Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আলে ইমরান 3:94 – আলে ইমরান 3:134

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আলে ইমরান 3:94
  2. আলে ইমরান 3:95
  3. আলে ইমরান 3:96
  4. আলে ইমরান 3:97
  5. আলে ইমরান 3:98
  6. আলে ইমরান 3:99
  7. আলে ইমরান 3:100
  8. আলে ইমরান 3:101
  9. আলে ইমরান 3:102
  10. আলে ইমরান 3:103
  11. আলে ইমরান 3:104
  12. আলে ইমরান 3:105
  13. আলে ইমরান 3:106
  14. আলে ইমরান 3:107
  15. আলে ইমরান 3:108
  16. আলে ইমরান 3:109
  17. আলে ইমরান 3:110
  18. আলে ইমরান 3:111
  19. আলে ইমরান 3:112
  20. আলে ইমরান 3:113
  21. আলে ইমরান 3:114
  22. আলে ইমরান 3:115
  23. আলে ইমরান 3:116
  24. আলে ইমরান 3:117
  25. আলে ইমরান 3:118
  26. আলে ইমরান 3:119
  27. আলে ইমরান 3:120
  28. আলে ইমরান 3:121
  29. আলে ইমরান 3:122
  30. আলে ইমরান 3:123
  31. আলে ইমরান 3:124
  32. আলে ইমরান 3:125
  33. আলে ইমরান 3:126
  34. আলে ইমরান 3:127
  35. আলে ইমরান 3:128
  36. আলে ইমরান 3:129
  37. আলে ইমরান 3:130
  38. আলে ইমরান 3:131
  39. আলে ইমরান 3:132
  40. আলে ইমরান 3:133
  41. আলে ইমরান 3:134

আলে ইমরান 3:94

৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একবার কয়েকজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ আমরা আপনাকে এমন কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করছি যেগুলো নবী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপনি ঐগুলোর উত্তর দিন।' তিনি বলেনঃ ‘যা ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস কর, কিন্তু আল্লাহ তা'আলাকে সম্মুখে বিদ্যমান জেনে আমার নিকট ঐ অঙ্গীকার কর যে অঙ্গীকার হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্রদের (বানী ইসরাঈল) নিকট নিয়েছিলেন। তা এই যে, আমি যদি ঐ কথাগুলো তোমাদেরকে ঠিক ঠিক বলে দেই তবে তোমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আমার অনুগত হয়ে যাবে।' তারা শপথ করে বললোঃ “আমরা একথা মেনে নিলাম। যদি আপনি সঠিক উত্তর দিতে পারেন তবে আমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আপনার অনুগত হয়ে যাবো।অতঃপর তারা বললোঃ আমাদেরকে এ চারটি প্রশ্নে উত্তর দিনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (হযরত ইয়াকূব আঃ) নিজের উপর কোন খাদ্য হারাম করেছিলেন? (২) পুরুষের বীর্য ও স্ত্রীলোকের বীর্য কিরূপ হয়, কখনো পুত্র ও কখনো কন্যা হয় কেন? (৩) নিরক্ষর নবীর ঘুম কিরূপ হয়? এবং (৪) ফেরেশতাদের মধ্যে কোন্ ফেরেশতা তাঁর নিকট অহী নিয়ে আসেন?' এরপর তিনি দ্বিতীয়বার তাদের নিকট অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি উত্তরে বলেনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (আঃ) কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাকে ঐ রোগ হতে আরোগ্য দান করেন তবে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস পরিত্যাগ করবেন। তারপরে তিনি আরোগ্য লাভ করলে উটের গোশত খাওয়া ও দুধ পান পরিত্যাগ করেন। (২) পুরুষের বীর্যের রং সাদা ও গাঢ় হয় এবং নারীর বীর্যের রং হলদে ও তরল হয়। এ দু-এর মধ্যে যা উপরে এসে যায় ওর উপরে সন্তান ছেলে বা মেয়ে হয়ে থাকে এবং আকার ও অনুরূপতাও ওর উপর নির্ভর করেই হয়। (৩) এ নিরক্ষর নবীর ঘুমের সময় চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে বটে কিন্তু অন্তর জেগে থাকে এবং (৪) আমার নিকট ঐ ফেরেশতাই অহী নিয়ে আসেন যিনি সমস্ত নবীর নিকট অহী নিয়ে আসতেন। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)।' একথা শুনেই তারা চীৎকার করে বলে উঠেঃ ‘যদি অন্য কোন ফেরেশতা আপনার বন্ধু হতেন তবে আপনার নবুওয়াতকে মেনে নিতে আমাদের কোন আপত্তি থাকতো না। প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে শপথ করাতেন ও প্রশ্ন করতেন এবং তারা স্বীকার করতে যে উত্তর সঠিক হয়েছে। তাদের ব্যাপারেই (আরবী) (২:৯৭)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর ‘আরাকুন নিসা' রোগ ছিল এবং ঐ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের ৫ম প্রশ্ন ছিলঃ বজ্র কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্যে একজন ফেরেশতা রয়েছেন যিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন। তার হাতে একটি আগুনের চাবুক রয়েছে যার সাহায্যে তিনি মেঘকে ঐদিকে নিয়ে যান যেদিকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হয় এবং এ গর্জনের শব্দ হচ্ছে ওরই শব্দ। হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর নাম শুনে ঐ ইয়াহূদীরা বলেঃ ‘তিনি তো হলেন শাস্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফেরেশতা এবং তিনি আমাদের শত্রু। যদি উৎপাদন ও মেঘের ফেরেশতা হযরত মীকাঈল (আঃ) আপনার বন্ধু হতেন তবে আমরা মেনে নিতাম।' হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর সন্তানাদিও তাঁর নীতির উপরই ছিলেন এবং তাঁরাও উটের গোশত খেতেন না। পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে এ আয়াতের সম্পর্ক এক তো এ রয়েছে যে, ইসরাঈল (আঃ) যেমন তাঁর প্রিয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার নযর’ করেছিলেন দ্রুপ তোমরাও কর। কিন্তু হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে এর নিয়ম এই ছিল যে, তারা স্বীয় পছন্দনীয় জিনিস আল্লাহ পাকের নামে পরিত্যাগ করতেন। কিন্তু আমাদের শরীয়তে ঐ নিয়ম নেই। বরং আমাদেরকে এই বলা হয়েছে যে, আমরা যেন আমাদের প্রিয় জিনিস হতে আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করি। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মালের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও সে তা প্রদান করে থাকে। (২:১৭৭) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এবং বন্দীকে ভোজন করিয়ে থাকে'। (৭৬:৮) দ্বিতীয় সম্পর্ক এও রয়েছে যে, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে খ্রীষ্টানদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত ছিল। কাজেই এখানে ইয়াহুদীদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, তাদের রীতিতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঠিক জন্মের ঘটনা বর্ণনা করতঃ তাদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হচ্ছে। এখানে তাদের ধর্ম রহিতকরণের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর তাদের বাজে বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। তাদের গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকা হতে স্থলভাগে অবতরণ করেন তখন তার জন্য সমস্ত জন্তু হালাল ছিল। অতঃপর হযরত ইয়াকূব (আঃ) উটের গোশত ও দুধ হারাম করে নেন এবং তাঁর সন্তানেরাও ও দুটো জিনিস হারামই মনে করতে থাকে। অতএব তাওরাতেও ওর অবৈধতা অবতীর্ণ হয়। এতদ্ব্যতীত আরও বহু জিনিস হারাম করা হয়। এটা রহিত ছাড়া আর কি হতে পারে? প্রাথমিক যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে পরস্পর সহোদর ভাই বোনের বিবাহও বৈধ ছিল। কিন্তু পরে তা হারাম করে দেয়া হয়। পরীদের উপর কৃতদাসীর বিয়ে ইবরাহীম (আঃ)-এর শারীয়াতে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইবরাহীম (আঃ) সারার (রাঃ) উপর হাজেরাকে বিয়ে করেন। কিন্তু আবার তাওরাতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সাথে দু' ভগ্নীকে বিয়ে করা ইয়াকুব (আঃ)এর যুগে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর ঘরে একই সাথে দু’ সহোদরা ভগ্নী পত্নীরূপে বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু তাওরাতে এটাও হারাম করা হয়। এটাকেই রহিতকরণ বলে। এগুলো তারা দেখছে এবং স্বীয় গ্রন্থে পাঠ করছে। অথচ রহিতকরণকে অস্বীকার করত ও ইঞ্জীল ও হযরত ঈসা (আঃ)-কে অমান্য করছে। অতঃপর তারা শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথেও এ ব্যবহারই করছে। তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে, ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর যা হারাম করেছিলেন তাছাড়া তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সমস্ত খাবারই হালাল ছিল। সুতরাং তোমরা তাওরাত আনয়ন করতঃ তা পাঠ কর। তাহলেই দেখতে পাবে যে, এ সব কিছুই ওর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি তোমাদের এ অপবাদ প্রদান যে, তিনি তোমাদের জন্য শনিবার দিনকে চিরদিনের জন্য সাপ্তাহিক খুশির দিন করেছেন, তোমাদের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তোমরা সদা-সর্বদা তাওরাতের উপরেই আমল করবে এবং অন্য কোন নারীকে মানবেনা, এটা কত বড় অত্যাচারমূলক কথা! এসব কথা সত্ত্বেও তোমাদের এ ব্যবহার নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে অত্যাচারী সাব্যস্ত করছে। আল্লাহ তাআলা সত্য সংবাদ প্রদান করেছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম ওটাই যা পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে। তোমরা এ কিতাব ও এ নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর। তার চেয়ে বড় কোন নবীও নেই এবং তাঁর শরীয়ত অপেক্ষা উত্তম শরীয়তও, আর নেই। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল যে, নিশ্চয়ই আমার প্রভু আমাকে সরল-সঠিক পথ-প্রদর্শন করেছেন।' (৬:১৬১) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।'

আলে ইমরান 3:95

৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একবার কয়েকজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ আমরা আপনাকে এমন কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করছি যেগুলো নবী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপনি ঐগুলোর উত্তর দিন।' তিনি বলেনঃ ‘যা ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস কর, কিন্তু আল্লাহ তা'আলাকে সম্মুখে বিদ্যমান জেনে আমার নিকট ঐ অঙ্গীকার কর যে অঙ্গীকার হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্রদের (বানী ইসরাঈল) নিকট নিয়েছিলেন। তা এই যে, আমি যদি ঐ কথাগুলো তোমাদেরকে ঠিক ঠিক বলে দেই তবে তোমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আমার অনুগত হয়ে যাবে।' তারা শপথ করে বললোঃ “আমরা একথা মেনে নিলাম। যদি আপনি সঠিক উত্তর দিতে পারেন তবে আমরা ইসলাম গ্রহণ করতঃ আপনার অনুগত হয়ে যাবো।অতঃপর তারা বললোঃ আমাদেরকে এ চারটি প্রশ্নে উত্তর দিনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (হযরত ইয়াকূব আঃ) নিজের উপর কোন খাদ্য হারাম করেছিলেন? (২) পুরুষের বীর্য ও স্ত্রীলোকের বীর্য কিরূপ হয়, কখনো পুত্র ও কখনো কন্যা হয় কেন? (৩) নিরক্ষর নবীর ঘুম কিরূপ হয়? এবং (৪) ফেরেশতাদের মধ্যে কোন্ ফেরেশতা তাঁর নিকট অহী নিয়ে আসেন?' এরপর তিনি দ্বিতীয়বার তাদের নিকট অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি উত্তরে বলেনঃ (১) হযরত ইসরাঈল (আঃ) কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাকে ঐ রোগ হতে আরোগ্য দান করেন তবে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস পরিত্যাগ করবেন। তারপরে তিনি আরোগ্য লাভ করলে উটের গোশত খাওয়া ও দুধ পান পরিত্যাগ করেন। (২) পুরুষের বীর্যের রং সাদা ও গাঢ় হয় এবং নারীর বীর্যের রং হলদে ও তরল হয়। এ দু-এর মধ্যে যা উপরে এসে যায় ওর উপরে সন্তান ছেলে বা মেয়ে হয়ে থাকে এবং আকার ও অনুরূপতাও ওর উপর নির্ভর করেই হয়। (৩) এ নিরক্ষর নবীর ঘুমের সময় চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে বটে কিন্তু অন্তর জেগে থাকে এবং (৪) আমার নিকট ঐ ফেরেশতাই অহী নিয়ে আসেন যিনি সমস্ত নবীর নিকট অহী নিয়ে আসতেন। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)।' একথা শুনেই তারা চীৎকার করে বলে উঠেঃ ‘যদি অন্য কোন ফেরেশতা আপনার বন্ধু হতেন তবে আপনার নবুওয়াতকে মেনে নিতে আমাদের কোন আপত্তি থাকতো না। প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে শপথ করাতেন ও প্রশ্ন করতেন এবং তারা স্বীকার করতে যে উত্তর সঠিক হয়েছে। তাদের ব্যাপারেই (আরবী) (২:৯৭)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর ‘আরাকুন নিসা' রোগ ছিল এবং ঐ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের ৫ম প্রশ্ন ছিলঃ বজ্র কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্যে একজন ফেরেশতা রয়েছেন যিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন। তার হাতে একটি আগুনের চাবুক রয়েছে যার সাহায্যে তিনি মেঘকে ঐদিকে নিয়ে যান যেদিকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হয় এবং এ গর্জনের শব্দ হচ্ছে ওরই শব্দ। হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর নাম শুনে ঐ ইয়াহূদীরা বলেঃ ‘তিনি তো হলেন শাস্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফেরেশতা এবং তিনি আমাদের শত্রু। যদি উৎপাদন ও মেঘের ফেরেশতা হযরত মীকাঈল (আঃ) আপনার বন্ধু হতেন তবে আমরা মেনে নিতাম।' হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর সন্তানাদিও তাঁর নীতির উপরই ছিলেন এবং তাঁরাও উটের গোশত খেতেন না। পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে এ আয়াতের সম্পর্ক এক তো এ রয়েছে যে, ইসরাঈল (আঃ) যেমন তাঁর প্রিয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার নযর’ করেছিলেন দ্রুপ তোমরাও কর। কিন্তু হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে এর নিয়ম এই ছিল যে, তারা স্বীয় পছন্দনীয় জিনিস আল্লাহ পাকের নামে পরিত্যাগ করতেন। কিন্তু আমাদের শরীয়তে ঐ নিয়ম নেই। বরং আমাদেরকে এই বলা হয়েছে যে, আমরা যেন আমাদের প্রিয় জিনিস হতে আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করি। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মালের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও সে তা প্রদান করে থাকে। (২:১৭৭) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এবং বন্দীকে ভোজন করিয়ে থাকে'। (৭৬:৮) দ্বিতীয় সম্পর্ক এও রয়েছে যে, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে খ্রীষ্টানদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত ছিল। কাজেই এখানে ইয়াহুদীদের রীতি-নীতির কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, তাদের রীতিতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঠিক জন্মের ঘটনা বর্ণনা করতঃ তাদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হচ্ছে। এখানে তাদের ধর্ম রহিতকরণের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর তাদের বাজে বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। তাদের গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকা হতে স্থলভাগে অবতরণ করেন তখন তার জন্য সমস্ত জন্তু হালাল ছিল। অতঃপর হযরত ইয়াকূব (আঃ) উটের গোশত ও দুধ হারাম করে নেন এবং তাঁর সন্তানেরাও ও দুটো জিনিস হারামই মনে করতে থাকে। অতএব তাওরাতেও ওর অবৈধতা অবতীর্ণ হয়। এতদ্ব্যতীত আরও বহু জিনিস হারাম করা হয়। এটা রহিত ছাড়া আর কি হতে পারে? প্রাথমিক যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে পরস্পর সহোদর ভাই বোনের বিবাহও বৈধ ছিল। কিন্তু পরে তা হারাম করে দেয়া হয়। পরীদের উপর কৃতদাসীর বিয়ে ইবরাহীম (আঃ)-এর শারীয়াতে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইবরাহীম (আঃ) সারার (রাঃ) উপর হাজেরাকে বিয়ে করেন। কিন্তু আবার তাওরাতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সাথে দু' ভগ্নীকে বিয়ে করা ইয়াকুব (আঃ)এর যুগে বৈধ ছিল। স্বয়ং হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর ঘরে একই সাথে দু’ সহোদরা ভগ্নী পত্নীরূপে বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু তাওরাতে এটাও হারাম করা হয়। এটাকেই রহিতকরণ বলে। এগুলো তারা দেখছে এবং স্বীয় গ্রন্থে পাঠ করছে। অথচ রহিতকরণকে অস্বীকার করত ও ইঞ্জীল ও হযরত ঈসা (আঃ)-কে অমান্য করছে। অতঃপর তারা শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথেও এ ব্যবহারই করছে। তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে, ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর যা হারাম করেছিলেন তাছাড়া তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সমস্ত খাবারই হালাল ছিল। সুতরাং তোমরা তাওরাত আনয়ন করতঃ তা পাঠ কর। তাহলেই দেখতে পাবে যে, এ সব কিছুই ওর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি তোমাদের এ অপবাদ প্রদান যে, তিনি তোমাদের জন্য শনিবার দিনকে চিরদিনের জন্য সাপ্তাহিক খুশির দিন করেছেন, তোমাদের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তোমরা সদা-সর্বদা তাওরাতের উপরেই আমল করবে এবং অন্য কোন নারীকে মানবেনা, এটা কত বড় অত্যাচারমূলক কথা! এসব কথা সত্ত্বেও তোমাদের এ ব্যবহার নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে অত্যাচারী সাব্যস্ত করছে। আল্লাহ তাআলা সত্য সংবাদ প্রদান করেছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম ওটাই যা পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে। তোমরা এ কিতাব ও এ নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর। তার চেয়ে বড় কোন নবীও নেই এবং তাঁর শরীয়ত অপেক্ষা উত্তম শরীয়তও, আর নেই। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল যে, নিশ্চয়ই আমার প্রভু আমাকে সরল-সঠিক পথ-প্রদর্শন করেছেন।' (৬:১৬১) অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।'

আলে ইমরান 3:96

৯৬-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ মানবমণ্ডলীর ইবাদত, কুরবানী, তাওয়াফ, নামায, ই'তিকাফ ইত্যাদির জন্য আল্লাহর ঘর, যার নির্মাতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ), যে ঘরের আনুগত্যের দাবী ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান, মুশরিক এবং মুসলমান সবাই করে থাকে ওটা ঐ ঘর যা সর্বপ্রথম মক্কায় নির্মিত হয়। আল্লাহ তা'আলার বন্ধু এ ইবরাহীম (আঃ)-ই ছিলেন হজ্বের ঘোষণাকারী। কিন্তু বড়ই বিস্ময় ও দুঃখের কথা এই যে, তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার দাবী করে, অথচ এ ঘরের সম্মান করে না, এখানে হজ্ব করতে আসে না, বরং নিজের কিবলা ও কা'বা পৃথক পৃথক করে বেড়ায়। এ বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যেই হিদায়াত নিহিত রয়েছে এবংএটা সারা বিশ্ববাসীর জন্যেই পথ-প্রদর্শক। হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম কোন্ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-হারাম।' তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেনঃ তারপরে কোটি’? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-বায়তুল মুকাদ্দাস।হযরত আবু যার (রাঃ) আবার প্রশ্ন করেনঃ ‘এ দু’টি মসজিদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ চল্লিশ বছর। তারপরে হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এরপরে কোন মসজিদ?' তিনি বলেনঃ “যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেখানেই নামায পড়ে নেবে, সমস্ত ভূমিই মসজিদ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “পূর্বে তো বহু ঘরই ছিল, কিন্তু বিশেষ করে আল্লাহর ইবাদতের ঘর সর্বপ্রথম এটাই।' কোন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ পৃথিবী পৃষ্ঠে কি সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “না, তবে কল্যাণময়, মাকাম-ই-ইবরাহীম এবং নিরাপত্তার ঘর সর্বপ্রথম এটাই'। বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণের পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-বাকারা (আরবী) (২:১২৫)-এ আয়াতের তাফসীরে লিখিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ ‘ভূ-পৃষ্ঠে সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মাণ করা হয়। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তিটিই সঠিক। আর বায়হাকীর ঐ হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) আল্লাহর নির্দেশক্রমে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণ করেন, তাওয়াফ করেন এবং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘তুমি সর্বপ্রথম মানুষ এবং এটাই সর্বপ্রথম ঘর'। এ হাদীসটি ইবনে লাহীঅ। বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। সম্ভবতঃ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তি এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি যে কিতাবীদের পুস্তকের দু’টি থলে পেয়েছিলেন ঐগুলোর মধ্যে এটাও লিখিত থাকবে। বাক্কা’ হচ্ছে মাক্কা শরীফের প্রসিদ্ধ নাম। বড় বড় স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তির স্কন্ধ এখানে ভেঙ্গে যেত এবং প্রত্যেক সম্মানিত ব্যক্তির মস্তক এখানে শুয়ে পড়তে বলে একে মাক্কা বলা হয়েছে। একে মাক্কা বলার আর একটি কারণ এই যে, এখানে জনগণের ভীড় জমে থাকে। আরও একটি কারণ এই যে, এখানে মানুষ মিশ্রিত হয়ে পড়ে। এমনকি কখনো কখনো স্ত্রী লোকেরা সম্মুখে সালাত আদায় করতে থাকে এবং পুরুষ লোকেরা তাদের পিছনে হয়ে যায়, যা অন্য কোন জায়গায় হয়না। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ফাজ্জ হতে তানঈম পর্যন্ত হচ্ছে মাক্কা এবং বাইতুল্লাহ হতে বাতহা পর্যন্ত হচ্ছে বাক্কা। বায়তুল্লাহ এবং মসজিদকে বাক্কা বলা হয়েছে। বায়তুল্লাহ এবং ওর আশে-পাশের জায়গাকে বাক্কা, আর অবশিষ্ট শহরকে মক্কাও বলা হয়েছে। এর আরও বহু নাম রয়েছে। যেমন বায়তুল আতীক, বায়তুল হারাম, বালাদুল আমীন, বালাদুল মামূন, উম্মে রহাম, উম্মুল কুরা, সিলাহ, আরশ, কাদিস, মুকাদ্দাস, নাসেবাহ, নাগেসাহ, হাতেমাহ, রা’স কাউসা, আল বালাদাহ, আল বায়্যেনাহ এবং আল কা’বা। এর মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী রয়েছে যা এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহামর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ পাকের ঘর এটাই। এখানে মাকাম-ই-ইবরাহীম (আঃ) রয়েছে যেখানে দাড়িয়ে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নিকট হতে পাথর নিয়ে নিয়ে কাবার দেয়াল উঁচু করতেন। এটা প্রথমে বায়তুল্লাহ শরীফের দেয়ালের সঙ্গে সংলগ্ন ছিল। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের আমলে এটাকে সামান্য সরিয়ে পূর্বমুখী করে দিয়েছিলেন, যেন তাওয়াফ পূর্ণভাবে হতে পারে এবং তাওয়াফের পরে যারা মাকাম-ই-ইবরাহীমের পিছনে নামায পড়তে চান। তাদের যেন কোন অসুবিধা সৃষ্টি না হয়। ঐ দিকেই নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় পূর্ণ তাফসীরও (আরবী) (২:১২৫) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রকাশ্য নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে মাকাম-ই-ইবরাহীম। অবশিষ্টগুলো হচ্ছে অন্যান্য নিদর্শন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন, মাকাম-ই-ইবরাহীমের উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যে পদচিহ্ন রয়েছে ওটাও একটি নিদর্শন। সম্পূর্ণ হারাম শরীফকে, হাতীমকে এবং হজ্বের সমুদয় রুকনকেও মুফাসসিরগণ মাকাম-ই-ইবরাহীমের তাফসীরের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।যারা এ ঘরে প্রবেশ করে তারা নিরাপত্তা লাভ করে। অজ্ঞতার যুগেও মক্কা নিরাপদ জায়গা হিসেবে গণ্য হতো। এখানে পিতৃহন্তাকে পেলেও তারা তাকে হত্যা করতো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘বায়তুল্লাহ আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দিয়ে থাকে কিন্তু স্থান ও খানাপানি দেয় না।' কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারামকে নিরাপত্তার জায়গা করেছি’? অন্য স্থানে রয়েছেঃ (২৯:৬৭)। (আরবী) অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ভয় হতে নিরাপত্তা দান করেছেন। (১০৬:৪) শুধু যে মানবের জন্যেই নিরাপত্তা রয়েছে তা নয়, বরং তথায় শিকার করা, শিকারকে তথা হতে তাড়িয়ে দেয়া, তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা, তাকে তার অবস্থান স্থল হতে বা বাসা হতে সরিয়ে দেয়া বা উড়িয়ে দেয়াও নিষিদ্ধ। তথাকার বৃক্ষ কেটে ফেলা এবং ঘাস উঠিয়ে ফেলাও বৈধ নয়। এ বিষয়ে আরও বহু হাদীস সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, জামেউত তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যেটাকে ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাসান সহীহ বলেছেন। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার হারূরা বাজারে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “হে মক্কা! তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট সমগ্র ভূমির মধ্যে উত্তম ও প্রিয় ভূমি। যদি আমাকে তোমার উপর হতে জোরপূর্বক বের করে দেয়া না হতো তবে আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।' এ আয়াতের একটি অর্থ এও আছে যে, সে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পেয়ে গেল। বায়হাকীর একটি মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর মধ্যে প্রবেশ করলো সে পুণ্যের মধ্যে এসে গেল ও পাপ হতে দূর হলো এবং তার পাপ ক্ষমা করে দেয়া হলো। কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবদুল্লাহ ইবনে নাওমাল, যিনি বর্ণনাকারী হিসেবে বলিষ্ঠ নন। আয়াতের শেষাংশ হচ্ছে হজ্ব ফরয হওয়ার দলীল। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটিই হচ্ছে হজ্জ ফরয হওয়ার দলীল। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই অধিকতর সঠিক। কয়েকটি হাদীসে এসেছে যে, হজ্ব ইসলামের রুকনসমূহের মধ্যে একটি রুকন। এটা যে ফরয এর উপর মুসলমানদের ইজমা রয়েছে। আর একথাও সাব্যস্ত যে, সমর্থ ব্যক্তিদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। নবী (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্ব করবে। একটি লোক জিজ্ঞেস করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রতি বছরই কি?' তিনি তখন নীরব হয়ে যান। লোকটি তিনবার ঐ প্রশ্নই করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “আমি যদি হাঁ বলতাম তবে প্রতি বছরই হজ্ব ফরয হয়ে যেতো। অতঃপর তোমরা পালন করতে পারতে না। আমি যা বলবো না তোমরা সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অধিক প্রশ্ন করার ফলে এবং নবীদের (আঃ) উপর মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার নির্দেশ সাধ্যানুসারে পালন কর এবং যে জিনিস হতে আমি নিষেধ করি তা হতে বিরত থাক’। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফের এ হাদীসে এতটুকু বেশী রয়েছে যে, এ প্রশ্নকারী ব্যক্তি ছিলেন হযরত আকরা’ ইবনে হাবিস (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে এ কথাও বলেছিলেন যে, একবার ফরয ও পরে নফল। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ প্রশ্ন সম্বন্ধেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যদি আমি হাঁ' বলতাম ও প্রতি বছর হজ্ব ফরয হয়ে যেতো তবে তোমরা পালন করতে পারতে না, ফলে শাস্তি অবতীর্ণ হতো'। (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বিদায় হজ্বে স্বীয় সহধর্মিণীগণকে বলেছিলেনঃ হজ্ব হয়ে গেছে। এখন আর বাড়ী হতে বের হবে না। এখন বাকী থাকলো ক্ষমতা ও সামর্থ। ওটা কখনও কারও মাধ্যম ব্যতিরেকেই মানুষের হয়ে থাকে, আবার কখনও কারও মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন আহকামের পুস্তকগুলোর মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাজী কে? তিনি বলেনঃ ‘বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট এবং ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত ব্যক্তি।' অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হজ্ব উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে হজ্বে খুব বেশী কুরবানী করা হয় এবং ‘লাব্বায়েক' শব্দ অধিক উচ্চারিত হয়। আর একটি লোক প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) শব্দের ভাবার্থ কি?' তিনি বলেনঃ ‘পাথেয়, পানাহারের উপযুক্ত খরচ এবং সোয়ারী।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল হলেও এর পিছনে অন্য সনদও রয়েছে। বিভিন্ন সাহাবী হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এর তাফসীরে পাথেয় এবং সোয়ারীর কথা বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ফরয হজু তাড়াতাড়ি আদায় করে নাও, না জানি কি ঘটে যায়। সুনন-ই-আবু দাউদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছেঃ “হজ্ব করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন শীঘ্রই স্বীয় বাসনা পূর্ণ করে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যার নিকট তিনশ রৌপ্যমুদ্রা রয়েছে সে সক্ষম ব্যক্তি।' হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, ইসলাম ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তা কখনও গৃহীত হবে না'। যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন ইয়াহূদীরা বলতে থাকেঃ “আমরাও মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ মুসলানদের উপর তো হজ্ব ফরয, তাহলে তোমরাও হজ্ব কর। তখন তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে। ফলে এ আয়াতটি অবর্তীণ হয় এবং বলা হয় যে, হজ্বের অস্বীকারকারী কাফির। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খাদ্য, পানীয় ও যানবাহনের উপর ক্ষমতা রাখে এ পরিমাণ মাল তার নিকট বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী বা খ্রীষ্টান ধর্মের উপর মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা মানুষের কর্তব্য যারা তদ্দিকে পথ অতিক্রমে সমর্থ, আর যদি কেউ অস্বীকার করে তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত।' এ হাসীসের বর্ণনাকারীর উপরও সমালোচনা রয়েছে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেন, ক্ষমতা থাকতেও যে ব্যক্তি হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী হয়ে বা খ্রীষ্টান হয়ে মারা যাবে। এর সনদ সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ। (হাফিয আবু বাকর ইসমাঈলী) মুসনাদ-ই- সাঈদ ইবনে মানসুরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ “আমার ইচ্ছে রয়েছে যে, আমি বিভিন্ন শহরে লোক পাঠিয়ে দেবো এবং তারা ঐসব লোকের উপর জিযিয়া কর বসিয়ে দেবে যারা ক্ষমতা থাকতেও হজ্ব করে না। কেননা তারা মুসলমান নয়।”

