Tafseer ibn Kathir — আন-নিসা 4:123 – আন-নিসা 4:156
Contents
- আন-নিসা 4:123
- আন-নিসা 4:124
- আন-নিসা 4:125
- আন-নিসা 4:126
- আন-নিসা 4:127
- আন-নিসা 4:128
- আন-নিসা 4:129
- আন-নিসা 4:130
- আন-নিসা 4:131
- আন-নিসা 4:132
- আন-নিসা 4:133
- আন-নিসা 4:134
- আন-নিসা 4:135
- আন-নিসা 4:136
- আন-নিসা 4:137
- আন-নিসা 4:138
- আন-নিসা 4:139
- আন-নিসা 4:140
- আন-নিসা 4:141
- আন-নিসা 4:142
- আন-নিসা 4:143
- আন-নিসা 4:144
- আন-নিসা 4:145
- আন-নিসা 4:146
- আন-নিসা 4:147
- আন-নিসা 4:148
- আন-নিসা 4:149
- আন-নিসা 4:150
- আন-নিসা 4:151
- আন-নিসা 4:152
- আন-নিসা 4:153
- আন-নিসা 4:154
- আন-নিসা 4:155
- আন-নিসা 4:156
আন-নিসা 4:123
১২৩-১২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, 'আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মধ্যে তর্ক হয়- আহলে কিতাব এই বলে মুসলমানদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নবী (আঃ) মুসলমানদের নবী (সঃ)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলমানদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। অপরপক্ষে মুসলমানেরা বলছিল যে, তাদের নবী (সঃ) সর্বশেষ নবী এবং তাদের কিতাবও পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ফায়সালাকারী। সে সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়।হযরত মুহাজিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের লোকেরা বলেছিল, ‘আমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা হবে না এবং আমাদের শাস্তিও হবে। ইয়াহূদীরা বলেছিল, ‘জান্নাতে শুধুমাত্র আমরাই যাবো।' খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ কথা বলেছিল। আর তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদেরকে শুধু কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আয়াতের বিষয়বস্তু এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয় না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং আহলে কিতাবের উচ্চাকাঙ্খা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ কার্যকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে না? বরং কিয়ামতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অণুপরিমাণ কার্যেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়াতেই প্রতিদান পাবে।'তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবৃনে উমার (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “সাবধান! যেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে শূলী দেয়া হয়েছে সেখান দিয়ে গমন করো না। কিন্তু গোলাম তাঁর এ কথা ভুলে যায় এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর দৃষ্টি হযরত ইবনে যুবায়েরের উপর নিপতিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! যতটুকু আমার জানা আছে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রোযাদার, নামাযী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্তকারী ছিলে। আমি আশা রাখি যে, যেটুকু মন্দকাজ তোমার দ্বারা সাধিত হয়েছে তার প্রতিশোধ দুনিয়াতেই হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তোমাকে আর শাস্তি দেবেন না। অতঃপর তিনি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) হতে আমি শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি মন্দকার্য করে তার প্রতিদান সে দুনিয়াতেই পেয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে শূলে দেখে বলেন, হে আবূ হাবীব! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন। আমি তোমার পিতার মুখেই এ হাদীসটি শুনেছি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিদ্যামানতায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন তখন তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন যে, প্রত্যেক আমলের যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তিপ্রাপ্তি খুব কঠিন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! জেনে রেখ যে, তোমার সঙ্গীদেরকে অর্থাৎ মুমিনদেরকে তো দুনিয়াতেই তাদের কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে এবং ঐ বিপদসমূহের কারণেই তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন তোমরা পবিত্র হয়ে উঠবে। হ্যা, তবে অন্য লোক যারা রয়েছে তাদের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।' এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ দুর্বল এবং অপর বর্ণনাকারী মাওলা ইবনে সিবা অজ্ঞাত। বহু পন্থায় এর মর্মকথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুমিনের এ প্রতিদান ওটাই যা দুনিয়াতেই তার উপর বিপদ-আপদের আকারে আপতিত হয়। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ ‘এমন কি একজন মুমিন হয় তো তার জামার পকেটে কিছু টাকা রাখলো, তারপর প্রয়োজনের সময় ক্ষণিকের জন্যে সে সেই টাকা পেলো না, এরপর আবার পকেটে হাত দিতেই টাকা বেরিয়ে আসে। এই যে কিছুক্ষণ সে টাকাটা পেলো না যার দরুন মনে কিছুটা কষ্ট পেলো, এর ফলেও তার পাপ মার্জনা করা হয় এবং এটাও তার মন্দ কার্যের প্রতিদান হয়ে যায়। দুনিয়ার এসব বিপদ তাকে এমন খাটি ও পবিত্র করে দেয় যে, কিয়ামতের কোন বোঝা তার উপরে থাকে না। যেমন সোনা আগুনে দিলে খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে, দ্রুপ সেও দুনিয়ায় পাক সাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ মুমিনকে প্রত্যেক জিনিসেই পুণ্য দেয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর যন্ত্রণায়ও পুণ্য দেয়া হয়।’মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন বান্দার পাপ খুব বেশী হয়ে যায় এবং সে পাপসমূহ দূর করার মত অধিক সৎ আমল থাকে না তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর কোন দুঃখ নাযিল করেন যার ফলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা ঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলমানের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমনকি কাঁটা লাগলেও (ঐ কারণে গুনাহ মাফ হয়ে থাকে)।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীগণ রোদন করছিলেন এবং তাঁরা খুবই চিন্তান্বিত ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে এ কথা বলেছিলেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আমাদের এ রোগে কি পাবো?' তিনি বলেনঃ ‘এর ফলে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।' একথা শুনে হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ) প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত যেন জ্বর আমা হতে পৃথক না হয়। কিন্তু যেন আমি হজ্ব, উমরা, জিহাদ এবং জামাআতে নামায পড়া হতে বঞ্চিত না হই। তাঁর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়, তার শরীরে হাত লাগালে জ্বর অনুভূত হতো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ‘প্রত্যেকে মন্দ কার্যেরই কি প্রতিদান দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা, ঐ রকমই এবং অতটুকুই কিন্তু প্রত্যেক সৎ কার্যের প্রতিদান দশগুণ করে দেয়া হয়। সুতরাং সে ধ্বংস হয়ে গেল যার এক দশ হতে বেড়ে গেল (অর্থাৎ পাপের প্রতিদান সমান সমান এবং পুণ্যের প্রতিদান দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও পাপ বেশী থেকে গেল)'। (তাফসীর-ইইবনে মিরদুওয়াই) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা কাফিরকে বুঝান হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি একমাত্র কাফিরদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। (৩৪:১৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কার্যের ভাবার্থ হচ্ছে শিক” এরপর বলা হচ্ছে- এ ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। হাঁ, যদি সে তাওবা করে তাহলে সেটা অন্য কথা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, প্রত্যেক মন্দ কাজই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মন্দকার্যের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ কার্যের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মন্দকাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়াতেই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্যে উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এটা হতে র করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন।সত্যার্যাবলী আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে থাকেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর বা নারীর সৎকার্য তিনি নষ্ট করেন না। তবে শর্ত এই যে, হতে হবে মুসমলান। এ সৎলোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন। তাদের পুণ্য তিনি মোটেই কম হতে দেবেন না। বলা হয় খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশকে। (আরবী) বলা হয় খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের হালকা ছালকে। এ দু'টো থাকে খেজুরের আঁটির মধ্যে। আর বলা হয় ঐ আঁটির উপরের আবরণকে। কুরআন কারীমের মধ্যে এরূপ স্থলে এ তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-ওর চেয়ে উত্তম ধর্মের লোক আর কে হতে পারে যে স্বীয় আনন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে? ঈমানদারী ও সৎ। নিয়তে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সে সৎকর্মশীলও হয়। অর্থাৎ সে শরীয়তের অনুসারী, সত্যধর্ম ও সুপথের পথিক এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের উপর আমলকারী। প্রত্যেক ভাল কাজ গ্রহণীয় হওয়ার জন্যে এ দু'টি শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা ও অহী অনুযায়ী হওয়া। (আরবী) বা আন্তরিকতার ভাবার্থ এই যে, উদ্দেশ্য হবে শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আর সঠিক হওয়ার অর্থ এই যে, সেটা হবে শরীয়ত অনুযায়ী। সুতরাং বাহির তো কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হওয়ার মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। আর ভেতর সুসজ্জিত হয় সৎ নিয়তের দ্বারা। যদি এ দুটির মধ্যে মাত্র একটি না থাকে তবে আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তরিকতা না থাকলে কপটতা চলে আসে। তখন মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদেরকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই সেই অবস্থায় আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ না হলে পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়, ফলে তখনও আমল গ্রহণযোগ্যরূপে বিবেচিত হয় না। যেহেতু মুমিনের আমল লোক দেখানো হতে এবং শরীয়তের বিপরীত হওয়া থেকে মুক্ত হয় সেহেতু তার কাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ হয়ে থাকে। ঐ কাজই আল্লাহ পাক ভালবাসেন এবং সে জন্যেই তা মোচনের কারণ হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরেই বলেন-“তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুকরণ করে থাকে। অর্থাৎ তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তাঁর পদাংক অনুসরণ করবেন তাদের সকলের ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘ইবরাহীমের বেশী নিকটতম তারাই যারা তার অনুসারী এবং এ নবী (সঃ)।' (৩:৬৮) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্গত ছিল না। (১৬:১২৩)(আরবী) বলা হয় স্বেচ্ছায় শির্ক হতে অসন্তোষ প্রকাশকারীকে ও পূর্ণভাবে সত্যের দিকে মন সংযোগকারীকে, যাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দিতে পারে এবং দূরকারী দূর করতে পারে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে এবং প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তার গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর বন্ধু। অর্থাৎ বান্দা উন্নতি করতে করতে যে উচ্চতম পদ সোপান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সে সোপান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দরজা অপেক্ষা বড় দরজা আর নেই। এটা হচ্ছে প্রেমের উচ্চতম স্থান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর পূর্ণ আনুগত্য। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেই ইবরাহীম যে পুরোপুরি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। (৫৩:৩৭) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলী সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেছিলেন। কখনও তিনি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেননি। তাঁর ইবাদতে তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কোন কিছু তাঁকে তাঁর ইবাদত হতে বিরত রাখতে পারেনি। আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমকে কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন সে ঐগুলো পূর্ণ করে।' (২৪ ১২৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ) ছিল একাগ্রচিত্তে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (১৬:১২০)সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুআয (রাঃ) ইয়ামনে ফজরের নামাযে যখন -এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন একটি লোক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মায়ের চক্ষু ঠাণ্ডা হলো।'তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) খালীলুল্লাহ উপাধি হওয়ার কারণ এই যে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মিসরে বা মুসিলে তার এক বন্ধুর নিকট হতে কিছু খাদ্য-শস্য আনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু তথায় কিছু না পেয়ে শূন্য হস্তে ফিরে আসছিলেন। স্বীয় গ্রামের নিকটবর্তী হলে তার খেয়াল হয় যে, এ বালুর ঢিবি হতে কিছু বালু বস্তায় ভর্তি করা হোক এবং এটা বাড়ী নিয়ে গিয়ে পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এভাবে তিনি বস্তায় বালু ভরে নেন এবং সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নিয়ে বাড়ী মুখে রওয়ানা হন। মহান আল্লাহর কুদরতে সে বালু প্রকৃত আটা হয়ে যায়। তিনি বাড়ীতে পৌঁছে বস্তা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তার পরিবারের লোকেরা বস্তা খুলে দেখে যে, সেটা উত্তম আটায় পূর্ণ রয়েছে। আটা খামীর করে রুটি পাকান হয়। তিনি জাগ্রত হয়ে পরিবারের লোককে আনন্দিত দেখতে পান এবং রুটিও প্রস্তুত দেখেন। তখন তিনি বিস্মিতভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে আটা দিয়ে তোমরা রুটি তৈরী করলে তা পেলে কোথায়? তারা উত্তরে বলেঃ আপনি তো আপনার বন্ধুর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেন এবং তাদেরকে বলেনঃ হ্যাঁ, এটা আমি আমার বন্ধু মহান সম্মানিত আল্লাহর নিকট হতে এনেছি।' সুতরাং আল্লাহ তা'আলাও তাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। আর তাঁকে খালীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন? কিন্তু এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। খুব বেশী বললে এটাই বলা যাবে যে, এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণনা, যাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও বলতে পারি না। তাকে আল্লাহর বন্ধু বলার প্রকৃত কারণ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ছিল। আর ছিল তার প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য। তিনি স্বীয় ইবাদত দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নবীও (সঃ) তাঁর বিদায় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী হতাম তবে আবু বকর ইবনে আবূ কুহাফা (রাঃ)-কে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (আমি) হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যেমন হযরত ইবরাহীমকে স্বীয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দ্রুপ তিনি আমাকেও তার বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।'হযরত আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তার অপেক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছিল। কেউ বলছিলেনঃ ‘চমকপ্রদ কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুকের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। অন্য একজন বলেনঃ ‘এর চেয়েও বড় মেহেরবানী এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তিনি স্বয়ং কথা বলেছেন এবং তার কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। অপর একজন বলেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) তো হচ্ছেন আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা। আর একজন বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে এসে বলেনঃ “আমি তোমাদের কথা শুনেছি। নিশ্চয়ই তোমাদের কথা সত্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হচ্ছেন খালীলুল্লাহ, হযরত মূসা (আঃ) হচ্ছেন কালীমুল্লাহ, হযরত ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ এবং হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ। এ রকমই হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বটে। জেনে রেখো আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করছি, এটা কিন্তু অহংকার হিসেবে নয়। আমি বলছি যে, আমি হাবীবুল্লাহ। আমি হচ্ছি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে। আমিই প্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাতকারী। আল্লাহ তাআলা আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দেবেন এবং আমাকেও ওর ভেতরে প্রবিষ্ট করবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে দরিদ্র মুমিন লোকেরা। কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী সম্মানিত হবো আমিই। এটা গৌরবের বশবর্তী হয়ে বলছি, বরং ঘটনা অবহিত করার জন্য তোমাদেরকে বলছি।' এ সনদে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু এর সত্যতার কতক প্রমাণও বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময় বোধ করছো যে, বন্ধুত্ব ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে, কালাম ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্যে এবং দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর জন্যে। (মুসতাদরিক-ই-হাকীম) এ রকমই বর্ণনা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে এবং আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হতেও বর্ণিত আছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু গুরুজন হতেও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি অতিথিদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতেন। একদিন তিনি অতিথির খোজে বের হন। কিন্তু কোন অতিথি না পেয়ে ফিরে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখেন যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আপনাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিল কে?' লোকটি উত্তরে বলেনঃ ‘এ বাড়ীর প্রকৃত মালিক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কে?' তিনি বলেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দার নিকট এজন্যে পাঠিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, আমি যেন তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দেই।' এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলেনঃ ‘তাহলে আমাকে বলুন তো, সে মহা পুরুষ কে? আল্লাহর শপথ! তিনি এ দুনিয়ার কোন দূর প্রান্তে থাকলেও আমি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করবো এবং আমার অবশিষ্ট জীবন তার পদচুম্বনে কাটিয়ে দেবো।' এটা শুনে মৃত্যুর ফেরেশতা বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি আপনিই।