Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আন-নিসা 4:20 – আন-নিসা 4:42

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আন-নিসা 4:20
  2. আন-নিসা 4:21
  3. আন-নিসা 4:22
  4. আন-নিসা 4:23
  5. আন-নিসা 4:24
  6. আন-নিসা 4:25
  7. আন-নিসা 4:26
  8. আন-নিসা 4:27
  9. আন-নিসা 4:28
  10. আন-নিসা 4:29
  11. আন-নিসা 4:30
  12. আন-নিসা 4:31
  13. আন-নিসা 4:32
  14. আন-নিসা 4:33
  15. আন-নিসা 4:34
  16. আন-নিসা 4:35
  17. আন-নিসা 4:36
  18. আন-নিসা 4:37
  19. আন-নিসা 4:38
  20. আন-নিসা 4:39
  21. আন-নিসা 4:40
  22. আন-নিসা 4:41
  23. আন-নিসা 4:42

আন-নিসা 4:20

১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কোন লোক মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে তার স্ত্রীর পূর্ণ দাবীদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে তাকে নিজেই বিয়ে করে নিতো, ইচ্ছে করলে অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো, আবার ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে করতেই দিতো না। ঐ স্ত্রীলোকটির আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষা এ লোকটিকেই তার বেশী হকদার মনে করা হতো। অজ্ঞতা যুগের এ জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মানুষ ঐ স্ত্রীলোকটিকে বাধ্য করতো যে, সে যেন মোহরের দাবী পরিত্যাগ করে কিংবা সে যেন আর বিয়েই করে। এও বর্ণিত আছে যে, কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে একটি লোক এসে ঐ স্ত্রীর উপর একখানা কাপড় নিক্ষেপ করতো এবং ঐ লোকটিকেই ঐ স্ত্রীলোকটির দাবীদার মনে করা হতো। এটাও বর্ণিত আছে যে, ঐ স্ত্রীলোকটি সুন্দরী হলে ঐ কাপড় নিক্ষেপকারী ব্যক্তি তাকে বিয়ে করে নিতে এবং বিশ্রী হলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বিধবা অবস্থাতেই রেখে দিতো। অতঃপর সে তার উত্তরাধকারী হয়ে যেতো। এও বর্ণিত আছে যে, ঐ মৃত ব্যক্তির অন্তরঙ্গ বন্ধু ঐ স্ত্রীর উপর কাপড় নিক্ষেপ করতো। অতঃপর ঐ স্ত্রী তাকে কিছু মুক্তিপণ বা বিনিময় প্রদান করলে সে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিতো, নচেৎ সে আজীবন বিধবাই থেকে যেতো।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের প্রথা ছিল এই যে, কোন লোক মারা গেলে যে ব্যক্তি তার মালের উত্তরাধিকারী হতে সে তার স্ত্রীরও উত্তরাধিকারী হতো। তারা স্ত্রীলোকদের সাথে অত্যন্ত জঘন্য ব্যবহার করতো। এমনকি তালাক প্রদানের সময়েও তাদের সাথে শর্ত করতো যে, তারা নিজেদের ইচ্ছেমত তাদের বিয়ে দেবে। এ প্রকারের বন্দীত্ব হতে মুক্ত হওয়ার এ পন্থা বের করা হয়েছিল যে, ঐ নারীগণ ঐ পুরুষ লোকদেরকে মুক্তিপণ স্বরূপ কিছু প্রদান করতো। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্যে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আবু কায়েস ইবনে। আসলাত মারা গেলে তার পুত্র অজ্ঞতা যুগের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রীকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে মানুষ মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে কোন একটি শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে দিতো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন কোন লোক মারা যেতো তখন তার পুত্রকেই তার স্ত্রীর বেশী হকদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে নিজেই তার বিমাতাকে বিয়ে করতো বা ইচ্ছেমত ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতো।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু কায়েসের ঐ স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে কাবীশাহ (রাঃ)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ সংবাদ প্রদান করে বলেন, এ লোকগুলো না আমাকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গণ্য করে আমার স্বামীর মীরাস প্রদান করছে, না আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে যে আমি অন্য কারও সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কাপড় নিক্ষেপের পূর্বেই যদি মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পালিয়ে গিয়ে তার পিত্রালয়ে চলে যেতো তবে সে মুক্তি পেয়ে যেতো।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যার নিকট কোন পিতৃহীনা বালিকা থাকতো তাকে সে আটক রাখতো এ আশায় যে, তার স্ত্রী মারা গেলে সে তাকে বিয়ে করবে কিংবা তার পুত্রের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেবে। এসব কথার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াত দ্বারা এসব কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং স্ত্রীলোকদেরকে এসব বিপদ হতে রক্ষা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- ‘স্ত্রীদের বাসস্থানকে সংকীর্ণ করতঃ তাদেরকে কষ্ট দিয়ে বাধ্য করো না যে, তারা যেন সমস্ত মোহর বা মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দেয় বা তাদের অবশ্য প্রাপ্য কোন হক পরিত্যাগ করে। কেননা, তাদেরকে শাসন গর্জন করে এই কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, স্ত্রী পছন্দ হচ্ছে না, তার সাথে মনোমালিন্য হচ্ছে, কাজেই তাকে ছেড়ে দিতে চায়। কিন্তু ছেড়ে দিলে মোহর ইত্যাদি সমস্ত হক পুরোপুরি দিতে হবে। এর থেকে বাঁচবার জন্যে স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছে এবং তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, যেন সে নিজেই বাধ্য হয়ে সমস্ত প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে এসব জঘন্য প্রথা হতে বিরত রাখেন। ইবনে। সালমানী (রঃ) বলেন, এ আয়াত দু'টির মধ্যে প্রথম আয়াতটি অজ্ঞতা যুগের প্রথাকে উঠিয়ে দেয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয় আয়াতটি ইসলামী রীতির সংশোধনের জন্যে অবতীর্ণ হয়। ইবনে মুবারকও (রঃ) এটাই বলেন।এরপর বলা হচ্ছে-“কিন্তু যদি তাদের দ্বারা প্রকাশ্য অশ্লীলতা প্রকাশ পায়। সাহাবী ও তাবেঈগণের অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে প্রকাশ্য অশ্লীলতার ভাবার্থ হচ্ছে ব্যভিচার। অর্থাৎ সে সময় তাদের নিকট হতে মোহর ফিরিয়ে নেয়া বৈধ। সে সময় তাদের জীবনকে সঙ্কটময় করে তোলা উচিত, যেন তারা খোলা করে নিতে বাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-বাকারার মধ্যে রয়েছে- “তোমাদের জন্যে বৈধ নয় যে, তাদেরকে প্রদত্ত মোহর হতে তোমরা কিছু গ্রহণ কর, কিন্তু শুধু সেই সময় পার যখন তাদের উভয়ের আল্লাহর সীমা ঠিক রাখতে না পারার ভয় হবে।' কারও কারও মতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করা, তার অবাধ্য হওয়া, তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করা, তার হক পুরোপুরি আদায় না করা ইত্যাদি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ, এর মধ্যে ব্যভিচারও রয়েছে এবং এ আচরণও রয়েছে। অর্থাৎ এ সর্বাবস্থায় স্বামীর জন্যে স্ত্রীর জীবন সংকটপূর্ণ করে তোলা বৈধ, যেন সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় ও পরে তাকে পৃথক করে দেয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথা খুবই যুক্তিযুক্ত। ইতিপূর্বে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ পর্যন্ত এ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা যুগের ঐ কুপ্রথাগুলো যা হতে আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে নিষেধ করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ পূর্ণ বর্ণনা ইসলাম দ্বারা অজ্ঞতা যুগের প্রথাগুলোকে সরিয়ে দেয়ার জন্যেই দেয়া হয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল যে, কোন লোক কোন ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করতো। অতঃপর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতো। কিন্তু এ শর্ত করতো যে, স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া অন্য জায়গায় বিয়ে করতে পারবে না। ঐকথার উপর সাক্ষী নির্ধারণ করতে এবং চুক্তিপত্র লিখে নেয়া হতো। তখন কোন জায়গা হতে বিয়ের গয়গাম এলে স্ত্রী যদি সে বিয়েতে সম্মত হতো তবে তার পূর্ব স্বামী বলতো, তুমি যদি আমাকে এত টাকা দাও তবে তোমাকে বিয়ের অনুমতি প্রদান করবো। স্ত্রী সম্মত হলে তো ভালই, নচেৎ তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়া হতো না। ওর নিষিদ্ধ ঘোষণায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ)-এর কথামত, এ নির্দেশ এবং সূরা-ই-বাকারার আয়াতের নির্দেশ একই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে অবস্থান কর, তাদের সাথে ন্ত্র ব্যবহার কর। সাধ্যানুযায়ী নিজের অবস্থাও ভাল রাখ। তোমরা যেমন চাও যে, তোমাদের স্ত্রীরা উত্তম সাজে সুসজ্জিতা থাকুক, দ্রুপ তোমরাও তাদের মনস্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে সুন্দর সাজে সজ্জিত রাখ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সদ্ভাবে যেমন তোমাদের অধিকার তাদের উপর রয়েছে তেমনই তাদের অধিকারও তোমাদের উপর রয়েছে।' (২৪২২৮) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারকারী হয়। আমি আমার সহধর্মিণীদের সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করে থাকি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পত্নীদের সাথে অত্যন্ত নম্র ব্যবহার করতেন, তাঁদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন, তাদেরকে সদা খুশী রাখতেন, মনোমুগ্ধকর কথা বলতেন, তাঁদের অন্তর তিনি স্বীয় মুষ্টির মধ্যে রাখতেন, তাঁদের জন্যে উত্তম খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতেন, প্রশান্ত মনে তাদের উপর খরচ করতেন এবং মাঝে মাঝে তিনি এমন কথাও বলতেন যে, তাঁরা হেসে উঠতেন। এমনও ঘটেছে যে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রঃ)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। সে দৌড়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) আগে বেড়ে যান। কিছু দিন পর আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে হযরত আয়েশা (রাঃ) পিছনে পড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “শোধ বোধ হয়ে গেল। এর দ্বারাও তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট রাখা।যে পত্নীর ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাত্রি যাপনের পালা পড়তো তথায় তার সমস্ত সহধর্মিণীগণ একত্রিত হতেন। তারা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতেন, আলাপ আলোচনা হতো এবং মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের সাথে রাত্রের খাবার খেতেন। অতঃপর তারা নিজ নিজ ঘরে চলে যেতেন এবং তিনি তথায়ই রাত্রি যাপন করতেন। স্বীয় সহধর্মিণীর সাথে একই চাদরে শয়ন করতেন, জামা খুলে ফেলতেন, শুধু লুঙ্গি পরে থাকতেন। ইশার নামাযের পর ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলতেন যেন সহধর্মিণীদের মন খুশী হয়। মোটকথা তিনি স্ত্রীদেরকে অত্যন্ত ভালবাসার সাথে রাখতেন। সুতরাং মুসলমানদেরও স্ত্রীদের সাথে প্রেম-প্রীতি বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণেই তোমাদের মঙ্গল রয়েছে। এর বিস্তারিত আহকাম বৰ্ণনার জায়গা তাফসীর নয় বরং ওর জন্য ঐ বিষয়েরই গ্রন্থরাজি রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “মন না চাইলেও স্ত্রীদের বাসস্থানের সুবন্দোবস্ত করার মধ্যেই এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, ওর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বড় রকমের মঙ্গল দান করেন। হয় তো তাদের উদরে সৎ সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং তাদের দ্বারা আল্লাহ পাক উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী করবেন।” বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে পৃথক করে না দেয়। যদি সে তার একটি আধটি কথায় অসন্তুষ্টও হয় তবে সে স্ত্রী তার কোন ব্যবহার দ্বারা সন্তুষ্টও করবে।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ইচ্ছে করে এবং তার স্থানে অন্যকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে সে যেন তার স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহর হতে কিছুই ফিরিয়ে না নেয়, যদিও তাকে প্রচুর মাল প্রদান করে থাকে। সূরা আলে ইমরানের মধ্যে। শব্দের তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন আবশ্যকতা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীকে মোহর হিসেবে প্রচুর মাল প্রদান করাও বৈধ। হযরত উমার (রাঃ) প্রথমে প্রচুর মোহর হতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর সে কথা ফিরিয়ে নেন।যেমন মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, তিনি বলেছিলেনঃ “তোমরা মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। যদি এটা পার্থিব ব্যাপারে কোন ভাল জিনিস হতো বা আল্লাহ তা'আলার নিকট মুত্তাকী পরিচয়ের কাজ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সর্ব প্রথম ওর উপর আমল করতেন। তিনি তো তার কোন স্ত্রীর বা কন্যার মোহর বারো আওকিয়্যার (প্রায় একশ পঁচিশ টাকা) বেশী করেননি। মানুষ অতিরিক্ত মোহর বেঁধে বিপদে পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী তার উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে যায় এবং তার অন্তরে তার প্রতি শত্রুতার সৃষ্টি হয়। সে তখন স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার স্কন্ধে মোশক ঝুলিয়ে দিয়েছ। এ হাদীসটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা লম্বা চওড়া মোহর বাধতে আরম্ভ করলে কেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ তো চারশ দিরহামের (প্রায় একশ টাকা) বেশী মোহর করেননি। এটা যদি অধিক মুত্তাকী হওয়া এবং দানশীলতার কাজ হতো তবে তোমরা ওর দিকে অগ্রগামী হতে না। সাবধান! আজ হতে আমি যেন শুনতে না পাই যে কেউ চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করেছ।' এ কথা বলে নীচে নেমে আসেন তখন একজন কুরাইশ রমণী সম্মুখে এসে তাকে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি জনগণকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যা। তখন স্ত্রীলোকটি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যে কালাম অবতীর্ণ করেছেন তা কি আপনি শুনেননি?' তিনি বলেন, ‘ঐ কালাম কি? স্ত্রীলোকটি বলেন, “শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এবং তোমরা তাদের কাউকে বিপুল ধনরাশি দিয়ে থাক’। হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। উমার (রাঃ) হতে তো প্রত্যেকেই বেশী জানে।' অতঃপর তিনি ফিরে যান এবং তৎক্ষণাৎ মিম্বরের উপর উঠে জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর দিতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন বলছি যে, যে কোন লোক তার মাল হতে ইচ্ছেমত মোহর নির্ধারণ করতে পারে। আমি বাধা দেব না।'অন্য একটি বর্ণনায় ঐ স্ত্রীলোকটির আয়াতটিকে নিম্নরূপ পাঠ করার কথা বর্ণিত আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং তোমরা তাদেরকে প্রচুর স্বর্ণ প্রদান করে থাক।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পঠনেও এরূপই বর্ণিত আছে এবং উমারের উপর একটি স্ত্রীলোক বিজয় লাভ করলো’ হযরত উমার (রাঃ)-এর এ উক্তিও বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ যদিও বিল কিস্সা অর্থাৎ ইয়াযিদ ইবনে হুসাইন হারেসীরও, মেয়ে হয় তথাপি তারও মোহর বেশী নির্ধারণ করো না। আর তোমরা যদি এরূপ কর তবে ঐ অতিরিক্ত অংক বায়তুল মালে জমা করে নেবো।' তখন এক দীর্ঘ দেহ ও চওড়া নাক বিশিষ্টা স্ত্রীলোক বলেনঃ “জনাব! আপনি এ কথা বলতে পারেন না। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “কেন?' তিনি বলেনঃ “যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)-তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, “স্ত্রীলোকটি ঠিক বলেছে এবং পুরুষ লোকটি ভুল করেছে।'অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- তোমাদের স্ত্রীদেরকে প্রদত্ত মোহর তোমরা কিরূপে ফিরিয়ে নেবে? অথচ তোমরা তাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছ, প্রয়োজন মিটিয়েছ, তারা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তোমারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছ। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ঐ হাদীসে রয়েছে যার মধ্যে একটি লোকের তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ পেশ করার কথা বর্ণিত আছে, অতঃপর তাদের উভয়ের শপথ গ্রহণ তার পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিঃ ‘তোমাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তোমাদের মধ্যে কেউ এখনও তাওবা করছে কি? তিনি এ কথা তিনবার বলেন। তখন পুরুষ লোকটি বলে, তার মোহর সম্বন্ধে আপনি কি বলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘ওর বিনিময়েই তো সে তোমার জন্য বৈধ হয়েছিল। এখন যদি তুমি তার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়ে থাক তবে তো এটা আরও বহু দূরের কথা।অনুরূপভাবে আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত নারা (রাঃ) একটি কুমারীকে বিয়ে করেন। তার সাথে মিলিত হতে গিয়ে তিনি দেখেন যে, সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করলে তিনি তাকে পৃথক করিয়ে দেন এবং হযরত নারা (রাঃ)-কে মোহর দিয়ে দিতে বলেন এবং স্ত্রীকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সে তোমার গোলাম হবে এবং মোহর তো তাকে বৈধ করার কারণ ছিল।' (সুনান-ই-আবি দাউদ)মোটকথা আয়াতের ভাবার্থ এই যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিলন হয়েই গেছে। সুতরাং এখন মোহর ফিরিয়ে নেয়ার কোন অর্থ থাকে না। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-বিবাহ বন্ধন হচ্ছে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার যার মধ্যে তোমরা আবদ্ধ হয়েছ। তোমরা মহান আল্লাহর এ নির্দেশ শুনেছঃ “তোমরা তাদেরকে বন্ধনে রাখলে ভালভাবে রাখ, আর পরিত্যাগ করলে উত্তম পন্থায় পরিত্যাগ কর।' হাদীস শরীফেও রয়েছেঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত দ্বারা গ্রহণ করে থাক এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা নিজেদের জন্যে বৈধ করে থাক।' অর্থাৎ বিবাহের খুত্বার সাক্ষ্য দ্বারা তাদেরকে হালাল করে থাক।মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেসব দানে ভূষিত করা হয়েছিল তন্মধ্যে একটি এও ছিল যে, তাঁকে বলা হয়েছিল-তোমার উম্মতের কোন ভাষণই বৈধ নয় যে পর্যন্ত না সে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তুমি আমার বান্দা এবং রাসূল।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা হালাল করেছ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বিমাতাকে বিয়ে করার অবৈধতা বর্ণনা করতঃ তার সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রকাশ করেছেন। এমনকি বাপ হয়তো শুধু বিয়েই করেছে, এখনও মা পিত্রালয় হতে বিদায় হয়েও আসেনি। এমতাবস্থায় তার তালাক হয়ে গেল বা পিতা মারা গেল তথাপিও ঐ স্ত্রী তার ছেলের উপর হারাম হয়ে যাবে। এর উপর ইজমা হয়ে গেছে। হযরত আবু কায়েশ (রাঃ) যিনি একজন বড় মর্যাদা সম্পন্ন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কায়েস তার স্ত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, অথচ তিনি তার বিমাতা ছিলেন। তখন তার বিমাতা তাকে বলেন, “তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সৎ লোক।কিন্তু আমি তোমাকে আমার ছেলেরূপ গণ্য করে থাকি। আচ্ছা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছি।'রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তিনি (পুত্রের বিমাতা) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি বাড়ী ফিরে যাও। অতঃপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- যাকে বাপ বিয়ে করেছে তাকে বিয়ে করা পুত্রের জন্য হারাম।' এ ধরনের আরও বহু ঘটনা সে সময় বিদ্যমান ছিল যাদেরকে এ কামনা হতে বিরত রাখা হয়েছিল। এক তো হলো এ আবু কায়েশ (রাঃ)-এর ঘটনা। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে উবাইদিল্লাহ যামরা’ (রাঃ)। দ্বিতীয় ঘটনা ছিল হযরত খালাফ (রাঃ)-এর যার ঘরে হযরত আবু তালহা (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাফওয়ান তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে করেছিল। হযরত সাহিলী (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকার যুগে এরূপ বিয়ে চালু ছিল এবং সেটাকে নিয়মিত বিয়ে মনে করা হতো ও সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য করা হতো। এ জন্যেই এখানেও বলা হচ্ছে-‘অতীতে যা হয়েছে তা হয়েছেই। যেমন দু’বোনকে একত্রে বিয়ে করার অবৈধতার কথা বর্ণনা করার পর এটাই বলা হয়েছে। কিনানা ইবনে খুযাইমাও এ কাজ করেছিল অর্থাৎ স্বীয় পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। তার গর্ভেই নাযারের জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছেঃ “আমার উপরের বংশের উৎপত্তিও বিয়ের দ্বারাতেই হয়েছে ব্যভিচারের দ্বারা নয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, এ প্রথা তাদের মধ্যে বরাবরই চালু ছিল, বৈধ ছিল এবং বিবাহ বলে গণ্য ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে আত্মীয়কে (বিয়ে করা) আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন ঐ সবকে অজ্ঞতা যুগের লোকেরাও হারাম বলে জানতো। শুধুমাত্র বিমাতা ও দু’বোনকে এক সাথে বিয়ে করাকে তারা হালাল মনে করতো। সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকের মধ্যে এদেরকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহও (রঃ) এটাই বলেন।এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, সাহিলী (রাঃ) কিনানার যে ঘটনাটি নকল করেছেন তা চিন্তা ও বিবেচনার বিষয়-সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয়। যা হোক, এ সম্বন্ধে এ উম্মতের উপর সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এমনকি আল্লাহ পাক বলেন যে, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও অরুচিকর এবং নিকৃষ্টতর পন্থা।অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছে-‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্টতর পন্থা। এখানে ওর চেয়েও বেশী বলেছেন যে, এটা অরুচিকরও বটে। অর্থাৎ এটা প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও জঘন্য কাজ। এর ফলে পিতা ও পুত্রের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে সে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি শত্রুতাই পোষণ করে থাকে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীগণকে মমিনদের মা রূপে গণ্য করা হয়েছে এবং উম্মতের উপর মা। দের মতই তাঁদেরকেও হারাম করা হয়েছে। কেননা, তাঁরা নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী, আর তিনি স্বীয় উম্মতের পিতার মতই। এমনকি ইজমা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তার হক বাপ দাদার হকের চাইতেও বেশী। বরং তার প্রতি ভালবাসাকে জীবনের প্রতি ভালবাসার উপরেও স্থান দেয়া হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, একাজ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ এবং অতি নিকৃষ্ট পন্থা। সুতরাং যে একাজ করে সে ধর্মত্যাগীর মধ্যে গণ্য। কাজেই তাকে হত্যা করা হবে এবং তার মাল ফাই' (বিনা যুদ্ধেই শত্রুদের নিকট থেকে যে মাল পাওয়া যায় তাকে ফাই বলা হয়) হিসেবে বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন সাহাবীকে ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরণ করেন যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। উক্ত সাহাবীর প্রতি নির্দেশ হয়েছিল যে, তিনি যেন তাকে হত্যা করেন ও তার মাল নিয়ে নেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ আমার পিতৃব্য হযরত হারিস ইবনে উমায়ের (রাঃ) নবী (সঃ) প্রদত্ত পতাকা নিয়ে আমার নিকট দিয়ে গমন করলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে কোথায় পাঠিয়েছেন? তিনি বলেন, আমি ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরিত হয়েছি যে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। তার গর্দান মারার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মাসআলাঃ এর উপর আলেমদের ইজমা রয়েছে যে, যে স্ত্রীর সঙ্গে পিতার সঙ্গম হয়েছে, হয় বিয়ে করেই হোক বা দাসী করেই হোক কিংবা সন্দেহের কারণেই হোক, ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করা পুত্রের জন্যে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি সঙ্গম না হয়, শুধুমাত্র সহবাস হয় কিংবা তার এমন অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করে যে অঙ্গের প্রতি ন্যর করা অপরিচিত হওয়ার অবস্থাতেও তার জন্যে হালাল ছিল না, এতে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমাদ তো সে অবস্থাতেও স্ত্রীকে পুত্রের উপর হারাম বলে থাকেন। হাফিয ইবনে আসাকেরের নিম্নের ঘটনা দ্বারাও এ মাযহাবের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঘটনাটি এই যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত খুদায়েজ হামশী (রাঃ) হযরত মুআবিয়ার জন্যে গৌরবর্ণের একটি সুশ্রী দাসী ক্রয় করেন এবং কাপড় ছাড়াই সাদীটিকে তার নিকট পাঠিয়ে দেন। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। এ ছড়ি দ্বারা ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘উত্তম সামগ্রী, যদি তার সামগ্রী হতো'।অতঃপর তিনি বলেন, একে ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দাও।' আবার বলেন, না, না থাম। রাবীআ' ইবনে আমর হারসী (রঃ)-কে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি একজন বড় ধর্মশাস্ত্রবিদ ছিলেন। তিনি এলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে নিম্নের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি এ স্ত্রীলোকটির এই এই অঙ্গ দেখেছি। সে কাপড় পরিহিতা ছিল না। এখন আমি। তাকে আমার পুত্র ইয়াযীদের নিকট পাঠাবার মনস্থ করেছি। এ তার জন্যে বৈধ হবে কি? হযরত রাবীআ’ বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এরূপ করবেন না। এ তার যোগ্য হয়নি।' তখন হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। অতঃপর তিনি তার লোকদেরকে বলেন, 'যাও, আবদুল্লাহ ইবনে সা'দা ফাযাযী (রাঃ)-কে ডেকে আন। তিনি এলেন। তিনি গোধুম বর্ণের ছিলেন। তাকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, এ দাসীটি আমি তোমাকে দান করছি, যেন তোমার সাদা বর্ণের সন্তান জন্ম লাভ করে। এই আবদুল্লাহ ইবনে সাদা (রাঃ) ছিলেন ঐ ব্যক্তি যাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। তিনি তাঁকে লালন পালন করেন, অতঃপর আল্লাহর নামে আযাদ করে দেন। তিনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট চলে আসেন।

আন-নিসা 4:21

১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কোন লোক মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে তার স্ত্রীর পূর্ণ দাবীদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে তাকে নিজেই বিয়ে করে নিতো, ইচ্ছে করলে অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো, আবার ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে করতেই দিতো না। ঐ স্ত্রীলোকটির আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষা এ লোকটিকেই তার বেশী হকদার মনে করা হতো। অজ্ঞতা যুগের এ জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মানুষ ঐ স্ত্রীলোকটিকে বাধ্য করতো যে, সে যেন মোহরের দাবী পরিত্যাগ করে কিংবা সে যেন আর বিয়েই করে। এও বর্ণিত আছে যে, কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে একটি লোক এসে ঐ স্ত্রীর উপর একখানা কাপড় নিক্ষেপ করতো এবং ঐ লোকটিকেই ঐ স্ত্রীলোকটির দাবীদার মনে করা হতো। এটাও বর্ণিত আছে যে, ঐ স্ত্রীলোকটি সুন্দরী হলে ঐ কাপড় নিক্ষেপকারী ব্যক্তি তাকে বিয়ে করে নিতে এবং বিশ্রী হলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বিধবা অবস্থাতেই রেখে দিতো। অতঃপর সে তার উত্তরাধকারী হয়ে যেতো। এও বর্ণিত আছে যে, ঐ মৃত ব্যক্তির অন্তরঙ্গ বন্ধু ঐ স্ত্রীর উপর কাপড় নিক্ষেপ করতো। অতঃপর ঐ স্ত্রী তাকে কিছু মুক্তিপণ বা বিনিময় প্রদান করলে সে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিতো, নচেৎ সে আজীবন বিধবাই থেকে যেতো।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের প্রথা ছিল এই যে, কোন লোক মারা গেলে যে ব্যক্তি তার মালের উত্তরাধিকারী হতে সে তার স্ত্রীরও উত্তরাধিকারী হতো। তারা স্ত্রীলোকদের সাথে অত্যন্ত জঘন্য ব্যবহার করতো। এমনকি তালাক প্রদানের সময়েও তাদের সাথে শর্ত করতো যে, তারা নিজেদের ইচ্ছেমত তাদের বিয়ে দেবে। এ প্রকারের বন্দীত্ব হতে মুক্ত হওয়ার এ পন্থা বের করা হয়েছিল যে, ঐ নারীগণ ঐ পুরুষ লোকদেরকে মুক্তিপণ স্বরূপ কিছু প্রদান করতো। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্যে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আবু কায়েস ইবনে। আসলাত মারা গেলে তার পুত্র অজ্ঞতা যুগের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রীকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে মানুষ মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে কোন একটি শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে দিতো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন কোন লোক মারা যেতো তখন তার পুত্রকেই তার স্ত্রীর বেশী হকদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে নিজেই তার বিমাতাকে বিয়ে করতো বা ইচ্ছেমত ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতো।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু কায়েসের ঐ স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে কাবীশাহ (রাঃ)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ সংবাদ প্রদান করে বলেন, এ লোকগুলো না আমাকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গণ্য করে আমার স্বামীর মীরাস প্রদান করছে, না আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে যে আমি অন্য কারও সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কাপড় নিক্ষেপের পূর্বেই যদি মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পালিয়ে গিয়ে তার পিত্রালয়ে চলে যেতো তবে সে মুক্তি পেয়ে যেতো।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যার নিকট কোন পিতৃহীনা বালিকা থাকতো তাকে সে আটক রাখতো এ আশায় যে, তার স্ত্রী মারা গেলে সে তাকে বিয়ে করবে কিংবা তার পুত্রের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেবে। এসব কথার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াত দ্বারা এসব কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং স্ত্রীলোকদেরকে এসব বিপদ হতে রক্ষা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- ‘স্ত্রীদের বাসস্থানকে সংকীর্ণ করতঃ তাদেরকে কষ্ট দিয়ে বাধ্য করো না যে, তারা যেন সমস্ত মোহর বা মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দেয় বা তাদের অবশ্য প্রাপ্য কোন হক পরিত্যাগ করে। কেননা, তাদেরকে শাসন গর্জন করে এই কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, স্ত্রী পছন্দ হচ্ছে না, তার সাথে মনোমালিন্য হচ্ছে, কাজেই তাকে ছেড়ে দিতে চায়। কিন্তু ছেড়ে দিলে মোহর ইত্যাদি সমস্ত হক পুরোপুরি দিতে হবে। এর থেকে বাঁচবার জন্যে স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছে এবং তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, যেন সে নিজেই বাধ্য হয়ে সমস্ত প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে এসব জঘন্য প্রথা হতে বিরত রাখেন। ইবনে। সালমানী (রঃ) বলেন, এ আয়াত দু'টির মধ্যে প্রথম আয়াতটি অজ্ঞতা যুগের প্রথাকে উঠিয়ে দেয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয় আয়াতটি ইসলামী রীতির সংশোধনের জন্যে অবতীর্ণ হয়। ইবনে মুবারকও (রঃ) এটাই বলেন।এরপর বলা হচ্ছে-“কিন্তু যদি তাদের দ্বারা প্রকাশ্য অশ্লীলতা প্রকাশ পায়। সাহাবী ও তাবেঈগণের অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে প্রকাশ্য অশ্লীলতার ভাবার্থ হচ্ছে ব্যভিচার। অর্থাৎ সে সময় তাদের নিকট হতে মোহর ফিরিয়ে নেয়া বৈধ। সে সময় তাদের জীবনকে সঙ্কটময় করে তোলা উচিত, যেন তারা খোলা করে নিতে বাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-বাকারার মধ্যে রয়েছে- “তোমাদের জন্যে বৈধ নয় যে, তাদেরকে প্রদত্ত মোহর হতে তোমরা কিছু গ্রহণ কর, কিন্তু শুধু সেই সময় পার যখন তাদের উভয়ের আল্লাহর সীমা ঠিক রাখতে না পারার ভয় হবে।' কারও কারও মতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করা, তার অবাধ্য হওয়া, তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করা, তার হক পুরোপুরি আদায় না করা ইত্যাদি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ, এর মধ্যে ব্যভিচারও রয়েছে এবং এ আচরণও রয়েছে। অর্থাৎ এ সর্বাবস্থায় স্বামীর জন্যে স্ত্রীর জীবন সংকটপূর্ণ করে তোলা বৈধ, যেন সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় ও পরে তাকে পৃথক করে দেয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথা খুবই যুক্তিযুক্ত। ইতিপূর্বে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ পর্যন্ত এ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা যুগের ঐ কুপ্রথাগুলো যা হতে আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে নিষেধ করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ পূর্ণ বর্ণনা ইসলাম দ্বারা অজ্ঞতা যুগের প্রথাগুলোকে সরিয়ে দেয়ার জন্যেই দেয়া হয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল যে, কোন লোক কোন ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করতো। অতঃপর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতো। কিন্তু এ শর্ত করতো যে, স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া অন্য জায়গায় বিয়ে করতে পারবে না। ঐকথার উপর সাক্ষী নির্ধারণ করতে এবং চুক্তিপত্র লিখে নেয়া হতো। তখন কোন জায়গা হতে বিয়ের গয়গাম এলে স্ত্রী যদি সে বিয়েতে সম্মত হতো তবে তার পূর্ব স্বামী বলতো, তুমি যদি আমাকে এত টাকা দাও তবে তোমাকে বিয়ের অনুমতি প্রদান করবো। স্ত্রী সম্মত হলে তো ভালই, নচেৎ তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়া হতো না। ওর নিষিদ্ধ ঘোষণায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ)-এর কথামত, এ নির্দেশ এবং সূরা-ই-বাকারার আয়াতের নির্দেশ একই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে অবস্থান কর, তাদের সাথে ন্ত্র ব্যবহার কর। সাধ্যানুযায়ী নিজের অবস্থাও ভাল রাখ। তোমরা যেমন চাও যে, তোমাদের স্ত্রীরা উত্তম সাজে সুসজ্জিতা থাকুক, দ্রুপ তোমরাও তাদের মনস্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে সুন্দর সাজে সজ্জিত রাখ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সদ্ভাবে যেমন তোমাদের অধিকার তাদের উপর রয়েছে তেমনই তাদের অধিকারও তোমাদের উপর রয়েছে।' (২৪২২৮) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারকারী হয়। আমি আমার সহধর্মিণীদের সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করে থাকি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পত্নীদের সাথে অত্যন্ত নম্র ব্যবহার করতেন, তাঁদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন, তাদেরকে সদা খুশী রাখতেন, মনোমুগ্ধকর কথা বলতেন, তাঁদের অন্তর তিনি স্বীয় মুষ্টির মধ্যে রাখতেন, তাঁদের জন্যে উত্তম খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতেন, প্রশান্ত মনে তাদের উপর খরচ করতেন এবং মাঝে মাঝে তিনি এমন কথাও বলতেন যে, তাঁরা হেসে উঠতেন। এমনও ঘটেছে যে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রঃ)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। সে দৌড়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) আগে বেড়ে যান। কিছু দিন পর আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে হযরত আয়েশা (রাঃ) পিছনে পড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “শোধ বোধ হয়ে গেল। এর দ্বারাও তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট রাখা।যে পত্নীর ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাত্রি যাপনের পালা পড়তো তথায় তার সমস্ত সহধর্মিণীগণ একত্রিত হতেন। তারা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতেন, আলাপ আলোচনা হতো এবং মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের সাথে রাত্রের খাবার খেতেন। অতঃপর তারা নিজ নিজ ঘরে চলে যেতেন এবং তিনি তথায়ই রাত্রি যাপন করতেন। স্বীয় সহধর্মিণীর সাথে একই চাদরে শয়ন করতেন, জামা খুলে ফেলতেন, শুধু লুঙ্গি পরে থাকতেন। ইশার নামাযের পর ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলতেন যেন সহধর্মিণীদের মন খুশী হয়। মোটকথা তিনি স্ত্রীদেরকে অত্যন্ত ভালবাসার সাথে রাখতেন। সুতরাং মুসলমানদেরও স্ত্রীদের সাথে প্রেম-প্রীতি বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণেই তোমাদের মঙ্গল রয়েছে। এর বিস্তারিত আহকাম বৰ্ণনার জায়গা তাফসীর নয় বরং ওর জন্য ঐ বিষয়েরই গ্রন্থরাজি রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “মন না চাইলেও স্ত্রীদের বাসস্থানের সুবন্দোবস্ত করার মধ্যেই এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, ওর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বড় রকমের মঙ্গল দান করেন। হয় তো তাদের উদরে সৎ সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং তাদের দ্বারা আল্লাহ পাক উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী করবেন।” বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে পৃথক করে না দেয়। যদি সে তার একটি আধটি কথায় অসন্তুষ্টও হয় তবে সে স্ত্রী তার কোন ব্যবহার দ্বারা সন্তুষ্টও করবে।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ইচ্ছে করে এবং তার স্থানে অন্যকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে সে যেন তার স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহর হতে কিছুই ফিরিয়ে না নেয়, যদিও তাকে প্রচুর মাল প্রদান করে থাকে। সূরা আলে ইমরানের মধ্যে। শব্দের তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন আবশ্যকতা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীকে মোহর হিসেবে প্রচুর মাল প্রদান করাও বৈধ। হযরত উমার (রাঃ) প্রথমে প্রচুর মোহর হতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর সে কথা ফিরিয়ে নেন।যেমন মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, তিনি বলেছিলেনঃ “তোমরা মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। যদি এটা পার্থিব ব্যাপারে কোন ভাল জিনিস হতো বা আল্লাহ তা'আলার নিকট মুত্তাকী পরিচয়ের কাজ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সর্ব প্রথম ওর উপর আমল করতেন। তিনি তো তার কোন স্ত্রীর বা কন্যার মোহর বারো আওকিয়্যার (প্রায় একশ পঁচিশ টাকা) বেশী করেননি। মানুষ অতিরিক্ত মোহর বেঁধে বিপদে পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী তার উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে যায় এবং তার অন্তরে তার প্রতি শত্রুতার সৃষ্টি হয়। সে তখন স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার স্কন্ধে মোশক ঝুলিয়ে দিয়েছ। এ হাদীসটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা লম্বা চওড়া মোহর বাধতে আরম্ভ করলে কেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ তো চারশ দিরহামের (প্রায় একশ টাকা) বেশী মোহর করেননি। এটা যদি অধিক মুত্তাকী হওয়া এবং দানশীলতার কাজ হতো তবে তোমরা ওর দিকে অগ্রগামী হতে না। সাবধান! আজ হতে আমি যেন শুনতে না পাই যে কেউ চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করেছ।' এ কথা বলে নীচে নেমে আসেন তখন একজন কুরাইশ রমণী সম্মুখে এসে তাকে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি জনগণকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যা। তখন স্ত্রীলোকটি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যে কালাম অবতীর্ণ করেছেন তা কি আপনি শুনেননি?' তিনি বলেন, ‘ঐ কালাম কি? স্ত্রীলোকটি বলেন, “শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এবং তোমরা তাদের কাউকে বিপুল ধনরাশি দিয়ে থাক’। হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। উমার (রাঃ) হতে তো প্রত্যেকেই বেশী জানে।' অতঃপর তিনি ফিরে যান এবং তৎক্ষণাৎ মিম্বরের উপর উঠে জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর দিতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন বলছি যে, যে কোন লোক তার মাল হতে ইচ্ছেমত মোহর নির্ধারণ করতে পারে। আমি বাধা দেব না।'অন্য একটি বর্ণনায় ঐ স্ত্রীলোকটির আয়াতটিকে নিম্নরূপ পাঠ করার কথা বর্ণিত আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং তোমরা তাদেরকে প্রচুর স্বর্ণ প্রদান করে থাক।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পঠনেও এরূপই বর্ণিত আছে এবং উমারের উপর একটি স্ত্রীলোক বিজয় লাভ করলো’ হযরত উমার (রাঃ)-এর এ উক্তিও বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ যদিও বিল কিস্সা অর্থাৎ ইয়াযিদ ইবনে হুসাইন হারেসীরও, মেয়ে হয় তথাপি তারও মোহর বেশী নির্ধারণ করো না। আর তোমরা যদি এরূপ কর তবে ঐ অতিরিক্ত অংক বায়তুল মালে জমা করে নেবো।' তখন এক দীর্ঘ দেহ ও চওড়া নাক বিশিষ্টা স্ত্রীলোক বলেনঃ “জনাব! আপনি এ কথা বলতে পারেন না। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “কেন?' তিনি বলেনঃ “যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)-তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, “স্ত্রীলোকটি ঠিক বলেছে এবং পুরুষ লোকটি ভুল করেছে।'অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- তোমাদের স্ত্রীদেরকে প্রদত্ত মোহর তোমরা কিরূপে ফিরিয়ে নেবে? অথচ তোমরা তাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছ, প্রয়োজন মিটিয়েছ, তারা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তোমারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছ। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ঐ হাদীসে রয়েছে যার মধ্যে একটি লোকের তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ পেশ করার কথা বর্ণিত আছে, অতঃপর তাদের উভয়ের শপথ গ্রহণ তার পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিঃ ‘তোমাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তোমাদের মধ্যে কেউ এখনও তাওবা করছে কি? তিনি এ কথা তিনবার বলেন। তখন পুরুষ লোকটি বলে, তার মোহর সম্বন্ধে আপনি কি বলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘ওর বিনিময়েই তো সে তোমার জন্য বৈধ হয়েছিল। এখন যদি তুমি তার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়ে থাক তবে তো এটা আরও বহু দূরের কথা।অনুরূপভাবে আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত নারা (রাঃ) একটি কুমারীকে বিয়ে করেন। তার সাথে মিলিত হতে গিয়ে তিনি দেখেন যে, সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করলে তিনি তাকে পৃথক করিয়ে দেন এবং হযরত নারা (রাঃ)-কে মোহর দিয়ে দিতে বলেন এবং স্ত্রীকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সে তোমার গোলাম হবে এবং মোহর তো তাকে বৈধ করার কারণ ছিল।' (সুনান-ই-আবি দাউদ)মোটকথা আয়াতের ভাবার্থ এই যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিলন হয়েই গেছে। সুতরাং এখন মোহর ফিরিয়ে নেয়ার কোন অর্থ থাকে না। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-বিবাহ বন্ধন হচ্ছে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার যার মধ্যে তোমরা আবদ্ধ হয়েছ। তোমরা মহান আল্লাহর এ নির্দেশ শুনেছঃ “তোমরা তাদেরকে বন্ধনে রাখলে ভালভাবে রাখ, আর পরিত্যাগ করলে উত্তম পন্থায় পরিত্যাগ কর।' হাদীস শরীফেও রয়েছেঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত দ্বারা গ্রহণ করে থাক এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা নিজেদের জন্যে বৈধ করে থাক।' অর্থাৎ বিবাহের খুত্বার সাক্ষ্য দ্বারা তাদেরকে হালাল করে থাক।মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেসব দানে ভূষিত করা হয়েছিল তন্মধ্যে একটি এও ছিল যে, তাঁকে বলা হয়েছিল-তোমার উম্মতের কোন ভাষণই বৈধ নয় যে পর্যন্ত না সে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তুমি আমার বান্দা এবং রাসূল।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা হালাল করেছ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বিমাতাকে বিয়ে করার অবৈধতা বর্ণনা করতঃ তার সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রকাশ করেছেন। এমনকি বাপ হয়তো শুধু বিয়েই করেছে, এখনও মা পিত্রালয় হতে বিদায় হয়েও আসেনি। এমতাবস্থায় তার তালাক হয়ে গেল বা পিতা মারা গেল তথাপিও ঐ স্ত্রী তার ছেলের উপর হারাম হয়ে যাবে। এর উপর ইজমা হয়ে গেছে। হযরত আবু কায়েশ (রাঃ) যিনি একজন বড় মর্যাদা সম্পন্ন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কায়েস তার স্ত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, অথচ তিনি তার বিমাতা ছিলেন। তখন তার বিমাতা তাকে বলেন, “তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সৎ লোক।কিন্তু আমি তোমাকে আমার ছেলেরূপ গণ্য করে থাকি। আচ্ছা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছি।'রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তিনি (পুত্রের বিমাতা) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি বাড়ী ফিরে যাও। অতঃপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- যাকে বাপ বিয়ে করেছে তাকে বিয়ে করা পুত্রের জন্য হারাম।' এ ধরনের আরও বহু ঘটনা সে সময় বিদ্যমান ছিল যাদেরকে এ কামনা হতে বিরত রাখা হয়েছিল। এক তো হলো এ আবু কায়েশ (রাঃ)-এর ঘটনা। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে উবাইদিল্লাহ যামরা’ (রাঃ)। দ্বিতীয় ঘটনা ছিল হযরত খালাফ (রাঃ)-এর যার ঘরে হযরত আবু তালহা (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাফওয়ান তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে করেছিল। হযরত সাহিলী (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকার যুগে এরূপ বিয়ে চালু ছিল এবং সেটাকে নিয়মিত বিয়ে মনে করা হতো ও সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য করা হতো। এ জন্যেই এখানেও বলা হচ্ছে-‘অতীতে যা হয়েছে তা হয়েছেই। যেমন দু’বোনকে একত্রে বিয়ে করার অবৈধতার কথা বর্ণনা করার পর এটাই বলা হয়েছে। কিনানা ইবনে খুযাইমাও এ কাজ করেছিল অর্থাৎ স্বীয় পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। তার গর্ভেই নাযারের জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছেঃ “আমার উপরের বংশের উৎপত্তিও বিয়ের দ্বারাতেই হয়েছে ব্যভিচারের দ্বারা নয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, এ প্রথা তাদের মধ্যে বরাবরই চালু ছিল, বৈধ ছিল এবং বিবাহ বলে গণ্য ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে আত্মীয়কে (বিয়ে করা) আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন ঐ সবকে অজ্ঞতা যুগের লোকেরাও হারাম বলে জানতো। শুধুমাত্র বিমাতা ও দু’বোনকে এক সাথে বিয়ে করাকে তারা হালাল মনে করতো। সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকের মধ্যে এদেরকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহও (রঃ) এটাই বলেন।এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, সাহিলী (রাঃ) কিনানার যে ঘটনাটি নকল করেছেন তা চিন্তা ও বিবেচনার বিষয়-সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয়। যা হোক, এ সম্বন্ধে এ উম্মতের উপর সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এমনকি আল্লাহ পাক বলেন যে, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও অরুচিকর এবং নিকৃষ্টতর পন্থা।অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছে-‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্টতর পন্থা। এখানে ওর চেয়েও বেশী বলেছেন যে, এটা অরুচিকরও বটে। অর্থাৎ এটা প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও জঘন্য কাজ। এর ফলে পিতা ও পুত্রের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে সে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি শত্রুতাই পোষণ করে থাকে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীগণকে মমিনদের মা রূপে গণ্য করা হয়েছে এবং উম্মতের উপর মা। দের মতই তাঁদেরকেও হারাম করা হয়েছে। কেননা, তাঁরা নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী, আর তিনি স্বীয় উম্মতের পিতার মতই। এমনকি ইজমা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তার হক বাপ দাদার হকের চাইতেও বেশী। বরং তার প্রতি ভালবাসাকে জীবনের প্রতি ভালবাসার উপরেও স্থান দেয়া হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, একাজ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ এবং অতি নিকৃষ্ট পন্থা। সুতরাং যে একাজ করে সে ধর্মত্যাগীর মধ্যে গণ্য। কাজেই তাকে হত্যা করা হবে এবং তার মাল ফাই' (বিনা যুদ্ধেই শত্রুদের নিকট থেকে যে মাল পাওয়া যায় তাকে ফাই বলা হয়) হিসেবে বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন সাহাবীকে ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরণ করেন যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। উক্ত সাহাবীর প্রতি নির্দেশ হয়েছিল যে, তিনি যেন তাকে হত্যা করেন ও তার মাল নিয়ে নেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ আমার পিতৃব্য হযরত হারিস ইবনে উমায়ের (রাঃ) নবী (সঃ) প্রদত্ত পতাকা নিয়ে আমার নিকট দিয়ে গমন করলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে কোথায় পাঠিয়েছেন? তিনি বলেন, আমি ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরিত হয়েছি যে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। তার গর্দান মারার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মাসআলাঃ এর উপর আলেমদের ইজমা রয়েছে যে, যে স্ত্রীর সঙ্গে পিতার সঙ্গম হয়েছে, হয় বিয়ে করেই হোক বা দাসী করেই হোক কিংবা সন্দেহের কারণেই হোক, ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করা পুত্রের জন্যে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি সঙ্গম না হয়, শুধুমাত্র সহবাস হয় কিংবা তার এমন অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করে যে অঙ্গের প্রতি ন্যর করা অপরিচিত হওয়ার অবস্থাতেও তার জন্যে হালাল ছিল না, এতে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমাদ তো সে অবস্থাতেও স্ত্রীকে পুত্রের উপর হারাম বলে থাকেন। হাফিয ইবনে আসাকেরের নিম্নের ঘটনা দ্বারাও এ মাযহাবের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঘটনাটি এই যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত খুদায়েজ হামশী (রাঃ) হযরত মুআবিয়ার জন্যে গৌরবর্ণের একটি সুশ্রী দাসী ক্রয় করেন এবং কাপড় ছাড়াই সাদীটিকে তার নিকট পাঠিয়ে দেন। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। এ ছড়ি দ্বারা ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘উত্তম সামগ্রী, যদি তার সামগ্রী হতো'।অতঃপর তিনি বলেন, একে ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দাও।' আবার বলেন, না, না থাম। রাবীআ' ইবনে আমর হারসী (রঃ)-কে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি একজন বড় ধর্মশাস্ত্রবিদ ছিলেন। তিনি এলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে নিম্নের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি এ স্ত্রীলোকটির এই এই অঙ্গ দেখেছি। সে কাপড় পরিহিতা ছিল না। এখন আমি। তাকে আমার পুত্র ইয়াযীদের নিকট পাঠাবার মনস্থ করেছি। এ তার জন্যে বৈধ হবে কি? হযরত রাবীআ’ বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এরূপ করবেন না। এ তার যোগ্য হয়নি।' তখন হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। অতঃপর তিনি তার লোকদেরকে বলেন, 'যাও, আবদুল্লাহ ইবনে সা'দা ফাযাযী (রাঃ)-কে ডেকে আন। তিনি এলেন। তিনি গোধুম বর্ণের ছিলেন। তাকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, এ দাসীটি আমি তোমাকে দান করছি, যেন তোমার সাদা বর্ণের সন্তান জন্ম লাভ করে। এই আবদুল্লাহ ইবনে সাদা (রাঃ) ছিলেন ঐ ব্যক্তি যাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। তিনি তাঁকে লালন পালন করেন, অতঃপর আল্লাহর নামে আযাদ করে দেন। তিনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট চলে আসেন।

