Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আলে ইমরান 3:163 – আলে ইমরান 3:189

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আলে ইমরান 3:163
  2. আলে ইমরান 3:164
  3. আলে ইমরান 3:165
  4. আলে ইমরান 3:166
  5. আলে ইমরান 3:167
  6. আলে ইমরান 3:168
  7. আলে ইমরান 3:169
  8. আলে ইমরান 3:170
  9. আলে ইমরান 3:171
  10. আলে ইমরান 3:172
  11. আলে ইমরান 3:173
  12. আলে ইমরান 3:174
  13. আলে ইমরান 3:175
  14. আলে ইমরান 3:176
  15. আলে ইমরান 3:177
  16. আলে ইমরান 3:178
  17. আলে ইমরান 3:179
  18. আলে ইমরান 3:180
  19. আলে ইমরান 3:181
  20. আলে ইমরান 3:182
  21. আলে ইমরান 3:183
  22. আলে ইমরান 3:184
  23. আলে ইমরান 3:185
  24. আলে ইমরান 3:186
  25. আলে ইমরান 3:187
  26. আলে ইমরান 3:188
  27. আলে ইমরান 3:189

আলে ইমরান 3:163

১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।

আলে ইমরান 3:164

১৫৯-১৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলমানদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-কে মান্যকারী ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বহু দূরে অবস্থানকারীদের জন্য তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরকে কোমল করে দিয়েছেন। তাঁর অনুকম্পা না হলে তাঁর নবীর হৃদয় এত কোমল হতো না। হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) যাকে আরববাসী কখনও বা (আরবী)-এর সঙ্গে মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। আবার কখনও (আরবী)-এর সঙ্গেও মিলিয়ে থাকে। যেমন (আরবী)-এর মধ্যে। এখানে ঐরূপই হয়েছে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি আল্লাহর করুণার ফলেই কোমল অন্তর বিশিষ্ট হয়েছ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র যার উপর তিনি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল এসেছেন, যার উপর তোমদের কষ্ট কঠিন ঠেকে, যিনি তোমাদের উপর লোভী এবং যিনি মুমিনদের উপর স্নেহশীল, দয়ালু।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বলেন, “হে আবূ উমামা! কতগুলো মুমিন এমন আছে যাদের জন্যে আমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্কশ ভাষা। কেননা, এর পরে (আরবী) শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন হৃদয়। ইরশাদ হচ্ছে-যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় বিশিষ্ট হতে তবে মানুষ তোমার চতুম্পার্শ্ব হতে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন। আর এজন্যে তাদের দিক হতে তোমাকেও প্রেম এবং তা দান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী দেখেছি যে, তিনি কর্কশভাষী, কঠিন হৃদয়, বাজারে গোলমালকারী এবং ন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দ্বারা গ্রহণকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মার্জনাকারী ও ক্ষমাকারী। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষকে অভিবাদন জানাতে, তাদের মঙ্গল কামনা করতে, তাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে আমাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঐ রূপই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেরূপভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও তাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও আল্লাহ পাকের নিকট তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ কর। এ কারণেই সাহাবীগণকে। সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সকল কার্যে তাদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যেমন বদরের যুদ্ধের দিন শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে তিনি তাঁদের নিকট পরামর্শ নেন। তখনি তাঁর সহচরবৃন্দ বলেছিলেন, যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করতঃ পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ারও নির্দেশ প্রদান করেন তবুও সে নির্দেশ পালনে আমরা মোটেই কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি আপনি আমাদেরকে বারকুল গামাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ইচ্ছে করেন তাহলেও আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার সাথে গমন করবো। আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের ন্যায় ‘তুমি ও তোমার প্রভু যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকছি’ এরূপ কথা কখনও মুখে আনব না। বরং আমরা আপনার ডানে, বামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবো। এরূপভাবে অবতরণস্থল কোথায় হবে তিনি তারও পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) পরামর্শ দেন যে, আগে বেড়ে তাদের সম্মুখে হতে হবে। অনুরূপভাবে উহুদের যুদ্ধেও তিনি পরামর্শ নেন যে, মদীনার ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে হবে, না বাইরে গিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করতে হবে? অধিকাংশ লোক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করারই মত প্রকাশ করেন। অতএব তিনি তাই করেন। পরিখার যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেন যে, মদীনার উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকারে বিরুদ্ধ দলের সাথে সন্ধি করা হবে কি? হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) এবং সা'দ ইবনে মুআজ (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন এবং তিনিও এ পরামর্শ গ্রহণ করেন ও সন্ধি করা থেকে বিরত থাকেন। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পরামর্শ নেন যে, মুশরিকদেরকে আক্রমণ করা হবে কি? তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরাব্রত পালন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটাও স্বীকার করে নেন। এ রকমই যখন মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর উপর অপবাদ দেয় তখন তিনি বলেন, “হে মুসলমান ভাই সব! যেসব লোক আমার গৃহিণীর দুর্নাম করছে তাদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি, তোমরা আমাকে এ পরামর্শ দান কর। আল্লাহর শপথ! আমার জানামতে তো আমার গৃহিণীর কোন দোষ নেই। আর যে লোকাটির সাথে অপবাদ দিচ্ছে, আল্লাহর কসম। সেও তো আমার মতে ভাল লোকই বটে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে পৃথক করণের ব্যাপারে তিনি হযরত আলী ও হযরত উসামা (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মোটকথা যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কার্যে এবং অন্যান্য কার্যেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওয়াজিব ছিল, না সাহাবীগণের মনস্তুষ্টির জন্যে তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল ছিল সে সম্বন্ধে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ আয়াতে হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ রয়েছে। (হাকিম) এ দু’জন সহচরই ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা। আর ঐ দু’জনই ছিলেন মুসলমানদের পিতৃতুল্য। (কালবী) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ দু’জন সাহাবী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ “কোন কার্যে যদি তোমারা দুজন একমত হয়ে যাও তবে আমি কখনও তোমাদের বিপরীত মত পোষণ করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ (আরবী) শব্দের অর্থ কি? তিনি বলেনঃ ‘জ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে যখন কোন কার্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাবে তখন তা মেনে নেয়া।' (ইবনে মিরদুওয়াই) সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণাও বর্ণিত আছেঃ যার নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা যায় সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণনাটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার ভাই-এর নিকট কোন পরামর্শ গ্রহণ করে তখন সে যেন তাকে ভাল পরামর্শ দান করে।' (ইবনে মিরদুওয়াই)এরপর আলাহ পাক বলেনঃ “যখন তোমরা কোন কার্যের পরামর্শ গ্রহণের পর ওটা সাধনের দৃঢ় সংকল্প করে ফেল তখন মহান আল্লাহর উপর নির্ভর কর, আল্লাহ তা'আলা নির্ভরশীলদেরকে ভাল বাসেন।' অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতের ঘঘাষণা ঠিক এ রূপই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাহায্য শুধু অল্লাহর পক্ষ থেকেই যিনি পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়। তার পরে বলা হচ্ছে যে, মুমিনদের শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করা উচিত। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- ‘আত্মসাত করা নবীর জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া গিয়েছিল, তন্মধ্য হতে একটি লাল রং-এর চাদর হারিয়ে যায়। তখন লোকেরা বলাবলি করে যে, সম্ভবতঃ এটা রাসূলুল্লাহ-ই (সঃ) নিয়েছেন। তখনই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিসের অপবাদ দিয়েছিল যার ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, রাসূলগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) যে কোন প্রকারের বিশ্বাসঘাকতা ও আত্মসাৎ করণ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সেটা মাল বন্টনই হোক বা আমানত আদায় করার ব্যাপারেই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছেঃ নবী (সঃ) আত্মসাত করতে পারেন না বা তিনি পক্ষপাতিত্বও করেন না যে, সৈন্যদের মধ্যে কাউকে যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ দেবেন এবং কাউকে বঞ্চিত রাখবেন। এ আয়াতের তাফসীর নিম্নরূপও করা হয়েছেঃ এটা হতে পারে না যে, নবী (সঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করবেন এবং স্বীয় উম্মতের নিকট পৌছিয়ে দেবেন না।' (আরবী) শব্দের (আরবী)-কে পেশ দিয়েও পড়া হয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ নবী (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব এরূপ নয় যে, তার নিকটতম সহচরগণ তার বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। যেহেতু হযরত কাতাদাহ (রাঃ) এবং হযরত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল হতে কিছু মাল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সহচর বন্টনের পূর্বেই গ্রহণ করেছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর আত্মসাতকারী লোকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং ভীষণ শাস্তির সংবাদ দেয়া হচ্ছে। হাদীসসমূহে এ সম্পর্কে অনেক কিছু ভীতির কথা রয়েছে। যেমন মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রের ভূমি বা ঘরের মাটি দাবিয়ে নেয়। যদি এক হাত মাটিও অন্যায়ভাবে নিজের দিকে চেপে নেয় তবে সাতটি যমীনের গলাবদ্ধ তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে আমি শাসনকর্তা নিযুক্ত করি, তার বাড়ী না থাকলে বাড়ী করতে পারে, স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী করতে পারে; খাদেম না থাকলে তা রাখতে পারে, সোয়ারী না থাকলে ওটাও সংগ্রহ করতে পারে এবং এগুলো ছাড়া যদি অন্য কিছু গ্রহণ করে তবে আত্মসাতকারী হিসেবে গণ্য হবে।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও অন্য শব্দে বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ঐ লোকটিকে চিনি যে কিয়ামতের দিন এমন ছাগল নিয়ে আগমন করবে যে ভ্যা ভ্যা চীৎকার করবে, লোকটি আমার নাম নিয়ে ডাক দেবে। আমি বলবো-আজ আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোন কাজে আসবো না, আমি তো তোমার নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে শব্দকারী উট নিয়ে আগমন করবে। সে বলবেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি বলবো-আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই অধিকারী নই। আমি তো তাবলীগ করেছিলাম। ঐ লোকটিকেও আমি চিনে। নেবো যে চিহি চিহি শব্দকারী ঘোড়া নিয়ে উঠবে। সেও আমাকে ডাক দেবে। আমি তাকেও বলবো- আমি তো (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি কোন কাজে আসবো না। আমি ঐ লোকটিকেও চিনি যে চামড়া নিয়ে উপস্থিত হবে এবং বলতে থাকবে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)'! আমি বলবো-আমি আল্লাহর নিকট তোমার জন্যে কোন উপকারের অধিকারী নই। আমি তো তোমার নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েই দিয়েছিলাম। এ হাদীসটি ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইদ গোত্রের একজন লোককে শাসনকর্তা করে পাঠান। লোকটিকে ইবনুল লাবতিয়্যাহ বলা হতো। সে যাকাত আদায় করে এসে বলে- এগুলো আপনারদের এবং এটা আমার যা তারা আমাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, যখন আমি তাদেরকে কোন কাজে প্রেরণ করি তখন এসে বলে- ‘এটা আপনাদের এবং এটা আমার উপঢৌকন? এরা বাড়িতেই এসে বসে থাকলে দেখা যেতো, কেউ তাদেরকে উপঢৌকন পাঠায় কি-না। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে। সেই সত্তার শপথ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওর মধ্য হতে কোন কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে ওটা স্কন্ধে বহন করে আগমন করবে। উট হলে চীৎকার করবে, গরু হলে হাম্বা রব করবে এবং ছাগল হলে ভ্যা ভ্যা শব্দ করবে।' অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় এত উঁচু করেন যে, তার বগলের সাদা অংশ চোখে পড়ে যায় এবং তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' মুসনাদ- ই-আহমাদের একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, এসব আদায়কারী ও শাসনকর্তা যেসব উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় তা আত্মসাতের মধ্যেই গণ্য। এ বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেই রয়েছে এবং এটা দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন এটা পূর্ববর্তী দীর্ঘ বর্ণনাগুলোরই সারাংশ। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন। আমি তথায় গমন করলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর নিকট ফিরে আসলে তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। তা হচ্ছে এই যে, আমার অনুমতি ছাড়া যেটা গ্রহণ করবে তা আত্মসাত এবং প্রত্যেক আত্মসাতকারী তার আত্মসাতকৃত জিনিস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ টুকুই আমার বলার ছিল। যাও, নিজ কার্যে লেগে পড়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাত করণের বর্ণনা দেন এবং ওর বড় বড় পাপ ও শাস্তির কথা বর্ণনা করে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। অতঃপর মানুষের কিয়ামতের দিন জন্তুসমূহ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সাহায্যের জন্যে আবেদন করা এবং তাঁর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করারও উল্লেখ আছে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তাতে সোনা-চাদিরও উল্লেখ রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! আমি যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি সে যদি একটি সুচ বা তার চেয়েও হালকা জিনিস চুরি করে তবে তা আত্মসাত রূপেই গণ্য হবে এবং তা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) নামক শ্যাম বর্ণের একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে আদায়কারী নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, “কেন?' তিনি বলেন, আপনার এ উক্তির কারণে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেন, হ্যাঁ, আরও জেনে রেখো যে, যার উপর আমি কোন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করি তার উচিত হবে কম বেশী সব কিছুই নিয়ে আসা। যা তাকে দেয়া হবে তা সে গ্রহণ করবে এবং যা হতে বিরত রাখা হবে তা হতে বিরত থাকবে।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে। হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসর নামাযের পরে প্রায়ই বানু আব্দুল আসহালের ওখানে গমন করতেন এবং প্রায়ই মাগরিব পর্যন্ত তথায় জনসমাবেশ থাকতো। একদা মাগরিবের সময় তিনি তথা হতে ফিরে আসছিলেন। সময় সংকীর্ণ ছিল বলে তিনি দ্রুত পদে চলছিলেন। বাকীতে (জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্থান) পৌছে তিনি বলেনঃ তোমার প্রতি অভিশাপ! তোমার প্রতি অভিশাপ!' আমি মনে করি যে, তিনি আমাকেই বলছেন। তাই আমি আমার কাপড় ঠিকঠাক করতে গিয়ে তার পিছনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে বললেনঃ ব্যাপার কি?' আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ উক্তির কারণে আমি পিছনে থেমে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি, বরং এটি অমুক ব্যক্তির সমাধি। আমি তাকে অমুক গোত্রের আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলাম। সে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ঐ চাদরটি এখন আগুন হয়ে তার উপর জ্বলতে রয়েছে।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত উবাদা ইবনে সাবিদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) গনীমতের মালের উষ্ট্রপৃষ্ঠের কিছু লোম গ্রহণ করতেন, অতঃপর বলতেনঃ ‘এতে আমার ঐ অধিকারই রয়েছে যে অধিকার তোমাদের কোন একজনের রয়েছে। তোমরা আত্মসাত হতে দূরে থাক। কিয়ামতের দিন আত্মসাতকারী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সুচ ও সূতাও পৌছিয়ে দাও এবং তদপেক্ষা নগণ্য জিনিসও (পৌছিয়ে দাও)। আল্লাহর পথে নিকটবর্তীদের সাথে এবং দূরবর্তীদের সাথে যুদ্ধ কর। যুদ্ধ স্বদেশেও কর এবং বিদেশেও কর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। জিহাদের কারণে আল্লাহ তা'আলা কাঠিন্য হতে এবং দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আল্লাহর শাস্তি নিকটবর্তীদের উপর ও দূরবর্তীদের উপর জারী কর। আল্লাহর কাজ হতে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। (মুসনাদ-ই- আহমাদ) এ হাদীসের কিছু অংশ সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত আছে। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আদায়কারী করে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেনঃ “হে আবু মাসউদ! যাও আমি তোমাকে যেন কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় না পাই যে, তোমার পৃষ্ঠোপরি শব্দকারী উট থাকে যা তুমি আত্মসাত করে নিয়েছে। আমি বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তাহলে যেতে চাই না। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে জোরপূর্বক পাঠাতেও চাইনে।' (সুনান-ই-আবি দাউদ) ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি কোন পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয় অতঃপর ওটা সত্তর বছর পর্যন্ত চলতে থাকে তথাপি জাহান্নামের তলদেশে পৌছতে পারবে না। আত্মসাতকৃত জিনিসকে ঐরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং আত্মসাতকারীকে বলা হবে-যাও ওটা নিয়ে এসো’। আল্লাহ পাকের (আরবী)-এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, খাইবারের যুদ্ধের দিন সাহাবা-ই-কিরাম আসেন ও বলেন, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। একটি লোক সম্বন্ধে এ কথা বলা হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, 'কখনই নয়, আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। কেননা, সে গনীমতের মাল হতে একটি চাদর আত্মসাত করেছিল। অতঃপর তিনি বলেন, “হে উমার ইবনে খাত্তাব! তুমি যাও এবং জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে এটা ঘোষণা করে দেই।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস (রাঃ)-এর সঙ্গে সাদকা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের ঘোষণা শুনেননি? তিনি সাদকার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতাকারীর সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ওর মধ্য হতে যে ব্যক্তি উট অথবা ছাগল নিয়ে নেবে, তাকে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উঠতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন বলেন, হ্যা'। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সাদকা আদায়কারী হিসেবে পাঠাবার ইচ্ছে করে বলেন, “হে সা’দ! এরূপ যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন তুমি উচ্চ শব্দকারী উট বহন করে আগমন কর।' তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, “আমি এ পদ গ্রহণও করব না, সুতরাং এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এ কার্য হতে নিষ্কৃতি দান করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রূম যুদ্ধে হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিকের সঙ্গে হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহও ছিলেন। এক ব্যক্তির মালপত্রের মধ্যে কিছু আত্মসাতের মালও পাওয়া যায়। সেনাপতি হযরত সালিমকে ঐ ব্যক্তির সম্বন্ধে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিতা হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'কারও মালপত্রের মধ্যে তোমরা চুরির মাল পেলে তা পুড়িয়ে ফেলবে।' বর্ণনাকারী বলেন, “আমার ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথাও বলেনঃ “এবং তাকে শাস্তি প্রদান করবে।' ঐ লোকটির মাল বাজারের মধ্যে বের করা হলে ওর মধ্যে একখানা কুরআন মাজীদও পাওয়া যায়। হযরত সালিমকে পুনরায় ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওটা বিক্রি করে মূল্য সাদকা করে দিন।' এ হাদীসটি সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরিমিযীর মধ্যেও রয়েছে। ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি বলেন যে, এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বলেন, 'সঠিক কথা এই যে, এটা হযরত সালিম (রঃ)-এর ফতওয়া। হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণেরও এটাই উক্তি। হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, তার মালপত্র জ্বালিয়ে দেয়া হবে, তাকে দাসের ‘হদ্দ’ অপেক্ষা কম প্রহার করা হবে এবং তাকে গনীমতের কোন অংশ দেয়া হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং জমহূরের মাযহাব এর বিপরীত। তারা বলেন যে, তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে না, বরং ওর তুল্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আত্মসাতকারীর জানাযার নামায পড়তে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দেননি। মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, যখন কুরআন কারীমের পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয় তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনগণকে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ পারলে যেন ওটা গোপন করে রাখে। কেননা, যে ব্যক্তি যে জিনিস গোপন করে রাখবে ঐ জিনিস নিয়েই সে কিয়ামতের দিন আগমন করবে। অতঃপর তিনি বলেন আমি সত্তর বার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভাষায় পাঠ করেছি। তবে কি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পড়িয়ে দেয়া আয়াতকে পরিত্যাগ করবো?’ ইমাম অকী’ও স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন গনীমতের মাল আসতো তখন তিনি হযরত বেলাল (রাঃ)-কে দিয়ে ঘোষণা করে দিতেনঃ যার কাছে যা আছে তা যেন সে নিয়ে আসে। অতঃপর তিনি তা হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতেন এবং অবশিষ্ট বন্টন করে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এর পরে একগুচ্ছ চুল নিয়ে হাযির হয় এবং বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার নিকট রয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেনঃ “হযরত বেলাল (রাঃ) যে তিনবার ঘোষণা করেছেন তা কি শুনতে পাওনি?' সে বলেঃ “হাঁ, পেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ ‘তখন আননি কেন?' সে ওযর পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এটা আর কখনও নেব না। তুমি এটা কিয়ামতের দিন নিয়ে যেয়ো।' এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীয়তের উপর চলে তার সন্তুষ্টি লাভ করে, তার পুণ্যের অধিকারী হয় এবং তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ পায় আর যারা তাঁর ক্রোধে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয় এ দু’দল কি কখনও সমান হতে পারে? কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গা রয়েছেঃ যারা আল্লাহর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে এবং যারা ওটা হতে অন্ধ রয়েছে তারা সমান নয়। অন্য স্থানে ইরশাদ হচ্ছে- 'যাদের সঙ্গে আল্লাহর উত্তম ওয়াদা হয়ে গেছে এবং যা তারা প্রাপ্ত হবে, তারা এবং দুনিয়ার উপকার লাভকারীরা সমান নয়। এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“ভাল ও মন্দের অধিকারীরা ভিন্ন সোপানের উপর রয়েছে; ওরা রয়েছে জান্নাতের সোপানে এবং এরা রয়েছে। জাহান্নামের সোপানে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্যে তাদের কার্য অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী দেখতে রয়েছেন এবং অতিসত্বরই তিনি সকলকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন; না পুণ্য মারা যাবে, না পাপ বৃদ্ধি পাবে বরং আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। এরপর আল্লাহপাক বলেনঃ মুমিনদের উপর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ রয়েছে যে তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য হতেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তার পার্শ্বে উঠতে বসতে পারে এবং পূর্ণভাবে উপকার গ্রহণ করতে পারে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি বল নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই মানুষ, আমার নিকট এই প্রত্যাদেশ হয়েছে যে নিশ্চয়ই তোমাদের মা’বৃদ একজনই বটে।' (১৮:১১০) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য ভক্ষণ করতো এবং বাজারসমূহে চলাফেরা করতো। (২৫:২০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি পুরুষ লোকদের নিকটই অহী করেছিলাম যারা পল্লী অঞ্চলের অধিবাসী ছিল।'(১২:১০৯) আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘হে দানব ও মানবগণ! তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতেই রাসূলগণ আসেনি?’ মোটকথা এটা পূর্ণ অনুগ্রহ যে সৃষ্টজীবের নিকট তাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠান হয়েছে যেন তারা তাদের সঙ্গে উঠা বসা করে বার বার প্রশ্নোত্তর করতঃ ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, রাসূল (সঃ) জনগণের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন অর্থাৎ কুরআন কারীম পাঠ করে তাদেরকে শুনিয়ে থাকেন, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকেন। এভাবে তিনি তাদের মধ্যে হতে শিক ও অজ্ঞতার অপবিত্রতা দূর করতঃ তাদেরকে নির্মল ও পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ রাসূল (সঃ)-এর আগমনের পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রকাশ্য অন্যায় ও পূর্ণ অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।