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যিই কি আমি? ফেরেশতা বলেনঃ হ্যাঁ, আপনিই’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুনরায় ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আপনি এ কথাও বলুন তো, কিসের উপর ভিত্তি করে এবং কোন কার্যের বিনিময়ে তিনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মনোনীত করেছেন?' ফেরেশতা উত্তরে বলেনঃ কারণ এই যে, আপনি সকলকে দিতে থাকেন, কিন্তু আপনি কারও নিকট কিছু যাজ্ঞা করেন না।অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হতে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘খালীলুল্লাহ' এ বিশিষ্ট উপাধিতে ভূষিত করেন তখন হতে তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এতো বেশী জমে উঠেছিল যে, তার অন্তরের কম্পনের শব্দ দূর হতে এমনিভাবেই শুনা যেতো যেমনিভাবে মহাশূন্যে পাখীর উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনা যায়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্বন্ধেও এসেছে যে, যে সময় আল্লাহ তাআলার ভয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করতো তখন তার কান্নার শব্দ, যা তিনি দমন করে রাখতেন, দূরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী লোকেরা এমনিভাবেই শুনতে পেতো যেমনিভাবে কোন হাঁড়ির মধ্যে পানি টগবগ করে ফুটলে তা শুনা যায়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার অধিকারে রয়েছে এবং সবাই তার দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছে। সবই তাঁর সৃষ্ট। তথায় তিনি যখন যা করার ইচ্ছে করেন, বিনা বাধা-বিপত্তিতে তাই করে থাকেন। কারও সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে হতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কেউ তাঁর আদেশের সামনে প্রতিবন্ধক রূপে দাঁড়াতে পারে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ন্যায় বিচারক, মহা বিজ্ঞানময়, সূক্ষ্মদর্শী ও পরম দয়ালু। তিনি এক। কারও মুখাপেক্ষী তিনি নন। কোন লুক্কায়িত জিনিস, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিস এবং বহু দূরের জিনিস তাঁর নিকট গুপ্ত নেই। যা কিছু আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তার সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান।
আন-নিসা 4:124
১২৩-১২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, 'আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মধ্যে তর্ক হয়- আহলে কিতাব এই বলে মুসলমানদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নবী (আঃ) মুসলমানদের নবী (সঃ)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলমানদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। অপরপক্ষে মুসলমানেরা বলছিল যে, তাদের নবী (সঃ) সর্বশেষ নবী এবং তাদের কিতাবও পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ফায়সালাকারী। সে সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়।হযরত মুহাজিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের লোকেরা বলেছিল, ‘আমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা হবে না এবং আমাদের শাস্তিও হবে। ইয়াহূদীরা বলেছিল, ‘জান্নাতে শুধুমাত্র আমরাই যাবো।' খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ কথা বলেছিল। আর তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদেরকে শুধু কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আয়াতের বিষয়বস্তু এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয় না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং আহলে কিতাবের উচ্চাকাঙ্খা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ কার্যকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে না? বরং কিয়ামতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অণুপরিমাণ কার্যেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়াতেই প্রতিদান পাবে।'তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবৃনে উমার (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “সাবধান! যেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে শূলী দেয়া হয়েছে সেখান দিয়ে গমন করো না। কিন্তু গোলাম তাঁর এ কথা ভুলে যায় এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর দৃষ্টি হযরত ইবনে যুবায়েরের উপর নিপতিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! যতটুকু আমার জানা আছে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রোযাদার, নামাযী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্তকারী ছিলে। আমি আশা রাখি যে, যেটুকু মন্দকাজ তোমার দ্বারা সাধিত হয়েছে তার প্রতিশোধ দুনিয়াতেই হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তোমাকে আর শাস্তি দেবেন না। অতঃপর তিনি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) হতে আমি শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি মন্দকার্য করে তার প্রতিদান সে দুনিয়াতেই পেয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে শূলে দেখে বলেন, হে আবূ হাবীব! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন। আমি তোমার পিতার মুখেই এ হাদীসটি শুনেছি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিদ্যামানতায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন তখন তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন যে, প্রত্যেক আমলের যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তিপ্রাপ্তি খুব কঠিন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! জেনে রেখ যে, তোমার সঙ্গীদেরকে অর্থাৎ মুমিনদেরকে তো দুনিয়াতেই তাদের কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে এবং ঐ বিপদসমূহের কারণেই তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন তোমরা পবিত্র হয়ে উঠবে। হ্যা, তবে অন্য লোক যারা রয়েছে তাদের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।' এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ দুর্বল এবং অপর বর্ণনাকারী মাওলা ইবনে সিবা অজ্ঞাত। বহু পন্থায় এর মর্মকথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুমিনের এ প্রতিদান ওটাই যা দুনিয়াতেই তার উপর বিপদ-আপদের আকারে আপতিত হয়। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ ‘এমন কি একজন মুমিন হয় তো তার জামার পকেটে কিছু টাকা রাখলো, তারপর প্রয়োজনের সময় ক্ষণিকের জন্যে সে সেই টাকা পেলো না, এরপর আবার পকেটে হাত দিতেই টাকা বেরিয়ে আসে। এই যে কিছুক্ষণ সে টাকাটা পেলো না যার দরুন মনে কিছুটা কষ্ট পেলো, এর ফলেও তার পাপ মার্জনা করা হয় এবং এটাও তার মন্দ কার্যের প্রতিদান হয়ে যায়। দুনিয়ার এসব বিপদ তাকে এমন খাটি ও পবিত্র করে দেয় যে, কিয়ামতের কোন বোঝা তার উপরে থাকে না। যেমন সোনা আগুনে দিলে খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে, দ্রুপ সেও দুনিয়ায় পাক সাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ মুমিনকে প্রত্যেক জিনিসেই পুণ্য দেয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর যন্ত্রণায়ও পুণ্য দেয়া হয়।’মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন বান্দার পাপ খুব বেশী হয়ে যায় এবং সে পাপসমূহ দূর করার মত অধিক সৎ আমল থাকে না তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর কোন দুঃখ নাযিল করেন যার ফলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা ঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলমানের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমনকি কাঁটা লাগলেও (ঐ কারণে গুনাহ মাফ হয়ে থাকে)।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীগণ রোদন করছিলেন এবং তাঁরা খুবই চিন্তান্বিত ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে এ কথা বলেছিলেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আমাদের এ রোগে কি পাবো?' তিনি বলেনঃ ‘এর ফলে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।' একথা শুনে হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ) প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত যেন জ্বর আমা হতে পৃথক না হয়। কিন্তু যেন আমি হজ্ব, উমরা, জিহাদ এবং জামাআতে নামায পড়া হতে বঞ্চিত না হই। তাঁর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়, তার শরীরে হাত লাগালে জ্বর অনুভূত হতো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ‘প্রত্যেকে মন্দ কার্যেরই কি প্রতিদান দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা, ঐ রকমই এবং অতটুকুই কিন্তু প্রত্যেক সৎ কার্যের প্রতিদান দশগুণ করে দেয়া হয়। সুতরাং সে ধ্বংস হয়ে গেল যার এক দশ হতে বেড়ে গেল (অর্থাৎ পাপের প্রতিদান সমান সমান এবং পুণ্যের প্রতিদান দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও পাপ বেশী থেকে গেল)'। (তাফসীর-ইইবনে মিরদুওয়াই) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা কাফিরকে বুঝান হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি একমাত্র কাফিরদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। (৩৪:১৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কার্যের ভাবার্থ হচ্ছে শিক” এরপর বলা হচ্ছে- এ ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। হাঁ, যদি সে তাওবা করে তাহলে সেটা অন্য কথা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, প্রত্যেক মন্দ কাজই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মন্দকার্যের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ কার্যের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মন্দকাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়াতেই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্যে উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এটা হতে র করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন।সত্যার্যাবলী আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে থাকেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর বা নারীর সৎকার্য তিনি নষ্ট করেন না। তবে শর্ত এই যে, হতে হবে মুসমলান। এ সৎলোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন। তাদের পুণ্য তিনি মোটেই কম হতে দেবেন না। বলা হয় খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশকে। (আরবী) বলা হয় খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের হালকা ছালকে। এ দু'টো থাকে খেজুরের আঁটির মধ্যে। আর বলা হয় ঐ আঁটির উপরের আবরণকে। কুরআন কারীমের মধ্যে এরূপ স্থলে এ তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-ওর চেয়ে উত্তম ধর্মের লোক আর কে হতে পারে যে স্বীয় আনন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে? ঈমানদারী ও সৎ। নিয়তে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সে সৎকর্মশীলও হয়। অর্থাৎ সে শরীয়তের অনুসারী, সত্যধর্ম ও সুপথের পথিক এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের উপর আমলকারী। প্রত্যেক ভাল কাজ গ্রহণীয় হওয়ার জন্যে এ দু'টি শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা ও অহী অনুযায়ী হওয়া। (আরবী) বা আন্তরিকতার ভাবার্থ এই যে, উদ্দেশ্য হবে শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আর সঠিক হওয়ার অর্থ এই যে, সেটা হবে শরীয়ত অনুযায়ী। সুতরাং বাহির তো কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হওয়ার মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। আর ভেতর সুসজ্জিত হয় সৎ নিয়তের দ্বারা। যদি এ দুটির মধ্যে মাত্র একটি না থাকে তবে আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তরিকতা না থাকলে কপটতা চলে আসে। তখন মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদেরকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই সেই অবস্থায় আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ না হলে পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়, ফলে তখনও আমল গ্রহণযোগ্যরূপে বিবেচিত হয় না। যেহেতু মুমিনের আমল লোক দেখানো হতে এবং শরীয়তের বিপরীত হওয়া থেকে মুক্ত হয় সেহেতু তার কাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ হয়ে থাকে। ঐ কাজই আল্লাহ পাক ভালবাসেন এবং সে জন্যেই তা মোচনের কারণ হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরেই বলেন-“তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুকরণ করে থাকে। অর্থাৎ তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তাঁর পদাংক অনুসরণ করবেন তাদের সকলের ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘ইবরাহীমের বেশী নিকটতম তারাই যারা তার অনুসারী এবং এ নবী (সঃ)।' (৩:৬৮) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্গত ছিল না। (১৬:১২৩)(আরবী) বলা হয় স্বেচ্ছায় শির্ক হতে অসন্তোষ প্রকাশকারীকে ও পূর্ণভাবে সত্যের দিকে মন সংযোগকারীকে, যাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দিতে পারে এবং দূরকারী দূর করতে পারে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে এবং প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তার গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর বন্ধু। অর্থাৎ বান্দা উন্নতি করতে করতে যে উচ্চতম পদ সোপান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সে সোপান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দরজা অপেক্ষা বড় দরজা আর নেই। এটা হচ্ছে প্রেমের উচ্চতম স্থান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর পূর্ণ আনুগত্য। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেই ইবরাহীম যে পুরোপুরি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। (৫৩:৩৭) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলী সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেছিলেন। কখনও তিনি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেননি। তাঁর ইবাদতে তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কোন কিছু তাঁকে তাঁর ইবাদত হতে বিরত রাখতে পারেনি। আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমকে কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন সে ঐগুলো পূর্ণ করে।' (২৪ ১২৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ) ছিল একাগ্রচিত্তে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (১৬:১২০)সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুআয (রাঃ) ইয়ামনে ফজরের নামাযে যখন -এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন একটি লোক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মায়ের চক্ষু ঠাণ্ডা হলো।'তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) খালীলুল্লাহ উপাধি হওয়ার কারণ এই যে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মিসরে বা মুসিলে তার এক বন্ধুর নিকট হতে কিছু খাদ্য-শস্য আনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু তথায় কিছু না পেয়ে শূন্য হস্তে ফিরে আসছিলেন। স্বীয় গ্রামের নিকটবর্তী হলে তার খেয়াল হয় যে, এ বালুর ঢিবি হতে কিছু বালু বস্তায় ভর্তি করা হোক এবং এটা বাড়ী নিয়ে গিয়ে পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এভাবে তিনি বস্তায় বালু ভরে নেন এবং সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নিয়ে বাড়ী মুখে রওয়ানা হন। মহান আল্লাহর কুদরতে সে বালু প্রকৃত আটা হয়ে যায়। তিনি বাড়ীতে পৌঁছে বস্তা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তার পরিবারের লোকেরা বস্তা খুলে দেখে যে, সেটা উত্তম আটায় পূর্ণ রয়েছে। আটা খামীর করে রুটি পাকান হয়। তিনি জাগ্রত হয়ে পরিবারের লোককে আনন্দিত দেখতে পান এবং রুটিও প্রস্তুত দেখেন। তখন তিনি বিস্মিতভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে আটা দিয়ে তোমরা রুটি তৈরী করলে তা পেলে কোথায়? তারা উত্তরে বলেঃ আপনি তো আপনার বন্ধুর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেন এবং তাদেরকে বলেনঃ হ্যাঁ, এটা আমি আমার বন্ধু মহান সম্মানিত আল্লাহর নিকট হতে এনেছি।' সুতরাং আল্লাহ তা'আলাও তাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। আর তাঁকে খালীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন? কিন্তু এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। খুব বেশী বললে এটাই বলা যাবে যে, এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণনা, যাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও বলতে পারি না। তাকে আল্লাহর বন্ধু বলার প্রকৃত কারণ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ছিল। আর ছিল তার প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য। তিনি স্বীয় ইবাদত দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নবীও (সঃ) তাঁর বিদায় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী হতাম তবে আবু বকর ইবনে আবূ কুহাফা (রাঃ)-কে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (আমি) হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যেমন হযরত ইবরাহীমকে স্বীয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দ্রুপ তিনি আমাকেও তার বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।'হযরত আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তার অপেক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছিল। কেউ বলছিলেনঃ ‘চমকপ্রদ কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুকের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। অন্য একজন বলেনঃ ‘এর চেয়েও বড় মেহেরবানী এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তিনি স্বয়ং কথা বলেছেন এবং তার কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। অপর একজন বলেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) তো হচ্ছেন আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা। আর একজন বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে এসে বলেনঃ “আমি তোমাদের কথা শুনেছি। নিশ্চয়ই তোমাদের কথা সত্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হচ্ছেন খালীলুল্লাহ, হযরত মূসা (আঃ) হচ্ছেন কালীমুল্লাহ, হযরত ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ এবং হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ। এ রকমই হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বটে। জেনে রেখো আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করছি, এটা কিন্তু অহংকার হিসেবে নয়। আমি বলছি যে, আমি হাবীবুল্লাহ। আমি হচ্ছি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে। আমিই প্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাতকারী। আল্লাহ তাআলা আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দেবেন এবং আমাকেও ওর ভেতরে প্রবিষ্ট করবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে দরিদ্র মুমিন লোকেরা। কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী সম্মানিত হবো আমিই। এটা গৌরবের বশবর্তী হয়ে বলছি, বরং ঘটনা অবহিত করার জন্য তোমাদেরকে বলছি।' এ সনদে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু এর সত্যতার কতক প্রমাণও বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময় বোধ করছো যে, বন্ধুত্ব ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে, কালাম ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্যে এবং দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর জন্যে। (মুসতাদরিক-ই-হাকীম) এ রকমই বর্ণনা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে এবং আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হতেও বর্ণিত আছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু গুরুজন হতেও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি অতিথিদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতেন। একদিন তিনি অতিথির খোজে বের হন। কিন্তু কোন অতিথি না পেয়ে ফিরে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখেন যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আপনাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিল কে?' লোকটি উত্তরে বলেনঃ ‘এ বাড়ীর প্রকৃত মালিক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কে?' তিনি বলেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দার নিকট এজন্যে পাঠিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, আমি যেন তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দেই।' এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলেনঃ ‘তাহলে আমাকে বলুন তো, সে মহা পুরুষ কে? আল্লাহর শপথ! তিনি এ দুনিয়ার কোন দূর প্রান্তে থাকলেও আমি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করবো এবং আমার অবশিষ্ট জীবন তার পদচুম্বনে কাটিয়ে দেবো।' এটা শুনে মৃত্যুর ফেরেশতা বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি আপনিই।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যিই কি আমি? ফেরেশতা বলেনঃ হ্যাঁ, আপনিই’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুনরায় ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আপনি এ কথাও বলুন তো, কিসের উপর ভিত্তি করে এবং কোন কার্যের বিনিময়ে তিনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মনোনীত করেছেন?' ফেরেশতা উত্তরে বলেনঃ কারণ এই যে, আপনি সকলকে দিতে থাকেন, কিন্তু আপনি কারও নিকট কিছু যাজ্ঞা করেন না।অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হতে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘খালীলুল্লাহ' এ বিশিষ্ট উপাধিতে ভূষিত করেন তখন হতে তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এতো বেশী জমে উঠেছিল যে, তার অন্তরের কম্পনের শব্দ দূর হতে এমনিভাবেই শুনা যেতো যেমনিভাবে মহাশূন্যে পাখীর উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনা যায়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্বন্ধেও এসেছে যে, যে সময় আল্লাহ তাআলার ভয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করতো তখন তার কান্নার শব্দ, যা তিনি দমন করে রাখতেন, দূরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী লোকেরা এমনিভাবেই শুনতে পেতো যেমনিভাবে কোন হাঁড়ির মধ্যে পানি টগবগ করে ফুটলে তা শুনা যায়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার অধিকারে রয়েছে এবং সবাই তার দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছে। সবই তাঁর সৃষ্ট। তথায় তিনি যখন যা করার ইচ্ছে করেন, বিনা বাধা-বিপত্তিতে তাই করে থাকেন। কারও সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে হতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কেউ তাঁর আদেশের সামনে প্রতিবন্ধক রূপে দাঁড়াতে পারে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ন্যায় বিচারক, মহা বিজ্ঞানময়, সূক্ষ্মদর্শী ও পরম দয়ালু। তিনি এক। কারও মুখাপেক্ষী তিনি নন। কোন লুক্কায়িত জিনিস, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিস এবং বহু দূরের জিনিস তাঁর নিকট গুপ্ত নেই। যা কিছু আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তার সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান।
আন-নিসা 4:125
১২৩-১২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, 'আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মধ্যে তর্ক হয়- আহলে কিতাব এই বলে মুসলমানদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নবী (আঃ) মুসলমানদের নবী (সঃ)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলমানদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। অপরপক্ষে মুসলমানেরা বলছিল যে, তাদের নবী (সঃ) সর্বশেষ নবী এবং তাদের কিতাবও পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ফায়সালাকারী। সে সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়।হযরত মুহাজিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের লোকেরা বলেছিল, ‘আমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা হবে না এবং আমাদের শাস্তিও হবে। ইয়াহূদীরা বলেছিল, ‘জান্নাতে শুধুমাত্র আমরাই যাবো।' খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ কথা বলেছিল। আর তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদেরকে শুধু কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আয়াতের বিষয়বস্তু এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয় না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং আহলে কিতাবের উচ্চাকাঙ্খা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ কার্যকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে না? বরং কিয়ামতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অণুপরিমাণ কার্যেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়াতেই প্রতিদান পাবে।'তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবৃনে উমার (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “সাবধান! যেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে শূলী দেয়া হয়েছে সেখান দিয়ে গমন করো না। কিন্তু গোলাম তাঁর এ কথা ভুলে যায় এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর দৃষ্টি হযরত ইবনে যুবায়েরের উপর নিপতিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! যতটুকু আমার জানা আছে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রোযাদার, নামাযী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্তকারী ছিলে। আমি আশা রাখি যে, যেটুকু মন্দকাজ তোমার দ্বারা সাধিত হয়েছে তার প্রতিশোধ দুনিয়াতেই হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তোমাকে আর শাস্তি দেবেন না। অতঃপর তিনি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) হতে আমি শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি মন্দকার্য করে তার প্রতিদান সে দুনিয়াতেই পেয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে শূলে দেখে বলেন, হে আবূ হাবীব! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন। আমি তোমার পিতার মুখেই এ হাদীসটি শুনেছি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিদ্যামানতায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন তখন তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন যে, প্রত্যেক আমলের যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তিপ্রাপ্তি খুব কঠিন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! জেনে রেখ যে, তোমার সঙ্গীদেরকে অর্থাৎ মুমিনদেরকে তো দুনিয়াতেই তাদের কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে এবং ঐ বিপদসমূহের কারণেই তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন তোমরা পবিত্র হয়ে উঠবে। হ্যা, তবে অন্য লোক যারা রয়েছে তাদের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।' এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ দুর্বল এবং অপর বর্ণনাকারী মাওলা ইবনে সিবা অজ্ঞাত। বহু পন্থায় এর মর্মকথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুমিনের এ প্রতিদান ওটাই যা দুনিয়াতেই তার উপর বিপদ-আপদের আকারে আপতিত হয়। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ ‘এমন কি একজন মুমিন হয় তো তার জামার পকেটে কিছু টাকা রাখলো, তারপর প্রয়োজনের সময় ক্ষণিকের জন্যে সে সেই টাকা পেলো না, এরপর আবার পকেটে হাত দিতেই টাকা বেরিয়ে আসে। এই যে কিছুক্ষণ সে টাকাটা পেলো না যার দরুন মনে কিছুটা কষ্ট পেলো, এর ফলেও তার পাপ মার্জনা করা হয় এবং এটাও তার মন্দ কার্যের প্রতিদান হয়ে যায়। দুনিয়ার এসব বিপদ তাকে এমন খাটি ও পবিত্র করে দেয় যে, কিয়ামতের কোন বোঝা তার উপরে থাকে না। যেমন সোনা আগুনে দিলে খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে, দ্রুপ সেও দুনিয়ায় পাক সাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ মুমিনকে প্রত্যেক জিনিসেই পুণ্য দেয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর যন্ত্রণায়ও পুণ্য দেয়া হয়।’মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন বান্দার পাপ খুব বেশী হয়ে যায় এবং সে পাপসমূহ দূর করার মত অধিক সৎ আমল থাকে না তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর কোন দুঃখ নাযিল করেন যার ফলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা ঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলমানের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমনকি কাঁটা লাগলেও (ঐ কারণে গুনাহ মাফ হয়ে থাকে)।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীগণ রোদন করছিলেন এবং তাঁরা খুবই চিন্তান্বিত ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে এ কথা বলেছিলেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আমাদের এ রোগে কি পাবো?' তিনি বলেনঃ ‘এর ফলে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।' একথা শুনে হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ) প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত যেন জ্বর আমা হতে পৃথক না হয়। কিন্তু যেন আমি হজ্ব, উমরা, জিহাদ এবং জামাআতে নামায পড়া হতে বঞ্চিত না হই। তাঁর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়, তার শরীরে হাত লাগালে জ্বর অনুভূত হতো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ‘প্রত্যেকে মন্দ কার্যেরই কি প্রতিদান দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা, ঐ রকমই এবং অতটুকুই কিন্তু প্রত্যেক সৎ কার্যের প্রতিদান দশগুণ করে দেয়া হয়। সুতরাং সে ধ্বংস হয়ে গেল যার এক দশ হতে বেড়ে গেল (অর্থাৎ পাপের প্রতিদান সমান সমান এবং পুণ্যের প্রতিদান দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও পাপ বেশী থেকে গেল)'। (তাফসীর-ইইবনে মিরদুওয়াই) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা কাফিরকে বুঝান হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি একমাত্র কাফিরদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। (৩৪:১৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কার্যের ভাবার্থ হচ্ছে শিক” এরপর বলা হচ্ছে- এ ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। হাঁ, যদি সে তাওবা করে তাহলে সেটা অন্য কথা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, প্রত্যেক মন্দ কাজই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মন্দকার্যের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ কার্যের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মন্দকাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়াতেই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্যে উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এটা হতে র করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন।সত্যার্যাবলী আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে থাকেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর বা নারীর সৎকার্য তিনি নষ্ট করেন না। তবে শর্ত এই যে, হতে হবে মুসমলান। এ সৎলোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন। তাদের পুণ্য তিনি মোটেই কম হতে দেবেন না। বলা হয় খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশকে। (আরবী) বলা হয় খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের হালকা ছালকে। এ দু'টো থাকে খেজুরের আঁটির মধ্যে। আর বলা হয় ঐ আঁটির উপরের আবরণকে। কুরআন কারীমের মধ্যে এরূপ স্থলে এ তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-ওর চেয়ে উত্তম ধর্মের লোক আর কে হতে পারে যে স্বীয় আনন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে? ঈমানদারী ও সৎ। নিয়তে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সে সৎকর্মশীলও হয়। অর্থাৎ সে শরীয়তের অনুসারী, সত্যধর্ম ও সুপথের পথিক এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের উপর আমলকারী। প্রত্যেক ভাল কাজ গ্রহণীয় হওয়ার জন্যে এ দু'টি শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা ও অহী অনুযায়ী হওয়া। (আরবী) বা আন্তরিকতার ভাবার্থ এই যে, উদ্দেশ্য হবে শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আর সঠিক হওয়ার অর্থ এই যে, সেটা হবে শরীয়ত অনুযায়ী। সুতরাং বাহির তো কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হওয়ার মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। আর ভেতর সুসজ্জিত হয় সৎ নিয়তের দ্বারা। যদি এ দুটির মধ্যে মাত্র একটি না থাকে তবে আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তরিকতা না থাকলে কপটতা চলে আসে। তখন মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদেরকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই সেই অবস্থায় আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ না হলে পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়, ফলে তখনও আমল গ্রহণযোগ্যরূপে বিবেচিত হয় না। যেহেতু মুমিনের আমল লোক দেখানো হতে এবং শরীয়তের বিপরীত হওয়া থেকে মুক্ত হয় সেহেতু তার কাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ হয়ে থাকে। ঐ কাজই আল্লাহ পাক ভালবাসেন এবং সে জন্যেই তা মোচনের কারণ হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরেই বলেন-“তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুকরণ করে থাকে। অর্থাৎ তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তাঁর পদাংক অনুসরণ করবেন তাদের সকলের ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘ইবরাহীমের বেশী নিকটতম তারাই যারা তার অনুসারী এবং এ নবী (সঃ)।' (৩:৬৮) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্গত ছিল না। (১৬:১২৩)(আরবী) বলা হয় স্বেচ্ছায় শির্ক হতে অসন্তোষ প্রকাশকারীকে ও পূর্ণভাবে সত্যের দিকে মন সংযোগকারীকে, যাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দিতে পারে এবং দূরকারী দূর করতে পারে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে এবং প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তার গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর বন্ধু। অর্থাৎ বান্দা উন্নতি করতে করতে যে উচ্চতম পদ সোপান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সে সোপান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দরজা অপেক্ষা বড় দরজা আর নেই। এটা হচ্ছে প্রেমের উচ্চতম স্থান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর পূর্ণ আনুগত্য। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেই ইবরাহীম যে পুরোপুরি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। (৫৩:৩৭) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলী সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেছিলেন। কখনও তিনি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেননি। তাঁর ইবাদতে তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কোন কিছু তাঁকে তাঁর ইবাদত হতে বিরত রাখতে পারেনি। আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমকে কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন সে ঐগুলো পূর্ণ করে।' (২৪ ১২৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ) ছিল একাগ্রচিত্তে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (১৬:১২০)সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুআয (রাঃ) ইয়ামনে ফজরের নামাযে যখন -এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন একটি লোক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মায়ের চক্ষু ঠাণ্ডা হলো।'তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) খালীলুল্লাহ উপাধি হওয়ার কারণ এই যে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মিসরে বা মুসিলে তার এক বন্ধুর নিকট হতে কিছু খাদ্য-শস্য আনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু তথায় কিছু না পেয়ে শূন্য হস্তে ফিরে আসছিলেন। স্বীয় গ্রামের নিকটবর্তী হলে তার খেয়াল হয় যে, এ বালুর ঢিবি হতে কিছু বালু বস্তায় ভর্তি করা হোক এবং এটা বাড়ী নিয়ে গিয়ে পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এভাবে তিনি বস্তায় বালু ভরে নেন এবং সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নিয়ে বাড়ী মুখে রওয়ানা হন। মহান আল্লাহর কুদরতে সে বালু প্রকৃত আটা হয়ে যায়। তিনি বাড়ীতে পৌঁছে বস্তা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তার পরিবারের লোকেরা বস্তা খুলে দেখে যে, সেটা উত্তম আটায় পূর্ণ রয়েছে। আটা খামীর করে রুটি পাকান হয়। তিনি জাগ্রত হয়ে পরিবারের লোককে আনন্দিত দেখতে পান এবং রুটিও প্রস্তুত দেখেন। তখন তিনি বিস্মিতভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে আটা দিয়ে তোমরা রুটি তৈরী করলে তা পেলে কোথায়? তারা উত্তরে বলেঃ আপনি তো আপনার বন্ধুর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেন এবং তাদেরকে বলেনঃ হ্যাঁ, এটা আমি আমার বন্ধু মহান সম্মানিত আল্লাহর নিকট হতে এনেছি।' সুতরাং আল্লাহ তা'আলাও তাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। আর তাঁকে খালীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন? কিন্তু এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। খুব বেশী বললে এটাই বলা যাবে যে, এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণনা, যাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও বলতে পারি না। তাকে আল্লাহর বন্ধু বলার প্রকৃত কারণ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ছিল। আর ছিল তার প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য। তিনি স্বীয় ইবাদত দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নবীও (সঃ) তাঁর বিদায় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী হতাম তবে আবু বকর ইবনে আবূ কুহাফা (রাঃ)-কে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (আমি) হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যেমন হযরত ইবরাহীমকে স্বীয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দ্রুপ তিনি আমাকেও তার বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।'হযরত আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তার অপেক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছিল। কেউ বলছিলেনঃ ‘চমকপ্রদ কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুকের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। অন্য একজন বলেনঃ ‘এর চেয়েও বড় মেহেরবানী এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তিনি স্বয়ং কথা বলেছেন এবং তার কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। অপর একজন বলেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) তো হচ্ছেন আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা। আর একজন বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে এসে বলেনঃ “আমি তোমাদের কথা শুনেছি। নিশ্চয়ই তোমাদের কথা সত্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হচ্ছেন খালীলুল্লাহ, হযরত মূসা (আঃ) হচ্ছেন কালীমুল্লাহ, হযরত ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ এবং হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ। এ রকমই হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বটে। জেনে রেখো আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করছি, এটা কিন্তু অহংকার হিসেবে নয়। আমি বলছি যে, আমি হাবীবুল্লাহ। আমি হচ্ছি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে। আমিই প্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাতকারী। আল্লাহ তাআলা আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দেবেন এবং আমাকেও ওর ভেতরে প্রবিষ্ট করবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে দরিদ্র মুমিন লোকেরা। কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী সম্মানিত হবো আমিই। এটা গৌরবের বশবর্তী হয়ে বলছি, বরং ঘটনা অবহিত করার জন্য তোমাদেরকে বলছি।' এ সনদে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু এর সত্যতার কতক প্রমাণও বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময় বোধ করছো যে, বন্ধুত্ব ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে, কালাম ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্যে এবং দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর জন্যে। (মুসতাদরিক-ই-হাকীম) এ রকমই বর্ণনা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে এবং আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হতেও বর্ণিত আছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু গুরুজন হতেও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি অতিথিদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতেন। একদিন তিনি অতিথির খোজে বের হন। কিন্তু কোন অতিথি না পেয়ে ফিরে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখেন যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আপনাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিল কে?' লোকটি উত্তরে বলেনঃ ‘এ বাড়ীর প্রকৃত মালিক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কে?' তিনি বলেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দার নিকট এজন্যে পাঠিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, আমি যেন তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দেই।' এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলেনঃ ‘তাহলে আমাকে বলুন তো, সে মহা পুরুষ কে? আল্লাহর শপথ! তিনি এ দুনিয়ার কোন দূর প্রান্তে থাকলেও আমি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করবো এবং আমার অবশিষ্ট জীবন তার পদচুম্বনে কাটিয়ে দেবো।' এটা শুনে মৃত্যুর ফেরেশতা বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি আপনিই।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যিই কি আমি? ফেরেশতা বলেনঃ হ্যাঁ, আপনিই’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুনরায় ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আপনি এ কথাও বলুন তো, কিসের উপর ভিত্তি করে এবং কোন কার্যের বিনিময়ে তিনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মনোনীত করেছেন?' ফেরেশতা উত্তরে বলেনঃ কারণ এই যে, আপনি সকলকে দিতে থাকেন, কিন্তু আপনি কারও নিকট কিছু যাজ্ঞা করেন না।অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হতে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘খালীলুল্লাহ' এ বিশিষ্ট উপাধিতে ভূষিত করেন তখন হতে তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এতো বেশী জমে উঠেছিল যে, তার অন্তরের কম্পনের শব্দ দূর হতে এমনিভাবেই শুনা যেতো যেমনিভাবে মহাশূন্যে পাখীর উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনা যায়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্বন্ধেও এসেছে যে, যে সময় আল্লাহ তাআলার ভয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করতো তখন তার কান্নার শব্দ, যা তিনি দমন করে রাখতেন, দূরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী লোকেরা এমনিভাবেই শুনতে পেতো যেমনিভাবে কোন হাঁড়ির মধ্যে পানি টগবগ করে ফুটলে তা শুনা যায়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার অধিকারে রয়েছে এবং সবাই তার দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছে। সবই তাঁর সৃষ্ট। তথায় তিনি যখন যা করার ইচ্ছে করেন, বিনা বাধা-বিপত্তিতে তাই করে থাকেন। কারও সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে হতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কেউ তাঁর আদেশের সামনে প্রতিবন্ধক রূপে দাঁড়াতে পারে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ন্যায় বিচারক, মহা বিজ্ঞানময়, সূক্ষ্মদর্শী ও পরম দয়ালু। তিনি এক। কারও মুখাপেক্ষী তিনি নন। কোন লুক্কায়িত জিনিস, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিস এবং বহু দূরের জিনিস তাঁর নিকট গুপ্ত নেই। যা কিছু আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তার সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান।
আন-নিসা 4:126
১২৩-১২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, 'আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মধ্যে তর্ক হয়- আহলে কিতাব এই বলে মুসলমানদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নবী (আঃ) মুসলমানদের নবী (সঃ)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলমানদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। অপরপক্ষে মুসলমানেরা বলছিল যে, তাদের নবী (সঃ) সর্বশেষ নবী এবং তাদের কিতাবও পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ফায়সালাকারী। সে সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়।হযরত মুহাজিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের লোকেরা বলেছিল, ‘আমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা হবে না এবং আমাদের শাস্তিও হবে। ইয়াহূদীরা বলেছিল, ‘জান্নাতে শুধুমাত্র আমরাই যাবো।' খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ কথা বলেছিল। আর তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদেরকে শুধু কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আয়াতের বিষয়বস্তু এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয় না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং আহলে কিতাবের উচ্চাকাঙ্খা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ কার্যকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে না? বরং কিয়ামতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অণুপরিমাণ কার্যেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়াতেই প্রতিদান পাবে।'তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবৃনে উমার (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “সাবধান! যেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে শূলী দেয়া হয়েছে সেখান দিয়ে গমন করো না। কিন্তু গোলাম তাঁর এ কথা ভুলে যায় এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর দৃষ্টি হযরত ইবনে যুবায়েরের উপর নিপতিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! যতটুকু আমার জানা আছে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রোযাদার, নামাযী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্তকারী ছিলে। আমি আশা রাখি যে, যেটুকু মন্দকাজ তোমার দ্বারা সাধিত হয়েছে তার প্রতিশোধ দুনিয়াতেই হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তোমাকে আর শাস্তি দেবেন না। অতঃপর তিনি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) হতে আমি শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি মন্দকার্য করে তার প্রতিদান সে দুনিয়াতেই পেয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে শূলে দেখে বলেন, হে আবূ হাবীব! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন। আমি তোমার পিতার মুখেই এ হাদীসটি শুনেছি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিদ্যামানতায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন তখন তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন যে, প্রত্যেক আমলের যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তিপ্রাপ্তি খুব কঠিন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! জেনে রেখ যে, তোমার সঙ্গীদেরকে অর্থাৎ মুমিনদেরকে তো দুনিয়াতেই তাদের কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে এবং ঐ বিপদসমূহের কারণেই তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন তোমরা পবিত্র হয়ে উঠবে। হ্যা, তবে অন্য লোক যারা রয়েছে তাদের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।' এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ দুর্বল এবং অপর বর্ণনাকারী মাওলা ইবনে সিবা অজ্ঞাত। বহু পন্থায় এর মর্মকথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুমিনের এ প্রতিদান ওটাই যা দুনিয়াতেই তার উপর বিপদ-আপদের আকারে আপতিত হয়। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ ‘এমন কি একজন মুমিন হয় তো তার জামার পকেটে কিছু টাকা রাখলো, তারপর প্রয়োজনের সময় ক্ষণিকের জন্যে সে সেই টাকা পেলো না, এরপর আবার পকেটে হাত দিতেই টাকা বেরিয়ে আসে। এই যে কিছুক্ষণ সে টাকাটা পেলো না যার দরুন মনে কিছুটা কষ্ট পেলো, এর ফলেও তার পাপ মার্জনা করা হয় এবং এটাও তার মন্দ কার্যের প্রতিদান হয়ে যায়। দুনিয়ার এসব বিপদ তাকে এমন খাটি ও পবিত্র করে দেয় যে, কিয়ামতের কোন বোঝা তার উপরে থাকে না। যেমন সোনা আগুনে দিলে খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে, দ্রুপ সেও দুনিয়ায় পাক সাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ মুমিনকে প্রত্যেক জিনিসেই পুণ্য দেয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর যন্ত্রণায়ও পুণ্য দেয়া হয়।’মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন বান্দার পাপ খুব বেশী হয়ে যায় এবং সে পাপসমূহ দূর করার মত অধিক সৎ আমল থাকে না তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর কোন দুঃখ নাযিল করেন যার ফলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা ঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলমানের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমনকি কাঁটা লাগলেও (ঐ কারণে গুনাহ মাফ হয়ে থাকে)।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীগণ রোদন করছিলেন এবং তাঁরা খুবই চিন্তান্বিত ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে এ কথা বলেছিলেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আমাদের এ রোগে কি পাবো?' তিনি বলেনঃ ‘এর ফলে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।' একথা শুনে হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ) প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত যেন জ্বর আমা হতে পৃথক না হয়। কিন্তু যেন আমি হজ্ব, উমরা, জিহাদ এবং জামাআতে নামায পড়া হতে বঞ্চিত না হই। তাঁর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়, তার শরীরে হাত লাগালে জ্বর অনুভূত হতো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ‘প্রত্যেকে মন্দ কার্যেরই কি প্রতিদান দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা, ঐ রকমই এবং অতটুকুই কিন্তু প্রত্যেক সৎ কার্যের প্রতিদান দশগুণ করে দেয়া হয়। সুতরাং সে ধ্বংস হয়ে গেল যার এক দশ হতে বেড়ে গেল (অর্থাৎ পাপের প্রতিদান সমান সমান এবং পুণ্যের প্রতিদান দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও পাপ বেশী থেকে গেল)'। (তাফসীর-ইইবনে মিরদুওয়াই) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা কাফিরকে বুঝান হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি একমাত্র কাফিরদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। (৩৪:১৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কার্যের ভাবার্থ হচ্ছে শিক” এরপর বলা হচ্ছে- এ ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। হাঁ, যদি সে তাওবা করে তাহলে সেটা অন্য কথা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, প্রত্যেক মন্দ কাজই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মন্দকার্যের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ কার্যের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মন্দকাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়াতেই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্যে উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এটা হতে র করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন।সত্যার্যাবলী আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে থাকেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর বা নারীর সৎকার্য তিনি নষ্ট করেন না। তবে শর্ত এই যে, হতে হবে মুসমলান। এ সৎলোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন। তাদের পুণ্য তিনি মোটেই কম হতে দেবেন না। বলা হয় খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশকে। (আরবী) বলা হয় খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের হালকা ছালকে। এ দু'টো থাকে খেজুরের আঁটির মধ্যে। আর বলা হয় ঐ আঁটির উপরের আবরণকে। কুরআন কারীমের মধ্যে এরূপ স্থলে এ তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-ওর চেয়ে উত্তম ধর্মের লোক আর কে হতে পারে যে স্বীয় আনন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে? ঈমানদারী ও সৎ। নিয়তে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সে সৎকর্মশীলও হয়। অর্থাৎ সে শরীয়তের অনুসারী, সত্যধর্ম ও সুপথের পথিক এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের উপর আমলকারী। প্রত্যেক ভাল কাজ গ্রহণীয় হওয়ার জন্যে এ দু'টি শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা ও অহী অনুযায়ী হওয়া। (আরবী) বা আন্তরিকতার ভাবার্থ এই যে, উদ্দেশ্য হবে শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আর সঠিক হওয়ার অর্থ এই যে, সেটা হবে শরীয়ত অনুযায়ী। সুতরাং বাহির তো কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হওয়ার মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। আর ভেতর সুসজ্জিত হয় সৎ নিয়তের দ্বারা। যদি এ দুটির মধ্যে মাত্র একটি না থাকে তবে আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তরিকতা না থাকলে কপটতা চলে আসে। তখন মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদেরকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই সেই অবস্থায় আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ না হলে পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়, ফলে তখনও আমল গ্রহণযোগ্যরূপে বিবেচিত হয় না। যেহেতু মুমিনের আমল লোক দেখানো হতে এবং শরীয়তের বিপরীত হওয়া থেকে মুক্ত হয় সেহেতু তার কাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ হয়ে থাকে। ঐ কাজই আল্লাহ পাক ভালবাসেন এবং সে জন্যেই তা মোচনের কারণ হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরেই বলেন-“তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুকরণ করে থাকে। অর্থাৎ তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তাঁর পদাংক অনুসরণ করবেন তাদের সকলের ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘ইবরাহীমের বেশী নিকটতম তারাই যারা তার অনুসারী এবং এ নবী (সঃ)।' (৩:৬৮) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্গত ছিল না। (১৬:১২৩)(আরবী) বলা হয় স্বেচ্ছায় শির্ক হতে অসন্তোষ প্রকাশকারীকে ও পূর্ণভাবে সত্যের দিকে মন সংযোগকারীকে, যাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দিতে পারে এবং দূরকারী দূর করতে পারে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে এবং প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তার গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর বন্ধু। অর্থাৎ বান্দা উন্নতি করতে করতে যে উচ্চতম পদ সোপান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সে সোপান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দরজা অপেক্ষা বড় দরজা আর নেই। এটা হচ্ছে প্রেমের উচ্চতম স্থান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর পূর্ণ আনুগত্য। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেই ইবরাহীম যে পুরোপুরি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। (৫৩:৩৭) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলী সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেছিলেন। কখনও তিনি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেননি। তাঁর ইবাদতে তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কোন কিছু তাঁকে তাঁর ইবাদত হতে বিরত রাখতে পারেনি। আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমকে কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন সে ঐগুলো পূর্ণ করে।' (২৪ ১২৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ) ছিল একাগ্রচিত্তে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (১৬:১২০)সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুআয (রাঃ) ইয়ামনে ফজরের নামাযে যখন -এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন একটি লোক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মায়ের চক্ষু ঠাণ্ডা হলো।'তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) খালীলুল্লাহ উপাধি হওয়ার কারণ এই যে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মিসরে বা মুসিলে তার এক বন্ধুর নিকট হতে কিছু খাদ্য-শস্য আনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু তথায় কিছু না পেয়ে শূন্য হস্তে ফিরে আসছিলেন। স্বীয় গ্রামের নিকটবর্তী হলে তার খেয়াল হয় যে, এ বালুর ঢিবি হতে কিছু বালু বস্তায় ভর্তি করা হোক এবং এটা বাড়ী নিয়ে গিয়ে পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এভাবে তিনি বস্তায় বালু ভরে নেন এবং সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নিয়ে বাড়ী মুখে রওয়ানা হন। মহান আল্লাহর কুদরতে সে বালু প্রকৃত আটা হয়ে যায়। তিনি বাড়ীতে পৌঁছে বস্তা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তার পরিবারের লোকেরা বস্তা খুলে দেখে যে, সেটা উত্তম আটায় পূর্ণ রয়েছে। আটা খামীর করে রুটি পাকান হয়। তিনি জাগ্রত হয়ে পরিবারের লোককে আনন্দিত দেখতে পান এবং রুটিও প্রস্তুত দেখেন। তখন তিনি বিস্মিতভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে আটা দিয়ে তোমরা রুটি তৈরী করলে তা পেলে কোথায়? তারা উত্তরে বলেঃ আপনি তো আপনার বন্ধুর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেন এবং তাদেরকে বলেনঃ হ্যাঁ, এটা আমি আমার বন্ধু মহান সম্মানিত আল্লাহর নিকট হতে এনেছি।' সুতরাং আল্লাহ তা'আলাও তাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। আর তাঁকে খালীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন? কিন্তু এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। খুব বেশী বললে এটাই বলা যাবে যে, এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণনা, যাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও বলতে পারি না। তাকে আল্লাহর বন্ধু বলার প্রকৃত কারণ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ছিল। আর ছিল তার প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য। তিনি স্বীয় ইবাদত দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নবীও (সঃ) তাঁর বিদায় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী হতাম তবে আবু বকর ইবনে আবূ কুহাফা (রাঃ)-কে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (আমি) হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যেমন হযরত ইবরাহীমকে স্বীয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দ্রুপ তিনি আমাকেও তার বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।'হযরত আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তার অপেক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছিল। কেউ বলছিলেনঃ ‘চমকপ্রদ কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুকের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। অন্য একজন বলেনঃ ‘এর চেয়েও বড় মেহেরবানী এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তিনি স্বয়ং কথা বলেছেন এবং তার কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। অপর একজন বলেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) তো হচ্ছেন আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা। আর একজন বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে এসে বলেনঃ “আমি তোমাদের কথা শুনেছি। নিশ্চয়ই তোমাদের কথা সত্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হচ্ছেন খালীলুল্লাহ, হযরত মূসা (আঃ) হচ্ছেন কালীমুল্লাহ, হযরত ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ এবং হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ। এ রকমই হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বটে। জেনে রেখো আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করছি, এটা কিন্তু অহংকার হিসেবে নয়। আমি বলছি যে, আমি হাবীবুল্লাহ। আমি হচ্ছি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে। আমিই প্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাতকারী। আল্লাহ তাআলা আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দেবেন এবং আমাকেও ওর ভেতরে প্রবিষ্ট করবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে দরিদ্র মুমিন লোকেরা। কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী সম্মানিত হবো আমিই। এটা গৌরবের বশবর্তী হয়ে বলছি, বরং ঘটনা অবহিত করার জন্য তোমাদেরকে বলছি।' এ সনদে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু এর সত্যতার কতক প্রমাণও বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময় বোধ করছো যে, বন্ধুত্ব ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে, কালাম ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্যে এবং দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর জন্যে। (মুসতাদরিক-ই-হাকীম) এ রকমই বর্ণনা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে এবং আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হতেও বর্ণিত আছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু গুরুজন হতেও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি অতিথিদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতেন। একদিন তিনি অতিথির খোজে বের হন। কিন্তু কোন অতিথি না পেয়ে ফিরে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখেন যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আপনাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিল কে?' লোকটি উত্তরে বলেনঃ ‘এ বাড়ীর প্রকৃত মালিক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কে?' তিনি বলেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দার নিকট এজন্যে পাঠিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, আমি যেন তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দেই।' এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলেনঃ ‘তাহলে আমাকে বলুন তো, সে মহা পুরুষ কে? আল্লাহর শপথ! তিনি এ দুনিয়ার কোন দূর প্রান্তে থাকলেও আমি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করবো এবং আমার অবশিষ্ট জীবন তার পদচুম্বনে কাটিয়ে দেবো।' এটা শুনে মৃত্যুর ফেরেশতা বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি আপনিই।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যিই কি আমি? ফেরেশতা বলেনঃ হ্যাঁ, আপনিই’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুনরায় ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আপনি এ কথাও বলুন তো, কিসের উপর ভিত্তি করে এবং কোন কার্যের বিনিময়ে তিনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মনোনীত করেছেন?' ফেরেশতা উত্তরে বলেনঃ কারণ এই যে, আপনি সকলকে দিতে থাকেন, কিন্তু আপনি কারও নিকট কিছু যাজ্ঞা করেন না।অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হতে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘খালীলুল্লাহ' এ বিশিষ্ট উপাধিতে ভূষিত করেন তখন হতে তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এতো বেশী জমে উঠেছিল যে, তার অন্তরের কম্পনের শব্দ দূর হতে এমনিভাবেই শুনা যেতো যেমনিভাবে মহাশূন্যে পাখীর উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনা যায়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্বন্ধেও এসেছে যে, যে সময় আল্লাহ তাআলার ভয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করতো তখন তার কান্নার শব্দ, যা তিনি দমন করে রাখতেন, দূরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী লোকেরা এমনিভাবেই শুনতে পেতো যেমনিভাবে কোন হাঁড়ির মধ্যে পানি টগবগ করে ফুটলে তা শুনা যায়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার অধিকারে রয়েছে এবং সবাই তার দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছে। সবই তাঁর সৃষ্ট। তথায় তিনি যখন যা করার ইচ্ছে করেন, বিনা বাধা-বিপত্তিতে তাই করে থাকেন। কারও সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে হতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কেউ তাঁর আদেশের সামনে প্রতিবন্ধক রূপে দাঁড়াতে পারে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ন্যায় বিচারক, মহা বিজ্ঞানময়, সূক্ষ্মদর্শী ও পরম দয়ালু। তিনি এক। কারও মুখাপেক্ষী তিনি নন। কোন লুক্কায়িত জিনিস, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিস এবং বহু দূরের জিনিস তাঁর নিকট গুপ্ত নেই। যা কিছু আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তার সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান।
আন-নিসা 4:127
সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, এ আয়াতে ঐ লোককে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে কোন পিতৃহীনা বালিকাকে লালন-পালন করে যার অভিভাবক উত্তরাধিকারী সে নিজেই এবং সে তার মালে অংশীদার হয়ে গেছে। এখন সে ঐ মেয়েটিকে নিজে বিয়ে করার ইচ্ছে করে বলে তাকে অন্য জায়গায় বিয়ে করতে বাধা প্রদান করে। এরূপ লোকের সম্বন্ধেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর যখন জনগণ পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ পিতৃহীন মেয়েদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেসা করে তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ (আরবী)-এ আয়াতে যা বলা হয়েছে এর দ্বারা (আরবী) (৪:৩)-এ প্রথম আয়াতটিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, পিতৃহীনা মেয়েদের অভিভাবক উত্তরাধিকারীগণ যখন ঐ মেয়েদের নিকট সম্পদ কম পেতো এবং তারা সুন্দরী না হতো তখন তারা তাদেরকে বিয়ে করা হতে বিরত থাকতো। আর তাদের মাল-ধন বেশী থাকলে এবং তারা সুন্দরী হলে তাদেরকে বিয়ে করতে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করতো। কিন্তু তাদের অন্য কোন অভিভাবক থাকতো না বলে ঐ অবস্থাতেও তাদেরকে তাদের মোহর ও অন্যান্য প্রাপ্য কম দিতে। তাই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করলেন যে, পিতৃহীনা বালিকাদেরকে তাদের মোহর ও অন্যান্য প্রাপ্য পুরোপুরি দেয়া ছাড়া বিয়ে করার অনুমতি নেই। উদ্দেশ্য এই যে, এরূপ পিতৃহীনা বালিকা, যাকে বিয়ে করা তার অভিভাবকের জন্যে বৈধ, তাকে তার সেই অভিভাবক বিয়ে করতে পারে। কিন্তু শর্ত এই যে, ঐ মেয়েটির বংশের অন্যান্য মেয়েরা তাদের বিয়েতে যে মোহর পেয়েছে সেই মোহর তাকেও দিতে হবে। যদি তা না দেয় তবে তার উচিত যে, সে যেন তাকে বিয়ে না করে।এ সূরার প্রথমকার এ বিষয়ের আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কখনও এমনও হয় যে, এ পিতৃহীনা বালিকার সেই অভিভাবক যার সাথে তার বিবাহ বৈধ, সে যে কোন কারণেই হোক তাকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু সে ভয় করে যে, যদি অন্য জায়গায় মেয়েটির বিয়ে দেয়া হয় তবে তার যে মালে তার অংশ রয়েছে। তা হাতছাড়া হয়ে যাবে, এ জন্যে সে মেয়েটিকে অন্য জায়গায় বিয়ে করতে বাধা দেয়। এ আয়াতে এ জঘন্য কাজ হতে নিষেধ করা হয়েছে।এও বর্ণিত আছে যে, অজ্ঞতার যুগে এ প্রথা ছিল-পিতৃহীনা বালিকার অভিভাবক যখন মেয়েটিকে তার অভিভাবকত্বে নিয়ে নিতো তখন সে তার উপরে একটা কাপড় ফেলে দিতো। তখন আর তাকে বিয়ে করার কারও কোন ক্ষমতা থাকতো না। এখন যদি সে সুশ্রী হতো তবে সে তাকে বিয়ে করে নিতে এবং তার মালও গলাধঃকরণ করতো। আর যদি সে বিশ্রী হতো, কিন্তু তার বহু মাল থাকতো তবে সে তাকে নিজেও বিয়ে করতো না এবং অন্য জায়গায় বিয়ে করতেও তাকে বাধা দিতো। ফলে মেয়েটি ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করতো এবং ঐ লোকটি তার মাল হস্তগত করতো। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ কাজে চরমভাবে বাধা দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর সাথে সাথে এটাও বর্ণিত আছে যে, অজ্ঞতা যুগের লোকেরা ছোট ছেলেদেরকে এবং বড় মেয়েদেরকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করতো। কুরআন কারীমে এ কু-প্রথার মূলেও কুঠারাঘাত করা হয়েছে। প্রত্যেককেই অংশ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ছেলে এবং মেয়ে ছোটই হোক বা বড়ই হোক তাদেরকে অংশ প্রদান কর তবে মেয়েকে অর্ধেক ও ছেলেকে পূর্ণ দাও। অর্থাৎ একটি ছেলেকে দু'টি মেয়ের সমান অংশ প্রদান কর। আর পিতৃহীনা মেয়েদের প্রতি ন্যায় বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। বলা হয়েছে-'যখন তোমরা সৌন্দর্য ও মালের অধিকারিণী পিতৃহীনা মেয়েদেরকে নিজেই বিয়ে করবে তখন যাদের মাল ও সৌন্দর্য কম আছে তাদেরকেও বিয়ে কর।’তারপর বলা হচ্ছে-তোমাদের সমুদয় কার্য সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা সম্যক অবগত আছেন। সুতরাং তোমাদের ভাল কাজ এবং আল্লাহ তা'আলার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে ভাল প্রতিদান গ্রহণ করা উচিত।
আন-নিসা 4:128
১২৮-১৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীর অবস্থাসমূহ এবং তাদের নির্দেশাবলীর নির্দেশ দিচ্ছেন। স্বামীরা কখনও কখনও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। তারা কখনও স্ত্রীদেরকে চায়, আবার কখনও পৃথক করে দেয়। সুতরাং যখন স্ত্রী তার স্বামীর অসন্তুষ্টির মনোভাব বুঝতে পারবে তখন যদি সে তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে তা সে করতে পারে। যেমন সে তার খাদ্য ও বস্ত্র ছেড়ে দেয় বা রাত্রি যাপনের হক ছেড়ে দেয় তবে উভয়ের জন্যে এটা বৈধ। অতঃপর ওরই প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন যে, সন্ধিই উত্তম। হযরত সাওদা বিনতে যামআ (রাঃ) যখন খুবই বৃদ্ধা হয়ে যান এবং বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে পৃথক করে দেয়ার ইচ্ছে রাখেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “আমি আমার পালার হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা স্বীকার করে নেন এবং এর উপরেই সন্ধি হয়ে যায় ।সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, স্বামী-স্ত্রী কোন কথার উপর একমত হলে তা বৈধ।' তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেন যাদের মধ্যে আটজনকে তিনি পালা (রাত্রি যাপনের পালা) বন্টন করে দিয়েছিলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সাওদা (রাঃ)-এর (রাত্রি যাপনের) পালার দিনটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে প্রদান করতেন। হযরত উরওয়া (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত সাওদা (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে যখন বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে পরিত্যাগ করার ইচ্ছে করেছেন তখন তিনি চিন্তা করেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর গাঢ় ভালবাসা রয়েছে। কাজেই যদি তিনি (সাওদা রাঃ) তাঁর (রাত্রি যাপনের) পালা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দেন তবে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্মত হয়ে যাবেন এতে বিস্ময়ের কি আছে? এবং তিনি তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী হয়েই থেকে যাবেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রি যাপনের ব্যাপারে সমস্ত স্ত্রীকে সমান অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণতঃ প্রত্যহ তিনি সকল স্ত্রীর নিকটে যেতেন, পার্শ্বে বসতেন, গল্প করতেন, কিন্তু স্পর্শ করতেন না। অবশেষে যার পালা থাকতো তাঁর ওখানেই রাত্রি যাপন করতেন। তারপরে তিনি হযরত সাওদা (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন, যা উপরে বর্ণিত হলো। (সুনান-ই-আবি দাউদ) মুজাম-ই-আবুল আব্বাসের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা (রাঃ)-এর নিকট তালাকের সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। হুযুর তথায় আগমন করলে হযরত সাওদা (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যে আল্লাহ আপনার উপর স্বীয় বাণী অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় মাখলুকের মধ্যে আপনাকে স্বীয় মনোনীত বান্দা করেছেন তাঁর শপথ! আপনি আমাকে ফিরিয়ে নিন। আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে। পুরুষের প্রতি আমার আর কোন আসক্তি নেই। কিন্তু আমার বাসনা এই যে, আমাকে যেন কিয়ামতের দিন আপনার স্ত্রীদের মধ্যে উঠান হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এতে সম্মত হন এবং তাকে ফিরিয়ে নেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার পালার দিন ও রাত্রি আপনার প্রিয় পত্নী হয়রত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছেঃ এর ভাবার্থ এই যে, কোন বৃদ্ধা স্ত্রী হয়তো তার স্বামীকে দেখে যে, সে তাকে ভালবাসে না বরং পৃথক করে দিতে চায়, তখন সে তাকে বলেঃ আমি আমার অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি, সুতরাং তুমি আমাকে পৃথক করো না।' এ আয়াতটি দু’জনকেই এ কাজের অনুমতি দিচ্ছে। ঐ সময়েও এ অবস্থা যখন কারো দু’টি স্ত্রী থাকবে এবং একটিকে সে তার বার্ধক্যের কারণে বা সে বিশ্রী হওয়ার কারণে তার সাথে ভালবাসা রাখবে না এবং ফলে তাকে তালাক দিয়ে দেয়ার ইচ্ছে করবে, কিন্তু ঐ স্ত্রী যে কোন কারণেই তার ঐ স্বামীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে ও পৃথক হয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করবে তখন তার এ অধিকার থাকবে যে, তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়ে তাকে তালাক দেয়া হতে বিরত থাকবে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ)-কে একটি প্রশ্ন করে। হযরত উমার (রাঃ) সেটা অপছন্দ করেন এবং তাকে চাবুক মেরে দেন। এরপর আর একটি লোক এ আয়াত সম্বন্ধে তাকে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, এটা জিজ্ঞাস্য বিষয়ই বটে। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে। ঐ অবস্থা যেমন একটি লোকের একটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে বৃদ্ধা হয়ে গেছে। তার আর ছেলে মেয়ে হয় না। তখন তার স্বামী একটি যুবতী নারীকে বিয়ে করে। এখন এ বৃদ্ধা স্ত্রী এবং তাঁর স্বামী যে কোন জিনিসের উপর একমত হয়ে গেলে সেটা বৈধ।হযরত আলী (রাঃ) এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ স্ত্রীকে বুঝান হয়েছে, যে তার বার্ধক্যের কারণে বা বিশ্রী হওয়ার কারণে অথবা দুশ্চরিত্রতার কারণে কিংবা অপরিচ্ছন্নতার কারণে তার স্বামীর নিকট দৃষ্টিকটু হয়ে গেছে, কিন্তু সে কামনা করে যে, তার স্বামী যেন তালাক না দেয়। এ অবস্থায় যদি সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে তার স্বামীর সাথে সন্ধি করে নেয় তবে তা করতে পারে।”পূর্ববর্তী মনীষীগণ ও ইমামগণ হতে বরাবরই এ তাফসীরই বর্ণিত আছে। এমনকি প্রায় সবাই এর উপর একমত এবং আমার ধারণায় তো এর বিরোধী কেউ নেই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম (রাঃ)-এর কন্যা হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজ (রাঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন। বার্ধক্যের কারণে বা অন্য কোন কারণে তার প্রতি তাঁর স্বামীর আকর্ষণ ছিল না। এমনকি তিনি তাকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করেন। তখন তিনি স্বীয় স্বামীকে বলেনঃ “আমাকে তালাক না দিয়ে বরং আপনি আমার নিকট যা চাইবেন আমি তাই দিতে সম্মত রয়েছি।" সে সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতদ্বয়ে ঐ স্ত্রীলোকটির বর্ণনা রয়েছে যার উপর তার স্বামীর মন চটে গেছে। তার স্বামীর উচিত যে, সে যেন তার ঐ স্ত্রীকে বলে দেয়-“তুমি ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দেবো। আর যদি তুমি আমার স্ত্রী হয়েই থাকতে চাও তবে আমি মাল বন্টনে এবং পালা বন্টনে তোমার উপর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে প্রাধান্য দেবো।” তখন ঐ স্ত্রীর যে কোন একটিকে মেনে নেয়ার অধিকার রয়েছে। সে যদি দ্বিতীয় কথাটি মেনে নেয় তবে তাকে রাত্রি যাপনের পালা না দেয়া স্বামীর জন্যে বৈধ। আর যে মোহর ইত্যাদি সে স্বামীর জন্যে ছেড়ে দিয়েছে সেটা নিজস্ব সম্পদ রূপে গ্রহণ করাও তার স্বামীর জন্য বৈধ।হযরত রাফে ইবনে খুদায়েজ আনসারী (রাঃ)-এর স্ত্রী যখন বৃদ্ধা হয়ে যান তখন তিনি এক নব যুবতীকে বিয়ে করেন। অতঃপর তিনি ঐ নব বিবাহিতা স্ত্রীকে পূর্বের স্ত্রীর উপর গুরুত্ব দিতে থাকেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাঁর পূর্ব স্ত্রী তালাক যাজ্ঞা করেন। হযরত রাফে' (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে তাকে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু এবারেও ঐ একই অবস্থা হয় যে তিনি যুবতী স্ত্রীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পূর্ব স্ত্রী আবার তালাক প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁকে এবারও তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু পুনরায় ফিরিয়ে নেন। এবারও অনুরূপ অবস্থাই ঘটে। অতঃপর ঐ স্ত্রী কসম দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে। তখন তিনি তাঁর ঐ বৃদ্ধা স্ত্রীকে বলেনঃ “চিন্তা করে দেখো, এটা কিন্তু শেষ তালাক। যদি তুমি চাও তবে আমি তালাক দিয়ে দেই, নতুবা এ অবস্থায় থাকাই স্বীকার করে নাও।” সুতরাং তিনি স্বীয় অধিকার ছেড়ে দিয়ে ঐভাবেই বাস করতে থাকেন। (আরবী) অর্থাৎ সন্ধি কল্যাণকর-এর একটি অর্থ নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছেঃ স্বামীর তার স্ত্রীকে এ অধিকার দেয়াসে ইচ্ছে করলে ঐভাবেই থাকবে যে, সে অন্য স্ত্রীর সমান অধিকার লাভ করবে না বা তালাক গ্রহণ করবে। এটা ওর চেয়ে উত্তম যে, সে তার স্ত্রীকে কিছু না বলেই অন্য স্ত্রীকে তার উপর প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এর চেয়ে উত্তম ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, স্ত্রী তার আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং ফলে স্বামী তাকে তালাক দেবে না, বরং পরস্পর মিলেমিশে থাকবে। এটা তালাক দেয়া ও নেয়া অপেক্ষা উত্তম। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা বিনতে জামাআ' (রাঃ)-কে স্বীয় স্ত্রী রূপেই রেখে দেন এবং তিনি তাঁর হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দেন। তার এ কার্যের মধ্যে তার উম্মতের জন্যে সুন্দর নমুনা রয়েছে যে, মনোমালিন্যের অবস্থাতেও তালাকের প্রশ্ন উঠবে না। যেহেতু আল্লাহ তা'আলার নিকট বিচ্ছেদ হতে সন্ধি উত্তম সেহেতু বলেছেন যে, সন্ধিই কল্যাণকর। এমন কি সুনান-ই-ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, সমস্ত হালাল জিনিসের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের অনুগ্রহ ও তাকওয়া প্রদর্শন করা অর্থাৎ স্ত্রীর অন্যায়কে ক্ষমা এবং তাকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তার পূর্ণ প্রাপ্য দিয়ে দেয়া এবং পালা ও লেন-দেনের ব্যাপারে সমতা রক্ষা খুবই উত্তম কাজ, যা আল্লাহ তা'আলা খুব ভালই জানেন। আর এর বিনিময়ে দেবেন তিনি উত্তম প্রতিদান।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা যদিও কামনা কর যে, তোমাদের কয়েকটি স্ত্রীর মধ্যে সর্বপ্রকারের ন্যায় ও সমতা বজায় রাখবে, তবুও তোমরা তা পারবে না। কেননা, তোমরা হয়তো একটি একটি করে রাত্রির পালা করে দিতে পার, কিন্তু প্রেম, চাহিদা, সঙ্গম ইত্যাদির সমতা কি রূপে রক্ষা করবে?ইবনে মুলাইকা (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন। এজন্যেই হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় স্ত্রীগণের মধ্যে সঠিকভাবে সমতা রক্ষা করে চলতেন। তথাপি তিনি আল্লাহ তা'আলার একনিষ্ঠ প্রার্থনা করতেনঃ “হে প্রভূ! এটা ঐ বন্টন যা আমার অধিকারে রয়েছে। এখন যেটা আমার অধিকারের বাইরে অর্থাৎ আন্তরিক সম্পর্ক, সে ব্যাপারে আপনি তিরস্কার করবেন না।” (সুনান-ই-আবি দাউদ) এর ইসনাদ বিশুদ্ধ, কিন্তু ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অন্য সনদে এটা মুরসাল রূপেও বর্ণিত আছে এবং ওটাই অধিকতর বিশুদ্ধ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- একদিকে সম্পূর্ণরূপে আসক্ত হয়ে পড়ো না যার ফলে অপর স্ত্রী দোদুল্যমান অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। কেননা সে সময় তার স্বামী থেকেও না থাকা হবে। তুমি তার থেকে সরে থাকবে অথচ সে তোমার পত্নীত্বের বন্ধনেই আবদ্ধ থাকবে। না তুমি তাকে তালাক দেবে যে, সে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারে, না তুমি তার সে হক আদায় করবে যে হক প্রত্যেক স্ত্রীর তার স্বামীর উপর রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার দুটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু একজনের দিকেই সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়েছে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার শরীরের অর্ধাংশ গোশত খসে পড়বে।” (মুসনাদ-ইআহমাদ ইত্যাদি) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মার’ পন্থায় হাম্মামের হাদীস ছাড়া জানা যায় না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা যদি তোমাদের কার্যের সংশোধন করে নাও এবং যতদূর তোমাদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায় ও সমতা রক্ষা কর ও সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চল তবে যদি কোন সময় কারও দিকে কিছু আস্ক্ত হয়েই পড়, সেটা তিনি ক্ষমা করে দেবেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তৃতীয় অবস্থা বর্ণনা করেছেন যে, যদি স্বামী-স্ত্রী বিছিন্ন হয়েই যায় তবে আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজন হতে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন। স্বামীকে তিনি এ স্ত্রী অপেক্ষা ভাল স্ত্রী দান করবেন এবং স্ত্রীকেও তিনি এ স্বামী অপেক্ষা ভাল স্বামী দান করবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ বড়ই প্রশস্ত, তিনি খুবই অনুগ্রহশীল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিজ্ঞানময়ও বটে। তাঁর সমস্ত কাজ এবং সমস্ত শরীয়ত পূর্ণ জ্ঞান ও নৈপুণ্যে ভরপুর।
আন-নিসা 4:129
১২৮-১৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীর অবস্থাসমূহ এবং তাদের নির্দেশাবলীর নির্দেশ দিচ্ছেন। স্বামীরা কখনও কখনও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। তারা কখনও স্ত্রীদেরকে চায়, আবার কখনও পৃথক করে দেয়। সুতরাং যখন স্ত্রী তার স্বামীর অসন্তুষ্টির মনোভাব বুঝতে পারবে তখন যদি সে তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে তা সে করতে পারে। যেমন সে তার খাদ্য ও বস্ত্র ছেড়ে দেয় বা রাত্রি যাপনের হক ছেড়ে দেয় তবে উভয়ের জন্যে এটা বৈধ। অতঃপর ওরই প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন যে, সন্ধিই উত্তম। হযরত সাওদা বিনতে যামআ (রাঃ) যখন খুবই বৃদ্ধা হয়ে যান এবং বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে পৃথক করে দেয়ার ইচ্ছে রাখেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “আমি আমার পালার হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা স্বীকার করে নেন এবং এর উপরেই সন্ধি হয়ে যায় ।সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, স্বামী-স্ত্রী কোন কথার উপর একমত হলে তা বৈধ।' তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেন যাদের মধ্যে আটজনকে তিনি পালা (রাত্রি যাপনের পালা) বন্টন করে দিয়েছিলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সাওদা (রাঃ)-এর (রাত্রি যাপনের) পালার দিনটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে প্রদান করতেন। হযরত উরওয়া (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত সাওদা (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে যখন বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে পরিত্যাগ করার ইচ্ছে করেছেন তখন তিনি চিন্তা করেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর গাঢ় ভালবাসা রয়েছে। কাজেই যদি তিনি (সাওদা রাঃ) তাঁর (রাত্রি যাপনের) পালা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দেন তবে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্মত হয়ে যাবেন এতে বিস্ময়ের কি আছে? এবং তিনি তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী হয়েই থেকে যাবেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রি যাপনের ব্যাপারে সমস্ত স্ত্রীকে সমান অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণতঃ প্রত্যহ তিনি সকল স্ত্রীর নিকটে যেতেন, পার্শ্বে বসতেন, গল্প করতেন, কিন্তু স্পর্শ করতেন না। অবশেষে যার পালা থাকতো তাঁর ওখানেই রাত্রি যাপন করতেন। তারপরে তিনি হযরত সাওদা (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন, যা উপরে বর্ণিত হলো। (সুনান-ই-আবি দাউদ) মুজাম-ই-আবুল আব্বাসের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা (রাঃ)-এর নিকট তালাকের সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। হুযুর তথায় আগমন করলে হযরত সাওদা (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যে আল্লাহ আপনার উপর স্বীয় বাণী অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় মাখলুকের মধ্যে আপনাকে স্বীয় মনোনীত বান্দা করেছেন তাঁর শপথ! আপনি আমাকে ফিরিয়ে নিন। আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে। পুরুষের প্রতি আমার আর কোন আসক্তি নেই। কিন্তু আমার বাসনা এই যে, আমাকে যেন কিয়ামতের দিন আপনার স্ত্রীদের মধ্যে উঠান হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এতে সম্মত হন এবং তাকে ফিরিয়ে নেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার পালার দিন ও রাত্রি আপনার প্রিয় পত্নী হয়রত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছেঃ এর ভাবার্থ এই যে, কোন বৃদ্ধা স্ত্রী হয়তো তার স্বামীকে দেখে যে, সে তাকে ভালবাসে না বরং পৃথক করে দিতে চায়, তখন সে তাকে বলেঃ আমি আমার অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি, সুতরাং তুমি আমাকে পৃথক করো না।' এ আয়াতটি দু’জনকেই এ কাজের অনুমতি দিচ্ছে। ঐ সময়েও এ অবস্থা যখন কারো দু’টি স্ত্রী থাকবে এবং একটিকে সে তার বার্ধক্যের কারণে বা সে বিশ্রী হওয়ার কারণে তার সাথে ভালবাসা রাখবে না এবং ফলে তাকে তালাক দিয়ে দেয়ার ইচ্ছে করবে, কিন্তু ঐ স্ত্রী যে কোন কারণেই তার ঐ স্বামীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে ও পৃথক হয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করবে তখন তার এ অধিকার থাকবে যে, তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়ে তাকে তালাক দেয়া হতে বিরত থাকবে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ)-কে একটি প্রশ্ন করে। হযরত উমার (রাঃ) সেটা অপছন্দ করেন এবং তাকে চাবুক মেরে দেন। এরপর আর একটি লোক এ আয়াত সম্বন্ধে তাকে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, এটা জিজ্ঞাস্য বিষয়ই বটে। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে। ঐ অবস্থা যেমন একটি লোকের একটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে বৃদ্ধা হয়ে গেছে। তার আর ছেলে মেয়ে হয় না। তখন তার স্বামী একটি যুবতী নারীকে বিয়ে করে। এখন এ বৃদ্ধা স্ত্রী এবং তাঁর স্বামী যে কোন জিনিসের উপর একমত হয়ে গেলে সেটা বৈধ।হযরত আলী (রাঃ) এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ স্ত্রীকে বুঝান হয়েছে, যে তার বার্ধক্যের কারণে বা বিশ্রী হওয়ার কারণে অথবা দুশ্চরিত্রতার কারণে কিংবা অপরিচ্ছন্নতার কারণে তার স্বামীর নিকট দৃষ্টিকটু হয়ে গেছে, কিন্তু সে কামনা করে যে, তার স্বামী যেন তালাক না দেয়। এ অবস্থায় যদি সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে তার স্বামীর সাথে সন্ধি করে নেয় তবে তা করতে পারে।”পূর্ববর্তী মনীষীগণ ও ইমামগণ হতে বরাবরই এ তাফসীরই বর্ণিত আছে। এমনকি প্রায় সবাই এর উপর একমত এবং আমার ধারণায় তো এর বিরোধী কেউ নেই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম (রাঃ)-এর কন্যা হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজ (রাঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন। বার্ধক্যের কারণে বা অন্য কোন কারণে তার প্রতি তাঁর স্বামীর আকর্ষণ ছিল না। এমনকি তিনি তাকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করেন। তখন তিনি স্বীয় স্বামীকে বলেনঃ “আমাকে তালাক না দিয়ে বরং আপনি আমার নিকট যা চাইবেন আমি তাই দিতে সম্মত রয়েছি।" সে সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতদ্বয়ে ঐ স্ত্রীলোকটির বর্ণনা রয়েছে যার উপর তার স্বামীর মন চটে গেছে। তার স্বামীর উচিত যে, সে যেন তার ঐ স্ত্রীকে বলে দেয়-“তুমি ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দেবো। আর যদি তুমি আমার স্ত্রী হয়েই থাকতে চাও তবে আমি মাল বন্টনে এবং পালা বন্টনে তোমার উপর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে প্রাধান্য দেবো।” তখন ঐ স্ত্রীর যে কোন একটিকে মেনে নেয়ার অধিকার রয়েছে। সে যদি দ্বিতীয় কথাটি মেনে নেয় তবে তাকে রাত্রি যাপনের পালা না দেয়া স্বামীর জন্যে বৈধ। আর যে মোহর ইত্যাদি সে স্বামীর জন্যে ছেড়ে দিয়েছে সেটা নিজস্ব সম্পদ রূপে গ্রহণ করাও তার স্বামীর জন্য বৈধ।হযরত রাফে ইবনে খুদায়েজ আনসারী (রাঃ)-এর স্ত্রী যখন বৃদ্ধা হয়ে যান তখন তিনি এক নব যুবতীকে বিয়ে করেন। অতঃপর তিনি ঐ নব বিবাহিতা স্ত্রীকে পূর্বের স্ত্রীর উপর গুরুত্ব দিতে থাকেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাঁর পূর্ব স্ত্রী তালাক যাজ্ঞা করেন। হযরত রাফে' (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে তাকে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু এবারেও ঐ একই অবস্থা হয় যে তিনি যুবতী স্ত্রীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পূর্ব স্ত্রী আবার তালাক প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁকে এবারও তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু পুনরায় ফিরিয়ে নেন। এবারও অনুরূপ অবস্থাই ঘটে। অতঃপর ঐ স্ত্রী কসম দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে। তখন তিনি তাঁর ঐ বৃদ্ধা স্ত্রীকে বলেনঃ “চিন্তা করে দেখো, এটা কিন্তু শেষ তালাক। যদি তুমি চাও তবে আমি তালাক দিয়ে দেই, নতুবা এ অবস্থায় থাকাই স্বীকার করে নাও।” সুতরাং তিনি স্বীয় অধিকার ছেড়ে দিয়ে ঐভাবেই বাস করতে থাকেন। (আরবী) অর্থাৎ সন্ধি কল্যাণকর-এর একটি অর্থ নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছেঃ স্বামীর তার স্ত্রীকে এ অধিকার দেয়াসে ইচ্ছে করলে ঐভাবেই থাকবে যে, সে অন্য স্ত্রীর সমান অধিকার লাভ করবে না বা তালাক গ্রহণ করবে। এটা ওর চেয়ে উত্তম যে, সে তার স্ত্রীকে কিছু না বলেই অন্য স্ত্রীকে তার উপর প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এর চেয়ে উত্তম ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, স্ত্রী তার আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং ফলে স্বামী তাকে তালাক দেবে না, বরং পরস্পর মিলেমিশে থাকবে। এটা তালাক দেয়া ও নেয়া অপেক্ষা উত্তম। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা বিনতে জামাআ' (রাঃ)-কে স্বীয় স্ত্রী রূপেই রেখে দেন এবং তিনি তাঁর হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দেন। তার এ কার্যের মধ্যে তার উম্মতের জন্যে সুন্দর নমুনা রয়েছে যে, মনোমালিন্যের অবস্থাতেও তালাকের প্রশ্ন উঠবে না। যেহেতু আল্লাহ তা'আলার নিকট বিচ্ছেদ হতে সন্ধি উত্তম সেহেতু বলেছেন যে, সন্ধিই কল্যাণকর। এমন কি সুনান-ই-ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, সমস্ত হালাল জিনিসের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের অনুগ্রহ ও তাকওয়া প্রদর্শন করা অর্থাৎ স্ত্রীর অন্যায়কে ক্ষমা এবং তাকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তার পূর্ণ প্রাপ্য দিয়ে দেয়া এবং পালা ও লেন-দেনের ব্যাপারে সমতা রক্ষা খুবই উত্তম কাজ, যা আল্লাহ তা'আলা খুব ভালই জানেন। আর এর বিনিময়ে দেবেন তিনি উত্তম প্রতিদান।