Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:268 – আলে ইমরান 3:36

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-বাকারা 2:268
  2. আল-বাকারা 2:269
  3. আল-বাকারা 2:270
  4. আল-বাকারা 2:271
  5. আল-বাকারা 2:272
  6. আল-বাকারা 2:273
  7. আল-বাকারা 2:274
  8. আল-বাকারা 2:275
  9. আল-বাকারা 2:276
  10. আল-বাকারা 2:277
  11. আল-বাকারা 2:278
  12. আল-বাকারা 2:279
  13. আল-বাকারা 2:280
  14. আল-বাকারা 2:281
  15. আল-বাকারা 2:282
  16. আল-বাকারা 2:283
  17. আল-বাকারা 2:284
  18. আল-বাকারা 2:285
  19. আল-বাকারা 2:286
  20. আলে ইমরান 3:1
  21. আলে ইমরান 3:2
  22. আলে ইমরান 3:3
  23. আলে ইমরান 3:4
  24. আলে ইমরান 3:5
  25. আলে ইমরান 3:6
  26. আলে ইমরান 3:7
  27. আলে ইমরান 3:8
  28. আলে ইমরান 3:9
  29. আলে ইমরান 3:10
  30. আলে ইমরান 3:11
  31. আলে ইমরান 3:12
  32. আলে ইমরান 3:13
  33. আলে ইমরান 3:14
  34. আলে ইমরান 3:15
  35. আলে ইমরান 3:16
  36. আলে ইমরান 3:17
  37. আলে ইমরান 3:18
  38. আলে ইমরান 3:19
  39. আলে ইমরান 3:20
  40. আলে ইমরান 3:21
  41. আলে ইমরান 3:22
  42. আলে ইমরান 3:23
  43. আলে ইমরান 3:24
  44. আলে ইমরান 3:25
  45. আলে ইমরান 3:26
  46. আলে ইমরান 3:27
  47. আলে ইমরান 3:28
  48. আলে ইমরান 3:29
  49. আলে ইমরান 3:30
  50. আলে ইমরান 3:31
  51. আলে ইমরান 3:32
  52. আলে ইমরান 3:33
  53. আলে ইমরান 3:34
  54. আলে ইমরান 3:35
  55. আলে ইমরান 3:36

আল-বাকারা 2:268

আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন ব্যবসার মাল, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন এবং সোনা, রূপা, শস্য ইত্যাদি যা তাদেরকে ভূমি হতে বের করে দেয়া হয়েছে তা হতে উত্তম ও পছন্দনীয় জিনিস তাঁর পথে খরচ করে। তারা যেন পঁচা, গলা ও মন্দ জিনিস আল্লাহর পথে না দেয়। আল্লাহ অত্যন্ত পবিত্র, তিনি অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “এমন জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করার ইচ্ছে করো না যা তোমাদের নিজেদেরকে দেয়া হলে তোমরাও তা গ্রহণ করতে সম্মত হতে না। সুতরাং তোমরা এই রকম জিনিস কিরূপে আল্লাহকে দিতে পারো: আর তিনি তা গ্রহণই যা করবেন কেন: তবে তোমরা যদি সম্পদ হাত ছাড়া হতে দেখে নিজের অধিকারের বিনিময়ে কোন পঁচা-গলা জিনিস বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে নাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু আল্লাহ পাক তো তোমাদের মত বাধ্য ও দুর্বল নন যে, তিনি এই সব জঘন্য জিনিস গ্রহণ করবেন: তিনি কোন অবস্থাতেই এই সব জিনিস গ্রহণ করেন না। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তোমরা হালাল জিনিস ছেড়ে হারাম মাল হতে দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের রুজী তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন তদ্রুপ চরিত্রও তোমদের বেঁটে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া তার বন্ধুদেরকেও দেন এবং শক্রদেরকেও দেন। কিন্তু দ্বীন শুধু তার বন্ধুদেরকেই দান করে থাকেন। যে দ্বীন লাভ করে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পাত্র। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কোন বান্দা মুসলমান হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার অন্তর ও তার জিহ্বা মুসলমান হয়। কোন বান্দা মুসলমান হতে পারবে না যে পর্যন্ত না তার প্রতিবেশী তার থেকে নির্ভয় হয়। জনগণের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কষ্টের ভাবার্থ হচ্ছে প্রতারণা ও উৎপীড়ন। যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন না এবং তার দান-খয়রাতও গ্রহণ করেন না। যা সে ছেড়ে যায় তার জন্যে তা দুযখে যাবার পাথেয় ও কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দের দ্বারা দূর করেন না বরং মন্দকে ভাল দ্বারা দূর করেন! অপবিত্র জিনিস অপবিত্র জিনিস দ্বারা বিদূরিত হয় না। সুতরাং দু’টি উক্তি হলো-এক হলো মন্দ জিনিস এবং দ্বিতীয় হলো হারাম মাল।হযরত বারা' বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ খেজুরের মৌসুমে আনসারগণ নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী খেজুরের গুচ্ছ এনে মসজিদে নব্বীর (সঃ) দুটি স্তম্ভের মধ্যে ঝুলানো রজ্জুতে ঝুলিয়ে দিতেন। ঐগুলো আসহাব-ই-সুফফা ও দরিদ্র মুহাজিরগণ ক্ষুধার সময় খেয়ে নিতেন। সাদকার প্রতি আগ্রহ কম ছিল এরূপ একটি লোক ওতে খারাপ খেজুরের একটি গুচ্ছ এনে ঝুলিয়ে দেয়। সেই সময়। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বলা হয়, যদি তোমাদেরকে এই রকমই জিনিস উপঢৌকন স্বরূপ দেয়া হয় তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে। অবশ্য মনে না চাইলেও যদি লজ্জার খাতিরে তা গ্রহণ করে নাও সেটা অন্য কথা। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই ভাল ভাল খেজুর নিয়ে আসতেন। (ইবনে জারীর) ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, মানুষ হালকা ধরনের খেজুর ও খারাপ ফল দানের জন্যে বের করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই রকম জিনিস দান করতে নিষেধ করেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাগফাল (রাঃ) বলেন যে, মুমিনের উপার্জন কখনও জঘন্য হতে পারে না। ভাবার্থ এই যে, তোমরা। বাজে জিনিস দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গো-সাপের (গুইসাপ) গোত আনা হলে তিনি নিজেও খেলেন না এবং কাউকে খেতে নিষেধও করলেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কোন মিসকীনকে দেবো কি: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা নিজেরা যা খেতে চাও না তা অপরকে খেতে দিও না। হযরত বারা (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমাদের কারও উপর কোন দাবী থাকে এবং সে তোমাকে এমন জিনিস দেয় যা বাজে ও মূল্যহীন তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে না, কিন্তু যখন তোমাদের হক নষ্ট হতে দেখবে তখন তোমরা চক্ষু বন্ধ করে তা নিয়ে নেবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা কাউকে উত্তম মাল ধার দিয়েছে, কিন্তু পরিশোধ করার সময় সে নিকৃষ্ট মাল নিয়ে আসছে, এইরূপ অবস্থায় তোমরা কখনও ঐ মাল গ্রহণ করবে না। আর যদি গ্রহণ করও তবে মূল্য কমিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করবে। তাহলে যে জিনিস তোমরা নিজেদের হকের বিনিময়ে গ্রহণ কর না, তা তোমরা আল্লাহর হকের বিনিময়ে কেন দেবে: সুতরাং তোমরা উত্তম ও পছন্দনীয় মাল আল্লাহর পথে খরচ কর। এই অর্থই হচ্ছেঃ (আরবি) এই আয়াতটির। অর্থাৎ ‘তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করতে পার না যে পর্যন্ত না তোমাদের পছন্দনীয় মাল হতে খরচ কর। (৩:৯২) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ যে তোমাদেরকে তাঁর পথে উত্তম ও পছন্দনীয় মাল খরচ করার নির্দেশ প্রদান করলেন, এই জন্যে তোমরা এই কথা বুঝে নিও না যে, আল্লাহ তোমাদের (আরবি) মুখাপেক্ষী। না, না, তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাব মুক্ত। তিনি কারও প্রত্যাশী নন। বরং তোমরা সবাই তার মুখাপেক্ষী। তাঁর নির্দেশ শুধু এই জন্যেই যে, দরিদ্র লোকেরাও যেন দুনিয়ার নিয়ামতসমূহ হতে বঞ্চিত না থাকে। যেমন অন্য জায়গায় কুরবানীর হুকুমের পরে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কুরবানীর গোশতও পৌছে না এবং রক্তও পৌছে না; কিন্তু তাঁর নিকট তোমাদের সংযমশীলতা পৌছে থাকে (২২:৩৭)।' তিনি বিপুল দাতা। তাঁর ধনভাণ্ডারে কোন কিছুর স্বল্পতা নেই। হালাল ও পবিত্র মাল হতে সাদকা বের করে আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহাদানের প্রতি লক্ষ্য কর। এর বহুগুণ বৃদ্ধি করে তিনি তোমাদেরকে প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি দরিদ্রও নন, অত্যাচারীও নন। তিনি প্রশংসিত। সমস্ত কথায় ও কাজে তারই প্রশংসা করা হয়। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি সারা জগতের পালন কর্তা। তিনি ব্যতীত কেউ কারও পালন কর্তা নয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বানী আদমের মনে শয়তান এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে এবং ফেরেশতা এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে। শয়তান দুষ্টামি ও সত্যকে অবিশ্বাস করার প্রতি উত্তেজিত করে এবং ফেরেশতা সৎকাজের প্রতি এবং সত্যকে স্বীকার করার প্রতি উৎসাহিত করে। যার মনে এই ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং জেনে নেয় যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়েছে। আর যার মনে ঐ ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। শেষে (আরবি) (২:২৬৮) এই আয়াতটি তিনি পাঠ করেন। (তিরমিযী) এই হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ করতে শয়তান বাধা দেয় এবং মনে কু-ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, এইভাবে খরচ করলে সে দরিদ্র হয়ে যাবে। এই কাজ হতে বিরত রাখার পর তাকে পাপের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে এবং আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে, অবৈধ কাজে এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণের কাজে উত্তেজিত করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত নির্দেশ দেন যে, সে যেন তাঁর পথে খরচ করা হতে বিরত না হয় এবং শয়তানের, ধমকের উল্টো বলেন যে, ঐ দানের বিনিময়ে তিনি তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর সে যে তাকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আল্লাহ তাকে তার সীমাহীন অনুগ্রহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছেন। তাঁর চেয়ে অধিক দাতা, দয়ালু ও অনুগ্রহশীল আর কে হতে পারে: আর পরিণামের জ্ঞান তার অপেক্ষা বেশী কার থাকতে পারে। এখানে ‘হিকমত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের পূর্ণ পারদর্শিতা লাভ, যার দ্বারা রহিতকৃত ও রহিতকারী, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট, পূর্বের ও পরের, হালাল ও হারামের এবং উপমার আয়াতসমূহের পূর্ণ পরিচয় লাভ হয়। ভাল-মন্দ পড়তে তো সবাই পারে কিন্তু ওর ব্যাখ্যা ও অনুধাবন হচ্ছে ঐ হিকমত, যা মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আর যাকে এই হিকমত দান করা হয় সে প্রকৃত ভাবার্থ জানতে পারে এবং কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। তার মুখে সঠিক ভাবার্থ উচ্চারিত হয়। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন সে লাভ করে বলেই তার অন্তরে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মারফু হাদীসেও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হিকমতের মূল হচ্ছে আল্লাহর ভয়। পৃথিবীতে এইরূপ বহু লোক রয়েছে যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় বড়ই পারদর্শী। দুনিয়ার বিষয়সমূহে তারা পূর্ণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা ধর্ম বিষয়ে একেবারেই অন্ধ। আবার পৃথিবীতে বহু লোক এমনও রয়েছেন যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় দুর্বল বটে, কিন্তু শরীয়তের বিদ্যায় তারা বড়ই পারদর্শী। সুতরাং এটাই ঐ হিকমত যা আল্লাহ তা'আলা এঁদেরকে দিয়েছেন এবং ওরদেরকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে হিকমতের ভাবার্থ হচ্ছে নবুওয়াত'। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, হিকমত' শব্দটির মধ্যে এই সবগুলোই মিলিত রয়েছে। আর নবুওয়াতও হচ্ছে ওর উঁচু ও বড় অংশ এবং এটা শুধু নবীদের (আঃ) জন্যেই নির্দিষ্ট রয়েছে। তারা ছাড়া এটা কেউ লাভ করতে পারে না। কিন্তু যারা নবীদের অনুসারী তাদেরকেও আল্লাহ পাক হিকমতের অন্যান্য অংশ হতে বঞ্চিত রাখেননি। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবনরূপ সম্পদ তাদেরকেও দান করা হয়েছে। কোন কোন হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদ মুখস্থ করেছে, তার স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যস্থলে নবুওয়াত চড়ে বসে; কিন্তু তার নিকট ওয়াহী করা হয় না। কিন্তু অপরপক্ষে বলা হয়েছে যে, হাদীসটি দুর্বল। কেননা বর্ণিত আছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন আমরের (রাঃ) নিজস্ব উক্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ দুই ব্যক্তি ছাড়া কারও প্রতি হিংসা করা যায় না। এক ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ মাল-ধন দিয়েছেন। অতঃপর তাকে ঐ মাল তার পথে খরচ করার তওফীক প্রদান করেছেন। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে সেই প্রজ্ঞা অনুযায়ী মীমাংসা করে এবং তা শিক্ষা দিয়ে থাকে। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে থাকে যারা জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী। অর্থাৎ যারা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের হাদীস পড়ে বুঝবার চেষ্টা করে, কথা মনে রাখে এবং ভাবার্থের প্রতি মনোযোগ দেয় তারাই ভাবার্থ উপলব্ধি করতে পারে। সুতরাং উপদেশ দ্বারা তারাই উপকৃত হয়।

আল-বাকারা 2:269

আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন ব্যবসার মাল, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন এবং সোনা, রূপা, শস্য ইত্যাদি যা তাদেরকে ভূমি হতে বের করে দেয়া হয়েছে তা হতে উত্তম ও পছন্দনীয় জিনিস তাঁর পথে খরচ করে। তারা যেন পঁচা, গলা ও মন্দ জিনিস আল্লাহর পথে না দেয়। আল্লাহ অত্যন্ত পবিত্র, তিনি অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “এমন জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করার ইচ্ছে করো না যা তোমাদের নিজেদেরকে দেয়া হলে তোমরাও তা গ্রহণ করতে সম্মত হতে না। সুতরাং তোমরা এই রকম জিনিস কিরূপে আল্লাহকে দিতে পারো: আর তিনি তা গ্রহণই যা করবেন কেন: তবে তোমরা যদি সম্পদ হাত ছাড়া হতে দেখে নিজের অধিকারের বিনিময়ে কোন পঁচা-গলা জিনিস বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে নাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু আল্লাহ পাক তো তোমাদের মত বাধ্য ও দুর্বল নন যে, তিনি এই সব জঘন্য জিনিস গ্রহণ করবেন: তিনি কোন অবস্থাতেই এই সব জিনিস গ্রহণ করেন না। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তোমরা হালাল জিনিস ছেড়ে হারাম মাল হতে দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের রুজী তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন তদ্রুপ চরিত্রও তোমদের বেঁটে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া তার বন্ধুদেরকেও দেন এবং শক্রদেরকেও দেন। কিন্তু দ্বীন শুধু তার বন্ধুদেরকেই দান করে থাকেন। যে দ্বীন লাভ করে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পাত্র। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কোন বান্দা মুসলমান হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার অন্তর ও তার জিহ্বা মুসলমান হয়। কোন বান্দা মুসলমান হতে পারবে না যে পর্যন্ত না তার প্রতিবেশী তার থেকে নির্ভয় হয়। জনগণের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কষ্টের ভাবার্থ হচ্ছে প্রতারণা ও উৎপীড়ন। যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন না এবং তার দান-খয়রাতও গ্রহণ করেন না। যা সে ছেড়ে যায় তার জন্যে তা দুযখে যাবার পাথেয় ও কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দের দ্বারা দূর করেন না বরং মন্দকে ভাল দ্বারা দূর করেন! অপবিত্র জিনিস অপবিত্র জিনিস দ্বারা বিদূরিত হয় না। সুতরাং দু’টি উক্তি হলো-এক হলো মন্দ জিনিস এবং দ্বিতীয় হলো হারাম মাল।হযরত বারা' বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ খেজুরের মৌসুমে আনসারগণ নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী খেজুরের গুচ্ছ এনে মসজিদে নব্বীর (সঃ) দুটি স্তম্ভের মধ্যে ঝুলানো রজ্জুতে ঝুলিয়ে দিতেন। ঐগুলো আসহাব-ই-সুফফা ও দরিদ্র মুহাজিরগণ ক্ষুধার সময় খেয়ে নিতেন। সাদকার প্রতি আগ্রহ কম ছিল এরূপ একটি লোক ওতে খারাপ খেজুরের একটি গুচ্ছ এনে ঝুলিয়ে দেয়। সেই সময়। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বলা হয়, যদি তোমাদেরকে এই রকমই জিনিস উপঢৌকন স্বরূপ দেয়া হয় তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে। অবশ্য মনে না চাইলেও যদি লজ্জার খাতিরে তা গ্রহণ করে নাও সেটা অন্য কথা। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই ভাল ভাল খেজুর নিয়ে আসতেন। (ইবনে জারীর) ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, মানুষ হালকা ধরনের খেজুর ও খারাপ ফল দানের জন্যে বের করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই রকম জিনিস দান করতে নিষেধ করেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাগফাল (রাঃ) বলেন যে, মুমিনের উপার্জন কখনও জঘন্য হতে পারে না। ভাবার্থ এই যে, তোমরা। বাজে জিনিস দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গো-সাপের (গুইসাপ) গোত আনা হলে তিনি নিজেও খেলেন না এবং কাউকে খেতে নিষেধও করলেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কোন মিসকীনকে দেবো কি: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা নিজেরা যা খেতে চাও না তা অপরকে খেতে দিও না। হযরত বারা (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমাদের কারও উপর কোন দাবী থাকে এবং সে তোমাকে এমন জিনিস দেয় যা বাজে ও মূল্যহীন তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে না, কিন্তু যখন তোমাদের হক নষ্ট হতে দেখবে তখন তোমরা চক্ষু বন্ধ করে তা নিয়ে নেবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা কাউকে উত্তম মাল ধার দিয়েছে, কিন্তু পরিশোধ করার সময় সে নিকৃষ্ট মাল নিয়ে আসছে, এইরূপ অবস্থায় তোমরা কখনও ঐ মাল গ্রহণ করবে না। আর যদি গ্রহণ করও তবে মূল্য কমিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করবে। তাহলে যে জিনিস তোমরা নিজেদের হকের বিনিময়ে গ্রহণ কর না, তা তোমরা আল্লাহর হকের বিনিময়ে কেন দেবে: সুতরাং তোমরা উত্তম ও পছন্দনীয় মাল আল্লাহর পথে খরচ কর। এই অর্থই হচ্ছেঃ (আরবি) এই আয়াতটির। অর্থাৎ ‘তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করতে পার না যে পর্যন্ত না তোমাদের পছন্দনীয় মাল হতে খরচ কর। (৩:৯২) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ যে তোমাদেরকে তাঁর পথে উত্তম ও পছন্দনীয় মাল খরচ করার নির্দেশ প্রদান করলেন, এই জন্যে তোমরা এই কথা বুঝে নিও না যে, আল্লাহ তোমাদের (আরবি) মুখাপেক্ষী। না, না, তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাব মুক্ত। তিনি কারও প্রত্যাশী নন। বরং তোমরা সবাই তার মুখাপেক্ষী। তাঁর নির্দেশ শুধু এই জন্যেই যে, দরিদ্র লোকেরাও যেন দুনিয়ার নিয়ামতসমূহ হতে বঞ্চিত না থাকে। যেমন অন্য জায়গায় কুরবানীর হুকুমের পরে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কুরবানীর গোশতও পৌছে না এবং রক্তও পৌছে না; কিন্তু তাঁর নিকট তোমাদের সংযমশীলতা পৌছে থাকে (২২:৩৭)।' তিনি বিপুল দাতা। তাঁর ধনভাণ্ডারে কোন কিছুর স্বল্পতা নেই। হালাল ও পবিত্র মাল হতে সাদকা বের করে আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহাদানের প্রতি লক্ষ্য কর। এর বহুগুণ বৃদ্ধি করে তিনি তোমাদেরকে প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি দরিদ্রও নন, অত্যাচারীও নন। তিনি প্রশংসিত। সমস্ত কথায় ও কাজে তারই প্রশংসা করা হয়। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি সারা জগতের পালন কর্তা। তিনি ব্যতীত কেউ কারও পালন কর্তা নয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বানী আদমের মনে শয়তান এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে এবং ফেরেশতা এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে। শয়তান দুষ্টামি ও সত্যকে অবিশ্বাস করার প্রতি উত্তেজিত করে এবং ফেরেশতা সৎকাজের প্রতি এবং সত্যকে স্বীকার করার প্রতি উৎসাহিত করে। যার মনে এই ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং জেনে নেয় যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়েছে। আর যার মনে ঐ ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। শেষে (আরবি) (২:২৬৮) এই আয়াতটি তিনি পাঠ করেন। (তিরমিযী) এই হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ করতে শয়তান বাধা দেয় এবং মনে কু-ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, এইভাবে খরচ করলে সে দরিদ্র হয়ে যাবে। এই কাজ হতে বিরত রাখার পর তাকে পাপের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে এবং আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে, অবৈধ কাজে এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণের কাজে উত্তেজিত করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত নির্দেশ দেন যে, সে যেন তাঁর পথে খরচ করা হতে বিরত না হয় এবং শয়তানের, ধমকের উল্টো বলেন যে, ঐ দানের বিনিময়ে তিনি তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর সে যে তাকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আল্লাহ তাকে তার সীমাহীন অনুগ্রহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছেন। তাঁর চেয়ে অধিক দাতা, দয়ালু ও অনুগ্রহশীল আর কে হতে পারে: আর পরিণামের জ্ঞান তার অপেক্ষা বেশী কার থাকতে পারে। এখানে ‘হিকমত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের পূর্ণ পারদর্শিতা লাভ, যার দ্বারা রহিতকৃত ও রহিতকারী, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট, পূর্বের ও পরের, হালাল ও হারামের এবং উপমার আয়াতসমূহের পূর্ণ পরিচয় লাভ হয়। ভাল-মন্দ পড়তে তো সবাই পারে কিন্তু ওর ব্যাখ্যা ও অনুধাবন হচ্ছে ঐ হিকমত, যা মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আর যাকে এই হিকমত দান করা হয় সে প্রকৃত ভাবার্থ জানতে পারে এবং কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। তার মুখে সঠিক ভাবার্থ উচ্চারিত হয়। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন সে লাভ করে বলেই তার অন্তরে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মারফু হাদীসেও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হিকমতের মূল হচ্ছে আল্লাহর ভয়। পৃথিবীতে এইরূপ বহু লোক রয়েছে যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় বড়ই পারদর্শী। দুনিয়ার বিষয়সমূহে তারা পূর্ণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা ধর্ম বিষয়ে একেবারেই অন্ধ। আবার পৃথিবীতে বহু লোক এমনও রয়েছেন যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় দুর্বল বটে, কিন্তু শরীয়তের বিদ্যায় তারা বড়ই পারদর্শী। সুতরাং এটাই ঐ হিকমত যা আল্লাহ তা'আলা এঁদেরকে দিয়েছেন এবং ওরদেরকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে হিকমতের ভাবার্থ হচ্ছে নবুওয়াত'। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, হিকমত' শব্দটির মধ্যে এই সবগুলোই মিলিত রয়েছে। আর নবুওয়াতও হচ্ছে ওর উঁচু ও বড় অংশ এবং এটা শুধু নবীদের (আঃ) জন্যেই নির্দিষ্ট রয়েছে। তারা ছাড়া এটা কেউ লাভ করতে পারে না। কিন্তু যারা নবীদের অনুসারী তাদেরকেও আল্লাহ পাক হিকমতের অন্যান্য অংশ হতে বঞ্চিত রাখেননি। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবনরূপ সম্পদ তাদেরকেও দান করা হয়েছে। কোন কোন হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদ মুখস্থ করেছে, তার স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যস্থলে নবুওয়াত চড়ে বসে; কিন্তু তার নিকট ওয়াহী করা হয় না। কিন্তু অপরপক্ষে বলা হয়েছে যে, হাদীসটি দুর্বল। কেননা বর্ণিত আছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন আমরের (রাঃ) নিজস্ব উক্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ দুই ব্যক্তি ছাড়া কারও প্রতি হিংসা করা যায় না। এক ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ মাল-ধন দিয়েছেন। অতঃপর তাকে ঐ মাল তার পথে খরচ করার তওফীক প্রদান করেছেন। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে সেই প্রজ্ঞা অনুযায়ী মীমাংসা করে এবং তা শিক্ষা দিয়ে থাকে। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে থাকে যারা জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী। অর্থাৎ যারা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের হাদীস পড়ে বুঝবার চেষ্টা করে, কথা মনে রাখে এবং ভাবার্থের প্রতি মনোযোগ দেয় তারাই ভাবার্থ উপলব্ধি করতে পারে। সুতরাং উপদেশ দ্বারা তারাই উপকৃত হয়।

আল-বাকারা 2:270

২৭০-২৭১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি প্রত্যেকটি দান, প্রতিজ্ঞা (নর) ও ভাল কাজের খবর রাখেন। তাঁর যেসব বান্দা তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে, স্বীয় সত্ত্বার্যের পুণ্যের প্রতি আশা রাখে, তার ওয়াদার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখে, তাদেরকে তিনি উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন। পক্ষান্তরে যারা তার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে, তার সাথে অন্যদেরও উপাসনা করবে তারা অত্যাচারী। কিয়ামতের দিন তাদেরকে বিভিন্ন প্রকারের কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে এবং সেই দিন এমন কেউ থাকবে না যে তাদেরকে ঐ শাস্তি হতে মুক্তি দিতে পারে বা কোন সাহায্য করতে পারে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘প্রকাশ্যভাবে দান করাও ভাল এবং গোপনে দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে দেয়াও উত্তম। কেননা, গোপন দানে রিয়াকারী বহু দূরে সরে থাকে। তবে যদি প্রকাশ্য দানের ব্যাপারে দাতার মহৎ কোন উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটা অন্য কথা। যেমন তার উদ্দেশ্য এই যে, তার দেখাদেখি অন্যরাও দান করবে ইত্যাদি। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রকাশ্যদানকারী উচ্চ শব্দে কুরআন পাঠকের ন্যায় এবং গোপনে দানকারী ধীরে ধীরে কুরআন পাঠকের ন্যায়। কুরআন মাজীদের এই আয়াত দ্বারা গোপন দানের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত হচ্ছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সাত প্রকারের লোককে তার ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন, যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ। (২) সেই নব-যুবক যে তার যৌবন আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে। (৩) ঐ দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্যই পরস্পর ভালবাসা রেখেছে, ঐ জন্যেই তারা একত্রিত থাকে এবং ঐ জন্যেই পৃথক হয় (৪) ঐ ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদ হতে বের হওয়া থেকে নিয়ে পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত মসজিদের সাথে সংলগ্ন থাকে। (৫) ঐ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে, অতঃপর তার নয়নযুগল হতে অশ্রুধারা নেমে আসে (৬) ঐ ব্যক্তি যাকে একজন বংশ মর্যাদা ও সৌন্দর্যের অধিকারিণী নারী (নির্লজ্জতার কাজে) আহবান করে, তখন সে বলে নিশ্চয় আমি সারা জগতের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি ।(৭) ঐ ব্যক্তি যে এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানতে পারে না।' মুসনাদ-ইআহমাদে হাদীস রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন পৃথিবী দুলতে আরম্ভ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা পর্বত সৃষ্টি করে পৃথিবীর মধ্যে গেড়ে দেন। ফলে পৃথিবীর কম্পন থেমে যায়। আল্লাহ তাআলা পর্বতরাজিকে এত শক্ত করে সৃষ্টি করেছেন দেখে ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনার সষ্ট বস্তসমূহের মধ্যে পর্বত অপেক্ষা শক্ত আর কিছু আছে কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যা লৌহ রয়েছে, ওর চেয়ে শক্ত হচ্ছে অগ্নি ওর চেয়ে শক্ত পানি, ওর চেয়ে শক্ত বাতাস। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহ! বাতাস অপেক্ষা শক্ত অন্য কিছু আছে কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যা, সেই আদম সন্তান যে এমন গোপনে দান করে যে, তার দক্ষিণ হস্ত যা খরচ করে বাম হস্ত তা জানতে পারে না।' আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, উত্তম দান হচ্ছে ওটাই যা গোপনে কোন অভাবগ্রস্তকে দেয়া হয় এবং মালের স্বল্পতা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে খরচ করা হয়। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (ইবনে আবি হাতিম)। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, : এই আয়াতটি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এবং হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) তো তাঁর অর্ধেক মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর খিদমতে এনে হাজির করেন। আর হযরত আবু বকর (রাঃ) বাড়ীতে যা ছিল সবই এনে উপস্থিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘পরিবারবর্গের জন্যে কিছু রেখে এসেছো কি: হযরত উমার (রাঃ) উত্তর দেনঃ এতটিই ছেড়ে এসেছি।' হযরত আবু বকরের (রাঃ) এটা প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল না এবং গোপনে সবকিছু তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁকেও যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন তখন বাধ্য হয়ে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অঙ্গীকারই যথেষ্ট।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ “হে আবূ বকর (রাঃ)! যে কোন সকার্যের দিকে আমরা অগ্রসর হয়েছি, আপনাকে অগ্রেই দেখেছি।' এই আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ। দান ফরয হোক, নফল হোক, যাকাত হোক বা খয়রাত হোক, প্রকাশ্যে দান করার চেয়ে গোপনে দান করা উত্তম। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নফল দান গোপনে দেয়ার ফযীলত সত্তরগুণ; কিন্তু ফরয দান অর্থাৎ যাকাত প্রকাশ্যে দেয়ার ফযীলত পঞ্চাশগুণ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘দানের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের পাপ ও অন্যায় দূর করে দেবেন, বিশেষ করে যখন গোপনে দান করা হবে। এর বিনিময়ে তোমরা বহু সুফল প্রাপ্ত হবে। এর দ্বারা তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং পাপসমূহ মোচন হয়ে যাবে। ব্যুকাফেরু শব্দকে ঝুকাফের পড়া হয়েছে। এতে বাহ্যতঃ এটা শর্তের জওয়াবের স্থলে (আরবি) হবে, যা হচ্ছে (আরবি) শব্দটি। যেমন (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) শব্দটি হয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমাদের কোন পাপ ও পুণ্যের কাজ,দানশীলতা ও কার্পণ্য, গোপনীয় ও প্রকাশ্য, সৎ উদ্দেশ্য ও দুনিয়া অনুসন্ধান প্রভৃতি কিছুই আল্লাহ তা'আলার নিকট অজানা নেই। সুতরাং তিনি পূর্ণভাবে প্রতিদান প্রদান করবেন।

আল-বাকারা 2:271

২৭০-২৭১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি প্রত্যেকটি দান, প্রতিজ্ঞা (নর) ও ভাল কাজের খবর রাখেন। তাঁর যেসব বান্দা তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে, স্বীয় সত্ত্বার্যের পুণ্যের প্রতি আশা রাখে, তার ওয়াদার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখে, তাদেরকে তিনি উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন। পক্ষান্তরে যারা তার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে, তার সাথে অন্যদেরও উপাসনা করবে তারা অত্যাচারী। কিয়ামতের দিন তাদেরকে বিভিন্ন প্রকারের কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে এবং সেই দিন এমন কেউ থাকবে না যে তাদেরকে ঐ শাস্তি হতে মুক্তি দিতে পারে বা কোন সাহায্য করতে পারে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘প্রকাশ্যভাবে দান করাও ভাল এবং গোপনে দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে দেয়াও উত্তম। কেননা, গোপন দানে রিয়াকারী বহু দূরে সরে থাকে। তবে যদি প্রকাশ্য দানের ব্যাপারে দাতার মহৎ কোন উদ্দেশ্য থাকে তবে সেটা অন্য কথা। যেমন তার উদ্দেশ্য এই যে, তার দেখাদেখি অন্যরাও দান করবে ইত্যাদি। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রকাশ্যদানকারী উচ্চ শব্দে কুরআন পাঠকের ন্যায় এবং গোপনে দানকারী ধীরে ধীরে কুরআন পাঠকের ন্যায়। কুরআন মাজীদের এই আয়াত দ্বারা গোপন দানের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত হচ্ছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সাত প্রকারের লোককে তার ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন, যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ। (২) সেই নব-যুবক যে তার যৌবন আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে। (৩) ঐ দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্যই পরস্পর ভালবাসা রেখেছে, ঐ জন্যেই তারা একত্রিত থাকে এবং ঐ জন্যেই পৃথক হয় (৪) ঐ ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদ হতে বের হওয়া থেকে নিয়ে পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত মসজিদের সাথে সংলগ্ন থাকে। (৫) ঐ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে, অতঃপর তার নয়নযুগল হতে অশ্রুধারা নেমে আসে (৬) ঐ ব্যক্তি যাকে একজন বংশ মর্যাদা ও সৌন্দর্যের অধিকারিণী নারী (নির্লজ্জতার কাজে) আহবান করে, তখন সে বলে নিশ্চয় আমি সারা জগতের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি ।(৭) ঐ ব্যক্তি যে এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানতে পারে না।' মুসনাদ-ইআহমাদে হাদীস রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন পৃথিবী দুলতে আরম্ভ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা পর্বত সৃষ্টি করে পৃথিবীর মধ্যে গেড়ে দেন। ফলে পৃথিবীর কম্পন থেমে যায়। আল্লাহ তাআলা পর্বতরাজিকে এত শক্ত করে সৃষ্টি করেছেন দেখে ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনার সষ্ট বস্তসমূহের মধ্যে পর্বত অপেক্ষা শক্ত আর কিছু আছে কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যা লৌহ রয়েছে, ওর চেয়ে শক্ত হচ্ছে অগ্নি ওর চেয়ে শক্ত পানি, ওর চেয়ে শক্ত বাতাস। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহ! বাতাস অপেক্ষা শক্ত অন্য কিছু আছে কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যা, সেই আদম সন্তান যে এমন গোপনে দান করে যে, তার দক্ষিণ হস্ত যা খরচ করে বাম হস্ত তা জানতে পারে না।' আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, উত্তম দান হচ্ছে ওটাই যা গোপনে কোন অভাবগ্রস্তকে দেয়া হয় এবং মালের স্বল্পতা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে খরচ করা হয়। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (ইবনে আবি হাতিম)। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, : এই আয়াতটি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এবং হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) তো তাঁর অর্ধেক মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর খিদমতে এনে হাজির করেন। আর হযরত আবু বকর (রাঃ) বাড়ীতে যা ছিল সবই এনে উপস্থিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘পরিবারবর্গের জন্যে কিছু রেখে এসেছো কি: হযরত উমার (রাঃ) উত্তর দেনঃ এতটিই ছেড়ে এসেছি।' হযরত আবু বকরের (রাঃ) এটা প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল না এবং গোপনে সবকিছু তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁকেও যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন তখন বাধ্য হয়ে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অঙ্গীকারই যথেষ্ট।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ “হে আবূ বকর (রাঃ)! যে কোন সকার্যের দিকে আমরা অগ্রসর হয়েছি, আপনাকে অগ্রেই দেখেছি।' এই আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ। দান ফরয হোক, নফল হোক, যাকাত হোক বা খয়রাত হোক, প্রকাশ্যে দান করার চেয়ে গোপনে দান করা উত্তম। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নফল দান গোপনে দেয়ার ফযীলত সত্তরগুণ; কিন্তু ফরয দান অর্থাৎ যাকাত প্রকাশ্যে দেয়ার ফযীলত পঞ্চাশগুণ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘দানের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের পাপ ও অন্যায় দূর করে দেবেন, বিশেষ করে যখন গোপনে দান করা হবে। এর বিনিময়ে তোমরা বহু সুফল প্রাপ্ত হবে। এর দ্বারা তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং পাপসমূহ মোচন হয়ে যাবে। ব্যুকাফেরু শব্দকে ঝুকাফের পড়া হয়েছে। এতে বাহ্যতঃ এটা শর্তের জওয়াবের স্থলে (আরবি) হবে, যা হচ্ছে (আরবি) শব্দটি। যেমন (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) শব্দটি হয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমাদের কোন পাপ ও পুণ্যের কাজ,দানশীলতা ও কার্পণ্য, গোপনীয় ও প্রকাশ্য, সৎ উদ্দেশ্য ও দুনিয়া অনুসন্ধান প্রভৃতি কিছুই আল্লাহ তা'আলার নিকট অজানা নেই। সুতরাং তিনি পূর্ণভাবে প্রতিদান প্রদান করবেন।

আল-বাকারা 2:272

২৭২-২৭৪ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমান সাহাবীগণ (রাঃ) তাঁদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে আদান-প্রদান করতে অপছন্দ করতেন। অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে লেন-দেন করার অনুমতি দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ ‘সাদকা শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে দেয়া হবে। যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ভিক্ষুক যে কোন মাযহাবের হোক না কেন তোমরা তাদেরকে সাদকা প্রদান কর (ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি (আরবি) (৬০:৮)এই আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যা কিছু খরচ করবে তা নিজেদের উপকারের জন্যই করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভাল কাজ করলো তা তার নিজের জন্যেই করলো।' এই ধরনের আরও বহু আয়াত রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ মুসলমানের প্রত্যেক খরচ আল্লাহ্র জন্যেই হয়ে থাকে, যদিও সে নিজেই খায় ও পান করে। হযরত আতা খোরাসানী (রঃ)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যখন তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করবে তখন দান গ্রহীতা যে কেউ হোক না কেন এবং যে কোন কাজই করুক না কেন তুমি তার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে।' এই ভাবার্থটিও খুব উত্তম। মোটকথা এই যে, সৎ উদ্দেশ্যে দানকারীর প্রতিদান যে আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে তা সাব্যস্ত হয়ে গেল। এখন সেই দান কোন সৎ লোকের হাতেই যাক বা কোন মন্দ লোকের হাতেই যাক-এতে কিছু যায় আসে না। সে তার সৎ উদ্দেশ্যের কারণে প্রতিদান পেয়েই যাবে। যদিও সে দেখে শুনে ও বিচার-বিবেচনা করে দান করে থাকে অতঃপর ভুল হয়ে যায় তবে তার দানের পুণ্য নষ্ট হবে না। এই জন্যে আয়াতের শেষে প্রতিদান প্রাপ্তির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এক ব্যক্তি ইচ্ছা করে, আজ আমি রাত্রে দান করবো। অতঃপর সে দান নিয়ে বের হয় এবং একটি ব্যভিচারিণী নারীর হাতে দিয়ে দেয়। সকালে 'জনগণের মধ্যে এই কথা নিয়ে সমালোচনা হতে থাকে যে, এক ব্যভিচারিণীকে সাদকা দেয়া হয়েছে। একথা শুনে লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে,আমার দান ব্যভিচারিণীর হাতে পড়েছে। আবার সে বলেঃ আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই সাদকা প্রদান করবো। অতঃপর সে এক ধনী ব্যক্তির হাতে রেখে দেয়। আবার সকালে জনগণ আলোচনা করতে থাকে যে, রাত্রে এক ধনী লোককে দান করা হয়েছে। সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমুদয় প্রশংসা যে, আমার দান একজন ধনী ব্যক্তির উপর পড়েছে। আবার সে বলে, “আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই দান। করবো। অতঃপর সে এক চোরের হাতে রেখে দেয়। সকালে পুনরায় জনগণের মধ্যে আলোচনা হতে থাকে যে, রাত্রে এক চোরকে সাদকা দেয়া হয়েছে। তখন সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে, আমার দান ব্যভিচারিণী, ধনী ও চোরের হাতে পড়েছে।' অতঃপর সে স্বপ্নে দেখে যে; একজন ফেরেশতা এসে বলছেনঃ তোমার দানগুলো আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়েছে। সম্ভবতঃ দুশ্চরিত্রা নারীটি তোমার দান পেয়ে ব্যভিচার থেকে বিরত থাকবে, হয়তো ধনী লোকটি এর দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং সেও দান করতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আর হতে পারে যে, মাল পেয়ে চোরটি চুরি করা ছেড়ে দেবে।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-সাদকা ঐ মুহাজিরদের প্রাপ্য যারা ইহলৌকিক সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বদেশ পরিত্যাগ করে, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর (সঃ) খিদমতে উপস্থিত হয়েছে। তাদের জীবন যাপনের এমন কোন উপায় নেই যা তাদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে এবং তারা সফরও করতে পারে না যে, চলে ফিরে নিজেদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতে পারে।'(আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীতে সফর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ যখন তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। আর এক জায়গায় রয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ “তারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে। তাদের অবস্থা যাদের জানা নেই তারা তাদের বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে এবং কথা-বার্তা শুনে তাঁদেরকে ধনী মনে করে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয়, যে বাড়ী বাড়ী ঘুরে বেড়ায়, কোথায়ও হয়তো একটি খেজুর পেয়ে গেল, কোথায়ও হয়তো দু'এক গ্রাস খাবার পেলো, আবার কোন জায়গায় হয়তো দু'একদিনের খাদ্য প্রাপ্ত হলো। বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যার নিকট ঐ পরিমাণ কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে এবং সে তার অবস্থাও এমন করেনি যার ফলে মানুষ তার অভাব অনুভব করে তার উপর কিছু অনুগ্রহ করছে। আবার ভিক্ষা করার অভ্যাসও তার নেই। কিন্তু যাদের অন্তদৃষ্টি রয়েছে তাদের কাছে এদের অবস্থা গোপন থাকে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তাদের (অভাবের) লক্ষণসমূহ তাদের মুখমণ্ডলের উপর রয়েছে।' (৪৮:২৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা অবশ্যই তাদেরকে তাদের কথার ভঙ্গিতে চিনে নেবে।' (৪৭:৩০) সুনানের একটি হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা মুমিনের বিচক্ষণতা হতে বেঁচে থাক, নিশ্চয় সে আল্লাহর ঐজ্জ্বল্যের দ্বারা দেখে থাকে। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ নিশ্চয় অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। (১৫:৭৫)। ‘তারা কাকুতি মিনতি করে কারও কাছে প্রার্থনা করে না' অর্থাৎ তারা যাঙ্ক্ষার দ্বারা মানুষকে ত্যক্ত-বিরক্ত করে না এবং তাদের কাছে সামান্য কিছু থাকা অবস্থায় তারা মানুষের কাছে হাত বাড়ায় না। প্রয়োজনের উপযোগী বস্তু বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষাবৃত্তি পরিত্যাগ করে না তাকেই পেশাগত ভিক্ষুক বলা হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যাকে দু'একটি খেজুর বা দু'এক গ্রাস আহার্য দেয়া হয়, বরং ভিক্ষুক ঐ ব্যক্তি যে অভাব থাকা সত্ত্বেও সংযমশীলতা রক্ষা করতঃ ভিক্ষা হতে দূরে থাকে। অতঃপর তিনি(আরবি) (২:২৭৩) উক্ত আয়াতের অংশটি পাঠ করেন। এই হাদীসটি বহু হাদীস গ্রন্থে বহু সনদে বর্ণিত আছে। মুযাইনা গোত্রের একটি লোককে তার মা বলেঃ ‘অন্যান্য লোক যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আনছে, তুমিও তার নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আন।' লোকটি বলেঃ আমি গিয়ে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি ভিক্ষা হতে বেঁচে থাকবে, আল্লাহ তাকে প্রকৃতপক্ষেই অমুখাপেক্ষী করবেন। যার কাছে পাঁচ আওকিয়া (এক আওকিয়া = চল্লিশ দিরহাম) মূল্যের জিনিস রয়েছে, অথচ সে ভিক্ষা করছে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক। আমি মনে মনে চিন্তা করি যে, আমার ইয়াকুতা নামী উষ্ট্ৰীটির মূল্য পাঁচ আওকিয়া অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং আমি কিছু না চেয়েই ফিরে আসি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা ছিল হযরত আবূ সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ঘটনা। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এও বলেনঃ “যে ব্যক্তি মানুষের প্রত্যাশা করে না আল্লাহই তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং এক আওকিয়া থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষা করে সে ভিক্ষার সঙ্গে জড়িত ভিক্ষুক।' চল্লিশ দিরহামে এক আওকিয়া হয় এবং চল্লিশ দিরহামে প্রায় দশ টাকা হয়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট এই পরিমাণ জিনিস রয়েছে যে, সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, তথাপি সে ভিক্ষা করে, কিয়ামতের দিন এই ভিক্ষা তার মুখে নাচতে থাকবে বা তার মুখ আহত করতে থাকবে জনগণ জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি পরিমাণ মাল থাকলে এই অবস্থা হবে: তিনি বলেনঃ পঞ্চাশটি দিরহাম বা তার সমমূল্যের সোনা। এই হাদীসটি দুর্বল। হারিস নামক একজন কুরাইশ সিরিয়ায় বাস করতেন। তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আবূ যার (রাঃ) অভাবগ্রস্ত রয়েছেন। সুতরাং তিনি তাঁর নিকট তিনশোটি স্বর্ন মুদ্রা পাঠিয়ে দেন। তখন তিনি দুঃখিত হয়ে বলেনঃ ঐ ব্যক্তি আমার চেয়ে বেশী অভাগ্ৰস্ত আর কাউকে পেলেন না: আমি তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তির কাছে চল্লিশটি দিরহাম থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষে করে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক।' আর আবু যারের পরিবারের কাছে তো চল্লিশটি দিরহাম, চল্লিশটি ছাগল এবং দু'টি ক্রীতদাসও রয়েছে। একটি বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলো। নিম্নরূপও রয়েছেঃ চল্লিশ দিরহাম রেখে ভিক্ষেকারী হচ্ছে ব্যাকুলভাবে প্রার্থনাকারী এবং সে হচ্ছে বালুকার ন্যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের সমস্ত দান সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা সম্যক অবগত রয়েছেন। যখন তোমরা সম্পূর্ণরূপে মুখাপেক্ষী হয়ে যাবে তখন তিনি তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নেই। এরপর আল্লাহ পাক ঐ সব লোকের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার পথে খরচ করে থাকে। তাদেরকেও প্রতিদান দেয়া হবে এবং তারা যে কোন ভয় ও চিন্তা হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। পরিবারের খরচ বহন করার কারণেও তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, মক্কা বিজয়ের বছর এবং অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে,বিদায় হজ্বের বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে (রাঃ) তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দেখতে গিয়ে বলেনঃ তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যা খরচ করবে তিনি এর বিনিময়ে তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন, এমনকি তুমি স্বয়ং তোমার স্ত্রীকে যা খাওয়াবে তারও প্রতিদান তোমাকে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, মুসলমান পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে নিজের ছেলে-মেয়ের জন্যে যা খরচ করে থাকে সেটাও সাদকা। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের শান-ই-নুযুল হচ্ছে মুসলমান মুজাহিদগণের ঐ খরচ যা তারা তাদের পরিবারের জন্য করে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুবাইর (রাঃ) বলেন যে,হযরত আলীর (রাঃ) নিকট চারটি দিরহাম ছিল। ওর মধ্য হতে তিনি একটি রাত্রে ও একটি দিনে আল্লাহর পথে দান করেন। অর্থাৎ একটি প্রকাশ্যে ও একটি গোপনে দান করেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু বর্ণনাটি দুর্বল। অন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য লাভ করার উদ্দেশ্যে যারা রাত্রে ওদিবসে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করে থাকে, তাদের প্রভুর নিকট তাদের পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না।

