Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:223 – আল-বাকারা 2:267

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-বাকারা 2:223
  2. আল-বাকারা 2:224
  3. আল-বাকারা 2:225
  4. আল-বাকারা 2:226
  5. আল-বাকারা 2:227
  6. আল-বাকারা 2:228
  7. আল-বাকারা 2:229
  8. আল-বাকারা 2:230
  9. আল-বাকারা 2:231
  10. আল-বাকারা 2:232
  11. আল-বাকারা 2:233
  12. আল-বাকারা 2:234
  13. আল-বাকারা 2:235
  14. আল-বাকারা 2:236
  15. আল-বাকারা 2:237
  16. আল-বাকারা 2:238
  17. আল-বাকারা 2:239
  18. আল-বাকারা 2:240
  19. আল-বাকারা 2:241
  20. আল-বাকারা 2:242
  21. আল-বাকারা 2:243
  22. আল-বাকারা 2:244
  23. আল-বাকারা 2:245
  24. আল-বাকারা 2:246
  25. আল-বাকারা 2:247
  26. আল-বাকারা 2:248
  27. আল-বাকারা 2:249
  28. আল-বাকারা 2:250
  29. আল-বাকারা 2:251
  30. আল-বাকারা 2:252
  31. আল-বাকারা 2:253
  32. আল-বাকারা 2:254
  33. আল-বাকারা 2:255
  34. আল-বাকারা 2:256
  35. আল-বাকারা 2:257
  36. আল-বাকারা 2:258
  37. আল-বাকারা 2:259
  38. আল-বাকারা 2:260
  39. আল-বাকারা 2:261
  40. আল-বাকারা 2:262
  41. আল-বাকারা 2:263
  42. আল-বাকারা 2:264
  43. আল-বাকারা 2:265
  44. আল-বাকারা 2:266
  45. আল-বাকারা 2:267

আল-বাকারা 2:223

২২২-২২৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহূদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীলোকদেরকে তাদের সাথে খেতেও দিতো না এবং তাদের পার্শ্বে রাখতো না। সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তারই উত্তরে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, সহবাস ছাড়া অন্যান্য সবকিছু বৈধ। একথা শুনে ইয়াহুদীরা বলেঃ “আমাদের বিরুদ্ধাচরণই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য।” হযরত উসায়েদ বিন হুযায়ের (রাঃ) এবং হযরত ইবাদ বিন বাশার (রাঃ) ইয়াহুদীদের এই কথা নকল করে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে তাহলে সহবাস করারও অনুমতি দিন।' এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডল (এর-রং) পরিবর্তিত হয়। অন্যান্য সাহাবীগণ (রাঃ) ধারণা করেন যে, তিনি তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন। অতঃপর এই মহান ব্যক্তিদ্বয় যেতে থাকলে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট কোন এক ব্যক্তি উপঢৌকন স্বরূপ কিছু দুধ নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে লোক। পাঠিয়ে তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং ঐ দুধ তাদেরকে পান করান। তখন জানা যায় যে ঐ ক্রোধ প্রশমিত হয়েছে (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীদের হতে পৃথক থাকো’-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সহবাস করো না। কারণ, এ ছাড়া অন্যান্য সবকিছুই বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মাযহাব এই যে, সহবাস বৈধ নয় বটে, কিন্তু প্রেমালাপ করা বৈধ। হাদীসসমূহেও রয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও সহধর্মিণীদের সাথে মেলামেশা করতেন, কিন্তু তারা গুপ্ত স্থান কাপড়ে বেঁধে রাখতেন (সুনান-ই-আবু দাউদ)।হযরত আম্মারার ফুফু (রাঃ) হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, যদি স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকে এবং স্বামী-স্ত্রীর একই বিছানা হয় তবে তারা কি করবে:' অর্থাৎ এই অবস্থায় তার স্বামী তার পাশে শুতে পারে কি-না:' হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি তোমাকে সংবাদ দিচ্ছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং করেছেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়িতে এসেই তার নামাযের জায়গায় চলে যান এবং নামাযে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। ইতিমধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। তিনি শীত অনুভব করে আমাকে বলেনঃ এখানে এসো। আমি বলি : আমি ঋতুবতী।' তিনি আমাকে আমার জানুর উপর হতে কাপড় সরাতে বলেন। অতঃপর তিনি আমার উরু ও গণ্ড দেশের উপর বক্ষ রেখে শুয়ে পড়েন। আমিও তার উপর ঝুঁকে পড়ি। ফলে ঠাপ কিছু প্রশমিত হয় এবং সেই গরমে তিনি ঘুমিয়ে যান।'হযরত মাসরূক (রঃ) একদা হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ নবী (সঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘মারহাবা, মারহাবা! অতঃপর তাঁকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেনঃ আমি আপনাকে একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছি কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেনঃ “আমি তোমার মা এবং তুমি আমার ছেলে (সুতরাং যা জিজ্ঞেস করতে চাও কর)।' তিনি বলেনঃ (আচ্ছা বলুন তো) ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে তার স্বামীর কি করা কর্তব্য:' তিনি বলেন ‘লজ্জা স্থান ছাড়া সবই জায়েয (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।' অন্য সনদেও বিভিন্ন শব্দে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুজাহিদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং ইকরামা (রঃ)-এর ফতওয়া এটাই। ভাবার্থ এই যে, ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে উঠা-বসা, খাওয়া ও পান করা ইত্যাদি সবই সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয।। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,তিনি বলেনঃ “আমি ঋতুর অবস্থায় নবী (সঃ)-এর মস্তক ধৌত করতাম, তিনি আমার ক্রোড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে কুরআন মাজীদ পাঠ করতেন। আমি হাড় চুষতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে তাঁকে গ্লাস দিতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে ঐ গ্লাস হতেই ঐ পানিই পান করতেন। সেই সময় আমি ঋতুবতী থাকতাম। সুনান-ই- আবু দাউদের মধ্যে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমার ঋতুর অবস্থায় আমি ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) একই বিছানায় শয়ন করতাম। তাঁর কাপড়ের কোন জায়গা খারাপ হয়ে গেলে তিনি শুধু ঐটুকু জায়গাই ধুয়ে ফেলতেন, শরীরের কোন জায়গায় কিছু লেগে গেলে ঐ জায়গাটুকুও ধুয়ে ফেলতেন এবং ঐ কাপড়েই নামায পড়তেন। তবে সুনানে আবূ দাউদের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি ঋতুর অবস্থায় বিছানা হতে নেমে গিয়ে মাদুরের উপরে চলে আসতাম। আমি পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসতেন না। তাহলে এই বর্ণনাটির ভাবার্থ এই যে, তিনি সতর্কতামূলকভাবে এর থেকে বেঁচে থাকতেন, নিষিদ্ধতার জন্যে নয়।কোন কোন মনীষী এ কথাও বলেন যে, কাপড় বাঁধানো অবস্থায় উপকার গ্রহণ করেছেন। হযরত হারিস হেলালিয়াহর (রাঃ) কন্যা মায়মুনা (রাঃ) বলেনঃ ‘নবী (সঃ) যখন তাঁর কোন সহধর্মিণীর সাথে মিলনের ইচ্ছে করতেন তখন তিনি তাকে কাপড় বেঁধে দেয়ার নির্দেশ দিতেন (সহীহ বুখারী)। এই রকমই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার স্ত্রীর ঋতুর অবস্থায় তার সাথে আমার কোন কিছু বৈধ আছে কি:' তিনি বলেন কাপড়ের উপরের সব কিছুই বৈধ (সুনান-ই-আবু দাউদ ইত্যাদি)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হতে বেঁচে থাকাও উত্তম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রাঃ) এবং হযরত শুরাইহের (রাঃ) মাযহাবও এটাই। এই ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রাঃ) দু'টি উক্তি রয়েছে, তন্মধ্যে এটাও একটি। অধিকাংশ ইরাকী প্রভৃতি মনীষীরও এটাই মাযহাব। তাঁরা বলেন যে, সহবাস যে হারাম এটাতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কাজেই এর আশপাশ হতেও বেঁচে থাকা উচিত যাতে হারামের মধ্যে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। ঋতুর অবস্থায় সহবাসের নিষিদ্ধতা এবং যে ব্যক্তি। এই কার্যে পতিত হবে তার পাপী হওয়া, এটা তো নিশ্চিত কথা। তাকে অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু তাকে কাফ্ফারাও দিতে হবে কি-না এ বিষয়ে আলেমদের দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, তাকে কাফফারাও দিতে হবে। মুসনাদ-ইআহমাদ ও সুনানের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে সে যেন একটি স্বর্ণ মুদ্রা বা অর্ধ স্বর্ণ মুদ্রা দান করে।' জামেউত্ তিরমিযী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত লাল হয় তবে একটা স্বর্ণ মুদ্রা আর যদি রক্ত হলদে বর্ণের হয় তবে অর্ধস্বর্ণ মুদ্রা। মুসনাদ-ই-আহমদের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত শেষ হয়ে গিয়ে থাকে এবং এখন পর্যন্ত স্ত্রী গোসল না করে থাকে, এই অবস্থায় যদি স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় তবে অর্ধ দীনার, নচেৎ এক দীনার। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, কাফফারা কিছুই নেই। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেই চলবে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ কথাই বলেন। অধিকতর সঠিক মাযহাবও এটাই এবং জমহুর ওলামাও এই মতই পোষণ করেন। যে হাদীসগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে সেই সম্পর্কে এঁদের কথা এ যে, এগুলোর মারফ হওয়া সঠিক কথা নয়, রবং সঠিক কথা এ যে, এলো। মাওকুফ হাদীস বর্ণনা হিসেবে এগুলো মারফু ও মাওকুফ উভয় রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ হাদীসশাস্ত্রবিদের মতে সঠিক কথা এই যে, এগুলো মাওকুফ হাদীস। তাদের নিকটে যেও না' এটা তাফসীর হচ্ছে এ নির্দেশের যে, ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীগণ হতে তোমরা পৃথক থাকবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ঋতু শেষ হয়ে গেলে তাদের নিকট যাওয়া বৈধ।হযরত ইমাম আবু আবদিল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেনঃ পবিত্রতা বলে দিচ্ছে যে, এখন তার নিকটে যাওয়া জায়েয। হযরত মায়মুনা (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমাদের মধ্যে যখন কেউ ঋতুবতী হতেন তখন তিনি কাপড় বেঁধে দিতেন এবং নবী (সঃ)-এর সাথে তার চাদরে শুয়ে যেতেন। এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, নিকটে যাওয়া হতে নিষেধ করার অর্থ সহবাস হতে নিষেধ করা। এ ছাড়া তার সাথে শয়ন, উপবেশন ইত্যাদি সবই বৈধ।এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তারা যখন পবিত্র হয়ে যাবে তখন তাদের সাথে সহবাস কর। ইমাম ইবনে হাযাম (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক হায়েযের পবিত্রতার উপর সহবাস করা ওয়াজিব। তার দলীল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ তাদের নিকটে এসো' এই শব্দটি। কিন্তু এটা কোন শক্ত দলীল নয়। এটা শুধু অবৈধতা সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা। এছাড়া অন্য কোন দলীল তার কাছে নেই। উসুল’ শাস্ত্রের আলেমগণের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, আমর’ অর্থাৎ নির্দেশ সাধারণভাবে অবশ্যকরণীয়রূপে এসে থাকে। তাদের পক্ষে ইমমি ইবনে হাযামের কথার উত্তর দেয়া খুব কঠিন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এই নির্দেশ শুধু অনুমতির জন্য। এর পূর্বে নিষিদ্ধতার কথা এসেছে বলে এটা এরই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এখানে আমর’ অবশ্য করণীয়ের জন্যে নয়। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। দলীল দ্বারা যা সাব্যস্ত হয়েছে তা এই যে, এরূপ স্থলে অর্থাৎ পূর্বে নিষিদ্ধ এবং পরে নির্দেশ, এ অবস্থায় নির্দেশ স্বীয় মূলের উপরেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ যা নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যেমন ছিল এখন তেমনই হয়ে যাবে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যদি কাজটি ওয়াজিব থেকে থাকে তবে এখনও ওয়াজিবই থাকবে। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর।' (৯:৫) আর যদি নিষিদ্ধতার পূর্বে তা বৈধ থেকে থাকে তবে তা বৈধই থাকবে। যেমন কুরআন পাকের (আরবি) অর্থাৎ যখন তোমরা ইহরাম খুলে দেবে তখন তোমরা শিকার কর।' (৫২) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন নামায পুরো করা হয়ে যাবে তখন তোমরা পৃথিবীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়।' (৬২:১০) ঐ আলেমদের এই সিদ্ধান্ত ঐ বিভিন্ন উক্তিগুলোকে একত্রিত করে দেয় যা ‘আমরে’র অবশ্যকরণীয় ইত্যাদি সম্বন্ধে রয়েছে। ইমাম গাযযালী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীও এটা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী কতকগুলো ইমাম এটাও পছন্দ করেছেন। এটাই সঠিকও বটে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টিও স্মরণীয় যে, যখন হায়েযের রক্ত আসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাবে, ওর পরেও স্ত্রীর সাথে স্বামীর সহবাস হালাল হবে না যে পর্যন্ত না সে গোসল করবে। হাঁ, তবে যদি তার কোন ওজর থাকে এবং গোসলের পরিবর্তে যদি তার জন্যে তায়াম্মুম করা যায়েয হয় তবে তায়াম্মুমের পর তার কাছে স্বামী আসতে পারে। এতে সমস্ত আলেমের মতৈক্য রয়েছে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এ সমস্ত আলেমের বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, যদি হায়েয় শেষ সময়কাল অর্থাৎ দশ দিন পর্যন্ত থেকে বন্ধ হয়ে যায় তবে সে গোসল না করলেও তার স্বামী তার সাথে সহবাস করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একবার তো (আরবি) শব্দ রয়েছে; এর ভাবার্থ হচ্ছে হায়েযের রক্ত বন্ধ হওয়া এবং তাত্বাহহারনা' শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে গোসল করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিববান (রঃ) হযরত শায়েস বিন সা'দ (রঃ) প্রভৃতি মহান ব্যক্তিও এটাই বলেন।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঐ জায়গা দিয়ে এসো, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যার নির্দেশ দিচ্ছেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে সম্মুখের স্থান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি অনেক মুফাসসিরও এই অর্থই বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে শিশুদের জন্মগ্রহণের জায়গা। এছাড়া অন্য স্থান অর্থাৎ পায়খানার স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ। এই রকম কাজ যারা করে তারা সীমা অতিক্রমকারী। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রঃ) হতে এর ভাবার্থ এরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ ‘হায়েযের অবস্থায় যে স্থান হতে তোমাদেরকে বিরত রাখা হয়েছিল এখন ঐ স্থান তোমাদের জন্যে হালাল হয়ে গেল। এর দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝা গেল যে, পায়খানার জায়গায় সহবাস করা হারাম। এর বিস্তারিত বর্ণনাও ইনশাআল্লাহ আসছে। পবিত্রতার অবস্থায় এসে যখন সে হায়েয হতে বেরিয়ে আসে’এ অর্থও নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এর পরবর্তী বাক্যে পাপ কার্য হতে প্রত্যাবর্তনকারী ও হায়েযের অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হতে দূরে অবস্থানকারীকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। অনুরূপভাবে (প্রস্রাবের স্থান ছাড়া) অন্য স্থান হতে যারা বিরত থাকে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেও অলবাসেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমাদের স্ত্রীগুলো তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ। অর্থাৎ সন্তান বের হওয়ার স্থানে তোমরা যেভাবেই চাও তোমাদের ক্ষেত্রে এসো। নিয়ম ও পদ্ধতি পখক হলেও স্থান একই। অর্থাৎ সম্মুখে করে অথবা তার বিপরীত। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে : ইয়াহূদীরা বলতো যে, স্ত্রীর সঙ্গে সম্মুখের দিক দিয়ে সহবাস না করে যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে যায় তবে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট সন্তান জন্মলাভ করবে। তাদের এ কথার খগুনে এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, স্বামীর এই ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, ইয়াহুদীরা এই কথাটিই মুসলমানদেরকেও বলেছিল। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, সম্মুখের দিক দিয়ে আসতে পারে এবং পিছনের দিক দিয়েও আসতে পারে। কিন্তু স্থান একটিই হবে।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেঃ “আমরা আমাদের স্ত্রীদের নিকট কিরূপে আসবো এবং কিরূপে ছাড়বো:” তিনি উত্তরে বলেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ, যেভাবেই চাও এসো। হাঁ, তবে তাদের মুখের উপরে মেরো না, তাদেরকে খুব মন্দ বলো না, ক্রোধ বশতঃ তাদের হতে পৃথক হয়ে যেয়ো না। একই ঘরে অবস্থান কর (আহমাদ ও সুনান)।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীমের মধ্যে রয়েছে যে, হামীর গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, আমার স্ত্রীদের সাথে আমার খুব ভালবাসা রয়েছে। সুতরাং তাদের সম্বন্ধে যে নির্দেশাবলী রয়েছে তা আমাকে বলে দিন।'তখন এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, কয়েকজন আনসারী সাহাবী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহাবীর (রঃ) মুশকিলুল হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে উল্টোভাবে সহবাস করেছিল। এতে মানুষ তার সমালোচনা করলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।‘তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন সাবেতাহ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকরের (রাঃ) কন্যা হযরত হাফসার (রাঃ) নিকটে এসে বলেন, আমি একটি জিজ্ঞাস্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতে চাই, কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেন, হে ভ্রাতুস্পুত্র! লজ্জা করো, যা জিজ্ঞেস করতে চাও জিজ্ঞেস কর।' তিনি বলেন, আচ্ছা বলুন তো, স্ত্রীদের সাথে পিছনের দিক দিয়ে সহবাস করা বৈধ কি:' তিনি বলেন, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আনসারগণ (রাঃ) স্ত্রীদেরকে উল্টো করে শোয়ায়ে দিতেন এবং ইয়াহূদীরা বলতো যে, এভাবে সহবাস করলে সত্তন টেরা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন মুহাজিরগণ (রাঃ) মদীনায় আগমন করেন এবং এখানকার স্ত্রী লোকদের সাথে তাদের বিয়ে হয়, তখন তারাও এরূপ করতে চাইলে একজন স্ত্রীলোক তার স্বামীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতঃ বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত আপনার কথা মানতে পারি না। সুতরাং তিনি নবীর (সঃ) দরবারে উপস্থিত হন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে বসিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখনই এসে যাবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করলে ঐ আনসারিয়া স্ত্রী লোকটি তো লজ্জায় জিজ্ঞেস করতে না পেরে ফিরে যান। কিন্তু হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘আনসারিয়া স্ত্রী লোকটিকে ডেকে পাঠাও।' তিনি তাঁকে ডেকে আনলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান এবং বলেন, স্থান একটিই হবে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ব্যাপার কি: হযরত উমার (রাঃ) বলেন, রাত্রে আমি আমার সোয়ারী উল্টো করেছি।' তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সেই সময়ই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তিনি বলেন, 'তুমি সম্মুখের দিক হতে বা পিছনের দিক হতে এসো, তোমার দু'টোরই অধিকার রয়েছে। কিন্তু ঋতুর অবস্থায় এসো না। আনসারীর ঘটনা সম্বলিত হাদীসটি। কিছু বিস্তারিতভাবেও বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে এও রয়েছে যে,হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে আল্লাহ ক্ষমা করুন,তিনি কিছু সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছেন। কথা এই যে, আনসারদের দল প্রথমে মূর্তি পূজক ছিলেন এবং ইয়াহুদীরা আহলে কিতাব ছিল। মূর্তি পূজকেরা কিতাবীদের মর্যাদা ও বিদ্যার কথা স্বীকার করতো। ইয়াহূদীরা একই প্রকারে তাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করতো। আনসারদেরও এই অভ্যাসই ছিল। পক্ষান্তরে মক্কাবাসীরা কোন নির্দিষ্ট নিয়মের অনুসারী ছিল না। তারা যথেচ্ছা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হতো।ইসলাম গ্রহণের পর মক্কাবাসী মুহাজিরগণ (রাঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন মক্কা হতে আগত একজন মুহাজির পুরুষ মদীনার একজন আনসারিয়াহু মহিলাকে বিয়ে করেন এবং মনোমত পন্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। মহিলাটি অস্বীকার করে বসেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, ‘আমি ঐ একই নিয়ম ছাড়া অনুমতি দেবো না। কথা বাড়তে বাড়তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সামনে বা পিছনে যেভাবে ইচ্ছা সহবাসের অধিকার রয়েছে, তবে স্থান একটিই হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, 'আমি হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) নিকট কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেছি। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তাকে শুনিয়েছি। এক একটি আয়াতের তাফসীর ও ভাবার্থ তাকে জিজ্ঞেস করেছি। এই আয়াতে পৌছে যখন আমি তাঁকে এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করি তখন তিনি এটাই বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) সন্দেহ ছিল এই যে, কতকগুলো বর্ণনায় রয়েছেঃ তিনি কুরআন মাজীদ পাঠের সময় কাউকেও বলতেন না। কিন্তু একদিন পাঠের সময় যখন এই আয়াতে পৌছেন তখন তিনি হযরত নাফে' (রঃ) নামক তাঁর একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন, এই আয়াতটি কি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা তুমি জান কি:' তিনি বলেন, ‘না’। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এটা স্ত্রী লোকদের অন্য জায়গায় সহবাস সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি (ইবনে উমার রাঃ) বলেন, একটি লোকে তার স্ত্রীর সাথে পিছন দিক দিয়ে সহবাস করেছিল। ফলে এই আয়াতটি ঐ কাজের অনুমতি প্রদান হিসেবে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু প্রথমতঃ হাদীস শাস্ত্রবিদগণ এতে কিছুটা ক্রটি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়তঃ এর অর্থও এই হতে পারে যে, পিছনের দিক দিয়ে সম্মুখের স্থানে করেছিলেন এবং উপরের বর্ণনাগুলোও সনদ হিসেবে সহীহ নয়। বরং ঐ হযরত নাফে' (রঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে,তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি একথা বলেন যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) গুহ্যদ্বারে সহবাস জায়েয বলেছেন:' তিনি বলেন, 'মানুষ মিথ্যা বলে থাকে। অতঃপর তিনি ঐ আনসারিয়াহ মহিলা ও মুহাজির পুরুষটির ঘটনাটাই বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তো এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করতেন। এই বর্ণনার ইসনাদও সম্পূর্ণরূপেই সঠিক এবং এর বিপরীত সনদ সঠিক নয়। ভাবার্থও অন্যরূপ হতে পারে। স্বয়ং হযরত ইবনে উমার (রাঃ)। হতেও এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে। ঐ বর্ণনাগুলো ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই। বর্ণিত হচ্ছে। ওগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'না এটা মুবাহ্, না হালাল, বরং হারাম। যদিও বৈধতার উক্তির সম্বন্ধ মদীনার কোন কোন ফকীহ প্রভৃতি মনীষীর দিকে লাগানো হয়েছে এবং কেউ কেউ তো ইমাম মালিকের (রঃ) দিকেও সম্বন্ধ লাগিয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক এটা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা কখনও ইমাম মালিকের (রঃ) কথা নয়। বহু সহীহ হাদীস দ্বারা এ কাজের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘হে জনমণ্ডলী! তোমরা লজ্জাবোধ কর। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীদের গুহ্যদ্বারে সহবাস করো না’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কার্য হতে মানুষকে নিষেধ করেছেন (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আরও একটি বর্ণনায় রয়েছে, “যে ব্যক্তি কোন স্ত্রী বা পুরুষের সঙ্গে একাজ করে, তার দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না। (জামেউত্ তিরমিযী) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'তুমি কি কুফরী করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলেন, (আরবি)-এর এই অর্থ বুঝেছি এবং এর উপর আমল করেছি। তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন, তাকে ভৎর্সনা করেন এবং বলেন, 'ভাবার্থ এই যে, দাড়িয়ে কর অথবা পেটের ভরে শোয়া। অবস্থায় কর, কিন্তু জায়গা একটিই হবে। অন্য এইটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে সে ছোট ‘লুতী (হযরত লুত আঃ -এর সম্প্রদায়ভুক্ত)-মুসনাদ-ই-আহমাদ। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বলেন যে, এটা কাফিরদের কাজ। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল-আস (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে এবং অধিকতর এটাই সঠিক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সাত প্রকার লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। এবং তাদেরকে বলে দেবেনঃ ‘দোযখীদের সাথে দোযখে চলে যাও।' (১) ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী (২) হস্ত মৈথুনকারী (৩) চতুষ্পদ জন্তুর সাথে এই কার্যকারী (৪) স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাসকারী (৫) স্ত্রী ও তার মেয়েকে বিয়েকারী। (৬) প্রতিবেশির স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারী এবং (৭) প্রতিবেশীকে এমনভাবে শাসন গর্জনকারী যে, শেষ পর্যন্ত সে তাকে অভিশাপ দেয়। কিন্তু এর সনদের মধ্যে লাহীআহ এবং তার শিক্ষক দু’জনই দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অন্য পথে সহবাস করে তাকে আল্লাহ দয়ার দৃষ্টিতে দেখেন না। মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সনানের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে অথবা অন্য পথে সহবাস করে কিংবা যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তাকে সত্যবাদী মনে করে সে ঐ জিনিসকে অস্বীকার করলো যা মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, ইমাম বুখারী (রঃ) এই হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে বর্ণিত আছে যে, গুহ্যদ্বারে সহবাস করাকে হযরত আবু সালমাও (রাঃ) হারাম বলতেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘লোকদের স্ত্রীদের সাথে এই কাজ করা কুফরী (সুনান-ই-নাসাঈ)। এই অর্থের একটি মারফু হাদীসও বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসটির মাওকুফ হওয়াই অধিকরত সঠিক কথা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এই স্থানটি হারাম। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘সেই ব্যক্তি অত্যন্ত বর্বর। তুমি আল্লাহর কালাম শুননি: কুরআন পাকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যখন লুতের (আঃ) কওমকে বলা হলো-তোমরা কি এমন নির্লজ্জতার কাজ করছে যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বে কেউ কোনদিন করেনি: সুতরাং বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ হতে এবং সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতে বহু বর্ণনা ও সনদ দ্বারা এই কার্যের নিষিদ্ধতা বর্ণিত আছে। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন উমারও (রাঃ) এই কাজকে অবৈধই বলেছেন। যেহেতু দারেমী’র মধ্যে রয়েছে যে, একবার তিনি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছিলেনঃ মুসলমানও এই কাজ করতে পারে: এর ইসনাদ সঠিক এবং এর দ্বারা এই কার্যের অবৈধতাও পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং অশুদ্ধ ও বিভিন্ন অর্থ বিশিষ্ট বর্ণনাগুলোর পিছনে পড়ে এরূপ একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীর (রাঃ) দিকে এরূপ জঘন্য মাসআলার সম্বন্ধ লাগানো মোটেই ঠিক নয়। এই প্রকারের বর্ণনাগুলো পাওয়া গেলেও ঐগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। এখন রইলেন ইমাম মালিক (রঃ)। তাঁর দিকেও এই কার্যের বৈধতার সম্বন্ধ লাগানো উচিত হবে না। হযরত মুআম্মার বিন ঈসা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এই কার্যকে হারাম বলতেন। ইসরাঈল বিন রাওহ্ (রঃ) একদা তাঁকে এই প্রশ্নই করলে তিনি বলেন, তুমি কি নির্বোধ: বীজ বপন তো ক্ষেত্রেই করতে হয়। সাবধান! লজ্জা স্থান ছাড়া অন্য জায়গা হতে বেঁচে থাকবে। প্রশ্নকারী বলেন, ‘জনাব! জনগণ তো একথাই বলে থাকে যে, আপনি এই কাজকে বৈধ বলেন। তখন তিনি বলেন, তারা মিথ্যাবাদী। আমার উপর তারা অপবাদ দিচ্ছে।' সুতরাং ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর অবৈধতা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাদের সমস্ত ছাত্র ও সহচর যেমন সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আবু সালমা (রঃ) ইকরামা (র), তাউস (রঃ), আতা (রঃ) সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ সবাই এই কাজকে অবৈধ বলেছেন এবং এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কার্যকে কুফরী পর্যন্ত বলেছেন। এর অবৈধতায় জমহুর উলামারও ইজমা রয়েছে। যদিও কতকগুলো লোক মদীনার ফকীহগণ হতে এমন কি ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর বৈধতা নকল করেছেন কিন্তু এগুলো সঠিক নয়।আবদুর রহমান বিন কাসিম (রঃ) বলেন, কোন ধর্মভীরু লোককে আমি এর অবৈধতা সম্বন্ধে সন্দেহ করতে দেখিনি। অতঃপর তিনি (আরবি) পাঠ করে বলেন, স্বয়ং (আরবি) অর্থাৎ ক্ষেত্র শব্দটিই এর অবৈধতা প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট। কেননা, অন্য জায়গা ক্ষেত্র নয়। ক্ষেত্রে যাবার পদ্ধতির স্বাধীনতা রয়েছে। বটে কিন্তু ক্ষেত্র পরিবর্তনের স্বাধীনতা নেই। ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটা বৈধ হওয়ার বর্ণনাসমূহ নকল করা হলেও সেগুলোর ইসনাদের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বলতা রয়েছে। অনুরূপভাবে ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতেও লোকেরা একটি বর্ণনা বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তিনি তার ছয়খানা গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় এটাকে হারাম লিখেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-নিজেদের জন্যে তোমরা অর্থেই কিছু পাঠিয়ে দাও। অর্থাৎ নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাক এবং সত্যার্যাবলী সম্পাদন কর, যেন পুণ্য অগ্রে চলে যায়। আল্লাহকে ভয় কর এবং বিশ্বাস রেখো যে, তার সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হবে ও তিনি পুঙ্খানুপুঙখরূপে তোমাদের হিসাব নেবেন। ঈমানদারগণ সদা আনন্দিত থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ভাবার্থ এও হতে পারে যে, সহবাসের ইচ্ছে করলে নিম্নের দুআটি পাঠ করবে। (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে শয়তান হতে রক্ষা করুন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি এই সহবাস দ্বারা শুক্র ধরে যায় তবে শয়তান ঐ সন্তানের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।'

আল-বাকারা 2:224

২২৪-২২৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা আল্লাহর শপথ করে পুণ্যের কাজ ও আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখা পরিত্যাগ করো না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও স্বচ্ছলতার অধিকারী তারা যেন আত্মীয়দেরকে, দরিদ্রদেরকে এবং আল্লহর পথে হিজরতকারীদেরকে না দেয়ার শপথ না করে, তারা যেন ক্ষমা ও মার্জনা করার অভ্যাস করে, তোমাদের নিজেদের কি এই ইচ্ছে নেই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন: এরূপ শপথ যদি কেউ করে বসে তবে সে যেন কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করে। সহীহ বুখারীর মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা সর্বশেষে আগমনকারী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা সবারই আগে গমনকারী।' তিনি বলেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই রকম শপথ করে বসে এবং কাফফারা আদায় না করে তার উপরেই স্থির থাকে সে বড় পাপী। এই হাদীসটি আরও বহু সনদে অনেক কিতাবে বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস ও (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীর এটাই বলেছেন। হযরত মাসরূক (রঃ) প্রভৃতি বহু তাফসীরকারক হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ঐ জমহুর উলামার এই উক্তির সমর্থন এই হাদীস দ্বারাও পাওয়া যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহর কসম, যদি আমি কোন শপথ করি এবং তা ভেঙ্গে দেয়াতে মঙ্গল বুঝতে পারি তবে আমি অবশ্যই তা ভেঙ্গে দেবো এবং কাফফারা আদায় করবো।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা হযরত আবদুর রহমান বিন সামরাকে (রাঃ) বলেনঃ “হে আবদুর রহমান! সর্দারী, নেতৃত্ব এবং ইমামতির অনুসন্ধান করো না। যদি চেয়েও তোমাকে তা দেয়া হয় তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে সাহায্য করা হবে আর যদি তুমি চেয়ে নাও তবে তোমাকে তার নিকট সমর্পণ করা হবে। যদি তুমি কোন শপথ করে বসো এবং তার বিপক্ষে মঙ্গল দেখতে পাও তবে স্বীয় শপথের কাফফারা আদায় করে ঐ সৎ কাজটি করে নাও' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন ব্যক্তি শপথ করে বসে, অতঃপর ওটা ছাড়া মঙ্গল চোখে পড়ে তবে কাফফারা আদায় করতঃ কসম ভেঙ্গে দিয়ে ঐ সৎ কাজটি তার করা উচিত।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, ওটা ছেড়ে দেয়াই হচ্ছে ওর কাফফারা। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে রয়েছে, ন্যর’ ও কসম ঐ জিনিসে নেই যা মানুষের অধিকারে নেই। আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতার কার্যেও নেই এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার কাজেও নেই। যে ব্যক্তি এমন কার্যে শপথ করে যাতে পুণ্য নেই, তবে সে যেন শপথ ভেঙ্গে দিয়ে পুণ্যের কাজই করে। ঐ শপথকে ছেড়ে দেয়াই হচ্ছে ওর কাফফারা। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বলেনঃ “সমস্ত বিশুদ্ধ হাদীসে এই শব্দ রয়েছে যে, এরূপ শপথের কাফফারা। দেবে।” একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এই শপথকে পুরো করা হচ্ছে এই যে, তা ভেঙ্গে দেবে ও ওটা হতে প্রত্যাবর্তন করবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), মাসরূক (রঃ) এবং শা'বীও (রঃ) এই মতেরই সমর্থক যে, এরূপ লোকের দায়িত্বে কোন কাফফারা নেই। অতঃপর বলা হচ্ছে-অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেসব শপথ তোমাদের মুখ দিয়ে অভ্যাসগতভাবে বেরিয়ে যায়, আল্লাহ সেই জন্যে তোমাদেরকে দোষী করবেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ‘লাত’ ও ‘উযু’র শপথ করে বসে সে যেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ে নেয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ইরশাদ ঐ লোকদের উপর হয়েছিল যারা সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং অজ্ঞতা যুগের শপথসমূহ তাদের মুখের উপরেই ছিল। তাই তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, যদি অভ্যাসগতভাবে কখনও তাদের মুখ দিয়ে এরূপ শিরকের কালেমা বেরিয়েও যায় তবে যেন তারা তৎক্ষণাৎ কালেমা-ই-তাওহীদ পাঠ করে নেয় তাহলে এর বিনিময় হয়ে যাবে। এর পরে বলা হচ্ছে-যদি ঐসব শপথ মনের সংকল্প অনুসারে করা হয় তবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ধরবেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে একটি মারফু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা অন্যান্য বর্ণনায় মাওকুফ রূপে এসেছে, তা এই যে, অর্থহীন শপথ ঐগুলো যেগুলো মানুষ তাদের ঘর-বাড়ী ও সন্তানাদির ব্যাপারে করে থাকে। যেমন হাঁ, আল্লাহর শপথ বা না, আল্লাহর শপথ! মোটকথা, অভ্যাস হিসেবেই মুখ দিয়ে এ কথাগুলো বেরিয়ে যায়, এতে মনের সংকল্প মোটেই থাকে না। হযরত আয়েশা | (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে যে, এগুলো ঐ শপথ যেগুলো হাসতে হাসতে মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এগুলোর জন্যে কাফফারা নেই। হাঁ, তবে যে শপথ মনের সংকল্পের সাথে হয় তার উল্টো করলে কাফফারা আদায় করতে হবে। তিনি ছাড়া আরও অন্যান্য সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈও (রঃ) এই আয়াতের এই তাফসীরই বর্ণনা করেছেন। এও বর্ণিত আছে যে, কেউ যদি কোন কার্যের ব্যাপারে নিজের সঠিকতার উপর ভরসা করে শপথ করে বসে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যদি তা দ্রুপ না হয় তবে সেই শপথ বাজে হবে। এই অর্থটিও অন্যান্য বহু মনীষী হতে বর্ণিত আছে। একটি হাসান ও মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন যারা তীর নিক্ষেপ করছিল এবং তার সাথে একজন সাহাবীও (রাঃ) ছিলেন। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি কখনও বলছিলঃ “আল্লাহর শপথ! তার তীর ঠিক লক্ষ্য স্থলেই লাগবে।" আবার কখনও বলছিলঃ “খোদার শপথ! তার এই তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে।” তখন নবীর (সঃ) সাথীটি তাঁকে বলেনঃ ‘লোকটি কসম ভঙ্গকারী হয়ে গেল।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এগুলো বাজে শপথ, সুতরাং তার উপরে কাফফারা নেই এবং এর জন্যে তার কোন শাস্তিও হবে না। কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, এগুলো হচ্ছে ঐ শপথ যে শপথ করার পরে মানুষের তা খেয়াল থাকে না। কিংবা কোন লোক নিজের জন্যে কোন একটি কাজ না করার উপর কোন বদ দোয়া বিশিষ্ট কথা মুখ দিয়ে বের করে থাকে, ওগুলোও বাজে অথবা ক্রোধের অবস্থায় হঠাৎ মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, বা হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম করে নেয়। এই অবস্থায় তার উচিত যে সে যেন এগুলোর উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী বজায় রাখে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আনসারী দুই ভাই এর মধ্যে মীরাসের কিছু মাল ছিল। একজন অপরজনকে বলেনঃ “আমাদের মধ্যে এই মাল বন্টন করা হোক।' তখন অপর জন বলেনঃ “যদি তুমি এই মাল বন্টন করতে বল তবে আমার সমস্ত মাল কাবা শরীফের ধন।' হযরত উমার (রাঃ) এই ঘটনাটি শুনে বলেনঃ 'কা'বা শরীফ এরূপ ধনের মুখাপেক্ষী নয়। তুমি তোমার শপথ ভেঙ্গে দাও এবং কাফফারা আদায় কর এবং তোমার ভাই এর সাথে কথা বল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতায় এবং যে জিনিসের উপর অধিকার নেই তাতে না আছে শপথ বা না আছে ন্যর'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা মনের সংকল্পের সাথে যে শপথ করবে তার জন্যে তোমাদেরকে ধরা হবে। অর্থাৎ মিথ্যা জানা সত্ত্বেও যদি তুমি শপথ করে নাও তবে এই জন্যে আল্লাহ পাক তোমাকে পাকড়াও করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শপথের জন্যে আল্লাহ তোমাদেরকে ধরবেন। (৫:৮৯) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে ক্ষমাকারী এবং তিনি অত্যন্ত সহনশীল।

আল-বাকারা 2:225

২২৪-২২৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা আল্লাহর শপথ করে পুণ্যের কাজ ও আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখা পরিত্যাগ করো না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও স্বচ্ছলতার অধিকারী তারা যেন আত্মীয়দেরকে, দরিদ্রদেরকে এবং আল্লহর পথে হিজরতকারীদেরকে না দেয়ার শপথ না করে, তারা যেন ক্ষমা ও মার্জনা করার অভ্যাস করে, তোমাদের নিজেদের কি এই ইচ্ছে নেই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন: এরূপ শপথ যদি কেউ করে বসে তবে সে যেন কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করে। সহীহ বুখারীর মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা সর্বশেষে আগমনকারী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা সবারই আগে গমনকারী।' তিনি বলেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই রকম শপথ করে বসে এবং কাফফারা আদায় না করে তার উপরেই স্থির থাকে সে বড় পাপী। এই হাদীসটি আরও বহু সনদে অনেক কিতাবে বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস ও (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীর এটাই বলেছেন। হযরত মাসরূক (রঃ) প্রভৃতি বহু তাফসীরকারক হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ঐ জমহুর উলামার এই উক্তির সমর্থন এই হাদীস দ্বারাও পাওয়া যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহর কসম, যদি আমি কোন শপথ করি এবং তা ভেঙ্গে দেয়াতে মঙ্গল বুঝতে পারি তবে আমি অবশ্যই তা ভেঙ্গে দেবো এবং কাফফারা আদায় করবো।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা হযরত আবদুর রহমান বিন সামরাকে (রাঃ) বলেনঃ “হে আবদুর রহমান! সর্দারী, নেতৃত্ব এবং ইমামতির অনুসন্ধান করো না। যদি চেয়েও তোমাকে তা দেয়া হয় তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে সাহায্য করা হবে আর যদি তুমি চেয়ে নাও তবে তোমাকে তার নিকট সমর্পণ করা হবে। যদি তুমি কোন শপথ করে বসো এবং তার বিপক্ষে মঙ্গল দেখতে পাও তবে স্বীয় শপথের কাফফারা আদায় করে ঐ সৎ কাজটি করে নাও' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন ব্যক্তি শপথ করে বসে, অতঃপর ওটা ছাড়া মঙ্গল চোখে পড়ে তবে কাফফারা আদায় করতঃ কসম ভেঙ্গে দিয়ে ঐ সৎ কাজটি তার করা উচিত।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, ওটা ছেড়ে দেয়াই হচ্ছে ওর কাফফারা। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে রয়েছে, ন্যর’ ও কসম ঐ জিনিসে নেই যা মানুষের অধিকারে নেই। আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতার কার্যেও নেই এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার কাজেও নেই। যে ব্যক্তি এমন কার্যে শপথ করে যাতে পুণ্য নেই, তবে সে যেন শপথ ভেঙ্গে দিয়ে পুণ্যের কাজই করে। ঐ শপথকে ছেড়ে দেয়াই হচ্ছে ওর কাফফারা। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বলেনঃ “সমস্ত বিশুদ্ধ হাদীসে এই শব্দ রয়েছে যে, এরূপ শপথের কাফফারা। দেবে।” একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এই শপথকে পুরো করা হচ্ছে এই যে, তা ভেঙ্গে দেবে ও ওটা হতে প্রত্যাবর্তন করবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), মাসরূক (রঃ) এবং শা'বীও (রঃ) এই মতেরই সমর্থক যে, এরূপ লোকের দায়িত্বে কোন কাফফারা নেই। অতঃপর বলা হচ্ছে-অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেসব শপথ তোমাদের মুখ দিয়ে অভ্যাসগতভাবে বেরিয়ে যায়, আল্লাহ সেই জন্যে তোমাদেরকে দোষী করবেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ‘লাত’ ও ‘উযু’র শপথ করে বসে সে যেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ে নেয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ইরশাদ ঐ লোকদের উপর হয়েছিল যারা সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং অজ্ঞতা যুগের শপথসমূহ তাদের মুখের উপরেই ছিল। তাই তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, যদি অভ্যাসগতভাবে কখনও তাদের মুখ দিয়ে এরূপ শিরকের কালেমা বেরিয়েও যায় তবে যেন তারা তৎক্ষণাৎ কালেমা-ই-তাওহীদ পাঠ করে নেয় তাহলে এর বিনিময় হয়ে যাবে। এর পরে বলা হচ্ছে-যদি ঐসব শপথ মনের সংকল্প অনুসারে করা হয় তবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ধরবেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে একটি মারফু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা অন্যান্য বর্ণনায় মাওকুফ রূপে এসেছে, তা এই যে, অর্থহীন শপথ ঐগুলো যেগুলো মানুষ তাদের ঘর-বাড়ী ও সন্তানাদির ব্যাপারে করে থাকে। যেমন হাঁ, আল্লাহর শপথ বা না, আল্লাহর শপথ! মোটকথা, অভ্যাস হিসেবেই মুখ দিয়ে এ কথাগুলো বেরিয়ে যায়, এতে মনের সংকল্প মোটেই থাকে না। হযরত আয়েশা | (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে যে, এগুলো ঐ শপথ যেগুলো হাসতে হাসতে মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এগুলোর জন্যে কাফফারা নেই। হাঁ, তবে যে শপথ মনের সংকল্পের সাথে হয় তার উল্টো করলে কাফফারা আদায় করতে হবে। তিনি ছাড়া আরও অন্যান্য সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈও (রঃ) এই আয়াতের এই তাফসীরই বর্ণনা করেছেন। এও বর্ণিত আছে যে, কেউ যদি কোন কার্যের ব্যাপারে নিজের সঠিকতার উপর ভরসা করে শপথ করে বসে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যদি তা দ্রুপ না হয় তবে সেই শপথ বাজে হবে। এই অর্থটিও অন্যান্য বহু মনীষী হতে বর্ণিত আছে। একটি হাসান ও মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন যারা তীর নিক্ষেপ করছিল এবং তার সাথে একজন সাহাবীও (রাঃ) ছিলেন। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি কখনও বলছিলঃ “আল্লাহর শপথ! তার তীর ঠিক লক্ষ্য স্থলেই লাগবে।" আবার কখনও বলছিলঃ “খোদার শপথ! তার এই তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে।” তখন নবীর (সঃ) সাথীটি তাঁকে বলেনঃ ‘লোকটি কসম ভঙ্গকারী হয়ে গেল।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এগুলো বাজে শপথ, সুতরাং তার উপরে কাফফারা নেই এবং এর জন্যে তার কোন শাস্তিও হবে না। কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, এগুলো হচ্ছে ঐ শপথ যে শপথ করার পরে মানুষের তা খেয়াল থাকে না। কিংবা কোন লোক নিজের জন্যে কোন একটি কাজ না করার উপর কোন বদ দোয়া বিশিষ্ট কথা মুখ দিয়ে বের করে থাকে, ওগুলোও বাজে অথবা ক্রোধের অবস্থায় হঠাৎ মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, বা হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম করে নেয়। এই অবস্থায় তার উচিত যে সে যেন এগুলোর উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী বজায় রাখে। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আনসারী দুই ভাই এর মধ্যে মীরাসের কিছু মাল ছিল। একজন অপরজনকে বলেনঃ “আমাদের মধ্যে এই মাল বন্টন করা হোক।' তখন অপর জন বলেনঃ “যদি তুমি এই মাল বন্টন করতে বল তবে আমার সমস্ত মাল কাবা শরীফের ধন।' হযরত উমার (রাঃ) এই ঘটনাটি শুনে বলেনঃ 'কা'বা শরীফ এরূপ ধনের মুখাপেক্ষী নয়। তুমি তোমার শপথ ভেঙ্গে দাও এবং কাফফারা আদায় কর এবং তোমার ভাই এর সাথে কথা বল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতায় এবং যে জিনিসের উপর অধিকার নেই তাতে না আছে শপথ বা না আছে ন্যর'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা মনের সংকল্পের সাথে যে শপথ করবে তার জন্যে তোমাদেরকে ধরা হবে। অর্থাৎ মিথ্যা জানা সত্ত্বেও যদি তুমি শপথ করে নাও তবে এই জন্যে আল্লাহ পাক তোমাকে পাকড়াও করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শপথের জন্যে আল্লাহ তোমাদেরকে ধরবেন। (৫:৮৯) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে ক্ষমাকারী এবং তিনি অত্যন্ত সহনশীল।

আল-বাকারা 2:226

২২৬-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরযদি কোন লোক কিছুদিন পর্যন্ত স্বীয় স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার শপথ গ্রহণ করে তবে এরূপ শপথকে (আরবি) বলা হয়। এর দু'টি রূপ রয়েছে। এই সময় চার মাসের কম হবে বা বেশী হবে। যদি কম হয় তবে চার মাস পুরো করবে এবং এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীও ধৈর্যধারণ করবে। এর মধ্যে সে স্বামীর নিকট আবেদন জানাতে পারবে না। এই চার মাস পুরো হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মিলিত হয়ে যাবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) এক মাসের জন্যে শপথ করেছিলেন এবং পূর্ণ উনত্রিশ দিন পৃথক থাকেন এবং বলেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে। আর যদি চার মাসের বেশী সময়ের জন্যে শপথ করে তবে চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর স্বামীর নিকট আবেদন জানাবার স্ত্রীর অধিকার রয়েছে যে, হয় মিলিত হবে, না হয় তালাক দেবে। শাসনকর্তা স্বামীকে এ দু' এর মধ্যে একটি করতে বাধ্য করবেন যেন স্ত্রী কষ্ট না পায়। এখানে এই বর্ণনাই হচ্ছে যে, যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে (আরবি) করবে, অর্থাৎ তাদের সাথে সহবাস না করার শপথ করবে তাদের জন্যে চার মাস সময় রয়েছে। চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদেরকে বাধ্য করা হবে যে, হয় তারা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না হয় তালাক দেবে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, (আরবি) স্ত্রীদের জন্যেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে, দাসীদের জন্যে নয়। এটাই জমহুর উলামার মাযহাব। স্বামীর জন্যে উচিত নয় যে, চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও স্ত্রী হতে পৃথক থাকবে। এখন যদি তারা ফিরে আসে, অর্থাৎ সহবাস করে তবে তার পক্ষ থেকে স্ত্রীর যে কষ্ট হয়েছে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেবেন। এতে ঐ আলেমদের জন্যে দলীল রয়েছে যারা বলেন যে, এই অবস্থায় স্বামীর উপর কোন কাফফারা নেই। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম উক্তি এটাই। এর সমর্থনে ঐ হাদীসও রয়েছে যা পূর্বের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে, তা এই যে, শপকারী শপথ ভেঙ্গে দেয়ার মধ্যেই যদি মঙ্গল বুঝতে পারে তবে তা ভেঙ্গে দেবে এবং এটাই তার কাফফারা। কিন্তু আলেমদের অন্য একটি দলের মাযহাব এই যে, ঐ শপথের কাফফারা দিতে হবে। এর হাদীসগুলোও উপরে বর্ণিত হয়েছে। জমহুরের মাযহাবও এটাই।অতঃপর ঘোষণা হচ্ছে-চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর যদি সে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করে;এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, চার মাস অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যায় না। পরবর্তী জমহুরের এটাই মাযহাব। তবে অন্য একটি দল এও বলেন যে, চার মাস অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যাবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) এবং কোন কোন তাবিঈ (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। অতঃপর কেউ বলেন যে, এটা তালাক-ই-রাজঈ' হবে। আবার কেউ বলেন যে, তালাক-ই-বায়েন হবে। যারা তালাক হয়ে যাওয়ার মত পোষণ করেন তারা বলেন যে, এর পরে স্ত্রীকে ‘ইদ্দত’ও পালন করতে হবে। তবে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আবুশ শাশা (রাঃ) বলেন যে, যদি এই চার মাসের মধ্যে ঐ স্ত্রী লোকটির তিনটি হায়ে এসে গিয়ে থাকে তবে তার উপর 'ইদ্দত’ও নেই। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) এটাই উক্তি। কিন্তু পরবর্তী জমহুর উলামার ঘোষণা এই যে, ঐ সময় অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যাবে। এমন কি তখন শপথকারীকে বাধ্য করা হবে যে, হয় সে শপথ ভেঙ্গে দেবে, না হয় তালাক দিয়ে দেবে। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। সহীহ বুখারীর মধ্যেও এই বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে।ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় সনদে হযরত সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ) হতে বর্ণনা করেনঃ ‘আমি দশজনের বেশী সাহাবী (রাঃ) হতে শুনেছি, তাঁরা বলেছেন যে, চার মাসের পরে শপথকারীকে দাঁড় করানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “তুমি মিলিত হও অথবা তালাক দাও।” সুতরাং কমপক্ষে তেরোজন সাহাবী (রাঃ) হলেন। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ এটাই আমাদের মাযহাব, এটাই হযরত উমার (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত উসমান বিন যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ), এবং দশের উপরে অন্যান্য সাহাবা-ই-কিরাম হতে বর্ণিত আছে। দারেকুতনীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেনঃ “আমি যারোজন সাহাবীকে (রাঃ) এই মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেছি। সবাই এই উত্তরই দিয়েছেন।হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) হযরত আবু দারদা (রাঃ), উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। তাবেঈগণের (রঃ) মধ্যে হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) এবং হযরত কাসিম (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাদের সঙ্গীদেরও এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন। লায়েস (রঃ), ইসহাক বিন রাওইয়াহ (রঃ), আবু উবাইদ (রঃ), আবু সাউর (রঃ), দাউদ (রঃ), প্রভৃতি মনীষীও এটাই বলেন। এই মনীষীগণ বলেন যে, যদি চার মাসের পরে সে ফিরে না আসে তবে তাকে তালাক দেয়াতে বাধ্য করা হবে। যদি তালাক না দেয় তবে শাসনকর্তা তার পক্ষ থেকে তালাক দেবেন এবং এটা হবে তালাক-ই-রাজঈ। ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার স্বামীর রয়েছে। শুধুমাত্র ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া জায়েয নয় যে পর্যন্ত না ইদ্দতের মধ্যে সহবাস করে। কিন্তু এই উক্তিটি অত্যন্ত গরীব। এখানে যে চার মাস বিলম্বের অনুমতি দেয়া হয়েছে এই ব্যাপারে মুআত্তা-ই-মালিকের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন দীনারের বর্ণনায় হযরত উমারের (রাঃ) একটি ঘটনা ধর্মশাস্ত্রবিদগণ সাধারণতঃ বর্ণনা করে থাকেন। তা হচ্ছে এই যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) সাধারণতঃ রাত্রি বেলায় মদীনার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। একদা রাত্রে বের হয়ে তিনি শুনতে পান যে, একটি স্ত্রী লোক সফরে গমনকৃত তার স্বামীর স্মরণে একটি কবিতা পাঠ করছে-যার অর্থ হচ্ছেঃ “হায়! এই কৃষ্ণ ও সুদীর্ঘ রাত্রিসমূহে আমার স্বামী নেই। তিনি থাকলে তার সাথে হাসি ও রং তামাশা করতাম। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহর ভয় আমার না থাকতো তবে অবশ্যই এই সময়ে চৌকির পায়া নড়ে উঠতো।” হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় কন্যা উম্মুল মুমেনীন হযরত হাফসার (রাঃ) নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ স্ত্রী তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে।' তিনি বলেনঃ “ছ-মাস বা চার মাস।” তিনি বলেন, এখন থেকে আমি নির্দেশ জারী করবো যে, কোন মুসলমান সৈন্য যেন সফরে এর চেয়ে অধিক দিন অবস্থান না করে। কোন কোন বর্ণনায় কিছু বেশীও রয়েছে এবং এর অনেক সনদ রয়েছে এবং এই ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