আলে ইমরান 3:97

৯৬-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: অর্থাৎ মানবমণ্ডলীর ইবাদত, কুরবানী, তাওয়াফ, নামায, ই'তিকাফ ইত্যাদির জন্য আল্লাহর ঘর, যার নির্মাতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ), যে ঘরের আনুগত্যের দাবী ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান, মুশরিক এবং মুসলমান সবাই করে থাকে ওটা ঐ ঘর যা সর্বপ্রথম মক্কায় নির্মিত হয়। আল্লাহ তা'আলার বন্ধু এ ইবরাহীম (আঃ)-ই ছিলেন হজ্বের ঘোষণাকারী। কিন্তু বড়ই বিস্ময় ও দুঃখের কথা এই যে, তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার দাবী করে, অথচ এ ঘরের সম্মান করে না, এখানে হজ্ব করতে আসে না, বরং নিজের কিবলা ও কা'বা পৃথক পৃথক করে বেড়ায়। এ বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যেই হিদায়াত নিহিত রয়েছে এবংএটা সারা বিশ্ববাসীর জন্যেই পথ-প্রদর্শক। হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম কোন্ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-হারাম।' তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেনঃ তারপরে কোটি’? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-বায়তুল মুকাদ্দাস।হযরত আবু যার (রাঃ) আবার প্রশ্ন করেনঃ ‘এ দু’টি মসজিদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ চল্লিশ বছর। তারপরে হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এরপরে কোন মসজিদ?' তিনি বলেনঃ “যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেখানেই নামায পড়ে নেবে, সমস্ত ভূমিই মসজিদ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “পূর্বে তো বহু ঘরই ছিল, কিন্তু বিশেষ করে আল্লাহর ইবাদতের ঘর সর্বপ্রথম এটাই।' কোন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ পৃথিবী পৃষ্ঠে কি সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “না, তবে কল্যাণময়, মাকাম-ই-ইবরাহীম এবং নিরাপত্তার ঘর সর্বপ্রথম এটাই'। বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণের পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-বাকারা (আরবী) (২:১২৫)-এ আয়াতের তাফসীরে লিখিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ ‘ভূ-পৃষ্ঠে সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মাণ করা হয়। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তিটিই সঠিক। আর বায়হাকীর ঐ হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) আল্লাহর নির্দেশক্রমে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণ করেন, তাওয়াফ করেন এবং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘তুমি সর্বপ্রথম মানুষ এবং এটাই সর্বপ্রথম ঘর'। এ হাদীসটি ইবনে লাহীঅ। বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। সম্ভবতঃ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তি এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি যে কিতাবীদের পুস্তকের দু’টি থলে পেয়েছিলেন ঐগুলোর মধ্যে এটাও লিখিত থাকবে। বাক্কা’ হচ্ছে মাক্কা শরীফের প্রসিদ্ধ নাম। বড় বড় স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তির স্কন্ধ এখানে ভেঙ্গে যেত এবং প্রত্যেক সম্মানিত ব্যক্তির মস্তক এখানে শুয়ে পড়তে বলে একে মাক্কা বলা হয়েছে। একে মাক্কা বলার আর একটি কারণ এই যে, এখানে জনগণের ভীড় জমে থাকে। আরও একটি কারণ এই যে, এখানে মানুষ মিশ্রিত হয়ে পড়ে। এমনকি কখনো কখনো স্ত্রী লোকেরা সম্মুখে সালাত আদায় করতে থাকে এবং পুরুষ লোকেরা তাদের পিছনে হয়ে যায়, যা অন্য কোন জায়গায় হয়না। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ফাজ্জ হতে তানঈম পর্যন্ত হচ্ছে মাক্কা এবং বাইতুল্লাহ হতে বাতহা পর্যন্ত হচ্ছে বাক্কা। বায়তুল্লাহ এবং মসজিদকে বাক্কা বলা হয়েছে। বায়তুল্লাহ এবং ওর আশে-পাশের জায়গাকে বাক্কা, আর অবশিষ্ট শহরকে মক্কাও বলা হয়েছে। এর আরও বহু নাম রয়েছে। যেমন বায়তুল আতীক, বায়তুল হারাম, বালাদুল আমীন, বালাদুল মামূন, উম্মে রহাম, উম্মুল কুরা, সিলাহ, আরশ, কাদিস, মুকাদ্দাস, নাসেবাহ, নাগেসাহ, হাতেমাহ, রা’স কাউসা, আল বালাদাহ, আল বায়্যেনাহ এবং আল কা’বা। এর মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী রয়েছে যা এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহামর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ পাকের ঘর এটাই। এখানে মাকাম-ই-ইবরাহীম (আঃ) রয়েছে যেখানে দাড়িয়ে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নিকট হতে পাথর নিয়ে নিয়ে কাবার দেয়াল উঁচু করতেন। এটা প্রথমে বায়তুল্লাহ শরীফের দেয়ালের সঙ্গে সংলগ্ন ছিল। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের আমলে এটাকে সামান্য সরিয়ে পূর্বমুখী করে দিয়েছিলেন, যেন তাওয়াফ পূর্ণভাবে হতে পারে এবং তাওয়াফের পরে যারা মাকাম-ই-ইবরাহীমের পিছনে নামায পড়তে চান। তাদের যেন কোন অসুবিধা সৃষ্টি না হয়। ঐ দিকেই নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় পূর্ণ তাফসীরও (আরবী) (২:১২৫) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রকাশ্য নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে মাকাম-ই-ইবরাহীম। অবশিষ্টগুলো হচ্ছে অন্যান্য নিদর্শন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন, মাকাম-ই-ইবরাহীমের উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যে পদচিহ্ন রয়েছে ওটাও একটি নিদর্শন। সম্পূর্ণ হারাম শরীফকে, হাতীমকে এবং হজ্বের সমুদয় রুকনকেও মুফাসসিরগণ মাকাম-ই-ইবরাহীমের তাফসীরের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।যারা এ ঘরে প্রবেশ করে তারা নিরাপত্তা লাভ করে। অজ্ঞতার যুগেও মক্কা নিরাপদ জায়গা হিসেবে গণ্য হতো। এখানে পিতৃহন্তাকে পেলেও তারা তাকে হত্যা করতো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘বায়তুল্লাহ আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দিয়ে থাকে কিন্তু স্থান ও খানাপানি দেয় না।' কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারামকে নিরাপত্তার জায়গা করেছি’? অন্য স্থানে রয়েছেঃ (২৯:৬৭)। (আরবী) অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ভয় হতে নিরাপত্তা দান করেছেন। (১০৬:৪) শুধু যে মানবের জন্যেই নিরাপত্তা রয়েছে তা নয়, বরং তথায় শিকার করা, শিকারকে তথা হতে তাড়িয়ে দেয়া, তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা, তাকে তার অবস্থান স্থল হতে বা বাসা হতে সরিয়ে দেয়া বা উড়িয়ে দেয়াও নিষিদ্ধ। তথাকার বৃক্ষ কেটে ফেলা এবং ঘাস উঠিয়ে ফেলাও বৈধ নয়। এ বিষয়ে আরও বহু হাদীস সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, জামেউত তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যেটাকে ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাসান সহীহ বলেছেন। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার হারূরা বাজারে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “হে মক্কা! তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট সমগ্র ভূমির মধ্যে উত্তম ও প্রিয় ভূমি। যদি আমাকে তোমার উপর হতে জোরপূর্বক বের করে দেয়া না হতো তবে আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।' এ আয়াতের একটি অর্থ এও আছে যে, সে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পেয়ে গেল। বায়হাকীর একটি মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর মধ্যে প্রবেশ করলো সে পুণ্যের মধ্যে এসে গেল ও পাপ হতে দূর হলো এবং তার পাপ ক্ষমা করে দেয়া হলো। কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবদুল্লাহ ইবনে নাওমাল, যিনি বর্ণনাকারী হিসেবে বলিষ্ঠ নন। আয়াতের শেষাংশ হচ্ছে হজ্ব ফরয হওয়ার দলীল। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটিই হচ্ছে হজ্জ ফরয হওয়ার দলীল। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই অধিকতর সঠিক। কয়েকটি হাদীসে এসেছে যে, হজ্ব ইসলামের রুকনসমূহের মধ্যে একটি রুকন। এটা যে ফরয এর উপর মুসলমানদের ইজমা রয়েছে। আর একথাও সাব্যস্ত যে, সমর্থ ব্যক্তিদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। নবী (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্ব করবে। একটি লোক জিজ্ঞেস করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রতি বছরই কি?' তিনি তখন নীরব হয়ে যান। লোকটি তিনবার ঐ প্রশ্নই করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “আমি যদি হাঁ বলতাম তবে প্রতি বছরই হজ্ব ফরয হয়ে যেতো। অতঃপর তোমরা পালন করতে পারতে না। আমি যা বলবো না তোমরা সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অধিক প্রশ্ন করার ফলে এবং নবীদের (আঃ) উপর মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার নির্দেশ সাধ্যানুসারে পালন কর এবং যে জিনিস হতে আমি নিষেধ করি তা হতে বিরত থাক’। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফের এ হাদীসে এতটুকু বেশী রয়েছে যে, এ প্রশ্নকারী ব্যক্তি ছিলেন হযরত আকরা’ ইবনে হাবিস (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে এ কথাও বলেছিলেন যে, একবার ফরয ও পরে নফল। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ প্রশ্ন সম্বন্ধেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যদি আমি হাঁ' বলতাম ও প্রতি বছর হজ্ব ফরয হয়ে যেতো তবে তোমরা পালন করতে পারতে না, ফলে শাস্তি অবতীর্ণ হতো'। (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বিদায় হজ্বে স্বীয় সহধর্মিণীগণকে বলেছিলেনঃ হজ্ব হয়ে গেছে। এখন আর বাড়ী হতে বের হবে না। এখন বাকী থাকলো ক্ষমতা ও সামর্থ। ওটা কখনও কারও মাধ্যম ব্যতিরেকেই মানুষের হয়ে থাকে, আবার কখনও কারও মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন আহকামের পুস্তকগুলোর মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাজী কে? তিনি বলেনঃ ‘বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট এবং ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত ব্যক্তি।' অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হজ্ব উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে হজ্বে খুব বেশী কুরবানী করা হয় এবং ‘লাব্বায়েক' শব্দ অধিক উচ্চারিত হয়। আর একটি লোক প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) শব্দের ভাবার্থ কি?' তিনি বলেনঃ ‘পাথেয়, পানাহারের উপযুক্ত খরচ এবং সোয়ারী।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল হলেও এর পিছনে অন্য সনদও রয়েছে। বিভিন্ন সাহাবী হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এর তাফসীরে পাথেয় এবং সোয়ারীর কথা বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ফরয হজু তাড়াতাড়ি আদায় করে নাও, না জানি কি ঘটে যায়। সুনন-ই-আবু দাউদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছেঃ “হজ্ব করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন শীঘ্রই স্বীয় বাসনা পূর্ণ করে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যার নিকট তিনশ রৌপ্যমুদ্রা রয়েছে সে সক্ষম ব্যক্তি।' হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, ইসলাম ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তা কখনও গৃহীত হবে না'। যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন ইয়াহূদীরা বলতে থাকেঃ “আমরাও মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ মুসলানদের উপর তো হজ্ব ফরয, তাহলে তোমরাও হজ্ব কর। তখন তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে। ফলে এ আয়াতটি অবর্তীণ হয় এবং বলা হয় যে, হজ্বের অস্বীকারকারী কাফির। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খাদ্য, পানীয় ও যানবাহনের উপর ক্ষমতা রাখে এ পরিমাণ মাল তার নিকট বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী বা খ্রীষ্টান ধর্মের উপর মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা মানুষের কর্তব্য যারা তদ্দিকে পথ অতিক্রমে সমর্থ, আর যদি কেউ অস্বীকার করে তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত।' এ হাসীসের বর্ণনাকারীর উপরও সমালোচনা রয়েছে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেন, ক্ষমতা থাকতেও যে ব্যক্তি হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী হয়ে বা খ্রীষ্টান হয়ে মারা যাবে। এর সনদ সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ। (হাফিয আবু বাকর ইসমাঈলী) মুসনাদ-ই- সাঈদ ইবনে মানসুরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ “আমার ইচ্ছে রয়েছে যে, আমি বিভিন্ন শহরে লোক পাঠিয়ে দেবো এবং তারা ঐসব লোকের উপর জিযিয়া কর বসিয়ে দেবে যারা ক্ষমতা থাকতেও হজ্ব করে না। কেননা তারা মুসলমান নয়।”

আলে ইমরান 3:98

৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: কিতাবীদের ঐ কাফিরদেরকে আল্লাহ ধমক দিচ্ছেন যারা সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল এবং জনগণকেও জোরপূর্বক ইসলাম হতে সরিয়ে রেখেছিল। অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা সম্বন্ধে তাদের পূর্ণ অবগতি ছিল। পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের ভবিষ্যদ্বাণী এবং তাঁদের শুভ সংবাদ তাদের নিকট বিদ্যমান ছিল। নিরক্ষর, হাশেমী, আরবী, মক্কা ও মদীনাবাসী, বানী আদমের নেতা ও নবীকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বর্ণনা তাদের গ্রন্থসমূহে মওজুদ ছিল। তথাপি তারা তাঁকে অবিশ্বাস করে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “আমি খুব ভাল করেই প্রত্যক্ষ করছি যে, তোমরা কিভাবে আমার নবীদেরকে অস্বীকার করছো, কি প্রকারে শেষ নবী (সঃ)-কে কষ্ট দিচ্ছ এবং কিরূপে আমার খাটি বান্দাদেরকে তাদের ইসলামের পথে বাধা প্রদান করছে। আমি তোমাদের কার্যাবলী সম্বন্ধে অমনোযোগী নই। তোমাদের প্রত্যেক অন্যায় কার্যের আমি পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। আমি তোমাদেরকে সেদিন ধরবো যেদিন তোমরা তোমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী ও সাহায্যকারী পাবে না।'

আলে ইমরান 3:99

৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: কিতাবীদের ঐ কাফিরদেরকে আল্লাহ ধমক দিচ্ছেন যারা সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল এবং জনগণকেও জোরপূর্বক ইসলাম হতে সরিয়ে রেখেছিল। অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা সম্বন্ধে তাদের পূর্ণ অবগতি ছিল। পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের ভবিষ্যদ্বাণী এবং তাঁদের শুভ সংবাদ তাদের নিকট বিদ্যমান ছিল। নিরক্ষর, হাশেমী, আরবী, মক্কা ও মদীনাবাসী, বানী আদমের নেতা ও নবীকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বর্ণনা তাদের গ্রন্থসমূহে মওজুদ ছিল। তথাপি তারা তাঁকে অবিশ্বাস করে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেনঃ “আমি খুব ভাল করেই প্রত্যক্ষ করছি যে, তোমরা কিভাবে আমার নবীদেরকে অস্বীকার করছো, কি প্রকারে শেষ নবী (সঃ)-কে কষ্ট দিচ্ছ এবং কিরূপে আমার খাটি বান্দাদেরকে তাদের ইসলামের পথে বাধা প্রদান করছে। আমি তোমাদের কার্যাবলী সম্বন্ধে অমনোযোগী নই। তোমাদের প্রত্যেক অন্যায় কার্যের আমি পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। আমি তোমাদেরকে সেদিন ধরবো যেদিন তোমরা তোমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী ও সাহায্যকারী পাবে না।'

আলে ইমরান 3:100

১০০-১০১ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে আহলে কিতাবের ঐ দলটির অনুসরণ করতে নিষেধ করছেন যাদের অন্তর কালিমাযুক্ত। কেননা, তারা হিংসুটে ও ঈমানের শত্রু। আল্লাহ তা'আলা যে আরবে নবী পাঠিয়েছেন এটা তাদের নিকট অসহ্য হয়ে উঠেছে এবং তারা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আহলে কিতাবের অনেকে তোমাদের প্রতি হিংসা বশতঃ তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় তোমাদেরকে কাফির বানিয়ে দেয়া পছন্দ করে। এখানেও আল্লাহ তাআলা এ কথাই বলেন- “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবের একটি দলের অনুসরণ কর তবে অবশ্যই তারা তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনয়নের পর পুনরায় কাফির বানিয়ে দেয়ার ব্যাপারে চেষ্টার ত্রুটি মোটেই করবে না। আমি জানি যে, তোমরা কুফর হতে বহু দূরে রয়েছে, তথাপি আমি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছি। তাদের প্রতারণায় তত তোমাদের পড়ার কথা নয়। কেননা, তোমরা রাত দিন আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী পাঠ করতে রয়েছে এবং স্বয়ং তাঁর রাসূল তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেন। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ “তোমরা কেন বিশ্বাস স্থাপন করবে না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনয়নের জন্যে আহ্বান করতে রয়েছেন এবং তোমাদের সঙ্গে অঙ্গীকারও করা হয়েছে, যদি তোমরা মুমিন হও। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা তাঁর সহচরবৃন্দকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈমানদার কে? তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ।' তিনি বলেনঃ তারা ঈমান আনবেন না কেন? স্বয়ং তাদের উপর তো অহী অবতীর্ণ হচ্ছে'। সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা।' তিনি বলেনঃ “তোমরা ঈমান আনবে না। কেন? স্বয়ং আমি তো তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি। তখন তারা বলেনঃ ‘দয়া করে আপনিই বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘সবচেয়ে ঈমানদার তারাই যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা গ্রন্থে লিখিত পাবে এবং ওর উপরেই বিশ্বাস স্থাপন করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আল্লাহর দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করে থাকা বান্দাদের কর্তব্য এবং তার উপর পূর্ণ ভরসা করলেই তারা সরল সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে এবং ভ্রান্ত পথ হতে দূরে থাকবে। এটাই হচ্ছে পুণ্য লাভ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। এর দ্বারাই সঠিক পথ লাভ করা যায় এবং উদ্দেশ্য সফল হয়।

আলে ইমরান 3:101

১০০-১০১ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে আহলে কিতাবের ঐ দলটির অনুসরণ করতে নিষেধ করছেন যাদের অন্তর কালিমাযুক্ত। কেননা, তারা হিংসুটে ও ঈমানের শত্রু। আল্লাহ তা'আলা যে আরবে নবী পাঠিয়েছেন এটা তাদের নিকট অসহ্য হয়ে উঠেছে এবং তারা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আহলে কিতাবের অনেকে তোমাদের প্রতি হিংসা বশতঃ তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় তোমাদেরকে কাফির বানিয়ে দেয়া পছন্দ করে। এখানেও আল্লাহ তাআলা এ কথাই বলেন- “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবের একটি দলের অনুসরণ কর তবে অবশ্যই তারা তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনয়নের পর পুনরায় কাফির বানিয়ে দেয়ার ব্যাপারে চেষ্টার ত্রুটি মোটেই করবে না। আমি জানি যে, তোমরা কুফর হতে বহু দূরে রয়েছে, তথাপি আমি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছি। তাদের প্রতারণায় তত তোমাদের পড়ার কথা নয়। কেননা, তোমরা রাত দিন আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী পাঠ করতে রয়েছে এবং স্বয়ং তাঁর রাসূল তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেন। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ “তোমরা কেন বিশ্বাস স্থাপন করবে না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনয়নের জন্যে আহ্বান করতে রয়েছেন এবং তোমাদের সঙ্গে অঙ্গীকারও করা হয়েছে, যদি তোমরা মুমিন হও। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা তাঁর সহচরবৃন্দকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈমানদার কে? তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ।' তিনি বলেনঃ তারা ঈমান আনবেন না কেন? স্বয়ং তাদের উপর তো অহী অবতীর্ণ হচ্ছে'। সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা।' তিনি বলেনঃ “তোমরা ঈমান আনবে না। কেন? স্বয়ং আমি তো তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি। তখন তারা বলেনঃ ‘দয়া করে আপনিই বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘সবচেয়ে ঈমানদার তারাই যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা গ্রন্থে লিখিত পাবে এবং ওর উপরেই বিশ্বাস স্থাপন করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আল্লাহর দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করে থাকা বান্দাদের কর্তব্য এবং তার উপর পূর্ণ ভরসা করলেই তারা সরল সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে এবং ভ্রান্ত পথ হতে দূরে থাকবে। এটাই হচ্ছে পুণ্য লাভ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। এর দ্বারাই সঠিক পথ লাভ করা যায় এবং উদ্দেশ্য সফল হয়।