আল-বাকারা 2:273

২৭২-২৭৪ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমান সাহাবীগণ (রাঃ) তাঁদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে আদান-প্রদান করতে অপছন্দ করতেন। অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে লেন-দেন করার অনুমতি দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ ‘সাদকা শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে দেয়া হবে। যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ভিক্ষুক যে কোন মাযহাবের হোক না কেন তোমরা তাদেরকে সাদকা প্রদান কর (ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি (আরবি) (৬০:৮)এই আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যা কিছু খরচ করবে তা নিজেদের উপকারের জন্যই করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভাল কাজ করলো তা তার নিজের জন্যেই করলো।' এই ধরনের আরও বহু আয়াত রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ মুসলমানের প্রত্যেক খরচ আল্লাহ্র জন্যেই হয়ে থাকে, যদিও সে নিজেই খায় ও পান করে। হযরত আতা খোরাসানী (রঃ)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যখন তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করবে তখন দান গ্রহীতা যে কেউ হোক না কেন এবং যে কোন কাজই করুক না কেন তুমি তার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে।' এই ভাবার্থটিও খুব উত্তম। মোটকথা এই যে, সৎ উদ্দেশ্যে দানকারীর প্রতিদান যে আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে তা সাব্যস্ত হয়ে গেল। এখন সেই দান কোন সৎ লোকের হাতেই যাক বা কোন মন্দ লোকের হাতেই যাক-এতে কিছু যায় আসে না। সে তার সৎ উদ্দেশ্যের কারণে প্রতিদান পেয়েই যাবে। যদিও সে দেখে শুনে ও বিচার-বিবেচনা করে দান করে থাকে অতঃপর ভুল হয়ে যায় তবে তার দানের পুণ্য নষ্ট হবে না। এই জন্যে আয়াতের শেষে প্রতিদান প্রাপ্তির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এক ব্যক্তি ইচ্ছা করে, আজ আমি রাত্রে দান করবো। অতঃপর সে দান নিয়ে বের হয় এবং একটি ব্যভিচারিণী নারীর হাতে দিয়ে দেয়। সকালে 'জনগণের মধ্যে এই কথা নিয়ে সমালোচনা হতে থাকে যে, এক ব্যভিচারিণীকে সাদকা দেয়া হয়েছে। একথা শুনে লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে,আমার দান ব্যভিচারিণীর হাতে পড়েছে। আবার সে বলেঃ আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই সাদকা প্রদান করবো। অতঃপর সে এক ধনী ব্যক্তির হাতে রেখে দেয়। আবার সকালে জনগণ আলোচনা করতে থাকে যে, রাত্রে এক ধনী লোককে দান করা হয়েছে। সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমুদয় প্রশংসা যে, আমার দান একজন ধনী ব্যক্তির উপর পড়েছে। আবার সে বলে, “আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই দান। করবো। অতঃপর সে এক চোরের হাতে রেখে দেয়। সকালে পুনরায় জনগণের মধ্যে আলোচনা হতে থাকে যে, রাত্রে এক চোরকে সাদকা দেয়া হয়েছে। তখন সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে, আমার দান ব্যভিচারিণী, ধনী ও চোরের হাতে পড়েছে।' অতঃপর সে স্বপ্নে দেখে যে; একজন ফেরেশতা এসে বলছেনঃ তোমার দানগুলো আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়েছে। সম্ভবতঃ দুশ্চরিত্রা নারীটি তোমার দান পেয়ে ব্যভিচার থেকে বিরত থাকবে, হয়তো ধনী লোকটি এর দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং সেও দান করতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আর হতে পারে যে, মাল পেয়ে চোরটি চুরি করা ছেড়ে দেবে।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-সাদকা ঐ মুহাজিরদের প্রাপ্য যারা ইহলৌকিক সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বদেশ পরিত্যাগ করে, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর (সঃ) খিদমতে উপস্থিত হয়েছে। তাদের জীবন যাপনের এমন কোন উপায় নেই যা তাদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে এবং তারা সফরও করতে পারে না যে, চলে ফিরে নিজেদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতে পারে।'(আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীতে সফর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ যখন তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। আর এক জায়গায় রয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ “তারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে। তাদের অবস্থা যাদের জানা নেই তারা তাদের বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে এবং কথা-বার্তা শুনে তাঁদেরকে ধনী মনে করে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয়, যে বাড়ী বাড়ী ঘুরে বেড়ায়, কোথায়ও হয়তো একটি খেজুর পেয়ে গেল, কোথায়ও হয়তো দু'এক গ্রাস খাবার পেলো, আবার কোন জায়গায় হয়তো দু'একদিনের খাদ্য প্রাপ্ত হলো। বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যার নিকট ঐ পরিমাণ কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে এবং সে তার অবস্থাও এমন করেনি যার ফলে মানুষ তার অভাব অনুভব করে তার উপর কিছু অনুগ্রহ করছে। আবার ভিক্ষা করার অভ্যাসও তার নেই। কিন্তু যাদের অন্তদৃষ্টি রয়েছে তাদের কাছে এদের অবস্থা গোপন থাকে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তাদের (অভাবের) লক্ষণসমূহ তাদের মুখমণ্ডলের উপর রয়েছে।' (৪৮:২৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা অবশ্যই তাদেরকে তাদের কথার ভঙ্গিতে চিনে নেবে।' (৪৭:৩০) সুনানের একটি হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা মুমিনের বিচক্ষণতা হতে বেঁচে থাক, নিশ্চয় সে আল্লাহর ঐজ্জ্বল্যের দ্বারা দেখে থাকে। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ নিশ্চয় অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। (১৫:৭৫)। ‘তারা কাকুতি মিনতি করে কারও কাছে প্রার্থনা করে না' অর্থাৎ তারা যাঙ্ক্ষার দ্বারা মানুষকে ত্যক্ত-বিরক্ত করে না এবং তাদের কাছে সামান্য কিছু থাকা অবস্থায় তারা মানুষের কাছে হাত বাড়ায় না। প্রয়োজনের উপযোগী বস্তু বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষাবৃত্তি পরিত্যাগ করে না তাকেই পেশাগত ভিক্ষুক বলা হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যাকে দু'একটি খেজুর বা দু'এক গ্রাস আহার্য দেয়া হয়, বরং ভিক্ষুক ঐ ব্যক্তি যে অভাব থাকা সত্ত্বেও সংযমশীলতা রক্ষা করতঃ ভিক্ষা হতে দূরে থাকে। অতঃপর তিনি(আরবি) (২:২৭৩) উক্ত আয়াতের অংশটি পাঠ করেন। এই হাদীসটি বহু হাদীস গ্রন্থে বহু সনদে বর্ণিত আছে। মুযাইনা গোত্রের একটি লোককে তার মা বলেঃ ‘অন্যান্য লোক যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আনছে, তুমিও তার নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আন।' লোকটি বলেঃ আমি গিয়ে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি ভিক্ষা হতে বেঁচে থাকবে, আল্লাহ তাকে প্রকৃতপক্ষেই অমুখাপেক্ষী করবেন। যার কাছে পাঁচ আওকিয়া (এক আওকিয়া = চল্লিশ দিরহাম) মূল্যের জিনিস রয়েছে, অথচ সে ভিক্ষা করছে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক। আমি মনে মনে চিন্তা করি যে, আমার ইয়াকুতা নামী উষ্ট্ৰীটির মূল্য পাঁচ আওকিয়া অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং আমি কিছু না চেয়েই ফিরে আসি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা ছিল হযরত আবূ সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ঘটনা। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এও বলেনঃ “যে ব্যক্তি মানুষের প্রত্যাশা করে না আল্লাহই তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং এক আওকিয়া থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষা করে সে ভিক্ষার সঙ্গে জড়িত ভিক্ষুক।' চল্লিশ দিরহামে এক আওকিয়া হয় এবং চল্লিশ দিরহামে প্রায় দশ টাকা হয়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট এই পরিমাণ জিনিস রয়েছে যে, সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, তথাপি সে ভিক্ষা করে, কিয়ামতের দিন এই ভিক্ষা তার মুখে নাচতে থাকবে বা তার মুখ আহত করতে থাকবে জনগণ জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি পরিমাণ মাল থাকলে এই অবস্থা হবে: তিনি বলেনঃ পঞ্চাশটি দিরহাম বা তার সমমূল্যের সোনা। এই হাদীসটি দুর্বল। হারিস নামক একজন কুরাইশ সিরিয়ায় বাস করতেন। তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আবূ যার (রাঃ) অভাবগ্রস্ত রয়েছেন। সুতরাং তিনি তাঁর নিকট তিনশোটি স্বর্ন মুদ্রা পাঠিয়ে দেন। তখন তিনি দুঃখিত হয়ে বলেনঃ ঐ ব্যক্তি আমার চেয়ে বেশী অভাগ্ৰস্ত আর কাউকে পেলেন না: আমি তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তির কাছে চল্লিশটি দিরহাম থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষে করে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক।' আর আবু যারের পরিবারের কাছে তো চল্লিশটি দিরহাম, চল্লিশটি ছাগল এবং দু'টি ক্রীতদাসও রয়েছে। একটি বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলো। নিম্নরূপও রয়েছেঃ চল্লিশ দিরহাম রেখে ভিক্ষেকারী হচ্ছে ব্যাকুলভাবে প্রার্থনাকারী এবং সে হচ্ছে বালুকার ন্যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের সমস্ত দান সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা সম্যক অবগত রয়েছেন। যখন তোমরা সম্পূর্ণরূপে মুখাপেক্ষী হয়ে যাবে তখন তিনি তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নেই। এরপর আল্লাহ পাক ঐ সব লোকের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার পথে খরচ করে থাকে। তাদেরকেও প্রতিদান দেয়া হবে এবং তারা যে কোন ভয় ও চিন্তা হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। পরিবারের খরচ বহন করার কারণেও তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, মক্কা বিজয়ের বছর এবং অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে,বিদায় হজ্বের বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে (রাঃ) তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দেখতে গিয়ে বলেনঃ তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যা খরচ করবে তিনি এর বিনিময়ে তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন, এমনকি তুমি স্বয়ং তোমার স্ত্রীকে যা খাওয়াবে তারও প্রতিদান তোমাকে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, মুসলমান পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে নিজের ছেলে-মেয়ের জন্যে যা খরচ করে থাকে সেটাও সাদকা। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের শান-ই-নুযুল হচ্ছে মুসলমান মুজাহিদগণের ঐ খরচ যা তারা তাদের পরিবারের জন্য করে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুবাইর (রাঃ) বলেন যে,হযরত আলীর (রাঃ) নিকট চারটি দিরহাম ছিল। ওর মধ্য হতে তিনি একটি রাত্রে ও একটি দিনে আল্লাহর পথে দান করেন। অর্থাৎ একটি প্রকাশ্যে ও একটি গোপনে দান করেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু বর্ণনাটি দুর্বল। অন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য লাভ করার উদ্দেশ্যে যারা রাত্রে ওদিবসে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করে থাকে, তাদের প্রভুর নিকট তাদের পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না।

আল-বাকারা 2:274

২৭২-২৭৪ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমান সাহাবীগণ (রাঃ) তাঁদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে আদান-প্রদান করতে অপছন্দ করতেন। অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের সাথে লেন-দেন করার অনুমতি দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ ‘সাদকা শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে দেয়া হবে। যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ভিক্ষুক যে কোন মাযহাবের হোক না কেন তোমরা তাদেরকে সাদকা প্রদান কর (ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি (আরবি) (৬০:৮)এই আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যা কিছু খরচ করবে তা নিজেদের উপকারের জন্যই করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভাল কাজ করলো তা তার নিজের জন্যেই করলো।' এই ধরনের আরও বহু আয়াত রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ মুসলমানের প্রত্যেক খরচ আল্লাহ্র জন্যেই হয়ে থাকে, যদিও সে নিজেই খায় ও পান করে। হযরত আতা খোরাসানী (রঃ)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যখন তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করবে তখন দান গ্রহীতা যে কেউ হোক না কেন এবং যে কোন কাজই করুক না কেন তুমি তার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে।' এই ভাবার্থটিও খুব উত্তম। মোটকথা এই যে, সৎ উদ্দেশ্যে দানকারীর প্রতিদান যে আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে তা সাব্যস্ত হয়ে গেল। এখন সেই দান কোন সৎ লোকের হাতেই যাক বা কোন মন্দ লোকের হাতেই যাক-এতে কিছু যায় আসে না। সে তার সৎ উদ্দেশ্যের কারণে প্রতিদান পেয়েই যাবে। যদিও সে দেখে শুনে ও বিচার-বিবেচনা করে দান করে থাকে অতঃপর ভুল হয়ে যায় তবে তার দানের পুণ্য নষ্ট হবে না। এই জন্যে আয়াতের শেষে প্রতিদান প্রাপ্তির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এক ব্যক্তি ইচ্ছা করে, আজ আমি রাত্রে দান করবো। অতঃপর সে দান নিয়ে বের হয় এবং একটি ব্যভিচারিণী নারীর হাতে দিয়ে দেয়। সকালে 'জনগণের মধ্যে এই কথা নিয়ে সমালোচনা হতে থাকে যে, এক ব্যভিচারিণীকে সাদকা দেয়া হয়েছে। একথা শুনে লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে,আমার দান ব্যভিচারিণীর হাতে পড়েছে। আবার সে বলেঃ আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই সাদকা প্রদান করবো। অতঃপর সে এক ধনী ব্যক্তির হাতে রেখে দেয়। আবার সকালে জনগণ আলোচনা করতে থাকে যে, রাত্রে এক ধনী লোককে দান করা হয়েছে। সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমুদয় প্রশংসা যে, আমার দান একজন ধনী ব্যক্তির উপর পড়েছে। আবার সে বলে, “আজ রাত্রেও আমি অবশ্যই দান। করবো। অতঃপর সে এক চোরের হাতে রেখে দেয়। সকালে পুনরায় জনগণের মধ্যে আলোচনা হতে থাকে যে, রাত্রে এক চোরকে সাদকা দেয়া হয়েছে। তখন সে বলেঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে, আমার দান ব্যভিচারিণী, ধনী ও চোরের হাতে পড়েছে।' অতঃপর সে স্বপ্নে দেখে যে; একজন ফেরেশতা এসে বলছেনঃ তোমার দানগুলো আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়েছে। সম্ভবতঃ দুশ্চরিত্রা নারীটি তোমার দান পেয়ে ব্যভিচার থেকে বিরত থাকবে, হয়তো ধনী লোকটি এর দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং সেও দান করতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আর হতে পারে যে, মাল পেয়ে চোরটি চুরি করা ছেড়ে দেবে।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-সাদকা ঐ মুহাজিরদের প্রাপ্য যারা ইহলৌকিক সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বদেশ পরিত্যাগ করে, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর (সঃ) খিদমতে উপস্থিত হয়েছে। তাদের জীবন যাপনের এমন কোন উপায় নেই যা তাদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে এবং তারা সফরও করতে পারে না যে, চলে ফিরে নিজেদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতে পারে।'(আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীতে সফর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ যখন তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। আর এক জায়গায় রয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ “তারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে। তাদের অবস্থা যাদের জানা নেই তারা তাদের বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে এবং কথা-বার্তা শুনে তাঁদেরকে ধনী মনে করে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয়, যে বাড়ী বাড়ী ঘুরে বেড়ায়, কোথায়ও হয়তো একটি খেজুর পেয়ে গেল, কোথায়ও হয়তো দু'এক গ্রাস খাবার পেলো, আবার কোন জায়গায় হয়তো দু'একদিনের খাদ্য প্রাপ্ত হলো। বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যার নিকট ঐ পরিমাণ কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে এবং সে তার অবস্থাও এমন করেনি যার ফলে মানুষ তার অভাব অনুভব করে তার উপর কিছু অনুগ্রহ করছে। আবার ভিক্ষা করার অভ্যাসও তার নেই। কিন্তু যাদের অন্তদৃষ্টি রয়েছে তাদের কাছে এদের অবস্থা গোপন থাকে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তাদের (অভাবের) লক্ষণসমূহ তাদের মুখমণ্ডলের উপর রয়েছে।' (৪৮:২৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা অবশ্যই তাদেরকে তাদের কথার ভঙ্গিতে চিনে নেবে।' (৪৭:৩০) সুনানের একটি হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা মুমিনের বিচক্ষণতা হতে বেঁচে থাক, নিশ্চয় সে আল্লাহর ঐজ্জ্বল্যের দ্বারা দেখে থাকে। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ নিশ্চয় অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। (১৫:৭৫)। ‘তারা কাকুতি মিনতি করে কারও কাছে প্রার্থনা করে না' অর্থাৎ তারা যাঙ্ক্ষার দ্বারা মানুষকে ত্যক্ত-বিরক্ত করে না এবং তাদের কাছে সামান্য কিছু থাকা অবস্থায় তারা মানুষের কাছে হাত বাড়ায় না। প্রয়োজনের উপযোগী বস্তু বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষাবৃত্তি পরিত্যাগ করে না তাকেই পেশাগত ভিক্ষুক বলা হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যাকে দু'একটি খেজুর বা দু'এক গ্রাস আহার্য দেয়া হয়, বরং ভিক্ষুক ঐ ব্যক্তি যে অভাব থাকা সত্ত্বেও সংযমশীলতা রক্ষা করতঃ ভিক্ষা হতে দূরে থাকে। অতঃপর তিনি(আরবি) (২:২৭৩) উক্ত আয়াতের অংশটি পাঠ করেন। এই হাদীসটি বহু হাদীস গ্রন্থে বহু সনদে বর্ণিত আছে। মুযাইনা গোত্রের একটি লোককে তার মা বলেঃ ‘অন্যান্য লোক যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আনছে, তুমিও তার নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আন।' লোকটি বলেঃ আমি গিয়ে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি ভিক্ষা হতে বেঁচে থাকবে, আল্লাহ তাকে প্রকৃতপক্ষেই অমুখাপেক্ষী করবেন। যার কাছে পাঁচ আওকিয়া (এক আওকিয়া = চল্লিশ দিরহাম) মূল্যের জিনিস রয়েছে, অথচ সে ভিক্ষা করছে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক। আমি মনে মনে চিন্তা করি যে, আমার ইয়াকুতা নামী উষ্ট্ৰীটির মূল্য পাঁচ আওকিয়া অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং আমি কিছু না চেয়েই ফিরে আসি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা ছিল হযরত আবূ সাঈদ খুদরীর (রাঃ) ঘটনা। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এও বলেনঃ “যে ব্যক্তি মানুষের প্রত্যাশা করে না আল্লাহই তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং এক আওকিয়া থাকা সত্ত্বেও যে ভিক্ষা করে সে ভিক্ষার সঙ্গে জড়িত ভিক্ষুক।' চল্লিশ দিরহামে এক আওকিয়া হয় এবং চল্লিশ দিরহামে প্রায় দশ টাকা হয়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তির নিকট এই পরিমাণ জিনিস রয়েছে যে, সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, তথাপি সে ভিক্ষা করে, কিয়ামতের দিন এই ভিক্ষা তার মুখে নাচতে থাকবে বা তার মুখ আহত করতে থাকবে জনগণ জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কি পরিমাণ মাল থাকলে এই অবস্থা হবে: তিনি বলেনঃ পঞ্চাশটি দিরহাম বা তার সমমূল্যের সোনা। এই হাদীসটি দুর্বল। হারিস নামক একজন কুরাইশ সিরিয়ায় বাস করতেন। তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আবূ যার (রাঃ) অভাবগ্রস্ত রয়েছেন। সুতরাং তিনি তাঁর নিকট তিনশোটি স্বর্ন মুদ্রা পাঠিয়ে দেন। তখন তিনি দুঃখিত হয়ে বলেনঃ ঐ ব্যক্তি আমার চেয়ে বেশী অভাগ্ৰস্ত আর কাউকে পেলেন না: আমি তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তির কাছে চল্লিশটি দিরহাম থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষে করে সে হচ্ছে ভিক্ষাকার্যে জড়িত ভিক্ষুক।' আর আবু যারের পরিবারের কাছে তো চল্লিশটি দিরহাম, চল্লিশটি ছাগল এবং দু'টি ক্রীতদাসও রয়েছে। একটি বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলো। নিম্নরূপও রয়েছেঃ চল্লিশ দিরহাম রেখে ভিক্ষেকারী হচ্ছে ব্যাকুলভাবে প্রার্থনাকারী এবং সে হচ্ছে বালুকার ন্যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের সমস্ত দান সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা সম্যক অবগত রয়েছেন। যখন তোমরা সম্পূর্ণরূপে মুখাপেক্ষী হয়ে যাবে তখন তিনি তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নেই। এরপর আল্লাহ পাক ঐ সব লোকের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার পথে খরচ করে থাকে। তাদেরকেও প্রতিদান দেয়া হবে এবং তারা যে কোন ভয় ও চিন্তা হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। পরিবারের খরচ বহন করার কারণেও তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে, মক্কা বিজয়ের বছর এবং অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে,বিদায় হজ্বের বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে (রাঃ) তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দেখতে গিয়ে বলেনঃ তুমি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যা খরচ করবে তিনি এর বিনিময়ে তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন, এমনকি তুমি স্বয়ং তোমার স্ত্রীকে যা খাওয়াবে তারও প্রতিদান তোমাকে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, মুসলমান পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে নিজের ছেলে-মেয়ের জন্যে যা খরচ করে থাকে সেটাও সাদকা। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের শান-ই-নুযুল হচ্ছে মুসলমান মুজাহিদগণের ঐ খরচ যা তারা তাদের পরিবারের জন্য করে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুবাইর (রাঃ) বলেন যে,হযরত আলীর (রাঃ) নিকট চারটি দিরহাম ছিল। ওর মধ্য হতে তিনি একটি রাত্রে ও একটি দিনে আল্লাহর পথে দান করেন। অর্থাৎ একটি প্রকাশ্যে ও একটি গোপনে দান করেন। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু বর্ণনাটি দুর্বল। অন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য লাভ করার উদ্দেশ্যে যারা রাত্রে ওদিবসে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করে থাকে, তাদের প্রভুর নিকট তাদের পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না।

আল-বাকারা 2:275

এর পূর্বে ঐ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা সৎ, দাতা, যাকাত প্রদানকারী, অভাবগ্রস্ত ও আত্মীয়-স্বজনের দেখা শুনাকারী এবং সদা-সর্বদা তাদের উপকার সাধনকারী। এখানে ঐসব লোকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা দুনিয়া লোভী, অত্যাচারী এবং অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী। বলা হচ্ছে যে, এই সুদখোর লোকেরা তাদের কবর হতে পাগল ও অজ্ঞান লোকের মত হয়ে উঠবে। তারা দাঁড়াতেও পারবে না। (আরবি) শব্দের পরে একটি পঠনে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। তাদেরকে বলা হবে-তোমরা অস্ত্র ধারণ কর এবং তোমাদের প্রভুর সাথে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতকগুলো লোককে দেখেন যে, তাদের পেট বড় বড় ঘরের মত। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ এই লোকগুলো কে:' বলা হয়ঃ এরা সুদখোর।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তাদের পেট সর্পে পরিপূর্ণ ছিল যা বাহির হতে দেখা যাচ্ছিল। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে সুদীর্ঘ দ্রিার হাদীসে হযরত সুমরা বিন জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন আমি লাল রং বিশিষ্ট একটি নদীতে পৌঁছি যার পানি রক্তের মত লাল ছিল, তখন আমি দেখি যে, কয়েকটি লোক অতি কষ্টে নদীর তীরে আসছে। কিন্তু তীরে একজন ফেরেশতা বহু পাথর জমা করে বসে আছেন এবং তাদের মুখ ফেড়ে এক একটি পাথর ভরে দিচ্ছেন। তারপর সে পলায়ন করছে। অতঃপর পুনরায় এই রূপই হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে, তারা সুদখোরের দল। তাদের এই শাস্তির কারণ এই যে, তারা বলতো সুদ ব্যবসায়ের মতই। তাদের এই প্রতিবাদ ছিল শরীয়তের উপর এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশের উপর। তারা সুদকে ক্রয় বিক্রয়ের মত হালাল মনে করতো। এটা মনে রাখার বিষয় যে, তারা যে সুদকে ক্রয়-বিক্রয়ের উপর অনুমান করতো তা নয়। কেননা মুশরিকরা পূর্ব হতেই ক্রয়-বিক্রয়কেও শরীয়ত সম্মত বলতো না। এবং এই কারণেও যে, যদি তারা সুদকে ক্রয়-বিক্রয়ের উপর অনুমান করে একথা বলে থাকতো তবে সুদ বেচা-কেনার মত এই কথা বলতো। তাদের কথার ভাবার্থ ছিল-এ দু'টো জিনিস একই রকম। সুতরাং একটিকে হালাল বলা এবং অন্যটিকে হারাম বলার কারণ কি: তাদেরকে উত্তর দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ঐ বৈধতা ও অবৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে। এও সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটা কাফিরদেরই উক্তি। তাহলে সূক্ষ্মতার সাথে একটি উত্তরও হয়ে যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা একটিকে হারাম করেছেন এবং অপরটিকে হালাল করেছেন এই জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও প্রতিবাদ কিসের: ‘সর্বজ্ঞাতা ও মহাবিজ্ঞানময় আল্লাহর নির্দেশের উপর প্রতিবাদ উত্তাপন করার তোমরা কে: তাঁর কার্যের বিচার বিশ্লেষণ করার কার অধিকার রয়েছে: সমস্ত কার্যের মূল তত্ত্ব তাঁরই জানা রয়েছে। তাঁর বান্দাদের জন্যে প্রকৃত উপকার কোন্ জিনিসে রয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতি কোন বস্তুতে রয়েছে সেটাতো তিনিই ভাল জানেন। তিনি উপকারী বস্তু হালাল করে থাকেন এবং ক্ষতিকর বস্তু হারাম করে থাকেন। মা তার দুগ্ধপায়ী শিশুর উপর ততো করুণাময়ী হতে পারে না যতটা করুণাময় আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের উপর। তিনি যা হতে নিষেধ করেন তার মধ্যে মঙ্গল নিহিত রয়েছে এবং যা করতে আদেশ করেন তার মধ্যেও মঙ্গল রয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার উপদেশ শ্রবণের পর যে ব্যক্তি সুদ গ্রহণ হতে বিরত থাকে তার পূর্বের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দেয়া হবে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ সে পূর্বে যা করেছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন।' (৫:৯৫) রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেমন মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেনঃ ‘অজ্ঞতাপূর্ণ যুগের সমস্ত সূদ আমার পদদ্বয়ের নীচে ধ্বংস হয়ে গেল। সর্বপ্রথম সুদ যা আমি মিটিয়ে দিচ্ছি তা হচ্ছে হযরত আব্বাসের (রাঃ) সুদ। সুতরাং অন্ধকার যুগে যেসব সুদ গ্রহণ করা হয়েছিল সেগুলো ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) উম্মে ওয়ালাদ (ক্রীতদাসীর সাথে মনিবের সহবাসের ফলে সন্তান জন্ম লাভ করলে তাকে উম্মে ওয়ালাদ’ বলা হয়) হযরত উম্মে বাহনা’ (রাঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে উম্মুল মু'মেনীন! আপনি কি যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ)-কে চিনেন:' তিনি বলেনঃ হাঁ। তখন হযরত উম্মে বাহনা' (রাঃ) বলেনঃ ঐ যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) নিকট আমি আট শো’তে একটি গোলাম বিক্রি করি এই শর্তে যে, আতা’ আসলে সে টাকা পরিশোধ করবে। এরপর তার নগদ টাকার প্রয়োজন হয় এবং নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সে ঐ গোলামটি বিক্রি করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আমি ছোতে ক্রয় করে নেই।' হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ তুমি এবং সে উভয়েই খারাপ করেছে। এটা সম্পূর্ণ রূপে শরীয়ত বিরোধী কাজ। যাও যায়েদ বিন আরকামকে (রাঃ) বল যে, যদি সে তাওবা না করে তবে তার জিহাদের পুণ্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যাবে, যে জিহাদ সে নবী (সঃ)-এর সাথে করেছে।'আমি বলি যে দু'শো আমি তার কাছে পাবো তা যদি ছেড়ে দেই এবং ছ'শো আদায় করে নেই তা হলে আমি আটশোই পেয়ে যাবো। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এতে কোন দোষ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২৭৫) এই আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) এটা একটি প্রসিদ্ধ হাদীস এবং এইটি ঐ লোকেদের দলীল যারা ‘আয়নার মাসআলাকে হারাম বলে থাকেন। এই সম্বন্ধে আরও হাদীস রয়েছে। সেগুলোর স্থান হচ্ছে “কিতাবুল আহকাম।' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-'সুদের নিষিদ্ধতা তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করার পরেও যদি সে সুদ গ্রহণ পরিত্যাগ না করে তবে সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। চিরকাল সে নরকে অবস্থান করবে। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি এখন সুদ পরিত্যাগ করলো না, সে যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সাথে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায় ।( সুনান -ই-আবি দাউদ)' (আরবি) শব্দের অর্থ এই যে, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির ভূমিতে শস্যের বীজ বপন করলো এবং চুক্তি করলো ভূমির এই অংশে যা উৎপন্ন হবে, তা আমার এবং অবশিষ্ট তোমার।'(আরবি) শব্দের অর্থ এই যে, একটি লোক অপর একটি লোককে বলেঃ “তোমার এই গাছে যা খেজুর রয়েছে তা আমার এবং এর বিনিময়ে আমি তোমাকে এই পরিমাণ খেজুর প্রদান করবো।” (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে বলেঃ তোমার শস্য ক্ষেত্রে যে শস্য রয়েছে তা আমি ক্রয় করছি এবং ওর বিনিময়ে আমার নিকট হতে কিছু শস্য তোমাকে প্রদান করছি।' ক্রয়-বিক্রয়ের এই পদ্ধতিগুলোকে শরীয়তে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে যেন সুদের মূল কর্তিত হয়। এগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ বর্ণনায় আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কেউ বলেছেন এক রকম এবং কেউ বলেছেন অন্য রকম। বাস্তব কথা এই যে, এটা একটা জটিল বিষয়। এমন কি হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, তিনটি জিজ্ঞাস্য বিষয় পূর্ণভাবে আমার বোধগম্য হয়নি। বিষয় তিনটি হচ্ছেঃ দাদার উত্তরাধিকার, পিতা-পুত্রহীনের উত্তরাধিকার এবং সুদের অবস্থাগুলো। অর্থাৎ সুদের কতকগুলো অবস্থা যেগুলোর মধ্যে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। অতঃপর যে কারণগুলো ঐ পর্যন্ত নিয়ে যায়। তাহলে এগুলো যখন হারাম তখন ঐগুলোও হারাম হবে। যেমন ঐ জিনিসও ওয়াজিব হয়ে যায় যা ছাড়া অন্য ওয়াজিব পূর্ণ হয় না। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হালালও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। কিন্তু এর মধ্যে কতকগুলো জিনিস সন্দেহযুক্ত রয়েছে। এগুলো হতে দূরে অবস্থানকারীগণ নিজেদের ধর্ম ও সম্মান বাঁচিয়ে নিলো। ঐ সন্দেহযুক্ত জিনিসগুলোর মধ্যে পতিত ব্যক্তিরাই হচ্ছে হারামের মধ্যে পতিত ব্যক্তি। যেমন কোন রাখাল কোন এক ব্যক্তির রক্ষিত চারণ ভূমির আশে পাশে তার পশুপাল চরিয়ে থাকে। সেখানে এই সম্ভাবনাও রয়েছে যে, ঐ পশুপাল ঐ ব্যক্তির চারণ ভূমিতে ঢুকে পড়বে।' সুনানের মধ্যে হাদীস রয়েছে; রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে জিনিস তোমাকে সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করে তা ছেড়ে দাও এবং যা পবিত্র তা গ্রহণ কর। অন্য হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘পাপ ওটাই যা অন্তরে খটকা দেয়, মনে সন্দেহের উদ্রেক করে এবং যা জনগণের মধ্যে জানাজানি হওয়াটা তুমি পছন্দ কর না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “তোমার মনকে ফতওয়া জিজ্ঞেস কর, যদিও মানুষ অন্য ফতওয়া প্রদান করে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুদের নিষিদ্ধতা সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী) হযরত উমার (রাঃ) বলতেনঃ বড়ই আফসোস যে, আমি সুদের তাফসীর পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারিনি এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করলেন। হে জনমণ্ডলী! তোমরা সুদ গ্রহণ পরিত্যাগ কর এবং প্রত্যেকে ঐ জিনিস পরিত্যাগ কর যার মধ্যে সামান্যতম সন্দেহ রয়েছে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) হযরত উমার (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেনঃ ‘সম্ভবতঃ আমি তোমাদেরকে এমন কতকগুলো জিনিস হতে বিরত রাখবো যা তোমাদের জন্য উপকারী এবং এমন কতকগুলো জিনিসের নির্দেশ প্রদান করব যা তোমাদের যুক্তিসিদ্ধতার বিপরীত। জেনে রেখো যে কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বশেষ সুদের। নিষিদ্ধতারআয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, তিনি আমাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেননি। তোমরা এমন প্রত্যেক জিনিস পরিত্যাগ করবে যা তোমাদেরকে সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করে।' (ইবনে মাজাহ) একটি হাদীসে রয়েছে যে, সুদের তেহাত্তরটি পাপ রয়েছে। সবচেয়ে হালকা পাপ হচ্ছে মায়ের সাথে ব্যভিচার করা। আর সবচেয়ে বড় সুদ হচ্ছে মুসলমানের মান হানি করা। (মুসতাদরাক-ই-হাকিম)। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এমন যুগ আসবে যে, মানুষ সুদ গ্রহণ করবে।' সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সবাই কি সুদ গ্রহণ করবে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “যে গ্রহণ করবে না তার কাছেও তার। ধূলি পৌছবে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এই ধূলি হতে বাঁচবার উদ্দেশ্যে ঐ কারণগুলোর পার্শ্বে যাওয়াও উচিত নয় যেগুলো হারামের দিকে নিয়ে যায়। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতটি সুদের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে এসে তা পাঠ করেন এবং সুদের ব্যবসা হারাম ঘোষণা করেন। কোন কোন ইমাম বলেন যে, ঐ রকমই মদ্যপান ও ওর যে কোন প্রকার ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি ঐ কারণসমূহ যেগুলো হারামের দিকে নিয়ে যায় ঐ সবই তিনি হারাম বলে ঘোষণা করেন। সহীহ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইয়াহুদীদেরকে আল্লাহ তা'আলা অভিশপ্ত করেছেন; কেননা যখন তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয় তখন তারা কৌশল অবলম্বন করতঃ ঐগুলো গলিয়ে বিক্রি করে এবং মূল্য গ্রহণ করে। মোট কথা প্রতারণা করে হারামকে হালাল করার চেষ্টা করাও হারাম এবং এই রূপ যে করে সে অভিশপ্ত। অনুরূপভাবে পূর্বে বর্ণিত হাদীসেও রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে পূর্বে বর্ণিত স্বামীর জন্য বৈধ করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে তার উপর এবং ঐ স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর উপর আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে।(আরবি) (২:২৩০) এর তাফসীর দ্রষ্টব্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, সাক্ষ্য দানকারী এবং লিখকদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে। তাহলে এটা স্পষ্ট কথা যে, সুদ লেখক ও সুদের সাক্ষ্যদাতাদের অযথা আল্লাহ তাআলার অভিশাপ স্কন্ধে বহন করার কি প্রয়োজন: ভাবার্থ এই যে, শরীয়তের বন্ধনে এনে কৌশল অবলম্বন করতঃ ঐ সুদের লেখা-পড়া করে এই জন্য তারাও অভিশপ্ত। হযরত আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) এই কৌশল খণ্ডন করার ব্যাপারে।(আরবি) নামে একখানা পৃথক পুস্তক রচনা করেছেন। কিতাবটি এই বিষয়ে উত্তম কিতাবই বটে।

আল-বাকারা 2:276

২৭৬-২৭৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি সুদকে সমূলে ধ্বংস করেন। অর্থাৎ হয় ওটাকেই সরাসরি নষ্ট করেন, না হয় ওর বরকত নষ্ট করে থাকেন। দুনিয়াতেও ওটা ধ্বংসের কারণ হয় এবং পরকালেও শাস্তির কারণ হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয় যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে বিস্ময়াভিভূত করে।” (৫:১০০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ তিনি মলিনতাপূর্ণ জিনিসকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে নরকে নিক্ষেপ করবেন।' (৮:৩৭) অন্যত্র রয়েছেঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত সুদ দ্বারা তোমরা যে তোমাদের মালকে বৃদ্ধি করতে চাচ্ছ তা আল্লাহর নিকট বাড়ে না। এই জন্যেই হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, সুদ বেশী হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কমেই যায়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) মসজিদ হতে বেরিয়ে শস্য ছড়ানো দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এই শস্য কোথা হতে এসেছে: জনগণ বলেনঃ ‘বিক্রির জন্যে এসেছে।' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এতে বরকত দান করুন।” জনগণ বলেনঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! এই শস্য উচ্চ মূল্যে বিক্রির জন্যে পূর্ব হতেই জমা করে রেখেছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘কে জমা করে রেখেছিল: জনগণ বলেনঃ ‘একজন হচ্ছে হযরত উসমানের (রাঃ) ক্রীতদাস ফারূক এবং অপর জন হচ্ছে আপনার আযাদকৃত গোলাম।' তিনি উভয়কে ডাকিয়ে আনেন এবং বলেনঃ “তোমরা কেন এরূপ করেছিলে:' তারা বলেঃ আমরা আমাদের মাল দ্বারা ক্রয় করি এবং যখন ইচ্ছে হয় বিক্রি করি। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে খাদ্য শস্য জমা করে রাখে, তাকে আল্লাহ দরিদ্র করে দেবেন অথবা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন। এই কথা শুনে হযরত ফারূক (রাঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা। করছি এবং আপনার নিকট অঙ্গীকার করছি যে, এই কাজ আর করবো না। কিন্তু হযরত উমারের (রাঃ) আযাদকৃত ক্রীতদাস পুনরায় একথাই বলেঃ আমি আমার মাল দিয়ে ক্রয় করছি এবং লাভ নিয়ে বিক্রি করছি, আবার ক্ষতি কি: হযরত ইয়াহইয়া (রঃ) বলেনঃ আমি তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে খাদ্য শস্য বন্ধ করে রাখে, আল্লাহ তাকে দরিদ্র করবেন বা কুষ্ঠ রোগী করবেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি দানকে বৃদ্ধি করে থাকেন।' ‘য়ূরবী’ শব্দটি অন্য পঠনে ঝুরাব্বীও রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার উপার্জন দ্বারা একটি খেজুরও দান করে, আল্লাহ তা দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করেন, অতঃপর তোমাদের বাছুর পালনের মত তিনি তা পালন করেন এবং ওর পুণ্য পর্বত সম করে দেন; আর তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একটি খেজুরের পুণ্য উহুদ পাহাড়ের সমান হয়ে থাকে। অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ এক ঘাস খাবারে উহুদ পাহাড়ের সমান পুণ্য পাওয়া যায়। সুতরাং তোমরা দান-খয়রাত করতে থাকে। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ কৃতঘ্ন পাপাচারীদেরকে ভালবাসেন না। ভাবার্থ এই যে, যারা দান-খয়রাত করে আল্লাহ তা'আলার বেশী দেয়ার প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে দুনিয়ার মাল জমা করতে থাকে, জঘন্য ও শরীয়ত পরিপন্থী উপায়ে উপার্জন করে এবং বাতিল ও অন্যায়ভাবে জনগণের মাল ভক্ষণ করে তারা আল্লাহ তা'আলার শত্রু। এই কৃতঘ্ন ও পাপীদের প্রতি মহান আল্লাহর ভালবাসা নেই।অতঃপর আল্লাহ তা'আলার ঐ বান্দাদের প্রশংসা করা হচ্ছে যারা তাদের প্রভুর নির্দেশাবলী যথাযোগ্য পালন করে থাকে, সকার্যাবলী সম্পাদন করে, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে ও যাকাত প্রদান করে, তারা কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে নিরাপদ থাকবে। তাদের কোন ভয় ও চিন্তার কারণ থাকবে না। বরং পরম করুণাময় আল্লাহ তাদেরকে সেই দিন বড় বড় পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন।

আল-বাকারা 2:277

২৭৬-২৭৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি সুদকে সমূলে ধ্বংস করেন। অর্থাৎ হয় ওটাকেই সরাসরি নষ্ট করেন, না হয় ওর বরকত নষ্ট করে থাকেন। দুনিয়াতেও ওটা ধ্বংসের কারণ হয় এবং পরকালেও শাস্তির কারণ হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয় যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে বিস্ময়াভিভূত করে।” (৫:১০০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ তিনি মলিনতাপূর্ণ জিনিসকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে নরকে নিক্ষেপ করবেন।' (৮:৩৭) অন্যত্র রয়েছেঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত সুদ দ্বারা তোমরা যে তোমাদের মালকে বৃদ্ধি করতে চাচ্ছ তা আল্লাহর নিকট বাড়ে না। এই জন্যেই হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, সুদ বেশী হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কমেই যায়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) মসজিদ হতে বেরিয়ে শস্য ছড়ানো দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এই শস্য কোথা হতে এসেছে: জনগণ বলেনঃ ‘বিক্রির জন্যে এসেছে।' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এতে বরকত দান করুন।” জনগণ বলেনঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! এই শস্য উচ্চ মূল্যে বিক্রির জন্যে পূর্ব হতেই জমা করে রেখেছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘কে জমা করে রেখেছিল: জনগণ বলেনঃ ‘একজন হচ্ছে হযরত উসমানের (রাঃ) ক্রীতদাস ফারূক এবং অপর জন হচ্ছে আপনার আযাদকৃত গোলাম।' তিনি উভয়কে ডাকিয়ে আনেন এবং বলেনঃ “তোমরা কেন এরূপ করেছিলে:' তারা বলেঃ আমরা আমাদের মাল দ্বারা ক্রয় করি এবং যখন ইচ্ছে হয় বিক্রি করি। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে খাদ্য শস্য জমা করে রাখে, তাকে আল্লাহ দরিদ্র করে দেবেন অথবা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন। এই কথা শুনে হযরত ফারূক (রাঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা। করছি এবং আপনার নিকট অঙ্গীকার করছি যে, এই কাজ আর করবো না। কিন্তু হযরত উমারের (রাঃ) আযাদকৃত ক্রীতদাস পুনরায় একথাই বলেঃ আমি আমার মাল দিয়ে ক্রয় করছি এবং লাভ নিয়ে বিক্রি করছি, আবার ক্ষতি কি: হযরত ইয়াহইয়া (রঃ) বলেনঃ আমি তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে খাদ্য শস্য বন্ধ করে রাখে, আল্লাহ তাকে দরিদ্র করবেন বা কুষ্ঠ রোগী করবেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি দানকে বৃদ্ধি করে থাকেন।' ‘য়ূরবী’ শব্দটি অন্য পঠনে ঝুরাব্বীও রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার উপার্জন দ্বারা একটি খেজুরও দান করে, আল্লাহ তা দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করেন, অতঃপর তোমাদের বাছুর পালনের মত তিনি তা পালন করেন এবং ওর পুণ্য পর্বত সম করে দেন; আর তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একটি খেজুরের পুণ্য উহুদ পাহাড়ের সমান হয়ে থাকে। অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ এক ঘাস খাবারে উহুদ পাহাড়ের সমান পুণ্য পাওয়া যায়। সুতরাং তোমরা দান-খয়রাত করতে থাকে। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “আল্লাহ কৃতঘ্ন পাপাচারীদেরকে ভালবাসেন না। ভাবার্থ এই যে, যারা দান-খয়রাত করে আল্লাহ তা'আলার বেশী দেয়ার প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে দুনিয়ার মাল জমা করতে থাকে, জঘন্য ও শরীয়ত পরিপন্থী উপায়ে উপার্জন করে এবং বাতিল ও অন্যায়ভাবে জনগণের মাল ভক্ষণ করে তারা আল্লাহ তা'আলার শত্রু। এই কৃতঘ্ন ও পাপীদের প্রতি মহান আল্লাহর ভালবাসা নেই।অতঃপর আল্লাহ তা'আলার ঐ বান্দাদের প্রশংসা করা হচ্ছে যারা তাদের প্রভুর নির্দেশাবলী যথাযোগ্য পালন করে থাকে, সকার্যাবলী সম্পাদন করে, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে ও যাকাত প্রদান করে, তারা কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে নিরাপদ থাকবে। তাদের কোন ভয় ও চিন্তার কারণ থাকবে না। বরং পরম করুণাময় আল্লাহ তাদেরকে সেই দিন বড় বড় পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন।