আন-নিসা 4:22

১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কোন লোক মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে তার স্ত্রীর পূর্ণ দাবীদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে তাকে নিজেই বিয়ে করে নিতো, ইচ্ছে করলে অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো, আবার ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে করতেই দিতো না। ঐ স্ত্রীলোকটির আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষা এ লোকটিকেই তার বেশী হকদার মনে করা হতো। অজ্ঞতা যুগের এ জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, মানুষ ঐ স্ত্রীলোকটিকে বাধ্য করতো যে, সে যেন মোহরের দাবী পরিত্যাগ করে কিংবা সে যেন আর বিয়েই করে। এও বর্ণিত আছে যে, কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে একটি লোক এসে ঐ স্ত্রীর উপর একখানা কাপড় নিক্ষেপ করতো এবং ঐ লোকটিকেই ঐ স্ত্রীলোকটির দাবীদার মনে করা হতো। এটাও বর্ণিত আছে যে, ঐ স্ত্রীলোকটি সুন্দরী হলে ঐ কাপড় নিক্ষেপকারী ব্যক্তি তাকে বিয়ে করে নিতে এবং বিশ্রী হলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বিধবা অবস্থাতেই রেখে দিতো। অতঃপর সে তার উত্তরাধকারী হয়ে যেতো। এও বর্ণিত আছে যে, ঐ মৃত ব্যক্তির অন্তরঙ্গ বন্ধু ঐ স্ত্রীর উপর কাপড় নিক্ষেপ করতো। অতঃপর ঐ স্ত্রী তাকে কিছু মুক্তিপণ বা বিনিময় প্রদান করলে সে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিতো, নচেৎ সে আজীবন বিধবাই থেকে যেতো।হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের প্রথা ছিল এই যে, কোন লোক মারা গেলে যে ব্যক্তি তার মালের উত্তরাধিকারী হতে সে তার স্ত্রীরও উত্তরাধিকারী হতো। তারা স্ত্রীলোকদের সাথে অত্যন্ত জঘন্য ব্যবহার করতো। এমনকি তালাক প্রদানের সময়েও তাদের সাথে শর্ত করতো যে, তারা নিজেদের ইচ্ছেমত তাদের বিয়ে দেবে। এ প্রকারের বন্দীত্ব হতে মুক্ত হওয়ার এ পন্থা বের করা হয়েছিল যে, ঐ নারীগণ ঐ পুরুষ লোকদেরকে মুক্তিপণ স্বরূপ কিছু প্রদান করতো। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্যে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আবু কায়েস ইবনে। আসলাত মারা গেলে তার পুত্র অজ্ঞতা যুগের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রীকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে মানুষ মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে কোন একটি শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে দিতো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন কোন লোক মারা যেতো তখন তার পুত্রকেই তার স্ত্রীর বেশী হকদার মনে করা হতো। সে ইচ্ছে করলে নিজেই তার বিমাতাকে বিয়ে করতো বা ইচ্ছেমত ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতো।হযরত ইকরামা (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু কায়েসের ঐ স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে কাবীশাহ (রাঃ)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ সংবাদ প্রদান করে বলেন, এ লোকগুলো না আমাকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গণ্য করে আমার স্বামীর মীরাস প্রদান করছে, না আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে যে আমি অন্য কারও সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কাপড় নিক্ষেপের পূর্বেই যদি মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পালিয়ে গিয়ে তার পিত্রালয়ে চলে যেতো তবে সে মুক্তি পেয়ে যেতো।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যার নিকট কোন পিতৃহীনা বালিকা থাকতো তাকে সে আটক রাখতো এ আশায় যে, তার স্ত্রী মারা গেলে সে তাকে বিয়ে করবে কিংবা তার পুত্রের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেবে। এসব কথার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ আয়াত দ্বারা এসব কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং স্ত্রীলোকদেরকে এসব বিপদ হতে রক্ষা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- ‘স্ত্রীদের বাসস্থানকে সংকীর্ণ করতঃ তাদেরকে কষ্ট দিয়ে বাধ্য করো না যে, তারা যেন সমস্ত মোহর বা মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দেয় বা তাদের অবশ্য প্রাপ্য কোন হক পরিত্যাগ করে। কেননা, তাদেরকে শাসন গর্জন করে এই কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, স্ত্রী পছন্দ হচ্ছে না, তার সাথে মনোমালিন্য হচ্ছে, কাজেই তাকে ছেড়ে দিতে চায়। কিন্তু ছেড়ে দিলে মোহর ইত্যাদি সমস্ত হক পুরোপুরি দিতে হবে। এর থেকে বাঁচবার জন্যে স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছে এবং তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, যেন সে নিজেই বাধ্য হয়ে সমস্ত প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে এসব জঘন্য প্রথা হতে বিরত রাখেন। ইবনে। সালমানী (রঃ) বলেন, এ আয়াত দু'টির মধ্যে প্রথম আয়াতটি অজ্ঞতা যুগের প্রথাকে উঠিয়ে দেয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয় আয়াতটি ইসলামী রীতির সংশোধনের জন্যে অবতীর্ণ হয়। ইবনে মুবারকও (রঃ) এটাই বলেন।এরপর বলা হচ্ছে-“কিন্তু যদি তাদের দ্বারা প্রকাশ্য অশ্লীলতা প্রকাশ পায়। সাহাবী ও তাবেঈগণের অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে প্রকাশ্য অশ্লীলতার ভাবার্থ হচ্ছে ব্যভিচার। অর্থাৎ সে সময় তাদের নিকট হতে মোহর ফিরিয়ে নেয়া বৈধ। সে সময় তাদের জীবনকে সঙ্কটময় করে তোলা উচিত, যেন তারা খোলা করে নিতে বাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-বাকারার মধ্যে রয়েছে- “তোমাদের জন্যে বৈধ নয় যে, তাদেরকে প্রদত্ত মোহর হতে তোমরা কিছু গ্রহণ কর, কিন্তু শুধু সেই সময় পার যখন তাদের উভয়ের আল্লাহর সীমা ঠিক রাখতে না পারার ভয় হবে।' কারও কারও মতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করা, তার অবাধ্য হওয়া, তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করা, তার হক পুরোপুরি আদায় না করা ইত্যাদি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ, এর মধ্যে ব্যভিচারও রয়েছে এবং এ আচরণও রয়েছে। অর্থাৎ এ সর্বাবস্থায় স্বামীর জন্যে স্ত্রীর জীবন সংকটপূর্ণ করে তোলা বৈধ, যেন সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় ও পরে তাকে পৃথক করে দেয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথা খুবই যুক্তিযুক্ত। ইতিপূর্বে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ পর্যন্ত এ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা যুগের ঐ কুপ্রথাগুলো যা হতে আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে নিষেধ করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ পূর্ণ বর্ণনা ইসলাম দ্বারা অজ্ঞতা যুগের প্রথাগুলোকে সরিয়ে দেয়ার জন্যেই দেয়া হয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল যে, কোন লোক কোন ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করতো। অতঃপর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতো। কিন্তু এ শর্ত করতো যে, স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া অন্য জায়গায় বিয়ে করতে পারবে না। ঐকথার উপর সাক্ষী নির্ধারণ করতে এবং চুক্তিপত্র লিখে নেয়া হতো। তখন কোন জায়গা হতে বিয়ের গয়গাম এলে স্ত্রী যদি সে বিয়েতে সম্মত হতো তবে তার পূর্ব স্বামী বলতো, তুমি যদি আমাকে এত টাকা দাও তবে তোমাকে বিয়ের অনুমতি প্রদান করবো। স্ত্রী সম্মত হলে তো ভালই, নচেৎ তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়া হতো না। ওর নিষিদ্ধ ঘোষণায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ)-এর কথামত, এ নির্দেশ এবং সূরা-ই-বাকারার আয়াতের নির্দেশ একই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে অবস্থান কর, তাদের সাথে ন্ত্র ব্যবহার কর। সাধ্যানুযায়ী নিজের অবস্থাও ভাল রাখ। তোমরা যেমন চাও যে, তোমাদের স্ত্রীরা উত্তম সাজে সুসজ্জিতা থাকুক, দ্রুপ তোমরাও তাদের মনস্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে সুন্দর সাজে সজ্জিত রাখ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সদ্ভাবে যেমন তোমাদের অধিকার তাদের উপর রয়েছে তেমনই তাদের অধিকারও তোমাদের উপর রয়েছে।' (২৪২২৮) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারকারী হয়। আমি আমার সহধর্মিণীদের সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করে থাকি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পত্নীদের সাথে অত্যন্ত নম্র ব্যবহার করতেন, তাঁদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন, তাদেরকে সদা খুশী রাখতেন, মনোমুগ্ধকর কথা বলতেন, তাঁদের অন্তর তিনি স্বীয় মুষ্টির মধ্যে রাখতেন, তাঁদের জন্যে উত্তম খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতেন, প্রশান্ত মনে তাদের উপর খরচ করতেন এবং মাঝে মাঝে তিনি এমন কথাও বলতেন যে, তাঁরা হেসে উঠতেন। এমনও ঘটেছে যে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রঃ)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। সে দৌড়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) আগে বেড়ে যান। কিছু দিন পর আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে হযরত আয়েশা (রাঃ) পিছনে পড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “শোধ বোধ হয়ে গেল। এর দ্বারাও তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট রাখা।যে পত্নীর ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাত্রি যাপনের পালা পড়তো তথায় তার সমস্ত সহধর্মিণীগণ একত্রিত হতেন। তারা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতেন, আলাপ আলোচনা হতো এবং মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের সাথে রাত্রের খাবার খেতেন। অতঃপর তারা নিজ নিজ ঘরে চলে যেতেন এবং তিনি তথায়ই রাত্রি যাপন করতেন। স্বীয় সহধর্মিণীর সাথে একই চাদরে শয়ন করতেন, জামা খুলে ফেলতেন, শুধু লুঙ্গি পরে থাকতেন। ইশার নামাযের পর ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলতেন যেন সহধর্মিণীদের মন খুশী হয়। মোটকথা তিনি স্ত্রীদেরকে অত্যন্ত ভালবাসার সাথে রাখতেন। সুতরাং মুসলমানদেরও স্ত্রীদের সাথে প্রেম-প্রীতি বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণেই তোমাদের মঙ্গল রয়েছে। এর বিস্তারিত আহকাম বৰ্ণনার জায়গা তাফসীর নয় বরং ওর জন্য ঐ বিষয়েরই গ্রন্থরাজি রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “মন না চাইলেও স্ত্রীদের বাসস্থানের সুবন্দোবস্ত করার মধ্যেই এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, ওর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বড় রকমের মঙ্গল দান করেন। হয় তো তাদের উদরে সৎ সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং তাদের দ্বারা আল্লাহ পাক উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী করবেন।” বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে পৃথক করে না দেয়। যদি সে তার একটি আধটি কথায় অসন্তুষ্টও হয় তবে সে স্ত্রী তার কোন ব্যবহার দ্বারা সন্তুষ্টও করবে।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ইচ্ছে করে এবং তার স্থানে অন্যকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে সে যেন তার স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহর হতে কিছুই ফিরিয়ে না নেয়, যদিও তাকে প্রচুর মাল প্রদান করে থাকে। সূরা আলে ইমরানের মধ্যে। শব্দের তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন আবশ্যকতা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীকে মোহর হিসেবে প্রচুর মাল প্রদান করাও বৈধ। হযরত উমার (রাঃ) প্রথমে প্রচুর মোহর হতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর সে কথা ফিরিয়ে নেন।যেমন মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, তিনি বলেছিলেনঃ “তোমরা মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। যদি এটা পার্থিব ব্যাপারে কোন ভাল জিনিস হতো বা আল্লাহ তা'আলার নিকট মুত্তাকী পরিচয়ের কাজ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সর্ব প্রথম ওর উপর আমল করতেন। তিনি তো তার কোন স্ত্রীর বা কন্যার মোহর বারো আওকিয়্যার (প্রায় একশ পঁচিশ টাকা) বেশী করেননি। মানুষ অতিরিক্ত মোহর বেঁধে বিপদে পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী তার উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে যায় এবং তার অন্তরে তার প্রতি শত্রুতার সৃষ্টি হয়। সে তখন স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার স্কন্ধে মোশক ঝুলিয়ে দিয়েছ। এ হাদীসটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা লম্বা চওড়া মোহর বাধতে আরম্ভ করলে কেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ তো চারশ দিরহামের (প্রায় একশ টাকা) বেশী মোহর করেননি। এটা যদি অধিক মুত্তাকী হওয়া এবং দানশীলতার কাজ হতো তবে তোমরা ওর দিকে অগ্রগামী হতে না। সাবধান! আজ হতে আমি যেন শুনতে না পাই যে কেউ চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করেছ।' এ কথা বলে নীচে নেমে আসেন তখন একজন কুরাইশ রমণী সম্মুখে এসে তাকে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি জনগণকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন? তিনি বলেনঃ হ্যা। তখন স্ত্রীলোকটি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যে কালাম অবতীর্ণ করেছেন তা কি আপনি শুনেননি?' তিনি বলেন, ‘ঐ কালাম কি? স্ত্রীলোকটি বলেন, “শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এবং তোমরা তাদের কাউকে বিপুল ধনরাশি দিয়ে থাক’। হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। উমার (রাঃ) হতে তো প্রত্যেকেই বেশী জানে।' অতঃপর তিনি ফিরে যান এবং তৎক্ষণাৎ মিম্বরের উপর উঠে জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে চারশ দিরহামের বেশী মোহর দিতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন বলছি যে, যে কোন লোক তার মাল হতে ইচ্ছেমত মোহর নির্ধারণ করতে পারে। আমি বাধা দেব না।'অন্য একটি বর্ণনায় ঐ স্ত্রীলোকটির আয়াতটিকে নিম্নরূপ পাঠ করার কথা বর্ণিত আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং তোমরা তাদেরকে প্রচুর স্বর্ণ প্রদান করে থাক।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পঠনেও এরূপই বর্ণিত আছে এবং উমারের উপর একটি স্ত্রীলোক বিজয় লাভ করলো’ হযরত উমার (রাঃ)-এর এ উক্তিও বর্ণিত আছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ যদিও বিল কিস্সা অর্থাৎ ইয়াযিদ ইবনে হুসাইন হারেসীরও, মেয়ে হয় তথাপি তারও মোহর বেশী নির্ধারণ করো না। আর তোমরা যদি এরূপ কর তবে ঐ অতিরিক্ত অংক বায়তুল মালে জমা করে নেবো।' তখন এক দীর্ঘ দেহ ও চওড়া নাক বিশিষ্টা স্ত্রীলোক বলেনঃ “জনাব! আপনি এ কথা বলতে পারেন না। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “কেন?' তিনি বলেনঃ “যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)-তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, “স্ত্রীলোকটি ঠিক বলেছে এবং পুরুষ লোকটি ভুল করেছে।'অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- তোমাদের স্ত্রীদেরকে প্রদত্ত মোহর তোমরা কিরূপে ফিরিয়ে নেবে? অথচ তোমরা তাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছ, প্রয়োজন মিটিয়েছ, তারা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তোমারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছ। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ঐ হাদীসে রয়েছে যার মধ্যে একটি লোকের তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ পেশ করার কথা বর্ণিত আছে, অতঃপর তাদের উভয়ের শপথ গ্রহণ তার পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উক্তিঃ ‘তোমাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তোমাদের মধ্যে কেউ এখনও তাওবা করছে কি? তিনি এ কথা তিনবার বলেন। তখন পুরুষ লোকটি বলে, তার মোহর সম্বন্ধে আপনি কি বলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘ওর বিনিময়েই তো সে তোমার জন্য বৈধ হয়েছিল। এখন যদি তুমি তার উপর মিথ্যে অপবাদ দিয়ে থাক তবে তো এটা আরও বহু দূরের কথা।অনুরূপভাবে আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত নারা (রাঃ) একটি কুমারীকে বিয়ে করেন। তার সাথে মিলিত হতে গিয়ে তিনি দেখেন যে, সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করলে তিনি তাকে পৃথক করিয়ে দেন এবং হযরত নারা (রাঃ)-কে মোহর দিয়ে দিতে বলেন এবং স্ত্রীকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সে তোমার গোলাম হবে এবং মোহর তো তাকে বৈধ করার কারণ ছিল।' (সুনান-ই-আবি দাউদ)মোটকথা আয়াতের ভাবার্থ এই যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিলন হয়েই গেছে। সুতরাং এখন মোহর ফিরিয়ে নেয়ার কোন অর্থ থাকে না। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-বিবাহ বন্ধন হচ্ছে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার যার মধ্যে তোমরা আবদ্ধ হয়েছ। তোমরা মহান আল্লাহর এ নির্দেশ শুনেছঃ “তোমরা তাদেরকে বন্ধনে রাখলে ভালভাবে রাখ, আর পরিত্যাগ করলে উত্তম পন্থায় পরিত্যাগ কর।' হাদীস শরীফেও রয়েছেঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত দ্বারা গ্রহণ করে থাক এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা নিজেদের জন্যে বৈধ করে থাক।' অর্থাৎ বিবাহের খুত্বার সাক্ষ্য দ্বারা তাদেরকে হালাল করে থাক।মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেসব দানে ভূষিত করা হয়েছিল তন্মধ্যে একটি এও ছিল যে, তাঁকে বলা হয়েছিল-তোমার উম্মতের কোন ভাষণই বৈধ নয় যে পর্যন্ত না সে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তুমি আমার বান্দা এবং রাসূল।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “তোমরা স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং তাদেরকে আল্লাহর কালেমা দ্বারা হালাল করেছ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বিমাতাকে বিয়ে করার অবৈধতা বর্ণনা করতঃ তার সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রকাশ করেছেন। এমনকি বাপ হয়তো শুধু বিয়েই করেছে, এখনও মা পিত্রালয় হতে বিদায় হয়েও আসেনি। এমতাবস্থায় তার তালাক হয়ে গেল বা পিতা মারা গেল তথাপিও ঐ স্ত্রী তার ছেলের উপর হারাম হয়ে যাবে। এর উপর ইজমা হয়ে গেছে। হযরত আবু কায়েশ (রাঃ) যিনি একজন বড় মর্যাদা সম্পন্ন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কায়েস তার স্ত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, অথচ তিনি তার বিমাতা ছিলেন। তখন তার বিমাতা তাকে বলেন, “তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সৎ লোক।কিন্তু আমি তোমাকে আমার ছেলেরূপ গণ্য করে থাকি। আচ্ছা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছি।'রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তিনি (পুত্রের বিমাতা) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি বাড়ী ফিরে যাও। অতঃপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়- যাকে বাপ বিয়ে করেছে তাকে বিয়ে করা পুত্রের জন্য হারাম।' এ ধরনের আরও বহু ঘটনা সে সময় বিদ্যমান ছিল যাদেরকে এ কামনা হতে বিরত রাখা হয়েছিল। এক তো হলো এ আবু কায়েশ (রাঃ)-এর ঘটনা। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে উবাইদিল্লাহ যামরা’ (রাঃ)। দ্বিতীয় ঘটনা ছিল হযরত খালাফ (রাঃ)-এর যার ঘরে হযরত আবু তালহা (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাফওয়ান তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে করেছিল। হযরত সাহিলী (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকার যুগে এরূপ বিয়ে চালু ছিল এবং সেটাকে নিয়মিত বিয়ে মনে করা হতো ও সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য করা হতো। এ জন্যেই এখানেও বলা হচ্ছে-‘অতীতে যা হয়েছে তা হয়েছেই। যেমন দু’বোনকে একত্রে বিয়ে করার অবৈধতার কথা বর্ণনা করার পর এটাই বলা হয়েছে। কিনানা ইবনে খুযাইমাও এ কাজ করেছিল অর্থাৎ স্বীয় পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। তার গর্ভেই নাযারের জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছেঃ “আমার উপরের বংশের উৎপত্তিও বিয়ের দ্বারাতেই হয়েছে ব্যভিচারের দ্বারা নয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, এ প্রথা তাদের মধ্যে বরাবরই চালু ছিল, বৈধ ছিল এবং বিবাহ বলে গণ্য ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে আত্মীয়কে (বিয়ে করা) আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন ঐ সবকে অজ্ঞতা যুগের লোকেরাও হারাম বলে জানতো। শুধুমাত্র বিমাতা ও দু’বোনকে এক সাথে বিয়ে করাকে তারা হালাল মনে করতো। সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকের মধ্যে এদেরকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহও (রঃ) এটাই বলেন।এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, সাহিলী (রাঃ) কিনানার যে ঘটনাটি নকল করেছেন তা চিন্তা ও বিবেচনার বিষয়-সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয়। যা হোক, এ সম্বন্ধে এ উম্মতের উপর সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এমনকি আল্লাহ পাক বলেন যে, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও অরুচিকর এবং নিকৃষ্টতর পন্থা।অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছে-‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্টতর পন্থা। এখানে ওর চেয়েও বেশী বলেছেন যে, এটা অরুচিকরও বটে। অর্থাৎ এটা প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও জঘন্য কাজ। এর ফলে পিতা ও পুত্রের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে সে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি শত্রুতাই পোষণ করে থাকে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীগণকে মমিনদের মা রূপে গণ্য করা হয়েছে এবং উম্মতের উপর মা। দের মতই তাঁদেরকেও হারাম করা হয়েছে। কেননা, তাঁরা নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী, আর তিনি স্বীয় উম্মতের পিতার মতই। এমনকি ইজমা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তার হক বাপ দাদার হকের চাইতেও বেশী। বরং তার প্রতি ভালবাসাকে জীবনের প্রতি ভালবাসার উপরেও স্থান দেয়া হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, একাজ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ এবং অতি নিকৃষ্ট পন্থা। সুতরাং যে একাজ করে সে ধর্মত্যাগীর মধ্যে গণ্য। কাজেই তাকে হত্যা করা হবে এবং তার মাল ফাই' (বিনা যুদ্ধেই শত্রুদের নিকট থেকে যে মাল পাওয়া যায় তাকে ফাই বলা হয়) হিসেবে বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন সাহাবীকে ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরণ করেন যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। উক্ত সাহাবীর প্রতি নির্দেশ হয়েছিল যে, তিনি যেন তাকে হত্যা করেন ও তার মাল নিয়ে নেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ আমার পিতৃব্য হযরত হারিস ইবনে উমায়ের (রাঃ) নবী (সঃ) প্রদত্ত পতাকা নিয়ে আমার নিকট দিয়ে গমন করলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে কোথায় পাঠিয়েছেন? তিনি বলেন, আমি ঐ ব্যক্তির দিকে প্রেরিত হয়েছি যে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। তার গর্দান মারার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) মাসআলাঃ এর উপর আলেমদের ইজমা রয়েছে যে, যে স্ত্রীর সঙ্গে পিতার সঙ্গম হয়েছে, হয় বিয়ে করেই হোক বা দাসী করেই হোক কিংবা সন্দেহের কারণেই হোক, ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করা পুত্রের জন্যে হারাম। হ্যাঁ, তবে যদি সঙ্গম না হয়, শুধুমাত্র সহবাস হয় কিংবা তার এমন অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করে যে অঙ্গের প্রতি ন্যর করা অপরিচিত হওয়ার অবস্থাতেও তার জন্যে হালাল ছিল না, এতে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমাদ তো সে অবস্থাতেও স্ত্রীকে পুত্রের উপর হারাম বলে থাকেন। হাফিয ইবনে আসাকেরের নিম্নের ঘটনা দ্বারাও এ মাযহাবের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঘটনাটি এই যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর ক্রীতদাস হযরত খুদায়েজ হামশী (রাঃ) হযরত মুআবিয়ার জন্যে গৌরবর্ণের একটি সুশ্রী দাসী ক্রয় করেন এবং কাপড় ছাড়াই সাদীটিকে তার নিকট পাঠিয়ে দেন। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। এ ছড়ি দ্বারা ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘উত্তম সামগ্রী, যদি তার সামগ্রী হতো'।অতঃপর তিনি বলেন, একে ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দাও।' আবার বলেন, না, না থাম। রাবীআ' ইবনে আমর হারসী (রঃ)-কে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি একজন বড় ধর্মশাস্ত্রবিদ ছিলেন। তিনি এলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে নিম্নের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি এ স্ত্রীলোকটির এই এই অঙ্গ দেখেছি। সে কাপড় পরিহিতা ছিল না। এখন আমি। তাকে আমার পুত্র ইয়াযীদের নিকট পাঠাবার মনস্থ করেছি। এ তার জন্যে বৈধ হবে কি? হযরত রাবীআ’ বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এরূপ করবেন না। এ তার যোগ্য হয়নি।' তখন হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। অতঃপর তিনি তার লোকদেরকে বলেন, 'যাও, আবদুল্লাহ ইবনে সা'দা ফাযাযী (রাঃ)-কে ডেকে আন। তিনি এলেন। তিনি গোধুম বর্ণের ছিলেন। তাকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, এ দাসীটি আমি তোমাকে দান করছি, যেন তোমার সাদা বর্ণের সন্তান জন্ম লাভ করে। এই আবদুল্লাহ ইবনে সাদা (রাঃ) ছিলেন ঐ ব্যক্তি যাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। তিনি তাঁকে লালন পালন করেন, অতঃপর আল্লাহর নামে আযাদ করে দেন। তিনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট চলে আসেন।

আন-নিসা 4:23

বংশজাত, দুগ্ধ পান সম্বন্ধীয় এবং বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে যেসব স্ত্রীলোক পুরুষদের জন্যে হারাম এ আয়াতে তাদেরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাত প্রকারের নারী বংশের কারণে এবং সাত প্রকারের নারী বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে পুরুষদের উপর হারাম করা হয়েছে।অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। ভগ্নি কন্যাগণ পর্যন্ত তো হচ্ছে বংশজাত আত্মীয়। জমহুর উলামা এ আয়াত দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, ব্যভিচার দ্বারা যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে সে মেয়েটিও ঐ ব্যভিচারীর উপর হারাম হবে। কেননা, সেও মেয়ে, অতএব হারাম। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে এর বৈধতার কথা বর্ণিত আছে। কেননা, শরীয়ত হিসেবে এটা কন্যা নয়। সুতরাং উত্তরাধিকারের ব্যাপারে যেমন মেয়ের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সে উত্তরাধিকার পায় না, তদ্রুপই আয়াতের মধ্য যে কয়জনকে হারাম করা হয়েছে তাদের অন্তর্ভুক্ত সে নয়।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমাদের আপন মাতা যেমন তোমাদের উপর হারাম, তদ্রপ তোমাদের দুধ-মাতাও তোমাদের জন্য হারাম।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছেঃ ‘জন্ম যাকে হারাম করে স্তন্যপানও তাকে হারাম করে।' সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, বংশের কারণে যে হারাম হয়, দুগ্ধ পানের কারণেও সে হারাম হয়।ধর্মশাস্ত্রবিদগণ এতে চারটি অবস্থা এবং কেউ কেউ ছয়টি অবস্থা নির্দিষ্ট করেছেন যা আহকামের শাখার গ্রন্থরাজির মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত কথা এই যে, এর মধ্যে কিছুই নির্দিষ্ট নেই। কেননা, ওরই মত কতগুলো অবস্থা বংশের মধ্যেও পাওয়া যায় এবং ঐ অবস্থাগুলোর মধ্যে কতগুলো শুধু বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণেই হারাম হয়ে থাকে। সুতরাং হাদীসের উপর কোন প্রতিবাদ উঠতে পারে না। এখন কয়বার দুধপান করলে অবৈধতা সাব্যস্ত হয় সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, সংখ্যা নির্দিষ্ট নেই। দুধপান করামাত্রই অবৈধতা সাব্যস্ত হয়ে যাবে। ইমাম মালিক (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত ইবনে উমার (রঃ), সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ), উরওয়া (রঃ), ইবনে যুবাইর (রঃ) এবং যুহরী (রঃ)-এর উক্তিও এটাই। দলীল এই যে, স্তন্য পান এখানে সাধারণ।কেহ কেহ বলেন যে, তিনবার পান করলে অবৈধতা সাব্যস্ত হবে। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “একবার চোষণ করা বা দু’বার পান করা হারাম করেনা।' এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। ইমাম আহমাদ (রঃ), ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ (রঃ), আবু উবাইদাহ (রঃ) এবং আবু সাউরও এ কথাই বলেন। আলী (রাঃ), আয়িশা (রাঃ), উম্মে আফযাল (রাঃ), ইবন যুবাইর (রঃ), সুলাইমান ইবন ইয়াসার (রঃ) এবং সাঈদ ইবন যুবাইর (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। তাদের দলীল হচ্ছে সহীহ মুসলিমের উপরোক্ত হাদীসটি।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে কুরআন পাকের মধ্যে দশবার দুধ পানের উপর অবৈধতার হুকুম অবতীর্ণ হয়েছিল। পরে ওটা রহিত হয়ে পাঁচবারের উপর রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যু পর্যন্ত ওটা পঠিত হতে থাকে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে হযরত সালহা বিনতে সাহীল (রাঃ)-এর বর্ণনাটি, তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন হযরত আবু হুযাইফার (রাঃ) গোলাম হযরত সালিম (রাঃ)-কে পাঁচবার দুধপান করিয়ে দেন।কোন স্ত্রীলোক তার নিকট কোন পুরুষ লোকের যাতায়াতকে পছন্দ করলে এ হাদীসটি অনুযায়ীই হযরত আয়েশা (রাঃ) তাকে এ নির্দেশই দিতেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণেরও ঘোষণা এটাই যে, পাঁচবার দুধ পানই নির্ভরযোগ্য। এটা স্মরণীয় বিষয় যে, জমহূরের মতে এ দুধপান শিশুর দুধ ছেড়ে দেয়ার পূর্বে অর্থাৎ দু'বছরের মধ্যেই হতে হবে। এর বিস্তারিত বিবরণ সূরা-ই-বাকারার (আরবী) (২:২৩৩)-এর তাফসীরের মধ্যে দেয়া হয়েছে। আবার এ দুধ পানের ক্রিয়া দুধ মাতার স্বামী পর্যন্ত পৌছবে কি-না এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের মতে এটা স্বামীর উপরও ক্রিয়াশীল হবে কিন্তু পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষীর মতে এটা শুধু দুধ দাত্রী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, দুধ পিতা পর্যন্ত পৌছবে না। এর ব্যাখ্যার স্থান হচ্ছে আহকামের বড় বড় গ্রন্থগুলো, তাফসীর নয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ শাশুড়ী হারাম।' যে মেয়ের সাথে বিয়ে হবে, এ বিবাহ বন্ধনের সাথে সাথেই তার মা হারাম হয়ে যাবে, মেয়ের স্বামী তার সঙ্গে সঙ্গম করুক আর নাই করুক। হ্যাঁ, তবে যে নারীকে বিয়ে করছে তার সাথে তার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত কন্যা রয়েছে। এখন যদি বিয়ের পর ঐ স্ত্রীলোকটির স্বামী তার সাথে সঙ্গম করে থাকে তবে তার মেয়েটি তার স্বামীর জন্যে হারাম হয়ে যাবে।আর যদি সঙ্গমের পূর্বেই স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় তবে তার কন্যা তার স্বামীর জন্যে হারাম হবে না। এজন্যেই এ আয়াতে এ শর্ত লাগানো। হয়েছে। কোন কোন লোক সর্বনামটিকে শাশুড়ী ও প্রতিপালিতা মেয়ে উভয়ের দিকেই ফিরিয়েছেন। তাঁরা বলেন যে, শাশুড়ীও ঐ সময় হারাম হয় যখন তার মেয়ের সঙ্গে তার জামাতার নির্জনবাস হয়, নচেৎ হারাম হয় না। শুধু বিবাহ বন্ধন দ্বারা স্ত্রীর মাতাও হারাম হয় না এবং স্ত্রীর মেয়েও হারাম হয় না।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কোন মেয়েকে বিয়ে করেছে, অতঃপর সঙ্গমের পূর্বেই তালাক দিয়েছে, সে ঐ মেয়ের মাতাকে বিয়ে করতে পারে, যেমন প্রতিপালিতা মেয়েকে এভাবেই তার মাতাকে তালাক দেয়ার পর বিয়ে করা যায়। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) হতেই আর একটি বর্ণনা রয়েছে যে, যখন ঐ স্ত্রী তার স্বামীর সাথে সঙ্গমের পূর্বেই মারা যাবে এবং এ স্বামী তার উত্তরাধিকার গ্রহণ করবে তখন তার মাতাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা মাকরূহ হবে। হ্যা, তবে যদি সঙ্গমের পূর্বেই তালাক দিয়ে দেয় তবে ইচ্ছে করলে তার মাতাকে বিয়ে করতে পারে।হযরত আবু বকর ইবনে কিনানা (রাঃ) বলেন, আমার পিতা তায়েফের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন। তার সাথে আমার নির্জন বাস হয়নি এমতাবস্থায় আমার চাচা (মেয়েটির পিতা) মারা যান। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমার শাশুড়ী বিধবা হন। তিনি বড় সম্পদ শালিনী ছিলেন। তাই আমার পিতা আমাকে পরামর্শ দেন যে, আমি যেন তার মেয়েকে তালাক দিয়ে তাকেই বিয়ে করি।আমি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ মাসআলাটি জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, তুমি তাকে বিয়ে করতে পার।' অতঃপর আমি হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞাস করি। তিনি বলেন, তুমি তাকে বিয়ে করতে পার না। আমি আমার পিতার নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি ঐ দু' মনীষীর ফতওয়া লিখে দিয়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) উত্তরে লিখেন, 'আমি হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করতে পারি না। তোমরাই অবস্থা সম্যক উপলব্ধি করছো, কারণ অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। সে ছাড়া আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে। মোটকথা তিনি অনুমতিও দিলেন না এবং নিষেধও করলেন না। আমার পিতা তখন তাঁর বাসনা আমার শাশুড়ীর দিক হতে ফিরিয়ে নেন এবং তার সাথে আমার বিয়ে দেয়া হতে বিরত থাকেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রীর কন্যা ও স্ত্রীর মাতার একই হুকুম। যদি স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম না হয় তবে এ দু’জনই হালাল হবে। কিন্তু এর ইসনাদে সন্দেহযুক্ত বর্ণনাকারী রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর এটাই উক্তি। ইবনে যুবাইর (রাঃ)-এবং হযরত ইবনে আব্বাসও (রাঃ) ঐ দিকেই গেছেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। শাফিঈ মাযহাব অবলম্বীদের মধ্যে আবুল হাসান (রঃ) আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সারূনী (রঃ) হতেও রাফেঈর উক্তি অনুযায়ী এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে! কিন্তু পরে তিনি তার একথা হতে প্রত্যাবর্তন করেন।তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, ‘ফারাহ গোত্রের শাখা ‘কাখ’ গোত্রের একটি লোক একটি নারীকে বিয়ে করে। অতঃপর তার বিধবা মাতার সৌন্দর্যের প্রতি তার দৃষ্টি নিবন্ধ হয়। তাই সে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে মাসআলা জিজ্ঞেস করে, তার মাতাকে বিয়ে করা আমার জন্যে বৈধ কি?' তিনি বলেন, হ্যা।' সুতরাং সেই মহিলাটিকে তালাক দিয়ে তার মাতাকে বিয়ে করে নেয়। তার ছেলেমেয়েও হয়।অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) মদীনায় আগমন করেন। এখানে তিনি এ মাসআলাটি বিশ্লেষণ করেন। ফলে তিনি জানতে পারেন যে, এটা হালাল নয়। অতঃপর তিনি কুফা প্রত্যাবর্তন করে ঐ লোকটিকে বলেন, ‘তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দাও। সে তোমার জন্যে হারাম।' লোকটি তার আদেশ প্রতিপালন করতঃ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয় ।জমহুর উলামা এ দিকেই গেছেন যে, মেয়ে শুধু বিবাহ বন্ধন দ্বারা হারাম হয়। যে পর্যন্ত না তার মায়ের সঙ্গে তার স্বামীর সঙ্গম হয়। তবে মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সাথে সাথেই সঙ্গম না হলেও মা হারাম হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নির্জনবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দেয় কিংবা মহিলাটি মারা যায়, তখন তার মা তার স্বামীর জন্যে হালাল নয়। এটা সন্দেহযুক্ত বলেই তিনি তা অপছন্দ করেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ), হযরত মাসরূক (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আতা' (রঃ) হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত যুহরী (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। ইমাম চতুষ্টয়, সাতজন ধর্মশাস্ত্রবিদ, জমহুর উলামা এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মনীষীবর্গের এটাই মাযহাব।ইমাম ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন, ঐ মনীষীদের উক্তি সঠিক যারা শাশুড়ীকে উভয় অবস্থাতেই হারাম বলে থাকেন। কেননা, মহান আল্লাহ তাদের অবৈধতার সঙ্গে সঙ্গমের শর্ত আরোপ করেননি, যেমন মেয়ের মায়ের জন্যে এ শর্ত আরোপ করেছেন। তাছাড়া এর উপর ইজমা হয়েছে যা এমন দলীল যে, যার বিপরীত করা সে সময় বৈধই নয় যখন ওর উপর সবাই একমত হয়। সনদের ব্যাপারে সমালোচনা থাকলেও একটি গারীব হাদীসেও এটা বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন কোন পুরুষ কোন স্ত্রীকে বিয়ে করে তখন তার মাকে বিয়ে করা হালাল নয়, স্বামী ঐ মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম করুক আর নাই করুক। হ্যা, তবে যে মহিলাকে বিয়ে করেছে তাকে যদি সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিয়ে দেয় তবে ইচ্ছে করলে তার মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। এ হাদীসটির সনদ দুর্বল বটে, কিন্তু এ মাসআলার উপর ইজমা হয়ে গেছে যা এর বিশুদ্ধতার উপর এমন এক সাক্ষী যার পরে আর কোন সাক্ষ্যের আবশ্যকতা নেই। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের প্রতিপালিতা ঐ মেয়েগুলো তোমাদের জন্যে হারাম যারা তোমাদের ক্রোড়ে অবস্থিতা, যদি তাদের মাতাদের সঙ্গে তোমাদের নির্জনবাস হয়ে থাকে। জমহূরের ঘোষণা এই যে, তারা ক্রোড়ে লালিত পালিতা হোক আর নাই হোক সর্বাবস্থাতেই হারাম হবে। যেহেতু এরূপ মেয়েরা সাধারণতঃ তাদের মাতাদের সাথেই থাকে এবং স্বীয় বৈপিত্রের (সৎ বাপের) নিকট প্রতি পালিত হয় সেহেতু একথা বলা হয়েছে। এটা কোন শর্ত নয়। যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমাদের দাসীরা পবিত্র থাকতে ইচ্ছে করে তবে তোমরা তাদেরকে নির্লজ্জতার কার্যে বাধ্য করো না।' (২৪:৩৩) এখানেও যদি তারা। পবিত্র থাকতে ইচ্ছে করে’ এ শর্তটি ঘটনার প্রাধান্য হিসেবে করা হয়েছে। অর্থ এই নয় যে, যদি তারা পবিত্র থাকতে না চায় তবে তাদেরকে নির্লজ্জতার কাজে উত্তেজিত কর। অনুরূপভাবে এ আয়াতেও বলা হয়েছে যে, যদি ক্রোড়ে অবস্থান করে। তাহলে বুঝা গেল যে, ক্রোড়ে অবস্থান না করলেও হারাম হবে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমার বোন আবু সুফইয়ানের কন্য ইযহূকে বিয়ে করুন। তিনি বলেনঃ তুমি এটা পছন্দ কর? হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ) বলেন ‘হ্যাঁ, আমি আপনাকে শূন্য রাখতে পারি না। তাছাড়া এ সকার্যে আমি আমার বোনকেও জড়িয়ে দেব না কেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ জেনে রেখো যে, এটা আমার জন্যে বৈধ নয়।'উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ) তখন বলেন, “আমি তো শুনেছি যে, আপনি নাকি আবু সালমা (রাঃ)-এর মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “উম্মে সালমা (রাঃ)-এর গর্ভের মেয়েটির কথা বলছ?তিনি বলেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘জেনে রেখো, প্রথমতঃ সে আমার উপর এ জন্যে হারাম যে, সে আমার প্রতিপালিতা, সে আমারই ক্রোড়ে লালিত পালিত হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ যদি এরূপ না হতো তবুও সে আমার উপর হারামই হতো। কেননা, সে আমার দুগ্ধ ভ্রাতার কন্যা, আমার ভ্রাতুস্পুত্রী। আমাকে ও তার পিতা আবু সালমা (রাঃ)-কে সাওবিয়া দুধ পান করিয়েছিলেন। সাবধান! তোমাদের কন্য ও ভগ্নীদেরকে আমার উপর পেশ করো না।'সহীহ বুখারীর মধ্যে নিম্নরূপ শব্দ রয়েছেঃ ‘উম্মে সালমা (রাঃ)-এর সাথে আমার বিয়ে যদি নাও হতো তথাপি সে আমার উপর হালাল হতো না। সুতরাং অবৈধতার মূল তিনি বিয়েকেই স্থির করেছেন। এ মাযহাবই হচ্ছে ইমাম চতুষ্টয়ের, সাতজন ধর্ম শাস্ত্রবিদের এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহূরের। এও বলা হয়েছে যে, যদি মেয়েটি ক্রোড়ে প্রতিপালিত হয় তবে হারাম হবে নচেৎ হারাম হবে না।হযরত মালিক ইবন আউস ইবন হাসান (রঃ) বলেন, আমার স্ত্রী সন্ত নাদি রেখে মারা যায়। তার প্রতি আমার খুবই ভালবাসা ছিল। এ জন্য তার মৃত্যুতে আমি অত্যন্ত শোকাভিভূত হয়ে পড়ি। ঘটনাক্রমে হযরত আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি আমাকে চিন্তিত দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। আমি ঘটনাটি তাঁর নিকট বর্ণনা করি। তিনি তখন আমাকে বলেন, “তোমার পূর্বে তার স্বামীর কোন সন্তান আছে কি?' আমি বলি হ্যাঁ, একটি কন্যা আছে এবং সে তায়েফে অবস্থান করে। তিনি বলেন, ‘মেয়েটিকে বিয়ে করে নাও।'আমি তখন কুরআন কারীমের এ আয়াতটি পাঠ করে তাকে বলি, এর ভাবার্থ কি হবে? তিনি বলেনঃ “এটা সে সময় হতো যদি সে তোমার নিকট লালিত পালিত হতো। আর সে তো তোমার কথামত তায়েফে রয়েছে। তোমার নিকটেই তো নেই। এর ইসনাদ সহীহ হলেও এ উক্তটি সম্পূর্ণ গারীব।হযরত দাউদ ইবনে আলী যাহেরী (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ ঐদিকেই গেছেন। রাফেঈ (রঃ) হযরত ইমাম মালিক (রঃ)-এরও এ উক্তির কথাই বলেছেন। ইবনে হাযামও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। আমাদের শায়েখ হাফিয আবি আব্দিল্লাহ যাহবী (রঃ) বলেন, “আমি এ কথাটি শায়েখ তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (রঃ)-এর নিকট পেশ করলে তিনি ওটাকে অত্যন্ত কঠিন অনুভব করেন এবং নীরবতা অবলম্বন করেন। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ঘর। যেমন হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তবে নিজের অধিকারে যে দাসী রয়েছে এবং তার সাথে তার মেয়েও রয়েছে, তার সম্বন্ধে হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞাসিত হন যে, একের পর অন্য বৈধ হবে কি-না?' তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, এক আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হালাল এবং অন্য আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে হারাম। সুতরাং আমি ওটা কখনও করবো না। শায়েখ আবু উমার ইবনে আব্দিল্লাহ (রঃ) বলেন, কারও জন্যে এটা হালাল নয় যে, কোন স্ত্রীলোকের উপর অধিকার লাভ করার কারণে তার সঙ্গে সঙ্গম করবে অতঃপর একই অধিকারের উপর ভিত্তি করে তার মেয়ের সঙ্গেও সঙ্গম করবে এবং এ মাসআলায় আলেমদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। কেননা আল্লাহ তা'আলা ওটাকে বিয়েতেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। আলেমদের মতে কারও উপরে অধিকার লাভ বিয়েরই অনুসারী। কিন্তু হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যে বর্ণনা দেয়া হয় তার উপর ফতওয়া প্রদানকারী ইমামগণ এবং তাদের অনুসারী কেউই নেই। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত কন্যা মেয়ে এবং মেয়ের মেয়ে এভাবে যতই নিম্নস্তরে যাক না কেন, সবাই হারাম। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর বর্ণনা মতে হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘নারীদেরকে বিয়ে করা।' হযরত আতা’ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘তাদের কাপড় সরিয়ে দেয়া, স্পর্শ করা এবং উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে তাদের পদদ্বয়ের মধ্যস্থলে বসে পড়া।' ইবনে জুরাইজ জিজ্ঞেস করেন, 'যদি এ কাজ স্ত্রীর বাড়ীতেই হয়? হযরত আতা’ উত্তরে বলেন, এখানকার ওখানকার দুটোর হুকুম একই। এরূপ যদি হয়ে যায় তবে তার মেয়ে তার স্বামীর উপর হারাম হয়ে যাবে।'ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, শুধু নির্জনবাসের দ্বারাই তার মেয়ের অবৈধতা সাব্যস্ত হয় না। যদি সঙ্গম করা, স্পর্শ করা এবং কামপ্রবৃত্তির সাথে।তার কোন অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পূর্বেই তালাক দিয়ে দেয় তবে সর্বসম্মতিক্রমে একথা সাব্যস্ত হয় যে, স্ত্রীর মেয়ে তার উপর হারাম হবে না।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমাদের পুত্রবধুগণও তোমাদের উপর হারাম, যারা তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের পত্নী’। অর্থাৎ পালক পুত্রের স্ত্রী হারাম নয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যখন যায়েদ তার নিকট হতে স্বীয় প্রয়োজন পুরো করে নেয়, তখন আমি তাকে তোমার বিবাহে দিয়ে দেই, যেন মুমিনদের উপর তাদের পালিত পুত্রদের ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতা না থাকে।' (৩৩:৩৭)হযরত আতা’ (রঃ) বলেন, আমরা শুনতাম যে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ)-কে বিয়ে করেন তখন মক্কার কুরাইশরা তার সমালোচনা শুরু করে দেয়। তখন (আরবী) (৩৩:৪) এ আয়াতটি এবং (আরবী) (৩৩:৪০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আয়াতগুলোর অর্থ হচ্ছেঃ “তোমাদের পালক পুত্রগণকে তিনি তোমাদের পুত্র করেননি। মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নয়।হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতগুলো অস্পষ্ট, যেমন তোমাদের পুত্রদের স্ত্রীগণ, তোমাদের শাশুড়ীগণ। হযরত তাউস (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত মাকহুল (রঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে। আমি বলি অস্পষ্টের ভাবার্থ হচ্ছে সাধারণ। অর্থাৎ যাদের সাথে সঙ্গম করা হয়েছে এবং যাদের সাথে সঙ্গম করা হয়নি সবাই এর মধ্যে জড়িত। শুধু বিয়ে করার পরেই অবৈধতা সাব্যস্ত হয়ে যায়, সঙ্গম হোক আর নাই হোক। এ মাসআলার উপর সবাই একমত যে, কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘আয়াতে তো শুধু ঔরসজাত পুত্রের উল্লেখ আছে, তাহলে দুধ পুত্রের স্ত্রী অবৈধ হওয়া কিরূপে সাব্যস্ত হবে। তবে এর উত্তর হবে এই যে, ওর অবৈধতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে। তিনি বলেনঃ স্তন্যপান দ্বারা ওটাই হারাম হয় যা হারাম হয় বংশের দ্বারা। জমহুরের মাযহাব এটাই যে, দুধ পুত্রের স্ত্রীও হারাম। কোন কোন লোক তো এর উপরই ইজমা নকল করেছেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“বিবাহে দু বোনকে একত্রিত করাও তোমাদের জন্যে হারাম। অধীনস্থ দাসীদের উপরও এ হুকুম প্রযোজ্য যে, একই সময় দু’ বোনের সাথে সঙ্গম করা হারাম। কিন্তু অজ্ঞতার যুগে যা হয়ে গেছে তা আমি ক্ষমা করে দিলাম। সুতরাং জানা গেল যে, আগামীতে কোন সময় এ কাজ কারও জন্যে বৈধ নয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ প্রথম মৃত্যু ছাড়া তথায় তারা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না। (৪৪ঃ৫৬) তাহলে জানা যাচ্ছে যে, আগামীতে আর মৃত্যুর আগমন ঘটবে না।সাহাবা, তাবেঈন, ঈমানগণ এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের ইজমা আছে যে, একই সাথে দু বোনকে বিয়ে করা হারাম। যে ব্যক্তি মুসলমান হবে এবং তার বিয়েতে দু’বোন থাকবে, তাকে এ অধিকার দেয়া হবে যে, সে যে কোন একজনকে রাখবে অপরজনকে তালাক দেবে। আর এটা তাকে করতেই হবে। হযরত যহ্হাক ইবনে ফীরোয (রাঃ) বলেন, আমি যখন মুসলমান হই। তখন আমার বিয়েতে দু' স্ত্রী ছিল যারা পরস্পর ভগ্নী ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন একজনকে তালাক দিয়ে দেই। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সুনান-ই-ইবনে মাজা, সুনান-ই-আবি দাউদ ও জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ দু'জনের মধ্যে যাকে ইচ্ছে রাখ অপরজনকে তালাক দাও। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদসিটি হাসান বলেছেন। সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে আবু খাররাশের এরূপ ঘটনাও বর্ণিত আছে। সম্ভবতঃ যহ্হাক ইবনে ফীররাযেরই কুনইয়াত আবু খাররাশ হবে এবং ঘটনাটি একই হবে। আবার এর বিপরীত হবারও সম্ভাবনা রয়েছে। হযরত দায়লামী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বিবাহে দু’বোন রয়েছে। তিনি বলেনঃ “তাদের মধ্যে যাকে চাও একজনকে তালাক দিয়ে দাও। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)সুতরাং দায়লামী অর্থে হযরত যহ্হাক ইবনে ফীরোযকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি ইয়ামনের ঐ নেতৃবর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা অভিশপ্ত আসওয়াদ আনসী মুতানাব্বীকে হত্যা করেছিলেন। পরস্পর দু’ বোন এ রূপ দু’জন দাসীকে একই সাথে একত্রিত করে তাদের সাথে সঙ্গম করাও হারাম। এর দলীল হচ্ছে এ আয়াতটির সাধারণতা, যার মধ্যে স্ত্রী ও দাসী উভয়ই জড়িত রয়েছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি এটাকে মকরূহ বলেন। প্রশ্নকারী বলে, কুরআন কারীমে যে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘কিন্তু তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের অধিকারী।'(২৩:৭) তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “তোমার উটও তো তোমার দক্ষিণ হস্তের অধিকারে রয়েছে।' জমহুরের প্রসিদ্ধ উক্তিও এটাই এবং ইমাম চুতষ্টয় প্রভৃতি মনীষীও এ কথাই বলেন। তবে পূর্ববর্তী কোন কোন মহামানব এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-কে এ মাসআলাটি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, একটি আয়াত এটাকে হালাল করছে এবং অপরটি হারাম করছে। আমি তো এটা হতে নিষেধ করি না। প্রশ্নকারী তথা হতে বের হয়। পথে একজন সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁকেও এ প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, 'আমার অধিকার থাকলে এরূপ কার্যকারীকে আমি শিক্ষামূলক শাস্তি প্রদান করতাম।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, “আমার ধারণা এ উক্তিকারী খুব সম্ভব হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে। ইসতিকার-ই-ইবনে আবদিল বারর’ গ্রন্থে রয়েছে যে, এ ঘটনার বর্ণনাকারী কাবীসা ইবনে যাভীব হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম নেয়নি, কারণ সে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের প্রিয়পাত্র ছিল এবং তাদের উপর তার নাম খুব কঠিন ঠেকতো।হযরত আইয়াস ইবনে আমের বলেন, আমি হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, আমার অধিকারে দু'টি দাসী রয়েছে যারা পরস্পর দু' বোন। একজনের সাথে আমি সম্পর্ক স্থাপন করেছি এবং আমার ঔরসে তার সন্তানাদিও হয়েছে। এখন আমার মনে চাচ্ছে যে, তার বোনটি যে আমার দাসী হিসেবে রয়েছে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করি। তাহলে বলুন শরীয়তে এ ব্যাপারে কি হুকুম রয়েছে?তিনি বলেন, প্রথম দাসীটিকে আযাদ করে দিয়ে তার বোনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পার।' তিনি বলেন, লোকে তো বলে যে, আমি তার বিয়ে করিয়ে দিয়ে তার বোনের সঙ্গে মিলিত হতে পারি।' হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন, ‘দেখ এ অবস্থাতেও ক্ষতি রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, যদি তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় বা মারা যায় তবে সে পুনরায় তোমার নিকট ফিরে আসবে। সুতরাং তাকে আযাদ করে দেয়ার মধ্যেই নিরাপত্তা রয়েছে।'অতঃপর তিনি আমার হাত ধারণ করে বলেন, জেনে রেখো যে, আযাদ ও দাসী স্ত্রীলোকদের হুকুম বৈধতা ও অবৈধতার দিক দিয়ে একই। হ্যাঁ, তবে সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। আযাদ মহিলাদেরকে চারটের বেশী একত্রিত করা যায় না। কিন্তু দাসীদের সংখ্যার কোন শর্ত নেই।' দুগ্ধ পানের সম্পর্কের ফলে ঐ সমুদয় স্ত্রীলোক হারাম হয়ে যায়, বংশীয় সম্পর্কের কারণে যেগুলো হারাম হয়ে থাকে। স্মরণ রাখতে হবে যে, হযরত উসমান (রাঃ)-এর মতই হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যেমন তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, পরস্পর বোন হয় এরূপ দু'টি দাসীকে একই সময়ে একত্রিত করে তাদের সাথে সঙ্গম করার বৈধতা এক আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে এবং অপর আয়াত দ্বারা অবৈধতা সাব্যস্ত হচ্ছে।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, দাসীদের সাথে আমার আত্মীয়তার কারণে তারা অন্যান্য গুটিকয়েক দাসীকে আমার উপর হারাম করে থাকে। কিন্তু তাদের পরস্পরের আত্মীয়তার কারণে হারাম করে না। অজ্ঞতা যুগের লোকেরাও। ঐ সমুদয় নারীকে হারাম বলে জানতো যাদেরকে তোমরা হারাম মনে করে থাক। কিন্তু তারা শুধু পিতার স্ত্রীকে অর্থাৎ বিমাতাকে এবং একই সাথে বিবাহে দু' বোনকে একত্রিত করাকে হারাম মনে করতো না। কিন্তু ইসলাম এসে এ দু’টোকেও হারাম করে দেয়। এ জন্যেই এ দু'টোর অবৈধতার বর্ণনার সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, যে বিয়ে হয়েছে তা হয়েছেই। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “যে আযাদ স্ত্রীলোকগুলো হারাম ঐ দাসীগুলোও হারাম। হ্যাঁ, তবে সংখ্যায় এক নয়। অর্থাৎ আযাদ মহিলাদেরকে চারটের বেশী একত্রিত করা যায় না। কিন্তু দাসীদের জন্যে কোন সীমা নেই।' হযরত শা'বীও (রঃ) এটাই বলেন।হযরত আবু আমর (রঃ) বলেন, “হযরত উসমান (রাঃ) এ ব্যাপারে যা বলেছেন, পূর্ববর্তী মনীষীদের একটি দলও এটাই বলেছেন, যাদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রয়েছেন। কিন্তু প্রথমতঃ এর নকলে তো স্বয়ং ঐ মনীষীদের মধ্যেই বহু কিছু মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে।দ্বিতীয়তঃ এ উক্তির দিকে বিবেকসম্পন্ন আলেমগণ মোটেই মনোযোগ দেননি এবং তা গ্রহণও করেননি। হেজায, ইরাক, সিরিয়া এমনকি পূর্ব পশ্চিমের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ ওর বিপক্ষে রয়েছেন।' মুষ্টিমেয় কয়েকজন শুধু শব্দের প্রতি লক্ষ্য করেই এবং কোন চিন্তা ও বুদ্ধি বিবেচনা না করেই তাদের হতে পৃথক রয়েছেন ও ইজমার বিপরীত মত পোষণ করেছেন। যারা পূর্ণ জ্ঞানের ও বিবেচনা শক্তির অধিকারী তাঁরা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, দু'বোনকে যেমন বিবাহে একত্রিত করা যায় না, তদ্রপ ঐ দাসীদের সাথেও একই সময় সঙ্গম করতে পারে না, যারা পরস্পর বোন। অনুরূপভাবে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে যে, এ আয়াতে মাতা, কন্যা, বোন ইত্যাদিকে হারাম করা হয়েছে। এদের সাথে যেমন বিয়ে হারাম, তদ্রুপ যদি তারা দাসী হয়ে অধীন হয়ে যায়, তবে তাদের সাথেও মিলন হারাম।মোটকথা, বিয়ের ও দাসীদের উপর অধিকার লাভের পরে, এ দু’ অবস্থাতেই এরা সবাই সমান। না তাদেরকে বিয়ে করে তাদের সাথে মিলন বৈধ, না তাদের উপর অধিকার লাভের পর তাদের সাথে মিলন বৈধ। অনুরূপভাবে এ হুকুমই হচ্ছে একই সাথে দু' বোনকে একত্রিত করণ এবং শাশুড়ীর ও স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত কন্যার একত্রিত করণ। স্বয়ং তাদের জমহূরেরও এটাই মাযহাব। আর এটাই হচ্ছে ঐ দলীল যা ঐ গুটিকয়েক বিপক্ষীর উপর পূর্ণ সনদ ও পরিপূর্ণ হুজ্জত।মোটকথা একই সাথে দু' বোনকে বিয়েতে একত্রিত করাও হারাম এবং দু’ বোনকে দাসীরূপে রেখে তাদের সাথে মিলিত হওয়াও হারাম।