আলে ইমরান 3:102

১০২-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলাকে পূর্ণরূপে ভয় করার অর্থ এই যে, তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে হবে, অবাধ্য হওয়া যাবে না, তাকে সদা স্মরণ করতে হবে, কোন সময়েই তাকে ভুলে যাওয়া চলবে না। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, কৃতঘ্ন হতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এ তাফসীর মারুফু' রূপেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। অর্থাৎ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তি। হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘোষণা এই যে, মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার দাবী পূরণ করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে স্বীয় জিহ্বাকে সংযত করে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (৬৪:১৬)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে। এ দ্বিতীয় আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ সাধ্যানুসারে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে যায়নি। বরং ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তার কার্যে যেন কোন ভৎসনাকারীর ভৎর্সনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, এমনকি নিজের উপরেও যেন ন্যায়ের নির্দেশ জারী করে। নিজের পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের ব্যাপারেও যেন ইনসাফ কায়েম করে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ কর। অর্থাৎ সারা জীবন ইসলামের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক, যাতে মৃত্যুও তার উপরেই হয়। ঐ মহান প্রভুর অভ্যাস এই যে, মানুষ স্বীয় জীবন যেভাবে চালিত করে ঐভাবেই তার মৃত্যু দিয়ে থাকেন। যার উপরে তার মৃত্যু সংঘটিত হবে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তাকে উথিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা এরবিপরীত হতে আমাদেরকে আশ্রয় দান করুন, আমীন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, মানুষ বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছিলেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তথায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাতে একখানা কাষ্ঠখণ্ড ছিল। তিনি বর্ণনা করছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ ‘যদি যাকুমের এক বিন্দুমাত্র দুনিয়ায় নিক্ষেপ করা হয় তবে দুনিয়াবাসীদের আহার্য নষ্ট হয়ে যাবে। তারা কোন জিনিস খেতে ও পান করতে পারবে না। তাহলে কল্পনা কর যে, ঐ জাহান্নামীদের অবস্থা কি হতে পারে যাদের আহার্য হবে এ যাকুম। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জাহান্নাম হতে পৃথক থাকতে ও জান্নাতে যেতে চায় তার উচিত যে, যেন সে আমরণ আল্লাহ তাআলার উপর এবং পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে ও লোকদের সাথে ঐ ব্যবহার করে যে ব্যবহার সে নিজের জন্য তাদের নিকট কামনা করে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত জাবের (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে তার মুখে শুনেছিঃ “দেখ, মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করবে। (সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার ধারণার পার্শ্বেই রয়েছি। যদি আমার প্রতি তার ভাল ধারণা হয় তবে আমি তার মঙ্গল সাধন করবো। আর যদি আমার প্রতি তার মন্দ ধারণা হয় তবে তার নিকট ঐভাবেই হাযির হবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটির পূর্ব অংশ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-বাযারে রয়েছে যে, এক রুগ্ন আনসারীকে দেখার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নিকট গমন করেন। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অবস্থা কিরূপ? তিনি বলেনঃ “আলহামদুলিল্লাহ, ভালই আছি। প্রভুর করুণার আশা করছি এবং তার শাস্তির ভয় করছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “জেনে রেখো, এরূপ অবস্থায় যার অন্তরে ভয় ও আশা উভয়ই থাকে তাকে আল্লাহ তার আশার জিনিস প্রদান করেন এবং ভয়ের জিনিস হতে রক্ষা করেন। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হাকীম ইবনে খারাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করতঃ বলেনঃ “আমি দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পতিত হয়ে যাবো। ইমাম নাসাঈ (রঃ) সুনানে নাসাঈর মধ্যে একথার ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে একটি অধ্যায় করেছেনঃ ‘সিজদায় কিভাবে যাওয়া উচিত তারই অধ্যায়। তথায় বলা হয়েছে যে, সিজদায় ঐভাবে যাওয়া উচিত। আবার নিম্নের ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়ছে- ‘আমি মুসলমান না হয়ে মরবো না। এ ছাড়া নিম্নের আর একটি ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে- আমি জিহাদে শত্রুর দিকে পিঠ করে মৃত্যুবরণ করবো না।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে থাক, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ো না। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা পবিত্র কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন কারীম আল্লাহ তা'আলার একটি দৃঢ় রঞ্জু এবং তাঁর সরল পথ। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে- ‘আল্লাহর কিতাব তাঁর আকাশ হতে পৃথিবীর দিকে লটকানো রজু বিশেষ।' আরও একটি মারফু’ হাদীসে রয়েছে- ‘এ কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা'আলার শক্ত রঞ্জু, এটা প্রকাশ্য দীপ্তি। এটা সরাসরি আরোগ্য দানকারী এবং উপকারী। এর উপর আমলকারীর জন্যে এটা রক্ষাকবচ, এর অনুসারীদের জন্যে এটা মুক্তির উপায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ঐ সব পথে তো শয়তানেরা চলে, তোমরা আল্লাহ তা'আলার পথে এসে যাও। তোমরা আল্লাহ পাকের রঞ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর। ঐ রঞ্জু হচ্ছে পবিত্র কুরআন। তোমরা মতভেদ সৃষ্টি করো না এবং পৃথক পৃথক হয়ে যেয়ো না। সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন এবং তিনটি কাজে অসন্তুষ্ট হন। যে তিনটি কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন তার একটি এই যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করবে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা মুসলমান বাদশাহদের সহায়তা করবে। আর যে তিনটি কাজ তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ তার একটি হচ্ছে বাজে ও অনর্থক কথা বলা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে অত্যধিক প্রশ্ন করা এবং তৃতীয়টি হচ্ছে সম্পদ ধ্বংস করা।' বহু হাদীস এমন রয়েছে যেগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, একতার সময় মানুষ ভুল ও অন্যায় হতে রক্ষা পায়। আবার বহু হাদীসে মতানৈক্য হতে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে কিন্তু এতদসত্ত্বেও উম্মতের মধ্যে মতভেদ ও অনৈক্যের সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে ৭৩টি দল হয়ে গেছে, যাদের মধ্যে একটি দল মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে এবং জাহান্নামের আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। এরা ঐসব যারা এমন জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যার উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অজ্ঞতার যুগে। আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বড়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কঠিন শত্রুতা ছিল। পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকতো। অতঃপর যখন গোত্রদ্বয় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় তখন মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তারা পূর্বের সব কিছু ভুলে গিয়ে সব এক হয়ে যায়। হিংসা বিদ্বেষ বিদায় নেয় এবং তারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যায়। তারা পুণ্যের কাজে একে অপরের সহায়ক হয় এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তারা পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে যায়। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনিই সেই আল্লাহ যিনি স্বীয় সাহায্য দ্বারা এবং মুমিনদের সাহায্য দ্বারা তোমাকে শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেছেন।' (৮:৬২-৬৩) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বিতীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন- “হে মুমিনগণ! তোমরা একেবারে জাহান্নামের অগ্নির ধারে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং তোমাদের কুফরী তোমাদেরকে ওর ভিতরে প্রবেশ করিয়ে দিত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ইসলাম গ্রহণের তাওফীক প্রদান করতঃ তোমাদেরকে ঐ আগুন থেকেও বাঁচিয়ে নিয়েছেন। হুনায়েন যুদ্ধে বিজয় লাভের পর ধর্মীয় মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে গিয়ে কোন কোন লোককে কিছু বেশী প্রদান করেন তখন কোন একজন লোক কিছু কটুক্তি করে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসার দলকে একত্রিত করতঃ একটি ভাষণ দান করেন। ঐ ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ হে আনসারের দল! তোমরা কি পথভ্রষ্ট ছিলে না? অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সুপথ-প্রদর্শন করেন? তোমরা কি দলে দলে বিভক্ত ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই কারণে তোমাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেন। তোমরা দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেন? প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে এ পবিত্র দলটি আল্লাহর শপথ করে সমস্বরে বলে উঠেনঃ আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) -এর অনুগ্রহ এর চেয়েও বেশী রয়েছে। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজের মধ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে শত্রুতা ছিল, অথচ তারাও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেছে দেখে ইয়াহুদীরা চোখে আঁধার দেখতে থাকে। তারা তোক নিযুক্ত করে যে, তারা যেন আউস ও খাযরাজের সভাস্থলে গমন করে এবং তাদেরকে তাদের পুরাতন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও শক্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের নিহত ব্যক্তিদের কথা যেন নতুনভাবে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয় এবং এভাবে যেন তাদেরকে উত্তেজিত করে তুলে। এ ঔষধ একদা তাদের উপর পড়েও যায় এবং উভয় গোত্রের মধ্যে পুরাতন অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। এমনকি তাদের মধ্যে তরবারী চালনারও উপক্রম হয়ে যায়। সেই অজ্ঞতার যুগের গণ্ডগোল ও চীৎকার শুরু হয়ে যায় এবং একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে পড়ে। স্থির হয় যে, তারা হুররার প্রান্তরে গিয়ে প্রাণ খুলে যুদ্ধ করবে এবং পিপাসার্ত ভূমিকে রক্ত পানে পরিতৃপ্ত করবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং উভয় দলকে শান্ত করে দেন। অতঃপর তিনি তাদের উভয় দলকে বলেনঃ পুনরায় তোমরা অজ্ঞতা যুগের ঝগড়া শুরু করে দিলে? আমার বিদ্যমানবস্থায় তোমরা পরস্পরের মধ্যে তরবারী চালনা আরম্ভ করলে?” তারপরে তিনি তাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। এতে সবাই লজ্জিত হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পূর্বের কার্যের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে। আবার তারা পরস্পরে কোলাকুলি করে এবং হাতে হাত মিলিয়ে নেয়। পুনরায় তারা ভাই ভাই হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-কে যখন মুনাফিকরা অপবাদ দিয়েছিল এবং তাকে দোষমুক্ত করে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন, তখন মুসলমানেরা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে পড়েছিল, সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল।

আলে ইমরান 3:103

১০২-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলাকে পূর্ণরূপে ভয় করার অর্থ এই যে, তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে হবে, অবাধ্য হওয়া যাবে না, তাকে সদা স্মরণ করতে হবে, কোন সময়েই তাকে ভুলে যাওয়া চলবে না। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, কৃতঘ্ন হতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এ তাফসীর মারুফু' রূপেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। অর্থাৎ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তি। হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘোষণা এই যে, মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার দাবী পূরণ করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে স্বীয় জিহ্বাকে সংযত করে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (৬৪:১৬)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে। এ দ্বিতীয় আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ সাধ্যানুসারে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে যায়নি। বরং ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তার কার্যে যেন কোন ভৎসনাকারীর ভৎর্সনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, এমনকি নিজের উপরেও যেন ন্যায়ের নির্দেশ জারী করে। নিজের পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের ব্যাপারেও যেন ইনসাফ কায়েম করে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ কর। অর্থাৎ সারা জীবন ইসলামের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক, যাতে মৃত্যুও তার উপরেই হয়। ঐ মহান প্রভুর অভ্যাস এই যে, মানুষ স্বীয় জীবন যেভাবে চালিত করে ঐভাবেই তার মৃত্যু দিয়ে থাকেন। যার উপরে তার মৃত্যু সংঘটিত হবে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তাকে উথিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা এরবিপরীত হতে আমাদেরকে আশ্রয় দান করুন, আমীন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, মানুষ বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছিলেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তথায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাতে একখানা কাষ্ঠখণ্ড ছিল। তিনি বর্ণনা করছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ ‘যদি যাকুমের এক বিন্দুমাত্র দুনিয়ায় নিক্ষেপ করা হয় তবে দুনিয়াবাসীদের আহার্য নষ্ট হয়ে যাবে। তারা কোন জিনিস খেতে ও পান করতে পারবে না। তাহলে কল্পনা কর যে, ঐ জাহান্নামীদের অবস্থা কি হতে পারে যাদের আহার্য হবে এ যাকুম। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জাহান্নাম হতে পৃথক থাকতে ও জান্নাতে যেতে চায় তার উচিত যে, যেন সে আমরণ আল্লাহ তাআলার উপর এবং পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে ও লোকদের সাথে ঐ ব্যবহার করে যে ব্যবহার সে নিজের জন্য তাদের নিকট কামনা করে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত জাবের (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে তার মুখে শুনেছিঃ “দেখ, মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করবে। (সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার ধারণার পার্শ্বেই রয়েছি। যদি আমার প্রতি তার ভাল ধারণা হয় তবে আমি তার মঙ্গল সাধন করবো। আর যদি আমার প্রতি তার মন্দ ধারণা হয় তবে তার নিকট ঐভাবেই হাযির হবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটির পূর্ব অংশ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-বাযারে রয়েছে যে, এক রুগ্ন আনসারীকে দেখার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নিকট গমন করেন। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অবস্থা কিরূপ? তিনি বলেনঃ “আলহামদুলিল্লাহ, ভালই আছি। প্রভুর করুণার আশা করছি এবং তার শাস্তির ভয় করছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “জেনে রেখো, এরূপ অবস্থায় যার অন্তরে ভয় ও আশা উভয়ই থাকে তাকে আল্লাহ তার আশার জিনিস প্রদান করেন এবং ভয়ের জিনিস হতে রক্ষা করেন। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হাকীম ইবনে খারাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করতঃ বলেনঃ “আমি দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পতিত হয়ে যাবো। ইমাম নাসাঈ (রঃ) সুনানে নাসাঈর মধ্যে একথার ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে একটি অধ্যায় করেছেনঃ ‘সিজদায় কিভাবে যাওয়া উচিত তারই অধ্যায়। তথায় বলা হয়েছে যে, সিজদায় ঐভাবে যাওয়া উচিত। আবার নিম্নের ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়ছে- ‘আমি মুসলমান না হয়ে মরবো না। এ ছাড়া নিম্নের আর একটি ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে- আমি জিহাদে শত্রুর দিকে পিঠ করে মৃত্যুবরণ করবো না।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে থাক, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ো না। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা পবিত্র কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন কারীম আল্লাহ তা'আলার একটি দৃঢ় রঞ্জু এবং তাঁর সরল পথ। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে- ‘আল্লাহর কিতাব তাঁর আকাশ হতে পৃথিবীর দিকে লটকানো রজু বিশেষ।' আরও একটি মারফু’ হাদীসে রয়েছে- ‘এ কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা'আলার শক্ত রঞ্জু, এটা প্রকাশ্য দীপ্তি। এটা সরাসরি আরোগ্য দানকারী এবং উপকারী। এর উপর আমলকারীর জন্যে এটা রক্ষাকবচ, এর অনুসারীদের জন্যে এটা মুক্তির উপায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ঐ সব পথে তো শয়তানেরা চলে, তোমরা আল্লাহ তা'আলার পথে এসে যাও। তোমরা আল্লাহ পাকের রঞ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর। ঐ রঞ্জু হচ্ছে পবিত্র কুরআন। তোমরা মতভেদ সৃষ্টি করো না এবং পৃথক পৃথক হয়ে যেয়ো না। সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন এবং তিনটি কাজে অসন্তুষ্ট হন। যে তিনটি কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন তার একটি এই যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করবে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা মুসলমান বাদশাহদের সহায়তা করবে। আর যে তিনটি কাজ তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ তার একটি হচ্ছে বাজে ও অনর্থক কথা বলা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে অত্যধিক প্রশ্ন করা এবং তৃতীয়টি হচ্ছে সম্পদ ধ্বংস করা।' বহু হাদীস এমন রয়েছে যেগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, একতার সময় মানুষ ভুল ও অন্যায় হতে রক্ষা পায়। আবার বহু হাদীসে মতানৈক্য হতে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে কিন্তু এতদসত্ত্বেও উম্মতের মধ্যে মতভেদ ও অনৈক্যের সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে ৭৩টি দল হয়ে গেছে, যাদের মধ্যে একটি দল মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে এবং জাহান্নামের আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। এরা ঐসব যারা এমন জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যার উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অজ্ঞতার যুগে। আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বড়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কঠিন শত্রুতা ছিল। পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকতো। অতঃপর যখন গোত্রদ্বয় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় তখন মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তারা পূর্বের সব কিছু ভুলে গিয়ে সব এক হয়ে যায়। হিংসা বিদ্বেষ বিদায় নেয় এবং তারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যায়। তারা পুণ্যের কাজে একে অপরের সহায়ক হয় এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তারা পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে যায়। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনিই সেই আল্লাহ যিনি স্বীয় সাহায্য দ্বারা এবং মুমিনদের সাহায্য দ্বারা তোমাকে শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেছেন।' (৮:৬২-৬৩) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বিতীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন- “হে মুমিনগণ! তোমরা একেবারে জাহান্নামের অগ্নির ধারে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং তোমাদের কুফরী তোমাদেরকে ওর ভিতরে প্রবেশ করিয়ে দিত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ইসলাম গ্রহণের তাওফীক প্রদান করতঃ তোমাদেরকে ঐ আগুন থেকেও বাঁচিয়ে নিয়েছেন। হুনায়েন যুদ্ধে বিজয় লাভের পর ধর্মীয় মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে গিয়ে কোন কোন লোককে কিছু বেশী প্রদান করেন তখন কোন একজন লোক কিছু কটুক্তি করে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসার দলকে একত্রিত করতঃ একটি ভাষণ দান করেন। ঐ ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ হে আনসারের দল! তোমরা কি পথভ্রষ্ট ছিলে না? অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সুপথ-প্রদর্শন করেন? তোমরা কি দলে দলে বিভক্ত ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই কারণে তোমাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেন। তোমরা দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেন? প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে এ পবিত্র দলটি আল্লাহর শপথ করে সমস্বরে বলে উঠেনঃ আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) -এর অনুগ্রহ এর চেয়েও বেশী রয়েছে। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজের মধ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে শত্রুতা ছিল, অথচ তারাও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেছে দেখে ইয়াহুদীরা চোখে আঁধার দেখতে থাকে। তারা তোক নিযুক্ত করে যে, তারা যেন আউস ও খাযরাজের সভাস্থলে গমন করে এবং তাদেরকে তাদের পুরাতন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও শক্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের নিহত ব্যক্তিদের কথা যেন নতুনভাবে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয় এবং এভাবে যেন তাদেরকে উত্তেজিত করে তুলে। এ ঔষধ একদা তাদের উপর পড়েও যায় এবং উভয় গোত্রের মধ্যে পুরাতন অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। এমনকি তাদের মধ্যে তরবারী চালনারও উপক্রম হয়ে যায়। সেই অজ্ঞতার যুগের গণ্ডগোল ও চীৎকার শুরু হয়ে যায় এবং একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে পড়ে। স্থির হয় যে, তারা হুররার প্রান্তরে গিয়ে প্রাণ খুলে যুদ্ধ করবে এবং পিপাসার্ত ভূমিকে রক্ত পানে পরিতৃপ্ত করবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং উভয় দলকে শান্ত করে দেন। অতঃপর তিনি তাদের উভয় দলকে বলেনঃ পুনরায় তোমরা অজ্ঞতা যুগের ঝগড়া শুরু করে দিলে? আমার বিদ্যমানবস্থায় তোমরা পরস্পরের মধ্যে তরবারী চালনা আরম্ভ করলে?” তারপরে তিনি তাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। এতে সবাই লজ্জিত হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পূর্বের কার্যের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে। আবার তারা পরস্পরে কোলাকুলি করে এবং হাতে হাত মিলিয়ে নেয়। পুনরায় তারা ভাই ভাই হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-কে যখন মুনাফিকরা অপবাদ দিয়েছিল এবং তাকে দোষমুক্ত করে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন, তখন মুসলমানেরা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে পড়েছিল, সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল।