আলে ইমরান 3:165

১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে যে বিপদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধের বিপদ। এ যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। কিন্তু মুসলমানগণ এর দ্বিগুণ বিপদ কাফিরদেরকে পৌছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হয়েছিল এবং সত্তরজন বন্দী হয়েছিল। মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, এ বিপদ কি করে আসলো? আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন-এ বিপদ তোমাদের নিজেদের পক্ষ হতেই এসেছে। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন, “বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ মুক্তিপণ নিয়ে যেসব কাফিরকে মুক্তি দিয়েছিলেন তারই শাস্তি স্বরূপ উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবীকে শহীদ করা হয়, তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার মাথার পাগড়ী পড়ে যায় এবং চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যায়। উক্ত আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার গোত্রের লোক যে কাফিরদেরকে বন্দী করেছে এটা আল্লাহ পাকের নিকট পছন্দীয় নয়। এখন দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দিন। হয় তারা বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলবে না হয় মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরে এ সংখ্যক মুসলমানও শহীদ হয়ে যাবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদেরকে একত্রিত করে এ দুটি সিদ্ধান্তই পেশ করেন। তাঁরা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আমাদের গোত্রীয় লোক এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। আর এ অর্থ দ্বারা আমরা শক্তি অর্জন করতঃ অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের মধ্য হতে যে এতজন লোক শহীদ হবেন তাতে আমাদের ক্ষতি কি? এরূপে ক্ষতিপূরণ আদায় করে সত্তরজন বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। উহুদ যুদ্ধে ঠিক সত্তরজন মুসলমানই শহীদ হন। (জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-নাসাঈ) সুতরাং এক ভাবার্থতো এই হলো যে, এটা স্বয়ং মুসলমানদের পক্ষ হতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই শর্তে বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন যে, তাদের মধ্য হতেও এ সংখ্যক মুসলমান শহীদ হবেন এবং ঘটেছিলও তাই। দ্বিতীয় ভাবার্থ হচ্ছে“তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়েছিলে বলেই তোমাদেরকে এ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।' তীরন্দাজগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের স্থান হতে সরতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ নিষেধ সত্ত্বেও তারা উক্ত স্থান হতে সরে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর সক্ষম। তিনি যা চান তাই করেন, যা ইচ্ছে করেন তাই নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পরে না। দু'টি দলের মুখখামুখী হওয়ার দিন (হে মুমিনগণ!) তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, যেমন তোমরা শত্রুদের মোকাবিলা করতে গিয়ে পলায়ন করেছিলে, তোমাদের কতক লোক শহীদ হয়েছিল এবং কিছু আহতও হয়েছিল, এ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমেই হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে, এর মাধ্যমে অটল ও দৃঢ় ঈমানের লোক এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করা হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীরা যারা রাস্তা হতে ফিরে এসেছিল। একজন মুসলমান তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর কিংবা কমপক্ষে ঐ আক্রমণকারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দাও।' কিন্তু তারা কৌশল করে বলে, ‘আমরা যুদ্ধবিদ্যায় মোটেই পারদর্শী নই। আমরা যুদ্ধবিদ্যা জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ওরা যদি কমপক্ষে মুসলমানদের সঙ্গেও থাকতে তাহলেও কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করা যেতো। কেননা এর ফলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখানো হতো বা তারা দু'আ করতো, কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ করতো। তাদের উপরের কথার ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ ‘আমরা যদি জানতে পারতাম যে, সত্য সত্যই তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সহযোগিতা করতাম। কিন্তু আমরা জানি যে, যুদ্ধ হবেই না। সীরাত-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক হাজার লোক নিয়ে উহুদের প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হন। পথে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং বলে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) অন্যদের কথা শুনে মদীনার বাইরে চলে আসলেন এবং আমার কথা শুনলেন না। আল্লাহর শপথ! কোন্ উপকারকে লক্ষ্য করে যে আমরা প্রাণ বিসর্জন দেবো তা আমাদের মোটেই জানা নেই। হে লোক সকল! কেন তোমরা জীবন হারাতে যাচ্ছ? কপট ও সন্দেহ পোষণকারী যত লোক। সবাই তার কথা মেনে নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে সে দুষ্ট ফিরে আসে। বানূ সালমার ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন, হে আমার গোত্র! স্বীয় নবী (সঃ)-কে ও স্বীয় সম্প্রদায়কে অপদস্থ করো না। তাদেরকে শত্রুর সম্মুকে নিক্ষেপ করে তোমরা পলায়ন করো না। কিন্তু তারা কৌশল অবলম্বন করে বলে, আমরা জানি যে যুদ্ধ হবেই না।' মুসলমানগণ তাদেরকে বুঝতে অসমর্থ হয়ে অবশেষে বলেন, “হে আল্লাহর শত্রুর দল! যাও আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করুন! তোমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাহায্যকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। ইরশাদ হচ্ছে-‘সে দিন তারা বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের বেশী নিকটবর্তী ছিল।' এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন প্রকারের। কখনও সে কুফরীর নিকটবর্তী হয় এবং কখনও ঈমানের নিকটবর্তী। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে-“আমরা যদি যুদ্ধ হওয়ার কথা জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে থাকতাম। অথচ তারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, মুশরিকরা মুসলমানদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা, ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তাদের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছিল। কাজেই তারা এখন দুর্বল মুমিনদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়েছে। সুতরাং এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘তাদের অন্তরের গোপনীয় কথা আমি খুব ভালভাবেই জানি।' এ লোকগুলো ওরাই যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, 'যদি এরা আমাদের পরামর্শ মত কাজ করতো এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতো তবে কখনও নিহত হতো না। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমাদের এ কথা সঠিক হয় যে, মানুষ যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত না হলে মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যাবে তবে তো তোমাদের না মরাই উচিত, কেননা তোমরা তো বাড়ীতেই বসে রয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, একদিন তোমরাও মৃত্যুবরণ করবে, যদিও সুদৃঢ় ও সুউচ্চ অট্টালিকায় আশ্রয় গ্রহণ কর। আমি তোমাদেরকে তখনই সত্যবাদী মনে করতে পারি যখন তোমরা নিজেরেদকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারবে।' হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “এ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়।

আলে ইমরান 3:166

১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে যে বিপদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধের বিপদ। এ যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। কিন্তু মুসলমানগণ এর দ্বিগুণ বিপদ কাফিরদেরকে পৌছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হয়েছিল এবং সত্তরজন বন্দী হয়েছিল। মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, এ বিপদ কি করে আসলো? আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন-এ বিপদ তোমাদের নিজেদের পক্ষ হতেই এসেছে। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন, “বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ মুক্তিপণ নিয়ে যেসব কাফিরকে মুক্তি দিয়েছিলেন তারই শাস্তি স্বরূপ উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবীকে শহীদ করা হয়, তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার মাথার পাগড়ী পড়ে যায় এবং চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যায়। উক্ত আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার গোত্রের লোক যে কাফিরদেরকে বন্দী করেছে এটা আল্লাহ পাকের নিকট পছন্দীয় নয়। এখন দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দিন। হয় তারা বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলবে না হয় মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরে এ সংখ্যক মুসলমানও শহীদ হয়ে যাবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদেরকে একত্রিত করে এ দুটি সিদ্ধান্তই পেশ করেন। তাঁরা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আমাদের গোত্রীয় লোক এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। আর এ অর্থ দ্বারা আমরা শক্তি অর্জন করতঃ অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের মধ্য হতে যে এতজন লোক শহীদ হবেন তাতে আমাদের ক্ষতি কি? এরূপে ক্ষতিপূরণ আদায় করে সত্তরজন বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। উহুদ যুদ্ধে ঠিক সত্তরজন মুসলমানই শহীদ হন। (জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-নাসাঈ) সুতরাং এক ভাবার্থতো এই হলো যে, এটা স্বয়ং মুসলমানদের পক্ষ হতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই শর্তে বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন যে, তাদের মধ্য হতেও এ সংখ্যক মুসলমান শহীদ হবেন এবং ঘটেছিলও তাই। দ্বিতীয় ভাবার্থ হচ্ছে“তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়েছিলে বলেই তোমাদেরকে এ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।' তীরন্দাজগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের স্থান হতে সরতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ নিষেধ সত্ত্বেও তারা উক্ত স্থান হতে সরে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর সক্ষম। তিনি যা চান তাই করেন, যা ইচ্ছে করেন তাই নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পরে না। দু'টি দলের মুখখামুখী হওয়ার দিন (হে মুমিনগণ!) তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, যেমন তোমরা শত্রুদের মোকাবিলা করতে গিয়ে পলায়ন করেছিলে, তোমাদের কতক লোক শহীদ হয়েছিল এবং কিছু আহতও হয়েছিল, এ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমেই হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে, এর মাধ্যমে অটল ও দৃঢ় ঈমানের লোক এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করা হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীরা যারা রাস্তা হতে ফিরে এসেছিল। একজন মুসলমান তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর কিংবা কমপক্ষে ঐ আক্রমণকারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দাও।' কিন্তু তারা কৌশল করে বলে, ‘আমরা যুদ্ধবিদ্যায় মোটেই পারদর্শী নই। আমরা যুদ্ধবিদ্যা জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ওরা যদি কমপক্ষে মুসলমানদের সঙ্গেও থাকতে তাহলেও কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করা যেতো। কেননা এর ফলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখানো হতো বা তারা দু'আ করতো, কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ করতো। তাদের উপরের কথার ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ ‘আমরা যদি জানতে পারতাম যে, সত্য সত্যই তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সহযোগিতা করতাম। কিন্তু আমরা জানি যে, যুদ্ধ হবেই না। সীরাত-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক হাজার লোক নিয়ে উহুদের প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হন। পথে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং বলে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) অন্যদের কথা শুনে মদীনার বাইরে চলে আসলেন এবং আমার কথা শুনলেন না। আল্লাহর শপথ! কোন্ উপকারকে লক্ষ্য করে যে আমরা প্রাণ বিসর্জন দেবো তা আমাদের মোটেই জানা নেই। হে লোক সকল! কেন তোমরা জীবন হারাতে যাচ্ছ? কপট ও সন্দেহ পোষণকারী যত লোক। সবাই তার কথা মেনে নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে সে দুষ্ট ফিরে আসে। বানূ সালমার ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন, হে আমার গোত্র! স্বীয় নবী (সঃ)-কে ও স্বীয় সম্প্রদায়কে অপদস্থ করো না। তাদেরকে শত্রুর সম্মুকে নিক্ষেপ করে তোমরা পলায়ন করো না। কিন্তু তারা কৌশল অবলম্বন করে বলে, আমরা জানি যে যুদ্ধ হবেই না।' মুসলমানগণ তাদেরকে বুঝতে অসমর্থ হয়ে অবশেষে বলেন, “হে আল্লাহর শত্রুর দল! যাও আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করুন! তোমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাহায্যকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। ইরশাদ হচ্ছে-‘সে দিন তারা বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের বেশী নিকটবর্তী ছিল।' এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন প্রকারের। কখনও সে কুফরীর নিকটবর্তী হয় এবং কখনও ঈমানের নিকটবর্তী। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে-“আমরা যদি যুদ্ধ হওয়ার কথা জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে থাকতাম। অথচ তারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, মুশরিকরা মুসলমানদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা, ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তাদের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছিল। কাজেই তারা এখন দুর্বল মুমিনদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়েছে। সুতরাং এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘তাদের অন্তরের গোপনীয় কথা আমি খুব ভালভাবেই জানি।' এ লোকগুলো ওরাই যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, 'যদি এরা আমাদের পরামর্শ মত কাজ করতো এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতো তবে কখনও নিহত হতো না। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমাদের এ কথা সঠিক হয় যে, মানুষ যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত না হলে মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যাবে তবে তো তোমাদের না মরাই উচিত, কেননা তোমরা তো বাড়ীতেই বসে রয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, একদিন তোমরাও মৃত্যুবরণ করবে, যদিও সুদৃঢ় ও সুউচ্চ অট্টালিকায় আশ্রয় গ্রহণ কর। আমি তোমাদেরকে তখনই সত্যবাদী মনে করতে পারি যখন তোমরা নিজেরেদকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারবে।' হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “এ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়।

আলে ইমরান 3:167

১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে যে বিপদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধের বিপদ। এ যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। কিন্তু মুসলমানগণ এর দ্বিগুণ বিপদ কাফিরদেরকে পৌছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হয়েছিল এবং সত্তরজন বন্দী হয়েছিল। মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, এ বিপদ কি করে আসলো? আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন-এ বিপদ তোমাদের নিজেদের পক্ষ হতেই এসেছে। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন, “বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ মুক্তিপণ নিয়ে যেসব কাফিরকে মুক্তি দিয়েছিলেন তারই শাস্তি স্বরূপ উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবীকে শহীদ করা হয়, তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার মাথার পাগড়ী পড়ে যায় এবং চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যায়। উক্ত আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার গোত্রের লোক যে কাফিরদেরকে বন্দী করেছে এটা আল্লাহ পাকের নিকট পছন্দীয় নয়। এখন দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দিন। হয় তারা বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলবে না হয় মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরে এ সংখ্যক মুসলমানও শহীদ হয়ে যাবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদেরকে একত্রিত করে এ দুটি সিদ্ধান্তই পেশ করেন। তাঁরা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আমাদের গোত্রীয় লোক এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। আর এ অর্থ দ্বারা আমরা শক্তি অর্জন করতঃ অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের মধ্য হতে যে এতজন লোক শহীদ হবেন তাতে আমাদের ক্ষতি কি? এরূপে ক্ষতিপূরণ আদায় করে সত্তরজন বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। উহুদ যুদ্ধে ঠিক সত্তরজন মুসলমানই শহীদ হন। (জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-নাসাঈ) সুতরাং এক ভাবার্থতো এই হলো যে, এটা স্বয়ং মুসলমানদের পক্ষ হতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই শর্তে বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন যে, তাদের মধ্য হতেও এ সংখ্যক মুসলমান শহীদ হবেন এবং ঘটেছিলও তাই। দ্বিতীয় ভাবার্থ হচ্ছে“তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়েছিলে বলেই তোমাদেরকে এ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।' তীরন্দাজগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের স্থান হতে সরতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ নিষেধ সত্ত্বেও তারা উক্ত স্থান হতে সরে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর সক্ষম। তিনি যা চান তাই করেন, যা ইচ্ছে করেন তাই নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পরে না। দু'টি দলের মুখখামুখী হওয়ার দিন (হে মুমিনগণ!) তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, যেমন তোমরা শত্রুদের মোকাবিলা করতে গিয়ে পলায়ন করেছিলে, তোমাদের কতক লোক শহীদ হয়েছিল এবং কিছু আহতও হয়েছিল, এ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমেই হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে, এর মাধ্যমে অটল ও দৃঢ় ঈমানের লোক এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করা হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীরা যারা রাস্তা হতে ফিরে এসেছিল। একজন মুসলমান তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর কিংবা কমপক্ষে ঐ আক্রমণকারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দাও।' কিন্তু তারা কৌশল করে বলে, ‘আমরা যুদ্ধবিদ্যায় মোটেই পারদর্শী নই। আমরা যুদ্ধবিদ্যা জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ওরা যদি কমপক্ষে মুসলমানদের সঙ্গেও থাকতে তাহলেও কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করা যেতো। কেননা এর ফলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখানো হতো বা তারা দু'আ করতো, কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ করতো। তাদের উপরের কথার ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ ‘আমরা যদি জানতে পারতাম যে, সত্য সত্যই তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সহযোগিতা করতাম। কিন্তু আমরা জানি যে, যুদ্ধ হবেই না। সীরাত-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক হাজার লোক নিয়ে উহুদের প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হন। পথে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং বলে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) অন্যদের কথা শুনে মদীনার বাইরে চলে আসলেন এবং আমার কথা শুনলেন না। আল্লাহর শপথ! কোন্ উপকারকে লক্ষ্য করে যে আমরা প্রাণ বিসর্জন দেবো তা আমাদের মোটেই জানা নেই। হে লোক সকল! কেন তোমরা জীবন হারাতে যাচ্ছ? কপট ও সন্দেহ পোষণকারী যত লোক। সবাই তার কথা মেনে নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে সে দুষ্ট ফিরে আসে। বানূ সালমার ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন, হে আমার গোত্র! স্বীয় নবী (সঃ)-কে ও স্বীয় সম্প্রদায়কে অপদস্থ করো না। তাদেরকে শত্রুর সম্মুকে নিক্ষেপ করে তোমরা পলায়ন করো না। কিন্তু তারা কৌশল অবলম্বন করে বলে, আমরা জানি যে যুদ্ধ হবেই না।' মুসলমানগণ তাদেরকে বুঝতে অসমর্থ হয়ে অবশেষে বলেন, “হে আল্লাহর শত্রুর দল! যাও আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করুন! তোমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাহায্যকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। ইরশাদ হচ্ছে-‘সে দিন তারা বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের বেশী নিকটবর্তী ছিল।' এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন প্রকারের। কখনও সে কুফরীর নিকটবর্তী হয় এবং কখনও ঈমানের নিকটবর্তী। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে-“আমরা যদি যুদ্ধ হওয়ার কথা জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে থাকতাম। অথচ তারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, মুশরিকরা মুসলমানদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা, ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তাদের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছিল। কাজেই তারা এখন দুর্বল মুমিনদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়েছে। সুতরাং এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘তাদের অন্তরের গোপনীয় কথা আমি খুব ভালভাবেই জানি।' এ লোকগুলো ওরাই যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, 'যদি এরা আমাদের পরামর্শ মত কাজ করতো এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতো তবে কখনও নিহত হতো না। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমাদের এ কথা সঠিক হয় যে, মানুষ যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত না হলে মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যাবে তবে তো তোমাদের না মরাই উচিত, কেননা তোমরা তো বাড়ীতেই বসে রয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, একদিন তোমরাও মৃত্যুবরণ করবে, যদিও সুদৃঢ় ও সুউচ্চ অট্টালিকায় আশ্রয় গ্রহণ কর। আমি তোমাদেরকে তখনই সত্যবাদী মনে করতে পারি যখন তোমরা নিজেরেদকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারবে।' হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “এ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়।