আল-বাকারা 2:227

২২৬-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরযদি কোন লোক কিছুদিন পর্যন্ত স্বীয় স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার শপথ গ্রহণ করে তবে এরূপ শপথকে (আরবি) বলা হয়। এর দু'টি রূপ রয়েছে। এই সময় চার মাসের কম হবে বা বেশী হবে। যদি কম হয় তবে চার মাস পুরো করবে এবং এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীও ধৈর্যধারণ করবে। এর মধ্যে সে স্বামীর নিকট আবেদন জানাতে পারবে না। এই চার মাস পুরো হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মিলিত হয়ে যাবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) এক মাসের জন্যে শপথ করেছিলেন এবং পূর্ণ উনত্রিশ দিন পৃথক থাকেন এবং বলেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে। আর যদি চার মাসের বেশী সময়ের জন্যে শপথ করে তবে চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর স্বামীর নিকট আবেদন জানাবার স্ত্রীর অধিকার রয়েছে যে, হয় মিলিত হবে, না হয় তালাক দেবে। শাসনকর্তা স্বামীকে এ দু' এর মধ্যে একটি করতে বাধ্য করবেন যেন স্ত্রী কষ্ট না পায়। এখানে এই বর্ণনাই হচ্ছে যে, যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে (আরবি) করবে, অর্থাৎ তাদের সাথে সহবাস না করার শপথ করবে তাদের জন্যে চার মাস সময় রয়েছে। চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদেরকে বাধ্য করা হবে যে, হয় তারা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না হয় তালাক দেবে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, (আরবি) স্ত্রীদের জন্যেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে, দাসীদের জন্যে নয়। এটাই জমহুর উলামার মাযহাব। স্বামীর জন্যে উচিত নয় যে, চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও স্ত্রী হতে পৃথক থাকবে। এখন যদি তারা ফিরে আসে, অর্থাৎ সহবাস করে তবে তার পক্ষ থেকে স্ত্রীর যে কষ্ট হয়েছে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেবেন। এতে ঐ আলেমদের জন্যে দলীল রয়েছে যারা বলেন যে, এই অবস্থায় স্বামীর উপর কোন কাফফারা নেই। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম উক্তি এটাই। এর সমর্থনে ঐ হাদীসও রয়েছে যা পূর্বের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে, তা এই যে, শপকারী শপথ ভেঙ্গে দেয়ার মধ্যেই যদি মঙ্গল বুঝতে পারে তবে তা ভেঙ্গে দেবে এবং এটাই তার কাফফারা। কিন্তু আলেমদের অন্য একটি দলের মাযহাব এই যে, ঐ শপথের কাফফারা দিতে হবে। এর হাদীসগুলোও উপরে বর্ণিত হয়েছে। জমহুরের মাযহাবও এটাই।অতঃপর ঘোষণা হচ্ছে-চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর যদি সে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করে;এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, চার মাস অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যায় না। পরবর্তী জমহুরের এটাই মাযহাব। তবে অন্য একটি দল এও বলেন যে, চার মাস অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যাবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) এবং কোন কোন তাবিঈ (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। অতঃপর কেউ বলেন যে, এটা তালাক-ই-রাজঈ' হবে। আবার কেউ বলেন যে, তালাক-ই-বায়েন হবে। যারা তালাক হয়ে যাওয়ার মত পোষণ করেন তারা বলেন যে, এর পরে স্ত্রীকে ‘ইদ্দত’ও পালন করতে হবে। তবে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আবুশ শাশা (রাঃ) বলেন যে, যদি এই চার মাসের মধ্যে ঐ স্ত্রী লোকটির তিনটি হায়ে এসে গিয়ে থাকে তবে তার উপর 'ইদ্দত’ও নেই। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) এটাই উক্তি। কিন্তু পরবর্তী জমহুর উলামার ঘোষণা এই যে, ঐ সময় অতিবাহিত হলেই তালাক হয়ে যাবে। এমন কি তখন শপথকারীকে বাধ্য করা হবে যে, হয় সে শপথ ভেঙ্গে দেবে, না হয় তালাক দিয়ে দেবে। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। সহীহ বুখারীর মধ্যেও এই বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে।ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় সনদে হযরত সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ) হতে বর্ণনা করেনঃ ‘আমি দশজনের বেশী সাহাবী (রাঃ) হতে শুনেছি, তাঁরা বলেছেন যে, চার মাসের পরে শপথকারীকে দাঁড় করানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “তুমি মিলিত হও অথবা তালাক দাও।” সুতরাং কমপক্ষে তেরোজন সাহাবী (রাঃ) হলেন। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ এটাই আমাদের মাযহাব, এটাই হযরত উমার (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত উসমান বিন যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ), এবং দশের উপরে অন্যান্য সাহাবা-ই-কিরাম হতে বর্ণিত আছে। দারেকুতনীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেনঃ “আমি যারোজন সাহাবীকে (রাঃ) এই মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেছি। সবাই এই উত্তরই দিয়েছেন।হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) হযরত আবু দারদা (রাঃ), উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। তাবেঈগণের (রঃ) মধ্যে হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) এবং হযরত কাসিম (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাদের সঙ্গীদেরও এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন। লায়েস (রঃ), ইসহাক বিন রাওইয়াহ (রঃ), আবু উবাইদ (রঃ), আবু সাউর (রঃ), দাউদ (রঃ), প্রভৃতি মনীষীও এটাই বলেন। এই মনীষীগণ বলেন যে, যদি চার মাসের পরে সে ফিরে না আসে তবে তাকে তালাক দেয়াতে বাধ্য করা হবে। যদি তালাক না দেয় তবে শাসনকর্তা তার পক্ষ থেকে তালাক দেবেন এবং এটা হবে তালাক-ই-রাজঈ। ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার স্বামীর রয়েছে। শুধুমাত্র ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া জায়েয নয় যে পর্যন্ত না ইদ্দতের মধ্যে সহবাস করে। কিন্তু এই উক্তিটি অত্যন্ত গরীব। এখানে যে চার মাস বিলম্বের অনুমতি দেয়া হয়েছে এই ব্যাপারে মুআত্তা-ই-মালিকের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন দীনারের বর্ণনায় হযরত উমারের (রাঃ) একটি ঘটনা ধর্মশাস্ত্রবিদগণ সাধারণতঃ বর্ণনা করে থাকেন। তা হচ্ছে এই যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) সাধারণতঃ রাত্রি বেলায় মদীনার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। একদা রাত্রে বের হয়ে তিনি শুনতে পান যে, একটি স্ত্রী লোক সফরে গমনকৃত তার স্বামীর স্মরণে একটি কবিতা পাঠ করছে-যার অর্থ হচ্ছেঃ “হায়! এই কৃষ্ণ ও সুদীর্ঘ রাত্রিসমূহে আমার স্বামী নেই। তিনি থাকলে তার সাথে হাসি ও রং তামাশা করতাম। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহর ভয় আমার না থাকতো তবে অবশ্যই এই সময়ে চৌকির পায়া নড়ে উঠতো।” হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় কন্যা উম্মুল মুমেনীন হযরত হাফসার (রাঃ) নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ স্ত্রী তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে।' তিনি বলেনঃ “ছ-মাস বা চার মাস।” তিনি বলেন, এখন থেকে আমি নির্দেশ জারী করবো যে, কোন মুসলমান সৈন্য যেন সফরে এর চেয়ে অধিক দিন অবস্থান না করে। কোন কোন বর্ণনায় কিছু বেশীও রয়েছে এবং এর অনেক সনদ রয়েছে এবং এই ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

আল-বাকারা 2:228

যে সাবালিকা নারীদের সাথে তাদের স্বামীদের মিলন ঘটেছে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে,তারা যেন তালাকপ্রাপ্তির পরে তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করে। অতঃপর ইচ্ছে করলে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারে। তবে ইমাম চতুষ্টয় এটা হতে দাসীদেরকে পৃথক করেছেন। তাঁদের মতে দাসীদের দুই ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, এসব ব্যাপারে দাসীরা আযাদ মেয়েদের অর্ধেকের উপর রয়েছে। কিন্তু ঋতুর মেয়াদের অর্ধেক ঠিক হয় না বলে তাদেরকে দুই ঋতু অপেক্ষা করতে হবে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, দাসীদের তালাকও দু'টি এবং ‘ইদ্দত’ও দুই ঋতু (তাফসীরে ইবনে জারীর)। কিন্তু এর বর্ণনাকারী হযরত মুহির দুর্বল। এই হাদীসটি জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-আবু দাউদ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজাহর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম হাফিয দারেকুতনী (রঃ) বলেনঃসঠিক কথা এই যে, এটা হযরত কাসেম বিন মুহাম্মদের নিজের উক্তি। কিন্তু হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে এই বর্ণনাটি মারফু রূপে বর্ণিত আছে। কিন্তু সে সম্বন্ধেও ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) নিজের উক্তি। অনুরূপভাবে স্বয়ং মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার ফারূক (রাঃ) হতে এই হাদীসটি বর্ণিত আছে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্বন্ধে সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে কোন মতভেদ ছিল না। তবে পূর্ববর্তী কয়েকজন মনীষী হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইদ্দতের ব্যাপারে আযাদ ও দাসী সমান। কেননা আয়াতটির মধ্যে সাধারণ হিসেবে দুটিই জড়িত আছে। তাছাড়া এটা স্বভাবজাত ব্যাপার। দাসী ও আযাদ এ ব্যাপারে সমান। মুহাম্মদ বিন সীরীনেরও এটাই উক্তি। কিন্তু এটা দুর্বল।‘মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীমের একটি দুর্বল সনদ বিশিষ্ট বর্ণনায় রয়েছে যে, এই আয়াতটি ইয়াযিদ বিন সাকানের কন্যা হযরত আসমা (রাঃ) নামক একজন আনসারীয়া নারীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এর পূর্বে তালাকের ইদ্দত ছিল না। সর্বপ্রথম ‘ইদ্দতের নির্দেশ এই স্ত্রী লোকটির তালাকের পরেই অবতীর্ণ হয়। (আরবি) শব্দটির অর্থের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদের মধ্যে বরাবরই মতভেদ চলে আসছে। এর একটি অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ পবিত্রতা। এটাই হযরত আয়েশার (রাঃ) অভিমত। তিনি তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী হযরত আবদুর রহমানের (রাঃ) কন্যা হযরত হাফসাকে (রাঃ) তাঁর তিন ‘হের অতিক্রান্ত হওয়ার পর তৃতীয় ঋতু আরম্ভ হওয়ার সময় স্থান পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত উরওয়া (রাঃ) যখন এটা বর্ণনা করেন তখন হযরত আয়েশার (রাঃ) দ্বিতীয়া ভ্রাতুস্পুত্রী হযরত উমর (রাঃ) এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং বলেন, জনগণ হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট আপত্তি উঠালে তিনি বলেন, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে, (আরবি)অর্থাৎ পবিত্রতা' (মুআত্তা-ই-মালিক)।' এমনকি মুআত্তার মধ্যে হযরত আবু বকর বিন আবদুর রহমানের (রাঃ) এই উক্তিটিও বর্ণিত আছে : ‘আমি বিজ্ঞ পণ্ডিত ও ধর্মশাস্ত্রবিদদেরকে (আরবি) শব্দের তাফসীর (আরবি) বা পবিত্রতাই করতে শুনেছি।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারও (রাঃ) এটাই বলেন যে, তৃতীয় ঋতু আরম্ভ হলেই স্ত্রী তার স্বামী হতে মুক্ত হয়ে যাবে এবং স্বামীও তার থেকে পৃথক হয়ে যাবে। (মুআত্তা)।ইমাম মালিক (রঃ) বলেনঃ 'আমাদের নিকটেও এটাই সঠিক মত।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ), সালিহা (রঃ) কাসিম (রঃ), উরওয়া (রঃ), সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ), আবু বকর বিন আবদুর রহমান (রাঃ), আবান বিন উসমান (রঃ), আতা ইবনে আবু রাবাহ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), যুহরী (রঃ) এবং অবশিষ্ট সাতজন ফকীহরও এটাই উক্তি। এটাই ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব। দাউদ (রঃ) এবং আবু সাঊরও (রঃ) এটাই বলেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা বর্ণিত আছে। ঐ মনীষীগণ এর দলীল নিম্নের আয়াত হতেও গ্রহণ করেছেনঃ(আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে ইদ্দতের মধ্যে তালাক প্রদান কর।' (৬৫:১) অর্থাৎ তোমরা স্ত্রীদেরকে -এর মধ্যে পবিত্রতার অবস্থায় তালাক দাও।যে তুহুরে তালাক দেয়া হয় ওটাও গণনার মধ্যে ধরা হয়। কাজেই জানা যাচ্ছে যে, উপরের আয়াতেও (আরবি) শব্দের ভাবার্থ তুহুর বা পবিত্রতাই নেয়া হয়েছে। আরব কবিদের কবিতাতেও (আরবি) শব্দটি তুহুর বা পবিত্রতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (আরবি) শব্দ সম্বন্ধে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, ওর অর্থ হচ্ছে ‘ঋতু'। তাহলে (আরবি)-এর অর্থ হবে তিন ঋতু। সুতরাং স্ত্রী যে পর্যন্ত না তৃতীয় ঋতু হতে পবিত্র হবে সে পর্যন্ত সে ইদ্দতের মধ্যেই থাকবে। এর প্রথম দলীল হচ্ছে . হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) এই ফায়সালাটিঃ তার নিকট একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী এসে বলে ও আমার স্বামী আমাকে একটি বা দুটি তলিকি দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি আমার নিকট সে সময় আগমন করেন যখন আমি কাপড় ছেড়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করেছিলাম (অর্থাৎ তৃতীয় ঋতু হতে পবিত্রতা লাভের উদ্দেশ্যে গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম)। তাহলে বলুন, এখন নির্দেশ কি: (অর্থাৎ রাজ’আত’ হবে কি হবে না:) তিনি বলেন, 'আমার ধারণা তো এই যে, ‘রাজ’আত' হয়ে গেছে।'হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এটা সমর্থন করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), হযরত উমার ফারুক (রাঃ), হযরত উসমান রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আবু দারদা (রাঃ), হযরত উবাদা বিন সামিত (রাঃ), হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হযরত মুয়ায (রাঃ), হযরত উবাই বিন কাব (রা), হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। সাইদ বিন মসাইয়া (রঃ), আলকামা (রঃ), আসওয়াদ (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), আতা (রঃ), তাউস (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), ইকরামা (রঃ), মুহাম্মদ বিন সীরিন (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), শাবী (রঃ), রাবী' (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ), সুদ্দী (রঃ), মাকস্থূল (রঃ), যহাক (রঃ), এবং আতা' খোরাসানীও (রঃ) এটাই বলেন। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরদেরও এটাই মাযহাব।ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) হতেও অধিকতর সঠিক বর্ণনায় এটাই বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বড় বড় সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত। সাউর (রঃ), আওযায়ী (রঃ), ইবনে আবী লাইলা (রঃ), ইবনে শিবরামাহ (রঃ), হাসান বিন সালিহ (রঃ), আবু উবাইদ (রঃ) এবং ইসহাক বিন রাহুয়াহ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। একটি হাদীসেও রয়েছে যে, নবী (সঃ) হযরত ফাতিমা বিনতে আবী জায়েশ (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘তোমরা (আরবি) এর দিনে নামায ছেড়ে দাও.।' সুতরাং জানা গেল যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে, ঋতু। কিন্তু এই হাদীসের মুনযির নামক একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত। তার নাম প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। তবে ইবনে হিব্বান (রঃ) তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “আভিধানিক অর্থে (আরবি) প্রত্যেক ঐ জিনিসের যাওয়া-আসার সময়কে বুঝায় যার যাওয়া-আসার সময় নির্ধারিত রয়েছে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই শব্দটির দু’টো অর্থ হবে। ঋতুও হবে। এবং পবিত্রতাও হবে। কয়েকজন উসুল’ শাস্ত্রবিদের এটাই মাযহাব। আসমাঈও (রঃ) বলেন যে, (আরবি) সময়’কে বলা হয়। আবু উমার বিন আলা (রঃ), বলেনঃ আরবে ঋতু ও পবিত্রতা উভয়কেই (আরবি) বলে। আবু উমার বিন আবদুল বারর (রঃ), বলেন, আরবী ভাষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এবং ধর্ম শাস্ত্রবিদদের এ ব্যাপারে কোন মতবিরোধই নেই। তবে এই আয়াতের অর্থ নির্দিষ্ট করার ব্যাপারে একদল গেছেন এদিকে এবং অন্যদল গেছেন ওদিকে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-প্তাদের গর্ভে যা রয়েছে তা গোপন করা বৈধ নয়। অর্থাৎ গর্ভবতী হলেও প্রকাশ করতে হবে+এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'যদি তাদের আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস থাকে। এর দ্বারা স্ত্রীদেরকে ধমকানো হচ্ছে যে, তারা যেন মিথ্যা কথা না বলে। এর দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সংবাদ প্রদানে তাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য হবে। কেননা, এর উপরে কোন বাহ্যিক সাক্ষ্য উপস্থিত কম যেতে পারে না। তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে যে, ইদ্দত’ হতে অতাড়ি বের হওয়ার জন্যে ঋতু না হওয়া সত্ত্বেও যেন তারা ‘ঋতু হয়ে গেছে’ ঐকথা না বলে। কিংবা ‘ইদ্দত’কে বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে ঋতু হওয়া সত্ত্বেও যেন তারা ঋতু হয়নি’ এ কথা না বলে।এর পরে বলা হচ্ছে-যে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যদি তালাক-ই-রাজঈ’ হয়ে থাকে। অর্থাৎ এক তালাক এবং দুই তালাকের পরে স্ত্রীকে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে পারে। এখন বাকী থাকলো তালাক-ই-বায়েন; অর্থাৎ যদি তিন তালাক হয়ে যায় তবে কি হবে: এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় তালকি-ই-বায়েন ছিলই না। বরং সে সময় পর্যন্ত শত তালাক দিলেও ‘তালাক-ই-রাজঈ' থাকতো। ইসলামের নির্দেশাবলীর মধ্যে তালাক-ই-বায়েন এসেছে যে, যদি তিন তালাক হয়ে যায় তবে আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-স্ত্রীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে তেমনই পুরুষদের উপরও স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকেরই অপরের মঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বিদায় হজের ভাষণে জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা স্ত্রী লোকদের সম্বন্ধে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা আল্লাহর আমানত হিসেবে তাদেরকে গ্রহণ করেছো এবং আল্লাহর কালেমা দ্বারা তাদের লজ্জা স্থানকে বৈধ করে নিয়েছে। স্ত্রীদের উপর তোমাদের এই অধিকার রয়েছে যে, তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে আসতে দেবে না যাদের প্রতি তোমরা অসন্তুষ্ট। যদি তারা এই কাজ করে তবে তোমরা তাদেরকে প্রহার কর। কিন্তু এমন প্রহার করো না যে, বাইরে তা প্রকাশ পায়। তোমাদের উপর তাদের এই অধিকার রয়েছে যে, তোমরা তাদেরকে তোমাদের সামর্থ অনুসারে খাওয়াবে ও পরাবে।একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, “আমাদের উপর আমাদের স্ত্রীদের কি অধিকার রয়েছে:' তিনি উত্তরে বলেন, যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে। তুমি যখন পরবে তখন তাকেও পরাবে। তাকে তার মুখের উপর মেরো না। তাকে গালি দিও না এবং রাগান্বিত হয়ে তাকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিও না বরং বাড়ীতেই রাখ। এই আয়াতটিই পাঠ করে হ্যরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন, ‘আমি পছন্দ করি যে, আমার স্ত্রীকে খুশী করার জন্যে আমি নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেই, যেমন আমার স্ত্রী আমাকে খুশী করবার জন্যে নিজেকে সুন্দর সাজে সাজিয়ে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-স্ত্রীদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। অর্থাৎ দৈহিক, চারিত্রিক মর্যাদা, হুকুম, আনুগত্য, খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি সব দিক দিয়েই স্ত্রীদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। মোট কথা, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মর্যাদা হিসেবে পুরুষদের প্রাধান্য রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে-‘পুরুষরা নারীদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে গৌরবান্বিত করেছেন এবং এ হেতু যে, তারা স্বীয় ধনসম্পদ হতে ব্যয় করে থাকে।' এরপরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অবাধ্যদের উপর প্রতিশোধ নেয়ার ব্যাপারে মহাপরাক্রান্ত এবং স্বীয় নির্দেশাবলীর ব্যাপারে মহাবিজ্ঞ।

আল-বাকারা 2:229

২২৯-২৩০ নং আয়াতের তাফসীরইসলামের পূর্বে প্রথা ছিল এই যে, স্বামী যত ইচ্ছা স্ত্রীকে তালাক দিতো এবং ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিতো। ফলে স্ত্রীগণ সংকটপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছিল। স্বামী তাদেরকে তালাক দিতো এবং ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার নিকটবর্তী হতেই ফিরিয়ে নিতো। পুনরায় তালাক দিতো। কাজেই স্ত্রীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইসলাম এই সীমা নির্ধারণ করে দেয় যে, এভাবে মাত্র দু'টি তালাক দিতে পারবে। তৃতীয় তালাকের পর ফিরিয়ে নেয়ার আর কোন অধিকার থাকবে না। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে এই অধ্যায় রয়েছে যে, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া রহিত হয়ে গেছে।অতঃপর এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে বলে-“আমি তোমাকে রাখবোও না এবং ছেড়েও দেবো না। স্ত্রী বলে : ‘কিরূপে:' সে বলে : তোমাকে তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় হলেই ফিরিয়ে নেবো। আবার তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই পুনরায় ফিরিয়ে নেবো। এরূপ করতেই থাকবো। ঐ স্ত্রীলোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার এই দুঃখের কথা বর্ণনা করে। তখন এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ঐলোকগুলো তালাকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে আরম্ভ করে এবং শুধরে যায়। তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর কোন অধিকার থাকলো না এবং তাদেরকে বলা হলো দুই তালাক পর্যন্ত তোমাদের অধিকার রয়েছে যে, সংশোধনের উদ্দেশ্যে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে ফিরিয়ে নেবে যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে থাকে এবং তোমাদের এও অধিকার রয়েছে যে, তোমরা তাদের ইদ্দত অতিক্রান্ত হতে দেবে এবং তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে না, যেন তারা নতুনভাবে বিয়ের যোগ্য হয়ে যায়। আর যদি তৃতীয় তালাক দেবারই ইচ্ছে কর তবে সত্তাবে তালাক দেবে। তাদের কোন হক নষ্ট করবে না, তাদের। উপর অত্যাচার করবে না এবং তাদের কোন ক্ষতি করবে না। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! এই আয়াতে দুই তালাকের কথাতো বর্ণিত হয়েছে, তৃতীয় তালাকের বর্ণনা কোথায় রয়েছে:' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা সভাবে পরিত্যাগ করতে হবে এর মধ্যে রয়েছে।' (২:২২৯) যখন তৃতীয় তালাক দেয়ার ইচ্ছে করবে তখন স্ত্রীকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তার জীবন সংকটময় করা এবং তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করা স্বামীর জন্যে একেবারে হারাম। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছে : ‘স্ত্রীদেরকে সংকটময় অবস্থায় নিক্ষেপ করো না এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তাদেরকে প্রদত্ত্ব বস্তু হতে কিছু গ্রহণ করবে। তবে স্ত্রী যদি খুশী মনে কিছু দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে তবে সেটা অন্য কথা। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে।(আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা খুশী মনে তোমাদের জন্যে কিছু ছেড়ে দেয় তবে তা তোমরা বেশ তৃপ্তির সাথে ভক্ষণ কর।' (৪:৪) আর যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য বেড়ে যায় এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে ও তার হক আদায় করে, এরূপ অবস্থায় যদি সে তার স্বামীকে কিছু প্রদান করতঃ তালাক গ্রহণ করে তবে তার দেয়ায় এবং এর নেয়ায় কোন পাপ নেই। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, যদি স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট ‘খোলা’ তালাক প্রার্থনা করে তবে সে অত্যন্ত পাপীনী হবে।জামেউত্ তিরমিযী প্রভৃতির হাদীসে রয়েছে যে, যে স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট তালাক প্রার্থনা করে অর উপর বেহেশতের সুগন্ধিও হারাম। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘অথচ বেহেশতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও এসে থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ স্ত্রী বিশ্বাসঘাতিনী। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের একটা বিরাট দলের ঘোষণা এই যে, ‘খোলা’ শুধুমাত্র ঐ অবস্থায় রয়েছে যখন অবাধ্যতা ও দুষ্টামি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হবে। ঐ সময় স্বামী মুক্তিপণ নিয়ে ঐ স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে পারে। যেমন কুরআন পাকের এই। আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় ‘ভোলা’ বৈধ নয়। এমন কি হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে এবং তার হক কিছু নষ্ট করে স্বামী তাকে বাধ্য করতঃ তার নিকট হতে কিছু গ্রহণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেয়া ওয়াজিব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মতানৈক্যের সময় যখন কিছু গ্রহণ করা বৈধ তখন মতৈক্যের সময় বৈধ হওয়ায় কোন অসুবিধার কারণ থাকতে পারে না।বাকর বিন আব্দুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি দ্বারা ‘খোলা' রহিত হয়ে গেছে। (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যদি তাদের কাউকে ধনভাণ্ডারও দিয়ে থাকো তথাপি তা হতে কিছু গ্রহণ করো না (৪:২০)।' কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল ও বর্জনীয়। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকের মধ্যে রয়েছেঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল আনসারিয়া’ (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযের জন্য অন্ধকার থাকতেই বের হন। দরজার উপর হযরত হাবীবা বিনতে সাহলকে (রাঃ) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি: তিনি বলেনঃ “আমি সাহলের কন্যা হাবীবা'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন ‘খবর কি: তিনি বলেনঃ “আমি সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রী রূপে থাকতে পারি না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। অতঃপর তার স্বামী হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) কিছু বলেছে।' হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তিনি আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা সবই আমার নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং আমি ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, ‘ঐগুলো গ্রহণ কর।' হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) তখন সেগুলো গ্রহণ করেন এবং হযরত হাবীবা (রাঃ) মুক্ত হয়ে যান। অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে প্রহার করেন, ফলে তাঁর কোন একটি হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন তিনি ফজরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, “তোমার স্ত্রীর কিছু মাল গ্রহণ কর এবং তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার জন্যে বৈধ হবে কি:' তিনি বলেন ‘হাঁ'। হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি তাকে দু'টি বাগান দিয়েছি এবং ও দু’টো তার মালিকানাধীনেই রয়েছে।' তখন নবী (সঃ) বলেন, তুমি ঐ দু’টো গ্রহণ করে তাকে পৃথক করে দাও।' তিনি তাই করেন।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত সাবিত (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে চরিত্র ও ধর্মভীরুতার ব্যাপারে দোষারোপ করছি না, কিন্তু আমি ইসলামের মধ্যে কুফরকে অপছন্দ করি।' অতঃপর মাল নিয়ে হযরত সাবিত (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম জামিলাও এসেছে। কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তিনি বলেন, এখন আমার ক্রোধ সম্বরণের শক্তি নেই। একটি বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, 'যা দিয়েছে, তাই নাও, বেশী নিও না। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, তিনি দেখতেও সুন্দর নন।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি আবদুল্লাহ বিন উবাই এর ভগ্নী ছিলেন ও ইসলামে এটাই সর্বপ্রথম ‘খোলা ছিল।হযরত হাবীবা (রাঃ) এর একটি কারণ এও বর্ণনা করেছেন, একদা আমি তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দেখতে পাই যে, আমার স্বামী কয়েকজন লোকের সাথে আসছেন। এদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বাপেক্ষা কালো, বেঁটে ও কুৎসিৎ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘তাকে তার বাগান ফিরিয়ে দাও।' এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বললে আমি আরও কিছু দিতে প্রস্তুত রয়েছি। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত হাবীবা (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর ভয় না থাকলে আমি তার মুখে থুথু দিতাম। জমহুরে মাযহাব এই যে, ‘খোলা তালাকে স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিলেও বৈধ হবে। কেননা, কুরআন মাজীদে(আরবি) অর্থাৎ ‘সে মুক্তি লাভের জন্যে যা কিছু বিনিময় দেয়' বলা হয়েছে। (২:২২৯) একজন স্ত্রীলোক স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে হযরত উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে। হযরত উমার (রাঃ) তাকে আবর্জনাযুক্ত একটি ঘরে বন্দী করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাকে কয়েদখানা হতে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অবস্থা কিরূপ:' সে বলে, 'আমার জীবনে আমি এই একটি রাত্রি আরামে কাটিয়েছি তখন তিনি তার স্বামীকে বলেন, তার কানের বিনিময়ে হলেও তার সাথে ভোলা করে নাও।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তাকে তিন দিন পর্যন্ত কয়েদখানায় রাখা হয়েছিল। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, একগুচ্ছ চুলের বিনিময়ে হলেও তুমি তা গ্রহণ করতঃ তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-চুলের গুচ্ছ ছাড়া সব কিছু নিয়েই খোলা তালাক হতে পারে। রাবী' বিনতে মুআওয়াজ বিন আফরা (রাঃ) বলেন, “আমার স্বামী বিদ্যমান থাকলেও আমার সাথে আদান-প্রদানে ত্রুটি করতেন এবং বিদেশে চলে গেলে তো সম্পূর্ণ রূপেই বঞ্চিত করতেন। একদিন ঝগড়ার সময় আমি বলে ফেলিআমার অধিকারে যা কিছু রয়েছে সবই নিয়ে নিন এবং আমাকে খোলা তালাক প্রদান করুন। তিনি বলেন ঠিক আছে, এটাই ফয়সালা হয়ে গেল। কিন্তু আমার চাচা মুয়ায বিন আফরা (রাঃ) এই ঘটনাটি হযরত উসমানের (রাঃ) নিকট বর্ণনা করেন। হযরত উসমান (রাঃ) ওটাই ঠিক রাখেন এবং বলেন, চুলের খোপা ছাড়া সব কিছু নিয়ে নাও।' কোন কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, ওর চেয়ে ছোট জিনিসও। মোট কথা সব কিছুই নিয়ে নাও। এসব ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীর নিকট যা কিছু রয়েছে সব দিয়েই সে ‘খোলা’ করিয়ে নিতে পারে এবং স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিয়েও ভোলা করতে পারে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), ইকরামা (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), কাবীসা বিন যাবীব (রঃ), হাসান বিন সালিহ (রঃ) এবং উসমানও (রঃ) এটাই বলেন। ইমাম মালিক (রঃ), লায়েস (রঃ) এবং আবু সাউরেরও (রঃ) মাযহাব এটাই। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) সহচরদের উক্তি এটাই যে, যদি অন্যায় ও ত্রুটি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয় তবে স্বামী তাকে যা দিয়েছে তা ফিরিয়ে নেয়া তার জন্যে বৈধ। কিন্তু তার চেয়ে বেশী নেয়া জায়েয নয়। আর বাড়াবাড়ি যদি পুরুষের পক্ষ হতে হয় তবে তার জন্যে কিছুই নেয়া বৈধ নয়। ইমাম আহমাদ (রঃ), উবাইদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং রাহুইয়াহ (রঃ) বলেন যে, স্বামীর জন্যে তার প্রদত্ত বস্তু হতে অতিরিক্ত নেয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়। সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আতা (রঃ), আমর বিন শুয়াইব (রঃ), যুহরী (রঃ), তাউস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), শাবী (রঃ), হাম্মাদ বিন আবূ সুলাইমান (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। মুআম্মার (রঃ) এবং হাকিম (রঃ) বলেন যে, হযরত আলীরও (রাঃ) ফায়সালা এটাই। আওযায়ীর (রঃ) ঘোষণা এই যে, কাযীগণ স্বামীর প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করা তার জন্যে বৈধ মনে করেন। এই মাযহাবের দলীল ঐ হাদীসটিও যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে, তোমার বাগান নিয়ে নাও কিন্তু বেশী নিও না।'‘মুসনাদ-ই-আবদ বিন হামীদ' নামক গ্রন্থেও একটি মারফু হাদীস রয়েছে যে, নবী (সঃ) খোলা গ্রহণ কারিণী স্ত্রীকে প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করাকে খারাপ মনে করেছেন। ঐ অবস্থায় যা কিছু মুক্তির বিনিময়ে সে দেবে কুরআন মাজীদের এই কথার অর্থ হবে এই যে, প্রদত্ত বস্তু হতে যা কিছু দেবে। কেননা, এর পূর্বে ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছে যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা হতে কিছুই গ্রহণ করো না। রাবী'র (রঃ) (আরবি) পঠনে শব্দের পরে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছে-এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। তোমরা এই সীমাগুলো অতিক্রম করো না, নতুবা পাপী হয়ে যাবে।পরিচ্ছেদকোন কোন মনীষী খোলাকে তালাকের মধ্যে গণ্য করেন না। তারা বলেন যে, যদি এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু'তালাক দিয়ে দেয়, অতঃপর ঐ স্ত্রী ‘খোলা’ করিয়ে নেয় তবে ঐ স্বামী ইচ্ছে করলে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে। তারা দলীল রূপে এই আয়াতটিকেই এনে থাকেন। এটা হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি। হযরত ইকরামাও (রঃ) বলেন যে, এটা তালাক নয়। দেখা যাচ্ছে যে, আয়াতটির প্রথমে তালাকের বর্ণনা রয়েছে। প্রথমে দু’তালাকের, শেষে তৃতীয় তালাকের এবং মধ্যে খেলার কথা বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, খোলা তালাক নয়। এবং এটা দ্বারা বিয়ে বাতিল করা হয়। আমীরুল মু'মেনীন হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), তাউস (রঃ), ইকরামা (রঃ), আহমাদ (রঃ), ইসহাক বিন রাহুইয়াহ্ (রঃ), আবু সাউর (রঃ) এবং দাউদ বিন আলী যাহিরীরও (রঃ) মাযহাব এটাই। এটাই ইমাম শাফিঈরও (রঃ) পূর্ব উক্তি। আয়াতটিরও প্রকাশ্য শব্দ এটাই।অন্যান্য কয়েকজন মনীষী বলেন যে, খোলা হচ্ছে তালাক-ই-বায়েন এবং একাধিক তালাকের নিয়্যাত করলেও তা বিশ্বাসযোগ্য। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, উম্মে বাকর আসলামিয়া (রাঃ) নাম্নী একটি স্ত্রীলোক তাঁর স্বামী হযরত আবদুল্লাহ বিন খালিদ (রাঃ) হতে খোলা গ্রহণ করেন এবং হযরত উসমান (রাঃ) ওটাকে এক তালাক হওয়ার ফতওয়া দেন। সঙ্গে সঙ্গে এটা বলে দেন যে, যদি কিছু নাম নিয়ে থাকে তবে যা নাম নিয়েছে তাই হবে। কিন্তু এই বর্ণনাটি দুর্বল। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযতর শুরাইহ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হযরত ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সাথী ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ) এবং আবু উসমান বাত্তীরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, খোলা তালাকই বটে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) নতুন উক্তি এটাই। তবে হানাফীগণ বলেন যে, ভোলা প্রদানকারী যদি দু’তালাকের নিয়্যাত করে তবে দু'টোই হয়ে যাবে। আর যদি কোনই শব্দ উচ্চারণ না করে এবং সাধারণ খোলা হয় তবে একটি তালাক-ই-বায়েন হবে। যদি তিনটির নিয়ত করে তবে তিনটিই হয়ে যাবে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) অন্য একটি উক্তিও রয়েছে যে, যদি তালাকের শব্দ না থাকে এবং কোন দলীল প্রমাণও না হয় তবে কোন কিছুই হবে না। জিজ্ঞাস্যঃইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইসহাক বিন রাহুইয়াহ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, তালাকের ইদ্দত হচ্ছে খোলার ইদ্দত। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ), উরওয়া (রঃ), সালেম (রঃ), আবু সালমা (রঃ), উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), ইবনে শিহাব (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) শাবী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), আবু আইয়া (রঃ), খালাস বিন আমর (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), সুফইয়ান সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), লায়েস বিন সা'দ (রঃ) এবং আবূ উবাইদাহ (রঃ) -এরও এটাই উক্তি। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অধিকাংশ আলেম এদিকেই গিয়েছেন। তারা বলেন, যেহেতু খোলোও তালাক, সুতরাং ওর ইদ্দত তালাকের ইদ্দতের মতই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, ওর ইদ্দত শুধুমাত্র একটি ঋতু। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এটাই ফায়সালা। ইবনে উমার (রাঃ) তিন ঋতুর ফতওয়া দিতেন বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলতেন, হযরত উসমান (রাঃ) আমাদের অপেক্ষা উত্তম এবং আমাদের চেয়ে বড় আলেম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে একটি ঋতুর ইদ্দতও বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইকরামা (রঃ), আব্বান বিন উসমান (রঃ) এবং ঐ সমস্ত লোক যাদের নাম উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাদেরও সবারই এই উক্তি হওয়াই বাঞ্ছণীয়।সুনানে আবু দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রীকে ঐ অবস্থায় এক হায়েয ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জামেউত্ তিরযিমীর মধ্যে রয়েছে যে, রাবী বিনতে মুআওয়ায (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খোলার পর একটি ঋতুই ইদ্দত রূপে পালন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রাঃ) খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীলোকটিকে বলেছিলেন : তোমার উপরে কোন ইদ্দতই নেই। তবে যদি খোলা গ্রহণের পূর্বক্ষণেই স্বামীর সাথে মিলিত হয়ে থাকো তবে একটি ঋতু আসা পর্যন্ত তার নিকটেই অবস্থান কর" মরইয়াম মুগালাবার (রাঃ) সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যা ফায়সালা ছিল হযরত উসমান (রাঃ) তারই অনুসরণ করেন। জিজ্ঞাস্যঃ জমহুর উলামা এবং ইমাম চতুষ্টয়ের মতে খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীকে স্বামীর ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। কেননা, সে মাল দিয়ে নিজেকে মুক্ত করেছে। আবদ বিন উবাই, আওফা, মাহানুল হানাফী, সাঈদ এবং যুহরীর (আল্লাহ তাদের প্রতি সহায় হউন) উক্তি এই যে, স্বামী তার নিকট হতে যা গ্রহণ করেছে তা তাকে ফিরিয়ে দিলে স্ত্রীকে রাজ'আত করতে পারবে। স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াও ফিরিয়ে নিতে পারবে। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যদি খোলার মধ্যে তালাকের শব্দ না থাকে তবে ওটা শুধু বিচ্ছেদ। সুতরাং ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। আর যদি তালাকের নাম নেয় তবে অবশ্যই ফিরিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দাউদ যাহেরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। তবে সবাই এর উপর এক মত যে, যদি দু'জনই সম্মত থাকে তবে ইদ্দতের মধ্যে নতুনভাবে বিয়ে করতে পারবে। ইবনে আবদুল বার (রাঃ) একটি দলের এই উক্তিও বর্ণনা করেন যে, ইদ্দতের মধ্যে যখন অন্য কেউ তাকে বিয়ে করতে পারবে না, তেমনই স্বামীও পারবে না। কিন্তু এই উক্তিটি বিরল ও বর্জনীয়। জিজ্ঞাস্যঃঐ স্ত্রীর উপর ইদ্দতের মধ্যেই দ্বিতীয় তালাক পড়তে পারে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম এই যে, ইদ্দতের মধ্যে দ্বিতীয় তালাক পতিত হবে না। কেননা, স্ত্রীটি নিজের অধিকারিণী এবং সে তার স্বামী হতে পৃথক হয়ে গেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে যুবাইর (রাঃ), ইকরামা (রঃ), জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং আবু সাউরের (রঃ) উক্তি এটাই। দ্বিতীয় হচ্ছে ইমাম মালিকের (রঃ) উক্তি। তা এই যে, খোলার সঙ্গে সঙ্গেই যদি নীরব না থেকে তালাক দিয়ে দেয় তবে তালাক হয়ে যাবে, নচেৎ হবে না। এই দৃষ্টান্ত হচ্ছে যা হযরত উসমান (রা) হতে বর্ণিত আছে। তৃতীয় উক্তি এই যে, ইদ্দতের মধ্যে তালাক হয়ে যাবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সহচর ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), শুরাইহ্ (রাঃ), তাউস (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), যুহরী (রঃ), হাকীম (রঃ), হাকাম (রঃ) এবং হাম্মাদেরও (রঃ) উক্তি এটাই। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আব দারদা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত হলেও তা প্রমাণিত নয়।এর পরে বলা হচ্ছে-‘এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর সীমাগুলো অতিক্রম করো না, তাঁর ফরযসমূহ বিনষ্ট করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের অসম্মান করো, শরীয়তে যেসব বিষয়ের উল্লেখ নেই, তোমরাও সেগুলো সম্পর্কে নীরব থাকবে, কেননা আল্লাহ তা'আলা ভুল-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।' এই আয়াত দ্বারা ঐসব মনীষীগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যাঁরা বলেন যে, একই সময়ে তিন তালাক দেয়াই হারাম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের এটাই মাযহাব। তাদের মতে সুন্নাত পন্থা এই যে, তালাক একটি একটি করে দিতে হবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তালাক দু'বার। ‘এগুলো আল্লাহর সীমা, অতএব সেগুলো অতিক্রম করো না। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশকে সুনানে নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত নিম্নের হাদীস দ্বারা জোরদার করা হয়েছে। হাদীসটি এই যে, কোন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কি আল্লাহর কিতাবের সাথে খেল-তামাশা শুরু হয়ে গেল:' শেষ পর্যন্ত একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি তাকে হত্যা করবো না: কিন্তু এর সনদের মধ্যে ইনকিতা' (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন) রয়েছে।তার পরে বলা হচ্ছে-যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু’তালাক দেয়ার পরে তৃতীয় তালাক দিয়ে ফেলবে তখন সে তার উপর হারাম হয়ে যাবে। যে পর্যন্ত অন্য কেউ নিয়মিতভাবে তাকে বিয়ে করতঃ সহবাস করার পর তালাক দেবে। বিয়ে না করে যদি তাকে দাসী করে নিয়ে তার সাথে সহবাসও করে তথাপি সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। অনুরূপভাবে যদি নিয়মিত বিয়েও হয় কিন্তু দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস না করে থাকে তাহলেও পূর্ব স্বামীর জন্যে সে হালাল হবে না। অধিকাংশ ফকীহগণের মধ্যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) মতে দ্বিতীয় বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামী সহবাস না করেই তালাক দিলেও সে তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) উক্তি রূপে প্রমাণিত হয়।একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় ও একটি লোকে একটি স্ত্রী লোককে বিয়ে করলো এবং সহবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিল। অতঃপর সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহিতা হলো, সেও তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি তাকে বিয়ে করা তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, না। যে পর্যন্ত না তারা একে অপরের মধুর স্বাদ গ্রহণ করে। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ ইত্যাদি। এই বর্ণনাটি স্বয়ং ইমাম সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে তিনি বর্ণনাও করবেন আবার নিজে বিরোধিতাও করবেন-তাও আবার বিনা দলীলে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, একটি লোক তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিলো। অতঃপর সে অন্যের সাথে বিবাহিতা হলো। এরপর দরজা বন্ধ করে ও পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে যৌন মিলন না করেই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি স্ত্রীটি তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হবে:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, যে পর্যন্ত না সে মধুর স্বাদ গ্রহণ করে' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত রিফা'আ কারামী (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যুবাইরের (রাঃ) সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করেন, “তিনি (আমার স্বামী আবদুর রহমান বিন যুবাইর) স্ত্রীর আকাংখা পূরণের যোগ্য নন।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, সম্ভবত তুমি রিফাআর (তার পূর্ব স্বামী) নিকট ফিরে যেতে চাও। এটা হবে না যে পর্যন্ত না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' এই হাদীসগুলোর বহু সনদ রয়েছে এবং বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। (পরিচ্ছেদ)-এটা মনে রাখতে হবে যে, দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার ভাবার্থ হচ্ছে ঐ স্ত্রীর প্রতি দ্বিতীয় স্বামীর আগ্রহ থাকতে হবে এবং চিরস্থায়ীভাবে তাকে। স্ত্রী রূপে রাখার উদ্দেশ্যে হতে হবে। শুধুমাত্র প্রথম স্বামীর জন্যে তাকে হালাল করার জন্যে নয়। এমনকি ইমাম মালিকের মতে এও শর্ত রয়েছে যে, এই সহবাস বৈধ পন্থায় হতে হবে। যেমন স্ত্রী যেন রোযার অবস্থায়, ইহরামের অবস্থায়, ইতেকাফের অবস্থায় এবং হায়েয ও নিফালের অবস্থায় না থাকে। অনুরূপভাবে স্বামীও যেন রোযা, ইহরাম ও ইতেকাকের অবস্থায় না থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রীর কোন একজন উল্লিখিত কোন এক অবস্থায় থাকে এবং এই অবস্থায় সহবাসও হয়ে যায় তথাপিও সে তার পূর্ব মুসলমান স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। কেননা, ইমাম মালিকের মতে কাফিরদের পরস্পরের বিয়ে বাতিল।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) তো এই শর্তও আরোপ করেন যে, বীর্যও নির্গত হতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘যে পর্যন্ত না সে তোমার এবং তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এই কথার দ্বারা এটাই বুঝা যাচ্ছে। হাসান বসরী (রঃ) যদি এই হাদীসটিকে সামনে রেখেই এই শর্ত আরোপ করে থাকেন তবে স্ত্রীর ব্যাপারেও এই শর্ত হওয়া উচিত। কিন্তু হাদীসের (আরবি) শব্দটির ভাবার্থ বীর্য নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে সহবাস। যদি এই বিয়ের দ্বারা প্রথম স্বামীর জন্যে ঐ স্ত্রীকে হালাল করাই দ্বিতীয় স্বামীর উদ্দেশ্য হয় তবে এইরূপ লোক যে নিন্দনীয় এমনকি অভিশপ্ত তা হাদীসসমূহে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, যে স্ত্রী লোক উলকী করে এবং যে স্ত্রী লোক উলকী করিয়ে নেয়, যে স্ত্রী লোক চুল মিলিয়ে দেয় এবং যে মিলিয়ে নেয়, যে ‘হালালা’ করে এবং যার জন্যে হালালা’ করা হয়, যে সুদ প্রদান করে এবং যে সুদ গ্রহণ করে এদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিশাপ দিয়েছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, সাহাবীদের (রাঃ) আমল এর উপরেই রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) এটাই মাযহাব। তাবেঈ ধর্ম শাস্ত্রবিদগণও এটাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সুদের সাক্ষ্যদানকারী এবং লিখকের প্রতিও অভিসম্পাত। যারা যাকাত প্রদান করে না এবং যারা যাকাত গ্রহণে বাড়াবাড়ি করে তাদের উপরও অভিসম্পাত। হিযরতের পর ধর্মত্যাগীদের উপরও অভিসম্পাত। বিলাপ করাও নিষিদ্ধ।একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ধার করা যাড় কে তা কি আমি তোমাদেরকে বলবো:' জনগণ বলেন, হ্যা বলুন।' তিনি বলেন, যে ‘হালালা করে অর্থাৎ যে তালাক প্রাপ্তা নারীকে এজন্যে বিয়ে করে যেন সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হয়ে যায়। যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করে তার উপরও আল্লাহর লানত এবং যে ব্যক্তি নিজের জন্যে এটা করিয়ে নেয় সেও অভিশপ্ত (সুনানে ইবনে মাজাহ)। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ বিয়ে সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, “এটা বিয়েই নয় যাতে উদ্দেশ্য থাকে এক এবং বাহ্যিক হয় অন্য এবং যাতে আল্লাহর কিতাবকে নিয়ে খেল-তামাশা করা হয়। বিয়ে তো শুধুমাত্র ওটাই যা আগ্রহের সাথে হয়ে থাকে।মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারকে জিজ্ঞেস করেন : ‘একটি লোক তার স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দিয়ে দেয়। এর পর তার ভাই তাকে এই উদ্দেশ্যে বিয়ে করে যে, সে যেন তার ভাই এর জন্যে হালাল হয়ে যায়। এই বিয়ে কি শুদ্ধ হয়েছে।' তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘কখনও নয়। আমরা এটাকে নবী (সঃ)-এর যুগে ব্যভিচারের মধ্যে গণ্য করতাম। বিয়ে ওটাই যাতে আগ্রহ থাকে। এ হাদীসটি মাওকুফ হলেও এর শেষের বাক্যটি একে মারফুর পর্যায়ে এনে দিয়েছে। এমন কি অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আমীরুল মুমেনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ যদি কেউ এই কাজ করে বা করায় তবে আমি উভয়কে ব্যভিচারের শাস্তি দেবো অর্থাৎ রজম করে দেবো। হযরত উসমান (রাঃ) স্বীয় খিলাফতকালে এরূপ বিয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করেন। এ রকমই হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি বহু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তারপর ঘোষণা হচ্ছে-দ্বিতীয় স্বামী যদি বিয়ে ও সহবাসের পর তালাক দিয়ে দেয় তবে পূর্ব স্বামী পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করলে কোন পাপ নেই, যদি তারা সদ্ভাবে বসবাস করে এবং এটাও জেনে নেয় যে, ঐ দ্বিতীয় বিয়ে শুধু প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ছিল না, বরং প্রকৃতই ছিল। এটাই হচ্ছে আল্লাহর বিধান যা তিনি জ্ঞানীদের জন্যে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ইমামগণের এই বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে একটি বা দুটি তালাক দিয়েছিল। অতঃপর তাকে ছেড়েই থাকলো। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীটির ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং সে অন্য স্বামী গ্রহণ করলো। দ্বিতীয় স্বামী তার সাথে সহবাসও করলো। অতঃপর সে তাকে তালাক দিয়ে দিল এবং তার ইদ্দত শেষ হয়ে গেল। তখন তার পূর্ব স্বামী তাকে পুনরায় বিয়ে করলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই স্বামী কি তিন তালাকের মধ্যে যে একটি বা দুটি তালাক বাকি রয়েছে শুধু ওরই অধিকারী হবে, না পূর্বের তিন তালাক গণনার মধ্যে হবে না, বরং সে নতুনভাবে তিন তালাকের মালিক হবে : প্রথমটি হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), এবং সাহাবীগণের একটি দলের মাযহাব। এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরদের মাযহাব। এঁদের দলীল এই যে, এভাবে তৃতীয় তালাকই যখন গণনায় আসছে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক কিভাবে আসতে পারে।

আল-বাকারা 2:230

২২৯-২৩০ নং আয়াতের তাফসীরইসলামের পূর্বে প্রথা ছিল এই যে, স্বামী যত ইচ্ছা স্ত্রীকে তালাক দিতো এবং ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিতো। ফলে স্ত্রীগণ সংকটপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছিল। স্বামী তাদেরকে তালাক দিতো এবং ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার নিকটবর্তী হতেই ফিরিয়ে নিতো। পুনরায় তালাক দিতো। কাজেই স্ত্রীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইসলাম এই সীমা নির্ধারণ করে দেয় যে, এভাবে মাত্র দু'টি তালাক দিতে পারবে। তৃতীয় তালাকের পর ফিরিয়ে নেয়ার আর কোন অধিকার থাকবে না। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে এই অধ্যায় রয়েছে যে, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া রহিত হয়ে গেছে।অতঃপর এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে বলে-“আমি তোমাকে রাখবোও না এবং ছেড়েও দেবো না। স্ত্রী বলে : ‘কিরূপে:' সে বলে : তোমাকে তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় হলেই ফিরিয়ে নেবো। আবার তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই পুনরায় ফিরিয়ে নেবো। এরূপ করতেই থাকবো। ঐ স্ত্রীলোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার এই দুঃখের কথা বর্ণনা করে। তখন এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ঐলোকগুলো তালাকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে আরম্ভ করে এবং শুধরে যায়। তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর কোন অধিকার থাকলো না এবং তাদেরকে বলা হলো দুই তালাক পর্যন্ত তোমাদের অধিকার রয়েছে যে, সংশোধনের উদ্দেশ্যে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে ফিরিয়ে নেবে যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে থাকে এবং তোমাদের এও অধিকার রয়েছে যে, তোমরা তাদের ইদ্দত অতিক্রান্ত হতে দেবে এবং তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে না, যেন তারা নতুনভাবে বিয়ের যোগ্য হয়ে যায়। আর যদি তৃতীয় তালাক দেবারই ইচ্ছে কর তবে সত্তাবে তালাক দেবে। তাদের কোন হক নষ্ট করবে না, তাদের। উপর অত্যাচার করবে না এবং তাদের কোন ক্ষতি করবে না। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! এই আয়াতে দুই তালাকের কথাতো বর্ণিত হয়েছে, তৃতীয় তালাকের বর্ণনা কোথায় রয়েছে:' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা সভাবে পরিত্যাগ করতে হবে এর মধ্যে রয়েছে।' (২:২২৯) যখন তৃতীয় তালাক দেয়ার ইচ্ছে করবে তখন স্ত্রীকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তার জীবন সংকটময় করা এবং তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করা স্বামীর জন্যে একেবারে হারাম। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছে : ‘স্ত্রীদেরকে সংকটময় অবস্থায় নিক্ষেপ করো না এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তাদেরকে প্রদত্ত্ব বস্তু হতে কিছু গ্রহণ করবে। তবে স্ত্রী যদি খুশী মনে কিছু দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে তবে সেটা অন্য কথা। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে।(আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা খুশী মনে তোমাদের জন্যে কিছু ছেড়ে দেয় তবে তা তোমরা বেশ তৃপ্তির সাথে ভক্ষণ কর।' (৪:৪) আর যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য বেড়ে যায় এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে ও তার হক আদায় করে, এরূপ অবস্থায় যদি সে তার স্বামীকে কিছু প্রদান করতঃ তালাক গ্রহণ করে তবে তার দেয়ায় এবং এর নেয়ায় কোন পাপ নেই। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, যদি স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট ‘খোলা’ তালাক প্রার্থনা করে তবে সে অত্যন্ত পাপীনী হবে।জামেউত্ তিরমিযী প্রভৃতির হাদীসে রয়েছে যে, যে স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট তালাক প্রার্থনা করে অর উপর বেহেশতের সুগন্ধিও হারাম। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘অথচ বেহেশতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও এসে থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ স্ত্রী বিশ্বাসঘাতিনী। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের একটা বিরাট দলের ঘোষণা এই যে, ‘খোলা’ শুধুমাত্র ঐ অবস্থায় রয়েছে যখন অবাধ্যতা ও দুষ্টামি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হবে। ঐ সময় স্বামী মুক্তিপণ নিয়ে ঐ স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে পারে। যেমন কুরআন পাকের এই। আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় ‘ভোলা’ বৈধ নয়। এমন কি হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে এবং তার হক কিছু নষ্ট করে স্বামী তাকে বাধ্য করতঃ তার নিকট হতে কিছু গ্রহণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেয়া ওয়াজিব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মতানৈক্যের সময় যখন কিছু গ্রহণ করা বৈধ তখন মতৈক্যের সময় বৈধ হওয়ায় কোন অসুবিধার কারণ থাকতে পারে না।বাকর বিন আব্দুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি দ্বারা ‘খোলা' রহিত হয়ে গেছে। (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যদি তাদের কাউকে ধনভাণ্ডারও দিয়ে থাকো তথাপি তা হতে কিছু গ্রহণ করো না (৪:২০)।' কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল ও বর্জনীয়। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকের মধ্যে রয়েছেঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল আনসারিয়া’ (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযের জন্য অন্ধকার থাকতেই বের হন। দরজার উপর হযরত হাবীবা বিনতে সাহলকে (রাঃ) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি: তিনি বলেনঃ “আমি সাহলের কন্যা হাবীবা'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন ‘খবর কি: তিনি বলেনঃ “আমি সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রী রূপে থাকতে পারি না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। অতঃপর তার স্বামী হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) কিছু বলেছে।' হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তিনি আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা সবই আমার নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং আমি ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, ‘ঐগুলো গ্রহণ কর।' হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) তখন সেগুলো গ্রহণ করেন এবং হযরত হাবীবা (রাঃ) মুক্ত হয়ে যান। অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে প্রহার করেন, ফলে তাঁর কোন একটি হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন তিনি ফজরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, “তোমার স্ত্রীর কিছু মাল গ্রহণ কর এবং তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার জন্যে বৈধ হবে কি:' তিনি বলেন ‘হাঁ'। হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি তাকে দু'টি বাগান দিয়েছি এবং ও দু’টো তার মালিকানাধীনেই রয়েছে।' তখন নবী (সঃ) বলেন, তুমি ঐ দু’টো গ্রহণ করে তাকে পৃথক করে দাও।' তিনি তাই করেন।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত সাবিত (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে চরিত্র ও ধর্মভীরুতার ব্যাপারে দোষারোপ করছি না, কিন্তু আমি ইসলামের মধ্যে কুফরকে অপছন্দ করি।' অতঃপর মাল নিয়ে হযরত সাবিত (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম জামিলাও এসেছে। কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তিনি বলেন, এখন আমার ক্রোধ সম্বরণের শক্তি নেই। একটি বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, 'যা দিয়েছে, তাই নাও, বেশী নিও না। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, তিনি দেখতেও সুন্দর নন।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি আবদুল্লাহ বিন উবাই এর ভগ্নী ছিলেন ও ইসলামে এটাই সর্বপ্রথম ‘খোলা ছিল।হযরত হাবীবা (রাঃ) এর একটি কারণ এও বর্ণনা করেছেন, একদা আমি তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দেখতে পাই যে, আমার স্বামী কয়েকজন লোকের সাথে আসছেন। এদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বাপেক্ষা কালো, বেঁটে ও কুৎসিৎ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘তাকে তার বাগান ফিরিয়ে দাও।' এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বললে আমি আরও কিছু দিতে প্রস্তুত রয়েছি। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত হাবীবা (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর ভয় না থাকলে আমি তার মুখে থুথু দিতাম। জমহুরে মাযহাব এই যে, ‘খোলা তালাকে স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিলেও বৈধ হবে। কেননা, কুরআন মাজীদে(আরবি) অর্থাৎ ‘সে মুক্তি লাভের জন্যে যা কিছু বিনিময় দেয়' বলা হয়েছে। (২:২২৯) একজন স্ত্রীলোক স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে হযরত উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে। হযরত উমার (রাঃ) তাকে আবর্জনাযুক্ত একটি ঘরে বন্দী করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাকে কয়েদখানা হতে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অবস্থা কিরূপ:' সে বলে, 'আমার জীবনে আমি এই একটি রাত্রি আরামে কাটিয়েছি তখন তিনি তার স্বামীকে বলেন, তার কানের বিনিময়ে হলেও তার সাথে ভোলা করে নাও।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তাকে তিন দিন পর্যন্ত কয়েদখানায় রাখা হয়েছিল। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, একগুচ্ছ চুলের বিনিময়ে হলেও তুমি তা গ্রহণ করতঃ তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-চুলের গুচ্ছ ছাড়া সব কিছু নিয়েই খোলা তালাক হতে পারে। রাবী' বিনতে মুআওয়াজ বিন আফরা (রাঃ) বলেন, “আমার স্বামী বিদ্যমান থাকলেও আমার সাথে আদান-প্রদানে ত্রুটি করতেন এবং বিদেশে চলে গেলে তো সম্পূর্ণ রূপেই বঞ্চিত করতেন। একদিন ঝগড়ার সময় আমি বলে ফেলিআমার অধিকারে যা কিছু রয়েছে সবই নিয়ে নিন এবং আমাকে খোলা তালাক প্রদান করুন। তিনি বলেন ঠিক আছে, এটাই ফয়সালা হয়ে গেল। কিন্তু আমার চাচা মুয়ায বিন আফরা (রাঃ) এই ঘটনাটি হযরত উসমানের (রাঃ) নিকট বর্ণনা করেন। হযরত উসমান (রাঃ) ওটাই ঠিক রাখেন এবং বলেন, চুলের খোপা ছাড়া সব কিছু নিয়ে নাও।' কোন কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, ওর চেয়ে ছোট জিনিসও। মোট কথা সব কিছুই নিয়ে নাও। এসব ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীর নিকট যা কিছু রয়েছে সব দিয়েই সে ‘খোলা’ করিয়ে নিতে পারে এবং স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিয়েও ভোলা করতে পারে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), ইকরামা (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), কাবীসা বিন যাবীব (রঃ), হাসান বিন সালিহ (রঃ) এবং উসমানও (রঃ) এটাই বলেন। ইমাম মালিক (রঃ), লায়েস (রঃ) এবং আবু সাউরেরও (রঃ) মাযহাব এটাই। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) সহচরদের উক্তি এটাই যে, যদি অন্যায় ও ত্রুটি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয় তবে স্বামী তাকে যা দিয়েছে তা ফিরিয়ে নেয়া তার জন্যে বৈধ। কিন্তু তার চেয়ে বেশী নেয়া জায়েয নয়। আর বাড়াবাড়ি যদি পুরুষের পক্ষ হতে হয় তবে তার জন্যে কিছুই নেয়া বৈধ নয়। ইমাম আহমাদ (রঃ), উবাইদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং রাহুইয়াহ (রঃ) বলেন যে, স্বামীর জন্যে তার প্রদত্ত বস্তু হতে অতিরিক্ত নেয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়। সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আতা (রঃ), আমর বিন শুয়াইব (রঃ), যুহরী (রঃ), তাউস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), শাবী (রঃ), হাম্মাদ বিন আবূ সুলাইমান (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। মুআম্মার (রঃ) এবং হাকিম (রঃ) বলেন যে, হযরত আলীরও (রাঃ) ফায়সালা এটাই। আওযায়ীর (রঃ) ঘোষণা এই যে, কাযীগণ স্বামীর প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করা তার জন্যে বৈধ মনে করেন। এই মাযহাবের দলীল ঐ হাদীসটিও যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে, তোমার বাগান নিয়ে নাও কিন্তু বেশী নিও না।'‘মুসনাদ-ই-আবদ বিন হামীদ' নামক গ্রন্থেও একটি মারফু হাদীস রয়েছে যে, নবী (সঃ) খোলা গ্রহণ কারিণী স্ত্রীকে প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করাকে খারাপ মনে করেছেন। ঐ অবস্থায় যা কিছু মুক্তির বিনিময়ে সে দেবে কুরআন মাজীদের এই কথার অর্থ হবে এই যে, প্রদত্ত বস্তু হতে যা কিছু দেবে। কেননা, এর পূর্বে ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছে যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা হতে কিছুই গ্রহণ করো না। রাবী'র (রঃ) (আরবি) পঠনে শব্দের পরে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছে-এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। তোমরা এই সীমাগুলো অতিক্রম করো না, নতুবা পাপী হয়ে যাবে।পরিচ্ছেদকোন কোন মনীষী খোলাকে তালাকের মধ্যে গণ্য করেন না। তারা বলেন যে, যদি এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু'তালাক দিয়ে দেয়, অতঃপর ঐ স্ত্রী ‘খোলা’ করিয়ে নেয় তবে ঐ স্বামী ইচ্ছে করলে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে। তারা দলীল রূপে এই আয়াতটিকেই এনে থাকেন। এটা হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি। হযরত ইকরামাও (রঃ) বলেন যে, এটা তালাক নয়। দেখা যাচ্ছে যে, আয়াতটির প্রথমে তালাকের বর্ণনা রয়েছে। প্রথমে দু’তালাকের, শেষে তৃতীয় তালাকের এবং মধ্যে খেলার কথা বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, খোলা তালাক নয়। এবং এটা দ্বারা বিয়ে বাতিল করা হয়। আমীরুল মু'মেনীন হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), তাউস (রঃ), ইকরামা (রঃ), আহমাদ (রঃ), ইসহাক বিন রাহুইয়াহ্ (রঃ), আবু সাউর (রঃ) এবং দাউদ বিন আলী যাহিরীরও (রঃ) মাযহাব এটাই। এটাই ইমাম শাফিঈরও (রঃ) পূর্ব উক্তি। আয়াতটিরও প্রকাশ্য শব্দ এটাই।অন্যান্য কয়েকজন মনীষী বলেন যে, খোলা হচ্ছে তালাক-ই-বায়েন এবং একাধিক তালাকের নিয়্যাত করলেও তা বিশ্বাসযোগ্য। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, উম্মে বাকর আসলামিয়া (রাঃ) নাম্নী একটি স্ত্রীলোক তাঁর স্বামী হযরত আবদুল্লাহ বিন খালিদ (রাঃ) হতে খোলা গ্রহণ করেন এবং হযরত উসমান (রাঃ) ওটাকে এক তালাক হওয়ার ফতওয়া দেন। সঙ্গে সঙ্গে এটা বলে দেন যে, যদি কিছু নাম নিয়ে থাকে তবে যা নাম নিয়েছে তাই হবে। কিন্তু এই বর্ণনাটি দুর্বল। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযতর শুরাইহ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হযরত ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সাথী ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ) এবং আবু উসমান বাত্তীরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, খোলা তালাকই বটে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) নতুন উক্তি এটাই। তবে হানাফীগণ বলেন যে, ভোলা প্রদানকারী যদি দু’তালাকের নিয়্যাত করে তবে দু'টোই হয়ে যাবে। আর যদি কোনই শব্দ উচ্চারণ না করে এবং সাধারণ খোলা হয় তবে একটি তালাক-ই-বায়েন হবে। যদি তিনটির নিয়ত করে তবে তিনটিই হয়ে যাবে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) অন্য একটি উক্তিও রয়েছে যে, যদি তালাকের শব্দ না থাকে এবং কোন দলীল প্রমাণও না হয় তবে কোন কিছুই হবে না। জিজ্ঞাস্যঃইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইসহাক বিন রাহুইয়াহ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, তালাকের ইদ্দত হচ্ছে খোলার ইদ্দত। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ), উরওয়া (রঃ), সালেম (রঃ), আবু সালমা (রঃ), উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), ইবনে শিহাব (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) শাবী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), আবু আইয়া (রঃ), খালাস বিন আমর (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), সুফইয়ান সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), লায়েস বিন সা'দ (রঃ) এবং আবূ উবাইদাহ (রঃ) -এরও এটাই উক্তি। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অধিকাংশ আলেম এদিকেই গিয়েছেন। তারা বলেন, যেহেতু খোলোও তালাক, সুতরাং ওর ইদ্দত তালাকের ইদ্দতের মতই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, ওর ইদ্দত শুধুমাত্র একটি ঋতু। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এটাই ফায়সালা। ইবনে উমার (রাঃ) তিন ঋতুর ফতওয়া দিতেন বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলতেন, হযরত উসমান (রাঃ) আমাদের অপেক্ষা উত্তম এবং আমাদের চেয়ে বড় আলেম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে একটি ঋতুর ইদ্দতও বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইকরামা (রঃ), আব্বান বিন উসমান (রঃ) এবং ঐ সমস্ত লোক যাদের নাম উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাদেরও সবারই এই উক্তি হওয়াই বাঞ্ছণীয়।সুনানে আবু দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রীকে ঐ অবস্থায় এক হায়েয ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জামেউত্ তিরযিমীর মধ্যে রয়েছে যে, রাবী বিনতে মুআওয়ায (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খোলার পর একটি ঋতুই ইদ্দত রূপে পালন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রাঃ) খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীলোকটিকে বলেছিলেন : তোমার উপরে কোন ইদ্দতই নেই। তবে যদি খোলা গ্রহণের পূর্বক্ষণেই স্বামীর সাথে মিলিত হয়ে থাকো তবে একটি ঋতু আসা পর্যন্ত তার নিকটেই অবস্থান কর" মরইয়াম মুগালাবার (রাঃ) সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যা ফায়সালা ছিল হযরত উসমান (রাঃ) তারই অনুসরণ করেন। জিজ্ঞাস্যঃ জমহুর উলামা এবং ইমাম চতুষ্টয়ের মতে খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীকে স্বামীর ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। কেননা, সে মাল দিয়ে নিজেকে মুক্ত করেছে। আবদ বিন উবাই, আওফা, মাহানুল হানাফী, সাঈদ এবং যুহরীর (আল্লাহ তাদের প্রতি সহায় হউন) উক্তি এই যে, স্বামী তার নিকট হতে যা গ্রহণ করেছে তা তাকে ফিরিয়ে দিলে স্ত্রীকে রাজ'আত করতে পারবে। স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াও ফিরিয়ে নিতে পারবে। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যদি খোলার মধ্যে তালাকের শব্দ না থাকে তবে ওটা শুধু বিচ্ছেদ। সুতরাং ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। আর যদি তালাকের নাম নেয় তবে অবশ্যই ফিরিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দাউদ যাহেরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। তবে সবাই এর উপর এক মত যে, যদি দু'জনই সম্মত থাকে তবে ইদ্দতের মধ্যে নতুনভাবে বিয়ে করতে পারবে। ইবনে আবদুল বার (রাঃ) একটি দলের এই উক্তিও বর্ণনা করেন যে, ইদ্দতের মধ্যে যখন অন্য কেউ তাকে বিয়ে করতে পারবে না, তেমনই স্বামীও পারবে না। কিন্তু এই উক্তিটি বিরল ও বর্জনীয়। জিজ্ঞাস্যঃঐ স্ত্রীর উপর ইদ্দতের মধ্যেই দ্বিতীয় তালাক পড়তে পারে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম এই যে, ইদ্দতের মধ্যে দ্বিতীয় তালাক পতিত হবে না। কেননা, স্ত্রীটি নিজের অধিকারিণী এবং সে তার স্বামী হতে পৃথক হয়ে গেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে যুবাইর (রাঃ), ইকরামা (রঃ), জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং আবু সাউরের (রঃ) উক্তি এটাই। দ্বিতীয় হচ্ছে ইমাম মালিকের (রঃ) উক্তি। তা এই যে, খোলার সঙ্গে সঙ্গেই যদি নীরব না থেকে তালাক দিয়ে দেয় তবে তালাক হয়ে যাবে, নচেৎ হবে না। এই দৃষ্টান্ত হচ্ছে যা হযরত উসমান (রা) হতে বর্ণিত আছে। তৃতীয় উক্তি এই যে, ইদ্দতের মধ্যে তালাক হয়ে যাবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সহচর ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), শুরাইহ্ (রাঃ), তাউস (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), যুহরী (রঃ), হাকীম (রঃ), হাকাম (রঃ) এবং হাম্মাদেরও (রঃ) উক্তি এটাই। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আব দারদা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত হলেও তা প্রমাণিত নয়।এর পরে বলা হচ্ছে-‘এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর সীমাগুলো অতিক্রম করো না, তাঁর ফরযসমূহ বিনষ্ট করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের অসম্মান করো, শরীয়তে যেসব বিষয়ের উল্লেখ নেই, তোমরাও সেগুলো সম্পর্কে নীরব থাকবে, কেননা আল্লাহ তা'আলা ভুল-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।' এই আয়াত দ্বারা ঐসব মনীষীগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যাঁরা বলেন যে, একই সময়ে তিন তালাক দেয়াই হারাম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের এটাই মাযহাব। তাদের মতে সুন্নাত পন্থা এই যে, তালাক একটি একটি করে দিতে হবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তালাক দু'বার। ‘এগুলো আল্লাহর সীমা, অতএব সেগুলো অতিক্রম করো না। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশকে সুনানে নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত নিম্নের হাদীস দ্বারা জোরদার করা হয়েছে। হাদীসটি এই যে, কোন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কি আল্লাহর কিতাবের সাথে খেল-তামাশা শুরু হয়ে গেল:' শেষ পর্যন্ত একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি তাকে হত্যা করবো না: কিন্তু এর সনদের মধ্যে ইনকিতা' (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন) রয়েছে।তার পরে বলা হচ্ছে-যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু’তালাক দেয়ার পরে তৃতীয় তালাক দিয়ে ফেলবে তখন সে তার উপর হারাম হয়ে যাবে। যে পর্যন্ত অন্য কেউ নিয়মিতভাবে তাকে বিয়ে করতঃ সহবাস করার পর তালাক দেবে। বিয়ে না করে যদি তাকে দাসী করে নিয়ে তার সাথে সহবাসও করে তথাপি সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। অনুরূপভাবে যদি নিয়মিত বিয়েও হয় কিন্তু দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস না করে থাকে তাহলেও পূর্ব স্বামীর জন্যে সে হালাল হবে না। অধিকাংশ ফকীহগণের মধ্যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) মতে দ্বিতীয় বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামী সহবাস না করেই তালাক দিলেও সে তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) উক্তি রূপে প্রমাণিত হয়।একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় ও একটি লোকে একটি স্ত্রী লোককে বিয়ে করলো এবং সহবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিল। অতঃপর সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহিতা হলো, সেও তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি তাকে বিয়ে করা তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, না। যে পর্যন্ত না তারা একে অপরের মধুর স্বাদ গ্রহণ করে। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ ইত্যাদি। এই বর্ণনাটি স্বয়ং ইমাম সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে তিনি বর্ণনাও করবেন আবার নিজে বিরোধিতাও করবেন-তাও আবার বিনা দলীলে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, একটি লোক তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিলো। অতঃপর সে অন্যের সাথে বিবাহিতা হলো। এরপর দরজা বন্ধ করে ও পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে যৌন মিলন না করেই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি স্ত্রীটি তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হবে:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, যে পর্যন্ত না সে মধুর স্বাদ গ্রহণ করে' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত রিফা'আ কারামী (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যুবাইরের (রাঃ) সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করেন, “তিনি (আমার স্বামী আবদুর রহমান বিন যুবাইর) স্ত্রীর আকাংখা পূরণের যোগ্য নন।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, সম্ভবত তুমি রিফাআর (তার পূর্ব স্বামী) নিকট ফিরে যেতে চাও। এটা হবে না যে পর্যন্ত না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' এই হাদীসগুলোর বহু সনদ রয়েছে এবং বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। (পরিচ্ছেদ)-এটা মনে রাখতে হবে যে, দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার ভাবার্থ হচ্ছে ঐ স্ত্রীর প্রতি দ্বিতীয় স্বামীর আগ্রহ থাকতে হবে এবং চিরস্থায়ীভাবে তাকে। স্ত্রী রূপে রাখার উদ্দেশ্যে হতে হবে। শুধুমাত্র প্রথম স্বামীর জন্যে তাকে হালাল করার জন্যে নয়। এমনকি ইমাম মালিকের মতে এও শর্ত রয়েছে যে, এই সহবাস বৈধ পন্থায় হতে হবে। যেমন স্ত্রী যেন রোযার অবস্থায়, ইহরামের অবস্থায়, ইতেকাফের অবস্থায় এবং হায়েয ও নিফালের অবস্থায় না থাকে। অনুরূপভাবে স্বামীও যেন রোযা, ইহরাম ও ইতেকাকের অবস্থায় না থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রীর কোন একজন উল্লিখিত কোন এক অবস্থায় থাকে এবং এই অবস্থায় সহবাসও হয়ে যায় তথাপিও সে তার পূর্ব মুসলমান স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। কেননা, ইমাম মালিকের মতে কাফিরদের পরস্পরের বিয়ে বাতিল।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) তো এই শর্তও আরোপ করেন যে, বীর্যও নির্গত হতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘যে পর্যন্ত না সে তোমার এবং তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এই কথার দ্বারা এটাই বুঝা যাচ্ছে। হাসান বসরী (রঃ) যদি এই হাদীসটিকে সামনে রেখেই এই শর্ত আরোপ করে থাকেন তবে স্ত্রীর ব্যাপারেও এই শর্ত হওয়া উচিত। কিন্তু হাদীসের (আরবি) শব্দটির ভাবার্থ বীর্য নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে সহবাস। যদি এই বিয়ের দ্বারা প্রথম স্বামীর জন্যে ঐ স্ত্রীকে হালাল করাই দ্বিতীয় স্বামীর উদ্দেশ্য হয় তবে এইরূপ লোক যে নিন্দনীয় এমনকি অভিশপ্ত তা হাদীসসমূহে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, যে স্ত্রী লোক উলকী করে এবং যে স্ত্রী লোক উলকী করিয়ে নেয়, যে স্ত্রী লোক চুল মিলিয়ে দেয় এবং যে মিলিয়ে নেয়, যে ‘হালালা’ করে এবং যার জন্যে হালালা’ করা হয়, যে সুদ প্রদান করে এবং যে সুদ গ্রহণ করে এদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিশাপ দিয়েছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, সাহাবীদের (রাঃ) আমল এর উপরেই রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) এটাই মাযহাব। তাবেঈ ধর্ম শাস্ত্রবিদগণও এটাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সুদের সাক্ষ্যদানকারী এবং লিখকের প্রতিও অভিসম্পাত। যারা যাকাত প্রদান করে না এবং যারা যাকাত গ্রহণে বাড়াবাড়ি করে তাদের উপরও অভিসম্পাত। হিযরতের পর ধর্মত্যাগীদের উপরও অভিসম্পাত। বিলাপ করাও নিষিদ্ধ।একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ধার করা যাড় কে তা কি আমি তোমাদেরকে বলবো:' জনগণ বলেন, হ্যা বলুন।' তিনি বলেন, যে ‘হালালা করে অর্থাৎ যে তালাক প্রাপ্তা নারীকে এজন্যে বিয়ে করে যেন সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হয়ে যায়। যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করে তার উপরও আল্লাহর লানত এবং যে ব্যক্তি নিজের জন্যে এটা করিয়ে নেয় সেও অভিশপ্ত (সুনানে ইবনে মাজাহ)। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ বিয়ে সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, “এটা বিয়েই নয় যাতে উদ্দেশ্য থাকে এক এবং বাহ্যিক হয় অন্য এবং যাতে আল্লাহর কিতাবকে নিয়ে খেল-তামাশা করা হয়। বিয়ে তো শুধুমাত্র ওটাই যা আগ্রহের সাথে হয়ে থাকে।মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারকে জিজ্ঞেস করেন : ‘একটি লোক তার স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দিয়ে দেয়। এর পর তার ভাই তাকে এই উদ্দেশ্যে বিয়ে করে যে, সে যেন তার ভাই এর জন্যে হালাল হয়ে যায়। এই বিয়ে কি শুদ্ধ হয়েছে।' তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘কখনও নয়। আমরা এটাকে নবী (সঃ)-এর যুগে ব্যভিচারের মধ্যে গণ্য করতাম। বিয়ে ওটাই যাতে আগ্রহ থাকে। এ হাদীসটি মাওকুফ হলেও এর শেষের বাক্যটি একে মারফুর পর্যায়ে এনে দিয়েছে। এমন কি অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আমীরুল মুমেনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ যদি কেউ এই কাজ করে বা করায় তবে আমি উভয়কে ব্যভিচারের শাস্তি দেবো অর্থাৎ রজম করে দেবো। হযরত উসমান (রাঃ) স্বীয় খিলাফতকালে এরূপ বিয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করেন। এ রকমই হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি বহু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তারপর ঘোষণা হচ্ছে-দ্বিতীয় স্বামী যদি বিয়ে ও সহবাসের পর তালাক দিয়ে দেয় তবে পূর্ব স্বামী পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করলে কোন পাপ নেই, যদি তারা সদ্ভাবে বসবাস করে এবং এটাও জেনে নেয় যে, ঐ দ্বিতীয় বিয়ে শুধু প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ছিল না, বরং প্রকৃতই ছিল। এটাই হচ্ছে আল্লাহর বিধান যা তিনি জ্ঞানীদের জন্যে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ইমামগণের এই বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে একটি বা দুটি তালাক দিয়েছিল। অতঃপর তাকে ছেড়েই থাকলো। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীটির ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং সে অন্য স্বামী গ্রহণ করলো। দ্বিতীয় স্বামী তার সাথে সহবাসও করলো। অতঃপর সে তাকে তালাক দিয়ে দিল এবং তার ইদ্দত শেষ হয়ে গেল। তখন তার পূর্ব স্বামী তাকে পুনরায় বিয়ে করলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই স্বামী কি তিন তালাকের মধ্যে যে একটি বা দুটি তালাক বাকি রয়েছে শুধু ওরই অধিকারী হবে, না পূর্বের তিন তালাক গণনার মধ্যে হবে না, বরং সে নতুনভাবে তিন তালাকের মালিক হবে : প্রথমটি হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), এবং সাহাবীগণের একটি দলের মাযহাব। এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরদের মাযহাব। এঁদের দলীল এই যে, এভাবে তৃতীয় তালাকই যখন গণনায় আসছে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক কিভাবে আসতে পারে।

আল-বাকারা 2:231

পুরুষদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে,যে তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার থাকে এই তালাক প্রদানের পর যখন ইদ্দত শেষ হতে চলবে তখন হয় তাদেরকে সত্তাবে ফিরিয়ে নেবে অর্থাৎ ফিরিয়ে নেয়ার উপর সাক্ষী রাখবে এবং সদ্ভাবে বসবাস করার নিয়্যাত করবে অথবা সদ্ভাবে পরিত্যাগ করবে। আর ইদ্দত শেষ হওয়ার পর কোন ঝগড়া-বিবাদ, মতবিরোধ এবং শক্রতা না করেই বিদায় করে দেবে। অজ্ঞতাযুগের জঘন্য প্রথাকে ইসলাম উঠিয়ে দিয়েছে। তা এই যে, তারা স্ত্রীকে তালাক দিতে এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার নিকটবর্তী হলেই ফিরিয়ে নিতো। আবার তালাক দিতো এবং পুনরায় ফিরিয়ে নিতো। এভাবে তারা স্ত্রীদের জীবন ধ্বংস করে দিতো। মহান আল্লাহ এটাকে বাধা দিয়ে ঘোষণা করেন যে, যারা এরূপ করে তারা অত্যাচারী। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা আল্লাহর নির্দেশাবলীকে বিদ্রুপ করো না। একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) আশআরী গোত্রের উপর অসন্তুষ্ট হন। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “এই লোকগুলো কেন বলে আমি তালাক দিয়েছি ও ফিরিয়ে নিয়েছি। জেনে রেখো যে এগুলো তালাক নয়। স্ত্রীদেরকে তাদের ইদ্দত অনুযায়ী তালাক প্রদান কর।' ভাবার্থ এই বলা হয়েছে যে, সেটি ঐ ব্যক্তি যে বিনা কারণে তালাক দেয় এবং স্ত্রীকে কষ্ট দেয়ার জন্যে ও তার ইদ্দত দীর্ঘ করার জন্যে তাকে ফিরিয়ে নিতেই থাকে। এও বলা হয়েছে যে, এটা ঐ ব্যক্তি যে তালাক দেয় বা আযাদ করে কিংবা বিয়ে করে অতঃপর বলে আমি তো হাসি -রহস্য করে এটা করেছি। এরূপ অবস্থায় এ তিনটি কাজ প্রকৃতপক্ষেই সংঘটিত হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে তালাক দেয় অতঃপর বলে, আমি তো রহস্য করেছিলাম। তখন আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, এটা তালাক হয়ে গেছে। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)।হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মানুষ তালাক দিতো, আযাদ করতো এবং বিয়ে করতে আর বলতো-আমি হাসি-তামাশা করে এটা করেছিলাম। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, যে তালাক দেয়, গোলাম আযাদ করে, বিয়ে করে বা করিয়ে দেয়, তা অন্তরের সাথেই করুক বা হাসি-তামাশা করেই করুক সবই সংঘটিত হয়ে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম)। এই হাদীসটি মুরসাল এবং মাওকুফ’। কয়েকটি সনদে এটা বর্ণিত আছে। সুনানে আবু দাউদ, জামেউত তিরমিযী ও সুনানে ইবনে মাজাহ্য়ে হাদীস রয়েছে যে, তিনটি জিনিস রয়েছে যা মনের ইচ্ছার সাথেই হোক বা হাসি-রহস্য করেই হোক-সংঘটিত হয়ে যায়। ঐ তিনটি হচ্ছে বিয়ে, তালাক ও রাজ'আত। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গরীব বলেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের নিকট রাসূল পাঠিয়েছেন, হিদায়াত ও দলীল অবতীর্ণ করেছেন, কিতাব ও সুন্নাত শিখিয়েছেন, নির্দেশও দিয়েছেন এবং নিষেধও করেছেন ইত্যাদি। তোমরা যে কাজ কর এবং যে কাজ হতে বিরত থাক সব সময়েই আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় খুব ভালভাবেই জানেন।

আল-বাকারা 2:232

এই আয়াতে স্ত্রী লোকদের অভিভাবক উত্তরাধিকারীদেরকে বলা হচ্ছে যে, যখন কোন স্ত্রী লোক তালাকপাপ্তা হয় এবং ইদ্দতও অতিক্রান্ত হয়ে যায় তখন যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মত হয়ে পুনরায় বিয়ে করতে ইচ্ছে করে তবে যেন তারা তাদেরকে বাধা না দেয়। এই আয়াতটি এই বিষয়েও দলীল যে, স্ত্রী লোকেরা নিজেই বিয়ে করতে পারে না এবং অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে হতে পারে না। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীসটি এনেছেন : এক স্ত্রী লোক অন্য স্ত্রী লোকের বিয়ে দিতে পারে না এবং সে নিজেও নিজের বিয়ে দিতে পারে না। এই স্ত্রী লোকেরা ব্যভিচারিণী যারা নিজেদের বিয়ে নিজেরাই দিয়ে দেয়। অন্য হাদীসে রয়েছে : পথ প্রদর্শক অভিভাবক ও দু’জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া বিয়ে হয় না। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে বটে কিন্তু তাফসীরে এটা বর্ণনা করার স্থান নয়। আমরা ‘কিতাবুল আহকামে' এর বর্ণনা দিয়েছি।এই আয়াতটি হযরত মাকাল বিন ইয়াসার (রাঃ) এবং তাঁর ভগ্নী সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে রয়েছে যে, হযরত মাকাল বিন ইয়াসার (রাঃ) বলেন, আমার নিকট আমার ভগ্নীর বিয়ের প্রস্তাব আসলে আমি তার বিয়ে দিয়ে দেই। তার স্বামী কিছুদিন পর তাকে তালাক দেয়। ইন্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর পুনরায় সে আমার নিকট বিয়ের প্রস্তাব করে। আমি তা প্রত্যাখ্যান করি। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটা শুনে হযরত মাকাল (রাঃ) আল্লাহর শপথ আমি তোমার সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে দেবো না এ শপথ সত্তেও বলেন, আমি আল্লাহর নির্দেশ শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। অতঃপর তিনি তাঁর ভগ্নিপতিকে ডেকে পাঠিয়ে পুনরায় তার সাথে তার বোনের বিয়ে দিয়ে দেন। এবং নিজের কসমের কাফফারা আদায় করেন। তার ভগ্নীর নাম ছিল জামীল বিনতে ইয়াসার (রাঃ) এবং তার স্বামীর নাম ছিল আবুল বাদাহ (রাঃ)। কেউ কেউ তার নাম : ফাতিমা বিনতে ইয়াসার বলেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তার চাচাতো বোনের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু প্রথম কথাটিই সঠিকতর। অতঃপর বলা হচ্ছে-এসব উপদেশ ঐসব লোকের জন্যে যাদের শরীয়তের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে এবং আল্লাহ ও কিয়ামতের ভয় রয়েছে। তাদের উচিত যে, তারা যেন তাদের অধীনস্থ নারীদেরকে এরূপ অবস্থায় বিয়ে হতে বিরত না রাখে। তারা যেন শরীয়তের অনুসরণ করতঃ এরূপ নারীদেরকে তাদের স্বামীদের বিয়েতে সমর্পণ করে এবং শরীয়তের পরিপন্থী নিজেদের মর্যাদাবোধ ও জেদকে শরীয়তের পদানত করে দেয়। এটাই তাদের জন্যে উত্তম। এর যুক্তি সঙ্গতার জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে তোমাদের নেই। অর্থাৎ কোন কাজ করলে মঙ্গল আছে এবং কোন কাজ ছেড়ে দিলে মঙ্গল আছে এর প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে।

আল-বাকারা 2:233

এখানে আল্লাহ তা'আলা শিশুর জননীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন যে, শিশুদেরকে দুধ পান করানোর পূর্ণ সময় হচ্ছে দু’বছর। এর পরে দুধ পান করলে তা ধর্তব্য নয় এবং এ সময়ে দুটি শিশু একত্রে দুধ পান করলে তারা তাদের পরস্পরের দুধ ভাই বা দুধ বোন হওয়া সাব্যস্ত হবে না। সুতরাং তাদের মধ্যে বিয়ে হারাম হবে না। অধিকাংশ ইমামের এটাই মাযহাব। জামেউত তিরমিযী শরীফের মধ্যে এই অধ্যায় রয়েছে : “যে দুধ পান দ্বারা নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হয় তা এই দু’বছরের পূর্বেই।'অতঃপর হাদীস আনা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “ঐ দুধ পান দ্বারাই নিষিদ্ধতা (পরস্পরের বিয়ের নিষিদ্ধতা) সাব্যস্ত হয়ে থাকে যে দুগ্ধ পাকস্থলীকে পূর্ণ করে দেয় এবং দুধ ছাড়ার পূর্বে হয়। এই হাদীসটি হাসান সহীহ। অধিকাংশ জ্ঞানী, সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) প্রভৃতির এর উপরই আমল হয়েছে যে, দু'বছরের পূর্বের দুধ পানই বিয়ে হারাম করে থাকে। এর পরের সময়ের দুগ্ধ পান বিয়ে হারাম করে না। এই হাদীসের বর্ণনাকারী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তের উপরে রয়েছে। হাদীসের মধ্যে (আরবি) শব্দটির অর্থও হচ্ছে দুগ্ধ পানের সময় অর্থাৎ দু’বছর পূর্বের সময়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শিশু পুত্র হযরত ইবরাহীমের (রাঃ) মৃত্যু হয়েছিল সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ ‘আমার পুত্র দুগ্ধ পানের যুগে মারা গেল, তার জস্য দুগ্ধদানকারী বেহেশতে নির্দিষ্ট রয়েছে। হযরত ইবরাহীম (রাঃ)-এর বয়স ছিল তখন এক বছর দশ মাস। দারেকুতনীর মধ্যে দু’বছরের পরের দুগ্ধ পান ধর্তব্য না হওয়ার একটি হাদীস রয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই সময়ের পরে কিছুই নেই। সুনানে আবূ দাউদ ও তায়ালেসীর বর্ণনায় রয়েছে যে, দুধ ছুটে যাওয়ার পর দুধ পান কোন ধর্তব্য বিষয় নয় এবং সাবালক হওয়ার পর পিতৃহীনতার হুকুম প্রযোজ্য নয়। স্বয়ং কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ দুধ ছাড়ার সময় হচ্ছে দু’বছর।' (৩১:১৪) অন্য জায়গায় রয়েছে(আরবি)অর্থাৎ তাকে বহন করা ও তার দুধ ছাড়ার সময় হচ্ছে ত্রিশ মাস।' দু বছরের পরে দুগ্ধ পানের দ্বারা যে বিয়ের অবৈধতা সাব্যস্ত হয় না এটা হচ্ছে নিম্নলিখিত মনীষীদের উক্তি ও হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত জাবির (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত উম্মে সালমা (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত আতা' (রঃ), এবং জমহুর উলামা।ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), ইমাম ইসহাক (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ), ইমাম মুহাম্মদ (রঃ) এবং ইমাম মালিকেরও (রঃ) এই মাযহাব। তবে ইমাম মালিক (রঃ) হতে একটি বর্ণনায় দু’বছর দু'মাস এবং আর একটি বর্ণনায় দু’বছর তিন মাসও বর্ণিত আছে। বিখ্যাত ইমাম আবু হানীফা (রঃ) দুধ পানের সময় দু’বছর ছ'মাস বলেছেন। ইমাম যুফার (রঃ) তিন বছর বলছেন। ইমাম আওযায়ী (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যদি কোন শিশু দু'বছরের পূর্বেই দুধ ছেড়ে দেয় অতঃপর সে যদি এর পরে অন্য স্ত্রীলোকের দুধ পান করে তবুও অবৈধতা সাব্যস্ত হবে। কেননা, এটা এখন খাদ্যের স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেল।ইমাম আওযায়ী (রঃ) হতে একটি বর্ণনা এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে : ‘দুধ ছাড়িয়ে দেয়ার পর দুগ্ধ পান আর নেই' এ উক্তির দু’টি ভাবার্থ হতে পরে। অর্থাৎ দু'বছরের পরে অথবা এর পূর্বে যখনই দুধ ছাড়ুক না কেন। যেমন, ইমাম মালিকের (রঃ) উক্তি। হাঁ, তবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি (হযরত আয়েশা (রাঃ) দু’বছরের পরেও এমন কি বড় মানুষের দুধ পানকেও বিয়ে অবৈধকারী মনে করতেন। আতা’ (রঃ) ও লায়েসেরও (রঃ) উক্তি এটাই। হযরত আয়েশা (রাঃ) যেখানে কোন পুরুষ লোকের যাতায়াত দরকার মনে করতেন সেখানে নির্দেশ দিতেন যে, স্ত্রীলোকেরা যেন তাকে তাদের দুধ পান করিয়ে দেয়।নিম্নের হাদীসটি তিনি দলীল রূপে পেশ করেন : হযরত আবু হুযাইফার (রাঃ) গোলাম হযরত সালেমকে (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দেন যে, সে যেন আবূ হুযাইফার (রাঃ) স্ত্রীর দুগ্ধ পান করে নেয়। অথচ সে বয়স্ক লোক ছিল এবং এই দুগ্ধ পানের কারণে সে বরাবরই হযরত আবু হুযাইফার (রাঃ) বাড়ীতে যাতায়াত করতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য সহধর্মিণীগণ এটা অস্বীকার করতেন এবং বলতেন যে, এটা সালেমের (রাঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে এই নির্দেশ নয়, এটাই জমহুরেরও মাযহাব। এটাই মাযহাব হচ্ছে ইমাম চুতষ্টয়ের, সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদগণের, বড় বড় সাহাবাই-কিরামের এবং উম্মুল মু'মেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) ছাড়া সমস্ত নবী সহধর্মিণীগণের।তাঁদের দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের ভাই কোটি তা দেখে নাও। দুধ পান সাব্যস্ত সেই সময় হয় যখন দুধ, ক্ষুধা নিবারণ করে থাকে। দুগ্ধ পান সম্পর্কীয় অন্যান্য মাসআলা (আরবি) (৪:২৩) এই আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। অতঃপর ঘোষণা হচ্ছে যে, শিশুদের জননীগণের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব তাদের জনকদের উপর রয়েছে। তারা তা শহরে প্রচলিত প্রথা হিসেবে আদায় করবে। কম বা বেশী না দিয়ে সাধ্যানুসারে তারা শিশুর জননীদের খরচ বহন করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 'সচ্ছল ব্যক্তি তার স্বচ্ছলতা অনুপাতে এবং দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্রতা অনুপাতে খরচ করবে। আল্লাহ তা'আলা কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেন না। সত্বরই আল্লাহ কঠিনের পরে সহজ করবেন। যহহাক (রঃ) বলেন, যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেবে এবং তার সাথে তার শিশুও থাকবে তখন ঐ শিশুর দুগ্ধ পানেরকাল পর্যন্ত শিশুর মায়ের খরচ বহন করা তার স্বামীর উপর ওয়াজিব।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-মা যেন তার শিশুকে দুগ্ধ পান করাতে অস্বীকার করতঃ শিশুর পিতাকে সংকটময় অবস্থায় নিক্ষেপ না করে বরং যেন শিশুকে দুগ্ধ পান করাতে থাকে। কেননা, এটা তার জীবন-যাপনের উপায়ও বটে। অতঃপর যখন শিশুর দুগ্ধের প্রয়োজন মিটে যাবে তখন তাকে তার পিতার নিকট ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তখনও যেন পিতার ক্ষতি করার ইচ্ছে না থাকে। অনুরূপভাবে পিতাও যেন বলপূর্বক শিশুকে তার মায়ের নিকট হতে ছিনিয়ে না নেয়। কেননা, এতে তার মায়ের কষ্ট হবে। উত্তরাধিকারীদেরও উচিত যে, তারা যেন শিশুর মায়ের খরচ কমিয়ে না দেয় এবং তারা যেন তার প্রাপ্যের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তার ক্ষতি না করে।হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের যারা এই উক্তির সমর্থক যে, আত্মীয়দের মধ্যে একে অপরের খরচ বহন করা ওয়াজিব, তাঁরা এই আয়াতটিকে দলীলরূপে গ্রহণ করে থাকেন। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং পূর্ববর্তী জমহুর মনীষীগণ হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত সুমরা (রাঃ) হতে মারফুরূপে বর্ণিত হাদীসটি দ্বারাও এটা প্রমাণিত হচ্ছে। হাদীসটি হচ্ছে, “যে ব্যক্তি তার মুহরিম' আত্মীয়ের মালিক হয়ে যাবে সেই আত্মীয়টি মুক্ত হয়ে যাবে। এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, দু'বছরের পরে শিশুকে দুগ্ধ পান করানো তার জন্যে ক্ষতিকর। সেই ক্ষতি দৈহিকই হোক বা মানসিকই হোক।হযরত আলকামা (রাঃ) একটি স্ত্রী লোককে দেখেন যে, সে দু’বছরের চেয়ে বড় তার এক শিশুকে দুধ পান করাচ্ছে। তখন তিনি তাকে নিষেধ করেন। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, উভয়ের সম্মতি ও পরামর্শক্রমে যদি দু’বছরের পূর্বেই দুধ ছাড়িয়ে দেয়া হয় তবে তাদের কোন পাপ নেই। তবে যদি এতে কোন একজন অসম্মত থাকে তবে এই কাজ ঠিক হবে না। কেননা এতে শিশুর ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এটা আল্লাহ তা'আলার তার বান্দাদের প্রতি পরম করুণা যে, তিনি বাপ-মাকে এমন কাজ হতে বিরত রাখলেন যা শিশুর ধ্বংসের কারণ এবং তাদেরকে এমন কাজ করার নির্দেশ দিলেন যাতে একদিকে শিশুকে রক্ষা করার ব্যবস্থা হলো, অপরদিকে বাপ মায়ের পক্ষেও তা হিতকর হলো। সূরা-ইতালাকের মধ্যে রয়েছে : 'যদি স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে শিশুদেরকে দুগ্ধ পান করায় তবে তোমরা তাদেরকে পারিশ্রমিক প্রদান কর এবং এই ব্যাপারে পরস্পরে পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রেখো এবং তোমরা যদি পরস্পর সংকটপূর্ণ অবস্থায় পতিত হও তবে অন্যের দ্বারা দুধপান করিয়ে নাও।'এখানেও বলা হচ্ছে যে, যদি জনক-জননী পরস্পর সম্মত হয়ে কোন ওজর বশতঃ অন্য কারও দ্বারা দুধ পান করাতে আরম্ভ করে এবং পূর্বের পারিশ্রমিক পূর্ণভাবে জননীকে প্রদান করে তাহলেও উভয়ের কোন পাপ নেই। তখন অন্য কোন ধাত্রীর সাথে পারিশ্রমিকের চুক্তি করতঃ দুধপান করিয়ে নেবে। তোমরা প্রতিটি কাজে আল্লাহকে ভয় করে চল এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা ও কাজ আল্লাহ ভাল ভাবেই জানেন।

আল-বাকারা 2:234

এই আয়াতে নির্দেশ হচ্ছে যে, স্ত্রীগণ তাদের স্বামীদের মৃত্যুর পর যেন চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করে। তাদের সাথে সহবাস হয়ে থাক আর নাই থাক। এর উপর আলেমদের ইজমা হয়েছে। এর একটি দলীল হচ্ছে এই আয়াতটি। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনানের মধ্যে রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযীও (রঃ) ওটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। হাদীসটি এই যে,হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ জিজ্ঞাসিত হন : একটি লোকে একটি স্ত্রী লোককে বিয়ে করেছিল এবং তার সাথে সহবাস করেনি। তার জন্যে কোন মোহরও ধার্য ছিল না। এই অবস্থায় লোকটি মারা যায়। তাহলে বলুন এর ফতওয়া কি হবে:' তারা কয়েকবার তার নিকট যাতায়াত করলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজের মতানুসারে ফতওয়া দিচ্ছি। যদি আমার ফতওয়া ঠিক হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ হতে মনে করবে। আর যদি ভুল হয় তবে জানবে যে এটা আমার ও শয়তানের পক্ষ থেকে হয়েছে। আমার ফতওয়া এই যে, ঐ স্ত্রীকে পূর্ণ মোহর দিতে হবে। এটা তার মৃত স্বামীর আর্থিক অবস্থার অনুপাতে হবে। এতে কম বেশী করা চলবে না। আর স্ত্রীকে পূর্ণ ইদ্দত পালন করতে হবে এবং সে মীরাসও পাবে।' একথা শুনে হযরত মাকাল বিন ইয়াসার আশায়ী (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ বা বিনতে ওয়াসিক (রাঃ)-এর সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই ফায়সালাই করেছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) একথা শুনে অত্যন্ত খুশী হন। .. কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, ‘আশজার’ বহু লোক এটা বর্ণনা করেছেন। তবে স্বামীর মৃত্যুর সময় যে গর্ভবতী থাকবে তার জন্যে এই ইদ্দত নয়। তার ইদ্দত হচ্ছে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। কুরআন পাকে রয়েছে -(আরবি)অর্থাৎ ‘গর্ভবতীদের ইদ্দত হচ্ছে তাদের সন্তান প্রসব করন পর্যন্ত’ (৬৫:৪)। তবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, গর্ভবতীর ইদ্দত হচ্ছে সন্তান প্রসব করার পরে আরও চার মাস দশ দিন। সবচেয়ে বিলম্বের ইদ্দত হচ্ছে গর্ভবতীর ইদ্দত। এই উক্তিটি তো বেশ উত্তম এবং এর দ্বারা দু’টি আয়াতের মধ্যে সুন্দরভাবে ভারসাম্যও রক্ষা হয়।কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এর বিপরীত স্পষ্ট হাদীস বিদ্যমান রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে যে, হযরত সীব'আ আসলামিয়াহ্ (রাঃ)-এর স্বামীর মৃত্যুকালে তিনি গর্ভবতী ছিলেন, স্বামীর ইন্তেকালের কয়েকদিন পরেই তিনি সন্তান প্রসব করেন। নেফাস হতে পবিত্র হয়ে ভাল পোশাক পরিধান করেন। হযরত আবু সানা বিল বিন বাংলাবা(রাঃ) এটা দেখে তাকে বলেন, ‘তুমি কি বিয়ে করতে চাও: আল্লাহর শপথ! চার মাস দশদিন অতিবাহিত না। হওয়া পর্যন্ত তুমি বিয়ে করতে পার না।' একথা শুনে হযরত সাবী'আ (রাঃ) নীরব হয়ে যান এবং সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, সন্তান প্রসবের পর থেকেই তুমি ইদ্দত হতে বেরিয়ে গেছো। সুতরাং এখন তুমি ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পার।' এও বর্ণিত আছে যে, এই হাদীসটি জানার পর হযরত ইবনে আব্বাসও (রাঃ) তাঁর উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেন। এর দ্বারাও এটা জোরদার হয় যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) ছাত্র ও সঙ্গী এই হাদীস দ্বারাই ফতওয়া প্রদান করতেন। দাসীদের ইদ্দতকাল হচ্ছে আযাদ স্ত্রীদের অর্ধেক অর্থাৎ দু'মাস ও পাঁচদিন। এটাই জমহুরের মাযহাব। দাসীদের শারঈ শাস্তি যেমন আযাদ স্ত্রীদের অর্ধেক তেমনই তার ইদ্দতকালও অর্ধেক। মুহাম্মদ বিন সিরীন এবং কতকগুলো উলামা-ই-যাহেরিয়াহ আযাদ ও দাসীর ইদ্দতকাল সমান বলে থাকেন। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রভৃতি বলেনঃ এই ইদ্দতকাল রাখার মধ্যে দুরদর্শিতা এই রয়েছে যে, যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকে তবে এ সময়ের মধ্যে তা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়ে যাবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত মারফু হাদীসে রয়েছে মানব সৃষ্টির অবস্থা এই যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত সে মায়ের গর্ভাশয়ে বীর্যের আকারে থাকে। তার পরে জমাট রক্ত হয়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত থাকে। অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশত পিণ্ড আকারে থাকে। তার পরে আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। উক্ত ফেরেশতা ফু দিয়ে তার ভিতরে আত্মা ভরে দেন। তাহলে মোট একশো বিশ দিন হয়। আর একশো বিশ দিনে চার মাস হয়। সতর্কতার জন্যে আর দশ দিন রেখে দিয়েছেন। কেননা, কোন কোন মাস উনত্রিশ দিনে হয়ে থাকে। ফুঁ দিয়ে যখন আত্মা ভরে দেয়া হয় তখন সন্তানের গতি অনুভূত হতে থাকে এবং গর্ভ সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ জন্যেই ইদ্দতকাল নির্দিষ্ট করা হয়েছে।হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রাঃ) বলেনঃ দশ দিন রাখার কারণ এই যে, এই দশ দিনের মধ্যেই আত্মাকে দেহের ভিতরে ফুঁ দিয়ে ভরে দেয়া হয়। হযরত রাবী বিন আনাসও (রঃ) একথাই বলেন। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যে দাসীর সন্তান জন্মলাভ করে তার ইদ্দতকালও আযাদ স্ত্রীদের সমানই বটে। কেননা, এখন সে শয্যা পেতে বসেছে এবং এটা এই জন্যেও যে, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত আমর বিন আস (রাঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাতের মধ্যে মিশ্রণ এনো না। জেনে রেখো যে, যে দাসীদের সন্তানাদি রয়েছে তাদের মনিবেরা মারা গেলে তাদের ইদ্দতকাল হবে চার মাস ও দশ দিন।'এই হাদীসটি সুনান-ই-আবূ দাউদের মধ্যে অন্যভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম আহমাদ (রঃ) এই হাদীসটিকে মুনকার বলেছেন। কেননা, এর একজন বর্ণনাকারী কাবীসা এই বর্ণনাটি তার শিক্ষক উমার হতে শুনেনি। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইবনে সীরীন (রঃ), আবু আইয়াম (রঃ), যুহরী (রঃ), এবং হযরত উমার বিন আবদুল আযীযেরও (রঃ) এটাই উক্তি। আমীরুল মুমেনীন ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানও এই নির্দেশই দিতেন। আওযাঈ (রঃ), ইবনে রাহুইয়াহ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) একটি বর্ণনায় এটাই বলেছেন। কিন্তু তাউস (রঃ) ও কাতাদাহ (রঃ) তার ইদ্দতকালও অর্ধেক অর্থাৎ দু'মাস পাঁচ দিন বলেছেন।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচর হাসান বিন সালেহ বিন হাই (রঃ) বলেন যে, তাকে ইদ্দতকালরূপে তিন ঋতু পালন করতে হবে। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ, আতা' (রঃ), ও ইবরাহীম নখঈরও (রঃ) এটাই উক্তি। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় রয়েছে যে, তার ইদ্দতকাল একটি ঋতু মাত্র। ইবনে উমার (রাঃ), শাবী (রঃ), লায়েস (রঃ), আবু উবাইদ (রঃ), আবূ সাউর (রঃ), মাকহুল (রঃ) এবং জমহূরের এটাই মাযহাব। হযরত শায়েস (রঃ) বলেন যে, যদি ঋতুর অবস্থায় ঐ দাসীর মনিবের মৃত্যু ঘটে তবে ঐ ঋতু শেষ হলেই তার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি তার ঋতু না আসে তবে তার ইদ্দতকাল হচ্ছে তিন মাস। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও জমহুর বলেনঃ “এক মাস এবং তিন দিন আমাদের নিকট বেশী পছন্দনীয়।পরবর্তী ইরশাদে জানা যাচ্ছে যে, ইদ্দতকালে মৃত স্বামীর জন্যে শোক করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে স্ত্রী লোক আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস করে তার পক্ষে কোন মৃতের উপর তিন দিনের বেশী বিলাপ করা বৈধ নয়, হাঁ, তবে স্বামীর জন্যে চার মাস দশদিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ করবে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। তার চক্ষু দুঃখ প্রকাশ করছে। আমি তার চোখে সুরমা লাগিয়ে দেবো কি:' রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না। দু' তিনবার সে এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) একই উত্তর দেন। অবশেষে তিনি বলেনঃ এটাতো মাত্র চার মাস দশদিন। অজ্ঞতার যুগে তো তোমরা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে।'হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “পূর্বে কোন স্ত্রী লোকের ঋতু হলে তাকে কুঁড়ে ঘরে রেখে দেয়া হতো। সে জঘন্যতম কাপড় পরতো এবং সুগন্ধি জাত দ্রব্য হতে দূরে থাকতো। সারাবছর ধরে এরকম নিকৃষ্ট অবস্থায় কাটাতো। এক বছর পরে বের হতো এবং উটের বিষ্ঠা নিয়ে নিক্ষেপ করতো। অতঃপর কোন প্রাণী যেমন গাধা, ছাগল অথবা পাখির শরীরের সাথে নিজের শরীরকে ঘর্ষণ করতো। কোন কোন সময়ে সে মরেই যেত।' এই তো ছিল অজ্ঞতা যুগের প্রথা। সুতরাং এই আয়াতটি পরবর্তী আয়াতটিকে রহিতকারী। ঐ আয়াতটির মধ্যে রয়েছে যে, এই প্রকারের স্ত্রী লোকেরা এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী একথাই বলেন। কিন্তু এটা বিবেচনার বিষয়। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ সত্ত্বরই আসছে।ভাবার্থ এই যে, এই সময়ে বিধবা স্ত্রী লোকদের জন্যে সৌন্দর্য, সুগন্ধি, উত্তম কাপড় এবং অলংকার নিষিদ্ধ। আর এই শোক প্রকাশ করা ওয়াজিব। তবে একটি উক্তি এও রয়েছে যে, তালাক-ই-রাজঈর ইদ্দতের মধ্যে এটা ওয়াজিব নয়। যখন তালাক-ই-বায়েন হবে তখন ওয়াজিব হওয়া ও না হওয়া এই দুটি উক্তি রয়েছে। মৃত স্বামীদের স্ত্রীদের সবারই উপর এই শোক প্রকাশ ওয়াজিব। তারা সাবালিকাই হোক বা নাবালিকাই হোক অথবা বৃদ্ধাই হোক। তারা আযাদই হোক বা দাসীই হোক। মুসলমানই হোক বা কাফেরই হোক। কেননা, এই আয়াতের মধ্যে সাধারণ নির্দেশ রয়েছে। হাঁ, তবে ইমাম সাউরী (রঃ) এবং আবূ হানীফা (রঃ) অবিশ্বাসকারিণীদের শোক প্রকাশের সমর্থক নন। এটাই আশহাব (রঃ) এবং ইবনে নাফে'রও উক্তি। তাদের দলীল ঐ হাদীসটি যার মধ্যে রয়েছেঃ ‘যে স্ত্রী লোকে আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার জন্যে কোন মৃতের উপর তিন দিনের বেশী বিলাপ করা বৈধ নয়। হাঁ, তবে স্বামীর জন্যে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ করবে।সুতরাং জানা গেল যে এটাও একটা ইবাদতের নির্দেশ। ইমাম সাউরী (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফা (রঃ) নাবালিকা মেয়ের জন্যেও এ কথাই বলে থাকেন। কেননা, তাদের প্রতিও ইবাদতের নির্দেশ নেই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ মুসলমান দাসীদেরকে এর অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন। কিন্তু এসব জিজ্ঞাস্য বিষয়গুলোর মীমাংসা করার স্থান এটা নয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ইদ্দতকাল পালনের পর যদি স্ত্রী লোকেরা সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিতা হয় বা বিয়ে করে তবে তাদের অভিভাবকদের কোন পাপ নেই। এগুলো তাদের জন্যে বৈধ। হাসান বসরী (রঃ) যুহরী (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে।

আল-বাকারা 2:235

ভাবার্থ এই যে, স্পষ্টভাবে না বলে কেউ যদি কোন স্ত্রী লোককে তার ইদ্দতের মধ্যে কোন উত্তম পন্থায় বিয়ের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে তবে কোন পাপ নেই। যেমন তাকে বলে : আমি বিয়ে করতে চাই। আমি এরূপ এরূপ স্ত্রী লোককে পছন্দ করি। আমি চাই যে, আল্লাহ যেন আমার জোড়া মিলিয়ে দেন। ইনশাআল্লাহ আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কোন স্ত্রী লোককে বিয়ে করার ইচ্ছে করবো না। আমি কোন সতী ও ধর্মভীরু স্ত্রী লোককে বিয়ে করতে চাই। অনুরূপভাবে তালাক-ই-বায়েন প্রাপ্তা নারীকেও তার ইদ্দতের মধ্যে এরূপ অস্পষ্ট শব্দগুলো বলা বৈধ। যেমন হযরত ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) নান্নী স্ত্রী লোকটিকে যখন তাঁর স্বামী হযরত আবু আমর বিন হাফস (রাঃ) তৃতীয় তালাক দিয়ে দেন সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেছিলেন : “যখন তোমার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে তখন আমাকে সংবাদ দেবে এবং তুমি ইদ্দতকাল ইবনে উম্মে মাকতুমের ওখানে অতিবাহিত করবে।'ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হলে হযরত ফাতেমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অবহিত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিয়ে হযরত উসামা বিন যায়েদের (রাঃ) সঙ্গে দিয়ে দেন যার তিনি ঘটকালি করেছিলেন। হাঁ, তবে যে স্ত্রীকে তালাক-ই-রাজঈ দেয়া হয়েছে তাকে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারও অস্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার অধিকার নেই। তোমরা তোমাদের অন্তরে যা গোপন করে রেখেছো এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা কোন স্ত্রী লোককে বিয়ে করার আকাংখা যে তোমাদের অন্তরে পোষণ করছে এতে তোমাদের কোন পাপ নেই। অন্য জায়গায় রয়েছে তোমার প্রভু তাদের অন্তরের গোপন কথাও জানেন এবং তিনি প্রকাশ্য কথাও জানেন।' আর এক জায়গায় রয়েছে। আমি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য সব কিছুই জানি।'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা খুব ভাল ভাবেই জানেন যে, তাঁর বান্দাগণ তাদের আকাংখিতা নারীদেরকে অন্তরে স্মরণ করবে। তাই, তিনি সংকীর্ণতা সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন গোপনে ঐ নারীদের কাছে অঙ্গীকার না নিয়ে বসে। অর্থাৎ তারা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকে এবং যেন এই কথা না বলে আমি তোমার প্রতি আসক্ত। সুতরাং তুমিও অঙ্গীকার কর যে, আমাকে ছাড়া আর কাউকেও স্বামীরূপে গ্রহণ করবে না। ইদ্দতের মধ্যে এরূপ ভাষা প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ। কিংবা ইদ্দতের মধ্যে গোপনে বিয়ে করে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তা প্রকাশ করাও বৈধ নয়। সুতরাং এই উক্তিগুলো এই আয়াতের সাধারণ নির্দেশের মধ্যে আসতে পারে।তাই ইরশাদ হচ্ছে-‘বরং বিহিতভাবে তাদের সাথে কথা বলবে। যেমন অভিভাবকদেরকে বলবে : তাড়াতাড়ি করবেন না। ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হলে আমাকে অবহিত করবেন ইত্যাদি। যে পর্যন্ত ইদ্দতকাল শেষ না হবে সে পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না। আলেমদের এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, ইদ্দতের মধ্যে বিয়ে শুদ্ধ নয়। যদি কেউ ইদ্দতের মধ্যে বিয়ে করে নেয় এবং সহবাসও হয়ে যায় তথাপি তাদেরকে পৃথক করে দিতে হবে। এখন সেই স্ত্রী তার জন্যে চিরকালের মত হারাম হয়ে যাবে না-কি ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আবার তাকে বিয়ে করতে পারে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। জমহূরের মতে তাকে আবার বিয়ে করতে পারে। কিন্তু ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, সে চিরকালের জন্যে হারাম হয়ে যাবে। এর দলীল এই যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ ‘ইদ্দতের মধ্যে যে স্ত্রীর বিয়ে হয় এবং স্বামীর সাথে তার মিলন না ঘটে, এরূপ স্বামী-স্ত্রীকে পৃথক করে দেয়া হবে। যখন এই স্ত্রী তার পূর্ব স্বামীর ইদ্দতকাল শেষ করে ফেলবে তখন এই লোকটিও অন্যান্য লোকের মতই তাকে বিয়ের পয়গাম দিতে পারবে। কিন্তু যদি দু’জনের মধ্যে মিলন ঘটে যার তবুও তাদেরকে পৃথক করে দেয়া হবে। অতঃপর এই স্ত্রী লোকটি তার পূর্ব স্বামীর ইদ্দতকাল শেষ করার পর দ্বিতীয় স্বামীর ইদ্দত পালন করবে। এর পরে দ্বিতীয় স্বামী আর কখনও তাকে বিয়ে করতে পারবে না।'এই ফায়সালা দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, যেহেতু সে তাড়াহুড়া করতঃ আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলো না। সেহেতু তাকে এই শাস্তি দেয়া হলে যে, ঐ স্ত্রী তার জন্যে চিরদিনের তরে হারাম হয়ে গেল। যেমন। হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করা হয়। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেন যে, ইমাম মালিকের (রঃ) প্রথম উক্তি এটাই ছিল বটে, কিন্তু পরে তিনি এটা হতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এখন তাঁর নতুন উক্তি এই যে, দ্বিতীয় স্বামী ঐ স্ত্রীকেও বিয়ে করতে পারে। কেননা, হযরত আলীর (রাঃ) ফতওয়া এটাই। হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি সনদ হিসেবে মুনকাতা। বরং হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা হতে প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং বলেছেনঃ ‘মোহর আদায় করতঃ ইদ্দত শেষ হওয়ার পর এরা পরস্পর ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পারে।'অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন- ফ্লেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরের কথা অবগত আছেন। সুতরাং তোমরা এর প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁকে সদা ভয় করে চল। স্ত্রীদের সম্পর্কে তোমাদের অন্তরে আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত চিন্তাও যেন স্থান না পায়। তোমাদের অন্তরকে সদা পরিষ্কার রাখে। কু-ধারণা হতে অন্তরকে পবিত্র রাখো। খোদা ভীতির নির্দেশের সাথে সাথে মহান আল্লাহ স্বীয় দয়া ও করুণার প্রতি লোভ দেখিয়ে বলেছেন যে, বিশ্ব প্রভু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পাপসমূহ ক্ষমাকারী এবং তিনি সহিষ্ণু।

আল-বাকারা 2:236

বিবাহ বন্ধনের পর সহবাসের পূর্বে ও তালাক দেয়ার বৈধতার কথা বলা হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), তাউস (রঃ), ইবরাহীম (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবি) শব্দের অর্থ বিবাহ। সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া, এমন কি মোহর নির্ধারিত না থাকলেও তালাক দেয়া বৈধ। তবে এতে স্ত্রীদের খুবই মনঃকষ্ট হবে বলে স্বামীদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন তাদের অবস্থা অনুপাতে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকে কিছু অর্থ সাহায্য করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওর সর্বোচ্চ অংশ হচ্ছে গোলাম ও নীচে হচ্ছে চাদী এবং সর্বনিম্ন হচ্ছে কাপড়। অর্থাৎ ধনী হলে গোলাম ইত্যাদি তাকে প্রদান করবে। আর যদি গরীব হয় তবে কমপক্ষে তিন খানা কাপড় দেবে। হযরত শাবী (রঃ) বলেন যে, তার জন্যে মধ্যম শ্রেণীর উপকারী বস্তু হবে জামা, দোপাট্টা, লেপ এবং চাদর।শুরাইহ (রঃ) বলেন যে, পাঁচশো দিরহাম প্রদান করবে। ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, গোলাম দেবে বা খাদ্য অথবা কাপড় দেবে। হযরত হাসান বিন আলী (রাঃ) তাঁর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দশ হাজার দিয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, এই প্রেমাস্পদের বিচ্ছেদের তুলনায় এটা অতি নগণ্য। ইমাম আবু হানীফার উক্তি এই যে, যদি এই উপকারী বস্তুর পরিমাণ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় তবে তার বংশের নারীদের যে মোহর রয়েছে তার অর্ধেক প্রদান করবে। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কোন নির্দিষ্ট জিনিসের উপর স্বামীকে বাধ্য করা যাবে না। বরং কমপক্ষে যে জিনিসকে ‘মাতআ' অর্থাৎ উপকারের বস্তু বা আসবাবপত্র বলা হয় ওটাই যথেষ্ট হবে। আমার মতে ঐ কাপড়কে ‘মাতআ' বলা হবে যে কাপড়ে নামায পড়া জায়েয হয়ে থাকে।' ইমাম শাফিঈর (রঃ) প্রথম উক্তি ছিল এইঃ এর সঠিক পরিমাণ আমার জানা নেই। কিন্তু আমার নিকট পছন্দনীয় এই যে, কমপক্ষে ত্রিশ দিরহাম দিতে হবে।' এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু আসবাবপত্র দেয়া উচিত, না শুধুমাত্র সহবাস করা হয়নি এরূপ নারীদেরকেই দিতে হবে এ সম্বন্ধে বহু উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তো সবারই জন্যে বলে থাকেন। কেননা কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তাদের বিহিতের সঙ্গে ‘মাতআ' রয়েছে (২:২৪১।' এই আয়াতটি সাধারণ। সুতরাং প্রত্যেকের জন্যেই এটা সাব্যস্ত হচ্ছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতটিও তাদের দলীল : “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বলে দাও তোমরা যদি ইহলৌকিক জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর তবে এসো, আমি তোমাদেরকে কিছু আসবাব দেই এবং বিহিতভাবে পরিত্যাগ করি।' সুতরাং এই সমুদয় সতী সাধ্বী নারী তাঁরাই ছিলেন যাদের মোহর নির্ধারিত ছিল এবং যারা মহানবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। এটাই ইমাম শাফিঈরও (রঃ) একটি উক্তি। কেউ কেউ তো বলেন যে, এটাই তার নতুন ও সঠিক উক্তি। কেউ কেউ বলেন যে, ঐ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে আসবাব দেয়া কর্তব্য যার সাথে নির্জন ঘরে অবস্থান করা হয়েছে, যদিও তার জন্যে মোহর ধার্য করা হয়ে থাকে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা বিশ্বাস স্থাপনকারিণী নারীদেরকে বিয়ে কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক প্রদান কর, তখন তোমাদের পক্ষ হতে তাদের কোন ইদ্দত নেই যা তারা অতিবাহিত করবে, তোমরা তাদেরকে কিছু আসবাবপত্র দিয়ে দাও এবং বিহিতভাবে পরিত্যাগ কর।' (৩৩:৪৯)।সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) উক্তি এই যে, সূরা-ই-আহযাবের এই আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। হযরত সালাহ বিন সা'দ (রাঃ) এবং হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমাইমাহ বিনতে শুরাহবিল (রাঃ)-কে বিয়ে করেন। তিনি বিদায় নিয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তিনি যেন সেটাকে খারাপ মনে করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসায়েদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “তাকে দুখানা নীল কাপড় দিয়ে বিদায় করে দাও।' তৃতীয় উক্তি এই যে, শুধুমাত্র সেই অবস্থায় স্ত্রীকে মাতআ' দিতে হবে যখন তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে এবং মোহর নির্ধারিত না থাকবে। আর যদি সহবাস হয়ে যায়, মোহর-ই-মিসাল’ অর্থাৎ তার বংশের স্ত্রী লোকদের জন্যে যে মোহর ধার্য রয়েছে ওটাই দিতে হবে। এটা ঐ সময় যখন মোহর ধার্য করা থাকবে না। আর যদি ধার্য হয়ে থাকে এবং সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দেয় তবে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। কিন্তু যদি সহবাস হয়ে গিয়ে থাকে তবে পুরো মোহরই দিতে হবে। আর এটাই মাতআ’র বিনিময় হয়ে যাবে। হাঁ, ঐ বিপদস্তা স্ত্রীর জন্যে মাতআ’ রয়েছে যার সাথে সহবাসও হয়নি এবং মোহরও ধার্য করা হয়নি- এমন অবস্থায় তালাক দেয়া হয়েছে।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং মুজাহিদের (রঃ) উক্তি এটাই। তবে কোন কোন আলেম প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু দেয়া মুস্তাহাব বলে থাকেন। কিন্তু যাদেরকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে এবং মোহর ধার্য করা থাকবে না তাদেরকে তো অবশ্যই দিতে হবে। ইতিপূর্বে সূরা-ই-আহযাবের যে আয়াতটির বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার ভাবার্থ এটাই। এজন্যেই এখানে এই নির্দিষ্ট অবস্থার কথা বলা হচ্ছে যে, ধনী তার অবস্থা অনুপাতে প্রদান করবে এবং গরীবও তার অবস্থা অনুপাতে প্রদান করবে। হযরত শাবী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় : “যে ব্যক্তি তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে এই মাতআ’ অর্থাৎ সংস্থানের ব্যবস্থা করে না দেবে তাকে কি আল্লাহ তা'আলার নিকট দায়ী থাকতে হবে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “নিজের ক্ষমতা অনুসারে দিতে হবে। আল্লাহর শপথ! এই ব্যাপারে কাউকেও দায়ী থাকতে হবে না। যদি এটা ওয়াজিব হতো তবে বিচারকগণ অবশ্যই এরূপ লোককে বন্দী করতেন।

আল-বাকারা 2:237

এই পবিত্র আয়াতের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, পূর্ব আয়াতে যে সব নারীর জন্যে মাতআ' নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তারা শুধুমাত্র ঐসব নারী যাদের বর্ণনা ঐ আয়াতে ছিল। কেননা, এই আয়াতে এই বর্ণনা রয়েছে যে, সহবাসের পূর্বে যখন তালাক দেয়া হবে এবং মোহর নির্দিষ্ট থাকবে, তখন তাদেরকে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। যদি এখানেও এই অর্ধেক মোহর ছাড়া কোন মাতআ ওয়াজিব হতো তবে অবশ্যই তা বর্ণনা করা হতো। কেননা, দু’টি আয়াতের দু'টি অবস্থাকে একের পর এক বর্ণনা করা হচ্ছে। এই আয়াতে বর্ণিত অবস্থার উপর ভিত্তি করে অর্ধমোহরের উপর আলেমদের ইজমা হয়েছে। কিন্তু তিনজনের মতে পূর্ণ মোহর ঐ সময় দিতে হবে যখন খালওয়াত’ হবে। অর্থাৎ যখন স্বামী-স্ত্রী কোন নির্জন ঘরে একত্রিত হয়েছে। এই অবস্থায় সহবাস না হলেও পূর্ণ মোহরই দিতে হবে। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম উক্তি এটাই। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই অবস্থাতেও শুধু অর্ধ মোহরই দিতে হবে।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ “আমিও এটাই বলি এবং আল্লাহর কিতাবের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারাও এটাই বুঝা যায়।' ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী লায়েস বিন আবি সালেমের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। বটে, কিন্তু ইবনে আবি তালহা (রঃ) হতে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এই বর্ণনাটি বর্ণিত আছে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা তারই উক্তি।'অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-এই অবস্থায় যদি স্ত্রীরা স্বেচ্ছায় তাদের অর্ধেক মোহর মাফ করে দেয় তবে এটা অন্য কথা। এই স্বামীর সবই মাফ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সায়্যেবা' (যার কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে) স্ত্রী যদি নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে এ অধিকার তার রয়েছে।' এটাই বহু তাবেঈ তাফসীরকারীর উক্তি। মুহাম্মদ বিন কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ স্ত্রীদের মাফ করে দেয়া নয়, বরং পুরুষদের মাফ করে দেয়া। অর্থাৎ পুরুষ তাদের অর্ধেক অংশ ছেড়ে দিয়ে যদি পূর্ণ মোহরই দিয়ে দেয় তবে তারও এ অধিকার রয়েছে। কিন্তু এ উক্তিটি খুবই বিরল। এই উক্তি আর কারও নেই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-বা ঐ ব্যক্তি ক্ষমা করবে যার হাতে বিবাহ বন্ধন রয়েছে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এর দ্বারা স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ এর দ্বারা কি স্ত্রীদের অভিভাবকগণকে বুঝানো হয়েছে: তিনি বলেনঃ না, বরং এর দ্বারা স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। আরও বহু মুফাসসির হতে এটাই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) নতুন উক্তি এটাই। এটাই ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রভৃতি মনীষীরও মাযহাব। কেননা, প্রকৃতপক্ষে বিয়ে ঠিক রাখা বা ভেঙ্গে দেয়া ইত্যাদি সবকাজই স্বামীর অধিকারে রয়েছে। তা ছাড়া অভিভাবক যার অভিভাবকত্ব করছে তার সম্পদ কাউকে প্রদান করা যেমন তার জন্যে বৈধ নয়, অনুরূপভাবে তার মোহর মাফ করে দেয়ারও তার অধিকার নেই। এব্যাপারে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা স্ত্রীর পিতা, ভ্রাতা এবং ঐসব লোককে বুঝানো হয়েছে যাদের অনুমতি ছাড়া তার বিয়ে হতে পারে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ), আলকামা (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ), আতা’ (রঃ) তাউস (রঃ), যুহরী (রঃ), রাবী'আ (রঃ), যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং মুহাম্মদ বিন সিরীন (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈরও (রঃ) পূর্ব উক্তি এটাই। তাদের দলীল এই যে, ওলীই তো তাকে ঐ হকের হকদার করেছে। সুতরাং ঐ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যদিও অন্য মালে হেরফের করার তার অধিকার নেই। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করার অধিকার স্ত্রীকে দিয়েছেন। সে যদি কার্পণ্য ও মনের সংকীর্ণতা প্রকাশ করে তবে তার অভিভাবক ক্ষমা করতে পারে যদিও স্ত্রী বুদ্ধিমতী হয়। হযরত শুরাইহও (রঃ) এই কথাই বলেন। কিন্তু শাবী (রঃ) যখন অস্বীকার করেন তখন তিনি ঐ উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বলেন যে, সেটার ভাবার্থ স্বামী। এমন কি তিনি ঐ কথার উপর মুবাহালা করতেও প্রস্তুত ছিলেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের ক্ষমা করে দেয়াই ধর্মপ্রাণতার অতি নিকটবর্তী।' এর দ্বারা স্বামী স্ত্রী দু'জনকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে উত্তম সেই যে নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দেয় অর্থাৎ হয় স্ত্রীই তার অর্ধেক প্রাপ্যও তার স্বামীকে ছেড়ে দেবে অথবা স্বামী তার স্ত্রীর প্রাপ্য অর্ধেক মোহরের পরিবর্তে পূর্ণ মোহরই দিয়ে দেবে। অতঃপর বলা হচ্ছে-“তোমরা পরস্পরের উপকারকে যেন ভুলে যেও না। অর্থাৎ তাকে অকর্মণ্যরূপে ছেড়ে দিও না, বরং তার কার্যের সংস্থান করে দাও। ‘তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই’-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জনগণের উপর এমন এক দংশনকারী যুগ আসবে যে, মু'মিনও তার হাতের জিনিস দাঁত দিয়ে ধরে নেবে এবং পরস্পরের অনুগ্রহের কথা ভুলে যাবে। অথচ আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা রয়েছে- “তোমরা পরস্পরের অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। নিকৃষ্টতম ঐ সমুদয় লোক যারা মুসলমানের অসহায়তা ও অভাবের সময় তার জিনিস সস্তা মূল্যে কিনে নেয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন। তোমার কাছে মঙ্গল কিছু থাকলে তোমার ভাইকেও সেই মঙ্গল পৌছাও এবং তার ধ্বংসের কাজে অংশ নিও না। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। না তাকে কষ্ট দেবে, না তাকে মঙ্গল। হতে বঞ্চিত করবে।হযরত আউন (রাঃ) হাদীসগুলো বর্ণনা করতেন এবং ক্রন্দন করতে থাকতেন। এমনকি তাঁর চোখের অশ্রুতে দাড়ি সিক্ত হয়ে যেতো। তিনি বলতেন : যখন আমি ধনীদের স্পর্শে থাকি তখন সদা মনে দুঃখ অনুভব করি। কেননা, যে দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করি সে দিকেই সবাইকে আমার চাইতে উত্তম পোষাকে, ভাল সুগন্ধিতে এবং চমৎকার সোয়ারীতে দেখতে পাই। তবে গরীবদের মজলিসে মনে বড় আনন্দ পাই। আল্লাহ পাকও ঐ কথাই বলেন যে, তোমরা একে অপরের উপকারের কথা ভুলে যেও না। কারও কাছে কোন ভিক্ষুক আসলে তাকে কিছু দিতে না পারলেও অন্ততঃ তার মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করবে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করছেন। তার কাছে তোমাদের কাজও তোমাদের অবস্থা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে এবং অতি সত্ত্বরই তিনি প্রত্যেক অমঙ্গলকারীকে তার আমলের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।

আল-বাকারা 2:238

২৩৮-২৩৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে-‘তোমরা নামাযসমূহের সময়ের হিফাযত কর,তাঁর সীমাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কর এবং সময়ের প্রথম অংশে নামায আদায় করতে থাকো।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল উত্তম:' তিনি বলেনঃ নামাযকে সময়মত আদায় করা।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘তার পরে কোনটি:' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “তার পরে কোনটি:' তিনি বলেনঃ পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ যদি আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতাম তবে তিনি আরও উত্তর দিতেন (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত উম্মে ফারওয়াহ (রাঃ) যিনি বায়আত গ্রহণকারিণীদের অন্যতম ছিলেন, বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমি শুনেছি, তিনি আমলসমূহের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। ঐ প্রসঙ্গেই তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় কাজ হচ্ছে নামাযকে সময়ের প্রথম অংশে আদায় করার জন্যে তাড়াতাড়ি করা (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' এই হাদীসের একজন বর্ণনাকরী উমরীকে ইমাম তিরমিযী (রঃ) নির্ভরযোগ্য বলেন না। অতঃপর মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। (আরবি) কোন নামাযের নাম এই ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ফজরের নামায।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা ফজরের নামায পড়ছিলেন। সেই নামাযে তিনি হাত উঠিয়ে কুনুতও পড়েছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “এটা ঐ মধ্যবর্তী নামায যাতে কুনুত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা ছিল বসরার মসজিদের ঘটনা এবং তথায় তিনি রুকুর পূর্বে কুনুত পড়েছিলেন। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ “একদা বসরার মসজিদে আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন কায়েসের (রঃ) পিছনে ফজরের নামায আদায় করি। অতঃপর একজন সাহাবীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করিঃ মধ্যবর্তী নামায কোনটি: তখন তিনি বলেনঃ “এই ফজরের নামাযই। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বহু সাহাবা-ই-কেরাম এই সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং সবাই এই উত্তরই দিয়েছিলেন। হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহও (রাঃ) একথাই বলেন এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ কথাই বলেন। কেননা, তাঁদের মতে ফজরের নামাযেই কুনুত রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মাগরিবের নামায। কেননা, এর পূর্বে চার রাকআত বিশিষ্ট নামায রয়েছে এবং পরেও রয়েছে। সফরে এগুলোর কসর পড়তে হয় কিন্তু মাগরিব পুরোই পড়তে হয়। আর একটি কারণ এই যে, এর পরে রাত্রির দুটি নামায রয়েছে অর্থাৎ এশা ও ফজর। এই দুই নামাযে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হয়। আবার এই নামাযের পূর্বে দিনের বেলায় দুটি নামায রয়েছে। অর্থাৎ যুহর ও আসর। এই দুই নামাযে কিরআত ধীরে ধীরে পড়তে হয়। কেউ কেউ বলেন যে, এই নামায হচ্ছে যুহরের নামায। একদা কতকগুলো লোক হযরত যায়েদ বিন সাবিতের (রঃ) সভায় উপবিষ্ট ছিলেন। তথায় এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। জনগণ হযরত উসামার (রাঃ) নিকট এর ফায়সালা নেয়ার জন্যে লোক পাঠালে তিনি বলেনঃ “এটা যুহরের নামায যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সময়ের প্রথমাংশে আদায় করতেন (তায়ালেসীর হাদীস)।হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ সাহাবীগণের (রাঃ) উপর এর চেয়ে ভারী নামায আর একটিও ছিল না। এ জন্যেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এর পূর্বেও দু'টি নামায রয়েছে এবং পরেও দু’টি রয়েছে। হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) হতেই এও বর্ণিত আছে যে,কুরাইশদের প্রেরিত দু'টি লোক তাঁকে এই প্রশ্নই করেছিলেন এবং তিনি উত্তরে ‘আসর বলেছিলেন। পুনরায় আর দু’টি লোক তাঁকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেল তিনি যুহর’ বলেছিলেন। অতঃপর ঐ দু'জন লোক হযরত উসামাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলে তিনি যুহর' বলেছিলেন। তিনি এটাই বলেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই নামাযকে সূর্য পশ্চিম দিকে একটু হেলে গেলেই আদায় করতেন। খুব কষ্ট করে দু'এক সারির লোক উপস্থিত হতেন। কেউ ঘুমিয়ে থাকতেন এবং কেউ ব্যবসায়ে লিপ্ত থাকতেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘হয় জনগণ এই অভ্যাস থেকে বিরত থাকবে না হয় আমি তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেবো।' কিন্তু এর বর্ণনাকারী যীরকান সাহাবীর (রাঃ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। তবে হযরত যায়েদ (রাঃ) হতে অন্যান্য বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি মধ্যবর্তী নামাযের ভাবার্থ যুহরই বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এটা রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রভৃতি হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) হতেও এটারই একটি বর্ণনা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আসরের নামায। অধিকাংশ উলামা, সাহাবা প্রভৃতি মনীষীর এটাই উক্তি। জমহ্র তাবেঈনেরও উক্তি এটাই।হাফিয আৰু মুহাম্মদ আব্দুল মু'মিন জিমইয়াতী (রঃ) এ সম্বন্ধে একটি পৃথক পুস্তিকা রচনা করেছেন যার নাম তিনি দিয়েছেন। এর মধ্যে এই ফায়সালাই রয়েছে যে, (আরবি) হচ্ছে আসরের নামায। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ), হযরত সুমরা বিন জুনদব (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত আবু সাঈদ (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ), হযরত উম্মে সালমা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রভৃতি উঁচু পর্যায়ের আদম সন্তানেরও উক্তি এটাই। তারা এটা বর্ণনাও করেছেন। বহু তাবেঈ (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। ইমাম আবু হানীফারও (রঃ) সহীহ মাযহাব এটাই। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে হাবীব মালিকীও (রঃ) এই কথাই বলেন। এই উক্তির দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খন্দকের যুদ্ধে বলেছিলেন “আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের অন্তর ও তাদের ঘরগুলো আগুন দ্বারা পূর্ণ করুন। তারা (আরবি) অর্থাৎ আসরের নামায হতে বিরত রেখেছে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমরা এর ভাবার্থ নিতাম ফজর অথবা আসরের নামায। অবশেষে খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি একথা শুনতে পাই। সমাধিগুলোকেও আগুন দিয়ে ভরে দেয়ার কথা এসেছে।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেন যে, এটা আসরের নামায। এই হাদীসটির বহু পন্থা রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরাকে (রাঃ) এর সম্বন্ধে একবার জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যেও একবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তখন আবু হাশিম বিন উবা (রাঃ) মজলিস থেকে উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ী চলে যান এবং অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নিকটে জেনে বাইরে এসে আমাদেরকে বলেন যে, এটা আসরের নামায (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।একবার আবদুল আযীয বিন মারওয়ানের (রঃ) মজলিসেও এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টি সম্বন্ধে কথা উঠে। তিনি তখন বলেনঃ “যাও, অমুক সাহাবীর (রাঃ) নিকট গিয়ে এটা জিজ্ঞেস করে এসো।” একথা শুনে এক ব্যক্তি বলেনঃ “এটা আমার নিকট শুনুন। আমার বাল্যাবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এই মাসআলাটিই জিজ্ঞেস করার জন্যে আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কনিষ্ঠাঙ্গুলিটি ধরে বলেনঃ “দেখ, এটা ফজরের নামায। তারপরে ওর পার্শ্বেকার অঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা যুহরের নামায। অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা মাগরিবের নামায। অতঃপর শাহাদাত অঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা হলো এশার নামায। এরপর আমাকে বলেন-“এখন আমাকে বলতো তোমার কোন্ অঙ্গুলিটি অবশিষ্ট রয়েছে: আমি বলি-মধ্যকারটি। তারপরে বলেন- আচ্ছা, এখন কোন্ নামায অবশিষ্ট রয়েছে: আমি বলি- আসরের নামায। তখন তিনি বলেন- “এটাই (আরবি) (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।” কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই গারীব। মোট কথা (আরবি)-এর ভাবার্থ আসরের নামায হওয়া সম্বন্ধে বহু হাদীস এসেছে যেগুলোর মধ্যে কোনটি হাসান, কোনটি সহীহ এবং কোনটি দুর্বল। জামেউত্ তিরমিযী, সহীহ মুসলিম প্রভৃতির মধ্যেও এ হাদীসগুলো রয়েছে। তাছাড়া এই নামাযের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং যারা এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেছে তাদের প্রতি কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন।যেমন একটি হাদীসে রয়েছে : যার আসরের নামায ছুটে গেল তার যেন পরিবারবর্গ ও ধনসম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল।' অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘মেঘের দিনে তোমরা আসরের নামায সময়ের পূর্বভাগেই পড়ে নাও। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দেয় তার আমলসমূহ নষ্ট হয়ে যায়। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) গেফার গোত্রের ‘হামিস নামক উপত্যকায় আসরের নামায আদায় করেন। অতঃপর বলেনঃ “এই নামাযই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপরও পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তা নষ্ট করে দিয়েছিল। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি এই নামায প্রতিষ্ঠিত করে থাকে তাকে দ্বিগুণ পুণ্য দেয়া হয়। এরপরে কোন নামায নেই যে পর্যন্ত না তোমরা তারকা দেখতে পাও (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।হযরত আয়েশা (রাঃ) তার আযাদকৃত গোলাম আবূ ইউনুস (রাঃ)-কে বলেনঃ তুমি আমার জন্যে একটা করে কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ কর এবং যখন তুমি(আরবি) (২:২৩৮) পর্যন্ত পৌঁছবে তখন আমাকে জানাবে। অতঃপর তাকে জানানো হলে তিনি আৰু ইউনুসের (রাঃ) দ্বারা -এর পরেলিখিয়ে নেন এবং বলেনঃ এটা স্বয়ং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' অন্য এক বর্ণনায় (আরবি) শব্দটিও রয়েছে (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত হাফসা (রাঃ) তাঁর কুরআন লেখক হযরত আমর বিন রাফে'র দ্বারা এই আয়াতটি এভাবে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। (মুআত্তা-ই-ইমাম মালিক)। এই হাদীসটিরও বহু ধারা রয়েছে এবং কয়েকটি গ্রন্থে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত হাফসা (রাঃ) বলেছিলেন : ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এ শব্দগুলো শুনেছি।' হযরত নাফে (রাঃ) বলেনঃ “আমি এই কুরআন মাজীদ স্বচক্ষে দেখেছি, এই শব্দই (আরবি)-এর সঙ্গে ছিল।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত উবায়েদ বিন উমায়েরের (রাঃ) কিরআতও এরূপই। এই বর্ণনাগুলো সামনে রেখে কয়েকজন মনীষী বলেন যে, যেহেতু (আরবি)অক্ষরটি (আরবি)-এর জন্যে এসে থাকে এবং (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) অর্থাৎ বিরোধ হয়ে থাকে, সেহেতু বুঝা যাচ্ছে (আরবি) এক জিনিস এবং (আরবি) অন্য জিনিস। কিন্তু এর উত্তর এই যে, যদি ওটাকে হাদীস হিসেবে স্বীকার করা হয় তবে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিই অধিকতর বিশুদ্ধ এবং তাতে স্পষ্টভাবেই বিদ্যমান রয়েছে। এখন বাকি থাকলো (আরবি) সম্বন্ধে কথা। তা হলে হতে পারে যে, এই(আরবি) টি (আরবি) নয়, বরং এটা (আরবি) বা অতিরিক্ত (আরবি) হবে। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে(আরবি)-এর মধ্যকার টি (আরবি) অতিরিক্ত। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) (৬৭৫)-এর মধ্যকার (আরবি) এর জন্যে এসেছে (আরবী) টি অতিরিক্ত। কিংবা হয়তো এই (আরবি) টি (আরবি)-এর জন্যে নয়। যেমন : (আরবি) (৩৩:৪০)-এর মধ্যে রয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছে'। (আরবি) (৮৭:১-৪)এসব স্থলে (আরবি) টি বিশেষণের সংযোগের জন্যে এসেছে।(আরবি)ও(আরবি)-কে পৃথক করণের জন্যে নয়। এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কবিদের কবিতার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। নাহবীদের ইমাম সিবওয়াই বলেন যে, (আরবি) এটা বলা শুদ্ধ হবে। অথচ এখানে (আরবি)ও (আরবি)একই ব্যক্তি। আর যদি এই শব্দগুলোকে কুরআনী শব্দ হিসেবে মেনে নেয়া হয় তবে তো এটা স্পষ্ট কথা যে, (আরবি) দ্বারা কুরআন মাজীদের পঠন সাব্যস্ত হয় , যে পর্যন্ত না, (আরবি) বা ক্রমপরম্পরা দ্বারা তা সাব্যস্ত হয়। এজন্যেই হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর কুরআনে এই কিরআত গ্রহণ করেননি। সপ্তকারীর পঠনেও এই শব্দগুলো নেই বা অন্য কোন বিশ্বস্ত কারীর পঠনেও নেই। তাছাড়া অন্য একটি হাদীস রয়েছে যার দ্বারা এই কিরআতের রহিত হয়ে যাওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত বারা বিন আজিব (রাঃ) বর্ণনা করেন (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং আমরা কিছু দিন ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এটা পড়তে থাকি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এটা রহিত করে দেন এবং (আরবি) অবতীর্ণ করেন। এর উপর ভিত্তি করে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত পঠন শব্দ হিসেবে রহিত হয়ে যাবে। আর যদি (আরবি) অক্ষরটিকে রূপে (আরবি) স্বীকার করা হয় তবে শব্দ ও অর্থ উভয় দিক দিয়েই রহিত হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মাগরিবের নামায। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু এর সনদে সমালোচনা রয়েছে। অন্য আরও কয়েকজন মনীষীরও এই উক্তি রয়েছে। এর একটি কারণ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, অন্যান্য নামায চার রাকআত বিশিষ্ট বা দই রাকআত বিশিষ্ট। কিন্তু এই নামায় (মাগরিব) তিন রাকআত বিশিষ্ট। সুতরাং এ দিক দিয়ে এটা মধ্যবর্তী নামায। দ্বিতীয় কারণ এই যে, ফরয নামাযের মধ্যে এটা বে নামায। তৃতীয় কারণ এই যে, এ নামাযের ফযীলতের বহু হাদীস এসেছে। কেউ কেউ এর ভাবার্থ এশার নামাযও বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মধ্যে এক ওয়াক্ত নামায।কিন্তু সেটা কোন ওয়াক্তের নামায তা আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। এটা আমাদের নিকট অজ্ঞাত। যেমন লাইলাতুল কাদর’ সারা বছরের মধ্যে বা রমযান শরীফের পূর্ণ মাসের মধ্যে অথবা উক্ত মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে। কিন্তু তা আমাদের নিকট অজ্ঞাত। কোন কোন মনীষী এটাও বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সমষ্টি। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে এশা এবং ফজরের নামায। কারো কারো মতে এটাই হচ্ছে জুমআর নামায। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে ভয়ের নামায। আবার কারও মতে এটা হচ্ছে ঈদের নামায। কেউ কেউ এটাকে চাশতের নামায বলেছেন। কেউ কেউ বলেনঃ “আমরা এ সম্বন্ধে নীরবতা অবলম্বন করি এবং কোন একটি মতই পোষণ করি না। কেননা, বিভিন্ন দলীল রয়েছে এবং কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার কারণ আমাদের জানা নেই। কোন একটি উক্তির উপর ইজমাও হয়নি এবং সাহাবীদের (রাঃ) যুগ হতে আজ পর্যন্ত এ সম্বন্ধে মতানৈক্য চলে আসছে। যেমন হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, এ ব্যাপারে সাহাবীগণ (রাঃ) এরূপ বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিলেন-অতঃপর তিনি অঙ্গুলির উপর অঙ্গুলি রেখে দেখিয়ে দেন। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, শেষের উক্তিগুলো সবই দুর্বল। মতানৈক্য রয়েছে শুধু ফজর ও আসর নিয়ে। বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ দ্বারা আসরের নামায (আরবি) হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। সমস্ত উক্তি ছেড়ে দিয়ে এই বিশ্বাস রাখাই উচিত যে, হচ্ছে আসরের নামায। ইমাম আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান বিন আবু হাতীম রাযী (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ফাযায়েল-ই-শাফিঈ (রঃ)-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলতেন: (আরবি) অর্থাৎ আমার যে কোন কথার বিপরীত বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত হয় তখন নবী (সঃ)-এর হাদীসই উত্তম। খবরদার! তোমরা আমাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করো না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) এই উক্তি ইমাম রাবী' (রঃ), ইমাম যাফরানী (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত মূসা আবুল ওয়ালিদ বিন জারূদ (রঃ) ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে নকল করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ অর্থাৎ আমার যে উক্তি হাদীসের উল্টো হয় তখন আমি আমার উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করি এবং স্পষ্টভাবে বলি যে, ওটাই আমার মাযহাব যা হাদীসে রয়েছে। এটা ইমাম সাহেবের বিশ্বস্ততা ও নেতৃত্বে এবং মাননীয় ইমামদের প্রত্যেকেই তারই মত একথাই বলেছেন যে, তাঁদের উক্তিকে যেন ধর্ম মনে করাহয়। এজন্যেই কাযী মাওয়ারদী (রঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর ব্যাপারে ইমাম শাফিঈরও (রঃ) এই মাযহাব মনে করা উচিত যে, ওটা আসরের নামায। যদিও তাঁর নতুন উক্তি এই যে, ওটা আসর নয়, তথাপি আমি তার নির্দেশক্রমে তাঁর উক্তিকে বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীত পাওয়ার কারণে ওটা পরিত্যাগ করলাম।শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী আরও বহু মুহাদ্দিসও একথাই বলেছেন। শাফিঈ মাযহাবের কয়েকজন ফিকাহ শাস্ত্রবিদ বলেন যে, ইমাম শাফিঈর (রঃ) একটি মাত্র উক্তি যে, ওটা হচ্ছে ফজরের নামায। কিন্তু তাফসীরের মধ্যে এইসব কথা আলোচনা করা উচিত নয়। পৃথকভাবে আমি ওগুলো বর্ণনা করেছি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- তোমরা বিনয় ও দারিদ্রের সাথে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হও। এর মধ্যে এটা অবশ্যই রয়েছে যে, নামাযের মধ্যে মানব সম্বন্ধীয় কোন কথা থাকবে না। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) সালামের উত্তর দেননি এবং নামায শেষে তাকে বলেনঃ নামায হচ্ছে নিমগ্নতার কাজ।' হযরত মুআবিয়া বিন হাকাম (রাঃ) নামাযের অবস্থায় কথা বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেছিলেন ও নামাযের মধ্যে মানবীয় কোন কথা বলা উচিত নয়। এতো হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার কাজ (সহীহ মুসলিম)।মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) বলেনঃ এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে মানুষ নামাযের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাগুলোও বলে ফেলতো। অতঃপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে মানুষকে নামাযের মধ্যে নীরব থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এই হাদীসের মধ্যে একটা সমস্যা এই রয়েছে যে, নামাযের মধ্যে কথাবার্তা বলার নিষিদ্ধতার নির্দেশ আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরে ও মদীনায় হিজরতের পূর্বে মক্কা শরীফেই অবতীর্ণ হয়েছিল। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আবিসিনিয়ায় হিজরতের পূর্বে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর নামাযের অবস্থায় সালাম দিতাম এবং তিনি নামাযের মধ্যেই উত্তর দিতেন। আবিসিনিয়া হতে ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর নামাযের অবস্থাতেই সালাম দেই। কিন্তু তিনি উত্তর দেননি। এতে আমার দুঃখের সীমা ছিল না। নামায শেষে তিনি আমাকে বলেনঃ “হে আবদুল্লাহ! অন্য কোন কথা নেই। আমি নামাযে ছিলাম বলেই তোমার সালামের উত্তর দেইনি। আল্লাহ যে নির্দেশ দিতে চান তাই দিয়ে থাকেন। তিনি এটা নতুন নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা নামাযের মধ্যে কথা বলো না। অথচ এই আয়াতটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল।এখন হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) মানুষ নামাযের মধ্যে প্রয়োজনে তার ভাই-এর সাথে কথা বলতো”-এই কথার ভাবার্থ আলেমগণ এই বলেন যে, এটা কথার শ্রেণী বিশেষ এবং নিষিদ্ধতা হিসেবে এই আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করাও হচ্ছে তাঁর নিজস্ব অনুভূতি মাত্র। আবার কেউ কেউ বলেন যে, সম্ভবতঃ নামাযের মধ্যে দু'বার বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং দু'বার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই অধিকতর স্পষ্ট। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি যা হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সালামের উত্তর না দেয়ায় আমার এই ভয় ছিল যে, সম্ভবতঃ আমার সম্বন্ধে কোন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষে আমাকে সম্বোধন করে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুসলমান ব্যক্তি। তোমার উপর শান্তি ও আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা যে নির্দেশ দিতে চান তাই দিয়ে থাকেন। সুতরাং যখন তোমরা নামাযে থাকবে তখন বিনয় প্রকাশ করবে ও নীরব থাকবে। ইতিপূর্বে য়েহেতু নামাযের পুরোপুরি সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সেহেতু এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেখানে পুরোপুরিভাবে নামাযের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। যেমন, যুদ্ধের মাঠে যখন শত্রু সৈন্য সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকে সেই সময়ের জন্যে নির্দেশ হচ্ছে‘যেভাবে সম্ভব হয় সেভাবেই তোমরা নামায আদায় কর। অর্থাৎ তোমরা সোয়ারীর উপরই থাক বা পদব্রজেই চল, কিবলার দিকে মুখ করতে পার আর নাই পার, তোমাদের সুবিধামত নামায আদায় কর। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আয়াতের ভাবার্থ এটাই বর্ণনা করেছেন। এমনকি হযরত নাফে' (রঃ) বলেনঃ “আমি তো জানি যে, এটা মারফু হাদীস। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কঠিন ভয়ের সময় তোমরা সোয়ারীর উপর আরূঢ় থাকলেও ইঙ্গিতে নামায পড়ে নাও।' হযরত আবদুল্লাহ বিন আনাস (রাঃ)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) খালিদ বিন সুফইয়ানকে হত্যা করার জন্যে প্রেরণ করেন তখন তিনি এভাবেই ইঙ্গিতে আসরের নামায আদায় করেছিলেন। (সুনান-ই-আবু দাউদ)।সুতরাং মহান আল্লাহ এর দ্বারা স্বীয় বান্দাদের উপর কর্তব্য খুবই সহজ করে দিয়েছেন এবং তাদের বোঝা হালকা করেছেন। ভয়ের নামায এক রাকআত পড়ার কথাও এসেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নবীর (সঃ) ভাষায় তোমাদের বাড়ীতে অবস্থানের সময় তোমাদের উপর চার রাকআত নামায ফরয করেছেন এবং সফরের অবস্থায় দু'রাকআত ও ভয়ের অবস্থায় এক রাকআত নামায ফরয করেছেন (সহীহ মুসলিম)। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন যে, এটা অতিরিক্ত ভয়ের সময় প্রযোজ্য। হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং আরও বহু মনীষী ভয়ের নামায এক রাকআত বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর মধ্যে দূর্গ বিজয়ের সময় ও শক্ত সৈন্যের সম্মুখীন হওয়ার সময় নামায আদায় করা নামে একটি অধ্যায়। রেখেছেন। ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, যদি বিজয় লাভ আসন্ন হয়ে যায়। এবং নামায আদায় করার সাধ্য না হয় তবে প্রত্যেক লোক তার শক্তি অনুসারে ইশারায় নামায পড়ে নেবে। যদি এটুকু সময় পাওয়া না যায় তবে বিলম্ব করবে যে পর্যন্ত না যুদ্ধ শেষ হয়। আর যদি নিরাপত্তা লাভ হয় তবে দু'রাকআত পড়বে নচেৎ এক রাকআতই যথেষ্ট। কিন্তু শুধু তাকবীর পাঠ করা যথেষ্ট নয় বরং বিলম্ব করবে যে পর্যন্ত না নিরাপদ হয়। মাকহুলও (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ ‘তাসতার দূর্গের যুদ্ধে সেনাবাহিনীর মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। সুবেহ সাদিকের সময় ভীষণ যুদ্ধ চলছিল। নামায আদায় করার সময়ই আমরা পাইনি। অনেক বেলা হলে পরে আমরা সেদিন ফজরের নামায আদায় করি। ঐ নামাযের বিনিময়ে যদি আমি দুনিয়া ও ওর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবই পেয়ে যাই তবুও আমি সন্তুষ্ট নই। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ। ইমাম বুখারী (রঃ) ঐ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যার মধ্যে রয়েছে যে, খন্দকের যুদ্ধে সূর্য পূর্ণ অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসরের নামায পড়তে পারেননি।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সাহাবীগণকে (রাঃ) বানী কুরাইযার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন বানী কুরাইযার মধ্যে ছাড়া আসরের নামায না পড়ে। তখন আসরের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ তো সেখানেই নামায আদায় করেন এবং বলেনরাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আমরা যেন খুব তাড়াতাড়ি চলি যাতে তথায় পৌছে আসরের সময় হয়। আবার কতকগুলো লোক নামায পড়েননি। অবশেষে সূর্য অস্তমিত হয়। বানী কুরাইযার নিকট গিয়ে তারা আসরের নামায আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ সংবাদ জানতে পেরেও এদেরকে বা ওঁদেরকে ধমকের সুরে কিছুই বলেননি। সুতরাং এর দ্বারাই ইমাম বুখারী (রঃ) যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামাযকে বিলম্ব করে পড়ার বৈধতার দলীল নিয়েছেন। কিন্তু জমহুর এর বিপরীত বলেছেন। তারা বলেন যে, সূরা-ই-নিসার মধ্যে যে(আরবি)-এর নির্দেশ রয়েছে এবং যে নামায শরীয়ত সম্মত হওয়ার কথা এবং যে নামাযের নিয়ম-কানুন হাদীসসমূহে এসেছে তা খন্দকের যুদ্ধের পরের ঘটনা। যেমন আবু সাঈদ (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর বর্ণনায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মাকহুল (রঃ) এবং ইমাম আওযায়ীর (রঃ) উত্তর এই যে, এটা পরে শরীয়ত সম্মত হওয়া এই বৈধতার উল্টো হতে পারে না যে, এটাও জায়েয এবং ওটাও নিয়ম। কেননা এরূপ অবস্থা খুবই বিরল। আর এরূপ অবস্থায় নামাযকে বিলম্বে পড়া জায়েয। যেহেতু স্বয়ং সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হযরত ফারূকে আযমের যুগে ‘তাসতার বিজয়ের সময় এর উপর আমল করেন এবং কেউ কোন অস্বীকৃতিও জ্ঞাপন করেননি।অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে-“যখন তোমরা নিরাপত্তা লাভ কর তখন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পুরোপুরিভাবে পালন করতে অবহেলা করো না। যেমন আমি তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছি এবং অজ্ঞতার পরে জ্ঞান ও বিবেক দিয়েছি, তেমনই তোমাদের উচিত যে, তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশরূপে শান্তভাবে আমাকে স্মরণ করবে। যেমন তিনি ভয়ের নামাযের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনযখন তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে তখন নামাযকে উত্তমরূপে আদায় করবে। নামাযকে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা মুমিনদের উপর ফরয।(আরবি)-এর পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-নিসার আয়াত (আরবি) এর তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।

আল-বাকারা 2:239

২৩৮-২৩৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে-‘তোমরা নামাযসমূহের সময়ের হিফাযত কর,তাঁর সীমাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কর এবং সময়ের প্রথম অংশে নামায আদায় করতে থাকো।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল উত্তম:' তিনি বলেনঃ নামাযকে সময়মত আদায় করা।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘তার পরে কোনটি:' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “তার পরে কোনটি:' তিনি বলেনঃ পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ যদি আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতাম তবে তিনি আরও উত্তর দিতেন (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত উম্মে ফারওয়াহ (রাঃ) যিনি বায়আত গ্রহণকারিণীদের অন্যতম ছিলেন, বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমি শুনেছি, তিনি আমলসমূহের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। ঐ প্রসঙ্গেই তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় কাজ হচ্ছে নামাযকে সময়ের প্রথম অংশে আদায় করার জন্যে তাড়াতাড়ি করা (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' এই হাদীসের একজন বর্ণনাকরী উমরীকে ইমাম তিরমিযী (রঃ) নির্ভরযোগ্য বলেন না। অতঃপর মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। (আরবি) কোন নামাযের নাম এই ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ফজরের নামায।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা ফজরের নামায পড়ছিলেন। সেই নামাযে তিনি হাত উঠিয়ে কুনুতও পড়েছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “এটা ঐ মধ্যবর্তী নামায যাতে কুনুত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা ছিল বসরার মসজিদের ঘটনা এবং তথায় তিনি রুকুর পূর্বে কুনুত পড়েছিলেন। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ “একদা বসরার মসজিদে আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন কায়েসের (রঃ) পিছনে ফজরের নামায আদায় করি। অতঃপর একজন সাহাবীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করিঃ মধ্যবর্তী নামায কোনটি: তখন তিনি বলেনঃ “এই ফজরের নামাযই। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বহু সাহাবা-ই-কেরাম এই সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং সবাই এই উত্তরই দিয়েছিলেন। হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহও (রাঃ) একথাই বলেন এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ কথাই বলেন। কেননা, তাঁদের মতে ফজরের নামাযেই কুনুত রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মাগরিবের নামায। কেননা, এর পূর্বে চার রাকআত বিশিষ্ট নামায রয়েছে এবং পরেও রয়েছে। সফরে এগুলোর কসর পড়তে হয় কিন্তু মাগরিব পুরোই পড়তে হয়। আর একটি কারণ এই যে, এর পরে রাত্রির দুটি নামায রয়েছে অর্থাৎ এশা ও ফজর। এই দুই নামাযে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হয়। আবার এই নামাযের পূর্বে দিনের বেলায় দুটি নামায রয়েছে। অর্থাৎ যুহর ও আসর। এই দুই নামাযে কিরআত ধীরে ধীরে পড়তে হয়। কেউ কেউ বলেন যে, এই নামায হচ্ছে যুহরের নামায। একদা কতকগুলো লোক হযরত যায়েদ বিন সাবিতের (রঃ) সভায় উপবিষ্ট ছিলেন। তথায় এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। জনগণ হযরত উসামার (রাঃ) নিকট এর ফায়সালা নেয়ার জন্যে লোক পাঠালে তিনি বলেনঃ “এটা যুহরের নামায যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সময়ের প্রথমাংশে আদায় করতেন (তায়ালেসীর হাদীস)।হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ সাহাবীগণের (রাঃ) উপর এর চেয়ে ভারী নামায আর একটিও ছিল না। এ জন্যেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এর পূর্বেও দু'টি নামায রয়েছে এবং পরেও দু’টি রয়েছে। হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) হতেই এও বর্ণিত আছে যে,কুরাইশদের প্রেরিত দু'টি লোক তাঁকে এই প্রশ্নই করেছিলেন এবং তিনি উত্তরে ‘আসর বলেছিলেন। পুনরায় আর দু’টি লোক তাঁকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেল তিনি যুহর’ বলেছিলেন। অতঃপর ঐ দু'জন লোক হযরত উসামাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলে তিনি যুহর' বলেছিলেন। তিনি এটাই বলেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই নামাযকে সূর্য পশ্চিম দিকে একটু হেলে গেলেই আদায় করতেন। খুব কষ্ট করে দু'এক সারির লোক উপস্থিত হতেন। কেউ ঘুমিয়ে থাকতেন এবং কেউ ব্যবসায়ে লিপ্ত থাকতেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘হয় জনগণ এই অভ্যাস থেকে বিরত থাকবে না হয় আমি তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেবো।' কিন্তু এর বর্ণনাকারী যীরকান সাহাবীর (রাঃ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। তবে হযরত যায়েদ (রাঃ) হতে অন্যান্য বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি মধ্যবর্তী নামাযের ভাবার্থ যুহরই বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এটা রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রভৃতি হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) হতেও এটারই একটি বর্ণনা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আসরের নামায। অধিকাংশ উলামা, সাহাবা প্রভৃতি মনীষীর এটাই উক্তি। জমহ্র তাবেঈনেরও উক্তি এটাই।হাফিয আৰু মুহাম্মদ আব্দুল মু'মিন জিমইয়াতী (রঃ) এ সম্বন্ধে একটি পৃথক পুস্তিকা রচনা করেছেন যার নাম তিনি দিয়েছেন। এর মধ্যে এই ফায়সালাই রয়েছে যে, (আরবি) হচ্ছে আসরের নামায। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ), হযরত সুমরা বিন জুনদব (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত আবু সাঈদ (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ), হযরত উম্মে সালমা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রভৃতি উঁচু পর্যায়ের আদম সন্তানেরও উক্তি এটাই। তারা এটা বর্ণনাও করেছেন। বহু তাবেঈ (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। ইমাম আবু হানীফারও (রঃ) সহীহ মাযহাব এটাই। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে হাবীব মালিকীও (রঃ) এই কথাই বলেন। এই উক্তির দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খন্দকের যুদ্ধে বলেছিলেন “আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের অন্তর ও তাদের ঘরগুলো আগুন দ্বারা পূর্ণ করুন। তারা (আরবি) অর্থাৎ আসরের নামায হতে বিরত রেখেছে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমরা এর ভাবার্থ নিতাম ফজর অথবা আসরের নামায। অবশেষে খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি একথা শুনতে পাই। সমাধিগুলোকেও আগুন দিয়ে ভরে দেয়ার কথা এসেছে।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেন যে, এটা আসরের নামায। এই হাদীসটির বহু পন্থা রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরাকে (রাঃ) এর সম্বন্ধে একবার জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যেও একবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তখন আবু হাশিম বিন উবা (রাঃ) মজলিস থেকে উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ী চলে যান এবং অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নিকটে জেনে বাইরে এসে আমাদেরকে বলেন যে, এটা আসরের নামায (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।একবার আবদুল আযীয বিন মারওয়ানের (রঃ) মজলিসেও এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টি সম্বন্ধে কথা উঠে। তিনি তখন বলেনঃ “যাও, অমুক সাহাবীর (রাঃ) নিকট গিয়ে এটা জিজ্ঞেস করে এসো।” একথা শুনে এক ব্যক্তি বলেনঃ “এটা আমার নিকট শুনুন। আমার বাল্যাবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) এই মাসআলাটিই জিজ্ঞেস করার জন্যে আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কনিষ্ঠাঙ্গুলিটি ধরে বলেনঃ “দেখ, এটা ফজরের নামায। তারপরে ওর পার্শ্বেকার অঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা যুহরের নামায। অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা মাগরিবের নামায। অতঃপর শাহাদাত অঙ্গুলি ধরে বলেন, এটা হলো এশার নামায। এরপর আমাকে বলেন-“এখন আমাকে বলতো তোমার কোন্ অঙ্গুলিটি অবশিষ্ট রয়েছে: আমি বলি-মধ্যকারটি। তারপরে বলেন- আচ্ছা, এখন কোন্ নামায অবশিষ্ট রয়েছে: আমি বলি- আসরের নামায। তখন তিনি বলেন- “এটাই (আরবি) (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।” কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই গারীব। মোট কথা (আরবি)-এর ভাবার্থ আসরের নামায হওয়া সম্বন্ধে বহু হাদীস এসেছে যেগুলোর মধ্যে কোনটি হাসান, কোনটি সহীহ এবং কোনটি দুর্বল। জামেউত্ তিরমিযী, সহীহ মুসলিম প্রভৃতির মধ্যেও এ হাদীসগুলো রয়েছে। তাছাড়া এই নামাযের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং যারা এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেছে তাদের প্রতি কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন।যেমন একটি হাদীসে রয়েছে : যার আসরের নামায ছুটে গেল তার যেন পরিবারবর্গ ও ধনসম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল।' অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘মেঘের দিনে তোমরা আসরের নামায সময়ের পূর্বভাগেই পড়ে নাও। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দেয় তার আমলসমূহ নষ্ট হয়ে যায়। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) গেফার গোত্রের ‘হামিস নামক উপত্যকায় আসরের নামায আদায় করেন। অতঃপর বলেনঃ “এই নামাযই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপরও পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তা নষ্ট করে দিয়েছিল। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি এই নামায প্রতিষ্ঠিত করে থাকে তাকে দ্বিগুণ পুণ্য দেয়া হয়। এরপরে কোন নামায নেই যে পর্যন্ত না তোমরা তারকা দেখতে পাও (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।হযরত আয়েশা (রাঃ) তার আযাদকৃত গোলাম আবূ ইউনুস (রাঃ)-কে বলেনঃ তুমি আমার জন্যে একটা করে কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ কর এবং যখন তুমি(আরবি) (২:২৩৮) পর্যন্ত পৌঁছবে তখন আমাকে জানাবে। অতঃপর তাকে জানানো হলে তিনি আৰু ইউনুসের (রাঃ) দ্বারা -এর পরেলিখিয়ে নেন এবং বলেনঃ এটা স্বয়ং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' অন্য এক বর্ণনায় (আরবি) শব্দটিও রয়েছে (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত হাফসা (রাঃ) তাঁর কুরআন লেখক হযরত আমর বিন রাফে'র দ্বারা এই আয়াতটি এভাবে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। (মুআত্তা-ই-ইমাম মালিক)। এই হাদীসটিরও বহু ধারা রয়েছে এবং কয়েকটি গ্রন্থে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত হাফসা (রাঃ) বলেছিলেন : ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এ শব্দগুলো শুনেছি।' হযরত নাফে (রাঃ) বলেনঃ “আমি এই কুরআন মাজীদ স্বচক্ষে দেখেছি, এই শব্দই (আরবি)-এর সঙ্গে ছিল।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত উবায়েদ বিন উমায়েরের (রাঃ) কিরআতও এরূপই। এই বর্ণনাগুলো সামনে রেখে কয়েকজন মনীষী বলেন যে, যেহেতু (আরবি)অক্ষরটি (আরবি)-এর জন্যে এসে থাকে এবং (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) অর্থাৎ বিরোধ হয়ে থাকে, সেহেতু বুঝা যাচ্ছে (আরবি) এক জিনিস এবং (আরবি) অন্য জিনিস। কিন্তু এর উত্তর এই যে, যদি ওটাকে হাদীস হিসেবে স্বীকার করা হয় তবে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিই অধিকতর বিশুদ্ধ এবং তাতে স্পষ্টভাবেই বিদ্যমান রয়েছে। এখন বাকি থাকলো (আরবি) সম্বন্ধে কথা। তা হলে হতে পারে যে, এই(আরবি) টি (আরবি) নয়, বরং এটা (আরবি) বা অতিরিক্ত (আরবি) হবে। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে(আরবি)-এর মধ্যকার টি (আরবি) অতিরিক্ত। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) (৬৭৫)-এর মধ্যকার (আরবি) এর জন্যে এসেছে (আরবী) টি অতিরিক্ত। কিংবা হয়তো এই (আরবি) টি (আরবি)-এর জন্যে নয়। যেমন : (আরবি) (৩৩:৪০)-এর মধ্যে রয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছে'। (আরবি) (৮৭:১-৪)এসব স্থলে (আরবি) টি বিশেষণের সংযোগের জন্যে এসেছে।(আরবি)ও(আরবি)-কে পৃথক করণের জন্যে নয়। এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কবিদের কবিতার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। নাহবীদের ইমাম সিবওয়াই বলেন যে, (আরবি) এটা বলা শুদ্ধ হবে। অথচ এখানে (আরবি)ও (আরবি)একই ব্যক্তি। আর যদি এই শব্দগুলোকে কুরআনী শব্দ হিসেবে মেনে নেয়া হয় তবে তো এটা স্পষ্ট কথা যে, (আরবি) দ্বারা কুরআন মাজীদের পঠন সাব্যস্ত হয় , যে পর্যন্ত না, (আরবি) বা ক্রমপরম্পরা দ্বারা তা সাব্যস্ত হয়। এজন্যেই হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর কুরআনে এই কিরআত গ্রহণ করেননি। সপ্তকারীর পঠনেও এই শব্দগুলো নেই বা অন্য কোন বিশ্বস্ত কারীর পঠনেও নেই। তাছাড়া অন্য একটি হাদীস রয়েছে যার দ্বারা এই কিরআতের রহিত হয়ে যাওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত বারা বিন আজিব (রাঃ) বর্ণনা করেন (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং আমরা কিছু দিন ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এটা পড়তে থাকি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এটা রহিত করে দেন এবং (আরবি) অবতীর্ণ করেন। এর উপর ভিত্তি করে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত পঠন শব্দ হিসেবে রহিত হয়ে যাবে। আর যদি (আরবি) অক্ষরটিকে রূপে (আরবি) স্বীকার করা হয় তবে শব্দ ও অর্থ উভয় দিক দিয়েই রহিত হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মাগরিবের নামায। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু এর সনদে সমালোচনা রয়েছে। অন্য আরও কয়েকজন মনীষীরও এই উক্তি রয়েছে। এর একটি কারণ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, অন্যান্য নামায চার রাকআত বিশিষ্ট বা দই রাকআত বিশিষ্ট। কিন্তু এই নামায় (মাগরিব) তিন রাকআত বিশিষ্ট। সুতরাং এ দিক দিয়ে এটা মধ্যবর্তী নামায। দ্বিতীয় কারণ এই যে, ফরয নামাযের মধ্যে এটা বে নামায। তৃতীয় কারণ এই যে, এ নামাযের ফযীলতের বহু হাদীস এসেছে। কেউ কেউ এর ভাবার্থ এশার নামাযও বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মধ্যে এক ওয়াক্ত নামায।কিন্তু সেটা কোন ওয়াক্তের নামায তা আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। এটা আমাদের নিকট অজ্ঞাত। যেমন লাইলাতুল কাদর’ সারা বছরের মধ্যে বা রমযান শরীফের পূর্ণ মাসের মধ্যে অথবা উক্ত মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে। কিন্তু তা আমাদের নিকট অজ্ঞাত। কোন কোন মনীষী এটাও বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সমষ্টি। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে এশা এবং ফজরের নামায। কারো কারো মতে এটাই হচ্ছে জুমআর নামায। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে ভয়ের নামায। আবার কারও মতে এটা হচ্ছে ঈদের নামায। কেউ কেউ এটাকে চাশতের নামায বলেছেন। কেউ কেউ বলেনঃ “আমরা এ সম্বন্ধে নীরবতা অবলম্বন করি এবং কোন একটি মতই পোষণ করি না। কেননা, বিভিন্ন দলীল রয়েছে এবং কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার কারণ আমাদের জানা নেই। কোন একটি উক্তির উপর ইজমাও হয়নি এবং সাহাবীদের (রাঃ) যুগ হতে আজ পর্যন্ত এ সম্বন্ধে মতানৈক্য চলে আসছে। যেমন হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, এ ব্যাপারে সাহাবীগণ (রাঃ) এরূপ বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিলেন-অতঃপর তিনি অঙ্গুলির উপর অঙ্গুলি রেখে দেখিয়ে দেন। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, শেষের উক্তিগুলো সবই দুর্বল। মতানৈক্য রয়েছে শুধু ফজর ও আসর নিয়ে। বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ দ্বারা আসরের নামায (আরবি) হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। সমস্ত উক্তি ছেড়ে দিয়ে এই বিশ্বাস রাখাই উচিত যে, হচ্ছে আসরের নামায। ইমাম আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান বিন আবু হাতীম রাযী (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ফাযায়েল-ই-শাফিঈ (রঃ)-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলতেন: (আরবি) অর্থাৎ আমার যে কোন কথার বিপরীত বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত হয় তখন নবী (সঃ)-এর হাদীসই উত্তম। খবরদার! তোমরা আমাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করো না। ইমাম শাফিঈর (রঃ) এই উক্তি ইমাম রাবী' (রঃ), ইমাম যাফরানী (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত মূসা আবুল ওয়ালিদ বিন জারূদ (রঃ) ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে নকল করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ অর্থাৎ আমার যে উক্তি হাদীসের উল্টো হয় তখন আমি আমার উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করি এবং স্পষ্টভাবে বলি যে, ওটাই আমার মাযহাব যা হাদীসে রয়েছে। এটা ইমাম সাহেবের বিশ্বস্ততা ও নেতৃত্বে এবং মাননীয় ইমামদের প্রত্যেকেই তারই মত একথাই বলেছেন যে, তাঁদের উক্তিকে যেন ধর্ম মনে করাহয়। এজন্যেই কাযী মাওয়ারদী (রঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর ব্যাপারে ইমাম শাফিঈরও (রঃ) এই মাযহাব মনে করা উচিত যে, ওটা আসরের নামায। যদিও তাঁর নতুন উক্তি এই যে, ওটা আসর নয়, তথাপি আমি তার নির্দেশক্রমে তাঁর উক্তিকে বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীত পাওয়ার কারণে ওটা পরিত্যাগ করলাম।শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী আরও বহু মুহাদ্দিসও একথাই বলেছেন। শাফিঈ মাযহাবের কয়েকজন ফিকাহ শাস্ত্রবিদ বলেন যে, ইমাম শাফিঈর (রঃ) একটি মাত্র উক্তি যে, ওটা হচ্ছে ফজরের নামায। কিন্তু তাফসীরের মধ্যে এইসব কথা আলোচনা করা উচিত নয়। পৃথকভাবে আমি ওগুলো বর্ণনা করেছি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- তোমরা বিনয় ও দারিদ্রের সাথে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হও। এর মধ্যে এটা অবশ্যই রয়েছে যে, নামাযের মধ্যে মানব সম্বন্ধীয় কোন কথা থাকবে না। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) সালামের উত্তর দেননি এবং নামায শেষে তাকে বলেনঃ নামায হচ্ছে নিমগ্নতার কাজ।' হযরত মুআবিয়া বিন হাকাম (রাঃ) নামাযের অবস্থায় কথা বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেছিলেন ও নামাযের মধ্যে মানবীয় কোন কথা বলা উচিত নয়। এতো হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার কাজ (সহীহ মুসলিম)।মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) বলেনঃ এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে মানুষ নামাযের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাগুলোও বলে ফেলতো। অতঃপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে মানুষকে নামাযের মধ্যে নীরব থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এই হাদীসের মধ্যে একটা সমস্যা এই রয়েছে যে, নামাযের মধ্যে কথাবার্তা বলার নিষিদ্ধতার নির্দেশ আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরে ও মদীনায় হিজরতের পূর্বে মক্কা শরীফেই অবতীর্ণ হয়েছিল। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আবিসিনিয়ায় হিজরতের পূর্বে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর নামাযের অবস্থায় সালাম দিতাম এবং তিনি নামাযের মধ্যেই উত্তর দিতেন। আবিসিনিয়া হতে ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর নামাযের অবস্থাতেই সালাম দেই। কিন্তু তিনি উত্তর দেননি। এতে আমার দুঃখের সীমা ছিল না। নামায শেষে তিনি আমাকে বলেনঃ “হে আবদুল্লাহ! অন্য কোন কথা নেই। আমি নামাযে ছিলাম বলেই তোমার সালামের উত্তর দেইনি। আল্লাহ যে নির্দেশ দিতে চান তাই দিয়ে থাকেন। তিনি এটা নতুন নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা নামাযের মধ্যে কথা বলো না। অথচ এই আয়াতটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল।এখন হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) মানুষ নামাযের মধ্যে প্রয়োজনে তার ভাই-এর সাথে কথা বলতো”-এই কথার ভাবার্থ আলেমগণ এই বলেন যে, এটা কথার শ্রেণী বিশেষ এবং নিষিদ্ধতা হিসেবে এই আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করাও হচ্ছে তাঁর নিজস্ব অনুভূতি মাত্র। আবার কেউ কেউ বলেন যে, সম্ভবতঃ নামাযের মধ্যে দু'বার বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং দু'বার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই অধিকতর স্পষ্ট। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি যা হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সালামের উত্তর না দেয়ায় আমার এই ভয় ছিল যে, সম্ভবতঃ আমার সম্বন্ধে কোন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষে আমাকে সম্বোধন করে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুসলমান ব্যক্তি। তোমার উপর শান্তি ও আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা যে নির্দেশ দিতে চান তাই দিয়ে থাকেন। সুতরাং যখন তোমরা নামাযে থাকবে তখন বিনয় প্রকাশ করবে ও নীরব থাকবে। ইতিপূর্বে য়েহেতু নামাযের পুরোপুরি সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সেহেতু এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেখানে পুরোপুরিভাবে নামাযের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। যেমন, যুদ্ধের মাঠে যখন শত্রু সৈন্য সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকে সেই সময়ের জন্যে নির্দেশ হচ্ছে‘যেভাবে সম্ভব হয় সেভাবেই তোমরা নামায আদায় কর। অর্থাৎ তোমরা সোয়ারীর উপরই থাক বা পদব্রজেই চল, কিবলার দিকে মুখ করতে পার আর নাই পার, তোমাদের সুবিধামত নামায আদায় কর। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এই আয়াতের ভাবার্থ এটাই বর্ণনা করেছেন। এমনকি হযরত নাফে' (রঃ) বলেনঃ “আমি তো জানি যে, এটা মারফু হাদীস। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কঠিন ভয়ের সময় তোমরা সোয়ারীর উপর আরূঢ় থাকলেও ইঙ্গিতে নামায পড়ে নাও।' হযরত আবদুল্লাহ বিন আনাস (রাঃ)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) খালিদ বিন সুফইয়ানকে হত্যা করার জন্যে প্রেরণ করেন তখন তিনি এভাবেই ইঙ্গিতে আসরের নামায আদায় করেছিলেন। (সুনান-ই-আবু দাউদ)।সুতরাং মহান আল্লাহ এর দ্বারা স্বীয় বান্দাদের উপর কর্তব্য খুবই সহজ করে দিয়েছেন এবং তাদের বোঝা হালকা করেছেন। ভয়ের নামায এক রাকআত পড়ার কথাও এসেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নবীর (সঃ) ভাষায় তোমাদের বাড়ীতে অবস্থানের সময় তোমাদের উপর চার রাকআত নামায ফরয করেছেন এবং সফরের অবস্থায় দু'রাকআত ও ভয়ের অবস্থায় এক রাকআত নামায ফরয করেছেন (সহীহ মুসলিম)। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন যে, এটা অতিরিক্ত ভয়ের সময় প্রযোজ্য। হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং আরও বহু মনীষী ভয়ের নামায এক রাকআত বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর মধ্যে দূর্গ বিজয়ের সময় ও শক্ত সৈন্যের সম্মুখীন হওয়ার সময় নামায আদায় করা নামে একটি অধ্যায়। রেখেছেন। ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, যদি বিজয় লাভ আসন্ন হয়ে যায়। এবং নামায আদায় করার সাধ্য না হয় তবে প্রত্যেক লোক তার শক্তি অনুসারে ইশারায় নামায পড়ে নেবে। যদি এটুকু সময় পাওয়া না যায় তবে বিলম্ব করবে যে পর্যন্ত না যুদ্ধ শেষ হয়। আর যদি নিরাপত্তা লাভ হয় তবে দু'রাকআত পড়বে নচেৎ এক রাকআতই যথেষ্ট। কিন্তু শুধু তাকবীর পাঠ করা যথেষ্ট নয় বরং বিলম্ব করবে যে পর্যন্ত না নিরাপদ হয়। মাকহুলও (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ ‘তাসতার দূর্গের যুদ্ধে সেনাবাহিনীর মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। সুবেহ সাদিকের সময় ভীষণ যুদ্ধ চলছিল। নামায আদায় করার সময়ই আমরা পাইনি। অনেক বেলা হলে পরে আমরা সেদিন ফজরের নামায আদায় করি। ঐ নামাযের বিনিময়ে যদি আমি দুনিয়া ও ওর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবই পেয়ে যাই তবুও আমি সন্তুষ্ট নই। এটা সহীহ বুখারীর শব্দ। ইমাম বুখারী (রঃ) ঐ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যার মধ্যে রয়েছে যে, খন্দকের যুদ্ধে সূর্য পূর্ণ অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসরের নামায পড়তে পারেননি।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সাহাবীগণকে (রাঃ) বানী কুরাইযার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন বানী কুরাইযার মধ্যে ছাড়া আসরের নামায না পড়ে। তখন আসরের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ তো সেখানেই নামায আদায় করেন এবং বলেনরাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আমরা যেন খুব তাড়াতাড়ি চলি যাতে তথায় পৌছে আসরের সময় হয়। আবার কতকগুলো লোক নামায পড়েননি। অবশেষে সূর্য অস্তমিত হয়। বানী কুরাইযার নিকট গিয়ে তারা আসরের নামায আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ সংবাদ জানতে পেরেও এদেরকে বা ওঁদেরকে ধমকের সুরে কিছুই বলেননি। সুতরাং এর দ্বারাই ইমাম বুখারী (রঃ) যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামাযকে বিলম্ব করে পড়ার বৈধতার দলীল নিয়েছেন। কিন্তু জমহুর এর বিপরীত বলেছেন। তারা বলেন যে, সূরা-ই-নিসার মধ্যে যে(আরবি)-এর নির্দেশ রয়েছে এবং যে নামায শরীয়ত সম্মত হওয়ার কথা এবং যে নামাযের নিয়ম-কানুন হাদীসসমূহে এসেছে তা খন্দকের যুদ্ধের পরের ঘটনা। যেমন আবু সাঈদ (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর বর্ণনায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মাকহুল (রঃ) এবং ইমাম আওযায়ীর (রঃ) উত্তর এই যে, এটা পরে শরীয়ত সম্মত হওয়া এই বৈধতার উল্টো হতে পারে না যে, এটাও জায়েয এবং ওটাও নিয়ম। কেননা এরূপ অবস্থা খুবই বিরল। আর এরূপ অবস্থায় নামাযকে বিলম্বে পড়া জায়েয। যেহেতু স্বয়ং সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হযরত ফারূকে আযমের যুগে ‘তাসতার বিজয়ের সময় এর উপর আমল করেন এবং কেউ কোন অস্বীকৃতিও জ্ঞাপন করেননি।অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে-“যখন তোমরা নিরাপত্তা লাভ কর তখন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পুরোপুরিভাবে পালন করতে অবহেলা করো না। যেমন আমি তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছি এবং অজ্ঞতার পরে জ্ঞান ও বিবেক দিয়েছি, তেমনই তোমাদের উচিত যে, তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশরূপে শান্তভাবে আমাকে স্মরণ করবে। যেমন তিনি ভয়ের নামাযের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনযখন তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে তখন নামাযকে উত্তমরূপে আদায় করবে। নামাযকে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা মুমিনদের উপর ফরয।(আরবি)-এর পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-নিসার আয়াত (আরবি) এর তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।

আল-বাকারা 2:240

২৪০-২৪২ নং আয়াতের তাফসীরঅধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এই আয়াতটি এর পূর্ববর্তী আয়াত (অর্থাৎ চার মাস দশ দিন ইদ্দত বিশিষ্ট আয়াত) দ্বারা রহিত হয়েছে। সহীহ। বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ)-কে বলেনঃ এই আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং আপনি এটাকে আর কুরআন মাজীদের মধ্যে লিখিয়ে নিচ্ছেন কেন:' তিনি বলেনঃ হে ভ্রাতুস্পুত্র! পূর্ববর্তী কুরআনে যেমন এটা বিদ্যমান রয়েছে তেমনই এখানেও থাকবে। আমি কোন হের ফের করতে পারি না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ পূর্বে তো এই নির্দেশই ছিল-এক বছর ধরে ঐ বিধবা স্ত্রীদেরকে তাদের মৃত স্বামীদের সম্পদ হতে ভাত-কাপড় দিতে হবে এবং তাদেরকে ঐ বাড়ীতেই রাখতে হবে। অতঃপর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াত এটাকে রহিত করে এবং স্বামীর সন্তান থাকলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে স্ত্রীর জন্যে এক অষ্টমাংশ, আর সন্তান না থাকলে এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করা হয়। আর স্ত্রীর ইদ্দতকাল নির্ধারিত হয় চার মাস ও দশ দিন। অধিকাংশ সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি রহিত হয়েছে। সাঈদ বিন মুসাইয়ার (রঃ) বলেন যে, সূরা-ইআহযাবের। (আরবি) (৩৩:৪৯) এই আয়াত দ্বারা সুরা-ই-বাকারার এই আয়াতটিকে রহিত করা হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এক বছরের মধ্যে চার মাস দশ দিন তো হচ্ছে মূল ইদ্দতকাল এবং এটা অতিবাহিত করা স্ত্রীর জন্যে ওয়াজিব। আর অবশিষ্ট সাত মাস ও বিশ দিন। স্ত্রী তার মৃত স্বামীর বাড়ীতেও থাকতে পারে বা চলেও যেতে পারে। মীরাসের আয়াত এটাকেও মানসূখ করে দিয়েছে। সে যেখানে পারে সেখানে গিয়ে ইদ্দত পালন করবে। বাড়ীর খরচ বহন স্বামীর দায়িত্বে নেই। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই আয়াত তো এক বছরের ইদ্দতকে ওয়াজিবই করেনি। সুতরাং রহিত হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এটা তো শুধুমাত্র স্বামীর অসিয়ত এবং সেটাকেও স্ত্রী ইচ্ছে করলে পুরো করবে আর না করলে না করবে। তার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।' (আরবি) শব্দের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে অসিয়ত করছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে অসিয়ত করছেন।(আরবি) শব্দের পূর্বে ।(আরবি) শব্দ উহ্য মেনে ওকে (আরবি) দেয়া হয়েছে। সুতরাং স্ত্রীরা যদি পুরো এক বছর তাদের মৃত স্বামীদের বাড়ীতেই থাকে তবে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে না। যদি তারা ইদ্দতকাল কাটিয়ে সেচ্ছায় চলে যায় তবে তাদেরকে বাধা দেয়া হবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন। আরও বহু। লোক এটাকেই গ্রহণ করে থাকেন। আর অবশিষ্ট দল এটাকে মানসূখ বলে থাকেন। এখন যদি ইদ্দতকালের পরবর্তী কাল মানসূখ’ হওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য হয় তবে তো ভাল কথা, নচেৎ এ ব্যাপারে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, স্ত্রীকে অবশ্যই মৃত স্বামীর বাড়ীতেই ইদ্দতকাল অতিবাহিত করতে হবে। তাঁদের দলীল হচ্ছে মুআত্তা-ই-মালিকের নিম্নের হাদীসটি-হয়রত আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ভগ্নী হযরত ফারী'আ বিনতে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে এসে বলেনঃ আমাদের ক্ৰতি দাসের পালিয়ে গিয়েছিল। আমার স্বামী তাদের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। কুদুম' নামক স্থানে তার সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটে এবং তারা তাকে হত্যা করে ফেলে। তার কোন ঘর-বাড়ী নেই যেখানে আমি ইদ্দতকাল অতিবাহিত করি এবং কোন পানাহারের জিনিসও নেই। সুতরাং আপনার অনুমতি হলে আমি আমার পিত্রালয়ে চলে গিয়ে তথায় আমার ইদ্দতকাল কাটিয়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, অনুমতি দেয়া হলো। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হয়েছি এবং এখনও কক্ষেই রয়েছি এমন সময় তিনি আমাকে ডেকে পাঠান বা নিজেই ডাক দেন এবং বলেনঃ তুমি কি বলছিলে:' আমি পুনরায় ঘটনাটি বর্ণনা করি। তখন তিনি বলেনঃ “তোমার ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বাড়ীতেই থাক। সুতরাং আমি সেখানেই আমার ইদ্দতকাল চার মাস দশ দিন অতিবাহিত করি।'হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে আমাকে ডেকে পাঠান এবং এই মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফায়সালাসহ আমার ঘটনাটি বর্ণনা করি। হযরত উসমান (রাঃ) এরই অনুসরণ করেন এবং এটাই ফায়সালা দেন।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে ‘মাতআ' দেয়া সম্বন্ধে জনগণ বলতো : “আমরা ইচ্ছে হলে দেবো, না হলে না দেবো।' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতটিকে সামনে রেখেই কেউ কেউ প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু দেয়া ওয়াজিব বলে থাকেন। আর কেউ কেউ ওটাকে শুধুমাত্র এইসব নারীর স্বার্থে নির্দিষ্ট মনে করেন যাদের বর্ণনা পূর্বে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঐসব নারী যাদের সাথে সহবাস হয়নি এবং মোহরও নির্ধারিত হয়নি এমতাবস্থায় তালাক দেয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্ব দলের উত্তর এই যে, সাধারণভাবে কোন নারীর বর্ণনা দেয়া ঐ অবস্থারই সাথে ঐ নির্দেশকে নির্দিষ্ট করে না। এটাই হচ্ছে প্রসিদ্ধ মাযহাব।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-এভাবেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নিদর্শনাবলী হালাল, হারাম, ফারায়েয, হুদুদ এবং আদেশ ও নিষেধ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন কোন কিছু গুপ্ত ও অস্পষ্ট না থাকে এবং যেন তা সবারই বোধগম্য হয়।

আল-বাকারা 2:241

২৪০-২৪২ নং আয়াতের তাফসীরঅধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এই আয়াতটি এর পূর্ববর্তী আয়াত (অর্থাৎ চার মাস দশ দিন ইদ্দত বিশিষ্ট আয়াত) দ্বারা রহিত হয়েছে। সহীহ। বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ)-কে বলেনঃ এই আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং আপনি এটাকে আর কুরআন মাজীদের মধ্যে লিখিয়ে নিচ্ছেন কেন:' তিনি বলেনঃ হে ভ্রাতুস্পুত্র! পূর্ববর্তী কুরআনে যেমন এটা বিদ্যমান রয়েছে তেমনই এখানেও থাকবে। আমি কোন হের ফের করতে পারি না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ পূর্বে তো এই নির্দেশই ছিল-এক বছর ধরে ঐ বিধবা স্ত্রীদেরকে তাদের মৃত স্বামীদের সম্পদ হতে ভাত-কাপড় দিতে হবে এবং তাদেরকে ঐ বাড়ীতেই রাখতে হবে। অতঃপর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াত এটাকে রহিত করে এবং স্বামীর সন্তান থাকলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে স্ত্রীর জন্যে এক অষ্টমাংশ, আর সন্তান না থাকলে এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করা হয়। আর স্ত্রীর ইদ্দতকাল নির্ধারিত হয় চার মাস ও দশ দিন। অধিকাংশ সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি রহিত হয়েছে। সাঈদ বিন মুসাইয়ার (রঃ) বলেন যে, সূরা-ইআহযাবের। (আরবি) (৩৩:৪৯) এই আয়াত দ্বারা সুরা-ই-বাকারার এই আয়াতটিকে রহিত করা হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এক বছরের মধ্যে চার মাস দশ দিন তো হচ্ছে মূল ইদ্দতকাল এবং এটা অতিবাহিত করা স্ত্রীর জন্যে ওয়াজিব। আর অবশিষ্ট সাত মাস ও বিশ দিন। স্ত্রী তার মৃত স্বামীর বাড়ীতেও থাকতে পারে বা চলেও যেতে পারে। মীরাসের আয়াত এটাকেও মানসূখ করে দিয়েছে। সে যেখানে পারে সেখানে গিয়ে ইদ্দত পালন করবে। বাড়ীর খরচ বহন স্বামীর দায়িত্বে নেই। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই আয়াত তো এক বছরের ইদ্দতকে ওয়াজিবই করেনি। সুতরাং রহিত হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এটা তো শুধুমাত্র স্বামীর অসিয়ত এবং সেটাকেও স্ত্রী ইচ্ছে করলে পুরো করবে আর না করলে না করবে। তার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।' (আরবি) শব্দের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে অসিয়ত করছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে অসিয়ত করছেন।(আরবি) শব্দের পূর্বে ।(আরবি) শব্দ উহ্য মেনে ওকে (আরবি) দেয়া হয়েছে। সুতরাং স্ত্রীরা যদি পুরো এক বছর তাদের মৃত স্বামীদের বাড়ীতেই থাকে তবে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে না। যদি তারা ইদ্দতকাল কাটিয়ে সেচ্ছায় চলে যায় তবে তাদেরকে বাধা দেয়া হবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন। আরও বহু। লোক এটাকেই গ্রহণ করে থাকেন। আর অবশিষ্ট দল এটাকে মানসূখ বলে থাকেন। এখন যদি ইদ্দতকালের পরবর্তী কাল মানসূখ’ হওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য হয় তবে তো ভাল কথা, নচেৎ এ ব্যাপারে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, স্ত্রীকে অবশ্যই মৃত স্বামীর বাড়ীতেই ইদ্দতকাল অতিবাহিত করতে হবে। তাঁদের দলীল হচ্ছে মুআত্তা-ই-মালিকের নিম্নের হাদীসটি-হয়রত আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ভগ্নী হযরত ফারী'আ বিনতে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে এসে বলেনঃ আমাদের ক্ৰতি দাসের পালিয়ে গিয়েছিল। আমার স্বামী তাদের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। কুদুম' নামক স্থানে তার সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটে এবং তারা তাকে হত্যা করে ফেলে। তার কোন ঘর-বাড়ী নেই যেখানে আমি ইদ্দতকাল অতিবাহিত করি এবং কোন পানাহারের জিনিসও নেই। সুতরাং আপনার অনুমতি হলে আমি আমার পিত্রালয়ে চলে গিয়ে তথায় আমার ইদ্দতকাল কাটিয়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, অনুমতি দেয়া হলো। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হয়েছি এবং এখনও কক্ষেই রয়েছি এমন সময় তিনি আমাকে ডেকে পাঠান বা নিজেই ডাক দেন এবং বলেনঃ তুমি কি বলছিলে:' আমি পুনরায় ঘটনাটি বর্ণনা করি। তখন তিনি বলেনঃ “তোমার ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বাড়ীতেই থাক। সুতরাং আমি সেখানেই আমার ইদ্দতকাল চার মাস দশ দিন অতিবাহিত করি।'হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে আমাকে ডেকে পাঠান এবং এই মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফায়সালাসহ আমার ঘটনাটি বর্ণনা করি। হযরত উসমান (রাঃ) এরই অনুসরণ করেন এবং এটাই ফায়সালা দেন।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে ‘মাতআ' দেয়া সম্বন্ধে জনগণ বলতো : “আমরা ইচ্ছে হলে দেবো, না হলে না দেবো।' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতটিকে সামনে রেখেই কেউ কেউ প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু দেয়া ওয়াজিব বলে থাকেন। আর কেউ কেউ ওটাকে শুধুমাত্র এইসব নারীর স্বার্থে নির্দিষ্ট মনে করেন যাদের বর্ণনা পূর্বে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঐসব নারী যাদের সাথে সহবাস হয়নি এবং মোহরও নির্ধারিত হয়নি এমতাবস্থায় তালাক দেয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্ব দলের উত্তর এই যে, সাধারণভাবে কোন নারীর বর্ণনা দেয়া ঐ অবস্থারই সাথে ঐ নির্দেশকে নির্দিষ্ট করে না। এটাই হচ্ছে প্রসিদ্ধ মাযহাব।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-এভাবেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নিদর্শনাবলী হালাল, হারাম, ফারায়েয, হুদুদ এবং আদেশ ও নিষেধ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন কোন কিছু গুপ্ত ও অস্পষ্ট না থাকে এবং যেন তা সবারই বোধগম্য হয়।

আল-বাকারা 2:242

২৪০-২৪২ নং আয়াতের তাফসীরঅধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এই আয়াতটি এর পূর্ববর্তী আয়াত (অর্থাৎ চার মাস দশ দিন ইদ্দত বিশিষ্ট আয়াত) দ্বারা রহিত হয়েছে। সহীহ। বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ)-কে বলেনঃ এই আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং আপনি এটাকে আর কুরআন মাজীদের মধ্যে লিখিয়ে নিচ্ছেন কেন:' তিনি বলেনঃ হে ভ্রাতুস্পুত্র! পূর্ববর্তী কুরআনে যেমন এটা বিদ্যমান রয়েছে তেমনই এখানেও থাকবে। আমি কোন হের ফের করতে পারি না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ পূর্বে তো এই নির্দেশই ছিল-এক বছর ধরে ঐ বিধবা স্ত্রীদেরকে তাদের মৃত স্বামীদের সম্পদ হতে ভাত-কাপড় দিতে হবে এবং তাদেরকে ঐ বাড়ীতেই রাখতে হবে। অতঃপর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াত এটাকে রহিত করে এবং স্বামীর সন্তান থাকলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে স্ত্রীর জন্যে এক অষ্টমাংশ, আর সন্তান না থাকলে এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করা হয়। আর স্ত্রীর ইদ্দতকাল নির্ধারিত হয় চার মাস ও দশ দিন। অধিকাংশ সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি রহিত হয়েছে। সাঈদ বিন মুসাইয়ার (রঃ) বলেন যে, সূরা-ইআহযাবের। (আরবি) (৩৩:৪৯) এই আয়াত দ্বারা সুরা-ই-বাকারার এই আয়াতটিকে রহিত করা হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এক বছরের মধ্যে চার মাস দশ দিন তো হচ্ছে মূল ইদ্দতকাল এবং এটা অতিবাহিত করা স্ত্রীর জন্যে ওয়াজিব। আর অবশিষ্ট সাত মাস ও বিশ দিন। স্ত্রী তার মৃত স্বামীর বাড়ীতেও থাকতে পারে বা চলেও যেতে পারে। মীরাসের আয়াত এটাকেও মানসূখ করে দিয়েছে। সে যেখানে পারে সেখানে গিয়ে ইদ্দত পালন করবে। বাড়ীর খরচ বহন স্বামীর দায়িত্বে নেই। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই আয়াত তো এক বছরের ইদ্দতকে ওয়াজিবই করেনি। সুতরাং রহিত হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এটা তো শুধুমাত্র স্বামীর অসিয়ত এবং সেটাকেও স্ত্রী ইচ্ছে করলে পুরো করবে আর না করলে না করবে। তার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।' (আরবি) শব্দের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে অসিয়ত করছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে অসিয়ত করছেন।(আরবি) শব্দের পূর্বে ।(আরবি) শব্দ উহ্য মেনে ওকে (আরবি) দেয়া হয়েছে। সুতরাং স্ত্রীরা যদি পুরো এক বছর তাদের মৃত স্বামীদের বাড়ীতেই থাকে তবে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে না। যদি তারা ইদ্দতকাল কাটিয়ে সেচ্ছায় চলে যায় তবে তাদেরকে বাধা দেয়া হবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন। আরও বহু। লোক এটাকেই গ্রহণ করে থাকেন। আর অবশিষ্ট দল এটাকে মানসূখ বলে থাকেন। এখন যদি ইদ্দতকালের পরবর্তী কাল মানসূখ’ হওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য হয় তবে তো ভাল কথা, নচেৎ এ ব্যাপারে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, স্ত্রীকে অবশ্যই মৃত স্বামীর বাড়ীতেই ইদ্দতকাল অতিবাহিত করতে হবে। তাঁদের দলীল হচ্ছে মুআত্তা-ই-মালিকের নিম্নের হাদীসটি-হয়রত আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ভগ্নী হযরত ফারী'আ বিনতে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে এসে বলেনঃ আমাদের ক্ৰতি দাসের পালিয়ে গিয়েছিল। আমার স্বামী তাদের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। কুদুম' নামক স্থানে তার সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটে এবং তারা তাকে হত্যা করে ফেলে। তার কোন ঘর-বাড়ী নেই যেখানে আমি ইদ্দতকাল অতিবাহিত করি এবং কোন পানাহারের জিনিসও নেই। সুতরাং আপনার অনুমতি হলে আমি আমার পিত্রালয়ে চলে গিয়ে তথায় আমার ইদ্দতকাল কাটিয়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, অনুমতি দেয়া হলো। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হয়েছি এবং এখনও কক্ষেই রয়েছি এমন সময় তিনি আমাকে ডেকে পাঠান বা নিজেই ডাক দেন এবং বলেনঃ তুমি কি বলছিলে:' আমি পুনরায় ঘটনাটি বর্ণনা করি। তখন তিনি বলেনঃ “তোমার ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বাড়ীতেই থাক। সুতরাং আমি সেখানেই আমার ইদ্দতকাল চার মাস দশ দিন অতিবাহিত করি।'হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে আমাকে ডেকে পাঠান এবং এই মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফায়সালাসহ আমার ঘটনাটি বর্ণনা করি। হযরত উসমান (রাঃ) এরই অনুসরণ করেন এবং এটাই ফায়সালা দেন।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে ‘মাতআ' দেয়া সম্বন্ধে জনগণ বলতো : “আমরা ইচ্ছে হলে দেবো, না হলে না দেবো।' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতটিকে সামনে রেখেই কেউ কেউ প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু দেয়া ওয়াজিব বলে থাকেন। আর কেউ কেউ ওটাকে শুধুমাত্র এইসব নারীর স্বার্থে নির্দিষ্ট মনে করেন যাদের বর্ণনা পূর্বে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঐসব নারী যাদের সাথে সহবাস হয়নি এবং মোহরও নির্ধারিত হয়নি এমতাবস্থায় তালাক দেয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্ব দলের উত্তর এই যে, সাধারণভাবে কোন নারীর বর্ণনা দেয়া ঐ অবস্থারই সাথে ঐ নির্দেশকে নির্দিষ্ট করে না। এটাই হচ্ছে প্রসিদ্ধ মাযহাব।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-এভাবেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নিদর্শনাবলী হালাল, হারাম, ফারায়েয, হুদুদ এবং আদেশ ও নিষেধ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন কোন কিছু গুপ্ত ও অস্পষ্ট না থাকে এবং যেন তা সবারই বোধগম্য হয়।

আল-বাকারা 2:243

২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো সংখ্যায় চার হাজার ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা ছিল আট হাজার। কেউ বলেন ন'হাজার, কেউ বলেন চল্লিশ হাজার এবং কেউ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশী বলে থাকেন। এরা যাওয়ারদান' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল যা ওয়াসিতের দিকে রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা আযরাআত নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। তারা প্লেগের ভয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সবাই মরে যায়। ঘটনাক্রমে একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর প্রার্থনার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনর্জীবিত করেন। কেউ কেউ বলেন যে, তারা একটি জনশূন্য নির্মল বায়ুযুক্ত খোলা মাঠে অবস্থান করেছিল। অতঃপর তারা দু'জন ফেরেশতার চীৎকারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অস্থিগুলোও চুনে পরিণত হয়। সেই জায়গায় জনবসতি বসে যায়। একদা হিযকীল নামে বানী ইসরাঈলের একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদের পুনর্জীবনের জন্যে প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন : “তুমি বল- “হে গলিত অস্থিগুলো! আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর প্রত্যেক শরীরের অস্থির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। এরপর তার উপর আল্লাহর নির্দেশ হলো : তুমি বলহে অস্থিগুলো! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে তোমরা গোত, শিরা ইত্যাদিও তোমাদের উপর মিলিয়ে নাও।' অতঃপর ঐ নবীর (আঃ) চোখের সামনে এটাও হয়ে গেল। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে আত্মাগুলোকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আত্মাসমূহ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হুকুমে পূর্বের নিজ নিজ দেহের ভিতর প্রবেশ কর। সঙ্গে সঙ্গে যেমন তারা এক সাথে সব মরে গিয়েছিল তেমনই সবাই এক সাথে জীবিত হয়ে গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের মুখে উচ্চারিত হলোঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি পবিত্র। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই।' কেয়ামতের দিন ঐ দেহের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার আত্মার উত্থিত হওয়ার এটা দলীল।অতঃপর বলা হচ্ছে, মানুষের উপর আল্লাহ তা'আলার বড় অনুগ্রহ রয়েছে। যে, তিনি মহাশক্তির বড় বড় নিদর্শনাবলী তাদেরকে প্রদর্শন করছেন। কিন্তু এটা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রাণ রক্ষা ও আশ্রয় লাভের অন্য কোন উপায় নেই। ঐ লোকগুলো প্লেগের ভয়ে পলায়ন করছিল এবং ইহলৌকিক জীবনের প্রতি লোভী ছিল, তাই তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এসে যায় এবং তার ধ্বংস হয়ে যায়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, যখন উমার (রাঃ) সিরিয়ার দিকে গমন করেন এবং সারাবা নামক স্থানে পৌছেন তখন হযরত আবু ওবাইদাহ বিন জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সেনাপতিদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা তাঁকে সংবাদ দেন যে, সিরিয়ায় আজকাল প্লেগ রোগ রয়েছে। এখন তারাও তথায় যাবেন কি যাবেন না এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এসে তাদের সাথে মিলিত হন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি : যখন এমন জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তোমরা অবস্থান করছে তখন তোমরা তার ভয়ে পলায়ন করো না। আর যখন তোমরা কোন জায়গায় বসে থাকার সংবাদ শুনতে পাও তখন তোমরা তথায় যেও না।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তথা হতে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “এটা আল্লাহর শাস্তি যা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “ঐ লোকদের পলায়ন যেমন তাদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারলো না দ্রুপ তোমাদেরও যুদ্ধ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বৃথা। মৃত্যু ও আহার্য দু'টোই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত আহার্য বাড়বেও না কমবেও না।, দ্রুপ মৃত্যুও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও আসবে না বা পিছনেও সরে যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছে : যারা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গীদেরকেও বলছে এই যুদ্ধে শহীদগণও যদি আমাদের অনুসরণ করতো তবে তারাও নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের নিজেদের জীবন হতে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও তো:অন্য স্থানে রয়েছে : তারা বলে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করেছেন কেন: কেন আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনের জন্যে অবসর দিলেন না: তুমি বল-ইহলৌকিক জগতের পুঁজি সামান্য এবং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্যে পরকালই উত্তম এবং তোমরা এতটুকুও অত্যাচারিত হবে না।' অন্যত্র রয়েছে। তোমাদেরকে মৃত্যু পেয়ে যাবেই যদিও তোমরা উচ্চতম শিখরে অবস্থান কর।' এস্থলে ইসলামী সৈনিকদের উদ্যমশীল নেতা, বীর পুরুষদের অগ্রগামী, আল্লাহর তরবারী এবং ইসলামের আশ্রয়স্থল আবূ সুলাইমান হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) ঐ উক্তি উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ সময়গাপযোগী হবে যা তিনি ঠিক মৃত্যুর সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ও মৃত্যুকে ভয়কারী, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী কাপুরুষের দল কোথায় রয়েছে: তারা দেখুক যে, আমার গ্রন্থীসমূহ আল্লাহর পথে আহত হয়েছে। দেহের কোন জায়গা এমন নেই যেখানে তীর, তরবারী, বর্শা ও বল্লমের আঘাত লাগেনি। কিন্তু দেখ যে, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে বিছানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করছি।অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর পথে খরচ করার উৎসাহ দিচ্ছেন। এরূপ উৎসাহ তিনি স্থানে স্থানে দিয়েছেন। হাদীস-ই-নযুলেও রয়েছে : ‘কে এমন আছে যে, সেই আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে যিনি না দরিদ্র, না অত্যাচারী: (আরবি) (২:২৪৫) এই আয়াতটি শুনে হযরত আবুদ দাহ্দাহ আনসারী (রাঃ) বলেছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আল্লাহ্ কি আমাদের নিকট ঋণ চাচ্ছেন:' তিনি বলেন 'হাঁ'। হযরত আবুদ দাহ্দাহ্ তখন বলেনঃ আমাকে আপনার হাত খানা দিন। অতঃপর তিনি তার হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত নিয়ে বলেনঃ আমি আমার ছয়শো খেজুর বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগানটি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সম্মানিত প্রভুকে ঋণ প্রদান করলাম। সেখান হতে সরাসরি তিনি বাগানে আগমন করেন এবং স্ত্রীকে ডাক দেন : “হে উম্মুদ্দাহ্দাহ্!' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ আমি উপস্থিত রয়েছি। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি বেরিয়ে এসো। আমি এই বাগানটি আমার মহা সম্মানিত প্রভুকে ঋণ দিয়েছি (তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কর-ই-হাসানা’-এর ভাবার্থ আল্লাহ তা'আলার পথেও খরচ হবে, সন্তানদের জন্যেও খরচ হবে এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতাও বর্ণনা করা হবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তা দ্বিগুণ চারগুণ করে দেবেন'। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ আল্লাহর পথে ব্যয়কারীর দৃষ্টান্ত ঐ শস্য বীজের ন্যয় যার সাতটি শীষ বের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক শীষে একশটি করে দানা থাকে এবং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তার চেয়েও বেশী দিয়ে থাকেন। এই আয়াতের তাফসীর ইনশাআল্লাহ অতি সত্ত্বরই আসছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে হযরত আবু উসমান নাহদী (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি শুনেছি যে,আপনি বলেনঃ “ এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য পাওয়া যায়। (এটা কি সত্য):' তিনি বলেনঃ ‘এতে তুমি কি বিস্ময়বোধ করছো: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট শুনেছিঃ একটি পুণ্যের বিনিময়ে দু’লক্ষ পূণ্য পাওয়া যায় (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। কিন্তু এই হাদীসটি গরীব।তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু উসমান নাহদী বলেনঃ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) খিদমতে আমার চেয়ে বেশী কেউ থাকতেন না। তিনি হজ্বে গমন করলে তার পিছনে আমিও গমন করি। আমি বসরায় গিয়ে শুনতে পাই যে, জনগণ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন। তাদেরকে আমি বলিঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমিই সবচেয়ে বেশী তাঁর সাহচর্যে থেকেছি। আমি কখনও তাঁর নিকট এই হাদীসটি শুনিনি।'অতঃপর আমার ইচ্ছে হলো যে, স্বয়ং আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে আমি জিজ্ঞেস করবো। আমি তথা হতে এখানে চলে আসি। এসে জানতে পারি যে, তিনি হজে চলে গেছেন। আমি শুধুমাত্র একটি হাদীসের জন্যে মক্কা চলে আসি। তথায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁকে বলিঃ জনাব! বসরাবাসী আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে এটা কিরূপ বর্ণনা দিচ্ছে:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়ের কি আছে:' অতঃপর এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার এই কথাটিও পড়ঃ(আরবি)অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের আসবাবপত্র পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা দু’লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন।জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এই বিষয়ের নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে : যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই, তিনি এক,তাঁর কেউ অংশীদার নেই, তার জন্যে সাম্রাজ্য ও তাঁর জন্যেই প্রশংসা এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান- এ দু'আটি পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্যে এক লাখ পুণ্য লিখেন এবং এক লাখ পাপ ক্ষমা করে দেন। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে(আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করেন: হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও বেশী দান করুন। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখনও তিনি এই প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণভাবে ও অপরিমিতভাবে দেয়া হবে’ (৩৯:১০) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত কা'ব বিন আহবর (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তির নিকট শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সূরা-ই (আরবি) একবার পাঠ করে তার জন্যে বেহেশতে দশ লক্ষ অট্টালিকা তৈরি হয়, এটা কি সত্য:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়বোধ করার কি আছে: বরং বিশ লক্ষ, ত্রিশ লক্ষ এবং আরও এত বেশী যে, ওগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না।' অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যখন (আরবি) অর্থাৎ বহু গুণ’ বলেছেন তখন তা গণনা করা মানুষের ক্ষমতার মধ্যে কি করে থাকতে পারে:' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আহার্যের হ্রাস ও বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহর পথে খরচ করাতে কার্পণ্য করো না। যাকে তিনি বেশী দিয়েছেন তার মধ্যেও যুক্তিসঙ্গতা রয়েছে এবং যাকে দেননি তার মধ্যেও দুরদর্শিতা রয়েছে। তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন তার নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে।

আল-বাকারা 2:244

২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো সংখ্যায় চার হাজার ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা ছিল আট হাজার। কেউ বলেন ন'হাজার, কেউ বলেন চল্লিশ হাজার এবং কেউ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশী বলে থাকেন। এরা যাওয়ারদান' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল যা ওয়াসিতের দিকে রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা আযরাআত নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। তারা প্লেগের ভয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সবাই মরে যায়। ঘটনাক্রমে একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর প্রার্থনার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনর্জীবিত করেন। কেউ কেউ বলেন যে, তারা একটি জনশূন্য নির্মল বায়ুযুক্ত খোলা মাঠে অবস্থান করেছিল। অতঃপর তারা দু'জন ফেরেশতার চীৎকারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অস্থিগুলোও চুনে পরিণত হয়। সেই জায়গায় জনবসতি বসে যায়। একদা হিযকীল নামে বানী ইসরাঈলের একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদের পুনর্জীবনের জন্যে প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন : “তুমি বল- “হে গলিত অস্থিগুলো! আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর প্রত্যেক শরীরের অস্থির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। এরপর তার উপর আল্লাহর নির্দেশ হলো : তুমি বলহে অস্থিগুলো! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে তোমরা গোত, শিরা ইত্যাদিও তোমাদের উপর মিলিয়ে নাও।' অতঃপর ঐ নবীর (আঃ) চোখের সামনে এটাও হয়ে গেল। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে আত্মাগুলোকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আত্মাসমূহ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হুকুমে পূর্বের নিজ নিজ দেহের ভিতর প্রবেশ কর। সঙ্গে সঙ্গে যেমন তারা এক সাথে সব মরে গিয়েছিল তেমনই সবাই এক সাথে জীবিত হয়ে গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের মুখে উচ্চারিত হলোঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি পবিত্র। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই।' কেয়ামতের দিন ঐ দেহের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার আত্মার উত্থিত হওয়ার এটা দলীল।অতঃপর বলা হচ্ছে, মানুষের উপর আল্লাহ তা'আলার বড় অনুগ্রহ রয়েছে। যে, তিনি মহাশক্তির বড় বড় নিদর্শনাবলী তাদেরকে প্রদর্শন করছেন। কিন্তু এটা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রাণ রক্ষা ও আশ্রয় লাভের অন্য কোন উপায় নেই। ঐ লোকগুলো প্লেগের ভয়ে পলায়ন করছিল এবং ইহলৌকিক জীবনের প্রতি লোভী ছিল, তাই তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এসে যায় এবং তার ধ্বংস হয়ে যায়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, যখন উমার (রাঃ) সিরিয়ার দিকে গমন করেন এবং সারাবা নামক স্থানে পৌছেন তখন হযরত আবু ওবাইদাহ বিন জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সেনাপতিদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা তাঁকে সংবাদ দেন যে, সিরিয়ায় আজকাল প্লেগ রোগ রয়েছে। এখন তারাও তথায় যাবেন কি যাবেন না এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এসে তাদের সাথে মিলিত হন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি : যখন এমন জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তোমরা অবস্থান করছে তখন তোমরা তার ভয়ে পলায়ন করো না। আর যখন তোমরা কোন জায়গায় বসে থাকার সংবাদ শুনতে পাও তখন তোমরা তথায় যেও না।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তথা হতে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “এটা আল্লাহর শাস্তি যা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “ঐ লোকদের পলায়ন যেমন তাদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারলো না দ্রুপ তোমাদেরও যুদ্ধ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বৃথা। মৃত্যু ও আহার্য দু'টোই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত আহার্য বাড়বেও না কমবেও না।, দ্রুপ মৃত্যুও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও আসবে না বা পিছনেও সরে যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছে : যারা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গীদেরকেও বলছে এই যুদ্ধে শহীদগণও যদি আমাদের অনুসরণ করতো তবে তারাও নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের নিজেদের জীবন হতে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও তো:অন্য স্থানে রয়েছে : তারা বলে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করেছেন কেন: কেন আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনের জন্যে অবসর দিলেন না: তুমি বল-ইহলৌকিক জগতের পুঁজি সামান্য এবং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্যে পরকালই উত্তম এবং তোমরা এতটুকুও অত্যাচারিত হবে না।' অন্যত্র রয়েছে। তোমাদেরকে মৃত্যু পেয়ে যাবেই যদিও তোমরা উচ্চতম শিখরে অবস্থান কর।' এস্থলে ইসলামী সৈনিকদের উদ্যমশীল নেতা, বীর পুরুষদের অগ্রগামী, আল্লাহর তরবারী এবং ইসলামের আশ্রয়স্থল আবূ সুলাইমান হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) ঐ উক্তি উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ সময়গাপযোগী হবে যা তিনি ঠিক মৃত্যুর সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ও মৃত্যুকে ভয়কারী, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী কাপুরুষের দল কোথায় রয়েছে: তারা দেখুক যে, আমার গ্রন্থীসমূহ আল্লাহর পথে আহত হয়েছে। দেহের কোন জায়গা এমন নেই যেখানে তীর, তরবারী, বর্শা ও বল্লমের আঘাত লাগেনি। কিন্তু দেখ যে, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে বিছানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করছি।অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর পথে খরচ করার উৎসাহ দিচ্ছেন। এরূপ উৎসাহ তিনি স্থানে স্থানে দিয়েছেন। হাদীস-ই-নযুলেও রয়েছে : ‘কে এমন আছে যে, সেই আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে যিনি না দরিদ্র, না অত্যাচারী: (আরবি) (২:২৪৫) এই আয়াতটি শুনে হযরত আবুদ দাহ্দাহ আনসারী (রাঃ) বলেছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আল্লাহ্ কি আমাদের নিকট ঋণ চাচ্ছেন:' তিনি বলেন 'হাঁ'। হযরত আবুদ দাহ্দাহ্ তখন বলেনঃ আমাকে আপনার হাত খানা দিন। অতঃপর তিনি তার হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত নিয়ে বলেনঃ আমি আমার ছয়শো খেজুর বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগানটি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সম্মানিত প্রভুকে ঋণ প্রদান করলাম। সেখান হতে সরাসরি তিনি বাগানে আগমন করেন এবং স্ত্রীকে ডাক দেন : “হে উম্মুদ্দাহ্দাহ্!' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ আমি উপস্থিত রয়েছি। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি বেরিয়ে এসো। আমি এই বাগানটি আমার মহা সম্মানিত প্রভুকে ঋণ দিয়েছি (তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কর-ই-হাসানা’-এর ভাবার্থ আল্লাহ তা'আলার পথেও খরচ হবে, সন্তানদের জন্যেও খরচ হবে এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতাও বর্ণনা করা হবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তা দ্বিগুণ চারগুণ করে দেবেন'। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ আল্লাহর পথে ব্যয়কারীর দৃষ্টান্ত ঐ শস্য বীজের ন্যয় যার সাতটি শীষ বের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক শীষে একশটি করে দানা থাকে এবং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তার চেয়েও বেশী দিয়ে থাকেন। এই আয়াতের তাফসীর ইনশাআল্লাহ অতি সত্ত্বরই আসছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে হযরত আবু উসমান নাহদী (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি শুনেছি যে,আপনি বলেনঃ “ এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য পাওয়া যায়। (এটা কি সত্য):' তিনি বলেনঃ ‘এতে তুমি কি বিস্ময়বোধ করছো: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট শুনেছিঃ একটি পুণ্যের বিনিময়ে দু’লক্ষ পূণ্য পাওয়া যায় (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। কিন্তু এই হাদীসটি গরীব।তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু উসমান নাহদী বলেনঃ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) খিদমতে আমার চেয়ে বেশী কেউ থাকতেন না। তিনি হজ্বে গমন করলে তার পিছনে আমিও গমন করি। আমি বসরায় গিয়ে শুনতে পাই যে, জনগণ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন। তাদেরকে আমি বলিঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমিই সবচেয়ে বেশী তাঁর সাহচর্যে থেকেছি। আমি কখনও তাঁর নিকট এই হাদীসটি শুনিনি।'অতঃপর আমার ইচ্ছে হলো যে, স্বয়ং আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে আমি জিজ্ঞেস করবো। আমি তথা হতে এখানে চলে আসি। এসে জানতে পারি যে, তিনি হজে চলে গেছেন। আমি শুধুমাত্র একটি হাদীসের জন্যে মক্কা চলে আসি। তথায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁকে বলিঃ জনাব! বসরাবাসী আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে এটা কিরূপ বর্ণনা দিচ্ছে:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়ের কি আছে:' অতঃপর এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার এই কথাটিও পড়ঃ(আরবি)অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের আসবাবপত্র পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা দু’লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন।জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এই বিষয়ের নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে : যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই, তিনি এক,তাঁর কেউ অংশীদার নেই, তার জন্যে সাম্রাজ্য ও তাঁর জন্যেই প্রশংসা এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান- এ দু'আটি পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্যে এক লাখ পুণ্য লিখেন এবং এক লাখ পাপ ক্ষমা করে দেন। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে(আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করেন: হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও বেশী দান করুন। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখনও তিনি এই প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণভাবে ও অপরিমিতভাবে দেয়া হবে’ (৩৯:১০) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত কা'ব বিন আহবর (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তির নিকট শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সূরা-ই (আরবি) একবার পাঠ করে তার জন্যে বেহেশতে দশ লক্ষ অট্টালিকা তৈরি হয়, এটা কি সত্য:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়বোধ করার কি আছে: বরং বিশ লক্ষ, ত্রিশ লক্ষ এবং আরও এত বেশী যে, ওগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না।' অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যখন (আরবি) অর্থাৎ বহু গুণ’ বলেছেন তখন তা গণনা করা মানুষের ক্ষমতার মধ্যে কি করে থাকতে পারে:' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আহার্যের হ্রাস ও বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহর পথে খরচ করাতে কার্পণ্য করো না। যাকে তিনি বেশী দিয়েছেন তার মধ্যেও যুক্তিসঙ্গতা রয়েছে এবং যাকে দেননি তার মধ্যেও দুরদর্শিতা রয়েছে। তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন তার নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে।

আল-বাকারা 2:245

২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো সংখ্যায় চার হাজার ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা ছিল আট হাজার। কেউ বলেন ন'হাজার, কেউ বলেন চল্লিশ হাজার এবং কেউ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশী বলে থাকেন। এরা যাওয়ারদান' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল যা ওয়াসিতের দিকে রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা আযরাআত নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। তারা প্লেগের ভয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সবাই মরে যায়। ঘটনাক্রমে একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর প্রার্থনার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনর্জীবিত করেন। কেউ কেউ বলেন যে, তারা একটি জনশূন্য নির্মল বায়ুযুক্ত খোলা মাঠে অবস্থান করেছিল। অতঃপর তারা দু'জন ফেরেশতার চীৎকারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অস্থিগুলোও চুনে পরিণত হয়। সেই জায়গায় জনবসতি বসে যায়। একদা হিযকীল নামে বানী ইসরাঈলের একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদের পুনর্জীবনের জন্যে প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন : “তুমি বল- “হে গলিত অস্থিগুলো! আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর প্রত্যেক শরীরের অস্থির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। এরপর তার উপর আল্লাহর নির্দেশ হলো : তুমি বলহে অস্থিগুলো! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে তোমরা গোত, শিরা ইত্যাদিও তোমাদের উপর মিলিয়ে নাও।' অতঃপর ঐ নবীর (আঃ) চোখের সামনে এটাও হয়ে গেল। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে আত্মাগুলোকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আত্মাসমূহ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হুকুমে পূর্বের নিজ নিজ দেহের ভিতর প্রবেশ কর। সঙ্গে সঙ্গে যেমন তারা এক সাথে সব মরে গিয়েছিল তেমনই সবাই এক সাথে জীবিত হয়ে গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের মুখে উচ্চারিত হলোঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি পবিত্র। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই।' কেয়ামতের দিন ঐ দেহের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার আত্মার উত্থিত হওয়ার এটা দলীল।অতঃপর বলা হচ্ছে, মানুষের উপর আল্লাহ তা'আলার বড় অনুগ্রহ রয়েছে। যে, তিনি মহাশক্তির বড় বড় নিদর্শনাবলী তাদেরকে প্রদর্শন করছেন। কিন্তু এটা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রাণ রক্ষা ও আশ্রয় লাভের অন্য কোন উপায় নেই। ঐ লোকগুলো প্লেগের ভয়ে পলায়ন করছিল এবং ইহলৌকিক জীবনের প্রতি লোভী ছিল, তাই তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এসে যায় এবং তার ধ্বংস হয়ে যায়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, যখন উমার (রাঃ) সিরিয়ার দিকে গমন করেন এবং সারাবা নামক স্থানে পৌছেন তখন হযরত আবু ওবাইদাহ বিন জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সেনাপতিদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা তাঁকে সংবাদ দেন যে, সিরিয়ায় আজকাল প্লেগ রোগ রয়েছে। এখন তারাও তথায় যাবেন কি যাবেন না এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এসে তাদের সাথে মিলিত হন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি : যখন এমন জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তোমরা অবস্থান করছে তখন তোমরা তার ভয়ে পলায়ন করো না। আর যখন তোমরা কোন জায়গায় বসে থাকার সংবাদ শুনতে পাও তখন তোমরা তথায় যেও না।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তথা হতে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “এটা আল্লাহর শাস্তি যা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “ঐ লোকদের পলায়ন যেমন তাদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারলো না দ্রুপ তোমাদেরও যুদ্ধ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বৃথা। মৃত্যু ও আহার্য দু'টোই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত আহার্য বাড়বেও না কমবেও না।, দ্রুপ মৃত্যুও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও আসবে না বা পিছনেও সরে যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছে : যারা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গীদেরকেও বলছে এই যুদ্ধে শহীদগণও যদি আমাদের অনুসরণ করতো তবে তারাও নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের নিজেদের জীবন হতে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও তো:অন্য স্থানে রয়েছে : তারা বলে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করেছেন কেন: কেন আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনের জন্যে অবসর দিলেন না: তুমি বল-ইহলৌকিক জগতের পুঁজি সামান্য এবং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্যে পরকালই উত্তম এবং তোমরা এতটুকুও অত্যাচারিত হবে না।' অন্যত্র রয়েছে। তোমাদেরকে মৃত্যু পেয়ে যাবেই যদিও তোমরা উচ্চতম শিখরে অবস্থান কর।' এস্থলে ইসলামী সৈনিকদের উদ্যমশীল নেতা, বীর পুরুষদের অগ্রগামী, আল্লাহর তরবারী এবং ইসলামের আশ্রয়স্থল আবূ সুলাইমান হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) ঐ উক্তি উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ সময়গাপযোগী হবে যা তিনি ঠিক মৃত্যুর সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ও মৃত্যুকে ভয়কারী, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী কাপুরুষের দল কোথায় রয়েছে: তারা দেখুক যে, আমার গ্রন্থীসমূহ আল্লাহর পথে আহত হয়েছে। দেহের কোন জায়গা এমন নেই যেখানে তীর, তরবারী, বর্শা ও বল্লমের আঘাত লাগেনি। কিন্তু দেখ যে, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে বিছানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করছি।অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর পথে খরচ করার উৎসাহ দিচ্ছেন। এরূপ উৎসাহ তিনি স্থানে স্থানে দিয়েছেন। হাদীস-ই-নযুলেও রয়েছে : ‘কে এমন আছে যে, সেই আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে যিনি না দরিদ্র, না অত্যাচারী: (আরবি) (২:২৪৫) এই আয়াতটি শুনে হযরত আবুদ দাহ্দাহ আনসারী (রাঃ) বলেছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আল্লাহ্ কি আমাদের নিকট ঋণ চাচ্ছেন:' তিনি বলেন 'হাঁ'। হযরত আবুদ দাহ্দাহ্ তখন বলেনঃ আমাকে আপনার হাত খানা দিন। অতঃপর তিনি তার হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত নিয়ে বলেনঃ আমি আমার ছয়শো খেজুর বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগানটি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সম্মানিত প্রভুকে ঋণ প্রদান করলাম। সেখান হতে সরাসরি তিনি বাগানে আগমন করেন এবং স্ত্রীকে ডাক দেন : “হে উম্মুদ্দাহ্দাহ্!' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ আমি উপস্থিত রয়েছি। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি বেরিয়ে এসো। আমি এই বাগানটি আমার মহা সম্মানিত প্রভুকে ঋণ দিয়েছি (তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কর-ই-হাসানা’-এর ভাবার্থ আল্লাহ তা'আলার পথেও খরচ হবে, সন্তানদের জন্যেও খরচ হবে এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতাও বর্ণনা করা হবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তা দ্বিগুণ চারগুণ করে দেবেন'। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ আল্লাহর পথে ব্যয়কারীর দৃষ্টান্ত ঐ শস্য বীজের ন্যয় যার সাতটি শীষ বের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক শীষে একশটি করে দানা থাকে এবং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তার চেয়েও বেশী দিয়ে থাকেন। এই আয়াতের তাফসীর ইনশাআল্লাহ অতি সত্ত্বরই আসছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে হযরত আবু উসমান নাহদী (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি শুনেছি যে,আপনি বলেনঃ “ এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য পাওয়া যায়। (এটা কি সত্য):' তিনি বলেনঃ ‘এতে তুমি কি বিস্ময়বোধ করছো: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট শুনেছিঃ একটি পুণ্যের বিনিময়ে দু’লক্ষ পূণ্য পাওয়া যায় (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। কিন্তু এই হাদীসটি গরীব।তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু উসমান নাহদী বলেনঃ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) খিদমতে আমার চেয়ে বেশী কেউ থাকতেন না। তিনি হজ্বে গমন করলে তার পিছনে আমিও গমন করি। আমি বসরায় গিয়ে শুনতে পাই যে, জনগণ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন। তাদেরকে আমি বলিঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমিই সবচেয়ে বেশী তাঁর সাহচর্যে থেকেছি। আমি কখনও তাঁর নিকট এই হাদীসটি শুনিনি।'অতঃপর আমার ইচ্ছে হলো যে, স্বয়ং আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে আমি জিজ্ঞেস করবো। আমি তথা হতে এখানে চলে আসি। এসে জানতে পারি যে, তিনি হজে চলে গেছেন। আমি শুধুমাত্র একটি হাদীসের জন্যে মক্কা চলে আসি। তথায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁকে বলিঃ জনাব! বসরাবাসী আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে এটা কিরূপ বর্ণনা দিচ্ছে:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়ের কি আছে:' অতঃপর এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার এই কথাটিও পড়ঃ(আরবি)অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের আসবাবপত্র পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা দু’লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন।জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এই বিষয়ের নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে : যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই, তিনি এক,তাঁর কেউ অংশীদার নেই, তার জন্যে সাম্রাজ্য ও তাঁর জন্যেই প্রশংসা এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান- এ দু'আটি পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্যে এক লাখ পুণ্য লিখেন এবং এক লাখ পাপ ক্ষমা করে দেন। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে(আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করেন: হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও বেশী দান করুন। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখনও তিনি এই প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণভাবে ও অপরিমিতভাবে দেয়া হবে’ (৩৯:১০) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত কা'ব বিন আহবর (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তির নিকট শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সূরা-ই (আরবি) একবার পাঠ করে তার জন্যে বেহেশতে দশ লক্ষ অট্টালিকা তৈরি হয়, এটা কি সত্য:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়বোধ করার কি আছে: বরং বিশ লক্ষ, ত্রিশ লক্ষ এবং আরও এত বেশী যে, ওগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না।' অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যখন (আরবি) অর্থাৎ বহু গুণ’ বলেছেন তখন তা গণনা করা মানুষের ক্ষমতার মধ্যে কি করে থাকতে পারে:' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আহার্যের হ্রাস ও বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহর পথে খরচ করাতে কার্পণ্য করো না। যাকে তিনি বেশী দিয়েছেন তার মধ্যেও যুক্তিসঙ্গতা রয়েছে এবং যাকে দেননি তার মধ্যেও দুরদর্শিতা রয়েছে। তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন তার নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে।

আল-বাকারা 2:246

যে নবীর এখানে বর্ণনা রয়েছে তার নাম হযরত কাতাদাহ (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে হযরত ইউশা ইবনে নূন ইবনে আফরাইয়াম বিন ইউসুফ বিন ইয়াকুব (আঃ)! কিন্তু এই উক্তি সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, এটি হযরত মূসা (আঃ)-এর বহু পরে হযরত দাউদ (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এটা স্পষ্টভাবেই বর্ণিত রয়েছে। আর হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর মধ্যে একাত্তর বছরেরও বেশী ব্যবধান রয়েছে। হযরত সুদ্দী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এই নবী হচ্ছেন হযরত শামাউন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তিনি হচ্ছেন হযরত শামবিল বিন বালী বিন আলকামা বিন তারখাম বিনিল ইয়াহাদ বাহরাম বিন আলকামা বিন মাজিব বিন উমারসা বিন ইযরিয়া বিন সুফইয়া বিন আলকামা বিন আবি ইয়াসিফ বিন কারূন বিন ইয়াসহার বিন কাহিস বিন লাবী বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহীম খালীল (আঃ)।ঘটনাটি এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে কিছুদিন পর্যন্ত বানী ইসরাঈল সত্যের উপরেই ছিল। অতঃপর তারা শিরক ও বিদআতের মধ্যে পতিত হয়। তথাপি তাদের মধ্যে ক্রমাগত নবী পাঠান হয়। কিন্তু যখন তাদের অন্যায় কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শত্রুদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করে দেন। সুতরাং তাদের শত্রুরা তাদের বহু লোককে হত্যা করলো, বহু বন্দী করলো এবং তাদের বহু শহর দখল করে নিলো। পূর্বে তাদের নিকট তাওরাত ও শান্তিতে পরিপূর্ণ তাবূত (সিন্দুক) বিদ্যমান ছিল যা হযরত মূসা (আঃ) হতে উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। এর ফলে তারা যুদ্ধে জয়লাভ করতো। কিন্তু তাদের দুষ্টামি ও জঘন্য পাপের কারণে মহান আল্লাহর এই নিয়ামত তাদের হাত হতে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের বংশের মধ্যে নবুওয়াতও শেষ হয়ে যায়। যেলাভী নামক ব্যক্তির বংশধরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নবুওয়াত চলে আসছিল তারা সবাই যুদ্ধসমূহে মারা যায়। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একটি গর্ভবতী স্ত্রী লোক বেঁচে থাকে। তার স্বামীও নিহত হয়েছিল। এখন বানী ইসরাঈলের দৃষ্টি ঐ স্ত্রী লোকটির উপর ছিল। তাদের আশা ছিল যে, আল্লাহ তাকে পুত্রসন্তান দান করবেন এবং তিনি নবী হবেন। দিন-রাত ঐ স্ত্রী লোকটিরও এই প্রার্থনাই ছিল। আল্লাহ তা'আলা তার প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। ছেলেটির নাম শ্যামভীল বা শামউন রাখা হয়। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন।' নবুওয়াতের বয়স হলে তাকে নবুওয়াত দেয়া হয়। যখন তিনি নবুওয়াতের দাওয়াত দেন তখন তাঁর সম্প্রদায় তাঁর নিকট প্রার্থনা জানায় যে, তাদের উপর যেন একজন বাদশাহ্ নিযুক্ত করা হয় তাহলে তারা তাঁর নেতৃত্বে জিহাদ করবে। বাদশাহ তো প্রকাশিত হয়েই পড়েছিলেন। কিন্তু উক্ত নবী (আঃ) তাঁর সন্দেহের কথা তাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, তাদের প্রতি জিহাদ ফরয করা হলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে না তো: তারা উত্তরে বলে যে, তাদের সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তাদের সন্তানাদিকে বন্দী করা হয়েছে তথাপি তারা কি এতই কাপুরুষ যে মৃত্যুর ভয়ে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে: তখন জিহাদ ফরয করে দেয়া হলো এবং তাদেরকে বাদশাহর সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গমন করতে বলা হলো। এই নির্দেশ শ্রবণমাত্র অল্প কয়েকজন ব্যতীত সবাই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তাদের এই অভ্যাস নতুন ছিল না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এটা জানতেন।

আল-বাকারা 2:247

ভাবার্থ এই যে, যখন তারা তাদের নবীকে তাদের একজন বাদশাহ নিযুক্ত করতে বললো তখন নবী (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে হযরত তালূতকে তাদের সামনে বাদশাহরূপে পেশ করলেন। তিনি বাদশাহী বংশের ছিলেন না বরং একজন সৈনিক ছিলেন। ইয়াহূদার সন্তানেরা রাজ বংশের লোক এবং হযরত তালুত এদের মধ্যে ছিলেন না। তাই জনগণ প্রতিবাদ করে বললো যে, তাক্ত অপেক্ষা তারাই রাজত্বের দাবীদার বেশী। দ্বিতীয় কথা এই যে, তিনি দরিদ্র ব্যক্তি। তাঁর কোন ধন-মাল নেই। কেউ কেউ বলেন যে, তিনি ভিস্তী ছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি চর্ম সংস্কারক ছিলেন। সুতরাং নবীর আদেশের সামনে তাদের এই প্রতিবাদ ছিল প্রথম বিরোধিতা। নবী (আঃ) উত্তর দিলেন : এই নির্বাচন আমার পক্ষ হতে হয়নি যে, আমি পুনর্বিবেচনা করবো। বরং এটা তো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ। সুতরাং এই নির্দেশ পালন করা অবশ্য কর্তব্য। তাছাড়া এটাতো প্রকাশমান যে, তিনি তোমাদের মধ্যে একজন বড় আলেম, তার দেহ সুঠাম ও সবল, তিনি একজন বীর পুরুষ এবং যুদ্ধ বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা রয়েছে। এর দ্বারা এটাও সাব্যস্ত হচ্ছে যে, বাদশাহর মধ্যে উপরোক্ত গুণাবলী থাকা প্রয়োজন।এরপরে বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই হচ্ছেন মহাবিজ্ঞ এবং সাম্রাজ্যের প্রকৃত অধিকর্তা তিনিই। সুতরাং তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই রাজত্ব প্রদান করে থাকেন। তিনি হচ্ছেন সর্বজ্ঞাতা ও মহাবিজ্ঞানময়। কার এই ক্ষমতা রয়েছে যে,তার কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করে: একমাত্র আল্লাহ পাক ছাড়া সবারই ব্যাপারে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি ব্যাপক দান ও অনুগ্রহের অধিকারী। তিনি যাকে চান নিজের নিয়ামত দ্বারা নির্দিষ্ট করে থাকেন, তিনি মহাজ্ঞানী। সুতরাং কে কোন জিনিসের যোগ্য এবং কোন জিনিসের অযোগ্য এটা তিনি খুব ভালভাবেই জানেন।

আল-বাকারা 2:248

নবী (আঃ) তাদেরকে বলেন- ‘তালূতের রাজত্বের প্রথম বরকতের নিদর্শন এই যে, শান্তিতে পরিপূর্ণ হারানো তাবৃত তোমরা পেয়ে যাবে। যার ভিতরে রয়েছে পদমর্যাদা, সম্মান, মহিমা, স্নেহ, ও করুণা। তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী যা তোমরা ভালভাবেই জান। কেউ কেউ বলেন যে, ‘সাকীনা’ ছিল সোনার একটি বড় থালা যাতে নবীদের (আঃ) অন্তরসমূহ ধৌত করা হতো। ওটা হযরত মূসা (আঃ) প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তার মধ্যে তিনি তাওরাতের তক্ত রাখতেন। কেউ কেউ বলেন যে,মানুষের মুখের মত ওর মুখও ছিল, আত্মাও ছিল, বায়ুও ছিল, দু'টি মাথা ছিল, দু’টি পাখা ছিল এবং লেজও ছিল ।অহাব (রঃ) বলেন যে, ওটা মৃত বিড়ালের মস্তক ছিল। যখন ওটা তাবুতের মধ্যে কথা বলতো তখন জনগণের সাহায্য প্রাপ্তির বিশ্বাস হয়ে যেতো এবং যুদ্ধে তারা জয়লাভ করতো। এই উক্তিও রয়েছে যে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একটা আত্মা ছিল। যখন বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হতো কিংবা কোন খবর তারা জানতে না পারতো তখন সেটা তা বলে দিতো। হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারুন (আঃ)-এর অনুচরদের অবশিষ্ট অংশ’-এর ভাবার্থ হচ্ছে কাঠ, তাওরাতের তক্তা, মান্ন' এবং তাদের কিছু কাপড় ও জুতো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ফেরেশতাগণ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল দিয়ে ঐ তালূতকে উঠিয়ে জনগণের সামনে নিয়ে আনেন এবং হযরত তালূত বাদশাহর সামনে রেখে দেন। তার নিকট তালূতকে দেখে লোকদের নবীর (আঃ) নবুওয়াত ও তালূতের রাজত্বের উপর পূর্ণ বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এটাকে গাভীর উপরে করে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন যে, কাফিরেরা যখন ইয়াহূদীদের উপর জয়যুক্ত হয় তখন তারা ‘সাকিনার সিন্দুককে তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং উরাইহা' নামক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের বড় প্রতিমাটির পায়ের নীচে রেখে দেয়। কাফিরেরা সকালে তাদের মূর্তি ঘরে গিয়ে দেখে যে, মূর্তিটি নীচে রয়েছে এবং সিন্দুকটি তার মাথার উপরে রয়েছে। তারা পুনরায় মূর্তিটিকে উপরে ও সিন্দুকটিকে নীচে রেখে দেয়। কিন্তু পরদিন সকালে গিয়ে আবার ঐ অবস্থাতে দেখতে পায়। পুনরায় তারা মূর্তিটিকে উপরে করে দেয়। কিন্তু আবার সকালে গিয়ে দেখে যে, প্রতিমা ভাঙ্গা অবস্থায় একদিকে পড়ে রয়েছে। তখন তারা বুঝতে পারে যে, এটা বিশ্ব প্রভুরই ইঙ্গিত। তখন তারা সিন্দুকটিকে তথা হতে নিয়ে গিয়ে অন্য একটি ছোট গ্রামে রেখে দেয়। এ গ্রামে এক মহামারী রোগ ছড়িয়ে পড়ে।অবশেষে তথায় বন্দিনী বানী ইসরাঈলের একটি স্ত্রী লোক তাদেরকে বলেঃ ‘তোমরা এই সিন্দুকটি বানী ইসরাঈলের নিকট পৌছিয়ে দিলে এই মহামারী থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। সুতরাং তারা তাবূতটি দুটি গাভীর উপর উঠিয়ে দিয়ে বানী ইসরাঈলের শহরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। শহরের নিকটবর্তী হয়ে গাভী দু’টি রশি ছিড়ে পালিয়ে যায় এবং তাবৃতটি ওখানেই পড়ে থাকে। অতঃপর বানী ইসরাঈল ওটা নিয়ে আসে। কেউ কেউ বলেন যে, দু'টি যুবক ওটা পৌছিয়ে দিয়েছিল। এও বলা হয়েছে যে, এটা প্যালেস্তাইনের গ্রামসমূহের একটি গ্রামে ছিল। গ্রামটির নাম ছিল ‘আযদাওয়াহ্'। এরপর নবী (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘আমার নবুওয়াত ও তালূতের রাজত্বের এটাও একটি প্রমাণ যে, যদি তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর তবে ফেরেশতাগণ তাবূতটি পৌছিয়ে দিয়ে যাবেন।

আল-বাকারা 2:249

এখন ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, যখন ঐ লোকেরা তালূতকে বাদশাহ বলে মেনে নিলো তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধে বের হলেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ছিল আশি হাজার। পথে তালূত তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি অনুসারে এই নদীটি উরদুন’ ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। ঐ নদীটির নাম ছিল 'নাহরুশ শারীআহ’। তার্ত তাদেরকে সতর্ক করে দেন যে, কেউ যেন ঐ নদীর পানি পান না করে। যারা পান করবে তারা যেন আমার সাথে না যায়। এক আধ চুমুক যদি কেউ পান করে নেয় তবে কোন দোষ নেই। কিন্তু তথায় পৌঁছে গিয়ে তারা অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। কাজেই তারা পেট পুরে পানি পান করে নেয়। কিন্তু অল্প কয়েকজন অত্যন্ত পাকা ঈমানদার লোক ছিলেন। তাঁরা এক চুমুক ব্যতীত পান করলেন না।হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি অনুযায়ী ঐ এক চুমুকেই তাঁদের পিপাসা মিটে যায় এবং তারা জিহাদেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যারা পূর্ণভাবে পান করেছিল তাদের পিপাসাও নিবৃত্ত হয়নি এবং তারা জিহাদের উপযুক্ত বলেও গণ্য হয়নি। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আশি হাজারের মধ্যে ছিয়াত্তর হাজারই পানি পান করেছিল এবং মাত্র চার হাজার লোকে প্রকৃত অনুগতরূপে প্রমাণিত হয়েছিলেন। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বলেন যে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) প্রায়ই বলতেন : বদরের যুদ্ধে আমাদের সংখ্যা ততজনই ছিল যতজন তালুতের অনুগত সৈন্যদের সংখ্যা ছিল। অর্থাৎ তিন শো তেরো জন।নদী পার হয়েই অবাধ্য লোকেরা প্রতারণা শুরু করে দিলো এবং অত্যন্ত কাপুরুষতার সাথে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে বসলো। শত্রু সৈন্যদের সংখ্যা বেশী শুনে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সুতরাং তারা স্পষ্টভাবে বলে ফেললো : “আজ তো আমরা জাতের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের মধ্যে অনুভব করতে পারছি না। তাদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন তারা তাদেরকে বহু রকম করে বুঝিয়ে বললেন : ‘বিজয় লাভ সৈন্যদের আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। ধৈর্যশীলদের উপর আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এসে থাকে। বহুবার এরূপ ঘটেছে যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকে বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর। এই ধৈর্যের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাদের মৃত অন্তরে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো না এবং তাদের ভীরুতা দূর হলো না।

আল-বাকারা 2:250

২৫০-২৫২ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ যেদিন মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র সেনাদলটি কাফিরদের কাপুরুষ সেনাদলকে দেখলেন তখন তারা মহান আল্লাহর নিকট করজোড় প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধৈর্য ও অটলতার পাহাড় বানিয়ে দিন এবং যুদ্ধের সময় আমাদের পদগুলো অটল ও স্থির রাখুন! যুদ্ধের মাঠ থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং শত্রুদের উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন। তাদের এই বিনীত ও আন্তরিক প্রার্থনা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং তাঁদের প্রতি সাহায্য অবতীর্ণ করেন। ফলে এই ক্ষুদ্র দলটি কাফিরদের ঐ বিরাট দলটিকে তছনছ করে দেয় এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর হাতে বিরোধী দলের নেতা জালূত মারা পড়ে। ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহে এটাও রয়েছে যে, হযরত তালূত হযরত দাউদের (আঃ) সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, যদি তিনি জালুতকে হত্যা করতে পারেন তবে তিনি তার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং তাঁকে তাঁর অর্ধেক সম্পত্তিও দেবেন, আর অর্ধেক রাজত্বেরও অধিকারী করবেন। অতঃপর হযরত দাউদ (আঃ) জাতের প্রতি একটি পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তাতেই সে মারা যায়। হযরত তালুত তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেন। অবশেষে তিনি একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে যান এবং বিশ্বপ্রভুর পক্ষ হতে তাঁকে নবুওয়াতও দান করা হয় এবং হযরত শামভীল (আঃ)-এর পর তিনি নবী ও বাদশাহ দু'ই থাকেন। এখানে ‘হিকমত'-এর ভাবার্থ নবুওয়াত। মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী তাকে গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিদ্যাও শিক্ষা দেন। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে হযরত তালুতের মত সঠিক পরামর্শদাতা ও চিন্তাশীল বাদশাহ এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর মত মহাবীর সেনাপতি দান করে জাত ও তার অধীনস্থদেরকে অপসারিত করেছেন, এভাবে যদি তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা অপসারিত না করতেন। তবে অবশ্যই মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যদি এরূপভাবে আল্লাহ মানুষের একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করতেন তবে উপাসনাগৃহ এবং যে মসজিদসমূহে খুব বেশী করে আল্লাহর যিকির করা হয়, সবই ভেঙ্গে দেয়া হতো।' (২২:৪০) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, একজন সৎ ও ঈমানদারের কারণে আল্লাহ তা'আলা তার আশে-পাশের শত শত পরিবার হতে বিপদসমূহ দূর করে থাকেন।অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)। কিন্তু এই হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের আর একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা একজন খাঁটি মুসলমানের সততার কারণে তার সন্তানদেরকে সন্তানদের সন্তানদেরকে, তার পরিবারকে এবং আশে পাশের অধিবাসীদেরকে উপযুক্ত করে তোলেন এবং তার বিদ্যমানতায় তারা সবাই আল্লাহর হিফাযতে : থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের একটি হাদীসে রয়েছে : ‘কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে তোমাদের মধ্যে সাত ব্যক্তি এমন থাকবে যাদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে।' তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের অপর একটি হাদীসে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ত্রিশজন লোক এমন থাকবে, যাদের কারণে তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে।' এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় হযরত হাসান বসরীও (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা আল্লাহ তাআলার একটা নিয়ামত ও অনুগ্রহ যে, তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করে থাকেন। তিনিই প্রকৃত হাকীম। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমাতে পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর দলীলসমূহ বান্দাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করতে রয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন-“হে নবী (সঃ)! এই ঘটনাবলী এবং সমস্ত সত্য কথা আমি ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানিয়েছি। তুমি আমার সত্য নবী। আমার এই কথাগুলো এবং স্বয়ং তোমার নবুওয়াতের সত্যতা সম্বন্ধেও ঐসব লোক পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে, যাদের হাতে কিতাব রয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় শপথ করে স্বীয় নবীর (সঃ) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।

আল-বাকারা 2:251

২৫০-২৫২ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ যেদিন মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র সেনাদলটি কাফিরদের কাপুরুষ সেনাদলকে দেখলেন তখন তারা মহান আল্লাহর নিকট করজোড় প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধৈর্য ও অটলতার পাহাড় বানিয়ে দিন এবং যুদ্ধের সময় আমাদের পদগুলো অটল ও স্থির রাখুন! যুদ্ধের মাঠ থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং শত্রুদের উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন। তাদের এই বিনীত ও আন্তরিক প্রার্থনা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং তাঁদের প্রতি সাহায্য অবতীর্ণ করেন। ফলে এই ক্ষুদ্র দলটি কাফিরদের ঐ বিরাট দলটিকে তছনছ করে দেয় এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর হাতে বিরোধী দলের নেতা জালূত মারা পড়ে। ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহে এটাও রয়েছে যে, হযরত তালূত হযরত দাউদের (আঃ) সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, যদি তিনি জালুতকে হত্যা করতে পারেন তবে তিনি তার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং তাঁকে তাঁর অর্ধেক সম্পত্তিও দেবেন, আর অর্ধেক রাজত্বেরও অধিকারী করবেন। অতঃপর হযরত দাউদ (আঃ) জাতের প্রতি একটি পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তাতেই সে মারা যায়। হযরত তালুত তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেন। অবশেষে তিনি একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে যান এবং বিশ্বপ্রভুর পক্ষ হতে তাঁকে নবুওয়াতও দান করা হয় এবং হযরত শামভীল (আঃ)-এর পর তিনি নবী ও বাদশাহ দু'ই থাকেন। এখানে ‘হিকমত'-এর ভাবার্থ নবুওয়াত। মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী তাকে গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিদ্যাও শিক্ষা দেন। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে হযরত তালুতের মত সঠিক পরামর্শদাতা ও চিন্তাশীল বাদশাহ এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর মত মহাবীর সেনাপতি দান করে জাত ও তার অধীনস্থদেরকে অপসারিত করেছেন, এভাবে যদি তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা অপসারিত না করতেন। তবে অবশ্যই মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যদি এরূপভাবে আল্লাহ মানুষের একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করতেন তবে উপাসনাগৃহ এবং যে মসজিদসমূহে খুব বেশী করে আল্লাহর যিকির করা হয়, সবই ভেঙ্গে দেয়া হতো।' (২২:৪০) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, একজন সৎ ও ঈমানদারের কারণে আল্লাহ তা'আলা তার আশে-পাশের শত শত পরিবার হতে বিপদসমূহ দূর করে থাকেন।অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)। কিন্তু এই হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের আর একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা একজন খাঁটি মুসলমানের সততার কারণে তার সন্তানদেরকে সন্তানদের সন্তানদেরকে, তার পরিবারকে এবং আশে পাশের অধিবাসীদেরকে উপযুক্ত করে তোলেন এবং তার বিদ্যমানতায় তারা সবাই আল্লাহর হিফাযতে : থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের একটি হাদীসে রয়েছে : ‘কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে তোমাদের মধ্যে সাত ব্যক্তি এমন থাকবে যাদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে।' তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের অপর একটি হাদীসে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ত্রিশজন লোক এমন থাকবে, যাদের কারণে তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে।' এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় হযরত হাসান বসরীও (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা আল্লাহ তাআলার একটা নিয়ামত ও অনুগ্রহ যে, তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করে থাকেন। তিনিই প্রকৃত হাকীম। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমাতে পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর দলীলসমূহ বান্দাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করতে রয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন-“হে নবী (সঃ)! এই ঘটনাবলী এবং সমস্ত সত্য কথা আমি ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানিয়েছি। তুমি আমার সত্য নবী। আমার এই কথাগুলো এবং স্বয়ং তোমার নবুওয়াতের সত্যতা সম্বন্ধেও ঐসব লোক পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে, যাদের হাতে কিতাব রয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় শপথ করে স্বীয় নবীর (সঃ) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।

আল-বাকারা 2:252

২৫০-২৫২ নং আয়াতের তাফসীরঅর্থাৎ যেদিন মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র সেনাদলটি কাফিরদের কাপুরুষ সেনাদলকে দেখলেন তখন তারা মহান আল্লাহর নিকট করজোড় প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধৈর্য ও অটলতার পাহাড় বানিয়ে দিন এবং যুদ্ধের সময় আমাদের পদগুলো অটল ও স্থির রাখুন! যুদ্ধের মাঠ থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং শত্রুদের উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন। তাদের এই বিনীত ও আন্তরিক প্রার্থনা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং তাঁদের প্রতি সাহায্য অবতীর্ণ করেন। ফলে এই ক্ষুদ্র দলটি কাফিরদের ঐ বিরাট দলটিকে তছনছ করে দেয় এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর হাতে বিরোধী দলের নেতা জালূত মারা পড়ে। ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহে এটাও রয়েছে যে, হযরত তালূত হযরত দাউদের (আঃ) সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, যদি তিনি জালুতকে হত্যা করতে পারেন তবে তিনি তার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং তাঁকে তাঁর অর্ধেক সম্পত্তিও দেবেন, আর অর্ধেক রাজত্বেরও অধিকারী করবেন। অতঃপর হযরত দাউদ (আঃ) জাতের প্রতি একটি পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তাতেই সে মারা যায়। হযরত তালুত তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেন। অবশেষে তিনি একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে যান এবং বিশ্বপ্রভুর পক্ষ হতে তাঁকে নবুওয়াতও দান করা হয় এবং হযরত শামভীল (আঃ)-এর পর তিনি নবী ও বাদশাহ দু'ই থাকেন। এখানে ‘হিকমত'-এর ভাবার্থ নবুওয়াত। মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী তাকে গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিদ্যাও শিক্ষা দেন। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে হযরত তালুতের মত সঠিক পরামর্শদাতা ও চিন্তাশীল বাদশাহ এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর মত মহাবীর সেনাপতি দান করে জাত ও তার অধীনস্থদেরকে অপসারিত করেছেন, এভাবে যদি তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা অপসারিত না করতেন। তবে অবশ্যই মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যদি এরূপভাবে আল্লাহ মানুষের একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করতেন তবে উপাসনাগৃহ এবং যে মসজিদসমূহে খুব বেশী করে আল্লাহর যিকির করা হয়, সবই ভেঙ্গে দেয়া হতো।' (২২:৪০) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, একজন সৎ ও ঈমানদারের কারণে আল্লাহ তা'আলা তার আশে-পাশের শত শত পরিবার হতে বিপদসমূহ দূর করে থাকেন।অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)। কিন্তু এই হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের আর একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা একজন খাঁটি মুসলমানের সততার কারণে তার সন্তানদেরকে সন্তানদের সন্তানদেরকে, তার পরিবারকে এবং আশে পাশের অধিবাসীদেরকে উপযুক্ত করে তোলেন এবং তার বিদ্যমানতায় তারা সবাই আল্লাহর হিফাযতে : থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের একটি হাদীসে রয়েছে : ‘কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে তোমাদের মধ্যে সাত ব্যক্তি এমন থাকবে যাদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে।' তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের অপর একটি হাদীসে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ত্রিশজন লোক এমন থাকবে, যাদের কারণে তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে।' এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় হযরত হাসান বসরীও (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা আল্লাহ তাআলার একটা নিয়ামত ও অনুগ্রহ যে, তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করে থাকেন। তিনিই প্রকৃত হাকীম। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমাতে পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর দলীলসমূহ বান্দাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করতে রয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন-“হে নবী (সঃ)! এই ঘটনাবলী এবং সমস্ত সত্য কথা আমি ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানিয়েছি। তুমি আমার সত্য নবী। আমার এই কথাগুলো এবং স্বয়ং তোমার নবুওয়াতের সত্যতা সম্বন্ধেও ঐসব লোক পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে, যাদের হাতে কিতাব রয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় শপথ করে স্বীয় নবীর (সঃ) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।

আল-বাকারা 2:253

এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, রাসূলগণের মধ্যেও শ্রেণীভেদ রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি কোন নবীকে কোন নবীর উপর মর্যাদা দান করেছি এবং দাউদকে (আঃ) যাবুর’ প্রদান করেছি। এখানেও ওরই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্বয়ং আল্লাহর সাথে কথা বলারও মর্যাদা লাভ করেছেন। যেমন হযরত মূসা (আঃ), হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং হযরত আদম (আঃ)।সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যার মধ্যে মি'রাজের বর্ণনার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন্ আকাশে কোন্ নবীকে (আঃ) পেয়েছিলেন তারও বর্ণনা রয়েছে। নবীদের (আঃ) মর্যাদা কম-বেশী হওয়ার এটাও একটা দলীল। একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন মুসলমান ও একজন ইয়াহূদীর মধ্যে কিছু বচসা হয়। ইয়াহুদী বলেঃ ‘সেই আল্লাহর শপথ যিনি হযরত মূসাকে (আঃ) সারা জগতের উপর মর্যাদা দান করেছেন। মুসলমানটি একথা সহ্য করতে না পেরে তাকে এক চড় মারেন এবং বলেনঃ “ওরে খবীস! মুহাম্মদ (সঃ) হতেও তিনি শ্রেষ্ঠ:’ ইয়াহূদী সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে মুসলমানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। তিনি বলেনঃ “তোমরা আমাকে। নবীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না। কিয়ামতের দিন সবাই অজ্ঞান হয়ে যাবে। সর্বপ্রথম আমার জ্ঞান ফিরবে। আমি দেখবো যে, হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর আরশের পায়া ধরে রয়েছেন। আমার জানা নেই যে, আমার পূর্বে তারই জ্ঞান ফিরেছে না তিনি আসলে অজ্ঞানই হননি এবং তুর পাহাড়ের অজ্ঞানতার বিনিময়ে আজ আল্লাহ তাকে অজ্ঞানতা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আমাকে নবীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না।' এই হাদীসটি কুরআন শরীফের এই আয়াতটির বিপরীত বলে মনে হচ্ছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দু'য়ের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা কিছু নেই।সম্ভবতঃ নবীদের উপর তার যে শ্রেষ্ঠত্ব এটা জানার পূর্বে তিনি এই নির্দেশ দিয়ে থাকবেন। কিন্তু এই উক্তিটি চিন্তাধীনে রয়েছে। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, তিনি শুধু বিস্ময় প্রকাশ হিসেবেই একথা বলেছিলেন। তৃতীয় উত্তর এই যে, এরূপ ঝগড়ার সময় একজনকে অন্যজনের উপর মর্যাদা দেয়া হলে অন্যের মর্যাদা কমিয়ে দেয়া হয়, এজন্যেই তিনি এটা বলতে নিষেধ করেছিলেন। চতুর্থ উত্তর এই যে, তিনি যেন বলেছেনঃ “তোমরা মর্যাদা প্রদান করো না অর্থাৎ শুধুমাত্র নিজেদের খেয়াল খুশী ও গোঁড়ামির বশবর্তী হয়ে তোমরা তোমাদের নবীকে (সঃ) অন্যান্য নবীর (আঃ) উপর মর্যাদা প্রদান করো না।' পঞ্চম উত্তর এই যে, তার এই কথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের ফায়সালা তোমাদের অধিকারে নেই। বরং এ ফায়সালা হবে মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে। সহীহ মুসলিম শরীফের মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে; কিন্তু তাতে পরের বাক্যটি নেই। তিনি যাকে মর্যাদা দান করবেন তোমাদেরকে তা মেনে নিতে হবে। তোমাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশকে মেনে নেয়া ও তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- ঈসা (আঃ)-কে তিনি এমন স্পষ্ট দলীলসমূহ। প্রদান করেছেন যেগুলো দ্বারা বানী ইসরাঈলের উপর স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, তাঁর রিসালাত সম্পূর্ণরূপে সত্য। আর সাথে সাথে এটাও স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ঈসা (আঃ) অন্যান্য বান্দাদের মত আল্লাহর একজন শক্তিহীন ও অসহায় বান্দা ছাড়া আর কিছুই নন। আর তিনি পবিত্ৰাত্মা অর্থাৎ হযরত জিব্রাঈল (আঃ) দ্বারা তাঁকে সাহায্য করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, পরবর্তীদের মতবিরোধও তাঁর ইচ্ছারই নমুনা। তার মাহাত্ম্য এই যে, তিনি যা ইচ্ছে করেন তাই করে থাকেন।

আল-বাকারা 2:254

আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সুপথে নিজেদের মাল খরচ করে, তাহলে আল্লাহর নিকট তার পুণ্য জমা থাকবে। অতঃপর বলেন যে, তারা যেন তাদের জীবদ্দশাতেই কিছু দান-খয়রাত করে। কেননা কিয়ামতের দিন না ক্রয়-বিক্রয় চলবে, না পৃথিবী পরিমাণ সোনা দিয়ে জীবন রক্ষা করা যাবে না কারও বংশ, বন্ধুত্ব ও ভালবাসা কোন কাজে আসবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে সে দিন না তাদের মধ্যে বংশ পরিচয় থাকবে, না একে অপরের অবস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করবে।' (২৩:১০১) সেদিন সুপারিশকারীর সুপারিশ কোন কাজে আসবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফিরেরাই অত্যাচারী। অর্থাৎ পূর্ণ অত্যাচারী তারাই যারা কুফরের অবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করে। হযরত আতা বিন দীনার (রঃ) বলেন, “আমি মহান আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, তিনি কাফিরদেরকে অত্যাচারী বলেছেন কিন্তু অত্যাচারীদেরকে কাফির বলেননি।

আল-বাকারা 2:255

এই আয়াতটি আয়াতুল কুরসী। এটা অত্যন্ত মর্যাদা বিশিষ্ট আয়াত। হযরত উবাই বিন কা'বকে (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলার কিতাবে সর্বাপেক্ষা মর্যাদা বিশিষ্ট আয়াত কোটি: তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন।' তিনি পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন। বারবার প্রশ্ন করায় তিনি বলেনঃ “আয়াতুল কুরসী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “হে আবুল মুনযির! আল্লাহ তোমার জ্ঞানে বরকত দান করুন! যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে আমি বলছি যে, এর জিহবা হবে, ওষ্ঠ হবে এবং এটা প্রকৃত বাদশাহর পবিত্রতা বর্ণনা করবে ও আরশের পায়ায় লেগে থাকবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)হযরত উবাই বিন কা'ব বলেন, 'আমার একটি খেজুর পূর্ণ থলে ছিল। আমি লক্ষ্য করি যে, ওটা হতে প্রত্যহ খেজুর কমে যাচ্ছে। একদা রাত্রে আমি জেগে জেগে পাহারা দেই। আমি দেখি যে, যুবক ছেলের ন্যায় একটি জন্তু আসলো। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে আমার সালামের উত্তর দিলো। আমি তাকে বললামঃ তুমি মানুষ না জ্বিন:' সে বলল ‘আমি জ্বিন। আমি তাকে বললামঃ ‘তোমার হাতটা একটু বাড়াও তো।' সে হাত বাড়ালো। আমি তার হাতটি আমার হাতের মধ্যে নিলাম। হাতটি কুকুরের মত ছিলো ও তার উপর কুকুরের মত লোমও ছিল। আমি বললামঃ জ্বিনদের সৃষ্টি কি এভাবেই হয়।' সে বললোঃ ‘সমস্ত জ্বিনের মধ্যে আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী।' আমি বললামঃ আচ্ছা, কিভাবে তুমি আমার জিনিস চুরি করতে সাহসী হলে:' সে বললোঃ “আমি জানি যে, আপনি দান করতে ভালবাসেন। তাই আমি মনে করলাম যে, আমি কেন বঞ্চিত থাকি:' আমি বললাম, তোমাদের অনিষ্ট হতে কোন্ জিনিস রক্ষা করতে পারে:' সে বললোঃ ‘আয়াতুল কুরসী।'সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে রাত্রির সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “খবীস তো এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্যই বলেছে। (আবূ ইয়ালা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজিরদের নিকট গেলে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কুরআন কারীমের খুব বড় আয়াত কোনটি:' তিনি এই আয়াতুল কুরসীটিই পাঠ করে শুনান। (তাবরানী) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের (রাঃ) মধ্যে এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কি বিয়ে করেছো:' তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট মাল-ধন নেই বলে বিয়ে করিনি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমার কি (আরবি) মুখস্থ নেই:' তিনি বলেনঃ “এটা তো মুখস্থ আছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এটা তো কুরআন কারীমের এক চতুর্থাংশ হয়ে গেল।(আরবি) কি মুখস্থ নেই:' তিনি বলেনঃ হ্যা, ওটাও আছে। তিনি বলেন ‘কুরআন পাকের এক চতুর্থাংশ এটা হলো। আবার জিজ্ঞেস করেন (আরবি) কি মুখস্থ আছে:' তিনি বলেনঃ ‘হা। তিনি বলেনঃ এক চতুর্থাংশ এটা হলো। মুখস্থ আছে কি:' তিনি বলেনঃ “হ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা এক চতুর্থাংশ ‘আয়াতুল কুরসী' কি মুখস্থ আছে: তিনি বলেনঃ হ্যা, আছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ এক চতুর্থাংশ কুরআন এটা হলো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে দেখি যে,তিনি মসজিদে অবস্থান করছেন। আমিও বসে পড়ি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কি নামায পড়েছো: আমি বলিঃ না।' তিনি বলেনঃ ‘উঠ, নামায আদায় করে নাও। আমি নামায আদায় করে আবার বসে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আমাকে বলেনঃ “হে আবূ যার! মানুষ শয়তান, জ্বিন শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর। আমি বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষ শয়তানও হয় নাকি:' তিনি বলেনঃ হ্যা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নামায সম্বন্ধে আপনি কি বলেন: তিনি বলেনঃ 'ওটার সবই ভাল। যার ইচ্ছে হবে কম অংশ নেবে এবং যার ইচ্ছে হবে বেশী অংশ নেবে। আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আর রোযা:' তিনি বলেনঃ “এটা এমন ফরয যা যথেষ্ট হয়ে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট অতিরিক্ত থাকে। আমি বলিঃ ‘আর দান-খয়রাত:'তিনি বলেনঃ ‘বহুগুণ বিনিময় আদায়কারী'। আমি বলিঃ ‘সবচেয়ে উত্তম দান কোন্টি:' তিনি বলেনঃ ‘যে ব্যক্তির মাল অল্প রয়েছে তার সাহস করা কিংবা গোপনে অভাবগ্রস্তের অভাব দূর করা। আমি জিজ্ঞেস করিঃ সর্বপ্রথম নবী কে:' তিনি বলেনঃ “হযরত আদম (আঃ)। আমি বলি, তিনি কি নবী ছিলেন: তিনি বলেনঃ “তিনি নবী ছিলেন এবং আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করিঃ রাসূলগণের সংখ্যা কত:' তিনি বলেনঃ “তিনশো এবং দশের কিছু উপর, বড় দল। একটি বর্ণনায় তিনশো পনের জন শব্দ (সংখ্যা) রয়েছে। আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উপর সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন কোন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেনঃ ‘আয়াতুল কুরসী।'(আরবি) মুসনাদ-ই- আহমাদ।হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “আমার ধনাগার হতে জ্বিনেরা ধন চুরি করে নিয়ে যেতো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এজন্যে অভিযোগে পেশ করি। তিনি বলেন, যখন তুমি তাকে দেখবে তখন(আরবি)| পাঠ করবে। যখন সে এলো তখন আমি এটা পাঠ করে তাকে ধরে ফেললাম। সে বললঃ আমি আর আসবো না। সুতরাং আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেনঃ তোমার বন্দী কি করেছিল: আমি বললাম, তাকে আমি ধরে ফেলেছিলাম। কিন্তু সে আর না আসার অঙ্গীকার করায় তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, সে আবার আসবে। আমি তাকে এভাবে দু'তিন বার ধরে ফেলে। অঙ্গীকার নিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেই। আমি তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি। তিনি বারবারই বলেন, সে আবার আসবে। শেষবার আমি তাকে বলি এবার আমি তোমাকে ছাড়বো না। সে বলে, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে এমন একটি জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি যে, কোন জ্বিন ও শয়তান আপনার কাছে আসতেই পারবে না। আমি বললাম আচ্ছা, বলে দাও। সে বললো, ওটা ‘আয়াতুল কুরসী। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি বলেন, সে মিথ্যাবাদী হলেও এটা সে সত্যই বলেছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে(আরবি) এর বর্ণনায়ও এই হাদীসটি হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে রমযানের যাকাতের উপর প্রহরী নিযুক্ত করেন। আমার নিকট একজন আগমনকারী আসে এবং ঐ মাল হতে কিছু কিছু উঠিয়ে নিয়ে সে তার চাদরে জমা করতে থাকে। আমি তাকে ধরে ফেলে বলি- তোমাকে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিয়ে যাবো। সে বলে, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি অত্যন্ত অভাবী। আমি তখন তাকে ছেড়ে দেই। সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার রাত্রের বন্দী কি করেছিল: আমি বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে তার ভীষণ অভাবের অভিযোগ করে। তার প্রতি আমার করুণার উদ্রেক হয়। কাজেই আমি তাকে ছেড়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ সে তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছে। সে আবার আসবে। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথায় বুঝলাম যে, সে সত্যই আবার আসবে। আমি পাহারা দিতে থাকলাম। সে এলো এবং খাদ্য উঠাতে থাকলো। আবার আমি তাকে ধরে ফেলে বললামঃ “তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে নিয়ে যাবো। সে আবার ঐ কথাই বললো, আমাকে ছেড়ে দিন। কেননা আমি অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। তার প্রতি আমার দয়া হলো। সুতরাং তাকে ছেড়ে দিলাম। সকালে আমাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হে আবু হুরাইরাহ (রাঃ)! তোমার রাত্রের বন্দীটি কি করেছে: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে অভাবের অভিযোগ করায় আমি তাকে দয়া করে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছে। সে আবার আসবে। আবার আমি তৃতীয় রাত্রে পাহারা দেই। অতঃপর সে এসে খাদ্য উঠাতে থাকলো। আমি তাকে বললামঃ ‘এটাই তৃতীয় বার এবং এবারই শেষ। তুমি বার বার বলছে যে, আর আসবে না; অথচ আবার আসছো। সুতরাং আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে নিয়ে যাবো।' তখন সে বললোঃ “আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আপনাকে এমন। কতকগুলো কথা শিখিয়ে দিচ্ছি যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনার উপকার সাধন করবেন। আমি বললামঃ ঐগুলো কি: সে বললোঃ “যখন আপনি বিছানায় শয়ন করবেন তখন আয়াতুল কুরসী।(আরবি) শেষ পর্যন্ত পড়ে নেবেন। তবে আল্লাহ আপনার রক্ষক হবেন এবং সকাল পর্যন্ত কোন শয়তান আপনার নিকটবর্তী হতে পারবে না। তারা ভাল জিনিসের খুবই লোভী। তখন, নবী (সঃ) বললেনঃ সে চরম মিথ্যাবাদী হলেও এটা সে সত্যই বলেছে। হে আবু হুরাইরাহ (রাঃ)! তিন রাত তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছে তা জান কি: আমি বললামঃ না। তিনি বললেনঃ সে শয়তান -(সহীহ বুখারী শরীফ)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐগুলো খেজুর ছিলো এবং ওগুলো সে মুষ্টি ভরে ভরে নিয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ তুমি শয়তানকে ধরবার ইচ্ছে করলে যখন সে দরজা খুলবে তখন। (আরবি) পাঠ করবে। শয়তান ওজর পেশ করে বলেছিলঃ আমি একটি দরিদ্র জ্বিনের ছেলে-মেয়ের জন্যে এগুলো নিয়ে যাচ্ছি। (তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই) সুতরাং ঘটনাটি। তিনজন সাহাবী (রাঃ) কর্তৃত বর্ণিত হলো। তারা হচ্ছেন হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ), হযরত আৰূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ)। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ একটি মানুষের সঙ্গে একটি জ্বিনের সাক্ষাৎ ঘটে। জ্বিনটা মানুষটাকে বলেঃ এসো আমরা দুজন মল্লযুদ্ধ করি। যদি তুমি আমাকে নীচে ফেলে দিতে পার তবে আমি তোমাকে এমন একটি আয়াত শিখিয়ে দেবো যে, যদি তুমি বাড়ী গিয়ে ঐ আয়াতটি পাঠ কর তবে শয়তান তোমার বাড়ীতে প্রবেশ করতে পারবে না। মল্লযুদ্ধ হলো এবং ঐ লোকটি জ্বিনটিকে নীচে ফেলে দেন। অতঃপর তিনি জ্বিনটিকে বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও কাপুরুষ। তোমার হাত কুকুরের মত। জ্বিনেরা কি সবাই এরকমই হয়ে থাকে, না তুমি একাই এরকম: সে বলেঃ তাদের মধ্যে আমিই তো শক্তিশালী। পুনরায় কুস্তি হলে সেবারেও জ্বিন নীচে পড়ে যায়। তখন জ্বিনটি বলেঃ ঐ আয়তটি হচ্ছে আয়াতুল কুরসী। যে ব্যক্তি বাড়ীতে প্রবেশের সময় এই আয়াতটি পাঠ করে থাকে তার বাড়ী হতে শয়তান গাদার মত চীৎকার করতে করতে পালিয়ে যায়। ঐ লোকটি ছিলেন হযরত উমার (রাঃ)। (কিতাবুল গারীব)।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কুরআন কারীমের মধ্যে একটি আয়াত রয়েছে যা কুরআন মাজীদের সমস্ত আয়াতের নেতা। যে বাড়ীতে ওটা পাঠ করা হয় তথা হতে শয়তান পালিয়ে যায়। ঐ আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসী। (মুসতাদরাক-ইহাকিম) জামেউত তিরমিযী শরীফের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, প্রত্যেক সূরার কুঁজ ও উচ্চতা রয়েছে। কুরআন মাজীদের চূড়া হচ্ছে সুরা-ই-বাকারা এবং তার মধ্যকার আয়াতুল কুরসীটি সমস্ত আয়াতের নেতা। হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ কুরআন মাজীদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন আয়াত কোনটি: হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ আমার খুব ভাল জানা আছে। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি যে, ওটা হচ্ছে ‘আয়াতুল কুরসী' (তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এ দুটি আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম রয়েছে। একটিতে হচ্ছে আয়াতুল কুরসী এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে।(আরবি) (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ইসমে আযম তিনটি সূরাতে রয়েছে। এই নামের বরকতে যে প্রার্থনাই আল্লাহ তা'আলার নিকট করা হয় তা গৃহীত হয়ে থাকে। ঐ সূরা তিনটি হচ্ছে সুরা বাকারা, সূরা আলে ইমরান এবং সূরা-ই-ত্বা-হা (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। দামেস্কের খতিব হযরত হিশাম বিন আম্মার (রঃ) বলেন যে, সূরা বাকারার ইসমে আযমের আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসী, সূরা আলে ইমরানের প্রথম আয়াত তিনটি এবং সূরা ত্বা-হার(আরবি) এই আয়াতটি।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাজের পরে আয়াতুল কুরসী পড়ে থাকে তাকে মৃত্যু ছাড়া অন্য কোন জিনিস বেহেশতে দেয় না। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। ইমাম নাসাঈও (রঃ) এই হাদীসটি স্বীয় পুস্তক আ'মালুল ইয়াওমু ওয়াল লাইল -এর মধ্যে এনেছেন। ইবনে হিব্বান (রঃ) ও এটাকে স্বীয় সহীহর -এর মধ্যে এনেছেন। এই হাদীসের সনদ সহীহ বুখারীর শর্তের উপর রয়েছে। কিন্তু আবুল ফারাহ বিন জাওলী এই হাদীসটিকে মাওযু' বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। কিন্তু এর ইসনাদও দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াইএর আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা বিন ইমরানের (আঃ) নিকট ওয়াহী অবতীর্ণ করেনঃ প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবে। যে ব্যক্তি এটা করবে আমি তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অন্তর এবং যিকিরকারী জিহ্বা দান করবো এবং তাকে নবীদের পুণ্য ও সিদ্দীকদের আমল প্রদান করবে। এর উপর সদা স্থিরতা শুধুমাত্র নবীদের দ্বারা বা সিদ্দীকদের দ্বারা সম্ভবপর হয়ে থাকে কিংবা ঐ বান্দাদের দ্বারা সম্ভবপর হয়ে থাকে যাদের অন্তর আমি ঈমানের জন্যে পরীক্ষা করে নিয়েছি বা নিজের পথে তাদেরকে শহীদ করার ইচ্ছে করেছি। কিন্তু এই হাদীসটি অত্যন্ত মুনকার’ বা অস্বীকার্য।জামেউত তিরমিযী শরীফে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি সূরা-হা-মীম আল মু'মিনকে (আরবি) পর্যন্ত এবং আয়াতুল কুরসীকে সকালে পড়ে নেবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় পড়ে নেবে সে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর হিফাযতে থাকবে। কিন্তু এই হাদীসটি গারীব। এই আয়াতের ফযীলত সম্বন্ধীয় আরও বহু হাদীস রয়েছে। কিন্তু ওগুলোর সনদে দুর্বলতা রয়েছে বলে এবং সংক্ষেপ করাও আমাদের উদ্দেশ্য বলে আমরা এখানে ঐ হাদীসগুলো আর পেশ করলাম না। এই পবিত্র আয়াতে পৃথক পৃথক অর্থ সম্বলিত দশটি বাক্য রয়েছে। প্রথম বাক্যে আল্লাহ তা'আলার একত্বের বর্ণনা রয়েছে যে, সৃষ্টজীবের তিনিই একমাত্র আল্লাহ। দ্বিতীয় বাক্যে রয়েছে যে, তিনি চির জীবন্ত, তার উপর কখনও মৃত্যু আসবে না। তিনি চির বিরাজমান। কাইউমুন শব্দটির দ্বিতীয় পঠন কাইয়্যামুনও রয়েছে। সুতরাং সমস্ত সৃষ্টজীব তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোন লোকই কোন জিনিস প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তাঁর (ক্ষমতার) নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটা নিদর্শন যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল তাঁরই হুকুমে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।' (৩০:২৫)অতঃপর বলা হচ্ছে, না কোন ক্ষয়-ক্ষতি তাঁকে স্পর্শ করে, না কোনও সময় তিনি স্বীয় জীব হতে উদাসীন থাকেন। বরং প্রত্যেকের কাজের উপর তাঁর সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। প্রত্যেকের অবস্থা তিনি দেখতে রয়েছেন। সৃষ্টজীবের কোন অণু-পরমাণুও তার হিফাযত ও জ্ঞানের বাইরে নেই। তন্দ্রা ও দ্রিা কখনও তাঁকে স্পর্শ করে না। সুতরাং তিনি ক্ষণিকের জন্যেও সৃষ্টজীব হতে উদাসীন থাকেন না। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে সাহাবীদেরকে (রাঃ) চারটি কথার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কখনও শয়ন করেন না আর পবিত্র সত্ত্বার জন্যে নিদ্রা আদৌ শোভনীয় নয়। তিনি দাঁড়িপাল্লার রক্ষক। যার জন্য চান ঝুঁকিয়ে দেন এবং যার জন্য চান উঁচু করে দেন। সারা দিনের কার্যাবলী রাত্রের পূর্বে এবং রাত্রির আমল দিনের পূর্বে তাঁর নিকট উঠিয়ে নেয়া হয়। তাঁর সামনে রয়েছে আলো বা আগুনের পর্দা। সেই পর্দা সরে গেলে যতদূর পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি পৌছে ততদূর পর্যন্ত সমস্ত জিনিস তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইকরামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা শয়ন করেন কি: তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের উপর ওয়াহী পাঠান যে, তারা যেন হযরত মূসাকে (আঃ) উপর্যুপরি তিন রাত্রি জাগিয়ে রাখেন। তাঁরা তাই করেন। পরপর তিনটি রাত ধরে তারা তাকে মোটেই ঘুমোতে দেননি। এরপরে তার হাতে দুটো বোতল দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, তিনি যেন ঐদু’টো আঁকড়ে ধরে রাখেন। তাকে আরও সতর্ক করে দেয়া হয়, যেন ওদু'টো পড়েও না যায় এবং ভেঙ্গেও না পড়ে। তিনি বোতল দু'টো ধরে রাখেন। কিন্তু দীর্ঘ জাগরণ ছিল বলে ক্ষণপরে তন্দ্রায় অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং তারপরেই গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লেন। ফলে বোতল দুটি তার অজ্ঞাতসারে দ্রিাভিভূত অবস্থায় হাত থেকে খসে পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। এতদ্বারা তাকে বলা হলো যে, যখন একজন তন্দ্রাভিভূত ও ঘুমন্ত ব্যক্তি সামান্য দু'টো বোতল ধরে রাখতে পারলো না, তখন যদি আল্লাহ তাআলার তন্দ্রা আসে বা তিনি দ্রিা যান তবে আকাশ ও পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ কিরূপে সম্ভব হবে: কিন্তু এটা বানী ইসরাঈলের রেওয়ায়াত। সুতরাং এটা মনেও তেমন ধরে না। কেননা, এটা অসম্ভব কথা যে, হযরত মূসার (আঃ) মত একজন মর্যাদাবান নবী এবং মহান আল্লাহর পরিচয় লাভকারী ব্যক্তি আল্লাহর ঐ গুণ হতে অজ্ঞাত থাকবেন ও তার সন্দেহ থাকবে যে, আল্লাহ শুধু জেগেই থাকেন , নিদ্রাও যান। এর চেয়েও বেশী গারীব ঐ হাদীসটি যা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তা হল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই ঘটনাটি মিম্বরের উপর বর্ণনা করেছেন। এটা অত্যন্ত গরীব হাদীস এবং স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে যে, এটা নবীর কথা নয় বরং বানী ইসরাঈলের কথা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এইরূপ বর্ণিত আছে, বানী ইসরাঈল বা হযরত ইয়াকুবের বংশধরগণই হযরত মূসা (আঃ)-কে এই প্রশ্ন করেছিলো যে, তার প্রভু ঘুমান কি না। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আঃ)-কে দু'টি বোতল হাতে ধরে রাখতে বলেন। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে বোতল দু’টো হঠাৎ করে তার হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেনঃ “হে মূসা! যদি আমি ঘুমাতাম তবে আকাশ ও পৃথিবী পড়ে ধ্বংস হয়ে যেতো, যেমন বোতল দু’টো তোমার হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর আয়াতুল কুরসী অবতীর্ণ করেন। এতে বলা হয় যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তাঁরই দাসত্বে নিয়োজিত রয়েছে এবং সবাই তাঁরই সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস রাহমানের দাসত্বের কার্যে উপস্থিত রয়েছে। তাদের সকলকেই আল্লাহ এক এক করে গণনা করে রেখেছেন এবং ঘিরে রেখেছেন। সমস্ত সৃষ্টজীব একে একে তাঁর সামনে উপস্থিত হবে। কেউ এমন নেই যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত কারও জন্য সুপারিশ করতে পারেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘আকাশসমূহে বহু ফেরেশতা রয়েছে; কিন্তু তাদের সুপারিশও কোন কাজে আসবে না। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি হিসেবে যদি কারও জন্যে অনুমতি দেয়া হয় সেটা অন্য কথা। অন্য স্থানে রয়েছে: (আরবি) অর্থাৎ তারা কারও জন্যে সুপারিশ করে না; কিন্তু তার জন্য করে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট (২১:২৮)।' এখানেও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহা-মর্যাদার কথা বর্ণিত হচ্ছে। তার অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া কারও সাহস নেই যে, সে কারও সুপারিশের জন্যে মুখ খোলে। হাদীস শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমি আল্লাহ তা'আলার আরশের নীচে গিয়ে জিসদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ পাক যতক্ষণ চাইবেন আমাকে এই অবস্থায় রাখবেন। অতঃপর বলবেনঃ মস্তক উত্তোলন কর। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে, সুপারিশ কর, তা গৃহীত হবে।' তিনি বলেনঃ “আমাকে সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হবেএবং তাদেরকে আমি বেহেশতে নিয়ে যাব। সেই আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্বন্ধে জ্ঞাত। তার জ্ঞান সমস্ত সৃষ্টজীবকে ঘিরে রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় ফেরেশতাদের উক্তি নকল করা হয়েছেঃ “আমরা তোমার প্রভুর নির্দেশ ছাড়া অবতরণ করতে পারি না। আমাদের সামনে ও পিছনের সমস্ত জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে এবং তোমার প্রভু ভুল-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং অন্যান্য মনীষী হতে নকল করা হয়েছে কুরসী’ শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে দুটি পা রাখার স্থান।একটি মারফু হাদীসেও এটাই বর্ণিত আছে এবং এও রয়েছে যে, ওর পরিমাপ আল্লাহ ছাড়া আর কারও জানা নেই। স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও মারুফু'রূপে এটাই বর্ণিত আছে বটে কিন্তু মারফু হওয়া সাব্যস্ত নয়। আবৃ মালিক (রঃ) বলেন যে, কুরসী আরশের নীচে রয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে,আকাশ ও পৃথিবী কুরসীর মধ্যস্থলে রয়েছে এবং কুরসী আরশের সম্মুখে রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে যদি ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং সবকে মিলিত করে এক করে দেয়া হয় তবে তা কুরসীর তুলনায় ঐরূপ যেরূপ জনশূন্য মরু প্রান্তরে একটি বৃত্ত।'ইবনে জারীর (রঃ) হযরত উবাই (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি (হযরত উবাই) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ সাতটি আকাশ কুরসীর মধ্যে এরূপই যেরূপ ঢালের মধ্যে সাতটি দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা)।হযরত আৰু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, আরশের কুরসী ঐরূপ যেরূপ জনশূন্য মরু প্রান্তরে একটি লোহার বৃত্ত। হযরত আবু যার (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, তিনি কুরসী সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কুরসীর তুলনায় সাতটি আকাশ ও পৃথিবী ঐরূপ যেরূপ মরু প্রান্তরে একটি বৃত্ত। নিশ্চয় কুরসীর উপরে আরশের মর্যাদা ঐরূপ যেরূপ মরুভূমির মর্যাদা বৃত্তের উপরে।হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলে আমার জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তাঁর কুরসী আকাশ ও পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু যেরূপ (মাল বোঝাই করায়) নতুন গদি চড়চড় করে সেইরূপ কুরসী আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ভারে চড়চড় করছে।' এই হাদীসটি বহু সনদে বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে বটে; কিন্তু কোন সনদে কোন বর্ণনাকারী অপ্রসিদ্ধ রয়েছে, কোনটি মুরসাল, কোনটি মাওকুফ, কোনটি খুবই গরীব, কোনটিতে কোন বর্ণনাকারী লুপ্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ‘গরীব হচ্ছে হযরত যুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি যা সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে এবং ঐ বর্ণনাগুলোও রয়েছে যেগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কুরসীকে ফায়সালার জন্যে রাখা হবে। প্রকাশ্য কথা এই যে, এই আয়াতে এটা বর্ণিত হয়নি। ইসলামী দর্শন বেত্তাগণ বলেন যে, কুরসী হচ্ছে অষ্টম আকাশ যাকে (আরবি) বলা হয়। তার উপর নবম আকাশ আর একটি রয়েছে যাকে, এবং বলা হয়। কিন্তু অন্যান্যগণ এটাকে খণ্ডন করেছেন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরসীটাই হচ্ছে আরশ। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, কুরসী ও আরশ এক জিনিস নয়; বরং কুরসী অপেক্ষা আরশ অনেক বড়। কেননা এর সমর্থনে বহু হাদীস এসেছে। আল্লামা ইবনে জারীর (রঃ) তো এই . ব্যাপারে হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটির উপরই ভরসা করে রয়েছে। কিন্তু আমার মতে এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-এগুলোর সংরক্ষণে তাকে বিব্রত হতে হয় না, বরং এগুলো সংরক্ষণ তার নিকট অতীব সহজ। তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের কার্যাবলী সম্বন্ধে সম্যক অবগত রয়েছেন। সমুদয় বস্তুর উপর তিনি রক্ষকরূপে রয়েছেন। কোন কিছুই তার দৃষ্টির অন্তরালে নেই। সমস্ত সৃষ্টজীব তার সামনে অতি তুচ্ছ। সবাই তার মুখাপেক্ষী এবং সবাই তার নিকট অতি দরিদ্র। তিনি ঐশ্বর্যশালী এবং অতীব প্রশংসিত। তিনি যা চান তাই করে থাকেন। তাঁকে হুকুম দাতা কেউ নেই এবং তাঁর কার্যের হিসাব গ্রহণকারীও কেউ নেই। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ব্যাপক ক্ষমতাবান। প্রত্যেক জিনিসেরই মালিকানা তাঁর হাতে রয়েছে। এ জন্যেই তিনি বলেনঃ(আরবি)অর্থাৎ তিনি সমুন্নত ও মহীয়ান।' এই আয়াতটিতে এবং এই প্রকারের আরও বহু আয়াতে ও সহীহ হাদীসসমূহে মহান আল্লাহর গুণাবলী সম্বন্ধে যত কিছু এসেছে এগুলোর অবস্থা জানবার চেষ্টা না করে এবং অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা না করে বরং ঐগুলোর উপর বিশ্বাস রাখাই আমাদের অবশ্য কর্তব্য। আমাদের পূর্ববর্তী মহা মনীষীগণ এই পন্থাই অবলম্বন করেছিলেন।

আল-বাকারা 2:256

এখানে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন-কাউকে জোর করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করো না। ইসলামের সত্যতা প্রকাশিত ও উজ্জ্বল হয়ে পড়েছে এবং ওর দলিল প্রমাণাদি বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং জোর জবরদস্তির কি প্রয়োজন: যাকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করবেন, যার বক্ষ খুলে দেবেন, যার অন্তর উজ্জ্বল হবে এবং যার চক্ষু দৃষ্টিমান হবে সে আপনা আপনিই ইসলামের প্রেমে পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু যার অন্তর-চক্ষু অন্ধ এবং কর্ণ বধির সে এর থেকে দূরে থাকবে। অতঃপর যদি তাদেরকে জোরপূর্বক ইসলামে দীক্ষিত করা হয়, তাতেই বা লাভ কি: তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কাউকেও ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে জোর জবরদস্তি করো না। এই আয়াতটির শান-ই-নুযুল এই যে, মদীনার মুশরিকরা স্ত্রী লোকদের সন্তানাদি না হলে তারা ন্যর' মানতো: যদি আমাদের ছেলে-মেয়ে হয় তবে আমরা তাদেরকে ইয়াহুদী করতঃ ইয়াহুদীদের নিকট সমর্পণ করে দেবো।' এইভাবে তাদের বহু সন্তান ইয়াহুদীদের নিকট ছিল। অতঃপর এই লোকগুলো ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় এবং আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারী রূপে গণ্য হয়। এদিকে ইয়াহুদীদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বাধে। অবশেষে তাদের আভ্যন্তরীণ যড়যন্ত্র ও প্রতারণা থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে দেশ হতে বহিস্কৃত করার নির্দেশ দেন। সেই সময় মদীনার এই আনসার মুসলমানদের যেসব ছেলে ইয়াহূদীদের নিকট ছিল তাদেরকে নিজেদের আকর্ষণে মুসলমান করে নেয়ার উদ্দেশ্যে তারা ইয়াহুদীদের নিকট হতে তাদেরকে ফিরিয়ে চান। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে বলা হয়- তোমরা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি করো না।অন্য একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আনসারদের বানু সলিম বিন আউফ গোত্রের মধ্যে হুসাইনী (রাঃ) নামক একটি লোক ছিলেন। তাঁর দু'টি ছেলে খ্রীষ্টান ছিল। আর তিনি নিজে মুসলমান ছিলেন। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট আরয করেন যে, তাঁকে অনুমতি দেয়া হলে তিনি তাঁর ছেলে দু’টিকে জোর করে মুসলমান করে নেবেন। কেননা তারা স্বেচ্ছায় খ্রীষ্টান ধর্ম হতে ফিরে আসতে চায় না। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এরূপ করতে নিষেধ করে দেয়া হয়। অন্য বর্ণনায় এতটুকু বেশীও রয়েছে যে, খ্রষ্টানদের এক যাত্রী দল ব্যবসার জন্য সিরিয়া হতে কিশমিশ নিয়ে এসেছিল। তাদের হাতে এই দুটি ছেলে খ্রীষ্টান হয়ে যায়। ঐ যাত্রী দল চলে যেতে আরম্ভ করলে এরাও তাদের সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাদের পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ আপনি অনুমতি দিলে আমি এদেরকে কিছু শাস্তি দিয়ে জোর পূর্বক মুসলমান করে নেই। নতুবা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্যে আপনাকে লোক পাঠাতে হবে। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।হযরত উমার (রাঃ)-এর আসবাক নামক ক্রীতদাসটি খ্রীষ্টান ছিল। তিনি তার নিকট ইসলাম পেশ করতেন; কিন্তু সে অস্বীকার করতো। তিনি তখন বলতেনঃ এটা তোমার ইচ্ছা। ইসলাম জোর-জবরদস্তি হতে বাধা দিয়ে থাকে। আলেমদের একটি বড় দলের ধারণা এই যে, এই আয়াতটি ঐ আহলে কিতাবের ব্যাপারে প্রযোজ্য যারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের রহিতকরণ ও পরিবর্তনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জিজিয়া প্রদানে সম্মত হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন যে, যুদ্ধের আয়াত এই আয়াতটিকে রহিত করেছে। এখন সমস্ত অমুসলমানকে এই পবিত্র ধর্মের প্রতি আহবান করা অবশ্য কর্তব্য। যদি কেউ এই ধর্ম গ্রহণে অস্বীকার করে এবং মুসলমানদের অধীনতা স্বীকার করতঃ জিজিয়া প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় তবে অবশ্যই মুসলমান তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করবে। যেমন অন্য জায়গায়। রয়েছেঃ অতিসত্বরই তোমাদেরকে ভীষণ শক্তিশালী এক সম্প্রদায়ের দিকে আহবান করা হবে, হয় তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “হে নবী (সঃ)! কাফির ও মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধ কর এবং তাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন কর।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের আশে-পাশের কাফিরদের সাথে যুদ্ধ কর তারা তোমাদের মধ্যে পাবে কঠোরতা এবং বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহ খোদাভীরুদের সাথেই রয়েছেন।বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ তোমার প্রভু ঐ লোকদের উপর বিস্মিত হন যাদেরকে শৃংখলে আবদ্ধ করে বেহেশতের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে আনা হয়, অর্থাৎ ঐ সব কাফির, যাদেরকে বন্দী অবস্থায় শৃংখলে আবদ্ধ করে যুদ্ধের মাঠ হতে টেনে আনা হয়। অতঃপর তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং এর ফলে তাদের ভিতর ও বাহির ভাল হয়ে যায় ও বেহেশতের যোগ্য হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুসলমান হয়ে যাও।' সে বলেঃ আমার মন চায় না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মন না চাইলেও মুসলমান হও। এই হাদীসটি ‘সুলাসী'। অর্থাৎ নবী (সঃ) পর্যন্ত এতে তিনজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। কিন্তু এর দ্বারা এটা মনে করা উচিত হবে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধ্য করেছিলেন। বরং তাঁর এই কথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ তুমি কালেমা পড়ে নাও, এক দিন হয়তো এমনও আসবে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তর খুলে দিবেন এবং তুমি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। তুমি হয়তো উত্তম নিয়ম ও খাটি আমলের তাওফিক লাভ করবে।যে ব্যক্তি প্রতিমা, বাতিল উপাস্য ও শয়তানী কথা পরিত্যাগ করতঃ আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী হয় এবং সত্যার্যাবলী সম্পাদন করে সে সঠিক পথের উপর রয়েছে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে যাদ এবং (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শয়তান। বীরত্ব ও ভীরুতা এই দুটি হচ্ছে উষ্ট্রের দু’দিকের দুটি সমান বোঝা যা মানুষের মধ্যে রয়েছে। একজন বীর পুরুষ একটি অপরিচিত লোকের সাহায্যার্থে জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। পক্ষান্তরে একজন কাপুরুষ আপন মায়ের জন্যেও সম্মুখে অগ্রসর হতে সাহসী হয় না। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা হচ্ছে তার ধর্ম। মানুষের সত্য বংশ হচ্ছে তার উত্তম চরিত্র, সে যে বংশেরই লোক হোক না কেন। হযরত উমারের (রাঃ) (আরবি)-এর অর্থ শয়তান’ লওয়া যথার্থই হয়েছে। কেননা, সমস্ত মন্দ কার্যই এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যেগুলো অজ্ঞতা যুগের লোকদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। যেমন প্রতিমা পূজা, তাদের কাছে অভাব অভিযোগ পেশ করা এবং বিপদের সময় তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তারা দৃঢ়তর রজ্জুকে আঁকড়িয়ে ধরলো। অর্থাৎ ধর্মের সুউচ্চ ও শক্ত ভিত্তিকে গ্রহণ করলো যা কখনও ছিড়ে পড়বে না।(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঈমান, ইসলাম, আল্লাহর একত্ববাদ, কুরআন ও আল্লাহর পথের প্রতি ভালবাসা এবং তাঁরই সন্তুষ্টির জন্যে শক্রতা করা। এই কড়া তার বেহেশতে প্রবেশ লাভ পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়বে না। অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে (১৩:১১)। মুসনাদ-ই-আমাদের একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত কায়েস বিন উবাদাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন ‘আমি মসজিদ-ই-নব্বীতে (সঃ) অবস্থান করছিলাম। এমন সময় তথায় এক ব্যক্তির আগমন ঘটে। যার মুখমণ্ডলে খোদাভীতির লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। তিনি হালকাভাবে দুই রাকাআত নামায আদায় করেন। জনগণ তাঁকে দেখে মন্তব্য করেনঃ এই লোকটি বেহেশতী। তিনি মসজিদ হতে বের হলে আমিও তার পিছনে গমন করি। তার সাথে আমার কথাবার্তা চলতে থাকে। আমি তার মনোযোগ আকর্ষণ করে বলিঃ ‘আপনার আগমনকালে জনগণ আপনার সম্বন্ধে এইরূপ মন্তব্য করেছিল। তিনি বলেনঃ সুবহান্নাল্লাহ! কারও এইরূপ কথা বলা উচিত নয় যা তার জানা নেই। তবে, হ্যা, এইরূপ কথা তো অবশ্যই রয়েছে। যে, আমি একবার স্বপ্নে দেখি, আমি যেন একটি সবুজ শ্যামল ফুল বাগানে রয়েছি। ঐ বাগানের মধ্যস্থলে একটি লোহার স্তম্ভ রয়েছে যা ভূমি হতে আকাশ পর্যন্ত উঠে গেছে। ওর চুড়ায় একটি কড়া রয়েছে। আমাকে ওর উপরে যেতে বলা হয়। আমি বলি যে, আমি তো উঠতে পারবো না। অতঃপর এক ব্যক্তি আমাকে ধরে থাকে এবং আমি অতি সহজেই উঠে যাই। তারপর আমি কড়াটিকে ধরে থাকি। লোকটি আমাকে বলেঃ খুব শক্ত করে ধরে থাক। কড়াটি আমি ধরে রয়েছি এই অবস্থাতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমি আমার এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ ‘ফুলের বাগানটি হচ্ছে ইসলাম, স্তম্ভটি ধর্মের স্তম্ভ এবং কড়াটি হচ্ছে (আরবি) তুমি মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।এই লোকেটি হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)। এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের ঐ হাদীসটিতেই রয়েছে যে, তিনি সেই সময় বৃদ্ধ ছিলেন এবং লাঠির উপর ভর করে মসজিদে নব্বীতে (সঃ) এসেছিলেন এবং একটি স্তম্ভের পিছনে নামায পড়েছিলেন। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ বেহেশত আল্লাহর জিনিস। তিনি যাকে চান তাকেই তথায় নিয়ে যান। তিনি স্বপ্নের বর্ণনায় বলেছিলেনঃ এক ব্যক্তি আমাকে একটি লম্বা চওড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মাঠে নিয়ে যান। তথায় আমি বাম দিকে চলতে থাকলে তিনি আমাকে বলেনঃ তুমি এইরূপ নও। আমি তখন ডান দিকে চলতে থাকি। হঠাৎ সুউচ্চ পাহাড় আমার চোখে পড়ে। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে উপরে উঠিয়ে নেন এবং আমি চূড়া পর্যন্ত পৌছে যাই। তথায় আমি একটি উঁচু লোহার স্তম্ভ দেখতে পাই। ওর আগায় একটি সোনার কড়া ছিল। আমাকে তিনি ঐ স্তম্ভের উপর চড়িয়ে দেন। আমি ঐ কড়াটি ধরে নেই। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ খুব শক্ত করে ধরেছো তো:' আমি বলি, হঁ্যা। তিনি সজোরে ঐ স্তম্ভের উপর পায়ের আঘাত করতঃ বেরিয়ে যান এবং কড়াটি আমার হাতে থেকে যায়। এই স্বপ্নটি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ এটা খুব উত্তম স্বপ্ন। মাঠটি হচ্ছে পুনরুত্থানের মাঠ। বাম দিকের পথটি হচ্ছে দোযখের পথ। তুমি তথাকার লোক নও। ডান দিকের পথটি হচ্ছে বেহেশতের পথ। সুউচ্চ পর্বতটি হচ্ছে ইসলামের শহীদদের স্থান। কড়াটি হচ্ছে ইসলামের কড়া। মৃত্যু পর্যন্ত ওটাকে শক্ত করে ধরে থাকে। এর পরে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ আমার আশা তো এই যে, আল্লাহ আমাকে বেহেশতে নিয়ে যাবেন।

আল-বাকারা 2:257

আল্লাহ তাআলা এখানে সংবাদ দিচ্ছেন যে, যারা তার সন্তুষ্টি কামনা করে তাদেরকে তিনি শান্তির পথ প্রদর্শন করবেন এবং সন্দেহ, কুফর ও শিরকের অন্ধকার হতে বের করে সত্যের আলোর দিকে নিয়ে আসবেন। শয়তানেরা কাফিরদের অভিভাবক। তারা তাদেরকে অজ্ঞতা, ভ্রষ্টতা, কুফর ও শিরককে সুন্দর ও সজ্জিত আকারে প্রদর্শন করতঃ ঈমান ও তাওহীদ হতে সরিয়ে রাখে এবং সত্যের আলো হতে সরিয়ে অসত্যের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। এরাই কাফির ও এরাই নরকের মধ্যে চিরকাল অবস্থান করবে। (আরবি) শব্দটিকে এক বচন এবং (আরবি) শব্দটিকে বহু বচন আনার কারণ এই যে, হক, ঈমান ও সত্যের পথ একটিই। কিন্তু কুফর কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে। কুফরের অনেক শাখা রয়েছে ঐগুলো সবই বাতিল ও অসত্য। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ আমার সঠিক পথ এটাই, সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর; অন্যান্য পথসমূহে চলো না, নতুবা তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে; এভাবেই তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা বাঁচতে পার (৬:১৫৩)।' আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ এবং তিনি অন্ধকারসমূহ ও আলো করেছেন। এই প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, সত্যের একটিই পথ এবং বাতিলের বিভিন্ন পর্থ রয়েছে। হযরত আইয়ুব বিন খালিদ (রাঃ) বলেন যে,ইচ্ছা পোষণকারীদেরকে অথবা পরীক্ষাকৃতদেরকে উঠানো হবে। অতঃপর যার কামনা শুধুমাত্র ঈমানই হবে সে ঔজ্জ্বল্যপূর্ণ চেহারা বিশিষ্ট হবে; আর যার কুফরের বাসনা হবে সে কৃষ্ণ ও কুৎসিত চেহারা বিশিষ্ট হবে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন।

আল-বাকারা 2:258

এই বাদশাহর নাম ছিল নমরূদ বিন কিনআন বিন কাউস বিন সাম বিন নূহ। তার রাজধানী ছিল বাবেল। তাঁর বংশলতার মধ্যে কিছু মতভেদও রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, দুনিয়ার পূর্ব-পশ্চিম সাম্রাজ্যের অধিপতি চারজন। তন্মধ্যে দু’জন মুসলমান ও দু’জন কাফির। মুসলমান দু’জন হচ্ছেন হযরত সুলাইমান বিন দাউদ (আঃ) ও হযরত যুলকারনাইন এবং কাফির দু'জন হচ্ছে নমরূদ ও বখতে নাসর। ঘোষণা হচ্ছে যে, হে নবী (সঃ)! তুমি স্বচক্ষে ঐ ব্যক্তিকে দেখনি, যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল: এই লোকটি নিজেকে খোদা বলে দাবী করেছিল। যেমন তারপরে ফিরআউনও তার নিজস্ব লোকদের মধ্যে এই দাবী করেছিলঃ “আমি ছাড়া তোমাদের যে অন্য কোন খোদা আছে তা আমার জানা নেই তার রাজত্ব দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছিল বলে তার মস্তিস্কে ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা প্রবেশ করেছিল এবং তার স্বভাবের মধ্যে অবাধ্যতা, অহংকার এবং আত্মগরিমা ঢুকে পড়েছিল। কারও কারও মতে সে সুদীর্ঘ চারশো বছর ধরে শাসন কার্য চালিয়ে আসছিল। সে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আল্লাহর অস্তিত্বের উপর প্রমাণ উপস্থিত করতে বললে তিনি অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বের আনয়ন এবং অস্তিত্ব হতে অস্তিত্বহীনতায় পরিণত করণ এই দলীল পেশ করেন। এটা সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল দলীল ছিল। প্রাণীসমূহের পূর্বে কিছুই না থাকা এবং পুনরায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া; এই প্রাণীসমূহের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের স্পষ্ট দলীল এবং তিনিই আল্লাহ। নমরূদ উত্তরে বলেঃ এটাতো আমিও করতে পারি। এই কথা বলে সে দু’জন লোককে ডেকে পাঠায় যাদের উপর মৃত্যু দন্ডাদেশ জারী করা হয়েছিল। অতঃপর সে একজনকে হত্যা করে এবং অপরজনকে ছেড়ে দেয়। এই উত্তর ও দাবী যে কত অবাস্তব ও বাজে ছিল তা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো আল্লাহ তাআলার গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণ এই বর্ণনা করেন যে, তিনি সৃষ্টি করেন অতঃপর ধ্বংস করেন। আর নমরূদ তো ঐ লোকে দুটিকে সৃষ্টি করেনি এবং তাদের অথবা তার নিজের জীবন ও মৃত্যুর উপর তার কোন ক্ষমতাই নেই। কিন্তু শুধু অজ্ঞদেরকে প্ররোচিত করার জন্য এবং বাজিমাৎ করার উদ্দেশ্যে সে যে ভুল করছে ও তর্কের মূলনীতির উল্টো কাজ করছে এটা জানা সত্ত্বেও একটা কথা বানিয়ে নেয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাকে বুঝে নেন এবং সেই নির্বোধের সামনে এমন প্রমাণ পেশ করেন যে, বাহ্যতঃ যেন সে ওর সাদৃশ্য মূলক কার্যে অকৃতকার্য হয়। তাই তাকে বলেনঃ তুমি যখন সৃষ্টি করা ও মৃত্যু দান করার ক্ষমতা রাখার দাবী করছো তখন সৃষ্ট বস্তুর উপরেও তোমার আধিপত্য থাকা উচিত। আমার প্রভু তো এই ক্ষমতা রাখেন যে, সূর্যকে তিনি পূর্ব গগনে উদিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সে আমার প্রভুর আদেশ পালন করতঃ পূর্ব দিকেই উদিত হচ্ছে। এখন তুমি তাকে নির্দেশ দাও যে, সে যেন পশ্চিম গগনে উদিত হয়। এবার সে বাহ্যতঃ ও কোন ভাঙ্গাচুরা উত্তর দিতে পারলো না। বরং সে হতভম্ব হয়ে নিজের অপারগতা স্বীকার করতে বাধ্য হলো এবং আল্লাহ তা'আলার প্রমাণ তার উপর পূর্ণরূপে জয়যুক্ত হলো। কিন্তু সুপথ প্রাপ্তি তার ভাগ্যে ছিল না বলে সে সুপথে আসতে পারলো না। এইরূপ বদ-স্বভাবের লোককে আল্লাহ তা'আলা কোন প্রমাণ বুঝবার তাওফীক দেন না। ফলে তারা সত্যকে কখনও আলিঙ্গন করে না। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। এই জগতেও তাদের কঠিন শাস্তি হয়ে থাকে। কোন কোন তর্কশাস্ত্রবিদ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এখানে একটি স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান প্রমাণ উপস্থিত করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। বরং প্রথম দলীলটি ছিল দ্বিতীয় দলীলের ভূমিকা স্বরূপ। এ দু’টোর দ্বারাই নমরূদের দাবীর অসারতা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুদানই হচ্ছে প্রকৃত দলীল। ঐ অজ্ঞান ও নির্বোধ এই দাবী করেছিল বলেই এই প্রমাণ পেশ করাও অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র জন্ম ও মৃত্যুদানের উপরই সক্ষম নন বরং দুনিয়ার বুকে যতগুলো সৃষ্ট বস্তু রয়েছে সবই তাঁর আজ্ঞাধীন। কাজেই নমরূদকেও বলা হচ্ছে যে, সেও যখন জন্ম ও মৃত্যু। দানের দাবী করছে তখন সূর্যও তো একটি সৃষ্ট বস্তু, কাজেই সে তার নির্দেশমত কেন পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিকে উদিত হবে না: এই যুক্তির বলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)খোলাখুলিভাবে নমরূদকে পরাস্ত করেন এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে নিরুত্তর করে দেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) অগ্নির মধ্য হতে বের হয়ে আসার পর নমরূদের সাথে তাঁর এই তর্ক হয়েছিল। এর পূর্বে ঐ অত্যাচারী রাজার সাথে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কোন সাক্ষাৎ হয়নি। হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রাঃ) বলেন যে, সেই সময় দুর্ভিক্ষ পড়েছিল। জনগণ মনরূদের নিকট হতে শস্য নিতে আসতো। হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তার নিকট যান।তথায় তার সাথে তাঁর এই তর্ক হয়। সেই পাপাচারী তাঁকে শস্য দেয়নি। তিনি শূন্য হস্তে ফিরে আসেন। বাড়ীর নিকটবর্তী হয়ে তিনি দুটি বস্তায় বালু ভরে নেন যাতে বাড়ীর লোক মনে করে যে, তিনি কিছু নিয়ে এসেছেন। বাড়ীতে পৌছেই তিনি বস্তা দু’টি রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর পত্মী বিবি সারা বস্তা দু’টি খুলে দেখেন যে, ও দু'টো উত্তম খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ রয়েছে। তিনি আহার্য প্রস্তুত করেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) জেগে উঠে দেখেন যে, খাদ্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন ও খাদ্য দ্রব্য কোথা হতে এসেছে:' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ ‘আপনি যে খাদ্যপূর্ণ বস্তা দু’টি এনেছিলেন তা হতেই এইগুলো বের করেছিলাম। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বুঝে নেন যে, এই বরকত লাভ আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়েছে এবং এটা তাঁর প্রতি আল্লাহ তা'আলার করুণারই পরিচায়ক।ঐ লম্পট রাজার কাছে আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তিনি তার নিকট এসে তাকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হতে আহবান জানান। কিন্তু সে তা অস্বীকার করে। ফেরেশতা তাকে দ্বিতীয় বার আহবান করেন। কিন্তু এবারও সে প্রত্যাখ্যান করে। তৃতীয়বার তিনি তাকে আল্লাহর দিকে আহবান জানান। কিন্তু এবারেও সে অস্বীকৃতিই জানায়। এইভাবে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ফেরেশতা তাকে বলেনঃ আচ্ছা তুমি তোমার সেনাবাহিনী ঠিক কর, আমিও আমার সেনাবাহিনী নিয়ে আসছি। নমরূদ এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে সূর্যোদয়ের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়। আর এদিকে আল্লাহ তা'আলা মশাসমূহের দরজা খুলে দেন। বড় বড় মশাগুলো এত অধিক সংখ্যায় আসে যে, সূর্যও জনগণের দৃষ্টির অন্তরালে চলে যায়। মহান আল্লাহর এই সেনাবাহিনী নমরূদের সেনাবাহিনীর উপর পতিত হয় এবং অল্পক্ষণের মধ্যে তাদের রক্ত তো পান করেই এমনকি তাদের মাংস পর্যন্তও খেয়ে নেয়। এইভাবে নমরূদের সমস্ত সৈন্য সেখানেই ধ্বংস হয়ে যায়। ঐ মশাগুলোরই একটি নমরূদের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে এবং চারশো বছর পর্যন্ত তার মস্তিষ্ক চাটতে থাকে। এমন কঠিন শাস্তির মধ্যে সে (পাপাত্মা নমরূদ) পড়ে থাকে যে, ওর চেয়ে মরণ হাজার গুণে উত্তম ছিল। সে (পাপী রাজা নমরূদ) প্রাচীরে ও পাথরে তার মস্তিষ্ক ঠুকে ঠুকে ফিরছিল এবং হাতুড়ি দ্বারা মাথায় মারিয়ে নিচ্ছিল। এইভাবে ঐ হতভাগ্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। আল্লাহর উপর আস্থাহীন পাপাত্মা বাবেল রাজা নমরূদের এইভাবেই জীবনলীলা সাঙ্গ হয়।

আল-বাকারা 2:259

উপরে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) তর্কের যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ওটার সাথে এর সংযোগ রয়েছে। এই অতিক্রমকারী হয় হযরত উযায়ের (আঃ) ছিলেন যেমন এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে, না হয় তিনি ছিলেন আরমিয়া বিন খালকিয়া এবং এটা হযরত খিযর (আঃ)-এর নাম ছিল। কিংবা ঐ অতিক্রমকারী ছিলেন হযরত হিযকীল বিন বাওয়া (আঃ) অথবা তিনি বানী ইসরাঈলের মধ্যেকার এক ব্যক্তি ছিলেন। এই জনপদ ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। এই উক্তিটিরই প্রসিদ্ধি রয়েছে। রাজা বখতে নাসর যখন ঐ জনবসতি ধ্বংস করে এবং জনগণকে তরবারির নীচে নিক্ষেপ করে তখন ঐ জনবসতি একেবারে শশানে পরিণত হয়। এরপর ঐ মহান ব্যক্তি সেখান দিয়ে গমন করেন। যখন তিনি দেখেন যে, জনপদটি একেবারে শশ্মান হয়ে গেছে, তথায় না আছে কোন বাড়ীঘর,না আছে কোন মানুষ! তথায় অবস্থানরত অবস্থায় তিনি চিন্তা করেন যে, এমন জাকজমকপূর্ণ শহর যেভাবে ধ্বংস হয়েছে এটা কি আর কোন দিন জনবসতি পূর্ণ হতে পারে! অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তাঁকেই মৃত্যু দান করেন। ইনি তো ঐ অবস্থাতেই থাকেন। আর এদিকে সত্তর বছর পর বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় জনবসতিপূর্ণ হয়। পলাতক বানী ইসরাঈল আবার ফিরে আসে এবং নিমেষের মধ্যে শহর ভরপুর হয়ে যায়। পূর্বের সেই শোভা ও জাকজমক পুনরায় পরিলক্ষিত হয়। এবারে একশো বছর পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাকে পূনর্জীবিত করেন এবং সর্বপ্রথম চক্ষুর মধ্যে অত্মাি প্রবেশ করে যেন তিনি নিজের পুনজীবন স্বচক্ষে দর্শন করতে পারেন। অতঃপর যখন ফু দিয়ে সারা দেহে আত্মা প্রবেশ করানো হয় তখন আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কত দিন ধরে মরেছিলে:' উত্তরে তিনি বলেনঃ ‘এখনও তো একদিন পুরোই হয়নি। এটা বলার কারণ ছিল এই যে, সকাল বেলায় তাঁর আত্মা বের হয়েছিল এবং একশো বছর পর যখন তিনি জীবিত হন তখন ছিল সন্ধ্যা। সুতরাং তিনি মনে করেন যে, ঐ দিনই রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ তুমি পূর্ণ একশো বছর মৃত অবস্থায় ছিলে। এখন আমার ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য কর যে, পাথেয় হিসাবে যে খাদ্য তোমার নিকট ছিল তা একশো বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও ঐরূপই রয়েছে, পচেওনি এবং সামান্য বিকৃতও হয়নি। ঐ খাদ্য ছিল আঙ্গুর, ডুমুর এবং ফলের নির্যাস। ঐ নির্যাস নষ্ট হয়নি, ডুমুর টক হয়নি এবং আরও খারাপ হয়নি। বরং প্রত্যেক জিনিসই স্বীয় আসল অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাকে বলেনঃ ‘তোমার গাধার যে গলিত অস্থি তোমার সামনে রয়েছে সে দিকে দৃষ্টিপাত কর। তোমার চোখের সামনেই আমি তোমার গাধাকে জীবিত করছি। আমি স্বয়ং তোমাকে মানব জাতির জন্যে নিদর্শন করতে চাই, যেন কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে। অতঃপর তিনি দেখতে দেখতেই অস্থিগুলো স্ব-স্ব জায়গায় সংযুক্ত হয়ে যায়। মুসতাদরাক-ই-হাকিমে রয়েছে যে, নবী (সঃ)-এর পঠন (আরবি) এর সঙ্গেই রয়েছে এবং ওটাকে (আরবি) এর সঙ্গেও পড়া হয়েছে। অর্থাৎ 'আমি জীবিত করবো।' মুজাহিদের (রঃ) পঠনও এটাই। সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, অস্থিগুলো ডানে বামে ছড়িয়ে ছিল এবং পচে যাওয়ার ফলে ওগুলোর শুভ্রতা চৰ্চ করছিল। বাতাসে ঐগুলো একত্রিত হয়ে যায়। পরে ওগুলো নিজ নিজ জায়গায় যুক্ত হয়ে যায় এবং পূর্ণ কাঠামো রূপে দাঁড়িয়ে যায় ।ওগুলোতে গোশত মোটেই ছিল না। আল্লাহ তা'আলা ওগুলোর উপর গোশত, শিরা ইত্যাদি পরিয়ে দেন। অতঃপর ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। তিনি তাঁর নাসারন্ধ্রে ফুঁ দেন। আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তৎক্ষণাৎ গাধাটি জীবিত হয়ে উঠে এবং শব্দ করতে থাকে। হযরত উয়ের (আঃ) দর্শন করতে থাকেন এবং মহান আল্লাহর এই সব কারিগরী তার চোখের সামনেই সংঘটিত হয়। এই সব কিছু দেখার পর তিনি বলেনঃ ‘আমার তো এটা বিশ্বাস ছিলই যে, আল্লাহ পাক সব কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। কিন্তু আজ আমি তা স্বচক্ষে দর্শন করলাম। সুতরাং আমি আমার যুগের সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী জ্ঞান ও বিশ্বাসের অধিকারী। কেউ কেউ আ’লামু শব্দকে ই’লামও পড়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি জেনে রেখো যে, আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের উপরেই ক্ষমতাবান।'

আল-বাকারা 2:260

হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশ্ন করার অনেক কারণ ছিল। প্রথম এই যে, যেহেতু তিনি এই দলীলই পাপাচারী নমরূদের সামনে পেশ করেছিলেন, তাই তিনি চেয়েছিলেন যে, প্রগাঢ় বিশ্বাস তো রয়েছেই, কিন্তু যেন প্রগাঢ়তম বিশ্বাস জন্মে। অর্থাৎ যেন তিনি চাচ্ছিলেনঃ ‘বিশ্বাস তো আছেই। কিন্তু দেখতেও চাই; সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এই আয়াতের ব্যাপারে একটি হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবরাহীম (আঃ) অপেক্ষা আমরা সন্দেহ পোষণের বেশী হকদার। কেননা তিনি বলেছিলেনঃ হে আমার প্রভু! কিরূপে আপনি মৃতকে জীবিত করেন তা আমাকে প্রদর্শন করুন। এই রকমই সহীহ মুসলিম শরীফেও হযরত ইয়াহইয়া বিন ওয়াহাব হতে বর্ণিত আছে। এর দ্বারা কোন অজ্ঞ ব্যক্তি যেন মনে না করে যে, আল্লাহ তা'আলার এই বিশেষণ সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কোন সন্দেহ ছিল। আল্লাহ তা'আলা যে বলেন, চারটি পাখী গ্রহণ কর, এই কথানুসারে হযরত ইবরাহীম (আঃ) যে কি কি পাখি গ্রহণ করেছিলেন সেই ব্যাপারে মুফাসসিরদের কয়েকটি উক্তি রয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট কথা এই যে, এর জ্ঞান আমাদের কোন উপকার করতে পারে না এবং তা না জানায় আমাদের কোন ক্ষতিও নেই। কেউ কেউ বলেন যে, ওগুলো ছিল কলঙ্গু, ময়ূর, মোরগ, ও কবুতর। আবার কউ কেউ বলেন যে, ওগুলো ছিল জলকুকুট, সীমুরগের (প্রবাদোক্তপাখী) বাচ্চা, মোরাগ এবং ময়ূর। কারও কারও মতে ওগুলো ছিল কবুতর, মোরগ, ময়ূর ও কাক। অতঃপর ঐগুলো কেটে খণ্ড খণ্ড কর’ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি)-এর অর্থ এটাই গ্রহণ করেছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছেঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘ঐগুলো তোমার নিকট সম্মিলিত কর।' অতঃপর যখন তিনি পাখীগুলো পেয়ে যান তখন ওগুলো জবাই করে খণ্ড খণ্ড করেন এবং ঐ চারটি পাখীর খণ্ডগুলো সব একত্রে মিলিয়ে দেন। এরপর ঐগুলো চারটি পাহাড়ের উপর বা সাতটি পাহাড়ের উপর রেখে দেন এবং ওগুলোর মাথা নিজের হাতে রাখেন। তারপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ওদেরকে আহবান করেন। তিনি যেই পাখীর নাম ধরে ডাক দিতেন ওর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত পালকগুলো এদিক ওদিক হতে উড়ে এসে পরস্পর মিলিত হয়ে যেতো। অনুরূপভাবে রক্ত রক্তের সাথে মিলে যেতো এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেই যেই পাহাড়ে ছিল সবই পরস্পর মিলে যেতো। অতঃপর ওটা পূর্ণ পাখী হয়ে তাঁর নিকট উড়ে আসতো। তিনি ওর উপর অন্য পাখীর মাথা লাগালে তা সংযুক্ত হতো না। কিন্তু ওর নিজের মাথা দিলে যুক্ত হয়ে যেতো। অবশেষে ঐ চারটি পাখী জীবিত হয়ে উড়ে যায় এবং আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা বলে মৃতের জীবিত হওয়ার এই বিশ্বাস উৎপাদক দৃশ্য হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বচক্ষে দর্শন করেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। কোন কাজেই তিনি অসমর্থ হন না। তিনি যা চান কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তা সম্পন্ন হয়ে যায়। প্রত্যেক জিনিসই তার অধিকারে রয়েছে। তিনি তাঁর সমুদয় কথা ও কাজে মহাবিজ্ঞানময়। অনুরূপভাবে নিয়ম-শঙ্খলার ব্যাপারে ও শরীয়তের নির্ধারণ ব্যাপারেও তিনি মহাবিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘তুমি কি বিশ্বাস কর না:' এই প্রশ্ন করা এবং হযরত ইবরাহীমের (আঃ) হ্যা, বিশ্বাস তো করি, কিন্তু অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতে চাই' এই উত্তর দেয়া, এই আয়াতটি অন্যান্য সমস্ত আয়াত অপেক্ষা বেশী আশা প্রদানকারী বলে আমার মনে হয়।” ভাবার্থ এই যে, কোন ঈমানদারের অন্তরে কোন সময় যদি কোন শয়তানী সংশয় ও সন্দেহ এসে যায় তবে এই জন্যে আল্লাহ তাকে ধরবেন না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ’সের (রাঃ) সাথে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) সাক্ষাৎ হলে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশী আশা উৎপাদনকারী আয়াত কোটি: হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেনঃ (আরবি) যুক্ত আয়াতটি। যাতে বলা হয়েছেঃ “হে আমার পাপী বান্দারা! তোমরা নিরাশ হয়ো না, আমি তোমাদের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবো।' তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার মতে তো সবচেয়ে বেশী আশা উৎপাদনকারী আয়াত হচ্ছে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) “হে আল্লাহ! তুমি কিরূপে মৃতকে জীবিত কর তা আমাকে প্রদর্শন কর' এই উক্তি এবং আল্লাহর তুমি কি বিশ্বাস কর না: এই প্রশ্ন ও তার বিশ্বাস করি, কিন্তু আমার অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতে চাই। উক্ত আয়াতটি (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক ও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ইত্যাদি)।

আল-বাকারা 2:261

এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে স্বীয় ধন-সম্পদ খরচ করে সে বড়ই বরকত ও পুণ্য লাভ করে থাকে। তাকে সাতগুণ প্রতিদান দেয়া হয়। তাই বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহর পথে খরচ করে অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ পালনে, জিহাদের জন্য ঘোড়া লালন-পালনে, অস্ত্র-শস্ত্র কেনায়, নিজে হজ্ব করার কাজে ও অপরকে হজ্ব করানো ইত্যাদি কাজে ধন-সম্পদ খরচ করে থাকে তাদের উপমা হচ্ছে যেমন একটি শস্য বীজ এবং প্রত্যেক বীজে উৎপন্ন হয়ে থাকে সাতটি শীষ, প্রত্যেক শীষে উৎপন্ন হয় একশো শস্যদানা। কি মনোমুগ্ধকর উপমা!একের বিনিময়ে সাতশো পাবে’ সরাসরি এই কথার চেয়ে উপরোক্ত কথা ও উপমার মধ্যে খুব বেশী সূক্ষ্মতা ও পরিচ্ছন্নতা রয়েছে এবং ঐদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সৎ কার্যাবলী আল্লাহ তা'আলার নিকট বৃদ্ধি পেতে থাকে যেমন বপনকৃত বীজ জমিতে বাড়তে থাকে। মুসনাদই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন-যে ব্যক্তি নিজের উদ্বৃত্ত জিনিস আল্লাহর পথে প্রদান করে, সে সাতশো পুণ্যের অধিকারী হয়। আর যে ব্যক্তি নিজের জীবনের উপর ও পরিবারবর্গের উপর খরচ করে সে দশগুণ পুণ্য লাভ করে। যে রোগগ্রস্ত ব্যক্তিকে পরিদর্শন করতে যায় তারও দশগুণ পুণ্য লাভ হয়। রোযা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ যে পর্যন্ত না তা নষ্ট করা হয়। যে ব্যক্তি শারীরিক বিপদ আপদ, দুঃখ কষ্ট, ব্যথা ও রোগে আক্রান্ত হয়, ঐগুলো তার পাপসমূহ ঝেড়ে ফেলে। এই হাদীসটি হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) সেই সময় বর্ণনা করেন যখন তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন এবং লোকেরা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী শিয়রে উপবিষ্টা ছিলেন। তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ রাত কিরূপ অবস্থায় অতিবাহিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ রাত্রি অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় অতিবাহিত হয়েছে। সেই সময় তার মুখমণ্ডল দেয়ালের দিকে ছিল। এই কথা শোনা মাত্রই তিনি জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেনঃ “আমার এ রাত্রি কঠিন অবস্থায় কাটেনি। কেননা, আমি এই কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক লাগাম বিশিষ্ট একটি উষ্ট্ৰী দান করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “লোকটি কিয়ামতের দিন সাত কোটি লাগাম বিশিষ্ট উন্ত্রী প্রাপ্ত হবে।মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বানী আদমের একটি পুণ্যকে দশটি পুণ্যের সমান করে দিয়েছেন এবং ওটা বাড়তে বাড়তে সাতশো পর্যন্ত হয়ে যায়। কিন্তু রোযা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'ওটা বিশেষ করে আমারই জন্যে এবং আমি নিজেই ওর প্রতিদান প্রদান করবো। রোযাদারের জন্য দু'টি খুশী রয়েছে। একটি খুশী ইফতারের সময় এবং আর একটি খুশী তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ তা'আলার নিকট মিশকের সুগন্ধি হতেও বেশী পছন্দনীয়।' অন্য হাদীসে এইটুকু বেশী রয়েছে-রোযাদার শুধু আমার জন্যেই পানাহার ত্যাগ করে থাকে। শেষে রয়েছে “রোযা ঢাল স্বরূপ।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নামায-রোযা ও আল্লাহর যিকির আল্লাহর পথে খরচ করার পুণ্য সাতশো গুণ বেড়ে যায়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জিহাদে কিছু অর্থ সাহায্য করে, সে নিজে জিহাদে অংশগ্রহণ না করলেও তাকে একের পরিবর্তে সাতশো খরচ করার পুণ্য দেয়া হয়। আর যদি নিজেও জিহাদে অংশগ্রহণ করে তবে একটি দিরহাম খরচ করার বিনিময়ে এক লাখ খরচ করার পুণ্য দেয়া হয়।' অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। এই হাদীসটি গারীব।আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি। (আরবি) এই আয়াতের তাফসীরে লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যে,একের বিনিময়ে দুই কোটি পুণ্য পাওয়া যায়। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর হাদীসে রয়েছে যে, যখন আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুআ করেন,-“হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও কিছু প্রদান করুন।' তখন(আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এই প্রার্থনাই জানালে (আরবি) (৩৯:১০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, আমলে যে পরিমাণ খাঁটিত্ব থাকবে সেই পরিমাণ পুণ্য বেশী হবে। আল্লাহ বিপুল দাতা ও সর্বজ্ঞাতা। তিনি জানেন যে, কে কি পরিমাণ পুণ্য লাভের হকদার এবং কে হকদার নয়।

আল-বাকারা 2:262

২৬২-২৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা তার ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা দান-খয়রাত করে থাকেন; অতঃপর যাদেরকে দান করেন তাদের নিকট নিজেদের কৃপার কথা প্রকাশ করে না এবং তাদের নিকট হতে কিছু উপকারেরও আশা করে না। তারা তাদের কথা ও কাজ দ্বারা দান গ্রহীতাদেরকে কোন প্রকারের কষ্টও দেয় না। মহান আল্লাহ তাঁর এই বান্দাদেরকে উত্তম প্রতিদান প্রদানের ওয়াদা করেছেন যে, তাদের প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের ভয় ও চিন্তার কারণ থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুখ দিয়ে উত্তম কথা বের করা, কোন মুসলমান ভাইয়ের জন্যে প্রার্থনা করা, দোষী ও অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া ঐ দান-খয়রাত হতে উত্তম, যার পিছনে থাকে ক্লেশ ও কষ্ট প্রদান। ইবনে আবি হাতিমের বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম কথা হতে ভাল দান আর কিছু নেই। তোমরা কি মহান আল্লাহর (আরবি) অর্থাৎ যে দানের পশ্চাতে থাকে ক্লেশ দান সেই দান অপেক্ষা উত্তম বাক্য ও ক্ষমা উৎকৃষ্টতর’ (২:২৬৩) এই ঘোষণা শুননি: আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাগণ হতে অমুখাপেক্ষী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব তারই মুখাপেক্ষী। তিনি অত্যন্ত সহিষ্ণু। বান্দার পাপ দেখেও ক্ষমা করে থাকেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে , রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না ও তাদেরকে পবিত্র করবেন না। বরং তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। প্রথম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে দান করার পর কৃপা প্রকাশ করে থাকে। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে পায়জামাকা লুঙ্গী পায়ের গোছার নীচে লটকিয়ে রাখে। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে মিথ্যা শপথ করে নিজের পণ্য দ্রব্য বিক্রি করে থাকে। সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ প্রভৃতি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বাপ-মার অবাধ্য, সাদকা করে কৃপা প্রকাশকারী, মদ্যপায়ী এবং তকদীরকে অবিশ্বাসকারী বেহেশতে প্রবেশ লাভ করবে না। সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে রয়েছে, রাসূলুয়াহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাতও করবেন না। পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ্যপানে অভ্যস্ত এবং দান করে অনুগ্রহ প্রকাশকারী। নাসাঈর অন্য হাদীসে রয়েছে যে,ঐ তিন ব্যক্তি (প্রাগুক্ত তিন ব্যক্তি) বেহেশতে প্রবেশ করবে না, এই জন্যেই এই আয়াতেও ইরশাদ হচ্ছেঃ অনুগ্রহ প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-খয়রাত নষ্ট করো না। এ অনুগ্রহ প্রকাশ ও কষ্ট দেয়ার পাপ দানের পুণ্য অবশিষ্ট রাখে না। অতঃপর অনুগ্রহ প্রকাশকারী ও কষ্ট প্রদানকারীর সাদকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপমা ঐ সাদকার সাথে দেয়া হয়েছে, যা মানুষকে দেখাবার জন্যে দেয়া হয় এবং উদ্দেশ্য থাকে যে, মানুষ তাকে দানশীল উপাধিতে ভূষিত করবে ও দেশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য তার মোটেই থাকে না এবং সে পুণ্য লাভেরও আশা পোষণ করে না। এই জন্যেই এই বাক্যের পর বলেছেন যদি আল্লাহ তা'আলার উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস না থাকে তবে ঐ লোক-দেখানো দান, অনুগ্রহ প্রকাশ করার দান এবং কষ্ট দেয়ার দানের দৃষ্টান্ত এইরূপ যেমন এক বৃহৎ মসৃণ প্রস্তর খণ্ড, যার উপরে কিছু মাটিও জমে গেছে। অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সমস্ত ধুয়ে গেছে এবং কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই দু' প্রকার ব্যক্তির দানের অবস্থাও দ্রুপ। লোকে মনে করে যে, সে দানের পুণ্য অবশ্যই পেয়ে যাবে। যেভাবে এই পাথরের মাটি দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু বৃষ্টিপাতের ফলে ঐ মাটি দূর হয়ে গেছে, তেমনই এই ব্যক্তির অনুগ্রহ প্রকাশ করা ও কষ্ট দেয়ার ফলে এবং ঐ ব্যক্তির রিয়াকারীর ফলে ঐ সব পুণ্য বিদায় নিয়েছে। আল্লাহ পাকের নিকট পৌছে তারা কোন প্রতিদান পাবে না। আল্লাহ তা'আলা অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।

আল-বাকারা 2:263

২৬২-২৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা তার ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা দান-খয়রাত করে থাকেন; অতঃপর যাদেরকে দান করেন তাদের নিকট নিজেদের কৃপার কথা প্রকাশ করে না এবং তাদের নিকট হতে কিছু উপকারেরও আশা করে না। তারা তাদের কথা ও কাজ দ্বারা দান গ্রহীতাদেরকে কোন প্রকারের কষ্টও দেয় না। মহান আল্লাহ তাঁর এই বান্দাদেরকে উত্তম প্রতিদান প্রদানের ওয়াদা করেছেন যে, তাদের প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের ভয় ও চিন্তার কারণ থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুখ দিয়ে উত্তম কথা বের করা, কোন মুসলমান ভাইয়ের জন্যে প্রার্থনা করা, দোষী ও অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া ঐ দান-খয়রাত হতে উত্তম, যার পিছনে থাকে ক্লেশ ও কষ্ট প্রদান। ইবনে আবি হাতিমের বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম কথা হতে ভাল দান আর কিছু নেই। তোমরা কি মহান আল্লাহর (আরবি) অর্থাৎ যে দানের পশ্চাতে থাকে ক্লেশ দান সেই দান অপেক্ষা উত্তম বাক্য ও ক্ষমা উৎকৃষ্টতর’ (২:২৬৩) এই ঘোষণা শুননি: আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাগণ হতে অমুখাপেক্ষী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব তারই মুখাপেক্ষী। তিনি অত্যন্ত সহিষ্ণু। বান্দার পাপ দেখেও ক্ষমা করে থাকেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে , রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না ও তাদেরকে পবিত্র করবেন না। বরং তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। প্রথম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে দান করার পর কৃপা প্রকাশ করে থাকে। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে পায়জামাকা লুঙ্গী পায়ের গোছার নীচে লটকিয়ে রাখে। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে মিথ্যা শপথ করে নিজের পণ্য দ্রব্য বিক্রি করে থাকে। সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ প্রভৃতি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বাপ-মার অবাধ্য, সাদকা করে কৃপা প্রকাশকারী, মদ্যপায়ী এবং তকদীরকে অবিশ্বাসকারী বেহেশতে প্রবেশ লাভ করবে না। সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে রয়েছে, রাসূলুয়াহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাতও করবেন না। পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ্যপানে অভ্যস্ত এবং দান করে অনুগ্রহ প্রকাশকারী। নাসাঈর অন্য হাদীসে রয়েছে যে,ঐ তিন ব্যক্তি (প্রাগুক্ত তিন ব্যক্তি) বেহেশতে প্রবেশ করবে না, এই জন্যেই এই আয়াতেও ইরশাদ হচ্ছেঃ অনুগ্রহ প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-খয়রাত নষ্ট করো না। এ অনুগ্রহ প্রকাশ ও কষ্ট দেয়ার পাপ দানের পুণ্য অবশিষ্ট রাখে না। অতঃপর অনুগ্রহ প্রকাশকারী ও কষ্ট প্রদানকারীর সাদকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপমা ঐ সাদকার সাথে দেয়া হয়েছে, যা মানুষকে দেখাবার জন্যে দেয়া হয় এবং উদ্দেশ্য থাকে যে, মানুষ তাকে দানশীল উপাধিতে ভূষিত করবে ও দেশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য তার মোটেই থাকে না এবং সে পুণ্য লাভেরও আশা পোষণ করে না। এই জন্যেই এই বাক্যের পর বলেছেন যদি আল্লাহ তা'আলার উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস না থাকে তবে ঐ লোক-দেখানো দান, অনুগ্রহ প্রকাশ করার দান এবং কষ্ট দেয়ার দানের দৃষ্টান্ত এইরূপ যেমন এক বৃহৎ মসৃণ প্রস্তর খণ্ড, যার উপরে কিছু মাটিও জমে গেছে। অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সমস্ত ধুয়ে গেছে এবং কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই দু' প্রকার ব্যক্তির দানের অবস্থাও দ্রুপ। লোকে মনে করে যে, সে দানের পুণ্য অবশ্যই পেয়ে যাবে। যেভাবে এই পাথরের মাটি দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু বৃষ্টিপাতের ফলে ঐ মাটি দূর হয়ে গেছে, তেমনই এই ব্যক্তির অনুগ্রহ প্রকাশ করা ও কষ্ট দেয়ার ফলে এবং ঐ ব্যক্তির রিয়াকারীর ফলে ঐ সব পুণ্য বিদায় নিয়েছে। আল্লাহ পাকের নিকট পৌছে তারা কোন প্রতিদান পাবে না। আল্লাহ তা'আলা অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।

আল-বাকারা 2:264

২৬২-২৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা তার ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা দান-খয়রাত করে থাকেন; অতঃপর যাদেরকে দান করেন তাদের নিকট নিজেদের কৃপার কথা প্রকাশ করে না এবং তাদের নিকট হতে কিছু উপকারেরও আশা করে না। তারা তাদের কথা ও কাজ দ্বারা দান গ্রহীতাদেরকে কোন প্রকারের কষ্টও দেয় না। মহান আল্লাহ তাঁর এই বান্দাদেরকে উত্তম প্রতিদান প্রদানের ওয়াদা করেছেন যে, তাদের প্রতিদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের ভয় ও চিন্তার কারণ থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুখ দিয়ে উত্তম কথা বের করা, কোন মুসলমান ভাইয়ের জন্যে প্রার্থনা করা, দোষী ও অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া ঐ দান-খয়রাত হতে উত্তম, যার পিছনে থাকে ক্লেশ ও কষ্ট প্রদান। ইবনে আবি হাতিমের বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম কথা হতে ভাল দান আর কিছু নেই। তোমরা কি মহান আল্লাহর (আরবি) অর্থাৎ যে দানের পশ্চাতে থাকে ক্লেশ দান সেই দান অপেক্ষা উত্তম বাক্য ও ক্ষমা উৎকৃষ্টতর’ (২:২৬৩) এই ঘোষণা শুননি: আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাগণ হতে অমুখাপেক্ষী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব তারই মুখাপেক্ষী। তিনি অত্যন্ত সহিষ্ণু। বান্দার পাপ দেখেও ক্ষমা করে থাকেন। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে , রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না ও তাদেরকে পবিত্র করবেন না। বরং তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। প্রথম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে দান করার পর কৃপা প্রকাশ করে থাকে। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে পায়জামাকা লুঙ্গী পায়ের গোছার নীচে লটকিয়ে রাখে। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে মিথ্যা শপথ করে নিজের পণ্য দ্রব্য বিক্রি করে থাকে। সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ প্রভৃতি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বাপ-মার অবাধ্য, সাদকা করে কৃপা প্রকাশকারী, মদ্যপায়ী এবং তকদীরকে অবিশ্বাসকারী বেহেশতে প্রবেশ লাভ করবে না। সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে রয়েছে, রাসূলুয়াহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাতও করবেন না। পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ্যপানে অভ্যস্ত এবং দান করে অনুগ্রহ প্রকাশকারী। নাসাঈর অন্য হাদীসে রয়েছে যে,ঐ তিন ব্যক্তি (প্রাগুক্ত তিন ব্যক্তি) বেহেশতে প্রবেশ করবে না, এই জন্যেই এই আয়াতেও ইরশাদ হচ্ছেঃ অনুগ্রহ প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-খয়রাত নষ্ট করো না। এ অনুগ্রহ প্রকাশ ও কষ্ট দেয়ার পাপ দানের পুণ্য অবশিষ্ট রাখে না। অতঃপর অনুগ্রহ প্রকাশকারী ও কষ্ট প্রদানকারীর সাদকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপমা ঐ সাদকার সাথে দেয়া হয়েছে, যা মানুষকে দেখাবার জন্যে দেয়া হয় এবং উদ্দেশ্য থাকে যে, মানুষ তাকে দানশীল উপাধিতে ভূষিত করবে ও দেশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য তার মোটেই থাকে না এবং সে পুণ্য লাভেরও আশা পোষণ করে না। এই জন্যেই এই বাক্যের পর বলেছেন যদি আল্লাহ তা'আলার উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস না থাকে তবে ঐ লোক-দেখানো দান, অনুগ্রহ প্রকাশ করার দান এবং কষ্ট দেয়ার দানের দৃষ্টান্ত এইরূপ যেমন এক বৃহৎ মসৃণ প্রস্তর খণ্ড, যার উপরে কিছু মাটিও জমে গেছে। অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সমস্ত ধুয়ে গেছে এবং কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই দু' প্রকার ব্যক্তির দানের অবস্থাও দ্রুপ। লোকে মনে করে যে, সে দানের পুণ্য অবশ্যই পেয়ে যাবে। যেভাবে এই পাথরের মাটি দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু বৃষ্টিপাতের ফলে ঐ মাটি দূর হয়ে গেছে, তেমনই এই ব্যক্তির অনুগ্রহ প্রকাশ করা ও কষ্ট দেয়ার ফলে এবং ঐ ব্যক্তির রিয়াকারীর ফলে ঐ সব পুণ্য বিদায় নিয়েছে। আল্লাহ পাকের নিকট পৌছে তারা কোন প্রতিদান পাবে না। আল্লাহ তা'আলা অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।

আল-বাকারা 2:265

এখানে মহান আল্লাহ ঐ মুমিনদের দানের দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন যারা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করে থাকেন এবং উত্তম প্রতিদান লাভেরও তাদের পূর্ণ বিশ্বাস থাকে। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি (আল্লাহর উপর) বিশ্বাস রেখে ও পুণ্য লাভের আশা রেখে রমযানের রোযা রাখে তার পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (আরবি) বলা হয় উঁচু ভূমিকে যেখান দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে প্রবল বৃষ্টিপাত। বাগানটি দ্বিগুণ ফল দান করে। অনান্য বাগানসমূহের তুলনায় এই বাগানটি এইরূপ যে, ওটা উর্বর ভূ-ভাগে অবস্থিত বলে বৃষ্টিপাত না হলেও শিশির দ্বারাই তাতে ফুল-ফল হয়ে থাকে। কোন বছরই ফল শূন্য হয় না। অনুরূপভাবে ঈমানদারদের আমল কখনও পুণ্যহীন হয় না, তাদেরকে তাদের কার্যের প্রতিদান অবশ্যই দেয়া হয়। তবে ঐ প্রতিদানের ব্যাপারে পার্থক্য রয়েছে যা ঈমানদারের খাঁটিত্ব ও সকার্যের গুরুত্ব হিসেবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। বান্দাদের কোন কাজ আল্লাহর নিকট গোপন নেই। বরং তিনি তাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত রয়েছেন।

আল-বাকারা 2:266

সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, আমীরুল মুমেনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একদা সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এই আয়াতটি কি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আপনারা জানেন কি: তারা বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলাই খুব ভাল জানেন। তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বলেনঃ আপনারা জানেন কি-না স্পষ্টভাবে বলুন: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ হে আমীরুল মু'মেনীন! আমার অন্তরে একটি কথা রয়েছে। তিনি বলেনঃ হে ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি বল এবং নিজেকে তুচ্ছ মনে করো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ একটি কার্যের দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ কোন কার্য: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এক ধনী ব্যক্তি, যে আল্লাহর। আনুগত্যের কাজ করতে রয়েছে। অতঃপর শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করে, ফলে সে পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং স্বীয় সকার্যাবলী নষ্ট করে দেয়। সুতরাং এই বর্ণনাটি এই আয়াতের পর্ণ তাফসীর। এতে বর্ণিত হচ্ছে যে, একটি লোক প্রথমে ভাল কাজ করলো। তারপর তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং সে অসৎকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লো। ফলে সে তার পূর্বের সৎকার্যাবলী ধ্বংস করে দিলো এবং শেষ অবস্থায় যখন পুণ্যের বিশেষ প্রয়োজন ছিল সে শূন্য হস্ত হয়ে গেল। যেমন একটি লোক একটি ফল বৃক্ষের বাগান তৈরী করলো। বছরের পর বছর ধরে সে বৃক্ষটি হতে ফল নামাতে থাকলো। কিন্তু যখন বার্ধক্যে উপনীত হলো তখন সে কাজের অযোগ্য হয়ে পড়লো। এখন তার জীবিকা নির্বাহের উপায় মাত্র একটি বাগান। ঘটনাক্রমে একদিন অগ্নিবাহী এক ঘূর্ণিবাত্যা তার বাগানের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাগানটি ভষ্মীভূত করে দিল। ঐ রকমই এই লোকটি, সে প্রথমে তো সৎ কার্যাবলীই সম্পাদন করেছিল; কিন্তু পরে দুঙ্কার্যে লিপ্ত হওয়ার ফলে তার পরিণাম ভাল হলো না। অতঃপর যখন ঐ সৎ কার্যাবলীর প্রতিদান প্রদানের সময় এলো তখন সে শূন্য হস্ত হয়ে গেল। কাফিরও যখন আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করে তখন তথায় তার কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। যেমন ঐ বদ্ধ, সে যা কিছু করেছিল অগ্নিবাহী ঘুর্ণিবাত্যা তা ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন পিছন হতেও কেউ তার কোন উপকার করতে পারবে না। যেমন ঐ বৃদ্ধের নাবালক সন্তানেরা তার কোন উপকার করতে পারেনি। মুসতাদরাক-ই- হাকিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের দোয়াটিও করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার বার্ধক্যের সময় ও আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার সময় আমাকে আপনার রূযী অধিক পরিমাণে দান করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আল্লাহ তোমাদের সামনে এই নিদর্শনাবলী বর্ণনা করেন যেন তোমরা চিন্তা ও গবেষণা কর ও তা হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এ দৃষ্টান্ত গুলো আমি মানবমণ্ডলীর জন্যে বর্ণনা করে থাকি এবং আলেমগণই এগুলো খুব ভাল বুঝে থাকে।'(২৯:৪৩)

আল-বাকারা 2:267

আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন ব্যবসার মাল, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন এবং সোনা, রূপা, শস্য ইত্যাদি যা তাদেরকে ভূমি হতে বের করে দেয়া হয়েছে তা হতে উত্তম ও পছন্দনীয় জিনিস তাঁর পথে খরচ করে। তারা যেন পঁচা, গলা ও মন্দ জিনিস আল্লাহর পথে না দেয়। আল্লাহ অত্যন্ত পবিত্র, তিনি অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “এমন জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করার ইচ্ছে করো না যা তোমাদের নিজেদেরকে দেয়া হলে তোমরাও তা গ্রহণ করতে সম্মত হতে না। সুতরাং তোমরা এই রকম জিনিস কিরূপে আল্লাহকে দিতে পারো: আর তিনি তা গ্রহণই যা করবেন কেন: তবে তোমরা যদি সম্পদ হাত ছাড়া হতে দেখে নিজের অধিকারের বিনিময়ে কোন পঁচা-গলা জিনিস বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে নাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু আল্লাহ পাক তো তোমাদের মত বাধ্য ও দুর্বল নন যে, তিনি এই সব জঘন্য জিনিস গ্রহণ করবেন: তিনি কোন অবস্থাতেই এই সব জিনিস গ্রহণ করেন না। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তোমরা হালাল জিনিস ছেড়ে হারাম মাল হতে দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের রুজী তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন তদ্রুপ চরিত্রও তোমদের বেঁটে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া তার বন্ধুদেরকেও দেন এবং শক্রদেরকেও দেন। কিন্তু দ্বীন শুধু তার বন্ধুদেরকেই দান করে থাকেন। যে দ্বীন লাভ করে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পাত্র। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কোন বান্দা মুসলমান হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার অন্তর ও তার জিহ্বা মুসলমান হয়। কোন বান্দা মুসলমান হতে পারবে না যে পর্যন্ত না তার প্রতিবেশী তার থেকে নির্ভয় হয়। জনগণের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কষ্টের ভাবার্থ হচ্ছে প্রতারণা ও উৎপীড়ন। যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন না এবং তার দান-খয়রাতও গ্রহণ করেন না। যা সে ছেড়ে যায় তার জন্যে তা দুযখে যাবার পাথেয় ও কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দের দ্বারা দূর করেন না বরং মন্দকে ভাল দ্বারা দূর করেন! অপবিত্র জিনিস অপবিত্র জিনিস দ্বারা বিদূরিত হয় না। সুতরাং দু’টি উক্তি হলো-এক হলো মন্দ জিনিস এবং দ্বিতীয় হলো হারাম মাল।হযরত বারা' বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ খেজুরের মৌসুমে আনসারগণ নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী খেজুরের গুচ্ছ এনে মসজিদে নব্বীর (সঃ) দুটি স্তম্ভের মধ্যে ঝুলানো রজ্জুতে ঝুলিয়ে দিতেন। ঐগুলো আসহাব-ই-সুফফা ও দরিদ্র মুহাজিরগণ ক্ষুধার সময় খেয়ে নিতেন। সাদকার প্রতি আগ্রহ কম ছিল এরূপ একটি লোক ওতে খারাপ খেজুরের একটি গুচ্ছ এনে ঝুলিয়ে দেয়। সেই সময়। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বলা হয়, যদি তোমাদেরকে এই রকমই জিনিস উপঢৌকন স্বরূপ দেয়া হয় তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে। অবশ্য মনে না চাইলেও যদি লজ্জার খাতিরে তা গ্রহণ করে নাও সেটা অন্য কথা। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই ভাল ভাল খেজুর নিয়ে আসতেন। (ইবনে জারীর) ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, মানুষ হালকা ধরনের খেজুর ও খারাপ ফল দানের জন্যে বের করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই রকম জিনিস দান করতে নিষেধ করেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাগফাল (রাঃ) বলেন যে, মুমিনের উপার্জন কখনও জঘন্য হতে পারে না। ভাবার্থ এই যে, তোমরা। বাজে জিনিস দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গো-সাপের (গুইসাপ) গোত আনা হলে তিনি নিজেও খেলেন না এবং কাউকে খেতে নিষেধও করলেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কোন মিসকীনকে দেবো কি: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা নিজেরা যা খেতে চাও না তা অপরকে খেতে দিও না। হযরত বারা (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমাদের কারও উপর কোন দাবী থাকে এবং সে তোমাকে এমন জিনিস দেয় যা বাজে ও মূল্যহীন তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে না, কিন্তু যখন তোমাদের হক নষ্ট হতে দেখবে তখন তোমরা চক্ষু বন্ধ করে তা নিয়ে নেবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা কাউকে উত্তম মাল ধার দিয়েছে, কিন্তু পরিশোধ করার সময় সে নিকৃষ্ট মাল নিয়ে আসছে, এইরূপ অবস্থায় তোমরা কখনও ঐ মাল গ্রহণ করবে না। আর যদি গ্রহণ করও তবে মূল্য কমিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করবে। তাহলে যে জিনিস তোমরা নিজেদের হকের বিনিময়ে গ্রহণ কর না, তা তোমরা আল্লাহর হকের বিনিময়ে কেন দেবে: সুতরাং তোমরা উত্তম ও পছন্দনীয় মাল আল্লাহর পথে খরচ কর। এই অর্থই হচ্ছেঃ (আরবি) এই আয়াতটির। অর্থাৎ ‘তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করতে পার না যে পর্যন্ত না তোমাদের পছন্দনীয় মাল হতে খরচ কর। (৩:৯২) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ যে তোমাদেরকে তাঁর পথে উত্তম ও পছন্দনীয় মাল খরচ করার নির্দেশ প্রদান করলেন, এই জন্যে তোমরা এই কথা বুঝে নিও না যে, আল্লাহ তোমাদের (আরবি) মুখাপেক্ষী। না, না, তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাব মুক্ত। তিনি কারও প্রত্যাশী নন। বরং তোমরা সবাই তার মুখাপেক্ষী। তাঁর নির্দেশ শুধু এই জন্যেই যে, দরিদ্র লোকেরাও যেন দুনিয়ার নিয়ামতসমূহ হতে বঞ্চিত না থাকে। যেমন অন্য জায়গায় কুরবানীর হুকুমের পরে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কুরবানীর গোশতও পৌছে না এবং রক্তও পৌছে না; কিন্তু তাঁর নিকট তোমাদের সংযমশীলতা পৌছে থাকে (২২:৩৭)।' তিনি বিপুল দাতা। তাঁর ধনভাণ্ডারে কোন কিছুর স্বল্পতা নেই। হালাল ও পবিত্র মাল হতে সাদকা বের করে আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহাদানের প্রতি লক্ষ্য কর। এর বহুগুণ বৃদ্ধি করে তিনি তোমাদেরকে প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি দরিদ্রও নন, অত্যাচারীও নন। তিনি প্রশংসিত। সমস্ত কথায় ও কাজে তারই প্রশংসা করা হয়। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি সারা জগতের পালন কর্তা। তিনি ব্যতীত কেউ কারও পালন কর্তা নয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বানী আদমের মনে শয়তান এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে এবং ফেরেশতা এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে। শয়তান দুষ্টামি ও সত্যকে অবিশ্বাস করার প্রতি উত্তেজিত করে এবং ফেরেশতা সৎকাজের প্রতি এবং সত্যকে স্বীকার করার প্রতি উৎসাহিত করে। যার মনে এই ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং জেনে নেয় যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়েছে। আর যার মনে ঐ ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। শেষে (আরবি) (২:২৬৮) এই আয়াতটি তিনি পাঠ করেন। (তিরমিযী) এই হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ করতে শয়তান বাধা দেয় এবং মনে কু-ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, এইভাবে খরচ করলে সে দরিদ্র হয়ে যাবে। এই কাজ হতে বিরত রাখার পর তাকে পাপের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে এবং আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে, অবৈধ কাজে এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণের কাজে উত্তেজিত করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত নির্দেশ দেন যে, সে যেন তাঁর পথে খরচ করা হতে বিরত না হয় এবং শয়তানের, ধমকের উল্টো বলেন যে, ঐ দানের বিনিময়ে তিনি তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর সে যে তাকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আল্লাহ তাকে তার সীমাহীন অনুগ্রহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছেন। তাঁর চেয়ে অধিক দাতা, দয়ালু ও অনুগ্রহশীল আর কে হতে পারে: আর পরিণামের জ্ঞান তার অপেক্ষা বেশী কার থাকতে পারে। এখানে ‘হিকমত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের পূর্ণ পারদর্শিতা লাভ, যার দ্বারা রহিতকৃত ও রহিতকারী, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট, পূর্বের ও পরের, হালাল ও হারামের এবং উপমার আয়াতসমূহের পূর্ণ পরিচয় লাভ হয়। ভাল-মন্দ পড়তে তো সবাই পারে কিন্তু ওর ব্যাখ্যা ও অনুধাবন হচ্ছে ঐ হিকমত, যা মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আর যাকে এই হিকমত দান করা হয় সে প্রকৃত ভাবার্থ জানতে পারে এবং কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। তার মুখে সঠিক ভাবার্থ উচ্চারিত হয়। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন সে লাভ করে বলেই তার অন্তরে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মারফু হাদীসেও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হিকমতের মূল হচ্ছে আল্লাহর ভয়। পৃথিবীতে এইরূপ বহু লোক রয়েছে যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় বড়ই পারদর্শী। দুনিয়ার বিষয়সমূহে তারা পূর্ণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা ধর্ম বিষয়ে একেবারেই অন্ধ। আবার পৃথিবীতে বহু লোক এমনও রয়েছেন যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় দুর্বল বটে, কিন্তু শরীয়তের বিদ্যায় তারা বড়ই পারদর্শী। সুতরাং এটাই ঐ হিকমত যা আল্লাহ তা'আলা এঁদেরকে দিয়েছেন এবং ওরদেরকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে হিকমতের ভাবার্থ হচ্ছে নবুওয়াত'। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, হিকমত' শব্দটির মধ্যে এই সবগুলোই মিলিত রয়েছে। আর নবুওয়াতও হচ্ছে ওর উঁচু ও বড় অংশ এবং এটা শুধু নবীদের (আঃ) জন্যেই নির্দিষ্ট রয়েছে। তারা ছাড়া এটা কেউ লাভ করতে পারে না। কিন্তু যারা নবীদের অনুসারী তাদেরকেও আল্লাহ পাক হিকমতের অন্যান্য অংশ হতে বঞ্চিত রাখেননি। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবনরূপ সম্পদ তাদেরকেও দান করা হয়েছে। কোন কোন হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদ মুখস্থ করেছে, তার স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যস্থলে নবুওয়াত চড়ে বসে; কিন্তু তার নিকট ওয়াহী করা হয় না। কিন্তু অপরপক্ষে বলা হয়েছে যে, হাদীসটি দুর্বল। কেননা বর্ণিত আছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন আমরের (রাঃ) নিজস্ব উক্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ দুই ব্যক্তি ছাড়া কারও প্রতি হিংসা করা যায় না। এক ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ মাল-ধন দিয়েছেন। অতঃপর তাকে ঐ মাল তার পথে খরচ করার তওফীক প্রদান করেছেন। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে সেই প্রজ্ঞা অনুযায়ী মীমাংসা করে এবং তা শিক্ষা দিয়ে থাকে। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে থাকে যারা জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী। অর্থাৎ যারা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের হাদীস পড়ে বুঝবার চেষ্টা করে, কথা মনে রাখে এবং ভাবার্থের প্রতি মনোযোগ দেয় তারাই ভাবার্থ উপলব্ধি করতে পারে। সুতরাং উপদেশ দ্বারা তারাই উপকৃত হয়।