আলে ইমরান 3:104

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:105

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:106

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:107

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:108

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:109

১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।

আলে ইমরান 3:110

১১০-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মত সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “তোমরা অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম উম্মত। তোমরা মানুষের ঘাড় ধরে ধরে তাদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করছে। অন্যান্য ব্যাখ্যাদাতাগণও এ কথাই বলেন। ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তোমরাই সবচেয়ে বেশী মুসলমানদের উপকার সাধনকারী। আবু লাহাবের কন্যা হযরত দুরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার নিকট কোন্ ব্যক্তি উত্তম?' তিনি বলেনঃ মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী কুরআন কারীমের পাঠক, সবচেয়ে বেশী ধর্মভীরু, সবচেয়ে বেশী সকার্যের আদেশ দানকারী, সর্বাপেক্ষা অধিক মন্দকার্যে বাধাদানকারী এবং সর্বাপেক্ষা বেশী আত্মীয়তার বন্ধন সংযুক্তকারী। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইনি ঐ সহচরিণী যিনি মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। সঠিক কথা এই যে, এ আয়াতের মধ্যে সমস্ত উম্মত জড়িত রয়েছে। তবে অবশ্যই নিম্নের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম যুগ হচ্ছে আমার যুগ, তারপরে তার নিকটবর্তী যুগ এবং তারপরে তার পরবর্তী যুগ। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা পূর্ববর্তী উম্মতদের সংখ্যা সত্তর পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমরা তাদের অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এটি একটি প্রসিদ্ধ হাদীস। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে এ উম্মতের নবী (সঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি সমস্ত মাখলুকের নেতা, সমস্ত রাসূল অপেক্ষা অধিক সম্মানিত। তার শরীয়ত এত পূর্ণ যে, এ রকম শরীয়ত আর কোন নবীর নেই। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এসব শ্রেষ্ঠত্ব একত্রকারী উম্মত ও সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ হবে। এ শরীয়তের সামান্য আমলও অন্যান্য উম্মতের অধিক আমল অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি ঐ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি যা আমার পূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ ‘ঐ নিয়ামতগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আমাকে প্রভাব প্রদান দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমাকে পৃথিবীর চাবি প্রদান করা হয়েছে। (৩) আমার নাম আহমাদ (সঃ) রাখা হয়েছে। (৪) আমার জন্যে মাটিকে পবিত্র করা হয়েছে। (৫) আমার উম্মতকে সমস্ত উম্মত অপেক্ষা বেশী শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদ এ হাদীসটির ইসনাদ উত্তম। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি আবুল কাসিম (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে বলেছিলেন, “আমি তোমার পরে একটি উম্মত প্রতিষ্ঠিত করবো যারা শান্তির সময় প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং বিপদে পুণ্য যাঞা করবে ও ধৈর্য ধারণ করবে, অথচ তাদের সহিষ্ণুতা ও জ্ঞান থাকবে না। তিনি তখন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ সহিষ্ণুতা, দুরদর্শিতা এবং পূর্ণ জ্ঞান ছাড়া এটা কিরূপে সম্ভব?' বিশ্ব প্রভু তখন বলেনঃ “আমি তাদেরকে সহনশীলতা ও জ্ঞান দান করবো। আমি এখানে এমন কতগুলো হাদীস বর্ণনা করতে চাই যেগুলোর বর্ণনা এখানে যথোপযুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মুখমণ্ডল চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিময় হবে। তারা হবে সবাই একই অন্তর বিশিষ্ট। আমি আল্লাহ আ'আলার নিকট আবেদন করি- “হে আমার প্রভু! এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেকের সাথে আরও সত্তর হাজার।' হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেনঃ “তাহলে তো এ সংখ্যার মধ্যে গ্রাম ও পল্লীবাসীও চলে আসবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার প্রভু আমাকে শুভ সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।' হযরত উমার (রাঃ) একথা শুনে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী যা করলে ভাল হতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আমার প্রভুর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি আমাকে সুসংবাদ দেন যে, প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে হবে।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) পুনরায় বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল(সঃ)! আরও বৃদ্ধির জন্যে প্রার্থনা করলে ভাল হতো।' তিনি বলেনঃ ‘আবার প্রার্থনা জানালে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে সত্তর হাজারের অঙ্গীকার করেন। হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু চাইতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি চেয়েছি এবং আরও এত বেশী লাভ করেছি।' অতঃপর তিনি দু' হাত প্রসারিত করে বলেনঃ “এরূপ।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন যে, এভাবে যখন আল্লাহ তাআলা একত্রিত করবেন তখন কত সংখ্যক মানুষ তাতে আসবে তা একমাত্র তিনিই জানেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত সাওবান (রাঃ) হিমসে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কুরত্ ছিলেন তথাকার আমীর। তিনি হযরত সাওবান (রাঃ)-কে দেখতে যেতে পারেননি। কিলাঙ্গ গোত্রের একটি লোক তাঁকে দেখতে যান। হযরত সাওবান (রাঃ) লোকটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি লেখা পড়া জানেন কি?' লোকটি বলেনঃ হ্যা। তখন হযরত সাওবান (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘লিখুন, এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেবক সাওবানের পক্ষ হতে আমীর আবদুল্লাহ ইবনে কুতকে দেয়া হচ্ছে। হাম্দ ও দরূদের পর প্রকাশ থাকে যে, যদি হযরত ঈসা (আঃ) অথবা হযরত মূসা (আঃ)-এর কোন খাদেম এখানে অবস্থান করতেন এবং রোগাক্রান্ত হতেন তবে আপনি অবশ্যই তাকে দেখতে যেতেন।' অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ ‘এ পত্রটি নিয়ে গিয়ে আমীরের নিকট পৌছিয়ে দেবেন।' পূত্রটি হিমসের আমীরের নিকট পৌছলে তিনি চিন্তান্বিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত সাওবান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। দীর্ঘক্ষণ বসে তাকে দেখার পর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে হযরত সাওবান (রাঃ) তার চাদর টেনে ধরেন এবং বলেনঃ একটি হাদীস শুনুন! আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখ হতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তি ভোগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সাথে আরও সত্তর হাজার করে হবে'। (মুসনাদ -ই-আহমাদ) এ হাদীসটিও বিশুদ্ধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আলাপ আলোচনো করি। অতঃপর প্রত্যুষে তার খিদমতে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আজ রাত্রে নবীগণ (আঃ)-এর নিজ নিজ উম্মতসহ আমাকে দেখানো হয়েছে। কোন কোন নবীর সাথে মাত্র তিনজন ছিলেন, কারও কারও সাথে ছিল ক্ষুদ্র একটি দল, কারও কারও সঙ্গে ছিল একটি জামা'আত এবং কারও কারও সাথে আবার একজনও ছিল না। যখন হযরত মূসা (আঃ) আগমন করেন তখন তার সাথে বহু লোক ছিল। এ দলটি আমার নিকট পছন্দনীয় হয়। আমি জিজ্ঞেস করিঃ ‘এটা কে?' বলা হয়ঃ ইনি আপনার ভাই। হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা হচ্ছে বানী ইসরাঈল। আমি বলিঃ আমার উম্মত কোথায়? উত্তর হয়ঃ আপনার ডান দিকে লক্ষ্য করুন। অতঃপর আমি লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছে, মনে হচ্ছে যেন পর্বতও ঢাকা পড়ে যাবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন কি? আমি বলি- হে আমার প্রভু! আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর আমাকে বলা হয় ‘এদের সাথে আরও সত্তর হাজার করে রয়েছে যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে চলে যাবে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ যদি সম্ভব হয় তবে এ সত্তর হাজারের অন্তর্গত হয়ে যাও। তা যদি সম্ভব না হয় তবে ওদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা পর্বতসমূহ ঢেকে ফেলেছিল। আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা আকাশের প্রান্তে প্রান্তে অবস্থান করছিল। হযরত উক্কাসা ইবনে মুহসিন (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে প্রার্থনা করুন। যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ সত্তর হাজারের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি প্রার্থনা করলে অন্য একজন সাহাবীও (রাঃ) দাড়িয়ে এ আরযই করেন। তখন তিনি বলেনঃ তোমার পূর্বে উক্কাস (রাঃ) অগ্রাধিকার লাভ করেছে।' তখন আমরা পরস্পর বলাবিল করি যে, সম্ভবতঃ এ সত্তর হাজার লোকেরাই হবে যারা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করতঃ সারা জীবনে কখনও আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করেনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের এ আলোচনা জানতে পেরে বলেনঃ “এরা ঐসব লোক যারা ঝাড় ফুক করিয়ে নেয় না, আগুন দ্বারা দাগিয়ে নেয় না এবং আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা রাখে।' (মুসনাদ-ইআহমাদ) অন্য এক সনদে নিম্নের এটুকু বেশীও রয়েছে- যখন আমি আমার সম্মতি প্রকাশ করি তখন আমাকে বলা হয়- ‘এখন আপনার বাম দিকে লক্ষ্য করুন। আমি তখন লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য জনসমাবেশ রয়েছে যারা আকাশ প্রান্তকে ঘিরে ফেলেছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হজ্ব মওসুমের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের এ আধিক্য আমার খুব পছন্দ হয়। তাদের দ্বারা সমস্ত পাহাড় পর্বত ও মাঠ প্রান্তর ভরপুর ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত উক্কাস (রাঃ)-এর পরে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন আনসারী। (হাদীস তাবরানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে ৭০ হাজার বা সাত লক্ষ লোক জান্নাতে চলে যাবে। যারা একে অপরের হাত ধরে থাকবে। তারা সবাই এক সাথে জান্নাতে যাবে। চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও তাবরানী) হযরত হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান (রঃ) বলেন, আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “রাত্রে যে তারকাটি ভেঙ্গে পড়েছিল তা তোমরা কেউ দেখেছিলে কি?' আমি বলিঃ হ্যাঁ, জনাব! আমি দেখেছি। আমি তখন নামাযে ছিলাম না। বরং আমাকে বিন্দুতে কেটে ছিল। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি তখন কি করেছিলে?' আমি বলিঃ ফুঁক দিয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ কেন? আমি বলিঃ হযরত শা’বী (রঃ) হযরত বুরাইদাহ্ ইবনে হাসীব (রঃ)-এর বর্ণনা হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, ন্যরবন্দী ও বিষাক্ত জন্তুর ব্যাপারে ঝাড়-ফুঁক করিয়ে নিতে হবে।' তিনি বলেনঃ আচ্ছা বেশ! যার নিকট যা পৌছবে তার উপরেই সে আমল করবে। আমাকে তো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) শুনিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উপরে উম্মতদেরকে পেশ করা হয়েছিল। কোন নবীর সাথে ছিল একটি দল। কারও সাথে ছিল একটি, কারও সাথে ছিল দু’টি এবং কারও কারও সাথে একটিও ছিল না। অতঃপর একটি বড় দল আমার দষ্টিগোচর হয়। আমি তখন মনে করি যে, এদলটি আমারই উম্মত। পরে আমি জানতে পারি যে, ওটা হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মত। আমাকে বলা হয়-“আকাশ প্রান্তের দিকে দৃষ্টিপাত কর। আমি তখন দেখি যে, তথায় অসংখ্য লোক রয়েছে। আমাকে বলা হয়-“এগুলো আপনারই উম্মত এবং ওদের সাথে আরও ৭০ হাজার রয়েছে যারা বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিভোগে জান্নাতে চলে যাবে। এ হাদীসটি বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ). তো বাড়ী চলে যান, অপর সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, সম্ভবতঃ এরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীই হবেন। কোন একজন বলেন যে, না, এঁরা ইসলামের উপরে জন্মগ্রণকারী এবং ইসলামের উপরেই মৃত্যুবরণকারী, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর নবী (সঃ) আগমন করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কি সম্বন্ধে আলোচনা করছো? আমরা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ না, বরং এরা ঐসব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না ও করিয়ে নেয় না, দাগিয়ে নেয় না এবং ভাবী শুভাশুভের লক্ষণের উপর বিশ্বাস করে না, বরং স্বীয় প্রভুর উপর ভরসা করে। হযরত উক্কাস (রাঃ) দুআর প্রার্থনা জানালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অতঃপর অন্য এক ব্যক্তিও এ কথাই বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘উক্কাসা অগ্রগামী হয়েছে।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তথায় ঝাড় ফুঁক করিয়ে নেয় না এ কথাটি নেই। মুসলিমের মধ্যে এ কথাটিও রয়েছে। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, প্রথম দলটি তো মুক্তি পেয়ে যাবে, তাদের মুখমণ্ডল পুর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হবে, তাদের নিকট হিসাবও গ্রহণ করা হবে না। অতঃপর তাদের পরবর্তীগণ সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল তারকার ন্যায় দীপ্তিময় মুখমণ্ডল বিশিষ্ট হবে। (সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার সঙ্গে আমার প্রভুর অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার হবে এবং আমার মহাসম্মানিত প্রভুর ললাপের (অঞ্জলি) তিন লোপ’। (হাফিজ আবু বকর ইবনে আসেমের কিতাবুস সুনান) এর ইসনাদ খুবই উত্তম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তার উম্মতের ৭০ হাজারের সংখ্যা শুনে হযরত ইয়াযিদ ইবনে আগনাস। (রাঃ) তাকে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উম্মতের সংখ্যার তুলনায় তো এ সংখ্যা খুবই কম। তখন তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও এক হাজার করে রয়েছে এবং এর পরে আল্লাহ তা'আলা তিন লোপ (করপুট) ভরে আরও দান করেন। এর ইসনাদও উত্তম। (কিতাবুস সুনান) অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার মহা মহিমান্বিত প্রভু আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার -- বিনা হিসেবে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর এক এক হাজারের সুপারিশক্রমে আরও ৭০ হাজার করে মানুষ জান্নাতে চলে যবে। তারপর আমার প্রভু স্বীয় দু' হাতের তিন লোপ ভরে আরও নিক্ষেপ করবেন। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খুশী হয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করেন এবং বলেনঃ তাদের সুপারিশ হবে স্বীয় বাপ-দাদা, পুত্র-কন্যা এবং বংশ ও গোত্রের পক্ষে। আল্লাহ করেন আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হই যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় লোপ ভরে শেষে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।' (তাবরানী হাদীস) এ সনদের মধ্যেও কোন ক্রটি নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাদীদ নামক স্থানে একটি হাদীস বর্ণনা করেন, যার মধ্যে তিনি এও বর্ণনা করেনঃ ‘এ ৭০ হাজার যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আমার ধারণায় তারা আসতে আসতে তো তোমরা তোমাদের জন্যে, তোমাদের ছেলে মেয়েদের জন্যে এবং তোমাদের স্ত্রীদের জন্যে জান্নাতে স্থান নির্ধারিত করেই ফেলবে।' (মুসনাদ-ই আহমাদ) এর সনদও মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর রয়েছে। অন্য আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে চার লক্ষ লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! এটাই যথেষ্ট মনে করুন।' তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, কেন জনাব? আমরা যদি সবাই জান্নাতে চলে যাই তবে আপনার ক্ষতি কি?' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ যদি আল্লাহ পাক চান তবে একই হাতে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জান্নাতে নিক্ষেপ করবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “উমার (রাঃ) ঠিকই বলেছে।' (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) এ হাদীসটি অন্য সনদেও বর্ণনা করা হয়েছে, ওতে সংখ্যা রয়েছে এক লাখ। (ইসবাহানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন সাহাবীগণ ৭০ হাজার ও প্রত্যেকের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার এবং আল্লাহ তা'আলার লোপ ভরে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার বর্ণনা শুনেন তখন তারা বলতে থাকেন তাহলে এতদসত্তেও যে জাহান্নামে যাবে তার মত হতভাগা আর কে আছে?' (আবু ইয়ালা) উপরের হাদীসটি অন্য একটি সনদেও বর্ণিত আছে, তাতে সংখ্যা রয়েছে তিন লাখ। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁর উক্তির সত্যতা স্বীকারের বর্ণনা রয়েছে। (তাবারানী হাদীস গ্রন্থ) অন্য একটি বর্ণনায় জান্নাতে প্রবেশকারীদের বর্ণনা করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “আমার উম্মতের সমস্ত মুহাজির তো এ সংখ্যার মধ্যে এসে যাবে এবং অবশিষ্টগুলো হবে পল্লীবাসীদের দ্বারা পূর্ণ'। (মুহাম্মদ ইবনে সাহল) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হিসেব করা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটি নব্বই হাজার। তাবরানীর হাদীসের মধ্যে আরও একটি হাসান হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! তোমরা এক অন্ধকার রাত্রির মত অসংখ্য লোক একই সাথে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে, জমীন তোমাদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে যাবে। সমস্ত ফেরেশতা সশব্দে বলে উঠবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সঙ্গে যে দল এসেছে তা সমস্ত নবীর দলসমূহ অপেক্ষা অনেক বেশী। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- শুধুমাত্র আমার অনুসারী উম্মত জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ হবে। সাহাবীগণ খুশী হয়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। পুনরায় তিনি বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হয়ে যাবে। আমরা। পুনরায় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করি। আবার তিনি বলেন, 'আমি আশা করছি যে, তোমরা অর্ধেক হয়ে যাবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বলেন, ‘তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ হবে এতে সন্তুষ্ট নও?' তারা সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তোমরা জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ হবে এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?' তারা পুনরায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তিনি তখন বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীদের অর্ধেক হয়ে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) তাবরানীর হাদীসের মধ্যে এ বর্ণনাটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা কি চাও যে, জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ তোমরা হবে এবং বাকী তিন চতুর্থাংশ অন্যান্য সমস্ত উম্মত হবে। সাহাবীগণ বলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বলেন, 'আচ্ছা, যদি তোমরা এক তৃতীয়াংশ হও তবে? তারা বলেন, এটা খুব বেশী। তিনি বলেন, “আচ্ছা যদি তোমরা অর্ধেক হও তবে?' তারা বলেন “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তা হলে তো এটা আরও অনেক বেশী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, “জেনে রেখো, সমস্ত জান্নাতবাসীর মোট একশ বিশটি সারি হবে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র আমার এ উম্মতেরই হবে আশিটি সারি।' মুসনাদ-ই-আহমাদেও রয়েছে যে, জান্নাত বাসীদের একশ বিশটি সারি হবে, তন্মধ্যে আশিটি সারি এ উম্মতেরই হবে। এ হাদীসটি তাবরানী, জামেউত তিরমিযী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে। তাবরানীর অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন (আরবী) অর্থাৎ, একটি বিরাট দল হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং একটি বিরাট দল হবে পরবর্তীদের মধ্যে হতে। (৫৬:৩৯-৪০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘তোমরা জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ, আবার বলেন, এক তৃতীয়াংশ, তার পরে বলেন, বরং অর্ধেক, সর্বশেষে বলেন, দুই তৃতীয়াংশ। সহীহ বুখারী শরীফে ও সহীহ মুসলিম শরীফ রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা পৃথিবীতে সর্বশেষে এসেছি এবং জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবো। তাদেরকে আল্লাহর কিতাব পূর্বে দেয়া হয়েছে, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে পরে। যে বিষয়ে তারা মতভেদ করেছে সে বিষয়ে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পন্থা অবলম্বনের তাওফীক প্রদান করেছেন। জুম'আর দিনও এরূপই যে, ইয়াহুদীরা আমাদের পিছনে রয়েছে, অর্থাৎ শনিবার এবং খ্রীষ্টানেরা তাদেরও পিছনে রয়েছে অর্থাৎ রবিবার। দারেকুতনীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘আমি যে পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ না করবো সে পর্যন্ত অন্যান্য নবীদের জন্যে জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। আর যে পর্যন্ত আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ না করবে সে পর্যন্ত অন্যান্য উম্মতের জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এগুলোই ছিল ঐ সব হাদীস যেগুলোকে আমরা এখানে বর্ণনা করতে চেয়েছিলাম। উম্মতের উচিত যে, এখানে এ আয়াতের মধ্যে যতগুলো বিশেষণ রয়েছে সেগুলোর উপর যেন দৃঢ়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ দান, মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনয়ন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় হজ্বে এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ যদি তোমরা এ আয়াতের প্রশংসার মধ্যে আসতে চাও তবে এ সমুদয় গুণও নিজেদের ভেতর সৃষ্টি কর।' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, “গ্রন্থ প্রাপ্তগণ ঐ সব কাজ পরিত্যাগ করেছিল বলেই আল্লাহ পাক স্বীয় কালামে তাদেরকে নিন্দে করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা মানুষকে অন্যায় কর্ম হতে বিরত রাখতো না।" (৫:৭৯) যেহেতু উপরোক্ত আয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই পরে গ্রন্থধারীদের নিন্দে করা হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এ লোকগুলোও যদি আমার শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতো তবে তারাও এ মর্যাদা লাভ করতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ অবিশ্বাস, দুষ্কার্য ও অবাধ্যতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তবে তাদের মধ্যে কতক লোক ঈমানদারও রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে শুভ সংবাদ দিচ্ছেন- “তোমরা হতবুদ্ধি ও চিন্তিত হয়ে পড়ো না, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধবাদীদের উপর জয়যুক্ত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা খায়বারের যুদ্ধে তাদেরকে পর্যুদস্ত করেন এবং এর পূর্বে বানূ কাইনুকা, বানূ নাযীর এবং বান্ কুরাইযাকেও লাঞ্ছিত ও পরাভূত করেছিলেন। অনুরূপভাবে সিরিয়ার খ্ৰীষ্টানগণ সাহাবীদের আমলে পরাজিত হয়েছিল এবং সিরিয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায় ও চিরদিনের জন্যে মুসলমানদের অধিকারে এসে পড়ে। তথায়। এক সত্যপন্থী দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। হযরত ঈসা (আঃ) এসে ইসলাম ধর্ম এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর শরীয়ত অনুযায়ী নির্দেশ দান করবেন এবং ক্রুশ ছিন্ন করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং শুধুমাত্র ইসলামই গ্রহণ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তাদের প্রতি লাঞ্ছনা ও হীনতা নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কোন জায়গাতেই তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নেই, তবে শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় দানের দ্বারা নিরাপত্তা পেতে পারে। অর্থাৎ যদি তারা জিযিয়া প্রদান করে ও মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করে তবে এক নিরাপত্তা পেতে পারে। কিংবা মুসলমানদের আশ্রয়দানের দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে, অর্থাৎ যদি মুসলমানদের সাথে চুক্তি হয়ে যায় বা কোন মুসলমান যদি তাদেরকে আশ্রয় দান করে তবেও তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। যদি সে নিরাপত্তা কোন স্ত্রী লোক বা কোন ক্রীতদাসও দান করে তবুও তারা নিরাপত্তা লাভ করবে। আলেমদের একটি উক্তি এও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে অঙ্গীকার। তারা আল্লাহ তা'আলার ক্রোধে পতিত হয়েছে এবং দারিদ্রে আক্রান্ত হয়েছে। এটাও তাদের কুফর, নবীদেরকে হত্যা, অহংকার, হিংসা এবং অবাধ্যতারই প্রতিফল। এ কারণেই তাদের উপর চিরদিনের জন্যে লাঞ্ছনা, হীনতা এবং দৈন্য নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে তাদের অবাধ্যতা এবং সত্যের সীমা অতিক্রমেরই প্রতিদান। আবু দাউদ এবং তায়ালেসীর মধ্যে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এক এক দিনে তিনশ জন করে নবী হত্যা করতো এবং দিনের শেষভাগে বাজারে নিজ নিজ কাজে লেগে যেতো।

আলে ইমরান 3:111

১১০-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মত সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “তোমরা অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম উম্মত। তোমরা মানুষের ঘাড় ধরে ধরে তাদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করছে। অন্যান্য ব্যাখ্যাদাতাগণও এ কথাই বলেন। ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তোমরাই সবচেয়ে বেশী মুসলমানদের উপকার সাধনকারী। আবু লাহাবের কন্যা হযরত দুরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার নিকট কোন্ ব্যক্তি উত্তম?' তিনি বলেনঃ মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী কুরআন কারীমের পাঠক, সবচেয়ে বেশী ধর্মভীরু, সবচেয়ে বেশী সকার্যের আদেশ দানকারী, সর্বাপেক্ষা অধিক মন্দকার্যে বাধাদানকারী এবং সর্বাপেক্ষা বেশী আত্মীয়তার বন্ধন সংযুক্তকারী। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইনি ঐ সহচরিণী যিনি মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। সঠিক কথা এই যে, এ আয়াতের মধ্যে সমস্ত উম্মত জড়িত রয়েছে। তবে অবশ্যই নিম্নের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম যুগ হচ্ছে আমার যুগ, তারপরে তার নিকটবর্তী যুগ এবং তারপরে তার পরবর্তী যুগ। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা পূর্ববর্তী উম্মতদের সংখ্যা সত্তর পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমরা তাদের অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এটি একটি প্রসিদ্ধ হাদীস। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে এ উম্মতের নবী (সঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি সমস্ত মাখলুকের নেতা, সমস্ত রাসূল অপেক্ষা অধিক সম্মানিত। তার শরীয়ত এত পূর্ণ যে, এ রকম শরীয়ত আর কোন নবীর নেই। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এসব শ্রেষ্ঠত্ব একত্রকারী উম্মত ও সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ হবে। এ শরীয়তের সামান্য আমলও অন্যান্য উম্মতের অধিক আমল অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি ঐ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি যা আমার পূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ ‘ঐ নিয়ামতগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আমাকে প্রভাব প্রদান দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমাকে পৃথিবীর চাবি প্রদান করা হয়েছে। (৩) আমার নাম আহমাদ (সঃ) রাখা হয়েছে। (৪) আমার জন্যে মাটিকে পবিত্র করা হয়েছে। (৫) আমার উম্মতকে সমস্ত উম্মত অপেক্ষা বেশী শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদ এ হাদীসটির ইসনাদ উত্তম। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি আবুল কাসিম (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে বলেছিলেন, “আমি তোমার পরে একটি উম্মত প্রতিষ্ঠিত করবো যারা শান্তির সময় প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং বিপদে পুণ্য যাঞা করবে ও ধৈর্য ধারণ করবে, অথচ তাদের সহিষ্ণুতা ও জ্ঞান থাকবে না। তিনি তখন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ সহিষ্ণুতা, দুরদর্শিতা এবং পূর্ণ জ্ঞান ছাড়া এটা কিরূপে সম্ভব?' বিশ্ব প্রভু তখন বলেনঃ “আমি তাদেরকে সহনশীলতা ও জ্ঞান দান করবো। আমি এখানে এমন কতগুলো হাদীস বর্ণনা করতে চাই যেগুলোর বর্ণনা এখানে যথোপযুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মুখমণ্ডল চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিময় হবে। তারা হবে সবাই একই অন্তর বিশিষ্ট। আমি আল্লাহ আ'আলার নিকট আবেদন করি- “হে আমার প্রভু! এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেকের সাথে আরও সত্তর হাজার।' হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেনঃ “তাহলে তো এ সংখ্যার মধ্যে গ্রাম ও পল্লীবাসীও চলে আসবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার প্রভু আমাকে শুভ সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।' হযরত উমার (রাঃ) একথা শুনে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী যা করলে ভাল হতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আমার প্রভুর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি আমাকে সুসংবাদ দেন যে, প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে হবে।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) পুনরায় বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল(সঃ)! আরও বৃদ্ধির জন্যে প্রার্থনা করলে ভাল হতো।' তিনি বলেনঃ ‘আবার প্রার্থনা জানালে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে সত্তর হাজারের অঙ্গীকার করেন। হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু চাইতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি চেয়েছি এবং আরও এত বেশী লাভ করেছি।' অতঃপর তিনি দু' হাত প্রসারিত করে বলেনঃ “এরূপ।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন যে, এভাবে যখন আল্লাহ তাআলা একত্রিত করবেন তখন কত সংখ্যক মানুষ তাতে আসবে তা একমাত্র তিনিই জানেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত সাওবান (রাঃ) হিমসে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কুরত্ ছিলেন তথাকার আমীর। তিনি হযরত সাওবান (রাঃ)-কে দেখতে যেতে পারেননি। কিলাঙ্গ গোত্রের একটি লোক তাঁকে দেখতে যান। হযরত সাওবান (রাঃ) লোকটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি লেখা পড়া জানেন কি?' লোকটি বলেনঃ হ্যা। তখন হযরত সাওবান (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘লিখুন, এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেবক সাওবানের পক্ষ হতে আমীর আবদুল্লাহ ইবনে কুতকে দেয়া হচ্ছে। হাম্দ ও দরূদের পর প্রকাশ থাকে যে, যদি হযরত ঈসা (আঃ) অথবা হযরত মূসা (আঃ)-এর কোন খাদেম এখানে অবস্থান করতেন এবং রোগাক্রান্ত হতেন তবে আপনি অবশ্যই তাকে দেখতে যেতেন।' অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ ‘এ পত্রটি নিয়ে গিয়ে আমীরের নিকট পৌছিয়ে দেবেন।' পূত্রটি হিমসের আমীরের নিকট পৌছলে তিনি চিন্তান্বিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত সাওবান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। দীর্ঘক্ষণ বসে তাকে দেখার পর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে হযরত সাওবান (রাঃ) তার চাদর টেনে ধরেন এবং বলেনঃ একটি হাদীস শুনুন! আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখ হতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তি ভোগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সাথে আরও সত্তর হাজার করে হবে'। (মুসনাদ -ই-আহমাদ) এ হাদীসটিও বিশুদ্ধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আলাপ আলোচনো করি। অতঃপর প্রত্যুষে তার খিদমতে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আজ রাত্রে নবীগণ (আঃ)-এর নিজ নিজ উম্মতসহ আমাকে দেখানো হয়েছে। কোন কোন নবীর সাথে মাত্র তিনজন ছিলেন, কারও কারও সাথে ছিল ক্ষুদ্র একটি দল, কারও কারও সঙ্গে ছিল একটি জামা'আত এবং কারও কারও সাথে আবার একজনও ছিল না। যখন হযরত মূসা (আঃ) আগমন করেন তখন তার সাথে বহু লোক ছিল। এ দলটি আমার নিকট পছন্দনীয় হয়। আমি জিজ্ঞেস করিঃ ‘এটা কে?' বলা হয়ঃ ইনি আপনার ভাই। হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা হচ্ছে বানী ইসরাঈল। আমি বলিঃ আমার উম্মত কোথায়? উত্তর হয়ঃ আপনার ডান দিকে লক্ষ্য করুন। অতঃপর আমি লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছে, মনে হচ্ছে যেন পর্বতও ঢাকা পড়ে যাবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন কি? আমি বলি- হে আমার প্রভু! আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর আমাকে বলা হয় ‘এদের সাথে আরও সত্তর হাজার করে রয়েছে যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে চলে যাবে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ যদি সম্ভব হয় তবে এ সত্তর হাজারের অন্তর্গত হয়ে যাও। তা যদি সম্ভব না হয় তবে ওদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা পর্বতসমূহ ঢেকে ফেলেছিল। আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা আকাশের প্রান্তে প্রান্তে অবস্থান করছিল। হযরত উক্কাসা ইবনে মুহসিন (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে প্রার্থনা করুন। যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ সত্তর হাজারের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি প্রার্থনা করলে অন্য একজন সাহাবীও (রাঃ) দাড়িয়ে এ আরযই করেন। তখন তিনি বলেনঃ তোমার পূর্বে উক্কাস (রাঃ) অগ্রাধিকার লাভ করেছে।' তখন আমরা পরস্পর বলাবিল করি যে, সম্ভবতঃ এ সত্তর হাজার লোকেরাই হবে যারা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করতঃ সারা জীবনে কখনও আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করেনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের এ আলোচনা জানতে পেরে বলেনঃ “এরা ঐসব লোক যারা ঝাড় ফুক করিয়ে নেয় না, আগুন দ্বারা দাগিয়ে নেয় না এবং আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা রাখে।' (মুসনাদ-ইআহমাদ) অন্য এক সনদে নিম্নের এটুকু বেশীও রয়েছে- যখন আমি আমার সম্মতি প্রকাশ করি তখন আমাকে বলা হয়- ‘এখন আপনার বাম দিকে লক্ষ্য করুন। আমি তখন লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য জনসমাবেশ রয়েছে যারা আকাশ প্রান্তকে ঘিরে ফেলেছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হজ্ব মওসুমের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের এ আধিক্য আমার খুব পছন্দ হয়। তাদের দ্বারা সমস্ত পাহাড় পর্বত ও মাঠ প্রান্তর ভরপুর ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত উক্কাস (রাঃ)-এর পরে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন আনসারী। (হাদীস তাবরানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে ৭০ হাজার বা সাত লক্ষ লোক জান্নাতে চলে যাবে। যারা একে অপরের হাত ধরে থাকবে। তারা সবাই এক সাথে জান্নাতে যাবে। চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও তাবরানী) হযরত হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান (রঃ) বলেন, আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “রাত্রে যে তারকাটি ভেঙ্গে পড়েছিল তা তোমরা কেউ দেখেছিলে কি?' আমি বলিঃ হ্যাঁ, জনাব! আমি দেখেছি। আমি তখন নামাযে ছিলাম না। বরং আমাকে বিন্দুতে কেটে ছিল। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি তখন কি করেছিলে?' আমি বলিঃ ফুঁক দিয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ কেন? আমি বলিঃ হযরত শা’বী (রঃ) হযরত বুরাইদাহ্ ইবনে হাসীব (রঃ)-এর বর্ণনা হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, ন্যরবন্দী ও বিষাক্ত জন্তুর ব্যাপারে ঝাড়-ফুঁক করিয়ে নিতে হবে।' তিনি বলেনঃ আচ্ছা বেশ! যার নিকট যা পৌছবে তার উপরেই সে আমল করবে। আমাকে তো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) শুনিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উপরে উম্মতদেরকে পেশ করা হয়েছিল। কোন নবীর সাথে ছিল একটি দল। কারও সাথে ছিল একটি, কারও সাথে ছিল দু’টি এবং কারও কারও সাথে একটিও ছিল না। অতঃপর একটি বড় দল আমার দষ্টিগোচর হয়। আমি তখন মনে করি যে, এদলটি আমারই উম্মত। পরে আমি জানতে পারি যে, ওটা হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মত। আমাকে বলা হয়-“আকাশ প্রান্তের দিকে দৃষ্টিপাত কর। আমি তখন দেখি যে, তথায় অসংখ্য লোক রয়েছে। আমাকে বলা হয়-“এগুলো আপনারই উম্মত এবং ওদের সাথে আরও ৭০ হাজার রয়েছে যারা বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিভোগে জান্নাতে চলে যাবে। এ হাদীসটি বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ). তো বাড়ী চলে যান, অপর সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, সম্ভবতঃ এরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীই হবেন। কোন একজন বলেন যে, না, এঁরা ইসলামের উপরে জন্মগ্রণকারী এবং ইসলামের উপরেই মৃত্যুবরণকারী, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর নবী (সঃ) আগমন করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কি সম্বন্ধে আলোচনা করছো? আমরা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ না, বরং এরা ঐসব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না ও করিয়ে নেয় না, দাগিয়ে নেয় না এবং ভাবী শুভাশুভের লক্ষণের উপর বিশ্বাস করে না, বরং স্বীয় প্রভুর উপর ভরসা করে। হযরত উক্কাস (রাঃ) দুআর প্রার্থনা জানালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অতঃপর অন্য এক ব্যক্তিও এ কথাই বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘উক্কাসা অগ্রগামী হয়েছে।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তথায় ঝাড় ফুঁক করিয়ে নেয় না এ কথাটি নেই। মুসলিমের মধ্যে এ কথাটিও রয়েছে। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, প্রথম দলটি তো মুক্তি পেয়ে যাবে, তাদের মুখমণ্ডল পুর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হবে, তাদের নিকট হিসাবও গ্রহণ করা হবে না। অতঃপর তাদের পরবর্তীগণ সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল তারকার ন্যায় দীপ্তিময় মুখমণ্ডল বিশিষ্ট হবে। (সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার সঙ্গে আমার প্রভুর অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার হবে এবং আমার মহাসম্মানিত প্রভুর ললাপের (অঞ্জলি) তিন লোপ’। (হাফিজ আবু বকর ইবনে আসেমের কিতাবুস সুনান) এর ইসনাদ খুবই উত্তম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তার উম্মতের ৭০ হাজারের সংখ্যা শুনে হযরত ইয়াযিদ ইবনে আগনাস। (রাঃ) তাকে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উম্মতের সংখ্যার তুলনায় তো এ সংখ্যা খুবই কম। তখন তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও এক হাজার করে রয়েছে এবং এর পরে আল্লাহ তা'আলা তিন লোপ (করপুট) ভরে আরও দান করেন। এর ইসনাদও উত্তম। (কিতাবুস সুনান) অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার মহা মহিমান্বিত প্রভু আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার -- বিনা হিসেবে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর এক এক হাজারের সুপারিশক্রমে আরও ৭০ হাজার করে মানুষ জান্নাতে চলে যবে। তারপর আমার প্রভু স্বীয় দু' হাতের তিন লোপ ভরে আরও নিক্ষেপ করবেন। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খুশী হয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করেন এবং বলেনঃ তাদের সুপারিশ হবে স্বীয় বাপ-দাদা, পুত্র-কন্যা এবং বংশ ও গোত্রের পক্ষে। আল্লাহ করেন আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হই যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় লোপ ভরে শেষে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।' (তাবরানী হাদীস) এ সনদের মধ্যেও কোন ক্রটি নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাদীদ নামক স্থানে একটি হাদীস বর্ণনা করেন, যার মধ্যে তিনি এও বর্ণনা করেনঃ ‘এ ৭০ হাজার যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আমার ধারণায় তারা আসতে আসতে তো তোমরা তোমাদের জন্যে, তোমাদের ছেলে মেয়েদের জন্যে এবং তোমাদের স্ত্রীদের জন্যে জান্নাতে স্থান নির্ধারিত করেই ফেলবে।' (মুসনাদ-ই আহমাদ) এর সনদও মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর রয়েছে। অন্য আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে চার লক্ষ লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! এটাই যথেষ্ট মনে করুন।' তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, কেন জনাব? আমরা যদি সবাই জান্নাতে চলে যাই তবে আপনার ক্ষতি কি?' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ যদি আল্লাহ পাক চান তবে একই হাতে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জান্নাতে নিক্ষেপ করবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “উমার (রাঃ) ঠিকই বলেছে।' (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) এ হাদীসটি অন্য সনদেও বর্ণনা করা হয়েছে, ওতে সংখ্যা রয়েছে এক লাখ। (ইসবাহানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন সাহাবীগণ ৭০ হাজার ও প্রত্যেকের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার এবং আল্লাহ তা'আলার লোপ ভরে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার বর্ণনা শুনেন তখন তারা বলতে থাকেন তাহলে এতদসত্তেও যে জাহান্নামে যাবে তার মত হতভাগা আর কে আছে?' (আবু ইয়ালা) উপরের হাদীসটি অন্য একটি সনদেও বর্ণিত আছে, তাতে সংখ্যা রয়েছে তিন লাখ। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁর উক্তির সত্যতা স্বীকারের বর্ণনা রয়েছে। (তাবারানী হাদীস গ্রন্থ) অন্য একটি বর্ণনায় জান্নাতে প্রবেশকারীদের বর্ণনা করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “আমার উম্মতের সমস্ত মুহাজির তো এ সংখ্যার মধ্যে এসে যাবে এবং অবশিষ্টগুলো হবে পল্লীবাসীদের দ্বারা পূর্ণ'। (মুহাম্মদ ইবনে সাহল) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হিসেব করা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটি নব্বই হাজার। তাবরানীর হাদীসের মধ্যে আরও একটি হাসান হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! তোমরা এক অন্ধকার রাত্রির মত অসংখ্য লোক একই সাথে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে, জমীন তোমাদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে যাবে। সমস্ত ফেরেশতা সশব্দে বলে উঠবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সঙ্গে যে দল এসেছে তা সমস্ত নবীর দলসমূহ অপেক্ষা অনেক বেশী। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- শুধুমাত্র আমার অনুসারী উম্মত জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ হবে। সাহাবীগণ খুশী হয়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। পুনরায় তিনি বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হয়ে যাবে। আমরা। পুনরায় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করি। আবার তিনি বলেন, 'আমি আশা করছি যে, তোমরা অর্ধেক হয়ে যাবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বলেন, ‘তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ হবে এতে সন্তুষ্ট নও?' তারা সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তোমরা জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ হবে এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?' তারা পুনরায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তিনি তখন বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীদের অর্ধেক হয়ে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) তাবরানীর হাদীসের মধ্যে এ বর্ণনাটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা কি চাও যে, জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ তোমরা হবে এবং বাকী তিন চতুর্থাংশ অন্যান্য সমস্ত উম্মত হবে। সাহাবীগণ বলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বলেন, 'আচ্ছা, যদি তোমরা এক তৃতীয়াংশ হও তবে? তারা বলেন, এটা খুব বেশী। তিনি বলেন, “আচ্ছা যদি তোমরা অর্ধেক হও তবে?' তারা বলেন “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তা হলে তো এটা আরও অনেক বেশী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, “জেনে রেখো, সমস্ত জান্নাতবাসীর মোট একশ বিশটি সারি হবে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র আমার এ উম্মতেরই হবে আশিটি সারি।' মুসনাদ-ই-আহমাদেও রয়েছে যে, জান্নাত বাসীদের একশ বিশটি সারি হবে, তন্মধ্যে আশিটি সারি এ উম্মতেরই হবে। এ হাদীসটি তাবরানী, জামেউত তিরমিযী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে। তাবরানীর অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন (আরবী) অর্থাৎ, একটি বিরাট দল হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং একটি বিরাট দল হবে পরবর্তীদের মধ্যে হতে। (৫৬:৩৯-৪০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘তোমরা জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ, আবার বলেন, এক তৃতীয়াংশ, তার পরে বলেন, বরং অর্ধেক, সর্বশেষে বলেন, দুই তৃতীয়াংশ। সহীহ বুখারী শরীফে ও সহীহ মুসলিম শরীফ রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা পৃথিবীতে সর্বশেষে এসেছি এবং জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবো। তাদেরকে আল্লাহর কিতাব পূর্বে দেয়া হয়েছে, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে পরে। যে বিষয়ে তারা মতভেদ করেছে সে বিষয়ে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পন্থা অবলম্বনের তাওফীক প্রদান করেছেন। জুম'আর দিনও এরূপই যে, ইয়াহুদীরা আমাদের পিছনে রয়েছে, অর্থাৎ শনিবার এবং খ্রীষ্টানেরা তাদেরও পিছনে রয়েছে অর্থাৎ রবিবার। দারেকুতনীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘আমি যে পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ না করবো সে পর্যন্ত অন্যান্য নবীদের জন্যে জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। আর যে পর্যন্ত আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ না করবে সে পর্যন্ত অন্যান্য উম্মতের জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এগুলোই ছিল ঐ সব হাদীস যেগুলোকে আমরা এখানে বর্ণনা করতে চেয়েছিলাম। উম্মতের উচিত যে, এখানে এ আয়াতের মধ্যে যতগুলো বিশেষণ রয়েছে সেগুলোর উপর যেন দৃঢ়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ দান, মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনয়ন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় হজ্বে এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ যদি তোমরা এ আয়াতের প্রশংসার মধ্যে আসতে চাও তবে এ সমুদয় গুণও নিজেদের ভেতর সৃষ্টি কর।' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, “গ্রন্থ প্রাপ্তগণ ঐ সব কাজ পরিত্যাগ করেছিল বলেই আল্লাহ পাক স্বীয় কালামে তাদেরকে নিন্দে করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা মানুষকে অন্যায় কর্ম হতে বিরত রাখতো না।" (৫:৭৯) যেহেতু উপরোক্ত আয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই পরে গ্রন্থধারীদের নিন্দে করা হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এ লোকগুলোও যদি আমার শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতো তবে তারাও এ মর্যাদা লাভ করতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ অবিশ্বাস, দুষ্কার্য ও অবাধ্যতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তবে তাদের মধ্যে কতক লোক ঈমানদারও রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে শুভ সংবাদ দিচ্ছেন- “তোমরা হতবুদ্ধি ও চিন্তিত হয়ে পড়ো না, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধবাদীদের উপর জয়যুক্ত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা খায়বারের যুদ্ধে তাদেরকে পর্যুদস্ত করেন এবং এর পূর্বে বানূ কাইনুকা, বানূ নাযীর এবং বান্ কুরাইযাকেও লাঞ্ছিত ও পরাভূত করেছিলেন। অনুরূপভাবে সিরিয়ার খ্ৰীষ্টানগণ সাহাবীদের আমলে পরাজিত হয়েছিল এবং সিরিয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায় ও চিরদিনের জন্যে মুসলমানদের অধিকারে এসে পড়ে। তথায়। এক সত্যপন্থী দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। হযরত ঈসা (আঃ) এসে ইসলাম ধর্ম এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর শরীয়ত অনুযায়ী নির্দেশ দান করবেন এবং ক্রুশ ছিন্ন করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং শুধুমাত্র ইসলামই গ্রহণ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তাদের প্রতি লাঞ্ছনা ও হীনতা নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কোন জায়গাতেই তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নেই, তবে শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় দানের দ্বারা নিরাপত্তা পেতে পারে। অর্থাৎ যদি তারা জিযিয়া প্রদান করে ও মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করে তবে এক নিরাপত্তা পেতে পারে। কিংবা মুসলমানদের আশ্রয়দানের দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে, অর্থাৎ যদি মুসলমানদের সাথে চুক্তি হয়ে যায় বা কোন মুসলমান যদি তাদেরকে আশ্রয় দান করে তবেও তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। যদি সে নিরাপত্তা কোন স্ত্রী লোক বা কোন ক্রীতদাসও দান করে তবুও তারা নিরাপত্তা লাভ করবে। আলেমদের একটি উক্তি এও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে অঙ্গীকার। তারা আল্লাহ তা'আলার ক্রোধে পতিত হয়েছে এবং দারিদ্রে আক্রান্ত হয়েছে। এটাও তাদের কুফর, নবীদেরকে হত্যা, অহংকার, হিংসা এবং অবাধ্যতারই প্রতিফল। এ কারণেই তাদের উপর চিরদিনের জন্যে লাঞ্ছনা, হীনতা এবং দৈন্য নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে তাদের অবাধ্যতা এবং সত্যের সীমা অতিক্রমেরই প্রতিদান। আবু দাউদ এবং তায়ালেসীর মধ্যে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এক এক দিনে তিনশ জন করে নবী হত্যা করতো এবং দিনের শেষভাগে বাজারে নিজ নিজ কাজে লেগে যেতো।

আলে ইমরান 3:112

১১০-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মত সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “তোমরা অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম উম্মত। তোমরা মানুষের ঘাড় ধরে ধরে তাদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করছে। অন্যান্য ব্যাখ্যাদাতাগণও এ কথাই বলেন। ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তোমরাই সবচেয়ে বেশী মুসলমানদের উপকার সাধনকারী। আবু লাহাবের কন্যা হযরত দুরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার নিকট কোন্ ব্যক্তি উত্তম?' তিনি বলেনঃ মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী কুরআন কারীমের পাঠক, সবচেয়ে বেশী ধর্মভীরু, সবচেয়ে বেশী সকার্যের আদেশ দানকারী, সর্বাপেক্ষা অধিক মন্দকার্যে বাধাদানকারী এবং সর্বাপেক্ষা বেশী আত্মীয়তার বন্ধন সংযুক্তকারী। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইনি ঐ সহচরিণী যিনি মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। সঠিক কথা এই যে, এ আয়াতের মধ্যে সমস্ত উম্মত জড়িত রয়েছে। তবে অবশ্যই নিম্নের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম যুগ হচ্ছে আমার যুগ, তারপরে তার নিকটবর্তী যুগ এবং তারপরে তার পরবর্তী যুগ। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা পূর্ববর্তী উম্মতদের সংখ্যা সত্তর পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমরা তাদের অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এটি একটি প্রসিদ্ধ হাদীস। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে এ উম্মতের নবী (সঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি সমস্ত মাখলুকের নেতা, সমস্ত রাসূল অপেক্ষা অধিক সম্মানিত। তার শরীয়ত এত পূর্ণ যে, এ রকম শরীয়ত আর কোন নবীর নেই। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এসব শ্রেষ্ঠত্ব একত্রকারী উম্মত ও সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ হবে। এ শরীয়তের সামান্য আমলও অন্যান্য উম্মতের অধিক আমল অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি ঐ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি যা আমার পূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ ‘ঐ নিয়ামতগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আমাকে প্রভাব প্রদান দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমাকে পৃথিবীর চাবি প্রদান করা হয়েছে। (৩) আমার নাম আহমাদ (সঃ) রাখা হয়েছে। (৪) আমার জন্যে মাটিকে পবিত্র করা হয়েছে। (৫) আমার উম্মতকে সমস্ত উম্মত অপেক্ষা বেশী শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদ এ হাদীসটির ইসনাদ উত্তম। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি আবুল কাসিম (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে বলেছিলেন, “আমি তোমার পরে একটি উম্মত প্রতিষ্ঠিত করবো যারা শান্তির সময় প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং বিপদে পুণ্য যাঞা করবে ও ধৈর্য ধারণ করবে, অথচ তাদের সহিষ্ণুতা ও জ্ঞান থাকবে না। তিনি তখন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ সহিষ্ণুতা, দুরদর্শিতা এবং পূর্ণ জ্ঞান ছাড়া এটা কিরূপে সম্ভব?' বিশ্ব প্রভু তখন বলেনঃ “আমি তাদেরকে সহনশীলতা ও জ্ঞান দান করবো। আমি এখানে এমন কতগুলো হাদীস বর্ণনা করতে চাই যেগুলোর বর্ণনা এখানে যথোপযুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মুখমণ্ডল চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিময় হবে। তারা হবে সবাই একই অন্তর বিশিষ্ট। আমি আল্লাহ আ'আলার নিকট আবেদন করি- “হে আমার প্রভু! এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেকের সাথে আরও সত্তর হাজার।' হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেনঃ “তাহলে তো এ সংখ্যার মধ্যে গ্রাম ও পল্লীবাসীও চলে আসবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার প্রভু আমাকে শুভ সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।' হযরত উমার (রাঃ) একথা শুনে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী যা করলে ভাল হতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আমার প্রভুর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি আমাকে সুসংবাদ দেন যে, প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে হবে।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) পুনরায় বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল(সঃ)! আরও বৃদ্ধির জন্যে প্রার্থনা করলে ভাল হতো।' তিনি বলেনঃ ‘আবার প্রার্থনা জানালে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে সত্তর হাজারের অঙ্গীকার করেন। হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু চাইতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি চেয়েছি এবং আরও এত বেশী লাভ করেছি।' অতঃপর তিনি দু' হাত প্রসারিত করে বলেনঃ “এরূপ।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন যে, এভাবে যখন আল্লাহ তাআলা একত্রিত করবেন তখন কত সংখ্যক মানুষ তাতে আসবে তা একমাত্র তিনিই জানেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত সাওবান (রাঃ) হিমসে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কুরত্ ছিলেন তথাকার আমীর। তিনি হযরত সাওবান (রাঃ)-কে দেখতে যেতে পারেননি। কিলাঙ্গ গোত্রের একটি লোক তাঁকে দেখতে যান। হযরত সাওবান (রাঃ) লোকটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি লেখা পড়া জানেন কি?' লোকটি বলেনঃ হ্যা। তখন হযরত সাওবান (রাঃ) তাকে বলেনঃ ‘লিখুন, এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেবক সাওবানের পক্ষ হতে আমীর আবদুল্লাহ ইবনে কুতকে দেয়া হচ্ছে। হাম্দ ও দরূদের পর প্রকাশ থাকে যে, যদি হযরত ঈসা (আঃ) অথবা হযরত মূসা (আঃ)-এর কোন খাদেম এখানে অবস্থান করতেন এবং রোগাক্রান্ত হতেন তবে আপনি অবশ্যই তাকে দেখতে যেতেন।' অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ ‘এ পত্রটি নিয়ে গিয়ে আমীরের নিকট পৌছিয়ে দেবেন।' পূত্রটি হিমসের আমীরের নিকট পৌছলে তিনি চিন্তান্বিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত সাওবান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। দীর্ঘক্ষণ বসে তাকে দেখার পর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে হযরত সাওবান (রাঃ) তার চাদর টেনে ধরেন এবং বলেনঃ একটি হাদীস শুনুন! আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখ হতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তি ভোগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সাথে আরও সত্তর হাজার করে হবে'। (মুসনাদ -ই-আহমাদ) এ হাদীসটিও বিশুদ্ধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আলাপ আলোচনো করি। অতঃপর প্রত্যুষে তার খিদমতে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আজ রাত্রে নবীগণ (আঃ)-এর নিজ নিজ উম্মতসহ আমাকে দেখানো হয়েছে। কোন কোন নবীর সাথে মাত্র তিনজন ছিলেন, কারও কারও সাথে ছিল ক্ষুদ্র একটি দল, কারও কারও সঙ্গে ছিল একটি জামা'আত এবং কারও কারও সাথে আবার একজনও ছিল না। যখন হযরত মূসা (আঃ) আগমন করেন তখন তার সাথে বহু লোক ছিল। এ দলটি আমার নিকট পছন্দনীয় হয়। আমি জিজ্ঞেস করিঃ ‘এটা কে?' বলা হয়ঃ ইনি আপনার ভাই। হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা হচ্ছে বানী ইসরাঈল। আমি বলিঃ আমার উম্মত কোথায়? উত্তর হয়ঃ আপনার ডান দিকে লক্ষ্য করুন। অতঃপর আমি লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছে, মনে হচ্ছে যেন পর্বতও ঢাকা পড়ে যাবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন কি? আমি বলি- হে আমার প্রভু! আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর আমাকে বলা হয় ‘এদের সাথে আরও সত্তর হাজার করে রয়েছে যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে চলে যাবে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ যদি সম্ভব হয় তবে এ সত্তর হাজারের অন্তর্গত হয়ে যাও। তা যদি সম্ভব না হয় তবে ওদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা পর্বতসমূহ ঢেকে ফেলেছিল। আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও যারা আকাশের প্রান্তে প্রান্তে অবস্থান করছিল। হযরত উক্কাসা ইবনে মুহসিন (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে প্রার্থনা করুন। যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ সত্তর হাজারের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি প্রার্থনা করলে অন্য একজন সাহাবীও (রাঃ) দাড়িয়ে এ আরযই করেন। তখন তিনি বলেনঃ তোমার পূর্বে উক্কাস (রাঃ) অগ্রাধিকার লাভ করেছে।' তখন আমরা পরস্পর বলাবিল করি যে, সম্ভবতঃ এ সত্তর হাজার লোকেরাই হবে যারা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করতঃ সারা জীবনে কখনও আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করেনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের এ আলোচনা জানতে পেরে বলেনঃ “এরা ঐসব লোক যারা ঝাড় ফুক করিয়ে নেয় না, আগুন দ্বারা দাগিয়ে নেয় না এবং আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা রাখে।' (মুসনাদ-ইআহমাদ) অন্য এক সনদে নিম্নের এটুকু বেশীও রয়েছে- যখন আমি আমার সম্মতি প্রকাশ করি তখন আমাকে বলা হয়- ‘এখন আপনার বাম দিকে লক্ষ্য করুন। আমি তখন লক্ষ্য করে দেখি যে, অসংখ্য জনসমাবেশ রয়েছে যারা আকাশ প্রান্তকে ঘিরে ফেলেছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হজ্ব মওসুমের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের এ আধিক্য আমার খুব পছন্দ হয়। তাদের দ্বারা সমস্ত পাহাড় পর্বত ও মাঠ প্রান্তর ভরপুর ছিল। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত উক্কাস (রাঃ)-এর পরে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন আনসারী। (হাদীস তাবরানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে ৭০ হাজার বা সাত লক্ষ লোক জান্নাতে চলে যাবে। যারা একে অপরের হাত ধরে থাকবে। তারা সবাই এক সাথে জান্নাতে যাবে। চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও তাবরানী) হযরত হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান (রঃ) বলেন, আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “রাত্রে যে তারকাটি ভেঙ্গে পড়েছিল তা তোমরা কেউ দেখেছিলে কি?' আমি বলিঃ হ্যাঁ, জনাব! আমি দেখেছি। আমি তখন নামাযে ছিলাম না। বরং আমাকে বিন্দুতে কেটে ছিল। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি তখন কি করেছিলে?' আমি বলিঃ ফুঁক দিয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ কেন? আমি বলিঃ হযরত শা’বী (রঃ) হযরত বুরাইদাহ্ ইবনে হাসীব (রঃ)-এর বর্ণনা হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, ন্যরবন্দী ও বিষাক্ত জন্তুর ব্যাপারে ঝাড়-ফুঁক করিয়ে নিতে হবে।' তিনি বলেনঃ আচ্ছা বেশ! যার নিকট যা পৌছবে তার উপরেই সে আমল করবে। আমাকে তো হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) শুনিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উপরে উম্মতদেরকে পেশ করা হয়েছিল। কোন নবীর সাথে ছিল একটি দল। কারও সাথে ছিল একটি, কারও সাথে ছিল দু’টি এবং কারও কারও সাথে একটিও ছিল না। অতঃপর একটি বড় দল আমার দষ্টিগোচর হয়। আমি তখন মনে করি যে, এদলটি আমারই উম্মত। পরে আমি জানতে পারি যে, ওটা হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মত। আমাকে বলা হয়-“আকাশ প্রান্তের দিকে দৃষ্টিপাত কর। আমি তখন দেখি যে, তথায় অসংখ্য লোক রয়েছে। আমাকে বলা হয়-“এগুলো আপনারই উম্মত এবং ওদের সাথে আরও ৭০ হাজার রয়েছে যারা বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিভোগে জান্নাতে চলে যাবে। এ হাদীসটি বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ). তো বাড়ী চলে যান, অপর সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, সম্ভবতঃ এরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীই হবেন। কোন একজন বলেন যে, না, এঁরা ইসলামের উপরে জন্মগ্রণকারী এবং ইসলামের উপরেই মৃত্যুবরণকারী, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর নবী (সঃ) আগমন করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কি সম্বন্ধে আলোচনা করছো? আমরা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ না, বরং এরা ঐসব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না ও করিয়ে নেয় না, দাগিয়ে নেয় না এবং ভাবী শুভাশুভের লক্ষণের উপর বিশ্বাস করে না, বরং স্বীয় প্রভুর উপর ভরসা করে। হযরত উক্কাস (রাঃ) দুআর প্রার্থনা জানালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অতঃপর অন্য এক ব্যক্তিও এ কথাই বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘উক্কাসা অগ্রগামী হয়েছে।' এ হাদীসটি সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তথায় ঝাড় ফুঁক করিয়ে নেয় না এ কথাটি নেই। মুসলিমের মধ্যে এ কথাটিও রয়েছে। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, প্রথম দলটি তো মুক্তি পেয়ে যাবে, তাদের মুখমণ্ডল পুর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হবে, তাদের নিকট হিসাবও গ্রহণ করা হবে না। অতঃপর তাদের পরবর্তীগণ সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল তারকার ন্যায় দীপ্তিময় মুখমণ্ডল বিশিষ্ট হবে। (সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমার সঙ্গে আমার প্রভুর অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার হবে এবং আমার মহাসম্মানিত প্রভুর ললাপের (অঞ্জলি) তিন লোপ’। (হাফিজ আবু বকর ইবনে আসেমের কিতাবুস সুনান) এর ইসনাদ খুবই উত্তম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তার উম্মতের ৭০ হাজারের সংখ্যা শুনে হযরত ইয়াযিদ ইবনে আগনাস। (রাঃ) তাকে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উম্মতের সংখ্যার তুলনায় তো এ সংখ্যা খুবই কম। তখন তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও এক হাজার করে রয়েছে এবং এর পরে আল্লাহ তা'আলা তিন লোপ (করপুট) ভরে আরও দান করেন। এর ইসনাদও উত্তম। (কিতাবুস সুনান) অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার মহা মহিমান্বিত প্রভু আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার -- বিনা হিসেবে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর এক এক হাজারের সুপারিশক্রমে আরও ৭০ হাজার করে মানুষ জান্নাতে চলে যবে। তারপর আমার প্রভু স্বীয় দু' হাতের তিন লোপ ভরে আরও নিক্ষেপ করবেন। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) খুশী হয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করেন এবং বলেনঃ তাদের সুপারিশ হবে স্বীয় বাপ-দাদা, পুত্র-কন্যা এবং বংশ ও গোত্রের পক্ষে। আল্লাহ করেন আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হই যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় লোপ ভরে শেষে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।' (তাবরানী হাদীস) এ সনদের মধ্যেও কোন ক্রটি নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাদীদ নামক স্থানে একটি হাদীস বর্ণনা করেন, যার মধ্যে তিনি এও বর্ণনা করেনঃ ‘এ ৭০ হাজার যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আমার ধারণায় তারা আসতে আসতে তো তোমরা তোমাদের জন্যে, তোমাদের ছেলে মেয়েদের জন্যে এবং তোমাদের স্ত্রীদের জন্যে জান্নাতে স্থান নির্ধারিত করেই ফেলবে।' (মুসনাদ-ই আহমাদ) এর সনদও মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর রয়েছে। অন্য আর একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে চার লক্ষ লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বেশী করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! এটাই যথেষ্ট মনে করুন।' তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, কেন জনাব? আমরা যদি সবাই জান্নাতে চলে যাই তবে আপনার ক্ষতি কি?' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ যদি আল্লাহ পাক চান তবে একই হাতে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জান্নাতে নিক্ষেপ করবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “উমার (রাঃ) ঠিকই বলেছে।' (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) এ হাদীসটি অন্য সনদেও বর্ণনা করা হয়েছে, ওতে সংখ্যা রয়েছে এক লাখ। (ইসবাহানী) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন সাহাবীগণ ৭০ হাজার ও প্রত্যেকের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার এবং আল্লাহ তা'আলার লোপ ভরে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার বর্ণনা শুনেন তখন তারা বলতে থাকেন তাহলে এতদসত্তেও যে জাহান্নামে যাবে তার মত হতভাগা আর কে আছে?' (আবু ইয়ালা) উপরের হাদীসটি অন্য একটি সনদেও বর্ণিত আছে, তাতে সংখ্যা রয়েছে তিন লাখ। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁর উক্তির সত্যতা স্বীকারের বর্ণনা রয়েছে। (তাবারানী হাদীস গ্রন্থ) অন্য একটি বর্ণনায় জান্নাতে প্রবেশকারীদের বর্ণনা করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “আমার উম্মতের সমস্ত মুহাজির তো এ সংখ্যার মধ্যে এসে যাবে এবং অবশিষ্টগুলো হবে পল্লীবাসীদের দ্বারা পূর্ণ'। (মুহাম্মদ ইবনে সাহল) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হিসেব করা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটি নব্বই হাজার। তাবরানীর হাদীসের মধ্যে আরও একটি হাসান হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! তোমরা এক অন্ধকার রাত্রির মত অসংখ্য লোক একই সাথে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে, জমীন তোমাদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে যাবে। সমস্ত ফেরেশতা সশব্দে বলে উঠবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সঙ্গে যে দল এসেছে তা সমস্ত নবীর দলসমূহ অপেক্ষা অনেক বেশী। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- শুধুমাত্র আমার অনুসারী উম্মত জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ হবে। সাহাবীগণ খুশী হয়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। পুনরায় তিনি বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হয়ে যাবে। আমরা। পুনরায় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করি। আবার তিনি বলেন, 'আমি আশা করছি যে, তোমরা অর্ধেক হয়ে যাবে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বলেন, ‘তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ হবে এতে সন্তুষ্ট নও?' তারা সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তোমরা জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ হবে এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?' তারা পুনরায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তিনি তখন বলেন, “আমি তো আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতবাসীদের অর্ধেক হয়ে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) তাবরানীর হাদীসের মধ্যে এ বর্ণনাটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা কি চাও যে, জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ তোমরা হবে এবং বাকী তিন চতুর্থাংশ অন্যান্য সমস্ত উম্মত হবে। সাহাবীগণ বলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বলেন, 'আচ্ছা, যদি তোমরা এক তৃতীয়াংশ হও তবে? তারা বলেন, এটা খুব বেশী। তিনি বলেন, “আচ্ছা যদি তোমরা অর্ধেক হও তবে?' তারা বলেন “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তা হলে তো এটা আরও অনেক বেশী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, “জেনে রেখো, সমস্ত জান্নাতবাসীর মোট একশ বিশটি সারি হবে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র আমার এ উম্মতেরই হবে আশিটি সারি।' মুসনাদ-ই-আহমাদেও রয়েছে যে, জান্নাত বাসীদের একশ বিশটি সারি হবে, তন্মধ্যে আশিটি সারি এ উম্মতেরই হবে। এ হাদীসটি তাবরানী, জামেউত তিরমিযী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে। তাবরানীর অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন (আরবী) অর্থাৎ, একটি বিরাট দল হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং একটি বিরাট দল হবে পরবর্তীদের মধ্যে হতে। (৫৬:৩৯-৪০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘তোমরা জান্নাতবাসীর এক চতুর্থাংশ, আবার বলেন, এক তৃতীয়াংশ, তার পরে বলেন, বরং অর্ধেক, সর্বশেষে বলেন, দুই তৃতীয়াংশ। সহীহ বুখারী শরীফে ও সহীহ মুসলিম শরীফ রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা পৃথিবীতে সর্বশেষে এসেছি এবং জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবো। তাদেরকে আল্লাহর কিতাব পূর্বে দেয়া হয়েছে, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে পরে। যে বিষয়ে তারা মতভেদ করেছে সে বিষয়ে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পন্থা অবলম্বনের তাওফীক প্রদান করেছেন। জুম'আর দিনও এরূপই যে, ইয়াহুদীরা আমাদের পিছনে রয়েছে, অর্থাৎ শনিবার এবং খ্রীষ্টানেরা তাদেরও পিছনে রয়েছে অর্থাৎ রবিবার। দারেকুতনীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘আমি যে পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ না করবো সে পর্যন্ত অন্যান্য নবীদের জন্যে জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। আর যে পর্যন্ত আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ না করবে সে পর্যন্ত অন্যান্য উম্মতের জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এগুলোই ছিল ঐ সব হাদীস যেগুলোকে আমরা এখানে বর্ণনা করতে চেয়েছিলাম। উম্মতের উচিত যে, এখানে এ আয়াতের মধ্যে যতগুলো বিশেষণ রয়েছে সেগুলোর উপর যেন দৃঢ়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ দান, মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনয়ন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় হজ্বে এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ যদি তোমরা এ আয়াতের প্রশংসার মধ্যে আসতে চাও তবে এ সমুদয় গুণও নিজেদের ভেতর সৃষ্টি কর।' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, “গ্রন্থ প্রাপ্তগণ ঐ সব কাজ পরিত্যাগ করেছিল বলেই আল্লাহ পাক স্বীয় কালামে তাদেরকে নিন্দে করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা মানুষকে অন্যায় কর্ম হতে বিরত রাখতো না।" (৫:৭৯) যেহেতু উপরোক্ত আয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই পরে গ্রন্থধারীদের নিন্দে করা হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এ লোকগুলোও যদি আমার শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতো তবে তারাও এ মর্যাদা লাভ করতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ অবিশ্বাস, দুষ্কার্য ও অবাধ্যতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তবে তাদের মধ্যে কতক লোক ঈমানদারও রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে শুভ সংবাদ দিচ্ছেন- “তোমরা হতবুদ্ধি ও চিন্তিত হয়ে পড়ো না, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধবাদীদের উপর জয়যুক্ত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা খায়বারের যুদ্ধে তাদেরকে পর্যুদস্ত করেন এবং এর পূর্বে বানূ কাইনুকা, বানূ নাযীর এবং বান্ কুরাইযাকেও লাঞ্ছিত ও পরাভূত করেছিলেন। অনুরূপভাবে সিরিয়ার খ্ৰীষ্টানগণ সাহাবীদের আমলে পরাজিত হয়েছিল এবং সিরিয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায় ও চিরদিনের জন্যে মুসলমানদের অধিকারে এসে পড়ে। তথায়। এক সত্যপন্থী দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। হযরত ঈসা (আঃ) এসে ইসলাম ধর্ম এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর শরীয়ত অনুযায়ী নির্দেশ দান করবেন এবং ক্রুশ ছিন্ন করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং শুধুমাত্র ইসলামই গ্রহণ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তাদের প্রতি লাঞ্ছনা ও হীনতা নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কোন জায়গাতেই তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নেই, তবে শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় দানের দ্বারা নিরাপত্তা পেতে পারে। অর্থাৎ যদি তারা জিযিয়া প্রদান করে ও মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করে তবে এক নিরাপত্তা পেতে পারে। কিংবা মুসলমানদের আশ্রয়দানের দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে, অর্থাৎ যদি মুসলমানদের সাথে চুক্তি হয়ে যায় বা কোন মুসলমান যদি তাদেরকে আশ্রয় দান করে তবেও তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। যদি সে নিরাপত্তা কোন স্ত্রী লোক বা কোন ক্রীতদাসও দান করে তবুও তারা নিরাপত্তা লাভ করবে। আলেমদের একটি উক্তি এও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে অঙ্গীকার। তারা আল্লাহ তা'আলার ক্রোধে পতিত হয়েছে এবং দারিদ্রে আক্রান্ত হয়েছে। এটাও তাদের কুফর, নবীদেরকে হত্যা, অহংকার, হিংসা এবং অবাধ্যতারই প্রতিফল। এ কারণেই তাদের উপর চিরদিনের জন্যে লাঞ্ছনা, হীনতা এবং দৈন্য নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে তাদের অবাধ্যতা এবং সত্যের সীমা অতিক্রমেরই প্রতিদান। আবু দাউদ এবং তায়ালেসীর মধ্যে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এক এক দিনে তিনশ জন করে নবী হত্যা করতো এবং দিনের শেষভাগে বাজারে নিজ নিজ কাজে লেগে যেতো।