আলে ইমরান 3:168

১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে যে বিপদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধের বিপদ। এ যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। কিন্তু মুসলমানগণ এর দ্বিগুণ বিপদ কাফিরদেরকে পৌছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হয়েছিল এবং সত্তরজন বন্দী হয়েছিল। মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, এ বিপদ কি করে আসলো? আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন-এ বিপদ তোমাদের নিজেদের পক্ষ হতেই এসেছে। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন, “বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ মুক্তিপণ নিয়ে যেসব কাফিরকে মুক্তি দিয়েছিলেন তারই শাস্তি স্বরূপ উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবীকে শহীদ করা হয়, তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার মাথার পাগড়ী পড়ে যায় এবং চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যায়। উক্ত আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার গোত্রের লোক যে কাফিরদেরকে বন্দী করেছে এটা আল্লাহ পাকের নিকট পছন্দীয় নয়। এখন দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দিন। হয় তারা বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলবে না হয় মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরে এ সংখ্যক মুসলমানও শহীদ হয়ে যাবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদেরকে একত্রিত করে এ দুটি সিদ্ধান্তই পেশ করেন। তাঁরা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আমাদের গোত্রীয় লোক এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। আর এ অর্থ দ্বারা আমরা শক্তি অর্জন করতঃ অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের মধ্য হতে যে এতজন লোক শহীদ হবেন তাতে আমাদের ক্ষতি কি? এরূপে ক্ষতিপূরণ আদায় করে সত্তরজন বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। উহুদ যুদ্ধে ঠিক সত্তরজন মুসলমানই শহীদ হন। (জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-নাসাঈ) সুতরাং এক ভাবার্থতো এই হলো যে, এটা স্বয়ং মুসলমানদের পক্ষ হতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই শর্তে বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন যে, তাদের মধ্য হতেও এ সংখ্যক মুসলমান শহীদ হবেন এবং ঘটেছিলও তাই। দ্বিতীয় ভাবার্থ হচ্ছে“তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়েছিলে বলেই তোমাদেরকে এ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।' তীরন্দাজগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের স্থান হতে সরতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ নিষেধ সত্ত্বেও তারা উক্ত স্থান হতে সরে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর সক্ষম। তিনি যা চান তাই করেন, যা ইচ্ছে করেন তাই নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পরে না। দু'টি দলের মুখখামুখী হওয়ার দিন (হে মুমিনগণ!) তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, যেমন তোমরা শত্রুদের মোকাবিলা করতে গিয়ে পলায়ন করেছিলে, তোমাদের কতক লোক শহীদ হয়েছিল এবং কিছু আহতও হয়েছিল, এ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমেই হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে, এর মাধ্যমে অটল ও দৃঢ় ঈমানের লোক এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করা হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীরা যারা রাস্তা হতে ফিরে এসেছিল। একজন মুসলমান তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর কিংবা কমপক্ষে ঐ আক্রমণকারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দাও।' কিন্তু তারা কৌশল করে বলে, ‘আমরা যুদ্ধবিদ্যায় মোটেই পারদর্শী নই। আমরা যুদ্ধবিদ্যা জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ওরা যদি কমপক্ষে মুসলমানদের সঙ্গেও থাকতে তাহলেও কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করা যেতো। কেননা এর ফলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখানো হতো বা তারা দু'আ করতো, কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ করতো। তাদের উপরের কথার ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ ‘আমরা যদি জানতে পারতাম যে, সত্য সত্যই তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সহযোগিতা করতাম। কিন্তু আমরা জানি যে, যুদ্ধ হবেই না। সীরাত-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক হাজার লোক নিয়ে উহুদের প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হন। পথে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং বলে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) অন্যদের কথা শুনে মদীনার বাইরে চলে আসলেন এবং আমার কথা শুনলেন না। আল্লাহর শপথ! কোন্ উপকারকে লক্ষ্য করে যে আমরা প্রাণ বিসর্জন দেবো তা আমাদের মোটেই জানা নেই। হে লোক সকল! কেন তোমরা জীবন হারাতে যাচ্ছ? কপট ও সন্দেহ পোষণকারী যত লোক। সবাই তার কথা মেনে নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে সে দুষ্ট ফিরে আসে। বানূ সালমার ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন, হে আমার গোত্র! স্বীয় নবী (সঃ)-কে ও স্বীয় সম্প্রদায়কে অপদস্থ করো না। তাদেরকে শত্রুর সম্মুকে নিক্ষেপ করে তোমরা পলায়ন করো না। কিন্তু তারা কৌশল অবলম্বন করে বলে, আমরা জানি যে যুদ্ধ হবেই না।' মুসলমানগণ তাদেরকে বুঝতে অসমর্থ হয়ে অবশেষে বলেন, “হে আল্লাহর শত্রুর দল! যাও আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করুন! তোমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাহায্যকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। ইরশাদ হচ্ছে-‘সে দিন তারা বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের বেশী নিকটবর্তী ছিল।' এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন প্রকারের। কখনও সে কুফরীর নিকটবর্তী হয় এবং কখনও ঈমানের নিকটবর্তী। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে-“আমরা যদি যুদ্ধ হওয়ার কথা জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে থাকতাম। অথচ তারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, মুশরিকরা মুসলমানদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা, ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তাদের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছিল। কাজেই তারা এখন দুর্বল মুমিনদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়েছে। সুতরাং এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘তাদের অন্তরের গোপনীয় কথা আমি খুব ভালভাবেই জানি।' এ লোকগুলো ওরাই যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, 'যদি এরা আমাদের পরামর্শ মত কাজ করতো এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতো তবে কখনও নিহত হতো না। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমাদের এ কথা সঠিক হয় যে, মানুষ যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত না হলে মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যাবে তবে তো তোমাদের না মরাই উচিত, কেননা তোমরা তো বাড়ীতেই বসে রয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, একদিন তোমরাও মৃত্যুবরণ করবে, যদিও সুদৃঢ় ও সুউচ্চ অট্টালিকায় আশ্রয় গ্রহণ কর। আমি তোমাদেরকে তখনই সত্যবাদী মনে করতে পারি যখন তোমরা নিজেরেদকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারবে।' হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “এ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়।

আলে ইমরান 3:169

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:170

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:171

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:172

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:173

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:174

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:175

১৬৯-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও আখেরাতে তাদের আত্মা জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। এ আয়াতটির শান-ই-নমূল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'চল্লিশ অথবা সত্তরজন সাহাবীকে ‘বীরে মুআওনাহ' -এর দিকে পাঠিয়েছিলেন। এ দলটি যখন ঐ কূপের উপরে অবস্থিত গুহা পর্যন্ত পৌছেন তখন তারা তথায় শিবির স্থাপন করেন। তারা পরস্পর বলাবলি করেন, এমন কে আছে যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর রাসূলে (সঃ)-এর কালেমাকে ঐ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? একজন সাহাবী ঐ জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং ঐসব লোকের বাড়ীর নিকটে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, “হে বীরে মুআওনার অধিবাসীবৃন্দ! জেনে রেখো যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর একজন দূত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র মা’রূদ এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এ কথা শুনামাত্রই এক কাফির তীর নিয়ে বাড়ী হতে বেরিয়ে আসে এবং এমনভাবে লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় যে, তার পঞ্জরের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐ সাহাবীর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) অর্থাৎ কা’বার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। তখন কাফিরেরা পদচিহ্ন ধরে ঐ গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাদের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল ঐ সব মুসলমানকে শহীদ করে দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের সম্বন্ধে কুরআন কারীমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাঁদের উক্তি যেন নিম্নরূপ, আমাদের পক্ষ হতে আমাদের সম্প্রদায়কে এ সংবাদ জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা বরাবর এ আয়াতগুলো পড়তে থাকি। অতঃপর কিছুদিন পর ঐগুলো রহিত করে দিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে জারীর) সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, 'আমরা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ তাদের আত্মাসমূহ সবুজ রং-এর পাখীর দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপসমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তারা যে কোন জায়গায় বিচরণ করে এবং ঐ প্রদীপসমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের প্রভু তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন-“তোমরা কিছু চাও কি?' তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা আর কি চাবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছেমত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন এবং তারা ঐ এক উত্তরই দেয়। তৃতীয় বার আল্লাহ পাক ঐ প্রশ্নই করেন। তারা যখন দেখে যে, কিছু চাওয়া ছাড়া উপায় নেই তখন বলে, “হে আমাদের প্রভু! আমরা চাই যে, আমাদের আত্মাগুলো আপনি আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন। আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করবো এবং শহীদ হবো’। তখন জানা হয়ে যায় যে, তাদের আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তোমরা আর কি চাও?' এ প্রশ্ন করা হতে আল্লাহ তা'আলা বিরত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনও দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এ আকাংখা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা দ্বিতীয় বার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা, তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফে এ হাদীসটি রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে জাবির! তুমিও জান যে, আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে জীবিত করেছেন এবং তাকে বলেছেন-'হে আমার বান্দা! কি চাবে চাও? তখন সে বলেছে, হে আল্লাহ! পৃথিবীতে আবার আমাকে পাঠিয়ে দিন, যেন আমি দ্বিতীয়বার আপনার পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারি।' আল্লাহ তাআলা তখন বলেন-“এটা তো আমি ফায়সালা করেই ফেলেছি যে, এখান হতে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। তাঁর নাম ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আনসারী (রাঃ)। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, “আমার পিতার শাহাদাত লাভের পর আমি কাঁদতে আরম্ভ করি এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে সরিয়ে বার বার তার চেহারা দেখতে থাকি। সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব ছিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “হে জাবির! ক্রন্দন করো না। যে পর্যন্ত তোমার পিতাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া না হবে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে তাকে ছায়া করে থাকবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ভাইদেরকে যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের আত্মাগুলোকে সবুজ পক্ষীসমূহের দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজির ফল ভক্ষণ করে, জান্নাতী নদীর পানি পান করে এবং আরশের ছায়ার নীচে লটকানো প্রদীপের মধ্যে আরাম ও শান্তি লাভ করে। যখন পানাহারের এরূপ উত্তম জিনিস তারা প্রাপ্ত হয় তখন বলতে থাকে, আমাদের জগতবাসী ভাইয়েরা যদি আমাদের উত্তম সুখভোগের সংবাদ পেতো, তাহলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো না এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা নিশ্চিত থাক। আমি জগতবাসীকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো।' তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো হযরত হামযা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরিক-ই-হাকিম) তাফসীর কারকগণ এ কথাও বলেছেন যে, উহুদের শহীদগণের ব্যাপারেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বলেনঃ “হে জাবির (রাঃ)! তোমার কি হয়েছে যে, আমি তোমাকে চিন্তিত দেখছি?' আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন এবং তার উপর অনেক ঋণের বোঝা রয়েছে। তা ছাড়া আমার বহু ছোট ভাই বোনও রয়েছে। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যার সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার আড়াল থেকেই বলেছেন। কিন্তু তোমার পিতার সঙ্গে তিনি মুখখামুখী হয়ে কথা বলেছেন। তিনি তাকে বলেছেনঃ “তুমি আমার নিকট চাও। যা চাইবে তাই আমি তোমাকে দেবো। তোমার আব্বা বলেছে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এই চাচ্ছি যে, আপনি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যেন আমি আপনার পথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে আসতে পারি।' মহা সম্মানিত আল্লাহ তখন বলেছেন, এ কথা তো আমি পূর্ব হতেই নির্ধারিত করে রেখেছি। যে, কেউই এখান হতে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাবে না। তখন তোমার পিতা বলেন, হে আমার প্রভু! আমার পরবর্তীদেরকে তাহলে আপনি এ মর্যাদার সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। বায়হাকীর মধ্যে এটুকু আরও বেশী আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তো আপনার ইবাদতের হকও আদায় করতে পারিনি।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, শহীদগণ জান্নাতের দরজার উপর নদীর ধারে সবুজ গম্বুজের উপর রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের নিকট জান্নাতী দান পৌঁছে যায়। হাদীস দুটির মধ্যে অনুরূপতা এই যে, কতগুলো শহীদ এমন রয়েছেন যাদের আত্মাগুলো পাখীর দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে, আবার কতগুলো এমন রয়েছেন যাদের অবস্থান স্থল হচ্ছে এ গম্বুজ। আর এও হতে পারে যে, তারা জান্নাতের মধ্যে ঘুরাফেরা করার পর এখানে একত্রিত হন এবং এখানেই তাদেরকে আহার করান হয়। এখানে এ হাদীসগুলো আনয়ন করাও খুবই উপযোগী হবে যেগুলোর মধ্যে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে এ সুসংবাদই রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিনের আত্মা হচ্ছে একটি পাখী যে জান্নাতের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে বেড়ায়। শেষে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা সকলকে দাঁড় করাবেন তখন ঐ আত্মাকে তার দেহে ফিরিয়ে দেবেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণের মধ্যে তিনজন মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম রয়েছেন, যারা এমন চারজন ইমামেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের মাযহাব মান্য করা হয়। প্রথম হচ্ছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)। তিনি এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফিঈ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষক হচ্ছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস আসবাহী (রঃ)। সুতরাং ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) এ তিনজন খ্যাতনামা ইমাম হচ্ছেন এ হাদীসের বর্ণনাকারী। অতএব, এ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমানদারের আত্মা জান্নাতী পাখীর আকারে জান্নাতে অবস্থান করে এবং শহীদগণের আত্মা পূর্ব বর্ণনা হিসেবে সবুজ রং-এর পাখীর দেহে অবস্থান করে। এ আত্মাগুলো তারকারাজির ন্যায়। সাধারণ মুমিনদের আত্মা এই মর্যাদা লাভ করবে না। ওরা নিজে নিজেই উড়ে বেড়ায়। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার মাধ্যমে ঈমান ও ইসলামের উপর। আমাদের মৃত্যু দান করেন, আমীন!অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- এ শহীদগণ যেসব সুখ ও শান্তির মধ্যে রয়েছে তাতে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং তাদের নিকট এটাও খুশীর বিষয় যে, তাদের বন্ধু যারা তাদের পরে আল্লাহর পথে শহীদ হবে ও তাদের নিকট আগমন করবে, আগামীর জন্যে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা যা দুনিয়ায় ছেড়ে এসেছে তজ্জন্যে তাদের কোন দুঃখ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও জান্নাত দান করুন! হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ ‘এর ভাবার্থ এই যে, তারা সন্তুষ্ট, কেননা তাদের ভাই বন্ধুদের মধ্যে যারা জিহাদে লিপ্ত রয়েছে তারাও শহীদ হয়ে তাদের সুখের অংশীদার হবে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিদানে উপকৃত হবে।' হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ শহীদকে একখানা পত্র দেয়া হয় যে, অমুক দিন তোমার নিকট অমুকের আগমন ঘটবে এবং অমুক দিন অমুক আসবে। সুতরাং যেমন দুনিয়াবাসী কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সংবাদে খুশী হয়ে থাকে, তদ্রুপ এ শহীদগণ ঐ শহীদদের আগমন সংবাদে সন্তুষ্ট হবে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, যখন শহীদগণ জান্নাতে গমন করেন এবং তথায় স্বীয় স্থান, করুণা ও সুখ-শান্তি দর্শন করেন তখন বলেন, 'যদি এ অবগতি আমাদের ঐ ভাইদের থাকতো যারা এখন পর্যন্ত দুনিয়াতেই রয়েছে, তবে তারা বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করতো এবং এমন জায়গায় প্রবেশ করতো যেখান হতে জীবিত ফিরে আসার আশা থাকতো না, তাহলে তারাও আমাদের এ সুখ ভোগের অংশীদার হতো।' সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে তাঁদের এ সম্ভোগের কথা জানিয়ে দেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলেন- 'আমি তোমাদের সংবাদ তোমাদের নবীর নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা অত্যন্ত খুশী হন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বীরে মুআওনার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সত্তরজন সাহাবী। তারা সবাই একই দিনে সকালে কাফিরদের তরবারীর আঘাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তাঁদের হত্যাকারীদের জন্যে একমাস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাযে কুনুতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদদু'আ করেন এবং তাদেরকে অভিশাপ দেন। তাদের ব্যাপারেই কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল-“আমাদের সম্প্রদায়কে আমাদের সংবাদ পৌছিয়ে দিন যে, আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক বলেন-“তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করার দরুন আনন্দিত হয়, আর এ জন্যেও আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। হযরত আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি সমস্ত মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শহীদ হোক আর নাই হোক। এরূপে খুব কম স্থানই রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করার পর মমিনদের প্রতিদানের বর্ণনা না করেন। অতঃপর ঐ খাটি মমিনদের প্রশংসামূলক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা হামরা-ই-আসাদের যুদ্ধে আহত ও ক্ষত বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বিপদ পৌছিয়ে ছিল, অতঃপর তারা বাড়ীর দিকে প্রস্থান করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ধারণা হয় যে, সুযোগ খুব ভাল ছিল। মুসলমানেরা পরাজিত হয়েছিল এবং আহতও হয়েছিল, আর তাদের বড় বড় বীর পুরুষেরা শহীদও হয়েছিল। কাজেই তাদের মতে তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করলে কাজই ফায়সালা হয়ে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতঃ বলেনঃ “তোমরা আমার সাথে চল। আমরা মুশরিকদের পিছনে ধাওয়া করবো যেন তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন জেনে নেয় যে, মুসলমানেরাও শক্তিহীন হয়নি। তিনি শুধু তাদেরকেই সাথে নিয়েছিলেন যারা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তারা ছাড়া তিনি শুধু হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যখন মুশরিকরা উহুদ হতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পথে তারা চিন্তা করতঃ পরস্পর বলাবলি করে, না তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করলে, না মুসলমানদের স্ত্রীদেরকে ধরে ফেললে। দুঃখের বিষয় তোমরা কিছুই করনি। চল, ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁরা সব প্রস্তুত হয়ে যান এবং মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তারা হামরাউল আসাদ বা বীরে আবি উয়াইনা পর্যন্ত পৌছেন। মুশরিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং “আচ্ছা, আগামী বছর দেখা যাবে’ -এ কথা বলে তারা মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও মদীনায় ফিরে আসেন। এটাকেও একটি পৃথক যুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। এ পবিত্র আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। উহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল রোজ শনিবার সংঘটিত হয়েছিল। ১৬ই শাওয়াল রোজ রবিবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলেন, “হে জনগণ! শত্রুদের অনুসন্ধানে চলুন এবং শুধুমাত্র তারাই যাবেন যারা গতকল্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। এ আহ্বান শুনে হযরত জাবির (রাঃ) উপস্থিত হয়ে আরয করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গতকালের যুদ্ধে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কেননা, আমার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছিলে, বৎস! তোমার সাথে তোমার এ ছোট ছোট বোনেরা রয়েছে। তুমি বা আমি কেউই এদেরকে একাকী এখানে ছেড়ে দু’জনই যাওয়া পছন্দ করি না। একজন যাবে এবং একজন এখানে থাকবে। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তুমি যাবে আর আমি এখানে বসে থাকবো। এ জন্যেই আমার আনন্দ এই যে, তুমি তোমার বোনদের নিকট অবস্থান কর এবং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি।' এ কারণেই আমি ওখানেই ছিলাম এবং আমার পিতা আপনার সাথে এসেছিলেন। এখন আমার আকাঙ্খা এই যে, আজ আপনি আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, শত্রু যেন ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের পিছনে আসতে দেখে বুঝে নেয় যে, মুসলমানদেরও শক্তি কম নেই এবং তাদের সাথে মোকাবিলা করতে তারা অসমর্থ নয়। বানূ আব্দুশ শাহল গোত্রের একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, “উহুদের যুদ্ধে আমরা দু' ভাই উপস্থিত ছিলাম। ভীষণভাবে আহত হয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহ্বানকারী যখন শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্যে ডাক দেন তখন আমরা দু’ ভাই পরস্পর বলাবলি করিঃ বড়ই দুঃখের বিষয় যে, না আমাদের নিকট কোন সোয়ারী আছে যে ওর উপর সোয়ার হয়ে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে গমন করি, না জখমের কারণে শরীরে এতটুকু শক্তি আছে যে, তার সাথে পদব্রজে চলি ।সুতরাং বড়ই আফসোস যে, এ যুদ্ধ আমাদের হাত থেকে ছুটে যাবে। আমাদের অসংখ্য গভীর জখম আজ আমাদেরকে গমন হতে বিরত রাখবে। কিন্তু আবার আমরা সাহসে বুক বেঁধে নেই। আমার ভাইয়ের তুলনায় আমার জখম কিছু হালকা ছিল। যখন আমার ভাই সম্পূর্ণরূপে অপারগ হয়ে যেতে এবং তার পা উঠতো না তখন কোনও রকমে আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন নামিয়ে দিতাম। এভাবে অতি কষ্টে আমরা সৈন্যদের নিকট পৌছেই গেলাম’! (সীরাত-ই-ইবনে ইসহাক) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উরওয়া (রঃ)-কে বলেন, “হে ভাগৃনে! তোমার দু' পিতা ঐ লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্বন্ধে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও হ্যরত সিদ্দীক (রাঃ)। উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মুশরিকরা সামনে অগ্রসর হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণা হয় যে, না জানি এরা পুনরায় ফিরে আসে। তাই, তিনি বলেনঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এরূপ কেউ আছে কি? এ কথা শুনা মাত্রই সত্তরজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান যাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং একজন ছিলেন হযরত যুবায়ের (রাঃ)। এ বর্ণনাটি আরও অনেক সনদে বহু কিতাবে রয়েছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার দু’জন পিতা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা মার’ রূপে বর্ণনা করা ভুল ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, এর ইসনাদগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের উল্টো। তারা এ বর্ণনাটিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে এনেছেন। তাছাড়া এ জন্যেও যে, অর্থের দিক দিয়ে এর বিপরীত সাব্যস্ত আছে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বাপ-দাদা কেউই হতেন না। সঠিক কথা এই যে, এ বর্ণনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে হযরত উরওয়া (রাঃ)-কে বলেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আৰূ সুফইয়ানের অন্তরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং যদিও তিনি উহুদের যুদ্ধে কিছুটা সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি মক্কার দিকে গমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ আবু সুফইয়ান তোমাদের ক্ষতি করে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করেছেন।' উহুদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়ীগণ যীকা’দী মাসে মদীনায় এসেছিলো। প্রতি বছর তারা বদর-ই-সুগরায় তাদের শিবির স্থাপন করতো। এবারও তারা এ ঘটনার পরে এখানে আগমন করেন। মুসলমানগণ যুদ্ধে আহত হওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁরা নিজেদের কষ্টের কথা বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁরা ভীষণ বিপদের মধ্যে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে এ কথার উপর উত্তেজিত করেন যে, তাঁরা যেন তার সাথে গমন করেন। এ লোকগুলো এখন চলে যাবে এবং আবার হজ্বের সময় আসবে। সুতরাং আগামী বছর পর্যন্ত তাদের উপর এ ক্ষমতা চলবে না। কিন্তু শয়তান মুসলমানদেরকে ধমক দিতে এবং পথভ্রষ্ট করতে আরম্ভ করে। সে তাদেরকে বলে, তোমাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে মুশরিকরা সৈন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে। এতে মুসলমানদের মন দমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমাদের একজনও না গেলেও আমি একাই যাবো। অতঃপর উৎসাহ প্রদানের ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ), হযরত আবূ উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সত্তর জন সাহাবী তার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ পবিত্র সেনাদল আবু সুফইয়ানের অনুসন্ধানে বদর-ই-সুগরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁদেরই মর্যাদা ও বীরত্বের বর্ণনা এ মুবারক আয়াতে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সফরে মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরা-ই-আসাদ’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে যান। মদীনায় তিনি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন। তথায় তিনি সোম, মঙ্গল ও বুধ এ তিন দিন অবস্থান করেন এবং তৎপর মদীনায় ফিরে আসেন। তথায় অবস্থানকালীন সময়ে খুযাআ গোত্রের নেতা মা’বাদ খুযায়ী সেখান দিয়ে গমন করে। লোকটি নিজে মুশরিক ছিল। কিন্তু ঐ পুরো গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্ধি হয়েছিল। ঐ গোত্রের মুশরিক ও মুমিন নির্বিশেষে তাঁর মঙ্গলাকাঙখী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে, “আপনার সঙ্গীদেরকে কষ্ট পৌছেছে বলে আমরা খুব দুঃখিত। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ও আপনার সহচরগণকে নিরাপদে রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হামরা-ইআসাদে পৌছার পূর্বেই আবু সুফইয়ান প্রস্থান করেছিলেন। যদিও তার ও তার সঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল যে, মুসলমানদেরকে হত্যা করে এবং আহত করে তাদের উপর বিজয় লাভের পরেও তাদের অবশিষ্টদেরকে হত্যা না করা ভুল হয়েছে। কাজেই ফিরে গিয়ে তাদের সকলকেই হত্যা করা উচিত। একথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, মা'বাদ খুযায়ীর তথায় আগমন ঘটেছিল। আবু সুফইয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, সংবাদ কি? সে বলে, রাসূলুল্লাহ স্বীয় সাহাবীবর্গসহ তোমাদের পিছনে আসছেন। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন। যারা পূর্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারাও আসছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তির সাথে আক্রমণে উদ্যত হয়েছেন। আমি এরূপ সেনাবাহিনী পূর্বে কখনও দেখিনি।' একথা শুনে আবু সুফইয়ানের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। তিনি মা'বাদ খুযায়ীকে বলেন, “তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ভালই হলো। নতুবা আমরা তো স্বয়ং তাদের দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। মা’বাদ বলে, কখনও এরূপ ইচ্ছে করে না। আমার কথা কি? তোমরা এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই হয়তো স্বয়ং ইসলামী সেনাবাহিনীর অশ্বসমূহ দেখতে পাবে। আমি তাঁদের সেনাবাহিনী, তাঁদের বীরত্ব, ক্রোধ, প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। আমি তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলছি যে, তোমরা অতি তাড়াতাড়ি পলায়ন কর ও নিজেদের প্রাণ রক্ষা কর। আমি তাদের ভয়াবহ প্রস্তুতির কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। সংক্ষেপ কথা এই যে, প্রাণ বাঁচাতে হলে শীঘ্রই এখান হতে প্রস্থান কর।' আবূ সুফইয়ান ও তার সঙ্গীরা হতবুদ্ধি হয়ে মক্কার পথ ধরে।আবদুল কায়েস গোত্রের লোক, যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা যাচ্ছিল, তাদেরকে আবু সুফইয়ান বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমাদের সম্বন্ধে এ সংবাদ দেবে যে, আমরা তাদেরকে হত্যা করার জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করছি এবং আমরা তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করে ফেলেছি। যদি তোমরা তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও তবে আমরা তোমাদেরকে উকাযের বাজারে অনেক কিসমিস প্রদান করবো।' অতএব তারা হামরা-ই-আসাদে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ভয়াবহ সংবাদ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তর দেন, “আমাদের জন্যে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের জন্যে একটি পাথরের চিহ্ন ঠিক করে রেখেছি। যদি তারা ফিরে আসে তবে তথায় পৌছে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যেমন গতকালকের দিনটি ছিল। কতগুলো লোক এও বলেছেন যে, এ আয়াত বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা হামরা-ই-আসাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর শত্রুরা মুসলমানদেরকে হতোদ্যম করার জন্যে শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম ও সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্যের পর্বতরূপে সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তাদের আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারা আল্লাহ তা'আলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়। (আরবী)-এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন এবং - হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ) এ কালেমাটি ঐ সময় পাঠ করেছিলেন যখন মানুষ তাঁকে কাফিরদের ভীরু ও কাপুরুষ সৈন্যদের হতে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। বড়ই বিস্ময়কর কথা এই যে, ইমাম হাকিম (রঃ) এ বর্ণনাটি আনয়নের পর বলেন, “এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মুখ দিয়ে যে শেষ কালেমাটি বের হয়েছিল তা ছিল এ কালেমাটিই। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাফিরদের সৈন্যদের সংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পথে খুযাআ গোত্রের একজন লোক এ সংবাদ পরিবেশন করে তখন তিনি এ কালেমাটি পাঠ করেছিলেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের উপর কোন কাজ এসে পড়ে তখন তোমরা (আরবী) শেষ পর্যন্ত পাঠ করে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু' ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করেন। তখন যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা হয় সে এ কালেমাটিই পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডাকিয়ে নিয়ে বলেনঃ “অপারগতা ও অলসতার উপর আল্লাহ তা'আলার তিরস্কার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দান কর। যখন কোন কঠিন কাজে পড়ে যাও তখন এটা পড়ে নাও।' মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “কিরূপে আমি নিশ্চিন্ত ও শান্তিতে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাধারণকারী মুখে শিঙ্গা ধরে রয়েছেন এবং কপাল নীচু করে আল্লাহর নির্দেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন আল্লাহর নির্দেশ হবে ও শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। সাহাবীগণ তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি পড়বো?' তিনি বলেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠ করবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব (রাঃ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন এবং তোমার বিয়ে দিয়েছেন তোমার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীগণ।' হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার দোষহীনতা ও পবিত্রতার আয়াতগুলো আকাশ হতে স্বীয় পাক কালামে অবতীর্ণ করেন।' হযরত যয়নাব (রাঃ) ওটা স্বীকার করে নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা বলতো, তুমি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুআত্তালের সোয়ারীর উপর আরোহণের সময় কি পড়েছিলে? হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, (আরবী) পড়েছিলাম। একথা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেন, তুমি ঈমানদারদের কালেমাই পড়েছিলে। এরূপে এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-“ঐ নির্ভরশীলদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক। যারা অন্যায়ের ইচ্ছে পোষণ করতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে ধ্বংস করেছেন। মুসলমানেরা আল্লাহ পাকের দয়া ও অনুগ্রহে কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বীয় শহরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং কাফিরেরা স্বীয় ষড়যন্ত্রে অকতকার্য হয়। মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা, তাঁরা সন্তুষ্টির কার্যই করেছে। আল্লাহ তাআলা বড়ই গৌরবময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নিয়ামত ছিল এই যে, তারা নিরাপদে ছিল এবং ফযল ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বণিকদের এক যাত্রীদলের নিকট মাল ক্রয় করেন যাতে বহু লাভ হয় এবং ঐ লভ্যাংশ তিনি স্বীয় সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন, 'এখন অঙ্গীকারের স্থান হচ্ছে বদর। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “সম্ভবতঃ তাই। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় পৌছেন। এ কাপুরুষের তথায় আগমন ঘটেনি। তথায় তখন বাজারের দিন ছিল। তিনি মাল ক্রয় করেন এবং লাভে বিক্রি করেন। ওরই নাম হচ্ছে বদর-ই-সুগরার যুদ্ধ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে ছিল শয়তান যে তার বন্ধুদের মাধ্যমে তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছিল, তাদেরকে ভয় না করাই তোমাদের কর্তব্য। বরং একমাত্র আমার ভয়ই অন্তরে জাগিয়ে রাখ। কেননা, ঈমানদারীর শর্ত এই যে, যখন কেউ ভয় প্রদর্শন করবে বা ধমক দেবে এবং ধর্মীয় কার্যে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করবে তখন মুসলমান আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করবে, তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই যথেষ্ট এবং তিনিই সাহায্যকারী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ কি তাঁর বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট নন? এবং তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের হতে ভয় দেখাচ্ছে'। (৩৯:৩৬) শেষে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল- আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তার উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে থাকে।' (৩৯:৩৮) অন্যস্থান রয়েছে- অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।' (৪:৭৬) আর এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা শয়তানের সৈন্য, জেনে রেখো যে, শয়তানের সৈন্যরাই ক্ষতিগ্রস্ত'। (৫৮:১৯) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন। অবশ্যই আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয় লাভ করবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শক্তিশালী, মহাপ্রতাপান্বিত।' (৫৮:২১) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে আল্লাহকে সাহায্য করবে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। (২২:৪০) আর এক স্থানে বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।' (৪৭:৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণকে ও মুমিগণকে ইহজগতেও সাহায্য করবো এবং সেদিনও সাহায্য করবে যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। যেদিন অত্যাচারীদের ওযর কোন উপকার দেবে না, তাদের জন্য অভিশাপ এবং তাদের জন্যে রয়েছে জঘন্য ঘর। (৪০:৫১-৫২)