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা যদিও কামনা কর যে, তোমাদের কয়েকটি স্ত্রীর মধ্যে সর্বপ্রকারের ন্যায় ও সমতা বজায় রাখবে, তবুও তোমরা তা পারবে না। কেননা, তোমরা হয়তো একটি একটি করে রাত্রির পালা করে দিতে পার, কিন্তু প্রেম, চাহিদা, সঙ্গম ইত্যাদির সমতা কি রূপে রক্ষা করবে?ইবনে মুলাইকা (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন। এজন্যেই হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় স্ত্রীগণের মধ্যে সঠিকভাবে সমতা রক্ষা করে চলতেন। তথাপি তিনি আল্লাহ তা'আলার একনিষ্ঠ প্রার্থনা করতেনঃ “হে প্রভূ! এটা ঐ বন্টন যা আমার অধিকারে রয়েছে। এখন যেটা আমার অধিকারের বাইরে অর্থাৎ আন্তরিক সম্পর্ক, সে ব্যাপারে আপনি তিরস্কার করবেন না।” (সুনান-ই-আবি দাউদ) এর ইসনাদ বিশুদ্ধ, কিন্তু ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অন্য সনদে এটা মুরসাল রূপেও বর্ণিত আছে এবং ওটাই অধিকতর বিশুদ্ধ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- একদিকে সম্পূর্ণরূপে আসক্ত হয়ে পড়ো না যার ফলে অপর স্ত্রী দোদুল্যমান অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। কেননা সে সময় তার স্বামী থেকেও না থাকা হবে। তুমি তার থেকে সরে থাকবে অথচ সে তোমার পত্নীত্বের বন্ধনেই আবদ্ধ থাকবে। না তুমি তাকে তালাক দেবে যে, সে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারে, না তুমি তার সে হক আদায় করবে যে হক প্রত্যেক স্ত্রীর তার স্বামীর উপর রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার দুটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু একজনের দিকেই সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়েছে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার শরীরের অর্ধাংশ গোশত খসে পড়বে।” (মুসনাদ-ইআহমাদ ইত্যাদি) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মার’ পন্থায় হাম্মামের হাদীস ছাড়া জানা যায় না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা যদি তোমাদের কার্যের সংশোধন করে নাও এবং যতদূর তোমাদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায় ও সমতা রক্ষা কর ও সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চল তবে যদি কোন সময় কারও দিকে কিছু আস্ক্ত হয়েই পড়, সেটা তিনি ক্ষমা করে দেবেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তৃতীয় অবস্থা বর্ণনা করেছেন যে, যদি স্বামী-স্ত্রী বিছিন্ন হয়েই যায় তবে আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজন হতে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন। স্বামীকে তিনি এ স্ত্রী অপেক্ষা ভাল স্ত্রী দান করবেন এবং স্ত্রীকেও তিনি এ স্বামী অপেক্ষা ভাল স্বামী দান করবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ বড়ই প্রশস্ত, তিনি খুবই অনুগ্রহশীল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিজ্ঞানময়ও বটে। তাঁর সমস্ত কাজ এবং সমস্ত শরীয়ত পূর্ণ জ্ঞান ও নৈপুণ্যে ভরপুর।
আন-নিসা 4:130
১২৮-১৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীর অবস্থাসমূহ এবং তাদের নির্দেশাবলীর নির্দেশ দিচ্ছেন। স্বামীরা কখনও কখনও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। তারা কখনও স্ত্রীদেরকে চায়, আবার কখনও পৃথক করে দেয়। সুতরাং যখন স্ত্রী তার স্বামীর অসন্তুষ্টির মনোভাব বুঝতে পারবে তখন যদি সে তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে তা সে করতে পারে। যেমন সে তার খাদ্য ও বস্ত্র ছেড়ে দেয় বা রাত্রি যাপনের হক ছেড়ে দেয় তবে উভয়ের জন্যে এটা বৈধ। অতঃপর ওরই প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন যে, সন্ধিই উত্তম। হযরত সাওদা বিনতে যামআ (রাঃ) যখন খুবই বৃদ্ধা হয়ে যান এবং বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে পৃথক করে দেয়ার ইচ্ছে রাখেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “আমি আমার পালার হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা স্বীকার করে নেন এবং এর উপরেই সন্ধি হয়ে যায় ।সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, স্বামী-স্ত্রী কোন কথার উপর একমত হলে তা বৈধ।' তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেন যাদের মধ্যে আটজনকে তিনি পালা (রাত্রি যাপনের পালা) বন্টন করে দিয়েছিলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সাওদা (রাঃ)-এর (রাত্রি যাপনের) পালার দিনটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে প্রদান করতেন। হযরত উরওয়া (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত সাওদা (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে যখন বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে পরিত্যাগ করার ইচ্ছে করেছেন তখন তিনি চিন্তা করেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর গাঢ় ভালবাসা রয়েছে। কাজেই যদি তিনি (সাওদা রাঃ) তাঁর (রাত্রি যাপনের) পালা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দেন তবে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্মত হয়ে যাবেন এতে বিস্ময়ের কি আছে? এবং তিনি তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী হয়েই থেকে যাবেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রি যাপনের ব্যাপারে সমস্ত স্ত্রীকে সমান অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণতঃ প্রত্যহ তিনি সকল স্ত্রীর নিকটে যেতেন, পার্শ্বে বসতেন, গল্প করতেন, কিন্তু স্পর্শ করতেন না। অবশেষে যার পালা থাকতো তাঁর ওখানেই রাত্রি যাপন করতেন। তারপরে তিনি হযরত সাওদা (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন, যা উপরে বর্ণিত হলো। (সুনান-ই-আবি দাউদ) মুজাম-ই-আবুল আব্বাসের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা (রাঃ)-এর নিকট তালাকের সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। হুযুর তথায় আগমন করলে হযরত সাওদা (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যে আল্লাহ আপনার উপর স্বীয় বাণী অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় মাখলুকের মধ্যে আপনাকে স্বীয় মনোনীত বান্দা করেছেন তাঁর শপথ! আপনি আমাকে ফিরিয়ে নিন। আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে। পুরুষের প্রতি আমার আর কোন আসক্তি নেই। কিন্তু আমার বাসনা এই যে, আমাকে যেন কিয়ামতের দিন আপনার স্ত্রীদের মধ্যে উঠান হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এতে সম্মত হন এবং তাকে ফিরিয়ে নেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার পালার দিন ও রাত্রি আপনার প্রিয় পত্নী হয়রত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছেঃ এর ভাবার্থ এই যে, কোন বৃদ্ধা স্ত্রী হয়তো তার স্বামীকে দেখে যে, সে তাকে ভালবাসে না বরং পৃথক করে দিতে চায়, তখন সে তাকে বলেঃ আমি আমার অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি, সুতরাং তুমি আমাকে পৃথক করো না।' এ আয়াতটি দু’জনকেই এ কাজের অনুমতি দিচ্ছে। ঐ সময়েও এ অবস্থা যখন কারো দু’টি স্ত্রী থাকবে এবং একটিকে সে তার বার্ধক্যের কারণে বা সে বিশ্রী হওয়ার কারণে তার সাথে ভালবাসা রাখবে না এবং ফলে তাকে তালাক দিয়ে দেয়ার ইচ্ছে করবে, কিন্তু ঐ স্ত্রী যে কোন কারণেই তার ঐ স্বামীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে ও পৃথক হয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করবে তখন তার এ অধিকার থাকবে যে, তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়ে তাকে তালাক দেয়া হতে বিরত থাকবে।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ)-কে একটি প্রশ্ন করে। হযরত উমার (রাঃ) সেটা অপছন্দ করেন এবং তাকে চাবুক মেরে দেন। এরপর আর একটি লোক এ আয়াত সম্বন্ধে তাকে জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, এটা জিজ্ঞাস্য বিষয়ই বটে। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে। ঐ অবস্থা যেমন একটি লোকের একটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে বৃদ্ধা হয়ে গেছে। তার আর ছেলে মেয়ে হয় না। তখন তার স্বামী একটি যুবতী নারীকে বিয়ে করে। এখন এ বৃদ্ধা স্ত্রী এবং তাঁর স্বামী যে কোন জিনিসের উপর একমত হয়ে গেলে সেটা বৈধ।হযরত আলী (রাঃ) এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ স্ত্রীকে বুঝান হয়েছে, যে তার বার্ধক্যের কারণে বা বিশ্রী হওয়ার কারণে অথবা দুশ্চরিত্রতার কারণে কিংবা অপরিচ্ছন্নতার কারণে তার স্বামীর নিকট দৃষ্টিকটু হয়ে গেছে, কিন্তু সে কামনা করে যে, তার স্বামী যেন তালাক না দেয়। এ অবস্থায় যদি সে তার সমস্ত প্রাপ্য বা আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দিয়ে তার স্বামীর সাথে সন্ধি করে নেয় তবে তা করতে পারে।”পূর্ববর্তী মনীষীগণ ও ইমামগণ হতে বরাবরই এ তাফসীরই বর্ণিত আছে। এমনকি প্রায় সবাই এর উপর একমত এবং আমার ধারণায় তো এর বিরোধী কেউ নেই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম (রাঃ)-এর কন্যা হযরত রাফে' ইবনে খুদায়েজ (রাঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন। বার্ধক্যের কারণে বা অন্য কোন কারণে তার প্রতি তাঁর স্বামীর আকর্ষণ ছিল না। এমনকি তিনি তাকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করেন। তখন তিনি স্বীয় স্বামীকে বলেনঃ “আমাকে তালাক না দিয়ে বরং আপনি আমার নিকট যা চাইবেন আমি তাই দিতে সম্মত রয়েছি।" সে সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতদ্বয়ে ঐ স্ত্রীলোকটির বর্ণনা রয়েছে যার উপর তার স্বামীর মন চটে গেছে। তার স্বামীর উচিত যে, সে যেন তার ঐ স্ত্রীকে বলে দেয়-“তুমি ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দেবো। আর যদি তুমি আমার স্ত্রী হয়েই থাকতে চাও তবে আমি মাল বন্টনে এবং পালা বন্টনে তোমার উপর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে প্রাধান্য দেবো।” তখন ঐ স্ত্রীর যে কোন একটিকে মেনে নেয়ার অধিকার রয়েছে। সে যদি দ্বিতীয় কথাটি মেনে নেয় তবে তাকে রাত্রি যাপনের পালা না দেয়া স্বামীর জন্যে বৈধ। আর যে মোহর ইত্যাদি সে স্বামীর জন্যে ছেড়ে দিয়েছে সেটা নিজস্ব সম্পদ রূপে গ্রহণ করাও তার স্বামীর জন্য বৈধ।হযরত রাফে ইবনে খুদায়েজ আনসারী (রাঃ)-এর স্ত্রী যখন বৃদ্ধা হয়ে যান তখন তিনি এক নব যুবতীকে বিয়ে করেন। অতঃপর তিনি ঐ নব বিবাহিতা স্ত্রীকে পূর্বের স্ত্রীর উপর গুরুত্ব দিতে থাকেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাঁর পূর্ব স্ত্রী তালাক যাজ্ঞা করেন। হযরত রাফে' (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে তাকে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু এবারেও ঐ একই অবস্থা হয় যে তিনি যুবতী স্ত্রীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পূর্ব স্ত্রী আবার তালাক প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁকে এবারও তালাক দিয়ে দেন। কিন্তু পুনরায় ফিরিয়ে নেন। এবারও অনুরূপ অবস্থাই ঘটে। অতঃপর ঐ স্ত্রী কসম দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে। তখন তিনি তাঁর ঐ বৃদ্ধা স্ত্রীকে বলেনঃ “চিন্তা করে দেখো, এটা কিন্তু শেষ তালাক। যদি তুমি চাও তবে আমি তালাক দিয়ে দেই, নতুবা এ অবস্থায় থাকাই স্বীকার করে নাও।” সুতরাং তিনি স্বীয় অধিকার ছেড়ে দিয়ে ঐভাবেই বাস করতে থাকেন। (আরবী) অর্থাৎ সন্ধি কল্যাণকর-এর একটি অর্থ নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছেঃ স্বামীর তার স্ত্রীকে এ অধিকার দেয়াসে ইচ্ছে করলে ঐভাবেই থাকবে যে, সে অন্য স্ত্রীর সমান অধিকার লাভ করবে না বা তালাক গ্রহণ করবে। এটা ওর চেয়ে উত্তম যে, সে তার স্ত্রীকে কিছু না বলেই অন্য স্ত্রীকে তার উপর প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এর চেয়ে উত্তম ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, স্ত্রী তার আংশিক প্রাপ্য ছেড়ে দেবে এবং ফলে স্বামী তাকে তালাক দেবে না, বরং পরস্পর মিলেমিশে থাকবে। এটা তালাক দেয়া ও নেয়া অপেক্ষা উত্তম। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাওদা বিনতে জামাআ' (রাঃ)-কে স্বীয় স্ত্রী রূপেই রেখে দেন এবং তিনি তাঁর হক হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দান করে দেন। তার এ কার্যের মধ্যে তার উম্মতের জন্যে সুন্দর নমুনা রয়েছে যে, মনোমালিন্যের অবস্থাতেও তালাকের প্রশ্ন উঠবে না। যেহেতু আল্লাহ তা'আলার নিকট বিচ্ছেদ হতে সন্ধি উত্তম সেহেতু বলেছেন যে, সন্ধিই কল্যাণকর। এমন কি সুনান-ই-ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, সমস্ত হালাল জিনিসের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের অনুগ্রহ ও তাকওয়া প্রদর্শন করা অর্থাৎ স্ত্রীর অন্যায়কে ক্ষমা এবং তাকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তার পূর্ণ প্রাপ্য দিয়ে দেয়া এবং পালা ও লেন-দেনের ব্যাপারে সমতা রক্ষা খুবই উত্তম কাজ, যা আল্লাহ তা'আলা খুব ভালই জানেন। আর এর বিনিময়ে দেবেন তিনি উত্তম প্রতিদান।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা যদিও কামনা কর যে, তোমাদের কয়েকটি স্ত্রীর মধ্যে সর্বপ্রকারের ন্যায় ও সমতা বজায় রাখবে, তবুও তোমরা তা পারবে না। কেননা, তোমরা হয়তো একটি একটি করে রাত্রির পালা করে দিতে পার, কিন্তু প্রেম, চাহিদা, সঙ্গম ইত্যাদির সমতা কি রূপে রক্ষা করবে?ইবনে মুলাইকা (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন। এজন্যেই হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় স্ত্রীগণের মধ্যে সঠিকভাবে সমতা রক্ষা করে চলতেন। তথাপি তিনি আল্লাহ তা'আলার একনিষ্ঠ প্রার্থনা করতেনঃ “হে প্রভূ! এটা ঐ বন্টন যা আমার অধিকারে রয়েছে। এখন যেটা আমার অধিকারের বাইরে অর্থাৎ আন্তরিক সম্পর্ক, সে ব্যাপারে আপনি তিরস্কার করবেন না।” (সুনান-ই-আবি দাউদ) এর ইসনাদ বিশুদ্ধ, কিন্তু ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অন্য সনদে এটা মুরসাল রূপেও বর্ণিত আছে এবং ওটাই অধিকতর বিশুদ্ধ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- একদিকে সম্পূর্ণরূপে আসক্ত হয়ে পড়ো না যার ফলে অপর স্ত্রী দোদুল্যমান অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। কেননা সে সময় তার স্বামী থেকেও না থাকা হবে। তুমি তার থেকে সরে থাকবে অথচ সে তোমার পত্নীত্বের বন্ধনেই আবদ্ধ থাকবে। না তুমি তাকে তালাক দেবে যে, সে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারে, না তুমি তার সে হক আদায় করবে যে হক প্রত্যেক স্ত্রীর তার স্বামীর উপর রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার দুটি স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু একজনের দিকেই সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়েছে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার শরীরের অর্ধাংশ গোশত খসে পড়বে।” (মুসনাদ-ইআহমাদ ইত্যাদি) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মার’ পন্থায় হাম্মামের হাদীস ছাড়া জানা যায় না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমরা যদি তোমাদের কার্যের সংশোধন করে নাও এবং যতদূর তোমাদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায় ও সমতা রক্ষা কর ও সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চল তবে যদি কোন সময় কারও দিকে কিছু আস্ক্ত হয়েই পড়, সেটা তিনি ক্ষমা করে দেবেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা তৃতীয় অবস্থা বর্ণনা করেছেন যে, যদি স্বামী-স্ত্রী বিছিন্ন হয়েই যায় তবে আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজন হতে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন। স্বামীকে তিনি এ স্ত্রী অপেক্ষা ভাল স্ত্রী দান করবেন এবং স্ত্রীকেও তিনি এ স্বামী অপেক্ষা ভাল স্বামী দান করবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ বড়ই প্রশস্ত, তিনি খুবই অনুগ্রহশীল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিজ্ঞানময়ও বটে। তাঁর সমস্ত কাজ এবং সমস্ত শরীয়ত পূর্ণ জ্ঞান ও নৈপুণ্যে ভরপুর।
আন-নিসা 4:131