আন-নিসা 4:24

অর্থাৎ যেসব নারীর স্বামী রয়েছে তারাও তোমাদের জন্যে হারাম। তবে হ্যাঁ, কাফিরদের যেসব স্ত্রী যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দিনী হয়ে তোমাদের অধিকারে আসবে, এক ঋতুকাল অতিক্রান্ত হবার পর তারা তোমাদের জন্যে বৈধ হবে। মুসনাদ-ইআহমাদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আওতাসের যুদ্ধে কতগুলো সধবা স্ত্রীলোক বন্দিনী হয়ে আসে। আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদের সাথে মিলিত হওয়াকে বৈধ করা হয়। জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাবরানীর হাদীসে বর্ণিত আছে যে, এটা খাইবার যুদ্ধের ঘটনা।পূর্ববর্তী মনীষীদের একটি দল এ আয়াতের সাধারণতা হতে দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, দাসীকে বিক্রি করে দেয়াই হচ্ছে তার স্বামীর পক্ষ হতে তালাক প্রাপ্তি। হযরত ইবরাহীম (রঃ)-কে এ মাসআলাটি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর ফতওয়াটিই বর্ণনা করতঃ এ আয়াতটি পাঠ করেন।অন্য সনদ দ্বারা বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, “যখন কোন সধবা নারী বিক্রীতা হয় তখন তার দেহের বেশী হকদার হচ্ছে তার মনিব।' হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) ফতওয়া এই যে, তার বিক্রি হওয়াই হচ্ছে তালাক প্রাপ্তি। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, দাসীর তালাক ছয় প্রকারের। তাকে বিক্রি করাও তালাক, আযাদ করাও তালাক, দান করাও তালাক, অব্যাহতি দেয়াও তালাক এবং তার স্বামীর তালাক দেয়াও তালাক।' (এখানে ৫ প্রকারের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। ৬ষ্ঠ প্রকারটি মূল তাফসীরে নেই) হযরত ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, সধবা নারীদের সাথে বিয়ে হারাম। কিন্তু দাসীরা এর ব্যতিক্রম, তাদের বিক্রি হওয়াই তালাক।।হযরত মুহাম্মার (রঃ) এবং হযরত হাসান বসরীও (রঃ) এটাই বলেছেন। এ গুরুজনদের তো উক্তি এই, কিন্তু জমহ্র তাদের বিরোধীমত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, দাসীদের বিক্রি তাদের জন্যে তালাক নয়। কেননা, ক্রেতা হচ্ছে বিক্রেতার প্রতিনিধি এবং বিক্রেতা তার সুফল স্বীয় অধিকার হতে বের করছে এবং দাসীর নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়ে ক্রেতার নিকট বিক্রি করছে।তাদের দলীল হচ্ছে হযরত বুরাইরা (রাঃ)-এর হাদীসটি যা সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত বুরাইরা (রাঃ)-কে ক্রয় করে আযাদ করে দেন। তখন কিন্তু তাঁর হযরত মুগীস (রাঃ)-এর সঙ্গেকার বিয়ে বাতিল হয়নি। বরং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সে বিয়ে বাতিল করার বা বাকী রাখার অধিকার প্রদান করেন। হযরত বুরাইরা (রাঃ) বিয়ে বাতিল করাকেই পছন্দ করেন। এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। সুতরাং ঐ গুরুজনদের কথা অনুযায়ী বিক্রি হওয়াই যদি তালাক হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বুরাইরা (রাঃ)-কে তাঁর বিক্রি হয়ে যাবার পর বিয়ে বাতিল করার বা ঠিক রাখার অধিকার দিতেন না। অধিকার দেয়ার দলীল হচ্ছে বিয়ে ঠিক থাকার। কাজেই আয়াতে শুধু ঐ স্ত্রীলোকদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা যুদ্ধে বন্দিনী হয়ে মুসলমানদের অধিকারে এসেছে। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে পুণ্যশীলা রমণীগণ। অর্থাৎ পুণ্যবতী নারীগণ তোমাদের জন্যে হারাম-যে পর্যন্ত না তোমরা বিয়ে, সাক্ষী, মোহর ও অভিভাবকের মাধ্যমে তাদের সতীত্বের অধিকারী হও, একজন হোক, দু'জন হোক, তিনজন হোক বা চারজন হোক। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত তাউস (রঃ) এ ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন। উমার (রঃ) এবং উবাইদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-চারটের বেশী স্ত্রী তোমাদের জন্যে হারাম। হ্যা, তবে দাসীদের ব্যাপারে এ সংখ্যা নেই। অতপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-এ নির্দেশ আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর লিখে দিয়েছেন, অর্থাৎ চারটের হুকুম। সুতরাং এটাই তোমাদের জন্যে অবশ্যপালনীয়, তোমারা ওর সীমা ছাড়িয়ে যেওনা। তোমরা তাঁর শরীয়ত ও ফরযগুলো মেনে চল।' এও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হারাম নারীদেরকে স্বীয় গ্রন্থে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এরপরে বলা হচ্ছে-‘যেসব নারীর হারাম হবার কথা বর্ণনা করা হলো, তারা ছাড়া সমস্ত নারী তোমাদের জন্যে হালাল। একটি ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ চারের কম তোমাদের জন্যে হালাল। কিন্তু এ উক্তি দূরের উক্তি। প্রথমটিই সঠিক ভাবার্থ। এটাই হযরত আতা' (রঃ)-এর উক্তি।হযরত কাতাদা (রঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করেন যে, এর দ্বারা দাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এ আয়াতটিই ঐ লোকদের দলীল, যারা বিবাহে একই সময়ে দু' বোনকে একত্রিত করার বৈধতার সমর্থক এবং ঐ লোকদেরও দলীল যারা বলেন যে, একটি আয়াত ওকে হালাল করছে ও একটি আয়াত হারাম করছে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা এ হালাল নারীদেরকে স্বীয় মাল দ্বারা গ্রহণ কর। আযাদ নারীদেরকে চারজন পর্যন্ত বিয়ে করতে পারবে এবং দাসীদেরকে সংখ্যা নির্ধারণ ছাড়াই বিয়ে করতে পারবে, তবে শরীয়তের পন্থায় হতে হবে। এ জন্যেই বলা হয়েছে-ব্যভিচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত বিবাহবদ্ধ করার জন্যে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যেসব স্ত্রী হতে তোমরা ফল ভোগ কর, সে ফল ভোগের বিনিময়ে তাদেরকে মোহর প্রদান কর।' যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘কিরূপে তোমরা তা (মোহর) গ্রহণ করবে? অথচ তোমরা পরস্পর একে অন্যের নিকট উপস্থিত হয়েছিলে।' (৪:২১) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা খুশী মনে স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর।' (৪:৪) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা স্ত্রীদেরকে যা কিছু প্রদান করেছ তা হতে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্যে বৈধ নয়।' (২:২২৯) এ আয়াত দ্বারা মুতআ’” (মুআ' হচ্ছে অস্থায়ী বা সাময়িক বিবাহ। কোন বস্তুর বিনিময়ে কোনরূপ ফল ভোগ করলে তাকে মু্তআ' বলে) বিবাহের উপর দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।ইসলামের প্রাথমিক যুগে ‘মুআ' শরীয়তেরই বিধান ছিল। পরে তা রহিত হয়ে যায়। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং উলামা-ই-কিরামের একটি দল বলেন যে, ‘মুআ’ দু’বার বৈধ করা হয়, অতঃপর রহিত করা হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার চেয়েও বেশীবার বৈধ হয়েছে ও রহিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন। যে, একবার মাত্র বৈধ হয়েছে, তারপরে রহিত হয়ে গেছে। এরপরে আর বৈধ হয়নি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী হতে প্রয়োজনের সময় এর বৈধতার কথা বর্ণিত আছে। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপই একটি বর্ণনা বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) হতে (আরবী) শব্দের পরে (আরবী)-এর পঠন বর্ণিত আছে। কিন্তু জমহুর এর উলটো।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এর উত্তম মীমাংসা করেছে যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খাইবারের যুদ্ধে মুতআ’র বিবাহ হতে এবং পালিত গাধার মাংস হতে নিষেধ করেছেন। এ হাদীসের শব্দগুলো আহকামের গ্রন্থসমূহে বিস্তারিতভাবে রয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত সুবরা' ইবনে মা’বাদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মক্কা বিজয়ের যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলেন। তিনি ইরশাদ করেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে মুতআ’র অনুমতি দিয়েছিলাম। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত ওটাকে হারাম করে দিয়েছেন। যার নিকট এ প্রকারের স্ত্রী রয়েছে সে যেন তাকে পরিত্যাগ করে এবং তোমরা যা কিছু তাদেরকে দিয়ে রেখেছো তা হতে কিছুই গ্রহণ করো না।' সহীহ মুসলিমের অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্বে একথা বলেছিলেন। হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে যার ব্যাখ্যার স্থান হচ্ছে আহকামের গ্রন্থসমূহ।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-‘মোহর নির্ধারণের পর যদি তোমরা পরস্পরের সম্মতিক্রমে কিছু মীমাংসা করে নাও তবে কোন অপরাধ হবে না। যারা পূর্ববর্তী বাক্যকে ‘মুআ’র’ অর্থে নিয়েছেন, তাঁরা এর ভাবার্থ এরূপ বর্ণনা করেন যে, যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন পুনরায় সময় বাড়িয়ে নেয়ায় এবং যা কিছু দিয়েছে তার উপর আরও কিছু দেয়ায় কোন পাপ নেই। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইচ্ছে করলে পূর্বে নির্ধারিত মোহরের পর সময় শেষ হবার পূর্বে যা দিয়েছে সে বলবে-“আমি এত সময়ের জন্যে পুনরায় মুতআ করছি।সুতরাং যদি গর্ভাশয়ের পবিত্রতার পূর্বে ঐ বেশীটা ঠিক করে নেয় তবে সময় শেষ হয়ে যাবার পর তার কোন ক্ষমতা থাকবে না। ঐ স্ত্রী পৃথক হয়ে যাবে এবং এক ঋতুকাল অপেক্ষা করে স্বীয় গর্ভাশয়কে পবিত্র করে নেবে। এ দু’ জনের মধ্যে উত্তরাধিকার নেই। স্ত্রীলোকটিও পুরুষ লোকটির উত্তরাধিকারিণী হবে না এবং পুরুষ লোকটিও স্ত্রীলোকটির উত্তরাধিকারী হবে না। আর যে মনীষীগণ বলেন যে, এটা সুন্নাত বিবাহ সম্পৰ্কীয় কথা, তাঁদের নিকটে এর ভাবার্থ তো পরিষ্কার যে, এখানে মোহর আদায়ের গুরুত্বের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন বলা হয়েছে- ‘মোহর সহজভাবে ও খুশী মনে দিয়ে দাও। তবে মোহর নির্ধারিত হবার পর যদি স্ত্রী তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য মাফ করে দেয়। তবে স্বামী বা স্ত্রীর কারও কোন পাপ নেই।' হযরত হারামী (রঃ) বলেন, মানুষ মোহর নির্ধারণ করে দেয়। অতঃপর তার দরিদ্র হয়ে যাবারও সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় যদি স্ত্রী তার প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে তা বৈধ। ইমাম ইবনে জারীরও এ উক্তিকেই পছন্দ করেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে, তাদেরকে পূর্ণ মোহর প্রদান কর। অতঃপর তাদেরকে বসবাস করার বা পৃথক হয়ে যাবার পূর্ণ অধিকার দাও।' এরপর বলা হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানময়। এ বৈধতা বা অবৈধ সম্পর্কীয় নির্দেশাবলীর মধ্যে যে নিপুণতা ও যুক্তিযুক্ততা রয়েছে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।

আন-নিসা 4:25

যারা স্বাধীনা নারীদেরকে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না এখানে তাদেরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। হযরত রাবীআ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ইচ্ছে ও বাসনা। অর্থাৎ দাসীকে বিয়ে করবে যখন তার প্রতি বাসনা জাগবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটি এনেছেন, অতঃপর তিনি সেটা খণ্ডন করেছেন। ভাবার্থ এই যে, মুসলমানদের অবস্থা যখন এরূপ হবে তখন তাদের অধিকারে যে দাসীগুলো থাকবে তাদেরকে তারা বিয়ে করবে।সমস্ত কার্যের যথার্থতা আল্লাহ পাকের নিকটে প্রকাশমান। মানুষ তো শুধু বাহ্যিকটাই দেখে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা স্বাধীন ও দাস সবাই ঈমানী সম্পর্কের দিক দিয়ে একই। দাসীদেরকে তাদের মনিবদের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর। জানা যাচ্ছে যে, দাসীদের অভিভাবক হচ্ছে তাদের মনিবগণ। তাদের অনুমতি ছাড়া দাসীদের বিবাহ সাধিত হয় না। অনুরূপভাবে দাসেরাও তাদের মনিবদের সম্মতি লাভ ছাড়া বিয়ে করতে পারে না।হাদীস শরীফে রয়েছেঃ ‘যে দাস তার মনিবের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে সে ব্যভিচারী। তবে যদি কোন দাসীর অধিকারিণী কোন স্ত্রীলোক হয় তবে তার অনুমতিক্রমে ঐ দাসীর বিয়ে ঐ ব্যক্তি দিয়ে দেবে যে স্ত্রীলোকের বিয়ে দিতে পারে। কেননা, হাদীস শরীফে রয়েছেঃ নারী যেন নারীর বিয়ে না করায়, নারী যেন নিজের বিয়ে নিজে না দেয়, ঐ নারীরা ব্যভিচারিণী যারা নিজেরা নিজেদের বিয়ে দিয়ে থাকে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“স্ত্রীদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও। তারা দাসী বলে তুচ্ছ জ্ঞান করতঃ নির্ধারিত মোহর হতে কিছুই কম করো না।' অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা লক্ষ্য রাখ যে, নারীরা যেন নির্লজ্জতার কাজে আসক্তা না হয়, না তারা এমন হয় যে, কেউ যদি তাদের প্রতি আসক্ত হয় তবে তারাও তাদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, না তারা প্রকাশ্যে ব্যভিচারিণী হয়, না গোপনে গোপনে ব্যভিচার করে যে এদিকে ওদিকে গোপন বন্ধু খুঁজে বেড়ায়। যাদের মধ্যে এরূপ জঘন্য আচরণ রয়েছে তাদেরকে বিয়ে করতে আল্লাহ তা'আলা চরমভাবে নিষেধ করেছেন। উহসিন্না শব্দের দ্বিতীয় পঠন আহসান্নাও রয়েছে। বলা হয়েছে যে, দু'টোর অর্থ একই। এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ ইসলাম বা বিবাহিতা হওয়া।মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের হচ্ছে ইসলাম ও পবিত্রতা। কিন্তু এ হাদীসটি মুনকার এবং এতে দুর্বলতাও রয়েছে। একজন বর্ণনাকারীর নাম নেই। এরূপ হাদীস দলীলের যোগ্য নয়। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বিবাহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), ইকরামা (রঃ), তাউস (রঃ), ইবনে যুবাইর (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখের এটাই উক্তি।হযরত আবু আলী তাবারী (রঃ) স্বীয় ‘ঈযাহ’ নামক গ্রন্থে হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে এটাই নকল করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, দাসীর (আরবী) হওয়ার অর্থ এই যে, সে কোন স্বাধীন ব্যক্তির সাথে বিবাহিতা হয়ে যায়। অনুরূপভাবে দাসের (আরবী) হওয়া এই যে, সে কোন স্বাধীনা মুসলিমা নারীর সাথে বিবাহিত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে। হযরত শা’বী (রঃ) ও হযরত নাখঈ (রঃ) একথাই বলেন। এটাও বলা হয়েছে যে, এ দু' পঠন হিসেবে অর্থ কখনও পরিবর্তিত হয়ে যায়। ‘উহসিন্না’ শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বিবাহ এবং আহসান্না’ শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। কিন্তু বাহ্যতঃ ভাবার্থ এখানে বিবাহই হবে। কেননা, আয়াতের পরবর্তী আলোচনা ওটাই প্রমাণ করছে। আইমানের বর্ণনা তো শব্দসমূহের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।"মোটকথা জমহুরের মাযহাব অনুযায়ী আয়াতটির অর্থে এখনও জটিলতা রয়েছে। কেননা, জমহূরের উক্তি এই যে, দাসীকে ব্যভিচারের কারণে ৫০ চাবুক মারতে হবে, সে মুসলমানই হোক আর অবিশ্বাসিনীই হোক, বিবাহিতাই হোক বা অবিবাহিতাই হোক। অথচ আয়াতের অর্থে বুঝা যাচ্ছে যে, অবিবাহিতা দাসীর উপর কোন হদ্দই নেই (শাস্তিই নেই)। এর বিভিন্ন উত্তর দেয়া হয়েছে। জমহরের উক্তি এই যে, প্রকাশ্য অর্থ ভাবার্থের উপর অগ্রগণ্য হয়ে থাকে। এ জন্যে যে সাধারণ হাদীসগুলোর মধ্যে দাসীদের হদ্দ মারার বর্ণনা রয়েছে ঐগুলোকে আমরা এ আয়াতের ভাবার্থের উপর অগ্রগণ্য করেছি।সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) স্বীয় ভাষণে বলেন, ‘হে জনমণ্ডলী! নিজেদের দাসীদের উপর হদ্দ’ প্রতিষ্ঠিত কর, তারা বিবাহিতাই হোক আর অবিবাহিতাই হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে তাঁর ব্যভিচারিণী দাসীকে ব্যভিচারের ‘হদ’ (শাস্তি) মারার নির্দেশ প্রদান করেন। সে সময় দাসীটি ‘নিফাসের অবস্থায় ছিল বলে আমার ভয় হয় যে, না জানি সে হদ্দের চাবুক মারার কারণে মরেই যায়। তাই আমি সে সময় তাকে শাস্তি না দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তুমি ভাল কাজই করেছ। সে ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ‘হদ্দ’ লাগাবে না।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “সে নিফাস হতে মুক্ত হলে তাকে পঞ্চাশ কোড়া মারবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কারও দাসী ব্যভিচার করে এবং তা প্রকাশ পেয়ে যায় তখন সে যেন তাকে হদ্দ মারে, কিন্তু যেন তাকে শাসন গর্জন না করে। দ্বিতীয়বার যদি ব্যভিচার করে তবে আবার যেন শাস্তি দেয়, কিন্তু এবারেও যেন শাসন গর্জন না করে। তৃতীয়বার যদি যিনা করে এবং তা প্রকাশ হয়ে পড়ে তবে যেন তাকে বিক্রি করে দেয়, যদিও চুলের রশির বিনিময়েও হয়।'সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যদি তৃতীয়বার তার দ্বারা এ কাজ হয় তবে চতুর্থবার যেন বিক্রি করে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে আইয়াশ ইবনে আবু রাবী আমাখযুমী (রঃ) বলেন, আমাদের কয়েকজন কুরাইশ যুবককে হযরত উমার ফারূক (রাঃ) রাষ্ট্রীয় দাসীদের কয়েক জনকে হদ্দ মারার নির্দেশ দেন। আমরা তাদেরকে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে পঞ্চাশ চাবুক মারি। এটা তাদেরই দ্বিতীয় উত্তর যারা একথার দিকে গেছেন যে, অবিবাহিতা দাসীদের উপর কোন শাস্তি নেই। তারা বলেন যে, এ প্রহার শুধুমাত্র আদব দেয়ার জন্যে এবং এ কাজ হতে বিরত রাখার জন্যে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ দিকেই গিয়েছেন। তাউস (রঃ), সাঈদ (রঃ), আবু উবায়েদ (রঃ) এবং দাউদ ইবনে আলী আযযাহেরীরও (রঃ) এটাই মাযহাব। তাদের বড় দলীল হচ্ছে আয়াতের ভাবার্থ এবং শর্তের ভাবার্থ এটাই। অধিকাংশের নিকট এটাই নির্ভরযোগ্য। এ জন্যেই এটা সাধারণের উপর অগ্রগণ্য হতে পারে। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ (রঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, যখন অবিবাহিতা দাসী ব্যভিচার করে তখন তার হুকুম কি?' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি সে ব্যভিচার করে তবে তাকে হদ্দ লাগাও, যদি পুনরায় ব্যভিচার করে তবে পুনরায় চাবুক মার, অতঃপর তাকে চুল দ্বারা পাকান রঞ্জুর বিনিময়ে হলেও বিক্রি করে দাও। হাদীসটির বর্ণনাকারী ইবনে শিহাব (রঃ) বলেন, “আমি জানিনা যে, তৃতীয়বারের পর বলেছেন কি চতুর্থবারের পর বলেছেন। সুতরাং এ হাদীসটিকে অবলম্বন করে তারা উত্তর দেন, দেখুন এখানে হদ্দের পরিমাণ ও চাবুকের সংখ্যা বর্ণনা করা হয়নি। কিন্তু বিবাহিতার ব্যাপারে পরিষ্কার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং কুরআন পাকের মধ্যে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, দাসীদের শাস্তি হচ্ছে স্বাধীনা নারীদের অর্ধেক। সুতরাং কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের মধ্যে এভাবে আনুকল্য করা ওয়াজিব হয়ে গেল। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এর চেয়েও অধিকতর স্পষ্ট হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা হযরত সাঈদ ইবনে মানসুর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে নকল করেছেন। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কোন দাসীর উপর হদ্দ নেই যে পর্যন্ত না সে বিবাহিতা হয়। অতএব যখন সে বিবাহিতা হবে তখন তার উপর বিবাহিতা স্বাধীনা নারীর অর্ধেক হদ্দ হবে।' ইবনে খুযাইমাও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি বলেন যে, হাদীসটিকে মার’ বলা ভুল, বরং এটা মাওকুফ হাদীস। অর্থাৎ এটা হযরত ইবনে আব্বাসেরই (রাঃ) উক্তি। বায়হাকী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর ফায়সালাও এটাই। তিনি বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) ও আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসগুলো একই ঘটনার মীমাংসা। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিরও কয়েকটি উত্তর রয়েছে। একতো এই যে, এটাকে উঠানো হয়েছে ঐ দাসীর উপর যে বিবাহিতা। এরূপে হাদীসদ্বয়ের মধ্যে আরও সাদৃশ্য একত্রিত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় এই যে, এ হাদীসের ‘হদ্দ’ শব্দটি কোন বর্ণনাকারী ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং তার দলীল হচ্ছে উত্তরের প্রতারণা। তৃতীয় এই যে, এ হাদীসটি হচ্ছে দু’জন সাহাবীর এবং ঐ হাদীসটি শুধু একজন সাহাবীর এবং দুই ও একের মধ্যে দুই-ই অগ্রগণ্য। এভাবেই এ হাদীসটি সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও বর্ণিত হয়েছে এবং ওর সনদ সহীহ মুসলিমের শর্তের উপর রয়েছে যে, হযরত ইবাদ ইবনে তামীম (রঃ) তাঁর চাচা বদরী সাহাবী হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন দাসী ব্যভিচার করে তখন তাকে চাবুক মার, আবার করে তো আবার মার, পুনরায় ব্যভিচার করলে পুনরায় চাবুক মার, অতঃপর চুল দ্বারা পাকান একটি রঞ্জুর বিনিময়ে হলেও তাকে বিক্রি করে দাও। চতুর্থ উত্তর এই যে, কোন বর্ণনাকারী যে (আরবী)-এর উপর (আরবী) শব্দের প্রয়োগ করেছেন এতে কোন বৈচিত্র নেই এবং তিনি হয়তো ‘ জিদ’কে ‘হদ্দ’ ধারণা করে থাকবেন কিংবা হয় তো আদব দেয়ার উদ্দেশ্যে শাস্তি দেয়ার উপর হদ্দ শব্দের প্রয়োগ করেছেন। যেমন হদ্দ শব্দের প্রয়োগ ঐ শাস্তির উপরও করা হয়েছে যে রুগ্ন ব্যভিচারীকে একটি খেজুরের গুচ্ছ দ্বারা প্রহার করেছিল যে গুচ্ছে ছোট ছোট একশটি শাখা ছিল। আর যেমন ‘হদ্দ’ শব্দের প্রয়োগ ঐ ব্যক্তির উপরও করা হয়েছে যে স্বীয় স্ত্রীর ঐ দাসীর সঙ্গে ব্যভিচার করেছিল যে দাসীকে তার স্ত্রী তার জন্যে হালাল করেছিল। তবুও তাকে শুধুমাত্র শাসনমূলক শাস্তির জন্যে একশ চাবুক মারা হয়েছিল।এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখ পূর্ববর্তী মনীষীর ধারণা। কিন্তু প্রকৃত ‘হদ্দ’ শুধু এই যে, অবিবাহিতকে একশ চাবুক মারা হবে এবং বিবাহিতকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ)-এর ঘোষণা এই যে, দাসীর যে পর্যন্ত বিয়ে হবে সে পর্যন্ত তাকে ব্যভিচারের জন্যে প্রহার করা হবে না। এর ইসনাদ বিশুদ্ধ বটে, কিন্তু এর দু’টো অর্থ হতে পারে। একতো এই যে, তাকে মোটেই প্রহার করা হবে না। হদ্দের’ও না, অন্য কোন শাস্তিরও না। এটা অর্থ হলে এ উক্তি সম্পূর্ণই গারীব। হতে পারে যে, তিনি শব্দের প্রতি লক্ষ্য করেই এ ফতওয়া দিয়েছেন এবং তাঁর নিকট হয়তো হাদীস পৌছেনি। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তাকে হদ্দ মারা হবে না। যদি এ অর্থ নেয়া হয় তবে এটা ওর উল্টো নয় যে, তাকে অন্য কোন শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীর ফতওয়ার অনুরূপ হয়ে যাবে। এ সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ পাকেরই আছে।তৃতীয় উত্তর এই যে, বিবাহিতা দাসীর উপর স্বাধীনা নারীর তুলনায় অর্ধেক শাস্তি হওয়ার প্রমাণ আয়াতে কারীমায় রয়েছে। কিন্তু বিবাহিতা হওয়ার পূর্বে কিতাব ও সুন্নাতের সাধারণত্বের মধ্যে এও জড়িত রয়েছে যে তাকেও একশ চাবুক মারা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষের প্রত্যেককে একশ চাবুক মার।' (২৪:২)আর যেমন হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার কথা গ্রহণ কর, আমার কথা বুঝে নাও, আল্লাহ তাদের জন্যে রাস্তা বের করে দিয়েছেন, যদি উভয়ই অবিবাহিত ও অবিবাহিতা হয় তবে একশ চাবুক ও এক বছর নির্বাসন। আর যদি দু'জনই বিবাহিত ও বিবাহিতা হয় তবে এক বছর নির্বাসন ও প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করণ।এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম শরীফেও রয়েছে এবং এ প্রকারের আরও হাদীস রয়েছে। হযরত দাউদ ইবনে আলী আযাহেরী (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। কিন্তু এটা অত্যন্ত দুর্বল। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বিবাহিতা দাসীদেরকে স্বাধীনা নারীদের তুলনায় অর্ধেক চাবুক মারার বর্ণনা দিয়েছেন অর্থাৎ পঞ্চাশ চাবুক। তাহলে যদি সে বিবাহিতা না হয় তদুপরি তাকে তার চেয়েও অধিক চাবুক কিরূপে মারা যেতে পারে? অথচ শরীয়তের তো আইন এই যে, বিবাহের পূর্বে শাস্তি কম হবে এবং বিবাহের পর শাস্তি বেশী হবে। সুতরাং এর বিপরীত কিরূপে সঠিক হতে পারে?রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর সাহাবীগণ অবিবাহিতা দাসীর ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন এবং তিনি উত্তর দিচ্ছেনঃ তাকে চাবুক মার। কিন্তু ‘একশ চাবুক মার’ একথা বলছেন না। সুতরাং যদি তার এ হুকুমই হতো, যেমন দাউদ ইবনে আলী আযহেরী (রঃ) বুঝেছেন, তবে সে হুকুম বর্ণনা করে দেয়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ওয়াজিব হতো। কেননা, তাঁদের এ প্রশ্ন তো শুধু এজন্যেই ছিল যে, দাসী বিবাহিতা হয়ে যাওয়ার পর তাকে একশ চাবুক মারার বর্ণনা দেয়া হয়নি। নচেৎ এ শর্ত লাগানোর কি প্রয়োজন ছিল যে, তাঁরা বলছেন, যদি সে বিবাহিতা না হয়? কেননা, ঐরূপ হলে বিবাহিতা ও অবিবাহিতার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকতো না যদি এ আয়াত অবতীর্ণ না হতো।কিন্তু যেহেতু এ দু’ অবস্থার মধ্যে একটি অবস্থা সম্বন্ধে তারা অবহিত হয়েই গিয়েছিলেন, এ জন্যেই দ্বিতীয় অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সাহাবীগণ যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর উপর দরূদ পাঠ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা বর্ণনা করেন।অতঃপর তিনি বলেনঃ ইসলাম তো এরকমই যেরকম তোমাদের জানা আছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন (আরবী) (৩৩ :৫৬) আল্লাহ তা'আলার এ ফরমান অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এর উপর দরূদ ও সালাম পাঠাবার নির্দেশ দেয়া হয় তখন সাহাবীগণ বলেন, 'সালামের নিয়ম ও ওর শব্দগুলো তো আমাদের জানা আছে, আপনি সালাতের অবস্থা বর্ণনা করুন। সুতরাং এ প্রশ্নটিও ঠিক ঐ রকমই।আয়াতের মাফহুমের চতুর্থ উত্তর হচ্ছে আবু সাওরের উত্তর যা দাউদের উত্তর হতেও বেশী দুর্বল। তিনি বলেন, যখন দাসীরা বিবাহিতা হয়ে যাবে তখন তাদের ব্যভিচারের ‘হদ্দ’ হবে বিবাহিতা স্বাধীনা ব্যভিচারিণী নারীদের হদ্দের অর্ধেক। তাহলে এটাতো স্পষ্ট কথা যে, বিবাহিতা স্বাধীনা ব্যভিচারিণী নারীদের শাস্তি হচ্ছে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা। আর এটাও স্পষ্ট কথা যে, এরূপ শাস্তির অর্ধেক করা যায় না। সুতরাং সে অবস্থায় দাসীদেরকেও হত্যা করতে হয় এবং বিবাহের পূর্বে পঞ্চাশ চাবুক মারতে হয়। কেননা, বিবাহের পূর্বে স্বাধীনা নারীদের একশ চাবুক মারার নির্দেশ রয়েছে।অতএব বুঝা যাচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে ভাবার্থ বুঝতেই তিনি ভুল করেছেন। এটা জমহুরের মতেরও বিপরীত। এমন কি ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, কোন মুসলমানের এতে মতবিরোধ নেই যে, দাস দাসীর ব্যভিচারের শাস্তি ‘রজম’ অর্থাৎ পাথর মেরে হত্যা করা মোটেই নয়। কেননা, আয়াত এটা প্রমাণ করছে যে, তাদের উপর স্বাধীনা নারীদের তুলনায় অর্ধেক শাস্তি। (আরবী) শব্দে যে (আরবী) রয়েছে তা হচ্ছে -এর আলিফ লাম। অর্থাৎ সেই। -এর মধ্যে যাদের বর্ণনায় আয়াতের প্রারম্ভের (আরবী)-এর মধ্যে হয়ে গেছে। এর ভাবার্থ শুধুমাত্র স্বাধীনা নারীগণ। এ সময় এখানে স্বাধীনা নারীদের বিবাহের মাসআলার আলোচনা নয় বরং আলোচনা হচ্ছে এই যে, ইরশাদ হচ্ছে- স্বাধীন নারীদের ব্যভিচারের যে শাস্তি ছিল, দাসীদের উপর তার অর্ধেক শাস্তি। তাহলে জানা গেল যে, এটা ঐ শাস্তির বর্ণনা, যা অর্ধেক হতে পারে এবং তা হচ্ছে চাবুক। যেমন একশর অধের্ক পঞ্চাশ। কিন্তু রজম’ এমন এক শাস্তি যার অংশ হতে পারে না। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে একটি ঘটনা রয়েছে, যা আবু সাউরের মাযহাবের পূর্ণ খণ্ডনকারী। ঘটনাটি এই যে, সুফিয়া নাম্নী একটি দাসী একজন দাসের সঙ্গে ব্যভিচার করে এবং ঐ ব্যভিচারের ফলেই একটি শিশুর জন্ম হয়। ব্যভিচারী দাসটি শিশুটির দাবী করে। মুকাদ্দমাটি হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। হযরত উসমান (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর উপর এর মীমাংসার ভার অর্পণ করেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বয়ং এ ব্যাপারে যে মীমাংসা করেছেন আমিও সে মীমাংসাই করবো। শিশুটি হবে দাসীর মনিবের এবং ব্যভিচারীর জন্যে পাথর রয়েছে। অতঃপর উভয়কে পঞ্চাশ পঞ্চাশ করে চাবুক মারেন।এও বলা হয়েছে যে, মাফহুম'-এর উদ্দেশ্য হচ্ছে উপর হতে নীচের উপর সতর্কতা। অর্থাৎ যখন সে বিবাহিতা হবে তখন তার হদ্দ’ হবে স্বাধীনা নারীদের তুলনায় অর্ধেক। অতএব, তাদের উপর রজম’ তো কোন অবস্থাতেই নেই। বিয়ের পূর্বেও নেই, পরেও নেই। উভয় অবস্থাতেই শুধু চাবুকই রয়েছে। এর দলীল হচ্ছে হাদীস। ইফসাহ’ নামক গ্রন্থের লেখক এ কথাই বলেন। ইবনে আবদিল হাকাম (রঃ) ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতেও এটা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হকী স্বীয় পুস্তক কিতাবুস সুনানে ওয়াল আ'সারের মধ্যে এটা এনেছেন। কিন্তু এ উক্তিটি আয়াতের শব্দ হতে বহু দূরে রয়েছে। কেননা, অর্ধেক। শাস্তি হবার দলীল শুধু কুরআন কারীমের আয়াত, অন্য কিছুই নয়। সুতরাং ওটা ছাড়া অন্য কিছুর অর্ধেক হওয়া কিরূপে বুঝা যাবে? এটাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে বিবাহিতা হওয়া অ ইমামই ‘হদ্দ’ কায়েম করতে পারেন, ঐ অবস্থায় ঐ দাসীর মনিব তার উপর ‘হদ্দ’ জারী করতে পারে না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মাযহাবে একটি উক্তি এটাই। তবে বিয়ের পূর্বে দাসীর মনিবের ঐ অবস্থায় তার উপর হদ্দ’ জারী করার অধিকার রয়েছে এমন কি তার উপর নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু উভয় অবস্থাতেই ‘হদ্দ’ অর্ধেকই থাকবে। এটাও কিন্তু বহু দূরের কথা। কেননা, আয়াতের মধ্যে এরও প্রমাণ নেই। যদি এ আয়াতটি না হতো তবে আমরা জানতে পারতাম না যে, দাসীদের ব্যাপারে অর্ধেক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে এবং সে অবস্থায় তাদেরকেও সাধারণেই অন্তর্ভুক্ত করে পূর্ণ হদ্দ অর্থাৎ একশ চাবুক এবং প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার হুকুম তাদের উপরও জারী করা ওয়াজিব হতো। যেমন সাধারণ বর্ণনা দ্বারা এটা সাব্যস্ত রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “হে জনগণ! তোমাদের অধীনস্থা দাসীদের উপর হদ্দ’ জারী কর। বিবাহিতাই হোক আর অবিবাহিতাই হোক। তাছাড়া পূর্ব বর্ণিত অন্যান্য সাধারণ হাদীসগুলোর মধ্যেও স্বামীবিশিষ্টা বা স্বামীহীনার কোন ব্যাখ্যা নেই। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে হাদীসটিকে জমহুর দলীলরূপে গ্রহণ করেছেন তা এই যে, যখন তোমাদের কারও দাসী ব্যভিচার করে, অতঃপর তার ব্যভিচার প্রকাশিত হয় তখন তার উপর হদ্দ’ জারী করা তার উচিত এবং পরে শাসন গর্জন করা উচিত নয়।মোটকথা, দাসীর ব্যভিচারের শাস্তির ব্যাপারে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। প্রথমতঃ এই যে, তার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তাকে পঞ্চাশ চাবুক মারতে হবে এবং বিয়ে হওয়ার পরেও এ শাস্তিই থাকবে। কিন্তু তাকে নির্বাসন দেয়া হবে কি-না সে ব্যাপারে তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, তাকে নির্বাসন দেয়া হবে। দ্বিতীয় এই যে, তাকে নির্বাসন দেয়া হবে না। তৃতীয় উক্তি এই যে, তার নির্বাসন অর্ধসমাপ্ত রাখা হবে। অর্থাৎ ছ'মাসের নির্বাসন হবে, পূর্ণ এক বছরের নয়। পূর্ণ এক বছর নির্বাসন হলো স্বাধীনা নারীদের জন্যে। এ তিনটি উক্তিই ইমাম শাফিঈর মাযহাবেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আবু হানীফা (রঃ)-এর মতে নির্বাসন শুধুমাত্র শাসনমূলক শাস্তি, ‘হদ্দ’ হিসেবে নয়। এটা ইমামের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। তিনি নির্বাসন দিতেও পারেন, নাও দিতে পারেন। পুরুষ ও নারী উভয়ই এ হুকুমেরই অন্তর্গত। তবে ইমাম মালিকের মাযহাব এই যে, নির্বাসন শুধু পুরুষদের জন্যে, নারীদের জন্যে নয়। কেননা, নির্বাসন তো শুধু তার নিরাপত্তার জন্যে এবং নারীদেরকে যদি নির্বাসন দেয়া হয় তবে নিরাপত্তা হতে বেরিয়ে যাবে। নর ও নারীদেরকে দেশান্তর করা সম্বন্ধীয় হাদীস শুধুমাত্র হযরত উবাদাহ ইবনে সাবিত (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবিবাহিতা ব্যভিচারীর ব্যাপারে ‘হদ্দ’ মারার এবং এক বছর দেশান্তর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী) এর ভেতরে উদ্দেশ্যে এটাই ছিল যে, এতে তার নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু নারীকে দেশান্তর করাতে কোন নিরাপত্তা নেই। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, অবিবাহিতা দাসীকে ব্যভিচারের কারণে পঞ্চাশ চাবুক মারতে হবে এবং তাকে আদব দেয়ার উদ্দেশ্যে কিছু মারপিট করতে হবে। কিন্তু তার জন্যে কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, বিবাহের পূর্বে তাকে মারা হবে না, যেমন হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ)-এর উক্তি। কিন্তু যদি তার ভাবার্থ এই হয় যে, তাকে মোটেই না মারা উচিত তবে এটা জটিল ব্যাখ্যাযুক্ত মাযহাব হবে। নচেৎ তাকে দ্বিতীয় উক্তির অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সে উক্তিটি এই যে, বিবাহের পূর্বে একশ চাবুক এবং বিবাহের পর পঞ্চাশ চাবুক। যেমন দাউদ ইবনে আলী আযযাহেরীর উক্তি এবং এটাই হচ্ছে সমস্ত উক্তির মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল উক্তি এবং এটাও দ্রুপ যে, বিয়ের পূর্বে পঞ্চাশ চাবুক ও বিয়ের পর ‘রজম’। যেমন আবু সাউরের উক্তি। সঠিক কথা আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।এরপরে বলা হচ্ছে-‘উপরোক্ত শর্তগুলোর বিদ্যমানতায় দাসীদেরকে বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হলো ঐ লোকদেরকে যাদের ব্যভিচারে পতিত হয়ে যাবারও ভয় রয়েছে এবং স্ত্রী মিলনের উপর ধৈর্যধারণ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাদের জন্যে অবশ্যই পবিত্র দাসীদের সাথে বিবাহ বৈধ।' সে সময়েও কিন্তু ধৈর্যধারণ করতঃ দাসীদেরকে বিয়ে না করাই উত্তম। কেননা, তাদের গর্ভে যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তারা তাদের মনিবের দাসী বা দাস হবে। হ্যা, তবে যদি তাদের স্বামী দরিদ্র হয় তবে ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর প্রাচীন উক্তি অনুযায়ী এ সন্তানগুলোর অধিকারী তাদের মনিব হবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর তবে এটা তোমাদের জন্যে উত্তম এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। জমহর উলামা এ আয়াত। দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দাসীর সঙ্গে বিবাহ বৈধ। তবে এটা অবশ্যই বৈধ। সে সময় যে সময় স্বাধীনা নারীদেরকে বিয়ে করার ক্ষমতা না থাকবে এবং স্বীয় প্রবৃত্তিকে দমন করারও শক্তি থাকবে না। বরং ব্যভিচারে পতিত হয়ে যাবারও ভয় থাকবে। কেননা, এতে একটি অসুবিধা এই রয়েছে যে, এর ফলে সন্তানেরা দাসত্বে আবদ্ধ হয় এবং স্বাধীনা নারীদেরকে ছেড়ে দিয়ে দাসীদেরকে বিয়ে করায় এক প্রকারের মানহানির কারণ হয়। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও তাঁর সহচরগণ জমহরের বিপরীত মতপোষণ করেন। তারা বলেন যে, এ দু'টো শর্ত নেই বরং যার বিয়েতে কোন স্বাধীনা নারী নেই তার জন্যে দাসীকে বিয়ে করা বৈধ। ঐ দাসী মুসলমানই হোক বা আহলে কিতাবই হোক, যদিও তার আযাদ নারীকে বিয়ে করার ক্ষমতাও থাকে এবং যদিও তার নির্লজ্জতার কাজে পতিত হওয়ার ভয়ও না থাকে। এর বড় দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের পবিত্র ও পরহেজগার নারীদেরকে (বিয়ে কর)।' তারা বলেন যে, আয়াতটি সাধারণ। এর মধ্যে স্বাধীন ও দাসী সবাই জড়িত রয়েছে। (আরবী) বলা হয় পবিত্র ও পরহেযগার মহিলাদেরকে। কিন্তু এর বাহ্যিক লক্ষণও ঐ মাসআলার উপরই রয়েছে যা জমহরের মাযহাব। এ বিষয়ে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আন-নিসা 4:26

