Tafseer ibn Kathir — আন-নিসা 4:85 – আন-নিসা 4:122
Contents
- আন-নিসা 4:85
- আন-নিসা 4:86
- আন-নিসা 4:87
- আন-নিসা 4:88
- আন-নিসা 4:89
- আন-নিসা 4:90
- আন-নিসা 4:91
- আন-নিসা 4:92
- আন-নিসা 4:93
- আন-নিসা 4:94
- আন-নিসা 4:95
- আন-নিসা 4:96
- আন-নিসা 4:97
- আন-নিসা 4:98
- আন-নিসা 4:99
- আন-নিসা 4:100
- আন-নিসা 4:101
- আন-নিসা 4:102
- আন-নিসা 4:103
- আন-নিসা 4:104
- আন-নিসা 4:105
- আন-নিসা 4:106
- আন-নিসা 4:107
- আন-নিসা 4:108
- আন-নিসা 4:109
- আন-নিসা 4:110
- আন-নিসা 4:111
- আন-নিসা 4:112
- আন-নিসা 4:113
- আন-নিসা 4:114
- আন-নিসা 4:115
- আন-নিসা 4:116
- আন-নিসা 4:117
- আন-নিসা 4:118
- আন-নিসা 4:119
- আন-নিসা 4:120
- আন-নিসা 4:121
- আন-নিসা 4:122
আন-নিসা 4:85
৮৪-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে তিনি যেন, নিজেই আল্লাহ তা'আলার পথে যুদ্ধ করেন, যদিও কেউ তার সাথে যোগ না দেয়। হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ যদি কোন মুসলমান একাই থাকে এবং শত্রুরা একশ জন হয় তবে কি মুসলমানটি তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।তখন হযরত আবু ইসহাক (রঃ) বলেনঃ কিন্তু কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত দ্বারা এর নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়ো না।' (২:১৯৫) হযরত বারা’ (রাঃ) তখন বলেনঃ শুন, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর; তোমার নিজের ছাড়া তোমার উপর অন্য কোন ভার অর্পণ করা হয়নি এবং মুমিনদেরকে উদ্বুদ্ধ কর'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে এটুকু বেশীও রয়েছে, মুশরিকদের উপর একাই আক্রমণকারী নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপকারী নয়, বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে খরচ করা হতে নিজের হাতকে বাধাদানকারী। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন সুতরাং তোমরাও জিহাদ কর।” এ হাদীসটি দুর্বল। এরপর বলা হচ্ছে-মুমিনদের মধ্যে সাহস জাগিয়ে তোল এবং তাদেরকে জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যুহ ঠিক করতে করতে বলেনঃ “তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে দাঁড়িয়ে যাও যার প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সমান।” জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ করার বহু হাদীস রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামায প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং রমযানের রোযা রাখে, আল্লাহর উপর (তার) এ হক রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, সে আল্লাহর পথে হিজরতই করুক বা স্বীয় জন্মভূমিতে বসেই থাকুক।' তখন সাহাবীগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমরা লোকদেরকে কি এ শুভ সংবাদ শুনিয়ে দেবো না?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, জান্নাতে একশটি সোপান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এক একটি সোপানের উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। এ সোপানগুলো আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে। অতএব তোমরা জান্নাত যাঞা করলে ফিরদাউস জান্নাত যাঞা করো। ওটাই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওর উপরই রহমানের আরশ রয়েছে এবং ওটা হতেই জান্নাতের নদীগুলো প্রবাহিত হয়।সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু সাঈদ! যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রভুরূপে, ইসলামকে ধর্মরূপে এবং মুহাম্মদ (সঃ)-কে রাসূল ও নবীরূপে মেনে নিতে সম্মত হয়েছে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব। এতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বিস্মিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর পুনরাবৃত্তি করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ওটা বর্ণনা করে বলেনঃ “আর একটি আমল রয়েছে যার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার দরজা একশগুণ উঁচু করে দেন। এক দরজা হতে অন্য দরজার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ আমলটি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যখন তুমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে তখন মুসলমানেরাও তোমার শিক্ষার কারণে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সঙ্গেই থাকবে। সত্বরই আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সংগ্রাম প্রতিরোধ করবেন, তারা সাহস হারিয়ে ফেলবে।কাজেই তারা তোমাদের মোকাবিলায় আসতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সংগ্রামে সুদৃঢ় এবং তিনি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দানকারী। তিনি এর উপর সক্ষম যে, দুনিয়াতেও তাদেরকে পরাজিত করবেন ও শাস্তি দেবেন এবং অনুরূপভাবে আখিরাতেও তাঁরই হাতে ক্ষমতা থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে স্বয়ং তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারেন কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরস্পর পরীক্ষা করছেন। (৪৭:৪)এরপর বলা হচ্ছে- যে কেউ উত্তম সুপারিশ করবে সে ওটা হতে অংশপ্রাপ্ত হবে এবং যে কেউ নিকৃষ্ট সুপারিশ করবে সেও ওটা হতে অংশ পাবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে। আল্লাহ যা চাইবেন স্বীয় নবী (সঃ)-এর ভাষায় তা জারী করবেন।' এ আয়াতটি একে অপরের সুপারিশ করার ব্যপারে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলার এত দয়ালু যে, শুধু সুপারিশ করলেই প্রতিদান পাওয়া যাবে। সে সুপারিশে কাজ হোক আর নাই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের রক্ষক এবং প্রত্যেক জিনিসের উপর বিদ্যমান। তিনি প্রত্যেকের হিসেব গ্রহণকারী। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। প্রত্যেকের তিনি আহার দাতা এবং প্রত্যেক মানুষের কার্যাবলীর পরিমাণ গ্রহণকারী।এরপর বলা হচ্ছে-‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে কেউ সালাম করে, তখন তোমরা তার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বাক্যে তার সালামের উত্তর দাও, অথবা তদ্রুপ শব্দই বলে দাও।' সুতরাং তার অপেক্ষা উত্তম শব্দে উত্তর দেয়া মুসতাহাব এবং তার অনুরূপ শব্দে উত্তর দেয়া ফরয। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সালামান ফারেসী (রাঃ) বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলেঃ। উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবী) অতঃপর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) আবার আর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তখন তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) লোকটি তখন বলেঃ ‘হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনার উপর আমার বাপ-মা কুরবান হোক, অমুক অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট এসে সালাম করলে আপনি তাদেরকে কিছু অতিরিক্ত শব্দের দ্বারা উত্তর প্রদান করলেন। কিন্তু আমাকে তো সেভাবে উত্তর দিলেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার জন্যে কিছুই অবশিষ্ট রাখনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যখন তোমাদের উপর সালাম করা হয় তখন তোমরা তার অপেক্ষা উত্তম বাক্যে উত্তর দাও বা ওটাই ফিরিয়ে দাও।” এ জন্যেই আমি ঐ শব্দগুলোই ফিরিয়ে দিয়েছি।' এ বর্ণনাটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমেও এরূপই মুআল্লাক রূপে বর্ণিত আছে। আবূ বকর ইবনে মিরদুওয়াইও এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি এটা মুসনাদে দেখিনি। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, সালামের বাক্য (আরবী) -এ শব্দগুলোর চেয়ে বেশী নেই। যদি বেশী থাকতো তবে নবী (সঃ) অবশ্যই এ শেষের সাহাবীর সালামের উত্তরে ওটা বলতেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হ্যরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়ে বলেনঃ সে দশটি নেকী পেল; দ্বিতীয় একজন এসে (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে বিশটি পুণ্য পেলো। তৃতীয় একজন এসে বলেঃ (আরবী) তিনি বলেনঃ “সে ত্রিশটি পুণ্য লাভ করলো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের মধ্যে যে কেউ সালাম দেবে তাকে উত্তর দিতে হবে যদিও সে মাজুসীও হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সালামের উত্তর উত্তমরূপে দেয়ার বিধান হচ্ছে মুসলমানদের জন্যে এবং ওটাকেই ফিরিয়ে দেয়ার বিধান হচ্ছে যিম্মীদের জন্যে। কিন্তু এ তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তার বিষয় রয়েছে। যেমন উপরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তার সালামের চেয়ে উত্তম উত্তর দেবে এবং যদি মুসলমান সালামের সমস্ত শব্দই বলে দেয় তবে উত্তরদাতাকে ওটাই ফিরিয়ে দিতে হবে।' যিম্মীদেরকে নিজে সালাম দেয়া ঠিক নয়। তবে সে যদি সালাম দেয় হবে তাকে তার শব্দেই উত্তর দিতে হবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন ইয়াহূদী সালাম করে তখন খেয়াল রেখো, কেননা, তাদের কেউ (আরবী) বলে থাকে, তখন তোমরা (আরবী) বলবে।'সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানকে তোমরা প্রথমে সালাম করো না। পথে যদি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে পথের সংকীর্ণতার দিকে যেতে বাধ্য কর।'ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সালাম দেয়া নফল এবং সালামের উত্তর দেয়া ফরয। উলামা-ই-কিরামের উক্তিও এটাই। সুতরাং কেউ যদি উত্তর না দেয় তবে সে পাপী হবে। কেননা, সালামের উত্তর দেয়া হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ।সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা স্থাপন না করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলে দেবো না যা করলে তোমাদের পরস্পরের ভালবাসা স্থাপিত হবে? তা হচ্ছে এই যে, তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় তাওহীদের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ইবাদতের যোগ্য যে তিনি একাই তা প্রকাশ করছেন। শপথও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্যেই দ্বিতীয় বাক্যকে দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে যা কসমের জওয়াবে এসে থাকে। অতএব (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তিটি হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) যে তিনি পূর্বের ও পরের সমস্ত লোককে হাশরের মাঠে একত্রিত করবেন এবং সকলকেই তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। আর কথায় আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে? অর্থাৎ কেউই নেই। তাঁর সংবাদ, তাঁর অঙ্গীকার এবং তার শাস্তির ভয় প্রদর্শন সবই সত্য। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া পালনকর্তা কেউ নেই।
আন-নিসা 4:86
৮৪-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে তিনি যেন, নিজেই আল্লাহ তা'আলার পথে যুদ্ধ করেন, যদিও কেউ তার সাথে যোগ না দেয়। হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ যদি কোন মুসলমান একাই থাকে এবং শত্রুরা একশ জন হয় তবে কি মুসলমানটি তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।তখন হযরত আবু ইসহাক (রঃ) বলেনঃ কিন্তু কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত দ্বারা এর নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়ো না।' (২:১৯৫) হযরত বারা’ (রাঃ) তখন বলেনঃ শুন, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর; তোমার নিজের ছাড়া তোমার উপর অন্য কোন ভার অর্পণ করা হয়নি এবং মুমিনদেরকে উদ্বুদ্ধ কর'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে এটুকু বেশীও রয়েছে, মুশরিকদের উপর একাই আক্রমণকারী নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপকারী নয়, বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে খরচ করা হতে নিজের হাতকে বাধাদানকারী। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন সুতরাং তোমরাও জিহাদ কর।” এ হাদীসটি দুর্বল। এরপর বলা হচ্ছে-মুমিনদের মধ্যে সাহস জাগিয়ে তোল এবং তাদেরকে জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যুহ ঠিক করতে করতে বলেনঃ “তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে দাঁড়িয়ে যাও যার প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সমান।” জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ করার বহু হাদীস রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামায প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং রমযানের রোযা রাখে, আল্লাহর উপর (তার) এ হক রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, সে আল্লাহর পথে হিজরতই করুক বা স্বীয় জন্মভূমিতে বসেই থাকুক।' তখন সাহাবীগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমরা লোকদেরকে কি এ শুভ সংবাদ শুনিয়ে দেবো না?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, জান্নাতে একশটি সোপান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এক একটি সোপানের উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। এ সোপানগুলো আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে। অতএব তোমরা জান্নাত যাঞা করলে ফিরদাউস জান্নাত যাঞা করো। ওটাই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওর উপরই রহমানের আরশ রয়েছে এবং ওটা হতেই জান্নাতের নদীগুলো প্রবাহিত হয়।সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু সাঈদ! যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রভুরূপে, ইসলামকে ধর্মরূপে এবং মুহাম্মদ (সঃ)-কে রাসূল ও নবীরূপে মেনে নিতে সম্মত হয়েছে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব। এতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বিস্মিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর পুনরাবৃত্তি করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ওটা বর্ণনা করে বলেনঃ “আর একটি আমল রয়েছে যার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার দরজা একশগুণ উঁচু করে দেন। এক দরজা হতে অন্য দরজার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ আমলটি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যখন তুমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে তখন মুসলমানেরাও তোমার শিক্ষার কারণে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সঙ্গেই থাকবে। সত্বরই আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সংগ্রাম প্রতিরোধ করবেন, তারা সাহস হারিয়ে ফেলবে।কাজেই তারা তোমাদের মোকাবিলায় আসতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সংগ্রামে সুদৃঢ় এবং তিনি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দানকারী। তিনি এর উপর সক্ষম যে, দুনিয়াতেও তাদেরকে পরাজিত করবেন ও শাস্তি দেবেন এবং অনুরূপভাবে আখিরাতেও তাঁরই হাতে ক্ষমতা থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে স্বয়ং তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারেন কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরস্পর পরীক্ষা করছেন। (৪৭:৪)এরপর বলা হচ্ছে- যে কেউ উত্তম সুপারিশ করবে সে ওটা হতে অংশপ্রাপ্ত হবে এবং যে কেউ নিকৃষ্ট সুপারিশ করবে সেও ওটা হতে অংশ পাবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে। আল্লাহ যা চাইবেন স্বীয় নবী (সঃ)-এর ভাষায় তা জারী করবেন।' এ আয়াতটি একে অপরের সুপারিশ করার ব্যপারে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলার এত দয়ালু যে, শুধু সুপারিশ করলেই প্রতিদান পাওয়া যাবে। সে সুপারিশে কাজ হোক আর নাই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের রক্ষক এবং প্রত্যেক জিনিসের উপর বিদ্যমান। তিনি প্রত্যেকের হিসেব গ্রহণকারী। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। প্রত্যেকের তিনি আহার দাতা এবং প্রত্যেক মানুষের কার্যাবলীর পরিমাণ গ্রহণকারী।এরপর বলা হচ্ছে-‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে কেউ সালাম করে, তখন তোমরা তার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বাক্যে তার সালামের উত্তর দাও, অথবা তদ্রুপ শব্দই বলে দাও।' সুতরাং তার অপেক্ষা উত্তম শব্দে উত্তর দেয়া মুসতাহাব এবং তার অনুরূপ শব্দে উত্তর দেয়া ফরয। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সালামান ফারেসী (রাঃ) বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলেঃ। উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবী) অতঃপর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) আবার আর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তখন তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) লোকটি তখন বলেঃ ‘হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনার উপর আমার বাপ-মা কুরবান হোক, অমুক অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট এসে সালাম করলে আপনি তাদেরকে কিছু অতিরিক্ত শব্দের দ্বারা উত্তর প্রদান করলেন। কিন্তু আমাকে তো সেভাবে উত্তর দিলেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার জন্যে কিছুই অবশিষ্ট রাখনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যখন তোমাদের উপর সালাম করা হয় তখন তোমরা তার অপেক্ষা উত্তম বাক্যে উত্তর দাও বা ওটাই ফিরিয়ে দাও।” এ জন্যেই আমি ঐ শব্দগুলোই ফিরিয়ে দিয়েছি।' এ বর্ণনাটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমেও এরূপই মুআল্লাক রূপে বর্ণিত আছে। আবূ বকর ইবনে মিরদুওয়াইও এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি এটা মুসনাদে দেখিনি। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, সালামের বাক্য (আরবী) -এ শব্দগুলোর চেয়ে বেশী নেই। যদি বেশী থাকতো তবে নবী (সঃ) অবশ্যই এ শেষের সাহাবীর সালামের উত্তরে ওটা বলতেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হ্যরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়ে বলেনঃ সে দশটি নেকী পেল; দ্বিতীয় একজন এসে (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে বিশটি পুণ্য পেলো। তৃতীয় একজন এসে বলেঃ (আরবী) তিনি বলেনঃ “সে ত্রিশটি পুণ্য লাভ করলো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের মধ্যে যে কেউ সালাম দেবে তাকে উত্তর দিতে হবে যদিও সে মাজুসীও হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সালামের উত্তর উত্তমরূপে দেয়ার বিধান হচ্ছে মুসলমানদের জন্যে এবং ওটাকেই ফিরিয়ে দেয়ার বিধান হচ্ছে যিম্মীদের জন্যে। কিন্তু এ তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তার বিষয় রয়েছে। যেমন উপরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তার সালামের চেয়ে উত্তম উত্তর দেবে এবং যদি মুসলমান সালামের সমস্ত শব্দই বলে দেয় তবে উত্তরদাতাকে ওটাই ফিরিয়ে দিতে হবে।' যিম্মীদেরকে নিজে সালাম দেয়া ঠিক নয়। তবে সে যদি সালাম দেয় হবে তাকে তার শব্দেই উত্তর দিতে হবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন ইয়াহূদী সালাম করে তখন খেয়াল রেখো, কেননা, তাদের কেউ (আরবী) বলে থাকে, তখন তোমরা (আরবী) বলবে।'সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানকে তোমরা প্রথমে সালাম করো না। পথে যদি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে পথের সংকীর্ণতার দিকে যেতে বাধ্য কর।'ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সালাম দেয়া নফল এবং সালামের উত্তর দেয়া ফরয। উলামা-ই-কিরামের উক্তিও এটাই। সুতরাং কেউ যদি উত্তর না দেয় তবে সে পাপী হবে। কেননা, সালামের উত্তর দেয়া হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ।সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা স্থাপন না করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলে দেবো না যা করলে তোমাদের পরস্পরের ভালবাসা স্থাপিত হবে? তা হচ্ছে এই যে, তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় তাওহীদের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ইবাদতের যোগ্য যে তিনি একাই তা প্রকাশ করছেন। শপথও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্যেই দ্বিতীয় বাক্যকে দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে যা কসমের জওয়াবে এসে থাকে। অতএব (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তিটি হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) যে তিনি পূর্বের ও পরের সমস্ত লোককে হাশরের মাঠে একত্রিত করবেন এবং সকলকেই তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। আর কথায় আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে? অর্থাৎ কেউই নেই। তাঁর সংবাদ, তাঁর অঙ্গীকার এবং তার শাস্তির ভয় প্রদর্শন সবই সত্য। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া পালনকর্তা কেউ নেই।
আন-নিসা 4:87
৮৪-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে তিনি যেন, নিজেই আল্লাহ তা'আলার পথে যুদ্ধ করেন, যদিও কেউ তার সাথে যোগ না দেয়। হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ যদি কোন মুসলমান একাই থাকে এবং শত্রুরা একশ জন হয় তবে কি মুসলমানটি তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে?' তিনি বলেনঃ হ্যাঁ।তখন হযরত আবু ইসহাক (রঃ) বলেনঃ কিন্তু কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াত দ্বারা এর নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়ো না।' (২:১৯৫) হযরত বারা’ (রাঃ) তখন বলেনঃ শুন, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর; তোমার নিজের ছাড়া তোমার উপর অন্য কোন ভার অর্পণ করা হয়নি এবং মুমিনদেরকে উদ্বুদ্ধ কর'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে এটুকু বেশীও রয়েছে, মুশরিকদের উপর একাই আক্রমণকারী নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপকারী নয়, বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে খরচ করা হতে নিজের হাতকে বাধাদানকারী। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন সুতরাং তোমরাও জিহাদ কর।” এ হাদীসটি দুর্বল। এরপর বলা হচ্ছে-মুমিনদের মধ্যে সাহস জাগিয়ে তোল এবং তাদেরকে জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যুহ ঠিক করতে করতে বলেনঃ “তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে দাঁড়িয়ে যাও যার প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সমান।” জিহাদের জন্যে উদ্বুদ্ধ করার বহু হাদীস রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামায প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং রমযানের রোযা রাখে, আল্লাহর উপর (তার) এ হক রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, সে আল্লাহর পথে হিজরতই করুক বা স্বীয় জন্মভূমিতে বসেই থাকুক।' তখন সাহাবীগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমরা লোকদেরকে কি এ শুভ সংবাদ শুনিয়ে দেবো না?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘জেনে রেখো, জান্নাতে একশটি সোপান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এক একটি সোপানের উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। এ সোপানগুলো আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে। অতএব তোমরা জান্নাত যাঞা করলে ফিরদাউস জান্নাত যাঞা করো। ওটাই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওর উপরই রহমানের আরশ রয়েছে এবং ওটা হতেই জান্নাতের নদীগুলো প্রবাহিত হয়।সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু সাঈদ! যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রভুরূপে, ইসলামকে ধর্মরূপে এবং মুহাম্মদ (সঃ)-কে রাসূল ও নবীরূপে মেনে নিতে সম্মত হয়েছে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব। এতে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বিস্মিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর পুনরাবৃত্তি করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় ওটা বর্ণনা করে বলেনঃ “আর একটি আমল রয়েছে যার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার দরজা একশগুণ উঁচু করে দেন। এক দরজা হতে অন্য দরজার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবীর উচ্চতার সমান। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ আমলটি কি?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যখন তুমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে তখন মুসলমানেরাও তোমার শিক্ষার কারণে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সঙ্গেই থাকবে। সত্বরই আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সংগ্রাম প্রতিরোধ করবেন, তারা সাহস হারিয়ে ফেলবে।কাজেই তারা তোমাদের মোকাবিলায় আসতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সংগ্রামে সুদৃঢ় এবং তিনি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দানকারী। তিনি এর উপর সক্ষম যে, দুনিয়াতেও তাদেরকে পরাজিত করবেন ও শাস্তি দেবেন এবং অনুরূপভাবে আখিরাতেও তাঁরই হাতে ক্ষমতা থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে স্বয়ং তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারেন কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরস্পর পরীক্ষা করছেন। (৪৭:৪)এরপর বলা হচ্ছে- যে কেউ উত্তম সুপারিশ করবে সে ওটা হতে অংশপ্রাপ্ত হবে এবং যে কেউ নিকৃষ্ট সুপারিশ করবে সেও ওটা হতে অংশ পাবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে। আল্লাহ যা চাইবেন স্বীয় নবী (সঃ)-এর ভাষায় তা জারী করবেন।' এ আয়াতটি একে অপরের সুপারিশ করার ব্যপারে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলার এত দয়ালু যে, শুধু সুপারিশ করলেই প্রতিদান পাওয়া যাবে। সে সুপারিশে কাজ হোক আর নাই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের রক্ষক এবং প্রত্যেক জিনিসের উপর বিদ্যমান। তিনি প্রত্যেকের হিসেব গ্রহণকারী। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। প্রত্যেকের তিনি আহার দাতা এবং প্রত্যেক মানুষের কার্যাবলীর পরিমাণ গ্রহণকারী।এরপর বলা হচ্ছে-‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে কেউ সালাম করে, তখন তোমরা তার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বাক্যে তার সালামের উত্তর দাও, অথবা তদ্রুপ শব্দই বলে দাও।' সুতরাং তার অপেক্ষা উত্তম শব্দে উত্তর দেয়া মুসতাহাব এবং তার অনুরূপ শব্দে উত্তর দেয়া ফরয। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত সালামান ফারেসী (রাঃ) বলেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলেঃ। উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবী) অতঃপর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) আবার আর একটি লোক এসে বলে, (আরবী) তখন তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) লোকটি তখন বলেঃ ‘হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনার উপর আমার বাপ-মা কুরবান হোক, অমুক অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট এসে সালাম করলে আপনি তাদেরকে কিছু অতিরিক্ত শব্দের দ্বারা উত্তর প্রদান করলেন। কিন্তু আমাকে তো সেভাবে উত্তর দিলেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার জন্যে কিছুই অবশিষ্ট রাখনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যখন তোমাদের উপর সালাম করা হয় তখন তোমরা তার অপেক্ষা উত্তম বাক্যে উত্তর দাও বা ওটাই ফিরিয়ে দাও।” এ জন্যেই আমি ঐ শব্দগুলোই ফিরিয়ে দিয়েছি।' এ বর্ণনাটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমেও এরূপই মুআল্লাক রূপে বর্ণিত আছে। আবূ বকর ইবনে মিরদুওয়াইও এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি এটা মুসনাদে দেখিনি। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, সালামের বাক্য (আরবী) -এ শব্দগুলোর চেয়ে বেশী নেই। যদি বেশী থাকতো তবে নবী (সঃ) অবশ্যই এ শেষের সাহাবীর সালামের উত্তরে ওটা বলতেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হ্যরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়ে বলেনঃ সে দশটি নেকী পেল; দ্বিতীয় একজন এসে (আরবী) বলে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে বিশটি পুণ্য পেলো। তৃতীয় একজন এসে বলেঃ (আরবী) তিনি বলেনঃ “সে ত্রিশটি পুণ্য লাভ করলো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের মধ্যে যে কেউ সালাম দেবে তাকে উত্তর দিতে হবে যদিও সে মাজুসীও হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সালামের উত্তর উত্তমরূপে দেয়ার বিধান হচ্ছে মুসলমানদের জন্যে এবং ওটাকেই ফিরিয়ে দেয়ার বিধান হচ্ছে যিম্মীদের জন্যে। কিন্তু এ তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তার বিষয় রয়েছে। যেমন উপরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তার সালামের চেয়ে উত্তম উত্তর দেবে এবং যদি মুসলমান সালামের সমস্ত শব্দই বলে দেয় তবে উত্তরদাতাকে ওটাই ফিরিয়ে দিতে হবে।' যিম্মীদেরকে নিজে সালাম দেয়া ঠিক নয়। তবে সে যদি সালাম দেয় হবে তাকে তার শব্দেই উত্তর দিতে হবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন কোন ইয়াহূদী সালাম করে তখন খেয়াল রেখো, কেননা, তাদের কেউ (আরবী) বলে থাকে, তখন তোমরা (আরবী) বলবে।'সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানকে তোমরা প্রথমে সালাম করো না। পথে যদি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে পথের সংকীর্ণতার দিকে যেতে বাধ্য কর।'ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সালাম দেয়া নফল এবং সালামের উত্তর দেয়া ফরয। উলামা-ই-কিরামের উক্তিও এটাই। সুতরাং কেউ যদি উত্তর না দেয় তবে সে পাপী হবে। কেননা, সালামের উত্তর দেয়া হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ।সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা স্থাপন না করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলে দেবো না যা করলে তোমাদের পরস্পরের ভালবাসা স্থাপিত হবে? তা হচ্ছে এই যে, তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় তাওহীদের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ইবাদতের যোগ্য যে তিনি একাই তা প্রকাশ করছেন। শপথও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্যেই দ্বিতীয় বাক্যকে দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে যা কসমের জওয়াবে এসে থাকে। অতএব (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তিটি হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) যে তিনি পূর্বের ও পরের সমস্ত লোককে হাশরের মাঠে একত্রিত করবেন এবং সকলকেই তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। আর কথায় আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে? অর্থাৎ কেউই নেই। তাঁর সংবাদ, তাঁর অঙ্গীকার এবং তার শাস্তির ভয় প্রদর্শন সবই সত্য। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া পালনকর্তা কেউ নেই।
আন-নিসা 4:88
৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের কোন ব্যাপারে যে মুসলমানদের দু' প্রকার মত হয়েছিল সে সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন উহুদ প্রান্তরে গমন করেন তখন তার সাথে মুনাফিকেরাও ছিল। তারা যুদ্ধের পূর্বেই ফিরে এসেছিল। তাদের ব্যাপারে কতক মুসলমান বলছিলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে ফেলা উচিত। আবার অন্য কয়েকজন বলছিলেন যে, হত্যা করা হবে না, কেননা তারাও মুমিন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা পবিত্র শহর, এটা নিজেই মালিন্য এমনভাবে দূর করে দেবে যেমনভাবে ভাটি লোহাকে পরিষ্কার করে থাকে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সম্বন্ধে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল তিনশ লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাতশ জন রয়ে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় এমন কতগুলো লোক ছিল যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করতো। তারা নিজেদের কোন বিশেষ প্রয়োজনে মক্কা হতে বের হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাদেরকে কোন বাধা প্রদান করবেন না। কেননা, প্রকাশ্যে তারা কালেমা পড়েছিল।মদীনার মুসলমানগণ যখন এ সংবাদ জানতে পারেন তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেনঃ “এ কাপুরুষদের সাথে প্রথমে জিহাদ করা হোক। কেননা, এরা আমাদের শত্রুদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু কতক লোক বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! যারা আমাদের মতই কালেমা পড়ে তোমরা তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে। শুধু এ কারণে যে, তারা হিজরত করেনি এবং নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়েনি? আমরা কিভাবে তাদের রক্ত ও মাল হালাল করতে পারি?রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের এ মতানৈক্য হয়েছিল। তিনি নীরব ছিলেন। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত সাদ ইবনে মুআয বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে যখন অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাড়িয়ে বলেনঃ “কে আছে যে আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উৎপীড়ন হতে রক্ষা করে? সে সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন। তাদের হিদায়াতের কোন পথ নেই। তারাতে চায় যে খাটি মুসলমানও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের অন্তরে যখন তোমাদের প্রতি এত শত্রুতা রয়েছে তখন তোমাদেরকে নিষেধ করা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত তারা হিজরত না করে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে নিজের মনে করো না। তোমরা এটা মনে করো না যে, তারা তোমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারী। বরং তারা নিজেরাই এর যোগ্য যে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। অতঃপর ওদের মধ্য হতে ঐ লোকদেরকে পৃথক করা হচ্ছে যারা কোন এমন সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে। তখন তাদের হুকুম সন্ধিযুক্ত সম্প্রদায়ের মতই হবে।সুরাকাহ্ ইবনে মালিক মুদলেজী বলে-বদর ও উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানেরা জয়যুক্ত হয় এবং আশে-পাশের লোকদের মধ্যে ইসলাম ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন আমি জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার গোত্র বানূ মুদলিজের বিরুদ্ধে হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার সংকল্প করেছেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থি হয়ে আরয করি- আমি আপনাকে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন জনগণ বলেনঃ “চুপ কর।' কিন্তু তিনি বলেনঃ ‘তাকে বলতে দাও। তুমি কি বলতে চাও, বল। আমি তখন বলি, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি আমার সম্প্রদায়ের দিকে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাচ্ছেন। আমি চাই, আপনি তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি করুন যে, যদি কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। আর যদি তারা মুসলমান না হয় তবে তাদের উপরও আপনি আক্রমণ করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর হাতখানা স্বীয় হাতের মধ্যে নিয়ে বলেনঃ তুমি এর সাথে যাও এবং এর কথা অনুসারে তার কওমের সাথে সন্ধি করে এসো। সুতরাং এ শর্তে সন্ধি হয়ে গেল যে, তারা ধর্মের শত্রুদেরকে কোন প্রকারের সাহায্য করবে না এবং যদি কুরাইশরা মুসলমান হয়ে যায় তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ এরা চায় যে, তাদের মত তোমরাও কুফরী কর যেন তোমরা সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এ বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিত হয় যে, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। সুতরাং যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে তারাও তাদের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কালামের শব্দের সাথে এরই বেশী সম্পর্ক রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হুদায়বিয়ার সন্ধি ঘটনায় রয়েছে যে, এরপর যে চাইতো মদীনার মুসলমানদের সাথে মিলিত হতো এবং চুক্তিপত্রের কারণে। নিরাপত্তা লাভ করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, নিম্নের আয়াতটি এ হুকুমকে রহিত করে দেয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যখন হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর”। (৯:৫) এরপর অন্য একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয় বটে কিন্তু তারা সংকুচিত চিত্ত হয়ে হাযির হয়। তারা না তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, না তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করা পছন্দ করে। বরং ত পক্ষীয় লোকে। তাদেরকে না তোমাদের শত্রু বলা যেতে পরে, না বন্ধু বলা যেতে পারে। সুতরাং এটাও আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেননি। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতা দান করতেন এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা তাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতেন। সুতরাং যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তবে তোমাদের জন্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবার অনুমতি নেই। বদরের যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্রের কতগুলো লোক মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছিল। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অন্তরে অপছন্দ করেছিল, তারাই ছিল এ প্রকারের লোক। যেমন হযরত আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁকে জীবিত গ্রেফতার করতে বলেছিলেন। অতঃপর আর একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা বাহ্যতঃ উপরোক্ত দলের মতই কিন্তু তাদের নিয়ত খুবই কুঞ্চিত, তারা মুনাফিক। এ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করতঃ স্বীয় জান ও মাল মুসলমানের হাত হতে রক্ষা করতো আর ওদিকে কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের বাতিল মাবুদের ইবাদত করতো এবং তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করতঃ তাদের সাথেই মিলেমিশে থাকতো যেন তাদের নিকটেও নিরাপদে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।' (২৪ ১৪) এখানেও বলা হচ্ছে-যখন তারা বিরোধের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় তখন তাতেই নিপতিত হয়। এখানেও শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শিরক। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ লোকগুলোও মক্কাবাসী ছিল। এখানে এসে তারা রিয়াকারী রূপে ইসলাম গ্রহণ করতো এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতো। তাই তাদের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত না হয় ও সন্ধি প্রার্থনা না করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করো না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধ কর, বন্দী কর এবং যেখানেই পাও হত্যা কর। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে প্রকাশ্য আধিপত্য দান করেছেন।
আন-নিসা 4:89
৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের কোন ব্যাপারে যে মুসলমানদের দু' প্রকার মত হয়েছিল সে সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন উহুদ প্রান্তরে গমন করেন তখন তার সাথে মুনাফিকেরাও ছিল। তারা যুদ্ধের পূর্বেই ফিরে এসেছিল। তাদের ব্যাপারে কতক মুসলমান বলছিলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে ফেলা উচিত। আবার অন্য কয়েকজন বলছিলেন যে, হত্যা করা হবে না, কেননা তারাও মুমিন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা পবিত্র শহর, এটা নিজেই মালিন্য এমনভাবে দূর করে দেবে যেমনভাবে ভাটি লোহাকে পরিষ্কার করে থাকে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সম্বন্ধে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল তিনশ লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাতশ জন রয়ে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় এমন কতগুলো লোক ছিল যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করতো। তারা নিজেদের কোন বিশেষ প্রয়োজনে মক্কা হতে বের হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাদেরকে কোন বাধা প্রদান করবেন না। কেননা, প্রকাশ্যে তারা কালেমা পড়েছিল।মদীনার মুসলমানগণ যখন এ সংবাদ জানতে পারেন তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেনঃ “এ কাপুরুষদের সাথে প্রথমে জিহাদ করা হোক। কেননা, এরা আমাদের শত্রুদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু কতক লোক বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! যারা আমাদের মতই কালেমা পড়ে তোমরা তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে। শুধু এ কারণে যে, তারা হিজরত করেনি এবং নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়েনি? আমরা কিভাবে তাদের রক্ত ও মাল হালাল করতে পারি?রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের এ মতানৈক্য হয়েছিল। তিনি নীরব ছিলেন। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত সাদ ইবনে মুআয বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে যখন অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাড়িয়ে বলেনঃ “কে আছে যে আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উৎপীড়ন হতে রক্ষা করে? সে সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন। তাদের হিদায়াতের কোন পথ নেই। তারাতে চায় যে খাটি মুসলমানও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের অন্তরে যখন তোমাদের প্রতি এত শত্রুতা রয়েছে তখন তোমাদেরকে নিষেধ করা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত তারা হিজরত না করে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে নিজের মনে করো না। তোমরা এটা মনে করো না যে, তারা তোমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারী। বরং তারা নিজেরাই এর যোগ্য যে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। অতঃপর ওদের মধ্য হতে ঐ লোকদেরকে পৃথক করা হচ্ছে যারা কোন এমন সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে। তখন তাদের হুকুম সন্ধিযুক্ত সম্প্রদায়ের মতই হবে।সুরাকাহ্ ইবনে মালিক মুদলেজী বলে-বদর ও উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানেরা জয়যুক্ত হয় এবং আশে-পাশের লোকদের মধ্যে ইসলাম ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন আমি জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার গোত্র বানূ মুদলিজের বিরুদ্ধে হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার সংকল্প করেছেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থি হয়ে আরয করি- আমি আপনাকে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন জনগণ বলেনঃ “চুপ কর।' কিন্তু তিনি বলেনঃ ‘তাকে বলতে দাও। তুমি কি বলতে চাও, বল। আমি তখন বলি, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি আমার সম্প্রদায়ের দিকে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাচ্ছেন। আমি চাই, আপনি তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি করুন যে, যদি কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। আর যদি তারা মুসলমান না হয় তবে তাদের উপরও আপনি আক্রমণ করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর হাতখানা স্বীয় হাতের মধ্যে নিয়ে বলেনঃ তুমি এর সাথে যাও এবং এর কথা অনুসারে তার কওমের সাথে সন্ধি করে এসো। সুতরাং এ শর্তে সন্ধি হয়ে গেল যে, তারা ধর্মের শত্রুদেরকে কোন প্রকারের সাহায্য করবে না এবং যদি কুরাইশরা মুসলমান হয়ে যায় তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ এরা চায় যে, তাদের মত তোমরাও কুফরী কর যেন তোমরা সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এ বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিত হয় যে, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। সুতরাং যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে তারাও তাদের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কালামের শব্দের সাথে এরই বেশী সম্পর্ক রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হুদায়বিয়ার সন্ধি ঘটনায় রয়েছে যে, এরপর যে চাইতো মদীনার মুসলমানদের সাথে মিলিত হতো এবং চুক্তিপত্রের কারণে। নিরাপত্তা লাভ করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, নিম্নের আয়াতটি এ হুকুমকে রহিত করে দেয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যখন হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর”। (৯:৫) এরপর অন্য একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয় বটে কিন্তু তারা সংকুচিত চিত্ত হয়ে হাযির হয়। তারা না তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, না তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করা পছন্দ করে। বরং ত পক্ষীয় লোকে। তাদেরকে না তোমাদের শত্রু বলা যেতে পরে, না বন্ধু বলা যেতে পারে। সুতরাং এটাও আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেননি। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতা দান করতেন এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা তাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতেন। সুতরাং যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তবে তোমাদের জন্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবার অনুমতি নেই। বদরের যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্রের কতগুলো লোক মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছিল। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অন্তরে অপছন্দ করেছিল, তারাই ছিল এ প্রকারের লোক। যেমন হযরত আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁকে জীবিত গ্রেফতার করতে বলেছিলেন। অতঃপর আর একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা বাহ্যতঃ উপরোক্ত দলের মতই কিন্তু তাদের নিয়ত খুবই কুঞ্চিত, তারা মুনাফিক। এ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করতঃ স্বীয় জান ও মাল মুসলমানের হাত হতে রক্ষা করতো আর ওদিকে কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের বাতিল মাবুদের ইবাদত করতো এবং তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করতঃ তাদের সাথেই মিলেমিশে থাকতো যেন তাদের নিকটেও নিরাপদে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।' (২৪ ১৪) এখানেও বলা হচ্ছে-যখন তারা বিরোধের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় তখন তাতেই নিপতিত হয়। এখানেও শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শিরক। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ লোকগুলোও মক্কাবাসী ছিল। এখানে এসে তারা রিয়াকারী রূপে ইসলাম গ্রহণ করতো এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতো। তাই তাদের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত না হয় ও সন্ধি প্রার্থনা না করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করো না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধ কর, বন্দী কর এবং যেখানেই পাও হত্যা কর। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে প্রকাশ্য আধিপত্য দান করেছেন।
আন-নিসা 4:90
৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের কোন ব্যাপারে যে মুসলমানদের দু' প্রকার মত হয়েছিল সে সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন উহুদ প্রান্তরে গমন করেন তখন তার সাথে মুনাফিকেরাও ছিল। তারা যুদ্ধের পূর্বেই ফিরে এসেছিল। তাদের ব্যাপারে কতক মুসলমান বলছিলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে ফেলা উচিত। আবার অন্য কয়েকজন বলছিলেন যে, হত্যা করা হবে না, কেননা তারাও মুমিন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা পবিত্র শহর, এটা নিজেই মালিন্য এমনভাবে দূর করে দেবে যেমনভাবে ভাটি লোহাকে পরিষ্কার করে থাকে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সম্বন্ধে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল তিনশ লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাতশ জন রয়ে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় এমন কতগুলো লোক ছিল যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করতো। তারা নিজেদের কোন বিশেষ প্রয়োজনে মক্কা হতে বের হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাদেরকে কোন বাধা প্রদান করবেন না। কেননা, প্রকাশ্যে তারা কালেমা পড়েছিল।মদীনার মুসলমানগণ যখন এ সংবাদ জানতে পারেন তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেনঃ “এ কাপুরুষদের সাথে প্রথমে জিহাদ করা হোক। কেননা, এরা আমাদের শত্রুদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু কতক লোক বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! যারা আমাদের মতই কালেমা পড়ে তোমরা তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে। শুধু এ কারণে যে, তারা হিজরত করেনি এবং নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়েনি? আমরা কিভাবে তাদের রক্ত ও মাল হালাল করতে পারি?রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের এ মতানৈক্য হয়েছিল। তিনি নীরব ছিলেন। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত সাদ ইবনে মুআয বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে যখন অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাড়িয়ে বলেনঃ “কে আছে যে আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উৎপীড়ন হতে রক্ষা করে? সে সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন। তাদের হিদায়াতের কোন পথ নেই। তারাতে চায় যে খাটি মুসলমানও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের অন্তরে যখন তোমাদের প্রতি এত শত্রুতা রয়েছে তখন তোমাদেরকে নিষেধ করা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত তারা হিজরত না করে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে নিজের মনে করো না। তোমরা এটা মনে করো না যে, তারা তোমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারী। বরং তারা নিজেরাই এর যোগ্য যে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। অতঃপর ওদের মধ্য হতে ঐ লোকদেরকে পৃথক করা হচ্ছে যারা কোন এমন সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে। তখন তাদের হুকুম সন্ধিযুক্ত সম্প্রদায়ের মতই হবে।সুরাকাহ্ ইবনে মালিক মুদলেজী বলে-বদর ও উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানেরা জয়যুক্ত হয় এবং আশে-পাশের লোকদের মধ্যে ইসলাম ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন আমি জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার গোত্র বানূ মুদলিজের বিরুদ্ধে হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার সংকল্প করেছেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থি হয়ে আরয করি- আমি আপনাকে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন জনগণ বলেনঃ “চুপ কর।' কিন্তু তিনি বলেনঃ ‘তাকে বলতে দাও। তুমি কি বলতে চাও, বল। আমি তখন বলি, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি আমার সম্প্রদায়ের দিকে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাচ্ছেন। আমি চাই, আপনি তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি করুন যে, যদি কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। আর যদি তারা মুসলমান না হয় তবে তাদের উপরও আপনি আক্রমণ করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর হাতখানা স্বীয় হাতের মধ্যে নিয়ে বলেনঃ তুমি এর সাথে যাও এবং এর কথা অনুসারে তার কওমের সাথে সন্ধি করে এসো। সুতরাং এ শর্তে সন্ধি হয়ে গেল যে, তারা ধর্মের শত্রুদেরকে কোন প্রকারের সাহায্য করবে না এবং যদি কুরাইশরা মুসলমান হয়ে যায় তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ এরা চায় যে, তাদের মত তোমরাও কুফরী কর যেন তোমরা সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এ বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিত হয় যে, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। সুতরাং যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে তারাও তাদের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কালামের শব্দের সাথে এরই বেশী সম্পর্ক রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হুদায়বিয়ার সন্ধি ঘটনায় রয়েছে যে, এরপর যে চাইতো মদীনার মুসলমানদের সাথে মিলিত হতো এবং চুক্তিপত্রের কারণে। নিরাপত্তা লাভ করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, নিম্নের আয়াতটি এ হুকুমকে রহিত করে দেয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যখন হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর”। (৯:৫) এরপর অন্য একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয় বটে কিন্তু তারা সংকুচিত চিত্ত হয়ে হাযির হয়। তারা না তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, না তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করা পছন্দ করে। বরং ত পক্ষীয় লোকে। তাদেরকে না তোমাদের শত্রু বলা যেতে পরে, না বন্ধু বলা যেতে পারে। সুতরাং এটাও আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেননি। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতা দান করতেন এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা তাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতেন। সুতরাং যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তবে তোমাদের জন্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবার অনুমতি নেই। বদরের যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্রের কতগুলো লোক মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছিল। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অন্তরে অপছন্দ করেছিল, তারাই ছিল এ প্রকারের লোক। যেমন হযরত আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁকে জীবিত গ্রেফতার করতে বলেছিলেন। অতঃপর আর একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা বাহ্যতঃ উপরোক্ত দলের মতই কিন্তু তাদের নিয়ত খুবই কুঞ্চিত, তারা মুনাফিক। এ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করতঃ স্বীয় জান ও মাল মুসলমানের হাত হতে রক্ষা করতো আর ওদিকে কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের বাতিল মাবুদের ইবাদত করতো এবং তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করতঃ তাদের সাথেই মিলেমিশে থাকতো যেন তাদের নিকটেও নিরাপদে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।' (২৪ ১৪) এখানেও বলা হচ্ছে-যখন তারা বিরোধের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় তখন তাতেই নিপতিত হয়। এখানেও শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শিরক। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ লোকগুলোও মক্কাবাসী ছিল। এখানে এসে তারা রিয়াকারী রূপে ইসলাম গ্রহণ করতো এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতো। তাই তাদের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত না হয় ও সন্ধি প্রার্থনা না করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করো না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধ কর, বন্দী কর এবং যেখানেই পাও হত্যা কর। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে প্রকাশ্য আধিপত্য দান করেছেন।
আন-নিসা 4:91
৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের কোন ব্যাপারে যে মুসলমানদের দু' প্রকার মত হয়েছিল সে সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন উহুদ প্রান্তরে গমন করেন তখন তার সাথে মুনাফিকেরাও ছিল। তারা যুদ্ধের পূর্বেই ফিরে এসেছিল। তাদের ব্যাপারে কতক মুসলমান বলছিলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে ফেলা উচিত। আবার অন্য কয়েকজন বলছিলেন যে, হত্যা করা হবে না, কেননা তারাও মুমিন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা পবিত্র শহর, এটা নিজেই মালিন্য এমনভাবে দূর করে দেবে যেমনভাবে ভাটি লোহাকে পরিষ্কার করে থাকে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সম্বন্ধে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল তিনশ লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাতশ জন রয়ে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় এমন কতগুলো লোক ছিল যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করতো। তারা নিজেদের কোন বিশেষ প্রয়োজনে মক্কা হতে বের হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাদেরকে কোন বাধা প্রদান করবেন না। কেননা, প্রকাশ্যে তারা কালেমা পড়েছিল।মদীনার মুসলমানগণ যখন এ সংবাদ জানতে পারেন তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেনঃ “এ কাপুরুষদের সাথে প্রথমে জিহাদ করা হোক। কেননা, এরা আমাদের শত্রুদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু কতক লোক বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! যারা আমাদের মতই কালেমা পড়ে তোমরা তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে। শুধু এ কারণে যে, তারা হিজরত করেনি এবং নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়েনি? আমরা কিভাবে তাদের রক্ত ও মাল হালাল করতে পারি?রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের এ মতানৈক্য হয়েছিল। তিনি নীরব ছিলেন। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত সাদ ইবনে মুআয বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে যখন অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাড়িয়ে বলেনঃ “কে আছে যে আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উৎপীড়ন হতে রক্ষা করে? সে সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন। তাদের হিদায়াতের কোন পথ নেই। তারাতে চায় যে খাটি মুসলমানও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের অন্তরে যখন তোমাদের প্রতি এত শত্রুতা রয়েছে তখন তোমাদেরকে নিষেধ করা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত তারা হিজরত না করে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে নিজের মনে করো না। তোমরা এটা মনে করো না যে, তারা তোমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারী। বরং তারা নিজেরাই এর যোগ্য যে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। অতঃপর ওদের মধ্য হতে ঐ লোকদেরকে পৃথক করা হচ্ছে যারা কোন এমন সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে। তখন তাদের হুকুম সন্ধিযুক্ত সম্প্রদায়ের মতই হবে।সুরাকাহ্ ইবনে মালিক মুদলেজী বলে-বদর ও উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানেরা জয়যুক্ত হয় এবং আশে-পাশের লোকদের মধ্যে ইসলাম ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন আমি জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার গোত্র বানূ মুদলিজের বিরুদ্ধে হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার সংকল্প করেছেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থি হয়ে আরয করি- আমি আপনাকে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন জনগণ বলেনঃ “চুপ কর।' কিন্তু তিনি বলেনঃ ‘তাকে বলতে দাও। তুমি কি বলতে চাও, বল। আমি তখন বলি, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি আমার সম্প্রদায়ের দিকে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাচ্ছেন। আমি চাই, আপনি তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি করুন যে, যদি কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। আর যদি তারা মুসলমান না হয় তবে তাদের উপরও আপনি আক্রমণ করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর হাতখানা স্বীয় হাতের মধ্যে নিয়ে বলেনঃ তুমি এর সাথে যাও এবং এর কথা অনুসারে তার কওমের সাথে সন্ধি করে এসো। সুতরাং এ শর্তে সন্ধি হয়ে গেল যে, তারা ধর্মের শত্রুদেরকে কোন প্রকারের সাহায্য করবে না এবং যদি কুরাইশরা মুসলমান হয়ে যায় তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ এরা চায় যে, তাদের মত তোমরাও কুফরী কর যেন তোমরা সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এ বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিত হয় যে, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। সুতরাং যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে তারাও তাদের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কালামের শব্দের সাথে এরই বেশী সম্পর্ক রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হুদায়বিয়ার সন্ধি ঘটনায় রয়েছে যে, এরপর যে চাইতো মদীনার মুসলমানদের সাথে মিলিত হতো এবং চুক্তিপত্রের কারণে। নিরাপত্তা লাভ করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, নিম্নের আয়াতটি এ হুকুমকে রহিত করে দেয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যখন হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর”। (৯:৫) এরপর অন্য একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয় বটে কিন্তু তারা সংকুচিত চিত্ত হয়ে হাযির হয়। তারা না তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, না তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করা পছন্দ করে। বরং ত পক্ষীয় লোকে। তাদেরকে না তোমাদের শত্রু বলা যেতে পরে, না বন্ধু বলা যেতে পারে। সুতরাং এটাও আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেননি। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতা দান করতেন এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা তাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতেন। সুতরাং যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তবে তোমাদের জন্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবার অনুমতি নেই। বদরের যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্রের কতগুলো লোক মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছিল। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অন্তরে অপছন্দ করেছিল, তারাই ছিল এ প্রকারের লোক। যেমন হযরত আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁকে জীবিত গ্রেফতার করতে বলেছিলেন। অতঃপর আর একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা বাহ্যতঃ উপরোক্ত দলের মতই কিন্তু তাদের নিয়ত খুবই কুঞ্চিত, তারা মুনাফিক। এ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করতঃ স্বীয় জান ও মাল মুসলমানের হাত হতে রক্ষা করতো আর ওদিকে কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের বাতিল মাবুদের ইবাদত করতো এবং তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করতঃ তাদের সাথেই মিলেমিশে থাকতো যেন তাদের নিকটেও নিরাপদে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।' (২৪ ১৪) এখানেও বলা হচ্ছে-যখন তারা বিরোধের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় তখন তাতেই নিপতিত হয়। এখানেও শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শিরক। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ লোকগুলোও মক্কাবাসী ছিল। এখানে এসে তারা রিয়াকারী রূপে ইসলাম গ্রহণ করতো এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতো। তাই তাদের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত না হয় ও সন্ধি প্রার্থনা না করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করো না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধ কর, বন্দী কর এবং যেখানেই পাও হত্যা কর। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে প্রকাশ্য আধিপত্য দান করেছেন।
আন-নিসা 4:92
৯২-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ “কোন মুমিনের উচিত নয় যে, সে তার কোন মুমিন ভাইকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আমি তাঁর রাসূল, তার রক্ত হালাল নয়, কিন্তু তিনটির মধ্যে যে কোন একটি কারণে (হত্যা করা বৈধ)। (১) কাউকে হত্যা করা, (২) বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা এবং (৩) ধর্ম ত্যাগ করে দল হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া। এ তিনটি কাজ কারও দ্বারা সংঘটিত হলে প্রজাদের মধ্যে কারও তাকে হত্যা করার অধিকার নেই বরং এটা হচ্ছে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধির অধিকার। এরপরে (আরবী) রয়েছে এবং এটা হচ্ছে (আরবী) যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবী) এ আয়াতের শান-ই-নকূলে একটি উক্তি এই বর্ণিত আছে যে, এটা আবু জেহেলের বৈপিত্রেয় ভাই আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআর (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁর মাতার নাম আসমা বিনতে মুখরামা। তিনি একটি লোককে হত্যা করেছিলেন। লোকটির নাম ছিল হাস ইবনে ইয়াযীদ আল গামেদী।ঘটনা এই যে, হযরত আইয়াশ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর ভাই আবু জেহেলের সঙ্গে হাস ইবনে ইয়াযীদ যোগ দিয়ে তাকে শাস্তি প্রদান করে। ফলে তিনি মনে সংকল্প করেন যে, সুযোগ পেলেই হাস ইবনে ইয়াযীদকে হত্যা করবেন। কিছু দিন পর হাও মুসলমান হয়ে যায় এবং হিজরতও করে। হযরত আইয়াশ (রাঃ) কিন্তু এ খবর জানতেন না। মক্কা বিজয়ের দিন সে তার চোখে পড়ে যায় এবং এখনও সে কুফরীর উপরই রয়েছে এই মনে করে হঠাৎ তার উপর আক্রমণ করতঃ তাকে হত্যা করে ফেলেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য উক্তি এই যে, এ আয়াজটি হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, তিনি একজন কাফিরের উপর তরবারী উঠিয়েছেন এমন সময় সে ঈমানের কালেমা পাঠ করে। কিন্তু হযরত আবু দারদা (রাঃ) তার উপর তরবারী বসিয়েই দেন এবং লোকটি নিহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণিত হলে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) বলেন, সে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে কালেমা পড়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি তার অন্তর ফেড়ে দেখেছিলে?' এ ঘটনাটি বিশুদ্ধ হাদীসেও রয়েছে কিন্তু সেখনে অন্য সাহাবীর নাম আছে।অতঃপর ভ্রমবশতঃ হত্যার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, কোন মুসলমান যদি অপর কোন মুসলমানকে ভ্রমবশতঃ হত্যা করে তবে দু'টো জিনিস ওয়াজিব হবে। প্রথম হচ্ছে একটি দাসকে মুক্ত করা এবং দ্বিতীয় হচ্ছে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা-বিনিময় প্রদান করা। ঐ দাসের ব্যাপারে আবার শর্ত এই যে, তাকে হতে হবে মুমিন। কাফির দাসকে মুক্ত করলে তা যথেষ্ট হবে না এবং ছোট নাবালক দাসও যথেষ্ট হবে না যে পর্যন্ত সে স্বেচ্ছায় ঈমান আনয়নের মত বয়স প্রাপ্ত না হবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মনোনীত উক্তি এই যে, ঐ ছেলের বাপ-মা দু’জনই যদি মুসলমান হয় তবে যথেষ্ট হবে, নচেৎ হবে না। জমহূরের মাযহাব এই যে, মুসলমান হওয়া শর্ত, ছোট বা বড় হওয়ার কোন শর্ত নেই।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন আনসারী (রা) কৃষ্ণবর্ণের একটি দাসী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটি মুসলমান দাস বা দাসী মুক্ত করার দায়িত্ব আমার উপর রয়েছে। যদি এ দাসীটিকে আপনি মুসলমান মনে করেন তবে আমি তাকে মুক্ত করে দেবো’। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দাসীটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই?' সে বলেঃ হ্যা।' তিনি বলেনঃ তুমি কি এ সাক্ষ্যও দিচ্ছ যে, আমি আল্লাহর রাসূল?' সে বলে, “হ্যা।' তিনি বলেনঃ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর তোমার বিশ্বাস আছে কি? সে বলে, “হ্যা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আনসারীকে বলেনঃ ‘তাকে আযাদ করে দাও।' এ হাদীসের ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং ঐ সাহাবী কে ছিলেন তা গুপ্ত থাকা সনদের পক্ষে ক্ষতিকর নয়।এ বর্ণনাটি হাদীসের অরিও বহু পুস্তকে নিম্নরূপে বর্ণিত রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাসীটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আল্লাহ কোথায় আছেন? সে বলে, ‘আকাশে।' তিনি বলেনঃ “আমি কে? সে বলে, “আপনি আল্লাহ রাসূল (সঃ)'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন সাহাবীকে বলেনঃ ‘তাকে আযাদ করে দাও, সে মুমিন। তাহলে ভ্রমবশতঃ হত্যার কারণে এক তো গোলাম আযাদ করা ওয়াজিব ও দ্বিতীয় হচ্ছে রক্তপণ আদায় করা ওয়াজিব যা নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে সমর্পণ করতে হবে। এটাই হচ্ছে তার হত্যার বিনিময়। এ রক্তপণ হচ্ছে একশটি উট এবং এগুলো হবে পাঁচ প্রকারের। (১) বয়স প্রথম বছর পেরিয়ে দ্বিতীয় বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্ৰী। (২) এ বয়সেরই বিশটি উষ্ট্র। (৩) দ্বিতীয় বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্ৰী। (৪) তৃতীয় বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্রী। (৫) চতুর্থ বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্রী। এটাই হচ্ছে ভ্রমে হত্যার বিনিময় যা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফায়সালা করেছেন। (সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)এ হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। হযরত আলী (রাঃ) এবং একটি জামাআত হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, এ রক্তপণ চার প্রকারেও বন্টন করা হয়েছে। এ রক্তপণে হত্যাকারীর ‘আকেলার’ উপর ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ তার প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের পরের নিকটতম আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব হবে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে আমি কোন বিপরীত মতপোষণকারী পাইনি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রক্তপণের ফায়সালা এ লোকদের উপর করেছেন। এটা-ই-খাসসাহ হতে অধিক। ইমাম শাফিঈ (রঃ) যে হাদীসগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন ঐগুলো অনেক রয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুযাইল গোত্রের দু’টি মহিলা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়। একজন অপরজনকে একটি পাথর মেরে দেয়। সে গর্ভবতী ছিল। সন্তানও নষ্ট হয়ে যায় এবং সেও মারা যায়। ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বর্ণিত হলে তিনি ফায়সালা দেন যে, এ শিশুর রক্তপণ হচ্ছে একটি প্রাণ, দাস বা দাসী এবং ঐ নিহত মহিলার রক্তপণ ওয়াজিব হবে হত্যাকারিণীর প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের পরবর্তী আত্মীয়দের উপর। এর দ্বারা এও জানা গেল যে, যে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা ভুল বশতঃ হয়ে যায়, রক্তপণ হিসেবে তার হুকুম শুধু ভুল বশতঃ হত্যার মতই। কিন্তু ঐ অবস্থায় বন্টন হবে তিনের উপর। কেননা, সেখানে ইচ্ছাপূর্বক হত্যার সঙ্গেও সামঞ্জস্য রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-কে একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে খুযাইমা গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তথায় গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করলো বটে কিন্তু অজ্ঞতা বশতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমরা ইসলাম গ্রহণ করলাম’-এ কথার পরিবর্তে (আরবী) অর্থাৎ আমরা বেদ্বীন হয়ে গেলাম এ কথা বললো। হযরত খালিদ (রাঃ) তাদেরকে হত্যা করতে আরম্ভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহ! আমি খালিদ (রাঃ)-এর এ কার্যে আপনার নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করছি এবং নিজেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করছি।'অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে খুযাইমা গোত্রের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদের নিহতদের রক্তপণ এবং আর্থিক সমস্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধির ভুলের বোঝা বায়তুলমালকেই বহন করতে হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘রক্তপণ ওয়াজিব বটে, কিন্তু যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন স্বেচ্ছায় রক্তপণ ক্ষমা করে দেয় তবে তা করার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা ওটা সাদকা হিসেবে ক্ষমা করে দিতে পারে। এরপর ঘোষণা করা হচ্ছে- নিহত ব্যক্তি যদি মুসলমান হয় কিন্তু তার আত্মীয়-স্বজন। অমুসলিম রাষ্ট্রের কাফির হয় তবে হত্যাকারীর দায়িত্বে রক্তপণ নেই। ঐ অবস্থায় তাকে শুধু গোলাম আযাদ করতে হবে। আর যদি নিহত ব্যক্তির অলী ও উত্তরাধিকারী এমন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে, তবে রক্তপণ আদায় করতে হবে। আর যদি নিহত ব্যক্তি কাফির হয় তবে কারও মতে পূর্ণ রক্তপণ দিতে হবে, কারও মতে অধিক দিতে হবে এবং কারও মতে এক তৃতীয়াংশ দিতে হবে। এর বিস্তারিত বিবরণ আহকামের পুস্তকগুলোতে দ্রষ্টব্য। হত্যাকারীকে একজন মুমিন গোলাম আযাদ করতে হবে। দারিদ্রতা বশতঃ যদি কোন ব্যক্তি তাতে সক্ষম না হয় তবে তাকে ক্রমাগত দু'মাস রোযা রাখতে হবে। রোগ, হায়েয, নিফাস ইত্যাদির মত কোন শরীয়ত সম্মত ওযর ছাড়াই মধ্যে কোন একদিন যদি রোযা ছেড়ে দেয় তবে আবার নতুনভাবে রোযা শুরু করতে হবে। সফরের ব্যাপারে দুটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এটাও একটি শরীয়ত সমর্থিত ওযর। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এটা একটি শরীয়ত সমর্থিত ওযর নয়।এরপরে বলা হচ্ছে- ভ্রমবশতঃ হত্যার তাওবার উপায় এই যে, গোলাম আযাদ করতে না পারলে ক্রমাগত দুমাস রোযা রাখতে হবে। যদি রোযা রাখতেও সক্ষম না হয় তবে ষাটটি মিসকীনকে খানা খেতে দেয়া তার উপর ওয়াজিব কি-না এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, রোযা রাখতে না পারলে ৬০টি মিসকীনকে খানা খেতে দিতে হবে। যেমন যিহারের কাফফারায় রয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এখানে স্পষ্টভাবে বর্ণনা না করার কারণ এই যে, এটা হচ্ছে ভীতি প্রদর্শনের স্থান। সুতরাং সহজ পন্থা যদি বলে দেয়া হতো তবে আতংক ও সন্ত্রাস এতটা প্রকাশ পেতো না। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, রোযার পরে আর কিছুই নেই। যদি থাকতো তবে সাথে সাথেই বর্ণনা করে দেয়া হতো। প্রয়োজনের সময় হতে বর্ণনাকে পিছিয়ে দেয়া ঠিক নয়। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়’ -এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। ভ্রমবশতঃ হত্যার বর্ণনার পর এখন ইচ্ছাপূর্বক হত্যার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এর কঠিন ভীতিযুক্ত শাস্তির কথা বলা হচ্ছে। এটা এমন একটা পাপ যাকে শিকের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘মুমিন তারাই যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে মা’বৃদরূপে খাড়া করে না এবং তারা কোন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না।' (২৫:৬৮)অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছেঃ (আরবী) (৬:১৫১) এখানেও আল্লাহ তা'আলা হারামকৃত কার্যাবলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে শির্ক ও হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম রক্তের ফায়সালা করা হবে। সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিন পুণ্যে ও মঙ্গলে বেড়ে চলে যে পর্যন্ত না সে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে। যখন সে এটা করে তখন সে ধ্বংস হয়ে যায়। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ আ'আলার নিকট সারা জগতের পতন একজন মুসলমানের হত্যা অপেক্ষা হালকা। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যদি সারা ভূপৃষ্ঠের ও আকাশের অধিবাসী একজন মুসলমানকে হত্যার কাজে একত্রিত হয় তবে আল্লাহ সকলকেই উল্টো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যার ব্যাপারে অর্ধেক কথা দিয়েও সাহায্য করে, সে কিয়ামতের দিন ঐ অবস্থায় উঠবে যে, তার কপালে লিখা থাকবেঃ এ ব্যক্তি আল্লাহর করুণা হতে বঞ্চিত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি তো এই যে, যে ব্যক্তি মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তার তাওবা কবুলই হয় না। কুফাবাসী এ মাসআলায় মতভেদ করলে হযরত ইবনে যুবাইর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) -কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন (২৫:৬৮) -এটা শেষ আয়াত যাকে অন্য কোন আয়াত রহিত করেনি। তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) -এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।অতএব যখন কোন লোক ইসলামের অবস্থায় শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়াই কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম এবং তার তাওবা গ্রহণীয় হবে না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) যখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ বর্ণনাটি শ্রবণ করেন তখন বলেন, কিন্তু যে অনুতপ্ত হয়। হযরত সালেম ইবনে আবুল জাদ (রঃ) বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যখন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সে সময় একদা আমরা তাঁর নিকটে বসেছিলাম। এমন সময় একটি লোক এসে তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলে, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করে তার সম্বন্ধে আপনি কি বলেন? তিনি বলেন, তার শাস্তি জাহান্নাম যার মধ্যে সে সদা অবস্থান করবে। আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত, তার উপর তার অভিসম্পাত রয়েছে এবং তার জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।' লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করে, যদি সে তাওবা করতঃ ভাল কাজ করে এবং হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়?' তিনি বলেন, তার মা তার জন্যে ক্রন্দন করুক, তার তাওবা ও সুপথ প্রাপ্তি কোথায়? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি তোমাদের নবী (সঃ) হতে শুনেছি ও তার মা তার জন্যে কাঁদুক, যে কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করেছে সে নিহত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তাকে স্বীয় ডান বা বাম হস্তে ধরে নিয়ে রহমানের আরশের সামনে আনবে এবং ডান হাতে বা বাম হাতে স্বীয় মস্তক ধারণ করবে। তার শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করবে এবং সে আল্লাহ তা'আলাকে বলবে হে আল্লাহ! সে আমাকে কেন হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়র পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যু পর্যন্ত একে রহিতকারী কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি।অন্য বর্ণনায় এটুকু বেশীও রয়েছেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এর ইন্তেকালের পর কোন অহী অবতীর্ণ হবে না।' হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ), হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে উমায়ের (রঃ), হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত যহহাকও (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতের সঙ্গে রয়েছেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি স্বীয় হত্যাকারীকে ধরে আল্লাহ তা'আলার সামনে নিয়ে আসবে এবং অন্য হাতে স্বীয় মস্তক ধারণ করবে, অতঃপর বলবেঃ “ হে আমার প্রভু! সে আমাকে কেন হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন। তখন হত্যাকারী বলবে, আমি তাকে হত্যা করেছিলাম যেন আপনার মর্য য়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “নিশ্চয়ই ওটা আমার জন্যে।অন্য একজন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ধরে নিয়ে আসবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রভু! এ লোকটি কেন আমাকে হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন।' হত্যাকারী তখন বলবে, আমি তাকে হত্যা করেছিলাম যেন অমুকের সম্মান বৃদ্ধি পায়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘ওটা তার জন্যে নয়। তুমি তার পাপের বোঝা নিয়ে ফিরে যাও।' অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, সত্তর বছরে সে ঐ গর্তের তলদেশে পৌছবে।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক পাপ মার্জনা করবেন, কিন্তু শুধু ঐ ব্যক্তিকে (ক্ষমা করবেন না) যে কুফরীর অবস্থায় মারা যায়, অথবা ঐ ব্যক্তিকে (মার্জনা করবেন না) যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে ।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে ইবনে যাকারিয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি উম্মু দারদা (রাঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু দারদা (রাঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন, কিন্তু (মার্জনা করবেন না) যে মুশরিক হয়ে মরেছে বা যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করেছে।” এ হাদীসটি দুর্বল। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিই রক্ষিত। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, সে মহাসম্মানিত আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে।' এ হাদীসটি মুনকার এবং এর ইসনাদেও বহু সমালোচনা রয়েছে। মুসনাদ-ই-আত্মাদে রয়েছে, হযরত হুমায়েদ (রঃ) বলেন, আমার নিকট হযরত আবুল আলিয়া আগমন করেন। সে সময় আমার নিকট আমার এক বন্ধুও ছিলেন। তিনি আমাদেরকে বলেন, “তোমরা দু'জন আমার অপেক্ষা বয়সে ছোট এবং আমার চেয়ে তোমাদের হাদীসও বেশী মনে রয়েছে, চল আমরা বাশার ইবনে আসেম (রঃ)-এর নিকট গমন করি। আমরা তথায় পৌছলে হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) হযরত বাশার (রঃ)-কে বলেনঃ ‘এদেরকেও ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দিন। তিনি তখন হাদীসটি শুনাতে আরম্ভ করেন। হযরত উকবা ইবনে মালিক লাইসী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাদল প্রেরণ করেন। তারা একটি গোত্রের উপর আক্রমণ চালায়। গোত্রের লোকগুলো পালিয়ে যায়। তাদের সাথে অন্য একটি লোকও পালিয়ে যাচ্ছিল। মুসলিম সৈন্যদের একজন তার পশ্চাদ্ধাবন করে এবং খোলা তরবারী নিয়ে তার নিকট পৌছে যায়। তখন লোকটি বলে, 'আমি তো মুসলমান। মুসলিম সৈন্যটি তার কথার উপর কোনই গুরুত্ব না দিয়ে তাকে হতা করে ফেলে। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং কঠোর উক্তি করেন। হত্যাকারীও এ সংবাদ পেয়ে যায়। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমন সময় ঐ হত্যাকারী বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটি তো এ কথা শুধু প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যেই বলেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং ভাষণ দিতেই থাকেন। লোকটি দ্বিতীয়বার ঐ কথাই বলে। কিন্তু এবারেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুখ ফিরিয়ে নেন। সে ধৈর্য ধারণ করতে না পেরে তৃতীয়বার বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটি তো শুধু প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই এ কথা বলেছিল। এবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি মননাযোগী হন এবং তার চেহারায় অসন্তোষের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তিনি বলেনঃ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুমিনের হত্যাকারীর উপর অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে।অতএব একটি মাযহাব তো হলো এই যে, জেনে শুনে হত্যাকারীর তাওবা গ্রহণীয় নয়। দ্বিতীয় মাযহাব এই যে, তাওবা তার ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহরের মাযহাব এটাই যে, সে যদি তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, বিনয় প্রকাশ করে এবং সৎকার্যাবলী সম্পাদন করতে থাকে তবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা গ্রহণ করবেন এবং নিহত ব্যক্তিকে স্বীয় পক্ষ হতে বিনিময় প্রদান করতঃ সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহ তা'আলা : (আরবী) হতে (আরবী) (২৫:৬৮-৬৯) পর্যন্ত আয়াত গুলোর মধ্যে যা বলেছেন তা হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) -এর মধ্যে রহিতকরণের সম্ভাবনাই নেই। আর ঐ আয়াতটি মুশরিকদের জন্যে এবং এ আয়াতকে মুমিনের জন্যে নির্দিষ্ট করা প্রকাশ্যের বিপরীত এবং কোন দলীলের মুখাপেক্ষী। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার ঐ বান্দারা যারা নিজেদের জীবনের উপর বাড়াবাড়ি করেছো, তোমরা আমার করুণা হতে নিরাশ হয়ো না।' (৩৯:৫৩) এ আয়াতটি সাধারণ, সুতরাং কুফরী, শিরুক, নিফাক, হত্যা ইত্যাদি সমস্ত পাপই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব পাপকার্যে লিপ্ত হবার পর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪:৪৮)-এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা শিরুক ছাড়া অন্যান্য সমস্ত পাপ ইচ্ছে করলে ক্ষমা করে দেবেন। এটা তাঁর একটা বড় অনুকম্পা যে, তিনি এ সূরার মধ্যেই এখন আমরা যে আয়াতের তাফসীর করছি এর পূর্বে একবার স্বীয় সাধারণ ক্ষমার আয়াত বর্ণনা করেছেন। এ আয়াতের পরই অনুরূপভাবে স্বীয় সাধারণ ক্ষমার কথা পুনরায় ঘোষণা করেছেন যেন আশা দৃঢ় হয়।এখানে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য যাতে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন লোক একশোটি লোককে হত্যা করেছিল। অতঃপর সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে, “আমার তাওবা গৃহীত হবে কি? তিনি উত্তরে বলেন, তোমার মধ্যে ও তোমার তাওবার মধ্যে কে প্রতিবন্ধক হবে?' অতঃপর তিনি তাকে পুণ্যময় শহরে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে বলেন। অতএব সে ঐ শহরে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়। পথে সে মৃত্যু মুখে পতিত হয় এবং রহমতের ফেরেশতা এসে তাকে নিয়ে যান। এ হাদীসটিকে পূর্ণভাবে কয়েক জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। বানী ইসরাঈলের মধ্যেই যখন ক্ষমার এ ব্যবস্থা রয়েছে তখন আমাদের মধ্যে তো সে ক্ষমার ব্যবস্থা বহুগুণে বেশী থাকা উচিত। কেননা, বানী ইসরাঈল এমন বহু অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যা থেকে আল্লাহ পাক আমাদেরকে মুক্ত রেখেছেন। আর তিনি বিশ্ব শান্তির দূত ও নবীদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পাঠিয়ে এমন ধর্ম তিনি আমাদেরকে দান করেছেন যা আকাশেও শান্তিদায়ক এবং পৃথিবীতেও শান্তিদায়ক। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সরল ও পরিষ্কার ধর্ম। কাজেই এখানে হত্যাকারীর তাওবার দরজা বন্ধ হবে কেন?তাহলে এখানে হত্যাকারীর যে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার ভাবার্থ এই যে, তার শাস্তি হচ্ছে এই যদি আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দেন। যেমন আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং পূর্বযুগীয় মনীষীদের একটি দল একথাই বলেন। এমনকি এ অর্থবোধক একটি হাদীসও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সনদ হিসেবে হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে প্রত্যেক শাস্তির ভয় প্রদর্শনের ভাবার্থ এই যে, ওর পিছনে যদি কোন সৎ আমল না থাকে তবে সে পাপের শাস্তি ওটাই হবে যে শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে ।শাস্তির ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে আমাদের নিকট সঠিক ও উত্তম পন্থা এটাই। সত্য সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। আর হত্যাকারীর জাহান্নামী হওয়ার ব্যাপারেও এটা প্রযোজ্য যে, সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে না। তার জাহান্নামী হওয়া হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে তাওবা গৃহীত না হওয়ার কারণেই হোক বা জমহূরের উক্তি অনুযায়ী ওর পিছনে কোন সন্ধার্য থাকার কারণেই হোক।এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বহুদিন অবস্থান-চিরদিন অবস্থান নয়। যেমন হাদীস-ই-মুতাওয়াতির দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, জাহান্নাম থেকে ঐ ব্যক্তিও বের হবে যার অন্তরে সরিষার ছোট দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে। উপরে যে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছেঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক পাপই ক্ষমা করে দেবেন, কিন্তু (ক্ষমা করবেন না) যে কাফির হয়ে যাবে বা যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করবে।” এ হাদীসে (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) বা আশা উদ্দীপক। তাহলে এ দু' অবস্থায় (কুফরী ও মুমিন হত্যা) যদিও আশা উঠে যায়, কিন্তু সংঘটন অর্থাৎ এরূপ ঘটে যাওয়া এ দুটোর মধ্যে একটিতে উঠে যায় না এবং সেটা হচ্ছে হত্যা। কেননা, শির্ক ও কুফরীর ক্ষমা না হওয়া তো কুরআন মাজীদের শব্দ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে। আর যে হাদীসগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট ধরে আনবে সেগুলোও সম্পূর্ণরূপে সঠিক। এতে মানুষের অধিকার রয়েছে বলে তাওবা দ্বারা এ পাপ ক্ষমা হতে পারে না। বরং মানুষের হক তো তাওবার অবস্থাতেও হকদারকে পৌছিয়ে দিতে হবে। এতে যেমন হত্যা রয়েছে দ্রুপ চুরি, জবরদখল, অপবাদ এবং অনান্য হককুল ইবাদও রয়েছে। এগুলো তাওবা দ্বারা ক্ষমা না হওয়া ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। এ অবস্থায় তাওবার বিশুদ্ধতার জন্যে শর্ত হলো প্রাপকদের প্রাপ্যগুলো আদায় করে দেয়া। আর আদায় করা যখন অসম্ভব তখন কিয়ামতের দিন দাবীদারগণ দাবী অবশ্যই করবে। কিন্তু দাবী করলেই যে শাস্তি ঘটেই যাবে এটা জরুরী নয়। এও সম্ভব যে, হত্যাকারীর সমস্ত ভাল কাজের পুণ্য নিহত ব্যক্তিকে দেয়া হবে বা আংশিক পূণ্য দেয়া হবে এবং তাকে দেয়ার পরেও হয়তো হত্যাকারীর নিকট কিছু পণ্য থেকেও যাবে, আর ওর বিনিময়ে হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আবার এটাও অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পক্ষ হতে নিহত ব্যক্তিকে হর, প্রাসাদ, উচ্চ মর্যাদা এবং জান্নাত দিয়ে তার দাবী পূরণ করবেন এবং ওরই বিনিময়ে হয়তো সে তার হন্তাকে খুশী মনে ক্ষমা করে দেবে, ফলে আল্লাহ তাআলাও তাকে মাফ করবেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন। ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর জন্যে কিছু ইহলৌকিক নির্দেশ রয়েছে এবং কিছু পারলৌকিক নির্দেশ রয়েছে। ইহজগতে তার উপর আল্লাহ তা'আলা নিহত ব্যক্তির অভিভাবককে প্রভুত্ব দান করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তির অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে, আমি তার অভিভাবককে প্রভুত্ব দান করেছি।' (১৭:৩৩) তার অধিকার রয়েছে যে, প্রতিশোধ নিতে পারে অর্থাৎ হত্যাকারীকেও হত্যা করাতে পারে কিংবা ক্ষমা করতে পারে, রক্তপণও আদায় করতে পারে। এর রক্তপণও খুব কঠিন। এটা তিন ভাগে বিভক্ত। (১) ত্রিশটি দিতে হবে ঐ উট যেগুলোর বয়স তিন বছর পার হয়ে চতুর্থ বছরে। পড়েছে। (২) ত্রিশটি দিতে হবে ঐ উট যেগুলো পঞ্চম বছরে পড়েছে। (৩) চল্লিশটি দিতে হবে গর্ভবতী উষ্ট্রী। এগুলো আহকামের পুস্তকসমূহে সাব্যস্ত রয়েছে। সজ্ঞানে হত্যাকারীর উপর গোলাম আযাদ করা বা একাধিক্রমে দু'মাস রোযা রাখা অথবা ষাটটি মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে কি-না সে ব্যাপারে ইমামগণের মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও তাঁর সহচরগণের ও আলেমদের একটি দলের উক্তি এই যে, ভ্রমবশতঃ হত্যায় যখন এ ব্যবস্থা রয়েছে তখন ইচ্ছাপূর্বক হত্যায় থাকাতে আরও যুক্তিযুক্ত। ঐগুলোর উপর উত্তর হিসেবে শরীয়ত অসম্মত, মিথ্যা শপথের কাফফারা পেশ করা হয়েছে এবং তাঁরা ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের কাযাকে তার ওযর বানিয়েছেন, যেমন ভুলের সময় তার উপর ইজমা রয়েছে।ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর সহচরগণ এবং অন্যান্যগণ বলেন যে, ইচ্ছাপূর্বক হত্যা কাফফারা হতে অনেক বড়। এজন্যেই তাতে কাফফারা নেই। অনুরূপভাবে মিথ্যা শপথ এবং ঐ দু’ অবস্থায়ও ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের মধ্যে পার্থক্য করণের তাঁদের কোন পথ নেই। কেননা, তারা ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের কাযা ওয়াজিব হওয়ার সমর্থক। পূর্বদলের একটি দলীল মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটিও বটেঃ হযরত গারীফ ইবনে আইয়াশ আদদায়লামী (রঃ) বলেন, আমরা হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসকা। (রাঃ)-এর নিকট এসে বলি, আমাদেরকে এমন একটি হাদীস শুনিয়ে দিন যাতে কোন কম বেশী থাকবে না।' একথা শুনে তিনি খুব অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন-‘তোমরা যখন কুরআন কারীম নিয়ে পাঠ কর তখন তাতে কম বেশী কর না কি?' তখন আমরা বলি, আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, যা আপনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। তিনি তখন বলেন, আমরা আমাদের এমন একটি লোকের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়েছিলাম যে লোকটি হত্যার কারণে নিজেকে জাহান্নামী করে নিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তার পক্ষ হতে একটি দাসকৈ মুক্ত কর। তার এক একটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ ঐ লোকটির এক একটি অঙ্গ জাহান্নাম হতে মুক্ত করবেন।
আন-নিসা 4:93
৯২-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ “কোন মুমিনের উচিত নয় যে, সে তার কোন মুমিন ভাইকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং আমি তাঁর রাসূল, তার রক্ত হালাল নয়, কিন্তু তিনটির মধ্যে যে কোন একটি কারণে (হত্যা করা বৈধ)। (১) কাউকে হত্যা করা, (২) বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা এবং (৩) ধর্ম ত্যাগ করে দল হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া। এ তিনটি কাজ কারও দ্বারা সংঘটিত হলে প্রজাদের মধ্যে কারও তাকে হত্যা করার অধিকার নেই বরং এটা হচ্ছে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধির অধিকার। এরপরে (আরবী) রয়েছে এবং এটা হচ্ছে (আরবী) যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবী) এ আয়াতের শান-ই-নকূলে একটি উক্তি এই বর্ণিত আছে যে, এটা আবু জেহেলের বৈপিত্রেয় ভাই আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআর (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁর মাতার নাম আসমা বিনতে মুখরামা। তিনি একটি লোককে হত্যা করেছিলেন। লোকটির নাম ছিল হাস ইবনে ইয়াযীদ আল গামেদী।ঘটনা এই যে, হযরত আইয়াশ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর ভাই আবু জেহেলের সঙ্গে হাস ইবনে ইয়াযীদ যোগ দিয়ে তাকে শাস্তি প্রদান করে। ফলে তিনি মনে সংকল্প করেন যে, সুযোগ পেলেই হাস ইবনে ইয়াযীদকে হত্যা করবেন। কিছু দিন পর হাও মুসলমান হয়ে যায় এবং হিজরতও করে। হযরত আইয়াশ (রাঃ) কিন্তু এ খবর জানতেন না। মক্কা বিজয়ের দিন সে তার চোখে পড়ে যায় এবং এখনও সে কুফরীর উপরই রয়েছে এই মনে করে হঠাৎ তার উপর আক্রমণ করতঃ তাকে হত্যা করে ফেলেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য উক্তি এই যে, এ আয়াজটি হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, তিনি একজন কাফিরের উপর তরবারী উঠিয়েছেন এমন সময় সে ঈমানের কালেমা পাঠ করে। কিন্তু হযরত আবু দারদা (রাঃ) তার উপর তরবারী বসিয়েই দেন এবং লোকটি নিহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণিত হলে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) বলেন, সে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে কালেমা পড়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি তার অন্তর ফেড়ে দেখেছিলে?' এ ঘটনাটি বিশুদ্ধ হাদীসেও রয়েছে কিন্তু সেখনে অন্য সাহাবীর নাম আছে।অতঃপর ভ্রমবশতঃ হত্যার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, কোন মুসলমান যদি অপর কোন মুসলমানকে ভ্রমবশতঃ হত্যা করে তবে দু'টো জিনিস ওয়াজিব হবে। প্রথম হচ্ছে একটি দাসকে মুক্ত করা এবং দ্বিতীয় হচ্ছে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা-বিনিময় প্রদান করা। ঐ দাসের ব্যাপারে আবার শর্ত এই যে, তাকে হতে হবে মুমিন। কাফির দাসকে মুক্ত করলে তা যথেষ্ট হবে না এবং ছোট নাবালক দাসও যথেষ্ট হবে না যে পর্যন্ত সে স্বেচ্ছায় ঈমান আনয়নের মত বয়স প্রাপ্ত না হবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মনোনীত উক্তি এই যে, ঐ ছেলের বাপ-মা দু’জনই যদি মুসলমান হয় তবে যথেষ্ট হবে, নচেৎ হবে না। জমহূরের মাযহাব এই যে, মুসলমান হওয়া শর্ত, ছোট বা বড় হওয়ার কোন শর্ত নেই।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, একজন আনসারী (রা) কৃষ্ণবর্ণের একটি দাসী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটি মুসলমান দাস বা দাসী মুক্ত করার দায়িত্ব আমার উপর রয়েছে। যদি এ দাসীটিকে আপনি মুসলমান মনে করেন তবে আমি তাকে মুক্ত করে দেবো’। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দাসীটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই?' সে বলেঃ হ্যা।' তিনি বলেনঃ তুমি কি এ সাক্ষ্যও দিচ্ছ যে, আমি আল্লাহর রাসূল?' সে বলে, “হ্যা।' তিনি বলেনঃ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর তোমার বিশ্বাস আছে কি? সে বলে, “হ্যা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আনসারীকে বলেনঃ ‘তাকে আযাদ করে দাও।' এ হাদীসের ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং ঐ সাহাবী কে ছিলেন তা গুপ্ত থাকা সনদের পক্ষে ক্ষতিকর নয়।এ বর্ণনাটি হাদীসের অরিও বহু পুস্তকে নিম্নরূপে বর্ণিত রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাসীটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আল্লাহ কোথায় আছেন? সে বলে, ‘আকাশে।' তিনি বলেনঃ “আমি কে? সে বলে, “আপনি আল্লাহ রাসূল (সঃ)'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন সাহাবীকে বলেনঃ ‘তাকে আযাদ করে দাও, সে মুমিন। তাহলে ভ্রমবশতঃ হত্যার কারণে এক তো গোলাম আযাদ করা ওয়াজিব ও দ্বিতীয় হচ্ছে রক্তপণ আদায় করা ওয়াজিব যা নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে সমর্পণ করতে হবে। এটাই হচ্ছে তার হত্যার বিনিময়। এ রক্তপণ হচ্ছে একশটি উট এবং এগুলো হবে পাঁচ প্রকারের। (১) বয়স প্রথম বছর পেরিয়ে দ্বিতীয় বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্ৰী। (২) এ বয়সেরই বিশটি উষ্ট্র। (৩) দ্বিতীয় বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্ৰী। (৪) তৃতীয় বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্রী। (৫) চতুর্থ বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে পড়েছে এরূপ বিশটি উষ্ট্রী। এটাই হচ্ছে ভ্রমে হত্যার বিনিময় যা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফায়সালা করেছেন। (সুনান ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)এ হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। হযরত আলী (রাঃ) এবং একটি জামাআত হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, এ রক্তপণ চার প্রকারেও বন্টন করা হয়েছে। এ রক্তপণে হত্যাকারীর ‘আকেলার’ উপর ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ তার প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের পরের নিকটতম আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব হবে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে আমি কোন বিপরীত মতপোষণকারী পাইনি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রক্তপণের ফায়সালা এ লোকদের উপর করেছেন। এটা-ই-খাসসাহ হতে অধিক। ইমাম শাফিঈ (রঃ) যে হাদীসগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন ঐগুলো অনেক রয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুযাইল গোত্রের দু’টি মহিলা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়। একজন অপরজনকে একটি পাথর মেরে দেয়। সে গর্ভবতী ছিল। সন্তানও নষ্ট হয়ে যায় এবং সেও মারা যায়। ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বর্ণিত হলে তিনি ফায়সালা দেন যে, এ শিশুর রক্তপণ হচ্ছে একটি প্রাণ, দাস বা দাসী এবং ঐ নিহত মহিলার রক্তপণ ওয়াজিব হবে হত্যাকারিণীর প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের পরবর্তী আত্মীয়দের উপর। এর দ্বারা এও জানা গেল যে, যে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা ভুল বশতঃ হয়ে যায়, রক্তপণ হিসেবে তার হুকুম শুধু ভুল বশতঃ হত্যার মতই। কিন্তু ঐ অবস্থায় বন্টন হবে তিনের উপর। কেননা, সেখানে ইচ্ছাপূর্বক হত্যার সঙ্গেও সামঞ্জস্য রয়েছে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-কে একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে খুযাইমা গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তথায় গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করলো বটে কিন্তু অজ্ঞতা বশতঃ (আরবী) অর্থাৎ আমরা ইসলাম গ্রহণ করলাম’-এ কথার পরিবর্তে (আরবী) অর্থাৎ আমরা বেদ্বীন হয়ে গেলাম এ কথা বললো। হযরত খালিদ (রাঃ) তাদেরকে হত্যা করতে আরম্ভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহ! আমি খালিদ (রাঃ)-এর এ কার্যে আপনার নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করছি এবং নিজেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করছি।'অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে খুযাইমা গোত্রের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদের নিহতদের রক্তপণ এবং আর্থিক সমস্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধির ভুলের বোঝা বায়তুলমালকেই বহন করতে হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘রক্তপণ ওয়াজিব বটে, কিন্তু যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন স্বেচ্ছায় রক্তপণ ক্ষমা করে দেয় তবে তা করার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা ওটা সাদকা হিসেবে ক্ষমা করে দিতে পারে। এরপর ঘোষণা করা হচ্ছে- নিহত ব্যক্তি যদি মুসলমান হয় কিন্তু তার আত্মীয়-স্বজন। অমুসলিম রাষ্ট্রের কাফির হয় তবে হত্যাকারীর দায়িত্বে রক্তপণ নেই। ঐ অবস্থায় তাকে শুধু গোলাম আযাদ করতে হবে। আর যদি নিহত ব্যক্তির অলী ও উত্তরাধিকারী এমন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে, তবে রক্তপণ আদায় করতে হবে। আর যদি নিহত ব্যক্তি কাফির হয় তবে কারও মতে পূর্ণ রক্তপণ দিতে হবে, কারও মতে অধিক দিতে হবে এবং কারও মতে এক তৃতীয়াংশ দিতে হবে। এর বিস্তারিত বিবরণ আহকামের পুস্তকগুলোতে দ্রষ্টব্য। হত্যাকারীকে একজন মুমিন গোলাম আযাদ করতে হবে। দারিদ্রতা বশতঃ যদি কোন ব্যক্তি তাতে সক্ষম না হয় তবে তাকে ক্রমাগত দু'মাস রোযা রাখতে হবে। রোগ, হায়েয, নিফাস ইত্যাদির মত কোন শরীয়ত সম্মত ওযর ছাড়াই মধ্যে কোন একদিন যদি রোযা ছেড়ে দেয় তবে আবার নতুনভাবে রোযা শুরু করতে হবে। সফরের ব্যাপারে দুটি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এটাও একটি শরীয়ত সমর্থিত ওযর। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এটা একটি শরীয়ত সমর্থিত ওযর নয়।এরপরে বলা হচ্ছে- ভ্রমবশতঃ হত্যার তাওবার উপায় এই যে, গোলাম আযাদ করতে না পারলে ক্রমাগত দুমাস রোযা রাখতে হবে। যদি রোযা রাখতেও সক্ষম না হয় তবে ষাটটি মিসকীনকে খানা খেতে দেয়া তার উপর ওয়াজিব কি-না এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, রোযা রাখতে না পারলে ৬০টি মিসকীনকে খানা খেতে দিতে হবে। যেমন যিহারের কাফফারায় রয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এখানে স্পষ্টভাবে বর্ণনা না করার কারণ এই যে, এটা হচ্ছে ভীতি প্রদর্শনের স্থান। সুতরাং সহজ পন্থা যদি বলে দেয়া হতো তবে আতংক ও সন্ত্রাস এতটা প্রকাশ পেতো না। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, রোযার পরে আর কিছুই নেই। যদি থাকতো তবে সাথে সাথেই বর্ণনা করে দেয়া হতো। প্রয়োজনের সময় হতে বর্ণনাকে পিছিয়ে দেয়া ঠিক নয়। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়’ -এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। ভ্রমবশতঃ হত্যার বর্ণনার পর এখন ইচ্ছাপূর্বক হত্যার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এর কঠিন ভীতিযুক্ত শাস্তির কথা বলা হচ্ছে। এটা এমন একটা পাপ যাকে শিকের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘মুমিন তারাই যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে মা’বৃদরূপে খাড়া করে না এবং তারা কোন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না।' (২৫:৬৮)অন্য জায়গায় ঘোষিত হচ্ছেঃ (আরবী) (৬:১৫১) এখানেও আল্লাহ তা'আলা হারামকৃত কার্যাবলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে শির্ক ও হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম রক্তের ফায়সালা করা হবে। সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুমিন পুণ্যে ও মঙ্গলে বেড়ে চলে যে পর্যন্ত না সে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে। যখন সে এটা করে তখন সে ধ্বংস হয়ে যায়। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ আ'আলার নিকট সারা জগতের পতন একজন মুসলমানের হত্যা অপেক্ষা হালকা। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, যদি সারা ভূপৃষ্ঠের ও আকাশের অধিবাসী একজন মুসলমানকে হত্যার কাজে একত্রিত হয় তবে আল্লাহ সকলকেই উল্টো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যার ব্যাপারে অর্ধেক কথা দিয়েও সাহায্য করে, সে কিয়ামতের দিন ঐ অবস্থায় উঠবে যে, তার কপালে লিখা থাকবেঃ এ ব্যক্তি আল্লাহর করুণা হতে বঞ্চিত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি তো এই যে, যে ব্যক্তি মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তার তাওবা কবুলই হয় না। কুফাবাসী এ মাসআলায় মতভেদ করলে হযরত ইবনে যুবাইর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) -কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন (২৫:৬৮) -এটা শেষ আয়াত যাকে অন্য কোন আয়াত রহিত করেনি। তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) -এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।অতএব যখন কোন লোক ইসলামের অবস্থায় শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়াই কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম এবং তার তাওবা গ্রহণীয় হবে না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) যখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ বর্ণনাটি শ্রবণ করেন তখন বলেন, কিন্তু যে অনুতপ্ত হয়। হযরত সালেম ইবনে আবুল জাদ (রঃ) বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যখন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সে সময় একদা আমরা তাঁর নিকটে বসেছিলাম। এমন সময় একটি লোক এসে তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলে, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করে তার সম্বন্ধে আপনি কি বলেন? তিনি বলেন, তার শাস্তি জাহান্নাম যার মধ্যে সে সদা অবস্থান করবে। আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত, তার উপর তার অভিসম্পাত রয়েছে এবং তার জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।' লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করে, যদি সে তাওবা করতঃ ভাল কাজ করে এবং হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়?' তিনি বলেন, তার মা তার জন্যে ক্রন্দন করুক, তার তাওবা ও সুপথ প্রাপ্তি কোথায়? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি তোমাদের নবী (সঃ) হতে শুনেছি ও তার মা তার জন্যে কাঁদুক, যে কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করেছে সে নিহত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তাকে স্বীয় ডান বা বাম হস্তে ধরে নিয়ে রহমানের আরশের সামনে আনবে এবং ডান হাতে বা বাম হাতে স্বীয় মস্তক ধারণ করবে। তার শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করবে এবং সে আল্লাহ তা'আলাকে বলবে হে আল্লাহ! সে আমাকে কেন হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়র পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যু পর্যন্ত একে রহিতকারী কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি।অন্য বর্ণনায় এটুকু বেশীও রয়েছেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এর ইন্তেকালের পর কোন অহী অবতীর্ণ হবে না।' হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ), হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে উমায়ের (রঃ), হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) এবং হযরত যহহাকও (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতের সঙ্গে রয়েছেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি স্বীয় হত্যাকারীকে ধরে আল্লাহ তা'আলার সামনে নিয়ে আসবে এবং অন্য হাতে স্বীয় মস্তক ধারণ করবে, অতঃপর বলবেঃ “ হে আমার প্রভু! সে আমাকে কেন হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন। তখন হত্যাকারী বলবে, আমি তাকে হত্যা করেছিলাম যেন আপনার মর্য য়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “নিশ্চয়ই ওটা আমার জন্যে।অন্য একজন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ধরে নিয়ে আসবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রভু! এ লোকটি কেন আমাকে হত্যা করেছিল তা তাকে জিজ্ঞেস করুন।' হত্যাকারী তখন বলবে, আমি তাকে হত্যা করেছিলাম যেন অমুকের সম্মান বৃদ্ধি পায়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘ওটা তার জন্যে নয়। তুমি তার পাপের বোঝা নিয়ে ফিরে যাও।' অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, সত্তর বছরে সে ঐ গর্তের তলদেশে পৌছবে।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক পাপ মার্জনা করবেন, কিন্তু শুধু ঐ ব্যক্তিকে (ক্ষমা করবেন না) যে কুফরীর অবস্থায় মারা যায়, অথবা ঐ ব্যক্তিকে (মার্জনা করবেন না) যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে ।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে ইবনে যাকারিয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি উম্মু দারদা (রাঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু দারদা (রাঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন, কিন্তু (মার্জনা করবেন না) যে মুশরিক হয়ে মরেছে বা যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করেছে।” এ হাদীসটি দুর্বল। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিই রক্ষিত। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, সে মহাসম্মানিত আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে।' এ হাদীসটি মুনকার এবং এর ইসনাদেও বহু সমালোচনা রয়েছে। মুসনাদ-ই-আত্মাদে রয়েছে, হযরত হুমায়েদ (রঃ) বলেন, আমার নিকট হযরত আবুল আলিয়া আগমন করেন। সে সময় আমার নিকট আমার এক বন্ধুও ছিলেন। তিনি আমাদেরকে বলেন, “তোমরা দু'জন আমার অপেক্ষা বয়সে ছোট এবং আমার চেয়ে তোমাদের হাদীসও বেশী মনে রয়েছে, চল আমরা বাশার ইবনে আসেম (রঃ)-এর নিকট গমন করি। আমরা তথায় পৌছলে হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) হযরত বাশার (রঃ)-কে বলেনঃ ‘এদেরকেও ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দিন। তিনি তখন হাদীসটি শুনাতে আরম্ভ করেন। হযরত উকবা ইবনে মালিক লাইসী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছোট সেনাদল প্রেরণ করেন। তারা একটি গোত্রের উপর আক্রমণ চালায়। গোত্রের লোকগুলো পালিয়ে যায়। তাদের সাথে অন্য একটি লোকও পালিয়ে যাচ্ছিল। মুসলিম সৈন্যদের একজন তার পশ্চাদ্ধাবন করে এবং খোলা তরবারী নিয়ে তার নিকট পৌছে যায়। তখন লোকটি বলে, 'আমি তো মুসলমান। মুসলিম সৈন্যটি তার কথার উপর কোনই গুরুত্ব না দিয়ে তাকে হতা করে ফেলে। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং কঠোর উক্তি করেন। হত্যাকারীও এ সংবাদ পেয়ে যায়। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমন সময় ঐ হত্যাকারী বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটি তো এ কথা শুধু প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যেই বলেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং ভাষণ দিতেই থাকেন। লোকটি দ্বিতীয়বার ঐ কথাই বলে। কিন্তু এবারেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুখ ফিরিয়ে নেন। সে ধৈর্য ধারণ করতে না পেরে তৃতীয়বার বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটি তো শুধু প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই এ কথা বলেছিল। এবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি মননাযোগী হন এবং তার চেহারায় অসন্তোষের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তিনি বলেনঃ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুমিনের হত্যাকারীর উপর অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এ বর্ণনাটি সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে।অতএব একটি মাযহাব তো হলো এই যে, জেনে শুনে হত্যাকারীর তাওবা গ্রহণীয় নয়। দ্বিতীয় মাযহাব এই যে, তাওবা তার ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহরের মাযহাব এটাই যে, সে যদি তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়, বিনয় প্রকাশ করে এবং সৎকার্যাবলী সম্পাদন করতে থাকে তবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা গ্রহণ করবেন এবং নিহত ব্যক্তিকে স্বীয় পক্ষ হতে বিনিময় প্রদান করতঃ সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহ তা'আলা : (আরবী) হতে (আরবী) (২৫:৬৮-৬৯) পর্যন্ত আয়াত গুলোর মধ্যে যা বলেছেন তা হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) -এর মধ্যে রহিতকরণের সম্ভাবনাই নেই। আর ঐ আয়াতটি মুশরিকদের জন্যে এবং এ আয়াতকে মুমিনের জন্যে নির্দিষ্ট করা প্রকাশ্যের বিপরীত এবং কোন দলীলের মুখাপেক্ষী। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার ঐ বান্দারা যারা নিজেদের জীবনের উপর বাড়াবাড়ি করেছো, তোমরা আমার করুণা হতে নিরাশ হয়ো না।' (৩৯:৫৩) এ আয়াতটি সাধারণ, সুতরাং কুফরী, শিরুক, নিফাক, হত্যা ইত্যাদি সমস্ত পাপই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব পাপকার্যে লিপ্ত হবার পর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় এবং তাওবা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪:৪৮)-এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা শিরুক ছাড়া অন্যান্য সমস্ত পাপ ইচ্ছে করলে ক্ষমা করে দেবেন। এটা তাঁর একটা বড় অনুকম্পা যে, তিনি এ সূরার মধ্যেই এখন আমরা যে আয়াতের তাফসীর করছি এর পূর্বে একবার স্বীয় সাধারণ ক্ষমার আয়াত বর্ণনা করেছেন। এ আয়াতের পরই অনুরূপভাবে স্বীয় সাধারণ ক্ষমার কথা পুনরায় ঘোষণা করেছেন যেন আশা দৃঢ় হয়।এখানে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য যাতে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন লোক একশোটি লোককে হত্যা করেছিল। অতঃপর সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে, “আমার তাওবা গৃহীত হবে কি? তিনি উত্তরে বলেন, তোমার মধ্যে ও তোমার তাওবার মধ্যে কে প্রতিবন্ধক হবে?' অতঃপর তিনি তাকে পুণ্যময় শহরে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে বলেন। অতএব সে ঐ শহরে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়। পথে সে মৃত্যু মুখে পতিত হয় এবং রহমতের ফেরেশতা এসে তাকে নিয়ে যান। এ হাদীসটিকে পূর্ণভাবে কয়েক জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। বানী ইসরাঈলের মধ্যেই যখন ক্ষমার এ ব্যবস্থা রয়েছে তখন আমাদের মধ্যে তো সে ক্ষমার ব্যবস্থা বহুগুণে বেশী থাকা উচিত। কেননা, বানী ইসরাঈল এমন বহু অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যা থেকে আল্লাহ পাক আমাদেরকে মুক্ত রেখেছেন। আর তিনি বিশ্ব শান্তির দূত ও নবীদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পাঠিয়ে এমন ধর্ম তিনি আমাদেরকে দান করেছেন যা আকাশেও শান্তিদায়ক এবং পৃথিবীতেও শান্তিদায়ক। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সরল ও পরিষ্কার ধর্ম। কাজেই এখানে হত্যাকারীর তাওবার দরজা বন্ধ হবে কেন?তাহলে এখানে হত্যাকারীর যে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার ভাবার্থ এই যে, তার শাস্তি হচ্ছে এই যদি আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দেন। যেমন আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং পূর্বযুগীয় মনীষীদের একটি দল একথাই বলেন। এমনকি এ অর্থবোধক একটি হাদীসও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সনদ হিসেবে হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে প্রত্যেক শাস্তির ভয় প্রদর্শনের ভাবার্থ এই যে, ওর পিছনে যদি কোন সৎ আমল না থাকে তবে সে পাপের শাস্তি ওটাই হবে যে শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে ।শাস্তির ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে আমাদের নিকট সঠিক ও উত্তম পন্থা এটাই। সত্য সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। আর হত্যাকারীর জাহান্নামী হওয়ার ব্যাপারেও এটা প্রযোজ্য যে, সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে না। তার জাহান্নামী হওয়া হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে তাওবা গৃহীত না হওয়ার কারণেই হোক বা জমহূরের উক্তি অনুযায়ী ওর পিছনে কোন সন্ধার্য থাকার কারণেই হোক।এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে বহুদিন অবস্থান-চিরদিন অবস্থান নয়। যেমন হাদীস-ই-মুতাওয়াতির দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, জাহান্নাম থেকে ঐ ব্যক্তিও বের হবে যার অন্তরে সরিষার ছোট দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে। উপরে যে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছেঃ “খুব সম্ভব আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক পাপই ক্ষমা করে দেবেন, কিন্তু (ক্ষমা করবেন না) যে কাফির হয়ে যাবে বা যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে জেনে শুনে হত্যা করবে।” এ হাদীসে (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) বা আশা উদ্দীপক। তাহলে এ দু' অবস্থায় (কুফরী ও মুমিন হত্যা) যদিও আশা উঠে যায়, কিন্তু সংঘটন অর্থাৎ এরূপ ঘটে যাওয়া এ দুটোর মধ্যে একটিতে উঠে যায় না এবং সেটা হচ্ছে হত্যা। কেননা, শির্ক ও কুফরীর ক্ষমা না হওয়া তো কুরআন মাজীদের শব্দ দ্বারাই সাব্যস্ত হয়েছে। আর যে হাদীসগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট ধরে আনবে সেগুলোও সম্পূর্ণরূপে সঠিক। এতে মানুষের অধিকার রয়েছে বলে তাওবা দ্বারা এ পাপ ক্ষমা হতে পারে না। বরং মানুষের হক তো তাওবার অবস্থাতেও হকদারকে পৌছিয়ে দিতে হবে। এতে যেমন হত্যা রয়েছে দ্রুপ চুরি, জবরদখল, অপবাদ এবং অনান্য হককুল ইবাদও রয়েছে। এগুলো তাওবা দ্বারা ক্ষমা না হওয়া ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। এ অবস্থায় তাওবার বিশুদ্ধতার জন্যে শর্ত হলো প্রাপকদের প্রাপ্যগুলো আদায় করে দেয়া। আর আদায় করা যখন অসম্ভব তখন কিয়ামতের দিন দাবীদারগণ দাবী অবশ্যই করবে। কিন্তু দাবী করলেই যে শাস্তি ঘটেই যাবে এটা জরুরী নয়। এও সম্ভব যে, হত্যাকারীর সমস্ত ভাল কাজের পুণ্য নিহত ব্যক্তিকে দেয়া হবে বা আংশিক পূণ্য দেয়া হবে এবং তাকে দেয়ার পরেও হয়তো হত্যাকারীর নিকট কিছু পণ্য থেকেও যাবে, আর ওর বিনিময়ে হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আবার এটাও অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পক্ষ হতে নিহত ব্যক্তিকে হর, প্রাসাদ, উচ্চ মর্যাদা এবং জান্নাত দিয়ে তার দাবী পূরণ করবেন এবং ওরই বিনিময়ে হয়তো সে তার হন্তাকে খুশী মনে ক্ষমা করে দেবে, ফলে আল্লাহ তাআলাও তাকে মাফ করবেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন। ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর জন্যে কিছু ইহলৌকিক নির্দেশ রয়েছে এবং কিছু পারলৌকিক নির্দেশ রয়েছে। ইহজগতে তার উপর আল্লাহ তা'আলা নিহত ব্যক্তির অভিভাবককে প্রভুত্ব দান করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তির অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে, আমি তার অভিভাবককে প্রভুত্ব দান করেছি।' (১৭:৩৩) তার অধিকার রয়েছে যে, প্রতিশোধ নিতে পারে অর্থাৎ হত্যাকারীকেও হত্যা করাতে পারে কিংবা ক্ষমা করতে পারে, রক্তপণও আদায় করতে পারে। এর রক্তপণও খুব কঠিন। এটা তিন ভাগে বিভক্ত। (১) ত্রিশটি দিতে হবে ঐ উট যেগুলোর বয়স তিন বছর পার হয়ে চতুর্থ বছরে। পড়েছে। (২) ত্রিশটি দিতে হবে ঐ উট যেগুলো পঞ্চম বছরে পড়েছে। (৩) চল্লিশটি দিতে হবে গর্ভবতী উষ্ট্রী। এগুলো আহকামের পুস্তকসমূহে সাব্যস্ত রয়েছে। সজ্ঞানে হত্যাকারীর উপর গোলাম আযাদ করা বা একাধিক্রমে দু'মাস রোযা রাখা অথবা ষাটটি মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে কি-না সে ব্যাপারে ইমামগণের মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও তাঁর সহচরগণের ও আলেমদের একটি দলের উক্তি এই যে, ভ্রমবশতঃ হত্যায় যখন এ ব্যবস্থা রয়েছে তখন ইচ্ছাপূর্বক হত্যায় থাকাতে আরও যুক্তিযুক্ত। ঐগুলোর উপর উত্তর হিসেবে শরীয়ত অসম্মত, মিথ্যা শপথের কাফফারা পেশ করা হয়েছে এবং তাঁরা ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের কাযাকে তার ওযর বানিয়েছেন, যেমন ভুলের সময় তার উপর ইজমা রয়েছে।ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর সহচরগণ এবং অন্যান্যগণ বলেন যে, ইচ্ছাপূর্বক হত্যা কাফফারা হতে অনেক বড়। এজন্যেই তাতে কাফফারা নেই। অনুরূপভাবে মিথ্যা শপথ এবং ঐ দু’ অবস্থায়ও ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের মধ্যে পার্থক্য করণের তাঁদের কোন পথ নেই। কেননা, তারা ইচ্ছাপূর্বক ছেড়ে দেয়া নামাযের কাযা ওয়াজিব হওয়ার সমর্থক। পূর্বদলের একটি দলীল মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটিও বটেঃ হযরত গারীফ ইবনে আইয়াশ আদদায়লামী (রঃ) বলেন, আমরা হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসকা। (রাঃ)-এর নিকট এসে বলি, আমাদেরকে এমন একটি হাদীস শুনিয়ে দিন যাতে কোন কম বেশী থাকবে না।' একথা শুনে তিনি খুব অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন-‘তোমরা যখন কুরআন কারীম নিয়ে পাঠ কর তখন তাতে কম বেশী কর না কি?' তখন আমরা বলি, আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, যা আপনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। তিনি তখন বলেন, আমরা আমাদের এমন একটি লোকের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়েছিলাম যে লোকটি হত্যার কারণে নিজেকে জাহান্নামী করে নিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তার পক্ষ হতে একটি দাসকৈ মুক্ত কর। তার এক একটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ ঐ লোকটির এক একটি অঙ্গ জাহান্নাম হতে মুক্ত করবেন।
আন-নিসা 4:94
মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বানু সালীম গোত্রের একটি লোক ছাগল চরাতে চরাতে সাহাবা-ই-কিরামের একটি দলের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে এবং তাদেরকে সালাম দেয়। তখন সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করেনঃ এ লোকটি মুসলমান তো নয় শুধু জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে সালাম করছে। অতএব তারা তাকে হত্যা করতঃ ছাগলগুলো নিয়ে নবী (সঃ)-এর নিকট চলে আসেন। সে সময়ই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।হাদীসটি বিশুদ্ধ তো বটে কিন্তু কতক লোক কয়েকটি কারণে এটাকে ত্রুটিযুক্ত বলেছেন। প্রথম কারণ এই যে, এর একজন বর্ণনাকারী সাম্মাক ছাড়া এ পন্থায় আর কেউ এটা বের করেনি। দ্বিতীয় কারণ এই যে, এটা তার হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণনা করার ব্যাপারেও সংশয় রয়েছে। তৃতীয় কারণ এই যে, এর শান-ই-নযুলে আরও ঘটনা বর্ণিত আছে। কেউ কেউ বলেন, এটা মুহলিম ইবনে জাসামার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অন্য কেউ বলেন যে, এটা হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। কিন্তু আমি বলি যে, এ সমুদয় কথাই বর্জনীয়। কেননা, সাম্মাক হতে বহু বড় বড় ইমাম এটা বর্ণনা করেছেন।সহীহ গ্রন্থে ইকরামা (রঃ) হতেও দলীল গ্রহণ করা হয়েছে। এ বর্ণনাটিই অন্য পন্থায় সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে মানসূরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন।তাফসীর-ই-ইবনে জারীর এবং মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, একটি লোককে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়ের লোক তাদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পৌছানোর জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করে। পথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রেরিত এক সেনাবাহিনীর সাথে রাত্রিকালে তার সাক্ষাৎ ঘটে। সে তাদের নিকট নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস না হওয়ায় শত্রু জ্ঞানে তারা তাকে হত্যা করে ফেলেন। তার পিতা এ সংবাদ পেয়ে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করে। ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করে রক্তপণ আদায় করেন এবং তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বিদায় করেন।মুহলিম ইবনে জাসামার ঘটনা এই যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাদরাদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ইমের দিকে প্রেরণ করেন। আমি একটি ক্ষুদ্র মুসলিম সেনাদলের সাথে বের হই যার মধ্যে ছিলেন আবু কাতাদাহ (রাঃ), হারিস ইবনে রাবঈ (রাঃ) এবং মুহলিম ইবনে জাসামা ইবনে কায়েস। আমরা বাতনে ইযমে পৌছলে আমের ইবনে আবাত আশজাঈ উটে চড়ে সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর সাথে বহু আসবাবপত্র ছিল। আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তখন আমরা তাকে হত্যা করা হতে বিরত থাকি। কিন্তু মুহলিম ইবনে জাসামা তাঁকে পারস্পরিক বিবাদের ভিত্তিতে হত্যা করে দেয় এবং তার উট ও আসবাবপত্র নিয়ে নেয়। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করি। তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আমের (রাঃ) ইসলামী রীতিতে সালাম দেন। কিন্তু অজ্ঞতা যুগে শক্রতার কারণে মুহলিম ইবনে জাসামা তাকে তীর মেরে হত্যা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি আমের (রাঃ)-এর লোকদের সাথে এ সম্বন্ধে আলোচনা করেন। তার পক্ষ হতে উয়াইনা ও আকরা’ কথা বলে। আকরা’ বলে, “হে আল্লাহ রাসূল (সঃ)! আজ সে খুশী হয়েছে, কিন্তু কাল সে দুঃখ ভোগ করবে। তখন উয়াইনা বলে, না, না। আল্লাহর শপথ! (তাকে ছাড়া হবে না) যে পর্যন্ত তার স্ত্রীদের উপর ঐ বিপদ না পৌছবে যে বিপদ আমাদের স্ত্রীদের উপর পৌঁছেছে। মুহলিম ইবনে জাসামা দু’ খানা চাদর পরিহিত হয়ে আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বসে পড়ে এ আশায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ক্ষমা করবেন না।' সে তখন অত্যন্ত লজ্জিত হয় এবং কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়ে ও চাদরে চক্ষু মুছতে মুছতে বিদায় হয়। সাতদিনও অতিক্রান্ত হয়নি এর মধ্যেই সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। জনগণ তাকে সমাধিস্থ করে। কিন্তু ভূমি তার দেহ উপরে উঠিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এ ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ ‘তোমাদের এ সঙ্গী অপেক্ষা বহুগুণ দুষ্ট লোককেও ভূমি গ্রহণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা এই যে, তিনি তোমাদেরকে মুসলমানের মর্যাদা প্রদর্শন করবেন। অতঃপর জনগণ তাকে পাহাড়ের উপর নিক্ষেপ করে এবং তার উপর পাথর চাপিয়ে দেয়। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর-ইইবনে জারীর) সহীহ বুখারী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মুআল্লাকরূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-কে বলেনঃ যখন একজন মুমিন কাফির সম্প্রদায়ের মধ্যে তার ঈমান গোপন রেখেছিল, অতঃপর সে তার ঈমান প্রকাশ করা সত্ত্বেও তুমি তাকে হত্যা করলে? তোমরাও তো মক্কায় এরূপই তোমাদের ঈমান গোপন রেখেছিলে’?মুসনাদ-ই-বাযযাযে হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ক্ষুদ্র সৈন্যদল প্রেরণ করেন যার মধ্যে হযরত মিকদাদও (রাঃ) ছিলেন। যখন তারা শত্রুদের নিকট পৌঁছেছেন তখন সবাই এদিক ওদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শুধু একটি লোক রয়ে যায় যার নিকট বহু মাল ছিল। সে তাদেরকে দেখামাত্রই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মাবুদ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও হযরত মিকদাদ (রাঃ) তার উপর আক্রমণ করতঃ তাকে হত্যা করে দেন। তখন তাঁর সঙ্গীদের এক ব্যক্তি তাকে বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল। যে, আল্লাহ ছাড়া কেন মাবুদ নেই তাকে তুমি হত্যা করলে? আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এটা বর্ণনা করবো।' অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটি লোক সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তাকে মিকদাদ (রাঃ) হত্যা করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা মিকদাদ (রাঃ)-কে আমার নিকট ডেকে আন।' (তিনি আসলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন):“হে মিকদাদ (রাঃ)! তুমি এমন এক লোককে হত্যা করলে যে (আরবী) পাঠ করেছিল? কিয়ামতের দিন তুমি এ (আরবী) -এর সামনে কি করবে?' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ(সঃ) বলেনঃ “হে মিকদাদ (রাঃ)! এ লোকটি গোপন মুসলিম ছিল। আর সে ইসলাম প্রকাশ করা সত্ত্বেও তুমি তাকে হত্যা করে দিলে?' অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রচুর গনীমত রয়েছে। অর্থাৎ গনীমতের লোভে তোমরা এরূপ অবহেলা প্রদর্শন করছো এবং ইসলাম প্রকাশকারীকেও সন্দেহের বশবর্তী হয়ে হত্যা করছে, তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে এ গনীমতও রয়েছে এবং তা তাঁর নিকট প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। সেগুলো তিনি তোমাদেরকে হালাল উপায়ে প্রদান করবেন। ওটা তোমাদের জন্যে এ মাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম হবে। তোমরা তোমাদের ঐ সময়কে স্মরণ কর যখন তোমরাও এরূপ ছিলে। তখন তোমরাও দুর্বলতার কারণে তোমাদের ঈমান প্রকাশ করার সাহস রাখনি। তোমরা তোমাদের কওমের মধ্যে গোপনে চলাফেরা করতে। আজ আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আজ তিনি তোমাদেরকে শক্তি দিয়েছেন বলেই তোমরা খোলাখুলি ইসলাম প্রকাশ করতে সাহসী হয়েছে। তাহলে আজও যারা শত্রুদের অধীনতা পাশে আবদ্ধ রয়েছে এবং প্রকাশ্যে ইসলাম প্রকাশ করতে পারছে না, তারা যদি তোমাদের সামনে তার ইসলাম প্রকাশ করে তবে তা মেনে নিতে হবে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর যখন তোমরা অল্প ছিলে ও ভূপৃষ্ঠে দুর্বল বলে বিবেচিত হচ্ছিলে।'(৮:২৬ মোটকথা, ইরশাদ হচ্ছে যে, যেমন এ ছাগলের রাখালটি স্বীয় ঈমান গোপন রেখেছিল তদ্রপ তোমরাও ইতিপূর্বে সংখ্যায় অল্প ছিলে, তোমাদের শক্তিও কম ছিল, কাজেই তোমরাও তখন মুশরিকদের মধ্যে তোমাদের ঈমান গোপন রেখেছিলে। ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমরাও তখন মুমিন ছিলে না। আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর অনুগ্রহ করতঃ তোমাদেরকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দান করেছেন।হযরত উসামা (রাঃ) শপথ করে বলেছিলেন, এরপরে আর কখনও “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' উচ্চারণকারীকে হত্যা করবো না। কেননা, এ ব্যাপারে তারা পূর্ণ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। অতঃপর গুরুত্ব দিয়ে দ্বিতীয়বার বলা হচ্ছে-‘তোমরা যা করছো তা খুব ভেবে চিন্তে কর।অতঃপর ধমক দেয়া হচ্ছে- ‘আল্লাহ তা'আলাকে তোমরা তোমাদের কার্যকলাপের ব্যাপারে উদাসীন মনে করো না। তোমরা যা কিছু করছো তার তিনি পূর্ণ খবর রাখছেন।
আন-নিসা 4:95
৯৫-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত বারা’ (রাঃ) বলেন যে, যখন এ আয়াতের প্রাথমিক শব্দগুলো অবতীর্ণ হয়-‘গৃহে উপবিষ্টগণ ও ধর্মযোদ্ধাগণ সমান নয়’ তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে ডেকে নিচ্ছিলেন এমন সময়ে হযরত উম্মে মাকতুম (রাঃ) উপস্থিত হন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো অন্ধ।' তখন (আরবী)-এ অংশটুকু অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ঐ উপবিষ্টগণ সমান নয় যারা বিনা ওযরে গৃহে উপবিষ্ট থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত যায়েদ (রাঃ) স্বীয় দোয়াত, কলম ও কালি নিয়ে এসেছিলেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) বলেছিলেন , ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমার ক্ষমতা থাকতো তবে আমি অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতাম। তখন (আরবী) -এ শব্দগুলো অবতীর্ণ হয়। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু হযরত যায়েদ (রাঃ)- এর উপর ছিল। হযরত যায়দ (রাঃ)- এর উরুর উপর এত চাপ পড়ে যে, যেন তা ভেঙ্গেই যাবে। আর একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, যখন এ শব্দগুলোর অহী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয় এবং সকীনা’ তাকে আবৃত করে সে সময় আমি তার পার্শ্বদেশে বসেছিলাম, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু আমার উপর এত ভারী অনুভূত হয় যে, আমি এত ভারী বোঝা কখনও বহন করিনি। অতঃপর অহী সরে যাওয়ার পর তিনি (আরবী) পর্যন্ত আয়াত লিখিয়ে নেন। আমি ওটা কাধের অস্থির উপর লিখে লই।অন্য একটি হাদীসে নিম্নের শব্দগুলো রয়েছেঃ “তখনও ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর কথাগুলো শেষ হয়নি এর মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উপর অহী অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয়ে যায়।'হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, ‘ঐ দৃশ্য এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে, আমি যেন দেখছি। পরে অবতীর্ণ এ শব্দগুলো আমি পূর্ব লিখার সঙ্গে সংযোগ করে দেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াত দ্বারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং যুদ্ধে অনুপস্থিতদেরকে বুঝান হয়েছে। বদরের যুদ্ধের সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা দু'জন তো অন্ধ। আমাদের জন্যে অবকাশ রয়েছে কি?' তখন তাঁদেকে কুরআন কারীমের এ আয়াতের মাধ্যমে অবকাশ দেয়া হয়। সুতরাং মুজাহিদগণকে যে উপবিষ্টদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে তারা হচ্ছেন ঐসব লোক যারা সুস্থ ও সবল। প্রথমে মুজাহিদগণকে সাধারণভাবে উপবিষ্টদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। অতঃপর (আরবী)-এ শব্দগুলো অবতীর্ণ করতঃ যাদের শরীয়ত সমর্থিত ওযর রয়েছে, তাদেরকে সাধারণ উপবিষ্টগণ হতে পৃথক করা হয়। যেমন অন্ধ, খোড়া, রুগ্ন ইত্যাদি। এসব লোক মুজাহিদগণেরই শ্রেণীভুক্ত। অতঃপর মুজাহিদগণের যে মর্যাদা বর্ণনা করেছেন ওটাও ঐসব লোকের উপর, যারা বিনা কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন না। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। আর এটা হওয়াই উচিতও বটে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মদীনায় এমন কতক লোকও রয়েছে যে, তোমরা যে যুদ্ধের সফর কর এবং যে জঙ্গল অতিক্রম কর, তারা পুণ্যে তোমাদের সমান। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, যদিও তারা মদীনাতেই অবস্থান করেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা, কেননা ওযর তাদেরকে বাধা দিয়ে রেখেছে? অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা যা খরচ কর তার পুণ্য তোমরাও যেমন পাও, তারাও তেমনই পেয়ে থাকে। এ ভাবার্থকেই একজন কবি নিম্নের কবিতায় বর্ণনা করেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহর ঘরের দিকে হজ্ব যাত্রীগণ! তোমরা যদিও সশরীরে ঐ দিকে চলেছো, কিন্তু আমরা রূহানী গতিতে ঐ দিকে চলেছি। জেনে রেখো যে, শক্তিহীনতা ও ওযর আমাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে এবং এটা স্পষ্ট কথা যে, ওযরের কারণে বাড়ীতে অবস্থানকারী যাত্রীদের অপেক্ষা কোন অংশে কম নয়।'এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“সকলকেই আল্লাহ তাআলা কল্যাণপ্রদ প্রতিশ্রুতি দান করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, জিহাদ ফরযে আইন নয়, বরং ফরযে কিফায়া। তারপরে ইরশাদ হচ্ছে-‘বাড়ীতে উপবিষ্টদের উপর মুজাহিদগণের বড়ই মর্যাদা রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদের উচ্চ পদ-মর্যাদা, তাদের পাপ মার্জনা করণ এবং তাদের উপর যে করুণা ও অনুগ্রহ রয়েছে তা বর্ণনা করেছেন। তারপর স্বীয় সাধারণ ক্ষমা ও সাধারণ দয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতে একশ দরজা রয়েছে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে জিহাদকারীদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং প্রত্যেক দরজার মধ্যে এ পরিমাণ দূরত্ব রয়েছে যে পরিমাণ দূরত্ব রয়েছে। আসমান ও যমীনের মধ্যে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে তীর চালনা করে সে জান্নাতের দরজা লাভ করে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ দরজা কি? তিনি বলেনঃ “ওটা তোমাদের এখানকার ঘরের দরজার সমান নয় বরং দু' দরজার মধ্যে শত বছরের দূরত্ব রয়েছে।” ________________________________________৯৭। নিশ্চয়ই যারা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করেছিল ফেরেশতা তাদের প্রাণ হরণ করে বলবে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলবে, আমরা দুনিয়ায় অসহায় ছিলাম; তারা বলবে, আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তন্মধ্যে তোমরা হিজরত করতে? অতএব ওদেরই বাসস্থান জান্নাম এবং ওটা নিকৃষ্ট গন্তব্য স্থান। ৯৮। কিন্তু পুরুষ, নারী এবং শিশুগণের মধ্যে অসহায়তা বশতঃ যারা কোন উপায় করতে পারে না অথবা কোন পথ প্রাপ্ত হয় না। ৯৯। ফলতঃ তাদেরই আশা আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। ১০০। আর যে কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করেছে সে পৃথিবীতে বহু প্রশস্ত স্থান ও স্বচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে, এবং যে কেউ গৃহ হতে বহির্গত হয়ে আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করে- তৎপর সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। তবে নিশ্চয়ই এর প্রতিদান আল্লাহর উপর ন্যস্ত রয়েছে; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
আন-নিসা 4:96
৯৫-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত বারা’ (রাঃ) বলেন যে, যখন এ আয়াতের প্রাথমিক শব্দগুলো অবতীর্ণ হয়-‘গৃহে উপবিষ্টগণ ও ধর্মযোদ্ধাগণ সমান নয়’ তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে ডেকে নিচ্ছিলেন এমন সময়ে হযরত উম্মে মাকতুম (রাঃ) উপস্থিত হন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো অন্ধ।' তখন (আরবী)-এ অংশটুকু অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ঐ উপবিষ্টগণ সমান নয় যারা বিনা ওযরে গৃহে উপবিষ্ট থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত যায়েদ (রাঃ) স্বীয় দোয়াত, কলম ও কালি নিয়ে এসেছিলেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) বলেছিলেন , ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমার ক্ষমতা থাকতো তবে আমি অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতাম। তখন (আরবী) -এ শব্দগুলো অবতীর্ণ হয়। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু হযরত যায়েদ (রাঃ)- এর উপর ছিল। হযরত যায়দ (রাঃ)- এর উরুর উপর এত চাপ পড়ে যে, যেন তা ভেঙ্গেই যাবে। আর একটি হাদীসে রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, যখন এ শব্দগুলোর অহী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয় এবং সকীনা’ তাকে আবৃত করে সে সময় আমি তার পার্শ্বদেশে বসেছিলাম, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু আমার উপর এত ভারী অনুভূত হয় যে, আমি এত ভারী বোঝা কখনও বহন করিনি। অতঃপর অহী সরে যাওয়ার পর তিনি (আরবী) পর্যন্ত আয়াত লিখিয়ে নেন। আমি ওটা কাধের অস্থির উপর লিখে লই।অন্য একটি হাদীসে নিম্নের শব্দগুলো রয়েছেঃ “তখনও ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর কথাগুলো শেষ হয়নি এর মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উপর অহী অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয়ে যায়।'হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, ‘ঐ দৃশ্য এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে, আমি যেন দেখছি। পরে অবতীর্ণ এ শব্দগুলো আমি পূর্ব লিখার সঙ্গে সংযোগ করে দেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াত দ্বারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং যুদ্ধে অনুপস্থিতদেরকে বুঝান হয়েছে। বদরের যুদ্ধের সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা দু'জন তো অন্ধ। আমাদের জন্যে অবকাশ রয়েছে কি?' তখন তাঁদেকে কুরআন কারীমের এ আয়াতের মাধ্যমে অবকাশ দেয়া হয়। সুতরাং মুজাহিদগণকে যে উপবিষ্টদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে তারা হচ্ছেন ঐসব লোক যারা সুস্থ ও সবল। প্রথমে মুজাহিদগণকে সাধারণভাবে উপবিষ্টদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। অতঃপর (আরবী)-এ শব্দগুলো অবতীর্ণ করতঃ যাদের শরীয়ত সমর্থিত ওযর রয়েছে, তাদেরকে সাধারণ উপবিষ্টগণ হতে পৃথক করা হয়। যেমন অন্ধ, খোড়া, রুগ্ন ইত্যাদি। এসব লোক মুজাহিদগণেরই শ্রেণীভুক্ত। অতঃপর মুজাহিদগণের যে মর্যাদা বর্ণনা করেছেন ওটাও ঐসব লোকের উপর, যারা বিনা কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন না। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। আর এটা হওয়াই উচিতও বটে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মদীনায় এমন কতক লোকও রয়েছে যে, তোমরা যে যুদ্ধের সফর কর এবং যে জঙ্গল অতিক্রম কর, তারা পুণ্যে তোমাদের সমান। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, যদিও তারা মদীনাতেই অবস্থান করেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা, কেননা ওযর তাদেরকে বাধা দিয়ে রেখেছে? অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা যা খরচ কর তার পুণ্য তোমরাও যেমন পাও, তারাও তেমনই পেয়ে থাকে। এ ভাবার্থকেই একজন কবি নিম্নের কবিতায় বর্ণনা করেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহর ঘরের দিকে হজ্ব যাত্রীগণ! তোমরা যদিও সশরীরে ঐ দিকে চলেছো, কিন্তু আমরা রূহানী গতিতে ঐ দিকে চলেছি। জেনে রেখো যে, শক্তিহীনতা ও ওযর আমাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে এবং এটা স্পষ্ট কথা যে, ওযরের কারণে বাড়ীতে অবস্থানকারী যাত্রীদের অপেক্ষা কোন অংশে কম নয়।'এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“সকলকেই আল্লাহ তাআলা কল্যাণপ্রদ প্রতিশ্রুতি দান করেছেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, জিহাদ ফরযে আইন নয়, বরং ফরযে কিফায়া। তারপরে ইরশাদ হচ্ছে-‘বাড়ীতে উপবিষ্টদের উপর মুজাহিদগণের বড়ই মর্যাদা রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদের উচ্চ পদ-মর্যাদা, তাদের পাপ মার্জনা করণ এবং তাদের উপর যে করুণা ও অনুগ্রহ রয়েছে তা বর্ণনা করেছেন। তারপর স্বীয় সাধারণ ক্ষমা ও সাধারণ দয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতে একশ দরজা রয়েছে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে জিহাদকারীদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং প্রত্যেক দরজার মধ্যে এ পরিমাণ দূরত্ব রয়েছে যে পরিমাণ দূরত্ব রয়েছে। আসমান ও যমীনের মধ্যে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে তীর চালনা করে সে জান্নাতের দরজা লাভ করে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ দরজা কি? তিনি বলেনঃ “ওটা তোমাদের এখানকার ঘরের দরজার সমান নয় বরং দু' দরজার মধ্যে শত বছরের দূরত্ব রয়েছে।” ________________________________________৯৭। নিশ্চয়ই যারা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করেছিল ফেরেশতা তাদের প্রাণ হরণ করে বলবে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলবে, আমরা দুনিয়ায় অসহায় ছিলাম; তারা বলবে, আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তন্মধ্যে তোমরা হিজরত করতে? অতএব ওদেরই বাসস্থান জান্নাম এবং ওটা নিকৃষ্ট গন্তব্য স্থান। ৯৮। কিন্তু পুরুষ, নারী এবং শিশুগণের মধ্যে অসহায়তা বশতঃ যারা কোন উপায় করতে পারে না অথবা কোন পথ প্রাপ্ত হয় না। ৯৯। ফলতঃ তাদেরই আশা আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। ১০০। আর যে কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করেছে সে পৃথিবীতে বহু প্রশস্ত স্থান ও স্বচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে, এবং যে কেউ গৃহ হতে বহির্গত হয়ে আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করে- তৎপর সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। তবে নিশ্চয়ই এর প্রতিদান আল্লাহর উপর ন্যস্ত রয়েছে; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
আন-নিসা 4:97
৯৭-১০০ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আল-আসওয়াদ (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যে সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাতে আমারও নাম ছিল। আমি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম হযরত ইকরামা (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এ কথাটি তাকে বলি। তিনি এতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং বলেন, “আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যেসব মুসলমান মুশরিকদের সঙ্গে ছিল এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল, মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, তাদের কেউ কেউ মুসলমানদেরই তীরের আঘাতে নিহত হতো বা তাদেরই তরবারী দ্বারা তাদেরকে হত্যা করা হতো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ লোক যারা তাদের ঈমান গোপন রেখেছিল, বদরের যুদ্ধে যখন তারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয় তখন মুসলমানদের হাতে তাদের কয়েকজন লোক মারা যায়। ফলে মুসলমানেরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলেঃ ‘আফসোস! এরা তো আমাদের ভাই ছিল, অথচ এরা আমাদেরই হাতে মারা গেল। তারা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর অবশিষ্ট মুসলমানদের নিকট এ আয়াতটি লিখেন যে, তাদের কোন ওযর ছিল না। তখন তারা বের হয় এবং তাদের সাথে মুশরিকরা মিলিত হয় ও তাদেরকে নিরাপত্তা দান করে। সে সময় (আরবী) (২:৮) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল এবং মক্কাতেই ছিল। তাদের মধ্যে ছিল আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবু মানসুর ইবনে হাজ্জাজ এবং হারেস ইবনে জামআ’।হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিজরতের পরেও মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সঙ্গে এসেছিল। তাদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যায়। ভাবার্থ এই যে, আয়াতের হুকুম হচ্ছে সাধারণ। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যেই এ হুকুম প্রযোজ্য যে হিজরত করতে সক্ষম অথচ মুশরিকদের মধ্যে পড়ে থাকে এবং দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকে না। সে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যাচারী। এ আয়াতের ভাব হিসেবে এবং মুসলমানদের ইজমা হিসেবেও সে হারাম কার্যে লিপ্ত হওয়ার দোষে দোষী। এ আয়াতে হিজরত করা ছেড়ে দেয়াকে অত্যাচার বলা হয়েছে। এ প্রকারের লোকদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা এখানে পড়ে রয়েছে কেন? কেন তোমরা হিজরত করনি? তারা উত্তর দেয়,“আমরা নিজেদের শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরে চলে যেতে সক্ষম হইনি।” তাদের এ কথার উত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন-“আল্লাহ তাআলার পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'মুসনাদ-ই-আবূ দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে মিলিত হয় এবং তার সাথেই বাস করে সে ওর মতই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত আব্বাস (রাঃ), আকীল ও নাওফিলকে বন্দী করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আপনার নিজের ও আপনার ভ্রাতুষ্পত্রের মুক্তি পণ প্রদান করুন।' তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি আপনার কিবলার দিকে নামায পড়তাম না এবং আমরা কি কালেমা-ই-শাহাদাত পাঠ করতাম না’? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনারা তর্কতো উত্থাপন করেছেন, কিন্তু আপনারা পরাজিত হয়ে যাবেন। শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'এরপর যে লোকদের হিজরত পরিত্যাগের উপর ভর্ৎসনা নেই তাদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা মুশরিকদের হাত হতে ছুটতে পারে না বা ছুটতে পারলেও হয়তো পথ চেনা নেই, তাদেরকে আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন। (আরবী) শব্দটি আল্লাহ তাআলার কালামে নিশ্চয়তা বোধক হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মার্জনাকারী ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইশার নামাযে (আরবী) বলার পর সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দু'আ করেছেনঃ “হে আল্লাহ! আইয়াশ ইবনে রাবীআকে, সালাম ইবনে হিশামকে, ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে এবং সমস্ত অসহায় ও শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের ছোবল হতে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! মুর' গোত্রের উপর আপনার কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করুন।' হে আল্লাহ! তাদের উপর আপনি এমন দুর্ভিক্ষ নাযিল করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যামানায় এসেছিল।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর কিবলাহ্ মুখী হয়েই হাত উঠিয়ে দু'আ করতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে, আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআকে সালমা ইবনে হিশামকে এবং অন্যান্য সমস্ত শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের হাত হতে রক্ষা করুন, যারা না পারে কোন উপায় করতে এবং না পায় কোন পথ।’তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামাযের পরে উপরোক্ত প্রার্থনা করতেন। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ, এ সনদ ছাড়া অন্যন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি এবং আমার মাতা ঐসব দুর্বল নারী ও শক্তিহীন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যাদের বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওযর বিশিষ্টদের মধ্যে গণ্য করেছেন।' হিজরত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং মুশরিকদের হতে পৃথক থাকার হিদায়াত করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আল্লাহর পথে হিজরতকারী যেন নিরাশ না হয়। তারা যেখানেই যাবে তিনি তাদের আশ্রয় লাভের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন এবং তারা শান্তিতে তথায় বসবাস করতে পারবে। (আরবী) শব্দের একটি অর্থ এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়াও বটে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, তারা দুঃখ কষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার বহু পন্থা পেয়ে যাবে। ওর বহু আসবাবপত্র সে লাভ করবে। সে শত্রুদের অত্যাচার হতেও রক্ষা পাবে এবং তার আহার্যেরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভ্রান্তির পথের স্থলে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে এবং দারিদ্র ধনশীলতায় পরিবর্তিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বহির্গত হয় কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌছার পূর্বেই পথে তার মৃত্যু এসে যায় সেও হিজরতের পূর্ণ পুণ্য প্রাপ্ত হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক কার্যের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ওটাই রয়েছে যার সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর উদ্দেশ্যে, তার হিজরত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনন্দের কারণ। আর যার হিজরত হয় দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্যে, সে প্রকৃত হিজরতের পুণ্য প্রাপ্ত হবে না। বরং হিজরত ঐ দিকেই মনে করা হবে।' এ হাদীসটি সাধারণ। হিজরত ও অন্যান্য সমস্ত আমলই এর অন্তর্ভুক্ত।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে একটি হাদীস রয়েছে যে নিরানব্বইটি লোককে হত্যা করে। অতঃপর একজন আবেদকে হত্যা করতঃ একশ পূর্ণ করে দেয়। তারপর তার তাওবা গৃহীহ হবে কি-না তা সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে। আলেম তাকে বলেনঃ তোমার তাওবা ও তোমার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। তুমি তোমার গ্রাম হতে হিজরত করে অমুক শহরে চলে যাও যেখানে আল্লাহ তাআলার আবেদগণ বাস করেন। অতএব সে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঐ শহরের দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন করুণা ও শাস্তির ফেরেশতাদের মধ্যে তার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। করুণার ফেরেশতাগণ বলেন যে, এ ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল। পক্ষান্তরে শাস্তির ফেরেশতাগণ বলেন যে, তথায় পৌছতে তো পারেনি। অতঃপর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হয় যে, এ দিকের এবং ঐ দিকের ভূমি মাপ করা হোক। যে গ্রাম সেখান হতে নিকটবর্তী হবে সে গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গেই তাকে মিলিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা যমীনকে নির্দেশ দেন যে, ওটা যেন খারাপ গ্রাম হতে দূরবর্তী হয়ে যায় এবং ভাল গ্রামের নিকটবর্তী হয়। ভূমি মাপা হলে দেখা যায় যে, একত্ববাদীদের গ্রামটি অর্ধহাত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়েছে। ফলে তাকে করুণার ফেরেশতাগণ নিয়ে যান।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর সময় সে সৎলোকদের গ্রামের দিকে বুকের ভরে এগিয়ে যাচ্ছিল।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হয়, তারপর তিনি বলেনঃ আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ কোথায়? অতঃপর সে সোয়ারী হতে পড়ে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ পাকের জিম্মায় চয়ে যায়। অথবা কোন জন্তু তাকে কামড়িয়ে নেয় ফলে সে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিংবা সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, তখনও জিহাদের পণ্যদান আল্লাহ তাআলার জিম্মায় রয়েছে।' (বর্ণনাকারী বলেন যে, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক শব্দ ব্যবহার করেন) আল্লাহর শপথ! আমি এরূপ শব্দ রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর পূর্বে কখনও কোন আরববাসীর মুখে শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “যে স্বীয় স্থানে মারা যায় সেও জান্নাতের অধিকারী হয়ে যায়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেন, হযরত খালিদ ইবনে হিযাম (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে তাঁকে একটি সর্পে দংশন করে এবং তাতেই তিনি মারা যান। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমি আবিসিনিয়ায় পৌছেই গিয়েছিলাম এবং সংবাদ পেয়েছিলাম যে, হযরত খালিদ ইবনে হিযামও (রাঃ) হিজরত করে আসছেন। সুতরাং আমি তার আগমনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানতাম যে, বানূ আসাদ গোত্রের তিনি ছাড়া আর কেউ হিজরত করে আসছে না এবং কমবেশী যত মুহাজির ছিলেন তাঁদের সবারই সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ ছিলেন না। তাই আমি উদ্বেগের সাথে হযরত খালিদ (রাঃ)-এর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমি তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রাপ্ত হই। এতে আমার বড়ই দুঃখ হয়। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এটা গারীব হওয়ার এও একটি কারণ যে, এটা হচ্ছে মক্কার ঘটনা, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনায়। কিন্তু খুব সম্ভব বর্ণনাকারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আয়াতটির হুকুম সাধারণ, যদিও শানে নমূল এটা না হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জুমরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিকট পৌছার পূর্বে পথে তার মৃত্যু ঘটে। তাঁর ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবু যামীরা ইবনে আয়িস আয্যারকী (রাঃ) বলেনঃ যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আমি বলি যে, আমি ধনীও বটে এবং আমার উপায়ও রয়েছে কাজেই আমাকে হিজরত করতেই হবে। অতঃপর তিনি হিজরত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেন। তিনি তানঈম’ নামক স্থানে পৌছে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু মালিক (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার অঙ্গীকারকে সত্য জেনে এবং আমার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রেখে আমার পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, আল্লাহর জিম্মায় এটা রয়েছে যে, তিনি তাকে সৈন্যদের সাথে মৃত্যু দান করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, অথবা সে আল্লাহর দায়িত্বে পুণ্য, গনীমত এবং অনুগ্রহসহ ফিরে আসবে। আর যদি সে স্বাভাবিকভাবে মারা যায় বা নিহত হয় কিংবা ঘোড়া বা উট হতে পড়ে গিয়ে মারা যায় অথবা কোন বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যায় বা স্বীয় বিছানায় মারা যায় তবে সে শহীদ হবে।' সুনান-ই-আবি দাউদে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে' এটুকু বেশী আছে। এর কতগুলো সুনান-ই-আবি দাউদে নেই। হাফি আবু ইয়ালা (রঃ)-এর মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর মারা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্যে হজ্ব করার পুণ্য লিখা হয়। আর যে উমরার উদ্দেশ্যে বের হয় এবং মারা যায় তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত উমরাকারীর পুণ্য লিখা হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত গাযীর পুণ্য লিখা হয়। এ হাদীসটিও গারীব।
আন-নিসা 4:98
৯৭-১০০ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আল-আসওয়াদ (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যে সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাতে আমারও নাম ছিল। আমি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম হযরত ইকরামা (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এ কথাটি তাকে বলি। তিনি এতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং বলেন, “আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যেসব মুসলমান মুশরিকদের সঙ্গে ছিল এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল, মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, তাদের কেউ কেউ মুসলমানদেরই তীরের আঘাতে নিহত হতো বা তাদেরই তরবারী দ্বারা তাদেরকে হত্যা করা হতো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ লোক যারা তাদের ঈমান গোপন রেখেছিল, বদরের যুদ্ধে যখন তারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয় তখন মুসলমানদের হাতে তাদের কয়েকজন লোক মারা যায়। ফলে মুসলমানেরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলেঃ ‘আফসোস! এরা তো আমাদের ভাই ছিল, অথচ এরা আমাদেরই হাতে মারা গেল। তারা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর অবশিষ্ট মুসলমানদের নিকট এ আয়াতটি লিখেন যে, তাদের কোন ওযর ছিল না। তখন তারা বের হয় এবং তাদের সাথে মুশরিকরা মিলিত হয় ও তাদেরকে নিরাপত্তা দান করে। সে সময় (আরবী) (২:৮) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল এবং মক্কাতেই ছিল। তাদের মধ্যে ছিল আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবু মানসুর ইবনে হাজ্জাজ এবং হারেস ইবনে জামআ’।হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিজরতের পরেও মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সঙ্গে এসেছিল। তাদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যায়। ভাবার্থ এই যে, আয়াতের হুকুম হচ্ছে সাধারণ। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যেই এ হুকুম প্রযোজ্য যে হিজরত করতে সক্ষম অথচ মুশরিকদের মধ্যে পড়ে থাকে এবং দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকে না। সে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যাচারী। এ আয়াতের ভাব হিসেবে এবং মুসলমানদের ইজমা হিসেবেও সে হারাম কার্যে লিপ্ত হওয়ার দোষে দোষী। এ আয়াতে হিজরত করা ছেড়ে দেয়াকে অত্যাচার বলা হয়েছে। এ প্রকারের লোকদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা এখানে পড়ে রয়েছে কেন? কেন তোমরা হিজরত করনি? তারা উত্তর দেয়,“আমরা নিজেদের শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরে চলে যেতে সক্ষম হইনি।” তাদের এ কথার উত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন-“আল্লাহ তাআলার পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'মুসনাদ-ই-আবূ দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে মিলিত হয় এবং তার সাথেই বাস করে সে ওর মতই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত আব্বাস (রাঃ), আকীল ও নাওফিলকে বন্দী করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আপনার নিজের ও আপনার ভ্রাতুষ্পত্রের মুক্তি পণ প্রদান করুন।' তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি আপনার কিবলার দিকে নামায পড়তাম না এবং আমরা কি কালেমা-ই-শাহাদাত পাঠ করতাম না’? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনারা তর্কতো উত্থাপন করেছেন, কিন্তু আপনারা পরাজিত হয়ে যাবেন। শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'এরপর যে লোকদের হিজরত পরিত্যাগের উপর ভর্ৎসনা নেই তাদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা মুশরিকদের হাত হতে ছুটতে পারে না বা ছুটতে পারলেও হয়তো পথ চেনা নেই, তাদেরকে আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন। (আরবী) শব্দটি আল্লাহ তাআলার কালামে নিশ্চয়তা বোধক হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মার্জনাকারী ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইশার নামাযে (আরবী) বলার পর সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দু'আ করেছেনঃ “হে আল্লাহ! আইয়াশ ইবনে রাবীআকে, সালাম ইবনে হিশামকে, ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে এবং সমস্ত অসহায় ও শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের ছোবল হতে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! মুর' গোত্রের উপর আপনার কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করুন।' হে আল্লাহ! তাদের উপর আপনি এমন দুর্ভিক্ষ নাযিল করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যামানায় এসেছিল।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর কিবলাহ্ মুখী হয়েই হাত উঠিয়ে দু'আ করতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে, আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআকে সালমা ইবনে হিশামকে এবং অন্যান্য সমস্ত শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের হাত হতে রক্ষা করুন, যারা না পারে কোন উপায় করতে এবং না পায় কোন পথ।’তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামাযের পরে উপরোক্ত প্রার্থনা করতেন। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ, এ সনদ ছাড়া অন্যন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি এবং আমার মাতা ঐসব দুর্বল নারী ও শক্তিহীন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যাদের বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওযর বিশিষ্টদের মধ্যে গণ্য করেছেন।' হিজরত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং মুশরিকদের হতে পৃথক থাকার হিদায়াত করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আল্লাহর পথে হিজরতকারী যেন নিরাশ না হয়। তারা যেখানেই যাবে তিনি তাদের আশ্রয় লাভের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন এবং তারা শান্তিতে তথায় বসবাস করতে পারবে। (আরবী) শব্দের একটি অর্থ এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়াও বটে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, তারা দুঃখ কষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার বহু পন্থা পেয়ে যাবে। ওর বহু আসবাবপত্র সে লাভ করবে। সে শত্রুদের অত্যাচার হতেও রক্ষা পাবে এবং তার আহার্যেরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভ্রান্তির পথের স্থলে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে এবং দারিদ্র ধনশীলতায় পরিবর্তিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বহির্গত হয় কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌছার পূর্বেই পথে তার মৃত্যু এসে যায় সেও হিজরতের পূর্ণ পুণ্য প্রাপ্ত হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক কার্যের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ওটাই রয়েছে যার সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর উদ্দেশ্যে, তার হিজরত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনন্দের কারণ। আর যার হিজরত হয় দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্যে, সে প্রকৃত হিজরতের পুণ্য প্রাপ্ত হবে না। বরং হিজরত ঐ দিকেই মনে করা হবে।' এ হাদীসটি সাধারণ। হিজরত ও অন্যান্য সমস্ত আমলই এর অন্তর্ভুক্ত।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে একটি হাদীস রয়েছে যে নিরানব্বইটি লোককে হত্যা করে। অতঃপর একজন আবেদকে হত্যা করতঃ একশ পূর্ণ করে দেয়। তারপর তার তাওবা গৃহীহ হবে কি-না তা সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে। আলেম তাকে বলেনঃ তোমার তাওবা ও তোমার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। তুমি তোমার গ্রাম হতে হিজরত করে অমুক শহরে চলে যাও যেখানে আল্লাহ তাআলার আবেদগণ বাস করেন। অতএব সে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঐ শহরের দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন করুণা ও শাস্তির ফেরেশতাদের মধ্যে তার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। করুণার ফেরেশতাগণ বলেন যে, এ ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল। পক্ষান্তরে শাস্তির ফেরেশতাগণ বলেন যে, তথায় পৌছতে তো পারেনি। অতঃপর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হয় যে, এ দিকের এবং ঐ দিকের ভূমি মাপ করা হোক। যে গ্রাম সেখান হতে নিকটবর্তী হবে সে গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গেই তাকে মিলিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা যমীনকে নির্দেশ দেন যে, ওটা যেন খারাপ গ্রাম হতে দূরবর্তী হয়ে যায় এবং ভাল গ্রামের নিকটবর্তী হয়। ভূমি মাপা হলে দেখা যায় যে, একত্ববাদীদের গ্রামটি অর্ধহাত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়েছে। ফলে তাকে করুণার ফেরেশতাগণ নিয়ে যান।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর সময় সে সৎলোকদের গ্রামের দিকে বুকের ভরে এগিয়ে যাচ্ছিল।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হয়, তারপর তিনি বলেনঃ আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ কোথায়? অতঃপর সে সোয়ারী হতে পড়ে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ পাকের জিম্মায় চয়ে যায়। অথবা কোন জন্তু তাকে কামড়িয়ে নেয় ফলে সে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিংবা সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, তখনও জিহাদের পণ্যদান আল্লাহ তাআলার জিম্মায় রয়েছে।' (বর্ণনাকারী বলেন যে, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক শব্দ ব্যবহার করেন) আল্লাহর শপথ! আমি এরূপ শব্দ রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর পূর্বে কখনও কোন আরববাসীর মুখে শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “যে স্বীয় স্থানে মারা যায় সেও জান্নাতের অধিকারী হয়ে যায়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেন, হযরত খালিদ ইবনে হিযাম (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে তাঁকে একটি সর্পে দংশন করে এবং তাতেই তিনি মারা যান। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমি আবিসিনিয়ায় পৌছেই গিয়েছিলাম এবং সংবাদ পেয়েছিলাম যে, হযরত খালিদ ইবনে হিযামও (রাঃ) হিজরত করে আসছেন। সুতরাং আমি তার আগমনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানতাম যে, বানূ আসাদ গোত্রের তিনি ছাড়া আর কেউ হিজরত করে আসছে না এবং কমবেশী যত মুহাজির ছিলেন তাঁদের সবারই সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ ছিলেন না। তাই আমি উদ্বেগের সাথে হযরত খালিদ (রাঃ)-এর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমি তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রাপ্ত হই। এতে আমার বড়ই দুঃখ হয়। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এটা গারীব হওয়ার এও একটি কারণ যে, এটা হচ্ছে মক্কার ঘটনা, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনায়। কিন্তু খুব সম্ভব বর্ণনাকারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আয়াতটির হুকুম সাধারণ, যদিও শানে নমূল এটা না হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জুমরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিকট পৌছার পূর্বে পথে তার মৃত্যু ঘটে। তাঁর ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবু যামীরা ইবনে আয়িস আয্যারকী (রাঃ) বলেনঃ যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আমি বলি যে, আমি ধনীও বটে এবং আমার উপায়ও রয়েছে কাজেই আমাকে হিজরত করতেই হবে। অতঃপর তিনি হিজরত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেন। তিনি তানঈম’ নামক স্থানে পৌছে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু মালিক (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার অঙ্গীকারকে সত্য জেনে এবং আমার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রেখে আমার পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, আল্লাহর জিম্মায় এটা রয়েছে যে, তিনি তাকে সৈন্যদের সাথে মৃত্যু দান করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, অথবা সে আল্লাহর দায়িত্বে পুণ্য, গনীমত এবং অনুগ্রহসহ ফিরে আসবে। আর যদি সে স্বাভাবিকভাবে মারা যায় বা নিহত হয় কিংবা ঘোড়া বা উট হতে পড়ে গিয়ে মারা যায় অথবা কোন বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যায় বা স্বীয় বিছানায় মারা যায় তবে সে শহীদ হবে।' সুনান-ই-আবি দাউদে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে' এটুকু বেশী আছে। এর কতগুলো সুনান-ই-আবি দাউদে নেই। হাফি আবু ইয়ালা (রঃ)-এর মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর মারা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্যে হজ্ব করার পুণ্য লিখা হয়। আর যে উমরার উদ্দেশ্যে বের হয় এবং মারা যায় তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত উমরাকারীর পুণ্য লিখা হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত গাযীর পুণ্য লিখা হয়। এ হাদীসটিও গারীব।
আন-নিসা 4:99
৯৭-১০০ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আল-আসওয়াদ (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যে সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাতে আমারও নাম ছিল। আমি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম হযরত ইকরামা (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এ কথাটি তাকে বলি। তিনি এতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং বলেন, “আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যেসব মুসলমান মুশরিকদের সঙ্গে ছিল এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল, মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, তাদের কেউ কেউ মুসলমানদেরই তীরের আঘাতে নিহত হতো বা তাদেরই তরবারী দ্বারা তাদেরকে হত্যা করা হতো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ লোক যারা তাদের ঈমান গোপন রেখেছিল, বদরের যুদ্ধে যখন তারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয় তখন মুসলমানদের হাতে তাদের কয়েকজন লোক মারা যায়। ফলে মুসলমানেরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলেঃ ‘আফসোস! এরা তো আমাদের ভাই ছিল, অথচ এরা আমাদেরই হাতে মারা গেল। তারা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর অবশিষ্ট মুসলমানদের নিকট এ আয়াতটি লিখেন যে, তাদের কোন ওযর ছিল না। তখন তারা বের হয় এবং তাদের সাথে মুশরিকরা মিলিত হয় ও তাদেরকে নিরাপত্তা দান করে। সে সময় (আরবী) (২:৮) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল এবং মক্কাতেই ছিল। তাদের মধ্যে ছিল আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবু মানসুর ইবনে হাজ্জাজ এবং হারেস ইবনে জামআ’।হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিজরতের পরেও মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সঙ্গে এসেছিল। তাদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যায়। ভাবার্থ এই যে, আয়াতের হুকুম হচ্ছে সাধারণ। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যেই এ হুকুম প্রযোজ্য যে হিজরত করতে সক্ষম অথচ মুশরিকদের মধ্যে পড়ে থাকে এবং দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকে না। সে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যাচারী। এ আয়াতের ভাব হিসেবে এবং মুসলমানদের ইজমা হিসেবেও সে হারাম কার্যে লিপ্ত হওয়ার দোষে দোষী। এ আয়াতে হিজরত করা ছেড়ে দেয়াকে অত্যাচার বলা হয়েছে। এ প্রকারের লোকদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা এখানে পড়ে রয়েছে কেন? কেন তোমরা হিজরত করনি? তারা উত্তর দেয়,“আমরা নিজেদের শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরে চলে যেতে সক্ষম হইনি।” তাদের এ কথার উত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন-“আল্লাহ তাআলার পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'মুসনাদ-ই-আবূ দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে মিলিত হয় এবং তার সাথেই বাস করে সে ওর মতই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত আব্বাস (রাঃ), আকীল ও নাওফিলকে বন্দী করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আপনার নিজের ও আপনার ভ্রাতুষ্পত্রের মুক্তি পণ প্রদান করুন।' তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি আপনার কিবলার দিকে নামায পড়তাম না এবং আমরা কি কালেমা-ই-শাহাদাত পাঠ করতাম না’? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনারা তর্কতো উত্থাপন করেছেন, কিন্তু আপনারা পরাজিত হয়ে যাবেন। শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'এরপর যে লোকদের হিজরত পরিত্যাগের উপর ভর্ৎসনা নেই তাদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা মুশরিকদের হাত হতে ছুটতে পারে না বা ছুটতে পারলেও হয়তো পথ চেনা নেই, তাদেরকে আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন। (আরবী) শব্দটি আল্লাহ তাআলার কালামে নিশ্চয়তা বোধক হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মার্জনাকারী ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইশার নামাযে (আরবী) বলার পর সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দু'আ করেছেনঃ “হে আল্লাহ! আইয়াশ ইবনে রাবীআকে, সালাম ইবনে হিশামকে, ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে এবং সমস্ত অসহায় ও শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের ছোবল হতে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! মুর' গোত্রের উপর আপনার কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করুন।' হে আল্লাহ! তাদের উপর আপনি এমন দুর্ভিক্ষ নাযিল করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যামানায় এসেছিল।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর কিবলাহ্ মুখী হয়েই হাত উঠিয়ে দু'আ করতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে, আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআকে সালমা ইবনে হিশামকে এবং অন্যান্য সমস্ত শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের হাত হতে রক্ষা করুন, যারা না পারে কোন উপায় করতে এবং না পায় কোন পথ।’তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামাযের পরে উপরোক্ত প্রার্থনা করতেন। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ, এ সনদ ছাড়া অন্যন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি এবং আমার মাতা ঐসব দুর্বল নারী ও শক্তিহীন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যাদের বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওযর বিশিষ্টদের মধ্যে গণ্য করেছেন।' হিজরত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং মুশরিকদের হতে পৃথক থাকার হিদায়াত করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আল্লাহর পথে হিজরতকারী যেন নিরাশ না হয়। তারা যেখানেই যাবে তিনি তাদের আশ্রয় লাভের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন এবং তারা শান্তিতে তথায় বসবাস করতে পারবে। (আরবী) শব্দের একটি অর্থ এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়াও বটে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, তারা দুঃখ কষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার বহু পন্থা পেয়ে যাবে। ওর বহু আসবাবপত্র সে লাভ করবে। সে শত্রুদের অত্যাচার হতেও রক্ষা পাবে এবং তার আহার্যেরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভ্রান্তির পথের স্থলে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে এবং দারিদ্র ধনশীলতায় পরিবর্তিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বহির্গত হয় কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌছার পূর্বেই পথে তার মৃত্যু এসে যায় সেও হিজরতের পূর্ণ পুণ্য প্রাপ্ত হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক কার্যের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ওটাই রয়েছে যার সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর উদ্দেশ্যে, তার হিজরত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনন্দের কারণ। আর যার হিজরত হয় দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্যে, সে প্রকৃত হিজরতের পুণ্য প্রাপ্ত হবে না। বরং হিজরত ঐ দিকেই মনে করা হবে।' এ হাদীসটি সাধারণ। হিজরত ও অন্যান্য সমস্ত আমলই এর অন্তর্ভুক্ত।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে একটি হাদীস রয়েছে যে নিরানব্বইটি লোককে হত্যা করে। অতঃপর একজন আবেদকে হত্যা করতঃ একশ পূর্ণ করে দেয়। তারপর তার তাওবা গৃহীহ হবে কি-না তা সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে। আলেম তাকে বলেনঃ তোমার তাওবা ও তোমার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। তুমি তোমার গ্রাম হতে হিজরত করে অমুক শহরে চলে যাও যেখানে আল্লাহ তাআলার আবেদগণ বাস করেন। অতএব সে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঐ শহরের দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন করুণা ও শাস্তির ফেরেশতাদের মধ্যে তার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। করুণার ফেরেশতাগণ বলেন যে, এ ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল। পক্ষান্তরে শাস্তির ফেরেশতাগণ বলেন যে, তথায় পৌছতে তো পারেনি। অতঃপর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হয় যে, এ দিকের এবং ঐ দিকের ভূমি মাপ করা হোক। যে গ্রাম সেখান হতে নিকটবর্তী হবে সে গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গেই তাকে মিলিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা যমীনকে নির্দেশ দেন যে, ওটা যেন খারাপ গ্রাম হতে দূরবর্তী হয়ে যায় এবং ভাল গ্রামের নিকটবর্তী হয়। ভূমি মাপা হলে দেখা যায় যে, একত্ববাদীদের গ্রামটি অর্ধহাত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়েছে। ফলে তাকে করুণার ফেরেশতাগণ নিয়ে যান।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর সময় সে সৎলোকদের গ্রামের দিকে বুকের ভরে এগিয়ে যাচ্ছিল।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হয়, তারপর তিনি বলেনঃ আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ কোথায়? অতঃপর সে সোয়ারী হতে পড়ে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ পাকের জিম্মায় চয়ে যায়। অথবা কোন জন্তু তাকে কামড়িয়ে নেয় ফলে সে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিংবা সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, তখনও জিহাদের পণ্যদান আল্লাহ তাআলার জিম্মায় রয়েছে।' (বর্ণনাকারী বলেন যে, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক শব্দ ব্যবহার করেন) আল্লাহর শপথ! আমি এরূপ শব্দ রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর পূর্বে কখনও কোন আরববাসীর মুখে শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “যে স্বীয় স্থানে মারা যায় সেও জান্নাতের অধিকারী হয়ে যায়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেন, হযরত খালিদ ইবনে হিযাম (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে তাঁকে একটি সর্পে দংশন করে এবং তাতেই তিনি মারা যান। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমি আবিসিনিয়ায় পৌছেই গিয়েছিলাম এবং সংবাদ পেয়েছিলাম যে, হযরত খালিদ ইবনে হিযামও (রাঃ) হিজরত করে আসছেন। সুতরাং আমি তার আগমনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানতাম যে, বানূ আসাদ গোত্রের তিনি ছাড়া আর কেউ হিজরত করে আসছে না এবং কমবেশী যত মুহাজির ছিলেন তাঁদের সবারই সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ ছিলেন না। তাই আমি উদ্বেগের সাথে হযরত খালিদ (রাঃ)-এর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমি তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রাপ্ত হই। এতে আমার বড়ই দুঃখ হয়। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এটা গারীব হওয়ার এও একটি কারণ যে, এটা হচ্ছে মক্কার ঘটনা, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনায়। কিন্তু খুব সম্ভব বর্ণনাকারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আয়াতটির হুকুম সাধারণ, যদিও শানে নমূল এটা না হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জুমরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিকট পৌছার পূর্বে পথে তার মৃত্যু ঘটে। তাঁর ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবু যামীরা ইবনে আয়িস আয্যারকী (রাঃ) বলেনঃ যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আমি বলি যে, আমি ধনীও বটে এবং আমার উপায়ও রয়েছে কাজেই আমাকে হিজরত করতেই হবে। অতঃপর তিনি হিজরত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেন। তিনি তানঈম’ নামক স্থানে পৌছে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু মালিক (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার অঙ্গীকারকে সত্য জেনে এবং আমার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রেখে আমার পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, আল্লাহর জিম্মায় এটা রয়েছে যে, তিনি তাকে সৈন্যদের সাথে মৃত্যু দান করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, অথবা সে আল্লাহর দায়িত্বে পুণ্য, গনীমত এবং অনুগ্রহসহ ফিরে আসবে। আর যদি সে স্বাভাবিকভাবে মারা যায় বা নিহত হয় কিংবা ঘোড়া বা উট হতে পড়ে গিয়ে মারা যায় অথবা কোন বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যায় বা স্বীয় বিছানায় মারা যায় তবে সে শহীদ হবে।' সুনান-ই-আবি দাউদে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে' এটুকু বেশী আছে। এর কতগুলো সুনান-ই-আবি দাউদে নেই। হাফি আবু ইয়ালা (রঃ)-এর মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর মারা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্যে হজ্ব করার পুণ্য লিখা হয়। আর যে উমরার উদ্দেশ্যে বের হয় এবং মারা যায় তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত উমরাকারীর পুণ্য লিখা হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত গাযীর পুণ্য লিখা হয়। এ হাদীসটিও গারীব।
আন-নিসা 4:100
৯৭-১০০ নং আয়াতের তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আল-আসওয়াদ (রঃ) বলেন, মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যে সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাতে আমারও নাম ছিল। আমি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম হযরত ইকরামা (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতঃ এ কথাটি তাকে বলি। তিনি এতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং বলেন, “আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যেসব মুসলমান মুশরিকদের সঙ্গে ছিল এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল, মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, তাদের কেউ কেউ মুসলমানদেরই তীরের আঘাতে নিহত হতো বা তাদেরই তরবারী দ্বারা তাদেরকে হত্যা করা হতো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ লোক যারা তাদের ঈমান গোপন রেখেছিল, বদরের যুদ্ধে যখন তারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয় তখন মুসলমানদের হাতে তাদের কয়েকজন লোক মারা যায়। ফলে মুসলমানেরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলেঃ ‘আফসোস! এরা তো আমাদের ভাই ছিল, অথচ এরা আমাদেরই হাতে মারা গেল। তারা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর অবশিষ্ট মুসলমানদের নিকট এ আয়াতটি লিখেন যে, তাদের কোন ওযর ছিল না। তখন তারা বের হয় এবং তাদের সাথে মুশরিকরা মিলিত হয় ও তাদেরকে নিরাপত্তা দান করে। সে সময় (আরবী) (২:৮) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল এবং মক্কাতেই ছিল। তাদের মধ্যে ছিল আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবু মানসুর ইবনে হাজ্জাজ এবং হারেস ইবনে জামআ’।হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিজরতের পরেও মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সঙ্গে এসেছিল। তাদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যায়। ভাবার্থ এই যে, আয়াতের হুকুম হচ্ছে সাধারণ। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যেই এ হুকুম প্রযোজ্য যে হিজরত করতে সক্ষম অথচ মুশরিকদের মধ্যে পড়ে থাকে এবং দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকে না। সে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যাচারী। এ আয়াতের ভাব হিসেবে এবং মুসলমানদের ইজমা হিসেবেও সে হারাম কার্যে লিপ্ত হওয়ার দোষে দোষী। এ আয়াতে হিজরত করা ছেড়ে দেয়াকে অত্যাচার বলা হয়েছে। এ প্রকারের লোকদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা এখানে পড়ে রয়েছে কেন? কেন তোমরা হিজরত করনি? তারা উত্তর দেয়,“আমরা নিজেদের শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরে চলে যেতে সক্ষম হইনি।” তাদের এ কথার উত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন-“আল্লাহ তাআলার পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'মুসনাদ-ই-আবূ দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে মিলিত হয় এবং তার সাথেই বাস করে সে ওর মতই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত আব্বাস (রাঃ), আকীল ও নাওফিলকে বন্দী করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আপনার নিজের ও আপনার ভ্রাতুষ্পত্রের মুক্তি পণ প্রদান করুন।' তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি আপনার কিবলার দিকে নামায পড়তাম না এবং আমরা কি কালেমা-ই-শাহাদাত পাঠ করতাম না’? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনারা তর্কতো উত্থাপন করেছেন, কিন্তু আপনারা পরাজিত হয়ে যাবেন। শুনুন, আল্লাহ তা'আলা বলে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না?'এরপর যে লোকদের হিজরত পরিত্যাগের উপর ভর্ৎসনা নেই তাদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা মুশরিকদের হাত হতে ছুটতে পারে না বা ছুটতে পারলেও হয়তো পথ চেনা নেই, তাদেরকে আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন। (আরবী) শব্দটি আল্লাহ তাআলার কালামে নিশ্চয়তা বোধক হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মার্জনাকারী ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইশার নামাযে (আরবী) বলার পর সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দু'আ করেছেনঃ “হে আল্লাহ! আইয়াশ ইবনে রাবীআকে, সালাম ইবনে হিশামকে, ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে এবং সমস্ত অসহায় ও শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের ছোবল হতে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! মুর' গোত্রের উপর আপনার কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করুন।' হে আল্লাহ! তাদের উপর আপনি এমন দুর্ভিক্ষ নাযিল করুন যেমন দুর্ভিক্ষ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যামানায় এসেছিল।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর কিবলাহ্ মুখী হয়েই হাত উঠিয়ে দু'আ করতেনঃ “হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে, আইয়াশ ইবনে আবু রাবীআকে সালমা ইবনে হিশামকে এবং অন্যান্য সমস্ত শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের হাত হতে রক্ষা করুন, যারা না পারে কোন উপায় করতে এবং না পায় কোন পথ।’তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামাযের পরে উপরোক্ত প্রার্থনা করতেন। এ হাদীসটি বিশুদ্ধ, এ সনদ ছাড়া অন্যন্য সনদেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি এবং আমার মাতা ঐসব দুর্বল নারী ও শক্তিহীন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যাদের বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ওযর বিশিষ্টদের মধ্যে গণ্য করেছেন।' হিজরত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং মুশরিকদের হতে পৃথক থাকার হিদায়াত করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আল্লাহর পথে হিজরতকারী যেন নিরাশ না হয়। তারা যেখানেই যাবে তিনি তাদের আশ্রয় লাভের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন এবং তারা শান্তিতে তথায় বসবাস করতে পারবে। (আরবী) শব্দের একটি অর্থ এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়াও বটে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, তারা দুঃখ কষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার বহু পন্থা পেয়ে যাবে। ওর বহু আসবাবপত্র সে লাভ করবে। সে শত্রুদের অত্যাচার হতেও রক্ষা পাবে এবং তার আহার্যেরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভ্রান্তির পথের স্থলে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে এবং দারিদ্র ধনশীলতায় পরিবর্তিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বহির্গত হয় কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌছার পূর্বেই পথে তার মৃত্যু এসে যায় সেও হিজরতের পূর্ণ পুণ্য প্রাপ্ত হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক কার্যের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ওটাই রয়েছে যার সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর উদ্দেশ্যে, তার হিজরত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনন্দের কারণ। আর যার হিজরত হয় দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্যে, সে প্রকৃত হিজরতের পুণ্য প্রাপ্ত হবে না। বরং হিজরত ঐ দিকেই মনে করা হবে।' এ হাদীসটি সাধারণ। হিজরত ও অন্যান্য সমস্ত আমলই এর অন্তর্ভুক্ত।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে একটি হাদীস রয়েছে যে নিরানব্বইটি লোককে হত্যা করে। অতঃপর একজন আবেদকে হত্যা করতঃ একশ পূর্ণ করে দেয়। তারপর তার তাওবা গৃহীহ হবে কি-না তা সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে। আলেম তাকে বলেনঃ তোমার তাওবা ও তোমার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। তুমি তোমার গ্রাম হতে হিজরত করে অমুক শহরে চলে যাও যেখানে আল্লাহ তাআলার আবেদগণ বাস করেন। অতএব সে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঐ শহরের দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন করুণা ও শাস্তির ফেরেশতাদের মধ্যে তার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। করুণার ফেরেশতাগণ বলেন যে, এ ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল। পক্ষান্তরে শাস্তির ফেরেশতাগণ বলেন যে, তথায় পৌছতে তো পারেনি। অতঃপর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হয় যে, এ দিকের এবং ঐ দিকের ভূমি মাপ করা হোক। যে গ্রাম সেখান হতে নিকটবর্তী হবে সে গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গেই তাকে মিলিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা যমীনকে নির্দেশ দেন যে, ওটা যেন খারাপ গ্রাম হতে দূরবর্তী হয়ে যায় এবং ভাল গ্রামের নিকটবর্তী হয়। ভূমি মাপা হলে দেখা যায় যে, একত্ববাদীদের গ্রামটি অর্ধহাত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়েছে। ফলে তাকে করুণার ফেরেশতাগণ নিয়ে যান।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর সময় সে সৎলোকদের গ্রামের দিকে বুকের ভরে এগিয়ে যাচ্ছিল।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হয়, তারপর তিনি বলেনঃ আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ কোথায়? অতঃপর সে সোয়ারী হতে পড়ে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ পাকের জিম্মায় চয়ে যায়। অথবা কোন জন্তু তাকে কামড়িয়ে নেয় ফলে সে মারা যায়, ওর পুণ্যদান আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। কিংবা সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, তখনও জিহাদের পণ্যদান আল্লাহ তাআলার জিম্মায় রয়েছে।' (বর্ণনাকারী বলেন যে, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন এক শব্দ ব্যবহার করেন) আল্লাহর শপথ! আমি এরূপ শব্দ রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর পূর্বে কখনও কোন আরববাসীর মুখে শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “যে স্বীয় স্থানে মারা যায় সেও জান্নাতের অধিকারী হয়ে যায়।'মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেন, হযরত খালিদ ইবনে হিযাম (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে তাঁকে একটি সর্পে দংশন করে এবং তাতেই তিনি মারা যান। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমি আবিসিনিয়ায় পৌছেই গিয়েছিলাম এবং সংবাদ পেয়েছিলাম যে, হযরত খালিদ ইবনে হিযামও (রাঃ) হিজরত করে আসছেন। সুতরাং আমি তার আগমনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানতাম যে, বানূ আসাদ গোত্রের তিনি ছাড়া আর কেউ হিজরত করে আসছে না এবং কমবেশী যত মুহাজির ছিলেন তাঁদের সবারই সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ ছিলেন না। তাই আমি উদ্বেগের সাথে হযরত খালিদ (রাঃ)-এর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমি তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রাপ্ত হই। এতে আমার বড়ই দুঃখ হয়। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এটা গারীব হওয়ার এও একটি কারণ যে, এটা হচ্ছে মক্কার ঘটনা, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনায়। কিন্তু খুব সম্ভব বর্ণনাকারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আয়াতটির হুকুম সাধারণ, যদিও শানে নমূল এটা না হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জুমরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিকট পৌছার পূর্বে পথে তার মৃত্যু ঘটে। তাঁর ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবু যামীরা ইবনে আয়িস আয্যারকী (রাঃ) বলেনঃ যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আমি বলি যে, আমি ধনীও বটে এবং আমার উপায়ও রয়েছে কাজেই আমাকে হিজরত করতেই হবে। অতঃপর তিনি হিজরত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট পৌছার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেন। তিনি তানঈম’ নামক স্থানে পৌছে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার সম্বন্ধে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।তাবরানীর হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু মালিক (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার অঙ্গীকারকে সত্য জেনে এবং আমার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রেখে আমার পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, আল্লাহর জিম্মায় এটা রয়েছে যে, তিনি তাকে সৈন্যদের সাথে মৃত্যু দান করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, অথবা সে আল্লাহর দায়িত্বে পুণ্য, গনীমত এবং অনুগ্রহসহ ফিরে আসবে। আর যদি সে স্বাভাবিকভাবে মারা যায় বা নিহত হয় কিংবা ঘোড়া বা উট হতে পড়ে গিয়ে মারা যায় অথবা কোন বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যায় বা স্বীয় বিছানায় মারা যায় তবে সে শহীদ হবে।' সুনান-ই-আবি দাউদে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে' এটুকু বেশী আছে। এর কতগুলো সুনান-ই-আবি দাউদে নেই। হাফি আবু ইয়ালা (রঃ)-এর মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর মারা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্যে হজ্ব করার পুণ্য লিখা হয়। আর যে উমরার উদ্দেশ্যে বের হয় এবং মারা যায় তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত উমরাকারীর পুণ্য লিখা হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হয়, অতঃপর তার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত গাযীর পুণ্য লিখা হয়। এ হাদীসটিও গারীব।
আন-নিসা 4:101
ইরশাদ হচ্ছে-'যখন তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে পর্যটন কর’ অর্থাৎ শহরসমূহের সফরে বের হও। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘জেনে রেখো যে, সত্বরই তোমাদের মধ্যে রুগীও হবে এবং অন্যান্য এমন লোকও হবে যারা আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করবে। (৭৩:২০) তবে সে সময় নামায সংক্ষেপ করায় তোমাদের কোন অপরাধ নেই। অর্থাৎ চার রাকআতের স্থলে দু'রাকআত, যেমন জমহুর এ আয়াত দ্বারা এটাই বুঝেছেন, যদিও তাদের মধ্যে কতক মাসআলায় মতভেদ রয়েছে। কেহ কেহ বলেন যে, সালাত সংক্ষেপ করার জন্য আনুগত্যের সফর হওয়া শর্ত। যেমন জিহাদের জন্য, হাজ্জ বা উমরার জন্য, বিদ্যা অনুসন্ধানের জন্য এবং যিয়ারত ইত্যাদির জন্য সফর করা। ইবন উমার (রাঃ), আতা' (রঃ) এবং ইয়াহইয়ারও (রঃ) উক্তি এটাই। একটি বর্ণনা হিসাবে ইমাম মালিকেরও (রঃ) এটাই উক্তি। কেননা এরপরে ঘোষণা রয়েছে ? যদি তোমরা আশংকা কর যে, অবিশ্বাসীরা তোমাদেরকে বিব্রত করবে। কারও কারও মতে এ শর্ত আরোপের কোনই প্রয়োজন নেই যে, এ সফর আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশে হতে হবে, বরং প্রত্যেক বৈধ সফরেই সালাত সংক্ষেপ করা যায়। যেমন মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণের অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: (আরবী) অর্থাৎ যে পাপাসক্তি ব্যতীত ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়বে (তার জন্যে মৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণ বৈধ)।' (৫:৩) হ্যা তবে শর্ত এই যে, সেটা যেন পাপ কার্যের উদ্দেশ্যে সফর না হয়। ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখ ইমামগণের এটাই উক্তি।হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একজন ব্যবসায়ী লোক। ব্যবসা উপলক্ষে আমি সমুদ্র ভ্রমণ করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দু' রাকআত নামায পড়ার নির্দেশ দেন। এ হাদীসটি মুরসাল। কোন কোন লোকের মাযহাব এই যে, প্রত্যেক সফরেই নামায কসর করতে হবে। সফর হয় বৈধই হোক বা অবৈধই হোক। এমনকি, যদি কেউ ডাকাতি বা লুঠতরাজি করার উদ্দেশ্যেও সফর করে সেখানেও নামাযকে কসর করার অনুমতি রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), সাওরী (রঃ) এবং দাউদেরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, আয়াতটি সাধারণ। কিন্তু এ উক্তি জমহুরের উক্তির বিপরীত। কাফিরদের হতে ভয় করার যে শর্ত লাগানো হয়েছে তা অধিক প্রচলনের কারণেই লাগানো হয়েছে। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যেহেতু অবস্থা প্রায় এরূপই ছিল সেহেতু আয়াতের মধ্যেও ওটা বর্ণনা করা হয়েছে। হিজরতের পর মুসলমানদেরকে যেসব সফরে যেতে হয়েছিল তার সবগুলোই ছিল সন্ত্রাসের সফর। প্রতি পদে পদে শত্রুর ভয় ছিল। এমনকি মুসলমানগণ জিহাদ ছাড়া এবং বিশেষ কোন সেনাবাহিনীর সঙ্গ ছাড়া সফরের জন্যে বের হতেই পারতেন না। আর নিয়ম আছে যে, অধিক হিসেবে যে কথা বলা হয় তার বোধগম্য ধর্তব্য হয় না। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে নির্লজ্জতার কার্যে বাধ্য করো না যদি তারা পবিত্র থাকতে ইচ্ছে করে।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে তোমরা সহবাস করছে তাদের ঐ মেয়েগুলোও তোমাদের জন্য হারাম যারা তোমাদের নিকট প্রতিপালিত হচ্ছে। অতএব এ আয়াত দু’টিতে যেমন শর্তের বর্ণনা রয়েছে, কিন্তু ওর হওয়ার উপরই হুকুম নির্ভর করে না, বরং এ শর্ত ছাড়াও ওটাই হুকুম। অর্থাৎ নির্লজ্জতার কার্যে দাসীদেরকে বাধ্য করা হারাম, তারা পবিত্র থাকার ইচ্ছে করুক আর নাই করুক। অনুরূপভাবে ঐ স্ত্রীর কন্যা তার স্বামীর পক্ষে হারাম যে স্ত্রীর সাথে স্বামী সহবাস করেছে, তার কন্যা তার স্বামীর নিকট প্রতিপালিতা হোক আর নাই হোক। অথচ কুরআন কারীমের মধ্যে দু’জায়গায় এ শর্ত রয়েছে। তাহলে এ দু জায়গায় যেমন এসব শর্ত ছাড়াও এ হুকুম, দ্রুপ এখানেও যদিও ভয় না থাকে তবুও শুধু সফরের কারণেই নামাযকে কসর করা বৈধ। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, নামায হালকা করার নির্দেশ তো ভয়ের অবস্থায় আর এখন তো নিরাপত্তা রয়েছে (সুতরাং এখন নির্দেশ কি)?' তখন হযরত উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ এ প্রশ্নই আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ ‘এটা আল্লাহ তা'আলার একটা সাদকা যা তিনি তোমাদেরকে প্রদান করেছেন, সুতরাং তোমরা তা গ্রহণ কর।' সহীহ মুসলিম, সুনান ইত্যাদির মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। বর্ণনাটি সম্পূর্ণই সঠিক।হযরত আবু হানযালা খুদামা (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে সফরের নামাযের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন দু'রাকআত। তিনি তখন বলেন, কুরআন পাকে তো ভয়ের অবস্থায় দু'রাকআতের কথা রয়েছে। আর এখন তো পূর্ণ নিরাপত্তা বিরাজ করছে?' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাই সুন্নাত। (ইবনে আবি শাইবা) অন্য এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আকাশ থেকে তো এ অবকাশ অবতীর্ণ হয়েছে। এখন তোমার ইচ্ছে হলে তা ফিরিয়ে দাও।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'মক্কা ও মদীনার মধ্যে নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে দু'রাকআত নামায পড়েছি। (সুনান-ই-নাসাঈ) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনা হতে মক্কার পথে রওয়ানা হয়েছেন, তখন সেখানে আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কোন ভয় ছিল না। তখনও তিনি দু'রাকআত নামায আদায় করতেন।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, মক্কা হতে মদীনা প্রত্যাবর্তনের পথেও তিনি দু'রাকআতই নামায আদায় করেছেন এবং সে সফরে তিনি মক্কায় দশ দিন অবস্থান করেছিলেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘মিনার মাঠে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে যোহর ও আসরের নামায দু’ রাকআত পড়েছি, অথচ আমরা সংখ্যায় অনেক ছিলাম এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় ছিলাম। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে, হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে এবং হযরত উসমান (রাঃ)-এর সঙ্গে (সফরে) দু' রাকআত নামায পড়েছি। কিন্তু এখন হযরত উসমান (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের শেষ যুগে পূর্ণ পড়তে আরম্ভ করেছেন।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট যখন হযরত উসমান (রাঃ)-এর চার রাকআত নামায পড়ার কথা বর্ণিত হয় তখন তিনি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মিনায় দু'রাকআত নামায পড়েছি এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গেও পড়েছি। সুতরাং যদি আমার ভাগ্যে এ চার রাকআতের পরিবর্তে গৃহীত দু'রাকআতই পড়তো!' অতএব উল্লিখিত হাদীসগুলো এ কথার উপর স্পষ্টভাবে দলীল যে, সফরে নামায কসর করার জন্যে ভয়ের অবস্থা হওয়া শর্ত নয়, বরং সম্পূর্ণ নিরাপদ সফরেও দু'রাকআত আদায় করা যায়। এ জন্যেই উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে কাইফিয়াত’ অর্থাৎ কিরআত, দাড়ান, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদির মধ্যে কসর বা সংক্ষেপ করা, কামইয়াত' অর্থাৎ রাকআতের সংখ্যায় সংক্ষেপ করা নয়। যহ্হাক (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)-এর এটাই উক্তি। যেমন পরে আসছে। এর একটি দলীল হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ)-এর বর্ণনাকৃত নিমের হাদীসটিঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, নামায দু' দু' রাকআত করেই বাড়ীতে ও সফরে ফরয করা হয়েছিল। অতঃপর সফরে তো দু' রাকআতই থেকে যায়। কিন্তু বাড়ীতে অবস্থানের সময় আরও দু' রাকআত বাড়িয়ে দেয়া হয়। সুতরাং আলেমদের এ দলটি বলেন যে, প্রকৃত নামায ছিল দু' রাকআত, তাহলে এ আয়াতে কসরের অর্থ কামইয়াত’ অর্থাৎ রাকাতের সংখ্যায় কম হওয়া কিরূপে হতে পারে? এই উক্তির স্বপক্ষে খুব বড় শক্তি নিম্নের হাদীস দ্বারা পাওয়া যাচ্ছেঃমুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘সফরে নামায হচ্ছে দু'রাকআত, ঈদুল আযহার নামায দু'রাকআত, ঈদুল ফিরের নামায দু'রাকআত এবং জুমার নামায দু'রাকআত, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ভাষায় এ হচ্ছে পূর্ণ নামায, কসর নয়।' এ হাদীসটি সুনান-ই-নাসাঈ, সুনান-ই-ইবনে মাজাহ্ এবং সহীহ ইবনে হিব্বানেও রয়েছে। এর সনদ। মুসলিমের শর্তের উপরে রয়েছে। এর একজন বর্ণনাকারী ইবনে আবি লাইলা (রঃ)-এর হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ করা সাব্যস্ত আছে। যেমন ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ সহীহ’-এর ভূমিকার মধ্যে লিখেছেন। স্বয়ং এ বর্ণনায় এবং এ ছাড়া অন্যান্য বর্ণনার মধ্যেও স্পষ্টভাবে এটা বিদ্যমান রয়েছে। আর এটা ইনশাআল্লাহ সঠিকও বটে, যদিও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রঃ), ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বলেন যে, ইবনে আবি লাইলা (রঃ) এটা হযরত উমার (রাঃ) হতে শুনেননি। কিন্তু এটা মেনে নিলেও এ সনদে কোন ত্রুটি থাকে না। কেননা, অন্য কোন পন্থায় হযরত ইবনে আবি লাইলার উপরে সিকাহ্ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন এবং তাঁর হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ বর্ণিত আছে। আর সুনান-ই-ইবনে মাজায় ইবনে আবি লাইলা (রঃ)-এর হযরত কাব ইবনে আজরা হতে এবং তার হযরত উমার (রাঃ) হতে রেওয়ায়াতও বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নবী (সঃ)-এর ভাষায় তোমাদের উপর নামায ফরয করেছেন বাড়ীতে অবস্থানের সময় চার রাকআত, সফরে দু' রাকআত এবং ভয়ের অবস্থায় এক রাকআত। অতএব বাড়ীতে অবস্থানের সময় এর পূর্বে ও পরে যেমনিভাবে নামায পড়া হতো তেমনিভাবে সফরেও পড়া হবে। এ বর্ণনায় এবং উপরে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বর্ণনায় যে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বাড়ীতে অবস্থানের সময়ও দু'রাকআতই ফরয করেছিলেন’ এ দুটো বর্ণনার মধ্যে বৈপরীত্ব কিছুই নেই। কেননা, মূল তো দু'রাকআতই ছিল পরে আরও দু'রাকআত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এখন বলা যেতে পারে যে, বাড়ীতে অবস্থানের অবস্থায় ফরয চার রাকআতই বটে, যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। মোটকথা এ দু'টি বর্ণনা দ্বারা জানা গেল যে, সফরে নামায দু'রাকআতই বটে এবং এটাই পূর্ণ নামায, অসম্পূর্ণ নামায় নয়, আর হযরত উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হয়েছে। তাহলে কসর' বা নামায় সংক্ষেপ করণের ভাবার্থ হচ্ছে কসর-ই-কাইফিয়াত' অর্থাৎ অবস্থার দিক দিয়ে সংক্ষেপণ, যেমন- ‘সলাতুল খাওফ' বা ভয়ের সময়ের নামাযে সংক্ষেপ করা হয়। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফিররা তোমাদেরকে বিব্রত করবে। আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরবর্তী আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তুমি যখন তাদের মধ্যে থাক তখন তাদের জন্যে নামায প্রতিষ্ঠিত কর। অতঃপর নামায সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এর নিয়মাবলীও বর্ণনা করেছেন। ইমামুল মুহাদ্দেসিন হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) (আরবী) পর্যন্ত লিখার পর আরম্ভ করেছেন। হযরত যহ্হাক (রঃ) (আরবী)-এর তাফসীরে বলেন যে, এটা হচ্ছে যুদ্ধের সময়, সে সময় মানুষ সোয়ারীর উপর দু’ তাকবীরে নামায পড়ে নেবে, তার মুখ যে দিকেই হোক না কেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন, যখন তুমি সফরে দু' রাকআত নামায পড়ে নেবে তখন তোমার এ কসর' পুরো নামাযই হয়ে গেল। হ্যা, তবে যদি ভয় থাকে যে, কাফিররা বিব্রত করবে তবে ‘কসর' এক রাকআতই পড়তে হবে। ভয়ের সময় ছাড়া এক রাকআত কসর' হালাল নয়।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত দ্বারা ঐ দিনকে বুঝান হয়েছে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীগণসহ ‘আসফান’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং মুশরিকরা ছিল ‘যজনান’ নামক স্থানে। একদল অপর দলের উপর আক্রমণের জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। এদিকে যোহরের নামাযের সময় হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণ চার রাকআতই আদায় করেন। এদিকে মুশরিকরা মুসলমানদের আসবাবপত্র লুটে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), জাবির (রঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাই অবলম্বন করেছেন এবং এটাকেই সঠিকও বলেছেন। হযরত খালিদ ইবনে উসায়েদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে বলেন, “আমরা ভয়ের নামাযের কসরের হুকুম তো আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে পাচ্ছি, কিন্তু মুসাফিরের নামাযের কসরের হুকুম তো আল্লাহ পাকের কিতাবে পাওয়া যায় না? 'হযরত ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমরা আমাদের নবী (সঃ) -কে সফরের নামায কসর করতে দেখেছি এবং আমরাও ওটার উপর আমল করেছি।লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, হযরত খালিদ ইবনে উসায়েদ (রঃ) কসরের প্রয়োগ ভয়ের নামাযের উপর করলেন এবং আয়াতের ভাবার্থ ভয়ের নামাযই নিলেন, আর মুসাফিরের নামাযকে ওর অন্তর্ভুক্ত করলেন না। আবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) ওটা সমর্থনও করলেন। এ আয়াত দ্বারা তিনি মুসাফিরের নামাযের কসরের বর্ণনা না দিয়ে বরং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজকে তার জন্যে সনদ করলেন। এর চেয়েও স্পষ্ট হচ্ছে ইবনে জারীর (রঃ)-এর বর্ণনাটি। ওতে রয়েছে যে, হযরত সাম্মাক (রঃ) তাঁকে সফরের নামাযের মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘সফরের নামায দু'রাকআত এবং এ দু'রাকআতই হচ্ছে সফরের পূর্ণ নামায, কসর নয়। কসর তো রয়েছে ভয়ের নামাযে। ইমাম একটি দলকে এক রাকআত নামায পড়াবেন, অন্য দলটি শত্রুদের সম্মুখে থাকবে। অতঃপর এ দলটি শত্রুদের সামনে চলে যাবে এবং ঐ দলটি চলে আসবে। এ দলটিকে ইমাম সাহেব এক রাকআত নামায পড়াবেন। তাহলে ইমামের দু'রাকআত হবে এবং দল দু’টির এক রাকআত করে হবে।
আন-নিসা 4:102
ভয়ের নামায কয়েক প্রকার এবং এর কয়েকটি অবস্থা আছে। কখনও এমন হয় যে, শত্রুরা কিবলার দিকে রয়েছে। কখনও তারা অন্য দিকে হয়। আবার নামাযও কখনও চার রাকআতের হয়। কখনও তিন রাকআতের হয়, যেমন মাগরিব। কখনও আবার দু'রাকআতের হয়, যেমন ফজর ও সফরের নামায। কখনও জামাআতের সাথে পড়া সম্ভব হয়, আবার কখনও শক্ররা এত মুখখামুখী হয়ে থাকে যে, জামাআতের সাথে নামায পড়া সম্ভবই হয় না। বরং পৃথক পৃথকভাবে কিবলার দিকে মুখ করে বা অন্য দিকে মুখ করে, পায়ে হেঁটে হেঁটে বা সোয়ারীর উপরে, যেভাবেই সম্ভব হয় পড়ে নেয়া হয়। বরং এমনও হয় এবং ওটা জায়েযও বটে যে, শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাতেই থাকা হয়, তাদেরকে প্রতিরোধও করা হয়, আবার নামায আদায় করে যাওয়া হয়। আলেমগণ শুধু এক রাকআত নামায পড়ারও ফতওয়া দিয়েছেন। তাঁদের দলীল হচ্ছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসটি যা এর পূর্ববর্তী আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। আতা (রঃ), জাবির (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), হাম্মাদ (রঃ), তাউস (রঃ), যহহাক (রঃ), মুহাম্মদ নাসর আল মারূযী (রঃ) এবং ইবনে হাযামেরও (রঃ) এটাই ফতওয়া। এ অবস্থায় যোহরের নামাযে এক রাকআতই রয়ে যায়। হযরত ইসহাক ইবনে রাহউয়াই (রঃ) বলেন যে, এরূপ দৌড়াদৌড়ির সময় এক রাকআতই যথেষ্ট। ইশারা করেই পড়বে। যদি এটাও সম্ভব না হয় তবে একটা সিজদাহ করবে। এটাও অল্লাহর যিকির। অন্যেরা বলেন যে, শুধু একটি তাকবীরই যথেষ্ট। কিন্তু এটাও হতে পরে যে, একটি সিজদা ও একটি তাকবীরের ভাবার্থ হচ্ছে এক রাকআত নামায। এটা হচ্ছে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং তার সঙ্গীদের ফতওয়া। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত কা'ব (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণেরও এটাই উক্তি। কিন্তু যেসব লোক শুধু একটি তাকবীরের কথা বলেছেন তারা ওটাকে পূর্ণ রাকআতের উপর প্রয়োগ করেন না, বরং ভাবার্থ তাকবীরই নিয়ে থাকেন। যেমন এটা হচ্ছে ইসহাক ইবনে রাহ্উয়াইর মাযহাব। আমীর আবদুল ওয়াহ্হাব ইবনে বাখৃত মাক্কীও (রঃ) ঐ দিকেই গিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেন যে, যদি একটি তাকবীরের উপরও সক্ষম না হয় তবে স্বীয় নাফসের মধ্যেও ওটা ছেড়ে দেবে না। অর্থাৎ শুধু নিয়ত করে নেবে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। কোন কোন আলেম এরূপ বিশেষ সময়ে নামাযকে বিলম্বে পড়ারও অবকাশ দিয়েছেন। তাদের দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিখার যুদ্ধে সূর্যাস্তের পর যোহর ও আসরের নামায আদায় করেছেন। তার পরে মাগরিব ও ইশার নামায পড়েছেন। এর পরে বানু কুরাইযার যুদ্ধে যাদেরকে প্রেরণ করেছিলেন তাদেরকে তিনি খুব জোর দিয়ে বলেছিলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন বানূ কুরাইযাদের নিকট পৌছার পূর্বে আসরের নামায না পড়ে। ঐ লোকগুলো পথে থাকতেই আসরের সময় হয়ে যায়। তখন কেউ কেউ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমাদেরকে এ কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল শুধু এই যে, আমরা যেন তাড়াতাড়ি বানু কুরাইযার নিকট পৌছে যাই, তার উদ্দেশ্য এটা ছিল না যে, পথে আসরের সময় হয়ে গেলেও আমরা নামায পড়বো না। সুতরাং পথেই তারা নামায আদায় করে নেন। অন্যেরা বানু কুরাইযার নিকট পৌঁছার পর আসরের নামায আদায় করেন। সে সময় সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। নবী (সঃ)-এর সামনে ওটা বর্ণনা করা হলে কোন দলকেই ধমক দিলেন না। আমরা কিতাবুস সীরাতে এর বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তথায় আমরা এটা প্রমাণ করেছি যে, ঐদলটিই বেশী সঠিক কাজ করেছিলেন যারা সময়মত নামায আদায় করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় দলটির ওরও শরীয়ত সমর্থিত ওযরই ছিল। উদ্দেশ্যে এই যে, ঐ দলটি জিহাদের স্থলে শত্রুদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের দুর্গের উপর আক্রমণ অব্যাহত রেখে নামায বিলম্বে আদায় করেন। শত্রুদের ঐ দলটি ছিল অভিশপ্ত ইয়াহুদীর দল। তারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল এবং সন্ধির শর্তের বিপরীত কাজ করেছিল। কিন্তু জমহুর বলেন যে, খাওফের নামাযের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর এসব রহিত হয়ে যায়। এটা ছিল এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের ঘটনা। খাওফের নামাযের নির্দেশ জারী হওয়ার পর জিহাদের সময় নামাযকে বিলম্বে পড়ার বৈধতা আর নেই। হযরত আবু সাঈদ (রঃ)-এর রিওয়ায়েত দ্বারাও এটাই প্রকাশিত হয়েছে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সহীহ বুখারী শরীফে (আরবী) এ অধ্যায়ে রয়েছে যে, আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ যদি বিজয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয় ও জামাআতের সঙ্গে নামায পড়া সম্ভবপর না হয় তবে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় নামায পৃথক পৃথকভাবে ইশারার মাধ্যমে আদায় করবে। যদি ওটাও সম্ভব না হয় তবে বিলম্ব করবে যে পর্যন্ত না যুদ্ধ শেষ হয় অথবা নিরাপত্তা লাভ হয়। অতঃপর দু'রাকআত পড়ে নেবে। কিন্তু যদি নিরাপত্তা লাভ না হয় তবে এক রাকআত আদায় করতে হবে। শুধু তাকবীর পাঠ যথেষ্ট নয়। যদি এ অবস্থাই হয় তবে। নামায বিলম্বে পড়তে হবে, যে পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তা না আসে।' হযরত মাকলেরও (রঃ) এটাই উক্তি। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ ‘তিসতার দুর্গের অবরোধের সময় আমি বিদ্যমান ছিলাম। সুবেহ-সাদিকের সময় ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়। আমরা ফজরের নামায পড়তে পারিনি, বরং যুদ্ধেই লিপ্ত ছিলাম। যখন আল্লাহ পাক আমাদেরকে দুর্গের উপর বিজয় দান করেন তখন সূর্য উপরে উঠে যাওয়ার পর আমরা ফজরের নামায আদায় করি। ঐ যুদ্ধে আমাদের ইমাম ছিলেন। হযরত আবূ মূসা (রাঃ)'। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘ঐ নামাযের বিনিময়ে সারা দুনিয়া এবং ওর সমুদয় জিনিসও আমাকে খুশি করতে পারে না।এরপর ইমাম বুখারী (রঃ) পরিখার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায বিলম্বে পড়ার বর্ণনা দেন। তারপর তিনি বান্ কুরাইযা যুক্ত ঘটনাটি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্ন উক্তিটি আনয়ন করেনঃ “তোমরা বানু কুরাইযার নিকট পৌছার পূর্বে আসরের নামায আদায় করবে না। সম্ভবতঃ ইমাম বুখারী (রঃ) এটাই পছন্দ করেন যে, এরূপ তুমুল যুদ্ধে, ভয়াবহ বিপদ এবং আসন্ন বিজয়ের সময় নামায বিলম্বে আদায় করলে কোন দোষ নেই।হযরত আবু মূসা (রাঃ)-এর নেতৃত্বে তিসতার দুর্গ বিজিত হওয়ার ঘটনাটি হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে সংঘটিত হয়। হযরত উমার (রাঃ) বা অন্য কোন সাহাবী যে এর প্রতিবাদ করেছেন এরূপ কোন বর্ণনা নকল করা হয়নি। এসব লোক একথাও বলেন যে, পরিখার যুদ্ধের সময়ও ‘খাওফের নামাযের আয়াতগুলো বিদ্যমান ছিল। কেননা, আয়াতগুলো ‘যাতুর রিকা’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আর এটা হচ্ছে পরিখার যুদ্ধের পূর্বের যুদ্ধ। এর উপর “সিয়ার’ ও ‘মাগাযীর’ জামহর-ই-উলামা একমত। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ), ওয়াকেদী (রঃ), ওয়াকেদীর লেখক মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) এবং খলীফা ইবনে খাইয়াত (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণেরও এটাই উক্তি। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষীর উক্তি এই যে, যাতুর রিকা’র যুদ্ধ পরিখার যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে হযরত আবু মূসা (রাঃ)-এর হাদীসটি এবং স্বয়ং তিনি খাইবারেই এসেছিলেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু সব চাইতে বিস্ময়কর কথা এই যে, আল মুযানী (রঃ), কাযী আবু ইউসুফ (রঃ) এবং ইবরাহীম ইবনে ইসমাঈল ইবনে ‘আলিয়া (রঃ) বলেন যে, 'সলাতুল খওফ’ (ভয়ের নামায) মানসুখ হয়ে গেছে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিখার যুদ্ধে নামায বিলম্বে পড়েছেন। এ উক্তি সম্পূর্ণ গারীব। যেহেতু পরিখার যুদ্ধের পরবর্তী সলাতুল খওফের’ হাদীসগুলো এ নামায রহিত না হওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। ঐ দিনে নামায বিলম্বে আদায় করাকে মাকহুল (রঃ) এবং আওযায়ী (রঃ)-এর উক্তির উপর মাহমল করাই যুক্তিসঙ্গত হবে। অর্থাৎ তাদের ঐ উক্তিটি যা তারা সহীহ বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন তা এই যে, আসন্ন বিজয়ের সময় নামায আদায় করা অসম্ভব হলে নামায বিলম্বে আদায় করা বৈধ।আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন-“যখন তুমি তাদের মধ্যে থাক তখন তাদের জন্যে নামায প্রতিষ্ঠিত কর।' অর্থাৎ যখন তুমি ভয়ের নামাযে ইমাম হয়ে নামায পড়াবে। এটা প্রথম অবস্থার সময় নয়। কেননা, সে সময় তো মাত্র এক রাকআত নামায পড়তে হবে এবং ওটাও আবার পৃথক পৃথকভাবে হেঁটে হেঁটে, সোয়ারীর উপরে, কিবলার দিকে মুখ করে বা না করে, বরং যে দিকে মুখ করে পড়া সম্ভব সে দিকেই পড়তে হবে। যেমন এর হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।এখন ইমাম ও জামাআতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ আয়াতটি জামাআত ওয়াজিব হওয়ার প্রকৃষ্ট ও দৃঢ় দলীল। জামায়াতের কারণেই এত বড় সুবিধে দান করা হয়েছে। জামাআত ওয়াজিব না হলে এটা বৈধ করা হতো না। কেউ কেউ আবার এ আয়াত দ্বারা অন্য দলীলও গ্রহণ করেছেন। তারা বলেন যে, এ সম্বোধন যখন নবী (সঃ)-কে করা হচ্ছে তখন জানা যাচ্ছে যে, 'সলাতুল খাওফ’ -এর হুকুম তাঁর পরে রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল যুক্তি। এ যুক্তি ঐ রকমই যেমন যুক্তি ঐ লোকদের ছিল যারা খোলাফায়ে রাশেদীনকে যাকাত প্রদানে বিরত হয়েছিল এবং তারা কুরআন পাকের নিম্নেন আয়াতটিকে দলীল রূপে পেশ করেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের মাল হতে যাকাত গ্রহণ কর যদ্দ্বারা তুমি তাদেরকে পাক-পবিত্র করবে এবং তুমি তাদের জন্যে করুণার প্রার্থনা জানাও, নিশ্চয়ই তোমার প্রার্থনা তাদের জন্যে শান্তির কারণ হবে।' (৯:১০৩) এ আয়াতকে কেন্দ্র করেই তারা বলেছিলঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরে আর কাউকেও যাকাতের মাল প্রদান করবো না, বরং স্বহস্তে যাকে চাইবো তাকেই দেবো। আর শুধু তাকেই দেবো যার প্রার্থনা আমাদের জন্যে শান্তির কারণ হবে। কিন্তু ওটা তাদের বাজে যুক্তি ছিল। এ কারণেই সাহাবীগণ তাদের যুক্তি অগ্রাহ্য করেন এবং তাদেরকে যাকাত প্রদানে বাধ্য করেন। আর তাদের মধ্যে যারা এর পরেও যাকাত প্রদানে বিরত থাকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।এখন আমরা এ আয়াতটির ‘সিফাত’ বর্ণনা করার পূর্বে তার শান-ই-নমূল বর্ণনা করছি। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, বানূ নাজ্জারের একটি গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো প্রায়ই ভূ-পৃষ্ঠে পর্যটন করে থাকি। অতএব আমরা নামায কিরূপে আদায় করবো?' তখন আল্লাহ তাআলা (আরবী) অর্থাৎ যখন তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে পর্যটন কর তখন তোমরা নামায কসর’ (সংক্ষেপ) করলে তোমাদের কোন দোষ নেই'-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অতঃপর বছর ধরে আর কোন অহী অবতীর্ণ হয়নি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক যুদ্ধে ছিলেন। তথায় তিনি যোহরের নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান। মুশরিকরা তখন পরস্পর বলাবলি করে, ‘খুব ভাল সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি মুসলমানদেরকে তাদের এ নামাযের অবস্থায় একযোগে অকস্মাৎ আক্রমণ করতে পারতাম।' একথা শুনে অপর একজন বলে, ‘এ সুযোগ তো তোমরা আবার পাবে। ক্ষণেক পরেই তো তারা অপর একটি নামাযের (আসরের) জন্যে দাঁড়াবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আসরের নামাযের পূর্বেই এবং যোহরের পরে (আরবী) হতে পূর্ণ দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেন। ফলে কাফিররা বিফল মনোরথ হয়। এ বর্ণনাটি অত্যন্ত গারীব। বা দুর্বল হলেও ওকে দৃঢ়কারী অন্যান্য বর্ণনাও রয়েছে। হযরত আবু আইয়াশ (রাঃ) বলেন, 'আসফান' নামক স্থানে আমরা নবী করীম (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) সে সময় কুফরীর অবস্থায় ছিলেন এবং তিনি ছিলেন মুশরিক সেনাবাহিনীর সেনাপতি। মুশরিকরা আমাদের সামনে কিবলামুখী হয়ে অবস্থান করছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে আমরা যোহরের নামায আদায় করি। মুশরিকরা তখন পরস্পর বলাবলি করেঃ ‘আমরা তো সুযোগ ছেড়ে দিলাম। সময় এমন ছিল যে, তারা নামাযে লিপ্ত ছিল, এ অবস্থায় আমরা তাদেরকে অতর্কিতভাবে আক্রমণ করতাম। তখন তাদের কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি বললো, 'ভাল, কোন অসুবিধে নেই। এরপরে আর একটা নামাযের সময় আসছে এবং সে সময় নামায তাদের নিকট তাদের পুত্র ও স্বীয় প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়। অতঃপর যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলার হুকুমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) (আরবী) আয়াতটি নিয়ে অবতীর্ণ হন। ফলে আসরের নামাযের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে অস্ত্র গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। আমরা তখন অস্ত্র গ্রহণ করতঃ তাঁর পিছনে দু'টি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে যাই। অতঃপর তিনি রুকু করলে আমরা সবাই রুকূ করি। তারপর নবী (সঃ) সিজদা করেন, তাঁর সঙ্গে তাঁর পিছনের প্রথম সারির লোকেরাও সিজদা করে এবং অন্য সারির লোকেরা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে। তারপর যখন এ লোকগুলো সিজদাকার্য সমাপ্ত করে দাঁড়িয়ে যায় তখন দ্বিতীয় সারির লোকগুলো সিজদায় চলে যায়। যখন এ দু'টি সারির লোকেরই সিজদা করা হয়ে যায় তখন প্রথম সারির লোকগুলো দ্বিতীয় সারির লোকদের স্থানে চলে যায়, আর দ্বিতীয় সারির লোকেরা প্রথম সারির লোকদের স্থানে চলে আসে। এরপর কিয়াম, রুকু' এবং কাওমা সবই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গেই আদায় করে। তারপর যখন তিনি সিজদায় যান তখন প্রথম সারির লোকেরা তার সাথে সিজদা করে এবং দ্বিতীয় সারির লোকেরা দাড়িয়ে পাহারা দিতে থাকে। যখন প্রথম সারির লোকেরা সিজদা সেরে আত্তাহিয়্যাতে বসে পড়ে তখন দ্বিতীয় সারির লোকগুলো সিজদায় যায় এবং আত্তাহিয়াতে সবাই এক সঙ্গে হয়ে যায় এবং সালামও সকলেই নবী (সঃ)-এর সঙ্গে এক সাথেই ফিরায়। ‘সালাতুল খাওফ’ (ভয়ের নামায) রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার প্রথমে এ আসফান' নামক স্থানে পড়েন এবং দ্বিতীয়বার বানূ সালিমের ভূমিতে পড়েন। এ হাদীসটি মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে। এর ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং এর শাহেদও অনেক রয়েছে।সহীহ বুখারীর মধ্যেও এ বর্ণনাটি সংক্ষিপ্তভাবে রয়েছে এবং তাতে আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবী (সঃ) নামাযে দাঁড়িয়ে গেলে ললাকেরাও তার সাথে দাড়িয়ে যায়। তিনি তাকবীর বললে তারাও তাকবীর বলে। তিনি রুকু' করলে লোকেরাও তাঁর সাথে রুকু করে। অতঃপর তিনি সিজদা করলে তারাও তাঁর সাথে সিজদা করে। তারপর তিনি দ্বিতীয় রাকআতের জন্যে দাড়িয়ে যান। তার সাথে তারাও দাড়িয়ে যান যারা তার সাথে। সিজদা করেছিল এবং তারপরে তারা তাদের ভাইদেরকে পাহারা দিতে থাকে। অতঃপর দ্বিতীয় দল চলে আসে তারা তার সাথে রুকু ও সিজদা করে। লোকেরা সবাই নামাযের মধ্যেই ছিল বটে, কিন্তু একে অপরকে পাহারাও দিচ্ছিল।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত সুলাইমান ইবনে কায়েস ইয়াসকারী (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ নামায কসর করার হুকুম কখন অবতীর্ণ হয়েছে?' তখন তিনি বলেন, ‘কুরাইশদের একটি যাত্রী দল সিরিয়া হতে আসছিল। আমরা তাদের দিকে গমন করি। আমরা নাখল নামক স্থানে পৌঁছলে একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং তাঁকে বলে, “হে মুহাম্মাদ ! আপনি কি আমাকে ভয় করেন না?' তিনি বলেনঃ না।' সে বলেঃ আপনাকে আমা হতে কে বাঁচাতে পারে?' তিনি বলেনঃ “আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে নেবেন। অতঃপর তিনি তরবারী বের করে তাকে ধমক দেন ও ভয় প্রদর্শন করেন। তারপর তিনি তথা হতে প্রস্থানের নির্দেশ দেন এবং অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চলতে আরম্ভ করেন। অতঃপর আযান দেয়া হয় এবং সাহাবীগণ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। একদল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায আদায় করছিলেন এবং অন্য দল পাহারা দিচ্ছিলেন। যে দলটি তাঁর সাথে মিলিত ছিলেন তাঁরা তাঁর সাথে দু’রাকআত পড়ে নেন। অতঃপর পিছনে সরে গিয়ে অন্য দলটির স্থানে চলে যান। এবং ঐদলটি তখন সম্মুখে অগ্রসর হয়ে প্রথম দলটির স্থানে দাঁড়িয়ে যান। তাদেরকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু'রাকআত পড়িয়ে দেন এবং সালাম ফেরান। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চার রাকআত হয় এবং ঐ দু’দলের-দু'রাকআত করে হয়, আর আল্লাহ তা'আলা নামায সংক্ষেপ করার ও অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে রাখার হুকুম নাযিল করেন।'মুসনাদ-ই-আহমাদের এ হাদীসেই রয়েছে যে, যে লোকটি তরবারী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আক্রমণে উদ্যত হয়েছিল সে শত্রুগোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তার নাম ছিল গারাস ইবনে হারিস। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নাম উচ্চারণ করেন তখন তার হাত হতে তরবারী পড়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সে তরবারী উঠিয়ে নেন। অতঃপর তাকে বলেনঃ এখন তোমাকে কে রক্ষা করবে?' সে তখন ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, আপনি আমার প্রতি সদয় হোন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল?' সে বলেঃ না, তবে আমি এটা স্বীকার করছি যে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবো না এবং যারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তাদেরও সহযোগিতা করবো না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ছেড়ে দেন। সে নিজের লোকদের নিকট গিয়ে বলে, আমি দুনিয়ার সর্বোত্তম লোকের নিকট হতে তোমাদের নিকট এসেছি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে। যে, ইয়াযীদ আল ফাকীর (রঃ) হযরত জাবীর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সফরে যে দু'রাকআত নামায রয়েছে ওটা কি ‘কসর’? তিনি উত্তরে বলেনঃ ওটা পূর্ণ নামায। কসর' তো জিহাদের সময় মাত্র এক রাকআত।' অতঃপর তিনি এভাবেই ‘সলাতুল খাওফ’-এরও বর্ণনা দেন। তাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সালামের সাথে পিছনের লোকগুলোও সালাম ফেরান, আর ঐ লোকগুলোও সালাম ফেরান। তাতে উভয় অংশের সৈন্যদের সাথে এক রাকআত করে নামায পড়ার বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং সকলেরই এক রাকআত করে হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দু'রাকআত হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে কাতারবন্দী হয়ে নামায পড়ছিলেন এবং অন্য দল শক্রর সম্মুখে ছিলেন। এক রাকআতের পর তার পিছনের লোকগুলো ঐ দলের স্থানে চলে যান এবং তাঁরা এখানে চলে আসেন। এ হাদীসটি বহু পুস্তকে বহু সনদসহ হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে। আর যে হাদীসটি হযরত সালিম (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন তাতে এও রয়েছে যে, পরে সাহাবীগণ দাড়িয়ে নিজে নিজে এক রাকআত করে আদায় করে নেন। ঐ হাদীসটিরও বহু সনদ ও বহু শব্দ রয়েছে। হাফিয আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এ সমস্তই জমা করেছেন এবং ঐ রকমই ইবনে জারীরও (রঃ) জমা করেছেন। এটা আমরা ইনশাআল্লাহ কিতাবুল আহকামিল কাবীরে লিখবো।কারও কারও মতে ভয়ের নামাযে অস্ত্র সঙ্গে রাখার নির্দেশ বাধ্যতামূলক। কেননা, আয়াতের প্রকাশ্য শব্দগুলো দ্বারা এটাই বুঝা যায়। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) এটাই উক্তি। এ আয়াতেরই পরবর্তী বাক্য এ উক্তির অনুকূলে রয়েছে। তথায় বলা হয়েছে-“যদি তোমরা বৃষ্টিপাতে বিব্রত হয়ে অথবা পীড়িত অবস্থায় অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ কর তবে এতে তোমাদের কোন অপরাধ নেই।'তারপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা স্বীয় আত্মরক্ষিকা সঙ্গে গ্রহণ কর।' অর্থাৎ এমন প্রস্তুত থাক যে, সময় আসলেই যেন বিনা কষ্ট ও অসুবিধেতেই অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হতে পার। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।
আন-নিসা 4:103
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে নির্দেশ দিচ্ছেন-‘সলাতুল খাওফ' বা ভয়ের সময়ের নামাযের পর তোমরা খুব বেশী করে আল্লাহ তা'আলা যিকির করবে, যদিও তাঁর যিকিরের নির্দেশ এবং ওর গুরুত্ব অন্য নামাযের পরেও এমন কি সব সময়ের জন্যেই রয়েছে। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে এজন্যেই বর্ণনা করেছেন যে, এখানে তিনি বান্দাহকে খুব বড় অবকাশ দান করেছেন। তিনি নামায হালকা করে দিয়েছেন। তাছাড়া নামাযের অবস্থায় এদিক ওদিকে সরে যাওয়া এবং যাতায়াত করা উপযোগীতা অনুযায়ী বৈধ করেছেন। যেমন তিনি মর্যাদাসম্পন্ন। মাসগুলো সম্পর্কে বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা ঐ গুলোর ব্যাপারে তোমাদের নাফসের উপর অত্যাচার করো না।' (৯:৩৬) যদিও অন্যান্য মাসেও অত্যাচার নিষিদ্ধ তথাপি এ পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে ওর থেকে বিরত থাকার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই এখানে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, সব সময়ই আল্লাহ তাআলার যিকির করতে থাক এবং যখন শান্তি এসে যাবে, কোন ভয় ও সন্ত্রাস থাকবে না তখন। নিয়মিতভাবে বিনয়ের সাথে নামাযের রুকনগুলো শরীয়ত মুতাবিক আদায় কর। এ নামায তোমাদের উপর নির্ধারিত সময়েই ফরযে আইন করে দেয়া হয়েছে। হজ্বের সময় যেমন নির্ধারিত রয়েছে, তদ্রপ নামাযের সময়ও নির্ধারিত রয়েছে। প্রথম সময়ের পরে দ্বিতীয় সময় এবং দ্বিতীয় সময়ের পরে তৃতীয় সময়।
আন-নিসা 4:104
এরপর বলা হয়েছে যে, তোমরা শত্রুদের অনুসন্ধানের ব্যাপারে ভীরুতা প্রদর্শন করো না। চাতুরীর সাথে গোপনীয় জায়গায় বসে থেকে তাদের খবরাখরব নিতে থাকো। তোমরা যদি নিহত বা আহত হও অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাক তবে তোমাদের শত্রুগণও তো এরূপ হয়ে থাকে। এ বিষয়টিকেই নিম্নের শব্দগুলোর দ্বারাও বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমাদেরকে যদি কষ্ট পৌছে থাকে তবে ঐরূপ কষ্ট তো ঐ সম্প্রদায়কেও স্পর্শ করেছিল।' (৩:১৪০) তাহলে বিপদ ও কষ্টে পতিত হওয়ার ব্যাপারে তোমরা ও কাফিরেরা সমান। তবে হ্যাঁ, তোমাদের এবং ওদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য এই যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমরা ঐসব আশা করে থাকো যেসব আশা তারা করে না। তোমরা এর পুণ্য ও প্রতিদানও পাবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সাহায্যও করা হবে। যেমন স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই এর অঙ্গীকার করেছেন। তার অঙ্গীকার টলতে পারে না। কাজেই এ ব্যাপারে তাদের তুলনায় তোমাদের মধ্যেই তো বেশী কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্যোগ থাকা উচিত। তোমাদের অন্তরেই খুব বেশী জিহাদের উদ্যম থাকা দরকার। পূর্ণ উদ্দীপনার সাথে তোমাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তা'আলার কালেমাকে প্রতিষ্ঠিত, ছড়ানো এবং সুউচ্চ করার ব্যাপারে তোমাদের অন্তরে সদা-সর্বদা শিহরণ ও উত্তেজনা জেগে উঠা উচিত। আল্লাহ তা'আলা যা কিছু ভাগ্যে লিখে দেন, যা কিছু ফায়সালা করেন, যত কিছু চালু করেন, যে শরীয়ত তিনি নির্ধারণ করেন এবং যে কাজই করেন সব কিছুর ব্যাপারেই তিনি মহাজ্ঞানী ও চরম বিজ্ঞানময়। সর্বাবস্থাতেই তিনি মহা প্রশংসিত।
আন-নিসা 4:105
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আন-নিসা 4:106
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আন-নিসা 4:107
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আন-নিসা 4:108
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আন-নিসা 4:109
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আন-নিসা 4:110
১১০-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, কেউ কোন পাপকার্য সম্পাদনের পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা দয়া করে তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। যে ব্যক্তি পাপ করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, আল্লাহ পাক তাকে স্বীয় অনুগ্রহ ও সীমাহীন করুণা দ্বারা ঢেকে নেন এবং তার ছোট ও বড় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। যদিও সে পাপ আকাশ, যমীন ও পর্বত থেকেও বড় হয়। বানী ইসরাঈলের মধ্য যখন কেউ কোন পাপ করতো তখন তার দরজার উপর কুদরতী অক্ষরে ওর কাফফারা লিখা হয়ে যেতো। সে কাফফারা তাকে আদায় করতে হতো। তাদের কাপড়ে প্রস্রাব লেগে গেলে তাদের উপর ঐ পরিমাণ কাপড় কেটে নেয়ার নির্দেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর এ সহজ ব্যবস্থা রেখেছেন যে, ঐ কাপড় পানি দ্বারা ধৌত করলেই পবিত্র হয়ে যাবে এবং পাপের জন্য তাওবা করলেই তা মাফ হয়ে যাবে।একটি স্ত্রীলোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফালকে একটি স্ত্রীলোক সম্বন্ধে ফওয়া জিজ্ঞেস করে যে ব্যভিচার করেছিল এবং এর ফলে একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছিল, তাকে সে হত্যা করে ফেলেছে। হযরত মুগাফফাল (রাঃ) তখন বলেন যে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। তখন স্ত্রীলোকটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে। যায়। হযরত মুগাফফাল তখন তাকে ডেকে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। অর্থাৎ যে কেউ দুষ্কর্ম করে অথবা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করার পর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় প্রাপ্ত হবে। তখন স্ত্রীলোকটি চোখের অশ্রু মুছে ফেলে এবং তথা হতে ফিরে যায়।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করার পর অযু করে দু'রাকআত নামায আদায় করতঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবী) (৩:১৩৫)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আমরা মুসনাদ-ই-আবু বকর’-এ এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি এবং কিছু বর্ণনা সূরা আলে ইমরানের তাফসীরে দেয়া হয়েছে। হযরত আবু দারদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি মাঝে মাঝে মজলিস হতে উঠে নিজের কোন কাজের জন্য যেতেন এবং ফিরে আসার ইচ্ছে থাকলে জুতা বা কাপড় কিছু না কিছু অবশ্যই ছেড়ে যেতেন।একদা তিনি স্বীয় জুতা রেখে এক বরতন পানি নিয়ে গমন করেন। আমিও তার পিছনে চলতে থাকি। কিছু দূর গিয়ে তিনি হাজত পুরো না করেই ফিরে আসেন এবং বলেনঃ ‘আমার প্রভুর পক্ষ হতে আমার নিকট একজন আগন্তুক এসেছিলেন এবং তিনি আমাকে এ পয়গাম দিয়ে গেলেন যে, (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন দুষ্কার্য করে বা স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচার করে অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় রূপে প্রাপ্ত হবে। আমি আমার সাহাবীগণকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্যে রাস্তা হতেই ফিরে আসছি।' কেননা এর পূর্বে (আরবী) অর্থাৎ যে খারাপ কাজ করবে তাকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।'(৪:১২৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ফলে ওটা সাহাবীগণের নিকট খুব কঠিন বলে মনে হয়েছিল। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে তবুও কি আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন? তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আমি দ্বিতীয়বার এ কথাই বলি। তিনি বলেনঃ হ্যা। তৃতীয়বারও ঐ কথাই আমি বলি। তখন তিনি বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবুও আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন। যদিও আবুদ্দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। এরপর যখনই হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখনই স্বীয় নাকের উপর হাত মেরে বলতেন। হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল এবং এটা গারীবও বটে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে কেউ পাপ অর্জন করে সে নিজের উপরই এর প্রতিক্রিয়া পৌছিয়ে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।” (৬:১৬৫) অর্থাৎ একে অপরের কোন উপকার করতে পারবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তার কর্মের ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না। এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনি মহাজ্ঞানী; বিজ্ঞানময়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর নিপুণতা, তার ন্যায়নীতি এবং তাঁর করুণা এর উল্টো যে, একের পাপের কারণে তিনি অপরকে ধরবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর নিরপরাধের প্রতি দোষারোপ করে, সে নিজেই সেই অপরাধ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। যেমন বানূ উবাইরিক হযরত লাবিদ ইবনে সহল (রাঃ)-এর নাম করেছিল- যে ঘটনাটি এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা এর দ্বারা যায়েদ ইবনে সামীনকে বুঝানো হয়েছে, যেমন এটা কোন কোন মুফাস্সীরের ধারণা যে, ঐ ইয়াহুদীর গোত্র একজন নিরপরাধ ব্যক্তির উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ স্বয়ং তাদের লোকই ছিল বিশ্বাসঘাতক ও অত্যাচারী। আয়াতটি শান-ই-নকূল হিসেবে বিশিষ্ট হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সাধারণ, যে কেউই এ কাজ করবে সেই আল্লাহ তা'আলার শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। এর পরবর্তী (আরবী)-এ আয়াতের সম্পর্কও এ ঘটনার সঙ্গেই রয়েছে। অর্থাৎ উসাইদ ইবনে উরওয়া এবং তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বানু উবাইরিকের চোরকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রকৃত রহস্য হতে সরিয়ে দেয়ার সমস্ত কার্যপ্রণালীই শেষ করে ফেলেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ হচ্ছেন তাঁর প্রকৃত রক্ষক। তাই তিনি স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে এ বিপজ্জনক অবস্থায় বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষপাতি করার দোষ হতে বাঁচিয়ে নেন এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দেন। এখানে ‘কিতাব’ শব্দ দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) শব্দ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। অহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা জানতেন না, আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে তাঁকে তা জানিয়ে দেন। তাই তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাকে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যা তুমি জানতে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (৪২:৫২) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (২৮:৮৬) এজন্যে এখানেও বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ তোমার প্রতি আল্লাহর অসীম করুণা রয়েছে।
আন-নিসা 4:111
১১০-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, কেউ কোন পাপকার্য সম্পাদনের পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা দয়া করে তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। যে ব্যক্তি পাপ করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, আল্লাহ পাক তাকে স্বীয় অনুগ্রহ ও সীমাহীন করুণা দ্বারা ঢেকে নেন এবং তার ছোট ও বড় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। যদিও সে পাপ আকাশ, যমীন ও পর্বত থেকেও বড় হয়। বানী ইসরাঈলের মধ্য যখন কেউ কোন পাপ করতো তখন তার দরজার উপর কুদরতী অক্ষরে ওর কাফফারা লিখা হয়ে যেতো। সে কাফফারা তাকে আদায় করতে হতো। তাদের কাপড়ে প্রস্রাব লেগে গেলে তাদের উপর ঐ পরিমাণ কাপড় কেটে নেয়ার নির্দেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর এ সহজ ব্যবস্থা রেখেছেন যে, ঐ কাপড় পানি দ্বারা ধৌত করলেই পবিত্র হয়ে যাবে এবং পাপের জন্য তাওবা করলেই তা মাফ হয়ে যাবে।একটি স্ত্রীলোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফালকে একটি স্ত্রীলোক সম্বন্ধে ফওয়া জিজ্ঞেস করে যে ব্যভিচার করেছিল এবং এর ফলে একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছিল, তাকে সে হত্যা করে ফেলেছে। হযরত মুগাফফাল (রাঃ) তখন বলেন যে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। তখন স্ত্রীলোকটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে। যায়। হযরত মুগাফফাল তখন তাকে ডেকে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। অর্থাৎ যে কেউ দুষ্কর্ম করে অথবা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করার পর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় প্রাপ্ত হবে। তখন স্ত্রীলোকটি চোখের অশ্রু মুছে ফেলে এবং তথা হতে ফিরে যায়।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করার পর অযু করে দু'রাকআত নামায আদায় করতঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবী) (৩:১৩৫)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আমরা মুসনাদ-ই-আবু বকর’-এ এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি এবং কিছু বর্ণনা সূরা আলে ইমরানের তাফসীরে দেয়া হয়েছে। হযরত আবু দারদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি মাঝে মাঝে মজলিস হতে উঠে নিজের কোন কাজের জন্য যেতেন এবং ফিরে আসার ইচ্ছে থাকলে জুতা বা কাপড় কিছু না কিছু অবশ্যই ছেড়ে যেতেন।একদা তিনি স্বীয় জুতা রেখে এক বরতন পানি নিয়ে গমন করেন। আমিও তার পিছনে চলতে থাকি। কিছু দূর গিয়ে তিনি হাজত পুরো না করেই ফিরে আসেন এবং বলেনঃ ‘আমার প্রভুর পক্ষ হতে আমার নিকট একজন আগন্তুক এসেছিলেন এবং তিনি আমাকে এ পয়গাম দিয়ে গেলেন যে, (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন দুষ্কার্য করে বা স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচার করে অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় রূপে প্রাপ্ত হবে। আমি আমার সাহাবীগণকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্যে রাস্তা হতেই ফিরে আসছি।' কেননা এর পূর্বে (আরবী) অর্থাৎ যে খারাপ কাজ করবে তাকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।'(৪:১২৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ফলে ওটা সাহাবীগণের নিকট খুব কঠিন বলে মনে হয়েছিল। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে তবুও কি আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন? তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আমি দ্বিতীয়বার এ কথাই বলি। তিনি বলেনঃ হ্যা। তৃতীয়বারও ঐ কথাই আমি বলি। তখন তিনি বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবুও আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন। যদিও আবুদ্দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। এরপর যখনই হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখনই স্বীয় নাকের উপর হাত মেরে বলতেন। হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল এবং এটা গারীবও বটে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে কেউ পাপ অর্জন করে সে নিজের উপরই এর প্রতিক্রিয়া পৌছিয়ে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।” (৬:১৬৫) অর্থাৎ একে অপরের কোন উপকার করতে পারবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তার কর্মের ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না। এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনি মহাজ্ঞানী; বিজ্ঞানময়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর নিপুণতা, তার ন্যায়নীতি এবং তাঁর করুণা এর উল্টো যে, একের পাপের কারণে তিনি অপরকে ধরবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর নিরপরাধের প্রতি দোষারোপ করে, সে নিজেই সেই অপরাধ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। যেমন বানূ উবাইরিক হযরত লাবিদ ইবনে সহল (রাঃ)-এর নাম করেছিল- যে ঘটনাটি এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা এর দ্বারা যায়েদ ইবনে সামীনকে বুঝানো হয়েছে, যেমন এটা কোন কোন মুফাস্সীরের ধারণা যে, ঐ ইয়াহুদীর গোত্র একজন নিরপরাধ ব্যক্তির উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ স্বয়ং তাদের লোকই ছিল বিশ্বাসঘাতক ও অত্যাচারী। আয়াতটি শান-ই-নকূল হিসেবে বিশিষ্ট হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সাধারণ, যে কেউই এ কাজ করবে সেই আল্লাহ তা'আলার শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। এর পরবর্তী (আরবী)-এ আয়াতের সম্পর্কও এ ঘটনার সঙ্গেই রয়েছে। অর্থাৎ উসাইদ ইবনে উরওয়া এবং তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বানু উবাইরিকের চোরকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রকৃত রহস্য হতে সরিয়ে দেয়ার সমস্ত কার্যপ্রণালীই শেষ করে ফেলেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ হচ্ছেন তাঁর প্রকৃত রক্ষক। তাই তিনি স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে এ বিপজ্জনক অবস্থায় বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষপাতি করার দোষ হতে বাঁচিয়ে নেন এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দেন। এখানে ‘কিতাব’ শব্দ দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) শব্দ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। অহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা জানতেন না, আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে তাঁকে তা জানিয়ে দেন। তাই তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাকে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যা তুমি জানতে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (৪২:৫২) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (২৮:৮৬) এজন্যে এখানেও বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ তোমার প্রতি আল্লাহর অসীম করুণা রয়েছে।
আন-নিসা 4:112
১১০-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, কেউ কোন পাপকার্য সম্পাদনের পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা দয়া করে তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। যে ব্যক্তি পাপ করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, আল্লাহ পাক তাকে স্বীয় অনুগ্রহ ও সীমাহীন করুণা দ্বারা ঢেকে নেন এবং তার ছোট ও বড় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। যদিও সে পাপ আকাশ, যমীন ও পর্বত থেকেও বড় হয়। বানী ইসরাঈলের মধ্য যখন কেউ কোন পাপ করতো তখন তার দরজার উপর কুদরতী অক্ষরে ওর কাফফারা লিখা হয়ে যেতো। সে কাফফারা তাকে আদায় করতে হতো। তাদের কাপড়ে প্রস্রাব লেগে গেলে তাদের উপর ঐ পরিমাণ কাপড় কেটে নেয়ার নির্দেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর এ সহজ ব্যবস্থা রেখেছেন যে, ঐ কাপড় পানি দ্বারা ধৌত করলেই পবিত্র হয়ে যাবে এবং পাপের জন্য তাওবা করলেই তা মাফ হয়ে যাবে।একটি স্ত্রীলোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফালকে একটি স্ত্রীলোক সম্বন্ধে ফওয়া জিজ্ঞেস করে যে ব্যভিচার করেছিল এবং এর ফলে একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছিল, তাকে সে হত্যা করে ফেলেছে। হযরত মুগাফফাল (রাঃ) তখন বলেন যে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। তখন স্ত্রীলোকটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে। যায়। হযরত মুগাফফাল তখন তাকে ডেকে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। অর্থাৎ যে কেউ দুষ্কর্ম করে অথবা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করার পর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় প্রাপ্ত হবে। তখন স্ত্রীলোকটি চোখের অশ্রু মুছে ফেলে এবং তথা হতে ফিরে যায়।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করার পর অযু করে দু'রাকআত নামায আদায় করতঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবী) (৩:১৩৫)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আমরা মুসনাদ-ই-আবু বকর’-এ এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি এবং কিছু বর্ণনা সূরা আলে ইমরানের তাফসীরে দেয়া হয়েছে। হযরত আবু দারদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি মাঝে মাঝে মজলিস হতে উঠে নিজের কোন কাজের জন্য যেতেন এবং ফিরে আসার ইচ্ছে থাকলে জুতা বা কাপড় কিছু না কিছু অবশ্যই ছেড়ে যেতেন।একদা তিনি স্বীয় জুতা রেখে এক বরতন পানি নিয়ে গমন করেন। আমিও তার পিছনে চলতে থাকি। কিছু দূর গিয়ে তিনি হাজত পুরো না করেই ফিরে আসেন এবং বলেনঃ ‘আমার প্রভুর পক্ষ হতে আমার নিকট একজন আগন্তুক এসেছিলেন এবং তিনি আমাকে এ পয়গাম দিয়ে গেলেন যে, (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন দুষ্কার্য করে বা স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচার করে অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় রূপে প্রাপ্ত হবে। আমি আমার সাহাবীগণকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্যে রাস্তা হতেই ফিরে আসছি।' কেননা এর পূর্বে (আরবী) অর্থাৎ যে খারাপ কাজ করবে তাকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।'(৪:১২৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ফলে ওটা সাহাবীগণের নিকট খুব কঠিন বলে মনে হয়েছিল। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে তবুও কি আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন? তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আমি দ্বিতীয়বার এ কথাই বলি। তিনি বলেনঃ হ্যা। তৃতীয়বারও ঐ কথাই আমি বলি। তখন তিনি বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবুও আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন। যদিও আবুদ্দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। এরপর যখনই হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখনই স্বীয় নাকের উপর হাত মেরে বলতেন। হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল এবং এটা গারীবও বটে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে কেউ পাপ অর্জন করে সে নিজের উপরই এর প্রতিক্রিয়া পৌছিয়ে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।” (৬:১৬৫) অর্থাৎ একে অপরের কোন উপকার করতে পারবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তার কর্মের ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না। এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনি মহাজ্ঞানী; বিজ্ঞানময়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর নিপুণতা, তার ন্যায়নীতি এবং তাঁর করুণা এর উল্টো যে, একের পাপের কারণে তিনি অপরকে ধরবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর নিরপরাধের প্রতি দোষারোপ করে, সে নিজেই সেই অপরাধ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। যেমন বানূ উবাইরিক হযরত লাবিদ ইবনে সহল (রাঃ)-এর নাম করেছিল- যে ঘটনাটি এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা এর দ্বারা যায়েদ ইবনে সামীনকে বুঝানো হয়েছে, যেমন এটা কোন কোন মুফাস্সীরের ধারণা যে, ঐ ইয়াহুদীর গোত্র একজন নিরপরাধ ব্যক্তির উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ স্বয়ং তাদের লোকই ছিল বিশ্বাসঘাতক ও অত্যাচারী। আয়াতটি শান-ই-নকূল হিসেবে বিশিষ্ট হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সাধারণ, যে কেউই এ কাজ করবে সেই আল্লাহ তা'আলার শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। এর পরবর্তী (আরবী)-এ আয়াতের সম্পর্কও এ ঘটনার সঙ্গেই রয়েছে। অর্থাৎ উসাইদ ইবনে উরওয়া এবং তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বানু উবাইরিকের চোরকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রকৃত রহস্য হতে সরিয়ে দেয়ার সমস্ত কার্যপ্রণালীই শেষ করে ফেলেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ হচ্ছেন তাঁর প্রকৃত রক্ষক। তাই তিনি স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে এ বিপজ্জনক অবস্থায় বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষপাতি করার দোষ হতে বাঁচিয়ে নেন এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দেন। এখানে ‘কিতাব’ শব্দ দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) শব্দ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। অহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা জানতেন না, আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে তাঁকে তা জানিয়ে দেন। তাই তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাকে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যা তুমি জানতে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (৪২:৫২) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (২৮:৮৬) এজন্যে এখানেও বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ তোমার প্রতি আল্লাহর অসীম করুণা রয়েছে।
আন-নিসা 4:113
১১০-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, কেউ কোন পাপকার্য সম্পাদনের পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা দয়া করে তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হন। যে ব্যক্তি পাপ করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, আল্লাহ পাক তাকে স্বীয় অনুগ্রহ ও সীমাহীন করুণা দ্বারা ঢেকে নেন এবং তার ছোট ও বড় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। যদিও সে পাপ আকাশ, যমীন ও পর্বত থেকেও বড় হয়। বানী ইসরাঈলের মধ্য যখন কেউ কোন পাপ করতো তখন তার দরজার উপর কুদরতী অক্ষরে ওর কাফফারা লিখা হয়ে যেতো। সে কাফফারা তাকে আদায় করতে হতো। তাদের কাপড়ে প্রস্রাব লেগে গেলে তাদের উপর ঐ পরিমাণ কাপড় কেটে নেয়ার নির্দেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের উপর এ সহজ ব্যবস্থা রেখেছেন যে, ঐ কাপড় পানি দ্বারা ধৌত করলেই পবিত্র হয়ে যাবে এবং পাপের জন্য তাওবা করলেই তা মাফ হয়ে যাবে।একটি স্ত্রীলোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফালকে একটি স্ত্রীলোক সম্বন্ধে ফওয়া জিজ্ঞেস করে যে ব্যভিচার করেছিল এবং এর ফলে একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছিল, তাকে সে হত্যা করে ফেলেছে। হযরত মুগাফফাল (রাঃ) তখন বলেন যে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। তখন স্ত্রীলোকটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে। যায়। হযরত মুগাফফাল তখন তাকে ডেকে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। অর্থাৎ যে কেউ দুষ্কর্ম করে অথবা স্বীয় জীবনের প্রতি অত্যাচার করার পর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় প্রাপ্ত হবে। তখন স্ত্রীলোকটি চোখের অশ্রু মুছে ফেলে এবং তথা হতে ফিরে যায়।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করার পর অযু করে দু'রাকআত নামায আদায় করতঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবী) (৩:১৩৫)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আমরা মুসনাদ-ই-আবু বকর’-এ এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি এবং কিছু বর্ণনা সূরা আলে ইমরানের তাফসীরে দেয়া হয়েছে। হযরত আবু দারদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি মাঝে মাঝে মজলিস হতে উঠে নিজের কোন কাজের জন্য যেতেন এবং ফিরে আসার ইচ্ছে থাকলে জুতা বা কাপড় কিছু না কিছু অবশ্যই ছেড়ে যেতেন।একদা তিনি স্বীয় জুতা রেখে এক বরতন পানি নিয়ে গমন করেন। আমিও তার পিছনে চলতে থাকি। কিছু দূর গিয়ে তিনি হাজত পুরো না করেই ফিরে আসেন এবং বলেনঃ ‘আমার প্রভুর পক্ষ হতে আমার নিকট একজন আগন্তুক এসেছিলেন এবং তিনি আমাকে এ পয়গাম দিয়ে গেলেন যে, (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন দুষ্কার্য করে বা স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচার করে অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় রূপে প্রাপ্ত হবে। আমি আমার সাহাবীগণকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্যে রাস্তা হতেই ফিরে আসছি।' কেননা এর পূর্বে (আরবী) অর্থাৎ যে খারাপ কাজ করবে তাকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।'(৪:১২৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ফলে ওটা সাহাবীগণের নিকট খুব কঠিন বলে মনে হয়েছিল। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে, অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে তবুও কি আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন? তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আমি দ্বিতীয়বার এ কথাই বলি। তিনি বলেনঃ হ্যা। তৃতীয়বারও ঐ কথাই আমি বলি। তখন তিনি বলেনঃ যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবুও আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন। যদিও আবুদ্দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। এরপর যখনই হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখনই স্বীয় নাকের উপর হাত মেরে বলতেন। হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল এবং এটা গারীবও বটে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- যে কেউ পাপ অর্জন করে সে নিজের উপরই এর প্রতিক্রিয়া পৌছিয়ে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।” (৬:১৬৫) অর্থাৎ একে অপরের কোন উপকার করতে পারবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তার কর্মের ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না। এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনি মহাজ্ঞানী; বিজ্ঞানময়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর নিপুণতা, তার ন্যায়নীতি এবং তাঁর করুণা এর উল্টো যে, একের পাপের কারণে তিনি অপরকে ধরবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন- যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর নিরপরাধের প্রতি দোষারোপ করে, সে নিজেই সেই অপরাধ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। যেমন বানূ উবাইরিক হযরত লাবিদ ইবনে সহল (রাঃ)-এর নাম করেছিল- যে ঘটনাটি এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা এর দ্বারা যায়েদ ইবনে সামীনকে বুঝানো হয়েছে, যেমন এটা কোন কোন মুফাস্সীরের ধারণা যে, ঐ ইয়াহুদীর গোত্র একজন নিরপরাধ ব্যক্তির উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ স্বয়ং তাদের লোকই ছিল বিশ্বাসঘাতক ও অত্যাচারী। আয়াতটি শান-ই-নকূল হিসেবে বিশিষ্ট হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সাধারণ, যে কেউই এ কাজ করবে সেই আল্লাহ তা'আলার শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। এর পরবর্তী (আরবী)-এ আয়াতের সম্পর্কও এ ঘটনার সঙ্গেই রয়েছে। অর্থাৎ উসাইদ ইবনে উরওয়া এবং তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বানু উবাইরিকের চোরকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রকৃত রহস্য হতে সরিয়ে দেয়ার সমস্ত কার্যপ্রণালীই শেষ করে ফেলেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ হচ্ছেন তাঁর প্রকৃত রক্ষক। তাই তিনি স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে এ বিপজ্জনক অবস্থায় বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষপাতি করার দোষ হতে বাঁচিয়ে নেন এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দেন। এখানে ‘কিতাব’ শব্দ দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) শব্দ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। অহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা জানতেন না, আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে তাঁকে তা জানিয়ে দেন। তাই তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাকে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যা তুমি জানতে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (৪২:৫২) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (২৮:৮৬) এজন্যে এখানেও বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ তোমার প্রতি আল্লাহর অসীম করুণা রয়েছে।
আন-নিসা 4:114
১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: জনগণের অধিকাংশ কথাই অমঙ্গলজনক হয়। তবে কতক লোক এমনও আছে যে, তারা মানুষকে দান খয়রাত করার, সকার্য সাধনের এবং পরস্পর মিলেমিশে থাকার উৎসাহ দিয়ে থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে হুনায়েশ (রঃ) বলেন, হযরত সুফইয়ান সাওয়ারী (রঃ) রোগ শয্যায় শায়িত হলে আমরা তাকে দেখতে যাই। আমাদের সঙ্গে হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সানও (রঃ) ছিলেন। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত সাঈদ (রঃ)-কে বলেন, “হে সাঈদ (রাঃ)! আপনি উম্মে সালেহ হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন তা আজকে আবার বর্ণনা করুন। হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সান (রঃ) বর্ণনা করতঃ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের সমস্ত কথাই তার জন্যে অমঙ্গল আনয়ন করে, তবে যদি সে আল্লাহর, যিকির, মানুষকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে (তবে সেটা মঙ্গলজনক)'। তখন হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এ বিষয়টিই (আরবী) -এ আয়াতে রয়েছে। (আরবী) -( ৭৮:৩৮) -এ আয়াতেও রয়েছে এবং (আরবী) (১০৩:১-২) -এ আয়াতেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ ‘জনগণের মধ্যে মিলজুল এবং সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ভাল কথা বলে বা এদিক হতে ওদিকে এ প্রকারের আলাপ আলোচনা করে সে মিথ্যাবাদী নয়।' হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) বলেন, তিন জায়গায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এরূপ কথা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি। (১) যুদ্ধে, (২) জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং (৩) স্বামীর এরূপ কথা বলা স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর এরূপ কথা বলা স্বামীকে। উম্মে কুলসুমের (রাঃ) রিওয়ায়েতে রাসূল (সঃ) হিজরাতকারীগণ এবং বাইআত গ্রহণকারীগণকে বলেন :আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের কথা বলে দেবনা যা নামায এবং রোযা অপেক্ষাও উত্তম? সাহাবীগণ বলেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বলুন। তখন তিনি বলেন :‘জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করা এবং তাদের পরস্পরের বিবাদ মিটিয়ে দেয়া।' (সুনান-ই-আবি দাউদ ইত্যাদি)। মুসনাদ-ই-বায়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু আইউব (রাঃ)-কে বলেনঃ এসো, আমি তোমাকে একটি ব্যবসায়ের কথা বলে দেই। লোকেরা যখন বিবাদে লিপ্ত হয় তখন তুমি তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও, যখন একজন অপরজন হতে সরে থাকে তখন তুমি তাদেরকে একত্রিত করে দাও।'আল্লাহ তা'আলার বলেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রসন্নতা সন্ধানের জন্যে ঐরূপ করে, আমি তাকে মহান বিনিময় প্রদান করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শরীয়তের বিপরীত পথে চলে, শরীয়ত হয় এক দিকে এবং তার পথ হয় অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক দিকে চলার নির্দেশ দেন এবং সে অন্যদিকে চলে, অথচ সত্য তার নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, সে দলীল প্রমাণাদি দেখেছে। তথাপি সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ মুসলমানদের সরল ও পরিষ্কার পথ হতে সরে পড়েছে, সুতরাং আমিও তাকে ঐ বক্র ও খারাপ পথেই ফিরিয়ে দেব। ঐ খারাপ পথই তখন তার নিকট ভাল বলে মনে হবে, অতঃপর সে জাহান্নামে গিয়ে পৌছে যাবে।মুসলমানদের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য পথ অনুসন্ধান করাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করা। কিন্তু কখনও হয় তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্পষ্ট কথারই উল্টো হয়, আবার কখনও কখনও ঐ জিনিসের বিপরীত হয় যার উপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত সবাই একমত রয়েছে। তাদের দ্রতা ও নম্রতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভুল হতে রক্ষা করেছেন। এ ব্যাপারে বহু হাদীসও রয়েছে এবং উসূলের হাদীসগুলোতে আমরা ওর বিরাট অংশ বর্ণনাও করেছি। ইমাম শাফিঈ (রঃ) চিন্তা ও গবেষণার পর এ আয়াত হতেই উম্মতের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই এ ব্যাপারে উত্তম ও দৃঢ়তার জিনিস। তবে অন্য কয়েকজন ইমাম এ যুক্তিকে কঠিন ও আয়াত হতে দূরে বলেছেন। মোটকথা যারা মুমিনদের পথ হতে সরে পড়ে তাদের রজ্জুকে আল্লাহ তা'আলা ঢিল দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি আমাকে ও যে এ কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাকে ছেড়ে দাও, সত্বরই আমি এমনভাবে ধরবো যে, সে জানতেই পারবে না।' (৬৮:৪৪) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা বাঁকা হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। (৬১:৫) আর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তাদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণে ছেড়ে দিচ্ছি, তন্মধ্যে তারা অন্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নামই হবে। (৬:১১০) যেমন এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে এবং তাদের দোসরদেরকে।” (৩৭:২২) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আগুন দেখে অত্যাচারীরা জেনে নেবে যে, তাদেরকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে এবং তারা পলায়নের কোন স্থান পাবে না।' (১৮:৫৩)।
আন-নিসা 4:115
১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: জনগণের অধিকাংশ কথাই অমঙ্গলজনক হয়। তবে কতক লোক এমনও আছে যে, তারা মানুষকে দান খয়রাত করার, সকার্য সাধনের এবং পরস্পর মিলেমিশে থাকার উৎসাহ দিয়ে থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে হুনায়েশ (রঃ) বলেন, হযরত সুফইয়ান সাওয়ারী (রঃ) রোগ শয্যায় শায়িত হলে আমরা তাকে দেখতে যাই। আমাদের সঙ্গে হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সানও (রঃ) ছিলেন। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত সাঈদ (রঃ)-কে বলেন, “হে সাঈদ (রাঃ)! আপনি উম্মে সালেহ হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন তা আজকে আবার বর্ণনা করুন। হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সান (রঃ) বর্ণনা করতঃ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের সমস্ত কথাই তার জন্যে অমঙ্গল আনয়ন করে, তবে যদি সে আল্লাহর, যিকির, মানুষকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে (তবে সেটা মঙ্গলজনক)'। তখন হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এ বিষয়টিই (আরবী) -এ আয়াতে রয়েছে। (আরবী) -( ৭৮:৩৮) -এ আয়াতেও রয়েছে এবং (আরবী) (১০৩:১-২) -এ আয়াতেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ ‘জনগণের মধ্যে মিলজুল এবং সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ভাল কথা বলে বা এদিক হতে ওদিকে এ প্রকারের আলাপ আলোচনা করে সে মিথ্যাবাদী নয়।' হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) বলেন, তিন জায়গায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এরূপ কথা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি। (১) যুদ্ধে, (২) জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং (৩) স্বামীর এরূপ কথা বলা স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর এরূপ কথা বলা স্বামীকে। উম্মে কুলসুমের (রাঃ) রিওয়ায়েতে রাসূল (সঃ) হিজরাতকারীগণ এবং বাইআত গ্রহণকারীগণকে বলেন :আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের কথা বলে দেবনা যা নামায এবং রোযা অপেক্ষাও উত্তম? সাহাবীগণ বলেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বলুন। তখন তিনি বলেন :‘জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করা এবং তাদের পরস্পরের বিবাদ মিটিয়ে দেয়া।' (সুনান-ই-আবি দাউদ ইত্যাদি)। মুসনাদ-ই-বায়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু আইউব (রাঃ)-কে বলেনঃ এসো, আমি তোমাকে একটি ব্যবসায়ের কথা বলে দেই। লোকেরা যখন বিবাদে লিপ্ত হয় তখন তুমি তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও, যখন একজন অপরজন হতে সরে থাকে তখন তুমি তাদেরকে একত্রিত করে দাও।'আল্লাহ তা'আলার বলেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রসন্নতা সন্ধানের জন্যে ঐরূপ করে, আমি তাকে মহান বিনিময় প্রদান করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শরীয়তের বিপরীত পথে চলে, শরীয়ত হয় এক দিকে এবং তার পথ হয় অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক দিকে চলার নির্দেশ দেন এবং সে অন্যদিকে চলে, অথচ সত্য তার নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, সে দলীল প্রমাণাদি দেখেছে। তথাপি সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ মুসলমানদের সরল ও পরিষ্কার পথ হতে সরে পড়েছে, সুতরাং আমিও তাকে ঐ বক্র ও খারাপ পথেই ফিরিয়ে দেব। ঐ খারাপ পথই তখন তার নিকট ভাল বলে মনে হবে, অতঃপর সে জাহান্নামে গিয়ে পৌছে যাবে।মুসলমানদের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য পথ অনুসন্ধান করাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করা। কিন্তু কখনও হয় তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্পষ্ট কথারই উল্টো হয়, আবার কখনও কখনও ঐ জিনিসের বিপরীত হয় যার উপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত সবাই একমত রয়েছে। তাদের দ্রতা ও নম্রতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভুল হতে রক্ষা করেছেন। এ ব্যাপারে বহু হাদীসও রয়েছে এবং উসূলের হাদীসগুলোতে আমরা ওর বিরাট অংশ বর্ণনাও করেছি। ইমাম শাফিঈ (রঃ) চিন্তা ও গবেষণার পর এ আয়াত হতেই উম্মতের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই এ ব্যাপারে উত্তম ও দৃঢ়তার জিনিস। তবে অন্য কয়েকজন ইমাম এ যুক্তিকে কঠিন ও আয়াত হতে দূরে বলেছেন। মোটকথা যারা মুমিনদের পথ হতে সরে পড়ে তাদের রজ্জুকে আল্লাহ তা'আলা ঢিল দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি আমাকে ও যে এ কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাকে ছেড়ে দাও, সত্বরই আমি এমনভাবে ধরবো যে, সে জানতেই পারবে না।' (৬৮:৪৪) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা বাঁকা হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। (৬১:৫) আর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তাদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণে ছেড়ে দিচ্ছি, তন্মধ্যে তারা অন্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নামই হবে। (৬:১১০) যেমন এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে এবং তাদের দোসরদেরকে।” (৩৭:২২) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আগুন দেখে অত্যাচারীরা জেনে নেবে যে, তাদেরকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে এবং তারা পলায়নের কোন স্থান পাবে না।' (১৮:৫৩)।
আন-নিসা 4:116
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:117
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:118
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:119
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:120
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:121
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'
আন-নিসা 4:122
১১৬-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ সূরার প্রথম দিকে আমরা (আরবী) -এ আয়াতটির তাফসীর করেছি এবং তথায় এ আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোও বর্ণনা করেছি। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ কুরআন কারীমের অন্য কোন আয়াত আমার নিকট এ আয়াত অপেক্ষা প্রিয় নেই। দুনিয়া ও আখিরাত মুশরিকদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ছে। তারা নিজেদের জীবনকে ও উভয় জগতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ মুশরিকরা নারীদের পূজারী ।মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রতিমার সাথে একটি মহিলা জ্বিন রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে মূর্তি। এটা অন্যান্য মুফাসৃসিরগণেরও উক্তি।হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে পূজা করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার মেয়ে বলে বিশ্বাস করতো ও বলতোঃ ‘তাদের ইবাদত দ্বারা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ।' তারা নারীদের আকারে ফেরেশতাদের ছবি প্রতিষ্ঠিত করতো। অতঃপর অন্ধভাবে তাদের ইবাদত করতো এবং বলতো যে, এগুলো হচ্ছে ফেরেশতাদের ছবি, তারা আল্লাহর কন্যা। এ তাফসীর (আরবী) (৫৩:১৯) -এ আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তথায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম নিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন- তাদের কি সুন্দর বিচার যে, ছেলেগুলো হচ্ছে তাদের এবং মেয়েগুলো আমার!' আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দাস ফেরেশতাদেরকে মহিলা মনে করে নিয়েছে।' (৪৩:১৯) আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে বংশ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (৩৭:১৫৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে মৃত। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আত্মাহীন প্রত্যেক জিনিসই (আরবী) সেটা শুষ্ক কাঠই হোক বা পাথরই হোক। কিন্তু এ উক্তি দুর্বল।অতঃপর বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই পূজারী। কেননা, সে-ই তাকে এ পথে চালিত করেছে এবং আসলে তাকেই সে মানছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করবে না’? (৩৬:৬০) এ কারণেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ স্পষ্টভাবে বলে দেবেনঃ ‘আমাদেরকে ইবাদত করার দাবীদারেরা প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদত করতো, তাদের অধিকাংশই তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। শয়তানকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা হতে দূর করে। দিয়েছিলেন। তাই সেও প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার বহুসংখ্যক বান্দাকে সে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন- অর্থাৎ প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জনকে সে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। একজন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে যে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সে বলেছিল, ‘আমি মানুষকে সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট করবো, তাকে আমি এমন আশা দিতে থাকবো যে, সে তাওবা করা ছেড়ে দেবে, স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে এবং মরণকে ভুলে যাবে। ফলে সে আখেরাত হতে বহু দূরে সরে পড়বে। তাদের দ্বারা আমি জন্তুর কান কাটিয়ে নিয়ে ছিদ্র করিয়ে দেবো এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার জন্যে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকবো। আল্লাহর তৈরী করা আকৃতি নষ্ট করার কার্যে তাদের উৎসাহিত করবো। যেমন অণ্ডকোষ কর্তিত করা। একটি হাদীসে এটার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেহারার উপর উল্কী করা এবং উল্কী করিয়ে নেয়া এও একটি অর্থ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে এটা নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং যে এরূপ উল্কী করিয়ে নেয় তাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে।সহীহ সনদে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যারা উল্কী করে ও করিয়ে নেয়, কপালের চুল তুলে ও তুলিয়ে নেয় এবং দাঁতে বিস্তৃতি সাধন করে, তাদের উপর অভিসম্পাত রয়েছে। আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করবো না কেন যাদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিসম্পাত করেছেন এবং যা আল্লাহ তা'আলার কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে?' অতঃপর তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।'(৫৯:৭) কোন কোন ব্যাখ্যাদাতার মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর দিনকে পরিবর্তিত করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তুমি তোমার মুখমণ্ডলকে আল্লাহর একমুখী ধর্মের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি যার উপর তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই।' (৩০:৩০) এ পরের বাক্যটিকে যখন আদেশবাচক ক্রিয়া অর্থে নেয়া হবে তখন এ তাফসীর ঠিকই হবে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না। মানুষকে তিনি যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন ওর উপরেই থাকতে দাও।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু প্রকৃতির উপরই জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাপ-মা তাকে ইয়াহূদী করে, খ্রীষ্টান করে বা মাজুসী করে। যেমন ছাগলের নিখুঁত বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে দোষমুক্ত হয়ে থাকে কিন্তু মানুষেরাই তার কান ইত্যাদি কেটে নিয়ে তাকে দোষযুক্ত করে থাকে।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাকে এক মুখী দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এসে তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতঃপর আমি আমার বৈধকে তাদের উপর অবৈধ করেছি।'শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে, যে ক্ষতির আর পূরণ নেই। কেননা, শয়তান তাকে ধোকা দিতে রয়েছে, শয়তান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মুক্তি ও মঙ্গল ঐ ভুল পথেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে বড় প্রতারক, সে স্পষ্টভাবে তাকে ধোকা দিচ্ছে। যেমন কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা সত্য ছিল। আর আমি তো ওয়াদা ভঙ্গকারী। তোমাদের উপর আমার কেনি জোর ছিল না। আমার আহ্বান শুনামাত্রই তোমরা নির্বোধের মত কেন তাতে সাড়া দিয়েছিলে? এখন আমাকে ভৎসনা করছো কেন? বরং তোমরা নিজেকেই ভৎসনা কর।' শয়তানের অঙ্গীকারকে সঠিক জ্ঞানকারী, তার প্রদত্ত আশা পূর্ণ হওয়ার ধারণাকারী জাহান্নামেই পৌছে যাবে, যেখান হতে পলায়ন করা অসম্ভব।ঐ হতভাগাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন-যে আমাকে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং শরীরের দ্বারা আমার আনুগত্য স্বীকার করে, আমার নির্দেশাবলীর উপর আমল করে, আমি যা নিষেধ করেছি সেটা হতে বিরত থাকে, তাকে আমি আমার নিয়ামত দান করবো এবং তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। ঐ জান্নাতের নদীগুলো তাদের ইচ্ছেমত বইতে থাকবে, সেখানে না আছে ধ্বংস না আছে মৃত্যু এবং না আছে কোন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার অটল ও সম্পূর্ণ সত্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই।'রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলতেনঃ 'সবচেয়ে সত্য কথা হচ্ছে আল্লাহর কথা এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রদর্শিত পথ। আর সমস্ত কাজের মধ্যে জঘন্যতম কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিস আনয়ন করা এবং প্রত্যেক এ নতুন জিনিসই হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিয়ে যাবে।'