Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আলে ইমরান 3:190 – আন-নিসা 4:19

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আলে ইমরান 3:190
  2. আলে ইমরান 3:191
  3. আলে ইমরান 3:192
  4. আলে ইমরান 3:193
  5. আলে ইমরান 3:194
  6. আলে ইমরান 3:195
  7. আলে ইমরান 3:196
  8. আলে ইমরান 3:197
  9. আলে ইমরান 3:198
  10. আলে ইমরান 3:199
  11. আলে ইমরান 3:200
  12. আন-নিসা 4:1
  13. আন-নিসা 4:2
  14. আন-নিসা 4:3
  15. আন-নিসা 4:4
  16. আন-নিসা 4:5
  17. আন-নিসা 4:6
  18. আন-নিসা 4:7
  19. আন-নিসা 4:8
  20. আন-নিসা 4:9
  21. আন-নিসা 4:10
  22. আন-নিসা 4:11
  23. আন-নিসা 4:12
  24. আন-নিসা 4:13
  25. আন-নিসা 4:14
  26. আন-নিসা 4:15
  27. আন-নিসা 4:16
  28. আন-নিসা 4:17
  29. আন-নিসা 4:18
  30. আন-নিসা 4:19

আলে ইমরান 3:190

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।' নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে। কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না? আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক। এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম। হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে। লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।' হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে। এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর! তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না। খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না। হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু! আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র। হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু! যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন। কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন। এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না। আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন। যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল। কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!' (আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন। শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন। অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও। চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো। অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ! তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল? হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই। সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।' আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আলে ইমরান 3:191

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।' নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে। কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না? আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক। এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম। হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে। লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।' হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে। এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর! তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না। খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না। হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু! আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র। হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু! যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন। কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন। এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না। আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন। যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল। কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!' (আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন। শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন। অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও। চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো। অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ! তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল? হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই। সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।' আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আলে ইমরান 3:192

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।' নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে। কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না? আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক। এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম। হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে। লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।' হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে। এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর! তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না। খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না। হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু! আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র। হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু! যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন। কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন। এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না। আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন। যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল। কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!' (আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন। শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন। অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও। চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো। অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ! তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল? হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই। সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।' আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আলে ইমরান 3:193

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।' নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে। কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না? আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক। এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম। হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে। লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।' হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে। এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর! তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না। খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না। হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু! আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র। হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু! যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন। কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন। এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না। আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন। যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল। কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!' (আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন। শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন। অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও। চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো। অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ! তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল? হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই। সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।' আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আলে ইমরান 3:194

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।' নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে। কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না? আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক। এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম। হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে। লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।' হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে। এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর! তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না। খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না। হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু! আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র। হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু! যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন। কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন। এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না। আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন। যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল। কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!' (আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন। শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন। অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও। চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো। অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ! তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল? হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই। সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।' আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আলে ইমরান 3:195

এখানে শব্দটি (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং আরবী ভাষায় এটা সমানভাবে প্রচলিত হয়েছে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরআন শরীফের মধ্যে কোনও জায়গায় আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীলোকদের হিজরতের কথা বলেননি এর কারণ কি? তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আনসারগণ বলেন, সর্বপ্রথম যে স্ত্রীলোকটি হাওদায় চড়ে আমাদের নিকট হিজরত করে এসেছিলেন তিনি হযরত উম্মে সালমাই (রাঃ) ছিলেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়। আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, জ্ঞানবান ও ঈমানদারগণ যখন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহের বর্ণিত প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট পেশ করেন তখন আল্লাহ তাআলাও তাদের প্রার্থিত জিনিস দান করেন। এজন্যে আয়াতটিকে (আরবী) অক্ষর দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে তখন (তাদেরকে বলে দাও আমি নিকটেই আছি, যখন কোন আহ্বানকারী আমাকে আহ্বান করে তখন অবশ্যই তার আহ্বানে আমি সাড়া দিয়ে থাকি; সুতরাং তাদেরও উচিত যে, তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তাহলে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা সুপথপ্রাপ্ত হবে।' (২:১৮৬) অতঃপর প্রার্থনা গৃহীত হওয়ার তাফসীর বর্ণিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক সংবাদ দিচ্ছেন-“আমি কোন কর্মীর কৃতকর্ম বিনষ্ট করি না। বরং সকলকেই পূর্ণ প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে পুরুষই 'হোক বা স্ত্রীই হোক। পুণ্য ও কার্যের প্রতিদানের ব্যাপারে আমার নিকট সবাই সমান। সুতরাং যেসব লোক অংশীবাদের স্থান ত্যাগ করে ঈমানের স্থানে আগমন করে, কাফিরদের দেশ হতে হিজরত করে। আল্লাহর নামে ভাই, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনকে পরিত্যাগ করে, মুশরিকদের প্রদত্ত কষ্ট সহ্য করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে দেশকে পরিত্যাগ করে এবং স্বীয় জন্মভূমি পরিত্যাগ করতেও দ্বিধাবোধ করে না; তারা জনগণের কোন ক্ষতি করেনি, যার ফলে তারা তাদেরকে ধমকাচ্ছে বরং তাদের দোষ শুধুমাত্র এই ছিল যে, তারা আমার পথের পথিক হয়েছে, আমার পথে চলার কারণেই তাদেরকে বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তারা রাসূল (সঃ)-কে এবং তোমাদেরকেও এ কারণেই দেশ হতে বের করে দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের প্রভু আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করছো।' (৬০ :১) অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ তারা তাদের সাথে শত্রুতা শুধু এ কারণেই করেছে যে, তারা প্রবল প্রতাপান্বিত ও প্রশংসিত আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে।' (৮৫:৮) এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তারা জিহাদও করেছে এবং শহীদও হয়েছে। এটা অতি উচ্চ পদমর্যাদা যে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করছে, সোয়ারী কর্তিত হচ্ছে এবং মুখমণ্ডল মাটি ও রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যদি ধৈর্যের সাথে, সৎ নিয়তে বীরত্বের সাথে এবং পিছনে আল্লাহর পথে জিহাদ করি তবে কি আল্লাহ তা'আলা আমার গোনাহ মার্জনা করবেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ ‘হা। দ্বিতীয়বার তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কি বলেছিলে আবার বলতো? লোকটি তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবার উত্তরে বললেনঃ 'হ্যা, কিন্তু ঋণ মার্জনা করা হবে। এ কথাটি আমাকে জিবরাঈল (আঃ) এখনই বলে গেলেন। তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলছেন-আমি উপরোক্ত গুণ বিশিষ্ট লোকদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবো এবং তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবো যার চতুর্দিকে স্রোতস্বিনীসমূহ বয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর কোনটিতে দুগ্ধ, কোনটিতে মধু, কোনটিতে সুরা এবং কোনটিতে নির্মল পানি রয়েছে। তাছাড়া ঐ সব নিয়ামতও রয়েছে যা কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি, কোন চক্ষু দর্শন করেনি এবং কোন হৃদয় কল্পনাও করেনি। এগুলোই হচ্ছে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে প্রতিদান। এটা স্পষ্ট কথা যে, সমস্ত সম্রাটের যিনি সম্রাট তাঁর নিকট হতে যে প্রতিদান পাওয়া যাবে। তা কতইনা অমূল্য অসীম হবে! যেমন কোন কবি বলেন, “তিনি যদি শাস্তি দেন তবে সেই শাস্তিও হবে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্নকারী, আর যদি তিনি পুরস্কার দেন। তবে সেটাও হবে বে-হিসাব ও ধারণার বাইরে। কেননা, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তিনি কারও ধার ধারেন না। সৎ কর্মশীলদের উত্তম বিনিময় আল্লাহর নিকটই রয়েছে। হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর তোমরা চিন্তিত ও অধৈর্য হয়ে যেয়ো না। জেনে রেখো যে, মুমিনের উপর অত্যাচার করা হয় না। তোমাদের যদি খুশী ও শান্তি লাভ হয় তবে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যদি তোমাদেরকে কষ্ট ও বিপদ পৌছে তবে ধৈর্য ধারণ কর ও তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর এবং পুণ্য ও প্রতিদানের আকাঙ্খা পোষণ কর। আল্লাহ তা'আলার নিকটই উত্তম ও পবিত্র প্রতিদান রয়েছে।

আলে ইমরান 3:196

১৯৬-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তুমি কাফিরদের মাতালতা, আনন্দ-বিহ্বলতা, সুখ সম্ভোগ এবং আঁকজমকের প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। অতিসত্বরই এসব কিছু বিনষ্ট ও বিলীন হয়ে যাবে এবং শুধু তাদের দুষ্কাৰ্যসমূহ শাস্তির আকারে তাদের উপর অবশিষ্ট থাকবে। তাদের এ সব সুখের সামগ্রী পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। এ বিষয়েরই বহু আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহের ব্যাপারে শুধুমাত্র কাফিরেরাই ঝগড়া করে থাকে, সুতরাং তাদের নগরসমূহে প্রত্যাগমন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে।” (৪০:৪) অন্য জায়গায় রয়েছে- “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা মুক্তি পায় না; তারা দুনিয়ায় কিছুদিন উপকৃত হবে, কিন্তু পরকালে তো তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট; আমি তাদেরকে তাদের কুফরীর প্রতিশোধরূপে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো।" আর এক স্থানে রয়েছে-“আমি তাদেরকে অল্পদিন উপকার পৌছাবো, অতঃপর তাদেরকে পুরু শাস্তির দিকে আকৃষ্ট করবো।” আর এক জায়গায় রয়েছে-“আমি কাফিরদেরকে কিছু অবকাশ দিয়ে থাকি।” অন্য জায়গায় রয়েছে-“যে ব্যক্তি আমার উত্তম অঙ্গীকার পেয়ে গেছে, আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আরাম উপভোগ করছে, কিন্তু কিয়ামতের দিন শাস্তির সম্মুখীন হবে তারা কি সমান হতে পারে?” যেহেতু কাফিরদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণিত হলো, কাজেই সাথে সাথে মুমিনদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- এ মুত্তাকী দলটি কিয়ামতের দিন এমন জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে যার পার্শ্ব দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদেরকে পুণ্যবান বলার কারণ এই যে, তারা পিতা-মাতার সাথে ও সন্তানাদির সাথে সৎ ব্যবহার। করে থাকে। যেমন তোমার উপর তোমার পিতা-মাতার অধিকার রয়েছে, দ্রুপ তোমার উপর তোমার সন্তান-সন্ততির অধিকার রয়েছে।” এ বর্ণনাটিই হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে মাওকুফরূপেও বর্ণিত আছে এবং এর মাওকুফ হওয়াই অধিকতর সঠিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)বলেন, “পুণ্যবান ঐ ব্যক্তি যে কাউকেও কষ্ট দেয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই মৃত্যু উত্তম। সে ব্যক্তি ভালই হোক আর মন্দই হোক। যদি সে সৎ হয় তবে তার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট যা কিছু। রয়েছে তা খুবই উত্তম। আর যদি সে অসৎ হয় তবে আল্লাহ তা'আলার শাস্তি ও তার পাপরাশি যা তার ইহলৌকিক জীবনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেই বৃদ্ধি এখান হতেই শেষ হয়ে যাবে। প্রথমটির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলার নিকট যা রয়েছে তা পুণ্যবানদের জন্যে উত্তম।" দ্বিতীয়টির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “অবিশ্বাসকারীরা যেন ধারণা না করে যে, আমি যে তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্যে উত্তম। আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি যেন তাদের পাপ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (৩:১৭৮) হযরত আবৃদ্দারদা (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

আলে ইমরান 3:197

১৯৬-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তুমি কাফিরদের মাতালতা, আনন্দ-বিহ্বলতা, সুখ সম্ভোগ এবং আঁকজমকের প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। অতিসত্বরই এসব কিছু বিনষ্ট ও বিলীন হয়ে যাবে এবং শুধু তাদের দুষ্কাৰ্যসমূহ শাস্তির আকারে তাদের উপর অবশিষ্ট থাকবে। তাদের এ সব সুখের সামগ্রী পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। এ বিষয়েরই বহু আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহের ব্যাপারে শুধুমাত্র কাফিরেরাই ঝগড়া করে থাকে, সুতরাং তাদের নগরসমূহে প্রত্যাগমন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে।” (৪০:৪) অন্য জায়গায় রয়েছে- “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা মুক্তি পায় না; তারা দুনিয়ায় কিছুদিন উপকৃত হবে, কিন্তু পরকালে তো তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট; আমি তাদেরকে তাদের কুফরীর প্রতিশোধরূপে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো।" আর এক স্থানে রয়েছে-“আমি তাদেরকে অল্পদিন উপকার পৌছাবো, অতঃপর তাদেরকে পুরু শাস্তির দিকে আকৃষ্ট করবো।” আর এক জায়গায় রয়েছে-“আমি কাফিরদেরকে কিছু অবকাশ দিয়ে থাকি।” অন্য জায়গায় রয়েছে-“যে ব্যক্তি আমার উত্তম অঙ্গীকার পেয়ে গেছে, আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আরাম উপভোগ করছে, কিন্তু কিয়ামতের দিন শাস্তির সম্মুখীন হবে তারা কি সমান হতে পারে?” যেহেতু কাফিরদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণিত হলো, কাজেই সাথে সাথে মুমিনদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- এ মুত্তাকী দলটি কিয়ামতের দিন এমন জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে যার পার্শ্ব দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদেরকে পুণ্যবান বলার কারণ এই যে, তারা পিতা-মাতার সাথে ও সন্তানাদির সাথে সৎ ব্যবহার। করে থাকে। যেমন তোমার উপর তোমার পিতা-মাতার অধিকার রয়েছে, দ্রুপ তোমার উপর তোমার সন্তান-সন্ততির অধিকার রয়েছে।” এ বর্ণনাটিই হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে মাওকুফরূপেও বর্ণিত আছে এবং এর মাওকুফ হওয়াই অধিকতর সঠিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)বলেন, “পুণ্যবান ঐ ব্যক্তি যে কাউকেও কষ্ট দেয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই মৃত্যু উত্তম। সে ব্যক্তি ভালই হোক আর মন্দই হোক। যদি সে সৎ হয় তবে তার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট যা কিছু। রয়েছে তা খুবই উত্তম। আর যদি সে অসৎ হয় তবে আল্লাহ তা'আলার শাস্তি ও তার পাপরাশি যা তার ইহলৌকিক জীবনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেই বৃদ্ধি এখান হতেই শেষ হয়ে যাবে। প্রথমটির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলার নিকট যা রয়েছে তা পুণ্যবানদের জন্যে উত্তম।" দ্বিতীয়টির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “অবিশ্বাসকারীরা যেন ধারণা না করে যে, আমি যে তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্যে উত্তম। আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি যেন তাদের পাপ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (৩:১৭৮) হযরত আবৃদ্দারদা (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

আলে ইমরান 3:198

১৯৬-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন-“হে নবী (সঃ)! তুমি কাফিরদের মাতালতা, আনন্দ-বিহ্বলতা, সুখ সম্ভোগ এবং আঁকজমকের প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। অতিসত্বরই এসব কিছু বিনষ্ট ও বিলীন হয়ে যাবে এবং শুধু তাদের দুষ্কাৰ্যসমূহ শাস্তির আকারে তাদের উপর অবশিষ্ট থাকবে। তাদের এ সব সুখের সামগ্রী পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। এ বিষয়েরই বহু আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহের ব্যাপারে শুধুমাত্র কাফিরেরাই ঝগড়া করে থাকে, সুতরাং তাদের নগরসমূহে প্রত্যাগমন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে।” (৪০:৪) অন্য জায়গায় রয়েছে- “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা মুক্তি পায় না; তারা দুনিয়ায় কিছুদিন উপকৃত হবে, কিন্তু পরকালে তো তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট; আমি তাদেরকে তাদের কুফরীর প্রতিশোধরূপে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো।" আর এক স্থানে রয়েছে-“আমি তাদেরকে অল্পদিন উপকার পৌছাবো, অতঃপর তাদেরকে পুরু শাস্তির দিকে আকৃষ্ট করবো।” আর এক জায়গায় রয়েছে-“আমি কাফিরদেরকে কিছু অবকাশ দিয়ে থাকি।” অন্য জায়গায় রয়েছে-“যে ব্যক্তি আমার উত্তম অঙ্গীকার পেয়ে গেছে, আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আরাম উপভোগ করছে, কিন্তু কিয়ামতের দিন শাস্তির সম্মুখীন হবে তারা কি সমান হতে পারে?” যেহেতু কাফিরদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণিত হলো, কাজেই সাথে সাথে মুমিনদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- এ মুত্তাকী দলটি কিয়ামতের দিন এমন জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে যার পার্শ্ব দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদেরকে পুণ্যবান বলার কারণ এই যে, তারা পিতা-মাতার সাথে ও সন্তানাদির সাথে সৎ ব্যবহার। করে থাকে। যেমন তোমার উপর তোমার পিতা-মাতার অধিকার রয়েছে, দ্রুপ তোমার উপর তোমার সন্তান-সন্ততির অধিকার রয়েছে।” এ বর্ণনাটিই হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে মাওকুফরূপেও বর্ণিত আছে এবং এর মাওকুফ হওয়াই অধিকতর সঠিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)বলেন, “পুণ্যবান ঐ ব্যক্তি যে কাউকেও কষ্ট দেয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই মৃত্যু উত্তম। সে ব্যক্তি ভালই হোক আর মন্দই হোক। যদি সে সৎ হয় তবে তার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট যা কিছু। রয়েছে তা খুবই উত্তম। আর যদি সে অসৎ হয় তবে আল্লাহ তা'আলার শাস্তি ও তার পাপরাশি যা তার ইহলৌকিক জীবনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেই বৃদ্ধি এখান হতেই শেষ হয়ে যাবে। প্রথমটির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলার নিকট যা রয়েছে তা পুণ্যবানদের জন্যে উত্তম।" দ্বিতীয়টির দলীল হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “অবিশ্বাসকারীরা যেন ধারণা না করে যে, আমি যে তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্যে উত্তম। আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি যেন তাদের পাপ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (৩:১৭৮) হযরত আবৃদ্দারদা (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

আলে ইমরান 3:199

১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের ঐ দলের প্রশংসা করছেন যারা পুরোপুরি ঈমান আনয়ন করেছিল। তারা কুরআন কারীমেও বিশ্বাস করে এবং নিজেদের কিতাবের উপরও বিশ্বাস রাখে। তারা অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় রেখে তার আদেশ পালনে সদা লিপ্ত থাকে। প্রভুর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করতঃ ক্রন্দন করে থাকে। তাদের কিতাবে শেষ নবী (সঃ)-এর যেসব বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে তা তারা গোপন করে না। বরং সকলকেই তা প্রদান করতঃ তাঁকে স্বীকার করে নিতে উৎসাহিত করে। এরূপ দল আল্লাহ তা'আলার নিকট পুণ্য প্রাপ্ত হবে, তারা ইয়াহুদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক। সূরা-ইকাসাসের মধ্যে এ বিষয়টি নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে-যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দান করেছিলাম তারা ওর উপরেও ঈমান আনয়ন করে এবং এ কিতাব (কুরআন কারীম) তাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে, ‘আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি। এটা আমাদের প্রভুর নিকট হতে সত্য কিতাব। আমরা তো প্রথম হতেই এটা মান্য করতাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। অন্য জায়গায় রয়েছে- যাদেরকে আমি গ্রন্থ প্রদান করেছি এবং যারা ওটা সঠিকভাবে পাঠ করে, তারা তো তৎক্ষণাৎ এ কুরআনের উপরও ঈমান এনে থাকে। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের মধ্যেও একটি দল সত্যের পথ প্রদর্শনকারী এবং সত্যের সঙ্গেই সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী।' (৭:১৫৯) অন্য স্থানে রয়েছে-“আহলে কিতাব সবাই সমান নয়, তাদের মধ্যে একটি দল রাত্রেও আল্লাহর কিতাব পাঠ করে থাকে এবং সিজদায় পড়ে যায়। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘হে নবী (সঃ)! তুমি বল হে মানবমণ্ডলী! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আর নাই কর, পূর্ব হতেই যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে যখন তাদের নিকট কুরআন কারীমের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা মুখের ভরে সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই তার ওয়াদা সত্য হয়েই থাকবে। এরা কাঁদতে কাঁদতে মুখের ভরে পড়ে যায় এবং তাদের বিনয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্য এরূপ গুণসম্পন্ন লোক পাওয়া যায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুব কম। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) এবং তার মত আরও কয়েকজন ঈমানদার ইয়াহুদী আলেম। কিন্তু তাদের সংখ্যা দশের বেশী হবে না। খ্রীষ্টানদের অধিকাংশই সুপথে এসে গিয়েছিল এবং সত্যের অনুগত হয়েছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে-“তুমি অবশ্যই ইয়াহুদ ও মুশরিকদেরকে মুমিনদের প্রতি ভীষণ শত্রুতা পোষণকারী পাবে এবং তাদের প্রতি ভালবাসা স্থাপনকারী পাবে ঐ লোকদেরকে যারা বলে, আমরা খ্রীষ্টান। এখান হতে তারা যা বলেছে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাত প্রদান করবেন যার নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এ পর্যন্ত। এখন বলা হচ্ছে যে, এসব লোক বিরাট প্রতিদানের অধিকারী। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, যখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) নাজ্জাসীর দরবারে বাদশাহ ও তার সভাসদবর্গের সামনে সূরা-ই-মারইয়াম পাঠ করেন তখন তার কান্না এসে যায়, ফলে বাদশাহ সহ উপস্থিত সমস্ত জনতাও কেঁদে ফেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের শত্রু সিক্ত হয়ে যায়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করতঃ বলেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাসী আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার জানাযার নামায আদায় কর।অতঃপর তিনি মাঠে গিয়ে সাহাবীগণকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করতঃ তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, যখন নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমাদের ভাই-এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।' এতে কতগুলো তোক বলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে সেই খ্রীষ্টানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন যে আবিসিনিয়ায় মারা গেছে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কুরআন কারীমই যেন তার মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ দিতে গিয়ে বলেনঃ “তোমাদের ভাই আসহামা মারা গিয়েছেন। অতঃপর তিনি বাইরে বেরিয়ে যান এবং যেভাবে তিনি জানাযার নামায পড়াতেন ঐভাবেই চার তাকবীরে জানাযার নামায আদায় করেন। এতে মুনাফিকরা ঐ প্রতিবাদ করে এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ নাজ্জাসীর ইন্তেকালের পর আমরা এ শুনতে থাকি যে, তাঁর সমাধির উপর আলো দেখা যায়। মুসতাদরীক-ই-হাকীমে রয়েছে যে, নাজ্জাসীর এক শত্রু তাঁরই সাম্রাজ্য হতে তার উপর আক্রমণ চালায়। তখন মুহাজিরগণ বলেন, আপনি তার মোকাবিলার জন্যে চলুন। আমরাও আপনার সাথে রয়েছি। আপনি আমাদের বীরত্ব দেখে নেবেন এবং যে উত্তম ব্যবহার আপনি আমাদের সাথে করেছেন তার প্রতিদানও হয়ে যাবে। কিন্তু নাজ্জাসী তখন বলেন, 'মানুষের সাহায্য নিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চাইতে আল্লাহর সাহায্যের নিরাপত্তাই উত্তম। ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুসলমানকে বুঝানো হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বে ছিল, তারা ইসলামকে বুঝতে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুগত হওয়ারও তারা সৌভাগ্য লাভ করেছিল। কাজেই প্রতিদানও তাদেরকে দ্বিগুণ দেয়া হবে। এক প্রতিদান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বেকার ঈমানের এবং দ্বিতীয় প্রতিদান হচ্ছে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের প্রতিদান। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিন প্রকারের লোক দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে আহলে কিতাবের ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং আমার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছে।'এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-তারা অল্পমূল্যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী বিক্রী করে না। অর্থাৎ তাদের কাছে যে ধর্মীয় শিক্ষা বিদ্যমান রয়েছে তা তারা গোপন করে না, যেমন তাদের মধ্যকার এক ইতর শ্রেণীর লোকের ঐ অভ্যাস ছিল। বরং ঐলোকগুলো তো ঐ শিক্ষাকে বেশী করে প্রচার করতো। তাদের প্রতিদান তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে-“নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।' অর্থাৎ সত্বর একত্রিতকারী, পরিবেষ্টনকারী এবং গণনাকারী। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“আমার পছন্দনীয় ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক। কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, বিপদের সময়, শান্তির সময় মোটকথা কোন অবস্থাতেই ওটা পরিত্যাগ করো না। এমনকি প্রাণবায়ু নির্গত হলে যেন ওরই উপর নির্গত হয় এবং ঐ শক্রদের হতেও ধৈর্য ধারণ কর ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন কর যারা স্বীয় ধর্মকে গোপন করে থাকে।' ইমাম হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি পূর্ববর্তী আলেমগণও এ তাফসীরই করেছেন। ইবাদতের স্থানকে স্থায়ী করা এবং তথায় অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাকে (আরবী) বলা হয়। আবার এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করাকেও (আরবী) বলে। এটাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর উক্তি। সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-নাসাঈতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এসো, আমি তোমাদেরকে এমন কাজ শিখিয়ে দেই যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপ মার্জনা করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (১) কষ্টের সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) মসজিদের দিকে গমন করা, (৩) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। ওটাই হচ্ছে (আরবী) ওটাই হচ্ছে (আরবী) এবং ওটাই হচ্ছে আল্লাহর পথের প্রস্তুতি গ্রহণ’। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত আবু সালমা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি এ আয়াতটির শান-ই-নমূল জান কি? হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন, আমার জানা নেই।' তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, “শুন, ঐ সময় কোন জিহাদ ছিল না। এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মসজিদকে আবাদ রাখতো এবং নামায ঠিক সময়ে আদায় করতো। অতঃপর আল্লাহ তাআলার যিকির করতো। তাদেরকেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, স্বীয় আত্মা ও প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখ, মসজিদের দিকে গমন করতে থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক, আর এ কার্যগুলোই হচ্ছে জাহান্নামের শাস্তি হতে মুক্তি প্রাপ্তির কারণ।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দেবো না যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মার্জনা করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? (১) অসুবিধার সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। এসব কাজেই তোমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।অন্য হাদীসে ‘খুব বেশী মসজিদের দিকে গমন করা এ কথাও রয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, পাপ মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ঐ আমলসমূহের দ্বারা মর্যাদাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটাই হচ্ছে এ আয়াতের ভাবার্থ। কিন্তু এ হাদীসটি একেবারেই গারীব। হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন- (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। কিন্তু উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা হচ্ছে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্তের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং শত্রুদেরকে ইসলামী শহরে প্রবেশ করতে না দেয়া। এর উৎসাহ দানের ব্যাপারেও বহু হাদীস রয়েছে এবং ওর জন্যে বড় বড় পুণ্য প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এক দিনের এ প্রস্তুতি সারা দুনিয়া ও ওর সমুদয় বস্তু হতে উত্তম। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দিবস ও রজনীর জিহাদের প্রস্তুতি এক মাসের পূর্ণ রোযা এবং এক মাসের সারা রাত্রির জাগরণ হতে উত্তম। ঐ প্রস্তুতির অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে গেলে সে.যত ভাল ভাল কাজ করতো সব কিছুরই সে পুণ্য পেতে থাকবে এবং অল্লাহ তা'আলার নিকট হতে তাকে আহার্য প্রদান করা হবে এবং গণ্ডগোল হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে প্রস্তুতির কার্যে রয়েছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে ও তাকে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি দেয়া হবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এও রয়েছে যে, উত্থান দিবসের আতংক হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় জান্নাত হতে আহার্য প্রদান করা হবে। কিয়ামত পর্যন্ত সে সৎকার্যে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতিদান পেতে থাকবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের সীমান্তের কোন প্রান্তে তিন দিন (জিহাদের) প্রহরায় নিযুক্ত থাকে তাকে সারা বছর ধরে প্রহরায় নিযুক্ত থাকার প্রতিদান দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) স্বীয় মিম্বরের উপর ভাষণ দান কালে একদা বলেন, “আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনা কথা শুনাচ্ছি। আমি বিশেষ এক খেয়ালে এ পর্যন্ত তোমাদেরকে তা শুনাইনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর পথে এক ঘন্টা পাহারা দেয়া এক হাজার রাত্রির ইবাদত হতে উত্তম যে রাত্রিগুলো দাঁড়িয়ে এবং দিনগুলো রোযায় কাটিয়ে দেয়া হয়। এতদিন ধরে তার এ হাদীসটি বর্ণনা না করার কারণ তিনি বর্ণনা করেন, আমার ভয় ছিল যে, এ মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা সবাই হয়তো মদীনা ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবে। এখন আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেক ব্যক্তিরই এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যে কাজ সে নিজের জন্যে পছন্দ করে তা যেন সে পালন করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি পরে বলেনঃ “আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? জনগণ বলেঃ ‘হ্যা। অতঃপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, হযরত শুরাহবিল ইবনে সামত (রাঃ) সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন। বহুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তিনি কিছু সংকীর্ণ মনা হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) তাঁর নিকট পৌছেন এবং বলেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি হাদীস শুনাবো। তিনি বলেছেনঃ ‘একদিন সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকা এক মাসের রোযা ও দাঁড়িয়ে ইবাদত হতে উত্তম। যে ব্যক্তি ঐ অবস্থাতেই মারা যায় সে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি পায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার কাজ চালু থাকে। সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে একরাত্রি আল্লাহর পথে পাহারা দেয়া একশ বছরের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম, যদিও ঐ রাত্রি রমযানের রাত্রি না হয়, যে একশ বছরের দিনগুলো রোযায় এবং রাত্রিগুলো তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়া হয়। আর মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে এবং পুণ্য লাভের নিয়তে রমযান মাসের দিন ছাড়াও কোন একটি দিনে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হাজার বছরের রোযা ও তাহাজ্জুদ হতে উত্তম। এখন যদি এ গাযী সহীহ সালামতে স্বীয় পরিবারের নিকট আগমন করে তবে এক হাজার বছরের পাপ তার আমল নামায় লিখা হয় না। কিন্তু পুণ্য লিখা হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার পুণ্য পেতে থাকে।” এ হাদীসটি গারীব এমনকি পরিত্যক্ত। এর একজন বর্ণনাকারী মিথ্যায় অভিযুক্ত। সুনান-ই-ইবনে মাজার একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান সৈন্যদের পিছনে এক রাত্রির পাহারা এক বছরের রাত্রি দাড়িয়ে ইবাদত করা হতে এবং দিনগুলোর রোযা রাখা হতে উত্তম। প্রত্যেক বছরের মধ্যে তিনশ ষাট দিন রয়েছে এবং প্রত্যেক দিন বছরের মত।' এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে সাঈদ ইবনে খালিদ, হযরত আবু যারআ’ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ তাকে দুর্বল বলেছেন। বরং ইমাম হাকিম (রঃ) বলেন যে, তার বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহের মধ্যে মাওযূ' হাদীসও রয়েছে। একটি মুনকাতা হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইসলামের সৈন্যের প্রহরীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক।' (সুনান-ই-ইবনে মাজা) হযরত সাহল ইবনে হানযালা (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মাগরিবের নামায আদায় করি এমন সময় একজন অশ্বারোহী এসে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি অগ্রে বেড়ে গিয়েছিলাম এবং অমুক পাহাড়ের উপর আরোহণ করে আমি লক্ষ্য করি যে, হাওয়াযেম গোত্রের লোক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে গেছে। তাদের সাথে উট, ছাগল, স্ত্রীলোক এবং শিশুরাও রয়েছে।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটু মুচকি হেসে উঠে বলেনঃ ইনশাআল্লাহ! এ সবগুলো মুসলমানদের যুদ্ধলব্ধ মালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আজকের রাত্রের পাহারা দেবে কে? হযরত আনাস ইবনে আবু মুরশিদ (রঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যাও, সোয়ারী নিয়ে এসো।' তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করে হাযির হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “এ ঘাটিতে চলে যাও এবং ঐ পর্বতের চূড়ায় আরোহণ কর। সাবধান! সকাল পর্যন্ত তাদের সাথে যেন তোমাদের কোন প্রকার বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।” ফজর হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের জায়গায় এসে দু' রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “বল তো, তোমাদের অশ্বারোহী প্রহরীর কোন পদশব্দ শুনা যাবে কি?” জনগণ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না।” তখন নামাযের জন্য তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি নামায আরম্ভ করেন। তাঁর খেয়াল ঘাটির দিকেই ছিল। নামাযের সালাম ফিরিয়েই তিনি বলেনঃ “তোমরা খুশী হও। তোমাদের অশ্বারোহী আসছে। আমরাও ঝোপের মধ্য হতে উঁকি মেরে দেখি। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরাও দেখতে পাই। সে এসেই রাসূল (সঃ)-কে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এ উপত্যকার উপরের অংশে পৌছে গিয়েছিলাম এবং আপনার নির্দেশক্রমে তথায়ই রাত্রি অতিবাহিত করি। সকালে আমি অন্য ঘাঁটিও দেখে লই কিন্তু সেখানেও কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, রাত্রে তুমি ওখান হতে নীচেও নেমেছিলে কি? তিনি বলেনঃ “না, শুধু নামাযের জন্যে এবং প্রস্রাব পায়খানার জন্যে নীচে নেমেছিলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে। এরপর আর কোন আমল না করলেও কোন ক্ষতি নেই।” (সুনান-ই-আবি দাউদ ও নাসাঈ) মুসনাদ -ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু রায়হানা বলেন, “এক যুদ্ধে আমরা একটি উঁচু ভূমির উপর ছিলাম। অত্যন্ত ঠাণ্ডা পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত লোক গর্ত খনন করে তাতে পড়ে রয়েছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ডাক দিয়ে বলেনঃ “আজ রাত্রে আমাদেরকে পাহারা দেবে এবং আমাদের নিকট হতে উত্তম দু'আ নেবে এমন কেউ আছে কি?” একথা শুনে একজন আনসারী (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতঃ তাঁর জন্যে বহু দু'আ করেন। আমি এ দু'আ শুনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও পাহারা দেবো। তিনি আমাকেও পার্শ্বে ডেকে নেন এবং নাম জিজ্ঞেস করে আমার জন্যেও দু'আ করেন। কিন্তু ঐ আনসারী সাহাবীর তুলনায় কম ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ চক্ষুর উপর জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং ঐ চক্ষুর উপরেও জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর পথে রাত্রি জাগরণ করে।” মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বাদশাহর পক্ষ হতে বেতন ছাড়াই মুসলমানদের পিছন হতে তাদের উপর পাহারা দেয় সে স্বীয় চক্ষু দ্বারাও জাহান্নামের আগুন দর্শন করবে না, কিন্তু শুধুমাত্র কসম পুরো হওয়ার জন্যে (দর্শন করবে)।” যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে সবাই ওর উপর আগমন করবে।” (১৯:৭১) সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বর্ণ মুদ্রার দাস রৌপ্য মুদ্রার দাস এবং বস্ত্রের দাস ধ্বংস হয়েছে। যদি তাকে সম্পদ দেয়া হয় তবে সে খুশী হয় এবং না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়, সে ধ্বংস হয়েছে এবং বিনষ্ট হয়েছে। তার পায়ে কাঁটা ঢুকলে তা বের করার চেষ্টাও করা হয় না। সৌভাগ্যবান ও উন্নতশীল ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে স্বীয় অশ্বের বগা ধারণ করে থাকে, তার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, পদদ্বয় ময়লা যুক্ত। তাঁকে পাহারায় নিযুক্ত করলে পাহারা দিয়ে থাকে, সেনাবাহিনীর অগ্রে নিযুক্ত করলে তাতেও খুশী হয়। লোকের দৃষ্টিতে সে এত নিকৃষ্ট যে, সে যেতে চাইলে অনুমতি পায় না, কারও জন্যে সুপারিশ করলে তা গৃহীত হয় না। আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা যে, এ আয়াত সম্পর্কীয় বিশেষ বিশেষ হাদীসসমূহ বর্ণিত হলো। তার দয়া ও অনুগ্রহের উপর আমরা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দুনিয়ায় থাকা পর্যন্ত তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হতে আমরা ক্ষান্ত হতে পারি না। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে আমীরুল মুমিনীন, খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে একটি পত্র লিখেন এবং সেই পত্রে রোমক সৈন্যদের আধিক্য, তাদের যুদ্ধাস্ত্রের অবস্থা এবং তাদের প্রস্তুতির অবস্থা বর্ণনা করেন এবং লিখেন যে, ভীষণ বিপদের আশংকা রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) উত্তর পত্র প্রেরণ করেন যাতে আল্লাহর প্রশংসার পরে লিখিত ছিলঃ “মাঝে মাঝে মুমিন বান্দাদের উপরেও কঠিন বিপদ-আপদ নেমে আসে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই কঠিন বিপদের পর তাদের পথ সহজ করে দেন। জেনে রেখো যে, ছুটি সরলতার উপর একটি কাঠিন্য জয়যুক্ত হতে পারে না। দেখ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য অবলম্বন কর এবণ সহিষ্ণু ও সুপ্রতিষ্ঠিত হও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা মুক্তি প্রাপ্ত হও।” হিজরী ১৭০ অথবা ১৭৭ সনে তারসুস শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) যখন জিহাদে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন তখন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে সাকীনা (রঃ) তাঁকে বিদায় দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) নিম্নলিখিত কবিতা লিখে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম (রঃ)-এর হাতে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মক্কা ও মদীনায় অবস্থান করে ইবাদতকারী! আপনি যদি আমাদের মুজাহিদগণকে দেখতেন তবে আপনি অবশ্যই জানতে পারতেন যে, আপনি ইবাদতে খেল-তামাশা করছেন মাত্র। এক ঐ ব্যক্তি যার নয়না তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে এবং এক আমরা যারা স্বীয় স্কন্ধ আল্লাহর পথে কাটিয়ে দিয়ে নিজেদের রক্তে নিজেরাই গোসল করে থাকি। এক ঐ ব্যক্তি যার ঘোড়া মিথ্যা ও বাজে কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের ঘোড়া আক্রমণ ও যুদ্ধের দিনেই শুধু ক্লান্ত হয়। আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে আপনাদের জন্যে, আর আমাদের জন্যে আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে ঘোড়ার খুরের মাটি ও পবিত্র ধূলাবালি। নিশ্চিতরূপে জেনে রাখুন, আমাদের নিকট নবী (সঃ)-এর এ হাদীসটি পৌঁছেছে যা সম্পূর্ণ সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না, তা এই যে, যার নাসিকায় সেই আল্লাহর সৈন্যের ধূলাবালিও পৌঁছেছে তার নাসিকায় অগ্নিশিখা যুক্ত জাহান্নামের আগুনের ধুয়াও প্রবেশ করবে না। নিন, এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব যা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলছে ও সত্য বলছে যে, শহীদ মৃত নয়।হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বলেন, যখন আমি মসজিদে হারামে পৌছে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-কে এ কবিতাগুলো প্রদর্শন করি তখন তিনি কান্নায় ফেটে পড়েন এবং বলেন, “আবু আব্দির রহমানের উপর আল্লাহ দয়া করুন! তিনি সত্য কথাই বলেছেন এবং আমাকে উপদেশ দিয়েছেন ও আমার খুবই মঙ্গল কামনা করছেন।” অতঃপর আমাকে বলেন, “তুমি কি হাদীস লিখে থাক?” আমি বলি জ্বি, হঁ্যা। তিনি বলেন, “আচ্ছা, তুমি যখন এ উপদেশনামা আমার নিকট নিয়ে এসেছে তখন তার পরিবর্তে আমি তোমার দ্বারা একটি হাদীস লিখিয়ে নিচ্ছি।” হাদীসটি নিম্নরূপঃরাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি আবেদন করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা পালন করলে আমি মুজাহিদের পুণ্য লাভ করতে পারি। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার মধ্যে কি এ শক্তি আছে যে, তুমি নামায পড়তেই থাকবে, কখনও ক্লান্ত হবে না এবং রোযা রাখতেই থাকবে এবং কখনও বে-রোযা থাকবে না?' লোকটি বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর শক্তি কোথায়? আমি তো এ ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটিকে বলেনঃ “যদি তোমার মধ্যে এরূপ শক্তি থাকতো এবং তুমি এরূপ করতেও থাকতে তথাপি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মর্যাদা লাভ করতে পারতে না। তুমিও তো এটা জান যে, যদি মুজাহিদদের ঘোড়ার দড়ি লম্বা হয়ে যায় এবং সে এদিক ওদিক চড়ে যায় তবে তজ্জন্যেও মুজাহিদের পুণ্য লিখা হয়।”এরপরে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং এ ভয় সর্বাবস্থায়, সব সময়, সর্বকাজে থাকতে হবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে যখন ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে বলেনঃ “হে মুআয! যেখানেই থাক না কেন অন্তরে আল্লাহর ভয়। রাখবে। যদি তোমার দ্বারা কোন পাপকার্য হয়ে যায় তবে তৎক্ষণাৎ কোন পুণ্যের কাজও করবে, যেন সেই পাপ মোচন হয়ে যায়। আর জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন- এ চারটি কাজ করলে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে।' হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কারাযী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে, 'তোমরা আমার খেয়াল রাখ, আমার ভয়ে কাঁপতে থাক। আমার ও তোমাদের কার্যের ব্যাপার সংযমী হও। যখন আমার উপর ভরসা করবে তখন তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম হবে।'

আলে ইমরান 3:200

১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের ঐ দলের প্রশংসা করছেন যারা পুরোপুরি ঈমান আনয়ন করেছিল। তারা কুরআন কারীমেও বিশ্বাস করে এবং নিজেদের কিতাবের উপরও বিশ্বাস রাখে। তারা অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় রেখে তার আদেশ পালনে সদা লিপ্ত থাকে। প্রভুর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করতঃ ক্রন্দন করে থাকে। তাদের কিতাবে শেষ নবী (সঃ)-এর যেসব বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে তা তারা গোপন করে না। বরং সকলকেই তা প্রদান করতঃ তাঁকে স্বীকার করে নিতে উৎসাহিত করে। এরূপ দল আল্লাহ তা'আলার নিকট পুণ্য প্রাপ্ত হবে, তারা ইয়াহুদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক। সূরা-ইকাসাসের মধ্যে এ বিষয়টি নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে-যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দান করেছিলাম তারা ওর উপরেও ঈমান আনয়ন করে এবং এ কিতাব (কুরআন কারীম) তাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে, ‘আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি। এটা আমাদের প্রভুর নিকট হতে সত্য কিতাব। আমরা তো প্রথম হতেই এটা মান্য করতাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। অন্য জায়গায় রয়েছে- যাদেরকে আমি গ্রন্থ প্রদান করেছি এবং যারা ওটা সঠিকভাবে পাঠ করে, তারা তো তৎক্ষণাৎ এ কুরআনের উপরও ঈমান এনে থাকে। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের মধ্যেও একটি দল সত্যের পথ প্রদর্শনকারী এবং সত্যের সঙ্গেই সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী।' (৭:১৫৯) অন্য স্থানে রয়েছে-“আহলে কিতাব সবাই সমান নয়, তাদের মধ্যে একটি দল রাত্রেও আল্লাহর কিতাব পাঠ করে থাকে এবং সিজদায় পড়ে যায়। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘হে নবী (সঃ)! তুমি বল হে মানবমণ্ডলী! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আর নাই কর, পূর্ব হতেই যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে যখন তাদের নিকট কুরআন কারীমের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা মুখের ভরে সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই তার ওয়াদা সত্য হয়েই থাকবে। এরা কাঁদতে কাঁদতে মুখের ভরে পড়ে যায় এবং তাদের বিনয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্য এরূপ গুণসম্পন্ন লোক পাওয়া যায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুব কম। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) এবং তার মত আরও কয়েকজন ঈমানদার ইয়াহুদী আলেম। কিন্তু তাদের সংখ্যা দশের বেশী হবে না। খ্রীষ্টানদের অধিকাংশই সুপথে এসে গিয়েছিল এবং সত্যের অনুগত হয়েছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে-“তুমি অবশ্যই ইয়াহুদ ও মুশরিকদেরকে মুমিনদের প্রতি ভীষণ শত্রুতা পোষণকারী পাবে এবং তাদের প্রতি ভালবাসা স্থাপনকারী পাবে ঐ লোকদেরকে যারা বলে, আমরা খ্রীষ্টান। এখান হতে তারা যা বলেছে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাত প্রদান করবেন যার নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এ পর্যন্ত। এখন বলা হচ্ছে যে, এসব লোক বিরাট প্রতিদানের অধিকারী। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, যখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) নাজ্জাসীর দরবারে বাদশাহ ও তার সভাসদবর্গের সামনে সূরা-ই-মারইয়াম পাঠ করেন তখন তার কান্না এসে যায়, ফলে বাদশাহ সহ উপস্থিত সমস্ত জনতাও কেঁদে ফেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের শত্রু সিক্ত হয়ে যায়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করতঃ বলেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাসী আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার জানাযার নামায আদায় কর।অতঃপর তিনি মাঠে গিয়ে সাহাবীগণকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করতঃ তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, যখন নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমাদের ভাই-এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।' এতে কতগুলো তোক বলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে সেই খ্রীষ্টানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন যে আবিসিনিয়ায় মারা গেছে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কুরআন কারীমই যেন তার মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ দিতে গিয়ে বলেনঃ “তোমাদের ভাই আসহামা মারা গিয়েছেন। অতঃপর তিনি বাইরে বেরিয়ে যান এবং যেভাবে তিনি জানাযার নামায পড়াতেন ঐভাবেই চার তাকবীরে জানাযার নামায আদায় করেন। এতে মুনাফিকরা ঐ প্রতিবাদ করে এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ নাজ্জাসীর ইন্তেকালের পর আমরা এ শুনতে থাকি যে, তাঁর সমাধির উপর আলো দেখা যায়। মুসতাদরীক-ই-হাকীমে রয়েছে যে, নাজ্জাসীর এক শত্রু তাঁরই সাম্রাজ্য হতে তার উপর আক্রমণ চালায়। তখন মুহাজিরগণ বলেন, আপনি তার মোকাবিলার জন্যে চলুন। আমরাও আপনার সাথে রয়েছি। আপনি আমাদের বীরত্ব দেখে নেবেন এবং যে উত্তম ব্যবহার আপনি আমাদের সাথে করেছেন তার প্রতিদানও হয়ে যাবে। কিন্তু নাজ্জাসী তখন বলেন, 'মানুষের সাহায্য নিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চাইতে আল্লাহর সাহায্যের নিরাপত্তাই উত্তম। ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুসলমানকে বুঝানো হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বে ছিল, তারা ইসলামকে বুঝতে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুগত হওয়ারও তারা সৌভাগ্য লাভ করেছিল। কাজেই প্রতিদানও তাদেরকে দ্বিগুণ দেয়া হবে। এক প্রতিদান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বেকার ঈমানের এবং দ্বিতীয় প্রতিদান হচ্ছে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের প্রতিদান। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিন প্রকারের লোক দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে আহলে কিতাবের ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং আমার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছে।'এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-তারা অল্পমূল্যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী বিক্রী করে না। অর্থাৎ তাদের কাছে যে ধর্মীয় শিক্ষা বিদ্যমান রয়েছে তা তারা গোপন করে না, যেমন তাদের মধ্যকার এক ইতর শ্রেণীর লোকের ঐ অভ্যাস ছিল। বরং ঐলোকগুলো তো ঐ শিক্ষাকে বেশী করে প্রচার করতো। তাদের প্রতিদান তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে-“নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।' অর্থাৎ সত্বর একত্রিতকারী, পরিবেষ্টনকারী এবং গণনাকারী। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“আমার পছন্দনীয় ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক। কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, বিপদের সময়, শান্তির সময় মোটকথা কোন অবস্থাতেই ওটা পরিত্যাগ করো না। এমনকি প্রাণবায়ু নির্গত হলে যেন ওরই উপর নির্গত হয় এবং ঐ শক্রদের হতেও ধৈর্য ধারণ কর ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন কর যারা স্বীয় ধর্মকে গোপন করে থাকে।' ইমাম হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি পূর্ববর্তী আলেমগণও এ তাফসীরই করেছেন। ইবাদতের স্থানকে স্থায়ী করা এবং তথায় অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাকে (আরবী) বলা হয়। আবার এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করাকেও (আরবী) বলে। এটাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর উক্তি। সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-নাসাঈতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এসো, আমি তোমাদেরকে এমন কাজ শিখিয়ে দেই যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপ মার্জনা করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (১) কষ্টের সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) মসজিদের দিকে গমন করা, (৩) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। ওটাই হচ্ছে (আরবী) ওটাই হচ্ছে (আরবী) এবং ওটাই হচ্ছে আল্লাহর পথের প্রস্তুতি গ্রহণ’। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত আবু সালমা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি এ আয়াতটির শান-ই-নমূল জান কি? হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন, আমার জানা নেই।' তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, “শুন, ঐ সময় কোন জিহাদ ছিল না। এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মসজিদকে আবাদ রাখতো এবং নামায ঠিক সময়ে আদায় করতো। অতঃপর আল্লাহ তাআলার যিকির করতো। তাদেরকেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, স্বীয় আত্মা ও প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখ, মসজিদের দিকে গমন করতে থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক, আর এ কার্যগুলোই হচ্ছে জাহান্নামের শাস্তি হতে মুক্তি প্রাপ্তির কারণ।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দেবো না যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মার্জনা করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? (১) অসুবিধার সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। এসব কাজেই তোমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।অন্য হাদীসে ‘খুব বেশী মসজিদের দিকে গমন করা এ কথাও রয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, পাপ মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ঐ আমলসমূহের দ্বারা মর্যাদাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটাই হচ্ছে এ আয়াতের ভাবার্থ। কিন্তু এ হাদীসটি একেবারেই গারীব। হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন- (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। কিন্তু উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা হচ্ছে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্তের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং শত্রুদেরকে ইসলামী শহরে প্রবেশ করতে না দেয়া। এর উৎসাহ দানের ব্যাপারেও বহু হাদীস রয়েছে এবং ওর জন্যে বড় বড় পুণ্য প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এক দিনের এ প্রস্তুতি সারা দুনিয়া ও ওর সমুদয় বস্তু হতে উত্তম। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দিবস ও রজনীর জিহাদের প্রস্তুতি এক মাসের পূর্ণ রোযা এবং এক মাসের সারা রাত্রির জাগরণ হতে উত্তম। ঐ প্রস্তুতির অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে গেলে সে.যত ভাল ভাল কাজ করতো সব কিছুরই সে পুণ্য পেতে থাকবে এবং অল্লাহ তা'আলার নিকট হতে তাকে আহার্য প্রদান করা হবে এবং গণ্ডগোল হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে প্রস্তুতির কার্যে রয়েছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে ও তাকে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি দেয়া হবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এও রয়েছে যে, উত্থান দিবসের আতংক হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় জান্নাত হতে আহার্য প্রদান করা হবে। কিয়ামত পর্যন্ত সে সৎকার্যে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতিদান পেতে থাকবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের সীমান্তের কোন প্রান্তে তিন দিন (জিহাদের) প্রহরায় নিযুক্ত থাকে তাকে সারা বছর ধরে প্রহরায় নিযুক্ত থাকার প্রতিদান দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) স্বীয় মিম্বরের উপর ভাষণ দান কালে একদা বলেন, “আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনা কথা শুনাচ্ছি। আমি বিশেষ এক খেয়ালে এ পর্যন্ত তোমাদেরকে তা শুনাইনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর পথে এক ঘন্টা পাহারা দেয়া এক হাজার রাত্রির ইবাদত হতে উত্তম যে রাত্রিগুলো দাঁড়িয়ে এবং দিনগুলো রোযায় কাটিয়ে দেয়া হয়। এতদিন ধরে তার এ হাদীসটি বর্ণনা না করার কারণ তিনি বর্ণনা করেন, আমার ভয় ছিল যে, এ মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা সবাই হয়তো মদীনা ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবে। এখন আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেক ব্যক্তিরই এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যে কাজ সে নিজের জন্যে পছন্দ করে তা যেন সে পালন করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি পরে বলেনঃ “আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? জনগণ বলেঃ ‘হ্যা। অতঃপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, হযরত শুরাহবিল ইবনে সামত (রাঃ) সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন। বহুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তিনি কিছু সংকীর্ণ মনা হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) তাঁর নিকট পৌছেন এবং বলেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি হাদীস শুনাবো। তিনি বলেছেনঃ ‘একদিন সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকা এক মাসের রোযা ও দাঁড়িয়ে ইবাদত হতে উত্তম। যে ব্যক্তি ঐ অবস্থাতেই মারা যায় সে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি পায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার কাজ চালু থাকে। সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে একরাত্রি আল্লাহর পথে পাহারা দেয়া একশ বছরের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম, যদিও ঐ রাত্রি রমযানের রাত্রি না হয়, যে একশ বছরের দিনগুলো রোযায় এবং রাত্রিগুলো তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়া হয়। আর মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে এবং পুণ্য লাভের নিয়তে রমযান মাসের দিন ছাড়াও কোন একটি দিনে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হাজার বছরের রোযা ও তাহাজ্জুদ হতে উত্তম। এখন যদি এ গাযী সহীহ সালামতে স্বীয় পরিবারের নিকট আগমন করে তবে এক হাজার বছরের পাপ তার আমল নামায় লিখা হয় না। কিন্তু পুণ্য লিখা হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার পুণ্য পেতে থাকে।” এ হাদীসটি গারীব এমনকি পরিত্যক্ত। এর একজন বর্ণনাকারী মিথ্যায় অভিযুক্ত। সুনান-ই-ইবনে মাজার একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান সৈন্যদের পিছনে এক রাত্রির পাহারা এক বছরের রাত্রি দাড়িয়ে ইবাদত করা হতে এবং দিনগুলোর রোযা রাখা হতে উত্তম। প্রত্যেক বছরের মধ্যে তিনশ ষাট দিন রয়েছে এবং প্রত্যেক দিন বছরের মত।' এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে সাঈদ ইবনে খালিদ, হযরত আবু যারআ’ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ তাকে দুর্বল বলেছেন। বরং ইমাম হাকিম (রঃ) বলেন যে, তার বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহের মধ্যে মাওযূ' হাদীসও রয়েছে। একটি মুনকাতা হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইসলামের সৈন্যের প্রহরীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক।' (সুনান-ই-ইবনে মাজা) হযরত সাহল ইবনে হানযালা (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মাগরিবের নামায আদায় করি এমন সময় একজন অশ্বারোহী এসে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি অগ্রে বেড়ে গিয়েছিলাম এবং অমুক পাহাড়ের উপর আরোহণ করে আমি লক্ষ্য করি যে, হাওয়াযেম গোত্রের লোক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে গেছে। তাদের সাথে উট, ছাগল, স্ত্রীলোক এবং শিশুরাও রয়েছে।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটু মুচকি হেসে উঠে বলেনঃ ইনশাআল্লাহ! এ সবগুলো মুসলমানদের যুদ্ধলব্ধ মালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আজকের রাত্রের পাহারা দেবে কে? হযরত আনাস ইবনে আবু মুরশিদ (রঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যাও, সোয়ারী নিয়ে এসো।' তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করে হাযির হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “এ ঘাটিতে চলে যাও এবং ঐ পর্বতের চূড়ায় আরোহণ কর। সাবধান! সকাল পর্যন্ত তাদের সাথে যেন তোমাদের কোন প্রকার বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।” ফজর হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের জায়গায় এসে দু' রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “বল তো, তোমাদের অশ্বারোহী প্রহরীর কোন পদশব্দ শুনা যাবে কি?” জনগণ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না।” তখন নামাযের জন্য তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি নামায আরম্ভ করেন। তাঁর খেয়াল ঘাটির দিকেই ছিল। নামাযের সালাম ফিরিয়েই তিনি বলেনঃ “তোমরা খুশী হও। তোমাদের অশ্বারোহী আসছে। আমরাও ঝোপের মধ্য হতে উঁকি মেরে দেখি। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরাও দেখতে পাই। সে এসেই রাসূল (সঃ)-কে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এ উপত্যকার উপরের অংশে পৌছে গিয়েছিলাম এবং আপনার নির্দেশক্রমে তথায়ই রাত্রি অতিবাহিত করি। সকালে আমি অন্য ঘাঁটিও দেখে লই কিন্তু সেখানেও কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, রাত্রে তুমি ওখান হতে নীচেও নেমেছিলে কি? তিনি বলেনঃ “না, শুধু নামাযের জন্যে এবং প্রস্রাব পায়খানার জন্যে নীচে নেমেছিলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে। এরপর আর কোন আমল না করলেও কোন ক্ষতি নেই।” (সুনান-ই-আবি দাউদ ও নাসাঈ) মুসনাদ -ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু রায়হানা বলেন, “এক যুদ্ধে আমরা একটি উঁচু ভূমির উপর ছিলাম। অত্যন্ত ঠাণ্ডা পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত লোক গর্ত খনন করে তাতে পড়ে রয়েছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ডাক দিয়ে বলেনঃ “আজ রাত্রে আমাদেরকে পাহারা দেবে এবং আমাদের নিকট হতে উত্তম দু'আ নেবে এমন কেউ আছে কি?” একথা শুনে একজন আনসারী (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতঃ তাঁর জন্যে বহু দু'আ করেন। আমি এ দু'আ শুনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও পাহারা দেবো। তিনি আমাকেও পার্শ্বে ডেকে নেন এবং নাম জিজ্ঞেস করে আমার জন্যেও দু'আ করেন। কিন্তু ঐ আনসারী সাহাবীর তুলনায় কম ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ চক্ষুর উপর জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং ঐ চক্ষুর উপরেও জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর পথে রাত্রি জাগরণ করে।” মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বাদশাহর পক্ষ হতে বেতন ছাড়াই মুসলমানদের পিছন হতে তাদের উপর পাহারা দেয় সে স্বীয় চক্ষু দ্বারাও জাহান্নামের আগুন দর্শন করবে না, কিন্তু শুধুমাত্র কসম পুরো হওয়ার জন্যে (দর্শন করবে)।” যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে সবাই ওর উপর আগমন করবে।” (১৯:৭১) সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বর্ণ মুদ্রার দাস রৌপ্য মুদ্রার দাস এবং বস্ত্রের দাস ধ্বংস হয়েছে। যদি তাকে সম্পদ দেয়া হয় তবে সে খুশী হয় এবং না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়, সে ধ্বংস হয়েছে এবং বিনষ্ট হয়েছে। তার পায়ে কাঁটা ঢুকলে তা বের করার চেষ্টাও করা হয় না। সৌভাগ্যবান ও উন্নতশীল ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে স্বীয় অশ্বের বগা ধারণ করে থাকে, তার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, পদদ্বয় ময়লা যুক্ত। তাঁকে পাহারায় নিযুক্ত করলে পাহারা দিয়ে থাকে, সেনাবাহিনীর অগ্রে নিযুক্ত করলে তাতেও খুশী হয়। লোকের দৃষ্টিতে সে এত নিকৃষ্ট যে, সে যেতে চাইলে অনুমতি পায় না, কারও জন্যে সুপারিশ করলে তা গৃহীত হয় না। আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা যে, এ আয়াত সম্পর্কীয় বিশেষ বিশেষ হাদীসসমূহ বর্ণিত হলো। তার দয়া ও অনুগ্রহের উপর আমরা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দুনিয়ায় থাকা পর্যন্ত তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হতে আমরা ক্ষান্ত হতে পারি না। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে আমীরুল মুমিনীন, খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে একটি পত্র লিখেন এবং সেই পত্রে রোমক সৈন্যদের আধিক্য, তাদের যুদ্ধাস্ত্রের অবস্থা এবং তাদের প্রস্তুতির অবস্থা বর্ণনা করেন এবং লিখেন যে, ভীষণ বিপদের আশংকা রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) উত্তর পত্র প্রেরণ করেন যাতে আল্লাহর প্রশংসার পরে লিখিত ছিলঃ “মাঝে মাঝে মুমিন বান্দাদের উপরেও কঠিন বিপদ-আপদ নেমে আসে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই কঠিন বিপদের পর তাদের পথ সহজ করে দেন। জেনে রেখো যে, ছুটি সরলতার উপর একটি কাঠিন্য জয়যুক্ত হতে পারে না। দেখ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য অবলম্বন কর এবণ সহিষ্ণু ও সুপ্রতিষ্ঠিত হও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা মুক্তি প্রাপ্ত হও।” হিজরী ১৭০ অথবা ১৭৭ সনে তারসুস শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) যখন জিহাদে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন তখন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে সাকীনা (রঃ) তাঁকে বিদায় দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) নিম্নলিখিত কবিতা লিখে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম (রঃ)-এর হাতে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মক্কা ও মদীনায় অবস্থান করে ইবাদতকারী! আপনি যদি আমাদের মুজাহিদগণকে দেখতেন তবে আপনি অবশ্যই জানতে পারতেন যে, আপনি ইবাদতে খেল-তামাশা করছেন মাত্র। এক ঐ ব্যক্তি যার নয়না তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে এবং এক আমরা যারা স্বীয় স্কন্ধ আল্লাহর পথে কাটিয়ে দিয়ে নিজেদের রক্তে নিজেরাই গোসল করে থাকি। এক ঐ ব্যক্তি যার ঘোড়া মিথ্যা ও বাজে কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের ঘোড়া আক্রমণ ও যুদ্ধের দিনেই শুধু ক্লান্ত হয়। আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে আপনাদের জন্যে, আর আমাদের জন্যে আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে ঘোড়ার খুরের মাটি ও পবিত্র ধূলাবালি। নিশ্চিতরূপে জেনে রাখুন, আমাদের নিকট নবী (সঃ)-এর এ হাদীসটি পৌঁছেছে যা সম্পূর্ণ সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না, তা এই যে, যার নাসিকায় সেই আল্লাহর সৈন্যের ধূলাবালিও পৌঁছেছে তার নাসিকায় অগ্নিশিখা যুক্ত জাহান্নামের আগুনের ধুয়াও প্রবেশ করবে না। নিন, এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব যা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলছে ও সত্য বলছে যে, শহীদ মৃত নয়।হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বলেন, যখন আমি মসজিদে হারামে পৌছে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-কে এ কবিতাগুলো প্রদর্শন করি তখন তিনি কান্নায় ফেটে পড়েন এবং বলেন, “আবু আব্দির রহমানের উপর আল্লাহ দয়া করুন! তিনি সত্য কথাই বলেছেন এবং আমাকে উপদেশ দিয়েছেন ও আমার খুবই মঙ্গল কামনা করছেন।” অতঃপর আমাকে বলেন, “তুমি কি হাদীস লিখে থাক?” আমি বলি জ্বি, হঁ্যা। তিনি বলেন, “আচ্ছা, তুমি যখন এ উপদেশনামা আমার নিকট নিয়ে এসেছে তখন তার পরিবর্তে আমি তোমার দ্বারা একটি হাদীস লিখিয়ে নিচ্ছি।” হাদীসটি নিম্নরূপঃরাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি আবেদন করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা পালন করলে আমি মুজাহিদের পুণ্য লাভ করতে পারি। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার মধ্যে কি এ শক্তি আছে যে, তুমি নামায পড়তেই থাকবে, কখনও ক্লান্ত হবে না এবং রোযা রাখতেই থাকবে এবং কখনও বে-রোযা থাকবে না?' লোকটি বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর শক্তি কোথায়? আমি তো এ ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটিকে বলেনঃ “যদি তোমার মধ্যে এরূপ শক্তি থাকতো এবং তুমি এরূপ করতেও থাকতে তথাপি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মর্যাদা লাভ করতে পারতে না। তুমিও তো এটা জান যে, যদি মুজাহিদদের ঘোড়ার দড়ি লম্বা হয়ে যায় এবং সে এদিক ওদিক চড়ে যায় তবে তজ্জন্যেও মুজাহিদের পুণ্য লিখা হয়।”এরপরে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং এ ভয় সর্বাবস্থায়, সব সময়, সর্বকাজে থাকতে হবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে যখন ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে বলেনঃ “হে মুআয! যেখানেই থাক না কেন অন্তরে আল্লাহর ভয়। রাখবে। যদি তোমার দ্বারা কোন পাপকার্য হয়ে যায় তবে তৎক্ষণাৎ কোন পুণ্যের কাজও করবে, যেন সেই পাপ মোচন হয়ে যায়। আর জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন- এ চারটি কাজ করলে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে।' হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কারাযী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে, 'তোমরা আমার খেয়াল রাখ, আমার ভয়ে কাঁপতে থাক। আমার ও তোমাদের কার্যের ব্যাপার সংযমী হও। যখন আমার উপর ভরসা করবে তখন তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম হবে।'