আল-বাকারা 2:278

২৭৮-২৮১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁকে ভয় করে ও ঐ কার্যাবলী হতে বিরত থাকে যেসব কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট। তাই তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সদা লক্ষ্য রাখ, প্রতিটি কাজে তাঁকে ভয় করে চল এবং মুসলমানদের উপর তোমাদের যে সুদ অবশিষ্ট রয়েছে, সাবধান! যদি তোমরা মুসলমান হও তবে তা নিও না! কেননা এখন তা হারাম হয়ে গেছে। সাকীফ গোত্রের বানু আমর বিন উমায়ের ও বানু মাখযুম গোত্রের বানু মুগীরার সম্বন্ধে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অজ্ঞতার যুগে তাদের মধ্যে সুদের কারবার ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর বানু আমর বানু মুগীরার নিকট সুদ চাইতে থাকে। তারা বলেঃ ইসলাম গ্রহণের পর আমরা তা দিতে পারি না। অবশেষে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। মক্কার প্রতিনিধি হযরত আত্তাব বিন উসায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে পত্র লিখেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা লিখে পাঠিয়ে দেন এবং তাদের জন্য সুদ গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে বানু আমর তাওবা করতঃ তাদের সুদ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়। এই আয়াতে ঐ লোকদের ভীষণভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যারা সুদের অবৈধতা জেনে নেয়া সত্ত্বেও ওর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন সুদখোরকে বলা হবে-“তোমরা অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।' তিনি বলেনঃ “যে সময়ে যিনি ইমাম থাকবেন তার জন্যে এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যারা সুদ পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে তাওবা করাবেন। যদি তারা তাওবা না করে তবে তিনি তাদেরকে হত্যা করবেন।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত ইবনে সীরীনেরও (রঃ) এটাই উক্তি।হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দেখ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করার ভয় প্রদর্শন করেছেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত হওয়ার যোগ্য বলেছেন! সাবধান! সুদ হতে ও সুদের ব্যবসা হতে দূরে থাকবে। হালাল জিনিস ও হালাল ব্যবসা বহু রয়েছে। না খেয়ে থাকবে তথাপি আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হবে না। পূর্বে বর্ণিত বর্ণনাটিও স্মরণ থাকতে পারে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) সুদযুক্ত লেনদেনের ব্যাপারে হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) সম্বন্ধে বলেছিলেনঃ ‘তার জিহাদ নষ্ট হয়ে গেছে। কেননা, জিহাদ হচ্ছে আল্লাহর শত্রুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নাম; অথচ সুদখোর নিজেই আল্লাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু এর ইসনাদ দুর্বল। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যদি তাওবা কর তবে তোমার আসল মাল যার নিকট রয়েছে তুমি অবশ্যই আদায় করবে। বেশী নিয়ে তুমিও তার উপর অত্যাচার করবে না এবং সেও তোমাকে কম দিয়ে বা আসলেই না দিয়ে তোমার উপর অত্যাচার করবে না। বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অজ্ঞতার যুগের সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিলাম। মূল সম্পদ গ্রহণ কর। বেশী নিয়ে তোমরাও কারও উপর অত্যাচার করবে না এবং কেউই তোমাদের মাল আত্মসাৎ করে তোমাদের উপরও অত্যাচার করবে না। হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের (রাঃ) সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিচ্ছি।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তির নিকট তোমার প্রাপ্য থাকে এবং সে তা পরিশোধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে তাকে কিছুদিন অবকাশ দাও যে, সে আরও কিছুদিন পর তোমাকে তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে। সাবধান! দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হারে সুদ বৃদ্ধি করতে থাকবে না। বরং ঐ সব দরিদ্রের ঋণ ক্ষমা করে দেয়াই মহোত্তম কাজ। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ কামনা করে সে যেন এই প্রকারের দরিদ্রদেরকে অবকাশ দেয় বা ঋণ সম্পূর্ণরূপে মাফ করে দেয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র লোকের উপর স্বীয় প্রাপ্য আদায়ের ব্যাপারে নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাকে অবকাশ দিয়ে থাকে; অতঃপর যতদিন পর্যন্ত সে তাকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত সে প্রতি দিন সেই পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে প্রতিদিন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। এই কথা শুনে হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্বে আপনি ঐ পরিমাণ দানের পুণ্য প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন। আর এখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ পুণ্য প্রাপ্তির কথা বললেন: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হাঁ, যে পর্যন্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত না হবে সেই পর্যন্ত ওর সমপরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে,এবং যখন মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে। একটি লোকের উপর হযরত কাতাদাহর (রাঃ) ঋণ ছিল। তিনি ঐ ঋণ আদায়ের তাগাদায় তার বাড়ী যেতেন; কিন্তু সে লুকিয়ে যেতো এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করতো না। একদা তিনি তার বাড়ী আসলে একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। তিনি তাকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। সে বলেঃ “হাঁ, তিনি বাড়ীতেই আছেন এবং খানা খাচ্ছেন। তখন হযরত কাতদিাহ (রাঃ) তাকে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেনঃ ‘আমি জানলাম যে, তুমি বাড়ীতেই আছ সুতরাং বাইরে এসো এবং উত্তর দাও। ঐ বেচারা বাইরে আসলে তিনি তাকে বলেনঃ “লুকিয়ে থাকছো কেন:' লোকটি বলেঃ জনাব, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমি একজন দরিদ্র লোক। এখন আমার নিকট আপনার ঋণ পরিশোধ করার মত অর্থ নেই। তাই, লজ্জায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি না।' তিনি বলেনঃ “শপথ কর। 'সে শপথ করলো। এ দেখে তিনি কান্নায় ফেটে পড়লেন এবং বললেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয় সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ার নীচে থাকবে।' (সহীহ মুসলিম)হযরত আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একটি লোককে আল্লাহ তা'আলার সামনে আনয়ন করা হবে। তাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেনঃ বল, তুমি আমার জন্যে কি পুণ্য করেছো:' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণুপরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট যা করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করবেন এবং সে এই উত্তর দেবে। আল্লাহ পাক আবার জিজ্ঞেস করবেন। এবার লোকটি বলবেঃ হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে কিছু মালও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি ব্যবসায়ী লোক ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে ধার কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এই লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধের নির্ধারিত সময়ে সে কর্জ পরিশোধ করতে পারলো না, তখন আমি তাকে আরও কিছুদিন অবকাশ দিতাম। ধনীদের উপর ও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন: আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশী সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি বেহেশতে চলে যাও।মুসতাদরাক-ই-হাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী যোদ্ধাকে সাহায্য করে বা দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে সাহায্য দেয় অথবা মুকাতাব গোলামকে (যে গোলামকে তার মনিব বলে দিয়েছেন, তুমি আমাকে এত টাকা দিলে তুমি আযাদ হয়ে যাবে) সাহায্য দান করে, তাকে আল্লাহ ঐ দিন ছায়া দান করবেন যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। মুসনাদ-ইআহমাদ' গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার প্রার্থনা কবুল করা হোক এবং তার কষ্ট ও বিপদ দূর করা হোক সে যেন অস্বচ্ছল লোকদের উপর স্বচ্ছলতা আনয়ন করে।' হযরত আব্বাদ বিন ওয়ালিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি ও আমার পিতা বিদ্যানুসন্ধানে বের হই এবং আমরা বলি যে, আনসারদের নিকট হাদীস শিক্ষা করবো। সর্বপ্রথম হযরত আবুল ইয়াসারের (রাঃ) সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর সাথে তাঁর একটি গোলাম ছিল, যার হাতে একখানা খাতা ছিল। গোলামও মনিব একই পোষাক পরিহিত ছিলেন। আমার পিতা তাকে বলেনঃএই সময় আপনাকে দেখে রাগান্বিত বলে মনে হচ্ছে।' তিনি বলেনঃ হ, অমুক ব্যক্তির উপর আমার কিছু ঋণ ছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। ঋণ আদায়ের জন্যে আমি তার বাড়ীতে গমন করি। সালাম দিয়ে সে বাড়ীতে আছে কি-না জিজ্ঞেস করি। বাড়ীতে নেই' এই উত্তর আসে। ঘটনাক্রমে তার ছোট ছেলে বাইরে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তোমার আব্বা কোথায় রয়েছে: সে বলেঃ আপনার শব্দ শুনে তিনি খাটের নীচে লুকিয়ে গেছেন। আমি আবার ডাক দেই এবং বলিঃ তুমি যে ভিতরে রয়েছে তা আমি জানতে পেরেছি। সুতরাং লুকিয়ে থেকো না বরং এসে উত্তর দাও।' সে আসে আমি বলিঃ ‘লুকিয়ে ছিলে কেন:' সে বলেঃ “আমার নিকট এখন অর্থ নেই। সুতরাং সাক্ষাৎ করলে হয় আমাকে মিথ্যা ওজর পেশ করতে হবে, না হয় মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হবে। তাই আমি আপনার সামনে আসতে লজ্জাবোধ করছিলাম। আপনি আল্লাহর রাসূলের (সঃ) সাহাবী। সুতরাং আপনাকে মিথ্যা কথা কি করে বলি:' আমি বলিঃ তুমি আল্লাহর শপথ করে বলছো যে, তোমার নিকট অর্থ নেই:' সে বলে-হা, আল্লাহর কসম! আমার নিকট কোন অর্থ নেই।' তিনবার আমি তাকে শপথ করিয়ে নেই, সে তিনবারই শপথ করে। আমি খাতা হতে তার নাম কাটিয়ে নেই এবং ঋণের অর্থ পরিশোধ’ লিখে নেই। অতঃপর তাকে বলিঃ “যাও, তোমার নাম হতে এই অংক কেটে দিলাম। এরপর যদি অর্থ পেয়ে যাও তবে আমার এই ঋণ পরিশোধ করে | দেবে, নচেৎ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। জেনে রেখো, আমার এই চক্ষু যুগল। দেখেছে, আমার এই কর্ণদ্বয় শুনেছে এবং আমার অন্তঃকরণ বেশ মনে রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের ছায়ায় স্থান দেবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করেন। মাটির দিকে মুখ করে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিঃস্বের পথ সহজ করবে বা তাকে ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে নরকের প্রখরতা হতে রক্ষা করবেন। জেনে রেখো যে, বেহেশতের কাজ দুঃখজনক ও প্রবৃত্তির প্রতিকূল এবং নরকের কাজ সহজ ও প্রবৃত্তির অনুকূল। ঐ লোকেরাই পুণ্যবান যারা ফিতনা ও গণ্ডগোল হতে দূরে থাকে। মানুষ ক্রোধের যে চুমুক পান করে নেয় ঐ চুমুক আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। যারা এই রূপ করে তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলা ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।তাবরানীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র ব্যক্তির উপর দয়া প্রদর্শন করতঃ স্বীয় ঋণ আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে তার পাপের জন্যে ধরেন না, শেষ পর্যন্ত সে তাওবা করে। অতপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার লয় ও ক্ষয়, মালের ধ্বংসশীলতা, পরকালের আগমন, আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন, আল্লাহ্ তা'আলাকে নিজেদের কাজের হিসাব। প্রদান এবং সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রাপ্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও তাঁর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।এও বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের এটাই সর্বশেষ আয়াত। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র নয় দিন জীবিত ছিলেন। এবং রবিউল আওয়াল মাসের ২রা তারিখ সোমবার দিন তিনি এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) একটি বর্ণনায় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একত্রিশ দিন জীবিত থাকার কথাও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ পূর্ববর্তী মনীষীদের উক্তি এই যে, এর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয় দিন জীবিত ছিলেন। শনিবার হতে আরম্ভ হয় এবং তিনি সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মোটকথা, কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বশেষ এই আয়াতটিই অবতীর্ণ হয়।

আল-বাকারা 2:279

২৭৮-২৮১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁকে ভয় করে ও ঐ কার্যাবলী হতে বিরত থাকে যেসব কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট। তাই তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সদা লক্ষ্য রাখ, প্রতিটি কাজে তাঁকে ভয় করে চল এবং মুসলমানদের উপর তোমাদের যে সুদ অবশিষ্ট রয়েছে, সাবধান! যদি তোমরা মুসলমান হও তবে তা নিও না! কেননা এখন তা হারাম হয়ে গেছে। সাকীফ গোত্রের বানু আমর বিন উমায়ের ও বানু মাখযুম গোত্রের বানু মুগীরার সম্বন্ধে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অজ্ঞতার যুগে তাদের মধ্যে সুদের কারবার ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর বানু আমর বানু মুগীরার নিকট সুদ চাইতে থাকে। তারা বলেঃ ইসলাম গ্রহণের পর আমরা তা দিতে পারি না। অবশেষে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। মক্কার প্রতিনিধি হযরত আত্তাব বিন উসায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে পত্র লিখেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা লিখে পাঠিয়ে দেন এবং তাদের জন্য সুদ গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে বানু আমর তাওবা করতঃ তাদের সুদ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়। এই আয়াতে ঐ লোকদের ভীষণভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যারা সুদের অবৈধতা জেনে নেয়া সত্ত্বেও ওর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন সুদখোরকে বলা হবে-“তোমরা অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।' তিনি বলেনঃ “যে সময়ে যিনি ইমাম থাকবেন তার জন্যে এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যারা সুদ পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে তাওবা করাবেন। যদি তারা তাওবা না করে তবে তিনি তাদেরকে হত্যা করবেন।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত ইবনে সীরীনেরও (রঃ) এটাই উক্তি।হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দেখ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করার ভয় প্রদর্শন করেছেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত হওয়ার যোগ্য বলেছেন! সাবধান! সুদ হতে ও সুদের ব্যবসা হতে দূরে থাকবে। হালাল জিনিস ও হালাল ব্যবসা বহু রয়েছে। না খেয়ে থাকবে তথাপি আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হবে না। পূর্বে বর্ণিত বর্ণনাটিও স্মরণ থাকতে পারে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) সুদযুক্ত লেনদেনের ব্যাপারে হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) সম্বন্ধে বলেছিলেনঃ ‘তার জিহাদ নষ্ট হয়ে গেছে। কেননা, জিহাদ হচ্ছে আল্লাহর শত্রুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নাম; অথচ সুদখোর নিজেই আল্লাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু এর ইসনাদ দুর্বল। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যদি তাওবা কর তবে তোমার আসল মাল যার নিকট রয়েছে তুমি অবশ্যই আদায় করবে। বেশী নিয়ে তুমিও তার উপর অত্যাচার করবে না এবং সেও তোমাকে কম দিয়ে বা আসলেই না দিয়ে তোমার উপর অত্যাচার করবে না। বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অজ্ঞতার যুগের সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিলাম। মূল সম্পদ গ্রহণ কর। বেশী নিয়ে তোমরাও কারও উপর অত্যাচার করবে না এবং কেউই তোমাদের মাল আত্মসাৎ করে তোমাদের উপরও অত্যাচার করবে না। হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের (রাঃ) সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিচ্ছি।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তির নিকট তোমার প্রাপ্য থাকে এবং সে তা পরিশোধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে তাকে কিছুদিন অবকাশ দাও যে, সে আরও কিছুদিন পর তোমাকে তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে। সাবধান! দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হারে সুদ বৃদ্ধি করতে থাকবে না। বরং ঐ সব দরিদ্রের ঋণ ক্ষমা করে দেয়াই মহোত্তম কাজ। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ কামনা করে সে যেন এই প্রকারের দরিদ্রদেরকে অবকাশ দেয় বা ঋণ সম্পূর্ণরূপে মাফ করে দেয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র লোকের উপর স্বীয় প্রাপ্য আদায়ের ব্যাপারে নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাকে অবকাশ দিয়ে থাকে; অতঃপর যতদিন পর্যন্ত সে তাকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত সে প্রতি দিন সেই পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে প্রতিদিন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। এই কথা শুনে হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্বে আপনি ঐ পরিমাণ দানের পুণ্য প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন। আর এখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ পুণ্য প্রাপ্তির কথা বললেন: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হাঁ, যে পর্যন্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত না হবে সেই পর্যন্ত ওর সমপরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে,এবং যখন মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে। একটি লোকের উপর হযরত কাতাদাহর (রাঃ) ঋণ ছিল। তিনি ঐ ঋণ আদায়ের তাগাদায় তার বাড়ী যেতেন; কিন্তু সে লুকিয়ে যেতো এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করতো না। একদা তিনি তার বাড়ী আসলে একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। তিনি তাকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। সে বলেঃ “হাঁ, তিনি বাড়ীতেই আছেন এবং খানা খাচ্ছেন। তখন হযরত কাতদিাহ (রাঃ) তাকে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেনঃ ‘আমি জানলাম যে, তুমি বাড়ীতেই আছ সুতরাং বাইরে এসো এবং উত্তর দাও। ঐ বেচারা বাইরে আসলে তিনি তাকে বলেনঃ “লুকিয়ে থাকছো কেন:' লোকটি বলেঃ জনাব, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমি একজন দরিদ্র লোক। এখন আমার নিকট আপনার ঋণ পরিশোধ করার মত অর্থ নেই। তাই, লজ্জায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি না।' তিনি বলেনঃ “শপথ কর। 'সে শপথ করলো। এ দেখে তিনি কান্নায় ফেটে পড়লেন এবং বললেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয় সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ার নীচে থাকবে।' (সহীহ মুসলিম)হযরত আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একটি লোককে আল্লাহ তা'আলার সামনে আনয়ন করা হবে। তাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেনঃ বল, তুমি আমার জন্যে কি পুণ্য করেছো:' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণুপরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট যা করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করবেন এবং সে এই উত্তর দেবে। আল্লাহ পাক আবার জিজ্ঞেস করবেন। এবার লোকটি বলবেঃ হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে কিছু মালও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি ব্যবসায়ী লোক ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে ধার কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এই লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধের নির্ধারিত সময়ে সে কর্জ পরিশোধ করতে পারলো না, তখন আমি তাকে আরও কিছুদিন অবকাশ দিতাম। ধনীদের উপর ও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন: আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশী সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি বেহেশতে চলে যাও।মুসতাদরাক-ই-হাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী যোদ্ধাকে সাহায্য করে বা দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে সাহায্য দেয় অথবা মুকাতাব গোলামকে (যে গোলামকে তার মনিব বলে দিয়েছেন, তুমি আমাকে এত টাকা দিলে তুমি আযাদ হয়ে যাবে) সাহায্য দান করে, তাকে আল্লাহ ঐ দিন ছায়া দান করবেন যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। মুসনাদ-ইআহমাদ' গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার প্রার্থনা কবুল করা হোক এবং তার কষ্ট ও বিপদ দূর করা হোক সে যেন অস্বচ্ছল লোকদের উপর স্বচ্ছলতা আনয়ন করে।' হযরত আব্বাদ বিন ওয়ালিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি ও আমার পিতা বিদ্যানুসন্ধানে বের হই এবং আমরা বলি যে, আনসারদের নিকট হাদীস শিক্ষা করবো। সর্বপ্রথম হযরত আবুল ইয়াসারের (রাঃ) সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর সাথে তাঁর একটি গোলাম ছিল, যার হাতে একখানা খাতা ছিল। গোলামও মনিব একই পোষাক পরিহিত ছিলেন। আমার পিতা তাকে বলেনঃএই সময় আপনাকে দেখে রাগান্বিত বলে মনে হচ্ছে।' তিনি বলেনঃ হ, অমুক ব্যক্তির উপর আমার কিছু ঋণ ছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। ঋণ আদায়ের জন্যে আমি তার বাড়ীতে গমন করি। সালাম দিয়ে সে বাড়ীতে আছে কি-না জিজ্ঞেস করি। বাড়ীতে নেই' এই উত্তর আসে। ঘটনাক্রমে তার ছোট ছেলে বাইরে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তোমার আব্বা কোথায় রয়েছে: সে বলেঃ আপনার শব্দ শুনে তিনি খাটের নীচে লুকিয়ে গেছেন। আমি আবার ডাক দেই এবং বলিঃ তুমি যে ভিতরে রয়েছে তা আমি জানতে পেরেছি। সুতরাং লুকিয়ে থেকো না বরং এসে উত্তর দাও।' সে আসে আমি বলিঃ ‘লুকিয়ে ছিলে কেন:' সে বলেঃ “আমার নিকট এখন অর্থ নেই। সুতরাং সাক্ষাৎ করলে হয় আমাকে মিথ্যা ওজর পেশ করতে হবে, না হয় মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হবে। তাই আমি আপনার সামনে আসতে লজ্জাবোধ করছিলাম। আপনি আল্লাহর রাসূলের (সঃ) সাহাবী। সুতরাং আপনাকে মিথ্যা কথা কি করে বলি:' আমি বলিঃ তুমি আল্লাহর শপথ করে বলছো যে, তোমার নিকট অর্থ নেই:' সে বলে-হা, আল্লাহর কসম! আমার নিকট কোন অর্থ নেই।' তিনবার আমি তাকে শপথ করিয়ে নেই, সে তিনবারই শপথ করে। আমি খাতা হতে তার নাম কাটিয়ে নেই এবং ঋণের অর্থ পরিশোধ’ লিখে নেই। অতঃপর তাকে বলিঃ “যাও, তোমার নাম হতে এই অংক কেটে দিলাম। এরপর যদি অর্থ পেয়ে যাও তবে আমার এই ঋণ পরিশোধ করে | দেবে, নচেৎ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। জেনে রেখো, আমার এই চক্ষু যুগল। দেখেছে, আমার এই কর্ণদ্বয় শুনেছে এবং আমার অন্তঃকরণ বেশ মনে রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের ছায়ায় স্থান দেবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করেন। মাটির দিকে মুখ করে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিঃস্বের পথ সহজ করবে বা তাকে ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে নরকের প্রখরতা হতে রক্ষা করবেন। জেনে রেখো যে, বেহেশতের কাজ দুঃখজনক ও প্রবৃত্তির প্রতিকূল এবং নরকের কাজ সহজ ও প্রবৃত্তির অনুকূল। ঐ লোকেরাই পুণ্যবান যারা ফিতনা ও গণ্ডগোল হতে দূরে থাকে। মানুষ ক্রোধের যে চুমুক পান করে নেয় ঐ চুমুক আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। যারা এই রূপ করে তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলা ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।তাবরানীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র ব্যক্তির উপর দয়া প্রদর্শন করতঃ স্বীয় ঋণ আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে তার পাপের জন্যে ধরেন না, শেষ পর্যন্ত সে তাওবা করে। অতপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার লয় ও ক্ষয়, মালের ধ্বংসশীলতা, পরকালের আগমন, আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন, আল্লাহ্ তা'আলাকে নিজেদের কাজের হিসাব। প্রদান এবং সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রাপ্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও তাঁর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।এও বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের এটাই সর্বশেষ আয়াত। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র নয় দিন জীবিত ছিলেন। এবং রবিউল আওয়াল মাসের ২রা তারিখ সোমবার দিন তিনি এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) একটি বর্ণনায় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একত্রিশ দিন জীবিত থাকার কথাও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ পূর্ববর্তী মনীষীদের উক্তি এই যে, এর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয় দিন জীবিত ছিলেন। শনিবার হতে আরম্ভ হয় এবং তিনি সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মোটকথা, কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বশেষ এই আয়াতটিই অবতীর্ণ হয়।

আল-বাকারা 2:280

২৭৮-২৮১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁকে ভয় করে ও ঐ কার্যাবলী হতে বিরত থাকে যেসব কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট। তাই তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সদা লক্ষ্য রাখ, প্রতিটি কাজে তাঁকে ভয় করে চল এবং মুসলমানদের উপর তোমাদের যে সুদ অবশিষ্ট রয়েছে, সাবধান! যদি তোমরা মুসলমান হও তবে তা নিও না! কেননা এখন তা হারাম হয়ে গেছে। সাকীফ গোত্রের বানু আমর বিন উমায়ের ও বানু মাখযুম গোত্রের বানু মুগীরার সম্বন্ধে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অজ্ঞতার যুগে তাদের মধ্যে সুদের কারবার ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর বানু আমর বানু মুগীরার নিকট সুদ চাইতে থাকে। তারা বলেঃ ইসলাম গ্রহণের পর আমরা তা দিতে পারি না। অবশেষে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। মক্কার প্রতিনিধি হযরত আত্তাব বিন উসায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে পত্র লিখেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা লিখে পাঠিয়ে দেন এবং তাদের জন্য সুদ গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে বানু আমর তাওবা করতঃ তাদের সুদ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়। এই আয়াতে ঐ লোকদের ভীষণভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যারা সুদের অবৈধতা জেনে নেয়া সত্ত্বেও ওর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন সুদখোরকে বলা হবে-“তোমরা অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।' তিনি বলেনঃ “যে সময়ে যিনি ইমাম থাকবেন তার জন্যে এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যারা সুদ পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে তাওবা করাবেন। যদি তারা তাওবা না করে তবে তিনি তাদেরকে হত্যা করবেন।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত ইবনে সীরীনেরও (রঃ) এটাই উক্তি।হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দেখ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করার ভয় প্রদর্শন করেছেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত হওয়ার যোগ্য বলেছেন! সাবধান! সুদ হতে ও সুদের ব্যবসা হতে দূরে থাকবে। হালাল জিনিস ও হালাল ব্যবসা বহু রয়েছে। না খেয়ে থাকবে তথাপি আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হবে না। পূর্বে বর্ণিত বর্ণনাটিও স্মরণ থাকতে পারে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) সুদযুক্ত লেনদেনের ব্যাপারে হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) সম্বন্ধে বলেছিলেনঃ ‘তার জিহাদ নষ্ট হয়ে গেছে। কেননা, জিহাদ হচ্ছে আল্লাহর শত্রুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নাম; অথচ সুদখোর নিজেই আল্লাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু এর ইসনাদ দুর্বল। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যদি তাওবা কর তবে তোমার আসল মাল যার নিকট রয়েছে তুমি অবশ্যই আদায় করবে। বেশী নিয়ে তুমিও তার উপর অত্যাচার করবে না এবং সেও তোমাকে কম দিয়ে বা আসলেই না দিয়ে তোমার উপর অত্যাচার করবে না। বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অজ্ঞতার যুগের সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিলাম। মূল সম্পদ গ্রহণ কর। বেশী নিয়ে তোমরাও কারও উপর অত্যাচার করবে না এবং কেউই তোমাদের মাল আত্মসাৎ করে তোমাদের উপরও অত্যাচার করবে না। হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের (রাঃ) সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিচ্ছি।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তির নিকট তোমার প্রাপ্য থাকে এবং সে তা পরিশোধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে তাকে কিছুদিন অবকাশ দাও যে, সে আরও কিছুদিন পর তোমাকে তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে। সাবধান! দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হারে সুদ বৃদ্ধি করতে থাকবে না। বরং ঐ সব দরিদ্রের ঋণ ক্ষমা করে দেয়াই মহোত্তম কাজ। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ কামনা করে সে যেন এই প্রকারের দরিদ্রদেরকে অবকাশ দেয় বা ঋণ সম্পূর্ণরূপে মাফ করে দেয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র লোকের উপর স্বীয় প্রাপ্য আদায়ের ব্যাপারে নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাকে অবকাশ দিয়ে থাকে; অতঃপর যতদিন পর্যন্ত সে তাকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত সে প্রতি দিন সেই পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে প্রতিদিন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। এই কথা শুনে হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্বে আপনি ঐ পরিমাণ দানের পুণ্য প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন। আর এখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ পুণ্য প্রাপ্তির কথা বললেন: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হাঁ, যে পর্যন্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত না হবে সেই পর্যন্ত ওর সমপরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে,এবং যখন মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে। একটি লোকের উপর হযরত কাতাদাহর (রাঃ) ঋণ ছিল। তিনি ঐ ঋণ আদায়ের তাগাদায় তার বাড়ী যেতেন; কিন্তু সে লুকিয়ে যেতো এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করতো না। একদা তিনি তার বাড়ী আসলে একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। তিনি তাকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। সে বলেঃ “হাঁ, তিনি বাড়ীতেই আছেন এবং খানা খাচ্ছেন। তখন হযরত কাতদিাহ (রাঃ) তাকে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেনঃ ‘আমি জানলাম যে, তুমি বাড়ীতেই আছ সুতরাং বাইরে এসো এবং উত্তর দাও। ঐ বেচারা বাইরে আসলে তিনি তাকে বলেনঃ “লুকিয়ে থাকছো কেন:' লোকটি বলেঃ জনাব, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমি একজন দরিদ্র লোক। এখন আমার নিকট আপনার ঋণ পরিশোধ করার মত অর্থ নেই। তাই, লজ্জায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি না।' তিনি বলেনঃ “শপথ কর। 'সে শপথ করলো। এ দেখে তিনি কান্নায় ফেটে পড়লেন এবং বললেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয় সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ার নীচে থাকবে।' (সহীহ মুসলিম)হযরত আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একটি লোককে আল্লাহ তা'আলার সামনে আনয়ন করা হবে। তাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেনঃ বল, তুমি আমার জন্যে কি পুণ্য করেছো:' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণুপরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট যা করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করবেন এবং সে এই উত্তর দেবে। আল্লাহ পাক আবার জিজ্ঞেস করবেন। এবার লোকটি বলবেঃ হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে কিছু মালও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি ব্যবসায়ী লোক ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে ধার কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এই লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধের নির্ধারিত সময়ে সে কর্জ পরিশোধ করতে পারলো না, তখন আমি তাকে আরও কিছুদিন অবকাশ দিতাম। ধনীদের উপর ও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন: আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশী সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি বেহেশতে চলে যাও।মুসতাদরাক-ই-হাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী যোদ্ধাকে সাহায্য করে বা দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে সাহায্য দেয় অথবা মুকাতাব গোলামকে (যে গোলামকে তার মনিব বলে দিয়েছেন, তুমি আমাকে এত টাকা দিলে তুমি আযাদ হয়ে যাবে) সাহায্য দান করে, তাকে আল্লাহ ঐ দিন ছায়া দান করবেন যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। মুসনাদ-ইআহমাদ' গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার প্রার্থনা কবুল করা হোক এবং তার কষ্ট ও বিপদ দূর করা হোক সে যেন অস্বচ্ছল লোকদের উপর স্বচ্ছলতা আনয়ন করে।' হযরত আব্বাদ বিন ওয়ালিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি ও আমার পিতা বিদ্যানুসন্ধানে বের হই এবং আমরা বলি যে, আনসারদের নিকট হাদীস শিক্ষা করবো। সর্বপ্রথম হযরত আবুল ইয়াসারের (রাঃ) সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর সাথে তাঁর একটি গোলাম ছিল, যার হাতে একখানা খাতা ছিল। গোলামও মনিব একই পোষাক পরিহিত ছিলেন। আমার পিতা তাকে বলেনঃএই সময় আপনাকে দেখে রাগান্বিত বলে মনে হচ্ছে।' তিনি বলেনঃ হ, অমুক ব্যক্তির উপর আমার কিছু ঋণ ছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। ঋণ আদায়ের জন্যে আমি তার বাড়ীতে গমন করি। সালাম দিয়ে সে বাড়ীতে আছে কি-না জিজ্ঞেস করি। বাড়ীতে নেই' এই উত্তর আসে। ঘটনাক্রমে তার ছোট ছেলে বাইরে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তোমার আব্বা কোথায় রয়েছে: সে বলেঃ আপনার শব্দ শুনে তিনি খাটের নীচে লুকিয়ে গেছেন। আমি আবার ডাক দেই এবং বলিঃ তুমি যে ভিতরে রয়েছে তা আমি জানতে পেরেছি। সুতরাং লুকিয়ে থেকো না বরং এসে উত্তর দাও।' সে আসে আমি বলিঃ ‘লুকিয়ে ছিলে কেন:' সে বলেঃ “আমার নিকট এখন অর্থ নেই। সুতরাং সাক্ষাৎ করলে হয় আমাকে মিথ্যা ওজর পেশ করতে হবে, না হয় মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হবে। তাই আমি আপনার সামনে আসতে লজ্জাবোধ করছিলাম। আপনি আল্লাহর রাসূলের (সঃ) সাহাবী। সুতরাং আপনাকে মিথ্যা কথা কি করে বলি:' আমি বলিঃ তুমি আল্লাহর শপথ করে বলছো যে, তোমার নিকট অর্থ নেই:' সে বলে-হা, আল্লাহর কসম! আমার নিকট কোন অর্থ নেই।' তিনবার আমি তাকে শপথ করিয়ে নেই, সে তিনবারই শপথ করে। আমি খাতা হতে তার নাম কাটিয়ে নেই এবং ঋণের অর্থ পরিশোধ’ লিখে নেই। অতঃপর তাকে বলিঃ “যাও, তোমার নাম হতে এই অংক কেটে দিলাম। এরপর যদি অর্থ পেয়ে যাও তবে আমার এই ঋণ পরিশোধ করে | দেবে, নচেৎ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। জেনে রেখো, আমার এই চক্ষু যুগল। দেখেছে, আমার এই কর্ণদ্বয় শুনেছে এবং আমার অন্তঃকরণ বেশ মনে রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের ছায়ায় স্থান দেবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করেন। মাটির দিকে মুখ করে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিঃস্বের পথ সহজ করবে বা তাকে ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে নরকের প্রখরতা হতে রক্ষা করবেন। জেনে রেখো যে, বেহেশতের কাজ দুঃখজনক ও প্রবৃত্তির প্রতিকূল এবং নরকের কাজ সহজ ও প্রবৃত্তির অনুকূল। ঐ লোকেরাই পুণ্যবান যারা ফিতনা ও গণ্ডগোল হতে দূরে থাকে। মানুষ ক্রোধের যে চুমুক পান করে নেয় ঐ চুমুক আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। যারা এই রূপ করে তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলা ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।তাবরানীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র ব্যক্তির উপর দয়া প্রদর্শন করতঃ স্বীয় ঋণ আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে তার পাপের জন্যে ধরেন না, শেষ পর্যন্ত সে তাওবা করে। অতপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার লয় ও ক্ষয়, মালের ধ্বংসশীলতা, পরকালের আগমন, আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন, আল্লাহ্ তা'আলাকে নিজেদের কাজের হিসাব। প্রদান এবং সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রাপ্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও তাঁর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।এও বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের এটাই সর্বশেষ আয়াত। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র নয় দিন জীবিত ছিলেন। এবং রবিউল আওয়াল মাসের ২রা তারিখ সোমবার দিন তিনি এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) একটি বর্ণনায় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একত্রিশ দিন জীবিত থাকার কথাও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ পূর্ববর্তী মনীষীদের উক্তি এই যে, এর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয় দিন জীবিত ছিলেন। শনিবার হতে আরম্ভ হয় এবং তিনি সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মোটকথা, কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বশেষ এই আয়াতটিই অবতীর্ণ হয়।

আল-বাকারা 2:281

২৭৮-২৮১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁকে ভয় করে ও ঐ কার্যাবলী হতে বিরত থাকে যেসব কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট। তাই তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সদা লক্ষ্য রাখ, প্রতিটি কাজে তাঁকে ভয় করে চল এবং মুসলমানদের উপর তোমাদের যে সুদ অবশিষ্ট রয়েছে, সাবধান! যদি তোমরা মুসলমান হও তবে তা নিও না! কেননা এখন তা হারাম হয়ে গেছে। সাকীফ গোত্রের বানু আমর বিন উমায়ের ও বানু মাখযুম গোত্রের বানু মুগীরার সম্বন্ধে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অজ্ঞতার যুগে তাদের মধ্যে সুদের কারবার ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর বানু আমর বানু মুগীরার নিকট সুদ চাইতে থাকে। তারা বলেঃ ইসলাম গ্রহণের পর আমরা তা দিতে পারি না। অবশেষে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। মক্কার প্রতিনিধি হযরত আত্তাব বিন উসায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই সম্বন্ধে পত্র লিখেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা লিখে পাঠিয়ে দেন এবং তাদের জন্য সুদ গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে বানু আমর তাওবা করতঃ তাদের সুদ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়। এই আয়াতে ঐ লোকদের ভীষণভাবে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যারা সুদের অবৈধতা জেনে নেয়া সত্ত্বেও ওর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন সুদখোরকে বলা হবে-“তোমরা অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।' তিনি বলেনঃ “যে সময়ে যিনি ইমাম থাকবেন তার জন্যে এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যারা সুদ পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে তাওবা করাবেন। যদি তারা তাওবা না করে তবে তিনি তাদেরকে হত্যা করবেন।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত ইবনে সীরীনেরও (রঃ) এটাই উক্তি।হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “দেখ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করার ভয় প্রদর্শন করেছেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত হওয়ার যোগ্য বলেছেন! সাবধান! সুদ হতে ও সুদের ব্যবসা হতে দূরে থাকবে। হালাল জিনিস ও হালাল ব্যবসা বহু রয়েছে। না খেয়ে থাকবে তথাপি আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হবে না। পূর্বে বর্ণিত বর্ণনাটিও স্মরণ থাকতে পারে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) সুদযুক্ত লেনদেনের ব্যাপারে হযরত যায়েদ বিন আরকামের (রাঃ) সম্বন্ধে বলেছিলেনঃ ‘তার জিহাদ নষ্ট হয়ে গেছে। কেননা, জিহাদ হচ্ছে আল্লাহর শত্রুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নাম; অথচ সুদখোর নিজেই আল্লাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু এর ইসনাদ দুর্বল। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যদি তাওবা কর তবে তোমার আসল মাল যার নিকট রয়েছে তুমি অবশ্যই আদায় করবে। বেশী নিয়ে তুমিও তার উপর অত্যাচার করবে না এবং সেও তোমাকে কম দিয়ে বা আসলেই না দিয়ে তোমার উপর অত্যাচার করবে না। বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অজ্ঞতার যুগের সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিলাম। মূল সম্পদ গ্রহণ কর। বেশী নিয়ে তোমরাও কারও উপর অত্যাচার করবে না এবং কেউই তোমাদের মাল আত্মসাৎ করে তোমাদের উপরও অত্যাচার করবে না। হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের (রাঃ) সমস্ত সুদ আমি ধ্বংস করে দিচ্ছি।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তির নিকট তোমার প্রাপ্য থাকে এবং সে তা পরিশোধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে তাকে কিছুদিন অবকাশ দাও যে, সে আরও কিছুদিন পর তোমাকে তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে। সাবধান! দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হারে সুদ বৃদ্ধি করতে থাকবে না। বরং ঐ সব দরিদ্রের ঋণ ক্ষমা করে দেয়াই মহোত্তম কাজ। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ কামনা করে সে যেন এই প্রকারের দরিদ্রদেরকে অবকাশ দেয় বা ঋণ সম্পূর্ণরূপে মাফ করে দেয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র লোকের উপর স্বীয় প্রাপ্য আদায়ের ব্যাপারে নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাকে অবকাশ দিয়ে থাকে; অতঃপর যতদিন পর্যন্ত সে তাকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত সে প্রতি দিন সেই পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে প্রতিদিন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য পেতে থাকবে। এই কথা শুনে হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্বে আপনি ঐ পরিমাণ দানের পুণ্য প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন। আর এখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ পুণ্য প্রাপ্তির কথা বললেন: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হাঁ, যে পর্যন্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত না হবে সেই পর্যন্ত ওর সমপরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে,এবং যখন মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের পুণ্য লাভ করবে। একটি লোকের উপর হযরত কাতাদাহর (রাঃ) ঋণ ছিল। তিনি ঐ ঋণ আদায়ের তাগাদায় তার বাড়ী যেতেন; কিন্তু সে লুকিয়ে যেতো এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করতো না। একদা তিনি তার বাড়ী আসলে একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। তিনি তাকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। সে বলেঃ “হাঁ, তিনি বাড়ীতেই আছেন এবং খানা খাচ্ছেন। তখন হযরত কাতদিাহ (রাঃ) তাকে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেনঃ ‘আমি জানলাম যে, তুমি বাড়ীতেই আছ সুতরাং বাইরে এসো এবং উত্তর দাও। ঐ বেচারা বাইরে আসলে তিনি তাকে বলেনঃ “লুকিয়ে থাকছো কেন:' লোকটি বলেঃ জনাব, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমি একজন দরিদ্র লোক। এখন আমার নিকট আপনার ঋণ পরিশোধ করার মত অর্থ নেই। তাই, লজ্জায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি না।' তিনি বলেনঃ “শপথ কর। 'সে শপথ করলো। এ দেখে তিনি কান্নায় ফেটে পড়লেন এবং বললেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয় সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ার নীচে থাকবে।' (সহীহ মুসলিম)হযরত আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একটি লোককে আল্লাহ তা'আলার সামনে আনয়ন করা হবে। তাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেনঃ বল, তুমি আমার জন্যে কি পুণ্য করেছো:' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণুপরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট যা করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করবেন এবং সে এই উত্তর দেবে। আল্লাহ পাক আবার জিজ্ঞেস করবেন। এবার লোকটি বলবেঃ হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে কিছু মালও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি ব্যবসায়ী লোক ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে ধার কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এই লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধের নির্ধারিত সময়ে সে কর্জ পরিশোধ করতে পারলো না, তখন আমি তাকে আরও কিছুদিন অবকাশ দিতাম। ধনীদের উপর ও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন: আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশী সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি বেহেশতে চলে যাও।মুসতাদরাক-ই-হাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী যোদ্ধাকে সাহায্য করে বা দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে সাহায্য দেয় অথবা মুকাতাব গোলামকে (যে গোলামকে তার মনিব বলে দিয়েছেন, তুমি আমাকে এত টাকা দিলে তুমি আযাদ হয়ে যাবে) সাহায্য দান করে, তাকে আল্লাহ ঐ দিন ছায়া দান করবেন যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। মুসনাদ-ইআহমাদ' গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার প্রার্থনা কবুল করা হোক এবং তার কষ্ট ও বিপদ দূর করা হোক সে যেন অস্বচ্ছল লোকদের উপর স্বচ্ছলতা আনয়ন করে।' হযরত আব্বাদ বিন ওয়ালিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি ও আমার পিতা বিদ্যানুসন্ধানে বের হই এবং আমরা বলি যে, আনসারদের নিকট হাদীস শিক্ষা করবো। সর্বপ্রথম হযরত আবুল ইয়াসারের (রাঃ) সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর সাথে তাঁর একটি গোলাম ছিল, যার হাতে একখানা খাতা ছিল। গোলামও মনিব একই পোষাক পরিহিত ছিলেন। আমার পিতা তাকে বলেনঃএই সময় আপনাকে দেখে রাগান্বিত বলে মনে হচ্ছে।' তিনি বলেনঃ হ, অমুক ব্যক্তির উপর আমার কিছু ঋণ ছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। ঋণ আদায়ের জন্যে আমি তার বাড়ীতে গমন করি। সালাম দিয়ে সে বাড়ীতে আছে কি-না জিজ্ঞেস করি। বাড়ীতে নেই' এই উত্তর আসে। ঘটনাক্রমে তার ছোট ছেলে বাইরে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তোমার আব্বা কোথায় রয়েছে: সে বলেঃ আপনার শব্দ শুনে তিনি খাটের নীচে লুকিয়ে গেছেন। আমি আবার ডাক দেই এবং বলিঃ তুমি যে ভিতরে রয়েছে তা আমি জানতে পেরেছি। সুতরাং লুকিয়ে থেকো না বরং এসে উত্তর দাও।' সে আসে আমি বলিঃ ‘লুকিয়ে ছিলে কেন:' সে বলেঃ “আমার নিকট এখন অর্থ নেই। সুতরাং সাক্ষাৎ করলে হয় আমাকে মিথ্যা ওজর পেশ করতে হবে, না হয় মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হবে। তাই আমি আপনার সামনে আসতে লজ্জাবোধ করছিলাম। আপনি আল্লাহর রাসূলের (সঃ) সাহাবী। সুতরাং আপনাকে মিথ্যা কথা কি করে বলি:' আমি বলিঃ তুমি আল্লাহর শপথ করে বলছো যে, তোমার নিকট অর্থ নেই:' সে বলে-হা, আল্লাহর কসম! আমার নিকট কোন অর্থ নেই।' তিনবার আমি তাকে শপথ করিয়ে নেই, সে তিনবারই শপথ করে। আমি খাতা হতে তার নাম কাটিয়ে নেই এবং ঋণের অর্থ পরিশোধ’ লিখে নেই। অতঃপর তাকে বলিঃ “যাও, তোমার নাম হতে এই অংক কেটে দিলাম। এরপর যদি অর্থ পেয়ে যাও তবে আমার এই ঋণ পরিশোধ করে | দেবে, নচেৎ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। জেনে রেখো, আমার এই চক্ষু যুগল। দেখেছে, আমার এই কর্ণদ্বয় শুনেছে এবং আমার অন্তঃকরণ বেশ মনে রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের ছায়ায় স্থান দেবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করেন। মাটির দিকে মুখ করে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিঃস্বের পথ সহজ করবে বা তাকে ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে নরকের প্রখরতা হতে রক্ষা করবেন। জেনে রেখো যে, বেহেশতের কাজ দুঃখজনক ও প্রবৃত্তির প্রতিকূল এবং নরকের কাজ সহজ ও প্রবৃত্তির অনুকূল। ঐ লোকেরাই পুণ্যবান যারা ফিতনা ও গণ্ডগোল হতে দূরে থাকে। মানুষ ক্রোধের যে চুমুক পান করে নেয় ঐ চুমুক আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। যারা এই রূপ করে তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলা ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।তাবরানীর হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন দরিদ্র ব্যক্তির উপর দয়া প্রদর্শন করতঃ স্বীয় ঋণ আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে তার পাপের জন্যে ধরেন না, শেষ পর্যন্ত সে তাওবা করে। অতপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার লয় ও ক্ষয়, মালের ধ্বংসশীলতা, পরকালের আগমন, আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন, আল্লাহ্ তা'আলাকে নিজেদের কাজের হিসাব। প্রদান এবং সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রাপ্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও তাঁর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।এও বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের এটাই সর্বশেষ আয়াত। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র নয় দিন জীবিত ছিলেন। এবং রবিউল আওয়াল মাসের ২রা তারিখ সোমবার দিন তিনি এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) একটি বর্ণনায় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একত্রিশ দিন জীবিত থাকার কথাও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ পূর্ববর্তী মনীষীদের উক্তি এই যে, এর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয় দিন জীবিত ছিলেন। শনিবার হতে আরম্ভ হয় এবং তিনি সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মোটকথা, কুরআন মাজীদের মধ্যে সর্বশেষ এই আয়াতটিই অবতীর্ণ হয়।