আলে ইমরান 3:176

১৭৬-১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের উপর অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন বলে কাফিরদের পথভ্রষ্টতা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকছিল। যেমন তারা কুফরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তেমন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁকে এটা হতে বিরত রাখছেন এবং বলছেন-এরই মধ্যে আল্লাহ পাকের নিপুণতা রয়েছে। হে নবী (সঃ)! তাদের কুফরী তোমার বা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এসব লোক তাদের পরকালের অংশ ধ্বংস করতে রয়েছে এবং নিজেদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখবেন। সুতরাং তুমি তাদের জন্য দুঃখ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমার নিকট এও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে যে, যারা ঈমানকে কুফরীর দ্বারা পরিবর্তিত করে সেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারে না বরং তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যে কাফিরদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দিচ্ছেন এ জন্য তাদের অহংকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- ‘আমি যে কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দিয়েছি এটা আমার পক্ষ হতে তাদের জন্য মঙ্গলের নিদর্শন এই কি তারা ধারণা করেছে? না, বরং তারা নির্বোধ ও অবুঝ। অন্য জায়গায় রয়েছে-‘আমাকে ও এ কথার অবিশ্বাসীদেরকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে এমন আস্তে আস্তে ধরবো যে, তারা জানতেই পারবে না। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মাল ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, আমি ওরই কারণে তাদরেকে দুনিয়াতেও শান্তি দিতে চাই এবং তাদের মৃত্যু কুফরীর উপরেই হবে'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা মীমাংসিত ব্যাপার যে, কতগুলো পরীক্ষা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুকে যাচাই, বাছাই ও প্রকাশ করে দিতে চান। ধৈর্যশীল মুমিন ও পাপী মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। এর দ্বারা উহুদের যুদ্ধকেই বুঝানো হয়েছে। ঐদিন একদিকে মুমিনদের ধৈর্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা, নির্ভরশীলতা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এবং অপরদিকে মুনাফিকদের অসহিষ্ণুতা, বিরুদ্ধাচরণ, অবিশ্বাস করণ এবং আত্মসাৎকরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা জিহাদের হুকুম, হিজরতের হুকুম প্রকৃতি যেন এক একটা পরীক্ষা ছিল যা ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করেছে। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জনগণ বলেছিল, 'যদি মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে, আমাদের মধ্যে কে সত্য মুমিন এবং কে মুমিন নয় তা বলে দিন তো? তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘তোমরা আল্লাহর অদৃশ্যকে জানতে পার না। তবে, তিনি এমন কারণ সৃষ্টি করে থাকেন যার ফলে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মধ্যে যাকে চান এ জন্যে মনোনীত করে থাকেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে-“আল্লাহ অদৃশ্য জানেন, অতঃপর তিনি কাউকেও সে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন না, কিন্তু রাসূলগণের মধ্যে যাকে পছন্দ করেন (জ্ঞান দান করে থাকেন) তার সম্মুখে ও পিছনে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা চালিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, অর্থাৎ তাদের আনুগত্য স্বীকার কর, শরীয়তের অনুসারী হও এবং জেনে রেখো যে, ঈমান ও খোদাভীরুতার ব্যাপারে তোমাদের জন্যে বড় প্রতিদান রয়েছে। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- 'কৃপণ ব্যক্তি যেন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে মঙ্গল মনে না করে, বরং ওটা তার জন্য চরম ক্ষতিকর। ধর্মের ব্যাপারে তো ক্ষতিকর বটেই, এমন কি কোন কোন সময় দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এর পরিণাম এই হয় যে, ঐ কৃপণের মাল কিয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।' সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেন এবং সে ঐ মালের যাকাত আদায় করে না, তার মাল কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট এবং চোখের উপর দুটি চিহ্ন যুক্ত সর্প হয়ে গলাবন্ধের ন্যায় তার গলায় জড়িয়ে যাবে। অতঃপর তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার মাল, আমি তোমার ধন ভাণ্ডার। এরপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে এও রয়েছে যে, লোকটি পালাতে থাকবে এবং সর্পটি তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকবে। অতঃপর তাকে ধরে নিয়ে গলাবন্ধের মত তার গলায় জড়িয়ে যাবে এবং তাকে দংশন করবে। মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার পিছনে ধন ভাণ্ডার ছেড়ে মারা যাবে, সেই ধন ভাণ্ডার একটি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত সর্পের আকারে- যার চক্ষু দ্বয়ের উপর দু’টি চিহ্ন থাকবে, তার পিছনে দৌড়াতে থাকবে। লোকটি পালাতে থাকবে এবং বলবে, ‘তুমি কে?’ সর্পটি বলবে, আমি তোমার সেই ধন ভাণ্ডার যা পিছনে ছেড়ে তুমি মারা গিয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে নেবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, অতঃপর অবশিষ্ট শরীরও চিবাতে থাকবে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মনিবের নিকট নিজের অভাবের কথা বলে এবং উদ্বৃত্ত মাল থাকা সত্ত্বেও মনিব তাকে কিছুই দেয় না, তার জন্যে কিয়ামতের দিন ক্রোধে ফেঁস ফোঁসকারী বিষাক্ত সাপকে ডেকে আনা হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যে অভাবী আত্মীয় তার ধনী আত্মীয়ের নিকট কিছু যাঙ্ক্ষা করে এবং সে কিছুই প্রদান করে না তারই এ শাস্তি হবে; ঐ সাপটি তার গলায় হার হয়ে যাবে'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ঐ আহলে কিতাবের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা তাদের গ্রন্থের কথা পৌছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্বধিকারী। তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা হতে তার নামে কিছু খরচ কর। সমস্ত কিছু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা দান করতে থাক, যেন কিয়ামতের দিন তা কাজে লাগে এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা এবং সমস্ত কাজের আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ খবর রাখেন।

আলে ইমরান 3:177

১৭৬-১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের উপর অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন বলে কাফিরদের পথভ্রষ্টতা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকছিল। যেমন তারা কুফরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তেমন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁকে এটা হতে বিরত রাখছেন এবং বলছেন-এরই মধ্যে আল্লাহ পাকের নিপুণতা রয়েছে। হে নবী (সঃ)! তাদের কুফরী তোমার বা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এসব লোক তাদের পরকালের অংশ ধ্বংস করতে রয়েছে এবং নিজেদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখবেন। সুতরাং তুমি তাদের জন্য দুঃখ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমার নিকট এও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে যে, যারা ঈমানকে কুফরীর দ্বারা পরিবর্তিত করে সেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারে না বরং তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যে কাফিরদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দিচ্ছেন এ জন্য তাদের অহংকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- ‘আমি যে কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দিয়েছি এটা আমার পক্ষ হতে তাদের জন্য মঙ্গলের নিদর্শন এই কি তারা ধারণা করেছে? না, বরং তারা নির্বোধ ও অবুঝ। অন্য জায়গায় রয়েছে-‘আমাকে ও এ কথার অবিশ্বাসীদেরকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে এমন আস্তে আস্তে ধরবো যে, তারা জানতেই পারবে না। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মাল ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, আমি ওরই কারণে তাদরেকে দুনিয়াতেও শান্তি দিতে চাই এবং তাদের মৃত্যু কুফরীর উপরেই হবে'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা মীমাংসিত ব্যাপার যে, কতগুলো পরীক্ষা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুকে যাচাই, বাছাই ও প্রকাশ করে দিতে চান। ধৈর্যশীল মুমিন ও পাপী মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। এর দ্বারা উহুদের যুদ্ধকেই বুঝানো হয়েছে। ঐদিন একদিকে মুমিনদের ধৈর্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা, নির্ভরশীলতা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এবং অপরদিকে মুনাফিকদের অসহিষ্ণুতা, বিরুদ্ধাচরণ, অবিশ্বাস করণ এবং আত্মসাৎকরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা জিহাদের হুকুম, হিজরতের হুকুম প্রকৃতি যেন এক একটা পরীক্ষা ছিল যা ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করেছে। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জনগণ বলেছিল, 'যদি মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে, আমাদের মধ্যে কে সত্য মুমিন এবং কে মুমিন নয় তা বলে দিন তো? তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘তোমরা আল্লাহর অদৃশ্যকে জানতে পার না। তবে, তিনি এমন কারণ সৃষ্টি করে থাকেন যার ফলে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মধ্যে যাকে চান এ জন্যে মনোনীত করে থাকেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে-“আল্লাহ অদৃশ্য জানেন, অতঃপর তিনি কাউকেও সে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন না, কিন্তু রাসূলগণের মধ্যে যাকে পছন্দ করেন (জ্ঞান দান করে থাকেন) তার সম্মুখে ও পিছনে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা চালিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, অর্থাৎ তাদের আনুগত্য স্বীকার কর, শরীয়তের অনুসারী হও এবং জেনে রেখো যে, ঈমান ও খোদাভীরুতার ব্যাপারে তোমাদের জন্যে বড় প্রতিদান রয়েছে। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- 'কৃপণ ব্যক্তি যেন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে মঙ্গল মনে না করে, বরং ওটা তার জন্য চরম ক্ষতিকর। ধর্মের ব্যাপারে তো ক্ষতিকর বটেই, এমন কি কোন কোন সময় দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এর পরিণাম এই হয় যে, ঐ কৃপণের মাল কিয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।' সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেন এবং সে ঐ মালের যাকাত আদায় করে না, তার মাল কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট এবং চোখের উপর দুটি চিহ্ন যুক্ত সর্প হয়ে গলাবন্ধের ন্যায় তার গলায় জড়িয়ে যাবে। অতঃপর তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার মাল, আমি তোমার ধন ভাণ্ডার। এরপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে এও রয়েছে যে, লোকটি পালাতে থাকবে এবং সর্পটি তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকবে। অতঃপর তাকে ধরে নিয়ে গলাবন্ধের মত তার গলায় জড়িয়ে যাবে এবং তাকে দংশন করবে। মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার পিছনে ধন ভাণ্ডার ছেড়ে মারা যাবে, সেই ধন ভাণ্ডার একটি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত সর্পের আকারে- যার চক্ষু দ্বয়ের উপর দু’টি চিহ্ন থাকবে, তার পিছনে দৌড়াতে থাকবে। লোকটি পালাতে থাকবে এবং বলবে, ‘তুমি কে?’ সর্পটি বলবে, আমি তোমার সেই ধন ভাণ্ডার যা পিছনে ছেড়ে তুমি মারা গিয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে নেবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, অতঃপর অবশিষ্ট শরীরও চিবাতে থাকবে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মনিবের নিকট নিজের অভাবের কথা বলে এবং উদ্বৃত্ত মাল থাকা সত্ত্বেও মনিব তাকে কিছুই দেয় না, তার জন্যে কিয়ামতের দিন ক্রোধে ফেঁস ফোঁসকারী বিষাক্ত সাপকে ডেকে আনা হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যে অভাবী আত্মীয় তার ধনী আত্মীয়ের নিকট কিছু যাঙ্ক্ষা করে এবং সে কিছুই প্রদান করে না তারই এ শাস্তি হবে; ঐ সাপটি তার গলায় হার হয়ে যাবে'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ঐ আহলে কিতাবের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা তাদের গ্রন্থের কথা পৌছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্বধিকারী। তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা হতে তার নামে কিছু খরচ কর। সমস্ত কিছু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা দান করতে থাক, যেন কিয়ামতের দিন তা কাজে লাগে এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা এবং সমস্ত কাজের আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ খবর রাখেন।

আলে ইমরান 3:178

১৭৬-১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের উপর অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন বলে কাফিরদের পথভ্রষ্টতা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকছিল। যেমন তারা কুফরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তেমন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁকে এটা হতে বিরত রাখছেন এবং বলছেন-এরই মধ্যে আল্লাহ পাকের নিপুণতা রয়েছে। হে নবী (সঃ)! তাদের কুফরী তোমার বা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এসব লোক তাদের পরকালের অংশ ধ্বংস করতে রয়েছে এবং নিজেদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখবেন। সুতরাং তুমি তাদের জন্য দুঃখ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমার নিকট এও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে যে, যারা ঈমানকে কুফরীর দ্বারা পরিবর্তিত করে সেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারে না বরং তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যে কাফিরদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দিচ্ছেন এ জন্য তাদের অহংকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- ‘আমি যে কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দিয়েছি এটা আমার পক্ষ হতে তাদের জন্য মঙ্গলের নিদর্শন এই কি তারা ধারণা করেছে? না, বরং তারা নির্বোধ ও অবুঝ। অন্য জায়গায় রয়েছে-‘আমাকে ও এ কথার অবিশ্বাসীদেরকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে এমন আস্তে আস্তে ধরবো যে, তারা জানতেই পারবে না। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মাল ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, আমি ওরই কারণে তাদরেকে দুনিয়াতেও শান্তি দিতে চাই এবং তাদের মৃত্যু কুফরীর উপরেই হবে'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা মীমাংসিত ব্যাপার যে, কতগুলো পরীক্ষা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুকে যাচাই, বাছাই ও প্রকাশ করে দিতে চান। ধৈর্যশীল মুমিন ও পাপী মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। এর দ্বারা উহুদের যুদ্ধকেই বুঝানো হয়েছে। ঐদিন একদিকে মুমিনদের ধৈর্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা, নির্ভরশীলতা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এবং অপরদিকে মুনাফিকদের অসহিষ্ণুতা, বিরুদ্ধাচরণ, অবিশ্বাস করণ এবং আত্মসাৎকরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা জিহাদের হুকুম, হিজরতের হুকুম প্রকৃতি যেন এক একটা পরীক্ষা ছিল যা ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করেছে। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জনগণ বলেছিল, 'যদি মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে, আমাদের মধ্যে কে সত্য মুমিন এবং কে মুমিন নয় তা বলে দিন তো? তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘তোমরা আল্লাহর অদৃশ্যকে জানতে পার না। তবে, তিনি এমন কারণ সৃষ্টি করে থাকেন যার ফলে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মধ্যে যাকে চান এ জন্যে মনোনীত করে থাকেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে-“আল্লাহ অদৃশ্য জানেন, অতঃপর তিনি কাউকেও সে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন না, কিন্তু রাসূলগণের মধ্যে যাকে পছন্দ করেন (জ্ঞান দান করে থাকেন) তার সম্মুখে ও পিছনে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা চালিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, অর্থাৎ তাদের আনুগত্য স্বীকার কর, শরীয়তের অনুসারী হও এবং জেনে রেখো যে, ঈমান ও খোদাভীরুতার ব্যাপারে তোমাদের জন্যে বড় প্রতিদান রয়েছে। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- 'কৃপণ ব্যক্তি যেন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে মঙ্গল মনে না করে, বরং ওটা তার জন্য চরম ক্ষতিকর। ধর্মের ব্যাপারে তো ক্ষতিকর বটেই, এমন কি কোন কোন সময় দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এর পরিণাম এই হয় যে, ঐ কৃপণের মাল কিয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।' সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেন এবং সে ঐ মালের যাকাত আদায় করে না, তার মাল কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট এবং চোখের উপর দুটি চিহ্ন যুক্ত সর্প হয়ে গলাবন্ধের ন্যায় তার গলায় জড়িয়ে যাবে। অতঃপর তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার মাল, আমি তোমার ধন ভাণ্ডার। এরপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে এও রয়েছে যে, লোকটি পালাতে থাকবে এবং সর্পটি তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকবে। অতঃপর তাকে ধরে নিয়ে গলাবন্ধের মত তার গলায় জড়িয়ে যাবে এবং তাকে দংশন করবে। মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার পিছনে ধন ভাণ্ডার ছেড়ে মারা যাবে, সেই ধন ভাণ্ডার একটি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত সর্পের আকারে- যার চক্ষু দ্বয়ের উপর দু’টি চিহ্ন থাকবে, তার পিছনে দৌড়াতে থাকবে। লোকটি পালাতে থাকবে এবং বলবে, ‘তুমি কে?’ সর্পটি বলবে, আমি তোমার সেই ধন ভাণ্ডার যা পিছনে ছেড়ে তুমি মারা গিয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে নেবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, অতঃপর অবশিষ্ট শরীরও চিবাতে থাকবে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মনিবের নিকট নিজের অভাবের কথা বলে এবং উদ্বৃত্ত মাল থাকা সত্ত্বেও মনিব তাকে কিছুই দেয় না, তার জন্যে কিয়ামতের দিন ক্রোধে ফেঁস ফোঁসকারী বিষাক্ত সাপকে ডেকে আনা হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যে অভাবী আত্মীয় তার ধনী আত্মীয়ের নিকট কিছু যাঙ্ক্ষা করে এবং সে কিছুই প্রদান করে না তারই এ শাস্তি হবে; ঐ সাপটি তার গলায় হার হয়ে যাবে'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ঐ আহলে কিতাবের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা তাদের গ্রন্থের কথা পৌছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্বধিকারী। তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা হতে তার নামে কিছু খরচ কর। সমস্ত কিছু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা দান করতে থাক, যেন কিয়ামতের দিন তা কাজে লাগে এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা এবং সমস্ত কাজের আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ খবর রাখেন।

আলে ইমরান 3:179

১৭৬-১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের উপর অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন বলে কাফিরদের পথভ্রষ্টতা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকছিল। যেমন তারা কুফরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তেমন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁকে এটা হতে বিরত রাখছেন এবং বলছেন-এরই মধ্যে আল্লাহ পাকের নিপুণতা রয়েছে। হে নবী (সঃ)! তাদের কুফরী তোমার বা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এসব লোক তাদের পরকালের অংশ ধ্বংস করতে রয়েছে এবং নিজেদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখবেন। সুতরাং তুমি তাদের জন্য দুঃখ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমার নিকট এও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে যে, যারা ঈমানকে কুফরীর দ্বারা পরিবর্তিত করে সেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারে না বরং তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যে কাফিরদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দিচ্ছেন এ জন্য তাদের অহংকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- ‘আমি যে কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দিয়েছি এটা আমার পক্ষ হতে তাদের জন্য মঙ্গলের নিদর্শন এই কি তারা ধারণা করেছে? না, বরং তারা নির্বোধ ও অবুঝ। অন্য জায়গায় রয়েছে-‘আমাকে ও এ কথার অবিশ্বাসীদেরকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে এমন আস্তে আস্তে ধরবো যে, তারা জানতেই পারবে না। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মাল ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, আমি ওরই কারণে তাদরেকে দুনিয়াতেও শান্তি দিতে চাই এবং তাদের মৃত্যু কুফরীর উপরেই হবে'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা মীমাংসিত ব্যাপার যে, কতগুলো পরীক্ষা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুকে যাচাই, বাছাই ও প্রকাশ করে দিতে চান। ধৈর্যশীল মুমিন ও পাপী মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। এর দ্বারা উহুদের যুদ্ধকেই বুঝানো হয়েছে। ঐদিন একদিকে মুমিনদের ধৈর্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা, নির্ভরশীলতা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এবং অপরদিকে মুনাফিকদের অসহিষ্ণুতা, বিরুদ্ধাচরণ, অবিশ্বাস করণ এবং আত্মসাৎকরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা জিহাদের হুকুম, হিজরতের হুকুম প্রকৃতি যেন এক একটা পরীক্ষা ছিল যা ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করেছে। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জনগণ বলেছিল, 'যদি মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে, আমাদের মধ্যে কে সত্য মুমিন এবং কে মুমিন নয় তা বলে দিন তো? তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘তোমরা আল্লাহর অদৃশ্যকে জানতে পার না। তবে, তিনি এমন কারণ সৃষ্টি করে থাকেন যার ফলে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মধ্যে যাকে চান এ জন্যে মনোনীত করে থাকেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে-“আল্লাহ অদৃশ্য জানেন, অতঃপর তিনি কাউকেও সে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন না, কিন্তু রাসূলগণের মধ্যে যাকে পছন্দ করেন (জ্ঞান দান করে থাকেন) তার সম্মুখে ও পিছনে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা চালিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, অর্থাৎ তাদের আনুগত্য স্বীকার কর, শরীয়তের অনুসারী হও এবং জেনে রেখো যে, ঈমান ও খোদাভীরুতার ব্যাপারে তোমাদের জন্যে বড় প্রতিদান রয়েছে। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- 'কৃপণ ব্যক্তি যেন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে মঙ্গল মনে না করে, বরং ওটা তার জন্য চরম ক্ষতিকর। ধর্মের ব্যাপারে তো ক্ষতিকর বটেই, এমন কি কোন কোন সময় দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এর পরিণাম এই হয় যে, ঐ কৃপণের মাল কিয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।' সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেন এবং সে ঐ মালের যাকাত আদায় করে না, তার মাল কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট এবং চোখের উপর দুটি চিহ্ন যুক্ত সর্প হয়ে গলাবন্ধের ন্যায় তার গলায় জড়িয়ে যাবে। অতঃপর তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার মাল, আমি তোমার ধন ভাণ্ডার। এরপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে এও রয়েছে যে, লোকটি পালাতে থাকবে এবং সর্পটি তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকবে। অতঃপর তাকে ধরে নিয়ে গলাবন্ধের মত তার গলায় জড়িয়ে যাবে এবং তাকে দংশন করবে। মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার পিছনে ধন ভাণ্ডার ছেড়ে মারা যাবে, সেই ধন ভাণ্ডার একটি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত সর্পের আকারে- যার চক্ষু দ্বয়ের উপর দু’টি চিহ্ন থাকবে, তার পিছনে দৌড়াতে থাকবে। লোকটি পালাতে থাকবে এবং বলবে, ‘তুমি কে?’ সর্পটি বলবে, আমি তোমার সেই ধন ভাণ্ডার যা পিছনে ছেড়ে তুমি মারা গিয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে নেবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, অতঃপর অবশিষ্ট শরীরও চিবাতে থাকবে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মনিবের নিকট নিজের অভাবের কথা বলে এবং উদ্বৃত্ত মাল থাকা সত্ত্বেও মনিব তাকে কিছুই দেয় না, তার জন্যে কিয়ামতের দিন ক্রোধে ফেঁস ফোঁসকারী বিষাক্ত সাপকে ডেকে আনা হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যে অভাবী আত্মীয় তার ধনী আত্মীয়ের নিকট কিছু যাঙ্ক্ষা করে এবং সে কিছুই প্রদান করে না তারই এ শাস্তি হবে; ঐ সাপটি তার গলায় হার হয়ে যাবে'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ঐ আহলে কিতাবের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা তাদের গ্রন্থের কথা পৌছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্বধিকারী। তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা হতে তার নামে কিছু খরচ কর। সমস্ত কিছু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা দান করতে থাক, যেন কিয়ামতের দিন তা কাজে লাগে এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা এবং সমস্ত কাজের আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ খবর রাখেন।

আলে ইমরান 3:180

১৭৬-১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের উপর অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন বলে কাফিরদের পথভ্রষ্টতা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকছিল। যেমন তারা কুফরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তেমন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁকে এটা হতে বিরত রাখছেন এবং বলছেন-এরই মধ্যে আল্লাহ পাকের নিপুণতা রয়েছে। হে নবী (সঃ)! তাদের কুফরী তোমার বা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এসব লোক তাদের পরকালের অংশ ধ্বংস করতে রয়েছে এবং নিজেদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখবেন। সুতরাং তুমি তাদের জন্য দুঃখ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমার নিকট এও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে যে, যারা ঈমানকে কুফরীর দ্বারা পরিবর্তিত করে সেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারে না বরং তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যে কাফিরদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দিচ্ছেন এ জন্য তাদের অহংকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- ‘আমি যে কাফিরদের মাল-ধন ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দিয়েছি এটা আমার পক্ষ হতে তাদের জন্য মঙ্গলের নিদর্শন এই কি তারা ধারণা করেছে? না, বরং তারা নির্বোধ ও অবুঝ। অন্য জায়গায় রয়েছে-‘আমাকে ও এ কথার অবিশ্বাসীদেরকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে এমন আস্তে আস্তে ধরবো যে, তারা জানতেই পারবে না। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মাল ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, আমি ওরই কারণে তাদরেকে দুনিয়াতেও শান্তি দিতে চাই এবং তাদের মৃত্যু কুফরীর উপরেই হবে'। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা মীমাংসিত ব্যাপার যে, কতগুলো পরীক্ষা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুকে যাচাই, বাছাই ও প্রকাশ করে দিতে চান। ধৈর্যশীল মুমিন ও পাপী মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। এর দ্বারা উহুদের যুদ্ধকেই বুঝানো হয়েছে। ঐদিন একদিকে মুমিনদের ধৈর্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা, নির্ভরশীলতা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এবং অপরদিকে মুনাফিকদের অসহিষ্ণুতা, বিরুদ্ধাচরণ, অবিশ্বাস করণ এবং আত্মসাৎকরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা জিহাদের হুকুম, হিজরতের হুকুম প্রকৃতি যেন এক একটা পরীক্ষা ছিল যা ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করেছে। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জনগণ বলেছিল, 'যদি মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে, আমাদের মধ্যে কে সত্য মুমিন এবং কে মুমিন নয় তা বলে দিন তো? তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘তোমরা আল্লাহর অদৃশ্যকে জানতে পার না। তবে, তিনি এমন কারণ সৃষ্টি করে থাকেন যার ফলে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রভেদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মধ্যে যাকে চান এ জন্যে মনোনীত করে থাকেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে-“আল্লাহ অদৃশ্য জানেন, অতঃপর তিনি কাউকেও সে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন না, কিন্তু রাসূলগণের মধ্যে যাকে পছন্দ করেন (জ্ঞান দান করে থাকেন) তার সম্মুখে ও পিছনে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা চালিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, অর্থাৎ তাদের আনুগত্য স্বীকার কর, শরীয়তের অনুসারী হও এবং জেনে রেখো যে, ঈমান ও খোদাভীরুতার ব্যাপারে তোমাদের জন্যে বড় প্রতিদান রয়েছে। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে- 'কৃপণ ব্যক্তি যেন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে মঙ্গল মনে না করে, বরং ওটা তার জন্য চরম ক্ষতিকর। ধর্মের ব্যাপারে তো ক্ষতিকর বটেই, এমন কি কোন কোন সময় দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এর পরিণাম এই হয় যে, ঐ কৃপণের মাল কিয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।' সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেন এবং সে ঐ মালের যাকাত আদায় করে না, তার মাল কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট এবং চোখের উপর দুটি চিহ্ন যুক্ত সর্প হয়ে গলাবন্ধের ন্যায় তার গলায় জড়িয়ে যাবে। অতঃপর তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার মাল, আমি তোমার ধন ভাণ্ডার। এরপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে এও রয়েছে যে, লোকটি পালাতে থাকবে এবং সর্পটি তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকবে। অতঃপর তাকে ধরে নিয়ে গলাবন্ধের মত তার গলায় জড়িয়ে যাবে এবং তাকে দংশন করবে। মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালার মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার পিছনে ধন ভাণ্ডার ছেড়ে মারা যাবে, সেই ধন ভাণ্ডার একটি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত সর্পের আকারে- যার চক্ষু দ্বয়ের উপর দু’টি চিহ্ন থাকবে, তার পিছনে দৌড়াতে থাকবে। লোকটি পালাতে থাকবে এবং বলবে, ‘তুমি কে?’ সর্পটি বলবে, আমি তোমার সেই ধন ভাণ্ডার যা পিছনে ছেড়ে তুমি মারা গিয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে নেবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, অতঃপর অবশিষ্ট শরীরও চিবাতে থাকবে। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মনিবের নিকট নিজের অভাবের কথা বলে এবং উদ্বৃত্ত মাল থাকা সত্ত্বেও মনিব তাকে কিছুই দেয় না, তার জন্যে কিয়ামতের দিন ক্রোধে ফেঁস ফোঁসকারী বিষাক্ত সাপকে ডেকে আনা হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যে অভাবী আত্মীয় তার ধনী আত্মীয়ের নিকট কিছু যাঙ্ক্ষা করে এবং সে কিছুই প্রদান করে না তারই এ শাস্তি হবে; ঐ সাপটি তার গলায় হার হয়ে যাবে'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ঐ আহলে কিতাবের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা তাদের গ্রন্থের কথা পৌছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘আল্লাহই হচ্ছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্বধিকারী। তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা হতে তার নামে কিছু খরচ কর। সমস্ত কিছু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা দান করতে থাক, যেন কিয়ামতের দিন তা কাজে লাগে এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের কথা এবং সমস্ত কাজের আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ খবর রাখেন।

