Tafseer ibn Kathir — আলে ইমরান 3:37 – আলে ইমরান 3:93
Contents
- আলে ইমরান 3:37
- আলে ইমরান 3:38
- আলে ইমরান 3:39
- আলে ইমরান 3:40
- আলে ইমরান 3:41
- আলে ইমরান 3:42
- আলে ইমরান 3:43
- আলে ইমরান 3:44
- আলে ইমরান 3:45
- আলে ইমরান 3:46
- আলে ইমরান 3:47
- আলে ইমরান 3:48
- আলে ইমরান 3:49
- আলে ইমরান 3:50
- আলে ইমরান 3:51
- আলে ইমরান 3:52
- আলে ইমরান 3:53
- আলে ইমরান 3:54
- আলে ইমরান 3:55
- আলে ইমরান 3:56
- আলে ইমরান 3:57
- আলে ইমরান 3:58
- আলে ইমরান 3:59
- আলে ইমরান 3:60
- আলে ইমরান 3:61
- আলে ইমরান 3:62
- আলে ইমরান 3:63
- আলে ইমরান 3:64
- আলে ইমরান 3:65
- আলে ইমরান 3:66
- আলে ইমরান 3:67
- আলে ইমরান 3:68
- আলে ইমরান 3:69
- আলে ইমরান 3:70
- আলে ইমরান 3:71
- আলে ইমরান 3:72
- আলে ইমরান 3:73
- আলে ইমরান 3:74
- আলে ইমরান 3:75
- আলে ইমরান 3:76
- আলে ইমরান 3:77
- আলে ইমরান 3:78
- আলে ইমরান 3:79
- আলে ইমরান 3:80
- আলে ইমরান 3:81
- আলে ইমরান 3:82
- আলে ইমরান 3:83
- আলে ইমরান 3:84
- আলে ইমরান 3:85
- আলে ইমরান 3:86
- আলে ইমরান 3:87
- আলে ইমরান 3:88
- আলে ইমরান 3:89
- আলে ইমরান 3:90
- আলে ইমরান 3:91
- আলে ইমরান 3:92
- আলে ইমরান 3:93
আলে ইমরান 3:37
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত হিন্নার নযর’ তিনি সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেন এবং তাঁকে উত্তমরূপে বর্ধিত করেন। তাঁকে তিনি বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক উভয় সৌন্দর্যই দান করেন এবং সৎ বান্দাদের মধ্যে তাঁর লালন-পালনের ব্যবস্থা করেন যেন তিনি চরিত্রবান লোকদের সংস্পর্শে থেকে তাঁদের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে তিনি হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর দায়িত্বভার অর্পণ করেন। ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ হযরত মারইয়াম (আঃ) পিতৃহীনা হয়েছিলেন বলে হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে তাঁর লালন-পালনের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। কিন্তু অন্যান্য মনীষীগণ বলেন যে, সে সময় দেশে দুর্ভিক্ষ পড়েছিল বলে হযরত যাকারিয়া (আঃ) তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। হয়তো দু'টি কারণই ছিল। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর বর্ণনানুযায়ী জানা যায় যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর খালু ছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি তার ভগ্নিপতি ছিলেন। যেমন মিরাজ সম্বলিত বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যারা পরস্পর খালোতো ভাই ছিলেন। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। কেননা, আরবের পরিভাষায় মায়ের খালার ছেলেকেও খালাতো ভাই বলা হয়ে থাকে। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) স্বীয় খালার নিকট লালিত-পালিত হন। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ) -এর পিতৃহীনা কন্যা উমরা (রাঃ)-কে তার খালা হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-এর স্ত্রীর নিকট সমর্পণ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “খালা হচ্ছেন মায়ের স্থলাভিষিক্ত। এখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর মাহাত্ম্য ও অলৌকিকতা বর্ণনা করছেন যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) যখনই হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করতেন তখনই তাঁর নিকট অসময়ের ফল দেখতে পেতেন। যেমন শীতকালে গ্রীষ্মকালীন ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন ফল। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত আবুশ শাশা (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রঃ), হযরত আতিয়া আওফী (রঃ) এবং হযরত সুদ্দী (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে একথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এখানে রিক -এর ভাবার্থ হচ্ছে জ্ঞান ও ঐ পুস্তিকা যার মধ্যে জ্ঞানপূর্ণ কথা লিপিবদ্ধ থাকতো। কিন্তু প্রথম উক্তিটি অধিকতর সঠিক। এ আয়াত আল্লাহর অলীদের কারামতের দলীল। এটা সাব্যস্ত করণে বহু হাদীসও এসেছে।হযরত যাকারিয়া (আঃ) একদিন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে মারইয়াম! তোমার নিকট এ আহার্যগুলো কোথা হতে আসে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘এগুলো আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসে থাকে। তিনি যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করে থাকেন। মুসনাদ-ই-হাফিয আবু ইয়ালা’র মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকদিন কিছু না খেয়েই কেটে যায়। ক্ষুধায় তার কষ্ট হতে থাকে। তিনি তাঁর সমস্ত সহধর্মিণীর বাড়ীতে গমন করেন। কিন্তু সব জায়গা থেকেই তাঁকে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়। অবশেষে তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “হে কন্যা আমার! তোমার নিকট আমার খাওয়ার মত কিছু আছে কি? আমি ক্ষুধার্ত। তিনি বলেনঃ “আমার বাপ-মা আপনার উপর কুরবান হোন, আল্লাহর শপথ! আমার নিকট কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নিকট থেকে বের হয়েছেন এমন সময় হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর দাসী তার নিকট দু’টি রুটি ও এক টুকরা গোশত পাঠিয়ে দেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) ঐগুলো একটি বাসনে রেখে বলেনঃ আমি, আমার স্বামী ও সন্তানাদি সবাই ক্ষুধার্ত রয়েছি। কিন্তু আমরা সবাই ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই কাটিয়ে দেবো এবং আল্লাহর শপথ! আজ এগুলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কেই দিয়ে দেবো। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে আনার জন্যে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে তাঁর খিদমতে পাঠিয়ে দেন। তিনি পথেই ছিলেন, সুতরাং ফিরে আসলেন।হযরত ফাতিমা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা-মাতা আপনার উপর উৎসর্গ হোন, আল্লাহ পাক কিছু পাঠিয়ে দিয়েছেন যা আমি আপনার জন্যে লুকিয়ে রেখেছি'। তিনি বলেনঃ হে আমার প্রিয় মেয়ে। নিয়ে এসো। হযরত ফাতিমা (রাঃ) পাত্র খুলেই দেখেন যে, তা রুটি ও গোশতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে পড়েন। কিন্তু সাথে সাথেই তিনি বুঝে নেন যে, মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এতে বরকত দান করা হয়েছে। অতএব তিনি আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করতঃ ঐগুলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এনে হাযির করেন। তিনিও ঐগুলো দেখে। আল্লাহ পাকের প্রশংসা করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রিয় মেয়ে! এগুলো কোথা হতে এলো’? তিনি বলেনঃ “হে পিতঃ! এগুলো আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এসেছে। তিনি যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আমার প্রিয় কন্যা! আল্লাহ তা'আলার সমুদয় প্রশংসা যে, তিনি তোমাকে বানী ইসরাঈলের সমস্ত নারীর নেত্রীর মত করেছেন। যখন আল্লাহ তা'আলা তাকে কোন কিছু দান করতেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি একথাই বলতেনঃ ‘এটা আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করে থাকেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে নেন এবং তিনি, হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত সহধর্মিণী (রাঃ) ও আহলে বায়েত (রাঃ) পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করেন। তবুও আরও ততোটা বেঁচে গেলো যতটা পূর্বে ছিল। সেগুলো আশে-পাশের প্রতিবেশীদের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ছিলো আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে চরম বরকত ও দান।
আলে ইমরান 3:38
৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) দেখেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে অসময়ের ফল দান করছেন। শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালের ফল তাঁর নিকট বিদ্যমান থাকছে। সুতরাং তিনিও স্বীয় বার্ধক্য ও স্বীয় সহধর্মিণীর বন্ধ্যাত্ব জানা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট অসময়ে ফল অর্থাৎ সুসন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আর যেহেতু এটা বাহ্যতঃ অসম্ভব জিনিস ছিল, তাই তিনি অতি সন্তর্পণে এ প্রার্থনা জানান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘নেদায়ান খাফীয়া অর্থাৎ ‘গোপন প্রার্থনা।' তিনি তাঁর ইবাদতখানাতেই ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম ইয়াহইয়া রাখতে হবে।' সাথে সাথে তারা একথাও বলে দেনঃ ‘এ সুসংবাদ আমাদের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইয়াহইয়া নাম রাখার কারণ এই যে, তাঁর জীবন হবে ঈমানের সাথে। তিনি আল্লাহর কালেমা অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ করবেন। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের প্রথম স্বীকারকারীও হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)'। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ঠিক হযরত ঈসা (আঃ)-এর পথের উপর ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মা প্রায়ই হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলতেনঃ ‘আমি আমার গর্ভের জিনিসকে দেখতে পাচ্ছি যে, সে তোমার গর্ভের জিনিসকে সিজদা করছে। এটা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ তার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্যতা অবগত হয়েছিলেন। তিনি বয়সে হযরত ঈসা (আঃ) অপেক্ষা বড় ছিলেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ধৈর্যশীল, বিদ্যা ও ইবাদতে অগ্রবর্তী, মুত্তাকী, ধর্ম শাস্ত্রবিদ, চরিত্রে ও ধর্মে সর্বাপেক্ষা উত্তম, ক্রোধকে দমনকারী এবং ভদ্র। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যে স্ত্রীলোকদের নিকট আসতে পারে না, যার সন্তানাদি হয় না এবং যার মধ্যে কোন কামভাব থাকে না। এ অর্থের একটি মারফু হাদীসও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শব্দটি পাঠ করতঃ ভূমি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, তাঁর অঙ্গ ছিল এরূপ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন, সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে শুধুমাত্র ইয়াহইয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার সাথে নিস্পাপরূপে সাক্ষাত করবেন। অতঃপর তিনি মাটি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, যার অঙ্গ এরূপ হয় তাকে (আরবী) বলে।' হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (রঃ) অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করেন। উপরে বর্ণিত মারফু বর্ণনা অপেক্ষা এ মাওকুফ বর্ণনাটি সনদ হিসেবে অধিকতর সঠিক। মার' বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাপড়ের ঝালরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরূপ ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি মাটি হতে একটা খড়কুটা উঠিয়ে নিয়ে ওর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, তার অঙ্গ ছিল এই খড়কুটার মত।এরপর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে দ্বিতীয় শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর পুত্র নবী হবেন। এ সুসংবাদ পূর্বের সুসংবাদ হতেও অগ্রগণ্য। এ সুসংবাদ প্রাপ্তির পর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ধারণা হয় যে, এর বাহ্যিক কারণগুলো তো অসম্ভব, তাই তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেন, “হে আমার প্রভু! আমি তো বার্ধক্যে পদার্পণ করেছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, কাজেই আমার সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? ফেরেশতাগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, আল্লাহর নির্দেশই সব চেয়ে বড়। তাঁর নিকট কোনকিছু অসম্ভবও নয় এবং কঠিনও নয়। তিনি কোন কাজে অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করে থাকেন। তখন হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন যাজ্ঞা করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়ঃ নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন পর্যন্ত লোকের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধুমাত্র ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘সুস্থতার সাথে তিন রাত'। (১৯:১০) এরপর বলা হচ্ছে- এ অবস্থায় খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার যিক্রি করা এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তোমার উচিত। সকাল-সন্ধ্যায় ঐ কাজেই লেগে থাকবে। এর দ্বিতীয় অংশ এবং পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আলে ইমরান 3:39
৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) দেখেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে অসময়ের ফল দান করছেন। শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালের ফল তাঁর নিকট বিদ্যমান থাকছে। সুতরাং তিনিও স্বীয় বার্ধক্য ও স্বীয় সহধর্মিণীর বন্ধ্যাত্ব জানা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট অসময়ে ফল অর্থাৎ সুসন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আর যেহেতু এটা বাহ্যতঃ অসম্ভব জিনিস ছিল, তাই তিনি অতি সন্তর্পণে এ প্রার্থনা জানান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘নেদায়ান খাফীয়া অর্থাৎ ‘গোপন প্রার্থনা।' তিনি তাঁর ইবাদতখানাতেই ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম ইয়াহইয়া রাখতে হবে।' সাথে সাথে তারা একথাও বলে দেনঃ ‘এ সুসংবাদ আমাদের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইয়াহইয়া নাম রাখার কারণ এই যে, তাঁর জীবন হবে ঈমানের সাথে। তিনি আল্লাহর কালেমা অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ করবেন। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের প্রথম স্বীকারকারীও হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)'। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ঠিক হযরত ঈসা (আঃ)-এর পথের উপর ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মা প্রায়ই হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলতেনঃ ‘আমি আমার গর্ভের জিনিসকে দেখতে পাচ্ছি যে, সে তোমার গর্ভের জিনিসকে সিজদা করছে। এটা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ তার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্যতা অবগত হয়েছিলেন। তিনি বয়সে হযরত ঈসা (আঃ) অপেক্ষা বড় ছিলেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ধৈর্যশীল, বিদ্যা ও ইবাদতে অগ্রবর্তী, মুত্তাকী, ধর্ম শাস্ত্রবিদ, চরিত্রে ও ধর্মে সর্বাপেক্ষা উত্তম, ক্রোধকে দমনকারী এবং ভদ্র। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যে স্ত্রীলোকদের নিকট আসতে পারে না, যার সন্তানাদি হয় না এবং যার মধ্যে কোন কামভাব থাকে না। এ অর্থের একটি মারফু হাদীসও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শব্দটি পাঠ করতঃ ভূমি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, তাঁর অঙ্গ ছিল এরূপ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন, সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে শুধুমাত্র ইয়াহইয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার সাথে নিস্পাপরূপে সাক্ষাত করবেন। অতঃপর তিনি মাটি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, যার অঙ্গ এরূপ হয় তাকে (আরবী) বলে।' হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (রঃ) অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করেন। উপরে বর্ণিত মারফু বর্ণনা অপেক্ষা এ মাওকুফ বর্ণনাটি সনদ হিসেবে অধিকতর সঠিক। মার' বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাপড়ের ঝালরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরূপ ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি মাটি হতে একটা খড়কুটা উঠিয়ে নিয়ে ওর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, তার অঙ্গ ছিল এই খড়কুটার মত।এরপর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে দ্বিতীয় শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর পুত্র নবী হবেন। এ সুসংবাদ পূর্বের সুসংবাদ হতেও অগ্রগণ্য। এ সুসংবাদ প্রাপ্তির পর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ধারণা হয় যে, এর বাহ্যিক কারণগুলো তো অসম্ভব, তাই তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেন, “হে আমার প্রভু! আমি তো বার্ধক্যে পদার্পণ করেছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, কাজেই আমার সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? ফেরেশতাগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, আল্লাহর নির্দেশই সব চেয়ে বড়। তাঁর নিকট কোনকিছু অসম্ভবও নয় এবং কঠিনও নয়। তিনি কোন কাজে অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করে থাকেন। তখন হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন যাজ্ঞা করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়ঃ নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন পর্যন্ত লোকের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধুমাত্র ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘সুস্থতার সাথে তিন রাত'। (১৯:১০) এরপর বলা হচ্ছে- এ অবস্থায় খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার যিক্রি করা এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তোমার উচিত। সকাল-সন্ধ্যায় ঐ কাজেই লেগে থাকবে। এর দ্বিতীয় অংশ এবং পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আলে ইমরান 3:40
৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) দেখেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে অসময়ের ফল দান করছেন। শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালের ফল তাঁর নিকট বিদ্যমান থাকছে। সুতরাং তিনিও স্বীয় বার্ধক্য ও স্বীয় সহধর্মিণীর বন্ধ্যাত্ব জানা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট অসময়ে ফল অর্থাৎ সুসন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আর যেহেতু এটা বাহ্যতঃ অসম্ভব জিনিস ছিল, তাই তিনি অতি সন্তর্পণে এ প্রার্থনা জানান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘নেদায়ান খাফীয়া অর্থাৎ ‘গোপন প্রার্থনা।' তিনি তাঁর ইবাদতখানাতেই ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম ইয়াহইয়া রাখতে হবে।' সাথে সাথে তারা একথাও বলে দেনঃ ‘এ সুসংবাদ আমাদের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইয়াহইয়া নাম রাখার কারণ এই যে, তাঁর জীবন হবে ঈমানের সাথে। তিনি আল্লাহর কালেমা অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ করবেন। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের প্রথম স্বীকারকারীও হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)'। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ঠিক হযরত ঈসা (আঃ)-এর পথের উপর ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মা প্রায়ই হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলতেনঃ ‘আমি আমার গর্ভের জিনিসকে দেখতে পাচ্ছি যে, সে তোমার গর্ভের জিনিসকে সিজদা করছে। এটা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ তার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্যতা অবগত হয়েছিলেন। তিনি বয়সে হযরত ঈসা (আঃ) অপেক্ষা বড় ছিলেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ধৈর্যশীল, বিদ্যা ও ইবাদতে অগ্রবর্তী, মুত্তাকী, ধর্ম শাস্ত্রবিদ, চরিত্রে ও ধর্মে সর্বাপেক্ষা উত্তম, ক্রোধকে দমনকারী এবং ভদ্র। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যে স্ত্রীলোকদের নিকট আসতে পারে না, যার সন্তানাদি হয় না এবং যার মধ্যে কোন কামভাব থাকে না। এ অর্থের একটি মারফু হাদীসও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শব্দটি পাঠ করতঃ ভূমি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, তাঁর অঙ্গ ছিল এরূপ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন, সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে শুধুমাত্র ইয়াহইয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার সাথে নিস্পাপরূপে সাক্ষাত করবেন। অতঃপর তিনি মাটি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, যার অঙ্গ এরূপ হয় তাকে (আরবী) বলে।' হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (রঃ) অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করেন। উপরে বর্ণিত মারফু বর্ণনা অপেক্ষা এ মাওকুফ বর্ণনাটি সনদ হিসেবে অধিকতর সঠিক। মার' বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাপড়ের ঝালরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরূপ ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি মাটি হতে একটা খড়কুটা উঠিয়ে নিয়ে ওর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, তার অঙ্গ ছিল এই খড়কুটার মত।এরপর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে দ্বিতীয় শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর পুত্র নবী হবেন। এ সুসংবাদ পূর্বের সুসংবাদ হতেও অগ্রগণ্য। এ সুসংবাদ প্রাপ্তির পর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ধারণা হয় যে, এর বাহ্যিক কারণগুলো তো অসম্ভব, তাই তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেন, “হে আমার প্রভু! আমি তো বার্ধক্যে পদার্পণ করেছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, কাজেই আমার সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? ফেরেশতাগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, আল্লাহর নির্দেশই সব চেয়ে বড়। তাঁর নিকট কোনকিছু অসম্ভবও নয় এবং কঠিনও নয়। তিনি কোন কাজে অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করে থাকেন। তখন হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন যাজ্ঞা করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়ঃ নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন পর্যন্ত লোকের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধুমাত্র ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘সুস্থতার সাথে তিন রাত'। (১৯:১০) এরপর বলা হচ্ছে- এ অবস্থায় খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার যিক্রি করা এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তোমার উচিত। সকাল-সন্ধ্যায় ঐ কাজেই লেগে থাকবে। এর দ্বিতীয় অংশ এবং পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আলে ইমরান 3:41
৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) দেখেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে অসময়ের ফল দান করছেন। শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালের ফল তাঁর নিকট বিদ্যমান থাকছে। সুতরাং তিনিও স্বীয় বার্ধক্য ও স্বীয় সহধর্মিণীর বন্ধ্যাত্ব জানা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট অসময়ে ফল অর্থাৎ সুসন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আর যেহেতু এটা বাহ্যতঃ অসম্ভব জিনিস ছিল, তাই তিনি অতি সন্তর্পণে এ প্রার্থনা জানান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘নেদায়ান খাফীয়া অর্থাৎ ‘গোপন প্রার্থনা।' তিনি তাঁর ইবাদতখানাতেই ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম ইয়াহইয়া রাখতে হবে।' সাথে সাথে তারা একথাও বলে দেনঃ ‘এ সুসংবাদ আমাদের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইয়াহইয়া নাম রাখার কারণ এই যে, তাঁর জীবন হবে ঈমানের সাথে। তিনি আল্লাহর কালেমা অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ করবেন। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের প্রথম স্বীকারকারীও হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)'। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ঠিক হযরত ঈসা (আঃ)-এর পথের উপর ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মা প্রায়ই হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলতেনঃ ‘আমি আমার গর্ভের জিনিসকে দেখতে পাচ্ছি যে, সে তোমার গর্ভের জিনিসকে সিজদা করছে। এটা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ তার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্যতা অবগত হয়েছিলেন। তিনি বয়সে হযরত ঈসা (আঃ) অপেক্ষা বড় ছিলেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ধৈর্যশীল, বিদ্যা ও ইবাদতে অগ্রবর্তী, মুত্তাকী, ধর্ম শাস্ত্রবিদ, চরিত্রে ও ধর্মে সর্বাপেক্ষা উত্তম, ক্রোধকে দমনকারী এবং ভদ্র। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যে স্ত্রীলোকদের নিকট আসতে পারে না, যার সন্তানাদি হয় না এবং যার মধ্যে কোন কামভাব থাকে না। এ অর্থের একটি মারফু হাদীসও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শব্দটি পাঠ করতঃ ভূমি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, তাঁর অঙ্গ ছিল এরূপ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন, সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে শুধুমাত্র ইয়াহইয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার সাথে নিস্পাপরূপে সাক্ষাত করবেন। অতঃপর তিনি মাটি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, যার অঙ্গ এরূপ হয় তাকে (আরবী) বলে।' হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (রঃ) অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করেন। উপরে বর্ণিত মারফু বর্ণনা অপেক্ষা এ মাওকুফ বর্ণনাটি সনদ হিসেবে অধিকতর সঠিক। মার' বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাপড়ের ঝালরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরূপ ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি মাটি হতে একটা খড়কুটা উঠিয়ে নিয়ে ওর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, তার অঙ্গ ছিল এই খড়কুটার মত।এরপর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে দ্বিতীয় শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর পুত্র নবী হবেন। এ সুসংবাদ পূর্বের সুসংবাদ হতেও অগ্রগণ্য। এ সুসংবাদ প্রাপ্তির পর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ধারণা হয় যে, এর বাহ্যিক কারণগুলো তো অসম্ভব, তাই তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেন, “হে আমার প্রভু! আমি তো বার্ধক্যে পদার্পণ করেছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, কাজেই আমার সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? ফেরেশতাগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, আল্লাহর নির্দেশই সব চেয়ে বড়। তাঁর নিকট কোনকিছু অসম্ভবও নয় এবং কঠিনও নয়। তিনি কোন কাজে অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করে থাকেন। তখন হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন যাজ্ঞা করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়ঃ নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন পর্যন্ত লোকের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধুমাত্র ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘সুস্থতার সাথে তিন রাত'। (১৯:১০) এরপর বলা হচ্ছে- এ অবস্থায় খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার যিক্রি করা এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তোমার উচিত। সকাল-সন্ধ্যায় ঐ কাজেই লেগে থাকবে। এর দ্বিতীয় অংশ এবং পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আলে ইমরান 3:42
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে তার অত্যাধিক ইবাদত, দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য ভাব, ভদ্রতা এবং শয়তানী কুধারণা হতে দূরে থাকার কারণে স্বীয় নৈকট্য লাভের যে মর্যদা দান করেছেন এবং সারা জগতের নারীদের উপর যে মনোনীত করেছেন তারই সুসংবাদ দিচ্ছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো নারী উষ্ট্রে আরোহণ করেছে তাদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে কুরাইশদের ঐ স্ত্রীলোকগুলো যারা নিজেদের শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ প্রদর্শন করে এবং স্বামীদের দ্রব্যাদির পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ) কখনও উষ্ট্রে আরোহণ করেননি। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ)। জামেউত তিরমিযীর বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সারা জগতের নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ), খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ), ফাতিমা (রাঃ) বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) তোমার জন্য যথেষ্ট। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, এ চারজন নারী সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে উত্তম। আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘পুরুষদের মধ্যে বহু পূর্ণাঙ্গ পুরুষ রয়েছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তা নারী মাত্র তিনজন। তারা হচ্ছেন- হযরত ইমরানের কন্যা হযরত মারইয়াম (আঃ), ফিরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আঃ) এবং খুয়াইলিদের কন্যা হযরত খাদীজা (রাঃ)। আর হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত নারীদের উপর এরূপ যেরূপ সারীদের (গোশতের ঝোলে ভিজান রুটির) ফযীলত সমস্ত আহার্যের উপর।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবু দাউদ ছাড়া অন্যান্য সব হাদীসেই রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের এ হাদীসে হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই। আমি এ হাদীসের সমস্ত সনদ এবং প্রত্যেক সনদের শব্দগুলো স্বীয় কিতাবুল বিদায়া ওয়ান্নিহায়াহ’-এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় জমা করেছি।ফেরেশতাগণ বলেন, “হে মারইয়াম! আপনি আপনার সময় বিনয় প্রকাশ এবং রুকু ও সিজদায় কাটিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় ক্ষমতার এক বিরাট নিদর্শন বানাতে চান। সুতরাং মহান আল্লাহর দিকে আপনার পূর্ণ মনঃসংযোগ করা উচিত। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে আনুগত্য প্রকাশ করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই অধিকারে রয়েছে এবং প্রত্যেকেই তাঁর অনুগত।' (৩০:২৬) মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দটি রয়েছে তারই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য স্বীকার।' ইবনে জারীরও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কিন্তু ওর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) নামাযে এত অধিকক্ষণ দাড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর জানুদ্বয় ফোলে যেতো। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযে এভাবেই লম্বা লম্বা রুকূ' করা।' হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার প্রভুর ইবাদতে লিপ্ত থাক এবং যারা রুকু ও সিজদা করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' হযরত আওযায়ী (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) স্বীয় ইবাদত কক্ষে এত বেশী পরিমাণে ও এত বিনয়ের সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয়ে হলদে পানি নেতে আসতো।এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বর্ণনা করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! এসব ঘটনা তুমি জানতে না। আমি তোমাকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম। আমি তোমাকে না জানালে তুমি জনগণের নিকট এসব ঘটনা কি করে পৌছাতে? কারণ, যখন এসব ঘটনা সংঘটিত হয় তখন তুমি তো তথায় উপস্থিত ছিলে না। কিন্তু আমি ঐগুলো তোমাকে এমনভাবে জানিয়ে দিলাম যে, যেন তুমি স্বয়ং তথায় ছিলে’। যখন হযরত মারইয়ামের লালন-পালনের ব্যাপার নিয়ে একে অপরের উপর অগ্রাধিকার লাভের চেষ্টা করছিল, সবাই ঐ পুণ্য লাভের আকাংখী ছিল, সে সময় তার মা তাঁকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মসজিদে উপস্থিত হন। সে সময় তথাকার সেবক ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর ভাই হযরত হারূনের (আঃ) বংশের লোকগণ। হ্যরত মারইয়াম (আঃ)-এর মা তাদেরকে বলেনঃ “আমি আমার প্রতিজ্ঞানুসারে আমার এ কন্যাকে আল্লাহ তা'আলার নামে আযাদ করে দিয়েছি। সুতরাং আপনারা তার রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করুন। এটা তো স্পষ্ট যে, সে একটি মেয়ে এবং ঋতুবর্তী মেয়েদের মসজিদে প্রবেশ যে নিষিদ্ধ এটাও কারও অজানা নেই। সুতরাং এর যা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় তা আপনারাই করুন। আমি কিন্তু একে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি না।' হযরত ইমরান (আঃ) তথাকার নামাযের ইমাম ও কুরবানীর পরিচালক ছিলেন। আর হযরত মারইয়াম (আঃ) ছিলেন তারই কন্যা। কাজেই সবাই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণের জন্যে আগ্রহী ছিলেন। এ দিকে হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর অগ্রাধিকার প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন‘এর সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, আমি তার খালু। সুতরাং মেয়েটিকে আমারই পাওয়া উচিত। কিন্তু অন্যেরা তাতে সম্মত না হওয়ায় অবশেষে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হয় এবং তাতে তাঁরা ঐসব লেখনী নিক্ষেপ করেন যেগুলো দিয়ে তাওরাত লিখতেন। এতে হযরত যাকারিয়ারই (আঃ) নাম উঠে। কাজেই তিনি ঐ সৌভাগ্যের অধিকারী হন। অন্য বিস্তারিত বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তারা জর্দান নদীতে গিয়ে তাদের কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করেন। কথা হয় যে, স্রোতের মুখে যাদের কলম চলতে থাকবে তারা নয় বরং যার কলম স্থির থাকবে সেই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করলে সবারই কলম চলতে থাকে, শুধুমাত্র হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর কলম স্থির থাকে। বরং ওটা স্রোতের বিপরীত দিকে চলতে থাকে। কাজেই একে তো গুটিকায় তার নাম উঠেছিল, দ্বিতীয়তঃ তিনি তাঁর আত্মীয় ছিলেন। তাছাড়া তিনি সবারই নেতা, ইমাম, আলেম এবং সর্বোপরি নবী ছিলেন। অতএব তাঁরই উপরে হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়।
আলে ইমরান 3:43
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে তার অত্যাধিক ইবাদত, দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য ভাব, ভদ্রতা এবং শয়তানী কুধারণা হতে দূরে থাকার কারণে স্বীয় নৈকট্য লাভের যে মর্যদা দান করেছেন এবং সারা জগতের নারীদের উপর যে মনোনীত করেছেন তারই সুসংবাদ দিচ্ছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো নারী উষ্ট্রে আরোহণ করেছে তাদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে কুরাইশদের ঐ স্ত্রীলোকগুলো যারা নিজেদের শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ প্রদর্শন করে এবং স্বামীদের দ্রব্যাদির পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ) কখনও উষ্ট্রে আরোহণ করেননি। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ)। জামেউত তিরমিযীর বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সারা জগতের নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ), খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ), ফাতিমা (রাঃ) বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) তোমার জন্য যথেষ্ট। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, এ চারজন নারী সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে উত্তম। আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘পুরুষদের মধ্যে বহু পূর্ণাঙ্গ পুরুষ রয়েছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তা নারী মাত্র তিনজন। তারা হচ্ছেন- হযরত ইমরানের কন্যা হযরত মারইয়াম (আঃ), ফিরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আঃ) এবং খুয়াইলিদের কন্যা হযরত খাদীজা (রাঃ)। আর হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত নারীদের উপর এরূপ যেরূপ সারীদের (গোশতের ঝোলে ভিজান রুটির) ফযীলত সমস্ত আহার্যের উপর।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবু দাউদ ছাড়া অন্যান্য সব হাদীসেই রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের এ হাদীসে হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই। আমি এ হাদীসের সমস্ত সনদ এবং প্রত্যেক সনদের শব্দগুলো স্বীয় কিতাবুল বিদায়া ওয়ান্নিহায়াহ’-এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় জমা করেছি।ফেরেশতাগণ বলেন, “হে মারইয়াম! আপনি আপনার সময় বিনয় প্রকাশ এবং রুকু ও সিজদায় কাটিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় ক্ষমতার এক বিরাট নিদর্শন বানাতে চান। সুতরাং মহান আল্লাহর দিকে আপনার পূর্ণ মনঃসংযোগ করা উচিত। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে আনুগত্য প্রকাশ করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই অধিকারে রয়েছে এবং প্রত্যেকেই তাঁর অনুগত।' (৩০:২৬) মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দটি রয়েছে তারই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য স্বীকার।' ইবনে জারীরও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কিন্তু ওর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) নামাযে এত অধিকক্ষণ দাড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর জানুদ্বয় ফোলে যেতো। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযে এভাবেই লম্বা লম্বা রুকূ' করা।' হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার প্রভুর ইবাদতে লিপ্ত থাক এবং যারা রুকু ও সিজদা করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' হযরত আওযায়ী (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) স্বীয় ইবাদত কক্ষে এত বেশী পরিমাণে ও এত বিনয়ের সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয়ে হলদে পানি নেতে আসতো।এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বর্ণনা করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! এসব ঘটনা তুমি জানতে না। আমি তোমাকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম। আমি তোমাকে না জানালে তুমি জনগণের নিকট এসব ঘটনা কি করে পৌছাতে? কারণ, যখন এসব ঘটনা সংঘটিত হয় তখন তুমি তো তথায় উপস্থিত ছিলে না। কিন্তু আমি ঐগুলো তোমাকে এমনভাবে জানিয়ে দিলাম যে, যেন তুমি স্বয়ং তথায় ছিলে’। যখন হযরত মারইয়ামের লালন-পালনের ব্যাপার নিয়ে একে অপরের উপর অগ্রাধিকার লাভের চেষ্টা করছিল, সবাই ঐ পুণ্য লাভের আকাংখী ছিল, সে সময় তার মা তাঁকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মসজিদে উপস্থিত হন। সে সময় তথাকার সেবক ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর ভাই হযরত হারূনের (আঃ) বংশের লোকগণ। হ্যরত মারইয়াম (আঃ)-এর মা তাদেরকে বলেনঃ “আমি আমার প্রতিজ্ঞানুসারে আমার এ কন্যাকে আল্লাহ তা'আলার নামে আযাদ করে দিয়েছি। সুতরাং আপনারা তার রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করুন। এটা তো স্পষ্ট যে, সে একটি মেয়ে এবং ঋতুবর্তী মেয়েদের মসজিদে প্রবেশ যে নিষিদ্ধ এটাও কারও অজানা নেই। সুতরাং এর যা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় তা আপনারাই করুন। আমি কিন্তু একে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি না।' হযরত ইমরান (আঃ) তথাকার নামাযের ইমাম ও কুরবানীর পরিচালক ছিলেন। আর হযরত মারইয়াম (আঃ) ছিলেন তারই কন্যা। কাজেই সবাই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণের জন্যে আগ্রহী ছিলেন। এ দিকে হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর অগ্রাধিকার প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন‘এর সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, আমি তার খালু। সুতরাং মেয়েটিকে আমারই পাওয়া উচিত। কিন্তু অন্যেরা তাতে সম্মত না হওয়ায় অবশেষে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হয় এবং তাতে তাঁরা ঐসব লেখনী নিক্ষেপ করেন যেগুলো দিয়ে তাওরাত লিখতেন। এতে হযরত যাকারিয়ারই (আঃ) নাম উঠে। কাজেই তিনি ঐ সৌভাগ্যের অধিকারী হন। অন্য বিস্তারিত বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তারা জর্দান নদীতে গিয়ে তাদের কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করেন। কথা হয় যে, স্রোতের মুখে যাদের কলম চলতে থাকবে তারা নয় বরং যার কলম স্থির থাকবে সেই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করলে সবারই কলম চলতে থাকে, শুধুমাত্র হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর কলম স্থির থাকে। বরং ওটা স্রোতের বিপরীত দিকে চলতে থাকে। কাজেই একে তো গুটিকায় তার নাম উঠেছিল, দ্বিতীয়তঃ তিনি তাঁর আত্মীয় ছিলেন। তাছাড়া তিনি সবারই নেতা, ইমাম, আলেম এবং সর্বোপরি নবী ছিলেন। অতএব তাঁরই উপরে হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়।
আলে ইমরান 3:44
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে তার অত্যাধিক ইবাদত, দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য ভাব, ভদ্রতা এবং শয়তানী কুধারণা হতে দূরে থাকার কারণে স্বীয় নৈকট্য লাভের যে মর্যদা দান করেছেন এবং সারা জগতের নারীদের উপর যে মনোনীত করেছেন তারই সুসংবাদ দিচ্ছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো নারী উষ্ট্রে আরোহণ করেছে তাদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে কুরাইশদের ঐ স্ত্রীলোকগুলো যারা নিজেদের শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ প্রদর্শন করে এবং স্বামীদের দ্রব্যাদির পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ) কখনও উষ্ট্রে আরোহণ করেননি। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং স্ত্রীলোকদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে হযরত খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ)। জামেউত তিরমিযীর বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সারা জগতের নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান (আঃ), খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ), ফাতিমা (রাঃ) বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) তোমার জন্য যথেষ্ট। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, এ চারজন নারী সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে উত্তম। আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘পুরুষদের মধ্যে বহু পূর্ণাঙ্গ পুরুষ রয়েছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তা নারী মাত্র তিনজন। তারা হচ্ছেন- হযরত ইমরানের কন্যা হযরত মারইয়াম (আঃ), ফিরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আঃ) এবং খুয়াইলিদের কন্যা হযরত খাদীজা (রাঃ)। আর হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত নারীদের উপর এরূপ যেরূপ সারীদের (গোশতের ঝোলে ভিজান রুটির) ফযীলত সমস্ত আহার্যের উপর।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবু দাউদ ছাড়া অন্যান্য সব হাদীসেই রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের এ হাদীসে হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই। আমি এ হাদীসের সমস্ত সনদ এবং প্রত্যেক সনদের শব্দগুলো স্বীয় কিতাবুল বিদায়া ওয়ান্নিহায়াহ’-এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় জমা করেছি।ফেরেশতাগণ বলেন, “হে মারইয়াম! আপনি আপনার সময় বিনয় প্রকাশ এবং রুকু ও সিজদায় কাটিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় ক্ষমতার এক বিরাট নিদর্শন বানাতে চান। সুতরাং মহান আল্লাহর দিকে আপনার পূর্ণ মনঃসংযোগ করা উচিত। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে আনুগত্য প্রকাশ করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই অধিকারে রয়েছে এবং প্রত্যেকেই তাঁর অনুগত।' (৩০:২৬) মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দটি রয়েছে তারই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য স্বীকার।' ইবনে জারীরও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কিন্তু ওর সনদে দুর্বলতা রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) নামাযে এত অধিকক্ষণ দাড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর জানুদ্বয় ফোলে যেতো। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযে এভাবেই লম্বা লম্বা রুকূ' করা।' হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার প্রভুর ইবাদতে লিপ্ত থাক এবং যারা রুকু ও সিজদা করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' হযরত আওযায়ী (রঃ) বলেন, হযরত মারইয়াম (আঃ) স্বীয় ইবাদত কক্ষে এত বেশী পরিমাণে ও এত বিনয়ের সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয়ে হলদে পানি নেতে আসতো।এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বর্ণনা করতঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! এসব ঘটনা তুমি জানতে না। আমি তোমাকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম। আমি তোমাকে না জানালে তুমি জনগণের নিকট এসব ঘটনা কি করে পৌছাতে? কারণ, যখন এসব ঘটনা সংঘটিত হয় তখন তুমি তো তথায় উপস্থিত ছিলে না। কিন্তু আমি ঐগুলো তোমাকে এমনভাবে জানিয়ে দিলাম যে, যেন তুমি স্বয়ং তথায় ছিলে’। যখন হযরত মারইয়ামের লালন-পালনের ব্যাপার নিয়ে একে অপরের উপর অগ্রাধিকার লাভের চেষ্টা করছিল, সবাই ঐ পুণ্য লাভের আকাংখী ছিল, সে সময় তার মা তাঁকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মসজিদে উপস্থিত হন। সে সময় তথাকার সেবক ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর ভাই হযরত হারূনের (আঃ) বংশের লোকগণ। হ্যরত মারইয়াম (আঃ)-এর মা তাদেরকে বলেনঃ “আমি আমার প্রতিজ্ঞানুসারে আমার এ কন্যাকে আল্লাহ তা'আলার নামে আযাদ করে দিয়েছি। সুতরাং আপনারা তার রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করুন। এটা তো স্পষ্ট যে, সে একটি মেয়ে এবং ঋতুবর্তী মেয়েদের মসজিদে প্রবেশ যে নিষিদ্ধ এটাও কারও অজানা নেই। সুতরাং এর যা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় তা আপনারাই করুন। আমি কিন্তু একে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি না।' হযরত ইমরান (আঃ) তথাকার নামাযের ইমাম ও কুরবানীর পরিচালক ছিলেন। আর হযরত মারইয়াম (আঃ) ছিলেন তারই কন্যা। কাজেই সবাই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণের জন্যে আগ্রহী ছিলেন। এ দিকে হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর অগ্রাধিকার প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন‘এর সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, আমি তার খালু। সুতরাং মেয়েটিকে আমারই পাওয়া উচিত। কিন্তু অন্যেরা তাতে সম্মত না হওয়ায় অবশেষে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হয় এবং তাতে তাঁরা ঐসব লেখনী নিক্ষেপ করেন যেগুলো দিয়ে তাওরাত লিখতেন। এতে হযরত যাকারিয়ারই (আঃ) নাম উঠে। কাজেই তিনি ঐ সৌভাগ্যের অধিকারী হন। অন্য বিস্তারিত বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তারা জর্দান নদীতে গিয়ে তাদের কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করেন। কথা হয় যে, স্রোতের মুখে যাদের কলম চলতে থাকবে তারা নয় বরং যার কলম স্থির থাকবে সেই তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা কলমগুলো পানিতে নিক্ষেপ করলে সবারই কলম চলতে থাকে, শুধুমাত্র হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর কলম স্থির থাকে। বরং ওটা স্রোতের বিপরীত দিকে চলতে থাকে। কাজেই একে তো গুটিকায় তার নাম উঠেছিল, দ্বিতীয়তঃ তিনি তাঁর আত্মীয় ছিলেন। তাছাড়া তিনি সবারই নেতা, ইমাম, আলেম এবং সর্বোপরি নবী ছিলেন। অতএব তাঁরই উপরে হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়।
আলে ইমরান 3:45
ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে এ সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তাঁর একটি বড় খ্যাতিসম্পন্ন পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি শুধু আল্লাহ তাআলার অর্থাৎ 'হও' শব্দ দ্বারা সৃষ্ট হবেন (আরবী) এবং (৩:৩৯)-এর তাফসীর এটাই, যেমন জমহুর বর্ণনা করেছেন, যার বর্ণনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে।তার নাম হবে মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ (আঃ)। প্রত্যেক মুমিন তাকে এ নামেই চিনবে। তার নাম মাসীহ হওয়ার কারণ এই যে, তিনি খুব বেশী পৃথিবীতে ভ্রমণ করবেন। মায়ের দিকে সম্বন্ধ করার কারণ এই যে, তাঁর কোন পিতা ছিল না। ইহকালে ও পরকালে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট মহা সম্মানিত ও তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্তর্ভুক্ত। তার উপর আল্লাহ তা'আলার শরীয়ত ও কিতাব অবতীর্ণ হবে। দুনিয়ায় তার উপর বড় বড় অনুগ্রহ বর্ষিত হবে এবং পরকালেও তিনি স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের মত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ও তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সুপারিশ করবেন এবং সেই সুপারিশও গৃহীত হবে।তিনি স্বীয় দোলনায় ও প্রৌঢ় বয়সে লোকদের সাথে কথা বলবেন। অর্থাৎ তিনি শৈশবকালেই লোকদেরকে একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করবেন যা তার একটি অলৌকিক ঘটনারূপে গণ্য হবে। আর পরিণত বয়সেও যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট অহী করবেন তখন তিনি স্বীয় কথায় ও কাজে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হবেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হবেন। একটি হাদীসে রয়েছে যে, শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত জুরায়েজের সঙ্গী। অন্য একটি হাদীসে অন্য একটি শিশুর কথা বলাও বর্ণিত আছে। তাহলে মাত্র এ তিনজন মানব শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) এ সুসংবাদ শুনে স্বীয় প্রার্থনার মধ্যেই বলেন, “হে আমার প্রভু! আমার সন্তান কিরূপে হতে পারে? আমি তো বিয়ে করিনি এবং আমার বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই। তাছাড়া আমি দুশ্চরিত্রা মেয়েও নই'। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতাগণ উত্তর দেন যে, আল্লাহ পাকের নির্দেশই খুব বড় জিনিস। কোন কাজেই তিনি অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই চান সৃষ্টি করে থাকেন। এ সূক্ষ্মতার বিষয় চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে (আরবী) শব্দ ছিল, আর এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি করেন। এর কারণ হচ্ছে এই যে, যেন বাতিলপন্থীদের কোন সন্দেহ করার সুযোগ না থাকে এবং পরিষ্কার ভাষায় বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট। অতঃপর ওর উপর আরও গুরুতু আরোপ করতঃ বলেন, তিনি যে কোন কাজ যখনই করার ইচ্ছে করেন তখন শুধুমাত্র বলেন, হও আর তেমনই হয়ে যায়। তাঁর নির্দেশের পর কার্য সংঘটিত হতে এক মুহূর্তও বিলম্ব হয় না। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমার একবার নির্দেশমাত্রই অবিলম্বে চোখের পলকে ঐ কাজ হয়ে যায়, আমার দ্বিতীয়বার বলার প্রয়োজন হয় না।' (৫৪:৫০)
আলে ইমরান 3:46
ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে এ সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তাঁর একটি বড় খ্যাতিসম্পন্ন পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি শুধু আল্লাহ তাআলার অর্থাৎ 'হও' শব্দ দ্বারা সৃষ্ট হবেন (আরবী) এবং (৩:৩৯)-এর তাফসীর এটাই, যেমন জমহুর বর্ণনা করেছেন, যার বর্ণনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে।তার নাম হবে মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ (আঃ)। প্রত্যেক মুমিন তাকে এ নামেই চিনবে। তার নাম মাসীহ হওয়ার কারণ এই যে, তিনি খুব বেশী পৃথিবীতে ভ্রমণ করবেন। মায়ের দিকে সম্বন্ধ করার কারণ এই যে, তাঁর কোন পিতা ছিল না। ইহকালে ও পরকালে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট মহা সম্মানিত ও তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্তর্ভুক্ত। তার উপর আল্লাহ তা'আলার শরীয়ত ও কিতাব অবতীর্ণ হবে। দুনিয়ায় তার উপর বড় বড় অনুগ্রহ বর্ষিত হবে এবং পরকালেও তিনি স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের মত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ও তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সুপারিশ করবেন এবং সেই সুপারিশও গৃহীত হবে।তিনি স্বীয় দোলনায় ও প্রৌঢ় বয়সে লোকদের সাথে কথা বলবেন। অর্থাৎ তিনি শৈশবকালেই লোকদেরকে একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করবেন যা তার একটি অলৌকিক ঘটনারূপে গণ্য হবে। আর পরিণত বয়সেও যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট অহী করবেন তখন তিনি স্বীয় কথায় ও কাজে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হবেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হবেন। একটি হাদীসে রয়েছে যে, শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত জুরায়েজের সঙ্গী। অন্য একটি হাদীসে অন্য একটি শিশুর কথা বলাও বর্ণিত আছে। তাহলে মাত্র এ তিনজন মানব শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) এ সুসংবাদ শুনে স্বীয় প্রার্থনার মধ্যেই বলেন, “হে আমার প্রভু! আমার সন্তান কিরূপে হতে পারে? আমি তো বিয়ে করিনি এবং আমার বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই। তাছাড়া আমি দুশ্চরিত্রা মেয়েও নই'। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতাগণ উত্তর দেন যে, আল্লাহ পাকের নির্দেশই খুব বড় জিনিস। কোন কাজেই তিনি অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই চান সৃষ্টি করে থাকেন। এ সূক্ষ্মতার বিষয় চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে (আরবী) শব্দ ছিল, আর এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি করেন। এর কারণ হচ্ছে এই যে, যেন বাতিলপন্থীদের কোন সন্দেহ করার সুযোগ না থাকে এবং পরিষ্কার ভাষায় বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট। অতঃপর ওর উপর আরও গুরুতু আরোপ করতঃ বলেন, তিনি যে কোন কাজ যখনই করার ইচ্ছে করেন তখন শুধুমাত্র বলেন, হও আর তেমনই হয়ে যায়। তাঁর নির্দেশের পর কার্য সংঘটিত হতে এক মুহূর্তও বিলম্ব হয় না। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমার একবার নির্দেশমাত্রই অবিলম্বে চোখের পলকে ঐ কাজ হয়ে যায়, আমার দ্বিতীয়বার বলার প্রয়োজন হয় না।' (৫৪:৫০)
আলে ইমরান 3:47
ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে এ সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তাঁর একটি বড় খ্যাতিসম্পন্ন পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি শুধু আল্লাহ তাআলার অর্থাৎ 'হও' শব্দ দ্বারা সৃষ্ট হবেন (আরবী) এবং (৩:৩৯)-এর তাফসীর এটাই, যেমন জমহুর বর্ণনা করেছেন, যার বর্ণনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে।তার নাম হবে মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ (আঃ)। প্রত্যেক মুমিন তাকে এ নামেই চিনবে। তার নাম মাসীহ হওয়ার কারণ এই যে, তিনি খুব বেশী পৃথিবীতে ভ্রমণ করবেন। মায়ের দিকে সম্বন্ধ করার কারণ এই যে, তাঁর কোন পিতা ছিল না। ইহকালে ও পরকালে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট মহা সম্মানিত ও তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্তর্ভুক্ত। তার উপর আল্লাহ তা'আলার শরীয়ত ও কিতাব অবতীর্ণ হবে। দুনিয়ায় তার উপর বড় বড় অনুগ্রহ বর্ষিত হবে এবং পরকালেও তিনি স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের মত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ও তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সুপারিশ করবেন এবং সেই সুপারিশও গৃহীত হবে।তিনি স্বীয় দোলনায় ও প্রৌঢ় বয়সে লোকদের সাথে কথা বলবেন। অর্থাৎ তিনি শৈশবকালেই লোকদেরকে একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করবেন যা তার একটি অলৌকিক ঘটনারূপে গণ্য হবে। আর পরিণত বয়সেও যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট অহী করবেন তখন তিনি স্বীয় কথায় ও কাজে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হবেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হবেন। একটি হাদীসে রয়েছে যে, শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত জুরায়েজের সঙ্গী। অন্য একটি হাদীসে অন্য একটি শিশুর কথা বলাও বর্ণিত আছে। তাহলে মাত্র এ তিনজন মানব শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) এ সুসংবাদ শুনে স্বীয় প্রার্থনার মধ্যেই বলেন, “হে আমার প্রভু! আমার সন্তান কিরূপে হতে পারে? আমি তো বিয়ে করিনি এবং আমার বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই। তাছাড়া আমি দুশ্চরিত্রা মেয়েও নই'। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতাগণ উত্তর দেন যে, আল্লাহ পাকের নির্দেশই খুব বড় জিনিস। কোন কাজেই তিনি অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই চান সৃষ্টি করে থাকেন। এ সূক্ষ্মতার বিষয় চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে (আরবী) শব্দ ছিল, আর এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি করেন। এর কারণ হচ্ছে এই যে, যেন বাতিলপন্থীদের কোন সন্দেহ করার সুযোগ না থাকে এবং পরিষ্কার ভাষায় বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট। অতঃপর ওর উপর আরও গুরুতু আরোপ করতঃ বলেন, তিনি যে কোন কাজ যখনই করার ইচ্ছে করেন তখন শুধুমাত্র বলেন, হও আর তেমনই হয়ে যায়। তাঁর নির্দেশের পর কার্য সংঘটিত হতে এক মুহূর্তও বিলম্ব হয় না। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমার একবার নির্দেশমাত্রই অবিলম্বে চোখের পলকে ঐ কাজ হয়ে যায়, আমার দ্বিতীয়বার বলার প্রয়োজন হয় না।' (৫৪:৫০)
আলে ইমরান 3:48
৪৮-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: ফেরেশতারা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলেনঃ “আপনার ছেলেকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন। (আরবী) শব্দের তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। আর আল্লাহ পাক তাকে তাওরাত শিক্ষা দেবেন যা হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁকে ইঞ্জীল শিক্ষা দেবেন যা তাঁর নিজের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ দু'টো কিতাব হযরত ঈসা (আঃ)-এর মুখস্থ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে বানী ইসরাঈলের নিকট নবী করে পাঠাবেন, যেন তিনি তাদেরকে স্বীয় অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন যে, তিনি মাটি দিয়ে পাখীর আকৃতি গঠন করেন। অতঃপর ওর মধ্যে ফুকার দেন, আর তেমনই ওটা বাস্তব পাখী হয়ে তাদের সামনে উড়তে থাকে। এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমেই হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজস্ব কোন ক্ষমতা ছিল না। বরং এটা তার জন্যে একটা মু'জিযা ছিল। (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে দিনে দেখতে পায় কিন্তু রাত্রে দেখতে পায় না। কেউ কেউ বলেন যে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট লোককে বলা হয়। কারো কারো উক্তি এও রয়েছে যে, (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে মায়ের গর্ভ হতেই অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এখানে এ অনুবাদই যথোপযুক্ত হবে। কেননা, এর দ্বারাই অলৌকিকতার পূর্ণতা প্রকাশ পায় এবং বিরুদ্ধবাদীকে অসমর্থ করার জন্যে এটাই উত্তম পন্থা। (আরবী) শ্বেত কুষ্ঠকে বলা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ঈসা (আঃ) এ রোগগ্রস্থ ব্যক্তিকেও নিরাময় করে দিতেন। আল্লাহ পাকের হুকুমে তিনি মৃতকেও জীবিত করতেন। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগের নবীকে যুগোপযোগী বিশেষ বিশেষ মু'জিযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুর খুব প্রচলন ছিল এবং যাদুকরদেরকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যে, যাদুকরগণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে এবং তাদের পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে, এটা কখনও যাদু হতে পারে না, বরং এটা মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর একটা বড় দান। অতএব তারা অবনত মস্তকে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হয়। হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগটা ছিল চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিকদের যুগ। তথায় তখন বড় বড় বৈজ্ঞানিক এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক বিদ্যমান ছিল। সুতরাং মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যার সামনে ঐ বড় বড় চিকিৎসকগণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। জন্মান্ধকে চক্ষু দান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করা ও নির্জীব পদার্থের মধ্যে প্রাণ দেয়া এবং সমাধিস্থ ব্যক্তিকে জীবিত করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তির রয়েছে? একমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে মু'জিযা রূপে তার দ্বারা এ সমুদয় কার্য সাধিত হয়। অনুরূপভাবে যে যুগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে সেটা ছিল সাহিত্য, কবিতা ও বাকপটতার যুগ। এসব বিষয়ে খ্যাতনামা কবিগণ এমন পূর্ণতা অর্জন করেছিল যে, সারা দুনিয়া তাদের সামনে মাথা হেঁট করেছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমন এক গ্রন্থ দান করলেন যার ঔজ্জ্বল্যের সামনে তাদের সমস্ত দীপ্তি ম্লান হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস জন্মে যে, এটা মানুষের কথা নয়। সারা বিশ্বের সামনে জোরে শশারে বারবার ঘোষণা করা হয়-এরূপ কথা বলতে পারে এমন কেউ আছে কি? একা একা নয় বরং তোমরা সবাই মিলিত হয়ে যাও, শুধু মানব নয় বরং দানবদেরকেও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও, অতঃপর পুরো কুরআনের সমান নয়, শুধুমাত্র ওর মত দশটি সূরা আনয়ন কর। আচ্ছা এও যদি সম্ভব না হয় তবে ওর মত একটি সূরাই নিয়ে এসো। কিন্তু তাদের কোমর ভেঙ্গে পড়ে, সাহস হারিয়ে যায়, কণ্ঠরোধ হয়ে যায়, বাকশক্তি লোপ পায় এবং আজ পর্যন্ত সারা বিশ্ব এ কাজে অসমর্থই রয়েছে, আর কিয়ামত পর্যন্ত অসমর্থ থেকেও যাবে। কোথায় আল্লাহ পাকের কালাম এবং কোথায় মানব ও দানবের কথা? সুতরাং এ যুগ হিসেবে এ মু'জিযা ক্রিয়াশীল হয় এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতেই হয়। তারা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় ।অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর আরও মু'জিয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তিনি বলেছিলেন এবং করেও দেখিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ বাড়ীতে যা কিছু খেয়ে এসেছে এবং আগামীকালের জন্যে সে যা কিছু জমা করে রেখেছে, আল্লাহর হুকুমে আমি তা বলে দিতে পারবো। এতে আমার সত্যবাদীতার দলীল রয়েছে, আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি তা চরম সত্য। তবে তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানই না থাকে তবে আর কি হবে? আমি আমার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে স্বীকার করছি এবং দুনিয়ায় ওর সত্যতার কথা ঘোষণা করছি। আমি তোমাদের জন্য এমন কতগুলো জিনিস বৈধ করতে এসেছি যেগুলো আমার পর্বে তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কতগুলো বিধান রহিত করেছেন। কয়েকজন তাফসীরকারের ধারণা এর বিপরীত হলেও এটাই সঠিক কথা। কোন কোন মনীষী বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কোন বিধান রহিত করেননি। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে, কতগুলো বৈধ জিনিসে যে মতভেদ ছিল এবং তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবৈধতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, হযরত ঈসা (আঃ) ঐগুলোর যথার্থতা বর্ণনা করতঃ ঐগুলোর বৈধতার উপর শীল (মোহর) মেরে দেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যে ব্যাপারে পরস্পর মতভেদ করছো আমি তোমাদের জন্যে তার মীমাংসা করে দেবো।'(৪৩:৬৩)অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমার নিকট আমার সত্যবাদিতার উপর আল্লাহ প্রদত্ত প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর, আমার কথা মান্য কর এবং জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। আর এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ।
আলে ইমরান 3:49
৪৮-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: ফেরেশতারা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলেনঃ “আপনার ছেলেকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন। (আরবী) শব্দের তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। আর আল্লাহ পাক তাকে তাওরাত শিক্ষা দেবেন যা হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁকে ইঞ্জীল শিক্ষা দেবেন যা তাঁর নিজের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ দু'টো কিতাব হযরত ঈসা (আঃ)-এর মুখস্থ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে বানী ইসরাঈলের নিকট নবী করে পাঠাবেন, যেন তিনি তাদেরকে স্বীয় অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন যে, তিনি মাটি দিয়ে পাখীর আকৃতি গঠন করেন। অতঃপর ওর মধ্যে ফুকার দেন, আর তেমনই ওটা বাস্তব পাখী হয়ে তাদের সামনে উড়তে থাকে। এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমেই হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজস্ব কোন ক্ষমতা ছিল না। বরং এটা তার জন্যে একটা মু'জিযা ছিল। (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে দিনে দেখতে পায় কিন্তু রাত্রে দেখতে পায় না। কেউ কেউ বলেন যে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট লোককে বলা হয়। কারো কারো উক্তি এও রয়েছে যে, (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে মায়ের গর্ভ হতেই অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এখানে এ অনুবাদই যথোপযুক্ত হবে। কেননা, এর দ্বারাই অলৌকিকতার পূর্ণতা প্রকাশ পায় এবং বিরুদ্ধবাদীকে অসমর্থ করার জন্যে এটাই উত্তম পন্থা। (আরবী) শ্বেত কুষ্ঠকে বলা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ঈসা (আঃ) এ রোগগ্রস্থ ব্যক্তিকেও নিরাময় করে দিতেন। আল্লাহ পাকের হুকুমে তিনি মৃতকেও জীবিত করতেন। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগের নবীকে যুগোপযোগী বিশেষ বিশেষ মু'জিযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুর খুব প্রচলন ছিল এবং যাদুকরদেরকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যে, যাদুকরগণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে এবং তাদের পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে, এটা কখনও যাদু হতে পারে না, বরং এটা মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর একটা বড় দান। অতএব তারা অবনত মস্তকে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হয়। হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগটা ছিল চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিকদের যুগ। তথায় তখন বড় বড় বৈজ্ঞানিক এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক বিদ্যমান ছিল। সুতরাং মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যার সামনে ঐ বড় বড় চিকিৎসকগণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। জন্মান্ধকে চক্ষু দান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করা ও নির্জীব পদার্থের মধ্যে প্রাণ দেয়া এবং সমাধিস্থ ব্যক্তিকে জীবিত করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তির রয়েছে? একমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে মু'জিযা রূপে তার দ্বারা এ সমুদয় কার্য সাধিত হয়। অনুরূপভাবে যে যুগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে সেটা ছিল সাহিত্য, কবিতা ও বাকপটতার যুগ। এসব বিষয়ে খ্যাতনামা কবিগণ এমন পূর্ণতা অর্জন করেছিল যে, সারা দুনিয়া তাদের সামনে মাথা হেঁট করেছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমন এক গ্রন্থ দান করলেন যার ঔজ্জ্বল্যের সামনে তাদের সমস্ত দীপ্তি ম্লান হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস জন্মে যে, এটা মানুষের কথা নয়। সারা বিশ্বের সামনে জোরে শশারে বারবার ঘোষণা করা হয়-এরূপ কথা বলতে পারে এমন কেউ আছে কি? একা একা নয় বরং তোমরা সবাই মিলিত হয়ে যাও, শুধু মানব নয় বরং দানবদেরকেও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও, অতঃপর পুরো কুরআনের সমান নয়, শুধুমাত্র ওর মত দশটি সূরা আনয়ন কর। আচ্ছা এও যদি সম্ভব না হয় তবে ওর মত একটি সূরাই নিয়ে এসো। কিন্তু তাদের কোমর ভেঙ্গে পড়ে, সাহস হারিয়ে যায়, কণ্ঠরোধ হয়ে যায়, বাকশক্তি লোপ পায় এবং আজ পর্যন্ত সারা বিশ্ব এ কাজে অসমর্থই রয়েছে, আর কিয়ামত পর্যন্ত অসমর্থ থেকেও যাবে। কোথায় আল্লাহ পাকের কালাম এবং কোথায় মানব ও দানবের কথা? সুতরাং এ যুগ হিসেবে এ মু'জিযা ক্রিয়াশীল হয় এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতেই হয়। তারা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় ।অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর আরও মু'জিয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তিনি বলেছিলেন এবং করেও দেখিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ বাড়ীতে যা কিছু খেয়ে এসেছে এবং আগামীকালের জন্যে সে যা কিছু জমা করে রেখেছে, আল্লাহর হুকুমে আমি তা বলে দিতে পারবো। এতে আমার সত্যবাদীতার দলীল রয়েছে, আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি তা চরম সত্য। তবে তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানই না থাকে তবে আর কি হবে? আমি আমার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে স্বীকার করছি এবং দুনিয়ায় ওর সত্যতার কথা ঘোষণা করছি। আমি তোমাদের জন্য এমন কতগুলো জিনিস বৈধ করতে এসেছি যেগুলো আমার পর্বে তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কতগুলো বিধান রহিত করেছেন। কয়েকজন তাফসীরকারের ধারণা এর বিপরীত হলেও এটাই সঠিক কথা। কোন কোন মনীষী বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কোন বিধান রহিত করেননি। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে, কতগুলো বৈধ জিনিসে যে মতভেদ ছিল এবং তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবৈধতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, হযরত ঈসা (আঃ) ঐগুলোর যথার্থতা বর্ণনা করতঃ ঐগুলোর বৈধতার উপর শীল (মোহর) মেরে দেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যে ব্যাপারে পরস্পর মতভেদ করছো আমি তোমাদের জন্যে তার মীমাংসা করে দেবো।'(৪৩:৬৩)অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমার নিকট আমার সত্যবাদিতার উপর আল্লাহ প্রদত্ত প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর, আমার কথা মান্য কর এবং জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। আর এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ।
আলে ইমরান 3:50
৪৮-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: ফেরেশতারা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলেনঃ “আপনার ছেলেকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন। (আরবী) শব্দের তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। আর আল্লাহ পাক তাকে তাওরাত শিক্ষা দেবেন যা হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁকে ইঞ্জীল শিক্ষা দেবেন যা তাঁর নিজের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ দু'টো কিতাব হযরত ঈসা (আঃ)-এর মুখস্থ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে বানী ইসরাঈলের নিকট নবী করে পাঠাবেন, যেন তিনি তাদেরকে স্বীয় অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন যে, তিনি মাটি দিয়ে পাখীর আকৃতি গঠন করেন। অতঃপর ওর মধ্যে ফুকার দেন, আর তেমনই ওটা বাস্তব পাখী হয়ে তাদের সামনে উড়তে থাকে। এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমেই হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজস্ব কোন ক্ষমতা ছিল না। বরং এটা তার জন্যে একটা মু'জিযা ছিল। (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে দিনে দেখতে পায় কিন্তু রাত্রে দেখতে পায় না। কেউ কেউ বলেন যে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট লোককে বলা হয়। কারো কারো উক্তি এও রয়েছে যে, (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে মায়ের গর্ভ হতেই অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এখানে এ অনুবাদই যথোপযুক্ত হবে। কেননা, এর দ্বারাই অলৌকিকতার পূর্ণতা প্রকাশ পায় এবং বিরুদ্ধবাদীকে অসমর্থ করার জন্যে এটাই উত্তম পন্থা। (আরবী) শ্বেত কুষ্ঠকে বলা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ঈসা (আঃ) এ রোগগ্রস্থ ব্যক্তিকেও নিরাময় করে দিতেন। আল্লাহ পাকের হুকুমে তিনি মৃতকেও জীবিত করতেন। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগের নবীকে যুগোপযোগী বিশেষ বিশেষ মু'জিযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুর খুব প্রচলন ছিল এবং যাদুকরদেরকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যে, যাদুকরগণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে এবং তাদের পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে, এটা কখনও যাদু হতে পারে না, বরং এটা মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর একটা বড় দান। অতএব তারা অবনত মস্তকে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হয়। হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগটা ছিল চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিকদের যুগ। তথায় তখন বড় বড় বৈজ্ঞানিক এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক বিদ্যমান ছিল। সুতরাং মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যার সামনে ঐ বড় বড় চিকিৎসকগণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। জন্মান্ধকে চক্ষু দান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করা ও নির্জীব পদার্থের মধ্যে প্রাণ দেয়া এবং সমাধিস্থ ব্যক্তিকে জীবিত করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তির রয়েছে? একমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে মু'জিযা রূপে তার দ্বারা এ সমুদয় কার্য সাধিত হয়। অনুরূপভাবে যে যুগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে সেটা ছিল সাহিত্য, কবিতা ও বাকপটতার যুগ। এসব বিষয়ে খ্যাতনামা কবিগণ এমন পূর্ণতা অর্জন করেছিল যে, সারা দুনিয়া তাদের সামনে মাথা হেঁট করেছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমন এক গ্রন্থ দান করলেন যার ঔজ্জ্বল্যের সামনে তাদের সমস্ত দীপ্তি ম্লান হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস জন্মে যে, এটা মানুষের কথা নয়। সারা বিশ্বের সামনে জোরে শশারে বারবার ঘোষণা করা হয়-এরূপ কথা বলতে পারে এমন কেউ আছে কি? একা একা নয় বরং তোমরা সবাই মিলিত হয়ে যাও, শুধু মানব নয় বরং দানবদেরকেও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও, অতঃপর পুরো কুরআনের সমান নয়, শুধুমাত্র ওর মত দশটি সূরা আনয়ন কর। আচ্ছা এও যদি সম্ভব না হয় তবে ওর মত একটি সূরাই নিয়ে এসো। কিন্তু তাদের কোমর ভেঙ্গে পড়ে, সাহস হারিয়ে যায়, কণ্ঠরোধ হয়ে যায়, বাকশক্তি লোপ পায় এবং আজ পর্যন্ত সারা বিশ্ব এ কাজে অসমর্থই রয়েছে, আর কিয়ামত পর্যন্ত অসমর্থ থেকেও যাবে। কোথায় আল্লাহ পাকের কালাম এবং কোথায় মানব ও দানবের কথা? সুতরাং এ যুগ হিসেবে এ মু'জিযা ক্রিয়াশীল হয় এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতেই হয়। তারা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় ।অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর আরও মু'জিয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তিনি বলেছিলেন এবং করেও দেখিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ বাড়ীতে যা কিছু খেয়ে এসেছে এবং আগামীকালের জন্যে সে যা কিছু জমা করে রেখেছে, আল্লাহর হুকুমে আমি তা বলে দিতে পারবো। এতে আমার সত্যবাদীতার দলীল রয়েছে, আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি তা চরম সত্য। তবে তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানই না থাকে তবে আর কি হবে? আমি আমার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে স্বীকার করছি এবং দুনিয়ায় ওর সত্যতার কথা ঘোষণা করছি। আমি তোমাদের জন্য এমন কতগুলো জিনিস বৈধ করতে এসেছি যেগুলো আমার পর্বে তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কতগুলো বিধান রহিত করেছেন। কয়েকজন তাফসীরকারের ধারণা এর বিপরীত হলেও এটাই সঠিক কথা। কোন কোন মনীষী বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কোন বিধান রহিত করেননি। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে, কতগুলো বৈধ জিনিসে যে মতভেদ ছিল এবং তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবৈধতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, হযরত ঈসা (আঃ) ঐগুলোর যথার্থতা বর্ণনা করতঃ ঐগুলোর বৈধতার উপর শীল (মোহর) মেরে দেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যে ব্যাপারে পরস্পর মতভেদ করছো আমি তোমাদের জন্যে তার মীমাংসা করে দেবো।'(৪৩:৬৩)অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমার নিকট আমার সত্যবাদিতার উপর আল্লাহ প্রদত্ত প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর, আমার কথা মান্য কর এবং জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। আর এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ।
আলে ইমরান 3:51
৪৮-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: ফেরেশতারা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলেনঃ “আপনার ছেলেকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন। (আরবী) শব্দের তাফসীর সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে। আর আল্লাহ পাক তাকে তাওরাত শিক্ষা দেবেন যা হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁকে ইঞ্জীল শিক্ষা দেবেন যা তাঁর নিজের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ দু'টো কিতাব হযরত ঈসা (আঃ)-এর মুখস্থ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে বানী ইসরাঈলের নিকট নবী করে পাঠাবেন, যেন তিনি তাদেরকে স্বীয় অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন যে, তিনি মাটি দিয়ে পাখীর আকৃতি গঠন করেন। অতঃপর ওর মধ্যে ফুকার দেন, আর তেমনই ওটা বাস্তব পাখী হয়ে তাদের সামনে উড়তে থাকে। এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমেই হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজস্ব কোন ক্ষমতা ছিল না। বরং এটা তার জন্যে একটা মু'জিযা ছিল। (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে দিনে দেখতে পায় কিন্তু রাত্রে দেখতে পায় না। কেউ কেউ বলেন যে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট লোককে বলা হয়। কারো কারো উক্তি এও রয়েছে যে, (আরবী) ঐ অন্ধকে বলা হয় যে মায়ের গর্ভ হতেই অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এখানে এ অনুবাদই যথোপযুক্ত হবে। কেননা, এর দ্বারাই অলৌকিকতার পূর্ণতা প্রকাশ পায় এবং বিরুদ্ধবাদীকে অসমর্থ করার জন্যে এটাই উত্তম পন্থা। (আরবী) শ্বেত কুষ্ঠকে বলা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ঈসা (আঃ) এ রোগগ্রস্থ ব্যক্তিকেও নিরাময় করে দিতেন। আল্লাহ পাকের হুকুমে তিনি মৃতকেও জীবিত করতেন। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগের নবীকে যুগোপযোগী বিশেষ বিশেষ মু'জিযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদুর খুব প্রচলন ছিল এবং যাদুকরদেরকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যে, যাদুকরগণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে এবং তাদের পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে, এটা কখনও যাদু হতে পারে না, বরং এটা মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর একটা বড় দান। অতএব তারা অবনত মস্তকে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হয়। হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগটা ছিল চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিকদের যুগ। তথায় তখন বড় বড় বৈজ্ঞানিক এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক বিদ্যমান ছিল। সুতরাং মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে এমন মু'জিযা দান করেন যার সামনে ঐ বড় বড় চিকিৎসকগণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। জন্মান্ধকে চক্ষু দান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করা ও নির্জীব পদার্থের মধ্যে প্রাণ দেয়া এবং সমাধিস্থ ব্যক্তিকে জীবিত করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তির রয়েছে? একমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে মু'জিযা রূপে তার দ্বারা এ সমুদয় কার্য সাধিত হয়। অনুরূপভাবে যে যুগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে সেটা ছিল সাহিত্য, কবিতা ও বাকপটতার যুগ। এসব বিষয়ে খ্যাতনামা কবিগণ এমন পূর্ণতা অর্জন করেছিল যে, সারা দুনিয়া তাদের সামনে মাথা হেঁট করেছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমন এক গ্রন্থ দান করলেন যার ঔজ্জ্বল্যের সামনে তাদের সমস্ত দীপ্তি ম্লান হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস জন্মে যে, এটা মানুষের কথা নয়। সারা বিশ্বের সামনে জোরে শশারে বারবার ঘোষণা করা হয়-এরূপ কথা বলতে পারে এমন কেউ আছে কি? একা একা নয় বরং তোমরা সবাই মিলিত হয়ে যাও, শুধু মানব নয় বরং দানবদেরকেও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও, অতঃপর পুরো কুরআনের সমান নয়, শুধুমাত্র ওর মত দশটি সূরা আনয়ন কর। আচ্ছা এও যদি সম্ভব না হয় তবে ওর মত একটি সূরাই নিয়ে এসো। কিন্তু তাদের কোমর ভেঙ্গে পড়ে, সাহস হারিয়ে যায়, কণ্ঠরোধ হয়ে যায়, বাকশক্তি লোপ পায় এবং আজ পর্যন্ত সারা বিশ্ব এ কাজে অসমর্থই রয়েছে, আর কিয়ামত পর্যন্ত অসমর্থ থেকেও যাবে। কোথায় আল্লাহ পাকের কালাম এবং কোথায় মানব ও দানবের কথা? সুতরাং এ যুগ হিসেবে এ মু'জিযা ক্রিয়াশীল হয় এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতেই হয়। তারা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় ।অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর আরও মু'জিয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তিনি বলেছিলেন এবং করেও দেখিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ বাড়ীতে যা কিছু খেয়ে এসেছে এবং আগামীকালের জন্যে সে যা কিছু জমা করে রেখেছে, আল্লাহর হুকুমে আমি তা বলে দিতে পারবো। এতে আমার সত্যবাদীতার দলীল রয়েছে, আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি তা চরম সত্য। তবে তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানই না থাকে তবে আর কি হবে? আমি আমার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে স্বীকার করছি এবং দুনিয়ায় ওর সত্যতার কথা ঘোষণা করছি। আমি তোমাদের জন্য এমন কতগুলো জিনিস বৈধ করতে এসেছি যেগুলো আমার পর্বে তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কতগুলো বিধান রহিত করেছেন। কয়েকজন তাফসীরকারের ধারণা এর বিপরীত হলেও এটাই সঠিক কথা। কোন কোন মনীষী বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাওরাতের কোন বিধান রহিত করেননি। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে, কতগুলো বৈধ জিনিসে যে মতভেদ ছিল এবং তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবৈধতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, হযরত ঈসা (আঃ) ঐগুলোর যথার্থতা বর্ণনা করতঃ ঐগুলোর বৈধতার উপর শীল (মোহর) মেরে দেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যে ব্যাপারে পরস্পর মতভেদ করছো আমি তোমাদের জন্যে তার মীমাংসা করে দেবো।'(৪৩:৬৩)অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমার নিকট আমার সত্যবাদিতার উপর আল্লাহ প্রদত্ত প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর, আমার কথা মান্য কর এবং জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। আর এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ।
আলে ইমরান 3:52
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদের একগুয়েমী ও বিবাদ প্রত্যক্ষ করলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, তারা হঠকারিতা হতে ফিরে আসবে না তখন তিনি বললেন, আল্লাহর উপর আমার আনুগত্য স্বীকারকারী কেউ আছে কি? আবার ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, এমন কেউ আছে কি যে আল্লাহর সাথে আমার সাহায্যকারী হতে পারে? কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলার দিকে মানুষকে আহ্বানের কাজে কেউ আমার হাত শক্তকারী আছে কি?' যেমন আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করার পূর্বে হজ্বের মৌসুমে বলেছিলেন, কুরাইশরা তো আমাকে আল্লাহর কালাম প্রচারের কার্যে বাধা দিচ্ছে, এমতাবস্থায় এ কার্যের জন্যে আমাকে জায়গা দিতে পারে এমন কেউ আছে কি?’ মদীনাবাসী আনসারগণ এ সেবার কার্যে এগিয়ে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জায়গা দান করেন। তাঁরা তাঁকে যথেষ্ট সাহায্যও করেন এবং যখন তিনি তাদের নিকট গমন করেন তখন তারা পুরোপুরি তাঁর সহযোগিতা করেন এবং তাঁর প্রতি তুলনাবিহীন সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। দুনিয়ার সাথে মোকাবিলায় তারা নিজেদের বক্ষকে নবী (সঃ)-এর জন্য ঢাল করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিফাযতে, মঙ্গল কামনায় ও তার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার কাজে তাদের আপাদমস্তক নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। অনুরূপভাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর এ আহ্বানেও কতক বানী ইসরাঈল সাড়া দেয়, তার উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে পূর্ণভাবে সাহায্য করে। আর তারা ঐ আলোকের অনুসরণ করে যা আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন, অর্থাৎ ইঞ্জীল। এ লোকগুলো ধোপা ছিল এবং তাদের সাদা কাপড়ের কারণেই তাদেরকে হাওয়ারী' বলা হতো। কেউ কেউ বলেন যে, তারা শিকারী ছিল। তবে সঠিক কথা এই যে, সাহায্যকারীকে ‘হাওয়ারী' বলা হয়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমার জন্যে স্বীয় বক্ষকে ঢাল করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি?' এ শব্দ শুনামাত্রই হ্যরত যুবায়ের (রাঃ) প্রস্তুত হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় বার একথাই বলেন, এবারেও হযরত যুবায়ের (রাঃ) অগ্রসর হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবীরই ‘হাওয়ারী (সাহায্যকারী) থাকে এবং আমার ‘হাওয়ারী’ হচ্ছে হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ লোকগুলো তাদের প্রার্থনায় বলে, “হে আমাদের প্রভু! সাক্ষীগণের মধ্যে আমাদের নাম লিখে নিন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ। হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে নাম লিখে নেয়া। এ তাফসীরের বর্ণনা সনদ হিসেবে খুবই উৎকৃষ্ট। অতঃপর বানী ইসরাঈলের ঐ অপবিত্র দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রাণের শত্রু ছিল। তারা তাকে হত্যা করার ও শূলে চড়াবার ইচ্ছে করেছিল। সেই যুগের বাদশাহর কাছে তারা তাঁর দুর্নাম করতো। তারা বাদশাহকে বলতো, “এ লোকটি জনগণকে পথভ্রষ্ট করছে, দেশের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছে, মানুষকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে এবং পিতা ও পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি করছে। বরং তারা তাঁকে দুশ্চরিত্র, বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী, প্রতারক প্রভৃতি বলে অপবাদ দিয়েছিল এমনকি তাঁকে ব্যভিচারিণীর পুত্র বলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। অবশেষে বাদশাহও তার জীবনের শত্রু হয়ে যায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে বলে, তাকে ধরে এনে ভীষণ শাস্তি প্রদান করতঃ ফাঁসি দিয়ে দাও। অতঃপর তিনি যে বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন সৈন্যগণ তাঁকে বন্দী করার উদ্দেশ্যে সে বাড়ী পরিবেষ্টন করে তার ঘরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাদের হাত হতে বাঁচিয়ে নেন এবং তাঁকে ঐ ঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশে উঠিয়ে নেন। আর তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য বিশিষ্ট একটি লোককে তথায় নিক্ষেপ করেন, যে সে ঘরেই অবস্থান করছিল। ঐ লোকগুলো রাত্রির অন্ধকারে তাকেই হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তারা কঠিন শাস্তি দেয় এবং তার মস্তকোপরি কাটার টুপি রেখে দিয়ে শূলে চড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের সাথে মহান আল্লাহর কৌশল যে, তাদের ধারণায় তারা আল্লাহ তা'আলার নবী (আঃ)-কে ফাঁসি দিয়েছে, অথচ আল্লাহ পাক স্বীয় নবীকে মুক্তি দিয়েছেন। ঐ দুষ্কর্যের ফল তারা এই প্রাপ্ত হয়েছিল যে, চিরদিনের মত তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তারা মিথ্যা ও অন্যায়ের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। দুনিয়াতেও তারা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয় এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ওরই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা ষড়যন্ত্র করলে হবে কি? আল্লাহ তা'আলার কৌশলের কাছে তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র বানচাল হয়ে যাবে। তিনিই সবচেয়ে বড় কৌশলী।
আলে ইমরান 3:53
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদের একগুয়েমী ও বিবাদ প্রত্যক্ষ করলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, তারা হঠকারিতা হতে ফিরে আসবে না তখন তিনি বললেন, আল্লাহর উপর আমার আনুগত্য স্বীকারকারী কেউ আছে কি? আবার ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, এমন কেউ আছে কি যে আল্লাহর সাথে আমার সাহায্যকারী হতে পারে? কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলার দিকে মানুষকে আহ্বানের কাজে কেউ আমার হাত শক্তকারী আছে কি?' যেমন আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করার পূর্বে হজ্বের মৌসুমে বলেছিলেন, কুরাইশরা তো আমাকে আল্লাহর কালাম প্রচারের কার্যে বাধা দিচ্ছে, এমতাবস্থায় এ কার্যের জন্যে আমাকে জায়গা দিতে পারে এমন কেউ আছে কি?’ মদীনাবাসী আনসারগণ এ সেবার কার্যে এগিয়ে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জায়গা দান করেন। তাঁরা তাঁকে যথেষ্ট সাহায্যও করেন এবং যখন তিনি তাদের নিকট গমন করেন তখন তারা পুরোপুরি তাঁর সহযোগিতা করেন এবং তাঁর প্রতি তুলনাবিহীন সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। দুনিয়ার সাথে মোকাবিলায় তারা নিজেদের বক্ষকে নবী (সঃ)-এর জন্য ঢাল করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিফাযতে, মঙ্গল কামনায় ও তার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার কাজে তাদের আপাদমস্তক নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। অনুরূপভাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর এ আহ্বানেও কতক বানী ইসরাঈল সাড়া দেয়, তার উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে পূর্ণভাবে সাহায্য করে। আর তারা ঐ আলোকের অনুসরণ করে যা আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন, অর্থাৎ ইঞ্জীল। এ লোকগুলো ধোপা ছিল এবং তাদের সাদা কাপড়ের কারণেই তাদেরকে হাওয়ারী' বলা হতো। কেউ কেউ বলেন যে, তারা শিকারী ছিল। তবে সঠিক কথা এই যে, সাহায্যকারীকে ‘হাওয়ারী' বলা হয়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমার জন্যে স্বীয় বক্ষকে ঢাল করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি?' এ শব্দ শুনামাত্রই হ্যরত যুবায়ের (রাঃ) প্রস্তুত হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় বার একথাই বলেন, এবারেও হযরত যুবায়ের (রাঃ) অগ্রসর হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবীরই ‘হাওয়ারী (সাহায্যকারী) থাকে এবং আমার ‘হাওয়ারী’ হচ্ছে হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ লোকগুলো তাদের প্রার্থনায় বলে, “হে আমাদের প্রভু! সাক্ষীগণের মধ্যে আমাদের নাম লিখে নিন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ। হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে নাম লিখে নেয়া। এ তাফসীরের বর্ণনা সনদ হিসেবে খুবই উৎকৃষ্ট। অতঃপর বানী ইসরাঈলের ঐ অপবিত্র দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রাণের শত্রু ছিল। তারা তাকে হত্যা করার ও শূলে চড়াবার ইচ্ছে করেছিল। সেই যুগের বাদশাহর কাছে তারা তাঁর দুর্নাম করতো। তারা বাদশাহকে বলতো, “এ লোকটি জনগণকে পথভ্রষ্ট করছে, দেশের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছে, মানুষকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে এবং পিতা ও পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি করছে। বরং তারা তাঁকে দুশ্চরিত্র, বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী, প্রতারক প্রভৃতি বলে অপবাদ দিয়েছিল এমনকি তাঁকে ব্যভিচারিণীর পুত্র বলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। অবশেষে বাদশাহও তার জীবনের শত্রু হয়ে যায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে বলে, তাকে ধরে এনে ভীষণ শাস্তি প্রদান করতঃ ফাঁসি দিয়ে দাও। অতঃপর তিনি যে বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন সৈন্যগণ তাঁকে বন্দী করার উদ্দেশ্যে সে বাড়ী পরিবেষ্টন করে তার ঘরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাদের হাত হতে বাঁচিয়ে নেন এবং তাঁকে ঐ ঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশে উঠিয়ে নেন। আর তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য বিশিষ্ট একটি লোককে তথায় নিক্ষেপ করেন, যে সে ঘরেই অবস্থান করছিল। ঐ লোকগুলো রাত্রির অন্ধকারে তাকেই হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তারা কঠিন শাস্তি দেয় এবং তার মস্তকোপরি কাটার টুপি রেখে দিয়ে শূলে চড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের সাথে মহান আল্লাহর কৌশল যে, তাদের ধারণায় তারা আল্লাহ তা'আলার নবী (আঃ)-কে ফাঁসি দিয়েছে, অথচ আল্লাহ পাক স্বীয় নবীকে মুক্তি দিয়েছেন। ঐ দুষ্কর্যের ফল তারা এই প্রাপ্ত হয়েছিল যে, চিরদিনের মত তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তারা মিথ্যা ও অন্যায়ের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। দুনিয়াতেও তারা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয় এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ওরই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা ষড়যন্ত্র করলে হবে কি? আল্লাহ তা'আলার কৌশলের কাছে তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র বানচাল হয়ে যাবে। তিনিই সবচেয়ে বড় কৌশলী।
আলে ইমরান 3:54
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদের একগুয়েমী ও বিবাদ প্রত্যক্ষ করলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, তারা হঠকারিতা হতে ফিরে আসবে না তখন তিনি বললেন, আল্লাহর উপর আমার আনুগত্য স্বীকারকারী কেউ আছে কি? আবার ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, এমন কেউ আছে কি যে আল্লাহর সাথে আমার সাহায্যকারী হতে পারে? কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলার দিকে মানুষকে আহ্বানের কাজে কেউ আমার হাত শক্তকারী আছে কি?' যেমন আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করার পূর্বে হজ্বের মৌসুমে বলেছিলেন, কুরাইশরা তো আমাকে আল্লাহর কালাম প্রচারের কার্যে বাধা দিচ্ছে, এমতাবস্থায় এ কার্যের জন্যে আমাকে জায়গা দিতে পারে এমন কেউ আছে কি?’ মদীনাবাসী আনসারগণ এ সেবার কার্যে এগিয়ে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জায়গা দান করেন। তাঁরা তাঁকে যথেষ্ট সাহায্যও করেন এবং যখন তিনি তাদের নিকট গমন করেন তখন তারা পুরোপুরি তাঁর সহযোগিতা করেন এবং তাঁর প্রতি তুলনাবিহীন সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। দুনিয়ার সাথে মোকাবিলায় তারা নিজেদের বক্ষকে নবী (সঃ)-এর জন্য ঢাল করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিফাযতে, মঙ্গল কামনায় ও তার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার কাজে তাদের আপাদমস্তক নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। অনুরূপভাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর এ আহ্বানেও কতক বানী ইসরাঈল সাড়া দেয়, তার উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে পূর্ণভাবে সাহায্য করে। আর তারা ঐ আলোকের অনুসরণ করে যা আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন, অর্থাৎ ইঞ্জীল। এ লোকগুলো ধোপা ছিল এবং তাদের সাদা কাপড়ের কারণেই তাদেরকে হাওয়ারী' বলা হতো। কেউ কেউ বলেন যে, তারা শিকারী ছিল। তবে সঠিক কথা এই যে, সাহায্যকারীকে ‘হাওয়ারী' বলা হয়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমার জন্যে স্বীয় বক্ষকে ঢাল করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি?' এ শব্দ শুনামাত্রই হ্যরত যুবায়ের (রাঃ) প্রস্তুত হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় বার একথাই বলেন, এবারেও হযরত যুবায়ের (রাঃ) অগ্রসর হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবীরই ‘হাওয়ারী (সাহায্যকারী) থাকে এবং আমার ‘হাওয়ারী’ হচ্ছে হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ লোকগুলো তাদের প্রার্থনায় বলে, “হে আমাদের প্রভু! সাক্ষীগণের মধ্যে আমাদের নাম লিখে নিন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ। হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে নাম লিখে নেয়া। এ তাফসীরের বর্ণনা সনদ হিসেবে খুবই উৎকৃষ্ট। অতঃপর বানী ইসরাঈলের ঐ অপবিত্র দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রাণের শত্রু ছিল। তারা তাকে হত্যা করার ও শূলে চড়াবার ইচ্ছে করেছিল। সেই যুগের বাদশাহর কাছে তারা তাঁর দুর্নাম করতো। তারা বাদশাহকে বলতো, “এ লোকটি জনগণকে পথভ্রষ্ট করছে, দেশের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছে, মানুষকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে এবং পিতা ও পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি করছে। বরং তারা তাঁকে দুশ্চরিত্র, বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী, প্রতারক প্রভৃতি বলে অপবাদ দিয়েছিল এমনকি তাঁকে ব্যভিচারিণীর পুত্র বলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। অবশেষে বাদশাহও তার জীবনের শত্রু হয়ে যায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে বলে, তাকে ধরে এনে ভীষণ শাস্তি প্রদান করতঃ ফাঁসি দিয়ে দাও। অতঃপর তিনি যে বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন সৈন্যগণ তাঁকে বন্দী করার উদ্দেশ্যে সে বাড়ী পরিবেষ্টন করে তার ঘরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাদের হাত হতে বাঁচিয়ে নেন এবং তাঁকে ঐ ঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশে উঠিয়ে নেন। আর তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য বিশিষ্ট একটি লোককে তথায় নিক্ষেপ করেন, যে সে ঘরেই অবস্থান করছিল। ঐ লোকগুলো রাত্রির অন্ধকারে তাকেই হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তারা কঠিন শাস্তি দেয় এবং তার মস্তকোপরি কাটার টুপি রেখে দিয়ে শূলে চড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের সাথে মহান আল্লাহর কৌশল যে, তাদের ধারণায় তারা আল্লাহ তা'আলার নবী (আঃ)-কে ফাঁসি দিয়েছে, অথচ আল্লাহ পাক স্বীয় নবীকে মুক্তি দিয়েছেন। ঐ দুষ্কর্যের ফল তারা এই প্রাপ্ত হয়েছিল যে, চিরদিনের মত তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তারা মিথ্যা ও অন্যায়ের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। দুনিয়াতেও তারা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয় এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ওরই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা ষড়যন্ত্র করলে হবে কি? আল্লাহ তা'আলার কৌশলের কাছে তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র বানচাল হয়ে যাবে। তিনিই সবচেয়ে বড় কৌশলী।
আলে ইমরান 3:55
৫৫-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি ব্যাখ্যা দানকারীগণের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নেবো, অতঃপর তোমাকে মৃত্যুদান করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে‘আমি তোমাকে মত্যুদানকারী’। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠাবার সময় দিনের প্রথমভাগে তিন ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যু দান করেছিলেন। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, খ্রষ্টানদের ধারণায় আল্লাহ তা'আলা তাকে সাত ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যুর অবস্থায় রেখেছিলেন। পরে তাকে জীবিত করে উঠিয়ে নেন। হযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, তিন দিন পর্যন্ত তিনি মৃত ছিলেন। পরে আল্লাহ পাক তাকে জীবন দান করে উঠিয়ে নেন। হযরত মাতরুল ওয়ারাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে দুনিয়া হতে উত্তোলনকারী। এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ মৃত্যু নয়।' অনুরূপভাবে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উঠিয়ে নেয়া। অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে দ্রিা। যেমন কুরআন হাকীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি সেই আল্লাহ যিনি রাত্রে তোমাদেরকে নিদ্রা দিয়ে থাকেন। (৬:৬০) আর এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রাণকে তার মৃত্যুর সময় উঠিয়ে নেন এবং যে প্রাণ মরে যায় তাকে তার নিদ্রার সময় (উঠিয়ে নেন)।' (৩৯: ৪২) রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিদ্রা হতে জাগরিত হয়ে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে মৃত্যুদান করার পর পুনরায় জীবিত করলেন। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ ‘তাদের অবিশ্বাসের কারণে এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপর বড় অপবাদ দেয়ার ফলে এবং এই কারণে যে, তারা বলে- আমরা মারইয়াম নন্দন ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি, অথচ তারা তাকে হত্যাও করেনি এবং শূলীও দেয়নি বরং তাদের জন্যে তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা নিশ্চিতরূপে তাকে হত্যা করেনি’ এ পর্যন্ত। বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তিনি মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়। আহলে কিতাবের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। (আরবী) শব্দের (আরবী) সর্বনামটি হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন তখন কিতাবী সবাই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। সে সময় সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। কেননা, না তিনি জিজিয়া কর গ্রহণ করবেন, না ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু সমর্থন করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে (আরবী)-এর তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঘুম চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং সে অবস্থাতেই তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিয়ে কাফিরদের হাত হতে পবিত্র করবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করবো। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। যখন আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেন তখন তার পরে তার সঙ্গী সাথীদের কয়েকটি দল হয়ে যায়। একটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলে স্বীকার করে, আর তারা একথাও স্বীকার করে যে, তিনি মহান আল্লাহর এক দাসীর পুত্র। তাদের মধ্যে আর একটি দল সীমা অতিক্রম করে বসে এবং তারা বলে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) অন্য একটি দল স্বয়ং তাকেই আল্লাহ বলে। আবার একদল তিন আল্লাহর মধ্যে তাকে এক আল্লাহ বলে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ বিশ্বাসের কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা খণ্ডনও করেছেন। তিনশ বছর পর্যন্ত এ অবস্থায়ই থাকে। তারপর গ্রীক রাজাদের মধ্যে কুসতুনতান নামক একজন রাজা, যে একজন দার্শনিক ছিল, বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এক কৌশল অবলম্বন করতঃ কপটতার আশ্রয় নিয়ে এ ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করে। মোটকথা সে সময় ঈসা (আঃ)-এর ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। সে ওর ভেতর হ্রাস বৃদ্ধিও আনয়ন করেছিল। সে বহু আইন কানুন আবিষ্কার করেছিল। ‘আমান-ই-কুবরা’ও তারই আবিষ্কার, যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম বিশ্বাস ভঙ্গতা। সে তার যুগে শূকরকে বৈধ করে নিয়েছিল। তারই আদেশে খ্রীষ্টানগণ পূর্বমুখী হয়ে নামায পড়তে থাকে। সে-ই গীর্জা, উপাসনালয় প্রভৃতির মধ্যে ছবি বানিয়ে নেয় এবং নিজের এক পাপের কারণে রোযার মধ্যে দশটি রোযা বেশী করে। মোটকথা তার যুগে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম ঈসায়ী ধর্মরূপে অবশিষ্ট ছিল না বরং ওটা ‘দ্বীন-ই-কুতুনতীনে পরিণত হয়েছিল। সে বাহ্যিক যথেষ্ট আঁকজমক এনেছিল, যেমন সে বারো হাজারেরও বেশী উপাসনালয় নির্মাণ করেছিল এবং নিজের নামে একটি শহর বসিয়েছিল। মালেকিয়্যাহ দলটি তার সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এসব জঘন্য কার্য সত্ত্বেও তারা ইয়াহূদীদের উপর বিজয় লাভ করেছিল। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই কাফির হলেও তুলানামূলকভাবে ঐ খ্রীষ্টানরাই সত্য ও ন্যায়ের বেশী নিকটবর্তী ছিল। তাদের সবারই উপর আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তার মনোনীত রাসূল করে দুনিয়ায় পাঠালেন তখন জনগণ তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের ঈমান ছিল আল্লাহর সত্তার উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, কিতাব সমূহের উপর এবং তার সমস্ত রাসূলের উপর। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে নবীগণের (আঃ) সত্যানুসারী এরাই ছিল অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)। কেননা, এরা নিরক্ষর, আরবী, সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল যিনি ছিলেন বানী আদমের নেতা। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শিক্ষা ছিল সমস্ত সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার শিক্ষা এবং প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক নবীর সত্যানুসারীদেরকে আমার উম্মত’ বলার দাবীদার ছিলেন তিনিই। কারণ, যারা নিজেদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উম্মত বলে দাবী করতো তারা ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দিয়েছিল। তা ছাড়া শেষ নবী (সঃ)-এর ধর্মও ছিল পূর্বের সমস্ত শরীয়তকে রহিতকারী। এ ধর্ম কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষিত থাকবে এবং একটি ক্ষুদ্র অংশও পরিবর্তিত হবে না। এ জন্যই এ আয়াতের অঙ্গীকার অনুসারে মহান আল্লাহ এ উম্মতকে কাফিরদের উপর বিজয়ী করেন এবং এরা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।এ উম্মতে মুহাম্মদী'ই বহু দেশ পদদলিত করে, বড় বড় অত্যাচারী ও শক্তিশালী কাফিরদের মস্তক ছিন্ন করে। অর্থ-সম্পদ তাদের পদতলে গড়িয়ে পড়ে। বিজয় ও গানিমত তাদের পদ-চুম্বন করে। বহু যুগের পুরাতন সাম্রাজ্যের সিংহাসনগুলো এরা পরিবর্তন করে দেয়। পারস্য সম্রাট কিসরার আঁকজমক পূর্ণ সাম্রাজ্য এবং তার সুন্দর সুন্দর উপাসনাগারগুলো এদের হাতে বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। রোমান সম্রাট কায়সারের মুকুট ও সিংহাসন এ মুসলিমবাহিনীর আক্রমণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়ে। এরাই ঐ খ্রীষ্টানদেরকে মাসীহ পূজার স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দেয়। তাদের ধন-ভাণ্ডার মুসলমানেরা ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্য নবী (সঃ)-এর ধর্মের প্রসার কার্যে প্রাণ খুলে খরচ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অঙ্গীকার মানুষ উদীয়মান সূর্য ও পূর্ণিমার চন্দ্রের ঔজ্জ্বল্যের ন্যয় সত্যরূপে প্রত্যক্ষ করে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর দুর্নামকারীরা এবং তাঁর নামে শয়তানের পূজারীরা বাধ্য হয়ে সিরিয়ার শ্যামল উদ্যানসমূহ এবং কোলাহলময় শরহগুলো এক আল্লাহর বন্দেগীকারীদের হাতে সমপর্ণ করতঃ অসহায় অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে রোমক সাম্রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু পরে তথা হতে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে বের করে দেয়া হয় এবং অবশেষে তারা স্বীয় বাদশাহর বিশেষ শহর কনস্টান্টিনোপলে পৌছে। অতঃপর সেখান হতেও তাদেরকে অপদস্থ করে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ইনশাআল্লাহ মুসলমানেরা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর বিজয়ীই থাকবে। সমস্ত সত্যবাদীর নেতা যার সত্যবাদিতার উপর মহান আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সংবাদ দিয়েই দিয়েছেন যা চিরদিন অটল থাকবে, তিনি বলেন যে, তাঁর উম্মত কনস্টান্টিনোপল জয় করবে এবং তথাকার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার তাদের অধিকারে এসে যাবে। রোমকদের সঙ্গেও তাদের এমন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে যার তুলনা দুনিয়ায় নেই। আমি এগুলো একটি পৃথক পুস্তকে সন্নিবেশিত করেছি।আল্লাহ তা'আলার পরবর্তী উক্তির প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যেসব ইয়াহূদী হযরত ঈসা (আঃ)-কে অবিশ্বাস করেছিল এবং যেসব খ্রীষ্টান তাঁর সম্পর্কে অশোভনীয় কথা বলেছিল, দুনিয়ায় তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করা হয়েছে এবং তাদের ধন-মাল ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তাদের উপর পার্থিব শাস্তি নেমে এসেছে। আর পরকালে তাদের জন্যে যেসব শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে সেগুলো সম্বন্ধেও তাদের চিন্তা করা উচিত। যেখানে তাদেরকে না কেউ রক্ষা করতে পারবে, কেউ কোন সাহায্য করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। দুনিয়াতেও তাদেরকে বিজয়, সাহায্য ও সম্মান দান করবেন এবং পরকালেও তারা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসে না ।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁর জন্মের প্রাথমিক অবস্থার প্রকৃত রহস্য এটাই ছিল যা আল্লাহ তা'আলা লওহে মাহফুয হতে অহীর মাধ্যমে তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই। যেমন সূরা-ই-মারইয়ামে বলেছেনঃ ‘এটাই ঈসা ইবনে মারইয়াম, এটাই প্রকৃত রহস্য যে ব্যাপারে তুমি সন্দেহ পোষণ করছিলে, তাঁর (আল্লাহর) সন্তান হওয়া মোটেই শশাভনীয় নয়। তিনি এটা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছে করেন তখন শুধু বলেন, 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
আলে ইমরান 3:56
৫৫-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি ব্যাখ্যা দানকারীগণের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নেবো, অতঃপর তোমাকে মৃত্যুদান করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে‘আমি তোমাকে মত্যুদানকারী’। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠাবার সময় দিনের প্রথমভাগে তিন ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যু দান করেছিলেন। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, খ্রষ্টানদের ধারণায় আল্লাহ তা'আলা তাকে সাত ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যুর অবস্থায় রেখেছিলেন। পরে তাকে জীবিত করে উঠিয়ে নেন। হযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, তিন দিন পর্যন্ত তিনি মৃত ছিলেন। পরে আল্লাহ পাক তাকে জীবন দান করে উঠিয়ে নেন। হযরত মাতরুল ওয়ারাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে দুনিয়া হতে উত্তোলনকারী। এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ মৃত্যু নয়।' অনুরূপভাবে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উঠিয়ে নেয়া। অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে দ্রিা। যেমন কুরআন হাকীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি সেই আল্লাহ যিনি রাত্রে তোমাদেরকে নিদ্রা দিয়ে থাকেন। (৬:৬০) আর এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রাণকে তার মৃত্যুর সময় উঠিয়ে নেন এবং যে প্রাণ মরে যায় তাকে তার নিদ্রার সময় (উঠিয়ে নেন)।' (৩৯: ৪২) রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিদ্রা হতে জাগরিত হয়ে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে মৃত্যুদান করার পর পুনরায় জীবিত করলেন। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ ‘তাদের অবিশ্বাসের কারণে এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপর বড় অপবাদ দেয়ার ফলে এবং এই কারণে যে, তারা বলে- আমরা মারইয়াম নন্দন ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি, অথচ তারা তাকে হত্যাও করেনি এবং শূলীও দেয়নি বরং তাদের জন্যে তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা নিশ্চিতরূপে তাকে হত্যা করেনি’ এ পর্যন্ত। বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তিনি মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়। আহলে কিতাবের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। (আরবী) শব্দের (আরবী) সর্বনামটি হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন তখন কিতাবী সবাই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। সে সময় সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। কেননা, না তিনি জিজিয়া কর গ্রহণ করবেন, না ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু সমর্থন করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে (আরবী)-এর তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঘুম চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং সে অবস্থাতেই তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিয়ে কাফিরদের হাত হতে পবিত্র করবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করবো। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। যখন আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেন তখন তার পরে তার সঙ্গী সাথীদের কয়েকটি দল হয়ে যায়। একটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলে স্বীকার করে, আর তারা একথাও স্বীকার করে যে, তিনি মহান আল্লাহর এক দাসীর পুত্র। তাদের মধ্যে আর একটি দল সীমা অতিক্রম করে বসে এবং তারা বলে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) অন্য একটি দল স্বয়ং তাকেই আল্লাহ বলে। আবার একদল তিন আল্লাহর মধ্যে তাকে এক আল্লাহ বলে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ বিশ্বাসের কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা খণ্ডনও করেছেন। তিনশ বছর পর্যন্ত এ অবস্থায়ই থাকে। তারপর গ্রীক রাজাদের মধ্যে কুসতুনতান নামক একজন রাজা, যে একজন দার্শনিক ছিল, বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এক কৌশল অবলম্বন করতঃ কপটতার আশ্রয় নিয়ে এ ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করে। মোটকথা সে সময় ঈসা (আঃ)-এর ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। সে ওর ভেতর হ্রাস বৃদ্ধিও আনয়ন করেছিল। সে বহু আইন কানুন আবিষ্কার করেছিল। ‘আমান-ই-কুবরা’ও তারই আবিষ্কার, যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম বিশ্বাস ভঙ্গতা। সে তার যুগে শূকরকে বৈধ করে নিয়েছিল। তারই আদেশে খ্রীষ্টানগণ পূর্বমুখী হয়ে নামায পড়তে থাকে। সে-ই গীর্জা, উপাসনালয় প্রভৃতির মধ্যে ছবি বানিয়ে নেয় এবং নিজের এক পাপের কারণে রোযার মধ্যে দশটি রোযা বেশী করে। মোটকথা তার যুগে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম ঈসায়ী ধর্মরূপে অবশিষ্ট ছিল না বরং ওটা ‘দ্বীন-ই-কুতুনতীনে পরিণত হয়েছিল। সে বাহ্যিক যথেষ্ট আঁকজমক এনেছিল, যেমন সে বারো হাজারেরও বেশী উপাসনালয় নির্মাণ করেছিল এবং নিজের নামে একটি শহর বসিয়েছিল। মালেকিয়্যাহ দলটি তার সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এসব জঘন্য কার্য সত্ত্বেও তারা ইয়াহূদীদের উপর বিজয় লাভ করেছিল। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই কাফির হলেও তুলানামূলকভাবে ঐ খ্রীষ্টানরাই সত্য ও ন্যায়ের বেশী নিকটবর্তী ছিল। তাদের সবারই উপর আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তার মনোনীত রাসূল করে দুনিয়ায় পাঠালেন তখন জনগণ তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের ঈমান ছিল আল্লাহর সত্তার উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, কিতাব সমূহের উপর এবং তার সমস্ত রাসূলের উপর। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে নবীগণের (আঃ) সত্যানুসারী এরাই ছিল অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)। কেননা, এরা নিরক্ষর, আরবী, সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল যিনি ছিলেন বানী আদমের নেতা। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শিক্ষা ছিল সমস্ত সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার শিক্ষা এবং প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক নবীর সত্যানুসারীদেরকে আমার উম্মত’ বলার দাবীদার ছিলেন তিনিই। কারণ, যারা নিজেদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উম্মত বলে দাবী করতো তারা ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দিয়েছিল। তা ছাড়া শেষ নবী (সঃ)-এর ধর্মও ছিল পূর্বের সমস্ত শরীয়তকে রহিতকারী। এ ধর্ম কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষিত থাকবে এবং একটি ক্ষুদ্র অংশও পরিবর্তিত হবে না। এ জন্যই এ আয়াতের অঙ্গীকার অনুসারে মহান আল্লাহ এ উম্মতকে কাফিরদের উপর বিজয়ী করেন এবং এরা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।এ উম্মতে মুহাম্মদী'ই বহু দেশ পদদলিত করে, বড় বড় অত্যাচারী ও শক্তিশালী কাফিরদের মস্তক ছিন্ন করে। অর্থ-সম্পদ তাদের পদতলে গড়িয়ে পড়ে। বিজয় ও গানিমত তাদের পদ-চুম্বন করে। বহু যুগের পুরাতন সাম্রাজ্যের সিংহাসনগুলো এরা পরিবর্তন করে দেয়। পারস্য সম্রাট কিসরার আঁকজমক পূর্ণ সাম্রাজ্য এবং তার সুন্দর সুন্দর উপাসনাগারগুলো এদের হাতে বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। রোমান সম্রাট কায়সারের মুকুট ও সিংহাসন এ মুসলিমবাহিনীর আক্রমণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়ে। এরাই ঐ খ্রীষ্টানদেরকে মাসীহ পূজার স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দেয়। তাদের ধন-ভাণ্ডার মুসলমানেরা ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্য নবী (সঃ)-এর ধর্মের প্রসার কার্যে প্রাণ খুলে খরচ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অঙ্গীকার মানুষ উদীয়মান সূর্য ও পূর্ণিমার চন্দ্রের ঔজ্জ্বল্যের ন্যয় সত্যরূপে প্রত্যক্ষ করে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর দুর্নামকারীরা এবং তাঁর নামে শয়তানের পূজারীরা বাধ্য হয়ে সিরিয়ার শ্যামল উদ্যানসমূহ এবং কোলাহলময় শরহগুলো এক আল্লাহর বন্দেগীকারীদের হাতে সমপর্ণ করতঃ অসহায় অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে রোমক সাম্রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু পরে তথা হতে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে বের করে দেয়া হয় এবং অবশেষে তারা স্বীয় বাদশাহর বিশেষ শহর কনস্টান্টিনোপলে পৌছে। অতঃপর সেখান হতেও তাদেরকে অপদস্থ করে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ইনশাআল্লাহ মুসলমানেরা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর বিজয়ীই থাকবে। সমস্ত সত্যবাদীর নেতা যার সত্যবাদিতার উপর মহান আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সংবাদ দিয়েই দিয়েছেন যা চিরদিন অটল থাকবে, তিনি বলেন যে, তাঁর উম্মত কনস্টান্টিনোপল জয় করবে এবং তথাকার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার তাদের অধিকারে এসে যাবে। রোমকদের সঙ্গেও তাদের এমন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে যার তুলনা দুনিয়ায় নেই। আমি এগুলো একটি পৃথক পুস্তকে সন্নিবেশিত করেছি।আল্লাহ তা'আলার পরবর্তী উক্তির প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যেসব ইয়াহূদী হযরত ঈসা (আঃ)-কে অবিশ্বাস করেছিল এবং যেসব খ্রীষ্টান তাঁর সম্পর্কে অশোভনীয় কথা বলেছিল, দুনিয়ায় তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করা হয়েছে এবং তাদের ধন-মাল ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তাদের উপর পার্থিব শাস্তি নেমে এসেছে। আর পরকালে তাদের জন্যে যেসব শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে সেগুলো সম্বন্ধেও তাদের চিন্তা করা উচিত। যেখানে তাদেরকে না কেউ রক্ষা করতে পারবে, কেউ কোন সাহায্য করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। দুনিয়াতেও তাদেরকে বিজয়, সাহায্য ও সম্মান দান করবেন এবং পরকালেও তারা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসে না ।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁর জন্মের প্রাথমিক অবস্থার প্রকৃত রহস্য এটাই ছিল যা আল্লাহ তা'আলা লওহে মাহফুয হতে অহীর মাধ্যমে তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই। যেমন সূরা-ই-মারইয়ামে বলেছেনঃ ‘এটাই ঈসা ইবনে মারইয়াম, এটাই প্রকৃত রহস্য যে ব্যাপারে তুমি সন্দেহ পোষণ করছিলে, তাঁর (আল্লাহর) সন্তান হওয়া মোটেই শশাভনীয় নয়। তিনি এটা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছে করেন তখন শুধু বলেন, 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
আলে ইমরান 3:57
৫৫-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি ব্যাখ্যা দানকারীগণের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নেবো, অতঃপর তোমাকে মৃত্যুদান করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে‘আমি তোমাকে মত্যুদানকারী’। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠাবার সময় দিনের প্রথমভাগে তিন ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যু দান করেছিলেন। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, খ্রষ্টানদের ধারণায় আল্লাহ তা'আলা তাকে সাত ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যুর অবস্থায় রেখেছিলেন। পরে তাকে জীবিত করে উঠিয়ে নেন। হযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, তিন দিন পর্যন্ত তিনি মৃত ছিলেন। পরে আল্লাহ পাক তাকে জীবন দান করে উঠিয়ে নেন। হযরত মাতরুল ওয়ারাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে দুনিয়া হতে উত্তোলনকারী। এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ মৃত্যু নয়।' অনুরূপভাবে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উঠিয়ে নেয়া। অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে দ্রিা। যেমন কুরআন হাকীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি সেই আল্লাহ যিনি রাত্রে তোমাদেরকে নিদ্রা দিয়ে থাকেন। (৬:৬০) আর এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রাণকে তার মৃত্যুর সময় উঠিয়ে নেন এবং যে প্রাণ মরে যায় তাকে তার নিদ্রার সময় (উঠিয়ে নেন)।' (৩৯: ৪২) রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিদ্রা হতে জাগরিত হয়ে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে মৃত্যুদান করার পর পুনরায় জীবিত করলেন। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ ‘তাদের অবিশ্বাসের কারণে এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপর বড় অপবাদ দেয়ার ফলে এবং এই কারণে যে, তারা বলে- আমরা মারইয়াম নন্দন ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি, অথচ তারা তাকে হত্যাও করেনি এবং শূলীও দেয়নি বরং তাদের জন্যে তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা নিশ্চিতরূপে তাকে হত্যা করেনি’ এ পর্যন্ত। বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তিনি মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়। আহলে কিতাবের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। (আরবী) শব্দের (আরবী) সর্বনামটি হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন তখন কিতাবী সবাই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। সে সময় সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। কেননা, না তিনি জিজিয়া কর গ্রহণ করবেন, না ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু সমর্থন করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে (আরবী)-এর তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঘুম চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং সে অবস্থাতেই তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিয়ে কাফিরদের হাত হতে পবিত্র করবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করবো। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। যখন আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেন তখন তার পরে তার সঙ্গী সাথীদের কয়েকটি দল হয়ে যায়। একটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলে স্বীকার করে, আর তারা একথাও স্বীকার করে যে, তিনি মহান আল্লাহর এক দাসীর পুত্র। তাদের মধ্যে আর একটি দল সীমা অতিক্রম করে বসে এবং তারা বলে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) অন্য একটি দল স্বয়ং তাকেই আল্লাহ বলে। আবার একদল তিন আল্লাহর মধ্যে তাকে এক আল্লাহ বলে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ বিশ্বাসের কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা খণ্ডনও করেছেন। তিনশ বছর পর্যন্ত এ অবস্থায়ই থাকে। তারপর গ্রীক রাজাদের মধ্যে কুসতুনতান নামক একজন রাজা, যে একজন দার্শনিক ছিল, বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এক কৌশল অবলম্বন করতঃ কপটতার আশ্রয় নিয়ে এ ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করে। মোটকথা সে সময় ঈসা (আঃ)-এর ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। সে ওর ভেতর হ্রাস বৃদ্ধিও আনয়ন করেছিল। সে বহু আইন কানুন আবিষ্কার করেছিল। ‘আমান-ই-কুবরা’ও তারই আবিষ্কার, যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম বিশ্বাস ভঙ্গতা। সে তার যুগে শূকরকে বৈধ করে নিয়েছিল। তারই আদেশে খ্রীষ্টানগণ পূর্বমুখী হয়ে নামায পড়তে থাকে। সে-ই গীর্জা, উপাসনালয় প্রভৃতির মধ্যে ছবি বানিয়ে নেয় এবং নিজের এক পাপের কারণে রোযার মধ্যে দশটি রোযা বেশী করে। মোটকথা তার যুগে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম ঈসায়ী ধর্মরূপে অবশিষ্ট ছিল না বরং ওটা ‘দ্বীন-ই-কুতুনতীনে পরিণত হয়েছিল। সে বাহ্যিক যথেষ্ট আঁকজমক এনেছিল, যেমন সে বারো হাজারেরও বেশী উপাসনালয় নির্মাণ করেছিল এবং নিজের নামে একটি শহর বসিয়েছিল। মালেকিয়্যাহ দলটি তার সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এসব জঘন্য কার্য সত্ত্বেও তারা ইয়াহূদীদের উপর বিজয় লাভ করেছিল। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই কাফির হলেও তুলানামূলকভাবে ঐ খ্রীষ্টানরাই সত্য ও ন্যায়ের বেশী নিকটবর্তী ছিল। তাদের সবারই উপর আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তার মনোনীত রাসূল করে দুনিয়ায় পাঠালেন তখন জনগণ তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের ঈমান ছিল আল্লাহর সত্তার উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, কিতাব সমূহের উপর এবং তার সমস্ত রাসূলের উপর। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে নবীগণের (আঃ) সত্যানুসারী এরাই ছিল অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)। কেননা, এরা নিরক্ষর, আরবী, সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল যিনি ছিলেন বানী আদমের নেতা। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শিক্ষা ছিল সমস্ত সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার শিক্ষা এবং প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক নবীর সত্যানুসারীদেরকে আমার উম্মত’ বলার দাবীদার ছিলেন তিনিই। কারণ, যারা নিজেদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উম্মত বলে দাবী করতো তারা ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দিয়েছিল। তা ছাড়া শেষ নবী (সঃ)-এর ধর্মও ছিল পূর্বের সমস্ত শরীয়তকে রহিতকারী। এ ধর্ম কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষিত থাকবে এবং একটি ক্ষুদ্র অংশও পরিবর্তিত হবে না। এ জন্যই এ আয়াতের অঙ্গীকার অনুসারে মহান আল্লাহ এ উম্মতকে কাফিরদের উপর বিজয়ী করেন এবং এরা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।এ উম্মতে মুহাম্মদী'ই বহু দেশ পদদলিত করে, বড় বড় অত্যাচারী ও শক্তিশালী কাফিরদের মস্তক ছিন্ন করে। অর্থ-সম্পদ তাদের পদতলে গড়িয়ে পড়ে। বিজয় ও গানিমত তাদের পদ-চুম্বন করে। বহু যুগের পুরাতন সাম্রাজ্যের সিংহাসনগুলো এরা পরিবর্তন করে দেয়। পারস্য সম্রাট কিসরার আঁকজমক পূর্ণ সাম্রাজ্য এবং তার সুন্দর সুন্দর উপাসনাগারগুলো এদের হাতে বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। রোমান সম্রাট কায়সারের মুকুট ও সিংহাসন এ মুসলিমবাহিনীর আক্রমণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়ে। এরাই ঐ খ্রীষ্টানদেরকে মাসীহ পূজার স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দেয়। তাদের ধন-ভাণ্ডার মুসলমানেরা ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্য নবী (সঃ)-এর ধর্মের প্রসার কার্যে প্রাণ খুলে খরচ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অঙ্গীকার মানুষ উদীয়মান সূর্য ও পূর্ণিমার চন্দ্রের ঔজ্জ্বল্যের ন্যয় সত্যরূপে প্রত্যক্ষ করে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর দুর্নামকারীরা এবং তাঁর নামে শয়তানের পূজারীরা বাধ্য হয়ে সিরিয়ার শ্যামল উদ্যানসমূহ এবং কোলাহলময় শরহগুলো এক আল্লাহর বন্দেগীকারীদের হাতে সমপর্ণ করতঃ অসহায় অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে রোমক সাম্রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু পরে তথা হতে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে বের করে দেয়া হয় এবং অবশেষে তারা স্বীয় বাদশাহর বিশেষ শহর কনস্টান্টিনোপলে পৌছে। অতঃপর সেখান হতেও তাদেরকে অপদস্থ করে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ইনশাআল্লাহ মুসলমানেরা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর বিজয়ীই থাকবে। সমস্ত সত্যবাদীর নেতা যার সত্যবাদিতার উপর মহান আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সংবাদ দিয়েই দিয়েছেন যা চিরদিন অটল থাকবে, তিনি বলেন যে, তাঁর উম্মত কনস্টান্টিনোপল জয় করবে এবং তথাকার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার তাদের অধিকারে এসে যাবে। রোমকদের সঙ্গেও তাদের এমন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে যার তুলনা দুনিয়ায় নেই। আমি এগুলো একটি পৃথক পুস্তকে সন্নিবেশিত করেছি।আল্লাহ তা'আলার পরবর্তী উক্তির প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যেসব ইয়াহূদী হযরত ঈসা (আঃ)-কে অবিশ্বাস করেছিল এবং যেসব খ্রীষ্টান তাঁর সম্পর্কে অশোভনীয় কথা বলেছিল, দুনিয়ায় তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করা হয়েছে এবং তাদের ধন-মাল ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তাদের উপর পার্থিব শাস্তি নেমে এসেছে। আর পরকালে তাদের জন্যে যেসব শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে সেগুলো সম্বন্ধেও তাদের চিন্তা করা উচিত। যেখানে তাদেরকে না কেউ রক্ষা করতে পারবে, কেউ কোন সাহায্য করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। দুনিয়াতেও তাদেরকে বিজয়, সাহায্য ও সম্মান দান করবেন এবং পরকালেও তারা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসে না ।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁর জন্মের প্রাথমিক অবস্থার প্রকৃত রহস্য এটাই ছিল যা আল্লাহ তা'আলা লওহে মাহফুয হতে অহীর মাধ্যমে তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই। যেমন সূরা-ই-মারইয়ামে বলেছেনঃ ‘এটাই ঈসা ইবনে মারইয়াম, এটাই প্রকৃত রহস্য যে ব্যাপারে তুমি সন্দেহ পোষণ করছিলে, তাঁর (আল্লাহর) সন্তান হওয়া মোটেই শশাভনীয় নয়। তিনি এটা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছে করেন তখন শুধু বলেন, 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
আলে ইমরান 3:58
৫৫-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি ব্যাখ্যা দানকারীগণের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নেবো, অতঃপর তোমাকে মৃত্যুদান করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে‘আমি তোমাকে মত্যুদানকারী’। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠাবার সময় দিনের প্রথমভাগে তিন ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যু দান করেছিলেন। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, খ্রষ্টানদের ধারণায় আল্লাহ তা'আলা তাকে সাত ঘন্টা পর্যন্ত মৃত্যুর অবস্থায় রেখেছিলেন। পরে তাকে জীবিত করে উঠিয়ে নেন। হযরত অহাব (রঃ) বলেন যে, তিন দিন পর্যন্ত তিনি মৃত ছিলেন। পরে আল্লাহ পাক তাকে জীবন দান করে উঠিয়ে নেন। হযরত মাতরুল ওয়ারাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে দুনিয়া হতে উত্তোলনকারী। এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ মৃত্যু নয়।' অনুরূপভাবে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে উঠিয়ে নেয়া। অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে দ্রিা। যেমন কুরআন হাকীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি সেই আল্লাহ যিনি রাত্রে তোমাদেরকে নিদ্রা দিয়ে থাকেন। (৬:৬০) আর এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রাণকে তার মৃত্যুর সময় উঠিয়ে নেন এবং যে প্রাণ মরে যায় তাকে তার নিদ্রার সময় (উঠিয়ে নেন)।' (৩৯: ৪২) রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিদ্রা হতে জাগরিত হয়ে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে মৃত্যুদান করার পর পুনরায় জীবিত করলেন। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ ‘তাদের অবিশ্বাসের কারণে এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপর বড় অপবাদ দেয়ার ফলে এবং এই কারণে যে, তারা বলে- আমরা মারইয়াম নন্দন ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি, অথচ তারা তাকে হত্যাও করেনি এবং শূলীও দেয়নি বরং তাদের জন্যে তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা নিশ্চিতরূপে তাকে হত্যা করেনি’ এ পর্যন্ত। বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তিনি মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়। আহলে কিতাবের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। (আরবী) শব্দের (আরবী) সর্বনামটি হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন তখন কিতাবী সবাই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসছে। সে সময় সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। কেননা, না তিনি জিজিয়া কর গ্রহণ করবেন, না ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু সমর্থন করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে (আরবী)-এর তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঘুম চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং সে অবস্থাতেই তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিয়ে কাফিরদের হাত হতে পবিত্র করবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করবো। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। যখন আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেন তখন তার পরে তার সঙ্গী সাথীদের কয়েকটি দল হয়ে যায়। একটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলে স্বীকার করে, আর তারা একথাও স্বীকার করে যে, তিনি মহান আল্লাহর এক দাসীর পুত্র। তাদের মধ্যে আর একটি দল সীমা অতিক্রম করে বসে এবং তারা বলে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) অন্য একটি দল স্বয়ং তাকেই আল্লাহ বলে। আবার একদল তিন আল্লাহর মধ্যে তাকে এক আল্লাহ বলে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ বিশ্বাসের কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা খণ্ডনও করেছেন। তিনশ বছর পর্যন্ত এ অবস্থায়ই থাকে। তারপর গ্রীক রাজাদের মধ্যে কুসতুনতান নামক একজন রাজা, যে একজন দার্শনিক ছিল, বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীনকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এক কৌশল অবলম্বন করতঃ কপটতার আশ্রয় নিয়ে এ ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করে। মোটকথা সে সময় ঈসা (আঃ)-এর ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। সে ওর ভেতর হ্রাস বৃদ্ধিও আনয়ন করেছিল। সে বহু আইন কানুন আবিষ্কার করেছিল। ‘আমান-ই-কুবরা’ও তারই আবিষ্কার, যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম বিশ্বাস ভঙ্গতা। সে তার যুগে শূকরকে বৈধ করে নিয়েছিল। তারই আদেশে খ্রীষ্টানগণ পূর্বমুখী হয়ে নামায পড়তে থাকে। সে-ই গীর্জা, উপাসনালয় প্রভৃতির মধ্যে ছবি বানিয়ে নেয় এবং নিজের এক পাপের কারণে রোযার মধ্যে দশটি রোযা বেশী করে। মোটকথা তার যুগে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম ঈসায়ী ধর্মরূপে অবশিষ্ট ছিল না বরং ওটা ‘দ্বীন-ই-কুতুনতীনে পরিণত হয়েছিল। সে বাহ্যিক যথেষ্ট আঁকজমক এনেছিল, যেমন সে বারো হাজারেরও বেশী উপাসনালয় নির্মাণ করেছিল এবং নিজের নামে একটি শহর বসিয়েছিল। মালেকিয়্যাহ দলটি তার সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এসব জঘন্য কার্য সত্ত্বেও তারা ইয়াহূদীদের উপর বিজয় লাভ করেছিল। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই কাফির হলেও তুলানামূলকভাবে ঐ খ্রীষ্টানরাই সত্য ও ন্যায়ের বেশী নিকটবর্তী ছিল। তাদের সবারই উপর আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে তার মনোনীত রাসূল করে দুনিয়ায় পাঠালেন তখন জনগণ তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের ঈমান ছিল আল্লাহর সত্তার উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, কিতাব সমূহের উপর এবং তার সমস্ত রাসূলের উপর। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে নবীগণের (আঃ) সত্যানুসারী এরাই ছিল অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)। কেননা, এরা নিরক্ষর, আরবী, সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল যিনি ছিলেন বানী আদমের নেতা। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শিক্ষা ছিল সমস্ত সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার শিক্ষা এবং প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক নবীর সত্যানুসারীদেরকে আমার উম্মত’ বলার দাবীদার ছিলেন তিনিই। কারণ, যারা নিজেদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উম্মত বলে দাবী করতো তারা ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দিয়েছিল। তা ছাড়া শেষ নবী (সঃ)-এর ধর্মও ছিল পূর্বের সমস্ত শরীয়তকে রহিতকারী। এ ধর্ম কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষিত থাকবে এবং একটি ক্ষুদ্র অংশও পরিবর্তিত হবে না। এ জন্যই এ আয়াতের অঙ্গীকার অনুসারে মহান আল্লাহ এ উম্মতকে কাফিরদের উপর বিজয়ী করেন এবং এরা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।এ উম্মতে মুহাম্মদী'ই বহু দেশ পদদলিত করে, বড় বড় অত্যাচারী ও শক্তিশালী কাফিরদের মস্তক ছিন্ন করে। অর্থ-সম্পদ তাদের পদতলে গড়িয়ে পড়ে। বিজয় ও গানিমত তাদের পদ-চুম্বন করে। বহু যুগের পুরাতন সাম্রাজ্যের সিংহাসনগুলো এরা পরিবর্তন করে দেয়। পারস্য সম্রাট কিসরার আঁকজমক পূর্ণ সাম্রাজ্য এবং তার সুন্দর সুন্দর উপাসনাগারগুলো এদের হাতে বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। রোমান সম্রাট কায়সারের মুকুট ও সিংহাসন এ মুসলিমবাহিনীর আক্রমণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়ে। এরাই ঐ খ্রীষ্টানদেরকে মাসীহ পূজার স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দেয়। তাদের ধন-ভাণ্ডার মুসলমানেরা ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্য নবী (সঃ)-এর ধর্মের প্রসার কার্যে প্রাণ খুলে খরচ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অঙ্গীকার মানুষ উদীয়মান সূর্য ও পূর্ণিমার চন্দ্রের ঔজ্জ্বল্যের ন্যয় সত্যরূপে প্রত্যক্ষ করে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর দুর্নামকারীরা এবং তাঁর নামে শয়তানের পূজারীরা বাধ্য হয়ে সিরিয়ার শ্যামল উদ্যানসমূহ এবং কোলাহলময় শরহগুলো এক আল্লাহর বন্দেগীকারীদের হাতে সমপর্ণ করতঃ অসহায় অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে রোমক সাম্রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু পরে তথা হতে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে বের করে দেয়া হয় এবং অবশেষে তারা স্বীয় বাদশাহর বিশেষ শহর কনস্টান্টিনোপলে পৌছে। অতঃপর সেখান হতেও তাদেরকে অপদস্থ করে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ইনশাআল্লাহ মুসলমানেরা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর বিজয়ীই থাকবে। সমস্ত সত্যবাদীর নেতা যার সত্যবাদিতার উপর মহান আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সংবাদ দিয়েই দিয়েছেন যা চিরদিন অটল থাকবে, তিনি বলেন যে, তাঁর উম্মত কনস্টান্টিনোপল জয় করবে এবং তথাকার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার তাদের অধিকারে এসে যাবে। রোমকদের সঙ্গেও তাদের এমন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে যার তুলনা দুনিয়ায় নেই। আমি এগুলো একটি পৃথক পুস্তকে সন্নিবেশিত করেছি।আল্লাহ তা'আলার পরবর্তী উক্তির প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যেসব ইয়াহূদী হযরত ঈসা (আঃ)-কে অবিশ্বাস করেছিল এবং যেসব খ্রীষ্টান তাঁর সম্পর্কে অশোভনীয় কথা বলেছিল, দুনিয়ায় তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করা হয়েছে এবং তাদের ধন-মাল ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তাদের উপর পার্থিব শাস্তি নেমে এসেছে। আর পরকালে তাদের জন্যে যেসব শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে সেগুলো সম্বন্ধেও তাদের চিন্তা করা উচিত। যেখানে তাদেরকে না কেউ রক্ষা করতে পারবে, কেউ কোন সাহায্য করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। দুনিয়াতেও তাদেরকে বিজয়, সাহায্য ও সম্মান দান করবেন এবং পরকালেও তারা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসে না ।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁর জন্মের প্রাথমিক অবস্থার প্রকৃত রহস্য এটাই ছিল যা আল্লাহ তা'আলা লওহে মাহফুয হতে অহীর মাধ্যমে তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই। যেমন সূরা-ই-মারইয়ামে বলেছেনঃ ‘এটাই ঈসা ইবনে মারইয়াম, এটাই প্রকৃত রহস্য যে ব্যাপারে তুমি সন্দেহ পোষণ করছিলে, তাঁর (আল্লাহর) সন্তান হওয়া মোটেই শশাভনীয় নয়। তিনি এটা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছে করেন তখন শুধু বলেন, 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
আলে ইমরান 3:59
৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আমি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমরা খুব বিস্ময়বোধ করছে? তার পূর্বে তো আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি, অথচ তার বাপও ছিল না, মাও ছিল না। বরং তাকে আমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম- “হে আদম! তুমি হও’, আর তেমনি সে হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমি যখন বিনা বাপ-মায়ে সৃষ্টি করতে পেরেছি তখন শুধু মায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা আমার কাছে কি কোন কঠিন কাজ? সুতরাং শুধু বাপ না হওয়ার কারণে যদি হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখতে পারে, তবে তো হযরত আদম আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হওয়ার আরও বেশী দাবীদার। (নাউজুবিল্লাহে) কিন্তু স্বয়ং তোমরাও তো তা স্বীকার কর না। কাজেই হযরত ঈসা (আঃ)-কে এ মর্যাদা হতে সরিয়ে ফেলা আরও উত্তম। কেননা, পুত্ৰত্বের দাবীর অসারতা ওখানের চাইতে এখানেই বেশী স্পষ্ট। কারণ এখানে তো মা আছে কিন্তু ওখানে মা ও বাপ কেউ ছিল না। এগুলো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি আদম (আঃ)-কে নারী পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হযরত হাওয়া (আঃ)-কে শুধু পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ‘সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তাকে (ঈসা আঃ-কে) মানুষের জন্যে আমার ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়েছি।' (১৯:২১) আর এখানে বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা এটাই। এটা ছাড়া কম বেশীর কোন স্থানই নেই। কেননা, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতারই স্থান। সুতরাং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্দেহ পোষণ করা মোটেই উচিত নয়।অতঃপর আল্লাহ পাক তার নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পরেও যদি কোন লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তুমি তাদেরকে মুবাহালার’ (পরস্পর বদ দু'আ করার) জন্যে আহবান করতঃ বল- “এসো আমরা উভয় দল আমাদের পুত্রদেরকে এবং স্ত্রীদেরকে নিয়ে মুবাহালার জন্যে বেরিয়ে যাই এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল মিথ্যাবাদী তার উপর আপনি আপনার অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।মুবাহালা’য় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রথম হতে এ পর্যন্ত এ সমুদয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিগণ। ঐলোকগণ এখানে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার অংশীদার এবং তাঁর পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) কাজেই তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডন ও তাদের কথার উত্তরে এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সীরাতে লিখেছেন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও নিজ নিজ পুস্তকসমূহে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানের খ্রীষ্টানগণ প্রতিনিধি হিসেবে ষাটজন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করে, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন তাদের নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ (১) আকিব, যার নাম ছিল আবদুল মাসীহ, (২) সায়্যেদ, যার নাম ছিল আইহাম, (৩) আবু হারিসা ইবনে আলকামা, যে ছিল বাকর ইবনে অয়েলের ভাই, (৪) ওয়ারিস ইবনে হারিস, (৫) যায়েদ, (৬) কায়েস, (৭) ইয়াযীদ, (৮) ও (৯) তার দু'টি পুত্র (১০) খুয়াইলিদ, (১১) আমর, (১২) খালিদ, (১৩) আবদুল্লাহ এবং (১৪) মুহসীন। এ চৌদ্দজন ছিল তাদের নেতা এবং এদের মধ্যে আবার তিনজন বড় নেতা ছিল। তারা হচ্ছেঃ (১) আকিব, এ লোকটি ছিল কওমের আমীর এবং তাকে জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হতো, আর তার অভিমতের উপরেই জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। (২) সায়্যেদ, এ লোকটি ছিল তাদের একজন বড় পাদরী ও উঁচু দরের শিক্ষক। সে বানূ বাকর ইবনে ওয়েলের আরব গোত্রভুক্ত ছিল। কিন্তু সে খ্রীষ্টান হয়ে গিয়েছিল। রোমকদের নিকট তার খুব সম্মান ছিল। তারা তার জন্যে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করেছিল। তার ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা দেখে তারা অত্যন্ত খাতির সম্মান করতো। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিল। কারণ, সে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে তাঁর বিশেষণ সম্বন্ধে পড়েছিল। অন্তরে সে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করতো। কিন্তু খ্রীষ্টানদের নিকট তার যে খাতির-সম্মান ছিল তা লোপ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে সুপথের দিকে আসতো না এবং (৩) হারিসা ইবনে আলকামা। মোটকথা এ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয় এবং সে সময় তিনি আসরের নামায সমাধা করে মসজিদে বসেছিলেন। এ লোকগুলো মূল্যবান পোষাক পরিহিত ছিল এবং তাদের গায়ে ছিল সুন্দর ও নরম চাদরসমূহ। তাদেরকে দেখে বানূ হারিস ইবনে কা'বের বংশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) মন্তব্য করেন যে, ওদের পরে ঐরকম জাঁকজমকপূর্ণ আর কোন প্রতিনিধি কখনও আসেনি। তাদের নামাযের সময় হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে তারা মসজিদে নববীতেই পূর্ব দিকে মুখ করে তাদের নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করে নেয়। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাদের আলোচনা শুরু হয়। মুখপাত্র হিসেবে নিম্নের তিনজনই কথা বলছিলঃ (১) হারেসা ইবনে আলকামা, (২) আকিব অর্থাৎ আবদুল মাসীহ এবং (৩) সায়্যেদ অর্থাৎ আইহাম। এরা শাহী মাযহাবের লোক ছিল বটে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে মতভেদ রাখতো। হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তাদের তিনটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ তিনি নিজেই আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র এবং তিন আল্লাহর মধ্যে এক আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অপবিত্র কথা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রায় সমস্ত খ্রীষ্টানেরই এ বিশ্বাস। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আল্লাহ হওয়ার দলীল তাদের নিকট এই ছিল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধদেরকে চক্ষু দান করতেন, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতেন, ভবিষ্যতের সংবাদ দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখী তৈরী করতঃ ওর মধ্যে ফুঁদিয়ে উড়িয়ে দিতেন। এর উত্তর এই যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এ সমস্ত কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পেতো। কারণ এই যে, যেন তার কথা সত্য হওয়ার উপর এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর তার নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যারা তাকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলতো তাদের দলীল এই যে, তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি দোলনা হতে কথা বলেছেন, যা তার পূর্বে কখনও ঘটেনি। আর তিন আল্লাহর তৃতীয় আল্লাহ বলার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকে বলেছেনঃ “আমরা করেছি, আমাদের নির্দেশ, আমাদের সৃষ্ট, আমরা মীমাংসা করেছি ইত্যাদি।” সুতরাং যদি আল্লাহ একজনই হতেন তবে এরূপ না বলে বরং বলতেনঃ “আমি করেছি, আমার নির্দেশ, আমার সৃষ্ট, আমি মীমাংসা করেছি। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তিনজন। একজন স্বয়ং আল্লাহ, দ্বিতীয় জন হযরত মারইয়াম এবং তৃতীয় জন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা ঐ অত্যাচারী ও কাফিরদের কথা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাদের এসব কথার অসারতা প্রকাশক আয়াত কুরআন মাজীদের মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনজন পাদরীর সাথে আলোচনা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তখন তারা বলেঃ আমরা তো স্বীকারকারী রয়েছিই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, না, তোমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছি। তারা বলে, আমরা তো আপনার পূর্বেকার মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, তোমাদের এ ইসলাম গ্রহণীয় নয়। কেননা, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান সাব্যস্ত করে থাক, ক্রুশের পূজো কর এবং শূকর খেয়ে থাক। তারা বলে, “আচ্ছা, তাহলে বলুন তো হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা কে ছিলেন? এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন এবং প্রথম হতে আশিটিরও বেশী আয়াত তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) এগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর বর্ণনা করার পর লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ আয়াতগুলো পাঠ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। মুবাহালার আয়াতটি পাঠ করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি স্বীকার না কর তবে এসো আমরা মুবাহালা’য় বের হই। এ কথা শুনে তারা বলে, “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমাদেরকে কিছুদিন সময় দেন। আমরা পরস্পর পরামর্শ করে আপনাকে এর উত্তর দেবো।' তখন তারা নির্জনে বসে আ’কবের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করে যাকে তাদের মধ্যে বড় শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মনে করা হতো। সে তার শেষ সিদ্ধান্তের কথা নিম্ন লিখিত ভাষায় স্বীয় সঙ্গীদেরকে শুনিয়ে দেয়, “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা নিশ্চিতরূপে এটা জেনে। নিয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার সত্য রাসূল। তোমরা এটাও জান যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূলতত্ত্ব তাই যা তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছো। আর তোমরা এটাও খুব ভাল জান যে, যে সম্প্রদায় নবীর সাথে পরস্পর অভিসম্পাত দেয়ার কাজে অংশ নেয় সে সম্প্রদায়ের ছোট বড় কেউ বাকি থাকে না বরং সবাই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যদি তোমরা মুবাহালা’র জন্যে অগ্রসর হও তবে তোমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুতরাং তোমরা ইসলাম ধর্মকেই গ্রহণ করে নাও। আর যদি তোমরা কোনক্রমেই এ ধর্ম গ্রহণ করতে স্বীকৃত না হও এবং ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তোমাদের যে ধারণা রয়েছে ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাও তবে মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাথে সন্ধি করতঃ স্বদেশে ফিরে যাও।” অতএব তারা এ পরামর্শ করতঃ নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা আপনার সাথে মুবাহালা’ করতে প্রস্তুত নই। আপনি আপনার ধর্মের উপর থাকুন এবং আমরা আমাদের ধারণার উপর রয়েছি। কিন্তু আপনি আমাদের সাথে আপনার সহচরদের মধ্যে হতে এমন একজনকে প্রেরণ করুন যার উপর আপনি সন্তুষ্ট রয়েছেন। তিনি আমাদের আর্থিক বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন। আপনারা আমাদের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, তোমরা দুপুরে আবার এসো। আমি একজন খুব বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি এদিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করিনি শুধুমাত্র এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে গুণের প্রশংসা করেছেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট আমিই যেন ঐ গুলোর অধিকারী হতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি সেদিন খুব সকাল সকাল যোহরের নামাযের জন্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করতঃ যোহরের নামায পড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি ডানে বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আমি বারবার আমার জায়গায় উঁচু হতে থাকি যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আমার প্রতি নিপতিত হয়। তিনি মনযোগের সাথে দেখতেই থাকেন। অবশেষে তার দৃষ্টি হযরত আবু উবাইদাই ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তাঁকে তিনি ডেকে বলেনঃ ‘এদের সাথে গমন কর এবং সত্যের সাথে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দাও।' সুতরাং তিনি তাদের সাথে গমন করেন। ইবনে মীরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থের মধ্যেও এ ঘটনাটি এভাবেই নকল করা হয়েছে, কিন্তু তথায় নেতৃবর্গের সংখ্যা রয়েছে বারজন এবং এ ঘটনার মধ্যে কিছু দীর্ঘতাও রয়েছে, তাছাড়া কিছু বেশী কথাও আছে।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাজরানের দু’জন নেতা আকিব ও সায়্যেদ মুবাহালা’র জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। কিন্তু একজন অপরজনকে বলেঃ এ কাজ করো না। আল্লাহর শপথ! যদি ইনি নবী হন আর আমরা তার সাথে মুবাহালা’ করি তবে আমরা আমাদের সন্তানাদিসহ ধ্বংস হয়ে যাব।' সুতরাং তারা একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ ‘জনাব! আপনি আমাদের নিকট যা চাইবেন আমরা তা প্রদান করবো। আপনি আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করুন এবং অবশ্যই বিশ্বস্ত লোককেই পাঠাতে হবে।' তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের সাথে আমি পূর্ণ বিশ্বস্ত লোককেই প্রেরণ করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাকে নির্বাচন করেন এটা দেখার জন্যে তাঁর সহচরবর্গ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।' তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ লোকটিই এ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক উম্মতের বিশ্বস্ত লোক থাকে এবং এ উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হচ্ছে হ্যরত আবু উবাইদাহ্ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল বলেছিলঃ যদি আমি মুহাম্মদ (সঃ)-কে কাবায় নামায পড়তে দেখতাম তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।' বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে এরূপ করতো তবে সবাই দেখতে পেত যে, ফেরেশতাগণ তারই গর্দান উড়িয়ে দিয়েছেন এবং যদি ইয়াহুদীরা মৃত্যুর আখাক্ষা করতো তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু এসে যেতো, আর তারা তাদের স্থান জাহান্নামের আগুনের মধ্যে দেখে নিতো। যেসব খীষ্টানকে মহালার জন্যে আহবান করা হয়েছিল, যদি তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের ধন-সম্পদ ও ছেলে মেয়েকে পেতো না।সহীহ বুখারী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘দালাইলুন্নবুওয়াহ’-এর মধ্যে নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের ঘটনাটি সুদীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে ওটা নকল করছি। কেননা, এতে বহু উপকার রয়েছে। তবে এতে দুর্বলতাও আছে। কিন্ত এ স্থানের সাথে এর যথেষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে। সালমা ইবনে আবদ ইয়াস’ স্বীয় দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি পূর্বে খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন যে, (আরবী) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাজরান বাসীর নিকট একখানা পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এ পত্রটি আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’ৰূদের নামে আরম্ভ করছি। এটা আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরানের বাদশাহ ও ওর অধিবাসীর নিকট। তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আমি তোমাদের সামনে হযরত ইবরাহীম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকবুব (আঃ)-এর প্রভুর প্রশংসা করছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বান্দার উপাসনা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং আমি তোমাদেরকে বান্দার নৈকট্য ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ডাকছি। যদি এটা অস্বীকার কর, তবে অধীনতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া কর প্রদান কর। আর যদি এটাও মানতে সম্মত না হও তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি, ওয়াস্সালাম।' এ পত্র প্রাপ্তির পর বাদশাহ তা পাঠ করেন এবং অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরাহবীল ইবনে অদাআহকে ডেকে পাঠান। সে ছিল হামদান গোত্রের লোক। সে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়লে সর্বপ্রথম অর্থাৎ আইহাম, সায়্যেদ এবং আকেবের পূর্বেও তার নিকট পরামর্শ নেয়া হতো। সে উপস্থিত হলে নেতা তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্রটি প্রদান করেন। তার পড়া হলে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার অভিমত কি?' সে বলে, বাদশাহর খুব ভাল জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হতে একজন নবী পাঠাবার অঙ্গীকার করেছেন। ইনিই হয়তো সেই নবী, এতে বিস্ময়ের কি আছে? নবুওয়াতের বিষয়ে আমি কি অভিমত পেশ করতে পারি? তবে রাজ্যের ব্যাপারে কোন কিছু হলে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে বের করতাম। বাদশাহ তাকে পৃথক জায়গায় বসিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীলকে আহ্বান করেন। এ লোকটিও রাজ্যের একজন পরামর্শদাতা ছিল। সে ছিল হুমায়ের গোত্রের লোক। বাদশাহ তাকে পত্রটি দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন এবং মতামত জিজ্ঞেস করেন। সে ঠিক প্রথম পরামর্শদাতার মতই কথা বলে। একেও বাদশাহ দূরে পৃথক জায়গায় বসিয়ে রাখেন। অতঃপর জাববার ইবনে ফায়েযকে ডাক দেন। এ লোকটি ছিল বানূ হারিস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এও পূর্বের দু’জনের মতই মন্তব্য করেন। বাদশাহ যখন দেখেন যে, ঐ তিন জনের অভিমত একই হয়ে গেছে তখন তিনি নির্দেশ দেন যে, যেন শখ বাজান হয়, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং গীর্জায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথায় এ প্রথা ছিল যে, যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়তো এবং জনগণকে রাত্রে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতো তখন তারা এরূপই করতো। আর দিনের বেলায় লোকদেরকে জমা করার প্রয়োজন হলে তারা গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিতো এবং জোরে জোরে শঙ্খ বাজাতো। এ নির্দেশ হওয়া মাত্রই চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শখের শব্দ সকলকে সতর্ক করে দেয়। পতাকা উত্তোলিত দেখে আশে-পাশের উপত্যকার সমস্ত লোক জমা হয়ে যায়। ঐ উপত্যকার দৈর্ঘ্য এতো বেশী ছিল যে, একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। চলে ওর শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারতো। ওর মধ্যে তিহাত্তরটি গ্রাম ছিল এবং এক লক্ষ বিশ হাজার তরবারী চালক তথায় বাস করতো।এসব লোক এসে গেলে বাদশাহ তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং তাদের মতামত জিজ্ঞেস করেন তখন সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি একবাক্যে বলে যে, শুরাহবীল ইবনে অদাইআহ্ হামদানী, আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীল আসবাহী এবং জাব্বার ইবনে ফায়েয হারেসীকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান হোক। তারা তথা হতে পূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসবে। তখন এখানকার প্রতিনিধি দল এ তিনজনের নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। মদীনায় পৌছে এ লোকগুলো তাদের ভ্রমণের পোষাক খুলে ফেলে এবং লম্বা লম্বা রেশমী চাদর ও লুঙ্গী পরিধান করে। তারা স্বর্ণ নির্মিত আংটি অঙ্গুলিতে পরে নেয়। অতঃপর তারা স্বীয় চাদরের প্রান্ত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয় এবং সালাম জানায়। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। এরা বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে থাকে যে, তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু ঐ রেশমী চাদর, লুঙ্গী এবং সোনার আংটির কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে কোন কথাও বললেন না। তখন এ লোকগুলো হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রাঃ)-এর খোঁজে বের হয়। এ দু'জন মনীষীর সাথেই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তারা মুহাজির ও আনসারের এক সভাস্থলে তাদের দু’জনকে পেয়ে যায়। তাদের নিকট তারা ঘটনাটি বর্ণনা করে বলে, আপনাদের নবী (সঃ) আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন। আমরা তাঁর উত্তর দেবার জন্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছি। আমরা তাঁর নিকট গিয়ে সালাম করি কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দেননি। অতঃপর আমরা তার সাথে কিছু আলোচনা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করি কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোন কথাই বলেননি। অবশেষে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছি। এখন আপনারা বলুন, আমরা কি এমনিই চলে যাবো?' ঐ দু’জন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনিই তাদেরকে উত্তর দিন।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘আমার ধারণায় এ লোকদের এ চাদর, লুঙ্গীগুলো ও আংটিসমূহ খুলে ফেলে দিয়ে ভ্রমণের ঐ সাধারণ পোষাকগুলো পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে পুনরায় উপস্থিত হওয়া উচিত। লোকগুলো তাই করে। তারা ঐ সাধারণ পোষাকেই তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা তাকে সালাম করে এবং তিনি উত্তর দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! এ লোকগুলো যখন আমার নিকট প্রথমবার এসেছিল তখন তাদের সাথে ইবলীস ছিল। তখন প্রশ্ন-উত্তর এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করছিলেন এবং উত্তরও দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে ঐ প্রতিনিধি দলও প্রশ্ন করছিল এবং উত্তর দিচ্ছিল। অবশেষে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে কি বলেন?' তখন তিনি বলেনঃ “আজ আমার নিকট এর উত্তর নেই। তোমরা অপেক্ষা কর, আমার প্রভু এ বিষয়ের যে উত্তর দেবেন আমি তোমাদেরকে তা শুনিয়ে দেবো। পরের দিন তারা পুনরায় আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনই অবতারিত (আরবী)-এ আয়াতটি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তারা এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরের দিন সকাল হওয়া মাত্রই পরস্পর লা'নত দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে স্বীয় চাদরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান, পিছনে পিছনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসছিলেন। সে সময় তার কয়েকজন সহধর্মিণী ছিলেন। শুরাহবীল এ দৃশ্য দেখামাত্র স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে বলেঃ “তোমরা জান যে, নাজরানের সারা উপত্যকা আমার কথা মত চলে এবং আমার মতানুসারেই তারা কাজ করে থাকে। জেনে রেখো যে, এটা খুব জটিল বিষয়। যদি এ লোকটি সত্য সত্যই নবীরূপে প্রেরিত হয়ে থাকেন তবে তার দষ্টিতে সর্বপ্রথম আমরাই অভিশপ্ত হবো এবং তার নবুওয়াতকে সর্বপ্রথম দরে নিক্ষেপকারীরূপে সাব্যস্ত আমরাই হবো। এ কথাটি তাঁর ও তাঁর সহচরদের অন্তর হতে মুছে যাবে না এবং আমাদের উপর কোন না কোন বিপদ আপতিত হবে। সারা আরবে তার সবচেয়ে নিকটতম আমিই। আর জেনে রেখো যে, যদি তিনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে মুবাহালা করা মাত্রই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমাদের একটি চুল বা নখ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না। তখন তাঁর সঙ্গীদ্বয় বলে, “হে আবূ মারইয়াম! আপনার অভিমত কি?' সে বলে, আমার মত এই যে, তাকে আমরা নির্দেশ দাতা বানিয়ে দেই। তিনি যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। তিনি কখনও অন্যায় নির্দেশ দেবেন না। তারা দু’জন। শুরাহবীলের কথা সমর্থন করে। তখন শুরাহবীল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, জনাব, আমি মুবাহালা’ অপেক্ষা উত্তম জিনিস আপনার সামনে পেশ করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সেটা কি?' সে বলে, আজকের দিন, আগামী রাত্রি এবং কাল সকাল পর্যন্ত আপনি আমাদের সম্বন্ধে যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “সম্ভবতঃ অন্যান্য লোক তোমাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না।শুরাহবীল বলেঃ আপনি আমার এ সঙ্গীদ্বয়কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিন।' তিনি ঐ দু’জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ ‘সারা উপত্যকার লোক তাঁরই মতের উপর চলে থাকে। তথায় এমন কেউ নেই যে তার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুবাহালা’ হতে বিরত হন, তারা তখনকার মত ফিরে যায়। পরের দিন সকালেই তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চুক্তিপত্র তাদের হাতে দেন। বিসমিল্লাহ'-এর পরে ঐ চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ‘এ চুক্তিপত্রটি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরান বাসীদের জন্য লিখিত হলো। তাদের প্রত্যেক হলদে, সাদা, কৃষ্ণ এবং গোলামের উপর আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হুকুম জারী ছিল। কিন্তু তিনি সবই তাদের হাতে ছেড়ে দিলেন। প্রতি বছর তারা শুধু দু’হাজার হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) প্রদান করবে। এক হাজার দেবে রজব মাসে ও এক হাজার সফর মাসে ইত্যাদি।' পূর্ণ চুক্তিপত্র তাদেরকে দেয়া হয়। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তাদের প্রতিনিধি দল হিজরী নবম সনে এসেছিল। কেননা, হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম ঐ নাজরানবাসীরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিযিয়া কর প্রদান করে। আর জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) (৯:২৯) শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতে কিতাবীদের নিকট হতে জিযিয়া গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় গ্রন্থে লিখেছেন যে, আকিব ও তায়্যেব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে ‘মুবাহালা’র জন্যে আহ্বান করেন এবং তিনি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদেরকে বলে পাঠালে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই আল্লাহর শপথ! যদি এরা দু’জন ‘না’ বলতো তবে এ উপত্যকাই তাদের উপর অগ্নি বর্ষণ করতো। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), ও হযরত আলী (রাঃ) শব্দের দ্বারা হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং শব্দ দ্বারা হযরত ফাতিমা যুহরা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুসতাদরিক-ই-হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ অর্থের হাদীস বর্ণিত আছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি তা চরম সত্য। এতে চুল পরিমাণও বেশী কম নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, অন্য কেউ নয়। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহান বিজ্ঞানময়। কিন্তু এখনও যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্য কিছু মানতে থাকে তবে আল্লাহ তা'আলা বাতিলপন্থী ও বিবাদীদেরকে ভাল করেই জানেন। তিনি তাদেরকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন এবং এর উপরে তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কেউ না পারবে তার নিকট হতে পালাতে না পারবে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আমরা তার শাস্তি হতে তারই নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
আলে ইমরান 3:60
৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আমি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমরা খুব বিস্ময়বোধ করছে? তার পূর্বে তো আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি, অথচ তার বাপও ছিল না, মাও ছিল না। বরং তাকে আমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম- “হে আদম! তুমি হও’, আর তেমনি সে হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমি যখন বিনা বাপ-মায়ে সৃষ্টি করতে পেরেছি তখন শুধু মায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা আমার কাছে কি কোন কঠিন কাজ? সুতরাং শুধু বাপ না হওয়ার কারণে যদি হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখতে পারে, তবে তো হযরত আদম আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হওয়ার আরও বেশী দাবীদার। (নাউজুবিল্লাহে) কিন্তু স্বয়ং তোমরাও তো তা স্বীকার কর না। কাজেই হযরত ঈসা (আঃ)-কে এ মর্যাদা হতে সরিয়ে ফেলা আরও উত্তম। কেননা, পুত্ৰত্বের দাবীর অসারতা ওখানের চাইতে এখানেই বেশী স্পষ্ট। কারণ এখানে তো মা আছে কিন্তু ওখানে মা ও বাপ কেউ ছিল না। এগুলো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি আদম (আঃ)-কে নারী পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হযরত হাওয়া (আঃ)-কে শুধু পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ‘সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তাকে (ঈসা আঃ-কে) মানুষের জন্যে আমার ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়েছি।' (১৯:২১) আর এখানে বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা এটাই। এটা ছাড়া কম বেশীর কোন স্থানই নেই। কেননা, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতারই স্থান। সুতরাং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্দেহ পোষণ করা মোটেই উচিত নয়।অতঃপর আল্লাহ পাক তার নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পরেও যদি কোন লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তুমি তাদেরকে মুবাহালার’ (পরস্পর বদ দু'আ করার) জন্যে আহবান করতঃ বল- “এসো আমরা উভয় দল আমাদের পুত্রদেরকে এবং স্ত্রীদেরকে নিয়ে মুবাহালার জন্যে বেরিয়ে যাই এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল মিথ্যাবাদী তার উপর আপনি আপনার অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।মুবাহালা’য় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রথম হতে এ পর্যন্ত এ সমুদয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিগণ। ঐলোকগণ এখানে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার অংশীদার এবং তাঁর পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) কাজেই তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডন ও তাদের কথার উত্তরে এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সীরাতে লিখেছেন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও নিজ নিজ পুস্তকসমূহে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানের খ্রীষ্টানগণ প্রতিনিধি হিসেবে ষাটজন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করে, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন তাদের নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ (১) আকিব, যার নাম ছিল আবদুল মাসীহ, (২) সায়্যেদ, যার নাম ছিল আইহাম, (৩) আবু হারিসা ইবনে আলকামা, যে ছিল বাকর ইবনে অয়েলের ভাই, (৪) ওয়ারিস ইবনে হারিস, (৫) যায়েদ, (৬) কায়েস, (৭) ইয়াযীদ, (৮) ও (৯) তার দু'টি পুত্র (১০) খুয়াইলিদ, (১১) আমর, (১২) খালিদ, (১৩) আবদুল্লাহ এবং (১৪) মুহসীন। এ চৌদ্দজন ছিল তাদের নেতা এবং এদের মধ্যে আবার তিনজন বড় নেতা ছিল। তারা হচ্ছেঃ (১) আকিব, এ লোকটি ছিল কওমের আমীর এবং তাকে জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হতো, আর তার অভিমতের উপরেই জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। (২) সায়্যেদ, এ লোকটি ছিল তাদের একজন বড় পাদরী ও উঁচু দরের শিক্ষক। সে বানূ বাকর ইবনে ওয়েলের আরব গোত্রভুক্ত ছিল। কিন্তু সে খ্রীষ্টান হয়ে গিয়েছিল। রোমকদের নিকট তার খুব সম্মান ছিল। তারা তার জন্যে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করেছিল। তার ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা দেখে তারা অত্যন্ত খাতির সম্মান করতো। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিল। কারণ, সে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে তাঁর বিশেষণ সম্বন্ধে পড়েছিল। অন্তরে সে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করতো। কিন্তু খ্রীষ্টানদের নিকট তার যে খাতির-সম্মান ছিল তা লোপ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে সুপথের দিকে আসতো না এবং (৩) হারিসা ইবনে আলকামা। মোটকথা এ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয় এবং সে সময় তিনি আসরের নামায সমাধা করে মসজিদে বসেছিলেন। এ লোকগুলো মূল্যবান পোষাক পরিহিত ছিল এবং তাদের গায়ে ছিল সুন্দর ও নরম চাদরসমূহ। তাদেরকে দেখে বানূ হারিস ইবনে কা'বের বংশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) মন্তব্য করেন যে, ওদের পরে ঐরকম জাঁকজমকপূর্ণ আর কোন প্রতিনিধি কখনও আসেনি। তাদের নামাযের সময় হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে তারা মসজিদে নববীতেই পূর্ব দিকে মুখ করে তাদের নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করে নেয়। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাদের আলোচনা শুরু হয়। মুখপাত্র হিসেবে নিম্নের তিনজনই কথা বলছিলঃ (১) হারেসা ইবনে আলকামা, (২) আকিব অর্থাৎ আবদুল মাসীহ এবং (৩) সায়্যেদ অর্থাৎ আইহাম। এরা শাহী মাযহাবের লোক ছিল বটে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে মতভেদ রাখতো। হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তাদের তিনটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ তিনি নিজেই আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র এবং তিন আল্লাহর মধ্যে এক আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অপবিত্র কথা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রায় সমস্ত খ্রীষ্টানেরই এ বিশ্বাস। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আল্লাহ হওয়ার দলীল তাদের নিকট এই ছিল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধদেরকে চক্ষু দান করতেন, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতেন, ভবিষ্যতের সংবাদ দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখী তৈরী করতঃ ওর মধ্যে ফুঁদিয়ে উড়িয়ে দিতেন। এর উত্তর এই যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এ সমস্ত কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পেতো। কারণ এই যে, যেন তার কথা সত্য হওয়ার উপর এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর তার নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যারা তাকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলতো তাদের দলীল এই যে, তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি দোলনা হতে কথা বলেছেন, যা তার পূর্বে কখনও ঘটেনি। আর তিন আল্লাহর তৃতীয় আল্লাহ বলার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকে বলেছেনঃ “আমরা করেছি, আমাদের নির্দেশ, আমাদের সৃষ্ট, আমরা মীমাংসা করেছি ইত্যাদি।” সুতরাং যদি আল্লাহ একজনই হতেন তবে এরূপ না বলে বরং বলতেনঃ “আমি করেছি, আমার নির্দেশ, আমার সৃষ্ট, আমি মীমাংসা করেছি। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তিনজন। একজন স্বয়ং আল্লাহ, দ্বিতীয় জন হযরত মারইয়াম এবং তৃতীয় জন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা ঐ অত্যাচারী ও কাফিরদের কথা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাদের এসব কথার অসারতা প্রকাশক আয়াত কুরআন মাজীদের মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনজন পাদরীর সাথে আলোচনা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তখন তারা বলেঃ আমরা তো স্বীকারকারী রয়েছিই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, না, তোমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছি। তারা বলে, আমরা তো আপনার পূর্বেকার মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, তোমাদের এ ইসলাম গ্রহণীয় নয়। কেননা, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান সাব্যস্ত করে থাক, ক্রুশের পূজো কর এবং শূকর খেয়ে থাক। তারা বলে, “আচ্ছা, তাহলে বলুন তো হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা কে ছিলেন? এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন এবং প্রথম হতে আশিটিরও বেশী আয়াত তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) এগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর বর্ণনা করার পর লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ আয়াতগুলো পাঠ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। মুবাহালার আয়াতটি পাঠ করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি স্বীকার না কর তবে এসো আমরা মুবাহালা’য় বের হই। এ কথা শুনে তারা বলে, “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমাদেরকে কিছুদিন সময় দেন। আমরা পরস্পর পরামর্শ করে আপনাকে এর উত্তর দেবো।' তখন তারা নির্জনে বসে আ’কবের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করে যাকে তাদের মধ্যে বড় শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মনে করা হতো। সে তার শেষ সিদ্ধান্তের কথা নিম্ন লিখিত ভাষায় স্বীয় সঙ্গীদেরকে শুনিয়ে দেয়, “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা নিশ্চিতরূপে এটা জেনে। নিয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার সত্য রাসূল। তোমরা এটাও জান যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূলতত্ত্ব তাই যা তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছো। আর তোমরা এটাও খুব ভাল জান যে, যে সম্প্রদায় নবীর সাথে পরস্পর অভিসম্পাত দেয়ার কাজে অংশ নেয় সে সম্প্রদায়ের ছোট বড় কেউ বাকি থাকে না বরং সবাই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যদি তোমরা মুবাহালা’র জন্যে অগ্রসর হও তবে তোমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুতরাং তোমরা ইসলাম ধর্মকেই গ্রহণ করে নাও। আর যদি তোমরা কোনক্রমেই এ ধর্ম গ্রহণ করতে স্বীকৃত না হও এবং ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তোমাদের যে ধারণা রয়েছে ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাও তবে মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাথে সন্ধি করতঃ স্বদেশে ফিরে যাও।” অতএব তারা এ পরামর্শ করতঃ নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা আপনার সাথে মুবাহালা’ করতে প্রস্তুত নই। আপনি আপনার ধর্মের উপর থাকুন এবং আমরা আমাদের ধারণার উপর রয়েছি। কিন্তু আপনি আমাদের সাথে আপনার সহচরদের মধ্যে হতে এমন একজনকে প্রেরণ করুন যার উপর আপনি সন্তুষ্ট রয়েছেন। তিনি আমাদের আর্থিক বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন। আপনারা আমাদের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, তোমরা দুপুরে আবার এসো। আমি একজন খুব বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি এদিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করিনি শুধুমাত্র এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে গুণের প্রশংসা করেছেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট আমিই যেন ঐ গুলোর অধিকারী হতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি সেদিন খুব সকাল সকাল যোহরের নামাযের জন্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করতঃ যোহরের নামায পড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি ডানে বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আমি বারবার আমার জায়গায় উঁচু হতে থাকি যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আমার প্রতি নিপতিত হয়। তিনি মনযোগের সাথে দেখতেই থাকেন। অবশেষে তার দৃষ্টি হযরত আবু উবাইদাই ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তাঁকে তিনি ডেকে বলেনঃ ‘এদের সাথে গমন কর এবং সত্যের সাথে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দাও।' সুতরাং তিনি তাদের সাথে গমন করেন। ইবনে মীরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থের মধ্যেও এ ঘটনাটি এভাবেই নকল করা হয়েছে, কিন্তু তথায় নেতৃবর্গের সংখ্যা রয়েছে বারজন এবং এ ঘটনার মধ্যে কিছু দীর্ঘতাও রয়েছে, তাছাড়া কিছু বেশী কথাও আছে।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাজরানের দু’জন নেতা আকিব ও সায়্যেদ মুবাহালা’র জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। কিন্তু একজন অপরজনকে বলেঃ এ কাজ করো না। আল্লাহর শপথ! যদি ইনি নবী হন আর আমরা তার সাথে মুবাহালা’ করি তবে আমরা আমাদের সন্তানাদিসহ ধ্বংস হয়ে যাব।' সুতরাং তারা একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ ‘জনাব! আপনি আমাদের নিকট যা চাইবেন আমরা তা প্রদান করবো। আপনি আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করুন এবং অবশ্যই বিশ্বস্ত লোককেই পাঠাতে হবে।' তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের সাথে আমি পূর্ণ বিশ্বস্ত লোককেই প্রেরণ করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাকে নির্বাচন করেন এটা দেখার জন্যে তাঁর সহচরবর্গ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।' তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ লোকটিই এ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক উম্মতের বিশ্বস্ত লোক থাকে এবং এ উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হচ্ছে হ্যরত আবু উবাইদাহ্ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল বলেছিলঃ যদি আমি মুহাম্মদ (সঃ)-কে কাবায় নামায পড়তে দেখতাম তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।' বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে এরূপ করতো তবে সবাই দেখতে পেত যে, ফেরেশতাগণ তারই গর্দান উড়িয়ে দিয়েছেন এবং যদি ইয়াহুদীরা মৃত্যুর আখাক্ষা করতো তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু এসে যেতো, আর তারা তাদের স্থান জাহান্নামের আগুনের মধ্যে দেখে নিতো। যেসব খীষ্টানকে মহালার জন্যে আহবান করা হয়েছিল, যদি তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের ধন-সম্পদ ও ছেলে মেয়েকে পেতো না।সহীহ বুখারী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘দালাইলুন্নবুওয়াহ’-এর মধ্যে নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের ঘটনাটি সুদীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে ওটা নকল করছি। কেননা, এতে বহু উপকার রয়েছে। তবে এতে দুর্বলতাও আছে। কিন্ত এ স্থানের সাথে এর যথেষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে। সালমা ইবনে আবদ ইয়াস’ স্বীয় দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি পূর্বে খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন যে, (আরবী) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাজরান বাসীর নিকট একখানা পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এ পত্রটি আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’ৰূদের নামে আরম্ভ করছি। এটা আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরানের বাদশাহ ও ওর অধিবাসীর নিকট। তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আমি তোমাদের সামনে হযরত ইবরাহীম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকবুব (আঃ)-এর প্রভুর প্রশংসা করছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বান্দার উপাসনা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং আমি তোমাদেরকে বান্দার নৈকট্য ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ডাকছি। যদি এটা অস্বীকার কর, তবে অধীনতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া কর প্রদান কর। আর যদি এটাও মানতে সম্মত না হও তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি, ওয়াস্সালাম।' এ পত্র প্রাপ্তির পর বাদশাহ তা পাঠ করেন এবং অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরাহবীল ইবনে অদাআহকে ডেকে পাঠান। সে ছিল হামদান গোত্রের লোক। সে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়লে সর্বপ্রথম অর্থাৎ আইহাম, সায়্যেদ এবং আকেবের পূর্বেও তার নিকট পরামর্শ নেয়া হতো। সে উপস্থিত হলে নেতা তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্রটি প্রদান করেন। তার পড়া হলে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার অভিমত কি?' সে বলে, বাদশাহর খুব ভাল জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হতে একজন নবী পাঠাবার অঙ্গীকার করেছেন। ইনিই হয়তো সেই নবী, এতে বিস্ময়ের কি আছে? নবুওয়াতের বিষয়ে আমি কি অভিমত পেশ করতে পারি? তবে রাজ্যের ব্যাপারে কোন কিছু হলে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে বের করতাম। বাদশাহ তাকে পৃথক জায়গায় বসিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীলকে আহ্বান করেন। এ লোকটিও রাজ্যের একজন পরামর্শদাতা ছিল। সে ছিল হুমায়ের গোত্রের লোক। বাদশাহ তাকে পত্রটি দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন এবং মতামত জিজ্ঞেস করেন। সে ঠিক প্রথম পরামর্শদাতার মতই কথা বলে। একেও বাদশাহ দূরে পৃথক জায়গায় বসিয়ে রাখেন। অতঃপর জাববার ইবনে ফায়েযকে ডাক দেন। এ লোকটি ছিল বানূ হারিস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এও পূর্বের দু’জনের মতই মন্তব্য করেন। বাদশাহ যখন দেখেন যে, ঐ তিন জনের অভিমত একই হয়ে গেছে তখন তিনি নির্দেশ দেন যে, যেন শখ বাজান হয়, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং গীর্জায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথায় এ প্রথা ছিল যে, যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়তো এবং জনগণকে রাত্রে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতো তখন তারা এরূপই করতো। আর দিনের বেলায় লোকদেরকে জমা করার প্রয়োজন হলে তারা গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিতো এবং জোরে জোরে শঙ্খ বাজাতো। এ নির্দেশ হওয়া মাত্রই চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শখের শব্দ সকলকে সতর্ক করে দেয়। পতাকা উত্তোলিত দেখে আশে-পাশের উপত্যকার সমস্ত লোক জমা হয়ে যায়। ঐ উপত্যকার দৈর্ঘ্য এতো বেশী ছিল যে, একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। চলে ওর শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারতো। ওর মধ্যে তিহাত্তরটি গ্রাম ছিল এবং এক লক্ষ বিশ হাজার তরবারী চালক তথায় বাস করতো।এসব লোক এসে গেলে বাদশাহ তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং তাদের মতামত জিজ্ঞেস করেন তখন সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি একবাক্যে বলে যে, শুরাহবীল ইবনে অদাইআহ্ হামদানী, আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীল আসবাহী এবং জাব্বার ইবনে ফায়েয হারেসীকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান হোক। তারা তথা হতে পূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসবে। তখন এখানকার প্রতিনিধি দল এ তিনজনের নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। মদীনায় পৌছে এ লোকগুলো তাদের ভ্রমণের পোষাক খুলে ফেলে এবং লম্বা লম্বা রেশমী চাদর ও লুঙ্গী পরিধান করে। তারা স্বর্ণ নির্মিত আংটি অঙ্গুলিতে পরে নেয়। অতঃপর তারা স্বীয় চাদরের প্রান্ত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয় এবং সালাম জানায়। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। এরা বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে থাকে যে, তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু ঐ রেশমী চাদর, লুঙ্গী এবং সোনার আংটির কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে কোন কথাও বললেন না। তখন এ লোকগুলো হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রাঃ)-এর খোঁজে বের হয়। এ দু'জন মনীষীর সাথেই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তারা মুহাজির ও আনসারের এক সভাস্থলে তাদের দু’জনকে পেয়ে যায়। তাদের নিকট তারা ঘটনাটি বর্ণনা করে বলে, আপনাদের নবী (সঃ) আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন। আমরা তাঁর উত্তর দেবার জন্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছি। আমরা তাঁর নিকট গিয়ে সালাম করি কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দেননি। অতঃপর আমরা তার সাথে কিছু আলোচনা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করি কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোন কথাই বলেননি। অবশেষে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছি। এখন আপনারা বলুন, আমরা কি এমনিই চলে যাবো?' ঐ দু’জন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনিই তাদেরকে উত্তর দিন।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘আমার ধারণায় এ লোকদের এ চাদর, লুঙ্গীগুলো ও আংটিসমূহ খুলে ফেলে দিয়ে ভ্রমণের ঐ সাধারণ পোষাকগুলো পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে পুনরায় উপস্থিত হওয়া উচিত। লোকগুলো তাই করে। তারা ঐ সাধারণ পোষাকেই তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা তাকে সালাম করে এবং তিনি উত্তর দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! এ লোকগুলো যখন আমার নিকট প্রথমবার এসেছিল তখন তাদের সাথে ইবলীস ছিল। তখন প্রশ্ন-উত্তর এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করছিলেন এবং উত্তরও দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে ঐ প্রতিনিধি দলও প্রশ্ন করছিল এবং উত্তর দিচ্ছিল। অবশেষে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে কি বলেন?' তখন তিনি বলেনঃ “আজ আমার নিকট এর উত্তর নেই। তোমরা অপেক্ষা কর, আমার প্রভু এ বিষয়ের যে উত্তর দেবেন আমি তোমাদেরকে তা শুনিয়ে দেবো। পরের দিন তারা পুনরায় আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনই অবতারিত (আরবী)-এ আয়াতটি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তারা এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরের দিন সকাল হওয়া মাত্রই পরস্পর লা'নত দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে স্বীয় চাদরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান, পিছনে পিছনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসছিলেন। সে সময় তার কয়েকজন সহধর্মিণী ছিলেন। শুরাহবীল এ দৃশ্য দেখামাত্র স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে বলেঃ “তোমরা জান যে, নাজরানের সারা উপত্যকা আমার কথা মত চলে এবং আমার মতানুসারেই তারা কাজ করে থাকে। জেনে রেখো যে, এটা খুব জটিল বিষয়। যদি এ লোকটি সত্য সত্যই নবীরূপে প্রেরিত হয়ে থাকেন তবে তার দষ্টিতে সর্বপ্রথম আমরাই অভিশপ্ত হবো এবং তার নবুওয়াতকে সর্বপ্রথম দরে নিক্ষেপকারীরূপে সাব্যস্ত আমরাই হবো। এ কথাটি তাঁর ও তাঁর সহচরদের অন্তর হতে মুছে যাবে না এবং আমাদের উপর কোন না কোন বিপদ আপতিত হবে। সারা আরবে তার সবচেয়ে নিকটতম আমিই। আর জেনে রেখো যে, যদি তিনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে মুবাহালা করা মাত্রই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমাদের একটি চুল বা নখ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না। তখন তাঁর সঙ্গীদ্বয় বলে, “হে আবূ মারইয়াম! আপনার অভিমত কি?' সে বলে, আমার মত এই যে, তাকে আমরা নির্দেশ দাতা বানিয়ে দেই। তিনি যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। তিনি কখনও অন্যায় নির্দেশ দেবেন না। তারা দু’জন। শুরাহবীলের কথা সমর্থন করে। তখন শুরাহবীল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, জনাব, আমি মুবাহালা’ অপেক্ষা উত্তম জিনিস আপনার সামনে পেশ করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সেটা কি?' সে বলে, আজকের দিন, আগামী রাত্রি এবং কাল সকাল পর্যন্ত আপনি আমাদের সম্বন্ধে যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “সম্ভবতঃ অন্যান্য লোক তোমাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না।শুরাহবীল বলেঃ আপনি আমার এ সঙ্গীদ্বয়কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিন।' তিনি ঐ দু’জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ ‘সারা উপত্যকার লোক তাঁরই মতের উপর চলে থাকে। তথায় এমন কেউ নেই যে তার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুবাহালা’ হতে বিরত হন, তারা তখনকার মত ফিরে যায়। পরের দিন সকালেই তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চুক্তিপত্র তাদের হাতে দেন। বিসমিল্লাহ'-এর পরে ঐ চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ‘এ চুক্তিপত্রটি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরান বাসীদের জন্য লিখিত হলো। তাদের প্রত্যেক হলদে, সাদা, কৃষ্ণ এবং গোলামের উপর আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হুকুম জারী ছিল। কিন্তু তিনি সবই তাদের হাতে ছেড়ে দিলেন। প্রতি বছর তারা শুধু দু’হাজার হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) প্রদান করবে। এক হাজার দেবে রজব মাসে ও এক হাজার সফর মাসে ইত্যাদি।' পূর্ণ চুক্তিপত্র তাদেরকে দেয়া হয়। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তাদের প্রতিনিধি দল হিজরী নবম সনে এসেছিল। কেননা, হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম ঐ নাজরানবাসীরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিযিয়া কর প্রদান করে। আর জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) (৯:২৯) শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতে কিতাবীদের নিকট হতে জিযিয়া গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় গ্রন্থে লিখেছেন যে, আকিব ও তায়্যেব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে ‘মুবাহালা’র জন্যে আহ্বান করেন এবং তিনি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদেরকে বলে পাঠালে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই আল্লাহর শপথ! যদি এরা দু’জন ‘না’ বলতো তবে এ উপত্যকাই তাদের উপর অগ্নি বর্ষণ করতো। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), ও হযরত আলী (রাঃ) শব্দের দ্বারা হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং শব্দ দ্বারা হযরত ফাতিমা যুহরা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুসতাদরিক-ই-হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ অর্থের হাদীস বর্ণিত আছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি তা চরম সত্য। এতে চুল পরিমাণও বেশী কম নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, অন্য কেউ নয়। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহান বিজ্ঞানময়। কিন্তু এখনও যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্য কিছু মানতে থাকে তবে আল্লাহ তা'আলা বাতিলপন্থী ও বিবাদীদেরকে ভাল করেই জানেন। তিনি তাদেরকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন এবং এর উপরে তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কেউ না পারবে তার নিকট হতে পালাতে না পারবে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আমরা তার শাস্তি হতে তারই নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
আলে ইমরান 3:61
৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আমি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমরা খুব বিস্ময়বোধ করছে? তার পূর্বে তো আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি, অথচ তার বাপও ছিল না, মাও ছিল না। বরং তাকে আমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম- “হে আদম! তুমি হও’, আর তেমনি সে হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমি যখন বিনা বাপ-মায়ে সৃষ্টি করতে পেরেছি তখন শুধু মায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা আমার কাছে কি কোন কঠিন কাজ? সুতরাং শুধু বাপ না হওয়ার কারণে যদি হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখতে পারে, তবে তো হযরত আদম আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হওয়ার আরও বেশী দাবীদার। (নাউজুবিল্লাহে) কিন্তু স্বয়ং তোমরাও তো তা স্বীকার কর না। কাজেই হযরত ঈসা (আঃ)-কে এ মর্যাদা হতে সরিয়ে ফেলা আরও উত্তম। কেননা, পুত্ৰত্বের দাবীর অসারতা ওখানের চাইতে এখানেই বেশী স্পষ্ট। কারণ এখানে তো মা আছে কিন্তু ওখানে মা ও বাপ কেউ ছিল না। এগুলো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি আদম (আঃ)-কে নারী পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হযরত হাওয়া (আঃ)-কে শুধু পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ‘সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তাকে (ঈসা আঃ-কে) মানুষের জন্যে আমার ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়েছি।' (১৯:২১) আর এখানে বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা এটাই। এটা ছাড়া কম বেশীর কোন স্থানই নেই। কেননা, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতারই স্থান। সুতরাং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্দেহ পোষণ করা মোটেই উচিত নয়।অতঃপর আল্লাহ পাক তার নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পরেও যদি কোন লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তুমি তাদেরকে মুবাহালার’ (পরস্পর বদ দু'আ করার) জন্যে আহবান করতঃ বল- “এসো আমরা উভয় দল আমাদের পুত্রদেরকে এবং স্ত্রীদেরকে নিয়ে মুবাহালার জন্যে বেরিয়ে যাই এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল মিথ্যাবাদী তার উপর আপনি আপনার অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।মুবাহালা’য় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রথম হতে এ পর্যন্ত এ সমুদয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিগণ। ঐলোকগণ এখানে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার অংশীদার এবং তাঁর পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) কাজেই তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডন ও তাদের কথার উত্তরে এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সীরাতে লিখেছেন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও নিজ নিজ পুস্তকসমূহে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানের খ্রীষ্টানগণ প্রতিনিধি হিসেবে ষাটজন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করে, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন তাদের নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ (১) আকিব, যার নাম ছিল আবদুল মাসীহ, (২) সায়্যেদ, যার নাম ছিল আইহাম, (৩) আবু হারিসা ইবনে আলকামা, যে ছিল বাকর ইবনে অয়েলের ভাই, (৪) ওয়ারিস ইবনে হারিস, (৫) যায়েদ, (৬) কায়েস, (৭) ইয়াযীদ, (৮) ও (৯) তার দু'টি পুত্র (১০) খুয়াইলিদ, (১১) আমর, (১২) খালিদ, (১৩) আবদুল্লাহ এবং (১৪) মুহসীন। এ চৌদ্দজন ছিল তাদের নেতা এবং এদের মধ্যে আবার তিনজন বড় নেতা ছিল। তারা হচ্ছেঃ (১) আকিব, এ লোকটি ছিল কওমের আমীর এবং তাকে জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হতো, আর তার অভিমতের উপরেই জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। (২) সায়্যেদ, এ লোকটি ছিল তাদের একজন বড় পাদরী ও উঁচু দরের শিক্ষক। সে বানূ বাকর ইবনে ওয়েলের আরব গোত্রভুক্ত ছিল। কিন্তু সে খ্রীষ্টান হয়ে গিয়েছিল। রোমকদের নিকট তার খুব সম্মান ছিল। তারা তার জন্যে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করেছিল। তার ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা দেখে তারা অত্যন্ত খাতির সম্মান করতো। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিল। কারণ, সে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে তাঁর বিশেষণ সম্বন্ধে পড়েছিল। অন্তরে সে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করতো। কিন্তু খ্রীষ্টানদের নিকট তার যে খাতির-সম্মান ছিল তা লোপ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে সুপথের দিকে আসতো না এবং (৩) হারিসা ইবনে আলকামা। মোটকথা এ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয় এবং সে সময় তিনি আসরের নামায সমাধা করে মসজিদে বসেছিলেন। এ লোকগুলো মূল্যবান পোষাক পরিহিত ছিল এবং তাদের গায়ে ছিল সুন্দর ও নরম চাদরসমূহ। তাদেরকে দেখে বানূ হারিস ইবনে কা'বের বংশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) মন্তব্য করেন যে, ওদের পরে ঐরকম জাঁকজমকপূর্ণ আর কোন প্রতিনিধি কখনও আসেনি। তাদের নামাযের সময় হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে তারা মসজিদে নববীতেই পূর্ব দিকে মুখ করে তাদের নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করে নেয়। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাদের আলোচনা শুরু হয়। মুখপাত্র হিসেবে নিম্নের তিনজনই কথা বলছিলঃ (১) হারেসা ইবনে আলকামা, (২) আকিব অর্থাৎ আবদুল মাসীহ এবং (৩) সায়্যেদ অর্থাৎ আইহাম। এরা শাহী মাযহাবের লোক ছিল বটে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে মতভেদ রাখতো। হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তাদের তিনটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ তিনি নিজেই আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র এবং তিন আল্লাহর মধ্যে এক আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অপবিত্র কথা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রায় সমস্ত খ্রীষ্টানেরই এ বিশ্বাস। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আল্লাহ হওয়ার দলীল তাদের নিকট এই ছিল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধদেরকে চক্ষু দান করতেন, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতেন, ভবিষ্যতের সংবাদ দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখী তৈরী করতঃ ওর মধ্যে ফুঁদিয়ে উড়িয়ে দিতেন। এর উত্তর এই যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এ সমস্ত কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পেতো। কারণ এই যে, যেন তার কথা সত্য হওয়ার উপর এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর তার নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যারা তাকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলতো তাদের দলীল এই যে, তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি দোলনা হতে কথা বলেছেন, যা তার পূর্বে কখনও ঘটেনি। আর তিন আল্লাহর তৃতীয় আল্লাহ বলার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকে বলেছেনঃ “আমরা করেছি, আমাদের নির্দেশ, আমাদের সৃষ্ট, আমরা মীমাংসা করেছি ইত্যাদি।” সুতরাং যদি আল্লাহ একজনই হতেন তবে এরূপ না বলে বরং বলতেনঃ “আমি করেছি, আমার নির্দেশ, আমার সৃষ্ট, আমি মীমাংসা করেছি। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তিনজন। একজন স্বয়ং আল্লাহ, দ্বিতীয় জন হযরত মারইয়াম এবং তৃতীয় জন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা ঐ অত্যাচারী ও কাফিরদের কথা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাদের এসব কথার অসারতা প্রকাশক আয়াত কুরআন মাজীদের মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনজন পাদরীর সাথে আলোচনা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তখন তারা বলেঃ আমরা তো স্বীকারকারী রয়েছিই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, না, তোমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছি। তারা বলে, আমরা তো আপনার পূর্বেকার মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, তোমাদের এ ইসলাম গ্রহণীয় নয়। কেননা, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান সাব্যস্ত করে থাক, ক্রুশের পূজো কর এবং শূকর খেয়ে থাক। তারা বলে, “আচ্ছা, তাহলে বলুন তো হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা কে ছিলেন? এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন এবং প্রথম হতে আশিটিরও বেশী আয়াত তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) এগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর বর্ণনা করার পর লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ আয়াতগুলো পাঠ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। মুবাহালার আয়াতটি পাঠ করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি স্বীকার না কর তবে এসো আমরা মুবাহালা’য় বের হই। এ কথা শুনে তারা বলে, “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমাদেরকে কিছুদিন সময় দেন। আমরা পরস্পর পরামর্শ করে আপনাকে এর উত্তর দেবো।' তখন তারা নির্জনে বসে আ’কবের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করে যাকে তাদের মধ্যে বড় শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মনে করা হতো। সে তার শেষ সিদ্ধান্তের কথা নিম্ন লিখিত ভাষায় স্বীয় সঙ্গীদেরকে শুনিয়ে দেয়, “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা নিশ্চিতরূপে এটা জেনে। নিয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার সত্য রাসূল। তোমরা এটাও জান যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূলতত্ত্ব তাই যা তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছো। আর তোমরা এটাও খুব ভাল জান যে, যে সম্প্রদায় নবীর সাথে পরস্পর অভিসম্পাত দেয়ার কাজে অংশ নেয় সে সম্প্রদায়ের ছোট বড় কেউ বাকি থাকে না বরং সবাই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যদি তোমরা মুবাহালা’র জন্যে অগ্রসর হও তবে তোমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুতরাং তোমরা ইসলাম ধর্মকেই গ্রহণ করে নাও। আর যদি তোমরা কোনক্রমেই এ ধর্ম গ্রহণ করতে স্বীকৃত না হও এবং ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তোমাদের যে ধারণা রয়েছে ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাও তবে মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাথে সন্ধি করতঃ স্বদেশে ফিরে যাও।” অতএব তারা এ পরামর্শ করতঃ নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা আপনার সাথে মুবাহালা’ করতে প্রস্তুত নই। আপনি আপনার ধর্মের উপর থাকুন এবং আমরা আমাদের ধারণার উপর রয়েছি। কিন্তু আপনি আমাদের সাথে আপনার সহচরদের মধ্যে হতে এমন একজনকে প্রেরণ করুন যার উপর আপনি সন্তুষ্ট রয়েছেন। তিনি আমাদের আর্থিক বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন। আপনারা আমাদের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, তোমরা দুপুরে আবার এসো। আমি একজন খুব বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি এদিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করিনি শুধুমাত্র এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে গুণের প্রশংসা করেছেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট আমিই যেন ঐ গুলোর অধিকারী হতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি সেদিন খুব সকাল সকাল যোহরের নামাযের জন্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করতঃ যোহরের নামায পড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি ডানে বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আমি বারবার আমার জায়গায় উঁচু হতে থাকি যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আমার প্রতি নিপতিত হয়। তিনি মনযোগের সাথে দেখতেই থাকেন। অবশেষে তার দৃষ্টি হযরত আবু উবাইদাই ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তাঁকে তিনি ডেকে বলেনঃ ‘এদের সাথে গমন কর এবং সত্যের সাথে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দাও।' সুতরাং তিনি তাদের সাথে গমন করেন। ইবনে মীরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থের মধ্যেও এ ঘটনাটি এভাবেই নকল করা হয়েছে, কিন্তু তথায় নেতৃবর্গের সংখ্যা রয়েছে বারজন এবং এ ঘটনার মধ্যে কিছু দীর্ঘতাও রয়েছে, তাছাড়া কিছু বেশী কথাও আছে।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাজরানের দু’জন নেতা আকিব ও সায়্যেদ মুবাহালা’র জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। কিন্তু একজন অপরজনকে বলেঃ এ কাজ করো না। আল্লাহর শপথ! যদি ইনি নবী হন আর আমরা তার সাথে মুবাহালা’ করি তবে আমরা আমাদের সন্তানাদিসহ ধ্বংস হয়ে যাব।' সুতরাং তারা একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ ‘জনাব! আপনি আমাদের নিকট যা চাইবেন আমরা তা প্রদান করবো। আপনি আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করুন এবং অবশ্যই বিশ্বস্ত লোককেই পাঠাতে হবে।' তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের সাথে আমি পূর্ণ বিশ্বস্ত লোককেই প্রেরণ করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাকে নির্বাচন করেন এটা দেখার জন্যে তাঁর সহচরবর্গ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।' তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ লোকটিই এ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক উম্মতের বিশ্বস্ত লোক থাকে এবং এ উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হচ্ছে হ্যরত আবু উবাইদাহ্ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল বলেছিলঃ যদি আমি মুহাম্মদ (সঃ)-কে কাবায় নামায পড়তে দেখতাম তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।' বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে এরূপ করতো তবে সবাই দেখতে পেত যে, ফেরেশতাগণ তারই গর্দান উড়িয়ে দিয়েছেন এবং যদি ইয়াহুদীরা মৃত্যুর আখাক্ষা করতো তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু এসে যেতো, আর তারা তাদের স্থান জাহান্নামের আগুনের মধ্যে দেখে নিতো। যেসব খীষ্টানকে মহালার জন্যে আহবান করা হয়েছিল, যদি তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের ধন-সম্পদ ও ছেলে মেয়েকে পেতো না।সহীহ বুখারী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘দালাইলুন্নবুওয়াহ’-এর মধ্যে নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের ঘটনাটি সুদীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে ওটা নকল করছি। কেননা, এতে বহু উপকার রয়েছে। তবে এতে দুর্বলতাও আছে। কিন্ত এ স্থানের সাথে এর যথেষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে। সালমা ইবনে আবদ ইয়াস’ স্বীয় দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি পূর্বে খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন যে, (আরবী) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাজরান বাসীর নিকট একখানা পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এ পত্রটি আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’ৰূদের নামে আরম্ভ করছি। এটা আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরানের বাদশাহ ও ওর অধিবাসীর নিকট। তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আমি তোমাদের সামনে হযরত ইবরাহীম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকবুব (আঃ)-এর প্রভুর প্রশংসা করছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বান্দার উপাসনা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং আমি তোমাদেরকে বান্দার নৈকট্য ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ডাকছি। যদি এটা অস্বীকার কর, তবে অধীনতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া কর প্রদান কর। আর যদি এটাও মানতে সম্মত না হও তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি, ওয়াস্সালাম।' এ পত্র প্রাপ্তির পর বাদশাহ তা পাঠ করেন এবং অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরাহবীল ইবনে অদাআহকে ডেকে পাঠান। সে ছিল হামদান গোত্রের লোক। সে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়লে সর্বপ্রথম অর্থাৎ আইহাম, সায়্যেদ এবং আকেবের পূর্বেও তার নিকট পরামর্শ নেয়া হতো। সে উপস্থিত হলে নেতা তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্রটি প্রদান করেন। তার পড়া হলে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার অভিমত কি?' সে বলে, বাদশাহর খুব ভাল জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হতে একজন নবী পাঠাবার অঙ্গীকার করেছেন। ইনিই হয়তো সেই নবী, এতে বিস্ময়ের কি আছে? নবুওয়াতের বিষয়ে আমি কি অভিমত পেশ করতে পারি? তবে রাজ্যের ব্যাপারে কোন কিছু হলে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে বের করতাম। বাদশাহ তাকে পৃথক জায়গায় বসিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীলকে আহ্বান করেন। এ লোকটিও রাজ্যের একজন পরামর্শদাতা ছিল। সে ছিল হুমায়ের গোত্রের লোক। বাদশাহ তাকে পত্রটি দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন এবং মতামত জিজ্ঞেস করেন। সে ঠিক প্রথম পরামর্শদাতার মতই কথা বলে। একেও বাদশাহ দূরে পৃথক জায়গায় বসিয়ে রাখেন। অতঃপর জাববার ইবনে ফায়েযকে ডাক দেন। এ লোকটি ছিল বানূ হারিস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এও পূর্বের দু’জনের মতই মন্তব্য করেন। বাদশাহ যখন দেখেন যে, ঐ তিন জনের অভিমত একই হয়ে গেছে তখন তিনি নির্দেশ দেন যে, যেন শখ বাজান হয়, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং গীর্জায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথায় এ প্রথা ছিল যে, যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়তো এবং জনগণকে রাত্রে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতো তখন তারা এরূপই করতো। আর দিনের বেলায় লোকদেরকে জমা করার প্রয়োজন হলে তারা গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিতো এবং জোরে জোরে শঙ্খ বাজাতো। এ নির্দেশ হওয়া মাত্রই চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শখের শব্দ সকলকে সতর্ক করে দেয়। পতাকা উত্তোলিত দেখে আশে-পাশের উপত্যকার সমস্ত লোক জমা হয়ে যায়। ঐ উপত্যকার দৈর্ঘ্য এতো বেশী ছিল যে, একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। চলে ওর শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারতো। ওর মধ্যে তিহাত্তরটি গ্রাম ছিল এবং এক লক্ষ বিশ হাজার তরবারী চালক তথায় বাস করতো।এসব লোক এসে গেলে বাদশাহ তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং তাদের মতামত জিজ্ঞেস করেন তখন সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি একবাক্যে বলে যে, শুরাহবীল ইবনে অদাইআহ্ হামদানী, আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীল আসবাহী এবং জাব্বার ইবনে ফায়েয হারেসীকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান হোক। তারা তথা হতে পূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসবে। তখন এখানকার প্রতিনিধি দল এ তিনজনের নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। মদীনায় পৌছে এ লোকগুলো তাদের ভ্রমণের পোষাক খুলে ফেলে এবং লম্বা লম্বা রেশমী চাদর ও লুঙ্গী পরিধান করে। তারা স্বর্ণ নির্মিত আংটি অঙ্গুলিতে পরে নেয়। অতঃপর তারা স্বীয় চাদরের প্রান্ত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয় এবং সালাম জানায়। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। এরা বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে থাকে যে, তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু ঐ রেশমী চাদর, লুঙ্গী এবং সোনার আংটির কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে কোন কথাও বললেন না। তখন এ লোকগুলো হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রাঃ)-এর খোঁজে বের হয়। এ দু'জন মনীষীর সাথেই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তারা মুহাজির ও আনসারের এক সভাস্থলে তাদের দু’জনকে পেয়ে যায়। তাদের নিকট তারা ঘটনাটি বর্ণনা করে বলে, আপনাদের নবী (সঃ) আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন। আমরা তাঁর উত্তর দেবার জন্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছি। আমরা তাঁর নিকট গিয়ে সালাম করি কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দেননি। অতঃপর আমরা তার সাথে কিছু আলোচনা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করি কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোন কথাই বলেননি। অবশেষে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছি। এখন আপনারা বলুন, আমরা কি এমনিই চলে যাবো?' ঐ দু’জন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনিই তাদেরকে উত্তর দিন।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘আমার ধারণায় এ লোকদের এ চাদর, লুঙ্গীগুলো ও আংটিসমূহ খুলে ফেলে দিয়ে ভ্রমণের ঐ সাধারণ পোষাকগুলো পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে পুনরায় উপস্থিত হওয়া উচিত। লোকগুলো তাই করে। তারা ঐ সাধারণ পোষাকেই তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা তাকে সালাম করে এবং তিনি উত্তর দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! এ লোকগুলো যখন আমার নিকট প্রথমবার এসেছিল তখন তাদের সাথে ইবলীস ছিল। তখন প্রশ্ন-উত্তর এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করছিলেন এবং উত্তরও দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে ঐ প্রতিনিধি দলও প্রশ্ন করছিল এবং উত্তর দিচ্ছিল। অবশেষে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে কি বলেন?' তখন তিনি বলেনঃ “আজ আমার নিকট এর উত্তর নেই। তোমরা অপেক্ষা কর, আমার প্রভু এ বিষয়ের যে উত্তর দেবেন আমি তোমাদেরকে তা শুনিয়ে দেবো। পরের দিন তারা পুনরায় আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনই অবতারিত (আরবী)-এ আয়াতটি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তারা এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরের দিন সকাল হওয়া মাত্রই পরস্পর লা'নত দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে স্বীয় চাদরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান, পিছনে পিছনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসছিলেন। সে সময় তার কয়েকজন সহধর্মিণী ছিলেন। শুরাহবীল এ দৃশ্য দেখামাত্র স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে বলেঃ “তোমরা জান যে, নাজরানের সারা উপত্যকা আমার কথা মত চলে এবং আমার মতানুসারেই তারা কাজ করে থাকে। জেনে রেখো যে, এটা খুব জটিল বিষয়। যদি এ লোকটি সত্য সত্যই নবীরূপে প্রেরিত হয়ে থাকেন তবে তার দষ্টিতে সর্বপ্রথম আমরাই অভিশপ্ত হবো এবং তার নবুওয়াতকে সর্বপ্রথম দরে নিক্ষেপকারীরূপে সাব্যস্ত আমরাই হবো। এ কথাটি তাঁর ও তাঁর সহচরদের অন্তর হতে মুছে যাবে না এবং আমাদের উপর কোন না কোন বিপদ আপতিত হবে। সারা আরবে তার সবচেয়ে নিকটতম আমিই। আর জেনে রেখো যে, যদি তিনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে মুবাহালা করা মাত্রই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমাদের একটি চুল বা নখ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না। তখন তাঁর সঙ্গীদ্বয় বলে, “হে আবূ মারইয়াম! আপনার অভিমত কি?' সে বলে, আমার মত এই যে, তাকে আমরা নির্দেশ দাতা বানিয়ে দেই। তিনি যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। তিনি কখনও অন্যায় নির্দেশ দেবেন না। তারা দু’জন। শুরাহবীলের কথা সমর্থন করে। তখন শুরাহবীল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, জনাব, আমি মুবাহালা’ অপেক্ষা উত্তম জিনিস আপনার সামনে পেশ করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সেটা কি?' সে বলে, আজকের দিন, আগামী রাত্রি এবং কাল সকাল পর্যন্ত আপনি আমাদের সম্বন্ধে যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “সম্ভবতঃ অন্যান্য লোক তোমাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না।শুরাহবীল বলেঃ আপনি আমার এ সঙ্গীদ্বয়কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিন।' তিনি ঐ দু’জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ ‘সারা উপত্যকার লোক তাঁরই মতের উপর চলে থাকে। তথায় এমন কেউ নেই যে তার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুবাহালা’ হতে বিরত হন, তারা তখনকার মত ফিরে যায়। পরের দিন সকালেই তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চুক্তিপত্র তাদের হাতে দেন। বিসমিল্লাহ'-এর পরে ঐ চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ‘এ চুক্তিপত্রটি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরান বাসীদের জন্য লিখিত হলো। তাদের প্রত্যেক হলদে, সাদা, কৃষ্ণ এবং গোলামের উপর আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হুকুম জারী ছিল। কিন্তু তিনি সবই তাদের হাতে ছেড়ে দিলেন। প্রতি বছর তারা শুধু দু’হাজার হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) প্রদান করবে। এক হাজার দেবে রজব মাসে ও এক হাজার সফর মাসে ইত্যাদি।' পূর্ণ চুক্তিপত্র তাদেরকে দেয়া হয়। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তাদের প্রতিনিধি দল হিজরী নবম সনে এসেছিল। কেননা, হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম ঐ নাজরানবাসীরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিযিয়া কর প্রদান করে। আর জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) (৯:২৯) শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতে কিতাবীদের নিকট হতে জিযিয়া গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় গ্রন্থে লিখেছেন যে, আকিব ও তায়্যেব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে ‘মুবাহালা’র জন্যে আহ্বান করেন এবং তিনি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদেরকে বলে পাঠালে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই আল্লাহর শপথ! যদি এরা দু’জন ‘না’ বলতো তবে এ উপত্যকাই তাদের উপর অগ্নি বর্ষণ করতো। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), ও হযরত আলী (রাঃ) শব্দের দ্বারা হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং শব্দ দ্বারা হযরত ফাতিমা যুহরা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুসতাদরিক-ই-হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ অর্থের হাদীস বর্ণিত আছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি তা চরম সত্য। এতে চুল পরিমাণও বেশী কম নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, অন্য কেউ নয়। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহান বিজ্ঞানময়। কিন্তু এখনও যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্য কিছু মানতে থাকে তবে আল্লাহ তা'আলা বাতিলপন্থী ও বিবাদীদেরকে ভাল করেই জানেন। তিনি তাদেরকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন এবং এর উপরে তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কেউ না পারবে তার নিকট হতে পালাতে না পারবে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আমরা তার শাস্তি হতে তারই নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
আলে ইমরান 3:62
৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আমি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমরা খুব বিস্ময়বোধ করছে? তার পূর্বে তো আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি, অথচ তার বাপও ছিল না, মাও ছিল না। বরং তাকে আমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম- “হে আদম! তুমি হও’, আর তেমনি সে হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমি যখন বিনা বাপ-মায়ে সৃষ্টি করতে পেরেছি তখন শুধু মায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা আমার কাছে কি কোন কঠিন কাজ? সুতরাং শুধু বাপ না হওয়ার কারণে যদি হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখতে পারে, তবে তো হযরত আদম আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হওয়ার আরও বেশী দাবীদার। (নাউজুবিল্লাহে) কিন্তু স্বয়ং তোমরাও তো তা স্বীকার কর না। কাজেই হযরত ঈসা (আঃ)-কে এ মর্যাদা হতে সরিয়ে ফেলা আরও উত্তম। কেননা, পুত্ৰত্বের দাবীর অসারতা ওখানের চাইতে এখানেই বেশী স্পষ্ট। কারণ এখানে তো মা আছে কিন্তু ওখানে মা ও বাপ কেউ ছিল না। এগুলো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি আদম (আঃ)-কে নারী পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হযরত হাওয়া (আঃ)-কে শুধু পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ‘সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তাকে (ঈসা আঃ-কে) মানুষের জন্যে আমার ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়েছি।' (১৯:২১) আর এখানে বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা এটাই। এটা ছাড়া কম বেশীর কোন স্থানই নেই। কেননা, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতারই স্থান। সুতরাং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্দেহ পোষণ করা মোটেই উচিত নয়।অতঃপর আল্লাহ পাক তার নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পরেও যদি কোন লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তুমি তাদেরকে মুবাহালার’ (পরস্পর বদ দু'আ করার) জন্যে আহবান করতঃ বল- “এসো আমরা উভয় দল আমাদের পুত্রদেরকে এবং স্ত্রীদেরকে নিয়ে মুবাহালার জন্যে বেরিয়ে যাই এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল মিথ্যাবাদী তার উপর আপনি আপনার অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।মুবাহালা’য় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রথম হতে এ পর্যন্ত এ সমুদয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিগণ। ঐলোকগণ এখানে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার অংশীদার এবং তাঁর পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) কাজেই তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডন ও তাদের কথার উত্তরে এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সীরাতে লিখেছেন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও নিজ নিজ পুস্তকসমূহে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানের খ্রীষ্টানগণ প্রতিনিধি হিসেবে ষাটজন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করে, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন তাদের নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ (১) আকিব, যার নাম ছিল আবদুল মাসীহ, (২) সায়্যেদ, যার নাম ছিল আইহাম, (৩) আবু হারিসা ইবনে আলকামা, যে ছিল বাকর ইবনে অয়েলের ভাই, (৪) ওয়ারিস ইবনে হারিস, (৫) যায়েদ, (৬) কায়েস, (৭) ইয়াযীদ, (৮) ও (৯) তার দু'টি পুত্র (১০) খুয়াইলিদ, (১১) আমর, (১২) খালিদ, (১৩) আবদুল্লাহ এবং (১৪) মুহসীন। এ চৌদ্দজন ছিল তাদের নেতা এবং এদের মধ্যে আবার তিনজন বড় নেতা ছিল। তারা হচ্ছেঃ (১) আকিব, এ লোকটি ছিল কওমের আমীর এবং তাকে জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হতো, আর তার অভিমতের উপরেই জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। (২) সায়্যেদ, এ লোকটি ছিল তাদের একজন বড় পাদরী ও উঁচু দরের শিক্ষক। সে বানূ বাকর ইবনে ওয়েলের আরব গোত্রভুক্ত ছিল। কিন্তু সে খ্রীষ্টান হয়ে গিয়েছিল। রোমকদের নিকট তার খুব সম্মান ছিল। তারা তার জন্যে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করেছিল। তার ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা দেখে তারা অত্যন্ত খাতির সম্মান করতো। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিল। কারণ, সে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে তাঁর বিশেষণ সম্বন্ধে পড়েছিল। অন্তরে সে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করতো। কিন্তু খ্রীষ্টানদের নিকট তার যে খাতির-সম্মান ছিল তা লোপ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে সুপথের দিকে আসতো না এবং (৩) হারিসা ইবনে আলকামা। মোটকথা এ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয় এবং সে সময় তিনি আসরের নামায সমাধা করে মসজিদে বসেছিলেন। এ লোকগুলো মূল্যবান পোষাক পরিহিত ছিল এবং তাদের গায়ে ছিল সুন্দর ও নরম চাদরসমূহ। তাদেরকে দেখে বানূ হারিস ইবনে কা'বের বংশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) মন্তব্য করেন যে, ওদের পরে ঐরকম জাঁকজমকপূর্ণ আর কোন প্রতিনিধি কখনও আসেনি। তাদের নামাযের সময় হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে তারা মসজিদে নববীতেই পূর্ব দিকে মুখ করে তাদের নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করে নেয়। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাদের আলোচনা শুরু হয়। মুখপাত্র হিসেবে নিম্নের তিনজনই কথা বলছিলঃ (১) হারেসা ইবনে আলকামা, (২) আকিব অর্থাৎ আবদুল মাসীহ এবং (৩) সায়্যেদ অর্থাৎ আইহাম। এরা শাহী মাযহাবের লোক ছিল বটে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে মতভেদ রাখতো। হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তাদের তিনটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ তিনি নিজেই আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র এবং তিন আল্লাহর মধ্যে এক আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অপবিত্র কথা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রায় সমস্ত খ্রীষ্টানেরই এ বিশ্বাস। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আল্লাহ হওয়ার দলীল তাদের নিকট এই ছিল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধদেরকে চক্ষু দান করতেন, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতেন, ভবিষ্যতের সংবাদ দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখী তৈরী করতঃ ওর মধ্যে ফুঁদিয়ে উড়িয়ে দিতেন। এর উত্তর এই যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এ সমস্ত কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পেতো। কারণ এই যে, যেন তার কথা সত্য হওয়ার উপর এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর তার নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যারা তাকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলতো তাদের দলীল এই যে, তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি দোলনা হতে কথা বলেছেন, যা তার পূর্বে কখনও ঘটেনি। আর তিন আল্লাহর তৃতীয় আল্লাহ বলার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকে বলেছেনঃ “আমরা করেছি, আমাদের নির্দেশ, আমাদের সৃষ্ট, আমরা মীমাংসা করেছি ইত্যাদি।” সুতরাং যদি আল্লাহ একজনই হতেন তবে এরূপ না বলে বরং বলতেনঃ “আমি করেছি, আমার নির্দেশ, আমার সৃষ্ট, আমি মীমাংসা করেছি। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তিনজন। একজন স্বয়ং আল্লাহ, দ্বিতীয় জন হযরত মারইয়াম এবং তৃতীয় জন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা ঐ অত্যাচারী ও কাফিরদের কথা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাদের এসব কথার অসারতা প্রকাশক আয়াত কুরআন মাজীদের মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনজন পাদরীর সাথে আলোচনা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তখন তারা বলেঃ আমরা তো স্বীকারকারী রয়েছিই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, না, তোমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছি। তারা বলে, আমরা তো আপনার পূর্বেকার মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, তোমাদের এ ইসলাম গ্রহণীয় নয়। কেননা, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান সাব্যস্ত করে থাক, ক্রুশের পূজো কর এবং শূকর খেয়ে থাক। তারা বলে, “আচ্ছা, তাহলে বলুন তো হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা কে ছিলেন? এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন এবং প্রথম হতে আশিটিরও বেশী আয়াত তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) এগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর বর্ণনা করার পর লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ আয়াতগুলো পাঠ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। মুবাহালার আয়াতটি পাঠ করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি স্বীকার না কর তবে এসো আমরা মুবাহালা’য় বের হই। এ কথা শুনে তারা বলে, “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমাদেরকে কিছুদিন সময় দেন। আমরা পরস্পর পরামর্শ করে আপনাকে এর উত্তর দেবো।' তখন তারা নির্জনে বসে আ’কবের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করে যাকে তাদের মধ্যে বড় শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মনে করা হতো। সে তার শেষ সিদ্ধান্তের কথা নিম্ন লিখিত ভাষায় স্বীয় সঙ্গীদেরকে শুনিয়ে দেয়, “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা নিশ্চিতরূপে এটা জেনে। নিয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার সত্য রাসূল। তোমরা এটাও জান যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূলতত্ত্ব তাই যা তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছো। আর তোমরা এটাও খুব ভাল জান যে, যে সম্প্রদায় নবীর সাথে পরস্পর অভিসম্পাত দেয়ার কাজে অংশ নেয় সে সম্প্রদায়ের ছোট বড় কেউ বাকি থাকে না বরং সবাই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যদি তোমরা মুবাহালা’র জন্যে অগ্রসর হও তবে তোমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুতরাং তোমরা ইসলাম ধর্মকেই গ্রহণ করে নাও। আর যদি তোমরা কোনক্রমেই এ ধর্ম গ্রহণ করতে স্বীকৃত না হও এবং ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তোমাদের যে ধারণা রয়েছে ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাও তবে মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাথে সন্ধি করতঃ স্বদেশে ফিরে যাও।” অতএব তারা এ পরামর্শ করতঃ নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা আপনার সাথে মুবাহালা’ করতে প্রস্তুত নই। আপনি আপনার ধর্মের উপর থাকুন এবং আমরা আমাদের ধারণার উপর রয়েছি। কিন্তু আপনি আমাদের সাথে আপনার সহচরদের মধ্যে হতে এমন একজনকে প্রেরণ করুন যার উপর আপনি সন্তুষ্ট রয়েছেন। তিনি আমাদের আর্থিক বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন। আপনারা আমাদের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, তোমরা দুপুরে আবার এসো। আমি একজন খুব বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি এদিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করিনি শুধুমাত্র এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে গুণের প্রশংসা করেছেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট আমিই যেন ঐ গুলোর অধিকারী হতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি সেদিন খুব সকাল সকাল যোহরের নামাযের জন্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করতঃ যোহরের নামায পড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি ডানে বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আমি বারবার আমার জায়গায় উঁচু হতে থাকি যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আমার প্রতি নিপতিত হয়। তিনি মনযোগের সাথে দেখতেই থাকেন। অবশেষে তার দৃষ্টি হযরত আবু উবাইদাই ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তাঁকে তিনি ডেকে বলেনঃ ‘এদের সাথে গমন কর এবং সত্যের সাথে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দাও।' সুতরাং তিনি তাদের সাথে গমন করেন। ইবনে মীরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থের মধ্যেও এ ঘটনাটি এভাবেই নকল করা হয়েছে, কিন্তু তথায় নেতৃবর্গের সংখ্যা রয়েছে বারজন এবং এ ঘটনার মধ্যে কিছু দীর্ঘতাও রয়েছে, তাছাড়া কিছু বেশী কথাও আছে।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাজরানের দু’জন নেতা আকিব ও সায়্যেদ মুবাহালা’র জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। কিন্তু একজন অপরজনকে বলেঃ এ কাজ করো না। আল্লাহর শপথ! যদি ইনি নবী হন আর আমরা তার সাথে মুবাহালা’ করি তবে আমরা আমাদের সন্তানাদিসহ ধ্বংস হয়ে যাব।' সুতরাং তারা একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ ‘জনাব! আপনি আমাদের নিকট যা চাইবেন আমরা তা প্রদান করবো। আপনি আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করুন এবং অবশ্যই বিশ্বস্ত লোককেই পাঠাতে হবে।' তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের সাথে আমি পূর্ণ বিশ্বস্ত লোককেই প্রেরণ করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাকে নির্বাচন করেন এটা দেখার জন্যে তাঁর সহচরবর্গ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।' তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ লোকটিই এ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক উম্মতের বিশ্বস্ত লোক থাকে এবং এ উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হচ্ছে হ্যরত আবু উবাইদাহ্ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল বলেছিলঃ যদি আমি মুহাম্মদ (সঃ)-কে কাবায় নামায পড়তে দেখতাম তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।' বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে এরূপ করতো তবে সবাই দেখতে পেত যে, ফেরেশতাগণ তারই গর্দান উড়িয়ে দিয়েছেন এবং যদি ইয়াহুদীরা মৃত্যুর আখাক্ষা করতো তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু এসে যেতো, আর তারা তাদের স্থান জাহান্নামের আগুনের মধ্যে দেখে নিতো। যেসব খীষ্টানকে মহালার জন্যে আহবান করা হয়েছিল, যদি তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের ধন-সম্পদ ও ছেলে মেয়েকে পেতো না।সহীহ বুখারী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘দালাইলুন্নবুওয়াহ’-এর মধ্যে নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের ঘটনাটি সুদীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে ওটা নকল করছি। কেননা, এতে বহু উপকার রয়েছে। তবে এতে দুর্বলতাও আছে। কিন্ত এ স্থানের সাথে এর যথেষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে। সালমা ইবনে আবদ ইয়াস’ স্বীয় দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি পূর্বে খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন যে, (আরবী) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাজরান বাসীর নিকট একখানা পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এ পত্রটি আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’ৰূদের নামে আরম্ভ করছি। এটা আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরানের বাদশাহ ও ওর অধিবাসীর নিকট। তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আমি তোমাদের সামনে হযরত ইবরাহীম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকবুব (আঃ)-এর প্রভুর প্রশংসা করছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বান্দার উপাসনা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং আমি তোমাদেরকে বান্দার নৈকট্য ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ডাকছি। যদি এটা অস্বীকার কর, তবে অধীনতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া কর প্রদান কর। আর যদি এটাও মানতে সম্মত না হও তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি, ওয়াস্সালাম।' এ পত্র প্রাপ্তির পর বাদশাহ তা পাঠ করেন এবং অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরাহবীল ইবনে অদাআহকে ডেকে পাঠান। সে ছিল হামদান গোত্রের লোক। সে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়লে সর্বপ্রথম অর্থাৎ আইহাম, সায়্যেদ এবং আকেবের পূর্বেও তার নিকট পরামর্শ নেয়া হতো। সে উপস্থিত হলে নেতা তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্রটি প্রদান করেন। তার পড়া হলে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার অভিমত কি?' সে বলে, বাদশাহর খুব ভাল জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হতে একজন নবী পাঠাবার অঙ্গীকার করেছেন। ইনিই হয়তো সেই নবী, এতে বিস্ময়ের কি আছে? নবুওয়াতের বিষয়ে আমি কি অভিমত পেশ করতে পারি? তবে রাজ্যের ব্যাপারে কোন কিছু হলে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে বের করতাম। বাদশাহ তাকে পৃথক জায়গায় বসিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীলকে আহ্বান করেন। এ লোকটিও রাজ্যের একজন পরামর্শদাতা ছিল। সে ছিল হুমায়ের গোত্রের লোক। বাদশাহ তাকে পত্রটি দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন এবং মতামত জিজ্ঞেস করেন। সে ঠিক প্রথম পরামর্শদাতার মতই কথা বলে। একেও বাদশাহ দূরে পৃথক জায়গায় বসিয়ে রাখেন। অতঃপর জাববার ইবনে ফায়েযকে ডাক দেন। এ লোকটি ছিল বানূ হারিস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এও পূর্বের দু’জনের মতই মন্তব্য করেন। বাদশাহ যখন দেখেন যে, ঐ তিন জনের অভিমত একই হয়ে গেছে তখন তিনি নির্দেশ দেন যে, যেন শখ বাজান হয়, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং গীর্জায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথায় এ প্রথা ছিল যে, যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়তো এবং জনগণকে রাত্রে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতো তখন তারা এরূপই করতো। আর দিনের বেলায় লোকদেরকে জমা করার প্রয়োজন হলে তারা গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিতো এবং জোরে জোরে শঙ্খ বাজাতো। এ নির্দেশ হওয়া মাত্রই চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শখের শব্দ সকলকে সতর্ক করে দেয়। পতাকা উত্তোলিত দেখে আশে-পাশের উপত্যকার সমস্ত লোক জমা হয়ে যায়। ঐ উপত্যকার দৈর্ঘ্য এতো বেশী ছিল যে, একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। চলে ওর শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারতো। ওর মধ্যে তিহাত্তরটি গ্রাম ছিল এবং এক লক্ষ বিশ হাজার তরবারী চালক তথায় বাস করতো।এসব লোক এসে গেলে বাদশাহ তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং তাদের মতামত জিজ্ঞেস করেন তখন সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি একবাক্যে বলে যে, শুরাহবীল ইবনে অদাইআহ্ হামদানী, আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীল আসবাহী এবং জাব্বার ইবনে ফায়েয হারেসীকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান হোক। তারা তথা হতে পূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসবে। তখন এখানকার প্রতিনিধি দল এ তিনজনের নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। মদীনায় পৌছে এ লোকগুলো তাদের ভ্রমণের পোষাক খুলে ফেলে এবং লম্বা লম্বা রেশমী চাদর ও লুঙ্গী পরিধান করে। তারা স্বর্ণ নির্মিত আংটি অঙ্গুলিতে পরে নেয়। অতঃপর তারা স্বীয় চাদরের প্রান্ত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয় এবং সালাম জানায়। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। এরা বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে থাকে যে, তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু ঐ রেশমী চাদর, লুঙ্গী এবং সোনার আংটির কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে কোন কথাও বললেন না। তখন এ লোকগুলো হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রাঃ)-এর খোঁজে বের হয়। এ দু'জন মনীষীর সাথেই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তারা মুহাজির ও আনসারের এক সভাস্থলে তাদের দু’জনকে পেয়ে যায়। তাদের নিকট তারা ঘটনাটি বর্ণনা করে বলে, আপনাদের নবী (সঃ) আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন। আমরা তাঁর উত্তর দেবার জন্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছি। আমরা তাঁর নিকট গিয়ে সালাম করি কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দেননি। অতঃপর আমরা তার সাথে কিছু আলোচনা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করি কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোন কথাই বলেননি। অবশেষে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছি। এখন আপনারা বলুন, আমরা কি এমনিই চলে যাবো?' ঐ দু’জন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনিই তাদেরকে উত্তর দিন।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘আমার ধারণায় এ লোকদের এ চাদর, লুঙ্গীগুলো ও আংটিসমূহ খুলে ফেলে দিয়ে ভ্রমণের ঐ সাধারণ পোষাকগুলো পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে পুনরায় উপস্থিত হওয়া উচিত। লোকগুলো তাই করে। তারা ঐ সাধারণ পোষাকেই তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা তাকে সালাম করে এবং তিনি উত্তর দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! এ লোকগুলো যখন আমার নিকট প্রথমবার এসেছিল তখন তাদের সাথে ইবলীস ছিল। তখন প্রশ্ন-উত্তর এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করছিলেন এবং উত্তরও দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে ঐ প্রতিনিধি দলও প্রশ্ন করছিল এবং উত্তর দিচ্ছিল। অবশেষে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে কি বলেন?' তখন তিনি বলেনঃ “আজ আমার নিকট এর উত্তর নেই। তোমরা অপেক্ষা কর, আমার প্রভু এ বিষয়ের যে উত্তর দেবেন আমি তোমাদেরকে তা শুনিয়ে দেবো। পরের দিন তারা পুনরায় আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনই অবতারিত (আরবী)-এ আয়াতটি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তারা এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরের দিন সকাল হওয়া মাত্রই পরস্পর লা'নত দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে স্বীয় চাদরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান, পিছনে পিছনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসছিলেন। সে সময় তার কয়েকজন সহধর্মিণী ছিলেন। শুরাহবীল এ দৃশ্য দেখামাত্র স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে বলেঃ “তোমরা জান যে, নাজরানের সারা উপত্যকা আমার কথা মত চলে এবং আমার মতানুসারেই তারা কাজ করে থাকে। জেনে রেখো যে, এটা খুব জটিল বিষয়। যদি এ লোকটি সত্য সত্যই নবীরূপে প্রেরিত হয়ে থাকেন তবে তার দষ্টিতে সর্বপ্রথম আমরাই অভিশপ্ত হবো এবং তার নবুওয়াতকে সর্বপ্রথম দরে নিক্ষেপকারীরূপে সাব্যস্ত আমরাই হবো। এ কথাটি তাঁর ও তাঁর সহচরদের অন্তর হতে মুছে যাবে না এবং আমাদের উপর কোন না কোন বিপদ আপতিত হবে। সারা আরবে তার সবচেয়ে নিকটতম আমিই। আর জেনে রেখো যে, যদি তিনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে মুবাহালা করা মাত্রই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমাদের একটি চুল বা নখ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না। তখন তাঁর সঙ্গীদ্বয় বলে, “হে আবূ মারইয়াম! আপনার অভিমত কি?' সে বলে, আমার মত এই যে, তাকে আমরা নির্দেশ দাতা বানিয়ে দেই। তিনি যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। তিনি কখনও অন্যায় নির্দেশ দেবেন না। তারা দু’জন। শুরাহবীলের কথা সমর্থন করে। তখন শুরাহবীল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, জনাব, আমি মুবাহালা’ অপেক্ষা উত্তম জিনিস আপনার সামনে পেশ করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সেটা কি?' সে বলে, আজকের দিন, আগামী রাত্রি এবং কাল সকাল পর্যন্ত আপনি আমাদের সম্বন্ধে যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “সম্ভবতঃ অন্যান্য লোক তোমাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না।শুরাহবীল বলেঃ আপনি আমার এ সঙ্গীদ্বয়কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিন।' তিনি ঐ দু’জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ ‘সারা উপত্যকার লোক তাঁরই মতের উপর চলে থাকে। তথায় এমন কেউ নেই যে তার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুবাহালা’ হতে বিরত হন, তারা তখনকার মত ফিরে যায়। পরের দিন সকালেই তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চুক্তিপত্র তাদের হাতে দেন। বিসমিল্লাহ'-এর পরে ঐ চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ‘এ চুক্তিপত্রটি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরান বাসীদের জন্য লিখিত হলো। তাদের প্রত্যেক হলদে, সাদা, কৃষ্ণ এবং গোলামের উপর আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হুকুম জারী ছিল। কিন্তু তিনি সবই তাদের হাতে ছেড়ে দিলেন। প্রতি বছর তারা শুধু দু’হাজার হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) প্রদান করবে। এক হাজার দেবে রজব মাসে ও এক হাজার সফর মাসে ইত্যাদি।' পূর্ণ চুক্তিপত্র তাদেরকে দেয়া হয়। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তাদের প্রতিনিধি দল হিজরী নবম সনে এসেছিল। কেননা, হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম ঐ নাজরানবাসীরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিযিয়া কর প্রদান করে। আর জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) (৯:২৯) শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতে কিতাবীদের নিকট হতে জিযিয়া গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় গ্রন্থে লিখেছেন যে, আকিব ও তায়্যেব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে ‘মুবাহালা’র জন্যে আহ্বান করেন এবং তিনি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদেরকে বলে পাঠালে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই আল্লাহর শপথ! যদি এরা দু’জন ‘না’ বলতো তবে এ উপত্যকাই তাদের উপর অগ্নি বর্ষণ করতো। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), ও হযরত আলী (রাঃ) শব্দের দ্বারা হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং শব্দ দ্বারা হযরত ফাতিমা যুহরা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুসতাদরিক-ই-হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ অর্থের হাদীস বর্ণিত আছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি তা চরম সত্য। এতে চুল পরিমাণও বেশী কম নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, অন্য কেউ নয়। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহান বিজ্ঞানময়। কিন্তু এখনও যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্য কিছু মানতে থাকে তবে আল্লাহ তা'আলা বাতিলপন্থী ও বিবাদীদেরকে ভাল করেই জানেন। তিনি তাদেরকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন এবং এর উপরে তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কেউ না পারবে তার নিকট হতে পালাতে না পারবে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আমরা তার শাস্তি হতে তারই নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
আলে ইমরান 3:63
৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আমি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমরা খুব বিস্ময়বোধ করছে? তার পূর্বে তো আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি, অথচ তার বাপও ছিল না, মাও ছিল না। বরং তাকে আমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম- “হে আদম! তুমি হও’, আর তেমনি সে হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমি যখন বিনা বাপ-মায়ে সৃষ্টি করতে পেরেছি তখন শুধু মায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা আমার কাছে কি কোন কঠিন কাজ? সুতরাং শুধু বাপ না হওয়ার কারণে যদি হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখতে পারে, তবে তো হযরত আদম আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হওয়ার আরও বেশী দাবীদার। (নাউজুবিল্লাহে) কিন্তু স্বয়ং তোমরাও তো তা স্বীকার কর না। কাজেই হযরত ঈসা (আঃ)-কে এ মর্যাদা হতে সরিয়ে ফেলা আরও উত্তম। কেননা, পুত্ৰত্বের দাবীর অসারতা ওখানের চাইতে এখানেই বেশী স্পষ্ট। কারণ এখানে তো মা আছে কিন্তু ওখানে মা ও বাপ কেউ ছিল না। এগুলো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি আদম (আঃ)-কে নারী পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হযরত হাওয়া (আঃ)-কে শুধু পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ‘সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তাকে (ঈসা আঃ-কে) মানুষের জন্যে আমার ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়েছি।' (১৯:২১) আর এখানে বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা এটাই। এটা ছাড়া কম বেশীর কোন স্থানই নেই। কেননা, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতারই স্থান। সুতরাং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্দেহ পোষণ করা মোটেই উচিত নয়।অতঃপর আল্লাহ পাক তার নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পরেও যদি কোন লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তুমি তাদেরকে মুবাহালার’ (পরস্পর বদ দু'আ করার) জন্যে আহবান করতঃ বল- “এসো আমরা উভয় দল আমাদের পুত্রদেরকে এবং স্ত্রীদেরকে নিয়ে মুবাহালার জন্যে বেরিয়ে যাই এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল মিথ্যাবাদী তার উপর আপনি আপনার অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।মুবাহালা’য় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রথম হতে এ পর্যন্ত এ সমুদয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিগণ। ঐলোকগণ এখানে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার অংশীদার এবং তাঁর পুত্র। (নাউজুবিল্লাহ) কাজেই তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডন ও তাদের কথার উত্তরে এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সীরাতে লিখেছেন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও নিজ নিজ পুস্তকসমূহে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানের খ্রীষ্টানগণ প্রতিনিধি হিসেবে ষাটজন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করে, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন তাদের নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ (১) আকিব, যার নাম ছিল আবদুল মাসীহ, (২) সায়্যেদ, যার নাম ছিল আইহাম, (৩) আবু হারিসা ইবনে আলকামা, যে ছিল বাকর ইবনে অয়েলের ভাই, (৪) ওয়ারিস ইবনে হারিস, (৫) যায়েদ, (৬) কায়েস, (৭) ইয়াযীদ, (৮) ও (৯) তার দু'টি পুত্র (১০) খুয়াইলিদ, (১১) আমর, (১২) খালিদ, (১৩) আবদুল্লাহ এবং (১৪) মুহসীন। এ চৌদ্দজন ছিল তাদের নেতা এবং এদের মধ্যে আবার তিনজন বড় নেতা ছিল। তারা হচ্ছেঃ (১) আকিব, এ লোকটি ছিল কওমের আমীর এবং তাকে জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হতো, আর তার অভিমতের উপরেই জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। (২) সায়্যেদ, এ লোকটি ছিল তাদের একজন বড় পাদরী ও উঁচু দরের শিক্ষক। সে বানূ বাকর ইবনে ওয়েলের আরব গোত্রভুক্ত ছিল। কিন্তু সে খ্রীষ্টান হয়ে গিয়েছিল। রোমকদের নিকট তার খুব সম্মান ছিল। তারা তার জন্যে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করেছিল। তার ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা দেখে তারা অত্যন্ত খাতির সম্মান করতো। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিল। কারণ, সে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে তাঁর বিশেষণ সম্বন্ধে পড়েছিল। অন্তরে সে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করতো। কিন্তু খ্রীষ্টানদের নিকট তার যে খাতির-সম্মান ছিল তা লোপ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে সুপথের দিকে আসতো না এবং (৩) হারিসা ইবনে আলকামা। মোটকথা এ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয় এবং সে সময় তিনি আসরের নামায সমাধা করে মসজিদে বসেছিলেন। এ লোকগুলো মূল্যবান পোষাক পরিহিত ছিল এবং তাদের গায়ে ছিল সুন্দর ও নরম চাদরসমূহ। তাদেরকে দেখে বানূ হারিস ইবনে কা'বের বংশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) মন্তব্য করেন যে, ওদের পরে ঐরকম জাঁকজমকপূর্ণ আর কোন প্রতিনিধি কখনও আসেনি। তাদের নামাযের সময় হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে তারা মসজিদে নববীতেই পূর্ব দিকে মুখ করে তাদের নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করে নেয়। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তাদের আলোচনা শুরু হয়। মুখপাত্র হিসেবে নিম্নের তিনজনই কথা বলছিলঃ (১) হারেসা ইবনে আলকামা, (২) আকিব অর্থাৎ আবদুল মাসীহ এবং (৩) সায়্যেদ অর্থাৎ আইহাম। এরা শাহী মাযহাবের লোক ছিল বটে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে মতভেদ রাখতো। হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তাদের তিনটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ তিনি নিজেই আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র এবং তিন আল্লাহর মধ্যে এক আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অপবিত্র কথা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রায় সমস্ত খ্রীষ্টানেরই এ বিশ্বাস। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আল্লাহ হওয়ার দলীল তাদের নিকট এই ছিল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধদেরকে চক্ষু দান করতেন, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতেন, ভবিষ্যতের সংবাদ দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখী তৈরী করতঃ ওর মধ্যে ফুঁদিয়ে উড়িয়ে দিতেন। এর উত্তর এই যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এ সমস্ত কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পেতো। কারণ এই যে, যেন তার কথা সত্য হওয়ার উপর এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের উপর তার নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যারা তাকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলতো তাদের দলীল এই যে, তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি দোলনা হতে কথা বলেছেন, যা তার পূর্বে কখনও ঘটেনি। আর তিন আল্লাহর তৃতীয় আল্লাহ বলার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকে বলেছেনঃ “আমরা করেছি, আমাদের নির্দেশ, আমাদের সৃষ্ট, আমরা মীমাংসা করেছি ইত্যাদি।” সুতরাং যদি আল্লাহ একজনই হতেন তবে এরূপ না বলে বরং বলতেনঃ “আমি করেছি, আমার নির্দেশ, আমার সৃষ্ট, আমি মীমাংসা করেছি। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তিনজন। একজন স্বয়ং আল্লাহ, দ্বিতীয় জন হযরত মারইয়াম এবং তৃতীয় জন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা ঐ অত্যাচারী ও কাফিরদের কথা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাদের এসব কথার অসারতা প্রকাশক আয়াত কুরআন মাজীদের মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনজন পাদরীর সাথে আলোচনা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তখন তারা বলেঃ আমরা তো স্বীকারকারী রয়েছিই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, না, তোমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছি। তারা বলে, আমরা তো আপনার পূর্বেকার মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, তোমাদের এ ইসলাম গ্রহণীয় নয়। কেননা, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান সাব্যস্ত করে থাক, ক্রুশের পূজো কর এবং শূকর খেয়ে থাক। তারা বলে, “আচ্ছা, তাহলে বলুন তো হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা কে ছিলেন? এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন এবং প্রথম হতে আশিটিরও বেশী আয়াত তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) এগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর বর্ণনা করার পর লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ আয়াতগুলো পাঠ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। মুবাহালার আয়াতটি পাঠ করতঃ তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি স্বীকার না কর তবে এসো আমরা মুবাহালা’য় বের হই। এ কথা শুনে তারা বলে, “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমাদেরকে কিছুদিন সময় দেন। আমরা পরস্পর পরামর্শ করে আপনাকে এর উত্তর দেবো।' তখন তারা নির্জনে বসে আ’কবের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করে যাকে তাদের মধ্যে বড় শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মনে করা হতো। সে তার শেষ সিদ্ধান্তের কথা নিম্ন লিখিত ভাষায় স্বীয় সঙ্গীদেরকে শুনিয়ে দেয়, “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা নিশ্চিতরূপে এটা জেনে। নিয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার সত্য রাসূল। তোমরা এটাও জান যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূলতত্ত্ব তাই যা তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর মুখে শুনেছো। আর তোমরা এটাও খুব ভাল জান যে, যে সম্প্রদায় নবীর সাথে পরস্পর অভিসম্পাত দেয়ার কাজে অংশ নেয় সে সম্প্রদায়ের ছোট বড় কেউ বাকি থাকে না বরং সবাই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যদি তোমরা মুবাহালা’র জন্যে অগ্রসর হও তবে তোমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুতরাং তোমরা ইসলাম ধর্মকেই গ্রহণ করে নাও। আর যদি তোমরা কোনক্রমেই এ ধর্ম গ্রহণ করতে স্বীকৃত না হও এবং ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তোমাদের যে ধারণা রয়েছে ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাও তবে মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাথে সন্ধি করতঃ স্বদেশে ফিরে যাও।” অতএব তারা এ পরামর্শ করতঃ নবী (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা আপনার সাথে মুবাহালা’ করতে প্রস্তুত নই। আপনি আপনার ধর্মের উপর থাকুন এবং আমরা আমাদের ধারণার উপর রয়েছি। কিন্তু আপনি আমাদের সাথে আপনার সহচরদের মধ্যে হতে এমন একজনকে প্রেরণ করুন যার উপর আপনি সন্তুষ্ট রয়েছেন। তিনি আমাদের আর্থিক বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন। আপনারা আমাদের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, তোমরা দুপুরে আবার এসো। আমি একজন খুব বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি এদিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করিনি শুধুমাত্র এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে গুণের প্রশংসা করেছেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট আমিই যেন ঐ গুলোর অধিকারী হতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি সেদিন খুব সকাল সকাল যোহরের নামাযের জন্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আগমন করতঃ যোহরের নামায পড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি ডানে বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আমি বারবার আমার জায়গায় উঁচু হতে থাকি যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আমার প্রতি নিপতিত হয়। তিনি মনযোগের সাথে দেখতেই থাকেন। অবশেষে তার দৃষ্টি হযরত আবু উবাইদাই ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তাঁকে তিনি ডেকে বলেনঃ ‘এদের সাথে গমন কর এবং সত্যের সাথে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করে দাও।' সুতরাং তিনি তাদের সাথে গমন করেন। ইবনে মীরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থের মধ্যেও এ ঘটনাটি এভাবেই নকল করা হয়েছে, কিন্তু তথায় নেতৃবর্গের সংখ্যা রয়েছে বারজন এবং এ ঘটনার মধ্যে কিছু দীর্ঘতাও রয়েছে, তাছাড়া কিছু বেশী কথাও আছে।সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাজরানের দু’জন নেতা আকিব ও সায়্যেদ মুবাহালা’র জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। কিন্তু একজন অপরজনকে বলেঃ এ কাজ করো না। আল্লাহর শপথ! যদি ইনি নবী হন আর আমরা তার সাথে মুবাহালা’ করি তবে আমরা আমাদের সন্তানাদিসহ ধ্বংস হয়ে যাব।' সুতরাং তারা একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ ‘জনাব! আপনি আমাদের নিকট যা চাইবেন আমরা তা প্রদান করবো। আপনি আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করুন এবং অবশ্যই বিশ্বস্ত লোককেই পাঠাতে হবে।' তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের সাথে আমি পূর্ণ বিশ্বস্ত লোককেই প্রেরণ করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাকে নির্বাচন করেন এটা দেখার জন্যে তাঁর সহচরবর্গ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বলেনঃ “হে আবু উবাইদাহ! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।' তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ লোকটিই এ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক উম্মতের বিশ্বস্ত লোক থাকে এবং এ উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হচ্ছে হ্যরত আবু উবাইদাহ্ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল বলেছিলঃ যদি আমি মুহাম্মদ (সঃ)-কে কাবায় নামায পড়তে দেখতাম তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।' বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে এরূপ করতো তবে সবাই দেখতে পেত যে, ফেরেশতাগণ তারই গর্দান উড়িয়ে দিয়েছেন এবং যদি ইয়াহুদীরা মৃত্যুর আখাক্ষা করতো তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু এসে যেতো, আর তারা তাদের স্থান জাহান্নামের আগুনের মধ্যে দেখে নিতো। যেসব খীষ্টানকে মহালার জন্যে আহবান করা হয়েছিল, যদি তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের ধন-সম্পদ ও ছেলে মেয়েকে পেতো না।সহীহ বুখারী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘দালাইলুন্নবুওয়াহ’-এর মধ্যে নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের ঘটনাটি সুদীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে ওটা নকল করছি। কেননা, এতে বহু উপকার রয়েছে। তবে এতে দুর্বলতাও আছে। কিন্ত এ স্থানের সাথে এর যথেষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে। সালমা ইবনে আবদ ইয়াস’ স্বীয় দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি পূর্বে খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন যে, (আরবী) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাজরান বাসীর নিকট একখানা পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এ পত্রটি আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’ৰূদের নামে আরম্ভ করছি। এটা আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরানের বাদশাহ ও ওর অধিবাসীর নিকট। তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আমি তোমাদের সামনে হযরত ইবরাহীম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকবুব (আঃ)-এর প্রভুর প্রশংসা করছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বান্দার উপাসনা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং আমি তোমাদেরকে বান্দার নৈকট্য ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ডাকছি। যদি এটা অস্বীকার কর, তবে অধীনতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া কর প্রদান কর। আর যদি এটাও মানতে সম্মত না হও তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি, ওয়াস্সালাম।' এ পত্র প্রাপ্তির পর বাদশাহ তা পাঠ করেন এবং অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরাহবীল ইবনে অদাআহকে ডেকে পাঠান। সে ছিল হামদান গোত্রের লোক। সে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়লে সর্বপ্রথম অর্থাৎ আইহাম, সায়্যেদ এবং আকেবের পূর্বেও তার নিকট পরামর্শ নেয়া হতো। সে উপস্থিত হলে নেতা তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্রটি প্রদান করেন। তার পড়া হলে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার অভিমত কি?' সে বলে, বাদশাহর খুব ভাল জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হতে একজন নবী পাঠাবার অঙ্গীকার করেছেন। ইনিই হয়তো সেই নবী, এতে বিস্ময়ের কি আছে? নবুওয়াতের বিষয়ে আমি কি অভিমত পেশ করতে পারি? তবে রাজ্যের ব্যাপারে কোন কিছু হলে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে বের করতাম। বাদশাহ তাকে পৃথক জায়গায় বসিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীলকে আহ্বান করেন। এ লোকটিও রাজ্যের একজন পরামর্শদাতা ছিল। সে ছিল হুমায়ের গোত্রের লোক। বাদশাহ তাকে পত্রটি দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন এবং মতামত জিজ্ঞেস করেন। সে ঠিক প্রথম পরামর্শদাতার মতই কথা বলে। একেও বাদশাহ দূরে পৃথক জায়গায় বসিয়ে রাখেন। অতঃপর জাববার ইবনে ফায়েযকে ডাক দেন। এ লোকটি ছিল বানূ হারিস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এও পূর্বের দু’জনের মতই মন্তব্য করেন। বাদশাহ যখন দেখেন যে, ঐ তিন জনের অভিমত একই হয়ে গেছে তখন তিনি নির্দেশ দেন যে, যেন শখ বাজান হয়, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং গীর্জায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথায় এ প্রথা ছিল যে, যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়তো এবং জনগণকে রাত্রে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতো তখন তারা এরূপই করতো। আর দিনের বেলায় লোকদেরকে জমা করার প্রয়োজন হলে তারা গীর্জায় আগুন জ্বালিয়ে দিতো এবং জোরে জোরে শঙ্খ বাজাতো। এ নির্দেশ হওয়া মাত্রই চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শখের শব্দ সকলকে সতর্ক করে দেয়। পতাকা উত্তোলিত দেখে আশে-পাশের উপত্যকার সমস্ত লোক জমা হয়ে যায়। ঐ উপত্যকার দৈর্ঘ্য এতো বেশী ছিল যে, একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। চলে ওর শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারতো। ওর মধ্যে তিহাত্তরটি গ্রাম ছিল এবং এক লক্ষ বিশ হাজার তরবারী চালক তথায় বাস করতো।এসব লোক এসে গেলে বাদশাহ তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং তাদের মতামত জিজ্ঞেস করেন তখন সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি একবাক্যে বলে যে, শুরাহবীল ইবনে অদাইআহ্ হামদানী, আবদুল্লাহ ইবনে শুরাহবীল আসবাহী এবং জাব্বার ইবনে ফায়েয হারেসীকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান হোক। তারা তথা হতে পূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসবে। তখন এখানকার প্রতিনিধি দল এ তিনজনের নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। মদীনায় পৌছে এ লোকগুলো তাদের ভ্রমণের পোষাক খুলে ফেলে এবং লম্বা লম্বা রেশমী চাদর ও লুঙ্গী পরিধান করে। তারা স্বর্ণ নির্মিত আংটি অঙ্গুলিতে পরে নেয়। অতঃপর তারা স্বীয় চাদরের প্রান্ত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয় এবং সালাম জানায়। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। এরা বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে থাকে যে, তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু ঐ রেশমী চাদর, লুঙ্গী এবং সোনার আংটির কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে কোন কথাও বললেন না। তখন এ লোকগুলো হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (রাঃ)-এর খোঁজে বের হয়। এ দু'জন মনীষীর সাথেই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তারা মুহাজির ও আনসারের এক সভাস্থলে তাদের দু’জনকে পেয়ে যায়। তাদের নিকট তারা ঘটনাটি বর্ণনা করে বলে, আপনাদের নবী (সঃ) আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন। আমরা তাঁর উত্তর দেবার জন্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছি। আমরা তাঁর নিকট গিয়ে সালাম করি কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দেননি। অতঃপর আমরা তার সাথে কিছু আলোচনা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করি কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোন কথাই বলেননি। অবশেষে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছি। এখন আপনারা বলুন, আমরা কি এমনিই চলে যাবো?' ঐ দু’জন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনিই তাদেরকে উত্তর দিন।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘আমার ধারণায় এ লোকদের এ চাদর, লুঙ্গীগুলো ও আংটিসমূহ খুলে ফেলে দিয়ে ভ্রমণের ঐ সাধারণ পোষাকগুলো পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে পুনরায় উপস্থিত হওয়া উচিত। লোকগুলো তাই করে। তারা ঐ সাধারণ পোষাকেই তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা তাকে সালাম করে এবং তিনি উত্তর দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! এ লোকগুলো যখন আমার নিকট প্রথমবার এসেছিল তখন তাদের সাথে ইবলীস ছিল। তখন প্রশ্ন-উত্তর এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করছিলেন এবং উত্তরও দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে ঐ প্রতিনিধি দলও প্রশ্ন করছিল এবং উত্তর দিচ্ছিল। অবশেষে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে কি বলেন?' তখন তিনি বলেনঃ “আজ আমার নিকট এর উত্তর নেই। তোমরা অপেক্ষা কর, আমার প্রভু এ বিষয়ের যে উত্তর দেবেন আমি তোমাদেরকে তা শুনিয়ে দেবো। পরের দিন তারা পুনরায় আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনই অবতারিত (আরবী)-এ আয়াতটি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তারা এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরের দিন সকাল হওয়া মাত্রই পরস্পর লা'নত দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে স্বীয় চাদরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান, পিছনে পিছনে হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসছিলেন। সে সময় তার কয়েকজন সহধর্মিণী ছিলেন। শুরাহবীল এ দৃশ্য দেখামাত্র স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে বলেঃ “তোমরা জান যে, নাজরানের সারা উপত্যকা আমার কথা মত চলে এবং আমার মতানুসারেই তারা কাজ করে থাকে। জেনে রেখো যে, এটা খুব জটিল বিষয়। যদি এ লোকটি সত্য সত্যই নবীরূপে প্রেরিত হয়ে থাকেন তবে তার দষ্টিতে সর্বপ্রথম আমরাই অভিশপ্ত হবো এবং তার নবুওয়াতকে সর্বপ্রথম দরে নিক্ষেপকারীরূপে সাব্যস্ত আমরাই হবো। এ কথাটি তাঁর ও তাঁর সহচরদের অন্তর হতে মুছে যাবে না এবং আমাদের উপর কোন না কোন বিপদ আপতিত হবে। সারা আরবে তার সবচেয়ে নিকটতম আমিই। আর জেনে রেখো যে, যদি তিনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে মুবাহালা করা মাত্রই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমাদের একটি চুল বা নখ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না। তখন তাঁর সঙ্গীদ্বয় বলে, “হে আবূ মারইয়াম! আপনার অভিমত কি?' সে বলে, আমার মত এই যে, তাকে আমরা নির্দেশ দাতা বানিয়ে দেই। তিনি যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। তিনি কখনও অন্যায় নির্দেশ দেবেন না। তারা দু’জন। শুরাহবীলের কথা সমর্থন করে। তখন শুরাহবীল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, জনাব, আমি মুবাহালা’ অপেক্ষা উত্তম জিনিস আপনার সামনে পেশ করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সেটা কি?' সে বলে, আজকের দিন, আগামী রাত্রি এবং কাল সকাল পর্যন্ত আপনি আমাদের সম্বন্ধে যা নির্দেশ দেবেন আমরা তা মেনে নেবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “সম্ভবতঃ অন্যান্য লোক তোমাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না।শুরাহবীল বলেঃ আপনি আমার এ সঙ্গীদ্বয়কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিন।' তিনি ঐ দু’জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ ‘সারা উপত্যকার লোক তাঁরই মতের উপর চলে থাকে। তথায় এমন কেউ নেই যে তার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুবাহালা’ হতে বিরত হন, তারা তখনকার মত ফিরে যায়। পরের দিন সকালেই তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চুক্তিপত্র তাদের হাতে দেন। বিসমিল্লাহ'-এর পরে ঐ চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ‘এ চুক্তিপত্রটি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে নাজরান বাসীদের জন্য লিখিত হলো। তাদের প্রত্যেক হলদে, সাদা, কৃষ্ণ এবং গোলামের উপর আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হুকুম জারী ছিল। কিন্তু তিনি সবই তাদের হাতে ছেড়ে দিলেন। প্রতি বছর তারা শুধু দু’হাজার হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) প্রদান করবে। এক হাজার দেবে রজব মাসে ও এক হাজার সফর মাসে ইত্যাদি।' পূর্ণ চুক্তিপত্র তাদেরকে দেয়া হয়। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তাদের প্রতিনিধি দল হিজরী নবম সনে এসেছিল। কেননা, হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম ঐ নাজরানবাসীরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিযিয়া কর প্রদান করে। আর জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) (৯:২৯) শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতে কিতাবীদের নিকট হতে জিযিয়া গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় গ্রন্থে লিখেছেন যে, আকিব ও তায়্যেব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে ‘মুবাহালা’র জন্যে আহ্বান করেন এবং তিনি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদেরকে বলে পাঠালে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই আল্লাহর শপথ! যদি এরা দু’জন ‘না’ বলতো তবে এ উপত্যকাই তাদের উপর অগ্নি বর্ষণ করতো। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), ও হযরত আলী (রাঃ) শব্দের দ্বারা হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে এবং শব্দ দ্বারা হযরত ফাতিমা যুহরা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুসতাদরিক-ই-হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ অর্থের হাদীস বর্ণিত আছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি তা চরম সত্য। এতে চুল পরিমাণও বেশী কম নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, অন্য কেউ নয়। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহান বিজ্ঞানময়। কিন্তু এখনও যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অন্য কিছু মানতে থাকে তবে আল্লাহ তা'আলা বাতিলপন্থী ও বিবাদীদেরকে ভাল করেই জানেন। তিনি তাদেরকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন এবং এর উপরে তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কেউ না পারবে তার নিকট হতে পালাতে না পারবে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আমরা তার শাস্তি হতে তারই নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
আলে ইমরান 3:64
ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং ঐ প্রকারের লোকদেরকে এখানে সম্বোধন করা হয়েছে। (আরবী) 'শব্দের প্রয়োগ (আরবী)-এর উপর হয়ে থাকে। যেমন এখানে (আরবী) বলার পর (আরবী) বলে ওর বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে। শব্দের অর্থ হচ্ছে সমান। অর্থাৎ যাতে মুসলমান ও ইয়াহূদ-খ্রীষ্টান সবাই সমান। অতঃপর ওর তাফসীর করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওটা এই যে, মানুষ এক আল্লাহরই ইবাদত করবে, তার সাথে না কোন প্রতিমার উপাসনা করবে, না ক্রুশের পূজো করবে, না পূজো করবে কোন ছবির। না আল্লাহ ছাড়া আগুনের পূজো করবে, না অন্য কোন জিনিসের উপাসনা করবে। বরং তারা এক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহরই ইবাদত করবে। সমস্ত নবী (আঃ) মানুষকে এ আহ্বানই জানিয়েছিলেন। ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বে আমি যত রাসূল পাঠিয়েছি সবারই নিকট এই অহীই করেছি যে, আমি ছাড়া কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।' (২১:২৫) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে এই বলিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং দেবতাদের উপাসনা হতে বিরত থাক। (১৬:৩৬)অতঃপর বলা হচ্ছে- আল্লাহকে ছেড়ে পরস্পর আমরা একে অপরকে প্রভু বানিয়ে নেবো না। ইবনে জুরায়েজ (রঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে‘আল্লাহর অবাধ্যতায় আমরা একে অপরের অনুসরণ করবো না।' ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও সিজদা করবো না। অতঃপর তারা যদি এ ন্যায় ভিত্তিক আহ্বানে সাড়া না দেয় তবে- “হে মুসলমানগণ, তোমরা যে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করছো ঐ লোকদেরকে তার সাক্ষী বানিয়ে নাও। আমি সহীহ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওর মধ্যে রয়েছে যে, আবু সুফইয়ান (রাঃ) যখন রোম সম্রাট কায়সারের দরবারে আহুত হন এবং সম্রাট তাঁকে রাসূলুল্লাহ। (সঃ)-এর বংশের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন, সে সময় তিনি অমুসলিম ও তাঁর চরম শত্রু হওয়া সত্ত্বেও তার বংশের আভিজাত্যের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হন। অনুরূপভাবে তিনি প্রত্যেক প্রশ্নেরই স্পষ্ট ও সঠিক উত্তর দেন। এটি হোদায়বিয়ার সন্ধির পরের ও মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। এ কারণেই নবী (সঃ) সম্বন্ধে কায়সারের ‘তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আবূ সুফইয়ান (রাঃ) বলেছিলেনঃ “তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন না, তবে এখন আমাদের ও তার মধ্যে একটি চুক্তি রয়েছে, না জানি তিনি এতে কি করেন। এখানে। উদ্দেশ্য এটাই যে, এ সমস্ত কথা বার্তার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র চিঠি পেশ করা হয়, যাতে ‘বিসমিল্লাহ’-এর পরে রয়েছেঃ ‘এ পত্রটি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে রোমের বাদশাহ কায়সারের নিকট। হিদায়াতের অনুসারীদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর ইসলাম গ্রহণ কর তবে শান্তি লাভ করবে এবং আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ পুণ্য দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে সমস্ত প্রজাদের পাপ তোমার উপর বর্তিত হবে। অতঃপর এ আয়াতটিই লিখেছিলেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী। লিখেছেন যে, এ সূরা অর্থাৎ সূরা-ই-আলে-ইমরানের প্রথম হতে নিয়ে কিছু কম বেশী আশি পর্যন্ত আয়াতগুলো নাজরানের প্রতিনিধিদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম এ লোকগুলোই জিযিয়া কর প্রদান করে এবং এ বিষয়ে মোটেই মতবিরোধ নেই যে, জিযিয়ার আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয়। এখন প্রশ্ন উঠে যে, এ আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পর অবতীর্ণ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি করে এ আয়াতটি হিরাক্লিয়াসের পত্রে। লিখলেন? এর উত্তর কয়েক প্রকারের দেয়া যেতে পারে। প্রথম এই যে, সম্ভবতঃ এ আয়াতটি দু’বার অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ একবার হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার মক্কা বিজয়ের পর। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, হয়তো সূরার প্রথম হতে এ আয়াতের পূর্ব পর্যন্ত আয়াতগুলো নাজরানের প্রতিনিধিদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় এবং এ আয়াতটি পূর্বেই অবতীর্ণ হয়েছিল। এ অবস্থায় ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর ‘আশির উপর আরও কিছু আয়াত’ -এ উক্তি রক্ষিত হয় না। কেননা, আবু সুফইয়ান (রাঃ) বর্ণিত ঘটনাটি এর সম্পূর্ণ উল্টো। তৃতীয় উত্তর এই যে, সম্ভবতঃ নাজরানের প্রতিনিধিদল হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে এসেছিল এবং তারা যা কিছু দিতে সম্মত হয়েছিল তা হয়তো মুবাহালা হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে সন্ধি হিসেবেই দিয়েছিল, জিযিয়া হিসেবে নয়। আর এটাইতো সর্বসম্মত কথা যে, জিযিয়ার আয়াত এ ঘটনার পরে অবতীর্ণ হয় যার মধ্যে ওর সাদৃশ্য এসে যায়। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রাঃ) বদরের পূর্বেকার যুদ্ধে যুদ্ধলব্ধ মালকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেন এবং এক পঞ্চমাংশ রেখে বাকীগুলো সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেন। অতঃপর গনীমতের মাল বন্টনের আয়াতগুলোও ওর অনুরূপই অবতীর্ণ হয় এবং এ নির্দেশই দেয়া হয়। চতুর্থ উত্তর এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্র হিরাক্লিয়াসকে পাঠিয়েছিলেন তাতে তিনি এ কথাগুলো নিজের পক্ষ হতেই লিখেছিলেন, অতঃপর তাঁর ভাষাতেই অহী অবতীর্ণ হয়। যেমন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর পর্দার নির্দেশের ব্যাপারে ঐ রকমই আয়াত অবতীর্ণ হয়। বদরের যুদ্ধে যেসব কাফির বন্দী হয়েছিল তাদের ব্যাপারেও হযরত উমার (রাঃ)-এর মতের অনুরূপই আয়াত নাযিল হয়। মুনাফিকদের জানাযার নামায না পড়ার ব্যাপারেও তার মতের অনুরূপ নির্দেশ জারী করা হয়। মাকাম-ই-ইবরাহীম (আঃ)-কে নামাযের স্থান বানানোর ব্যাপারেও এরূপই অহী অবতীর্ণ হয়। (আরবী) (৬৬:৫) -এ আয়াতটিও তার কথারই সাদৃশ্যে অবতীর্ণ হয়। সুতরাং এ আয়াতটিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণার সাদৃশ্যে নাযিল হয়। এটাই খুব সম্ভব।
আলে ইমরান 3:65
৬৫-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা বলতো যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদী ছিলেন এবং খ্রীষ্টানরা বলতো যে, তিনি খ্রীষ্টান ছিলেন এবং একথা নিয়ে তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করতো। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতসমূহে তাদের এ দাবীকে খণ্ডন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টানদের নিকট ইয়াহূদী আলেমগণ আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনেই তারা কলহ আরম্ভ করে দেয়। প্রত্যেক দলেরই এ দাবী ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে বলা হয়, “হে ইয়াহুদীর দল! তোমরা কি করে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত বলছো? অথচ তার যুগে তো হযরত মূসা (আঃ) ছিলেন না এবং তাওরাতও ছিল না। মূসা (আঃ) এবং তাওরাত তো ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে এসেছে। অনুরূপভাবে- “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-কে খ্রীষ্টান কিরূপে বলছো? অথচ খ্রীষ্টান ধর্ম তো তাঁর বহু শতাব্দী পরে প্রকাশ পেয়েছে। এ মোটা কথাটা বুঝার মতও কি তোমাদের জ্ঞান নেই?' অতঃপর এ দু’টি দল যে কিছু না জেনেও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা ভৎসনা করেছেন যে, ধর্মীয় বিষয়ে যে জ্ঞান তাদের রয়েছে তা নিয়ে যদি তারা কলহ করতো তবে কিছুটা খাপ খেতো। কিন্তু তারা এমন বিষয় নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়েছে, যে বিষয়ে তাদের মোটেই জ্ঞান নেই। যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই সে বিষয়টি সর্বজ্ঞাত আল্লাহকে সমর্পণ করাই তাদের উচিত, যিনি প্রত্যেক জিনিসের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত রয়েছেন। একমাত্র মহান আল্লাহর প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। এ জন্যেই তিনি বলেন-“আল্লাহ তা'আলা পরিজ্ঞাত আছেন এবং তোমারা অবগত নও। প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। বরং তিনি অংশীবাদকে ঘৃণা করতেন এবং মুশরিকদের হতে বহু দূরে থাকতেন। তিনি ছিলেন খাটি ঈমানদার। তিনি কখনও মুশরিক ছিলেন।' এ আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল, তোমরা ইয়াহূদী হয়ে যাও অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও তবে সুপথ প্রাপ্ত হবে। (২:১৩৫)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণের বেশী দাবীদার ঐ সব লোক যারা তাঁর যুগে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং এখন এ নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এবং তাঁর অনুসারী মুমিনদের দল, যারা হচ্ছে মুহাজির ও আনসার এবং তাদের পরেও কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারী যত লোক আসবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু নবীদের (আঃ) মধ্য হতে হয়ে থাকে এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হচ্ছেন নবীদের মধ্যে হতে আমার পিতা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। (জামেউত্ তিরমিযী ইত্যাদি) তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে কেউ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করবে তার অভিভাবক আল্লাহ।
আলে ইমরান 3:66
৬৫-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা বলতো যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদী ছিলেন এবং খ্রীষ্টানরা বলতো যে, তিনি খ্রীষ্টান ছিলেন এবং একথা নিয়ে তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করতো। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতসমূহে তাদের এ দাবীকে খণ্ডন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টানদের নিকট ইয়াহূদী আলেমগণ আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনেই তারা কলহ আরম্ভ করে দেয়। প্রত্যেক দলেরই এ দাবী ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে বলা হয়, “হে ইয়াহুদীর দল! তোমরা কি করে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত বলছো? অথচ তার যুগে তো হযরত মূসা (আঃ) ছিলেন না এবং তাওরাতও ছিল না। মূসা (আঃ) এবং তাওরাত তো ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে এসেছে। অনুরূপভাবে- “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-কে খ্রীষ্টান কিরূপে বলছো? অথচ খ্রীষ্টান ধর্ম তো তাঁর বহু শতাব্দী পরে প্রকাশ পেয়েছে। এ মোটা কথাটা বুঝার মতও কি তোমাদের জ্ঞান নেই?' অতঃপর এ দু’টি দল যে কিছু না জেনেও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা ভৎসনা করেছেন যে, ধর্মীয় বিষয়ে যে জ্ঞান তাদের রয়েছে তা নিয়ে যদি তারা কলহ করতো তবে কিছুটা খাপ খেতো। কিন্তু তারা এমন বিষয় নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়েছে, যে বিষয়ে তাদের মোটেই জ্ঞান নেই। যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই সে বিষয়টি সর্বজ্ঞাত আল্লাহকে সমর্পণ করাই তাদের উচিত, যিনি প্রত্যেক জিনিসের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত রয়েছেন। একমাত্র মহান আল্লাহর প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। এ জন্যেই তিনি বলেন-“আল্লাহ তা'আলা পরিজ্ঞাত আছেন এবং তোমারা অবগত নও। প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। বরং তিনি অংশীবাদকে ঘৃণা করতেন এবং মুশরিকদের হতে বহু দূরে থাকতেন। তিনি ছিলেন খাটি ঈমানদার। তিনি কখনও মুশরিক ছিলেন।' এ আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল, তোমরা ইয়াহূদী হয়ে যাও অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও তবে সুপথ প্রাপ্ত হবে। (২:১৩৫)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণের বেশী দাবীদার ঐ সব লোক যারা তাঁর যুগে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং এখন এ নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এবং তাঁর অনুসারী মুমিনদের দল, যারা হচ্ছে মুহাজির ও আনসার এবং তাদের পরেও কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারী যত লোক আসবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু নবীদের (আঃ) মধ্য হতে হয়ে থাকে এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হচ্ছেন নবীদের মধ্যে হতে আমার পিতা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। (জামেউত্ তিরমিযী ইত্যাদি) তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে কেউ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করবে তার অভিভাবক আল্লাহ।
আলে ইমরান 3:67
৬৫-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা বলতো যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদী ছিলেন এবং খ্রীষ্টানরা বলতো যে, তিনি খ্রীষ্টান ছিলেন এবং একথা নিয়ে তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করতো। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতসমূহে তাদের এ দাবীকে খণ্ডন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টানদের নিকট ইয়াহূদী আলেমগণ আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনেই তারা কলহ আরম্ভ করে দেয়। প্রত্যেক দলেরই এ দাবী ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে বলা হয়, “হে ইয়াহুদীর দল! তোমরা কি করে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত বলছো? অথচ তার যুগে তো হযরত মূসা (আঃ) ছিলেন না এবং তাওরাতও ছিল না। মূসা (আঃ) এবং তাওরাত তো ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে এসেছে। অনুরূপভাবে- “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-কে খ্রীষ্টান কিরূপে বলছো? অথচ খ্রীষ্টান ধর্ম তো তাঁর বহু শতাব্দী পরে প্রকাশ পেয়েছে। এ মোটা কথাটা বুঝার মতও কি তোমাদের জ্ঞান নেই?' অতঃপর এ দু’টি দল যে কিছু না জেনেও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা ভৎসনা করেছেন যে, ধর্মীয় বিষয়ে যে জ্ঞান তাদের রয়েছে তা নিয়ে যদি তারা কলহ করতো তবে কিছুটা খাপ খেতো। কিন্তু তারা এমন বিষয় নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়েছে, যে বিষয়ে তাদের মোটেই জ্ঞান নেই। যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই সে বিষয়টি সর্বজ্ঞাত আল্লাহকে সমর্পণ করাই তাদের উচিত, যিনি প্রত্যেক জিনিসের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত রয়েছেন। একমাত্র মহান আল্লাহর প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। এ জন্যেই তিনি বলেন-“আল্লাহ তা'আলা পরিজ্ঞাত আছেন এবং তোমারা অবগত নও। প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। বরং তিনি অংশীবাদকে ঘৃণা করতেন এবং মুশরিকদের হতে বহু দূরে থাকতেন। তিনি ছিলেন খাটি ঈমানদার। তিনি কখনও মুশরিক ছিলেন।' এ আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল, তোমরা ইয়াহূদী হয়ে যাও অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও তবে সুপথ প্রাপ্ত হবে। (২:১৩৫)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণের বেশী দাবীদার ঐ সব লোক যারা তাঁর যুগে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং এখন এ নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এবং তাঁর অনুসারী মুমিনদের দল, যারা হচ্ছে মুহাজির ও আনসার এবং তাদের পরেও কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারী যত লোক আসবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু নবীদের (আঃ) মধ্য হতে হয়ে থাকে এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হচ্ছেন নবীদের মধ্যে হতে আমার পিতা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। (জামেউত্ তিরমিযী ইত্যাদি) তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে কেউ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করবে তার অভিভাবক আল্লাহ।
আলে ইমরান 3:68
৬৫-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা বলতো যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদী ছিলেন এবং খ্রীষ্টানরা বলতো যে, তিনি খ্রীষ্টান ছিলেন এবং একথা নিয়ে তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করতো। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতসমূহে তাদের এ দাবীকে খণ্ডন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নাজরান হতে আগত খ্রীষ্টানদের নিকট ইয়াহূদী আলেমগণ আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনেই তারা কলহ আরম্ভ করে দেয়। প্রত্যেক দলেরই এ দাবী ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে বলা হয়, “হে ইয়াহুদীর দল! তোমরা কি করে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত বলছো? অথচ তার যুগে তো হযরত মূসা (আঃ) ছিলেন না এবং তাওরাতও ছিল না। মূসা (আঃ) এবং তাওরাত তো ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে এসেছে। অনুরূপভাবে- “হে খ্রীষ্টানের দল! তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-কে খ্রীষ্টান কিরূপে বলছো? অথচ খ্রীষ্টান ধর্ম তো তাঁর বহু শতাব্দী পরে প্রকাশ পেয়েছে। এ মোটা কথাটা বুঝার মতও কি তোমাদের জ্ঞান নেই?' অতঃপর এ দু’টি দল যে কিছু না জেনেও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা ভৎসনা করেছেন যে, ধর্মীয় বিষয়ে যে জ্ঞান তাদের রয়েছে তা নিয়ে যদি তারা কলহ করতো তবে কিছুটা খাপ খেতো। কিন্তু তারা এমন বিষয় নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়েছে, যে বিষয়ে তাদের মোটেই জ্ঞান নেই। যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই সে বিষয়টি সর্বজ্ঞাত আল্লাহকে সমর্পণ করাই তাদের উচিত, যিনি প্রত্যেক জিনিসের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত রয়েছেন। একমাত্র মহান আল্লাহর প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। এ জন্যেই তিনি বলেন-“আল্লাহ তা'আলা পরিজ্ঞাত আছেন এবং তোমারা অবগত নও। প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। বরং তিনি অংশীবাদকে ঘৃণা করতেন এবং মুশরিকদের হতে বহু দূরে থাকতেন। তিনি ছিলেন খাটি ঈমানদার। তিনি কখনও মুশরিক ছিলেন।' এ আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল, তোমরা ইয়াহূদী হয়ে যাও অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও তবে সুপথ প্রাপ্ত হবে। (২:১৩৫)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণের বেশী দাবীদার ঐ সব লোক যারা তাঁর যুগে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং এখন এ নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এবং তাঁর অনুসারী মুমিনদের দল, যারা হচ্ছে মুহাজির ও আনসার এবং তাদের পরেও কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারী যত লোক আসবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু নবীদের (আঃ) মধ্য হতে হয়ে থাকে এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হচ্ছেন নবীদের মধ্যে হতে আমার পিতা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। (জামেউত্ তিরমিযী ইত্যাদি) তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে কেউ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করবে তার অভিভাবক আল্লাহ।
আলে ইমরান 3:69
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:70
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:71
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:72
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:73
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:74
৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।' তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আলে ইমরান 3:75
৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা যে গচ্ছিত দ্রব্য আত্মসৎ করে থাকে এখানে সে সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তারা যেন ইয়াহূদীদের প্রতারণায় না পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্যই বিশ্বস্ত রয়েছে, কিন্তু কেউ কেউ বড়ই আত্মসাত্তারী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন বিশ্বস্ত যে, তার কাছে রাশি রাশি সম্পদ রাখলেও সে যেমনকার তেমনই প্রত্যর্পণ করবে। কিন্তু কেউ কেউ এত বড় আত্মসাঙ্কারী যে, তার নিকট শুধুমাত্র একটি দীনার’ গচ্ছিত রাখলেও সে তা ফিরিয়ে দেবে না। তবে যদি মাঝে মাঝে তাগাদা করা হয় তবে হয়তো ফিরিয়ে দেবে নচেৎ একেবারে হজম করে নেবে। সে যখন একটা দীনারেরও লোভ সামলাতে পারলো না তখন বেশী সম্পদ তার নিকট গচ্ছিত রাখলে যে অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। (আরবী) শব্দটির পূর্ণ তাফসীর সূরার প্রথমেই বর্ণিত হয়েছে। আর দীনারের অর্থততা সর্বজন বিদিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত মালিক ইবনে দীনারের উক্তি বর্ণিত আছেঃ ‘দীনারকে দীনার বলার কারণ এই যে, ওটা ‘দীন’ অর্থাৎ ঈমানও বটে এবং নার’ অর্থাৎ আগুনও বটে। ভাবার্থ এই যে, সত্যের সাথে গ্রহণ করলে দীন এবং অন্যায়ভাবে গ্রহণ করলে জাহান্নামের অগ্নি। এ স্থলে ঐ হাদীসটি বর্ণনা করাও যথোপযুক্ত বলে মনে করি যা সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে কয়েক জায়গায় এসেছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে একটি লোক অন্য একটি লোকের নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ঋণ চায়। ঐ লোকটি বলেঃ ‘সাক্ষী নিয়ে এসো।' সে বলেঃ আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' সে বলেঃ জামিন আন। সে বলেঃ ‘জামানত আল্লাহ তা'আলাকেই দিচ্ছি।' সে তাতে সম্মত হয়ে যায় এবং পরিশোধের মেয়াদ ঠিক করে তাকে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে দেয়।অতঃপর ঋণী ব্যক্তি সামুদ্রিক সফরে বেরিয়ে পড়ে। কাজ-কাম শেষ করে সে সমুদ্রের ধারে এসে কোন জাহাজের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে, উদ্দেশ্য এই যে, মহাজনের নিকট গিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু কোন জাহাজ পেলো না। তখন সে এক খণ্ড কাঠ নিয়ে ওর ভেতর ফাঁপা করলো এবং ওর মধ্যে এক হাজার দীনার রেখে দিল এবং মহাজনের নামে একটি চিঠিও দিল। অতঃপর ওর মুখ বন্ধ করে দিয়ে ওটা সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল। অতঃপর বললোঃ “হে আল্লাহ! আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে, আমি অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে এক হাজার দীনার কর্জ নিয়েছি। তাতে আমি আপনাকেই সাক্ষী ও জামিন রেখেছি। সেও তাতে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ঋণ দিয়েছে। এখন আমি সময়মত তার ঋণ পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নৌকা খোঁজ করছি কিন্তু পাচ্ছি না। কাজেই আমি বাধ্য হয়ে আপনারই উপর ভরসা করতঃ তা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছি। আপনি তাকে তা পৌঁছে দিন।' এ প্রার্থনা জানিয়ে সে চলে আসে। কাঠটি পানিতে ডুবে যায়। সে কিন্তু নৌকার অনুসন্ধানেই থাকে যে, গিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করবে। এদিকে ঐ মহাজন লোকটি এ আশায় নদীর ধারে আসে যে, হয়তো ঋণী ব্যক্তি নৌকায় তার প্রাপ্য নিয়ে আসছে। যখন দেখল যে, কোন নৌকা আসেনি তখন সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমতাবস্থায় একটি কাঠ নদীর ধারে পড়ে থাকতে দেখে জ্বালানীর কাজ দেবে মনে করে তা উঠিয়ে নেয় এবং বাড়ী গিয়ে কাঠটি ফাঁড়লে এক হাজার দীনার ও একটি চিঠি বেরিয়ে পড়ে। অতঃপর ঋণ গ্রহীতা লোকটি এসে পড়ে এবং বলেঃ ‘আল্লাহ জানেন আমি সদা চেষ্টা করেছি যে, নৌকা পেলে তাতে উঠে আপনার নিকট আগমন করতঃ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার ঋণ পরিশোধ করবো। কিন্তু কোন নৌকা না পাওয়ায় বিলম্ব হয়ে গেল। সে তখন বলেঃ আপনি যে মুদ্রা পাঠিয়েছিলেন আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট পৌছে দিয়েছেন। এখন আপনি আপনার মুদ্রা নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যান। আহলে কিতাবের ভুল ধারণা এই ছিল যে, ধর্মান্ধ ও অশিক্ষিতদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করলে কোন দোষ নেই। ওটা তাদের জন্য বৈধ। তাদের এ বদ ধারণা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে। কেননা, ওটা যে তাদের জন্য বৈধ নয় তা তারাও জানে। কারণ তাদের গ্রন্থেও অন্যায় মালকে আল্লাহ তাআলা অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এ নির্বোধের দল নিজেদের মনগড়া কথাকে শরীয়তের রঙ্গে রঞ্জিত করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জনগণ ফতওয়া জিজ্ঞেস করেনঃ ‘জিহাদের অবস্থায় কখনো কখনো আমরা জিম্মী কাফিরদের মুরগী, ছাগল ইত্যাদি পেয়ে থাকি এবং মনে করি যে ঐগুলো গ্রহণ করাতে কোন দোষ নেই (এতে আপনার মত কি?)।' তিনি বলেনঃ “কিতাবধারীরাও ঠিক এ কথাই বলতো যে, মূর্খদের মাল গ্রহণে কোন দোষ নেই। জেনে রেখো যে, যখন তারা জিযিয়া কর প্রদান করবে তখন তাদের কোন মাল তোমাদের জন্যে বৈধ হবে না। তবে যদি তারা খুশী মনে দেয় তা অন্য কথা। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক) হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, যখন গ্ৰন্থধারীদের নিকট হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শ্রবণ করেন তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শত্রুরা মিথ্যাবাদী। একমাত্র আমানত ছাড়া অজ্ঞতা যুগের সমস্ত কিছুই আমার পায়ের নীচে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কেননা, আমানত কোন পাপী ও দুরাচারের হলেও ফিরিয়ে দিতে হবে।'অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘কিন্তু যে ব্যক্তি স্বীয় অঙ্গীকার পুরো করে এবং আল্লাহকে ভয় করে, আর আহলে কিতাব হয়েও স্বীয় ধর্মগ্রন্থের হিদায়াত অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে, যে অঙ্গীকার সমস্ত নবী (আঃ)-এর নিকট হতে নেয়া হয়েছিল এবং যে অঙ্গীকার প্রতিপালনের দায়িত্ব তাদের উম্মতগণের উপরও রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ পাকের অবৈধকৃত জিনিস হতে দূরে থাকে, তাঁর শরীয়তের অনুসরণ করে এবং নবীগণের (আঃ) নেতা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে, সেই মুত্তাকী এবং মুত্তাকী ব্যক্তিরাই আল্লাহর বন্ধু।
আলে ইমরান 3:76
৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা যে গচ্ছিত দ্রব্য আত্মসৎ করে থাকে এখানে সে সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তারা যেন ইয়াহূদীদের প্রতারণায় না পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্যই বিশ্বস্ত রয়েছে, কিন্তু কেউ কেউ বড়ই আত্মসাত্তারী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন বিশ্বস্ত যে, তার কাছে রাশি রাশি সম্পদ রাখলেও সে যেমনকার তেমনই প্রত্যর্পণ করবে। কিন্তু কেউ কেউ এত বড় আত্মসাঙ্কারী যে, তার নিকট শুধুমাত্র একটি দীনার’ গচ্ছিত রাখলেও সে তা ফিরিয়ে দেবে না। তবে যদি মাঝে মাঝে তাগাদা করা হয় তবে হয়তো ফিরিয়ে দেবে নচেৎ একেবারে হজম করে নেবে। সে যখন একটা দীনারেরও লোভ সামলাতে পারলো না তখন বেশী সম্পদ তার নিকট গচ্ছিত রাখলে যে অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। (আরবী) শব্দটির পূর্ণ তাফসীর সূরার প্রথমেই বর্ণিত হয়েছে। আর দীনারের অর্থততা সর্বজন বিদিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত মালিক ইবনে দীনারের উক্তি বর্ণিত আছেঃ ‘দীনারকে দীনার বলার কারণ এই যে, ওটা ‘দীন’ অর্থাৎ ঈমানও বটে এবং নার’ অর্থাৎ আগুনও বটে। ভাবার্থ এই যে, সত্যের সাথে গ্রহণ করলে দীন এবং অন্যায়ভাবে গ্রহণ করলে জাহান্নামের অগ্নি। এ স্থলে ঐ হাদীসটি বর্ণনা করাও যথোপযুক্ত বলে মনে করি যা সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে কয়েক জায়গায় এসেছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে একটি লোক অন্য একটি লোকের নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ঋণ চায়। ঐ লোকটি বলেঃ ‘সাক্ষী নিয়ে এসো।' সে বলেঃ আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' সে বলেঃ জামিন আন। সে বলেঃ ‘জামানত আল্লাহ তা'আলাকেই দিচ্ছি।' সে তাতে সম্মত হয়ে যায় এবং পরিশোধের মেয়াদ ঠিক করে তাকে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে দেয়।অতঃপর ঋণী ব্যক্তি সামুদ্রিক সফরে বেরিয়ে পড়ে। কাজ-কাম শেষ করে সে সমুদ্রের ধারে এসে কোন জাহাজের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে, উদ্দেশ্য এই যে, মহাজনের নিকট গিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু কোন জাহাজ পেলো না। তখন সে এক খণ্ড কাঠ নিয়ে ওর ভেতর ফাঁপা করলো এবং ওর মধ্যে এক হাজার দীনার রেখে দিল এবং মহাজনের নামে একটি চিঠিও দিল। অতঃপর ওর মুখ বন্ধ করে দিয়ে ওটা সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল। অতঃপর বললোঃ “হে আল্লাহ! আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে, আমি অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে এক হাজার দীনার কর্জ নিয়েছি। তাতে আমি আপনাকেই সাক্ষী ও জামিন রেখেছি। সেও তাতে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ঋণ দিয়েছে। এখন আমি সময়মত তার ঋণ পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নৌকা খোঁজ করছি কিন্তু পাচ্ছি না। কাজেই আমি বাধ্য হয়ে আপনারই উপর ভরসা করতঃ তা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছি। আপনি তাকে তা পৌঁছে দিন।' এ প্রার্থনা জানিয়ে সে চলে আসে। কাঠটি পানিতে ডুবে যায়। সে কিন্তু নৌকার অনুসন্ধানেই থাকে যে, গিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করবে। এদিকে ঐ মহাজন লোকটি এ আশায় নদীর ধারে আসে যে, হয়তো ঋণী ব্যক্তি নৌকায় তার প্রাপ্য নিয়ে আসছে। যখন দেখল যে, কোন নৌকা আসেনি তখন সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমতাবস্থায় একটি কাঠ নদীর ধারে পড়ে থাকতে দেখে জ্বালানীর কাজ দেবে মনে করে তা উঠিয়ে নেয় এবং বাড়ী গিয়ে কাঠটি ফাঁড়লে এক হাজার দীনার ও একটি চিঠি বেরিয়ে পড়ে। অতঃপর ঋণ গ্রহীতা লোকটি এসে পড়ে এবং বলেঃ ‘আল্লাহ জানেন আমি সদা চেষ্টা করেছি যে, নৌকা পেলে তাতে উঠে আপনার নিকট আগমন করতঃ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার ঋণ পরিশোধ করবো। কিন্তু কোন নৌকা না পাওয়ায় বিলম্ব হয়ে গেল। সে তখন বলেঃ আপনি যে মুদ্রা পাঠিয়েছিলেন আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট পৌছে দিয়েছেন। এখন আপনি আপনার মুদ্রা নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যান। আহলে কিতাবের ভুল ধারণা এই ছিল যে, ধর্মান্ধ ও অশিক্ষিতদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করলে কোন দোষ নেই। ওটা তাদের জন্য বৈধ। তাদের এ বদ ধারণা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে। কেননা, ওটা যে তাদের জন্য বৈধ নয় তা তারাও জানে। কারণ তাদের গ্রন্থেও অন্যায় মালকে আল্লাহ তাআলা অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এ নির্বোধের দল নিজেদের মনগড়া কথাকে শরীয়তের রঙ্গে রঞ্জিত করছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জনগণ ফতওয়া জিজ্ঞেস করেনঃ ‘জিহাদের অবস্থায় কখনো কখনো আমরা জিম্মী কাফিরদের মুরগী, ছাগল ইত্যাদি পেয়ে থাকি এবং মনে করি যে ঐগুলো গ্রহণ করাতে কোন দোষ নেই (এতে আপনার মত কি?)।' তিনি বলেনঃ “কিতাবধারীরাও ঠিক এ কথাই বলতো যে, মূর্খদের মাল গ্রহণে কোন দোষ নেই। জেনে রেখো যে, যখন তারা জিযিয়া কর প্রদান করবে তখন তাদের কোন মাল তোমাদের জন্যে বৈধ হবে না। তবে যদি তারা খুশী মনে দেয় তা অন্য কথা। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাক) হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, যখন গ্ৰন্থধারীদের নিকট হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শ্রবণ করেন তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শত্রুরা মিথ্যাবাদী। একমাত্র আমানত ছাড়া অজ্ঞতা যুগের সমস্ত কিছুই আমার পায়ের নীচে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কেননা, আমানত কোন পাপী ও দুরাচারের হলেও ফিরিয়ে দিতে হবে।'অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘কিন্তু যে ব্যক্তি স্বীয় অঙ্গীকার পুরো করে এবং আল্লাহকে ভয় করে, আর আহলে কিতাব হয়েও স্বীয় ধর্মগ্রন্থের হিদায়াত অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে, যে অঙ্গীকার সমস্ত নবী (আঃ)-এর নিকট হতে নেয়া হয়েছিল এবং যে অঙ্গীকার প্রতিপালনের দায়িত্ব তাদের উম্মতগণের উপরও রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ পাকের অবৈধকৃত জিনিস হতে দূরে থাকে, তাঁর শরীয়তের অনুসরণ করে এবং নবীগণের (আঃ) নেতা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে, সেই মুত্তাকী এবং মুত্তাকী ব্যক্তিরাই আল্লাহর বন্ধু।
আলে ইমরান 3:77
অর্থাৎ গ্রন্থধারীদের মধ্যে যারা আল্লাহর অঙ্গীকারের কোন ধার ধারে না, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণ করে না, তার গুণাবলীর কথা জনগণের সামনে প্রকাশ করে না, তার সম্পর্কে কিছুই বর্ণনা করে না এবং মিথ্যা শপথ করে থাকে আর এসব জঘন্য কার্যের বিনিময়ে এ নশ্বর জগতে কিছু উপকার লাভ করে, তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কোন ভালবাসাপূর্ণ কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না। তাদেরকে তিনি পাপ হতে পবিত্রও করবেন না, রবং তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেবেন। তথায় তারা বেদনাদায়ক শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। এ আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীসও রয়েছে। ঐগুলোর মধ্যে সামান্য কয়েকটি হাদীস এখানে বর্ণনা করা হচ্ছেঃ(১) মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিন প্রকারের লোক রয়েছে যাদের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা না কথা বলবেন, না। তাদের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন আর না তাদেরকে পবিত্র করবেন। একথা শুনে হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ লোকগুলো কে? এরা তো বড় ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার একথাই বলেন। অতঃপর তিনি উত্তর দেনঃ ১. যে ব্যক্তি পায়ের গিটের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়, ২. মিথ্যা শপথ করে যে নিজের পণ্য বিক্রি করে এবং ৩, অনুগ্রহ করার পরে যে তা প্রকাশ করে। সহীহ মুসলিম প্রভৃতির মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। (২) মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আবু আহমাস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি হযরত আবু যার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ তাঁকে বলি-আমি শুনেছি যে, আপনি নাকি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করে থাকেন? তিনি বলেন, জেনে রাখুন যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে যা শুনি সে ব্যাপারে আমি তার উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারি না। বলুন, ঐ হাদীসটি কি? আমি বলি, (তা হচ্ছে) তিন প্রকারের লোককে আল্লাহ তা'আলা বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন এবং তিন প্রকারের লোকের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন। তখন তিনি বলেনঃ হ্যা, এ হাদীসটি আমি বর্ণনাও করেছি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছিও বটে।' আমি জিজ্ঞেস করি, কোন কোন্ লোককে তিনি বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। তিনি বলেনঃ ‘প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'আলার শত্রুদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বীরত্বের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যায়। অতঃপর হয় সে বক্ষ বিদীর্ণ করিয়ে দেয়, না হয় বিজয়ী বেশে ফিরে আসে। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে কোন যাত্রী দলের সাথে সফররত হয়েছে। বহু রাত পর্যন্ত যাত্রী দল চলতে থাকে। যখন অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন এক জায়গায় অবতরণ করে। সবাই তো ঘুমিয়ে পড়ে কিন্তু ঐ লোকটি জেগে থাকে এবং নামাযে মশগুল হয়ে পড়ে। অতঃপর যাত্রার সময় সকলকে জাগিয়ে দেয়। তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যার প্রতিবেশী তাকে কষ্ট দেয় এবং সে ধৈর্যধারণ করে, যে পর্যন্ত না মৃত্যু অথবা সফর তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করে। আমি বলিঃ ঐ তিন ব্যক্তি কারা যাদের উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট? তিনি বলেনঃ ১. খুব বেশী শপথকারী ব্যবসায়ী, ২. অহংকারী দরিদ্র এবং ৩. অনুগ্রহ প্রকাশকারী কৃপণ। এ হাদীসটি এ সনদে গারীব।(৩) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, কিন্দা গোত্রের ইমরুল কায়েস নামক একটি লোকের সঙ্গে হায়রে মাউতের একটি লোকের জমিজমা নিয়ে বিবাদ ছিল। এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হলে তিনি বলেনঃ “হারামী ব্যক্তি প্রমাণ উপস্থিত করুক। তার নিকট কোন প্রমাণ ছিল না। তখন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘কিন্দী ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করুক।' তখন হাযরামী লোকটি বলেঃ আপনি যখন তার শপথের উপরেই ফায়সালা করলেন তখন কা’বার প্রভুর শপথ করে আমি বলতে পারি যে, সে আমার জমি নিয়ে নেবে।' তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খেয়ে কারও মাল নিজের করে নেবে সে যখন আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে তখন আল্লাহ পাক তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন ইমরুল কায়েস বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি কেউ তার দাবী ছেড়ে দেয় তবে সে তার কি প্রতিদান পাবে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: ‘জান্নাত। সে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমি তাকে সমস্ত ভূমি ছেড়ে দিলাম। এ হাদীসটি সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে। (৪) “যে ব্যক্তি কারও সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে মিথ্যা শপথ করে, সে যখন আল্লাহ পাকের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হবেন। হযরত আশআস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর শপথ! এটা আমারই সম্বন্ধে। আমারও একজন ইয়াহূদীর মধ্যে ভাগে এক খণ্ড ভূমি ছিল। সে আমার অংশ অস্বীকার করে বসে। আমি ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি। তিনি আমাকে বলেনঃ “তোমার নিকট কোন প্রমাণ আছে কি? আমি বলিঃ না। তিনি ইয়াহূদীকে শপথ করতে বলেন। আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তি শপথ করে আমার মাল নিয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও রয়েছে।(৫) মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের মাল অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ পাক তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকবেন। এমন সময় তথায় হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ আবু আব্দির রহমান আপনার নিকট কি হাদীস বর্ণনা করেন? আমি দ্বিতীয় বার বর্ণনা করি। তখন তিনি বলেনঃ এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ব্যাপারেই বর্ণনা করেছেন। আমার এবং আমার এক চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে একটি কূপ নিয়ে বিবাদ ছিল। কূপটি তারই অধিকারে ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আমরা এ মামলা নিয়ে গেলে তিনি আমাকে বলেনঃ তুমি প্রমাণ উপস্থিত কর যে, কূপটি তোমারই, নতুবা তার শপথের উপরেই ফায়সালা হবে। আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট তো কোন প্রমাণ নেই, আর যদি তার শপথের উপরে নির্ভর করে মীমাংসা করা হয় তবে সে আমার কূপ নিয়ে নেবে। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তো দুশ্চরিত্র ব্যক্তি। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করতঃ এ আয়াতটি পাঠ করেন।(৬) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের মধ্যে কতক বান্দা এমনও রয়েছে যাদের সঙ্গে তিনি কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে দেখবেন না। জিজ্ঞেস করা হয়ঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কে? তিনি বলেনঃ “স্বীয় বাপ-মার প্রতি অসন্তোষ ও অনাগ্রহ প্রকাশকারী ছেলে, ছেলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশকারী ও তার নিকট হতে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনকারী বাপ এবং ঐ ব্যক্তি যার উপর কোন গোত্রের অনুগ্রহ রয়েছে কিন্তু সে তা অস্বীকার করে এবং নিজেকে ওটা হতে মুক্ত মনে করতঃ তাদের দিক হতে চক্ষু ফিরিয়ে নেয়।(৭) মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “একটি লোক স্বীয় পণ্য দ্রব্য বাজারে রেখে শপথ করে বলে যে, ঐ গুলোর এত এত দর দেয়া হতো। কিন্তু আসলে তা দেয়া হতো না। উদ্দেশ্যে ছিল যেন মুসলমানেরা তার ফাঁদে পড়ে যায়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারীর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে।(৮) মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিন ব্যক্তির সঙ্গে মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে দেখবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, আর তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। প্রথম ঐ ব্যক্তি যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি রয়েছে কিন্তু কোন মুসাফিরকে সে তা প্রদান করে না। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে আসরের পরে মিথ্যা কসম খেয়ে স্বীয় মাল বিক্রি করে। তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যে মুসলমান বাদশাহর হাতে বায়আত গ্রহণ করে, অতঃপর যদি বাদশাহ তাকে মাল প্রদান করেন তবে সে বায়আত পুরো করে এবং মাল না দিলে তা পুরো করে না। এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন।
আলে ইমরান 3:78
এখানেও ঐ অভিশপ্ত ইয়াহূদীদেরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের মধ্যে একটি দল এমনও রয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার কথাকে স্বীয় স্থান হতে সরিয়ে দেয়, তাঁর গ্রন্থের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে এবং প্রকৃত অর্থ ও সঠিক ভাবার্থ বিকৃত করে দেয়। আর এর মাধ্যমে তারা মূর্খদেরকে এই চক্রে ফেলে দেয় যে, এটাই আল্লাহর কিতাব। আবার তারা ওটাকে আল্লাহর কিতাবের নাম দিয়ে পাঠ করতঃ তাদের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে। তারা জেনে শুনে এভাবে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা বলে। এখানে ভাষাকে বক্র বা কুঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন করে দেয়া। সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ঐ লোকগুলো পরিবর্তন করে দিতো এবং সরিয়ে দিতো। সৃষ্টজীবের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আল্লাহ তা'আলার কিতাবের কোন শব্দ পরিবর্তন করতে পারে। তবে হ্য, ঐ লোকগুলো অর্থ পরিবর্তন করতো এবং বাজে ব্যাখ্যা করতো। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) বলেন যে, তাওরাত ও ইঞ্জীল ঐ রূপই রয়েছে। যেরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা ওগুলো অবতীর্ণ করেছেন। ওগুলোর একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি। কিন্তু ঐ লোকেরা অর্থের পরিবর্তন, মনগড়া ব্যাখ্যা করে জনগণকে পথভ্রষ্ট করতো। তারা নিজেদের পক্ষ হতে সে পুস্তকগুলো লিখতো এবং আল্লাহ তা'আলার কিতাব বলে প্রচার করতো, ওগুলো দ্বারাও লোকদেরকে বিপথে চালিত করতো, অথচ ওগুলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত কিতাবগুলো রক্ষিতই রয়েছে, ঐগুলো কখনও পরিবর্তিত হয় না। (মুসনাদ-ই-ইবনে হাতিম) হযরত অহাব (রঃ)-এর এ ঘোষণার ভাবার্থ যদি এই হয় যে, তাদের নিকট এখন যে গ্রন্থসমূহ রয়েছে তবে তো আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, ওগুলো পরিবর্তিত হয়েছে এবং ওগুলো হ্রাস বৃদ্ধি হতে মোটেই পবিত্র নয়। অতঃপর আরবী ভাষায় অনুদিত হয়ে যেগুলো আমাদের হাতে রয়েছে ওগুলো তো বড়ই ত্রুটিপূর্ণ এবং এগুলোর মধ্যে খুবই বাড়াবাড়ি আছে ও মূল হতে বহু ঘাটতিও রয়েছে। তাছাড়া ঐগুলোর মধ্যে স্পষ্ট সন্দেহ ও প্রকাশ্য ক্রটি বিদ্যমান। বরং প্রকৃত প্রস্তাবে ওকে অনুবাদ বলাই শোভনীয় নয়। ওটাতো তাফসীর, তাও আবার এমন তাফসীর যা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়। ওগুলো নির্বোধের লিখা তাফসীর। আর যদি হযরত অহাব (রঃ)-এর ঘোষণার ভাবার্থ হয় আল্লাহ তা'আলার কিতাব, অর্থাৎ যা প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর কিতাব, তবে তা নিঃসন্দেহে রক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে হ্রাস বৃদ্ধি সম্ভবই নয়।
আলে ইমরান 3:79
৭৯-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যখন ইয়াহূদী ও নাজরানের খ্রীষ্টানগণ একত্রিত হয় এবং তিনি তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের প্রতি আহ্বান জানান তখন আবু রাফি’ ফারাযী বলেঃ আপনি চান যে, খ্রীষ্টানেরা যেমন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর ইবাদত করে তদ্রুপ আমরাও আপনার ইবাদত করি? তখন নাজরানী খ্রীষ্টানদের মধ্যে আঈস' নামক এক ব্যক্তিও এ কথাই বলেঃ ‘আপনি কি এটাই চান? এই কি আপনার দাওয়াত? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এটা হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। না নিজে আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করি, না অন্য কাউকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করার শিক্ষা দেই। আমার প্রেরিতত্ত্বের উদ্দেশ্যও এটা নয়। এবং আল্লাহ তা'আলা আমাকে এর নির্দেশও দেননি। তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয়-কোন মানুষের জন্যে বাঞ্ছনীয় নয় যে, ধর্মীয় গ্রন্থ, নবুওয়াত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান লাভের পর সে মানুষকে স্বীয় ইবাদতের জন্যে আহ্বান করে। এত বড় বড় নবী যাদেরকে এত বেশী শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান দান করা হয়েছে। তাদেরকেই যখন মানুষের ইবাদত গ্রহণের মর্যাদা দেয়া হয়নি। তখন অন্য লোক কোন মুখে মানুষকে নিজের ইবাদতের জন্যে আহ্বান করতে পারে? ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ একজন সাধারণ মুমিন দ্বারাও এটা হতে পারে না যে, সে মানুষকে স্বীয় ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। এখানে এটা বলার কারণ এই যে, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা পরস্পরের মধ্যেই একে অপরের ইবাদত করতো। পবিত্র কুরআনই তার সাক্ষী। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের আলেমদেরকে ও দরবেশদেরকে নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। (৯:৩১) মুসনাদ-ই-আহমাদ ও জামেউত্ তিরমিযীর এ হাদীসও আসছে যে, হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেন যে, তারা তো তাদের পূজো করতো না। তখন তিনি বলেনঃ “কেন নয়? তারা তাদের উপর হারামকে হালাল করতো এবং হালালকে হারাম করতো এবং ওরা ওদের কথা মেনে চলতো। এটাই ছিল তাদের ইবাদত।' সুতরাং মূর্খ দরবেশ এবং নির্বোধ আলেমরা এ ধমকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তার অনুসারী আলেমগণ এটা হতে সম্পূর্ণ পৃথক। কেননা, তারা তো শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার আদেশ ও নিষেধ এবং তার রাসূল (সঃ)-এর কথাই প্রচার করে থাকেন এবং এসব কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখেন যেসব কাজ হতে নবীগণ (আঃ) বিরত রাখতেন। নবীগণততা হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টের মাঝে দূত স্বরূপ। তারা প্রেরিতত্বের কার্যাবলী পালন করেন এবং আল্লাহ তাআলার আমানত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাঁর বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে থাকেন। রাসূলদের সুপথ প্রদর্শন তো হচ্ছে মানুষকে প্রভুর ইবাদতকারী বানিয়ে দেয়া। ওর মাধ্যমে তারা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, মুত্তাকী এবং পুণ্যবান হয়ে যায়। হযরত যহহাক (রঃ) বলেন, কুরআন কারীম শিক্ষাকারীদের উপর এ দাবী রয়েছে যে, তারা যেন বিবেচক হয়। তাআলামুনা এবং তুআলেমুনা এ দুটো পঠনই রয়েছে। প্রথমটির অর্থ হচ্ছে অনুধাবন করা এবং দ্বিতীয়টির অর্থ হচ্ছে শিক্ষা দান করা। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শব্দসমূহ মুখস্থ করা।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ সে এই নির্দেশ দেয় না যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর, সে আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত রাসূলই হোক বা তার নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাই হোক। এ কথা ঐ ব্যক্তিই বলতে পারে যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতের দিকে আহবান করে। আর যে ব্যক্তি এ কাজ করে সে কুফরী করে এবং কুফরী করা নবীদের (আঃ) কাজ নয়। তাদের কাজ তো হচ্ছে ঈমান, আর ঈমান হচ্ছে একক আল্লাহর ইবাদত করার নাম। নবীদের কণ্ঠে এ শব্দই উচ্চারিত হয়। যেমন স্বয়ং কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি যত রাসূল পাঠিয়েছিলাম সবারই উপরেই এ অহী করেছিলাম যে, আমি ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদত কর। (২১:২৫) অন্য জায়গায় ঘোষণা করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত হতে বিরত থাক। (১৬:৩৬), অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছেঃ “তোমার পূর্বেকার সমস্ত নবী (আঃ)-কে জিজ্ঞেস কর যে, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য মাবুদ নির্ধারিত করেছি যাদের তারা ইবাদত করবে?' ফেরেশতাদের পক্ষ হতে আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে বলে- আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমিই পূজনীয় আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবো এবং এভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। (২১:২৯)
আলে ইমরান 3:80
৭৯-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যখন ইয়াহূদী ও নাজরানের খ্রীষ্টানগণ একত্রিত হয় এবং তিনি তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের প্রতি আহ্বান জানান তখন আবু রাফি’ ফারাযী বলেঃ আপনি চান যে, খ্রীষ্টানেরা যেমন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর ইবাদত করে তদ্রুপ আমরাও আপনার ইবাদত করি? তখন নাজরানী খ্রীষ্টানদের মধ্যে আঈস' নামক এক ব্যক্তিও এ কথাই বলেঃ ‘আপনি কি এটাই চান? এই কি আপনার দাওয়াত? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এটা হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। না নিজে আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করি, না অন্য কাউকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করার শিক্ষা দেই। আমার প্রেরিতত্ত্বের উদ্দেশ্যও এটা নয়। এবং আল্লাহ তা'আলা আমাকে এর নির্দেশও দেননি। তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয়-কোন মানুষের জন্যে বাঞ্ছনীয় নয় যে, ধর্মীয় গ্রন্থ, নবুওয়াত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান লাভের পর সে মানুষকে স্বীয় ইবাদতের জন্যে আহ্বান করে। এত বড় বড় নবী যাদেরকে এত বেশী শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান দান করা হয়েছে। তাদেরকেই যখন মানুষের ইবাদত গ্রহণের মর্যাদা দেয়া হয়নি। তখন অন্য লোক কোন মুখে মানুষকে নিজের ইবাদতের জন্যে আহ্বান করতে পারে? ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ একজন সাধারণ মুমিন দ্বারাও এটা হতে পারে না যে, সে মানুষকে স্বীয় ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। এখানে এটা বলার কারণ এই যে, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা পরস্পরের মধ্যেই একে অপরের ইবাদত করতো। পবিত্র কুরআনই তার সাক্ষী। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের আলেমদেরকে ও দরবেশদেরকে নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। (৯:৩১) মুসনাদ-ই-আহমাদ ও জামেউত্ তিরমিযীর এ হাদীসও আসছে যে, হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেন যে, তারা তো তাদের পূজো করতো না। তখন তিনি বলেনঃ “কেন নয়? তারা তাদের উপর হারামকে হালাল করতো এবং হালালকে হারাম করতো এবং ওরা ওদের কথা মেনে চলতো। এটাই ছিল তাদের ইবাদত।' সুতরাং মূর্খ দরবেশ এবং নির্বোধ আলেমরা এ ধমকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তার অনুসারী আলেমগণ এটা হতে সম্পূর্ণ পৃথক। কেননা, তারা তো শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার আদেশ ও নিষেধ এবং তার রাসূল (সঃ)-এর কথাই প্রচার করে থাকেন এবং এসব কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখেন যেসব কাজ হতে নবীগণ (আঃ) বিরত রাখতেন। নবীগণততা হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টের মাঝে দূত স্বরূপ। তারা প্রেরিতত্বের কার্যাবলী পালন করেন এবং আল্লাহ তাআলার আমানত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাঁর বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে থাকেন। রাসূলদের সুপথ প্রদর্শন তো হচ্ছে মানুষকে প্রভুর ইবাদতকারী বানিয়ে দেয়া। ওর মাধ্যমে তারা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, মুত্তাকী এবং পুণ্যবান হয়ে যায়। হযরত যহহাক (রঃ) বলেন, কুরআন কারীম শিক্ষাকারীদের উপর এ দাবী রয়েছে যে, তারা যেন বিবেচক হয়। তাআলামুনা এবং তুআলেমুনা এ দুটো পঠনই রয়েছে। প্রথমটির অর্থ হচ্ছে অনুধাবন করা এবং দ্বিতীয়টির অর্থ হচ্ছে শিক্ষা দান করা। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শব্দসমূহ মুখস্থ করা।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ সে এই নির্দেশ দেয় না যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর, সে আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত রাসূলই হোক বা তার নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাই হোক। এ কথা ঐ ব্যক্তিই বলতে পারে যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতের দিকে আহবান করে। আর যে ব্যক্তি এ কাজ করে সে কুফরী করে এবং কুফরী করা নবীদের (আঃ) কাজ নয়। তাদের কাজ তো হচ্ছে ঈমান, আর ঈমান হচ্ছে একক আল্লাহর ইবাদত করার নাম। নবীদের কণ্ঠে এ শব্দই উচ্চারিত হয়। যেমন স্বয়ং কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি যত রাসূল পাঠিয়েছিলাম সবারই উপরেই এ অহী করেছিলাম যে, আমি ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদত কর। (২১:২৫) অন্য জায়গায় ঘোষণা করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত হতে বিরত থাক। (১৬:৩৬), অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছেঃ “তোমার পূর্বেকার সমস্ত নবী (আঃ)-কে জিজ্ঞেস কর যে, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য মাবুদ নির্ধারিত করেছি যাদের তারা ইবাদত করবে?' ফেরেশতাদের পক্ষ হতে আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে বলে- আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমিই পূজনীয় আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবো এবং এভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। (২১:২৯)
আলে ইমরান 3:81
৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবী (আঃ)-এর নিকট আল্লাহ তা'আলা এই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, কোন সময় যখন তাদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ পাক গ্রন্থ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান দান করবেন এবং তিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন, তখন যদি তার যুগেই অন্য কোন নবী এসে যান তবে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাকে সাহায্য করা এ নবীর অবশ্য কর্তব্য। এই নয় যে, স্বীয় জ্ঞান ও নবুওয়াতের প্রতি লক্ষ্য করতঃ তিনি তাঁর পরবর্তী নবী (আঃ)-এর অনুসরণ ও সাহায্য হতে বিরত থাকবেন। অতঃপর তিনি নবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা কি এটা স্বীকার করলে এবং আমার সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করলে?' তারা তখন বললেনঃ আমরা স্বীকার করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও সাক্ষী থাকলাম। অতঃপর যে কেউ এই অঙ্গীকার হতে ফিরে যাবে সে নিশ্চিতরূপে দুষ্কার্যকারী। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর নিকট এই অঙ্গীকার নেন যে, যদি তিনি তাঁর যুগে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করেন তবে তাঁর অবশ্যকর্তব্য হবে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁকে সাহায্য করা, আর স্বীয় উম্মতকেও উপদেশ দেয়া যে, তারাও যেন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে থাকে। হযরত তাউস (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা নবীদের (আঃ) নিকট অঙ্গীকার নেন যে, তারা যেন একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদন করেন। কেউ যেন এটা মনে না করেন যে, এ তাফসীর উপরের তাফসীরের বিপরীত বরং এটা ওরই পষ্ঠপোষক। এ জন্যেই হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বর্ণনার মতই হযরত তাউস (রঃ) হতে তার পূর্বের বর্ণনাও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার এক কুরাইযী ইয়াহূদী বন্ধুকে বলেছিলাম যে, সে যেন আমাকে তাওরাতের সমস্ত কথা লিখে দেয়। আপনার অনুমতি হলে আমি ঐগুলো পেশ করি।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক পরিবর্তিত হয়ে যায়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাবিত (রাঃ) তখন হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলের অবস্থা লক্ষ্য করছেন না?' তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহকে প্রভুরূপে, মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রাসূলরূপে এবং ইসলামকে ধর্মরূপে আমি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিচ্ছি। এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্রোধ বিদূরিত হয় এবং তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে আগমন করেন এবং তোমরা আমাকে ছেড়ে তার অনুসরণ কর তবে তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে আমার অংশের উম্মত তোমরাই এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর মধ্যে তোমাদের অংশের নবী আমি।'মুসনাদ-ই-আবু ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা কিতাব ধারীদেরকে কিছুই জিজ্ঞেস করো না। তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট, সুতরাং তোমাদেরকে কিরূপে তারা সুপথ প্রদর্শন করবে? বরং সম্ভবতঃ তোমরা কোন মিথ্যার সত্যতা প্রতিপাদন করবে এবং কোন সত্যকে মিথ্যা বলে দেবে। আল্লাহর শপথ! যদি হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকতেন তবে তার জন্যে আমার আনুগত্য ছাড়া অন্য কিছু বৈধ হতো না। কোন কোন হাদীসে রয়েছেঃ যদি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁদেরও আমার আনুগত্য ছাড়া কোন উপায় ছিল না। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আমাদের রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী এবং সবচেয়ে বড় ইমাম। যে কোন যুগে তিনি নবী হয়ে আসলে তার আনুগত্য স্বীকার করা সবারই জন্যে অবশ্য কর্তব্য হতো। আর সেই যুগের সমস্ত নবী (আঃ)-এর আনুগত্যের উপর তার আনুগত্য অগ্রগণ্য হতো। এ কারণেই মিরাজের রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁকেই সমস্ত নবী (আঃ)-এর ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছি। অনুরূপভাবে হাশরের মাঠেও আল্লাহ তাআলার নিকট একমাত্র সুপারিশকারী তিনিই হবেন। এটাই ঐ মাকাম-ই-মাহমুদ’ যা তিনি ছাড়া আর কারও জন্যে উপযুক্ত নয়। সমস্ত নবী এবং প্রত্যেক রাসূল সেদিন এ কাজ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। অবশেষে তিনিই বিশেষভাবে এ স্থানে দণ্ডয়ামান হবেন। কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা সদা-সর্বদার জন্য তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। আমীন।
আলে ইমরান 3:82
৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবী (আঃ)-এর নিকট আল্লাহ তা'আলা এই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, কোন সময় যখন তাদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ পাক গ্রন্থ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান দান করবেন এবং তিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন, তখন যদি তার যুগেই অন্য কোন নবী এসে যান তবে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাকে সাহায্য করা এ নবীর অবশ্য কর্তব্য। এই নয় যে, স্বীয় জ্ঞান ও নবুওয়াতের প্রতি লক্ষ্য করতঃ তিনি তাঁর পরবর্তী নবী (আঃ)-এর অনুসরণ ও সাহায্য হতে বিরত থাকবেন। অতঃপর তিনি নবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা কি এটা স্বীকার করলে এবং আমার সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করলে?' তারা তখন বললেনঃ আমরা স্বীকার করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও সাক্ষী থাকলাম। অতঃপর যে কেউ এই অঙ্গীকার হতে ফিরে যাবে সে নিশ্চিতরূপে দুষ্কার্যকারী। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর নিকট এই অঙ্গীকার নেন যে, যদি তিনি তাঁর যুগে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করেন তবে তাঁর অবশ্যকর্তব্য হবে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁকে সাহায্য করা, আর স্বীয় উম্মতকেও উপদেশ দেয়া যে, তারাও যেন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে থাকে। হযরত তাউস (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা নবীদের (আঃ) নিকট অঙ্গীকার নেন যে, তারা যেন একে অপরের সত্যতা প্রতিপাদন করেন। কেউ যেন এটা মনে না করেন যে, এ তাফসীর উপরের তাফসীরের বিপরীত বরং এটা ওরই পষ্ঠপোষক। এ জন্যেই হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বর্ণনার মতই হযরত তাউস (রঃ) হতে তার পূর্বের বর্ণনাও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার এক কুরাইযী ইয়াহূদী বন্ধুকে বলেছিলাম যে, সে যেন আমাকে তাওরাতের সমস্ত কথা লিখে দেয়। আপনার অনুমতি হলে আমি ঐগুলো পেশ করি।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক পরিবর্তিত হয়ে যায়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাবিত (রাঃ) তখন হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলের অবস্থা লক্ষ্য করছেন না?' তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহকে প্রভুরূপে, মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রাসূলরূপে এবং ইসলামকে ধর্মরূপে আমি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিচ্ছি। এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্রোধ বিদূরিত হয় এবং তিনি বলেনঃ “যে আল্লাহর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে আগমন করেন এবং তোমরা আমাকে ছেড়ে তার অনুসরণ কর তবে তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে আমার অংশের উম্মত তোমরাই এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর মধ্যে তোমাদের অংশের নবী আমি।'মুসনাদ-ই-আবু ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা কিতাব ধারীদেরকে কিছুই জিজ্ঞেস করো না। তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট, সুতরাং তোমাদেরকে কিরূপে তারা সুপথ প্রদর্শন করবে? বরং সম্ভবতঃ তোমরা কোন মিথ্যার সত্যতা প্রতিপাদন করবে এবং কোন সত্যকে মিথ্যা বলে দেবে। আল্লাহর শপথ! যদি হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকতেন তবে তার জন্যে আমার আনুগত্য ছাড়া অন্য কিছু বৈধ হতো না। কোন কোন হাদীসে রয়েছেঃ যদি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁদেরও আমার আনুগত্য ছাড়া কোন উপায় ছিল না। সুতরাং সাব্যস্ত হলো যে, আমাদের রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবীদের (আঃ) সমাপ্তকারী এবং সবচেয়ে বড় ইমাম। যে কোন যুগে তিনি নবী হয়ে আসলে তার আনুগত্য স্বীকার করা সবারই জন্যে অবশ্য কর্তব্য হতো। আর সেই যুগের সমস্ত নবী (আঃ)-এর আনুগত্যের উপর তার আনুগত্য অগ্রগণ্য হতো। এ কারণেই মিরাজের রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁকেই সমস্ত নবী (আঃ)-এর ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছি। অনুরূপভাবে হাশরের মাঠেও আল্লাহ তাআলার নিকট একমাত্র সুপারিশকারী তিনিই হবেন। এটাই ঐ মাকাম-ই-মাহমুদ’ যা তিনি ছাড়া আর কারও জন্যে উপযুক্ত নয়। সমস্ত নবী এবং প্রত্যেক রাসূল সেদিন এ কাজ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। অবশেষে তিনিই বিশেষভাবে এ স্থানে দণ্ডয়ামান হবেন। কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা সদা-সর্বদার জন্য তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। আমীন।
আলে ইমরান 3:83
৮৩-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থ ও রাসূলদের মাধ্যমে যে সত্য ধর্ম অবতীর্ণ করেছেন অর্থাৎ শুধুমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহরই ইবাদত করা, এছাড়া যদি কোন ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তবে তা কখনই গৃহীত হবে না। একথাই এখানে বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু খুশী মনেই হোক বা অসন্তুষ্ট চিত্তেই হোক, তাঁর বাধ্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (সেজদার আয়াত) (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মখলুক আল্লাহর সামনে খুশী মনে বা বাধ্য হয়ে সিজদা করে থাকে। (১৩:১৫) অন্য জায়গায় রয়েছে- তারা কি দেখে না যে, সমস্ত সৃষ্টজীবের ছায়া ডানে ও বামে ঝুঁকে পড়ে আল্লাহকে সিজদা করে থাকে এবং আকাশসমূহের সমস্ত জিনিস ও পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী এবং সমস্ত ফেরেশতা আল্লাহরই জন্যে সিজদা করে থাকে, কেউ অহংকার করে না এবং তারা সবাই স্বীয় প্রভুকে ভয় করে থাকে ও তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা তারা পালন করে। সুতরাং মুমিনদের ভেতর ও বাহির দু'টোই আল্লাহ তা'আলার অনুগত ও বাধ্য হয়ে থাকে। আর কাফিরেরাও তাঁর মুষ্টির মধ্যে রয়েছে এবং বাধ্য হয়ে তাঁর সামনে নত হয়ে আছে। সর্বদিক দিয়েই তারা আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীনে রয়েছে। কোন কিছুই তার প্রতাপ ও ক্ষমতার বাইরে নেই। এ আয়াতের তাফসীরে একটি গারীব হাদীসও এসেছে। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আকাশবাসী তো হচ্ছেন ফেরেশতাগণ। তারা সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনে নিয়োজিত রয়েছেন। আর পৃথিবীবাসী ওরাই যারা ইসলামের উপর সৃষ্ট হয়েছে। এরাও খুশী মনে আল্লাহর অনুগত নিরানন্দ অধীন তারাই যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুসলমান সৈনিকদের হাতে বন্দী হয় এবং শৃংখলিত অবস্থায় আনীত হয়। এ লোকদেরকেই জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার হয় কিন্তু তারা তা চায় না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমার প্রভু ঐ লোকদের জন্যে বিস্ময়বোধ। করেন যাদেরকে শৃংখল ও রশিতে বেঁধে জান্নাতের দিকে টেনে আনা হয়। এ হাদীসের আরও সনদ রয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের অর্থ ওটাই বেশী দৃঢ় যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ 'যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, আকাশসমূহ ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে যে আল্লাহ।' (৩৯:৩৮) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ প্রথম দিন বুঝানো হয়েছে যেদিন তাদের সবারই নিকট হতে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল।‘সবাই তার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সকলকেই আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা বল, আমরা আল্লাহর উপর, কুরআন কারীমের উপর, ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক ও ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর যে পুস্তিকাসমূহ ও অহী অবতীর্ণ হয়েছিল ঐগুলোর উপর, আর তাঁদের সন্তানদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি।' (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের গোত্র যারা হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত ছিল। এরা ছিল হযরত ইয়াকূবের বারোটি পুত্রের সন্তান। হযরত মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল তাওরাত এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল ইঞ্জীল। আরও যত নবী (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট হতে যা কিছু এনেছেন ঐগুলোর উপরও আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করি না। অর্থাৎ কাউকে মানবো এবং কাউকে মানবো না, এ কাজ আমরা করি না, বরং সকলের উপরেই আমাদের ঈমান রয়েছে, আমরা আল্লাহ তা'আলার অনুগত। সুতরাং এ উম্মতের মুমিনগণ সমস্ত নবী (আঃ) ও গ্রন্থ মেনে থাকে। তারা কোন নবীকে অস্বীকার করে না এবং তারা প্রত্যেক নবীর সত্যতা প্রতিপাদনকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহর দ্বীন-ই-ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসন্ধানে যে লেগে থাকে তা কখনও গৃহীত হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যা আমার নির্দেশের বহির্ভূত, তা প্রত্যাখ্যাত। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কার্যাবলী আগমন করবে। নামায এসে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি নামায। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তুমি ভাল জিনিস।' সাদকা এসে বলবে- হে প্রভু! আমি সাদকা। উত্তর হবে- তুমিও মঙ্গলের উপর রয়েছে। রোযা এসে বলবে- ‘আমি রোযা। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমিও মঙ্গলের উপর আছ। তারপর আরও আমলসমূহ আসবে এবং সবকেই এ উত্তরই দেয়া হবে। অতঃপর ইসলাম এসে বলবে-“হে আল্লাহ! আপনি সালাম এবং আমি ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমি মঙ্গলের উপর রয়েছে। আজ আমি তোমার কারণেই ধরবো এবং তোমার কারণেই পুরস্কৃত করবো। আল্লাহ তাআলা স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অন্বেষণ করে তা কখনই তার নিকট হতে গৃহীত হবে না এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ হাদীসটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে এবং বর্ণনাকারী হাসানের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এটা শুনা প্রমাণিত নয়।
আলে ইমরান 3:84
৮৩-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থ ও রাসূলদের মাধ্যমে যে সত্য ধর্ম অবতীর্ণ করেছেন অর্থাৎ শুধুমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহরই ইবাদত করা, এছাড়া যদি কোন ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তবে তা কখনই গৃহীত হবে না। একথাই এখানে বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু খুশী মনেই হোক বা অসন্তুষ্ট চিত্তেই হোক, তাঁর বাধ্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (সেজদার আয়াত) (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মখলুক আল্লাহর সামনে খুশী মনে বা বাধ্য হয়ে সিজদা করে থাকে। (১৩:১৫) অন্য জায়গায় রয়েছে- তারা কি দেখে না যে, সমস্ত সৃষ্টজীবের ছায়া ডানে ও বামে ঝুঁকে পড়ে আল্লাহকে সিজদা করে থাকে এবং আকাশসমূহের সমস্ত জিনিস ও পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী এবং সমস্ত ফেরেশতা আল্লাহরই জন্যে সিজদা করে থাকে, কেউ অহংকার করে না এবং তারা সবাই স্বীয় প্রভুকে ভয় করে থাকে ও তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা তারা পালন করে। সুতরাং মুমিনদের ভেতর ও বাহির দু'টোই আল্লাহ তা'আলার অনুগত ও বাধ্য হয়ে থাকে। আর কাফিরেরাও তাঁর মুষ্টির মধ্যে রয়েছে এবং বাধ্য হয়ে তাঁর সামনে নত হয়ে আছে। সর্বদিক দিয়েই তারা আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীনে রয়েছে। কোন কিছুই তার প্রতাপ ও ক্ষমতার বাইরে নেই। এ আয়াতের তাফসীরে একটি গারীব হাদীসও এসেছে। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আকাশবাসী তো হচ্ছেন ফেরেশতাগণ। তারা সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনে নিয়োজিত রয়েছেন। আর পৃথিবীবাসী ওরাই যারা ইসলামের উপর সৃষ্ট হয়েছে। এরাও খুশী মনে আল্লাহর অনুগত নিরানন্দ অধীন তারাই যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুসলমান সৈনিকদের হাতে বন্দী হয় এবং শৃংখলিত অবস্থায় আনীত হয়। এ লোকদেরকেই জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার হয় কিন্তু তারা তা চায় না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমার প্রভু ঐ লোকদের জন্যে বিস্ময়বোধ। করেন যাদেরকে শৃংখল ও রশিতে বেঁধে জান্নাতের দিকে টেনে আনা হয়। এ হাদীসের আরও সনদ রয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের অর্থ ওটাই বেশী দৃঢ় যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ 'যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, আকাশসমূহ ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে যে আল্লাহ।' (৩৯:৩৮) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ প্রথম দিন বুঝানো হয়েছে যেদিন তাদের সবারই নিকট হতে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল।‘সবাই তার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সকলকেই আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা বল, আমরা আল্লাহর উপর, কুরআন কারীমের উপর, ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক ও ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর যে পুস্তিকাসমূহ ও অহী অবতীর্ণ হয়েছিল ঐগুলোর উপর, আর তাঁদের সন্তানদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি।' (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের গোত্র যারা হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত ছিল। এরা ছিল হযরত ইয়াকূবের বারোটি পুত্রের সন্তান। হযরত মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল তাওরাত এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল ইঞ্জীল। আরও যত নবী (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট হতে যা কিছু এনেছেন ঐগুলোর উপরও আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করি না। অর্থাৎ কাউকে মানবো এবং কাউকে মানবো না, এ কাজ আমরা করি না, বরং সকলের উপরেই আমাদের ঈমান রয়েছে, আমরা আল্লাহ তা'আলার অনুগত। সুতরাং এ উম্মতের মুমিনগণ সমস্ত নবী (আঃ) ও গ্রন্থ মেনে থাকে। তারা কোন নবীকে অস্বীকার করে না এবং তারা প্রত্যেক নবীর সত্যতা প্রতিপাদনকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহর দ্বীন-ই-ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসন্ধানে যে লেগে থাকে তা কখনও গৃহীত হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যা আমার নির্দেশের বহির্ভূত, তা প্রত্যাখ্যাত। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কার্যাবলী আগমন করবে। নামায এসে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি নামায। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তুমি ভাল জিনিস।' সাদকা এসে বলবে- হে প্রভু! আমি সাদকা। উত্তর হবে- তুমিও মঙ্গলের উপর রয়েছে। রোযা এসে বলবে- ‘আমি রোযা। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমিও মঙ্গলের উপর আছ। তারপর আরও আমলসমূহ আসবে এবং সবকেই এ উত্তরই দেয়া হবে। অতঃপর ইসলাম এসে বলবে-“হে আল্লাহ! আপনি সালাম এবং আমি ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমি মঙ্গলের উপর রয়েছে। আজ আমি তোমার কারণেই ধরবো এবং তোমার কারণেই পুরস্কৃত করবো। আল্লাহ তাআলা স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অন্বেষণ করে তা কখনই তার নিকট হতে গৃহীত হবে না এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ হাদীসটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে এবং বর্ণনাকারী হাসানের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এটা শুনা প্রমাণিত নয়।
আলে ইমরান 3:85
৮৩-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থ ও রাসূলদের মাধ্যমে যে সত্য ধর্ম অবতীর্ণ করেছেন অর্থাৎ শুধুমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহরই ইবাদত করা, এছাড়া যদি কোন ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তবে তা কখনই গৃহীত হবে না। একথাই এখানে বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু খুশী মনেই হোক বা অসন্তুষ্ট চিত্তেই হোক, তাঁর বাধ্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (সেজদার আয়াত) (আরবী) অর্থাৎ ‘আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত মখলুক আল্লাহর সামনে খুশী মনে বা বাধ্য হয়ে সিজদা করে থাকে। (১৩:১৫) অন্য জায়গায় রয়েছে- তারা কি দেখে না যে, সমস্ত সৃষ্টজীবের ছায়া ডানে ও বামে ঝুঁকে পড়ে আল্লাহকে সিজদা করে থাকে এবং আকাশসমূহের সমস্ত জিনিস ও পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী এবং সমস্ত ফেরেশতা আল্লাহরই জন্যে সিজদা করে থাকে, কেউ অহংকার করে না এবং তারা সবাই স্বীয় প্রভুকে ভয় করে থাকে ও তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা তারা পালন করে। সুতরাং মুমিনদের ভেতর ও বাহির দু'টোই আল্লাহ তা'আলার অনুগত ও বাধ্য হয়ে থাকে। আর কাফিরেরাও তাঁর মুষ্টির মধ্যে রয়েছে এবং বাধ্য হয়ে তাঁর সামনে নত হয়ে আছে। সর্বদিক দিয়েই তারা আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীনে রয়েছে। কোন কিছুই তার প্রতাপ ও ক্ষমতার বাইরে নেই। এ আয়াতের তাফসীরে একটি গারীব হাদীসও এসেছে। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আকাশবাসী তো হচ্ছেন ফেরেশতাগণ। তারা সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনে নিয়োজিত রয়েছেন। আর পৃথিবীবাসী ওরাই যারা ইসলামের উপর সৃষ্ট হয়েছে। এরাও খুশী মনে আল্লাহর অনুগত নিরানন্দ অধীন তারাই যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুসলমান সৈনিকদের হাতে বন্দী হয় এবং শৃংখলিত অবস্থায় আনীত হয়। এ লোকদেরকেই জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার হয় কিন্তু তারা তা চায় না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমার প্রভু ঐ লোকদের জন্যে বিস্ময়বোধ। করেন যাদেরকে শৃংখল ও রশিতে বেঁধে জান্নাতের দিকে টেনে আনা হয়। এ হাদীসের আরও সনদ রয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের অর্থ ওটাই বেশী দৃঢ় যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ 'যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, আকাশসমূহ ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে যে আল্লাহ।' (৩৯:৩৮) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ প্রথম দিন বুঝানো হয়েছে যেদিন তাদের সবারই নিকট হতে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল।‘সবাই তার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সকলকেই আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা বল, আমরা আল্লাহর উপর, কুরআন কারীমের উপর, ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক ও ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর যে পুস্তিকাসমূহ ও অহী অবতীর্ণ হয়েছিল ঐগুলোর উপর, আর তাঁদের সন্তানদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি।' (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের গোত্র যারা হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত ছিল। এরা ছিল হযরত ইয়াকূবের বারোটি পুত্রের সন্তান। হযরত মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল তাওরাত এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল ইঞ্জীল। আরও যত নবী (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট হতে যা কিছু এনেছেন ঐগুলোর উপরও আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করি না। অর্থাৎ কাউকে মানবো এবং কাউকে মানবো না, এ কাজ আমরা করি না, বরং সকলের উপরেই আমাদের ঈমান রয়েছে, আমরা আল্লাহ তা'আলার অনুগত। সুতরাং এ উম্মতের মুমিনগণ সমস্ত নবী (আঃ) ও গ্রন্থ মেনে থাকে। তারা কোন নবীকে অস্বীকার করে না এবং তারা প্রত্যেক নবীর সত্যতা প্রতিপাদনকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহর দ্বীন-ই-ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসন্ধানে যে লেগে থাকে তা কখনও গৃহীত হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যা আমার নির্দেশের বহির্ভূত, তা প্রত্যাখ্যাত। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কার্যাবলী আগমন করবে। নামায এসে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি নামায। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ তুমি ভাল জিনিস।' সাদকা এসে বলবে- হে প্রভু! আমি সাদকা। উত্তর হবে- তুমিও মঙ্গলের উপর রয়েছে। রোযা এসে বলবে- ‘আমি রোযা। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমিও মঙ্গলের উপর আছ। তারপর আরও আমলসমূহ আসবে এবং সবকেই এ উত্তরই দেয়া হবে। অতঃপর ইসলাম এসে বলবে-“হে আল্লাহ! আপনি সালাম এবং আমি ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা বলবেন- তুমি মঙ্গলের উপর রয়েছে। আজ আমি তোমার কারণেই ধরবো এবং তোমার কারণেই পুরস্কৃত করবো। আল্লাহ তাআলা স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অন্বেষণ করে তা কখনই তার নিকট হতে গৃহীত হবে না এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ হাদীসটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে এবং বর্ণনাকারী হাসানের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এটা শুনা প্রমাণিত নয়।
আলে ইমরান 3:86
৮৬-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একজন আনসারী ধর্ম ত্যাগী হয়ে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়। অতঃপর যে অনুশোচনা করতঃ স্বগোত্রীয় লোকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে জিজ্ঞেস করে যে, পুনরায় তার তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তার গোত্রের লোক তাকে বলে পাঠায়। তখন সে তাওবা করতঃ নতুনভাবে মুসলমান। হয়ে হাযির হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে হিব্বান (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম হাকিম (রঃ) এ ইসনাদর্কে সহীহ বলেছেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকে রয়েছে যে, হযরত হারিস ইবনে সাভীদ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করতঃ স্বগোত্রের সঙ্গে মিলিত হন। তাঁর সম্বন্ধে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তাঁর সম্প্রদায়ের একজন লোক এ আয়াতগুলো তাঁকে পড়ে শোনান। তিনি লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার ধারণায় আপনি একজন সত্যবাদী লোক, আর নবী (সঃ) তো আপনার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং আল্লাহ তাআলা সমস্ত সত্যবাদী অপেক্ষা খুব বেশী সত্যবাদী।' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খুব ভালভাবেই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার উপর দলীল প্রমাণাদি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হওয়া। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করেছে, দলীল প্রমাণাদি স্বচক্ষে দেখেছে, অতঃপর শিরকের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে, তারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য নয়। কেননা, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে তারা পছন্দ করেছে। অবিবেচক লোকদেরকে আল্লাহ তা'আলা সুপথ প্রদর্শন করেন না। তাদের উপর আল্লাহও অভিশাপ দেন এবং তাঁর সৃষ্টজীবও তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়ে থাকে। এ অভিশাপ হচ্ছে চিরস্থায়ী অভিশাপ। কোন সময়ের জন্য তাদের শাস্তি না হালকা করা হবে, না বন্ধ করা হবে। তারপর মহান আল্লাহ স্বীয় করুণা ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করেছেন যে, এ জঘন্য পাপ কার্যের পরেও যদি কেউ আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং সংশোধিত হয়ে যায় তবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আলে ইমরান 3:87
৮৬-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একজন আনসারী ধর্ম ত্যাগী হয়ে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়। অতঃপর যে অনুশোচনা করতঃ স্বগোত্রীয় লোকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে জিজ্ঞেস করে যে, পুনরায় তার তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তার গোত্রের লোক তাকে বলে পাঠায়। তখন সে তাওবা করতঃ নতুনভাবে মুসলমান। হয়ে হাযির হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে হিব্বান (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম হাকিম (রঃ) এ ইসনাদর্কে সহীহ বলেছেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকে রয়েছে যে, হযরত হারিস ইবনে সাভীদ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করতঃ স্বগোত্রের সঙ্গে মিলিত হন। তাঁর সম্বন্ধে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তাঁর সম্প্রদায়ের একজন লোক এ আয়াতগুলো তাঁকে পড়ে শোনান। তিনি লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার ধারণায় আপনি একজন সত্যবাদী লোক, আর নবী (সঃ) তো আপনার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং আল্লাহ তাআলা সমস্ত সত্যবাদী অপেক্ষা খুব বেশী সত্যবাদী।' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খুব ভালভাবেই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার উপর দলীল প্রমাণাদি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হওয়া। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করেছে, দলীল প্রমাণাদি স্বচক্ষে দেখেছে, অতঃপর শিরকের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে, তারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য নয়। কেননা, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে তারা পছন্দ করেছে। অবিবেচক লোকদেরকে আল্লাহ তা'আলা সুপথ প্রদর্শন করেন না। তাদের উপর আল্লাহও অভিশাপ দেন এবং তাঁর সৃষ্টজীবও তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়ে থাকে। এ অভিশাপ হচ্ছে চিরস্থায়ী অভিশাপ। কোন সময়ের জন্য তাদের শাস্তি না হালকা করা হবে, না বন্ধ করা হবে। তারপর মহান আল্লাহ স্বীয় করুণা ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করেছেন যে, এ জঘন্য পাপ কার্যের পরেও যদি কেউ আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং সংশোধিত হয়ে যায় তবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আলে ইমরান 3:88
৮৬-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একজন আনসারী ধর্ম ত্যাগী হয়ে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়। অতঃপর যে অনুশোচনা করতঃ স্বগোত্রীয় লোকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে জিজ্ঞেস করে যে, পুনরায় তার তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তার গোত্রের লোক তাকে বলে পাঠায়। তখন সে তাওবা করতঃ নতুনভাবে মুসলমান। হয়ে হাযির হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে হিব্বান (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম হাকিম (রঃ) এ ইসনাদর্কে সহীহ বলেছেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকে রয়েছে যে, হযরত হারিস ইবনে সাভীদ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করতঃ স্বগোত্রের সঙ্গে মিলিত হন। তাঁর সম্বন্ধে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তাঁর সম্প্রদায়ের একজন লোক এ আয়াতগুলো তাঁকে পড়ে শোনান। তিনি লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার ধারণায় আপনি একজন সত্যবাদী লোক, আর নবী (সঃ) তো আপনার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং আল্লাহ তাআলা সমস্ত সত্যবাদী অপেক্ষা খুব বেশী সত্যবাদী।' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খুব ভালভাবেই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার উপর দলীল প্রমাণাদি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হওয়া। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করেছে, দলীল প্রমাণাদি স্বচক্ষে দেখেছে, অতঃপর শিরকের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে, তারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য নয়। কেননা, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে তারা পছন্দ করেছে। অবিবেচক লোকদেরকে আল্লাহ তা'আলা সুপথ প্রদর্শন করেন না। তাদের উপর আল্লাহও অভিশাপ দেন এবং তাঁর সৃষ্টজীবও তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়ে থাকে। এ অভিশাপ হচ্ছে চিরস্থায়ী অভিশাপ। কোন সময়ের জন্য তাদের শাস্তি না হালকা করা হবে, না বন্ধ করা হবে। তারপর মহান আল্লাহ স্বীয় করুণা ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করেছেন যে, এ জঘন্য পাপ কার্যের পরেও যদি কেউ আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং সংশোধিত হয়ে যায় তবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আলে ইমরান 3:89
৮৬-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একজন আনসারী ধর্ম ত্যাগী হয়ে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়। অতঃপর যে অনুশোচনা করতঃ স্বগোত্রীয় লোকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে জিজ্ঞেস করে যে, পুনরায় তার তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তার গোত্রের লোক তাকে বলে পাঠায়। তখন সে তাওবা করতঃ নতুনভাবে মুসলমান। হয়ে হাযির হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে হিব্বান (রঃ)-এর গ্রন্থেও এ বর্ণনাটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম হাকিম (রঃ) এ ইসনাদর্কে সহীহ বলেছেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকে রয়েছে যে, হযরত হারিস ইবনে সাভীদ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করতঃ স্বগোত্রের সঙ্গে মিলিত হন। তাঁর সম্বন্ধে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তাঁর সম্প্রদায়ের একজন লোক এ আয়াতগুলো তাঁকে পড়ে শোনান। তিনি লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার ধারণায় আপনি একজন সত্যবাদী লোক, আর নবী (সঃ) তো আপনার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং আল্লাহ তাআলা সমস্ত সত্যবাদী অপেক্ষা খুব বেশী সত্যবাদী।' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খুব ভালভাবেই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতার উপর দলীল প্রমাণাদি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হওয়া। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করেছে, দলীল প্রমাণাদি স্বচক্ষে দেখেছে, অতঃপর শিরকের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে, তারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য নয়। কেননা, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে তারা পছন্দ করেছে। অবিবেচক লোকদেরকে আল্লাহ তা'আলা সুপথ প্রদর্শন করেন না। তাদের উপর আল্লাহও অভিশাপ দেন এবং তাঁর সৃষ্টজীবও তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়ে থাকে। এ অভিশাপ হচ্ছে চিরস্থায়ী অভিশাপ। কোন সময়ের জন্য তাদের শাস্তি না হালকা করা হবে, না বন্ধ করা হবে। তারপর মহান আল্লাহ স্বীয় করুণা ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করেছেন যে, এ জঘন্য পাপ কার্যের পরেও যদি কেউ আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং সংশোধিত হয়ে যায় তবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আলে ইমরান 3:90
৯০-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: বিশ্বাস স্থাপনের পর অবিশ্বাসকারী এবং ঐ অবিশ্বাসের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ কারীদেরকে এখানে আল্লাহ তা'আলা ভয় প্রদর্শন করেছেন। বলা হচ্ছে যে, মৃত্যুর সময় তাদের তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাপ কার্যে লিপ্ত ব্যক্তি মৃত্যু দেখে তাওবা করলে তা আল্লাহর নিকট গৃহীত হয় না।' (৪:১৮) এখানেও ঐ কথাই বলা হয়েছে যে, তাদের তাওবা কখনই গৃহীত হবে না এবং এরাই তারা যারা সুপথ হতে ভ্রষ্ট হয়ে ভ্রান্তপথে চালিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ কতক লোক মুসলমান হয়ে ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। অতঃপর আবার ইসলাম গ্রহণ করে এবং পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে পড়ে। তারপর তারা স্বীয় গোত্রের নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে যে, এখন তাদের তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তাদের গোত্রের লোক তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।' (মুসনাদ-ই-বাযযার) এর ইসনাদ খুবই উত্তম। এরপর বলা হচ্ছেঃ কুফরের উপর মৃত্যুবরণ কারীদের তাওবা কখনও গৃহীত হবে না, যদিও তারা পৃথিবী পরিমাণ সোনা আল্লাহর পথে খরচ করে।' নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন একজন বড় অতিথি সেবক ও গোলাম আযাদকারী লোক ছিল। তার এ পুণ্য কোন কাজে আসবে কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, কেননা সে সারা জীবনে একবারও (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! কিয়ামতের দিন আমাকে ক্ষমা করুন বলেনি। তার দান যেমন গৃহীত হবে না তেমনই তার বিনিময়ও গ্রহণ করা হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ না তাদের বিনিময় গৃহীত হবে, না সুপারিশ কোন উপকার দেবে। (২:১২৩) আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেইদিন না। থাকবে ক্রয়-বিক্রয় না থাকবে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা।' অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘পৃথিবী পরিমাণ জিনিস যদি কাফিরদের নিকট থাকে এবং আরও এ পরিমাণ জিনিস হয়, অতঃপর সে ঐ সমস্তই কিয়ামতের শাস্তির বিনিময়ে মুক্তিপণরূপে প্রদান করে তবুও তা গ্রহণ করা হবে না, তাকে সেই কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিভোগ করতে হবে। ঐ বিষয়ই এখানেও বর্ণনা করা হয়েছে। কেউ কেউ (আরবী) শব্দের (আরবী)-টিকে অতিরিক্ত বলেছেন। কিন্তু (আরবী) টিকে সংযোগের (আরবী) স্বীকার করতঃ আমরা যে তাফসীর করেছি ঐ তাফসীর করা খুব উত্তম। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, কাফিরদেরকে আল্লাহ তাআলার শাস্তি হতে কোন জিনিসই রক্ষা করতে পারবে না। যদিও সে অত্যন্ত সৎ ও খুবই দানশীল হয়। যদিও সে পৃথিবী পরিমাণ সোনা আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, কিংবা পাহাড়, পর্বত, মাটি, বালু, মরুভূমি, শক্তভূমি এবং সিক্ত মাটি পরিমাণ সোনা শাস্তির বিনিময়ে খরচ করে দেয় তবুও তা তার কোন উপকারে আসবে না। ‘মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জাহান্নামবাসীকে কিয়ামতের দিন বলা হবে-পৃথিবীতে যত কিছু রয়েছে সবই যদি তোমার হয়ে যায় তবে কি তুমি এ দিনের ভীষণ শাস্তির বিনিময়ে ঐ সমস্তই মুক্তিপণ স্বরূপ দিয়ে দেবে?' সে বলবে- হ্যা। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘আমি তোমার নিকট এর তুলনায় অনেক কম চেয়েছিলাম। যখন তুমি তোমার পিতা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে ছিলে তখন আমি তোমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তুমি আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না। কিন্তু তুমি শিবুক ছাড়া থাকতে পারনি।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও অন্য সনদে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এক জান্নাতবাসীকে আনা হবে এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ বল, তুমি কিরূপ জায়গা পেয়েছো।' সে উত্তরে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি খুব উত্তম জায়গা পেয়েছি। আল্লাহ তাআলা তখন বলবেনঃ “আচ্ছা, আরও চাইতে হলে চাও এবং মনের কিছু আকাঙ্খা থাকলে তা প্রকাশ কর।' সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমার শুধুমাত্র বাসনা এটাই এবং এ একটি মাত্রই যা যে, আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হোক। আমি আপনার পথে জিহাদ করে পুনরায় হীদ হব, আবার জীবিত হবে এবং পুনরায় শহীদ হবো। দশবার যেন এরকমই হয়। কেননা, শাহাদাতের প্রকৃষ্টতা এবং শহীদের পদ-মর্যাদা সে স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। অনুরূপভাবে একজন জাহান্নামবাসীকে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার স্থান কিরূপ পেয়েছো?' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! খুবই জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেনঃ পৃথিবী পরিমাণ সোনা দিয়ে এ শাস্তি হতে মুক্তি পাওয়া তুমি পছন্দ কর কি?' সে বলবেঃ হে প্রভু! হ্যা'। সেই সময় মহান প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ ‘তুমি মিথ্যাবাদী। আমি তো তোমার নিকট এর চেয়ে বহু কম ও অত্যন্ত সহজ জিনিস চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি ওটাও করনি।' অতএব, তাকে জাহান্নামে পাঠিয় দেয়া হবে। তাই, এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ ‘তাদের জন্যে বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং এমন কোন জিনিস নেই যা তাদেরকে এ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারে বা তাদেরকে কোন প্রকারে সাহায্য করতে পারে।
আলে ইমরান 3:91
৯০-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: বিশ্বাস স্থাপনের পর অবিশ্বাসকারী এবং ঐ অবিশ্বাসের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ কারীদেরকে এখানে আল্লাহ তা'আলা ভয় প্রদর্শন করেছেন। বলা হচ্ছে যে, মৃত্যুর সময় তাদের তাওবা গৃহীত হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাপ কার্যে লিপ্ত ব্যক্তি মৃত্যু দেখে তাওবা করলে তা আল্লাহর নিকট গৃহীত হয় না।' (৪:১৮) এখানেও ঐ কথাই বলা হয়েছে যে, তাদের তাওবা কখনই গৃহীত হবে না এবং এরাই তারা যারা সুপথ হতে ভ্রষ্ট হয়ে ভ্রান্তপথে চালিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ কতক লোক মুসলমান হয়ে ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। অতঃপর আবার ইসলাম গ্রহণ করে এবং পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে পড়ে। তারপর তারা স্বীয় গোত্রের নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে যে, এখন তাদের তাওবা গৃহীত হবে কি-না? তাদের গোত্রের লোক তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।' (মুসনাদ-ই-বাযযার) এর ইসনাদ খুবই উত্তম। এরপর বলা হচ্ছেঃ কুফরের উপর মৃত্যুবরণ কারীদের তাওবা কখনও গৃহীত হবে না, যদিও তারা পৃথিবী পরিমাণ সোনা আল্লাহর পথে খরচ করে।' নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন একজন বড় অতিথি সেবক ও গোলাম আযাদকারী লোক ছিল। তার এ পুণ্য কোন কাজে আসবে কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, কেননা সে সারা জীবনে একবারও (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! কিয়ামতের দিন আমাকে ক্ষমা করুন বলেনি। তার দান যেমন গৃহীত হবে না তেমনই তার বিনিময়ও গ্রহণ করা হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ না তাদের বিনিময় গৃহীত হবে, না সুপারিশ কোন উপকার দেবে। (২:১২৩) আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেইদিন না। থাকবে ক্রয়-বিক্রয় না থাকবে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা।' অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘পৃথিবী পরিমাণ জিনিস যদি কাফিরদের নিকট থাকে এবং আরও এ পরিমাণ জিনিস হয়, অতঃপর সে ঐ সমস্তই কিয়ামতের শাস্তির বিনিময়ে মুক্তিপণরূপে প্রদান করে তবুও তা গ্রহণ করা হবে না, তাকে সেই কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিভোগ করতে হবে। ঐ বিষয়ই এখানেও বর্ণনা করা হয়েছে। কেউ কেউ (আরবী) শব্দের (আরবী)-টিকে অতিরিক্ত বলেছেন। কিন্তু (আরবী) টিকে সংযোগের (আরবী) স্বীকার করতঃ আমরা যে তাফসীর করেছি ঐ তাফসীর করা খুব উত্তম। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, কাফিরদেরকে আল্লাহ তাআলার শাস্তি হতে কোন জিনিসই রক্ষা করতে পারবে না। যদিও সে অত্যন্ত সৎ ও খুবই দানশীল হয়। যদিও সে পৃথিবী পরিমাণ সোনা আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, কিংবা পাহাড়, পর্বত, মাটি, বালু, মরুভূমি, শক্তভূমি এবং সিক্ত মাটি পরিমাণ সোনা শাস্তির বিনিময়ে খরচ করে দেয় তবুও তা তার কোন উপকারে আসবে না। ‘মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জাহান্নামবাসীকে কিয়ামতের দিন বলা হবে-পৃথিবীতে যত কিছু রয়েছে সবই যদি তোমার হয়ে যায় তবে কি তুমি এ দিনের ভীষণ শাস্তির বিনিময়ে ঐ সমস্তই মুক্তিপণ স্বরূপ দিয়ে দেবে?' সে বলবে- হ্যা। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘আমি তোমার নিকট এর তুলনায় অনেক কম চেয়েছিলাম। যখন তুমি তোমার পিতা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে ছিলে তখন আমি তোমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তুমি আমার সাথে কাউকেও অংশীদার করবে না। কিন্তু তুমি শিবুক ছাড়া থাকতে পারনি।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও অন্য সনদে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এক জান্নাতবাসীকে আনা হবে এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ বল, তুমি কিরূপ জায়গা পেয়েছো।' সে উত্তরে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি খুব উত্তম জায়গা পেয়েছি। আল্লাহ তাআলা তখন বলবেনঃ “আচ্ছা, আরও চাইতে হলে চাও এবং মনের কিছু আকাঙ্খা থাকলে তা প্রকাশ কর।' সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমার শুধুমাত্র বাসনা এটাই এবং এ একটি মাত্রই যা যে, আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হোক। আমি আপনার পথে জিহাদ করে পুনরায় হীদ হব, আবার জীবিত হবে এবং পুনরায় শহীদ হবো। দশবার যেন এরকমই হয়। কেননা, শাহাদাতের প্রকৃষ্টতা এবং শহীদের পদ-মর্যাদা সে স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। অনুরূপভাবে একজন জাহান্নামবাসীকে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার স্থান কিরূপ পেয়েছো?' সে বলবেঃ “হে আল্লাহ! খুবই জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেনঃ পৃথিবী পরিমাণ সোনা দিয়ে এ শাস্তি হতে মুক্তি পাওয়া তুমি পছন্দ কর কি?' সে বলবেঃ হে প্রভু! হ্যা'। সেই সময় মহান প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ ‘তুমি মিথ্যাবাদী। আমি তো তোমার নিকট এর চেয়ে বহু কম ও অত্যন্ত সহজ জিনিস চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি ওটাও করনি।' অতএব, তাকে জাহান্নামে পাঠিয় দেয়া হবে। তাই, এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ ‘তাদের জন্যে বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং এমন কোন জিনিস নেই যা তাদেরকে এ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারে বা তাদেরকে কোন প্রকারে সাহায্য করতে পারে।
আলে ইমরান 3:92
হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে জান্নাত। অর্থাৎ যে পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস হতে আল্লাহর পথে ব্যয় কর সে পর্যন্ত তোমরা কখনই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সমস্ত আনসারের মধ্যে হযরত আবু তালহা (রাঃ) ছিলেন সবচেয়ে বেশী সম্পদশালী। তিনি তাঁর সমস্ত ধন-সম্পত্তির মধ্যে (আরবী) নামক বাগানটিকে সর্বাপেক্ষা বেশী পছন্দ করতেন। বাগানটি মসজিদই-ই-নববীর সম্মুখে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায়ই ঐ বাগানে গমন করতেন এবং ওর কূপের নির্মল পানি পান করতেন। যখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত আবু তালহা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা এরূপ কথা বলেছেন এবং এ (আরবী) (নামক বাগানটিই) হচ্ছে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এ জন্যে আমি ওটি আল্লাহর পথে সাদকা করছি এ আশায় যে, তার নিকট যে প্রতিদান রয়েছে তাই আমার জন্যে জমা থাকবে। সুতরাং আপনাকে অধিকার দিয়ে দিলাম যেভাবে ভাল মনে করেন ওটা বন্টন করে দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুশী হয়ে বলেনঃ বাঃ বাঃ! এটা খুবই উপকারী সম্পদ। এর দ্বারা জনগণের বেশ উপকার সাধিত হবে। আমার মত এই যে, তুমি এ সম্পদ তোমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বন্টন করে দাও।' হযরত আবু তালহা (রাঃ) বলেন, “খুব ভাল। অতঃপর তিনি ওটা তার আত্মীয়-স্বজন এবং চাচাতো ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দেন। (মুসনাদ-ই- আহমাদ, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এসেছে যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার সবচেয় প্রিয় ও উত্তম মাল ওটাই যা খাইবারে আমার জমির একটি অংশ রয়েছে। (আমি ওটা আল্লাহর পথে সাদকা করতে চাই) বলুন, কি করি?' তিনি বলেনঃ মূলকে (জমিকে) তোমার অধিকারে রাখ এবং ওর উৎপাদিত শস্য, ফল ইত্যাদি আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দাও। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘পাঠের সময় যখন আমি উপরোক্ত আয়াতে পৌছি তখন আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ সম্বন্ধে চিন্তা করি। কিন্তু আমার রুমী দাসীটি অপেক্ষা অধিক প্রিয় কোন জিনিস আমার চোখে পড়লো না। কাজেই আমি ঐ দাসীটিকেই আল্লাহর পথে আযাদ করে দিলাম। আমার অন্তরে ওর প্রতি এত বেশী ভালবাসা রয়েছে যে, যদি আমি আল্লাহর পথে প্রদত্ত কোন জিনিস ফিরিয়ে নিতে পারতাম তবে আমি অবশ্যই তাকে বিয়ে করে নিতাম। (মুসনাদ-ই-বাযযার)
আলে ইমরান 3:93
৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একবার কয়েকজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ আমরা আপনাকে এমন কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করছি যেগুলো নবী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপনি ঐগুলোর উত্তর দিন।' তিনি বলেনঃ ‘যা ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস কর, কিন্তু আল্লাহ তা'আলাকে সম্মুখে বিদ্যমান জেনে আমার নিকট ঐ অঙ্গীকার কর যে অঙ্গীকার হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্রদের (বানী ইসরাঈল) নিকট নিয়েছিলেন। তা এই যে, আমি যদি ঐ কথাগুলো তোমাদেরকে ঠিক ঠিক বলে দেই তবে তোমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আমার অনুগত হয়ে যাবে।' তারা শপথ করে বললোঃ “আমরা একথা মেনে নিলাম। যদি আপনি সঠিক উত্তর দিতে পারেন তবে আমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আপনার অনুগত হয়ে যাবো।অতঃপর তারা বললোঃ আমাদেরকে এ চারটি প্রশ্নে উত্তর দিনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (হযরত ইয়াকূব আঃ) নিজের উপর কোন খাদ্য হারাম করেছিলেন? (২) পুরুষের বীর্য ও স্ত্রীলোকের বীর্য কিরূপ হয়, কখনো পুত্র ও কখনো কন্যা হয় কেন? (৩) নিরক্ষর নবীর ঘুম কিরূপ হয়? এবং (৪) ফেরেশতাদের মধ্যে কোন্ ফেরেশতা তাঁর নিকট অহী নিয়ে আসেন?' এরপর তিনি দ্বিতীয়বার তাদের নিকট অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি উত্তরে বলেনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (আঃ) কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাকে ঐ রোগ হতে আরোগ্য দান করেন তবে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস পরিত্যাগ করবেন। তারপরে তিনি আরোগ্য লাভ করলে উটের গোশত খাওয়া ও দুধ পান পরিত্যাগ করেন। (২) পুরুষের বীর্যের রং সাদা ও গাঢ় হয় এবং নারীর বীর্যের রং হলদে ও তরল হয়। এ দু-এর মধ্যে যা উপরে এসে যায় ওর উপরে সন্তান ছেলে বা মেয়ে হয়ে থাকে এবং আকার ও অনুরূপতাও ওর উপর নির্ভর করেই হয়। (৩) এ নিরক্ষর নবীর ঘুমের সময় চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে বটে কিন্তু অন্তর জেগে থাকে এবং (৪) আমার নিকট ঐ ফেরেশতাই অহী নিয়ে আসেন যিনি সমস্ত নবীর নিকট অহী নিয়ে আসতেন। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)।' একথা শুনেই তারা চীৎকার করে বলে উঠেঃ ‘যদি অন্য কোন ফেরেশতা আপনার বন্ধু হতেন তবে আপনার নবুওয়াতকে মেনে নিতে আমাদের কোন আপত্তি থাকতো না। প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে শপথ করাতেন ও প্রশ্ন করতেন এবং তারা স্বীকার করতে যে উত্তর সঠিক হয়েছে। তাদের ব্যাপারেই (আরবী) (২:৯৭)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর ‘আরাকুন নিসা' রোগ ছিল এবং ঐ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের ৫ম প্রশ্ন ছিলঃ বজ্র কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্যে একজন ফেরেশতা রয়েছেন যিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন। তার হাতে একটি আগুনের চাবুক রয়েছে যার সাহায্যে তিনি মেঘকে ঐদিকে নিয়ে যান যেদিকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হয় এবং এ গর্জনের শব্দ হচ্ছে ওরই শব্দ। হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর নাম শুনে ঐ ইয়াহূদীরা বলেঃ ‘তিনি তো হলেন শাস্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফেরেশতা এবং তিনি আমাদের শত্রু। যদি উৎপাদন ও মেঘের ফেরেশতা হযরত মীকাঈল (আঃ) আপনার বন্ধু হতেন তবে আমরা মেনে নিতাম।' হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর সন্তানাদিও তাঁর নীতির উপরই ছিলেন এবং তাঁরাও উটের গোশত খেতেন না। পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে এ আয়াতের সম্পর্ক এক তো এ রয়েছে যে, ইসরাঈল (আঃ) যেমন তাঁর প্রিয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার নযর’ করেছিলেন দ্রুপ তোমরাও কর। কিন্তু হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে এর নিয়ম এই ছিল যে, তারা স্বীয় পছন্দনীয় জিনিস আল্লাহ পাকের নামে পরিত্যাগ করতেন। কিন্তু আমাদের শরীয়তে ঐ নিয়ম নেই। বরং আমাদেরকে এই বলা হয়েছে যে, আমরা যেন আমাদের প্রিয় জিনিস হতে আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করি। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মালের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও সে তা প্রদান করে থাকে। (২:১৭৭) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এবং বন্দীকে ভোজন করিয়ে থাকে'। (৭৬:৮) দ্বিতীয় সম্পর্ক এও রয়েছে যে, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে খ্রীষ্টানদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত ছিল। কাজেই এখানে ইয়াহুদীদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, তাদের রীতিতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঠিক জন্মের ঘটনা বর্ণনা করতঃ তাদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হচ্ছে। এখানে তাদের ধর্ম রহিতকরণের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর তাদের বাজে বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। তাদের গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকা হতে স্থলভাগে অবতরণ করেন তখন তার জন্য সমস্ত জন্তু হালাল ছিল। অতঃপর হযরত ইয়াকূব (আঃ) উটের গোশত ও দুধ হারাম করে নেন এবং তাঁর সন্তানেরাও ও দুটো জিনিস হারামই মনে করতে থাকে। অতএব তাওরাতেও ওর অবৈধতা অবতীর্ণ হয়। এতদ্ব্যতীত আরও বহু জিনিস হারাম করা হয়। এটা রহিত ছাড়া আর কি হতে পারে? প্রাথমিক যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে পরস্পর সহোদর ভাই বোনের বিবাহও বৈধ ছিল। কিন্তু পরে তা হারাম করে দেয়া হয়। পরীদের উপর কৃতদাসীর বিয়ে ইবরাহীম (আঃ)-এর শারীয়াতে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইবরাহীম (আঃ) সারার (রাঃ) উপর হাজেরাকে বিয়ে করেন। কিন্তু আবার তাওরাতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সাথে দু' ভগ্নীকে বিয়ে করা ইয়াকুব (আঃ)এর যুগে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর ঘরে একই সাথে দু’ সহোদরা ভগ্নী পত্নীরূপে বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু তাওরাতে এটাও হারাম করা হয়। এটাকেই রহিতকরণ বলে। এগুলো তারা দেখছে এবং স্বীয় গ্রন্থে পাঠ করছে। অথচ রহিতকরণকে অস্বীকার করত ও ইঞ্জীল ও হযরত ঈসা (আঃ)-কে অমান্য করছে। অতঃপর তারা শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথেও এ ব্যবহারই করছে। তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে, ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর যা হারাম করেছিলেন তাছাড়া তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সমস্ত খাবারই হালাল ছিল। সুতরাং তোমরা তাওরাত আনয়ন করতঃ তা পাঠ কর। তাহলেই দেখতে পাবে যে, এ সব কিছুই ওর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি তোমাদের এ অপবাদ প্রদান যে, তিনি তোমাদের জন্য শনিবার দিনকে চিরদিনের জন্য সাপ্তাহিক খুশির দিন করেছেন, তোমাদের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তোমরা সদা-সর্বদা তাওরাতের উপরেই আমল করবে এবং অন্য কোন নারীকে মানবেনা, এটা কত বড় অত্যাচারমূলক কথা! এসব কথা সত্ত্বেও তোমাদের এ ব্যবহার নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে অত্যাচারী সাব্যস্ত করছে। আল্লাহ তাআলা সত্য সংবাদ প্রদান করেছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম ওটাই যা পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে। তোমরা এ কিতাব ও এ নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর। তার চেয়ে বড় কোন নবীও নেই এবং তাঁর শরীয়ত অপেক্ষা উত্তম শরীয়তও, আর নেই। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল যে, নিশ্চয়ই আমার প্রভু আমাকে সরল-সঠিক পথ-প্রদর্শন করেছেন।' (৬:১৬১) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।'