আন-নিসা 4:1

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি মদীনা শরীফে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যখন এ সূরাটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “এখন আর রুদ্ধরাখা নয়।” মুসতাদরিক-ই-হাকিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “সূরা-ই-নিসার মধ্যে পাঁচটি এমন আয়াত আছে যে, যদি আমি সারা দুনিয়া পেয়ে যেতাম তথাপি আমি তত খুশী হতাম না যত খুশী এ আয়াতগুলোতে হয়েছি। একটি আয়াত হচ্ছেঃ “আল্লাহ তা'আলা কারও উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করেন না, যার যে পুণ্য থাকে তার প্রতিদান তিনি তাকে বেশী বেশী করে দেন এবং নিজের পক্ষ হতে পুরস্কার হিসেবে যে বড় প্রতিদান তা তো পৃথক।” দ্বিতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “তোমরা যদি বড় বড় পাপসমূহ হতে বেঁচে থাক তবে ছোট ছোট পাপগুলো তিনি নিজেই ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।” তৃতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করেন না এবং অবশিষ্ট পাপীদের যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে থাকেন। চতুর্থ আয়াত হচ্ছেঃ “ঐ লোকগুলো যদি নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচার করার পর তোমার নিকট এসে যেতো এবং নিজেও স্বীয় পাপের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো ও রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পেতো।” ইমাম হাকিম (রঃ) বলেনঃ এর ইসনাদ সহীহ বটে, কিন্তু এর আবদুর রহমান নামক একজন বর্ণনাকারীর তার পিতার নিকট হতে শুনার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আবদুর রায্যাকের বর্ণনায় এই আয়াতটির পরিবর্তে নিম্নের আয়াতটি রয়েছেঃ “যে ব্যক্তির দ্বারা কোন পাপকার্য সংঘটিত হয় কিংবা সে নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে সে নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলাকে ক্ষমাশীল, দয়ালু পাবে।” হাদীসদ্বয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য এই ভাবে হবে যে, প্রথম হাদীসে একটি আয়াতের বর্ণনা বাকী রয়ে গেছে এবং এর বর্ণনা দ্বিতীয় হাদীসে হয়েছে। তাহলে পূর্ববর্তী হাদীসের চার আয়াত এবং পরবর্তী হাদীসের, এক আয়াত মিলে মোট পাঁচ আয়াত হয়ে গেল। কিংবা (আরবী) (৪:৪০) হতেই একটি আয়াত পূর্ণ হয়ে গেছে এবং (আরবী)-কে পৃথক আয়াত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তবে দু’টি হাদীসেই পাঁচটি পাঁচটি করে আয়াত হয়ে গেল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ সূরায় এমন ৮টা আয়াত রয়েছে যেগুলো এ উম্মতের জন্যে প্রত্যেক ঐ জিনিস হতে উত্তম যার মধ্যে সূর্য উদিত ও অস্তমিত হয়। প্রথমটি হচ্ছেঃ “আল্লাহ স্বীয় আহকাম তোমাদের উপর পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে চান এবং তোমাদেরকে ঐ সৎ লোকদের পথ-প্রদর্শন করতে চান যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে ও তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, আল্লাহ মহাজ্ঞাতা, বিজ্ঞানময়। দ্বিতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করতে এবং তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, আর স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারীরা চায় যে, তোমরা সত্য পথ হতে বহু দূরে সরে পড়।” তৃতীয় আয়াতটি হচ্ছেঃ “মানুষকে যেহেতু দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তোমাদের উপর হালকা করতে চান।” বাকী আয়াত হচ্ছে ঐগুলো যেগুলো পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি মালকিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ ‘আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে সূরা-ই-নিসা সম্পর্কে শুনেছি। কুরআন কারীম পড়েছি, অথচ আমি ছোট শিশু ছিলাম।' (মুসতাদরিক-ই-হাকিম)আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে এবং অন্তরে যেন তাঁরই ভয় রাখে। অতঃপর তিনি স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন-আল্লাহ তোমাদের সকলকে একই ব্যক্তি হতে অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন। এবং ঐ ব্যক্তি হতেই তিনি হযরত হাওয়া (আঃ)-কেও সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম (আঃ) ঘুমিয়ে ছিলেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তার বাম পাজরের পিছন দিক হতে হযরত হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন। তিনি জাগ্রত হয়ে তাঁকে দেখতে পান এবং তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর প্রতিও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর ভালবাসার সৃষ্টি হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রীকে পুরুষ হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ জন্যে তার প্রয়োজন ও কামভাব পুরুষের মধ্যেই রাখা হয়েছে। আর পুরুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি দ্বারা এ জন্যেই তার প্রয়োজন মাটিতেইঙ্খা হয়েছে। সুতরাং তোমরা স্বীয় স্ত্রীদেরকে রুদ্ধ রাখ। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ “স্ত্রীলোককে পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সবচেয়ে উঁচু পাঁজর হচ্ছে সবচেয়ে বেশী বক্র। সুতরাং তুমি যদি তাকে সম্পূর্ণ সোজা করার ইচ্ছে কর তবে তাকে ভেঙ্গে দেবে। আর যদি তার মধ্যে কিছু বক্রতা রেখে দিয়ে উপকার লাভ করতে চাও তবে অবশ্যই উপকার লাভ করতে পারবে।'অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘দু’জন হতে অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) হতে বহু নর ও নারী সৃষ্টি করতঃ দুনিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যাদের প্রকারে, বিশেষণে, রঙ্গে, আকারে এবং কথাবার্তায় বিভিন্নতা রয়েছে। এ সমস্ত যেমন পূর্বে আল্লাহ তাআলারই অধিকারে ছিল, তিনি তাদেরকে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ঠিক তেমনই এক সময়ে তিনি সকলকে একত্রিত করে পুনরায় নিজের দখলে নিয়ে নেবেন এবং একটি মাঠে জমা করবেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতে থাক, তার আনুগত্য ও ইবাদত করতে থাক। তোমরা সেই আল্লাহরই মাধ্যম দিয়ে তার নামেরই দোহাই দিয়ে একে অপরের নিকট তাগাদা করে থাক। যেমন কেউ বলে- আমি আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং আত্মীয়তাকে মনে করিয়ে দিয়ে তোমাকে এ কথা বলছি।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমরা তারই নামে শপথ করে থাক এবং অঙ্গীকার দৃঢ় করে থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় করতঃ আত্মীয়তার রক্ষণাবেক্ষণ করে, ওর বন্ধন ছিন্ন করো না, বরং যুক্ত রাখ। একে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার কর। একটি পঠনে (আরবী) ও রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর নামে এবং আত্মীয়তার মাধ্যমে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সমস্ত অবস্থা ও কার্যাবলীর সংবাদ রাখেন এবং তিনি খুব ভালভাবে তোমাদের তত্ত্বাবধান করতে রয়েছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী রয়েছেন।বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যে, যেন তুমি তাকে দেখছো, অথবা তুমি তাকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।' ভাবার্থ এই যে, তোমরা তাঁর প্রতি মনোযোগ দাও যিনি তোমাদের উঠায়, বসায়, চলায় ও ফেরায় তোমাদের রক্ষক হিসেবে রয়েছেন। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! একই বাপ-মায়ের মাধ্যমে তো তোমাদের জন্ম হয়েছে। সুতরাং তোমরা পরস্পরে একে অপরের প্রতি প্রেম-প্রীতি বজায় রেখো, দুর্বলদের সহায়তা কর এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার কর। সহীহ মুসলিমে একটি হাদীসে রয়েছে যে, মুযা’র ঘোত্র যখন নিজেদেরকে চাদরে আবৃত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে, কেননা, তাদের শরীরে কাপড় পর্যন্ত ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ যোহরের নামাযের পর দাঁড়িয়ে ভাষণ দান করেন, যাতে তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করতঃ নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেকেই যেন দেখে যে, সে আগামীকালের জন্যে কি সামনে পাঠিয়েছে?' (৫৯:১৮) অতঃপর তিনি জনগণকে দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহিত করেন। ফলে যে যা পারলেন ঐ লোকগুলোকে দান করলেন। স্বর্ণ মুদ্রা, রৌপ্য মুদ্রা, খেজুর, গম ইত্যাদি সব কিছুই দিলেন। মুসনাদ ও সুনানের মধ্যে অভাবের ভাষণের বর্ণনায় রয়েছে যে, পরে তিনি তিনটি আয়াত পাঠ করেন যার মধ্যে একটি এ আয়াতটিই।

আন-নিসা 4:2

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পিতৃহীনদের অভিভাবকগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন-পিতৃহীনেরা যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌছে ও বিবেকসম্পন্ন হয় তখন তাদেরকে তাদের মাল পুরোপুরি প্রদান করবে। কিছুমাত্র কম করবে না বা আত্মসাৎও করবে না। তাদের মালকে তোমাদের মালের সঙ্গে মিশ্রিত করে ভক্ষণ করার বাসনা অন্তরে পোষণ করো না। হালাল মাল যখন আল্লাহ পাক তোমাদেরকে প্রদান করেছেন-তখন হারামের দিকে যাবে কেন? তোমাদের ভাগ্যে যে অংশ লিপিবদ্ধ তা তোমরা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। তোমাদের হালাল মাল ছেড়ে দিয়ে অপরের মাল যা তোমাদের জন্যে হারাম তা কখনও গ্রহণ করো না। নিজেদের দুর্বল ও পাতলা পশুগুলো দিয়ে অপরের মোটাতাজাগুলো হস্তগত করো না। মন্দ দিয়ে ভাল নেয়ার চেষ্টা করো না। পূর্বে লোকেরা এরূপ করতো যে, তারা পিতৃহীনদের ছাগলের পাল হতে বেছে বেছে ভালগুলো নিয়ে নিজেদের দুর্বল ছাগলগুলো দিতো এবং এভাবে গণনা ঠিক রাখতো। মন্দ দিরহামগুলো তাদের মালে রেখে দিয়ে তাদের ভালগুলো নিয়ে নিতো। অতঃপর মনে করতো যে তারা ঠিকই করেছে। কেননা, ছাগলের পরিবর্তে ছাগল দিয়েছে এবং দিরহামের পরিবর্তে দিরহাম দিয়েছে। তারা পিতৃহীনদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়ে এ কৌশল করতো যে, এখন আর স্বাতন্ত্র কি আছে? তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তাদের সম্পদ নষ্ট করো না, কেননা, এটা বড় পাপ। একটি দুর্বল হাদীসেও আয়াতটির শেষ বাক্যের এ অর্থই বর্ণিত আছে।সুনান-ই-আবু দাউদের একটি দু'আতেও (আরবী) শব্দটি পাপের অর্থে এসেছে। হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) স্বীয় পত্মীকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘এক তালাক প্রদানে পাপ হবে। সুতরাং তিনি স্বীয় সংকল্প হতে বিরত থাকেন। অন্য বর্ণনায় এ ঘটনাটি হযরত আবূ তালহা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সুলায়েম (রাঃ)-এর ঘটনা বলে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘কোন পিতৃহীনা বালিকার লালন পালনের দায়িত্ব যদি তোমাদের উপর ন্যস্ত থাকে এবং তোমরা তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কর, কিন্তু যেহেতু তার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমরা এরূপ করো না যে, তাকে মোহর কম দিয়ে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করবে, বরং আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে তাদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দুটি, তিনটি এবং চারটিকে বিয়ে কর।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘একটি পিতৃহীনা বালিকা ছিল। তার মাল-ধনও ছিল এবং বাগানও ছিল। যে লোকটি তাকে লালন পালন করছিল সে। শুধুমাত্র তার মাল-ধনের লালসায় পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ না করেই তাকে বিয়ে করে নেয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমার ধারণা এই যে, ঐ বাগানে ও মালে এ বালিকাটির অংশ ছিল।'সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত ইবনে শিহাব (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে ভাগ্নে! এটা পিতৃহীনা বালিকার বর্ণনা, যে তার অভিভাবকের অধিকারে রয়েছে এবং তার মালে তার অংশ রয়েছে। আর সে বালিকার মাল ও সৌন্দর্য তার চোখে লেগেছে। সুতরাং সে তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু অন্য জায়গায় বালিকাটি যতটা মোহর ইত্যাদি পেতো ততটা সে দেয় না। সুতরাং সে অভিভাবককে নিষেধ করা হয়েছে যে, সে যেন সে বাসনা পরিত্যাগ করে এবং অন্যান্য স্ত্রীলোকদেরকে পছন্দমত বিয়ে করে নেয়। অতঃপর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ ব্যাপারেই প্রশ্ন করে এবং (আরবী) (৪:১৬৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তথায় বলা হয়-যখন পৃতিহীনা মেয়ের মাল ও সৌন্দর্য কম থাকে তখন তো অভিভাবক তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না, সুতরাং এর কোন কারণ নেই যে, তার মাল ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার পূর্ণ হক আদায় না করেই তাকে বিয়ে করে নেবে। হ্যাঁ, তবে ন্যায়ের সাথে যদি পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ করতঃ বিয়ে করে তবে কোন দোষ নেই। নচেৎ স্ত্রীলোকের কোন অভাব নেই। তাদের মধ্যে হতে যেন পছন্দ মত সে বিয়ে করে। ইচ্ছে করলে দু’টি, তিনটি এবং চারটি পর্যন্ত করতে পারে। অন্য জায়গাতেও এ শব্দগুলো এ অর্থেই এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ যে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা দূতরূপে প্রেরণ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন দুটি ডানা বিশিষ্ট, কেউ রয়েছেন তিনটি ডানা বিশিষ্ট এবং কেউ রয়েছেন চারটি ডানা বিশিষ্ট।'(৩৫:১) ফেরেশতাদের মধ্যে এর চেয়ে বেশী ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাও রয়েছেন। কেননা এটা দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু পুরুষের জন্যে এক সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ, যেমন এ আয়াতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং জমহুরের এটাই উক্তি। এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় অনুগ্রহ ও দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সুতরাং চারটের বেশীর উপর সমর্থন থাকলেও অবশ্যই তা বলতেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাকারী হাদীস শরীফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারও জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী একত্রিত করা বৈধ নয়।' এর উপরই উলামা-ই-কিরামের ইজমা হয়েছে। তবে কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টি পর্যন্ত একত্রিত করা বৈধ। বরং কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টির বেশী একত্রিত করলেও কোন দোষ নেই। তাদের মতে কোন সংখ্যাই নির্ধারিত নেই। তাদের দলীল হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজ। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, তার নয়জন পত্নী ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের মুআল্লাক হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারী এগার জন বলেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পনেরজন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তেরজনের সাথে তাঁর সহবাস হয়েছিল। একই সময়ে এগারজন পত্নী তার নিকট বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয়জন পত্নী রেখে ইন্তেকাল করেন। আমাদের পক্ষ হতে এর উত্তর এই যে, এটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই বৈধ ছিল। তাঁর উম্মতের জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই।এর প্রমাণ রূপে নিম্নের হাদীসগুলো পেশ করা যেতে পারেঃ (১) হযরত গায়লান ইবনে সালমা সাকাফী (রাঃ) যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিল। রাসূলুল্লাহ(সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার ইচ্ছেমত চারটি স্ত্রী রেখে বাকীগুলো পরিত্যাগ কর। তিনি তাই করেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি তাঁর ঐ স্ত্রীগুলোকেও তালাক দিয়ে দেন এবং স্বীয় ধন-সম্পদ স্বীয় ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত উমার (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে তাকে বলেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার শয়তান কথা চুরি করেছে এবং তোমার মনে এ ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছে যে, তুমি সত্বরই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। এজন্যেই তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছো যেন তারা তোমার সম্পত্তির অংশ না পায়। আর এ কারণেই তুমি তোমার সম্পদ তোমার ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছ। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে রাজমাত কর (ফিরিয়ে নাও) এবং তোমার ছেলেদের নিকট হতে মাল ফিরিয়ে নাও। যদি তুমি এ কাজ না কর তবে তোমার মৃত্যুর পর আমি তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকেও তোমার উত্তরাধিকারিণী বানিয়ে দেবো। কেননা, তুমি তাদেরকে এ ভয়েই তালাক দিয়েছে। আর মনে হচ্ছে যে, তোমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছে। যদি তুমি আমার কথা অমান্য কর তবে জেনে রেখো যে, আমি তোমার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করার জন্যে জনগণকে নির্দেশ প্রদান করবো, যেমন আবু রাগালের কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ, শাফিঈ, জামেউত তিরিমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, দারেকুতনী ইত্যাদি) মারফু হাদীস পর্যন্ত তো এসব কিতাবেই রয়েছে।তবে হযরত উমার (রাঃ)-এর ঘটনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে। কিন্তু এ অতিরিক্তটুকু হাসান। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে দুর্বল বলেছেন এবং এর ইসনাদের দ্বিতীয় ধারা বর্ণনা করার পর ঐ ধারাকে অরক্ষিত বলেছেন। কিন্তু এ ত্রুটি প্রদর্শনের ব্যাপারটাও চিন্তার বিষয়। সম্মানিত হাদীস বিশারদগণও এর উপর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত। হাদীসটির সমস্ত বর্ণনাকারীই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে নির্ভরযোগ্য। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ দশজন স্ত্রীও মুসলমান হয়েছিলেন। (সুনান-ই-নাসাঈ)এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হলো যে, একই সময়ে যদি চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা বৈধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গায়লান (রাঃ)-কে। দশজন স্ত্রীর মধ্যে যে কোন চারজনকে রেখে অবশিষ্ট ছয়জনকে তালাক দিতে বলতেন না, কেননা তারা সবাই ঈমান এনেছিলেন। এখানে এটাও স্মরণ রাখার কথা যে, গায়লান (রাঃ)-এর নিকট তো দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেনই, তথাপি তিনি ছয়জনকে পৃথক করিয়ে দিলেন, তাহলে নতুনভাবে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা কিরূপে সম্ভব হতে পারে? (২) সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজা ইত্যাদির মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত উমাইয়া আসাদী (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার আটটি স্ত্রী ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ ‘তোমার ইচ্ছেমত ওদের মধ্যে চারজনকে রাখ।' এর সনদ হাসান এবং এর সাক্ষীও রয়েছে। বর্ণনাকারীদের নামের হেরফের ইত্যাদি এরূপ বর্ণনায় ক্ষতিকর হয় না। (৩) মুসনাদ-ইশাফিঈর মধ্যে রয়েছে, হযরত নাওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার ৫টা স্ত্রী ছিল। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওদের মধ্যে পছন্দমত চারটিকে রাখ এবং একটিকে পৃথক করে দাও। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল এবং নিঃসন্তান ছিল তাকে আমি তালাক দিয়ে দেই। সুতরাং এ হাদীসগুলো হযরত গায়লানযুক্ত হাদীসের সাক্ষী, যেমন ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেছেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখতে না পারার ভয় থাকে তবে একটিকেই যথেষ্ট মনে কর বা দাসীদেরকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা ইচ্ছে করলেও স্ত্রীর মধ্যে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে না।'(৪:১২৯) এখানে এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, দাসীদের মধ্যে পালা করা ইত্যাদি ওয়জিব নয়, তবে মুস্তাহাব বটে। যে করে সে ভালই করে এবং যে না করে তারও কোন দোষ নেই। এর পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ কেউ কেউ বলেছেন, এটা তোমাদের দারিদ্র বেশী না হওয়ার অতি নিকটবর্তী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা দারিদ্রের ভয় কর। কোন আরব কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘দরিদ্র ব্যক্তি জানে না যে, সে কখন ধনী হবে এবং ধনী ব্যক্তিও জানে যে, সে কখন দরিদ্র হবে। যখন কোন ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন আরবের লোকেরা বলে থাকে (আরবী) অর্থাৎ লোকটি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। মোটকথা এ অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে এ তাফসীর খুব ভাল বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি আযাদ স্ত্রীলোকদের আধিক্য দারিদ্রের কারণ হতে পারে তবে দাসীদের আধ্যিকও দারিদ্রের কারণ হতে পারবে। সুতরাং জমহুরের উক্তি সত্যিই সঠিক যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তোমরা অত্যাচার হতে বেঁচে যাও এটা তারই অতি নিকটবর্তী।' আরবে বলা হয়- (আরবী) অর্থাৎ সে হুকুমের ব্যাপারে অত্যাচার করেছে। আবু তালিবের নিম্নের বিখ্যাত কাসিদায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এমন দাঁড়িপাল্লায় ওজন করছে যা এক যব পরিমাণও কম করে। তার নিকট স্বয়ং তার আত্মাই সাক্ষী রয়েছে যে অত্যাচারী নয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখনই কুফাবাসী হযরত উসমান (রাঃ)-কে প্রদত্ত এক চিঠিতে তাঁকে কিছু দোষারোপ করে তখন তার উত্তরে তিনি লিখেন, (আরবী) অর্থাৎ আমি অত্যাচারের দাড়ি-পাল্লা নই। সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতির মধ্যে একটি মারফু হাদীসে এ বাক্যের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা অত্যাচার করো না।'হযরত ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এর মারফু হওয়া ভুল কথা, তবে এটা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর উক্তি বটে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা, (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আবূ মালিক (রঃ), হযরত আবু যারীন (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), যাহ্হাক (রঃ), হযরত আতা খুরাসানী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রভৃতি হতেও এ অর্থ বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামাও (রাঃ) আবু তালিবের উক্ত কাসিদাটি পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি নিজেও এটাই পছন্দ করেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে খুশী মনে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও যা দিতে তোমরা স্বীকৃত হয়েছে। তবে যদি স্ত্রী ইচ্ছে প্রণোদিত হয়ে তার সমস্ত মোহর বা কিছু অংশ মাফ করে দেয় তবে তা করার তার অধিকার রয়েছে এবং সে অবস্থায় স্বামীর পক্ষে তা ভোগ করা বৈধ। নবী (সঃ)-এর পরে কারও জন্যে মোহর ওয়াজিব করা ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় এবং ফাকি দিয়ে শুধু নামমাত্র মোহর ধার্য করাও বৈধ নয়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রোগাক্রান্ত হয় তখন তার উচিত যে, সে যেন তার স্ত্রীর মালের তিন দিরহাম বা কিছু কম বেশী গ্রহণ করতঃ তা দিয়ে মধু ক্রয় করে এবং আকাশের বৃষ্টির পানি তার সাথে মিশ্রিত করে, তাহলে তিনটি মঙ্গল সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে স্ত্রীর মাল যাকে আল্লাহ পাক তৃপ্তি সহকারে খেতে বলেছেন, দ্বিতীয় হচ্ছে মধুর শিকা এবং তৃতীয় হচ্ছে কল্যাণময় বৃষ্টির পানি। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, মানুষ তাদের মেয়েদের মোহর নিজেরা গ্রহণ করতো। ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এ কাজ হতে বিরত রাখা হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) এ নির্দেশ শুনে জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি?' তিনি বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপরেই তাদের পরিবার সম্মত হয়ে যায়।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)রাসূলুল্লাহ (সঃ)! স্বীয় ভাষণে তিনবার বলেনঃ “তোমরা বিধবাদের বিয়ে দিয়ে দাও।' তখন একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি? তিনি বলেনঃ যার উপর তাদের পরিবারের লোক সম্মত হয়ে যাবে।' এ হাদীসের ইবনে সালমানী নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল, তা ছাড়া এতে ইনকিতাও রয়েছে।

আন-নিসা 4:3

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পিতৃহীনদের অভিভাবকগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন-পিতৃহীনেরা যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌছে ও বিবেকসম্পন্ন হয় তখন তাদেরকে তাদের মাল পুরোপুরি প্রদান করবে। কিছুমাত্র কম করবে না বা আত্মসাৎও করবে না। তাদের মালকে তোমাদের মালের সঙ্গে মিশ্রিত করে ভক্ষণ করার বাসনা অন্তরে পোষণ করো না। হালাল মাল যখন আল্লাহ পাক তোমাদেরকে প্রদান করেছেন-তখন হারামের দিকে যাবে কেন? তোমাদের ভাগ্যে যে অংশ লিপিবদ্ধ তা তোমরা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। তোমাদের হালাল মাল ছেড়ে দিয়ে অপরের মাল যা তোমাদের জন্যে হারাম তা কখনও গ্রহণ করো না। নিজেদের দুর্বল ও পাতলা পশুগুলো দিয়ে অপরের মোটাতাজাগুলো হস্তগত করো না। মন্দ দিয়ে ভাল নেয়ার চেষ্টা করো না। পূর্বে লোকেরা এরূপ করতো যে, তারা পিতৃহীনদের ছাগলের পাল হতে বেছে বেছে ভালগুলো নিয়ে নিজেদের দুর্বল ছাগলগুলো দিতো এবং এভাবে গণনা ঠিক রাখতো। মন্দ দিরহামগুলো তাদের মালে রেখে দিয়ে তাদের ভালগুলো নিয়ে নিতো। অতঃপর মনে করতো যে তারা ঠিকই করেছে। কেননা, ছাগলের পরিবর্তে ছাগল দিয়েছে এবং দিরহামের পরিবর্তে দিরহাম দিয়েছে। তারা পিতৃহীনদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়ে এ কৌশল করতো যে, এখন আর স্বাতন্ত্র কি আছে? তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তাদের সম্পদ নষ্ট করো না, কেননা, এটা বড় পাপ। একটি দুর্বল হাদীসেও আয়াতটির শেষ বাক্যের এ অর্থই বর্ণিত আছে।সুনান-ই-আবু দাউদের একটি দু'আতেও (আরবী) শব্দটি পাপের অর্থে এসেছে। হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) স্বীয় পত্মীকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘এক তালাক প্রদানে পাপ হবে। সুতরাং তিনি স্বীয় সংকল্প হতে বিরত থাকেন। অন্য বর্ণনায় এ ঘটনাটি হযরত আবূ তালহা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সুলায়েম (রাঃ)-এর ঘটনা বলে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘কোন পিতৃহীনা বালিকার লালন পালনের দায়িত্ব যদি তোমাদের উপর ন্যস্ত থাকে এবং তোমরা তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কর, কিন্তু যেহেতু তার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমরা এরূপ করো না যে, তাকে মোহর কম দিয়ে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করবে, বরং আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে তাদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দুটি, তিনটি এবং চারটিকে বিয়ে কর।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘একটি পিতৃহীনা বালিকা ছিল। তার মাল-ধনও ছিল এবং বাগানও ছিল। যে লোকটি তাকে লালন পালন করছিল সে। শুধুমাত্র তার মাল-ধনের লালসায় পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ না করেই তাকে বিয়ে করে নেয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমার ধারণা এই যে, ঐ বাগানে ও মালে এ বালিকাটির অংশ ছিল।'সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত ইবনে শিহাব (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে ভাগ্নে! এটা পিতৃহীনা বালিকার বর্ণনা, যে তার অভিভাবকের অধিকারে রয়েছে এবং তার মালে তার অংশ রয়েছে। আর সে বালিকার মাল ও সৌন্দর্য তার চোখে লেগেছে। সুতরাং সে তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু অন্য জায়গায় বালিকাটি যতটা মোহর ইত্যাদি পেতো ততটা সে দেয় না। সুতরাং সে অভিভাবককে নিষেধ করা হয়েছে যে, সে যেন সে বাসনা পরিত্যাগ করে এবং অন্যান্য স্ত্রীলোকদেরকে পছন্দমত বিয়ে করে নেয়। অতঃপর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ ব্যাপারেই প্রশ্ন করে এবং (আরবী) (৪:১৬৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তথায় বলা হয়-যখন পৃতিহীনা মেয়ের মাল ও সৌন্দর্য কম থাকে তখন তো অভিভাবক তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না, সুতরাং এর কোন কারণ নেই যে, তার মাল ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার পূর্ণ হক আদায় না করেই তাকে বিয়ে করে নেবে। হ্যাঁ, তবে ন্যায়ের সাথে যদি পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ করতঃ বিয়ে করে তবে কোন দোষ নেই। নচেৎ স্ত্রীলোকের কোন অভাব নেই। তাদের মধ্যে হতে যেন পছন্দ মত সে বিয়ে করে। ইচ্ছে করলে দু’টি, তিনটি এবং চারটি পর্যন্ত করতে পারে। অন্য জায়গাতেও এ শব্দগুলো এ অর্থেই এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ যে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা দূতরূপে প্রেরণ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন দুটি ডানা বিশিষ্ট, কেউ রয়েছেন তিনটি ডানা বিশিষ্ট এবং কেউ রয়েছেন চারটি ডানা বিশিষ্ট।'(৩৫:১) ফেরেশতাদের মধ্যে এর চেয়ে বেশী ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাও রয়েছেন। কেননা এটা দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু পুরুষের জন্যে এক সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ, যেমন এ আয়াতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং জমহুরের এটাই উক্তি। এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় অনুগ্রহ ও দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সুতরাং চারটের বেশীর উপর সমর্থন থাকলেও অবশ্যই তা বলতেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাকারী হাদীস শরীফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারও জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী একত্রিত করা বৈধ নয়।' এর উপরই উলামা-ই-কিরামের ইজমা হয়েছে। তবে কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টি পর্যন্ত একত্রিত করা বৈধ। বরং কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টির বেশী একত্রিত করলেও কোন দোষ নেই। তাদের মতে কোন সংখ্যাই নির্ধারিত নেই। তাদের দলীল হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজ। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, তার নয়জন পত্নী ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের মুআল্লাক হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারী এগার জন বলেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পনেরজন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তেরজনের সাথে তাঁর সহবাস হয়েছিল। একই সময়ে এগারজন পত্নী তার নিকট বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয়জন পত্নী রেখে ইন্তেকাল করেন। আমাদের পক্ষ হতে এর উত্তর এই যে, এটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই বৈধ ছিল। তাঁর উম্মতের জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই।এর প্রমাণ রূপে নিম্নের হাদীসগুলো পেশ করা যেতে পারেঃ (১) হযরত গায়লান ইবনে সালমা সাকাফী (রাঃ) যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিল। রাসূলুল্লাহ(সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার ইচ্ছেমত চারটি স্ত্রী রেখে বাকীগুলো পরিত্যাগ কর। তিনি তাই করেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি তাঁর ঐ স্ত্রীগুলোকেও তালাক দিয়ে দেন এবং স্বীয় ধন-সম্পদ স্বীয় ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত উমার (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে তাকে বলেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার শয়তান কথা চুরি করেছে এবং তোমার মনে এ ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছে যে, তুমি সত্বরই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। এজন্যেই তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছো যেন তারা তোমার সম্পত্তির অংশ না পায়। আর এ কারণেই তুমি তোমার সম্পদ তোমার ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছ। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে রাজমাত কর (ফিরিয়ে নাও) এবং তোমার ছেলেদের নিকট হতে মাল ফিরিয়ে নাও। যদি তুমি এ কাজ না কর তবে তোমার মৃত্যুর পর আমি তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকেও তোমার উত্তরাধিকারিণী বানিয়ে দেবো। কেননা, তুমি তাদেরকে এ ভয়েই তালাক দিয়েছে। আর মনে হচ্ছে যে, তোমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছে। যদি তুমি আমার কথা অমান্য কর তবে জেনে রেখো যে, আমি তোমার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করার জন্যে জনগণকে নির্দেশ প্রদান করবো, যেমন আবু রাগালের কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ, শাফিঈ, জামেউত তিরিমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, দারেকুতনী ইত্যাদি) মারফু হাদীস পর্যন্ত তো এসব কিতাবেই রয়েছে।তবে হযরত উমার (রাঃ)-এর ঘটনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে। কিন্তু এ অতিরিক্তটুকু হাসান। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে দুর্বল বলেছেন এবং এর ইসনাদের দ্বিতীয় ধারা বর্ণনা করার পর ঐ ধারাকে অরক্ষিত বলেছেন। কিন্তু এ ত্রুটি প্রদর্শনের ব্যাপারটাও চিন্তার বিষয়। সম্মানিত হাদীস বিশারদগণও এর উপর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত। হাদীসটির সমস্ত বর্ণনাকারীই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে নির্ভরযোগ্য। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ দশজন স্ত্রীও মুসলমান হয়েছিলেন। (সুনান-ই-নাসাঈ)এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হলো যে, একই সময়ে যদি চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা বৈধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গায়লান (রাঃ)-কে। দশজন স্ত্রীর মধ্যে যে কোন চারজনকে রেখে অবশিষ্ট ছয়জনকে তালাক দিতে বলতেন না, কেননা তারা সবাই ঈমান এনেছিলেন। এখানে এটাও স্মরণ রাখার কথা যে, গায়লান (রাঃ)-এর নিকট তো দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেনই, তথাপি তিনি ছয়জনকে পৃথক করিয়ে দিলেন, তাহলে নতুনভাবে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা কিরূপে সম্ভব হতে পারে? (২) সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজা ইত্যাদির মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত উমাইয়া আসাদী (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার আটটি স্ত্রী ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ ‘তোমার ইচ্ছেমত ওদের মধ্যে চারজনকে রাখ।' এর সনদ হাসান এবং এর সাক্ষীও রয়েছে। বর্ণনাকারীদের নামের হেরফের ইত্যাদি এরূপ বর্ণনায় ক্ষতিকর হয় না। (৩) মুসনাদ-ইশাফিঈর মধ্যে রয়েছে, হযরত নাওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার ৫টা স্ত্রী ছিল। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওদের মধ্যে পছন্দমত চারটিকে রাখ এবং একটিকে পৃথক করে দাও। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল এবং নিঃসন্তান ছিল তাকে আমি তালাক দিয়ে দেই। সুতরাং এ হাদীসগুলো হযরত গায়লানযুক্ত হাদীসের সাক্ষী, যেমন ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেছেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখতে না পারার ভয় থাকে তবে একটিকেই যথেষ্ট মনে কর বা দাসীদেরকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা ইচ্ছে করলেও স্ত্রীর মধ্যে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে না।'(৪:১২৯) এখানে এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, দাসীদের মধ্যে পালা করা ইত্যাদি ওয়জিব নয়, তবে মুস্তাহাব বটে। যে করে সে ভালই করে এবং যে না করে তারও কোন দোষ নেই। এর পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ কেউ কেউ বলেছেন, এটা তোমাদের দারিদ্র বেশী না হওয়ার অতি নিকটবর্তী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা দারিদ্রের ভয় কর। কোন আরব কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘দরিদ্র ব্যক্তি জানে না যে, সে কখন ধনী হবে এবং ধনী ব্যক্তিও জানে যে, সে কখন দরিদ্র হবে। যখন কোন ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন আরবের লোকেরা বলে থাকে (আরবী) অর্থাৎ লোকটি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। মোটকথা এ অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে এ তাফসীর খুব ভাল বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি আযাদ স্ত্রীলোকদের আধিক্য দারিদ্রের কারণ হতে পারে তবে দাসীদের আধ্যিকও দারিদ্রের কারণ হতে পারবে। সুতরাং জমহুরের উক্তি সত্যিই সঠিক যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তোমরা অত্যাচার হতে বেঁচে যাও এটা তারই অতি নিকটবর্তী।' আরবে বলা হয়- (আরবী) অর্থাৎ সে হুকুমের ব্যাপারে অত্যাচার করেছে। আবু তালিবের নিম্নের বিখ্যাত কাসিদায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এমন দাঁড়িপাল্লায় ওজন করছে যা এক যব পরিমাণও কম করে। তার নিকট স্বয়ং তার আত্মাই সাক্ষী রয়েছে যে অত্যাচারী নয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখনই কুফাবাসী হযরত উসমান (রাঃ)-কে প্রদত্ত এক চিঠিতে তাঁকে কিছু দোষারোপ করে তখন তার উত্তরে তিনি লিখেন, (আরবী) অর্থাৎ আমি অত্যাচারের দাড়ি-পাল্লা নই। সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতির মধ্যে একটি মারফু হাদীসে এ বাক্যের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা অত্যাচার করো না।'হযরত ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এর মারফু হওয়া ভুল কথা, তবে এটা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর উক্তি বটে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা, (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আবূ মালিক (রঃ), হযরত আবু যারীন (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), যাহ্হাক (রঃ), হযরত আতা খুরাসানী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রভৃতি হতেও এ অর্থ বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামাও (রাঃ) আবু তালিবের উক্ত কাসিদাটি পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি নিজেও এটাই পছন্দ করেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে খুশী মনে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও যা দিতে তোমরা স্বীকৃত হয়েছে। তবে যদি স্ত্রী ইচ্ছে প্রণোদিত হয়ে তার সমস্ত মোহর বা কিছু অংশ মাফ করে দেয় তবে তা করার তার অধিকার রয়েছে এবং সে অবস্থায় স্বামীর পক্ষে তা ভোগ করা বৈধ। নবী (সঃ)-এর পরে কারও জন্যে মোহর ওয়াজিব করা ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় এবং ফাকি দিয়ে শুধু নামমাত্র মোহর ধার্য করাও বৈধ নয়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রোগাক্রান্ত হয় তখন তার উচিত যে, সে যেন তার স্ত্রীর মালের তিন দিরহাম বা কিছু কম বেশী গ্রহণ করতঃ তা দিয়ে মধু ক্রয় করে এবং আকাশের বৃষ্টির পানি তার সাথে মিশ্রিত করে, তাহলে তিনটি মঙ্গল সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে স্ত্রীর মাল যাকে আল্লাহ পাক তৃপ্তি সহকারে খেতে বলেছেন, দ্বিতীয় হচ্ছে মধুর শিকা এবং তৃতীয় হচ্ছে কল্যাণময় বৃষ্টির পানি। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, মানুষ তাদের মেয়েদের মোহর নিজেরা গ্রহণ করতো। ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এ কাজ হতে বিরত রাখা হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) এ নির্দেশ শুনে জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি?' তিনি বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপরেই তাদের পরিবার সম্মত হয়ে যায়।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)রাসূলুল্লাহ (সঃ)! স্বীয় ভাষণে তিনবার বলেনঃ “তোমরা বিধবাদের বিয়ে দিয়ে দাও।' তখন একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি? তিনি বলেনঃ যার উপর তাদের পরিবারের লোক সম্মত হয়ে যাবে।' এ হাদীসের ইবনে সালমানী নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল, তা ছাড়া এতে ইনকিতাও রয়েছে।

আন-নিসা 4:4

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পিতৃহীনদের অভিভাবকগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন-পিতৃহীনেরা যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌছে ও বিবেকসম্পন্ন হয় তখন তাদেরকে তাদের মাল পুরোপুরি প্রদান করবে। কিছুমাত্র কম করবে না বা আত্মসাৎও করবে না। তাদের মালকে তোমাদের মালের সঙ্গে মিশ্রিত করে ভক্ষণ করার বাসনা অন্তরে পোষণ করো না। হালাল মাল যখন আল্লাহ পাক তোমাদেরকে প্রদান করেছেন-তখন হারামের দিকে যাবে কেন? তোমাদের ভাগ্যে যে অংশ লিপিবদ্ধ তা তোমরা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। তোমাদের হালাল মাল ছেড়ে দিয়ে অপরের মাল যা তোমাদের জন্যে হারাম তা কখনও গ্রহণ করো না। নিজেদের দুর্বল ও পাতলা পশুগুলো দিয়ে অপরের মোটাতাজাগুলো হস্তগত করো না। মন্দ দিয়ে ভাল নেয়ার চেষ্টা করো না। পূর্বে লোকেরা এরূপ করতো যে, তারা পিতৃহীনদের ছাগলের পাল হতে বেছে বেছে ভালগুলো নিয়ে নিজেদের দুর্বল ছাগলগুলো দিতো এবং এভাবে গণনা ঠিক রাখতো। মন্দ দিরহামগুলো তাদের মালে রেখে দিয়ে তাদের ভালগুলো নিয়ে নিতো। অতঃপর মনে করতো যে তারা ঠিকই করেছে। কেননা, ছাগলের পরিবর্তে ছাগল দিয়েছে এবং দিরহামের পরিবর্তে দিরহাম দিয়েছে। তারা পিতৃহীনদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়ে এ কৌশল করতো যে, এখন আর স্বাতন্ত্র কি আছে? তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তাদের সম্পদ নষ্ট করো না, কেননা, এটা বড় পাপ। একটি দুর্বল হাদীসেও আয়াতটির শেষ বাক্যের এ অর্থই বর্ণিত আছে।সুনান-ই-আবু দাউদের একটি দু'আতেও (আরবী) শব্দটি পাপের অর্থে এসেছে। হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) স্বীয় পত্মীকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘এক তালাক প্রদানে পাপ হবে। সুতরাং তিনি স্বীয় সংকল্প হতে বিরত থাকেন। অন্য বর্ণনায় এ ঘটনাটি হযরত আবূ তালহা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সুলায়েম (রাঃ)-এর ঘটনা বলে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘কোন পিতৃহীনা বালিকার লালন পালনের দায়িত্ব যদি তোমাদের উপর ন্যস্ত থাকে এবং তোমরা তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কর, কিন্তু যেহেতু তার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমরা এরূপ করো না যে, তাকে মোহর কম দিয়ে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করবে, বরং আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে তাদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দুটি, তিনটি এবং চারটিকে বিয়ে কর।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘একটি পিতৃহীনা বালিকা ছিল। তার মাল-ধনও ছিল এবং বাগানও ছিল। যে লোকটি তাকে লালন পালন করছিল সে। শুধুমাত্র তার মাল-ধনের লালসায় পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ না করেই তাকে বিয়ে করে নেয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমার ধারণা এই যে, ঐ বাগানে ও মালে এ বালিকাটির অংশ ছিল।'সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত ইবনে শিহাব (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে ভাগ্নে! এটা পিতৃহীনা বালিকার বর্ণনা, যে তার অভিভাবকের অধিকারে রয়েছে এবং তার মালে তার অংশ রয়েছে। আর সে বালিকার মাল ও সৌন্দর্য তার চোখে লেগেছে। সুতরাং সে তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু অন্য জায়গায় বালিকাটি যতটা মোহর ইত্যাদি পেতো ততটা সে দেয় না। সুতরাং সে অভিভাবককে নিষেধ করা হয়েছে যে, সে যেন সে বাসনা পরিত্যাগ করে এবং অন্যান্য স্ত্রীলোকদেরকে পছন্দমত বিয়ে করে নেয়। অতঃপর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ ব্যাপারেই প্রশ্ন করে এবং (আরবী) (৪:১৬৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তথায় বলা হয়-যখন পৃতিহীনা মেয়ের মাল ও সৌন্দর্য কম থাকে তখন তো অভিভাবক তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না, সুতরাং এর কোন কারণ নেই যে, তার মাল ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার পূর্ণ হক আদায় না করেই তাকে বিয়ে করে নেবে। হ্যাঁ, তবে ন্যায়ের সাথে যদি পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ করতঃ বিয়ে করে তবে কোন দোষ নেই। নচেৎ স্ত্রীলোকের কোন অভাব নেই। তাদের মধ্যে হতে যেন পছন্দ মত সে বিয়ে করে। ইচ্ছে করলে দু’টি, তিনটি এবং চারটি পর্যন্ত করতে পারে। অন্য জায়গাতেও এ শব্দগুলো এ অর্থেই এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ যে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা দূতরূপে প্রেরণ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন দুটি ডানা বিশিষ্ট, কেউ রয়েছেন তিনটি ডানা বিশিষ্ট এবং কেউ রয়েছেন চারটি ডানা বিশিষ্ট।'(৩৫:১) ফেরেশতাদের মধ্যে এর চেয়ে বেশী ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাও রয়েছেন। কেননা এটা দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু পুরুষের জন্যে এক সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ, যেমন এ আয়াতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং জমহুরের এটাই উক্তি। এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় অনুগ্রহ ও দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সুতরাং চারটের বেশীর উপর সমর্থন থাকলেও অবশ্যই তা বলতেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাকারী হাদীস শরীফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারও জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী একত্রিত করা বৈধ নয়।' এর উপরই উলামা-ই-কিরামের ইজমা হয়েছে। তবে কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টি পর্যন্ত একত্রিত করা বৈধ। বরং কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টির বেশী একত্রিত করলেও কোন দোষ নেই। তাদের মতে কোন সংখ্যাই নির্ধারিত নেই। তাদের দলীল হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজ। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, তার নয়জন পত্নী ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের মুআল্লাক হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারী এগার জন বলেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পনেরজন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তেরজনের সাথে তাঁর সহবাস হয়েছিল। একই সময়ে এগারজন পত্নী তার নিকট বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয়জন পত্নী রেখে ইন্তেকাল করেন। আমাদের পক্ষ হতে এর উত্তর এই যে, এটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই বৈধ ছিল। তাঁর উম্মতের জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই।এর প্রমাণ রূপে নিম্নের হাদীসগুলো পেশ করা যেতে পারেঃ (১) হযরত গায়লান ইবনে সালমা সাকাফী (রাঃ) যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিল। রাসূলুল্লাহ(সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার ইচ্ছেমত চারটি স্ত্রী রেখে বাকীগুলো পরিত্যাগ কর। তিনি তাই করেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি তাঁর ঐ স্ত্রীগুলোকেও তালাক দিয়ে দেন এবং স্বীয় ধন-সম্পদ স্বীয় ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত উমার (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে তাকে বলেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার শয়তান কথা চুরি করেছে এবং তোমার মনে এ ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছে যে, তুমি সত্বরই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। এজন্যেই তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছো যেন তারা তোমার সম্পত্তির অংশ না পায়। আর এ কারণেই তুমি তোমার সম্পদ তোমার ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছ। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে রাজমাত কর (ফিরিয়ে নাও) এবং তোমার ছেলেদের নিকট হতে মাল ফিরিয়ে নাও। যদি তুমি এ কাজ না কর তবে তোমার মৃত্যুর পর আমি তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকেও তোমার উত্তরাধিকারিণী বানিয়ে দেবো। কেননা, তুমি তাদেরকে এ ভয়েই তালাক দিয়েছে। আর মনে হচ্ছে যে, তোমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছে। যদি তুমি আমার কথা অমান্য কর তবে জেনে রেখো যে, আমি তোমার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করার জন্যে জনগণকে নির্দেশ প্রদান করবো, যেমন আবু রাগালের কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ, শাফিঈ, জামেউত তিরিমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, দারেকুতনী ইত্যাদি) মারফু হাদীস পর্যন্ত তো এসব কিতাবেই রয়েছে।তবে হযরত উমার (রাঃ)-এর ঘটনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে। কিন্তু এ অতিরিক্তটুকু হাসান। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে দুর্বল বলেছেন এবং এর ইসনাদের দ্বিতীয় ধারা বর্ণনা করার পর ঐ ধারাকে অরক্ষিত বলেছেন। কিন্তু এ ত্রুটি প্রদর্শনের ব্যাপারটাও চিন্তার বিষয়। সম্মানিত হাদীস বিশারদগণও এর উপর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত। হাদীসটির সমস্ত বর্ণনাকারীই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে নির্ভরযোগ্য। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ দশজন স্ত্রীও মুসলমান হয়েছিলেন। (সুনান-ই-নাসাঈ)এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হলো যে, একই সময়ে যদি চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা বৈধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গায়লান (রাঃ)-কে। দশজন স্ত্রীর মধ্যে যে কোন চারজনকে রেখে অবশিষ্ট ছয়জনকে তালাক দিতে বলতেন না, কেননা তারা সবাই ঈমান এনেছিলেন। এখানে এটাও স্মরণ রাখার কথা যে, গায়লান (রাঃ)-এর নিকট তো দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেনই, তথাপি তিনি ছয়জনকে পৃথক করিয়ে দিলেন, তাহলে নতুনভাবে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা কিরূপে সম্ভব হতে পারে? (২) সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজা ইত্যাদির মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত উমাইয়া আসাদী (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার আটটি স্ত্রী ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ ‘তোমার ইচ্ছেমত ওদের মধ্যে চারজনকে রাখ।' এর সনদ হাসান এবং এর সাক্ষীও রয়েছে। বর্ণনাকারীদের নামের হেরফের ইত্যাদি এরূপ বর্ণনায় ক্ষতিকর হয় না। (৩) মুসনাদ-ইশাফিঈর মধ্যে রয়েছে, হযরত নাওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার ৫টা স্ত্রী ছিল। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওদের মধ্যে পছন্দমত চারটিকে রাখ এবং একটিকে পৃথক করে দাও। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল এবং নিঃসন্তান ছিল তাকে আমি তালাক দিয়ে দেই। সুতরাং এ হাদীসগুলো হযরত গায়লানযুক্ত হাদীসের সাক্ষী, যেমন ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেছেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখতে না পারার ভয় থাকে তবে একটিকেই যথেষ্ট মনে কর বা দাসীদেরকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা ইচ্ছে করলেও স্ত্রীর মধ্যে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে না।'(৪:১২৯) এখানে এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, দাসীদের মধ্যে পালা করা ইত্যাদি ওয়জিব নয়, তবে মুস্তাহাব বটে। যে করে সে ভালই করে এবং যে না করে তারও কোন দোষ নেই। এর পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ কেউ কেউ বলেছেন, এটা তোমাদের দারিদ্র বেশী না হওয়ার অতি নিকটবর্তী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা দারিদ্রের ভয় কর। কোন আরব কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘দরিদ্র ব্যক্তি জানে না যে, সে কখন ধনী হবে এবং ধনী ব্যক্তিও জানে যে, সে কখন দরিদ্র হবে। যখন কোন ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন আরবের লোকেরা বলে থাকে (আরবী) অর্থাৎ লোকটি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। মোটকথা এ অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে এ তাফসীর খুব ভাল বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি আযাদ স্ত্রীলোকদের আধিক্য দারিদ্রের কারণ হতে পারে তবে দাসীদের আধ্যিকও দারিদ্রের কারণ হতে পারবে। সুতরাং জমহুরের উক্তি সত্যিই সঠিক যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তোমরা অত্যাচার হতে বেঁচে যাও এটা তারই অতি নিকটবর্তী।' আরবে বলা হয়- (আরবী) অর্থাৎ সে হুকুমের ব্যাপারে অত্যাচার করেছে। আবু তালিবের নিম্নের বিখ্যাত কাসিদায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এমন দাঁড়িপাল্লায় ওজন করছে যা এক যব পরিমাণও কম করে। তার নিকট স্বয়ং তার আত্মাই সাক্ষী রয়েছে যে অত্যাচারী নয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখনই কুফাবাসী হযরত উসমান (রাঃ)-কে প্রদত্ত এক চিঠিতে তাঁকে কিছু দোষারোপ করে তখন তার উত্তরে তিনি লিখেন, (আরবী) অর্থাৎ আমি অত্যাচারের দাড়ি-পাল্লা নই। সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতির মধ্যে একটি মারফু হাদীসে এ বাক্যের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা অত্যাচার করো না।'হযরত ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এর মারফু হওয়া ভুল কথা, তবে এটা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর উক্তি বটে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা, (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আবূ মালিক (রঃ), হযরত আবু যারীন (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), যাহ্হাক (রঃ), হযরত আতা খুরাসানী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রভৃতি হতেও এ অর্থ বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামাও (রাঃ) আবু তালিবের উক্ত কাসিদাটি পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি নিজেও এটাই পছন্দ করেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে খুশী মনে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও যা দিতে তোমরা স্বীকৃত হয়েছে। তবে যদি স্ত্রী ইচ্ছে প্রণোদিত হয়ে তার সমস্ত মোহর বা কিছু অংশ মাফ করে দেয় তবে তা করার তার অধিকার রয়েছে এবং সে অবস্থায় স্বামীর পক্ষে তা ভোগ করা বৈধ। নবী (সঃ)-এর পরে কারও জন্যে মোহর ওয়াজিব করা ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় এবং ফাকি দিয়ে শুধু নামমাত্র মোহর ধার্য করাও বৈধ নয়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রোগাক্রান্ত হয় তখন তার উচিত যে, সে যেন তার স্ত্রীর মালের তিন দিরহাম বা কিছু কম বেশী গ্রহণ করতঃ তা দিয়ে মধু ক্রয় করে এবং আকাশের বৃষ্টির পানি তার সাথে মিশ্রিত করে, তাহলে তিনটি মঙ্গল সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে স্ত্রীর মাল যাকে আল্লাহ পাক তৃপ্তি সহকারে খেতে বলেছেন, দ্বিতীয় হচ্ছে মধুর শিকা এবং তৃতীয় হচ্ছে কল্যাণময় বৃষ্টির পানি। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, মানুষ তাদের মেয়েদের মোহর নিজেরা গ্রহণ করতো। ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এ কাজ হতে বিরত রাখা হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) এ নির্দেশ শুনে জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি?' তিনি বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপরেই তাদের পরিবার সম্মত হয়ে যায়।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)রাসূলুল্লাহ (সঃ)! স্বীয় ভাষণে তিনবার বলেনঃ “তোমরা বিধবাদের বিয়ে দিয়ে দাও।' তখন একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি? তিনি বলেনঃ যার উপর তাদের পরিবারের লোক সম্মত হয়ে যাবে।' এ হাদীসের ইবনে সালমানী নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল, তা ছাড়া এতে ইনকিতাও রয়েছে।

আন-নিসা 4:5

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নির্বোধদেরকে তাদের মাল প্রদান না করে। মাল-ধন ব্যবসা ইত্যাদিতে খাটিয়ে আল্লাহ তা'আলা ওর দ্বারা মানুষের জীবন যাপনের উপায় করে দিয়েছেন, এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, অবোধদেরকে তাদের মাল খরচ করা হতে বিরত রাখা উচিত। যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে, পাগল, নির্বোধ এবং বেদ্বীন অন্যায়ভাবে স্বীয় মাল-ধন নিঃশেষে ব্যয় করে ফেলছে, তাদের এভাবে মাল খরচ করা হতে বাধা দিতে হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তির স্কন্ধে বহু ঋণের ভার চেপে গেছে, যে ঋণ সে তার সমস্ত মাল দিয়েও পরিশোধ করতে পারে না, যদি মহাজন সে সময়ের শাসনকর্তার নিকট আবেদন করে তবে শাসনকর্তা তার সমস্ত মাল হস্তগত করবেন এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে বেদখল করে দেবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীগণ, তদ্রুপ হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হাকাম ইবনে উয়াইনা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ স্ত্রী ও ছেলেমেয়েই বটে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে পিতৃহীনেরা। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে স্ত্রীগণ। সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বীয় স্বামীর আনুগত্য স্বীকার করে এরা ছাড়া নিশ্চয়ই স্ত্রীলোকেরা বুদ্ধিহীনা।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও এ হাদীসটি দীর্ঘতার সাথে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে দুষ্ট দাস। এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তাদেরকেও খাওয়াও, পরাও এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে, আল্লাহ পাক তোমার যে মালকে তোমার জীবন ধারণের উপায় করে দিয়েছেন তা তুমি তোমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে প্রদান করতঃ তাদের হাতের দিকে চেয়ে থেকো না। বরং তোমার মাল তুমি তোমার দখলেই রেখে ওকে ঠিক রাখ এবং তুমি স্বহস্তে তাদের খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কর।' হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেনঃ তিন প্রকারের লোক রয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে কিন্তু তাদের প্রার্থনা (আল্লাহ পাক) ককূল করেন না। প্রথম ঐ ব্যক্তি যার স্ত্রী দুষ্টা ও দুশ্চরিত্রা সত্ত্বেও সে তাকে তালাক প্রদান করে না। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে তার মাল নির্বোধদেরকে প্রদান করে থাকে, অথচ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-'তোমরা তোমাদের মাল নির্বোধদেরকে প্রদান করো না।' তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যার কারও উপরে ঋণ রয়েছে এবং সে ঐ ঋণের উপর কাউকে সাক্ষী রাখেনি।এরপরে বলা হচ্ছে- তাদেরকে ভাল কথা বল'। অর্থাৎ তাদের সাথে উত্তম ও নম্রভাবে ব্যবহার কর। এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, অভাবগ্রস্তদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা উচিত। যার নিজ হাতে খরচ করার অধিকার নেই তার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা করা ও খবরা-খবর লওয়া এবং নম্র ব্যবহার করা উচিত।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা পিতৃহীনদের দেখাশুনা কর যে পর্যন্ত না তারা যৌবনে পদার্পণ করে। এখানে- (আরবী) শব্দ দ্বারা প্রাপ্ত বয়স বুঝনো হয়েছে এবং প্রাপ্ত বয়সের পরিচয় তখনই পাওয়া যায় যখন এক বিশেষ প্রকারের স্বপ্ন দেখা যায় এবং এক বিশেষ প্রকারের পানি তীব্র বেগে বহির্গত হয়।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিটি ভালভাবেই স্মরণ আছেঃ স্বপ্নদোষের পর পিতৃহীনতাও নই এবং সারা দিনরাত নীরব থাকাও নেই। অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “তিন প্রকারের লোক হতে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। (১) শিশু, যে পর্যন্ত না সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়। (২) ঘুমন্ত ব্যক্তি, যে পর্যন্ত সে জেগে উঠে। (৩) পাগল ব্যক্তি, যে পর্যন্ত না তার জ্ঞান ফিরে আসে। সুতরাং প্রাপ্ত বয়সের নিদর্শন একতো হচ্ছে এই।দ্বিতীয় নিদর্শন কারও কারও মতে এই যে, যখন তার বয়স পনেরো বছর হবে। এর দলীল হচ্ছে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি, যাতে তিনি বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সঙ্গে নেননি। তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। খন্দকের যুদ্ধের সময় আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির করা হলে তিনি সম্মতন হন। সে সময় আমার বয়স ছিল পনেরো বছর। হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-এর নিকট এ হাদীসটি পৌছলে তিনি বলেনঃ ‘প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমা এটাই।'প্রাপ্ত বয়সের তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে নাভীর নীচে চুল গজান। এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন! দ্বিতীয় উক্তি এই যে, মুসলমানদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন নয় এবং তৃতীয় উক্তি এই যে, মুসলমানদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন নয় কিন্তু যিম্মীদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন। কেননা, এটা সম্ভাবনা রয়েছে যে, কোন ঔষধের কারণে এ চুল তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে এবং যুবক হওয়া মাত্রই যিম্মীদের উপর জিযিয়া কর ধার্য করা হয়। তাহলে তারা এটা ব্যবহার করতে লাগলো কেন? কিন্তু সঠিক কথা এই যে, সকলের পক্ষেই এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন। কেননা, প্রথমতঃ এটা প্রকৃতিগত ব্যাপার। প্রতিষেধকের সম্ভাবনা খুব দূরের সম্ভাবনা। প্রকৃত কথা এই যে, এ চুল স্বীয় সময়মতই বের হয়ে থাকে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে-মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসটি, যাতে হযরত আতিয়া যারাযীর (রাঃ) বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেনঃ ‘বানু কুরাইযার যুদ্ধের পর আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হাযির করা হয়। তিনি নির্দেশ দেনঃ এক ব্যক্তি দেখুক যে, বন্দীদের মধ্যে যাদের এ চুল বের হয়েছে তাদেরকে হত্যা করা হবে এবং যাদের বের হয়নি তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে।' সে সময় আমার এ চুল বের হয়নি বলে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সুনান-ই-আরবাআর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং ইমাম তিরিমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন।হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তের উপর বানু কুরাইযা গোত্র সম্মত হয়ে যুদ্ধ হতে বিরত হয়েছিল। অতঃপর হযরত সা'দ (রাঃ) এ ফায়সালা করেন যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হোক এবং শিশুদেরকে বন্দী করা হোক। ‘গারায়েবী আবি উবায়েদের মধ্যে রয়েছে যে, একটি ছেলে একটি যুবতী মেয়ের সম্পর্কে বলে, আমি তার সাথে ব্যভিচার করেছি। প্রকৃতপক্ষে এটা অপবাদ ছিল। হযরত উমার (রাঃ) তাকে অপবাদের হদ্দ গালাবার ইচ্ছে করেন। কিন্তু বলেনঃ তোমরা দেখ, যদি তার নাভীর নীচে চুল গজিয়ে থাকে তবে তার উপরে হদ্দ লাগাবে নচেৎ নয়। যখন দেখা যায় যে, তার সেই চুল গজায়নি তখন তার হদ্দ লাগানা বন্ধ রাখা হয়। অতঃপর আল্লাহ বলেন- যখন তোমরা দেখ যে, তাদের ধর্ম গ্রহণের সামর্থ এবং মাল রক্ষার যোগ্যতা হয়েছে তখন তাদের অভিভাবকদের কর্তব্য হবে তাদের মাল তাদেরকে সমর্পণ করা। প্রয়োজন ছাড়াই শুধুমাত্র এই ভয়ে যে, তারা বড় হওয়ামাত্রই তাদের মাল নিয়ে নেবে, কাজেই তার পূর্বেই তাদের মাল শেষ করে দেবে, খবরদার! এ কাজ করো না। যে ধনী হবে, নিজেরই খাওয়া পরার জিনিস যথেষ্ট থাকবে, তার তো কর্তব্য হবে তাদের মাল হতে কিছুই গ্রহণ না করা। মৃত জন্তু এবং প্রবাহিত রক্তের ন্যায় এ মাল তাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি অভিভাবক দরিদ্র হয় তাহলে অবশ্যই তাকে লালন-পালন করার পারিশ্রমিক হিসেবে সময়ের প্রয়োজন ও দেশ প্রথা অনুযায়ী তার মাল হতে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। সে নিজের প্রয়োজন দেখবে এবং পরিশ্রমও দেখবে। যদি প্রয়োজন পরিশ্রম অপেক্ষা কম হয় তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করবে। আর যদি পরিশ্রম প্রয়োজন অপেক্ষা কম হয় তবে পরিশ্রমের বিনিময় গ্রহণ করবে।অতঃপর এরূপ অভিভাবক যদি ধনী হয়ে যায় তবে তার সেই ভক্ষণকৃত ও গ্রহণকৃত মাল ফিরিয়ে দিতে হবে কি না সেই ব্যাপার দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি তো এই যে, ফিরিয়ে দিতে হবে না। কেননা, সে নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে তা গ্রহণ করেছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর সহচরদের মতে এটাই সঠিক। কেননা, আয়াতে বিনিময় ছাড়া তাদের মাল হতে খাওয়াকে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট কোন মাল নেই। একজন পিতৃহীনকে আমি লালন-পালন করছি। আমি তার আহার্যের মধ্য হতে কিছু খেতে পারি কি?' তিনি বলেনঃ হ্যা, তুমি পিতৃহীনের মাল নিজের কাজে লাগাতে পার, যদি প্রয়োজনের বেশী গ্রহণ না কর, জমা না কর এবং এটাও না কর যে, নিজের মাল বাঁচিয়ে রেখে তার মাল খেয়ে ফেল।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে এ রকমই বর্ণনা রয়েছে।ইবনে হিব্বান (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি পিতৃহীনকে ভদ্রতা শিখাবার জন্যে প্রয়োজন বশতঃ কোন জিনিস দিয়ে মারবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যা দিয়ে তুমি তোমার শিশুকে শাসন-গর্জন করে থাক। নিজের মাল বাঁচিয়ে তার মাল খরচ করো না, তার সম্পদ দ্বারা ধনবান হওয়ার চেষ্টা করো না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করে, আমার নিজের উট রয়েছে এবং আমার নিকট যে পিতৃহীন প্রতিপালিত হচ্ছে তারও উট রয়েছে। আমি আমার উষ্ট্রগুলো দরিদ্রদেরকে দুধ পান করার জন্যে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়ে থাকি। ঐ ইয়াতিমদের উষ্ট্রগুলোর দুধ পান করা কি আমার জন্যে বৈধ হবে?তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘ঐ ইয়ামতিমদের হারান উটগুলো যদি খুঁজে আন, ওগুলোর খড় পানির ব্যবস্থার কর, ওদের হাউজগুলো ঠিক করে থাক, ঐগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কর তবে অবশ্যই তুমি ওগুলোর দুধ দ্বারা উপকার লাভ করতে পারবে। তবে এভাবে যে, যেন ঐ শিশুদের কোন ক্ষতি না হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্তও নেবে না।' (মুআত্তা-ই-ইমাম মালিক) হযরত আতা ইবনে আবু রিবাহ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতিয়া আওফী (রঃ) এবং হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, অস্বচ্ছলতা দূর হয়ে যাওয়ার পর ইয়াতিমের মাল হতে ভক্ষিত ও গৃহীত জিনিস তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কেননা, মূলে তো তা নিষিদ্ধ। কোন কারণ বশতঃ বৈধ হয়েছিল মাত্র। ঐ কারণ যখন দূর হয়ে গেল তখন তার বিনিময় দিতে হবে। যেমন কেউ নিঃসহায় ও নিরূপায় হয়ে অপরের মাল ভক্ষণ করলো। অতঃপর প্রয়োজন মিটে যাবার পর যদি সুসময় ফিরে আসে তবে সেই ভক্ষিত মাল তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় দলীল এই যে, হযরত উমার (রাঃ) যখন খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হন তখন ঘোষণা করেনঃ এখানে আমার জীবনোপায় পিতৃহীনের অভিভাবকের জীবনোপায়ের মতই। আমার প্রয়োজন না হলে বায়তুল মাল হতে আমি কিছুই গ্রহণ করবো না। আর যদি অভাব হয়ে পড়ে তবে ঋণস্বরূপ গ্রহণ করবো। যখন স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে তখন ফিরিয়ে দেবো।' (ইবনে আবিদ দুনিয়া) এ হাদীসটি হযরত সাঈদ ইবনে মানসুরও (রঃ) বর্ণনা করেছেন, এর ইসনাদ সহীহ। বায়হাকীর হাদীসের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের বাক্যটির তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, ঋণরূপে ভক্ষণ করবে। অন্যান্য মুফাসসিরগণ হতেও এটা বর্ণিত আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গতভাবে খাবার ভাবার্থ এই যে, তিন অঙ্গুলী দ্বারা খাবে। অন্য বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, সে নিজেরই মালকে শুধু নিজের প্রয়োজন পুরো হবার উপযাগীরূপেই খরচ করবে যাতে তার ইয়াতিমের মাল খরচ করার প্রয়োজনই না হয়। হযরত আমের শাবী (রঃ) বলেনঃ যদি এমনই নিরূপায় অবস্থা হয় যাতে মৃতদেহ ভক্ষণ হালাল হয়ে থাকে তবে অবশ্যই খাবে (ইয়াতিমের মাল) কিন্তু পরে তা পরিশোধ করতে হবে। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী (রঃ) এবং হযরত রাবীআ (রঃ) হতে এর তাফসীর নিম্নরূপ বর্ণিত আছে-‘যদি ইয়াতিম দরিদ্র হয় তবে তার অভিভাবক তাকে তার প্রয়োজন অনুপাতে প্রদান করবে এবং তার অভিভাবক কিছুই পাবে না।' রচনায় কিন্তু এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। কিন্তু পূর্বে রয়েছে যে, যে ধনী হবে সে বিরত থাকবে। অর্থাৎ যে অভিভাবক ধনবান হবে সে ইয়াতিমের মাল গ্রহণ করা হতে বিরত থাকবে। তাহলে এখানেও এ ভাবার্থই হবে যে, যে অভিভাবক দরিদ্র হবে’ এ অর্থ নয়। অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা পিতৃহীনের মালের নিকটও যেওনা, কিন্তু শুদ্ধকরণের নিমিত্ত যেতে পার, অতঃপর যদি তোমাদের প্রয়োজন হয় তবে প্রয়োজনানুপাতে সংগতভাবে ওর মধ্য হতে খাও। (১৭:৩৪)।এরপর অভিভাবকদেরকে বলা হচ্ছে-যখন তারা প্রাপ্ত বয়সে পৌছে যাবে এবং তোমরা তাদের মধ্যে বিবেচনা জ্ঞান লক্ষ্য করবে তখন সাক্ষী রেখে তাদের মাল তাদেরকে সমর্পণ করবে, যেন অস্বীকার করার সুযোগই না আসে। প্রকৃতপক্ষে সত্য সাক্ষী, পূর্ণ রক্ষক এবং সূক্ষ হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহ তা'আলাই রয়েছেন, ইয়াতিমের মালের ব্যাপারে অভিভাবকের নিয়ত কি ছিল তা তিনি খুব ভালই জানেন।অভিভাবক নিজেই হয়তো বা ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করেছে, ধ্বংস করেছে এবং মিথ্যা হিসেব লিখে রেখেছে, কিংবা হয়তো সৎ নিয়তের অধিকারী অভিভাবক ইয়াতিমের মাল পুরোপুরি রক্ষা করেছে এবং সঠিক হিসেব রেখেছে, এসব সংবাদ সেই সবজান্তা এবং মহান রক্ষক আল্লাহ তা'আলার অবশ্যই জানা রয়েছে।সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু যার! আমি তোমাকে দুর্বল ও শক্তিহীন দেখছি এবং আমি নিজের জন্যে যা পছন্দ করি তোমার জন্যে তা পছন্দ করি। সাবধান! কখনই তুমি দু ব্যক্তিরও নেতা বা আমীর নির্বাচিত হয়ো না এবং কখনও কোন ইয়াতিমের মালের অভিভাবক নিযুক্ত হয়ো না।

আন-নিসা 4:6

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নির্বোধদেরকে তাদের মাল প্রদান না করে। মাল-ধন ব্যবসা ইত্যাদিতে খাটিয়ে আল্লাহ তা'আলা ওর দ্বারা মানুষের জীবন যাপনের উপায় করে দিয়েছেন, এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, অবোধদেরকে তাদের মাল খরচ করা হতে বিরত রাখা উচিত। যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে, পাগল, নির্বোধ এবং বেদ্বীন অন্যায়ভাবে স্বীয় মাল-ধন নিঃশেষে ব্যয় করে ফেলছে, তাদের এভাবে মাল খরচ করা হতে বাধা দিতে হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তির স্কন্ধে বহু ঋণের ভার চেপে গেছে, যে ঋণ সে তার সমস্ত মাল দিয়েও পরিশোধ করতে পারে না, যদি মহাজন সে সময়ের শাসনকর্তার নিকট আবেদন করে তবে শাসনকর্তা তার সমস্ত মাল হস্তগত করবেন এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে বেদখল করে দেবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীগণ, তদ্রুপ হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত হাকাম ইবনে উয়াইনা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত যহহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ স্ত্রী ও ছেলেমেয়েই বটে। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে পিতৃহীনেরা। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে স্ত্রীগণ। সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বীয় স্বামীর আনুগত্য স্বীকার করে এরা ছাড়া নিশ্চয়ই স্ত্রীলোকেরা বুদ্ধিহীনা।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও এ হাদীসটি দীর্ঘতার সাথে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে দুষ্ট দাস। এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তাদেরকেও খাওয়াও, পরাও এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে, আল্লাহ পাক তোমার যে মালকে তোমার জীবন ধারণের উপায় করে দিয়েছেন তা তুমি তোমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে প্রদান করতঃ তাদের হাতের দিকে চেয়ে থেকো না। বরং তোমার মাল তুমি তোমার দখলেই রেখে ওকে ঠিক রাখ এবং তুমি স্বহস্তে তাদের খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কর।' হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেনঃ তিন প্রকারের লোক রয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে কিন্তু তাদের প্রার্থনা (আল্লাহ পাক) ককূল করেন না। প্রথম ঐ ব্যক্তি যার স্ত্রী দুষ্টা ও দুশ্চরিত্রা সত্ত্বেও সে তাকে তালাক প্রদান করে না। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে তার মাল নির্বোধদেরকে প্রদান করে থাকে, অথচ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-'তোমরা তোমাদের মাল নির্বোধদেরকে প্রদান করো না।' তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যার কারও উপরে ঋণ রয়েছে এবং সে ঐ ঋণের উপর কাউকে সাক্ষী রাখেনি।এরপরে বলা হচ্ছে- তাদেরকে ভাল কথা বল'। অর্থাৎ তাদের সাথে উত্তম ও নম্রভাবে ব্যবহার কর। এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, অভাবগ্রস্তদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা উচিত। যার নিজ হাতে খরচ করার অধিকার নেই তার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা করা ও খবরা-খবর লওয়া এবং নম্র ব্যবহার করা উচিত।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা পিতৃহীনদের দেখাশুনা কর যে পর্যন্ত না তারা যৌবনে পদার্পণ করে। এখানে- (আরবী) শব্দ দ্বারা প্রাপ্ত বয়স বুঝনো হয়েছে এবং প্রাপ্ত বয়সের পরিচয় তখনই পাওয়া যায় যখন এক বিশেষ প্রকারের স্বপ্ন দেখা যায় এবং এক বিশেষ প্রকারের পানি তীব্র বেগে বহির্গত হয়।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিটি ভালভাবেই স্মরণ আছেঃ স্বপ্নদোষের পর পিতৃহীনতাও নই এবং সারা দিনরাত নীরব থাকাও নেই। অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “তিন প্রকারের লোক হতে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। (১) শিশু, যে পর্যন্ত না সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়। (২) ঘুমন্ত ব্যক্তি, যে পর্যন্ত সে জেগে উঠে। (৩) পাগল ব্যক্তি, যে পর্যন্ত না তার জ্ঞান ফিরে আসে। সুতরাং প্রাপ্ত বয়সের নিদর্শন একতো হচ্ছে এই।দ্বিতীয় নিদর্শন কারও কারও মতে এই যে, যখন তার বয়স পনেরো বছর হবে। এর দলীল হচ্ছে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি, যাতে তিনি বলেনঃ “উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সঙ্গে নেননি। তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। খন্দকের যুদ্ধের সময় আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির করা হলে তিনি সম্মতন হন। সে সময় আমার বয়স ছিল পনেরো বছর। হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-এর নিকট এ হাদীসটি পৌছলে তিনি বলেনঃ ‘প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমা এটাই।'প্রাপ্ত বয়সের তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে নাভীর নীচে চুল গজান। এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন! দ্বিতীয় উক্তি এই যে, মুসলমানদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন নয় এবং তৃতীয় উক্তি এই যে, মুসলমানদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন নয় কিন্তু যিম্মীদের মধ্যে এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন। কেননা, এটা সম্ভাবনা রয়েছে যে, কোন ঔষধের কারণে এ চুল তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে এবং যুবক হওয়া মাত্রই যিম্মীদের উপর জিযিয়া কর ধার্য করা হয়। তাহলে তারা এটা ব্যবহার করতে লাগলো কেন? কিন্তু সঠিক কথা এই যে, সকলের পক্ষেই এটা প্রাপ্ত বয়সের চিহ্ন। কেননা, প্রথমতঃ এটা প্রকৃতিগত ব্যাপার। প্রতিষেধকের সম্ভাবনা খুব দূরের সম্ভাবনা। প্রকৃত কথা এই যে, এ চুল স্বীয় সময়মতই বের হয়ে থাকে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে-মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসটি, যাতে হযরত আতিয়া যারাযীর (রাঃ) বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেনঃ ‘বানু কুরাইযার যুদ্ধের পর আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হাযির করা হয়। তিনি নির্দেশ দেনঃ এক ব্যক্তি দেখুক যে, বন্দীদের মধ্যে যাদের এ চুল বের হয়েছে তাদেরকে হত্যা করা হবে এবং যাদের বের হয়নি তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে।' সে সময় আমার এ চুল বের হয়নি বলে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সুনান-ই-আরবাআর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং ইমাম তিরিমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন।হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তের উপর বানু কুরাইযা গোত্র সম্মত হয়ে যুদ্ধ হতে বিরত হয়েছিল। অতঃপর হযরত সা'দ (রাঃ) এ ফায়সালা করেন যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হোক এবং শিশুদেরকে বন্দী করা হোক। ‘গারায়েবী আবি উবায়েদের মধ্যে রয়েছে যে, একটি ছেলে একটি যুবতী মেয়ের সম্পর্কে বলে, আমি তার সাথে ব্যভিচার করেছি। প্রকৃতপক্ষে এটা অপবাদ ছিল। হযরত উমার (রাঃ) তাকে অপবাদের হদ্দ গালাবার ইচ্ছে করেন। কিন্তু বলেনঃ তোমরা দেখ, যদি তার নাভীর নীচে চুল গজিয়ে থাকে তবে তার উপরে হদ্দ লাগাবে নচেৎ নয়। যখন দেখা যায় যে, তার সেই চুল গজায়নি তখন তার হদ্দ লাগানা বন্ধ রাখা হয়। অতঃপর আল্লাহ বলেন- যখন তোমরা দেখ যে, তাদের ধর্ম গ্রহণের সামর্থ এবং মাল রক্ষার যোগ্যতা হয়েছে তখন তাদের অভিভাবকদের কর্তব্য হবে তাদের মাল তাদেরকে সমর্পণ করা। প্রয়োজন ছাড়াই শুধুমাত্র এই ভয়ে যে, তারা বড় হওয়ামাত্রই তাদের মাল নিয়ে নেবে, কাজেই তার পূর্বেই তাদের মাল শেষ করে দেবে, খবরদার! এ কাজ করো না। যে ধনী হবে, নিজেরই খাওয়া পরার জিনিস যথেষ্ট থাকবে, তার তো কর্তব্য হবে তাদের মাল হতে কিছুই গ্রহণ না করা। মৃত জন্তু এবং প্রবাহিত রক্তের ন্যায় এ মাল তাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি অভিভাবক দরিদ্র হয় তাহলে অবশ্যই তাকে লালন-পালন করার পারিশ্রমিক হিসেবে সময়ের প্রয়োজন ও দেশ প্রথা অনুযায়ী তার মাল হতে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। সে নিজের প্রয়োজন দেখবে এবং পরিশ্রমও দেখবে। যদি প্রয়োজন পরিশ্রম অপেক্ষা কম হয় তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করবে। আর যদি পরিশ্রম প্রয়োজন অপেক্ষা কম হয় তবে পরিশ্রমের বিনিময় গ্রহণ করবে।অতঃপর এরূপ অভিভাবক যদি ধনী হয়ে যায় তবে তার সেই ভক্ষণকৃত ও গ্রহণকৃত মাল ফিরিয়ে দিতে হবে কি না সেই ব্যাপার দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি তো এই যে, ফিরিয়ে দিতে হবে না। কেননা, সে নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে তা গ্রহণ করেছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর সহচরদের মতে এটাই সঠিক। কেননা, আয়াতে বিনিময় ছাড়া তাদের মাল হতে খাওয়াকে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট কোন মাল নেই। একজন পিতৃহীনকে আমি লালন-পালন করছি। আমি তার আহার্যের মধ্য হতে কিছু খেতে পারি কি?' তিনি বলেনঃ হ্যা, তুমি পিতৃহীনের মাল নিজের কাজে লাগাতে পার, যদি প্রয়োজনের বেশী গ্রহণ না কর, জমা না কর এবং এটাও না কর যে, নিজের মাল বাঁচিয়ে রেখে তার মাল খেয়ে ফেল।' মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে এ রকমই বর্ণনা রয়েছে।ইবনে হিব্বান (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি পিতৃহীনকে ভদ্রতা শিখাবার জন্যে প্রয়োজন বশতঃ কোন জিনিস দিয়ে মারবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যা দিয়ে তুমি তোমার শিশুকে শাসন-গর্জন করে থাক। নিজের মাল বাঁচিয়ে তার মাল খরচ করো না, তার সম্পদ দ্বারা ধনবান হওয়ার চেষ্টা করো না।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করে, আমার নিজের উট রয়েছে এবং আমার নিকট যে পিতৃহীন প্রতিপালিত হচ্ছে তারও উট রয়েছে। আমি আমার উষ্ট্রগুলো দরিদ্রদেরকে দুধ পান করার জন্যে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়ে থাকি। ঐ ইয়াতিমদের উষ্ট্রগুলোর দুধ পান করা কি আমার জন্যে বৈধ হবে?তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘ঐ ইয়ামতিমদের হারান উটগুলো যদি খুঁজে আন, ওগুলোর খড় পানির ব্যবস্থার কর, ওদের হাউজগুলো ঠিক করে থাক, ঐগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কর তবে অবশ্যই তুমি ওগুলোর দুধ দ্বারা উপকার লাভ করতে পারবে। তবে এভাবে যে, যেন ঐ শিশুদের কোন ক্ষতি না হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্তও নেবে না।' (মুআত্তা-ই-ইমাম মালিক) হযরত আতা ইবনে আবু রিবাহ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতিয়া আওফী (রঃ) এবং হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, অস্বচ্ছলতা দূর হয়ে যাওয়ার পর ইয়াতিমের মাল হতে ভক্ষিত ও গৃহীত জিনিস তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কেননা, মূলে তো তা নিষিদ্ধ। কোন কারণ বশতঃ বৈধ হয়েছিল মাত্র। ঐ কারণ যখন দূর হয়ে গেল তখন তার বিনিময় দিতে হবে। যেমন কেউ নিঃসহায় ও নিরূপায় হয়ে অপরের মাল ভক্ষণ করলো। অতঃপর প্রয়োজন মিটে যাবার পর যদি সুসময় ফিরে আসে তবে সেই ভক্ষিত মাল তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় দলীল এই যে, হযরত উমার (রাঃ) যখন খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হন তখন ঘোষণা করেনঃ এখানে আমার জীবনোপায় পিতৃহীনের অভিভাবকের জীবনোপায়ের মতই। আমার প্রয়োজন না হলে বায়তুল মাল হতে আমি কিছুই গ্রহণ করবো না। আর যদি অভাব হয়ে পড়ে তবে ঋণস্বরূপ গ্রহণ করবো। যখন স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে তখন ফিরিয়ে দেবো।' (ইবনে আবিদ দুনিয়া) এ হাদীসটি হযরত সাঈদ ইবনে মানসুরও (রঃ) বর্ণনা করেছেন, এর ইসনাদ সহীহ। বায়হাকীর হাদীসের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের বাক্যটির তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, ঋণরূপে ভক্ষণ করবে। অন্যান্য মুফাসসিরগণ হতেও এটা বর্ণিত আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘সঙ্গতভাবে খাবার ভাবার্থ এই যে, তিন অঙ্গুলী দ্বারা খাবে। অন্য বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, সে নিজেরই মালকে শুধু নিজের প্রয়োজন পুরো হবার উপযাগীরূপেই খরচ করবে যাতে তার ইয়াতিমের মাল খরচ করার প্রয়োজনই না হয়। হযরত আমের শাবী (রঃ) বলেনঃ যদি এমনই নিরূপায় অবস্থা হয় যাতে মৃতদেহ ভক্ষণ হালাল হয়ে থাকে তবে অবশ্যই খাবে (ইয়াতিমের মাল) কিন্তু পরে তা পরিশোধ করতে হবে। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী (রঃ) এবং হযরত রাবীআ (রঃ) হতে এর তাফসীর নিম্নরূপ বর্ণিত আছে-‘যদি ইয়াতিম দরিদ্র হয় তবে তার অভিভাবক তাকে তার প্রয়োজন অনুপাতে প্রদান করবে এবং তার অভিভাবক কিছুই পাবে না।' রচনায় কিন্তু এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। কিন্তু পূর্বে রয়েছে যে, যে ধনী হবে সে বিরত থাকবে। অর্থাৎ যে অভিভাবক ধনবান হবে সে ইয়াতিমের মাল গ্রহণ করা হতে বিরত থাকবে। তাহলে এখানেও এ ভাবার্থই হবে যে, যে অভিভাবক দরিদ্র হবে’ এ অর্থ নয়। অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা পিতৃহীনের মালের নিকটও যেওনা, কিন্তু শুদ্ধকরণের নিমিত্ত যেতে পার, অতঃপর যদি তোমাদের প্রয়োজন হয় তবে প্রয়োজনানুপাতে সংগতভাবে ওর মধ্য হতে খাও। (১৭:৩৪)।এরপর অভিভাবকদেরকে বলা হচ্ছে-যখন তারা প্রাপ্ত বয়সে পৌছে যাবে এবং তোমরা তাদের মধ্যে বিবেচনা জ্ঞান লক্ষ্য করবে তখন সাক্ষী রেখে তাদের মাল তাদেরকে সমর্পণ করবে, যেন অস্বীকার করার সুযোগই না আসে। প্রকৃতপক্ষে সত্য সাক্ষী, পূর্ণ রক্ষক এবং সূক্ষ হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহ তা'আলাই রয়েছেন, ইয়াতিমের মালের ব্যাপারে অভিভাবকের নিয়ত কি ছিল তা তিনি খুব ভালই জানেন।অভিভাবক নিজেই হয়তো বা ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করেছে, ধ্বংস করেছে এবং মিথ্যা হিসেব লিখে রেখেছে, কিংবা হয়তো সৎ নিয়তের অধিকারী অভিভাবক ইয়াতিমের মাল পুরোপুরি রক্ষা করেছে এবং সঠিক হিসেব রেখেছে, এসব সংবাদ সেই সবজান্তা এবং মহান রক্ষক আল্লাহ তা'আলার অবশ্যই জানা রয়েছে।সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু যার! আমি তোমাকে দুর্বল ও শক্তিহীন দেখছি এবং আমি নিজের জন্যে যা পছন্দ করি তোমার জন্যে তা পছন্দ করি। সাবধান! কখনই তুমি দু ব্যক্তিরও নেতা বা আমীর নির্বাচিত হয়ো না এবং কখনও কোন ইয়াতিমের মালের অভিভাবক নিযুক্ত হয়ো না।

আন-নিসা 4:7

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরদের প্রথা ছিল এই যে, কেউ মারা গেলে তার বড় সন্তানেরা তার সমস্ত মাল পেয়ে যেতো। তার ছোট সন্তানেরা ও স্ত্রীরা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতো। ইসলাম এ নির্দেশ জারী করে সবারই জন্যে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বলা হয় যে, উত্তরাধিকারী সবাই হবে, প্রকৃত আত্মীয়তাই হোক বা বিবাহ বন্ধনের কারণেই হোক বা আযাদী সম্পর্কীয় কারণেই হোক না কেন, অংশ সবাই পাবে- অংশ কমই হোক আর বেশীই হোক।হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কাজ্জাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার দুটি ছেলে আছে। তাদের পিতা মারা গেছে এবং তাদের নিকট কিছুই নেই। এ হাদীসটি অন্য শব্দে উত্তরাধিকারের অন্য দু’টি আয়াতের তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসবে। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- যখন কোন মৃত ব্যক্তির মীরাস বন্টন হতে থাকবে, সে সময় যদি তার কোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ও এসে পড়ে যার কোন অংশ নেই এবং ইয়াতিম ও মিসকীনেরাও এসে যায় তবে তাদেরকেও কিছু কিছু প্রদান কর।'ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো এটা ওয়াজিব ছিল এবং কারও কারও মতে এটা মুসতাহাব ছিল, আর এখনও এ হুকুম বাকী আছে কি না সে বিষয়ে দুটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এ হুকুম এখনও বাকী আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আৰূ মূসা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত শাবী (রঃ) , হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত মাকল (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতা’ ইবনে আবি রিবাহ্ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআম্মারও (রঃ) একথাই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়া এসব পণ্ডিত এ হুকুমকে ওয়াজিব বলেছেন। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) এক অসিয়তের অভিভাবকত্ব করেন। তিনি একটি ছাগী যবেহ করেন এবং ঐ তিন প্রকারের লোককে ডেকে ভোজন করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘এ আয়াতটি না থাকলে এটাও আমার মালই ছিল।' হযরত উরওয়া (রাঃ) হযরত মুসআব (রাঃ)-এর মাল বন্টনের সময়েও এটা প্রদান করেন। হযরত যুহরীরও রঃ) উক্তি এই যে, এ আয়াতটি মুহকাম'- মানসুখ নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা অসিয়তের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ)-এর ইন্তিকালের পর যখন তার ছেলে হযরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার মীরাস বন্টন করেন তখন তিনি পরিবারের সকল মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করেন এবং এ আয়াতটিই পাঠ করেন। আর সে সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “তিনি ঠিক করেননি। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এটা তখনই কার্যকরী হবে যখন মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি রহিতই হয়ে গেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত এবং একে রহিতকারী হচ্ছে (আরবী)-এ আয়াতটি। অংশ নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে এ নির্দেশ ছিল। অতঃপর হকদারকে যখন আল্লাহ পাক হক পৌছিয়ে দেন তখন সাদকা শুধু ওটাই থাকে যা মৃত ব্যক্তি বলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) এটাই বলেন যে, যদি ঐ লোকদের জন্যে অসিয়ত থাকে তবে সেটা অন্য কথা নচেৎ এ আয়াতটি মানসুখই বটে।জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে এক বিস্ময়কর উক্তি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কয়েকবারের লিখার সার কথা হচ্ছে নিম্নরূপঃ ‘অসিয়তের মাল বন্টনের সময় মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এসে গেলে তাদেরকেও দাও এবং তথায় আগত মিসকীনদের সঙ্গে তার সাথে কথা বল ও উত্তর প্রদান কর'। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এখানে বন্টনের অর্থ হচ্ছে মীরাসের বন্টন। সুতরাং এ উক্তিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তির বিপরীত। এ আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছেঃ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বন্টনের সময় যদি এসব দরিদ্র লোক উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমরা নিজ নিজ অংশ পৃথক করে ফেল আর এ বেচারারা তোমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তখন তাদেরকে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দিও না। তাদেরকে তথা হতে নিরাশ করে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দেয়াকে পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। সুতরাং আল্লাহর পথে সাদকা হিসেবে তাদেরকে কিছু প্রদান কর যেন তারা খুশী হয়ে যায়।যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ “তোমরা তার ফল হতে খাও যখন তিনি ফল দান করেন এবং শস্য কর্তনের দিন তার হক আদায় কর। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ও দরিদ্র লোকদের ভয়ে যারা তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্ষেত্রের ফসল কেটে নেয় এবং গাছের ফল নামিয়ে থাকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিন্দে করেছেন। যেমন সূরা-ই-নূন-এ রয়েছে যে, এক বাগানের মালিকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে বঞ্চিত করার। নিয়তে একদা রাত্রিকালে অতি সন্তর্পণে বাগানের ফল নামিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে রওনা হয়। তাদের পৌছার পূর্বেই তথায় আল্লাহ তা'আলার শাস্তি নেমে আসে এবং সমস্ত বাগান পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। অন্যের হক নষ্টকারীদের পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, যে মালে সাদকা মিলিত হয় অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করে না, তার মাল সে কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তজ্জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে যাচ্ছে এবং সেই অসিয়তে তার উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হচ্ছে এমতাবস্থায় যে তা শ্রবণ করছে তার আল্লাহকে ভয় করতঃ ঐ অসিয়তকারীকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা উচিত এবং তার কর্তব্য এই যে, সে যেন ঐ অসিয়তকারীর মঙ্গল কামনা করে যেমন সে নিজের উত্তরাধিকারীদের মঙ্গল কামনা করে থাকে, যখন তাদের ক্ষতির ও ধ্বংসের আশংকা থাকে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যান। সে সময় হযরত সা'দ (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু মাল রয়েছে এবং আমার একটি মাত্র কন্যা আছে। আমি আমার দুই তৃতীয়াংশ মাল আল্লাহর পথে দান করে দেই। আপনি আমাকে এর অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেন :“আচ্ছা, অর্ধেকের অনুমতি আছে কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “তাহলে এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, কিন্তু এক তৃতীয়াংশও বেশী। তুমি যদি তোমার পিছনে তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাও তবে এটা ওটা হতে উত্তম যে, তুমি তাদেরকে দরিদ্ররূপে ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশেরও কম অর্থাৎ এক চতুর্থাংশের অসিয়ত করে তবে ওটাই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশকেও বেশী বলেছেন। ধর্মশাস্ত্রবিদগণ বলেন যে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী যদি ধনী হয় তবে তো এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা মুসতাহাব। আর যদি উত্তরাধিকারী দরিদ্র হয় তবে তার চেয়ে কমের অসিয়ত করাই মুসতাহাব। এ আয়াতের দ্বিতীয় ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “তোমরা ইয়াতিমদের প্রতি এরূপই খেয়াল রাখ যেমন তুমি তোমার মৃত্যুর পর তোমার ছোট সন্তানদের প্রতি অন্য লোকদের খেয়াল রাখার কামনা কর। তুমি যেমন চাও না যে, তাদের মাল অন্যেরা অন্যায়ভাবে খেয়ে নিক এবং তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে দরিদ্র থেকে যাক, তদ্রুপ তুমিও অন্যদের সন্তানগণের মাল খেয়ো না।' এ ভাবার্থও খুব উত্তম বটে। এ কারণেই এর পরেই পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের শাস্তির কথা বলা হয় যে, এ লোকগুলো নিজেদের পেটে অগ্নি ভক্ষণ করছে এবং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সাতটি এমন পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাকো যা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তিনি জিজ্ঞাসিত হনঃ পাপগুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন, (২) যাদু, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা, (৪) সুদ ভক্ষণ, (৫) পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণ, (৬) জিহাদ হতে মুখ ফিরানো এবং (৭) সতী সাধ্বী সরলা মুসলিম নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া।সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিরাজের রাত্রের ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ওষ্ঠ নীচে ঝুলতে রয়েছে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে হেঁচড়িয়ে টেনে তাদের মুখ খুলে দিচ্ছেন। অতঃপর জাহান্নামের গরমপাথর তাদের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যা তাদের মুখের ভেতর দিয়ে ডুকে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ভীষণভাবে চীৎকার করছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করিঃ এরা কারা?' তিনি বলেনঃ ‘এরা ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণকারী যারা তাদের পেটের ভেতর আগুন ভরতে রয়েছে। অতিসত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণকারী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার কবর হতে এমনভাবে উঠবে যে, তার মুখ দিয়ে, চক্ষু দিয়ে, নাক দিয়ে এবং কান দিয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে! প্রত্যেক ব্যক্তি দেখেই চিনে নেবে যে, সে কোন পিতৃহীনের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়েরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা ঐ দু' দুর্বলের মাল পৌছিয়ে দাও, স্ত্রীদের মাল এবং পিতৃহীনদের মাল। তোমরা তাদের মাল হতে বেঁচে থাকো।”সূরা-ই-বাকারায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন যাঁদের কাছে পিতৃহীনেরা লালিত পালিত হচ্ছিল তারা তাদের আহার্য এবং পানীয় পর্যন্ত পৃথক করে দেন। তখন অবস্থা প্রায় এই দাঁড়ালো যে, যদি ঐ পিতৃহীনদের খানা পানির কোন কিছু বেঁচে যেতো তখন হয় তারা নিজেরাই ঐ বাসী জিনিস খেয়ে নিতে না হয় তা পচে নষ্ট হয়ে যেতো। বাড়ীর লোকেরা কেউ তাতে হাতও লাগাতো না। এটা উভয় দিক দিয়েই অপছন্দনীয় হলো। নবী (সঃ)-এর সামনেও এটা আলোচিত হলো। তখনঃ (আরবী) (২:২২০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। এর ভাবার্থ এই যে, যে কাজে তোমরা পিতৃহীনদের মঙ্গল বুঝতে পারো তাই কর। ফলে এর পরে খানা-পিনা এক সাথেই হতে থাকে।

আন-নিসা 4:8

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরদের প্রথা ছিল এই যে, কেউ মারা গেলে তার বড় সন্তানেরা তার সমস্ত মাল পেয়ে যেতো। তার ছোট সন্তানেরা ও স্ত্রীরা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতো। ইসলাম এ নির্দেশ জারী করে সবারই জন্যে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বলা হয় যে, উত্তরাধিকারী সবাই হবে, প্রকৃত আত্মীয়তাই হোক বা বিবাহ বন্ধনের কারণেই হোক বা আযাদী সম্পর্কীয় কারণেই হোক না কেন, অংশ সবাই পাবে- অংশ কমই হোক আর বেশীই হোক।হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কাজ্জাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার দুটি ছেলে আছে। তাদের পিতা মারা গেছে এবং তাদের নিকট কিছুই নেই। এ হাদীসটি অন্য শব্দে উত্তরাধিকারের অন্য দু’টি আয়াতের তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসবে। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- যখন কোন মৃত ব্যক্তির মীরাস বন্টন হতে থাকবে, সে সময় যদি তার কোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ও এসে পড়ে যার কোন অংশ নেই এবং ইয়াতিম ও মিসকীনেরাও এসে যায় তবে তাদেরকেও কিছু কিছু প্রদান কর।'ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো এটা ওয়াজিব ছিল এবং কারও কারও মতে এটা মুসতাহাব ছিল, আর এখনও এ হুকুম বাকী আছে কি না সে বিষয়ে দুটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এ হুকুম এখনও বাকী আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আৰূ মূসা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত শাবী (রঃ) , হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত মাকল (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতা’ ইবনে আবি রিবাহ্ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআম্মারও (রঃ) একথাই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়া এসব পণ্ডিত এ হুকুমকে ওয়াজিব বলেছেন। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) এক অসিয়তের অভিভাবকত্ব করেন। তিনি একটি ছাগী যবেহ করেন এবং ঐ তিন প্রকারের লোককে ডেকে ভোজন করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘এ আয়াতটি না থাকলে এটাও আমার মালই ছিল।' হযরত উরওয়া (রাঃ) হযরত মুসআব (রাঃ)-এর মাল বন্টনের সময়েও এটা প্রদান করেন। হযরত যুহরীরও রঃ) উক্তি এই যে, এ আয়াতটি মুহকাম'- মানসুখ নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা অসিয়তের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ)-এর ইন্তিকালের পর যখন তার ছেলে হযরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার মীরাস বন্টন করেন তখন তিনি পরিবারের সকল মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করেন এবং এ আয়াতটিই পাঠ করেন। আর সে সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “তিনি ঠিক করেননি। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এটা তখনই কার্যকরী হবে যখন মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি রহিতই হয়ে গেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত এবং একে রহিতকারী হচ্ছে (আরবী)-এ আয়াতটি। অংশ নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে এ নির্দেশ ছিল। অতঃপর হকদারকে যখন আল্লাহ পাক হক পৌছিয়ে দেন তখন সাদকা শুধু ওটাই থাকে যা মৃত ব্যক্তি বলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) এটাই বলেন যে, যদি ঐ লোকদের জন্যে অসিয়ত থাকে তবে সেটা অন্য কথা নচেৎ এ আয়াতটি মানসুখই বটে।জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে এক বিস্ময়কর উক্তি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কয়েকবারের লিখার সার কথা হচ্ছে নিম্নরূপঃ ‘অসিয়তের মাল বন্টনের সময় মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এসে গেলে তাদেরকেও দাও এবং তথায় আগত মিসকীনদের সঙ্গে তার সাথে কথা বল ও উত্তর প্রদান কর'। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এখানে বন্টনের অর্থ হচ্ছে মীরাসের বন্টন। সুতরাং এ উক্তিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তির বিপরীত। এ আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছেঃ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বন্টনের সময় যদি এসব দরিদ্র লোক উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমরা নিজ নিজ অংশ পৃথক করে ফেল আর এ বেচারারা তোমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তখন তাদেরকে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দিও না। তাদেরকে তথা হতে নিরাশ করে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দেয়াকে পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। সুতরাং আল্লাহর পথে সাদকা হিসেবে তাদেরকে কিছু প্রদান কর যেন তারা খুশী হয়ে যায়।যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ “তোমরা তার ফল হতে খাও যখন তিনি ফল দান করেন এবং শস্য কর্তনের দিন তার হক আদায় কর। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ও দরিদ্র লোকদের ভয়ে যারা তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্ষেত্রের ফসল কেটে নেয় এবং গাছের ফল নামিয়ে থাকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিন্দে করেছেন। যেমন সূরা-ই-নূন-এ রয়েছে যে, এক বাগানের মালিকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে বঞ্চিত করার। নিয়তে একদা রাত্রিকালে অতি সন্তর্পণে বাগানের ফল নামিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে রওনা হয়। তাদের পৌছার পূর্বেই তথায় আল্লাহ তা'আলার শাস্তি নেমে আসে এবং সমস্ত বাগান পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। অন্যের হক নষ্টকারীদের পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, যে মালে সাদকা মিলিত হয় অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করে না, তার মাল সে কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তজ্জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে যাচ্ছে এবং সেই অসিয়তে তার উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হচ্ছে এমতাবস্থায় যে তা শ্রবণ করছে তার আল্লাহকে ভয় করতঃ ঐ অসিয়তকারীকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা উচিত এবং তার কর্তব্য এই যে, সে যেন ঐ অসিয়তকারীর মঙ্গল কামনা করে যেমন সে নিজের উত্তরাধিকারীদের মঙ্গল কামনা করে থাকে, যখন তাদের ক্ষতির ও ধ্বংসের আশংকা থাকে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যান। সে সময় হযরত সা'দ (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু মাল রয়েছে এবং আমার একটি মাত্র কন্যা আছে। আমি আমার দুই তৃতীয়াংশ মাল আল্লাহর পথে দান করে দেই। আপনি আমাকে এর অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেন :“আচ্ছা, অর্ধেকের অনুমতি আছে কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “তাহলে এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, কিন্তু এক তৃতীয়াংশও বেশী। তুমি যদি তোমার পিছনে তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাও তবে এটা ওটা হতে উত্তম যে, তুমি তাদেরকে দরিদ্ররূপে ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশেরও কম অর্থাৎ এক চতুর্থাংশের অসিয়ত করে তবে ওটাই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশকেও বেশী বলেছেন। ধর্মশাস্ত্রবিদগণ বলেন যে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী যদি ধনী হয় তবে তো এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা মুসতাহাব। আর যদি উত্তরাধিকারী দরিদ্র হয় তবে তার চেয়ে কমের অসিয়ত করাই মুসতাহাব। এ আয়াতের দ্বিতীয় ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “তোমরা ইয়াতিমদের প্রতি এরূপই খেয়াল রাখ যেমন তুমি তোমার মৃত্যুর পর তোমার ছোট সন্তানদের প্রতি অন্য লোকদের খেয়াল রাখার কামনা কর। তুমি যেমন চাও না যে, তাদের মাল অন্যেরা অন্যায়ভাবে খেয়ে নিক এবং তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে দরিদ্র থেকে যাক, তদ্রুপ তুমিও অন্যদের সন্তানগণের মাল খেয়ো না।' এ ভাবার্থও খুব উত্তম বটে। এ কারণেই এর পরেই পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের শাস্তির কথা বলা হয় যে, এ লোকগুলো নিজেদের পেটে অগ্নি ভক্ষণ করছে এবং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সাতটি এমন পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাকো যা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তিনি জিজ্ঞাসিত হনঃ পাপগুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন, (২) যাদু, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা, (৪) সুদ ভক্ষণ, (৫) পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণ, (৬) জিহাদ হতে মুখ ফিরানো এবং (৭) সতী সাধ্বী সরলা মুসলিম নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া।সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিরাজের রাত্রের ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ওষ্ঠ নীচে ঝুলতে রয়েছে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে হেঁচড়িয়ে টেনে তাদের মুখ খুলে দিচ্ছেন। অতঃপর জাহান্নামের গরমপাথর তাদের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যা তাদের মুখের ভেতর দিয়ে ডুকে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ভীষণভাবে চীৎকার করছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করিঃ এরা কারা?' তিনি বলেনঃ ‘এরা ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণকারী যারা তাদের পেটের ভেতর আগুন ভরতে রয়েছে। অতিসত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণকারী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার কবর হতে এমনভাবে উঠবে যে, তার মুখ দিয়ে, চক্ষু দিয়ে, নাক দিয়ে এবং কান দিয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে! প্রত্যেক ব্যক্তি দেখেই চিনে নেবে যে, সে কোন পিতৃহীনের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়েরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা ঐ দু' দুর্বলের মাল পৌছিয়ে দাও, স্ত্রীদের মাল এবং পিতৃহীনদের মাল। তোমরা তাদের মাল হতে বেঁচে থাকো।”সূরা-ই-বাকারায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন যাঁদের কাছে পিতৃহীনেরা লালিত পালিত হচ্ছিল তারা তাদের আহার্য এবং পানীয় পর্যন্ত পৃথক করে দেন। তখন অবস্থা প্রায় এই দাঁড়ালো যে, যদি ঐ পিতৃহীনদের খানা পানির কোন কিছু বেঁচে যেতো তখন হয় তারা নিজেরাই ঐ বাসী জিনিস খেয়ে নিতে না হয় তা পচে নষ্ট হয়ে যেতো। বাড়ীর লোকেরা কেউ তাতে হাতও লাগাতো না। এটা উভয় দিক দিয়েই অপছন্দনীয় হলো। নবী (সঃ)-এর সামনেও এটা আলোচিত হলো। তখনঃ (আরবী) (২:২২০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। এর ভাবার্থ এই যে, যে কাজে তোমরা পিতৃহীনদের মঙ্গল বুঝতে পারো তাই কর। ফলে এর পরে খানা-পিনা এক সাথেই হতে থাকে।

আন-নিসা 4:9

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরদের প্রথা ছিল এই যে, কেউ মারা গেলে তার বড় সন্তানেরা তার সমস্ত মাল পেয়ে যেতো। তার ছোট সন্তানেরা ও স্ত্রীরা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতো। ইসলাম এ নির্দেশ জারী করে সবারই জন্যে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বলা হয় যে, উত্তরাধিকারী সবাই হবে, প্রকৃত আত্মীয়তাই হোক বা বিবাহ বন্ধনের কারণেই হোক বা আযাদী সম্পর্কীয় কারণেই হোক না কেন, অংশ সবাই পাবে- অংশ কমই হোক আর বেশীই হোক।হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কাজ্জাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার দুটি ছেলে আছে। তাদের পিতা মারা গেছে এবং তাদের নিকট কিছুই নেই। এ হাদীসটি অন্য শব্দে উত্তরাধিকারের অন্য দু’টি আয়াতের তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসবে। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- যখন কোন মৃত ব্যক্তির মীরাস বন্টন হতে থাকবে, সে সময় যদি তার কোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ও এসে পড়ে যার কোন অংশ নেই এবং ইয়াতিম ও মিসকীনেরাও এসে যায় তবে তাদেরকেও কিছু কিছু প্রদান কর।'ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো এটা ওয়াজিব ছিল এবং কারও কারও মতে এটা মুসতাহাব ছিল, আর এখনও এ হুকুম বাকী আছে কি না সে বিষয়ে দুটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এ হুকুম এখনও বাকী আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আৰূ মূসা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত শাবী (রঃ) , হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত মাকল (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতা’ ইবনে আবি রিবাহ্ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআম্মারও (রঃ) একথাই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়া এসব পণ্ডিত এ হুকুমকে ওয়াজিব বলেছেন। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) এক অসিয়তের অভিভাবকত্ব করেন। তিনি একটি ছাগী যবেহ করেন এবং ঐ তিন প্রকারের লোককে ডেকে ভোজন করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘এ আয়াতটি না থাকলে এটাও আমার মালই ছিল।' হযরত উরওয়া (রাঃ) হযরত মুসআব (রাঃ)-এর মাল বন্টনের সময়েও এটা প্রদান করেন। হযরত যুহরীরও রঃ) উক্তি এই যে, এ আয়াতটি মুহকাম'- মানসুখ নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা অসিয়তের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ)-এর ইন্তিকালের পর যখন তার ছেলে হযরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার মীরাস বন্টন করেন তখন তিনি পরিবারের সকল মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করেন এবং এ আয়াতটিই পাঠ করেন। আর সে সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “তিনি ঠিক করেননি। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এটা তখনই কার্যকরী হবে যখন মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি রহিতই হয়ে গেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত এবং একে রহিতকারী হচ্ছে (আরবী)-এ আয়াতটি। অংশ নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে এ নির্দেশ ছিল। অতঃপর হকদারকে যখন আল্লাহ পাক হক পৌছিয়ে দেন তখন সাদকা শুধু ওটাই থাকে যা মৃত ব্যক্তি বলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) এটাই বলেন যে, যদি ঐ লোকদের জন্যে অসিয়ত থাকে তবে সেটা অন্য কথা নচেৎ এ আয়াতটি মানসুখই বটে।জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে এক বিস্ময়কর উক্তি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কয়েকবারের লিখার সার কথা হচ্ছে নিম্নরূপঃ ‘অসিয়তের মাল বন্টনের সময় মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এসে গেলে তাদেরকেও দাও এবং তথায় আগত মিসকীনদের সঙ্গে তার সাথে কথা বল ও উত্তর প্রদান কর'। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এখানে বন্টনের অর্থ হচ্ছে মীরাসের বন্টন। সুতরাং এ উক্তিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তির বিপরীত। এ আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছেঃ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বন্টনের সময় যদি এসব দরিদ্র লোক উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমরা নিজ নিজ অংশ পৃথক করে ফেল আর এ বেচারারা তোমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তখন তাদেরকে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দিও না। তাদেরকে তথা হতে নিরাশ করে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দেয়াকে পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। সুতরাং আল্লাহর পথে সাদকা হিসেবে তাদেরকে কিছু প্রদান কর যেন তারা খুশী হয়ে যায়।যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ “তোমরা তার ফল হতে খাও যখন তিনি ফল দান করেন এবং শস্য কর্তনের দিন তার হক আদায় কর। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ও দরিদ্র লোকদের ভয়ে যারা তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্ষেত্রের ফসল কেটে নেয় এবং গাছের ফল নামিয়ে থাকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিন্দে করেছেন। যেমন সূরা-ই-নূন-এ রয়েছে যে, এক বাগানের মালিকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে বঞ্চিত করার। নিয়তে একদা রাত্রিকালে অতি সন্তর্পণে বাগানের ফল নামিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে রওনা হয়। তাদের পৌছার পূর্বেই তথায় আল্লাহ তা'আলার শাস্তি নেমে আসে এবং সমস্ত বাগান পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। অন্যের হক নষ্টকারীদের পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, যে মালে সাদকা মিলিত হয় অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করে না, তার মাল সে কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তজ্জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে যাচ্ছে এবং সেই অসিয়তে তার উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হচ্ছে এমতাবস্থায় যে তা শ্রবণ করছে তার আল্লাহকে ভয় করতঃ ঐ অসিয়তকারীকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা উচিত এবং তার কর্তব্য এই যে, সে যেন ঐ অসিয়তকারীর মঙ্গল কামনা করে যেমন সে নিজের উত্তরাধিকারীদের মঙ্গল কামনা করে থাকে, যখন তাদের ক্ষতির ও ধ্বংসের আশংকা থাকে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যান। সে সময় হযরত সা'দ (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু মাল রয়েছে এবং আমার একটি মাত্র কন্যা আছে। আমি আমার দুই তৃতীয়াংশ মাল আল্লাহর পথে দান করে দেই। আপনি আমাকে এর অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেন :“আচ্ছা, অর্ধেকের অনুমতি আছে কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “তাহলে এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, কিন্তু এক তৃতীয়াংশও বেশী। তুমি যদি তোমার পিছনে তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাও তবে এটা ওটা হতে উত্তম যে, তুমি তাদেরকে দরিদ্ররূপে ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশেরও কম অর্থাৎ এক চতুর্থাংশের অসিয়ত করে তবে ওটাই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশকেও বেশী বলেছেন। ধর্মশাস্ত্রবিদগণ বলেন যে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী যদি ধনী হয় তবে তো এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা মুসতাহাব। আর যদি উত্তরাধিকারী দরিদ্র হয় তবে তার চেয়ে কমের অসিয়ত করাই মুসতাহাব। এ আয়াতের দ্বিতীয় ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “তোমরা ইয়াতিমদের প্রতি এরূপই খেয়াল রাখ যেমন তুমি তোমার মৃত্যুর পর তোমার ছোট সন্তানদের প্রতি অন্য লোকদের খেয়াল রাখার কামনা কর। তুমি যেমন চাও না যে, তাদের মাল অন্যেরা অন্যায়ভাবে খেয়ে নিক এবং তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে দরিদ্র থেকে যাক, তদ্রুপ তুমিও অন্যদের সন্তানগণের মাল খেয়ো না।' এ ভাবার্থও খুব উত্তম বটে। এ কারণেই এর পরেই পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের শাস্তির কথা বলা হয় যে, এ লোকগুলো নিজেদের পেটে অগ্নি ভক্ষণ করছে এবং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সাতটি এমন পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাকো যা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তিনি জিজ্ঞাসিত হনঃ পাপগুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন, (২) যাদু, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা, (৪) সুদ ভক্ষণ, (৫) পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণ, (৬) জিহাদ হতে মুখ ফিরানো এবং (৭) সতী সাধ্বী সরলা মুসলিম নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া।সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিরাজের রাত্রের ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ওষ্ঠ নীচে ঝুলতে রয়েছে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে হেঁচড়িয়ে টেনে তাদের মুখ খুলে দিচ্ছেন। অতঃপর জাহান্নামের গরমপাথর তাদের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যা তাদের মুখের ভেতর দিয়ে ডুকে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ভীষণভাবে চীৎকার করছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করিঃ এরা কারা?' তিনি বলেনঃ ‘এরা ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণকারী যারা তাদের পেটের ভেতর আগুন ভরতে রয়েছে। অতিসত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণকারী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার কবর হতে এমনভাবে উঠবে যে, তার মুখ দিয়ে, চক্ষু দিয়ে, নাক দিয়ে এবং কান দিয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে! প্রত্যেক ব্যক্তি দেখেই চিনে নেবে যে, সে কোন পিতৃহীনের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়েরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা ঐ দু' দুর্বলের মাল পৌছিয়ে দাও, স্ত্রীদের মাল এবং পিতৃহীনদের মাল। তোমরা তাদের মাল হতে বেঁচে থাকো।”সূরা-ই-বাকারায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন যাঁদের কাছে পিতৃহীনেরা লালিত পালিত হচ্ছিল তারা তাদের আহার্য এবং পানীয় পর্যন্ত পৃথক করে দেন। তখন অবস্থা প্রায় এই দাঁড়ালো যে, যদি ঐ পিতৃহীনদের খানা পানির কোন কিছু বেঁচে যেতো তখন হয় তারা নিজেরাই ঐ বাসী জিনিস খেয়ে নিতে না হয় তা পচে নষ্ট হয়ে যেতো। বাড়ীর লোকেরা কেউ তাতে হাতও লাগাতো না। এটা উভয় দিক দিয়েই অপছন্দনীয় হলো। নবী (সঃ)-এর সামনেও এটা আলোচিত হলো। তখনঃ (আরবী) (২:২২০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। এর ভাবার্থ এই যে, যে কাজে তোমরা পিতৃহীনদের মঙ্গল বুঝতে পারো তাই কর। ফলে এর পরে খানা-পিনা এক সাথেই হতে থাকে।

আন-নিসা 4:10

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরদের প্রথা ছিল এই যে, কেউ মারা গেলে তার বড় সন্তানেরা তার সমস্ত মাল পেয়ে যেতো। তার ছোট সন্তানেরা ও স্ত্রীরা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতো। ইসলাম এ নির্দেশ জারী করে সবারই জন্যে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বলা হয় যে, উত্তরাধিকারী সবাই হবে, প্রকৃত আত্মীয়তাই হোক বা বিবাহ বন্ধনের কারণেই হোক বা আযাদী সম্পর্কীয় কারণেই হোক না কেন, অংশ সবাই পাবে- অংশ কমই হোক আর বেশীই হোক।হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কাজ্জাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার দুটি ছেলে আছে। তাদের পিতা মারা গেছে এবং তাদের নিকট কিছুই নেই। এ হাদীসটি অন্য শব্দে উত্তরাধিকারের অন্য দু’টি আয়াতের তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসবে। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- যখন কোন মৃত ব্যক্তির মীরাস বন্টন হতে থাকবে, সে সময় যদি তার কোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ও এসে পড়ে যার কোন অংশ নেই এবং ইয়াতিম ও মিসকীনেরাও এসে যায় তবে তাদেরকেও কিছু কিছু প্রদান কর।'ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো এটা ওয়াজিব ছিল এবং কারও কারও মতে এটা মুসতাহাব ছিল, আর এখনও এ হুকুম বাকী আছে কি না সে বিষয়ে দুটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এ হুকুম এখনও বাকী আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আৰূ মূসা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত শাবী (রঃ) , হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত মাকল (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতা’ ইবনে আবি রিবাহ্ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআম্মারও (রঃ) একথাই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়া এসব পণ্ডিত এ হুকুমকে ওয়াজিব বলেছেন। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) এক অসিয়তের অভিভাবকত্ব করেন। তিনি একটি ছাগী যবেহ করেন এবং ঐ তিন প্রকারের লোককে ডেকে ভোজন করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘এ আয়াতটি না থাকলে এটাও আমার মালই ছিল।' হযরত উরওয়া (রাঃ) হযরত মুসআব (রাঃ)-এর মাল বন্টনের সময়েও এটা প্রদান করেন। হযরত যুহরীরও রঃ) উক্তি এই যে, এ আয়াতটি মুহকাম'- মানসুখ নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা অসিয়তের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ)-এর ইন্তিকালের পর যখন তার ছেলে হযরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার মীরাস বন্টন করেন তখন তিনি পরিবারের সকল মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করেন এবং এ আয়াতটিই পাঠ করেন। আর সে সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “তিনি ঠিক করেননি। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এটা তখনই কার্যকরী হবে যখন মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি রহিতই হয়ে গেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত এবং একে রহিতকারী হচ্ছে (আরবী)-এ আয়াতটি। অংশ নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে এ নির্দেশ ছিল। অতঃপর হকদারকে যখন আল্লাহ পাক হক পৌছিয়ে দেন তখন সাদকা শুধু ওটাই থাকে যা মৃত ব্যক্তি বলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) এটাই বলেন যে, যদি ঐ লোকদের জন্যে অসিয়ত থাকে তবে সেটা অন্য কথা নচেৎ এ আয়াতটি মানসুখই বটে।জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে এক বিস্ময়কর উক্তি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কয়েকবারের লিখার সার কথা হচ্ছে নিম্নরূপঃ ‘অসিয়তের মাল বন্টনের সময় মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এসে গেলে তাদেরকেও দাও এবং তথায় আগত মিসকীনদের সঙ্গে তার সাথে কথা বল ও উত্তর প্রদান কর'। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এখানে বন্টনের অর্থ হচ্ছে মীরাসের বন্টন। সুতরাং এ উক্তিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তির বিপরীত। এ আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছেঃ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বন্টনের সময় যদি এসব দরিদ্র লোক উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমরা নিজ নিজ অংশ পৃথক করে ফেল আর এ বেচারারা তোমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তখন তাদেরকে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দিও না। তাদেরকে তথা হতে নিরাশ করে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দেয়াকে পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। সুতরাং আল্লাহর পথে সাদকা হিসেবে তাদেরকে কিছু প্রদান কর যেন তারা খুশী হয়ে যায়।যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ “তোমরা তার ফল হতে খাও যখন তিনি ফল দান করেন এবং শস্য কর্তনের দিন তার হক আদায় কর। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ও দরিদ্র লোকদের ভয়ে যারা তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্ষেত্রের ফসল কেটে নেয় এবং গাছের ফল নামিয়ে থাকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিন্দে করেছেন। যেমন সূরা-ই-নূন-এ রয়েছে যে, এক বাগানের মালিকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে বঞ্চিত করার। নিয়তে একদা রাত্রিকালে অতি সন্তর্পণে বাগানের ফল নামিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে রওনা হয়। তাদের পৌছার পূর্বেই তথায় আল্লাহ তা'আলার শাস্তি নেমে আসে এবং সমস্ত বাগান পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। অন্যের হক নষ্টকারীদের পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, যে মালে সাদকা মিলিত হয় অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করে না, তার মাল সে কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তজ্জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে যাচ্ছে এবং সেই অসিয়তে তার উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হচ্ছে এমতাবস্থায় যে তা শ্রবণ করছে তার আল্লাহকে ভয় করতঃ ঐ অসিয়তকারীকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা উচিত এবং তার কর্তব্য এই যে, সে যেন ঐ অসিয়তকারীর মঙ্গল কামনা করে যেমন সে নিজের উত্তরাধিকারীদের মঙ্গল কামনা করে থাকে, যখন তাদের ক্ষতির ও ধ্বংসের আশংকা থাকে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যান। সে সময় হযরত সা'দ (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু মাল রয়েছে এবং আমার একটি মাত্র কন্যা আছে। আমি আমার দুই তৃতীয়াংশ মাল আল্লাহর পথে দান করে দেই। আপনি আমাকে এর অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেন :“আচ্ছা, অর্ধেকের অনুমতি আছে কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “তাহলে এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, কিন্তু এক তৃতীয়াংশও বেশী। তুমি যদি তোমার পিছনে তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাও তবে এটা ওটা হতে উত্তম যে, তুমি তাদেরকে দরিদ্ররূপে ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশেরও কম অর্থাৎ এক চতুর্থাংশের অসিয়ত করে তবে ওটাই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশকেও বেশী বলেছেন। ধর্মশাস্ত্রবিদগণ বলেন যে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী যদি ধনী হয় তবে তো এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা মুসতাহাব। আর যদি উত্তরাধিকারী দরিদ্র হয় তবে তার চেয়ে কমের অসিয়ত করাই মুসতাহাব। এ আয়াতের দ্বিতীয় ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “তোমরা ইয়াতিমদের প্রতি এরূপই খেয়াল রাখ যেমন তুমি তোমার মৃত্যুর পর তোমার ছোট সন্তানদের প্রতি অন্য লোকদের খেয়াল রাখার কামনা কর। তুমি যেমন চাও না যে, তাদের মাল অন্যেরা অন্যায়ভাবে খেয়ে নিক এবং তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে দরিদ্র থেকে যাক, তদ্রুপ তুমিও অন্যদের সন্তানগণের মাল খেয়ো না।' এ ভাবার্থও খুব উত্তম বটে। এ কারণেই এর পরেই পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের শাস্তির কথা বলা হয় যে, এ লোকগুলো নিজেদের পেটে অগ্নি ভক্ষণ করছে এবং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সাতটি এমন পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাকো যা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তিনি জিজ্ঞাসিত হনঃ পাপগুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন, (২) যাদু, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা, (৪) সুদ ভক্ষণ, (৫) পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণ, (৬) জিহাদ হতে মুখ ফিরানো এবং (৭) সতী সাধ্বী সরলা মুসলিম নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া।সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিরাজের রাত্রের ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ওষ্ঠ নীচে ঝুলতে রয়েছে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে হেঁচড়িয়ে টেনে তাদের মুখ খুলে দিচ্ছেন। অতঃপর জাহান্নামের গরমপাথর তাদের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যা তাদের মুখের ভেতর দিয়ে ডুকে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ভীষণভাবে চীৎকার করছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করিঃ এরা কারা?' তিনি বলেনঃ ‘এরা ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণকারী যারা তাদের পেটের ভেতর আগুন ভরতে রয়েছে। অতিসত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণকারী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার কবর হতে এমনভাবে উঠবে যে, তার মুখ দিয়ে, চক্ষু দিয়ে, নাক দিয়ে এবং কান দিয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে! প্রত্যেক ব্যক্তি দেখেই চিনে নেবে যে, সে কোন পিতৃহীনের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়েরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা ঐ দু' দুর্বলের মাল পৌছিয়ে দাও, স্ত্রীদের মাল এবং পিতৃহীনদের মাল। তোমরা তাদের মাল হতে বেঁচে থাকো।”সূরা-ই-বাকারায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন যাঁদের কাছে পিতৃহীনেরা লালিত পালিত হচ্ছিল তারা তাদের আহার্য এবং পানীয় পর্যন্ত পৃথক করে দেন। তখন অবস্থা প্রায় এই দাঁড়ালো যে, যদি ঐ পিতৃহীনদের খানা পানির কোন কিছু বেঁচে যেতো তখন হয় তারা নিজেরাই ঐ বাসী জিনিস খেয়ে নিতে না হয় তা পচে নষ্ট হয়ে যেতো। বাড়ীর লোকেরা কেউ তাতে হাতও লাগাতো না। এটা উভয় দিক দিয়েই অপছন্দনীয় হলো। নবী (সঃ)-এর সামনেও এটা আলোচিত হলো। তখনঃ (আরবী) (২:২২০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। এর ভাবার্থ এই যে, যে কাজে তোমরা পিতৃহীনদের মঙ্গল বুঝতে পারো তাই কর। ফলে এর পরে খানা-পিনা এক সাথেই হতে থাকে।

আন-নিসা 4:11

এ আয়াতটি, এর পরবর্তী আয়াতটি এবং সূৰ্বর শেষের আয়াতটি ইলমে ফারায়েযের আয়াত। এ পূর্ণ ইলমের দলীলরূপে এ আয়াতগুলোকে এবং হাদীসগুলোকে দলীলরূপে গ্রহণ করা হয়েছে যে, হাদীসগুলো যেন এ আয়াতগুলোরই তাফসীর ও ব্যাখ্যা। এখানে আমরা এ আয়াতটিরই তাফসীর লিখছি। বাকী মীরাসের যে জিজ্ঞাস্য বিষয়ের পূর্ণ আলোচনা রয়েছে এবং ওতে যে দলীলসমূহের অনুধাবনে কিছু মতভেদ আছে তা বর্ণনা করার উপযুক্ত স্থান হচ্ছে আহকামের পুস্তকসমূহ-তাফসীর নয়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সাহায্য করুন! ফারায়ে বিদ্যা শিক্ষার প্রতি উৎসাহ প্রদানের ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। এ আয়াতসমূহে যে নির্ধারিত অংশসমূহের বর্ণনা রয়েছে সেগুলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।সুনান-ই-আবি দাউদ ও সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, ইলম প্রকৃতপক্ষে তিনটি। এছাড়া সবই অতিরিক্ত। প্রথম হচ্ছে কুরআন কারীমের আয়াতসমূহ যা দৃঢ় এবং যার আহকাম বাকী রয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত অর্থাৎ হাদীসসমূহ যা প্রমাণিত। তৃতীয় হচ্ছে ‘ফারিয়া-ই-আদেলা অর্থাৎ উত্তরাধিকারের জিজ্ঞাস্য বিষয়সমূহ যা কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। সুনান-ই-ইবনে মাজার দ্বিতীয় দুর্বল সনদযুক্ত হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ফারায়েয শিক্ষা কর এবং অন্যদেরকে শিক্ষা দান কর, এটা হচ্ছে অর্ধেক ইম। মানুষ এটা ভুলে যায় এবং এটাই প্রথম জিনিস যা আমার উম্মতের নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে।' হযরত ইবনে উইয়াইনা (রঃ) বলেনঃ ‘একে অর্ধেক ইলম বলার কারণ এই যে, প্রায় সমস্ত মানুষকেই এর সম্মুখীন হতে হয়।সহীহ বুখারী শরীফে এ আয়াতের তাফসীরে হ্যরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি রুগ্ন ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আবু বকর (রাঃ) আমাকে দেখতে আসেন। বানূ সালমার মহল্লায় তারা পদব্রজে আগমন করেন। আমি সে সময় অজ্ঞান ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পানি চেয়ে নিয়ে অযু করেন। অতঃপর আমার উপর অযুর পানি ছিটিয়ে দেন। ফলে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আমি তখন বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার মাল কিভাবে বন্টন করবো? সে সময় এ পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সহীহ মুসলিম, সুনান-ই-নাসাঈ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে।সুনান-ই-আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, মুসনাদ-ই-আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত সা'দ ইবনে রাবী'র সহধর্মিণী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ দু’টি হযরত সা'দের (রাঃ) কন্যা, এদের পিতা উহুদের যুদ্ধে আপনার সাথে শরীক ছিলেন। ঐ যুদ্ধেই তিনি শহীদ হন। এদের চাচা তাঁর সমস্ত মাল নিয়ে নেয়। এদের জন্যে কিছুই রাখেনি। এটা স্পষ্ট কথা যে, মাল ছাড়া এদের বিয়ে হতে পারে না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ এর ফায়সালা স্বয়ং আল্লাহ পাকই করবেন। সে সময় উত্তরাধিকারের আয়াত অবতীর্ণ হয়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এদের চাচার নিকট লোক পাঠিয়ে তাকে নির্দেশ দেনঃ ‘দুই তৃতীয়াংশ (তোমার ভাইয়ের সম্পত্তির) এ মেয়েগুলোকে দিয়ে দাও, এক অষ্টমাংশ এদের মাকে প্রদান কর এবং বাকি তোমার অংশ।' বাহ্যতঃ জানা। যাচ্ছে যে, হযরত জাবের (রাঃ)-এর প্রশ্নের উপর এ সূরাটির শেষ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে থাকবে যেমন অতিসত্বরই ইনশাআল্লাহ আসছে। কেননা, তার উত্তরাধিকারিণী তো শুধুমাত্র তার বোনেরা ছিল। তাঁর মেয়ে তো ছিলই না। তিনি তো (যে ব্যক্তির পিতা ও পুত্র থাকে না তাকে বলে) (আরবী) ছিলেন। আর এ আয়াতটি এ সম্বন্ধেই অর্থাৎ হযরত সাদ ইবনে রাবী (রাঃ)-এর উত্তরাধিকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় এবং এর বর্ণনাকারীও হচ্ছেন স্বয়ং হযরত জাবির (রাঃ)। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকেও এ আয়াতের তাফসীরেই এনেছেন। এ জন্যে আমরাও তাঁর অনুসরণ করেছি।আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। অজ্ঞতার যুগে লোকেরা তাদের সমস্ত মাল ছেলেদেরই শুধু প্রদান করতো এবং মেয়েদেরকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করতো। তাই আল্লাহ তা'আলা মেয়েদের জন্যে অংশ নির্ধারণ করেন। তবে তাদের মধ্যে পার্থক্য রেখেছেন। কেননা, যতগুলো কর্তব্য পালন পুরুষদের দায়িত্বে রয়েছে। ততটা স্ত্রীদের দায়িত্বে নেই। যেমন পরিবারের খাওয়া পরার জন্যে আয় ব্যয়ের। দায়িত্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনুরূপভাবে অন্যান্য বহু কষ্ট তাদেরকে সহ্য করতে হয়। এ জন্যেই তাদের প্রয়োজন অনুপাতে তাদেরকে স্ত্রীদের দ্বিগুণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন কোন বিজ্ঞ মনীষী এখানে একটি সূক্ষ্ণ তত্ত্ব বের করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর পিতা-মাতা হতেও বহু গুণে দয়ালু ও স্নেহশীল। পিতা-মাতাকে তিনি তাদের সন্তানদের ব্যাপারে অসিয়ত করছেন। সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, আমাদের সৃষ্টিকর্তা করুণাময় আল্লাহ তার সৃষ্টজীবের উপর যত বেশী দয়াবান তত দয়াবান বাপ মা তাদের সন্তানদের প্রতি নয়। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, বন্দীদের মধ্য হতে একটি শিশু তার মা হতে পৃথক হয়ে পড়ে। মা তার শিশুর খোজে পাগলিনীর ন্যায় ছুটাছুটি করে এবং যে শিশুকেই পায় তাকেই বুকে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করিয়ে দেয়। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীগণকে বলেনঃ “আচ্ছা বলতো, অধিকার থাকা সত্ত্বেও কি এ স্ত্রী লোকটি তার শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে? সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কখনই না!” তিনি তখন বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের উপর এর চেয়েও বেশী দয়ালু।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে অংশীদার ও হকদার শুধু পুত্রই ছিল। পিতা-মাতা অসিয়ত হিসেবে কিছু পেয়ে যেতো মাত্র। আল্লাহ তা'আলা এটা রহিত করে দেন এবং পুত্রকে কন্যার দ্বিগুণ পিতা-মাতাকে এক ষষ্ঠাংশ ও এক তৃতীয়াংশও বটে, স্ত্রীকে এক অষ্টমাংশ ও এক চতুর্থাংশ, স্বামীকে এক চতুর্থাংশ ও অর্ধেক দেয়ার নির্দেশ দেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলেন যে, উত্তরাধিকারের আহকাম অবতীর্ণ হলে কতগুলো লোক এটা অপছন্দ করে ও বলেঃ ‘স্ত্রীকে দেয়া হবে এক চতুর্থাংশ ও এক অষ্টমাংশ, মেয়েকে দেয়া হবে অর্ধাংশ এবং ছোট ছোট ছেলেদের জন্যেও অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ এদের মধ্যে কেউই না যুদ্ধের জন্যে বের হতে পারে, না গনীমতের মাল আনতে পারে। সুতরাং তোমরা এ আয়াত হতে নীরব থাক তাহলে সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলে যাবেন, কিংবা আমাদের বলার কারণে তিনি এ আহকাম পরিবর্তন করবেন।অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মেয়েকে তার পিতার পরিত্যক্ত মাল হতে অর্ধেক দিচ্ছেন অথচ না সে ঘোড়ার উপর বসার যোগ্যতা রাখে, না সে শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারে। আপনি শিশুকেও উত্তরাধিকারীরূপে সাব্যস্ত করেছেন, তার দ্বারা কি উপকার পাওয়া যেতে পারে? এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগে এরূপ করতো যে, মীরাস শুধু তাদেরকেই প্রদান করতো যারা যুদ্ধের যোগ্য ছিল। তারা সবচেয়ে বড় ছেলেকে উত্তরাধিকার করতো।(আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ অতিরিক্ত বলে থাকেন। যেমন- (আরবী) (৮:১২)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি অতিরিক্ত। কিন্তু আমরা এটাকে স্বীকার করি না। এ আয়াতেও না, ঐ আয়াতেও না। কেননা, কুরআন কারীমের মধ্যে এমন কোন অতিরিক্ত জিনিস নেই যা বিনা উপকারে আনা হয়েছে। আল্লাহ পাকের কালামে এরূপ হওয়া অসম্ভব। আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, যদি এরূপই হতো তবে ওর পরে (আরবী) আসতো না, বরং (আরবী) আসতো। হ্যাঁ, এটা দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, যদি মেয়ে দু’য়ের অধিক না হয়, অর্থাৎ শুধু দু'টোই হয় তাহলেও এটাই হুকুম অর্থাৎ তারাও দুই তৃতীয়াংশই পাবে। কেননা, দ্বিতীয় আয়াতে দু বোনকে দুই তৃতীয়াংশ দেয়ার নির্দেশ রয়েছে। সুতরাং যদি দু' বোন দুই তৃতীয়াংশ পায় তবে দু’ মেয়ে দুই তৃতীয়াংশ পাবে না কেন? তাদের জন্যে তো দুই তৃতীয়াংশ হওয়া আরও বাঞ্চনীয়। অন্য হাদীসে এসেছে যে, দুটি মেয়েকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে দুই তৃতীয়াংশ দিয়েছেন। যেমন এ আয়াতের শান-ই-নমূলের বর্ণনায় হযরত সা’দের কন্যাদের ব্যাপারে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে এটাও এর দলীল যে, যদি পুত্র না থাকে এবং একটি মাত্র কন্যা থাকে তবে সে অর্ধেক অংশ পেয়ে যাবে, সুতরাং যদি দু’টি কন্যা থাকার অবস্থাতেও অর্ধেক অংশ দেয়ার নির্দেশ দেয়া উদ্দেশ্যে হতো তবে এখানে তা বর্ণনা করা হতো। এককে যখন পৃথক করা হয়েছে তখন জানা যাচ্ছে যে, দুয়ের বেশী থাকা অবস্থায় যে হুকুম দুজন থাকা অবস্থাও সেই হুকুম।অতঃপর বাপ-মায়ের অংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। বাপ-মায়ের অবস্থা বিভিন্নরূপ। প্রথম অবস্থা এই যে, মৃত ব্যক্তির যদি একাধিক মেয়ে থাকে এবং পিতা-মাতাও থাকে তবে পিতা-মাতা উভয়েই এক ষষ্ঠাংশ করে পাবে। অর্থাৎ এক ষষ্ঠাংশ পাবে পিতা এবং এক ষষ্ঠাংশ পাবে মাতা। আর যদি মৃত ব্যক্তির একটি মাত্র কন্যা থাকে তবে অর্ধেক মাল তো মেয়েটি পাবে এবং এক ষষ্ঠাংশ মা পাবে ও এক ষষ্ঠাংশ বাপ পাবে, আরও যে এক ষষ্ঠাংশ অবশিষ্ট থাকছে ওটাও বাপ (যে উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারিত নেই অথচ অংশ পেয়ে থাকে, তাকে ‘আসাবা বলে। যেমন পুত্র ইত্যাদি কোন কোন সময় উত্তরাধিকারী ও আসাবা হয়ে থাকে) ‘আসাবা হিসেবে পেয়ে যাবে। তাহলে এখানে পিতা তার নির্ধারিত এক ষষ্ঠাংশ পেয়ে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে ‘আসাবা' হিসেবেও অবশিষ্ট অংশ পেয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থা এই যে, উত্তরাধিকারী শুধু পিতা ও মাতা। এ অবস্থায় মাতা পাবে এক তৃতীয়াংশ এবং অবশিষ্ট সমস্ত মাল পিতা ‘আসাবা’ হিসেবে পেয়ে যাবে। তাহলে পিতা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ প্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ মায়ের তুলনায় বাপ দ্বিগুণ পাবে। এখন যদি মৃত স্ত্রীর স্বামীও বিদ্যমান থাকে কিংবা মৃত স্বামীর স্ত্রী থাকে, অর্থাৎ ছেলে মেয়ে নেই, বরং আছে শুধু পিতা-মাতা এবং স্বামী বা স্ত্রী, তবে এ ব্যাপারে তো আলেমগণ একমত যে, এ অবস্থায় স্বামী পাবে অর্ধেক এবং স্ত্রী পাবে এক চতুর্থাংশ। কিন্তু আলেমদের এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, এ অবস্থায় এর পরে মা কত পাবে? এতে তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, স্বামী বা স্ত্রীর (অংশ) নেয়ার পর যা বাকী থাকবে মা তার এক তৃতীয়াংশ পাবে। হয় স্ত্রী স্বামী ছেড়ে যাক বা স্বামী স্ত্রী ছেড়ে যাক। কেননা, অবশিষ্ট মাল তাদের ব্যাপারে যেন পুরো মাল। আর মায়ের অংশ হচ্ছে বাপের অর্ধেক। সুতরাং অবশিষ্ট মালের এক তৃতীয়াংশ মা নিয়ে নেবে এবং বাকী দুই তৃতীয়াংশ বাপ প্রাপ্ত হবে।হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর এটাই ফায়সালা। এটাই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতেরও (রাঃ) উক্তি। সাতজন ফকীহ, ইমাম চতুষ্টয় এবং জমহূরেরও এটাই ফতওয়া। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এ দু' অবস্থায়ই মা সমস্ত মালের এক তৃতীয়াংশ পাবে। কেননা, আয়াতটি সাধারণ, স্বামী-স্ত্রী থাক আর নাই থাক, সাধারণভাবে ছেলেমেয়ে না থাকার সময় মাকে সমস্ত মালের এক তৃতীয়াংশ দেয়ার কথা বলা। হয়েছে। এটাই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি। হযরত আলী (রাঃ)। এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতেও এভাবেই বর্ণিত আছে। হযরত শুরায়েহ্ (রাঃ) এবং হযরত দাউদ যাহেরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত আবুল হাসান ইবনে লাব্বান বাসারীও (রঃ) স্বীয় ইলম-ই-ফারায়েয সম্বন্ধীয় গ্রন্থ ‘কিতাবুল ঈজাযে’ এ উক্তিকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এ উক্তিটি বিবেচনা সাপেক্ষ, এমন কি দুর্বলও বটে। কেননা, আয়াতে মায়ের এ অংশ সেই সময় নির্ধারণ করেছে যখন সম্পূর্ণ মালের উত্তরাধিকারী শুধু পিতা ও মাতা হয়। আর যখন স্বামী বা স্ত্রী রয়েছে তখন তারা তাদের নির্ধারিত অংশ নেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে মা তারই এক তৃতীয়াংশ পাবে। তৃতীয় উক্তি এই যে, মৃত ব্যক্তি যদি পুরুষ হয় এবং তার স্ত্রী বিদ্যমান থাকে তবে শুধু এ অবস্থাতে মা সম্পূর্ণ মালের এক তৃতীয়াংশ পাবে। কেননা, স্ত্রী সমস্ত মালের এক চতুর্থাংশ পাবে। যদি সমস্ত মালকে বার ভাগ করা হয় তবে তিন ভাগ নেবে স্ত্রী, চার ভাগ নেবে মা এবং অবশিষ্ট পাঁচ ভাগ পাবে পিতা। কিন্তু যদি স্ত্রী মারা যায় এবং তার স্বামী বিদ্যমান থাকে,তবে মা অবশিষ্ট মালের এক তৃতীয়াংশ পাবে। ঐ অবস্থাতেও যদি মাকে সমস্ত মালের এক তৃতীয়াংশ দেয়া হয় তবে সে বাপ অপেক্ষাও বেশী পেয়ে যাবে। যেমন মালের ছয় ভাগ করা হলো, তিন ভাগ তো স্বামী পেয়ে গেল, মা পেলো দু’ভাগ এবং বাপ পাচ্ছে মাত্র এক ভাগ, যা মা অপেক্ষাও কম। সুতরাং এ অবস্থায় ছয় ভাগের মধ্যে তিন ভাগ পাবে স্বামী এবং বাকী তিন ভাগের মধ্যে মাকে দেয়া হবে এক ভাগ ও বাপকে দেয়া হবে দু'ভাগ। ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ)-এর এটাই উক্তি। এরূপই বুঝতে হবে যে, এ উক্তিটি দু'টি উক্তির সংমিশ্রণ। এটাও দুর্বল। প্রথম উক্তিটিই সঠিক। বাপ-মায়ের তৃতীয় অবস্থা এই যে, তারা মৃত ব্যক্তির ভাইদের সঙ্গে উত্তরাধিকারী হয়, তারা সহোদর ভাইই হোক অথবা বৈপিত্রেয় ভাইই হোক। এ অবস্থায় বাপের বিদ্যমানতায় ভাইগুলো কিছুই পাবে না, তবে তারা মাকে এক তৃতীয়াংশ হতে এক ষষ্ঠাংশে নামিয়ে দেবে। আর যদি অন্য কোন উত্তরাধিকারীই না থাকে এবং মায়ের সাথে শুধু বাপ থাকে তবে বাকী মাল সমস্তই বাপ পেয়ে যাবে। জমহূরের এটাই উক্তি। তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত উসমান (রাঃ)-কে বলেনঃ দু' ভাই মাতাকে এক তৃতীয়াংশ হতে সরিয়ে এক ষষ্ঠাংশে নিয়ে যায় না। কুরআন কারীমের মধ্যে (আরবী) শব্দ এসেছে এবং এটা বহু বচন। ভাবার্থ দু' ভাই হলে শব্দ অর্থাৎ দ্বিবচন ব্যবহার করা হতো। তৃতীয় খলিফা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা বহু পূর্ব হতে চলে আসছে এবং এ মাসআলাটি এভাবেই চতুর্দিকে পৌঁছে গেছে। সমস্ত মানুষ এর উপরই আমল করছে। সুতরাং আমি এটা পরিবর্তন করতে পারি না। প্রথমতঃ এ বর্ণনাটি তো প্রমাণিতই নয়। এর বর্ণনাকারী শা’বার উপর ইমাম মালিক (রঃ)-এর মিথ্যা প্রতিপাদন বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া এ কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর না হওয়ার দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে এই যে, স্বয়ং তার বিশিষ্ট সহচরগণ এবং উচ্চ পর্যায়ের ছাত্রগণও এর বিপরীত মত পোষণ করেন। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেন যে, দুইকেও (আরবী) বলা হয়। আমি এ মাসআলাটি পৃথক পুস্তিকায় পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। হযরত সাঈদ ইবনে কাতাদা (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। হ্যা, তবে যদি মৃত ব্যক্তির একটিমাত্র ভাই থাকে তবে সে মাতাকে এক তৃতীয়াংশ হতে সরাতে পারবে না। উলামা-ই-কিরামের ঘোষণা মতে এতে নিপুণতা রয়েছে এই যে, ভাইদের বিয়ে, খাওয়া, পরা ইত্যাদির খরচ বহন পিতারই দায়িত্বে রয়েছে, মাতার দায়িত্বে নেই। সুতরাং পিতাকে অধিক দেয়ার মধ্যেই হিকমত নিহিত রয়েছে। এটা উত্তম উক্তি। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, ভাইয়েরা মায়ের যে এক ষষ্ঠাংশ কমিয়ে দিল তা পিতা পাবে না, বরং ওরাই পাবে। ঐ উক্তি খুবই বিরল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ উক্তি সমস্ত উম্মতের বিপরীত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যার পুত্র ও পিতা না থাকে।এরপরে বলা হচ্ছে- ‘অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর মীরাস বন্টিত হবে।' পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মনীষী এতে একমত যে, ঋণ অসিয়তের অগ্রবর্তী। আয়াতের তাৎপর্যের প্রতি গভীর চিন্তা সহকারে লক্ষ্য করলে এটাই পরিলক্ষিত হবে। জামেউত্ তিরমিযী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা কুরআন কারীমের অসিয়তের নির্দেশ পূর্বে এবং ঋণের হুকুম পরে পাঠ করে থাক। কিন্তু জেনে রেখো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পূর্বে ঋণ পরিশোধ করিয়েছেন এবং পরে অসিয়ত জারী করেছেন। একই মাতাজাত ভ্রাতাগণ পরস্পর একে অপরের উত্তরাধিকারী হবে, বৈমাত্রেয় ভাইদের উত্তরাধিকারী হবে না। মানুষ তার সহোদর ভাইয়ের উত্তরাধিকারী হবে, কিন্তু ঐ ভাইয়ের উত্তরাধিকারী হবে না যার মা অন্য। এ হাদীসটি শুধু হযরত হারিস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং তার এ হাদীস কোন কোন মুহাদ্দিস খণ্ডন করেছেন। কিন্তু তিনি ফারায়েযের হাফিজ ছিলেন। এ বিদ্যায় তাঁর বিশেষ চিত্তাকর্ষতা ও দক্ষতা ছিল। অংকেও তাঁর বেশ পাণ্ডিত্য ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি পিতা ও পুত্রগণকে প্রকৃত মীরাসে নিজ নিজ নির্ধারিত অংশ গ্রহণকারী করেছি এবং অজ্ঞতা যুগের প্রথা দূরীভূত করেছি। বরং ইসলামেও প্রথমে মাল শুধুমাত্র সন্তানদেরকে দেয়ার নির্দেশ ছিল এবং বাপ মা শুধু অসিয়ত হিসেবে কিছু লাভ করতো, যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা সেটাকেও রহিত করে দিয়েছেন। এখন এ হুকুম হচ্ছে যে, পিতার দ্বারা তোমাদের বেশী উপকার সাধিত হবে কি পুত্রের দ্বারা হবে তা তোমাদের জানা নেই। উভয় হতেই উপকারের আশা রয়েছে। এদের একের অপর হতে বেশী উপকার লাভের নিশ্চয়তা নেই। পিতার চেয়ে পুত্রের দ্বারা বেশী উপকার লাভেরও সম্ভাবনা রয়েছে, আবার পুত্র অপেক্ষা পিতার দ্বারাও বেশী উপকার প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে।এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘ঐ নিধারিত অংশ ও উত্তরাধিকারের এ আহকাম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফরয করা হয়েছে। কোন আশায় বা ভয়ে এতে কম-বেশী করার কোন স্থান নেই। না কাউকে বঞ্চিত করা যাবে, না কাউকে বেশী দেয়া যাবে। আল্লাহ তাআলা সবজান্তা ও মহাবিজ্ঞ। যে যার হকদার তিনি তাকে তাই দিয়ে থাকেন। প্রত্যেক জিনিসের স্থান তিনি খুব ভালই জানেন। তোমাদের লাভ ও ক্ষতি সম্বন্ধে তার পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। তার কোন কাজ ও কোন নির্দেশ নিপুণতা শূন্য নয়। সুতরাং তাঁর নির্দেশাবলী তোমাদের মেনে চলা উচিত।'

আন-নিসা 4:12

আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে পুরুষ লোকেরা! তোমাদের স্ত্রীগণ যা ছেড়ে যাবে, যদি তাদের ছেলে মেয়ে থাকে তবে তোমরা এক চতুর্থাংশ পাবে। এটা তাদের অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে হবে। শৃংখলা বিধান হচ্ছে এই যে, পূর্বে তাদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তারপরে তাদের অসিয়ত পূরণ করতে হবে এবং পরে তাদের পরিত্যক্ত মাল বন্টিত হবে। এটা এমন একটি জিজ্ঞাস্য বিষয় যার উপর উম্মতের সমস্ত আলেমের ইজমা রয়েছে। এ মাসআলায় পুত্রের হুকুমে পৌত্র রয়েছে। এমনকি তাদের সন্তান এবং সন্তানের সন্তানও এ হুকুমেরই আওতাভুক্ত। অর্থাৎ তাদের বিদ্যমানতায়ও স্বামী তার স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ পাবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীদের অংশের কথা বলছেন যে, তারা স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ পাবে বা এক অষ্টমাংশ পাবে। স্বামীর সন্তান না থাকলে চতুর্থাংশ পাবে এবং সন্তান থাকলে এক অষ্টমাংশ পাবে। এই এক চতুর্থাংশ বা এক অষ্টমাংশের মধ্যে মৃত স্বামীর সমস্ত স্ত্রীই জড়িত থাকবে। চারজন, তিনজন বা দু’জন হলে তাদের মধ্যে এই অংশ সমানভাবে বন্টিত হবে। আর যদি একজনই হয় তবে অংশ সে একাই পাবে। (আরবী)-এর তাফসীর ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। (আরবী) 'শব্দটিকে (আরবী) শব্দ হতে বের করা হয়েছে ঐ মুকুট ইত্যাদিকে বলা হয় যা মস্তককে চতুর্দিক হতে ঘিরে নেয়। এখানে এর ভাবার্থ এই যে, তার উত্তরাধিকারী হচ্ছে চার পাশের লোক। তার আসল ও ফরা’ অর্থাৎ মূল ও শাখা নেই।হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে (আরবী) শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি আমার মতানুসারে উত্তর দিচ্ছি। যদি সেটা সঠিক হয় তবে তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হবে। আর যদি ভুল হয় তবে শয়তানের পক্ষ থেকে হবে। আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (সঃ) এটা হতে সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হবেন। তাকেই বলে যার পিতা ও পুত্র থাকে না। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) খলীফা হলে তিনিও তার অনুকূলেই মত প্রকাশ করেন এবং বলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মতের বিরুদ্ধাচরণ করতে আমি লজ্জাবোধ করি। (তাফসীর-ই ইবনে জারীর ইত্যাদি)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ)-এর সর্বশেষ যুগ আমি পেয়েছি। আমি তাকে বলতে শুনেছি-কথা ওটাই যা আমি বলেছি। সঠিক কথা এই যে, (আরবী) তাকেই বলা হয় যার পিতা ও পুত্র নেই। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আশবাঈ (রাঃ), হযরত নাখঈ (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ) এবং হযরত জাবির ইবনে যায়েদও (রঃ) এ কথাই বলেন। মদীনাবাসী, কুফাবাসী এবং বসরাবাসীরও এটাই উক্তি। সাতজন ধর্মশাস্ত্রবিদ, ইমাম চতুষ্টয় এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত জমহূর-ই-উলামাও এটাই বলেন। বহু মনীষী এর উপর ইজমা নকল করেছেন। একটি মারফু হাদীসেও এটাই এসেছে। ইবনে লাব্বান (রঃ) বলেনঃ “ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) তাকেই বলে যার সন্তান থাকে না। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক এবং খুব সম্ভব বর্ণনাকারী ভাবার্থই বুঝেনি।অতঃপর বলা হচ্ছে যে-তার ভাই অথবা বোন থাকে, অর্থাৎ মা পক্ষীয় ভাই বা বোন যেমন হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ) প্রভৃতি পূর্ববর্তী কয়েকজন মনীষীর কিরআত রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) প্রভৃতি (মহামানব) হতেও এ তাফসীরই বর্ণিত আছে। তাহলে তাদের প্রত্যেকের জন্য এক ষষ্ঠাংশ। আর যদি একাধিক থাকে তবে সবাই এক তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে। মাতাজাত ভ্রাতাগণ কয়েকটি কারণে অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণ হতে পৃথক। একটি এই যে, যারা তাদেরকে উত্তরাধিকারী করে দিচ্ছে তাদেরও তারা উত্তরাধিকারী হবে। যেমন মা। দ্বিতীয় এই যে, তাদের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী অর্থাৎ ভাই ও বোন সমান সমান মীরাস পাবে। তৃতীয় এই যে, তারা শুধুমাত্র ঐ সময়েই উত্তরাধিকারী হবে যখন মৃত ব্যক্তি পিতা ও পুত্রহীন হবে। সুতরাং তারা পিতা ও পিতামহ এবং পুত্র ও পৌত্রের বিদ্যমানতায় উত্তরাধিকারী হবে না। চতুর্থ এই যে, তারা এক তৃতীয়াংশের বেশী কোন অবস্থাতেই পায় না। তাদের সংখ্যা যতই বেশী হোক না কেন এবং পুরুষই হোক আর স্ত্রীই হোক। হযরত উমার (রাঃ)-এর ফায়সালা মতে মাতাজাত ভ্রাতা ভগ্নী তাদের মীরাস পরস্পরের মধ্যে এভাবে বন্টন করবে যে, ভাই পাবে দ্বিগুণ এবং বোন পাবে একগুণ। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) এ ফায়সালা করতে পারেন না যে পর্যন্ত না তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে থাকবেন। আয়াতে তো এটা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে যে, যদি একাধিক থাকে তবে তারা সবাই এক তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে। এমন অবস্থায় আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে যে, যদি মৃতের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে স্বামী, মাতা বা পিতামহী এবং দু' মা পক্ষীয় ভাই ও একটি বা একাধিক বাপ ও মা প্ৰক্ষীয় ভাই থাকে তবে জমহুরের মতে এ অবস্থায় স্বামী অর্ধেক পাবে, মাতা বা পিতামহী পাবে এক ষষ্ঠাংশ, মা পক্ষীয় ভ্রাতাগণ পাবে এক তৃতীয়াংশ এবং এতে মা ও বাপ উভয় পক্ষীয় ভ্রাতাগণও জড়িত থাকবে।আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর যুগে এরূপই একটি ঘটনা ঘটেছিল। তখন তিনি অর্ধেক মাল স্বামীকে প্রদান করেন এবং মা পক্ষীয় ভ্রাতাগণকে প্রদান করেন এক তৃতীয়াংশ। পরে মা ও বাপ উভয় পক্ষীয় ভ্রাতাগণ তাদের নিজেদের দাবীর কথা জানালে তিনি বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মা পক্ষীয় ভাইদের সঙ্গেই অংশীদার রয়েছ। অন্যান্য বর্ণনায় হযরত উসমানেরও (রাঃ) এরূপ অংশীদার করে দেয়ার কথা বর্ণিত আছে। এরূপই একটি বর্ণনা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) এবং ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাঃ), কাজী শুরাইহ (রঃ), মাসরূক (রঃ), তাউস (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ), সাওরী (রঃ) এবং শুয়েক (রঃ)-এর এটাই উক্তি। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ্ও (রঃ) এ দিকেই গিয়েছেন।তবে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) এতে অংশীদার হওয়ার মত সমর্থন করতেন না। বরং তিনি ঐ অবস্থায় মা পক্ষীয় সন্তানদেরকে এক তৃতীয়াংশ প্রদান করতেন এবং একই মা-বাপের সন্তানদেরকে কিছুই প্রদান করতেন না। কেননা এরা আসাবা। আর আসাবা তখনই পেয়ে থাকে যখন নির্দিষ্ট অংশ প্রাপকদের অংশ নেয়ার পর বেঁচে যায়। এমন কি হযরত অকী ইবনে জাররাহ (রঃ) বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) হতে এর বিপরীত করার কথা বর্ণিতই নেই। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এবং আবূ মূসা আশ আরীরও (রাঃ) এটাই উক্তি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। শা'বী (রঃ), ইবনে আবি লাইলা (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (রঃ), হাসান ইবনে যিয়াদ (রঃ), যুফার ইবনে হাযীল (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইয়াহইয়া ইবনে আদম (রঃ), নাঈদ ইবনে হাম্মাদ (রঃ), আবূ সাউর (রঃ), দাউদ ইবনে যাহেরীও (রঃ) ঐদিকেই গিয়েছেন।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘এই মীরাস বন্টন অসিয়ত পুরো করার পরে হতে হবে। অসিয়ত এমন হবে যে, যেন কোন অবিচার না হয়, কারও কোন ক্ষতি না হয়, কেউ অত্যাচারিত না হয়, কোন উত্তরাধিকারীর উত্তরাধিকার যেন মারা না যায় বা যেন কোন কম বেশী না হয়। এর বিপরীত অসিয়তকারী এবং এরূপ শরীয়ত বিরোধী অসিয়তের ব্যাপারে চেষ্টাকারী হচ্ছে আল্লাহ পাকের নির্দেশ অমান্যকারী, তাঁর শরীয়তের বিরুদ্ধাচরণকারী এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ অসিয়তের ব্যাপারে কারও কোন ক্ষতি সাধন করা কাবীরা গুনাহ। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিও এভাবেই বর্ণিত আছে। কোন কোন বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তার এ ঘঘাষণার পরে আয়াতের এ অংশটি পাঠ করার কথাও বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে সঠিক কথা এই যে, এটা মারফু হাদীস নয়, বরং মাওকুফ হাদীস। মৃত ব্যক্তি স্বীয় উত্তরাধিকারীর জন্যে কিছু চুক্তি করতে পারে কি-না এ ব্যাপারে ইমাম মহোদয়গণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারও কারও মতে এরূপ চুক্তি করা ঠিক নয়। কেননা, এতে অপবাদের সুযোগ রয়েছে।হাদীস শরীফে বিশুদ্ধ সনদে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হকদারের হক পৌছিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং এখন উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন অসিয়ত নেই।' ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর প্রথম উক্তি এটাই ছিল। কিন্তু তাঁর শেষ উক্তি এই যে, চুক্তি করা ঠিক হবে। তাউস (রঃ), আতা' (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। হযরত ইমাম বুখারীও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন এবং স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীর মধ্যে এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এর প্রমাণ হিসেবে নিম্নরূপ একটি বর্ণনাও রয়েছেঃ “হযরত রাফে ইবনে খুযায়েজ (রাঃ) অসিয়ত করেন যে, ফাযারিয়্যাহ যে জিনিসের উপর স্বীয় দরজা বন্ধ রাখে তা যেন ভোলা না হয়।' হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) বলেনঃ “কোন কোন লোক বলেন যে, মৃত ব্যক্তির এ চুক্তি উত্তরাধিকারীগণের কুধারণার কারণেই বৈধ হয়। কিন্তু আমি বলি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো বলেছেনঃ ‘তোমরা কুধারণা হতে বেঁচে থাক, কুধারণা সবেচেয়ে বড় মিথ্যা। আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যাদের আমানত তোমদের নিকট রয়েছে তাদের নিকট তোমরা তা পৌছিয়ে দাও। এখানে উত্তরাধিকারী ও অউত্তরাধিকারীকে বিশিষ্ট করা হয়নি। এটা স্মরণীয় বিষয় যে, এ মতবিরোধ ঐ সময় রয়েছে যখন এ চুক্তি প্রকৃতই সঠিক হবে এবং প্রকৃত কাজ অনুযায়ী হবে। যদি এ চুক্তি শুধুমাত্র ছল-চাতুরীর জন্য হয় এবং কোন কোন উত্তরাধিকারীকে বেশী দেয়া ও কাউকে কম দেয়ার জন্যে হয় তবে তা পুরো করা যে হারাম এ বিষয়ে সবাই একমত। এ আয়াতের স্পষ্ট শব্দগুলোও এর অবৈধতার ফতওয়া দিচ্ছে। এরপরে বলা হচ্ছে যে, এগুলো হচ্ছে সেই আল্লাহর নির্দেশ যিনি মহাজ্ঞানী ও সহিষ্ণু।

আন-নিসা 4:13

১৩-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্য হয় ও তাঁর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, যার মধ্যে সে সদা অবস্থান করবে। এরূপ লোকদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে। অর্থাৎ এসব অবশ্য করণীয় কাজ এবং এ পরিমাণ যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করেছেন ও মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসগণকে তাদের আত্মীয়তার নৈকট্য এবং তাদের প্রয়োজন অনুপাতে যার জন্যে যে অংশ নির্দিষ্ট করেছেন এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সীমারেখা, তোমরা ঐগুলো ভেঙ্গে দিয়ো না বা অতিক্রম করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশাবলী মেনে নেয়, কোন ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে কোন উত্তরাধিকারীকে কম বেশী দেয়ার চেষ্টা করে না, বরং আল্লাহ পাকের নির্দেশ পুরোপুরি পালন করে, আল্লাহ তাআলা অঙ্গীকার করেছেন যে, তিনি তাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন যার তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী সমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তারাই সফলকাম হবে এবং তাদেরই উদ্দেশ্য সফল হবে।পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ পাকের নির্দেশ পরিবর্তন করে দেয়, কোন ওয়ারিসের মীরাস কম বেশী করে, তার সন্তুষ্টি কামনা করে না, বরং তাঁর নির্দেশের বিপরীত কাজ করে বা তাঁর বন্টনকে ভাল চক্ষে দেখে না কিংবা তার আদেশকে ন্যায় মনে করে না, তারা চিরস্থায়ী অপমানজনক এবং বেদনাদায়ক শাস্তির মধ্যে অবস্থান করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “একটি লোক সত্তর বছর পর্যন্ত পুণ্যের কাজ করতে থাকে, অতঃপর সে অসিয়তে সময় অন্যায় ও অবিচার করে, ফলে তার পরিণতি খারাপ কার্যের উপর হয়ে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে।অপরপক্ষে আর একজন লোক সত্তর বছর পর্যন্ত অসৎ কাজ করতে থাকে, অতঃপর সে স্বীয় অসিয়তে ন্যায় পন্থা অবলম্বন করে, ফলে তার পরিণতি ভাল কাজের উপর হয়ে থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করে। অতঃপর এ হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ তোমরা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি পাঠ কর। সুনান-ই-আবি দাউদে (আরবী) -এর মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ একজন পুরুষ লোক বা স্ত্রীলোক ষাট বছর পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের কার্যে লেগে থাকে, অতঃপর সে মৃত্যুর সময় অসিয়তের ব্যাপারে কষ্ট ও ক্ষতিকর কাজ করে থাকে, তখন তার জন্যে জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) (আরবী) হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। জামেউত্ তিরমিযী ও সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেন। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে এ হাদীসটি পূর্ণভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

আন-নিসা 4:14

১৩-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্য হয় ও তাঁর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, যার মধ্যে সে সদা অবস্থান করবে। এরূপ লোকদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে। অর্থাৎ এসব অবশ্য করণীয় কাজ এবং এ পরিমাণ যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করেছেন ও মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসগণকে তাদের আত্মীয়তার নৈকট্য এবং তাদের প্রয়োজন অনুপাতে যার জন্যে যে অংশ নির্দিষ্ট করেছেন এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সীমারেখা, তোমরা ঐগুলো ভেঙ্গে দিয়ো না বা অতিক্রম করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশাবলী মেনে নেয়, কোন ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে কোন উত্তরাধিকারীকে কম বেশী দেয়ার চেষ্টা করে না, বরং আল্লাহ পাকের নির্দেশ পুরোপুরি পালন করে, আল্লাহ তাআলা অঙ্গীকার করেছেন যে, তিনি তাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন যার তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী সমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তারাই সফলকাম হবে এবং তাদেরই উদ্দেশ্য সফল হবে।পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ পাকের নির্দেশ পরিবর্তন করে দেয়, কোন ওয়ারিসের মীরাস কম বেশী করে, তার সন্তুষ্টি কামনা করে না, বরং তাঁর নির্দেশের বিপরীত কাজ করে বা তাঁর বন্টনকে ভাল চক্ষে দেখে না কিংবা তার আদেশকে ন্যায় মনে করে না, তারা চিরস্থায়ী অপমানজনক এবং বেদনাদায়ক শাস্তির মধ্যে অবস্থান করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “একটি লোক সত্তর বছর পর্যন্ত পুণ্যের কাজ করতে থাকে, অতঃপর সে অসিয়তে সময় অন্যায় ও অবিচার করে, ফলে তার পরিণতি খারাপ কার্যের উপর হয়ে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে।অপরপক্ষে আর একজন লোক সত্তর বছর পর্যন্ত অসৎ কাজ করতে থাকে, অতঃপর সে স্বীয় অসিয়তে ন্যায় পন্থা অবলম্বন করে, ফলে তার পরিণতি ভাল কাজের উপর হয়ে থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করে। অতঃপর এ হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ তোমরা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি পাঠ কর। সুনান-ই-আবি দাউদে (আরবী) -এর মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ একজন পুরুষ লোক বা স্ত্রীলোক ষাট বছর পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের কার্যে লেগে থাকে, অতঃপর সে মৃত্যুর সময় অসিয়তের ব্যাপারে কষ্ট ও ক্ষতিকর কাজ করে থাকে, তখন তার জন্যে জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) (আরবী) হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। জামেউত্ তিরমিযী ও সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেন। মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে এ হাদীসটি পূর্ণভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

আন-নিসা 4:15

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইসলামের প্রাথমিক যুগে এরূপ নির্দেশ ছিল যে, ন্যায়বান সাক্ষীদের সত্য সাক্ষ্য দ্বারা কোন স্ত্রীলোকের অশ্লীলতা প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে যেন বাড়ীর বাইরে যেতে দেয়া না হয় বরং জন্মের মত বাড়ীতেই যেন আটক রাখা হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে তাকে যেন ছেড়ে দেয়া না হয়। এটা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক বলেন-হ্যা তবে এটা অন্য কথা যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে কোন পথ নির্দেশ করে দেন। অতঃপর যখন অন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তখন পূর্বের ঐ নির্দেশ রহিত হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোকের জন্যে এ নির্দেশই ছিল। অতঃপর সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হলে বিবাহিতা নারীকে রজম করা অর্থাৎ প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং অবিবাহিতা নারীকে। একশ চাবুক মারার নির্দেশ দেয়া হয়।হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আতা' খুরাসানী (রঃ), হযরত আবু সালেহ (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), এবং হযরত যহ্হাকেরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে এবং এ বিষয়ে সবাই একমত। হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তা তাঁর উপর বড় ক্রিয়াশীল হতো এবং তিনি কষ্ট অনুভব করতেন ও তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যেতো। একদা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ করেন। অহীর সময়কালীন অবস্থা দূরীভূত হলে তিনি বলেনঃ “তোমরা আমার কথা গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে পথ নির্দেশ করেছেন।যদি বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা স্ত্রী ব্যভিচার করে তবে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে, অতঃপর প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে। আর অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রী ব্যভিচার করলে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে এবং এক বছর নির্বাসন দিতে হবে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও এ হাদীসটি শব্দের পরিবর্তনের সাথে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। এ রকমই সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে।ইবনে মিরদুওয়াই-এর গারীব হাদীসে অবিবাহিত ও বিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীর এ নির্দেশের সাথে সাথে এও রয়েছে যে, যদি তারা বুড়ো বুড়ী হয় তবে তাদেরকে রজম করতে হবে। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-নিসা অবতীর্ণ হওয়ার পর আবদ্ধ রাখার হুকুম অবিশষ্ট নেই।' এ হাদীস অনুযায়ী ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, বিবাহিত ও বিবাহিতা ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে চাবুকও মারতে হবে এবং রজমও করতে হবে। আর জমহূরের মতে চাবুক মারতে হবে না, শুধু রজম করতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মায়েয (রাঃ)-কে এবং গামেদিয়্যাহ নারীকে রজম করেছিলেন কিন্তু চাবুক মারেননি। অনুরূপভাবে রাসূলল্লাহ (সঃ) দু’জন ইয়াহূদীকে রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং রজমের পূর্বে তাদেরকে চাবুক মারার নির্দেশ দেননি। সুতরাং জমহুরের এ উক্তি অনুযায়ী জানা যাচ্ছে যে, রজমের পূর্বে চাবুক মারার নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং এটা জরুরী নয়। অতঃপর বলা হচ্ছে-যদি দু’জন পুরুষ পরস্পর এ নির্লজ্জতার কাজ করে তবে তোমরা তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর। অর্থাৎ তাদেরকে তিরস্কার কর, অপদস্থ কর, জুতো মার ইত্যাদি। চাবুক মারা ও রজব করার নির্দেশ দ্বারা এ নির্দেশও রহিত হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আতা’ (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থও হচ্ছে পুরুষ ও স্ত্রী। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ নব যুবকগণ যারা বিবাহিত নয়।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘লাওয়াতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাউকে তোমরা হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের কাজ করতে দেখলে তাকে এবং যার উপরে সে সেই কাজ করেছে তাকেও হত্যা করে ফেল।এরপর বলা হচ্ছে- যদি তারা উভয়ে এ কাজ হতে বিরত থাকে এবং সংশোধিত হয় তবে তোমরা তাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন করো না। কেননা, পাপ হতে প্রত্যাবর্তনকারী নিস্পাপ ব্যক্তির মতই।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, করুণাময়।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারও দাসী ব্যভিচার করে তখন যেন সে তাকে চাবুক দ্বারা শাস্তি প্রদান করে এবং তার উপর আর যেন কোন শাসন গর্জন না করে। অর্থাৎ শাস্তি প্রদানের পর মনিব যেন তার দাসীকে আর কোন দোষারোপ না করে। কেননা, শাস্তি প্রদানই হচ্ছে পাপ মোচনের উপায়।

আন-নিসা 4:16

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইসলামের প্রাথমিক যুগে এরূপ নির্দেশ ছিল যে, ন্যায়বান সাক্ষীদের সত্য সাক্ষ্য দ্বারা কোন স্ত্রীলোকের অশ্লীলতা প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে যেন বাড়ীর বাইরে যেতে দেয়া না হয় বরং জন্মের মত বাড়ীতেই যেন আটক রাখা হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে তাকে যেন ছেড়ে দেয়া না হয়। এটা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক বলেন-হ্যা তবে এটা অন্য কথা যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে কোন পথ নির্দেশ করে দেন। অতঃপর যখন অন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তখন পূর্বের ঐ নির্দেশ রহিত হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোকের জন্যে এ নির্দেশই ছিল। অতঃপর সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হলে বিবাহিতা নারীকে রজম করা অর্থাৎ প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং অবিবাহিতা নারীকে। একশ চাবুক মারার নির্দেশ দেয়া হয়।হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আতা' খুরাসানী (রঃ), হযরত আবু সালেহ (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), এবং হযরত যহ্হাকেরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে এবং এ বিষয়ে সবাই একমত। হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তা তাঁর উপর বড় ক্রিয়াশীল হতো এবং তিনি কষ্ট অনুভব করতেন ও তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যেতো। একদা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ করেন। অহীর সময়কালীন অবস্থা দূরীভূত হলে তিনি বলেনঃ “তোমরা আমার কথা গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে পথ নির্দেশ করেছেন।যদি বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা স্ত্রী ব্যভিচার করে তবে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে, অতঃপর প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে। আর অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রী ব্যভিচার করলে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে এবং এক বছর নির্বাসন দিতে হবে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও এ হাদীসটি শব্দের পরিবর্তনের সাথে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। এ রকমই সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে।ইবনে মিরদুওয়াই-এর গারীব হাদীসে অবিবাহিত ও বিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীর এ নির্দেশের সাথে সাথে এও রয়েছে যে, যদি তারা বুড়ো বুড়ী হয় তবে তাদেরকে রজম করতে হবে। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-নিসা অবতীর্ণ হওয়ার পর আবদ্ধ রাখার হুকুম অবিশষ্ট নেই।' এ হাদীস অনুযায়ী ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, বিবাহিত ও বিবাহিতা ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে চাবুকও মারতে হবে এবং রজমও করতে হবে। আর জমহূরের মতে চাবুক মারতে হবে না, শুধু রজম করতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মায়েয (রাঃ)-কে এবং গামেদিয়্যাহ নারীকে রজম করেছিলেন কিন্তু চাবুক মারেননি। অনুরূপভাবে রাসূলল্লাহ (সঃ) দু’জন ইয়াহূদীকে রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং রজমের পূর্বে তাদেরকে চাবুক মারার নির্দেশ দেননি। সুতরাং জমহুরের এ উক্তি অনুযায়ী জানা যাচ্ছে যে, রজমের পূর্বে চাবুক মারার নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং এটা জরুরী নয়। অতঃপর বলা হচ্ছে-যদি দু’জন পুরুষ পরস্পর এ নির্লজ্জতার কাজ করে তবে তোমরা তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর। অর্থাৎ তাদেরকে তিরস্কার কর, অপদস্থ কর, জুতো মার ইত্যাদি। চাবুক মারা ও রজব করার নির্দেশ দ্বারা এ নির্দেশও রহিত হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আতা’ (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থও হচ্ছে পুরুষ ও স্ত্রী। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ নব যুবকগণ যারা বিবাহিত নয়।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘লাওয়াতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাউকে তোমরা হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের কাজ করতে দেখলে তাকে এবং যার উপরে সে সেই কাজ করেছে তাকেও হত্যা করে ফেল।এরপর বলা হচ্ছে- যদি তারা উভয়ে এ কাজ হতে বিরত থাকে এবং সংশোধিত হয় তবে তোমরা তাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন করো না। কেননা, পাপ হতে প্রত্যাবর্তনকারী নিস্পাপ ব্যক্তির মতই।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, করুণাময়।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারও দাসী ব্যভিচার করে তখন যেন সে তাকে চাবুক দ্বারা শাস্তি প্রদান করে এবং তার উপর আর যেন কোন শাসন গর্জন না করে। অর্থাৎ শাস্তি প্রদানের পর মনিব যেন তার দাসীকে আর কোন দোষারোপ না করে। কেননা, শাস্তি প্রদানই হচ্ছে পাপ মোচনের উপায়।

আন-নিসা 4:17

১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, মহান আল্লাহ তাঁর ঐ বান্দাদের তাওবা কবূল করে থাকেন যারা অজ্ঞানতা বশতঃ কোন খারাপ কাজ করে বসে, অতঃপর তাওবা করে, যদিও এ তাওবা মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখার পরেও গড়গড়ার পূর্বে হয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন, ইচ্ছেপূর্বকই হোক আর ভুল বশতঃই হোক যে কেউই আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয় সেই অজ্ঞ, যে পর্যন্ত না সে তা হতে বিরত হয়। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ সাহাবা-ই-কিরাম বলতেন, বান্দা যে পাপ করে তা অজ্ঞতা বশতঃই করে। হযরত কাতাদাও (রঃ) সাহাবীদের একটি দল হতে অনুরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত আতা (রঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে। অবিলম্বে তাওবা করে নেয়ার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, মরণের ফেরেশতাকে দেখে নেয়ার পূর্বে মৃত্যু যন্ত্রণার সময়কে অবিলম্বে বলা হয়েছে। সুস্থ থাকার সময় তাওবা করা উচিত। গড়গড়ার সময়ের পূর্বে তাওবা করলে সেই তাওবা গৃহীত হয়ে থাকে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়ার সমস্তই নিকটেই বটে। এ সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে।(১) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা ককূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না গড়গড়া উপস্থিত হয়।' (জামেউত্ তিরমিযী) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি হাসান গারীব।(২) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি ও যে কোন বান্দা তার মৃত্যুর এক মাস পূর্বেও তাওবা করে, তার তাওবা আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করে থাকেন, এমনকি তার পরেও বরং মৃত্যুর এক দিন পূর্বে হলেও, এমনকি এক ঘন্টা পূর্বে হলেও। যে ব্যক্তি খাটি অন্তরে ও সত্যতার (সততার) সাথে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তিনি তার তাওবা কবূল করে থাকেন।(৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি তার মৃত্যুর এক বছর পূর্বে তাওবা করে আল্লাহ তা'আলা তার তাওবা গ্রহণ করে থাকেন। আর যে এক মাস পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও আল্লাহ পাক কবূল করে থাকেন এবং যে এক সপ্তাহ পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও তিনি গ্রহণ করেন। আর যে একদিন পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। এটা শুনে হযরত আইয়ূব (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যা শুনেছি তাই বলছি। (৪) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, চারজন সাহাবী একত্রিত হন। তাঁদের মধ্যে একজন বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি তার মৃত্যুর একদিন পূর্বেও তাওবা করে নেয়, আল্লাহ তা'আলা তার তাওবাও ককূল করে থকেন।' অন্য একজন জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যই কি আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ। তখন ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ 'যদি অর্ধদিন পূর্বেও তাওবা করে তবে সেই তাওবাও আল্লাহ তা'আলা কবূল করে থাকেন।'তৃতীয়জন বলেনঃ “তুমি কি এটা শুনেছ?' তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, আমি স্বয়ং শুনেছি।' তিনি বলেনঃ “আমি তো শুনেছিঃ যদি এক প্রহর পূর্বেও তাওবা করার সৌভাগ্য হয় তবে সেই তাওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। চতুর্থ ব্যক্তি বলেনঃ ‘আপনি এটা শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।' তিনি বলেনঃ আমি তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন পর্যন্ত শুনেছিঃ যে পর্যন্ত তার গড়গড়া উপস্থিত না হয় সে পর্যন্ত তার জন্যে তাওবার দরজা খোলা থাকে।(৫) তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পর্যন্ত গড়গড়া আরম্ভ না হয় সে পর্যন্ত তাওবা কবুল হয়ে থাকে। কয়েকটি মুরসাল হাদীসেও এ বিষয়টি রয়েছে। হযরত আবু কালাবা (রঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা। ইবলিসের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেন তখন সে অবকাশ চেয়ে বলেঃ আপনার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! আদম সন্তানের অন্তরে যে পর্যন্ত আত্মা থাকবে সে পর্যন্ত আমি তার অন্তর হতে বের হবে না। আল্লাহ তাআলা তখন উত্তরে বলেনঃ “আমিও আমার সম্মান ও মর্যাদার শপথ করে বলছি যে, যে পর্যন্ত তার দেহে আত্মা থাকবে সে পর্যন্ত আমি তার তাওবা কবূল করবো। একটি মারফু হাদীসেও এর কাছাকাছি বর্ণিত আছে। সুতরাং এ সমুদয় হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, বান্দা যে পর্যন্ত জীবিত রয়েছে এবং তার জীবনের আশা আছে সে পর্যন্ত যদি সে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তাওবা করে তবে আল্লাহ তা'আলা তার তাওবা কবূল করে থাকেন ও তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। আল্লাহ তা'আলা মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানময়।তবে হ্যাঁ, যখন সে জীবন হতে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে যাবে, মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে দেখতে পাবে এবং আত্মা দেহ হতে বেরিয়ে কণ্ঠনালীতে পৌছে যাবে এবং গড়গড়া শুরু হয়ে যাবে তখন তার তাওবা গৃহীত হয় না। এ জন্যেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “জীবন ভর যে পাপ কার্যে লিপ্ত থাকে এবং মৃত্যু অবলোকন করে বলে, এখন আমি তাওবা করছি।' এরূপ লোকের তাওবা গৃহীত হয় না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (দুই আয়াত পর্যন্ত) ভাবার্থ এই যে, আমার শাস্তি দেখে নেয়ার পর ঈমানের স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসবে না। (৪০:৮৪)অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) ভাবার্থ এই যে, যখন মানুষ সূর্যকে পশ্চিম দিকে উদিত হতে দেখবে তখন যে কেউ ঈমান আনয়ন করবে বা সকার্য সম্পাদন করবে তার সে সকাজ বা ঈমান কোন উপকারে আসবে না। (৬:১৫৮) অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “যারা কুফর ও শিরকের উপর মৃত্যু বরণ করে তাদেরও তাওবায় কোন উপকার হবে না, তাদের নিকট হতে কোন ক্ষতিপূরণ বা বিনিময়ও নেয়া হবে না। যদিও তারা পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণ দেবারও ইচ্ছে প্রকাশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মহাপুরুষ বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন যে পর্যন্ত পর্দা পড়ে না যায়। তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়, পর্দা পড়ে যাওয়ার অর্থ কি?' তিনি বলেনঃ ‘শিরকের অবস্থায় প্রাণ বহির্গত হওয়া। এরূপ লোকদের জন্যেই আল্লাহ তা'আলা চিরস্থায়ী বেদনাদায়ক শাস্তি তৈরী করে রেখেছেন।

আন-নিসা 4:18

১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, মহান আল্লাহ তাঁর ঐ বান্দাদের তাওবা কবূল করে থাকেন যারা অজ্ঞানতা বশতঃ কোন খারাপ কাজ করে বসে, অতঃপর তাওবা করে, যদিও এ তাওবা মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখার পরেও গড়গড়ার পূর্বে হয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন, ইচ্ছেপূর্বকই হোক আর ভুল বশতঃই হোক যে কেউই আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয় সেই অজ্ঞ, যে পর্যন্ত না সে তা হতে বিরত হয়। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ সাহাবা-ই-কিরাম বলতেন, বান্দা যে পাপ করে তা অজ্ঞতা বশতঃই করে। হযরত কাতাদাও (রঃ) সাহাবীদের একটি দল হতে অনুরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত আতা (রঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে। অবিলম্বে তাওবা করে নেয়ার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, মরণের ফেরেশতাকে দেখে নেয়ার পূর্বে মৃত্যু যন্ত্রণার সময়কে অবিলম্বে বলা হয়েছে। সুস্থ থাকার সময় তাওবা করা উচিত। গড়গড়ার সময়ের পূর্বে তাওবা করলে সেই তাওবা গৃহীত হয়ে থাকে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়ার সমস্তই নিকটেই বটে। এ সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে।(১) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা ককূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না গড়গড়া উপস্থিত হয়।' (জামেউত্ তিরমিযী) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি হাসান গারীব।(২) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি ও যে কোন বান্দা তার মৃত্যুর এক মাস পূর্বেও তাওবা করে, তার তাওবা আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করে থাকেন, এমনকি তার পরেও বরং মৃত্যুর এক দিন পূর্বে হলেও, এমনকি এক ঘন্টা পূর্বে হলেও। যে ব্যক্তি খাটি অন্তরে ও সত্যতার (সততার) সাথে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তিনি তার তাওবা কবূল করে থাকেন।(৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি তার মৃত্যুর এক বছর পূর্বে তাওবা করে আল্লাহ তা'আলা তার তাওবা গ্রহণ করে থাকেন। আর যে এক মাস পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও আল্লাহ পাক কবূল করে থাকেন এবং যে এক সপ্তাহ পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও তিনি গ্রহণ করেন। আর যে একদিন পূর্বে তাওবা করে তার তাওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। এটা শুনে হযরত আইয়ূব (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যা শুনেছি তাই বলছি। (৪) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, চারজন সাহাবী একত্রিত হন। তাঁদের মধ্যে একজন বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি তার মৃত্যুর একদিন পূর্বেও তাওবা করে নেয়, আল্লাহ তা'আলা তার তাওবাও ককূল করে থকেন।' অন্য একজন জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যই কি আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ। তখন ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ 'যদি অর্ধদিন পূর্বেও তাওবা করে তবে সেই তাওবাও আল্লাহ তা'আলা কবূল করে থাকেন।'তৃতীয়জন বলেনঃ “তুমি কি এটা শুনেছ?' তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, আমি স্বয়ং শুনেছি।' তিনি বলেনঃ “আমি তো শুনেছিঃ যদি এক প্রহর পূর্বেও তাওবা করার সৌভাগ্য হয় তবে সেই তাওবাও গৃহীত হয়ে থাকে। চতুর্থ ব্যক্তি বলেনঃ ‘আপনি এটা শুনেছেন?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।' তিনি বলেনঃ আমি তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন পর্যন্ত শুনেছিঃ যে পর্যন্ত তার গড়গড়া উপস্থিত না হয় সে পর্যন্ত তার জন্যে তাওবার দরজা খোলা থাকে।(৫) তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পর্যন্ত গড়গড়া আরম্ভ না হয় সে পর্যন্ত তাওবা কবুল হয়ে থাকে। কয়েকটি মুরসাল হাদীসেও এ বিষয়টি রয়েছে। হযরত আবু কালাবা (রঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা। ইবলিসের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেন তখন সে অবকাশ চেয়ে বলেঃ আপনার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! আদম সন্তানের অন্তরে যে পর্যন্ত আত্মা থাকবে সে পর্যন্ত আমি তার অন্তর হতে বের হবে না। আল্লাহ তাআলা তখন উত্তরে বলেনঃ “আমিও আমার সম্মান ও মর্যাদার শপথ করে বলছি যে, যে পর্যন্ত তার দেহে আত্মা থাকবে সে পর্যন্ত আমি তার তাওবা কবূল করবো। একটি মারফু হাদীসেও এর কাছাকাছি বর্ণিত আছে। সুতরাং এ সমুদয় হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, বান্দা যে পর্যন্ত জীবিত রয়েছে এবং তার জীবনের আশা আছে সে পর্যন্ত যদি সে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তাওবা করে তবে আল্লাহ তা'আলা তার তাওবা কবূল করে থাকেন ও তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। আল্লাহ তা'আলা মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানময়।তবে হ্যাঁ, যখন সে জীবন হতে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে যাবে, মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে দেখতে পাবে এবং আত্মা দেহ হতে বেরিয়ে কণ্ঠনালীতে পৌছে যাবে এবং গড়গড়া শুরু হয়ে যাবে তখন তার তাওবা গৃহীত হয় না। এ জন্যেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “জীবন ভর যে পাপ কার্যে লিপ্ত থাকে এবং মৃত্যু অবলোকন করে বলে, এখন আমি তাওবা করছি।' এরূপ লোকের তাওবা গৃহীত হয় না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (দুই আয়াত পর্যন্ত) ভাবার্থ এই যে, আমার শাস্তি দেখে নেয়ার পর ঈমানের স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসবে না। (৪০:৮৪)অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) ভাবার্থ এই যে, যখন মানুষ সূর্যকে পশ্চিম দিকে উদিত হতে দেখবে তখন যে কেউ ঈমান আনয়ন করবে বা সকার্য সম্পাদন করবে তার সে সকাজ বা ঈমান কোন উপকারে আসবে না। (৬:১৫৮) অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “যারা কুফর ও শিরকের উপর মৃত্যু বরণ করে তাদেরও তাওবায় কোন উপকার হবে না, তাদের নিকট হতে কোন ক্ষতিপূরণ বা বিনিময়ও নেয়া হবে না। যদিও তারা পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণ দেবারও ইচ্ছে প্রকাশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মহাপুরুষ বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন যে পর্যন্ত পর্দা পড়ে না যায়। তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়, পর্দা পড়ে যাওয়ার অর্থ কি?' তিনি বলেনঃ ‘শিরকের অবস্থায় প্রাণ বহির্গত হওয়া। এরূপ লোকদের জন্যেই আল্লাহ তা'আলা চিরস্থায়ী বেদনাদায়ক শাস্তি তৈরী করে রেখেছেন।

আন-নিসা 4:19

১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কোন লোক মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে তার স্ত্রীর পূর্ণ দাবীদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে তাকে নিজেই বিয়ে করে নিতো, ইচ্ছে করলে অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো, আবার ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে করতেই দিতো না। ঐ স্ত্রীলোকটির আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষা এ লোকটিকেই তার বেশী হকদার মনে করা হতো। অজ্ঞতা যুগের এ জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মানুষ ঐ স্ত্রীলোকটিকে বাধ্য করতো যে, সে যেন মোহরের দাবী পরিত্যাগ করে কিংবা সে যেন আর বিয়েই করে। এও বর্ণিত আছে যে, কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে একটি লোক এসে ঐ স্ত্রীর উপর একখানা কাপড় নিক্ষেপ করতো এবং ঐ লোকটিকেই ঐ স্ত্রীলোকটির দাবীদার মনে করা হতো। এটাও বর্ণিত আছে যে, ঐ স্ত্রীলোকটি সুন্দরী হলে ঐ কাপড় নিক্ষেপকারী ব্যক্তি তাকে বিয়ে করে নিতে এবং বিশ্রী হলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বিধবা অবস্থাতেই রেখে দিতো। অতঃপর সে তার উত্তরাধকারী হয়ে যেতো। এও বর্ণিত আছে যে, ঐ মৃত ব্যক্তির অন্তরঙ্গ বন্ধু ঐ স্ত্রীর উপর কাপড় নিক্ষেপ করতো। অতঃপর ঐ স্ত্রী তাকে কিছু মুক্তিপণ বা বিনিময় প্রদান করলে সে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিতো, নচেৎ সে আজীবন বিধবাই থেকে যেতো।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের প্রথা ছিল এই যে, কোন লোক মারা গেলে যে ব্যক্তি তার মালের উত্তরাধিকারী হতে সে তার স্ত্রীরও উত্তরাধিকারী হতো। তারা স্ত্রীলোকদের সাথে অত্যন্ত জঘন্য ব্যবহার করতো। এমনকি তালাক প্রদানের সময়েও তাদের সাথে শর্ত করতো যে, তারা নিজেদের ইচ্ছেমত তাদের বিয়ে দেবে। এ প্রকারের বন্দীত্ব হতে মুক্ত হওয়ার এ পন্থা বের করা হয়েছিল যে, ঐ নারীগণ ঐ পুরুষ লোকদেরকে মুক্তিপণ স্বরূপ কিছু প্রদান করতো। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্যে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আবু কায়েস ইবনে। আসলাত মারা গেলে তার পুত্র অজ্ঞতা যুগের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রীকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে মানুষ মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে কোন একটি শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে দিতো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন কোন লোক মারা যেতো তখন তার পুত্রকেই তার স্ত্রীর বেশী হকদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে নিজেই তার বিমাতাকে বিয়ে করতো বা ইচ্ছেমত ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতো।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু কায়েসের ঐ স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে কাবীশাহ (রাঃ)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ সংবাদ প্রদান করে বলেন, এ লোকগুলো না আমাকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গণ্য করে আমার স্বামীর মীরাস প্রদান করছে, না আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে যে আমি অন্য কারও সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কাপড় নিক্ষেপের পূর্বেই যদি মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পালিয়ে গিয়ে তার পিত্রালয়ে চলে যেতো তবে সে মুক্তি পেয়ে যেতো।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যার নিকট কোন পিতৃহীনা বালিকা থাকতো তাকে সে আটক রাখতো এ আশায় যে, তার স্ত্রী মারা গেলে সে তাকে বিয়ে করবে কিংবা তার পুত্রের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেবে। এসব কথার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াত দ্বারা এসব কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং স্ত্রীলোকদেরকে এসব বিপদ হতে রক্ষা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- ‘স্ত্রীদের বাসস্থানকে সংকীর্ণ করতঃ তাদেরকে কষ্ট দিয়ে বাধ্য করো না যে, তারা যেন সমস্ত মোহর বা মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দেয় বা তাদের অবশ্য প্রাপ্য কোন হক পরিত্যাগ করে। কেননা, তাদেরকে শাসন গর্জন করে এই কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, স্ত্রী পছন্দ হচ্ছে না, তার সাথে মনোমালিন্য হচ্ছে, কাজেই তাকে ছেড়ে দিতে চায়। কিন্তু ছেড়ে দিলে মোহর ইত্যাদি সমস্ত হক পুরোপুরি দিতে হবে। এর থেকে বাঁচবার জন্যে স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছে এবং তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, যেন সে নিজেই বাধ্য হয়ে সমস্ত প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে এসব জঘন্য প্রথা হতে বিরত রাখেন। ইবনে। সালমানী (রঃ) বলেন, এ আয়াত দু'টির মধ্যে প্রথম আয়াতটি অজ্ঞতা যুগের প্রথাকে উঠিয়ে দেয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয় আয়াতটি ইসলামী রীতির সংশোধনের জন্যে অবতীর্ণ হয়। ইবনে মুবারকও (রঃ) এটাই বলেন।এরপর বলা হচ্ছে-“কিন্তু যদি তাদের দ্বারা প্রকাশ্য অশ্লীলতা প্রকাশ পায়। সাহাবী ও তাবেঈগণের অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে প্রকাশ্য অশ্লীলতার ভাবার্থ হচ্ছে ব্যভিচার। অর্থাৎ সে সময় তাদের নিকট হতে মোহর ফিরিয়ে নেয়া বৈধ। সে সময় তাদের জীবনকে সঙ্কটময় করে তোলা উচিত, যেন তারা খোলা করে নিতে বাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-বাকারার মধ্যে রয়েছে- “তোমাদের জন্যে বৈধ নয় যে, তাদেরকে প্রদত্ত মোহর হতে তোমরা কিছু গ্রহণ কর, কিন্তু শুধু সেই সময় পার যখন তাদের উভয়ের আল্লাহর সীমা ঠিক রাখতে না পারার ভয় হবে।' কারও কারও মতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করা, তার অবাধ্য হওয়া, তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করা, তার হক পুরোপুরি আদায় না করা ইত্যাদি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ, এর মধ্যে ব্যভিচারও রয়েছে এবং এ আচরণও রয়েছে। অর্থাৎ এ সর্বাবস্থায় স্বামীর জন্যে স্ত্রীর জীবন সংকটপূর্ণ করে তোলা বৈধ, যেন সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় ও পরে তাকে পৃথক করে দেয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথা খুবই যুক্তিযুক্ত। ইতিপূর্বে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ পর্যন্ত এ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা যুগের ঐ কুপ্রথাগুলো যা হতে আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে নিষেধ করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ পূর্ণ বর্ণনা ইসলাম দ্বারা অজ্ঞতা যুগের প্রথাগুলোকে সরিয়ে দেয়ার জন্যেই দেয়া হয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল যে, কোন লোক কোন ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করতো। অতঃপর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতো। কিন্তু এ শর্ত করতো যে, স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া অন্য জায়গায় বিয়ে করতে পারবে না। ঐকথার উপর সাক্ষী নির্ধারণ করতে এবং চুক্তিপত্র লিখে নেয়া হতো। তখন কোন জায়গা হতে বিয়ের গয়গাম এলে স্ত্রী যদি সে বিয়েতে সম্মত হতো তবে তার পূর্ব স্বামী বলতো, তুমি যদি আমাকে এত টাকা দাও তবে তোমাকে বিয়ের অনুমতি প্রদান করবো। স্ত্রী সম্মত হলে তো ভালই, নচেৎ তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়া হতো না। ওর নিষিদ্ধ ঘোষণায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ)-এর কথামত, এ নির্দেশ এবং সূরা-ই-বাকারার আয়াতের নির্দেশ একই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে অবস্থান কর, তাদের সাথে ন্ত্র ব্যবহার কর। সাধ্যানুযায়ী নিজের অবস্থাও ভাল রাখ। তোমরা যেমন চাও যে, তোমাদের স্ত্রীরা উত্তম সাজে সুসজ্জিতা থাকুক, দ্রুপ তোমরাও তাদের মনস্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে সুন্দর সাজে সজ্জিত রাখ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সদ্ভাবে যেমন তোমাদের অধিকার তাদের উপর রয়েছে তেমনই তাদের অধিকারও তোমাদের উপর রয়েছে।' (২৪২২৮) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারকারী হয়। আমি আমার সহধর্মিণীদের সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করে থাকি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পত্নীদের সাথে অত্যন্ত নম্র ব্যবহার করতেন, তাঁদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন, তাদেরকে সদা খুশী রাখতেন, মনোমুগ্ধকর কথা বলতেন, তাঁদের অন্তর তিনি স্বীয় মুষ্টির মধ্যে রাখতেন, তাঁদের জন্যে উত্তম খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতেন, প্রশান্ত মনে তাদের উপর খরচ করতেন এবং মাঝে মাঝে তিনি এমন কথাও বলতেন যে, তাঁরা হেসে উঠতেন। এমনও ঘটেছে যে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রঃ)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। সে দৌড়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) আগে বেড়ে যান। কিছু দিন পর আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে হযরত আয়েশা (রাঃ) পিছনে পড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “শোধ বোধ হয়ে গেল। এর দ্বারাও তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট রাখা।যে পত্নীর ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাত্রি যাপনের পালা পড়তো তথায় তার সমস্ত সহধর্মিণীগণ একত্রিত হতেন। তারা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতেন, আলাপ আলোচনা হতো এবং মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের সাথে রাত্রের খাবার খেতেন। অতঃপর তারা নিজ নিজ ঘরে চলে যেতেন এবং তিনি তথায়ই রাত্রি যাপন করতেন। স্বীয় সহধর্মিণীর সাথে একই চাদরে শয়ন করতেন, জামা খুলে ফেলতেন, শুধু লুঙ্গি পরে থাকতেন। ইশার নামাযের পর ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলতেন যেন সহধর্মিণীদের মন খুশী হয়। মোটকথা তিনি স্ত্রীদেরকে অত্যন্ত ভালবাসার সাথে রাখতেন। সুতরাং মুসলমানদেরও স্ত্রীদের সাথে প্রেম-প্রীতি বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণেই তোমাদের মঙ্গল রয়েছে। এর বিস্তারিত আহকাম বৰ্ণনার জায়গা তাফসীর নয় বরং ওর জন্য ঐ বিষয়েরই গ্রন্থরাজি রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “মন না চাইলেও স্ত্রীদের বাসস্থানের সুবন্দোবস্ত করার মধ্যেই এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, ওর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বড় রকমের মঙ্গল দান করেন। হয় তো তাদের উদরে সৎ সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং তাদের দ্বারা আল্লাহ পাক উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী করবেন।” বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে পৃথক করে না দেয়। যদি সে তার একটি আধটি কথায় অসন্তুষ্টও হয় তবে সে স্ত্রী তার কোন ব্যবহার দ্বারা সন্তুষ্টও করবে।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ইচ্ছে করে এবং তার স্থানে অন্যকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে সে যেন তার স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহর হতে কিছুই ফিরিয়ে না নেয়, যদিও তাকে প্রচুর মাল প্রদান করে থাকে। সূরা আলে ইমরানের মধ্যে। শব্দের তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন আবশ্যকতা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীকে মোহর হিসেবে প্রচুর মাল প্রদান করাও বৈধ। হযরত উমার (রাঃ) প্রথমে প্রচুর মোহর হতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর সে কথা ফিরিয়ে নেন।যেমন মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, তিনি বলেছিলেনঃ “তোমরা মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। যদি এটা পার্থিব ব্যাপারে কোন ভাল জিনিস হতো বা আল্লাহ তা'আলার নিকট মুত্তাকী পরিচয়ের কাজ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সর্ব প্রথম ওর উপর আমল করতেন। তিনি তো তার কোন স্ত্রীর বা কন্যার মোহর বারো আওকিয়্যার (প্রায় একশ পঁচিশ টাকা) বেশী করেননি। মানুষ অতিরিক্ত মোহর বেঁধে বিপদে পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী তার উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে যায় এবং তার অন্তরে তার প্রতি শত্রুতার সৃষ্টি হয়। সে তখন স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার স্কন্ধে মোশক ঝুলিয়ে দিয়েছ। এ হাদীসটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা লম্বা চওড়া মোহর বাধতে আরম্ভ করলে কেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ তো চারশ দিরহামের (প্রায় একশ টাকা) বেশী মোহর করেননি। এটা যদি অধিক মুত্তাকী হওয়া এবং দানশীলতার কাজ হতো তবে তোমরা ওর দিকে অগ্রগামী হতে না। সাবধান! আজ হতে আমি যেন শুনতে না পাই যে কেউ চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করেছ।' এ কথা বলে নীচে নেমে আসেন তখন একজন কুরাইশ রমণী সম্মুখে এসে তাকে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি জনগণকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যা। তখন স্ত্রীলোকটি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যে কালাম অবতীর্ণ করেছেন তা কি আপনি শুনেননি?' তিনি বলেন, ‘ঐ কালাম কি? স্ত্রীলোকটি বলেন, “শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এবং তোমরা তাদের কাউকে বিপুল ধনরাশি দিয়ে থাক’। হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। উমার (রাঃ) হতে তো প্রত্যেকেই বেশী জানে।' অতঃপর তিনি ফিরে যান এবং তৎক্ষণাৎ মিম্বরের উপর উঠে জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর দিতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন বলছি যে, যে কোন লোক তার মাল হতে ইচ্ছেমত মোহর নির্ধারণ করতে পারে। আমি বাধা দেব না।'অন্য একটি বর্ণনায় ঐ স্ত্রীলোকটির আয়াতটিকে নিম্নরূপ পাঠ করার কথা বর্ণিত আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং তোমরা তাদেরকে প্রচুর স্বর্ণ প্রদান করে থাক।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পঠনেও এরূপই বর্ণিত আছে এবং উমারের উপর একটি স্ত্রীলোক বিজয় লাভ করলো’ হযরত উমার (রাঃ)-এর এ উক্তিও বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ যদিও বিল কিস্সা অর্থাৎ ইয়াযিদ ইবনে হুসাইন হারেসীরও, মেয়ে হয় তথাপি তারও মোহর বেশী নির্ধারণ করো না। আর তোমরা যদি এরূপ কর তবে ঐ অতিরিক্ত অংক বায়তুল মালে জমা করে নেবো।' তখন এক দীর্ঘ দেহ ও চওড়া নাক বিশিষ্টা স্ত্রীলোক বলেনঃ “জনাব! আপনি এ কথা বলতে পারেন না। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “কেন?' তিনি বলেনঃ “যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)-তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, “স্ত্রীলোকটি ঠিক বলেছে এবং পুরুষ লোকটি ভুল করেছে।'অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- তোমাদের স্ত্রীদেরকে প্রদত্ত মোহর তোমরা কিরূপে ফিরিয়ে নেবে? অথচ তোমরা তাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছ, প্রয়োজন মিটিয়েছ, তারা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তোমারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছ। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ঐ হাদীসে রয়েছে যার মধ্যে একটি লোকের তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ পেশ করার কথা বর্ণিত আছে, অতঃপর তাদের উভয়ের শপথ গ্রহণ তার পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিঃ ‘তোমাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তোমাদের মধ্যে কেউ এখনও তাওবা করছে কি? তিনি এ কথা তিনবার বলেন। তখন পুরুষ লোকটি বলে, তার মোহর সম্বন্ধে আপনি কি বলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘ওর বিনিময়েই তো সে তোমার জন্য বৈধ হয়েছিল। এখন যদি তুমি তার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়ে থাক তবে তো এটা আরও বহু দূরের কথা।অনুরূপভাবে আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত নারা (রাঃ) একটি কুমারীকে বিয়ে করেন। তার সাথে মিলিত হতে গিয়ে তিনি দেখেন যে, সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করলে তিনি তাকে পৃথক করিয়ে দেন এবং হযরত নারা (রাঃ)-কে মোহর দিয়ে দিতে বলেন এবং স্ত্রীকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সে তোমার গোলাম হবে এবং মোহর তো তাকে বৈধ করার কারণ ছিল।' (সুনান-ই-আবি দাউদ)মোটকথা আয়াতের ভাবার্থ এই যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিলন হয়েই গেছে। সুতরাং এখন মোহর ফিরিয়ে নেয়ার কোন অর্থ থাকে না। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-বিবাহ বন্ধন হচ্ছে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার যার মধ্যে তোমরা আবদ্ধ হয়েছ। তোমরা মহান আল্লাহর এ নির্দেশ শুনেছঃ “তোমরা তাদেরকে বন্ধনে রাখলে ভালভাবে রাখ, আর পরিত্যাগ করলে উত্তম পন্থায় পরিত্যাগ কর।' হাদীস শরীফেও রয়েছেঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত দ্বারা গ্রহণ করে থাক এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা নিজেদের জন্যে বৈধ করে থাক।' অর্থাৎ বিবাহের খুত্বার সাক্ষ্য দ্বারা তাদেরকে হালাল করে থাক।মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেসব দানে ভূষিত করা হয়েছিল তন্মধ্যে একটি এও ছিল যে, তাঁকে বলা হয়েছিল-তোমার উম্মতের কোন ভাষণই বৈধ নয় যে পর্যন্ত না সে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তুমি আমার বান্দা এবং রাসূল।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা হালাল করেছ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বিমাতাকে বিয়ে করার অবৈধতা বর্ণনা করতঃ তার সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রকাশ করেছেন। এমনকি বাপ হয়তো শুধু বিয়েই করেছে, এখনও মা পিত্রালয় হতে বিদায় হয়েও আসেনি। এমতাবস্থায় তার তালাক হয়ে গেল বা পিতা মারা গেল তথাপিও ঐ স্ত্রী তার ছেলের উপর হারাম হয়ে যাবে। এর উপর ইজমা হয়ে গেছে। হযরত আবু কায়েশ (রাঃ) যিনি একজন বড় মর্যাদা সম্পন্ন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কায়েস তার স্ত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, অথচ তিনি তার বিমাতা ছিলেন। তখন তার বিমাতা তাকে বলেন, “তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সৎ লোক।কিন্তু আমি তোমাকে আমার ছেলেরূপ গণ্য করে থাকি। আচ্ছা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছি।'রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তিনি (পুত্রের বিমাতা) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি বাড়ী ফিরে যাও। অতঃপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- যাকে বাপ বিয়ে করেছে তাকে বিয়ে করা পুত্রের জন্য হারাম।' এ ধরনের আরও বহু ঘটনা সে সময় বিদ্যমান ছিল যাদেরকে এ কামনা হতে বিরত রাখা হয়েছিল। এক তো হলো এ আবু কায়েশ (রাঃ)-এর ঘটনা। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে উবাইদিল্লাহ যামরা’ (রাঃ)। দ্বিতীয় ঘটনা ছিল হযরত খালাফ (রাঃ)-এর যার ঘরে হযরত আবু তালহা (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাফওয়ান তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে করেছিল। হযরত সাহিলী (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকার যুগে এরূপ বিয়ে চালু ছিল এবং সেটাকে নিয়মিত বিয়ে মনে করা হতো ও সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য করা হতো। এ জন্যেই এখানেও বলা হচ্ছে-‘অতীতে যা হয়েছে তা হয়েছেই। যেমন দু’বোনকে একত্রে বিয়ে করার অবৈধতার কথা বর্ণনা করার পর এটাই বলা হয়েছে। কিনানা ইবনে খুযাইমাও এ কাজ করেছিল অর্থাৎ স্বীয় পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। তার গর্ভেই নাযারের জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছেঃ “আমার উপরের বংশের উৎপত্তিও বিয়ের দ্বারাতেই হয়েছে ব্যভিচারের দ্বারা নয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, এ প্রথা তাদের মধ্যে বরাবরই চালু ছিল, বৈধ ছিল এবং বিবাহ বলে গণ্য ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে আত্মীয়কে (বিয়ে করা) আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন ঐ সবকে অজ্ঞতা যুগের লোকেরাও হারাম বলে জানতো। শুধুমাত্র বিমাতা ও দু’বোনকে এক সাথে বিয়ে করাকে তারা হালাল মনে করতো। সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকের মধ্যে এদেরকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহও (রঃ) এটাই বলেন।এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, সাহিলী (রাঃ) কিনানার যে ঘটনাটি নকল করেছেন তা চিন্তা ও বিবেচনার বিষয়-সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয়। যা হোক, এ সম্বন্ধে এ উম্মতের উপর সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এমনকি আল্লাহ পাক বলেন যে, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও অরুচিকর এবং নিকৃষ্টতর পন্থা।অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছে-‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্টতর পন্থা। এখানে ওর চেয়েও বেশী বলেছেন যে, এটা অরুচিকরও বটে। অর্থাৎ এটা প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও জঘন্য কাজ। এর ফলে পিতা ও পুত্রের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে সে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি শত্রুতাই পোষণ করে থাকে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীগণকে মমিনদের মা রূপে গণ্য করা হয়েছে এবং উম্মতের উপর মা। দের মতই তাঁদেরকেও হারাম করা হয়েছে। কেননা, তাঁরা নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী, আর তিনি স্বীয় উম্মতের পিতার মতই। এমনকি ইজমা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তার হক বাপ দাদার হকের চাইতেও বেশী। বরং তার প্রতি ভালবাসাকে জীবনের প্রতি ভালবাসার উপরেও স্থান দেয়া হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, একাজ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ এবং অতি নিকৃষ্ট পন্থা। সুতরাং যে একাজ করে সে ধর্মত্যাগীর মধ্যে গণ্য। কাজেই তাকে হত্যা করা হবে এবং তার মাল ফাই' (বিনা যুদ্ধেই শত্রুদের নিকট থেকে যে মাল পাওয়া যায় তাকে ফাই বলা হয়) হিসেবে বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন সাহাবীকে ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরণ করেন যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। উক্ত সাহাবীর প্রতি নির্দেশ হয়েছিল যে, তিনি যেন তাকে হত্যা করেন ও তার মাল নিয়ে নেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ আমার পিতৃব্য হযরত হারিস ইবনে উমায়ের (রাঃ) নবী (সঃ) প্রদত্ত পতাকা নিয়ে আমার নিকট দিয়ে গমন করলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে কোথায় পাঠিয়েছেন? তিনি বলেন, আমি ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরিত হয়েছি যে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। তার গর্দান মারার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মাসআলাঃ এর উপর আলেমদের ইজমা রয়েছে যে, যে স্ত্রীর সঙ্গে পিতার সঙ্গম হয়েছে, হয় বিয়ে করেই হোক বা দাসী করেই হোক কিংবা সন্দেহের কারণেই হোক, ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করা পুত্রের জন্যে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি সঙ্গম না হয়, শুধুমাত্র সহবাস হয় কিংবা তার এমন অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করে যে অঙ্গের প্রতি ন্যর করা অপরিচিত হওয়ার অবস্থাতেও তার জন্যে হালাল ছিল না, এতে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমাদ তো সে অবস্থাতেও স্ত্রীকে পুত্রের উপর হারাম বলে থাকেন। হাফিয ইবনে আসাকেরের নিম্নের ঘটনা দ্বারাও এ মাযহাবের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঘটনাটি এই যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত খুদায়েজ হামশী (রাঃ) হযরত মুআবিয়ার জন্যে গৌরবর্ণের একটি সুশ্রী দাসী ক্রয় করেন এবং কাপড় ছাড়াই সাদীটিকে তার নিকট পাঠিয়ে দেন। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। এ ছড়ি দ্বারা ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘উত্তম সামগ্রী, যদি তার সামগ্রী হতো'।অতঃপর তিনি বলেন, একে ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দাও।' আবার বলেন, না, না থাম। রাবীআ' ইবনে আমর হারসী (রঃ)-কে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি একজন বড় ধর্মশাস্ত্রবিদ ছিলেন। তিনি এলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে নিম্নের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি এ স্ত্রীলোকটির এই এই অঙ্গ দেখেছি। সে কাপড় পরিহিতা ছিল না। এখন আমি। তাকে আমার পুত্র ইয়াযীদের নিকট পাঠাবার মনস্থ করেছি। এ তার জন্যে বৈধ হবে কি? হযরত রাবীআ’ বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এরূপ করবেন না। এ তার যোগ্য হয়নি।' তখন হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। অতঃপর তিনি তার লোকদেরকে বলেন, 'যাও, আবদুল্লাহ ইবনে সা'দা ফাযাযী (রাঃ)-কে ডেকে আন। তিনি এলেন। তিনি গোধুম বর্ণের ছিলেন। তাকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, এ দাসীটি আমি তোমাকে দান করছি, যেন তোমার সাদা বর্ণের সন্তান জন্ম লাভ করে। এই আবদুল্লাহ ইবনে সাদা (রাঃ) ছিলেন ঐ ব্যক্তি যাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। তিনি তাঁকে লালন পালন করেন, অতঃপর আল্লাহর নামে আযাদ করে দেন। তিনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট চলে আসেন।