আলে ইমরান 3:113

১১৩-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহূলে কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ সমান নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইশার নামাযে আসতে বিলম্ব করেন। অতঃপর যখন আগমন করেন তখন সাহাবীগণ অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমরা ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক এখন আল্লাহ তাআলার যিকির করছে না। তখন আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাখ্যাতার মতে এ আয়াতগুলো আহলে কিতাবের আলেমগণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত সা’দ ইবনে শুবা (রাঃ) প্রভৃতি। এসব লোক ঐসব আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নন পূর্বে যাদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হয়েছে এবং এ ঈমানদার লোকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ তাআলা বলেন- তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়তের তারা অনুসারী, তাদের মধ্যে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে। এ নির্মল নিষ্কলুষ লোকগুলো রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযেও আল্লাহ পাকের কালাম পাঠ করে থাকে এবং জনগণকেও তারা এসব কাজেই নির্দেশ দেয় এবং এরা বিপরীত কার্য হতে বিরত রাখে। ভাল কাজে তারা সদা অগ্রগামী থাকে। এখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্বন্ধে বলেন যে, তারা ভাল লোক। এ সূরার শেষেও বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর উপর, তোমাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর এবং তাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে থাকে। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সৎকার্যাবলী বিনষ্ট হবে না এবং তাদেরকে তাদের সমুদয় কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। সমস্ত আল্লাহ-ভীরু মানুষ আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেই রয়েছে। তিনি কারও সকার্য বিনষ্ট করেন না। তবে ধর্মদ্রোহী লোকদের জন্যে তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন উপকারে আসবে না। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা যা শস্যসমূহ ধ্বংস করে থাকে। মোটকথা যেমন শস্য ক্ষেত্রে বরফ জমে যাওয়ার ফলে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, এ কাফিরদের অবস্থাও ঠিক তদ্রুপ। এরা যা কিছু খরচ করে তার পুণ্য লাভ তো দূরের কথা, বরং তাদের আরও শাস্তি হবে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার নয়, বরং এটা তাদের মন্দ কার্যাবলীরই শাস্তি।

আলে ইমরান 3:114

১১৩-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহূলে কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ সমান নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইশার নামাযে আসতে বিলম্ব করেন। অতঃপর যখন আগমন করেন তখন সাহাবীগণ অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমরা ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক এখন আল্লাহ তাআলার যিকির করছে না। তখন আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাখ্যাতার মতে এ আয়াতগুলো আহলে কিতাবের আলেমগণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত সা’দ ইবনে শুবা (রাঃ) প্রভৃতি। এসব লোক ঐসব আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নন পূর্বে যাদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হয়েছে এবং এ ঈমানদার লোকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ তাআলা বলেন- তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়তের তারা অনুসারী, তাদের মধ্যে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে। এ নির্মল নিষ্কলুষ লোকগুলো রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযেও আল্লাহ পাকের কালাম পাঠ করে থাকে এবং জনগণকেও তারা এসব কাজেই নির্দেশ দেয় এবং এরা বিপরীত কার্য হতে বিরত রাখে। ভাল কাজে তারা সদা অগ্রগামী থাকে। এখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্বন্ধে বলেন যে, তারা ভাল লোক। এ সূরার শেষেও বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর উপর, তোমাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর এবং তাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে থাকে। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সৎকার্যাবলী বিনষ্ট হবে না এবং তাদেরকে তাদের সমুদয় কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। সমস্ত আল্লাহ-ভীরু মানুষ আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেই রয়েছে। তিনি কারও সকার্য বিনষ্ট করেন না। তবে ধর্মদ্রোহী লোকদের জন্যে তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন উপকারে আসবে না। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা যা শস্যসমূহ ধ্বংস করে থাকে। মোটকথা যেমন শস্য ক্ষেত্রে বরফ জমে যাওয়ার ফলে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, এ কাফিরদের অবস্থাও ঠিক তদ্রুপ। এরা যা কিছু খরচ করে তার পুণ্য লাভ তো দূরের কথা, বরং তাদের আরও শাস্তি হবে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার নয়, বরং এটা তাদের মন্দ কার্যাবলীরই শাস্তি।

আলে ইমরান 3:115

১১৩-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহূলে কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ সমান নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইশার নামাযে আসতে বিলম্ব করেন। অতঃপর যখন আগমন করেন তখন সাহাবীগণ অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমরা ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক এখন আল্লাহ তাআলার যিকির করছে না। তখন আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাখ্যাতার মতে এ আয়াতগুলো আহলে কিতাবের আলেমগণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত সা’দ ইবনে শুবা (রাঃ) প্রভৃতি। এসব লোক ঐসব আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নন পূর্বে যাদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হয়েছে এবং এ ঈমানদার লোকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ তাআলা বলেন- তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়তের তারা অনুসারী, তাদের মধ্যে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে। এ নির্মল নিষ্কলুষ লোকগুলো রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযেও আল্লাহ পাকের কালাম পাঠ করে থাকে এবং জনগণকেও তারা এসব কাজেই নির্দেশ দেয় এবং এরা বিপরীত কার্য হতে বিরত রাখে। ভাল কাজে তারা সদা অগ্রগামী থাকে। এখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্বন্ধে বলেন যে, তারা ভাল লোক। এ সূরার শেষেও বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর উপর, তোমাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর এবং তাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে থাকে। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সৎকার্যাবলী বিনষ্ট হবে না এবং তাদেরকে তাদের সমুদয় কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। সমস্ত আল্লাহ-ভীরু মানুষ আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেই রয়েছে। তিনি কারও সকার্য বিনষ্ট করেন না। তবে ধর্মদ্রোহী লোকদের জন্যে তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন উপকারে আসবে না। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা যা শস্যসমূহ ধ্বংস করে থাকে। মোটকথা যেমন শস্য ক্ষেত্রে বরফ জমে যাওয়ার ফলে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, এ কাফিরদের অবস্থাও ঠিক তদ্রুপ। এরা যা কিছু খরচ করে তার পুণ্য লাভ তো দূরের কথা, বরং তাদের আরও শাস্তি হবে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার নয়, বরং এটা তাদের মন্দ কার্যাবলীরই শাস্তি।

আলে ইমরান 3:116

১১৩-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহূলে কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ সমান নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইশার নামাযে আসতে বিলম্ব করেন। অতঃপর যখন আগমন করেন তখন সাহাবীগণ অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমরা ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক এখন আল্লাহ তাআলার যিকির করছে না। তখন আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাখ্যাতার মতে এ আয়াতগুলো আহলে কিতাবের আলেমগণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত সা’দ ইবনে শুবা (রাঃ) প্রভৃতি। এসব লোক ঐসব আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নন পূর্বে যাদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হয়েছে এবং এ ঈমানদার লোকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ তাআলা বলেন- তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়তের তারা অনুসারী, তাদের মধ্যে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে। এ নির্মল নিষ্কলুষ লোকগুলো রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযেও আল্লাহ পাকের কালাম পাঠ করে থাকে এবং জনগণকেও তারা এসব কাজেই নির্দেশ দেয় এবং এরা বিপরীত কার্য হতে বিরত রাখে। ভাল কাজে তারা সদা অগ্রগামী থাকে। এখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্বন্ধে বলেন যে, তারা ভাল লোক। এ সূরার শেষেও বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর উপর, তোমাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর এবং তাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে থাকে। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সৎকার্যাবলী বিনষ্ট হবে না এবং তাদেরকে তাদের সমুদয় কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। সমস্ত আল্লাহ-ভীরু মানুষ আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেই রয়েছে। তিনি কারও সকার্য বিনষ্ট করেন না। তবে ধর্মদ্রোহী লোকদের জন্যে তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন উপকারে আসবে না। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা যা শস্যসমূহ ধ্বংস করে থাকে। মোটকথা যেমন শস্য ক্ষেত্রে বরফ জমে যাওয়ার ফলে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, এ কাফিরদের অবস্থাও ঠিক তদ্রুপ। এরা যা কিছু খরচ করে তার পুণ্য লাভ তো দূরের কথা, বরং তাদের আরও শাস্তি হবে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার নয়, বরং এটা তাদের মন্দ কার্যাবলীরই শাস্তি।

আলে ইমরান 3:117

১১৩-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহূলে কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসারীগণ সমান নয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইশার নামাযে আসতে বিলম্ব করেন। অতঃপর যখন আগমন করেন তখন সাহাবীগণ অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমরা ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক এখন আল্লাহ তাআলার যিকির করছে না। তখন আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাখ্যাতার মতে এ আয়াতগুলো আহলে কিতাবের আলেমগণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আসাদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত সা’দ ইবনে শুবা (রাঃ) প্রভৃতি। এসব লোক ঐসব আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নন পূর্বে যাদের জঘন্য কাজের নিন্দে করা হয়েছে এবং এ ঈমানদার লোকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ তাআলা বলেন- তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়তের তারা অনুসারী, তাদের মধ্যে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে। এ নির্মল নিষ্কলুষ লোকগুলো রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযেও আল্লাহ পাকের কালাম পাঠ করে থাকে এবং জনগণকেও তারা এসব কাজেই নির্দেশ দেয় এবং এরা বিপরীত কার্য হতে বিরত রাখে। ভাল কাজে তারা সদা অগ্রগামী থাকে। এখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্বন্ধে বলেন যে, তারা ভাল লোক। এ সূরার শেষেও বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর উপর, তোমাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর এবং তাদের উপর অবতারিত গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে থাকে। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সৎকার্যাবলী বিনষ্ট হবে না এবং তাদেরকে তাদের সমুদয় কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। সমস্ত আল্লাহ-ভীরু মানুষ আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেই রয়েছে। তিনি কারও সকার্য বিনষ্ট করেন না। তবে ধর্মদ্রোহী লোকদের জন্যে তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন উপকারে আসবে না। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা যা শস্যসমূহ ধ্বংস করে থাকে। মোটকথা যেমন শস্য ক্ষেত্রে বরফ জমে যাওয়ার ফলে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, এ কাফিরদের অবস্থাও ঠিক তদ্রুপ। এরা যা কিছু খরচ করে তার পুণ্য লাভ তো দূরের কথা, বরং তাদের আরও শাস্তি হবে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার নয়, বরং এটা তাদের মন্দ কার্যাবলীরই শাস্তি।

আলে ইমরান 3:118

১১৮-১২০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- এরা তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা তাদের বাহ্যিক মিষ্ট কথায় ভুলে যেও না এবং তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ো না। নতুবা তারা সুযোগ পেয়ে তোমাদেরকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তদের ভেতরের শত্রুতা তখন প্রকাশ পেয়ে যাবে। তোমরা তাদের নিকট তোমাদের গুপ্ত কথা কখনও প্রকাশ করো না। (আরবী) বলা হয় মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধুকে এবং (আরবী) দ্বারা ইসলাম ছাড়া অন্যান্য সমস্ত দলকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যে নবীকেই প্রেরণ করেছেন এবং যে প্রতিনিধিকেই নিযুক্ত করেছেন, তাঁর জন্যে তিনি দু’জন বন্ধু নির্ধারিত করেছেন। একজন তাকে ভাল কথা বুঝিয়ে থাকেন ও ভালকার্যে উৎসাহ দিয়ে থাকেন এবং অপরজন তাকে মন্দকার্যের পথ-প্রদর্শন করে ও সেই কার্যে উত্তেজিত করে। সুতরাং আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন সেই রক্ষা পেতে পারে।' হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে বলা হয়ঃ ‘এখানে ‘হীরার’ একজন লোক রয়েছে, খুব ভাল লিখতে পরে এবং তার স্মরণশক্তি খুব ভাল সুতরাং আপনি তাকে আপনার লিখক নিযুক্ত করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ তাহলে তো আমি একজন অমুসলিমকে আমার বন্ধু বানিয়ে নেবো যা আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছেন’! এ ঘটনাটিও এ আয়াতটিকে সামনে রেখে চিন্তা করলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে যে, যিম্মী কাফিরদেরকেও এরূপ কার্যে নিয়োগ করা উচিত নয়। কেননা, হতে পারে যে, তারা শত্রুপক্ষকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত করবে এবং তাদেরকে সতর্ক করে দেবে। কারণ, মুসলমানদের পতনই তাদের কাম্য। হযরত আযহার ইবনে রাশেদ (রঃ) বলেন যে, মানুষ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট হাদীস শুনতেন। কোন হাদীসের ভাবার্থ বোধগম্য না হলে তারা হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর নিকট তা বুঝে নিতেন। একদা হযরত আনাস (রাঃ) নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করেনঃ “তোমরা অংশীবাদীদের অগ্নি হতে আলোক গ্রহণ। করো না এবং স্বীয় আংটিতে আরবী অংকন করো না। তারা এসে খাজা সাহেবকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ দ্বিতীয় বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমরা আংটিতে মুহাম্মদ (সঃ)-এর নাম খোদাই করো না এবং প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘তোমরা নিজেদের কার্যের ব্যাপারে মুশরিকদের পরামর্শ গ্রহণ করো না।' দেখুন, আল্লাহ তা'আলাও স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্যদের বিশ্বস্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না'। (আবু ইয়ালা) কিন্তু খাজা সাহেবের এ ব্যাখ্যাটি একটি বিবেচ্য বিষয়। সম্ভবতঃ হাদীসটির সঠিক ভাবার্থ হবেঃ (আরবী) (৪৯:২৯) আরবী অক্ষরে আংটির উপর খোদাই করো না। যেমন অন্য হাদীসে এর নিষিদ্ধতা পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এর কারণ এই যে, এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোহরের সঙ্গে সাদৃশ্য এসে যাবে। আর প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হবেঃ “তোমরা মুশরিকদের গ্রামের পার্শ্বে থেকো না, তাদের প্রতিবেশী হয়ো না এবং তাদের শহর হতে হিজরত কর।' যেমন সুনান-ই-আবু দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান ও মুশরিকদের মধ্যকার যুদ্ধ কি তোমরা দেখ না? অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যারা মুশরিকদের সাথে মেলামেশা করে, তাদের সাথে বসবাস করে, তারা তাদের মতই।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের কথাতেও শুক্রতা প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের চেহারা দেখেই শুভাশুভ নিরূপকগণ তাদের ভেতরের দুষ্টামির কথা জানতে পারে। তাদের অন্তরে যে ধ্বংসাত্মক মনোভাব রয়েছে তা তোমাদের জানা নেই। কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম। সুতরাং জ্ঞানীরা কখনও তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়বে না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, এটা কত বড় দুর্বলতার কথা যে, তোমরা তাদেরকে ভালবাসছো, অথচ তারা তোমাদেরকে চায় না। তোমরা সমস্ত গ্রন্থকে স্বীকার করে থাক বটে, কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যেই পড়ে রয়েছে। তোমরা তাদের গ্রন্থে বিশ্বাস কর বটে, কিন্তু তারা তোমাদের গ্রন্থে বিশ্বাস করে না। অতএব, উচিত তো ছিল যে, তোমরা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে দেখতে। পক্ষান্তরে তারা কিন্তু তোমাদের প্রতি শত্রুতাই পোষণ করছে।তারা মুসলমানদের মুখোমুখি হলে নিজেদের ঈমানদারীর কাহিনী বলতে আরম্ভ করে। কিন্তু যখনই তাদের হতে পৃথক হয় তখনই হিংসা ও ক্রোধে নিজেদের অঙ্গুলি কামড়াতে থাকে। সুতরাং মুসলমানদের উচিত যে, তারা যেন মুনাফিকদের বাহ্যিক ভাব দেখেই তাদেরকে বন্ধু মনে না করে। এ মুনাফিকরা মুসলমানদের উন্নতি দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরলেও আল্লাহ তা'আলা ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি সাধন করতেই থাকবেন। মুসলমানরা সর্বদিক দিয়ে বেড়েই চলবে, যদিও মুশরিক ও মুনাফিকরা হিংসা ও ক্রোধে জ্বলে পুড়ে মরে যায়। আল্লাহ পাক তাদের অন্তরের কথা খুব ভাল করেই জানেন। তাদের সমুদয় ষড়যন্ত্রের উপর মাটি পড়ে যাবে এবং তারা তাদের জঘন্য কার্যে কৃতকার্য হবে না। তারা মুসলমানদের উন্নতি চায় না তথাপি মুসলমানেরা দিন দিন উন্নতি লাভ করতেই থাকবে এবং পরকালেও তাদেরকে সুখময় জান্নাতে দেখতে পাবে। পক্ষান্তরে এ মুশরিক ও মুনাফিকরা ইহজগতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তারা জাহান্নামের জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হবে। তারা যে তোমাদের চরমশ তার বড় প্রমাণ এই যে, যখন তোমাদের কোন মঙ্গল সাধিত হয় তখন তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোন ক্ষতি সাধিত হয় তখন তারা তাতে আনন্দ লাভ করে। অর্থাৎ যখন আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সাহায্য করেন এবং তারা কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করতঃ যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য প্রাপ্ত হয় তখন ঐ মুনাফিকরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যখন মুমিনগণ পরাজয় বরণ করে তখন তারা কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এখন মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেন‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা তাদের দুষ্টামি হতে মুক্তি পেতে চাও তবে ধৈর্যধারণ কর, সংযমী হও এবং আমার উপর নির্ভর কর, আমি তোমাদের শত্রুদেরকে ঘিরে নেবো। কোন মঙ্গল লাভ করা এবং কোন অমঙ্গল হতে রক্ষা পাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না। তোমরা যদি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর কর তবে তিনিই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট।' এ সম্পর্কেই এখন উহুদ যুদ্ধের বর্ণনা শুরু হচ্ছে, যার মধ্যে মুসলমানদের ধৈর্য ও সহনশীলতার বর্ণনা রয়েছে এবং যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার পরীক্ষার পূর্ণচিত্র ও যদ্দ্বারা মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ প্রকাশ পেয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

আলে ইমরান 3:119

১১৮-১২০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- এরা তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা তাদের বাহ্যিক মিষ্ট কথায় ভুলে যেও না এবং তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ো না। নতুবা তারা সুযোগ পেয়ে তোমাদেরকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তদের ভেতরের শত্রুতা তখন প্রকাশ পেয়ে যাবে। তোমরা তাদের নিকট তোমাদের গুপ্ত কথা কখনও প্রকাশ করো না। (আরবী) বলা হয় মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধুকে এবং (আরবী) দ্বারা ইসলাম ছাড়া অন্যান্য সমস্ত দলকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যে নবীকেই প্রেরণ করেছেন এবং যে প্রতিনিধিকেই নিযুক্ত করেছেন, তাঁর জন্যে তিনি দু’জন বন্ধু নির্ধারিত করেছেন। একজন তাকে ভাল কথা বুঝিয়ে থাকেন ও ভালকার্যে উৎসাহ দিয়ে থাকেন এবং অপরজন তাকে মন্দকার্যের পথ-প্রদর্শন করে ও সেই কার্যে উত্তেজিত করে। সুতরাং আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন সেই রক্ষা পেতে পারে।' হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে বলা হয়ঃ ‘এখানে ‘হীরার’ একজন লোক রয়েছে, খুব ভাল লিখতে পরে এবং তার স্মরণশক্তি খুব ভাল সুতরাং আপনি তাকে আপনার লিখক নিযুক্ত করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ তাহলে তো আমি একজন অমুসলিমকে আমার বন্ধু বানিয়ে নেবো যা আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছেন’! এ ঘটনাটিও এ আয়াতটিকে সামনে রেখে চিন্তা করলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে যে, যিম্মী কাফিরদেরকেও এরূপ কার্যে নিয়োগ করা উচিত নয়। কেননা, হতে পারে যে, তারা শত্রুপক্ষকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত করবে এবং তাদেরকে সতর্ক করে দেবে। কারণ, মুসলমানদের পতনই তাদের কাম্য। হযরত আযহার ইবনে রাশেদ (রঃ) বলেন যে, মানুষ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট হাদীস শুনতেন। কোন হাদীসের ভাবার্থ বোধগম্য না হলে তারা হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর নিকট তা বুঝে নিতেন। একদা হযরত আনাস (রাঃ) নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করেনঃ “তোমরা অংশীবাদীদের অগ্নি হতে আলোক গ্রহণ। করো না এবং স্বীয় আংটিতে আরবী অংকন করো না। তারা এসে খাজা সাহেবকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ দ্বিতীয় বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমরা আংটিতে মুহাম্মদ (সঃ)-এর নাম খোদাই করো না এবং প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘তোমরা নিজেদের কার্যের ব্যাপারে মুশরিকদের পরামর্শ গ্রহণ করো না।' দেখুন, আল্লাহ তা'আলাও স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্যদের বিশ্বস্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না'। (আবু ইয়ালা) কিন্তু খাজা সাহেবের এ ব্যাখ্যাটি একটি বিবেচ্য বিষয়। সম্ভবতঃ হাদীসটির সঠিক ভাবার্থ হবেঃ (আরবী) (৪৯:২৯) আরবী অক্ষরে আংটির উপর খোদাই করো না। যেমন অন্য হাদীসে এর নিষিদ্ধতা পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এর কারণ এই যে, এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোহরের সঙ্গে সাদৃশ্য এসে যাবে। আর প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হবেঃ “তোমরা মুশরিকদের গ্রামের পার্শ্বে থেকো না, তাদের প্রতিবেশী হয়ো না এবং তাদের শহর হতে হিজরত কর।' যেমন সুনান-ই-আবু দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান ও মুশরিকদের মধ্যকার যুদ্ধ কি তোমরা দেখ না? অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যারা মুশরিকদের সাথে মেলামেশা করে, তাদের সাথে বসবাস করে, তারা তাদের মতই।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের কথাতেও শুক্রতা প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের চেহারা দেখেই শুভাশুভ নিরূপকগণ তাদের ভেতরের দুষ্টামির কথা জানতে পারে। তাদের অন্তরে যে ধ্বংসাত্মক মনোভাব রয়েছে তা তোমাদের জানা নেই। কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম। সুতরাং জ্ঞানীরা কখনও তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়বে না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, এটা কত বড় দুর্বলতার কথা যে, তোমরা তাদেরকে ভালবাসছো, অথচ তারা তোমাদেরকে চায় না। তোমরা সমস্ত গ্রন্থকে স্বীকার করে থাক বটে, কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যেই পড়ে রয়েছে। তোমরা তাদের গ্রন্থে বিশ্বাস কর বটে, কিন্তু তারা তোমাদের গ্রন্থে বিশ্বাস করে না। অতএব, উচিত তো ছিল যে, তোমরা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে দেখতে। পক্ষান্তরে তারা কিন্তু তোমাদের প্রতি শত্রুতাই পোষণ করছে।তারা মুসলমানদের মুখোমুখি হলে নিজেদের ঈমানদারীর কাহিনী বলতে আরম্ভ করে। কিন্তু যখনই তাদের হতে পৃথক হয় তখনই হিংসা ও ক্রোধে নিজেদের অঙ্গুলি কামড়াতে থাকে। সুতরাং মুসলমানদের উচিত যে, তারা যেন মুনাফিকদের বাহ্যিক ভাব দেখেই তাদেরকে বন্ধু মনে না করে। এ মুনাফিকরা মুসলমানদের উন্নতি দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরলেও আল্লাহ তা'আলা ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি সাধন করতেই থাকবেন। মুসলমানরা সর্বদিক দিয়ে বেড়েই চলবে, যদিও মুশরিক ও মুনাফিকরা হিংসা ও ক্রোধে জ্বলে পুড়ে মরে যায়। আল্লাহ পাক তাদের অন্তরের কথা খুব ভাল করেই জানেন। তাদের সমুদয় ষড়যন্ত্রের উপর মাটি পড়ে যাবে এবং তারা তাদের জঘন্য কার্যে কৃতকার্য হবে না। তারা মুসলমানদের উন্নতি চায় না তথাপি মুসলমানেরা দিন দিন উন্নতি লাভ করতেই থাকবে এবং পরকালেও তাদেরকে সুখময় জান্নাতে দেখতে পাবে। পক্ষান্তরে এ মুশরিক ও মুনাফিকরা ইহজগতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তারা জাহান্নামের জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হবে। তারা যে তোমাদের চরমশ তার বড় প্রমাণ এই যে, যখন তোমাদের কোন মঙ্গল সাধিত হয় তখন তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোন ক্ষতি সাধিত হয় তখন তারা তাতে আনন্দ লাভ করে। অর্থাৎ যখন আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সাহায্য করেন এবং তারা কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করতঃ যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য প্রাপ্ত হয় তখন ঐ মুনাফিকরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যখন মুমিনগণ পরাজয় বরণ করে তখন তারা কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এখন মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেন‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা তাদের দুষ্টামি হতে মুক্তি পেতে চাও তবে ধৈর্যধারণ কর, সংযমী হও এবং আমার উপর নির্ভর কর, আমি তোমাদের শত্রুদেরকে ঘিরে নেবো। কোন মঙ্গল লাভ করা এবং কোন অমঙ্গল হতে রক্ষা পাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না। তোমরা যদি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর কর তবে তিনিই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট।' এ সম্পর্কেই এখন উহুদ যুদ্ধের বর্ণনা শুরু হচ্ছে, যার মধ্যে মুসলমানদের ধৈর্য ও সহনশীলতার বর্ণনা রয়েছে এবং যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার পরীক্ষার পূর্ণচিত্র ও যদ্দ্বারা মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ প্রকাশ পেয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

আলে ইমরান 3:120

১১৮-১২০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- এরা তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা তাদের বাহ্যিক মিষ্ট কথায় ভুলে যেও না এবং তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ো না। নতুবা তারা সুযোগ পেয়ে তোমাদেরকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তদের ভেতরের শত্রুতা তখন প্রকাশ পেয়ে যাবে। তোমরা তাদের নিকট তোমাদের গুপ্ত কথা কখনও প্রকাশ করো না। (আরবী) বলা হয় মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধুকে এবং (আরবী) দ্বারা ইসলাম ছাড়া অন্যান্য সমস্ত দলকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যে নবীকেই প্রেরণ করেছেন এবং যে প্রতিনিধিকেই নিযুক্ত করেছেন, তাঁর জন্যে তিনি দু’জন বন্ধু নির্ধারিত করেছেন। একজন তাকে ভাল কথা বুঝিয়ে থাকেন ও ভালকার্যে উৎসাহ দিয়ে থাকেন এবং অপরজন তাকে মন্দকার্যের পথ-প্রদর্শন করে ও সেই কার্যে উত্তেজিত করে। সুতরাং আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন সেই রক্ষা পেতে পারে।' হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে বলা হয়ঃ ‘এখানে ‘হীরার’ একজন লোক রয়েছে, খুব ভাল লিখতে পরে এবং তার স্মরণশক্তি খুব ভাল সুতরাং আপনি তাকে আপনার লিখক নিযুক্ত করুন।' একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ তাহলে তো আমি একজন অমুসলিমকে আমার বন্ধু বানিয়ে নেবো যা আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছেন’! এ ঘটনাটিও এ আয়াতটিকে সামনে রেখে চিন্তা করলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে যে, যিম্মী কাফিরদেরকেও এরূপ কার্যে নিয়োগ করা উচিত নয়। কেননা, হতে পারে যে, তারা শত্রুপক্ষকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত করবে এবং তাদেরকে সতর্ক করে দেবে। কারণ, মুসলমানদের পতনই তাদের কাম্য। হযরত আযহার ইবনে রাশেদ (রঃ) বলেন যে, মানুষ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট হাদীস শুনতেন। কোন হাদীসের ভাবার্থ বোধগম্য না হলে তারা হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর নিকট তা বুঝে নিতেন। একদা হযরত আনাস (রাঃ) নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করেনঃ “তোমরা অংশীবাদীদের অগ্নি হতে আলোক গ্রহণ। করো না এবং স্বীয় আংটিতে আরবী অংকন করো না। তারা এসে খাজা সাহেবকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ দ্বিতীয় বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমরা আংটিতে মুহাম্মদ (সঃ)-এর নাম খোদাই করো না এবং প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘তোমরা নিজেদের কার্যের ব্যাপারে মুশরিকদের পরামর্শ গ্রহণ করো না।' দেখুন, আল্লাহ তা'আলাও স্বীয় গ্রন্থে বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্যদের বিশ্বস্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না'। (আবু ইয়ালা) কিন্তু খাজা সাহেবের এ ব্যাখ্যাটি একটি বিবেচ্য বিষয়। সম্ভবতঃ হাদীসটির সঠিক ভাবার্থ হবেঃ (আরবী) (৪৯:২৯) আরবী অক্ষরে আংটির উপর খোদাই করো না। যেমন অন্য হাদীসে এর নিষিদ্ধতা পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এর কারণ এই যে, এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোহরের সঙ্গে সাদৃশ্য এসে যাবে। আর প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হবেঃ “তোমরা মুশরিকদের গ্রামের পার্শ্বে থেকো না, তাদের প্রতিবেশী হয়ো না এবং তাদের শহর হতে হিজরত কর।' যেমন সুনান-ই-আবু দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান ও মুশরিকদের মধ্যকার যুদ্ধ কি তোমরা দেখ না? অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যারা মুশরিকদের সাথে মেলামেশা করে, তাদের সাথে বসবাস করে, তারা তাদের মতই।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের কথাতেও শুক্রতা প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের চেহারা দেখেই শুভাশুভ নিরূপকগণ তাদের ভেতরের দুষ্টামির কথা জানতে পারে। তাদের অন্তরে যে ধ্বংসাত্মক মনোভাব রয়েছে তা তোমাদের জানা নেই। কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম। সুতরাং জ্ঞানীরা কখনও তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়বে না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, এটা কত বড় দুর্বলতার কথা যে, তোমরা তাদেরকে ভালবাসছো, অথচ তারা তোমাদেরকে চায় না। তোমরা সমস্ত গ্রন্থকে স্বীকার করে থাক বটে, কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যেই পড়ে রয়েছে। তোমরা তাদের গ্রন্থে বিশ্বাস কর বটে, কিন্তু তারা তোমাদের গ্রন্থে বিশ্বাস করে না। অতএব, উচিত তো ছিল যে, তোমরা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে দেখতে। পক্ষান্তরে তারা কিন্তু তোমাদের প্রতি শত্রুতাই পোষণ করছে।তারা মুসলমানদের মুখোমুখি হলে নিজেদের ঈমানদারীর কাহিনী বলতে আরম্ভ করে। কিন্তু যখনই তাদের হতে পৃথক হয় তখনই হিংসা ও ক্রোধে নিজেদের অঙ্গুলি কামড়াতে থাকে। সুতরাং মুসলমানদের উচিত যে, তারা যেন মুনাফিকদের বাহ্যিক ভাব দেখেই তাদেরকে বন্ধু মনে না করে। এ মুনাফিকরা মুসলমানদের উন্নতি দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরলেও আল্লাহ তা'আলা ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি সাধন করতেই থাকবেন। মুসলমানরা সর্বদিক দিয়ে বেড়েই চলবে, যদিও মুশরিক ও মুনাফিকরা হিংসা ও ক্রোধে জ্বলে পুড়ে মরে যায়। আল্লাহ পাক তাদের অন্তরের কথা খুব ভাল করেই জানেন। তাদের সমুদয় ষড়যন্ত্রের উপর মাটি পড়ে যাবে এবং তারা তাদের জঘন্য কার্যে কৃতকার্য হবে না। তারা মুসলমানদের উন্নতি চায় না তথাপি মুসলমানেরা দিন দিন উন্নতি লাভ করতেই থাকবে এবং পরকালেও তাদেরকে সুখময় জান্নাতে দেখতে পাবে। পক্ষান্তরে এ মুশরিক ও মুনাফিকরা ইহজগতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তারা জাহান্নামের জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হবে। তারা যে তোমাদের চরমশ তার বড় প্রমাণ এই যে, যখন তোমাদের কোন মঙ্গল সাধিত হয় তখন তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোন ক্ষতি সাধিত হয় তখন তারা তাতে আনন্দ লাভ করে। অর্থাৎ যখন আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সাহায্য করেন এবং তারা কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করতঃ যুদ্ধলব্ধ দ্রব্য প্রাপ্ত হয় তখন ঐ মুনাফিকরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। আর যখন মুমিনগণ পরাজয় বরণ করে তখন তারা কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এখন মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেন‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা তাদের দুষ্টামি হতে মুক্তি পেতে চাও তবে ধৈর্যধারণ কর, সংযমী হও এবং আমার উপর নির্ভর কর, আমি তোমাদের শত্রুদেরকে ঘিরে নেবো। কোন মঙ্গল লাভ করা এবং কোন অমঙ্গল হতে রক্ষা পাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না। তোমরা যদি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর কর তবে তিনিই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট।' এ সম্পর্কেই এখন উহুদ যুদ্ধের বর্ণনা শুরু হচ্ছে, যার মধ্যে মুসলমানদের ধৈর্য ও সহনশীলতার বর্ণনা রয়েছে এবং যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার পরীক্ষার পূর্ণচিত্র ও যদ্দ্বারা মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ প্রকাশ পেয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

আলে ইমরান 3:121

১২১-১২৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে উহুদ যুদ্ধের ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে। তবে কোন কোন মুফাসসির এটাকে পরীখার ঘটনাও বলেছেন। কিন্তু এটা উহুদ যুদ্ধের ঘটনা হওয়াই সঠিক কথা। উহুদের যুদ্ধ হিজরী তৃতীয় সনের ১১ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়। বদরের যুদ্ধে মুশরিকরা পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছিল। তাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক সেই যুদ্ধে মারা যায়। তখন ওর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। ঐ ব্যবসায়ের মাল যা বদরের যুদ্ধের সময় অন্য পথে রক্ষা পেয়েছিল ঐ সবগুলোই তারা এ যুদ্ধের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছিলো। চুতর্দিক থেকে লোক সংগ্রহ করে তারা তিন হাজার সৈন্যের এক বিরাট সেনাবাহিনী গঠন করে পূর্ণ আসবাসপত্রসহ মদীনার উপর আক্রমণ করে। এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর নামায শেষে হযরত মালিক ইবনে আমর (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়িয়ে দেন, তিনি ছিলেন বনী নাজ্জার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তিনি জনগণকে পরামর্শ গ্রহণ উদ্দেশ্যে বলেনঃ “এ আক্রমণ প্রতিহত করার সর্বোত্তম পন্থা তোমাদের নিকট কি আছে?” তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বলেনঃ “আমাদের মদীনার বাইরে যাওয়া উচিত নয়। যদি তারা এসে বাইরে অবস্থান করে তবে যেন জেলখানার মধ্যে পড়ে যাবে। আর যদি মদীনার ভেতরে প্রবেশ করে তবে একদিকে রয়েছে আমাদের বীর পুরুষদের তরবারীসমূহ এবং অপর দিকে রয়েছে আমাদের তীরন্দাজদের লক্ষ্যভ্রষ্টহীন তীরগুলো। আর যদি তারা এমনি ফিরে যায় তবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই ফিরে যাবে।” কিন্তু তার মতের বিপরীত মত পেশ করেছিলন ঐ সাহাবীবৃন্দ যারা বদর যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তারা খুব জোর দিয়ে বলছিলেন যে, মদীনার বাইরে গিয়ে প্রাণ খুলে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ী গমন করেন এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসেন। তখন ঐ সাহাবীগণের ধারণা হয় যে, না জানি তারা হয়তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইচ্ছের বিপরীত মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেছেন। তাই তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! যদি এখানে থেকেই যুদ্ধ করা ভাল মনে করেন তবে তাই করুন, আমাদের পক্ষ হতে কোন হঠকারিতা নেই।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ নবী (সঃ)-এর জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, তিনি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার পর তা খুলে ফেলবেন। এখন আমি আর ফিরে যেতে পারি না। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাক যা চান তাই সংঘটিত না হয়। অতএব তিনি এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনার বাইরে বেরিয়ে পড়েন। শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছার পর ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিশ্বাসঘাতকতা করতঃ তার তিনশ লোক নিয়ে ফিরে আসে। তারা বলে যে, যুদ্ধ যে হবে না এটা জানা কথা কাজেই অযথা কষ্ট করে লাভ কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের গ্রাহ্য না করে অবশিষ্ট সাতশ সাহাবীকে নিয়েই উহুদ পর্বত অভিমুখে রওয়ানা হন। পর্বতকে পিছনে করতঃ পর্বত উপত্যকায় তিনি সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দেন এবং তাদের নির্দেশ দেন, আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ শুরু করবে না।' পঞ্চাশজন তীরন্দাজ সাহাবীকে পৃথক করতঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁদের আমীর নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমারা পাহাড়ের উপর উঠে যাও এবং এটা লক্ষ্য রাখ যে, শত্রুরা যেন পিছন দিক থেকে আসতে না পারে। জেনে রেখো, আমরা জয়যুক্ত হবো। (আল্লাহ না করেন) আমরা যদি পরাজিত হয়েই যাই তথাপিও তোমরা কখনও তোমাদের জায়গা থেকে সরবে না। এসব সুব্যবস্থা করার পর স্বয়ং তিনিও প্রস্তুত হয়ে যান। তিনি দুটি লৌহবর্ম পরিধান করেন। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ)-কে পতাকা প্রদান করেন। এদিন কয়েক জন। বালককেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে দেখা যায়। এ ক্ষুদে সৈনিকেরাও আল্লাহর পথে প্রাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অন্যান্য বালককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সঙ্গে নেননি। পরিখার যুদ্ধে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। পরিখার যুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের দু’বছর পরে সংঘটিত হয়েছিল। কুরাইশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত আঁকজমকের সাথে মোকাবেলায় এগিয়ে আসে। তাদের সৈন্য সংখ্য ছিল তিন হাজার। তাদের সঙ্গে দু’শটি সুসজ্জিত অশ্ব যেগুলো সময়ে কাজে আসতে পারে বলে সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের ডান অংশে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বাম অংশে ছিলেন ইকরামা ইবনে আবূ জেহেল (এরা দু’জন পরে মুসলমান হয়েছিলেন)। তাদের পতাকা বাহক ছিল বানূ আবদুদ্দার গোত্র। অতঃপর যুদ্ধ আরম্ভ হয়। যুদ্ধের বিস্তারিত ঘটনাবলী ঐ সম্পৰ্কীয় আয়াতগুলোর তাফসীরের সঙ্গে ইনশাআল্লাহ ক্রমাগত বর্ণিত হতে থাকবে। মোটকথা এ আয়াতে ওরই বর্ণনা হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনা হতে বের হয়ে সৈন্যগণকে যুদ্ধের যথাস্থানে নিযুক্ত করতে থাকেন। সৈন্যশ্রেণীর দক্ষিণ বাহু ও বাম বাহু নির্ধারণ করেন।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত কথা শুনে থাকেন এবং তিনি সকলের অন্তরের কথা জানেন।বর্ণনাসমূহে রয়েছে যে, শুক্রবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধের জন্যে মদীনা হতে বের হন। কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “হে নবী (সঃ)! বিশ্বাসীদেরকে যুদ্ধার্থ যথাস্থানে সংস্থাপিত করবার জন্যে তুমি প্রভাতেই পরিজন হতে বের হয়েছিলে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, শুক্রবারে বের হয়ে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং অন্যান্য কাজ-কর্ম শুরু হয় শনিবার দিন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আয়াতটি আমাদের সম্বন্ধে অর্থাৎ বানূ হারেসা ও বান্ সালমার গোত্রদ্বয়ের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। আমাদেরকে বলা হয়- “তোমরা দু'টি দল কাপুরুষতা প্রদর্শনের ইচ্ছে করেছিলে।” এতে আমাদের একটি দুর্বলতার বর্ণনা রয়েছে বটে, কিন্তু এ আয়াতটিকে আমাদের পক্ষে অতি উত্তম বলে মনে করি। কেননা, এ আয়াতে এও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ঐ দলদ্বয়ের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে বদরের যুদ্ধেও বিজয়ী করেছি, অথচ তোমরা অতি অল্পসংখ্যক ছিলে এবং তোমাদের আসবাবপত্রও অতি নগণ্য ছিল। বদরের যুদ্ধ হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ই রামাযানুল মুবারাক রোজ শুক্রবার সংঘটিত হয়। ঐদিনকেই ‘ইয়াওমুল ফুরকান বা পৃথককারী দিন বলা হয়। সেই দিন ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মান লাভ হয় এবং শিরক ধ্বংস হয়ে যায়, শিরকের স্থান বিধ্বস্ত হয়। অথচ সেই দিন মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশ তেরজন। তাদের নিকট ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া, সত্তরটি উট এবং অবশিষ্ট সবাই পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করেছিলেন। অস্ত্রশস্ত্র এত অল্প ছিল যে, যেন ছিলই না। পক্ষান্তরে শত্রুর সংখ্যা ছিল সে দিন মুসলমানদের তিনগুণ, এক হাজারের কিছু কম ছিল। তারা সবাই ছিল বর্ম পরিহিত। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছিল অস্ত্রশস্ত্র এবং যথেষ্ট সংখ্যক সুন্দর সুন্দর ঘোড়া ছিল। তারা এত বড় বড় ধনী ছিল যে, তাদের নিকট স্বর্ণের অলংকার ছিল। এ স্থলে মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্মান ও বিজয় দান করেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের মুখ উজ্জ্বল করেন এবং শয়তান ও তার সঙ্গীদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে ও জান্নাতী সৈন্যদেরকে তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন- “তোমাদের সংখ্যার স্বল্পতা ও বাহ্যিক আসবাবপত্রের অবিদ্যমানতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। যেন তোমরা জানতে পার যে, বিজয় লাভ বাহ্যিক আড়ম্বর ও জাকজমকের উপর নির্ভর করে না।” এ জন্যেই দ্বিতীয় আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন- হুনায়েনের যুদ্ধে তোমরা বাহ্যিক আসবাবপত্রের প্রতি লক্ষ্য করেছিলে এবং নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে খুশী হয়েছিলে। কিন্তু ঐ সংখ্যাধিক্য ও আসবাবপত্রের বিদ্যমানতা তোমাদের কোন উপকারে আসেনি। হযরত আইয়ায় আশআরী (রঃ) বলেনঃ ইয়ারমুকের যুদ্ধে আমাদের পাঁচজন নেতা ছিলেন। তারা হচ্ছেনঃ (১) হযরত আবু উবাইদা (রাঃ), (২) হযরত ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ), (৩) হযরত ইবনে হাসানা, (রাঃ) (৪) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং (৫) হযরত আইয়ায (রাঃ)। আর মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার (রাঃ)-এর নির্দেশ ছিল যে, যুদ্ধের সময় হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) নেতৃত্ব দেবেন। এ যুদ্ধে চতুর্দিক হতেই আমাদের পরাজয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আমরা তখন হযরত উমার (রঃ)-কে পত্র লিখে জানাই- “মৃত্যু আমাদেরকে পরিবেষ্টন করেছে। সুতরাং সাহায্য প্রেরণ করুন। আমাদের এ আবেদনের উত্তরে খলীফা হযরত উমার (রাঃ) আমাদেরকে লিখেন- 'তোমাদের সাহায্য প্রার্থনার পত্র পেয়েছি। আমি তোমাদেরকে এমন এক সত্তার কথা বলছি যিনি সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী এবং যার হাতে শক্তিশালী সৈন্য রয়েছে। ঐ সত্তা হচ্ছেন স্বয়ং মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ। যিনি বদর যুদ্ধে স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন। বদরী সৈন্য তো তোমাদের অপেক্ষা বহু কম ছিলেন। আমার এ পত্র পাঠমাত্রই জিহাদ শুরু করে দাও এবং আমাকে কিছুই লিখবে না ও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। এ পত্র পাঠের পর আমাদের বীরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমরা দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করি। মহান আল্লাহর দয়ায় শত্রুরা পরাজিত হয় এবং পলায়ন করে। আমরা বার মাইল পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। আমরা বহু যুদ্ধলব্ধ মাল প্রাপ্ত হই এবং পরস্পরে বন্টন কর নেই। অতঃপর হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) বলেনঃ “আমার সাথে কে দৌড় প্রতিযোগিতা করবে?' এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে বলেনঃ “আপনি অসন্তুষ্ট না হলে আমি হাজির আছি।' অতঃপর দৌড়ে যুবকটি অগ্রে হয়ে যান। আমি লক্ষ্য করি যে, ঐ দু’জনের চুলেরগুচ্ছ বাতাসে উড়ছিল। হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) ঐ যুবকের পিছনে ঘোড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বদর ইবনে নারীণ নামক একটি ছিল। তার নামেই একটি কূপের নামকরণ করা হয় এবং যে প্রান্তরে ঐ কূপটি ছিল ওটাও বদর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। বদরের যুদ্ধও ঐ নামেই খ্যাতি লাভ করে। মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে এ জায়গাটি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পার।

আলে ইমরান 3:122

১২১-১২৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে উহুদ যুদ্ধের ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে। তবে কোন কোন মুফাসসির এটাকে পরীখার ঘটনাও বলেছেন। কিন্তু এটা উহুদ যুদ্ধের ঘটনা হওয়াই সঠিক কথা। উহুদের যুদ্ধ হিজরী তৃতীয় সনের ১১ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়। বদরের যুদ্ধে মুশরিকরা পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছিল। তাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক সেই যুদ্ধে মারা যায়। তখন ওর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। ঐ ব্যবসায়ের মাল যা বদরের যুদ্ধের সময় অন্য পথে রক্ষা পেয়েছিল ঐ সবগুলোই তারা এ যুদ্ধের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছিলো। চুতর্দিক থেকে লোক সংগ্রহ করে তারা তিন হাজার সৈন্যের এক বিরাট সেনাবাহিনী গঠন করে পূর্ণ আসবাসপত্রসহ মদীনার উপর আক্রমণ করে। এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর নামায শেষে হযরত মালিক ইবনে আমর (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়িয়ে দেন, তিনি ছিলেন বনী নাজ্জার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তিনি জনগণকে পরামর্শ গ্রহণ উদ্দেশ্যে বলেনঃ “এ আক্রমণ প্রতিহত করার সর্বোত্তম পন্থা তোমাদের নিকট কি আছে?” তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বলেনঃ “আমাদের মদীনার বাইরে যাওয়া উচিত নয়। যদি তারা এসে বাইরে অবস্থান করে তবে যেন জেলখানার মধ্যে পড়ে যাবে। আর যদি মদীনার ভেতরে প্রবেশ করে তবে একদিকে রয়েছে আমাদের বীর পুরুষদের তরবারীসমূহ এবং অপর দিকে রয়েছে আমাদের তীরন্দাজদের লক্ষ্যভ্রষ্টহীন তীরগুলো। আর যদি তারা এমনি ফিরে যায় তবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই ফিরে যাবে।” কিন্তু তার মতের বিপরীত মত পেশ করেছিলন ঐ সাহাবীবৃন্দ যারা বদর যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তারা খুব জোর দিয়ে বলছিলেন যে, মদীনার বাইরে গিয়ে প্রাণ খুলে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ী গমন করেন এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসেন। তখন ঐ সাহাবীগণের ধারণা হয় যে, না জানি তারা হয়তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইচ্ছের বিপরীত মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেছেন। তাই তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! যদি এখানে থেকেই যুদ্ধ করা ভাল মনে করেন তবে তাই করুন, আমাদের পক্ষ হতে কোন হঠকারিতা নেই।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ নবী (সঃ)-এর জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, তিনি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার পর তা খুলে ফেলবেন। এখন আমি আর ফিরে যেতে পারি না। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাক যা চান তাই সংঘটিত না হয়। অতএব তিনি এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনার বাইরে বেরিয়ে পড়েন। শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছার পর ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিশ্বাসঘাতকতা করতঃ তার তিনশ লোক নিয়ে ফিরে আসে। তারা বলে যে, যুদ্ধ যে হবে না এটা জানা কথা কাজেই অযথা কষ্ট করে লাভ কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের গ্রাহ্য না করে অবশিষ্ট সাতশ সাহাবীকে নিয়েই উহুদ পর্বত অভিমুখে রওয়ানা হন। পর্বতকে পিছনে করতঃ পর্বত উপত্যকায় তিনি সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দেন এবং তাদের নির্দেশ দেন, আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ শুরু করবে না।' পঞ্চাশজন তীরন্দাজ সাহাবীকে পৃথক করতঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁদের আমীর নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমারা পাহাড়ের উপর উঠে যাও এবং এটা লক্ষ্য রাখ যে, শত্রুরা যেন পিছন দিক থেকে আসতে না পারে। জেনে রেখো, আমরা জয়যুক্ত হবো। (আল্লাহ না করেন) আমরা যদি পরাজিত হয়েই যাই তথাপিও তোমরা কখনও তোমাদের জায়গা থেকে সরবে না। এসব সুব্যবস্থা করার পর স্বয়ং তিনিও প্রস্তুত হয়ে যান। তিনি দুটি লৌহবর্ম পরিধান করেন। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ)-কে পতাকা প্রদান করেন। এদিন কয়েক জন। বালককেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে দেখা যায়। এ ক্ষুদে সৈনিকেরাও আল্লাহর পথে প্রাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অন্যান্য বালককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সঙ্গে নেননি। পরিখার যুদ্ধে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। পরিখার যুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের দু’বছর পরে সংঘটিত হয়েছিল। কুরাইশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত আঁকজমকের সাথে মোকাবেলায় এগিয়ে আসে। তাদের সৈন্য সংখ্য ছিল তিন হাজার। তাদের সঙ্গে দু’শটি সুসজ্জিত অশ্ব যেগুলো সময়ে কাজে আসতে পারে বলে সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের ডান অংশে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বাম অংশে ছিলেন ইকরামা ইবনে আবূ জেহেল (এরা দু’জন পরে মুসলমান হয়েছিলেন)। তাদের পতাকা বাহক ছিল বানূ আবদুদ্দার গোত্র। অতঃপর যুদ্ধ আরম্ভ হয়। যুদ্ধের বিস্তারিত ঘটনাবলী ঐ সম্পৰ্কীয় আয়াতগুলোর তাফসীরের সঙ্গে ইনশাআল্লাহ ক্রমাগত বর্ণিত হতে থাকবে। মোটকথা এ আয়াতে ওরই বর্ণনা হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনা হতে বের হয়ে সৈন্যগণকে যুদ্ধের যথাস্থানে নিযুক্ত করতে থাকেন। সৈন্যশ্রেণীর দক্ষিণ বাহু ও বাম বাহু নির্ধারণ করেন।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত কথা শুনে থাকেন এবং তিনি সকলের অন্তরের কথা জানেন।বর্ণনাসমূহে রয়েছে যে, শুক্রবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধের জন্যে মদীনা হতে বের হন। কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “হে নবী (সঃ)! বিশ্বাসীদেরকে যুদ্ধার্থ যথাস্থানে সংস্থাপিত করবার জন্যে তুমি প্রভাতেই পরিজন হতে বের হয়েছিলে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, শুক্রবারে বের হয়ে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং অন্যান্য কাজ-কর্ম শুরু হয় শনিবার দিন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আয়াতটি আমাদের সম্বন্ধে অর্থাৎ বানূ হারেসা ও বান্ সালমার গোত্রদ্বয়ের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। আমাদেরকে বলা হয়- “তোমরা দু'টি দল কাপুরুষতা প্রদর্শনের ইচ্ছে করেছিলে।” এতে আমাদের একটি দুর্বলতার বর্ণনা রয়েছে বটে, কিন্তু এ আয়াতটিকে আমাদের পক্ষে অতি উত্তম বলে মনে করি। কেননা, এ আয়াতে এও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ঐ দলদ্বয়ের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে বদরের যুদ্ধেও বিজয়ী করেছি, অথচ তোমরা অতি অল্পসংখ্যক ছিলে এবং তোমাদের আসবাবপত্রও অতি নগণ্য ছিল। বদরের যুদ্ধ হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ই রামাযানুল মুবারাক রোজ শুক্রবার সংঘটিত হয়। ঐদিনকেই ‘ইয়াওমুল ফুরকান বা পৃথককারী দিন বলা হয়। সেই দিন ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মান লাভ হয় এবং শিরক ধ্বংস হয়ে যায়, শিরকের স্থান বিধ্বস্ত হয়। অথচ সেই দিন মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশ তেরজন। তাদের নিকট ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া, সত্তরটি উট এবং অবশিষ্ট সবাই পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করেছিলেন। অস্ত্রশস্ত্র এত অল্প ছিল যে, যেন ছিলই না। পক্ষান্তরে শত্রুর সংখ্যা ছিল সে দিন মুসলমানদের তিনগুণ, এক হাজারের কিছু কম ছিল। তারা সবাই ছিল বর্ম পরিহিত। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছিল অস্ত্রশস্ত্র এবং যথেষ্ট সংখ্যক সুন্দর সুন্দর ঘোড়া ছিল। তারা এত বড় বড় ধনী ছিল যে, তাদের নিকট স্বর্ণের অলংকার ছিল। এ স্থলে মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্মান ও বিজয় দান করেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের মুখ উজ্জ্বল করেন এবং শয়তান ও তার সঙ্গীদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে ও জান্নাতী সৈন্যদেরকে তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন- “তোমাদের সংখ্যার স্বল্পতা ও বাহ্যিক আসবাবপত্রের অবিদ্যমানতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। যেন তোমরা জানতে পার যে, বিজয় লাভ বাহ্যিক আড়ম্বর ও জাকজমকের উপর নির্ভর করে না।” এ জন্যেই দ্বিতীয় আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন- হুনায়েনের যুদ্ধে তোমরা বাহ্যিক আসবাবপত্রের প্রতি লক্ষ্য করেছিলে এবং নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে খুশী হয়েছিলে। কিন্তু ঐ সংখ্যাধিক্য ও আসবাবপত্রের বিদ্যমানতা তোমাদের কোন উপকারে আসেনি। হযরত আইয়ায় আশআরী (রঃ) বলেনঃ ইয়ারমুকের যুদ্ধে আমাদের পাঁচজন নেতা ছিলেন। তারা হচ্ছেনঃ (১) হযরত আবু উবাইদা (রাঃ), (২) হযরত ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ), (৩) হযরত ইবনে হাসানা, (রাঃ) (৪) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং (৫) হযরত আইয়ায (রাঃ)। আর মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার (রাঃ)-এর নির্দেশ ছিল যে, যুদ্ধের সময় হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) নেতৃত্ব দেবেন। এ যুদ্ধে চতুর্দিক হতেই আমাদের পরাজয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আমরা তখন হযরত উমার (রঃ)-কে পত্র লিখে জানাই- “মৃত্যু আমাদেরকে পরিবেষ্টন করেছে। সুতরাং সাহায্য প্রেরণ করুন। আমাদের এ আবেদনের উত্তরে খলীফা হযরত উমার (রাঃ) আমাদেরকে লিখেন- 'তোমাদের সাহায্য প্রার্থনার পত্র পেয়েছি। আমি তোমাদেরকে এমন এক সত্তার কথা বলছি যিনি সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী এবং যার হাতে শক্তিশালী সৈন্য রয়েছে। ঐ সত্তা হচ্ছেন স্বয়ং মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ। যিনি বদর যুদ্ধে স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন। বদরী সৈন্য তো তোমাদের অপেক্ষা বহু কম ছিলেন। আমার এ পত্র পাঠমাত্রই জিহাদ শুরু করে দাও এবং আমাকে কিছুই লিখবে না ও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। এ পত্র পাঠের পর আমাদের বীরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমরা দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করি। মহান আল্লাহর দয়ায় শত্রুরা পরাজিত হয় এবং পলায়ন করে। আমরা বার মাইল পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। আমরা বহু যুদ্ধলব্ধ মাল প্রাপ্ত হই এবং পরস্পরে বন্টন কর নেই। অতঃপর হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) বলেনঃ “আমার সাথে কে দৌড় প্রতিযোগিতা করবে?' এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে বলেনঃ “আপনি অসন্তুষ্ট না হলে আমি হাজির আছি।' অতঃপর দৌড়ে যুবকটি অগ্রে হয়ে যান। আমি লক্ষ্য করি যে, ঐ দু’জনের চুলেরগুচ্ছ বাতাসে উড়ছিল। হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) ঐ যুবকের পিছনে ঘোড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বদর ইবনে নারীণ নামক একটি ছিল। তার নামেই একটি কূপের নামকরণ করা হয় এবং যে প্রান্তরে ঐ কূপটি ছিল ওটাও বদর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। বদরের যুদ্ধও ঐ নামেই খ্যাতি লাভ করে। মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে এ জায়গাটি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পার।

আলে ইমরান 3:123

১২১-১২৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে উহুদ যুদ্ধের ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে। তবে কোন কোন মুফাসসির এটাকে পরীখার ঘটনাও বলেছেন। কিন্তু এটা উহুদ যুদ্ধের ঘটনা হওয়াই সঠিক কথা। উহুদের যুদ্ধ হিজরী তৃতীয় সনের ১১ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়। বদরের যুদ্ধে মুশরিকরা পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছিল। তাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক সেই যুদ্ধে মারা যায়। তখন ওর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। ঐ ব্যবসায়ের মাল যা বদরের যুদ্ধের সময় অন্য পথে রক্ষা পেয়েছিল ঐ সবগুলোই তারা এ যুদ্ধের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছিলো। চুতর্দিক থেকে লোক সংগ্রহ করে তারা তিন হাজার সৈন্যের এক বিরাট সেনাবাহিনী গঠন করে পূর্ণ আসবাসপত্রসহ মদীনার উপর আক্রমণ করে। এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর নামায শেষে হযরত মালিক ইবনে আমর (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়িয়ে দেন, তিনি ছিলেন বনী নাজ্জার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তিনি জনগণকে পরামর্শ গ্রহণ উদ্দেশ্যে বলেনঃ “এ আক্রমণ প্রতিহত করার সর্বোত্তম পন্থা তোমাদের নিকট কি আছে?” তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বলেনঃ “আমাদের মদীনার বাইরে যাওয়া উচিত নয়। যদি তারা এসে বাইরে অবস্থান করে তবে যেন জেলখানার মধ্যে পড়ে যাবে। আর যদি মদীনার ভেতরে প্রবেশ করে তবে একদিকে রয়েছে আমাদের বীর পুরুষদের তরবারীসমূহ এবং অপর দিকে রয়েছে আমাদের তীরন্দাজদের লক্ষ্যভ্রষ্টহীন তীরগুলো। আর যদি তারা এমনি ফিরে যায় তবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই ফিরে যাবে।” কিন্তু তার মতের বিপরীত মত পেশ করেছিলন ঐ সাহাবীবৃন্দ যারা বদর যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তারা খুব জোর দিয়ে বলছিলেন যে, মদীনার বাইরে গিয়ে প্রাণ খুলে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ী গমন করেন এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসেন। তখন ঐ সাহাবীগণের ধারণা হয় যে, না জানি তারা হয়তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইচ্ছের বিপরীত মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেছেন। তাই তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! যদি এখানে থেকেই যুদ্ধ করা ভাল মনে করেন তবে তাই করুন, আমাদের পক্ষ হতে কোন হঠকারিতা নেই।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ নবী (সঃ)-এর জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, তিনি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার পর তা খুলে ফেলবেন। এখন আমি আর ফিরে যেতে পারি না। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাক যা চান তাই সংঘটিত না হয়। অতএব তিনি এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনার বাইরে বেরিয়ে পড়েন। শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছার পর ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিশ্বাসঘাতকতা করতঃ তার তিনশ লোক নিয়ে ফিরে আসে। তারা বলে যে, যুদ্ধ যে হবে না এটা জানা কথা কাজেই অযথা কষ্ট করে লাভ কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের গ্রাহ্য না করে অবশিষ্ট সাতশ সাহাবীকে নিয়েই উহুদ পর্বত অভিমুখে রওয়ানা হন। পর্বতকে পিছনে করতঃ পর্বত উপত্যকায় তিনি সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দেন এবং তাদের নির্দেশ দেন, আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ শুরু করবে না।' পঞ্চাশজন তীরন্দাজ সাহাবীকে পৃথক করতঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁদের আমীর নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “তোমারা পাহাড়ের উপর উঠে যাও এবং এটা লক্ষ্য রাখ যে, শত্রুরা যেন পিছন দিক থেকে আসতে না পারে। জেনে রেখো, আমরা জয়যুক্ত হবো। (আল্লাহ না করেন) আমরা যদি পরাজিত হয়েই যাই তথাপিও তোমরা কখনও তোমাদের জায়গা থেকে সরবে না। এসব সুব্যবস্থা করার পর স্বয়ং তিনিও প্রস্তুত হয়ে যান। তিনি দুটি লৌহবর্ম পরিধান করেন। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ)-কে পতাকা প্রদান করেন। এদিন কয়েক জন। বালককেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে দেখা যায়। এ ক্ষুদে সৈনিকেরাও আল্লাহর পথে প্রাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অন্যান্য বালককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সঙ্গে নেননি। পরিখার যুদ্ধে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। পরিখার যুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের দু’বছর পরে সংঘটিত হয়েছিল। কুরাইশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত আঁকজমকের সাথে মোকাবেলায় এগিয়ে আসে। তাদের সৈন্য সংখ্য ছিল তিন হাজার। তাদের সঙ্গে দু’শটি সুসজ্জিত অশ্ব যেগুলো সময়ে কাজে আসতে পারে বলে সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের ডান অংশে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বাম অংশে ছিলেন ইকরামা ইবনে আবূ জেহেল (এরা দু’জন পরে মুসলমান হয়েছিলেন)। তাদের পতাকা বাহক ছিল বানূ আবদুদ্দার গোত্র। অতঃপর যুদ্ধ আরম্ভ হয়। যুদ্ধের বিস্তারিত ঘটনাবলী ঐ সম্পৰ্কীয় আয়াতগুলোর তাফসীরের সঙ্গে ইনশাআল্লাহ ক্রমাগত বর্ণিত হতে থাকবে। মোটকথা এ আয়াতে ওরই বর্ণনা হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনা হতে বের হয়ে সৈন্যগণকে যুদ্ধের যথাস্থানে নিযুক্ত করতে থাকেন। সৈন্যশ্রেণীর দক্ষিণ বাহু ও বাম বাহু নির্ধারণ করেন।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত কথা শুনে থাকেন এবং তিনি সকলের অন্তরের কথা জানেন।বর্ণনাসমূহে রয়েছে যে, শুক্রবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধের জন্যে মদীনা হতে বের হন। কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “হে নবী (সঃ)! বিশ্বাসীদেরকে যুদ্ধার্থ যথাস্থানে সংস্থাপিত করবার জন্যে তুমি প্রভাতেই পরিজন হতে বের হয়েছিলে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, শুক্রবারে বের হয়ে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং অন্যান্য কাজ-কর্ম শুরু হয় শনিবার দিন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আয়াতটি আমাদের সম্বন্ধে অর্থাৎ বানূ হারেসা ও বান্ সালমার গোত্রদ্বয়ের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। আমাদেরকে বলা হয়- “তোমরা দু'টি দল কাপুরুষতা প্রদর্শনের ইচ্ছে করেছিলে।” এতে আমাদের একটি দুর্বলতার বর্ণনা রয়েছে বটে, কিন্তু এ আয়াতটিকে আমাদের পক্ষে অতি উত্তম বলে মনে করি। কেননা, এ আয়াতে এও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ঐ দলদ্বয়ের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে বদরের যুদ্ধেও বিজয়ী করেছি, অথচ তোমরা অতি অল্পসংখ্যক ছিলে এবং তোমাদের আসবাবপত্রও অতি নগণ্য ছিল। বদরের যুদ্ধ হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ই রামাযানুল মুবারাক রোজ শুক্রবার সংঘটিত হয়। ঐদিনকেই ‘ইয়াওমুল ফুরকান বা পৃথককারী দিন বলা হয়। সেই দিন ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মান লাভ হয় এবং শিরক ধ্বংস হয়ে যায়, শিরকের স্থান বিধ্বস্ত হয়। অথচ সেই দিন মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশ তেরজন। তাদের নিকট ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া, সত্তরটি উট এবং অবশিষ্ট সবাই পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করেছিলেন। অস্ত্রশস্ত্র এত অল্প ছিল যে, যেন ছিলই না। পক্ষান্তরে শত্রুর সংখ্যা ছিল সে দিন মুসলমানদের তিনগুণ, এক হাজারের কিছু কম ছিল। তারা সবাই ছিল বর্ম পরিহিত। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছিল অস্ত্রশস্ত্র এবং যথেষ্ট সংখ্যক সুন্দর সুন্দর ঘোড়া ছিল। তারা এত বড় বড় ধনী ছিল যে, তাদের নিকট স্বর্ণের অলংকার ছিল। এ স্থলে মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্মান ও বিজয় দান করেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের মুখ উজ্জ্বল করেন এবং শয়তান ও তার সঙ্গীদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে ও জান্নাতী সৈন্যদেরকে তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন- “তোমাদের সংখ্যার স্বল্পতা ও বাহ্যিক আসবাবপত্রের অবিদ্যমানতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। যেন তোমরা জানতে পার যে, বিজয় লাভ বাহ্যিক আড়ম্বর ও জাকজমকের উপর নির্ভর করে না।” এ জন্যেই দ্বিতীয় আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন- হুনায়েনের যুদ্ধে তোমরা বাহ্যিক আসবাবপত্রের প্রতি লক্ষ্য করেছিলে এবং নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে খুশী হয়েছিলে। কিন্তু ঐ সংখ্যাধিক্য ও আসবাবপত্রের বিদ্যমানতা তোমাদের কোন উপকারে আসেনি। হযরত আইয়ায় আশআরী (রঃ) বলেনঃ ইয়ারমুকের যুদ্ধে আমাদের পাঁচজন নেতা ছিলেন। তারা হচ্ছেনঃ (১) হযরত আবু উবাইদা (রাঃ), (২) হযরত ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ), (৩) হযরত ইবনে হাসানা, (রাঃ) (৪) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং (৫) হযরত আইয়ায (রাঃ)। আর মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার (রাঃ)-এর নির্দেশ ছিল যে, যুদ্ধের সময় হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) নেতৃত্ব দেবেন। এ যুদ্ধে চতুর্দিক হতেই আমাদের পরাজয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আমরা তখন হযরত উমার (রঃ)-কে পত্র লিখে জানাই- “মৃত্যু আমাদেরকে পরিবেষ্টন করেছে। সুতরাং সাহায্য প্রেরণ করুন। আমাদের এ আবেদনের উত্তরে খলীফা হযরত উমার (রাঃ) আমাদেরকে লিখেন- 'তোমাদের সাহায্য প্রার্থনার পত্র পেয়েছি। আমি তোমাদেরকে এমন এক সত্তার কথা বলছি যিনি সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী এবং যার হাতে শক্তিশালী সৈন্য রয়েছে। ঐ সত্তা হচ্ছেন স্বয়ং মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ। যিনি বদর যুদ্ধে স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন। বদরী সৈন্য তো তোমাদের অপেক্ষা বহু কম ছিলেন। আমার এ পত্র পাঠমাত্রই জিহাদ শুরু করে দাও এবং আমাকে কিছুই লিখবে না ও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। এ পত্র পাঠের পর আমাদের বীরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমরা দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করি। মহান আল্লাহর দয়ায় শত্রুরা পরাজিত হয় এবং পলায়ন করে। আমরা বার মাইল পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। আমরা বহু যুদ্ধলব্ধ মাল প্রাপ্ত হই এবং পরস্পরে বন্টন কর নেই। অতঃপর হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) বলেনঃ “আমার সাথে কে দৌড় প্রতিযোগিতা করবে?' এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে বলেনঃ “আপনি অসন্তুষ্ট না হলে আমি হাজির আছি।' অতঃপর দৌড়ে যুবকটি অগ্রে হয়ে যান। আমি লক্ষ্য করি যে, ঐ দু’জনের চুলেরগুচ্ছ বাতাসে উড়ছিল। হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) ঐ যুবকের পিছনে ঘোড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বদর ইবনে নারীণ নামক একটি ছিল। তার নামেই একটি কূপের নামকরণ করা হয় এবং যে প্রান্তরে ঐ কূপটি ছিল ওটাও বদর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। বদরের যুদ্ধও ঐ নামেই খ্যাতি লাভ করে। মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে এ জায়গাটি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পার।

আলে ইমরান 3:124

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:125

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:126

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:127

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:128

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:129

১২৪-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। হযরত হাসান বসরী (রঃ), আমির (রঃ), শা'বী (রঃ), রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুসলমানদের নিকট এ সংবাদ পৌছে যে, কার ইবনে জাবির মুশরিকদেরকে সাহায্য করবে, কেননা সে মুশরিকদের নিকট এটা অঙ্গীকার করেছিল। এটা মুসলমানদের নিকট খুব কঠিন ঠেকে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। কারূ ইবনে জাবির মুশরিকদের পরাজয়ের সংবাদ শুনে তাদের সাহায্যার্থে আসেনি এবং আল্লাহ তাআলাও পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠাননি। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে প্রথমে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, তার পরে তিন হাজারে পৌছে যায় এবং শেষে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়। এখানে এ আয়াতে তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য দানের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের সময় এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার অঙ্গীকার ছিল। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পিছনে আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্যকারী। (৮:৯) আয়াতদ্বয়ের মধ্যে সমতা এভাবেই হতে পারে। কেননা, তথায় (আরবী) শব্দ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, প্রথমে পাঠান হয়েছিল এক হাজার অতঃপর তাদের পরে আর দু’হাজার পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজার করা হয় এবং সর্বশেষে আরও দু’হাজার প্রেরণ করে তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌছিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যতঃ এটাই জানা যাচ্ছে যে, এ অঙ্গীকার ছিল বদরের যুদ্ধের জন্যে, উহুদের যুদ্ধের জন্যে নয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এ অঙ্গীকার উহুদের যুদ্ধের জন্যেই ছিল। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মূসা ইবনে উকবা (রঃ) প্রভৃতির এটাই উক্তি কিন্তু তারা বলেন যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরে পড়েছিলেন বলে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি। কেননা, সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও'-এ কথা বলেছেন। (আরবী) শব্দের কয়েকটি অর্থ রয়েছেঃ (১) নিমিষে, (২) ক্রোধ ও (৩) ভ্রমণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে চিহ্ন বিশিষ্ট। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন ফেরেশতাদের চিহ্নছিল সাদা পশম। আর তাদের ঘোড়ার চিহ্ন ছিল মস্তকের শুভ্রতা, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, তাদের লাল পশমের চিহ্ন ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্কন্ধের চুল ও লেজের চিহ্ন ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর এ চিহ্নই ছিল। অর্থাৎ পশমের চিহ্ন। মাকহুল (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল পশমের শিরস্ত্রাণ এবং ঐ গুলোর রং ছিল কাল। হুনায়েনের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা এসেছিলেন তাঁদের চিহ্ন ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী। তারা এসেছিলেন শুধুমাত্র সাহায্য করার জন্যে ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। তারা যুদ্ধ করেনি। এও বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর মাথায় ছিল সাদা রঙ্গের পাগড়ী এবং ফেরেশতাদের মস্তকোপরি হলদে রঙ্গের পাগড়ী ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করা এবং তোমাদেরকে এর সুসংবাদ দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তোমাদের মনে শান্তি আনয়ন করা। নচেৎ আল্লাহ তা'আলা এত ব্যাপক ক্ষমতাবান যে, তিনি ফেরেশতা অবতীর্ণ না করেও এবং তোমাদের যুদ্ধ ছাড়াও তোমাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। সাহায্য শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই এসে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে এবং যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের দিক হতে প্রতিশোধ নিতেন, কিন্তু যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন; আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদের কার্যাবলী কখনও বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইঙ্গিত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি তাদেরকে ওটা চিনিয়ে দেবেন। তিনি মহাসম্মানিত এবং প্রত্যেক কার্যে বড় বিজ্ঞানময়। এ জিহাদের। নির্দেশও বিভিন্ন প্রকারের নিপুণতায় পরিপূর্ণ। এর ফলে কাফিরেরা ধ্বংস হবে বা লাঞ্ছিত হবে কিংবা তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে যাবে।এরপরে বলা হচ্ছে- নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কোন কার্যের অধিকার তোমার নেই। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।'(১৩:৪০) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তোমার নেই, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করে থাকেন।' (২:২৭২) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে সুপথ দেখাতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান সুপথ দেখিয়ে থাকেন। (২৮:৫৬) সুতরাং হে নবী! আমার বান্দাদের কার্যের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। তোমার কাজ তো শুধু তাদের নিকট আমার নির্দেশ পৌছিয়ে দেয়া। এও সম্ভবনা রয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক প্রদান করবেন, ফলে তারা মন্দ কার্যের পর ভাল কার্য করতে থাকবে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন। অথবা এরও সম্ভবনা রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে তাদের কুফ্র ও পাপ কার্যের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন। তখন এটা কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অত্যাচার হবে না, বরং তারা তারই উপযুক্ত। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযে যখন দ্বিতীয় রাকআতের রুকূ' হতে মস্তক উত্তোলন করতেন এবং (আরবী) বলে নিতেন তখন তিনি কাফিরদের উপর বদদুআ করতঃ বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। সে সম্বন্ধেই (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। যে কাফিরদের জন্যে তিনি বদদু'আ করতেন, মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে ওদের নামও এসেছে। যেমন হারিস ইবনে হিশাম, সাহল ইবনে উমার এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। ওর মধ্যেই রয়েছে যে, শেষে ঐ লোকগুলো হিদায়াত প্রাপ্ত হয় ও মুসলমান হয়ে যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ বদদু'আ চার ব্যক্তির উপর ছিল, যা হতে তাঁকে বিরত রাখা হয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কারও উপর বদদু'আ বা ভাল দু'আ করার ইচ্ছে করতেন তখন রুকুর পরে (আরবী) বলার পর দুআ করতেন। কখনো বলতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালমা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে আবু রাবী'আ এবং দুর্বল মুমিনদেরকে কাফিরদের হাত হতে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! মুযির গোত্রের উপর ধরপাকড় শাস্তি অবতীর্ণ করুন এবং তাদেরকে এমন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে ছিল।' এ প্রার্থনা তিনি উচ্চৈঃস্বরে করতেন। আবার কোন সময় ফজরের নামাযের কুনূতে এ কথাও বলতেনঃ হে আল্লাহ! অমুক অমুকের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন এবং আরবের কতকগুলো গোত্রের নাম নিতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে যায়, মুখমণ্ডল আহত হয় এবং রক্ত বইতে থাকে তখন পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ঃ ‘ঐ সম্প্রদায় কিরূপে মুক্তি পেতে পারে যে স্বীয় নবীর সাথে এরূপ ব্যবহার করলো? অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছিলেন। তখন (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি ঐ যুদ্ধে একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল, কতক তো এ কারণে এবং একটি কারণ এও ছিল যে, তিনি দু’টি বর্ম পরিহিত ছিলেন, কাজেই উঠতে পারেননি। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত সালিম (রাঃ) তথায় পৌঁছেন এবং তার চেহারা মুবারক হতে রক্ত মুছে নেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি এ কথা বলেন এবং ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বস্তু তাঁরই। সবাই তাঁর দাস। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। তিনি যা চান তাই নির্দেশ দেন। কেউ তাঁর কার্যের হিসেব নিতে পারে না। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আলে ইমরান 3:130

১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'

আলে ইমরান 3:131

১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'

আলে ইমরান 3:132

১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'

আলে ইমরান 3:133

১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'

আলে ইমরান 3:134

১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'