২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর: কুরআন ঘোষণা করে- হে মুমিনগণ! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হালাল ও হারাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে চান, যেমন এ সূরায় এবং অন্যান্য সূরাসমূহে তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রশংসনীয় পথে চালাতে চান, যেন তোমরা তাঁর শরীয়তের উপর আমল করতে থাক যে কাজ তাঁর নিকট প্রিয় ও যে কাজে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান। যে পাপ ও অন্যায়কার্য হতে তোমরা তাওবা করে থাক সে তাওবা তিনি সতুর কবুল করে থাকেন। তিনি মহাজ্ঞানী ও মহা বিজ্ঞানময়। স্বীয় শরীয়তে, স্বীয় অনুমানে, স্বীয় কার্যে ও স্বীয় ঘঘাষণায় তিনি সঠিক জ্ঞান ও পর্ণ নিপুণতার অধিকারী। প্রবত্তি পূজারীরা অর্থাৎ শয়তানের দাস ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা এবং অসৎ লোকেরা তোমাদের পদস্খলন ঘটিয়ে তোমাদেরকে সত্য ও সরল পথ হতে সরিয়ে দিয়ে অন্যায় ও অসত্যের পথে চালাতে চায়। আল্লাহ তা'আলা শরীয়তের আহকাম নির্ধাণের ব্যাপারে তোমাদের পথ সহজ করতে চান এবং এর উপর ভিত্তি করেই কতগুলো শর্ত আরোপ করতঃ দাসীদেরকে বিয়ে করে নেয়া তোমাদের জন্যে বৈধ করেছেন। মানুষ জন্মগত দুর্বল বলে মহান আল্লাহ স্বীয় আহকামের মধ্যে কোন কাঠিন্য রাখেননি। মানুষ সৃষ্টিগতই দুর্বল বলে তার আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তি দুর্বল। তারা স্ত্রীদের ব্যাপারে দুর্বল। তারা এখানে এসে একেবারে বোকা বনে যায়।তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মিরাজের রাত্রে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ হতে ফিরে আসেন এবং হযরত মূসা কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তখন তিনি রাসূল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার উপর কি ফরয করা হয়েছে?' তিনি বলেনঃ “প্রত্যহ দিন রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায। তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ 'আপনি ফিরে যান এবং মহান আল্লাহর নিকট লঘুকরণের জন্যে প্রার্থনা করুন। আপনার উম্মতের মধ্যে এটা পালনের শক্তি নেই। আপনার পূর্ববর্তী লোকদেরকে আমি পরীক্ষা করেছি। তারা এর চেয়ে বহু কমেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আর আপনার উম্মত তো কর্ণের, চক্ষুর এবং অন্তরের দুর্বলতায় তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে।'অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে যান এবং দশ ওয়াক্ত কমিয়ে আনেন। পুনরায় হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে একই আলোচনা হয়। তিনি পুনরায় ফিরে যান এবং আবার দশ ওয়াক্ত কম করিয়ে আনেন। অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত থেকে যায়।

আন-নিসা 4:27

২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর: কুরআন ঘোষণা করে- হে মুমিনগণ! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হালাল ও হারাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে চান, যেমন এ সূরায় এবং অন্যান্য সূরাসমূহে তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রশংসনীয় পথে চালাতে চান, যেন তোমরা তাঁর শরীয়তের উপর আমল করতে থাক যে কাজ তাঁর নিকট প্রিয় ও যে কাজে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান। যে পাপ ও অন্যায়কার্য হতে তোমরা তাওবা করে থাক সে তাওবা তিনি সতুর কবুল করে থাকেন। তিনি মহাজ্ঞানী ও মহা বিজ্ঞানময়। স্বীয় শরীয়তে, স্বীয় অনুমানে, স্বীয় কার্যে ও স্বীয় ঘঘাষণায় তিনি সঠিক জ্ঞান ও পর্ণ নিপুণতার অধিকারী। প্রবত্তি পূজারীরা অর্থাৎ শয়তানের দাস ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা এবং অসৎ লোকেরা তোমাদের পদস্খলন ঘটিয়ে তোমাদেরকে সত্য ও সরল পথ হতে সরিয়ে দিয়ে অন্যায় ও অসত্যের পথে চালাতে চায়। আল্লাহ তা'আলা শরীয়তের আহকাম নির্ধাণের ব্যাপারে তোমাদের পথ সহজ করতে চান এবং এর উপর ভিত্তি করেই কতগুলো শর্ত আরোপ করতঃ দাসীদেরকে বিয়ে করে নেয়া তোমাদের জন্যে বৈধ করেছেন। মানুষ জন্মগত দুর্বল বলে মহান আল্লাহ স্বীয় আহকামের মধ্যে কোন কাঠিন্য রাখেননি। মানুষ সৃষ্টিগতই দুর্বল বলে তার আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তি দুর্বল। তারা স্ত্রীদের ব্যাপারে দুর্বল। তারা এখানে এসে একেবারে বোকা বনে যায়।তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মিরাজের রাত্রে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ হতে ফিরে আসেন এবং হযরত মূসা কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তখন তিনি রাসূল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার উপর কি ফরয করা হয়েছে?' তিনি বলেনঃ “প্রত্যহ দিন রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায। তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ 'আপনি ফিরে যান এবং মহান আল্লাহর নিকট লঘুকরণের জন্যে প্রার্থনা করুন। আপনার উম্মতের মধ্যে এটা পালনের শক্তি নেই। আপনার পূর্ববর্তী লোকদেরকে আমি পরীক্ষা করেছি। তারা এর চেয়ে বহু কমেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আর আপনার উম্মত তো কর্ণের, চক্ষুর এবং অন্তরের দুর্বলতায় তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে।'অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে যান এবং দশ ওয়াক্ত কমিয়ে আনেন। পুনরায় হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে একই আলোচনা হয়। তিনি পুনরায় ফিরে যান এবং আবার দশ ওয়াক্ত কম করিয়ে আনেন। অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত থেকে যায়।

আন-নিসা 4:28

২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর: কুরআন ঘোষণা করে- হে মুমিনগণ! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হালাল ও হারাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে চান, যেমন এ সূরায় এবং অন্যান্য সূরাসমূহে তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রশংসনীয় পথে চালাতে চান, যেন তোমরা তাঁর শরীয়তের উপর আমল করতে থাক যে কাজ তাঁর নিকট প্রিয় ও যে কাজে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান। যে পাপ ও অন্যায়কার্য হতে তোমরা তাওবা করে থাক সে তাওবা তিনি সতুর কবুল করে থাকেন। তিনি মহাজ্ঞানী ও মহা বিজ্ঞানময়। স্বীয় শরীয়তে, স্বীয় অনুমানে, স্বীয় কার্যে ও স্বীয় ঘঘাষণায় তিনি সঠিক জ্ঞান ও পর্ণ নিপুণতার অধিকারী। প্রবত্তি পূজারীরা অর্থাৎ শয়তানের দাস ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা এবং অসৎ লোকেরা তোমাদের পদস্খলন ঘটিয়ে তোমাদেরকে সত্য ও সরল পথ হতে সরিয়ে দিয়ে অন্যায় ও অসত্যের পথে চালাতে চায়। আল্লাহ তা'আলা শরীয়তের আহকাম নির্ধাণের ব্যাপারে তোমাদের পথ সহজ করতে চান এবং এর উপর ভিত্তি করেই কতগুলো শর্ত আরোপ করতঃ দাসীদেরকে বিয়ে করে নেয়া তোমাদের জন্যে বৈধ করেছেন। মানুষ জন্মগত দুর্বল বলে মহান আল্লাহ স্বীয় আহকামের মধ্যে কোন কাঠিন্য রাখেননি। মানুষ সৃষ্টিগতই দুর্বল বলে তার আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তি দুর্বল। তারা স্ত্রীদের ব্যাপারে দুর্বল। তারা এখানে এসে একেবারে বোকা বনে যায়।তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মিরাজের রাত্রে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ হতে ফিরে আসেন এবং হযরত মূসা কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তখন তিনি রাসূল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার উপর কি ফরয করা হয়েছে?' তিনি বলেনঃ “প্রত্যহ দিন রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায। তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ 'আপনি ফিরে যান এবং মহান আল্লাহর নিকট লঘুকরণের জন্যে প্রার্থনা করুন। আপনার উম্মতের মধ্যে এটা পালনের শক্তি নেই। আপনার পূর্ববর্তী লোকদেরকে আমি পরীক্ষা করেছি। তারা এর চেয়ে বহু কমেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আর আপনার উম্মত তো কর্ণের, চক্ষুর এবং অন্তরের দুর্বলতায় তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে।'অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে যান এবং দশ ওয়াক্ত কমিয়ে আনেন। পুনরায় হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে একই আলোচনা হয়। তিনি পুনরায় ফিরে যান এবং আবার দশ ওয়াক্ত কম করিয়ে আনেন। অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত থেকে যায়।

আন-নিসা 4:29

২৯-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তার ঈমানদার বান্দাদেরকে একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে নিষেধ করছেন। সে উপার্জনের দ্বারাই হোক যা শরীয়তে হারাম, যেমন-সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা বা এরকমই প্রত্যেক প্রকারের কৌশলের দ্বারাই হোক, যদিও এটাকে শরীয়তে বৈধ রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহ তাআলা খুব ভালই জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হচ্ছে, একটি লোক কাপড় ক্রয় করছে এবং বলছে, আমার যদি পছন্দ হয় তবে রেখে দেব, নচেৎ কাপড় এবং একটি দিরহাম ফিরিয়ে দেব'। এর হুকুম কি? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ তাকে অন্যায়ভাবে মাল ভক্ষণকারীর অন্তর্ভুক্ত করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘মুহাকাম’ অর্থাৎ রহিত নয়। এটা কিয়ামত পর্যন্ত রহিত হতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন মুসলমানগণ একে অপরের মাল ভক্ষণ করা পরিত্যাগ করেন। যার ফলে (আরবী) (৪৮:১৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তিজারাতান শব্দটিকে তিজারাতুনও পড়া হয়েছে। এটি (আরবী) যেমন বলা হচ্ছে-‘অবৈধতাযুক্ত কারণসমূহ দ্বারা মাল জমা করো না। কিন্তু শরীয়তের পন্থায় ব্যবসা দ্বারা লাভ করা বৈধ, যা ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতিক্রমে হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে-‘কোন নিস্পাপ প্রাণকে মেরো না। তবে হকের সঙ্গে হলে জায়েয আছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে-‘তথায় তারা প্রথম মৃত্যু ছাড়া আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করে বলেন, সম্মতি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয় না। কেননা, এটাই হচ্ছে সম্মতির পূর্ণ সনদ। শুধুমাত্র আদান-প্রদান কখনও সম্মতির উপর দলীল হতে পারে না।' জমহুর এর বিপরীত মতপোষণ করেন। অন্যান্য তিনজন ইমামের উক্তি এই যে, মৌখিক কথা বার্তা যেমন সম্মতির প্রমাণ, দ্রুপ আদান-প্রদানও সম্মতির দলীল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, কম মূল্যবান সাধারণ জিনিসে শুধু লেন-দেনই যথেষ্ট এবং এরকমই ব্যবসার সে নিয়ম থাকে। সহীহ মাযহাবে তো সতর্কতামূলক দৃষ্টিতে কথা বার্তায় স্বীকৃতি থাকা অন্য কথা। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ক্রয়-বিক্রয় হোক বা দান হোক, সব কিছুর মধ্যেই এ হুকুম রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর (রঃ)-এর একটি মার’ হাদীসে রয়েছেঃ ব্যবসা হচ্ছে সম্মতি এবং ব্যবসার পরেই ইখতিয়ার রয়েছে। কোন মুসলমানের অন্য মুসলমানকে প্রতারিত করা বৈধ নয়।' এ হাদীসটি ‘মুরসাল'। মজলিসের শেষ পর্যন্তও পূর্ণ সম্মতির অধিকার রয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই পৃথক না হওয়া পর্যন্ত ইখতিয়ার রয়েছে। এ হাদীস অনুসারেই ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তার সহচরদের ফতওয়া রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহুরেরও ফতওয়া এর উপরে ভিত্তি করেই। এ পূর্ণ সম্মতির মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের তিন দিন পরে ইখতিয়ার দেয়াও জড়িত রয়েছে যদিও সে ইখতিয়ার পূর্ণ এক বছরের জন্যেও হয়, যেমন গ্রামবাসী প্রভৃতি লোকদের মধ্যে রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই, যদিও তাঁর মতে শুধুমাত্র আদান-প্রদান দ্বারাই ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয়ে থাকে। শাফিঈ মাযহাবেরও একটা উক্তি এটাই এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, মানুষ ব্যবসায়ের জন্যে যে অল্প মূল্যের সাধারণ জিনিস রেখে থাকে তাতে শুধুমাত্র আদান-প্রদানই যথেষ্ট হবে। আসহাবের কারও কারও ইখতিয়ার এটাই, যেমন মুত্তাফাকুন আলাইহি।এরপর বলা হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলার হারাম কাজগুলো করে অবাধ্য হয়ে, আর অন্যায়ভাবে একে অপরের মাল ভক্ষণ করে তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু। তাঁর প্রত্যেক আদেশ ও নিষেধ দয়ায় পরিপূর্ণ।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আমর ইবনে আল আস (রাঃ)-কে ‘যাতুস্সালাসিলের’ যুদ্ধের বছরে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি বলেন, একদা কঠিন শীতের রাত্রে আমার স্বপ্নদোষ হয়, এমনকি গোসল করাতে আমি আমার জীবনের উপর ভয় করি। সুতরাং আমি তায়াম্মুম করে নিয়ে আমার জামাআতকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেই। অতঃপর ফিরে এসে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। তাঁর নিকট আমি আমার এ ঘটনাটি বর্ণনা করি।তিনি বলেনঃ তুমি কি তাহলে অপবিত্র অবস্থায় তোমার সঙ্গীদেরকে নামায পড়িয়েছ?' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কঠিন ঠাণ্ডা ছিল এবং আমার প্রাণের ভয় ছিল। অতঃপর আমার মনে পড়ে গেল যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন এবং আমাকে কিছুই বলেননি।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, লোকেরাই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেছিলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করায় হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) এ ওর পেশ করেছিলেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি জেনে-শুনে জীবন দেয়ার উদ্দেশ্যে বিষপান করবে, সে সদা-সর্বদার জন্যে জাহান্নামে বিষপান করতে থাকবে।'আর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ ‘যে নিজেকে যে জিনিস দ্বারা হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে জিনিস দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণায় রয়েছেঃ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে একটি লোক আহত হয়। সে ছুরি দিয়ে স্বীয় হাত কেটে দেয়। রক্ত বন্ধ হয় না এবং তাতেই সে মারা যায়। তখন আল্লাহ পাক বলেন-“আমার বান্দা নিজেকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করেছে, সুতরাং আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।'এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন-“যে কেউ অত্যাচার ও সীমা অতিক্রম করে একাজ করবে, অর্থাৎ হারাম জেনেও স্বীয় বীরত্বপণা দেখিয়ে ঐ কাজ করবে, সে জাহান্নামী হবে। সুতরাং প্রত্যেকেরই এ কঠিন ভীতি প্রদর্শন ব্যাপারে ভয় করা উচিত। অন্তরের পর্দা খুলে আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশ শ্রবণ করতঃ হারাম কাজ হতে (মানুষের) বিরত থাকা উচিত।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যদি বড় বড় পাপ হতে বেঁচে থাক তবে আমি তোমাদের ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো।'হযরত আনাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমরা ওর মত কিছুই দেখিনি যা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আমাদের নিকট পৌছেছে, অতঃপর আমরা তাঁর জন্যে আমাদের পরিবার ও সম্পদ হতে পৃথক হবো না যে, তিনি আমাদের বড় বড় পাপগুলো ছাড়া ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন'। এরপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীসও রয়েছে। আমরা কিছু কিছু এখানে বর্ণনা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ ‘জুমআর দিন কি, তা তুমি জান কি'? আমি উত্তরে বলি, ওটা ঐদিন যে দিনে আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি জমা করেন।তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা শুন। যে ব্যক্তি এ দিন ভালভাবে পবিত্রতা লাভ করতঃ জুম'আর নামাযের জন্যে আগমন করে এবং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরবতা অবলম্বন করে, তার সে কাজ পরবর্তী জুম'আ পর্যন্ত সমস্ত পাপ মোচনের কারণ হয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে হত্যা কাজ হতে বেঁচে থাকে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত সাঈদ (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণ দান কালে বলেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! এ কথা তিনি তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি মাথা নীচু করেন। আমরা সকলেই নীচু করি এবং জনগণ কাঁদতে আরম্ভ করে। আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন্ জিনিসের উপরই বা শপথ করলেন এবং নীরবতাই বা অবলম্বন করলেন কেন? অল্পক্ষণ পরে তিনি মস্তক উত্তোলন করেন এবং তাঁর চেহারা প্রফুল্ল ছিল, যা দেখে আমরা এত খুশী হই যে, আমরা লাল রঙ্গের উট পেলেও এত খুশী হতাম না। তখন তিনি বলতে আরম্ভ করেনঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, যাকাত আদায় করে এবং সাতটি কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, তার জন্যে জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে রাখা হবে এবং তাকে বলা হবে-‘নিরাপত্তার সাথে তথায় চলে যাও।'তাতে যে সাতটি পাপের উল্লেখ আছে তার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে নিম্নরূপ এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ধ্বংসকারী সাতটি পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাক।' জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐপাপগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা। (২) যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ তাকে হত্যা করা, তবে শরীয়তের কোন কারণে যদি তার রক্ত হালাল হয় সেটা অন্য কথা। (৩) যাদু করা। (৪) সুদ ভক্ষণ করা। (৫) পৃতিহীনের মাল ভক্ষণ করা। (৬) কাফিরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা। (৭) সতীসাধ্বী পবিত্র মুসলমান নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। একটি বর্ণনায় যাদুর পরিবর্তে ‘হিজরত করার পর পুনরায় ফিরে এসে স্বদেশে অবস্থান’ এ উক্তিটি রয়েছে। এটা অবশ্যই স্মরণযোগ্য কথা যে, উল্লিখিত সাতটি পাপকে কাবীরা বলার ভাবার্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র এগুলোই কাবীরা.. গুনাহ, যেমন কারও কারও এ ধারণা রয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই ভুল কথা, বিশেষ করে ঐ সময়, যখন ওর বিপরীত দলীল বিদ্যমান থাকে। আর এখানেতো পরিষ্কার ভাষায় অন্যান্য কাবীরা গুনাহগুলোরও বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নলিখিত হাদীসগুলো দ্রষ্টব্যঃমুসতাদরিক-ই-হাকিমে রয়েছে যে, বিদায় হজ্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, নামাযীরা হচ্ছে আল্লাহর বন্ধু, যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, ফরয জেনে এবং পুণ্য লাভের নিয়ত করে খুশী মনে যাকাত আদায় করে, আর ঐ সমুদয় কাবীরা গুনাহ হতে বিরত থাকে যেগুলো হতে আল্লাহ্ দূরে থাকতে বলেছেন।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘শিরুক, হত্যা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ, পবিত্র নারীদেরকে অপবাদ দেয়া, পিতা- মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মরণের কিবলাহ্ বায়তুল্লাহ শরীফের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা। জেনে রেখো যে ব্যক্তি মৃত্যু পর্যন্ত এ বড় বড় পাপগুলো হতে দূরে সরে থাকবে এবং নামায ও যাকাত নিয়মিতভাবে আদায় করবে, সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে জান্নাতে সোনার অট্টালিকায় অবস্থান করবে।হযরত তায়লাস ইবনে মাইয়াস (রঃ) বলেন, আমি কয়েকটি পাপকার্য করে বসি যা আমার মতে কারীরা গুনাহই ছিল। আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বলি যে, আমি কয়েকটি পাপকার্য। করেছি যেগুলোকে কাবীরা গুনাহ বলেই মনে করি। তিনি বলেন, ঐগুলো কি? আমি বলি যে, আমি এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, এগুলো কাবীরা। গুনাহ্ নয়। আমি বলি যে, আমি আরও এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, ‘এগুলোও কাবীরা গুনাহ নয়।' এসো, আমি তোমাকে কাবীরা গুনাহগুলো গণনা করে শুনিয়ে দেই। ঐগুলো হচ্ছে নয়টি। (১) আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা। (২) কাউকে বিনা কারণে হত্যা করা। (৩) যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা। (৪) পবিত্রা নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। (৫) সুদ ভক্ষণ করা। (৬) অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা। (৭) মসজিদ-ই-হারামে ধর্মদ্রোহীতা ছড়িয়ে দেয়া। (৮) যাদুকে বৈধ মনে করা। (৯) বিনা কারণে পিতা-মাতাকে কাঁদানো। হযরত তায়লাস (রঃ) বলেন, এটা বর্ণনা করার পরেও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, আমার ভয় তখনও কমেনি। কাজেই তিনি বলেন, তোমার কি জাহান্নামে প্রবেশের ভয় এবং জান্নাতে প্রবেশের আকাক্ষখা আছে? আমি বলি, হ্যাঁ! তিনি বলেন, “আচ্ছা, তোমার পিতা-মাতা বেঁচে আছেন কি? আমি বলি, শুধু মা বেঁচে আছেন। তিনি তখন বলেন, “আচ্ছা, তুমি তাকে নরম কথা বল, আহার করাতে থাক এবং এসব কাবারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাক, তাহলেই তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত তায়তাসা ইবনে আলী হিন্দী (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে আরাফা প্রান্তরে আরাফার দিনে ‘পীলু' বৃক্ষের নীচে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) স্বীয় মস্তক ও চেহারার উপর পানি ঢালছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) অপবাদ দেয়ার কথা উল্লেখ করেন, তখন আমি বলি, এটাও কি হত্যার মতই খুব বড় পাপ? তিনি বলেনঃ হ্যা, হ্যাঁ। ওর মধ্যে পাপসমূহের বর্ণনায় যাদুরও উল্লেখ রয়েছে।আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তার সাথে আমার সাক্ষাৎ সন্ধ্যার সময় হয়েছিল এবং আমি তাঁকে কাবীরা গুনাহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, কাবীরা গুনাহ সাতটি।' আমি জিজ্ঞেস করি, কি কি? তিনি বলেনঃ ‘শিরক ও অপবাদ। আমি বলি, এ দু’টোও কি রক্তের মতই অন্যায়? তিনি বলেনঃ “হাঁ, হাঁ। আর কোন মুমিনকে বিনা কারণে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মৃত্যুর কিবলাহ বায়তুল্লাহ শরীফে ধর্মদ্রোহীতার কাজ করা।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর যে বান্দা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করে না, নামায সু-প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে এবং কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, সে জান্নাতী।' একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা, মুমিন প্রাণকে হত্যা করা এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা।ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়ামানবাসীর নিকট একটি পত্র লিখিয়ে পাঠিয়ে দেন। যাতে ফরযসমূহ, সুন্নাতসমূহ এবং দিয়্যাত অর্থাৎ জরিমানার নির্দেশসমূহ লিখিত ছিল এবং এ পত্রখানা তিনি হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-এর হাতে তাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। এ পত্রে নিম্নলিখিত কথাটিও ছিলঃ “কিয়ামতের দিন বড় বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ হবে এই যে, মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করে, কোন মুমিন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করে, মা-বাপের অবাধ্য হয়, স্ত্রীলোকেরা যে পাপ করেনি তাদের প্রতি এরূপ পাপের অপবাদ দেয়, যাদু শিক্ষা করে, সুদ খায় এবং ইয়াতিমের মাল ধ্বংস করে। অন্য বর্ণনায় কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কথাও রয়েছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, কাবীরা গুনাহগুলো বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথার উল্লেখ করেন তখন তিনি সোজা হয়ে বসে পড়েন এবং বলেনঃ “সাবধান! তোমরা মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথা হতে দূরে থাকবে। তিনি একথা বার বার বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবীগণ বলেন, যদি তিনি নীরব হতেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় গুনাহ কোন্টি? তিনি বলেনঃ ‘তা এই যে, তুমি অন্য কাউকে আল্লাহর অংশীদার কর, অথচ একমাত্র তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করি, তার পরে কোটি ? তিনি বলেনঃ তার পরে এই যে, তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার করবে এ ভয়ে তুমি তাকে হত্যা করে ফেল। আমি জিজ্ঞেস করি, তারপর কোন্টি? তিনি বলেনঃ তারপরে এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২৫:৬৮) হতে। (আরবী) (২৫:৭০) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন।মুসনাদ-ই-ইবনে হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) মসজিদ-ই-হারামে হাতীমের মধ্যে বসে ছিলেন। তাঁকে এক ব্যক্তি মদ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ আমার মত বুড়ো বয়সের মানুষ কি এ স্থানে বসে আল্লাহর রাসূলের (সঃ) উপর মিথ্যা কথা বলতে পারে? অতঃপর তিনি বলেন, 'মদ্য পান হচ্ছে বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ। এ কাজ হচ্ছে সমস্ত দুশ্চরিত্রতার মূল। মদখোর ব্যক্তি নাম পরিত্যাগকারী হয়ে থাকে। সে স্বীয় মা, খালা এবং ফুফুর সাথে ব্যভিচার করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এ হাদীসটি গারীব। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য আরও বহু সাহাবা-ই-কিরাম একবার একটি মজলিসে বসেছিলেন। তথায়। কাবীরা গুনাহগুলোর আলোচনা চলছিল যে, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? কারও নিকট সর্বশেষ উত্তর ছিল না। তখন তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে পাঠান যে, তিনি যেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসেন। তিনি তাঁর নিকট গমন করেন। তিনি উত্তরে বলেন যে, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে মদ্যপান। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি ফিরে এসে উক্ত মজলিসে এ উত্তর শুনিয়ে দেই। কিন্তু মজলিসের লোক। সান্ত্বনা লাভ করলেন না। সুতরাং তারা সবাই উঠে গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-এর বাড়ী গমন করেন এবং তারা নিজেরাই তাঁকে জিজ্ঞেস করেন।তখন তিনি বর্ণনা করেনঃ জনগণ নবী (সঃ)-এর সামনে একটি ঘটনা বর্ণনা করে যে, বানী ইসরাঈলের বাদশাহদের মধ্যে একজন বাদশাহ্ একটি লোককে গ্রেফতার করে। অতঃপর লোকটিকে বলে, হয় তুমি জীবনের আশা ত্যাগ কর না হয় এ কাজগুলোর মধ্যে কোন একটি কর, অর্থাৎ মদ্যপান কর বা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা কর কিংবা শূকরের মাংস ভক্ষণ কর। লোকটি কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনার পর হাল্কা জিনিস মনে করে মদ্যপান করতে সম্মত হয়। কিন্তু মদ্যপান করা মাত্রই সে নেশার অবস্থায় ঐ সমুদয় কাজও করে বসে যা হতে সে পূর্বে বিরত ছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ঘটনাটি শুনে আমাদেরকে বলেনঃ “যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, আল্লাহ তা'আলা চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। আর যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যস্ত অবস্থাতেই মারা যায় এবং তার মূত্রস্থলীতে সামান্য পরিমাণও মদ্য থেকে যায়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং যদি মদ্যপান করার পর চল্লিশ দিনের মধ্যেই মারা যায় তবে তার অজ্ঞতা যুগের মৃত্যু হয়ে থাকে। এ হাদীসটি দুর্বল। অন্য একটি হাদীসে মিথ্যা শপথকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবীরা গুনাহ বলে গণ্য করেছেন। (সহীহ বুখারী ইত্যাদি)মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে মিথ্যা শপথের পর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে কোন কথা বলে এবং তাতে মশার সমানও বাড়িয়ে কিছু বলে, তার অন্তরে একটা কাল দাগ হয়ে যায়, যা কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থেকে যায়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়াও কাবীরা গুনাহ। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষ তার পিতা-মাতাকে কিরূপে গালি দেবে?' তিনি বলেনঃ ‘এভাবে যে, সে অন্যের বাপকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার বাপকে গালি দেয়, সে অন্যের মাকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার মাকে গালি দেয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সবচেয়ে বড় কাবীরা গুনাহ এই যে, মানুষ তার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে?' তিনি বলেনঃ ‘অন্যের মা-বাপকে বলে নিজের মা-বাপকে বলিয়ে নেয়া। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমানকে গালি প্রদান মানুষকে ফাসিক বানিয়ে দেয় এবং তাকে হত্যা করা হচ্ছে কুফরী।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে কোন মুসলমানের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা এবং একটা গালির পরিবর্তে দু'টো গালি দেয়া। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি বিনা ওযরে দু’টি নামাযকে একত্রিত করে, সে কাবীরা গুনাহসমূহের দু'টি দরজার একটি দরজার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু কাতাদাতুল আদাভী হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর যে পত্র আমাদের সামনে পাঠ করা হয় তাতে এও ছিল যে, বিনা ওযরে দু’ নামাযকে একত্রিত করা কাবীরা গুনাহ এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করাও কাবীরা গুনাহ। মোটকথা, যোহর, আসর কিংবা মাগরিব ও ইশা সময়ের পূর্বে বা পরে শরীয়তের অবকাশ ছাড়া একত্রিত করে পড়া কাবীরা গুনাহ। তাহলে যারা মোটেই (নামায) পড়ে না তাদের পাপের তো কোন ঠিক ঠিকানাই নেই। যেমন, সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা ও শিরকের মধ্যেস্থলে রয়েছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদেরও কাফিরদের মধ্যে পৃথককারী জিনিস হচ্ছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। যে ব্যক্তি নামাযকে ছেড়ে দিল সে কুফরী করলো। অন্য একটি বর্ণনায় তাঁর এ উক্তিটিও নকল করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল তার কার্যাবলী বিনষ্ট হয়ে গেল। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তির আসরের নামায ছুটে গেল তার যেন মাল ও পরিবার পরিজন ধ্বংস হয়ে গেল।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহ কি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর মকর হতে (মকর শব্দটি আল্লাহর ব্যাপারে ফন্দির প্রতিশোধ নেয়া বুঝায়) নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ।'হযরত বাযযার (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, আল্লাহর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ।' কিন্তু এর ইসনাদে সমালোচনা রয়েছে। সবচেয়ে সঠিক কথা এই যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, সর্বাপেক্ষা বড় পাপ হচ্ছে মহা সম্মানিত আল্লাহ তাআলার প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা।' এ বর্ণনাটি অত্যন্ত দুর্বল। ইতিপূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যার মধ্যে হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে বসতি স্থাপন করাকেও কাবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। এ হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে। সাতটি কাবীরা গুনাহর মধ্যে একটি এটিকে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তার বিষয় রয়েছে এবং একে মারফু বলা সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক কথা এটাই যা তাফসীরে ইবনে জারীরের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। তাতে তিনি বলেন, হে জনগণ! কবীরা গুনাহ সাতটি।' একথা শুনে লোকগুলো চীৎকার করে উঠে। তিনি তিনবার ওরই পুনরাবৃত্তি করেন।অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা আমাঁকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করছো না কেন? জনগণ তখন বলে, “হে আমীরুল মুমিনীন! বলুন, ওগুলো কি?' তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, যে প্রাণ বধ করা আল্লাহ হারাম করেছেন তা বধ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, যুদ্ধের দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা এবং হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে এসে বসতি স্থাপন করা।' হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত সাহল (রঃ) তাঁর পিতা হযরত সাহল ইবনে খাইসুমার (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘এটাকে কিভাবে কাবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, হে প্রিয় বৎস! একটি লোক হিজরত করে মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হলো, গনীমতের মালে তার অংশ নির্ধারিত হলো, মুজাহিদদের নামের তালিকায় তার নাম এসে গেছে। অতঃপর সে সমস্ত জিনিস পরিত্যাগ করতঃ বেদুঈন হয়ে গিয়ে কাফিরদের দেশে ফিরে গেল এবং যেমন ছিল তেমনই হলো, এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কি হতে পারে?মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের খুৎবায় বলেনঃ সাবধান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, অন্যায় হত্যা হতে বেঁচে থাক, তবে শরীয়তের অনুমতি অন্য জিনিস, ব্যভিচার করো না এবং চুরি করো না।' ঐ হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, অসিয়তের ব্যাপারে কারও ক্ষতি সাধন করাও একটি কাবীরা গুনাহ। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা সাহাবায়ে কেরাম কবীরা গুনাহসমূহের উল্লেখ করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, ধর্মযুদ্ধ থেকে পলায়ন করা, পাক পবিত্র রমণীদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা বলা, ধোকা দেয়া, খিয়ানত করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া এগুলো সব কাবীরা গুনাহ। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আর ঐ গুনাহকে কোথায় রাখছে যে, লোকেরা আল্লাহর ওয়াদা এবং নিজেদের কসমকে অল্প মূল্যে বিক্রি করে ফিরছে। আয়াতের শেষ পর্যন্ত তিনি তেলাওয়াত করেন। এর ইসনাদ স্পষ্ট এবং হাদীসটি হাসান।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, মিসরে কতগুলো লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে আমরা কতগুলো জিনিস এমন পাচ্ছি যেগুলোর উপর আমাদের আমল নেই। তাই, আমরা এ সম্বন্ধে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে চাই।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে মদীনায় আগমন করেন। তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হযরত উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, কবে এসেছে? তিনি উত্তরে বলেন, এতদিন হলো।' পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, অনুমতিক্রমে এসেছো কি? তারও উত্তর তিনি দেন। অতঃপর তিনি জনগণের কথা উল্লেখ করেন।হযরত উমার (রাঃ) বলেন, তাদেরকে একত্রিত কর।' এরপর তিনি তাদের নিকট আগমন করেন এবং তাদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাকে আল্লাহ ও ইসলামের সত্যতার শপথ! তুমি কি সম্পূর্ণ কুরআন কারীম পাঠ করেছো?' লোকটি বলেন, হ্যা।' তিনি বলেন, “তুমি কি ওকে তোমার অন্তরে রক্ষিতও রেখেছো ?' তিনি বলেন , না।' তিনি যদি ‘হ্যা’ বলতেন তবে হযরত উমার (রাঃ) তাকে দলীল প্রমাণাদি দ্বারা অপারগ করে দিতেন।এরপর তিনি বলেন, “তুমি ওকে স্বীয় চক্ষে, স্বীয় জিহবায় এবং স্বীয় চালচলনেও রক্ষিত রেখেছো কি?' তিনি বলেনঃ না। অতঃপর তিনি এক এক করে সবাইকেই এ প্রশ্নই করেন। তারপর তিনি বলেন, “তোমরা উমার (রাঃ)-কে এ কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চাচ্ছ যে, তিনি যেন জনগণকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সোজা করে দেন। আমার দোষত্রুটির কথা আমার এ পূর্ব হতেই জানতেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অর্থাৎ যদি তোমরা সেই মহাপাপসমূহ হতে বিরত হও যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলেই আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবো। এরপর তিনি বলেন, মদীনাবাসী তোমাদের আগমনের কারণ জানে কি? তাঁরা বলেন, 'না।' তিনি বলেন, তারাও যদি এটা জানতো তবে এ সম্বন্ধে আমার তাদেরকেও উপদেশ দিতে হতো। এর ইসনাদও হাসান এবং পঠনও হাসান। যদিও হযরত উমার (রাঃ) হতে হাসানের এ বর্ণনাটির মধ্যে ইনকিতা রয়েছে তথাপি এ ত্রুটি পূরণের পক্ষে এর পূর্ণ প্রসিদ্ধিই যথেষ্ট।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, কাউকে হত্যা করা, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদেরকে অপবাদ দেয়া, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থান করা, যাদু করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, সুদ খাওয়া, জামাআত হতে পৃথক হওয়া এবং ক্রয়-বিক্রয় ভেঙ্গে দেয়া। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর প্রশস্ততা ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং তার মকর হতে নির্ভয় থাকা।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে। যে, সূরা-ই-নিসার প্রথম তির্মটি আয়াতে কাবীরা গুনাহর বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, বাপ-মাকে অসন্তুষ্ট করা, পরিতৃপ্তির পর অতিরক্তি পানি প্রয়োজন বোধকারীদেরকে না দেয়া এবং নিজের নরপশুকে কারও মাদী পশুর জন্যে কিছু নেয়া ছাড়া না দেয়া।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকিয়ে রাখা যাবে না এবং অতিরিক্ত ঘাস হতেও বাধা দেয়া যাবে না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের পাপীদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অতিরিক্ত পানি ও অতিরিক্ত ঘাসকে আটকিয়ে রাখে, কিয়ামতের দিন আলাহ তা'আলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ দু'টি যা নারীদের নিকট বায়আত নেয়ার বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে, অর্থাৎ (আরবী) (৬০:১২) -এ আয়াতটির মধ্যে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এ আয়াতটিকে আল্লাহ তাআলার বিরাট ইহসানের মধ্যে বর্ণনা করেন এবং এর উপর বড় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আয়াতটিকে।একবার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে জনগণ বলেন, কাবীরা গুনাহ হচ্ছে সাতটি।' তিনি বলেন, কোন কোন সময় সাতটি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেন, 'কমপক্ষে সাতটি নচেৎ সত্তরটি।' অন্য একটি লোকের কথায় তিনি বলেনঃ “ওটা হচ্ছে সাতশ পর্যন্ত এবং সাতশ হচ্ছে খুবই নিকটে। হ্যা, তবে জেনে রেখো যে, ক্ষমা প্রার্থনার পর কাবীরা আর কাবীরা থাকে না। আর সদা-সর্বদা করতে থাকলে সাগীরাও আর সাগীরা থাকে না।'অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, “যে পাপের উপর জাহান্নামের, আল্লাহর ক্রোধের, অভিসম্পাতের এবং শাস্তির ভীতি প্রদর্শন রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যা হতে আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেন সেটাই কাবীরা। যে কার্যে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ পায় ওটাই বড় পাপ। এখন তাবেঈগণের উক্তি আলোচনা করা যাচ্ছেঃ হযরত উবাইদাহ (রঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্রে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, সচ্চরিত্রা মেয়েদের (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়া ও হিজরতের পর স্বদেশ প্রিয়তা।' হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আউন (রঃ) স্বীয় শিক্ষক মুহাম্মাদ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘যাদু কাবীরা গুনাহ নয় কি?' তিনি বলেন, এটা অপবাদের মধ্যে এসে গেল। এ শব্দটির মধ্যে বহু জঘন্যতা জড়িত রয়েছে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) কাবীরা গুনাহের উপর কুরআন কারীমের আয়াত পড়েও শুনিয়ে দেন। শিরকের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলো সে যেন আকাশ হতে পড়ে গেল অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে দূরে কোন অজানা জঘন্য স্থানে নিক্ষেপ করবে।' (২২:৩১) ইয়াতীমের মাল নষ্ট করার উপর আয়াত পেশ করেন (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করে, নিশ্চয়ই তারা তাদের পেটের মধ্যে আগুন ভক্ষণ করে।' (৪:১০) সুদ খাওয়ার উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা কিয়ামতের দিন জ্ঞানশূন্য ও পাগলের মত হয়ে উঠবে।' (২:২৭৫) অপবাদের উপর পড়েন- (আরবী) অর্থাৎ যারা পবিত্রা, উদাসীনা, মুমিনা নারীদেরকে অপবাদ দেয়। (২৪:২৩) যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারীদের উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কাফিরদের মোকাবিলায় দণ্ডায়মান হও, তখন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না।' (৮:১৫) হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থানের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুপথ প্রাপ্তির পর ধর্মত্যাগী হয়।' (৪৭:২৫) কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, যার মধ্যে সে চির অবস্থান করবে।' (৪:৯৩)। হযরত আতা’ (রঃ) হতেও কাবীরা গুনাহ্র বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে এবং তাতে মিথ্যা সাক্ষ্যের কথাও রয়েছে। হযরত মুগীরা (রঃ) বলেন, 'হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে মন্দ বলাও কাবীরা গুনাহই।' আমি বলি যে, আলেমদের একটি দল ঐ লোকদেরকে কাফির বলেছেন যারা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে মন্দ বলে থাকে। হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতে এটা বর্ণিত আছে।হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন, আমি এটা কল্পনা করতে পারি না যে, কোন ব্যক্তির অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি ভালবাসা রয়েছে অথচ হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে।' (জামেউত্ তিরমিযী)হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তার আয়াতসমূহ ও রাসূলদের সাথে কুফরী করা, যাদু করা, সন্তানদেরকে হত্যা করা, আল্লাহ তাআলার সন্তান ও স্ত্রী সাব্যস্ত করা এবং এ ধরনের কাজ ও কথা যার পরে কোন পুণ্যের কাজ গৃহীত হয় না। হ্যাঁ, তবে যেসব পাপকার্যের পর ধর্ম অবশিষ্ট থাকতে পারে এবং আমল গৃহীত হতে পারে এরূপ পাপসমূহ আল্লাহ তাআলা পুণ্যের বিনিময়ে ক্ষমা করে থাকেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করার অঙ্গীকার করেছেন যারা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে। আর আমাদের নিকট এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাক, সোজা ও ঠিক এবং শুভ সংবাদ গ্রহণ কর।মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাকে সহীহ সনদে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহকারীদের জন্যেও আমার শাফাআত রয়েছে।' ইমাম তিরমিযীও (রঃ) একে হাসান বলেছেন। যদিও এর বর্ণনা ও সনদ দুর্বলতা শূন্য নয়, তথাপি এর যে সাক্ষীগুলো রয়েছে তাতেও সঠিক বর্ণনা রয়েছে। যেমন একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা কি মনে কর যে, আমার শাফা'আত শুধু মুত্তাকী ও মুমিনদের জন্যই? , না। বরং ঐ গুনাহগার পাপীদের জন্যেই।এখন আলেমদের উক্তি বর্ণিত হচ্ছেঃ কাবীরা গুনাহ কাকে বলে সে সম্বন্ধে কেউ কেউ বলেন যে, যার উপর শরঈ হদ্দ (শরীয়তের শাস্তি) রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কেউ বলেন যে, যার উপর কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে কোন শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কারও উক্তি এই যে, যাতে দ্বীনদারী কম হয় এবং সততা হ্রাস পায়, সেটাই হচ্ছে কাবীরা গুনাহ্। কাযী আবূ সাঈদ হারভী (রঃ) বলেন যে, যার হারাম হওয়া শব্দের দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং যার অবাধ্যতার উপর কোন হদ্দ থাকে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। যেমন হত্যা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যে কোন ফরয কাজ ছেড়ে দেয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা বর্ণনা এবং মিথ্যা শপথও কাবীরা গুনাহ্।কাযী রূইয়ানী (রঃ) বলেন যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে সাতটিঃ বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, ব্যভিচার করা, পুরুষে পুরুষে নির্লজ্জতার কাজে (লোওয়াতাত) লিপ্ত হওয়া, মদ্যপান করা, চুরি করা, জবরদখল করা এবং অপবাদ দেয়া (সতী নারীকে)। অপর বর্ণনায় অষ্টমও একটি আছে, তা হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান। আর এর সাথে নিম্নেরগুলোকে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে-সুদ খাওয়া, বিনা ওযরে রমযানের রোযা পরিত্যাগ করা, মিথ্যা শপথ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, মা-বাপের অবাধ্য হওয়া, জিহাদ হতে পলায়ন করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, বিনা ওযরে সময়ের পূর্বে নামায আদায় করা ওজনে কম বেশী করা, বিনা কারণে মুসলমাকে হত্যা করা, জেনে শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করা, তাঁর সাহাবীগণকে গালি দেয়া, বিনা কারণে সাক্ষ্য গোপন করা, ঘুষ নেয়া, পুরুষ ও স্ত্রীদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করা, বাদশাহের নিকট পরোক্ষ নিন্দে করা, যাকাত দেয়া বন্ধ করা, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ না করা, কুরআন কারীম শিক্ষা করে ভুলে যাওয়া, প্রাণীকে আগুন দ্বারা পুড়িয়ে ফেলা, বিনা ওযরে স্ত্রীর তার স্বামীর নিকটে না যাওয়া, আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হওয়া, তাঁর মকর হতে নির্ভয় হওয়া, আলেম ও কারীদের ক্ষতিসাধন করা, যিহার করা (যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ এরূপ কোন নারীর কোন অঙ্গের সঙ্গে স্ত্রীর তুলনা করাকে যিহার বলে। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বলে অর্থাৎ (আরবী) তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত), শূকরের গোশত ভক্ষণ করা এবং মৃত জিনিস খাওয়া। তবে খুবই প্রয়োজন বোধে মৃত জন্তুর গোশত খেলে সেটা অন্য কথা।ইমাম রাফেঈ (রঃ) বলেন যে, এগুলোর কয়েকটির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বড় বড় গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনীষীগণ বহু গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। আমাদের শায়েখ হাকিম আবু আবদুল্লাহ যাহরী (রঃ) একটি পুস্তক লিখেছেন, যার মধ্যে তিনি সত্তরটি কাবীরা গুনাহর সংখ্যা দিয়েছেন। এও বলা হয়েছে যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে ঐগুলো যেগুলোর উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এ প্রকারের গুনাহই যদি গণনা করা যায় তবে বহু গুনাহই বেরিয়ে যাবে। আর যদি কাবীরা গুনাহ্ ঐ (ধরনের) কাজের প্রত্যেকটিকে বলা হয় যা হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দূরে থাকতে বলেছেন তবে তো কাবীরা গুনাহ্ অসংখ্য হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন।

আন-নিসা 4:30

২৯-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তার ঈমানদার বান্দাদেরকে একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে নিষেধ করছেন। সে উপার্জনের দ্বারাই হোক যা শরীয়তে হারাম, যেমন-সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা বা এরকমই প্রত্যেক প্রকারের কৌশলের দ্বারাই হোক, যদিও এটাকে শরীয়তে বৈধ রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহ তাআলা খুব ভালই জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হচ্ছে, একটি লোক কাপড় ক্রয় করছে এবং বলছে, আমার যদি পছন্দ হয় তবে রেখে দেব, নচেৎ কাপড় এবং একটি দিরহাম ফিরিয়ে দেব'। এর হুকুম কি? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ তাকে অন্যায়ভাবে মাল ভক্ষণকারীর অন্তর্ভুক্ত করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘মুহাকাম’ অর্থাৎ রহিত নয়। এটা কিয়ামত পর্যন্ত রহিত হতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন মুসলমানগণ একে অপরের মাল ভক্ষণ করা পরিত্যাগ করেন। যার ফলে (আরবী) (৪৮:১৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তিজারাতান শব্দটিকে তিজারাতুনও পড়া হয়েছে। এটি (আরবী) যেমন বলা হচ্ছে-‘অবৈধতাযুক্ত কারণসমূহ দ্বারা মাল জমা করো না। কিন্তু শরীয়তের পন্থায় ব্যবসা দ্বারা লাভ করা বৈধ, যা ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতিক্রমে হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে-‘কোন নিস্পাপ প্রাণকে মেরো না। তবে হকের সঙ্গে হলে জায়েয আছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে-‘তথায় তারা প্রথম মৃত্যু ছাড়া আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করে বলেন, সম্মতি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয় না। কেননা, এটাই হচ্ছে সম্মতির পূর্ণ সনদ। শুধুমাত্র আদান-প্রদান কখনও সম্মতির উপর দলীল হতে পারে না।' জমহুর এর বিপরীত মতপোষণ করেন। অন্যান্য তিনজন ইমামের উক্তি এই যে, মৌখিক কথা বার্তা যেমন সম্মতির প্রমাণ, দ্রুপ আদান-প্রদানও সম্মতির দলীল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, কম মূল্যবান সাধারণ জিনিসে শুধু লেন-দেনই যথেষ্ট এবং এরকমই ব্যবসার সে নিয়ম থাকে। সহীহ মাযহাবে তো সতর্কতামূলক দৃষ্টিতে কথা বার্তায় স্বীকৃতি থাকা অন্য কথা। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ক্রয়-বিক্রয় হোক বা দান হোক, সব কিছুর মধ্যেই এ হুকুম রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর (রঃ)-এর একটি মার’ হাদীসে রয়েছেঃ ব্যবসা হচ্ছে সম্মতি এবং ব্যবসার পরেই ইখতিয়ার রয়েছে। কোন মুসলমানের অন্য মুসলমানকে প্রতারিত করা বৈধ নয়।' এ হাদীসটি ‘মুরসাল'। মজলিসের শেষ পর্যন্তও পূর্ণ সম্মতির অধিকার রয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই পৃথক না হওয়া পর্যন্ত ইখতিয়ার রয়েছে। এ হাদীস অনুসারেই ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তার সহচরদের ফতওয়া রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহুরেরও ফতওয়া এর উপরে ভিত্তি করেই। এ পূর্ণ সম্মতির মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের তিন দিন পরে ইখতিয়ার দেয়াও জড়িত রয়েছে যদিও সে ইখতিয়ার পূর্ণ এক বছরের জন্যেও হয়, যেমন গ্রামবাসী প্রভৃতি লোকদের মধ্যে রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই, যদিও তাঁর মতে শুধুমাত্র আদান-প্রদান দ্বারাই ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয়ে থাকে। শাফিঈ মাযহাবেরও একটা উক্তি এটাই এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, মানুষ ব্যবসায়ের জন্যে যে অল্প মূল্যের সাধারণ জিনিস রেখে থাকে তাতে শুধুমাত্র আদান-প্রদানই যথেষ্ট হবে। আসহাবের কারও কারও ইখতিয়ার এটাই, যেমন মুত্তাফাকুন আলাইহি।এরপর বলা হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলার হারাম কাজগুলো করে অবাধ্য হয়ে, আর অন্যায়ভাবে একে অপরের মাল ভক্ষণ করে তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু। তাঁর প্রত্যেক আদেশ ও নিষেধ দয়ায় পরিপূর্ণ।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আমর ইবনে আল আস (রাঃ)-কে ‘যাতুস্সালাসিলের’ যুদ্ধের বছরে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি বলেন, একদা কঠিন শীতের রাত্রে আমার স্বপ্নদোষ হয়, এমনকি গোসল করাতে আমি আমার জীবনের উপর ভয় করি। সুতরাং আমি তায়াম্মুম করে নিয়ে আমার জামাআতকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেই। অতঃপর ফিরে এসে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। তাঁর নিকট আমি আমার এ ঘটনাটি বর্ণনা করি।তিনি বলেনঃ তুমি কি তাহলে অপবিত্র অবস্থায় তোমার সঙ্গীদেরকে নামায পড়িয়েছ?' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কঠিন ঠাণ্ডা ছিল এবং আমার প্রাণের ভয় ছিল। অতঃপর আমার মনে পড়ে গেল যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন এবং আমাকে কিছুই বলেননি।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, লোকেরাই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেছিলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করায় হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) এ ওর পেশ করেছিলেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি জেনে-শুনে জীবন দেয়ার উদ্দেশ্যে বিষপান করবে, সে সদা-সর্বদার জন্যে জাহান্নামে বিষপান করতে থাকবে।'আর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ ‘যে নিজেকে যে জিনিস দ্বারা হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে জিনিস দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণায় রয়েছেঃ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে একটি লোক আহত হয়। সে ছুরি দিয়ে স্বীয় হাত কেটে দেয়। রক্ত বন্ধ হয় না এবং তাতেই সে মারা যায়। তখন আল্লাহ পাক বলেন-“আমার বান্দা নিজেকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করেছে, সুতরাং আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।'এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন-“যে কেউ অত্যাচার ও সীমা অতিক্রম করে একাজ করবে, অর্থাৎ হারাম জেনেও স্বীয় বীরত্বপণা দেখিয়ে ঐ কাজ করবে, সে জাহান্নামী হবে। সুতরাং প্রত্যেকেরই এ কঠিন ভীতি প্রদর্শন ব্যাপারে ভয় করা উচিত। অন্তরের পর্দা খুলে আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশ শ্রবণ করতঃ হারাম কাজ হতে (মানুষের) বিরত থাকা উচিত।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যদি বড় বড় পাপ হতে বেঁচে থাক তবে আমি তোমাদের ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো।'হযরত আনাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমরা ওর মত কিছুই দেখিনি যা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আমাদের নিকট পৌছেছে, অতঃপর আমরা তাঁর জন্যে আমাদের পরিবার ও সম্পদ হতে পৃথক হবো না যে, তিনি আমাদের বড় বড় পাপগুলো ছাড়া ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন'। এরপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীসও রয়েছে। আমরা কিছু কিছু এখানে বর্ণনা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ ‘জুমআর দিন কি, তা তুমি জান কি'? আমি উত্তরে বলি, ওটা ঐদিন যে দিনে আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি জমা করেন।তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা শুন। যে ব্যক্তি এ দিন ভালভাবে পবিত্রতা লাভ করতঃ জুম'আর নামাযের জন্যে আগমন করে এবং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরবতা অবলম্বন করে, তার সে কাজ পরবর্তী জুম'আ পর্যন্ত সমস্ত পাপ মোচনের কারণ হয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে হত্যা কাজ হতে বেঁচে থাকে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত সাঈদ (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণ দান কালে বলেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! এ কথা তিনি তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি মাথা নীচু করেন। আমরা সকলেই নীচু করি এবং জনগণ কাঁদতে আরম্ভ করে। আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন্ জিনিসের উপরই বা শপথ করলেন এবং নীরবতাই বা অবলম্বন করলেন কেন? অল্পক্ষণ পরে তিনি মস্তক উত্তোলন করেন এবং তাঁর চেহারা প্রফুল্ল ছিল, যা দেখে আমরা এত খুশী হই যে, আমরা লাল রঙ্গের উট পেলেও এত খুশী হতাম না। তখন তিনি বলতে আরম্ভ করেনঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, যাকাত আদায় করে এবং সাতটি কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, তার জন্যে জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে রাখা হবে এবং তাকে বলা হবে-‘নিরাপত্তার সাথে তথায় চলে যাও।'তাতে যে সাতটি পাপের উল্লেখ আছে তার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে নিম্নরূপ এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ধ্বংসকারী সাতটি পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাক।' জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐপাপগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা। (২) যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ তাকে হত্যা করা, তবে শরীয়তের কোন কারণে যদি তার রক্ত হালাল হয় সেটা অন্য কথা। (৩) যাদু করা। (৪) সুদ ভক্ষণ করা। (৫) পৃতিহীনের মাল ভক্ষণ করা। (৬) কাফিরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা। (৭) সতীসাধ্বী পবিত্র মুসলমান নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। একটি বর্ণনায় যাদুর পরিবর্তে ‘হিজরত করার পর পুনরায় ফিরে এসে স্বদেশে অবস্থান’ এ উক্তিটি রয়েছে। এটা অবশ্যই স্মরণযোগ্য কথা যে, উল্লিখিত সাতটি পাপকে কাবীরা বলার ভাবার্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র এগুলোই কাবীরা.. গুনাহ, যেমন কারও কারও এ ধারণা রয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই ভুল কথা, বিশেষ করে ঐ সময়, যখন ওর বিপরীত দলীল বিদ্যমান থাকে। আর এখানেতো পরিষ্কার ভাষায় অন্যান্য কাবীরা গুনাহগুলোরও বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নলিখিত হাদীসগুলো দ্রষ্টব্যঃমুসতাদরিক-ই-হাকিমে রয়েছে যে, বিদায় হজ্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, নামাযীরা হচ্ছে আল্লাহর বন্ধু, যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, ফরয জেনে এবং পুণ্য লাভের নিয়ত করে খুশী মনে যাকাত আদায় করে, আর ঐ সমুদয় কাবীরা গুনাহ হতে বিরত থাকে যেগুলো হতে আল্লাহ্ দূরে থাকতে বলেছেন।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘শিরুক, হত্যা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ, পবিত্র নারীদেরকে অপবাদ দেয়া, পিতা- মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মরণের কিবলাহ্ বায়তুল্লাহ শরীফের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা। জেনে রেখো যে ব্যক্তি মৃত্যু পর্যন্ত এ বড় বড় পাপগুলো হতে দূরে সরে থাকবে এবং নামায ও যাকাত নিয়মিতভাবে আদায় করবে, সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে জান্নাতে সোনার অট্টালিকায় অবস্থান করবে।হযরত তায়লাস ইবনে মাইয়াস (রঃ) বলেন, আমি কয়েকটি পাপকার্য করে বসি যা আমার মতে কারীরা গুনাহই ছিল। আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বলি যে, আমি কয়েকটি পাপকার্য। করেছি যেগুলোকে কাবীরা গুনাহ বলেই মনে করি। তিনি বলেন, ঐগুলো কি? আমি বলি যে, আমি এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, এগুলো কাবীরা। গুনাহ্ নয়। আমি বলি যে, আমি আরও এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, ‘এগুলোও কাবীরা গুনাহ নয়।' এসো, আমি তোমাকে কাবীরা গুনাহগুলো গণনা করে শুনিয়ে দেই। ঐগুলো হচ্ছে নয়টি। (১) আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা। (২) কাউকে বিনা কারণে হত্যা করা। (৩) যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা। (৪) পবিত্রা নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। (৫) সুদ ভক্ষণ করা। (৬) অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা। (৭) মসজিদ-ই-হারামে ধর্মদ্রোহীতা ছড়িয়ে দেয়া। (৮) যাদুকে বৈধ মনে করা। (৯) বিনা কারণে পিতা-মাতাকে কাঁদানো। হযরত তায়লাস (রঃ) বলেন, এটা বর্ণনা করার পরেও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, আমার ভয় তখনও কমেনি। কাজেই তিনি বলেন, তোমার কি জাহান্নামে প্রবেশের ভয় এবং জান্নাতে প্রবেশের আকাক্ষখা আছে? আমি বলি, হ্যাঁ! তিনি বলেন, “আচ্ছা, তোমার পিতা-মাতা বেঁচে আছেন কি? আমি বলি, শুধু মা বেঁচে আছেন। তিনি তখন বলেন, “আচ্ছা, তুমি তাকে নরম কথা বল, আহার করাতে থাক এবং এসব কাবারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাক, তাহলেই তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত তায়তাসা ইবনে আলী হিন্দী (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে আরাফা প্রান্তরে আরাফার দিনে ‘পীলু' বৃক্ষের নীচে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) স্বীয় মস্তক ও চেহারার উপর পানি ঢালছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) অপবাদ দেয়ার কথা উল্লেখ করেন, তখন আমি বলি, এটাও কি হত্যার মতই খুব বড় পাপ? তিনি বলেনঃ হ্যা, হ্যাঁ। ওর মধ্যে পাপসমূহের বর্ণনায় যাদুরও উল্লেখ রয়েছে।আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তার সাথে আমার সাক্ষাৎ সন্ধ্যার সময় হয়েছিল এবং আমি তাঁকে কাবীরা গুনাহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, কাবীরা গুনাহ সাতটি।' আমি জিজ্ঞেস করি, কি কি? তিনি বলেনঃ ‘শিরক ও অপবাদ। আমি বলি, এ দু’টোও কি রক্তের মতই অন্যায়? তিনি বলেনঃ “হাঁ, হাঁ। আর কোন মুমিনকে বিনা কারণে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মৃত্যুর কিবলাহ বায়তুল্লাহ শরীফে ধর্মদ্রোহীতার কাজ করা।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর যে বান্দা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করে না, নামায সু-প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে এবং কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, সে জান্নাতী।' একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা, মুমিন প্রাণকে হত্যা করা এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা।ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়ামানবাসীর নিকট একটি পত্র লিখিয়ে পাঠিয়ে দেন। যাতে ফরযসমূহ, সুন্নাতসমূহ এবং দিয়্যাত অর্থাৎ জরিমানার নির্দেশসমূহ লিখিত ছিল এবং এ পত্রখানা তিনি হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-এর হাতে তাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। এ পত্রে নিম্নলিখিত কথাটিও ছিলঃ “কিয়ামতের দিন বড় বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ হবে এই যে, মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করে, কোন মুমিন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করে, মা-বাপের অবাধ্য হয়, স্ত্রীলোকেরা যে পাপ করেনি তাদের প্রতি এরূপ পাপের অপবাদ দেয়, যাদু শিক্ষা করে, সুদ খায় এবং ইয়াতিমের মাল ধ্বংস করে। অন্য বর্ণনায় কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কথাও রয়েছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, কাবীরা গুনাহগুলো বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথার উল্লেখ করেন তখন তিনি সোজা হয়ে বসে পড়েন এবং বলেনঃ “সাবধান! তোমরা মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথা হতে দূরে থাকবে। তিনি একথা বার বার বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবীগণ বলেন, যদি তিনি নীরব হতেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় গুনাহ কোন্টি? তিনি বলেনঃ ‘তা এই যে, তুমি অন্য কাউকে আল্লাহর অংশীদার কর, অথচ একমাত্র তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করি, তার পরে কোটি ? তিনি বলেনঃ তার পরে এই যে, তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার করবে এ ভয়ে তুমি তাকে হত্যা করে ফেল। আমি জিজ্ঞেস করি, তারপর কোন্টি? তিনি বলেনঃ তারপরে এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২৫:৬৮) হতে। (আরবী) (২৫:৭০) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন।মুসনাদ-ই-ইবনে হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) মসজিদ-ই-হারামে হাতীমের মধ্যে বসে ছিলেন। তাঁকে এক ব্যক্তি মদ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ আমার মত বুড়ো বয়সের মানুষ কি এ স্থানে বসে আল্লাহর রাসূলের (সঃ) উপর মিথ্যা কথা বলতে পারে? অতঃপর তিনি বলেন, 'মদ্য পান হচ্ছে বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ। এ কাজ হচ্ছে সমস্ত দুশ্চরিত্রতার মূল। মদখোর ব্যক্তি নাম পরিত্যাগকারী হয়ে থাকে। সে স্বীয় মা, খালা এবং ফুফুর সাথে ব্যভিচার করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এ হাদীসটি গারীব। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য আরও বহু সাহাবা-ই-কিরাম একবার একটি মজলিসে বসেছিলেন। তথায়। কাবীরা গুনাহগুলোর আলোচনা চলছিল যে, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? কারও নিকট সর্বশেষ উত্তর ছিল না। তখন তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে পাঠান যে, তিনি যেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসেন। তিনি তাঁর নিকট গমন করেন। তিনি উত্তরে বলেন যে, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে মদ্যপান। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি ফিরে এসে উক্ত মজলিসে এ উত্তর শুনিয়ে দেই। কিন্তু মজলিসের লোক। সান্ত্বনা লাভ করলেন না। সুতরাং তারা সবাই উঠে গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-এর বাড়ী গমন করেন এবং তারা নিজেরাই তাঁকে জিজ্ঞেস করেন।তখন তিনি বর্ণনা করেনঃ জনগণ নবী (সঃ)-এর সামনে একটি ঘটনা বর্ণনা করে যে, বানী ইসরাঈলের বাদশাহদের মধ্যে একজন বাদশাহ্ একটি লোককে গ্রেফতার করে। অতঃপর লোকটিকে বলে, হয় তুমি জীবনের আশা ত্যাগ কর না হয় এ কাজগুলোর মধ্যে কোন একটি কর, অর্থাৎ মদ্যপান কর বা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা কর কিংবা শূকরের মাংস ভক্ষণ কর। লোকটি কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনার পর হাল্কা জিনিস মনে করে মদ্যপান করতে সম্মত হয়। কিন্তু মদ্যপান করা মাত্রই সে নেশার অবস্থায় ঐ সমুদয় কাজও করে বসে যা হতে সে পূর্বে বিরত ছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ঘটনাটি শুনে আমাদেরকে বলেনঃ “যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, আল্লাহ তা'আলা চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। আর যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যস্ত অবস্থাতেই মারা যায় এবং তার মূত্রস্থলীতে সামান্য পরিমাণও মদ্য থেকে যায়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং যদি মদ্যপান করার পর চল্লিশ দিনের মধ্যেই মারা যায় তবে তার অজ্ঞতা যুগের মৃত্যু হয়ে থাকে। এ হাদীসটি দুর্বল। অন্য একটি হাদীসে মিথ্যা শপথকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবীরা গুনাহ বলে গণ্য করেছেন। (সহীহ বুখারী ইত্যাদি)মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে মিথ্যা শপথের পর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে কোন কথা বলে এবং তাতে মশার সমানও বাড়িয়ে কিছু বলে, তার অন্তরে একটা কাল দাগ হয়ে যায়, যা কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থেকে যায়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়াও কাবীরা গুনাহ। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষ তার পিতা-মাতাকে কিরূপে গালি দেবে?' তিনি বলেনঃ ‘এভাবে যে, সে অন্যের বাপকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার বাপকে গালি দেয়, সে অন্যের মাকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার মাকে গালি দেয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সবচেয়ে বড় কাবীরা গুনাহ এই যে, মানুষ তার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে?' তিনি বলেনঃ ‘অন্যের মা-বাপকে বলে নিজের মা-বাপকে বলিয়ে নেয়া। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমানকে গালি প্রদান মানুষকে ফাসিক বানিয়ে দেয় এবং তাকে হত্যা করা হচ্ছে কুফরী।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে কোন মুসলমানের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা এবং একটা গালির পরিবর্তে দু'টো গালি দেয়া। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি বিনা ওযরে দু’টি নামাযকে একত্রিত করে, সে কাবীরা গুনাহসমূহের দু'টি দরজার একটি দরজার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু কাতাদাতুল আদাভী হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর যে পত্র আমাদের সামনে পাঠ করা হয় তাতে এও ছিল যে, বিনা ওযরে দু’ নামাযকে একত্রিত করা কাবীরা গুনাহ এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করাও কাবীরা গুনাহ। মোটকথা, যোহর, আসর কিংবা মাগরিব ও ইশা সময়ের পূর্বে বা পরে শরীয়তের অবকাশ ছাড়া একত্রিত করে পড়া কাবীরা গুনাহ। তাহলে যারা মোটেই (নামায) পড়ে না তাদের পাপের তো কোন ঠিক ঠিকানাই নেই। যেমন, সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা ও শিরকের মধ্যেস্থলে রয়েছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদেরও কাফিরদের মধ্যে পৃথককারী জিনিস হচ্ছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। যে ব্যক্তি নামাযকে ছেড়ে দিল সে কুফরী করলো। অন্য একটি বর্ণনায় তাঁর এ উক্তিটিও নকল করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল তার কার্যাবলী বিনষ্ট হয়ে গেল। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তির আসরের নামায ছুটে গেল তার যেন মাল ও পরিবার পরিজন ধ্বংস হয়ে গেল।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহ কি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর মকর হতে (মকর শব্দটি আল্লাহর ব্যাপারে ফন্দির প্রতিশোধ নেয়া বুঝায়) নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ।'হযরত বাযযার (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, আল্লাহর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ।' কিন্তু এর ইসনাদে সমালোচনা রয়েছে। সবচেয়ে সঠিক কথা এই যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, সর্বাপেক্ষা বড় পাপ হচ্ছে মহা সম্মানিত আল্লাহ তাআলার প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা।' এ বর্ণনাটি অত্যন্ত দুর্বল। ইতিপূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যার মধ্যে হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে বসতি স্থাপন করাকেও কাবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। এ হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে। সাতটি কাবীরা গুনাহর মধ্যে একটি এটিকে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তার বিষয় রয়েছে এবং একে মারফু বলা সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক কথা এটাই যা তাফসীরে ইবনে জারীরের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। তাতে তিনি বলেন, হে জনগণ! কবীরা গুনাহ সাতটি।' একথা শুনে লোকগুলো চীৎকার করে উঠে। তিনি তিনবার ওরই পুনরাবৃত্তি করেন।অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা আমাঁকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করছো না কেন? জনগণ তখন বলে, “হে আমীরুল মুমিনীন! বলুন, ওগুলো কি?' তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, যে প্রাণ বধ করা আল্লাহ হারাম করেছেন তা বধ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, যুদ্ধের দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা এবং হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে এসে বসতি স্থাপন করা।' হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত সাহল (রঃ) তাঁর পিতা হযরত সাহল ইবনে খাইসুমার (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘এটাকে কিভাবে কাবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, হে প্রিয় বৎস! একটি লোক হিজরত করে মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হলো, গনীমতের মালে তার অংশ নির্ধারিত হলো, মুজাহিদদের নামের তালিকায় তার নাম এসে গেছে। অতঃপর সে সমস্ত জিনিস পরিত্যাগ করতঃ বেদুঈন হয়ে গিয়ে কাফিরদের দেশে ফিরে গেল এবং যেমন ছিল তেমনই হলো, এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কি হতে পারে?মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের খুৎবায় বলেনঃ সাবধান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, অন্যায় হত্যা হতে বেঁচে থাক, তবে শরীয়তের অনুমতি অন্য জিনিস, ব্যভিচার করো না এবং চুরি করো না।' ঐ হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, অসিয়তের ব্যাপারে কারও ক্ষতি সাধন করাও একটি কাবীরা গুনাহ। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা সাহাবায়ে কেরাম কবীরা গুনাহসমূহের উল্লেখ করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, ধর্মযুদ্ধ থেকে পলায়ন করা, পাক পবিত্র রমণীদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা বলা, ধোকা দেয়া, খিয়ানত করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া এগুলো সব কাবীরা গুনাহ। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আর ঐ গুনাহকে কোথায় রাখছে যে, লোকেরা আল্লাহর ওয়াদা এবং নিজেদের কসমকে অল্প মূল্যে বিক্রি করে ফিরছে। আয়াতের শেষ পর্যন্ত তিনি তেলাওয়াত করেন। এর ইসনাদ স্পষ্ট এবং হাদীসটি হাসান।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, মিসরে কতগুলো লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে আমরা কতগুলো জিনিস এমন পাচ্ছি যেগুলোর উপর আমাদের আমল নেই। তাই, আমরা এ সম্বন্ধে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে চাই।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে মদীনায় আগমন করেন। তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হযরত উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, কবে এসেছে? তিনি উত্তরে বলেন, এতদিন হলো।' পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, অনুমতিক্রমে এসেছো কি? তারও উত্তর তিনি দেন। অতঃপর তিনি জনগণের কথা উল্লেখ করেন।হযরত উমার (রাঃ) বলেন, তাদেরকে একত্রিত কর।' এরপর তিনি তাদের নিকট আগমন করেন এবং তাদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাকে আল্লাহ ও ইসলামের সত্যতার শপথ! তুমি কি সম্পূর্ণ কুরআন কারীম পাঠ করেছো?' লোকটি বলেন, হ্যা।' তিনি বলেন, “তুমি কি ওকে তোমার অন্তরে রক্ষিতও রেখেছো ?' তিনি বলেন , না।' তিনি যদি ‘হ্যা’ বলতেন তবে হযরত উমার (রাঃ) তাকে দলীল প্রমাণাদি দ্বারা অপারগ করে দিতেন।এরপর তিনি বলেন, “তুমি ওকে স্বীয় চক্ষে, স্বীয় জিহবায় এবং স্বীয় চালচলনেও রক্ষিত রেখেছো কি?' তিনি বলেনঃ না। অতঃপর তিনি এক এক করে সবাইকেই এ প্রশ্নই করেন। তারপর তিনি বলেন, “তোমরা উমার (রাঃ)-কে এ কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চাচ্ছ যে, তিনি যেন জনগণকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সোজা করে দেন। আমার দোষত্রুটির কথা আমার এ পূর্ব হতেই জানতেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অর্থাৎ যদি তোমরা সেই মহাপাপসমূহ হতে বিরত হও যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলেই আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবো। এরপর তিনি বলেন, মদীনাবাসী তোমাদের আগমনের কারণ জানে কি? তাঁরা বলেন, 'না।' তিনি বলেন, তারাও যদি এটা জানতো তবে এ সম্বন্ধে আমার তাদেরকেও উপদেশ দিতে হতো। এর ইসনাদও হাসান এবং পঠনও হাসান। যদিও হযরত উমার (রাঃ) হতে হাসানের এ বর্ণনাটির মধ্যে ইনকিতা রয়েছে তথাপি এ ত্রুটি পূরণের পক্ষে এর পূর্ণ প্রসিদ্ধিই যথেষ্ট।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, কাউকে হত্যা করা, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদেরকে অপবাদ দেয়া, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থান করা, যাদু করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, সুদ খাওয়া, জামাআত হতে পৃথক হওয়া এবং ক্রয়-বিক্রয় ভেঙ্গে দেয়া। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর প্রশস্ততা ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং তার মকর হতে নির্ভয় থাকা।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে। যে, সূরা-ই-নিসার প্রথম তির্মটি আয়াতে কাবীরা গুনাহর বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, বাপ-মাকে অসন্তুষ্ট করা, পরিতৃপ্তির পর অতিরক্তি পানি প্রয়োজন বোধকারীদেরকে না দেয়া এবং নিজের নরপশুকে কারও মাদী পশুর জন্যে কিছু নেয়া ছাড়া না দেয়া।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকিয়ে রাখা যাবে না এবং অতিরিক্ত ঘাস হতেও বাধা দেয়া যাবে না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের পাপীদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অতিরিক্ত পানি ও অতিরিক্ত ঘাসকে আটকিয়ে রাখে, কিয়ামতের দিন আলাহ তা'আলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ দু'টি যা নারীদের নিকট বায়আত নেয়ার বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে, অর্থাৎ (আরবী) (৬০:১২) -এ আয়াতটির মধ্যে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এ আয়াতটিকে আল্লাহ তাআলার বিরাট ইহসানের মধ্যে বর্ণনা করেন এবং এর উপর বড় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আয়াতটিকে।একবার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে জনগণ বলেন, কাবীরা গুনাহ হচ্ছে সাতটি।' তিনি বলেন, কোন কোন সময় সাতটি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেন, 'কমপক্ষে সাতটি নচেৎ সত্তরটি।' অন্য একটি লোকের কথায় তিনি বলেনঃ “ওটা হচ্ছে সাতশ পর্যন্ত এবং সাতশ হচ্ছে খুবই নিকটে। হ্যা, তবে জেনে রেখো যে, ক্ষমা প্রার্থনার পর কাবীরা আর কাবীরা থাকে না। আর সদা-সর্বদা করতে থাকলে সাগীরাও আর সাগীরা থাকে না।'অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, “যে পাপের উপর জাহান্নামের, আল্লাহর ক্রোধের, অভিসম্পাতের এবং শাস্তির ভীতি প্রদর্শন রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যা হতে আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেন সেটাই কাবীরা। যে কার্যে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ পায় ওটাই বড় পাপ। এখন তাবেঈগণের উক্তি আলোচনা করা যাচ্ছেঃ হযরত উবাইদাহ (রঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্রে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, সচ্চরিত্রা মেয়েদের (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়া ও হিজরতের পর স্বদেশ প্রিয়তা।' হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আউন (রঃ) স্বীয় শিক্ষক মুহাম্মাদ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘যাদু কাবীরা গুনাহ নয় কি?' তিনি বলেন, এটা অপবাদের মধ্যে এসে গেল। এ শব্দটির মধ্যে বহু জঘন্যতা জড়িত রয়েছে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) কাবীরা গুনাহের উপর কুরআন কারীমের আয়াত পড়েও শুনিয়ে দেন। শিরকের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলো সে যেন আকাশ হতে পড়ে গেল অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে দূরে কোন অজানা জঘন্য স্থানে নিক্ষেপ করবে।' (২২:৩১) ইয়াতীমের মাল নষ্ট করার উপর আয়াত পেশ করেন (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করে, নিশ্চয়ই তারা তাদের পেটের মধ্যে আগুন ভক্ষণ করে।' (৪:১০) সুদ খাওয়ার উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা কিয়ামতের দিন জ্ঞানশূন্য ও পাগলের মত হয়ে উঠবে।' (২:২৭৫) অপবাদের উপর পড়েন- (আরবী) অর্থাৎ যারা পবিত্রা, উদাসীনা, মুমিনা নারীদেরকে অপবাদ দেয়। (২৪:২৩) যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারীদের উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কাফিরদের মোকাবিলায় দণ্ডায়মান হও, তখন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না।' (৮:১৫) হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থানের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুপথ প্রাপ্তির পর ধর্মত্যাগী হয়।' (৪৭:২৫) কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, যার মধ্যে সে চির অবস্থান করবে।' (৪:৯৩)। হযরত আতা’ (রঃ) হতেও কাবীরা গুনাহ্র বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে এবং তাতে মিথ্যা সাক্ষ্যের কথাও রয়েছে। হযরত মুগীরা (রঃ) বলেন, 'হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে মন্দ বলাও কাবীরা গুনাহই।' আমি বলি যে, আলেমদের একটি দল ঐ লোকদেরকে কাফির বলেছেন যারা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে মন্দ বলে থাকে। হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতে এটা বর্ণিত আছে।হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন, আমি এটা কল্পনা করতে পারি না যে, কোন ব্যক্তির অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি ভালবাসা রয়েছে অথচ হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে।' (জামেউত্ তিরমিযী)হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তার আয়াতসমূহ ও রাসূলদের সাথে কুফরী করা, যাদু করা, সন্তানদেরকে হত্যা করা, আল্লাহ তাআলার সন্তান ও স্ত্রী সাব্যস্ত করা এবং এ ধরনের কাজ ও কথা যার পরে কোন পুণ্যের কাজ গৃহীত হয় না। হ্যাঁ, তবে যেসব পাপকার্যের পর ধর্ম অবশিষ্ট থাকতে পারে এবং আমল গৃহীত হতে পারে এরূপ পাপসমূহ আল্লাহ তাআলা পুণ্যের বিনিময়ে ক্ষমা করে থাকেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করার অঙ্গীকার করেছেন যারা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে। আর আমাদের নিকট এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাক, সোজা ও ঠিক এবং শুভ সংবাদ গ্রহণ কর।মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাকে সহীহ সনদে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহকারীদের জন্যেও আমার শাফাআত রয়েছে।' ইমাম তিরমিযীও (রঃ) একে হাসান বলেছেন। যদিও এর বর্ণনা ও সনদ দুর্বলতা শূন্য নয়, তথাপি এর যে সাক্ষীগুলো রয়েছে তাতেও সঠিক বর্ণনা রয়েছে। যেমন একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা কি মনে কর যে, আমার শাফা'আত শুধু মুত্তাকী ও মুমিনদের জন্যই? , না। বরং ঐ গুনাহগার পাপীদের জন্যেই।এখন আলেমদের উক্তি বর্ণিত হচ্ছেঃ কাবীরা গুনাহ কাকে বলে সে সম্বন্ধে কেউ কেউ বলেন যে, যার উপর শরঈ হদ্দ (শরীয়তের শাস্তি) রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কেউ বলেন যে, যার উপর কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে কোন শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কারও উক্তি এই যে, যাতে দ্বীনদারী কম হয় এবং সততা হ্রাস পায়, সেটাই হচ্ছে কাবীরা গুনাহ্। কাযী আবূ সাঈদ হারভী (রঃ) বলেন যে, যার হারাম হওয়া শব্দের দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং যার অবাধ্যতার উপর কোন হদ্দ থাকে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। যেমন হত্যা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যে কোন ফরয কাজ ছেড়ে দেয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা বর্ণনা এবং মিথ্যা শপথও কাবীরা গুনাহ্।কাযী রূইয়ানী (রঃ) বলেন যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে সাতটিঃ বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, ব্যভিচার করা, পুরুষে পুরুষে নির্লজ্জতার কাজে (লোওয়াতাত) লিপ্ত হওয়া, মদ্যপান করা, চুরি করা, জবরদখল করা এবং অপবাদ দেয়া (সতী নারীকে)। অপর বর্ণনায় অষ্টমও একটি আছে, তা হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান। আর এর সাথে নিম্নেরগুলোকে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে-সুদ খাওয়া, বিনা ওযরে রমযানের রোযা পরিত্যাগ করা, মিথ্যা শপথ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, মা-বাপের অবাধ্য হওয়া, জিহাদ হতে পলায়ন করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, বিনা ওযরে সময়ের পূর্বে নামায আদায় করা ওজনে কম বেশী করা, বিনা কারণে মুসলমাকে হত্যা করা, জেনে শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করা, তাঁর সাহাবীগণকে গালি দেয়া, বিনা কারণে সাক্ষ্য গোপন করা, ঘুষ নেয়া, পুরুষ ও স্ত্রীদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করা, বাদশাহের নিকট পরোক্ষ নিন্দে করা, যাকাত দেয়া বন্ধ করা, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ না করা, কুরআন কারীম শিক্ষা করে ভুলে যাওয়া, প্রাণীকে আগুন দ্বারা পুড়িয়ে ফেলা, বিনা ওযরে স্ত্রীর তার স্বামীর নিকটে না যাওয়া, আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হওয়া, তাঁর মকর হতে নির্ভয় হওয়া, আলেম ও কারীদের ক্ষতিসাধন করা, যিহার করা (যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ এরূপ কোন নারীর কোন অঙ্গের সঙ্গে স্ত্রীর তুলনা করাকে যিহার বলে। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বলে অর্থাৎ (আরবী) তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত), শূকরের গোশত ভক্ষণ করা এবং মৃত জিনিস খাওয়া। তবে খুবই প্রয়োজন বোধে মৃত জন্তুর গোশত খেলে সেটা অন্য কথা।ইমাম রাফেঈ (রঃ) বলেন যে, এগুলোর কয়েকটির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বড় বড় গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনীষীগণ বহু গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। আমাদের শায়েখ হাকিম আবু আবদুল্লাহ যাহরী (রঃ) একটি পুস্তক লিখেছেন, যার মধ্যে তিনি সত্তরটি কাবীরা গুনাহর সংখ্যা দিয়েছেন। এও বলা হয়েছে যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে ঐগুলো যেগুলোর উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এ প্রকারের গুনাহই যদি গণনা করা যায় তবে বহু গুনাহই বেরিয়ে যাবে। আর যদি কাবীরা গুনাহ্ ঐ (ধরনের) কাজের প্রত্যেকটিকে বলা হয় যা হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দূরে থাকতে বলেছেন তবে তো কাবীরা গুনাহ্ অসংখ্য হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন।

আন-নিসা 4:31

২৯-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তার ঈমানদার বান্দাদেরকে একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে নিষেধ করছেন। সে উপার্জনের দ্বারাই হোক যা শরীয়তে হারাম, যেমন-সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা বা এরকমই প্রত্যেক প্রকারের কৌশলের দ্বারাই হোক, যদিও এটাকে শরীয়তে বৈধ রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহ তাআলা খুব ভালই জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হচ্ছে, একটি লোক কাপড় ক্রয় করছে এবং বলছে, আমার যদি পছন্দ হয় তবে রেখে দেব, নচেৎ কাপড় এবং একটি দিরহাম ফিরিয়ে দেব'। এর হুকুম কি? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ তাকে অন্যায়ভাবে মাল ভক্ষণকারীর অন্তর্ভুক্ত করেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘মুহাকাম’ অর্থাৎ রহিত নয়। এটা কিয়ামত পর্যন্ত রহিত হতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন মুসলমানগণ একে অপরের মাল ভক্ষণ করা পরিত্যাগ করেন। যার ফলে (আরবী) (৪৮:১৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তিজারাতান শব্দটিকে তিজারাতুনও পড়া হয়েছে। এটি (আরবী) যেমন বলা হচ্ছে-‘অবৈধতাযুক্ত কারণসমূহ দ্বারা মাল জমা করো না। কিন্তু শরীয়তের পন্থায় ব্যবসা দ্বারা লাভ করা বৈধ, যা ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতিক্রমে হয়ে থাকে। যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে-‘কোন নিস্পাপ প্রাণকে মেরো না। তবে হকের সঙ্গে হলে জায়েয আছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে-‘তথায় তারা প্রথম মৃত্যু ছাড়া আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করে বলেন, সম্মতি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয় না। কেননা, এটাই হচ্ছে সম্মতির পূর্ণ সনদ। শুধুমাত্র আদান-প্রদান কখনও সম্মতির উপর দলীল হতে পারে না।' জমহুর এর বিপরীত মতপোষণ করেন। অন্যান্য তিনজন ইমামের উক্তি এই যে, মৌখিক কথা বার্তা যেমন সম্মতির প্রমাণ, দ্রুপ আদান-প্রদানও সম্মতির দলীল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, কম মূল্যবান সাধারণ জিনিসে শুধু লেন-দেনই যথেষ্ট এবং এরকমই ব্যবসার সে নিয়ম থাকে। সহীহ মাযহাবে তো সতর্কতামূলক দৃষ্টিতে কথা বার্তায় স্বীকৃতি থাকা অন্য কথা। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ক্রয়-বিক্রয় হোক বা দান হোক, সব কিছুর মধ্যেই এ হুকুম রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর (রঃ)-এর একটি মার’ হাদীসে রয়েছেঃ ব্যবসা হচ্ছে সম্মতি এবং ব্যবসার পরেই ইখতিয়ার রয়েছে। কোন মুসলমানের অন্য মুসলমানকে প্রতারিত করা বৈধ নয়।' এ হাদীসটি ‘মুরসাল'। মজলিসের শেষ পর্যন্তও পূর্ণ সম্মতির অধিকার রয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই পৃথক না হওয়া পর্যন্ত ইখতিয়ার রয়েছে। এ হাদীস অনুসারেই ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তার সহচরদের ফতওয়া রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহুরেরও ফতওয়া এর উপরে ভিত্তি করেই। এ পূর্ণ সম্মতির মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের তিন দিন পরে ইখতিয়ার দেয়াও জড়িত রয়েছে যদিও সে ইখতিয়ার পূর্ণ এক বছরের জন্যেও হয়, যেমন গ্রামবাসী প্রভৃতি লোকদের মধ্যে রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই, যদিও তাঁর মতে শুধুমাত্র আদান-প্রদান দ্বারাই ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হয়ে থাকে। শাফিঈ মাযহাবেরও একটা উক্তি এটাই এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, মানুষ ব্যবসায়ের জন্যে যে অল্প মূল্যের সাধারণ জিনিস রেখে থাকে তাতে শুধুমাত্র আদান-প্রদানই যথেষ্ট হবে। আসহাবের কারও কারও ইখতিয়ার এটাই, যেমন মুত্তাফাকুন আলাইহি।এরপর বলা হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলার হারাম কাজগুলো করে অবাধ্য হয়ে, আর অন্যায়ভাবে একে অপরের মাল ভক্ষণ করে তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু। তাঁর প্রত্যেক আদেশ ও নিষেধ দয়ায় পরিপূর্ণ।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আমর ইবনে আল আস (রাঃ)-কে ‘যাতুস্সালাসিলের’ যুদ্ধের বছরে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি বলেন, একদা কঠিন শীতের রাত্রে আমার স্বপ্নদোষ হয়, এমনকি গোসল করাতে আমি আমার জীবনের উপর ভয় করি। সুতরাং আমি তায়াম্মুম করে নিয়ে আমার জামাআতকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেই। অতঃপর ফিরে এসে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। তাঁর নিকট আমি আমার এ ঘটনাটি বর্ণনা করি।তিনি বলেনঃ তুমি কি তাহলে অপবিত্র অবস্থায় তোমার সঙ্গীদেরকে নামায পড়িয়েছ?' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কঠিন ঠাণ্ডা ছিল এবং আমার প্রাণের ভয় ছিল। অতঃপর আমার মনে পড়ে গেল যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন এবং আমাকে কিছুই বলেননি।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, লোকেরাই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেছিলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করায় হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) এ ওর পেশ করেছিলেন।সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে লোহা দ্বারা আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি জেনে-শুনে জীবন দেয়ার উদ্দেশ্যে বিষপান করবে, সে সদা-সর্বদার জন্যে জাহান্নামে বিষপান করতে থাকবে।'আর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ ‘যে নিজেকে যে জিনিস দ্বারা হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে জিনিস দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণায় রয়েছেঃ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে একটি লোক আহত হয়। সে ছুরি দিয়ে স্বীয় হাত কেটে দেয়। রক্ত বন্ধ হয় না এবং তাতেই সে মারা যায়। তখন আল্লাহ পাক বলেন-“আমার বান্দা নিজেকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করেছে, সুতরাং আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।'এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন-“যে কেউ অত্যাচার ও সীমা অতিক্রম করে একাজ করবে, অর্থাৎ হারাম জেনেও স্বীয় বীরত্বপণা দেখিয়ে ঐ কাজ করবে, সে জাহান্নামী হবে। সুতরাং প্রত্যেকেরই এ কঠিন ভীতি প্রদর্শন ব্যাপারে ভয় করা উচিত। অন্তরের পর্দা খুলে আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশ শ্রবণ করতঃ হারাম কাজ হতে (মানুষের) বিরত থাকা উচিত।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা যদি বড় বড় পাপ হতে বেঁচে থাক তবে আমি তোমাদের ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো।'হযরত আনাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমরা ওর মত কিছুই দেখিনি যা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আমাদের নিকট পৌছেছে, অতঃপর আমরা তাঁর জন্যে আমাদের পরিবার ও সম্পদ হতে পৃথক হবো না যে, তিনি আমাদের বড় বড় পাপগুলো ছাড়া ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন'। এরপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীসও রয়েছে। আমরা কিছু কিছু এখানে বর্ণনা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ ‘জুমআর দিন কি, তা তুমি জান কি'? আমি উত্তরে বলি, ওটা ঐদিন যে দিনে আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি জমা করেন।তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা শুন। যে ব্যক্তি এ দিন ভালভাবে পবিত্রতা লাভ করতঃ জুম'আর নামাযের জন্যে আগমন করে এবং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরবতা অবলম্বন করে, তার সে কাজ পরবর্তী জুম'আ পর্যন্ত সমস্ত পাপ মোচনের কারণ হয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে হত্যা কাজ হতে বেঁচে থাকে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত সাঈদ (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণ দান কালে বলেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! এ কথা তিনি তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি মাথা নীচু করেন। আমরা সকলেই নীচু করি এবং জনগণ কাঁদতে আরম্ভ করে। আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন্ জিনিসের উপরই বা শপথ করলেন এবং নীরবতাই বা অবলম্বন করলেন কেন? অল্পক্ষণ পরে তিনি মস্তক উত্তোলন করেন এবং তাঁর চেহারা প্রফুল্ল ছিল, যা দেখে আমরা এত খুশী হই যে, আমরা লাল রঙ্গের উট পেলেও এত খুশী হতাম না। তখন তিনি বলতে আরম্ভ করেনঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, যাকাত আদায় করে এবং সাতটি কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, তার জন্যে জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে রাখা হবে এবং তাকে বলা হবে-‘নিরাপত্তার সাথে তথায় চলে যাও।'তাতে যে সাতটি পাপের উল্লেখ আছে তার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে নিম্নরূপ এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ধ্বংসকারী সাতটি পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাক।' জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐপাপগুলো কি?' তিনি বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা। (২) যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ তাকে হত্যা করা, তবে শরীয়তের কোন কারণে যদি তার রক্ত হালাল হয় সেটা অন্য কথা। (৩) যাদু করা। (৪) সুদ ভক্ষণ করা। (৫) পৃতিহীনের মাল ভক্ষণ করা। (৬) কাফিরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা। (৭) সতীসাধ্বী পবিত্র মুসলমান নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। একটি বর্ণনায় যাদুর পরিবর্তে ‘হিজরত করার পর পুনরায় ফিরে এসে স্বদেশে অবস্থান’ এ উক্তিটি রয়েছে। এটা অবশ্যই স্মরণযোগ্য কথা যে, উল্লিখিত সাতটি পাপকে কাবীরা বলার ভাবার্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র এগুলোই কাবীরা.. গুনাহ, যেমন কারও কারও এ ধারণা রয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই ভুল কথা, বিশেষ করে ঐ সময়, যখন ওর বিপরীত দলীল বিদ্যমান থাকে। আর এখানেতো পরিষ্কার ভাষায় অন্যান্য কাবীরা গুনাহগুলোরও বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নলিখিত হাদীসগুলো দ্রষ্টব্যঃমুসতাদরিক-ই-হাকিমে রয়েছে যে, বিদায় হজ্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো যে, নামাযীরা হচ্ছে আল্লাহর বন্ধু, যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, ফরয জেনে এবং পুণ্য লাভের নিয়ত করে খুশী মনে যাকাত আদায় করে, আর ঐ সমুদয় কাবীরা গুনাহ হতে বিরত থাকে যেগুলো হতে আল্লাহ্ দূরে থাকতে বলেছেন।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘শিরুক, হত্যা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ, পবিত্র নারীদেরকে অপবাদ দেয়া, পিতা- মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মরণের কিবলাহ্ বায়তুল্লাহ শরীফের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা। জেনে রেখো যে ব্যক্তি মৃত্যু পর্যন্ত এ বড় বড় পাপগুলো হতে দূরে সরে থাকবে এবং নামায ও যাকাত নিয়মিতভাবে আদায় করবে, সে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সঙ্গে জান্নাতে সোনার অট্টালিকায় অবস্থান করবে।হযরত তায়লাস ইবনে মাইয়াস (রঃ) বলেন, আমি কয়েকটি পাপকার্য করে বসি যা আমার মতে কারীরা গুনাহই ছিল। আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বলি যে, আমি কয়েকটি পাপকার্য। করেছি যেগুলোকে কাবীরা গুনাহ বলেই মনে করি। তিনি বলেন, ঐগুলো কি? আমি বলি যে, আমি এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, এগুলো কাবীরা। গুনাহ্ নয়। আমি বলি যে, আমি আরও এই এই কাজ করেছি। তিনি বলেন, ‘এগুলোও কাবীরা গুনাহ নয়।' এসো, আমি তোমাকে কাবীরা গুনাহগুলো গণনা করে শুনিয়ে দেই। ঐগুলো হচ্ছে নয়টি। (১) আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা। (২) কাউকে বিনা কারণে হত্যা করা। (৩) যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা। (৪) পবিত্রা নারীদেরকে অপবাদ দেয়া। (৫) সুদ ভক্ষণ করা। (৬) অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা। (৭) মসজিদ-ই-হারামে ধর্মদ্রোহীতা ছড়িয়ে দেয়া। (৮) যাদুকে বৈধ মনে করা। (৯) বিনা কারণে পিতা-মাতাকে কাঁদানো। হযরত তায়লাস (রঃ) বলেন, এটা বর্ণনা করার পরেও হযরত ইবনে উমার (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, আমার ভয় তখনও কমেনি। কাজেই তিনি বলেন, তোমার কি জাহান্নামে প্রবেশের ভয় এবং জান্নাতে প্রবেশের আকাক্ষখা আছে? আমি বলি, হ্যাঁ! তিনি বলেন, “আচ্ছা, তোমার পিতা-মাতা বেঁচে আছেন কি? আমি বলি, শুধু মা বেঁচে আছেন। তিনি তখন বলেন, “আচ্ছা, তুমি তাকে নরম কথা বল, আহার করাতে থাক এবং এসব কাবারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাক, তাহলেই তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত তায়তাসা ইবনে আলী হিন্দী (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে আরাফা প্রান্তরে আরাফার দিনে ‘পীলু' বৃক্ষের নীচে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) স্বীয় মস্তক ও চেহারার উপর পানি ঢালছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যখন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) অপবাদ দেয়ার কথা উল্লেখ করেন, তখন আমি বলি, এটাও কি হত্যার মতই খুব বড় পাপ? তিনি বলেনঃ হ্যা, হ্যাঁ। ওর মধ্যে পাপসমূহের বর্ণনায় যাদুরও উল্লেখ রয়েছে।আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, তার সাথে আমার সাক্ষাৎ সন্ধ্যার সময় হয়েছিল এবং আমি তাঁকে কাবীরা গুনাহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, কাবীরা গুনাহ সাতটি।' আমি জিজ্ঞেস করি, কি কি? তিনি বলেনঃ ‘শিরক ও অপবাদ। আমি বলি, এ দু’টোও কি রক্তের মতই অন্যায়? তিনি বলেনঃ “হাঁ, হাঁ। আর কোন মুমিনকে বিনা কারণে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তোমাদের জীবন ও মৃত্যুর কিবলাহ বায়তুল্লাহ শরীফে ধর্মদ্রোহীতার কাজ করা।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর যে বান্দা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করে না, নামায সু-প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে এবং কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, সে জান্নাতী।' একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ ‘আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা, মুমিন প্রাণকে হত্যা করা এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা।ইবনে মিরদুওয়াই স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়ামানবাসীর নিকট একটি পত্র লিখিয়ে পাঠিয়ে দেন। যাতে ফরযসমূহ, সুন্নাতসমূহ এবং দিয়্যাত অর্থাৎ জরিমানার নির্দেশসমূহ লিখিত ছিল এবং এ পত্রখানা তিনি হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-এর হাতে তাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। এ পত্রে নিম্নলিখিত কথাটিও ছিলঃ “কিয়ামতের দিন বড় বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ হবে এই যে, মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করে, কোন মুমিন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করে, মা-বাপের অবাধ্য হয়, স্ত্রীলোকেরা যে পাপ করেনি তাদের প্রতি এরূপ পাপের অপবাদ দেয়, যাদু শিক্ষা করে, সুদ খায় এবং ইয়াতিমের মাল ধ্বংস করে। অন্য বর্ণনায় কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কথাও রয়েছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, কাবীরা গুনাহগুলো বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথার উল্লেখ করেন তখন তিনি সোজা হয়ে বসে পড়েন এবং বলেনঃ “সাবধান! তোমরা মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা কথা হতে দূরে থাকবে। তিনি একথা বার বার বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবীগণ বলেন, যদি তিনি নীরব হতেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় গুনাহ কোন্টি? তিনি বলেনঃ ‘তা এই যে, তুমি অন্য কাউকে আল্লাহর অংশীদার কর, অথচ একমাত্র তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করি, তার পরে কোটি ? তিনি বলেনঃ তার পরে এই যে, তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার করবে এ ভয়ে তুমি তাকে হত্যা করে ফেল। আমি জিজ্ঞেস করি, তারপর কোন্টি? তিনি বলেনঃ তারপরে এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২৫:৬৮) হতে। (আরবী) (২৫:৭০) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন।মুসনাদ-ই-ইবনে হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) মসজিদ-ই-হারামে হাতীমের মধ্যে বসে ছিলেন। তাঁকে এক ব্যক্তি মদ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ আমার মত বুড়ো বয়সের মানুষ কি এ স্থানে বসে আল্লাহর রাসূলের (সঃ) উপর মিথ্যা কথা বলতে পারে? অতঃপর তিনি বলেন, 'মদ্য পান হচ্ছে বড় পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ। এ কাজ হচ্ছে সমস্ত দুশ্চরিত্রতার মূল। মদখোর ব্যক্তি নাম পরিত্যাগকারী হয়ে থাকে। সে স্বীয় মা, খালা এবং ফুফুর সাথে ব্যভিচার করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এ হাদীসটি গারীব। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য আরও বহু সাহাবা-ই-কিরাম একবার একটি মজলিসে বসেছিলেন। তথায়। কাবীরা গুনাহগুলোর আলোচনা চলছিল যে, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? কারও নিকট সর্বশেষ উত্তর ছিল না। তখন তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে পাঠান যে, তিনি যেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসেন। তিনি তাঁর নিকট গমন করেন। তিনি উত্তরে বলেন যে, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে মদ্যপান। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি ফিরে এসে উক্ত মজলিসে এ উত্তর শুনিয়ে দেই। কিন্তু মজলিসের লোক। সান্ত্বনা লাভ করলেন না। সুতরাং তারা সবাই উঠে গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-এর বাড়ী গমন করেন এবং তারা নিজেরাই তাঁকে জিজ্ঞেস করেন।তখন তিনি বর্ণনা করেনঃ জনগণ নবী (সঃ)-এর সামনে একটি ঘটনা বর্ণনা করে যে, বানী ইসরাঈলের বাদশাহদের মধ্যে একজন বাদশাহ্ একটি লোককে গ্রেফতার করে। অতঃপর লোকটিকে বলে, হয় তুমি জীবনের আশা ত্যাগ কর না হয় এ কাজগুলোর মধ্যে কোন একটি কর, অর্থাৎ মদ্যপান কর বা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা কর কিংবা শূকরের মাংস ভক্ষণ কর। লোকটি কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনার পর হাল্কা জিনিস মনে করে মদ্যপান করতে সম্মত হয়। কিন্তু মদ্যপান করা মাত্রই সে নেশার অবস্থায় ঐ সমুদয় কাজও করে বসে যা হতে সে পূর্বে বিরত ছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ঘটনাটি শুনে আমাদেরকে বলেনঃ “যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, আল্লাহ তা'আলা চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। আর যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যস্ত অবস্থাতেই মারা যায় এবং তার মূত্রস্থলীতে সামান্য পরিমাণও মদ্য থেকে যায়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং যদি মদ্যপান করার পর চল্লিশ দিনের মধ্যেই মারা যায় তবে তার অজ্ঞতা যুগের মৃত্যু হয়ে থাকে। এ হাদীসটি দুর্বল। অন্য একটি হাদীসে মিথ্যা শপথকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবীরা গুনাহ বলে গণ্য করেছেন। (সহীহ বুখারী ইত্যাদি)মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে মিথ্যা শপথের পর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে কোন কথা বলে এবং তাতে মশার সমানও বাড়িয়ে কিছু বলে, তার অন্তরে একটা কাল দাগ হয়ে যায়, যা কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থেকে যায়। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়াও কাবীরা গুনাহ। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষ তার পিতা-মাতাকে কিরূপে গালি দেবে?' তিনি বলেনঃ ‘এভাবে যে, সে অন্যের বাপকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার বাপকে গালি দেয়, সে অন্যের মাকে গালি দেয়, অন্য লোকটি তখন তার মাকে গালি দেয়। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সবচেয়ে বড় কাবীরা গুনাহ এই যে, মানুষ তার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়। জনগণ জিজ্ঞেস করে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে?' তিনি বলেনঃ ‘অন্যের মা-বাপকে বলে নিজের মা-বাপকে বলিয়ে নেয়া। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমানকে গালি প্রদান মানুষকে ফাসিক বানিয়ে দেয় এবং তাকে হত্যা করা হচ্ছে কুফরী।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কাবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে কোন মুসলমানের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা এবং একটা গালির পরিবর্তে দু'টো গালি দেয়া। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি বিনা ওযরে দু’টি নামাযকে একত্রিত করে, সে কাবীরা গুনাহসমূহের দু'টি দরজার একটি দরজার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু কাতাদাতুল আদাভী হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর যে পত্র আমাদের সামনে পাঠ করা হয় তাতে এও ছিল যে, বিনা ওযরে দু’ নামাযকে একত্রিত করা কাবীরা গুনাহ এবং যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করাও কাবীরা গুনাহ। মোটকথা, যোহর, আসর কিংবা মাগরিব ও ইশা সময়ের পূর্বে বা পরে শরীয়তের অবকাশ ছাড়া একত্রিত করে পড়া কাবীরা গুনাহ। তাহলে যারা মোটেই (নামায) পড়ে না তাদের পাপের তো কোন ঠিক ঠিকানাই নেই। যেমন, সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা ও শিরকের মধ্যেস্থলে রয়েছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদেরও কাফিরদের মধ্যে পৃথককারী জিনিস হচ্ছে নামাযকে ছেড়ে দেয়া। যে ব্যক্তি নামাযকে ছেড়ে দিল সে কুফরী করলো। অন্য একটি বর্ণনায় তাঁর এ উক্তিটিও নকল করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল তার কার্যাবলী বিনষ্ট হয়ে গেল। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তির আসরের নামায ছুটে গেল তার যেন মাল ও পরিবার পরিজন ধ্বংস হয়ে গেল।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহ কি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর মকর হতে (মকর শব্দটি আল্লাহর ব্যাপারে ফন্দির প্রতিশোধ নেয়া বুঝায়) নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ।'হযরত বাযযার (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোক জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাবীরা গুনাহগুলো কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, আল্লাহর নিয়ামত ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় থাকা এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ।' কিন্তু এর ইসনাদে সমালোচনা রয়েছে। সবচেয়ে সঠিক কথা এই যে, এ হাদীসটি মাওকুফ। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, সর্বাপেক্ষা বড় পাপ হচ্ছে মহা সম্মানিত আল্লাহ তাআলার প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা।' এ বর্ণনাটি অত্যন্ত দুর্বল। ইতিপূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যার মধ্যে হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে বসতি স্থাপন করাকেও কাবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। এ হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে। সাতটি কাবীরা গুনাহর মধ্যে একটি এটিকে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তার বিষয় রয়েছে এবং একে মারফু বলা সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক কথা এটাই যা তাফসীরে ইবনে জারীরের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। তাতে তিনি বলেন, হে জনগণ! কবীরা গুনাহ সাতটি।' একথা শুনে লোকগুলো চীৎকার করে উঠে। তিনি তিনবার ওরই পুনরাবৃত্তি করেন।অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা আমাঁকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করছো না কেন? জনগণ তখন বলে, “হে আমীরুল মুমিনীন! বলুন, ওগুলো কি?' তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, যে প্রাণ বধ করা আল্লাহ হারাম করেছেন তা বধ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, যুদ্ধের দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা এবং হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে এসে বসতি স্থাপন করা।' হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত সাহল (রঃ) তাঁর পিতা হযরত সাহল ইবনে খাইসুমার (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘এটাকে কিভাবে কাবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, হে প্রিয় বৎস! একটি লোক হিজরত করে মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হলো, গনীমতের মালে তার অংশ নির্ধারিত হলো, মুজাহিদদের নামের তালিকায় তার নাম এসে গেছে। অতঃপর সে সমস্ত জিনিস পরিত্যাগ করতঃ বেদুঈন হয়ে গিয়ে কাফিরদের দেশে ফিরে গেল এবং যেমন ছিল তেমনই হলো, এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কি হতে পারে?মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের খুৎবায় বলেনঃ সাবধান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, অন্যায় হত্যা হতে বেঁচে থাক, তবে শরীয়তের অনুমতি অন্য জিনিস, ব্যভিচার করো না এবং চুরি করো না।' ঐ হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, অসিয়তের ব্যাপারে কারও ক্ষতি সাধন করাও একটি কাবীরা গুনাহ। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, একদা সাহাবায়ে কেরাম কবীরা গুনাহসমূহের উল্লেখ করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, ধর্মযুদ্ধ থেকে পলায়ন করা, পাক পবিত্র রমণীদের প্রতি অপবাদ দেয়া, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা বলা, ধোকা দেয়া, খিয়ানত করা, যাদু করা, সুদ খাওয়া এগুলো সব কাবীরা গুনাহ। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আর ঐ গুনাহকে কোথায় রাখছে যে, লোকেরা আল্লাহর ওয়াদা এবং নিজেদের কসমকে অল্প মূল্যে বিক্রি করে ফিরছে। আয়াতের শেষ পর্যন্ত তিনি তেলাওয়াত করেন। এর ইসনাদ স্পষ্ট এবং হাদীসটি হাসান।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, মিসরে কতগুলো লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে আমরা কতগুলো জিনিস এমন পাচ্ছি যেগুলোর উপর আমাদের আমল নেই। তাই, আমরা এ সম্বন্ধে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে চাই।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে মদীনায় আগমন করেন। তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হযরত উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, কবে এসেছে? তিনি উত্তরে বলেন, এতদিন হলো।' পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, অনুমতিক্রমে এসেছো কি? তারও উত্তর তিনি দেন। অতঃপর তিনি জনগণের কথা উল্লেখ করেন।হযরত উমার (রাঃ) বলেন, তাদেরকে একত্রিত কর।' এরপর তিনি তাদের নিকট আগমন করেন এবং তাদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাকে আল্লাহ ও ইসলামের সত্যতার শপথ! তুমি কি সম্পূর্ণ কুরআন কারীম পাঠ করেছো?' লোকটি বলেন, হ্যা।' তিনি বলেন, “তুমি কি ওকে তোমার অন্তরে রক্ষিতও রেখেছো ?' তিনি বলেন , না।' তিনি যদি ‘হ্যা’ বলতেন তবে হযরত উমার (রাঃ) তাকে দলীল প্রমাণাদি দ্বারা অপারগ করে দিতেন।এরপর তিনি বলেন, “তুমি ওকে স্বীয় চক্ষে, স্বীয় জিহবায় এবং স্বীয় চালচলনেও রক্ষিত রেখেছো কি?' তিনি বলেনঃ না। অতঃপর তিনি এক এক করে সবাইকেই এ প্রশ্নই করেন। তারপর তিনি বলেন, “তোমরা উমার (রাঃ)-কে এ কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চাচ্ছ যে, তিনি যেন জনগণকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সোজা করে দেন। আমার দোষত্রুটির কথা আমার এ পূর্ব হতেই জানতেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অর্থাৎ যদি তোমরা সেই মহাপাপসমূহ হতে বিরত হও যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলেই আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবো। এরপর তিনি বলেন, মদীনাবাসী তোমাদের আগমনের কারণ জানে কি? তাঁরা বলেন, 'না।' তিনি বলেন, তারাও যদি এটা জানতো তবে এ সম্বন্ধে আমার তাদেরকেও উপদেশ দিতে হতো। এর ইসনাদও হাসান এবং পঠনও হাসান। যদিও হযরত উমার (রাঃ) হতে হাসানের এ বর্ণনাটির মধ্যে ইনকিতা রয়েছে তথাপি এ ত্রুটি পূরণের পক্ষে এর পূর্ণ প্রসিদ্ধিই যথেষ্ট।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, কাউকে হত্যা করা, পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, পবিত্র স্ত্রীলোকদেরকে অপবাদ দেয়া, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থান করা, যাদু করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, সুদ খাওয়া, জামাআত হতে পৃথক হওয়া এবং ক্রয়-বিক্রয় ভেঙ্গে দেয়া। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তাঁর প্রশস্ততা ও করুণা হতে নিরাশ হওয়া এবং তার মকর হতে নির্ভয় থাকা।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে। যে, সূরা-ই-নিসার প্রথম তির্মটি আয়াতে কাবীরা গুনাহর বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, বাপ-মাকে অসন্তুষ্ট করা, পরিতৃপ্তির পর অতিরক্তি পানি প্রয়োজন বোধকারীদেরকে না দেয়া এবং নিজের নরপশুকে কারও মাদী পশুর জন্যে কিছু নেয়া ছাড়া না দেয়া।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকিয়ে রাখা যাবে না এবং অতিরিক্ত ঘাস হতেও বাধা দেয়া যাবে না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের পাপীদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অতিরিক্ত পানি ও অতিরিক্ত ঘাসকে আটকিয়ে রাখে, কিয়ামতের দিন আলাহ তা'আলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ দু'টি যা নারীদের নিকট বায়আত নেয়ার বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে, অর্থাৎ (আরবী) (৬০:১২) -এ আয়াতটির মধ্যে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এ আয়াতটিকে আল্লাহ তাআলার বিরাট ইহসানের মধ্যে বর্ণনা করেন এবং এর উপর বড় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আয়াতটিকে।একবার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে জনগণ বলেন, কাবীরা গুনাহ হচ্ছে সাতটি।' তিনি বলেন, কোন কোন সময় সাতটি।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেন, 'কমপক্ষে সাতটি নচেৎ সত্তরটি।' অন্য একটি লোকের কথায় তিনি বলেনঃ “ওটা হচ্ছে সাতশ পর্যন্ত এবং সাতশ হচ্ছে খুবই নিকটে। হ্যা, তবে জেনে রেখো যে, ক্ষমা প্রার্থনার পর কাবীরা আর কাবীরা থাকে না। আর সদা-সর্বদা করতে থাকলে সাগীরাও আর সাগীরা থাকে না।'অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, “যে পাপের উপর জাহান্নামের, আল্লাহর ক্রোধের, অভিসম্পাতের এবং শাস্তির ভীতি প্রদর্শন রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ।' আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যা হতে আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেন সেটাই কাবীরা। যে কার্যে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ পায় ওটাই বড় পাপ। এখন তাবেঈগণের উক্তি আলোচনা করা যাচ্ছেঃ হযরত উবাইদাহ (রঃ) বলেন, 'কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যুদ্ধক্ষেত্রে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, সচ্চরিত্রা মেয়েদের (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়া ও হিজরতের পর স্বদেশ প্রিয়তা।' হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আউন (রঃ) স্বীয় শিক্ষক মুহাম্মাদ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘যাদু কাবীরা গুনাহ নয় কি?' তিনি বলেন, এটা অপবাদের মধ্যে এসে গেল। এ শব্দটির মধ্যে বহু জঘন্যতা জড়িত রয়েছে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) কাবীরা গুনাহের উপর কুরআন কারীমের আয়াত পড়েও শুনিয়ে দেন। শিরকের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলো সে যেন আকাশ হতে পড়ে গেল অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে দূরে কোন অজানা জঘন্য স্থানে নিক্ষেপ করবে।' (২২:৩১) ইয়াতীমের মাল নষ্ট করার উপর আয়াত পেশ করেন (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করে, নিশ্চয়ই তারা তাদের পেটের মধ্যে আগুন ভক্ষণ করে।' (৪:১০) সুদ খাওয়ার উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা কিয়ামতের দিন জ্ঞানশূন্য ও পাগলের মত হয়ে উঠবে।' (২:২৭৫) অপবাদের উপর পড়েন- (আরবী) অর্থাৎ যারা পবিত্রা, উদাসীনা, মুমিনা নারীদেরকে অপবাদ দেয়। (২৪:২৩) যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারীদের উপর পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কাফিরদের মোকাবিলায় দণ্ডায়মান হও, তখন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না।' (৮:১৫) হিজরতের পর কাফিরদের দেশে অবস্থানের উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যারা সুপথ প্রাপ্তির পর ধর্মত্যাগী হয়।' (৪৭:২৫) কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার উপর আয়াত পাঠ করেন (আরবী) অর্থাৎ যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, যার মধ্যে সে চির অবস্থান করবে।' (৪:৯৩)। হযরত আতা’ (রঃ) হতেও কাবীরা গুনাহ্র বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে এবং তাতে মিথ্যা সাক্ষ্যের কথাও রয়েছে। হযরত মুগীরা (রঃ) বলেন, 'হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে মন্দ বলাও কাবীরা গুনাহই।' আমি বলি যে, আলেমদের একটি দল ঐ লোকদেরকে কাফির বলেছেন যারা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে মন্দ বলে থাকে। হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রঃ) হতে এটা বর্ণিত আছে।হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন, আমি এটা কল্পনা করতে পারি না যে, কোন ব্যক্তির অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি ভালবাসা রয়েছে অথচ হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে।' (জামেউত্ তিরমিযী)হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে-আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা, তার আয়াতসমূহ ও রাসূলদের সাথে কুফরী করা, যাদু করা, সন্তানদেরকে হত্যা করা, আল্লাহ তাআলার সন্তান ও স্ত্রী সাব্যস্ত করা এবং এ ধরনের কাজ ও কথা যার পরে কোন পুণ্যের কাজ গৃহীত হয় না। হ্যাঁ, তবে যেসব পাপকার্যের পর ধর্ম অবশিষ্ট থাকতে পারে এবং আমল গৃহীত হতে পারে এরূপ পাপসমূহ আল্লাহ তাআলা পুণ্যের বিনিময়ে ক্ষমা করে থাকেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করার অঙ্গীকার করেছেন যারা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে। আর আমাদের নিকট এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাক, সোজা ও ঠিক এবং শুভ সংবাদ গ্রহণ কর।মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাকে সহীহ সনদে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেনঃ “আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহকারীদের জন্যেও আমার শাফাআত রয়েছে।' ইমাম তিরমিযীও (রঃ) একে হাসান বলেছেন। যদিও এর বর্ণনা ও সনদ দুর্বলতা শূন্য নয়, তথাপি এর যে সাক্ষীগুলো রয়েছে তাতেও সঠিক বর্ণনা রয়েছে। যেমন একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা কি মনে কর যে, আমার শাফা'আত শুধু মুত্তাকী ও মুমিনদের জন্যই? , না। বরং ঐ গুনাহগার পাপীদের জন্যেই।এখন আলেমদের উক্তি বর্ণিত হচ্ছেঃ কাবীরা গুনাহ কাকে বলে সে সম্বন্ধে কেউ কেউ বলেন যে, যার উপর শরঈ হদ্দ (শরীয়তের শাস্তি) রয়েছে সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কেউ বলেন যে, যার উপর কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে কোন শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। কারও উক্তি এই যে, যাতে দ্বীনদারী কম হয় এবং সততা হ্রাস পায়, সেটাই হচ্ছে কাবীরা গুনাহ্। কাযী আবূ সাঈদ হারভী (রঃ) বলেন যে, যার হারাম হওয়া শব্দের দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং যার অবাধ্যতার উপর কোন হদ্দ থাকে, সেটাই কাবীরা গুনাহ্। যেমন হত্যা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যে কোন ফরয কাজ ছেড়ে দেয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা বর্ণনা এবং মিথ্যা শপথও কাবীরা গুনাহ্।কাযী রূইয়ানী (রঃ) বলেন যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে সাতটিঃ বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, ব্যভিচার করা, পুরুষে পুরুষে নির্লজ্জতার কাজে (লোওয়াতাত) লিপ্ত হওয়া, মদ্যপান করা, চুরি করা, জবরদখল করা এবং অপবাদ দেয়া (সতী নারীকে)। অপর বর্ণনায় অষ্টমও একটি আছে, তা হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান। আর এর সাথে নিম্নেরগুলোকে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে-সুদ খাওয়া, বিনা ওযরে রমযানের রোযা পরিত্যাগ করা, মিথ্যা শপথ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, মা-বাপের অবাধ্য হওয়া, জিহাদ হতে পলায়ন করা, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, বিনা ওযরে সময়ের পূর্বে নামায আদায় করা ওজনে কম বেশী করা, বিনা কারণে মুসলমাকে হত্যা করা, জেনে শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করা, তাঁর সাহাবীগণকে গালি দেয়া, বিনা কারণে সাক্ষ্য গোপন করা, ঘুষ নেয়া, পুরুষ ও স্ত্রীদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করা, বাদশাহের নিকট পরোক্ষ নিন্দে করা, যাকাত দেয়া বন্ধ করা, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ না করা, কুরআন কারীম শিক্ষা করে ভুলে যাওয়া, প্রাণীকে আগুন দ্বারা পুড়িয়ে ফেলা, বিনা ওযরে স্ত্রীর তার স্বামীর নিকটে না যাওয়া, আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হওয়া, তাঁর মকর হতে নির্ভয় হওয়া, আলেম ও কারীদের ক্ষতিসাধন করা, যিহার করা (যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ এরূপ কোন নারীর কোন অঙ্গের সঙ্গে স্ত্রীর তুলনা করাকে যিহার বলে। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বলে অর্থাৎ (আরবী) তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত), শূকরের গোশত ভক্ষণ করা এবং মৃত জিনিস খাওয়া। তবে খুবই প্রয়োজন বোধে মৃত জন্তুর গোশত খেলে সেটা অন্য কথা।ইমাম রাফেঈ (রঃ) বলেন যে, এগুলোর কয়েকটির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বড় বড় গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনীষীগণ বহু গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। আমাদের শায়েখ হাকিম আবু আবদুল্লাহ যাহরী (রঃ) একটি পুস্তক লিখেছেন, যার মধ্যে তিনি সত্তরটি কাবীরা গুনাহর সংখ্যা দিয়েছেন। এও বলা হয়েছে যে, কাবীরা গুনাহ্ হচ্ছে ঐগুলো যেগুলোর উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এ প্রকারের গুনাহই যদি গণনা করা যায় তবে বহু গুনাহই বেরিয়ে যাবে। আর যদি কাবীরা গুনাহ্ ঐ (ধরনের) কাজের প্রত্যেকটিকে বলা হয় যা হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দূরে থাকতে বলেছেন তবে তো কাবীরা গুনাহ্ অসংখ্য হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন।

আন-নিসা 4:32

হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পুরুষ লোকেরা জিহাদে অংশগ্রহণ করে থাকে, আর আমরা নারীরা এ পুণ্য হতে বঞ্চিত থাকি। অনুরূপভাবে মীরাসও আমরা পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক পেয়ে থাকি। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (জামেউত তিরমিযী) অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এর পরে আবার (৩:১৯৫) (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, নারীরা নিম্নরূপ আকাঙ্খ পোষণ করেছিলঃ ‘আমরা যদি পুরুষ হতাম তবে তো আমরাও জিহাদে অংশগ্রহণ করতাম।' আরও একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একটি স্ত্রীলোক নবী (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, “দেখুনতো একজন পুরুষ দু'জন স্ত্রীর সমান অংশ পেয়ে থাকে, দু’জন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান মনে করা হয়, তাছাড়া আমলের ব্যাপারেও এরূপ যে, পুরুষের জন্যে একটি পুণ্য এবং নারীর জন্যে অর্ধপুণ্য।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।সুদ্দী (রঃ) বলেন, পুরুষ লোকেরা বলেছিল, আমরা যখন দ্বিগুণ অংশের মালিক তখন আমরা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হবো না কেন? আর ঐ দিকে স্ত্রীলোকেরা বলেছিল, “আমাদের উপর তো জিহাদ ফরযই নয় তবে আমরা শাহাদাতের পুণ্য লাভ করবো না কেন?' এতে আল্লাহ তা'আলা উভয়কেই বাধা দেন এবং বলেন-“তোমরা আমার অনুগ্রহ যাঞা করতে থাক।হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করেছেন-“মানুষ যেন এ আশা পোষণ না করে যে, যদি অমুক ব্যক্তির মাল ও সন্তান আমার হতো। এর উপর এ হাদীস দ্বারা কোন অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে না যাতে রয়েছে যে, ঈর্ষার যোগ্য মাত্র দু’জন। এক ঐ ধনী ব্যক্তি যে স্বীয় মাল আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, আর অন্য ব্যক্তি বলে, 'যদি আমারও মাল থাকতো তবে আমিও এরূপ ভাবে তা আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ করতে থাকতাম। অতএব দু' ব্যক্তিই পুণ্য লাভের ব্যাপারে সমান। কেননা এটা নিষিদ্ধ নয়। অর্থাৎ এরূপ পুণ্য লাভের লোভ দুষণীয় নয়। এখানে এরূপ জিনিস এরূপ পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে লাভ করার আকাঙ্খা রয়েছে যা প্রশংসনীয়। আর ওখানে অপরের জিনিস নিজের অধিকারে নিয়ে নেয়ার নিয়ত রয়েছে যা সব সময়ই নিন্দনীয়। সুতরাং এরূপভাবে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অনুগ্রহ যাঞা করা নিষিদ্ধ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, প্রত্যেককেই তার কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে। ভাল কার্যের প্রতিদান ভাল এবং মন্দ কার্যের প্রতিদান মন্দ হবে। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, সকলকেই তাদের হক অনুযায়ী উত্তরাধিকার প্রদান করা হবে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আমার নিকট আমার অনুগ্রহ যাজ্ঞা করতে থাক, পরস্পর একে অপরের ফযীলত চাওয়া অনর্থক হবে। হ্যা, তবে আমার নিকট যদি আমার অনুগ্রহ যাজ্ঞা কর তবে আমি কৃপণ নই, বরং আমি দাতা, সুতরাং আমি দান করবো এবং অনেক কিছুই দান করবো।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর অনুগ্রহ যাজ্ঞা কর। তার নিকট চাওয়া তিনি খুব পছন্দ করেন। জেনে রেখো যে, সবচেয়ে বড় ইবাদত হচ্ছে প্রশস্ততা ও করুণার জন্যে অপেক্ষা করা এবং তার প্রতি আশা রাখা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ আশা পোষণকারীকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী। কে পাওয়ার যোগ্য এবং কে দারিদ্রের যোগ্য, কে পারলৌকিক নিআমতের দাবীদার, আর কে তথায় লাঞ্ছিত হওয়ার যোগ্য তা তিনিই খুব ভাল জানেন। তাকে তিনি তার আসবাব ও মাধ্যম জোগাড় করে দেন এবং তার জন্যে তা সহজ করে দেন।

আন-নিসা 4:33

বহু মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ‘উত্তরাধিকারী'। কারও কারও মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘আসাবা'। পিতৃব্য পুত্রদেরকেও ‘মাওলা বলা হয়। যেমন হযরত ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবী) সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হল এই যে, হে জনগণ! তোমাদের মধ্য হতে প্রত্যেকের জন্যে আমি আসাবা বানিয়ে দিয়েছি যারা সে মালের উত্তরাধিকারী হবে যা তাদের পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে যাবে। আর যারা তোমাদের মুখের ভাই তাদেরকে তাদের উত্তরাধিকারের অংশ প্রদান কর। যেমন শপথের সময় তোমাদের মধ্যে অঙ্গীকার হয়েছিল।এটা ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের নির্দেশ। পরে এটা রহিত হয়ে যায় এবং নির্দেশ দেয়া হয় যে, যাদের সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছে সে অঙ্গীকার ঠিক রাখতে হবে এবং তাদেরকে ভুলে যাওয়া চলবে না, কিন্তু তারা মীরাস পাবে না। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে উত্তরাধিকারী। আর পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, মুহাজিরগণ যখন মদীনায় আগমন করেন তখন তথাকার প্রথা অনুযায়ী তাঁরা তাঁদের আনসার ভাইদের উত্তরাধিকারী হতেন এবং আনসারদের আত্মীয়-স্বজন তাঁদের উত্তরাধিকারী হতেন না। সুতরাং এ আয়াত দ্বারা উক্ত প্রথা রহিত হয়ে যায় এবং তাদেরকে বলা হয়-'তোমরা তোমাদের ভাইদেরকে সাহায্য কর, তাদের উপকার কর এবং তাদের মঙ্গল কামনা কর। কিন্তু তারা তোমাদের মীরাস পাবে না। হ্যা, তবে তোমরা তাদের জন্য অসিয়ত করে যাও।' ইসলামের পূর্বে প্রথা ছিল এই যে, দুই ব্যক্তি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে বলতো, আমি তোমার উত্তরাধিকারী।' এভাবে আরব গোত্রগুলো অঙ্গীকার ও চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে পড়তো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অজ্ঞতার যুগের শপথ এবং অঙ্গীকার ও চুক্তিকে ইসলাম আরও দৃঢ় করেছে। কিন্তু এখন ইসলামে শপথ এবং এ প্রকারের আহাদ ও অঙ্গীকার নেই। ঐগুলোকে এ আয়াতটি রহিত করে দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যক্তিদের তুলনায় আত্মীয়-স্বজনগণই আল্লাহর কিতাবের নির্দেশক্রমে বেশী উত্তম।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইসলামে শপথ নেই এবং অজ্ঞতা যুগের প্রত্যেক শপথর্কে ইসলাম আরও দৃঢ় করেছে। যদি আমাকে লাল রঙের উটও দেয়া হয় এবং ঐ শপথকে ভেঙ্গে দিতে বলা হয় যা দারুন নদওয়ায় করা হয়েছিল, তথাপি আমি তা পছন্দ করবো না।' হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি বাল্যকালে মুতায়্যাবাইনের’ শপথের সময় আমার মাতুলদের সাথে ছিলাম। সুতরাং আমি লাল রঙের উট পেলেও সে শপথকে ভেঙ্গে দেয়া পছন্দ করবো না। সুতরাং এটা স্মরণ রাখার যোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরাইশ ও আনসারের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন তা ছিল শুধুমাত্র প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করার জন্যে। হযরত কায়েস ইবনে আ’সেম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কসম' সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘অজ্ঞতার যুগে যে কসম ছিল তা তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকবে, কিন্তু ইসলামে কসম নেই।'হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলামে হলফ’ নেই, কিন্তু অজ্ঞতা যুগের হলফকে ইসলাম দৃঢ় করেছে।' মক্কা বিজয়ের দিনেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে স্বীয় ভাষণে এ কথাই ঘোষণা করেছিলেন।হযরত দাউদ ইবনে হুসাইন (রঃ) বলেন, আমি হযরত উম্মে সা’দ বিনতে রুবায়ের (রাঃ) নিকট কুরআন কারীম পাঠ করতাম। আমার সাথে তাঁর পৌত্র মূসা ইবনে সা’দও (রঃ) পড়তেন। হযরত উম্মে সা'দ (রাঃ) পিতৃহীনা অবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ক্রোড়ে লালিত পালিত হয়েছিলেন। আমি এ আয়াতের (আরবী) পাঠ করি। তখন শিক্ষিকা আমাকে বাধা দিয়ে বলেনঃ (আরবী) পড়। জেনে রেখ যে, এ আয়াতটি হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং তাঁর পুত্র হযরত আবদুর রহমান (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) প্রথমে ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাই হযরত আবু বকর (রাঃ) শপথ করে বলেনঃ “আমি তাকে উত্তরাধিকারী করবো না। অতঃপর যখন তিনি মুসলমানদের তরবারীর চাপে বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হয় যে, তিনি যেন স্বীয় পুত্র আবদুর রহমানকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত না করেন। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। প্রথমটিই সঠিক উক্তি।মোটকথা, এ আয়াত এবং হাদীসসমূহ দ্বারা ঐ মনীষীদের উক্তি খণ্ডন করা হচ্ছে যারা শপথ ও অঙ্গীকারের উপর ভিিত্ত করে এখনও উত্তরাধিকার দেয়ার পক্ষপাতি। যেমন ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরদের এ ধারণা রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু সঠিক মাযহাব হচ্ছে জমহুরের মাযহাব এবং ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মাযহাবও সঠিকই বটে।অতএব, উল্লিখিত আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হচ্ছে তার আত্মীয়-স্বজন, অন্য কেউ নয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ অংশীদার উত্তরাধিকারীদেরকে তাদের অংশ মুতাবিক অংশ দিয়ে বাকী যা থাকবে তা আসাবাগণ পাবে। উত্তরাধিকারী হচ্ছে ওরাই যাদের বর্ণনা ফারায়েযের দু'টি আয়াতে রয়েছে। আর যাদের সঙ্গে তোমরা দৃঢ়চুক্তি ও অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে (অর্থাৎ এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে) তাদেরকে মীরাস প্রদান কর।' এর পরে যে হলফ হবে তা ক্রিয়াশীল মনে করা হবে না। আবার এও বলা হয়েছে যে, অঙ্গীকার ও শপথ এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই হোক বা পরেই তোক নির্দেশ একই যে, যাদের সাথে অঙ্গীকার করা হবে। তারা মীরাস পাবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে তাদের অংশ হচ্ছে সাহায্য সহানুভূতি, মঙ্গল কামনা এবং অসিয়ত-মীরাস নয়। তিনি বলেন, ‘জনগণ অঙ্গীকার ও চুক্তি করতো যে, তাদের মধ্যে যে প্রথমে মারা যাবে অপর জন তার ওয়ারিস হবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা (আরবী) এ আয়াতটি অবতীর্ণ করে নির্দেশ দেন যে, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন একে অপরের সাথে বেশী সম্পর্কযুক্ত, তবে তোমরা তোমাদের বন্ধুদের সাথে সদ্ব্যবহার কর। (৩৩:৬) অর্থাৎ তাদের জন্যে যদি এক তৃতীয়াংশ মাল অসিয়ত করে যাও তবে তা বৈধ। সুপরিচিত ও সুপ্রসিদ্ধ কাজও এটাই। পূর্ববর্তী আরো বহু মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি (আরবী)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে তাদের অংশ দাও’ -এর ভাবার্থ হচ্ছে মীরাস। হযরত আবু বকর (রাঃ) একটি লোককে স্বীয় ‘মাওলা' বানিয়েছিলেন এবং তাকে উত্তরাধিকারী করেছিলেন। হযরত ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবর্তীণ হয় নিজেদের পুত্রদের ছাড়া অন্যদেরকে নিজেদের পুত্র বানিয়ে নিতে এবং তাদেরকে তাদের সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলে সাব্যস্ত করতো। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের অংশ অসিয়তের মাধ্যমে দিতে বলেছেন এবং মীরাস দিতে বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজনদেরকে। আল্লাহ তা'আলা শুধু মুখের ও পালিত পুত্রদেরকে মীরাস দিতে নিষেধ করেছেন এবং খুব অপছন্দও করেছেন। তবে তাদেরকে অসিয়তের মাধ্যমে দিতে বলেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, আমার নিকট মনোনীত উক্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে অংশ দাও’ -এর ভাবার্থ হচ্ছে-তাদেরকে সাহায্য সহানুভূতির অংশ দাও। কিন্তু এটা নয় যে, তাদেরকে তাদের মীরাসের অংশ দাও। এ অর্থ করলে আয়াতটিকে মানসুখ' বলার কোন কারণ থাকে না বা একথা বলারও প্রয়োজন হয় না যে, এ নির্দেশ পূর্বে ছিল এখন নেই। বরং আয়াত শুধু ঐ কথার নির্দেশ করেছে যে, তোমাদের মধ্যে একে অপরের সাহায্য সহানুভূতি করার যে অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা পূরণ কর। সুতরাং এ আয়াতটি ‘মুহকাম’ ও রহিতহীন। কিন্তু ইমাম সাহেবের এ উক্তির ব্যাপারে কিছু চিন্তার বিষয় রয়েছে। কেননা, এটা নিঃসন্দেহ যে, কতগুলো অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি শুধু সাহায্য সহানুভূতির উপরই হতো। কিন্তু এতেও সন্দেহ নেই যে, কতগুলো অঙ্গীকার মীরাসের উপরও হতো। যেমন পূর্ববর্তী বহু গুরুজন হতে বর্ণিত হয়েছে এবং যেমন হযরত ইবনে আববাস (রাঃ)-এর তাফসীরেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মুহাজিরগণ আনসারদের উত্তরাধিকারী হতেন এবং তাদের আত্মীয়গণ উত্তরাধিকারী হতেন না। অবশেষে এটা রহিত হয়ে যায়। তাহলে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একথা কিরূপে বলতে পারেন যে, এ আয়াতটি মুহকাম ও রহিতহীন? এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আন-নিসা 4:34

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন যে, পুরুষ হচ্ছে স্ত্রীর নেতা। সে স্ত্রীকে সোজা ও ঠিক-ঠাককারী। কেননা, পুরুষ স্ত্রীর উপর মর্যাদাবান। এ কারণেই নবুওয়াত পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অনুরূপভাবে শরীয়তের নির্দেশ অনুসারে খলীফা একমাত্র পুরুষই হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ সব লোক কখনও মুক্তি পেতে পারেন না যারা কোন নারীকে তাদের শাসনকত্রী বানিয়ে নেয়। (সহীহ বুখারী) এরূপভাবে বিচারপতি প্রভৃতি পদের জন্যেও শুধু পুরুষেরাই যোগ্য। নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা লাভের দ্বিতীয় কারণ এই যে, পুরুষেরা নারীদের উপর তাদের মাল খরচ করে থাকে, যে খরচের দায়িত্ব কিতাব ও সুন্নাহ তাদের প্রতি অর্পণ করেছে। যেমন মোহরের খরচ, খাওয়া পরার খরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ। সুতরাং জন্মগতভাবেও পুরুষ স্ত্রী অপেক্ষা উত্তম এবং উপকারের দিক দিয়েও পুরুষের মর্যাদা স্ত্রীর উপরে। এ জন্যেই স্ত্রীর উপর পুরুষকে নেতা বানানো হয়েছে। অন্য জায়গা রয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর (স্ত্রীদের) পুরুষদের মর্যাদা রয়েছে।' (২:২২৮) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এ আয়াতের ভাবার্থ এই যে, নারীদেরকে পুরুষদের আনুগত্য (স্বীকার করতে হবে এবং তাদের কাজ হচ্ছে সন্তানাদির রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং স্বামীর মালের হিফাযত করা ইত্যাদি।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন, একটি স্ত্রীলোক নবী (সঃ)-এর সামনে স্বীয় স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে, তার স্বামী থাকে থাপ্পড় মেরেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতিশোধ নেয়ার হুকুম প্রায় দিয়েই ফেলেছিলেন, এমন সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং প্রতিশোধ গ্রহণ হতে বিরত রাখা হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার স্বামী আমাকে চড় মেরেছে। ওর চিহ্ন এখনও আমার চেহারায় বিদ্যমান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তার এ অধিকার ছিল না। সেখানেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি চেয়েছিলাম এক রকম এবং আল্লাহ তা'আলা চাইলেন অন্য রকম।”হযরত শা’বী (রাঃ) বলেন যে, মাল খরচ করার ভাবার্থ হচ্ছে মোহর আদায় করা। দেখা যায় যে, পুরুষ যদি স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেয় তবে লেআনের (একের অপরকে অভিশাপ দেয়াকে ‘লে আন’ বলে) হুকুম রয়েছে। পক্ষান্তরে যদি স্ত্রী স্বামীর সম্পর্কে একথা বলে এবং প্রমাণ করতে না পারে তবে স্ত্রীকে চাবুক মারা হয়। অতএব, নারীদের মধ্যে সতী সাধ্বী হচ্ছে ঐ নারী, যে তার স্বামীর মাল রক্ষণাবেক্ষণ করে, যা রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম ঐ নারী যখন তার স্বামী তার দিকে তাকায় তখন সে তাকে সন্তুষ্ট করে, যখন কোন নির্দেশ দেয় তখন তা পালন করে এবং যখন সে বিদেশে গমন করে তখন সে নিজেকে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ। হতে নিরাপদে রাখে ও স্বীয় স্বামীর মালের হিফাযত করে।”অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে, রমযানের রোযা রাখবে, স্বীয় গুপ্তাঙ্গের হিফাযত করবে এবং স্বামীকে মেনে চলবে, তাকে বলা হবে-যে কোন দরজা দিয়ে চাও জান্নাতে প্রবেশ কর।”এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-যেসব নারীর দুষ্টামিকে তোমরা ভয় কর, অর্থাৎ যারা তোমাদের উপরে হতে চায়, তোমাদের অবাধ্যাচরণ করে, তোমাদেরকে কোন গুরুত্ব দেয় না এবং তোমাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তাদেরকে তোমরা প্রথমে মুখে উপদেশ প্রদান কর, নানা প্রকারে তাদের অন্তরে তাওয়া সৃষ্টি কর, স্বামীর অধিকারের কথা তাদেরকে বুঝিয়ে দাও। তাদেকে বল-দেখ, স্বামীর এত অধিকার রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যদি কাউকে আমি এ নির্দেশ দিতে পারতাম যে, সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করবে তবে নারীকে নির্দেশ দিতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। কেননা, তার উপর সবচেয়ে বড় হক তারই রয়েছে।'সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন লোক তার স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করে এবং সে অস্বীকার করে তখন সকাল পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।' সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে রাত্রে কোন স্ত্রী রাগান্বিত হয়ে স্বামীর বিছানা পরিত্যাগ করে, সকাল পর্যন্ত আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করতে থাকে।তাই এখানে ইরশাদ হচ্ছে-এরূপ অবাধ্য নারীদেরকে প্রথমে বুঝাতে চেষ্টা কর অথবা বিছানা হতে পৃথক রাখ। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, “অর্থাৎ শয়ন-তো বিছানার উপরেই করাবে, কিন্তু পার্শ্ব পরিবর্তন করে থাকবে এবং সঙ্গম করবে না। তার সাথে কথা বলাও বন্ধ রাখতে পারো এবং স্ত্রীর জন্য এটাই হচ্ছে বড় শাস্তি।” কোন কোন তাফসীরকারকের মতে তাকে পার্শ্বে শুতেও দেবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “স্ত্রীর তার স্বামীর উপর কি হক রয়েছে?” তিনি বলেনঃ “যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরবে তখন তাকেও পরাবে, তার মুখে মেরো না, গালি দিও না, ঘর হতে পৃথক করো না, ক্রোধের সময় যদি শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে কথা বন্ধ কর তথাপি তাকে ঘর হতে বের করো না।” অতঃপর বলেনঃ “তাতেও যদি ঠিক না হয় তবে তাকে শাসন-গর্জন করে এবং মেরে-পিটেও সরল পথে আনয়ন কর।সহীহ মুসলিমে নবী (সঃ)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণে রয়েছেঃ নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তারা তোমাদের সেবিকা ও অধীনস্থা। তাদের উপর তোমাদের হক এই যে, যাদের যাতায়াতে তোমরা অসন্তুষ্ট তাদেরকে তারা আসতে দেবে না। যদি তারা এরূপ না করে তবে তোমরা তাদেরকে যেন-তেন প্রকারে সতর্ক করতে পার। কিন্তু তোমরা তাদেরকে কঠিনভাবে প্রহার করতে পার না, যে প্রহারের চিহ্ন প্রকাশ পায়। তোমাদের উপর তাদের হক এই যে, তোমরা তাদেরকে খাওয়াবে ও পরাবে এবং এমন প্রহার করা উচিত নয় যার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে, কোন অঙ্গ ভেঙ্গে যায় কিংবা কোন অঙ্গ আহত হয়।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “এরপরও যদি তারা বিরত না হয় তবে ক্ষতিপূরণ নিয়ে তালাক দিয়ে দাও। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহর দাসীদেরকে প্রহার করো না।' এরপর একদা হযরত উমার ফারূক (রাঃ) এসে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নারীরা আপনার এ নির্দেশ শুনে তাদের স্বামীদের উপর বীরত্বপনা দেখানো আরম্ভ করেছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে মারার অনুমতি দেন। তখন পুরুষদের পক্ষ হতে বেদম মারপিট শুরু হয়ে যায় এবং বহু নারী অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ জেনে রেখ যে, আমার নিকট নারীদের অভিযোগ পৌছেছে। মনে রেখ যে, যারা স্ত্রীদের উপর , শক্তি প্রয়োগ করে তারা ভাল মানুষ নয়।' (সুনান-ই-আবি দাউদ)হযরত আশআস (রঃ) বলেন, একদা আমি হযরত উমার (রাঃ)-এর আতিথ্য গ্রহণ করি। ঘটনাক্রমে সে দিন তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু তিক্ততার সৃষ্টি হয়। হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় পত্নীকে প্রহার করেন, অতঃপর আমাকে বলেন, হে আশআস (রাঃ)! তিনটি কথা স্মরণ রেখ, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে স্মরণ রেখেছি। এক তো এই যে, স্বামীকে জিজ্ঞেস করতে হবে না যে, তিনি স্বীয় স্ত্রীকে কেন মেরেছেন। দ্বিতীয় এই যে, বিতরের নামায না পড়ে শুতে হবে না। তৃতীয় কথাটি বর্ণনাকারীর মনে নেই। (সুনান-ই-নাসাঈ) অতঃপর বলেন, তখন যদি নারীরা তোমাদের বাধ্য হয়ে যায় তবে তোমরা তাদের প্রতি কোন কঠোরতা অবলম্বন করো না, মারপিট করো না এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশও করো না।‘আল্লাহ সমুন্নত ও মহীয়ান।' অর্থাৎ যদি নারীদের পক্ষ হতে দোষত্রুটি প্রকাশ পাওয়া ছাড়াই বা দোষত্রুটি করার পর সংশোধিত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তোমরা তাদেরকে শাসন-গর্জন কর, তবে জেনে রেখ যে, তাদেরকে সাহায্য করা ও তাদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা রয়েছেন এবং নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাবান।

আন-নিসা 4:35

উপরে ঐ অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, অবাধ্যতা ও বক্রতা যদি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয়। আর এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয় হচ্ছে যে, যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের প্রতি বিরূপ মত পোষণ করে তবে কি করতে হবে? এ ব্যাপারে উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, এরূপ অবস্থায় শাসনকর্তা একজন নির্ভরযোগ্য ও বুদ্ধিমান বিচারক নিযুক্ত করবেন। যিনি দেখবেন যে, অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি কার পক্ষ হতে হচ্ছে। অতঃপর তিনি অত্যাচারীকে অত্যাচার হতে বাধা দান করবেন। যদি এর দ্বারা কোন সন্তোষজনক ফল পাওয়া না যায় তবে শাসনকর্তা স্ত্রীর পক্ষ হতে একজন ও পুরুষের পক্ষ হতে একজন বিচারক নির্ধারণ করবেন এবং তাঁরা দুজন মিলিতভাবে বিষয়টি যাচাই করে দেখবেন। অতঃপর যাতে তারা মঙ্গল বিবেচনা করবেন সে মীমাংসাই করবেন। অর্থাৎ হয় তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনয়ন করবেন, না হয় মিলন ঘটিয়ে দেবেন। কিন্তু শরীয়তের প্রচারক (সঃ) তো ঐ কাজের দিকেই আগ্রহ উৎপাদন করেছেন যে, তাঁরা যেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিলন ঘটাবারই যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। বিচারকদ্বয়ের যাচাইয়ে যদি স্বামীর দিক হতে অন্যায় প্রমাণিত হয় তবে তারা এ স্ত্রীকে তার স্বামী হতে পৃথক করে রাখবেন এবং স্বামীকে বাধ্য করবেন যে, সে। যেন তার চরিত্র ভাল না করা পর্যন্ত স্বীয় স্ত্রী হতে পৃথক থাকে এবং তার খরচ বহন করে। আর যদি দুষ্টামি স্ত্রীর দিক হতে প্রমাণিত হয় তবে তারা তার স্বামীকে খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন না, বরং স্ত্রীকেই করবেন। অনুরূপভাবে যদি বিচারকদ্বয় তালাকের ফায়সালা করেন তবে স্বামী তালাক দিতে বাধ্য হবে। আর যদি তারা তাদের পরস্পরেই বসবাসের ফায়সালা করেন। তবে সেটাও তাদেরকে মানতে হবে। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তো বলেন যে, সালিসদ্বয় যদি তাদেরকে একত্রীকরণের ফায়সালা করেন এবং সে ফায়সালা একজন মেনে নেয় ও অপরজন না মানে আর ঐ অবস্থাতেই একজনের মৃত্যু হয়ে যায় তবে যে সম্মত ছিল সে অসম্মত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু যে অসম্মত ছিল সে সম্মত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে না। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)এ রকমই একটি বিবাদে হযরত উসমান (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে সালিস নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বলেন, তোমরা যদি তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে চাও তবে সংযোগ স্থাপিত হয়ে যাবে। আর যদি বিচ্ছেদ আনয়নের ইচ্ছে কর তবে বিচ্ছেদই হয়ে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আকীল ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হযরত ফাতিমা বিনতে উত্মা ইবনে রাবিআ’ (রাঃ)-কে বিয়ে করেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) হযরত আকীল (রাঃ)-কে বলেন, তুমি আমার নিকট আসবেও এবং আমি তোমার খরচও বহন করবো। তখন এই ঘটতে থাকে যে, হযরত আকীল (রাঃ) যখন হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর নিকট আসার ইচ্ছে করতেন তখন তিনি (ফাতিমা রাঃ) জিজ্ঞেস করতেন, উৎকী ইবনে রাধিকা এবং “শাইবা ইবনে রাবীআ' কোথায় রয়েছে? হযরত আকীল (রাঃ) বলতেন, “তোমার বাম পার্শ্বে জাহান্নামে রয়েছে। এতে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কুপিতা হয়ে স্বীয় কাপড় ঠিক করে নিতেন (অর্থাৎ অনাবৃত দেহ বস্ত্রে আবৃত করতেন)। একদিন হযরত আকীল (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। হযরত উসমান (রাঃ) এতে হৈসে উঠেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে তাদের সালিস নিযুক্ত করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তো বলছিলেন যে, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনয়ন করা হোক। কিন্তু হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) বলেছিলেন, “আমি বান্ ‘আবদ-ই-মানাফের মধ্যে এ বিচ্ছেদ অপছন্দ করি। তখন তারা হযরত আকীল (রাঃ)-এর গৃহে আগমন করেন। এসে দেখেন যে, দরজা কন্ধ রয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রী দু'জনই ভেতরে রয়েছেন। তখন তারা ফিরে আসেন।মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাকে রয়েছে যে, আলী (রাঃ)-এর খিলাফতকালে এক দম্পত্তি মনোমালিন্যের ঝগড়া নিয়ে হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। উভয়ের সাথে নিজ উভয় দল হতে একজন করে লোক বেছে নিয়ে তাদেরকে সালিস নিযুক্ত করেন। অতঃপর তিনি সালিসদ্বয়কে বলেন, “তোমাদের কাজ কি তা তোমরা জান কি? তোমাদের কাজ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে একত্রিত করণ বা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান। একথা শুনে স্ত্রী বলে, আমি আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্তের উপর সম্মত রয়েছি, সেটা হয় সংযোগ হোক, না হয় বিচ্ছেদই হোক। কিন্তু স্বামী বলে, বিচ্ছেদে আমি সম্মত নই। তাতে হযরত আলী (রাঃ) বলেন, না, না। আল্লাহর শপথ! তোমাকে দু'টোতেই সম্মত হতে হবে। অতএব, আলেমদের ইজমা হয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় ঐ সালীসদ্বয়ের দু’টোরই স্বাধীনতা রয়েছে। এমনকি হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) ৱলেন যে, তাঁরা ইচ্ছে করলে দু'টি বা তিনটি তালাকও দিতে পারেন। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হ্যাঁ, তবে হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, তাদের একত্রিকরণের অধিকার রয়েছে বটে, কিন্তু বিচ্ছেদ করণের অধিকার নেই। হযরত কাতাদা (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। ইমাম আহমাদ (রঃ), আবু সাউর এবং (রঃ) দাউদেরও মাযহাব এটাই। তাদের দলীল হচ্ছে- (আরবী) যুক্ত আয়াতটি। কেননা, এতে বিচ্ছেদের উল্লেখ নেই। হ্যা, তবে যদি তাঁরা দু’জন দু’পক্ষ হতে ওয়াকীলু (উকিল) নির্বাচিত হন তবে অবশ্যই তাদের সংযোগ ও বিচ্ছেদ দু'টোরই অধিকার রয়েছে। আর এতে কারও বিরোধ নকল করা হয়নি। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এ দু’জন সালীস শাসনকর্তার পক্ষ হতে নিযুক্ত হবেন এবং তার পক্ষ হতেই ফায়সালা করবেন, যদিও তাতে উভয়পক্ষ অসম্মত থাকে। অথরা সালীসদ্বয়, স্বামী ও স্ত্রীর পক্ষ হতে ওয়াকীল (উকিল) নির্বাচিত হবেন। জমহূরের মাযহাব হচ্ছে প্রথমটি। তাদের দলীল হচ্ছে এই যে, কুরআন হাকিম তাঁদের নাম ‘হাকাম রেখেছে এবং ‘হাকামে’র ফায়সালায় কেউ সন্তুষ্ট হোক আর অসন্তুষ্টই হোক সর্বাবস্থাতেই তাদের ফায়সালা শিরোধার্য।আয়াতের বাহ্যিক শব্দগুলো জমহুরের পক্ষেই রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর নতুন উক্তি এটাই এবং ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ও তাঁর সহচরদের এটাই উক্তি। দ্বিতীয় উক্তি যাদের তারা বলেন যে, যদি তারা ‘হাকামের অবস্থায় হতেন তবে. হযরত আলী (রাঃ) ঐ স্বামীকে কেন বললেন- তোমার স্ত্রী যখন দু' • অবস্থাকেই মেনে নিয়েছে তখন তুমি না মানলে তুমি মিথ্যবাদীরূপে সাব্যস্ত হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলারই জ্ঞান সবচেয়ে বেশী রয়েছে।ইমাম ইবনে বারুর (রঃ) বলেন, এ কথার উপর আলেমদের ইজমা হয়েছে যে, দু’জন সালীসের উক্তির মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দেবে তখন অপরের উক্তির উপর কোন গুরুত্ব দেয়া হবে না। একথার উপরও ইজমা হয়েছে যে, যদি সালীসদ্বয় সংযোগ স্থাপন করতে চান তবে তাঁদের ফায়সালা কার্যকরী হবে। কিন্তু যদি তারা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ, আনয়ন করতে চান তাহলেও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে কি-না সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু জমহুরের মাযহাব এটাই যে, সে সময়েও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে যদিও তাদেরকে ওয়াকীল (উকিল) বানানো না হয়।

আন-নিসা 4:36

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইবাদতের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং স্বীয় একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছেন এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করতে নিষেধ করছেন। কেননা, সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা, নিআমত প্রদানকারী এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের উপর সদা-সর্বদা ও সর্বাবস্থায় দানের বৃষ্টি বর্ষণকারী একমাত্র তিনিই। সুতরাং একমাত্র তিনিই হচ্ছেন ইবাদতের যোগ্য। হযরত মুআয (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “বান্দাদের উপর আল্লাহর হক কী তা জান কি?” তিনি উত্তরে বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) খুব ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তা হচ্ছে এই যে, বান্দা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “বান্দা যখন এটা করবে তখন আল্লাহর জিম্মায় তাদের হক কী রয়েছে তা জান কি? তা এই যে, তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।”আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে থাক। কেননা, তারাই তোমাদেরকে অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে আনয়ন করার কারণ। কুরআন কারীমের অনেক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গেই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং তোমার পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।" (৩১:১৪) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রভু এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমার একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।" (১৭:২৩) এখানেও এ নির্দেশ দেয়ার পর হুকুম দিচ্ছেন- “তোমরা তোমাদের আত্মীয়স্বজনদের সাথেও ভাল ব্যবহার কর।' যেমন হাদীস শরীফে এসেছেঃ “মিসকীনদের উপর সাদকা শুধ সাদকাই হয় এবং আত্মীয়দের উপর সাদকা। সাদকাও হয় এবং সাথে সাথে আত্মীয়তার সংযোগ স্থাপনও হয়।”অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে-‘তোমরা পিতৃহীনদের সাথেও উত্তম ব্যবহার কর। কেননা, তাদের দেখাশুনাকারী, তাদের মস্তকোপরি স্নেহের হস্তচালনাকারী, তাদেরকে সোহাগকারী এবং স্নেহ ও আদরের সাথে তাদেরকে পানাহারকারী দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেছে।' এরপর মিসকীনদের সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কেননা, তারা অভাবগ্রস্ত, রিক্ত হস্ত এবং পরমুখাপেক্ষী। তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তোমরা এ মিসকীনদের অভাব দূর কর এবং তাদের কাজকর্ম করে দাও।' ফকীর ও মিসকীনের পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-বারাআতে ইনশাআল্লাহ আসবে।এবারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রাখ। তাদের সাথে ভাল ব্যবহার কর। তারা সম্পর্কীয় প্রতিবেশীই হোক আর সম্পর্ক বিহীনই হোক, তারা মুসলমানই হোক বা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানই হোক।' এও বলা হয়েছে যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে স্ত্রী এবং (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সফরের বন্ধু। প্রতিবেশীদের ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। নিম্নে কিছু বর্ণিত হচ্ছে- (১) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে প্রতিবেশীদের সম্বন্ধে এত বেশী উপদেশ দেন যে, আমার ধারণা হয় তিনি প্রতিবেশীদেরকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।” (২) মুসনাদ-ইআহমাদেই রয়েছে, হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেনঃ “সঙ্গীদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট উত্তম সঙ্গী ঐ ব্যক্তি যে তার সঙ্গীর সাথে উত্তম ব্যবহার করে থাকে এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম প্রতিবেশী ঐ ব্যক্তি যে প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করে।” (৩) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে; হযরত উমর (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের উচিত নয় যে, সে প্রতিবেশীকে পরিতৃপ্ত না করে নিজে তৃপ্তি সহকারে আহার করে। (৪) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা স্বীয় সাহাবীবর্গকে জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যভিচার সম্বন্ধে তোমরা কি বল?” সাহাবীগণ বলেন, এটা অবৈধ। আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল (সঃ) ওটাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত এটা অবৈধই থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জেনে রেখ যে, দশজন নারীর সাথে ব্যভিচারকারী ব্যক্তি ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কম পাপী যে তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে।” পুনরায় তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা চুরি সম্বন্ধে কি বল? তারা উত্তরে বলেন, “ওটাকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) হারাম করেছেন এবং ওটাও কিয়ামত পর্যন্ত হারামই থাকবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “জেনে রেখ যে, যে চোর দশ বাড়ীতে চুরি করেছে তার পাপ ঐ চোরের পাপ হতে হালকা, যে তার প্রতিবেশীর ঘর হতে কিছু চুরি করে।” (৫) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোন্টি?” তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন কর, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বলি, তারপর কোনটি? তিনি বলেনঃ “তারপরে এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হও।” (৬) একজন আনসারী সাহাবী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হই। তথায় গিয়ে দেখি যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে আছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার মুখোমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তার কোন কাজ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং লোকটির সাথে কথাবার্তা চলছে। অধিক বিলম্ব হয়ে যায়। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্লান্তির ধারণা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। অনেকক্ষণ পর তিনি ফিরে আসেন এবং আমার নিকট আগমন করেন। আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি তো বহুক্ষণ ধরে আপনাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। আমি তো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। হয়তো আপনার পা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেনঃ “আচ্ছা তুমি তাকে দেখেছো?” আমি বলি, হ্যা খুব ভাল করে দেখেছি। তিনি বলেন, “তুমি কি জান তিনি কে ছিলেন? তিনি ছিলেন হর্ষরত জিবরাঈল (আঃ)। তিনি প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে আমার প্রতি চাপ সৃষ্টি করছিলেন। তিনি তাদের এত বেশী হক বর্ণনা করেন যে, আমার মনে সন্দেহ হয়, না জানি আজ তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারীই বানিয়ে দেন।” অতঃপর তিনি বলেন, “তুমি যদি তাকে সালাম করতে তবে অবশ্যই তিনি তোমার সালামের উত্তর দিতেন।(মুসনাদই-আহমাদ) (৭) মুসনাদ-ই-আদ ইবনে হামীদে রয়েছে, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, পল্লী অঞ্চল হতে একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐ জায়গায় নামায পড়ছিলেন যেখানে জানাযার নামায পড়া হতো। নামায শেষে ঐ লোকটি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অন্য একটি লোক যে আপনার সাথে নামায পড়ছিলেন তিনি কে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “তুমি তাঁকে দেখেছো?' লোকটি বলেন, 'হ্যাঁ'। তিনি বলেন, 'তুমি খুব উত্তম জিনিস দেখেছে। তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আঃ)।তিনি প্রতিবেশীর ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। আমার ধারণা হয় যে, অতিসত্বরই তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।”" (৮), আবু বকর আল বায (রঃ)-এর গ্রন্থে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “প্রতিবেশী তিন প্রকারের রয়েছেঃ (১) এক হক বিশিষ্ট অর্থাৎ নিম্নতম। (২) দু’ হক বিশিষ্ট এবং (৩) তিন হক বিশিষ্ট অর্থাৎ সর্বোচ্চ। এক হক বিশিষ্ট ঐ প্রতিবেশী যে মুশরিক এবং যার সঙ্গে কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। দু' হক বিশিষ্ট ঐ প্রতিবেশী যে মুসলমান, কিন্তু তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। তার এক হক হলো ইসলামের হক এবং দ্বিতীয় হক হচ্ছে প্রতিবেশীর হক। তিন হক বিশিষ্ট হচ্ছে ঐ প্রতিবেশী যে মুসলমান এবং তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কও রয়েছে। কাজেই তার প্রথম হক হলো ইসলামের হক, দ্বিতীয় হক হলো প্রতিবেশীর হক এবং তৃতীয় হক হলো আত্মীয়তার হক।”(৯) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমার দু'টি প্রতিবেশী রয়েছে। আমি একজনের কাছে উপঢৌকন পাঠাতে চাই, তাহলে কার কাছে পাঠাবো? তিনি উত্তরে বলেনঃ “যার দরজা নিকটে হবে।”(১০) তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করেন। জনগণ তার অযুর পানি নিয়ে শরীরে মলতে আরম্ভ করেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এরূপ করছো কেন? তাঁরা বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মহব্বতে'। তখন তিনি বলেনঃ ‘যে- এতে খুশী হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাকে ভালবাসেন সে যেন যখন কথা বলে তখন সত্য বলে, যখন আমানত দেয়া হয় তখন তা আদায় করে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে।'(১১) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সামনে প্রথম যে ঝগড়া পেশ করা হবে তা হবে দু’জন প্রতিবেশীর ঝগড়া।এরপর আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন-‘তোমরা পার্শ্ববর্তী সহচরের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার কর।' বহু তাফসীর কারকের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে স্ত্রী, আবার অনেকের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে সফরের সঙ্গী। এও বর্ণিত হয়েছে যে, সাধারণভাবে এর ভাবার্থ হচ্ছে বন্ধু ও সঙ্গী। সে সঙ্গী সফরেরই হোক বা বাড়ীর পার্শ্বেরই হোক। (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে অতিথি। আবার যে পথ চলতে চলতে থেমে গেছে এরূপ লোককেও ইবনুস সাবিল’ বলা হয়েছে। সুতরাং যদি অতিথিরও এ অর্থ নেয়া হয় যে সফরে চলতে চলতে অতিথি হয়ে গেছে তবে দু’টো এক হয়ে যায়। এরও পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-বারাআতে আসবে ইনশাআল্লাহ।অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের অধিকারী তাদের সঙ্গেও সৎ ব্যবহার কর। কেননা, ঐ গরীবেরা তো তোমাদের হাতে রয়েছে। তাদের উপর তো তোমাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কাজেই তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং সাধ্যানুসারে তাদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো স্বীয় মরণ রোগেও স্বীয় উম্মতকে এর জন্যে অসিয়ত করে গেছেন। তিনি বলেনঃ “হে লোক সকল! নামায ও দাসদের প্রতি খুব খেয়াল রাখবে।' বার বার তিনি একথা বলতেই থাকেন, অবশেষে তাঁর বাকশক্তি রহিত হয়ে যায়।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি নিজে যা খাও ওটাও সাদকা, যা তোমার সন্তানদেরকে খাওয়াও ওটাও সাদকা, যা তোমার স্ত্রীকে খাওয়াও ওটাও সাদকা এবং যা তোমার পরিচারককে খাওয়াও ওটাও সাদকা।”সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) স্বীয় দারোগাকে বলেন, “গোলামদেরকে তাদের আহার্য দিয়েছো কি?' তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেইনি।' তখন হযরত আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন, যাও, দিয়ে এসো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের জন্যে এ পাপই যথেষ্ট যে, সে যে আহার্যের মালিক তা সে আটকিয়ে রাখে।'সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ অধীনস্থ গোলামের হক এই-যে, তাকে খাওয়ানো, পান করানো ও পরানো হবে এবং তার দ্বারা তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নেয়া হবে না।'সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের কারও পরিচারক তার খাদ্য নিয়ে আসে তখন তোমাদের উচিত যে, যদি পার্শ্বে বসিয়ে খাওয়াতে না পার তবে কমপক্ষে তাকে দু' এক গ্লাস দিয়ে দেবে। তোমরা এটা খেয়াল রাখবে যে, রান্না করার গরম ও কষ্ট তাকেই ভোগ করতে হয়েছে। অন্য বর্ণনা রয়েছেঃ “তোমাদের উচিত তো এই যে, তাকে সঙ্গে বসিয়ে খাওয়াবে। যদি খাদ্য কম হয় তবে তাকে দু' গ্রাস দিয়ে দেবে।' তিনি বলেন, ‘তোমাদের গোলামও তোমাদের ভাই। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং যার অধীনে তার ভাই থাকবে তাকে যেন সে তার খাবার হতে খেতে দেয়, যা সে প্রবে তা হতে যেন তাকেও পরতে দেয়। তাদের দ্বারা এমন কাজ করিয়ে নেবে না যাতে তারা অসমর্থ হয়ে পড়ে। যদি এরূপ কোন কাজ এসেই পড়ে তবে নিজেরাও তাদেরকে সাহায্য করবে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘অহংকারীও আত্মাভিমানীকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন না। তারা নিজেদেরকে ভাল মনে করলেও আল্লাহ পাকের নিকট তারা আদৌ ভাল নয়। তারা নিজেদেরকে বড় ও সম্মানিত মনে করলেও আল্লাহ তা'আলার নিকট তারা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। জনগণের দৃষ্টিতেও তারা হেয় ও তুচ্ছ। তারা কত বড় অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ যে, কারও উপর কিছু অনুগ্রহ করলে তাকে সে অনুগ্রহের খোটা দেয়, কিন্তু তাদের প্রভুর যে নিআমত তাদের উপর রয়েছে তার জন্য তারা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। মানুষের মধ্যে বসে তারা গর্ব করে বলে আমি এত বড় লোক, আমার এটা আছে, ওটা আছে।হযরত আবু রাজা হারভী (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক দুশ্চরিত্র ব্যক্তি অহংকারী ও আত্মম্ভরী হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি পাপাচারী ও হতভাগা হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি (আরবী) (১৯:৩২) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আওয়াম ইবনে হাওশাবও (রঃ) এটাই বলেন।হযরত মাতরাফ (রঃ) বলেন, আমার নিকট হযরত আবু যার (রাঃ)-এর একটি বর্ণনা পৌছেছিল এবং আমার মনের বাসনা ছিল যে, কোন সময় নিজেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তার নিজেরই মুখে, বর্ণনাটি শুনবো। ঘটনাক্রমে একবার তার সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি তাকে বলি, আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করে থাকেন। হাদীসটি হচ্ছেঃ “আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার লোককে পছন্দ করেন এবং তিন প্রকার লোককে অপছন্দ করেন। হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন-“হ্যাঁ, এটা সত্য।আমি কি আমার বন্ধুর (সঃ) উপর মিথ্যা আরোপ করবো? এ কথা তিনি তিনবার বলেন, আমি তখন বলি আচ্ছা, ঐ তিন প্রকারের লোক কারা যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা কুপিত? তিনি বলেন, ‘অহংকারী ও আত্মাভিমানী ব্যক্তি। তারপরে তিনি বলেন-“এটা তো আপনি আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যেও পেয়ে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবী) (৪:৩৬)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। বানু হাজীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বলেনঃ কাপড় পায়ের গিঠের নীচে ঝুলিয়ে (লটকিয়ে) দিওনা। কেননা, এটা হচ্ছে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা যা আল্লাহ পাক পছন্দ করেন না।

আন-নিসা 4:37

৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- যারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির কার্যে মাল খরচ করতে কার্পণ্য করে, যেমন বাপ-মাকে প্রদান করতে এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কযুক্ত ও সম্পর্ক বিঙ্কন প্রতিবেশী, মুসাফির এবং দাস-দাসীকে অভাবের সময় আল্লাহর ওয়াস্তে দান করার কার্যে কার্পণ্য করে, শুধু তাই নয় বরং লোকদেরকেও কার্পণ্য শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ না। করার পরামর্শ দেয়, তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কার্পণ্য অপেক্ষা বড় রোগ আর কি হতে পারে? তিনি আরো বলেছেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা কার্পণ্য হতে বেঁচে থাক। এটাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর কারণেই তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতা, অন্যায় ও দুস্কার্য প্রকাশ পেয়েছিল। এরপর বলা হচ্ছে- তারা এ দু'টি দুঙ্কার্যের সাথে সাথে আরও একটি দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়। তা এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ গোপন করে, ঐগুলো প্রকাশ করে না। ঐগুলো না তাদের খাওয়া পরায় প্রকাশ পায় না। আদান-প্রদানে প্রকাশিত হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই মানুষ তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর নিশ্চয়ই সে নিজেই তার ঐ অবস্থা ও অভ্যাসের উপর সাক্ষী।' (১০০:৬-৭) তার পরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে মালের প্রেমে পাগল।' (১০০:৮) এখানেও বলা হয়েছে যে, সে আল্লাহর অনুগ্রহ গোপন করছে। এরপর তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কু' শব্দের অর্থ হচ্ছে গোপন করা এবং ঢেকে দেয়া। কৃপণও আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে গোপন করে, ওর উপরে পর্দা নিক্ষেপ করে, অর্থাৎ ঐ নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করে। সুতরাং সে নিয়ামতসমূহের অস্বীকারকারী হয়ে গেল। হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “আল্লাহ তা'আলা যখন কোন বান্দার উপর স্বীয় নি'আমত দান করেন তখন চান যে, ওর চিহ্ন যেন তার উপরে প্রকাশ পায়। নবী (সঃ)-এর প্রার্থনায় রয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নি'আমতের প্রতি কৃতজ্ঞ বানিয়ে দিন এবং তার কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ওগুলো গ্রহণকারী বানিয়ে দিন ও ঐগুলো আমাদের উপর পূর্ণভাবে দান করুন।পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি ইয়াহূদীদের ঐ কার্পণ্যের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে কার্পণ্য তারা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন করার ব্যাপারে করতো। এ জন্যেই এর শেষে রয়েছে-‘আমি কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।এ আয়াতটি যে ইয়াহূদীদের কার্পণ্যের ব্যাপারেও হতে পারে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু স্পষ্টতঃ এখানে মালের কৃপণতার কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে, যদিও ইলমের কৃপণতা এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। এটা ভুললে চলবে না যে, এ আয়াতে আত্মীয়-স্বজন ও দুর্বলদেরকে মাল প্রদানের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পরবর্তী আয়াতে লোকদেরকে দেখাবার জন্যে মাল প্রদানকারীদের নিন্দে করা হয়েছে। এখানে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ কৃপণদের যারা টাকা পয়সাকে দাঁত দিয়ে ধরে রাখে। তার পরে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ লোকদের যারা মাল খরচ তো করে বটে, কিন্ত অসৎ উদ্দেশ্যে ও দুনিয়ায় নাম নেয়ার জন্যে।যেমন হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “যে তিন প্রকারের লোকের জন্যে জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত করা হবে, তারা এ রিয়াকারগণই হবে। রিয়াকার আলেম, রিয়াকার গাযী এবং রিয়াকার দাতা। এ দাতা বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রত্যেক রাস্তায় স্বীয় মাল খরচ করেছিলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার ইচ্ছা তো শুধু এই ছিল যে, তুমি বড় দাতারূপে প্রসিদ্ধি লাভ কর। সুতরাং তা বলা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তোমার উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি লাভ। তা আমি তোমাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিয়েছি। কাজেই তুমি তোমার উদ্দেশ্য লাভ করেছ।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার পিতা স্বীয় দান দ্বারা যা চেয়েছিল তা সে পেয়ে গেছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে জাদ আনতো একজন বড় দাতা ছিল। সে দরিদ্র ও অভাবীদের সাথে বড়ই উত্তম ব্যবহার করতো এবং আল্লাহর নামে বহু গোলাম আযাদ করেছিল, সে কি এর কোন লাভ পাবে না?' তিনি বলেনঃ না, সে তো সারা জীবনে একদিনও বলেনি-“হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আমার পাপ মার্জনা করুন।এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আল্লাহ বলেন-আল্লাহ ও কিয়ামতের উপর তাদের বিশ্বাস নেই, নতুবা তারা শয়তানের ফাঁদে পড়তো না এবং খারাপকে ভালো মনে করতো না। তারা শয়তানের সঙ্গী। সঙ্গীর দুস্কার্যের উপর তাদের দুষ্কার্য চিন্তা করে নাও। একজন আরব কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না, বরং জিজ্ঞেস কর তার সাথী সম্বন্ধে, প্রত্যেক সাথী তার সাথীরই অনুসারী হয়ে থাকে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে- তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নে, সঠিক পথে চলতে, রিয়াকারী পরিত্যাগ করতে এবং ইখলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে কিসে বাধা দিচ্ছে? তাতে তাদের ক্ষতি কি আছে? বরং সরাসরি উপকারই রয়েছে। কারণ এর ফলে তাদের পরিণাম ভাল হবে। তারা আল্লাহর পথে খরচ করতে সংকীর্ণ মনোভাব প্রকাশ করছে কেন? তারা আল্লাহ তাআলার ভালবাসা ও সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করছে না কেন? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে খুব ভাল করেই জানেন। তাদের ভাল ও মন্দ নিয়তের জ্ঞান তাঁর পুরোপুরিই রয়েছে। ভাল কার্যের তাওফীক লাভ করার যোগ্য ও অযোগ্য সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান। ভাল লোকদেরকে তিনি ভাল কাজ করার তাওফীক প্রদান করতঃ স্বীয় সন্তুষ্টির কাজ তাদের দ্বারা করিয়ে নিয়ে তাদেরকে তার নৈকট্য দান করে থাকেন। পক্ষান্তরে মন্দ লোকদেরকে তিনি স্বীয় মহা মর্যাদাসম্পন্ন দরবার হতে দূরে সরিয়ে দেন। যার ফলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওটা হতে আশ্রয় দান করুন!

আন-নিসা 4:38

৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- যারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির কার্যে মাল খরচ করতে কার্পণ্য করে, যেমন বাপ-মাকে প্রদান করতে এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কযুক্ত ও সম্পর্ক বিঙ্কন প্রতিবেশী, মুসাফির এবং দাস-দাসীকে অভাবের সময় আল্লাহর ওয়াস্তে দান করার কার্যে কার্পণ্য করে, শুধু তাই নয় বরং লোকদেরকেও কার্পণ্য শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ না। করার পরামর্শ দেয়, তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কার্পণ্য অপেক্ষা বড় রোগ আর কি হতে পারে? তিনি আরো বলেছেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা কার্পণ্য হতে বেঁচে থাক। এটাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর কারণেই তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতা, অন্যায় ও দুস্কার্য প্রকাশ পেয়েছিল। এরপর বলা হচ্ছে- তারা এ দু'টি দুঙ্কার্যের সাথে সাথে আরও একটি দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়। তা এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ গোপন করে, ঐগুলো প্রকাশ করে না। ঐগুলো না তাদের খাওয়া পরায় প্রকাশ পায় না। আদান-প্রদানে প্রকাশিত হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই মানুষ তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর নিশ্চয়ই সে নিজেই তার ঐ অবস্থা ও অভ্যাসের উপর সাক্ষী।' (১০০:৬-৭) তার পরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে মালের প্রেমে পাগল।' (১০০:৮) এখানেও বলা হয়েছে যে, সে আল্লাহর অনুগ্রহ গোপন করছে। এরপর তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কু' শব্দের অর্থ হচ্ছে গোপন করা এবং ঢেকে দেয়া। কৃপণও আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে গোপন করে, ওর উপরে পর্দা নিক্ষেপ করে, অর্থাৎ ঐ নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করে। সুতরাং সে নিয়ামতসমূহের অস্বীকারকারী হয়ে গেল। হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “আল্লাহ তা'আলা যখন কোন বান্দার উপর স্বীয় নি'আমত দান করেন তখন চান যে, ওর চিহ্ন যেন তার উপরে প্রকাশ পায়। নবী (সঃ)-এর প্রার্থনায় রয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নি'আমতের প্রতি কৃতজ্ঞ বানিয়ে দিন এবং তার কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ওগুলো গ্রহণকারী বানিয়ে দিন ও ঐগুলো আমাদের উপর পূর্ণভাবে দান করুন।পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি ইয়াহূদীদের ঐ কার্পণ্যের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে কার্পণ্য তারা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন করার ব্যাপারে করতো। এ জন্যেই এর শেষে রয়েছে-‘আমি কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।এ আয়াতটি যে ইয়াহূদীদের কার্পণ্যের ব্যাপারেও হতে পারে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু স্পষ্টতঃ এখানে মালের কৃপণতার কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে, যদিও ইলমের কৃপণতা এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। এটা ভুললে চলবে না যে, এ আয়াতে আত্মীয়-স্বজন ও দুর্বলদেরকে মাল প্রদানের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পরবর্তী আয়াতে লোকদেরকে দেখাবার জন্যে মাল প্রদানকারীদের নিন্দে করা হয়েছে। এখানে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ কৃপণদের যারা টাকা পয়সাকে দাঁত দিয়ে ধরে রাখে। তার পরে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ লোকদের যারা মাল খরচ তো করে বটে, কিন্ত অসৎ উদ্দেশ্যে ও দুনিয়ায় নাম নেয়ার জন্যে।যেমন হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “যে তিন প্রকারের লোকের জন্যে জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত করা হবে, তারা এ রিয়াকারগণই হবে। রিয়াকার আলেম, রিয়াকার গাযী এবং রিয়াকার দাতা। এ দাতা বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রত্যেক রাস্তায় স্বীয় মাল খরচ করেছিলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার ইচ্ছা তো শুধু এই ছিল যে, তুমি বড় দাতারূপে প্রসিদ্ধি লাভ কর। সুতরাং তা বলা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তোমার উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি লাভ। তা আমি তোমাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিয়েছি। কাজেই তুমি তোমার উদ্দেশ্য লাভ করেছ।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার পিতা স্বীয় দান দ্বারা যা চেয়েছিল তা সে পেয়ে গেছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে জাদ আনতো একজন বড় দাতা ছিল। সে দরিদ্র ও অভাবীদের সাথে বড়ই উত্তম ব্যবহার করতো এবং আল্লাহর নামে বহু গোলাম আযাদ করেছিল, সে কি এর কোন লাভ পাবে না?' তিনি বলেনঃ না, সে তো সারা জীবনে একদিনও বলেনি-“হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আমার পাপ মার্জনা করুন।এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আল্লাহ বলেন-আল্লাহ ও কিয়ামতের উপর তাদের বিশ্বাস নেই, নতুবা তারা শয়তানের ফাঁদে পড়তো না এবং খারাপকে ভালো মনে করতো না। তারা শয়তানের সঙ্গী। সঙ্গীর দুস্কার্যের উপর তাদের দুষ্কার্য চিন্তা করে নাও। একজন আরব কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না, বরং জিজ্ঞেস কর তার সাথী সম্বন্ধে, প্রত্যেক সাথী তার সাথীরই অনুসারী হয়ে থাকে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে- তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নে, সঠিক পথে চলতে, রিয়াকারী পরিত্যাগ করতে এবং ইখলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে কিসে বাধা দিচ্ছে? তাতে তাদের ক্ষতি কি আছে? বরং সরাসরি উপকারই রয়েছে। কারণ এর ফলে তাদের পরিণাম ভাল হবে। তারা আল্লাহর পথে খরচ করতে সংকীর্ণ মনোভাব প্রকাশ করছে কেন? তারা আল্লাহ তাআলার ভালবাসা ও সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করছে না কেন? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে খুব ভাল করেই জানেন। তাদের ভাল ও মন্দ নিয়তের জ্ঞান তাঁর পুরোপুরিই রয়েছে। ভাল কার্যের তাওফীক লাভ করার যোগ্য ও অযোগ্য সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান। ভাল লোকদেরকে তিনি ভাল কাজ করার তাওফীক প্রদান করতঃ স্বীয় সন্তুষ্টির কাজ তাদের দ্বারা করিয়ে নিয়ে তাদেরকে তার নৈকট্য দান করে থাকেন। পক্ষান্তরে মন্দ লোকদেরকে তিনি স্বীয় মহা মর্যাদাসম্পন্ন দরবার হতে দূরে সরিয়ে দেন। যার ফলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওটা হতে আশ্রয় দান করুন!

আন-নিসা 4:39

৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- যারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির কার্যে মাল খরচ করতে কার্পণ্য করে, যেমন বাপ-মাকে প্রদান করতে এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কযুক্ত ও সম্পর্ক বিঙ্কন প্রতিবেশী, মুসাফির এবং দাস-দাসীকে অভাবের সময় আল্লাহর ওয়াস্তে দান করার কার্যে কার্পণ্য করে, শুধু তাই নয় বরং লোকদেরকেও কার্পণ্য শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ না। করার পরামর্শ দেয়, তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কার্পণ্য অপেক্ষা বড় রোগ আর কি হতে পারে? তিনি আরো বলেছেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা কার্পণ্য হতে বেঁচে থাক। এটাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর কারণেই তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতা, অন্যায় ও দুস্কার্য প্রকাশ পেয়েছিল। এরপর বলা হচ্ছে- তারা এ দু'টি দুঙ্কার্যের সাথে সাথে আরও একটি দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়। তা এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ গোপন করে, ঐগুলো প্রকাশ করে না। ঐগুলো না তাদের খাওয়া পরায় প্রকাশ পায় না। আদান-প্রদানে প্রকাশিত হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই মানুষ তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর নিশ্চয়ই সে নিজেই তার ঐ অবস্থা ও অভ্যাসের উপর সাক্ষী।' (১০০:৬-৭) তার পরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে মালের প্রেমে পাগল।' (১০০:৮) এখানেও বলা হয়েছে যে, সে আল্লাহর অনুগ্রহ গোপন করছে। এরপর তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কু' শব্দের অর্থ হচ্ছে গোপন করা এবং ঢেকে দেয়া। কৃপণও আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে গোপন করে, ওর উপরে পর্দা নিক্ষেপ করে, অর্থাৎ ঐ নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করে। সুতরাং সে নিয়ামতসমূহের অস্বীকারকারী হয়ে গেল। হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “আল্লাহ তা'আলা যখন কোন বান্দার উপর স্বীয় নি'আমত দান করেন তখন চান যে, ওর চিহ্ন যেন তার উপরে প্রকাশ পায়। নবী (সঃ)-এর প্রার্থনায় রয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নি'আমতের প্রতি কৃতজ্ঞ বানিয়ে দিন এবং তার কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ওগুলো গ্রহণকারী বানিয়ে দিন ও ঐগুলো আমাদের উপর পূর্ণভাবে দান করুন।পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি ইয়াহূদীদের ঐ কার্পণ্যের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে কার্পণ্য তারা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন করার ব্যাপারে করতো। এ জন্যেই এর শেষে রয়েছে-‘আমি কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।এ আয়াতটি যে ইয়াহূদীদের কার্পণ্যের ব্যাপারেও হতে পারে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু স্পষ্টতঃ এখানে মালের কৃপণতার কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে, যদিও ইলমের কৃপণতা এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। এটা ভুললে চলবে না যে, এ আয়াতে আত্মীয়-স্বজন ও দুর্বলদেরকে মাল প্রদানের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পরবর্তী আয়াতে লোকদেরকে দেখাবার জন্যে মাল প্রদানকারীদের নিন্দে করা হয়েছে। এখানে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ কৃপণদের যারা টাকা পয়সাকে দাঁত দিয়ে ধরে রাখে। তার পরে বর্ণনা দেয়া হয়েছে ঐ লোকদের যারা মাল খরচ তো করে বটে, কিন্ত অসৎ উদ্দেশ্যে ও দুনিয়ায় নাম নেয়ার জন্যে।যেমন হাদীস শরীফে রয়েছেঃ “যে তিন প্রকারের লোকের জন্যে জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত করা হবে, তারা এ রিয়াকারগণই হবে। রিয়াকার আলেম, রিয়াকার গাযী এবং রিয়াকার দাতা। এ দাতা বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রত্যেক রাস্তায় স্বীয় মাল খরচ করেছিলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার ইচ্ছা তো শুধু এই ছিল যে, তুমি বড় দাতারূপে প্রসিদ্ধি লাভ কর। সুতরাং তা বলা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তোমার উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি লাভ। তা আমি তোমাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিয়েছি। কাজেই তুমি তোমার উদ্দেশ্য লাভ করেছ।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার পিতা স্বীয় দান দ্বারা যা চেয়েছিল তা সে পেয়ে গেছে। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে জাদ আনতো একজন বড় দাতা ছিল। সে দরিদ্র ও অভাবীদের সাথে বড়ই উত্তম ব্যবহার করতো এবং আল্লাহর নামে বহু গোলাম আযাদ করেছিল, সে কি এর কোন লাভ পাবে না?' তিনি বলেনঃ না, সে তো সারা জীবনে একদিনও বলেনি-“হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আমার পাপ মার্জনা করুন।এজন্যেই এখানেও আল্লাহ তা'আল্লাহ বলেন-আল্লাহ ও কিয়ামতের উপর তাদের বিশ্বাস নেই, নতুবা তারা শয়তানের ফাঁদে পড়তো না এবং খারাপকে ভালো মনে করতো না। তারা শয়তানের সঙ্গী। সঙ্গীর দুস্কার্যের উপর তাদের দুষ্কার্য চিন্তা করে নাও। একজন আরব কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না, বরং জিজ্ঞেস কর তার সাথী সম্বন্ধে, প্রত্যেক সাথী তার সাথীরই অনুসারী হয়ে থাকে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে- তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নে, সঠিক পথে চলতে, রিয়াকারী পরিত্যাগ করতে এবং ইখলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে কিসে বাধা দিচ্ছে? তাতে তাদের ক্ষতি কি আছে? বরং সরাসরি উপকারই রয়েছে। কারণ এর ফলে তাদের পরিণাম ভাল হবে। তারা আল্লাহর পথে খরচ করতে সংকীর্ণ মনোভাব প্রকাশ করছে কেন? তারা আল্লাহ তাআলার ভালবাসা ও সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করছে না কেন? আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে খুব ভাল করেই জানেন। তাদের ভাল ও মন্দ নিয়তের জ্ঞান তাঁর পুরোপুরিই রয়েছে। ভাল কার্যের তাওফীক লাভ করার যোগ্য ও অযোগ্য সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান। ভাল লোকদেরকে তিনি ভাল কাজ করার তাওফীক প্রদান করতঃ স্বীয় সন্তুষ্টির কাজ তাদের দ্বারা করিয়ে নিয়ে তাদেরকে তার নৈকট্য দান করে থাকেন। পক্ষান্তরে মন্দ লোকদেরকে তিনি স্বীয় মহা মর্যাদাসম্পন্ন দরবার হতে দূরে সরিয়ে দেন। যার ফলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওটা হতে আশ্রয় দান করুন!

আন-নিসা 4:40

৪০-৪২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি কারও উপর অত্যচার করেন না, কারও পুণ্য নষ্ট করেন না, আরও বৃদ্ধি করে তার পুণ্য ও প্রতিদান কিয়ামতের দিন দান করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমি ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লা রাখবো।' (২১:৪৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন যে, হযরত লোকমান (আঃ) স্বীয় পুত্রকে বলেন (আরবী) অর্থাৎ বাছা! যদি কোন জিনিস সরিষার দানার সমানও হয় এবং তা কোন পাথরে বা আকাশসমূহ অথবা পৃথিবীর মধ্যে থাকে, আল্লাহ তা আনয়ন করবেন, নিশ্চয়ই তিনি সুক্ষ্মদর্শী ও অভিজ্ঞ।' (৩১:১৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন (আরবী) অর্থাৎ সে দিন মানুষ বিভিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে যেন তাদেরকে তাদের কার্যাবলী দেখানো হয়, অতএব সে অণুপরিমাণও যা সকাজ করেছে তা দেখতে পাবে এবং অণুপরিমাণও যা মন্দ কাজ করেছে তাও দেখতে পাবে।' (৯৯:৬-৮)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শাফ‘আতযুক্ত সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছেঃ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, ফিরে এসো এবং যার অন্তরে সরিষার দানার সমানও ঈমান দেখ তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আন। সুতরাং বহু মাখলুক জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেন, “তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআন কারীমের (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে নাও।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার কোন দাস বা দাসীকে আনয়ন করা হবে এবং একজন আহ্বানকারী হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলবেন, এ হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুক। যে কারও প্রাপ্য তার জিম্মায় রয়েছে সে যেন এসে নিয়ে যায়। সেদিন অবস্থা এই হবে যে, স্ত্রীলোক চাইবে তার কোন প্রাপ্য পিতার উপর, মাতার উপর, ভ্রাতার উপর বা স্বামীর উপর থাকলে সে দৌড়িয়ে এসে নিয়ে যাবে। অতঃপর তিনি (আরবী) (২৩:১০১)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ সেদিন বংশ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় হক ইচ্ছেমত ক্ষমা করবেন। কিন্তু মানুষের প্রাপ্য ক্ষমা করবেন না। যখন দাবীদারগণ এসে যাবে তখন তাকে বলা হবে, তাদের প্রাপ্য আদায় কর। সে তখন বলবে, দুনিয়াতে শেষ হয়ে গেছে, আজ আমার হাতে কি রয়েছে যে, তা আমি দেবো? অতএব তার সৎ কার্যাবলী নেয়া হবে এবং দাবীদারদেরকে দেয়া হবে ।এভাবেই প্রত্যেকের প্রাপ্য আদায় করা হবে। এখন লোকটি যদি আল্লাহভক্ত হয় তবে তার কাছে এক সরিষার দানা পরিমাণ পুণ্য অবশিষ্ট থাকলেও আল্লাহ তা'আলা ওকে বৃদ্ধি করতঃ শুধুমাত্র ওরই উপর ভিত্তি করে তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আর যদি লোকটি আল্লাহভক্ত না হয়, বরং পাপী ও দুরাচার হয় তবে তার অবস্থা এই হবে যে, ফেরেশতাগণ বলবেন-‘হে। আল্লাহ! তার পুণ্যগুলো শেষ হয়ে গেছে কিন্তু এখনও দাবীদারগণ বাকী রয়েছে।তখন নির্দেশ দেয়া হবে-দাবীদারদের পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট কর।' এ মাওকুফ হাদীসটির কিছু কিছু ‘শাওয়াহিদ' মারফু হাদীসেও বিদ্যমান রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে (আরবী)-এ আয়াতটি মরুচারী আরবদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এর উপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয় তাহলে মুহাজিরদের ব্যাপারে কোন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়? তিনি উত্তরে বলেনঃ এর চেয়ে উত্তম (আরবী)-এ আয়াতটি। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ উক্তি হিসেবে এর কারণে মুশরিকেরও শাস্তি কম করা হবে। হ্যা, তবে জাহান্নাম হতে তো বের হবেই না। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার চাচা আবু তালিব আপনার আশ্রয়দাতা ছিলেন। তিনি আপনাকে লোকদের কষ্ট দেয়া হতে রক্ষা করতেন এবং আপনার পক্ষ হতে তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন, তাহলে তার কোন লাভ হবে কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা, তিনি খুব অল্প আগুনের মধ্যে রয়েছেন। যদি আমার এ সম্পর্ক না থাকতো তবে তিনি জাহান্নামের একেবারে নিম্ন তলায় থাকতেন।কিন্তু খুব সম্ভব এ উপকার শুধুমাত্র আবু তালিবের জন্যেই নির্দিষ্ট। অন্যান্য কাফির এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-তায়ালেসীর হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ মুমিনের কোন পুণ্যের উপর অত্যাচার করেন না। দুনিয়ায় খাওয়া-পরা ইত্যাদির আকারে ওর প্রতিদান পেয়ে থাকে এবং আখিরাতে সওয়াবের আকারে ওর প্রতিদান পাবে। হ্যাঁ, তবে কাফির তো তার পুণ্য দুনিয়াতেই খেয়ে নেয়। সুতরাং কিয়ামতের দিন তার নিকটে কোন পুণ্যই থাকবে না।এ আয়াতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে জান্নাত। আমরা আল্লাহ পাকের নিকট জান্নাত যাজ্ঞা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু উসমান (রঃ) বলেন, আমি সংবাদ পাই যে, আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন। আমার বড়ই বিস্ময় বোধ হয় এবং আমি বলি- আমি তো তোমাদের সবার চাইতে অধিক হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর খিদমতে থেকেছি। আমি তো কখনও তাঁর নিকট এ হাদীসটি শুনিনি। তখন আমি দৃঢ় সংকল্প করে ফেলি যে, আমি নিজেই গিয়ে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এটা জিজ্ঞেস করে আসবো।অতএব আমি সফরের আসবাবপত্র ঠিক করে নিয়ে এ বর্ণনাটির সত্যতা নিরূপণের জন্যে যাত্রা শুরু করি। আমি জানতে পারি যে, তিনি হজ্বে গিয়েছেন। আমিও হজ্বের নিয়ত করে তথায় পৌছি। তার সাথে সাক্ষাৎ হলে তাকে জিজ্ঞেস করি, হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! আমি শুনেছি যে, আপনি এরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটা কি সত্য? তিনি তখন বলেন, “তুমি কি এতে বিস্ময় বোধ করছো? তুমি কি কুরআন কারীম পাঠ করনি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, আল্লাহ তাকে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়ে থাকেন।অন্য আয়াতে রয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ “পরকালের তুলনায় ইহকালের জগতের আসবাবপত্র খুবই অল্প।” (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছিঃ ‘একটি পুণ্যকে বৃদ্ধি করে ওর বিনিময়ে দু’ লক্ষ পুণ্য প্রদান করবেন।' এ হাদীসটি অন্যান্য পন্থায়ও বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেদিন নবীগণকে সাক্ষী রূপে পেশ করা হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “পৃথিবী স্বীয় প্রভুর আলোকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আমলনামা দেয়া হবে এবং নবীদেরকে ও সাক্ষীদেরকে আনয়ন করা হবে।” (৩৯:৬৯) অন্য এক জায়গায় ঘোষণা করা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ সেই দিন প্রত্যেক উম্মতের উপর আমি তাদেরই মধ্য হতে সাক্ষী প্রেরণ করবো। (১৬:৮৯) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বলেন, “আমাকে কিছু কুরআন কারীম পাঠ করে শুনাও।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তখন বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে কুরআন কারীম পাঠ করে কি শুনাবো? কুরআন কারীম তো আপনার উপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেনঃ হ্যা, কিন্তু আমি অন্যের নিকট হতে শুনতে চাই।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আমি তখন সূরা নিসা পাঠ করতে আরম্ভ করি। পড়তে পড়তে যখন আমি। (৪:৪১) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করি তখন তিনি বলেনঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি দেখি যে, তার চক্ষু অশ্রুসিক্ত ছিল।”হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ফুযালা আনসারী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানী যুক্র গোত্রের নিকট আগমন করেন এবং সে পাথরের উপর বসে পড়েন যা এখন পর্যন্ত সে মহল্লায় বিদ্যমান রয়েছে। তার সাথে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত মুয়াম্ ইবনে জাবাল (রঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন কারীকে বলেনঃ “কুরআন কারীম পাঠ কর।” তিনি পড়তে পড়তে যখন উক্ত আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তিনি এত ক্রন্দন করেন। যে, তাঁর গণ্ডদেশ এবং শত্রু সিক্ত হয়ে যায় এবং তিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি যাদের সামনে রয়েছি তাদের উপর আমার সাক্ষ্য দান সম্ভব, কিন্তু যাদেরকে আমি দেখিনি তাদের ব্যাপারে কিরূপে এটা সম্ভব? (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের উপর সাক্ষী আছি যতদিন পর্যন্ত আমি তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি। অতঃপর যখন আপনি আমাকে মৃত্যু দান করবেন তখন আপনিই তাদের উপর রক্ষক।” হযরত আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী স্বীয় পুস্তক তাজকেরা’য় একটি পরিচ্ছেদ করেছেনঃ 'নবী (সঃ)-এর স্বীয় উম্মতের উপর সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে যা এসেছে। তাতে তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবের এ উক্তি এনেছেন যে, সকাল সন্ধ্যায় নবী (সঃ)-এর উপর তাঁর উম্মতের কার্যাবলী তাদের নামসহ পেশ করা হয়। সুতরাং তিনি কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু প্রথমতঃ এটা হযরত সাঈদ (রঃ)-এর নিজের উক্তি। দ্বিতীয়তঃ এর সনদে ইনকিতা (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন হওয়াকে ‘ইনকিতা’ বলে) রয়েছে। এতে একজন বর্ণনাকারী সন্দেহযুক্ত যার নামই নেই। তৃতীয়তঃ এ হাদীসটি মারফু’রূপে বর্ণনাই করেন না। হ্যাঁ, তবে ইমাম কুরতুবী (রঃ) এটাকে গ্রহণ করে থাকেন। হাদীসটি আনার পর তিনি বলেন, পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক সোমবার ও বৃস্পতিবার আল্লাহ তা'আলার সামনে কার্যাবলী পেশ করা হয় এবং নবীদের উপর ও পিতা-মাতার উপর প্রতি শুক্রবার হাযির করা হয়, আর এতে কোন তা'আরু বা পরস্পর বিরোধ নেই। কাজেই সম্ভবতঃ আমাদের নবী (সঃ)-এর কাছে প্রত্যেকদিন এবং অন্যান্য নবীদের কাছে প্রতি শুক্রবার উম্মতের কার্যাবলী পেশ করা হয়।আল্লাহ তা'আলা বলেন-সেদিন কাফিরেরা এবং রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণকারীরা আকাঙ্খা করবে যে, যদি যমীন ফেটে যেতো এবং তারা ওর ভেতরে প্রবেশ করতে পারতো এবং পরে মাটি সমতল হয়ে যেতো তবে কতইনা ভাল হতো! কেননা, তারা সেই দিন অসহ্য সন্ত্রাস, অপমান এবং শাসন-গর্জনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যেদিন মানুষ সম্মুখে প্রেরিত কার্যাবলী স্বচক্ষে দেখে নেবে এবং কাফির বলবে- যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম।' (৭৮:৪০)অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তারা সেদিন এ সমস্ত কাজের কথা স্বীকার করে নেবে যা তারা দুনিয়ায় করেছিল এবং একটি কথাও তারা গোপন করতে পারবে না।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরআন কারীমের এক জায়গায় তো রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ আমাদের প্রভু আল্লাহর শপথ! আমার মুশরিক ছিলাম না। (৬৪২৩) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর নিকট কোন কথাই গোপন করবে না। এ দু'টি আয়াতের ভাবার্থ কি?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, মুশরিকরা যখন দেখবে যে, মুসলমান ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে- এস আমরা অস্বীকার করে বসি। তখন তারা বলবে- (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখমণ্ডলের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতগুলো ও পাগুলো কথা বলতে থাকবে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) মুসনদি-ই-আবদুর রাযযাকে রয়েছে যে, ঐ লোকটি এসে বলেন, কুরআন পাকের মধ্যে বহু জিনিস আমার নিকট বৈসাদৃশ ঠেকছে।' তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমার উদ্দেশ্য কি? কুরআন কারীমের ব্যাপারে তোমার কি সন্দেহ রয়েছে? লোকটি বলেন, সন্দেহ তো নেই। কিন্তু আমার জ্ঞানে কুরআন পাকের মধ্যে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যেখানে যেখানে তুমি বৈসাদৃশ্য মনে করছে এগুলো উল্লেখ কর তো। তখন লোকটি উপরোক্ত আয়াতদ্বয় পেশ করে বলেন, একটি দ্বারা গোপন করা প্রমাণিত হচ্ছে এবং অপরটি দ্বারা গোপন না করা প্রমাণিত হচ্ছে। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ উত্তর প্রদান করতঃ দু'টি আয়াতের আনুকূল্য বুঝিয়ে দেন।অন্য একটি বর্ণনায় প্রশ্নকারীর নামও এসেছে যে, তিনি ছিলেন হযরত নাফে' ইবনে আযাক (রঃ)। ঐ বর্ণনায় এও এসেছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) লোকটিকে বলেন, আমার ধারণা এই যে, তুমি তোমার সঙ্গীদের নিকট হতে আসছে। সেখানেও হয় তো এ আলোচনা চলছিল। তুমি হয়তো বলেছে‘আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসছি। আমার ধারণা যদি সত্য হয় তবে যখন তুমি তাদের নিকট ফিরে যাবে তখন তাদেরকে সংবাদ দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সমস্ত লোককে একই স্থানে একত্রিত করবেন। সে সময় মুশরিকরা বলবে, আল্লাহ তা'আলা একমাত্র একত্ববাদীদের ছাড়া কারও নিকট হতে কিছুই গ্রহণ করবেন না, কাজেই এসো আমরা অস্বীকার করি। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, তখন তারা বলবে- (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর শপথ। আমরা মুশরিক ছিলাম না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতপা কথা বলবে ও তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তারা মুশরিক ছিল। সে সময় তারা কামনা করবে যে, যেন ভূমণ্ডল তাদের সাথে সমতল হয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন কথাই তারা গোপন করতে পারবে না। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন।

আন-নিসা 4:41

৪০-৪২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি কারও উপর অত্যচার করেন না, কারও পুণ্য নষ্ট করেন না, আরও বৃদ্ধি করে তার পুণ্য ও প্রতিদান কিয়ামতের দিন দান করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমি ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লা রাখবো।' (২১:৪৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন যে, হযরত লোকমান (আঃ) স্বীয় পুত্রকে বলেন (আরবী) অর্থাৎ বাছা! যদি কোন জিনিস সরিষার দানার সমানও হয় এবং তা কোন পাথরে বা আকাশসমূহ অথবা পৃথিবীর মধ্যে থাকে, আল্লাহ তা আনয়ন করবেন, নিশ্চয়ই তিনি সুক্ষ্মদর্শী ও অভিজ্ঞ।' (৩১:১৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন (আরবী) অর্থাৎ সে দিন মানুষ বিভিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে যেন তাদেরকে তাদের কার্যাবলী দেখানো হয়, অতএব সে অণুপরিমাণও যা সকাজ করেছে তা দেখতে পাবে এবং অণুপরিমাণও যা মন্দ কাজ করেছে তাও দেখতে পাবে।' (৯৯:৬-৮)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শাফ‘আতযুক্ত সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছেঃ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, ফিরে এসো এবং যার অন্তরে সরিষার দানার সমানও ঈমান দেখ তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আন। সুতরাং বহু মাখলুক জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেন, “তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআন কারীমের (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে নাও।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার কোন দাস বা দাসীকে আনয়ন করা হবে এবং একজন আহ্বানকারী হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলবেন, এ হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুক। যে কারও প্রাপ্য তার জিম্মায় রয়েছে সে যেন এসে নিয়ে যায়। সেদিন অবস্থা এই হবে যে, স্ত্রীলোক চাইবে তার কোন প্রাপ্য পিতার উপর, মাতার উপর, ভ্রাতার উপর বা স্বামীর উপর থাকলে সে দৌড়িয়ে এসে নিয়ে যাবে। অতঃপর তিনি (আরবী) (২৩:১০১)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ সেদিন বংশ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় হক ইচ্ছেমত ক্ষমা করবেন। কিন্তু মানুষের প্রাপ্য ক্ষমা করবেন না। যখন দাবীদারগণ এসে যাবে তখন তাকে বলা হবে, তাদের প্রাপ্য আদায় কর। সে তখন বলবে, দুনিয়াতে শেষ হয়ে গেছে, আজ আমার হাতে কি রয়েছে যে, তা আমি দেবো? অতএব তার সৎ কার্যাবলী নেয়া হবে এবং দাবীদারদেরকে দেয়া হবে ।এভাবেই প্রত্যেকের প্রাপ্য আদায় করা হবে। এখন লোকটি যদি আল্লাহভক্ত হয় তবে তার কাছে এক সরিষার দানা পরিমাণ পুণ্য অবশিষ্ট থাকলেও আল্লাহ তা'আলা ওকে বৃদ্ধি করতঃ শুধুমাত্র ওরই উপর ভিত্তি করে তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আর যদি লোকটি আল্লাহভক্ত না হয়, বরং পাপী ও দুরাচার হয় তবে তার অবস্থা এই হবে যে, ফেরেশতাগণ বলবেন-‘হে। আল্লাহ! তার পুণ্যগুলো শেষ হয়ে গেছে কিন্তু এখনও দাবীদারগণ বাকী রয়েছে।তখন নির্দেশ দেয়া হবে-দাবীদারদের পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট কর।' এ মাওকুফ হাদীসটির কিছু কিছু ‘শাওয়াহিদ' মারফু হাদীসেও বিদ্যমান রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে (আরবী)-এ আয়াতটি মরুচারী আরবদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এর উপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয় তাহলে মুহাজিরদের ব্যাপারে কোন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়? তিনি উত্তরে বলেনঃ এর চেয়ে উত্তম (আরবী)-এ আয়াতটি। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ উক্তি হিসেবে এর কারণে মুশরিকেরও শাস্তি কম করা হবে। হ্যা, তবে জাহান্নাম হতে তো বের হবেই না। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার চাচা আবু তালিব আপনার আশ্রয়দাতা ছিলেন। তিনি আপনাকে লোকদের কষ্ট দেয়া হতে রক্ষা করতেন এবং আপনার পক্ষ হতে তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন, তাহলে তার কোন লাভ হবে কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা, তিনি খুব অল্প আগুনের মধ্যে রয়েছেন। যদি আমার এ সম্পর্ক না থাকতো তবে তিনি জাহান্নামের একেবারে নিম্ন তলায় থাকতেন।কিন্তু খুব সম্ভব এ উপকার শুধুমাত্র আবু তালিবের জন্যেই নির্দিষ্ট। অন্যান্য কাফির এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-তায়ালেসীর হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ মুমিনের কোন পুণ্যের উপর অত্যাচার করেন না। দুনিয়ায় খাওয়া-পরা ইত্যাদির আকারে ওর প্রতিদান পেয়ে থাকে এবং আখিরাতে সওয়াবের আকারে ওর প্রতিদান পাবে। হ্যাঁ, তবে কাফির তো তার পুণ্য দুনিয়াতেই খেয়ে নেয়। সুতরাং কিয়ামতের দিন তার নিকটে কোন পুণ্যই থাকবে না।এ আয়াতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে জান্নাত। আমরা আল্লাহ পাকের নিকট জান্নাত যাজ্ঞা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু উসমান (রঃ) বলেন, আমি সংবাদ পাই যে, আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন। আমার বড়ই বিস্ময় বোধ হয় এবং আমি বলি- আমি তো তোমাদের সবার চাইতে অধিক হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর খিদমতে থেকেছি। আমি তো কখনও তাঁর নিকট এ হাদীসটি শুনিনি। তখন আমি দৃঢ় সংকল্প করে ফেলি যে, আমি নিজেই গিয়ে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এটা জিজ্ঞেস করে আসবো।অতএব আমি সফরের আসবাবপত্র ঠিক করে নিয়ে এ বর্ণনাটির সত্যতা নিরূপণের জন্যে যাত্রা শুরু করি। আমি জানতে পারি যে, তিনি হজ্বে গিয়েছেন। আমিও হজ্বের নিয়ত করে তথায় পৌছি। তার সাথে সাক্ষাৎ হলে তাকে জিজ্ঞেস করি, হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! আমি শুনেছি যে, আপনি এরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটা কি সত্য? তিনি তখন বলেন, “তুমি কি এতে বিস্ময় বোধ করছো? তুমি কি কুরআন কারীম পাঠ করনি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, আল্লাহ তাকে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়ে থাকেন।অন্য আয়াতে রয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ “পরকালের তুলনায় ইহকালের জগতের আসবাবপত্র খুবই অল্প।” (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছিঃ ‘একটি পুণ্যকে বৃদ্ধি করে ওর বিনিময়ে দু’ লক্ষ পুণ্য প্রদান করবেন।' এ হাদীসটি অন্যান্য পন্থায়ও বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেদিন নবীগণকে সাক্ষী রূপে পেশ করা হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “পৃথিবী স্বীয় প্রভুর আলোকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আমলনামা দেয়া হবে এবং নবীদেরকে ও সাক্ষীদেরকে আনয়ন করা হবে।” (৩৯:৬৯) অন্য এক জায়গায় ঘোষণা করা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ সেই দিন প্রত্যেক উম্মতের উপর আমি তাদেরই মধ্য হতে সাক্ষী প্রেরণ করবো। (১৬:৮৯) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বলেন, “আমাকে কিছু কুরআন কারীম পাঠ করে শুনাও।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তখন বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে কুরআন কারীম পাঠ করে কি শুনাবো? কুরআন কারীম তো আপনার উপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেনঃ হ্যা, কিন্তু আমি অন্যের নিকট হতে শুনতে চাই।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আমি তখন সূরা নিসা পাঠ করতে আরম্ভ করি। পড়তে পড়তে যখন আমি। (৪:৪১) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করি তখন তিনি বলেনঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি দেখি যে, তার চক্ষু অশ্রুসিক্ত ছিল।”হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ফুযালা আনসারী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানী যুক্র গোত্রের নিকট আগমন করেন এবং সে পাথরের উপর বসে পড়েন যা এখন পর্যন্ত সে মহল্লায় বিদ্যমান রয়েছে। তার সাথে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত মুয়াম্ ইবনে জাবাল (রঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন কারীকে বলেনঃ “কুরআন কারীম পাঠ কর।” তিনি পড়তে পড়তে যখন উক্ত আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তিনি এত ক্রন্দন করেন। যে, তাঁর গণ্ডদেশ এবং শত্রু সিক্ত হয়ে যায় এবং তিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি যাদের সামনে রয়েছি তাদের উপর আমার সাক্ষ্য দান সম্ভব, কিন্তু যাদেরকে আমি দেখিনি তাদের ব্যাপারে কিরূপে এটা সম্ভব? (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের উপর সাক্ষী আছি যতদিন পর্যন্ত আমি তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি। অতঃপর যখন আপনি আমাকে মৃত্যু দান করবেন তখন আপনিই তাদের উপর রক্ষক।” হযরত আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী স্বীয় পুস্তক তাজকেরা’য় একটি পরিচ্ছেদ করেছেনঃ 'নবী (সঃ)-এর স্বীয় উম্মতের উপর সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে যা এসেছে। তাতে তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবের এ উক্তি এনেছেন যে, সকাল সন্ধ্যায় নবী (সঃ)-এর উপর তাঁর উম্মতের কার্যাবলী তাদের নামসহ পেশ করা হয়। সুতরাং তিনি কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু প্রথমতঃ এটা হযরত সাঈদ (রঃ)-এর নিজের উক্তি। দ্বিতীয়তঃ এর সনদে ইনকিতা (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন হওয়াকে ‘ইনকিতা’ বলে) রয়েছে। এতে একজন বর্ণনাকারী সন্দেহযুক্ত যার নামই নেই। তৃতীয়তঃ এ হাদীসটি মারফু’রূপে বর্ণনাই করেন না। হ্যাঁ, তবে ইমাম কুরতুবী (রঃ) এটাকে গ্রহণ করে থাকেন। হাদীসটি আনার পর তিনি বলেন, পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক সোমবার ও বৃস্পতিবার আল্লাহ তা'আলার সামনে কার্যাবলী পেশ করা হয় এবং নবীদের উপর ও পিতা-মাতার উপর প্রতি শুক্রবার হাযির করা হয়, আর এতে কোন তা'আরু বা পরস্পর বিরোধ নেই। কাজেই সম্ভবতঃ আমাদের নবী (সঃ)-এর কাছে প্রত্যেকদিন এবং অন্যান্য নবীদের কাছে প্রতি শুক্রবার উম্মতের কার্যাবলী পেশ করা হয়।আল্লাহ তা'আলা বলেন-সেদিন কাফিরেরা এবং রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণকারীরা আকাঙ্খা করবে যে, যদি যমীন ফেটে যেতো এবং তারা ওর ভেতরে প্রবেশ করতে পারতো এবং পরে মাটি সমতল হয়ে যেতো তবে কতইনা ভাল হতো! কেননা, তারা সেই দিন অসহ্য সন্ত্রাস, অপমান এবং শাসন-গর্জনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যেদিন মানুষ সম্মুখে প্রেরিত কার্যাবলী স্বচক্ষে দেখে নেবে এবং কাফির বলবে- যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম।' (৭৮:৪০)অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তারা সেদিন এ সমস্ত কাজের কথা স্বীকার করে নেবে যা তারা দুনিয়ায় করেছিল এবং একটি কথাও তারা গোপন করতে পারবে না।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরআন কারীমের এক জায়গায় তো রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ আমাদের প্রভু আল্লাহর শপথ! আমার মুশরিক ছিলাম না। (৬৪২৩) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর নিকট কোন কথাই গোপন করবে না। এ দু'টি আয়াতের ভাবার্থ কি?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, মুশরিকরা যখন দেখবে যে, মুসলমান ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে- এস আমরা অস্বীকার করে বসি। তখন তারা বলবে- (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখমণ্ডলের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতগুলো ও পাগুলো কথা বলতে থাকবে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) মুসনদি-ই-আবদুর রাযযাকে রয়েছে যে, ঐ লোকটি এসে বলেন, কুরআন পাকের মধ্যে বহু জিনিস আমার নিকট বৈসাদৃশ ঠেকছে।' তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমার উদ্দেশ্য কি? কুরআন কারীমের ব্যাপারে তোমার কি সন্দেহ রয়েছে? লোকটি বলেন, সন্দেহ তো নেই। কিন্তু আমার জ্ঞানে কুরআন পাকের মধ্যে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যেখানে যেখানে তুমি বৈসাদৃশ্য মনে করছে এগুলো উল্লেখ কর তো। তখন লোকটি উপরোক্ত আয়াতদ্বয় পেশ করে বলেন, একটি দ্বারা গোপন করা প্রমাণিত হচ্ছে এবং অপরটি দ্বারা গোপন না করা প্রমাণিত হচ্ছে। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ উত্তর প্রদান করতঃ দু'টি আয়াতের আনুকূল্য বুঝিয়ে দেন।অন্য একটি বর্ণনায় প্রশ্নকারীর নামও এসেছে যে, তিনি ছিলেন হযরত নাফে' ইবনে আযাক (রঃ)। ঐ বর্ণনায় এও এসেছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) লোকটিকে বলেন, আমার ধারণা এই যে, তুমি তোমার সঙ্গীদের নিকট হতে আসছে। সেখানেও হয় তো এ আলোচনা চলছিল। তুমি হয়তো বলেছে‘আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসছি। আমার ধারণা যদি সত্য হয় তবে যখন তুমি তাদের নিকট ফিরে যাবে তখন তাদেরকে সংবাদ দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সমস্ত লোককে একই স্থানে একত্রিত করবেন। সে সময় মুশরিকরা বলবে, আল্লাহ তা'আলা একমাত্র একত্ববাদীদের ছাড়া কারও নিকট হতে কিছুই গ্রহণ করবেন না, কাজেই এসো আমরা অস্বীকার করি। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, তখন তারা বলবে- (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর শপথ। আমরা মুশরিক ছিলাম না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতপা কথা বলবে ও তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তারা মুশরিক ছিল। সে সময় তারা কামনা করবে যে, যেন ভূমণ্ডল তাদের সাথে সমতল হয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন কথাই তারা গোপন করতে পারবে না। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন।

আন-নিসা 4:42

৪০-৪২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি কারও উপর অত্যচার করেন না, কারও পুণ্য নষ্ট করেন না, আরও বৃদ্ধি করে তার পুণ্য ও প্রতিদান কিয়ামতের দিন দান করবেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমি ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লা রাখবো।' (২১:৪৭) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন যে, হযরত লোকমান (আঃ) স্বীয় পুত্রকে বলেন (আরবী) অর্থাৎ বাছা! যদি কোন জিনিস সরিষার দানার সমানও হয় এবং তা কোন পাথরে বা আকাশসমূহ অথবা পৃথিবীর মধ্যে থাকে, আল্লাহ তা আনয়ন করবেন, নিশ্চয়ই তিনি সুক্ষ্মদর্শী ও অভিজ্ঞ।' (৩১:১৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন (আরবী) অর্থাৎ সে দিন মানুষ বিভিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে যেন তাদেরকে তাদের কার্যাবলী দেখানো হয়, অতএব সে অণুপরিমাণও যা সকাজ করেছে তা দেখতে পাবে এবং অণুপরিমাণও যা মন্দ কাজ করেছে তাও দেখতে পাবে।' (৯৯:৬-৮)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শাফ‘আতযুক্ত সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছেঃ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, ফিরে এসো এবং যার অন্তরে সরিষার দানার সমানও ঈমান দেখ তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আন। সুতরাং বহু মাখলুক জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলতেন, “তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআন কারীমের (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে নাও।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার কোন দাস বা দাসীকে আনয়ন করা হবে এবং একজন আহ্বানকারী হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলবেন, এ হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুক। যে কারও প্রাপ্য তার জিম্মায় রয়েছে সে যেন এসে নিয়ে যায়। সেদিন অবস্থা এই হবে যে, স্ত্রীলোক চাইবে তার কোন প্রাপ্য পিতার উপর, মাতার উপর, ভ্রাতার উপর বা স্বামীর উপর থাকলে সে দৌড়িয়ে এসে নিয়ে যাবে। অতঃপর তিনি (আরবী) (২৩:১০১)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ সেদিন বংশ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় হক ইচ্ছেমত ক্ষমা করবেন। কিন্তু মানুষের প্রাপ্য ক্ষমা করবেন না। যখন দাবীদারগণ এসে যাবে তখন তাকে বলা হবে, তাদের প্রাপ্য আদায় কর। সে তখন বলবে, দুনিয়াতে শেষ হয়ে গেছে, আজ আমার হাতে কি রয়েছে যে, তা আমি দেবো? অতএব তার সৎ কার্যাবলী নেয়া হবে এবং দাবীদারদেরকে দেয়া হবে ।এভাবেই প্রত্যেকের প্রাপ্য আদায় করা হবে। এখন লোকটি যদি আল্লাহভক্ত হয় তবে তার কাছে এক সরিষার দানা পরিমাণ পুণ্য অবশিষ্ট থাকলেও আল্লাহ তা'আলা ওকে বৃদ্ধি করতঃ শুধুমাত্র ওরই উপর ভিত্তি করে তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আর যদি লোকটি আল্লাহভক্ত না হয়, বরং পাপী ও দুরাচার হয় তবে তার অবস্থা এই হবে যে, ফেরেশতাগণ বলবেন-‘হে। আল্লাহ! তার পুণ্যগুলো শেষ হয়ে গেছে কিন্তু এখনও দাবীদারগণ বাকী রয়েছে।তখন নির্দেশ দেয়া হবে-দাবীদারদের পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট কর।' এ মাওকুফ হাদীসটির কিছু কিছু ‘শাওয়াহিদ' মারফু হাদীসেও বিদ্যমান রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে (আরবী)-এ আয়াতটি মরুচারী আরবদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এর উপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয় তাহলে মুহাজিরদের ব্যাপারে কোন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়? তিনি উত্তরে বলেনঃ এর চেয়ে উত্তম (আরবী)-এ আয়াতটি। হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ উক্তি হিসেবে এর কারণে মুশরিকেরও শাস্তি কম করা হবে। হ্যা, তবে জাহান্নাম হতে তো বের হবেই না। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার চাচা আবু তালিব আপনার আশ্রয়দাতা ছিলেন। তিনি আপনাকে লোকদের কষ্ট দেয়া হতে রক্ষা করতেন এবং আপনার পক্ষ হতে তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন, তাহলে তার কোন লাভ হবে কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা, তিনি খুব অল্প আগুনের মধ্যে রয়েছেন। যদি আমার এ সম্পর্ক না থাকতো তবে তিনি জাহান্নামের একেবারে নিম্ন তলায় থাকতেন।কিন্তু খুব সম্ভব এ উপকার শুধুমাত্র আবু তালিবের জন্যেই নির্দিষ্ট। অন্যান্য কাফির এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-তায়ালেসীর হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ মুমিনের কোন পুণ্যের উপর অত্যাচার করেন না। দুনিয়ায় খাওয়া-পরা ইত্যাদির আকারে ওর প্রতিদান পেয়ে থাকে এবং আখিরাতে সওয়াবের আকারে ওর প্রতিদান পাবে। হ্যাঁ, তবে কাফির তো তার পুণ্য দুনিয়াতেই খেয়ে নেয়। সুতরাং কিয়ামতের দিন তার নিকটে কোন পুণ্যই থাকবে না।এ আয়াতে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে জান্নাত। আমরা আল্লাহ পাকের নিকট জান্নাত যাজ্ঞা করছি। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু উসমান (রঃ) বলেন, আমি সংবাদ পাই যে, আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন। আমার বড়ই বিস্ময় বোধ হয় এবং আমি বলি- আমি তো তোমাদের সবার চাইতে অধিক হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর খিদমতে থেকেছি। আমি তো কখনও তাঁর নিকট এ হাদীসটি শুনিনি। তখন আমি দৃঢ় সংকল্প করে ফেলি যে, আমি নিজেই গিয়ে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এটা জিজ্ঞেস করে আসবো।অতএব আমি সফরের আসবাবপত্র ঠিক করে নিয়ে এ বর্ণনাটির সত্যতা নিরূপণের জন্যে যাত্রা শুরু করি। আমি জানতে পারি যে, তিনি হজ্বে গিয়েছেন। আমিও হজ্বের নিয়ত করে তথায় পৌছি। তার সাথে সাক্ষাৎ হলে তাকে জিজ্ঞেস করি, হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! আমি শুনেছি যে, আপনি এরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটা কি সত্য? তিনি তখন বলেন, “তুমি কি এতে বিস্ময় বোধ করছো? তুমি কি কুরআন কারীম পাঠ করনি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, আল্লাহ তাকে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়ে থাকেন।অন্য আয়াতে রয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ “পরকালের তুলনায় ইহকালের জগতের আসবাবপত্র খুবই অল্প।” (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছিঃ ‘একটি পুণ্যকে বৃদ্ধি করে ওর বিনিময়ে দু’ লক্ষ পুণ্য প্রদান করবেন।' এ হাদীসটি অন্যান্য পন্থায়ও বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেদিন নবীগণকে সাক্ষী রূপে পেশ করা হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “পৃথিবী স্বীয় প্রভুর আলোকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আমলনামা দেয়া হবে এবং নবীদেরকে ও সাক্ষীদেরকে আনয়ন করা হবে।” (৩৯:৬৯) অন্য এক জায়গায় ঘোষণা করা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ সেই দিন প্রত্যেক উম্মতের উপর আমি তাদেরই মধ্য হতে সাক্ষী প্রেরণ করবো। (১৬:৮৯) সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বলেন, “আমাকে কিছু কুরআন কারীম পাঠ করে শুনাও।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তখন বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে কুরআন কারীম পাঠ করে কি শুনাবো? কুরআন কারীম তো আপনার উপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেনঃ হ্যা, কিন্তু আমি অন্যের নিকট হতে শুনতে চাই।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আমি তখন সূরা নিসা পাঠ করতে আরম্ভ করি। পড়তে পড়তে যখন আমি। (৪:৪১) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করি তখন তিনি বলেনঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি দেখি যে, তার চক্ষু অশ্রুসিক্ত ছিল।”হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ফুযালা আনসারী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানী যুক্র গোত্রের নিকট আগমন করেন এবং সে পাথরের উপর বসে পড়েন যা এখন পর্যন্ত সে মহল্লায় বিদ্যমান রয়েছে। তার সাথে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত মুয়াম্ ইবনে জাবাল (রঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন কারীকে বলেনঃ “কুরআন কারীম পাঠ কর।” তিনি পড়তে পড়তে যখন উক্ত আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তিনি এত ক্রন্দন করেন। যে, তাঁর গণ্ডদেশ এবং শত্রু সিক্ত হয়ে যায় এবং তিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি যাদের সামনে রয়েছি তাদের উপর আমার সাক্ষ্য দান সম্ভব, কিন্তু যাদেরকে আমি দেখিনি তাদের ব্যাপারে কিরূপে এটা সম্ভব? (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাদের উপর সাক্ষী আছি যতদিন পর্যন্ত আমি তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি। অতঃপর যখন আপনি আমাকে মৃত্যু দান করবেন তখন আপনিই তাদের উপর রক্ষক।” হযরত আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী স্বীয় পুস্তক তাজকেরা’য় একটি পরিচ্ছেদ করেছেনঃ 'নবী (সঃ)-এর স্বীয় উম্মতের উপর সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে যা এসেছে। তাতে তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবের এ উক্তি এনেছেন যে, সকাল সন্ধ্যায় নবী (সঃ)-এর উপর তাঁর উম্মতের কার্যাবলী তাদের নামসহ পেশ করা হয়। সুতরাং তিনি কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু প্রথমতঃ এটা হযরত সাঈদ (রঃ)-এর নিজের উক্তি। দ্বিতীয়তঃ এর সনদে ইনকিতা (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন হওয়াকে ‘ইনকিতা’ বলে) রয়েছে। এতে একজন বর্ণনাকারী সন্দেহযুক্ত যার নামই নেই। তৃতীয়তঃ এ হাদীসটি মারফু’রূপে বর্ণনাই করেন না। হ্যাঁ, তবে ইমাম কুরতুবী (রঃ) এটাকে গ্রহণ করে থাকেন। হাদীসটি আনার পর তিনি বলেন, পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক সোমবার ও বৃস্পতিবার আল্লাহ তা'আলার সামনে কার্যাবলী পেশ করা হয় এবং নবীদের উপর ও পিতা-মাতার উপর প্রতি শুক্রবার হাযির করা হয়, আর এতে কোন তা'আরু বা পরস্পর বিরোধ নেই। কাজেই সম্ভবতঃ আমাদের নবী (সঃ)-এর কাছে প্রত্যেকদিন এবং অন্যান্য নবীদের কাছে প্রতি শুক্রবার উম্মতের কার্যাবলী পেশ করা হয়।আল্লাহ তা'আলা বলেন-সেদিন কাফিরেরা এবং রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণকারীরা আকাঙ্খা করবে যে, যদি যমীন ফেটে যেতো এবং তারা ওর ভেতরে প্রবেশ করতে পারতো এবং পরে মাটি সমতল হয়ে যেতো তবে কতইনা ভাল হতো! কেননা, তারা সেই দিন অসহ্য সন্ত্রাস, অপমান এবং শাসন-গর্জনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যেদিন মানুষ সম্মুখে প্রেরিত কার্যাবলী স্বচক্ষে দেখে নেবে এবং কাফির বলবে- যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম।' (৭৮:৪০)অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তারা সেদিন এ সমস্ত কাজের কথা স্বীকার করে নেবে যা তারা দুনিয়ায় করেছিল এবং একটি কথাও তারা গোপন করতে পারবে না।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরআন কারীমের এক জায়গায় তো রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ আমাদের প্রভু আল্লাহর শপথ! আমার মুশরিক ছিলাম না। (৬৪২৩) অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর নিকট কোন কথাই গোপন করবে না। এ দু'টি আয়াতের ভাবার্থ কি?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, মুশরিকরা যখন দেখবে যে, মুসলমান ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে- এস আমরা অস্বীকার করে বসি। তখন তারা বলবে- (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখমণ্ডলের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতগুলো ও পাগুলো কথা বলতে থাকবে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) মুসনদি-ই-আবদুর রাযযাকে রয়েছে যে, ঐ লোকটি এসে বলেন, কুরআন পাকের মধ্যে বহু জিনিস আমার নিকট বৈসাদৃশ ঠেকছে।' তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমার উদ্দেশ্য কি? কুরআন কারীমের ব্যাপারে তোমার কি সন্দেহ রয়েছে? লোকটি বলেন, সন্দেহ তো নেই। কিন্তু আমার জ্ঞানে কুরআন পাকের মধ্যে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যেখানে যেখানে তুমি বৈসাদৃশ্য মনে করছে এগুলো উল্লেখ কর তো। তখন লোকটি উপরোক্ত আয়াতদ্বয় পেশ করে বলেন, একটি দ্বারা গোপন করা প্রমাণিত হচ্ছে এবং অপরটি দ্বারা গোপন না করা প্রমাণিত হচ্ছে। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ উত্তর প্রদান করতঃ দু'টি আয়াতের আনুকূল্য বুঝিয়ে দেন।অন্য একটি বর্ণনায় প্রশ্নকারীর নামও এসেছে যে, তিনি ছিলেন হযরত নাফে' ইবনে আযাক (রঃ)। ঐ বর্ণনায় এও এসেছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) লোকটিকে বলেন, আমার ধারণা এই যে, তুমি তোমার সঙ্গীদের নিকট হতে আসছে। সেখানেও হয় তো এ আলোচনা চলছিল। তুমি হয়তো বলেছে‘আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসছি। আমার ধারণা যদি সত্য হয় তবে যখন তুমি তাদের নিকট ফিরে যাবে তখন তাদেরকে সংবাদ দেবে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সমস্ত লোককে একই স্থানে একত্রিত করবেন। সে সময় মুশরিকরা বলবে, আল্লাহ তা'আলা একমাত্র একত্ববাদীদের ছাড়া কারও নিকট হতে কিছুই গ্রহণ করবেন না, কাজেই এসো আমরা অস্বীকার করি। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, তখন তারা বলবে- (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর শপথ। আমরা মুশরিক ছিলাম না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখের উপর মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাতপা কথা বলবে ও তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তারা মুশরিক ছিল। সে সময় তারা কামনা করবে যে, যেন ভূমণ্ডল তাদের সাথে সমতল হয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন কথাই তারা গোপন করতে পারবে না। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন।