Tafseer ibn Kathir — আলে ইমরান 3:135 – আলে ইমরান 3:162
Contents
- আলে ইমরান 3:135
- আলে ইমরান 3:136
- আলে ইমরান 3:137
- আলে ইমরান 3:138
- আলে ইমরান 3:139
- আলে ইমরান 3:140
- আলে ইমরান 3:141
- আলে ইমরান 3:142
- আলে ইমরান 3:143
- আলে ইমরান 3:144
- আলে ইমরান 3:145
- আলে ইমরান 3:146
- আলে ইমরান 3:147
- আলে ইমরান 3:148
- আলে ইমরান 3:149
- আলে ইমরান 3:150
- আলে ইমরান 3:151
- আলে ইমরান 3:152
- আলে ইমরান 3:153
- আলে ইমরান 3:154
- আলে ইমরান 3:155
- আলে ইমরান 3:156
- আলে ইমরান 3:157
- আলে ইমরান 3:158
- আলে ইমরান 3:159
- আলে ইমরান 3:160
- আলে ইমরান 3:161
- আলে ইমরান 3:162
আলে ইমরান 3:135
১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'
আলে ইমরান 3:136
১৩০-১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের সুদ আদান প্রদান হতে এবং ভক্ষণ হতে নিষেধ করেছেন। অজ্ঞতা যুগের লোকেরা সুদের উপর ঋণ প্রদান করতো। ঋণ পরিশোধের একটি সময় নির্ধারিত হতো। ঐ সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সময় বাড়িয়ে দিয়ে সুদের উপর সুদ বৃদ্ধি করা। হতো। এভাবে চক্রাকারে সুদ বৃদ্ধি পেতে পেতে মূলধন কয়েক গুণ হয়ে যেতো। মহান আল্লাহ স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে এরূপ অন্যায়ভাবে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করতে চরমভাবে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করতঃ ওর উপর মুক্তিদানের অঙ্গীকার করছেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ তদীয় রাসূলের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দান করতঃ ওর উপর করুণা প্রদর্শনের ওয়াদা দিচ্ছেন। এরপর ইহজগত ও পরজগতের মঙ্গল লাভের জন্য তাদের সৎকার্যের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং জান্নাতের প্রশংসা করছেন। এর প্রস্থ বর্ণনা করতঃ দৈর্ঘ্যের অনুমানের ভার শ্রোতাদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন। যেমন তিনি জান্নাতী বিছানার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ওর ভেতর হবে নরম রেশমের। (৫৫:৫৪) ভাবার্থ এই যে, ভেতরই যখন এরূপ তখন বাহির কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে এখানেও বলা হচ্ছে যে, জান্নাতের প্রস্থই যখন সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের সমান, তখন দৈর্ঘ্য কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কেউ কেউ বলেন যে, জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। কেননা, জান্নাত গম্বুজের মত আরশের নীচে রয়েছে এবং যে জিনিস গম্বুজ সদৃশ তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত যা করলে ফিরদাউস যা করো। এটাই সবচেয়ে উঁচু ও সর্বোত্তম জান্নাত। এ জান্নাতের মধ্য দিয়েই সমস্ত নদী প্রবাহিত হয় এবং ওর ছাদই হচ্ছে পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর আরশ।' মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি প্রতিবদিমূলক পত্র লিখে পাঠায়। পত্রে লিখা ছিল- আপনি আমাকে এমন জান্নাতের দিকে আহবান করছেন যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। তাহলে বলুন, জাহান্নাম কোথায় গেল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সুবহান্নাল্লাহ! যখন দিন আসে তখন রাত কোথায় যায়? যে দূতটি হিরাক্লিয়াসের পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলো তার সাথে হিমস নামক স্থানে হযরত আবূ ইয়ালার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হযরত আবু ইয়ালা বলেন যে, ঐ সময় উক্ত দূতটি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে বলেঃ যখন আমি পত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করি তখন তিনি উক্ত পত্রটি তাঁর বাম দিকের একজন সাহাবীকে প্রদান করেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করিঃ ‘তার নাম কি?' জনগণ বলেনঃ ‘ইনি হচ্ছেন হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। হযরত উমারকেও (রাঃ) এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন ও রাতের সময় দিন কোথায় যায়?' এ উত্তর শুনে ইয়াহূদী লজ্জিত হয়ে বলেঃ ‘এটা তাওরাত হতেই গ্রহণ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ উত্তর বর্ণিত আছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন প্রত্যেক জিনিসের উপর রাত এসে যায় তখন দিন কোথায় যায়?' তখন সে বলেঃ “যেখানে আল্লাহ চান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ রকমই জাহান্নামও সেখানেই যায়। যেখানে আল্লাহ চান। (বাযযারা) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, রাত্রে যদিও আমরা দিনকে দেখতে পাই না, তথাপি দিন কোন জায়গায় থাকা অসম্ভব নয়। অনুরূপভাবে যদিও জান্নাতের বিস্তার এত বেশী তথাপি জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন সেখানে ওটাও রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যখন দিন একদিকে চড়ে যায় তখন রাত অন্য দিকে থাকে। দ্রুপ জান্নাত সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে। কাজেই এ দুয়ের অবস্থানের কোন অসুবিধে নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪) কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে। (আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়? জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো! কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা, তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল। তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে। তারপরে তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?' জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিনি বলেনঃ না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম) একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ দরিদ্র কে তোমরা জান কি? সাহাবীগণ বলেনঃ যার কোন ধন-সম্পদ নেই। তিনি বলেনঃ না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'। (মুসনাদ-ইআহমাদ) হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন। তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “রাগ করো না।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন। কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ রাগ করো না।' তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ) মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন। তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি। সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে, “যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন। যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবি দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ (১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি চায় যে, তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে, সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ! তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর। ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি কোন পাপ কার্য করে, অতঃপর আল্লাহ পাকের সামনে হাযির হয়ে বলেঃ হে আমার প্রভু! আমার দ্বারা পাপকার্য সাধিত হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যদিও পাপকার্য করেছে, কিন্তু তার বিশ্বাস রয়েছে যে, তার প্রভু তাকে পাপের কারণে ধরতেও পারেন, আবার ক্ষমা করতেনও পারেন, আমি আমার ঐ বান্দার পাপ ক্ষমা করে দিলাম। সে আবার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা এবারেও ক্ষমা করেন। বার পাপ করে ও তাওবা করে, আল্লাহ পাক তৃতীয়বারও ক্ষমা করেন। সে চতুর্থবার পাপ করে ও তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করতঃ বলেনঃ “আমার বান্দা এখন যা ইচ্ছে আমল করুক'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন আমরা আপনাকে দর্শন করি তখন আমাদের অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয় এবং আমরা মুত্তাকী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আপনার নিকট হতে চলে যাই তখন ঐ অবস্থা আর থাকে না, ছেলে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং পারিবারিক কাজ কর্মে লেগে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, আমার নিকট অবস্থান কালে তোমাদের মনের অবস্থা যেমন থাকে, যদি সর্বদা এরূপ থাকতো তবে ফেরেশতাগণ তোমাদের করমর্দন করতেন এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তোমাদের বাড়ীতেই আগমন করতেন। মনে রেখো, তোমরা যদি পাপ কর্ম না কর তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবেন এবং অন্য এক সম্প্রদায়কে এখানে বসিয়ে দেবেন যারা পাপকার্য করবে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।' আমরা বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতের ভিত্তি কিসের তৈরী তা আমাদেরকে বলুন।' তিনি বলেনঃ ‘একটি সোনার ইট ও একটি চাদির ইট এবং ওর গারা (দেয়াল ইত্যাদি বাঁধবার জন্যে চুন, বালি ও মাটি পানিতে মিশিয়ে যে কাদা তৈরী করা হয়) খাটি মৃগনাভির। ওর পাথর মনি মুক্তার এবং মাটি হচ্ছে যাফরানের। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কখনও শেষ হবে না। তথায় হবে চিরস্থায়ী জীবন। তথাকার অধিবাসীদের কাপড় কখনও পুরাতন হবে না। তাদের যৌবন ক্ষয় হবে না।' তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য হয় নাঃ (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ, (২) রোযাদার ব্যক্তি এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তি। তাদের প্রার্থনা মেঘে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং ওর জন্যে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ‘আমার মর্যাদার শপথ! কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকার্য করার পর অযু করতঃ দুই রাকাআত নামায আদায় করে এবং পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে, মহাসম্মানিত আল্লাহ তার পাপ মার্জনা করে দেন। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিমে রয়েছে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে অযু করতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল' পাঠ করে, তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) সুন্নাত অনুযায়ী অযু করেন অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার মত অযু করে, অতঃপর খাটি অন্তরে দু'রাকা'আত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে দেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)এটাই সেই কল্যাণময় আয়াত যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় ইবলীস কাঁদতে আরম্ভ করেছিল। (মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক) মুসনাদ-ই-আবূ ইয়া’লার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) খুব বেশী করে পাঠ কর এবং সদা-সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। ইবলীস পাপের মাধ্যমে মানুষকে ধ্বংস করতে চায় এবং তার নিজের ধ্বংস রয়েছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু পাঠে ও ক্ষমা প্রার্থনায়। এ অবস্থা দেখে ইবলীস মানুষকে প্রবৃত্তির উপাসনায় নিক্ষেপ করেছে। সুতরাং মানুষ নিজেকে সঠিক পথের পথিক বলে মনে করে, অথচ সে ধ্বংসের পথে রয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইবলীস বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনার মার্যাদার শপথ! আমি আদম সন্তানকে তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট করতে থাকবো।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ “আমার মাহাত্ম্য ও মর্যাদার শপথ! যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকবো।' মুসনাদ-ই-বায্যারে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি পাপকার্য করেছি।' তিনি বলেনঃ তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি তাওবা করেছি, পরে আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বলেনঃ পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ ‘আমার দ্বারা পুনরায় পাপকার্য সাধিত হয়েছে।' তিনি বলেনঃ ‘পুনরায় তাওবা কর।' সে বলেঃ আমি আবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাক, শেষ পর্যন্ত শয়তান পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। এর পর বলা হচ্ছে- ‘পাপ মার্জনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন বন্দী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘সে প্রকৃত অধিকারীকেই অধিকার প্রদান করেছে।' হঠকারিতা না করার ভাবার্থ এই যে, তাওবা না করেই সে পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। কয়েকবার পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়লে কয়েকবার ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। মুসনাদ-ই-আবু ইয়া'লার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপরে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা জানে।' অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবূলকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?' (৯:১০৪) অন্য স্থানে রয়েছে- 'যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ করে। কিংবা নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়ালু পাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর বর্ণনা করেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। যারা কথা বানিয়ে বলে তাদের দুর্ভাগ্য এবং যারা পাপকার্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরও দুর্ভাগ্য। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের ঐ সব সত্ত্বার্যের পুরস্কার হবে তাদের প্রভুর পক্ষ হতে মার্জনা, এমন উদ্যানসমূহ যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং কর্মীদের জন্যে কি সুন্দর প্রতিদান।'
আলে ইমরান 3:137
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:138
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:139
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:140
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:141
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:142
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:143
১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
আলে ইমরান 3:144
১৪৪-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: উহুদ প্রান্তরে মুসলমানগণ পরাজিতও হয়েছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মুহাম্মাদও (সঃ) শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ' নামক একজন কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে-‘আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে আসছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ উক্তিও মিথ্যা ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণ করেছিল বটে কিন্তু তাতে শুধুমাত্র তাঁর চেহারা মুবারক কিছুটা আহত হয়েছিল, তাছাড়া আর কিছুই নয়। এ মিথ্যা সংবাদে মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যায়, তাঁদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, পূর্বের নবীদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হবেন কিন্তু আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারীকে উহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারী (রাঃ)-কে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ 'যদি এ সংবাদ সত্য হয় তবে তিনি তার কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই তাঁর ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন। ঐ সমন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাত বা মৃত্যু এমন কিছু নয় যে, তোমরা আল্লাহ পাকের ধর্ম হতে পশ্চাদপদে ফিরে যাবে এবং যে এভাবে ফিরে যাবে সে মহান আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেব না। আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদেরকেই উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন যারা তার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তাঁর ধর্মের সাহায্যের কার্যে লেগে পড়ে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণে সুদৃঢ় থাকে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) জীবিত থাকুন আর নাই থাকুন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেন এবং মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করতঃ জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হিবরার চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তিনি পবিত্র মুখমণ্ডল হতে চাদর সরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুম্বন দান করেন এবং কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেনঃ “আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আল্লাহ তাআলার শপথ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দু’বার মৃত্যু দিতে পারেন না। যে মৃত্যু তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল তার উপর এসে গেছে।' এরপর তিনি পুনরায় মসজিদে আগমন করেন এবং দেখেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি তাঁকে বলেনঃ ‘নীরবতা অলম্বন করুন। তাকে নীরব করে দিয়ে তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপাসনা করতা সে যেন জেনে নেয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে সে যেন সন্তুষ্ট থাকে যে, আল্লাহ পাক জীবিত আছেন। মৃত্যু তার উপর পতিত হয় না।' অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। জনগণের অনুভূতি এই হয় যে, আয়াতটি যেন তখনই অবতীর্ণ হলো। তখন তো প্রত্যেকের মুখেই আয়াতটি উচ্চারিত হলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আর এ জগতে নেই। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মুখে এ আয়াতটির পাঠ শ্রবণ করে হযরত উমার (রাঃ)-এর চরণযুগল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারও পূর্ণ বিশ্বাস হলো যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এ নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করলে বা শহীদ হলে আমরা ধর্মত্যাগী হবো না। আল্লাহর শপথ! যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিহত হন তবুও আমরা তাঁর ধর্মের উপরেই আমরণ প্রতিষ্ঠিত থাকবো। আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর বন্ধু ও চাচাতো ভাই এবং তার উত্তরাধিকারী, তার আমার চেয়ে বড় হকদার আর কে হবে’?অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তার উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার পরেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- কারও বয়স বৃদ্ধি করা হয় না বা কারও বয়স হ্রাস করা হয় না, বরং সব কিছুই আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য স্থানে রয়েছে-তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি সময় পূর্ণ করেছেন এবং মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন। উপরোক্ত আয়াতে কাপুরুষ লোকদেরকে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, বীরত্ব প্রকাশের কারণে বয়স হ্রাস পায় না, আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করতঃ জিহাদ হতে সৱে থাকার ফলে বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্তও হয় না। মৃত্যু তো নির্ধারিত সময়ে আসবে, মানুষ হয় বীরত্বের সাথে জিহাদে যোগদান করুক বা ভীরুতা প্রদর্শন করে জিহাদ হতে সরেই থাকুক। হযরত হাজার ইবনে উদ্দী (রাঃ) ধর্মীয় শত্রুদের সম্মুখীন হতে গিয়ে টাইগ্রীস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউই মারা যায় না। এসো, এ টাইগ্রীস নদীতেই ঘোড়া নিক্ষেপ কর।' একথা বলেই তিনি টাইগ্রীস নদীর মধ্যে ঘোড়া নিক্ষেপ করেন। তার দেখাদেখি অন্যেরাও নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে শত্রুদের রক্ত শুকিয়ে যায় এবং তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করে- এরা তো পাগল। এরা সমুদ্রের তরঙ্গকেও ভয় করে না। কাজেই চল আমরা পলায়ন করি। অতএব তারা সবাই পালিয়ে যায়।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-‘যার কার্য শুধুমাত্র দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই সাধিত হয়ে থাকে সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ পেয়ে যায় বটে, কিন্তু পরকালে সে একেবারে শূন্য হস্ত হয়ে যায়। আর পরকাল লাভের যার উদ্দেশ্য থাকে সে পরকাল তো পায়ই, এমনকি দুনিয়াতেও সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে-‘পরকালের ক্ষেত্র যাাকারীকে আমি আরও বেশী দিয়ে থাকি। আর ইহকালের ক্ষেত্র যাঞ্চাকারীকে আমি তা প্রদান করি বটে, কিন্তু পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র দুনিয়াই চায়, আমি তাদের মধ্যে যাকে চাই এবং যে পরিমাণ চাই দুনিয়া প্রদান করি; অতঃপর সে জাহান্নামী হয়ে যায় এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে তথায় গমন করে; আর যে পরকাল চায় এবং ঈমানদার হয়, তাদের চেষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রশংসনীয় হবে। এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কৃতজ্ঞদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকি।' এরপর আল্লাহ তা'আলা উহুদ যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সম্বোধন করে বলেনইতিপূর্বেও বহু নবী তাদের দলবল নিয়ে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তোমাদের মতই তাদেরকেও বহু বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তাঁরা দৃঢ়চিত্ত, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞই রয়েছিলেন। তাঁরা অলস ও দুর্বল হননি এবং ঐ ধৈর্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহ পাকের ভালবাসা ক্রয় করে নিয়েছিলেন। একটি অর্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, “হে উহুদের যোদ্ধাগণ! মুহাম্মাদ (সঃ) শহীদ হয়েছেন, এ সংবাদ শুনে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলছ কেন? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীগণের (আঃ) শাহাদাত। লক্ষ্য করেও সাহস হারাও হয়নি বা পিছনে সরেও যায়নি, বরং তারা আরও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। এত বড় বিপদেও তাদের পা টলমলিয়ে যায়নি এবং তারা দুঃখের ভারে ভেঙ্গেও পড়েনি। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে তোমাদের এত মুষড়ে পড়া মোটেই উচিত হয়নি।' (আরবী) শব্দটির বহু অর্থ এসেছে-যেমন জ্ঞানবান, সৎ ধর্মভীরু, সাধক, নির্দেশ পালনকারী ইত্যাদি। কুরআন কারীম সেই বিপদের সময় তাদের প্রার্থনা নকল করেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এর সাথে সাথে তাদের জন্যে পারলৌকিক পুরস্কারও বিদ্যমান রয়েছে, আর পরকালের পুরস্কার দুনিয়ার পুরস্কার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেয়। এ সৎ কর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা।
আলে ইমরান 3:145
১৪৪-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: উহুদ প্রান্তরে মুসলমানগণ পরাজিতও হয়েছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মুহাম্মাদও (সঃ) শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ' নামক একজন কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে-‘আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে আসছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ উক্তিও মিথ্যা ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণ করেছিল বটে কিন্তু তাতে শুধুমাত্র তাঁর চেহারা মুবারক কিছুটা আহত হয়েছিল, তাছাড়া আর কিছুই নয়। এ মিথ্যা সংবাদে মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যায়, তাঁদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, পূর্বের নবীদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হবেন কিন্তু আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারীকে উহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারী (রাঃ)-কে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ 'যদি এ সংবাদ সত্য হয় তবে তিনি তার কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই তাঁর ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন। ঐ সমন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাত বা মৃত্যু এমন কিছু নয় যে, তোমরা আল্লাহ পাকের ধর্ম হতে পশ্চাদপদে ফিরে যাবে এবং যে এভাবে ফিরে যাবে সে মহান আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেব না। আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদেরকেই উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন যারা তার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তাঁর ধর্মের সাহায্যের কার্যে লেগে পড়ে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণে সুদৃঢ় থাকে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) জীবিত থাকুন আর নাই থাকুন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেন এবং মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করতঃ জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হিবরার চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তিনি পবিত্র মুখমণ্ডল হতে চাদর সরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুম্বন দান করেন এবং কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেনঃ “আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আল্লাহ তাআলার শপথ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দু’বার মৃত্যু দিতে পারেন না। যে মৃত্যু তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল তার উপর এসে গেছে।' এরপর তিনি পুনরায় মসজিদে আগমন করেন এবং দেখেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি তাঁকে বলেনঃ ‘নীরবতা অলম্বন করুন। তাকে নীরব করে দিয়ে তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপাসনা করতা সে যেন জেনে নেয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে সে যেন সন্তুষ্ট থাকে যে, আল্লাহ পাক জীবিত আছেন। মৃত্যু তার উপর পতিত হয় না।' অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। জনগণের অনুভূতি এই হয় যে, আয়াতটি যেন তখনই অবতীর্ণ হলো। তখন তো প্রত্যেকের মুখেই আয়াতটি উচ্চারিত হলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আর এ জগতে নেই। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মুখে এ আয়াতটির পাঠ শ্রবণ করে হযরত উমার (রাঃ)-এর চরণযুগল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারও পূর্ণ বিশ্বাস হলো যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এ নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করলে বা শহীদ হলে আমরা ধর্মত্যাগী হবো না। আল্লাহর শপথ! যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিহত হন তবুও আমরা তাঁর ধর্মের উপরেই আমরণ প্রতিষ্ঠিত থাকবো। আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর বন্ধু ও চাচাতো ভাই এবং তার উত্তরাধিকারী, তার আমার চেয়ে বড় হকদার আর কে হবে’?অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তার উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার পরেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- কারও বয়স বৃদ্ধি করা হয় না বা কারও বয়স হ্রাস করা হয় না, বরং সব কিছুই আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য স্থানে রয়েছে-তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি সময় পূর্ণ করেছেন এবং মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন। উপরোক্ত আয়াতে কাপুরুষ লোকদেরকে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, বীরত্ব প্রকাশের কারণে বয়স হ্রাস পায় না, আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করতঃ জিহাদ হতে সৱে থাকার ফলে বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্তও হয় না। মৃত্যু তো নির্ধারিত সময়ে আসবে, মানুষ হয় বীরত্বের সাথে জিহাদে যোগদান করুক বা ভীরুতা প্রদর্শন করে জিহাদ হতে সরেই থাকুক। হযরত হাজার ইবনে উদ্দী (রাঃ) ধর্মীয় শত্রুদের সম্মুখীন হতে গিয়ে টাইগ্রীস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউই মারা যায় না। এসো, এ টাইগ্রীস নদীতেই ঘোড়া নিক্ষেপ কর।' একথা বলেই তিনি টাইগ্রীস নদীর মধ্যে ঘোড়া নিক্ষেপ করেন। তার দেখাদেখি অন্যেরাও নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে শত্রুদের রক্ত শুকিয়ে যায় এবং তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করে- এরা তো পাগল। এরা সমুদ্রের তরঙ্গকেও ভয় করে না। কাজেই চল আমরা পলায়ন করি। অতএব তারা সবাই পালিয়ে যায়।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-‘যার কার্য শুধুমাত্র দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই সাধিত হয়ে থাকে সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ পেয়ে যায় বটে, কিন্তু পরকালে সে একেবারে শূন্য হস্ত হয়ে যায়। আর পরকাল লাভের যার উদ্দেশ্য থাকে সে পরকাল তো পায়ই, এমনকি দুনিয়াতেও সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে-‘পরকালের ক্ষেত্র যাাকারীকে আমি আরও বেশী দিয়ে থাকি। আর ইহকালের ক্ষেত্র যাঞ্চাকারীকে আমি তা প্রদান করি বটে, কিন্তু পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র দুনিয়াই চায়, আমি তাদের মধ্যে যাকে চাই এবং যে পরিমাণ চাই দুনিয়া প্রদান করি; অতঃপর সে জাহান্নামী হয়ে যায় এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে তথায় গমন করে; আর যে পরকাল চায় এবং ঈমানদার হয়, তাদের চেষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রশংসনীয় হবে। এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কৃতজ্ঞদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকি।' এরপর আল্লাহ তা'আলা উহুদ যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সম্বোধন করে বলেনইতিপূর্বেও বহু নবী তাদের দলবল নিয়ে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তোমাদের মতই তাদেরকেও বহু বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তাঁরা দৃঢ়চিত্ত, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞই রয়েছিলেন। তাঁরা অলস ও দুর্বল হননি এবং ঐ ধৈর্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহ পাকের ভালবাসা ক্রয় করে নিয়েছিলেন। একটি অর্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, “হে উহুদের যোদ্ধাগণ! মুহাম্মাদ (সঃ) শহীদ হয়েছেন, এ সংবাদ শুনে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলছ কেন? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীগণের (আঃ) শাহাদাত। লক্ষ্য করেও সাহস হারাও হয়নি বা পিছনে সরেও যায়নি, বরং তারা আরও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। এত বড় বিপদেও তাদের পা টলমলিয়ে যায়নি এবং তারা দুঃখের ভারে ভেঙ্গেও পড়েনি। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে তোমাদের এত মুষড়ে পড়া মোটেই উচিত হয়নি।' (আরবী) শব্দটির বহু অর্থ এসেছে-যেমন জ্ঞানবান, সৎ ধর্মভীরু, সাধক, নির্দেশ পালনকারী ইত্যাদি। কুরআন কারীম সেই বিপদের সময় তাদের প্রার্থনা নকল করেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এর সাথে সাথে তাদের জন্যে পারলৌকিক পুরস্কারও বিদ্যমান রয়েছে, আর পরকালের পুরস্কার দুনিয়ার পুরস্কার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেয়। এ সৎ কর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা।
আলে ইমরান 3:146
১৪৪-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: উহুদ প্রান্তরে মুসলমানগণ পরাজিতও হয়েছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মুহাম্মাদও (সঃ) শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ' নামক একজন কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে-‘আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে আসছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ উক্তিও মিথ্যা ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণ করেছিল বটে কিন্তু তাতে শুধুমাত্র তাঁর চেহারা মুবারক কিছুটা আহত হয়েছিল, তাছাড়া আর কিছুই নয়। এ মিথ্যা সংবাদে মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যায়, তাঁদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, পূর্বের নবীদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হবেন কিন্তু আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারীকে উহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারী (রাঃ)-কে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ 'যদি এ সংবাদ সত্য হয় তবে তিনি তার কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই তাঁর ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন। ঐ সমন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাত বা মৃত্যু এমন কিছু নয় যে, তোমরা আল্লাহ পাকের ধর্ম হতে পশ্চাদপদে ফিরে যাবে এবং যে এভাবে ফিরে যাবে সে মহান আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেব না। আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদেরকেই উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন যারা তার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তাঁর ধর্মের সাহায্যের কার্যে লেগে পড়ে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণে সুদৃঢ় থাকে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) জীবিত থাকুন আর নাই থাকুন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেন এবং মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করতঃ জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হিবরার চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তিনি পবিত্র মুখমণ্ডল হতে চাদর সরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুম্বন দান করেন এবং কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেনঃ “আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আল্লাহ তাআলার শপথ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দু’বার মৃত্যু দিতে পারেন না। যে মৃত্যু তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল তার উপর এসে গেছে।' এরপর তিনি পুনরায় মসজিদে আগমন করেন এবং দেখেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি তাঁকে বলেনঃ ‘নীরবতা অলম্বন করুন। তাকে নীরব করে দিয়ে তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপাসনা করতা সে যেন জেনে নেয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে সে যেন সন্তুষ্ট থাকে যে, আল্লাহ পাক জীবিত আছেন। মৃত্যু তার উপর পতিত হয় না।' অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। জনগণের অনুভূতি এই হয় যে, আয়াতটি যেন তখনই অবতীর্ণ হলো। তখন তো প্রত্যেকের মুখেই আয়াতটি উচ্চারিত হলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আর এ জগতে নেই। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মুখে এ আয়াতটির পাঠ শ্রবণ করে হযরত উমার (রাঃ)-এর চরণযুগল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারও পূর্ণ বিশ্বাস হলো যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এ নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করলে বা শহীদ হলে আমরা ধর্মত্যাগী হবো না। আল্লাহর শপথ! যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিহত হন তবুও আমরা তাঁর ধর্মের উপরেই আমরণ প্রতিষ্ঠিত থাকবো। আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর বন্ধু ও চাচাতো ভাই এবং তার উত্তরাধিকারী, তার আমার চেয়ে বড় হকদার আর কে হবে’?অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তার উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার পরেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- কারও বয়স বৃদ্ধি করা হয় না বা কারও বয়স হ্রাস করা হয় না, বরং সব কিছুই আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য স্থানে রয়েছে-তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি সময় পূর্ণ করেছেন এবং মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন। উপরোক্ত আয়াতে কাপুরুষ লোকদেরকে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, বীরত্ব প্রকাশের কারণে বয়স হ্রাস পায় না, আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করতঃ জিহাদ হতে সৱে থাকার ফলে বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্তও হয় না। মৃত্যু তো নির্ধারিত সময়ে আসবে, মানুষ হয় বীরত্বের সাথে জিহাদে যোগদান করুক বা ভীরুতা প্রদর্শন করে জিহাদ হতে সরেই থাকুক। হযরত হাজার ইবনে উদ্দী (রাঃ) ধর্মীয় শত্রুদের সম্মুখীন হতে গিয়ে টাইগ্রীস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউই মারা যায় না। এসো, এ টাইগ্রীস নদীতেই ঘোড়া নিক্ষেপ কর।' একথা বলেই তিনি টাইগ্রীস নদীর মধ্যে ঘোড়া নিক্ষেপ করেন। তার দেখাদেখি অন্যেরাও নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে শত্রুদের রক্ত শুকিয়ে যায় এবং তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করে- এরা তো পাগল। এরা সমুদ্রের তরঙ্গকেও ভয় করে না। কাজেই চল আমরা পলায়ন করি। অতএব তারা সবাই পালিয়ে যায়।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-‘যার কার্য শুধুমাত্র দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই সাধিত হয়ে থাকে সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ পেয়ে যায় বটে, কিন্তু পরকালে সে একেবারে শূন্য হস্ত হয়ে যায়। আর পরকাল লাভের যার উদ্দেশ্য থাকে সে পরকাল তো পায়ই, এমনকি দুনিয়াতেও সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে-‘পরকালের ক্ষেত্র যাাকারীকে আমি আরও বেশী দিয়ে থাকি। আর ইহকালের ক্ষেত্র যাঞ্চাকারীকে আমি তা প্রদান করি বটে, কিন্তু পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র দুনিয়াই চায়, আমি তাদের মধ্যে যাকে চাই এবং যে পরিমাণ চাই দুনিয়া প্রদান করি; অতঃপর সে জাহান্নামী হয়ে যায় এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে তথায় গমন করে; আর যে পরকাল চায় এবং ঈমানদার হয়, তাদের চেষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রশংসনীয় হবে। এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কৃতজ্ঞদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকি।' এরপর আল্লাহ তা'আলা উহুদ যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সম্বোধন করে বলেনইতিপূর্বেও বহু নবী তাদের দলবল নিয়ে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তোমাদের মতই তাদেরকেও বহু বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তাঁরা দৃঢ়চিত্ত, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞই রয়েছিলেন। তাঁরা অলস ও দুর্বল হননি এবং ঐ ধৈর্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহ পাকের ভালবাসা ক্রয় করে নিয়েছিলেন। একটি অর্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, “হে উহুদের যোদ্ধাগণ! মুহাম্মাদ (সঃ) শহীদ হয়েছেন, এ সংবাদ শুনে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলছ কেন? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীগণের (আঃ) শাহাদাত। লক্ষ্য করেও সাহস হারাও হয়নি বা পিছনে সরেও যায়নি, বরং তারা আরও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। এত বড় বিপদেও তাদের পা টলমলিয়ে যায়নি এবং তারা দুঃখের ভারে ভেঙ্গেও পড়েনি। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে তোমাদের এত মুষড়ে পড়া মোটেই উচিত হয়নি।' (আরবী) শব্দটির বহু অর্থ এসেছে-যেমন জ্ঞানবান, সৎ ধর্মভীরু, সাধক, নির্দেশ পালনকারী ইত্যাদি। কুরআন কারীম সেই বিপদের সময় তাদের প্রার্থনা নকল করেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এর সাথে সাথে তাদের জন্যে পারলৌকিক পুরস্কারও বিদ্যমান রয়েছে, আর পরকালের পুরস্কার দুনিয়ার পুরস্কার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেয়। এ সৎ কর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা।
আলে ইমরান 3:147
১৪৪-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: উহুদ প্রান্তরে মুসলমানগণ পরাজিতও হয়েছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মুহাম্মাদও (সঃ) শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ' নামক একজন কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে-‘আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে আসছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ উক্তিও মিথ্যা ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণ করেছিল বটে কিন্তু তাতে শুধুমাত্র তাঁর চেহারা মুবারক কিছুটা আহত হয়েছিল, তাছাড়া আর কিছুই নয়। এ মিথ্যা সংবাদে মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যায়, তাঁদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, পূর্বের নবীদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হবেন কিন্তু আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারীকে উহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারী (রাঃ)-কে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ 'যদি এ সংবাদ সত্য হয় তবে তিনি তার কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই তাঁর ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন। ঐ সমন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাত বা মৃত্যু এমন কিছু নয় যে, তোমরা আল্লাহ পাকের ধর্ম হতে পশ্চাদপদে ফিরে যাবে এবং যে এভাবে ফিরে যাবে সে মহান আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেব না। আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদেরকেই উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন যারা তার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তাঁর ধর্মের সাহায্যের কার্যে লেগে পড়ে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণে সুদৃঢ় থাকে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) জীবিত থাকুন আর নাই থাকুন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেন এবং মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করতঃ জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হিবরার চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তিনি পবিত্র মুখমণ্ডল হতে চাদর সরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুম্বন দান করেন এবং কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেনঃ “আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আল্লাহ তাআলার শপথ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দু’বার মৃত্যু দিতে পারেন না। যে মৃত্যু তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল তার উপর এসে গেছে।' এরপর তিনি পুনরায় মসজিদে আগমন করেন এবং দেখেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি তাঁকে বলেনঃ ‘নীরবতা অলম্বন করুন। তাকে নীরব করে দিয়ে তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপাসনা করতা সে যেন জেনে নেয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে সে যেন সন্তুষ্ট থাকে যে, আল্লাহ পাক জীবিত আছেন। মৃত্যু তার উপর পতিত হয় না।' অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। জনগণের অনুভূতি এই হয় যে, আয়াতটি যেন তখনই অবতীর্ণ হলো। তখন তো প্রত্যেকের মুখেই আয়াতটি উচ্চারিত হলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আর এ জগতে নেই। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মুখে এ আয়াতটির পাঠ শ্রবণ করে হযরত উমার (রাঃ)-এর চরণযুগল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারও পূর্ণ বিশ্বাস হলো যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এ নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করলে বা শহীদ হলে আমরা ধর্মত্যাগী হবো না। আল্লাহর শপথ! যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিহত হন তবুও আমরা তাঁর ধর্মের উপরেই আমরণ প্রতিষ্ঠিত থাকবো। আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর বন্ধু ও চাচাতো ভাই এবং তার উত্তরাধিকারী, তার আমার চেয়ে বড় হকদার আর কে হবে’?অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তার উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার পরেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- কারও বয়স বৃদ্ধি করা হয় না বা কারও বয়স হ্রাস করা হয় না, বরং সব কিছুই আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য স্থানে রয়েছে-তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি সময় পূর্ণ করেছেন এবং মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন। উপরোক্ত আয়াতে কাপুরুষ লোকদেরকে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, বীরত্ব প্রকাশের কারণে বয়স হ্রাস পায় না, আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করতঃ জিহাদ হতে সৱে থাকার ফলে বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্তও হয় না। মৃত্যু তো নির্ধারিত সময়ে আসবে, মানুষ হয় বীরত্বের সাথে জিহাদে যোগদান করুক বা ভীরুতা প্রদর্শন করে জিহাদ হতে সরেই থাকুক। হযরত হাজার ইবনে উদ্দী (রাঃ) ধর্মীয় শত্রুদের সম্মুখীন হতে গিয়ে টাইগ্রীস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউই মারা যায় না। এসো, এ টাইগ্রীস নদীতেই ঘোড়া নিক্ষেপ কর।' একথা বলেই তিনি টাইগ্রীস নদীর মধ্যে ঘোড়া নিক্ষেপ করেন। তার দেখাদেখি অন্যেরাও নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে শত্রুদের রক্ত শুকিয়ে যায় এবং তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করে- এরা তো পাগল। এরা সমুদ্রের তরঙ্গকেও ভয় করে না। কাজেই চল আমরা পলায়ন করি। অতএব তারা সবাই পালিয়ে যায়।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-‘যার কার্য শুধুমাত্র দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই সাধিত হয়ে থাকে সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ পেয়ে যায় বটে, কিন্তু পরকালে সে একেবারে শূন্য হস্ত হয়ে যায়। আর পরকাল লাভের যার উদ্দেশ্য থাকে সে পরকাল তো পায়ই, এমনকি দুনিয়াতেও সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে-‘পরকালের ক্ষেত্র যাাকারীকে আমি আরও বেশী দিয়ে থাকি। আর ইহকালের ক্ষেত্র যাঞ্চাকারীকে আমি তা প্রদান করি বটে, কিন্তু পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র দুনিয়াই চায়, আমি তাদের মধ্যে যাকে চাই এবং যে পরিমাণ চাই দুনিয়া প্রদান করি; অতঃপর সে জাহান্নামী হয়ে যায় এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে তথায় গমন করে; আর যে পরকাল চায় এবং ঈমানদার হয়, তাদের চেষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রশংসনীয় হবে। এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কৃতজ্ঞদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকি।' এরপর আল্লাহ তা'আলা উহুদ যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সম্বোধন করে বলেনইতিপূর্বেও বহু নবী তাদের দলবল নিয়ে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তোমাদের মতই তাদেরকেও বহু বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তাঁরা দৃঢ়চিত্ত, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞই রয়েছিলেন। তাঁরা অলস ও দুর্বল হননি এবং ঐ ধৈর্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহ পাকের ভালবাসা ক্রয় করে নিয়েছিলেন। একটি অর্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, “হে উহুদের যোদ্ধাগণ! মুহাম্মাদ (সঃ) শহীদ হয়েছেন, এ সংবাদ শুনে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলছ কেন? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীগণের (আঃ) শাহাদাত। লক্ষ্য করেও সাহস হারাও হয়নি বা পিছনে সরেও যায়নি, বরং তারা আরও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। এত বড় বিপদেও তাদের পা টলমলিয়ে যায়নি এবং তারা দুঃখের ভারে ভেঙ্গেও পড়েনি। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে তোমাদের এত মুষড়ে পড়া মোটেই উচিত হয়নি।' (আরবী) শব্দটির বহু অর্থ এসেছে-যেমন জ্ঞানবান, সৎ ধর্মভীরু, সাধক, নির্দেশ পালনকারী ইত্যাদি। কুরআন কারীম সেই বিপদের সময় তাদের প্রার্থনা নকল করেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এর সাথে সাথে তাদের জন্যে পারলৌকিক পুরস্কারও বিদ্যমান রয়েছে, আর পরকালের পুরস্কার দুনিয়ার পুরস্কার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেয়। এ সৎ কর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা।
আলে ইমরান 3:148
১৪৪-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: উহুদ প্রান্তরে মুসলমানগণ পরাজিতও হয়েছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মুহাম্মাদও (সঃ) শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ' নামক একজন কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে-‘আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে আসছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ উক্তিও মিথ্যা ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণ করেছিল বটে কিন্তু তাতে শুধুমাত্র তাঁর চেহারা মুবারক কিছুটা আহত হয়েছিল, তাছাড়া আর কিছুই নয়। এ মিথ্যা সংবাদে মুসলমানদের মন ভেঙ্গে যায়, তাঁদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, পূর্বের নবীদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হবেন কিন্তু আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারীকে উহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারী (রাঃ)-কে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ 'যদি এ সংবাদ সত্য হয় তবে তিনি তার কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই তাঁর ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন। ঐ সমন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাত বা মৃত্যু এমন কিছু নয় যে, তোমরা আল্লাহ পাকের ধর্ম হতে পশ্চাদপদে ফিরে যাবে এবং যে এভাবে ফিরে যাবে সে মহান আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেব না। আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদেরকেই উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন যারা তার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তাঁর ধর্মের সাহায্যের কার্যে লেগে পড়ে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণে সুদৃঢ় থাকে-রাসূলুল্লাহ (সঃ) জীবিত থাকুন আর নাই থাকুন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেন এবং মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করতঃ জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হিবরার চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তিনি পবিত্র মুখমণ্ডল হতে চাদর সরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুম্বন দান করেন এবং কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেনঃ “আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আল্লাহ তাআলার শপথ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দু’বার মৃত্যু দিতে পারেন না। যে মৃত্যু তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল তার উপর এসে গেছে।' এরপর তিনি পুনরায় মসজিদে আগমন করেন এবং দেখেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি তাঁকে বলেনঃ ‘নীরবতা অলম্বন করুন। তাকে নীরব করে দিয়ে তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপাসনা করতা সে যেন জেনে নেয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে সে যেন সন্তুষ্ট থাকে যে, আল্লাহ পাক জীবিত আছেন। মৃত্যু তার উপর পতিত হয় না।' অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। জনগণের অনুভূতি এই হয় যে, আয়াতটি যেন তখনই অবতীর্ণ হলো। তখন তো প্রত্যেকের মুখেই আয়াতটি উচ্চারিত হলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আর এ জগতে নেই। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মুখে এ আয়াতটির পাঠ শ্রবণ করে হযরত উমার (রাঃ)-এর চরণযুগল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারও পূর্ণ বিশ্বাস হলো যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এ নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুবরণ করলে বা শহীদ হলে আমরা ধর্মত্যাগী হবো না। আল্লাহর শপথ! যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিহত হন তবুও আমরা তাঁর ধর্মের উপরেই আমরণ প্রতিষ্ঠিত থাকবো। আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর বন্ধু ও চাচাতো ভাই এবং তার উত্তরাধিকারী, তার আমার চেয়ে বড় হকদার আর কে হবে’?অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তার উপর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার পরেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- কারও বয়স বৃদ্ধি করা হয় না বা কারও বয়স হ্রাস করা হয় না, বরং সব কিছুই আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। অন্য স্থানে রয়েছে-তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি সময় পূর্ণ করেছেন এবং মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন। উপরোক্ত আয়াতে কাপুরুষ লোকদেরকে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, বীরত্ব প্রকাশের কারণে বয়স হ্রাস পায় না, আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করতঃ জিহাদ হতে সৱে থাকার ফলে বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্তও হয় না। মৃত্যু তো নির্ধারিত সময়ে আসবে, মানুষ হয় বীরত্বের সাথে জিহাদে যোগদান করুক বা ভীরুতা প্রদর্শন করে জিহাদ হতে সরেই থাকুক। হযরত হাজার ইবনে উদ্দী (রাঃ) ধর্মীয় শত্রুদের সম্মুখীন হতে গিয়ে টাইগ্রীস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউই মারা যায় না। এসো, এ টাইগ্রীস নদীতেই ঘোড়া নিক্ষেপ কর।' একথা বলেই তিনি টাইগ্রীস নদীর মধ্যে ঘোড়া নিক্ষেপ করেন। তার দেখাদেখি অন্যেরাও নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে শত্রুদের রক্ত শুকিয়ে যায় এবং তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করে- এরা তো পাগল। এরা সমুদ্রের তরঙ্গকেও ভয় করে না। কাজেই চল আমরা পলায়ন করি। অতএব তারা সবাই পালিয়ে যায়।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-‘যার কার্য শুধুমাত্র দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই সাধিত হয়ে থাকে সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ পেয়ে যায় বটে, কিন্তু পরকালে সে একেবারে শূন্য হস্ত হয়ে যায়। আর পরকাল লাভের যার উদ্দেশ্য থাকে সে পরকাল তো পায়ই, এমনকি দুনিয়াতেও সে তার ভাগ্যের নির্ধারিত অংশ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে-‘পরকালের ক্ষেত্র যাাকারীকে আমি আরও বেশী দিয়ে থাকি। আর ইহকালের ক্ষেত্র যাঞ্চাকারীকে আমি তা প্রদান করি বটে, কিন্তু পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র দুনিয়াই চায়, আমি তাদের মধ্যে যাকে চাই এবং যে পরিমাণ চাই দুনিয়া প্রদান করি; অতঃপর সে জাহান্নামী হয়ে যায় এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে তথায় গমন করে; আর যে পরকাল চায় এবং ঈমানদার হয়, তাদের চেষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রশংসনীয় হবে। এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কৃতজ্ঞদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকি।' এরপর আল্লাহ তা'আলা উহুদ যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সম্বোধন করে বলেনইতিপূর্বেও বহু নবী তাদের দলবল নিয়ে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তোমাদের মতই তাদেরকেও বহু বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তাঁরা দৃঢ়চিত্ত, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞই রয়েছিলেন। তাঁরা অলস ও দুর্বল হননি এবং ঐ ধৈর্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহ পাকের ভালবাসা ক্রয় করে নিয়েছিলেন। একটি অর্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, “হে উহুদের যোদ্ধাগণ! মুহাম্মাদ (সঃ) শহীদ হয়েছেন, এ সংবাদ শুনে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলছ কেন? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীগণের (আঃ) শাহাদাত। লক্ষ্য করেও সাহস হারাও হয়নি বা পিছনে সরেও যায়নি, বরং তারা আরও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। এত বড় বিপদেও তাদের পা টলমলিয়ে যায়নি এবং তারা দুঃখের ভারে ভেঙ্গেও পড়েনি। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে তোমাদের এত মুষড়ে পড়া মোটেই উচিত হয়নি।' (আরবী) শব্দটির বহু অর্থ এসেছে-যেমন জ্ঞানবান, সৎ ধর্মভীরু, সাধক, নির্দেশ পালনকারী ইত্যাদি। কুরআন কারীম সেই বিপদের সময় তাদের প্রার্থনা নকল করেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এর সাথে সাথে তাদের জন্যে পারলৌকিক পুরস্কারও বিদ্যমান রয়েছে, আর পরকালের পুরস্কার দুনিয়ার পুরস্কার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেয়। এ সৎ কর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দা।
আলে ইমরান 3:149
১৪৯-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের কথা মান্য করতে নিষেধ করছেন এবং বলছেন, যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা ইহকালে ও পরকালে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তাদের চাহিদা তো এই যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন ইসলাম হতে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকেই তোমরা তোমাদের প্রভু ও সাহায্যকারী রূপে মেনে নাও, আমার সাথেই ভালবাসা স্থাপন কর, আমার উপরেই নির্ভর কর এবং একমাত্র। আমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ দুষ্টদের দুষ্টামির কারণে আমি তাদের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেবো।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী (আঃ)-কে দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে ভূমিকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষ করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমার নবুওয়াতকে সারা জগতের জন্যে সাধারণ করা হয়েছে। মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সমস্ত নবী (আঃ)-এর এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে, সমস্ত উম্মতের উপর চারটি মর্যাদা দান করেছেন-(১) আমাকে সারা জগতের নবী করে প্রেরণ করা হয়েছে। (২) আমার উম্মতের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্র করা হয়েছে। যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেই জায়গাটাই তাদের জন্যে মসজিদ ও অযুর স্থান। (৩) আমার শত্রু আমা হতে এক মাসের পথের ব্যবধানে থাকলেও আল্লাহ পাক তার অন্তর আমার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবেন। (৪) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল বৈধ করা হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শত্রুর অন্তরে ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছেঃ (১) আমি প্রত্যেক লাল ও সাদার নিকট প্রেরিত হয়েছি। (২) আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে বৈধ করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীর জন্যে বৈধ করা হয়নি। (৪) এক মাসের রাস্তা পর্যন্ত (শত্রুর অন্তরে) ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (৫) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সমস্ত নবী সুপারিশ চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার উম্মতের ঐ সব লোকের জন্যে সুপারিশ গোপন রেখেছি যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেনি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আবু সুফইয়ান (রাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভীতি উৎপাদন করেছেন, সুতরাং তিনি যুদ্ধ হতে ফিরে গেলেন। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্বীয় অঙ্গীকার সত্য করেছেন। এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এ অঙ্গীকার ছিল উহুদের যুদ্ধে। শত্রুদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, তথাপি তাদের চরণসমূহ টলে যায় এবং মুসলমানেরা বিজয় লাভ করে। কিন্তু আবার তীরন্দাজদের অবাধ্যতার কারণে এবং কয়েকজনের কাপুরুষতা প্রদর্শনের ফলে শর্তের উপর যে অঙ্গীকার ছিল তা উঠিয়ে নেয়া হয়। তাই আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে। প্রথম দিনেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করেন। কিন্তু তোমরা ভীরুতা প্রদর্শন করলে এবং নবী (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে গেলে ও তাঁর নির্দেশিত স্থান হতে সরে পড়লে, আর পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করলে। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ তোমরা স্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়েছিলে। গনীমতের মাল তোমাদের চক্ষের সামনে বিদ্যমান। ছিল। শত্রুরা পৃষ্ঠ প্রদর্শনের উপক্রম করেছিল। কাফিরদের পরাজয় দেখে নবী (সঃ)-এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে তোমাদের কেউ কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে গনীমতের মালের প্রতি ঝাপিয়ে পড়ে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎ নিয়াতের অধিকারী এবং পরকালের আকাঙখী থাকলেও কতগুলো লোকের অবাধ্যতার কারণে কাফিরদের সুযোগ এসে পড়ে এবং তোমাদের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায় যে, তোমরা বিজয় লাভের পরেও পরাজিত হয়ে যাও। কিন্তু এর পরেও আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কেননা, তিনি জানেন যে, স্পষ্টতঃই তোমরা সংখ্যা ও আসবাবপত্রে খুবই নগণ্য ছিলে।' ভুল মার্জনা হওয়াও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এভাবে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাহাদাত দানের পর তিনি স্বীয় পরীক্ষা উঠিয়ে নেন এবং অবশিষ্টকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসী লোকদের প্রতিই অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উহুদের যুদ্ধে যত সাহায্য করা হয়েছিল তত সাহায্য অন্য কোন যুদ্ধে করা হয়নি। ঐ সম্বন্ধেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ স্বীয় অঙ্গীকার তোমাদের জন্যে সত্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কর্মদোষের কারণেই ফল উল্টো হয়ে যায়। কোন কোন লোক দুনিয়ালোভী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ কয়েকজন তীরন্দাজ, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বত ঘাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন- এখান হতে তোমরা শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য কর যে, তারা যেন আমাদের পিছনের দিক দিয়ে আসতে না পারে, যদি তোমরা দেখ যে, আমরা পরাজিত হয়ে চলেছি তবুও তোমরা স্বীয় স্থান হতে সরে যেয়ো না। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সবদিক দিয়েই আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, তবুও তোমরা গনীমত লুটের উদ্দেশ্যে স্বীয় জায়গা পরিত্যাগ করো না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয় লাভ করেন তখন তীরন্দাজগণ তাঁর নির্দেশ পরিবর্তন করে এবং তারা তাদের স্থান ছেড়ে দিয়ে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় ও গনীমতের মাল জমা করতে আরম্ভ করে। পর্বত ঘাটি শূন্য পেয়ে মুশরিকরা পলায়ন বন্ধ করে এবং ভাবনা চিন্তা করে এ জায়গায় আক্রমণ চালিয়ে দেয়। যে কয়েকজন মুসলমান তখনও তথায় স্থির ছিলেন তাঁরা শহীদ হয়ে যান। তখন তারা পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে তাদের অজ্ঞাতে এমন ভীষণভাবে আক্রমণ করে যে, মুসলমানদের চরণসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায় এবং প্রথম দিনের বিজয় লাভ পরাজয়ে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে এর বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। অল্পক্ষণ পরেই মুসলমানদের দৃষ্টি তার পবিত্র মুখমণ্ডলে পতিত হয় তখন তারা সমস্ত বিপদ ভুলে যান এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দিকে আসছিলেন এবং বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহর কঠিন ক্রোধ বর্ষিত হোক যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তাদের কোনই অধিকার ছিল না যে, এভাবে তারা আমাদের উপর জয়যুক্ত হতে পারে। বর্ণনাকারী বলেনঃ অল্পক্ষণ পরেই আমরা শুনি যে, আবু সুফইয়ান পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে হোবল! আপনার মস্তক উন্নত হোক, হে হোবল! আপনামর মস্তক উন্নত হোক। আবু বকর কোথায়? উমার কোথায়? হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমাকে অনুমতি হলে আমি তাকে উত্তর দেই।' তিনি অনুমতি দেন। হযরত উমার (রাঃ) তখন উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত, আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত। আবু সুফইয়ান জিজ্ঞেস করেনঃ ‘বল মুহাম্মাদ (সঃ) কোথায়? আবু বকর কোথায়? উমার (রাঃ) কোথায়? তিনি বলেন, এই তো এখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ), ইনিই হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), আর আমিই হচ্ছি উমার।' আবূ সুফইয়ান তখন বলেনঃ “এটা বদরের যুদ্ধেরই প্রতিশোধ। এভাবেই রৌদ্র ও ছায়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের দৃষ্টান্ত তো কূপের বালতির ন্যায়।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এটা সমান কখনই নয়। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে গিয়েছে এবং আমাদের শহীদগণ জান্নাতে গিয়েছেন। আবু সুফইয়ান তখন বলেনঃ 'যদি এটাই হয় তবে তো অবশ্যই আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। জেনে রেখো, তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের কতগুলোকে তোমরা নাক কান কর্তিতও পাবে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের এটা অভিমত ছিল না বটে, তবে এটা আমাদের নিকট মন্দ বলেও মনে হয়নি। এ হাদীসটি গারীব এবং এ গল্পটিও বিস্ময়কর। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুরসালারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিও তার পিতা কেউই উহুদের যুদ্ধে বিদ্যমান ছিলেন না। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী (রাঃ)-এর (আরবী)-এর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এর কতক অংশের সত্যতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন স্ত্রীলোকেরা মুসলমান সৈনিকদের পিছনে অবস্থান করছিলেন এবং আহতদের দেখাশুনা করছিলেন। আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সেদিন আমাদের কেউই দুনিয়া লিন্দু ছিলেন না। বরং সেদিন যদি আমাকে ঐ কথার উপর শপথ করানো হতো তবে আমি শপথ করতাম। কিন্তু কুরআন কারীমে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া লিন্দুও ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন সাহাবীগণ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নির্দেশের বিপরীত কার্য সাধিত হয় এবং তার অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন তাদের পদসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে টলায়মান হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে শুধুমাত্র সাতজন আনসারী এবং দু’জন মুহাজির অবশিষ্ট থাকেন। যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ। তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর করুণা বর্ষণ করবেন যে তাদেরকে সরিয়ে দেবে। এ কথা শুনে একজন আনসারী দাঁড়িয়ে যান এবং একাকী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। আবার কাফিরেরা আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ঐ কথাই বলেন। এবারেও আর একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে যান এবং এমন ভীষণ বেগে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে অসমর্থ হয়। কিন্তু অবশেষে তিনিও শহীদ হয়ে যান। এভাবে সাতজন সাহাবীই (রাঃ) মহান আল্লাহর নিকট পৌছে যান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিরগণকে বলেনঃ বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে পক্ষপাতহীন ব্যবহার করলাম না। তখন আবু সুফইয়ান সশব্দে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে হোবল! আপনার শির, উন্নত হোক!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমরা বল (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহ উচ্চ ও মহা সম্মানিত।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমাদের জন্য উয রয়েছেন, তোমাদের জন্যে কোন উযযা নেই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বল- (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং কাফিরদের কোনই প্রভু নেই।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ “আজকের দিন হচ্ছে বদরের দিনের প্রতিশোধ। কোনদিন আমাদের এবং কোনদিন তোমাদের। এটা তো হাতে হাতের সওদা। একের পরিবর্তে একটি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সমান কখনই নয়। আমাদের শহীদগণ জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আহার্য দেয়া হচ্ছে, আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের জাহান্নামে শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পুনরায় আবু সুফইয়ান বলেনঃ “তোমরা তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতগুলোকে দেখতে পাবে যে, তাদের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি, করতে নিষেধও করিনি, আমি এটা পছন্দও করিনি, অপছন্দ ও করিনি, এটা আমাদের নিকট না ভাল বলে অনুভূত হয়েছে, না মন্দ বলে।' তখন শহীদগণের খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর পেট ফেড়ে দেয়া হয়েছে এবং হিন্দা কলিজা বের করে চিবিয়েছে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে না পেরে উগরিয়ে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত হামযা (রাঃ)-এর সামান্য গোত হিন্দার পেটে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মহান আল্লাহ চান না যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর শরীরের কোন অংশ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সামনে রেখে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর একজন আনসারীর জানাযা হাযির করা হয়। তাঁকে হযরত হামযা (রাঃ)-এর পার্শ্ব দেশে রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। আনসারীর জানাযা উঠিয়ে নেয়া হয় কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সেখানেই থেকে যায়। এভাবে সত্তরজন শহীদকে আনা হয় এবং সত্তরবার হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়া হয়। (মুসনাদ-ইআহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তীরন্দাজদের একটি দলকে একটি পৃথক স্থানে নিযুক্ত করেন। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে তাদের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলেনঃ 'যদি তোমরা আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত দেখতে পাও তবুও এখান হতে সরে যেয়ো না। আর তারা আমাদের উপর বিজয়ী হলেও তোমরা এ স্থান পরিত্যাগ করো না।' যুদ্ধ। শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহর ফযলে মুশরিকদের চরণগুলো পিছনে সরে পড়ে। এমনকি নারীগণও লুঙ্গী উঁচু করতঃ পর্বতের উপর এদিক ওদিক দৌড়াতে আরম্ভ করে। তখন তীরন্দাজ দলটি ‘গনীমত' ‘গনীমত' বলতে বলতে নীচে নেমে আসে। তাদের নেতা তাদেরকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। এ সুযোগে মুশরিকরা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হন। আবু সুফইয়ান একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) আছে কি? আবূ বকর কি বিদ্যমান আছে? উমার জীবিত আছে কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবাই নীরব থাকেন। তখন তিনি আত্মহারা হয়ে বলতে থাকেনঃ এরা সবাই আমাদের তরবারীর ঘাটে অবতরণ করেছে। এরা জীবিত থাকলে অবশ্যই উত্তর দিত। তখন হযরত উমার (রাঃ) অধৈর্য হয়ে বলে উঠেন :“হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর ফযলে আমরা সবাই বিদ্যমান রয়েছি এবং তোমাকে ধ্বংসকারী আল্লাহ আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। তারপরে ঐ সব কথাবার্তা হয় যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে এবং ইবলীস উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের সংবাদ লও। আগের দল পিছনের উপর পতিত হয়েছে। হযরত হুযায়ফা (রাঃ) দেখেন যে, মুসলমানদের তরবারী তাঁর পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)-এর উপর বর্ষিত হচ্ছে। বার বার তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা। ইনি আমার পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি এভাবেই শহীদ হয়ে যান। কিন্তু হযরত হুযায়ফা (রাঃ) কিছুই না বলে শুধুমাত্র বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন।' হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর এ সৌজন্য তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সীরাতে ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং দেখেছি যে, মুশরিকরা মুসলমানদের প্রথম আক্রমণেই পালাতে আরম্ভ করে, এমনকি তাদের নারীরা যেমন হিন্দা প্রভৃতি লুঙ্গী উঁচু করে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু এরপরে যখন তীরন্দাজগণ কেন্দ্রস্থল পরিত্যাগ করে এবং কাফিরেরা একত্রিত হয়ে পিছন দিক হতে আমাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে ও একজন সশব্দে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। নচেৎ আমরা তাদের পতাকা বাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার হাত হতে পতাকা নীচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমরা বিনতে আলকামা হারেসিয়্যা’ নাম্নী একজন স্ত্রীলোক ওটা উঠিয়ে নিয়েছিল এবং কুরায়েশরা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিকের চাচা হযরত আনাস ইবনে নার (রাঃ) এ পরিস্থিতি দেখে হযরত উমার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) প্রভৃতির নিকট আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা সাহস হারিয়েছেন কেন?' তারা বলেনঃ রাসূলল্লাহ তো শহীদ হয়েছেন।' হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ তাহলে আপনারা জীবিত থেকে কি করবেন?' একথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েন। অতঃপর বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেন। ইনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ ‘আগামী কোন দিনে সুযোগ আসলে দেখা যাবে। এ যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যখন মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি মুসলমানদের এ কার্যের জন্যে দায়ী নই এবং আমি মুশরিকদের এ কার্য হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অতঃপর তিনি তরবারী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। পথে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো উহুদ পাহাড় হতে জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' এ কথা বলেই মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে শাহাদাত লাভ করেন। তার শরীরে তীর ও তরবারীর আশিটিরও বেশী যখম ছিল। তাকে চিনবার কোন উপায় ছিল না। অঙ্গুলির গ্রন্থি দেখে চেনা গিয়েছিল। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, একজন হাজী বায়তুল্লাহ শরীফে একটি জনসমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো কে? উত্তরে বলা হয়ঃ কুরায়েশী'। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের শায়েখ কে?' বলা হয়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)।' তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আগমন করলে উক্ত হাজী সাহেব তাকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেত চাই।' তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করুন।' তিনি বলেন, আপনাকে এ বায়তুল্লাহ শরীফের কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি জানেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, এ সংবাদ কি আপনার জানা আছে যে, তিনি বদরের যুদ্ধেও যোগদান করেননি? তিনি বলেন , 'হ্যা। লোকটি আবার প্রশ্ন করেন, এ খবর কি আপনি অবগত আছেন যে, তিনি বায়'আতুর রিযওয়ানেও অংশগ্রহণ করেননি?' তিনি বলেন, “এটাও সঠিক কথা।' এবারে লোকটি খুশী হয়ে তাকবীর পাঠ করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন ‘এদিকে আসুন। এখন আমি আপনার নিকট বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করছি। উহুদের যুদ্ধ হতে পলায়ন তো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ ছিল এই যে, তাঁর বাড়িতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা ছিলেন এবং সে সময় তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, তুমি মদীনাতেই অবস্থান কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুণ্য দান করবেন এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও তোমার অংশ থাকবে। বায়'আতুর রিযওয়ানের ঘটনা এই যে, তাঁকে তিনি মক্কাবাসীদের নিকট স্বীয় পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেননা, মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর যেমন সম্মান ছিল অন্য কারও ছিল না। তার মক্কা গমনের পর এ বায়আত গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত উঠিয়ে বললেন, এটা উসমানের হাত।' অতঃপর তিনি ঐ হাতখানা তার অন্য হাতের উপর রাখেন (যেন তিনি, বায়'আত গ্রহণ। করলেন)। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন, এখন প্রস্থান করুন এবং এ ঘটনাটি সঙ্গে নিন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা শত্রুগণ হতে পলায়ন করে পর্বতের উপরে আরোহণ করছিলে এবং ভয়ের কারণে কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না, আর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে পশ্চাৎ হতে আহ্বান করছিলেন। এবং তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন, তোমরা পলায়ন করো না, বরং ফিরে এসো।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মুশরিকদের এ আকস্মিক প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলমানদের পদসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায়। তারা মদীনার পথে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কেউ কেউ পর্বতের শিকরে আরোহণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাঁদেরকে পিছন হতে ডাক দিয়ে বলছিলেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আমার দিকে এসো। এ ঘটনারই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে সময় মাত্র বারজন সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি দুদীর্ঘ হাদীসেও এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দালায়েলুন নবুওয়াহ’-এর মধ্যেও রয়েছে যে, যখন মুসলমানদের পরাজয় ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মাত্র এগারজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাহাড়ের উপর আরোহণ করছিলেন এমন সময় মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে নেয়। তিনি তাঁর সঙ্গীরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ ‘তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে এমন কেউ আছে কি? হযরত তালহা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তার এ আহ্বানে সাড়া দেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এখন থেমে যাও'। তখন একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে শহীদ হয়ে যান। এভাবে সবাই একের পর এক শাহাদাত বরণ করেন। তখন শুধুমাত্র হযরত তালহা (রাঃ) রয়ে যান। এ মহান ব্যক্তি বার বার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন কিন্তু বারবারই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধা দিচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন যে, শত্রুরা সবাই এক দিকে এবং তিনি একাই এক দিকে। এ যুদ্ধে তার অঙ্গুলিগুলো কেটে পড়ে। ফলে তার মুখ দিয়ে ইস’ শব্দ বের হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি বিসমিল্লাহ বলতে বা আল্লাহ তা'আলার নাম নিতে তবে তোমাকে ফেরেশতাগণ আকাশে উঠিয়ে নিতেন এবং লোকেরা দেখতে থাকত। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে পৌছে গেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত কায়েস ইবনে হাযেম (রাঃ) বলেনঃ হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর যে হাতখানা ভালরূপে ব্যবহার করছিলেন তা অচল হয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তৃণ হতে সমস্ত তীর আমার নিকট ছড়িয়ে দেন এবং বলেনঃ তোমার উপর আমার বাপ মা উৎসর্গ হোন। লও, মুশরিকদেরকে মারতে থাকো।' তিনি আমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন এবং আমি লক্ষ্য করে করে মুশরিকদেরকে মেরে চলছিলাম। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডানে-বামে এমন দু’জন লোককে দেখেছিলাম যারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলেন এবং যাদেরকে আমি ওর পূর্বেও কখনও দেখিনি এবং পরেও দেখিনি।' এ দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাঈল (আঃ)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সকলের পলায়নের পর যে কয়েজন মহান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করছিলেন এবং এক এক করে শহীদ হয়েছিলেন, তাদেরকে তিনি বলে চলছিলেনঃ “তাদেরকে বাধা প্রদান করতঃ জান্নাতে চলে যাবে ও জান্নাতে আমার বন্ধু হবে এমন কেউ আছ কি? মক্কায় উবাই ইবনে খালফ শপথ করে বলেছিল, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, সে তো নয় বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তাকে হত্যা করবো।' উহুদের যুদ্ধে সেই দুরাচার আপাদমস্তক লৌহ বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয় এবং বলতে বলতে আসেঃ ‘যদি মুহাম্মাদ বেঁচে যান তবে আমি নিজেকেই ধ্বংস করে দেবো। এদিকে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) ঐ দুরাচারের দিকে অগ্রসর হন। তার সারা দেহ লৌহবর্মে আবৃত ছিল। শুধুমাত্র কপালের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল। তিনি ঐ স্থান লক্ষ্য করে স্বীয় বর্শা দ্বারা সামান্য আঘাত করেন। তা ঠিক লক্ষ্যস্থলেই লেগে যায়। এর ফলে সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। আঘাত প্রাপ্ত স্থান হতে রক্তও বের হয়নি, অথচ তার অবস্থা এই ছিল যে, সে উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিল। তার লোকেরা তাকে উঠিয়ে সেনাবাহিনীর নিকট নিয়ে যায় এবং সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, বেশী আঘাত তো লাগেনি, তুমি এত কাপুরুষতা প্রদর্শন করছো কেন? অবশেষে সে তাদের বিদ্রুপে বাধ্য হয়ে বলে, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি উবাইকে হত্যা করবো। তোমরা এটা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, আমি বাঁচতে পারি না। এটা তোমরা মনে করো না যে, এ সামান্য আঁচড়ে কি হতে পারে? যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি সারা আরববাসীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিজ হাতের এ সামান্য আঘাত লাগতো তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকম অস্থিরভাবে ছটফট করতে করতে সেই পাপিষ্টের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়। মাগাযী-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে’ রয়েছে যে, যখন এ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখীন হয় তখন সাহাবীগণ তাঁর মোকাবিলা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি তাদেরকে বাধা দেন এবং বলেনঃ “তাকে আসতে দাও। যখন সে নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হারিস ইবনে সাম্মার (রাঃ) হাত হতে বর্শা নিয়ে তার উপর আক্রমণ করেন। তাঁর হাতে বর্শা দেখেই সে কেঁপে উঠে। সাহাবীগণ (রাঃ) তখনই বুঝে নেন যে, তার মঙ্গল নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার স্কন্ধে আঘাত করেন, এর ফলেই সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘বাতনে রাবেগ’ নামক স্থানে ঐ কাফিরের মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেনঃ একবার শেষরাত্রে এখান দিয়ে গমনের সময় এক জায়গায় এক ভীতিপ্রদ অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেখি এবং দেখতে পাই যে, একটি লোককে লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ করে ঐ আগুনে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা বলে চিৎকার করছে। অন্য এক ব্যক্তি বলছেঃ তাকে পানি দিও না। সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর হস্তে নিহত ব্যক্তি। সে হচ্ছে উবাই ইবনে খালফ'। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনের যে চারটি দাঁত মুশরিকরা উহুদের যুদ্ধে শহীদ করে দিয়েছিল ঐদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহ তাআলার কঠিন অভিশাপ রয়েছে যারা তাদের নবীর সাথে এ ব্যবহার করেছে এবং তার উপরও আল্লাহ পাকের ভীষণ অভিশাপ যাকে তাঁর রাসূল (সঃ) তাঁর পথে হত্যা করেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ রয়েছেঃ যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করেছে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার ভীষণ অভিশাপ রয়েছে।' উবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলে এ আঘাত লেগেছিল। তাঁর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। গণ্ডদেশও আহত হয়েছিল এবং ওষ্ঠেও আঘাত লেগেছিল। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলতেনঃ ঐ লোকটিকে হত্যা করার যেমন লোভ আমার ছিল অন্য কাউকে হত্যা করার তেমন ছিল না। ঐ লোকটি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ছিল এবং সারা গোত্রই তার শত্রু ছিল। তার দুশ্চরিত্রতা ও জঘন্য আচরণের প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটিই যথেষ্ট। নবী (সঃ)-কে। আহতকারীর উপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত। মুসনাদ-ই-আবদুর রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে বদদুআ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সারা বছরের মধ্যে সে যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরীর অবস্থায় যেন তার মৃত্যু ঘটে। বস্তুতঃ হলোও তাই। সেই দুরাচার কাফির হয়েই মারা গেল এবং জাহান্নামের অধিবাসী হলো। একজন মুহাজির বর্ণনা করেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন চতুর্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর তীর বর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সমস্তই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।' আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী সেদিন শপথ করে বলেছিলঃ মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখিয়ে দাও, সে আজ আমার হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। সে যদি মুক্তি পেয়ে যায় তবে আমার মুক্তি নেই। সে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর পার্শ্বেই এসে পড়ে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট কেউই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষুর উপর পর্দা নিক্ষেপ করেন। সুতরাং সে তাঁকে দেখতেই পায় না। যখন সে বিফল হয়ে ফিরে যায় তখন শাফওয়ান তাকে বিদ্রুপ করে। সে তখন বলেঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখতেই পাইনি। আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আমরা তাঁকে মারতে পারব না। জেনে রেখো, আমরা চার জন লোক তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং পরস্পর প্রতিজ্ঞাও করে বসি। কিন্তু শেষে অকৃতকার্য হয়ে পড়ি। ওয়াকেদী (রঃ) বলেনঃ ‘কিন্তু প্রমাণজনক কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপালে আঘাতকারী ছিল ইবনে কামইয়্যাহ এবং তাঁর ওষ্ঠে ও দাঁতে যে আঘাত করেছিল সে ছিল উবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস।' উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন উহুদের ঘটনা বর্ণনা করতেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে বলতেনঃ “সে দিনের সমস্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত তালহা (রাঃ)। আমি ফিরে এসে দেখি যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। আমি বলিঃ ‘আল্লাহ করেন ইনি তালহা হন!' তখন আমি নিকটে গিয়ে দেখি যে, তিনি তালহাই (রাঃ) বটে। আমি তখন আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতঃ বলি-ইনি আমারই গোত্রের একজন লোক। আমার এবং মুশরিকদের মধ্যস্থলে একজন লোক দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার প্রচণ্ড আক্রমণ মুশরিকদের সাহস হারিয়ে দিয়েছিল। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)। তারপরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই যে, তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে। এবং চেহারা মুবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে এবং কপালে লৌহ বর্মের দু'টি কড়া ঢুকে গেছে। আমি তখন দ্রুত বেগে তার দিকে ধাবিত হই। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আবু তালহা (রাঃ)-এর সংবাদ লও।” আমি চাচ্ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে কড়া দুটি বের করে ফেলি। কিন্তু হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে নিষেধ করেন এবং নিজেই নিকটে এসে হাত দিয়ে বের করতে খুবই কষ্ট অনুভব করেন। কাজেই দাঁত দিয়ে ধরে একটি বের করেন। কিন্তু এতে তার দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন আমি পুনরায় চাইলাম যে, দ্বিতীয়টি আমি বের করবো। কিন্তু আবার তিনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বিরত রাখলেন। সুতরাং আমি বিরত থাকলাম। তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এবারেও তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেল। এ কার্য সাধনের পর আমি হযরত তালহা (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি এবং দেখি যে, তাঁর দেহে সত্তরটি যখম হয়েছে। তার অঙ্গুলিগুলোও কেটে পড়েছে। আমি পুনরায় তাঁর সংবাদ নেই। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখমের রক্ত চুষে নেন, যেন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ কুলকুচা করে ফেল’। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি কুলকুচা করবো না। তারপরে তিনি যুদ্ধেক্ষেত্রে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি কেউ জান্নাতী লোককে দেখতে ইচ্ছে করে তবে যেন এ লোকটিকে দেখে।' এরূপে তিনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়, সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং মস্তকের শিরস্ত্রাণ পড়ে যায়। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রক্ত ধৌত করছিলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ক্ষতস্থানে নিক্ষেপ করছিলেন। যখন দেখেন যে, রক্ত কোন কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) মাদুর পুড়িয়ে ওর ভস্ম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ প্রদান করলেন। (আরবী) শব্দে (আরবী) অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) (২০:৭১)-এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি, (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক দুঃখ তো পরাজয়ের দুঃখ, যখন এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ না করুন রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে বিজয়ী বেশে মুশরিকদের পর্বতের উপর আরোহণ, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ তাদের জন্যে এ উচ্চতা বাঞ্ছনীয় ছিল না। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেনঃ ‘প্রথম দুঃখ হচ্ছে পরাজয়ের দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শহীদ হওয়ার সংবাদ। এ দুঃখ প্রথম দুঃখ অপেক্ষা অধিক ছিল। অনুরূপভাবে এক দুঃখ গনীমত হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ পরাজয়ের দুঃখ। এরূপভাবে এক দুঃখ স্বীয় ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে জঘন্য সংবাদের দুঃখ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে গনীমত ও বিজয় তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল তার জন্যে দুঃখ করো না। প্রবল প্রতাপান্বিত ও মহা সম্মানিত আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত আছেন।
আলে ইমরান 3:150
১৪৯-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের কথা মান্য করতে নিষেধ করছেন এবং বলছেন, যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা ইহকালে ও পরকালে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তাদের চাহিদা তো এই যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন ইসলাম হতে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকেই তোমরা তোমাদের প্রভু ও সাহায্যকারী রূপে মেনে নাও, আমার সাথেই ভালবাসা স্থাপন কর, আমার উপরেই নির্ভর কর এবং একমাত্র। আমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ দুষ্টদের দুষ্টামির কারণে আমি তাদের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেবো।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী (আঃ)-কে দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে ভূমিকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষ করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমার নবুওয়াতকে সারা জগতের জন্যে সাধারণ করা হয়েছে। মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সমস্ত নবী (আঃ)-এর এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে, সমস্ত উম্মতের উপর চারটি মর্যাদা দান করেছেন-(১) আমাকে সারা জগতের নবী করে প্রেরণ করা হয়েছে। (২) আমার উম্মতের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্র করা হয়েছে। যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেই জায়গাটাই তাদের জন্যে মসজিদ ও অযুর স্থান। (৩) আমার শত্রু আমা হতে এক মাসের পথের ব্যবধানে থাকলেও আল্লাহ পাক তার অন্তর আমার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবেন। (৪) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল বৈধ করা হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শত্রুর অন্তরে ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছেঃ (১) আমি প্রত্যেক লাল ও সাদার নিকট প্রেরিত হয়েছি। (২) আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে বৈধ করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীর জন্যে বৈধ করা হয়নি। (৪) এক মাসের রাস্তা পর্যন্ত (শত্রুর অন্তরে) ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (৫) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সমস্ত নবী সুপারিশ চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার উম্মতের ঐ সব লোকের জন্যে সুপারিশ গোপন রেখেছি যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেনি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আবু সুফইয়ান (রাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভীতি উৎপাদন করেছেন, সুতরাং তিনি যুদ্ধ হতে ফিরে গেলেন। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্বীয় অঙ্গীকার সত্য করেছেন। এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এ অঙ্গীকার ছিল উহুদের যুদ্ধে। শত্রুদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, তথাপি তাদের চরণসমূহ টলে যায় এবং মুসলমানেরা বিজয় লাভ করে। কিন্তু আবার তীরন্দাজদের অবাধ্যতার কারণে এবং কয়েকজনের কাপুরুষতা প্রদর্শনের ফলে শর্তের উপর যে অঙ্গীকার ছিল তা উঠিয়ে নেয়া হয়। তাই আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে। প্রথম দিনেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করেন। কিন্তু তোমরা ভীরুতা প্রদর্শন করলে এবং নবী (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে গেলে ও তাঁর নির্দেশিত স্থান হতে সরে পড়লে, আর পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করলে। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ তোমরা স্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়েছিলে। গনীমতের মাল তোমাদের চক্ষের সামনে বিদ্যমান। ছিল। শত্রুরা পৃষ্ঠ প্রদর্শনের উপক্রম করেছিল। কাফিরদের পরাজয় দেখে নবী (সঃ)-এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে তোমাদের কেউ কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে গনীমতের মালের প্রতি ঝাপিয়ে পড়ে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎ নিয়াতের অধিকারী এবং পরকালের আকাঙখী থাকলেও কতগুলো লোকের অবাধ্যতার কারণে কাফিরদের সুযোগ এসে পড়ে এবং তোমাদের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায় যে, তোমরা বিজয় লাভের পরেও পরাজিত হয়ে যাও। কিন্তু এর পরেও আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কেননা, তিনি জানেন যে, স্পষ্টতঃই তোমরা সংখ্যা ও আসবাবপত্রে খুবই নগণ্য ছিলে।' ভুল মার্জনা হওয়াও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এভাবে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাহাদাত দানের পর তিনি স্বীয় পরীক্ষা উঠিয়ে নেন এবং অবশিষ্টকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসী লোকদের প্রতিই অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উহুদের যুদ্ধে যত সাহায্য করা হয়েছিল তত সাহায্য অন্য কোন যুদ্ধে করা হয়নি। ঐ সম্বন্ধেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ স্বীয় অঙ্গীকার তোমাদের জন্যে সত্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কর্মদোষের কারণেই ফল উল্টো হয়ে যায়। কোন কোন লোক দুনিয়ালোভী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ কয়েকজন তীরন্দাজ, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বত ঘাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন- এখান হতে তোমরা শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য কর যে, তারা যেন আমাদের পিছনের দিক দিয়ে আসতে না পারে, যদি তোমরা দেখ যে, আমরা পরাজিত হয়ে চলেছি তবুও তোমরা স্বীয় স্থান হতে সরে যেয়ো না। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সবদিক দিয়েই আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, তবুও তোমরা গনীমত লুটের উদ্দেশ্যে স্বীয় জায়গা পরিত্যাগ করো না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয় লাভ করেন তখন তীরন্দাজগণ তাঁর নির্দেশ পরিবর্তন করে এবং তারা তাদের স্থান ছেড়ে দিয়ে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় ও গনীমতের মাল জমা করতে আরম্ভ করে। পর্বত ঘাটি শূন্য পেয়ে মুশরিকরা পলায়ন বন্ধ করে এবং ভাবনা চিন্তা করে এ জায়গায় আক্রমণ চালিয়ে দেয়। যে কয়েকজন মুসলমান তখনও তথায় স্থির ছিলেন তাঁরা শহীদ হয়ে যান। তখন তারা পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে তাদের অজ্ঞাতে এমন ভীষণভাবে আক্রমণ করে যে, মুসলমানদের চরণসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায় এবং প্রথম দিনের বিজয় লাভ পরাজয়ে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে এর বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। অল্পক্ষণ পরেই মুসলমানদের দৃষ্টি তার পবিত্র মুখমণ্ডলে পতিত হয় তখন তারা সমস্ত বিপদ ভুলে যান এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দিকে আসছিলেন এবং বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহর কঠিন ক্রোধ বর্ষিত হোক যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তাদের কোনই অধিকার ছিল না যে, এভাবে তারা আমাদের উপর জয়যুক্ত হতে পারে। বর্ণনাকারী বলেনঃ অল্পক্ষণ পরেই আমরা শুনি যে, আবু সুফইয়ান পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে হোবল! আপনার মস্তক উন্নত হোক, হে হোবল! আপনামর মস্তক উন্নত হোক। আবু বকর কোথায়? উমার কোথায়? হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমাকে অনুমতি হলে আমি তাকে উত্তর দেই।' তিনি অনুমতি দেন। হযরত উমার (রাঃ) তখন উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত, আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত। আবু সুফইয়ান জিজ্ঞেস করেনঃ ‘বল মুহাম্মাদ (সঃ) কোথায়? আবু বকর কোথায়? উমার (রাঃ) কোথায়? তিনি বলেন, এই তো এখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ), ইনিই হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), আর আমিই হচ্ছি উমার।' আবূ সুফইয়ান তখন বলেনঃ “এটা বদরের যুদ্ধেরই প্রতিশোধ। এভাবেই রৌদ্র ও ছায়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের দৃষ্টান্ত তো কূপের বালতির ন্যায়।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এটা সমান কখনই নয়। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে গিয়েছে এবং আমাদের শহীদগণ জান্নাতে গিয়েছেন। আবু সুফইয়ান তখন বলেনঃ 'যদি এটাই হয় তবে তো অবশ্যই আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। জেনে রেখো, তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের কতগুলোকে তোমরা নাক কান কর্তিতও পাবে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের এটা অভিমত ছিল না বটে, তবে এটা আমাদের নিকট মন্দ বলেও মনে হয়নি। এ হাদীসটি গারীব এবং এ গল্পটিও বিস্ময়কর। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুরসালারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিও তার পিতা কেউই উহুদের যুদ্ধে বিদ্যমান ছিলেন না। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী (রাঃ)-এর (আরবী)-এর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এর কতক অংশের সত্যতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন স্ত্রীলোকেরা মুসলমান সৈনিকদের পিছনে অবস্থান করছিলেন এবং আহতদের দেখাশুনা করছিলেন। আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সেদিন আমাদের কেউই দুনিয়া লিন্দু ছিলেন না। বরং সেদিন যদি আমাকে ঐ কথার উপর শপথ করানো হতো তবে আমি শপথ করতাম। কিন্তু কুরআন কারীমে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া লিন্দুও ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন সাহাবীগণ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নির্দেশের বিপরীত কার্য সাধিত হয় এবং তার অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন তাদের পদসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে টলায়মান হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে শুধুমাত্র সাতজন আনসারী এবং দু’জন মুহাজির অবশিষ্ট থাকেন। যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ। তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর করুণা বর্ষণ করবেন যে তাদেরকে সরিয়ে দেবে। এ কথা শুনে একজন আনসারী দাঁড়িয়ে যান এবং একাকী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। আবার কাফিরেরা আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ঐ কথাই বলেন। এবারেও আর একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে যান এবং এমন ভীষণ বেগে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে অসমর্থ হয়। কিন্তু অবশেষে তিনিও শহীদ হয়ে যান। এভাবে সাতজন সাহাবীই (রাঃ) মহান আল্লাহর নিকট পৌছে যান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিরগণকে বলেনঃ বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে পক্ষপাতহীন ব্যবহার করলাম না। তখন আবু সুফইয়ান সশব্দে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে হোবল! আপনার শির, উন্নত হোক!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমরা বল (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহ উচ্চ ও মহা সম্মানিত।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমাদের জন্য উয রয়েছেন, তোমাদের জন্যে কোন উযযা নেই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বল- (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং কাফিরদের কোনই প্রভু নেই।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ “আজকের দিন হচ্ছে বদরের দিনের প্রতিশোধ। কোনদিন আমাদের এবং কোনদিন তোমাদের। এটা তো হাতে হাতের সওদা। একের পরিবর্তে একটি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সমান কখনই নয়। আমাদের শহীদগণ জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আহার্য দেয়া হচ্ছে, আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের জাহান্নামে শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পুনরায় আবু সুফইয়ান বলেনঃ “তোমরা তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতগুলোকে দেখতে পাবে যে, তাদের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি, করতে নিষেধও করিনি, আমি এটা পছন্দও করিনি, অপছন্দ ও করিনি, এটা আমাদের নিকট না ভাল বলে অনুভূত হয়েছে, না মন্দ বলে।' তখন শহীদগণের খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর পেট ফেড়ে দেয়া হয়েছে এবং হিন্দা কলিজা বের করে চিবিয়েছে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে না পেরে উগরিয়ে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত হামযা (রাঃ)-এর সামান্য গোত হিন্দার পেটে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মহান আল্লাহ চান না যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর শরীরের কোন অংশ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সামনে রেখে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর একজন আনসারীর জানাযা হাযির করা হয়। তাঁকে হযরত হামযা (রাঃ)-এর পার্শ্ব দেশে রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। আনসারীর জানাযা উঠিয়ে নেয়া হয় কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সেখানেই থেকে যায়। এভাবে সত্তরজন শহীদকে আনা হয় এবং সত্তরবার হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়া হয়। (মুসনাদ-ইআহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তীরন্দাজদের একটি দলকে একটি পৃথক স্থানে নিযুক্ত করেন। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে তাদের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলেনঃ 'যদি তোমরা আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত দেখতে পাও তবুও এখান হতে সরে যেয়ো না। আর তারা আমাদের উপর বিজয়ী হলেও তোমরা এ স্থান পরিত্যাগ করো না।' যুদ্ধ। শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহর ফযলে মুশরিকদের চরণগুলো পিছনে সরে পড়ে। এমনকি নারীগণও লুঙ্গী উঁচু করতঃ পর্বতের উপর এদিক ওদিক দৌড়াতে আরম্ভ করে। তখন তীরন্দাজ দলটি ‘গনীমত' ‘গনীমত' বলতে বলতে নীচে নেমে আসে। তাদের নেতা তাদেরকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। এ সুযোগে মুশরিকরা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হন। আবু সুফইয়ান একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) আছে কি? আবূ বকর কি বিদ্যমান আছে? উমার জীবিত আছে কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবাই নীরব থাকেন। তখন তিনি আত্মহারা হয়ে বলতে থাকেনঃ এরা সবাই আমাদের তরবারীর ঘাটে অবতরণ করেছে। এরা জীবিত থাকলে অবশ্যই উত্তর দিত। তখন হযরত উমার (রাঃ) অধৈর্য হয়ে বলে উঠেন :“হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর ফযলে আমরা সবাই বিদ্যমান রয়েছি এবং তোমাকে ধ্বংসকারী আল্লাহ আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। তারপরে ঐ সব কথাবার্তা হয় যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে এবং ইবলীস উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের সংবাদ লও। আগের দল পিছনের উপর পতিত হয়েছে। হযরত হুযায়ফা (রাঃ) দেখেন যে, মুসলমানদের তরবারী তাঁর পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)-এর উপর বর্ষিত হচ্ছে। বার বার তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা। ইনি আমার পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি এভাবেই শহীদ হয়ে যান। কিন্তু হযরত হুযায়ফা (রাঃ) কিছুই না বলে শুধুমাত্র বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন।' হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর এ সৌজন্য তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সীরাতে ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং দেখেছি যে, মুশরিকরা মুসলমানদের প্রথম আক্রমণেই পালাতে আরম্ভ করে, এমনকি তাদের নারীরা যেমন হিন্দা প্রভৃতি লুঙ্গী উঁচু করে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু এরপরে যখন তীরন্দাজগণ কেন্দ্রস্থল পরিত্যাগ করে এবং কাফিরেরা একত্রিত হয়ে পিছন দিক হতে আমাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে ও একজন সশব্দে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। নচেৎ আমরা তাদের পতাকা বাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার হাত হতে পতাকা নীচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমরা বিনতে আলকামা হারেসিয়্যা’ নাম্নী একজন স্ত্রীলোক ওটা উঠিয়ে নিয়েছিল এবং কুরায়েশরা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিকের চাচা হযরত আনাস ইবনে নার (রাঃ) এ পরিস্থিতি দেখে হযরত উমার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) প্রভৃতির নিকট আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা সাহস হারিয়েছেন কেন?' তারা বলেনঃ রাসূলল্লাহ তো শহীদ হয়েছেন।' হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ তাহলে আপনারা জীবিত থেকে কি করবেন?' একথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েন। অতঃপর বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেন। ইনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ ‘আগামী কোন দিনে সুযোগ আসলে দেখা যাবে। এ যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যখন মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি মুসলমানদের এ কার্যের জন্যে দায়ী নই এবং আমি মুশরিকদের এ কার্য হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অতঃপর তিনি তরবারী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। পথে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো উহুদ পাহাড় হতে জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' এ কথা বলেই মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে শাহাদাত লাভ করেন। তার শরীরে তীর ও তরবারীর আশিটিরও বেশী যখম ছিল। তাকে চিনবার কোন উপায় ছিল না। অঙ্গুলির গ্রন্থি দেখে চেনা গিয়েছিল। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, একজন হাজী বায়তুল্লাহ শরীফে একটি জনসমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো কে? উত্তরে বলা হয়ঃ কুরায়েশী'। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের শায়েখ কে?' বলা হয়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)।' তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আগমন করলে উক্ত হাজী সাহেব তাকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেত চাই।' তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করুন।' তিনি বলেন, আপনাকে এ বায়তুল্লাহ শরীফের কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি জানেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, এ সংবাদ কি আপনার জানা আছে যে, তিনি বদরের যুদ্ধেও যোগদান করেননি? তিনি বলেন , 'হ্যা। লোকটি আবার প্রশ্ন করেন, এ খবর কি আপনি অবগত আছেন যে, তিনি বায়'আতুর রিযওয়ানেও অংশগ্রহণ করেননি?' তিনি বলেন, “এটাও সঠিক কথা।' এবারে লোকটি খুশী হয়ে তাকবীর পাঠ করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন ‘এদিকে আসুন। এখন আমি আপনার নিকট বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করছি। উহুদের যুদ্ধ হতে পলায়ন তো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ ছিল এই যে, তাঁর বাড়িতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা ছিলেন এবং সে সময় তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, তুমি মদীনাতেই অবস্থান কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুণ্য দান করবেন এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও তোমার অংশ থাকবে। বায়'আতুর রিযওয়ানের ঘটনা এই যে, তাঁকে তিনি মক্কাবাসীদের নিকট স্বীয় পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেননা, মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর যেমন সম্মান ছিল অন্য কারও ছিল না। তার মক্কা গমনের পর এ বায়আত গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত উঠিয়ে বললেন, এটা উসমানের হাত।' অতঃপর তিনি ঐ হাতখানা তার অন্য হাতের উপর রাখেন (যেন তিনি, বায়'আত গ্রহণ। করলেন)। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন, এখন প্রস্থান করুন এবং এ ঘটনাটি সঙ্গে নিন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা শত্রুগণ হতে পলায়ন করে পর্বতের উপরে আরোহণ করছিলে এবং ভয়ের কারণে কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না, আর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে পশ্চাৎ হতে আহ্বান করছিলেন। এবং তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন, তোমরা পলায়ন করো না, বরং ফিরে এসো।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মুশরিকদের এ আকস্মিক প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলমানদের পদসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায়। তারা মদীনার পথে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কেউ কেউ পর্বতের শিকরে আরোহণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাঁদেরকে পিছন হতে ডাক দিয়ে বলছিলেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আমার দিকে এসো। এ ঘটনারই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে সময় মাত্র বারজন সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি দুদীর্ঘ হাদীসেও এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দালায়েলুন নবুওয়াহ’-এর মধ্যেও রয়েছে যে, যখন মুসলমানদের পরাজয় ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মাত্র এগারজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাহাড়ের উপর আরোহণ করছিলেন এমন সময় মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে নেয়। তিনি তাঁর সঙ্গীরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ ‘তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে এমন কেউ আছে কি? হযরত তালহা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তার এ আহ্বানে সাড়া দেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এখন থেমে যাও'। তখন একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে শহীদ হয়ে যান। এভাবে সবাই একের পর এক শাহাদাত বরণ করেন। তখন শুধুমাত্র হযরত তালহা (রাঃ) রয়ে যান। এ মহান ব্যক্তি বার বার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন কিন্তু বারবারই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধা দিচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন যে, শত্রুরা সবাই এক দিকে এবং তিনি একাই এক দিকে। এ যুদ্ধে তার অঙ্গুলিগুলো কেটে পড়ে। ফলে তার মুখ দিয়ে ইস’ শব্দ বের হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি বিসমিল্লাহ বলতে বা আল্লাহ তা'আলার নাম নিতে তবে তোমাকে ফেরেশতাগণ আকাশে উঠিয়ে নিতেন এবং লোকেরা দেখতে থাকত। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে পৌছে গেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত কায়েস ইবনে হাযেম (রাঃ) বলেনঃ হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর যে হাতখানা ভালরূপে ব্যবহার করছিলেন তা অচল হয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তৃণ হতে সমস্ত তীর আমার নিকট ছড়িয়ে দেন এবং বলেনঃ তোমার উপর আমার বাপ মা উৎসর্গ হোন। লও, মুশরিকদেরকে মারতে থাকো।' তিনি আমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন এবং আমি লক্ষ্য করে করে মুশরিকদেরকে মেরে চলছিলাম। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডানে-বামে এমন দু’জন লোককে দেখেছিলাম যারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলেন এবং যাদেরকে আমি ওর পূর্বেও কখনও দেখিনি এবং পরেও দেখিনি।' এ দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাঈল (আঃ)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সকলের পলায়নের পর যে কয়েজন মহান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করছিলেন এবং এক এক করে শহীদ হয়েছিলেন, তাদেরকে তিনি বলে চলছিলেনঃ “তাদেরকে বাধা প্রদান করতঃ জান্নাতে চলে যাবে ও জান্নাতে আমার বন্ধু হবে এমন কেউ আছ কি? মক্কায় উবাই ইবনে খালফ শপথ করে বলেছিল, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, সে তো নয় বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তাকে হত্যা করবো।' উহুদের যুদ্ধে সেই দুরাচার আপাদমস্তক লৌহ বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয় এবং বলতে বলতে আসেঃ ‘যদি মুহাম্মাদ বেঁচে যান তবে আমি নিজেকেই ধ্বংস করে দেবো। এদিকে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) ঐ দুরাচারের দিকে অগ্রসর হন। তার সারা দেহ লৌহবর্মে আবৃত ছিল। শুধুমাত্র কপালের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল। তিনি ঐ স্থান লক্ষ্য করে স্বীয় বর্শা দ্বারা সামান্য আঘাত করেন। তা ঠিক লক্ষ্যস্থলেই লেগে যায়। এর ফলে সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। আঘাত প্রাপ্ত স্থান হতে রক্তও বের হয়নি, অথচ তার অবস্থা এই ছিল যে, সে উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিল। তার লোকেরা তাকে উঠিয়ে সেনাবাহিনীর নিকট নিয়ে যায় এবং সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, বেশী আঘাত তো লাগেনি, তুমি এত কাপুরুষতা প্রদর্শন করছো কেন? অবশেষে সে তাদের বিদ্রুপে বাধ্য হয়ে বলে, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি উবাইকে হত্যা করবো। তোমরা এটা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, আমি বাঁচতে পারি না। এটা তোমরা মনে করো না যে, এ সামান্য আঁচড়ে কি হতে পারে? যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি সারা আরববাসীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিজ হাতের এ সামান্য আঘাত লাগতো তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকম অস্থিরভাবে ছটফট করতে করতে সেই পাপিষ্টের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়। মাগাযী-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে’ রয়েছে যে, যখন এ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখীন হয় তখন সাহাবীগণ তাঁর মোকাবিলা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি তাদেরকে বাধা দেন এবং বলেনঃ “তাকে আসতে দাও। যখন সে নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হারিস ইবনে সাম্মার (রাঃ) হাত হতে বর্শা নিয়ে তার উপর আক্রমণ করেন। তাঁর হাতে বর্শা দেখেই সে কেঁপে উঠে। সাহাবীগণ (রাঃ) তখনই বুঝে নেন যে, তার মঙ্গল নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার স্কন্ধে আঘাত করেন, এর ফলেই সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘বাতনে রাবেগ’ নামক স্থানে ঐ কাফিরের মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেনঃ একবার শেষরাত্রে এখান দিয়ে গমনের সময় এক জায়গায় এক ভীতিপ্রদ অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেখি এবং দেখতে পাই যে, একটি লোককে লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ করে ঐ আগুনে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা বলে চিৎকার করছে। অন্য এক ব্যক্তি বলছেঃ তাকে পানি দিও না। সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর হস্তে নিহত ব্যক্তি। সে হচ্ছে উবাই ইবনে খালফ'। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনের যে চারটি দাঁত মুশরিকরা উহুদের যুদ্ধে শহীদ করে দিয়েছিল ঐদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহ তাআলার কঠিন অভিশাপ রয়েছে যারা তাদের নবীর সাথে এ ব্যবহার করেছে এবং তার উপরও আল্লাহ পাকের ভীষণ অভিশাপ যাকে তাঁর রাসূল (সঃ) তাঁর পথে হত্যা করেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ রয়েছেঃ যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করেছে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার ভীষণ অভিশাপ রয়েছে।' উবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলে এ আঘাত লেগেছিল। তাঁর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। গণ্ডদেশও আহত হয়েছিল এবং ওষ্ঠেও আঘাত লেগেছিল। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলতেনঃ ঐ লোকটিকে হত্যা করার যেমন লোভ আমার ছিল অন্য কাউকে হত্যা করার তেমন ছিল না। ঐ লোকটি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ছিল এবং সারা গোত্রই তার শত্রু ছিল। তার দুশ্চরিত্রতা ও জঘন্য আচরণের প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটিই যথেষ্ট। নবী (সঃ)-কে। আহতকারীর উপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত। মুসনাদ-ই-আবদুর রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে বদদুআ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সারা বছরের মধ্যে সে যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরীর অবস্থায় যেন তার মৃত্যু ঘটে। বস্তুতঃ হলোও তাই। সেই দুরাচার কাফির হয়েই মারা গেল এবং জাহান্নামের অধিবাসী হলো। একজন মুহাজির বর্ণনা করেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন চতুর্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর তীর বর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সমস্তই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।' আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী সেদিন শপথ করে বলেছিলঃ মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখিয়ে দাও, সে আজ আমার হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। সে যদি মুক্তি পেয়ে যায় তবে আমার মুক্তি নেই। সে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর পার্শ্বেই এসে পড়ে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট কেউই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষুর উপর পর্দা নিক্ষেপ করেন। সুতরাং সে তাঁকে দেখতেই পায় না। যখন সে বিফল হয়ে ফিরে যায় তখন শাফওয়ান তাকে বিদ্রুপ করে। সে তখন বলেঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখতেই পাইনি। আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আমরা তাঁকে মারতে পারব না। জেনে রেখো, আমরা চার জন লোক তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং পরস্পর প্রতিজ্ঞাও করে বসি। কিন্তু শেষে অকৃতকার্য হয়ে পড়ি। ওয়াকেদী (রঃ) বলেনঃ ‘কিন্তু প্রমাণজনক কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপালে আঘাতকারী ছিল ইবনে কামইয়্যাহ এবং তাঁর ওষ্ঠে ও দাঁতে যে আঘাত করেছিল সে ছিল উবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস।' উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন উহুদের ঘটনা বর্ণনা করতেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে বলতেনঃ “সে দিনের সমস্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত তালহা (রাঃ)। আমি ফিরে এসে দেখি যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। আমি বলিঃ ‘আল্লাহ করেন ইনি তালহা হন!' তখন আমি নিকটে গিয়ে দেখি যে, তিনি তালহাই (রাঃ) বটে। আমি তখন আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতঃ বলি-ইনি আমারই গোত্রের একজন লোক। আমার এবং মুশরিকদের মধ্যস্থলে একজন লোক দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার প্রচণ্ড আক্রমণ মুশরিকদের সাহস হারিয়ে দিয়েছিল। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)। তারপরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই যে, তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে। এবং চেহারা মুবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে এবং কপালে লৌহ বর্মের দু'টি কড়া ঢুকে গেছে। আমি তখন দ্রুত বেগে তার দিকে ধাবিত হই। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আবু তালহা (রাঃ)-এর সংবাদ লও।” আমি চাচ্ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে কড়া দুটি বের করে ফেলি। কিন্তু হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে নিষেধ করেন এবং নিজেই নিকটে এসে হাত দিয়ে বের করতে খুবই কষ্ট অনুভব করেন। কাজেই দাঁত দিয়ে ধরে একটি বের করেন। কিন্তু এতে তার দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন আমি পুনরায় চাইলাম যে, দ্বিতীয়টি আমি বের করবো। কিন্তু আবার তিনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বিরত রাখলেন। সুতরাং আমি বিরত থাকলাম। তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এবারেও তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেল। এ কার্য সাধনের পর আমি হযরত তালহা (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি এবং দেখি যে, তাঁর দেহে সত্তরটি যখম হয়েছে। তার অঙ্গুলিগুলোও কেটে পড়েছে। আমি পুনরায় তাঁর সংবাদ নেই। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখমের রক্ত চুষে নেন, যেন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ কুলকুচা করে ফেল’। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি কুলকুচা করবো না। তারপরে তিনি যুদ্ধেক্ষেত্রে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি কেউ জান্নাতী লোককে দেখতে ইচ্ছে করে তবে যেন এ লোকটিকে দেখে।' এরূপে তিনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়, সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং মস্তকের শিরস্ত্রাণ পড়ে যায়। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রক্ত ধৌত করছিলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ক্ষতস্থানে নিক্ষেপ করছিলেন। যখন দেখেন যে, রক্ত কোন কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) মাদুর পুড়িয়ে ওর ভস্ম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ প্রদান করলেন। (আরবী) শব্দে (আরবী) অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) (২০:৭১)-এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি, (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক দুঃখ তো পরাজয়ের দুঃখ, যখন এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ না করুন রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে বিজয়ী বেশে মুশরিকদের পর্বতের উপর আরোহণ, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ তাদের জন্যে এ উচ্চতা বাঞ্ছনীয় ছিল না। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেনঃ ‘প্রথম দুঃখ হচ্ছে পরাজয়ের দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শহীদ হওয়ার সংবাদ। এ দুঃখ প্রথম দুঃখ অপেক্ষা অধিক ছিল। অনুরূপভাবে এক দুঃখ গনীমত হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ পরাজয়ের দুঃখ। এরূপভাবে এক দুঃখ স্বীয় ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে জঘন্য সংবাদের দুঃখ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে গনীমত ও বিজয় তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল তার জন্যে দুঃখ করো না। প্রবল প্রতাপান্বিত ও মহা সম্মানিত আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত আছেন।
আলে ইমরান 3:151
১৪৯-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের কথা মান্য করতে নিষেধ করছেন এবং বলছেন, যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা ইহকালে ও পরকালে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তাদের চাহিদা তো এই যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন ইসলাম হতে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকেই তোমরা তোমাদের প্রভু ও সাহায্যকারী রূপে মেনে নাও, আমার সাথেই ভালবাসা স্থাপন কর, আমার উপরেই নির্ভর কর এবং একমাত্র। আমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ দুষ্টদের দুষ্টামির কারণে আমি তাদের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেবো।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী (আঃ)-কে দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে ভূমিকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষ করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমার নবুওয়াতকে সারা জগতের জন্যে সাধারণ করা হয়েছে। মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সমস্ত নবী (আঃ)-এর এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে, সমস্ত উম্মতের উপর চারটি মর্যাদা দান করেছেন-(১) আমাকে সারা জগতের নবী করে প্রেরণ করা হয়েছে। (২) আমার উম্মতের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্র করা হয়েছে। যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেই জায়গাটাই তাদের জন্যে মসজিদ ও অযুর স্থান। (৩) আমার শত্রু আমা হতে এক মাসের পথের ব্যবধানে থাকলেও আল্লাহ পাক তার অন্তর আমার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবেন। (৪) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল বৈধ করা হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শত্রুর অন্তরে ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছেঃ (১) আমি প্রত্যেক লাল ও সাদার নিকট প্রেরিত হয়েছি। (২) আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে বৈধ করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীর জন্যে বৈধ করা হয়নি। (৪) এক মাসের রাস্তা পর্যন্ত (শত্রুর অন্তরে) ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (৫) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সমস্ত নবী সুপারিশ চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার উম্মতের ঐ সব লোকের জন্যে সুপারিশ গোপন রেখেছি যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেনি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আবু সুফইয়ান (রাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভীতি উৎপাদন করেছেন, সুতরাং তিনি যুদ্ধ হতে ফিরে গেলেন। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্বীয় অঙ্গীকার সত্য করেছেন। এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এ অঙ্গীকার ছিল উহুদের যুদ্ধে। শত্রুদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, তথাপি তাদের চরণসমূহ টলে যায় এবং মুসলমানেরা বিজয় লাভ করে। কিন্তু আবার তীরন্দাজদের অবাধ্যতার কারণে এবং কয়েকজনের কাপুরুষতা প্রদর্শনের ফলে শর্তের উপর যে অঙ্গীকার ছিল তা উঠিয়ে নেয়া হয়। তাই আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে। প্রথম দিনেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করেন। কিন্তু তোমরা ভীরুতা প্রদর্শন করলে এবং নবী (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে গেলে ও তাঁর নির্দেশিত স্থান হতে সরে পড়লে, আর পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করলে। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ তোমরা স্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়েছিলে। গনীমতের মাল তোমাদের চক্ষের সামনে বিদ্যমান। ছিল। শত্রুরা পৃষ্ঠ প্রদর্শনের উপক্রম করেছিল। কাফিরদের পরাজয় দেখে নবী (সঃ)-এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে তোমাদের কেউ কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে গনীমতের মালের প্রতি ঝাপিয়ে পড়ে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎ নিয়াতের অধিকারী এবং পরকালের আকাঙখী থাকলেও কতগুলো লোকের অবাধ্যতার কারণে কাফিরদের সুযোগ এসে পড়ে এবং তোমাদের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায় যে, তোমরা বিজয় লাভের পরেও পরাজিত হয়ে যাও। কিন্তু এর পরেও আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কেননা, তিনি জানেন যে, স্পষ্টতঃই তোমরা সংখ্যা ও আসবাবপত্রে খুবই নগণ্য ছিলে।' ভুল মার্জনা হওয়াও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এভাবে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাহাদাত দানের পর তিনি স্বীয় পরীক্ষা উঠিয়ে নেন এবং অবশিষ্টকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসী লোকদের প্রতিই অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উহুদের যুদ্ধে যত সাহায্য করা হয়েছিল তত সাহায্য অন্য কোন যুদ্ধে করা হয়নি। ঐ সম্বন্ধেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ স্বীয় অঙ্গীকার তোমাদের জন্যে সত্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কর্মদোষের কারণেই ফল উল্টো হয়ে যায়। কোন কোন লোক দুনিয়ালোভী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ কয়েকজন তীরন্দাজ, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বত ঘাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন- এখান হতে তোমরা শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য কর যে, তারা যেন আমাদের পিছনের দিক দিয়ে আসতে না পারে, যদি তোমরা দেখ যে, আমরা পরাজিত হয়ে চলেছি তবুও তোমরা স্বীয় স্থান হতে সরে যেয়ো না। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সবদিক দিয়েই আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, তবুও তোমরা গনীমত লুটের উদ্দেশ্যে স্বীয় জায়গা পরিত্যাগ করো না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয় লাভ করেন তখন তীরন্দাজগণ তাঁর নির্দেশ পরিবর্তন করে এবং তারা তাদের স্থান ছেড়ে দিয়ে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় ও গনীমতের মাল জমা করতে আরম্ভ করে। পর্বত ঘাটি শূন্য পেয়ে মুশরিকরা পলায়ন বন্ধ করে এবং ভাবনা চিন্তা করে এ জায়গায় আক্রমণ চালিয়ে দেয়। যে কয়েকজন মুসলমান তখনও তথায় স্থির ছিলেন তাঁরা শহীদ হয়ে যান। তখন তারা পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে তাদের অজ্ঞাতে এমন ভীষণভাবে আক্রমণ করে যে, মুসলমানদের চরণসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায় এবং প্রথম দিনের বিজয় লাভ পরাজয়ে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে এর বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। অল্পক্ষণ পরেই মুসলমানদের দৃষ্টি তার পবিত্র মুখমণ্ডলে পতিত হয় তখন তারা সমস্ত বিপদ ভুলে যান এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দিকে আসছিলেন এবং বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহর কঠিন ক্রোধ বর্ষিত হোক যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তাদের কোনই অধিকার ছিল না যে, এভাবে তারা আমাদের উপর জয়যুক্ত হতে পারে। বর্ণনাকারী বলেনঃ অল্পক্ষণ পরেই আমরা শুনি যে, আবু সুফইয়ান পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে হোবল! আপনার মস্তক উন্নত হোক, হে হোবল! আপনামর মস্তক উন্নত হোক। আবু বকর কোথায়? উমার কোথায়? হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমাকে অনুমতি হলে আমি তাকে উত্তর দেই।' তিনি অনুমতি দেন। হযরত উমার (রাঃ) তখন উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত, আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত। আবু সুফইয়ান জিজ্ঞেস করেনঃ ‘বল মুহাম্মাদ (সঃ) কোথায়? আবু বকর কোথায়? উমার (রাঃ) কোথায়? তিনি বলেন, এই তো এখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ), ইনিই হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), আর আমিই হচ্ছি উমার।' আবূ সুফইয়ান তখন বলেনঃ “এটা বদরের যুদ্ধেরই প্রতিশোধ। এভাবেই রৌদ্র ও ছায়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের দৃষ্টান্ত তো কূপের বালতির ন্যায়।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এটা সমান কখনই নয়। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে গিয়েছে এবং আমাদের শহীদগণ জান্নাতে গিয়েছেন। আবু সুফইয়ান তখন বলেনঃ 'যদি এটাই হয় তবে তো অবশ্যই আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। জেনে রেখো, তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের কতগুলোকে তোমরা নাক কান কর্তিতও পাবে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের এটা অভিমত ছিল না বটে, তবে এটা আমাদের নিকট মন্দ বলেও মনে হয়নি। এ হাদীসটি গারীব এবং এ গল্পটিও বিস্ময়কর। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুরসালারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিও তার পিতা কেউই উহুদের যুদ্ধে বিদ্যমান ছিলেন না। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী (রাঃ)-এর (আরবী)-এর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এর কতক অংশের সত্যতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন স্ত্রীলোকেরা মুসলমান সৈনিকদের পিছনে অবস্থান করছিলেন এবং আহতদের দেখাশুনা করছিলেন। আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সেদিন আমাদের কেউই দুনিয়া লিন্দু ছিলেন না। বরং সেদিন যদি আমাকে ঐ কথার উপর শপথ করানো হতো তবে আমি শপথ করতাম। কিন্তু কুরআন কারীমে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া লিন্দুও ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন সাহাবীগণ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নির্দেশের বিপরীত কার্য সাধিত হয় এবং তার অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন তাদের পদসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে টলায়মান হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে শুধুমাত্র সাতজন আনসারী এবং দু’জন মুহাজির অবশিষ্ট থাকেন। যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ। তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর করুণা বর্ষণ করবেন যে তাদেরকে সরিয়ে দেবে। এ কথা শুনে একজন আনসারী দাঁড়িয়ে যান এবং একাকী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। আবার কাফিরেরা আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ঐ কথাই বলেন। এবারেও আর একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে যান এবং এমন ভীষণ বেগে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে অসমর্থ হয়। কিন্তু অবশেষে তিনিও শহীদ হয়ে যান। এভাবে সাতজন সাহাবীই (রাঃ) মহান আল্লাহর নিকট পৌছে যান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিরগণকে বলেনঃ বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে পক্ষপাতহীন ব্যবহার করলাম না। তখন আবু সুফইয়ান সশব্দে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে হোবল! আপনার শির, উন্নত হোক!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমরা বল (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহ উচ্চ ও মহা সম্মানিত।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমাদের জন্য উয রয়েছেন, তোমাদের জন্যে কোন উযযা নেই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বল- (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং কাফিরদের কোনই প্রভু নেই।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ “আজকের দিন হচ্ছে বদরের দিনের প্রতিশোধ। কোনদিন আমাদের এবং কোনদিন তোমাদের। এটা তো হাতে হাতের সওদা। একের পরিবর্তে একটি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সমান কখনই নয়। আমাদের শহীদগণ জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আহার্য দেয়া হচ্ছে, আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের জাহান্নামে শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পুনরায় আবু সুফইয়ান বলেনঃ “তোমরা তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতগুলোকে দেখতে পাবে যে, তাদের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি, করতে নিষেধও করিনি, আমি এটা পছন্দও করিনি, অপছন্দ ও করিনি, এটা আমাদের নিকট না ভাল বলে অনুভূত হয়েছে, না মন্দ বলে।' তখন শহীদগণের খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর পেট ফেড়ে দেয়া হয়েছে এবং হিন্দা কলিজা বের করে চিবিয়েছে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে না পেরে উগরিয়ে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত হামযা (রাঃ)-এর সামান্য গোত হিন্দার পেটে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মহান আল্লাহ চান না যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর শরীরের কোন অংশ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সামনে রেখে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর একজন আনসারীর জানাযা হাযির করা হয়। তাঁকে হযরত হামযা (রাঃ)-এর পার্শ্ব দেশে রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। আনসারীর জানাযা উঠিয়ে নেয়া হয় কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সেখানেই থেকে যায়। এভাবে সত্তরজন শহীদকে আনা হয় এবং সত্তরবার হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়া হয়। (মুসনাদ-ইআহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তীরন্দাজদের একটি দলকে একটি পৃথক স্থানে নিযুক্ত করেন। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে তাদের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলেনঃ 'যদি তোমরা আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত দেখতে পাও তবুও এখান হতে সরে যেয়ো না। আর তারা আমাদের উপর বিজয়ী হলেও তোমরা এ স্থান পরিত্যাগ করো না।' যুদ্ধ। শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহর ফযলে মুশরিকদের চরণগুলো পিছনে সরে পড়ে। এমনকি নারীগণও লুঙ্গী উঁচু করতঃ পর্বতের উপর এদিক ওদিক দৌড়াতে আরম্ভ করে। তখন তীরন্দাজ দলটি ‘গনীমত' ‘গনীমত' বলতে বলতে নীচে নেমে আসে। তাদের নেতা তাদেরকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। এ সুযোগে মুশরিকরা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হন। আবু সুফইয়ান একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) আছে কি? আবূ বকর কি বিদ্যমান আছে? উমার জীবিত আছে কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবাই নীরব থাকেন। তখন তিনি আত্মহারা হয়ে বলতে থাকেনঃ এরা সবাই আমাদের তরবারীর ঘাটে অবতরণ করেছে। এরা জীবিত থাকলে অবশ্যই উত্তর দিত। তখন হযরত উমার (রাঃ) অধৈর্য হয়ে বলে উঠেন :“হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর ফযলে আমরা সবাই বিদ্যমান রয়েছি এবং তোমাকে ধ্বংসকারী আল্লাহ আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। তারপরে ঐ সব কথাবার্তা হয় যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে এবং ইবলীস উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের সংবাদ লও। আগের দল পিছনের উপর পতিত হয়েছে। হযরত হুযায়ফা (রাঃ) দেখেন যে, মুসলমানদের তরবারী তাঁর পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)-এর উপর বর্ষিত হচ্ছে। বার বার তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা। ইনি আমার পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি এভাবেই শহীদ হয়ে যান। কিন্তু হযরত হুযায়ফা (রাঃ) কিছুই না বলে শুধুমাত্র বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন।' হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর এ সৌজন্য তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সীরাতে ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং দেখেছি যে, মুশরিকরা মুসলমানদের প্রথম আক্রমণেই পালাতে আরম্ভ করে, এমনকি তাদের নারীরা যেমন হিন্দা প্রভৃতি লুঙ্গী উঁচু করে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু এরপরে যখন তীরন্দাজগণ কেন্দ্রস্থল পরিত্যাগ করে এবং কাফিরেরা একত্রিত হয়ে পিছন দিক হতে আমাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে ও একজন সশব্দে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। নচেৎ আমরা তাদের পতাকা বাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার হাত হতে পতাকা নীচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমরা বিনতে আলকামা হারেসিয়্যা’ নাম্নী একজন স্ত্রীলোক ওটা উঠিয়ে নিয়েছিল এবং কুরায়েশরা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিকের চাচা হযরত আনাস ইবনে নার (রাঃ) এ পরিস্থিতি দেখে হযরত উমার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) প্রভৃতির নিকট আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা সাহস হারিয়েছেন কেন?' তারা বলেনঃ রাসূলল্লাহ তো শহীদ হয়েছেন।' হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ তাহলে আপনারা জীবিত থেকে কি করবেন?' একথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েন। অতঃপর বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেন। ইনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ ‘আগামী কোন দিনে সুযোগ আসলে দেখা যাবে। এ যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যখন মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি মুসলমানদের এ কার্যের জন্যে দায়ী নই এবং আমি মুশরিকদের এ কার্য হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অতঃপর তিনি তরবারী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। পথে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো উহুদ পাহাড় হতে জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' এ কথা বলেই মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে শাহাদাত লাভ করেন। তার শরীরে তীর ও তরবারীর আশিটিরও বেশী যখম ছিল। তাকে চিনবার কোন উপায় ছিল না। অঙ্গুলির গ্রন্থি দেখে চেনা গিয়েছিল। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, একজন হাজী বায়তুল্লাহ শরীফে একটি জনসমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো কে? উত্তরে বলা হয়ঃ কুরায়েশী'। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের শায়েখ কে?' বলা হয়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)।' তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আগমন করলে উক্ত হাজী সাহেব তাকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেত চাই।' তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করুন।' তিনি বলেন, আপনাকে এ বায়তুল্লাহ শরীফের কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি জানেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, এ সংবাদ কি আপনার জানা আছে যে, তিনি বদরের যুদ্ধেও যোগদান করেননি? তিনি বলেন , 'হ্যা। লোকটি আবার প্রশ্ন করেন, এ খবর কি আপনি অবগত আছেন যে, তিনি বায়'আতুর রিযওয়ানেও অংশগ্রহণ করেননি?' তিনি বলেন, “এটাও সঠিক কথা।' এবারে লোকটি খুশী হয়ে তাকবীর পাঠ করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন ‘এদিকে আসুন। এখন আমি আপনার নিকট বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করছি। উহুদের যুদ্ধ হতে পলায়ন তো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ ছিল এই যে, তাঁর বাড়িতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা ছিলেন এবং সে সময় তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, তুমি মদীনাতেই অবস্থান কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুণ্য দান করবেন এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও তোমার অংশ থাকবে। বায়'আতুর রিযওয়ানের ঘটনা এই যে, তাঁকে তিনি মক্কাবাসীদের নিকট স্বীয় পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেননা, মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর যেমন সম্মান ছিল অন্য কারও ছিল না। তার মক্কা গমনের পর এ বায়আত গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত উঠিয়ে বললেন, এটা উসমানের হাত।' অতঃপর তিনি ঐ হাতখানা তার অন্য হাতের উপর রাখেন (যেন তিনি, বায়'আত গ্রহণ। করলেন)। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন, এখন প্রস্থান করুন এবং এ ঘটনাটি সঙ্গে নিন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা শত্রুগণ হতে পলায়ন করে পর্বতের উপরে আরোহণ করছিলে এবং ভয়ের কারণে কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না, আর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে পশ্চাৎ হতে আহ্বান করছিলেন। এবং তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন, তোমরা পলায়ন করো না, বরং ফিরে এসো।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মুশরিকদের এ আকস্মিক প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলমানদের পদসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায়। তারা মদীনার পথে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কেউ কেউ পর্বতের শিকরে আরোহণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাঁদেরকে পিছন হতে ডাক দিয়ে বলছিলেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আমার দিকে এসো। এ ঘটনারই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে সময় মাত্র বারজন সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি দুদীর্ঘ হাদীসেও এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দালায়েলুন নবুওয়াহ’-এর মধ্যেও রয়েছে যে, যখন মুসলমানদের পরাজয় ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মাত্র এগারজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাহাড়ের উপর আরোহণ করছিলেন এমন সময় মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে নেয়। তিনি তাঁর সঙ্গীরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ ‘তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে এমন কেউ আছে কি? হযরত তালহা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তার এ আহ্বানে সাড়া দেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এখন থেমে যাও'। তখন একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে শহীদ হয়ে যান। এভাবে সবাই একের পর এক শাহাদাত বরণ করেন। তখন শুধুমাত্র হযরত তালহা (রাঃ) রয়ে যান। এ মহান ব্যক্তি বার বার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন কিন্তু বারবারই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধা দিচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন যে, শত্রুরা সবাই এক দিকে এবং তিনি একাই এক দিকে। এ যুদ্ধে তার অঙ্গুলিগুলো কেটে পড়ে। ফলে তার মুখ দিয়ে ইস’ শব্দ বের হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি বিসমিল্লাহ বলতে বা আল্লাহ তা'আলার নাম নিতে তবে তোমাকে ফেরেশতাগণ আকাশে উঠিয়ে নিতেন এবং লোকেরা দেখতে থাকত। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে পৌছে গেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত কায়েস ইবনে হাযেম (রাঃ) বলেনঃ হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর যে হাতখানা ভালরূপে ব্যবহার করছিলেন তা অচল হয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তৃণ হতে সমস্ত তীর আমার নিকট ছড়িয়ে দেন এবং বলেনঃ তোমার উপর আমার বাপ মা উৎসর্গ হোন। লও, মুশরিকদেরকে মারতে থাকো।' তিনি আমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন এবং আমি লক্ষ্য করে করে মুশরিকদেরকে মেরে চলছিলাম। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডানে-বামে এমন দু’জন লোককে দেখেছিলাম যারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলেন এবং যাদেরকে আমি ওর পূর্বেও কখনও দেখিনি এবং পরেও দেখিনি।' এ দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাঈল (আঃ)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সকলের পলায়নের পর যে কয়েজন মহান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করছিলেন এবং এক এক করে শহীদ হয়েছিলেন, তাদেরকে তিনি বলে চলছিলেনঃ “তাদেরকে বাধা প্রদান করতঃ জান্নাতে চলে যাবে ও জান্নাতে আমার বন্ধু হবে এমন কেউ আছ কি? মক্কায় উবাই ইবনে খালফ শপথ করে বলেছিল, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, সে তো নয় বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তাকে হত্যা করবো।' উহুদের যুদ্ধে সেই দুরাচার আপাদমস্তক লৌহ বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয় এবং বলতে বলতে আসেঃ ‘যদি মুহাম্মাদ বেঁচে যান তবে আমি নিজেকেই ধ্বংস করে দেবো। এদিকে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) ঐ দুরাচারের দিকে অগ্রসর হন। তার সারা দেহ লৌহবর্মে আবৃত ছিল। শুধুমাত্র কপালের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল। তিনি ঐ স্থান লক্ষ্য করে স্বীয় বর্শা দ্বারা সামান্য আঘাত করেন। তা ঠিক লক্ষ্যস্থলেই লেগে যায়। এর ফলে সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। আঘাত প্রাপ্ত স্থান হতে রক্তও বের হয়নি, অথচ তার অবস্থা এই ছিল যে, সে উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিল। তার লোকেরা তাকে উঠিয়ে সেনাবাহিনীর নিকট নিয়ে যায় এবং সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, বেশী আঘাত তো লাগেনি, তুমি এত কাপুরুষতা প্রদর্শন করছো কেন? অবশেষে সে তাদের বিদ্রুপে বাধ্য হয়ে বলে, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি উবাইকে হত্যা করবো। তোমরা এটা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, আমি বাঁচতে পারি না। এটা তোমরা মনে করো না যে, এ সামান্য আঁচড়ে কি হতে পারে? যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি সারা আরববাসীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিজ হাতের এ সামান্য আঘাত লাগতো তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকম অস্থিরভাবে ছটফট করতে করতে সেই পাপিষ্টের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়। মাগাযী-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে’ রয়েছে যে, যখন এ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখীন হয় তখন সাহাবীগণ তাঁর মোকাবিলা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি তাদেরকে বাধা দেন এবং বলেনঃ “তাকে আসতে দাও। যখন সে নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হারিস ইবনে সাম্মার (রাঃ) হাত হতে বর্শা নিয়ে তার উপর আক্রমণ করেন। তাঁর হাতে বর্শা দেখেই সে কেঁপে উঠে। সাহাবীগণ (রাঃ) তখনই বুঝে নেন যে, তার মঙ্গল নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার স্কন্ধে আঘাত করেন, এর ফলেই সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘বাতনে রাবেগ’ নামক স্থানে ঐ কাফিরের মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেনঃ একবার শেষরাত্রে এখান দিয়ে গমনের সময় এক জায়গায় এক ভীতিপ্রদ অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেখি এবং দেখতে পাই যে, একটি লোককে লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ করে ঐ আগুনে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা বলে চিৎকার করছে। অন্য এক ব্যক্তি বলছেঃ তাকে পানি দিও না। সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর হস্তে নিহত ব্যক্তি। সে হচ্ছে উবাই ইবনে খালফ'। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনের যে চারটি দাঁত মুশরিকরা উহুদের যুদ্ধে শহীদ করে দিয়েছিল ঐদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহ তাআলার কঠিন অভিশাপ রয়েছে যারা তাদের নবীর সাথে এ ব্যবহার করেছে এবং তার উপরও আল্লাহ পাকের ভীষণ অভিশাপ যাকে তাঁর রাসূল (সঃ) তাঁর পথে হত্যা করেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ রয়েছেঃ যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করেছে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার ভীষণ অভিশাপ রয়েছে।' উবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলে এ আঘাত লেগেছিল। তাঁর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। গণ্ডদেশও আহত হয়েছিল এবং ওষ্ঠেও আঘাত লেগেছিল। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলতেনঃ ঐ লোকটিকে হত্যা করার যেমন লোভ আমার ছিল অন্য কাউকে হত্যা করার তেমন ছিল না। ঐ লোকটি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ছিল এবং সারা গোত্রই তার শত্রু ছিল। তার দুশ্চরিত্রতা ও জঘন্য আচরণের প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটিই যথেষ্ট। নবী (সঃ)-কে। আহতকারীর উপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত। মুসনাদ-ই-আবদুর রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে বদদুআ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সারা বছরের মধ্যে সে যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরীর অবস্থায় যেন তার মৃত্যু ঘটে। বস্তুতঃ হলোও তাই। সেই দুরাচার কাফির হয়েই মারা গেল এবং জাহান্নামের অধিবাসী হলো। একজন মুহাজির বর্ণনা করেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন চতুর্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর তীর বর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সমস্তই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।' আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী সেদিন শপথ করে বলেছিলঃ মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখিয়ে দাও, সে আজ আমার হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। সে যদি মুক্তি পেয়ে যায় তবে আমার মুক্তি নেই। সে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর পার্শ্বেই এসে পড়ে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট কেউই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষুর উপর পর্দা নিক্ষেপ করেন। সুতরাং সে তাঁকে দেখতেই পায় না। যখন সে বিফল হয়ে ফিরে যায় তখন শাফওয়ান তাকে বিদ্রুপ করে। সে তখন বলেঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখতেই পাইনি। আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আমরা তাঁকে মারতে পারব না। জেনে রেখো, আমরা চার জন লোক তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং পরস্পর প্রতিজ্ঞাও করে বসি। কিন্তু শেষে অকৃতকার্য হয়ে পড়ি। ওয়াকেদী (রঃ) বলেনঃ ‘কিন্তু প্রমাণজনক কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপালে আঘাতকারী ছিল ইবনে কামইয়্যাহ এবং তাঁর ওষ্ঠে ও দাঁতে যে আঘাত করেছিল সে ছিল উবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস।' উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন উহুদের ঘটনা বর্ণনা করতেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে বলতেনঃ “সে দিনের সমস্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত তালহা (রাঃ)। আমি ফিরে এসে দেখি যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। আমি বলিঃ ‘আল্লাহ করেন ইনি তালহা হন!' তখন আমি নিকটে গিয়ে দেখি যে, তিনি তালহাই (রাঃ) বটে। আমি তখন আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতঃ বলি-ইনি আমারই গোত্রের একজন লোক। আমার এবং মুশরিকদের মধ্যস্থলে একজন লোক দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার প্রচণ্ড আক্রমণ মুশরিকদের সাহস হারিয়ে দিয়েছিল। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)। তারপরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই যে, তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে। এবং চেহারা মুবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে এবং কপালে লৌহ বর্মের দু'টি কড়া ঢুকে গেছে। আমি তখন দ্রুত বেগে তার দিকে ধাবিত হই। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আবু তালহা (রাঃ)-এর সংবাদ লও।” আমি চাচ্ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে কড়া দুটি বের করে ফেলি। কিন্তু হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে নিষেধ করেন এবং নিজেই নিকটে এসে হাত দিয়ে বের করতে খুবই কষ্ট অনুভব করেন। কাজেই দাঁত দিয়ে ধরে একটি বের করেন। কিন্তু এতে তার দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন আমি পুনরায় চাইলাম যে, দ্বিতীয়টি আমি বের করবো। কিন্তু আবার তিনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বিরত রাখলেন। সুতরাং আমি বিরত থাকলাম। তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এবারেও তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেল। এ কার্য সাধনের পর আমি হযরত তালহা (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি এবং দেখি যে, তাঁর দেহে সত্তরটি যখম হয়েছে। তার অঙ্গুলিগুলোও কেটে পড়েছে। আমি পুনরায় তাঁর সংবাদ নেই। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখমের রক্ত চুষে নেন, যেন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ কুলকুচা করে ফেল’। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি কুলকুচা করবো না। তারপরে তিনি যুদ্ধেক্ষেত্রে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি কেউ জান্নাতী লোককে দেখতে ইচ্ছে করে তবে যেন এ লোকটিকে দেখে।' এরূপে তিনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়, সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং মস্তকের শিরস্ত্রাণ পড়ে যায়। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রক্ত ধৌত করছিলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ক্ষতস্থানে নিক্ষেপ করছিলেন। যখন দেখেন যে, রক্ত কোন কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) মাদুর পুড়িয়ে ওর ভস্ম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ প্রদান করলেন। (আরবী) শব্দে (আরবী) অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) (২০:৭১)-এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি, (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক দুঃখ তো পরাজয়ের দুঃখ, যখন এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ না করুন রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে বিজয়ী বেশে মুশরিকদের পর্বতের উপর আরোহণ, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ তাদের জন্যে এ উচ্চতা বাঞ্ছনীয় ছিল না। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেনঃ ‘প্রথম দুঃখ হচ্ছে পরাজয়ের দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শহীদ হওয়ার সংবাদ। এ দুঃখ প্রথম দুঃখ অপেক্ষা অধিক ছিল। অনুরূপভাবে এক দুঃখ গনীমত হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ পরাজয়ের দুঃখ। এরূপভাবে এক দুঃখ স্বীয় ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে জঘন্য সংবাদের দুঃখ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে গনীমত ও বিজয় তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল তার জন্যে দুঃখ করো না। প্রবল প্রতাপান্বিত ও মহা সম্মানিত আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত আছেন।
আলে ইমরান 3:152
১৪৯-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের কথা মান্য করতে নিষেধ করছেন এবং বলছেন, যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা ইহকালে ও পরকালে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তাদের চাহিদা তো এই যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন ইসলাম হতে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকেই তোমরা তোমাদের প্রভু ও সাহায্যকারী রূপে মেনে নাও, আমার সাথেই ভালবাসা স্থাপন কর, আমার উপরেই নির্ভর কর এবং একমাত্র। আমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ দুষ্টদের দুষ্টামির কারণে আমি তাদের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেবো।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী (আঃ)-কে দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে ভূমিকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষ করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমার নবুওয়াতকে সারা জগতের জন্যে সাধারণ করা হয়েছে। মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সমস্ত নবী (আঃ)-এর এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে, সমস্ত উম্মতের উপর চারটি মর্যাদা দান করেছেন-(১) আমাকে সারা জগতের নবী করে প্রেরণ করা হয়েছে। (২) আমার উম্মতের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্র করা হয়েছে। যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেই জায়গাটাই তাদের জন্যে মসজিদ ও অযুর স্থান। (৩) আমার শত্রু আমা হতে এক মাসের পথের ব্যবধানে থাকলেও আল্লাহ পাক তার অন্তর আমার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবেন। (৪) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল বৈধ করা হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শত্রুর অন্তরে ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছেঃ (১) আমি প্রত্যেক লাল ও সাদার নিকট প্রেরিত হয়েছি। (২) আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে বৈধ করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীর জন্যে বৈধ করা হয়নি। (৪) এক মাসের রাস্তা পর্যন্ত (শত্রুর অন্তরে) ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (৫) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সমস্ত নবী সুপারিশ চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার উম্মতের ঐ সব লোকের জন্যে সুপারিশ গোপন রেখেছি যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেনি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আবু সুফইয়ান (রাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভীতি উৎপাদন করেছেন, সুতরাং তিনি যুদ্ধ হতে ফিরে গেলেন। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্বীয় অঙ্গীকার সত্য করেছেন। এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এ অঙ্গীকার ছিল উহুদের যুদ্ধে। শত্রুদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, তথাপি তাদের চরণসমূহ টলে যায় এবং মুসলমানেরা বিজয় লাভ করে। কিন্তু আবার তীরন্দাজদের অবাধ্যতার কারণে এবং কয়েকজনের কাপুরুষতা প্রদর্শনের ফলে শর্তের উপর যে অঙ্গীকার ছিল তা উঠিয়ে নেয়া হয়। তাই আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে। প্রথম দিনেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করেন। কিন্তু তোমরা ভীরুতা প্রদর্শন করলে এবং নবী (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে গেলে ও তাঁর নির্দেশিত স্থান হতে সরে পড়লে, আর পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করলে। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ তোমরা স্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়েছিলে। গনীমতের মাল তোমাদের চক্ষের সামনে বিদ্যমান। ছিল। শত্রুরা পৃষ্ঠ প্রদর্শনের উপক্রম করেছিল। কাফিরদের পরাজয় দেখে নবী (সঃ)-এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে তোমাদের কেউ কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে গনীমতের মালের প্রতি ঝাপিয়ে পড়ে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎ নিয়াতের অধিকারী এবং পরকালের আকাঙখী থাকলেও কতগুলো লোকের অবাধ্যতার কারণে কাফিরদের সুযোগ এসে পড়ে এবং তোমাদের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায় যে, তোমরা বিজয় লাভের পরেও পরাজিত হয়ে যাও। কিন্তু এর পরেও আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কেননা, তিনি জানেন যে, স্পষ্টতঃই তোমরা সংখ্যা ও আসবাবপত্রে খুবই নগণ্য ছিলে।' ভুল মার্জনা হওয়াও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এভাবে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাহাদাত দানের পর তিনি স্বীয় পরীক্ষা উঠিয়ে নেন এবং অবশিষ্টকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসী লোকদের প্রতিই অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উহুদের যুদ্ধে যত সাহায্য করা হয়েছিল তত সাহায্য অন্য কোন যুদ্ধে করা হয়নি। ঐ সম্বন্ধেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ স্বীয় অঙ্গীকার তোমাদের জন্যে সত্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কর্মদোষের কারণেই ফল উল্টো হয়ে যায়। কোন কোন লোক দুনিয়ালোভী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ কয়েকজন তীরন্দাজ, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বত ঘাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন- এখান হতে তোমরা শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য কর যে, তারা যেন আমাদের পিছনের দিক দিয়ে আসতে না পারে, যদি তোমরা দেখ যে, আমরা পরাজিত হয়ে চলেছি তবুও তোমরা স্বীয় স্থান হতে সরে যেয়ো না। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সবদিক দিয়েই আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, তবুও তোমরা গনীমত লুটের উদ্দেশ্যে স্বীয় জায়গা পরিত্যাগ করো না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয় লাভ করেন তখন তীরন্দাজগণ তাঁর নির্দেশ পরিবর্তন করে এবং তারা তাদের স্থান ছেড়ে দিয়ে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় ও গনীমতের মাল জমা করতে আরম্ভ করে। পর্বত ঘাটি শূন্য পেয়ে মুশরিকরা পলায়ন বন্ধ করে এবং ভাবনা চিন্তা করে এ জায়গায় আক্রমণ চালিয়ে দেয়। যে কয়েকজন মুসলমান তখনও তথায় স্থির ছিলেন তাঁরা শহীদ হয়ে যান। তখন তারা পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে তাদের অজ্ঞাতে এমন ভীষণভাবে আক্রমণ করে যে, মুসলমানদের চরণসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায় এবং প্রথম দিনের বিজয় লাভ পরাজয়ে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে এর বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। অল্পক্ষণ পরেই মুসলমানদের দৃষ্টি তার পবিত্র মুখমণ্ডলে পতিত হয় তখন তারা সমস্ত বিপদ ভুলে যান এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দিকে আসছিলেন এবং বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহর কঠিন ক্রোধ বর্ষিত হোক যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তাদের কোনই অধিকার ছিল না যে, এভাবে তারা আমাদের উপর জয়যুক্ত হতে পারে। বর্ণনাকারী বলেনঃ অল্পক্ষণ পরেই আমরা শুনি যে, আবু সুফইয়ান পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে হোবল! আপনার মস্তক উন্নত হোক, হে হোবল! আপনামর মস্তক উন্নত হোক। আবু বকর কোথায়? উমার কোথায়? হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমাকে অনুমতি হলে আমি তাকে উত্তর দেই।' তিনি অনুমতি দেন। হযরত উমার (রাঃ) তখন উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত, আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত। আবু সুফইয়ান জিজ্ঞেস করেনঃ ‘বল মুহাম্মাদ (সঃ) কোথায়? আবু বকর কোথায়? উমার (রাঃ) কোথায়? তিনি বলেন, এই তো এখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ), ইনিই হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), আর আমিই হচ্ছি উমার।' আবূ সুফইয়ান তখন বলেনঃ “এটা বদরের যুদ্ধেরই প্রতিশোধ। এভাবেই রৌদ্র ও ছায়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের দৃষ্টান্ত তো কূপের বালতির ন্যায়।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এটা সমান কখনই নয়। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে গিয়েছে এবং আমাদের শহীদগণ জান্নাতে গিয়েছেন। আবু সুফইয়ান তখন বলেনঃ 'যদি এটাই হয় তবে তো অবশ্যই আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। জেনে রেখো, তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের কতগুলোকে তোমরা নাক কান কর্তিতও পাবে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের এটা অভিমত ছিল না বটে, তবে এটা আমাদের নিকট মন্দ বলেও মনে হয়নি। এ হাদীসটি গারীব এবং এ গল্পটিও বিস্ময়কর। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুরসালারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিও তার পিতা কেউই উহুদের যুদ্ধে বিদ্যমান ছিলেন না। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী (রাঃ)-এর (আরবী)-এর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এর কতক অংশের সত্যতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন স্ত্রীলোকেরা মুসলমান সৈনিকদের পিছনে অবস্থান করছিলেন এবং আহতদের দেখাশুনা করছিলেন। আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সেদিন আমাদের কেউই দুনিয়া লিন্দু ছিলেন না। বরং সেদিন যদি আমাকে ঐ কথার উপর শপথ করানো হতো তবে আমি শপথ করতাম। কিন্তু কুরআন কারীমে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া লিন্দুও ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন সাহাবীগণ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নির্দেশের বিপরীত কার্য সাধিত হয় এবং তার অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন তাদের পদসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে টলায়মান হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে শুধুমাত্র সাতজন আনসারী এবং দু’জন মুহাজির অবশিষ্ট থাকেন। যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ। তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর করুণা বর্ষণ করবেন যে তাদেরকে সরিয়ে দেবে। এ কথা শুনে একজন আনসারী দাঁড়িয়ে যান এবং একাকী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। আবার কাফিরেরা আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ঐ কথাই বলেন। এবারেও আর একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে যান এবং এমন ভীষণ বেগে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে অসমর্থ হয়। কিন্তু অবশেষে তিনিও শহীদ হয়ে যান। এভাবে সাতজন সাহাবীই (রাঃ) মহান আল্লাহর নিকট পৌছে যান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিরগণকে বলেনঃ বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে পক্ষপাতহীন ব্যবহার করলাম না। তখন আবু সুফইয়ান সশব্দে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে হোবল! আপনার শির, উন্নত হোক!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমরা বল (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহ উচ্চ ও মহা সম্মানিত।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমাদের জন্য উয রয়েছেন, তোমাদের জন্যে কোন উযযা নেই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বল- (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং কাফিরদের কোনই প্রভু নেই।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ “আজকের দিন হচ্ছে বদরের দিনের প্রতিশোধ। কোনদিন আমাদের এবং কোনদিন তোমাদের। এটা তো হাতে হাতের সওদা। একের পরিবর্তে একটি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সমান কখনই নয়। আমাদের শহীদগণ জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আহার্য দেয়া হচ্ছে, আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের জাহান্নামে শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পুনরায় আবু সুফইয়ান বলেনঃ “তোমরা তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতগুলোকে দেখতে পাবে যে, তাদের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি, করতে নিষেধও করিনি, আমি এটা পছন্দও করিনি, অপছন্দ ও করিনি, এটা আমাদের নিকট না ভাল বলে অনুভূত হয়েছে, না মন্দ বলে।' তখন শহীদগণের খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর পেট ফেড়ে দেয়া হয়েছে এবং হিন্দা কলিজা বের করে চিবিয়েছে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে না পেরে উগরিয়ে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত হামযা (রাঃ)-এর সামান্য গোত হিন্দার পেটে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মহান আল্লাহ চান না যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর শরীরের কোন অংশ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সামনে রেখে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর একজন আনসারীর জানাযা হাযির করা হয়। তাঁকে হযরত হামযা (রাঃ)-এর পার্শ্ব দেশে রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। আনসারীর জানাযা উঠিয়ে নেয়া হয় কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সেখানেই থেকে যায়। এভাবে সত্তরজন শহীদকে আনা হয় এবং সত্তরবার হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়া হয়। (মুসনাদ-ইআহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তীরন্দাজদের একটি দলকে একটি পৃথক স্থানে নিযুক্ত করেন। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে তাদের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলেনঃ 'যদি তোমরা আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত দেখতে পাও তবুও এখান হতে সরে যেয়ো না। আর তারা আমাদের উপর বিজয়ী হলেও তোমরা এ স্থান পরিত্যাগ করো না।' যুদ্ধ। শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহর ফযলে মুশরিকদের চরণগুলো পিছনে সরে পড়ে। এমনকি নারীগণও লুঙ্গী উঁচু করতঃ পর্বতের উপর এদিক ওদিক দৌড়াতে আরম্ভ করে। তখন তীরন্দাজ দলটি ‘গনীমত' ‘গনীমত' বলতে বলতে নীচে নেমে আসে। তাদের নেতা তাদেরকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। এ সুযোগে মুশরিকরা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হন। আবু সুফইয়ান একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) আছে কি? আবূ বকর কি বিদ্যমান আছে? উমার জীবিত আছে কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবাই নীরব থাকেন। তখন তিনি আত্মহারা হয়ে বলতে থাকেনঃ এরা সবাই আমাদের তরবারীর ঘাটে অবতরণ করেছে। এরা জীবিত থাকলে অবশ্যই উত্তর দিত। তখন হযরত উমার (রাঃ) অধৈর্য হয়ে বলে উঠেন :“হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর ফযলে আমরা সবাই বিদ্যমান রয়েছি এবং তোমাকে ধ্বংসকারী আল্লাহ আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। তারপরে ঐ সব কথাবার্তা হয় যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে এবং ইবলীস উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের সংবাদ লও। আগের দল পিছনের উপর পতিত হয়েছে। হযরত হুযায়ফা (রাঃ) দেখেন যে, মুসলমানদের তরবারী তাঁর পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)-এর উপর বর্ষিত হচ্ছে। বার বার তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা। ইনি আমার পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি এভাবেই শহীদ হয়ে যান। কিন্তু হযরত হুযায়ফা (রাঃ) কিছুই না বলে শুধুমাত্র বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন।' হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর এ সৌজন্য তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সীরাতে ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং দেখেছি যে, মুশরিকরা মুসলমানদের প্রথম আক্রমণেই পালাতে আরম্ভ করে, এমনকি তাদের নারীরা যেমন হিন্দা প্রভৃতি লুঙ্গী উঁচু করে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু এরপরে যখন তীরন্দাজগণ কেন্দ্রস্থল পরিত্যাগ করে এবং কাফিরেরা একত্রিত হয়ে পিছন দিক হতে আমাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে ও একজন সশব্দে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। নচেৎ আমরা তাদের পতাকা বাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার হাত হতে পতাকা নীচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমরা বিনতে আলকামা হারেসিয়্যা’ নাম্নী একজন স্ত্রীলোক ওটা উঠিয়ে নিয়েছিল এবং কুরায়েশরা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিকের চাচা হযরত আনাস ইবনে নার (রাঃ) এ পরিস্থিতি দেখে হযরত উমার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) প্রভৃতির নিকট আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা সাহস হারিয়েছেন কেন?' তারা বলেনঃ রাসূলল্লাহ তো শহীদ হয়েছেন।' হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ তাহলে আপনারা জীবিত থেকে কি করবেন?' একথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েন। অতঃপর বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেন। ইনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ ‘আগামী কোন দিনে সুযোগ আসলে দেখা যাবে। এ যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যখন মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি মুসলমানদের এ কার্যের জন্যে দায়ী নই এবং আমি মুশরিকদের এ কার্য হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অতঃপর তিনি তরবারী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। পথে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো উহুদ পাহাড় হতে জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' এ কথা বলেই মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে শাহাদাত লাভ করেন। তার শরীরে তীর ও তরবারীর আশিটিরও বেশী যখম ছিল। তাকে চিনবার কোন উপায় ছিল না। অঙ্গুলির গ্রন্থি দেখে চেনা গিয়েছিল। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, একজন হাজী বায়তুল্লাহ শরীফে একটি জনসমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো কে? উত্তরে বলা হয়ঃ কুরায়েশী'। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের শায়েখ কে?' বলা হয়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)।' তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আগমন করলে উক্ত হাজী সাহেব তাকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেত চাই।' তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করুন।' তিনি বলেন, আপনাকে এ বায়তুল্লাহ শরীফের কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি জানেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, এ সংবাদ কি আপনার জানা আছে যে, তিনি বদরের যুদ্ধেও যোগদান করেননি? তিনি বলেন , 'হ্যা। লোকটি আবার প্রশ্ন করেন, এ খবর কি আপনি অবগত আছেন যে, তিনি বায়'আতুর রিযওয়ানেও অংশগ্রহণ করেননি?' তিনি বলেন, “এটাও সঠিক কথা।' এবারে লোকটি খুশী হয়ে তাকবীর পাঠ করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন ‘এদিকে আসুন। এখন আমি আপনার নিকট বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করছি। উহুদের যুদ্ধ হতে পলায়ন তো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ ছিল এই যে, তাঁর বাড়িতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা ছিলেন এবং সে সময় তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, তুমি মদীনাতেই অবস্থান কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুণ্য দান করবেন এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও তোমার অংশ থাকবে। বায়'আতুর রিযওয়ানের ঘটনা এই যে, তাঁকে তিনি মক্কাবাসীদের নিকট স্বীয় পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেননা, মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর যেমন সম্মান ছিল অন্য কারও ছিল না। তার মক্কা গমনের পর এ বায়আত গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত উঠিয়ে বললেন, এটা উসমানের হাত।' অতঃপর তিনি ঐ হাতখানা তার অন্য হাতের উপর রাখেন (যেন তিনি, বায়'আত গ্রহণ। করলেন)। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন, এখন প্রস্থান করুন এবং এ ঘটনাটি সঙ্গে নিন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা শত্রুগণ হতে পলায়ন করে পর্বতের উপরে আরোহণ করছিলে এবং ভয়ের কারণে কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না, আর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে পশ্চাৎ হতে আহ্বান করছিলেন। এবং তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন, তোমরা পলায়ন করো না, বরং ফিরে এসো।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মুশরিকদের এ আকস্মিক প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলমানদের পদসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায়। তারা মদীনার পথে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কেউ কেউ পর্বতের শিকরে আরোহণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাঁদেরকে পিছন হতে ডাক দিয়ে বলছিলেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আমার দিকে এসো। এ ঘটনারই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে সময় মাত্র বারজন সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি দুদীর্ঘ হাদীসেও এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দালায়েলুন নবুওয়াহ’-এর মধ্যেও রয়েছে যে, যখন মুসলমানদের পরাজয় ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মাত্র এগারজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাহাড়ের উপর আরোহণ করছিলেন এমন সময় মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে নেয়। তিনি তাঁর সঙ্গীরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ ‘তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে এমন কেউ আছে কি? হযরত তালহা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তার এ আহ্বানে সাড়া দেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এখন থেমে যাও'। তখন একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে শহীদ হয়ে যান। এভাবে সবাই একের পর এক শাহাদাত বরণ করেন। তখন শুধুমাত্র হযরত তালহা (রাঃ) রয়ে যান। এ মহান ব্যক্তি বার বার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন কিন্তু বারবারই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধা দিচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন যে, শত্রুরা সবাই এক দিকে এবং তিনি একাই এক দিকে। এ যুদ্ধে তার অঙ্গুলিগুলো কেটে পড়ে। ফলে তার মুখ দিয়ে ইস’ শব্দ বের হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি বিসমিল্লাহ বলতে বা আল্লাহ তা'আলার নাম নিতে তবে তোমাকে ফেরেশতাগণ আকাশে উঠিয়ে নিতেন এবং লোকেরা দেখতে থাকত। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে পৌছে গেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত কায়েস ইবনে হাযেম (রাঃ) বলেনঃ হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর যে হাতখানা ভালরূপে ব্যবহার করছিলেন তা অচল হয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তৃণ হতে সমস্ত তীর আমার নিকট ছড়িয়ে দেন এবং বলেনঃ তোমার উপর আমার বাপ মা উৎসর্গ হোন। লও, মুশরিকদেরকে মারতে থাকো।' তিনি আমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন এবং আমি লক্ষ্য করে করে মুশরিকদেরকে মেরে চলছিলাম। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডানে-বামে এমন দু’জন লোককে দেখেছিলাম যারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলেন এবং যাদেরকে আমি ওর পূর্বেও কখনও দেখিনি এবং পরেও দেখিনি।' এ দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাঈল (আঃ)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সকলের পলায়নের পর যে কয়েজন মহান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করছিলেন এবং এক এক করে শহীদ হয়েছিলেন, তাদেরকে তিনি বলে চলছিলেনঃ “তাদেরকে বাধা প্রদান করতঃ জান্নাতে চলে যাবে ও জান্নাতে আমার বন্ধু হবে এমন কেউ আছ কি? মক্কায় উবাই ইবনে খালফ শপথ করে বলেছিল, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, সে তো নয় বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তাকে হত্যা করবো।' উহুদের যুদ্ধে সেই দুরাচার আপাদমস্তক লৌহ বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয় এবং বলতে বলতে আসেঃ ‘যদি মুহাম্মাদ বেঁচে যান তবে আমি নিজেকেই ধ্বংস করে দেবো। এদিকে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) ঐ দুরাচারের দিকে অগ্রসর হন। তার সারা দেহ লৌহবর্মে আবৃত ছিল। শুধুমাত্র কপালের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল। তিনি ঐ স্থান লক্ষ্য করে স্বীয় বর্শা দ্বারা সামান্য আঘাত করেন। তা ঠিক লক্ষ্যস্থলেই লেগে যায়। এর ফলে সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। আঘাত প্রাপ্ত স্থান হতে রক্তও বের হয়নি, অথচ তার অবস্থা এই ছিল যে, সে উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিল। তার লোকেরা তাকে উঠিয়ে সেনাবাহিনীর নিকট নিয়ে যায় এবং সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, বেশী আঘাত তো লাগেনি, তুমি এত কাপুরুষতা প্রদর্শন করছো কেন? অবশেষে সে তাদের বিদ্রুপে বাধ্য হয়ে বলে, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি উবাইকে হত্যা করবো। তোমরা এটা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, আমি বাঁচতে পারি না। এটা তোমরা মনে করো না যে, এ সামান্য আঁচড়ে কি হতে পারে? যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি সারা আরববাসীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিজ হাতের এ সামান্য আঘাত লাগতো তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকম অস্থিরভাবে ছটফট করতে করতে সেই পাপিষ্টের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়। মাগাযী-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে’ রয়েছে যে, যখন এ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখীন হয় তখন সাহাবীগণ তাঁর মোকাবিলা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি তাদেরকে বাধা দেন এবং বলেনঃ “তাকে আসতে দাও। যখন সে নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হারিস ইবনে সাম্মার (রাঃ) হাত হতে বর্শা নিয়ে তার উপর আক্রমণ করেন। তাঁর হাতে বর্শা দেখেই সে কেঁপে উঠে। সাহাবীগণ (রাঃ) তখনই বুঝে নেন যে, তার মঙ্গল নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার স্কন্ধে আঘাত করেন, এর ফলেই সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘বাতনে রাবেগ’ নামক স্থানে ঐ কাফিরের মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেনঃ একবার শেষরাত্রে এখান দিয়ে গমনের সময় এক জায়গায় এক ভীতিপ্রদ অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেখি এবং দেখতে পাই যে, একটি লোককে লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ করে ঐ আগুনে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা বলে চিৎকার করছে। অন্য এক ব্যক্তি বলছেঃ তাকে পানি দিও না। সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর হস্তে নিহত ব্যক্তি। সে হচ্ছে উবাই ইবনে খালফ'। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনের যে চারটি দাঁত মুশরিকরা উহুদের যুদ্ধে শহীদ করে দিয়েছিল ঐদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহ তাআলার কঠিন অভিশাপ রয়েছে যারা তাদের নবীর সাথে এ ব্যবহার করেছে এবং তার উপরও আল্লাহ পাকের ভীষণ অভিশাপ যাকে তাঁর রাসূল (সঃ) তাঁর পথে হত্যা করেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ রয়েছেঃ যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করেছে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার ভীষণ অভিশাপ রয়েছে।' উবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলে এ আঘাত লেগেছিল। তাঁর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। গণ্ডদেশও আহত হয়েছিল এবং ওষ্ঠেও আঘাত লেগেছিল। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলতেনঃ ঐ লোকটিকে হত্যা করার যেমন লোভ আমার ছিল অন্য কাউকে হত্যা করার তেমন ছিল না। ঐ লোকটি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ছিল এবং সারা গোত্রই তার শত্রু ছিল। তার দুশ্চরিত্রতা ও জঘন্য আচরণের প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটিই যথেষ্ট। নবী (সঃ)-কে। আহতকারীর উপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত। মুসনাদ-ই-আবদুর রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে বদদুআ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সারা বছরের মধ্যে সে যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরীর অবস্থায় যেন তার মৃত্যু ঘটে। বস্তুতঃ হলোও তাই। সেই দুরাচার কাফির হয়েই মারা গেল এবং জাহান্নামের অধিবাসী হলো। একজন মুহাজির বর্ণনা করেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন চতুর্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর তীর বর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সমস্তই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।' আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী সেদিন শপথ করে বলেছিলঃ মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখিয়ে দাও, সে আজ আমার হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। সে যদি মুক্তি পেয়ে যায় তবে আমার মুক্তি নেই। সে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর পার্শ্বেই এসে পড়ে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট কেউই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষুর উপর পর্দা নিক্ষেপ করেন। সুতরাং সে তাঁকে দেখতেই পায় না। যখন সে বিফল হয়ে ফিরে যায় তখন শাফওয়ান তাকে বিদ্রুপ করে। সে তখন বলেঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখতেই পাইনি। আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আমরা তাঁকে মারতে পারব না। জেনে রেখো, আমরা চার জন লোক তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং পরস্পর প্রতিজ্ঞাও করে বসি। কিন্তু শেষে অকৃতকার্য হয়ে পড়ি। ওয়াকেদী (রঃ) বলেনঃ ‘কিন্তু প্রমাণজনক কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপালে আঘাতকারী ছিল ইবনে কামইয়্যাহ এবং তাঁর ওষ্ঠে ও দাঁতে যে আঘাত করেছিল সে ছিল উবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস।' উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন উহুদের ঘটনা বর্ণনা করতেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে বলতেনঃ “সে দিনের সমস্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত তালহা (রাঃ)। আমি ফিরে এসে দেখি যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। আমি বলিঃ ‘আল্লাহ করেন ইনি তালহা হন!' তখন আমি নিকটে গিয়ে দেখি যে, তিনি তালহাই (রাঃ) বটে। আমি তখন আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতঃ বলি-ইনি আমারই গোত্রের একজন লোক। আমার এবং মুশরিকদের মধ্যস্থলে একজন লোক দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার প্রচণ্ড আক্রমণ মুশরিকদের সাহস হারিয়ে দিয়েছিল। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)। তারপরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই যে, তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে। এবং চেহারা মুবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে এবং কপালে লৌহ বর্মের দু'টি কড়া ঢুকে গেছে। আমি তখন দ্রুত বেগে তার দিকে ধাবিত হই। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আবু তালহা (রাঃ)-এর সংবাদ লও।” আমি চাচ্ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে কড়া দুটি বের করে ফেলি। কিন্তু হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে নিষেধ করেন এবং নিজেই নিকটে এসে হাত দিয়ে বের করতে খুবই কষ্ট অনুভব করেন। কাজেই দাঁত দিয়ে ধরে একটি বের করেন। কিন্তু এতে তার দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন আমি পুনরায় চাইলাম যে, দ্বিতীয়টি আমি বের করবো। কিন্তু আবার তিনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বিরত রাখলেন। সুতরাং আমি বিরত থাকলাম। তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এবারেও তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেল। এ কার্য সাধনের পর আমি হযরত তালহা (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি এবং দেখি যে, তাঁর দেহে সত্তরটি যখম হয়েছে। তার অঙ্গুলিগুলোও কেটে পড়েছে। আমি পুনরায় তাঁর সংবাদ নেই। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখমের রক্ত চুষে নেন, যেন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ কুলকুচা করে ফেল’। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি কুলকুচা করবো না। তারপরে তিনি যুদ্ধেক্ষেত্রে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি কেউ জান্নাতী লোককে দেখতে ইচ্ছে করে তবে যেন এ লোকটিকে দেখে।' এরূপে তিনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়, সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং মস্তকের শিরস্ত্রাণ পড়ে যায়। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রক্ত ধৌত করছিলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ক্ষতস্থানে নিক্ষেপ করছিলেন। যখন দেখেন যে, রক্ত কোন কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) মাদুর পুড়িয়ে ওর ভস্ম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ প্রদান করলেন। (আরবী) শব্দে (আরবী) অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) (২০:৭১)-এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি, (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক দুঃখ তো পরাজয়ের দুঃখ, যখন এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ না করুন রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে বিজয়ী বেশে মুশরিকদের পর্বতের উপর আরোহণ, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ তাদের জন্যে এ উচ্চতা বাঞ্ছনীয় ছিল না। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেনঃ ‘প্রথম দুঃখ হচ্ছে পরাজয়ের দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শহীদ হওয়ার সংবাদ। এ দুঃখ প্রথম দুঃখ অপেক্ষা অধিক ছিল। অনুরূপভাবে এক দুঃখ গনীমত হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ পরাজয়ের দুঃখ। এরূপভাবে এক দুঃখ স্বীয় ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে জঘন্য সংবাদের দুঃখ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে গনীমত ও বিজয় তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল তার জন্যে দুঃখ করো না। প্রবল প্রতাপান্বিত ও মহা সম্মানিত আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত আছেন।
আলে ইমরান 3:153
১৪৯-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে কাফির ও মুনাফিকদের কথা মান্য করতে নিষেধ করছেন এবং বলছেন, যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা ইহকালে ও পরকালে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তাদের চাহিদা তো এই যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন ইসলাম হতে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকেই তোমরা তোমাদের প্রভু ও সাহায্যকারী রূপে মেনে নাও, আমার সাথেই ভালবাসা স্থাপন কর, আমার উপরেই নির্ভর কর এবং একমাত্র। আমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ দুষ্টদের দুষ্টামির কারণে আমি তাদের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেবো।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী (আঃ)-কে দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে ভূমিকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষ করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমার নবুওয়াতকে সারা জগতের জন্যে সাধারণ করা হয়েছে। মুসনাদ-ই আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সমস্ত নবী (আঃ)-এর এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে, সমস্ত উম্মতের উপর চারটি মর্যাদা দান করেছেন-(১) আমাকে সারা জগতের নবী করে প্রেরণ করা হয়েছে। (২) আমার উম্মতের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্র করা হয়েছে। যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেই জায়গাটাই তাদের জন্যে মসজিদ ও অযুর স্থান। (৩) আমার শত্রু আমা হতে এক মাসের পথের ব্যবধানে থাকলেও আল্লাহ পাক তার অন্তর আমার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবেন। (৪) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল বৈধ করা হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শত্রুর অন্তরে ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছেঃ (১) আমি প্রত্যেক লাল ও সাদার নিকট প্রেরিত হয়েছি। (২) আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে মসজিদ ও অযুর জন্যে পবিত্র করা হয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে বৈধ করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীর জন্যে বৈধ করা হয়নি। (৪) এক মাসের রাস্তা পর্যন্ত (শত্রুর অন্তরে) ভীতি উৎপাদন দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (৫) আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সমস্ত নবী সুপারিশ চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার উম্মতের ঐ সব লোকের জন্যে সুপারিশ গোপন রেখেছি যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেনি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আবু সুফইয়ান (রাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভীতি উৎপাদন করেছেন, সুতরাং তিনি যুদ্ধ হতে ফিরে গেলেন। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্বীয় অঙ্গীকার সত্য করেছেন। এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এ অঙ্গীকার ছিল উহুদের যুদ্ধে। শত্রুদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, তথাপি তাদের চরণসমূহ টলে যায় এবং মুসলমানেরা বিজয় লাভ করে। কিন্তু আবার তীরন্দাজদের অবাধ্যতার কারণে এবং কয়েকজনের কাপুরুষতা প্রদর্শনের ফলে শর্তের উপর যে অঙ্গীকার ছিল তা উঠিয়ে নেয়া হয়। তাই আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে। প্রথম দিনেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করেন। কিন্তু তোমরা ভীরুতা প্রদর্শন করলে এবং নবী (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে গেলে ও তাঁর নির্দেশিত স্থান হতে সরে পড়লে, আর পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করলে। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ তোমরা স্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়েছিলে। গনীমতের মাল তোমাদের চক্ষের সামনে বিদ্যমান। ছিল। শত্রুরা পৃষ্ঠ প্রদর্শনের উপক্রম করেছিল। কাফিরদের পরাজয় দেখে নবী (সঃ)-এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে তোমাদের কেউ কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে গনীমতের মালের প্রতি ঝাপিয়ে পড়ে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎ নিয়াতের অধিকারী এবং পরকালের আকাঙখী থাকলেও কতগুলো লোকের অবাধ্যতার কারণে কাফিরদের সুযোগ এসে পড়ে এবং তোমাদের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায় যে, তোমরা বিজয় লাভের পরেও পরাজিত হয়ে যাও। কিন্তু এর পরেও আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কেননা, তিনি জানেন যে, স্পষ্টতঃই তোমরা সংখ্যা ও আসবাবপত্রে খুবই নগণ্য ছিলে।' ভুল মার্জনা হওয়াও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এভাবে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাহাদাত দানের পর তিনি স্বীয় পরীক্ষা উঠিয়ে নেন এবং অবশিষ্টকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসী লোকদের প্রতিই অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উহুদের যুদ্ধে যত সাহায্য করা হয়েছিল তত সাহায্য অন্য কোন যুদ্ধে করা হয়নি। ঐ সম্বন্ধেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ স্বীয় অঙ্গীকার তোমাদের জন্যে সত্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কর্মদোষের কারণেই ফল উল্টো হয়ে যায়। কোন কোন লোক দুনিয়ালোভী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ কয়েকজন তীরন্দাজ, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বত ঘাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন- এখান হতে তোমরা শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য কর যে, তারা যেন আমাদের পিছনের দিক দিয়ে আসতে না পারে, যদি তোমরা দেখ যে, আমরা পরাজিত হয়ে চলেছি তবুও তোমরা স্বীয় স্থান হতে সরে যেয়ো না। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সবদিক দিয়েই আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, তবুও তোমরা গনীমত লুটের উদ্দেশ্যে স্বীয় জায়গা পরিত্যাগ করো না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয় লাভ করেন তখন তীরন্দাজগণ তাঁর নির্দেশ পরিবর্তন করে এবং তারা তাদের স্থান ছেড়ে দিয়ে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় ও গনীমতের মাল জমা করতে আরম্ভ করে। পর্বত ঘাটি শূন্য পেয়ে মুশরিকরা পলায়ন বন্ধ করে এবং ভাবনা চিন্তা করে এ জায়গায় আক্রমণ চালিয়ে দেয়। যে কয়েকজন মুসলমান তখনও তথায় স্থির ছিলেন তাঁরা শহীদ হয়ে যান। তখন তারা পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে তাদের অজ্ঞাতে এমন ভীষণভাবে আক্রমণ করে যে, মুসলমানদের চরণসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায় এবং প্রথম দিনের বিজয় লাভ পরাজয়ে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে এর বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। অল্পক্ষণ পরেই মুসলমানদের দৃষ্টি তার পবিত্র মুখমণ্ডলে পতিত হয় তখন তারা সমস্ত বিপদ ভুলে যান এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দিকে আসছিলেন এবং বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহর কঠিন ক্রোধ বর্ষিত হোক যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তাদের কোনই অধিকার ছিল না যে, এভাবে তারা আমাদের উপর জয়যুক্ত হতে পারে। বর্ণনাকারী বলেনঃ অল্পক্ষণ পরেই আমরা শুনি যে, আবু সুফইয়ান পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে হোবল! আপনার মস্তক উন্নত হোক, হে হোবল! আপনামর মস্তক উন্নত হোক। আবু বকর কোথায়? উমার কোথায়? হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমাকে অনুমতি হলে আমি তাকে উত্তর দেই।' তিনি অনুমতি দেন। হযরত উমার (রাঃ) তখন উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত, আল্লাহই সর্বোচ্চ ও মহাসম্মানিত। আবু সুফইয়ান জিজ্ঞেস করেনঃ ‘বল মুহাম্মাদ (সঃ) কোথায়? আবু বকর কোথায়? উমার (রাঃ) কোথায়? তিনি বলেন, এই তো এখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ), ইনিই হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), আর আমিই হচ্ছি উমার।' আবূ সুফইয়ান তখন বলেনঃ “এটা বদরের যুদ্ধেরই প্রতিশোধ। এভাবেই রৌদ্র ও ছায়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের দৃষ্টান্ত তো কূপের বালতির ন্যায়।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এটা সমান কখনই নয়। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে গিয়েছে এবং আমাদের শহীদগণ জান্নাতে গিয়েছেন। আবু সুফইয়ান তখন বলেনঃ 'যদি এটাই হয় তবে তো অবশ্যই আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। জেনে রেখো, তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের কতগুলোকে তোমরা নাক কান কর্তিতও পাবে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের এটা অভিমত ছিল না বটে, তবে এটা আমাদের নিকট মন্দ বলেও মনে হয়নি। এ হাদীসটি গারীব এবং এ গল্পটিও বিস্ময়কর। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুরসালারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিও তার পিতা কেউই উহুদের যুদ্ধে বিদ্যমান ছিলেন না। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী (রাঃ)-এর (আরবী)-এর মধ্যেও এটা বর্ণিত আছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এর কতক অংশের সত্যতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন স্ত্রীলোকেরা মুসলমান সৈনিকদের পিছনে অবস্থান করছিলেন এবং আহতদের দেখাশুনা করছিলেন। আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সেদিন আমাদের কেউই দুনিয়া লিন্দু ছিলেন না। বরং সেদিন যদি আমাকে ঐ কথার উপর শপথ করানো হতো তবে আমি শপথ করতাম। কিন্তু কুরআন কারীমে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া লিন্দুও ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন সাহাবীগণ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নির্দেশের বিপরীত কার্য সাধিত হয় এবং তার অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন তাদের পদসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে টলায়মান হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে শুধুমাত্র সাতজন আনসারী এবং দু’জন মুহাজির অবশিষ্ট থাকেন। যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ। তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর করুণা বর্ষণ করবেন যে তাদেরকে সরিয়ে দেবে। এ কথা শুনে একজন আনসারী দাঁড়িয়ে যান এবং একাকী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। আবার কাফিরেরা আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ঐ কথাই বলেন। এবারেও আর একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে যান এবং এমন ভীষণ বেগে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে অসমর্থ হয়। কিন্তু অবশেষে তিনিও শহীদ হয়ে যান। এভাবে সাতজন সাহাবীই (রাঃ) মহান আল্লাহর নিকট পৌছে যান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিরগণকে বলেনঃ বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে পক্ষপাতহীন ব্যবহার করলাম না। তখন আবু সুফইয়ান সশব্দে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে হোবল! আপনার শির, উন্নত হোক!' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমরা বল (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহ উচ্চ ও মহা সম্মানিত।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমাদের জন্য উয রয়েছেন, তোমাদের জন্যে কোন উযযা নেই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বল- (আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং কাফিরদের কোনই প্রভু নেই।' আবু সুফইয়ান বলেনঃ “আজকের দিন হচ্ছে বদরের দিনের প্রতিশোধ। কোনদিন আমাদের এবং কোনদিন তোমাদের। এটা তো হাতে হাতের সওদা। একের পরিবর্তে একটি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সমান কখনই নয়। আমাদের শহীদগণ জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আহার্য দেয়া হচ্ছে, আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের জাহান্নামে শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পুনরায় আবু সুফইয়ান বলেনঃ “তোমরা তোমাদের নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কতগুলোকে দেখতে পাবে যে, তাদের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি, করতে নিষেধও করিনি, আমি এটা পছন্দও করিনি, অপছন্দ ও করিনি, এটা আমাদের নিকট না ভাল বলে অনুভূত হয়েছে, না মন্দ বলে।' তখন শহীদগণের খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর পেট ফেড়ে দেয়া হয়েছে এবং হিন্দা কলিজা বের করে চিবিয়েছে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে না পেরে উগরিয়ে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত হামযা (রাঃ)-এর সামান্য গোত হিন্দার পেটে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মহান আল্লাহ চান না যে, হযরত হামযা (রাঃ)-এর শরীরের কোন অংশ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সামনে রেখে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর একজন আনসারীর জানাযা হাযির করা হয়। তাঁকে হযরত হামযা (রাঃ)-এর পার্শ্ব দেশে রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। আনসারীর জানাযা উঠিয়ে নেয়া হয় কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযা সেখানেই থেকে যায়। এভাবে সত্তরজন শহীদকে আনা হয় এবং সত্তরবার হযরত হামযা (রাঃ)-এর জানাযার নামায পড়া হয়। (মুসনাদ-ইআহমাদ) সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তীরন্দাজদের একটি দলকে একটি পৃথক স্থানে নিযুক্ত করেন। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে তাদের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলেনঃ 'যদি তোমরা আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত দেখতে পাও তবুও এখান হতে সরে যেয়ো না। আর তারা আমাদের উপর বিজয়ী হলেও তোমরা এ স্থান পরিত্যাগ করো না।' যুদ্ধ। শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহর ফযলে মুশরিকদের চরণগুলো পিছনে সরে পড়ে। এমনকি নারীগণও লুঙ্গী উঁচু করতঃ পর্বতের উপর এদিক ওদিক দৌড়াতে আরম্ভ করে। তখন তীরন্দাজ দলটি ‘গনীমত' ‘গনীমত' বলতে বলতে নীচে নেমে আসে। তাদের নেতা তাদেরকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করে না। এ সুযোগে মুশরিকরা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হন। আবু সুফইয়ান একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) আছে কি? আবূ বকর কি বিদ্যমান আছে? উমার জীবিত আছে কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবাই নীরব থাকেন। তখন তিনি আত্মহারা হয়ে বলতে থাকেনঃ এরা সবাই আমাদের তরবারীর ঘাটে অবতরণ করেছে। এরা জীবিত থাকলে অবশ্যই উত্তর দিত। তখন হযরত উমার (রাঃ) অধৈর্য হয়ে বলে উঠেন :“হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর ফযলে আমরা সবাই বিদ্যমান রয়েছি এবং তোমাকে ধ্বংসকারী আল্লাহ আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। তারপরে ঐ সব কথাবার্তা হয় যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় ঘটে এবং ইবলীস উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের সংবাদ লও। আগের দল পিছনের উপর পতিত হয়েছে। হযরত হুযায়ফা (রাঃ) দেখেন যে, মুসলমানদের তরবারী তাঁর পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)-এর উপর বর্ষিত হচ্ছে। বার বার তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা। ইনি আমার পিতা হযরত ইয়ামান (রাঃ)। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি এভাবেই শহীদ হয়ে যান। কিন্তু হযরত হুযায়ফা (রাঃ) কিছুই না বলে শুধুমাত্র বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন।' হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর এ সৌজন্য তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সীরাতে ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং দেখেছি যে, মুশরিকরা মুসলমানদের প্রথম আক্রমণেই পালাতে আরম্ভ করে, এমনকি তাদের নারীরা যেমন হিন্দা প্রভৃতি লুঙ্গী উঁচু করে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু এরপরে যখন তীরন্দাজগণ কেন্দ্রস্থল পরিত্যাগ করে এবং কাফিরেরা একত্রিত হয়ে পিছন দিক হতে আমাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে ও একজন সশব্দে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। নচেৎ আমরা তাদের পতাকা বাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার হাত হতে পতাকা নীচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমরা বিনতে আলকামা হারেসিয়্যা’ নাম্নী একজন স্ত্রীলোক ওটা উঠিয়ে নিয়েছিল এবং কুরায়েশরা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিকের চাচা হযরত আনাস ইবনে নার (রাঃ) এ পরিস্থিতি দেখে হযরত উমার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) প্রভৃতির নিকট আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা সাহস হারিয়েছেন কেন?' তারা বলেনঃ রাসূলল্লাহ তো শহীদ হয়েছেন।' হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ তাহলে আপনারা জীবিত থেকে কি করবেন?' একথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েন। অতঃপর বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেন। ইনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ ‘আগামী কোন দিনে সুযোগ আসলে দেখা যাবে। এ যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যখন মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি মুসলমানদের এ কার্যের জন্যে দায়ী নই এবং আমি মুশরিকদের এ কার্য হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অতঃপর তিনি তরবারী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। পথে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো উহুদ পাহাড় হতে জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' এ কথা বলেই মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে শাহাদাত লাভ করেন। তার শরীরে তীর ও তরবারীর আশিটিরও বেশী যখম ছিল। তাকে চিনবার কোন উপায় ছিল না। অঙ্গুলির গ্রন্থি দেখে চেনা গিয়েছিল। সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, একজন হাজী বায়তুল্লাহ শরীফে একটি জনসমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো কে? উত্তরে বলা হয়ঃ কুরায়েশী'। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের শায়েখ কে?' বলা হয়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)।' তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আগমন করলে উক্ত হাজী সাহেব তাকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেত চাই।' তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করুন।' তিনি বলেন, আপনাকে এ বায়তুল্লাহ শরীফের কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি জানেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, এ সংবাদ কি আপনার জানা আছে যে, তিনি বদরের যুদ্ধেও যোগদান করেননি? তিনি বলেন , 'হ্যা। লোকটি আবার প্রশ্ন করেন, এ খবর কি আপনি অবগত আছেন যে, তিনি বায়'আতুর রিযওয়ানেও অংশগ্রহণ করেননি?' তিনি বলেন, “এটাও সঠিক কথা।' এবারে লোকটি খুশী হয়ে তাকবীর পাঠ করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন ‘এদিকে আসুন। এখন আমি আপনার নিকট বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করছি। উহুদের যুদ্ধ হতে পলায়ন তো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ ছিল এই যে, তাঁর বাড়িতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা ছিলেন এবং সে সময় তিনি কঠিন রোগে ভুগছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, তুমি মদীনাতেই অবস্থান কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুণ্য দান করবেন এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও তোমার অংশ থাকবে। বায়'আতুর রিযওয়ানের ঘটনা এই যে, তাঁকে তিনি মক্কাবাসীদের নিকট স্বীয় পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেননা, মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর যেমন সম্মান ছিল অন্য কারও ছিল না। তার মক্কা গমনের পর এ বায়আত গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত উঠিয়ে বললেন, এটা উসমানের হাত।' অতঃপর তিনি ঐ হাতখানা তার অন্য হাতের উপর রাখেন (যেন তিনি, বায়'আত গ্রহণ। করলেন)। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন, এখন প্রস্থান করুন এবং এ ঘটনাটি সঙ্গে নিন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা শত্রুগণ হতে পলায়ন করে পর্বতের উপরে আরোহণ করছিলে এবং ভয়ের কারণে কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না, আর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে পশ্চাৎ হতে আহ্বান করছিলেন। এবং তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন, তোমরা পলায়ন করো না, বরং ফিরে এসো।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মুশরিকদের এ আকস্মিক প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলমানদের পদসমূহ টলটলায়মান হয়ে যায়। তারা মদীনার পথে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কেউ কেউ পর্বতের শিকরে আরোহণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাঁদেরকে পিছন হতে ডাক দিয়ে বলছিলেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আমার দিকে এসো। এ ঘটনারই বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে সময় মাত্র বারজন সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি দুদীর্ঘ হাদীসেও এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দালায়েলুন নবুওয়াহ’-এর মধ্যেও রয়েছে যে, যখন মুসলমানদের পরাজয় ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মাত্র এগারজন লোক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাহাড়ের উপর আরোহণ করছিলেন এমন সময় মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে নেয়। তিনি তাঁর সঙ্গীরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ ‘তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে এমন কেউ আছে কি? হযরত তালহা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তার এ আহ্বানে সাড়া দেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এখন থেমে যাও'। তখন একজন আনসারী প্রস্তুত হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে শহীদ হয়ে যান। এভাবে সবাই একের পর এক শাহাদাত বরণ করেন। তখন শুধুমাত্র হযরত তালহা (রাঃ) রয়ে যান। এ মহান ব্যক্তি বার বার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন কিন্তু বারবারই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বাধা দিচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন যে, শত্রুরা সবাই এক দিকে এবং তিনি একাই এক দিকে। এ যুদ্ধে তার অঙ্গুলিগুলো কেটে পড়ে। ফলে তার মুখ দিয়ে ইস’ শব্দ বের হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি বিসমিল্লাহ বলতে বা আল্লাহ তা'আলার নাম নিতে তবে তোমাকে ফেরেশতাগণ আকাশে উঠিয়ে নিতেন এবং লোকেরা দেখতে থাকত। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে পৌছে গেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত কায়েস ইবনে হাযেম (রাঃ) বলেনঃ হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর যে হাতখানা ভালরূপে ব্যবহার করছিলেন তা অচল হয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তৃণ হতে সমস্ত তীর আমার নিকট ছড়িয়ে দেন এবং বলেনঃ তোমার উপর আমার বাপ মা উৎসর্গ হোন। লও, মুশরিকদেরকে মারতে থাকো।' তিনি আমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন এবং আমি লক্ষ্য করে করে মুশরিকদেরকে মেরে চলছিলাম। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডানে-বামে এমন দু’জন লোককে দেখেছিলাম যারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলেন এবং যাদেরকে আমি ওর পূর্বেও কখনও দেখিনি এবং পরেও দেখিনি।' এ দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাঈল (আঃ)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সকলের পলায়নের পর যে কয়েজন মহান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করছিলেন এবং এক এক করে শহীদ হয়েছিলেন, তাদেরকে তিনি বলে চলছিলেনঃ “তাদেরকে বাধা প্রদান করতঃ জান্নাতে চলে যাবে ও জান্নাতে আমার বন্ধু হবে এমন কেউ আছ কি? মক্কায় উবাই ইবনে খালফ শপথ করে বলেছিল, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবো।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, সে তো নয় বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তাকে হত্যা করবো।' উহুদের যুদ্ধে সেই দুরাচার আপাদমস্তক লৌহ বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয় এবং বলতে বলতে আসেঃ ‘যদি মুহাম্মাদ বেঁচে যান তবে আমি নিজেকেই ধ্বংস করে দেবো। এদিকে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) ঐ দুরাচারের দিকে অগ্রসর হন। তার সারা দেহ লৌহবর্মে আবৃত ছিল। শুধুমাত্র কপালের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল। তিনি ঐ স্থান লক্ষ্য করে স্বীয় বর্শা দ্বারা সামান্য আঘাত করেন। তা ঠিক লক্ষ্যস্থলেই লেগে যায়। এর ফলে সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। আঘাত প্রাপ্ত স্থান হতে রক্তও বের হয়নি, অথচ তার অবস্থা এই ছিল যে, সে উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিল। তার লোকেরা তাকে উঠিয়ে সেনাবাহিনীর নিকট নিয়ে যায় এবং সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, বেশী আঘাত তো লাগেনি, তুমি এত কাপুরুষতা প্রদর্শন করছো কেন? অবশেষে সে তাদের বিদ্রুপে বাধ্য হয়ে বলে, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি উবাইকে হত্যা করবো। তোমরা এটা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, আমি বাঁচতে পারি না। এটা তোমরা মনে করো না যে, এ সামান্য আঁচড়ে কি হতে পারে? যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি সারা আরববাসীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিজ হাতের এ সামান্য আঘাত লাগতো তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকম অস্থিরভাবে ছটফট করতে করতে সেই পাপিষ্টের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়। মাগাযী-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে’ রয়েছে যে, যখন এ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখীন হয় তখন সাহাবীগণ তাঁর মোকাবিলা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি তাদেরকে বাধা দেন এবং বলেনঃ “তাকে আসতে দাও। যখন সে নিকটবর্তী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হারিস ইবনে সাম্মার (রাঃ) হাত হতে বর্শা নিয়ে তার উপর আক্রমণ করেন। তাঁর হাতে বর্শা দেখেই সে কেঁপে উঠে। সাহাবীগণ (রাঃ) তখনই বুঝে নেন যে, তার মঙ্গল নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার স্কন্ধে আঘাত করেন, এর ফলেই সে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া হতে পড়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘বাতনে রাবেগ’ নামক স্থানে ঐ কাফিরের মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেনঃ একবার শেষরাত্রে এখান দিয়ে গমনের সময় এক জায়গায় এক ভীতিপ্রদ অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেখি এবং দেখতে পাই যে, একটি লোককে লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ করে ঐ আগুনে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা বলে চিৎকার করছে। অন্য এক ব্যক্তি বলছেঃ তাকে পানি দিও না। সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর হস্তে নিহত ব্যক্তি। সে হচ্ছে উবাই ইবনে খালফ'। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনের যে চারটি দাঁত মুশরিকরা উহুদের যুদ্ধে শহীদ করে দিয়েছিল ঐদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছিলেনঃ “ঐ লোকদের উপর আল্লাহ তাআলার কঠিন অভিশাপ রয়েছে যারা তাদের নবীর সাথে এ ব্যবহার করেছে এবং তার উপরও আল্লাহ পাকের ভীষণ অভিশাপ যাকে তাঁর রাসূল (সঃ) তাঁর পথে হত্যা করেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ রয়েছেঃ যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করেছে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার ভীষণ অভিশাপ রয়েছে।' উবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডলে এ আঘাত লেগেছিল। তাঁর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। গণ্ডদেশও আহত হয়েছিল এবং ওষ্ঠেও আঘাত লেগেছিল। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলতেনঃ ঐ লোকটিকে হত্যা করার যেমন লোভ আমার ছিল অন্য কাউকে হত্যা করার তেমন ছিল না। ঐ লোকটি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ছিল এবং সারা গোত্রই তার শত্রু ছিল। তার দুশ্চরিত্রতা ও জঘন্য আচরণের প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিটিই যথেষ্ট। নবী (সঃ)-কে। আহতকারীর উপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত। মুসনাদ-ই-আবদুর রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে বদদুআ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সারা বছরের মধ্যে সে যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরীর অবস্থায় যেন তার মৃত্যু ঘটে। বস্তুতঃ হলোও তাই। সেই দুরাচার কাফির হয়েই মারা গেল এবং জাহান্নামের অধিবাসী হলো। একজন মুহাজির বর্ণনা করেনঃ “উহুদের যুদ্ধের দিন চতুর্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর তীর বর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সমস্তই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।' আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী সেদিন শপথ করে বলেছিলঃ মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখিয়ে দাও, সে আজ আমার হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। সে যদি মুক্তি পেয়ে যায় তবে আমার মুক্তি নেই। সে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর পার্শ্বেই এসে পড়ে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট কেউই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষুর উপর পর্দা নিক্ষেপ করেন। সুতরাং সে তাঁকে দেখতেই পায় না। যখন সে বিফল হয়ে ফিরে যায় তখন শাফওয়ান তাকে বিদ্রুপ করে। সে তখন বলেঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে দেখতেই পাইনি। আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আমরা তাঁকে মারতে পারব না। জেনে রেখো, আমরা চার জন লোক তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং পরস্পর প্রতিজ্ঞাও করে বসি। কিন্তু শেষে অকৃতকার্য হয়ে পড়ি। ওয়াকেদী (রঃ) বলেনঃ ‘কিন্তু প্রমাণজনক কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপালে আঘাতকারী ছিল ইবনে কামইয়্যাহ এবং তাঁর ওষ্ঠে ও দাঁতে যে আঘাত করেছিল সে ছিল উবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস।' উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন উহুদের ঘটনা বর্ণনা করতেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে বলতেনঃ “সে দিনের সমস্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত তালহা (রাঃ)। আমি ফিরে এসে দেখি যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। আমি বলিঃ ‘আল্লাহ করেন ইনি তালহা হন!' তখন আমি নিকটে গিয়ে দেখি যে, তিনি তালহাই (রাঃ) বটে। আমি তখন আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতঃ বলি-ইনি আমারই গোত্রের একজন লোক। আমার এবং মুশরিকদের মধ্যস্থলে একজন লোক দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার প্রচণ্ড আক্রমণ মুশরিকদের সাহস হারিয়ে দিয়েছিল। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)। তারপরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই যে, তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে। এবং চেহারা মুবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে এবং কপালে লৌহ বর্মের দু'টি কড়া ঢুকে গেছে। আমি তখন দ্রুত বেগে তার দিকে ধাবিত হই। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আবু তালহা (রাঃ)-এর সংবাদ লও।” আমি চাচ্ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে কড়া দুটি বের করে ফেলি। কিন্তু হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে নিষেধ করেন এবং নিজেই নিকটে এসে হাত দিয়ে বের করতে খুবই কষ্ট অনুভব করেন। কাজেই দাঁত দিয়ে ধরে একটি বের করেন। কিন্তু এতে তার দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন আমি পুনরায় চাইলাম যে, দ্বিতীয়টি আমি বের করবো। কিন্তু আবার তিনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বিরত রাখলেন। সুতরাং আমি বিরত থাকলাম। তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এবারেও তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেল। এ কার্য সাধনের পর আমি হযরত তালহা (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি এবং দেখি যে, তাঁর দেহে সত্তরটি যখম হয়েছে। তার অঙ্গুলিগুলোও কেটে পড়েছে। আমি পুনরায় তাঁর সংবাদ নেই। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখমের রক্ত চুষে নেন, যেন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ কুলকুচা করে ফেল’। কিন্তু তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি কুলকুচা করবো না। তারপরে তিনি যুদ্ধেক্ষেত্রে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি কেউ জান্নাতী লোককে দেখতে ইচ্ছে করে তবে যেন এ লোকটিকে দেখে।' এরূপে তিনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়, সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং মস্তকের শিরস্ত্রাণ পড়ে যায়। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রক্ত ধৌত করছিলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ক্ষতস্থানে নিক্ষেপ করছিলেন। যখন দেখেন যে, রক্ত কোন কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) মাদুর পুড়িয়ে ওর ভস্ম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ প্রদান করলেন। (আরবী) শব্দে (আরবী) অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) (২০:৭১)-এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি, (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক দুঃখ তো পরাজয়ের দুঃখ, যখন এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ না করুন রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে বিজয়ী বেশে মুশরিকদের পর্বতের উপর আরোহণ, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ তাদের জন্যে এ উচ্চতা বাঞ্ছনীয় ছিল না। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেনঃ ‘প্রথম দুঃখ হচ্ছে পরাজয়ের দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শহীদ হওয়ার সংবাদ। এ দুঃখ প্রথম দুঃখ অপেক্ষা অধিক ছিল। অনুরূপভাবে এক দুঃখ গনীমত হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ পরাজয়ের দুঃখ। এরূপভাবে এক দুঃখ স্বীয় ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ এবং দ্বিতীয় দুঃখ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে জঘন্য সংবাদের দুঃখ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে গনীমত ও বিজয় তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল তার জন্যে দুঃখ করো না। প্রবল প্রতাপান্বিত ও মহা সম্মানিত আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত আছেন।
আলে ইমরান 3:154
১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর সেই দুঃখ ও চিন্তার সময় যে অনুগ্রহ করেছিলেন এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তাদেরকে তন্দ্রাভিভূত করেছিলেন। অস্ত্র-শস্ত্র হাতে রয়েছে এবং শত্রু সম্মুখে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু অন্তরে এত শান্তি রয়েছে যে, চক্ষু তন্দ্রায় ঢলে পড়েছে"যা শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষণ। যেমন সূরা-ই-আনফালের মধ্যে বদরের ঘটনায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তার পক্ষ হতে শান্তিরূপে যখন তন্দ্রা তোমাদেরকে আচ্ছন্ন করে। (৮:১১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ ‘যুদ্ধের সময় যে তন্দ্রা আসে তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসে থাকে এবং নামাযের সময় যে তন্দ্রা আসে তা শয়তানের পক্ষ হতে আসে।' হযরত আবু তালহা (রাঃ) বলেনঃ ‘উহুদের যুদ্ধের দিন আমার চক্ষে এত বেশী তন্দ্রা এসেছিল যে, আমার হাত হতে তরবারী বারবার ছুটে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি চক্ষু উঠিয়ে দেখি যে, প্রায় সবারই ঐরূপ অবস্থাই ছিল। তবে অবশ্যই একটি দল এরূপও ছিল যাদের অন্তর ছিল কপটতায় পরিপূর্ণ এবং তারা ছিল সদা ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের কুধারণা শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অতএব বিশ্বস্ত আল্লাহর উপর নির্ভরশীল এবং সত্যপন্থী লোকদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ পাক অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তারা অবশ্যই সফলকাম হবে। কিন্তু কপট সন্দেহ পোষণকারী এবং টলমলে ঈমানের লোকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। তাদের প্রাণ শাস্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তারা সদা হায় হায় করছিল এবং তাদের অন্তরে বিভিন্ন প্রকারের কুমন্ত্রণা ঢুকে পড়েছিল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা মরতে চলেছে। তাদের অন্তরে বিশ্বাসও বদ্ধমূল হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং মুমিনগণ আর দুনিয়ায় থাকবে না। কাজেই বাঁচার কোন উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকদের অবস্থা এই হয় যে, যেখানেই তারা সামান্য নিম্নভূমি দেখে, তাদের নৈরাশ্যের ঘনঘটা তাদেরকে ঘিরে নেয়। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ মন্দ হতে মন্দতম অবস্থাতেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভাল ধারণাই রাখেন। মুনাফিকদের মনের ধারণা ছিল এই যে, যদি তাদের কোন অধিকার থাকতো তবে তারা সেদিনের মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যেতো এবং তারা গোপনে ওটা বলতোও বটে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ ‘ঐ কঠিন ভয়ের সময়েও আমাদেরকে এত ঘুম পেয়ে বসে যে, আমাদের চিবুকগুলো বক্ষের সাথে লেগে যায়। আমি আমার সে অবস্থাতেই মু’তাব ইবনে কুশায়েরের নিম্নের উক্তি শুনতে পাইঃ যদি আমার সামান্য কিছু অধিকার থাকতো তবে এখানে নিহত হতাম না। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেই বলছেনঃ মৃত্যু তো আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্যে লিখিত রয়েছে। মৃত্যুর সময় পরিবর্তিত হতে পারে না। তোমরা যদি বাড়ীতেও অবস্থান করতে, তথাপি এখানে যার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা রয়েছে সে অবশ্যই বাড়ী ছেড়ে এখানে চলে আসতো। ফলে আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্য লিখন পূর্ণ হয়ে যেতো। এ সময়টি এ জন্যেই ছিল যে, যেন আল্লাহ তোমাদের অন্তরের গোপন কথা প্রকাশ করে দেন। এ পরীক্ষা দ্বারা ভাল-মন্দ, সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ হয়ে গেল। যে আল্লাহ তাআলা অন্তরের গোপন কথা অবগত আছেন তিনি এ সামান্য ঘটনা দ্বারা মুনাফিকদেরকে প্রকাশ করে দিলেন এবং মুসলামনদেরও স্পষ্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। এখন আল্লাহ পাক খাটি মুসলমানদের পদস্খলনের বর্ণনা দিচ্ছেন যা মানবীয় দুর্বলতার কারণে তাদের দ্বারা সাধিত হয়েছিল। শয়তানই তাদের এ পদস্খলন ঘটিয়েছিল এবং প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল তাদের কর্মেরই ফল। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যও হতো না এবং তাদের পদগুলো টলমলও করতো না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমার যোগ্য মনে করতঃ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাকের কাজই হচ্ছে ক্ষমা করে দেয়া। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত উসমান (রাঃ) প্রভৃতির ঐ অপরাধকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত ওলীদ ইবনে উকবা (রাঃ) একদা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘শেষ পর্যন্ত আপনি আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-এর উপর এত চটে রয়েছেন কেন?' তিনি তাকে বললেনঃ হযরত উসমান (রাঃ)-কে তুমি বল- আপনি কি উহুদের যুদ্ধের সময় পলায়ন করেননি? বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকেননি এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা পরিত্যাগ করেননি?”হযরত ওলীদ (রাঃ) গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন হযরত উসমান (রাঃ)এর উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ (উহুদ যুদ্ধের অপরাধের জন্যে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং সে জন্যে আর দোষারোপ কেন? বদরের যুদ্ধের সময় আমার সহধর্মিণী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা হযরত রুকাইয়াহ রোগাক্রান্ত হওয়ায় তার রোগ দেখাশুনার কাজে ব্যস্ত থাকি। সে ঐ রোগেই মারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে গনীমতের মালের পূর্ণ অংশ দিয়েছিলেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, একমাত্র সে ব্যক্তিই যুদ্ধলব্ধ মাল পেয়ে থাকে যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং বদরের যুদ্ধে আমার উপস্থিত থাকাই সাব্যস্ত হয়েছে। এখন বাকী থাকলো হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা, ওটার ক্ষমতা আমারও নেই এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফেরও (রাঃ) নেই। যাও তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও।
আলে ইমরান 3:155
১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর সেই দুঃখ ও চিন্তার সময় যে অনুগ্রহ করেছিলেন এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তাদেরকে তন্দ্রাভিভূত করেছিলেন। অস্ত্র-শস্ত্র হাতে রয়েছে এবং শত্রু সম্মুখে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু অন্তরে এত শান্তি রয়েছে যে, চক্ষু তন্দ্রায় ঢলে পড়েছে"যা শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষণ। যেমন সূরা-ই-আনফালের মধ্যে বদরের ঘটনায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তার পক্ষ হতে শান্তিরূপে যখন তন্দ্রা তোমাদেরকে আচ্ছন্ন করে। (৮:১১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ ‘যুদ্ধের সময় যে তন্দ্রা আসে তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসে থাকে এবং নামাযের সময় যে তন্দ্রা আসে তা শয়তানের পক্ষ হতে আসে।' হযরত আবু তালহা (রাঃ) বলেনঃ ‘উহুদের যুদ্ধের দিন আমার চক্ষে এত বেশী তন্দ্রা এসেছিল যে, আমার হাত হতে তরবারী বারবার ছুটে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি চক্ষু উঠিয়ে দেখি যে, প্রায় সবারই ঐরূপ অবস্থাই ছিল। তবে অবশ্যই একটি দল এরূপও ছিল যাদের অন্তর ছিল কপটতায় পরিপূর্ণ এবং তারা ছিল সদা ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের কুধারণা শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অতএব বিশ্বস্ত আল্লাহর উপর নির্ভরশীল এবং সত্যপন্থী লোকদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ পাক অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তারা অবশ্যই সফলকাম হবে। কিন্তু কপট সন্দেহ পোষণকারী এবং টলমলে ঈমানের লোকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। তাদের প্রাণ শাস্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তারা সদা হায় হায় করছিল এবং তাদের অন্তরে বিভিন্ন প্রকারের কুমন্ত্রণা ঢুকে পড়েছিল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা মরতে চলেছে। তাদের অন্তরে বিশ্বাসও বদ্ধমূল হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং মুমিনগণ আর দুনিয়ায় থাকবে না। কাজেই বাঁচার কোন উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকদের অবস্থা এই হয় যে, যেখানেই তারা সামান্য নিম্নভূমি দেখে, তাদের নৈরাশ্যের ঘনঘটা তাদেরকে ঘিরে নেয়। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ মন্দ হতে মন্দতম অবস্থাতেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভাল ধারণাই রাখেন। মুনাফিকদের মনের ধারণা ছিল এই যে, যদি তাদের কোন অধিকার থাকতো তবে তারা সেদিনের মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যেতো এবং তারা গোপনে ওটা বলতোও বটে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ ‘ঐ কঠিন ভয়ের সময়েও আমাদেরকে এত ঘুম পেয়ে বসে যে, আমাদের চিবুকগুলো বক্ষের সাথে লেগে যায়। আমি আমার সে অবস্থাতেই মু’তাব ইবনে কুশায়েরের নিম্নের উক্তি শুনতে পাইঃ যদি আমার সামান্য কিছু অধিকার থাকতো তবে এখানে নিহত হতাম না। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেই বলছেনঃ মৃত্যু তো আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্যে লিখিত রয়েছে। মৃত্যুর সময় পরিবর্তিত হতে পারে না। তোমরা যদি বাড়ীতেও অবস্থান করতে, তথাপি এখানে যার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা রয়েছে সে অবশ্যই বাড়ী ছেড়ে এখানে চলে আসতো। ফলে আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্য লিখন পূর্ণ হয়ে যেতো। এ সময়টি এ জন্যেই ছিল যে, যেন আল্লাহ তোমাদের অন্তরের গোপন কথা প্রকাশ করে দেন। এ পরীক্ষা দ্বারা ভাল-মন্দ, সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ হয়ে গেল। যে আল্লাহ তাআলা অন্তরের গোপন কথা অবগত আছেন তিনি এ সামান্য ঘটনা দ্বারা মুনাফিকদেরকে প্রকাশ করে দিলেন এবং মুসলামনদেরও স্পষ্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। এখন আল্লাহ পাক খাটি মুসলমানদের পদস্খলনের বর্ণনা দিচ্ছেন যা মানবীয় দুর্বলতার কারণে তাদের দ্বারা সাধিত হয়েছিল। শয়তানই তাদের এ পদস্খলন ঘটিয়েছিল এবং প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল তাদের কর্মেরই ফল। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যও হতো না এবং তাদের পদগুলো টলমলও করতো না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমার যোগ্য মনে করতঃ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাকের কাজই হচ্ছে ক্ষমা করে দেয়া। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত উসমান (রাঃ) প্রভৃতির ঐ অপরাধকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত ওলীদ ইবনে উকবা (রাঃ) একদা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘শেষ পর্যন্ত আপনি আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-এর উপর এত চটে রয়েছেন কেন?' তিনি তাকে বললেনঃ হযরত উসমান (রাঃ)-কে তুমি বল- আপনি কি উহুদের যুদ্ধের সময় পলায়ন করেননি? বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকেননি এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা পরিত্যাগ করেননি?”হযরত ওলীদ (রাঃ) গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন হযরত উসমান (রাঃ)এর উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ (উহুদ যুদ্ধের অপরাধের জন্যে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং সে জন্যে আর দোষারোপ কেন? বদরের যুদ্ধের সময় আমার সহধর্মিণী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা হযরত রুকাইয়াহ রোগাক্রান্ত হওয়ায় তার রোগ দেখাশুনার কাজে ব্যস্ত থাকি। সে ঐ রোগেই মারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে গনীমতের মালের পূর্ণ অংশ দিয়েছিলেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, একমাত্র সে ব্যক্তিই যুদ্ধলব্ধ মাল পেয়ে থাকে যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং বদরের যুদ্ধে আমার উপস্থিত থাকাই সাব্যস্ত হয়েছে। এখন বাকী থাকলো হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা, ওটার ক্ষমতা আমারও নেই এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফেরও (রাঃ) নেই। যাও তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও।
আলে ইমরান 3:156
১৫৬-১৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কাফিরদের ন্যায় অসৎ ও জঘন্য বিশ্বাস রাখতে নিষেধ করছেন। এ কাফিরেরা মনে করতো যে, তাদের বন্ধু-বান্ধব যদি পৃথিবী পৃষ্ঠে ভ্রমণ না করতো বা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হতো তবে তারা মৃত্যুমুখে পতিত হতো না। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এ বাজে ও ভিত্তিহীন ধারণা তাদের দুঃখ ও অনুশোচনা আরও বৃদ্ধি করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতেই রয়েছে। তাঁর ইচ্ছানুসারেই মানুষ মরে থাকে এবং তার চাহিদা হিসেবেই তারা জীবন লাভ করে। তাহলে তার ইচ্ছাক্রমে সমস্ত কাজ চালু করা তাঁরই অধিকার। তিনি ভাগ্যে যা লিখে দিয়েছেন টলবার নয়। তার জ্ঞান হতে ও দৃষ্টি হতে কোন কিছু বাইরে নেই। সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রত্যেক কাজ তিনি খুব ভাল করেই জানেন। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহর পথে নিহত হওয়া বা মরে যাওয়া তাঁর ক্ষমা ও করুণা লাভেরই মাধ্যম এবং এটা নিশ্চিতরূপে দুনিয়া ও ওর সমুদয় জিনিস হতে উত্তম। কেননা, এটা ক্ষণস্থায়ী এবং ওটা চিরস্থায়ী।' এরপরে বলা হচ্ছে যে, মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করুক বা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদই হোক, যেভাবেই ইহজগত হতে বিদায় গ্রহণ করুক না কেন আল্লাহর নিকটই সকলে একত্রিত হবে। অতঃপর তারা তথায় তাদের কৃতকর্মের ফল স্বচক্ষে দর্শন করবে-কাজ ভালই হোক আর মন্দই হোক।
আলে ইমরান 3:157
১৫৬-১৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কাফিরদের ন্যায় অসৎ ও জঘন্য বিশ্বাস রাখতে নিষেধ করছেন। এ কাফিরেরা মনে করতো যে, তাদের বন্ধু-বান্ধব যদি পৃথিবী পৃষ্ঠে ভ্রমণ না করতো বা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হতো তবে তারা মৃত্যুমুখে পতিত হতো না। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এ বাজে ও ভিত্তিহীন ধারণা তাদের দুঃখ ও অনুশোচনা আরও বৃদ্ধি করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতেই রয়েছে। তাঁর ইচ্ছানুসারেই মানুষ মরে থাকে এবং তার চাহিদা হিসেবেই তারা জীবন লাভ করে। তাহলে তার ইচ্ছাক্রমে সমস্ত কাজ চালু করা তাঁরই অধিকার। তিনি ভাগ্যে যা লিখে দিয়েছেন টলবার নয়। তার জ্ঞান হতে ও দৃষ্টি হতে কোন কিছু বাইরে নেই। সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রত্যেক কাজ তিনি খুব ভাল করেই জানেন। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহর পথে নিহত হওয়া বা মরে যাওয়া তাঁর ক্ষমা ও করুণা লাভেরই মাধ্যম এবং এটা নিশ্চিতরূপে দুনিয়া ও ওর সমুদয় জিনিস হতে উত্তম। কেননা, এটা ক্ষণস্থায়ী এবং ওটা চিরস্থায়ী।' এরপরে বলা হচ্ছে যে, মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করুক বা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদই হোক, যেভাবেই ইহজগত হতে বিদায় গ্রহণ করুক না কেন আল্লাহর নিকটই সকলে একত্রিত হবে। অতঃপর তারা তথায় তাদের কৃতকর্মের ফল স্বচক্ষে দর্শন করবে-কাজ ভালই হোক আর মন্দই হোক।
আলে ইমরান 3:158
১৫৬-১৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কাফিরদের ন্যায় অসৎ ও জঘন্য বিশ্বাস রাখতে নিষেধ করছেন। এ কাফিরেরা মনে করতো যে, তাদের বন্ধু-বান্ধব যদি পৃথিবী পৃষ্ঠে ভ্রমণ না করতো বা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হতো তবে তারা মৃত্যুমুখে পতিত হতো না। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এ বাজে ও ভিত্তিহীন ধারণা তাদের দুঃখ ও অনুশোচনা আরও বৃদ্ধি করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতেই রয়েছে। তাঁর ইচ্ছানুসারেই মানুষ মরে থাকে এবং তার চাহিদা হিসেবেই তারা জীবন লাভ করে। তাহলে তার ইচ্ছাক্রমে সমস্ত কাজ চালু করা তাঁরই অধিকার। তিনি ভাগ্যে যা লিখে দিয়েছেন টলবার নয়। তার জ্ঞান হতে ও দৃষ্টি হতে কোন কিছু বাইরে নেই। সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রত্যেক কাজ তিনি খুব ভাল করেই জানেন। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহর পথে নিহত হওয়া বা মরে যাওয়া তাঁর ক্ষমা ও করুণা লাভেরই মাধ্যম এবং এটা নিশ্চিতরূপে দুনিয়া ও ওর সমুদয় জিনিস হতে উত্তম। কেননা, এটা ক্ষণস্থায়ী এবং ওটা চিরস্থায়ী।' এরপরে বলা হচ্ছে যে, মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করুক বা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদই হোক, যেভাবেই ইহজগত হতে বিদায় গ্রহণ করুক না কেন আল্লাহর নিকটই সকলে একত্রিত হবে। অতঃপর তারা তথায় তাদের কৃতকর্মের ফল স্বচক্ষে দর্শন করবে-কাজ ভালই হোক আর মন্দই হোক।
আলে ইমরান 3:159
১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।
আলে ইমরান 3:160
১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।
আলে ইমরান 3:161
১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।
আলে ইমরান 3:162
১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।