আলে ইমরান 3:181

১৮১-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন- ‘আল্লাহকে উত্তম কর্জ দিতে পারে এমন কে আছে? এবং তিনি তাকে দ্বিগুণ-চতুগুণ করে প্রদান করবেন। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন ইয়াহূদীরা বলতে আরম্ভ করে, “হে নবী (সঃ)! আপনার প্রভু দরিদ্র হয়ে পড়েছেন এবং এ জন্যেই তিনি স্বীয় বান্দাদের নিকট কর্জ যা করছেন। তখন উপরের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা ইয়াহুদীদের বিদ্যালয়ে গমন করেন। ফানহাস নামক এখানকার একজন বড় শিক্ষক ছিল এবং তার অধীনে আশী’ নামক একজন বড় আলেম ছিল। তথায় জন-সমাবেশ ছিল। তিনি তাদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিলেন। তিনি ফানহাসকে সম্বোধন করে বলেন, “হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় করতঃ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমার খুব ভাল করেই জানা আছে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর সত্য রাসূল। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট হতে সত্য আনয়ন করেছেন। তাঁর গুণাবলী তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে বর্ণিত আছে যা "তোমাদের হাতেই বিদ্যমান। রয়েছে। ফানহাস তখন উত্তরে বলে, “হে আবু বকর (রাঃ) শুনুন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাদের মুখাপেক্ষী, আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই। আমরা তাঁর নিকট ঐরূপ কাকুতি মিনতি করি না যেমন তিনি আমাদের নিকট কাকুতি মিনতি করে থাকেন। বরং আমরা তো তাঁর নিকট মোটেই মুখাপেক্ষী নই। কারণ, আমরা ধনবান। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদের নিকট ঋণ চাইতেন না। যেমন আপনাদের নবী বলছেন। আল্লাহ তো আমাদেরকে সুদ হতে বিরত রাখতে চাচ্ছেন, অথচ নিজেই সুদ দিতে চাচ্ছেন। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদেরকে সুদ দিতে চাইবেন কেন?' এ কথা শুনে হযরত আবু। বকর (রাঃ) ক্রেধিান্বিত হয়ে ফানহাসের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেন এবং বলেন, “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমাদের ইয়াহূদীদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকতো তবে আমি অবশ্যই তোমার মত আল্লাহদ্রোহীর মস্তক কেটে নিতাম।' ফানহাস সরাসরি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ তাকে মেরেছে কেন?' হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ফাহাস চালাকি করে বলে, 'আমি তো এরূপ কথা মোটেই বলিনি। সে সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন, তাদের এরূপ উক্তি এবং সাথে সাথে তাদের ঐরূপই বড় পাপ অর্থাৎ নবীদেরকে হত্যাকরণ আমি তাদের আমলনামায় লিখে নিয়েছি। এক দিকে তাদের মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর শানে বেয়াদবী এবং অপর দিকে নবীগণকে হত্যা করার কারণে তাদেরকে ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আমি তাদেরকে বলবো‘এটা তোমাদের পূর্বের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।' এ কথা বলে তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি প্রদান করা হবে। এটা সরাসরি সুবিচারই বটে এবং এটাও স্পষ্ট কথা যে, মনিব কখনও স্বীয় দাসের উপর অত্যাচার করেন না। এরপর আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের ঐ ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করছেন যে, তারা বলতো, যেসব আসমানী কিতাব আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোতে তিনি আমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন,-আমরা যেন কোন রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করি যে পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে এ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন না করবেন যে, তিনি তার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন কিছু কুরবানী করবে, তার সেই কুরবানী খেয়ে নেয়ার জন্যে আকাশ হতে আল্লাহ-প্রেরিত আগুন এসে তা খেয়ে নেবে। তাদের এই কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের চাহিদা মত অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনকারী নবীগণ নিদর্শন ও প্রমাণাদি নিয়ে তো তোমাদের নিকট আগমন করেছিলেন, তথাপি তোমরা তাদেরকে হত্যা করেছিলে কেন? তাদেরকে তো আল্লাহ পাক ঐ মুজিযাও দিয়ে রেখেছিলেন যে, প্রত্যেক গৃহীত কুরবানীকে আসমানী আগুন এসে খেয়ে নিত। কিন্তু তোমরা তাদেরকেও তো সত্যবাদী বলে স্বীকার করে নাওনি। তোমরা তাদেরও বিরুদ্ধাচরণ ও শক্রতা করেছিলে, এমনকি তাদেরকে হত্যা করেও ফেলেছিলে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের কথারও কোন মর্যাদা দাও না। তোমরা সত্যের সাথীও নও এবং নবীকে সত্য বলে স্বীকার করতেও সম্মত নও। নিশ্চয়ই তোমরা চরম মিথ্যাবাদী'।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে বলে তোমার মন ছোট করার ও দুঃখিত হওয়ার কোনই প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী দৃঢ়চিত্ত নবীদের ঘটনাবলীকে সান্ত্বনাদায়ক হিসেবে গ্রহণ কর। তারাও স্পষ্ট দলীলসমূহ এনেছিল এবং ভালভাবে নিজেদের সত্যতা প্রকাশ করেছিল। তথাপি জনগণ তাদেরকে অবিশ্বাস করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করেনি'। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব আসমানী গ্রন্থ যেগুলো ক্ষুদ্র পুস্তিকারূপে নবীদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকাশ্য, স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান।

আলে ইমরান 3:182

১৮১-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন- ‘আল্লাহকে উত্তম কর্জ দিতে পারে এমন কে আছে? এবং তিনি তাকে দ্বিগুণ-চতুগুণ করে প্রদান করবেন। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন ইয়াহূদীরা বলতে আরম্ভ করে, “হে নবী (সঃ)! আপনার প্রভু দরিদ্র হয়ে পড়েছেন এবং এ জন্যেই তিনি স্বীয় বান্দাদের নিকট কর্জ যা করছেন। তখন উপরের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা ইয়াহুদীদের বিদ্যালয়ে গমন করেন। ফানহাস নামক এখানকার একজন বড় শিক্ষক ছিল এবং তার অধীনে আশী’ নামক একজন বড় আলেম ছিল। তথায় জন-সমাবেশ ছিল। তিনি তাদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিলেন। তিনি ফানহাসকে সম্বোধন করে বলেন, “হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় করতঃ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমার খুব ভাল করেই জানা আছে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর সত্য রাসূল। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট হতে সত্য আনয়ন করেছেন। তাঁর গুণাবলী তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে বর্ণিত আছে যা "তোমাদের হাতেই বিদ্যমান। রয়েছে। ফানহাস তখন উত্তরে বলে, “হে আবু বকর (রাঃ) শুনুন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাদের মুখাপেক্ষী, আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই। আমরা তাঁর নিকট ঐরূপ কাকুতি মিনতি করি না যেমন তিনি আমাদের নিকট কাকুতি মিনতি করে থাকেন। বরং আমরা তো তাঁর নিকট মোটেই মুখাপেক্ষী নই। কারণ, আমরা ধনবান। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদের নিকট ঋণ চাইতেন না। যেমন আপনাদের নবী বলছেন। আল্লাহ তো আমাদেরকে সুদ হতে বিরত রাখতে চাচ্ছেন, অথচ নিজেই সুদ দিতে চাচ্ছেন। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদেরকে সুদ দিতে চাইবেন কেন?' এ কথা শুনে হযরত আবু। বকর (রাঃ) ক্রেধিান্বিত হয়ে ফানহাসের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেন এবং বলেন, “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমাদের ইয়াহূদীদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকতো তবে আমি অবশ্যই তোমার মত আল্লাহদ্রোহীর মস্তক কেটে নিতাম।' ফানহাস সরাসরি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ তাকে মেরেছে কেন?' হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ফাহাস চালাকি করে বলে, 'আমি তো এরূপ কথা মোটেই বলিনি। সে সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন, তাদের এরূপ উক্তি এবং সাথে সাথে তাদের ঐরূপই বড় পাপ অর্থাৎ নবীদেরকে হত্যাকরণ আমি তাদের আমলনামায় লিখে নিয়েছি। এক দিকে তাদের মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর শানে বেয়াদবী এবং অপর দিকে নবীগণকে হত্যা করার কারণে তাদেরকে ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আমি তাদেরকে বলবো‘এটা তোমাদের পূর্বের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।' এ কথা বলে তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি প্রদান করা হবে। এটা সরাসরি সুবিচারই বটে এবং এটাও স্পষ্ট কথা যে, মনিব কখনও স্বীয় দাসের উপর অত্যাচার করেন না। এরপর আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের ঐ ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করছেন যে, তারা বলতো, যেসব আসমানী কিতাব আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোতে তিনি আমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন,-আমরা যেন কোন রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করি যে পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে এ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন না করবেন যে, তিনি তার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন কিছু কুরবানী করবে, তার সেই কুরবানী খেয়ে নেয়ার জন্যে আকাশ হতে আল্লাহ-প্রেরিত আগুন এসে তা খেয়ে নেবে। তাদের এই কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের চাহিদা মত অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনকারী নবীগণ নিদর্শন ও প্রমাণাদি নিয়ে তো তোমাদের নিকট আগমন করেছিলেন, তথাপি তোমরা তাদেরকে হত্যা করেছিলে কেন? তাদেরকে তো আল্লাহ পাক ঐ মুজিযাও দিয়ে রেখেছিলেন যে, প্রত্যেক গৃহীত কুরবানীকে আসমানী আগুন এসে খেয়ে নিত। কিন্তু তোমরা তাদেরকেও তো সত্যবাদী বলে স্বীকার করে নাওনি। তোমরা তাদেরও বিরুদ্ধাচরণ ও শক্রতা করেছিলে, এমনকি তাদেরকে হত্যা করেও ফেলেছিলে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের কথারও কোন মর্যাদা দাও না। তোমরা সত্যের সাথীও নও এবং নবীকে সত্য বলে স্বীকার করতেও সম্মত নও। নিশ্চয়ই তোমরা চরম মিথ্যাবাদী'।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে বলে তোমার মন ছোট করার ও দুঃখিত হওয়ার কোনই প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী দৃঢ়চিত্ত নবীদের ঘটনাবলীকে সান্ত্বনাদায়ক হিসেবে গ্রহণ কর। তারাও স্পষ্ট দলীলসমূহ এনেছিল এবং ভালভাবে নিজেদের সত্যতা প্রকাশ করেছিল। তথাপি জনগণ তাদেরকে অবিশ্বাস করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করেনি'। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব আসমানী গ্রন্থ যেগুলো ক্ষুদ্র পুস্তিকারূপে নবীদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকাশ্য, স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান।

আলে ইমরান 3:183

১৮১-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন- ‘আল্লাহকে উত্তম কর্জ দিতে পারে এমন কে আছে? এবং তিনি তাকে দ্বিগুণ-চতুগুণ করে প্রদান করবেন। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন ইয়াহূদীরা বলতে আরম্ভ করে, “হে নবী (সঃ)! আপনার প্রভু দরিদ্র হয়ে পড়েছেন এবং এ জন্যেই তিনি স্বীয় বান্দাদের নিকট কর্জ যা করছেন। তখন উপরের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা ইয়াহুদীদের বিদ্যালয়ে গমন করেন। ফানহাস নামক এখানকার একজন বড় শিক্ষক ছিল এবং তার অধীনে আশী’ নামক একজন বড় আলেম ছিল। তথায় জন-সমাবেশ ছিল। তিনি তাদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিলেন। তিনি ফানহাসকে সম্বোধন করে বলেন, “হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় করতঃ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমার খুব ভাল করেই জানা আছে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর সত্য রাসূল। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট হতে সত্য আনয়ন করেছেন। তাঁর গুণাবলী তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে বর্ণিত আছে যা "তোমাদের হাতেই বিদ্যমান। রয়েছে। ফানহাস তখন উত্তরে বলে, “হে আবু বকর (রাঃ) শুনুন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাদের মুখাপেক্ষী, আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই। আমরা তাঁর নিকট ঐরূপ কাকুতি মিনতি করি না যেমন তিনি আমাদের নিকট কাকুতি মিনতি করে থাকেন। বরং আমরা তো তাঁর নিকট মোটেই মুখাপেক্ষী নই। কারণ, আমরা ধনবান। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদের নিকট ঋণ চাইতেন না। যেমন আপনাদের নবী বলছেন। আল্লাহ তো আমাদেরকে সুদ হতে বিরত রাখতে চাচ্ছেন, অথচ নিজেই সুদ দিতে চাচ্ছেন। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদেরকে সুদ দিতে চাইবেন কেন?' এ কথা শুনে হযরত আবু। বকর (রাঃ) ক্রেধিান্বিত হয়ে ফানহাসের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেন এবং বলেন, “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমাদের ইয়াহূদীদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকতো তবে আমি অবশ্যই তোমার মত আল্লাহদ্রোহীর মস্তক কেটে নিতাম।' ফানহাস সরাসরি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ তাকে মেরেছে কেন?' হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ফাহাস চালাকি করে বলে, 'আমি তো এরূপ কথা মোটেই বলিনি। সে সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন, তাদের এরূপ উক্তি এবং সাথে সাথে তাদের ঐরূপই বড় পাপ অর্থাৎ নবীদেরকে হত্যাকরণ আমি তাদের আমলনামায় লিখে নিয়েছি। এক দিকে তাদের মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর শানে বেয়াদবী এবং অপর দিকে নবীগণকে হত্যা করার কারণে তাদেরকে ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আমি তাদেরকে বলবো‘এটা তোমাদের পূর্বের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।' এ কথা বলে তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি প্রদান করা হবে। এটা সরাসরি সুবিচারই বটে এবং এটাও স্পষ্ট কথা যে, মনিব কখনও স্বীয় দাসের উপর অত্যাচার করেন না। এরপর আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের ঐ ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করছেন যে, তারা বলতো, যেসব আসমানী কিতাব আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোতে তিনি আমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন,-আমরা যেন কোন রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করি যে পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে এ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন না করবেন যে, তিনি তার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন কিছু কুরবানী করবে, তার সেই কুরবানী খেয়ে নেয়ার জন্যে আকাশ হতে আল্লাহ-প্রেরিত আগুন এসে তা খেয়ে নেবে। তাদের এই কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের চাহিদা মত অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনকারী নবীগণ নিদর্শন ও প্রমাণাদি নিয়ে তো তোমাদের নিকট আগমন করেছিলেন, তথাপি তোমরা তাদেরকে হত্যা করেছিলে কেন? তাদেরকে তো আল্লাহ পাক ঐ মুজিযাও দিয়ে রেখেছিলেন যে, প্রত্যেক গৃহীত কুরবানীকে আসমানী আগুন এসে খেয়ে নিত। কিন্তু তোমরা তাদেরকেও তো সত্যবাদী বলে স্বীকার করে নাওনি। তোমরা তাদেরও বিরুদ্ধাচরণ ও শক্রতা করেছিলে, এমনকি তাদেরকে হত্যা করেও ফেলেছিলে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের কথারও কোন মর্যাদা দাও না। তোমরা সত্যের সাথীও নও এবং নবীকে সত্য বলে স্বীকার করতেও সম্মত নও। নিশ্চয়ই তোমরা চরম মিথ্যাবাদী'।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে বলে তোমার মন ছোট করার ও দুঃখিত হওয়ার কোনই প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী দৃঢ়চিত্ত নবীদের ঘটনাবলীকে সান্ত্বনাদায়ক হিসেবে গ্রহণ কর। তারাও স্পষ্ট দলীলসমূহ এনেছিল এবং ভালভাবে নিজেদের সত্যতা প্রকাশ করেছিল। তথাপি জনগণ তাদেরকে অবিশ্বাস করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করেনি'। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব আসমানী গ্রন্থ যেগুলো ক্ষুদ্র পুস্তিকারূপে নবীদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকাশ্য, স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান।

আলে ইমরান 3:184

১৮১-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন- ‘আল্লাহকে উত্তম কর্জ দিতে পারে এমন কে আছে? এবং তিনি তাকে দ্বিগুণ-চতুগুণ করে প্রদান করবেন। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন ইয়াহূদীরা বলতে আরম্ভ করে, “হে নবী (সঃ)! আপনার প্রভু দরিদ্র হয়ে পড়েছেন এবং এ জন্যেই তিনি স্বীয় বান্দাদের নিকট কর্জ যা করছেন। তখন উপরের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা ইয়াহুদীদের বিদ্যালয়ে গমন করেন। ফানহাস নামক এখানকার একজন বড় শিক্ষক ছিল এবং তার অধীনে আশী’ নামক একজন বড় আলেম ছিল। তথায় জন-সমাবেশ ছিল। তিনি তাদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিলেন। তিনি ফানহাসকে সম্বোধন করে বলেন, “হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় করতঃ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমার খুব ভাল করেই জানা আছে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর সত্য রাসূল। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট হতে সত্য আনয়ন করেছেন। তাঁর গুণাবলী তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে বর্ণিত আছে যা "তোমাদের হাতেই বিদ্যমান। রয়েছে। ফানহাস তখন উত্তরে বলে, “হে আবু বকর (রাঃ) শুনুন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাদের মুখাপেক্ষী, আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই। আমরা তাঁর নিকট ঐরূপ কাকুতি মিনতি করি না যেমন তিনি আমাদের নিকট কাকুতি মিনতি করে থাকেন। বরং আমরা তো তাঁর নিকট মোটেই মুখাপেক্ষী নই। কারণ, আমরা ধনবান। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদের নিকট ঋণ চাইতেন না। যেমন আপনাদের নবী বলছেন। আল্লাহ তো আমাদেরকে সুদ হতে বিরত রাখতে চাচ্ছেন, অথচ নিজেই সুদ দিতে চাচ্ছেন। তিনি যদি ধনী হতেন তবে আমাদেরকে সুদ দিতে চাইবেন কেন?' এ কথা শুনে হযরত আবু। বকর (রাঃ) ক্রেধিান্বিত হয়ে ফানহাসের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেন এবং বলেন, “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমাদের ইয়াহূদীদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকতো তবে আমি অবশ্যই তোমার মত আল্লাহদ্রোহীর মস্তক কেটে নিতাম।' ফানহাস সরাসরি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ তাকে মেরেছে কেন?' হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ফাহাস চালাকি করে বলে, 'আমি তো এরূপ কথা মোটেই বলিনি। সে সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন, তাদের এরূপ উক্তি এবং সাথে সাথে তাদের ঐরূপই বড় পাপ অর্থাৎ নবীদেরকে হত্যাকরণ আমি তাদের আমলনামায় লিখে নিয়েছি। এক দিকে তাদের মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর শানে বেয়াদবী এবং অপর দিকে নবীগণকে হত্যা করার কারণে তাদেরকে ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আমি তাদেরকে বলবো‘এটা তোমাদের পূর্বের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।' এ কথা বলে তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি প্রদান করা হবে। এটা সরাসরি সুবিচারই বটে এবং এটাও স্পষ্ট কথা যে, মনিব কখনও স্বীয় দাসের উপর অত্যাচার করেন না। এরপর আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের ঐ ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করছেন যে, তারা বলতো, যেসব আসমানী কিতাব আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোতে তিনি আমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন,-আমরা যেন কোন রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করি যে পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে এ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন না করবেন যে, তিনি তার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন কিছু কুরবানী করবে, তার সেই কুরবানী খেয়ে নেয়ার জন্যে আকাশ হতে আল্লাহ-প্রেরিত আগুন এসে তা খেয়ে নেবে। তাদের এই কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের চাহিদা মত অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনকারী নবীগণ নিদর্শন ও প্রমাণাদি নিয়ে তো তোমাদের নিকট আগমন করেছিলেন, তথাপি তোমরা তাদেরকে হত্যা করেছিলে কেন? তাদেরকে তো আল্লাহ পাক ঐ মুজিযাও দিয়ে রেখেছিলেন যে, প্রত্যেক গৃহীত কুরবানীকে আসমানী আগুন এসে খেয়ে নিত। কিন্তু তোমরা তাদেরকেও তো সত্যবাদী বলে স্বীকার করে নাওনি। তোমরা তাদেরও বিরুদ্ধাচরণ ও শক্রতা করেছিলে, এমনকি তাদেরকে হত্যা করেও ফেলেছিলে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের কথারও কোন মর্যাদা দাও না। তোমরা সত্যের সাথীও নও এবং নবীকে সত্য বলে স্বীকার করতেও সম্মত নও। নিশ্চয়ই তোমরা চরম মিথ্যাবাদী'।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে বলে তোমার মন ছোট করার ও দুঃখিত হওয়ার কোনই প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী দৃঢ়চিত্ত নবীদের ঘটনাবলীকে সান্ত্বনাদায়ক হিসেবে গ্রহণ কর। তারাও স্পষ্ট দলীলসমূহ এনেছিল এবং ভালভাবে নিজেদের সত্যতা প্রকাশ করেছিল। তথাপি জনগণ তাদেরকে অবিশ্বাস করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করেনি'। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব আসমানী গ্রন্থ যেগুলো ক্ষুদ্র পুস্তিকারূপে নবীদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকাশ্য, স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান।

আলে ইমরান 3:185

১৮৫-১৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: সাধারণভাবে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জানানো হচ্ছে যে, প্রত্যেক জীবই মরণশীল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এ পৃথিবীর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল। শুধু তোমার প্রভুর মুখমণ্ডলই চির বিদ্যমান থাকবে যিনি মহা সম্মানিত ও মহান দাতা। (৫৫:২৬-২৭) সুতরাং একমাত্র সেই এক আল্লাহই চিরস্থায়ী জীবনের অধিকারী। তিনি কখনও ধ্বংস হবেন না। দানব ও মানব প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ। গ্রহণকারী। অনুরূপভাবে ফেরেশতামণ্ডলী ও আরশ বহনকারীগণও মরণশীল। শুধুমাত্র এক অদ্বিতীয় আল্লাহই চিরকাল বাকী থাকবেন। তাঁর কোন লয় ও ক্ষয় নেই। প্রথমেও তিনিই এবং শেষেও তিনিই থাকবেন। যখন সবাই মরে যাবে, দীর্ঘ মেয়াদী সময় শেষ হয়ে যাবে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠ হতে যত সন্তান হবার ছিল হয়ে যাবে, অতঃপর সকলেই মৃত্যুর ঘাটে অবতরণ করবে এবং সমস্ত সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে, সে সময় আল্লাহ তা'আলার হুকুমে কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন তিনি সকলকেই তাদের ছোট বড় সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রদান করবেন। কারও উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করা হবে না। এ কথাই পরবর্তী বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইতেকালের পর আমাদের নিকট এরূপ অনুভূত হয় যে, যেন কেউ আসছেন। পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে, কিন্তু কোন লোককে দেখা যায় না। তিনি এসে বলেনঃ “হে নবী পরিবারের লোকগণ! আপনাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহর করুণা ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক! প্রত্যেক জীবই মৃত্যুর আশ্বাদ গ্রহণকারী। কিয়ামতের পর আপনাদের সকলকেই সমস্ত কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। বিপদে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে তাদের পুরস্কার মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করুন এবং তারই নিকট মঙ্গলের আশা রাখুন। জেনে রাখুন যে, প্রকৃতপক্ষে বিপদগ্রস্ত ঐ ব্যক্তি যে পুণ্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়ে যায়। আপনাদের উপর আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে শান্তি, করুণা ও বরকত নাযিল হোক।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত আলী (রাঃ)-এর ধারণা মতে তিনি ছিলেন হযরত খিযির (আঃ)। সারকথা এই যে, সফলকাম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ করতঃ জান্নাতে প্রবেশ লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘জান্নাতের মধ্যে একটি চাবুক বরাবর জায়গা পেয়ে যাওয়া দুনিয়া ও তন্মধ্যকার সমস্ত জিনিস হতে উত্তম। তোমাদের ইচ্ছে পাঠ কর- (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অগ্নি হতে বিমুক্ত হয়েছ ও জান্নাতে প্রবিষ্ট হয়েছে, ফলতঃ সেই সফলকাম হয়েছে। এ পরবর্তী বেশীটুকু ছাড়া এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। আর বেশীটুকু সহ মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তি পাওয়ার ও জান্নাতে প্রবেশ করার যার ইচ্ছে রয়েছে সে যেন মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস রাখে এবং জনগণের সাথে সেই ব্যবহার করে, যে ব্যবহার সে নিজের জন্যে পছন্দ করে। এ হাদীসটি। (আরবী) (৩:১০২) এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে এবং আকী ইবনে জাররাহের তাফসীরেও এই হাদীসটি রয়েছে। এরপর দুনিয়ার নিকৃষ্টতা ও তুচ্ছতার কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, দুনিয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট, ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী জিনিস। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তোমরা ইহলৌকিক জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছ অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও স্থায়ী।' (৭৮:১৬-১৭) অন্য জায়গায় রয়েছে-“তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো শুধুমাত্র ইহলৌকিক জীবনের উপকারের বস্তু ও সৌন্দর্য; উত্তম ও স্থায়ী তো ওটাই যা আল্লাহর নিকট রয়েছে। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক সমুদ্রে অঙ্গুলী ডুবালে তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগে যে পানি উঠে সেই পানির সঙ্গে সমুদ্রের পানির যে তুলনা পরকালের তুলনায় দুনিয়া ঠিক তদ্রুপ'। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, দুনিয়া প্রতারণার একটা বেড়া ছাড়া আর কি? যাকে ছেড়ে তোমাদেরকে বিদায় হতে হবে। যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এ তো অতিসত্বরই তোমাদের হতে পৃথক হয়ে যাবে ও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং এখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় প্রদান করতঃ আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লেগে পড় এবং সাধ্যনুসারে পুণ্য অর্জন কর। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়া কোন কাজ সাধিত হয় না। অতঃপর মানুষের পরীক্ষার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা করবো।' (২:১৫৫) ভাবার্থ এই যে, মুমিনের পরীক্ষা অবশ্যই হয়ে থাকে। কখনো জীবনের উপর, কখনো অর্থের উপর, কখনো পরিবারের উপর এবং কখনো অন্য কিছুর উপর, মুত্তাকীর তারতম্য অনুযায়ী পরীক্ষা হয়ে থাকে। যে খুব বেশী ধর্মভীরু তার পরীক্ষা বেশী কঠিন হয়। আর যার ঈমানে দুর্বলতা রয়েছে তার পরীক্ষা হালকা হয়। এরপর আল্লাহ তাআলা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন-বদরের যুদ্ধের পূর্বে গ্রন্থধারী ও অংশীবাদীদের নিকট হতে তোমাদেরকে বহু দুঃখজনক কথা শুনতে হবে। তারপর তাদেরকে সান্ত্বনা। দিয়ে বলেছেন- সে সময় তোমাদেরকে ধৈর্যধারণ করতে হবে ও সংযমী হতে হবে এবং মুত্তাকী হওয়ার উপর এটা খুব কঠিন কাজই বটে'। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীবর্গ মুশরিক ও আহলে কিতাবের অপরাধ প্রায়ই ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের কষ্টদায়ক কথার উপর ধৈর্যধারণ করতেন ও আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশের উপর আমল করতেন। অবশেষে জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারী শরীফে এ আয়াতের তাফসীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গাধার উপর আরোহণ করতঃ হযরত উসামা (রাঃ)-কে পিছনে বসিয়ে নিয়ে রোগাক্রান্ত হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-কে দেখবার জন্যে বানূ হারিস খাযরাজের গোত্রের মধ্যে গমন করেন। এটা বদর যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। পথে একটি জনসমাবেশ দেখা যায়, যেখানে মুসলমান, ইয়াহূদী ও মুশরিক সবাই উপস্থিত ছিল। ওর মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালও ছিল। তখন পর্যন্ত সে প্রকাশ্যভাবে কুফরীর রঙ্গেই রঞ্জিত ছিল। মুসলমানদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সোয়ারী হতে ধূলোবালি উড়তে থাকলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নাকে কাপড় দিয়ে বলেঃ ‘ধূলা উড়াবেন না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিকটে পৌঁছেই গিয়েছিলেন। সোয়ারী হতে নেমে তিনি সালাম করেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তাদেরকে তিনি কুরআন কারীমের কয়েকটি আয়াতও শুনিয়ে দেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলে, “শুনুন জনাব, আপনার এ পন্থা আমাদের নিকট মোটেই পছন্দনীয় নয়। আপনার কথা সত্যই বা হলো, কিন্তু তাই বলে এটা উচিত নয় যে, আপনি আপনার সমাবেশে এসে আমাদেরকে কষ্ট দেবেন। আপনার বাড়ীতে যে যাবে তাকেই আপনি শুনাবেন।' এ কথা শুনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অবশ্যই আপনি আমাদের সভায় আগমন করবেন। আপনার কথা শুনবার তো আমাদের চাহিদা আছেই। তাদের মধ্যে তখন হট্টগোলের সৃষ্টি হয়ে যায়। একে অপরকে ভাল-মন্দ বলতে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবার উপক্রম হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বুঝানোর ফলে অবশেষে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং সবাই নীরব হয়ে যায়। তিনি স্বীয় সোয়ারীর উপর আরোহণ করে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তথায় গিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু হাব্বার! আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তো আজকে এরূপ এরূপ করেছে।' হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, এরূপ হতে দিন! ক্ষমা করুন! যে আল্লাহ আপনার প্রতি পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তার শপথ! আপনার সঙ্গে তো তার চরম শত্রুতা রয়েছে এবং এটা হওয়া স্বাভাবিক। কেননা, এখানকার মানুষ তাকে তাদের নেতা নির্বাচন করতে চেয়েছিল এবং তার জন্যে নেতৃত্বের পাগড়ী তৈরীরও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় নবী করে পাঠিয়ে দেন। জনগণ আপনাকে নবী বলে স্বীকার করে নেয়। সুতরাং তার নেতৃত্ব চলে যায়। ফলে সে চরম দুঃখিত হয়। এ জন্যেই সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। যা সে বলেছে বলেছেই। আপনি তার কথার উপর গুরুত্ব দেবেন না।' অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ক্ষমা করে দেন এবং এটা তার অভ্যাসই ছিল। তার সাহাবীগণও ইয়াহূদী ও মুশরিকদের অপরাধ ক্ষমা করে দিতেন এবং উপরোক্ত আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশের উপর আমল করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিহাদের অনুমতি দেয়া হয় এবং প্রথম। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যে যুদ্ধে কাফিরদের নেতৃবৃন্দ নিহত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইসলামের এই অগ্রগতি দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও তার সঙ্গীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ ও নিজেদেরকে বাহ্যতঃ মুসলমানরূপে পরিচিত করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। সুতরাং এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, প্রত্যেক পন্থী যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকে তাদের উপর অবশ্যই বিপদ-আপদ এসে থাকে। কাজেই আল্লাহর পথে এসব বিপদ-আপদ সহ্য করা, তার উপর পূর্ণ ভরসা রাখা, তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা মুমিনদের একান্ত কর্তব্য।

আলে ইমরান 3:186

১৮৫-১৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: সাধারণভাবে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জানানো হচ্ছে যে, প্রত্যেক জীবই মরণশীল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এ পৃথিবীর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল। শুধু তোমার প্রভুর মুখমণ্ডলই চির বিদ্যমান থাকবে যিনি মহা সম্মানিত ও মহান দাতা। (৫৫:২৬-২৭) সুতরাং একমাত্র সেই এক আল্লাহই চিরস্থায়ী জীবনের অধিকারী। তিনি কখনও ধ্বংস হবেন না। দানব ও মানব প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ। গ্রহণকারী। অনুরূপভাবে ফেরেশতামণ্ডলী ও আরশ বহনকারীগণও মরণশীল। শুধুমাত্র এক অদ্বিতীয় আল্লাহই চিরকাল বাকী থাকবেন। তাঁর কোন লয় ও ক্ষয় নেই। প্রথমেও তিনিই এবং শেষেও তিনিই থাকবেন। যখন সবাই মরে যাবে, দীর্ঘ মেয়াদী সময় শেষ হয়ে যাবে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠ হতে যত সন্তান হবার ছিল হয়ে যাবে, অতঃপর সকলেই মৃত্যুর ঘাটে অবতরণ করবে এবং সমস্ত সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে, সে সময় আল্লাহ তা'আলার হুকুমে কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন তিনি সকলকেই তাদের ছোট বড় সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রদান করবেন। কারও উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করা হবে না। এ কথাই পরবর্তী বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইতেকালের পর আমাদের নিকট এরূপ অনুভূত হয় যে, যেন কেউ আসছেন। পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে, কিন্তু কোন লোককে দেখা যায় না। তিনি এসে বলেনঃ “হে নবী পরিবারের লোকগণ! আপনাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহর করুণা ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক! প্রত্যেক জীবই মৃত্যুর আশ্বাদ গ্রহণকারী। কিয়ামতের পর আপনাদের সকলকেই সমস্ত কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। বিপদে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে তাদের পুরস্কার মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করুন এবং তারই নিকট মঙ্গলের আশা রাখুন। জেনে রাখুন যে, প্রকৃতপক্ষে বিপদগ্রস্ত ঐ ব্যক্তি যে পুণ্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়ে যায়। আপনাদের উপর আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে শান্তি, করুণা ও বরকত নাযিল হোক।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত আলী (রাঃ)-এর ধারণা মতে তিনি ছিলেন হযরত খিযির (আঃ)। সারকথা এই যে, সফলকাম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ করতঃ জান্নাতে প্রবেশ লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘জান্নাতের মধ্যে একটি চাবুক বরাবর জায়গা পেয়ে যাওয়া দুনিয়া ও তন্মধ্যকার সমস্ত জিনিস হতে উত্তম। তোমাদের ইচ্ছে পাঠ কর- (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অগ্নি হতে বিমুক্ত হয়েছ ও জান্নাতে প্রবিষ্ট হয়েছে, ফলতঃ সেই সফলকাম হয়েছে। এ পরবর্তী বেশীটুকু ছাড়া এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। আর বেশীটুকু সহ মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তি পাওয়ার ও জান্নাতে প্রবেশ করার যার ইচ্ছে রয়েছে সে যেন মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস রাখে এবং জনগণের সাথে সেই ব্যবহার করে, যে ব্যবহার সে নিজের জন্যে পছন্দ করে। এ হাদীসটি। (আরবী) (৩:১০২) এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে এবং আকী ইবনে জাররাহের তাফসীরেও এই হাদীসটি রয়েছে। এরপর দুনিয়ার নিকৃষ্টতা ও তুচ্ছতার কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, দুনিয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট, ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী জিনিস। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তোমরা ইহলৌকিক জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছ অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও স্থায়ী।' (৭৮:১৬-১৭) অন্য জায়গায় রয়েছে-“তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো শুধুমাত্র ইহলৌকিক জীবনের উপকারের বস্তু ও সৌন্দর্য; উত্তম ও স্থায়ী তো ওটাই যা আল্লাহর নিকট রয়েছে। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক সমুদ্রে অঙ্গুলী ডুবালে তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগে যে পানি উঠে সেই পানির সঙ্গে সমুদ্রের পানির যে তুলনা পরকালের তুলনায় দুনিয়া ঠিক তদ্রুপ'। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, দুনিয়া প্রতারণার একটা বেড়া ছাড়া আর কি? যাকে ছেড়ে তোমাদেরকে বিদায় হতে হবে। যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এ তো অতিসত্বরই তোমাদের হতে পৃথক হয়ে যাবে ও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং এখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় প্রদান করতঃ আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লেগে পড় এবং সাধ্যনুসারে পুণ্য অর্জন কর। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়া কোন কাজ সাধিত হয় না। অতঃপর মানুষের পরীক্ষার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা করবো।' (২:১৫৫) ভাবার্থ এই যে, মুমিনের পরীক্ষা অবশ্যই হয়ে থাকে। কখনো জীবনের উপর, কখনো অর্থের উপর, কখনো পরিবারের উপর এবং কখনো অন্য কিছুর উপর, মুত্তাকীর তারতম্য অনুযায়ী পরীক্ষা হয়ে থাকে। যে খুব বেশী ধর্মভীরু তার পরীক্ষা বেশী কঠিন হয়। আর যার ঈমানে দুর্বলতা রয়েছে তার পরীক্ষা হালকা হয়। এরপর আল্লাহ তাআলা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন-বদরের যুদ্ধের পূর্বে গ্রন্থধারী ও অংশীবাদীদের নিকট হতে তোমাদেরকে বহু দুঃখজনক কথা শুনতে হবে। তারপর তাদেরকে সান্ত্বনা। দিয়ে বলেছেন- সে সময় তোমাদেরকে ধৈর্যধারণ করতে হবে ও সংযমী হতে হবে এবং মুত্তাকী হওয়ার উপর এটা খুব কঠিন কাজই বটে'। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীবর্গ মুশরিক ও আহলে কিতাবের অপরাধ প্রায়ই ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের কষ্টদায়ক কথার উপর ধৈর্যধারণ করতেন ও আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশের উপর আমল করতেন। অবশেষে জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারী শরীফে এ আয়াতের তাফসীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গাধার উপর আরোহণ করতঃ হযরত উসামা (রাঃ)-কে পিছনে বসিয়ে নিয়ে রোগাক্রান্ত হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-কে দেখবার জন্যে বানূ হারিস খাযরাজের গোত্রের মধ্যে গমন করেন। এটা বদর যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। পথে একটি জনসমাবেশ দেখা যায়, যেখানে মুসলমান, ইয়াহূদী ও মুশরিক সবাই উপস্থিত ছিল। ওর মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালও ছিল। তখন পর্যন্ত সে প্রকাশ্যভাবে কুফরীর রঙ্গেই রঞ্জিত ছিল। মুসলমানদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সোয়ারী হতে ধূলোবালি উড়তে থাকলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নাকে কাপড় দিয়ে বলেঃ ‘ধূলা উড়াবেন না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিকটে পৌঁছেই গিয়েছিলেন। সোয়ারী হতে নেমে তিনি সালাম করেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তাদেরকে তিনি কুরআন কারীমের কয়েকটি আয়াতও শুনিয়ে দেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলে, “শুনুন জনাব, আপনার এ পন্থা আমাদের নিকট মোটেই পছন্দনীয় নয়। আপনার কথা সত্যই বা হলো, কিন্তু তাই বলে এটা উচিত নয় যে, আপনি আপনার সমাবেশে এসে আমাদেরকে কষ্ট দেবেন। আপনার বাড়ীতে যে যাবে তাকেই আপনি শুনাবেন।' এ কথা শুনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অবশ্যই আপনি আমাদের সভায় আগমন করবেন। আপনার কথা শুনবার তো আমাদের চাহিদা আছেই। তাদের মধ্যে তখন হট্টগোলের সৃষ্টি হয়ে যায়। একে অপরকে ভাল-মন্দ বলতে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবার উপক্রম হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বুঝানোর ফলে অবশেষে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং সবাই নীরব হয়ে যায়। তিনি স্বীয় সোয়ারীর উপর আরোহণ করে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তথায় গিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু হাব্বার! আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তো আজকে এরূপ এরূপ করেছে।' হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, এরূপ হতে দিন! ক্ষমা করুন! যে আল্লাহ আপনার প্রতি পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তার শপথ! আপনার সঙ্গে তো তার চরম শত্রুতা রয়েছে এবং এটা হওয়া স্বাভাবিক। কেননা, এখানকার মানুষ তাকে তাদের নেতা নির্বাচন করতে চেয়েছিল এবং তার জন্যে নেতৃত্বের পাগড়ী তৈরীরও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় নবী করে পাঠিয়ে দেন। জনগণ আপনাকে নবী বলে স্বীকার করে নেয়। সুতরাং তার নেতৃত্ব চলে যায়। ফলে সে চরম দুঃখিত হয়। এ জন্যেই সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। যা সে বলেছে বলেছেই। আপনি তার কথার উপর গুরুত্ব দেবেন না।' অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ক্ষমা করে দেন এবং এটা তার অভ্যাসই ছিল। তার সাহাবীগণও ইয়াহূদী ও মুশরিকদের অপরাধ ক্ষমা করে দিতেন এবং উপরোক্ত আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশের উপর আমল করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিহাদের অনুমতি দেয়া হয় এবং প্রথম। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যে যুদ্ধে কাফিরদের নেতৃবৃন্দ নিহত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইসলামের এই অগ্রগতি দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও তার সঙ্গীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ ও নিজেদেরকে বাহ্যতঃ মুসলমানরূপে পরিচিত করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। সুতরাং এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, প্রত্যেক পন্থী যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকে তাদের উপর অবশ্যই বিপদ-আপদ এসে থাকে। কাজেই আল্লাহর পথে এসব বিপদ-আপদ সহ্য করা, তার উপর পূর্ণ ভরসা রাখা, তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা মুমিনদের একান্ত কর্তব্য।

আলে ইমরান 3:187

১৮৭-১৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা গ্রন্থধারীদেরকে ধমক দিচ্ছেন যে, নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তাদের যে অঙ্গীকার হয়েছিল তা হচ্ছে তারা শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তার বর্ণনা ও আগমন সংবাদ জনগণের মধ্যে প্রচার করবে, তাদেরকে তার অনুসরণের ব্যাপারে উত্তেজিত করবে। অতঃপর যখন তিনি আগমন করবেন তখন তারা খাটি অন্তরের সাথে তার অনুসারী হয়ে যাবে। কিন্তু তারা ঐ অঙ্গীকারকে গোপন করছে এবং এটা প্রকাশ করলে দুনিয়া ও আখেরাতের যে মঙ্গলের ওয়াদা তাদের সাথে করা হয়েছিল ওর বিনিময়ে সামান্য পুঁজির উপর জড়িয়ে পড়েছিলো। তাদের এ ক্রয়-বিক্রয় জঘন্য হতে জঘন্যতর। এতে আলেমদের জন্যও সতর্কবাণী রয়েছে যে, তারা যেন ওদের মত না হন এবং সত্য জিনিস গোপন না করেন। নচেৎ তাদেরকেও ঐ শাস্তি ভোগ করতে হবে যে শাস্তি ঐ কিতাবীদেরকে ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাঁদেরকেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়তে হবে যেমন ঐ কিতাবীদেরকে পড়তে হয়েছিল। সুতরাং উলামা-ই-কিরামের উপর এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যে উপকারী ধর্মীয় শিক্ষা তাঁদের মধ্যে রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সত্বার্যের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে তা যেন তারা ছড়িয়ে দেন এবং কোন কথা গোপন না করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিকে কোন জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে। দ্বিতীয় আয়াতে রিয়াকারদেরকে নিন্দে করা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা দাবী করে অধিক যাজ্ঞা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে আরও কম দেবেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অন্য এক হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে প্রদান করা হয়নি তার সাথে পরিতৃপ্তির সংবাদদাতা দু’জন মিথ্যা কাপড় পরিধানকারীর ন্যায়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, একদা মারওয়ান স্বীয় দারোয়ান রাফে’কে বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন কর এবং তাঁকে বল, স্বীয় কৃতকর্মের প্রতি আনন্দিত ব্যক্তিকে এবং না করা কার্যের উপর প্রশংসা প্রার্থীকে যদি আল্লাহ পাক শাস্তি প্রদান করেন তবে আমাদের মধ্যে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ওর উত্তরে বলেন, এ আয়াতের সঙ্গে তোমাদের কি সম্পর্ক? এটা তো কিতাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) হতে এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কোন জিনিস সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন তারা ওর একটি ভুল উত্তর দিয়েছিল এবং বাইরে এসে ধারণা করে যে, তারা নবী (সঃ)-এর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। আর সাথে সাথে তাদের এ বাসনাও হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের প্রশংসা করবেন এবং তারা যে প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর গোপন রেখেছিল এতেও তারা সন্তুষ্ট ছিল। উল্লিখিত আয়াতে এর-ই বর্ণনা রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যেও রয়েছে। সহীহ বুখারীর মধ্যে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতেন তখন মুনাফিকরা বাড়ীতে বসে থাকতো, সঙ্গে যেতো না। অতঃপর তারা যুদ্ধ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার কারণে আনন্দ উপভোগ করতো। তারপর যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে ফিরে আসতেন তখন তারা সত্য-মিথ্যা ওর পেশ করতো এবং শপথ করে করে নবী (সঃ)-এর নিকট তাদের ওযরের সত্যতা প্রমাণ করতে চাইতো। আর তারা এ বাসনা রাখতো যে, তারা যে কাজ করেনি তার জন্যেও যেন তাদের প্রশংসা করা হয়। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) -কে এ আয়াত সম্বন্ধে ঐ রকমই প্রশ্ন করেছিলেন যেমন প্রশ্ন তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে করেছিলেন। তখন হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) আয়াতটির শানাই-নমূল ঐ মুনাফিকদেরকেই সাব্যস্ত করে ছিলেন যারা যুদ্ধের সময় বাড়ীতে বসে থাকতো অতঃপর মুসলমানগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আনন্দ অনুভব করতো। আর তারা জয়যুক্ত হলে ঐ কপটেরা মিথ্যা ওযর পেশ করতে এবং মুসলমানদের বিজয় লাভের জন্যে বাহ্যতঃ উল্লাস প্রকাশ করতো। তখন মারওয়ান বলেন, কোথায় এ ঘটনা আর কোথায় এ আয়াত?' আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) এটা অবগত আছেন।” মারওয়ান হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন। তিনিও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তারপর হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, এটা হযরত রাফে’ ইবনে খুদায়েজও (রাঃ) জানেন, তিনি সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় করেন যে, যদি তিনি তা প্রকাশ করেন তবে আপনি তার সাদকার উটগুলো ছিনিয়ে নেবেন। বাইরে এসে হযরত যায়েদ (রাঃ) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আমার সাক্ষ্য দানের উপর আপনি আমার প্রশংসা করলেন না কেন?” হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “সত্য সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।" হযরত যায়েদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সত্য সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে তো আমি প্রশংসার দাবীদার।" ঐ যুগে এ মারওয়ান মদীনার আমীর ছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মারওয়ান সর্বপ্রথম হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজকেই (রাঃ) এ প্রশ্ন করেছিলেন। এর পূর্ববর্তী বর্ণনায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মারওয়ান এ আয়াত সম্বন্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহলে স্মরণ রাখতে হবে এ দুয়ের মধ্যে কোন বিভিন্নতা নেই। এ আয়াতটি সাধারণ। এর মধ্যে ওটা ও এটা দু'টোই জড়িত রয়েছে। হযরত সাবিত ইবনে কায়েস আনসারী (রাঃ)। নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বীয় বংশের উপর আমার বড় আশংকা রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কেন?” তিনি উত্তরে বলেন, “একটি কারণ তো এই যে, আল্লাহ তা'আলা না করা কার্যের উপর প্রশংসাপ্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমার অবস্থা এই যে, আমি ঐ রূপ কার্যের উপর প্রশংসা পছন্দ করি। দ্বিতীয় কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা অহংকার করতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমি আমার সৌন্দর্যকে পছন্দ করি। তৃতীয় কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বরের উপর স্বর উঁচু করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আমার স্বর খুব উচ্চ।" তখন রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার জীবন উত্তম ও মঙ্গলময় হোক, তোমার মৃত্যু শাহাদাতের মৃত্যু হোক এবং তুমি জান্নাতবাসী হয়ে যাও?" তিনি খুশী হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! খুশী হবো না। কেন? এটা তো খুব ভাল কথা।" শেষে তাই হয়েছিল। তিনি প্রশংসাময় জীবন লাভ করেছিলেন। আর তিনি পেয়েছিলেন শহীদের মৃত্যু। মুসাইলামা কায্যাবের সঙ্গে মুসলমানদের যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাতে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) ও পড়া হয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেন-(হে নবী সঃ!) তাদেরকে তুমি শাস্তি হতে বিমুক্ত মনে করো না। তাদের শাস্তি অবশ্যই হবে এবং সে শাস্তিও হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তিনি প্রত্যেক জিনিসেরই অধিপতি এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান। কোন কাজেই তিনি অক্ষম নন। সুতরাং তোমরা তাঁকে ভয় করতে থাক এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করো না। তাঁর ক্রোধ হতে বাঁচবার চেষ্টা কর। তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ কর। তার চেয়ে বড় কেউই নেই এবং তার চেয়ে বেশী ক্ষমতাও কারও নেই।

আলে ইমরান 3:188

১৮৭-১৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা গ্রন্থধারীদেরকে ধমক দিচ্ছেন যে, নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তাদের যে অঙ্গীকার হয়েছিল তা হচ্ছে তারা শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তার বর্ণনা ও আগমন সংবাদ জনগণের মধ্যে প্রচার করবে, তাদেরকে তার অনুসরণের ব্যাপারে উত্তেজিত করবে। অতঃপর যখন তিনি আগমন করবেন তখন তারা খাটি অন্তরের সাথে তার অনুসারী হয়ে যাবে। কিন্তু তারা ঐ অঙ্গীকারকে গোপন করছে এবং এটা প্রকাশ করলে দুনিয়া ও আখেরাতের যে মঙ্গলের ওয়াদা তাদের সাথে করা হয়েছিল ওর বিনিময়ে সামান্য পুঁজির উপর জড়িয়ে পড়েছিলো। তাদের এ ক্রয়-বিক্রয় জঘন্য হতে জঘন্যতর। এতে আলেমদের জন্যও সতর্কবাণী রয়েছে যে, তারা যেন ওদের মত না হন এবং সত্য জিনিস গোপন না করেন। নচেৎ তাদেরকেও ঐ শাস্তি ভোগ করতে হবে যে শাস্তি ঐ কিতাবীদেরকে ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাঁদেরকেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়তে হবে যেমন ঐ কিতাবীদেরকে পড়তে হয়েছিল। সুতরাং উলামা-ই-কিরামের উপর এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যে উপকারী ধর্মীয় শিক্ষা তাঁদের মধ্যে রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সত্বার্যের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে তা যেন তারা ছড়িয়ে দেন এবং কোন কথা গোপন না করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিকে কোন জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে। দ্বিতীয় আয়াতে রিয়াকারদেরকে নিন্দে করা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা দাবী করে অধিক যাজ্ঞা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে আরও কম দেবেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অন্য এক হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে প্রদান করা হয়নি তার সাথে পরিতৃপ্তির সংবাদদাতা দু’জন মিথ্যা কাপড় পরিধানকারীর ন্যায়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, একদা মারওয়ান স্বীয় দারোয়ান রাফে’কে বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন কর এবং তাঁকে বল, স্বীয় কৃতকর্মের প্রতি আনন্দিত ব্যক্তিকে এবং না করা কার্যের উপর প্রশংসা প্রার্থীকে যদি আল্লাহ পাক শাস্তি প্রদান করেন তবে আমাদের মধ্যে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ওর উত্তরে বলেন, এ আয়াতের সঙ্গে তোমাদের কি সম্পর্ক? এটা তো কিতাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) হতে এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কোন জিনিস সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন তারা ওর একটি ভুল উত্তর দিয়েছিল এবং বাইরে এসে ধারণা করে যে, তারা নবী (সঃ)-এর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। আর সাথে সাথে তাদের এ বাসনাও হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের প্রশংসা করবেন এবং তারা যে প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর গোপন রেখেছিল এতেও তারা সন্তুষ্ট ছিল। উল্লিখিত আয়াতে এর-ই বর্ণনা রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যেও রয়েছে। সহীহ বুখারীর মধ্যে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতেন তখন মুনাফিকরা বাড়ীতে বসে থাকতো, সঙ্গে যেতো না। অতঃপর তারা যুদ্ধ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার কারণে আনন্দ উপভোগ করতো। তারপর যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে ফিরে আসতেন তখন তারা সত্য-মিথ্যা ওর পেশ করতো এবং শপথ করে করে নবী (সঃ)-এর নিকট তাদের ওযরের সত্যতা প্রমাণ করতে চাইতো। আর তারা এ বাসনা রাখতো যে, তারা যে কাজ করেনি তার জন্যেও যেন তাদের প্রশংসা করা হয়। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) -কে এ আয়াত সম্বন্ধে ঐ রকমই প্রশ্ন করেছিলেন যেমন প্রশ্ন তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে করেছিলেন। তখন হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) আয়াতটির শানাই-নমূল ঐ মুনাফিকদেরকেই সাব্যস্ত করে ছিলেন যারা যুদ্ধের সময় বাড়ীতে বসে থাকতো অতঃপর মুসলমানগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আনন্দ অনুভব করতো। আর তারা জয়যুক্ত হলে ঐ কপটেরা মিথ্যা ওযর পেশ করতে এবং মুসলমানদের বিজয় লাভের জন্যে বাহ্যতঃ উল্লাস প্রকাশ করতো। তখন মারওয়ান বলেন, কোথায় এ ঘটনা আর কোথায় এ আয়াত?' আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) এটা অবগত আছেন।” মারওয়ান হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন। তিনিও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তারপর হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, এটা হযরত রাফে’ ইবনে খুদায়েজও (রাঃ) জানেন, তিনি সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় করেন যে, যদি তিনি তা প্রকাশ করেন তবে আপনি তার সাদকার উটগুলো ছিনিয়ে নেবেন। বাইরে এসে হযরত যায়েদ (রাঃ) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আমার সাক্ষ্য দানের উপর আপনি আমার প্রশংসা করলেন না কেন?” হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “সত্য সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।" হযরত যায়েদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সত্য সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে তো আমি প্রশংসার দাবীদার।" ঐ যুগে এ মারওয়ান মদীনার আমীর ছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মারওয়ান সর্বপ্রথম হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজকেই (রাঃ) এ প্রশ্ন করেছিলেন। এর পূর্ববর্তী বর্ণনায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মারওয়ান এ আয়াত সম্বন্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহলে স্মরণ রাখতে হবে এ দুয়ের মধ্যে কোন বিভিন্নতা নেই। এ আয়াতটি সাধারণ। এর মধ্যে ওটা ও এটা দু'টোই জড়িত রয়েছে। হযরত সাবিত ইবনে কায়েস আনসারী (রাঃ)। নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বীয় বংশের উপর আমার বড় আশংকা রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কেন?” তিনি উত্তরে বলেন, “একটি কারণ তো এই যে, আল্লাহ তা'আলা না করা কার্যের উপর প্রশংসাপ্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমার অবস্থা এই যে, আমি ঐ রূপ কার্যের উপর প্রশংসা পছন্দ করি। দ্বিতীয় কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা অহংকার করতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমি আমার সৌন্দর্যকে পছন্দ করি। তৃতীয় কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বরের উপর স্বর উঁচু করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আমার স্বর খুব উচ্চ।" তখন রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার জীবন উত্তম ও মঙ্গলময় হোক, তোমার মৃত্যু শাহাদাতের মৃত্যু হোক এবং তুমি জান্নাতবাসী হয়ে যাও?" তিনি খুশী হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! খুশী হবো না। কেন? এটা তো খুব ভাল কথা।" শেষে তাই হয়েছিল। তিনি প্রশংসাময় জীবন লাভ করেছিলেন। আর তিনি পেয়েছিলেন শহীদের মৃত্যু। মুসাইলামা কায্যাবের সঙ্গে মুসলমানদের যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাতে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) ও পড়া হয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেন-(হে নবী সঃ!) তাদেরকে তুমি শাস্তি হতে বিমুক্ত মনে করো না। তাদের শাস্তি অবশ্যই হবে এবং সে শাস্তিও হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তিনি প্রত্যেক জিনিসেরই অধিপতি এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান। কোন কাজেই তিনি অক্ষম নন। সুতরাং তোমরা তাঁকে ভয় করতে থাক এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করো না। তাঁর ক্রোধ হতে বাঁচবার চেষ্টা কর। তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ কর। তার চেয়ে বড় কেউই নেই এবং তার চেয়ে বেশী ক্ষমতাও কারও নেই।

আলে ইমরান 3:189

১৮৭-১৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা গ্রন্থধারীদেরকে ধমক দিচ্ছেন যে, নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তাদের যে অঙ্গীকার হয়েছিল তা হচ্ছে তারা শেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তার বর্ণনা ও আগমন সংবাদ জনগণের মধ্যে প্রচার করবে, তাদেরকে তার অনুসরণের ব্যাপারে উত্তেজিত করবে। অতঃপর যখন তিনি আগমন করবেন তখন তারা খাটি অন্তরের সাথে তার অনুসারী হয়ে যাবে। কিন্তু তারা ঐ অঙ্গীকারকে গোপন করছে এবং এটা প্রকাশ করলে দুনিয়া ও আখেরাতের যে মঙ্গলের ওয়াদা তাদের সাথে করা হয়েছিল ওর বিনিময়ে সামান্য পুঁজির উপর জড়িয়ে পড়েছিলো। তাদের এ ক্রয়-বিক্রয় জঘন্য হতে জঘন্যতর। এতে আলেমদের জন্যও সতর্কবাণী রয়েছে যে, তারা যেন ওদের মত না হন এবং সত্য জিনিস গোপন না করেন। নচেৎ তাদেরকেও ঐ শাস্তি ভোগ করতে হবে যে শাস্তি ঐ কিতাবীদেরকে ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাঁদেরকেও আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়তে হবে যেমন ঐ কিতাবীদেরকে পড়তে হয়েছিল। সুতরাং উলামা-ই-কিরামের উপর এটা অবশ্য কর্তব্য যে, যে উপকারী ধর্মীয় শিক্ষা তাঁদের মধ্যে রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সত্বার্যের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে তা যেন তারা ছড়িয়ে দেন এবং কোন কথা গোপন না করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তিকে কোন জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয় এবং সে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে। দ্বিতীয় আয়াতে রিয়াকারদেরকে নিন্দে করা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা দাবী করে অধিক যাজ্ঞা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে আরও কম দেবেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অন্য এক হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যাকে প্রদান করা হয়নি তার সাথে পরিতৃপ্তির সংবাদদাতা দু’জন মিথ্যা কাপড় পরিধানকারীর ন্যায়।' মুসনাদ-ইআহমাদে রয়েছে যে, একদা মারওয়ান স্বীয় দারোয়ান রাফে’কে বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন কর এবং তাঁকে বল, স্বীয় কৃতকর্মের প্রতি আনন্দিত ব্যক্তিকে এবং না করা কার্যের উপর প্রশংসা প্রার্থীকে যদি আল্লাহ পাক শাস্তি প্রদান করেন তবে আমাদের মধ্যে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ওর উত্তরে বলেন, এ আয়াতের সঙ্গে তোমাদের কি সম্পর্ক? এটা তো কিতাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) হতে এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কোন জিনিস সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন তারা ওর একটি ভুল উত্তর দিয়েছিল এবং বাইরে এসে ধারণা করে যে, তারা নবী (সঃ)-এর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। আর সাথে সাথে তাদের এ বাসনাও হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের প্রশংসা করবেন এবং তারা যে প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর গোপন রেখেছিল এতেও তারা সন্তুষ্ট ছিল। উল্লিখিত আয়াতে এর-ই বর্ণনা রয়েছে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী প্রভৃতির মধ্যেও রয়েছে। সহীহ বুখারীর মধ্যে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতেন তখন মুনাফিকরা বাড়ীতে বসে থাকতো, সঙ্গে যেতো না। অতঃপর তারা যুদ্ধ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার কারণে আনন্দ উপভোগ করতো। তারপর যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে ফিরে আসতেন তখন তারা সত্য-মিথ্যা ওর পেশ করতো এবং শপথ করে করে নবী (সঃ)-এর নিকট তাদের ওযরের সত্যতা প্রমাণ করতে চাইতো। আর তারা এ বাসনা রাখতো যে, তারা যে কাজ করেনি তার জন্যেও যেন তাদের প্রশংসা করা হয়। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, মারওয়ান হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) -কে এ আয়াত সম্বন্ধে ঐ রকমই প্রশ্ন করেছিলেন যেমন প্রশ্ন তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে করেছিলেন। তখন হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) আয়াতটির শানাই-নমূল ঐ মুনাফিকদেরকেই সাব্যস্ত করে ছিলেন যারা যুদ্ধের সময় বাড়ীতে বসে থাকতো অতঃপর মুসলমানগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আনন্দ অনুভব করতো। আর তারা জয়যুক্ত হলে ঐ কপটেরা মিথ্যা ওযর পেশ করতে এবং মুসলমানদের বিজয় লাভের জন্যে বাহ্যতঃ উল্লাস প্রকাশ করতো। তখন মারওয়ান বলেন, কোথায় এ ঘটনা আর কোথায় এ আয়াত?' আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) এটা অবগত আছেন।” মারওয়ান হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন। তিনিও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তারপর হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, এটা হযরত রাফে’ ইবনে খুদায়েজও (রাঃ) জানেন, তিনি সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় করেন যে, যদি তিনি তা প্রকাশ করেন তবে আপনি তার সাদকার উটগুলো ছিনিয়ে নেবেন। বাইরে এসে হযরত যায়েদ (রাঃ) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আমার সাক্ষ্য দানের উপর আপনি আমার প্রশংসা করলেন না কেন?” হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, “সত্য সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।" হযরত যায়েদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সত্য সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে তো আমি প্রশংসার দাবীদার।" ঐ যুগে এ মারওয়ান মদীনার আমীর ছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মারওয়ান সর্বপ্রথম হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজকেই (রাঃ) এ প্রশ্ন করেছিলেন। এর পূর্ববর্তী বর্ণনায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, মারওয়ান এ আয়াত সম্বন্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহলে স্মরণ রাখতে হবে এ দুয়ের মধ্যে কোন বিভিন্নতা নেই। এ আয়াতটি সাধারণ। এর মধ্যে ওটা ও এটা দু'টোই জড়িত রয়েছে। হযরত সাবিত ইবনে কায়েস আনসারী (রাঃ)। নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বীয় বংশের উপর আমার বড় আশংকা রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কেন?” তিনি উত্তরে বলেন, “একটি কারণ তো এই যে, আল্লাহ তা'আলা না করা কার্যের উপর প্রশংসাপ্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমার অবস্থা এই যে, আমি ঐ রূপ কার্যের উপর প্রশংসা পছন্দ করি। দ্বিতীয় কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা অহংকার করতে নিষেধ করেছেন। অথচ আমি আমার সৌন্দর্যকে পছন্দ করি। তৃতীয় কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বরের উপর স্বর উঁচু করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আমার স্বর খুব উচ্চ।" তখন রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার জীবন উত্তম ও মঙ্গলময় হোক, তোমার মৃত্যু শাহাদাতের মৃত্যু হোক এবং তুমি জান্নাতবাসী হয়ে যাও?" তিনি খুশী হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! খুশী হবো না। কেন? এটা তো খুব ভাল কথা।" শেষে তাই হয়েছিল। তিনি প্রশংসাময় জীবন লাভ করেছিলেন। আর তিনি পেয়েছিলেন শহীদের মৃত্যু। মুসাইলামা কায্যাবের সঙ্গে মুসলমানদের যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাতে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) ও পড়া হয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেন-(হে নবী সঃ!) তাদেরকে তুমি শাস্তি হতে বিমুক্ত মনে করো না। তাদের শাস্তি অবশ্যই হবে এবং সে শাস্তিও হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তিনি প্রত্যেক জিনিসেরই অধিপতি এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান। কোন কাজেই তিনি অক্ষম নন। সুতরাং তোমরা তাঁকে ভয় করতে থাক এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করো না। তাঁর ক্রোধ হতে বাঁচবার চেষ্টা কর। তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ কর। তার চেয়ে বড় কেউই নেই এবং তার চেয়ে বেশী ক্ষমতাও কারও নেই।