আল-বাকারা 2:282

কুরআন কারীমের মধ্যে এই আয়াতটি সবচেয়ে বড় আয়াত। হযরত সাইদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) বলেনঃ “আমার নিকট এই সংবাদ পৌছেছে যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে আরশের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা নতুন আয়াত ঋণের এই আয়াতটিই। আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত আদমই (আঃ) অস্বীকারকারী। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত বুলিয়ে দেন। ফলে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাই বেরিয়ে আসে। হযরত আদম (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে স্বচক্ষে দেখতে পান। একজনকে অত্যন্ত হৃষ্ট পুষ্ট ও ঔজ্জ্বল্যময় দেখে জিজ্ঞেস করেন“হে আল্লাহ! এর নাম কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা তোমার সন্তান দাউদ (আঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ 'তার বয়স কত: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ষাট বছর।' তিনি বলেনঃ তার বয়স তার কিছুদিন বাড়িয়ে দিন! আল্লাহ, তাআলা বলেন-না, তা হবে না। তবে তুমি যদি তোমার বয়সের মধ্য হতে তাকে কিছু দিতে চাও তবে দিতে পার। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আমার বয়সের মধ্য হতে চল্লিশ বছর তাকে দেয়া হোক। সুতরাং তা দেয়া হয়। হযরত আদম (আঃ) এর প্রকৃত বয়স ছিল এক হাজার বছর। বয়সের এই আদান -প্রদান লিখে নেয়া হয় এবং ফেরেশতাদেরকে ওর উপর সাক্ষী রাখা হয়। হযরত আদমের (আঃ)-মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আমার বয়সের এখনও তো চল্লিশ বছর অবশিষ্ট রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন বলেনঃ “তুমি তোমার সন্তান দাউদ (আঃ)-কে চল্লিশ বছর দান করেছে। হযরত আদম (আঃ) তা অস্বীকার করেন। তখন তাঁকে ঐ লিখা দেখানো হয় এবং ফেরেশতাগণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স এক হাজার বছর পূর্ণ করেছিলেন। এবং হযরত দাউদ (আঃ) এর বয়স করেছিলেন একশো বছর। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কিন্তু এই হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এর একজন বর্ণনাকারী আলী বিন যায়েদ বিন জাদআন হতে বর্ণিত হাদীসগুলো অগ্রাহ্য হয়ে থাকে। মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন-আদান-প্রদান লিখে রাখে, তা হলে ঋণের পরিমাণ ও নির্ধারিত সময়ের ব্যাপারে কোন গণ্ডগোল সৃষ্টি হবে না। এতে সাক্ষীরাও ভুল করবে না। এর দ্বারা ঋণের জন্যে একটি সময় নির্ধারিত করার বৈধতাও সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ ‘সময় নির্ধারণ করে ঋণ আদান-প্রদানের অনুমতি এই আয়াত দ্বারা সুন্দরভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে। যে, “মদীনাবাসীদের ঋণ অদান-প্রদান দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন,-“তোমরা মাপ বা ওজন নির্ধারণ করবে, দর চুকিয়ে নেবে এবং সময়েরও ফায়সালা করে নেবে”। কুরআন কারীমে নির্দেশ হচ্ছে-‘তোমরা লিখে রাখ। আর হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নিরক্ষর উম্মত, না আমরা লিখতে জানি, না হিসাব জানি।” এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য এইভাবে যে, ধর্মীয় জিজ্ঞাস্য বিষয়াবলী এবং শরীয়তের বিধানসমূহ লিখার মমাটেই প্রয়োজন নেই। স্বয়ং মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এগুলো অত্যন্ত সহজ করে দেয়া হয়েছে। কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফে মুখস্থ রাখা মানুষের জন্যে প্রকৃতিগতভাবেই সহজ। কিন্তু ইহলৌকিক ছোট খাট আদান-প্রদান ও ধার-কর্জের বিষয়গুলো অবশ্যই লিখে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এটাও স্মরণ রাখবার বিষয় যে, এই নির্দেশ ফরযের জন্যে নয়। সুতরাং না লিখা ধর্মীয় কার্যে এবং লিখে রাখা সাংসারিক কার্যে প্রযোজ্য। কেউ কেউ এই লিখে রাখাকে ফরযও বলেছেন। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেছেন, যে ধার দেবে সে লিখে রাখবে এবং যে বিক্রি করবে সে সাক্ষী রাখবে। হযরত আবূ সুলাইমান মিরআশী (রঃ) বহুদিন হযরত কা'বের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তিনি একদা তাঁর পার্শ্ববর্তী লোকদের বলেন-ঐ অত্যাচারিত ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে অথচ তার প্রার্থনা গ্রহণীয় হয় না, তোমরা তার পরিচয় জান কি: তারা বলে-এটা কিরূপে: তিনি বলেন, এটা ঐ ব্যক্তি যে ব্যক্তি একটা নির্ধারিত সময়ের জন্যে ধার দেয় কিন্তু সাক্ষীও রাখে না বা লিখেও রাখে না। অতঃপর নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে তাগাদা শুরু করে এবং ঋণী ব্যক্তি তা অস্বীকার করে। তখন এই লোকটি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে কিন্তু তার; প্রার্থনা গৃহীত হয় না। কেননা,সে মহান আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত করেছে। সুতরাং সে তাঁর অবাধ্য হয়েছে। হযরত আবু সাঈদ (রঃ), শাবী (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ), ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমূখের উক্তি এই যে, এইভাবে লিখে পড়ে রাখার কাজটি প্রথমে অবশ্যকরণীয় কাজ ছিল। কিন্তু পরে তা রহিত হয়ে যায়। পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি)অর্থাৎ যদি তোমাদের একের অপরের প্রতি আস্থা থাকে তবে যার নিকট তার আমানত রাখা হবে তা যেন সে আদায় করে দেয় (২:২৮৩)। ওর দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটি। এই ঘটনাটি পূর্ব যুগীয় উম্মতের হলেও তাদের শরীয়তই আমাদের শরীয়ত, যদি আমাদের শরীয়ত তা অস্বীকার না করে। যে ঘটনা আমরা এখন বর্ণনা করতে যাচ্ছি তাতে লিখা পড়া না হওয়া এবং সাক্ষী ঠিক না রাখাকে আইন রচয়িতা (সঃ) অস্বীকার করেননি। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বানী ইসরাঈলের একটি লোক অন্য একটি লোকের নিকট এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার চায়। সে বলেঃ ‘সাক্ষী আন। সে বলেঃ ‘আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' সে বলেঃ জামানত আন।' সে বলে “আল্লাহ পাকের জামানতই যথেষ্ট। তথন ঋণ দাতা লোকটিকে বলেঃ তুমি সত্যই বলছো।' অতঃপর ঋণ আদায়ের সময় নির্ধারিত হয় এবং সে তাকে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা গুনে দেয়। এরপর ঋণ গ্রহীতা লোকটি সামুদ্রিক ভ্রমণে বের হয় এবং নিজের কাজ হতে অবকাশ লাভ করে। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেলে সে সমুদ্রের তীরে আগমন করে। তার ইচ্ছে এই যে, কোন জাহাজ আসলে তাতে উঠে বাড়ী চলে আসবে এবং ঐ লোকটির ঋণ পরিশোধ করে দেবে। কিন্তু কোন জাহাজ পেলো না। এখন সে দেখলো যে, সে সময় মত পৌছতে পারবে না। তখন সে একখানা কাঠ নিয়ে খোদিত করলো এবং তাতে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা রেখে দিলো ও এক টুকরো কাগজও রাখলো। অতঃপর ওর মুখ বন্ধ করে দিলো এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলো, | হে প্রভু! আপনি খুব ভাল জানেন যে, আমি অমুক ব্যক্তির নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ধার করেছি। সে আমার নিকট জামানত চাইলে আমি আপনাকেই জামিন দেই এবং তাতে সে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। সে সাক্ষী উপস্থিত করতে বললে আমি আপনাকেই সাক্ষী রাখি। সে তাতেও সন্তুষ্ট হয়ে যায়। এখন যখন সময় শেষ হতে চলেছে তখন আমি সদা নৌকা অনুসন্ধান করতে থাকি যে, নৌকা যোগে বাড়ী গিয়ে কর্জ পরিশোধ করবো। কিন্তু কোন নৌকা পাওয়া যায়নি। এখন আমি সেই অংক আপনাকেই সমর্পণ করছি এবং সমুদ্রে নিক্ষেপ করছি ও প্রার্থনা করছি যে,আপনি এই মুদ্রা তার নিকট পৌছিয়ে দিন। অতঃপর সে ঐ কাঠটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে এবং নিজে চলে আসে। কিন্তু তবুও সে নৌকার খোজেই থাকে যে, নৌকা পেলে চলে যাবে। এখানে তো এই হলো। আর ওখানে যে ব্যক্তি তাকে ঋণ দিয়েছিলো সে যখন দেখলো যে, সময় হয়ে গেছে এবং আজ তার যাওয়া উচিত। কাজেই সেও সমুদ্রের ধারে আসে যে ঐ ঋণ গ্রহীতা আসবে এবং তাকে তার ঋণ পরিশোধ করবে কিংবা কারও হাতে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু যখন সন্ধ্যা হয়ে গেল কোন নৌকা এলো না তখন সে ফিরে আসার মনস্থ করলো। সমুদ্রের ধারে একটি কাঠ দেখে মনে করলো, বাড়ী তো খালি হাতেই যাচ্ছি কাঠটি নিয়ে যাই। একে ফেড়ে শুকিয়ে জ্বালানি কাঠ রূপে ব্যবহার করা যাবে। বাড়ী পৌছে কাঠটিকে কাড়া মাত্রই ঝন ঝন করে বেজে উঠে স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে আসে। গণনা করে দেখে যে, পুরো এক হাজারই রয়েছে। তথায় কাগজ খণ্ডের উপর দৃষ্টি পড়ে। ওটা উঠিয়ে পড়ে নেয়। অতঃপর একদিন ঐ লোকটিই এসে এক হাজার দীনার পেশ করতঃ বলে-“আপনার প্রাপ্য মুদ্রা গ্রহণ করুন এবং আমাকে ক্ষমা করুন। আমি সদা অঙ্গীকার ভঙ্গ না করার চেষ্টা করেছি। নৌকা না পাওয়ার কারণে বিলম্ব করতে বাধ্য হয়েছি। আজ নৌকা পাওয়ায় মুদ্রা নিয়ে আপনার নিকট উপস্থিত হয়েছি।' তখন ঐ ঋণ দাতা লোকটি বলে আপনি আমার প্রাপ্য পাঠিয়েও দিয়েছিলেন কি: সে বলে, “আমি তো বলেই দিয়েছি যে, আমি নৌকা পাইনি।' সে বলে, “আপনি আপনার অর্থ নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যান। আপনি মহান আল্লাহর উপর নির্ভর করতঃ কাঠের মধ্যে ভরে যে মুদ্রা নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন তা আল্লাহ আমার নিকট পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং আমি আমার পূর্ণ প্রাপ্য পেয়েছি। এই হাদীসের সনদ সম্পূর্ণ সঠিক। সহীহ বুখারীর মধ্যে সাত জায়গায় এই হাদীসটি এসেছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, লেখক যেন ন্যায় ও সত্যের সঙ্গে লিখে। লিখার ব্যাপারে যেন কোন দলের উপর অত্যাচার না করে, এদিকে ওদিকে কিছু কম বেশী না করে। বরং আদান-প্রদানকারী একমত হয়ে যা তাকে লিখতে বলবে ঠিক তাই যেন সে লিখে দেয়। যেমন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ রয়েছে যে, তিনি তাকে লিখা-পড়া শিখিয়েছেন, তেমনই যারা লিখা-পড়া জানে না সেও যেন তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করতঃ তাদের আদান প্রদান ঠিকভাবে লিখে দেয়। হাদীস শরীফে এসেছেঃ কোন কার্যরত ব্যক্তিকে সাহায্য করা এবং কোন পতিত ব্যক্তির কাজ করে দেয়াও সাদকা। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বিদ্যা জেনে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত আতা (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ধারা অনুসারে লিখে দেয়া লেখকের উপর ওয়াজিব।” লিখিয়ে নেয়ার দায়িত্ব যার উপর রয়েছে সে যেন হক ও সত্যের সঙ্গে লিখিয়ে নেয় এবং আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতঃ যেন বেশী-কম না করেও বিশ্বাসঘাতকতা না করে। যদি এই লোকটি অবুঝ হয়, দুর্বল হয়, নাবালক হয়, জ্ঞান ঠিক না থাকে কিংবা নির্বুদ্ধিতার কারণে লিখিয়ে নিতে অসমর্থ হয়, তবে তার অভিভাবক ও বড় মানুষ লিখিয়ে নেবে। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, লিখার সাথে সাথে সাক্ষ্যও হতে হবে, যেন এই আদান-প্রদানের ব্যাপারটি খুবই শক্ত ও পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা দু’জন পুরুষ লোককে সাক্ষী করবে। যদি দু’জন পুরুষ পাওয়া যায় তবে একজন পুরুষ ও দুজন স্ত্রী হলেও চলবে। এই নির্দেশ ধন-সম্পদের ব্যাপারে এবং সম্পদের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে রয়েছে। স্ত্রী লোকের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেই দু'জন স্ত্রী লোককে একজন পুরুষের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। যেমন সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হে স্ত্রী লোকেরা! তোমরা দান-খয়রাত কর এবং খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আমি জাহান্নামে তোমাদেরই সংখ্যা বেশী দেখেছি। একজন স্ত্রী লোক বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর কারণ কি:' তিনি বলেন, ‘তোমরা খুব বেশী অভিশাপ দিয়ে থাক এবং তোমাদের স্বামীদের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। তোমাদের জ্ঞান ও দ্বীনের স্বল্পতা সত্ত্বেও পুরুষদের জ্ঞান হরণকারিণী তোমাদের অপেক্ষা বেশী আর কেউ নেই।' সে পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “দ্বীন ও জ্ঞানের স্বল্পতা কিরূপে: তিনি উত্তরে বলেন, জ্ঞানের স্বল্পতা তো এর দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছে যে, দু’জন স্ত্রী লোকের সাক্ষ্য একজন পুরুষ লোকের সাক্ষ্যের সমান আর দ্বীনের স্বল্পতা এই যে, তোমাদের ঋতুর অবস্থায় তোমরা নামায পড় না ও রোযা কাযা করে থাকি। সাক্ষীদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তাদের ন্যায়পরায়ণ হওয়া শর্ত। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে যেখানেই সাক্ষীদের বর্ণনা রয়েছে, সেখানে শব্দে না থাকলেও ভাবার্থে ন্যায়পরায়ণতার শর্ত অবশ্যই রয়েছে। যারা ন্যায়পরায়ণ নয় তাদের সাক্ষ্য যারা প্রত্যাখ্যান করেছেন, এই আয়াতটিই তাদের দলীল। তারা বলেন যে, সাক্ষীগণকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ। হতে হবে। দু’জন স্ত্রী লোক নির্ধারণ করারও দূরদর্শিতা বর্ণনা করা হয়েছে যে, যদি একজন ভুলে যায় তবে অপরজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। ফাতুজাক্কিরা শব্দটি অন্য পঠনে ফাতুজাকিরুও রয়েছে। যারা বলেন যে, একজন স্ত্রীর সাক্ষ্য অন্য স্ত্রীর সাক্ষ্যের সাথে মিলে যায় তখন তা পুরুষ লোকের সাক্ষ্যের মতই হয়ে যায়, এটা তাঁদের মন গড়া কথা। প্রথম উক্তিটিই সঠিক। বলা হচ্ছে, সাক্ষীদেরকে ডাকা হলে তারা যেন অস্বীকার না করে অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হবে তোমরা এসো ও সাক্ষ্য প্রদান কর, তখন তারা যেন অস্বীকৃতি জ্ঞাপন না করে। যেমন লেখকদের ব্যাপারেও এটাই বলা হয়েছে। এখান থেকে এই উপকারও লাভ করা যাচ্ছে যে, সাক্ষী থাকা ফরযে কেফায়া। ‘জমহূরের মাযহাব এটাই' এ কথাও বলা হয়েছে। এই অর্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন। সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে ডাক দেয়া হবে অর্থাৎ যখন তাদেরকে ঘটনা জিজ্ঞেস করা হবে তখন যেন তারা সাক্ষ্য দেয়ার কাজ হতে বিরত না, থাকে। হযরত আবু মুজাল্লা (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেন যে, যখন সাক্ষী হওয়ার জন্য কাউকে ডাকা হবে তখন তার সাক্ষী হওয়ার বা না হওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সাক্ষী হয়ে যাওয়ার পর সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে আহবান করা হলে অবশ্যই যেতে হবে। সহীহ মুসলিম ও সুনানের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'উত্তম সাক্ষী তারাই যারা সাক্ষ্য না চাইতেই সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, ‘জঘন্যতম সাক্ষী তারাই যাদের নিকট সাক্ষ্য না চাইতেই সাক্ষ্য দিয়ে থাকে এবং সেই হাদীসটি-র মধ্যে রয়েছে যে, এমন লোক আসবে যাদের শপথ সাক্ষ্যের উপর ও সাক্ষ্য শপথের উপর অগ্রে অগ্র থাকবে তাতে জানা যাচ্ছে যে, এইসব নিন্দে সূচক কথা মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারী সম্বন্ধেই বলা হয়েছে এবং উপরের ঐ প্রশংসামূলক কথা সত্য সাক্ষ্য প্রদানকারী সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এইভাবেই এই পরস্পর বিরোধী হাদীসগুলোর মধ্যে অনুরূপতা দান করা হবে। এই হাদীসসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন, ‘সাক্ষ্য দিতে ও সাক্ষী হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা উচিত নয়। এই দু'টোই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।'অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, বিষয় বড়ই হোক আর ছোটই হোক, সময়ের মেয়াদ ইত্যাদি লিখে নাও। আমার এই নির্দেশ ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী এবং সাক্ষ্যের সঠিকতা সাব্যস্তকারী।' কেননা,নিজের লিখা দেখে বিস্মৃত কথাও স্মরণ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে লিখা না থাকলে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয়ে থাকে। লিখা থাকলে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে কেননা, মতানৈক্যের সময় লিখা দেখে নিঃসন্দেহে মীমাংসা করা যেতে পারে।এরপর বলা হচ্ছে যে, যদি নগদ ক্রয়-বিক্রয় হয় তবে বিবাদের কোন সম্ভাবনা নেই বলে না লিখলেও কোন দোষ নেই। এখন রইলো সাক্ষ্য। এই ব্যাপারে হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) বলেন যে, ধার হোক আর নগদই হোক সর্বাবস্থাতেই সাক্ষী রাখতে হবে। অন্যান্য মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এই কথা বলে আল্লাহ তা'আলা সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশও উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, জমহরের মতে এই নির্দেশ ওয়াজিবের জন্যে নয়, বরং এর মধ্যে মঙ্গল নিহিত আছে বলে মুস্তাহাব হিসেবে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটি যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্রয়-বিক্রয় করেছেন কিন্তু সাক্ষী রাখেননি। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন বেদুঈনের নিকট হতে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন। বেদুঈন মূল্য। নেয়ার উদ্দেশ্যে তার পিছনে পিছনে তার বাড়ীর দিকে আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব দ্রুত চলছিলেন এবং বেদুঈনটি ধীরে ধীরে চলছিল। ঘোড়াটি যে বিক্রি হয়ে গেছে এ সংবাদ জনগণ জানতো না বলে তারা ঐ ঘোড়ার দাম করতে থাকে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘোড়াটি যে দামে বিক্রি করেছিল তার চেয়ে বেশী দাম লেগে যায়। বেদুঈন নিয়্যত পরিবর্তন করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডাক দিয়ে বলে- জনাব, আপনি হয় ঘোড়াটি ক্রয় করুন, না হয় আমি অন্যের হাতে বিক্রি করে দেই।' একথা শুনে নবী (সঃ) থেমে যান এবং বলেন-“তুমি তো ঘোড়াটি আমার হাতে বিক্রি করেই ফেলেছো; সুতরাং এখন আবার কি বলছো:’ বেদুঈনটি তখন বলে, “আল্লাহর শপথ! আমি বিক্রি করিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তোমার ও আমার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়ে গেছে। এখন এদিক ওদিক থেকে তোক একথা ওকথা বলতে থাকে। ঐ নির্বোধ তখন বলে, আমি আপনার নিকট বিক্রি করেছি তার সাক্ষী আনয়ন করুন। মুসলমানগণ তাকে বারবার বলে, ওরে হতভাগা! তিনি তো আল্লাহর রাসূল, তার মুখ দিয়ে ততা সত্য কথাই বের হয়। কিন্তু তার এই একই কথা-সাক্ষ্য আনয়ন করুন। এমন সময় হযরত খুযাইমা (রাঃ) এসে পড়েন এবং বেদুঈনের কথা শুনে বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে ঘোড়াটি বিক্রি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন, তুমি কি করে সাক্ষ্য দিচ্ছ: তিনি বলেন, আপনার সত্যবাদিতার উপর ভিত্তি করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আজ খুযাইমার (রাঃ) সাক্ষ্য দু'জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সমান। সুতরাং এই হাদীস দ্বারা ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা প্রমাণিত হয় না। কিন্তু মঙ্গল ওর মধ্যেই রয়েছে যে, ব্যবসা বাণিজ্যেরও সাক্ষী রাখতে হবে। কেননা, তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যে রয়েছে, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে; কিন্তু তাদের প্রার্থনা কবুল হয়। প্রথম ঐ ব্যক্তি যার ঘরে দুশ্চরিত্রা স্ত্রী রয়েছে অথচ সে তাকে পরিত্যাগ করে না। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে পিতৃহীনকে তার মাল তার প্রাপ্ত বয়সের পূর্বেই সমর্পণ করে। তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যে কাউকে মাল ধার দেয় কিন্তু সাক্ষী রাখে না। ইমাম হাকিম (রঃ) হাদীসটিকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তের উপর সহীহ বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটিকে তাঁদের কিতাবে আনেননি। তার কারণ এই যে, হযরত শু'বার (রঃ) শিষ্য এই বর্ণনাটিকে হযরত আবু মূসা আশআরীর (রাঃ) উপর মাওকুফ বলে থাকেন। অর্থাৎ সনদ নবী (সঃ) পর্যন্ত পৌছেনি। এর পর বলা হচ্ছে যে, যা লিখিয়ে নিচ্ছে লেখক যেন তার বিপরীত কথা না লিখে। অনুরূপভাবে সাক্ষীরও উচিত যে, সে যেন মূল ঘটনার উল্টো সাক্ষ্য না দেয় বা যেন সাক্ষ্য প্রদানে কার্পণ্য না করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর এটাই উক্তি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই দু’জনকে কষ্ট দেয়া হবে না’ এর ভাবার্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, যেমন কেউ তাদেরকে ডাকতে গেল। সেই সময় তারা তাদের কাজকর্মে লিপ্ত রয়েছে। এই লোকটি তাদেরকে বলে ঐ কাজ দু’টো সম্পাদন করা তোমাদের উপর ফরয। সুতরাং নিজেদের ক্ষতি করে তথায় তোমাদেরকে অবশ্যই যেতে হবে।' এ কথা তাদেরকে বলার অধিকার তার নেই। অন্যান্য বহু মনীষী হতেও এটাই বর্ণিত আছে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি যা করতে নিষেধ করি তা করা এবং যা করতে বলি তা হতে বিরত থাকা চরম অন্যায়। এর শাস্তি তোমাদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।' এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করতঃ তাঁকে ভয় করে চল, তাঁর আদেশ পালন কর এবং তাঁর নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ইমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে চল তবে তিনি তোমাদেরকে দলীল প্রদান করবেন। (৮:২৯) অন্য স্থানে রয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস রেখো, তিনি তোমাদেরকে দ্বিগুণ করুণা দান করবেন এবং তোমাদেরকে এমন নূর দান করবেন যার ঔজ্জ্বল্যে তোমরা চলতে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন ‘কার্যসমূহের পরিণাম এবং গূঢ় রহস্য সম্পর্কে, ঐগুলোর মঙ্গল ও দূরদর্শিতা সম্পর্কে আল্লাহ সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছেন। কোন কিছুই তার দৃষ্টির অন্তরালে নেই; তার জ্ঞান সারা জগৎকে ঘিরে রয়েছে এবং প্রত্যেক জিনিসেরই প্রকৃত জ্ঞান তার রয়েছে।

আল-বাকারা 2:283

অর্থাৎ বিদেশে যদি ধারের আদান-প্রদান হয় এবং কোন লেখক পাওয়া না যায় অথবা কলম, কালি, কাগজ ইত্যাদি না থাকে তবে বন্ধক রাখো এবং যে জিনিস বন্ধক রাখবে তা ঋণ দাতার অধিকারে দিয়ে দাও। (আরবি) শব্দ দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, বন্ধক যে পর্যন্ত অধিকারে না আসবে সেই পর্যন্ত তা অপরিহার্য হবে না। এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও জমহূরের মাযহাব। অন্য দল এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করেছে তার হাতেই বন্ধকের জিনিস রাখা জরুরী। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং অন্য একটি দল হতে এটাই নকল করা হয়েছে। অন্য একটি দলের উক্তি এই যে, শরীয়তে শুধুমাত্র সফরের জন্যেই বন্ধকের বিধান রয়েছে। যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুনিয়া হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন তখন তাঁর লৌহ বর্মটিআবুশ শাহাম নামক একজন ইয়াহূদীর নিকট তিন ‘ওয়াসাক’ যবের বিনিময়ে বন্ধক ছিল, যে যব তিনি স্বীয় পরিবারের খাবারের জন্যে গ্রহণ করেছিলেন। এইসব জিজ্ঞাস্য বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা তাফসীর নয়। বরং তার জন্যে বড় বড় আহকামের কিতাব রয়েছে। এর পরবর্তী বাক্য।(আরবি) দ্বারা পূর্বের নির্দেশ রহিত হয়েছে। শাবী। (রঃ) বলেন যে, যখন না দেয়ার ভয় থাকবে না তখন লিখে না রাখলে বা সাক্ষী রাখলে কোন দোষ নেই।যার নিকট কিছু গচ্ছিত রাখা হবে তার আল্লাহকে ভয় করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “হাতের উপরে রয়েছে যা তুমি গ্রহণ করেছো যে পর্যন্ত না তুমি আদায় কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, সাক্ষ্য গোপন করো না, বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তা প্রকাশ করা হতে বিরত হয়ো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং সাক্ষ্যকে গোপন করা বড় পাপ (কবিরা গুনাহ)। এখানেও বলা হচ্ছে যে, সাক্ষ্য গোপনকারীর মন পাপাচারী। অন্যস্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আমরা আল্লাহর সাক্ষ্য গোপন করি না, এবং যদি আমরা এরূপ করি তবে নিশ্চয় আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। (৫:১০৬) অন্যত্র রয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে আল্লাহর উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতিকূলে হয়; যদি সে ধনী হয় বা দরিদ্র হয় তবে আল্লাহ তাদের অপেক্ষা উত্তম, অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও বা এড়িয়ে চল তবে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত রয়েছেন। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, সাক্ষ্য গোপনকারীর অন্তর পাপাচারী এবং আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক জ্ঞাতা।'

আল-বাকারা 2:284

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের একচ্ছত্র অধিপতি। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, গোপনীয় বিষয়সমূহের হিসাব গ্রহণকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘বল তোমাদের অন্তরে যা কিছু রয়েছে তা তোমরা গোপনই রাখ বা প্রকাশ কর,আল্লাহ তা জানেন। (৩:২৯) অন্য স্থানে রয়েছে, তিনি গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয়সমূহ খুব ভাল জানেন। এই অর্থ সম্বলিত আরও বহু আয়াত রয়েছে। এখানে ওর সাথে এটাও বলেছেন যে,তিনি তার হিসার গ্রহণ করবেন। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে সাহাবীদের (রাঃ) উপর এটা খুব কঠিন বোধ হয় যে, ছোট বড় সমস্ত জিনিসের আল্লাহ তা'আলা হিসাব গ্রহণ করবেন। সুতরাং তাদের ঈমানের দৃঢ়তার কারণে তারা কম্পিত হন। তাই তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে জানুর ভরে বসে পড়েন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে নামায, রোযা, জিহাদ এবং দানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা আমাদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে; কিন্তু এখন যে আয়াত অবতীর্ণ হলো তা পালন করার শক্তি আমাদের নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমরা কি ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের মত বলতে চাও যে, আমরা শুনলাম ও মানলাম না: তোমাদের বলা উচিত, আমরা শুনলাম ও মানলাম। হে আল্লাহ, আমরা আপনার দান কামনা করছি। হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে তো আপনার নিকটই ফিরে যেতে হবে। অতঃপর সাহাবীগণ (রাঃ) একথা মেনে নেন এবং তাঁদের মুখে নবীর (সঃ) শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো উচ্চারিত হতে থাকে। তখন (আরবি) অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ তা'আলা ঐ কষ্ট দূর করে দেন এবং (আরবি) অবতীর্ণ করেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা এই কষ্ট উঠিয়ে দিয়ে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন এবং যখন মুসলমানেরা বলে, “হে আল্লাহ! আমাদের ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যে আমাদেরকে ধরবেন না।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন(আরবি) অর্থাৎ হ্যাঁ আমি এটাই করবো।' মুসলমানগণ বলেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর ঐ বোঝা চাপাবেন না যে বোঝা আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা কবুল করা হলো।' অতঃপর মুসলমানেরা বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর এমন বোঝা চাপাবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।' এটাও মঞ্জুর হয়। অতঃপর তারা প্রার্থনা করে, হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদের পাপসমূহ মাফ করে দিন, আমাদের উপর দয়া করুন এবং কাফিরদের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন। এটাও আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন। এই হাদীসটি আরও বহু পন্থায় বর্ণিত হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন,আমি হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) নিকট ঘটনা বর্ণনা করি যে, (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) খুবই ক্রন্দন করেছেন। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাহাবীদের (রাঃ) এই অবস্থাই হয়েছিল, তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং তারা এই কথাও বলেছিলেন, ‘অন্তরের মালিক তো আমরা নই। সুতরাং অন্তরের ধারণার জন্যেও যদি আমাদেরকে ধরা হয় তবে তো খুব কঠিন হয়ে পড়বে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, (আরবি) বল।' সাহাবীগণ এই কথাই বলেন। অতপর পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, কার্যাবলীর জন্যে ধরা হবে বটে; কিন্তু মনের ধারণা ও সংশয়ের জন্যে ধরা হবে না। অন্য ধারাতে এই বর্ণনাটি ইবনে মারজানা (রঃ) হতেও এইভাবে বর্ণিত আছে। তাতে এও রয়েছে, কুরআন ফায়সালা করে দিয়েছে যে, তোমাদেরকে তোমাদের সৎ ও অসৎ কার্যের উপর ধরা হবে, তা মুখের দ্বারাই হোক, বা অন্য অঙ্গের দ্বারাই হোক কিন্তু মনের সংশয় ক্ষমা করে দেয়া হলো। আরও বহু সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) দ্বারা এর রহিত হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। সহীহ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের ধারণা ও সংশয় ক্ষমা করেছেন। তারা যা বলবে বা করবে তার উপরেই তাদেরকে ধরা হবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলেন, 'যখন আমার বান্দা খারাপ কাজের ইচ্ছে পোষণ করে তখন তা লিখো না, যে পর্যন্ত না সে করে বসে। যদি করেই ফেলে তবে একটি পাপ লিখ। আর যখন সে সকাজের ইচ্ছে করে তখন শুধু ইচ্ছার জন্যেই একটি পুণ্য লিখো এবং যখন করে ফেলবে তখন একের বিনিময়ে দশটি পুণ্য লিখে নাও। (সহীহ মুসলিম) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে সাতশোটি পুণ্য লিখা হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বান্দা যখন খারাপ কাজের ইচ্ছে করে তখন ফেরেশতা মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করে, হে আল্লাহ! আপনার অমুক বান্দা অসৎ কাজ করতে চায়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘বিরত থাক, যে পর্যন্ত না সে তা করে বসে সেই পর্যন্ত তা আমলনামায় লিখো। যদি করে ফেলে তবে একটি লিখবে। আর যদি ছেড়ে দেয় তবে একটি পুণ্য লিখবে। কেননা, সে আমাকে ভয় করে ছেড়ে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যে খাটি ও পাকা মুসলমান হয়ে যায় তার এক একটি ভাল কাজের পুণ্য দশ হতে সাতশো পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং মন্দ কাজ বৃদ্ধি পায় না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কখনো পূণ্য সাতশো অপেক্ষাও বেশী বৃদ্ধি করা হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ধ্বংস প্রাপ্ত ঐ ব্যক্তি যে এত দয়া ও করুণা সত্ত্বেও ধ্বংস হয়ে থাকে। একদা সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মাঝে মাঝে আমাদের অন্তরে এমন সংশয়ের সৃষ্টি হয়ে থাকে যে, তা মুখে বর্ণনা করাও আমাদের উপর কঠিন হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনে বলেন, এইরূপ পাচ্ছ না-কি: তাঁরা বলেন, জ্বি হা। তিনি বলেন, এটাই স্পষ্ট ঈমান। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি)।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেএটাও বর্ণিত আছে তিনি বলেন, এই আয়াতটি মানসূখ হয়নি। বরং ভাবার্থ এই যে, কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত সৃষ্টজীবকে আল্লাহ তা'আলা একত্রিত করবেন তখন বলবেন, আমি তোমাদের মনের এমন গোপন কথা বলে দিচ্ছি যা আমার ফেরেশতারাও জানে না। মু'মিনদেরকে ঐ কথাগুলো বলে দিয়ে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু মুনাফিক ও সন্দেহ পোষণকারীদেরকে তাদের মনের অবিশ্বাসের কথা বলে দিয়ে পাকড়াও করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘কিন্তু তিনি তোমাদেরকে তোমাদের অন্তরের উপার্জনের জন্যে পাকড়াও করবেন।' (২:২২৫) অর্থাৎ অন্তরের সন্দেহ ও কপটতার জন্যে আল্লাহ তা'আলা ধরবেন। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এটাকে মানসূখ বলেন ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই উক্তিকেই পছন্দ করেন এবং বলেন, হিসাব এক জিনিস এবং শাস্তি অন্য জিনিস। হিসাব গ্রহণের জন্যে শাস্তি জরুরী নয়। হিসাব গ্রহণের পর ক্ষমারও সম্ভাবনা রয়েছে এবং শাস্তির সম্ভবনাও রয়েছে।' হযরত সাফওয়ান বিন মুহাররাম (রঃ) বলেন, আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারের (রাঃ) সঙ্গে বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছিলাম। এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কানা ঘুষা সম্বন্ধে আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে কি শুনেছেন:' তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ তাআলা ঈমানদারকে নিজের পার্শ্বে ডেকে নেবেন, এমন কি স্বীয় বাহু তার উপরে রাখবেন। অতঃপর তাকে বললেন, তুমি কি অমুক অমুক পাপ করেছো:' সে বলবে, হে আল্লাহ! হাঁ,আমি করেছি। দু’বার বলবে। যখন খুব পাপের কথা স্বীকার করবে তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, জেনে রেখো দুনিয়ায় আমি তোমার দোষগুলো গোপন রেখেছিলাম এবং আজ আমি তোমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিলাম।' অতঃপর তার পুণ্যের পুস্তিকা তাকে ডান হাতে দিবেন। তবে অবশই কাফির ও মুনাফিকদেরকে জনমণ্ডলীর সামনে লাঞ্ছিত ও অপমাণিত করা হবে এবং তাদের পাপগুলো প্রকাশ করে দেয়া হবে। অতঃপর বলা হবে, এই লোকগুলো তারাই যারা তাদের প্রভুর উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল। ঐ অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। একবার হযরত যায়েদ (রাঃ) হযরত আয়েশাকে (রাঃ) এই আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ 'যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলাম তখন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন লোক আমাকে এই আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেনি। তুমি আজ জিজ্ঞেস করলে। তাহলে জেনে রেখো যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে--বান্দার উপর ইহলৌকিক কষ্ট। যেমন, তাদের জ্বর-জ্বালা ইত্যাদি হয়ে থাকে, এমনকি মনে কর একটি লোক তার জামার একটি পকেটে কিছু টাকা রেখেছে এবং তার ধারণা হয়েছে। যে, টাকা অন্য পকেটে রয়েছে। কিন্তু ঐ পকেটে হাত ভরে দেখে টাকা নেই। তখন সে মনে ব্যাথা পেয়েছে, অতঃপর অন্য পকেটে হাত ভরে দেখে যে, টাকা। রয়েছে। এই জন্যেও তার পাপ মোচন হয়ে থাকে। এমনকি সে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত পাপ হতে এমনভাবে বেরিয়ে যায় যেমন খাটি লাল সোনা বেরিয়ে থাকে। (তিরমিযী ইত্যাদি) এই হাদীসটি গরীব।

আল-বাকারা 2:285

২৮৫-২৮৬ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াত দু'টির ফযীলতের বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াত দু'টি রাত্রে পাঠ করবে তার জন্যে এ দু'টোই যথেষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াত দু'টি আমাকে আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। আমার পূর্বে কোন নবীকে এ দু'টো দেয়া হয়নি।' সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে। মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি সপ্তম আকাশে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছেন,যে জিনিস আকাশের দিকে উঠে যায় তা এই স্থান পর্যন্ত পৌছে থাকে ও এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয় এবং যে জিনিস উপর থেকে নেমে আসে ওটাও এখন পর্যন্তই পৌছে থাকে। অতঃপর এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয়। ঐ স্থানটিকে সোনার ফড়িং ঢেকে রেখেছিল। তথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনটি জিনিস দেয়া হয়-(১) পাঁচ ওয়াক্ত নামায। (২) সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং (৩) একত্ববাদীদের সমস্ত পাপের ক্ষমা। মুসনাদ -ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উকবা বিন আমির (রাঃ)-কে বলেনঃ সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে থাকবে। আমাকে এ দুটো আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই গ্রন্থেই রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাদেরকে লোকদের উপর তিনটি ফযীলত দেয়া হয়েছে। সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াতগুলো আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। এ দুটো আমার পূর্বে আর কাউকেও দেয়া হয়নি। এবং আমার পরেও আর কাউকেও দেয়া হবে।' ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার জানা নেই যে, ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে এরূপ লোকেদের মধ্যে কেউ আয়াতুল কুরসী এবং সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি না পড়েই শুয়ে যায়। এটা এমন একটি ধনভাণ্ডার যা তোমাদের নবী (সঃ)-কে আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।' জামে তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দু'হাজার বছর পূর্বে একটি কিতাব লিখেছিলেন। যার মধ্যে দু'টি আয়াত অবতীর্ণ করে সূরা-ই-বাকারা শেষ করেন। যেই বাড়ীতে তিন রাত্রি পর্যন্ত এই আয়াত দু’টি পাঠ করা হবে শয়তান সেই বাড়ীর নিকটেও যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। কিন্তু হাকীম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাকের মধ্যে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং আয়াতুল কুরসী পাঠ করতেন তখন তিনি হেসে উঠে বলতেনঃ ‘এই দু'টো রহমানের (আল্লাহর) আরশের নীচের ধন ভাণ্ডার। যখন তিনি (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে।(আরবি) অর্থাৎ মানুষ যা চেষ্টা করেছে তাই তার জন্যে রয়েছে অর্থাৎ নিশ্চয় তার চেষ্টার ফল তাকে সত্বরই দেখানো হবে অর্থাৎ অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। (৫৩:৩৯-৪১) এই আয়াতগুলো পাঠ করতেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী’ আয়াতটি বেরিয়ে যেতো এবং তিনি বিষন্ন হয়ে পড়তেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমাকে সূরা-ই-ফাতিহা এবং সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি আরশের নিম্নদেশ হতে দেয়া হয়েছে এবং মুফাসসাল সূরাগুলো অতিরিক্ত। হযরত ইবনে আব্বাস। (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এবং হযরত জিবরাঈলও (আঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। এমন সময় আকাশ হতে এক ভয়াবহ শব্দ আসে। হ্যরত জিবরাঈল (আঃ) উপরের দিকে চক্ষু উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেল যা আজ পর্যন্ত কোন দিন খুলেনি। তথা হতে এক ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং নবী (সঃ)কে বলেনঃ আপনি সন্তোষ প্রকাশ করুন! আপনাকে ঐ দু’টি নূর দেয়া হচ্ছে যা আপনার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তা হচ্ছে সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি। এগুলোর প্রত্যেকটি অক্ষরের উপর আপনাকে নূর দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম) সুতরাং এই দশটি হাদীসে এই বরকতপূর্ণ আয়াতগুলোর ফযীলত সম্বন্ধে বর্ণিত হলো। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, রাসূল অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর উপর তার প্রভুর পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর তিনি ঈমান এনেছেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি ঈমান আনয়নের পূর্ণ হকদার। অন্যান্য মুমিনগণও ঈমান এনেছে। তারা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ এক। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই। এই মুমিনরা সমস্ত নবীকেই (আঃ) স্বীকার করে। তারা সমস্ত রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, ঐ আসমানী কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে যেগুলো নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তারা নবীদের (আঃ) মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করে না। অর্থাৎ কাউকে মানবে এবং কাউকে মানবে না তা নয়। বরং সকলকেই সত্য বলে স্বীকার করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাঁরা সবাই সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং মানুষকে ন্যায়ের দিকে আহবান করতেন। তবে কোন কোন আহকাম প্রত্যেক নবীর যুগে পরিবর্তিত হতো বটে, এমনকি শেষ পর্যন্ত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়ত সকল শরীয়তকে রহিতকারী হয়ে যায়। নবী (সঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসূল। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর শরীয়ত বাকী থাকবে এবং একটি দল তাঁর অনুসরণও করতে থাকবে। তারা স্বীকারও করে আমরা আল্লাহর কালাম শুনলাম এবং তাঁর নির্দেশাবলী আমরা অবনত মস্তকে স্বীকার করে নিলাম। তারা বললো-“হে আমাদের প্রভু! আপনারই নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আপনারই নিকট আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।' হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে আপনার ও আপনার অনুসারী উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই সুযোগে আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন তা গৃহীত হবে এবং তার নিকট যাঞা করুন যে,তিনি যেন সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট না দেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সামর্থের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না। এটা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ। সাহাবীগণের (রাঃ) মনে যে খটকা এসেছিল এবং আল্লাহ তা'আলা মনের ধারণার জন্যেও যে হিসাব নিবেন তা তাঁদের কাছে যে খুব কঠিন ঠেকেছিল, আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দ্বারা তা নিরসন করেন। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা হিসাব গ্রহণ করবেন বটে, কিন্তু সাধ্যের অতিরিক্ত কার্যের জন্যে তিনি শাস্তি প্রদান করবেন না। কেননা, মনে হঠাৎ কোন ধারণা এসে যাওয়া এটা রোধ করা কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়। বরং হাদীসে তো এটাও এসেছে যে, এরূপ। ধারণাকে খারাপ মনে করাও ঈমানের পরিচায়ক।নিজ নিজ কর্মের ফল সকলকেই ভোগ করতে হবে। ভাল কাজ করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। এবং মন্দ কাজের ফল মন্দ হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তার বান্দাদেরকে প্রার্থনা শিখিয়ে দিচ্ছেন এবং তা কবুল করারও তিনি অঙ্গীকার করছেন। বান্দা প্রার্থনা করছেঃ হে আমাদের প্রভু! যদি আমাদের ভ্রম অথবা ক্রটি হয় তজ্জন্য আমাদেরকে ধরবেন না। অর্থাৎ যদি ভুল বশতঃ কোন নির্দেশ পালনে আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি বা কোন মন্দ কাজ করে থাকি অথবা শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ আমাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে তবে আমাদেরকে তজ্জন্যে। পাকড়াও না করে দয়া করে ক্ষমা করুন। 'ইতিপূর্বে সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই প্রার্থনার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনআমি এটা কবুল করেছি এবং আমি এটাই করেছি।' অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক যে কাজ করিয়ে নেয়া হয় তজ্জন্যেও ক্ষমা রয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।' ‘হে আল্লাহ! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর অজ্রপ গুরুভার অর্পণ করবেন না। আল্লাহ তা'আলা তাদের এই প্রার্থনাও কবুল করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শান্তিপূর্ণ ও সহজ ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।' ‘হে আমাদের প্রভু! যা আমাদের শক্তির অতীত এরূপ কার্যভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না।' হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মনের সংকল্প এবং প্রবৃত্তির উপর বিজয় লাভ। এই প্রার্থনার উত্তরেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন।' অর্থাৎ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন, আমাদের পাপসমূহ মার্জনা করুন, আমাদের অসকার্যাবলী গোপন রাখুন এবং আমাদের উপর সদয় হউন যেন পুনরায় আমাদের দ্বারা আপনার অসন্তুষ্টির কোন কাজ সাধিত না হয়। এ জন্যে মনীষীদের উক্তি রয়েছে যে, পাপীদের জন্যে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। (১) আল্লাহর ক্ষমা যেন সে শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারে। (২) গোপনীয়তা রক্ষা, যেন সে অপমান ও লাঞ্ছনা হতে রক্ষা পায়। (৩) পবিত্রতা লাভ, যেন সে দ্বিতীয় বার পাপ কার্যে লিপ্ত না হয়। এর উপরও আল্লাহ তাআলার মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আপনিই আমাদের সাহায্যকারী, আপনার উপরেই আমাদের ভরসা, আপনার নিকটই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি, আপনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আপনার সাহায্য ছাড়া না আমরা অন্য কারও সাহায্য পেতে পারি, না কোন মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতে পারি। আপনি আমাদেরকে ঐ লোকদের উপর সাহায্য করুন যারা আপনার মনোনীত ধর্মের বিরোধী, যারা আপনার একত্বে বিশ্বাসী নয়, যারা আপনার রাসূলের (সঃ) রিসালাতকে অস্বীকার করে, যারা আপনার ইবাদতে অন্যদেরকে অংশীদার করে; হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে তাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করুন। আল্লাহ তা'আলা এর উত্তরেও বলেনঃ হাঁ, আমি এটাও করলাম।' হযরত মু'আজ (রাঃ) এই আয়াতটি শেষ করে আমীন বলতেন। (ইবনে জারীর) "

আল-বাকারা 2:286

২৮৫-২৮৬ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াত দু'টির ফযীলতের বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াত দু'টি রাত্রে পাঠ করবে তার জন্যে এ দু'টোই যথেষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াত দু'টি আমাকে আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। আমার পূর্বে কোন নবীকে এ দু'টো দেয়া হয়নি।' সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে। মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি সপ্তম আকাশে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছেন,যে জিনিস আকাশের দিকে উঠে যায় তা এই স্থান পর্যন্ত পৌছে থাকে ও এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয় এবং যে জিনিস উপর থেকে নেমে আসে ওটাও এখন পর্যন্তই পৌছে থাকে। অতঃপর এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয়। ঐ স্থানটিকে সোনার ফড়িং ঢেকে রেখেছিল। তথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনটি জিনিস দেয়া হয়-(১) পাঁচ ওয়াক্ত নামায। (২) সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং (৩) একত্ববাদীদের সমস্ত পাপের ক্ষমা। মুসনাদ -ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উকবা বিন আমির (রাঃ)-কে বলেনঃ সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে থাকবে। আমাকে এ দুটো আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই গ্রন্থেই রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাদেরকে লোকদের উপর তিনটি ফযীলত দেয়া হয়েছে। সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াতগুলো আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। এ দুটো আমার পূর্বে আর কাউকেও দেয়া হয়নি। এবং আমার পরেও আর কাউকেও দেয়া হবে।' ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার জানা নেই যে, ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে এরূপ লোকেদের মধ্যে কেউ আয়াতুল কুরসী এবং সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি না পড়েই শুয়ে যায়। এটা এমন একটি ধনভাণ্ডার যা তোমাদের নবী (সঃ)-কে আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।' জামে তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দু'হাজার বছর পূর্বে একটি কিতাব লিখেছিলেন। যার মধ্যে দু'টি আয়াত অবতীর্ণ করে সূরা-ই-বাকারা শেষ করেন। যেই বাড়ীতে তিন রাত্রি পর্যন্ত এই আয়াত দু’টি পাঠ করা হবে শয়তান সেই বাড়ীর নিকটেও যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। কিন্তু হাকীম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাকের মধ্যে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং আয়াতুল কুরসী পাঠ করতেন তখন তিনি হেসে উঠে বলতেনঃ ‘এই দু'টো রহমানের (আল্লাহর) আরশের নীচের ধন ভাণ্ডার। যখন তিনি (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে।(আরবি) অর্থাৎ মানুষ যা চেষ্টা করেছে তাই তার জন্যে রয়েছে অর্থাৎ নিশ্চয় তার চেষ্টার ফল তাকে সত্বরই দেখানো হবে অর্থাৎ অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। (৫৩:৩৯-৪১) এই আয়াতগুলো পাঠ করতেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী’ আয়াতটি বেরিয়ে যেতো এবং তিনি বিষন্ন হয়ে পড়তেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমাকে সূরা-ই-ফাতিহা এবং সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি আরশের নিম্নদেশ হতে দেয়া হয়েছে এবং মুফাসসাল সূরাগুলো অতিরিক্ত। হযরত ইবনে আব্বাস। (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এবং হযরত জিবরাঈলও (আঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। এমন সময় আকাশ হতে এক ভয়াবহ শব্দ আসে। হ্যরত জিবরাঈল (আঃ) উপরের দিকে চক্ষু উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেল যা আজ পর্যন্ত কোন দিন খুলেনি। তথা হতে এক ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং নবী (সঃ)কে বলেনঃ আপনি সন্তোষ প্রকাশ করুন! আপনাকে ঐ দু’টি নূর দেয়া হচ্ছে যা আপনার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তা হচ্ছে সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি। এগুলোর প্রত্যেকটি অক্ষরের উপর আপনাকে নূর দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম) সুতরাং এই দশটি হাদীসে এই বরকতপূর্ণ আয়াতগুলোর ফযীলত সম্বন্ধে বর্ণিত হলো। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, রাসূল অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর উপর তার প্রভুর পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর তিনি ঈমান এনেছেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি ঈমান আনয়নের পূর্ণ হকদার। অন্যান্য মুমিনগণও ঈমান এনেছে। তারা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ এক। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই। এই মুমিনরা সমস্ত নবীকেই (আঃ) স্বীকার করে। তারা সমস্ত রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, ঐ আসমানী কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে যেগুলো নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তারা নবীদের (আঃ) মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করে না। অর্থাৎ কাউকে মানবে এবং কাউকে মানবে না তা নয়। বরং সকলকেই সত্য বলে স্বীকার করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাঁরা সবাই সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং মানুষকে ন্যায়ের দিকে আহবান করতেন। তবে কোন কোন আহকাম প্রত্যেক নবীর যুগে পরিবর্তিত হতো বটে, এমনকি শেষ পর্যন্ত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়ত সকল শরীয়তকে রহিতকারী হয়ে যায়। নবী (সঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসূল। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর শরীয়ত বাকী থাকবে এবং একটি দল তাঁর অনুসরণও করতে থাকবে। তারা স্বীকারও করে আমরা আল্লাহর কালাম শুনলাম এবং তাঁর নির্দেশাবলী আমরা অবনত মস্তকে স্বীকার করে নিলাম। তারা বললো-“হে আমাদের প্রভু! আপনারই নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আপনারই নিকট আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।' হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে আপনার ও আপনার অনুসারী উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই সুযোগে আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন তা গৃহীত হবে এবং তার নিকট যাঞা করুন যে,তিনি যেন সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট না দেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সামর্থের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না। এটা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ। সাহাবীগণের (রাঃ) মনে যে খটকা এসেছিল এবং আল্লাহ তা'আলা মনের ধারণার জন্যেও যে হিসাব নিবেন তা তাঁদের কাছে যে খুব কঠিন ঠেকেছিল, আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দ্বারা তা নিরসন করেন। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা হিসাব গ্রহণ করবেন বটে, কিন্তু সাধ্যের অতিরিক্ত কার্যের জন্যে তিনি শাস্তি প্রদান করবেন না। কেননা, মনে হঠাৎ কোন ধারণা এসে যাওয়া এটা রোধ করা কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়। বরং হাদীসে তো এটাও এসেছে যে, এরূপ। ধারণাকে খারাপ মনে করাও ঈমানের পরিচায়ক।নিজ নিজ কর্মের ফল সকলকেই ভোগ করতে হবে। ভাল কাজ করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। এবং মন্দ কাজের ফল মন্দ হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তার বান্দাদেরকে প্রার্থনা শিখিয়ে দিচ্ছেন এবং তা কবুল করারও তিনি অঙ্গীকার করছেন। বান্দা প্রার্থনা করছেঃ হে আমাদের প্রভু! যদি আমাদের ভ্রম অথবা ক্রটি হয় তজ্জন্য আমাদেরকে ধরবেন না। অর্থাৎ যদি ভুল বশতঃ কোন নির্দেশ পালনে আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি বা কোন মন্দ কাজ করে থাকি অথবা শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ আমাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে তবে আমাদেরকে তজ্জন্যে। পাকড়াও না করে দয়া করে ক্ষমা করুন। 'ইতিপূর্বে সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই প্রার্থনার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনআমি এটা কবুল করেছি এবং আমি এটাই করেছি।' অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক যে কাজ করিয়ে নেয়া হয় তজ্জন্যেও ক্ষমা রয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।' ‘হে আল্লাহ! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর অজ্রপ গুরুভার অর্পণ করবেন না। আল্লাহ তা'আলা তাদের এই প্রার্থনাও কবুল করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শান্তিপূর্ণ ও সহজ ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।' ‘হে আমাদের প্রভু! যা আমাদের শক্তির অতীত এরূপ কার্যভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না।' হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মনের সংকল্প এবং প্রবৃত্তির উপর বিজয় লাভ। এই প্রার্থনার উত্তরেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন।' অর্থাৎ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন, আমাদের পাপসমূহ মার্জনা করুন, আমাদের অসকার্যাবলী গোপন রাখুন এবং আমাদের উপর সদয় হউন যেন পুনরায় আমাদের দ্বারা আপনার অসন্তুষ্টির কোন কাজ সাধিত না হয়। এ জন্যে মনীষীদের উক্তি রয়েছে যে, পাপীদের জন্যে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। (১) আল্লাহর ক্ষমা যেন সে শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারে। (২) গোপনীয়তা রক্ষা, যেন সে অপমান ও লাঞ্ছনা হতে রক্ষা পায়। (৩) পবিত্রতা লাভ, যেন সে দ্বিতীয় বার পাপ কার্যে লিপ্ত না হয়। এর উপরও আল্লাহ তাআলার মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আপনিই আমাদের সাহায্যকারী, আপনার উপরেই আমাদের ভরসা, আপনার নিকটই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি, আপনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আপনার সাহায্য ছাড়া না আমরা অন্য কারও সাহায্য পেতে পারি, না কোন মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতে পারি। আপনি আমাদেরকে ঐ লোকদের উপর সাহায্য করুন যারা আপনার মনোনীত ধর্মের বিরোধী, যারা আপনার একত্বে বিশ্বাসী নয়, যারা আপনার রাসূলের (সঃ) রিসালাতকে অস্বীকার করে, যারা আপনার ইবাদতে অন্যদেরকে অংশীদার করে; হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে তাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করুন। আল্লাহ তা'আলা এর উত্তরেও বলেনঃ হাঁ, আমি এটাও করলাম।' হযরত মু'আজ (রাঃ) এই আয়াতটি শেষ করে আমীন বলতেন। (ইবনে জারীর) "

আলে ইমরান 3:1

এ সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এর প্রাথমিক তিরাশিটি আয়াত নাজরানের খ্রীষ্টানদের দূত সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়, যে দূত হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। এর বিস্তারিত বিবরণ ‘মুবাহালা’র আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। এ সূরার ফযীলত সম্বন্ধে যে হাদীসসমূহ এসেছে ঐগুলো সূরা-ই-বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে বর্ণিত হয়েছে। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বেই আয়াতুল কুরসীর তাফসীরের বর্ণনায় এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে, ইসম-ই-আযম এ আয়াতের মধ্যে ও আয়াতুল কুরসীর মধ্যে রয়েছে। (আরবী)-এর তাফসীর সূরা-ই-বাকারার প্রারম্ভে লিখা হয়েছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। (আরবী)-এর তাফসীরও আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে লিখা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তোমার উপর সত্যের সঙ্গে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার মধ্যে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। বরং নিশ্চয়ই ওটা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে এসেছে, যা তিনি স্বীয় জ্ঞানের সাথে অবতীর্ণ করেছেন। ফেরেশতাগণ এর উপর সাক্ষী রয়েছেন এবং আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কুরআন মাজীদ তার পূর্বের সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকারকারী এবং ঐ কিতাবগুলো, এ কুরআন কারীমের সত্যতার উপর দলীল স্বরূপ। কেননা, ঐগুলোর মধ্যে নবী (সঃ)-এর আগমন এবং এ কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার যে সংবাদ ছিল তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েছে। তিনিই হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর তাওরাত এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছিলেন। এ দু'টোও সে যুগীয় লোকদের জন্যে পথপ্রদর্শক ছিল।তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যা সত্য ও মিথ্যা, সুপথ ও ভ্রান্ত পথের মধ্যে পার্থক্য আনয়নকারী। ওর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীলগুলো প্রত্যেকের জন্যে যথেষ্ট হয়ে থাকে। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত রাবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এখানে ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন। যদিও এটা (আরবী) কিন্তু এর পূর্বে কুরআনের বর্ণনা হয়েছে বলে এখানে (আরবী) বলেছেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে ‘তাওরাত', কিন্তু এটা দুর্বল। কেননা, তাওরাতের বর্ণনা এর পূর্বে হয়েছে। কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসকারী এবং বাতিলপন্থীদের কঠিন শাস্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা মহা পরাক্রমশালী ও বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী। যারা মহা সম্মানিত নবী ও রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং আল্লাহর আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ তাআলা পূর্ণভাবে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

আলে ইমরান 3:2

এ সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এর প্রাথমিক তিরাশিটি আয়াত নাজরানের খ্রীষ্টানদের দূত সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়, যে দূত হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। এর বিস্তারিত বিবরণ ‘মুবাহালা’র আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। এ সূরার ফযীলত সম্বন্ধে যে হাদীসসমূহ এসেছে ঐগুলো সূরা-ই-বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে বর্ণিত হয়েছে। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বেই আয়াতুল কুরসীর তাফসীরের বর্ণনায় এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে, ইসম-ই-আযম এ আয়াতের মধ্যে ও আয়াতুল কুরসীর মধ্যে রয়েছে। (আরবী)-এর তাফসীর সূরা-ই-বাকারার প্রারম্ভে লিখা হয়েছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। (আরবী)-এর তাফসীরও আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে লিখা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তোমার উপর সত্যের সঙ্গে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার মধ্যে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। বরং নিশ্চয়ই ওটা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে এসেছে, যা তিনি স্বীয় জ্ঞানের সাথে অবতীর্ণ করেছেন। ফেরেশতাগণ এর উপর সাক্ষী রয়েছেন এবং আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কুরআন মাজীদ তার পূর্বের সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকারকারী এবং ঐ কিতাবগুলো, এ কুরআন কারীমের সত্যতার উপর দলীল স্বরূপ। কেননা, ঐগুলোর মধ্যে নবী (সঃ)-এর আগমন এবং এ কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার যে সংবাদ ছিল তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েছে। তিনিই হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর তাওরাত এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছিলেন। এ দু'টোও সে যুগীয় লোকদের জন্যে পথপ্রদর্শক ছিল।তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যা সত্য ও মিথ্যা, সুপথ ও ভ্রান্ত পথের মধ্যে পার্থক্য আনয়নকারী। ওর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীলগুলো প্রত্যেকের জন্যে যথেষ্ট হয়ে থাকে। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত রাবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এখানে ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন। যদিও এটা (আরবী) কিন্তু এর পূর্বে কুরআনের বর্ণনা হয়েছে বলে এখানে (আরবী) বলেছেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে ‘তাওরাত', কিন্তু এটা দুর্বল। কেননা, তাওরাতের বর্ণনা এর পূর্বে হয়েছে। কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসকারী এবং বাতিলপন্থীদের কঠিন শাস্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা মহা পরাক্রমশালী ও বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী। যারা মহা সম্মানিত নবী ও রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং আল্লাহর আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ তাআলা পূর্ণভাবে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

আলে ইমরান 3:3

এ সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এর প্রাথমিক তিরাশিটি আয়াত নাজরানের খ্রীষ্টানদের দূত সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়, যে দূত হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। এর বিস্তারিত বিবরণ ‘মুবাহালা’র আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। এ সূরার ফযীলত সম্বন্ধে যে হাদীসসমূহ এসেছে ঐগুলো সূরা-ই-বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে বর্ণিত হয়েছে। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বেই আয়াতুল কুরসীর তাফসীরের বর্ণনায় এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে, ইসম-ই-আযম এ আয়াতের মধ্যে ও আয়াতুল কুরসীর মধ্যে রয়েছে। (আরবী)-এর তাফসীর সূরা-ই-বাকারার প্রারম্ভে লিখা হয়েছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। (আরবী)-এর তাফসীরও আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে লিখা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তোমার উপর সত্যের সঙ্গে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার মধ্যে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। বরং নিশ্চয়ই ওটা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে এসেছে, যা তিনি স্বীয় জ্ঞানের সাথে অবতীর্ণ করেছেন। ফেরেশতাগণ এর উপর সাক্ষী রয়েছেন এবং আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কুরআন মাজীদ তার পূর্বের সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকারকারী এবং ঐ কিতাবগুলো, এ কুরআন কারীমের সত্যতার উপর দলীল স্বরূপ। কেননা, ঐগুলোর মধ্যে নবী (সঃ)-এর আগমন এবং এ কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার যে সংবাদ ছিল তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েছে। তিনিই হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর তাওরাত এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছিলেন। এ দু'টোও সে যুগীয় লোকদের জন্যে পথপ্রদর্শক ছিল।তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যা সত্য ও মিথ্যা, সুপথ ও ভ্রান্ত পথের মধ্যে পার্থক্য আনয়নকারী। ওর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীলগুলো প্রত্যেকের জন্যে যথেষ্ট হয়ে থাকে। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত রাবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এখানে ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন। যদিও এটা (আরবী) কিন্তু এর পূর্বে কুরআনের বর্ণনা হয়েছে বলে এখানে (আরবী) বলেছেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে ‘তাওরাত', কিন্তু এটা দুর্বল। কেননা, তাওরাতের বর্ণনা এর পূর্বে হয়েছে। কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসকারী এবং বাতিলপন্থীদের কঠিন শাস্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা মহা পরাক্রমশালী ও বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী। যারা মহা সম্মানিত নবী ও রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং আল্লাহর আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ তাআলা পূর্ণভাবে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

আলে ইমরান 3:4

এ সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এর প্রাথমিক তিরাশিটি আয়াত নাজরানের খ্রীষ্টানদের দূত সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়, যে দূত হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। এর বিস্তারিত বিবরণ ‘মুবাহালা’র আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। এ সূরার ফযীলত সম্বন্ধে যে হাদীসসমূহ এসেছে ঐগুলো সূরা-ই-বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে বর্ণিত হয়েছে। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বেই আয়াতুল কুরসীর তাফসীরের বর্ণনায় এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে, ইসম-ই-আযম এ আয়াতের মধ্যে ও আয়াতুল কুরসীর মধ্যে রয়েছে। (আরবী)-এর তাফসীর সূরা-ই-বাকারার প্রারম্ভে লিখা হয়েছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। (আরবী)-এর তাফসীরও আয়াতুল কুরসীর তাফসীরে লিখা হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তোমার উপর সত্যের সঙ্গে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার মধ্যে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। বরং নিশ্চয়ই ওটা আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে এসেছে, যা তিনি স্বীয় জ্ঞানের সাথে অবতীর্ণ করেছেন। ফেরেশতাগণ এর উপর সাক্ষী রয়েছেন এবং আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কুরআন মাজীদ তার পূর্বের সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকারকারী এবং ঐ কিতাবগুলো, এ কুরআন কারীমের সত্যতার উপর দলীল স্বরূপ। কেননা, ঐগুলোর মধ্যে নবী (সঃ)-এর আগমন এবং এ কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার যে সংবাদ ছিল তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েছে। তিনিই হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর তাওরাত এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছিলেন। এ দু'টোও সে যুগীয় লোকদের জন্যে পথপ্রদর্শক ছিল।তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যা সত্য ও মিথ্যা, সুপথ ও ভ্রান্ত পথের মধ্যে পার্থক্য আনয়নকারী। ওর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীলগুলো প্রত্যেকের জন্যে যথেষ্ট হয়ে থাকে। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত রাবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এখানে ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন। যদিও এটা (আরবী) কিন্তু এর পূর্বে কুরআনের বর্ণনা হয়েছে বলে এখানে (আরবী) বলেছেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, ফুরকানের ভাবার্থ হচ্ছে ‘তাওরাত', কিন্তু এটা দুর্বল। কেননা, তাওরাতের বর্ণনা এর পূর্বে হয়েছে। কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসকারী এবং বাতিলপন্থীদের কঠিন শাস্তি হবে। আল্লাহ তা'আলা মহা পরাক্রমশালী ও বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী। যারা মহা সম্মানিত নবী ও রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং আল্লাহর আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ তাআলা পূর্ণভাবে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

আলে ইমরান 3:5

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর কোন বস্তুই তাঁর নিকট লুক্কায়িত নেই, বরং সব কিছুরই তিনি পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তিনি বলেন- “আল্লাহ পাক তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের জরায়ুর মধ্যে আকৃতি বিশিষ্ট করেছেন। তিনি যেভাবেই আকৃতি গঠনের ইচ্ছে করেছেন তাই করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই। তিনি মহা পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। একমাত্র তিনিই যখন তোমাদের আকৃতি গঠন করতঃ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তখন তোমরা একমাত্র তার ইবাদত ছাড়া অন্যের ইবাদত করবে কেন? তিনি অবিনষ্ট সম্মান ও ধ্বংসহীন জ্ঞানের অধিকারী। এতে ইঙ্গিত রয়েছে এমন কি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে যে, হযরত ঈসাও (আঃ) আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট এবং তাঁরই পদপ্রান্তে মস্তক অবনতকারী। সমস্ত মানুষের ন্যায় তিনিও একজন মানুষ। তার আকৃতিও আল্লাহ তা'আলা তার মায়ের জরায়ুর মধ্যে গঠন করেছিলেন এবং তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং তিনি কিরূপে আল্লাহ হয়ে গেলেন, যেমন অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরা মনে করে নিয়েছে। অথচ তিনিইতো তোমাদেরকে তোমাদের এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে ফিরিয়ে থাকেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তিনিই তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে এক সৃষ্টির পর অন্য সৃষ্টির মাধ্যমে সৃষ্টি করে থাকেন।' (৩৯:৬)

আলে ইমরান 3:6

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর কোন বস্তুই তাঁর নিকট লুক্কায়িত নেই, বরং সব কিছুরই তিনি পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তিনি বলেন- “আল্লাহ পাক তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের জরায়ুর মধ্যে আকৃতি বিশিষ্ট করেছেন। তিনি যেভাবেই আকৃতি গঠনের ইচ্ছে করেছেন তাই করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই। তিনি মহা পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। একমাত্র তিনিই যখন তোমাদের আকৃতি গঠন করতঃ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তখন তোমরা একমাত্র তার ইবাদত ছাড়া অন্যের ইবাদত করবে কেন? তিনি অবিনষ্ট সম্মান ও ধ্বংসহীন জ্ঞানের অধিকারী। এতে ইঙ্গিত রয়েছে এমন কি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে যে, হযরত ঈসাও (আঃ) আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট এবং তাঁরই পদপ্রান্তে মস্তক অবনতকারী। সমস্ত মানুষের ন্যায় তিনিও একজন মানুষ। তার আকৃতিও আল্লাহ তা'আলা তার মায়ের জরায়ুর মধ্যে গঠন করেছিলেন এবং তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং তিনি কিরূপে আল্লাহ হয়ে গেলেন, যেমন অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরা মনে করে নিয়েছে। অথচ তিনিইতো তোমাদেরকে তোমাদের এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে ফিরিয়ে থাকেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তিনিই তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে এক সৃষ্টির পর অন্য সৃষ্টির মাধ্যমে সৃষ্টি করে থাকেন।' (৩৯:৬)

আলে ইমরান 3:7

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যেগুলোর বর্ণনা খুবই স্পষ্ট ও অত্যন্ত পরিষ্কার এবং সরল ও সহজ। প্রত্যেকেই ওগুলোর ভাবার্থ অনুধাবন করতে পারে। আবার কতগুলো আয়াত এরূপও রয়েছে যেগুলোর ভাবার্থ সাধারণতঃ বোধগম্য হয় না। এখন যারা দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতগুলোকে প্রথম প্রকারের আয়াত সমূহের দিকে ফিরিয়ে থাকে, অর্থাৎ যে জিজ্ঞাস্য বিষয়ের স্পষ্টতা যে আয়াতের মধ্যে প্রাপ্ত হয় তাই গ্রহণ করে থাকে, তারাই সঠিক পথের উপর রয়েছে। আর যারা স্পষ্ট আয়াতগুলোকে ছেড়ে এমন আয়াতগুলোকে দলীলরূপে গ্রহণ করে থাকে, যেগুলো তাদের জ্ঞানের ঊর্ধে এবং ওগুলোর মধ্যেই জড়িত হয়ে পড়ে, তারা ওরাই যারা মুখের ভরে পতিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ মূল ও ভিত্তি। ঐগুলো আল্লাহর কিতাবের পরিষ্কার ও স্পষ্ট আয়াতসমূহ।‘তোমরা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ো না, বরং স্পষ্ট আয়াতসমূহের প্রতিই আমল কর,ঐগুলোকেই মীমাংসাকারী হিসেবে গ্রহণ কর। কতগুলো আয়াত এমনও রয়েছে যে, ঐগুলোর একটি অর্থ তো স্পষ্ট আয়াত সমূহের মতই কিন্তু ঐ অর্থ ছাড়া অন্য অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এরূপ অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ো না।' পূর্ববর্তী মনীষীগণ হতে (আরবী) ও (আরবী) শব্দদ্বয়ের বহু অর্থ নকল করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে রহিতকারী আয়াতগুলো, যেগুলোর মধ্যে হালাল, হারাম, আদেশ, নিষেধ এবং আমল সমূহের বর্ণনা থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবী) (৬:১৫১) এবং এর পরবর্তী হুকুমের আয়াতগুলো হচ্ছে মুহকামাত এবং (আরবী) (১৭:২৩) ও এর পরবর্তী তিনটি আয়াত মুহকামাত। হযরত আবু ফাকতাহ (রঃ) বলেন যে, এগুলো সূরাসমূহের সূচনা। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার (রঃ) বলেন যে, এগুলো হচ্ছে ফরযসমূহ, নির্দেশাবলী, বাধা-নিষেধ এবং হালাল ও হারামের আয়াতসমূহ। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন, ‘এ আয়াতগুলোকে কিতাবের মূল বলার কারণ এই যে, এগুলো সমগ্র কিতাবের মধ্যে রয়েছে। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, সমস্ত মাযহাবের লোক এগুলোকে স্বীকার করে বলে এগুলোকে কিতাবের মূল বলা হয়। (আরবী) ঐ আয়াতগুলোকে বলা হয় যেগুলো রহিত হয়ে গেছে। যেগুলোর পূর্বের ও পরের, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টান্তসমূহ এবং যেগুলো দ্বারা শপথ করা হয়েছে।ঐগুলোর উপর শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। আমল করার জন্যে ঐগুলো আহকাম নয়। হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) উক্তি এটাই। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, ঐগুলো হচ্ছে সূরাসমূহের প্রথমে লিখিত (আরবী) হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, (আরবী) আয়াতগুলো একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবী) (৩৯:২৩) এবং এটাও উল্লিখিত হয়েছে যে, এটা এমন এক বাক্য যা একই রচনা রীতির অধীনস্থ হয়। আর (আরবী) ওকেই বলা হয় যেখানে দুটি বিপরীতমুখী জিনিসের উল্লেখ থাকে। যেমন জান্নাত ও জাহান্নামের বিশেষণ বর্ণনা এবং পাপ-পুণ্যের অবস্থা বর্ণনা ইত্যাদি। এ আয়াতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বিপরীত শব্দরূপে এসেছে। এ জন্যেই আমরা যে ভাবার্থ বর্ণনা করেছি ওটাই সঠিক। এটাই হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইয়াসারেরও (রঃ) উক্তি। তিনি বলেন যে, এগুলো হচ্ছে প্রভুর দলীল স্বরূপ। ঐগুলোর মধ্যে বান্দাদের রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিবাদ ও বাতিলের মীমাংসা রয়েছে। ঐগুলোর প্রকৃত ভাবার্থ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। (আরবী) আয়াতগুলোর সত্যতার ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। ঐ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া উচিত নয়। ঐ আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন, যেমন পরীক্ষা করে থাকেন হালাল ও হারাম দ্বারা। আয়াতগুলোকে সত্য হতে ফিরিয়ে দিয়ে অসত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেই উচিত নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, অর্থাৎ যারা সত্য পথ ছেড়ে দিয়ে ভ্রান্তির পথে গমন করে তারাই এ অস্পষ্ট আয়াতগুলোর মাধ্যমে স্বীয় জঘন্য উদ্দেশ্যাবলী পুরো করতে চায় এবং শাব্দিক অনৈক্য হতে অবৈধ। উপকার গ্রহণ করতঃ নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। স্পষ্ট আয়াত সমূহ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য পুরো হয় না। কেননা, ঐগুলোর শব্দসমূহ সম্পূর্ণ স্পষ্ট এবং একেবারে খোলাখুলি। তারা ঐগুলো সরাতেও পারে না এবং ওগুলোর মধ্যে নিজেদের অনুকূলে কোন দলীলও প্রাপ্ত হয় না। এ জন্যেই ঘোষণা হচ্ছে যে, এর দ্বারা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে অশান্তি উৎপাদন, যেন তারা স্বীয় অধীনস্থ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। তারা নিজেদের বিদআতের দলীল কুরআন পাক থেকেই নিতে চায়, অথচ কুরআন মাজীদতো বিদআতকে খণ্ডন করে থাকে। যেমন খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলার পুত্র (নাউজুবিল্লাহ) সাব্যস্ত করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনের (আরবী) শব্দকে দলীল রূপে গ্রহণ করেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, তারা এ অস্পষ্ট আয়াতটিকে গ্রহণ করতঃ নিম্নলিখিত স্পষ্ট আয়াতগুলোকে পরিত্যাগ করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে ঈসা (আঃ) একজন দাস ছাড়া কিছুই নয়, তাকে আমি পুরস্কৃত করেছি।' (৪৩:৫৯) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ) এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর মতই, তাকে (আদম আঃ) তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বলেছেন- 'হও' তেমনই হয়ে গেছে।' (৩:৫৯) এ প্রকারের আরও বহু স্পষ্ট আয়াত রয়েছে। কিন্তু এসবকে ছেড়ে দিয়ে অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরা অস্পষ্ট আয়াত দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ পাকের পুত্র হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছে। অথচ তিনি আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট, তাঁর বান্দা ও রাসূল। "অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘অস্পষ্ট আয়াতগুলোর পিছনে পড়ার তাদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, অর্থ পরিবর্তন করা এবং ঐগুলোকে স্বীয় স্থান হতে সরিয়ে দেয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতগুলো নিয়ে ঝগড়া করে তখন তোমরা তাদেরকে পরিত্যাগ কর। এ আয়াতে ঐগুলোকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।' এ হাদীসটি বিভিন্ন পন্থায় বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ছহীহ বুখারী শরীফেও এ হাদীসটি কিতাবুল কাদরের মধ্যে এ আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, এগুলো খারেজী ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটিকে মাওকুফ' মনে করা হলেও এর বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ। কেননা, প্রথম বিদআত তারাই ছড়িয়েছিল। এ দলটি শুধুমাত্র ইহলৌকিক দুঃখের কারণে মুসলমানগণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনাইন যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য বন্টন করেন তখন ঐ লোকগুলো ঐ বন্টনকে অন্যায় মনে করেছিল। তাদের মধ্য হতে যুল খুয়াইসির নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে পরিষ্কারভাবে বলেই দেয়ঃ ন্যায়নীতি অবলম্বন করুন। এ বন্টনে আপনি সুবিচার প্রদর্শন করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তো আমাকে বিশ্বস্ত রূপে পাঠিয়েছেন। সুতরাং আমিই যদি সুবিচার না করি তবে তো তুমি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' সে ফিরে গেলে হযরত উমার (রাঃ) আবেদন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাকে হত্যা করে ফেলি, আপনি আমাকে এ অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ছেড়ে দাও, তার বংশ হতে এমন এক সম্প্রদায় বের হবে যে, তোমরা তোমাদের নামাযকে তাদের নামাযের তুলনায় এবং তোমাদের কুরআন পাঠকে তাদের কুরআন পাঠের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করবে। প্রকৃতপক্ষে তারা ধর্ম হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকার হতে বেরিয়ে যায়। তোমরা তাদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। যারা তাদেরকে হত্যা করবে তাদের জন্যে বড় পুণ্য রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তাদের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তাদেরকে নাহরাওয়ানে হত্যা করেন। অতঃপর তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদী দলের সৃষ্টি হয়। ধর্মের মধ্যে তারা নতুন বিদআত চালু করে এবং আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে সরে পড়ে। তাদের পরে কাদরিয়্যাহ দলের আবির্ভাব হয়। তার পরে বের হয় মুতাযিলা সম্প্রদায়। তার পরে জাহমিয়্যাহ ইত্যাদি দলের উদ্ভব হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্ন বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। তিনি বলেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে অতিসত্বরই তেহাত্তরটি দলের আবির্ভাব ঘটবে। একটি দল ছাড়া সবই জাহান্নামী হবে।' সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ঐটি কোন্ দল? তিনি বলেনঃ ‘তারা ওরাই যারা এমন জিনিসের উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ (রাঃ) রয়েছে।' (মুসতাদরিক-ইহাকিম) আবূ ই'য়ালার হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে যারা কুরআন মাজীদ তো পাঠ করবে, কিন্তু ওটা এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলবে যেমন কেউ খেজুরের আঁটি খুঁড়ে ফেলে। ওর ভুল অর্থ বর্ণনা করবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আছে কি নেই, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘চার প্রকারের তাফসীর রয়েছে। (১) প্রথম হচ্ছে ঐ তাফসীর যা সবাই বুঝতে পারে। (২) দ্বিতীয় ঐ তাফসীর যা আরববাসী নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে অনুধাবন করে থাকে। (৩) তৃতীয় ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র বড় বড় পণ্ডিতগণই বুঝে থাকেন। (৪) চতুর্থ ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কেউ জানে না। এটা পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখেরও এটাই উক্তি। মু'জাম-ই-কাবীর গ্রন্থে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের উপর আমার শুধু তিনটি , জিনিসের ভয় রয়েছে। (১) প্রথম ভয় মালের আধিক্যে। কেননা, এরই কারণে হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি হবে এবং পরস্পরের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে। (২) দ্বিতীয় ভয় এই যে, তারা আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যার পিছনে লেগে পড়বে, অথচ ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী তারা বলে ওর উপর আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। (৩) তৃতীয় ভয় এই যে, তারা বিদ্যা অর্জন করে তা নষ্ট করে দেবে এবং কোনই গ্রাহ্য করবে না।' এ হাদীসটি সম্পূর্ণ গারীব। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীম এ জন্যে অবতীর্ণ হয়নি যে, একটি আয়াত অন্য আয়াতের বিপরীত হবে। যা তোমরা বুঝতে পার তার উপর আমল কর এবং যা অস্পষ্ট তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।' (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এবং হযরত মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, গভীর জ্ঞানের অধিকারী লোকেরাও এর প্রকৃত অর্থ অবগত হন না। তবে তাঁরা ওর উপর বিশ্বাস রাখেন। হযরত ইবেন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এর জটিল ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা ঐ কথাই বলেন যে, ওগুলোর উপর তাদের ঈমান রয়েছে। হযরত উবাই ইবনে কা’বও (রাঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। এ উক্তিগুলো হচ্ছে ঐ দলের যারা (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আনয়ন করতঃ পরবর্তী বাক্যকে এর থেকে পৃথক করে থাকেন। অন্য একটি দল (আরবী) শব্দের উপর বিরতি না এনে শব্দের উপর বিরতি এনে থাকেন (ওয়াকফ করে থাকেন)। অধিকাংশ ব্যাখ্যাতা ও শাস্ত্রের মূলনীতির উপর পাণ্ডিত্য অর্জনকারী ব্যক্তিগণও একথাই বলেন। তাঁদের বড় দলীল এই যে, যে কথা বোধগম্য নয় তা বলা ঠিক নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আমি একজন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিগণও অস্পষ্ট আয়াত সমূহের ব্যাখ্যা জানেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেনঃ ‘প্রকৃত ব্যাখ্যা এবং ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন এবং যারা জ্ঞানে পরিপক্ক তাঁরা বলেনঃ “আমরা ঐগুলোর উপর ঈমান এনেছি। অতঃপর তাঁরা স্পষ্ট আয়াতের দ্বারা অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা করে থাকেন। ফলে কারও মুখ খোলার প্রশ্নই উঠে না। অথচ কুরআন কারীমের বিষয়বস্তুও যথার্থ হয়ে যায়, দলীল চালু হয়, অন্যায় পরিত্যক্ত হয় এবং কুফর বিদূরতি হয়। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে আপনি ধর্মের বোধ এবং তাফসীরের জ্ঞান দান করুন। কতক আলেম এখানে বিশ্লেষণ করে বলেন যে, (আরবী) শব্দটি কুরআন মাজীদের মধ্যে দু’টি অর্থে এসেছে। একটি অর্থ হচ্ছে কোন জিনিসের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা। যেমন কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে পিতঃ! এটাই আমার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা। (১২:১০০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু ওর যথার্থতারই অপেক্ষা করছে, যেদিন ওর যথার্থতা এসে যাবে। (৭:৫৩) সুতরাং এ দু' জায়গায় (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূলতত্ত্ব বা যথার্থতা। যদি এ পবিত্র আয়াতের। শব্দের ভাবার্থ এটাই নেয়া হয় তবে শব্দের উপর ওয়াফ করা জরুরী। কেননা, কোন কার্যের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (আরবী) উদ্দেশ্য হবে এবং (আরবী) বিধেয় হবে আর এ বাক্যটি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হবে। (আরবী) শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা এবং একটি জিনিস দ্বারা অন্য জিনিসের ব্যাখ্যা করা। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ, আমাদেরকে ওর (আরবী) বা ব্যাখ্যা বলুন।' (১২:৩৬) যদি উপরোক্ত আয়াতে (আরবী) শব্দের এ অর্থ নেয়া হয় তবে (আরবী) শব্দের উপর ওয়াকফ করা উচিত। কেননা, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ জানেন ও বুঝেন। আর সম্বোধনও তাঁদেরকেই করা হয়েছে, যদিও মূলতত্ত্বের জ্ঞান তাদের নেই। এরূপ (আরবী) হলে শব্দটি (আরবী) হবে। আবার (আরবী) ছাড়াই (আরবী) হতে পারে, যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) হতে (আরবী) (৫৯:৮-১০) পর্যন্ত অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) (৮৯:২২) অর্থাৎ (আরবী) এ রকম ছিল। জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের পক্ষ হতে এ সংবাদ প্রদান-'আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি’ এর অর্থ এই যে, তারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের উপর ঈমান এনেছেন। অতঃপর তারা স্বীকার করেছেন যে, এ সবগুলোই অর্থাৎ স্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহ সবগুলোই সত্য এবং একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সমস্ত আয়াতই আল্লাহতা'আলার নিকট হতে এসেছে। ঐগুলোর মধ্যে বৈপরীত্ব কিছুই নেই। যেমন এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো তবে অবশ্যই তারা এর মধ্যে বহু মতভেদ পেতো।' (৪:৮২) এ জন্যেই এখানেও বলেছেন- এটা শুধুমাত্র জ্ঞানীরাই অনুধাবন করে থাকে, যারা এ সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে, যাদের জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত এবং যারা স্থির মস্তিষ্ক সম্পন্ন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ ‘পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী কে?' তিনি উত্তরে বলেনঃ যার শপথ সত্য, যে স্থির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট, যার কথা সত্য, যার অন্তর পরিশুদ্ধ, যার পেট হারাম থেকে রক্ষিত এবং যার লজ্জাস্থান ব্যভিচার হতে মুক্ত সেই পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতক লোককে দেখেন যে, তারা কুরআন মাজীদ সম্বন্ধে ঝগড়ায় লিপ্ত রয়েছে। তিনি তাদেরকে বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা আল্লাহর কিতাবের আয়াত সমূহকে পরস্পর বিরোধী বলতো। অথচ তাঁর কিতাবের প্রতিটি আয়াত অন্য আয়াতের সত্যতা প্রতিপন্ন করে। তোমরা আল্লাহ তা'আলার কিতাবের ব্যাপারে মতবিরোধ সৃষ্টি করে একটিকে অন্যটির বিপরীত বলো না। যা জান তা বল এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন সাত অক্ষরে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের ব্যাপারে ঝগড়া করা কুফর। (এ কথা তিনবার বলেন) যা জান তার উপর আমল কর এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর।' (আবু ইয়া’লা) হযরত নাফে' ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) বলেন, ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত তারাই যারা বিনয়ী, যারা নম্রতা প্রকাশ করেন, প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা করেন, বড়দেরকে বশীভূত করেন না এবং ছোটদেরকে ঘৃণা করেন না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা প্রার্থনা করে, “হে আমাদের প্রভু! সুপথ প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তরকে ওসব লোকের অন্তরের ন্যায় করবেন না যারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ে বিপথগামী হয়ে থাকে। বরং আমাদেরকে সরল-সোজা পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন, দৃঢ় ধর্মের উপর কায়েম রাখুন, আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন, আমাদের অন্তর ঠিক রাখুন, আমাদের বিক্ষিপ্ততা দূর করুন এবং আমাদের বিশ্বাস বাড়িয়ে দিন। নিশ্চয়ই আপনি সুপ্রচুর প্রদানকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে অন্তরের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করতেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায়ই নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! হে অন্তর সমূহের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের উপর স্থির রাখুন। হযরত আসমা (রাঃ) একদা তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অন্তরের কি পরিবর্তন হয়ে থাকে? তিনি বলেনঃ হ্যা, প্রত্যেক মানুষের অন্তর আল্লাহ তা'আলার অঙ্গুলি সমূহের দুই অঙ্গুলির মধ্যে রয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলে ঠিক রাখেন এবং ইচ্ছে করলে বক্র করে দেন। আমাদের প্রার্থনা এই যে, আমাদের অন্তরকে সুপথ প্রদর্শনের পর আল্লাহ তাআলা যেন তা বক্র না করেন এবং তিনি যেন আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করেন। তিনি প্রচুর প্রদানকারী।' অন্য বর্ণনায় এও রয়েছে, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি নিজের জন্যে করতে থাকবো। তিনি বলেনঃ “এই প্রার্থনা করঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, হে নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রভু! আমার পাপ মার্জনা। করুন, আমার অন্তরের ক্রোধ, দুঃখ কাঠিন্য দূর করুন এবং আমাকে পথভ্রষ্টকারী ফিতনা হতে বাঁচিয়ে নিন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর। (আরবী) -এ প্রার্থনাটি শুনে হযরত আসমা (রাঃ)-এর মত তিনিও প্রশ্ন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে শুনান। এ হাদীসটি গারীব। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে, তবে কুরআন কারীমের এ আয়াতটি পাঠ করার উল্লেখ নেই। সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রাত্রে জাগরিত হতেন তখন তিনি নিম্নের দু'আটি পড়তেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট আমার পাপের ক্ষমা চাচ্ছি এবং আপনার নিকট করুণা যাঞা করছি। হে আল্লাহ! আমার বিদ্যা বাড়িয়ে দিন এবং সুপথ প্রদর্শনের পর আমার অন্তরকে বক্র করবেন না ও আপনার নিকট হতে আমাকে রহমত দান করুন, আপনি সুপ্রচুর দানকারী'। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মাগরিবের নামায পড়ান। প্রথম দু'রাক'আতে আলহামদু শরীফের পর তিনি মুফাসসালের ছোট দু'টি সূরা পাঠ করেন এবং তৃতীয় রাকআতে আলহামদু শরীফের পর এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আবু আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন, “আমি সে সময় তার নিকটেই চলে গিয়েছিলাম, এমন কি আমার কাপড় তার কাপড়ের সাথে লেগে গিয়েছিল এবং আমি স্বয়ং তাঁকে এ আয়াতটি পড়তে শুনেছি। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক) হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এ হাদীসটি শুনার পূর্ব পর্যন্ত মাগরিবের তৃতীয় রাক'আতে (আরবী) পাঠ করতেন। কিন্তু এ হাদীসটি শ্রবণের পর তিনিও এ রাকআতে এ আয়াতটি পড়তে আরম্ভ করেন এবং কখনও পরিত্যাগ করেননি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা বলে, হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে সমবেতকারী এবং তাদের মধ্যে হুকুম ও ফায়সালাকারী। আপনিই সকলকে তাদের ভাল-মন্দ কার্যের বিনিময় প্রদানকারী। ঐদিনের আগমনে এবং আপনার অঙ্গীকারের সত্যতায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

আলে ইমরান 3:8

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যেগুলোর বর্ণনা খুবই স্পষ্ট ও অত্যন্ত পরিষ্কার এবং সরল ও সহজ। প্রত্যেকেই ওগুলোর ভাবার্থ অনুধাবন করতে পারে। আবার কতগুলো আয়াত এরূপও রয়েছে যেগুলোর ভাবার্থ সাধারণতঃ বোধগম্য হয় না। এখন যারা দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতগুলোকে প্রথম প্রকারের আয়াত সমূহের দিকে ফিরিয়ে থাকে, অর্থাৎ যে জিজ্ঞাস্য বিষয়ের স্পষ্টতা যে আয়াতের মধ্যে প্রাপ্ত হয় তাই গ্রহণ করে থাকে, তারাই সঠিক পথের উপর রয়েছে। আর যারা স্পষ্ট আয়াতগুলোকে ছেড়ে এমন আয়াতগুলোকে দলীলরূপে গ্রহণ করে থাকে, যেগুলো তাদের জ্ঞানের ঊর্ধে এবং ওগুলোর মধ্যেই জড়িত হয়ে পড়ে, তারা ওরাই যারা মুখের ভরে পতিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ মূল ও ভিত্তি। ঐগুলো আল্লাহর কিতাবের পরিষ্কার ও স্পষ্ট আয়াতসমূহ।‘তোমরা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ো না, বরং স্পষ্ট আয়াতসমূহের প্রতিই আমল কর,ঐগুলোকেই মীমাংসাকারী হিসেবে গ্রহণ কর। কতগুলো আয়াত এমনও রয়েছে যে, ঐগুলোর একটি অর্থ তো স্পষ্ট আয়াত সমূহের মতই কিন্তু ঐ অর্থ ছাড়া অন্য অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এরূপ অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ো না।' পূর্ববর্তী মনীষীগণ হতে (আরবী) ও (আরবী) শব্দদ্বয়ের বহু অর্থ নকল করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে রহিতকারী আয়াতগুলো, যেগুলোর মধ্যে হালাল, হারাম, আদেশ, নিষেধ এবং আমল সমূহের বর্ণনা থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবী) (৬:১৫১) এবং এর পরবর্তী হুকুমের আয়াতগুলো হচ্ছে মুহকামাত এবং (আরবী) (১৭:২৩) ও এর পরবর্তী তিনটি আয়াত মুহকামাত। হযরত আবু ফাকতাহ (রঃ) বলেন যে, এগুলো সূরাসমূহের সূচনা। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার (রঃ) বলেন যে, এগুলো হচ্ছে ফরযসমূহ, নির্দেশাবলী, বাধা-নিষেধ এবং হালাল ও হারামের আয়াতসমূহ। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন, ‘এ আয়াতগুলোকে কিতাবের মূল বলার কারণ এই যে, এগুলো সমগ্র কিতাবের মধ্যে রয়েছে। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, সমস্ত মাযহাবের লোক এগুলোকে স্বীকার করে বলে এগুলোকে কিতাবের মূল বলা হয়। (আরবী) ঐ আয়াতগুলোকে বলা হয় যেগুলো রহিত হয়ে গেছে। যেগুলোর পূর্বের ও পরের, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টান্তসমূহ এবং যেগুলো দ্বারা শপথ করা হয়েছে।ঐগুলোর উপর শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। আমল করার জন্যে ঐগুলো আহকাম নয়। হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) উক্তি এটাই। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, ঐগুলো হচ্ছে সূরাসমূহের প্রথমে লিখিত (আরবী) হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, (আরবী) আয়াতগুলো একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবী) (৩৯:২৩) এবং এটাও উল্লিখিত হয়েছে যে, এটা এমন এক বাক্য যা একই রচনা রীতির অধীনস্থ হয়। আর (আরবী) ওকেই বলা হয় যেখানে দুটি বিপরীতমুখী জিনিসের উল্লেখ থাকে। যেমন জান্নাত ও জাহান্নামের বিশেষণ বর্ণনা এবং পাপ-পুণ্যের অবস্থা বর্ণনা ইত্যাদি। এ আয়াতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বিপরীত শব্দরূপে এসেছে। এ জন্যেই আমরা যে ভাবার্থ বর্ণনা করেছি ওটাই সঠিক। এটাই হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইয়াসারেরও (রঃ) উক্তি। তিনি বলেন যে, এগুলো হচ্ছে প্রভুর দলীল স্বরূপ। ঐগুলোর মধ্যে বান্দাদের রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিবাদ ও বাতিলের মীমাংসা রয়েছে। ঐগুলোর প্রকৃত ভাবার্থ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। (আরবী) আয়াতগুলোর সত্যতার ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। ঐ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া উচিত নয়। ঐ আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন, যেমন পরীক্ষা করে থাকেন হালাল ও হারাম দ্বারা। আয়াতগুলোকে সত্য হতে ফিরিয়ে দিয়ে অসত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেই উচিত নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, অর্থাৎ যারা সত্য পথ ছেড়ে দিয়ে ভ্রান্তির পথে গমন করে তারাই এ অস্পষ্ট আয়াতগুলোর মাধ্যমে স্বীয় জঘন্য উদ্দেশ্যাবলী পুরো করতে চায় এবং শাব্দিক অনৈক্য হতে অবৈধ। উপকার গ্রহণ করতঃ নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। স্পষ্ট আয়াত সমূহ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য পুরো হয় না। কেননা, ঐগুলোর শব্দসমূহ সম্পূর্ণ স্পষ্ট এবং একেবারে খোলাখুলি। তারা ঐগুলো সরাতেও পারে না এবং ওগুলোর মধ্যে নিজেদের অনুকূলে কোন দলীলও প্রাপ্ত হয় না। এ জন্যেই ঘোষণা হচ্ছে যে, এর দ্বারা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে অশান্তি উৎপাদন, যেন তারা স্বীয় অধীনস্থ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। তারা নিজেদের বিদআতের দলীল কুরআন পাক থেকেই নিতে চায়, অথচ কুরআন মাজীদতো বিদআতকে খণ্ডন করে থাকে। যেমন খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলার পুত্র (নাউজুবিল্লাহ) সাব্যস্ত করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনের (আরবী) শব্দকে দলীল রূপে গ্রহণ করেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, তারা এ অস্পষ্ট আয়াতটিকে গ্রহণ করতঃ নিম্নলিখিত স্পষ্ট আয়াতগুলোকে পরিত্যাগ করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে ঈসা (আঃ) একজন দাস ছাড়া কিছুই নয়, তাকে আমি পুরস্কৃত করেছি।' (৪৩:৫৯) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ) এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর মতই, তাকে (আদম আঃ) তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বলেছেন- 'হও' তেমনই হয়ে গেছে।' (৩:৫৯) এ প্রকারের আরও বহু স্পষ্ট আয়াত রয়েছে। কিন্তু এসবকে ছেড়ে দিয়ে অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরা অস্পষ্ট আয়াত দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ পাকের পুত্র হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছে। অথচ তিনি আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট, তাঁর বান্দা ও রাসূল। "অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘অস্পষ্ট আয়াতগুলোর পিছনে পড়ার তাদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, অর্থ পরিবর্তন করা এবং ঐগুলোকে স্বীয় স্থান হতে সরিয়ে দেয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতগুলো নিয়ে ঝগড়া করে তখন তোমরা তাদেরকে পরিত্যাগ কর। এ আয়াতে ঐগুলোকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।' এ হাদীসটি বিভিন্ন পন্থায় বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ছহীহ বুখারী শরীফেও এ হাদীসটি কিতাবুল কাদরের মধ্যে এ আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, এগুলো খারেজী ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটিকে মাওকুফ' মনে করা হলেও এর বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ। কেননা, প্রথম বিদআত তারাই ছড়িয়েছিল। এ দলটি শুধুমাত্র ইহলৌকিক দুঃখের কারণে মুসলমানগণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনাইন যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য বন্টন করেন তখন ঐ লোকগুলো ঐ বন্টনকে অন্যায় মনে করেছিল। তাদের মধ্য হতে যুল খুয়াইসির নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে পরিষ্কারভাবে বলেই দেয়ঃ ন্যায়নীতি অবলম্বন করুন। এ বন্টনে আপনি সুবিচার প্রদর্শন করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তো আমাকে বিশ্বস্ত রূপে পাঠিয়েছেন। সুতরাং আমিই যদি সুবিচার না করি তবে তো তুমি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' সে ফিরে গেলে হযরত উমার (রাঃ) আবেদন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাকে হত্যা করে ফেলি, আপনি আমাকে এ অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ছেড়ে দাও, তার বংশ হতে এমন এক সম্প্রদায় বের হবে যে, তোমরা তোমাদের নামাযকে তাদের নামাযের তুলনায় এবং তোমাদের কুরআন পাঠকে তাদের কুরআন পাঠের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করবে। প্রকৃতপক্ষে তারা ধর্ম হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকার হতে বেরিয়ে যায়। তোমরা তাদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। যারা তাদেরকে হত্যা করবে তাদের জন্যে বড় পুণ্য রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তাদের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তাদেরকে নাহরাওয়ানে হত্যা করেন। অতঃপর তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদী দলের সৃষ্টি হয়। ধর্মের মধ্যে তারা নতুন বিদআত চালু করে এবং আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে সরে পড়ে। তাদের পরে কাদরিয়্যাহ দলের আবির্ভাব হয়। তার পরে বের হয় মুতাযিলা সম্প্রদায়। তার পরে জাহমিয়্যাহ ইত্যাদি দলের উদ্ভব হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্ন বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। তিনি বলেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে অতিসত্বরই তেহাত্তরটি দলের আবির্ভাব ঘটবে। একটি দল ছাড়া সবই জাহান্নামী হবে।' সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ঐটি কোন্ দল? তিনি বলেনঃ ‘তারা ওরাই যারা এমন জিনিসের উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ (রাঃ) রয়েছে।' (মুসতাদরিক-ইহাকিম) আবূ ই'য়ালার হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে যারা কুরআন মাজীদ তো পাঠ করবে, কিন্তু ওটা এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলবে যেমন কেউ খেজুরের আঁটি খুঁড়ে ফেলে। ওর ভুল অর্থ বর্ণনা করবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আছে কি নেই, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘চার প্রকারের তাফসীর রয়েছে। (১) প্রথম হচ্ছে ঐ তাফসীর যা সবাই বুঝতে পারে। (২) দ্বিতীয় ঐ তাফসীর যা আরববাসী নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে অনুধাবন করে থাকে। (৩) তৃতীয় ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র বড় বড় পণ্ডিতগণই বুঝে থাকেন। (৪) চতুর্থ ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কেউ জানে না। এটা পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখেরও এটাই উক্তি। মু'জাম-ই-কাবীর গ্রন্থে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের উপর আমার শুধু তিনটি , জিনিসের ভয় রয়েছে। (১) প্রথম ভয় মালের আধিক্যে। কেননা, এরই কারণে হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি হবে এবং পরস্পরের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে। (২) দ্বিতীয় ভয় এই যে, তারা আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যার পিছনে লেগে পড়বে, অথচ ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী তারা বলে ওর উপর আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। (৩) তৃতীয় ভয় এই যে, তারা বিদ্যা অর্জন করে তা নষ্ট করে দেবে এবং কোনই গ্রাহ্য করবে না।' এ হাদীসটি সম্পূর্ণ গারীব। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীম এ জন্যে অবতীর্ণ হয়নি যে, একটি আয়াত অন্য আয়াতের বিপরীত হবে। যা তোমরা বুঝতে পার তার উপর আমল কর এবং যা অস্পষ্ট তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।' (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এবং হযরত মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, গভীর জ্ঞানের অধিকারী লোকেরাও এর প্রকৃত অর্থ অবগত হন না। তবে তাঁরা ওর উপর বিশ্বাস রাখেন। হযরত ইবেন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এর জটিল ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা ঐ কথাই বলেন যে, ওগুলোর উপর তাদের ঈমান রয়েছে। হযরত উবাই ইবনে কা’বও (রাঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। এ উক্তিগুলো হচ্ছে ঐ দলের যারা (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আনয়ন করতঃ পরবর্তী বাক্যকে এর থেকে পৃথক করে থাকেন। অন্য একটি দল (আরবী) শব্দের উপর বিরতি না এনে শব্দের উপর বিরতি এনে থাকেন (ওয়াকফ করে থাকেন)। অধিকাংশ ব্যাখ্যাতা ও শাস্ত্রের মূলনীতির উপর পাণ্ডিত্য অর্জনকারী ব্যক্তিগণও একথাই বলেন। তাঁদের বড় দলীল এই যে, যে কথা বোধগম্য নয় তা বলা ঠিক নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আমি একজন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিগণও অস্পষ্ট আয়াত সমূহের ব্যাখ্যা জানেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেনঃ ‘প্রকৃত ব্যাখ্যা এবং ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন এবং যারা জ্ঞানে পরিপক্ক তাঁরা বলেনঃ “আমরা ঐগুলোর উপর ঈমান এনেছি। অতঃপর তাঁরা স্পষ্ট আয়াতের দ্বারা অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা করে থাকেন। ফলে কারও মুখ খোলার প্রশ্নই উঠে না। অথচ কুরআন কারীমের বিষয়বস্তুও যথার্থ হয়ে যায়, দলীল চালু হয়, অন্যায় পরিত্যক্ত হয় এবং কুফর বিদূরতি হয়। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে আপনি ধর্মের বোধ এবং তাফসীরের জ্ঞান দান করুন। কতক আলেম এখানে বিশ্লেষণ করে বলেন যে, (আরবী) শব্দটি কুরআন মাজীদের মধ্যে দু’টি অর্থে এসেছে। একটি অর্থ হচ্ছে কোন জিনিসের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা। যেমন কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে পিতঃ! এটাই আমার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা। (১২:১০০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু ওর যথার্থতারই অপেক্ষা করছে, যেদিন ওর যথার্থতা এসে যাবে। (৭:৫৩) সুতরাং এ দু' জায়গায় (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূলতত্ত্ব বা যথার্থতা। যদি এ পবিত্র আয়াতের। শব্দের ভাবার্থ এটাই নেয়া হয় তবে শব্দের উপর ওয়াফ করা জরুরী। কেননা, কোন কার্যের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (আরবী) উদ্দেশ্য হবে এবং (আরবী) বিধেয় হবে আর এ বাক্যটি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হবে। (আরবী) শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা এবং একটি জিনিস দ্বারা অন্য জিনিসের ব্যাখ্যা করা। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ, আমাদেরকে ওর (আরবী) বা ব্যাখ্যা বলুন।' (১২:৩৬) যদি উপরোক্ত আয়াতে (আরবী) শব্দের এ অর্থ নেয়া হয় তবে (আরবী) শব্দের উপর ওয়াকফ করা উচিত। কেননা, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ জানেন ও বুঝেন। আর সম্বোধনও তাঁদেরকেই করা হয়েছে, যদিও মূলতত্ত্বের জ্ঞান তাদের নেই। এরূপ (আরবী) হলে শব্দটি (আরবী) হবে। আবার (আরবী) ছাড়াই (আরবী) হতে পারে, যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) হতে (আরবী) (৫৯:৮-১০) পর্যন্ত অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) (৮৯:২২) অর্থাৎ (আরবী) এ রকম ছিল। জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের পক্ষ হতে এ সংবাদ প্রদান-'আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি’ এর অর্থ এই যে, তারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের উপর ঈমান এনেছেন। অতঃপর তারা স্বীকার করেছেন যে, এ সবগুলোই অর্থাৎ স্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহ সবগুলোই সত্য এবং একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সমস্ত আয়াতই আল্লাহতা'আলার নিকট হতে এসেছে। ঐগুলোর মধ্যে বৈপরীত্ব কিছুই নেই। যেমন এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো তবে অবশ্যই তারা এর মধ্যে বহু মতভেদ পেতো।' (৪:৮২) এ জন্যেই এখানেও বলেছেন- এটা শুধুমাত্র জ্ঞানীরাই অনুধাবন করে থাকে, যারা এ সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে, যাদের জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত এবং যারা স্থির মস্তিষ্ক সম্পন্ন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ ‘পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী কে?' তিনি উত্তরে বলেনঃ যার শপথ সত্য, যে স্থির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট, যার কথা সত্য, যার অন্তর পরিশুদ্ধ, যার পেট হারাম থেকে রক্ষিত এবং যার লজ্জাস্থান ব্যভিচার হতে মুক্ত সেই পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতক লোককে দেখেন যে, তারা কুরআন মাজীদ সম্বন্ধে ঝগড়ায় লিপ্ত রয়েছে। তিনি তাদেরকে বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা আল্লাহর কিতাবের আয়াত সমূহকে পরস্পর বিরোধী বলতো। অথচ তাঁর কিতাবের প্রতিটি আয়াত অন্য আয়াতের সত্যতা প্রতিপন্ন করে। তোমরা আল্লাহ তা'আলার কিতাবের ব্যাপারে মতবিরোধ সৃষ্টি করে একটিকে অন্যটির বিপরীত বলো না। যা জান তা বল এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন সাত অক্ষরে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের ব্যাপারে ঝগড়া করা কুফর। (এ কথা তিনবার বলেন) যা জান তার উপর আমল কর এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর।' (আবু ইয়া’লা) হযরত নাফে' ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) বলেন, ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত তারাই যারা বিনয়ী, যারা নম্রতা প্রকাশ করেন, প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা করেন, বড়দেরকে বশীভূত করেন না এবং ছোটদেরকে ঘৃণা করেন না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা প্রার্থনা করে, “হে আমাদের প্রভু! সুপথ প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তরকে ওসব লোকের অন্তরের ন্যায় করবেন না যারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ে বিপথগামী হয়ে থাকে। বরং আমাদেরকে সরল-সোজা পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন, দৃঢ় ধর্মের উপর কায়েম রাখুন, আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন, আমাদের অন্তর ঠিক রাখুন, আমাদের বিক্ষিপ্ততা দূর করুন এবং আমাদের বিশ্বাস বাড়িয়ে দিন। নিশ্চয়ই আপনি সুপ্রচুর প্রদানকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে অন্তরের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করতেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায়ই নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! হে অন্তর সমূহের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের উপর স্থির রাখুন। হযরত আসমা (রাঃ) একদা তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অন্তরের কি পরিবর্তন হয়ে থাকে? তিনি বলেনঃ হ্যা, প্রত্যেক মানুষের অন্তর আল্লাহ তা'আলার অঙ্গুলি সমূহের দুই অঙ্গুলির মধ্যে রয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলে ঠিক রাখেন এবং ইচ্ছে করলে বক্র করে দেন। আমাদের প্রার্থনা এই যে, আমাদের অন্তরকে সুপথ প্রদর্শনের পর আল্লাহ তাআলা যেন তা বক্র না করেন এবং তিনি যেন আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করেন। তিনি প্রচুর প্রদানকারী।' অন্য বর্ণনায় এও রয়েছে, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি নিজের জন্যে করতে থাকবো। তিনি বলেনঃ “এই প্রার্থনা করঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, হে নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রভু! আমার পাপ মার্জনা। করুন, আমার অন্তরের ক্রোধ, দুঃখ কাঠিন্য দূর করুন এবং আমাকে পথভ্রষ্টকারী ফিতনা হতে বাঁচিয়ে নিন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর। (আরবী) -এ প্রার্থনাটি শুনে হযরত আসমা (রাঃ)-এর মত তিনিও প্রশ্ন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে শুনান। এ হাদীসটি গারীব। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে, তবে কুরআন কারীমের এ আয়াতটি পাঠ করার উল্লেখ নেই। সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রাত্রে জাগরিত হতেন তখন তিনি নিম্নের দু'আটি পড়তেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট আমার পাপের ক্ষমা চাচ্ছি এবং আপনার নিকট করুণা যাঞা করছি। হে আল্লাহ! আমার বিদ্যা বাড়িয়ে দিন এবং সুপথ প্রদর্শনের পর আমার অন্তরকে বক্র করবেন না ও আপনার নিকট হতে আমাকে রহমত দান করুন, আপনি সুপ্রচুর দানকারী'। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মাগরিবের নামায পড়ান। প্রথম দু'রাক'আতে আলহামদু শরীফের পর তিনি মুফাসসালের ছোট দু'টি সূরা পাঠ করেন এবং তৃতীয় রাকআতে আলহামদু শরীফের পর এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আবু আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন, “আমি সে সময় তার নিকটেই চলে গিয়েছিলাম, এমন কি আমার কাপড় তার কাপড়ের সাথে লেগে গিয়েছিল এবং আমি স্বয়ং তাঁকে এ আয়াতটি পড়তে শুনেছি। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক) হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এ হাদীসটি শুনার পূর্ব পর্যন্ত মাগরিবের তৃতীয় রাক'আতে (আরবী) পাঠ করতেন। কিন্তু এ হাদীসটি শ্রবণের পর তিনিও এ রাকআতে এ আয়াতটি পড়তে আরম্ভ করেন এবং কখনও পরিত্যাগ করেননি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা বলে, হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে সমবেতকারী এবং তাদের মধ্যে হুকুম ও ফায়সালাকারী। আপনিই সকলকে তাদের ভাল-মন্দ কার্যের বিনিময় প্রদানকারী। ঐদিনের আগমনে এবং আপনার অঙ্গীকারের সত্যতায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

আলে ইমরান 3:9

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যেগুলোর বর্ণনা খুবই স্পষ্ট ও অত্যন্ত পরিষ্কার এবং সরল ও সহজ। প্রত্যেকেই ওগুলোর ভাবার্থ অনুধাবন করতে পারে। আবার কতগুলো আয়াত এরূপও রয়েছে যেগুলোর ভাবার্থ সাধারণতঃ বোধগম্য হয় না। এখন যারা দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতগুলোকে প্রথম প্রকারের আয়াত সমূহের দিকে ফিরিয়ে থাকে, অর্থাৎ যে জিজ্ঞাস্য বিষয়ের স্পষ্টতা যে আয়াতের মধ্যে প্রাপ্ত হয় তাই গ্রহণ করে থাকে, তারাই সঠিক পথের উপর রয়েছে। আর যারা স্পষ্ট আয়াতগুলোকে ছেড়ে এমন আয়াতগুলোকে দলীলরূপে গ্রহণ করে থাকে, যেগুলো তাদের জ্ঞানের ঊর্ধে এবং ওগুলোর মধ্যেই জড়িত হয়ে পড়ে, তারা ওরাই যারা মুখের ভরে পতিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ মূল ও ভিত্তি। ঐগুলো আল্লাহর কিতাবের পরিষ্কার ও স্পষ্ট আয়াতসমূহ।‘তোমরা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ো না, বরং স্পষ্ট আয়াতসমূহের প্রতিই আমল কর,ঐগুলোকেই মীমাংসাকারী হিসেবে গ্রহণ কর। কতগুলো আয়াত এমনও রয়েছে যে, ঐগুলোর একটি অর্থ তো স্পষ্ট আয়াত সমূহের মতই কিন্তু ঐ অর্থ ছাড়া অন্য অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এরূপ অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ো না।' পূর্ববর্তী মনীষীগণ হতে (আরবী) ও (আরবী) শব্দদ্বয়ের বহু অর্থ নকল করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে রহিতকারী আয়াতগুলো, যেগুলোর মধ্যে হালাল, হারাম, আদেশ, নিষেধ এবং আমল সমূহের বর্ণনা থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবী) (৬:১৫১) এবং এর পরবর্তী হুকুমের আয়াতগুলো হচ্ছে মুহকামাত এবং (আরবী) (১৭:২৩) ও এর পরবর্তী তিনটি আয়াত মুহকামাত। হযরত আবু ফাকতাহ (রঃ) বলেন যে, এগুলো সূরাসমূহের সূচনা। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার (রঃ) বলেন যে, এগুলো হচ্ছে ফরযসমূহ, নির্দেশাবলী, বাধা-নিষেধ এবং হালাল ও হারামের আয়াতসমূহ। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন, ‘এ আয়াতগুলোকে কিতাবের মূল বলার কারণ এই যে, এগুলো সমগ্র কিতাবের মধ্যে রয়েছে। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, সমস্ত মাযহাবের লোক এগুলোকে স্বীকার করে বলে এগুলোকে কিতাবের মূল বলা হয়। (আরবী) ঐ আয়াতগুলোকে বলা হয় যেগুলো রহিত হয়ে গেছে। যেগুলোর পূর্বের ও পরের, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টান্তসমূহ এবং যেগুলো দ্বারা শপথ করা হয়েছে।ঐগুলোর উপর শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। আমল করার জন্যে ঐগুলো আহকাম নয়। হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) উক্তি এটাই। হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, ঐগুলো হচ্ছে সূরাসমূহের প্রথমে লিখিত (আরবী) হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, (আরবী) আয়াতগুলো একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবী) (৩৯:২৩) এবং এটাও উল্লিখিত হয়েছে যে, এটা এমন এক বাক্য যা একই রচনা রীতির অধীনস্থ হয়। আর (আরবী) ওকেই বলা হয় যেখানে দুটি বিপরীতমুখী জিনিসের উল্লেখ থাকে। যেমন জান্নাত ও জাহান্নামের বিশেষণ বর্ণনা এবং পাপ-পুণ্যের অবস্থা বর্ণনা ইত্যাদি। এ আয়াতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বিপরীত শব্দরূপে এসেছে। এ জন্যেই আমরা যে ভাবার্থ বর্ণনা করেছি ওটাই সঠিক। এটাই হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইয়াসারেরও (রঃ) উক্তি। তিনি বলেন যে, এগুলো হচ্ছে প্রভুর দলীল স্বরূপ। ঐগুলোর মধ্যে বান্দাদের রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিবাদ ও বাতিলের মীমাংসা রয়েছে। ঐগুলোর প্রকৃত ভাবার্থ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। (আরবী) আয়াতগুলোর সত্যতার ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। ঐ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া উচিত নয়। ঐ আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন, যেমন পরীক্ষা করে থাকেন হালাল ও হারাম দ্বারা। আয়াতগুলোকে সত্য হতে ফিরিয়ে দিয়ে অসত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেই উচিত নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, অর্থাৎ যারা সত্য পথ ছেড়ে দিয়ে ভ্রান্তির পথে গমন করে তারাই এ অস্পষ্ট আয়াতগুলোর মাধ্যমে স্বীয় জঘন্য উদ্দেশ্যাবলী পুরো করতে চায় এবং শাব্দিক অনৈক্য হতে অবৈধ। উপকার গ্রহণ করতঃ নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। স্পষ্ট আয়াত সমূহ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য পুরো হয় না। কেননা, ঐগুলোর শব্দসমূহ সম্পূর্ণ স্পষ্ট এবং একেবারে খোলাখুলি। তারা ঐগুলো সরাতেও পারে না এবং ওগুলোর মধ্যে নিজেদের অনুকূলে কোন দলীলও প্রাপ্ত হয় না। এ জন্যেই ঘোষণা হচ্ছে যে, এর দ্বারা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে অশান্তি উৎপাদন, যেন তারা স্বীয় অধীনস্থ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। তারা নিজেদের বিদআতের দলীল কুরআন পাক থেকেই নিতে চায়, অথচ কুরআন মাজীদতো বিদআতকে খণ্ডন করে থাকে। যেমন খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলার পুত্র (নাউজুবিল্লাহ) সাব্যস্ত করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনের (আরবী) শব্দকে দলীল রূপে গ্রহণ করেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, তারা এ অস্পষ্ট আয়াতটিকে গ্রহণ করতঃ নিম্নলিখিত স্পষ্ট আয়াতগুলোকে পরিত্যাগ করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে ঈসা (আঃ) একজন দাস ছাড়া কিছুই নয়, তাকে আমি পুরস্কৃত করেছি।' (৪৩:৫৯) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ) এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর মতই, তাকে (আদম আঃ) তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বলেছেন- 'হও' তেমনই হয়ে গেছে।' (৩:৫৯) এ প্রকারের আরও বহু স্পষ্ট আয়াত রয়েছে। কিন্তু এসবকে ছেড়ে দিয়ে অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরা অস্পষ্ট আয়াত দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ পাকের পুত্র হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছে। অথচ তিনি আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট, তাঁর বান্দা ও রাসূল। "অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘অস্পষ্ট আয়াতগুলোর পিছনে পড়ার তাদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, অর্থ পরিবর্তন করা এবং ঐগুলোকে স্বীয় স্থান হতে সরিয়ে দেয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতগুলো নিয়ে ঝগড়া করে তখন তোমরা তাদেরকে পরিত্যাগ কর। এ আয়াতে ঐগুলোকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।' এ হাদীসটি বিভিন্ন পন্থায় বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ছহীহ বুখারী শরীফেও এ হাদীসটি কিতাবুল কাদরের মধ্যে এ আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, এগুলো খারেজী ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটিকে মাওকুফ' মনে করা হলেও এর বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ। কেননা, প্রথম বিদআত তারাই ছড়িয়েছিল। এ দলটি শুধুমাত্র ইহলৌকিক দুঃখের কারণে মুসলমানগণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনাইন যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য বন্টন করেন তখন ঐ লোকগুলো ঐ বন্টনকে অন্যায় মনে করেছিল। তাদের মধ্য হতে যুল খুয়াইসির নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এসে পরিষ্কারভাবে বলেই দেয়ঃ ন্যায়নীতি অবলম্বন করুন। এ বন্টনে আপনি সুবিচার প্রদর্শন করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তো আমাকে বিশ্বস্ত রূপে পাঠিয়েছেন। সুতরাং আমিই যদি সুবিচার না করি তবে তো তুমি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' সে ফিরে গেলে হযরত উমার (রাঃ) আবেদন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাকে হত্যা করে ফেলি, আপনি আমাকে এ অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ছেড়ে দাও, তার বংশ হতে এমন এক সম্প্রদায় বের হবে যে, তোমরা তোমাদের নামাযকে তাদের নামাযের তুলনায় এবং তোমাদের কুরআন পাঠকে তাদের কুরআন পাঠের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করবে। প্রকৃতপক্ষে তারা ধর্ম হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকার হতে বেরিয়ে যায়। তোমরা তাদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। যারা তাদেরকে হত্যা করবে তাদের জন্যে বড় পুণ্য রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তাদের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তাদেরকে নাহরাওয়ানে হত্যা করেন। অতঃপর তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদী দলের সৃষ্টি হয়। ধর্মের মধ্যে তারা নতুন বিদআত চালু করে এবং আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে সরে পড়ে। তাদের পরে কাদরিয়্যাহ দলের আবির্ভাব হয়। তার পরে বের হয় মুতাযিলা সম্প্রদায়। তার পরে জাহমিয়্যাহ ইত্যাদি দলের উদ্ভব হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্ন বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। তিনি বলেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে অতিসত্বরই তেহাত্তরটি দলের আবির্ভাব ঘটবে। একটি দল ছাড়া সবই জাহান্নামী হবে।' সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ঐটি কোন্ দল? তিনি বলেনঃ ‘তারা ওরাই যারা এমন জিনিসের উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ (রাঃ) রয়েছে।' (মুসতাদরিক-ইহাকিম) আবূ ই'য়ালার হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে যারা কুরআন মাজীদ তো পাঠ করবে, কিন্তু ওটা এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলবে যেমন কেউ খেজুরের আঁটি খুঁড়ে ফেলে। ওর ভুল অর্থ বর্ণনা করবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আছে কি নেই, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘চার প্রকারের তাফসীর রয়েছে। (১) প্রথম হচ্ছে ঐ তাফসীর যা সবাই বুঝতে পারে। (২) দ্বিতীয় ঐ তাফসীর যা আরববাসী নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে অনুধাবন করে থাকে। (৩) তৃতীয় ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র বড় বড় পণ্ডিতগণই বুঝে থাকেন। (৪) চতুর্থ ঐ তাফসীর যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কেউ জানে না। এটা পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে।হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখেরও এটাই উক্তি। মু'জাম-ই-কাবীর গ্রন্থে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের উপর আমার শুধু তিনটি , জিনিসের ভয় রয়েছে। (১) প্রথম ভয় মালের আধিক্যে। কেননা, এরই কারণে হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি হবে এবং পরস্পরের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে। (২) দ্বিতীয় ভয় এই যে, তারা আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যার পিছনে লেগে পড়বে, অথচ ওর প্রকৃত ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী তারা বলে ওর উপর আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। (৩) তৃতীয় ভয় এই যে, তারা বিদ্যা অর্জন করে তা নষ্ট করে দেবে এবং কোনই গ্রাহ্য করবে না।' এ হাদীসটি সম্পূর্ণ গারীব। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীম এ জন্যে অবতীর্ণ হয়নি যে, একটি আয়াত অন্য আয়াতের বিপরীত হবে। যা তোমরা বুঝতে পার তার উপর আমল কর এবং যা অস্পষ্ট তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।' (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এবং হযরত মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, গভীর জ্ঞানের অধিকারী লোকেরাও এর প্রকৃত অর্থ অবগত হন না। তবে তাঁরা ওর উপর বিশ্বাস রাখেন। হযরত ইবেন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এর জটিল ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা ঐ কথাই বলেন যে, ওগুলোর উপর তাদের ঈমান রয়েছে। হযরত উবাই ইবনে কা’বও (রাঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। এ উক্তিগুলো হচ্ছে ঐ দলের যারা (আরবী) শব্দের উপর বিরতি আনয়ন করতঃ পরবর্তী বাক্যকে এর থেকে পৃথক করে থাকেন। অন্য একটি দল (আরবী) শব্দের উপর বিরতি না এনে শব্দের উপর বিরতি এনে থাকেন (ওয়াকফ করে থাকেন)। অধিকাংশ ব্যাখ্যাতা ও শাস্ত্রের মূলনীতির উপর পাণ্ডিত্য অর্জনকারী ব্যক্তিগণও একথাই বলেন। তাঁদের বড় দলীল এই যে, যে কথা বোধগম্য নয় তা বলা ঠিক নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আমি একজন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিগণও অস্পষ্ট আয়াত সমূহের ব্যাখ্যা জানেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেনঃ ‘প্রকৃত ব্যাখ্যা এবং ভাবার্থ একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন এবং যারা জ্ঞানে পরিপক্ক তাঁরা বলেনঃ “আমরা ঐগুলোর উপর ঈমান এনেছি। অতঃপর তাঁরা স্পষ্ট আয়াতের দ্বারা অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা করে থাকেন। ফলে কারও মুখ খোলার প্রশ্নই উঠে না। অথচ কুরআন কারীমের বিষয়বস্তুও যথার্থ হয়ে যায়, দলীল চালু হয়, অন্যায় পরিত্যক্ত হয় এবং কুফর বিদূরতি হয়। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে আপনি ধর্মের বোধ এবং তাফসীরের জ্ঞান দান করুন। কতক আলেম এখানে বিশ্লেষণ করে বলেন যে, (আরবী) শব্দটি কুরআন মাজীদের মধ্যে দু’টি অর্থে এসেছে। একটি অর্থ হচ্ছে কোন জিনিসের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা। যেমন কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে পিতঃ! এটাই আমার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা। (১২:১০০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু ওর যথার্থতারই অপেক্ষা করছে, যেদিন ওর যথার্থতা এসে যাবে। (৭:৫৩) সুতরাং এ দু' জায়গায় (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূলতত্ত্ব বা যথার্থতা। যদি এ পবিত্র আয়াতের। শব্দের ভাবার্থ এটাই নেয়া হয় তবে শব্দের উপর ওয়াফ করা জরুরী। কেননা, কোন কার্যের মূলতত্ত্ব ও যথার্থতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (আরবী) উদ্দেশ্য হবে এবং (আরবী) বিধেয় হবে আর এ বাক্যটি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হবে। (আরবী) শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা এবং একটি জিনিস দ্বারা অন্য জিনিসের ব্যাখ্যা করা। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ, আমাদেরকে ওর (আরবী) বা ব্যাখ্যা বলুন।' (১২:৩৬) যদি উপরোক্ত আয়াতে (আরবী) শব্দের এ অর্থ নেয়া হয় তবে (আরবী) শব্দের উপর ওয়াকফ করা উচিত। কেননা, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ জানেন ও বুঝেন। আর সম্বোধনও তাঁদেরকেই করা হয়েছে, যদিও মূলতত্ত্বের জ্ঞান তাদের নেই। এরূপ (আরবী) হলে শব্দটি (আরবী) হবে। আবার (আরবী) ছাড়াই (আরবী) হতে পারে, যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) হতে (আরবী) (৫৯:৮-১০) পর্যন্ত অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) (৮৯:২২) অর্থাৎ (আরবী) এ রকম ছিল। জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের পক্ষ হতে এ সংবাদ প্রদান-'আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি’ এর অর্থ এই যে, তারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের উপর ঈমান এনেছেন। অতঃপর তারা স্বীকার করেছেন যে, এ সবগুলোই অর্থাৎ স্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহ সবগুলোই সত্য এবং একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। আর তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সমস্ত আয়াতই আল্লাহতা'আলার নিকট হতে এসেছে। ঐগুলোর মধ্যে বৈপরীত্ব কিছুই নেই। যেমন এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো তবে অবশ্যই তারা এর মধ্যে বহু মতভেদ পেতো।' (৪:৮২) এ জন্যেই এখানেও বলেছেন- এটা শুধুমাত্র জ্ঞানীরাই অনুধাবন করে থাকে, যারা এ সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে, যাদের জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত এবং যারা স্থির মস্তিষ্ক সম্পন্ন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ ‘পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী কে?' তিনি উত্তরে বলেনঃ যার শপথ সত্য, যে স্থির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট, যার কথা সত্য, যার অন্তর পরিশুদ্ধ, যার পেট হারাম থেকে রক্ষিত এবং যার লজ্জাস্থান ব্যভিচার হতে মুক্ত সেই পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতক লোককে দেখেন যে, তারা কুরআন মাজীদ সম্বন্ধে ঝগড়ায় লিপ্ত রয়েছে। তিনি তাদেরকে বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা আল্লাহর কিতাবের আয়াত সমূহকে পরস্পর বিরোধী বলতো। অথচ তাঁর কিতাবের প্রতিটি আয়াত অন্য আয়াতের সত্যতা প্রতিপন্ন করে। তোমরা আল্লাহ তা'আলার কিতাবের ব্যাপারে মতবিরোধ সৃষ্টি করে একটিকে অন্যটির বিপরীত বলো না। যা জান তা বল এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন সাত অক্ষরে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের ব্যাপারে ঝগড়া করা কুফর। (এ কথা তিনবার বলেন) যা জান তার উপর আমল কর এবং যা জান না তা জ্ঞানীদের উপর সমর্পণ কর।' (আবু ইয়া’লা) হযরত নাফে' ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) বলেন, ‘জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত তারাই যারা বিনয়ী, যারা নম্রতা প্রকাশ করেন, প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা করেন, বড়দেরকে বশীভূত করেন না এবং ছোটদেরকে ঘৃণা করেন না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা প্রার্থনা করে, “হে আমাদের প্রভু! সুপথ প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তরকে ওসব লোকের অন্তরের ন্যায় করবেন না যারা অস্পষ্ট আয়াত সমূহের পিছনে পড়ে বিপথগামী হয়ে থাকে। বরং আমাদেরকে সরল-সোজা পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন, দৃঢ় ধর্মের উপর কায়েম রাখুন, আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন, আমাদের অন্তর ঠিক রাখুন, আমাদের বিক্ষিপ্ততা দূর করুন এবং আমাদের বিশ্বাস বাড়িয়ে দিন। নিশ্চয়ই আপনি সুপ্রচুর প্রদানকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে অন্তরের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করতেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায়ই নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! হে অন্তর সমূহের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের উপর স্থির রাখুন। হযরত আসমা (রাঃ) একদা তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অন্তরের কি পরিবর্তন হয়ে থাকে? তিনি বলেনঃ হ্যা, প্রত্যেক মানুষের অন্তর আল্লাহ তা'আলার অঙ্গুলি সমূহের দুই অঙ্গুলির মধ্যে রয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলে ঠিক রাখেন এবং ইচ্ছে করলে বক্র করে দেন। আমাদের প্রার্থনা এই যে, আমাদের অন্তরকে সুপথ প্রদর্শনের পর আল্লাহ তাআলা যেন তা বক্র না করেন এবং তিনি যেন আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করেন। তিনি প্রচুর প্রদানকারী।' অন্য বর্ণনায় এও রয়েছে, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি নিজের জন্যে করতে থাকবো। তিনি বলেনঃ “এই প্রার্থনা করঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, হে নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রভু! আমার পাপ মার্জনা। করুন, আমার অন্তরের ক্রোধ, দুঃখ কাঠিন্য দূর করুন এবং আমাকে পথভ্রষ্টকারী ফিতনা হতে বাঁচিয়ে নিন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর। (আরবী) -এ প্রার্থনাটি শুনে হযরত আসমা (রাঃ)-এর মত তিনিও প্রশ্ন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে শুনান। এ হাদীসটি গারীব। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে, তবে কুরআন কারীমের এ আয়াতটি পাঠ করার উল্লেখ নেই। সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রাত্রে জাগরিত হতেন তখন তিনি নিম্নের দু'আটি পড়তেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট আমার পাপের ক্ষমা চাচ্ছি এবং আপনার নিকট করুণা যাঞা করছি। হে আল্লাহ! আমার বিদ্যা বাড়িয়ে দিন এবং সুপথ প্রদর্শনের পর আমার অন্তরকে বক্র করবেন না ও আপনার নিকট হতে আমাকে রহমত দান করুন, আপনি সুপ্রচুর দানকারী'। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মাগরিবের নামায পড়ান। প্রথম দু'রাক'আতে আলহামদু শরীফের পর তিনি মুফাসসালের ছোট দু'টি সূরা পাঠ করেন এবং তৃতীয় রাকআতে আলহামদু শরীফের পর এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আবু আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন, “আমি সে সময় তার নিকটেই চলে গিয়েছিলাম, এমন কি আমার কাপড় তার কাপড়ের সাথে লেগে গিয়েছিল এবং আমি স্বয়ং তাঁকে এ আয়াতটি পড়তে শুনেছি। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক) হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এ হাদীসটি শুনার পূর্ব পর্যন্ত মাগরিবের তৃতীয় রাক'আতে (আরবী) পাঠ করতেন। কিন্তু এ হাদীসটি শ্রবণের পর তিনিও এ রাকআতে এ আয়াতটি পড়তে আরম্ভ করেন এবং কখনও পরিত্যাগ করেননি।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা বলে, হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে সমবেতকারী এবং তাদের মধ্যে হুকুম ও ফায়সালাকারী। আপনিই সকলকে তাদের ভাল-মন্দ কার্যের বিনিময় প্রদানকারী। ঐদিনের আগমনে এবং আপনার অঙ্গীকারের সত্যতায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

আলে ইমরান 3:10

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, অস্বীকারকারীরা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ হবে। সেদিন ঐ অত্যাচারীদের ওযর কৈফিয়ত কোন কাজে আসবে না। তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত এবং তাদের জন্যে জঘন্য বাসস্থান রয়েছে। সেদিন তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই উপকার করতে পারবে না, তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেছেনঃ ‘তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততির উপর বিস্ময়বোধ করো না, আল্লাহ ওর কারণে তাদেরকে দুনিয়ায় শাস্তি দিতে চান, কফরীর অবস্থাতেই তাদের প্রাণ বহির্গত হবে।অন্য স্থানে রয়েছেঃ “তাদের শহরে ঘুরাফেরা যেন তোমাদের প্রতারিত না করে, এ পুঁজি অল্পদিনের, অতঃপর তাদের বাসস্থান জাহান্নাম এবং ওটা জঘন্যতম স্থান। অনুরূপ এখানেও বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ তাআলার কথা অস্বীকারকারী, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্যকারী, তাঁর কিতাবের বিরোধী, অহীর অবাধ্য তারা যেন তাদের মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা কোন মঙ্গলের আশা না করে। তারা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ, তাদের দ্বারা জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত করা হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা ও তোমাদের উপাস্যেরা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মা হযরত উম্মে ফযল (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ মক্কা শরীফে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক রাত্রে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি কি আল্লাহর কথা তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? হে জনগণ! আমি কি প্রচারকার্য চালিয়েছি? হে লোক সকল! আমি কি একত্ব ও রিসালাত তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি’? হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর দ্বীন আমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছেন।'অতঃপর সকাল হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো! আল্লাহর শপথ! ইসলাম জয়যুক্ত হবে এবং বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত কাফিরেরা তাদের জায়গায় আত্মগোপন করবে। মুসলমানেরা ইসলামকে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেবে ও তার কার্য চালিয়ে যাবে। জেনে রেখো যে, এমন যুগও আসবে যখন মানুষ কুরআন মাজীদ শিক্ষা করবে ও পাঠ করবে। অতঃপর (অহংকার ও আমিত্ব প্রকাশ করতঃ) বলবেঃ আমরা কুরআন কারীমের পাঠক, আমরা বিদ্বান। কে আমাদের চেয়ে বেড়ে যাবে?' তাদের জন্য কোন মঙ্গল রয়েছে কি”? জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! ঐগুলো কে?' তিনি বলেনঃ “তোমাদের মুসলমানদের মধ্য হতেই হবে কিন্তু মনে রাখবে যে, তারা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! আপনি অত্যন্ত আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে প্রচার কার্য চালিয়েছেন এবং আপনি যথেষ্ট চেষ্টা ও পরিশ্রম করেছেন। আপনি বিশেষভাবে আমাদের মঙ্গল কামনা করেছেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যেমন অবস্থা ফিরআউন সম্প্রদায়ের ছিল, যেমন তাদের কৃতকর্ম ছিল। (আরবী) শব্দটির (আরবী) অক্ষরটি জযমের সঙ্গেও এসেছে এবং যবরের সঙ্গেও এসেছে। যেমন নাহরুন ও নাহার শব্দটি। (আরবী) শব্দটি জাকজমক, অভ্যাস, অবস্থা এবং পন্থা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। ইমরুল কায়েসের কবিতায়ও এ শব্দটি এরূপ অর্থে এসেছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর নিকট কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোন কাজে আসবে না, যেমন ফিরআউন সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের ধন-মাল ও সন্তানাদি তাদের কোন কাজে আসেনি। আল্লাহ তা'আলার পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন এবং তার শাস্তি বড়ই বেদনাদায়ক। কেউ কোন ক্ষমতার বলে ঐ শাস্তি হতে রক্ষা পেতে পারে না এবং তা সরিয়ে দিতেও পারে না। আল্লাহ পাক যা চান তাই করে থাকেন। প্রত্যেক জিনিসই তার বশীভূত। তিনি ব্যতীত কেউ মাবুদ নেই।

আলে ইমরান 3:11

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, অস্বীকারকারীরা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ হবে। সেদিন ঐ অত্যাচারীদের ওযর কৈফিয়ত কোন কাজে আসবে না। তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত এবং তাদের জন্যে জঘন্য বাসস্থান রয়েছে। সেদিন তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই উপকার করতে পারবে না, তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেছেনঃ ‘তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততির উপর বিস্ময়বোধ করো না, আল্লাহ ওর কারণে তাদেরকে দুনিয়ায় শাস্তি দিতে চান, কফরীর অবস্থাতেই তাদের প্রাণ বহির্গত হবে।অন্য স্থানে রয়েছেঃ “তাদের শহরে ঘুরাফেরা যেন তোমাদের প্রতারিত না করে, এ পুঁজি অল্পদিনের, অতঃপর তাদের বাসস্থান জাহান্নাম এবং ওটা জঘন্যতম স্থান। অনুরূপ এখানেও বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ তাআলার কথা অস্বীকারকারী, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্যকারী, তাঁর কিতাবের বিরোধী, অহীর অবাধ্য তারা যেন তাদের মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা কোন মঙ্গলের আশা না করে। তারা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ, তাদের দ্বারা জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত করা হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা ও তোমাদের উপাস্যেরা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মা হযরত উম্মে ফযল (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ মক্কা শরীফে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক রাত্রে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি কি আল্লাহর কথা তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? হে জনগণ! আমি কি প্রচারকার্য চালিয়েছি? হে লোক সকল! আমি কি একত্ব ও রিসালাত তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি’? হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর দ্বীন আমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছেন।'অতঃপর সকাল হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো! আল্লাহর শপথ! ইসলাম জয়যুক্ত হবে এবং বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত কাফিরেরা তাদের জায়গায় আত্মগোপন করবে। মুসলমানেরা ইসলামকে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেবে ও তার কার্য চালিয়ে যাবে। জেনে রেখো যে, এমন যুগও আসবে যখন মানুষ কুরআন মাজীদ শিক্ষা করবে ও পাঠ করবে। অতঃপর (অহংকার ও আমিত্ব প্রকাশ করতঃ) বলবেঃ আমরা কুরআন কারীমের পাঠক, আমরা বিদ্বান। কে আমাদের চেয়ে বেড়ে যাবে?' তাদের জন্য কোন মঙ্গল রয়েছে কি”? জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! ঐগুলো কে?' তিনি বলেনঃ “তোমাদের মুসলমানদের মধ্য হতেই হবে কিন্তু মনে রাখবে যে, তারা জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! আপনি অত্যন্ত আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে প্রচার কার্য চালিয়েছেন এবং আপনি যথেষ্ট চেষ্টা ও পরিশ্রম করেছেন। আপনি বিশেষভাবে আমাদের মঙ্গল কামনা করেছেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যেমন অবস্থা ফিরআউন সম্প্রদায়ের ছিল, যেমন তাদের কৃতকর্ম ছিল। (আরবী) শব্দটির (আরবী) অক্ষরটি জযমের সঙ্গেও এসেছে এবং যবরের সঙ্গেও এসেছে। যেমন নাহরুন ও নাহার শব্দটি। (আরবী) শব্দটি জাকজমক, অভ্যাস, অবস্থা এবং পন্থা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। ইমরুল কায়েসের কবিতায়ও এ শব্দটি এরূপ অর্থে এসেছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর নিকট কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোন কাজে আসবে না, যেমন ফিরআউন সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের ধন-মাল ও সন্তানাদি তাদের কোন কাজে আসেনি। আল্লাহ তা'আলার পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন এবং তার শাস্তি বড়ই বেদনাদায়ক। কেউ কোন ক্ষমতার বলে ঐ শাস্তি হতে রক্ষা পেতে পারে না এবং তা সরিয়ে দিতেও পারে না। আল্লাহ পাক যা চান তাই করে থাকেন। প্রত্যেক জিনিসই তার বশীভূত। তিনি ব্যতীত কেউ মাবুদ নেই।

আলে ইমরান 3:12

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি অবিশ্বাসীদেরকে বলে দাও যে, তারা পৃথিবীতেও পরাজিত ও পর্যদস্ত হবে এবং মুসলমানদের অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে এবং কিয়ামতের দিনও তাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে, আর ওটা হচ্ছে জঘন্যতম স্থান। সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক’ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আমর ইবনে কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদর যুদ্ধে বিজয় লাভের পর যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন তিনি বানূ কাইনুকার বাজারে ইয়াহুদীদেরকে একত্রিত করেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়াহুদীর দল! কুরাইশদের লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হওয়ার ন্যায় তোমরাও লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হওয়ার পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কর।' এ কথা শুনে ঐ উদ্ধত ও অবাধ্য দলটি উত্তর দেয়ঃ ‘যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কয়েকজন কুরাইশকে পরাজিত করেই বুঝি আপনি অহংকারে ফেটে পড়েছেন? আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ হলে জানতে পারবেন যুদ্ধ কাকে বলে! এখনও আমাদের সাথে আপনার যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- মক্কা বিজয়ই এটা প্রমাণ করেছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সত্য, উত্তম ও পছন্দনীয় দ্বীনকে ও ঐ দ্বীনধারীদেরকে সম্মান দানকারী। তিনি তাঁর রাসূলের ও তাঁর অনুসারীদের স্বয়ং সাহায্যকারী'। দু’টি দল যুদ্ধে পরস্পর সম্মুখীন হয়। একটি সাহাবা-ই-কিরামের দল এবং অপরটি মুশরিক কুরাইশদের দল। এটা বদর যুদ্ধের ঘটনা। সেদিন মুশরিকদের উপর এমন প্রভাব পড়ে (মুসলমানদের) এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে এমনভাবে সাহায্য করেন যে, যদিও মুসলমানেরা সংখ্যায় মুশরিকদের অপেক্ষা বহু কম ছিল, কিন্তু মুশরিকরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমানদেরকে দ্বিগুণ দেখছিল। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মুশরিকরা উমায়ের ইবনে সাদকে গোয়েন্দাগিরির জন্যে প্রেরণ করেছিল। সে এসে সংবাদ দেয় যে, মুসলমানদের সংখ্যা কিছু কম বেশী তিনশ জন। আসলেও তাই ছিল। তাদের সংখ্যা ছিল তিনশ দশ এবং আর কয়েকজন বেশী। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহ তা'আলা তাঁর বিশিষ্ট ও নির্বাচিত এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। একটি অর্থ তো এই। দ্বিতীয় ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, কাফিরদের সংখ্যা মুসলমানদের দ্বিগুণ ছিল, এটা মুসলমানেরা জানতো এবং প্রত্যক্ষও করছিল। তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সাহায্য করতঃ কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, বদরী সাহাবীরা (রাঃ) ছিলেন তিনশ তেরোজন এবং মুশরিকরা ছিল দু’শ ষোল জন। কিন্তু ইতিহাসের পুস্তকগুলোতে মুশরিকদের ন’শ হতে এক হাজার বর্ণনা করা হয়েছে। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রাঃ) কুরআন শরীফের শব্দ দ্বারাই দলীল গ্রহণ করে থাকবেন। বানূ হাজ্জাজ গোত্রের একটি কৃষ্ণ বর্ণের ক্রীতদাস যে ধৃত হয়ে এসেছিল, তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরাইশদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে সে বলেঃ ‘অনেক। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা দৈনিক কতটি উট যবেহ করছে?' সে বলেঃ ‘একদিন নয়টি এবং আর একদিন দশটি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তাহলে মুশরিকদের সংখ্যা নয়শ এবং এক হাজারের মধ্যবর্তী।' সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকরা মুসলমানদের তিনগুণ ছিল। কিন্তু এটা স্মরণ রাখবার বিষয় যে, আরববাসী বলে থাকে, আমার নিকট এক হাজার তো রয়েছে কিন্তু আমার আরও এর দ্বিগুণ প্রয়োজন এবং তার তিন হাজারের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। তাহলে কোন অসুবিধা থাকলো না কিন্তু প্রশ্ন আরও একটি রয়েছে, তা এই যে, কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তোমরা মুখোমুখী হয়ে গেলে তখন আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের চোখে কম দেখালেন যেন আল্লাহ যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা হয়ে যায়। (৮:৪৪) সুতরাং এ পবিত্র আয়াতের দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, প্রকৃত সংখ্যার চেয়েও অল্প পরিলক্ষিত হয়। আর উপরোক্ত আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে। যে, বেশী এমন কি দ্বিগুণ পরিলক্ষিত হয়। তাহলে আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য কিরূপে হতে পারে? উত্তর এই যে, ঐ আয়াতে অবস্থা ছিল এক রকম এবং এ আয়াতে অবস্থা ছিল অন্য রকম। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ বদরের দিন মুশরিকদের সংখ্যা আমাদের চোখে মোটেই বেশী দেখায়নি। আমরা আবার গভীরভাবে দৃষ্টিপতি করেও বুঝতে পারি যে, তাদের সংখ্যা আমাদের অপেক্ষা বেশী নয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘মুশরিকদের সংখ্যা আমাদের নিকট এত অল্প মনে হলো যে, আমি আমার পাশ্ববর্তী একজনকে বললাম-এরা সত্তরজন হবে। ঐ লোকটি তখন বললোঃ না না,একশজন হবে। তাদের একজন লোক ধৃত হলে আমরা তাকে মুশরিকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করি। সে বলেঃ এক হাজার। অতঃপর যখন উভয় পক্ষ সারিবদ্ধভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন মুসলমাদের মনে হয় যে, মুশরিকরা তাদের দ্বিগুণ হবে। এটা এ জন্যই যে, যেন তারা নিজেদের দুর্বলতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে, সমস্ত মনোযোগ তারই দিকে ফিরিয়ে দেয় এবং তারই নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানায়। অনুরূপভাবে মুশরিকদের নিকটও মুসলমানদের সংখ্যা তাদের দ্বিগুণ অনুভূত হয়, যেন তাদের অন্তরে ভয় ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। অতঃপর যখন যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায় তখন প্রত্যেক দলের দৃষ্টিতে নিজেদের তুলনায় অন্য দলের সংখ্যা কম পরিলক্ষিত হয় যেন উভয় দলই উদ্যমের সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাআলা সত্য ও মিথ্যার স্পষ্ট মীমাংসা করে দেন। যেন কুফর ও ঔদ্ধত্যের উপর ঈমানের বিজয় লাভ ঘটে এবং যেন মুসলমানেরা সম্মানিত হয় এবং কাফিরেরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ বদরের দিন তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন, অথচ তোমরা সে সময় দুর্বল ছিলে।' (৩:১২৩) এ জন্যেই এখানেও বলেছেন- “আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তদীয় সাহায্যদানে শক্তিশালী করে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এর মধ্যে চক্ষুষ্মনদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। অর্থাৎ যারা স্থির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট তারা আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনে উঠেপড়ে লেগে যাবে এবং বুঝে নেবে যে, আল্লাহ পাক তাঁর মনোনীত বান্দাদেরকে এ ইহলৌকিক জগতেও সাহায্য করবেন এবং কিয়ামতের দিনও তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করবেন।

আলে ইমরান 3:13

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি অবিশ্বাসীদেরকে বলে দাও যে, তারা পৃথিবীতেও পরাজিত ও পর্যদস্ত হবে এবং মুসলমানদের অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে এবং কিয়ামতের দিনও তাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে, আর ওটা হচ্ছে জঘন্যতম স্থান। সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক’ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আমর ইবনে কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদর যুদ্ধে বিজয় লাভের পর যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন তিনি বানূ কাইনুকার বাজারে ইয়াহুদীদেরকে একত্রিত করেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়াহুদীর দল! কুরাইশদের লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হওয়ার ন্যায় তোমরাও লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হওয়ার পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কর।' এ কথা শুনে ঐ উদ্ধত ও অবাধ্য দলটি উত্তর দেয়ঃ ‘যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কয়েকজন কুরাইশকে পরাজিত করেই বুঝি আপনি অহংকারে ফেটে পড়েছেন? আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ হলে জানতে পারবেন যুদ্ধ কাকে বলে! এখনও আমাদের সাথে আপনার যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- মক্কা বিজয়ই এটা প্রমাণ করেছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সত্য, উত্তম ও পছন্দনীয় দ্বীনকে ও ঐ দ্বীনধারীদেরকে সম্মান দানকারী। তিনি তাঁর রাসূলের ও তাঁর অনুসারীদের স্বয়ং সাহায্যকারী'। দু’টি দল যুদ্ধে পরস্পর সম্মুখীন হয়। একটি সাহাবা-ই-কিরামের দল এবং অপরটি মুশরিক কুরাইশদের দল। এটা বদর যুদ্ধের ঘটনা। সেদিন মুশরিকদের উপর এমন প্রভাব পড়ে (মুসলমানদের) এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে এমনভাবে সাহায্য করেন যে, যদিও মুসলমানেরা সংখ্যায় মুশরিকদের অপেক্ষা বহু কম ছিল, কিন্তু মুশরিকরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমানদেরকে দ্বিগুণ দেখছিল। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মুশরিকরা উমায়ের ইবনে সাদকে গোয়েন্দাগিরির জন্যে প্রেরণ করেছিল। সে এসে সংবাদ দেয় যে, মুসলমানদের সংখ্যা কিছু কম বেশী তিনশ জন। আসলেও তাই ছিল। তাদের সংখ্যা ছিল তিনশ দশ এবং আর কয়েকজন বেশী। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহ তা'আলা তাঁর বিশিষ্ট ও নির্বাচিত এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। একটি অর্থ তো এই। দ্বিতীয় ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, কাফিরদের সংখ্যা মুসলমানদের দ্বিগুণ ছিল, এটা মুসলমানেরা জানতো এবং প্রত্যক্ষও করছিল। তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সাহায্য করতঃ কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, বদরী সাহাবীরা (রাঃ) ছিলেন তিনশ তেরোজন এবং মুশরিকরা ছিল দু’শ ষোল জন। কিন্তু ইতিহাসের পুস্তকগুলোতে মুশরিকদের ন’শ হতে এক হাজার বর্ণনা করা হয়েছে। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রাঃ) কুরআন শরীফের শব্দ দ্বারাই দলীল গ্রহণ করে থাকবেন। বানূ হাজ্জাজ গোত্রের একটি কৃষ্ণ বর্ণের ক্রীতদাস যে ধৃত হয়ে এসেছিল, তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরাইশদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে সে বলেঃ ‘অনেক। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা দৈনিক কতটি উট যবেহ করছে?' সে বলেঃ ‘একদিন নয়টি এবং আর একদিন দশটি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তাহলে মুশরিকদের সংখ্যা নয়শ এবং এক হাজারের মধ্যবর্তী।' সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকরা মুসলমানদের তিনগুণ ছিল। কিন্তু এটা স্মরণ রাখবার বিষয় যে, আরববাসী বলে থাকে, আমার নিকট এক হাজার তো রয়েছে কিন্তু আমার আরও এর দ্বিগুণ প্রয়োজন এবং তার তিন হাজারের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। তাহলে কোন অসুবিধা থাকলো না কিন্তু প্রশ্ন আরও একটি রয়েছে, তা এই যে, কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তোমরা মুখোমুখী হয়ে গেলে তখন আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের চোখে কম দেখালেন যেন আল্লাহ যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা হয়ে যায়। (৮:৪৪) সুতরাং এ পবিত্র আয়াতের দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, প্রকৃত সংখ্যার চেয়েও অল্প পরিলক্ষিত হয়। আর উপরোক্ত আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে। যে, বেশী এমন কি দ্বিগুণ পরিলক্ষিত হয়। তাহলে আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য কিরূপে হতে পারে? উত্তর এই যে, ঐ আয়াতে অবস্থা ছিল এক রকম এবং এ আয়াতে অবস্থা ছিল অন্য রকম। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ বদরের দিন মুশরিকদের সংখ্যা আমাদের চোখে মোটেই বেশী দেখায়নি। আমরা আবার গভীরভাবে দৃষ্টিপতি করেও বুঝতে পারি যে, তাদের সংখ্যা আমাদের অপেক্ষা বেশী নয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘মুশরিকদের সংখ্যা আমাদের নিকট এত অল্প মনে হলো যে, আমি আমার পাশ্ববর্তী একজনকে বললাম-এরা সত্তরজন হবে। ঐ লোকটি তখন বললোঃ না না,একশজন হবে। তাদের একজন লোক ধৃত হলে আমরা তাকে মুশরিকদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করি। সে বলেঃ এক হাজার। অতঃপর যখন উভয় পক্ষ সারিবদ্ধভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন মুসলমাদের মনে হয় যে, মুশরিকরা তাদের দ্বিগুণ হবে। এটা এ জন্যই যে, যেন তারা নিজেদের দুর্বলতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে, সমস্ত মনোযোগ তারই দিকে ফিরিয়ে দেয় এবং তারই নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানায়। অনুরূপভাবে মুশরিকদের নিকটও মুসলমানদের সংখ্যা তাদের দ্বিগুণ অনুভূত হয়, যেন তাদের অন্তরে ভয় ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। অতঃপর যখন যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায় তখন প্রত্যেক দলের দৃষ্টিতে নিজেদের তুলনায় অন্য দলের সংখ্যা কম পরিলক্ষিত হয় যেন উভয় দলই উদ্যমের সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাআলা সত্য ও মিথ্যার স্পষ্ট মীমাংসা করে দেন। যেন কুফর ও ঔদ্ধত্যের উপর ঈমানের বিজয় লাভ ঘটে এবং যেন মুসলমানেরা সম্মানিত হয় এবং কাফিরেরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ বদরের দিন তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন, অথচ তোমরা সে সময় দুর্বল ছিলে।' (৩:১২৩) এ জন্যেই এখানেও বলেছেন- “আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তদীয় সাহায্যদানে শক্তিশালী করে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এর মধ্যে চক্ষুষ্মনদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। অর্থাৎ যারা স্থির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট তারা আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনে উঠেপড়ে লেগে যাবে এবং বুঝে নেবে যে, আল্লাহ পাক তাঁর মনোনীত বান্দাদেরকে এ ইহলৌকিক জগতেও সাহায্য করবেন এবং কিয়ামতের দিনও তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করবেন।

আলে ইমরান 3:14

১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, পার্থিব জীবনকে বিভিন্ন প্রকারের উপভোগ্য (বস্তু) দ্বারা সুশোভিত করা হয়েছে। এ সমুদয় জিনিসের মধ্যে সর্বপ্রথম নারীদের কথা বর্ণনা করেছেন, কেননা তাদের অনিষ্ট সবচেয়ে বড়। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আমার পরে পুরুষদের উপর স্ত্রীদের চেয়ে বেশী ক্ষতিকর ও ফিত্না ছেড়ে গেলাম না। হ্যা, তবে যখন বিবাহ দ্বারা কোন লোকের উদ্দেশ্য হবে ব্যভিচার হতে রক্ষা পাওয়া ও সন্তানাদির আধিক্য তখন নিঃসন্দেহে ওটা উত্তম কাজ হবে। শরীয়ত বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে এবং বিয়ে করা এমনকি বহু বিয়ে করার ফযীলতের অনেক হাদীসও এসেছে এবং এ উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে অধিক স্ত্রীর অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘দুনিয়া একটি উপকারের বস্তু এবং ওর সর্বোত্তম উপকারী জিনিস হচ্ছে সতী সাধ্বী পত্নী। স্বামী যদি তার দিকে। দৃষ্টিপাত করে তবে সে তাকে সন্তুষ্ট করে, যদি নির্দেশ দেয় তবে পালন করে। আর যদি সে স্ত্রী হতে অনুপস্থিত থাকে তবে সে নিজের জীবনের ও স্বামীর ধন-মালের রক্ষণাবেক্ষণ করে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমার নিকট নারী ও সুগন্ধি অত্যন্ত পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হচ্ছে নামায। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিল নারীগণ, তবে তিনি ঘোড়াও খুব পছন্দ করতেন। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তার খুব চাহিদার জিনিস ঘোড়া ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। হ্যা, তবে শুধুমাত্র নারীরা ছিল। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, স্ত্রীদেরকে ভালবাসার মধ্যে মঙ্গলও রয়েছে এবং অমঙ্গলও রয়েছে। অনুরূপভাবে অন্যদের উপর অহংকার প্রকাশ করার জন্যে যদি অধিক সন্তান লাভ কামনা করে তবে তা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি এর দ্বারা বংশ বৃদ্ধি ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে একত্ববাদী মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য থাকে তবে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ভালবাসা স্থাপনকারিণী ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণী নারীদেরকে তোমরা বিয়ে কর, কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের সংখ্যার আধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতবর্গের উপর গর্ববোধ করবো।' মাল-ধনের ব্যাপারেও একই কথা। যদি ওর প্রতি ভালবাসার উদ্দেশ্য হয় দুর্বলদের ঘৃণা করা ও দরিদ্রের উপর অহংকার প্রকাশ করা, তবে তা অতি জঘন্য। আর যদি মালের চাহিদার উদ্দেশ্য হয় নিকটের ও দূরের আত্মীয়দের উপর খরচ করা, সকার্যাবলী সম্পাদন করা এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করা তবে তা শরীয়ত সম্মত ও খুবই উত্তম। (আরবী)-এর পরিমাণের ব্যাপারে তাফসীর কারকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মোটকথা এই যে, অত্যধিক মালকে (আরবী) বলা হয়। যেমন হযরত যন্হাকের উক্তি রয়েছে। আরও বহু উক্তি রয়েছে, যেমন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা, বারো হাজার, চল্লিশ হাজার, ষাট হাজার, সত্তর হাজার, আশি হাজার ইত্যাদি। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘বারো হাজার আওকিয়ায় এক কিনতার হয় এবং প্রত্যেক আওকিয়া পৃথিবী ও আকাশ হতে উত্তম। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এ রকমই একটি মাওকুফ হাদীসও বর্ণিত আছে এবং এটাই সর্বাপেক্ষা সঠিক। হযরত ইবনে জারীর (রঃ), হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটা বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাতিম (রঃ)-এর গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বারো আওকিয়া’য় এক কিনতার হয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘বারোশ আওকিয়া’য় এক কিনতার হয়। কিন্তু এ হাদীসটি ‘মুনকার'। সম্ভবতঃ এটা হযরত উবাই ইবনে কাবের উক্তি। যেমন অন্যান্য সাহাবীরও (রাঃ) এই উক্তি রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি একশ আয়াত পাঠ করবে তার নাম উদাসীনদের মধ্যে লেখা হবে না এবং যে ব্যক্তি এক হাজার পর্যন্ত পাঠ করবে তাকে এক কিনতার পুণ্য দেয়া হবে। আর কিনতার হচ্ছে বড় পাহাড়ের সমান।' মুসতাদরিক-ইহাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ শব্দটির ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “দু'হাজার আওকিয়া।' ইমাম হাকিম (রঃ) হাদীসটিকে ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সঠিক বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটি আনেননি। তাবরানী প্রভৃতি মনীষীর হাদীস গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, কিনতার হচ্ছে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে মাওকুফ’ বা ‘মুরসাল’ রূপে বর্ণিত আছে যে, কিনতার হচ্ছে বারোশ স্বর্ণমুদ্রা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, কোন কোন আরববাসী কিনতারকে বারোশ বলে থাকেন আবার কেউ কেউ বারো হাজার বলেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, বলদের গাত্র-চর্ম পূর্ণ হয়ে যায় এই পরিমাণ স্বর্ণকে কিনতার বলা হয়। এটা মারফু রূপেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর মাওকুফ হওয়াই অধিকতর সঠিক।অশ্বের প্রতি প্রেম তিন প্রকারের। প্রথম হচ্ছে ঐসব লোক যারা অশ্বের উপর আরোহণ করে আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্যে তা লালন-পালন করে। তাদের জন্য এ ঘোড়া পুণ্য ও সওয়াবের কারণ। দ্বিতীয় হচ্ছে তারাই যারা গর্ব ও অহংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে অশ্ব পালন করে থাকে। এদের জন্য শাস্তি রয়েছে। তৃতীয় হচ্ছে ওরাই যারা ভিক্ষাবৃত্তি হতে রক্ষা পাওয়া এবং ওর বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যে অশ্ব পালন করে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রাপ্য বিস্মরণ হয় না। এদের জন্যে পুণ্য বা শাস্তি কোনটাই নেই। এ বিষয়ের (আরবী) হাদীস (৮:৬০) -এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্নিত এবং কপালে ও চার পায়ে সাদা চিহ্নযুক্ত ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক আরবী অশ্ব ফজরের সময় আল্লাহ তাআলার অনুমতিক্রমে দু'টি প্রার্থনা করে থাকে। সে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যার অধিকারে রেখেছেন তার অন্তরে আমার ভালবাসা তার মাল ও পরিবার অপেক্ষা বেশী করে দিন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উট, ছাগল ও গরু। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ ভূমি যা ফসলের বীজ বপন বা বৃক্ষরোপণের জন্যে তৈরী করা হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের উত্তম মাল হচ্ছে অধিক বংশ বিশিষ্ট ঘোড়া এবং অধিক ফলবান বৃক্ষ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।' অতঃপর বলা হচ্ছেঃ ‘এগুলো পার্থিব জীবনের লোভনীয় সম্পদ। অর্থাৎ এগুলো ইহলৌকিক জীবনের লোভনীয় বস্তু, এগুলো সবই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং শ্রেষ্ঠতম অবস্থান স্থল ও উত্তম বিনিময় প্রাপ্তির জায়গা মহান আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, যখন (আরবী) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি যখন আমাদের জন্যে এটাকে সুশোভিত করেছেন তাহলে এখন'? তখন পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এখানে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়ঃ (হে নবী সঃ)! তুমি বলে দাও আমি তোমাদেরকে এসব অপেক্ষা উত্তম জিনিসের সংবাদ দিচ্ছি। এ পার্থিব জিনিসগুলো তো একদিন না একদিন ধ্বংস হবেই। কিন্তু আমি তোমাদেরকে যেসব জিনিসের কথা বলছি সেগুলো অস্থায়ী নয় বরং চিরস্থায়ী। জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে তাদের প্রভুর নিকট এমন সুখময় জান্নাত রয়েছে যার ধারে ধারে ও যার বৃক্ষাদির মধ্যস্থলে বিভিন্ন প্রকারের স্রোতস্বিনী সমূহ বয়ে যাচ্ছে। কোন স্থানে রয়েছে মধুর নদী, কোন জায়গায় রয়েছে দুধের নদী, কোথাও বা রয়েছে সুরার স্রোতস্বিনী এবং কোন স্থলে রয়েছে স্বচ্ছ পানির প্রস্রবণ। আরও এমন এমন সুখ-সম্পদ রয়েছে যা না শ্রবণ করেছে কোন কর্ণ, না দর্শন করেছে কোন চক্ষু, ধারণা করেছে কেন অন্তর। এরূপ সুখময় ও আরামদায়ক স্থানে মুত্তাকী লোকেরা চিরকাল অবস্থান করবে। তথা হতে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে। না, তাদেরকে প্রদত্ত নিয়ামতরাজী কমে যাবে না এবং ধ্বংসও হবে না। অতঃপর তথায় এমন সহধর্মিণী পাওয়া যাবে যারা ময়লা মালিন্য, অপবিত্রতা, ঋতুরক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রকারের পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বিরাজ করবে। সর্বোপরি খুশীর কারণ এই যে, মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। এর পরেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কোন ভয় থাকবে না। এজন্যেই সূরা-ই-বারাআতের নিম্নের আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই খুব বড় জিনিস'। (২:৭২) অর্থাৎ নিয়ামত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হচ্ছে প্রভুর সন্তুষ্টি লাভ। সমস্ত বান্দাই আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। কে তাঁর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য এবং কে যোগ্য নয় তা তিনিই ভাল জানেন।

আলে ইমরান 3:15

১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, পার্থিব জীবনকে বিভিন্ন প্রকারের উপভোগ্য (বস্তু) দ্বারা সুশোভিত করা হয়েছে। এ সমুদয় জিনিসের মধ্যে সর্বপ্রথম নারীদের কথা বর্ণনা করেছেন, কেননা তাদের অনিষ্ট সবচেয়ে বড়। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আমার পরে পুরুষদের উপর স্ত্রীদের চেয়ে বেশী ক্ষতিকর ও ফিত্না ছেড়ে গেলাম না। হ্যা, তবে যখন বিবাহ দ্বারা কোন লোকের উদ্দেশ্য হবে ব্যভিচার হতে রক্ষা পাওয়া ও সন্তানাদির আধিক্য তখন নিঃসন্দেহে ওটা উত্তম কাজ হবে। শরীয়ত বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে এবং বিয়ে করা এমনকি বহু বিয়ে করার ফযীলতের অনেক হাদীসও এসেছে এবং এ উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে অধিক স্ত্রীর অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘দুনিয়া একটি উপকারের বস্তু এবং ওর সর্বোত্তম উপকারী জিনিস হচ্ছে সতী সাধ্বী পত্নী। স্বামী যদি তার দিকে। দৃষ্টিপাত করে তবে সে তাকে সন্তুষ্ট করে, যদি নির্দেশ দেয় তবে পালন করে। আর যদি সে স্ত্রী হতে অনুপস্থিত থাকে তবে সে নিজের জীবনের ও স্বামীর ধন-মালের রক্ষণাবেক্ষণ করে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমার নিকট নারী ও সুগন্ধি অত্যন্ত পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হচ্ছে নামায। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিল নারীগণ, তবে তিনি ঘোড়াও খুব পছন্দ করতেন। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তার খুব চাহিদার জিনিস ঘোড়া ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। হ্যা, তবে শুধুমাত্র নারীরা ছিল। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, স্ত্রীদেরকে ভালবাসার মধ্যে মঙ্গলও রয়েছে এবং অমঙ্গলও রয়েছে। অনুরূপভাবে অন্যদের উপর অহংকার প্রকাশ করার জন্যে যদি অধিক সন্তান লাভ কামনা করে তবে তা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি এর দ্বারা বংশ বৃদ্ধি ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে একত্ববাদী মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য থাকে তবে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ভালবাসা স্থাপনকারিণী ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণী নারীদেরকে তোমরা বিয়ে কর, কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের সংখ্যার আধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতবর্গের উপর গর্ববোধ করবো।' মাল-ধনের ব্যাপারেও একই কথা। যদি ওর প্রতি ভালবাসার উদ্দেশ্য হয় দুর্বলদের ঘৃণা করা ও দরিদ্রের উপর অহংকার প্রকাশ করা, তবে তা অতি জঘন্য। আর যদি মালের চাহিদার উদ্দেশ্য হয় নিকটের ও দূরের আত্মীয়দের উপর খরচ করা, সকার্যাবলী সম্পাদন করা এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করা তবে তা শরীয়ত সম্মত ও খুবই উত্তম। (আরবী)-এর পরিমাণের ব্যাপারে তাফসীর কারকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মোটকথা এই যে, অত্যধিক মালকে (আরবী) বলা হয়। যেমন হযরত যন্হাকের উক্তি রয়েছে। আরও বহু উক্তি রয়েছে, যেমন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা, বারো হাজার, চল্লিশ হাজার, ষাট হাজার, সত্তর হাজার, আশি হাজার ইত্যাদি। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘বারো হাজার আওকিয়ায় এক কিনতার হয় এবং প্রত্যেক আওকিয়া পৃথিবী ও আকাশ হতে উত্তম। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এ রকমই একটি মাওকুফ হাদীসও বর্ণিত আছে এবং এটাই সর্বাপেক্ষা সঠিক। হযরত ইবনে জারীর (রঃ), হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটা বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাতিম (রঃ)-এর গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বারো আওকিয়া’য় এক কিনতার হয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘বারোশ আওকিয়া’য় এক কিনতার হয়। কিন্তু এ হাদীসটি ‘মুনকার'। সম্ভবতঃ এটা হযরত উবাই ইবনে কাবের উক্তি। যেমন অন্যান্য সাহাবীরও (রাঃ) এই উক্তি রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি একশ আয়াত পাঠ করবে তার নাম উদাসীনদের মধ্যে লেখা হবে না এবং যে ব্যক্তি এক হাজার পর্যন্ত পাঠ করবে তাকে এক কিনতার পুণ্য দেয়া হবে। আর কিনতার হচ্ছে বড় পাহাড়ের সমান।' মুসতাদরিক-ইহাকিম’ গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ শব্দটির ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “দু'হাজার আওকিয়া।' ইমাম হাকিম (রঃ) হাদীসটিকে ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সঠিক বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটি আনেননি। তাবরানী প্রভৃতি মনীষীর হাদীস গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, কিনতার হচ্ছে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে মাওকুফ’ বা ‘মুরসাল’ রূপে বর্ণিত আছে যে, কিনতার হচ্ছে বারোশ স্বর্ণমুদ্রা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, কোন কোন আরববাসী কিনতারকে বারোশ বলে থাকেন আবার কেউ কেউ বারো হাজার বলেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, বলদের গাত্র-চর্ম পূর্ণ হয়ে যায় এই পরিমাণ স্বর্ণকে কিনতার বলা হয়। এটা মারফু রূপেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর মাওকুফ হওয়াই অধিকতর সঠিক।অশ্বের প্রতি প্রেম তিন প্রকারের। প্রথম হচ্ছে ঐসব লোক যারা অশ্বের উপর আরোহণ করে আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্যে তা লালন-পালন করে। তাদের জন্য এ ঘোড়া পুণ্য ও সওয়াবের কারণ। দ্বিতীয় হচ্ছে তারাই যারা গর্ব ও অহংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে অশ্ব পালন করে থাকে। এদের জন্য শাস্তি রয়েছে। তৃতীয় হচ্ছে ওরাই যারা ভিক্ষাবৃত্তি হতে রক্ষা পাওয়া এবং ওর বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যে অশ্ব পালন করে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রাপ্য বিস্মরণ হয় না। এদের জন্যে পুণ্য বা শাস্তি কোনটাই নেই। এ বিষয়ের (আরবী) হাদীস (৮:৬০) -এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্নিত এবং কপালে ও চার পায়ে সাদা চিহ্নযুক্ত ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক আরবী অশ্ব ফজরের সময় আল্লাহ তাআলার অনুমতিক্রমে দু'টি প্রার্থনা করে থাকে। সে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যার অধিকারে রেখেছেন তার অন্তরে আমার ভালবাসা তার মাল ও পরিবার অপেক্ষা বেশী করে দিন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উট, ছাগল ও গরু। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ ভূমি যা ফসলের বীজ বপন বা বৃক্ষরোপণের জন্যে তৈরী করা হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের উত্তম মাল হচ্ছে অধিক বংশ বিশিষ্ট ঘোড়া এবং অধিক ফলবান বৃক্ষ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।' অতঃপর বলা হচ্ছেঃ ‘এগুলো পার্থিব জীবনের লোভনীয় সম্পদ। অর্থাৎ এগুলো ইহলৌকিক জীবনের লোভনীয় বস্তু, এগুলো সবই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং শ্রেষ্ঠতম অবস্থান স্থল ও উত্তম বিনিময় প্রাপ্তির জায়গা মহান আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, যখন (আরবী) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি যখন আমাদের জন্যে এটাকে সুশোভিত করেছেন তাহলে এখন'? তখন পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এখানে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়ঃ (হে নবী সঃ)! তুমি বলে দাও আমি তোমাদেরকে এসব অপেক্ষা উত্তম জিনিসের সংবাদ দিচ্ছি। এ পার্থিব জিনিসগুলো তো একদিন না একদিন ধ্বংস হবেই। কিন্তু আমি তোমাদেরকে যেসব জিনিসের কথা বলছি সেগুলো অস্থায়ী নয় বরং চিরস্থায়ী। জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে তাদের প্রভুর নিকট এমন সুখময় জান্নাত রয়েছে যার ধারে ধারে ও যার বৃক্ষাদির মধ্যস্থলে বিভিন্ন প্রকারের স্রোতস্বিনী সমূহ বয়ে যাচ্ছে। কোন স্থানে রয়েছে মধুর নদী, কোন জায়গায় রয়েছে দুধের নদী, কোথাও বা রয়েছে সুরার স্রোতস্বিনী এবং কোন স্থলে রয়েছে স্বচ্ছ পানির প্রস্রবণ। আরও এমন এমন সুখ-সম্পদ রয়েছে যা না শ্রবণ করেছে কোন কর্ণ, না দর্শন করেছে কোন চক্ষু, ধারণা করেছে কেন অন্তর। এরূপ সুখময় ও আরামদায়ক স্থানে মুত্তাকী লোকেরা চিরকাল অবস্থান করবে। তথা হতে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে। না, তাদেরকে প্রদত্ত নিয়ামতরাজী কমে যাবে না এবং ধ্বংসও হবে না। অতঃপর তথায় এমন সহধর্মিণী পাওয়া যাবে যারা ময়লা মালিন্য, অপবিত্রতা, ঋতুরক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রকারের পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বিরাজ করবে। সর্বোপরি খুশীর কারণ এই যে, মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। এর পরেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কোন ভয় থাকবে না। এজন্যেই সূরা-ই-বারাআতের নিম্নের আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই খুব বড় জিনিস'। (২:৭২) অর্থাৎ নিয়ামত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হচ্ছে প্রভুর সন্তুষ্টি লাভ। সমস্ত বান্দাই আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। কে তাঁর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য এবং কে যোগ্য নয় তা তিনিই ভাল জানেন।

আলে ইমরান 3:16

১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সংযমী বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা আপনার উপর, আপনার কিতাবের উপর ও রাসূল (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। সুতরাং এ ঈমানের উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতঃ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিন। এ সংযমী লোকেরা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য স্বীকার করতঃ তাঁর সমস্ত আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে এবং অবৈধ জিনিস হতে দূরে থাকে। তারা প্রতিটি কাজে-কর্মে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। তারা ঈমানের দাবীতেও সত্যবাদী।জীবনের উপর কঠিন ও কষ্টকর হলেও তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে। তারা বিনয় ও নমতা প্রকাশকারী। তারা নিজেদের ধন-মাল আল্লাহর পথে তার নির্দেশ মত ব্যয় করে থাকে। তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, মানুষকে অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখে এবং তাদের দুঃখে সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করে। তারা দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য দানে পরিতুষ্ট করে এবং ভোর রাত্রে উঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ সময় ক্ষমা প্রার্থনা করার গুরুত্ব অত্যধিক। এও বলা হয়েছে যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ) তাঁর পুত্রদেরকে যে সময় বলেছিলেনঃ (আরবী) আল্লাহর পথে তাঁর অর্থাৎ ‘অতিসত্বরই আমি আমার প্রভুর নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।' (১২:৯৮) ওটার ভাবার্থ ঊষাকালই বটে। অর্থাৎ হযরত ইয়াকূব (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে বলেনঃ ‘প্রাতঃকালে তোমাদের জন্যে আমার প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাত্রে এক তৃতীয়াংশ রাত্র অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ ‘কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি যাকে আমি দান করবো? কোন প্রার্থনাকারী আছে কি যার প্রার্থনা আমি কবূল করবো? কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি যাকে আমি ক্ষমা করবো?হাফেজ আবুল হাসান দারেকুতনী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি পৃথক পুস্তক রচনা করেছেন এবং উক্ত পুস্তকের মধ্যে এ হাদীসটির সমস্ত সনদ এবং ওর প্রত্যেকটি শব্দ এনেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের প্রথমভাগে, মধ্যভাগে এবং শেষভাগে বেতেরের নামায পড়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বেতের পড়ার সর্বশেষ সময় ছিল ঊষার উদয় পর্যন্ত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) রাত্রে তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং স্বীয় গোলাম হযরত নাফে'কে জিজ্ঞেস করতেনঃ সকাল হয়েছে কি? যখন বলতো, 'হ্যা, হয়েছে, তখন তিনি সুবহে সাদিক হওয়া পর্যন্ত দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনায় লিপ্ত থাকতেন। হযরত হাতিব (রঃ) বলেনঃ ঊষার সময় আমি শুনতে পাই কে যেন মসজিদের কোন এক প্রান্তে বলছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন আমি তা পালন করেছি। এটা উষাকাল, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি দেখি যে, তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ ‘আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হতো যে, আমরা তাহাজ্জুদের নামায পড়লে যেন ঊষার শেষ সময়ে সত্তরবার আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।'

আলে ইমরান 3:17

১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সংযমী বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা আপনার উপর, আপনার কিতাবের উপর ও রাসূল (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। সুতরাং এ ঈমানের উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতঃ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিন। এ সংযমী লোকেরা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য স্বীকার করতঃ তাঁর সমস্ত আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে এবং অবৈধ জিনিস হতে দূরে থাকে। তারা প্রতিটি কাজে-কর্মে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। তারা ঈমানের দাবীতেও সত্যবাদী।জীবনের উপর কঠিন ও কষ্টকর হলেও তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে। তারা বিনয় ও নমতা প্রকাশকারী। তারা নিজেদের ধন-মাল আল্লাহর পথে তার নির্দেশ মত ব্যয় করে থাকে। তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, মানুষকে অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখে এবং তাদের দুঃখে সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করে। তারা দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য দানে পরিতুষ্ট করে এবং ভোর রাত্রে উঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ সময় ক্ষমা প্রার্থনা করার গুরুত্ব অত্যধিক। এও বলা হয়েছে যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ) তাঁর পুত্রদেরকে যে সময় বলেছিলেনঃ (আরবী) আল্লাহর পথে তাঁর অর্থাৎ ‘অতিসত্বরই আমি আমার প্রভুর নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।' (১২:৯৮) ওটার ভাবার্থ ঊষাকালই বটে। অর্থাৎ হযরত ইয়াকূব (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে বলেনঃ ‘প্রাতঃকালে তোমাদের জন্যে আমার প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাত্রে এক তৃতীয়াংশ রাত্র অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ ‘কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি যাকে আমি দান করবো? কোন প্রার্থনাকারী আছে কি যার প্রার্থনা আমি কবূল করবো? কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি যাকে আমি ক্ষমা করবো?হাফেজ আবুল হাসান দারেকুতনী (রঃ) এ বিষয়ের উপর একটি পৃথক পুস্তক রচনা করেছেন এবং উক্ত পুস্তকের মধ্যে এ হাদীসটির সমস্ত সনদ এবং ওর প্রত্যেকটি শব্দ এনেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের প্রথমভাগে, মধ্যভাগে এবং শেষভাগে বেতেরের নামায পড়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বেতের পড়ার সর্বশেষ সময় ছিল ঊষার উদয় পর্যন্ত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) রাত্রে তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং স্বীয় গোলাম হযরত নাফে'কে জিজ্ঞেস করতেনঃ সকাল হয়েছে কি? যখন বলতো, 'হ্যা, হয়েছে, তখন তিনি সুবহে সাদিক হওয়া পর্যন্ত দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনায় লিপ্ত থাকতেন। হযরত হাতিব (রঃ) বলেনঃ ঊষার সময় আমি শুনতে পাই কে যেন মসজিদের কোন এক প্রান্তে বলছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন আমি তা পালন করেছি। এটা উষাকাল, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি দেখি যে, তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ ‘আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হতো যে, আমরা তাহাজ্জুদের নামায পড়লে যেন ঊষার শেষ সময়ে সত্তরবার আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।'

আলে ইমরান 3:18

১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সুতরাং তাঁর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী সাক্ষী এবং তারই কথা সবচেয়ে সত্য। তিনি বলেন যে, সমস্ত সৃষ্টজীব তার দাস এবং একমাত্র তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তারই মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। মা’রূদ ও আল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে তিনি। একাই, তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। যেমনঃ কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ সজ্ঞানে তোমার প্রতি অবতীর্ণকৃত কিতাবের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রদান করছেন এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' অতঃপর আল্লাহ পাক স্বীয় সাক্ষ্যের সাথে ফেরেশতাদের ও আলেমদের সাক্ষ্যকেও মিলিয়ে নিচ্ছেন। এখান হতে আলেমদের বড় মর্যাদা সাব্যস্ত হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এখানে (আরবী) হয়েছে বলে তার উপর (আরবী) দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সদা ও সর্বাবস্থায় এ রকমই। অতঃপর আরও বেশী গুরুত্ব দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার ইরশাদ হচ্ছে যে, প্রকৃত মা'বুদ একমাত্র তিনিই। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং কথা ও কাজে বিজ্ঞানময়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফায় এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়ে বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও ওর উপর সাক্ষীগণের মধ্যে একজন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নরূপ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, হযরত গালিব কাৰ্তান (রঃ) বলেন, 'আমি ব্যবসা উপলক্ষে কুফায় গমন করতঃ হযরত আমাশ (রঃ)-এর নিকট অবস্থান করি। রাত্রে হযরত আমাশ (রঃ) তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে যান। পড়তে পড়তে যখন তিনি এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন এবং (আরবী) পাঠ করেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমিও ওর সাক্ষ্য দিচ্ছি যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন এবং এ সাক্ষ্য আমি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। আল্লাহ তা'আলার নিকট এটা আমার আমানত।” অতঃপর তিনি কয়েকবার। (আরবী) পাঠ করেন। আমি মনে মনে ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সম্বন্ধে কোন হাদীস রয়েছে। অতি প্রত্যুষেই আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করিঃ হে আবু মুহাম্মদ! আপনার বার বার এ আয়াতটি পড়ার কারণ কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আপনার কি এ আয়াতের ফযীলত জানা নেই?” আমি বলিঃ জনাব আমি তো এক মাস ধরে আপনার এখানে অবস্থান করছি, কিন্তু আপনি তো কোন হাদীসই বর্ণনা করেননি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি তো এক বছর পর্যন্ত বর্ণনা করবো না।” তখন আমি এ হাদীসটি শুনবার জন্যে এক বছর কাল তথায় অবস্থান করি এবং তার দরজায় পড়ে থাকি। এক বছর পূর্ণ হলে আমি তাকে বলি, হে আবু মুহাম্মদ (রঃ)! এক বছর তো পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা শুনুন! আবূ অয়েল (রঃ) আমার নিকট হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আবদুল্লাহ (রঃ)-এর নিকট শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এর পাঠককে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে এবং মহা সম্মানিত আল্লাহ বলবেন ‘এ বান্দা আমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছে এবং আমি সবচেয়ে উত্তম অঙ্গীকার পূর্ণকারী, আমার এ বান্দাকে বেহেশতে নিয়ে যাও”।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি শুধুমাত্র ইসলামকেই গ্রহণ করে থাকেন। সর্বযুগীয় নবীদের (আঃ) অহীর অনুসরণ করার নাম ইসলাম। সর্বশেষ এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর সমাপ্তকারী হচ্ছেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ)। তাঁর নবুওয়াতের পর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যে কেউ তাঁর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছুর উপর আমল করবে সে মহান আল্লাহর নিকট ধার্মিক বলে গণ্য হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করবে তা কখনও গ্রহণীয় হবে না।'(৩:৮৫) অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও ধর্মকে ইসলামের উপর সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াবেঃ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন ও তার ফেরেশ্তামন্ডলী এবং জ্ঞানবান লোকেরাও সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম শুধুমাত্র ইসলাম। জমহুরের পঠনে ‘ইন্না রয়েছে এবং অর্থ হিসেবে দু'টোই ঠিক আছে। কিন্তু জমহুরের উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।এরপর ইরশাদ হচ্ছে- ‘পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা মহান আল্লাহর নবীদের (আঃ) আগমনের পর ও তাঁর কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর মতভেদ করেছিল এবং এরই কারণে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিল। একজন এক কথা বললে তা সত্য হলেও অন্যজন তার বিরোধিতা করতো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যারা ঐগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ অমান্য করে, আল্লাহ তা'আলা সত্বরই তাদের হিসেব গ্রহণ করবেন এবং তাঁর কিতাবের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তারা যদি তোমার সাথে আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তাদেরকে বলে দাও-“আমি তো নির্ভেজালভাবে সেই আল্লাহরই ইবাদত করবো যার কোন অংশীদার নেই, যিনি অতুলনীয়, যার না আছে কোন সন্তান এবং না রয়েছে কোন পত্নী। আর যারা আমার অনুসারী, যারা আমার ধর্মের উপর রয়েছে তাদেরও এই একই কথা।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তুমি বল- এটাই আমার পথ। আমি খুব চিন্তা-গবেষণা করেই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি, আমিও এবং আমার অনুসারীগণও।' (১২:১০৮)অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! কিতাবধারী ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে এবং নিরক্ষর মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমাদের সবারই সুপথ প্রাপ্তি ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। যদি তারা অমান্য করে তবে কোন কথা নেই। তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা এবং তুমি তোমার এই কর্তব্য পালন করেছে। আল্লাহ তাদেরকে দেখে নেবেন। তাদের সবারই প্রত্যাবর্তন তার কাছেই। তিনি যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। স্বীয় নৈপুণ্য তাঁরই ভাল জানা আছে। তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে ভ্রান্তপথের পথিক তা তিনিই ভাল জানেন। তাঁর কার্যের হিসাব গ্রহণকারী কেউ নেই।' এ আয়াতে এবং এরই মত বহু আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমস্ত সৃষ্টজীবের নিকট রাসূল হয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর ধর্মের নির্দেশাবলী এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিতাব ও সুন্নাহর মধ্যে এ বিষয়ের বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। কুরআন পাকের মধ্যে এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই জন্যে আল্লাহর রাসূল।” (৭:১৫৮) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই আল্লাহ কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়”। (২৫:১) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা ধারাবাহিক রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চতুম্পার্শ্বের সমস্ত বাদশাহর নিকট এবং অন্যান্য লোকদের নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। ঐ পত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। তারা আরবই হোক বা আজমীই হোক, কিতাবধারীই হোক বা অন্য কোন ধর্মের লোক হোক না কেন। এভাবে তিনি প্রচারের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছিলেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! এ উম্মতের মধ্যে ইয়াহূদই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক যারই কানে আমার নবুওয়াতের সংবাদ পৌছবে এবং আমার আনীত জিনিসের উপর সে বিশ্বাস স্থাপন করবে না, আর ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করবে সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে।” সহীহ মুসলিম শরীফেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “আমি প্রত্যেক লাল ও কৃষ্ণের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকে নবী (আঃ)-কে শুধুমাত্র তাঁর গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমি সমস্ত মানুষের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহূদীর ছেলে, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর পানি রাখতো এবং তাঁর জুতা এনে দিতো, সে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছেলেটিকে বলেনঃ “হে অমুক! তুমি (আরবী) পাঠ কর।" সে তখন তার পিতার দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং পিতাকে নীরব থাকতে দেখে সেও নীরব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার এ কথাই বলেন। সে পুনরায় তার পিতার দিকে তাকায়। তার পিতা বলেঃ “আবুল কাসিম (সঃ)-এর কথা মেনে নাও।” ছেলেটি তখন বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে যাবার সময় বলেনঃ “সেই আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার কারণে তাকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করলেন।” এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ বুখারীর মধ্যে এনেছেন। এগুলো ছাড়াও আরও বহু বিশুদ্ধ হাদীস এবং কুরআন কারীমের বহু আয়াত এ সম্বন্ধে রয়েছে।

আলে ইমরান 3:19

১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সুতরাং তাঁর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী সাক্ষী এবং তারই কথা সবচেয়ে সত্য। তিনি বলেন যে, সমস্ত সৃষ্টজীব তার দাস এবং একমাত্র তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তারই মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। মা’রূদ ও আল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে তিনি। একাই, তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। যেমনঃ কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ সজ্ঞানে তোমার প্রতি অবতীর্ণকৃত কিতাবের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রদান করছেন এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' অতঃপর আল্লাহ পাক স্বীয় সাক্ষ্যের সাথে ফেরেশতাদের ও আলেমদের সাক্ষ্যকেও মিলিয়ে নিচ্ছেন। এখান হতে আলেমদের বড় মর্যাদা সাব্যস্ত হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এখানে (আরবী) হয়েছে বলে তার উপর (আরবী) দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সদা ও সর্বাবস্থায় এ রকমই। অতঃপর আরও বেশী গুরুত্ব দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার ইরশাদ হচ্ছে যে, প্রকৃত মা'বুদ একমাত্র তিনিই। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং কথা ও কাজে বিজ্ঞানময়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফায় এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়ে বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও ওর উপর সাক্ষীগণের মধ্যে একজন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নরূপ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, হযরত গালিব কাৰ্তান (রঃ) বলেন, 'আমি ব্যবসা উপলক্ষে কুফায় গমন করতঃ হযরত আমাশ (রঃ)-এর নিকট অবস্থান করি। রাত্রে হযরত আমাশ (রঃ) তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে যান। পড়তে পড়তে যখন তিনি এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন এবং (আরবী) পাঠ করেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমিও ওর সাক্ষ্য দিচ্ছি যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন এবং এ সাক্ষ্য আমি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। আল্লাহ তা'আলার নিকট এটা আমার আমানত।” অতঃপর তিনি কয়েকবার। (আরবী) পাঠ করেন। আমি মনে মনে ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সম্বন্ধে কোন হাদীস রয়েছে। অতি প্রত্যুষেই আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করিঃ হে আবু মুহাম্মদ! আপনার বার বার এ আয়াতটি পড়ার কারণ কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আপনার কি এ আয়াতের ফযীলত জানা নেই?” আমি বলিঃ জনাব আমি তো এক মাস ধরে আপনার এখানে অবস্থান করছি, কিন্তু আপনি তো কোন হাদীসই বর্ণনা করেননি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি তো এক বছর পর্যন্ত বর্ণনা করবো না।” তখন আমি এ হাদীসটি শুনবার জন্যে এক বছর কাল তথায় অবস্থান করি এবং তার দরজায় পড়ে থাকি। এক বছর পূর্ণ হলে আমি তাকে বলি, হে আবু মুহাম্মদ (রঃ)! এক বছর তো পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা শুনুন! আবূ অয়েল (রঃ) আমার নিকট হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আবদুল্লাহ (রঃ)-এর নিকট শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এর পাঠককে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে এবং মহা সম্মানিত আল্লাহ বলবেন ‘এ বান্দা আমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছে এবং আমি সবচেয়ে উত্তম অঙ্গীকার পূর্ণকারী, আমার এ বান্দাকে বেহেশতে নিয়ে যাও”।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি শুধুমাত্র ইসলামকেই গ্রহণ করে থাকেন। সর্বযুগীয় নবীদের (আঃ) অহীর অনুসরণ করার নাম ইসলাম। সর্বশেষ এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর সমাপ্তকারী হচ্ছেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ)। তাঁর নবুওয়াতের পর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যে কেউ তাঁর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছুর উপর আমল করবে সে মহান আল্লাহর নিকট ধার্মিক বলে গণ্য হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করবে তা কখনও গ্রহণীয় হবে না।'(৩:৮৫) অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও ধর্মকে ইসলামের উপর সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াবেঃ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন ও তার ফেরেশ্তামন্ডলী এবং জ্ঞানবান লোকেরাও সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম শুধুমাত্র ইসলাম। জমহুরের পঠনে ‘ইন্না রয়েছে এবং অর্থ হিসেবে দু'টোই ঠিক আছে। কিন্তু জমহুরের উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।এরপর ইরশাদ হচ্ছে- ‘পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা মহান আল্লাহর নবীদের (আঃ) আগমনের পর ও তাঁর কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর মতভেদ করেছিল এবং এরই কারণে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিল। একজন এক কথা বললে তা সত্য হলেও অন্যজন তার বিরোধিতা করতো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যারা ঐগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ অমান্য করে, আল্লাহ তা'আলা সত্বরই তাদের হিসেব গ্রহণ করবেন এবং তাঁর কিতাবের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তারা যদি তোমার সাথে আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তাদেরকে বলে দাও-“আমি তো নির্ভেজালভাবে সেই আল্লাহরই ইবাদত করবো যার কোন অংশীদার নেই, যিনি অতুলনীয়, যার না আছে কোন সন্তান এবং না রয়েছে কোন পত্নী। আর যারা আমার অনুসারী, যারা আমার ধর্মের উপর রয়েছে তাদেরও এই একই কথা।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তুমি বল- এটাই আমার পথ। আমি খুব চিন্তা-গবেষণা করেই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি, আমিও এবং আমার অনুসারীগণও।' (১২:১০৮)অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! কিতাবধারী ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে এবং নিরক্ষর মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমাদের সবারই সুপথ প্রাপ্তি ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। যদি তারা অমান্য করে তবে কোন কথা নেই। তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা এবং তুমি তোমার এই কর্তব্য পালন করেছে। আল্লাহ তাদেরকে দেখে নেবেন। তাদের সবারই প্রত্যাবর্তন তার কাছেই। তিনি যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। স্বীয় নৈপুণ্য তাঁরই ভাল জানা আছে। তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে ভ্রান্তপথের পথিক তা তিনিই ভাল জানেন। তাঁর কার্যের হিসাব গ্রহণকারী কেউ নেই।' এ আয়াতে এবং এরই মত বহু আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমস্ত সৃষ্টজীবের নিকট রাসূল হয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর ধর্মের নির্দেশাবলী এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিতাব ও সুন্নাহর মধ্যে এ বিষয়ের বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। কুরআন পাকের মধ্যে এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই জন্যে আল্লাহর রাসূল।” (৭:১৫৮) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই আল্লাহ কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়”। (২৫:১) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা ধারাবাহিক রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চতুম্পার্শ্বের সমস্ত বাদশাহর নিকট এবং অন্যান্য লোকদের নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। ঐ পত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। তারা আরবই হোক বা আজমীই হোক, কিতাবধারীই হোক বা অন্য কোন ধর্মের লোক হোক না কেন। এভাবে তিনি প্রচারের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছিলেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! এ উম্মতের মধ্যে ইয়াহূদই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক যারই কানে আমার নবুওয়াতের সংবাদ পৌছবে এবং আমার আনীত জিনিসের উপর সে বিশ্বাস স্থাপন করবে না, আর ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করবে সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে।” সহীহ মুসলিম শরীফেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “আমি প্রত্যেক লাল ও কৃষ্ণের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকে নবী (আঃ)-কে শুধুমাত্র তাঁর গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমি সমস্ত মানুষের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহূদীর ছেলে, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর পানি রাখতো এবং তাঁর জুতা এনে দিতো, সে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছেলেটিকে বলেনঃ “হে অমুক! তুমি (আরবী) পাঠ কর।" সে তখন তার পিতার দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং পিতাকে নীরব থাকতে দেখে সেও নীরব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার এ কথাই বলেন। সে পুনরায় তার পিতার দিকে তাকায়। তার পিতা বলেঃ “আবুল কাসিম (সঃ)-এর কথা মেনে নাও।” ছেলেটি তখন বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে যাবার সময় বলেনঃ “সেই আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার কারণে তাকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করলেন।” এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ বুখারীর মধ্যে এনেছেন। এগুলো ছাড়াও আরও বহু বিশুদ্ধ হাদীস এবং কুরআন কারীমের বহু আয়াত এ সম্বন্ধে রয়েছে।

আলে ইমরান 3:20

১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সুতরাং তাঁর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী সাক্ষী এবং তারই কথা সবচেয়ে সত্য। তিনি বলেন যে, সমস্ত সৃষ্টজীব তার দাস এবং একমাত্র তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তারই মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। মা’রূদ ও আল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে তিনি। একাই, তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। যেমনঃ কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ সজ্ঞানে তোমার প্রতি অবতীর্ণকৃত কিতাবের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রদান করছেন এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' অতঃপর আল্লাহ পাক স্বীয় সাক্ষ্যের সাথে ফেরেশতাদের ও আলেমদের সাক্ষ্যকেও মিলিয়ে নিচ্ছেন। এখান হতে আলেমদের বড় মর্যাদা সাব্যস্ত হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এখানে (আরবী) হয়েছে বলে তার উপর (আরবী) দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সদা ও সর্বাবস্থায় এ রকমই। অতঃপর আরও বেশী গুরুত্ব দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার ইরশাদ হচ্ছে যে, প্রকৃত মা'বুদ একমাত্র তিনিই। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং কথা ও কাজে বিজ্ঞানময়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফায় এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়ে বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও ওর উপর সাক্ষীগণের মধ্যে একজন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নরূপ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, হযরত গালিব কাৰ্তান (রঃ) বলেন, 'আমি ব্যবসা উপলক্ষে কুফায় গমন করতঃ হযরত আমাশ (রঃ)-এর নিকট অবস্থান করি। রাত্রে হযরত আমাশ (রঃ) তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে যান। পড়তে পড়তে যখন তিনি এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন এবং (আরবী) পাঠ করেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমিও ওর সাক্ষ্য দিচ্ছি যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন এবং এ সাক্ষ্য আমি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। আল্লাহ তা'আলার নিকট এটা আমার আমানত।” অতঃপর তিনি কয়েকবার। (আরবী) পাঠ করেন। আমি মনে মনে ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সম্বন্ধে কোন হাদীস রয়েছে। অতি প্রত্যুষেই আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করিঃ হে আবু মুহাম্মদ! আপনার বার বার এ আয়াতটি পড়ার কারণ কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আপনার কি এ আয়াতের ফযীলত জানা নেই?” আমি বলিঃ জনাব আমি তো এক মাস ধরে আপনার এখানে অবস্থান করছি, কিন্তু আপনি তো কোন হাদীসই বর্ণনা করেননি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি তো এক বছর পর্যন্ত বর্ণনা করবো না।” তখন আমি এ হাদীসটি শুনবার জন্যে এক বছর কাল তথায় অবস্থান করি এবং তার দরজায় পড়ে থাকি। এক বছর পূর্ণ হলে আমি তাকে বলি, হে আবু মুহাম্মদ (রঃ)! এক বছর তো পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা শুনুন! আবূ অয়েল (রঃ) আমার নিকট হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আবদুল্লাহ (রঃ)-এর নিকট শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এর পাঠককে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে এবং মহা সম্মানিত আল্লাহ বলবেন ‘এ বান্দা আমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছে এবং আমি সবচেয়ে উত্তম অঙ্গীকার পূর্ণকারী, আমার এ বান্দাকে বেহেশতে নিয়ে যাও”।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি শুধুমাত্র ইসলামকেই গ্রহণ করে থাকেন। সর্বযুগীয় নবীদের (আঃ) অহীর অনুসরণ করার নাম ইসলাম। সর্বশেষ এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর সমাপ্তকারী হচ্ছেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ)। তাঁর নবুওয়াতের পর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যে কেউ তাঁর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছুর উপর আমল করবে সে মহান আল্লাহর নিকট ধার্মিক বলে গণ্য হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করবে তা কখনও গ্রহণীয় হবে না।'(৩:৮৫) অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও ধর্মকে ইসলামের উপর সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াবেঃ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন ও তার ফেরেশ্তামন্ডলী এবং জ্ঞানবান লোকেরাও সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম শুধুমাত্র ইসলাম। জমহুরের পঠনে ‘ইন্না রয়েছে এবং অর্থ হিসেবে দু'টোই ঠিক আছে। কিন্তু জমহুরের উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।এরপর ইরশাদ হচ্ছে- ‘পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা মহান আল্লাহর নবীদের (আঃ) আগমনের পর ও তাঁর কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর মতভেদ করেছিল এবং এরই কারণে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিল। একজন এক কথা বললে তা সত্য হলেও অন্যজন তার বিরোধিতা করতো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যারা ঐগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ অমান্য করে, আল্লাহ তা'আলা সত্বরই তাদের হিসেব গ্রহণ করবেন এবং তাঁর কিতাবের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তারা যদি তোমার সাথে আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তাদেরকে বলে দাও-“আমি তো নির্ভেজালভাবে সেই আল্লাহরই ইবাদত করবো যার কোন অংশীদার নেই, যিনি অতুলনীয়, যার না আছে কোন সন্তান এবং না রয়েছে কোন পত্নী। আর যারা আমার অনুসারী, যারা আমার ধর্মের উপর রয়েছে তাদেরও এই একই কথা।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তুমি বল- এটাই আমার পথ। আমি খুব চিন্তা-গবেষণা করেই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি, আমিও এবং আমার অনুসারীগণও।' (১২:১০৮)অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! কিতাবধারী ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে এবং নিরক্ষর মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমাদের সবারই সুপথ প্রাপ্তি ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। যদি তারা অমান্য করে তবে কোন কথা নেই। তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা এবং তুমি তোমার এই কর্তব্য পালন করেছে। আল্লাহ তাদেরকে দেখে নেবেন। তাদের সবারই প্রত্যাবর্তন তার কাছেই। তিনি যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। স্বীয় নৈপুণ্য তাঁরই ভাল জানা আছে। তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে ভ্রান্তপথের পথিক তা তিনিই ভাল জানেন। তাঁর কার্যের হিসাব গ্রহণকারী কেউ নেই।' এ আয়াতে এবং এরই মত বহু আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমস্ত সৃষ্টজীবের নিকট রাসূল হয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর ধর্মের নির্দেশাবলী এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিতাব ও সুন্নাহর মধ্যে এ বিষয়ের বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। কুরআন পাকের মধ্যে এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই জন্যে আল্লাহর রাসূল।” (৭:১৫৮) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই আল্লাহ কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়”। (২৫:১) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা ধারাবাহিক রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চতুম্পার্শ্বের সমস্ত বাদশাহর নিকট এবং অন্যান্য লোকদের নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। ঐ পত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। তারা আরবই হোক বা আজমীই হোক, কিতাবধারীই হোক বা অন্য কোন ধর্মের লোক হোক না কেন। এভাবে তিনি প্রচারের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছিলেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! এ উম্মতের মধ্যে ইয়াহূদই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক যারই কানে আমার নবুওয়াতের সংবাদ পৌছবে এবং আমার আনীত জিনিসের উপর সে বিশ্বাস স্থাপন করবে না, আর ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করবে সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে।” সহীহ মুসলিম শরীফেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “আমি প্রত্যেক লাল ও কৃষ্ণের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকে নবী (আঃ)-কে শুধুমাত্র তাঁর গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমি সমস্ত মানুষের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহূদীর ছেলে, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর পানি রাখতো এবং তাঁর জুতা এনে দিতো, সে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছেলেটিকে বলেনঃ “হে অমুক! তুমি (আরবী) পাঠ কর।" সে তখন তার পিতার দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং পিতাকে নীরব থাকতে দেখে সেও নীরব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার এ কথাই বলেন। সে পুনরায় তার পিতার দিকে তাকায়। তার পিতা বলেঃ “আবুল কাসিম (সঃ)-এর কথা মেনে নাও।” ছেলেটি তখন বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে যাবার সময় বলেনঃ “সেই আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার কারণে তাকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করলেন।” এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ বুখারীর মধ্যে এনেছেন। এগুলো ছাড়াও আরও বহু বিশুদ্ধ হাদীস এবং কুরআন কারীমের বহু আয়াত এ সম্বন্ধে রয়েছে।

আলে ইমরান 3:21

২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে কিতাবধারীদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হচ্ছে। তারা পাপ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকতো এবং মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদের (আঃ) মাধ্যমে যেসব কথা পৌছিয়ে দিয়েছিলেন সেগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো। শুধু তাই নয়, বরং তারা নবীদেরকে হত্যা করে ফেলতো। তাদের অবাধ্যতা এত চরমে পৌছেছিল যে, যেসব লোক তাদেরকে ন্যায়ের দিকে আহ্বান করতো তাদেরকে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করতো। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্যকে অস্বীকার করা ও ন্যায় পন্থীদেরকে লাঞ্ছিত করাই হচ্ছে অহংকারের শেষ সীমা।”মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহ রাসূল! কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তির সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে’? তিনি বলেনঃ ‘সেই ব্যক্তির যে কোন নবী (আঃ)-কে হত্যা করে কিংবা এমন কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে যে ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ (রাঃ)! বানী ইসরাঈল দিনের প্রথমভাগে এক ঘন্টার মধ্যে তেতাল্লিশজন নবী (আঃ)-কে হত্যা করে। অতঃপর একশ সত্তর জন ঈমানদার বানী ইসরাঈলকে হত্যা করে যারা এ কাজে বাধা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এবং তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করতো ও মন্দ কাজে নিষেধ করতো। তাদের সকলকে তারা দিনের শেষ ভাগে হত্যা করে। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ওদের কথাই বর্ণনা করেছেন।' হযরত ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈল তিনশ নবী (আঃ)-কে দিনের প্রথম অংশে হত্যা করে। অতঃপর দিনের শেষাংশে তারা বাজারে তাদের শাক সজী বিক্রীর কাজে লেগে যায়। সুতরাং তাদের এ অবাধ্যতা, অহংকার এবং দুঙ্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইহজগতেও লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেন এবং পরকালেও তাদের জন্য অপমানজনক ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিয়ে দাও। এদের সমস্ত কৃতকর্ম ইহকালেও ব্যর্থ হয়ে গেল এবং পরকালেও ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী থাকবে না।

আলে ইমরান 3:22

২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে কিতাবধারীদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হচ্ছে। তারা পাপ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকতো এবং মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদের (আঃ) মাধ্যমে যেসব কথা পৌছিয়ে দিয়েছিলেন সেগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো। শুধু তাই নয়, বরং তারা নবীদেরকে হত্যা করে ফেলতো। তাদের অবাধ্যতা এত চরমে পৌছেছিল যে, যেসব লোক তাদেরকে ন্যায়ের দিকে আহ্বান করতো তাদেরকে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করতো। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্যকে অস্বীকার করা ও ন্যায় পন্থীদেরকে লাঞ্ছিত করাই হচ্ছে অহংকারের শেষ সীমা।”মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহ রাসূল! কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তির সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে’? তিনি বলেনঃ ‘সেই ব্যক্তির যে কোন নবী (আঃ)-কে হত্যা করে কিংবা এমন কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে যে ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ (রাঃ)! বানী ইসরাঈল দিনের প্রথমভাগে এক ঘন্টার মধ্যে তেতাল্লিশজন নবী (আঃ)-কে হত্যা করে। অতঃপর একশ সত্তর জন ঈমানদার বানী ইসরাঈলকে হত্যা করে যারা এ কাজে বাধা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এবং তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করতো ও মন্দ কাজে নিষেধ করতো। তাদের সকলকে তারা দিনের শেষ ভাগে হত্যা করে। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ওদের কথাই বর্ণনা করেছেন।' হযরত ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈল তিনশ নবী (আঃ)-কে দিনের প্রথম অংশে হত্যা করে। অতঃপর দিনের শেষাংশে তারা বাজারে তাদের শাক সজী বিক্রীর কাজে লেগে যায়। সুতরাং তাদের এ অবাধ্যতা, অহংকার এবং দুঙ্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইহজগতেও লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেন এবং পরকালেও তাদের জন্য অপমানজনক ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিয়ে দাও। এদের সমস্ত কৃতকর্ম ইহকালেও ব্যর্থ হয়ে গেল এবং পরকালেও ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী থাকবে না।

আলে ইমরান 3:23

২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা তাদের এ দাবীতেও মিথ্যাবাদী যে, তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর তাদের বিশ্বাস রয়েছে। কেননা, ঐ কিতাবগুলোর নির্দেশ অনুসারে যখন তাদেরকে শেষ নবী (সঃ)-এর-আনুগত্যের দিকে আহবান করা হয় তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। এর দ্বারা তাদের বড় রকমের অবাধ্যতা, অহংকার এবং বিরোধিতা প্রকাশ পাচ্ছে। সত্যের এ বিরোধিতা ও বৃথা অবাধ্যতার উপর এ বিশ্বাসই তাদের সাহস যুগিয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে না থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে নিয়ে বলেঃ আমরা তো নির্দিষ্ট কয়েক দিন মাত্র জাহান্নামে অবস্থান করবো। অর্থাৎ মাত্র সাত দিন। দুনিয়ার হিসেবে প্রতি হাজার বছর পরে একদিন। এর পুরো তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। এ বাজে ও অলীক কল্পনা তাদেরকে এ বাতিল দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখেছে। অথচ এটা স্বয়ং তাদেরও জানা আছে যে, না আল্লাহ তাআলা এ কথা বলেছেন, না তাদের নিকট কোন কিতাবী দলীল রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধমকের সুরে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন তাদের কি অবস্থা হবে? তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে, নবীদেরকে ও হক পন্থী আলেমদেরকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদেরকে তাদের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব দিতে হবে এবং এক একটি পাপের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ঐদিনের আগমন সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ নেই। ঐদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং কারও উপর কোন প্রকারের অত্যাচার করা হবে না'।

আলে ইমরান 3:24

২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা তাদের এ দাবীতেও মিথ্যাবাদী যে, তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর তাদের বিশ্বাস রয়েছে। কেননা, ঐ কিতাবগুলোর নির্দেশ অনুসারে যখন তাদেরকে শেষ নবী (সঃ)-এর-আনুগত্যের দিকে আহবান করা হয় তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। এর দ্বারা তাদের বড় রকমের অবাধ্যতা, অহংকার এবং বিরোধিতা প্রকাশ পাচ্ছে। সত্যের এ বিরোধিতা ও বৃথা অবাধ্যতার উপর এ বিশ্বাসই তাদের সাহস যুগিয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে না থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে নিয়ে বলেঃ আমরা তো নির্দিষ্ট কয়েক দিন মাত্র জাহান্নামে অবস্থান করবো। অর্থাৎ মাত্র সাত দিন। দুনিয়ার হিসেবে প্রতি হাজার বছর পরে একদিন। এর পুরো তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। এ বাজে ও অলীক কল্পনা তাদেরকে এ বাতিল দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখেছে। অথচ এটা স্বয়ং তাদেরও জানা আছে যে, না আল্লাহ তাআলা এ কথা বলেছেন, না তাদের নিকট কোন কিতাবী দলীল রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধমকের সুরে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন তাদের কি অবস্থা হবে? তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে, নবীদেরকে ও হক পন্থী আলেমদেরকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদেরকে তাদের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব দিতে হবে এবং এক একটি পাপের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ঐদিনের আগমন সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ নেই। ঐদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং কারও উপর কোন প্রকারের অত্যাচার করা হবে না'।

আলে ইমরান 3:25

২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা তাদের এ দাবীতেও মিথ্যাবাদী যে, তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর তাদের বিশ্বাস রয়েছে। কেননা, ঐ কিতাবগুলোর নির্দেশ অনুসারে যখন তাদেরকে শেষ নবী (সঃ)-এর-আনুগত্যের দিকে আহবান করা হয় তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। এর দ্বারা তাদের বড় রকমের অবাধ্যতা, অহংকার এবং বিরোধিতা প্রকাশ পাচ্ছে। সত্যের এ বিরোধিতা ও বৃথা অবাধ্যতার উপর এ বিশ্বাসই তাদের সাহস যুগিয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে না থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে নিয়ে বলেঃ আমরা তো নির্দিষ্ট কয়েক দিন মাত্র জাহান্নামে অবস্থান করবো। অর্থাৎ মাত্র সাত দিন। দুনিয়ার হিসেবে প্রতি হাজার বছর পরে একদিন। এর পুরো তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। এ বাজে ও অলীক কল্পনা তাদেরকে এ বাতিল দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখেছে। অথচ এটা স্বয়ং তাদেরও জানা আছে যে, না আল্লাহ তাআলা এ কথা বলেছেন, না তাদের নিকট কোন কিতাবী দলীল রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধমকের সুরে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন তাদের কি অবস্থা হবে? তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে, নবীদেরকে ও হক পন্থী আলেমদেরকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদেরকে তাদের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব দিতে হবে এবং এক একটি পাপের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ঐদিনের আগমন সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ নেই। ঐদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং কারও উপর কোন প্রকারের অত্যাচার করা হবে না'।

আলে ইমরান 3:26

২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর সম্মানার্থে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে ও সমস্ত কাজ তাঁর নিকট সমর্পণের উদ্দেশ্যে তাঁর পবিত্র সত্তার উপর নির্ভর করতঃ উপরোক্ত শব্দগুলো দ্বারা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর।' অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি সাম্রাজ্যের অধিপতি। সমস্ত সাম্রাজ্য আপনারই অধিকারে রয়েছে। আপনি যাকে ইচ্ছে সাম্রাজ্য প্রদান করে থাকেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছে রাজ্য কেড়ে নেন। আপনিই প্রদানকারী। আপনি যা চান না তা হতে পারে না। এ আয়াতে এ কথার দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে এবং ঐ নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও নির্দেশ রয়েছে যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতকে দান করা হয়েছে। তা এই যে, বানী ইসরাঈল হতে নবুওয়াত ছিনিয়ে নিয়ে মক্কার নিরক্ষর, কুরায়েশী আরবী নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে। আর তাকে সাধারণভাবে নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী এবং সমস্ত মানব ও দানবের রাসূল করে পাঠান। হয়েছে। পূর্বের সমস্ত নবীর গুণাবলী তার মধ্যে পুঞ্জীভূত করা হয়েছে এবং তাঁকে ঐসব ফযীলত দান করা হয়েছে যা হতে অন্যান্য নবীগণ (আঃ) বঞ্চিত ছিলেন। ঐ ফযীলত আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান সম্বন্ধেই হোক বা ঐ মহান প্রভুর শরীয়তের ব্যাপারেই হোক অথবা অতীত ও ভবিষ্যতের সংবাদ সম্পর্কেই হোক, আল্লাহ পাক তাঁর উপর পরকালের সমস্ত রহস্য খুলে দিয়েছেন, তাঁর উম্মতকে পূর্ব হতে পশ্চিমে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার দ্বীন ও শরীয়তকে সমস্ত দ্বীন ও সমস্ত মাযহাবের উপর জয়যুক্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার দরূদ ও সালাম তার প্রতি বর্ষিত হোক, আজ হতে কিয়ামত পর্যন্ত যতদিন দিবস-রজনীর আবর্তন চালু থাকবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর যেন স্বীয় করুণা সদাসর্বদার জন্যে বর্ষণ করতে থাকেন। আমীন!অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তুমি বল-“হে আল্লাহ! আপনিই স্বীয় সৃষ্টির মধ্যে আবর্তন বিবর্তন এনে থাকেন। আপনি যা চান তাই করে থাকেন। যারা বলেছিলঃ “দু'টি গ্রামের কোন একজন বড়লোকের উপর কেন আল্লাহ তাআলা এ কুরআন অবতীর্ণ করেননি। তাদের এ কথা খণ্ডন করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারাই কি তোমার প্রভুর করুণা বন্টন করছে?’ (৪৩:৩২) অর্থাৎ ‘আমি যখন তাদের আহার্যেরও মালিক, যাকে চাই কম দেই এবং যাকে চাই বেশী দেই, তখন এরা আমার উপর হুকুম চালাবার কে যে, আমি অমুককে কেন নবী করলাম? নবুওয়াতও আমারই অধিকারের জিনিস। নবুওয়াত প্রাপ্তির যোগ্য কোন ব্যক্তি তা আমিই জানি।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেখানেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রিসালাত অবতীর্ণ করেন তা তিনিই। ভাল জানেন।' (৬:১২৪) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি লক্ষ্য কর যে, কিরূপে তাদের পরস্পরের মধ্যে এককে অপরের উপর উৎকৃষ্টতা দান করেছি।' (১৭:২১)।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আপনিই রাত্রির অতিরিক্ত অংশ দিনের কমতির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে দিন-রাত্র সমান করে থাকেন। আবার এদিকের অংশ ওদিকে দিয়ে ঐ দু’টোকেই ছোট বড় করেন এবং পুনরায় সমান সমান করে থাকেন। আকাশ ও পৃথিবীর উপর এবং সূর্য ও চন্দ্রের উপর পূর্ণ আধিপত্য আপনারই রয়েছে। অনুরূপভাবে গ্রীষ্মকে শীতের সাথে পরিবর্তন করারও পূর্ণ ক্ষমতা আপনারই আছে। বসন্তকাল ও শরৎকালের উপর আপনিই ক্ষমতাবান। আপনিই জীবিত হতে মতকে এবং মত হতে জীবিতকে বের করে থাকেন। ক্ষেত্র শস্য হতে এবং শস্য ক্ষেত্র হতে বের করারও ক্ষমতা আপনারই। খেজুর গাছ আঁটি হতে এবং আঁটি খেজুর হতে আপনিই সৃষ্টি করে থাকেন। মুমিনকে কাফিরের ঔরষে এবং কাফিরকে মুমিনের ঔরষে আপনিই জন্মদান করে থাকেন এবং মুরগী ডিম হতে এবং ডিম মুরগী হতে সৃষ্টি করাও আপনারই কাজ। এ রকমই সমস্ত জিনিসই আপনার অধিকারে রয়েছে। আপনি যাকে ইচ্ছে করেন। এত ধন-সম্পদ প্রদান করেন যা গণনা করে ও পরিমাপ করে শেষ করা যায় না। আবার যাকে ইচ্ছে করেন ক্ষুধা নিবারণের আহার্য পর্যন্ত প্রদান করেন না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আপনার এ সমস্ত কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ এবং সবকিছুই আপনারই ইচ্ছানুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, (আরবী)-এ আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ‘ইসম-ই-আযম' রয়েছে। এ নামের মাধ্যমে তাঁর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি তা কবূল করে থাকেন।

আলে ইমরান 3:27

২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর সম্মানার্থে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে ও সমস্ত কাজ তাঁর নিকট সমর্পণের উদ্দেশ্যে তাঁর পবিত্র সত্তার উপর নির্ভর করতঃ উপরোক্ত শব্দগুলো দ্বারা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর।' অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি সাম্রাজ্যের অধিপতি। সমস্ত সাম্রাজ্য আপনারই অধিকারে রয়েছে। আপনি যাকে ইচ্ছে সাম্রাজ্য প্রদান করে থাকেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছে রাজ্য কেড়ে নেন। আপনিই প্রদানকারী। আপনি যা চান না তা হতে পারে না। এ আয়াতে এ কথার দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে এবং ঐ নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও নির্দেশ রয়েছে যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতকে দান করা হয়েছে। তা এই যে, বানী ইসরাঈল হতে নবুওয়াত ছিনিয়ে নিয়ে মক্কার নিরক্ষর, কুরায়েশী আরবী নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে। আর তাকে সাধারণভাবে নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী এবং সমস্ত মানব ও দানবের রাসূল করে পাঠান। হয়েছে। পূর্বের সমস্ত নবীর গুণাবলী তার মধ্যে পুঞ্জীভূত করা হয়েছে এবং তাঁকে ঐসব ফযীলত দান করা হয়েছে যা হতে অন্যান্য নবীগণ (আঃ) বঞ্চিত ছিলেন। ঐ ফযীলত আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান সম্বন্ধেই হোক বা ঐ মহান প্রভুর শরীয়তের ব্যাপারেই হোক অথবা অতীত ও ভবিষ্যতের সংবাদ সম্পর্কেই হোক, আল্লাহ পাক তাঁর উপর পরকালের সমস্ত রহস্য খুলে দিয়েছেন, তাঁর উম্মতকে পূর্ব হতে পশ্চিমে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার দ্বীন ও শরীয়তকে সমস্ত দ্বীন ও সমস্ত মাযহাবের উপর জয়যুক্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার দরূদ ও সালাম তার প্রতি বর্ষিত হোক, আজ হতে কিয়ামত পর্যন্ত যতদিন দিবস-রজনীর আবর্তন চালু থাকবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর যেন স্বীয় করুণা সদাসর্বদার জন্যে বর্ষণ করতে থাকেন। আমীন!অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তুমি বল-“হে আল্লাহ! আপনিই স্বীয় সৃষ্টির মধ্যে আবর্তন বিবর্তন এনে থাকেন। আপনি যা চান তাই করে থাকেন। যারা বলেছিলঃ “দু'টি গ্রামের কোন একজন বড়লোকের উপর কেন আল্লাহ তাআলা এ কুরআন অবতীর্ণ করেননি। তাদের এ কথা খণ্ডন করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারাই কি তোমার প্রভুর করুণা বন্টন করছে?’ (৪৩:৩২) অর্থাৎ ‘আমি যখন তাদের আহার্যেরও মালিক, যাকে চাই কম দেই এবং যাকে চাই বেশী দেই, তখন এরা আমার উপর হুকুম চালাবার কে যে, আমি অমুককে কেন নবী করলাম? নবুওয়াতও আমারই অধিকারের জিনিস। নবুওয়াত প্রাপ্তির যোগ্য কোন ব্যক্তি তা আমিই জানি।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেখানেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রিসালাত অবতীর্ণ করেন তা তিনিই। ভাল জানেন।' (৬:১২৪) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি লক্ষ্য কর যে, কিরূপে তাদের পরস্পরের মধ্যে এককে অপরের উপর উৎকৃষ্টতা দান করেছি।' (১৭:২১)।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আপনিই রাত্রির অতিরিক্ত অংশ দিনের কমতির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে দিন-রাত্র সমান করে থাকেন। আবার এদিকের অংশ ওদিকে দিয়ে ঐ দু’টোকেই ছোট বড় করেন এবং পুনরায় সমান সমান করে থাকেন। আকাশ ও পৃথিবীর উপর এবং সূর্য ও চন্দ্রের উপর পূর্ণ আধিপত্য আপনারই রয়েছে। অনুরূপভাবে গ্রীষ্মকে শীতের সাথে পরিবর্তন করারও পূর্ণ ক্ষমতা আপনারই আছে। বসন্তকাল ও শরৎকালের উপর আপনিই ক্ষমতাবান। আপনিই জীবিত হতে মতকে এবং মত হতে জীবিতকে বের করে থাকেন। ক্ষেত্র শস্য হতে এবং শস্য ক্ষেত্র হতে বের করারও ক্ষমতা আপনারই। খেজুর গাছ আঁটি হতে এবং আঁটি খেজুর হতে আপনিই সৃষ্টি করে থাকেন। মুমিনকে কাফিরের ঔরষে এবং কাফিরকে মুমিনের ঔরষে আপনিই জন্মদান করে থাকেন এবং মুরগী ডিম হতে এবং ডিম মুরগী হতে সৃষ্টি করাও আপনারই কাজ। এ রকমই সমস্ত জিনিসই আপনার অধিকারে রয়েছে। আপনি যাকে ইচ্ছে করেন। এত ধন-সম্পদ প্রদান করেন যা গণনা করে ও পরিমাপ করে শেষ করা যায় না। আবার যাকে ইচ্ছে করেন ক্ষুধা নিবারণের আহার্য পর্যন্ত প্রদান করেন না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আপনার এ সমস্ত কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ এবং সবকিছুই আপনারই ইচ্ছানুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, (আরবী)-এ আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ‘ইসম-ই-আযম' রয়েছে। এ নামের মাধ্যমে তাঁর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি তা কবূল করে থাকেন।

আলে ইমরান 3:28

এখানে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা স্থাপন না করে এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে প্রণয় ও ভালবাসা থাকা উচিত। অতঃপর তিনি সতর্ক করে বলছেন যে, এরূপ যে ব্যক্তি করবে অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের সাথে মিত্রতা করবে তার প্রতি তিনি রাগান্বিত হয়ে যাবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থা ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করো না'। (৬০:১) অন্য স্থানে রয়েছেঃ “হে মুমনিগণ! এই ইয়াহুদী এবং খ্রীষ্টানেরা পরস্পর বন্ধু, তোমাদের মধ্যে যে কেউ তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' অন্যত্র আল্লাহ তাআলা মুহাজির, আনসার ও অন্যান্য মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের উল্লেখ করে বলেনঃ “অবিশ্বাসকারীরা পরস্পর বন্ধু, তোমরা যদি এরূপ না কর তবে পৃথিবীর পৃষ্ঠে গণ্ডগোলের সৃষ্টি হবে এবং ভীষণ হাঙ্গামা সংঘটিত হবে।'অতঃপর আল্লাহ পাক ঐ লোকদেরকে অনুমতি দেন যারা কোন শহরে কোন সময় অবিশ্বাসীদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে মৌখিক তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখে কিন্তু তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখে না। যেমন সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘কোন কোন গোত্রের সাথে আমরা প্রশস্ত বদনে মিলিত হই, কিন্তু আমাদের অন্তর তাদের প্রতি অভিশাপ দেয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “শুধু মুখে বন্ধুত্ব প্রকাশ করতে হবে কিন্তু কাজে-কর্মে এরূপ অবস্থাতেও কখনও তাদের সহযোগিতা করতে হবে না'। এ উক্তিটিই অন্যান্য ব্যাখ্যাকারী হতেও বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের ঘোষণাটিতেও এ উক্তিরই সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ঈমান আনয়নের পর আল্লাহর সাথে কুফরী করে কিন্তু যার প্রতি জবরদস্তি করা হয়েছে এবং তার অন্তর ঈমানের সাথে শান্তি প্রাপ্ত (অসমাপ্ত আয়াত)। (১৬:১০৬)।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত হাসান (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামত পর্যন্তই এ নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় অস্তিত্বের ভয়প্রদর্শন করছেন। অর্থাৎ তিনি ঐ লোকদেরকে স্বীয় শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছেন যারা তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করতঃ তাঁর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে এবং তার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা পোষণ করছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তার নিকটই ফিরে যেতে হবে। প্রত্যেকেই তার কাছে স্বীয় কার্যের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে। মুসনাদ ইবনে আবি হাতিম’ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত মাইমুন ইবনে মাহরান বলেন, হযরত মুআয (রাঃ) দাঁড়িয়ে আমাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আওদ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূতরূপে তোমাদের নিকট আগমন করেছি। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নিকট সকলকে ফিরে যেতে হবে। অতঃপর অবস্থান স্থল হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম।'

আলে ইমরান 3:29

২৯-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কথাই ভালই জানেন। কোন ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্ৰমত কথাও তাঁর নিকট লুক্কায়িত থাকে না। তার জ্ঞান সমস্ত জিনিসকে প্রতি মুহূর্তে বেষ্টন করে রয়েছে। পৃথিবী প্রান্তে, পর্বতে, সমুদ্রে, আকাশে, বাতাসে, ছিদ্রে মোটকথা যেখানে যা কিছু আছে সবই তাঁর গোচরে রয়েছে। সব কিছুর উপরেই তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা বিদ্যমান। তিনি যেভাবেই চান রাখেন, যাকে ইচ্ছে করেন শাস্তি দেন। সুতরাং এত ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী ও এতবড় ক্ষমতাবান হতে সকলেরই সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা, সদা-সর্বদা তাঁর আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকা এবং অবাধ্যতা হতে বিরত থাকা উচিত। তিনি সবজান্তাও বটে এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারীও বটে। সম্ভবতঃ তিনি কাউকে ঢিল দিয়ে রাখবেন, কিন্তু যখন ধরবেন তখন এমন কঠিনভাবে ধরবেন যে, পালিয়ে যাবার কোন উপায় থাকবে না। এমন একদিন আসবে যেদিন সমস্ত ভাল-মন্দ কাজের হিসেব সামনে রেখে দেয়া হবে। পুণ্যের কাজ দেখে আনন্দ লাভ হবে এবং মন্দ কাজ দেখে দাঁত কামড়াতে থাকবে ও হা-হুতাশ করবে। সেদিন তারা ইচ্ছে পোষণ করবে যে, যদি তার মধ্যে ও ঐ মন্দ কার্যের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকতো তবে কতই না চমৎকার হতো! কুরআন কারীমের আর এক স্থানে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সেদিন মানুষকে তার পূর্বের ও পরের কৃৎকর্মের সংবাদ দেয়া হবে। (৭৫:১৩) দুনিয়ায় যে শয়তান তার সঙ্গে থাকতো এবং তাকে অন্যায় কার্যে উত্তেজিত করতো সেদিন তার উপরও সে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে শয়তান, যদি তোমার ও আমার মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান হতো তবে কতই না ভাল হতো! তুমি মন্দ সাথী।' (৪৩:৩৮)আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় অস্তিত্ব হতে অর্থাৎ স্বীয় শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন। অতঃপর তিনি স্বীয় সৎ বান্দাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর দয়া ও স্নেহ হতেও নিরাশ না হয়। কেননা, তিনি। অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল। ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “এটাও তার সরাসরি দয়া ও ভালবাসা যে, তিনি স্বীয় অস্তিত্ব হতে বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়েছেন। এও ভাবার্থ হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। সুতরাং বান্দাদেরও উচিত যে, তারা যেন সরল-সঠিক পথ হতে সরে না পড়ে, পবিত্র ধর্মকে পরিত্যাগ না করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে না নেয়।

আলে ইমরান 3:30

২৯-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কথাই ভালই জানেন। কোন ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্ৰমত কথাও তাঁর নিকট লুক্কায়িত থাকে না। তার জ্ঞান সমস্ত জিনিসকে প্রতি মুহূর্তে বেষ্টন করে রয়েছে। পৃথিবী প্রান্তে, পর্বতে, সমুদ্রে, আকাশে, বাতাসে, ছিদ্রে মোটকথা যেখানে যা কিছু আছে সবই তাঁর গোচরে রয়েছে। সব কিছুর উপরেই তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা বিদ্যমান। তিনি যেভাবেই চান রাখেন, যাকে ইচ্ছে করেন শাস্তি দেন। সুতরাং এত ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী ও এতবড় ক্ষমতাবান হতে সকলেরই সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা, সদা-সর্বদা তাঁর আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকা এবং অবাধ্যতা হতে বিরত থাকা উচিত। তিনি সবজান্তাও বটে এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারীও বটে। সম্ভবতঃ তিনি কাউকে ঢিল দিয়ে রাখবেন, কিন্তু যখন ধরবেন তখন এমন কঠিনভাবে ধরবেন যে, পালিয়ে যাবার কোন উপায় থাকবে না। এমন একদিন আসবে যেদিন সমস্ত ভাল-মন্দ কাজের হিসেব সামনে রেখে দেয়া হবে। পুণ্যের কাজ দেখে আনন্দ লাভ হবে এবং মন্দ কাজ দেখে দাঁত কামড়াতে থাকবে ও হা-হুতাশ করবে। সেদিন তারা ইচ্ছে পোষণ করবে যে, যদি তার মধ্যে ও ঐ মন্দ কার্যের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকতো তবে কতই না চমৎকার হতো! কুরআন কারীমের আর এক স্থানে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সেদিন মানুষকে তার পূর্বের ও পরের কৃৎকর্মের সংবাদ দেয়া হবে। (৭৫:১৩) দুনিয়ায় যে শয়তান তার সঙ্গে থাকতো এবং তাকে অন্যায় কার্যে উত্তেজিত করতো সেদিন তার উপরও সে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে শয়তান, যদি তোমার ও আমার মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান হতো তবে কতই না ভাল হতো! তুমি মন্দ সাথী।' (৪৩:৩৮)আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় অস্তিত্ব হতে অর্থাৎ স্বীয় শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন। অতঃপর তিনি স্বীয় সৎ বান্দাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর দয়া ও স্নেহ হতেও নিরাশ না হয়। কেননা, তিনি। অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল। ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “এটাও তার সরাসরি দয়া ও ভালবাসা যে, তিনি স্বীয় অস্তিত্ব হতে বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়েছেন। এও ভাবার্থ হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। সুতরাং বান্দাদেরও উচিত যে, তারা যেন সরল-সঠিক পথ হতে সরে না পড়ে, পবিত্র ধর্মকে পরিত্যাগ না করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে না নেয়।

আলে ইমরান 3:31

৩১-৩২ নং আয়াতের তাফসীর: এ পবিত্র আয়াতটি মীমাংসা করে দিয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে ভালবাসার দাবী করে, কিন্তু তার আমল ও বিশ্বাস যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের অনুরূপ না হয় এবং সে তাঁর সুন্নাতের অনুসারী না হয়, তবে সে তার এ দাবীতে মিথ্যাবাদী। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা অগ্রাহ্য। এ জন্যেই এখানেও ইরশাদ হচ্ছে—যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে ভালবাসা রাখার দাবীতে সত্যবাদী হও তবে আমার সুন্নাতের উপর আমল কর। সে সময় আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তোমাদের চাহিদা অপেক্ষা বেশী দান করবেন অর্থাৎ স্বয়ং তিনিই তোমাদেরকে চাইবেন। যেমন বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেনঃ ‘তোমার চাওয়া কোন জিনিসই নয়, মজা ও স্বাদ তো ওর মধ্যেই রয়েছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তোমাকে চাইতে থাকেন। মোটকথা আল্লাহ তা'আলার ভালবাসা রাখার পরিচয় এই যে, প্রতিটি কাজে সুন্নাতের প্রতি আনুগত্যই হবে একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দ্বীন হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্যে ভালবাসা ও তারই জন্যে শত্রুতার নাম। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু সনদ হিসেবে হাদীসটি মুনকার’। অতঃপর বলা হচ্ছে-হাদীসের উপর চলার কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দেবেন। এরপর সর্বসাধারণের উপর নির্দেশ হচ্ছে যে, তারা যেন সবাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে। যারা এরপর থেকে ফিরে যাবে অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়বে তারা কাফির এবং আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে ভালবাসেন না। যদিও তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসার দাবী করে কিন্তু যে পর্যন্ত তারা আল্লাহ তা'আলার সত্যবাদী, নিরক্ষর, রাসূলগণের (আঃ) সমাপ্তি আনয়নকারী এবং দানব ও মানবের নবী (সঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণ না করবে সেই পর্যন্ত তারা তাদের এ দাবীতে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এমনই রাসূল যে, যদি আজ নবীগণ (আঃ) এমনকি স্থির প্রতিজ্ঞ রাসূলগণও (আঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁদেরও এ রাসূল (সঃ)-কে ও তাঁর শরীয়তকে মান্য করা ছাড়া উপায় ছিল না। এর বিস্তারিত বিবরণ (আরবী) (৩:৮১) -এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।

আলে ইমরান 3:32

৩১-৩২ নং আয়াতের তাফসীর: এ পবিত্র আয়াতটি মীমাংসা করে দিয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে ভালবাসার দাবী করে, কিন্তু তার আমল ও বিশ্বাস যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের অনুরূপ না হয় এবং সে তাঁর সুন্নাতের অনুসারী না হয়, তবে সে তার এ দাবীতে মিথ্যাবাদী। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা অগ্রাহ্য। এ জন্যেই এখানেও ইরশাদ হচ্ছে—যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে ভালবাসা রাখার দাবীতে সত্যবাদী হও তবে আমার সুন্নাতের উপর আমল কর। সে সময় আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তোমাদের চাহিদা অপেক্ষা বেশী দান করবেন অর্থাৎ স্বয়ং তিনিই তোমাদেরকে চাইবেন। যেমন বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেনঃ ‘তোমার চাওয়া কোন জিনিসই নয়, মজা ও স্বাদ তো ওর মধ্যেই রয়েছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তোমাকে চাইতে থাকেন। মোটকথা আল্লাহ তা'আলার ভালবাসা রাখার পরিচয় এই যে, প্রতিটি কাজে সুন্নাতের প্রতি আনুগত্যই হবে একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দ্বীন হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্যে ভালবাসা ও তারই জন্যে শত্রুতার নাম। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু সনদ হিসেবে হাদীসটি মুনকার’। অতঃপর বলা হচ্ছে-হাদীসের উপর চলার কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দেবেন। এরপর সর্বসাধারণের উপর নির্দেশ হচ্ছে যে, তারা যেন সবাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে। যারা এরপর থেকে ফিরে যাবে অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়বে তারা কাফির এবং আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে ভালবাসেন না। যদিও তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসার দাবী করে কিন্তু যে পর্যন্ত তারা আল্লাহ তা'আলার সত্যবাদী, নিরক্ষর, রাসূলগণের (আঃ) সমাপ্তি আনয়নকারী এবং দানব ও মানবের নবী (সঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণ না করবে সেই পর্যন্ত তারা তাদের এ দাবীতে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এমনই রাসূল যে, যদি আজ নবীগণ (আঃ) এমনকি স্থির প্রতিজ্ঞ রাসূলগণও (আঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁদেরও এ রাসূল (সঃ)-কে ও তাঁর শরীয়তকে মান্য করা ছাড়া উপায় ছিল না। এর বিস্তারিত বিবরণ (আরবী) (৩:৮১) -এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।

আলে ইমরান 3:33

৩৩-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ এ মহামানবগণকে আল্লাহ তা'আলা সারা বিশ্বের উপর মনোনীত করেছেন। হযরত আদম (আঃ)-কে তিনি স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে স্বীয় রূহ প্রবেশ করিয়েছেন, তাঁকে সমস্ত জিনিসের নাম বলে দিয়েছেন, তাঁকে জান্নাতে বাস করিয়েছেন এবং স্বীয় নৈপুণ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে আঁকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেন। যখন সারা জগত প্রতিমা পূজায় ছেয়ে যায় তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রথম রাসূল রূপে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। অতঃপর যখন তার গোত্র তাঁর অবাধ্য হয়ে যায় এবং তাঁর হিদায়াতের উপর আমল করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে তখন তিনি রাতদিন প্রকাশ্য ও গোপনে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার দিকে আহ্বান করতে থাকেন, কিন্তু তারা কোনমতেই তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ)-এর অনুসারীগণ ছাড়া অন্য সকলকে স্বীয় পানির শাস্তি অর্থাৎ বিখ্যাত নূহের তুফানে’ ডুবিয়ে দেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশকে আল্লাহ তা'আলা মনোনয়ন দান করেন। তারশংশেই মানব জাতির নেতা এবং নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) জন্মগ্রহণ করেন। ইমরান (আঃ)-এর বংশকেও তিনি মনোনীত করেন। ইমরান হযরত ঈসা (আঃ)-এর জননী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পিতার নাম। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে তার বংশলতা নিম্নরূপঃ ইমরান ইবনে হাশিম ইবনে মীশা ইবনে হিযকিয়া ইবনে ইবরাহীম ইবনে গারইয়া ইবনে নাওশ ইবনে আযর ইবনে বাহওয়া ইবনে মুকাসিত ইবনে আয়শা ইবনে আইয়াম ইবনে সুলায়মান (আঃ) ইবনে দাউদ (আঃ)। সুতরাং হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর। এর বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-আনআমের তাফসীরে আসবে।

আলে ইমরান 3:34

৩৩-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ এ মহামানবগণকে আল্লাহ তা'আলা সারা বিশ্বের উপর মনোনীত করেছেন। হযরত আদম (আঃ)-কে তিনি স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে স্বীয় রূহ প্রবেশ করিয়েছেন, তাঁকে সমস্ত জিনিসের নাম বলে দিয়েছেন, তাঁকে জান্নাতে বাস করিয়েছেন এবং স্বীয় নৈপুণ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে আঁকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেন। যখন সারা জগত প্রতিমা পূজায় ছেয়ে যায় তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রথম রাসূল রূপে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। অতঃপর যখন তার গোত্র তাঁর অবাধ্য হয়ে যায় এবং তাঁর হিদায়াতের উপর আমল করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে তখন তিনি রাতদিন প্রকাশ্য ও গোপনে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার দিকে আহ্বান করতে থাকেন, কিন্তু তারা কোনমতেই তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ)-এর অনুসারীগণ ছাড়া অন্য সকলকে স্বীয় পানির শাস্তি অর্থাৎ বিখ্যাত নূহের তুফানে’ ডুবিয়ে দেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশকে আল্লাহ তা'আলা মনোনয়ন দান করেন। তারশংশেই মানব জাতির নেতা এবং নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) জন্মগ্রহণ করেন। ইমরান (আঃ)-এর বংশকেও তিনি মনোনীত করেন। ইমরান হযরত ঈসা (আঃ)-এর জননী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পিতার নাম। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে তার বংশলতা নিম্নরূপঃ ইমরান ইবনে হাশিম ইবনে মীশা ইবনে হিযকিয়া ইবনে ইবরাহীম ইবনে গারইয়া ইবনে নাওশ ইবনে আযর ইবনে বাহওয়া ইবনে মুকাসিত ইবনে আয়শা ইবনে আইয়াম ইবনে সুলায়মান (আঃ) ইবনে দাউদ (আঃ)। সুতরাং হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর। এর বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-আনআমের তাফসীরে আসবে।

আলে ইমরান 3:35

৩৫-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইমরানের যে পত্নী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর মা ছিলেন তাঁর নাম ছিল হিন্না বিনতে ফাকুয। হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ তার ছেলে মেয়ে হতো না। একদা তিনি একটি পাখীকে দেখেন যে, সে তার বাচ্চাগুলোকে আদর করছে। এতে তাঁর অন্তরে সন্তানের বাসনা জেগে উঠে। ঐ সময়েই তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আন্তরিকতার সাথে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ পাক তাঁর প্রার্থনা কবূল করেন; ঐ রাত্রেই তিনি গর্ভবতী হন।গর্ভ ধারণের পূর্ণ বিশ্বাস হলে তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রতিজ্ঞা করেন (ন্যর মানেন) যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সন্তান দান করলে তিনি তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে আযাদ করে দেবেন। অতঃপর পুনরায় তিনি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেনঃ হে আল্লাহ! আপনি আমার এই নিষ্কলুষ নর কবুল করুন। আপনি আমার প্রার্থনা শুনতে রয়েছেন এবং আমার নিয়তের কথাও আপনি খুব অবগত আছেন। তখন পুত্র সন্তান হবে কি কন্যা সন্তান হবে তাতো আর জানা ছিল না। কাজেই সন্তান ভূমিষ্ট হলে দেখা যায়, তিনি কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবা কার্য পরিচালনার যোগ্যতা কন্যা সন্তানের থাকতে পারে না। ওর জন্যে তো পুত্র সন্তানের প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্বীয় দুর্বলতার কথা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রকাশ করতঃ বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি তো তাকে আপনার নামে, আযাদ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এ যে কন্যা হয়ে গেল। (আরবী) এরূপও পড়া হয়েছে। অর্থাৎ এ উক্তিটিও হযরত হিন্নারই ছিল। তাহলে অর্থ হবে ‘আমি যে কন্যা সন্তান প্রসব করেছি তা আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন। আবার ‘অযাআত’ও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবে সে যে কি সন্তান প্রসব করেছে তা আল্লাহ তা'আলা খুব ভাল জানেন। হযরত হিন্না বলেনঃ নর ও নারী সমান নয়। আমি তার নাম মারইয়াম রাখলাম। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, জন্মের দিনও শিশুর নাম রাখা বৈধ। কেননা, পূর্ববর্তীদের শরীয়তও আমাদের শরীয়ত। আর এখানে এটা বর্ণনা করা হয়েছে এবং খণ্ডন করা হয়নি। বরং ওটাকে ঠিকই রাখা হয়েছে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আজ রাত্রে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে এবং তার নাম আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নামানুসারে ইবরাহীম রেখেছি'। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)হযরত আনাস (রাঃ)-এর একটি ভাই জন্মগ্রহণ করলে তিনি তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বহস্তে তার মুখে খাবার পুরে দেন এবং তার নাম রাখেন আবদুল্লাহ। এ হাদীসটিও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল! রাত্রে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তার নাম কি রাখবো’? তিনি বলেনঃ “আবদুর রাহমান রাখ’-সহীহ বুখারী। আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ)-এর একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাকে নিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন, যেন তিনি স্বীয় পবিত্র হস্তে তার মুখে খাবার পুরে দেন। তিনি অন্য দিকে মনোযোগ দেন এবং শিশুটির কথা বিস্মরণ হন। হযরত উসায়েদ (রাঃ) শিশুটিকে বাড়ী পাঠিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবকাশ প্রাপ্ত হয়ে শিশুটির কথা খেয়াল করেন এবং তাকে দেখতে না পেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতঃ অবস্থা জানতে পেরে বলেনঃ “তার নাম রাখ মুনযির (অর্থাৎ ভয় প্রদর্শক)।” মুসনাদ-ই-আহ্মাদ ও সুনানের মধ্যে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যাকে ইমাম তিরমিযী বিশুদ্ধ বলেছেন, তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু স্বীয় ‘আকীকায় বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে আকীকাহ দিতে হবে অর্থাৎ জন্তু যবেহ করতে হবে, শিশুর নাম রাখতে হবে এবং মস্তক মুণ্ডন করতে হবে।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রক্তপাত করতে হবে। এ বর্ণনাটিই বেশী সঠিক রূপে প্রমাণিত। কিন্তু যুবাইর ইবনে বাকারের বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পুত্র হযরত ইবরাহীম (রাঃ)-এর ‘আকীকাহ’ করেছিলেন এবং নাম রেখেছিলেন ইবরাহীম (রাঃ)। এ হাদীসটি সনদ দ্বারা সাব্যস্ত নয় এবং এর বিপরীত বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। সামঞ্জস্য এভাবে হতে পারে যে, ঐদিনে ঐ নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর মাতাও স্বীয় শিশু কন্যাকে ও তার ভবিষ্যৎ সন্তানদেরকে বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট হতে আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে সমর্পণ করেন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনাটি ককূল করেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘শয়তান প্রত্যেক শিশুকেই তার জন্মের সময় আঘাত করে, ওরই কারণে সে চীষ্কার করে কেঁদে উঠে। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এটা হতে রক্ষা পেয়েছিলেন। এ হাদীসটি বর্ণনা করে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নাও।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছে। এটা আরও বহু কিতাবে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। কোন একটিতে রয়েছে যে, এক ঘা বা দু ঘা দেয়। একটি হাদীসে শুধুমাত্র হযরত ঈসারই (আঃ) উল্লেখ আছে যে, শয়তান তাঁকেও ঘা দিতে চেয়েছিল কিন্তু তাঁকে লাগেনি, পর্দায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল।

আলে ইমরান 3:36

৩৫-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইমরানের যে পত্নী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর মা ছিলেন তাঁর নাম ছিল হিন্না বিনতে ফাকুয। হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ তার ছেলে মেয়ে হতো না। একদা তিনি একটি পাখীকে দেখেন যে, সে তার বাচ্চাগুলোকে আদর করছে। এতে তাঁর অন্তরে সন্তানের বাসনা জেগে উঠে। ঐ সময়েই তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আন্তরিকতার সাথে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ পাক তাঁর প্রার্থনা কবূল করেন; ঐ রাত্রেই তিনি গর্ভবতী হন।গর্ভ ধারণের পূর্ণ বিশ্বাস হলে তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রতিজ্ঞা করেন (ন্যর মানেন) যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সন্তান দান করলে তিনি তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে আযাদ করে দেবেন। অতঃপর পুনরায় তিনি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেনঃ হে আল্লাহ! আপনি আমার এই নিষ্কলুষ নর কবুল করুন। আপনি আমার প্রার্থনা শুনতে রয়েছেন এবং আমার নিয়তের কথাও আপনি খুব অবগত আছেন। তখন পুত্র সন্তান হবে কি কন্যা সন্তান হবে তাতো আর জানা ছিল না। কাজেই সন্তান ভূমিষ্ট হলে দেখা যায়, তিনি কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবা কার্য পরিচালনার যোগ্যতা কন্যা সন্তানের থাকতে পারে না। ওর জন্যে তো পুত্র সন্তানের প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্বীয় দুর্বলতার কথা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রকাশ করতঃ বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি তো তাকে আপনার নামে, আযাদ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এ যে কন্যা হয়ে গেল। (আরবী) এরূপও পড়া হয়েছে। অর্থাৎ এ উক্তিটিও হযরত হিন্নারই ছিল। তাহলে অর্থ হবে ‘আমি যে কন্যা সন্তান প্রসব করেছি তা আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন। আবার ‘অযাআত’ও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবে সে যে কি সন্তান প্রসব করেছে তা আল্লাহ তা'আলা খুব ভাল জানেন। হযরত হিন্না বলেনঃ নর ও নারী সমান নয়। আমি তার নাম মারইয়াম রাখলাম। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, জন্মের দিনও শিশুর নাম রাখা বৈধ। কেননা, পূর্ববর্তীদের শরীয়তও আমাদের শরীয়ত। আর এখানে এটা বর্ণনা করা হয়েছে এবং খণ্ডন করা হয়নি। বরং ওটাকে ঠিকই রাখা হয়েছে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আজ রাত্রে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে এবং তার নাম আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নামানুসারে ইবরাহীম রেখেছি'। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)হযরত আনাস (রাঃ)-এর একটি ভাই জন্মগ্রহণ করলে তিনি তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বহস্তে তার মুখে খাবার পুরে দেন এবং তার নাম রাখেন আবদুল্লাহ। এ হাদীসটিও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল! রাত্রে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তার নাম কি রাখবো’? তিনি বলেনঃ “আবদুর রাহমান রাখ’-সহীহ বুখারী। আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ)-এর একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাকে নিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন, যেন তিনি স্বীয় পবিত্র হস্তে তার মুখে খাবার পুরে দেন। তিনি অন্য দিকে মনোযোগ দেন এবং শিশুটির কথা বিস্মরণ হন। হযরত উসায়েদ (রাঃ) শিশুটিকে বাড়ী পাঠিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবকাশ প্রাপ্ত হয়ে শিশুটির কথা খেয়াল করেন এবং তাকে দেখতে না পেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতঃ অবস্থা জানতে পেরে বলেনঃ “তার নাম রাখ মুনযির (অর্থাৎ ভয় প্রদর্শক)।” মুসনাদ-ই-আহ্মাদ ও সুনানের মধ্যে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যাকে ইমাম তিরমিযী বিশুদ্ধ বলেছেন, তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু স্বীয় ‘আকীকায় বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে আকীকাহ দিতে হবে অর্থাৎ জন্তু যবেহ করতে হবে, শিশুর নাম রাখতে হবে এবং মস্তক মুণ্ডন করতে হবে।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রক্তপাত করতে হবে। এ বর্ণনাটিই বেশী সঠিক রূপে প্রমাণিত। কিন্তু যুবাইর ইবনে বাকারের বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পুত্র হযরত ইবরাহীম (রাঃ)-এর ‘আকীকাহ’ করেছিলেন এবং নাম রেখেছিলেন ইবরাহীম (রাঃ)। এ হাদীসটি সনদ দ্বারা সাব্যস্ত নয় এবং এর বিপরীত বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। সামঞ্জস্য এভাবে হতে পারে যে, ঐদিনে ঐ নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর মাতাও স্বীয় শিশু কন্যাকে ও তার ভবিষ্যৎ সন্তানদেরকে বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট হতে আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে সমর্পণ করেন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনাটি ককূল করেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘শয়তান প্রত্যেক শিশুকেই তার জন্মের সময় আঘাত করে, ওরই কারণে সে চীষ্কার করে কেঁদে উঠে। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এটা হতে রক্ষা পেয়েছিলেন। এ হাদীসটি বর্ণনা করে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নাও।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছে। এটা আরও বহু কিতাবে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। কোন একটিতে রয়েছে যে, এক ঘা বা দু ঘা দেয়। একটি হাদীসে শুধুমাত্র হযরত ঈসারই (আঃ) উল্লেখ আছে যে, শয়তান তাঁকেও ঘা দিতে চেয়েছিল কিন্তু তাঁকে লাগেনি, পর্দায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল।