা হয়ে থাকে। এই নিয়মে এখানেও তৃতীয় মাসের উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের মধ্যেও (আরবি) (২:২০৩) রয়েছে। অর্থাৎ যে দু’দিনে তাড়াতাড়ি করে। অথচ ঐ তাড়াতাড়ি দেড় দিনের হয়ে থাকে। কিন্তু গণনায় দু’দিন বলা হয়েছে।' ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈর (রঃ) প্রথম উক্তি এটাও রয়েছে যে, শাওয়াল, যুলকা'দা এবং যুলহাজির পুরো মাসই। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে শিহাব (রঃ) আতা (রঃ), জাবির বিন আবদুল্লাহ (রঃ), তাউস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), উরওয়াহ (রঃ), রাবী (রঃ )এবং কাতাদা (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত রয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এটা এসেছে। কিন্তু ওটা মাওযূ। কেননা, এর বর্ণনাকারী হচ্ছে হুসাইন বিন মুখারিক, যার উপরে এই দুর্নাম রয়েছে যে, সে হাদীস বানিয়ে থাকে। সুতরাং হাদীসটির মারফু হওয়া সাব্যস্ত হয় না। ইমাম মালিকের (রঃ) এই উক্তিকে মেনে নেয়ার পর এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যুল-হাজ্ব মাসে উমরা করা ঠিক হবে না। এটা ভাবার্থ নয় যে, দশই যুলহাজ্বের পরেও হজ্ব হতে পারে।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা ঠিক নয়। ইবনে জারীরও (রঃ) এ উক্তিগুলির এই ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন যে, হজের সময় তো মিনার দিন (দশই যিল হজ্ব) অতিক্রান্ত হওয়া মাত্রই শেষ হয়ে যায়। মুহাম্মদ ইবনে সীরীন বর্ণনা করেন-‘আমার জানা মতে এমন কোন আলেম নেই যিনি হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্যান্য মাসে উমরাহ করাকে এই মাসগুলোর মধ্যে উমরাহ করা অপেক্ষা উত্তম মনে করতে সন্দেহ করে থাকেনঃ কাসিম বিন মুহাম্মদ (রঃ) কে ইবনে আউন হজ্বের মাসগুলিতে উমরাহ করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন-মনীষীগণ একে পূর্ণ উমরাহ মনে করতেন না।' হযরত উমার (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্যান্য মাসে উমরাহ করাকে পছন্দ করতেন। এমনকি তারা হজ্বের মাসগুলোতে উমরাহ করতে নিষেধ করতেন। (পূর্ব আয়াতটির তাফসীরে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুলকা'দা মাসে চারটি উমরাহ আদায় করেছেন। অথচ যুলকা'দা মাসও হচ্ছে হজ্বের মাস। সুতরাং হজ্বের মাসগুলোতে উমরাহ করা জায়েয প্রমাণিত হলো, এ সম্পর্কে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন-অনুবাদক)অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্বের সংকল্প করে অর্থাৎ হজ্বের ইহরাম বাঁধে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হজ্বের ইহরাম বাঁধা ও তা পুরো করা অবশ্য কর্তব্য। ফরয’ শব্দের এখানে অর্থ হচ্ছে সংকল্প করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ওদেরকে বুঝান হয়েছে যারা হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম বেঁধেছে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, এখানে ফরয’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ইহরাম। ইবরাহীম (রঃ) ও যহ্হাক (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' পাঠের পর কোন স্থানে থেমে যাওয়া উচিত নয়। অন্যান্য মনীষীদেরও এটাই উক্তি। কোন কোন মনীষী বলেন যে, ফর' শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ‘লাব্বায়েক' পাঠ। শব্দের অর্থ হচ্ছে সহবাস। যেমন কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ রোযার রাত্রে স্ত্রী সহবাস তোমাদের জন্য হালাল করা হলো।' (২১৮৭) ইহরামের অবস্থায় সহবাস এবং ওর পূর্ববর্তী সমস্ত কার্যই হারাম। যেমন প্রেমালাপ করা, চুম্বন দেয়া এবং স্ত্রীদের বিদ্যমানতায় এসব কথা আলোচনা করা। কেউ কেউ পুরুষদের মজলিসেও এসব কথা আলোচনা করাকে(আরবি) এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে। একদা তিনি ইহরামের অবস্থায় এই ধরনেরই একটি কবিতা পাঠ করেন। এ সম্বন্ধে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, স্ত্রী লোকদের সামনে এই প্রকারের কথা বললে (আরবি) হয়ে থাকে। (আরবি) এর নিম্নতম পর্যায় এই যে, সহবাস প্রভৃতির আলোচনা করা, কটু কথা বলা, ইশারা ইঙ্গিতে সহবাস করা, নিজ স্ত্রীকে বলা যে ইহরাম ভেঙ্গে গেলেই সহবাস করা হবে, আলিঙ্গন করা, চুম্বন দেয়া ইত্যাদি সব কিছুই (আরবি)-এর অন্তর্গত। ইহরামের অবস্থায় এসব করা হারাম। বিভিন্ন ব্যাখ্যাতার বিভিন্ন উক্তির সমষ্টি এই।(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে অবাধ্য হওয়া, শিকার করা, গালি দেয়া ইত্যাদি। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে যে, মুসলমানকে গালি দেয়া হলো ফিস্ক এবং তাকে হত্যা করা হলো কুফর। আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্তু, যবাহ করাও হচ্ছে ফিস্ক। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা ফিস্ক যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবাহ করা হয়েছে।' (৬:১৪৫) খারাপ উপাধি দ্বারা ডাক দেয়াও ফিস্ক। যেমন কুরআন পাকে ঘোষিত হয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা অন্যকে কলংক যুক্ত উপাধিতে সম্বোধন করো না।' (৪৯:১১) সংক্ষিপ্ত কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলার প্রত্যেক অবাধ্যতাই ফিকের অন্তর্গত। এটা সর্বদাই অবৈধ বটে; কিন্তু সম্মানিত মাসগুলিতে এর অবৈধতা আরও বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা এই সম্মানিত মাসগুলোতে তোমাদের আত্মার উপর অত্যাচার করো না।' (৯:৩৬) অনুরূপভাবে হারাম শরীফের মধ্যে এর অবৈধতা বৃদ্ধি পায়। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, (আরবি) অর্থাৎ ‘হারামের মধ্যে যে ব্যক্তি ধর্মদ্রোহীতার ইচ্ছে করবে, তাকে আমি বেদনাদায়ক শাস্তি দেবো।' (২২:২৫) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে ‘ফিক’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ কাজ যা ইহরামের অবস্থায় নিষিদ্ধ। যেমন শিকার করা, মস্তক মুণ্ডন করা বা ঘেঁটে দেয়া এবং নখ কাটা ইত্যাদি। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিন্তু সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হচ্ছে ওটাই যা আমরা বর্ণনা করেছি। অর্থাৎ প্রত্যেক পাপের কাজ হতে বিরত রাখা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে-যে ব্যক্তি এই বায়তুল্লাহর হজ্ব করে সে যেন ‘রাফাস’ এবং ‘ ফিক’ না করে, তবে সে পাপ হতে এমনই মুক্ত হয়ে যাবে যেমন তার জন্মের দিন ছিল।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-হজ্বে কলহ নেই।' অর্থাৎ হজ্বের সময় এবং হজ্বের আরকান ইত্যাদির মধ্যে তোমরা কলহ করো না। এর পূর্ণ বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন যে, হজ্বের মাসগুলো নির্ধারিত রয়েছে। সুতরাং তাতে কম-বেশী করা চলবে না এবং পূর্বেও পরেও করা চলবে না। মুশরিকরা এরূপ করে থাকতো। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় এর নিন্দে করা হয়েছে। অনুরূপভাবে কুরাইশরা মাশআর-ই-হারামের পাশে মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং আরবের বাকি লোক আরাফায় অবস্থান করতো। অতঃপর তারা পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়তো এবং একে অপরকে বলতো, আমরা সঠিক পথের উপর এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর পথের উপর রয়েছি। এখানে এটা হতে নিষেধ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর (সঃ) মাধ্যমে হজ্বের সময়, আরকান ও আহকাম এবং অবস্থানের স্থান ইত্যাদি সব কিছু বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এখন আর কেউ অপরের উপর কোন গৌরব প্রকাশ করতে পারবে না বা হজ্বের দিন পরিবর্তন করতে পারবে না। কাজেই সকলকেই এখন কলহ-বিবাদ হতে বিরত থাকতে হবে। ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমরা হজ্বের সফরে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করো না, একে অপরকে রাগান্বিত করো না এবং কেউ কাউকেও গালি দিয়ো না। বহু মুফাসসিরের এই উক্তিও রয়েছে, আবার অনেকের পূর্বের উক্তিও রয়েছে। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন, কারও নিজের দাসকে শাসন গর্জন করা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে মারতে পারে না। কিন্তু আমি বলি যে, যদি নিজের ক্রীতদাসকে মেরেও দেয় তবুও কোন দোষ নেই। এর প্রমাণ মুসনাদ-ই -আহমাদের নিম্নের এই হাদীসটি-হযরত আবু বকরের (রাঃ) কন্যা হযরত আসমা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্বের সফরে ছিলাম। আমরা ‘আরায’ নামক স্থানে বিশ্রাম গ্রহণ করছিলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাশে বসেছিলেন এবং আমি আমার জনক হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকটে বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উটের আসবাবপত্র হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পরিচারকের নিকট ছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) তার অপেক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর সে এসে পড়ে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, উট কোথায়: সে বলে, ‘গত রাত্রে উটটি হারিয়ে গেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) এতে অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন একটি মাত্র উট তুমি দেখতে পারলে না, হারিয়ে দিলে:' একথা বলে তিনি তাকে প্রহার করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মুচকি হেসে বলেন, ‘তোমরা দেখ, তিনি ইহরামের অবস্থায় কি কাজ করছেন: এই হাদীসটি সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ্নর মধ্যেও রয়েছে। পূর্ববর্তী কোন একজন মনীষী হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এই প্রহার ছিল হজ্ব শেষ হওয়ার পর। কিন্তু এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) কে রাসূলুল্লাহর (সঃ) “দেখ, তিনি ইহরামের অবস্থায় কি করছেন!’-একথা বলার মধ্যে খুবই সূক্ষ্ম অস্বীকৃতি। রয়েছে এবং এর মধ্যে এইভাব নিহিত রয়েছে যে, তাকে ছেড়ে দেয়াই উত্তম ছিল।তাফসীর-ই-মুসনাদ-ই-আবদ বিন হামীদের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এরূপ অবস্থায় হজ্ব পূর্ণ করলো যে, কোন মুসলমান তার হাতের দ্বারা এবং মুখের দ্বারা কষ্ট পেলো না, তার পূর্বের সমস্ত পাপ মোচন হয়ে গেলো। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“তোমরা যে কোন সকার্য কর না কেন আল্লাহ তা অবগত আছেন। উপরে যেহেতু অন্যায় ও অশ্লীল কাজ হতে বাধা দেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে পুণ্যের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তাদেরকে কিয়ামতের দিন প্রতিটি সত্ত্বার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে ।আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা হজ্বের সফরে নিজেদের সাথে পাথেয় নিয়ে যাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জনগণ পাথেয় ছাড়াই হজ্বের সফরে বেরিয়ে পড়তো। পরে তারা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়াতো। এজন্যেই এই নিদের্শ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন পাথেয় সাথে নিয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত উয়াইনাও (রঃ) একথাই বলেন। সহীহ্ বুখারী, সুনান -ই-নাসাঈ প্রভৃতির মধ্যেও এই বর্ণনাগুলো রয়েছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, ইয়ামনবাসীরা এরূপ করতো এবং বলতো-‘আমরা আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যখন তারা ইহরাম বাঁধতো তখন তাদের কাছে যে পাথেয় থাকতো তা তারা ফেলে দিতে এবং পুনরায় নতুনভাবে পাথেয় গ্রহণ করতো। এজন্যেই তাদের উপর এই নির্দেশ হয় যে, তারা যেন এরূপ না করে এবং আটা, ছাতু ইত্যাদি। খাদ্য যেন পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যান্য আরও বহু বিশ্বস্ত মুফাসপ্রিও এরকমই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তো একথাও বলেছেন যে, সফরে উত্তম পাথেয় রাখার মধ্যেই মানুষের মর্যাদা নিহিত রয়েছে। সাথীদের প্রতি মন খুলে খরচ করারও তিনি শর্ত আরোপ করতেন। ইহলৌকিক পাথেয়ের বর্ণনার সাথে আল্লাহ তা'আলা পারলৌকিক পাথেয়ের প্রস্তুতি গ্রহণের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অর্থাৎ বান্দী যেন তার কবর রূপ সফরে আল্লাহ তা'আলার ভয়কে পাথেয় হিসেবে সাথে নিয়ে যায়। যেমন অন্য স্থানে পোষাকের বর্ণনা দিয়ে বলেন (আরবি) অর্থাৎ এবং খোদা -ভীরুতার পোষাকই হচ্ছে উত্তম।' (৭:২৬) অর্থাৎ বান্দা যেন বিনয়, নম্রতা, আনুগত্য এবং খোদা-ভীরুতার গোপনীয় পোষাক হতে শূন্য না থাকে। এমনকি এই গোপনীয় পোষাক বাহ্যিক পোষাক হতে বহু গুণে শ্রেয়।একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় পাথেয় গ্রহণ করে তা আখেরাতে তার উপকারে আসবে (তাবরানীর হাদীস)। এ নির্দেশ শুনে একজন দরিদ্র সাহাবী (রাঃ) বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট তো কিছুই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এতটুকু তো রয়েছে যে, তোমাকে কারও কাছে ভিক্ষে করতে হয় না এবং উত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়।' (তাফসীর ই- ইবনে-আবি হাতিম)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে জ্ঞানবানগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।' অর্থাৎ আমার শাস্তি ও পাকড়াওকে ভয় করতঃ তোমরা আমার নির্দেশকে অমান্য করো না তা হলেই মুক্তি পেয়ে যাবে এবং এটাই হবে জ্ঞানের পরিচায়ক।
আল-বাকারা 2:198
সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অজ্ঞতার যুগে উকায, মুজিন্না এবং যুলমাজাহ্ নামে বাজার ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর হজ্বের সময় সাহাবীগণ (রাঃ) ঐ বাজারগুলোতে ব্যবসা করার ব্যাপারে পাপ হয়ে যাবার ভয় করেন। ফলে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হয় যে, হজ্বের মৌসুমে ব্যবসা করলে কোন পাপ নেই। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এই বিষয়টি সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, হজ্বের সময় ইহরামের পূর্বে অথবা ইহরামের পর হাজীদের জন্যে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কিরআতে (আরবি)-এর পর (আরবি)কথাটিও রয়েছে। হযরত ইবেন যুবাইর (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অন্যান্য মুফাসিরগণও এর তাফসীর এরকমই করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, একটি লোক হজ্ব করতে যাচ্ছে এবং সাথে সাথে ব্যবসাও করছে তার ব্যাপারে নির্দেশ কি: তখন তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।মুসনাদ-ই-আহমাদের বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু উমামা তায়মী (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হজ্বে আমরা জন্তু ভাড়ার উপর দিয়ে থাকি, আমাদেরও হজ্ব হয়ে যাবে কি: তিনি উত্তরে বলেন, “তোমরা কি বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ কর না:' তোমরা কি আরাফায় অবস্থান কর না: শয়তানকে কি তোমরা পাথর মার না: তোমরা কি মস্তক মুণ্ডন কর না:' তিনি বলেন, “এইসব কাজতো আমরা করি। তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, তাহলে জেনে রেখো যে, একটি লোক এই প্রশ্নই নবী (সঃ)-কেও করেছিল এবং ওরই উত্তরে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) (আরবি) এই আয়াতটি নিয়ে অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটিকে ডাক দিয়ে বলেন, “তুমি হাজী। তোমার হজু হয়ে গেছে। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। তাফসীর’ আব্দ বিন হামীদ’ এর মধ্যে এটা আছে। কোন কোন বর্ণনায় শব্দেরও কিছু কম বেশী রয়েছে।একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তোমরা কি ইহরাম বাঁধ না:' আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনারা কি হজ্বের দিনেও ব্যবসা করতেন: তিনি উত্তর দেন, ব্যবসায়ের মৌসুমই বা আর কোনটা ছিল:' (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) পড়া হয়েছে অথচ (আরবি) হওয়ার দুটি ওর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ (আরবি) এবং (আরবি) কেননা, প্রকৃতপক্ষে এটা বহুবচন। যেমন- (আরবি) ও(আরবি) শব্দদ্বয়। এটা বিশেষ এক জায়গার নাম রাখা হয়েছে। এজন্যে মূলের প্রতি লক্ষ্য রেখেও (আরবি) পড়া হয়েছে।(আরবি) ঐ জায়গার নাম যেখানে অবস্থান করা হজ্বের একটি কাজ। মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান বিন মুআম্মারুদ্দায়লী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, হজ্ব হচ্ছে আরাফায়।' একথা তিনি তিন বার বলেন। অতঃপর বলেন, “যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বেই আরাফায় পৌছে গেল সে হজ্ব পেয়ে গেল। আর মিনা’র হচ্ছে তিন দিন। যে ব্যক্তি দু’দিনে তাড়াতাড়ি করলো তারও কোন পাপ নেই এবং যে বিলম্ব করলো তারও কোন পাপ নেই। আরাফায় অবস্থানের সময় হচ্ছে নয়ই যিলহজ্ব তারিখে পশ্চিমে সূর্য হেলে যাওয়া থেকে নিয়ে দশই যিলহজ্ব তারিখের ফজর প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত। কেননা, নবী (সঃ) বিদায় হজ্জে যুহরের নামাযের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেছিলেন এবং বলেছিলেন, “আমার নিকট হতে তোমরা তোমাদের হজ্বের নিয়মাবলী শিখে নাও।'হযরত ইমাম মালিক (রঃ) ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ইমাম শাফিঈর (রঃ) এটাই মাযহাব যে, দশ তারিখের ফজরের পূর্বে যে ব্যক্তি আরাফায় পৌছে গেল সে হজ্ব পেয়ে গেল। হযরত আহমাদ (রঃ) বলেন যে, ৯ই যিলহজ্ব তারিখের প্রথম থেকেই হচ্ছে আরাফায় অবস্থানের সময়। তার দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যার মধ্যে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালিফায় নামাযের জন্যে অগ্রসর হন তখন একজন লোক তার খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাই পাহাড় হতে আসছি। আমার আরোহণের পশুটি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ফলে আমি বড়ই বিপদে পড়ে যাই। আল্লাহর শপথ। আমি প্রত্যেক পাহাড়ের উপরেই থেমেছি, আমার হজ্ব হয়েছে কি:' তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এখানে আমাদের এই নামাযে পৌছে যাবে এবং চলার সময় পর্যন্ত আমাদের সাথে অবস্থান করবে, আর এর পূর্বে সে আরাফাতেও অবস্থান করে থাকবে, রাতেই হোক বা দিনেই হোক, তবে তার হজ্ব পুরো হয়ে যাবে। ফরযিয়ত হতে সে অবকাশ লাভ করবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনান-ই)। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে সঠিক বলেছেন। আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট আল্লাহ তাআলা হযরত জিব্রাঈল (আঃ)-কে প্রেরণ করেন এবং তিনি তাকে হজ্ব করিয়ে দেন। আরাফাতে পৌছে তাকে জিজ্ঞেস করেন (আরবি) আপনি চিনতে পেরেছেন কি: হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আরাফতু অর্থাৎ আমি নিচতে পেরেছি।' কেননা, এর পূর্বে আমি এখানে এসেছিলাম। এজন্যেই এ স্থানের নাম ‘আরাফা’ হয়ে গেছে। হযরত আতা (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু মুজিলযির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। আরাফাতের নাম ‘মাশআরুল হারাম’, ‘মাশআরুল আকসা’ এবং ইলাল’ও বটে। ঐ পাহাড়কেও আরাফাত বলে যার মধ্য স্থলে 'জাবালুর রহমত’ রয়েছে। আবু তালিবের একটি বিখ্যাত কাসীদার মধ্যে এই অর্থের কবিতা রয়েছে। অজ্ঞতা-যুগের অধিবাসীরাও আরাফায় অবস্থান করতো। যখন রোদ পর্বত চূড়ায় এরূপভাবে অবশিষ্ট থাকতো যেরূপভাবে মানুষের মাথায় পাগড়ী থাকে, তখন তারা তথা হতে চলে যেতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্যাস্তের পর সেখান হতে প্রস্থান করেন। অতঃপর তিনি মুযদালিফায় পৌছে তথায় শিবির স্থাপন করেন এবং প্রত্যুষে অন্ধকার থাকতেই একেবারে সময়ের প্রথমভাগে রাত্রির অন্ধকার ও দিবালোকের মিলিত সময়ে এখানে তিনি ফজরের নামায আদায় করেন। ফজরের সময়ের শেষ ভাগে তিনি এখান হতে যাত্রা করেন। হযরত মাসুর বিন মুখাররামা (রাঃ) বলেন, নবী (সঃ) আরাফায় আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করেন এবং অভ্যাস মত আল্লাহর প্রশংসা কীর্তনের পর (আরবী) বলে বলেনঃ ‘আজকের দিনই বড় হজ্ব। মুশরিক ও প্রতিমা পূজকেরা এখান হতে সূর্য অস্তমিত হবার পূর্বেই প্রস্থান করতো, যে সময় মানুষের মাথায় পাগড়ী থাকার ন্যায় পর্বত শিখরে রৌদ্র অবশিষ্ট থাকতো। কিন্তু আমরা সূর্যাস্তের পর এখান হতে বিদায় গ্রহণ করবো।' মাশআরে হারাম’ হতে তারা সূর্যোদয়ের পর রওয়ানা দিতো। তখন রোদ এতটুকু উপরে উঠতো যে,ঐ রোদ পর্বতের চূড়ায় এমনই প্রকাশ পেতো যেমন মানুষের মাথায় পাগড়ী প্রকাশ পায়। কিন্তু আমরা সুর্যোদয়ের পূর্বেই সেখান হতে যাত্রা করবো। আমাদের পদ্ধতি মুশরিকদের পদ্ধতির উল্টো। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই ও তাফসীর-ই-মুস্তাদরিক-ই-হাকিম)। ইমাম হাকিম (রঃ) এটাকে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের (রঃ) শর্তের উপর সঠিক বলেছেন। এর দ্বারা এও সাব্যস্ত হলো যে, হযরত মাসূর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এটা শুনেছেন। এ লোকদের কথা ঠিন নয় যারা বলেন যে, হযরত মাসূর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে দেখেছেন; কিন্তু তাঁর নিকট হতে কিছুই শুনেননি। হযরত মারুর বিন সাভীদ (রঃ) বলেন-“আমি হযরত উমার (রাঃ)-কে আরাফাত হতে ফিরতে দেখেছি। ঐ দৃশ্য যেন আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। তার মাথার অগ্রভাগে চুল ছিল না। তিনি স্বীয় উষ্ট্রের উপর আসীন ছিলেন এবং মুখে উচ্চারণ করেছিলেন, 'আমার প্রত্যাবর্তনকে সম্পূর্ণরূপে উজ্জ্বল পেয়েছি।'সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি সুদীর্ঘ হাদীসে বিদায় হজ্বের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করেন। যখন সূর্য লুপ্ত হয় এবং কিঞ্চিৎ হলদে বর্ণ প্রকাশ পায় তখন তিনি নিজের সওয়ারীর উপর হযরত উসামা বিন জায়েদ (রাঃ)-কে পিছনে বসিয়ে নেন। অতঃপর তিনি ঊন্ত্রীর লাগাম টেনে ধরেন, ফলে উন্থর মাথা গদির নিকটে পৌছে যায়। ডান হাতের ইশারায় তিনি জনগণকে বলতে বলতে যানঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা ধীরে-সুস্থে ও আরামআয়েশের সাথে চল। যখনই তিনি কোন পাহাড়ের সম্মুখীন হন তখন তিনি লাগাম কিছুটা ঢিল দেন যাতে পশুটি সহজে উপরে উঠতে পারে। মুযদালিফায় পৌছে তিনি এক আযান ও দুই ইকামতের মাধ্যমে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করেন। মাগরিব ও ইশার ফরয নামাজের মধ্যবর্তী সময় কোন সুন্নাত ও নফল নামায পড়েননি। অতঃপর শুয়ে পড়েন। সুবহে সাদিক প্রকাশিত হওয়ার পর আযান ও ইকামতের মাধ্যমে ফজরের নামায আদায় করেন। তারপর ‘কাসওয়া’ নামক উষ্ট্ৰীতে আরোহণ করে ‘মাশআরে হারামে আসেন এবং কিবলামুখী হয়ে প্রার্থনায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। আল্লাহু আকবার ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করতঃ আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ব বর্ণনা করতে থাকেন। তারপর তিনি খুবই সকালে ঘুমিয়ে পড়েন। সূর্যোদয়ের পূর্বেই তিনি এখান হতে রওয়ানা হয়ে যান। হযরত উসামা (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখান হতে যাওয়ার সময় কেমন তালে চলেন: তিনি উত্তরে বলেনঃ মধ্যম গতিতে তিনি সওয়ারী চালনা করেন। তবে রাস্তা প্রশস্ত দেখলে কিছু দ্রুত গতিতেও চালাতেন। (সহীহ বুখারীও সহীহ মুসলিম)। অতঃপর বলা হচ্ছে-“আরাফা' হতে প্রত্যাবর্তিত হয়ে মাশআরে হারামে আল্লাহকে স্মরণ কর।' অর্থাৎ এখানে দুই নামাযকে একত্রিত কর। হযরত আমর বিন মায়মুন (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে মাশআরে হারাম’ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি নীরব থাকেন। যাত্রীদল মুযদালিফায় অবতরণ করলে তিনি বলেনঃ ‘প্রশ্নকারী কোথায়: এটাই হচ্ছে মাশআরে হারাম।' তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, মুযদালিফার প্রত্যেকটি জায়গাই হচ্ছে ‘মাশআরে হারাম'। তিনি জনগণকে দেখতে পান যে, তারা কাযাহ’ নামক স্থানে ভীড় করছে। তখন তিনি বলেনঃ “এই লোকগুলো এখানে ভীড় করছে কেন: এখানকার সব জায়গাইতো মাশআরুল হারাম।" আরও বহু তাফসীরকারক এটাই বলেছেন যে, দুই পর্বতের মধ্যবর্তী প্রত্যেক স্থানই মাশআরুল হারাম। হযরত আতা (রঃ) জিজ্ঞাসিত হনঃ মুযদালিফা কোথায়: উত্তরে তিনি বলেনঃ “আরাফা হতে রওয়ানা হয়ে আরাফা প্রান্তরের দুই প্রান্ত ছেড়ে গেলেই মুযদালিফা আরম্ভ হয়ে যায়। মুহাস্সার' নামক উপত্যকা পর্যন্ত এর শেষ সীমা। এর মধ্যে যেখানে ইচ্ছা সেখানেই অবস্থান করা যায়। তবে আমি কাযাহে’র উপর থেমে যাওয়াই পছন্দ করি যাতে পথের সাথে সংযোগ স্থাপিত হয়।(আরবি) বলা হয় বাহ্যিক চিহ্নগুলোকে। মুযদালিফা হারামের অন্তর্ভুক্ত বলে তাকে মাশআরে হারাম' বলা হয়। পূর্ববর্তী সাধু পুরুষদের একটি দলের এবং ইমাম শাফিঈর (রঃ) কোন কোন সহচর যেমন কাফফাল ও ইবনে খুযাইমার ধারণা এই যে,এখানে অবস্থান করা হজ্বের একটি রুকন বিশেষ। এখানে থামা ছাড়া হজ্ব শুদ্ধ হয় না। কেননা, হযরত উরওয়া বিন মাযরাস (রঃ) হতে এই অর্থেরই একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ এই অবস্থানকে ওয়াজিব বলেছেন। হযরত ইমাম শাফিঈর (রঃ) বর্ণনায় এও রয়েছে যে,যদি কেউ এখানে না থামে তবে একটি কুরবানী করতে হবে। তাঁর দ্বিতীয় উক্তি অনুসারে এটা মুস্তাহাব। সুতরাং না থামলেও কোন দোষ নেই। কাজেই এই তিনটি উক্তি হলো। এখানে এর আলেচিনা খুব লম্বা করা আমরা উচিত মনে করি না। একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে,আরাফাতের সমস্ত প্রান্তরই অবস্থান স্থল। আরাফাত হতে উঠো এবং মুযদালিফার প্রত্যেক সীমাও থামার জায়গা। তবে মুহাস্সার উপত্যকাটি নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের এই হাদীসের মধ্যে এর পরে রয়েছে যে, মক্কা শরীফের সমস্ত গলিই কুরবানীর জায়গা এবং ‘আইয়্যামে তাশরীকের (১১,১২ ও ১৩ই যিলহজ্ব) সমস্ত দিনই হচ্ছে কুরবানীর দিন। কিন্তু এই হাদীসটিও মুনকাতা'। কেননা, সুলাইমান বিন মূসা রাশদাক যুবাইর বিন মুতইমকে (রাঃ) পায়নি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ কর। কেননা, তিনি তোমাদেরকে সুপথ দেখিয়েছেন। হজ্বের আহকাম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এই সুন্নাতকে প্রকাশিত করেছেন। অথচ তোমরা এর পূর্বে বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। অর্থাৎ এই সুপথ প্রদর্শনের পূর্বে কিংবা এই কুরআন পাকের পূর্বে অথবা এই রাসূল (সঃ)-এর পূর্বে প্রকৃতপক্ষে এই তিনটারই পূর্বে দুনিয়া ভ্রান্তির মধ্যে ছিল।
আল-বাকারা 2:199
(আরবি) শব্দটি (আরবি) এখানে (আরবি)-এর উপর -এর সংযোগ স্থাপনের জন্যে এসেছে, যেন শৃংখলা বজায় থাকে। আরাফায় অবস্থানকারীদেরকে যেন নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা এখান থেকে মুযদালিফায় যাবে, যেন মাশআরে হারামের নিকট আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করতে পারে। এটাও তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তারা সমস্ত লোকের সাথে আরাফাতে অবস্থান করবে, যেমন সর্বসাধারণ এখানে অবস্থান করতো। তবে অবশ্যই কুরাইশরা তাদের গৌরব ও আভিজাত্য প্রকাশের জন্যে এই অবস্থান করে থাকতো। তারা হারাম শরীফের সীমা হতে বাইরে যেতো না এবং ‘হারামে’র শেষ সীমায় অবস্থান করতো এবং বলতো: ‘আমরা আল্লাহর ভক্ত এবং তাঁরই শহরের আমরা নেতা ও তারই ঘরের খাদেম।'সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, কুরাইশ ও তাদের মতানুসারী লোকেরা মুযদালিফাতেই থেমে যেতো এবং নিজেদের নাম (আরবি) রাখতো। অবশিষ্ট সমস্ত আরববাসী আরাফায় গিয়ে অবস্থান করতো এবং ওখান হতে ফিরে আসতো। এজন্যেই ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে যে, সর্বসাধারণ যেখান হতে প্রত্যাবর্তন করতো, তোমরা সেখান হতে প্রত্যাবর্তন কর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রাঃ), হযরত আতা (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীও এটাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)ও এই তাফসীরই পছন্দ করেছেন এবং বলেছেন যে, এর উপর ইজমা রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত যুবাইর বিন মুতইম (রাঃ) বলেনঃ “আমার উট আরাফায় হারিয়ে যায়, আমি উটটি খুঁজতে বের হই। তথায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অবস্থানরত অবস্থায় দেখতে পাই। আমি বলি- এটা কেমন কথা যে, ইনি হচ্ছে (আরবি) অথচ হারাম শরীফের বাইরে এসে অবস্থান করছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে প্রস্তর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে মুযদালিফা হতে মিনায় যাওয়া।আর (আরবি) শব্দ দ্বারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘ইমাম'। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, যদি এর বিপরীত ইজমা হওয়ার প্রমাণ না থাকতো তবে এই উক্তিটির প্রাধান্য হতো।অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যার নির্দেশ সাধারণতঃ ইবাদতের পরে দেয়া হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফরয নামায সমাপ্ত করার পর তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন (সহীহ মুসলিম)। তিনি জনসাধারণকে সুবহানাল্লাহি ‘আল হামদুলিল্লাহি’ এবং আল্লাহু আকবার’ তেত্রিশ বার করে পড়ার নির্দেশ দিতেন (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। এটাও বর্ণিত আছে যে, আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) সন্ধ্যার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর উম্মতের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ইরশাদও বর্ণিত হয়েছে যে, সমুদয় ক্ষমা প্রার্থনার নেতা হচ্ছে নিম্নের এই প্রার্থনাটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রভু। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার দাস। আমি সাধ্যানুসারে আপনার আহাদ ও অঙ্গীকারের উপর রয়েছি ।"আমি যে অন্যায় করেছি তা হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার উপর যে আপনার নিয়ামত রয়েছে তা আমি স্বীকার করছি এবং আমার পাপকেও আমি স্বীকার করছি। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি এই দু'আটি রাত্রে পড়ে নেবে, যদি সে সেই রাত্রেই মারা যায় তবে সে অবশ্যই বেহেশতী হবে। আর যে ব্যক্তি এটা দিনে পড়বে, যদি ঐ দিনেই সে মৃত্যুবরণ করে তবে অবশ্যই সে জান্নাতী হবে (সহীহ বুখারী)। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি নামাযে পাঠ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আপনি বলুনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আমার জীবনের উপরে বড়ই অত্যাচার করেছি এবং আপনি ছাড়া কেউ ক্ষমা করতে পারে না। সুতরাং আপনি আমাকে আপনার নিকট হতে ক্ষমা করে দিন এবং আমার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।
আল-বাকারা 2:200
২০০-২০২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন-“হজ্ব সমাপনের পর খুব বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রথম বাক্যের একটি অর্থ তো এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, শিশু যেমন তার পিতা-মাতাকে স্মরণ করে ঐরূপ তোমরাও আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ কর। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা হজ্বের সময় অবস্থানের স্থানে অবস্থান করতো। অতঃপর কেউ বলতো‘আমার পিতা একজন বড় অতিথি সেবক ছিলেন। তিনি সাধারণের কাজ করে দিতেন। তিনি দানশীলতা ও বীরত্বে অদ্বিতীয় ছিলেন ইত্যাদি। কাজেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘এই সব বাজে কথা পরিত্যাগ কর এবং আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা কর। অধিকাংশ মুফাসির এটাই বর্ণনা করেছেন। মোটকথা এই যে, তোমরা খুব বেশী আল্লাহর যিক্র কর। এজন্যেই (আরবি) বা প্রভেদের উপর ভিত্তি করে (আরবি) এর উপর যবর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যেভাবে তোমরা তোমাদের বড়দের জন্যে গৌরববোধ করে থাকো সেইভাবেই আল্লাহকে স্মরণ কর। (আরবি) দ্বারা এখানে, (আরবি)-এর সাদৃশ্য নিরূপণ করা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং এর মধ্যে -এর সাদৃশ্য প্রকাশের জন্যে (আরবি) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই সমুদয় স্থানে শব্দটি (আরবি) কখনই সন্দেহের জন্যে নয়, বরং যার সংবাদ দেয়া হয়েছে তারই বিশ্লেষণের জন্যে। অর্থাৎ ঐ যিকর এতটাই হবে বা তার চেয়েও বেশী হবে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহর যিক্র খুব বেশী করতঃ প্রার্থনা করতে থাক। কেননা, এটা হচ্ছে প্রার্থনা কবুলের সময়। সাথে সাথে ঐ সব লোকের অমঙ্গল কামনা করা হচ্ছে যারা আল্লাহর নিকট শুধু দুনিয়া লাভের জন্যেই প্রার্থনা জানিয়ে থাকে এবং আখেরাতের দিকে ভ্রুক্ষেপই করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালে কোনই অংশ নেই। হযরত আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা রয়েছে যে, কতকগুলো পল্লীবাসী এখানে অবস্থান করে শুধুমাত্র এই প্রার্থনা করতে, হে আল্লাহ! এই বছর ভালভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করুন যেন ফসল ভাল জন্মে এবং বহু সন্তান দান করুন ইত্যাদি। কিন্তু মু'মিনদের প্রার্থনা উভয় জগতের মঙ্গলের জন্যেই হতো। এজন্যেই তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। এই প্রার্থনার মধ্যে ইহজগত ও পরজগতের সমুদয় মঙ্গল একত্রিত করা হয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল হতে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। কেননা, দুনিয়ার মঙ্গলের মধ্যে নিরাপত্তা, শান্তি, সুস্থতা, পরিবার পরিজন, খাদ্য, শিক্ষা, যানবাহন, দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী এবং সম্মান ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। আর আখেরাতের মঙ্গলের মধ্যে হিসাব সহজ হওয়া, ভয় সন্ত্রাস হতে মুক্তি পাওয়া, আমলনামা ডান হাতে পাওয়া এবং সম্মানের সাথে বেহেস্তে প্রবেশ করা ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। এর পরে দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি চাওয়া। এর ভাবার্থ এই যে, এরূপ কারণসমূহ আল্লাহ তা'আলা প্রস্তুত করে দেবেন। যেমন যারা অবৈধ কাজ করে থাকে তা থেকে তারা বিরত থাকবে এবং পাপ কার্য পরিত্যাগ করবে ইত্যাদি। কাসিম (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অন্তর, যিক্রকারী জিহ্বা এবং ধৈর্যধারণকারী দেহ লাভ করেছে সে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল পেয়ে গেছে এবং দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করেছে।সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটিকে খুব বেশী পড়তেন। এই হাদীসে (আরবি) শব্দের পূর্বে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) হযরত আনাস (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন দু'আটি খুব বেশী পড়তেন: উত্তরে তিনি এই দু'আটির কথাই বলেন (তাফসীর-ইআহমাদ) হযরত আনাস (রাঃ) নিজেও যখন কোন দু'আ করতেন তখন তিনি এই দু'আটি ছাড়তেন না। হযরত সাবিত (রাঃ) একদা বলেন, “জনাব! আপনার এই ভাইটি চায় যে, আপনারা তার জন্যে দু'আ করেন। তখন তিনি এই দু'আটি পড়েন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসে আলাপ আলোচনার পর তিনি চলে যাবার সময় আবার দু'আর প্রার্থনা জানালে তিনি বলেন, তুমি কি খণ্ড করতে চাচ্ছ: এই দু'আর মধ্যে তো সমস্ত মঙ্গল এসে গেছে (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি মুসলমান রুগ্ন ব্যক্তিকে পরিদর্শন করতে যান। তাকে তিনি দেখেন যে, একেবারে ক্ষীণ হয়ে গেছেন এবং শুধু মাত্র অস্থির কাঠামো অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন প্রার্থনা জানাচ্ছিলে কি তিনি বলেন “হাঁ, আমি এই প্রার্থনা করছিলাম। হে আল্লাহ! আপনি পরকালে আমাকে যে শাস্তি দিতে চান সেই শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন ‘সুবহানাল্লাহ! কারও মধ্যে ঐ শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি: তুমি।(আরবি) এই দু'আটি পড়নি কেন:' সুতরাং রুগ্ন ব্যক্তি তখন থেকে ঐ দু’আটিই পড়তে থাকেন এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আরোগ্য দান করেন (তাফসীর-ই-আহমাদ)। রুকনে বানী হামাজ এবং ‘রুকনে আওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটি পড়তেন (সুনান-ই-ইবনে মাজাহ ইত্যাদি) কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, 'যখন আমি রুকনের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি তখন দেখি যে, তথায় ফেরেশতা রয়েছেন এবং ‘আমীন' বলছেন। তোমরা যখনই ওখান দিয়ে যাবে এই দু'আটি পড়বে (তাফসীর-ই-ইবনে-মিরদুওয়াই)এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করে, “আমি একটি যাত্রী দলের সেবার কার্যে এই পারিশ্রমিকের উপর নিযুক্ত হয়েছি যে, তারা আমাকে তাদের সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নেবে এবং হজ্বের সময় তারা আমাকে হজ্ব করবার অবকাশ দেবে ও অন্যান্য দিনে আমি তাদের সেবার কার্যে নিয়োজিত থাকবে। তাহলে বলুন, এভাবে আমার হজ্ব আদায় হবে কি: তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ, বরং তুমি তো ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে কুরআন মাজীদের মধ্যে। (আরবি) অর্থাৎ তারা যা অর্জন করেছে তাদের জন্যে তারই অংশ রয়েছে’-এই আয়াতটি ঘোষিত হয়েছে (মুস্তাদরিক-ই-হাকিম)।
আল-বাকারা 2:201
২০০-২০২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন-“হজ্ব সমাপনের পর খুব বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রথম বাক্যের একটি অর্থ তো এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, শিশু যেমন তার পিতা-মাতাকে স্মরণ করে ঐরূপ তোমরাও আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ কর। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা হজ্বের সময় অবস্থানের স্থানে অবস্থান করতো। অতঃপর কেউ বলতো‘আমার পিতা একজন বড় অতিথি সেবক ছিলেন। তিনি সাধারণের কাজ করে দিতেন। তিনি দানশীলতা ও বীরত্বে অদ্বিতীয় ছিলেন ইত্যাদি। কাজেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘এই সব বাজে কথা পরিত্যাগ কর এবং আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা কর। অধিকাংশ মুফাসির এটাই বর্ণনা করেছেন। মোটকথা এই যে, তোমরা খুব বেশী আল্লাহর যিক্র কর। এজন্যেই (আরবি) বা প্রভেদের উপর ভিত্তি করে (আরবি) এর উপর যবর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যেভাবে তোমরা তোমাদের বড়দের জন্যে গৌরববোধ করে থাকো সেইভাবেই আল্লাহকে স্মরণ কর। (আরবি) দ্বারা এখানে, (আরবি)-এর সাদৃশ্য নিরূপণ করা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং এর মধ্যে -এর সাদৃশ্য প্রকাশের জন্যে (আরবি) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই সমুদয় স্থানে শব্দটি (আরবি) কখনই সন্দেহের জন্যে নয়, বরং যার সংবাদ দেয়া হয়েছে তারই বিশ্লেষণের জন্যে। অর্থাৎ ঐ যিকর এতটাই হবে বা তার চেয়েও বেশী হবে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহর যিক্র খুব বেশী করতঃ প্রার্থনা করতে থাক। কেননা, এটা হচ্ছে প্রার্থনা কবুলের সময়। সাথে সাথে ঐ সব লোকের অমঙ্গল কামনা করা হচ্ছে যারা আল্লাহর নিকট শুধু দুনিয়া লাভের জন্যেই প্রার্থনা জানিয়ে থাকে এবং আখেরাতের দিকে ভ্রুক্ষেপই করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালে কোনই অংশ নেই। হযরত আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা রয়েছে যে, কতকগুলো পল্লীবাসী এখানে অবস্থান করে শুধুমাত্র এই প্রার্থনা করতে, হে আল্লাহ! এই বছর ভালভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করুন যেন ফসল ভাল জন্মে এবং বহু সন্তান দান করুন ইত্যাদি। কিন্তু মু'মিনদের প্রার্থনা উভয় জগতের মঙ্গলের জন্যেই হতো। এজন্যেই তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। এই প্রার্থনার মধ্যে ইহজগত ও পরজগতের সমুদয় মঙ্গল একত্রিত করা হয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল হতে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। কেননা, দুনিয়ার মঙ্গলের মধ্যে নিরাপত্তা, শান্তি, সুস্থতা, পরিবার পরিজন, খাদ্য, শিক্ষা, যানবাহন, দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী এবং সম্মান ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। আর আখেরাতের মঙ্গলের মধ্যে হিসাব সহজ হওয়া, ভয় সন্ত্রাস হতে মুক্তি পাওয়া, আমলনামা ডান হাতে পাওয়া এবং সম্মানের সাথে বেহেস্তে প্রবেশ করা ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। এর পরে দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি চাওয়া। এর ভাবার্থ এই যে, এরূপ কারণসমূহ আল্লাহ তা'আলা প্রস্তুত করে দেবেন। যেমন যারা অবৈধ কাজ করে থাকে তা থেকে তারা বিরত থাকবে এবং পাপ কার্য পরিত্যাগ করবে ইত্যাদি। কাসিম (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অন্তর, যিক্রকারী জিহ্বা এবং ধৈর্যধারণকারী দেহ লাভ করেছে সে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল পেয়ে গেছে এবং দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করেছে।সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটিকে খুব বেশী পড়তেন। এই হাদীসে (আরবি) শব্দের পূর্বে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) হযরত আনাস (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন দু'আটি খুব বেশী পড়তেন: উত্তরে তিনি এই দু'আটির কথাই বলেন (তাফসীর-ইআহমাদ) হযরত আনাস (রাঃ) নিজেও যখন কোন দু'আ করতেন তখন তিনি এই দু'আটি ছাড়তেন না। হযরত সাবিত (রাঃ) একদা বলেন, “জনাব! আপনার এই ভাইটি চায় যে, আপনারা তার জন্যে দু'আ করেন। তখন তিনি এই দু'আটি পড়েন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসে আলাপ আলোচনার পর তিনি চলে যাবার সময় আবার দু'আর প্রার্থনা জানালে তিনি বলেন, তুমি কি খণ্ড করতে চাচ্ছ: এই দু'আর মধ্যে তো সমস্ত মঙ্গল এসে গেছে (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি মুসলমান রুগ্ন ব্যক্তিকে পরিদর্শন করতে যান। তাকে তিনি দেখেন যে, একেবারে ক্ষীণ হয়ে গেছেন এবং শুধু মাত্র অস্থির কাঠামো অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন প্রার্থনা জানাচ্ছিলে কি তিনি বলেন “হাঁ, আমি এই প্রার্থনা করছিলাম। হে আল্লাহ! আপনি পরকালে আমাকে যে শাস্তি দিতে চান সেই শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন ‘সুবহানাল্লাহ! কারও মধ্যে ঐ শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি: তুমি।(আরবি) এই দু'আটি পড়নি কেন:' সুতরাং রুগ্ন ব্যক্তি তখন থেকে ঐ দু’আটিই পড়তে থাকেন এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আরোগ্য দান করেন (তাফসীর-ই-আহমাদ)। রুকনে বানী হামাজ এবং ‘রুকনে আওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটি পড়তেন (সুনান-ই-ইবনে মাজাহ ইত্যাদি) কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, 'যখন আমি রুকনের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি তখন দেখি যে, তথায় ফেরেশতা রয়েছেন এবং ‘আমীন' বলছেন। তোমরা যখনই ওখান দিয়ে যাবে এই দু'আটি পড়বে (তাফসীর-ই-ইবনে-মিরদুওয়াই)এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করে, “আমি একটি যাত্রী দলের সেবার কার্যে এই পারিশ্রমিকের উপর নিযুক্ত হয়েছি যে, তারা আমাকে তাদের সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নেবে এবং হজ্বের সময় তারা আমাকে হজ্ব করবার অবকাশ দেবে ও অন্যান্য দিনে আমি তাদের সেবার কার্যে নিয়োজিত থাকবে। তাহলে বলুন, এভাবে আমার হজ্ব আদায় হবে কি: তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ, বরং তুমি তো ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে কুরআন মাজীদের মধ্যে। (আরবি) অর্থাৎ তারা যা অর্জন করেছে তাদের জন্যে তারই অংশ রয়েছে’-এই আয়াতটি ঘোষিত হয়েছে (মুস্তাদরিক-ই-হাকিম)।
আল-বাকারা 2:202
২০০-২০২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন-“হজ্ব সমাপনের পর খুব বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রথম বাক্যের একটি অর্থ তো এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, শিশু যেমন তার পিতা-মাতাকে স্মরণ করে ঐরূপ তোমরাও আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ কর। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা হজ্বের সময় অবস্থানের স্থানে অবস্থান করতো। অতঃপর কেউ বলতো‘আমার পিতা একজন বড় অতিথি সেবক ছিলেন। তিনি সাধারণের কাজ করে দিতেন। তিনি দানশীলতা ও বীরত্বে অদ্বিতীয় ছিলেন ইত্যাদি। কাজেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘এই সব বাজে কথা পরিত্যাগ কর এবং আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা কর। অধিকাংশ মুফাসির এটাই বর্ণনা করেছেন। মোটকথা এই যে, তোমরা খুব বেশী আল্লাহর যিক্র কর। এজন্যেই (আরবি) বা প্রভেদের উপর ভিত্তি করে (আরবি) এর উপর যবর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যেভাবে তোমরা তোমাদের বড়দের জন্যে গৌরববোধ করে থাকো সেইভাবেই আল্লাহকে স্মরণ কর। (আরবি) দ্বারা এখানে, (আরবি)-এর সাদৃশ্য নিরূপণ করা হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং এর মধ্যে -এর সাদৃশ্য প্রকাশের জন্যে (আরবি) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই সমুদয় স্থানে শব্দটি (আরবি) কখনই সন্দেহের জন্যে নয়, বরং যার সংবাদ দেয়া হয়েছে তারই বিশ্লেষণের জন্যে। অর্থাৎ ঐ যিকর এতটাই হবে বা তার চেয়েও বেশী হবে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহর যিক্র খুব বেশী করতঃ প্রার্থনা করতে থাক। কেননা, এটা হচ্ছে প্রার্থনা কবুলের সময়। সাথে সাথে ঐ সব লোকের অমঙ্গল কামনা করা হচ্ছে যারা আল্লাহর নিকট শুধু দুনিয়া লাভের জন্যেই প্রার্থনা জানিয়ে থাকে এবং আখেরাতের দিকে ভ্রুক্ষেপই করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালে কোনই অংশ নেই। হযরত আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা রয়েছে যে, কতকগুলো পল্লীবাসী এখানে অবস্থান করে শুধুমাত্র এই প্রার্থনা করতে, হে আল্লাহ! এই বছর ভালভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করুন যেন ফসল ভাল জন্মে এবং বহু সন্তান দান করুন ইত্যাদি। কিন্তু মু'মিনদের প্রার্থনা উভয় জগতের মঙ্গলের জন্যেই হতো। এজন্যেই তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। এই প্রার্থনার মধ্যে ইহজগত ও পরজগতের সমুদয় মঙ্গল একত্রিত করা হয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল হতে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। কেননা, দুনিয়ার মঙ্গলের মধ্যে নিরাপত্তা, শান্তি, সুস্থতা, পরিবার পরিজন, খাদ্য, শিক্ষা, যানবাহন, দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী এবং সম্মান ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। আর আখেরাতের মঙ্গলের মধ্যে হিসাব সহজ হওয়া, ভয় সন্ত্রাস হতে মুক্তি পাওয়া, আমলনামা ডান হাতে পাওয়া এবং সম্মানের সাথে বেহেস্তে প্রবেশ করা ইত্যাদি সব কিছুই এসে গেল। এর পরে দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি চাওয়া। এর ভাবার্থ এই যে, এরূপ কারণসমূহ আল্লাহ তা'আলা প্রস্তুত করে দেবেন। যেমন যারা অবৈধ কাজ করে থাকে তা থেকে তারা বিরত থাকবে এবং পাপ কার্য পরিত্যাগ করবে ইত্যাদি। কাসিম (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অন্তর, যিক্রকারী জিহ্বা এবং ধৈর্যধারণকারী দেহ লাভ করেছে সে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল পেয়ে গেছে এবং দোযখের শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করেছে।সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটিকে খুব বেশী পড়তেন। এই হাদীসে (আরবি) শব্দের পূর্বে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) হযরত আনাস (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন দু'আটি খুব বেশী পড়তেন: উত্তরে তিনি এই দু'আটির কথাই বলেন (তাফসীর-ইআহমাদ) হযরত আনাস (রাঃ) নিজেও যখন কোন দু'আ করতেন তখন তিনি এই দু'আটি ছাড়তেন না। হযরত সাবিত (রাঃ) একদা বলেন, “জনাব! আপনার এই ভাইটি চায় যে, আপনারা তার জন্যে দু'আ করেন। তখন তিনি এই দু'আটি পড়েন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসে আলাপ আলোচনার পর তিনি চলে যাবার সময় আবার দু'আর প্রার্থনা জানালে তিনি বলেন, তুমি কি খণ্ড করতে চাচ্ছ: এই দু'আর মধ্যে তো সমস্ত মঙ্গল এসে গেছে (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি মুসলমান রুগ্ন ব্যক্তিকে পরিদর্শন করতে যান। তাকে তিনি দেখেন যে, একেবারে ক্ষীণ হয়ে গেছেন এবং শুধু মাত্র অস্থির কাঠামো অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন প্রার্থনা জানাচ্ছিলে কি তিনি বলেন “হাঁ, আমি এই প্রার্থনা করছিলাম। হে আল্লাহ! আপনি পরকালে আমাকে যে শাস্তি দিতে চান সেই শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন ‘সুবহানাল্লাহ! কারও মধ্যে ঐ শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি: তুমি।(আরবি) এই দু'আটি পড়নি কেন:' সুতরাং রুগ্ন ব্যক্তি তখন থেকে ঐ দু’আটিই পড়তে থাকেন এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আরোগ্য দান করেন (তাফসীর-ই-আহমাদ)। রুকনে বানী হামাজ এবং ‘রুকনে আওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দু'আটি পড়তেন (সুনান-ই-ইবনে মাজাহ ইত্যাদি) কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, 'যখন আমি রুকনের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি তখন দেখি যে, তথায় ফেরেশতা রয়েছেন এবং ‘আমীন' বলছেন। তোমরা যখনই ওখান দিয়ে যাবে এই দু'আটি পড়বে (তাফসীর-ই-ইবনে-মিরদুওয়াই)এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করে, “আমি একটি যাত্রী দলের সেবার কার্যে এই পারিশ্রমিকের উপর নিযুক্ত হয়েছি যে, তারা আমাকে তাদের সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নেবে এবং হজ্বের সময় তারা আমাকে হজ্ব করবার অবকাশ দেবে ও অন্যান্য দিনে আমি তাদের সেবার কার্যে নিয়োজিত থাকবে। তাহলে বলুন, এভাবে আমার হজ্ব আদায় হবে কি: তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ, বরং তুমি তো ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে কুরআন মাজীদের মধ্যে। (আরবি) অর্থাৎ তারা যা অর্জন করেছে তাদের জন্যে তারই অংশ রয়েছে’-এই আয়াতটি ঘোষিত হয়েছে (মুস্তাদরিক-ই-হাকিম)।
আল-বাকারা 2:203
(আরবি) দ্বারা (আরবি) (১১ই, ১২ই, ও ১৩ই যিলহজ্ব) কে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা যিলহজ্ব মাসের দশদিন অর্থ নেয়া হয়েছে। আইয়্যামে তাশরীকে ফরয নামাযের পর (আরবি) পাঠ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আরাফার দিন, কুরবানীর দিন এবং আইয়্যামে তাশরীক আমাদের জন্যে অর্থাৎ মুসলমানদের জন্যে খুশীর দিন এবং এই দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন (তাফসীর-ই আহমাদ)। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আইয়্যামে তাশরীক হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহকে স্মরণ করার দিন (আহমদ)। ইতিপূর্বে এই হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যে, আরাফার সমস্ত জায়গাই হচ্ছে অবস্থানের জায়গা এবং আইয়্যামে তাশরীক সবই হচ্ছে কুরবানীর দিন। এই হাদীসটিও পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মিনার দিন হচ্ছে তিনটি। দু'দিনে তাড়াতাড়িকারী বা বিলম্বকারীর জন্যে কোন পাপ নেই। ইবনে জারিরের একটি হাদীসে রয়েছে যে, আইয়্যামে তাশরীক হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করার দিন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ বিন হাযাফাকে (রাঃ) এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন মিনার চতুর্দিকে ঘুরে ঘোষণা করেনঃ “এই দিনগুলোতে কেউ যেন রোযা না রাখে। এই দিনগুলো হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহকে স্মরণ করার দিন।' অন্য একটি মুরসাল হাদীসের মধ্যে এটুকু বেশী আছে : ‘কিন্তু যার উপর কুরবানীর পরিবর্তে রোযা রয়েছে তার জন্য এটা অতিরিক্ত পুণ্য।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঘোষণাকারী ছিলেন হযরত বাশার বিন সাহীম (রাঃ)। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই দিনগুলোতে রোযা রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করে আনসার ঘাটিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেনঃ “হে জনমণ্ডলী! এই দিনগুলো রোযা রাখার দিন নয়, বরং এগুলো হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহকে স্মরণ করার দিন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ (আরবি) হচ্ছে (আরবি) এবং এ হচ্ছে চার দিন। দশই যিলহজ্ব ও তার পরবর্তী তিন দিন। অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্ব হতে ১৩ই যিলহজ্ব পর্যন্ত। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ), হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ), আতা’ (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), আবূ মালিক (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), ইয়াহইয়া বিন আবি কাসীর (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), যুহরী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ), যহাক (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ), আতা’ খুরাসানী (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ) প্রভৃতি মনীষীও এটাই বলেন।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “এ হচ্ছে তিন দিন ১০, ১১, ও ১২ই যিলহজ্ব। এই তিন দিনের মধ্যে যে দিন চাও কুরবানী কর। কিন্তু উত্তম হচ্ছে প্রথম দিন। কিন্তু পূর্ব উক্তিটিই প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তাছাড়া পবিত্র কুরআনের শব্দ দ্বারাও এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। কেননা বলা হয়েছে যে, দু'দিনের তাড়াতাড়ি ও বিলম্ব ক্ষমার্হ। কাজেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈদের পরে তিন দিন হওয়াই উচিত এবং এই দিনগুলোতে আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করার সময় হচ্ছে কুরবানীর পশু যবাহ্ করার সময়। পূর্বে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাবই প্রাধান্য প্রাপ্ত। তা হলো এই যে, কুরবানীর সময় হচ্ছে ঈদের দিন হতে নিয়ে আইয়্যামে তাশরীকের শেষ পর্যন্ত। আল্লাহকে স্মরণ কর’ এর ভাবার্থ নামায শেষের নির্দিষ্ট যিগুলোও হতে পারে এবং সাধারণভাবে আল্লাহর যিক্রও ভাবার্থ হতে পারে। এর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, এই সময় হচ্ছে আরাফার দিনের (৯ই যিলহজ্ব) সকাল থেকে নিয়ে আইয়্যামে তাশরীকের শেষ দিনের (১৩ই যিলহজ্ব) আসরের নামায পর্যন্ত। এ ব্যাপারে দারেকুতনির মধ্যে একটি মারফু হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর মারফু হওয়া সঠিক নয়। হযরত উমার (রাঃ) তাঁর তাঁবুর মধ্যে তাকবীর পাঠ করতেন এবং তাঁর তাকবীর ধ্বনি শুনে বাজারে অবস্থানকারীরাও তাকবীর পাঠ করতো, ফলে মিনা প্রান্তর তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতো। অনুরূপভাবে ভাবার্থ এও হতে পারে যে, শয়তানদের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপের সময় আল্লাহর যিকর করতে হবে। তা হবে আইয়্যামে তাশরিকের প্রত্যেক দিনেই। সুনানে আবু দাউদ প্রভৃতি হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা, সাফা মারওয়ায় দৌড়ান, শয়তানদের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ ইত্যাদি সমস্ত কাজই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার যি প্রতিষ্ঠার জন্যে। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা হজ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনের উল্লেখ করেন এবং পরে মানুষ এসব পবিত্র ভূমি ছেড়ে নিজ নিজ শহরে ও গ্রামে ফিরে যাবে, এজন্যে ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাকো এবং বিশ্বাস রেখো যে, তোমাদেরকে তারই সম্মুখে একত্রিত করা হবে। তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে রেখেছেন, আবার তিনিই তোমাদেরকে একত্রিত করবেন। অতঃপর তারই সম্মুখে তোমাদেরকে উপস্থিত হতে হবে। সুতরাং তোমরা যেখানেই থাকনা কেন, তাঁকে ভয় করতে থাকো।
আল-বাকারা 2:204
২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীরসুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ! আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে। তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না। (৪:১০৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়। কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল। মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন। আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়। তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে। ‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ! তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।
আল-বাকারা 2:205
২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীরসুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ! আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে। তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না। (৪:১০৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়। কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল। মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন। আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়। তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে। ‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ! তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।
আল-বাকারা 2:206
২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীরসুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ! আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে। তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না। (৪:১০৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়। কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল। মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন। আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়। তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে। ‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ! তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।
আল-বাকারা 2:207
২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীরসুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ! আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে। তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না। (৪:১০৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়। কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল। মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন। আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়। তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে। ‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ! তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।
আল-বাকারা 2:208
২০৮-২০৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তার উপরে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণকে ও তাঁর নবীর (সঃ) সত্যতা স্বীকারকারীগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তার সমস্ত নির্দেশ মেনে চলে। এবং সমস্ত নিষিদ্ধ জিনিস হতে বিরত থাকে ও পূর্ণ শরীয়তের উপর আমল করে। (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ইসলাম। ভাবার্থ আনুগত্য ও সততাও হতে পারে। (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে সব কিছু’ ও ‘পরিপূর্ণ। হযরত ইকরামার (রাঃ) উক্তি এই যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ বিন উবাইদ (রাঃ), হযরত সালাবা (রাঃ) প্রভৃতি মহাপুরুষ যারা ইয়াহুদী হতে মুসলমান হয়েছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আবেদন জানিয়েছিলেন যে, তাদেরকে যেন শনিবারের দিন উৎসবের দিন হিসেবে পালন করার ও রাত্রে তাওরাতের উপর আমল করার অনুমতি দেয়া হয়। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তাঁদেরকে বলা হয়-ইসলামের নির্দেশাবলীর উপরেই আমল করতে হবে। কিন্তু এখানে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালামের (রাঃ) নাম ঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, তিনি উচ্চ স্তরের পণ্ডিত ছিলেন এবং পূর্ণ মুসলমান ছিলেন। তিনি পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন যে, শনিবারের মর্যাদা রহিত হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে শুক্রবার ইসলামের উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং এটা অসম্ভব কথা যে, এরূপ অভিলাষের উপর তিনি অন্যদের সাথে হাত মেলাবেন। কোন কোন তাফসীরকারক (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) বলেছেন। অর্থাৎ ‘তোমরা সবাই ইসলামের মধ্যে প্রবেশ কর। কিন্তু প্রথম উক্তিটি অধিকতর সঠিক। অর্থাৎ “তোমরা সাধ্যানুসারে ইসলামের প্রত্যেক নির্দেশ মেনে চল।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আহলে কিতাব ইসলাম গ্রহণের পরেও তাওরাতের কতকগুলো নির্দেশ মেনে চলতো। তাদেরকেই বলা হচ্ছে-দ্বীনে মুহাম্মদীর (সঃ) মধ্যে পুরোপুরি এসে যাও। ওর কোন আমলই পরিত্যাগ করো না। তাওরাতের উপর শুধু ঈমান রাখাই যথেষ্ট।অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আনুগত্য স্বীকার কর, শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। সে তো শুধুমাত্র পাপ ও অন্যায় কার্যেরই নির্দেশ দিয়ে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়ার কথা বলে থাকে। তার ও তার দলের ইচ্ছে এটাই যে,তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু'। এর পরে বলা হচ্ছে-প্রমাণাদি জেনে নেয়ার পরেও যদি তোমরা সত্য হতে সরে পড় তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত। না তার থেকে কেউ পলায়ন করতে পারবে, না তার উপর কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তিনি তাঁর নির্দেশাবলী চালু করার ব্যাপারে মহা বিজ্ঞানময়। পাকড়াও করার কাজে তিনি মহান পরাক্রমশালী, এবং নির্দেশ জারী করার কার্যে তিনি মহা বিজ্ঞানময়। তিনি কাফিরদের উপর প্রভূতু বিস্তারকারী এবং তাদের ওজর ও প্রমাণ কর্তন করার ব্যাপারে তিনি নৈপুণ্যের অধিকারী।
আল-বাকারা 2:209
২০৮-২০৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তার উপরে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণকে ও তাঁর নবীর (সঃ) সত্যতা স্বীকারকারীগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তার সমস্ত নির্দেশ মেনে চলে। এবং সমস্ত নিষিদ্ধ জিনিস হতে বিরত থাকে ও পূর্ণ শরীয়তের উপর আমল করে। (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে ইসলাম। ভাবার্থ আনুগত্য ও সততাও হতে পারে। (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে সব কিছু’ ও ‘পরিপূর্ণ। হযরত ইকরামার (রাঃ) উক্তি এই যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ বিন উবাইদ (রাঃ), হযরত সালাবা (রাঃ) প্রভৃতি মহাপুরুষ যারা ইয়াহুদী হতে মুসলমান হয়েছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আবেদন জানিয়েছিলেন যে, তাদেরকে যেন শনিবারের দিন উৎসবের দিন হিসেবে পালন করার ও রাত্রে তাওরাতের উপর আমল করার অনুমতি দেয়া হয়। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তাঁদেরকে বলা হয়-ইসলামের নির্দেশাবলীর উপরেই আমল করতে হবে। কিন্তু এখানে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালামের (রাঃ) নাম ঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, তিনি উচ্চ স্তরের পণ্ডিত ছিলেন এবং পূর্ণ মুসলমান ছিলেন। তিনি পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন যে, শনিবারের মর্যাদা রহিত হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে শুক্রবার ইসলামের উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং এটা অসম্ভব কথা যে, এরূপ অভিলাষের উপর তিনি অন্যদের সাথে হাত মেলাবেন। কোন কোন তাফসীরকারক (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) বলেছেন। অর্থাৎ ‘তোমরা সবাই ইসলামের মধ্যে প্রবেশ কর। কিন্তু প্রথম উক্তিটি অধিকতর সঠিক। অর্থাৎ “তোমরা সাধ্যানুসারে ইসলামের প্রত্যেক নির্দেশ মেনে চল।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আহলে কিতাব ইসলাম গ্রহণের পরেও তাওরাতের কতকগুলো নির্দেশ মেনে চলতো। তাদেরকেই বলা হচ্ছে-দ্বীনে মুহাম্মদীর (সঃ) মধ্যে পুরোপুরি এসে যাও। ওর কোন আমলই পরিত্যাগ করো না। তাওরাতের উপর শুধু ঈমান রাখাই যথেষ্ট।অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আনুগত্য স্বীকার কর, শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। সে তো শুধুমাত্র পাপ ও অন্যায় কার্যেরই নির্দেশ দিয়ে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়ার কথা বলে থাকে। তার ও তার দলের ইচ্ছে এটাই যে,তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু'। এর পরে বলা হচ্ছে-প্রমাণাদি জেনে নেয়ার পরেও যদি তোমরা সত্য হতে সরে পড় তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত। না তার থেকে কেউ পলায়ন করতে পারবে, না তার উপর কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তিনি তাঁর নির্দেশাবলী চালু করার ব্যাপারে মহা বিজ্ঞানময়। পাকড়াও করার কাজে তিনি মহান পরাক্রমশালী, এবং নির্দেশ জারী করার কার্যে তিনি মহা বিজ্ঞানময়। তিনি কাফিরদের উপর প্রভূতু বিস্তারকারী এবং তাদের ওজর ও প্রমাণ কর্তন করার ব্যাপারে তিনি নৈপুণ্যের অধিকারী।
আল-বাকারা 2:210
এই আয়াতে মহান আল্লাহ কাফিরদেরকে ধমক দিয়ে বলছেন যে, তারা কি কিয়ামতেরই অপেক্ষা করছে যে দিন সত্যের সঙ্গে ফায়সালা হয়ে যাবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের ফলভোগ করবে: যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, ‘যে দিন পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে যাবে এবং স্বয়ং তোমার প্রভু এসে যাবেন, ফেরেস্তাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে, দোযখকেও সামনে এনে দাড় করানো হবে, সেদিন এসব লোক শিক্ষা ও উপদেশ লাভ করবে, কিন্তু তাতে আর কি উপকার হবে:' অন্যস্থানে রয়েছে, তারা কি এরই অপেক্ষা করছে যে, তাদের নিকট ফেরেস্তারা এসে যাবে বা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই এসে যাবেন কিংবা তার কতকগুলো নিদর্শন এসে যাবে: যদি এটা হয়েই যায় তবে না ঈমান কোন কাজ দেবে, না সৎ কার্যাবলী সম্পাদনের সময় থাকবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে একটি দীর্ঘ হাদীস এনেছেন যার মধ্যে শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)। মুসনাদ ইত্যাদির মধ্যে এই হাদীসটি রয়েছে। এর মধ্যে বর্ণিত আছে যে, যখন মানুষ ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে তখন তারা নবীদের (আঃ) নিকট সুপারিশের প্রার্থনা জানাবে। হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে এক একজন নবীর কাছে তারা যাবে এবং প্রত্যেকের কাছে পরিষ্কার জবাব পেয়ে ফিরে আসবে। অবশেষে তারা আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট পৌছবে। তিনি উত্তর দেবেন, আমি প্রস্তুত আছি। আমিই তার অধিকারী। অতঃপর তিনি যাবেন এবং আরশের নীচে সিজদায় পড়ে যাবেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করবেন যে, তিনি যেন বান্দাদের ফায়সালার জন্যে আগমন করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সুপারিশ কবুল করবেন এবং মেঘমালার ছত্রতলে সমাগত হবেন। দুনিয়ার আকাশও ফেটে যাবে এবং তার সমস্ত ফেরেস্তা এসে যাবেন। অতঃপর দ্বিতীয় আকাশটিও ফেটে যাবে এবং ওর ফেরেস্তাগণও এসে যাবেন। এভাবে সাতটি আকাশই ফেটে যাবে এবং সেগুলোর ফেরেস্তাগণ এসে যাবেন। এরপর আল্লাহ তাআলার আরশ নেমে আসবে এবং সম্মানিত ফেরেস্তাগণ অবতরণ করবেন এবং স্বয়ং মহা শক্তিশালী আল্লাহ আগমন করবেন। সমস্ত ফেরেস্তা তাসবীহ পাঠে লিপ্ত হয়ে পড়বেন। সেই সময় তারা নিম্নলিখিত তাসবীহ পাঠ করবেনঃ (আরবি)অর্থাৎ সাম্রাজ্য ও আত্মার অধিকারীর পবিত্রতা বর্ণনা করছি। সম্মান ও অসীম ক্ষমতার অধিকারীর প্রশংসা কীর্তন করছি। সেই চিরঞ্জীবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। তাঁরই গুণগান করছি যিনি সৃষ্টজীবসমূহের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন এবং তিনি নিজে মৃত্যুমুখে পতিত হন না। ফেরেস্তাগণ ও আত্মার প্রভুর তাসবীহ পাঠ করছি। আমাদের বড় প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি। সাম্রাজ্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীর আমরা গুণকীর্তন করছি। সদা-সর্বদা তারই পবিত্রতা বর্ণনা করছি।'হাফিয ইবনে আবু বকর মিরদুওয়াই (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে অনেক হাদীস এনেছেন সেগুলোর মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে,রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদেরকে ঐ দিন একত্রিত করবেন যার সময় নির্ধারিত রয়েছে। তাদের দৃষ্টিগুলো আকাশের দিকে থাকবে। প্রত্যেকেই ফায়সালার জন্যে অপেক্ষমান থাকবে। আল্লাহ তা'আলা মেঘমালার ছত্রতলে আরশ হতে কুরসীর উপর অবতরণ করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, যে সময় তিনি অবতরণ করবেন সেই সময় তার মধ্যে ও তার সৃষ্টজীবের মধ্যে সত্তর হাজার আবরণ থাকবে। আবরণগুলো হবে আলো, অন্ধকার ও পানির আবরণ। পানি অন্ধকারের মধ্যে এমন শব্দ করবে যার ফলে অন্তর কেঁপে উঠবে ।হযরত যুহাইর বিন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন যে, ঐ মেঘপুঞ্জের ছায়াতল মণি দ্বারা জড়ান থাকবে এবং তা হবে মুক্তা ও পান্না বিশিষ্ট। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই মেঘমালা সাধারণ মেঘমালা নয়। রবং এটা ঐ মেঘমালা যা তীহ উপত্যকায় বানী ইসরাঈলের মস্তকোপরি বিরাজমান ছিল। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, ফেরেস্তাগণও মেঘপুঞ্জের ছায়াতলে আসবেন এবং আল্লাহ তা'আলা যাতে চাবেন তাতেই আসবেন। কোন কোন পঠনে এও আছে (আরবি)অর্থাৎ তারা কি এই অপেক্ষাই করছে যে, আল্লাহ তাদের নিকট আগমন করবেন এবং ফেরেস্তাগণ মেঘমালার ছায়াতলে আসবে:' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘সেইদিন আকাশ মেঘসই ফেটে যাবে এবং ফেরেস্তাগণ অবতরণ করবেন।' (২৫:২৫)
আল-বাকারা 2:211
২১১-২১২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা দেখ, বানী ইসরাঈলকে আমি বহু মু'জিযা প্রদর্শন করেছি। হযরত মূসার (আঃ) হাতের লাঠি, তার হাতের ঔজ্জ্বল্য, তাদের সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করা, কঠিন গরমের সময় তাদের উপর মেঘের ছায়া দান করা, তাদের উপর মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতীর্ণ করা, ইত্যাদি। যার দ্বারা আমার যা ইচ্ছে করা এবং সব কিছুরই উপর ক্ষমতাবান হওয়া স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এর দ্বারা আমার নবী হযরত মূসার (আঃ) নবুয়াতের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তবু বানী ইসরাঈল আমার নিয়ামতের উপর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর উপরই স্থির থেকেছে। কাজেই তারা আমার কঠিন শাস্তি হতে কিরূপে রক্ষা পাবে: কুরাইশ কাফিরদের সম্বন্ধেও এই সংবাদ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে (আরবি)অর্থাৎ তুমি কি ঐ লোকদেরকে দেখনি যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফর দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং নিজেদের সম্প্রদায়কে ধ্বংসের ঘরে নিক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ জাহান্নাম, যা অতি জঘন্য অবস্থান স্থল।' (১৪:২৮-২৯) অতঃপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এই কাফিরেরা শুধুমাত্র ইহলৌকিক জগতের উপরই সন্তুষ্ট রয়েছে। সম্পদ জমা করা এবং আল্লাহর পথে খরচ করতে কার্পণ্য করাই তাদের স্বভাব। বরং যেসব মু'মিন এই নশ্বর জগত হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছে তাদেরকে এরা উপহাস করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে ভাগ্যবানতো এই মু'মিনরাই। কিয়ামতের দিন এই মুমিনদের মর্যাদা দেখে এই কাফিরদের চক্ষু খুলে যাবে। সেদিন নিজেদের দুর্ভাগ্য ও মু'মিনদের সৌভাগ্য লক্ষ্য করে তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, কারা উচ্চ পদস্থ ও কারা নিম্ন পদস্থ।ইহকালে আল্লাহ তাআলা যাকে ধন-মাল দেয়ার ইচ্ছে করেন তাকে তিনি অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকেন। আবার তিনি যাকে ইচ্ছে করেন এখানেও দেন এবং পরকালেও দেবেন। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে, (আল্লাহ তাআলা বলেন) হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে খরচ কর আমি তোমাকে দিতেই থাকবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বেলাল (রাঃ) কে বলেন, 'হে বেলাল (রাঃ)! তুমি আল্লাহর পথে খরচ করতে থাকো এবং আরশের অধিকারী হতে সঙ্কীর্ণতার ভয় করো না।' কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে -(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ পাক তার প্রতিদান দেবেন। (৩৪:৩৯) সহীহ হাদীসে রয়েছে, সকালে দু’জন ফেরেস্তা অবতরণ করেন। একজন প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! আপনার পথে ব্যয়কারীকে আপনি বরকত দান করুন।' অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।অন্য হাদীসে রয়েছে, মানুষ বলে-“আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল তো ঐগুলোই যা তুমি খেয়ে ধ্বংস করেছে আর যা তুমি দান করে বাকী রেখেছে। অন্য যত কিছু রয়েছে সেগুলো সবই তুমি অন্যদের জন্যে ছেড়ে এখান হতে বিদায় গ্রহণ করবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “দুনিয়া তারই ঘর যার কোন ঘর নেই, দুনিয়া তারই মাল যার কোন মাল নেই এবং দুনিয়া শুধু ঐ ব্যক্তি সংগ্রহ করে থাকে যার বিবেক নেই।
আল-বাকারা 2:212
২১১-২১২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা দেখ, বানী ইসরাঈলকে আমি বহু মু'জিযা প্রদর্শন করেছি। হযরত মূসার (আঃ) হাতের লাঠি, তার হাতের ঔজ্জ্বল্য, তাদের সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করা, কঠিন গরমের সময় তাদের উপর মেঘের ছায়া দান করা, তাদের উপর মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতীর্ণ করা, ইত্যাদি। যার দ্বারা আমার যা ইচ্ছে করা এবং সব কিছুরই উপর ক্ষমতাবান হওয়া স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এর দ্বারা আমার নবী হযরত মূসার (আঃ) নবুয়াতের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তবু বানী ইসরাঈল আমার নিয়ামতের উপর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর উপরই স্থির থেকেছে। কাজেই তারা আমার কঠিন শাস্তি হতে কিরূপে রক্ষা পাবে: কুরাইশ কাফিরদের সম্বন্ধেও এই সংবাদ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে (আরবি)অর্থাৎ তুমি কি ঐ লোকদেরকে দেখনি যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফর দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং নিজেদের সম্প্রদায়কে ধ্বংসের ঘরে নিক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ জাহান্নাম, যা অতি জঘন্য অবস্থান স্থল।' (১৪:২৮-২৯) অতঃপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এই কাফিরেরা শুধুমাত্র ইহলৌকিক জগতের উপরই সন্তুষ্ট রয়েছে। সম্পদ জমা করা এবং আল্লাহর পথে খরচ করতে কার্পণ্য করাই তাদের স্বভাব। বরং যেসব মু'মিন এই নশ্বর জগত হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছে তাদেরকে এরা উপহাস করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে ভাগ্যবানতো এই মু'মিনরাই। কিয়ামতের দিন এই মুমিনদের মর্যাদা দেখে এই কাফিরদের চক্ষু খুলে যাবে। সেদিন নিজেদের দুর্ভাগ্য ও মু'মিনদের সৌভাগ্য লক্ষ্য করে তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, কারা উচ্চ পদস্থ ও কারা নিম্ন পদস্থ।ইহকালে আল্লাহ তাআলা যাকে ধন-মাল দেয়ার ইচ্ছে করেন তাকে তিনি অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকেন। আবার তিনি যাকে ইচ্ছে করেন এখানেও দেন এবং পরকালেও দেবেন। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে, (আল্লাহ তাআলা বলেন) হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে খরচ কর আমি তোমাকে দিতেই থাকবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বেলাল (রাঃ) কে বলেন, 'হে বেলাল (রাঃ)! তুমি আল্লাহর পথে খরচ করতে থাকো এবং আরশের অধিকারী হতে সঙ্কীর্ণতার ভয় করো না।' কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে -(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ পাক তার প্রতিদান দেবেন। (৩৪:৩৯) সহীহ হাদীসে রয়েছে, সকালে দু’জন ফেরেস্তা অবতরণ করেন। একজন প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! আপনার পথে ব্যয়কারীকে আপনি বরকত দান করুন।' অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।অন্য হাদীসে রয়েছে, মানুষ বলে-“আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল তো ঐগুলোই যা তুমি খেয়ে ধ্বংস করেছে আর যা তুমি দান করে বাকী রেখেছে। অন্য যত কিছু রয়েছে সেগুলো সবই তুমি অন্যদের জন্যে ছেড়ে এখান হতে বিদায় গ্রহণ করবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “দুনিয়া তারই ঘর যার কোন ঘর নেই, দুনিয়া তারই মাল যার কোন মাল নেই এবং দুনিয়া শুধু ঐ ব্যক্তি সংগ্রহ করে থাকে যার বিবেক নেই।
আল-বাকারা 2:213
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত আদম (আঃ)-এর মধ্যে দশটি যুগ ছিল। ঐ যুগসমূহের লোকেরা সত্য শরীয়তের অনুসারী ছিল। অতঃপর তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা নবীগণকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তার কিরআতও নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ মানব জাতি একই সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল, অতঃপর তারা মতভেদ সৃষ্টি করে।' (১০:১৯) হযরত উবাই বিন কা'বেরও (রাঃ) পঠন এটাই। কাতাদাহও (রঃ) এর তাফসীর এরকমই করেছেন যে, যখন তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রথম রাসূল অর্থাৎ হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেন। হযরত মুজাহিদও (রঃ) এটাই বলেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, প্রথমে সবাই কাফির ছিল। কিন্তু প্রথম উক্তিটি অর্থ হিসেবেও এবং সনদ হিসেবেও অধিকতর সঠিক। সুতরাং ঐ নবীগণ (আঃ) মু'মিনদেরকে সুসংবাদ শুনিয়েছেন এবং কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। তাঁদের সাথে আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থও ছিল, যেন জনগণের প্রত্যেক মতভেদের মীমাংসা ইলাহী কানুন দ্বারা হতে পারে। কিন্তু ঐ প্রমাণাদির পরেও শুধুমাত্র পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ, গোঁড়ামি, একগুঁয়েমি এবং প্রবৃত্তির কারণেই তারা একমত হতে পারেনি। কিন্তু মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা সুপথ প্রদর্শন করেন। সুতরাং তারা মতবিরোধের চক্র হতে বেরিয়ে সরল সঠিক পথের সন্ধান লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমরা দুনিয়ায় আগমন হিসেবে সর্বশেষ বটে, কিন্তু কিয়ামতের দিন বেহেশতে প্রবেশ লাভ হিসেবে আমরা সর্ব প্রথম হবো। আহলে কিতাবকে আল্লাহর কিতাব আমাদের পূর্বে দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে দেয়া হয়েছে পরে। কিন্তু তারা মতভেদ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। জুম’আ সম্বন্ধেও এদের মধ্যে মতবিরোধ রয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এই সৌভাগ্য লাভ হয় যে, এই দিক দিয়েও সমস্ত আহলে কিতাব আমাদের পিছনে পড়ে যায়। শুক্রবার আমাদের, শনিবার ইয়াহূদীদের এবং রবিবার খ্রীষ্টানদের।'হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, জুম’আ ছাড়াও"কিবলার ব্যাপারেও এটা ঘটেছে। খ্রীষ্টানেরা পূর্ব দিককে কিবলা বানিয়েছে, ইয়াহূদীরা কিবলা করেছে বায়তুল মুকাদ্দাসকে, কিন্তু মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ কাবাকে তাদের কিবলা রূপে নির্ধারিত করেছে। অনুরূপভাবে নামাযেও মুসলমানেরা অগ্রে রয়েছে। আহলে কিতাবের কারও নামাযে রুকু আছে কিন্তু সিজদা নেই, আবার কারও সিজদা আছে কিন্তু রুকু নেই। আবার কেউ কেউ নামাযে কথা-বার্তা বলে থাকে, আবার কেউ কেউ নামাযে চলা-ফেরা করে থাকে। কিন্তু মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের নামায নীরবতা ও স্থিরতার সাথে পালিত হয়। এরা নামাযের মধ্যে না কথা বলবে, না চলা-ফেরা করবে। এরকমই রোযার ব্যাপারেও তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কিন্তু এতেও মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মত সুপথ প্রদর্শিত হয়েছে। পূর্বে উম্মতবর্গের কেউ কেউ তো দিনের কিছু অংশে রোযা রাখতো, কোন দল কোন কোন প্রকারের খাদ্য পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আমাদের রোযা সব দিক দিয়েই পূর্ণতা প্রাপ্ত এবং এর মধ্যে আমাদেরকে সত্য পথ সম্বন্ধে বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্বন্ধে ইয়াহুদীরা বলেছিল যে, তিনি ইয়াহুদী ছিলেন এবং খ্রীষ্টানেরা বলেছিল যে, তিনি খ্রীষ্টান ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন পুরোপুরি মুসলমান ছিলেন। সুতরাং এই ব্যাপারেও আমরা সুপথ প্রদর্শিত হয়েছি। এবং হযরত ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ) সম্বন্ধে সঠিক ধারণা। আমাদেরকে দেয়া হয়েছে।হযরত ঈসা (আঃ)-কেও ইয়াহুদীরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল এবং তাঁর সম্মানিতা মাতা সম্পর্কে জঘন্য কথা উচ্চারণ করেছিল। খ্রীষ্টানেরা তাঁকে আল্লাহ ও আল্লাহর পুত্র বলেছিল। কিন্তু মুসলমানকে আল্লাহ তা'আলা এই দু'টো হতেই রক্ষা করেছেন। তারা তাঁকে আল্লাহর রূহ, আল্লাহর কালেমা এবং সত্য নবী বলে স্বীকার করেছে। হযরত রাবী বিন আনাস (রাঃ) বলেন, ‘আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, যেমনভাবে প্রথমে সমস্ত লোকে আল্লাহর উপাসনাকারী ছিল এবং তারা সৎ কার্য সম্পাদন করতো ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতো। অতঃপর মধ্যভাগে তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। তেমনিভাবে শেষ উম্মতকে। আল্লাহ তাআলা মতানৈক্য হতে সরিয়ে প্রথম দলের ন্যায় সঠিক পথে নিয়ে। এসেছেন। এই উম্মত অন্যান্য উম্মতের উপরে সাক্ষী হবে। এমনকি হযরত নূহ (আঃ)-এর উম্মতের উপরেও এরা সাক্ষ্য দান করবে। হযরত হূদের(আঃ) কওম, হযরত তালুতের (আঃ) কওম, হযরত সালেহের (আঃ) কওম, হযরত শুয়াইবের (আঃ) কওম এবং ফিরআউনের বংশধরদের মীমাংসাও এদের সাক্ষ্যের মাধ্যমেই হবে। এরা বলবে যে, এই নবীগণ (আঃ) প্রচার করেছিলেন এবং এই উম্মতেরা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলো। হযরত উবাই বিন কাবের পঠনে (আরবি) রয়েছে অর্থাৎ যেন তারা কিয়ামতের দিন জনগণের উপর সাক্ষী হয় এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সরল পথপ্রদর্শন করে থাকেন। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন, এই আয়াতে যেন নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে,সন্দেহ হতে, ভ্রান্তি হতে এবং বিবাদ হতে বেঁচে থাকা উচিত। এই হিদায়াত আল্লাহ তা'আলার ইলম এবং তাঁর পথপ্রদর্শনের মাধ্যমেই হয়েছে। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল সঠিক পথের জ্ঞান দান করে থাকেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতেন তখন নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেন : (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! হে জিবরাঈল, মিকাঈল ও ইসরাফিলের প্রভু! হে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে প্রকাশ্য ও গুপ্তের জ্ঞাতা! আপনিই আপনার বান্দাদের পারস্পরিক মতভেদের মীমাংসা করে থাকেন। আমার প্রার্থনা এই যে, যেসব ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় তার মধ্যে যা সঠিক আমাকে অপনি তারই জ্ঞান দান করুন। আপনি যাকে ইচ্ছা সরল পথপ্রদর্শন করে থাকেন।'রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের প্রার্থনাটিও নকল করা হয়েছে (আরবি)অর্থাৎ হে আল্লাহ! যা সত্য তা আমাদেরকে সত্য রূপে প্রদর্শন করুন এবং তার অনুসরণ করার আমাদেরকে তাওফীক প্রদান করুন। আর মিথ্যাকে মিথ্যারূপে আমাদেরকে প্রদর্শন করুন এবং আমাদেরকে ওটা হতে বাঁচবার তাওফীক দিন। আমাদের উপর সত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রিত করবেন না। যার কারণে আমরা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ি। হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি সৎ ও খোদাভীরু লোকদের ইমাম বানিয়ে দিন।
আল-বাকারা 2:214
ভাবার্থ এই যে,পরীক্ষার পূর্বে বেহেশতে প্রবেশের আশা করা ঠিক নয়। পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মতেরই পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। তাদেরকেও রোগ ও বিপদাপদ স্পর্শ করেছিল। (আরবি) শব্দটির অর্থ দারিদ্র এবং (আরবি) শব্দটির অর্থ রোগও ধরা হয়েছে। তাদেরকে শত্রুর ভয় এমন আতংকিত করে তুলেছিল যে, তারা কম্পিত হয়েছিল। ঐ সমুদয় পরীক্ষায় তারা সফলতা লাভ করেছিল। ফলে তারা বেহেশতের উত্তরাধিকারী হয়েছিল। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, একদা হযরত খাব্বাব বিন আরাত (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাদের সাহায্যের জন্যে প্রার্থনা করেন না:' তিনি বলেন, এখনই ভীত হয়ে পড়লে: জেনে রেখো যে, পূর্ববর্তী একতুবাদীদের মস্তোকোপরি করাত রেখে তাদেরকে পা পর্যন্ত ফেঁড়ে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হতো, কিন্তু তথাপি তারা তাওহীদ ও সুন্নাত হতে সরে পড়তো না। লোহার চিরুণী দিয়ে তাদের দেহের গোত আঁচড়া হতো, তথাপি তারা আল্লাহর দ্বীন পরিত্যাগ করতো না। আল্লাহর শপথ! আমার এই দ্বীনকে আল্লাহ এমন পরিপূর্ণ করবেন যে, একজন অশ্বারোহী ‘সুনআ' হতে ‘হাযারা মাওত পর্যন্ত নির্ভয়ে ভ্রমণ করবে এবং একমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া তার আর কোন ভয় থাকবে না। তবে অন্তরে এই ধারণা হওয়া অন্য কথা যে, হয়তো তার বকরীর উপরে বাঘ এসে পড়বে। কিন্তু আফসোস! তোমরা তাড়াতা কুরআন মাজীদের মধ্যে ঠিক এই ভাবটিই অন্য জায়গায় নিম্নলিখিতভাবে বর্ণিত হয়েছে (আরবি)অর্থাৎ মানুষেরা কি মনে করছে যে, তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না: আর অবশ্যই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম, সুতরাং অবশ্যই আল্লাহ সত্যবাদীদেরকেও জেনে নেবেন এবং নিশ্চয় যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকেও আল্লাহ জানবেন।' (২৯:১-৩) এভাবেই ‘পরিখার যুদ্ধে’ সাহাবা-ই-কিরামেরও পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। যেমন, স্বয়ং পবিত্র কুরআনই এর চিত্র এঁকেছে। ঘোষণা হচ্ছে, যখন তারা (কাফিরেরা) তোমাদের উপরের দিক হতে এবং তোমাদের নিম্ন দিক হতেও তোমাদের উপর চড়াও করেছিল এবং যখন (ভয়ে -বিস্ময়ে) চক্ষুসমূহ বিস্ফারিতই রয়ে গিয়েছিল এবং অন্তরসমূহ কণ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আর তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানারূপ ধারণা পোষণ করছিলে। তথায় মুসলমানদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে প্রবল প্ৰকম্পে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যখন মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা বলেছিল-আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলতো আমাদেরকে শুধু প্রবঞ্চনামূলক ওয়াদাই দিয়েছেন।' রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে তাঁর কুফরীর অবস্থায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই নবুওয়াতের দাবীদারের (মুহাম্মদ সঃ) সাথে আপনাদের কোন যুদ্ধ হয়েছিল কি': আবু সুফিয়ান (রাঃ) বলেন, ‘হাঁ'। হিরাক্লিয়াস পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছিল: তিনি বলেন, 'কখনও আমরা জয়যুক্ত হয়েছিলাম এবং কখনও তিনি। হিরাক্লিয়াস বলেন, এভাবেই নবীদের (আঃ) পরীক্ষা হয়ে আসছে। কিন্তু পরিণামে প্রকাশ্য বিজয় তাঁদেরই হয়ে থাকে। (আরবি) শব্দটির অর্থ এখানে রীতি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ পূর্ববর্তীদের রীতি অতীত হয়েছে। পূর্ব যুগের মু'মিনগণ তাঁদের নবীদের (আঃ) সাথে এরকমই কঠিন অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন এবং সেই সঠিক ও সংকীর্ণ অবস্থা হতে মুক্তি চেয়েছিলেন। উত্তরে তাঁদেরকে বলা হয়েছিল যে, সাহায্য অতি নিকটবতী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে(আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় কাঠিন্যের সাথে সহজতা রয়েছে।' (৯৪:৫) একটি হাদীসে রয়েছে যে, বান্দা যখন নিরাশ হতে থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা বিস্মিত হয়ে বলেন-আমার সাহায্য তো এসেই যাচ্ছে, অথচ তারা নিরাশ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই দ্রুততা এবং তাঁর দয়া নিকটবর্তী হওয়ার উপর হেসে থাকেন।
আল-বাকারা 2:215
হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি হচ্ছে নফল দান সম্বন্ধে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাকাত এই আয়াতটিকে রহিত করে দিয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটি বিবেচ্য বিষয়। আয়াতটির ভাবার্থ এই যে-হে নবী (সঃ)! মানুষ তোমাকে খরচ করার পাত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। তুমি তাদেরকে বলে দাও-তারা যেন ঐসব লোকের জন্যে খরচ করে যাদের বর্ণনা আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। হাদীসে রয়েছে, তোমরা মাতার সাথে, পিতার সাথে, ভগ্নীর সাথে, ভ্রাতার সাথে, অতঃপর নিকটতম আত্মীয়দের সাথে আদান প্রদান কর।' এই হাদীসটি বর্ণনা করতঃ হযরত মায়মুন বিন মাহরান (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন অতঃপর বলেন, এগুলোই হচ্ছে খরচ করার স্থান। ঢোল-তবলা, ছবি এবং দেয়ালে কাপড় পরানো, এগুলো খরচের স্থান নয়। অতঃপর বলা হচ্ছে-তোমরা যেসব সকার্য সম্পাদন করছে। আল্লাহ তা'আলা তা অবগত আছেন এবং তিনি তার জন্যে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তিনি অনু পরিমাণও অন্যায় করবেন না।
আল-বাকারা 2:216
দ্বীন ইসলামকে রক্ষার জন্যে ইসলামের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা ফরয হওয়ার নির্দেশ এই আয়াতে দেয়া হয়েছে। যুহরী (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক লোকের উপরেই জিহাদ ফরয। সে স্বয়ং যুদ্ধে যোগদান করুক বা বাড়ীতে বসেই থাক। যারা বাড়ীতে অবস্থান করবে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া হলে তাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। প্রয়োজনবোধে তাদেরকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যোগদানের আহ্বান জানান হলে তাদেরকে অবশ্যই যুদ্ধের মাঠে যোগদান করতে হবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে, “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, সে জিহাদে অংশগ্রহণ করলো, না মনে জিহাদের কথা বললো, সে অজ্ঞতা যুগের মৃত্যুবরণ করলো।' অন্য হাদীসে রয়েছে, মক্কা বিজয়ের পরে আর হিজরত নেই। তবে রয়েছে জিহাদ ও নিয়্যাত। যখন তোমাদেরকে জিহাদের জন্যে ডাক দেয়া হবে তখন তোমরা তার জন্যে বেরিয়ে পড়বে। মক্কা বিজয়ের দিনে তিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন।অতঃপর বলা হচ্ছে-এই জিহাদের নির্দেশ তোমাদের নিকট কঠিন মনে হতে পারে। কেননা, এতে কষ্ট ও বিপদ রয়েছে এবং তোমরা নিহত হয়ে যেতেও পার কিংবা আহত হতে পার। তা ছাড়া সফরের কষ্ট, শত্রুদের আক্রমণ ইত্যাদি। কিন্তু জেনে রেখো যে, যা তোমরা নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করছো তাই হয়তো তোমাদের জন্যে উত্তম। কেননা, এতেই তোমাদের বিজয় এবং শত্রুদের ধ্বংস রয়েছে। তাদের ধন-মাল, তাদের সামাজ্য এমন কি তাদের সন্তানাদি পর্যন্ত তোমাদের পায়ের উপর নিক্ষিপ্ত হবে। আবার এও হতে পারে যে, তোমরা যে জিনিসকে তোমাদের জন্যে ভাল মনে করছো তাই তোমাদের জন্যে ক্ষতিকর। সাধারণতঃ এরূপ হয়ে থাকে যে, মানুষ একটা জিনিস চায় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাতে কোন মঙ্গল ও কল্যাণ নেই। অনুরূপভাবে তোমরা জিহাদ না করাকে মঙ্গল মনে করছে কিন্তু ওটা তোমাদের জন্য চরম ক্ষতিকর। কেননা,এর ফলে শক্ররা তোমাদের উপর বিজয় লাভ করবে এবং দুনিয়ায় ততামাদের জন্যে পা রাখারও জায়গা থাকবে না। সব কাজের পরিণামের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। তিনিই জানেন যে, পরিণাম হিসেবে তোমাদের জন্যে কোন্ কাজটি ভাল ও কোন্ কাজটি মন্দ। তিনি তোমাদেরকে ঐ কাজেরই নির্দেশ দিয়ে থাকেন যার মধ্যে তোমাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল নিহিত রয়েছে। সুতরাং তোমরা তাঁর নির্দেশসমূহ মনেপ্রাণে স্বীকার করে নাও। তাঁর প্রত্যেক নির্দেশকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে চল। ওরই মধ্যে তোমাদের মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
আল-বাকারা 2:217
২১৭-২১৮ নং আয়াতের তাফসীররাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রাঃ)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি বিদায়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিচ্ছেদের দুঃখে ভীষণ ক্রন্দন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ফিরিয়ে নেন এবং তার স্থলে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশ (রাঃ)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তাঁকে একখানা পত্র দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন | ‘বাতনে নাখলা' নামক স্থানে পৌঁছার পূর্বে এই পত্র পড়বে না। তথায় পৌছে যখন এর বিষয়বস্তু দেখবে তখন সঙ্গীদের কাউকেও তোমার সাথে যাবার জন্যে বাধ্য করবে না। অতএব হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই যাত্রা শুরু করেন। নির্ধারিত স্থানে পৌছে তিনি নবীজীর (সঃ) নির্দেশনামা পাঠ করতঃ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়েন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নির্দেশনামা পড়েছি এবং তাঁর নির্দেশ পালনে আমি প্রস্তুত রয়েছি। অতঃপর তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করেন। সুতরাং দুই ব্যক্তি ফিরে যান, কিন্তু অন্যান্য সবাই তার সাথে যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তারা ইবনুল হারামী নামক কাফিরকে দেখতে পান। ঐ দিনটি জমাদিউল উখরার শেষ দিন ছিল কি রজবের প্রথম দিন ছিল এটা তাদের জানা ছিল না। সুতরাং তারা ঐ সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালান এবং ইবনুল হাযরামী মারা যায়। মুসলমানদের ঐ দলটি তথা হতে ফিরে আসেন। তখন মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলেঃ ‘দেখ! তারা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করেছে এবং হত্যাও করেছে। এ ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে,এই দলে ছিলেন হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রাঃ), হযরত আবু হুযাইফা বিন উবা বিন রাবী'আ (রাঃ), হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (ব্লাঃ), হযরত উবা বিন গাওয়ান সালমা (রাঃ), হযরত সাহীল বিন বায়যা (রাঃ), হযরত আমের বিন ফাহীরাহ (রাঃ) এবং হযরত ওয়াকিদ বিন আবদুল্লাহ ইয়ারবুঈ (রাঃ)। বাতনে নাখলা’ পৌছে হযরত আবদুৱাহ বিন জাহাশ (রাঃ) পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন যে, যে ব্যক্তি শাহাদাত লাভের প্রত্যাশী একমাত্র সেই সম্মুখে অগ্রসর হবে। এখান হতে প্রত্যাবর্তনকারীগণ ছিলেন হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস ও হযরত উবা (রাঃ)। তাঁদের এই বাহিনীর সাথে না যাওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের উট হারিয়ে গিয়েছিল। উট খোজ করার জন্যেই তারা রয়ে গিয়েছিলেন। মুশরিকদের মধ্যে হাকাম বিন কাইসান, উসমান বিন আবদুল্লাহ প্রভৃতি ছিল। হযরত ওয়াকিদের (রাঃ) হাতে আমর নিহত হয় এবং এই ক্ষুদ্র বাহিনী যুদ্ধ লব্ধ দ্রব্যনিয়ে ফিরে আসে। এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ লব্ধ মাল যা মুসলমান সাহাবীগণ (রাঃ) প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই প্রাণ উৎসর্গকারী দলটি দু’জন বন্দী ও গাণীমতের মাল নিয়ে ফিরে আসেন মক্কার মুশরিকরা তখন প্রতিবাদ স্বরূপ বলে : মুহাম্মদের (সঃ) দাবীতো এই যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারকারী, কিন্তু সম্মানিত মাসগুলোর কোন সম্মান করেন না, বরং রজব মাসে যুদ্ধ ও হত্যা করে থাকেন। মুসলমানগণ বলেনঃ “আমরা রজব মাসে তো হত্যা করিনি বরং জমাদিউল উখরা মাসে যুদ্ধ হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার এ যে, ওটা ছিল রজবের প্রথম রাত্রি এবং জমাদিউল উখরার শেষ রাত্রি। রজব মাস আরম্ভ হওয়া মাত্রই মুসলমানদের তরবারী কোষ বদ্ধ হয়েছিল। মুশরিকদের এ প্রতিবাদের উত্তরে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এই মাসগুলোতে যুদ্ধ হারাম বটে। কিন্তু হে মুশরিকরা! তোমাদের মন্দ কার্যাবলী তো মন্দ হিসেবে এর চেয়েও বেড়ে গেছে। তোমরা আমাকে অস্বীকার করছো। তোমরা আমার নবী (সঃ)-কে ও তার সহচরদেরকে আমার মসজিদ হতে প্রতিরোধ করছে। তোমরা তাদেরকে তথা হতে বহিস্কৃত করেছে। সুতরাং তোমাদের এই অসৎ কার্যাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত কর যে, ওগুলো কত জঘন্য কাজ!' এই নিষিদ্ধ মাসগুলোতেই মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বায়তুল্লাহ শরীফ হতে বাধা দিয়েছিল এবং তারা বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তী বছর নিষিদ্ধ মাসগুলোতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর (সঃ) হাতে মক্কা বিজয় করিয়ে দেন এবং তথায় মুসলমানদের পূর্ণ আধিপত্য লাভ হয়। তখন তারা প্রতিবাদ করলে এই আয়াতগুলো দ্বারা তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। আমর বিন হাযরামীকে যে হত্যা করা হয়েছিল, সে তায়েফ হতে মক্কা আসছিল। রজবের চন্দ্র উদিত হয়েছিল বটে, কিন্তু সাহাবীদের (রাঃ) তা জানা ছিল না। তারা ঐ রাত্রিকে জমাদিউল উখরার রাত্রি মনে করেছিলেন।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশের সাথে আট জন লোক ছিলেন। সাতজন তো তারাই যাদের নাম উপরে বর্ণিত হয়েছে। অষ্টম ছিলেন হযরত রাবাব আসাদী (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এঁদেরকে প্রথম বদর যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় প্রেরণ করেছিলেন। এরা সবাই ছিলেন মুহাজির সাহাবী (রাঃ)। তাঁদের মধ্যে আনসারী একজনও ছিলেন না। দু’দিন চলার পর তারা নবীজী (সঃ)-এর পত্রখানা পাঠ করেছিলেন। পত্রে লিখিত ছিল, ‘আমার এই নির্দেশনামা পড়ে মক্কা, ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা' নামক স্থানে পৌছে তথায় অবস্থান করবে এবং কুরাইশ যাত্রীদলের অপেক্ষা করবে। তাদের খবরা-খবর জেনে আমার নিকট পৌছিয়ে দেবে। যখন এই মহান ব্যক্তিবর্গ এখান হতে গমন করেন তখন তারা সবাই গিয়েছিলেন। দু’জন সাহাবী যারা উট খুঁজতে গিয়ে রয়ে গিয়েছিলেন, এখান হতে তারাও সঙ্গেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘ফারাগের উপরে ‘মাদানে পৌছে নাজরানে তাদেরকে উটের খোঁজে রয়ে যেতে হয়। কুরাইশদের এই যাত্রীদলের সাথে যায়তুন' প্রভৃতি ব্যবসায়ের মাল ছিল। মুশরিকদের মধ্যে উপরোল্লিখিত লোক ছাড়াও নাওফিস বিন আবদুল্লাহ প্রভৃতিও ছিল।মুসলমানগণ প্রথমে তাদেরকে দেখেতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তারা এই চিন্তা করেন যে, যদি তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় তবে এই রাত্রির পরইতো নিষিদ্ধ মাস পড়ে যাবে, কাজেই তারা কিছুই করতে পারবেন না। সুতরাং পরামর্শক্রমে তারা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে দেন। হযরত ওয়াকিদ বিন আবদুল্লাহ তামীমী (রাঃ) আমর বিন হাযরামীকে লক্ষ্য করে এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করেন যে, তার ফায়সালাই হয়ে যায়। উসমান ও আবদুল্লাহকে বন্দী করে নেয়া হয় এবং গাণীমতের মাল নিয়ে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। পথেই সেনাপতি বলে দিয়েছিলেন যে, এই মালের এক পঞ্চমাংশ তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই থাকবে। সুতরাং এই অংশটি তাঁরা পৃথক করে রেখে দেন এবং বাকী অংশ সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে বন্টন করে দেন। যুদ্ধ লব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ যে বের করে দিতে হবে এই নির্দেশ তখন পর্যন্ত অবতীর্ণ হয়নি। যখন তাঁরা নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হন তখন তিনি এই ঘটনা শুনে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘নিষিদ্ধ মাসগুলোতে যুদ্ধ করতে আমি তোমাদেরকে কখন বলেছিলাম:' না তিনি সেই যাত্রী দলের কোন মাল গ্রহণ করলেন, না বন্দীদেরকে স্বীয় অধিকারে নিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই কথায় ও কাজে তারা খুবই লজ্জিত হলেন এবং নিজেদের পাপ কার্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে গেলেন। অতঃপর অন্যান্য মুসলমানও তাঁদের সমালোচনা করতে আরম্ভ করলেন। আর ওদিকে কুরাইশরা বিদ্রুপ করতে আরম্ভ করলো যে, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর সহচরগণ নিষিদ্ধ মাসগুলোর মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হতে বিরত হন না। অপর পক্ষে ইয়াহুদীরা একটা কুলক্ষণ বের করে। আমর বিন হারামী নিহত হয়েছিল বলে ইয়াহুদীরা বলে (আরবি) অর্থাৎ দীর্ঘ দিন ধরে প্রচণ্ড ও ভয়াবহ যুদ্ধ চলতে থাকবে।' আমরের পিতার নাম ছিল হারামী। এজন্যেই তারা কুলক্ষণ গ্রহণ করে বলে (আরবি) অর্থাৎ ‘যুদ্ধের সময় উপস্থিত হয়ে গেছে। হত্যাকারীর নাম ওয়াকিদ (রাঃ), কাজেই তারা বলে (আরবি) অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। কিন্তু মহান আল্লাহ এর বিপরীত করে দেন এবং পরিণাম সবই মুশরিকদের প্রতিকূলে হয়। তাদের প্রতিবাদের উত্তরে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, যুদ্ধ যদি নিষিদ্ধ মাসে হয়েই থাকে তবে তোমাদের কার্যাবলী এর চেয়েও জঘন্য। তোমাদের অশান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে এই যে, তোমরা মুসলমানদেরকে আল্লাহর দ্বীন হতে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সম্ভাব্য কোন চেষ্টারই ত্রুটি করনি। এটা হত্যা অপেক্ষাও বেশী মারাত্মক। তোমরা এসব কাজ হতে না বিরত হচ্ছো, না তাওবা করছে, না লজ্জিত হচ্ছে। এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর মুসলমানগণ এই দুঃখ হতে মুক্তিপ্রাপ্ত হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাত্রীদলকে ও বন্দীদেরকে নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট দূত পাঠিয়ে বলে, মুক্তিপণ নিয়ে এই বন্দীদেরকে ছেড়ে দিন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) দূতকে বলেন, আমার দু’জন সাহাবী হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং হযরত উত্বা বিন গাযওয়ান (রাঃ) যখন এসে যাবেন তখন তোমরা এসো। আমার ভয় হয় যে, তোমরা তাদেরকে কষ্ট দেবে। অতএব তারা উভয়ে এসে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদ্বয়কে মুক্ত করে দেন। হযরত হাকাম বিন কাসইয়ান (রাঃ) তো মুসলমান হয়ে যান এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতেই রয়ে যান। 'বি'রে মাউনা’ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। উসমান বিন আবদুল্লাহ মক্কায় ফিরে যায় এবং তথায় কুফরের অবস্থাতেই মারা যায়। এই আয়াত শুনে ঐ বিজেতাগণ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টি, সাহাবীগণের (রাঃ) সমালোচনা ও কাফিরদের বিদ্রুপের কারণে তাঁদের অন্তরে যে দুঃখ ছিল, সবই দূর হয়ে যায়। কিন্তু এখন তাদের এই চিন্তা হয় যে, এ যুদ্ধের ফলে তারা পারলৌকিক পুণ্য লাভ করবেন কি-না এবং গাযীদের মধ্যে তাঁদেরকে গণ্য করা হবে কি-না! এ সম্বন্ধে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে বড় বড় আশা প্রদান করেন। মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যকার যুদ্ধে সর্বপ্রথম ইবনুল হাযরামীই মারা যায়। কাফিরদের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘নিষিদ্ধ মাসগুলোর মধ্যে হত্যা করা কি বৈধ: তখন (আরবি)আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটাই ছিল সর্বপ্রথম গাণীমতের মাল যা মুসলমানগণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশই (রাঃ) সর্ব প্রথম যুদ্ধ লব্ধ মাল হতে এক পঞ্চমাংশ বের করেন এবং এটাই ইসলামে চালু হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশও এই রকমই অবতীর্ণ হয়। এ দু’জন বন্দীও ছিল ইসলামের প্রথম বন্দী।
আল-বাকারা 2:218
২১৭-২১৮ নং আয়াতের তাফসীররাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রাঃ)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি বিদায়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিচ্ছেদের দুঃখে ভীষণ ক্রন্দন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ফিরিয়ে নেন এবং তার স্থলে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশ (রাঃ)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তাঁকে একখানা পত্র দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন | ‘বাতনে নাখলা' নামক স্থানে পৌঁছার পূর্বে এই পত্র পড়বে না। তথায় পৌছে যখন এর বিষয়বস্তু দেখবে তখন সঙ্গীদের কাউকেও তোমার সাথে যাবার জন্যে বাধ্য করবে না। অতএব হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই যাত্রা শুরু করেন। নির্ধারিত স্থানে পৌছে তিনি নবীজীর (সঃ) নির্দেশনামা পাঠ করতঃ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়েন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নির্দেশনামা পড়েছি এবং তাঁর নির্দেশ পালনে আমি প্রস্তুত রয়েছি। অতঃপর তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করেন। সুতরাং দুই ব্যক্তি ফিরে যান, কিন্তু অন্যান্য সবাই তার সাথে যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তারা ইবনুল হারামী নামক কাফিরকে দেখতে পান। ঐ দিনটি জমাদিউল উখরার শেষ দিন ছিল কি রজবের প্রথম দিন ছিল এটা তাদের জানা ছিল না। সুতরাং তারা ঐ সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালান এবং ইবনুল হাযরামী মারা যায়। মুসলমানদের ঐ দলটি তথা হতে ফিরে আসেন। তখন মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলেঃ ‘দেখ! তারা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করেছে এবং হত্যাও করেছে। এ ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে,এই দলে ছিলেন হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রাঃ), হযরত আবু হুযাইফা বিন উবা বিন রাবী'আ (রাঃ), হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (ব্লাঃ), হযরত উবা বিন গাওয়ান সালমা (রাঃ), হযরত সাহীল বিন বায়যা (রাঃ), হযরত আমের বিন ফাহীরাহ (রাঃ) এবং হযরত ওয়াকিদ বিন আবদুল্লাহ ইয়ারবুঈ (রাঃ)। বাতনে নাখলা’ পৌছে হযরত আবদুৱাহ বিন জাহাশ (রাঃ) পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন যে, যে ব্যক্তি শাহাদাত লাভের প্রত্যাশী একমাত্র সেই সম্মুখে অগ্রসর হবে। এখান হতে প্রত্যাবর্তনকারীগণ ছিলেন হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস ও হযরত উবা (রাঃ)। তাঁদের এই বাহিনীর সাথে না যাওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের উট হারিয়ে গিয়েছিল। উট খোজ করার জন্যেই তারা রয়ে গিয়েছিলেন। মুশরিকদের মধ্যে হাকাম বিন কাইসান, উসমান বিন আবদুল্লাহ প্রভৃতি ছিল। হযরত ওয়াকিদের (রাঃ) হাতে আমর নিহত হয় এবং এই ক্ষুদ্র বাহিনী যুদ্ধ লব্ধ দ্রব্যনিয়ে ফিরে আসে। এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ লব্ধ মাল যা মুসলমান সাহাবীগণ (রাঃ) প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই প্রাণ উৎসর্গকারী দলটি দু’জন বন্দী ও গাণীমতের মাল নিয়ে ফিরে আসেন মক্কার মুশরিকরা তখন প্রতিবাদ স্বরূপ বলে : মুহাম্মদের (সঃ) দাবীতো এই যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারকারী, কিন্তু সম্মানিত মাসগুলোর কোন সম্মান করেন না, বরং রজব মাসে যুদ্ধ ও হত্যা করে থাকেন। মুসলমানগণ বলেনঃ “আমরা রজব মাসে তো হত্যা করিনি বরং জমাদিউল উখরা মাসে যুদ্ধ হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার এ যে, ওটা ছিল রজবের প্রথম রাত্রি এবং জমাদিউল উখরার শেষ রাত্রি। রজব মাস আরম্ভ হওয়া মাত্রই মুসলমানদের তরবারী কোষ বদ্ধ হয়েছিল। মুশরিকদের এ প্রতিবাদের উত্তরে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এই মাসগুলোতে যুদ্ধ হারাম বটে। কিন্তু হে মুশরিকরা! তোমাদের মন্দ কার্যাবলী তো মন্দ হিসেবে এর চেয়েও বেড়ে গেছে। তোমরা আমাকে অস্বীকার করছো। তোমরা আমার নবী (সঃ)-কে ও তার সহচরদেরকে আমার মসজিদ হতে প্রতিরোধ করছে। তোমরা তাদেরকে তথা হতে বহিস্কৃত করেছে। সুতরাং তোমাদের এই অসৎ কার্যাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত কর যে, ওগুলো কত জঘন্য কাজ!' এই নিষিদ্ধ মাসগুলোতেই মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বায়তুল্লাহ শরীফ হতে বাধা দিয়েছিল এবং তারা বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তী বছর নিষিদ্ধ মাসগুলোতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর (সঃ) হাতে মক্কা বিজয় করিয়ে দেন এবং তথায় মুসলমানদের পূর্ণ আধিপত্য লাভ হয়। তখন তারা প্রতিবাদ করলে এই আয়াতগুলো দ্বারা তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। আমর বিন হাযরামীকে যে হত্যা করা হয়েছিল, সে তায়েফ হতে মক্কা আসছিল। রজবের চন্দ্র উদিত হয়েছিল বটে, কিন্তু সাহাবীদের (রাঃ) তা জানা ছিল না। তারা ঐ রাত্রিকে জমাদিউল উখরার রাত্রি মনে করেছিলেন।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশের সাথে আট জন লোক ছিলেন। সাতজন তো তারাই যাদের নাম উপরে বর্ণিত হয়েছে। অষ্টম ছিলেন হযরত রাবাব আসাদী (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এঁদেরকে প্রথম বদর যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় প্রেরণ করেছিলেন। এরা সবাই ছিলেন মুহাজির সাহাবী (রাঃ)। তাঁদের মধ্যে আনসারী একজনও ছিলেন না। দু’দিন চলার পর তারা নবীজী (সঃ)-এর পত্রখানা পাঠ করেছিলেন। পত্রে লিখিত ছিল, ‘আমার এই নির্দেশনামা পড়ে মক্কা, ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা' নামক স্থানে পৌছে তথায় অবস্থান করবে এবং কুরাইশ যাত্রীদলের অপেক্ষা করবে। তাদের খবরা-খবর জেনে আমার নিকট পৌছিয়ে দেবে। যখন এই মহান ব্যক্তিবর্গ এখান হতে গমন করেন তখন তারা সবাই গিয়েছিলেন। দু’জন সাহাবী যারা উট খুঁজতে গিয়ে রয়ে গিয়েছিলেন, এখান হতে তারাও সঙ্গেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘ফারাগের উপরে ‘মাদানে পৌছে নাজরানে তাদেরকে উটের খোঁজে রয়ে যেতে হয়। কুরাইশদের এই যাত্রীদলের সাথে যায়তুন' প্রভৃতি ব্যবসায়ের মাল ছিল। মুশরিকদের মধ্যে উপরোল্লিখিত লোক ছাড়াও নাওফিস বিন আবদুল্লাহ প্রভৃতিও ছিল।মুসলমানগণ প্রথমে তাদেরকে দেখেতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তারা এই চিন্তা করেন যে, যদি তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় তবে এই রাত্রির পরইতো নিষিদ্ধ মাস পড়ে যাবে, কাজেই তারা কিছুই করতে পারবেন না। সুতরাং পরামর্শক্রমে তারা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে দেন। হযরত ওয়াকিদ বিন আবদুল্লাহ তামীমী (রাঃ) আমর বিন হাযরামীকে লক্ষ্য করে এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করেন যে, তার ফায়সালাই হয়ে যায়। উসমান ও আবদুল্লাহকে বন্দী করে নেয়া হয় এবং গাণীমতের মাল নিয়ে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। পথেই সেনাপতি বলে দিয়েছিলেন যে, এই মালের এক পঞ্চমাংশ তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই থাকবে। সুতরাং এই অংশটি তাঁরা পৃথক করে রেখে দেন এবং বাকী অংশ সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে বন্টন করে দেন। যুদ্ধ লব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ যে বের করে দিতে হবে এই নির্দেশ তখন পর্যন্ত অবতীর্ণ হয়নি। যখন তাঁরা নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হন তখন তিনি এই ঘটনা শুনে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘নিষিদ্ধ মাসগুলোতে যুদ্ধ করতে আমি তোমাদেরকে কখন বলেছিলাম:' না তিনি সেই যাত্রী দলের কোন মাল গ্রহণ করলেন, না বন্দীদেরকে স্বীয় অধিকারে নিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই কথায় ও কাজে তারা খুবই লজ্জিত হলেন এবং নিজেদের পাপ কার্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে গেলেন। অতঃপর অন্যান্য মুসলমানও তাঁদের সমালোচনা করতে আরম্ভ করলেন। আর ওদিকে কুরাইশরা বিদ্রুপ করতে আরম্ভ করলো যে, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর সহচরগণ নিষিদ্ধ মাসগুলোর মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হতে বিরত হন না। অপর পক্ষে ইয়াহুদীরা একটা কুলক্ষণ বের করে। আমর বিন হারামী নিহত হয়েছিল বলে ইয়াহুদীরা বলে (আরবি) অর্থাৎ দীর্ঘ দিন ধরে প্রচণ্ড ও ভয়াবহ যুদ্ধ চলতে থাকবে।' আমরের পিতার নাম ছিল হারামী। এজন্যেই তারা কুলক্ষণ গ্রহণ করে বলে (আরবি) অর্থাৎ ‘যুদ্ধের সময় উপস্থিত হয়ে গেছে। হত্যাকারীর নাম ওয়াকিদ (রাঃ), কাজেই তারা বলে (আরবি) অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। কিন্তু মহান আল্লাহ এর বিপরীত করে দেন এবং পরিণাম সবই মুশরিকদের প্রতিকূলে হয়। তাদের প্রতিবাদের উত্তরে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, যুদ্ধ যদি নিষিদ্ধ মাসে হয়েই থাকে তবে তোমাদের কার্যাবলী এর চেয়েও জঘন্য। তোমাদের অশান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে এই যে, তোমরা মুসলমানদেরকে আল্লাহর দ্বীন হতে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সম্ভাব্য কোন চেষ্টারই ত্রুটি করনি। এটা হত্যা অপেক্ষাও বেশী মারাত্মক। তোমরা এসব কাজ হতে না বিরত হচ্ছো, না তাওবা করছে, না লজ্জিত হচ্ছে। এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর মুসলমানগণ এই দুঃখ হতে মুক্তিপ্রাপ্ত হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাত্রীদলকে ও বন্দীদেরকে নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট দূত পাঠিয়ে বলে, মুক্তিপণ নিয়ে এই বন্দীদেরকে ছেড়ে দিন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) দূতকে বলেন, আমার দু’জন সাহাবী হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং হযরত উত্বা বিন গাযওয়ান (রাঃ) যখন এসে যাবেন তখন তোমরা এসো। আমার ভয় হয় যে, তোমরা তাদেরকে কষ্ট দেবে। অতএব তারা উভয়ে এসে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদ্বয়কে মুক্ত করে দেন। হযরত হাকাম বিন কাসইয়ান (রাঃ) তো মুসলমান হয়ে যান এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতেই রয়ে যান। 'বি'রে মাউনা’ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। উসমান বিন আবদুল্লাহ মক্কায় ফিরে যায় এবং তথায় কুফরের অবস্থাতেই মারা যায়। এই আয়াত শুনে ঐ বিজেতাগণ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টি, সাহাবীগণের (রাঃ) সমালোচনা ও কাফিরদের বিদ্রুপের কারণে তাঁদের অন্তরে যে দুঃখ ছিল, সবই দূর হয়ে যায়। কিন্তু এখন তাদের এই চিন্তা হয় যে, এ যুদ্ধের ফলে তারা পারলৌকিক পুণ্য লাভ করবেন কি-না এবং গাযীদের মধ্যে তাঁদেরকে গণ্য করা হবে কি-না! এ সম্বন্ধে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে বড় বড় আশা প্রদান করেন। মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যকার যুদ্ধে সর্বপ্রথম ইবনুল হাযরামীই মারা যায়। কাফিরদের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘নিষিদ্ধ মাসগুলোর মধ্যে হত্যা করা কি বৈধ: তখন (আরবি)আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটাই ছিল সর্বপ্রথম গাণীমতের মাল যা মুসলমানগণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহাশই (রাঃ) সর্ব প্রথম যুদ্ধ লব্ধ মাল হতে এক পঞ্চমাংশ বের করেন এবং এটাই ইসলামে চালু হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশও এই রকমই অবতীর্ণ হয়। এ দু’জন বন্দীও ছিল ইসলামের প্রথম বন্দী।
আল-বাকারা 2:219
২১৯-২২০ নং আয়াতের তাফসীরযখন মদ্য হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি এটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিন।' তখন সুরা-ই-বাকারার এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডাকা হয়। এবং তাঁকে এই আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় এই দোয়াই করেন : হে আল্লাহ! এটা আপনি আমাদের জন্যে আরও স্পষ্ট করে বর্ণনা করুন।' তখন সূরা-ই- নিসা’র (আরবি) অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়ো না।' (৪:৪৩) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। প্রত্যেক নামাযের সময় ঘোষিত হতে থাকে যে নেশাগ্রস্ত মানুষ যেন নামাযের নিকটও না আসে। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তাকে এই আয়াতটিও পাঠ করে শুনানো হয়। হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় এই প্রার্থনাই করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে এটা আরও স্পষ্ট করে বর্ণনা করুন! এবার সূরা মায়েদার আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এই আয়াতটিও পাঠ করে শুনানো হয় এবং তার কানে আয়াতটির।(আরবি) অর্থাৎ তোমরা কি বিরত হবে না:' (৫:৯১) এই শেষ কথাটি পৌছে তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ 'আমরা বিরত থাকলাম, আমরা দূরে থাকলাম। (মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবু দাউদ, জামেউ তিরমিযী, সুনানই-নাসাঈ ইত্যাদি)মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, ও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে আবূ মাইসারা, যার নাম আমর বিন শারাহ বিল হামদানী কুফী। হযরত আবু যারআ (রঃ) বলেন যে, তাঁর এই হাদীসটি হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ করা প্রমাণিত হয়। ইমাম আলী বিন মাদীনী (রঃ) বলেন যে,এর ইসনাদ উত্তম ও সঠিক। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম’ গ্রন্থে হযরত উমারের (রাঃ) (আরবি) উক্তির পরে এই কথাগুলোও রয়েছে ও মদ্য মাল ধ্বংস করে থাকে এবং জ্ঞান লোপ করে দেয়।' এই বর্ণনাটি এবং এর সঙ্গে মুসনাদ-ই আহমাদের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত অন্যান্য বর্ণনাগুলো সূরা মায়েদার মদ্য হারাম সম্বন্ধীয় আয়াতটির তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হবে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মদ্য ঐ জিনিসের প্রত্যেকটিকে বলা হয় যা জ্ঞান লোপ করে দেয়। ইনশাআল্লাহ এরও পূর্ণ বর্ণনা সূরা মায়েদায় আসবে। (আরবি) বলা হয় জুয়া খেলাকে। এগুলোর পাপ হচ্ছে পারলৌকিক এবং লাভ হচ্ছে ইহলৌকিক। যেমন,এর ফলে শরীরের কিছু উপকার হয়, খাদ্য হযম হয়, মেধা শক্তি বৃদ্ধি পায়, এক প্রকারের আনন্দ লাভ হয় ইত্যাদি। যেমন হযরত হাসান বিন সাবিত (রাঃ) অজ্ঞতাযুগের একটি কবিতার মধ্যে বলেছেন ও মদ্য পান করে আমরা বাদশাহ ও বীর পুরুষ হয়ে থাকি। অনুরূপভাবে এর ব্যবসায়েও লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। এরকমই জুয়া খেলাতে বিজয় লাভের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এগুলোর উপকারের তুলনায় ক্ষতি ও অপকারই বেশী। কেননা, এর দ্বারা জ্ঞান লোপ পাওয়ার সাথে সাথে ধর্মও ধ্বংস হয়ে থাকে। এই আয়াতের মধ্যে মদ্য হারাম হওয়ার পূর্বাভাষ থাকলেও স্পষ্টভাবে হারাম হওয়ার কথা বর্ণিত হয়নি। তাই হযরত উমার (রাঃ) চাচ্ছিলেন যে, স্পষ্ট ভাষায় মদ্য হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হোক। কাজেই সূরা মায়েদার আয়াতে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়া হয় ও মদ্য পান, জুয়া খেলা, পাশা খেলা এবং তীরের সাহায্যে পূর্ব লক্ষণ গ্রহণ করা সমস্তই হারাম ও শয়তানী কাজ। হে মুসলমানগণ! যদি তোমরা মুক্তি পেতে চাও তবে এসব কাজ হতে বিরত থাক। শয়তানের আকাংখা এই যে, সে মদ্য ও জুয়ার সাহায্যে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা উৎপাদন করে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর যিকর ও নামায হতে বিরত রাখে, সুতরাং তোমরা এসব হতে বিরত হবে কি: ইবনে উমার (রাঃ), শাবী (রঃ), মুজাহিদ(রঃ) কাতাদাহ (রঃ) রাবী বিন আনাস (রাঃ) ও আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, মদ্যের ব্যাপারে প্রথম সূরা-ই-বাকারার এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এরপর অবতীর্ণ হয় সুরা-ই-নিসার আয়াতটি। সর্বশেষে সূরা-ই-মায়েদার আয়াতটি অবতীর্ণ করে আল্লাহ তা'আলা মদ্যকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দেন। কুলিল আফওয়া’ এর একটি পঠন কুলিল আ’ফউ'ও রয়েছে এবং উভয় পঠনই বিশুদ্ধ। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) এবং হযরত সালাবা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করেন : “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের গোলামও রয়েছে এবং সন্তানাদিও রয়েছে, আমরা ধনী বটে, আমরা আল্লাহর পথে কিছু দান করবো কি: এর উত্তরে বলা হয়(আরবি) অর্থাৎ-(হে নবীজি সঃ) তুমি বল-যা তোমাদের উদ্বৃত্ত।' (২:২১৯) অর্থাৎ সন্তানাদির জন্যে খরচ করার পরে যা অতিরিক্ত হয় তাই খরচ কর। বহু সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রাঃ) হতে এর তাফসীর এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত তাউস (রাঃ) বলেনঃ প্রত্যেক জিনিস হতেই কিছু কিছু করে আল্লাহর পথে দিতে থাক।' রাবী (রাঃ) বলেনঃ ‘ভাল ও উত্তম মাল আল্লাহর পথে দান কর।' সমস্ত উক্তির সারমর্ম এই যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় কর। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ তোমরা এরূপ করো না যে,সবই দিয়ে ফেলবে, অতঃপর নিজেই ভিক্ষের ঝুলি কাঁধে নিবে।'সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছেঃ “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে একটি স্বর্ণ মুদ্রা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার কাজে লাগিয়ে দাও।' লোকটি বলেঃ আমার নিকট আরও একটি রয়েছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমার স্ত্রীর জন্যে খরচ কর।' সে বলে, আরও একটি আছে।' তিনি বলেনঃ “তোমার ছেলেমেয়ের প্রয়োজনে লাগিয়ে দাও।' সে বলেঃ আমার নিকট আরও একটি রয়েছে।' তিনি বলেন, ‘তা হলে এখন তুমি খুব চিন্তা ভাবনা করে দেখতে পার।' সহীহ মুসলিম শরীফের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ প্রথমে তুমি তোমার জীবন থেকে আরম্ভ কর। প্রথমে ওরই উপরে সাদকা কর। বাঁচলে ছেলেমেয়ের উপর খরচ কর। এর পরে বাঁচলে নিজের আত্মীয়-স্বজনের উপর সাদকা কর। এর পরেও যদি বাঁচে তবে অন্যান্য অভাগ্রস্তদের উপর সাদকা কর।ঐ কিতাবেরই আরও একটি হাদীসে রয়েছেঃ সবচেয়ে উত্তম দান হচ্ছে ওটাই যে, মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুপাতে রেখে অবশিষ্ট জিনিস আল্লাহর পথে দান করে দেয়। উপরের হাত নীচের হাত হতে উত্তম। প্রথমে তাদেরকে দাও যাদের খরচ বহন তোমার দায়িত্বে রয়েছে।' অন্য একটি হাদীসে রয়েছে : “হে আদম সন্তান! তোমার হাতে তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা রয়েছে তা আল্লাহর পথে দিয়ে দেয়াই তোমার জন্যে মঙ্গলকর এবং তা বন্ধ রাখা তোমার জন্যে ক্ষতিকর। হাঁ, তবে নিজের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ করাতে তোমার প্রতি কোন ভৎসনা নেই।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একটি উক্তি এও বর্ণিত আছে যে, এই হুকুমটি যাকাতের হুকুম দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাকাতের আয়াত যেন এই আয়াতেরই তাফসীর এবং এর স্পষ্ট বর্ণনা, সঠিক উক্তি এটাই।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আমি এই নির্দেশাবলী স্পষ্ট ও খোলাখুলি ভাবে বর্ণনা করেছি দ্রুপ অবশিষ্ট নির্দেশাবলীও আমি পরিষ্কারও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দেবো। বেহেশতের অঙ্গীকার ও দোযখ হতে ভয় প্রদর্শনের কথাও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হবে, যেন তোমরা এই নশ্বর জগত হতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পারলৌকিক জগতের প্রতি আগ্রহী হতে পার, যা অনন্তকালের জন্যে স্থায়ী হবে।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! যে চিন্তা ও গবেষণা করবে সে অবশ্যই জানতে পারবে যে, ইহজগতের ঘর হচ্ছে বিপদের ঘর এবং পরিণামে এটা ধ্বংস হয়ে যাবে, আর পরজগতই হচ্ছে প্রতিদানের ঘর এবং তা চিরস্থায়ী থাকবে।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দুনিয়ার উপর আখেরাতের যে কি মর্যাদা রয়েছে তা একটু চিন্তা করলেই পরিষ্কারভাবে জানতে পারা যাকে। সুতরাং জ্ঞানীদের উচিত যে, তারা যেন পরকালের পুণ্য সংগ্রহ করার কাজে সদা সচেষ্ট থাকে।অতঃপর পিতৃহীনদের সম্পর্কে নির্দশাবলী অবতীর্ণ হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে এই নির্দেশ ছিল (আরবি) অর্থাৎ উৎকৃষ্ট পন্থা ব্যতিরেকে পিতৃহীনদের মালের নিকটে যেও ।' (৬:১৫২) আরও বলেছেনঃ(আরবি)অর্থাৎ নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা তাদের পেটের মধ্যে আগুন ভক্ষণ করছে এবং তারা অতি সত্বরই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' (৪:১০) এই আয়াতগুলো শ্রবণ করে পিতৃহীনদের অভিভাবকগণ ইয়াতীমদের আহার্য ও পানীয় হতে নিজেদের আহার্য ও পানীয় সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেন। তখন ঐ পিতৃহীনদের জন্যে রান্নাকৃত খাদ্য বেঁচে গেলে হয় ওরাই। তা অন্য সময় খেয়ে নিতো না হয় নষ্ট হয়ে যেতো। এর ফলে একদিকে যেমন ইয়াতীমদের ক্ষতি হতে থাকে, অপরদিকে তেমনই তাদের অভিভাবকগণ অস্বস্তিবোধ করতে থাকেন। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এই সম্বন্ধে আরজ করেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং সৎ নিয়তে ও বিশ্বস্ততার সাথে তাদের মাল নিজেদের মালের সাথে মিলিত রাখার অনুমতি দেয়া হয়। সুনান-ই-আবু দাউদ, সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদির মধ্যে এই বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদের একটি দল এর শান-ই-নযুল এটাই বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “ইয়াতীমদের খাদ্য ও পানি পৃথক করা ছাড়া খুঁটিনাটিভাবে তাদের মাল দেখাশুনা করা খুবই কঠিন।”(আরবি)-এর ভাবার্থ এই পৃথক করণই বটে। কিন্তু (আরবি) বলে মিলিত রাখার অনুমতি দেয়া হয়। কেননা, তারাও তো ধর্মীয় ভাই। তবে নিয়্যাত সৎ হওয়া উচিত। ইয়াতীমদের ক্ষতি করার যদি উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটাও আল্লাহ পাকের নিকট অজানা নেই। আর যদি ইয়াতীমদের মঙ্গলের ও তাদের মাল রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটাও আল্লাহ তা'আলা খুব ভালই জানেন। অতঃপর বলা হচ্ছে-আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্ট ও বিপদের মধ্যে জড়িত করতে চান না। পিতৃহীনদের আহার্য ও পানি পৃথক করণের ফলে তোমরা যে অসুবিধের সম্মুখীন হয়েছিলে আল্লাহ তা'আলা তা দূর করে দিলেন। এখন একই হাঁড়িতে রান্নাবান্না করা এবং মিলিতভাবে কাজ করা তোমাদের জন্যে মহান আল্লাহ বৈধ করলেন। এমনকি পিতৃহীনের অভিভাবক যদি দরিদ্র হয় তবে ন্যায়ভাবে সে নিজের কাজে ইয়াতীমের মাল খরচ করতে পারে। আর যদি কোন ধনী অভিভাবক প্রয়োজন বশতঃ ইয়াতীমের মাল নিজের কাজে লাগিয়ে থাকে তবে সে পরে তা আদায় করে দেবে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়গুলো সূরা-ইনিসা’র তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হবে।
আল-বাকারা 2:220
২১৯-২২০ নং আয়াতের তাফসীরযখন মদ্য হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি এটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিন।' তখন সুরা-ই-বাকারার এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডাকা হয়। এবং তাঁকে এই আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় এই দোয়াই করেন : হে আল্লাহ! এটা আপনি আমাদের জন্যে আরও স্পষ্ট করে বর্ণনা করুন।' তখন সূরা-ই- নিসা’র (আরবি) অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়ো না।' (৪:৪৩) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। প্রত্যেক নামাযের সময় ঘোষিত হতে থাকে যে নেশাগ্রস্ত মানুষ যেন নামাযের নিকটও না আসে। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তাকে এই আয়াতটিও পাঠ করে শুনানো হয়। হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় এই প্রার্থনাই করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে এটা আরও স্পষ্ট করে বর্ণনা করুন! এবার সূরা মায়েদার আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এই আয়াতটিও পাঠ করে শুনানো হয় এবং তার কানে আয়াতটির।(আরবি) অর্থাৎ তোমরা কি বিরত হবে না:' (৫:৯১) এই শেষ কথাটি পৌছে তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ 'আমরা বিরত থাকলাম, আমরা দূরে থাকলাম। (মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবু দাউদ, জামেউ তিরমিযী, সুনানই-নাসাঈ ইত্যাদি)মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, ও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে আবূ মাইসারা, যার নাম আমর বিন শারাহ বিল হামদানী কুফী। হযরত আবু যারআ (রঃ) বলেন যে, তাঁর এই হাদীসটি হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ করা প্রমাণিত হয়। ইমাম আলী বিন মাদীনী (রঃ) বলেন যে,এর ইসনাদ উত্তম ও সঠিক। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম’ গ্রন্থে হযরত উমারের (রাঃ) (আরবি) উক্তির পরে এই কথাগুলোও রয়েছে ও মদ্য মাল ধ্বংস করে থাকে এবং জ্ঞান লোপ করে দেয়।' এই বর্ণনাটি এবং এর সঙ্গে মুসনাদ-ই আহমাদের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত অন্যান্য বর্ণনাগুলো সূরা মায়েদার মদ্য হারাম সম্বন্ধীয় আয়াতটির তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হবে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মদ্য ঐ জিনিসের প্রত্যেকটিকে বলা হয় যা জ্ঞান লোপ করে দেয়। ইনশাআল্লাহ এরও পূর্ণ বর্ণনা সূরা মায়েদায় আসবে। (আরবি) বলা হয় জুয়া খেলাকে। এগুলোর পাপ হচ্ছে পারলৌকিক এবং লাভ হচ্ছে ইহলৌকিক। যেমন,এর ফলে শরীরের কিছু উপকার হয়, খাদ্য হযম হয়, মেধা শক্তি বৃদ্ধি পায়, এক প্রকারের আনন্দ লাভ হয় ইত্যাদি। যেমন হযরত হাসান বিন সাবিত (রাঃ) অজ্ঞতাযুগের একটি কবিতার মধ্যে বলেছেন ও মদ্য পান করে আমরা বাদশাহ ও বীর পুরুষ হয়ে থাকি। অনুরূপভাবে এর ব্যবসায়েও লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। এরকমই জুয়া খেলাতে বিজয় লাভের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এগুলোর উপকারের তুলনায় ক্ষতি ও অপকারই বেশী। কেননা, এর দ্বারা জ্ঞান লোপ পাওয়ার সাথে সাথে ধর্মও ধ্বংস হয়ে থাকে। এই আয়াতের মধ্যে মদ্য হারাম হওয়ার পূর্বাভাষ থাকলেও স্পষ্টভাবে হারাম হওয়ার কথা বর্ণিত হয়নি। তাই হযরত উমার (রাঃ) চাচ্ছিলেন যে, স্পষ্ট ভাষায় মদ্য হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হোক। কাজেই সূরা মায়েদার আয়াতে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়া হয় ও মদ্য পান, জুয়া খেলা, পাশা খেলা এবং তীরের সাহায্যে পূর্ব লক্ষণ গ্রহণ করা সমস্তই হারাম ও শয়তানী কাজ। হে মুসলমানগণ! যদি তোমরা মুক্তি পেতে চাও তবে এসব কাজ হতে বিরত থাক। শয়তানের আকাংখা এই যে, সে মদ্য ও জুয়ার সাহায্যে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা উৎপাদন করে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর যিকর ও নামায হতে বিরত রাখে, সুতরাং তোমরা এসব হতে বিরত হবে কি: ইবনে উমার (রাঃ), শাবী (রঃ), মুজাহিদ(রঃ) কাতাদাহ (রঃ) রাবী বিন আনাস (রাঃ) ও আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, মদ্যের ব্যাপারে প্রথম সূরা-ই-বাকারার এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এরপর অবতীর্ণ হয় সুরা-ই-নিসার আয়াতটি। সর্বশেষে সূরা-ই-মায়েদার আয়াতটি অবতীর্ণ করে আল্লাহ তা'আলা মদ্যকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দেন। কুলিল আফওয়া’ এর একটি পঠন কুলিল আ’ফউ'ও রয়েছে এবং উভয় পঠনই বিশুদ্ধ। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) এবং হযরত সালাবা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করেন : “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের গোলামও রয়েছে এবং সন্তানাদিও রয়েছে, আমরা ধনী বটে, আমরা আল্লাহর পথে কিছু দান করবো কি: এর উত্তরে বলা হয়(আরবি) অর্থাৎ-(হে নবীজি সঃ) তুমি বল-যা তোমাদের উদ্বৃত্ত।' (২:২১৯) অর্থাৎ সন্তানাদির জন্যে খরচ করার পরে যা অতিরিক্ত হয় তাই খরচ কর। বহু সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রাঃ) হতে এর তাফসীর এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত তাউস (রাঃ) বলেনঃ প্রত্যেক জিনিস হতেই কিছু কিছু করে আল্লাহর পথে দিতে থাক।' রাবী (রাঃ) বলেনঃ ‘ভাল ও উত্তম মাল আল্লাহর পথে দান কর।' সমস্ত উক্তির সারমর্ম এই যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় কর। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ তোমরা এরূপ করো না যে,সবই দিয়ে ফেলবে, অতঃপর নিজেই ভিক্ষের ঝুলি কাঁধে নিবে।'সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছেঃ “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে একটি স্বর্ণ মুদ্রা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার কাজে লাগিয়ে দাও।' লোকটি বলেঃ আমার নিকট আরও একটি রয়েছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমার স্ত্রীর জন্যে খরচ কর।' সে বলে, আরও একটি আছে।' তিনি বলেনঃ “তোমার ছেলেমেয়ের প্রয়োজনে লাগিয়ে দাও।' সে বলেঃ আমার নিকট আরও একটি রয়েছে।' তিনি বলেন, ‘তা হলে এখন তুমি খুব চিন্তা ভাবনা করে দেখতে পার।' সহীহ মুসলিম শরীফের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ প্রথমে তুমি তোমার জীবন থেকে আরম্ভ কর। প্রথমে ওরই উপরে সাদকা কর। বাঁচলে ছেলেমেয়ের উপর খরচ কর। এর পরে বাঁচলে নিজের আত্মীয়-স্বজনের উপর সাদকা কর। এর পরেও যদি বাঁচে তবে অন্যান্য অভাগ্রস্তদের উপর সাদকা কর।ঐ কিতাবেরই আরও একটি হাদীসে রয়েছেঃ সবচেয়ে উত্তম দান হচ্ছে ওটাই যে, মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুপাতে রেখে অবশিষ্ট জিনিস আল্লাহর পথে দান করে দেয়। উপরের হাত নীচের হাত হতে উত্তম। প্রথমে তাদেরকে দাও যাদের খরচ বহন তোমার দায়িত্বে রয়েছে।' অন্য একটি হাদীসে রয়েছে : “হে আদম সন্তান! তোমার হাতে তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা রয়েছে তা আল্লাহর পথে দিয়ে দেয়াই তোমার জন্যে মঙ্গলকর এবং তা বন্ধ রাখা তোমার জন্যে ক্ষতিকর। হাঁ, তবে নিজের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ করাতে তোমার প্রতি কোন ভৎসনা নেই।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একটি উক্তি এও বর্ণিত আছে যে, এই হুকুমটি যাকাতের হুকুম দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাকাতের আয়াত যেন এই আয়াতেরই তাফসীর এবং এর স্পষ্ট বর্ণনা, সঠিক উক্তি এটাই।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আমি এই নির্দেশাবলী স্পষ্ট ও খোলাখুলি ভাবে বর্ণনা করেছি দ্রুপ অবশিষ্ট নির্দেশাবলীও আমি পরিষ্কারও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দেবো। বেহেশতের অঙ্গীকার ও দোযখ হতে ভয় প্রদর্শনের কথাও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হবে, যেন তোমরা এই নশ্বর জগত হতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পারলৌকিক জগতের প্রতি আগ্রহী হতে পার, যা অনন্তকালের জন্যে স্থায়ী হবে।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! যে চিন্তা ও গবেষণা করবে সে অবশ্যই জানতে পারবে যে, ইহজগতের ঘর হচ্ছে বিপদের ঘর এবং পরিণামে এটা ধ্বংস হয়ে যাবে, আর পরজগতই হচ্ছে প্রতিদানের ঘর এবং তা চিরস্থায়ী থাকবে।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দুনিয়ার উপর আখেরাতের যে কি মর্যাদা রয়েছে তা একটু চিন্তা করলেই পরিষ্কারভাবে জানতে পারা যাকে। সুতরাং জ্ঞানীদের উচিত যে, তারা যেন পরকালের পুণ্য সংগ্রহ করার কাজে সদা সচেষ্ট থাকে।অতঃপর পিতৃহীনদের সম্পর্কে নির্দশাবলী অবতীর্ণ হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে এই নির্দেশ ছিল (আরবি) অর্থাৎ উৎকৃষ্ট পন্থা ব্যতিরেকে পিতৃহীনদের মালের নিকটে যেও ।' (৬:১৫২) আরও বলেছেনঃ(আরবি)অর্থাৎ নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা তাদের পেটের মধ্যে আগুন ভক্ষণ করছে এবং তারা অতি সত্বরই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' (৪:১০) এই আয়াতগুলো শ্রবণ করে পিতৃহীনদের অভিভাবকগণ ইয়াতীমদের আহার্য ও পানীয় হতে নিজেদের আহার্য ও পানীয় সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেন। তখন ঐ পিতৃহীনদের জন্যে রান্নাকৃত খাদ্য বেঁচে গেলে হয় ওরাই। তা অন্য সময় খেয়ে নিতো না হয় নষ্ট হয়ে যেতো। এর ফলে একদিকে যেমন ইয়াতীমদের ক্ষতি হতে থাকে, অপরদিকে তেমনই তাদের অভিভাবকগণ অস্বস্তিবোধ করতে থাকেন। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এই সম্বন্ধে আরজ করেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং সৎ নিয়তে ও বিশ্বস্ততার সাথে তাদের মাল নিজেদের মালের সাথে মিলিত রাখার অনুমতি দেয়া হয়। সুনান-ই-আবু দাউদ, সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদির মধ্যে এই বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদের একটি দল এর শান-ই-নযুল এটাই বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “ইয়াতীমদের খাদ্য ও পানি পৃথক করা ছাড়া খুঁটিনাটিভাবে তাদের মাল দেখাশুনা করা খুবই কঠিন।”(আরবি)-এর ভাবার্থ এই পৃথক করণই বটে। কিন্তু (আরবি) বলে মিলিত রাখার অনুমতি দেয়া হয়। কেননা, তারাও তো ধর্মীয় ভাই। তবে নিয়্যাত সৎ হওয়া উচিত। ইয়াতীমদের ক্ষতি করার যদি উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটাও আল্লাহ পাকের নিকট অজানা নেই। আর যদি ইয়াতীমদের মঙ্গলের ও তাদের মাল রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটাও আল্লাহ তা'আলা খুব ভালই জানেন। অতঃপর বলা হচ্ছে-আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্ট ও বিপদের মধ্যে জড়িত করতে চান না। পিতৃহীনদের আহার্য ও পানি পৃথক করণের ফলে তোমরা যে অসুবিধের সম্মুখীন হয়েছিলে আল্লাহ তা'আলা তা দূর করে দিলেন। এখন একই হাঁড়িতে রান্নাবান্না করা এবং মিলিতভাবে কাজ করা তোমাদের জন্যে মহান আল্লাহ বৈধ করলেন। এমনকি পিতৃহীনের অভিভাবক যদি দরিদ্র হয় তবে ন্যায়ভাবে সে নিজের কাজে ইয়াতীমের মাল খরচ করতে পারে। আর যদি কোন ধনী অভিভাবক প্রয়োজন বশতঃ ইয়াতীমের মাল নিজের কাজে লাগিয়ে থাকে তবে সে পরে তা আদায় করে দেবে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়গুলো সূরা-ইনিসা’র তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হবে।
আল-বাকারা 2:221
এখানে অংশীবাদিনী মহিলাদেরকে বিয়ে করার অবৈধতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আয়াতটি সাধারণ বলে প্রত্যেক মুশরিকা মহিলাকে বিয়ে করার নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হলেও অন্য জায়গায় রয়েছে: “তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের খোদাভীরু মহিলাগণকেও মোহর দিয়ে বিয়ে করা ততামাদের জন্যে বৈধ-যারা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকে।” হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) উক্তি এটাই যে, ঐ মুশরিকা মহিলাগণ হতে কিতাবীদের মহিলাগণ বিশিষ্টা। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), মাকল (রঃ), হাসান বিন সাবিত (রঃ), যহহাক (রঃ) কাতাদাহ (রঃ), যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসেরও (রঃ) উক্তি এটাই। কেউ কেউ বলেন যে, এই আয়াতটি শুধুমাত্র মূর্তিপূজক মুশরিকা নারীদের জন্যেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কয়েক প্রকারের নারীকে বিয়ে করার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। হিজরতকারিনী ও বিশ্বাসিনী নারীদেরকে ছাড়া অন্যান্য ঐসমস্ত মেয়েকে বিয়ে করার অবৈধতা ঘোষণা করেছেন যারা অন্য ধর্মের অনুসারিনী।কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ঈমানের প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়েছে তার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে।' (৫:৫) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রাঃ) একজন ইয়াহূদী মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। এবং হযরত হুযাইফা বিন ইয়ামান (রাঃ) একজন খ্রীষ্টান নারীকে বিয়ে করেছিলেন। হযরত উমার (রাঃ) এতে অত্যন্ত রাগান্বিত হন। এমনকি তিনি যেন তাদেরকে চাবুক মারতে উদ্যত হন। ঐ দুই মহান ব্যক্তি তখন বলেনঃ “হে আমিরুল মু'মেনীন! আপনি আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না। আমরা তাদেরকে তালাক দিচ্ছি।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তালাক দেয়া যদি হালাল হয় তবে বিয়েও হালাল হওয়া উচিত। আমি তাদেরকে তোমাদের নিকট হতে ছিনিয়ে নেবো এবং অত্যন্ত অপমানের সাথে তাদেরকে পৃথক করে দেবো।” কিন্তু এই হাদীসটি অত্যন্ত গরীব এবং হযরত উমার (রাঃ) হতে সম্পূর্ণরূপেই গরীব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) কিতাবী মহিলাদেরকে বিয়ে করার বৈধতার উপর ইজমা নকল করেছেন এবং হযরত উমারের (রাঃ) এই হাদীস সম্বন্ধে লিখেছেন যে, এটা শুধু রাজনৈতিক যৌক্তিকতার ভিত্তিতে ছিল যেন মানুষ মুসলিম নারীগণের প্রতি অনাগ্রহী না হয় কিংবা অন্য কোন দূরদর্শিতা এই নির্দেশের মধ্যে নিহিত ছিল। যেহেতু একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) যখন এই নির্দেশনামা প্রাপ্ত হন তখন তিনি উত্তরে লিখেন : “আপনি কি এটাকে হারাম বলেন: মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার ফারুক (রাঃ), বলেনঃ “আমি হারাম তো বলি না। কিন্তু আমার ভয় যে, তোমরা মুসলমান নারীদেরকে বিয়ে কর না কেন:" এই বর্ণনাটির ইসনাদও বিশুদ্ধ। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ “মুসলমান পুরুষ খ্রীস্টান মহিলাকে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মুসলমান মহিলার সাথে খ্রষ্টান পুরুষের বিয়ে হতে পারে না।" এই বর্ণনাটির সনদ প্রথম বর্ণনাটি হতে সঠিকতর।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে একটি মারফু হাদীস ইসনাদসহ বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা আহলে কিতাবের নারীদেরকে বিয়ে করতে পারি কিন্তু আমাদের নারীদেরকে আহলে কিতাবের পুরুষ লোকেরা বিয়ে করতে পারে না। কিন্তু এর সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও উম্মতের ইজমা এর উপরেই রয়েছে। ইবনে আবি হাতিমের বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) আহলে কিতাবের বিয়েকে অপছন্দ করতঃ এই আয়াতটি পাঠ করেন। ইমাম বুখারী (রঃ) হ্যরত উমারের (রাঃ) এই উক্তিও নকল করেছেনঃ ‘কোন মহিলা বলে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার প্রভু, এই শিরক অপেক্ষা বড় শিরক আমি জানি না।' হযরত ইমাম আহমাদকে (রঃ) এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা আরবের ঐ মুশরিক মহিলাদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা মূর্তি পূজা করতো।"অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-বিশ্বাসিনী মহিলা অংশীবাদিনী মহিলা হতে উত্তম। এই ঘোষণাটি হযরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ)-এর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। তাঁর কৃষ্ণ বর্ণের একটি দাসী ছিল। একদা ক্রোধান্বিত হয়ে তিনি তাকে একটি চড় বসিয়ে দেন। অতঃপর তিনি সন্ত্রস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তার ধ্যান ধারণা কি।" তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে রোযা রাখে, নামায পড়ে, ভালভাবে অযু করে, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করে এবং আপনার প্রেরিতত্বের সাক্ষ্য প্রদান করে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “হে আবু আব্দিল্লাহ! তবে তো সে মুসলমান। তিনি তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেই আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন। আমি তাকে মুক্ত করে দেবো। শুধু তাই নয়, আমি তাকে বিয়েও করে নেবো।” সুতরাং তিনি তাই করেন। এতে কতকগুলো মুসলমান তাঁকে বিদ্রুপ করেন। তারা চাচ্ছিলেন যে, মুশরিক মহিলার সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেবেন এবং নিজেদের নারীদের বিয়েও মুশরিকদের সাথে দেবেন। তাহলে বংশ মর্যাদা বজায় থাকবে। তখন এই ঘোষণা দেয়া হয় যে, মুশরিকা আযাদ মহিলা হতে মুসলমান দাসী বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। অনুরূপভাবে মুশরিক আযাদ পুরুষ হতে মুসলমান দাস বহুগুণে উত্তম। তাফসীর-ই-আবদ বিন হামীদ গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নারীদের শুধুমাত্র সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদেরকে বিয়ে করো না। হতে পারে যে, তাদের সৌন্দর্য তাদের মধ্যে অহংকার উৎপাদন করবে। নারীদেরকে তাদের সম্পদের উপরে বিয়ে করো না। তাদের সম্পদ তাদেরকে অবাধ্য করে তুলবে এ সম্ভাবনা রয়েছে। বিয়ে করলে ধর্মপরায়ণতা দেখ। কালো-কুৎসিতা দাসীও যদি ধর্মপরায়ণা হয় তবে সে বহুগুণে উত্তম।” কিন্তু এই হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে আফরেকী দুর্বল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “চারটি জিনিস দেখে নারীদেরকে বিয়ে করা হয়। প্রথম মাল, দ্বিতীয় বংশ, তৃতীয় সৌন্দর্য এবং চতুর্থ ধর্মপরায়ণতা। তোমরা ধর্মপরায়ণতাই অনুসন্ধান কর।” সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সম্পূর্ণ দুনিয়াটাই একটা সম্পদ বিশেষ। দুনিয়ার সম্পদসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে সতী নারী।” অতঃপর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে : মুশরিক পুরুষদের সাথে মুসলমান নারীদের বিয়ে দিও না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ কাফির মহিলারা মুসলমান পুরুষদের জন্যে বৈধ নয় এবং মুসলমান পুরুষেরা কাফির মহিলাদের জন্যে বৈধ নয়। (৬০:১০) এর পরে বলা হয়েছে-মু'মিন পুরুষ যদি কাফ্রী ও ক্রীতদাসও হয় তথাপি সে স্বাধীন কাফির নেতা হতে উত্তম। ঐসব লোকের সাথে মেলামেশা, তাদের সাহচর্য, দুনিয়ার। প্রতি ভালবাসা এবং দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয়া শিক্ষা দেয়। এর পরিণাম হচ্ছে দোযখে অবস্থান। আর আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দাদের অনুসরণ, তাঁর নির্দেশ পালন বেহেশতের পথে চালিত করে এবং পাপ মোচনের কারণ হয়ে থাকে। মানুষকে উপদেশ ও শিক্ষা দেয়ার জন্যে আল্লাহ তাআলা তাঁর আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন।
আল-বাকারা 2:222
২২২-২২৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহূদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীলোকদেরকে তাদের সাথে খেতেও দিতো না এবং তাদের পার্শ্বে রাখতো না। সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তারই উত্তরে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, সহবাস ছাড়া অন্যান্য সবকিছু বৈধ। একথা শুনে ইয়াহুদীরা বলেঃ “আমাদের বিরুদ্ধাচরণই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য।” হযরত উসায়েদ বিন হুযায়ের (রাঃ) এবং হযরত ইবাদ বিন বাশার (রাঃ) ইয়াহুদীদের এই কথা নকল করে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে তাহলে সহবাস করারও অনুমতি দিন।' এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডল (এর-রং) পরিবর্তিত হয়। অন্যান্য সাহাবীগণ (রাঃ) ধারণা করেন যে, তিনি তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন। অতঃপর এই মহান ব্যক্তিদ্বয় যেতে থাকলে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট কোন এক ব্যক্তি উপঢৌকন স্বরূপ কিছু দুধ নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে লোক। পাঠিয়ে তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং ঐ দুধ তাদেরকে পান করান। তখন জানা যায় যে ঐ ক্রোধ প্রশমিত হয়েছে (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীদের হতে পৃথক থাকো’-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সহবাস করো না। কারণ, এ ছাড়া অন্যান্য সবকিছুই বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মাযহাব এই যে, সহবাস বৈধ নয় বটে, কিন্তু প্রেমালাপ করা বৈধ। হাদীসসমূহেও রয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও সহধর্মিণীদের সাথে মেলামেশা করতেন, কিন্তু তারা গুপ্ত স্থান কাপড়ে বেঁধে রাখতেন (সুনান-ই-আবু দাউদ)।হযরত আম্মারার ফুফু (রাঃ) হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, যদি স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকে এবং স্বামী-স্ত্রীর একই বিছানা হয় তবে তারা কি করবে:' অর্থাৎ এই অবস্থায় তার স্বামী তার পাশে শুতে পারে কি-না:' হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি তোমাকে সংবাদ দিচ্ছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং করেছেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়িতে এসেই তার নামাযের জায়গায় চলে যান এবং নামাযে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। ইতিমধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। তিনি শীত অনুভব করে আমাকে বলেনঃ এখানে এসো। আমি বলি : আমি ঋতুবতী।' তিনি আমাকে আমার জানুর উপর হতে কাপড় সরাতে বলেন। অতঃপর তিনি আমার উরু ও গণ্ড দেশের উপর বক্ষ রেখে শুয়ে পড়েন। আমিও তার উপর ঝুঁকে পড়ি। ফলে ঠাপ কিছু প্রশমিত হয় এবং সেই গরমে তিনি ঘুমিয়ে যান।'হযরত মাসরূক (রঃ) একদা হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ নবী (সঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘মারহাবা, মারহাবা! অতঃপর তাঁকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেনঃ আমি আপনাকে একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছি কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেনঃ “আমি তোমার মা এবং তুমি আমার ছেলে (সুতরাং যা জিজ্ঞেস করতে চাও কর)।' তিনি বলেনঃ (আচ্ছা বলুন তো) ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে তার স্বামীর কি করা কর্তব্য:' তিনি বলেন ‘লজ্জা স্থান ছাড়া সবই জায়েয (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।' অন্য সনদেও বিভিন্ন শব্দে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুজাহিদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং ইকরামা (রঃ)-এর ফতওয়া এটাই। ভাবার্থ এই যে, ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে উঠা-বসা, খাওয়া ও পান করা ইত্যাদি সবই সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয।। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,তিনি বলেনঃ “আমি ঋতুর অবস্থায় নবী (সঃ)-এর মস্তক ধৌত করতাম, তিনি আমার ক্রোড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে কুরআন মাজীদ পাঠ করতেন। আমি হাড় চুষতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে তাঁকে গ্লাস দিতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে ঐ গ্লাস হতেই ঐ পানিই পান করতেন। সেই সময় আমি ঋতুবতী থাকতাম। সুনান-ই- আবু দাউদের মধ্যে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমার ঋতুর অবস্থায় আমি ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) একই বিছানায় শয়ন করতাম। তাঁর কাপড়ের কোন জায়গা খারাপ হয়ে গেলে তিনি শুধু ঐটুকু জায়গাই ধুয়ে ফেলতেন, শরীরের কোন জায়গায় কিছু লেগে গেলে ঐ জায়গাটুকুও ধুয়ে ফেলতেন এবং ঐ কাপড়েই নামায পড়তেন। তবে সুনানে আবূ দাউদের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি ঋতুর অবস্থায় বিছানা হতে নেমে গিয়ে মাদুরের উপরে চলে আসতাম। আমি পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসতেন না। তাহলে এই বর্ণনাটির ভাবার্থ এই যে, তিনি সতর্কতামূলকভাবে এর থেকে বেঁচে থাকতেন, নিষিদ্ধতার জন্যে নয়।কোন কোন মনীষী এ কথাও বলেন যে, কাপড় বাঁধানো অবস্থায় উপকার গ্রহণ করেছেন। হযরত হারিস হেলালিয়াহর (রাঃ) কন্যা মায়মুনা (রাঃ) বলেনঃ ‘নবী (সঃ) যখন তাঁর কোন সহধর্মিণীর সাথে মিলনের ইচ্ছে করতেন তখন তিনি তাকে কাপড় বেঁধে দেয়ার নির্দেশ দিতেন (সহীহ বুখারী)। এই রকমই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার স্ত্রীর ঋতুর অবস্থায় তার সাথে আমার কোন কিছু বৈধ আছে কি:' তিনি বলেন কাপড়ের উপরের সব কিছুই বৈধ (সুনান-ই-আবু দাউদ ইত্যাদি)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হতে বেঁচে থাকাও উত্তম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রাঃ) এবং হযরত শুরাইহের (রাঃ) মাযহাবও এটাই। এই ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রাঃ) দু'টি উক্তি রয়েছে, তন্মধ্যে এটাও একটি। অধিকাংশ ইরাকী প্রভৃতি মনীষীরও এটাই মাযহাব। তাঁরা বলেন যে, সহবাস যে হারাম এটাতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কাজেই এর আশপাশ হতেও বেঁচে থাকা উচিত যাতে হারামের মধ্যে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। ঋতুর অবস্থায় সহবাসের নিষিদ্ধতা এবং যে ব্যক্তি। এই কার্যে পতিত হবে তার পাপী হওয়া, এটা তো নিশ্চিত কথা। তাকে অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু তাকে কাফ্ফারাও দিতে হবে কি-না এ বিষয়ে আলেমদের দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, তাকে কাফফারাও দিতে হবে। মুসনাদ-ইআহমাদ ও সুনানের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে সে যেন একটি স্বর্ণ মুদ্রা বা অর্ধ স্বর্ণ মুদ্রা দান করে।' জামেউত্ তিরমিযী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত লাল হয় তবে একটা স্বর্ণ মুদ্রা আর যদি রক্ত হলদে বর্ণের হয় তবে অর্ধস্বর্ণ মুদ্রা। মুসনাদ-ই-আহমদের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত শেষ হয়ে গিয়ে থাকে এবং এখন পর্যন্ত স্ত্রী গোসল না করে থাকে, এই অবস্থায় যদি স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় তবে অর্ধ দীনার, নচেৎ এক দীনার। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, কাফফারা কিছুই নেই। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেই চলবে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ কথাই বলেন। অধিকতর সঠিক মাযহাবও এটাই এবং জমহুর ওলামাও এই মতই পোষণ করেন। যে হাদীসগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে সেই সম্পর্কে এঁদের কথা এ যে, এগুলোর মারফ হওয়া সঠিক কথা নয়, রবং সঠিক কথা এ যে, এলো। মাওকুফ হাদীস বর্ণনা হিসেবে এগুলো মারফু ও মাওকুফ উভয় রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ হাদীসশাস্ত্রবিদের মতে সঠিক কথা এই যে, এগুলো মাওকুফ হাদীস। তাদের নিকটে যেও না' এটা তাফসীর হচ্ছে এ নির্দেশের যে, ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীগণ হতে তোমরা পৃথক থাকবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ঋতু শেষ হয়ে গেলে তাদের নিকট যাওয়া বৈধ।হযরত ইমাম আবু আবদিল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেনঃ পবিত্রতা বলে দিচ্ছে যে, এখন তার নিকটে যাওয়া জায়েয। হযরত মায়মুনা (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমাদের মধ্যে যখন কেউ ঋতুবতী হতেন তখন তিনি কাপড় বেঁধে দিতেন এবং নবী (সঃ)-এর সাথে তার চাদরে শুয়ে যেতেন। এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, নিকটে যাওয়া হতে নিষেধ করার অর্থ সহবাস হতে নিষেধ করা। এ ছাড়া তার সাথে শয়ন, উপবেশন ইত্যাদি সবই বৈধ।এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তারা যখন পবিত্র হয়ে যাবে তখন তাদের সাথে সহবাস কর। ইমাম ইবনে হাযাম (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক হায়েযের পবিত্রতার উপর সহবাস করা ওয়াজিব। তার দলীল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ তাদের নিকটে এসো' এই শব্দটি। কিন্তু এটা কোন শক্ত দলীল নয়। এটা শুধু অবৈধতা সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা। এছাড়া অন্য কোন দলীল তার কাছে নেই। উসুল’ শাস্ত্রের আলেমগণের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, আমর’ অর্থাৎ নির্দেশ সাধারণভাবে অবশ্যকরণীয়রূপে এসে থাকে। তাদের পক্ষে ইমমি ইবনে হাযামের কথার উত্তর দেয়া খুব কঠিন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এই নির্দেশ শুধু অনুমতির জন্য। এর পূর্বে নিষিদ্ধতার কথা এসেছে বলে এটা এরই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এখানে আমর’ অবশ্য করণীয়ের জন্যে নয়। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। দলীল দ্বারা যা সাব্যস্ত হয়েছে তা এই যে, এরূপ স্থলে অর্থাৎ পূর্বে নিষিদ্ধ এবং পরে নির্দেশ, এ অবস্থায় নির্দেশ স্বীয় মূলের উপরেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ যা নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যেমন ছিল এখন তেমনই হয়ে যাবে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যদি কাজটি ওয়াজিব থেকে থাকে তবে এখনও ওয়াজিবই থাকবে। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর।' (৯:৫) আর যদি নিষিদ্ধতার পূর্বে তা বৈধ থেকে থাকে তবে তা বৈধই থাকবে। যেমন কুরআন পাকের (আরবি) অর্থাৎ যখন তোমরা ইহরাম খুলে দেবে তখন তোমরা শিকার কর।' (৫২) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন নামায পুরো করা হয়ে যাবে তখন তোমরা পৃথিবীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়।' (৬২:১০) ঐ আলেমদের এই সিদ্ধান্ত ঐ বিভিন্ন উক্তিগুলোকে একত্রিত করে দেয় যা ‘আমরে’র অবশ্যকরণীয় ইত্যাদি সম্বন্ধে রয়েছে। ইমাম গাযযালী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীও এটা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী কতকগুলো ইমাম এটাও পছন্দ করেছেন। এটাই সঠিকও বটে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টিও স্মরণীয় যে, যখন হায়েযের রক্ত আসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাবে, ওর পরেও স্ত্রীর সাথে স্বামীর সহবাস হালাল হবে না যে পর্যন্ত না সে গোসল করবে। হাঁ, তবে যদি তার কোন ওজর থাকে এবং গোসলের পরিবর্তে যদি তার জন্যে তায়াম্মুম করা যায়েয হয় তবে তায়াম্মুমের পর তার কাছে স্বামী আসতে পারে। এতে সমস্ত আলেমের মতৈক্য রয়েছে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এ সমস্ত আলেমের বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, যদি হায়েয় শেষ সময়কাল অর্থাৎ দশ দিন পর্যন্ত থেকে বন্ধ হয়ে যায় তবে সে গোসল না করলেও তার স্বামী তার সাথে সহবাস করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একবার তো (আরবি) শব্দ রয়েছে; এর ভাবার্থ হচ্ছে হায়েযের রক্ত বন্ধ হওয়া এবং তাত্বাহহারনা' শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে গোসল করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিববান (রঃ) হযরত শায়েস বিন সা'দ (রঃ) প্রভৃতি মহান ব্যক্তিও এটাই বলেন।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঐ জায়গা দিয়ে এসো, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যার নির্দেশ দিচ্ছেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে সম্মুখের স্থান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি অনেক মুফাসসিরও এই অর্থই বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে শিশুদের জন্মগ্রহণের জায়গা। এছাড়া অন্য স্থান অর্থাৎ পায়খানার স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ। এই রকম কাজ যারা করে তারা সীমা অতিক্রমকারী। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রঃ) হতে এর ভাবার্থ এরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ ‘হায়েযের অবস্থায় যে স্থান হতে তোমাদেরকে বিরত রাখা হয়েছিল এখন ঐ স্থান তোমাদের জন্যে হালাল হয়ে গেল। এর দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝা গেল যে, পায়খানার জায়গায় সহবাস করা হারাম। এর বিস্তারিত বর্ণনাও ইনশাআল্লাহ আসছে। পবিত্রতার অবস্থায় এসে যখন সে হায়েয হতে বেরিয়ে আসে’এ অর্থও নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এর পরবর্তী বাক্যে পাপ কার্য হতে প্রত্যাবর্তনকারী ও হায়েযের অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হতে দূরে অবস্থানকারীকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। অনুরূপভাবে (প্রস্রাবের স্থান ছাড়া) অন্য স্থান হতে যারা বিরত থাকে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেও অলবাসেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমাদের স্ত্রীগুলো তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ। অর্থাৎ সন্তান বের হওয়ার স্থানে তোমরা যেভাবেই চাও তোমাদের ক্ষেত্রে এসো। নিয়ম ও পদ্ধতি পখক হলেও স্থান একই। অর্থাৎ সম্মুখে করে অথবা তার বিপরীত। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে : ইয়াহূদীরা বলতো যে, স্ত্রীর সঙ্গে সম্মুখের দিক দিয়ে সহবাস না করে যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে যায় তবে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট সন্তান জন্মলাভ করবে। তাদের এ কথার খগুনে এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, স্বামীর এই ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, ইয়াহুদীরা এই কথাটিই মুসলমানদেরকেও বলেছিল। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, সম্মুখের দিক দিয়ে আসতে পারে এবং পিছনের দিক দিয়েও আসতে পারে। কিন্তু স্থান একটিই হবে।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেঃ “আমরা আমাদের স্ত্রীদের নিকট কিরূপে আসবো এবং কিরূপে ছাড়বো:” তিনি উত্তরে বলেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ, যেভাবেই চাও এসো। হাঁ, তবে তাদের মুখের উপরে মেরো না, তাদেরকে খুব মন্দ বলো না, ক্রোধ বশতঃ তাদের হতে পৃথক হয়ে যেয়ো না। একই ঘরে অবস্থান কর (আহমাদ ও সুনান)।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীমের মধ্যে রয়েছে যে, হামীর গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, আমার স্ত্রীদের সাথে আমার খুব ভালবাসা রয়েছে। সুতরাং তাদের সম্বন্ধে যে নির্দেশাবলী রয়েছে তা আমাকে বলে দিন।'তখন এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, কয়েকজন আনসারী সাহাবী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহাবীর (রঃ) মুশকিলুল হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে উল্টোভাবে সহবাস করেছিল। এতে মানুষ তার সমালোচনা করলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।‘তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন সাবেতাহ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকরের (রাঃ) কন্যা হযরত হাফসার (রাঃ) নিকটে এসে বলেন, আমি একটি জিজ্ঞাস্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতে চাই, কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেন, হে ভ্রাতুস্পুত্র! লজ্জা করো, যা জিজ্ঞেস করতে চাও জিজ্ঞেস কর।' তিনি বলেন, আচ্ছা বলুন তো, স্ত্রীদের সাথে পিছনের দিক দিয়ে সহবাস করা বৈধ কি:' তিনি বলেন, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আনসারগণ (রাঃ) স্ত্রীদেরকে উল্টো করে শোয়ায়ে দিতেন এবং ইয়াহূদীরা বলতো যে, এভাবে সহবাস করলে সত্তন টেরা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন মুহাজিরগণ (রাঃ) মদীনায় আগমন করেন এবং এখানকার স্ত্রী লোকদের সাথে তাদের বিয়ে হয়, তখন তারাও এরূপ করতে চাইলে একজন স্ত্রীলোক তার স্বামীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতঃ বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত আপনার কথা মানতে পারি না। সুতরাং তিনি নবীর (সঃ) দরবারে উপস্থিত হন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে বসিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখনই এসে যাবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করলে ঐ আনসারিয়া স্ত্রী লোকটি তো লজ্জায় জিজ্ঞেস করতে না পেরে ফিরে যান। কিন্তু হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘আনসারিয়া স্ত্রী লোকটিকে ডেকে পাঠাও।' তিনি তাঁকে ডেকে আনলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান এবং বলেন, স্থান একটিই হবে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ব্যাপার কি: হযরত উমার (রাঃ) বলেন, রাত্রে আমি আমার সোয়ারী উল্টো করেছি।' তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সেই সময়ই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তিনি বলেন, 'তুমি সম্মুখের দিক হতে বা পিছনের দিক হতে এসো, তোমার দু'টোরই অধিকার রয়েছে। কিন্তু ঋতুর অবস্থায় এসো না। আনসারীর ঘটনা সম্বলিত হাদীসটি। কিছু বিস্তারিতভাবেও বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে এও রয়েছে যে,হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে আল্লাহ ক্ষমা করুন,তিনি কিছু সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছেন। কথা এই যে, আনসারদের দল প্রথমে মূর্তি পূজক ছিলেন এবং ইয়াহুদীরা আহলে কিতাব ছিল। মূর্তি পূজকেরা কিতাবীদের মর্যাদা ও বিদ্যার কথা স্বীকার করতো। ইয়াহূদীরা একই প্রকারে তাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করতো। আনসারদেরও এই অভ্যাসই ছিল। পক্ষান্তরে মক্কাবাসীরা কোন নির্দিষ্ট নিয়মের অনুসারী ছিল না। তারা যথেচ্ছা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হতো।ইসলাম গ্রহণের পর মক্কাবাসী মুহাজিরগণ (রাঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন মক্কা হতে আগত একজন মুহাজির পুরুষ মদীনার একজন আনসারিয়াহু মহিলাকে বিয়ে করেন এবং মনোমত পন্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। মহিলাটি অস্বীকার করে বসেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, ‘আমি ঐ একই নিয়ম ছাড়া অনুমতি দেবো না। কথা বাড়তে বাড়তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সামনে বা পিছনে যেভাবে ইচ্ছা সহবাসের অধিকার রয়েছে, তবে স্থান একটিই হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, 'আমি হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) নিকট কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেছি। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তাকে শুনিয়েছি। এক একটি আয়াতের তাফসীর ও ভাবার্থ তাকে জিজ্ঞেস করেছি। এই আয়াতে পৌছে যখন আমি তাঁকে এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করি তখন তিনি এটাই বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) সন্দেহ ছিল এই যে, কতকগুলো বর্ণনায় রয়েছেঃ তিনি কুরআন মাজীদ পাঠের সময় কাউকেও বলতেন না। কিন্তু একদিন পাঠের সময় যখন এই আয়াতে পৌছেন তখন তিনি হযরত নাফে' (রঃ) নামক তাঁর একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন, এই আয়াতটি কি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা তুমি জান কি:' তিনি বলেন, ‘না’। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এটা স্ত্রী লোকদের অন্য জায়গায় সহবাস সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি (ইবনে উমার রাঃ) বলেন, একটি লোকে তার স্ত্রীর সাথে পিছন দিক দিয়ে সহবাস করেছিল। ফলে এই আয়াতটি ঐ কাজের অনুমতি প্রদান হিসেবে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু প্রথমতঃ হাদীস শাস্ত্রবিদগণ এতে কিছুটা ক্রটি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়তঃ এর অর্থও এই হতে পারে যে, পিছনের দিক দিয়ে সম্মুখের স্থানে করেছিলেন এবং উপরের বর্ণনাগুলোও সনদ হিসেবে সহীহ নয়। বরং ঐ হযরত নাফে' (রঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে,তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি একথা বলেন যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) গুহ্যদ্বারে সহবাস জায়েয বলেছেন:' তিনি বলেন, 'মানুষ মিথ্যা বলে থাকে। অতঃপর তিনি ঐ আনসারিয়াহ মহিলা ও মুহাজির পুরুষটির ঘটনাটাই বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তো এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করতেন। এই বর্ণনার ইসনাদও সম্পূর্ণরূপেই সঠিক এবং এর বিপরীত সনদ সঠিক নয়। ভাবার্থও অন্যরূপ হতে পারে। স্বয়ং হযরত ইবনে উমার (রাঃ)। হতেও এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে। ঐ বর্ণনাগুলো ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই। বর্ণিত হচ্ছে। ওগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'না এটা মুবাহ্, না হালাল, বরং হারাম। যদিও বৈধতার উক্তির সম্বন্ধ মদীনার কোন কোন ফকীহ প্রভৃতি মনীষীর দিকে লাগানো হয়েছে এবং কেউ কেউ তো ইমাম মালিকের (রঃ) দিকেও সম্বন্ধ লাগিয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক এটা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা কখনও ইমাম মালিকের (রঃ) কথা নয়। বহু সহীহ হাদীস দ্বারা এ কাজের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘হে জনমণ্ডলী! তোমরা লজ্জাবোধ কর। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীদের গুহ্যদ্বারে সহবাস করো না’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কার্য হতে মানুষকে নিষেধ করেছেন (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আরও একটি বর্ণনায় রয়েছে, “যে ব্যক্তি কোন স্ত্রী বা পুরুষের সঙ্গে একাজ করে, তার দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না। (জামেউত্ তিরমিযী) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'তুমি কি কুফরী করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলেন, (আরবি)-এর এই অর্থ বুঝেছি এবং এর উপর আমল করেছি। তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন, তাকে ভৎর্সনা করেন এবং বলেন, 'ভাবার্থ এই যে, দাড়িয়ে কর অথবা পেটের ভরে শোয়া। অবস্থায় কর, কিন্তু জায়গা একটিই হবে। অন্য এইটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে সে ছোট ‘লুতী (হযরত লুত আঃ -এর সম্প্রদায়ভুক্ত)-মুসনাদ-ই-আহমাদ। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বলেন যে, এটা কাফিরদের কাজ। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল-আস (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে এবং অধিকতর এটাই সঠিক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সাত প্রকার লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। এবং তাদেরকে বলে দেবেনঃ ‘দোযখীদের সাথে দোযখে চলে যাও।' (১) ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী (২) হস্ত মৈথুনকারী (৩) চতুষ্পদ জন্তুর সাথে এই কার্যকারী (৪) স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাসকারী (৫) স্ত্রী ও তার মেয়েকে বিয়েকারী। (৬) প্রতিবেশির স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারী এবং (৭) প্রতিবেশীকে এমনভাবে শাসন গর্জনকারী যে, শেষ পর্যন্ত সে তাকে অভিশাপ দেয়। কিন্তু এর সনদের মধ্যে লাহীআহ এবং তার শিক্ষক দু’জনই দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অন্য পথে সহবাস করে তাকে আল্লাহ দয়ার দৃষ্টিতে দেখেন না। মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সনানের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে অথবা অন্য পথে সহবাস করে কিংবা যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তাকে সত্যবাদী মনে করে সে ঐ জিনিসকে অস্বীকার করলো যা মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, ইমাম বুখারী (রঃ) এই হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে বর্ণিত আছে যে, গুহ্যদ্বারে সহবাস করাকে হযরত আবু সালমাও (রাঃ) হারাম বলতেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘লোকদের স্ত্রীদের সাথে এই কাজ করা কুফরী (সুনান-ই-নাসাঈ)। এই অর্থের একটি মারফু হাদীসও বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসটির মাওকুফ হওয়াই অধিকরত সঠিক কথা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এই স্থানটি হারাম। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘সেই ব্যক্তি অত্যন্ত বর্বর। তুমি আল্লাহর কালাম শুননি: কুরআন পাকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যখন লুতের (আঃ) কওমকে বলা হলো-তোমরা কি এমন নির্লজ্জতার কাজ করছে যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বে কেউ কোনদিন করেনি: সুতরাং বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ হতে এবং সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতে বহু বর্ণনা ও সনদ দ্বারা এই কার্যের নিষিদ্ধতা বর্ণিত আছে। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন উমারও (রাঃ) এই কাজকে অবৈধই বলেছেন। যেহেতু দারেমী’র মধ্যে রয়েছে যে, একবার তিনি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছিলেনঃ মুসলমানও এই কাজ করতে পারে: এর ইসনাদ সঠিক এবং এর দ্বারা এই কার্যের অবৈধতাও পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং অশুদ্ধ ও বিভিন্ন অর্থ বিশিষ্ট বর্ণনাগুলোর পিছনে পড়ে এরূপ একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীর (রাঃ) দিকে এরূপ জঘন্য মাসআলার সম্বন্ধ লাগানো মোটেই ঠিক নয়। এই প্রকারের বর্ণনাগুলো পাওয়া গেলেও ঐগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। এখন রইলেন ইমাম মালিক (রঃ)। তাঁর দিকেও এই কার্যের বৈধতার সম্বন্ধ লাগানো উচিত হবে না। হযরত মুআম্মার বিন ঈসা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এই কার্যকে হারাম বলতেন। ইসরাঈল বিন রাওহ্ (রঃ) একদা তাঁকে এই প্রশ্নই করলে তিনি বলেন, তুমি কি নির্বোধ: বীজ বপন তো ক্ষেত্রেই করতে হয়। সাবধান! লজ্জা স্থান ছাড়া অন্য জায়গা হতে বেঁচে থাকবে। প্রশ্নকারী বলেন, ‘জনাব! জনগণ তো একথাই বলে থাকে যে, আপনি এই কাজকে বৈধ বলেন। তখন তিনি বলেন, তারা মিথ্যাবাদী। আমার উপর তারা অপবাদ দিচ্ছে।' সুতরাং ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর অবৈধতা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাদের সমস্ত ছাত্র ও সহচর যেমন সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আবু সালমা (রঃ) ইকরামা (র), তাউস (রঃ), আতা (রঃ) সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ সবাই এই কাজকে অবৈধ বলেছেন এবং এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কার্যকে কুফরী পর্যন্ত বলেছেন। এর অবৈধতায় জমহুর উলামারও ইজমা রয়েছে। যদিও কতকগুলো লোক মদীনার ফকীহগণ হতে এমন কি ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর বৈধতা নকল করেছেন কিন্তু এগুলো সঠিক নয়।আবদুর রহমান বিন কাসিম (রঃ) বলেন, কোন ধর্মভীরু লোককে আমি এর অবৈধতা সম্বন্ধে সন্দেহ করতে দেখিনি। অতঃপর তিনি (আরবি) পাঠ করে বলেন, স্বয়ং (আরবি) অর্থাৎ ক্ষেত্র শব্দটিই এর অবৈধতা প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট। কেননা, অন্য জায়গা ক্ষেত্র নয়। ক্ষেত্রে যাবার পদ্ধতির স্বাধীনতা রয়েছে। বটে কিন্তু ক্ষেত্র পরিবর্তনের স্বাধীনতা নেই। ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটা বৈধ হওয়ার বর্ণনাসমূহ নকল করা হলেও সেগুলোর ইসনাদের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বলতা রয়েছে। অনুরূপভাবে ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতেও লোকেরা একটি বর্ণনা বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তিনি তার ছয়খানা গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় এটাকে হারাম লিখেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-নিজেদের জন্যে তোমরা অর্থেই কিছু পাঠিয়ে দাও। অর্থাৎ নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাক এবং সত্যার্যাবলী সম্পাদন কর, যেন পুণ্য অগ্রে চলে যায়। আল্লাহকে ভয় কর এবং বিশ্বাস রেখো যে, তার সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হবে ও তিনি পুঙ্খানুপুঙখরূপে তোমাদের হিসাব নেবেন। ঈমানদারগণ সদা আনন্দিত থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ভাবার্থ এও হতে পারে যে, সহবাসের ইচ্ছে করলে নিম্নের দুআটি পাঠ করবে। (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে শয়তান হতে রক্ষা করুন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি এই সহবাস দ্বারা শুক্র ধরে যায় তবে শয়তান ঐ সন্তানের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।'