Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আন-নিসা 4:43 – আন-নিসা 4:84

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আন-নিসা 4:43
  2. আন-নিসা 4:44
  3. আন-নিসা 4:45
  4. আন-নিসা 4:46
  5. আন-নিসা 4:47
  6. আন-নিসা 4:48
  7. আন-নিসা 4:49
  8. আন-নিসা 4:50
  9. আন-নিসা 4:51
  10. আন-নিসা 4:52
  11. আন-নিসা 4:53
  12. আন-নিসা 4:54
  13. আন-নিসা 4:55
  14. আন-নিসা 4:56
  15. আন-নিসা 4:57
  16. আন-নিসা 4:58
  17. আন-নিসা 4:59
  18. আন-নিসা 4:60
  19. আন-নিসা 4:61
  20. আন-নিসা 4:62
  21. আন-নিসা 4:63
  22. আন-নিসা 4:64
  23. আন-নিসা 4:65
  24. আন-নিসা 4:66
  25. আন-নিসা 4:67
  26. আন-নিসা 4:68
  27. আন-নিসা 4:69
  28. আন-নিসা 4:70
  29. আন-নিসা 4:71
  30. আন-নিসা 4:72
  31. আন-নিসা 4:73
  32. আন-নিসা 4:74
  33. আন-নিসা 4:75
  34. আন-নিসা 4:76
  35. আন-নিসা 4:77
  36. আন-নিসা 4:78
  37. আন-নিসা 4:79
  38. আন-নিসা 4:80
  39. আন-নিসা 4:81
  40. আন-নিসা 4:82
  41. আন-নিসা 4:83
  42. আন-নিসা 4:84

আন-নিসা 4:43

আল্লাহ তাআলা স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে নেশার অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করছেন। কেননা, সে সময় নামাযী নিজেই বুঝতে পারে না যে, সে কি বলছে? সঙ্গে সঙ্গে নামাযের স্থানে অর্থাৎ মসজিদে আসতে তাকেও নিষেধ করছেন এবং অবগাহনের পূর্বে অপবিত্র লোককেও নিষধ করছেন। হ্যাঁ, তবে এরূপ ব্যক্তি কোন কার্য বশতঃ যদি মসজিদের একটি দরজা দিয়ে গিয়ে অন্য দরজা দিয়ে ফিরে আসে এবং তথায় অবস্থান না করে তবে এ যাতায়াত বৈধ। নেশার অবস্থায় নামাযের নিকটে না যাওয়ার নির্দেশ মদ্য হারাম হওয়ার পূর্বে ছিল। যেমনঃ সূরা-ই-বাকারার (আরবী) (২:২১৯)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হাদীসে প্রকাশিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এ আয়াতটি হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে পাঠ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) প্রার্থনা করেন-“হে আল্লাহ! মদ্য সম্বন্ধে আরও পরিষ্কারভাবে আয়াত অবতীর্ণ করুন।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ নেশার অবস্থায় নামাযের নিটকবতী না হওয়ার আয়াতটি নাযিল হয়। এরপরে লোকেরা নামাযের সময় মদ্যপান পরিত্যাগ করে। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) পুনরায় এ প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবী) (৫:৯০-৯১) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। যার মধ্যে মদ্য হতে দূরে থাকার পরিষ্কার নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমরা বিরত থাকলাম।' এ বর্ণনার একটি সনদে রয়েছে যে, যখন সূরা-ইনিসার এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং নেশার অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করা হয় তখন প্রথা ছিল, যখন নামায আরম্ভ করা হতো তখন একটি লোক উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করতো-মাতাল ব্যক্তি যেন নামাযের নিকটবর্তী না হয়।সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে, হযরত সাদ (রাঃ) বলেন, “আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। একজন আনসারী খাদ্য রান্না করতঃ বহু লোককে দাওয়াত দেন। আমরা ভোজনে পরিতৃপ্ত হই। অতঃপর আমরা মদ্যপান করে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। এরপরে আমরা পরস্পরের গৌরব প্রকাশ করতে থাকি। একটি লোক উটের চোয়ালের অস্থি উঠিয়ে হযরত সাদ (রাঃ)-কে মেরে দেয়, যার ফলে তাঁর নাক আহত হয় এবং ওর চিহ্ন থেকে যায়। সে সময় পর্যন্ত মদ্য হারাম হয়নি। অতঃপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।' এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) জনগণকে জিয়াফত করেন। জনগণ আহারের পর মদ্যপান করেন এবং জ্ঞানশূন্য হয়ে যান। এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত এসে যায়। একজনকে ইমাম করা হয়। তিনি পাঠ করেনঃ (আরবী) সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং মত্ততাবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করা হয়। এ হাদীসটি জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও রয়েছে এবং এটা হাসান। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) এবং তৃতীয় একজন সাহাবী মদ্যপান করেন। হযরত আবদুর রহমান (রাঃ)-কে ইমাম বানান হয়। কুরআন কারীমের সূরা তিনি বিশৃংখলভাবে পাঠ করেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুনান-ই-আবি দাউদ এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরেও আর একটি বর্ণনা রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) ইমাম হন এবং যেভাবে পড়তে চেয়েছিলেন সেভাবে পড়তে পারেননি। তখন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) ইমাম হয়েছিলেন এবং তিনি নিম্নরূপ পাঠ করেছিলেনঃ (আরবী) তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং ঐ অবস্থায় নামায পড়া হারাম ঘোষণা করা হয়।হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, মদ্যের অবৈধতার পূর্বে মানুষ মাতাল অবস্থায় নামাযে দাড়িয়ে যেতেন। সুতরাং এ আয়াত দ্বারা তাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করে দেয়া হয়।' (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর তোক এ কাজ হতে বিরত থাকে।অতঃপর সম্পূর্ণরূপে মদ্যের অবৈধতা ঘোষিত হয়। হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এখানে ভাবার্থ মদ্যের মত্ততা নয় বরং ভাবর্থ হচ্ছে দ্রিালুতা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে মদ্যের মত্ততা ভাবার্থ হওয়াই সঠিক কথা এবং এখানে নেশায় উন্মত্ত লোকদেরই সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু এতটা নয় যে, শরীয়তের আহকাম তাদের উপর জারী হতেই পারে না। কেননা, নেশায় এরূপ মত্ততাবিশিষ্ট ব্যক্তিকে পাগলেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উসূল’ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ মনীষীদের উক্তি এই যে, সম্বোধন দ্বারা ঐ লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয় যারা কথা বুঝতে পারে। এমন উন্মত্ত ব্যক্তিদেরকে সম্বোধন করা যেতে পারে না যারা কিছুই বুঝে না যে, তাদেরকে কি বলা হচ্ছে। কেননা, সম্বোধন অনুধাবন করার শর্ত হচ্ছে তাকলীফের। এও বলা হয়েছে যে, যদিও শব্দ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে-‘তোমরা মাতাল অবস্থায় নামায পড়ো না, কিন্তু ভাবার্থ হচ্ছে-তোমরা নেশার জিনিস পানাহারও করো না। কেননা, এটা কিরূপে সম্ভব যে, একজন মদ্যপায়ী পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিক সময়ে আদায় করতে পারে অথচ সে বরাবর মদ্য পান করতেই থাকে? এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রয়েছে। তাহলে এ নির্দেশও ঠিক ঐ নির্দেশরই মত যেখানে বলা হয়েছে- “হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যতটা ভয়ের তাঁর হক রয়েছে এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মরো না। এখানে ভাবার্থ এই যে, তোমারা সদা-সর্বদা এরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ কর এবং এমন সৎ কার্যাবলী সব সময় সম্পাদন করতে থাক যে, যখন তোমরা মরণ বরণ করবে তখন যেন তোমাদের মৃত্যু ইসলামের উপরেই হয়।তদ্রুপ এ আয়াতে যে নির্দেশ হচ্ছে- যে পর্যন্ত না তোমরা বুঝতে পার যে, তোমরা কি বলছ, এটা হচ্ছে নেশার সীমারেখা। অর্থাৎ নেশার অবস্থায় ঐ ব্যক্তিকে বুঝতে হবে যে নিজের কথাই বুঝতে পারে না। নেশায় উন্মত্ত ব্যক্তি কুরআন কারীম বিশৃংখলভাবে পাঠ করে থাকে। তার বুঝবার এবং চিন্তা গবেষণা করবার সুযোগ হয় না। সে নামাযে বিনয়ও প্রকাশ করতে পারে না।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ নামায পড়া অবস্থায় তোমাদের কারও তন্দ্রা এলে সে যেন ফিরে আসে এবং ঘুমিয়ে পড়ে যে পর্যন্ত না সে বুঝতে পারে যে সে কি বলছে।' সহীহ বুখারী ও সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। হাদীসের কতক শব্দ এও রয়েছেঃ ‘সে চায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে কিন্তু হয়তো তার মুখ দিয়ে বিপরীত কথা বেরিয়ে যাবে।' এবারে বলা হচ্ছে-‘অপবিত্র ব্যক্তিও যেন গোসল করার পূর্বে নামাযের নিকটবর্তী না হয়। হ্যাঁ, তবে অতিক্রম করা হিসেবে মসজিদের ভেতর দিয়ে গমন করা জায়েয। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন যে, এরূপ অপবিত্র অবস্থায় মসজিদের ভেতরে যাওয়া জায়েয নয়। তবে মসজিদের একদিক দিয়ে প্রবেশ করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় কোন দোষ নেই। মসজিদে বসতে পারবে না। আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈর এটাই উক্তি।হযরত ইয়াযীদ ইবনে আবু হাবীব বলেন যে,"কতগুলো আনসার যারা মসজিদের চতুর্দিকে বাস করতেন তাঁরা অপবিত্র হলে বাড়ীতে হয়তো পানি থাকতো না, আর তাদের ঘরের দরজা মসজিদের সাথে সংযুক্ত থাকতো, তাদেরকে অনুমতি দেয়া হয় যে, তাঁরা ঐ অবস্থাতেই মসজিদ দিয়ে গমন করতে পারেন।সহীহ বুখারী শরীফে তো একথা স্পষ্টভাবে রয়েছে যে, লোকদের ঘরের দরজা মসজিদেই ছিল। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় মরণ রোগের সময় বলেনঃ ‘মসজিদে যেসব লোকের দরজা রয়েছে সবগুলো বন্ধ করে দাও। শুধুমাত্র হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর দরজাটি রেখে দাও।' এর দ্বারা এটাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর তার স্থলাভিষিক্ত হযরত আবু বকরই (রাঃ) হবেন এবং তার প্রায় সব সময় মসজিদে যাতায়াতের প্রয়োজন হবে যেন তিনি মুসমানদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ মীমাংসা করতে পারেন। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমস্ত দরজা বন্ধ করে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর দরজা খুলে রাখতে নির্দেশ দেন। সুনানের কোন কোন হাদীসে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পরিবর্তে হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক ওটাই যা সহীহতে রয়েছে।এ আয়াত দ্বারা অধিকাংশ ইমাম দলীল গ্রহণ করেছেন যে, অপবিত্র লোকের মসজিদে অবস্থান নিষিদ্ধ। তবে গমন করা বৈধ। হায়ে্যু ও নিফাস্ বিশিষ্ট নারীদেরও এ হুকুম। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, এরূপ নারীদের জন্যে মসজিদ দিয়ে গমনও বৈধ নয়। কেননা, এতে মসজিদে অপবিত্রতা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার অন্য কেউ বলেন যে, যদি এ ভয় না থাকে তবে তাদের গমনও বৈধ।সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘আমাকে মসজিদ হতে মাদুরটি এনে দাও। তিনি তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি হায়েযের অবস্থায় রয়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হায়েয তো তোমার হাতে নেই।' এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঋতুবতী নারী মসজিদে যাতায়াত করতে পারে। নিফাস বিশিষ্টা নারীরও এ হুকুম। এরা রাস্তায় চলা হিসেবে যাতায়াত করতে পারে। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা রয়েছেঃ আমি ঋতুবতী নারী ও অপবিত্র লোকদের জন্যে মসজিদকে হালাল করি না। ইমাম আবু মুসলিম খাত্তাবী (রঃ) বলেন, এ হাদীসটিকে একটি দল দুর্বল বলেছেন। কেননা, এর একজন বর্ণনাকারী আফলাত ইবনে খালীফাতুল আমেরী অপরিচিত। কিন্তু সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে এ বর্ণনাটি রয়েছে। তাতে আফলাতের স্থলে মা’দূম যিহূলী রয়েছে। প্রথম হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এবং এ দ্বিতীয় হাদীসটি হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু সঠিক নাম হযরত আয়েশারই (রাঃ) বটে।জামেউত্ তিরযিমীর মধ্যে অন্য একটি হাদীস হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আলী! এ মসজিদে অপবিত্র হওয়া তোমার ও আমার ছাড়া আর কারও জন্যে হালাল নয়। এ হাদীসটি সম্পূর্ণই দুর্বল এবং এটা কখনই সাব্যস্ত হতে পারে না। এতে সালিম নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যে পরিত্যাজ্য এবং তার শিক্ষক আতিয়্যাও দুর্বল। এ বিষয়ে আল্লাহ পাকই ভাল জানেন। এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ভাবার্থ এই যে, অপবিত্র ব্যক্তি এ অবস্থায় গোসল না করে নামায পড়তে পারে না, কিন্তু যদি সফরে থাকে এবং পানি না পায় তবে পানি না পাওয়া পর্যন্ত পড়তে পারে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) এবং হযরত যহাক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত যায়েদ (রঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত হয়েছে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, “আমরা শুনতাম যে, এ হাদীসটি সফরের হুকুমে অবতীর্ণ হয়েছে।' এ হাদীস দ্বারাও এ মাসআলার সাক্ষ্য হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পবিত্র মাটি হচ্ছে মুসলমানকে পবিত্রকারী যদিও দশ বছর পর্যন্ত পানি পাওয়া না যায়। যখন পানি পাওয়া যাবে তখন ওটাই ব্যবহার করবে, এটাই তোমার জন্যে উত্তম।' (সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ দু’টি উক্তির মধ্যে উত্তম হচ্ছে ঐ লোকদের উক্তি যারা বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে অতিক্রম করা হিসেবে মসজিদে গমন করা। কেননা, যে মুসাফির অপবিত্র অবস্থায় পানি পাবে না তার হুকুমতো পরে পরিষ্কারভাবে রয়েছে। সুতরং এখানেও যদি এ ভাবার্থই হয় তবে পরে আবার একে অন্য বাক্যে ফেরানোর কোন আবশ্যকতা থাকে না।অতএব আয়াতের অর্থ এখন এই হলো যে, হে মুমিনগণ! তোমরা মাতাল অবস্থায় মসিজদে যেওনা যে পর্যন্ত তোমরা নিজেদের কথা নিজেরাই বুঝতে না পার। অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থাতেও তোমরা মসজিদে যেওনা যে পর্যন্ত অবগাহন না কর। তবে রাস্তা অতিক্রম করা হিসেবে যাওয়া বৈধ। শব্দের অর্থ হচ্ছে আসা-যাওয়া অর্থাৎ অতিক্রম করা। এর। বা এসে থাকে। যখন কেউ নদী অতিক্রম করে তখন আরববাসীরা বলে, (আরবী) অর্থাৎ ‘অমুক নদী অতিক্রম করেছে।অনুরূপভাবে যে শক্তিশালী উট সফরে পথ অতিক্রম করে তাকেও তারা বলে, (আরবী) অর্থাৎ উট ভ্ৰমণ পথ অতিক্রম করেছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেন, জমহুরেরও ঐ উক্তি। আর আয়াত দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা সে অসম্পূর্ণ অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করছেন যা নামাযের উদ্দেশ্যের বিপরীত। অনুরূপভাবে নামাযের স্থানে এমন অবস্থায় আসতে বাধা দিচ্ছেন যা সে স্থানের শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতার উল্টো। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান ভাল রয়েছে।তারপর যে আল্লাহ পাক বলেন-‘যে পর্যন্ত তোমরা গোসল না কর। এটা দলীল হচ্ছে ইমাম আবু হানিফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর যে, অপবিত্র ব্যক্তির মসজিদে অবস্থান নিষিদ্ধ, যে পর্যন্ত সে গোসল না করবে বা যদি পানি না পায় কিংবা পানি পায় কিন্তু তা ব্যবহারের ক্ষমতা না থাকে তবে তায়াম্মুম করে নেবে।ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, অপবিত্র ব্যক্তি যখন নামায পড়ে নেবে তখন তার জন্যে মসজিদে অবস্থান বৈধ। যেমন মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সুনান-ই-সাঈদ মানসূরে বর্ণিত আছে। হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণকে দেখেছি যে, তারা অপবিত্র হতেন এবং অযু করে মসজিদে বসে থাকতেন।' এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এখন কোন কোন সময় তায়াম্মুম করা জায়েয তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যে রোগের কারণে তায়াম্মুম জায়েয হয় ওটা হচ্ছে ঐ রোগ যে ঐ সময় পানি ব্যবহার করলে কোন অঙ্গ নষ্ট হওয়ার বা রোগের সময় বেড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কোন কোন আলেম প্রত্যক রোগের জন্য তায়াম্মুমের অনুমতির ফতওয়া দিয়েছেন। কেননা আয়াত সাধারণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, একজন আনসারী রুগ্ন ছিলেন। না তিনি দাঁড়িয়ে অযু করতে পারেন, না তার কোন সেবক ছিলো যে তাঁকে পানি দেয়। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করেন। সে সময় এ হুকুম অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটি মুরসাল।তায়াম্মুমের বৈধতার দ্বিতীয় অবস্থা হচ্ছে সফর। সে সফর দীর্ঘই হোক বা ক্ষুদ্র হোক। (আরবী) বলা হয় নরম ভূমিকে। এখানে ওর দ্বারা পায়খানাকে বুঝান হয়েছে। লা-মাসতুম শব্দের দ্বিতীয় পঠন হচ্ছে লামাসতুম। এর তাফসীরে দুটি উক্তি রয়েছে। একটি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সঙ্গম। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা সঙ্গমের পূর্বে স্ত্রীদেরকে তালাক প্রদান কর এবং তাদের মোহর নির্দিষ্ট কর তবে যা নির্দষ্ট করেছে তারা তার অর্ধেক পাবে।' (২:২৩৭) অন্য আয়াতে রয়েছে- “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নারীদেরকে বিয়ে কর অতঃপর সঙ্গমের পূর্বে তালাক প্রদান কর তখন তাদের জন্যে ইদ্দত’ নেই। এখানেও (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে (আরবী) (৫:৬)-এর ভাবার্থ সঙ্গম। হযরত আলী (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ) হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন, একবার এ শব্দের উপর আলোচনা হলে কতগুলো মাওয়ালী বলেন যে, এটা সঙ্গম নয় এবং কতগুলো আরব বলেন যে, এটা সঙ্গম। আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন-তুমি কাদের সঙ্গে ছিলে? আমি বলি- ‘আমি মাওয়ালীদের সঙ্গে ছিলাম। তিনি বলেন, মাওয়ালীগণ পরাজিত হয়েছে। (আরবী) এবং (আরবী) অর্থ হচ্ছে সঙ্গম। আল্লাহ তা'আলা এখানে কিনায়া করেছেন। অন্যান্য কয়েকজন মনীষী এর ভাবার্থ সাধারণ স্পর্শ করা নিয়েছেন। নিজের শরীরের কোন অংশ স্ত্রীর শরীরের কোন অংশের সাথে মিলিয়ে নিলেই অযু ওয়াজিব হয়ে যায়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, ‘সঙ্গম ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশ স্পর্শ করাকে (আরবী) বলা হয়। তিনি বলেন যে, চুম্বনও (আরবী)-এরই অন্তর্ভুক্ত এবং ওতেও অযু করা অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়বে।' তিনি আরও বলেন, ‘সঙ্গম করায়, হাত দ্বারা স্পর্শ করায় এবং চুম্বন করায় অযু করতে হয়।' (আরবী)-এর ভাবার্থ স্পর্শ করা।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) চুম্বন দেয়াতে অযু ফরয হওয়ার উক্তিকারী ছিলেন এবং ওটাকেও (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন। হযরত উবাইদাহ (রাঃ), হযরত আবু উসমান (রাঃ), হযরত সাবিতা (রাঃ), হযরত ইবরাহীম (রাঃ) এবং হযরত যায়েদও (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সঙ্গম ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশ স্পর্শ করা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'মানুষের স্বীয় স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া এবং হাত দ্বারা স্পর্শ করা হচ্ছে (আরবী) এতে অযু ফরয হয়ে যাবে। (মুআত্তা-ই-মালিক)দারেকুতনীর হাদীসের মধ্যে স্বয়ং হযরত উমার (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় বর্ণনা এর বিপরীতও পাওয়া যায় যে, তিনি অযুর অবস্থায় ছিলেন এবং স্বীয় স্ত্রীকে চুম্বন দেন, অতঃপর অযু করেননি, ঐ অবস্থাতেই নামায আদায় করেন। সুতরাং এ দু’টি বর্ণনাকে সঠিক মেনে নেয়ার পর এ ফায়সালা করতেই হবে যে, তিনি অযুকে মুস্তাহাব মনে করতেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।সাধারণ স্পর্শতেই অযু করতে হবে এ উক্তি হচ্ছে শাফিঈ (রঃ) এবং তাঁর সহচরের। ইমাম মালিক ও প্রসিদ্ধ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এ উক্তিই বর্ণিত আছে। যারা এ উক্তি করেন তাঁরা বলেন যে, এখানে দু'টি কিরআত রয়েছে। একটি হচ্ছে লা-মাসতুম এবং অপরটি হচ্ছে লামাসতুম। আর কুরআন কারীমের মধ্যে হাত দ্বারা স্পর্শ করার উপরও শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) (৬:৭) এটা স্পষ্টকথা যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে হাত দ্বারা স্পর্শ করা। অনুরূপভাবে হযরত মায়েয ইবনে মালিক (রাঃ)-কে রাসূল (সঃ) বলেছিলেনঃ সম্ভবতঃ তুমি চুম্বন দিয়ে বা হাত দ্বারা স্পর্শ করে থাকবে। সেখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে এবং শুধু হাত লাগানোর অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হাতের ব্যভিচার হচ্ছে হাত দ্বারা স্পর্শ করা।' হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, এরূপ খুব কম দিনই অতিবাহিত হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট এসে আমাদেরকে চুম্বন দেননি বা হাত দ্বারা স্পর্শ করেননি।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে নিষেধ করেছেন। এখানেও এর অর্থ হচ্ছে হাত দ্বারা স্পর্শ করার ক্রয়-বিক্রয়। অতএব হাদীসটিকে যেমন সঙ্গমের উপর প্রয়োগ করা হয় দ্রুপ হাত দ্বারা স্পর্শ করার উপরও প্রয়োগ করা হয়। কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার হাত তার হাতের সাথে মিলিত হয়েছে, আমি ধন চাই।'ইবনে আবি লাইলা হযরত মুআয (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটির ব্যাপারে মীমাংসা কী হতে পারে যে একটি অপরিচিতা নারীর সঙ্গে শুধু ব্যভিচার ছাড়া ঐ সমস্ত কাজ করেছে যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়ে থাকে। তখন- (আরবী) (১১:১১৪) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটিকে বলেন, অযু কর ও নামায আদায় কর। হযরত মুআয (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কি একমাত্র তার জন্যে নির্দিষ্ট, না সমস্ত মুসলমানের জন্য সাধারণ? তিনি উত্তর দেনঃ “বরং এটা সমস্ত মুসলমানের জন্যে সাধারণ। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে যায়েদার হাদীস থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, এর সনদ সংযুক্ত নয়। ইমাম নাসাঈ (রঃ) হতে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেন। মোটকথা, এটার উক্তিকারী এ হাদীসটি সম্বন্ধে বলেন, লোকটিকে অযু করার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, সে স্ত্রীলোকটিকে স্পর্শ করেছিল মাত্র সঙ্গম করেনি। এর উত্তর এই দেয়া যায় যে, প্রথমতঃ এটা মুনকাতা। ইবনে আবি লাইলা ও হযরত মু'আযের মধ্যে সাক্ষাত প্রমাণিত নয় ।দ্বিতীয়তঃ হতে পারে যে, তাকে ফরয নামায আদায়ের জন্যে অযু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে বান্দা কোন পাপ করার পর অযু করে দু' রাকআত নামায আদায় করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। এ হাদীসটি পূর্ণভাবে সূরা আলে ইমরানের (আরবী) (৩:১৩৫)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, এ উক্তি দুটির মধ্যে উত্তম হচ্ছে ঐ লোকদের উক্তি যারা বলেন যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সঙ্গম, অন্য কিছু নয়। কেননা, সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কোন পত্নীকে চুম্বন দেন এবং অযু না করেই নামায আদায় করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করতেন, অতঃপর চুম্বন দিতেন এবং পরে অযু না করেই নামায আদায় করতেন। হযরত হাবীব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোন সহধর্মিণীকে চুম্বন করতেন, অতঃপর নামাযে যেতেন এবং অযু করতেন না। আমি বলি, সে স্ত্রী আপনিই হতেন। তখন তিনি মুচকি হেসে উঠেন। এর সনদে সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সনদে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, উপরের বর্ণনাকারী অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে শ্রবণকারী হচ্ছেন হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ)।অন্য বর্ণনায় রয়েছে- ‘অযুর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে চুম্বন করতেন এবং পুনরায় অযু করতেন না। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, তিনি চুম্বন করেন এবং পরে অযু না করেই নামায আদায় করেন।হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুম্বন করতেন অথচ তিনি রোযার অবস্থায় থাকতেন এবং তাতে তার রোযাও নষ্ট হতো না ও তিনি নতুনভাবে অযুও করতেন না'। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত যায়নাব সাহমিয়া' (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুম্বন দেয়ার পর অযু না করেই নামায আদায় করতেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেন-“যদি পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর।' এর দ্বারা অধিকাংশ ধর্মশাস্ত্রবিদ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পানি না পাওয়ার কারণে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে পানি অনুসন্ধানের পর। কুতুবে ফুরু’র মধ্যে অনুসন্ধানের অবস্থাও বর্ণনা করা হয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে দেখেন যে, সে লোকদের সাথে নামায না পড়ে পৃথক হয়ে রয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘জনগণের সাথে তুমি নামায পড়লে না কেন? তুমি কি মুসলমান নও? লোকটি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি মুসলমান তো বটে, কিন্তু আমি অপবিত্র হয়ে গেছি এবং পানি পাইনি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ অবস্থায় তোমার জন্যে মাটি যথেষ্ট ছিল। (আরবী) শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছে করা। আরবেরা বলে- (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা স্বীয় হিফাযতের সঙ্গে তোমার প্রতি ইচ্ছে পোষণ করুন। ইমরুল কায়েসের নিম্নের কবিতায়ও (আরবী) শব্দটি এ অর্থেই এসেছেঃ (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ জিনিস যা ভূপৃষ্ঠের উপর চড়ে গেছে। সুতরাং মাটি, বালু, গাছ প্রভৃতিও এর অন্তর্ভুক্ত। বলা হয়েছে যে, যে জিনিস মাটির শ্রেণীভুক্ত, যেমন বালু, ইট এবং চুন ইত্যাদি। এটা ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব। আবার শুধু মাটিকেও বলা হয়েছে এবং এটা হচ্ছে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং তাঁদের সহচরদের উক্তি। এর প্রথম দলীল তো কুরআন কারীমের এ শব্দগুলো (আরবী) অর্থাৎ সুতরাং ওটা পিচ্ছিল মাটি হয়ে যাবে।' (১৮:৪০) দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে সহীহ মুসলিমের নিম্নে হাদীসটিঃহযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদেরকে সমস্ত মানুষের উপর তিনটি মর্যাদা দেয়া হয়েছে (১) আমাদের সারিগুলো ফেরেশতাদের সারির মত করা হয়েছে (২) আমাদের জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ করা হয়েছে এবং (৩) ভূপৃষ্ঠের মৃত্তিকাকে আমাদের জন্যে পবিত্র ও পবিত্রকারী বানানো হয়েছে যখন আমরা পানি না পাই। হাদীসের শব্দগুলোর মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে এবং অন্য সনদে (আরবী)-এর স্থলে (আরবী) শব্দ বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এ হাদীসে কৃপা প্রকাশের সময় মাটিকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যদি অন্য কোন জিনিস অযুর স্থলবর্তী হতো তবে সাথে সাথে ওরও উল্লেখ করতেন। এখানে (আরবী) শব্দটির অর্থের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ওর ভাবার্থ হচ্ছে হালাল এবং কারও কারও মতে ওর ভাবার্থ হচ্ছে পবিত্র। যেমন হাদীস শরীফ রয়েছে, হররত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পবিত্র মাটি হচ্ছে মুসলমানদের অযু, যদিও দশ বছর পর্যন্ত পানি পাওয়া না যায়। অতঃপর যখন পানি পাওয়া যাবে তখন সে যেন তা তার শরীরে বুলিয়ে দেয়। এটাই তার জন্যে উত্তম।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন। হাফিয আবুল হাসান কাত্তানও (রঃ) একে বিশুদ্ধ বলেছেন। সবচেয়ে পবিত্র মাটি হচ্ছে ক্ষেত্র ভূমির মাটি। এমন কি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে একে মার’ রূপে আনা হয়েছে। এরপর বলা হচ্ছে-‘ঐ মাটি স্বীয় মুখমণ্ডলে ও হাতে ঘর্ষণ কর।' তায়াম্মুম হচ্ছে অযুর স্থলবর্তী। এটা শুধুমাত্র পবিত্রতা লাভের জন্যে সমস্ত শরীরে ঘর্ষণের জন্যে নয়। সুতরাং শুধু মুখে ও হাতে ঘর্ষণ করলেই যথেষ্ট হবে। এর উপর ইজমা হয়েছে। কিন্তু তায়াম্মুম করার নিয়মে মতবিরোধ রয়েছে।নতুন শাফিঈ মাযহাব এই যে, দু'বার করে মুখ এবং দু'খানা হাত কনুই পর্যন্ত মাসাহ্ করা ওয়াজিব। কেননা, (আরবী)-এর প্রয়োগ কাদের নিম্নাংশ পর্যন্ত ও হাতের কনুই পর্যন্ত এর উপর হয়ে থাকে। যেমন অযুর আয়াতে রয়েছে। আর এ শব্দেরই প্রয়োগ হয়ে থাকে এবং ভাবার্থ শুধু হস্তদ্বয়ের তালু হয়ে থাকে। যেমন চোরের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন- (আরবী) (৫৩৮) এখানে তায়াম্মুমের হুকুমে হাতের বর্ণনা হচ্ছে সাধারণ এবং অযুর হুকুমে হচ্ছে শর্তযুক্ত। এজন্যেই মুতলাক'-কে ‘মুকাইয়াদ’ -এর হুকুমে উঠান হবে। কেননা, অযুর মধ্যে ব্যাপক পবিত্রতা বিদ্যমান রয়েছে। কেউ কেউ এর দলীলরূপে দারেকুতনী (রঃ)-এর বর্ণনাকে গ্রহণ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তায়াম্মুত হচ্ছে দু’বার (হাত) মারা। একবার হাত মেরে মুখের উপর ঘর্ষণ করা এবং আর একবার হাত মেরে দু হাতকে কনুই পর্যন্ত ঘর্ষণ করা। কিন্তু হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। কেননা, এর ইসনাদে দুর্বলতা রয়েছে। হাদীসটি প্রমাণিত নয়।সুনান-ই-আবূ দাউদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হস্ত একটি দেয়ালের উপর মারেন এবং মুখমণ্ডলে ঘর্ষণ করেন, দ্বিতীয়বার হাত মেরে স্বীয় হস্তদ্বয়ের উপর ঘর্ষণ করেন। কিন্তু এর ইসনাদে মুহাম্মাদ ইবনে সাবিত আবদী দুর্বল। কোন কোন হাফি-ই-হাদীস তাকে দুর্বল বলেছেন। এ হাদীসটিই কোন কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারা মারফু করেন না, বরং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর কাজ বলে থাকেন। ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম আবু যারআ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আ’দীর (রঃ) সিদ্ধান্ত এই যে, এ হাদীসটি মাওকুফই বটে। ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসকে মার’ বলা মুনকার।নিম্নের হাদীসটিও ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দলীল। হযরত ইবনুস্ সাম্মা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তায়াম্মুম করেন এবং স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের উপর হাত ফিরিয়ে দেন। হযরত আবূ জাহাম (রাঃ) বলেন, “আমি দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রস্রাব করছেন। আমি তাঁকে সালাম দেই কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তিনি দেয়ালের নিকট গিয়ে তার উভয় হস্তদ্বয় মারেন এবং হস্তদ্বয় কনুই পর্যন্ত ঘর্ষণ করেন। অতঃপর তিনি আমার সালামের উত্তর দেন।' (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) এতো ছিল ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর নতুন মাযহাব। তার প্রাচীন মাযহাব এই যে, তায়াম্মুমে মার তো দু’টোই, কিন্তু দ্বিতীয় মারে হাতকে কজি পর্যন্ত ঘর্ষণ করতে হবে। তৃতীয় উক্তি এই যে, শুধু একটি বার মার অর্থাৎ শুধু একবার হস্তদ্বয় মাটির উপর মেরে নেয়াই যথেষ্ট। ধূলিযুক্ত হাতকে মুখের উপর এবং হস্তদ্বয়ের কজি পর্যন্ত ফিরিয়ে নেবে। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে বলে-“আমি অপবিত্র হয়ে গেছি এবং পানি পাইনি। আমাকে কি করতে হবে?' তিনি বলেন, 'নামায পড়তে হবে না। তাঁর দরবারে হযরত আম্মারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। তিনি বলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার কি স্মরণ নেই যে, আমরা এক সেনাদলে ছিলাম। আমি ও আপনি দু’জন অপবিত্র হয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের নিকট পানি ছিল না। আপনি তো নামায পড়েননি। আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে নামায আদায় করেছিলাম। ফিরে এসে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই এবং আমি তাঁর নিকট উক্ত ঘটনা বর্ণনা করি। তখন তিনি হেসে উঠেন ও বলেনঃ “তুমি এরূপ করলেই যথেষ্ট হতো। অতঃপর তিনি মাটিতে হাত মারেন এবং ফু দিয়ে স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ে হাত ফিরিয়ে নেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তায়াম্মুমে একবারই হাত মারতে হয় যা মুখমণ্ডলের জন্যে ও হস্তদ্বয়ের তালুর জন্যে। মুসনাদ-ই-আহমাদেরই আর একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত শাকীক (রঃ) বলেন, 'আমি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ও হযরত আবু মূসা (রাঃ)-এর সঙ্গে বসেছিলাম। হযরত আবু ইয়ালা (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেন, ‘যদি কেউ পানি না পায় তবে সে যেন নামায না পড়ে।' একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ বলেন, “হযরত আম্মার (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে যা বলেছিলেন তা কি আপনার স্মরণ নেই? তিনি হযরত উমর (রাঃ)-কে বলেছিলেনআপনার কি স্মরণ নেই যে, আমাকে ও আপনাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উটে চড়িয়ে (কোন এক জায়গায়) পাঠিয়েছিলেন। তথায় আমি অপবিত্র হয়ে যাই এবং মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে নামায পড়ে লই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে তাঁকে এ সংবাদ দেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠে বলেনঃ ‘তুমি এরূপ করলেই যথেষ্ট হতো। অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় ভূমির উপর মারেন এবং হস্তের তালুদ্বয় এক সাথে ঘর্ষণ করেন ও মুখমণ্ডলে একবার হাত ফিরিয়ে নেন। মার একবারই ছিল।' হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, এতে কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) সন্তুষ্ট হননি।' একথা শুনে হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেন, তাহলে সূরা-ই-নিসার এ আয়াতটিকে কি করবেন যাতে রয়েছে-‘পানি না পেলে পবিত্র মাটির ইচ্ছে কর।' হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর উত্তর দিতে পারেননি এবং বলেন, জেনে রাখুন যে, যদি আমরা জনগণকে তায়াম্মুমের অনুমতি দিয়ে দেই তবে খুব সম্ভব পানি যখন তাদের কাছে খুব ঠাণ্ডা অনুভূত হবে তখন তারা তায়াম্মুম করতে আরম্ভ করবে।'সুরা মায়েদায় ঘোষিত হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘ওটা তোমাদের মুখমণ্ডলে ও তোমাদের হাতে ঘর্ষণ কর।' (৫:৬) এটা দ্বারা হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) দলীল গ্রহণ করেছেন যে, তায়াম্মুম পবিত্র মাটি দ্বারা হওয়া ও ওটা ধূলিযুক্ত হওয়া যাতে ধূলি হাতে লেগে যায় এবং মুখ ও হাতের উপর ঘর্ষণ করা যায়, এটা জরুরী। যেমন হযরত আবূ জাহাম (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে বর্ণনা করা রয়েছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রস্রাব করতে দেখেন এবং সালাম করেন। তাতে এও রয়েছে যে, ঐ কার্য শেষ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেয়ালের পার্শ্বে যান এবং স্বীয় লাঠি দ্বারা কিছু মাটি উঠিয়ে নিয়ে ওটা হাতে মেরে তায়াম্মুম করেন। এরপর ঘোষিত হচ্ছে আল্লাহ তোমাদের উপর তোমাদের ধর্মে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্য আনয়ন করতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান। এ জন্যেই পানি না পাওয়ার সময় মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করাকে তোমাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং তোমাদের উপর স্বীয় নি'আমত দান করেছেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। সুতরাং এ উম্মত এ নিআমতের সঙ্গে নির্দিষ্ট। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা পূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) আমার জন্যে সমস্ত ভূমিকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বানানো হয়েছে। আমার উম্মতের যে কোন জায়গায় নামাযের সময় এসে যাবে সেখাইে নামায পড়ে নেবে। তার মসজিদও তার অযু সেখানেই তার নিকট বিদ্যমান রয়েছে। (৩) আমার জন্যে যুদ্ধলব্ধ মালকে হালাল করা হয়েছে যা আমার পূর্বে কারও জন্যে হালাল করা হয়নি। (৪) আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। (৫) সমস্ত নবী (আঃ)-কে শুধুমাত্র নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট পাঠানো হতো। কিন্তু আমি সারা দুনিয়ার নিকট প্রেরিত হয়েছি।'সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে ঐ হাদীসেও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সমস্ত লোকের উপর আমাদেরকে তিনটি ফযীলত দেয়া হয়েছে। (১) আমাদের সারিগুলো ফেরেশতাদের সারির মত বানানো হয়েছে। (২) আমাদের জন্য সারা ভূমিকে মসজিদ বানানো হয়েছে। (৩) পানি পাওয়া না গেলে ওর মাটিকে অযু বানানো হয়েছে। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন-পানি না পাওয়ার সময় স্বীয় মুখমণ্ডল ও হাতের উপর মাসেহ্ কর, তিনি মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। তার মার্জনা ও ক্ষমার অবস্থা এই যে, পানি না পাওয়ার সময় তায়াম্মুমকে শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করতঃ ঐভাবে নামায আদায় করার অনুমতি দান করেছেন। তিনি এ অনুমতি না দিলে তোমরা কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে যেতে। কেননা, এ পবিত্র আয়াতে নামাযকে অসম্পূর্ণ অবস্থায় আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন নেশার অবস্থায় বা অপবিত্র অবস্থায় কিংবা বে-অযু অবস্থায় নামায পড়াকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন যে পর্যন্ত সে নিজের কথা নিজেই বুঝতে না পারবে, নিয়মিতভাবে গোসল না করবে এবং শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী অযু না করবে। কিন্তু রোগের অবস্থায় ও পানি না পাওয়ার অবস্থায় তায়াম্মুমকে অযু ও গোসলের স্থলবর্তী করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার এ অনুগ্রহের জন্যে আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্যেই। এখন তায়াম্মুমের অনুমতি দেয়ার ঘটনা বর্ণনা হচ্ছে। আমরা সূরা-ই-নিসার এ আয়াতের তাফসীরে এ ঘটনাটি যে বর্ণনা করছি, এর কারণ এই যে, সূরা-ই-মায়েদার তায়াম্মুমের আয়াতটি এ আয়াতের পর অবতীর্ণ হয়। এর প্রমাণ এই যে, স্পষ্টতঃ এটিই হচ্ছে মদ্য নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বের আয়াত এবং মদ্য হারাম হয় উহুদ যুদ্ধের কিছুদিন পর, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বান্ নাযীরের ইয়াহূদীদেরকে অবরোধ করে রেখেছিলেন। আর কুরআন শরীফের যে সূরাগুলো শেষের দিকে অবতীর্ণ হয়, সূরা-ই-মায়েদাহ ঐগুলোর মধ্যে একটি। বিশেষ করে এ সূরার প্রাথমিক আয়াতগুলো শেষের দিকে অবতীর্ণ হয়। সুতরাং তায়াম্মুমের শান-ই-নমূল এখানে বর্ণনা করাই যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ তাআলার উত্তম তাওফীক দানের উপরই নির্ভর করছি।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে হযরত আসমা (রাঃ)-এর নিকট হতে একটি হার ধার করেছিলেন। উক্ত হারটি সফরে কোন জায়গায় হারিয়ে যায়। হারটি অনুসন্ধানের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে দেন। হার পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ওটা খুঁজতে খুঁজতে নামাযের ওয়াক্ত এসে যায়। তাদের নিকট পানি ছিল না। তারা বিনা অযুতেই নামায আদায় করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ওটা বর্ণনা করেন। সে সময় তায়াম্মুমের হুকুম অবতীর্ণ হয়। হযরত উসায়েদ ইবনে হুজায়ের (রাঃ) তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন। আল্লাহর শপথ! আপনার উপর যে বিপদ এসে থাকে তার পরিণাম মুসলমানদের জন্য মঙ্গলজনকই হয়।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে কোন এক সফরে বের হই। যখন আমরা বায়দা অথবা যাতুল জায়েশ’ নামক স্থানে ছিলাম তখন আমার হারটি ভেঙ্গে কোথায় পড়ে যায়। হারটি খুঁজবার জন্য যাত্রীদলসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তথায় থেমে যান। তখন না আমাদের নিকট পানি ছিল, না ঐ প্রান্তরের কোন জায়গায় পানি ছিল। জনগণ আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন-“দেখুন আমরা তাঁর কারণে কি বিপদেই না পড়েছি!' অতএব আমার পিতা আমার নিকট আগমন করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার উরুর উপর স্বীয় মস্তক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এসেই তিনি আমাকে বলেন, “তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ও জনগণকে এখানে থামিয়ে দিয়েছে। এখন না তাদের নিকট পানি রয়েছে, না কোন জায়গায় পানি দেখা যাচ্ছে?' মোটকথা তিনি আমাকে খুব শাসন গর্জন করেন এবং আল্লাহ জানেন কত কি তিনি আমাকে বলেছেন। এমনকি স্বীয় হস্ত দ্বারা আমার পার্শ্ব দেশে প্রহার করতেও থাকেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে বলে আমি সামান্য নড়াচড়াও করিনি। সারা রাত্রি কেটে যায়। সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন। কিন্তু পানি ছিল না। সে সময় আল্লাহ তা'আলা তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ করেন। তখন সমস্ত লোক তায়াম্মুম করেন। হযরত উসায়েদ ইবনে হুজায়ের (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আবু বকরের পরিবারবর্গ! এ বরকত আপনাদের প্রথম নয়। তখন যে উটে আমি আরোহণ করেছিলাম ঐ উটটি উঠালে ওর নীচে আমার হার পেয়ে যাই।' (সহীহ বুখারী)মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় পত্নী হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে যাতুল জায়েশ’ এর মধ্য দিয়ে গমন করছিলেন। তথায় হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ইয়ামানী হারটি ভেঙ্গে কোথায় পড়ে যায়। ঐ হারটি খুঁজবার জন্য জনগণ তথায় থেমে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সঙ্গীয় মুসলমানগণ সারা রাত্রি তথায় কাটিয়ে দেন। সকালে উঠে দেখেন যে, পানি মোটেই নেই। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে পবিত্রতা লাভ করার অনুমতি দানের আয়াত অবতীর্ণ করেন। মুসলমানগণ রাসূলুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে উঠে মাটির উপর হাত মারেন এবং হাতে যে মাটি লাগে তা ঝেড়ে না ফেলেই স্বীয় চেহারার উপর ও হস্তদ্বয়ের উপর কাঁধ পর্যন্ত ও হাতের নীচ হতে বগল পর্যন্ত ঘর্ষণ করেন।ইবনে জারীর (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, এর পূর্বে তো হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর উপর ভীষণ রাগন্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু তায়াম্মুমের অনুমতির হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার সংবাদ শুনে আনন্দিত চিত্তে স্বীয় কন্যার নিকট আগমন করেন এবং বলেন, তুমি বড়ই কল্যাণময়ী। মুসলমানেরা এত বড় অবকাশ পেয়েছে।অতঃপর মুসলমানগণ একবার হাত মেরে চেহারা ঘর্ষণ করেন এবং দ্বিতীয়বার হাত মেরে কনুই পর্যন্ত ও বগল পর্যন্ত হস্তদ্বয় ঘর্ষণ করেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আসলা’ ইবনে সুরাইক (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উষ্ট্ৰীটি চালনা করছিলাম যার উপর তিনি আরোহিত ছিলেন। তখন ছিল শীতকাল, রাত্রে ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছিল, সে সময় আমি অপবিত্র হয়ে পড়ি। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাত্রার ইচ্ছে করেছেন। ঐ অবস্থায় আমি তার উস্ত্রী ছালনা করতে অপছন্দ করি। সাথে সাথে আমার এটাও ধারণা হয় যে, ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করলে আমি মরেই যাবো বা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়বো। আমি চুপে চুপে একজন আনসারীকে (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উষ্ট্ৰীটির লাগাম ধরতে বলি। সুতরাং তিনি লাগাম ধরে চলতে থাকেন, আর আমি আগুন জ্বেলে পানি গরম করতঃ গোসল করে লই। তারপর দৌড়ে গিয়ে যাত্রীদলের নিকট পৌছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ ‘আসল’ ব্যাপার কি? উষ্ট্ৰীটির চলন কেমন যেন বিগড়ে গেছে?' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতক্ষণ আমি উষ্ট্ৰী চালাইনি। বরং অমুক আনসার (রাঃ) চালনা করছিলেন। তিনি তখন বলেনঃ “এর কারণ কি?' আমি তখন সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। তখন আল্লাহ তাআলা হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ বর্ণনাটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে।

আন-নিসা 4:44

৪৪-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন- ইয়াহুদীদের (কেয়ামত পর্যন্ত তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক) একটি নিন্দনীয় স্বভাব এও রয়েছে যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্তপথকে গ্রহণ করেছে, শেষ নবী (সঃ)-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা হতে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং পূর্ববর্তী নবীগণ হতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে যে জ্ঞান তারা প্রাপ্ত হয়েছে সেটাও তারা শিষ্যদের নিকট হতে নৈবেদ্য নেয়ার লোভে প্রকাশ করছে না। বরং সাথে সাথে এটাও কামনা করছে যে, স্বয়ং মুসলমানেরাও যেন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলার গ্রন্থকে অস্বীকার করে এবং সুপথ ও সঠিক ইলকে পরিত্যাগ করে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের শত্রুদের সংবাদ খুব ভালভাবেই রাখেন। তিনি তোমাদেরকে তাদের হতে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন তাদের প্রতারণার ফাঁদে না পড়। তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্যই যথেষ্ট। তোমরা বিশ্বাস রাখ যে, যারা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, তিনি তাদের অবশ্যই সহায়তা করে থাকেন এবং তিনি তাদের সাহায্যকারী হয়ে যান। তৃতীয় আয়াতটি যা (আরবী) শব্দ দ্বারা শুরু হয়েছে তাতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) বর্ণনা করার জন্য এসেছে। যেমন (আরবী) (২২:৩০) অতঃপর ইয়াহূদীদের ঐ দলের যে পরিবর্তন করণের কথা বলা হচ্ছে, তার ভাবার্থ এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার কথার ভাবার্থ বদলিয়ে দেয় এবং ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। আর এ কাজ তারা জেনে শুনে ও বুঝে সুঝে করে থাকে। এর ফলে তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা আরোপকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা নকল করেছেন যে, তারা বলে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি যা কিছু বলেন আমরা তা শুনি কিন্তু মান্য করি না। তাদের কুফরী ও ধর্মদ্রোহীতার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তারা জেনে ও বুঝে স্পষ্টভাষায় কিভাবে নিজেদের অপবিত্র খেয়ালের কথা প্রকাশ করছে এবং বলছে- ‘আমরা যা বলি তা আপনি শুনুন, আল্লাহ করেন আপনি না শুনেন। কিংবা ভাবার্থ এই যে, আপনি শুনুন, কিন্তু আপনার কথা মান্য করা হবে না। কিন্তু প্রথম ভাবার্থটিই অধিকতর সঠিক। এ কথা তারা উপহাস ও বিদ্রুপের ছলে বলতো। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। তারা (আরবী) বলতো। এর দ্বারা বাহ্যতঃ বুঝা যেতো যে তারা বলছে- আমাদের দিকে কান লাগিয়ে দিন। কিন্তু তারা এ শব্দ দ্বারা ভাবার্থ গ্রহণ করতো- আপনি বড়ই উদ্ধত ও অহংকারী। এর পূর্ণ ভাবার্থ (আরবী) (২:১০৪)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, যা তারা বাইরে প্রকাশ করতো, স্বীয় জিহ্বাকে বক্র করে বিদ্রুপ সূচক ভঙ্গিতে অন্তরের মধ্যে তার উল্টো ভাব গোপন করে রাখতো। প্রকৃতপক্ষে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে বেয়াদবী করতো। তাই তাদেরকে হিদায়াত করা হচ্ছে যে, তারা যেন এ দু’অর্থযুক্ত শব্দগুলো বর্ণনা পরিত্যাগ করে এবং স্পষ্টভাবে বলে, আমরা শুনলাম ও মানলাম, আপনি আমাদের আর শুনুন ও আমাদের দিকে দেখুন। এ কথা তাদের জন্য উত্তম এবং এটাই হচ্ছে পরিষ্কার, সরল, সোজা এবং উপযুক্ত কথা। কিন্তু তাদের অন্তরকে মঙ্গল হতে বহুদূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রকৃত ঈমান পূর্ণভাবে তাদের অন্তরে স্থানই পায় না। এ বাক্যের তাফসীরও পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ভাবার্থ এই যে, উপকার দানকারী ঈমান তাদের মধ্যে নেই।

আন-নিসা 4:45

৪৪-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন- ইয়াহুদীদের (কেয়ামত পর্যন্ত তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক) একটি নিন্দনীয় স্বভাব এও রয়েছে যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্তপথকে গ্রহণ করেছে, শেষ নবী (সঃ)-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা হতে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং পূর্ববর্তী নবীগণ হতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে যে জ্ঞান তারা প্রাপ্ত হয়েছে সেটাও তারা শিষ্যদের নিকট হতে নৈবেদ্য নেয়ার লোভে প্রকাশ করছে না। বরং সাথে সাথে এটাও কামনা করছে যে, স্বয়ং মুসলমানেরাও যেন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলার গ্রন্থকে অস্বীকার করে এবং সুপথ ও সঠিক ইলকে পরিত্যাগ করে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের শত্রুদের সংবাদ খুব ভালভাবেই রাখেন। তিনি তোমাদেরকে তাদের হতে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন তাদের প্রতারণার ফাঁদে না পড়। তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্যই যথেষ্ট। তোমরা বিশ্বাস রাখ যে, যারা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, তিনি তাদের অবশ্যই সহায়তা করে থাকেন এবং তিনি তাদের সাহায্যকারী হয়ে যান। তৃতীয় আয়াতটি যা (আরবী) শব্দ দ্বারা শুরু হয়েছে তাতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) বর্ণনা করার জন্য এসেছে। যেমন (আরবী) (২২:৩০) অতঃপর ইয়াহূদীদের ঐ দলের যে পরিবর্তন করণের কথা বলা হচ্ছে, তার ভাবার্থ এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার কথার ভাবার্থ বদলিয়ে দেয় এবং ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। আর এ কাজ তারা জেনে শুনে ও বুঝে সুঝে করে থাকে। এর ফলে তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা আরোপকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা নকল করেছেন যে, তারা বলে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি যা কিছু বলেন আমরা তা শুনি কিন্তু মান্য করি না। তাদের কুফরী ও ধর্মদ্রোহীতার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তারা জেনে ও বুঝে স্পষ্টভাষায় কিভাবে নিজেদের অপবিত্র খেয়ালের কথা প্রকাশ করছে এবং বলছে- ‘আমরা যা বলি তা আপনি শুনুন, আল্লাহ করেন আপনি না শুনেন। কিংবা ভাবার্থ এই যে, আপনি শুনুন, কিন্তু আপনার কথা মান্য করা হবে না। কিন্তু প্রথম ভাবার্থটিই অধিকতর সঠিক। এ কথা তারা উপহাস ও বিদ্রুপের ছলে বলতো। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। তারা (আরবী) বলতো। এর দ্বারা বাহ্যতঃ বুঝা যেতো যে তারা বলছে- আমাদের দিকে কান লাগিয়ে দিন। কিন্তু তারা এ শব্দ দ্বারা ভাবার্থ গ্রহণ করতো- আপনি বড়ই উদ্ধত ও অহংকারী। এর পূর্ণ ভাবার্থ (আরবী) (২:১০৪)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, যা তারা বাইরে প্রকাশ করতো, স্বীয় জিহ্বাকে বক্র করে বিদ্রুপ সূচক ভঙ্গিতে অন্তরের মধ্যে তার উল্টো ভাব গোপন করে রাখতো। প্রকৃতপক্ষে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে বেয়াদবী করতো। তাই তাদেরকে হিদায়াত করা হচ্ছে যে, তারা যেন এ দু’অর্থযুক্ত শব্দগুলো বর্ণনা পরিত্যাগ করে এবং স্পষ্টভাবে বলে, আমরা শুনলাম ও মানলাম, আপনি আমাদের আর শুনুন ও আমাদের দিকে দেখুন। এ কথা তাদের জন্য উত্তম এবং এটাই হচ্ছে পরিষ্কার, সরল, সোজা এবং উপযুক্ত কথা। কিন্তু তাদের অন্তরকে মঙ্গল হতে বহুদূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রকৃত ঈমান পূর্ণভাবে তাদের অন্তরে স্থানই পায় না। এ বাক্যের তাফসীরও পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ভাবার্থ এই যে, উপকার দানকারী ঈমান তাদের মধ্যে নেই।

আন-নিসা 4:46

৪৪-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন- ইয়াহুদীদের (কেয়ামত পর্যন্ত তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক) একটি নিন্দনীয় স্বভাব এও রয়েছে যে, তারা সুপথের বিনিময়ে ভ্রান্তপথকে গ্রহণ করেছে, শেষ নবী (সঃ)-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা হতে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং পূর্ববর্তী নবীগণ হতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর গুণাবলী সম্বন্ধে যে জ্ঞান তারা প্রাপ্ত হয়েছে সেটাও তারা শিষ্যদের নিকট হতে নৈবেদ্য নেয়ার লোভে প্রকাশ করছে না। বরং সাথে সাথে এটাও কামনা করছে যে, স্বয়ং মুসলমানেরাও যেন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলার গ্রন্থকে অস্বীকার করে এবং সুপথ ও সঠিক ইলকে পরিত্যাগ করে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের শত্রুদের সংবাদ খুব ভালভাবেই রাখেন। তিনি তোমাদেরকে তাদের হতে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন তাদের প্রতারণার ফাঁদে না পড়। তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্যই যথেষ্ট। তোমরা বিশ্বাস রাখ যে, যারা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, তিনি তাদের অবশ্যই সহায়তা করে থাকেন এবং তিনি তাদের সাহায্যকারী হয়ে যান। তৃতীয় আয়াতটি যা (আরবী) শব্দ দ্বারা শুরু হয়েছে তাতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) বর্ণনা করার জন্য এসেছে। যেমন (আরবী) (২২:৩০) অতঃপর ইয়াহূদীদের ঐ দলের যে পরিবর্তন করণের কথা বলা হচ্ছে, তার ভাবার্থ এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার কথার ভাবার্থ বদলিয়ে দেয় এবং ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। আর এ কাজ তারা জেনে শুনে ও বুঝে সুঝে করে থাকে। এর ফলে তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা আরোপকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা নকল করেছেন যে, তারা বলে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি যা কিছু বলেন আমরা তা শুনি কিন্তু মান্য করি না। তাদের কুফরী ও ধর্মদ্রোহীতার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তারা জেনে ও বুঝে স্পষ্টভাষায় কিভাবে নিজেদের অপবিত্র খেয়ালের কথা প্রকাশ করছে এবং বলছে- ‘আমরা যা বলি তা আপনি শুনুন, আল্লাহ করেন আপনি না শুনেন। কিংবা ভাবার্থ এই যে, আপনি শুনুন, কিন্তু আপনার কথা মান্য করা হবে না। কিন্তু প্রথম ভাবার্থটিই অধিকতর সঠিক। এ কথা তারা উপহাস ও বিদ্রুপের ছলে বলতো। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন। তারা (আরবী) বলতো। এর দ্বারা বাহ্যতঃ বুঝা যেতো যে তারা বলছে- আমাদের দিকে কান লাগিয়ে দিন। কিন্তু তারা এ শব্দ দ্বারা ভাবার্থ গ্রহণ করতো- আপনি বড়ই উদ্ধত ও অহংকারী। এর পূর্ণ ভাবার্থ (আরবী) (২:১০৪)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, যা তারা বাইরে প্রকাশ করতো, স্বীয় জিহ্বাকে বক্র করে বিদ্রুপ সূচক ভঙ্গিতে অন্তরের মধ্যে তার উল্টো ভাব গোপন করে রাখতো। প্রকৃতপক্ষে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে বেয়াদবী করতো। তাই তাদেরকে হিদায়াত করা হচ্ছে যে, তারা যেন এ দু’অর্থযুক্ত শব্দগুলো বর্ণনা পরিত্যাগ করে এবং স্পষ্টভাবে বলে, আমরা শুনলাম ও মানলাম, আপনি আমাদের আর শুনুন ও আমাদের দিকে দেখুন। এ কথা তাদের জন্য উত্তম এবং এটাই হচ্ছে পরিষ্কার, সরল, সোজা এবং উপযুক্ত কথা। কিন্তু তাদের অন্তরকে মঙ্গল হতে বহুদূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রকৃত ঈমান পূর্ণভাবে তাদের অন্তরে স্থানই পায় না। এ বাক্যের তাফসীরও পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ভাবার্থ এই যে, উপকার দানকারী ঈমান তাদের মধ্যে নেই।

আন-নিসা 4:47

৪৭-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আমি আমার মহা মর্যাদাবান গ্রন্থ আমার উত্তম নবী (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে স্বয়ং তোমাদের কিতাবের সত্যতা ও স্বীকৃত রয়েছে। সুতরাং তোমরা এর উপর ঈমান আনয়ন কর এর পূর্বে যে, আমি তোমাদের আকৃতি বিকৃত করে দেই। অর্থাৎ মুখ বিপরীত দিকে করে দেই এবং তোমাদের চক্ষু এ দিকের পরিবর্তে ঐ দিকে হয়ে যায়।' কিংবা ভাবার্থ এই যে, তোমাদের চেহারা নষ্ট করে দেই যাতে তোমাদের কান, নাক সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অতঃপর এ বিকৃত চেহারাও উল্টো হয়ে যায়।' এ শাস্তি তাদের কর্মেরই পূর্ণ ফল। এরা সত্য হতে সরে মিথ্যার দিকে এবং সুপথ হতে বিপথের দিকে ধাবিত হচ্ছে, কাজেই আল্লাহ তা'আলাও তাদেরকে ধমক দিয়ে বলছেনঃ ‘আমিও এভাবেই তোমাদের মুখ উল্টিয়ে দেবো যেন তোমাদেরকে পিছন পায় চলতে হয়। তোমাদের চক্ষুগুলো তোমাদের গ্রীবার দিকে করে দেবো'। আর এ রকমই তাফসীর কেউ কেউ (আরবী) (৩৬:৮) -এ আয়াতের তাফসীরেও করেছেন। মোটকথা তাদের পথভ্রষ্টতা ও সুপথ হতে সরে পড়ার এ খারাপ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- “আমি তোমাদেরকে সত্যপথ হতে সরিয়ে ভ্রান্তির পথের দিকে নিয়ে যাবো, তোমাদেকে কাফির বানিয়ে দেবো এবং তোমাদের চেহারা বানরের চেহারার মত করে দেবো।' আবু যায়েদ (রঃ) বলেনঃ ‘ফিরিয়ে দেয়ার অর্থ এই যে, তাদেরকে হিযাখ্যা হতে সিরিয়ায় পৌছিয়ে দেন। এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি শুনেই হযরত কা'ব ইবনে আহবার (রাঃ) ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাফসীর-ইইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (রঃ)-এর সামনে যখন হযরত কা'ব (রঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের আলোচনা হয়, তখন তিনি বলেনঃ হযরত কা'ব (রঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে মুসলমান হয়েছিলেন। কিন্তু বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার পথে মদীনায় আগনম করেন। হযরত উমার (রাঃ) তার নিকট গিয়ে বলেনঃ “হে কাব (রঃ)! মুসলমান হয়ে যাও। উত্তরে তিনি বলেনঃ আপনারা তো কুরআন কারীমে পড়েছেন-“যাদের দ্বারা তাওরাত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, অতঃপর তারা তা উঠায়নি তাদের দৃষ্টান্ত গাধার ন্যায়, যে বোঝা বহন করে থাকে। আর আপনি এটাও জানেন যে, যাদের দ্বারা তাওরাত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আমিও তাদের মধ্যে একজন। তখন হযরত উমার তাঁকে ছেড়ে দেন। তিনি এখান হতে রওয়ানা হয়ে হেমসে পৌঁছেন। তথায় তিনি শুনতে পান, যে, তারই বংশের একজন লোক (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করছেন। তাঁর পাঠ শেষ হলে হযরত কা'ব (রঃ) ভয় করেন যে, এ আয়াতে যাদেরকে এ শাস্তি প্রদানের ভয় দেখানো হয়েছে তিনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান কি-না এবং না জানি তাঁর আকারই বিকৃত হয়ে যায়। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি বলে উঠেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রভু! আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।”অতঃপর তিনি হেমস হতেই স্বীয় দেশ ইয়ামনে ফিরে আসেন। এখানে এসে তিনি সপরিবারে মুসলমান হয়ে যান। মসুনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব (রঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নিম্নরূপ বর্ণিত আছে যে, তার শিক্ষক আবু মুসলিম জালিলী তাঁর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যাপারে বিলম্বের কারণে সদা তাকে তিরস্কার করতে থাকেন। অতঃপর তাওরাতে যে নবীর শুভ সংবাদ দেয়া হয়েছে ও তার গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যই সেই নবী কি-না তা দেখার জন্য হযরত কা'ব (রঃ)-কে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। হযরত কা'ব (রঃ) বলেনঃ ‘আমি মদীনায় পৌছি। হঠাৎ আমি শুনতে পাই যে, একটি লোক কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাট করছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে গ্রন্থ প্রাপ্তগণ! তোমাদের সঙ্গে যা আছে-তার সত্যতা প্রতিপাদনকারী যা আমি অবতীর্ণ করেছি, তপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এর পূর্বে যে, আমি বহু মুখমণ্ডল বিকৃত করে দেই, তৎপর তাদেরকে পৃষ্ঠের দিকে উল্টিয়ে দেই। এটা শুনেই আমি চমকিত হয়ে উঠি এবং তাড়াতাড়ি গোসলের কাজে লেগে পড়ি। আমি আমার চেহারার উপর হাত দিয়ে দেখি যে, না জানি আমার ঈমান আনয়নে বিলম্ব হয়, ফলে আমার মুখমণ্ডল পৃষ্ঠের দিকে উল্টে যায়! এরপর অতিসত্বর আমি মুসলমান হয়ে যাই।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘অথবা শনিবারীয়দের প্রতি আমি যেরূপ অভিসম্পাত করেছিলাম দ্রুপ তাদের উপরও অভিম্পাত করি।' অর্থাৎ যারা কৌশল করে শনিবার দিন মৎস শিকার করেছিল, অথচ সে দিন তাদেরকে মৎস শিকার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। যার প্রতিফল স্বরূপ তারা বানর ও শূকরে পরিণত হয়েছিল। এর বিস্তারিত ঘটনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-আ'রাফে আসবে।এরপর বলা হচ্ছে- আল্লাহর আদেশ সুসম্পন্ন হয়েই থাকে। তিনি যখন কোন নির্দেশ দেন তখন এমন কেউ নেই যে, তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে বা তাকে বাধা প্রদান করে। এরপরে আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তার সাথে অংশীস্থাপনকারীর পাপ মার্জনা করেন না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে, সে মুশরিক, তার জন্যে ক্ষমার দরজা বন্ধ। এ পাপ ছাড়া অন্য পাপ যত বেশী হোক না কেন তিনি ইচ্ছে করলে ক্ষমা করতে পারেন। এ পবিত্র আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে। আমরা এখানে কিছু কিছু বর্ণনা করছি।(১) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ পাপের বিভাগ (দেওয়ান) হচ্ছে তিনটি। প্রথম হচ্ছে ঐ পাপ যার আল্লাহ তা'আলা কোন পরওয়া করেন না। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ পাপ যার মধ্যে হতে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড়েন না। তৃতীয় হচ্ছে ঐ পাপ যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করেন না। যে পাপ তিনি ক্ষমা করেন না তা হচ্ছে শিরক। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে অংশীস্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করবেন না। অন্য জায়গায় বলেন, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন করে তিনি তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। যে দেওয়ানের আল্লাহ তাআলার নিকট কোন গুরুত্ব নেই তা হচ্ছে বান্দার নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করা, যার সম্পর্ক বান্দা ও আল্লাহর সাথে রয়েছে। যেমন সে কোন দিনের রোযা ছেড়ে দিয়েছে বা নামায ছেড়েছে। আল্লাহ তা'আলা এটা ক্ষমা করে থাকেন। আর আল্লাহ তাআলা যে দেওয়ানের কিছুই ছাড়েন না তা হচ্ছে বান্দাদের পরস্পরের অত্যাচার যার কিসাস বা প্রতিশোধ গ্রহণ জরুরী হয়ে থাকে। (২) মুসনাদ-ই-আবু বাকার আল-বাযযারের মধ্যে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেনঃ অত্যাচার তিন প্রকার। প্রথম হচ্ছে ঐ অত্যাচার যা আল্লাহ ক্ষমা করেন না। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ অত্যাচার যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে থাকেন। তৃতীয় হচ্ছে ঐ অত্যাচার, আল্লাহ তা'আলা যার কিছুই ছাড়েন না। যে অত্যাচার আল্লাহ ক্ষমা করেন না তা হচ্ছে শিক। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই শির্ক হচ্ছে বড় অত্যাচার। দ্বিতীয় অত্যাচার হচ্ছে বান্দাদের নিজের জীবনের উপর অত্যাচার, যার সম্পর্ক তাদের ও তাদের প্রভুর মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা যে অত্যাচারের কিছুই ছাড়েন না তা হচ্ছে বান্দাদের একের অপরের প্রতি অত্যাচার, আল্লাহ তা'আলা এটা ছেড়ে দেন না যে পর্যন্ত একে অন্যের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ না করে। (৩) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘আল্লাহ তা'আলা সমস্ত পাপই মার্জনা করে থাকেন, শুধু ঐ ব্যক্তিকে তিনি ক্ষমা করেন না যে কুফরীর অবস্থায় মারা যায় এবং ঐ ব্যক্তিকে মার্জনা করেন না, যে কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করে। (৪) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে আমার বান্দা! তুমি যে পর্যন্ত আমার ইবাদত করতে থাকবে এবং আমার নিকট হতে ভাল আশা পোষণ করবে, আমিও তোমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করতে থাকব। হে আমার বান্দা! তুমি যদি সারা পৃথিবীপূর্ণ পাপ নিয়ে আমার নিকট আগমন কর, আমি পৃথিবীপূর্ণ ক্ষমা নিয়ে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবো এ শর্তে যে, তুমি আমার সাথে অংশীস্থাপন করনি।(৫) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বলে এবং এর উপরই মৃত্যুবরণ করে সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে।' এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেন, যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরিও করে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরিও করে।' তিনবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। চতুর্থবারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদিও আবূ যারের নাক ধূলায় মলিন হয়। তথা হতে হযরত আবু যার (রাঃ) স্বীয় চাদর টানতে টানতে বের হন এবং বলতে বলতে যানঃ যদিও আবূ যারের নাক ধূলায় মলিন হয়। এরপরেও যখনই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখন এ বাক্যটি অবশ্যই বলতেন। এ হাদীসটি অন্য সনদে কিছু অতিরিক্ততার সঙ্গেও বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, 'আমি মদীনার প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে চলছিলাম। আমাদের দৃষ্টি ছিল উহুদ পাহাড়ের দিকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি হাযির আছি। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি আমার নিকট এ উহুদ পাহাড়ের সমানও স্বর্ণ থাকে তবুও আমি চাইব না যে, তৃতীয় সন্ধ্যায় আমার নিকট ওর মধ্য হতে কিছু অবশিষ্ট থাক ঐ দীনারটি ছাড়া যা আমি ঋণ পরিশোধের জন্য রেখে দেই। বাকী সমস্ত মাল আমি এভাবে ও এভাবে আল্লাহর পথে আল্লাহর বান্দাদেরকে দিয়ে দেবো। আর তিনি ডানে, বামে ও সম্মুখে অঞ্জলি নিক্ষেপ করেন। অতঃপর কিছুক্ষণ ধরে আমরা চলতে থাকি। আবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দেন ও বলেনঃ এখানে যার অধিক রয়েছে, কিয়ামতের দিন তার অল্প থাকবে; কিন্তু যে এরূপ করে এবং তিনি তার ডানে, বামে ও সামনে অঞ্জলি ভরে এভাবে ইশারা করেন। আবার কিছুক্ষণ চলার পর আমাকে বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! তুমি এখানে থামো, আমি আসছি।' তিনি চলে যান এবং আমার চক্ষু হতে অদৃশ্য হন কিন্তু আমি তাঁর শব্দ শুনতে পাই। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি যে, না জানি একাকী পেয়ে তাকে কোন শত্রু আক্রমণ করে বসে। আমি তার নিকট পৌছার ইচ্ছে করি, কিন্তু সাথে সাথে তার এ নির্দেশ আমার স্মরণ হয়-“আমি না আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা কর। সুতরাং আমি সেখানই রয়ে গেলাম। অবশেষে তিনি ফিরে আসেন। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কেমন যেন শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম? তিনি বলেনঃ - আমার নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসেছিলেন এবং বলেছিলেন- আপনার উম্মতের মধ্যে যে এমন অবস্থায় মারা যাবে যে, সে আল্লাহর সঙ্গে কাউকেও শরীক করেনি, সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। আমি বলি- 'যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরি করে?' তিনি বলেনঃ “হ্যা যদিও সে ব্যভিচার ও চুরি করে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এও রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাত্রে বের হই। দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চলতে রয়েছেন। আমি ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সময় তিনি কাউকেও সঙ্গে নিতে চান না। তাই আমি চন্দ্রের ছায়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে চলতে থাকি। তিনি ঘুরে যখন আমাকে দেখতে পান তখন বলেনঃ ‘কে তুমি?' আমি বলি- আবু যার, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন। তখন তিনি আমাকে বলেনঃ ‘এসো আমার সঙ্গে চল। কিছুক্ষণ ধরে আমরা চলতে থাকি। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আধিক্যের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন অল্পের অধিকারী হবে, তারা ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ধন-মাল দিয়েছেন, সেই মাল তারা ডানে, বামে, সামনে, পিছনে ভাল কাজে খরচ করে থাকে। আবার কিছুক্ষণ চলার পর আমাকে বলেনঃ ‘এখানে বস।' তিনি আমাকে এমন এক জায়গায় বসিয়ে দেন যার চতুর্দিকে পাথর ছিল। তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাক।' অতঃপর তিনি চলে যান এবং দৃষ্টি হতে অদৃশ্য হয়ে যান। তাঁর খুব বিলম্ব হয়ে যায়। অবশেষে আমি দেখি যে, তিনি বলতে বলতে আসছেনঃ যদিও ব্যভিচার করে থাকে এবং যদিও চুরি করে থাকে। যখন তিনি আমার নিকট পৌছেন তখন আমি থাকতে পেরে তাকে জিজ্ঞেস করি, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আপনার উপর উৎসর্গ করুন, আপনি মাঠের প্রান্তে কার সাথে কথা বলছিলেন? আমি শুনেছি, তিনি আপনাকে উত্তরও দিচ্ছিলেন। তিনি বলেনঃ তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আঃ)। এখানে এসে তিনি আমাকে বলেনঃ 'আপনার উম্মতকে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন না করা অবস্থায় মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। আমি বলি, হে জিবরাঈল (আঃ)। যদিও সে চুরিও করে এবং ব্যভিচারও করে?' তিনি বলেনঃ হ্যা'। আমি বলি, 'যদিও সে চুরিও করে এবং ব্যভিচারও করে?' তিনি বলেনঃ ‘হ্যা, এমনকি যদি সে মদ্যপানও করে।(৬) মুসনাদ-ই-আবৃদ ইবনে হামীদের মধ্যে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াজিবকারী জিনিসগুলো কি?' তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি শির্ক না করেই মারা গেল তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব এবং যে ব্যক্তি শিরুক করে মারা গেল তার জন্যে জান্নাম ওয়াজিব।' এ হাদীসটি অন্য রীতিতেও বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছে- “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক না করেই মারা গেল তার জন্যে ক্ষমা বৈধ। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছে করলে ক্ষমা করবেন। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক। করে তাকে তিনি ক্ষমা করেন না। ঐ ব্যক্তিকে ছাড়া যাকে তিনি ইচ্ছে ক্ষমা করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য সনদ হতে বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :বান্দার উপর ক্ষমা সর্বদা চালু থাকে যে পর্যন্ত পর্দা না পড়ে যায়। জিজ্ঞেস করা হয়, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পর্দা পড়া কি? তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি শিরক না করা অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সাক্ষাত করে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা বৈধ হয়ে যায়। তিনি ইচ্ছে করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছে করলে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর তিনি। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। (মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা)।(৭) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন না করে মারা গেল সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।'(৮) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদের নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “তোমাদের মহান সম্মানিত প্রভু আমাকে আমার উম্মতের মধ্যকার সত্তর হাজার লোকের উপর এ অধিকার দিয়েছেন যে, তারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমার জন্য আমার উম্মতের ব্যাপারে যা রক্ষিত রয়েছে তা আমি তার নিকট প্রকাশ করবো।' তখন কোন একজন সাহাবী (রাঃ) বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্যে কি ওটা সংরক্ষিত রাখবেন’? একথা শুনে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। অতঃপর তিনি তাকবীর পাঠ করতে করতে বাইরে আসেন এবং বলেনঃ আমার প্রভু আমাকে প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে সত্তর হাজার বেশী দান করেছেন এবং তার নিকটে ঐ সংরক্ষিত অংশও রয়েছে। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) যখন এ হাদীসটি বর্ণনা করেন তখন হযরত আবু রাহাম (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘ঐ সংরক্ষিত জিনিস কি? জনগণ তখন আবু রাহাম (রঃ)-কে ধমক দিয়ে বলেনঃ “কোথায় তুমি এবং কোথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সংরক্ষিত জিনিস?' হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) জনগণকে তখন বলেনঃ “তোমরা লোকটিকে ছেড়ে দাও। এসো আমি আমার ধারণা মতে তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সংরক্ষিত জিনিসের সংবাদ দেই। এমনকি আমি প্রায় নিশ্চিতরূপেই বলতে পারি যে, ঐ জিনিস হচ্ছে প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশ লাভ যে খাটি অন্তরে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।' (৯) হযতর আবু আইয়ুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার একটি ভ্রাতুস্পুত্র রয়েছে, সে হারাম হতে বিরত থাকে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ তার দ্বীনদারী কিরূপ?' লোকটি বলে, “সে নামাযী ও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ যাও, তার নিকট তার দ্বীন দান হিসেবে যাজ্ঞা কর। যদি অস্বীকার করে তবে কিনে নাও।' লোকটি গিয়ে তার নিকট যাজ্ঞা করে। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। লোকটি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সংবাদ দেয়। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি তাকে স্বীয় ধর্মের প্রতি অটল পেলাম। সে সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)(১০) হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কোন প্রয়োজন ও প্রয়োজন বিশিষ্টকে না করে ছাড়িনি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি তিন বার এ সাক্ষ্য দাও না যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল? লোকটি বলে, 'হাঁ।' তিনি বলেন: ‘এটা এ সবগুলোর উপর জয়যুক্ত হবে।' (১১) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত যমযম ইবনে জাওশুল ইয়ামানী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘হে জাওশ ইয়ামানী (রঃ)! কোন মানুষকে কখনও বল না যে, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন না। আমি তখন বলি, “হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! এ কথাতো আমাদের প্রত্যেকেই ক্রোধের সময় তার ভাই ও বন্ধুকে বলে থাকে। তিনি বলেন, সাবধান! কখনও বলো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, বানী ইসরাঈলের মধ্যে দু'টি লোক ছিল। একজন ছিল চরম উপাসক এবং অপরজন ছিল স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচারী। উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বভাব ছিল। উপাসক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রায় কোন না কোন পাপ কার্যে লিপ্ত দেখত এবং তাকে বলতো, 'তুমি এ কাজ হতে বিরত থাক। সে তখন উত্তরে বলতো, “আমাকে আমার প্রভুর উপর ছেড়ে দাও। তুমি কি আমার রক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছো?' একদা উপাসক ব্যক্তি দেখে যে, সে পুনরায় এমন এক পাপ কাজ করতে রয়েছে যা তার নিকট অত্যন্ত বড় পাপ বলে মনে হয়। তাই সে তাকে বলে, তোমাকে সতর্ক করছি, তুমি বিরত থাক।' সে ঐ উত্তরই দেয়। উপাসক ব্যক্তি তখন বলেঃ আল্লাহর শপথ! আল্লাহ। তোমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাআলা তখন তাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন যিনি তাদের রূহ্ কব্য করে নেন। যখন তারা আল্লাহ তাআলার নিকট একত্রিত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ পাপীকে বলেন- ‘আমার করুণার ভিত্তিতে তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর।' আর ঐ উপাসককে বলেন- “তোমার কি প্রকৃত জ্ঞান ছিল? তুমি কি আমার অধিকৃত বস্তুর উপর ক্ষমতাবান ছিলেঃ (হে ফেরেশতাগণ!) তোমরা তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আবুল কাসিম (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! সে এমন এক কথা মুখ দিয়ে বের করে যা তার দুনিয়া ও আখেরাত ধ্বংস করে দেয়।(১২) তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছে যে, আমি পাপ মার্জনায় সক্ষম, আমি তার পাপ মার্জনাই করে থাকি এবং এতে কোন পরওয়া করি না যে পর্যন্ত না আমার সঙ্গে অংশী স্থাপন করে।'হাফিয আবু বাকর আল বাযযায (রঃ) এবং হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ)-এর। গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কার্যের উপর আল্লাহ তা'আলা কোন পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন তা তিনি অবশ্যই পূরণ করবেন এবং যে কার্যের উপর শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন তা তার ইচ্ছাধীন।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা নবী (সঃ)-এর সাহাবীগণ হত্যাকারী, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণকারী, পবিত্র নবীদের উপর অপবাদ প্রদানকারী এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীদের ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করতাম না। অবশেষে। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং নবী (সঃ)-এর সাহাবীগণ সাক্ষ্য প্রদান হতে বিরত থাকেন।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে যে সমস্ত পাপ কার্যের উপর জাহান্নামের বর্ণনা রয়েছে সেসব কার্যে লিপ্ত ব্যক্তিদের উপর জাহান্নাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে আমরা কোন সন্দেহ পোষণ করতাম না। অবশেষে আমাদের উপর উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটা শুনার পর আমরা সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাকি এবং সমস্ত বিষয় আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করি।' বায (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা হতে আমরা বিরত ছিলাম। অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে উপরোক্ত আয়াত শ্রবণ করি এবং তিনি একথাও বলেনঃ আমি আমার শাফাআতকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহ্কারীদের জন্যে পিছিয়ে রেখেছি। ইমাম আবু জাফর রাযী (রঃ)-এর বর্ণনায় হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিম্নরূপ উক্তি রয়েছেঃ যখন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার ঐ বান্দাগণ যারা নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচার করেছে, তোমরা আমার করুণা হতে নিরাশ হয়ো না'। (৩৯:৫৩) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন একটি লোক দাঁড়িয়ে বলে, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীও কি? আল্লাহর রাসূল (সঃ) তার এ প্রশ্ন অপছন্দ করেন এবং তাকে, আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন।ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর রীতি হতে বর্ণনা করেছেন যে, সূরা-ই-তানযীল’-এর এ আয়াতটি তাওবার সঙ্গে শর্তযুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি যে কোন পাপ কার্য হতে তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলা তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন, যদিও সে বারবার সেই কাজ করে। সুতরাং নিরাশ না হওয়ার আয়াতে তাওবার শর্ত অবশ্যই রয়েছে। নচেৎ তার, সাথে মুশরিকও চলে আসবে এবং ভাবার্থ সঠিক হবে না। কেননা (আরবী)–এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার সাথে অংশী স্থাপনকারীর ক্ষমা নেই। হ্যা, তবে এটা ছাড়া অন্যান্য পাপের জন্য যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করবেন যদিও সে তাওবা না করে। এ ভাবার্থ হলে এ আয়াতই অপেক্ষাকৃত বেশী আশা উৎপাদক হবে। এসব বিষয় আল্লাহ পাকই সব চেয়ে বেশী জানেন। এরপর বলা হচ্ছে- “যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শির্ক খুব বড় অত্যাচার।'(৩১:১৩)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর অংশ স্থির কর, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় পাপের কথা বলছি।' অতঃপর তিনি (আরবী)-এ অংশটুকু পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ এবং মা-বাপের অবাধ্য হওয়া। অতঃপর তিনি, (আরবী) (৩১:১৪) –এ অংশটুকু পাঠ করেন। অর্থাৎ আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল।

আন-নিসা 4:48

৪৭-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আমি আমার মহা মর্যাদাবান গ্রন্থ আমার উত্তম নবী (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে স্বয়ং তোমাদের কিতাবের সত্যতা ও স্বীকৃত রয়েছে। সুতরাং তোমরা এর উপর ঈমান আনয়ন কর এর পূর্বে যে, আমি তোমাদের আকৃতি বিকৃত করে দেই। অর্থাৎ মুখ বিপরীত দিকে করে দেই এবং তোমাদের চক্ষু এ দিকের পরিবর্তে ঐ দিকে হয়ে যায়।' কিংবা ভাবার্থ এই যে, তোমাদের চেহারা নষ্ট করে দেই যাতে তোমাদের কান, নাক সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অতঃপর এ বিকৃত চেহারাও উল্টো হয়ে যায়।' এ শাস্তি তাদের কর্মেরই পূর্ণ ফল। এরা সত্য হতে সরে মিথ্যার দিকে এবং সুপথ হতে বিপথের দিকে ধাবিত হচ্ছে, কাজেই আল্লাহ তা'আলাও তাদেরকে ধমক দিয়ে বলছেনঃ ‘আমিও এভাবেই তোমাদের মুখ উল্টিয়ে দেবো যেন তোমাদেরকে পিছন পায় চলতে হয়। তোমাদের চক্ষুগুলো তোমাদের গ্রীবার দিকে করে দেবো'। আর এ রকমই তাফসীর কেউ কেউ (আরবী) (৩৬:৮) -এ আয়াতের তাফসীরেও করেছেন। মোটকথা তাদের পথভ্রষ্টতা ও সুপথ হতে সরে পড়ার এ খারাপ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- “আমি তোমাদেরকে সত্যপথ হতে সরিয়ে ভ্রান্তির পথের দিকে নিয়ে যাবো, তোমাদেকে কাফির বানিয়ে দেবো এবং তোমাদের চেহারা বানরের চেহারার মত করে দেবো।' আবু যায়েদ (রঃ) বলেনঃ ‘ফিরিয়ে দেয়ার অর্থ এই যে, তাদেরকে হিযাখ্যা হতে সিরিয়ায় পৌছিয়ে দেন। এও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি শুনেই হযরত কা'ব ইবনে আহবার (রাঃ) ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাফসীর-ইইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (রঃ)-এর সামনে যখন হযরত কা'ব (রঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের আলোচনা হয়, তখন তিনি বলেনঃ হযরত কা'ব (রঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে মুসলমান হয়েছিলেন। কিন্তু বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার পথে মদীনায় আগনম করেন। হযরত উমার (রাঃ) তার নিকট গিয়ে বলেনঃ “হে কাব (রঃ)! মুসলমান হয়ে যাও। উত্তরে তিনি বলেনঃ আপনারা তো কুরআন কারীমে পড়েছেন-“যাদের দ্বারা তাওরাত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, অতঃপর তারা তা উঠায়নি তাদের দৃষ্টান্ত গাধার ন্যায়, যে বোঝা বহন করে থাকে। আর আপনি এটাও জানেন যে, যাদের দ্বারা তাওরাত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আমিও তাদের মধ্যে একজন। তখন হযরত উমার তাঁকে ছেড়ে দেন। তিনি এখান হতে রওয়ানা হয়ে হেমসে পৌঁছেন। তথায় তিনি শুনতে পান, যে, তারই বংশের একজন লোক (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করছেন। তাঁর পাঠ শেষ হলে হযরত কা'ব (রঃ) ভয় করেন যে, এ আয়াতে যাদেরকে এ শাস্তি প্রদানের ভয় দেখানো হয়েছে তিনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান কি-না এবং না জানি তাঁর আকারই বিকৃত হয়ে যায়। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি বলে উঠেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রভু! আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।”অতঃপর তিনি হেমস হতেই স্বীয় দেশ ইয়ামনে ফিরে আসেন। এখানে এসে তিনি সপরিবারে মুসলমান হয়ে যান। মসুনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব (রঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নিম্নরূপ বর্ণিত আছে যে, তার শিক্ষক আবু মুসলিম জালিলী তাঁর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যাপারে বিলম্বের কারণে সদা তাকে তিরস্কার করতে থাকেন। অতঃপর তাওরাতে যে নবীর শুভ সংবাদ দেয়া হয়েছে ও তার গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যই সেই নবী কি-না তা দেখার জন্য হযরত কা'ব (রঃ)-কে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। হযরত কা'ব (রঃ) বলেনঃ ‘আমি মদীনায় পৌছি। হঠাৎ আমি শুনতে পাই যে, একটি লোক কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাট করছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে গ্রন্থ প্রাপ্তগণ! তোমাদের সঙ্গে যা আছে-তার সত্যতা প্রতিপাদনকারী যা আমি অবতীর্ণ করেছি, তপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এর পূর্বে যে, আমি বহু মুখমণ্ডল বিকৃত করে দেই, তৎপর তাদেরকে পৃষ্ঠের দিকে উল্টিয়ে দেই। এটা শুনেই আমি চমকিত হয়ে উঠি এবং তাড়াতাড়ি গোসলের কাজে লেগে পড়ি। আমি আমার চেহারার উপর হাত দিয়ে দেখি যে, না জানি আমার ঈমান আনয়নে বিলম্ব হয়, ফলে আমার মুখমণ্ডল পৃষ্ঠের দিকে উল্টে যায়! এরপর অতিসত্বর আমি মুসলমান হয়ে যাই।অতঃপর বলা হচ্ছে- ‘অথবা শনিবারীয়দের প্রতি আমি যেরূপ অভিসম্পাত করেছিলাম দ্রুপ তাদের উপরও অভিম্পাত করি।' অর্থাৎ যারা কৌশল করে শনিবার দিন মৎস শিকার করেছিল, অথচ সে দিন তাদেরকে মৎস শিকার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। যার প্রতিফল স্বরূপ তারা বানর ও শূকরে পরিণত হয়েছিল। এর বিস্তারিত ঘটনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-আ'রাফে আসবে।এরপর বলা হচ্ছে- আল্লাহর আদেশ সুসম্পন্ন হয়েই থাকে। তিনি যখন কোন নির্দেশ দেন তখন এমন কেউ নেই যে, তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে বা তাকে বাধা প্রদান করে। এরপরে আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তার সাথে অংশীস্থাপনকারীর পাপ মার্জনা করেন না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে, সে মুশরিক, তার জন্যে ক্ষমার দরজা বন্ধ। এ পাপ ছাড়া অন্য পাপ যত বেশী হোক না কেন তিনি ইচ্ছে করলে ক্ষমা করতে পারেন। এ পবিত্র আয়াত সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে। আমরা এখানে কিছু কিছু বর্ণনা করছি।(১) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ পাপের বিভাগ (দেওয়ান) হচ্ছে তিনটি। প্রথম হচ্ছে ঐ পাপ যার আল্লাহ তা'আলা কোন পরওয়া করেন না। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ পাপ যার মধ্যে হতে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড়েন না। তৃতীয় হচ্ছে ঐ পাপ যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করেন না। যে পাপ তিনি ক্ষমা করেন না তা হচ্ছে শিরক। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে অংশীস্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করবেন না। অন্য জায়গায় বলেন, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন করে তিনি তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। যে দেওয়ানের আল্লাহ তাআলার নিকট কোন গুরুত্ব নেই তা হচ্ছে বান্দার নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করা, যার সম্পর্ক বান্দা ও আল্লাহর সাথে রয়েছে। যেমন সে কোন দিনের রোযা ছেড়ে দিয়েছে বা নামায ছেড়েছে। আল্লাহ তা'আলা এটা ক্ষমা করে থাকেন। আর আল্লাহ তাআলা যে দেওয়ানের কিছুই ছাড়েন না তা হচ্ছে বান্দাদের পরস্পরের অত্যাচার যার কিসাস বা প্রতিশোধ গ্রহণ জরুরী হয়ে থাকে। (২) মুসনাদ-ই-আবু বাকার আল-বাযযারের মধ্যে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেনঃ অত্যাচার তিন প্রকার। প্রথম হচ্ছে ঐ অত্যাচার যা আল্লাহ ক্ষমা করেন না। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ অত্যাচার যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে থাকেন। তৃতীয় হচ্ছে ঐ অত্যাচার, আল্লাহ তা'আলা যার কিছুই ছাড়েন না। যে অত্যাচার আল্লাহ ক্ষমা করেন না তা হচ্ছে শিক। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই শির্ক হচ্ছে বড় অত্যাচার। দ্বিতীয় অত্যাচার হচ্ছে বান্দাদের নিজের জীবনের উপর অত্যাচার, যার সম্পর্ক তাদের ও তাদের প্রভুর মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা যে অত্যাচারের কিছুই ছাড়েন না তা হচ্ছে বান্দাদের একের অপরের প্রতি অত্যাচার, আল্লাহ তা'আলা এটা ছেড়ে দেন না যে পর্যন্ত একে অন্যের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ না করে। (৩) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘আল্লাহ তা'আলা সমস্ত পাপই মার্জনা করে থাকেন, শুধু ঐ ব্যক্তিকে তিনি ক্ষমা করেন না যে কুফরীর অবস্থায় মারা যায় এবং ঐ ব্যক্তিকে মার্জনা করেন না, যে কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করে। (৪) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে আমার বান্দা! তুমি যে পর্যন্ত আমার ইবাদত করতে থাকবে এবং আমার নিকট হতে ভাল আশা পোষণ করবে, আমিও তোমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করতে থাকব। হে আমার বান্দা! তুমি যদি সারা পৃথিবীপূর্ণ পাপ নিয়ে আমার নিকট আগমন কর, আমি পৃথিবীপূর্ণ ক্ষমা নিয়ে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবো এ শর্তে যে, তুমি আমার সাথে অংশীস্থাপন করনি।(৫) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বলে এবং এর উপরই মৃত্যুবরণ করে সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে।' এ কথা শুনে হযরত আবূ যার (রাঃ) বলেন, যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরিও করে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরিও করে।' তিনবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়। চতুর্থবারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদিও আবূ যারের নাক ধূলায় মলিন হয়। তথা হতে হযরত আবু যার (রাঃ) স্বীয় চাদর টানতে টানতে বের হন এবং বলতে বলতে যানঃ যদিও আবূ যারের নাক ধূলায় মলিন হয়। এরপরেও যখনই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখন এ বাক্যটি অবশ্যই বলতেন। এ হাদীসটি অন্য সনদে কিছু অতিরিক্ততার সঙ্গেও বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, 'আমি মদীনার প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে চলছিলাম। আমাদের দৃষ্টি ছিল উহুদ পাহাড়ের দিকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি হাযির আছি। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি আমার নিকট এ উহুদ পাহাড়ের সমানও স্বর্ণ থাকে তবুও আমি চাইব না যে, তৃতীয় সন্ধ্যায় আমার নিকট ওর মধ্য হতে কিছু অবশিষ্ট থাক ঐ দীনারটি ছাড়া যা আমি ঋণ পরিশোধের জন্য রেখে দেই। বাকী সমস্ত মাল আমি এভাবে ও এভাবে আল্লাহর পথে আল্লাহর বান্দাদেরকে দিয়ে দেবো। আর তিনি ডানে, বামে ও সম্মুখে অঞ্জলি নিক্ষেপ করেন। অতঃপর কিছুক্ষণ ধরে আমরা চলতে থাকি। আবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দেন ও বলেনঃ এখানে যার অধিক রয়েছে, কিয়ামতের দিন তার অল্প থাকবে; কিন্তু যে এরূপ করে এবং তিনি তার ডানে, বামে ও সামনে অঞ্জলি ভরে এভাবে ইশারা করেন। আবার কিছুক্ষণ চলার পর আমাকে বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! তুমি এখানে থামো, আমি আসছি।' তিনি চলে যান এবং আমার চক্ষু হতে অদৃশ্য হন কিন্তু আমি তাঁর শব্দ শুনতে পাই। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি যে, না জানি একাকী পেয়ে তাকে কোন শত্রু আক্রমণ করে বসে। আমি তার নিকট পৌছার ইচ্ছে করি, কিন্তু সাথে সাথে তার এ নির্দেশ আমার স্মরণ হয়-“আমি না আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা কর। সুতরাং আমি সেখানই রয়ে গেলাম। অবশেষে তিনি ফিরে আসেন। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কেমন যেন শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম? তিনি বলেনঃ - আমার নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসেছিলেন এবং বলেছিলেন- আপনার উম্মতের মধ্যে যে এমন অবস্থায় মারা যাবে যে, সে আল্লাহর সঙ্গে কাউকেও শরীক করেনি, সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। আমি বলি- 'যদিও সে ব্যভিচার এবং চুরি করে?' তিনি বলেনঃ “হ্যা যদিও সে ব্যভিচার ও চুরি করে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এও রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাত্রে বের হই। দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চলতে রয়েছেন। আমি ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সময় তিনি কাউকেও সঙ্গে নিতে চান না। তাই আমি চন্দ্রের ছায়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে চলতে থাকি। তিনি ঘুরে যখন আমাকে দেখতে পান তখন বলেনঃ ‘কে তুমি?' আমি বলি- আবু যার, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন। তখন তিনি আমাকে বলেনঃ ‘এসো আমার সঙ্গে চল। কিছুক্ষণ ধরে আমরা চলতে থাকি। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আধিক্যের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন অল্পের অধিকারী হবে, তারা ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ধন-মাল দিয়েছেন, সেই মাল তারা ডানে, বামে, সামনে, পিছনে ভাল কাজে খরচ করে থাকে। আবার কিছুক্ষণ চলার পর আমাকে বলেনঃ ‘এখানে বস।' তিনি আমাকে এমন এক জায়গায় বসিয়ে দেন যার চতুর্দিকে পাথর ছিল। তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাক।' অতঃপর তিনি চলে যান এবং দৃষ্টি হতে অদৃশ্য হয়ে যান। তাঁর খুব বিলম্ব হয়ে যায়। অবশেষে আমি দেখি যে, তিনি বলতে বলতে আসছেনঃ যদিও ব্যভিচার করে থাকে এবং যদিও চুরি করে থাকে। যখন তিনি আমার নিকট পৌছেন তখন আমি থাকতে পেরে তাকে জিজ্ঞেস করি, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আপনার উপর উৎসর্গ করুন, আপনি মাঠের প্রান্তে কার সাথে কথা বলছিলেন? আমি শুনেছি, তিনি আপনাকে উত্তরও দিচ্ছিলেন। তিনি বলেনঃ তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আঃ)। এখানে এসে তিনি আমাকে বলেনঃ 'আপনার উম্মতকে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন না করা অবস্থায় মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। আমি বলি, হে জিবরাঈল (আঃ)। যদিও সে চুরিও করে এবং ব্যভিচারও করে?' তিনি বলেনঃ হ্যা'। আমি বলি, 'যদিও সে চুরিও করে এবং ব্যভিচারও করে?' তিনি বলেনঃ ‘হ্যা, এমনকি যদি সে মদ্যপানও করে।(৬) মুসনাদ-ই-আবৃদ ইবনে হামীদের মধ্যে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াজিবকারী জিনিসগুলো কি?' তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি শির্ক না করেই মারা গেল তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব এবং যে ব্যক্তি শিরুক করে মারা গেল তার জন্যে জান্নাম ওয়াজিব।' এ হাদীসটি অন্য রীতিতেও বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছে- “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক না করেই মারা গেল তার জন্যে ক্ষমা বৈধ। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছে করলে ক্ষমা করবেন। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক। করে তাকে তিনি ক্ষমা করেন না। ঐ ব্যক্তিকে ছাড়া যাকে তিনি ইচ্ছে ক্ষমা করে থাকেন। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) অন্য সনদ হতে বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :বান্দার উপর ক্ষমা সর্বদা চালু থাকে যে পর্যন্ত পর্দা না পড়ে যায়। জিজ্ঞেস করা হয়, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পর্দা পড়া কি? তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি শিরক না করা অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সাক্ষাত করে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা বৈধ হয়ে যায়। তিনি ইচ্ছে করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছে করলে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর তিনি। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। (মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা)।(৭) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন না করে মারা গেল সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।'(৮) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদের নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “তোমাদের মহান সম্মানিত প্রভু আমাকে আমার উম্মতের মধ্যকার সত্তর হাজার লোকের উপর এ অধিকার দিয়েছেন যে, তারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমার জন্য আমার উম্মতের ব্যাপারে যা রক্ষিত রয়েছে তা আমি তার নিকট প্রকাশ করবো।' তখন কোন একজন সাহাবী (রাঃ) বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্যে কি ওটা সংরক্ষিত রাখবেন’? একথা শুনে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। অতঃপর তিনি তাকবীর পাঠ করতে করতে বাইরে আসেন এবং বলেনঃ আমার প্রভু আমাকে প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে সত্তর হাজার বেশী দান করেছেন এবং তার নিকটে ঐ সংরক্ষিত অংশও রয়েছে। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) যখন এ হাদীসটি বর্ণনা করেন তখন হযরত আবু রাহাম (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘ঐ সংরক্ষিত জিনিস কি? জনগণ তখন আবু রাহাম (রঃ)-কে ধমক দিয়ে বলেনঃ “কোথায় তুমি এবং কোথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সংরক্ষিত জিনিস?' হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) জনগণকে তখন বলেনঃ “তোমরা লোকটিকে ছেড়ে দাও। এসো আমি আমার ধারণা মতে তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সংরক্ষিত জিনিসের সংবাদ দেই। এমনকি আমি প্রায় নিশ্চিতরূপেই বলতে পারি যে, ঐ জিনিস হচ্ছে প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশ লাভ যে খাটি অন্তরে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।' (৯) হযতর আবু আইয়ুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার একটি ভ্রাতুস্পুত্র রয়েছে, সে হারাম হতে বিরত থাকে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ তার দ্বীনদারী কিরূপ?' লোকটি বলে, “সে নামাযী ও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ যাও, তার নিকট তার দ্বীন দান হিসেবে যাজ্ঞা কর। যদি অস্বীকার করে তবে কিনে নাও।' লোকটি গিয়ে তার নিকট যাজ্ঞা করে। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। লোকটি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সংবাদ দেয়। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আমি তাকে স্বীয় ধর্মের প্রতি অটল পেলাম। সে সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)(১০) হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কোন প্রয়োজন ও প্রয়োজন বিশিষ্টকে না করে ছাড়িনি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি তিন বার এ সাক্ষ্য দাও না যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল? লোকটি বলে, 'হাঁ।' তিনি বলেন: ‘এটা এ সবগুলোর উপর জয়যুক্ত হবে।' (১১) মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত যমযম ইবনে জাওশুল ইয়ামানী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘হে জাওশ ইয়ামানী (রঃ)! কোন মানুষকে কখনও বল না যে, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন না। আমি তখন বলি, “হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! এ কথাতো আমাদের প্রত্যেকেই ক্রোধের সময় তার ভাই ও বন্ধুকে বলে থাকে। তিনি বলেন, সাবধান! কখনও বলো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, বানী ইসরাঈলের মধ্যে দু'টি লোক ছিল। একজন ছিল চরম উপাসক এবং অপরজন ছিল স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচারী। উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বভাব ছিল। উপাসক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রায় কোন না কোন পাপ কার্যে লিপ্ত দেখত এবং তাকে বলতো, 'তুমি এ কাজ হতে বিরত থাক। সে তখন উত্তরে বলতো, “আমাকে আমার প্রভুর উপর ছেড়ে দাও। তুমি কি আমার রক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছো?' একদা উপাসক ব্যক্তি দেখে যে, সে পুনরায় এমন এক পাপ কাজ করতে রয়েছে যা তার নিকট অত্যন্ত বড় পাপ বলে মনে হয়। তাই সে তাকে বলে, তোমাকে সতর্ক করছি, তুমি বিরত থাক।' সে ঐ উত্তরই দেয়। উপাসক ব্যক্তি তখন বলেঃ আল্লাহর শপথ! আল্লাহ। তোমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং তোমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন না। আল্লাহ তাআলা তখন তাদের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন যিনি তাদের রূহ্ কব্য করে নেন। যখন তারা আল্লাহ তাআলার নিকট একত্রিত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ পাপীকে বলেন- ‘আমার করুণার ভিত্তিতে তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর।' আর ঐ উপাসককে বলেন- “তোমার কি প্রকৃত জ্ঞান ছিল? তুমি কি আমার অধিকৃত বস্তুর উপর ক্ষমতাবান ছিলেঃ (হে ফেরেশতাগণ!) তোমরা তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আবুল কাসিম (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! সে এমন এক কথা মুখ দিয়ে বের করে যা তার দুনিয়া ও আখেরাত ধ্বংস করে দেয়।(১২) তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছে যে, আমি পাপ মার্জনায় সক্ষম, আমি তার পাপ মার্জনাই করে থাকি এবং এতে কোন পরওয়া করি না যে পর্যন্ত না আমার সঙ্গে অংশী স্থাপন করে।'হাফিয আবু বাকর আল বাযযায (রঃ) এবং হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ)-এর। গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কার্যের উপর আল্লাহ তা'আলা কোন পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন তা তিনি অবশ্যই পূরণ করবেন এবং যে কার্যের উপর শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন তা তার ইচ্ছাধীন।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা নবী (সঃ)-এর সাহাবীগণ হত্যাকারী, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণকারী, পবিত্র নবীদের উপর অপবাদ প্রদানকারী এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীদের ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করতাম না। অবশেষে। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং নবী (সঃ)-এর সাহাবীগণ সাক্ষ্য প্রদান হতে বিরত থাকেন।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে যে সমস্ত পাপ কার্যের উপর জাহান্নামের বর্ণনা রয়েছে সেসব কার্যে লিপ্ত ব্যক্তিদের উপর জাহান্নাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে আমরা কোন সন্দেহ পোষণ করতাম না। অবশেষে আমাদের উপর উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটা শুনার পর আমরা সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাকি এবং সমস্ত বিষয় আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করি।' বায (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, বড় বড় পাপ কার্যে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা হতে আমরা বিরত ছিলাম। অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে উপরোক্ত আয়াত শ্রবণ করি এবং তিনি একথাও বলেনঃ আমি আমার শাফাআতকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহ্কারীদের জন্যে পিছিয়ে রেখেছি। ইমাম আবু জাফর রাযী (রঃ)-এর বর্ণনায় হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিম্নরূপ উক্তি রয়েছেঃ যখন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার ঐ বান্দাগণ যারা নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচার করেছে, তোমরা আমার করুণা হতে নিরাশ হয়ো না'। (৩৯:৫৩) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন একটি লোক দাঁড়িয়ে বলে, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীও কি? আল্লাহর রাসূল (সঃ) তার এ প্রশ্ন অপছন্দ করেন এবং তাকে, আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন।ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর রীতি হতে বর্ণনা করেছেন যে, সূরা-ই-তানযীল’-এর এ আয়াতটি তাওবার সঙ্গে শর্তযুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি যে কোন পাপ কার্য হতে তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলা তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন, যদিও সে বারবার সেই কাজ করে। সুতরাং নিরাশ না হওয়ার আয়াতে তাওবার শর্ত অবশ্যই রয়েছে। নচেৎ তার, সাথে মুশরিকও চলে আসবে এবং ভাবার্থ সঠিক হবে না। কেননা (আরবী)–এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার সাথে অংশী স্থাপনকারীর ক্ষমা নেই। হ্যা, তবে এটা ছাড়া অন্যান্য পাপের জন্য যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করবেন যদিও সে তাওবা না করে। এ ভাবার্থ হলে এ আয়াতই অপেক্ষাকৃত বেশী আশা উৎপাদক হবে। এসব বিষয় আল্লাহ পাকই সব চেয়ে বেশী জানেন। এরপর বলা হচ্ছে- “যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শির্ক খুব বড় অত্যাচার।'(৩১:১৩)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর অংশ স্থির কর, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় পাপের কথা বলছি।' অতঃপর তিনি (আরবী)-এ অংশটুকু পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ এবং মা-বাপের অবাধ্য হওয়া। অতঃপর তিনি, (আরবী) (৩১:১৪) –এ অংশটুকু পাঠ করেন। অর্থাৎ আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল।

আন-নিসা 4:49

৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন তারা বলেছিলঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয় পাত্র এবং আরও বলেছিলঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে না।'মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের নাবালক ছেলেদেরকে দুআ ও নামাযে তাদের ইমাম করতো এবং তাদেরকে নিস্পাপ বলে ধারণা করতো। এও বর্ণিত আছে যে, তাদের ধারণায় তাদের যেসব ছেলে মারা গেছে তাদের মাধ্যমে তারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করবে এবং তারা তাদের জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট সুপারিশ করবে ও তাদেরকে পবিত্র করবে। তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইয়াহূদীদের তাদের ছেলেদেরকে ইমাম করার ঘটনা বর্ণনা করে বলেনঃ তারা মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআলা কোন পাপীকে কোন নিম্পাপের কারণে পবিত্র করেন না। তারা বলতোঃ আমাদের শিশুরা যেমন নিস্পাপ, দ্রুপ আমরাও নিস্পাপ।' এও বলা হয়েছে যে, হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন প্রশংসাকারীর মুখ মাটির দ্বারা পূর্ণ করে দেই। সহীহ বুখারীর ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে অন্য একটি লোকের প্রশংসা করতে শুনতে পেয়ে বলেনঃ ‘অফসোস! তুমি তোমার সঙ্গীর স্কন্ধ কেটে দিলে।' অতঃপর বলেনঃ 'যদি তোমাদের কারও কোন ব্যক্তির প্রশংসা করা অপরিহার্য হয়েই পড়ে তবে যেন সে বলে-আমি অমুক ব্যক্তিকে এরূপ মনে করি। কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা'আলার নিকট এরূপই পবিত্র এ কথা যেন না বলে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি বলে-আমি আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে -আমি জান্নাতী সে জাহান্নামী।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে ভয় এই যে, কেউ স্বীয় মতকেই পছন্দ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বলে যে, সে একজন মুমিন, সে কাফির। যে বলে যে, সে একজন আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে যে, সে জান্নাতে রয়েছে। সে জাহান্নামে রয়েছে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন এবং খুব কম জম‘আই এরূপ গেছে যেখানে তিনি নিম্নের কথাগুলো বলেননিঃ ‘যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা মঙ্গলের ইচ্ছে করেন তাকে তিনি ধর্মের বোধ শক্তি দান করেন। এ মাল হচ্ছে মিষ্ট ও সবুজ রঙ্গের। সুতরাং এটা যে তার হকের সাথে গ্রহণ করবে তার জন্যে তাতে বরকত দেয়া হবে। তোমরা একে অপরের প্রশংসা করা হতে বিরত হও। কেননা, এটা হচ্ছে যবেহু করারই তুল্য।' এ পরের বাক্যটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত রয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ সকালে মানুষ তার ধর্ম নিয়ে বের হয়। অতঃপর যখন সে ফিরে আসে তখন তার নিকট তার ধর্মের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। (এভাবে যে,) সে কারও সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার প্রশংসা করতে আরম্ভ করে দেয় ও শপথ করে করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আপনি এরূপই বটে, আপনি এরূপই বটে।' অথচ না সে তার ক্ষতির অধিকারী, না লাভের অধিকারী এবং এ কথাগুলোর পরেও হয়তো তার দ্বারা কোন কাজ হয় না। অথচ সে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে দিলো। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ। করেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা (আরবী) (৫৩:৩২)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। তাই, এখানে বলা হচ্ছেঃ বরং আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন। কেননা, সমুদয় জিনিসের মূলতত্ত্ব একমাত্র তিনিই জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তারা সূত্র পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না।' অর্থাৎ তিনি সূত্রের ওজন পরিমাণও কারোও পুণ্য ছেড়ে দেবেন না। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের সূত্রটি। আবার এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে ঐ সূতা যা অঙ্গুলি দ্বারা পাকানো হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- লক্ষ্য কর, কিরূপে তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে!' যেমন তারা বলছে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয় পাত্র, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ছাড়া আর কেউ জান্নাতে যাবে না, আমাদেরকে নির্দিষ্ট সামান্য কয়েক দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। আর যেমন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সত্ত্বার্যের উপর নির্ভর করে রয়েছে। অথচ একের কাজ অন্যকে কোন উপকার দেয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ ‘ওটা একটা দল যা অতীত হয়েছে, তারা যা উপার্জন করেছে তা তাদের সঙ্গে এবং তোমরা যা উপার্জন করেছে তা তোমাদের সঙ্গে। (২:১৩৪)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের এসব কথা বলাই তাদের প্রকাশ্য অপরাধী হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যাদু' এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহ্হাক (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেন। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) হচ্ছে আবিসিনীয় শব্দ। ওর অর্থ হচ্ছে শয়তান। এটা শিরক, প্রতিমা, যাদুকর ইত্যাদি অর্থেও এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে বুঝান হয়েছে। আবার কারও কারও মতে এ হচ্ছে কাব ইবনে আশরাফ। হাদীসে রয়েছে যে, পাখীসমূহের নাম নিয়ে শুভাশুভ সূচিত করা এবং মাটিতে রেখা টেনে কার্যাবলীর মীমাংসা করা হচ্ছে (আরবী) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে শয়তানের গুন গুন শব্দ। (আরবী) শব্দের বিশ্লেষণ সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে, সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।হযরত জাবির (রাঃ) (আরবী) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ তারা ছিল যাদুকর এবং তাদের নিকট শয়তান আসতো।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা হচ্ছে মানুষ রূপী শয়তান। তাদের নিকট মানুষ তাদের বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে বিচারক মেনে থাকে। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে প্রত্যেক ঐ জিনিস, আল্লাহ তাআলা ছাড়া যার ইবাদত করা হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- তাদের মূর্খতা, ধর্মহীনতা এবং স্বীয় গ্রন্থের সাথে কুফরী এত চরমে পৌছে গেছে যে, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কাবাসীদের নিকট আগমন করে। মক্কাবাসীরা তাদেরকে বলেঃ তোমরা আহলে কিতাব ও পণ্ডিত লোক। আচ্ছা বলতে আমরা ভাল, না মুহাম্মাদ (সঃ) ভাল? তখন তারা বলেঃ “তোমরা কি এবং মুহাম্মাদ (সঃ) কি? মক্কাবাসীরা বলেঃ আমরা আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখি, উট যবেহ্ করে আহার করিয়ে থাকি, দুগ্ধ মিশ্রিত পানি পান করিয়ে থাকি, ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করিয়ে থাকি। হাজীদেরকে পানি পান করিয়ে থাকি। পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ (সঃ) তো আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং গেফার গোত্রের চোর হাজীরা তাঁর সঙ্গলাভ করেছে। এখন বলতো, আমরা ভাল, না সে ভাল? তখন ঐ দু’জন বলেঃ “তোমরাই ভাল। তোমরাই সোজা ও সঠিক পথে রয়েছ।সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তাদের ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বানূ অয়েল ও বা নাযীর গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক যখন আরবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছিল এবং ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল, সে সময় যখন তারা কুরাইশদের নিকট আগমন করে তখন কুরাইশরা তাদেরকে আলেম ও দরবেশ মনে করে জিজ্ঞেস করেঃ বলুন তো আমাদের ধর্ম উত্তম, না মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ধর্ম উত্তম? ঐলোকগুলো বলেঃ “তোমাদের ধর্মই উত্তম এবং তোমরাই অধিকতর সঠিক পথে রয়েছে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে অভিশপ্ত দল বলে ঘোষণা করা হয়। আরও বলা হয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। তারা শুধু কাফিরদেরকে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্যই তাদের জ্ঞানের বিপরীত এ তোষামোদমূলক কথাগুলো উচ্চারণ করছে। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা কৃতকার্য হতে পারে না। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। তারা সমস্ত আরবকে দলভুক্ত করতঃ এ সম্মিলিত বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনার উপর আক্রমণ চালায়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করতে বাধ্য হন। অবশেষে সারা জগত দেখে নেয় যে, তাদের ষড়যন্ত্র তাদের উপরই প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়। আল্লাহ তা'আলাই মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং স্বীয় প্রতাপ ও ক্ষমতার বলে কাফিরদেরকে উল্টো মুখে নিক্ষেপ করেন।

আন-নিসা 4:50

৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন তারা বলেছিলঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয় পাত্র এবং আরও বলেছিলঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে না।'মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের নাবালক ছেলেদেরকে দুআ ও নামাযে তাদের ইমাম করতো এবং তাদেরকে নিস্পাপ বলে ধারণা করতো। এও বর্ণিত আছে যে, তাদের ধারণায় তাদের যেসব ছেলে মারা গেছে তাদের মাধ্যমে তারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করবে এবং তারা তাদের জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট সুপারিশ করবে ও তাদেরকে পবিত্র করবে। তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইয়াহূদীদের তাদের ছেলেদেরকে ইমাম করার ঘটনা বর্ণনা করে বলেনঃ তারা মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআলা কোন পাপীকে কোন নিম্পাপের কারণে পবিত্র করেন না। তারা বলতোঃ আমাদের শিশুরা যেমন নিস্পাপ, দ্রুপ আমরাও নিস্পাপ।' এও বলা হয়েছে যে, হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন প্রশংসাকারীর মুখ মাটির দ্বারা পূর্ণ করে দেই। সহীহ বুখারীর ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে অন্য একটি লোকের প্রশংসা করতে শুনতে পেয়ে বলেনঃ ‘অফসোস! তুমি তোমার সঙ্গীর স্কন্ধ কেটে দিলে।' অতঃপর বলেনঃ 'যদি তোমাদের কারও কোন ব্যক্তির প্রশংসা করা অপরিহার্য হয়েই পড়ে তবে যেন সে বলে-আমি অমুক ব্যক্তিকে এরূপ মনে করি। কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা'আলার নিকট এরূপই পবিত্র এ কথা যেন না বলে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি বলে-আমি আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে -আমি জান্নাতী সে জাহান্নামী।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে ভয় এই যে, কেউ স্বীয় মতকেই পছন্দ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বলে যে, সে একজন মুমিন, সে কাফির। যে বলে যে, সে একজন আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে যে, সে জান্নাতে রয়েছে। সে জাহান্নামে রয়েছে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন এবং খুব কম জম‘আই এরূপ গেছে যেখানে তিনি নিম্নের কথাগুলো বলেননিঃ ‘যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা মঙ্গলের ইচ্ছে করেন তাকে তিনি ধর্মের বোধ শক্তি দান করেন। এ মাল হচ্ছে মিষ্ট ও সবুজ রঙ্গের। সুতরাং এটা যে তার হকের সাথে গ্রহণ করবে তার জন্যে তাতে বরকত দেয়া হবে। তোমরা একে অপরের প্রশংসা করা হতে বিরত হও। কেননা, এটা হচ্ছে যবেহু করারই তুল্য।' এ পরের বাক্যটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত রয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ সকালে মানুষ তার ধর্ম নিয়ে বের হয়। অতঃপর যখন সে ফিরে আসে তখন তার নিকট তার ধর্মের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। (এভাবে যে,) সে কারও সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার প্রশংসা করতে আরম্ভ করে দেয় ও শপথ করে করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আপনি এরূপই বটে, আপনি এরূপই বটে।' অথচ না সে তার ক্ষতির অধিকারী, না লাভের অধিকারী এবং এ কথাগুলোর পরেও হয়তো তার দ্বারা কোন কাজ হয় না। অথচ সে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে দিলো। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ। করেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা (আরবী) (৫৩:৩২)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। তাই, এখানে বলা হচ্ছেঃ বরং আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন। কেননা, সমুদয় জিনিসের মূলতত্ত্ব একমাত্র তিনিই জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তারা সূত্র পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না।' অর্থাৎ তিনি সূত্রের ওজন পরিমাণও কারোও পুণ্য ছেড়ে দেবেন না। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের সূত্রটি। আবার এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে ঐ সূতা যা অঙ্গুলি দ্বারা পাকানো হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- লক্ষ্য কর, কিরূপে তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে!' যেমন তারা বলছে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয় পাত্র, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ছাড়া আর কেউ জান্নাতে যাবে না, আমাদেরকে নির্দিষ্ট সামান্য কয়েক দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। আর যেমন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সত্ত্বার্যের উপর নির্ভর করে রয়েছে। অথচ একের কাজ অন্যকে কোন উপকার দেয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ ‘ওটা একটা দল যা অতীত হয়েছে, তারা যা উপার্জন করেছে তা তাদের সঙ্গে এবং তোমরা যা উপার্জন করেছে তা তোমাদের সঙ্গে। (২:১৩৪)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের এসব কথা বলাই তাদের প্রকাশ্য অপরাধী হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যাদু' এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহ্হাক (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেন। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) হচ্ছে আবিসিনীয় শব্দ। ওর অর্থ হচ্ছে শয়তান। এটা শিরক, প্রতিমা, যাদুকর ইত্যাদি অর্থেও এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে বুঝান হয়েছে। আবার কারও কারও মতে এ হচ্ছে কাব ইবনে আশরাফ। হাদীসে রয়েছে যে, পাখীসমূহের নাম নিয়ে শুভাশুভ সূচিত করা এবং মাটিতে রেখা টেনে কার্যাবলীর মীমাংসা করা হচ্ছে (আরবী) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে শয়তানের গুন গুন শব্দ। (আরবী) শব্দের বিশ্লেষণ সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে, সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।হযরত জাবির (রাঃ) (আরবী) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ তারা ছিল যাদুকর এবং তাদের নিকট শয়তান আসতো।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা হচ্ছে মানুষ রূপী শয়তান। তাদের নিকট মানুষ তাদের বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে বিচারক মেনে থাকে। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে প্রত্যেক ঐ জিনিস, আল্লাহ তাআলা ছাড়া যার ইবাদত করা হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- তাদের মূর্খতা, ধর্মহীনতা এবং স্বীয় গ্রন্থের সাথে কুফরী এত চরমে পৌছে গেছে যে, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কাবাসীদের নিকট আগমন করে। মক্কাবাসীরা তাদেরকে বলেঃ তোমরা আহলে কিতাব ও পণ্ডিত লোক। আচ্ছা বলতে আমরা ভাল, না মুহাম্মাদ (সঃ) ভাল? তখন তারা বলেঃ “তোমরা কি এবং মুহাম্মাদ (সঃ) কি? মক্কাবাসীরা বলেঃ আমরা আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখি, উট যবেহ্ করে আহার করিয়ে থাকি, দুগ্ধ মিশ্রিত পানি পান করিয়ে থাকি, ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করিয়ে থাকি। হাজীদেরকে পানি পান করিয়ে থাকি। পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ (সঃ) তো আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং গেফার গোত্রের চোর হাজীরা তাঁর সঙ্গলাভ করেছে। এখন বলতো, আমরা ভাল, না সে ভাল? তখন ঐ দু’জন বলেঃ “তোমরাই ভাল। তোমরাই সোজা ও সঠিক পথে রয়েছ।সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তাদের ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বানূ অয়েল ও বা নাযীর গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক যখন আরবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছিল এবং ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল, সে সময় যখন তারা কুরাইশদের নিকট আগমন করে তখন কুরাইশরা তাদেরকে আলেম ও দরবেশ মনে করে জিজ্ঞেস করেঃ বলুন তো আমাদের ধর্ম উত্তম, না মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ধর্ম উত্তম? ঐলোকগুলো বলেঃ “তোমাদের ধর্মই উত্তম এবং তোমরাই অধিকতর সঠিক পথে রয়েছে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে অভিশপ্ত দল বলে ঘোষণা করা হয়। আরও বলা হয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। তারা শুধু কাফিরদেরকে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্যই তাদের জ্ঞানের বিপরীত এ তোষামোদমূলক কথাগুলো উচ্চারণ করছে। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা কৃতকার্য হতে পারে না। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। তারা সমস্ত আরবকে দলভুক্ত করতঃ এ সম্মিলিত বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনার উপর আক্রমণ চালায়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করতে বাধ্য হন। অবশেষে সারা জগত দেখে নেয় যে, তাদের ষড়যন্ত্র তাদের উপরই প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়। আল্লাহ তা'আলাই মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং স্বীয় প্রতাপ ও ক্ষমতার বলে কাফিরদেরকে উল্টো মুখে নিক্ষেপ করেন।

আন-নিসা 4:51

৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন তারা বলেছিলঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয় পাত্র এবং আরও বলেছিলঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে না।'মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের নাবালক ছেলেদেরকে দুআ ও নামাযে তাদের ইমাম করতো এবং তাদেরকে নিস্পাপ বলে ধারণা করতো। এও বর্ণিত আছে যে, তাদের ধারণায় তাদের যেসব ছেলে মারা গেছে তাদের মাধ্যমে তারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করবে এবং তারা তাদের জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট সুপারিশ করবে ও তাদেরকে পবিত্র করবে। তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইয়াহূদীদের তাদের ছেলেদেরকে ইমাম করার ঘটনা বর্ণনা করে বলেনঃ তারা মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআলা কোন পাপীকে কোন নিম্পাপের কারণে পবিত্র করেন না। তারা বলতোঃ আমাদের শিশুরা যেমন নিস্পাপ, দ্রুপ আমরাও নিস্পাপ।' এও বলা হয়েছে যে, হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন প্রশংসাকারীর মুখ মাটির দ্বারা পূর্ণ করে দেই। সহীহ বুখারীর ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে অন্য একটি লোকের প্রশংসা করতে শুনতে পেয়ে বলেনঃ ‘অফসোস! তুমি তোমার সঙ্গীর স্কন্ধ কেটে দিলে।' অতঃপর বলেনঃ 'যদি তোমাদের কারও কোন ব্যক্তির প্রশংসা করা অপরিহার্য হয়েই পড়ে তবে যেন সে বলে-আমি অমুক ব্যক্তিকে এরূপ মনে করি। কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা'আলার নিকট এরূপই পবিত্র এ কথা যেন না বলে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি বলে-আমি আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে -আমি জান্নাতী সে জাহান্নামী।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে ভয় এই যে, কেউ স্বীয় মতকেই পছন্দ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বলে যে, সে একজন মুমিন, সে কাফির। যে বলে যে, সে একজন আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে যে, সে জান্নাতে রয়েছে। সে জাহান্নামে রয়েছে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন এবং খুব কম জম‘আই এরূপ গেছে যেখানে তিনি নিম্নের কথাগুলো বলেননিঃ ‘যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা মঙ্গলের ইচ্ছে করেন তাকে তিনি ধর্মের বোধ শক্তি দান করেন। এ মাল হচ্ছে মিষ্ট ও সবুজ রঙ্গের। সুতরাং এটা যে তার হকের সাথে গ্রহণ করবে তার জন্যে তাতে বরকত দেয়া হবে। তোমরা একে অপরের প্রশংসা করা হতে বিরত হও। কেননা, এটা হচ্ছে যবেহু করারই তুল্য।' এ পরের বাক্যটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত রয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ সকালে মানুষ তার ধর্ম নিয়ে বের হয়। অতঃপর যখন সে ফিরে আসে তখন তার নিকট তার ধর্মের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। (এভাবে যে,) সে কারও সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার প্রশংসা করতে আরম্ভ করে দেয় ও শপথ করে করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আপনি এরূপই বটে, আপনি এরূপই বটে।' অথচ না সে তার ক্ষতির অধিকারী, না লাভের অধিকারী এবং এ কথাগুলোর পরেও হয়তো তার দ্বারা কোন কাজ হয় না। অথচ সে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে দিলো। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ। করেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা (আরবী) (৫৩:৩২)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। তাই, এখানে বলা হচ্ছেঃ বরং আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন। কেননা, সমুদয় জিনিসের মূলতত্ত্ব একমাত্র তিনিই জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তারা সূত্র পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না।' অর্থাৎ তিনি সূত্রের ওজন পরিমাণও কারোও পুণ্য ছেড়ে দেবেন না। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের সূত্রটি। আবার এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে ঐ সূতা যা অঙ্গুলি দ্বারা পাকানো হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- লক্ষ্য কর, কিরূপে তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে!' যেমন তারা বলছে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয় পাত্র, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ছাড়া আর কেউ জান্নাতে যাবে না, আমাদেরকে নির্দিষ্ট সামান্য কয়েক দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। আর যেমন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সত্ত্বার্যের উপর নির্ভর করে রয়েছে। অথচ একের কাজ অন্যকে কোন উপকার দেয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ ‘ওটা একটা দল যা অতীত হয়েছে, তারা যা উপার্জন করেছে তা তাদের সঙ্গে এবং তোমরা যা উপার্জন করেছে তা তোমাদের সঙ্গে। (২:১৩৪)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের এসব কথা বলাই তাদের প্রকাশ্য অপরাধী হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যাদু' এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহ্হাক (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেন। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) হচ্ছে আবিসিনীয় শব্দ। ওর অর্থ হচ্ছে শয়তান। এটা শিরক, প্রতিমা, যাদুকর ইত্যাদি অর্থেও এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে বুঝান হয়েছে। আবার কারও কারও মতে এ হচ্ছে কাব ইবনে আশরাফ। হাদীসে রয়েছে যে, পাখীসমূহের নাম নিয়ে শুভাশুভ সূচিত করা এবং মাটিতে রেখা টেনে কার্যাবলীর মীমাংসা করা হচ্ছে (আরবী) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে শয়তানের গুন গুন শব্দ। (আরবী) শব্দের বিশ্লেষণ সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে, সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।হযরত জাবির (রাঃ) (আরবী) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ তারা ছিল যাদুকর এবং তাদের নিকট শয়তান আসতো।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা হচ্ছে মানুষ রূপী শয়তান। তাদের নিকট মানুষ তাদের বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে বিচারক মেনে থাকে। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে প্রত্যেক ঐ জিনিস, আল্লাহ তাআলা ছাড়া যার ইবাদত করা হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- তাদের মূর্খতা, ধর্মহীনতা এবং স্বীয় গ্রন্থের সাথে কুফরী এত চরমে পৌছে গেছে যে, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কাবাসীদের নিকট আগমন করে। মক্কাবাসীরা তাদেরকে বলেঃ তোমরা আহলে কিতাব ও পণ্ডিত লোক। আচ্ছা বলতে আমরা ভাল, না মুহাম্মাদ (সঃ) ভাল? তখন তারা বলেঃ “তোমরা কি এবং মুহাম্মাদ (সঃ) কি? মক্কাবাসীরা বলেঃ আমরা আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখি, উট যবেহ্ করে আহার করিয়ে থাকি, দুগ্ধ মিশ্রিত পানি পান করিয়ে থাকি, ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করিয়ে থাকি। হাজীদেরকে পানি পান করিয়ে থাকি। পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ (সঃ) তো আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং গেফার গোত্রের চোর হাজীরা তাঁর সঙ্গলাভ করেছে। এখন বলতো, আমরা ভাল, না সে ভাল? তখন ঐ দু’জন বলেঃ “তোমরাই ভাল। তোমরাই সোজা ও সঠিক পথে রয়েছ।সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তাদের ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বানূ অয়েল ও বা নাযীর গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক যখন আরবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছিল এবং ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল, সে সময় যখন তারা কুরাইশদের নিকট আগমন করে তখন কুরাইশরা তাদেরকে আলেম ও দরবেশ মনে করে জিজ্ঞেস করেঃ বলুন তো আমাদের ধর্ম উত্তম, না মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ধর্ম উত্তম? ঐলোকগুলো বলেঃ “তোমাদের ধর্মই উত্তম এবং তোমরাই অধিকতর সঠিক পথে রয়েছে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে অভিশপ্ত দল বলে ঘোষণা করা হয়। আরও বলা হয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। তারা শুধু কাফিরদেরকে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্যই তাদের জ্ঞানের বিপরীত এ তোষামোদমূলক কথাগুলো উচ্চারণ করছে। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা কৃতকার্য হতে পারে না। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। তারা সমস্ত আরবকে দলভুক্ত করতঃ এ সম্মিলিত বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনার উপর আক্রমণ চালায়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করতে বাধ্য হন। অবশেষে সারা জগত দেখে নেয় যে, তাদের ষড়যন্ত্র তাদের উপরই প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়। আল্লাহ তা'আলাই মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং স্বীয় প্রতাপ ও ক্ষমতার বলে কাফিরদেরকে উল্টো মুখে নিক্ষেপ করেন।

আন-নিসা 4:52

৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন তারা বলেছিলঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয় পাত্র এবং আরও বলেছিলঃ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে না।'মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের নাবালক ছেলেদেরকে দুআ ও নামাযে তাদের ইমাম করতো এবং তাদেরকে নিস্পাপ বলে ধারণা করতো। এও বর্ণিত আছে যে, তাদের ধারণায় তাদের যেসব ছেলে মারা গেছে তাদের মাধ্যমে তারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করবে এবং তারা তাদের জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট সুপারিশ করবে ও তাদেরকে পবিত্র করবে। তাদের এ বিশ্বাস খণ্ডনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইয়াহূদীদের তাদের ছেলেদেরকে ইমাম করার ঘটনা বর্ণনা করে বলেনঃ তারা মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআলা কোন পাপীকে কোন নিম্পাপের কারণে পবিত্র করেন না। তারা বলতোঃ আমাদের শিশুরা যেমন নিস্পাপ, দ্রুপ আমরাও নিস্পাপ।' এও বলা হয়েছে যে, হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন প্রশংসাকারীর মুখ মাটির দ্বারা পূর্ণ করে দেই। সহীহ বুখারীর ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে অন্য একটি লোকের প্রশংসা করতে শুনতে পেয়ে বলেনঃ ‘অফসোস! তুমি তোমার সঙ্গীর স্কন্ধ কেটে দিলে।' অতঃপর বলেনঃ 'যদি তোমাদের কারও কোন ব্যক্তির প্রশংসা করা অপরিহার্য হয়েই পড়ে তবে যেন সে বলে-আমি অমুক ব্যক্তিকে এরূপ মনে করি। কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা'আলার নিকট এরূপই পবিত্র এ কথা যেন না বলে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি বলে-আমি আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে -আমি জান্নাতী সে জাহান্নামী।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে ভয় এই যে, কেউ স্বীয় মতকেই পছন্দ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বলে যে, সে একজন মুমিন, সে কাফির। যে বলে যে, সে একজন আলেম সে মূর্খ এবং যে বলে যে, সে জান্নাতে রয়েছে। সে জাহান্নামে রয়েছে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন এবং খুব কম জম‘আই এরূপ গেছে যেখানে তিনি নিম্নের কথাগুলো বলেননিঃ ‘যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা মঙ্গলের ইচ্ছে করেন তাকে তিনি ধর্মের বোধ শক্তি দান করেন। এ মাল হচ্ছে মিষ্ট ও সবুজ রঙ্গের। সুতরাং এটা যে তার হকের সাথে গ্রহণ করবে তার জন্যে তাতে বরকত দেয়া হবে। তোমরা একে অপরের প্রশংসা করা হতে বিরত হও। কেননা, এটা হচ্ছে যবেহু করারই তুল্য।' এ পরের বাক্যটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও বর্ণিত রয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ সকালে মানুষ তার ধর্ম নিয়ে বের হয়। অতঃপর যখন সে ফিরে আসে তখন তার নিকট তার ধর্মের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। (এভাবে যে,) সে কারও সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার প্রশংসা করতে আরম্ভ করে দেয় ও শপথ করে করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আপনি এরূপই বটে, আপনি এরূপই বটে।' অথচ না সে তার ক্ষতির অধিকারী, না লাভের অধিকারী এবং এ কথাগুলোর পরেও হয়তো তার দ্বারা কোন কাজ হয় না। অথচ সে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে দিলো। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ। করেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা (আরবী) (৫৩:৩২)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে। তাই, এখানে বলা হচ্ছেঃ বরং আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন। কেননা, সমুদয় জিনিসের মূলতত্ত্ব একমাত্র তিনিই জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তারা সূত্র পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না।' অর্থাৎ তিনি সূত্রের ওজন পরিমাণও কারোও পুণ্য ছেড়ে দেবেন না। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের সূত্রটি। আবার এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে ঐ সূতা যা অঙ্গুলি দ্বারা পাকানো হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- লক্ষ্য কর, কিরূপে তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে!' যেমন তারা বলছে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয় পাত্র, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ছাড়া আর কেউ জান্নাতে যাবে না, আমাদেরকে নির্দিষ্ট সামান্য কয়েক দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। আর যেমন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সত্ত্বার্যের উপর নির্ভর করে রয়েছে। অথচ একের কাজ অন্যকে কোন উপকার দেয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ ‘ওটা একটা দল যা অতীত হয়েছে, তারা যা উপার্জন করেছে তা তাদের সঙ্গে এবং তোমরা যা উপার্জন করেছে তা তোমাদের সঙ্গে। (২:১৩৪)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের এসব কথা বলাই তাদের প্রকাশ্য অপরাধী হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যাদু' এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহ্হাক (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেন। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) হচ্ছে আবিসিনীয় শব্দ। ওর অর্থ হচ্ছে শয়তান। এটা শিরক, প্রতিমা, যাদুকর ইত্যাদি অর্থেও এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে বুঝান হয়েছে। আবার কারও কারও মতে এ হচ্ছে কাব ইবনে আশরাফ। হাদীসে রয়েছে যে, পাখীসমূহের নাম নিয়ে শুভাশুভ সূচিত করা এবং মাটিতে রেখা টেনে কার্যাবলীর মীমাংসা করা হচ্ছে (আরবী) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে শয়তানের গুন গুন শব্দ। (আরবী) শব্দের বিশ্লেষণ সূরা-ই-বাকারায় হয়ে গেছে, সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।হযরত জাবির (রাঃ) (আরবী) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ তারা ছিল যাদুকর এবং তাদের নিকট শয়তান আসতো।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তারা হচ্ছে মানুষ রূপী শয়তান। তাদের নিকট মানুষ তাদের বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে বিচারক মেনে থাকে। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে প্রত্যেক ঐ জিনিস, আল্লাহ তাআলা ছাড়া যার ইবাদত করা হয়।এরপর আল্লাহ পাক বলেন- তাদের মূর্খতা, ধর্মহীনতা এবং স্বীয় গ্রন্থের সাথে কুফরী এত চরমে পৌছে গেছে যে, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কাবাসীদের নিকট আগমন করে। মক্কাবাসীরা তাদেরকে বলেঃ তোমরা আহলে কিতাব ও পণ্ডিত লোক। আচ্ছা বলতে আমরা ভাল, না মুহাম্মাদ (সঃ) ভাল? তখন তারা বলেঃ “তোমরা কি এবং মুহাম্মাদ (সঃ) কি? মক্কাবাসীরা বলেঃ আমরা আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত রাখি, উট যবেহ্ করে আহার করিয়ে থাকি, দুগ্ধ মিশ্রিত পানি পান করিয়ে থাকি, ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করিয়ে থাকি। হাজীদেরকে পানি পান করিয়ে থাকি। পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ (সঃ) তো আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং গেফার গোত্রের চোর হাজীরা তাঁর সঙ্গলাভ করেছে। এখন বলতো, আমরা ভাল, না সে ভাল? তখন ঐ দু’জন বলেঃ “তোমরাই ভাল। তোমরাই সোজা ও সঠিক পথে রয়েছ।সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তাদের ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বানূ অয়েল ও বা নাযীর গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক যখন আরবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করছিল এবং ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল, সে সময় যখন তারা কুরাইশদের নিকট আগমন করে তখন কুরাইশরা তাদেরকে আলেম ও দরবেশ মনে করে জিজ্ঞেস করেঃ বলুন তো আমাদের ধর্ম উত্তম, না মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ধর্ম উত্তম? ঐলোকগুলো বলেঃ “তোমাদের ধর্মই উত্তম এবং তোমরাই অধিকতর সঠিক পথে রয়েছে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে অভিশপ্ত দল বলে ঘোষণা করা হয়। আরও বলা হয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। তারা শুধু কাফিরদেরকে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্যই তাদের জ্ঞানের বিপরীত এ তোষামোদমূলক কথাগুলো উচ্চারণ করছে। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা কৃতকার্য হতে পারে না। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। তারা সমস্ত আরবকে দলভুক্ত করতঃ এ সম্মিলিত বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনার উপর আক্রমণ চালায়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করতে বাধ্য হন। অবশেষে সারা জগত দেখে নেয় যে, তাদের ষড়যন্ত্র তাদের উপরই প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়। আল্লাহ তা'আলাই মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং স্বীয় প্রতাপ ও ক্ষমতার বলে কাফিরদেরকে উল্টো মুখে নিক্ষেপ করেন।

আন-নিসা 4:53

৫৩-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে অস্বীকৃতি সূচক ভাষায় আল্লাহ পাক প্রশ্ন করেছেনঃ তারা কি রাজত্বের কোন অংশের মালিক?' অর্থাৎ তারা মালিক নয়। অতঃপর তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যদি এরূপ হতো তবে তারা কারো কোন উপকার করতো না। বিশেষ করে তারা আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী (সঃ)-কে এতটুকুও দিত না যতটুকু খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলে পর্দা থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল-যদি তোমরা আমার প্রভুর করুণা ভাণ্ডারের অধিকারী হতে তবে তোমরা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে (খরচ করা হতে)সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে।' (১৭:১০০) এটা স্পষ্ট কথা যে, এতে সম্পদ কমে যেতে পারে না, তথাপি কৃপণতা তোমাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মানুষ বড়ই কৃপণ। তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়ার পর তাদের হিংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে বড় নবুওয়াত দান করেছেন এবং তিনি যেহেতু আরবের অন্তর্ভুক্ত, বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত নন সেহেতু তারা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে ও জনগণকে তার সত্যতা স্বীকার করা হতে বিরত রাখছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এখানে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে আমরা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমি ইবরাহীমের বংশধরকে নবুওয়াত দিয়েছিলাম যারা ছিল বানী ইসরাঈল গোত্র এবং হযরত ইবরাহীমের সন্তানদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদের উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, রীতি-নীতি শিক্ষা দিয়েছি এবং রাজত্বও দান করেছি। তথাপি তাদের মধ্যে অনেক মুমিন থাকলেও অনেক কাফিরও ছিল। তারা নবী ও কিতাবকে মেনে নেয়নি। নিজেরা ততা স্বীকার করেইনি, এমনকি অন্যদেরকেও বিরত রেখেছিল। অথচ ঐ সব নবী (আঃ) বানী ইসরাঈল ছিল। কাজেই তারা যখন নিজেদের নবীদেরকেই অস্বীকার করেছে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তারা তোমাকে যে অস্বীকার করবে এতে আর বিস্ময়ের কি আছে? কারণ তুমি তো তাদের মধ্য হতে নও।'আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের মধ্যে কতক লোক শেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল এবং কতক লোক ঈমান আনেনি। সুতরাং এ কাফিরেরা তাদের কুফরীর উপর খুবই দৃঢ় রয়েছে এবং সুপথ হতে বহু দূরে সরে পড়েছে।অতঃপর তাদেরকে তাদের শাস্তির কথা শোনানো হচ্ছে যে, জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের অস্বীকৃতি, অবাধ্যতা, মিথ্যা প্রতিপাদন ও বিরোধিতার এ শাস্তিই যথেষ্ট।

আন-নিসা 4:54

৫৩-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে অস্বীকৃতি সূচক ভাষায় আল্লাহ পাক প্রশ্ন করেছেনঃ তারা কি রাজত্বের কোন অংশের মালিক?' অর্থাৎ তারা মালিক নয়। অতঃপর তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যদি এরূপ হতো তবে তারা কারো কোন উপকার করতো না। বিশেষ করে তারা আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী (সঃ)-কে এতটুকুও দিত না যতটুকু খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলে পর্দা থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল-যদি তোমরা আমার প্রভুর করুণা ভাণ্ডারের অধিকারী হতে তবে তোমরা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে (খরচ করা হতে)সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে।' (১৭:১০০) এটা স্পষ্ট কথা যে, এতে সম্পদ কমে যেতে পারে না, তথাপি কৃপণতা তোমাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মানুষ বড়ই কৃপণ। তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়ার পর তাদের হিংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে বড় নবুওয়াত দান করেছেন এবং তিনি যেহেতু আরবের অন্তর্ভুক্ত, বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত নন সেহেতু তারা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে ও জনগণকে তার সত্যতা স্বীকার করা হতে বিরত রাখছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এখানে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে আমরা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমি ইবরাহীমের বংশধরকে নবুওয়াত দিয়েছিলাম যারা ছিল বানী ইসরাঈল গোত্র এবং হযরত ইবরাহীমের সন্তানদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদের উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, রীতি-নীতি শিক্ষা দিয়েছি এবং রাজত্বও দান করেছি। তথাপি তাদের মধ্যে অনেক মুমিন থাকলেও অনেক কাফিরও ছিল। তারা নবী ও কিতাবকে মেনে নেয়নি। নিজেরা ততা স্বীকার করেইনি, এমনকি অন্যদেরকেও বিরত রেখেছিল। অথচ ঐ সব নবী (আঃ) বানী ইসরাঈল ছিল। কাজেই তারা যখন নিজেদের নবীদেরকেই অস্বীকার করেছে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তারা তোমাকে যে অস্বীকার করবে এতে আর বিস্ময়ের কি আছে? কারণ তুমি তো তাদের মধ্য হতে নও।'আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের মধ্যে কতক লোক শেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল এবং কতক লোক ঈমান আনেনি। সুতরাং এ কাফিরেরা তাদের কুফরীর উপর খুবই দৃঢ় রয়েছে এবং সুপথ হতে বহু দূরে সরে পড়েছে।অতঃপর তাদেরকে তাদের শাস্তির কথা শোনানো হচ্ছে যে, জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের অস্বীকৃতি, অবাধ্যতা, মিথ্যা প্রতিপাদন ও বিরোধিতার এ শাস্তিই যথেষ্ট।

আন-নিসা 4:55

৫৩-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে অস্বীকৃতি সূচক ভাষায় আল্লাহ পাক প্রশ্ন করেছেনঃ তারা কি রাজত্বের কোন অংশের মালিক?' অর্থাৎ তারা মালিক নয়। অতঃপর তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যদি এরূপ হতো তবে তারা কারো কোন উপকার করতো না। বিশেষ করে তারা আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী (সঃ)-কে এতটুকুও দিত না যতটুকু খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলে পর্দা থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘তুমি বল-যদি তোমরা আমার প্রভুর করুণা ভাণ্ডারের অধিকারী হতে তবে তোমরা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে (খরচ করা হতে)সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে।' (১৭:১০০) এটা স্পষ্ট কথা যে, এতে সম্পদ কমে যেতে পারে না, তথাপি কৃপণতা তোমাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মানুষ বড়ই কৃপণ। তাদের কার্পণ্যের বর্ণনা দেয়ার পর তাদের হিংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে বড় নবুওয়াত দান করেছেন এবং তিনি যেহেতু আরবের অন্তর্ভুক্ত, বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত নন সেহেতু তারা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে ও জনগণকে তার সত্যতা স্বীকার করা হতে বিরত রাখছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এখানে (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে আমরা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-“আমি ইবরাহীমের বংশধরকে নবুওয়াত দিয়েছিলাম যারা ছিল বানী ইসরাঈল গোত্র এবং হযরত ইবরাহীমের সন্তানদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদের উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, রীতি-নীতি শিক্ষা দিয়েছি এবং রাজত্বও দান করেছি। তথাপি তাদের মধ্যে অনেক মুমিন থাকলেও অনেক কাফিরও ছিল। তারা নবী ও কিতাবকে মেনে নেয়নি। নিজেরা ততা স্বীকার করেইনি, এমনকি অন্যদেরকেও বিরত রেখেছিল। অথচ ঐ সব নবী (আঃ) বানী ইসরাঈল ছিল। কাজেই তারা যখন নিজেদের নবীদেরকেই অস্বীকার করেছে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তারা তোমাকে যে অস্বীকার করবে এতে আর বিস্ময়ের কি আছে? কারণ তুমি তো তাদের মধ্য হতে নও।'আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের মধ্যে কতক লোক শেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছিল এবং কতক লোক ঈমান আনেনি। সুতরাং এ কাফিরেরা তাদের কুফরীর উপর খুবই দৃঢ় রয়েছে এবং সুপথ হতে বহু দূরে সরে পড়েছে।অতঃপর তাদেরকে তাদের শাস্তির কথা শোনানো হচ্ছে যে, জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের অস্বীকৃতি, অবাধ্যতা, মিথ্যা প্রতিপাদন ও বিরোধিতার এ শাস্তিই যথেষ্ট।

আন-নিসা 4:56

৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী অস্বীকার করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহী করে তোলে, এখানে তাদেরই শাস্তি ও মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে এবং সেই আগুন তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেবে এবং তাদের শরীরের সূক্ষ্ম ললাম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেবে। শুধু এটাই নয়, বরং এ শাস্তি হবে তাদের জন্যে চিরস্থায়ী। একটি চামড়া পুড়ে গেলে আবার নতুন চামড়া লাগিয়ে দেয়া হবে, যা হবে সাদা কাগজের মত। এক একজন কাফিরের শত শত চামড়া হবে এবং প্রত্যেক চামড়ার উপর নানা প্রকার পৃথক পৃথক শাস্তি হবে। এক এক দিনে সত্তর হাজারবার চামড়া পরিবর্তন করা হবে। অর্থাৎ ঐ লোকগুলোকে বলা হবে‘পুনরায় তোমরা ফিরে এসো’ তখন এগুলো পুনরায় ফিরে আসবে।হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলে তিনি পাঠককে দ্বিতীয়বার পাঠ করে শুনাতে বলেন। পাঠক দ্বিতীয়বার পাঠ করেন। হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ আমি আপনাকে এর তাফসীর শুনাচ্ছি। এক এক ঘন্টায় একশবার করে পরিবর্তন করা হবে।' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে এরূপই শুনেছি। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি)।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সে সময় হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ ‘এ আয়াতের তাফসীর আমার মনে আছে। আমি এটা আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে পাঠ করেছিলাম। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আচ্ছা বলতো। যদি এটা ঐরূপই হয় যেরূপ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি তবে তো আমি তা মেনে নেবো, নচেৎ ওর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করবো না। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) বলেনঃ ‘এক ঘন্টায় একশ বিশ বার। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এ রকমই শুনেছি।হযরত রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী গ্রন্থে লিখা রয়েছে যে, তাদের চামড়া হবে চল্লিশ হাত ও পঁচাত্তর হাত। আর তাদের পেট এত বড় হবে যে, তাতে পর্বত রাখলেও ধরে যাবে। যখন ঐ চামড়াগুলো আগুনে পুড়ে যাবে তখন অন্য চামড়া এসে যাবে। অন্য হাদীসে এর চেয়েও বেশী রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ জাহান্নামে জাহান্নামবাসীকে এত বড় করা হবে যে, তার কানের লতি ও স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানের দূরত্ব হবে সাতশ বছরের পথ। তার চামড়া হবে সত্তরগজ পুরু এবং দাত হতে উহুদ পাহাড়ের মত। আবার চামড়া হতে ভাবার্থ পোষাকও নেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা দুর্বল এবং প্রকাশ্য শব্দের বিপরীত।এরপর সৎ লোকদের পরিণামের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আদন। জান্নাতে অবস্থান করবে যার নিম্নদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তাদের ইচ্ছেমত নদীগুলো প্রবাহিত হবে। স্বীয় অট্টালিকায়, বাগানে, পথে মোটকথা যেখানেই তার মন চাইবে সেখানেই নদীগুলো বইতে থাকবে। সবচেয়ে বড় মজার কথা এই যে, এসব নিয়ামত হবে চিরস্থায়ী। এগুলো না নষ্ট হবে, না কিছু হ্রাস পাবে, না ধ্বংস হবে না শেষ হবে এবং না ফিরিয়ে নেয়া হবে। আরও থাকবে তাদের জন্যে সুন্দরী হুরগণ, যারা হবে হায়েয-নেফাস, ময়লা, দুর্গন্ধ এবং অন্যান্য জঘন্য বিশেষণ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। আর তাদের জন্যে হবে সুদূর প্রসারিত গাছের ছায়া, যা হবে অত্যন্ত আরামদায়ক ও মনোমুগ্ধকর। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ থাকবে যার ছায়ায় একজন আরোহী একশ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে তবুও তার ছায়া শেষ হবে। ওটা হচ্ছে শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী বৃক্ষ)।

আন-নিসা 4:57

৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী অস্বীকার করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহী করে তোলে, এখানে তাদেরই শাস্তি ও মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে এবং সেই আগুন তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেবে এবং তাদের শরীরের সূক্ষ্ম ললাম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেবে। শুধু এটাই নয়, বরং এ শাস্তি হবে তাদের জন্যে চিরস্থায়ী। একটি চামড়া পুড়ে গেলে আবার নতুন চামড়া লাগিয়ে দেয়া হবে, যা হবে সাদা কাগজের মত। এক একজন কাফিরের শত শত চামড়া হবে এবং প্রত্যেক চামড়ার উপর নানা প্রকার পৃথক পৃথক শাস্তি হবে। এক এক দিনে সত্তর হাজারবার চামড়া পরিবর্তন করা হবে। অর্থাৎ ঐ লোকগুলোকে বলা হবে‘পুনরায় তোমরা ফিরে এসো’ তখন এগুলো পুনরায় ফিরে আসবে।হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলে তিনি পাঠককে দ্বিতীয়বার পাঠ করে শুনাতে বলেন। পাঠক দ্বিতীয়বার পাঠ করেন। হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ আমি আপনাকে এর তাফসীর শুনাচ্ছি। এক এক ঘন্টায় একশবার করে পরিবর্তন করা হবে।' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে এরূপই শুনেছি। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি)।অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সে সময় হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ ‘এ আয়াতের তাফসীর আমার মনে আছে। আমি এটা আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে পাঠ করেছিলাম। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আচ্ছা বলতো। যদি এটা ঐরূপই হয় যেরূপ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি তবে তো আমি তা মেনে নেবো, নচেৎ ওর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করবো না। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) বলেনঃ ‘এক ঘন্টায় একশ বিশ বার। এটা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এ রকমই শুনেছি।হযরত রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী গ্রন্থে লিখা রয়েছে যে, তাদের চামড়া হবে চল্লিশ হাত ও পঁচাত্তর হাত। আর তাদের পেট এত বড় হবে যে, তাতে পর্বত রাখলেও ধরে যাবে। যখন ঐ চামড়াগুলো আগুনে পুড়ে যাবে তখন অন্য চামড়া এসে যাবে। অন্য হাদীসে এর চেয়েও বেশী রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ জাহান্নামে জাহান্নামবাসীকে এত বড় করা হবে যে, তার কানের লতি ও স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানের দূরত্ব হবে সাতশ বছরের পথ। তার চামড়া হবে সত্তরগজ পুরু এবং দাত হতে উহুদ পাহাড়ের মত। আবার চামড়া হতে ভাবার্থ পোষাকও নেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা দুর্বল এবং প্রকাশ্য শব্দের বিপরীত।এরপর সৎ লোকদের পরিণামের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আদন। জান্নাতে অবস্থান করবে যার নিম্নদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তাদের ইচ্ছেমত নদীগুলো প্রবাহিত হবে। স্বীয় অট্টালিকায়, বাগানে, পথে মোটকথা যেখানেই তার মন চাইবে সেখানেই নদীগুলো বইতে থাকবে। সবচেয়ে বড় মজার কথা এই যে, এসব নিয়ামত হবে চিরস্থায়ী। এগুলো না নষ্ট হবে, না কিছু হ্রাস পাবে, না ধ্বংস হবে না শেষ হবে এবং না ফিরিয়ে নেয়া হবে। আরও থাকবে তাদের জন্যে সুন্দরী হুরগণ, যারা হবে হায়েয-নেফাস, ময়লা, দুর্গন্ধ এবং অন্যান্য জঘন্য বিশেষণ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। আর তাদের জন্যে হবে সুদূর প্রসারিত গাছের ছায়া, যা হবে অত্যন্ত আরামদায়ক ও মনোমুগ্ধকর। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ থাকবে যার ছায়ায় একজন আরোহী একশ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে তবুও তার ছায়া শেষ হবে। ওটা হচ্ছে শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী বৃক্ষ)।

আন-নিসা 4:58

আল্লাহ তা'আলা গচ্ছিত বিষয় ওর অধিকারীকে অর্পণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যে তোমাদের সাথে বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করে, তুমি তার গচ্ছিত দ্রব্য আদায় কর এবং যে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনান) আয়াতের শব্দগুলো সাধারণ। আল্লাহ তা'আলার সমস্ত হক আদায় করণও এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন রোযা, নামায, কাফফারা, নযর ইত্যাদি। আর বান্দাদের পরস্পরের সমস্ত হক এর অন্তর্গত। যেমন গচ্ছিত রাখা দ্রব্য ইত্যাদি। সুতরাং যে ব্যক্তি যে হক আদায় করবে না তার জন্য কিয়ামতের দিন তাকে ধরা হবে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করিয়ে দেয়া হবে। এমন কি শিং বিশিষ্ট ছাগল কোন শিং বিহনী ছাগলকে মেরে থাকলে ওর প্রতিশোধও গ্রহণ করিয়ে দেয়া হবে।”মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ সাক্ষ্য দানের কারণে সমস্ত পাপ মুছে যায়, কিন্তু আমানত মুছে যায় না। যদি কোন লোক আল্লাহর পথে শহীদও হয়ে থাকে তাকেও কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে এবং বলা হবে- ‘আমানত আদায় কর।' সে উত্তরে বলবে, এখন তো দুনিয়ায় নেই, সুতরাং আমি আমানত কোথা হতে আদায় করব’? অতঃপর সে ঐ জিনিস জাহান্নামের তলদেশে দেখতে পাবে এবং তাকে বলা হবে-ওটা নিয়ে এসো'। সে ওটা তার স্কন্ধে বহন করে চলতে থাকবে। কিন্তু ওটা পড়ে যাবে এবং সে পুনরায় ওটা নিতে যাবে। অতএব সে ঐ শাস্তিতেই জড়িত থাকবে। হযরত যাযান (রাঃ) এ বর্ণনাটি শুনে হযরত বারা’র (রাঃ) নিকট এসে বর্ণনা করেন। হযরত বারা' (রাঃ) বলেনঃ “আমার ভাই সত্যই বলেছেন।" অতঃপর তিনি কুরআন কারীমের (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া (রঃ) বলেন যে, সৎ ও অসৎ উভয়ের জন্যেই এ একই নির্দেশ।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, যে জিনিসের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং যা নিষেধ করা হয়েছে ঐসবগুলোই আমানত। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) বলেন যে, নারীর নিকট তার লজ্জাস্থান একটি আমানত। হযরত রাবী ইবনে আনাস (রঃ) বলেন, তোমার ও অপরের মধ্যে যে লেন-দেন হয়ে থাকে ঐ সবগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “ওটাও এর অন্তর্ভুক্ত যে, বাদশাহ্ ঈদের দিন নারীদেরকে খুত্ব শুনাবেন।' এ আয়াতের শান-ই-নকূলে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা জয় করেন এবং শান্তভাবে বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করেন তখন তিনি স্বীয় উন্ত্রীর উপর আরোহণ করতঃ তাওয়াফ করেন। সে সময় তিনি হাজরে আসওয়াদকে স্বীয় লাঠি দ্বারা স্পর্শ করছিলেন। তারপর তিনি কা'বা গৃহের চাবি রক্ষক হযরত উসমান ইবনে তালহাকে আহবান করেন এবং তার নিকট চাবি যাজ্ঞা করেন। হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) চাবি প্রদানে সম্মত হয়েছেন এমন সময় হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! চাবিটি আমার হাতে সমর্পণ করুন, যেন যমযমের পানি পান করানো ও কা'বা গৃহের চাবি রক্ষণাবেক্ষণ এ উভয় কাজ আমাদের বংশের মধ্যে থাকে। একথা শোনামাত্রই হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) হাত টেনে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার চাইলে একই ব্যাপারই ঘটে। তিনি তৃতীয়বার চাইলে তিনি নিম্নের কথাটি বলে চাবিটি প্রদান করেন ও আল্লাহ তাআলার আমানতের সঙ্গে দিচ্ছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কা'বা গৃহের দরজা খুলে দেন। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি সমস্ত মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মূর্তিও ছিল, যার হাতে শুভাশুভ নিরূপণের তীর ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ মুশরিকদেরকে ধ্বংস করুন। এ তীরের সঙ্গে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কি সম্বন্ধ রয়েছে?” অতঃপর তিনি ঐ সমুদয় জিনিসকে ধ্বংস করে ওদের স্থানে পানি ঢেলে দেন এবং ঐগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেন। অতঃপর তিনি বাইরে এসে কা’বার দরজার উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেনঃ “আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার সত্য করে দেখিয়েছেন। তিনি বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং সমুদয় সৈন্যকে একক সত্তাই পরাজিত করেছেন।অতঃপর তিনি একটি সুদীর্ঘ ভাষণ দান করেন। সে ভাষণে তিনি এ কথাও বলেনঃ “অজ্ঞতা যুগের সমস্ত বিবাদ এখন আমার পদতলে দলিত হয়েছে, সেটা মালের বিবাদই হোক বা জানের বিবাদই হোক। হ্যাঁ, তবে বায়তুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাজীদেরকে পানি পান করানোর মর্যাদা যাদের ছিল তাদেরই থাকবে।”এ ভাষণ দানের পর তিনি সবেমাত্র বসেছেন এমন সময় হযরত আলী (রাঃ) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাবিটি আমাকে প্রদান করুন, যেন বায়তুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করানোর মর্যাদা এ দু'টোই এক জায়গায় একত্রিত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাবিটি তাঁকে দিলেন না। তিনি মাকাম-ই-ইবরাহীমকে কা'বার ভেতর হতে বের করে কা’বার দেয়ালের সাথে মিলিয়ে রেখে দেন এবং লোকদেরকে বলেনঃ ‘এটাই আমাদের কিবলাহ।'অতঃপর তিনি তাওয়াফের কাজে লেগে পড়েন। তিনি শুধুমাত্র দু'বার প্রদক্ষিণ করেছেন এমন সময় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) অবতীর্ণ হন এবং রাসূলুল্লাহ (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করতে আরম্ভ করেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মা-বাপ আপনার উপর উৎসর্গ হোক, আমি-এর পূর্বে তো আপনাকে এ আয়াতটি পাঠ করতে শুনিনি।' তখন তিনি হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) -কে ডেকে তাকে চাবিটি দিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আজকের দিন হজ্ব পুরা করার দিন এবং উত্তম ব্যবহার করার দিন। এ উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) যার বংশের মধ্যে এখন পর্যন্ত কা'বাতুল্লাহর চাবি রক্ষিত হয়ে আসছে, তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সময় হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) ও হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) মুসলমান হন। তাঁর চাচা উসমান ইবনে তালহা উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের সাথে ছিল, এমনকি তাদের পতাকাবাহক ছিল এবং সেখানই কুফরীর অবস্থায় মারা যায়। মোটকথা প্রসিদ্ধ কথা তো এই যে, এ আয়াতটি এ সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়। এখন এ সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়ে থাক আর নাই থাক এর হুকুম হচ্ছে সাধারণ। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এর দ্বারা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রত্যেক ব্যক্তির আমানত আদায় করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-ন্যায়ের সঙ্গে মীমাংসা কর।' বিচারকদেরকে সর্বাপেক্ষা বড় বিচারপতির পক্ষ হতে নির্দেশ হচ্ছে- কোন অবস্থাতেই তোমরা ন্যায়ের অঞ্চল পরিত্যাগ করো না। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বিচারকের সঙ্গে থাকেন যে পর্যন্ত না সে অত্যাচার করে। যখন সে অত্যাচার করে তখন তা তারই দিকে সমর্পণ করেন। একটি হাদীসে রয়েছেঃ 'এক দিনের ন্যায় বিচার চল্লিশ বছরের ইবাদতের সমান। অতঃপর বলা হচ্ছে-‘গচ্ছিত জিনিস ওর অধিকারীকে অর্পণ করার নির্দেশ এবং ন্যায় বিচার করার নির্দেশ ও অনুরূপভাবে শরীয়তের সমস্ত আদেশ ও নিষেধ তোমাদের জন্য উত্তম ও ফলদায়ক, যেসব আদেশ ও নিষেধ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি জারী করে থাকেন।আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি শ্রবণকারী, পরিদর্শক।' অর্থাৎ তিনি তোমাদের কথাসমূহ শ্রবণকারী এবং তোমাদের কার্যাবলী পরিদর্শনকারী। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত উবা ইবনে আমের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি, তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পড়ছিলেন। তিনি বলেন-“তিনি প্রত্যেক জিনিস পরিদর্শনকারী। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত আবু ইউনুস (রঃ) বলেন, আমি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে (আরবী) আয়াতটি পড়তে শুনতে পাই, তিনি (আরবী)-এ পর্যন্ত পাঠ করেন এবং স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলি স্বীয় কানের উপর রাখেন ও ওর পার্শ্ববর্তী অঙ্গুলিটি চক্ষুর উপর রাখেন এবং বলেন, এরূপই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আয়াতটি পড়তে শুনছি এবং তিনি এভাবেই অঙ্গুলি দু’টি রাখতেন। হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী হযরত যাকারিয়া (রঃ) বলেন, আমাদের শিক্ষক হযরত মুকরী (রঃ) অর্থাৎ আৰূ আবদুর রহমান আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) এভাবেই ইঙ্গিত করে আমাদেরকে এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়েছেন। সে সময় হযরত যাকারিয়া (রঃ) তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি তাঁর ডান চোখের উপর রাখেন এবং তার পার্শ্ববর্তী অঙ্গুলি তাঁর ডান কানে রাখেন। অতঃপর তিনি বলেন, এরূপে।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) এভাবে ইমাম আবু দাউদও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে হিব্বানও (রঃ) স্বীয় পুস্তক ‘সহীহ'-এর মধ্যে এটা এনেছেন। ইবনে মিরদুওয়াইও (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এটা এনেছেন। এর সনদের মধ্যে আবু ইউনুস যে রয়েছেন তিনি হযরত আবু হুরাইরার মাওলা। তার নাম হচ্ছে সালিম ইবনে যুবাইর।

আন-নিসা 4:59

সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট নৌবাহিনীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযায়ফা ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তার ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং একজন আনসারীকে তার নেতৃত্ব দান করেন। একদা তিনি সৈন্যদের উপর কি এক ব্যাপারে ভীষণ রাগান্বিত হয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্যের নির্দেশ দেননি? তাঁরা বলেন, হ্যা। তিনি বলেন, “তোমরা জ্বালানী কাষ্ঠ জমা কর। অতঃপর তিনি আগুন আনিয়ে নিয়ে কাষ্ঠগুলো জ্বালিয়ে দেন।তারপরে তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে এ আগুনের মধ্যে প্রবেশ করার নির্দেশ দিলাম। তখন একজন নব্য যুবক সৈন্যদেরকে বলেন, আপনারা অগ্নি হতে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট আশ্রয় নিয়েছেন। আপনারা তাড়াতাড়ি করবেন না যে পর্যন্ত না আপনারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর তিনিও যদি আপনাদেরকে আগুনে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন তবে ওতে প্রবেশ করবেন। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ তোমরা যদি আগুনে প্রবেশ করতে তবে আর কখনও সে আগুন হতে বের হতে না। জেনে। রেখো, আনুগত্য শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির কার্যেই রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। সুনান-ই-আবু দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শ্রবণ করা ও মান্য করা মুসলমানের উপর ফরয়, তা তার নিকট প্রিয়ই হোক বা অপছন্দনীয়ই হোক, যে পর্যন্ত না (আল্লাহ ও রাসূলের) অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়া হয়। যখন অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়া হবে তখন শ্রবণও করতে হবে না এবং মান্যও করতে হবে না।'সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা শ্রবণ করা ও মান্য করার উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করি, তাতে আমাদের সন্তুষ্টিই হোক বা অসন্তুষ্টিই হোক, আমরা কঠিন অবস্থাতেই থাকি বা সহজ অবস্থাতেই থাকি। এবং যদিও আমাদের উপর অপরকে প্রাধান্য দেয়া হয়, আর আমরা কার্যের যোগ্য ব্যক্তি হতে কার্য ছিনিয়ে না নেই। তিনি বলেন, কিন্তু এই যে, তোমরা স্পষ্ট কুফরী দেখ যার ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহ প্রদত্ত কোন প্রকাশ্য দলীল রয়েছে। সে সময় তোমাদেরকে শ্রবণও করতে হবে না, মান্যও করতে হবে না)।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা শ্রবণ কর ও মান্য কর যদিও তোমাদের উপর একজন ক্ষুদ্র মস্তক বিশিষ্ট হাবশী ক্রীতদাসকে আমীর বানিয়ে দেয়া হয়। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার বন্ধু (সঃ) আমাকে শ্রবণ করার ও মান্য করার উপদেশ দিয়েছেন যদিও সে একজন ত্রুটিযুক্ত হাত-পা বিশিষ্ট হাবশী ক্রীতদাসও হয়'।সহীহ মুসলিমে হযরত উম্মে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার বিদায় হজ্বের ভাষণে বলতে শুনেছেন-“যদি তোমাদের উপর একজন ক্রীতদাসকে আমেল বানিয়ে দেয়া হয় এবং সে তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত করে তবে তোমরা তার কথা শ্রবণ করবে ও মান্য করবে। অন্য বর্ণনায় ‘কর্তিত অঙ্গ বিশিষ্ট হাবশী ক্রীতদাস’-এ শব্দগুলো রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ আমার পরে সত্বরই তোমাদের উপর ভাল আমীর ভাল হুকুম চালাবে এবং মন্দ আমীর মন্দ হুকুম চালাবে। সত্যের অনুরূপ কার্যে তোমরা প্রত্যেকেরই আদেশ শুনবে ও মানবে এবং তাদের পিছনে নামায পড়তে থাকবে। যদি তারা ভাল কাজ করে তবে তাদের জন্যেও মঙ্গল এবং তোমাদের জন্যেও মঙ্গল। আর যদি তারা মন্দ কাজ করে তবে তোমাদের জন্যে মঙ্গল বটে কিন্তু তাদের মন্দ কর্মের প্রতিফল তাদেরকেই ভোগ করতে হবে।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বানী ইসরাঈলের মধ্যে ক্রমাগত একের পর এক নবী আসতে থাকতেন। কিন্তু আমার পরে কোন নবী নেই, বরং খলীফা রয়েছে এবং তারা অধিক সংখ্যক হবে। জনগণ জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আপনি আমাদেরকে কি নির্দেশ দিচ্ছেন?' তিনি বলেনঃ ‘প্রথম জনের বায়আত পূর্ণ কর, তারপর তার পরবর্তী জনের বায়আত পূর্ণ কর। তোমরা তাদেরকে তাদের হক পূর্ণভাবে দিয়ে দাও। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের প্রজাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি স্বীয় আমীরের কোন অপছন্দীয় কাজ দেখে সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। যে ব্যক্তি দল হতে অর্ধ হাত দূরে সরে যাবে সে অজ্ঞতা যুগের মৃত্যুবরণ করবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আনুগত্য হতে হাত টেনে নেয় সে কিয়ামতের দিন। হুজ্জত ও দলীল ছাড়াই আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে। আর যে ব্যক্তি। এমন অবস্থায় মারা যাবে যে তার স্কন্ধে কারও বশ্যতা স্বীকার নেই, সে অজ্ঞতার যুগের মৃত্যুবরণ করবে।' (সহীহ মুসলিম)সহীহ মুসলিমেই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবদ-ই-রাব্বিল কাবা হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি বায়তুল্লাহ শরীফে গিয়ে দেখি যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) কাবা ঘরের ছায়ায় বসে রয়েছেন এবং তথায় একটি জনসমাবেশ রয়েছে। আমিও ঐ সমাবেশের এক পার্শ্বে বসে পড়ি। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক সফরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমরা এক মজলিসে অবতরণ করি। কেউ তাঁর তাঁবু ঠিক করতে লেগে পড়েন, কেউ স্বীয় তীর গুছিয়ে নেন এবং কেউ অন্য কোন কাজে লেগে পড়েন। এমন সময় হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণাকারী সকলকে ডাক দিয়ে বলেন-নামাযের জন্য একত্রিত হোন। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একত্রিত হই। তখন তিনি বলেনঃ ‘প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর উপর আল্লাহ পাক ফরয করেছেন যে, তিনি যেন স্বীয় উম্মতকে তার জানা সমস্ত ভাল কথা শিখিয়ে দেন এবং তাঁর দৃষ্টিতে যা কিছু মন্দ তা হতে যেন তাদেরকে সতর্ক করেন। জেনে রেখো, এ উম্মতের নিরাপত্তার যুগ হচ্ছে এ প্রথম যুগ। শেষ যুগে বড় বড় বিপদ আসবে যা মুসলমানগণ অপছন্দ করবে এবং ক্রমাগত ফিনা আসতে থাকবে। একটি হাঙ্গামা উপস্থিত হলে মুমিন মনে করবে যে, তাতেই তার ধ্বংস রয়েছে। ওটা সরে গিয়ে আর একটি ওর চেয়েও বড় গণ্ডগোল আসবে যাতে সে নিজের ধ্বংস অনিবার্য বলে বিশ্বাস করবে। এভাবেই ক্রমাগত হাঙ্গামা, ভয়াবহ পরীক্ষা এবং ভীষণ বিপদ আসতেই থাকবে। সুতরাং যে ব্যক্তি জাহান্নাম হতে দূরে থাকতে ও জান্নাতে অংশ নিতে চায়, সে যেন মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের দিনের উপর বিশ্বাস রাখে। জনগণের সাথে যেন ঐ ব্যবহার করে যা সে নিজের জন্যে পছন্দ করে। জেনে রেখো যে ব্যক্তি ইমামের বায়আত গ্রহণ করলো সে তার হাতের ক্ষমতা এবং অন্তরের ফল তাকে দিয়ে দিল। তখন তার আনুগত্য স্বীকার করা তার উচিত। তখন যদি অন্য কেউ এসে ঐ ক্ষমতা ইমাম হতে ছিনিয়ে নেয়ার ইচ্ছে করে তবে তোমরা তার গর্দান উড়িয়ে দাও।' আবদুর রহমান (রঃ) বলেন, আমি নিকটে গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-কে বলি, আমি আপনাকে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে বলছি, আপনি কি স্বয়ং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছেন? তখন তিনি তাঁর দু'খানা হাত স্বীয় কান ও অন্তরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এ দু'কানে শুনেছি এবং এ অন্তরে রক্ষিত রেখেছি। আমি তখন বলি, আপনার চাচাত ভাই হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে দেখুন যে, তিনি আমাদেরকে আমাদের পরস্পরের মাল অন্যায়ভাবে খেতে ও পরস্পর যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, অথচ আল্লাহ তাআলা এদুটো কাজ হতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসা ব্যতীত অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করো না এবং তোমরা নিজেদেরকে। হত্যাও করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাশীল।' (৪:২৯) এটা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের কাজে তোমরা তার আদেশ মান্য কর এবং তাঁর অবাধ্যতার কোন নির্দেশ দিলে তা মান্য করো না। এ সম্পর্কে আরও বহু হাদীস রয়েছে।(আরবী) -এ আয়াতের তাফসীরেই হযরত সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-কে এর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। ঐ সেনাবাহিনীতে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসারও (রাঃ) ছিলেন। ঐ সেনাবাহিনী যে গোত্রের দিকে যাওয়ার ইচ্ছে করেছিলেন সে দিকেই চলছিলেন। রাত্রিকালে তাদের গ্রামের নিকটে তারা শিবির সন্নিবেশ করেন। ঐ লোকগুলো গুপ্তচরের মাধ্যমে এ সংবাদ জেনে নেয় এবং ঐ রাত্রেই তারা সবাই গ্রাম হতে পলায়ন করে। শুধুমাত্র একটি লোক রয়ে যায়। সে তার পরিবারের লোককে নির্দেশ দেয়ায় তারা তাদের আসবাবপত্র জমা করে। অতঃপর সে রাত্রির অন্ধকারেই হযরত খালিদ (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে চলে আসে এবং ঠিকানা জেনে হযরত আম্মার (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়। হযরত আম্মার (রাঃ)-কে সে বলে, “হে আবুল ইয়াকন! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমার সারা গোত্র এখানে আপনাদের আগমন সংবাদ শুনে পলায়ন করেছে। শুধু আমি রয়ে গেছি। তাহলে আগামীকাল কি আমার এ ইসলাম আমার জন্যে উপকারী হবে? যদি আমি উপকৃত না হই তবে আমিও পালিয়ে যাই।' হযরত আম্মার (রাঃ) বলেন, “নিশ্চয়ই তোমার এ ইসলাম দ্বারা তোমার উপকার লাভ হবে। তুমি পালিয়ে যেয়ো না, ওখানেই থাক। সকালে হযরত খালিদ (রাঃ) আক্রমণ চালান এবং ঐ লোকটি ছাড়া আর কাউকেও পেলেন না। তাকে তিনি মালসহ গ্রেফতার করেন। হযরত আম্মার (রাঃ) এ সংবাদ জানতে পেরে হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে বলেন, একে ছেড়ে দিন। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং আমার আশ্রয়ে রয়েছে। হযরত খালিদ (রাঃ) তখন তাকে বলেন, আপনি তাকে আশ্রয় দেয়ার কে?' এতে উভয় মনীষীর মধ্যে কিছু বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আম্মার (রাঃ)-এর এ আশ্রয় দানকে বৈধ বলে ঘোষণা করেন এবং আগামীতে আমীরের পক্ষ হতে কাউকে আশ্রয় দিতে নিষেধ করে দেন। আবার দু'জনের মধ্যে বচসা শুরু হয়ে যায়। এতে হযরত খালিদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, আপনি এ নাক কাটা গোলামকে কিছু বলছেন না? দেখুন তো, সে আমাকে কিরূপ অন্যায় কথা বলছে?' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে খালিদ (রাঃ)! হযরত আম্মার (রাঃ)-কে মন্দ বলো না। যে আম্মার (রাঃ)-কে গালি দেবে, আল্লাহ পাক তাকে গালি দেবেন। যে ব্যক্তি আম্মার (রাঃ)-এর শত্রুতা পোষণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবেন। যে ব্যক্তি আম্মার (রাঃ)-কে অভিশাপ দেবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অভিশাপ দেবেন।' হযরত আম্মার (রাঃ) ক্রোধে তথা হতে প্রস্থান করেন। হযরত খালিদ (রাঃ) তখন দৌড়ে গিয়ে তাঁর (কাপড়ের) অঞ্চল টেনে ধরেন এবং স্বীয় অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন ও অবশেষে তিনি তাকে ক্ষমা করতে সম্মত হন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর ও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা বোধশক্তি সম্পন্ন ও ধার্মিক ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আলেমগণ। বাহ্যিক কথা তো এটাই মনে হচ্ছে, তবে প্রকত জ্ঞান আল্লাহ পাকেরই রয়েছে। এ শব্দটি সাধারণ, এর ভাবার্থ আমীর’ ও ‘আলেম উভয়ই হতে পারে, যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ তাদের আলেমগণ তাদেরকে মিথ্যা কথা বলা হতে এবং সুদ ভক্ষণ হতে নিষেধ করে না কেন?’(৫:৬৩) অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা না জানলে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। (১৬:৫৩) সহীহ হাদীসে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার আনুগত্য স্বীকারকারী হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারকারী এবং যে আমার অবাধ্য হয়েছে সে আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়েছে। যে ব্যক্তি আমার নির্বাচিত আমীরের অবাধ্য হয়েছে সে আমারই অবাধ্য হয়েছে। সুতরাং এ হলো আলেম ও আমীরগণের অনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ। এ আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা আল্লাহ তা'আলার আনুগত হও' অর্থাৎ তার কিতাবের অনুসারী হও। আল্লাহ তা'আলার রাসূলের অনুগত হও’ অর্থাৎ তাঁর সুন্নাতের উপর আমল কর। আর তোমাদের আদেশদাতাদের আনুগত্য স্বীকার কর। অর্থাৎ তাদের ঐ নির্দেশের প্রতি অনুগত হও যেখানে আল্লাহ তা'আলার। আনুগত্য রয়েছে। তারা যদি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের বিপরীত কোন আদেশ করে তবে তাদের সে আদেশ মান্য করা মোটেই উচিত নয়। কেননা, এ সময়ে আলেম ও আমীরদের আদেশ মান্য করা হারাম। যেমন ইতিপূর্বে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আনুগত্য শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির কার্যেই রয়েছে। অর্থাৎ তাদের আনুগত্য রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশের বেষ্টনীর মধ্যে।মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে এর চেয়েও স্পষ্ট হাদীস রয়েছে। সেখানে হযরত ইমরান ইবনে হোসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতার কার্যে আনুগত্য নেই। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“যদি তোমাদের মধ্যে কোন মতবিরোধ সৃষ্টি হয় তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হও।' অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর হাদীসের দিকে ফিরে এসো, যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর তাফসীরে রয়েছে। সুতরাং এখানে স্পষ্ট ভাষায় মহা সম্মানিত আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে যে, যে মাসআলায় মানুষের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, ঐ মাসআলা ধর্মনীতি সম্পৰ্কীয়ই হোক বা ধর্মের শাখা-প্রশাখা সম্পর্কীয়ই হোক, এর মীমাংসার জন্যে একটিমাত্র পথ রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলার কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর হাদীসকে মীমাংসাকারী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এ দুটোর মধ্যে যা রয়েছে তাই মেনে নিতে হবে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য আয়াতের রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ সৃষ্টি কর, ওর ফায়সালা আল্লাহ তাআলার নিকট রয়েছে।' (৪২:১০) অতএব, কিন্তব ও সুন্নাহ যা নির্দেশ দেবে এবং যে মাসআলার উপর সঠিকতার সাক্ষ্য প্রদান করবে এটাই সত্য এবং অন্য সবই মিথ্যা। কুরআন কারীমে ঘোষণা হচ্ছেঃ সত্যের পরে যা রয়েছে তা শুধু পথভ্রষ্টতাই বটে।' এ জন্যেই এখানেও এ নির্দেশের সাথেই ইরশাদ হচ্ছেঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাক।' অর্থাৎ যদি তোমরা ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও তবে যে জিজ্ঞাস্য বিষয়ে তোমাদের জ্ঞান নেই এবং যাতে মতভেদ রয়েছে, যে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করা হয়, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর হাদীস দ্বারা এসবের মীমাংসা কর, এ দুটোর মধ্যে যা রয়েছে তাই মেনে নাও।' অতএব, সাব্যস্ত হলো যে, মতভেদী জিজ্ঞাস্য বিষয়ের মীমাংসার জন্য যারা কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসে না তারা আল্লাহ তা'আলার উপর বিশ্বাস রাখে না। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-বিবাদসমূহে ও মতভেদের ব্যাপারে আল্লাহ পাকের কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করাই তোমাদের জন্যে উত্তম এবং এটাই হচ্ছে কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি। এটাই হচ্ছে উত্তম প্রতিদান লাভের কাজ।

আন-নিসা 4:60

৬০-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। যারা মুখে স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলার পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর এবং এ কুরআন কারীমের উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। কিন্তু যখন কোন বিবাদের মীমাংসা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন তারা কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, বরং অন্য দিকে যায়। এ আয়াতটি ঐ দু’ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যাদের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখা দিয়েছিল। একজন ছিল ইয়াহূদী এবং অপর জন ছিল আনসারী। ইয়াহদী আনসারীকে বলছিল, চল আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট হতে এর মীমাংসা করিয়ে নেবো। আনসারী বলছিল চল আমরা কা'ব ইবনে আশরাফের নিকট যাই। এও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাইরে ইসলাম প্রকাশ করতো বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অজ্ঞতা যুগের আহকামের দিকে আকৃষ্ট হতে চাচ্ছিল। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আয়াতটি স্বীয় আদেশ ও শব্দসমূহ হিসেবে সাধারণ। এ সমুদয় ঘটনা এর অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির দুর্নাম ও নিন্দে করছে, যে কিতাব ও সুন্নাহূকে ছেড়ে অন্য কোন বাতিলের দিকে স্বীয় ফায়সালা নিয়ে যায়। এখানে এটাই হচ্ছে তাগুত’-এর ভাবার্থ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে-বরং আমরা অনুসরণ করবো ঐ জিনিসের যার উপরে আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।'(২:১৭০) মুমিনদের এ উত্তর হতে পারে না। বরং তাদের উত্তর অন্য আয়াতে নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ মুমিনদেরকে যখন তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের এ উত্তরই হয় যে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।'(২৪:৫১)এরপর মুনাফিকদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, হে নবী (সঃ)! যখন তারা তাদের পাপের কারণে বিপদে পড়ে এবং তোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তখন তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকট আগমন করে এবং ওযর পেশ করতঃ শপথ করে করে বলে- 'আমরা কল্যাণ ও সম্মিলন ব্যতীত কিছুই কামনা করিনি এবং আপনাকে ছেড়ে আমাদের মোকদ্দমা অন্যের নিকট নিয়ে যাওয়ার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের মন যোগানো ও তাদের সাথে বাহ্যিক মিল রাখা। তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক আস্থা মোটেই নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তুমি তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) দেখবে যে, তারা তাদের (ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান) সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের সর্বপ্রকারের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং বলবে- আমাদের বিপদে পড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে, সুতরাং খুব সম্ভব আল্লাহ বিজয় আনয়ন করবেন অথবা নিজের কোন হুকুম জারী করবেন এবং এর ফলে তারা তাদের অন্তরে লুক্কায়িত উদ্দেশ্যের কারণে লজ্জিত হবে। (৫:৫২)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আবু বারযা আসলামী ছিল একজন যাদুকর। ইয়াহদীরা তাদের কতক মোকদ্দমার মীমাংসা তার দ্বারা করিয়ে নিত। একটি ঘটনায় মুশরিকেরাও তার নিকট দৌড়িয়ে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর বলা হচ্ছে- এ প্রকারের লোকের অর্থাৎ মুনাফিকদের অন্তরে কি রয়েছে তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তাঁর নিকট ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন জিনিসও গুপ্ত নয়। তিনি তাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবরই রাখেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের দিক হতে নির্লিপ্ত থাক এবং তাদেরকে তাদের অন্তরের খারাপ উদ্দেশ্যের কারণে শাসন-গর্জন করো না। তারা যেন কপটতা দ্বারা অন্যদের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি না করে তজ্জন্যে তাদেরকে সদুপদেশ দিতে থাক এবং তাদের সাথে হৃদয়স্পর্শী ভাষায় কথা বল ও তাদের জন্যে প্রার্থনাও কর।

আন-নিসা 4:61

৬০-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। যারা মুখে স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলার পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর এবং এ কুরআন কারীমের উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। কিন্তু যখন কোন বিবাদের মীমাংসা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন তারা কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, বরং অন্য দিকে যায়। এ আয়াতটি ঐ দু’ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যাদের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখা দিয়েছিল। একজন ছিল ইয়াহূদী এবং অপর জন ছিল আনসারী। ইয়াহদী আনসারীকে বলছিল, চল আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট হতে এর মীমাংসা করিয়ে নেবো। আনসারী বলছিল চল আমরা কা'ব ইবনে আশরাফের নিকট যাই। এও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাইরে ইসলাম প্রকাশ করতো বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অজ্ঞতা যুগের আহকামের দিকে আকৃষ্ট হতে চাচ্ছিল। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আয়াতটি স্বীয় আদেশ ও শব্দসমূহ হিসেবে সাধারণ। এ সমুদয় ঘটনা এর অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির দুর্নাম ও নিন্দে করছে, যে কিতাব ও সুন্নাহূকে ছেড়ে অন্য কোন বাতিলের দিকে স্বীয় ফায়সালা নিয়ে যায়। এখানে এটাই হচ্ছে তাগুত’-এর ভাবার্থ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে-বরং আমরা অনুসরণ করবো ঐ জিনিসের যার উপরে আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।'(২:১৭০) মুমিনদের এ উত্তর হতে পারে না। বরং তাদের উত্তর অন্য আয়াতে নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ মুমিনদেরকে যখন তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের এ উত্তরই হয় যে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।'(২৪:৫১)এরপর মুনাফিকদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, হে নবী (সঃ)! যখন তারা তাদের পাপের কারণে বিপদে পড়ে এবং তোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তখন তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকট আগমন করে এবং ওযর পেশ করতঃ শপথ করে করে বলে- 'আমরা কল্যাণ ও সম্মিলন ব্যতীত কিছুই কামনা করিনি এবং আপনাকে ছেড়ে আমাদের মোকদ্দমা অন্যের নিকট নিয়ে যাওয়ার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের মন যোগানো ও তাদের সাথে বাহ্যিক মিল রাখা। তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক আস্থা মোটেই নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তুমি তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) দেখবে যে, তারা তাদের (ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান) সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের সর্বপ্রকারের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং বলবে- আমাদের বিপদে পড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে, সুতরাং খুব সম্ভব আল্লাহ বিজয় আনয়ন করবেন অথবা নিজের কোন হুকুম জারী করবেন এবং এর ফলে তারা তাদের অন্তরে লুক্কায়িত উদ্দেশ্যের কারণে লজ্জিত হবে। (৫:৫২)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আবু বারযা আসলামী ছিল একজন যাদুকর। ইয়াহদীরা তাদের কতক মোকদ্দমার মীমাংসা তার দ্বারা করিয়ে নিত। একটি ঘটনায় মুশরিকেরাও তার নিকট দৌড়িয়ে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর বলা হচ্ছে- এ প্রকারের লোকের অর্থাৎ মুনাফিকদের অন্তরে কি রয়েছে তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তাঁর নিকট ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন জিনিসও গুপ্ত নয়। তিনি তাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবরই রাখেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের দিক হতে নির্লিপ্ত থাক এবং তাদেরকে তাদের অন্তরের খারাপ উদ্দেশ্যের কারণে শাসন-গর্জন করো না। তারা যেন কপটতা দ্বারা অন্যদের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি না করে তজ্জন্যে তাদেরকে সদুপদেশ দিতে থাক এবং তাদের সাথে হৃদয়স্পর্শী ভাষায় কথা বল ও তাদের জন্যে প্রার্থনাও কর।

আন-নিসা 4:62

৬০-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। যারা মুখে স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলার পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর এবং এ কুরআন কারীমের উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। কিন্তু যখন কোন বিবাদের মীমাংসা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন তারা কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, বরং অন্য দিকে যায়। এ আয়াতটি ঐ দু’ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যাদের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখা দিয়েছিল। একজন ছিল ইয়াহূদী এবং অপর জন ছিল আনসারী। ইয়াহদী আনসারীকে বলছিল, চল আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট হতে এর মীমাংসা করিয়ে নেবো। আনসারী বলছিল চল আমরা কা'ব ইবনে আশরাফের নিকট যাই। এও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাইরে ইসলাম প্রকাশ করতো বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অজ্ঞতা যুগের আহকামের দিকে আকৃষ্ট হতে চাচ্ছিল। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আয়াতটি স্বীয় আদেশ ও শব্দসমূহ হিসেবে সাধারণ। এ সমুদয় ঘটনা এর অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির দুর্নাম ও নিন্দে করছে, যে কিতাব ও সুন্নাহূকে ছেড়ে অন্য কোন বাতিলের দিকে স্বীয় ফায়সালা নিয়ে যায়। এখানে এটাই হচ্ছে তাগুত’-এর ভাবার্থ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে-বরং আমরা অনুসরণ করবো ঐ জিনিসের যার উপরে আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।'(২:১৭০) মুমিনদের এ উত্তর হতে পারে না। বরং তাদের উত্তর অন্য আয়াতে নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ মুমিনদেরকে যখন তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের এ উত্তরই হয় যে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।'(২৪:৫১)এরপর মুনাফিকদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, হে নবী (সঃ)! যখন তারা তাদের পাপের কারণে বিপদে পড়ে এবং তোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তখন তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকট আগমন করে এবং ওযর পেশ করতঃ শপথ করে করে বলে- 'আমরা কল্যাণ ও সম্মিলন ব্যতীত কিছুই কামনা করিনি এবং আপনাকে ছেড়ে আমাদের মোকদ্দমা অন্যের নিকট নিয়ে যাওয়ার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের মন যোগানো ও তাদের সাথে বাহ্যিক মিল রাখা। তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক আস্থা মোটেই নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তুমি তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) দেখবে যে, তারা তাদের (ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান) সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের সর্বপ্রকারের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং বলবে- আমাদের বিপদে পড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে, সুতরাং খুব সম্ভব আল্লাহ বিজয় আনয়ন করবেন অথবা নিজের কোন হুকুম জারী করবেন এবং এর ফলে তারা তাদের অন্তরে লুক্কায়িত উদ্দেশ্যের কারণে লজ্জিত হবে। (৫:৫২)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আবু বারযা আসলামী ছিল একজন যাদুকর। ইয়াহদীরা তাদের কতক মোকদ্দমার মীমাংসা তার দ্বারা করিয়ে নিত। একটি ঘটনায় মুশরিকেরাও তার নিকট দৌড়িয়ে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর বলা হচ্ছে- এ প্রকারের লোকের অর্থাৎ মুনাফিকদের অন্তরে কি রয়েছে তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তাঁর নিকট ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন জিনিসও গুপ্ত নয়। তিনি তাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবরই রাখেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের দিক হতে নির্লিপ্ত থাক এবং তাদেরকে তাদের অন্তরের খারাপ উদ্দেশ্যের কারণে শাসন-গর্জন করো না। তারা যেন কপটতা দ্বারা অন্যদের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি না করে তজ্জন্যে তাদেরকে সদুপদেশ দিতে থাক এবং তাদের সাথে হৃদয়স্পর্শী ভাষায় কথা বল ও তাদের জন্যে প্রার্থনাও কর।

আন-নিসা 4:63

৬০-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। যারা মুখে স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলার পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর এবং এ কুরআন কারীমের উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। কিন্তু যখন কোন বিবাদের মীমাংসা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন তারা কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, বরং অন্য দিকে যায়। এ আয়াতটি ঐ দু’ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যাদের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখা দিয়েছিল। একজন ছিল ইয়াহূদী এবং অপর জন ছিল আনসারী। ইয়াহদী আনসারীকে বলছিল, চল আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট হতে এর মীমাংসা করিয়ে নেবো। আনসারী বলছিল চল আমরা কা'ব ইবনে আশরাফের নিকট যাই। এও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাইরে ইসলাম প্রকাশ করতো বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অজ্ঞতা যুগের আহকামের দিকে আকৃষ্ট হতে চাচ্ছিল। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আয়াতটি স্বীয় আদেশ ও শব্দসমূহ হিসেবে সাধারণ। এ সমুদয় ঘটনা এর অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির দুর্নাম ও নিন্দে করছে, যে কিতাব ও সুন্নাহূকে ছেড়ে অন্য কোন বাতিলের দিকে স্বীয় ফায়সালা নিয়ে যায়। এখানে এটাই হচ্ছে তাগুত’-এর ভাবার্থ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে-বরং আমরা অনুসরণ করবো ঐ জিনিসের যার উপরে আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।'(২:১৭০) মুমিনদের এ উত্তর হতে পারে না। বরং তাদের উত্তর অন্য আয়াতে নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ মুমিনদেরকে যখন তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের এ উত্তরই হয় যে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।'(২৪:৫১)এরপর মুনাফিকদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, হে নবী (সঃ)! যখন তারা তাদের পাপের কারণে বিপদে পড়ে এবং তোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তখন তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকট আগমন করে এবং ওযর পেশ করতঃ শপথ করে করে বলে- 'আমরা কল্যাণ ও সম্মিলন ব্যতীত কিছুই কামনা করিনি এবং আপনাকে ছেড়ে আমাদের মোকদ্দমা অন্যের নিকট নিয়ে যাওয়ার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের মন যোগানো ও তাদের সাথে বাহ্যিক মিল রাখা। তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক আস্থা মোটেই নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের সম্বন্ধে বলেনঃ (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তুমি তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) দেখবে যে, তারা তাদের (ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান) সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের সর্বপ্রকারের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং বলবে- আমাদের বিপদে পড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে, সুতরাং খুব সম্ভব আল্লাহ বিজয় আনয়ন করবেন অথবা নিজের কোন হুকুম জারী করবেন এবং এর ফলে তারা তাদের অন্তরে লুক্কায়িত উদ্দেশ্যের কারণে লজ্জিত হবে। (৫:৫২)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আবু বারযা আসলামী ছিল একজন যাদুকর। ইয়াহদীরা তাদের কতক মোকদ্দমার মীমাংসা তার দ্বারা করিয়ে নিত। একটি ঘটনায় মুশরিকেরাও তার নিকট দৌড়িয়ে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর বলা হচ্ছে- এ প্রকারের লোকের অর্থাৎ মুনাফিকদের অন্তরে কি রয়েছে তা আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তাঁর নিকট ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন জিনিসও গুপ্ত নয়। তিনি তাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবরই রাখেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের দিক হতে নির্লিপ্ত থাক এবং তাদেরকে তাদের অন্তরের খারাপ উদ্দেশ্যের কারণে শাসন-গর্জন করো না। তারা যেন কপটতা দ্বারা অন্যদের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি না করে তজ্জন্যে তাদেরকে সদুপদেশ দিতে থাক এবং তাদের সাথে হৃদয়স্পর্শী ভাষায় কথা বল ও তাদের জন্যে প্রার্থনাও কর।

আন-নিসা 4:64

৬৪-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক যুগের রাসূলের আনুগত্য স্বীকার করা তাঁর উম্মতের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফরয হয়ে থাকে। রিসালাতের পদমর্যাদা এই যে, তাঁর সমস্ত আদেশকে আল্লাহ তা'আলার আদেশ মনে করা হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন: (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার হাতেই রয়েছে এবং তা তার শক্তি ও ইচ্ছের উপরই নির্ভর করে। অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছে ছাড়া কেউ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে পারে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাঁর হুকুমে তাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছিলে।' (৩:১৫২) এখানেও (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে তার ক্ষমতা ও ইচ্ছা। অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবাধ্য ও পাপীদের প্রতি ইরশাদ করেছেন যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটও যেন তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার আবেদন জানায়। তারা যখন এরূপ করবে তখন নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করবেন এবং তাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।আবু মানসূর আস্সাববাগ্ (রঃ) স্বীয় প্রসিদ্ধ গল্পের পুস্তকে উত্তীর (রঃ) একটি বর্ণনা নকল করেছেন। উত্তী (রঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমাধির পার্শ্বে বসেছিলাম। এমন সময় সেখানে এক বেদুঈনের আগমন ঘটে। সে বলে, আস্সালামু আলাইকুম ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)! আমি আল্লাহ তা'আলার (আরবী) উক্তি শুনেছি। তাই আমি আপনার সামনে স্বীয় পাপের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও আপনার শাফাআত কামনা করছি। অতঃপর সে নিম্নের কবিতাটি পাঠ করেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে ঐ সবের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি! যাদের অস্থিগুলো প্রান্তরে প্রোথিত হয়েছে এবং সেগুলোর সুবাসে পর্বত ও প্রান্তর সুরভিত হয়েছে। সে কবরের জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গিত হোক, যে কবরে আপনি অবস্থানকারী। এতে রয়েছে পবিত্রতা, দানশীলতা ও ভদ্রতা। অতঃপর বেদুঈন চলে যায় এবং আমার চোখে দ্রিা চেপে বসে। আমি স্বপ্নে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে যেন বলছেনঃ 'যাও, ঐ বেদুঈনকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পবিত্র ও সম্মানিত সত্তার শপথ করে বলছেনঃ ‘কোন ব্যক্তিই ঈমানের সীমার মধ্যে আসতে পারে না যে পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ তাআলার শেষ নবী (সঃ)-কে ন্যায় বিচারক রূপে মেনে না নেবে এবং প্রত্যেক নির্দেশকে, প্রত্যেক মীমাংসাকে, প্রত্যেক সুন্নাতকে, প্রত্যেক হাদীসকে গ্রহণযোগ্য রূপে স্বীকার না করবে। আর অন্তর ও দেহকে একমাত্র ঐ রাসূলেরই (সঃ) অনুগত না করবে। মোটকথা, যে ব্যক্তি তার প্রকাশ্য, গোপনীয়, ছোট ও বড় প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসকে সমস্ত নীতির মূল মনে করবে সে হচ্ছে মুমিন। অতএব নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, তারা যেন তোমার মীমাংসাকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয় এবং স্বীয় অন্তরে যেন কোন প্রকারের সংকীর্ণতা পোষণ না করে। তারা যেন সমস্ত হাদীসকেই স্বীকার করে নেয়। তারা যেন না হাদীসসমূহকে স্বীকার করা হতে বিরত থাকে, না ঐগুলোকে সরিয়ে দেয়ার উপায় অনুসন্ধান করে, না ওর মত অন্য কোন জিনিসকে মর্যাদা সম্পন্ন মনে করে, না ঐ গুলো খণ্ডন করে এবং না ঐ গুলো মেনে নেয়ার ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেনঃ যার অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে স্বীয় প্রবৃত্তিকে ঐ জিনিসের অনুগত করে যা আমি আনয়ন করেছি।'সহীহ বুখারী শরীফে হযরত উরওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, নর্দমা দিয়ে বাগানে পানি নেয়ার ব্যাপারে একটি লোকের সঙ্গে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর বিবাদ হয়। নবী (সঃ) তখন বলেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তোমার বাগানে পানি নেয়ার পর তুমি আনসারীর বাগানে পানি যেতে দাও। তার একথা শুনে আনসারী বলে, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আপনার ফুপাতো ভাই তো!' এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক পরিবর্তিত হয় এবং তিনি বলেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি তোমার বাগানে পানি দেয়ার পর তা বন্ধ রেখো যে পর্যন্ত না সে পানি বাগানের প্রাচীর পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর পানি তোমার প্রতিবেশীর দিকে ছেড়ে দাও।' প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন পন্থা বের করেন যাতে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর কষ্ট না হয় এবং আনসারীরও প্রশস্ততা বেড়ে যায়। কিন্তু আনসারী যখন সেটা তার পক্ষে উত্তম মনে করলো না, তখন তিনি হযরত যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁর পূর্ণ হক প্রদান করলেন। হযরত যুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি ধারণা করি যে, (আরবী)-এ আয়াতটি এ ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, এ আনসারী বদরী সাহাবী ছিলেন। অন্য বর্ণনা হিসেবে উভয়ের মধ্যে বিবাদ ছিল এই যে, পানির নালা হতে প্রথমেই ছিল হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর বাগান এবং তারপরে ঐ আনসারীর বাগান। আনসারী হযরত যুবাইর (রাঃ)-কে বলতেন, ‘পানি বন্ধ করবেন না। পানি আপনা আপনি এক সাথে দু’ বাগানেই আসবে।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের আর একটি খুব বেশী দুর্বল বর্ণনায় এ আয়াতের শান-ই-নযুল এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দু'ব্যক্তি তাদের বিবাদের মীমাংসার জন্যে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তিনি একটা মীমাংসা করে দেন। কিন্তু মীমাংসা যার প্রতিকূল হয়েছিল সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মীমাংসার জন্যে আপনি আমাদেরকে হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঠিক আছে, তোমরা সেখানেই যাও।' তারা এখানে আসলে যার অনুকূলে ফায়সালা হয়েছিল সে সমস্ত ঘটনা হযরত উমারের নিকট বর্ণনা করে। হযরত উমার (রাঃ) অপর ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, এটা সত্যা কি?' সে স্বীকার করে নেয়। হযরত উমার (রাঃ) তখন তাদেরকে বলেন, এখানে তোমরা থাম, আমি এসে ফায়সালা করছি।' তিনি। তরবারী নিয়ে আসলেন এবং যে ব্যক্তি বলেছিল, আমাদেরকে হযরত উমার (রাঃ)এর নিকট পাঠিয়ে দিন তার গর্দান উড়িয়ে দেন। অপর ব্যক্তি এটা দেখেই দৌড়ে পালিয়ে আসে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমি পালিয়ে না আসলে আমার মঙ্গল ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “আমি উমার (রাঃ)-কে এরূপ জানতাম না যে, তিনি এরূপ বীরত্বপনা দেখিয়ে একজন মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করবেন। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ফলে ঐ ব্যক্তির রক্ত বিফলে যায় এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে নির্দোষ সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু এ নিয়ম চালু হয়ে যাওয়া আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। তাই তিনি (আরবী) (৪:৬৬) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ। করেন যা পরে আসছে।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে যা গারীব ও মুরসাল। ইবনে আবি লাহীআহ্ নামক বর্ণনাকারী দুর্বল। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। অন্য সনদের মাধ্যমে বর্ণিত আছে যে, দু’ ব্যক্তি তাদের বিবাদ মীমাংসার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়। তিনি হক পন্থীর পক্ষে মীমাংসা করেন। কিন্তু মীমাংসা যার প্রতিকূলে হয়েছিল সে বলে, আমি সম্মত নই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কি চাও?' সে বলে, আমি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট যেতে চাই।'উভয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট পৌছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘটনাটি শুনে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে ফায়সালা করেছেন তোমাদের জন্যে ওটাই ফায়সালা।' সে তাতেও সম্মত না হয়ে সঙ্গীকে বলে, চল আমরা হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট যাবো।' তথায় তারা গমন করেন। তথায় যা সংঘটিত হয় তা উপরে বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীর-ই-ইবনে হাফিয আবু ইসহাক)

আন-নিসা 4:65

৬৪-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক যুগের রাসূলের আনুগত্য স্বীকার করা তাঁর উম্মতের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফরয হয়ে থাকে। রিসালাতের পদমর্যাদা এই যে, তাঁর সমস্ত আদেশকে আল্লাহ তা'আলার আদেশ মনে করা হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন: (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার হাতেই রয়েছে এবং তা তার শক্তি ও ইচ্ছের উপরই নির্ভর করে। অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছে ছাড়া কেউ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে পারে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাঁর হুকুমে তাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছিলে।' (৩:১৫২) এখানেও (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে তার ক্ষমতা ও ইচ্ছা। অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবাধ্য ও পাপীদের প্রতি ইরশাদ করেছেন যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটও যেন তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার আবেদন জানায়। তারা যখন এরূপ করবে তখন নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করবেন এবং তাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।আবু মানসূর আস্সাববাগ্ (রঃ) স্বীয় প্রসিদ্ধ গল্পের পুস্তকে উত্তীর (রঃ) একটি বর্ণনা নকল করেছেন। উত্তী (রঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমাধির পার্শ্বে বসেছিলাম। এমন সময় সেখানে এক বেদুঈনের আগমন ঘটে। সে বলে, আস্সালামু আলাইকুম ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)! আমি আল্লাহ তা'আলার (আরবী) উক্তি শুনেছি। তাই আমি আপনার সামনে স্বীয় পাপের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও আপনার শাফাআত কামনা করছি। অতঃপর সে নিম্নের কবিতাটি পাঠ করেঃ (আরবী) অর্থাৎ হে ঐ সবের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি! যাদের অস্থিগুলো প্রান্তরে প্রোথিত হয়েছে এবং সেগুলোর সুবাসে পর্বত ও প্রান্তর সুরভিত হয়েছে। সে কবরের জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গিত হোক, যে কবরে আপনি অবস্থানকারী। এতে রয়েছে পবিত্রতা, দানশীলতা ও ভদ্রতা। অতঃপর বেদুঈন চলে যায় এবং আমার চোখে দ্রিা চেপে বসে। আমি স্বপ্নে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে যেন বলছেনঃ 'যাও, ঐ বেদুঈনকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পবিত্র ও সম্মানিত সত্তার শপথ করে বলছেনঃ ‘কোন ব্যক্তিই ঈমানের সীমার মধ্যে আসতে পারে না যে পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ তাআলার শেষ নবী (সঃ)-কে ন্যায় বিচারক রূপে মেনে না নেবে এবং প্রত্যেক নির্দেশকে, প্রত্যেক মীমাংসাকে, প্রত্যেক সুন্নাতকে, প্রত্যেক হাদীসকে গ্রহণযোগ্য রূপে স্বীকার না করবে। আর অন্তর ও দেহকে একমাত্র ঐ রাসূলেরই (সঃ) অনুগত না করবে। মোটকথা, যে ব্যক্তি তার প্রকাশ্য, গোপনীয়, ছোট ও বড় প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসকে সমস্ত নীতির মূল মনে করবে সে হচ্ছে মুমিন। অতএব নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, তারা যেন তোমার মীমাংসাকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয় এবং স্বীয় অন্তরে যেন কোন প্রকারের সংকীর্ণতা পোষণ না করে। তারা যেন সমস্ত হাদীসকেই স্বীকার করে নেয়। তারা যেন না হাদীসসমূহকে স্বীকার করা হতে বিরত থাকে, না ঐগুলোকে সরিয়ে দেয়ার উপায় অনুসন্ধান করে, না ওর মত অন্য কোন জিনিসকে মর্যাদা সম্পন্ন মনে করে, না ঐ গুলো খণ্ডন করে এবং না ঐ গুলো মেনে নেয়ার ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেনঃ যার অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে স্বীয় প্রবৃত্তিকে ঐ জিনিসের অনুগত করে যা আমি আনয়ন করেছি।'সহীহ বুখারী শরীফে হযরত উরওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, নর্দমা দিয়ে বাগানে পানি নেয়ার ব্যাপারে একটি লোকের সঙ্গে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর বিবাদ হয়। নবী (সঃ) তখন বলেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তোমার বাগানে পানি নেয়ার পর তুমি আনসারীর বাগানে পানি যেতে দাও। তার একথা শুনে আনসারী বলে, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে আপনার ফুপাতো ভাই তো!' এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক পরিবর্তিত হয় এবং তিনি বলেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি তোমার বাগানে পানি দেয়ার পর তা বন্ধ রেখো যে পর্যন্ত না সে পানি বাগানের প্রাচীর পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর পানি তোমার প্রতিবেশীর দিকে ছেড়ে দাও।' প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন পন্থা বের করেন যাতে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর কষ্ট না হয় এবং আনসারীরও প্রশস্ততা বেড়ে যায়। কিন্তু আনসারী যখন সেটা তার পক্ষে উত্তম মনে করলো না, তখন তিনি হযরত যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁর পূর্ণ হক প্রদান করলেন। হযরত যুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি ধারণা করি যে, (আরবী)-এ আয়াতটি এ ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, এ আনসারী বদরী সাহাবী ছিলেন। অন্য বর্ণনা হিসেবে উভয়ের মধ্যে বিবাদ ছিল এই যে, পানির নালা হতে প্রথমেই ছিল হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর বাগান এবং তারপরে ঐ আনসারীর বাগান। আনসারী হযরত যুবাইর (রাঃ)-কে বলতেন, ‘পানি বন্ধ করবেন না। পানি আপনা আপনি এক সাথে দু’ বাগানেই আসবে।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের আর একটি খুব বেশী দুর্বল বর্ণনায় এ আয়াতের শান-ই-নযুল এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, দু'ব্যক্তি তাদের বিবাদের মীমাংসার জন্যে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তিনি একটা মীমাংসা করে দেন। কিন্তু মীমাংসা যার প্রতিকূল হয়েছিল সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মীমাংসার জন্যে আপনি আমাদেরকে হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঠিক আছে, তোমরা সেখানেই যাও।' তারা এখানে আসলে যার অনুকূলে ফায়সালা হয়েছিল সে সমস্ত ঘটনা হযরত উমারের নিকট বর্ণনা করে। হযরত উমার (রাঃ) অপর ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, এটা সত্যা কি?' সে স্বীকার করে নেয়। হযরত উমার (রাঃ) তখন তাদেরকে বলেন, এখানে তোমরা থাম, আমি এসে ফায়সালা করছি।' তিনি। তরবারী নিয়ে আসলেন এবং যে ব্যক্তি বলেছিল, আমাদেরকে হযরত উমার (রাঃ)এর নিকট পাঠিয়ে দিন তার গর্দান উড়িয়ে দেন। অপর ব্যক্তি এটা দেখেই দৌড়ে পালিয়ে আসে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমি পালিয়ে না আসলে আমার মঙ্গল ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “আমি উমার (রাঃ)-কে এরূপ জানতাম না যে, তিনি এরূপ বীরত্বপনা দেখিয়ে একজন মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করবেন। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ফলে ঐ ব্যক্তির রক্ত বিফলে যায় এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে নির্দোষ সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু এ নিয়ম চালু হয়ে যাওয়া আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। তাই তিনি (আরবী) (৪:৬৬) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ। করেন যা পরে আসছে।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে যা গারীব ও মুরসাল। ইবনে আবি লাহীআহ্ নামক বর্ণনাকারী দুর্বল। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। অন্য সনদের মাধ্যমে বর্ণিত আছে যে, দু’ ব্যক্তি তাদের বিবাদ মীমাংসার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়। তিনি হক পন্থীর পক্ষে মীমাংসা করেন। কিন্তু মীমাংসা যার প্রতিকূলে হয়েছিল সে বলে, আমি সম্মত নই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ তুমি কি চাও?' সে বলে, আমি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট যেতে চাই।'উভয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট পৌছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘটনাটি শুনে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে ফায়সালা করেছেন তোমাদের জন্যে ওটাই ফায়সালা।' সে তাতেও সম্মত না হয়ে সঙ্গীকে বলে, চল আমরা হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট যাবো।' তথায় তারা গমন করেন। তথায় যা সংঘটিত হয় তা উপরে বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীর-ই-ইবনে হাফিয আবু ইসহাক)

আন-নিসা 4:66

৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন- অধিকাংশ লোক এরূপ যে, তাদেরকে যদি ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করারও নির্দেশ দেয়া হতো যা তারা এ সময়ে করতে রয়েছে তবে তারা ঐ কাজগুলোও করতো না। কেননা, তাদের হীন প্রকৃতিকে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচরণের উপরই গঠন করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর ঐ জ্ঞানের সংবাদ দিচ্ছেন যা হয়নি। কিন্তু যদি হতো তবে কিরূপ হতো? হযরত আবু ইসহাক সাবীঈ (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন মনীষী বলেছিলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ নির্দেশ দিতেন তবে অবশ্যই আমরা তা পালন করতাম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে এটা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনেন তখন তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের অন্তরে ঈমান মজবুত পর্বত অপেক্ষাও বেশী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (মুসনাদ-ইইবনে আবি হাতিম)অন্য সনদে রয়েছে যে, কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) এ কথা বলেছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে গর্ব করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর স্বয়ং আমাদের হত্যা ফরয। করেছিলেন এবং আমরা তা পালন করেছিলাম। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) বলেনঃ যদি আমাদের উপর ওটা ফরয করা হতো তবে আমরাও তা পালন করতাম।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি এ নির্দেশ দেয়া হতো হবে তা পালনকারীদের মধ্যে একজন ইবনে উম্মে আবদও (রাঃ) হতো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পড়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করত বলেনঃ ‘এর উপর আমলকারীদের মধ্যে এও একজন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আমার আদেশ পালন করতো এবং আমার নিষিদ্ধ জিনিস ও কাজ হতে বিরত থাকতো তবে আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো। এটাই হতো তাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় আমি তাদেরকে জান্নাত দান করতাম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পথ প্রদর্শন করতাম।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানের ঘরে নিয়ে যাবেন এবং নবীদের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নবীদের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মুমিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভেতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর উঠতে পারেননি তখন তাঁর কণ্ঠস্বর বসে যায়। সে সময় আমি তাকে বলতে শুনি, ‘ওদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাকে অধিকার দেয়া হয়েছে'।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তাঁর নিম্নের শব্দগুলো এসেছে, হে আল্লাহ! আমি সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বন্ধুর সাথে মিলন যাজ্ঞা করছি। অতঃপর তিনি এ নশ্বর জগত হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন। এ কথা তিনি তিনবার পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেন। পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত তার উক্তির ভাবার্থ এটাই ।এ পবিত্র আয়াতের শানে নুযূলঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে তো সকাল সন্ধ্যায় আমরা আপনার ' খেদমতে এসে উঠা বসা করছি এবং আপনার মুখমণ্ডলও দর্শন করছি। কিন্তু কাল কিয়ামতের দিন তো আপনি নবীগণের সমাবেশে সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট থাকবেন। তখন তো আমরা আপনার নিকট পৌছাতে পারবো না! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না। সে সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতটি আনয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোক পাঠিয়ে উক্ত আনসারীকে সুসংবাদ প্রদান করেন। এ হাদীসটি মুরসাল সনদেও বর্ণিত আছে, যে সনদটি খুবই উত্তম।হযরত রাবী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন, এটা তো স্পষ্ট কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মর্যাদা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কারীদের বহু উর্ধে। সুতরাং জান্নাতে যখন এঁরা সব একত্রিত হবেন তখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কিরূপে দেখা সাক্ষাৎ হবে? তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিম্নমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিকট নেমে আসবে এবং তারা সব ফুল বাগানে একত্রিত হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করবে ও তার প্রশংসা করবে। তারা যা চাইবে তাই পাবে এবং তন্মধ্যে সদা তারা আমোদ-আহলাদ করতে থাকবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে আমার প্রাণ হতে, পরিবার পরিজন হতে এবং সন্তান অপেক্ষাও বেশী ভালবাসি। আমি বাড়ীতে থাকি বটে, কিন্তু আপনাকে স্মরণ করা মাত্র আপনার নিকট আগমন ছাড়া আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। অতঃপর এসে আপনাকে দর্শন করি। কিন্তু যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আপনি নবীদের সঙ্গে সুউচ্চ প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবেন, তখন আমার ভয় হয় যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ লাভ করলেও আপনাকে হয়তো দেখতে পাবো না। সে সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটির আরও ধারা রয়েছে।সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত রাবিআ’ ইবনে কা'ব আসলামী (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে অবস্থান করতাম এবং তাঁকে পানি ইত্যাদি এনে দিতাম। একদা তিনি আমাকে বলেনঃ “কিছু যাঞা কর'। আমি বলি, জান্নাতে আপনার বন্ধুত্ব যাজ্ঞা করছি। তিনি বলেনঃ “এটা ছাড়া অন্য কিছু?' আমি বলি, এটাও এটাই বটে। তখন তিনি বলেনঃ তা হলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তুমি তোমার জীবনের উপর আমাকে সাহায্য কর।'মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আমর ইবনে মুররাতুল জাহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি, স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করি এবং রমযানের রোযা রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অঙ্গুলি উঠিয়ে ইঙ্গিত করতঃ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এর উপরই মৃত্যুবরণ করবে সে কিয়ামতের দিন এভাবে নবীদের সঙ্গে, সত্য সাধকদের সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন পিতা-মাতার অবাধ্য না হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে সে কিয়ামতের দিন ইনশাআল্লাহ নবীদের, সত্য সাধকদের, শহীদদের এবং সৎ কর্মশীলদের সঙ্গে মিলিত হবে। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযতর আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বণিক- নবী, সিদ্দীক ও শহীদের সঙ্গে থাকবে।সহীহ ও মুসনাদ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল হতে ক্রম পরম্পরায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হন যে একটি গোত্রের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘মানুষ তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে সে ভালবাসতো।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, মুসলমানেরা এ হাদীস শুনে যত খুশী হয়েছিল এত খুশী অন্য কোন জিনিসে হয়নি। আল্লাহর শপথ! আমার ভালবাসা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযতর উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে রয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁদের সঙ্গেই উঠাবেন, যদিও আমার আমল তাঁদের মত নয়।'হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নতবাসীরা তাদের অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন জন্নাতবাসীদেরকে তাদের প্রাসাদ এরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোন উজ্জ্বল তারকা দেখে থাক। তাদের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকবে। তখন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এসব প্রাসাদ তো নবীদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। সুতরাং তথায় তো তারা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হ্যা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যেসব লোক আল্লাহ তা'আলা উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করেছে তারাও তথায় পৌছে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে কিছু প্রশ্ন করার জন্যে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘জিজ্ঞেস কর ও অনুধাবন কর।' সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে আকারে, রঙ্গে এবং নবুওয়াতে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি যার উপর ঈমান এনেছেন আমিও যদি তার উপর ঈমান আনি এবং যেসব নির্দেশ আপনি পালন করেন আমিও যদি তা পালন করি তবে কি আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যা। যে আল্লাহ তা'আলার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী এমন সাদা উজ্জ্বল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে যে, তার ঔজ্জ্বল্য এক হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতেও দৃষ্টিগোচর হবে। অতঃপর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট অঙ্গীকার রয়েছে এবং যে ব্যক্তি 'সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। তখন আর এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন এত পুণ্য লাভ হবে তখন আমরা ধ্বংস কিরূপে হতে পারি। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একজন লোক কিয়ামতের দিন এত পুণ্য নিয়ে হাযির হবে যে, যদি তা কোন পর্বতের উপর রাখা হয় তবে তার উপর ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নি'আমত দাড়িয়ে যাবে এবং ওরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে এ সমুদয় আমল খুবই অল্প রূপ পরিলক্ষিত হবে। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তাআলা যদি তাকে স্বীয় পূর্ণ করুণা দ্বারা ঢেকে দিয়ে জান্নাত দান করেন সেটা অন্য কথা। সে সময় (আরবী) (৭৬:১-২০) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে আমার চক্ষুও কি তা দেখতে পাবে’? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যাঁ'। একথা শুনে সে কেঁদে পড়ে এবং এত বেশী ক্রন্দন করে যে, তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'আমি ঐ লোকটির মৃত দেহ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরে নামাতে দেখেছি।' এ বর্ণনাটি গারীব এবং মুনকারও বটে। এর সনদও দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই অনুগ্রহ ও দান এবং তাঁর বিশেষ করুণা, যার কারণে তাঁর বান্দা এত মর্যাদা লাভ করেছে, এটা সে তার কার্যবলে লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন।' অর্থাৎ হিদায়াত ও তাওফীক লাভের হকদার যে কে তাঁর খুব ভালরূপেই জানা আছে।

আন-নিসা 4:67

৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন- অধিকাংশ লোক এরূপ যে, তাদেরকে যদি ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করারও নির্দেশ দেয়া হতো যা তারা এ সময়ে করতে রয়েছে তবে তারা ঐ কাজগুলোও করতো না। কেননা, তাদের হীন প্রকৃতিকে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচরণের উপরই গঠন করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর ঐ জ্ঞানের সংবাদ দিচ্ছেন যা হয়নি। কিন্তু যদি হতো তবে কিরূপ হতো? হযরত আবু ইসহাক সাবীঈ (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন মনীষী বলেছিলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ নির্দেশ দিতেন তবে অবশ্যই আমরা তা পালন করতাম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে এটা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনেন তখন তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের অন্তরে ঈমান মজবুত পর্বত অপেক্ষাও বেশী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (মুসনাদ-ইইবনে আবি হাতিম)অন্য সনদে রয়েছে যে, কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) এ কথা বলেছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে গর্ব করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর স্বয়ং আমাদের হত্যা ফরয। করেছিলেন এবং আমরা তা পালন করেছিলাম। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) বলেনঃ যদি আমাদের উপর ওটা ফরয করা হতো তবে আমরাও তা পালন করতাম।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি এ নির্দেশ দেয়া হতো হবে তা পালনকারীদের মধ্যে একজন ইবনে উম্মে আবদও (রাঃ) হতো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পড়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করত বলেনঃ ‘এর উপর আমলকারীদের মধ্যে এও একজন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আমার আদেশ পালন করতো এবং আমার নিষিদ্ধ জিনিস ও কাজ হতে বিরত থাকতো তবে আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো। এটাই হতো তাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় আমি তাদেরকে জান্নাত দান করতাম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পথ প্রদর্শন করতাম।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানের ঘরে নিয়ে যাবেন এবং নবীদের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নবীদের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মুমিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভেতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর উঠতে পারেননি তখন তাঁর কণ্ঠস্বর বসে যায়। সে সময় আমি তাকে বলতে শুনি, ‘ওদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাকে অধিকার দেয়া হয়েছে'।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তাঁর নিম্নের শব্দগুলো এসেছে, হে আল্লাহ! আমি সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বন্ধুর সাথে মিলন যাজ্ঞা করছি। অতঃপর তিনি এ নশ্বর জগত হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন। এ কথা তিনি তিনবার পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেন। পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত তার উক্তির ভাবার্থ এটাই ।এ পবিত্র আয়াতের শানে নুযূলঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে তো সকাল সন্ধ্যায় আমরা আপনার ' খেদমতে এসে উঠা বসা করছি এবং আপনার মুখমণ্ডলও দর্শন করছি। কিন্তু কাল কিয়ামতের দিন তো আপনি নবীগণের সমাবেশে সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট থাকবেন। তখন তো আমরা আপনার নিকট পৌছাতে পারবো না! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না। সে সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতটি আনয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোক পাঠিয়ে উক্ত আনসারীকে সুসংবাদ প্রদান করেন। এ হাদীসটি মুরসাল সনদেও বর্ণিত আছে, যে সনদটি খুবই উত্তম।হযরত রাবী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন, এটা তো স্পষ্ট কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মর্যাদা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কারীদের বহু উর্ধে। সুতরাং জান্নাতে যখন এঁরা সব একত্রিত হবেন তখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কিরূপে দেখা সাক্ষাৎ হবে? তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিম্নমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিকট নেমে আসবে এবং তারা সব ফুল বাগানে একত্রিত হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করবে ও তার প্রশংসা করবে। তারা যা চাইবে তাই পাবে এবং তন্মধ্যে সদা তারা আমোদ-আহলাদ করতে থাকবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে আমার প্রাণ হতে, পরিবার পরিজন হতে এবং সন্তান অপেক্ষাও বেশী ভালবাসি। আমি বাড়ীতে থাকি বটে, কিন্তু আপনাকে স্মরণ করা মাত্র আপনার নিকট আগমন ছাড়া আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। অতঃপর এসে আপনাকে দর্শন করি। কিন্তু যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আপনি নবীদের সঙ্গে সুউচ্চ প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবেন, তখন আমার ভয় হয় যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ লাভ করলেও আপনাকে হয়তো দেখতে পাবো না। সে সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটির আরও ধারা রয়েছে।সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত রাবিআ’ ইবনে কা'ব আসলামী (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে অবস্থান করতাম এবং তাঁকে পানি ইত্যাদি এনে দিতাম। একদা তিনি আমাকে বলেনঃ “কিছু যাঞা কর'। আমি বলি, জান্নাতে আপনার বন্ধুত্ব যাজ্ঞা করছি। তিনি বলেনঃ “এটা ছাড়া অন্য কিছু?' আমি বলি, এটাও এটাই বটে। তখন তিনি বলেনঃ তা হলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তুমি তোমার জীবনের উপর আমাকে সাহায্য কর।'মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আমর ইবনে মুররাতুল জাহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি, স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করি এবং রমযানের রোযা রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অঙ্গুলি উঠিয়ে ইঙ্গিত করতঃ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এর উপরই মৃত্যুবরণ করবে সে কিয়ামতের দিন এভাবে নবীদের সঙ্গে, সত্য সাধকদের সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন পিতা-মাতার অবাধ্য না হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে সে কিয়ামতের দিন ইনশাআল্লাহ নবীদের, সত্য সাধকদের, শহীদদের এবং সৎ কর্মশীলদের সঙ্গে মিলিত হবে। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযতর আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বণিক- নবী, সিদ্দীক ও শহীদের সঙ্গে থাকবে।সহীহ ও মুসনাদ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল হতে ক্রম পরম্পরায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হন যে একটি গোত্রের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘মানুষ তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে সে ভালবাসতো।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, মুসলমানেরা এ হাদীস শুনে যত খুশী হয়েছিল এত খুশী অন্য কোন জিনিসে হয়নি। আল্লাহর শপথ! আমার ভালবাসা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযতর উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে রয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁদের সঙ্গেই উঠাবেন, যদিও আমার আমল তাঁদের মত নয়।'হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নতবাসীরা তাদের অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন জন্নাতবাসীদেরকে তাদের প্রাসাদ এরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোন উজ্জ্বল তারকা দেখে থাক। তাদের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকবে। তখন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এসব প্রাসাদ তো নবীদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। সুতরাং তথায় তো তারা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হ্যা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যেসব লোক আল্লাহ তা'আলা উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করেছে তারাও তথায় পৌছে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে কিছু প্রশ্ন করার জন্যে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘জিজ্ঞেস কর ও অনুধাবন কর।' সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে আকারে, রঙ্গে এবং নবুওয়াতে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি যার উপর ঈমান এনেছেন আমিও যদি তার উপর ঈমান আনি এবং যেসব নির্দেশ আপনি পালন করেন আমিও যদি তা পালন করি তবে কি আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যা। যে আল্লাহ তা'আলার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী এমন সাদা উজ্জ্বল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে যে, তার ঔজ্জ্বল্য এক হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতেও দৃষ্টিগোচর হবে। অতঃপর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট অঙ্গীকার রয়েছে এবং যে ব্যক্তি 'সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। তখন আর এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন এত পুণ্য লাভ হবে তখন আমরা ধ্বংস কিরূপে হতে পারি। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একজন লোক কিয়ামতের দিন এত পুণ্য নিয়ে হাযির হবে যে, যদি তা কোন পর্বতের উপর রাখা হয় তবে তার উপর ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নি'আমত দাড়িয়ে যাবে এবং ওরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে এ সমুদয় আমল খুবই অল্প রূপ পরিলক্ষিত হবে। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তাআলা যদি তাকে স্বীয় পূর্ণ করুণা দ্বারা ঢেকে দিয়ে জান্নাত দান করেন সেটা অন্য কথা। সে সময় (আরবী) (৭৬:১-২০) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে আমার চক্ষুও কি তা দেখতে পাবে’? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যাঁ'। একথা শুনে সে কেঁদে পড়ে এবং এত বেশী ক্রন্দন করে যে, তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'আমি ঐ লোকটির মৃত দেহ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরে নামাতে দেখেছি।' এ বর্ণনাটি গারীব এবং মুনকারও বটে। এর সনদও দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই অনুগ্রহ ও দান এবং তাঁর বিশেষ করুণা, যার কারণে তাঁর বান্দা এত মর্যাদা লাভ করেছে, এটা সে তার কার্যবলে লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন।' অর্থাৎ হিদায়াত ও তাওফীক লাভের হকদার যে কে তাঁর খুব ভালরূপেই জানা আছে।

আন-নিসা 4:68

৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন- অধিকাংশ লোক এরূপ যে, তাদেরকে যদি ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করারও নির্দেশ দেয়া হতো যা তারা এ সময়ে করতে রয়েছে তবে তারা ঐ কাজগুলোও করতো না। কেননা, তাদের হীন প্রকৃতিকে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচরণের উপরই গঠন করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর ঐ জ্ঞানের সংবাদ দিচ্ছেন যা হয়নি। কিন্তু যদি হতো তবে কিরূপ হতো? হযরত আবু ইসহাক সাবীঈ (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন মনীষী বলেছিলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ নির্দেশ দিতেন তবে অবশ্যই আমরা তা পালন করতাম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে এটা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনেন তখন তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের অন্তরে ঈমান মজবুত পর্বত অপেক্ষাও বেশী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (মুসনাদ-ইইবনে আবি হাতিম)অন্য সনদে রয়েছে যে, কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) এ কথা বলেছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে গর্ব করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর স্বয়ং আমাদের হত্যা ফরয। করেছিলেন এবং আমরা তা পালন করেছিলাম। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) বলেনঃ যদি আমাদের উপর ওটা ফরয করা হতো তবে আমরাও তা পালন করতাম।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি এ নির্দেশ দেয়া হতো হবে তা পালনকারীদের মধ্যে একজন ইবনে উম্মে আবদও (রাঃ) হতো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পড়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করত বলেনঃ ‘এর উপর আমলকারীদের মধ্যে এও একজন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আমার আদেশ পালন করতো এবং আমার নিষিদ্ধ জিনিস ও কাজ হতে বিরত থাকতো তবে আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো। এটাই হতো তাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় আমি তাদেরকে জান্নাত দান করতাম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পথ প্রদর্শন করতাম।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানের ঘরে নিয়ে যাবেন এবং নবীদের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নবীদের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মুমিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভেতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর উঠতে পারেননি তখন তাঁর কণ্ঠস্বর বসে যায়। সে সময় আমি তাকে বলতে শুনি, ‘ওদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাকে অধিকার দেয়া হয়েছে'।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তাঁর নিম্নের শব্দগুলো এসেছে, হে আল্লাহ! আমি সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বন্ধুর সাথে মিলন যাজ্ঞা করছি। অতঃপর তিনি এ নশ্বর জগত হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন। এ কথা তিনি তিনবার পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেন। পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত তার উক্তির ভাবার্থ এটাই ।এ পবিত্র আয়াতের শানে নুযূলঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে তো সকাল সন্ধ্যায় আমরা আপনার ' খেদমতে এসে উঠা বসা করছি এবং আপনার মুখমণ্ডলও দর্শন করছি। কিন্তু কাল কিয়ামতের দিন তো আপনি নবীগণের সমাবেশে সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট থাকবেন। তখন তো আমরা আপনার নিকট পৌছাতে পারবো না! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না। সে সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতটি আনয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোক পাঠিয়ে উক্ত আনসারীকে সুসংবাদ প্রদান করেন। এ হাদীসটি মুরসাল সনদেও বর্ণিত আছে, যে সনদটি খুবই উত্তম।হযরত রাবী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন, এটা তো স্পষ্ট কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মর্যাদা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কারীদের বহু উর্ধে। সুতরাং জান্নাতে যখন এঁরা সব একত্রিত হবেন তখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কিরূপে দেখা সাক্ষাৎ হবে? তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিম্নমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিকট নেমে আসবে এবং তারা সব ফুল বাগানে একত্রিত হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করবে ও তার প্রশংসা করবে। তারা যা চাইবে তাই পাবে এবং তন্মধ্যে সদা তারা আমোদ-আহলাদ করতে থাকবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে আমার প্রাণ হতে, পরিবার পরিজন হতে এবং সন্তান অপেক্ষাও বেশী ভালবাসি। আমি বাড়ীতে থাকি বটে, কিন্তু আপনাকে স্মরণ করা মাত্র আপনার নিকট আগমন ছাড়া আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। অতঃপর এসে আপনাকে দর্শন করি। কিন্তু যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আপনি নবীদের সঙ্গে সুউচ্চ প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবেন, তখন আমার ভয় হয় যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ লাভ করলেও আপনাকে হয়তো দেখতে পাবো না। সে সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটির আরও ধারা রয়েছে।সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত রাবিআ’ ইবনে কা'ব আসলামী (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে অবস্থান করতাম এবং তাঁকে পানি ইত্যাদি এনে দিতাম। একদা তিনি আমাকে বলেনঃ “কিছু যাঞা কর'। আমি বলি, জান্নাতে আপনার বন্ধুত্ব যাজ্ঞা করছি। তিনি বলেনঃ “এটা ছাড়া অন্য কিছু?' আমি বলি, এটাও এটাই বটে। তখন তিনি বলেনঃ তা হলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তুমি তোমার জীবনের উপর আমাকে সাহায্য কর।'মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আমর ইবনে মুররাতুল জাহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি, স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করি এবং রমযানের রোযা রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অঙ্গুলি উঠিয়ে ইঙ্গিত করতঃ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এর উপরই মৃত্যুবরণ করবে সে কিয়ামতের দিন এভাবে নবীদের সঙ্গে, সত্য সাধকদের সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন পিতা-মাতার অবাধ্য না হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে সে কিয়ামতের দিন ইনশাআল্লাহ নবীদের, সত্য সাধকদের, শহীদদের এবং সৎ কর্মশীলদের সঙ্গে মিলিত হবে। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযতর আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বণিক- নবী, সিদ্দীক ও শহীদের সঙ্গে থাকবে।সহীহ ও মুসনাদ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল হতে ক্রম পরম্পরায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হন যে একটি গোত্রের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘মানুষ তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে সে ভালবাসতো।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, মুসলমানেরা এ হাদীস শুনে যত খুশী হয়েছিল এত খুশী অন্য কোন জিনিসে হয়নি। আল্লাহর শপথ! আমার ভালবাসা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযতর উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে রয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁদের সঙ্গেই উঠাবেন, যদিও আমার আমল তাঁদের মত নয়।'হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নতবাসীরা তাদের অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন জন্নাতবাসীদেরকে তাদের প্রাসাদ এরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোন উজ্জ্বল তারকা দেখে থাক। তাদের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকবে। তখন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এসব প্রাসাদ তো নবীদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। সুতরাং তথায় তো তারা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হ্যা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যেসব লোক আল্লাহ তা'আলা উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করেছে তারাও তথায় পৌছে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে কিছু প্রশ্ন করার জন্যে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘জিজ্ঞেস কর ও অনুধাবন কর।' সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে আকারে, রঙ্গে এবং নবুওয়াতে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি যার উপর ঈমান এনেছেন আমিও যদি তার উপর ঈমান আনি এবং যেসব নির্দেশ আপনি পালন করেন আমিও যদি তা পালন করি তবে কি আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যা। যে আল্লাহ তা'আলার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী এমন সাদা উজ্জ্বল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে যে, তার ঔজ্জ্বল্য এক হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতেও দৃষ্টিগোচর হবে। অতঃপর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট অঙ্গীকার রয়েছে এবং যে ব্যক্তি 'সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। তখন আর এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন এত পুণ্য লাভ হবে তখন আমরা ধ্বংস কিরূপে হতে পারি। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একজন লোক কিয়ামতের দিন এত পুণ্য নিয়ে হাযির হবে যে, যদি তা কোন পর্বতের উপর রাখা হয় তবে তার উপর ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নি'আমত দাড়িয়ে যাবে এবং ওরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে এ সমুদয় আমল খুবই অল্প রূপ পরিলক্ষিত হবে। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তাআলা যদি তাকে স্বীয় পূর্ণ করুণা দ্বারা ঢেকে দিয়ে জান্নাত দান করেন সেটা অন্য কথা। সে সময় (আরবী) (৭৬:১-২০) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে আমার চক্ষুও কি তা দেখতে পাবে’? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যাঁ'। একথা শুনে সে কেঁদে পড়ে এবং এত বেশী ক্রন্দন করে যে, তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'আমি ঐ লোকটির মৃত দেহ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরে নামাতে দেখেছি।' এ বর্ণনাটি গারীব এবং মুনকারও বটে। এর সনদও দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই অনুগ্রহ ও দান এবং তাঁর বিশেষ করুণা, যার কারণে তাঁর বান্দা এত মর্যাদা লাভ করেছে, এটা সে তার কার্যবলে লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন।' অর্থাৎ হিদায়াত ও তাওফীক লাভের হকদার যে কে তাঁর খুব ভালরূপেই জানা আছে।

আন-নিসা 4:69

৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন- অধিকাংশ লোক এরূপ যে, তাদেরকে যদি ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করারও নির্দেশ দেয়া হতো যা তারা এ সময়ে করতে রয়েছে তবে তারা ঐ কাজগুলোও করতো না। কেননা, তাদের হীন প্রকৃতিকে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচরণের উপরই গঠন করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর ঐ জ্ঞানের সংবাদ দিচ্ছেন যা হয়নি। কিন্তু যদি হতো তবে কিরূপ হতো? হযরত আবু ইসহাক সাবীঈ (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন মনীষী বলেছিলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ নির্দেশ দিতেন তবে অবশ্যই আমরা তা পালন করতাম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে এটা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনেন তখন তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের অন্তরে ঈমান মজবুত পর্বত অপেক্ষাও বেশী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (মুসনাদ-ইইবনে আবি হাতিম)অন্য সনদে রয়েছে যে, কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) এ কথা বলেছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে গর্ব করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর স্বয়ং আমাদের হত্যা ফরয। করেছিলেন এবং আমরা তা পালন করেছিলাম। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) বলেনঃ যদি আমাদের উপর ওটা ফরয করা হতো তবে আমরাও তা পালন করতাম।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি এ নির্দেশ দেয়া হতো হবে তা পালনকারীদের মধ্যে একজন ইবনে উম্মে আবদও (রাঃ) হতো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পড়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করত বলেনঃ ‘এর উপর আমলকারীদের মধ্যে এও একজন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আমার আদেশ পালন করতো এবং আমার নিষিদ্ধ জিনিস ও কাজ হতে বিরত থাকতো তবে আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো। এটাই হতো তাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় আমি তাদেরকে জান্নাত দান করতাম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পথ প্রদর্শন করতাম।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানের ঘরে নিয়ে যাবেন এবং নবীদের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নবীদের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মুমিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভেতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর উঠতে পারেননি তখন তাঁর কণ্ঠস্বর বসে যায়। সে সময় আমি তাকে বলতে শুনি, ‘ওদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাকে অধিকার দেয়া হয়েছে'।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তাঁর নিম্নের শব্দগুলো এসেছে, হে আল্লাহ! আমি সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বন্ধুর সাথে মিলন যাজ্ঞা করছি। অতঃপর তিনি এ নশ্বর জগত হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন। এ কথা তিনি তিনবার পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেন। পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত তার উক্তির ভাবার্থ এটাই ।এ পবিত্র আয়াতের শানে নুযূলঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে তো সকাল সন্ধ্যায় আমরা আপনার ' খেদমতে এসে উঠা বসা করছি এবং আপনার মুখমণ্ডলও দর্শন করছি। কিন্তু কাল কিয়ামতের দিন তো আপনি নবীগণের সমাবেশে সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট থাকবেন। তখন তো আমরা আপনার নিকট পৌছাতে পারবো না! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না। সে সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতটি আনয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোক পাঠিয়ে উক্ত আনসারীকে সুসংবাদ প্রদান করেন। এ হাদীসটি মুরসাল সনদেও বর্ণিত আছে, যে সনদটি খুবই উত্তম।হযরত রাবী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন, এটা তো স্পষ্ট কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মর্যাদা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কারীদের বহু উর্ধে। সুতরাং জান্নাতে যখন এঁরা সব একত্রিত হবেন তখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কিরূপে দেখা সাক্ষাৎ হবে? তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিম্নমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিকট নেমে আসবে এবং তারা সব ফুল বাগানে একত্রিত হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করবে ও তার প্রশংসা করবে। তারা যা চাইবে তাই পাবে এবং তন্মধ্যে সদা তারা আমোদ-আহলাদ করতে থাকবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে আমার প্রাণ হতে, পরিবার পরিজন হতে এবং সন্তান অপেক্ষাও বেশী ভালবাসি। আমি বাড়ীতে থাকি বটে, কিন্তু আপনাকে স্মরণ করা মাত্র আপনার নিকট আগমন ছাড়া আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। অতঃপর এসে আপনাকে দর্শন করি। কিন্তু যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আপনি নবীদের সঙ্গে সুউচ্চ প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবেন, তখন আমার ভয় হয় যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ লাভ করলেও আপনাকে হয়তো দেখতে পাবো না। সে সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটির আরও ধারা রয়েছে।সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত রাবিআ’ ইবনে কা'ব আসলামী (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে অবস্থান করতাম এবং তাঁকে পানি ইত্যাদি এনে দিতাম। একদা তিনি আমাকে বলেনঃ “কিছু যাঞা কর'। আমি বলি, জান্নাতে আপনার বন্ধুত্ব যাজ্ঞা করছি। তিনি বলেনঃ “এটা ছাড়া অন্য কিছু?' আমি বলি, এটাও এটাই বটে। তখন তিনি বলেনঃ তা হলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তুমি তোমার জীবনের উপর আমাকে সাহায্য কর।'মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আমর ইবনে মুররাতুল জাহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি, স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করি এবং রমযানের রোযা রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অঙ্গুলি উঠিয়ে ইঙ্গিত করতঃ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এর উপরই মৃত্যুবরণ করবে সে কিয়ামতের দিন এভাবে নবীদের সঙ্গে, সত্য সাধকদের সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন পিতা-মাতার অবাধ্য না হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে সে কিয়ামতের দিন ইনশাআল্লাহ নবীদের, সত্য সাধকদের, শহীদদের এবং সৎ কর্মশীলদের সঙ্গে মিলিত হবে। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযতর আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বণিক- নবী, সিদ্দীক ও শহীদের সঙ্গে থাকবে।সহীহ ও মুসনাদ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল হতে ক্রম পরম্পরায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হন যে একটি গোত্রের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘মানুষ তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে সে ভালবাসতো।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, মুসলমানেরা এ হাদীস শুনে যত খুশী হয়েছিল এত খুশী অন্য কোন জিনিসে হয়নি। আল্লাহর শপথ! আমার ভালবাসা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযতর উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে রয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁদের সঙ্গেই উঠাবেন, যদিও আমার আমল তাঁদের মত নয়।'হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নতবাসীরা তাদের অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন জন্নাতবাসীদেরকে তাদের প্রাসাদ এরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোন উজ্জ্বল তারকা দেখে থাক। তাদের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকবে। তখন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এসব প্রাসাদ তো নবীদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। সুতরাং তথায় তো তারা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হ্যা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যেসব লোক আল্লাহ তা'আলা উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করেছে তারাও তথায় পৌছে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে কিছু প্রশ্ন করার জন্যে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘জিজ্ঞেস কর ও অনুধাবন কর।' সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে আকারে, রঙ্গে এবং নবুওয়াতে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি যার উপর ঈমান এনেছেন আমিও যদি তার উপর ঈমান আনি এবং যেসব নির্দেশ আপনি পালন করেন আমিও যদি তা পালন করি তবে কি আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যা। যে আল্লাহ তা'আলার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী এমন সাদা উজ্জ্বল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে যে, তার ঔজ্জ্বল্য এক হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতেও দৃষ্টিগোচর হবে। অতঃপর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট অঙ্গীকার রয়েছে এবং যে ব্যক্তি 'সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। তখন আর এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন এত পুণ্য লাভ হবে তখন আমরা ধ্বংস কিরূপে হতে পারি। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একজন লোক কিয়ামতের দিন এত পুণ্য নিয়ে হাযির হবে যে, যদি তা কোন পর্বতের উপর রাখা হয় তবে তার উপর ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নি'আমত দাড়িয়ে যাবে এবং ওরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে এ সমুদয় আমল খুবই অল্প রূপ পরিলক্ষিত হবে। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তাআলা যদি তাকে স্বীয় পূর্ণ করুণা দ্বারা ঢেকে দিয়ে জান্নাত দান করেন সেটা অন্য কথা। সে সময় (আরবী) (৭৬:১-২০) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে আমার চক্ষুও কি তা দেখতে পাবে’? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যাঁ'। একথা শুনে সে কেঁদে পড়ে এবং এত বেশী ক্রন্দন করে যে, তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'আমি ঐ লোকটির মৃত দেহ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরে নামাতে দেখেছি।' এ বর্ণনাটি গারীব এবং মুনকারও বটে। এর সনদও দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই অনুগ্রহ ও দান এবং তাঁর বিশেষ করুণা, যার কারণে তাঁর বান্দা এত মর্যাদা লাভ করেছে, এটা সে তার কার্যবলে লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন।' অর্থাৎ হিদায়াত ও তাওফীক লাভের হকদার যে কে তাঁর খুব ভালরূপেই জানা আছে।

আন-নিসা 4:70

৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন- অধিকাংশ লোক এরূপ যে, তাদেরকে যদি ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করারও নির্দেশ দেয়া হতো যা তারা এ সময়ে করতে রয়েছে তবে তারা ঐ কাজগুলোও করতো না। কেননা, তাদের হীন প্রকৃতিকে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচরণের উপরই গঠন করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর ঐ জ্ঞানের সংবাদ দিচ্ছেন যা হয়নি। কিন্তু যদি হতো তবে কিরূপ হতো? হযরত আবু ইসহাক সাবীঈ (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন মনীষী বলেছিলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ নির্দেশ দিতেন তবে অবশ্যই আমরা তা পালন করতাম। কিন্তু তিনি আমাদেরকে এটা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন বলে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।' যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা শুনেন তখন তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের অন্তরে ঈমান মজবুত পর্বত অপেক্ষাও বেশী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (মুসনাদ-ইইবনে আবি হাতিম)অন্য সনদে রয়েছে যে, কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) এ কথা বলেছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে গর্ব করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর স্বয়ং আমাদের হত্যা ফরয। করেছিলেন এবং আমরা তা পালন করেছিলাম। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) বলেনঃ যদি আমাদের উপর ওটা ফরয করা হতো তবে আমরাও তা পালন করতাম।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যদি এ নির্দেশ দেয়া হতো হবে তা পালনকারীদের মধ্যে একজন ইবনে উম্মে আবদও (রাঃ) হতো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পড়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করত বলেনঃ ‘এর উপর আমলকারীদের মধ্যে এও একজন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আমার আদেশ পালন করতো এবং আমার নিষিদ্ধ জিনিস ও কাজ হতে বিরত থাকতো তবে আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো। এটাই হতো তাদের জন্য কল্যাণকর ও অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় আমি তাদেরকে জান্নাত দান করতাম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পথ প্রদর্শন করতাম।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানের ঘরে নিয়ে যাবেন এবং নবীদের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নবীদের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মুমিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভেতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর উঠতে পারেননি তখন তাঁর কণ্ঠস্বর বসে যায়। সে সময় আমি তাকে বলতে শুনি, ‘ওদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাকে অধিকার দেয়া হয়েছে'।অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তাঁর নিম্নের শব্দগুলো এসেছে, হে আল্লাহ! আমি সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বন্ধুর সাথে মিলন যাজ্ঞা করছি। অতঃপর তিনি এ নশ্বর জগত হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন। এ কথা তিনি তিনবার পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেন। পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত তার উক্তির ভাবার্থ এটাই ।এ পবিত্র আয়াতের শানে নুযূলঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে তো সকাল সন্ধ্যায় আমরা আপনার ' খেদমতে এসে উঠা বসা করছি এবং আপনার মুখমণ্ডলও দর্শন করছি। কিন্তু কাল কিয়ামতের দিন তো আপনি নবীগণের সমাবেশে সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট থাকবেন। তখন তো আমরা আপনার নিকট পৌছাতে পারবো না! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না। সে সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতটি আনয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোক পাঠিয়ে উক্ত আনসারীকে সুসংবাদ প্রদান করেন। এ হাদীসটি মুরসাল সনদেও বর্ণিত আছে, যে সনদটি খুবই উত্তম।হযরত রাবী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন, এটা তো স্পষ্ট কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মর্যাদা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কারীদের বহু উর্ধে। সুতরাং জান্নাতে যখন এঁরা সব একত্রিত হবেন তখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কিরূপে দেখা সাক্ষাৎ হবে? তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিম্নমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিকট নেমে আসবে এবং তারা সব ফুল বাগানে একত্রিত হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করবে ও তার প্রশংসা করবে। তারা যা চাইবে তাই পাবে এবং তন্মধ্যে সদা তারা আমোদ-আহলাদ করতে থাকবে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে আমার প্রাণ হতে, পরিবার পরিজন হতে এবং সন্তান অপেক্ষাও বেশী ভালবাসি। আমি বাড়ীতে থাকি বটে, কিন্তু আপনাকে স্মরণ করা মাত্র আপনার নিকট আগমন ছাড়া আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। অতঃপর এসে আপনাকে দর্শন করি। কিন্তু যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আপনি নবীদের সঙ্গে সুউচ্চ প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবেন, তখন আমার ভয় হয় যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ লাভ করলেও আপনাকে হয়তো দেখতে পাবো না। সে সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটির আরও ধারা রয়েছে।সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত রাবিআ’ ইবনে কা'ব আসলামী (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে অবস্থান করতাম এবং তাঁকে পানি ইত্যাদি এনে দিতাম। একদা তিনি আমাকে বলেনঃ “কিছু যাঞা কর'। আমি বলি, জান্নাতে আপনার বন্ধুত্ব যাজ্ঞা করছি। তিনি বলেনঃ “এটা ছাড়া অন্য কিছু?' আমি বলি, এটাও এটাই বটে। তখন তিনি বলেনঃ তা হলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তুমি তোমার জীবনের উপর আমাকে সাহায্য কর।'মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আমর ইবনে মুররাতুল জাহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি, স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করি এবং রমযানের রোযা রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অঙ্গুলি উঠিয়ে ইঙ্গিত করতঃ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এর উপরই মৃত্যুবরণ করবে সে কিয়ামতের দিন এভাবে নবীদের সঙ্গে, সত্য সাধকদের সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন পিতা-মাতার অবাধ্য না হয়।মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে সে কিয়ামতের দিন ইনশাআল্লাহ নবীদের, সত্য সাধকদের, শহীদদের এবং সৎ কর্মশীলদের সঙ্গে মিলিত হবে। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযতর আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বণিক- নবী, সিদ্দীক ও শহীদের সঙ্গে থাকবে।সহীহ ও মুসনাদ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল হতে ক্রম পরম্পরায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হন যে একটি গোত্রের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘মানুষ তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে সে ভালবাসতো।'হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, মুসলমানেরা এ হাদীস শুনে যত খুশী হয়েছিল এত খুশী অন্য কোন জিনিসে হয়নি। আল্লাহর শপথ! আমার ভালবাসা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযতর উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে রয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁদের সঙ্গেই উঠাবেন, যদিও আমার আমল তাঁদের মত নয়।'হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নতবাসীরা তাদের অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন জন্নাতবাসীদেরকে তাদের প্রাসাদ এরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোন উজ্জ্বল তারকা দেখে থাক। তাদের মধ্যে বহু দূরের ব্যবধান থাকবে। তখন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এসব প্রাসাদ তো নবীদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। সুতরাং তথায় তো তারা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হ্যা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যেসব লোক আল্লাহ তা'আলা উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করেছে তারাও তথায় পৌছে যাবে।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে কিছু প্রশ্ন করার জন্যে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘জিজ্ঞেস কর ও অনুধাবন কর।' সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে আকারে, রঙ্গে এবং নবুওয়াতে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি যার উপর ঈমান এনেছেন আমিও যদি তার উপর ঈমান আনি এবং যেসব নির্দেশ আপনি পালন করেন আমিও যদি তা পালন করি তবে কি আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করবো?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হ্যা। যে আল্লাহ তা'আলার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী এমন সাদা উজ্জ্বল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে যে, তার ঔজ্জ্বল্য এক হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতেও দৃষ্টিগোচর হবে। অতঃপর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট অঙ্গীকার রয়েছে এবং যে ব্যক্তি 'সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। তখন আর এক ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যখন এত পুণ্য লাভ হবে তখন আমরা ধ্বংস কিরূপে হতে পারি। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একজন লোক কিয়ামতের দিন এত পুণ্য নিয়ে হাযির হবে যে, যদি তা কোন পর্বতের উপর রাখা হয় তবে তার উপর ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নি'আমত দাড়িয়ে যাবে এবং ওরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে এ সমুদয় আমল খুবই অল্প রূপ পরিলক্ষিত হবে। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তাআলা যদি তাকে স্বীয় পূর্ণ করুণা দ্বারা ঢেকে দিয়ে জান্নাত দান করেন সেটা অন্য কথা। সে সময় (আরবী) (৭৬:১-২০) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে আমার চক্ষুও কি তা দেখতে পাবে’? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যাঁ'। একথা শুনে সে কেঁদে পড়ে এবং এত বেশী ক্রন্দন করে যে, তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'আমি ঐ লোকটির মৃত দেহ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরে নামাতে দেখেছি।' এ বর্ণনাটি গারীব এবং মুনকারও বটে। এর সনদও দুর্বল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতেই অনুগ্রহ ও দান এবং তাঁর বিশেষ করুণা, যার কারণে তাঁর বান্দা এত মর্যাদা লাভ করেছে, এটা সে তার কার্যবলে লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা খুব ভাল জানেন।' অর্থাৎ হিদায়াত ও তাওফীক লাভের হকদার যে কে তাঁর খুব ভালরূপেই জানা আছে।

আন-নিসা 4:71

৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সর্বদা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সদা যেন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে যাতে শত্রুরা অতি সহজে তাদের উপর জয়যুক্ত না হয়। তারা সব সময় যেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখে, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং শক্তি দৃঢ় করে। নির্দেশ মাত্রই যেন তারা বীর বেশে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট সৈন্যদলে বিভক্ত হয়েই হোক বা সবাই সম্মিলিত হয়েই হোক সুযোগমত তারা যেন যুদ্ধের অহ্বান মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে। (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহু বচন। আবার কখনও (আরবী)-এর বহু বছন (আরবী) ও আসে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বহির্গত হও। আর (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে বেড়িয়ে পড়।' মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), যহহাক (রঃ), আতা' আল খুরাসানী (রঃ), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং খাসীফ আল জাযারীও (রঃ) এ কথাই বলেন। মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষী বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুনাফিকদের স্বভাব এই যে, নিজেও তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং অপরকেও যুদ্ধে না যেতে উৎসাহিত করে। যেমন মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাকূলের কার্যকলাপ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে। অপমানিত করুন।তাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তাআলার কোন হিকমতের কারণে যদি মুসলমানরা তাদের শত্রুদের উপর বিজয় লাভে অসমর্থ হয় বরং শত্রুরাই তাদের উপর চেপে বসে এবং মুসলমানদের ক্ষতি হয় ও তাদের লোক শাহাদাত বরণ করে তখন ঐ মুনাফিকরা বাড়িতে বসে ফুলতে থাকে এবং স্বীয় বুদ্ধির উপর গৌরব বোধ করে। তারা তখন তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আল্লাহ তা'আলার দান বলে গণ্য করে। কিন্তু ঐ নির্বোধেরা বুঝে না যে, ঐ মুজাহিদেরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছে তা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রয়েছে। যদি তারাও জিহাদে অংশ নিত তবে মুসলমানদের মত তারাও গাযী হওয়ার মর্যাদা এবং ধৈর্য ধারণের পুণ্য লাভ করতে অথবা শহীদ হওয়ার গৌরব লাভ করতো। পক্ষান্তরে যদি মুসলমান মুজাহিদগণ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শত্রুদের উপর জয়ী হয় এবং শত্রুরা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় আর এর ফলে মুসলমানেরা যুদ্ধলব্ধ মাল নিয়ে ও দাস-দাসী নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে, তবে ঐ মুনাফিকরা চরম দুঃখিত হয় এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এত হা-হুতাশ করে ও এমন এমন কথা মুখ দিয়ে বের করে যে, যেন মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না। তাদের ধর্মই যেন অন্য। তারা তখন বলে, হায়! আমরাও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম তবে আমরাও গনীমতের মাল পেতাম এবং তাদের মত আমরাও দাস-দাসী ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে যেতাম।মোটকথা, দুনিয়া লাভই তাদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য। সুতরাং যারা ইহকালের বিনিময়ে পরকালকে বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ ঘোষণা করা উচিত। তারা কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে দুনিয়ার সামান্য লাভের বিনিময়ে আখিরাতকে ধ্বংস করেছে। তাই মুনাফিকদের বলা হচ্ছে- হে মুনাফিকের দল! তোমরা জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহ তাআলার পথের মুজাহিদ তারা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। তাদের উভয় হস্তে লাড়ু রয়েছে। নিহত হলেও তাদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসলেও রয়েছে গনীমতের মালের বিরাট অংশ।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “আল্লাহর পথের মুজাহিদের যামিন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। হয় তিনি তাকে মৃত্যু দান করে জান্নাতে পৌছিয়ে দেবেন, আর না হয় যেখান হতে সে বের হয়েছে সেখানেই যুদ্ধলব্ধ মালসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।

আন-নিসা 4:72

৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সর্বদা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সদা যেন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে যাতে শত্রুরা অতি সহজে তাদের উপর জয়যুক্ত না হয়। তারা সব সময় যেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখে, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং শক্তি দৃঢ় করে। নির্দেশ মাত্রই যেন তারা বীর বেশে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট সৈন্যদলে বিভক্ত হয়েই হোক বা সবাই সম্মিলিত হয়েই হোক সুযোগমত তারা যেন যুদ্ধের অহ্বান মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে। (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহু বচন। আবার কখনও (আরবী)-এর বহু বছন (আরবী) ও আসে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বহির্গত হও। আর (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে বেড়িয়ে পড়।' মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), যহহাক (রঃ), আতা' আল খুরাসানী (রঃ), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং খাসীফ আল জাযারীও (রঃ) এ কথাই বলেন। মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষী বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুনাফিকদের স্বভাব এই যে, নিজেও তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং অপরকেও যুদ্ধে না যেতে উৎসাহিত করে। যেমন মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাকূলের কার্যকলাপ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে। অপমানিত করুন।তাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তাআলার কোন হিকমতের কারণে যদি মুসলমানরা তাদের শত্রুদের উপর বিজয় লাভে অসমর্থ হয় বরং শত্রুরাই তাদের উপর চেপে বসে এবং মুসলমানদের ক্ষতি হয় ও তাদের লোক শাহাদাত বরণ করে তখন ঐ মুনাফিকরা বাড়িতে বসে ফুলতে থাকে এবং স্বীয় বুদ্ধির উপর গৌরব বোধ করে। তারা তখন তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আল্লাহ তা'আলার দান বলে গণ্য করে। কিন্তু ঐ নির্বোধেরা বুঝে না যে, ঐ মুজাহিদেরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছে তা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রয়েছে। যদি তারাও জিহাদে অংশ নিত তবে মুসলমানদের মত তারাও গাযী হওয়ার মর্যাদা এবং ধৈর্য ধারণের পুণ্য লাভ করতে অথবা শহীদ হওয়ার গৌরব লাভ করতো। পক্ষান্তরে যদি মুসলমান মুজাহিদগণ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শত্রুদের উপর জয়ী হয় এবং শত্রুরা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় আর এর ফলে মুসলমানেরা যুদ্ধলব্ধ মাল নিয়ে ও দাস-দাসী নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে, তবে ঐ মুনাফিকরা চরম দুঃখিত হয় এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এত হা-হুতাশ করে ও এমন এমন কথা মুখ দিয়ে বের করে যে, যেন মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না। তাদের ধর্মই যেন অন্য। তারা তখন বলে, হায়! আমরাও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম তবে আমরাও গনীমতের মাল পেতাম এবং তাদের মত আমরাও দাস-দাসী ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে যেতাম।মোটকথা, দুনিয়া লাভই তাদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য। সুতরাং যারা ইহকালের বিনিময়ে পরকালকে বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ ঘোষণা করা উচিত। তারা কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে দুনিয়ার সামান্য লাভের বিনিময়ে আখিরাতকে ধ্বংস করেছে। তাই মুনাফিকদের বলা হচ্ছে- হে মুনাফিকের দল! তোমরা জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহ তাআলার পথের মুজাহিদ তারা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। তাদের উভয় হস্তে লাড়ু রয়েছে। নিহত হলেও তাদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসলেও রয়েছে গনীমতের মালের বিরাট অংশ।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “আল্লাহর পথের মুজাহিদের যামিন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। হয় তিনি তাকে মৃত্যু দান করে জান্নাতে পৌছিয়ে দেবেন, আর না হয় যেখান হতে সে বের হয়েছে সেখানেই যুদ্ধলব্ধ মালসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।

আন-নিসা 4:73

৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সর্বদা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সদা যেন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে যাতে শত্রুরা অতি সহজে তাদের উপর জয়যুক্ত না হয়। তারা সব সময় যেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখে, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং শক্তি দৃঢ় করে। নির্দেশ মাত্রই যেন তারা বীর বেশে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট সৈন্যদলে বিভক্ত হয়েই হোক বা সবাই সম্মিলিত হয়েই হোক সুযোগমত তারা যেন যুদ্ধের অহ্বান মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে। (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহু বচন। আবার কখনও (আরবী)-এর বহু বছন (আরবী) ও আসে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বহির্গত হও। আর (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে বেড়িয়ে পড়।' মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), যহহাক (রঃ), আতা' আল খুরাসানী (রঃ), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং খাসীফ আল জাযারীও (রঃ) এ কথাই বলেন। মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষী বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুনাফিকদের স্বভাব এই যে, নিজেও তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং অপরকেও যুদ্ধে না যেতে উৎসাহিত করে। যেমন মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাকূলের কার্যকলাপ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে। অপমানিত করুন।তাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তাআলার কোন হিকমতের কারণে যদি মুসলমানরা তাদের শত্রুদের উপর বিজয় লাভে অসমর্থ হয় বরং শত্রুরাই তাদের উপর চেপে বসে এবং মুসলমানদের ক্ষতি হয় ও তাদের লোক শাহাদাত বরণ করে তখন ঐ মুনাফিকরা বাড়িতে বসে ফুলতে থাকে এবং স্বীয় বুদ্ধির উপর গৌরব বোধ করে। তারা তখন তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আল্লাহ তা'আলার দান বলে গণ্য করে। কিন্তু ঐ নির্বোধেরা বুঝে না যে, ঐ মুজাহিদেরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছে তা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রয়েছে। যদি তারাও জিহাদে অংশ নিত তবে মুসলমানদের মত তারাও গাযী হওয়ার মর্যাদা এবং ধৈর্য ধারণের পুণ্য লাভ করতে অথবা শহীদ হওয়ার গৌরব লাভ করতো। পক্ষান্তরে যদি মুসলমান মুজাহিদগণ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শত্রুদের উপর জয়ী হয় এবং শত্রুরা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় আর এর ফলে মুসলমানেরা যুদ্ধলব্ধ মাল নিয়ে ও দাস-দাসী নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে, তবে ঐ মুনাফিকরা চরম দুঃখিত হয় এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এত হা-হুতাশ করে ও এমন এমন কথা মুখ দিয়ে বের করে যে, যেন মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না। তাদের ধর্মই যেন অন্য। তারা তখন বলে, হায়! আমরাও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম তবে আমরাও গনীমতের মাল পেতাম এবং তাদের মত আমরাও দাস-দাসী ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে যেতাম।মোটকথা, দুনিয়া লাভই তাদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য। সুতরাং যারা ইহকালের বিনিময়ে পরকালকে বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ ঘোষণা করা উচিত। তারা কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে দুনিয়ার সামান্য লাভের বিনিময়ে আখিরাতকে ধ্বংস করেছে। তাই মুনাফিকদের বলা হচ্ছে- হে মুনাফিকের দল! তোমরা জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহ তাআলার পথের মুজাহিদ তারা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। তাদের উভয় হস্তে লাড়ু রয়েছে। নিহত হলেও তাদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসলেও রয়েছে গনীমতের মালের বিরাট অংশ।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “আল্লাহর পথের মুজাহিদের যামিন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। হয় তিনি তাকে মৃত্যু দান করে জান্নাতে পৌছিয়ে দেবেন, আর না হয় যেখান হতে সে বের হয়েছে সেখানেই যুদ্ধলব্ধ মালসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।

আন-নিসা 4:74

৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সর্বদা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সদা যেন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে যাতে শত্রুরা অতি সহজে তাদের উপর জয়যুক্ত না হয়। তারা সব সময় যেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখে, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং শক্তি দৃঢ় করে। নির্দেশ মাত্রই যেন তারা বীর বেশে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট সৈন্যদলে বিভক্ত হয়েই হোক বা সবাই সম্মিলিত হয়েই হোক সুযোগমত তারা যেন যুদ্ধের অহ্বান মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে। (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহু বচন। আবার কখনও (আরবী)-এর বহু বছন (আরবী) ও আসে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বহির্গত হও। আর (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে বেড়িয়ে পড়।' মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), যহহাক (রঃ), আতা' আল খুরাসানী (রঃ), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং খাসীফ আল জাযারীও (রঃ) এ কথাই বলেন। মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষী বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুনাফিকদের স্বভাব এই যে, নিজেও তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং অপরকেও যুদ্ধে না যেতে উৎসাহিত করে। যেমন মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাকূলের কার্যকলাপ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে। অপমানিত করুন।তাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তাআলার কোন হিকমতের কারণে যদি মুসলমানরা তাদের শত্রুদের উপর বিজয় লাভে অসমর্থ হয় বরং শত্রুরাই তাদের উপর চেপে বসে এবং মুসলমানদের ক্ষতি হয় ও তাদের লোক শাহাদাত বরণ করে তখন ঐ মুনাফিকরা বাড়িতে বসে ফুলতে থাকে এবং স্বীয় বুদ্ধির উপর গৌরব বোধ করে। তারা তখন তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আল্লাহ তা'আলার দান বলে গণ্য করে। কিন্তু ঐ নির্বোধেরা বুঝে না যে, ঐ মুজাহিদেরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছে তা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রয়েছে। যদি তারাও জিহাদে অংশ নিত তবে মুসলমানদের মত তারাও গাযী হওয়ার মর্যাদা এবং ধৈর্য ধারণের পুণ্য লাভ করতে অথবা শহীদ হওয়ার গৌরব লাভ করতো। পক্ষান্তরে যদি মুসলমান মুজাহিদগণ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শত্রুদের উপর জয়ী হয় এবং শত্রুরা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় আর এর ফলে মুসলমানেরা যুদ্ধলব্ধ মাল নিয়ে ও দাস-দাসী নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে, তবে ঐ মুনাফিকরা চরম দুঃখিত হয় এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এত হা-হুতাশ করে ও এমন এমন কথা মুখ দিয়ে বের করে যে, যেন মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না। তাদের ধর্মই যেন অন্য। তারা তখন বলে, হায়! আমরাও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম তবে আমরাও গনীমতের মাল পেতাম এবং তাদের মত আমরাও দাস-দাসী ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে যেতাম।মোটকথা, দুনিয়া লাভই তাদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য। সুতরাং যারা ইহকালের বিনিময়ে পরকালকে বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ ঘোষণা করা উচিত। তারা কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে দুনিয়ার সামান্য লাভের বিনিময়ে আখিরাতকে ধ্বংস করেছে। তাই মুনাফিকদের বলা হচ্ছে- হে মুনাফিকের দল! তোমরা জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহ তাআলার পথের মুজাহিদ তারা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। তাদের উভয় হস্তে লাড়ু রয়েছে। নিহত হলেও তাদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসলেও রয়েছে গনীমতের মালের বিরাট অংশ।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “আল্লাহর পথের মুজাহিদের যামিন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। হয় তিনি তাকে মৃত্যু দান করে জান্নাতে পৌছিয়ে দেবেন, আর না হয় যেখান হতে সে বের হয়েছে সেখানেই যুদ্ধলব্ধ মালসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।

আন-নিসা 4:75

৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে তাঁর পথে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন- ‘গুটি কয়েক দুর্বল ও অসহায় লোক মক্কায় রয়েগেছে। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। মক্কায় অবস্থান তাদের জন্যে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তাদের উপর কাফিরেরা নানা প্রকার উৎপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে মুক্ত করে আন। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছে- “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি এ অত্যাচারীদের গ্রাম হতে অর্থাৎ মক্কা হতে বহির্গত করুন। মক্কাকে নিম্নের আয়াতেও গ্রাম বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘বহু গ্রাম তোমার ঐ গ্রাম অপেক্ষা বেশী শক্তিশালী ছিল যে গ্রাম অর্থাৎ গ্রামবাসী তোমাকে বের করে দিয়েছে।'(৪৭:১৩) ঐ দুর্বল লোকেরা মক্কার কাফিরদের অত্যাচারের অভিযোগ পেশ করছে এবং সাথে সাথে স্বীয় প্রার্থনায় বলছে- “হে আমাদের প্রভু! আপনার পক্ষ হতে আপনি আমাদের জন্যে পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী নির্বাচন করুন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি এবং আমার আম্মাও ঐ দুর্বলদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী)-এ অংশটুকু পাঠ করে বলেন, 'আমি ও আমার আম্মা ঐ লোকদের অন্তর্গত ছিলাম যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দুর্বল ও অসহায় করে রেখেছিলেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালন ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে থাকে। পক্ষান্তরে কাফিরেরা শয়তানের আনুগত্যের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে। সুতরাং মুসলমানদের উচিত যে, তারা যেন আল্লাহ তা'আলার শত্রু ও শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধ করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, শয়তানের কলাকৌশল সম্পূর্ণরূপে বৃথায় পর্যবসিত হবে।

আন-নিসা 4:76

৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে তাঁর পথে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন- ‘গুটি কয়েক দুর্বল ও অসহায় লোক মক্কায় রয়েগেছে। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। মক্কায় অবস্থান তাদের জন্যে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তাদের উপর কাফিরেরা নানা প্রকার উৎপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে মুক্ত করে আন। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছে- “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি এ অত্যাচারীদের গ্রাম হতে অর্থাৎ মক্কা হতে বহির্গত করুন। মক্কাকে নিম্নের আয়াতেও গ্রাম বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘বহু গ্রাম তোমার ঐ গ্রাম অপেক্ষা বেশী শক্তিশালী ছিল যে গ্রাম অর্থাৎ গ্রামবাসী তোমাকে বের করে দিয়েছে।'(৪৭:১৩) ঐ দুর্বল লোকেরা মক্কার কাফিরদের অত্যাচারের অভিযোগ পেশ করছে এবং সাথে সাথে স্বীয় প্রার্থনায় বলছে- “হে আমাদের প্রভু! আপনার পক্ষ হতে আপনি আমাদের জন্যে পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী নির্বাচন করুন। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি এবং আমার আম্মাও ঐ দুর্বলদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী)-এ অংশটুকু পাঠ করে বলেন, 'আমি ও আমার আম্মা ঐ লোকদের অন্তর্গত ছিলাম যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দুর্বল ও অসহায় করে রেখেছিলেন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালন ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে থাকে। পক্ষান্তরে কাফিরেরা শয়তানের আনুগত্যের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে। সুতরাং মুসলমানদের উচিত যে, তারা যেন আল্লাহ তা'আলার শত্রু ও শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধ করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, শয়তানের কলাকৌশল সম্পূর্ণরূপে বৃথায় পর্যবসিত হবে।

আন-নিসা 4:77

৭৭-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা মক্কায় অবস্থান করছিল তখন তারা ছিল দুর্বল। তারা মর্যাদাসম্পন্ন শহরে বাস করছিল। তথায় কাফিরদেরই প্রাধান্য বজায় ছিল। মুসলমানরা তাদেরই শহরে ছিল।কাফিরেরা সংখ্যায় খুব বেশী ছিল এবং যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্রও ছিল তাদের অধিক। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেননি। বরং তাদেরকে কাফিরদের অত্যাচার সহ্য করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে আরও আদেশ করেছিলেন যে, তিনি যেসব হুকুম আহকাম অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোর উপর যেন তারা আমল করে। যেমন তারা যেন নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে। সাধারণতঃ যদিও তখন তাদের মালের আধিক্য ছিল না তথাপি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে এটাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন যে, তারা যেন এখানে কাফিরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করে বরং সবর ও ধৈর্যের দ্বারাই যেন কাজ নেয়। আর ওদিকে কাফিররা ভীষণ বীরত্বের সাথে মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের পাহাড় চাপিয়ে দেয়। তারা ছোট-বড় প্রত্যেককেই কঠিন হতে কঠিনতম শাস্তি দিতে থাকে। কাজেই মুসলমানগণ অত্যন্ত সংকীর্ণতার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছিল। মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে যেতো এবং তারা কামনা করতো যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ দিতেন। অবশেষে যখন তাদেরকে মদীনায় হিজরত করার অনুমিত দেয়া হয় তখন মুসলমানরা স্বীয় মাতৃভূমি, আত্মীয়-স্বজন সবকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে মদীনায় হিজরত করে। তথায় আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুবিধা ও নিরাপত্তা দান করেন। সাহায্যকারী হিসেবে তারা মদীনার আনসারদেরকে পেয়ে যায় এবং তাদের সংখ্যাও বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া তারা যথেষ্ট শক্তিও অর্জন করে।তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করে। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই কতক লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জিহাদের কথা চিন্তা করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত এবং স্ত্রীদের বিধবা হওয়া ও শিশুদের পিতৃহীন হওয়ার দৃশ্য তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভয় পেয়ে তারা বলে উঠে- “হে আমাদের প্রভু! এখনই কেন আমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করলেন? আমাদেরকে আরও কিছুদিন অবসর দিতেন!' এ বিষয়কেই অন্য আয়াতে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবী) (৪৭:২০) এর সংক্ষিপ্ত ভাবৰ্থ এই যে, মুমিনগণ বলে-(যুদ্ধের) কোন সূরা অবতীর্ণ হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় এবং তাতে জিহাদের বর্ণনা দেয়া হয় তখন রুগ্ন অন্তরবিশিষ্ট লোকেরা চীৎকার করে উঠে এবং ভ্রুকুঞ্চিত করে তোমার দিকে তাকায় এবং ঐ ব্যক্তির মত চক্ষু বন্ধ করে নেয় যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে অচৈতন্য হয়ে থাকে। তাদের জন্যে আফসোস!মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মক্কায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! কুফরীর অবস্থায় আমরা সম্মানিত ছিলাম, আর আজ ইসলামের অবস্থায় আমাদের লাঞ্ছিত মনে করা হচ্ছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমার উপর আল্লাহ পাকের এ নির্দেশই রয়েছে যে, আমি যেন ক্ষমা করে দেই। সাবধান কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো না।'অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর এখানে যখন জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন লোকেরা বিরত থাকে। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)ও এটা বর্ণনা করেছেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিল। তখন তারা আকাঙক্ষা করে যে, জিহাদও যদি ফরয করা হতো!অতঃপর যখন জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয় তখন দুর্বল ঈমানের লোকেরা মানুষকে ঐরূপ ভয় করতে লাগে যেমন আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা উচিত; বরং তার চেয়েও বেশী ভয় করতে থাকে এবং বলে-“হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের উপর জিহাদ কেন ফরয করলেন? স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে দুনিয়ায় সুখ ভোগ করতে দিলেন না কেন?' তখন তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, দুনিয়ার সুখ ভোগ খুবই অস্থায়ী এবং জান্নাতের তুলনায় খুবই নগণ্যও বটে। আর আখিরাত আল্লাহ ভীরুদের জন্য দুনিয়া হতে বহুগুণ উত্তম ও পবিত্র।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে উত্তরে বলা হয়-“আল্লাহভীরুদের পরিণাম সূচনা হতে বহুগুণে উত্তম। তোমাদেরকে তোমাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। তোমাদের একটি সৎ আমলও বিনষ্ট হবে না। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কারও উপর এক চুল পরিমাণ ও অত্যাচার হওয়া অসম্ভব। এ বাক্যে দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ উৎপাদন করে পরকালের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে জিহাদের উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত হাসান বসরী (রঃ)। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর সদয় হোন যে দুনিয়ায় এভাবেই থাকে। দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এ রকমই অবস্থা যেমন একজন নিদ্রিত ব্যক্তি স্বপ্নে নিজের কোন পছন্দনীয় জিনিস দেখতে পায় কিন্তু চক্ষু খোলা মাত্রই জানতে পারে যে, মূলে কিছুই ছিল না। হযরত আবু মুসহির (রঃ)-এর নিম্নের কবিতাংশটি কতই না সুন্দরঃ (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়ায় ঐ ব্যক্তির জন্য কোনই মঙ্গল নেই, যার জন্যে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কোনই অংশ নেই, যদিও দুনিয়া কতক লোককে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে, কিন্তু এটা খুব অল্পই সুখ এবং এর ধ্বংস খুব নিকটবর্তী।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর।' কোন মধ্যস্থতা কাউকেও এটা হতে বাঁচাতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এর উপর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল।'(৫৫:২৬) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) আর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী'। (৩:১৮৫) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষের জন্য চিরস্থায়ী জীবন নির্ধারণ করিনি।'(২১:৩৪) এগুলো বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ জিহাদ করুক আর নাই করুক একমাত্র আল্লাহ পাকের সত্তা ছাড়া সকলকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। প্রত্যেকের জন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং প্রত্যেকের মুত্যুর স্থানও নির্দিষ্ট রয়েছে।হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) স্বীয় মরণ শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেনঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি বহু বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতঃ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছি। তোমরা এসে দেখ যে, আমার শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যেখানে বলুম, বর্শা, তীর, তরবারী বা অন্য কোন অস্ত্রের চিহ্ন দেখা যায় না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আমার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা ছিল না বলে আজ তোমরা দেখ যে আমি গৃহ শয্যায় মৃত্যুবরণ করছি। সুতরাং কাপুরুষের দল আমার জীবন হতে যেন শিক্ষা গ্রহণ করে।আল্লাহ তা'আলা বলেন- মৃত্যুর থাবা হতে উচ্চতম, সুদৃঢ় এবং সংরক্ষিত দুর্গ ও অট্টালিকাও রক্ষা করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন যে শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আকাশের বুরুজ। কিন্তু এটা দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সুরক্ষিত প্রাসাদাসমূহ। অর্থাৎ মৃত্যু হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যে কোন সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন ওটা নির্ধারিত সময়েই আসবে, একটুও আগে পিছে হবে না। যুহাইর ইবনে আবি সালমা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণে পলায়ন করে তাকে মুত্যু পেয়ে বসবেই, যদিও সে সোপানের সাহায্যে আকাশ মার্গেও আরোহণ করে।(আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ তাশদীদ সহ বলেছেন এবং কেউ কেউ ‘তাশদীদ’ ছাড়াই বলেছেন। দুটোরই একই অর্থ। কিন্তু কারও কারও মতে আবার এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মুশাইয়্যাদাহ্ পড়লে অর্থ হবে সুদীর্ঘ এবং মুশায়াদাহ পড়লে অর্থ হবে চুন দ্বারা সুশোভিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাফসীর -ই-ইবনে জারীর এবং মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে একটি সুদীর্ঘ গল্প হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন যে, পূর্ব যুগে একটি স্ত্রীলোক গর্ভবতী ছিল। তার প্রসব বেদনা উঠে এবং সে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে। সে তখন তার পরিচারককে বলে, “যাও কোন জায়গা হতে আগুন নিয়ে এসো। পরিচারক বাইরে গিয়ে দেখে যে, দরজার উপর একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। লোকটি পরিচারককে জিজ্ঞেস করে, “স্ত্রী লোকটি কি সন্তান প্রসব করেছেন? সে বলে, ‘কন্যা সন্তান।লোকটি তখন বলে, ‘জেনে রেখ যে, এ মেয়েটি একশ জন পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করবে এবং এখন স্ত্রীলোকটির যে পরিচারক রয়েছে শেষে তার সাথে এ মেয়েটির বিয়ে হবে। আর একটি মাকড়সা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।এ কথা শুনে চাকরটি সেখান হতে ফিরে যায় এবং ঐ মেয়েটির পেট ফেড়ে দেয়। অতঃপর তাকে মৃতা মনে করে তথা হতে পলায়ন করে। এ অবস্থা দেখে তার মা তার পেট সেলাই করে দেয় এবং চিকিৎসা করতে আরম্ভ করে। অবশেষে মেয়েটির ক্ষতস্থান ভাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে এক যুগ অতিবাহিত হয়। মেয়েটি যৌবনে পদার্পণ করে। সে খুব সুন্দরী ছিল। তখন সে ব্যভিচারের কাজ শুরু করে দেয়। আর ওদিকে ঐ চাকরটি সমুদ্র পথে পালিয়ে গিয়ে কাজ-কাম আরম্ভ করে দেয় এবং বহু অর্থ উপার্জন করে। দীর্ঘদিন পর প্রচুর ধন-সম্পদসহ সে তার সেই গ্রামে ফিরে আসে। তারপর সে একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে ডেকে পাঠিয়ে বলেঃ আমি বিয়ে করতে চাই। এ গ্রামের যে খুব সুশ্রী মেয়ে তার সঙ্গে আমার বিয়ে দাও।' বৃদ্ধা তথা হতে বিদায় নেয়। ঐ গ্রামের ঐ মেয়েটি অপেক্ষা সুশ্রী মেয়ে আর একটিও ছিল না বলে সে তাকেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রস্তাব সমর্থন করে এবং বিয়ে হয়ে যায়। সে সব কিছু ত্যাগ করে লোকটির নিকট চলেও আসে। তার ঐ স্বামীকে জিজ্ঞেস করেঃ আচ্ছা বলুনতো, আপনি কে? কোথা হতে এসেছেন এবং কিভাবেই বা এখানে এসেছেন?' লোকটি তখন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করে বলেঃ এখানে আমি একটি স্ত্রীলোকের পরিচারক ছিলাম। তার মেয়ের সঙ্গে এরূপ কাজ করে এখান হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বহু বছর পরে এসেছি।' তখন মেয়েটি বলে, যে মেয়েটির পেট ফেড়ে আপনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই মেয়ে।' এ বলে সে তাকে তার ক্ষত স্থানের দাগও দেখিয়ে দেয়। তখন লোকটির বিশ্বাস হয়ে যায় এবং মেয়েটিকে বলে, তুমি যখন ঐ মেয়ে তখন তোমার সম্বন্ধে আমার আর একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, তুমি আমার পূর্বে একশ জন লোকের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেয়েটি তখন বলে, কথা তো ঠিকই, কিন্তু আমার গণনা মনে নেই। লোকটি বলে তোমার সম্বন্ধে আমার আরও একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, একটি মাকড়সা তোমার মুত্যুর কারণ হবে। যা হোক, তোমার প্রতি আমার খুবই ভালবাসা রয়েছে। কাজেই আমি তোমাকে একটি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় প্রাসাদ নির্মাণ করে দিচ্ছি। তুমি সেখানে অবস্থান করবে। তাহলে সেখানে কোন পোকা-মাকড়ও প্রবেশ করতে পারবে না। সে তাই করে। মেয়েটির জন্যে এরূপই একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং সে সেখানেই বাস করতে থাকে, কিছুদিন পর একদা তারা স্বামী-স্ত্রী ঐ প্রাসাদের মধ্যে বসে রয়েছে, এমন সময় হঠাৎ ছাদের উপর একটি মাকড়সা দেখা যায়। ঐ লোক তখন তার স্ত্রীকে বলে, “দেখ, আজ এখানে মাকড়সা দেখা গেছে। ওটা দেখা মাত্রই মেয়েটি বলে, আচ্ছা, এটা আমার প্রাণ নেয় নেবেই কিন্তু আমিই এর প্রাণ নেব।' অতঃপর সে চাকরকে বলেঃ মাকড়সাটিকে আমার নিকট জ্যান্ত ধরে আন। চারকটি ধরে আনে। সে তখন মাকড়সাটিকে স্বীয় পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দলিত করে। ফলে মাকড়সাটির প্রাণ বায়ু নির্গত হয়। ওর দেহের যে রস বের হয় ওরই এক আধ ফোটা তার বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ ও মাংসের মধ্যস্থলে প্রবেশ করে। ফলে বিষক্রিয়া আরম্ভ হয় এবং পা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়।হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর বিদ্রোহীগণ যখন আক্রমণ চালায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতঃপর তিনি নিম্নের ছন্দ দু’টি পাঠ করেনঃ (আরবী) হাযরের বাদশাহ সাতেরূনকে পারস্য সমাট সাবুর যুল আলতাফ যে হত্যা করেছিল সে ঘটনাটিও আমরা এখানে বর্ণনা করছি। ইবনে হিশাম বলেছেন যে, সাকূর যখন ইরাকে অবস্থান করছিল সে সময় তার এলাকার উপর সাতেরূন আক্রমণ চালিয়েছিল। এর প্রতিশোধ স্বরূপ সাকূর যখন তার উপর আক্রমণ চালায় তখন সে দুর্গের দরজা বন্ধ করে তাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দু’বছর পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় কিন্তু কোনক্রমেই দুর্গ বিজিত হয় না।একদা সাতেরূনের নাযীরা নাম্নী এক কন্যা তার পিতার দুর্গে টহল দিচ্ছিল। এমন সময় সায়ূরের উপর তার দৃষ্টি যায়। সে সময় সাকূর শাহী রেশমী পোশাক পরিহিত ছিল এবং তার মস্তকে ছিল রাজমুকুট। নাযীরা মনে মনে বলে-তোর সাথে আমার বিয়ে হলে কতইনা উত্তম হতো! সুতরাং গোপনে তার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে আরম্ভ করে এবং সাকূর ওয়াদা করে যে, যদি এ মেয়েটি তাকে দুর্গ দখল করিয়ে দিতে পারে তবে সে তাকে বিয়ে করবে।সাতেরূন ছিল বড়ই মদ্যপায়ী। সারারাত তার মদ্যের নেশাতেই কেটে যেতো। মেয়েটি এ সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে। রাতে স্বীয় পিতাকে মদমত্ত অবস্থায় দেখে চুপে চুপে তার শিয়র হতে দুর্গের দরজার চাবিটি বের করে নেয় এবং তার নির্ভরযোগ্য ক্রীতদাসের মাধ্যমে সানূরের নিকট পৌছিয়ে দেয়। সাবুর তখন ঐ চাবি দিয়ে দুর্গের দরজা খুলে দেয় এবং ভেতরে প্রবেশ করে সাধারণভাবে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়।অবশেষে দুর্গ তার দখলে এসে যায়। এও বলা হয়েছে যে, ঐ দুর্গে একটি যাদুযুক্ত জিনিস ছিল। ওটা ভাঙ্গতে না পারলে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব ছিল না। ঐ মেয়েটিই ওটা ভাঙ্গবার পদ্ধতি বলে দেয় যে, একটি সাদাকালো মিশ্রিত রঙের কবুতর এনে তার পা কোন কুমারী মেয়ের প্রথম ঋতুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করতে হবে, তারপর কবুতরটিকে ছেড়ে দিলেই ওটা উড়ে গিয়ে ঐ দুর্গের দেয়ালে বসবে। আর তেমনি যাদুযুক্ত জিনিসটি পড়ে যাবে এবং দুর্গের সিংহদ্বার খুলে যাবে।অতএব সাকূর তাই করে এবং দুর্গ জয় করতঃ সাতেরূনকে হত্যা করে। অতঃপর সমস্ত লোককে তরবারীর নীচে নিক্ষেপ করে এবং সারা শহর ধ্বংস। করে দেয়। তারপর সাতেরূনের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে স্বীয় রাজ্যে ফিরে আসে এবং তাকে বিয়ে করে নেয়। একদা রাত্রে মেয়েটি স্বীয় শয্যায় শুয়ে আছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। সে অস্থিরতা প্রকাশ করছে। তার এ অবস্থা দেখে সাবুর তাকে জিজ্ঞেস করেঃ ব্যাপার কি?' সে বলে, সম্ভবতঃ বিছানায় কিছু রয়েছে যে কারণে আমার ঘুমে ধরছে না। প্রদীপ জ্বালিয়ে বিছানায় অনুসন্ধান চালানো হলো। অবশেষে তৃণ জাতীয় গাছের ছোট একটি পাতা পাওয়া গেল।তার এ চরম বিলাসিতা দেখে সানূর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো যে, ছোট একটি পাতা বিছানায় থাকার কারণে তার ঘুম আসছে না! তাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার পিতার নিকট তোমার জন্যে কি কি থাকতো'? সে বললোঃ ‘আমার জন্যে থাকতো নরম রেশমের বিছানা এবং পাতলা নরম রেশমের পোশাক। আর আমি আহার করতাম পায়ের অস্থির মজ্জা এবং পান করতাম। খাটি সুরা। এ ব্যবস্থাই আমার আব্বা আমার জন্যে রেখেছিলেন। মেয়েটি এরূপ ছিল যে, বাহির হতে তার পায়ের গোছর গোড়ালির) মজ্জা পর্যন্তও দেখা যেতো। একথাগুলো সায়ূরের মনে অন্য এক উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং মেয়েটিকে বলেঃ ‘যে পিতা তোমাকে এভাবে লালন পালন করেছে, তুমি তোমার সে পিতার সাথে এ ব্যবহার করেছে যে, আমার দ্বারা তাকে হত্যা করিয়েছে এবং তার রাজ্যকে ছারখার করিয়েছে। কাজেই আমার সঙ্গেও যে তুমি এরূপ ব্যবহার করবে না তা আমি কিরূপে বিশ্বাস করতে পারি’? তৎক্ষণাৎ সে নির্দেশ দেয় যে, তার চুলকে ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া হোক। তাই করা হয়। ঘোড়া নাচতে লাফাতে আরম্ভ করে এবং এভাবে তাকে এ নশ্বর জগৎ হতে চির বিদায় গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহপাক বলেন-যদি তাদের উপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ যদি তারা খাদ্যশস্য, ফল, সন্তানাদি ইত্যাদি লাভ করে তবে তারা বলে- এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এসেছে। আর যদি তাদের উপর কোন অমঙ্গল নিপতিত হয় অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, মাল ও সন্তানের স্বল্পতা এবং ক্ষেত্র ও বাগানের ক্ষতি ইত্যাদি পৌছে যায় তখন তারা বলে-“হে নবী (সঃ)! এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ এটা নবী (সঃ)-এর অনুসরণ এবং মুসলমান হওয়ার কারণেই হয়েছে। ফিরাউনের অনুসারীরাও অমঙ্গলের বেলায় হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে কু-লক্ষণ বলে অভিহিত করতো। যেমন। কুরআন কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদের নিকট কোন মঙ্গল পৌছে তখন তারা বলে- এটা আমাদের জন্যই হয়েছে এবং যখন তাদের নিকট কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে কুলক্ষণে বলে থাকে।’(৭:১৩১)আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ কতক লোক এমন রয়েছে যারা এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে।'(২২:১১) অতএব এখানেও এ মুনাফিকরা যারা বাহ্যিক মুসলমান কিন্তু অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে তাদের নিকট যখন কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা ঝট করে বলে ফেলে যে, এ ক্ষতি ইসলাম গ্রহণের কারণেই হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ বৃষ্টিপাত হওয়া, গৃহপালিত পশুর আধিক্য হওয়া, ছেলেমেয়ে বেশী হওয়া এবং স্বচ্ছলতা আসা। এসব হলে তারা বলতো-“এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়েছে। আর যদি এর বিপরীত হতো তবে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কেই এ জন্যে দায়ী করতো এবং তাঁকে বলতো-এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ আমরা আমাদের বড়দের আনুগত্য ছেড়ে এ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করেছি বলেই আমরা এ বিপদে পড়েছি। তাই আল্লাহ পাক তাদের এ অপবিত্র কথা ও জঘন্য বিশ্বাসের খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন- সবই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। তার ফায়সালা ও ভাগ্যলিখন প্রত্যেক ভাল-মন্দ, ফাসিক, ফাজির, মুমিন এবং কাফির সবারই উপরেই জারী রয়েছে। ভাল ও মন্দ সবই তার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।অতঃপর তিনি তাদের সে উক্তি খণ্ডন করছেন যা তারা শুধুমাত্র সন্দেহ, অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং অত্যাচারের বশবর্তী হয়েই বলে থাকে। তিনি বলেনতাদের কি হয়েছে যে, কোন কথা বুঝবার যোগ্যতা তাদের মধ্য হতে লোপ পাচ্ছে? (আরবী) সম্পর্কে যে একটি গারীব হাদীস রয়েছে তারও এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মুসনাদ-ই-বাযে ' হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তাঁর দাদা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় কতগুলো লোককে সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) আগমন করেন। তাঁরা উচ্চেঃস্বরে কথা বলছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাঁরা দুজন বসে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “উচ্চৈঃস্বরে কিসের আলোচনা চলছিল?' এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেন যে, পুণ্য এবং মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং মন্দ ও অমঙ্গল আমাদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি বলছিলে’? হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি বলছিলাম যে, দু'টোই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এ তর্ক প্রথম প্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাইল (আঃ)-এর মধ্যেও হয়েছিল। হযরত মিকাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিল এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা তুমি (হযরত উমার রাঃ) বলছিলে। তাহলে আকাশবাসীদের মধ্যে যখন মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে তখন পৃথিবীবাসীদের মধ্যে এটা হওয়া তো স্বাভাবিক'।অতঃপর ইসরাফীল (আঃ)-এর উপর এর মীমাংসার ভার পড়ে যায়। তিনি মীমাংসা করেন যে, ভাল ও মন্দ দু'টোই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি তাঁদের দুজনকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আমার সিদ্ধান্ত শুনে নাও এবং স্মরণ রেখো আল্লাহ তাআলা যদি স্বীয় অবাধ্যাচরণ না চাইতেন তবে তিনি ইবলিশকে সৃষ্টি করতেন না।কিন্তু শায়খুল ইসলাম ইমাম তাকিয়ুদ্দীন আবূ আব্বাস হযরত ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মাও’ এবং যেসব মুহাদ্দিস হাদীস পরীক্ষা করে থাকেন তাঁরা সবাই একমত যে, এ হাদীসটি তৈরী করে নেয়া হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ অতঃপর এ সম্বোধন সাধারণ হয়ে গেছে, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সকলকেই সম্বোধন করে বলছেন- “তোমাদের নিকট যে কল্যাণ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ তাআলারই অনুগ্রহ, দয়া ও করুণা। আর তোমাদের উপর যে অমঙ্গল নিপতিত হয় তা তোমাদের স্বীয় কর্মেরই প্রতিফল।' যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের উপর যে বিপদ পৌছে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তারই কিছুটা প্রতিফল এবং তিনি তোমাদের অধিকাংশ পাপই ক্ষমা করে দেন। (৪২:৩০) এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার পাপের কারণে। অর্থাৎ কার্যেরই প্রতিফল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির শরীরের সামান্য ছাল উঠে যায় বা তার পদস্খলন ঘটে কিংবা তাকে কিছু কাজ করতে হয়, ফলে শরীর দিয়ে ঘাম বের হয়, ওটাও কোন না কোন পাপের কারণেই হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তা'আলা যে পাপগুলো দেখেও দেখেন না এবং ক্ষমা করে থাকেন সেগুলো তো অনেক রয়েছে।” এ মুরসাল হাদীসটির বিষয়বস্তু একটি মুত্তাসিল সহীহ হাদীসেও রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মুমিনকে যে দুঃখকষ্ট পৌছে, এমনকি তার পায়ে যে কাঁটা ফুটে সে কারণেও আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যে অমঙ্গল তোমার উপর নিপতিত হয় তার কারণ হচ্ছে তোমার পাপ। হ্যা, তবে ওটাও ভাগ্যে আল্লাহ তা'আলাই লিখেছেন।হযরত মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, তোমরা তকদীর সম্বন্ধে কি জিজ্ঞেস করছো? তোমাদের জন্যে কি সূরা-ই-নিসার (আরবী)-এ আয়াতটি যথেষ্ট নয়? আল্লাহর শপথ! মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পণ করা হয়নি বরং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাঁরই নিকট তারা ফিরে যাবে। এ উক্তিটি খুবই দৃঢ় ও মজবুত এবং এটা কাদরিয়্যাহ্ এবং জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়ের উক্তিকে চরমভাবে খণ্ডন করেছে। এ তর্ক-বিতর্কের জায়গা তাফসীর নয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে নবী (সঃ)! তোমার কাজ হচ্ছে শুধু শরীয়তকে প্রচার করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কাজকে, তার আদেশ ও নিষেধকে মানুষের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। অনুরূপভাবে তাঁরই সাক্ষ্য এ ব্যাপারেও যথেষ্ট যে, তুমি প্রচারকার্য চালিয়েছো। তোমার ও তাদের মধ্যে যা কিছু হচ্ছে তিনি সব কিছুই দেখছেন। তারা তোমার সাথে যে অবাধ্যাচরণ ও অহংকার করছে তাও তিনি দেখতে রয়েছেন।

আন-নিসা 4:78

৭৭-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা মক্কায় অবস্থান করছিল তখন তারা ছিল দুর্বল। তারা মর্যাদাসম্পন্ন শহরে বাস করছিল। তথায় কাফিরদেরই প্রাধান্য বজায় ছিল। মুসলমানরা তাদেরই শহরে ছিল।কাফিরেরা সংখ্যায় খুব বেশী ছিল এবং যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্রও ছিল তাদের অধিক। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেননি। বরং তাদেরকে কাফিরদের অত্যাচার সহ্য করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে আরও আদেশ করেছিলেন যে, তিনি যেসব হুকুম আহকাম অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোর উপর যেন তারা আমল করে। যেমন তারা যেন নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে। সাধারণতঃ যদিও তখন তাদের মালের আধিক্য ছিল না তথাপি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে এটাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন যে, তারা যেন এখানে কাফিরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করে বরং সবর ও ধৈর্যের দ্বারাই যেন কাজ নেয়। আর ওদিকে কাফিররা ভীষণ বীরত্বের সাথে মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের পাহাড় চাপিয়ে দেয়। তারা ছোট-বড় প্রত্যেককেই কঠিন হতে কঠিনতম শাস্তি দিতে থাকে। কাজেই মুসলমানগণ অত্যন্ত সংকীর্ণতার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছিল। মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে যেতো এবং তারা কামনা করতো যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ দিতেন। অবশেষে যখন তাদেরকে মদীনায় হিজরত করার অনুমিত দেয়া হয় তখন মুসলমানরা স্বীয় মাতৃভূমি, আত্মীয়-স্বজন সবকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে মদীনায় হিজরত করে। তথায় আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুবিধা ও নিরাপত্তা দান করেন। সাহায্যকারী হিসেবে তারা মদীনার আনসারদেরকে পেয়ে যায় এবং তাদের সংখ্যাও বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া তারা যথেষ্ট শক্তিও অর্জন করে।তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করে। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই কতক লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জিহাদের কথা চিন্তা করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত এবং স্ত্রীদের বিধবা হওয়া ও শিশুদের পিতৃহীন হওয়ার দৃশ্য তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভয় পেয়ে তারা বলে উঠে- “হে আমাদের প্রভু! এখনই কেন আমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করলেন? আমাদেরকে আরও কিছুদিন অবসর দিতেন!' এ বিষয়কেই অন্য আয়াতে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবী) (৪৭:২০) এর সংক্ষিপ্ত ভাবৰ্থ এই যে, মুমিনগণ বলে-(যুদ্ধের) কোন সূরা অবতীর্ণ হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় এবং তাতে জিহাদের বর্ণনা দেয়া হয় তখন রুগ্ন অন্তরবিশিষ্ট লোকেরা চীৎকার করে উঠে এবং ভ্রুকুঞ্চিত করে তোমার দিকে তাকায় এবং ঐ ব্যক্তির মত চক্ষু বন্ধ করে নেয় যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে অচৈতন্য হয়ে থাকে। তাদের জন্যে আফসোস!মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মক্কায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! কুফরীর অবস্থায় আমরা সম্মানিত ছিলাম, আর আজ ইসলামের অবস্থায় আমাদের লাঞ্ছিত মনে করা হচ্ছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমার উপর আল্লাহ পাকের এ নির্দেশই রয়েছে যে, আমি যেন ক্ষমা করে দেই। সাবধান কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো না।'অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর এখানে যখন জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন লোকেরা বিরত থাকে। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)ও এটা বর্ণনা করেছেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিল। তখন তারা আকাঙক্ষা করে যে, জিহাদও যদি ফরয করা হতো!অতঃপর যখন জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয় তখন দুর্বল ঈমানের লোকেরা মানুষকে ঐরূপ ভয় করতে লাগে যেমন আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা উচিত; বরং তার চেয়েও বেশী ভয় করতে থাকে এবং বলে-“হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের উপর জিহাদ কেন ফরয করলেন? স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে দুনিয়ায় সুখ ভোগ করতে দিলেন না কেন?' তখন তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, দুনিয়ার সুখ ভোগ খুবই অস্থায়ী এবং জান্নাতের তুলনায় খুবই নগণ্যও বটে। আর আখিরাত আল্লাহ ভীরুদের জন্য দুনিয়া হতে বহুগুণ উত্তম ও পবিত্র।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে উত্তরে বলা হয়-“আল্লাহভীরুদের পরিণাম সূচনা হতে বহুগুণে উত্তম। তোমাদেরকে তোমাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। তোমাদের একটি সৎ আমলও বিনষ্ট হবে না। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কারও উপর এক চুল পরিমাণ ও অত্যাচার হওয়া অসম্ভব। এ বাক্যে দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ উৎপাদন করে পরকালের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে জিহাদের উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত হাসান বসরী (রঃ)। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর সদয় হোন যে দুনিয়ায় এভাবেই থাকে। দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এ রকমই অবস্থা যেমন একজন নিদ্রিত ব্যক্তি স্বপ্নে নিজের কোন পছন্দনীয় জিনিস দেখতে পায় কিন্তু চক্ষু খোলা মাত্রই জানতে পারে যে, মূলে কিছুই ছিল না। হযরত আবু মুসহির (রঃ)-এর নিম্নের কবিতাংশটি কতই না সুন্দরঃ (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়ায় ঐ ব্যক্তির জন্য কোনই মঙ্গল নেই, যার জন্যে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কোনই অংশ নেই, যদিও দুনিয়া কতক লোককে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে, কিন্তু এটা খুব অল্পই সুখ এবং এর ধ্বংস খুব নিকটবর্তী।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর।' কোন মধ্যস্থতা কাউকেও এটা হতে বাঁচাতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এর উপর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল।'(৫৫:২৬) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) আর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী'। (৩:১৮৫) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষের জন্য চিরস্থায়ী জীবন নির্ধারণ করিনি।'(২১:৩৪) এগুলো বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ জিহাদ করুক আর নাই করুক একমাত্র আল্লাহ পাকের সত্তা ছাড়া সকলকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। প্রত্যেকের জন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং প্রত্যেকের মুত্যুর স্থানও নির্দিষ্ট রয়েছে।হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) স্বীয় মরণ শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেনঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি বহু বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতঃ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছি। তোমরা এসে দেখ যে, আমার শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যেখানে বলুম, বর্শা, তীর, তরবারী বা অন্য কোন অস্ত্রের চিহ্ন দেখা যায় না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আমার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা ছিল না বলে আজ তোমরা দেখ যে আমি গৃহ শয্যায় মৃত্যুবরণ করছি। সুতরাং কাপুরুষের দল আমার জীবন হতে যেন শিক্ষা গ্রহণ করে।আল্লাহ তা'আলা বলেন- মৃত্যুর থাবা হতে উচ্চতম, সুদৃঢ় এবং সংরক্ষিত দুর্গ ও অট্টালিকাও রক্ষা করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন যে শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আকাশের বুরুজ। কিন্তু এটা দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সুরক্ষিত প্রাসাদাসমূহ। অর্থাৎ মৃত্যু হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যে কোন সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন ওটা নির্ধারিত সময়েই আসবে, একটুও আগে পিছে হবে না। যুহাইর ইবনে আবি সালমা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণে পলায়ন করে তাকে মুত্যু পেয়ে বসবেই, যদিও সে সোপানের সাহায্যে আকাশ মার্গেও আরোহণ করে।(আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ তাশদীদ সহ বলেছেন এবং কেউ কেউ ‘তাশদীদ’ ছাড়াই বলেছেন। দুটোরই একই অর্থ। কিন্তু কারও কারও মতে আবার এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মুশাইয়্যাদাহ্ পড়লে অর্থ হবে সুদীর্ঘ এবং মুশায়াদাহ পড়লে অর্থ হবে চুন দ্বারা সুশোভিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাফসীর -ই-ইবনে জারীর এবং মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে একটি সুদীর্ঘ গল্প হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন যে, পূর্ব যুগে একটি স্ত্রীলোক গর্ভবতী ছিল। তার প্রসব বেদনা উঠে এবং সে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে। সে তখন তার পরিচারককে বলে, “যাও কোন জায়গা হতে আগুন নিয়ে এসো। পরিচারক বাইরে গিয়ে দেখে যে, দরজার উপর একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। লোকটি পরিচারককে জিজ্ঞেস করে, “স্ত্রী লোকটি কি সন্তান প্রসব করেছেন? সে বলে, ‘কন্যা সন্তান।লোকটি তখন বলে, ‘জেনে রেখ যে, এ মেয়েটি একশ জন পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করবে এবং এখন স্ত্রীলোকটির যে পরিচারক রয়েছে শেষে তার সাথে এ মেয়েটির বিয়ে হবে। আর একটি মাকড়সা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।এ কথা শুনে চাকরটি সেখান হতে ফিরে যায় এবং ঐ মেয়েটির পেট ফেড়ে দেয়। অতঃপর তাকে মৃতা মনে করে তথা হতে পলায়ন করে। এ অবস্থা দেখে তার মা তার পেট সেলাই করে দেয় এবং চিকিৎসা করতে আরম্ভ করে। অবশেষে মেয়েটির ক্ষতস্থান ভাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে এক যুগ অতিবাহিত হয়। মেয়েটি যৌবনে পদার্পণ করে। সে খুব সুন্দরী ছিল। তখন সে ব্যভিচারের কাজ শুরু করে দেয়। আর ওদিকে ঐ চাকরটি সমুদ্র পথে পালিয়ে গিয়ে কাজ-কাম আরম্ভ করে দেয় এবং বহু অর্থ উপার্জন করে। দীর্ঘদিন পর প্রচুর ধন-সম্পদসহ সে তার সেই গ্রামে ফিরে আসে। তারপর সে একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে ডেকে পাঠিয়ে বলেঃ আমি বিয়ে করতে চাই। এ গ্রামের যে খুব সুশ্রী মেয়ে তার সঙ্গে আমার বিয়ে দাও।' বৃদ্ধা তথা হতে বিদায় নেয়। ঐ গ্রামের ঐ মেয়েটি অপেক্ষা সুশ্রী মেয়ে আর একটিও ছিল না বলে সে তাকেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রস্তাব সমর্থন করে এবং বিয়ে হয়ে যায়। সে সব কিছু ত্যাগ করে লোকটির নিকট চলেও আসে। তার ঐ স্বামীকে জিজ্ঞেস করেঃ আচ্ছা বলুনতো, আপনি কে? কোথা হতে এসেছেন এবং কিভাবেই বা এখানে এসেছেন?' লোকটি তখন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করে বলেঃ এখানে আমি একটি স্ত্রীলোকের পরিচারক ছিলাম। তার মেয়ের সঙ্গে এরূপ কাজ করে এখান হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বহু বছর পরে এসেছি।' তখন মেয়েটি বলে, যে মেয়েটির পেট ফেড়ে আপনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই মেয়ে।' এ বলে সে তাকে তার ক্ষত স্থানের দাগও দেখিয়ে দেয়। তখন লোকটির বিশ্বাস হয়ে যায় এবং মেয়েটিকে বলে, তুমি যখন ঐ মেয়ে তখন তোমার সম্বন্ধে আমার আর একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, তুমি আমার পূর্বে একশ জন লোকের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেয়েটি তখন বলে, কথা তো ঠিকই, কিন্তু আমার গণনা মনে নেই। লোকটি বলে তোমার সম্বন্ধে আমার আরও একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, একটি মাকড়সা তোমার মুত্যুর কারণ হবে। যা হোক, তোমার প্রতি আমার খুবই ভালবাসা রয়েছে। কাজেই আমি তোমাকে একটি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় প্রাসাদ নির্মাণ করে দিচ্ছি। তুমি সেখানে অবস্থান করবে। তাহলে সেখানে কোন পোকা-মাকড়ও প্রবেশ করতে পারবে না। সে তাই করে। মেয়েটির জন্যে এরূপই একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং সে সেখানেই বাস করতে থাকে, কিছুদিন পর একদা তারা স্বামী-স্ত্রী ঐ প্রাসাদের মধ্যে বসে রয়েছে, এমন সময় হঠাৎ ছাদের উপর একটি মাকড়সা দেখা যায়। ঐ লোক তখন তার স্ত্রীকে বলে, “দেখ, আজ এখানে মাকড়সা দেখা গেছে। ওটা দেখা মাত্রই মেয়েটি বলে, আচ্ছা, এটা আমার প্রাণ নেয় নেবেই কিন্তু আমিই এর প্রাণ নেব।' অতঃপর সে চাকরকে বলেঃ মাকড়সাটিকে আমার নিকট জ্যান্ত ধরে আন। চারকটি ধরে আনে। সে তখন মাকড়সাটিকে স্বীয় পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দলিত করে। ফলে মাকড়সাটির প্রাণ বায়ু নির্গত হয়। ওর দেহের যে রস বের হয় ওরই এক আধ ফোটা তার বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ ও মাংসের মধ্যস্থলে প্রবেশ করে। ফলে বিষক্রিয়া আরম্ভ হয় এবং পা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়।হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর বিদ্রোহীগণ যখন আক্রমণ চালায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতঃপর তিনি নিম্নের ছন্দ দু’টি পাঠ করেনঃ (আরবী) হাযরের বাদশাহ সাতেরূনকে পারস্য সমাট সাবুর যুল আলতাফ যে হত্যা করেছিল সে ঘটনাটিও আমরা এখানে বর্ণনা করছি। ইবনে হিশাম বলেছেন যে, সাকূর যখন ইরাকে অবস্থান করছিল সে সময় তার এলাকার উপর সাতেরূন আক্রমণ চালিয়েছিল। এর প্রতিশোধ স্বরূপ সাকূর যখন তার উপর আক্রমণ চালায় তখন সে দুর্গের দরজা বন্ধ করে তাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দু’বছর পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় কিন্তু কোনক্রমেই দুর্গ বিজিত হয় না।একদা সাতেরূনের নাযীরা নাম্নী এক কন্যা তার পিতার দুর্গে টহল দিচ্ছিল। এমন সময় সায়ূরের উপর তার দৃষ্টি যায়। সে সময় সাকূর শাহী রেশমী পোশাক পরিহিত ছিল এবং তার মস্তকে ছিল রাজমুকুট। নাযীরা মনে মনে বলে-তোর সাথে আমার বিয়ে হলে কতইনা উত্তম হতো! সুতরাং গোপনে তার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে আরম্ভ করে এবং সাকূর ওয়াদা করে যে, যদি এ মেয়েটি তাকে দুর্গ দখল করিয়ে দিতে পারে তবে সে তাকে বিয়ে করবে।সাতেরূন ছিল বড়ই মদ্যপায়ী। সারারাত তার মদ্যের নেশাতেই কেটে যেতো। মেয়েটি এ সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে। রাতে স্বীয় পিতাকে মদমত্ত অবস্থায় দেখে চুপে চুপে তার শিয়র হতে দুর্গের দরজার চাবিটি বের করে নেয় এবং তার নির্ভরযোগ্য ক্রীতদাসের মাধ্যমে সানূরের নিকট পৌছিয়ে দেয়। সাবুর তখন ঐ চাবি দিয়ে দুর্গের দরজা খুলে দেয় এবং ভেতরে প্রবেশ করে সাধারণভাবে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়।অবশেষে দুর্গ তার দখলে এসে যায়। এও বলা হয়েছে যে, ঐ দুর্গে একটি যাদুযুক্ত জিনিস ছিল। ওটা ভাঙ্গতে না পারলে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব ছিল না। ঐ মেয়েটিই ওটা ভাঙ্গবার পদ্ধতি বলে দেয় যে, একটি সাদাকালো মিশ্রিত রঙের কবুতর এনে তার পা কোন কুমারী মেয়ের প্রথম ঋতুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করতে হবে, তারপর কবুতরটিকে ছেড়ে দিলেই ওটা উড়ে গিয়ে ঐ দুর্গের দেয়ালে বসবে। আর তেমনি যাদুযুক্ত জিনিসটি পড়ে যাবে এবং দুর্গের সিংহদ্বার খুলে যাবে।অতএব সাকূর তাই করে এবং দুর্গ জয় করতঃ সাতেরূনকে হত্যা করে। অতঃপর সমস্ত লোককে তরবারীর নীচে নিক্ষেপ করে এবং সারা শহর ধ্বংস। করে দেয়। তারপর সাতেরূনের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে স্বীয় রাজ্যে ফিরে আসে এবং তাকে বিয়ে করে নেয়। একদা রাত্রে মেয়েটি স্বীয় শয্যায় শুয়ে আছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। সে অস্থিরতা প্রকাশ করছে। তার এ অবস্থা দেখে সাবুর তাকে জিজ্ঞেস করেঃ ব্যাপার কি?' সে বলে, সম্ভবতঃ বিছানায় কিছু রয়েছে যে কারণে আমার ঘুমে ধরছে না। প্রদীপ জ্বালিয়ে বিছানায় অনুসন্ধান চালানো হলো। অবশেষে তৃণ জাতীয় গাছের ছোট একটি পাতা পাওয়া গেল।তার এ চরম বিলাসিতা দেখে সানূর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো যে, ছোট একটি পাতা বিছানায় থাকার কারণে তার ঘুম আসছে না! তাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার পিতার নিকট তোমার জন্যে কি কি থাকতো'? সে বললোঃ ‘আমার জন্যে থাকতো নরম রেশমের বিছানা এবং পাতলা নরম রেশমের পোশাক। আর আমি আহার করতাম পায়ের অস্থির মজ্জা এবং পান করতাম। খাটি সুরা। এ ব্যবস্থাই আমার আব্বা আমার জন্যে রেখেছিলেন। মেয়েটি এরূপ ছিল যে, বাহির হতে তার পায়ের গোছর গোড়ালির) মজ্জা পর্যন্তও দেখা যেতো। একথাগুলো সায়ূরের মনে অন্য এক উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং মেয়েটিকে বলেঃ ‘যে পিতা তোমাকে এভাবে লালন পালন করেছে, তুমি তোমার সে পিতার সাথে এ ব্যবহার করেছে যে, আমার দ্বারা তাকে হত্যা করিয়েছে এবং তার রাজ্যকে ছারখার করিয়েছে। কাজেই আমার সঙ্গেও যে তুমি এরূপ ব্যবহার করবে না তা আমি কিরূপে বিশ্বাস করতে পারি’? তৎক্ষণাৎ সে নির্দেশ দেয় যে, তার চুলকে ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া হোক। তাই করা হয়। ঘোড়া নাচতে লাফাতে আরম্ভ করে এবং এভাবে তাকে এ নশ্বর জগৎ হতে চির বিদায় গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহপাক বলেন-যদি তাদের উপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ যদি তারা খাদ্যশস্য, ফল, সন্তানাদি ইত্যাদি লাভ করে তবে তারা বলে- এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এসেছে। আর যদি তাদের উপর কোন অমঙ্গল নিপতিত হয় অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, মাল ও সন্তানের স্বল্পতা এবং ক্ষেত্র ও বাগানের ক্ষতি ইত্যাদি পৌছে যায় তখন তারা বলে-“হে নবী (সঃ)! এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ এটা নবী (সঃ)-এর অনুসরণ এবং মুসলমান হওয়ার কারণেই হয়েছে। ফিরাউনের অনুসারীরাও অমঙ্গলের বেলায় হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে কু-লক্ষণ বলে অভিহিত করতো। যেমন। কুরআন কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদের নিকট কোন মঙ্গল পৌছে তখন তারা বলে- এটা আমাদের জন্যই হয়েছে এবং যখন তাদের নিকট কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে কুলক্ষণে বলে থাকে।’(৭:১৩১)আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ কতক লোক এমন রয়েছে যারা এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে।'(২২:১১) অতএব এখানেও এ মুনাফিকরা যারা বাহ্যিক মুসলমান কিন্তু অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে তাদের নিকট যখন কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা ঝট করে বলে ফেলে যে, এ ক্ষতি ইসলাম গ্রহণের কারণেই হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ বৃষ্টিপাত হওয়া, গৃহপালিত পশুর আধিক্য হওয়া, ছেলেমেয়ে বেশী হওয়া এবং স্বচ্ছলতা আসা। এসব হলে তারা বলতো-“এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়েছে। আর যদি এর বিপরীত হতো তবে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কেই এ জন্যে দায়ী করতো এবং তাঁকে বলতো-এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ আমরা আমাদের বড়দের আনুগত্য ছেড়ে এ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করেছি বলেই আমরা এ বিপদে পড়েছি। তাই আল্লাহ পাক তাদের এ অপবিত্র কথা ও জঘন্য বিশ্বাসের খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন- সবই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। তার ফায়সালা ও ভাগ্যলিখন প্রত্যেক ভাল-মন্দ, ফাসিক, ফাজির, মুমিন এবং কাফির সবারই উপরেই জারী রয়েছে। ভাল ও মন্দ সবই তার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।অতঃপর তিনি তাদের সে উক্তি খণ্ডন করছেন যা তারা শুধুমাত্র সন্দেহ, অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং অত্যাচারের বশবর্তী হয়েই বলে থাকে। তিনি বলেনতাদের কি হয়েছে যে, কোন কথা বুঝবার যোগ্যতা তাদের মধ্য হতে লোপ পাচ্ছে? (আরবী) সম্পর্কে যে একটি গারীব হাদীস রয়েছে তারও এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মুসনাদ-ই-বাযে ' হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তাঁর দাদা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় কতগুলো লোককে সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) আগমন করেন। তাঁরা উচ্চেঃস্বরে কথা বলছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাঁরা দুজন বসে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “উচ্চৈঃস্বরে কিসের আলোচনা চলছিল?' এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেন যে, পুণ্য এবং মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং মন্দ ও অমঙ্গল আমাদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি বলছিলে’? হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি বলছিলাম যে, দু'টোই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এ তর্ক প্রথম প্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাইল (আঃ)-এর মধ্যেও হয়েছিল। হযরত মিকাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিল এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা তুমি (হযরত উমার রাঃ) বলছিলে। তাহলে আকাশবাসীদের মধ্যে যখন মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে তখন পৃথিবীবাসীদের মধ্যে এটা হওয়া তো স্বাভাবিক'।অতঃপর ইসরাফীল (আঃ)-এর উপর এর মীমাংসার ভার পড়ে যায়। তিনি মীমাংসা করেন যে, ভাল ও মন্দ দু'টোই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি তাঁদের দুজনকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আমার সিদ্ধান্ত শুনে নাও এবং স্মরণ রেখো আল্লাহ তাআলা যদি স্বীয় অবাধ্যাচরণ না চাইতেন তবে তিনি ইবলিশকে সৃষ্টি করতেন না।কিন্তু শায়খুল ইসলাম ইমাম তাকিয়ুদ্দীন আবূ আব্বাস হযরত ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মাও’ এবং যেসব মুহাদ্দিস হাদীস পরীক্ষা করে থাকেন তাঁরা সবাই একমত যে, এ হাদীসটি তৈরী করে নেয়া হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ অতঃপর এ সম্বোধন সাধারণ হয়ে গেছে, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সকলকেই সম্বোধন করে বলছেন- “তোমাদের নিকট যে কল্যাণ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ তাআলারই অনুগ্রহ, দয়া ও করুণা। আর তোমাদের উপর যে অমঙ্গল নিপতিত হয় তা তোমাদের স্বীয় কর্মেরই প্রতিফল।' যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের উপর যে বিপদ পৌছে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তারই কিছুটা প্রতিফল এবং তিনি তোমাদের অধিকাংশ পাপই ক্ষমা করে দেন। (৪২:৩০) এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার পাপের কারণে। অর্থাৎ কার্যেরই প্রতিফল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির শরীরের সামান্য ছাল উঠে যায় বা তার পদস্খলন ঘটে কিংবা তাকে কিছু কাজ করতে হয়, ফলে শরীর দিয়ে ঘাম বের হয়, ওটাও কোন না কোন পাপের কারণেই হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তা'আলা যে পাপগুলো দেখেও দেখেন না এবং ক্ষমা করে থাকেন সেগুলো তো অনেক রয়েছে।” এ মুরসাল হাদীসটির বিষয়বস্তু একটি মুত্তাসিল সহীহ হাদীসেও রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মুমিনকে যে দুঃখকষ্ট পৌছে, এমনকি তার পায়ে যে কাঁটা ফুটে সে কারণেও আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যে অমঙ্গল তোমার উপর নিপতিত হয় তার কারণ হচ্ছে তোমার পাপ। হ্যা, তবে ওটাও ভাগ্যে আল্লাহ তা'আলাই লিখেছেন।হযরত মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, তোমরা তকদীর সম্বন্ধে কি জিজ্ঞেস করছো? তোমাদের জন্যে কি সূরা-ই-নিসার (আরবী)-এ আয়াতটি যথেষ্ট নয়? আল্লাহর শপথ! মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পণ করা হয়নি বরং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাঁরই নিকট তারা ফিরে যাবে। এ উক্তিটি খুবই দৃঢ় ও মজবুত এবং এটা কাদরিয়্যাহ্ এবং জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়ের উক্তিকে চরমভাবে খণ্ডন করেছে। এ তর্ক-বিতর্কের জায়গা তাফসীর নয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে নবী (সঃ)! তোমার কাজ হচ্ছে শুধু শরীয়তকে প্রচার করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কাজকে, তার আদেশ ও নিষেধকে মানুষের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। অনুরূপভাবে তাঁরই সাক্ষ্য এ ব্যাপারেও যথেষ্ট যে, তুমি প্রচারকার্য চালিয়েছো। তোমার ও তাদের মধ্যে যা কিছু হচ্ছে তিনি সব কিছুই দেখছেন। তারা তোমার সাথে যে অবাধ্যাচরণ ও অহংকার করছে তাও তিনি দেখতে রয়েছেন।

আন-নিসা 4:79

৭৭-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা মক্কায় অবস্থান করছিল তখন তারা ছিল দুর্বল। তারা মর্যাদাসম্পন্ন শহরে বাস করছিল। তথায় কাফিরদেরই প্রাধান্য বজায় ছিল। মুসলমানরা তাদেরই শহরে ছিল।কাফিরেরা সংখ্যায় খুব বেশী ছিল এবং যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্রও ছিল তাদের অধিক। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেননি। বরং তাদেরকে কাফিরদের অত্যাচার সহ্য করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে আরও আদেশ করেছিলেন যে, তিনি যেসব হুকুম আহকাম অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোর উপর যেন তারা আমল করে। যেমন তারা যেন নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে। সাধারণতঃ যদিও তখন তাদের মালের আধিক্য ছিল না তথাপি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে এটাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন যে, তারা যেন এখানে কাফিরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করে বরং সবর ও ধৈর্যের দ্বারাই যেন কাজ নেয়। আর ওদিকে কাফিররা ভীষণ বীরত্বের সাথে মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের পাহাড় চাপিয়ে দেয়। তারা ছোট-বড় প্রত্যেককেই কঠিন হতে কঠিনতম শাস্তি দিতে থাকে। কাজেই মুসলমানগণ অত্যন্ত সংকীর্ণতার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছিল। মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে যেতো এবং তারা কামনা করতো যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ দিতেন। অবশেষে যখন তাদেরকে মদীনায় হিজরত করার অনুমিত দেয়া হয় তখন মুসলমানরা স্বীয় মাতৃভূমি, আত্মীয়-স্বজন সবকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে মদীনায় হিজরত করে। তথায় আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুবিধা ও নিরাপত্তা দান করেন। সাহায্যকারী হিসেবে তারা মদীনার আনসারদেরকে পেয়ে যায় এবং তাদের সংখ্যাও বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া তারা যথেষ্ট শক্তিও অর্জন করে।তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করে। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই কতক লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জিহাদের কথা চিন্তা করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত এবং স্ত্রীদের বিধবা হওয়া ও শিশুদের পিতৃহীন হওয়ার দৃশ্য তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভয় পেয়ে তারা বলে উঠে- “হে আমাদের প্রভু! এখনই কেন আমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করলেন? আমাদেরকে আরও কিছুদিন অবসর দিতেন!' এ বিষয়কেই অন্য আয়াতে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবী) (৪৭:২০) এর সংক্ষিপ্ত ভাবৰ্থ এই যে, মুমিনগণ বলে-(যুদ্ধের) কোন সূরা অবতীর্ণ হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় এবং তাতে জিহাদের বর্ণনা দেয়া হয় তখন রুগ্ন অন্তরবিশিষ্ট লোকেরা চীৎকার করে উঠে এবং ভ্রুকুঞ্চিত করে তোমার দিকে তাকায় এবং ঐ ব্যক্তির মত চক্ষু বন্ধ করে নেয় যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে অচৈতন্য হয়ে থাকে। তাদের জন্যে আফসোস!মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মক্কায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! কুফরীর অবস্থায় আমরা সম্মানিত ছিলাম, আর আজ ইসলামের অবস্থায় আমাদের লাঞ্ছিত মনে করা হচ্ছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমার উপর আল্লাহ পাকের এ নির্দেশই রয়েছে যে, আমি যেন ক্ষমা করে দেই। সাবধান কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো না।'অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর এখানে যখন জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন লোকেরা বিরত থাকে। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)ও এটা বর্ণনা করেছেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিল। তখন তারা আকাঙক্ষা করে যে, জিহাদও যদি ফরয করা হতো!অতঃপর যখন জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয় তখন দুর্বল ঈমানের লোকেরা মানুষকে ঐরূপ ভয় করতে লাগে যেমন আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা উচিত; বরং তার চেয়েও বেশী ভয় করতে থাকে এবং বলে-“হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের উপর জিহাদ কেন ফরয করলেন? স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে দুনিয়ায় সুখ ভোগ করতে দিলেন না কেন?' তখন তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, দুনিয়ার সুখ ভোগ খুবই অস্থায়ী এবং জান্নাতের তুলনায় খুবই নগণ্যও বটে। আর আখিরাত আল্লাহ ভীরুদের জন্য দুনিয়া হতে বহুগুণ উত্তম ও পবিত্র।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে উত্তরে বলা হয়-“আল্লাহভীরুদের পরিণাম সূচনা হতে বহুগুণে উত্তম। তোমাদেরকে তোমাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। তোমাদের একটি সৎ আমলও বিনষ্ট হবে না। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কারও উপর এক চুল পরিমাণ ও অত্যাচার হওয়া অসম্ভব। এ বাক্যে দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ উৎপাদন করে পরকালের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে জিহাদের উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত হাসান বসরী (রঃ)। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর সদয় হোন যে দুনিয়ায় এভাবেই থাকে। দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এ রকমই অবস্থা যেমন একজন নিদ্রিত ব্যক্তি স্বপ্নে নিজের কোন পছন্দনীয় জিনিস দেখতে পায় কিন্তু চক্ষু খোলা মাত্রই জানতে পারে যে, মূলে কিছুই ছিল না। হযরত আবু মুসহির (রঃ)-এর নিম্নের কবিতাংশটি কতই না সুন্দরঃ (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়ায় ঐ ব্যক্তির জন্য কোনই মঙ্গল নেই, যার জন্যে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কোনই অংশ নেই, যদিও দুনিয়া কতক লোককে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে, কিন্তু এটা খুব অল্পই সুখ এবং এর ধ্বংস খুব নিকটবর্তী।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর।' কোন মধ্যস্থতা কাউকেও এটা হতে বাঁচাতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এর উপর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল।'(৫৫:২৬) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) আর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী'। (৩:১৮৫) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষের জন্য চিরস্থায়ী জীবন নির্ধারণ করিনি।'(২১:৩৪) এগুলো বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ জিহাদ করুক আর নাই করুক একমাত্র আল্লাহ পাকের সত্তা ছাড়া সকলকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। প্রত্যেকের জন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং প্রত্যেকের মুত্যুর স্থানও নির্দিষ্ট রয়েছে।হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) স্বীয় মরণ শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেনঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি বহু বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতঃ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছি। তোমরা এসে দেখ যে, আমার শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যেখানে বলুম, বর্শা, তীর, তরবারী বা অন্য কোন অস্ত্রের চিহ্ন দেখা যায় না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আমার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা ছিল না বলে আজ তোমরা দেখ যে আমি গৃহ শয্যায় মৃত্যুবরণ করছি। সুতরাং কাপুরুষের দল আমার জীবন হতে যেন শিক্ষা গ্রহণ করে।আল্লাহ তা'আলা বলেন- মৃত্যুর থাবা হতে উচ্চতম, সুদৃঢ় এবং সংরক্ষিত দুর্গ ও অট্টালিকাও রক্ষা করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন যে শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আকাশের বুরুজ। কিন্তু এটা দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সুরক্ষিত প্রাসাদাসমূহ। অর্থাৎ মৃত্যু হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যে কোন সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন ওটা নির্ধারিত সময়েই আসবে, একটুও আগে পিছে হবে না। যুহাইর ইবনে আবি সালমা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণে পলায়ন করে তাকে মুত্যু পেয়ে বসবেই, যদিও সে সোপানের সাহায্যে আকাশ মার্গেও আরোহণ করে।(আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ তাশদীদ সহ বলেছেন এবং কেউ কেউ ‘তাশদীদ’ ছাড়াই বলেছেন। দুটোরই একই অর্থ। কিন্তু কারও কারও মতে আবার এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মুশাইয়্যাদাহ্ পড়লে অর্থ হবে সুদীর্ঘ এবং মুশায়াদাহ পড়লে অর্থ হবে চুন দ্বারা সুশোভিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাফসীর -ই-ইবনে জারীর এবং মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে একটি সুদীর্ঘ গল্প হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন যে, পূর্ব যুগে একটি স্ত্রীলোক গর্ভবতী ছিল। তার প্রসব বেদনা উঠে এবং সে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে। সে তখন তার পরিচারককে বলে, “যাও কোন জায়গা হতে আগুন নিয়ে এসো। পরিচারক বাইরে গিয়ে দেখে যে, দরজার উপর একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। লোকটি পরিচারককে জিজ্ঞেস করে, “স্ত্রী লোকটি কি সন্তান প্রসব করেছেন? সে বলে, ‘কন্যা সন্তান।লোকটি তখন বলে, ‘জেনে রেখ যে, এ মেয়েটি একশ জন পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করবে এবং এখন স্ত্রীলোকটির যে পরিচারক রয়েছে শেষে তার সাথে এ মেয়েটির বিয়ে হবে। আর একটি মাকড়সা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।এ কথা শুনে চাকরটি সেখান হতে ফিরে যায় এবং ঐ মেয়েটির পেট ফেড়ে দেয়। অতঃপর তাকে মৃতা মনে করে তথা হতে পলায়ন করে। এ অবস্থা দেখে তার মা তার পেট সেলাই করে দেয় এবং চিকিৎসা করতে আরম্ভ করে। অবশেষে মেয়েটির ক্ষতস্থান ভাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে এক যুগ অতিবাহিত হয়। মেয়েটি যৌবনে পদার্পণ করে। সে খুব সুন্দরী ছিল। তখন সে ব্যভিচারের কাজ শুরু করে দেয়। আর ওদিকে ঐ চাকরটি সমুদ্র পথে পালিয়ে গিয়ে কাজ-কাম আরম্ভ করে দেয় এবং বহু অর্থ উপার্জন করে। দীর্ঘদিন পর প্রচুর ধন-সম্পদসহ সে তার সেই গ্রামে ফিরে আসে। তারপর সে একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে ডেকে পাঠিয়ে বলেঃ আমি বিয়ে করতে চাই। এ গ্রামের যে খুব সুশ্রী মেয়ে তার সঙ্গে আমার বিয়ে দাও।' বৃদ্ধা তথা হতে বিদায় নেয়। ঐ গ্রামের ঐ মেয়েটি অপেক্ষা সুশ্রী মেয়ে আর একটিও ছিল না বলে সে তাকেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রস্তাব সমর্থন করে এবং বিয়ে হয়ে যায়। সে সব কিছু ত্যাগ করে লোকটির নিকট চলেও আসে। তার ঐ স্বামীকে জিজ্ঞেস করেঃ আচ্ছা বলুনতো, আপনি কে? কোথা হতে এসেছেন এবং কিভাবেই বা এখানে এসেছেন?' লোকটি তখন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করে বলেঃ এখানে আমি একটি স্ত্রীলোকের পরিচারক ছিলাম। তার মেয়ের সঙ্গে এরূপ কাজ করে এখান হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বহু বছর পরে এসেছি।' তখন মেয়েটি বলে, যে মেয়েটির পেট ফেড়ে আপনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই মেয়ে।' এ বলে সে তাকে তার ক্ষত স্থানের দাগও দেখিয়ে দেয়। তখন লোকটির বিশ্বাস হয়ে যায় এবং মেয়েটিকে বলে, তুমি যখন ঐ মেয়ে তখন তোমার সম্বন্ধে আমার আর একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, তুমি আমার পূর্বে একশ জন লোকের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেয়েটি তখন বলে, কথা তো ঠিকই, কিন্তু আমার গণনা মনে নেই। লোকটি বলে তোমার সম্বন্ধে আমার আরও একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, একটি মাকড়সা তোমার মুত্যুর কারণ হবে। যা হোক, তোমার প্রতি আমার খুবই ভালবাসা রয়েছে। কাজেই আমি তোমাকে একটি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় প্রাসাদ নির্মাণ করে দিচ্ছি। তুমি সেখানে অবস্থান করবে। তাহলে সেখানে কোন পোকা-মাকড়ও প্রবেশ করতে পারবে না। সে তাই করে। মেয়েটির জন্যে এরূপই একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং সে সেখানেই বাস করতে থাকে, কিছুদিন পর একদা তারা স্বামী-স্ত্রী ঐ প্রাসাদের মধ্যে বসে রয়েছে, এমন সময় হঠাৎ ছাদের উপর একটি মাকড়সা দেখা যায়। ঐ লোক তখন তার স্ত্রীকে বলে, “দেখ, আজ এখানে মাকড়সা দেখা গেছে। ওটা দেখা মাত্রই মেয়েটি বলে, আচ্ছা, এটা আমার প্রাণ নেয় নেবেই কিন্তু আমিই এর প্রাণ নেব।' অতঃপর সে চাকরকে বলেঃ মাকড়সাটিকে আমার নিকট জ্যান্ত ধরে আন। চারকটি ধরে আনে। সে তখন মাকড়সাটিকে স্বীয় পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দলিত করে। ফলে মাকড়সাটির প্রাণ বায়ু নির্গত হয়। ওর দেহের যে রস বের হয় ওরই এক আধ ফোটা তার বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ ও মাংসের মধ্যস্থলে প্রবেশ করে। ফলে বিষক্রিয়া আরম্ভ হয় এবং পা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়।হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর বিদ্রোহীগণ যখন আক্রমণ চালায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতঃপর তিনি নিম্নের ছন্দ দু’টি পাঠ করেনঃ (আরবী) হাযরের বাদশাহ সাতেরূনকে পারস্য সমাট সাবুর যুল আলতাফ যে হত্যা করেছিল সে ঘটনাটিও আমরা এখানে বর্ণনা করছি। ইবনে হিশাম বলেছেন যে, সাকূর যখন ইরাকে অবস্থান করছিল সে সময় তার এলাকার উপর সাতেরূন আক্রমণ চালিয়েছিল। এর প্রতিশোধ স্বরূপ সাকূর যখন তার উপর আক্রমণ চালায় তখন সে দুর্গের দরজা বন্ধ করে তাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দু’বছর পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় কিন্তু কোনক্রমেই দুর্গ বিজিত হয় না।একদা সাতেরূনের নাযীরা নাম্নী এক কন্যা তার পিতার দুর্গে টহল দিচ্ছিল। এমন সময় সায়ূরের উপর তার দৃষ্টি যায়। সে সময় সাকূর শাহী রেশমী পোশাক পরিহিত ছিল এবং তার মস্তকে ছিল রাজমুকুট। নাযীরা মনে মনে বলে-তোর সাথে আমার বিয়ে হলে কতইনা উত্তম হতো! সুতরাং গোপনে তার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে আরম্ভ করে এবং সাকূর ওয়াদা করে যে, যদি এ মেয়েটি তাকে দুর্গ দখল করিয়ে দিতে পারে তবে সে তাকে বিয়ে করবে।সাতেরূন ছিল বড়ই মদ্যপায়ী। সারারাত তার মদ্যের নেশাতেই কেটে যেতো। মেয়েটি এ সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে। রাতে স্বীয় পিতাকে মদমত্ত অবস্থায় দেখে চুপে চুপে তার শিয়র হতে দুর্গের দরজার চাবিটি বের করে নেয় এবং তার নির্ভরযোগ্য ক্রীতদাসের মাধ্যমে সানূরের নিকট পৌছিয়ে দেয়। সাবুর তখন ঐ চাবি দিয়ে দুর্গের দরজা খুলে দেয় এবং ভেতরে প্রবেশ করে সাধারণভাবে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়।অবশেষে দুর্গ তার দখলে এসে যায়। এও বলা হয়েছে যে, ঐ দুর্গে একটি যাদুযুক্ত জিনিস ছিল। ওটা ভাঙ্গতে না পারলে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব ছিল না। ঐ মেয়েটিই ওটা ভাঙ্গবার পদ্ধতি বলে দেয় যে, একটি সাদাকালো মিশ্রিত রঙের কবুতর এনে তার পা কোন কুমারী মেয়ের প্রথম ঋতুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করতে হবে, তারপর কবুতরটিকে ছেড়ে দিলেই ওটা উড়ে গিয়ে ঐ দুর্গের দেয়ালে বসবে। আর তেমনি যাদুযুক্ত জিনিসটি পড়ে যাবে এবং দুর্গের সিংহদ্বার খুলে যাবে।অতএব সাকূর তাই করে এবং দুর্গ জয় করতঃ সাতেরূনকে হত্যা করে। অতঃপর সমস্ত লোককে তরবারীর নীচে নিক্ষেপ করে এবং সারা শহর ধ্বংস। করে দেয়। তারপর সাতেরূনের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে স্বীয় রাজ্যে ফিরে আসে এবং তাকে বিয়ে করে নেয়। একদা রাত্রে মেয়েটি স্বীয় শয্যায় শুয়ে আছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। সে অস্থিরতা প্রকাশ করছে। তার এ অবস্থা দেখে সাবুর তাকে জিজ্ঞেস করেঃ ব্যাপার কি?' সে বলে, সম্ভবতঃ বিছানায় কিছু রয়েছে যে কারণে আমার ঘুমে ধরছে না। প্রদীপ জ্বালিয়ে বিছানায় অনুসন্ধান চালানো হলো। অবশেষে তৃণ জাতীয় গাছের ছোট একটি পাতা পাওয়া গেল।তার এ চরম বিলাসিতা দেখে সানূর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো যে, ছোট একটি পাতা বিছানায় থাকার কারণে তার ঘুম আসছে না! তাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার পিতার নিকট তোমার জন্যে কি কি থাকতো'? সে বললোঃ ‘আমার জন্যে থাকতো নরম রেশমের বিছানা এবং পাতলা নরম রেশমের পোশাক। আর আমি আহার করতাম পায়ের অস্থির মজ্জা এবং পান করতাম। খাটি সুরা। এ ব্যবস্থাই আমার আব্বা আমার জন্যে রেখেছিলেন। মেয়েটি এরূপ ছিল যে, বাহির হতে তার পায়ের গোছর গোড়ালির) মজ্জা পর্যন্তও দেখা যেতো। একথাগুলো সায়ূরের মনে অন্য এক উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং মেয়েটিকে বলেঃ ‘যে পিতা তোমাকে এভাবে লালন পালন করেছে, তুমি তোমার সে পিতার সাথে এ ব্যবহার করেছে যে, আমার দ্বারা তাকে হত্যা করিয়েছে এবং তার রাজ্যকে ছারখার করিয়েছে। কাজেই আমার সঙ্গেও যে তুমি এরূপ ব্যবহার করবে না তা আমি কিরূপে বিশ্বাস করতে পারি’? তৎক্ষণাৎ সে নির্দেশ দেয় যে, তার চুলকে ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া হোক। তাই করা হয়। ঘোড়া নাচতে লাফাতে আরম্ভ করে এবং এভাবে তাকে এ নশ্বর জগৎ হতে চির বিদায় গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহপাক বলেন-যদি তাদের উপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ যদি তারা খাদ্যশস্য, ফল, সন্তানাদি ইত্যাদি লাভ করে তবে তারা বলে- এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এসেছে। আর যদি তাদের উপর কোন অমঙ্গল নিপতিত হয় অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, মাল ও সন্তানের স্বল্পতা এবং ক্ষেত্র ও বাগানের ক্ষতি ইত্যাদি পৌছে যায় তখন তারা বলে-“হে নবী (সঃ)! এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ এটা নবী (সঃ)-এর অনুসরণ এবং মুসলমান হওয়ার কারণেই হয়েছে। ফিরাউনের অনুসারীরাও অমঙ্গলের বেলায় হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে কু-লক্ষণ বলে অভিহিত করতো। যেমন। কুরআন কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদের নিকট কোন মঙ্গল পৌছে তখন তারা বলে- এটা আমাদের জন্যই হয়েছে এবং যখন তাদের নিকট কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে কুলক্ষণে বলে থাকে।’(৭:১৩১)আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ কতক লোক এমন রয়েছে যারা এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে।'(২২:১১) অতএব এখানেও এ মুনাফিকরা যারা বাহ্যিক মুসলমান কিন্তু অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে তাদের নিকট যখন কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা ঝট করে বলে ফেলে যে, এ ক্ষতি ইসলাম গ্রহণের কারণেই হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ বৃষ্টিপাত হওয়া, গৃহপালিত পশুর আধিক্য হওয়া, ছেলেমেয়ে বেশী হওয়া এবং স্বচ্ছলতা আসা। এসব হলে তারা বলতো-“এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়েছে। আর যদি এর বিপরীত হতো তবে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কেই এ জন্যে দায়ী করতো এবং তাঁকে বলতো-এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ আমরা আমাদের বড়দের আনুগত্য ছেড়ে এ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করেছি বলেই আমরা এ বিপদে পড়েছি। তাই আল্লাহ পাক তাদের এ অপবিত্র কথা ও জঘন্য বিশ্বাসের খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন- সবই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। তার ফায়সালা ও ভাগ্যলিখন প্রত্যেক ভাল-মন্দ, ফাসিক, ফাজির, মুমিন এবং কাফির সবারই উপরেই জারী রয়েছে। ভাল ও মন্দ সবই তার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।অতঃপর তিনি তাদের সে উক্তি খণ্ডন করছেন যা তারা শুধুমাত্র সন্দেহ, অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং অত্যাচারের বশবর্তী হয়েই বলে থাকে। তিনি বলেনতাদের কি হয়েছে যে, কোন কথা বুঝবার যোগ্যতা তাদের মধ্য হতে লোপ পাচ্ছে? (আরবী) সম্পর্কে যে একটি গারীব হাদীস রয়েছে তারও এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মুসনাদ-ই-বাযে ' হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তাঁর দাদা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় কতগুলো লোককে সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) আগমন করেন। তাঁরা উচ্চেঃস্বরে কথা বলছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাঁরা দুজন বসে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “উচ্চৈঃস্বরে কিসের আলোচনা চলছিল?' এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেন যে, পুণ্য এবং মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং মন্দ ও অমঙ্গল আমাদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি বলছিলে’? হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি বলছিলাম যে, দু'টোই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এ তর্ক প্রথম প্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাইল (আঃ)-এর মধ্যেও হয়েছিল। হযরত মিকাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিল এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা তুমি (হযরত উমার রাঃ) বলছিলে। তাহলে আকাশবাসীদের মধ্যে যখন মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে তখন পৃথিবীবাসীদের মধ্যে এটা হওয়া তো স্বাভাবিক'।অতঃপর ইসরাফীল (আঃ)-এর উপর এর মীমাংসার ভার পড়ে যায়। তিনি মীমাংসা করেন যে, ভাল ও মন্দ দু'টোই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি তাঁদের দুজনকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আমার সিদ্ধান্ত শুনে নাও এবং স্মরণ রেখো আল্লাহ তাআলা যদি স্বীয় অবাধ্যাচরণ না চাইতেন তবে তিনি ইবলিশকে সৃষ্টি করতেন না।কিন্তু শায়খুল ইসলাম ইমাম তাকিয়ুদ্দীন আবূ আব্বাস হযরত ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মাও’ এবং যেসব মুহাদ্দিস হাদীস পরীক্ষা করে থাকেন তাঁরা সবাই একমত যে, এ হাদীসটি তৈরী করে নেয়া হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ অতঃপর এ সম্বোধন সাধারণ হয়ে গেছে, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সকলকেই সম্বোধন করে বলছেন- “তোমাদের নিকট যে কল্যাণ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ তাআলারই অনুগ্রহ, দয়া ও করুণা। আর তোমাদের উপর যে অমঙ্গল নিপতিত হয় তা তোমাদের স্বীয় কর্মেরই প্রতিফল।' যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের উপর যে বিপদ পৌছে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তারই কিছুটা প্রতিফল এবং তিনি তোমাদের অধিকাংশ পাপই ক্ষমা করে দেন। (৪২:৩০) এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার পাপের কারণে। অর্থাৎ কার্যেরই প্রতিফল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির শরীরের সামান্য ছাল উঠে যায় বা তার পদস্খলন ঘটে কিংবা তাকে কিছু কাজ করতে হয়, ফলে শরীর দিয়ে ঘাম বের হয়, ওটাও কোন না কোন পাপের কারণেই হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তা'আলা যে পাপগুলো দেখেও দেখেন না এবং ক্ষমা করে থাকেন সেগুলো তো অনেক রয়েছে।” এ মুরসাল হাদীসটির বিষয়বস্তু একটি মুত্তাসিল সহীহ হাদীসেও রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মুমিনকে যে দুঃখকষ্ট পৌছে, এমনকি তার পায়ে যে কাঁটা ফুটে সে কারণেও আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যে অমঙ্গল তোমার উপর নিপতিত হয় তার কারণ হচ্ছে তোমার পাপ। হ্যা, তবে ওটাও ভাগ্যে আল্লাহ তা'আলাই লিখেছেন।হযরত মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, তোমরা তকদীর সম্বন্ধে কি জিজ্ঞেস করছো? তোমাদের জন্যে কি সূরা-ই-নিসার (আরবী)-এ আয়াতটি যথেষ্ট নয়? আল্লাহর শপথ! মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পণ করা হয়নি বরং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাঁরই নিকট তারা ফিরে যাবে। এ উক্তিটি খুবই দৃঢ় ও মজবুত এবং এটা কাদরিয়্যাহ্ এবং জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়ের উক্তিকে চরমভাবে খণ্ডন করেছে। এ তর্ক-বিতর্কের জায়গা তাফসীর নয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে নবী (সঃ)! তোমার কাজ হচ্ছে শুধু শরীয়তকে প্রচার করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কাজকে, তার আদেশ ও নিষেধকে মানুষের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। অনুরূপভাবে তাঁরই সাক্ষ্য এ ব্যাপারেও যথেষ্ট যে, তুমি প্রচারকার্য চালিয়েছো। তোমার ও তাদের মধ্যে যা কিছু হচ্ছে তিনি সব কিছুই দেখছেন। তারা তোমার সাথে যে অবাধ্যাচরণ ও অহংকার করছে তাও তিনি দেখতে রয়েছেন।

আন-নিসা 4:80

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ হচ্ছে- আমার বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর যে অনুগত প্রকারান্তরে সে আমারই অনুগত। তার যে অবাধ্য সে আমারই অবাধ্য। কেননা, আমরা নবী (সঃ) নিজের পক্ষ হতে কিছুই বলে না। আমার পক্ষ হতে তার উপর যে অহী করা হয় তাই সে বলে থাকে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমাকে যে মানে সে আল্লাহূকে মানে এবং যে আমাকে অমান্য করে সে আল্লাহকে অমান্য করে। আর যে আমীরের অনুগত হয় সে আমারই অনুগত হয় এবং যে আমীরের অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, হে নবী (সঃ)! তার পাপ তোমার উপর নেই। তোমার কাজ তো শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া। ভাগ্যবান ব্যক্তি মেনে নেবে এবং মুক্তি ও পুণ্য লাভ করবে। তবে তাদের ভাল কাজের পুণ্য তুমিও লাভ করবে। কেননা, তার পথপ্রদর্শক তো তুমিই এবং তার সকার্যের শিক্ষকও তুমিই। আর যে ব্যক্তি মানবে না সে হতভাগা। সে নিজের ক্ষতি নিজেই করবে।তাদের পাপ তোমার উপর হবে না। কেননা, তুমি বুঝাতে ও সত্যপথ প্রদর্শনে কোন প্রকার ত্রুটি করনি। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত ব্যক্তি সুপথ প্রাপ্ত এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্য ব্যক্তি নিজের জীবনেরই ক্ষতি সাধনকারী।এরপর মুনাফিকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা বাহ্যিকভাবে তো আনুগত্য স্বীকার করছে এবং আনুগত্য প্রকাশ করছে কিন্তু যখনই দৃষ্টির অন্তরালে চলে যাচ্ছে, এখান হতে চলে গিয়ে নিজের জায়গায় পৌছে তখন এমন হয়ে যায় যে, তাদের রূপ যেন এরূপ ছিলই না। এখানে যা কিছু বলেছিল, রাত্রে গোপনে গোপনে তার সম্পূর্ণ বিপরীত পরামর্শ করতে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা তাদের এ গোপন ষড়যন্ত্র সবই জানেন। তাঁর নির্ধারিত ফেরেশতাগণ তাদের এ কার্যাবলী এবং এসব কথা তাঁর নির্দেশক্রমে তাদের আমলনামায় লিখে নিচ্ছেন।সুতরাং তাদেরকে ধমক দেয়া হচ্ছে যে, তাদের এ চাল-চলন কতই না জঘন্য। তোমাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিকট তোমাদের ঐ সব কাজ গুপ্ত নেই। তোমরা তোমাদের ভেতর ও বাহির যখন এক রাখতে পারছো না তখন তোমাদের ভেতর ও বাহিরের সমস্ত সংবাদ যিনি রাখেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের এ নিকৃষ্ট কাজের জন্যে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের স্বভাব অন্য শব্দে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন (আরবী) অর্থাৎ তারা বলে- আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি ও। আনুগত্য স্বীকার করেছি।'(২৪:৪৭)।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিচ্ছেন- তুমি তাদের প্রতি বিমুখ হও; ধৈর্য অবলম্বন কর, তাদের ক্ষমা করে দাও এবং তাদের অবস্থা তাদের নাম করে করে তাদেরকে বলো না। তুমি তাদের হতে সম্পূর্ণরূপে নির্ভয় থাকো। আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর কর। যে ব্যক্তি তার উপর নির্ভর করে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় আল্লাহ তাআলা তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান।

আন-নিসা 4:81

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ হচ্ছে- আমার বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর যে অনুগত প্রকারান্তরে সে আমারই অনুগত। তার যে অবাধ্য সে আমারই অবাধ্য। কেননা, আমরা নবী (সঃ) নিজের পক্ষ হতে কিছুই বলে না। আমার পক্ষ হতে তার উপর যে অহী করা হয় তাই সে বলে থাকে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমাকে যে মানে সে আল্লাহূকে মানে এবং যে আমাকে অমান্য করে সে আল্লাহকে অমান্য করে। আর যে আমীরের অনুগত হয় সে আমারই অনুগত হয় এবং যে আমীরের অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, হে নবী (সঃ)! তার পাপ তোমার উপর নেই। তোমার কাজ তো শুধুমাত্র পৌছিয়ে দেয়া। ভাগ্যবান ব্যক্তি মেনে নেবে এবং মুক্তি ও পুণ্য লাভ করবে। তবে তাদের ভাল কাজের পুণ্য তুমিও লাভ করবে। কেননা, তার পথপ্রদর্শক তো তুমিই এবং তার সকার্যের শিক্ষকও তুমিই। আর যে ব্যক্তি মানবে না সে হতভাগা। সে নিজের ক্ষতি নিজেই করবে।তাদের পাপ তোমার উপর হবে না। কেননা, তুমি বুঝাতে ও সত্যপথ প্রদর্শনে কোন প্রকার ত্রুটি করনি। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত ব্যক্তি সুপথ প্রাপ্ত এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অবাধ্য ব্যক্তি নিজের জীবনেরই ক্ষতি সাধনকারী।এরপর মুনাফিকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা বাহ্যিকভাবে তো আনুগত্য স্বীকার করছে এবং আনুগত্য প্রকাশ করছে কিন্তু যখনই দৃষ্টির অন্তরালে চলে যাচ্ছে, এখান হতে চলে গিয়ে নিজের জায়গায় পৌছে তখন এমন হয়ে যায় যে, তাদের রূপ যেন এরূপ ছিলই না। এখানে যা কিছু বলেছিল, রাত্রে গোপনে গোপনে তার সম্পূর্ণ বিপরীত পরামর্শ করতে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা তাদের এ গোপন ষড়যন্ত্র সবই জানেন। তাঁর নির্ধারিত ফেরেশতাগণ তাদের এ কার্যাবলী এবং এসব কথা তাঁর নির্দেশক্রমে তাদের আমলনামায় লিখে নিচ্ছেন।সুতরাং তাদেরকে ধমক দেয়া হচ্ছে যে, তাদের এ চাল-চলন কতই না জঘন্য। তোমাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিকট তোমাদের ঐ সব কাজ গুপ্ত নেই। তোমরা তোমাদের ভেতর ও বাহির যখন এক রাখতে পারছো না তখন তোমাদের ভেতর ও বাহিরের সমস্ত সংবাদ যিনি রাখেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের এ নিকৃষ্ট কাজের জন্যে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের স্বভাব অন্য শব্দে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন (আরবী) অর্থাৎ তারা বলে- আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি ও। আনুগত্য স্বীকার করেছি।'(২৪:৪৭)।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে নির্দেশ দিচ্ছেন- তুমি তাদের প্রতি বিমুখ হও; ধৈর্য অবলম্বন কর, তাদের ক্ষমা করে দাও এবং তাদের অবস্থা তাদের নাম করে করে তাদেরকে বলো না। তুমি তাদের হতে সম্পূর্ণরূপে নির্ভয় থাকো। আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর কর। যে ব্যক্তি তার উপর নির্ভর করে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় আল্লাহ তাআলা তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান।

আন-নিসা 4:82

৮২-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে,তারা যেন কুরআন কারীমকে চিন্তা ও গবেষণা সহকারে পাঠ করে। ওটা হতে যেন তারা বিমুখ না হয়, অবজ্ঞা না করে। ওর মজবুত রচনা, নৈপুণ্য পূর্ণ নির্দেশাবলী এবং বাকচাতুর্য সম্বন্ধে যেন চিন্তা করে। সাথে সাথে এ সংবাদও দিচ্ছেন যে, এ পবিত্র গ্রন্থটি মতভেদ ও মতানৈক্য হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। কেননা, এটা মহা বিজ্ঞানময় ও চরম প্রশংসিত আল্লাহরই বাণী। তিনি নিজে সত্য এবং দ্রুপ তাঁর কালামও সম্পূর্ণ সত্য। যেমন অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ রয়েছে? (৪৭:২৪)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-মুশরিক ও মুনাফিকদের ধারণা হিসেবে এ কুরআন যদি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত না হতো এবং কারও মনগড়া কথা হতো তবে অবশ্যই মানুষ ওর মধ্যে বহু মতভেদ লক্ষ্য করতো। অর্থাৎ মানুষের কথা বৈপরীত্যশূন্য হওয়া অসম্ভব। এটা অবশ্যই হতো যে, এখানে কিছু পেতো ওখানে কিছু পেতো, হয়তো এক জায়গায় ওরই বিপরীত কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থের এসব ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়া এরই পরিষ্কার দলীল যে, এটা আল্লাহ্ পাকেরই বাণী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞানে পরিপক্ক আলেমদের কথা বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলে, আমরা এগুলোর উপর ঈমান এনেছি, এগুলো সবই আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আগত। অর্থাৎ স্পষ্ট আয়তি ও অস্পষ্ট আয়াত সবই সত্য। এ জন্যই তারা অস্পষ্ট আয়াতগুলোকে স্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে তারা স্পষ্ট আয়াতগুলো অস্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা প্রথম প্রকারের লোকদের প্রশংসা করেছেন এবং দ্বিতীয় প্রকারের লোকদের নিন্দে করেছেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, তার দাদা বলেনঃ আমি এবং আমার ভাই এমন এক সমাবেশে বসেছিলাম যা আমার নিকট এত প্রিয় ছিল যে, আমি একটি লাল বর্ণের উট পেলেও এমজলিসের তুলনায় ওটাকে নগণ্য মনে করতাম। আমরা এসে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরজার উপর কয়েকজন মর্যাদাবান সাহাবী (রাঃ) দাড়িয়ে রয়েছেন। আমরা ভদ্রতা রক্ষা করে এক দিকে বসে পড়ি। তথায় কুরআন মাজীদের কোন আয়াত নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং তাদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। অবশেষে কথা বেড়ে যায় এবং তারা পরস্পর উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে কুপিত অবস্থায় বাইরে আগমন করেন এবং তার চেহারা মুবারক রক্ত বর্ণ ধারণ করেছিল। তাদের উপর মাটি নিক্ষেপ করতঃ বলেনঃ “তোমরা নীরবতা অবলম্বন কর। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, তারা তাদের নবীদের উপর মতানৈক্য আনয়ন করেছিল এবং আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াতকে অপর আয়াতের বিপরীত বলেছিল। জেনে রেখো যে, কুরআন মাজীদের কোন আয়াত অপর আয়াতের সত্যতা প্রতিপাদন করে। তোমরা যেটা জান তার উপর আমল কর এবং যেটা জাননা সেটা যারা জানে তাদের উপর ছেড়ে দাও।'অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবা-ই-কিরাম তাকদীর সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ যদি আমি এ সমাবেশে না বসতাম!' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি দুপুরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারের উপস্থিত হই। আমি বসে রয়েছি এমন সময় দু'টি লোকের মধ্যে একটি আয়াতের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং কণ্ঠস্বর উচ্চ হতে থাকে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ধ্বংসের একমাত্র কারণই ছিল আল্লাহ তা'আলার কিতাবে তাদের মতভেদ সৃষ্টি করা। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)এরপর ঐ তাড়াহুড়োকারীদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে যারা কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের সংবাদ পাওয়া মাত্রই সত্যাসত্য যাচাই না করেই এদিক হতে ওদিক পৃর্যন্ত পৌঁছিয়ে থাকে। অথচ ওটা সম্পূর্ণ ভুল সংবাদ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফের ভূমিকায় হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মানুষকে মিথ্যাবাদী বলার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বর্ণনা করে।' সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ অর্থাৎ ‘লোকেরা যেসব কথা বলে থাকে এরূপ বহু কথা সত্যাসত্য যাচাই ও চিন্তা ভাবনা না করেই যে ব্যক্তি বর্ণনা করে থাকে। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কথা বর্ণনা করে এবং সে ধারণা করে যে, ওটা যথার্থ নয় সেও মিথ্যাবাদীদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী।' এখানে আমরা হযরত উমার (রাঃ)-এর হাদীসটি বর্ণনা করছি যার বিশুদ্ধতার উপর মতৈক্য রয়েছে। যখন তিনি শুনেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন। তখন তিনি স্বীয় বাড়ী হতে বের হয়ে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন। এখানেও তিনি জনগণকে একথাই বলতে শুনেন। সুতরাং স্বয়ং তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কি আপনার সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন?' তিনি বলেনঃ না।' তখন তিনি-‘আল্লাহু আকবার পাঠ করেন। হাদীসটি দীর্ঘতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, অতঃপর তিনি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন্নঃ ‘হে জনমণ্ডলী! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পত্নীগণকে তালাক দেননি।'সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) এ ব্যাপারে তত্ত্ব অনুসন্ধান করেছেন। সুতরাং তিনি তত্বানুসন্ধিৎসুগণের মধ্যে একজন। কোন জিনিসকে ওর ঠিকানা ও আগার হতে বের করাকে (আরবী) বলা হয়। যখন তোক খনি খনন করে ওর মধ্যে হতে কোন জিনিস বের করে তখন আরববাসীরা (আরবী) এ কথা বলে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তবে অল্প সংখ্যক ব্যতীত অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন ব্যতীত তোমরা শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে।' এরূপ স্থলে এ অর্থও হয় যে, তোমরা সবাই শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে। আরবী কবিতাতেও এ অর্থের ব্যবহার দেখা যায়।

আন-নিসা 4:83

৮২-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে,তারা যেন কুরআন কারীমকে চিন্তা ও গবেষণা সহকারে পাঠ করে। ওটা হতে যেন তারা বিমুখ না হয়, অবজ্ঞা না করে। ওর মজবুত রচনা, নৈপুণ্য পূর্ণ নির্দেশাবলী এবং বাকচাতুর্য সম্বন্ধে যেন চিন্তা করে। সাথে সাথে এ সংবাদও দিচ্ছেন যে, এ পবিত্র গ্রন্থটি মতভেদ ও মতানৈক্য হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। কেননা, এটা মহা বিজ্ঞানময় ও চরম প্রশংসিত আল্লাহরই বাণী। তিনি নিজে সত্য এবং দ্রুপ তাঁর কালামও সম্পূর্ণ সত্য। যেমন অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ রয়েছে? (৪৭:২৪)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-মুশরিক ও মুনাফিকদের ধারণা হিসেবে এ কুরআন যদি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত না হতো এবং কারও মনগড়া কথা হতো তবে অবশ্যই মানুষ ওর মধ্যে বহু মতভেদ লক্ষ্য করতো। অর্থাৎ মানুষের কথা বৈপরীত্যশূন্য হওয়া অসম্ভব। এটা অবশ্যই হতো যে, এখানে কিছু পেতো ওখানে কিছু পেতো, হয়তো এক জায়গায় ওরই বিপরীত কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থের এসব ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়া এরই পরিষ্কার দলীল যে, এটা আল্লাহ্ পাকেরই বাণী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞানে পরিপক্ক আলেমদের কথা বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলে, আমরা এগুলোর উপর ঈমান এনেছি, এগুলো সবই আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আগত। অর্থাৎ স্পষ্ট আয়তি ও অস্পষ্ট আয়াত সবই সত্য। এ জন্যই তারা অস্পষ্ট আয়াতগুলোকে স্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে তারা স্পষ্ট আয়াতগুলো অস্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা প্রথম প্রকারের লোকদের প্রশংসা করেছেন এবং দ্বিতীয় প্রকারের লোকদের নিন্দে করেছেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, তার দাদা বলেনঃ আমি এবং আমার ভাই এমন এক সমাবেশে বসেছিলাম যা আমার নিকট এত প্রিয় ছিল যে, আমি একটি লাল বর্ণের উট পেলেও এমজলিসের তুলনায় ওটাকে নগণ্য মনে করতাম। আমরা এসে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরজার উপর কয়েকজন মর্যাদাবান সাহাবী (রাঃ) দাড়িয়ে রয়েছেন। আমরা ভদ্রতা রক্ষা করে এক দিকে বসে পড়ি। তথায় কুরআন মাজীদের কোন আয়াত নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং তাদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। অবশেষে কথা বেড়ে যায় এবং তারা পরস্পর উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে কুপিত অবস্থায় বাইরে আগমন করেন এবং তার চেহারা মুবারক রক্ত বর্ণ ধারণ করেছিল। তাদের উপর মাটি নিক্ষেপ করতঃ বলেনঃ “তোমরা নীরবতা অবলম্বন কর। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, তারা তাদের নবীদের উপর মতানৈক্য আনয়ন করেছিল এবং আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াতকে অপর আয়াতের বিপরীত বলেছিল। জেনে রেখো যে, কুরআন মাজীদের কোন আয়াত অপর আয়াতের সত্যতা প্রতিপাদন করে। তোমরা যেটা জান তার উপর আমল কর এবং যেটা জাননা সেটা যারা জানে তাদের উপর ছেড়ে দাও।'অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবা-ই-কিরাম তাকদীর সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ যদি আমি এ সমাবেশে না বসতাম!' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি দুপুরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারের উপস্থিত হই। আমি বসে রয়েছি এমন সময় দু'টি লোকের মধ্যে একটি আয়াতের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং কণ্ঠস্বর উচ্চ হতে থাকে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ধ্বংসের একমাত্র কারণই ছিল আল্লাহ তা'আলার কিতাবে তাদের মতভেদ সৃষ্টি করা। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)এরপর ঐ তাড়াহুড়োকারীদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে যারা কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের সংবাদ পাওয়া মাত্রই সত্যাসত্য যাচাই না করেই এদিক হতে ওদিক পৃর্যন্ত পৌঁছিয়ে থাকে। অথচ ওটা সম্পূর্ণ ভুল সংবাদ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফের ভূমিকায় হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মানুষকে মিথ্যাবাদী বলার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বর্ণনা করে।' সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ অর্থাৎ ‘লোকেরা যেসব কথা বলে থাকে এরূপ বহু কথা সত্যাসত্য যাচাই ও চিন্তা ভাবনা না করেই যে ব্যক্তি বর্ণনা করে থাকে। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কথা বর্ণনা করে এবং সে ধারণা করে যে, ওটা যথার্থ নয় সেও মিথ্যাবাদীদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী।' এখানে আমরা হযরত উমার (রাঃ)-এর হাদীসটি বর্ণনা করছি যার বিশুদ্ধতার উপর মতৈক্য রয়েছে। যখন তিনি শুনেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন। তখন তিনি স্বীয় বাড়ী হতে বের হয়ে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন। এখানেও তিনি জনগণকে একথাই বলতে শুনেন। সুতরাং স্বয়ং তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কি আপনার সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন?' তিনি বলেনঃ না।' তখন তিনি-‘আল্লাহু আকবার পাঠ করেন। হাদীসটি দীর্ঘতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, অতঃপর তিনি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন্নঃ ‘হে জনমণ্ডলী! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পত্নীগণকে তালাক দেননি।'সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) এ ব্যাপারে তত্ত্ব অনুসন্ধান করেছেন। সুতরাং তিনি তত্বানুসন্ধিৎসুগণের মধ্যে একজন। কোন জিনিসকে ওর ঠিকানা ও আগার হতে বের করাকে (আরবী) বলা হয়। যখন তোক খনি খনন করে ওর মধ্যে হতে কোন জিনিস বের করে তখন আরববাসীরা (আরবী) এ কথা বলে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তবে অল্প সংখ্যক ব্যতীত অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন ব্যতীত তোমরা শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে।' এরূপ স্থলে এ অর্থও হয় যে, তোমরা সবাই শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে। আরবী কবিতাতেও এ অর্থের ব্যবহার দেখা যায়।

আন-নিসা 4:84

৮৪-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে তিনি যেন, নিজেই আল্লাহ তা'আলার পথে যুদ্ধ করেন, যদিও কেউ তার সাথে যোগ না দেয়। হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ যদি কোন মুসলমান একাই থাকে এবং শত্রুরা একশ জন হয় তবে কি মুসলমানটি তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।তখন হযরত আবু ইসহাক (রঃ) বলেনঃ কিন্তু কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত দ্বারা এর নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়ো না।' (২:১৯৫) হযরত বারা’ (রাঃ) তখন বলেনঃ শুন, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর; তোমার নিজের ছাড়া তোমার উপর অন্য কোন ভার অর্পণ করা হয়নি এবং মুমিনদেরকে উদ্বুদ্ধ কর'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে এটুকু বেশীও রয়েছে, মুশরিকদের উপর একাই আক্রমণকারী নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপকারী নয়, বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে খরচ করা হতে নিজের হাতকে বাধাদানকারী। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন সুতরাং তোমরাও জিহাদ কর।” এ হাদীসটি দুর্বল। এরপর বলা হচ্ছে-মুমিনদের মধ্যে সাহস জাগিয়ে তোল এবং তাদেরকে জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যুহ ঠিক করতে করতে বলেনঃ “তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে দাঁড়িয়ে যাও যার প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সমান।” জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ করার বহু হাদীস রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামায প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং রমযানের রোযা রাখে, আল্লাহর উপর (তার) এ হক রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, সে আল্লাহর পথে হিজরতই করুক বা স্বীয় জন্মভূমিতে বসেই থাকুক।' তখন সাহাবীগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমরা লোকদেরকে কি এ শুভ সংবাদ শুনিয়ে দেবো না?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, জান্নাতে একশটি সোপান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এক একটি সোপানের উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। এ সোপানগুলো আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে। অতএব তোমরা জান্নাত যাঞা করলে ফিরদাউস জান্নাত যাঞা করো। ওটাই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওর উপরই রহমানের আরশ রয়েছে এবং ওটা হতেই জান্নাতের নদীগুলো প্রবাহিত হয়।সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু সাঈদ! যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রভুরূপে, ইসলামকে ধর্মরূপে এবং মুহাম্মদ (সঃ)-কে রাসূল ও নবীরূপে মেনে নিতে সম্মত হয়েছে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব। এতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বিস্মিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর পুনরাবৃত্তি করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ওটা বর্ণনা করে বলেনঃ “আর একটি আমল রয়েছে যার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার দরজা একশগুণ উঁচু করে দেন। এক দরজা হতে অন্য দরজার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ আমলটি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যখন তুমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে তখন মুসলমানেরাও তোমার শিক্ষার কারণে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সঙ্গেই থাকবে। সত্বরই আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সংগ্রাম প্রতিরোধ করবেন, তারা সাহস হারিয়ে ফেলবে।কাজেই তারা তোমাদের মোকাবিলায় আসতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সংগ্রামে সুদৃঢ় এবং তিনি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দানকারী। তিনি এর উপর সক্ষম যে, দুনিয়াতেও তাদেরকে পরাজিত করবেন ও শাস্তি দেবেন এবং অনুরূপভাবে আখিরাতেও তাঁরই হাতে ক্ষমতা থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে স্বয়ং তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারেন কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরস্পর পরীক্ষা করছেন। (৪৭:৪)এরপর বলা হচ্ছে- যে কেউ উত্তম সুপারিশ করবে সে ওটা হতে অংশপ্রাপ্ত হবে এবং যে কেউ নিকৃষ্ট সুপারিশ করবে সেও ওটা হতে অংশ পাবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে। আল্লাহ যা চাইবেন স্বীয় নবী (সঃ)-এর ভাষায় তা জারী করবেন।' এ আয়াতটি একে অপরের সুপারিশ করার ব্যপারে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলার এত দয়ালু যে, শুধু সুপারিশ করলেই প্রতিদান পাওয়া যাবে। সে সুপারিশে কাজ হোক আর নাই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের রক্ষক এবং প্রত্যেক জিনিসের উপর বিদ্যমান। তিনি প্রত্যেকের হিসেব গ্রহণকারী। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। প্রত্যেকের তিনি আহার দাতা এবং প্রত্যেক মানুষের কার্যাবলীর পরিমাণ গ্রহণকারী।এরপর বলা হচ্ছে-‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে কেউ সালাম করে, তখন তোমরা তার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বাক্যে তার সালামের উত্তর দাও, অথবা তদ্রুপ শব্দই বলে দাও।' সুতরাং তার অপেক্ষা উত্তম শব্দে উত্তর দেয়া মুসতাহাব এবং তার অনুরূপ শব্দে উত্তর দেয়া ফরয। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সালামান ফারেসী (রাঃ) বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলেঃ। উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবী) অতঃপর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) আবার আর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তখন তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) লোকটি তখন বলেঃ ‘হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনার উপর আমার বাপ-মা কুরবান হোক, অমুক অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট এসে সালাম করলে আপনি তাদেরকে কিছু অতিরিক্ত শব্দের দ্বারা উত্তর প্রদান করলেন। কিন্তু আমাকে তো সেভাবে উত্তর দিলেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার জন্যে কিছুই অবশিষ্ট রাখনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যখন তোমাদের উপর সালাম করা হয় তখন তোমরা তার অপেক্ষা উত্তম বাক্যে উত্তর দাও বা ওটাই ফিরিয়ে দাও।” এ জন্যেই আমি ঐ শব্দগুলোই ফিরিয়ে দিয়েছি।' এ বর্ণনাটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমেও এরূপই মুআল্লাক রূপে বর্ণিত আছে। আবূ বকর ইবনে মিরদুওয়াইও এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি এটা মুসনাদে দেখিনি। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, সালামের বাক্য (আরবী) -এ শব্দগুলোর চেয়ে বেশী নেই। যদি বেশী থাকতো তবে নবী (সঃ) অবশ্যই এ শেষের সাহাবীর সালামের উত্তরে ওটা বলতেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হ্যরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়ে বলেনঃ সে দশটি নেকী পেল; দ্বিতীয় একজন এসে (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে বিশটি পুণ্য পেলো। তৃতীয় একজন এসে বলেঃ (আরবী) তিনি বলেনঃ “সে ত্রিশটি পুণ্য লাভ করলো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের মধ্যে যে কেউ সালাম দেবে তাকে উত্তর দিতে হবে যদিও সে মাজুসীও হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সালামের উত্তর উত্তমরূপে দেয়ার বিধান হচ্ছে মুসলমানদের জন্যে এবং ওটাকেই ফিরিয়ে দেয়ার বিধান হচ্ছে যিম্মীদের জন্যে। কিন্তু এ তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তার বিষয় রয়েছে। যেমন উপরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তার সালামের চেয়ে উত্তম উত্তর দেবে এবং যদি মুসলমান সালামের সমস্ত শব্দই বলে দেয় তবে উত্তরদাতাকে ওটাই ফিরিয়ে দিতে হবে।' যিম্মীদেরকে নিজে সালাম দেয়া ঠিক নয়। তবে সে যদি সালাম দেয় হবে তাকে তার শব্দেই উত্তর দিতে হবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন ইয়াহূদী সালাম করে তখন খেয়াল রেখো, কেননা, তাদের কেউ (আরবী) বলে থাকে, তখন তোমরা (আরবী) বলবে।'সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানকে তোমরা প্রথমে সালাম করো না। পথে যদি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে পথের সংকীর্ণতার দিকে যেতে বাধ্য কর।'ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সালাম দেয়া নফল এবং সালামের উত্তর দেয়া ফরয। উলামা-ই-কিরামের উক্তিও এটাই। সুতরাং কেউ যদি উত্তর না দেয় তবে সে পাপী হবে। কেননা, সালামের উত্তর দেয়া হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ।সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা স্থাপন না করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলে দেবো না যা করলে তোমাদের পরস্পরের ভালবাসা স্থাপিত হবে? তা হচ্ছে এই যে, তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় তাওহীদের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ইবাদতের যোগ্য যে তিনি একাই তা প্রকাশ করছেন। শপথও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্যেই দ্বিতীয় বাক্যকে দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে যা কসমের জওয়াবে এসে থাকে। অতএব (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তিটি হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) যে তিনি পূর্বের ও পরের সমস্ত লোককে হাশরের মাঠে একত্রিত করবেন এবং সকলকেই তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। আর কথায় আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে? অর্থাৎ কেউই নেই। তাঁর সংবাদ, তাঁর অঙ্গীকার এবং তার শাস্তির ভয় প্রদর্শন সবই সত্য। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া পালনকর্তা কেউ নেই।