১৩১-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র অধিকারী তিনিই। তিনি বলেন-যে নির্দেশাবলী তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তার একত্বে বিশ্বাস করবে, তার ইবাদত করবে এবং তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না, এ নির্দেশাবলীই তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবকেও দেয়া হয়েছিল। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে তাঁর কি ক্ষতি করতে পারবে? তিনি তো একাই আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। যেমন হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় গোত্রের লোককে বলেছিলেনঃ যদি তোমরা ও সারা জগতের লোক আল্লাহকে অস্বীকার কর তবুও তিনি তোমাদের হতে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার যোগ্য। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা অস্বীকার করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহ তাদের হতে অমুখাপেক্ষী হয়েছিলেন, তিনি বড়ই অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসিত। (৬৪:৬)বলা হচ্ছে-তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের মালিক ও তিনি প্রত্যেকের সমস্ত কার্যের উপর সাক্ষী। কোন কিছুই তার অজানা নেই। তিনি এ ক্ষমতাও রাখেন যে, তোমরা যদি তার অবাধ্যাচরণ কর তবে তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের স্থলে অন্য মাখলুক আনয়ন করবেন।যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য সম্প্রদায়কে আনয়ন করবেন যারা তোমাদের মত হবে না। (৪৭:৩৮)পূর্ব যুগের কোন একজন মনীষী বলেনঃ “তোমরা এ আয়াতটি সম্বন্ধে গবেষণা কর যে, পাপী বান্দারা আল্লাহ তা'আলার নিকট কত তুচ্ছ?' এ আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট এ কাজ মমাটেই কঠিন নয়! অতঃপর তিনি বলেন-হে ঐ ব্যক্তি! যার মনোবাসনা ও চেষ্টা একমাত্র দুনিয়ার জন্যে সে যেন জেনে নেয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার অধিকারেই রয়েছে। সুতরাং যখন তুমি তার নিকট দু'টোই যাজ্ঞা করবে তখন তিনি তোমাদেরকে দু'টোই দান করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং পরিতৃপ্ত করবেন। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আপনি দুনিয়া দান করুন, তাদের জন্য পরকালের কোনই অংশ। নেই। আর তাদের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ায় মঙ্গল দান করুন এবং পরকালেও মঙ্গল দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন। এদের জন্যে ঐ অংশ রয়েছে। যা তারা অর্জন করেছে।' (২:২০০-২০২) আর এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পরকালের ক্ষেত্রের আকাঙ্খ করে আমি তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করে দেবো।' (৪২৪ ২০) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়া যাা করে, তখন আমি যাকে চাই ও যত চাই দুনিয়ায় প্রদান করে থাকি।' (১৭:১৮) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) -এ আয়াতের ভাবার্থ। এই বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকরা দুনিয়া অনুসন্ধানে ঈমান কবুল করেছিল, তারা দুনিয়া পেয়ে যায় বটে, অর্থাৎ মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধলব্ধ মালে অংশীদার হয়ে যায়, কিন্তু পরকালে তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট যা তৈরী রয়েছে তা সেখানে তারা পেয়ে যাবে। অর্থাৎ জান্নামের অগ্নি ও তথাকার বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। সুতরাং উক্ত ইমাম সাহেবের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (১১:১৫) -এ আয়াতটির মতই। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ আয়াতের অর্থ তো বাহ্যতঃ এটাই, কিন্তু প্রথম আয়াতটিকেও এ অর্থে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ আয়াতের শব্দগুলো ততা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল দান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন তার জীবনটা একটি জিনিসের অনুসন্ধানেই শেষ করে না দেয়। বরং সে যেন দুটো জিনিসই লাভ করার জন্যে সচেষ্ট হয়।বলা হচ্ছে-যে তোমাদেরকে দুনিয়া দিচ্ছেন, আখিরাতের অধিকারীও তিনিই। এটা বড়ই কাপুরুষতার পরিচয় যে, তোমরা তোমাদের চক্ষু বন্ধ করে নেবে এবং অধিক প্রদানকারীর নিকট অল্প যাজ্ঞা করবে। না, না বরং তোমরা ইহকাল ও পরকালের বড় বড় কাজ ও উত্তম উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা কর। স্বীয় লক্ষ্যস্থল শুধু দুনিয়াকে বানিয়ে নিও না, বরং উচ্চাকাঙ্খর দ্বারা দৃষ্টি প্রসারিত করতঃ উভয় জগতে শান্তি লাভের চেষ্টা কর। মনে রেখ যে, উভয় জগতেরই মালিক তিনিই। প্রত্যেক লাভ ও ক্ষতি তারই হাতে রয়েছে। এমন কেউ নেই যে, তার অংশীদার হতে পারে কিংবা তাঁর কার্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তিনিই বন্টন করেছেন। ধন ভাণ্ডারের চাবিগুলো তিনি স্বীয় হস্তে রেখেছেন। তিনি প্রত্যেক হকদারকেই চেনেন এবং যে যার হকদার তিনি তাকে তাই পৌছিয়ে থাকেন। তোমাদের তো এটা চিন্তা করা উচিত যে, যিনি তোমাদেরকে দেখবার শুনবার ক্ষমতা দান করেছেন, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ কেমন হতে পারে।
আন-নিসা 4:132
১৩১-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র অধিকারী তিনিই। তিনি বলেন-যে নির্দেশাবলী তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তার একত্বে বিশ্বাস করবে, তার ইবাদত করবে এবং তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না, এ নির্দেশাবলীই তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবকেও দেয়া হয়েছিল। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে তাঁর কি ক্ষতি করতে পারবে? তিনি তো একাই আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। যেমন হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় গোত্রের লোককে বলেছিলেনঃ যদি তোমরা ও সারা জগতের লোক আল্লাহকে অস্বীকার কর তবুও তিনি তোমাদের হতে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার যোগ্য। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা অস্বীকার করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহ তাদের হতে অমুখাপেক্ষী হয়েছিলেন, তিনি বড়ই অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসিত। (৬৪:৬)বলা হচ্ছে-তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের মালিক ও তিনি প্রত্যেকের সমস্ত কার্যের উপর সাক্ষী। কোন কিছুই তার অজানা নেই। তিনি এ ক্ষমতাও রাখেন যে, তোমরা যদি তার অবাধ্যাচরণ কর তবে তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের স্থলে অন্য মাখলুক আনয়ন করবেন।যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য সম্প্রদায়কে আনয়ন করবেন যারা তোমাদের মত হবে না। (৪৭:৩৮)পূর্ব যুগের কোন একজন মনীষী বলেনঃ “তোমরা এ আয়াতটি সম্বন্ধে গবেষণা কর যে, পাপী বান্দারা আল্লাহ তা'আলার নিকট কত তুচ্ছ?' এ আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট এ কাজ মমাটেই কঠিন নয়! অতঃপর তিনি বলেন-হে ঐ ব্যক্তি! যার মনোবাসনা ও চেষ্টা একমাত্র দুনিয়ার জন্যে সে যেন জেনে নেয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার অধিকারেই রয়েছে। সুতরাং যখন তুমি তার নিকট দু'টোই যাজ্ঞা করবে তখন তিনি তোমাদেরকে দু'টোই দান করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং পরিতৃপ্ত করবেন। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আপনি দুনিয়া দান করুন, তাদের জন্য পরকালের কোনই অংশ। নেই। আর তাদের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ায় মঙ্গল দান করুন এবং পরকালেও মঙ্গল দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন। এদের জন্যে ঐ অংশ রয়েছে। যা তারা অর্জন করেছে।' (২:২০০-২০২) আর এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পরকালের ক্ষেত্রের আকাঙ্খ করে আমি তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করে দেবো।' (৪২৪ ২০) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়া যাা করে, তখন আমি যাকে চাই ও যত চাই দুনিয়ায় প্রদান করে থাকি।' (১৭:১৮) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) -এ আয়াতের ভাবার্থ। এই বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকরা দুনিয়া অনুসন্ধানে ঈমান কবুল করেছিল, তারা দুনিয়া পেয়ে যায় বটে, অর্থাৎ মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধলব্ধ মালে অংশীদার হয়ে যায়, কিন্তু পরকালে তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট যা তৈরী রয়েছে তা সেখানে তারা পেয়ে যাবে। অর্থাৎ জান্নামের অগ্নি ও তথাকার বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। সুতরাং উক্ত ইমাম সাহেবের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (১১:১৫) -এ আয়াতটির মতই। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ আয়াতের অর্থ তো বাহ্যতঃ এটাই, কিন্তু প্রথম আয়াতটিকেও এ অর্থে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ আয়াতের শব্দগুলো ততা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল দান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন তার জীবনটা একটি জিনিসের অনুসন্ধানেই শেষ করে না দেয়। বরং সে যেন দুটো জিনিসই লাভ করার জন্যে সচেষ্ট হয়।বলা হচ্ছে-যে তোমাদেরকে দুনিয়া দিচ্ছেন, আখিরাতের অধিকারীও তিনিই। এটা বড়ই কাপুরুষতার পরিচয় যে, তোমরা তোমাদের চক্ষু বন্ধ করে নেবে এবং অধিক প্রদানকারীর নিকট অল্প যাজ্ঞা করবে। না, না বরং তোমরা ইহকাল ও পরকালের বড় বড় কাজ ও উত্তম উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা কর। স্বীয় লক্ষ্যস্থল শুধু দুনিয়াকে বানিয়ে নিও না, বরং উচ্চাকাঙ্খর দ্বারা দৃষ্টি প্রসারিত করতঃ উভয় জগতে শান্তি লাভের চেষ্টা কর। মনে রেখ যে, উভয় জগতেরই মালিক তিনিই। প্রত্যেক লাভ ও ক্ষতি তারই হাতে রয়েছে। এমন কেউ নেই যে, তার অংশীদার হতে পারে কিংবা তাঁর কার্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তিনিই বন্টন করেছেন। ধন ভাণ্ডারের চাবিগুলো তিনি স্বীয় হস্তে রেখেছেন। তিনি প্রত্যেক হকদারকেই চেনেন এবং যে যার হকদার তিনি তাকে তাই পৌছিয়ে থাকেন। তোমাদের তো এটা চিন্তা করা উচিত যে, যিনি তোমাদেরকে দেখবার শুনবার ক্ষমতা দান করেছেন, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ কেমন হতে পারে।
আন-নিসা 4:133
১৩১-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র অধিকারী তিনিই। তিনি বলেন-যে নির্দেশাবলী তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তার একত্বে বিশ্বাস করবে, তার ইবাদত করবে এবং তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না, এ নির্দেশাবলীই তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবকেও দেয়া হয়েছিল। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে তাঁর কি ক্ষতি করতে পারবে? তিনি তো একাই আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। যেমন হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় গোত্রের লোককে বলেছিলেনঃ যদি তোমরা ও সারা জগতের লোক আল্লাহকে অস্বীকার কর তবুও তিনি তোমাদের হতে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার যোগ্য। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা অস্বীকার করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহ তাদের হতে অমুখাপেক্ষী হয়েছিলেন, তিনি বড়ই অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসিত। (৬৪:৬)বলা হচ্ছে-তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের মালিক ও তিনি প্রত্যেকের সমস্ত কার্যের উপর সাক্ষী। কোন কিছুই তার অজানা নেই। তিনি এ ক্ষমতাও রাখেন যে, তোমরা যদি তার অবাধ্যাচরণ কর তবে তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের স্থলে অন্য মাখলুক আনয়ন করবেন।যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য সম্প্রদায়কে আনয়ন করবেন যারা তোমাদের মত হবে না। (৪৭:৩৮)পূর্ব যুগের কোন একজন মনীষী বলেনঃ “তোমরা এ আয়াতটি সম্বন্ধে গবেষণা কর যে, পাপী বান্দারা আল্লাহ তা'আলার নিকট কত তুচ্ছ?' এ আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট এ কাজ মমাটেই কঠিন নয়! অতঃপর তিনি বলেন-হে ঐ ব্যক্তি! যার মনোবাসনা ও চেষ্টা একমাত্র দুনিয়ার জন্যে সে যেন জেনে নেয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার অধিকারেই রয়েছে। সুতরাং যখন তুমি তার নিকট দু'টোই যাজ্ঞা করবে তখন তিনি তোমাদেরকে দু'টোই দান করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং পরিতৃপ্ত করবেন। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আপনি দুনিয়া দান করুন, তাদের জন্য পরকালের কোনই অংশ। নেই। আর তাদের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ায় মঙ্গল দান করুন এবং পরকালেও মঙ্গল দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন। এদের জন্যে ঐ অংশ রয়েছে। যা তারা অর্জন করেছে।' (২:২০০-২০২) আর এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পরকালের ক্ষেত্রের আকাঙ্খ করে আমি তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করে দেবো।' (৪২৪ ২০) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়া যাা করে, তখন আমি যাকে চাই ও যত চাই দুনিয়ায় প্রদান করে থাকি।' (১৭:১৮) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) -এ আয়াতের ভাবার্থ। এই বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকরা দুনিয়া অনুসন্ধানে ঈমান কবুল করেছিল, তারা দুনিয়া পেয়ে যায় বটে, অর্থাৎ মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধলব্ধ মালে অংশীদার হয়ে যায়, কিন্তু পরকালে তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট যা তৈরী রয়েছে তা সেখানে তারা পেয়ে যাবে। অর্থাৎ জান্নামের অগ্নি ও তথাকার বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। সুতরাং উক্ত ইমাম সাহেবের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (১১:১৫) -এ আয়াতটির মতই। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ আয়াতের অর্থ তো বাহ্যতঃ এটাই, কিন্তু প্রথম আয়াতটিকেও এ অর্থে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ আয়াতের শব্দগুলো ততা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল দান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন তার জীবনটা একটি জিনিসের অনুসন্ধানেই শেষ করে না দেয়। বরং সে যেন দুটো জিনিসই লাভ করার জন্যে সচেষ্ট হয়।বলা হচ্ছে-যে তোমাদেরকে দুনিয়া দিচ্ছেন, আখিরাতের অধিকারীও তিনিই। এটা বড়ই কাপুরুষতার পরিচয় যে, তোমরা তোমাদের চক্ষু বন্ধ করে নেবে এবং অধিক প্রদানকারীর নিকট অল্প যাজ্ঞা করবে। না, না বরং তোমরা ইহকাল ও পরকালের বড় বড় কাজ ও উত্তম উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা কর। স্বীয় লক্ষ্যস্থল শুধু দুনিয়াকে বানিয়ে নিও না, বরং উচ্চাকাঙ্খর দ্বারা দৃষ্টি প্রসারিত করতঃ উভয় জগতে শান্তি লাভের চেষ্টা কর। মনে রেখ যে, উভয় জগতেরই মালিক তিনিই। প্রত্যেক লাভ ও ক্ষতি তারই হাতে রয়েছে। এমন কেউ নেই যে, তার অংশীদার হতে পারে কিংবা তাঁর কার্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তিনিই বন্টন করেছেন। ধন ভাণ্ডারের চাবিগুলো তিনি স্বীয় হস্তে রেখেছেন। তিনি প্রত্যেক হকদারকেই চেনেন এবং যে যার হকদার তিনি তাকে তাই পৌছিয়ে থাকেন। তোমাদের তো এটা চিন্তা করা উচিত যে, যিনি তোমাদেরকে দেখবার শুনবার ক্ষমতা দান করেছেন, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ কেমন হতে পারে।
আন-নিসা 4:134
১৩১-১৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র অধিকারী তিনিই। তিনি বলেন-যে নির্দেশাবলী তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তার একত্বে বিশ্বাস করবে, তার ইবাদত করবে এবং তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না, এ নির্দেশাবলীই তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবকেও দেয়া হয়েছিল। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে তাঁর কি ক্ষতি করতে পারবে? তিনি তো একাই আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। যেমন হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় গোত্রের লোককে বলেছিলেনঃ যদি তোমরা ও সারা জগতের লোক আল্লাহকে অস্বীকার কর তবুও তিনি তোমাদের হতে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার যোগ্য। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ তারা অস্বীকার করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহ তাদের হতে অমুখাপেক্ষী হয়েছিলেন, তিনি বড়ই অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসিত। (৬৪:৬)বলা হচ্ছে-তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের মালিক ও তিনি প্রত্যেকের সমস্ত কার্যের উপর সাক্ষী। কোন কিছুই তার অজানা নেই। তিনি এ ক্ষমতাও রাখেন যে, তোমরা যদি তার অবাধ্যাচরণ কর তবে তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের স্থলে অন্য মাখলুক আনয়ন করবেন।যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য সম্প্রদায়কে আনয়ন করবেন যারা তোমাদের মত হবে না। (৪৭:৩৮)পূর্ব যুগের কোন একজন মনীষী বলেনঃ “তোমরা এ আয়াতটি সম্বন্ধে গবেষণা কর যে, পাপী বান্দারা আল্লাহ তা'আলার নিকট কত তুচ্ছ?' এ আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট এ কাজ মমাটেই কঠিন নয়! অতঃপর তিনি বলেন-হে ঐ ব্যক্তি! যার মনোবাসনা ও চেষ্টা একমাত্র দুনিয়ার জন্যে সে যেন জেনে নেয় যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার অধিকারেই রয়েছে। সুতরাং যখন তুমি তার নিকট দু'টোই যাজ্ঞা করবে তখন তিনি তোমাদেরকে দু'টোই দান করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং পরিতৃপ্ত করবেন। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আপনি দুনিয়া দান করুন, তাদের জন্য পরকালের কোনই অংশ। নেই। আর তাদের মধ্যে এমনও রয়েছে যে বলে- হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ায় মঙ্গল দান করুন এবং পরকালেও মঙ্গল দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন। এদের জন্যে ঐ অংশ রয়েছে। যা তারা অর্জন করেছে।' (২:২০০-২০২) আর এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি পরকালের ক্ষেত্রের আকাঙ্খ করে আমি তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করে দেবো।' (৪২৪ ২০) অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়া যাা করে, তখন আমি যাকে চাই ও যত চাই দুনিয়ায় প্রদান করে থাকি।' (১৭:১৮) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) -এ আয়াতের ভাবার্থ। এই বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকরা দুনিয়া অনুসন্ধানে ঈমান কবুল করেছিল, তারা দুনিয়া পেয়ে যায় বটে, অর্থাৎ মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধলব্ধ মালে অংশীদার হয়ে যায়, কিন্তু পরকালে তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট যা তৈরী রয়েছে তা সেখানে তারা পেয়ে যাবে। অর্থাৎ জান্নামের অগ্নি ও তথাকার বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। সুতরাং উক্ত ইমাম সাহেবের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (১১:১৫) -এ আয়াতটির মতই। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ আয়াতের অর্থ তো বাহ্যতঃ এটাই, কিন্তু প্রথম আয়াতটিকেও এ অর্থে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ আয়াতের শব্দগুলো ততা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল দান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন তার জীবনটা একটি জিনিসের অনুসন্ধানেই শেষ করে না দেয়। বরং সে যেন দুটো জিনিসই লাভ করার জন্যে সচেষ্ট হয়।বলা হচ্ছে-যে তোমাদেরকে দুনিয়া দিচ্ছেন, আখিরাতের অধিকারীও তিনিই। এটা বড়ই কাপুরুষতার পরিচয় যে, তোমরা তোমাদের চক্ষু বন্ধ করে নেবে এবং অধিক প্রদানকারীর নিকট অল্প যাজ্ঞা করবে। না, না বরং তোমরা ইহকাল ও পরকালের বড় বড় কাজ ও উত্তম উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা কর। স্বীয় লক্ষ্যস্থল শুধু দুনিয়াকে বানিয়ে নিও না, বরং উচ্চাকাঙ্খর দ্বারা দৃষ্টি প্রসারিত করতঃ উভয় জগতে শান্তি লাভের চেষ্টা কর। মনে রেখ যে, উভয় জগতেরই মালিক তিনিই। প্রত্যেক লাভ ও ক্ষতি তারই হাতে রয়েছে। এমন কেউ নেই যে, তার অংশীদার হতে পারে কিংবা তাঁর কার্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তিনিই বন্টন করেছেন। ধন ভাণ্ডারের চাবিগুলো তিনি স্বীয় হস্তে রেখেছেন। তিনি প্রত্যেক হকদারকেই চেনেন এবং যে যার হকদার তিনি তাকে তাই পৌছিয়ে থাকেন। তোমাদের তো এটা চিন্তা করা উচিত যে, যিনি তোমাদেরকে দেখবার শুনবার ক্ষমতা দান করেছেন, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ কেমন হতে পারে।
আন-নিসা 4:135
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। সেটা থেকে যেন এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক সরে না পড়ে। এরূপ যেন না হয় যে তারা কারও ভয়ে, কোন লোভে, কারও তোষামোদে, কারও প্রতি দয়া দেখিয়ে এবং কারও সুপারিশে ইনসাফকে ছেড়ে দেয়। তারা সম্মিলিতভাবে যেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করে। এ ব্যাপারে যেন তারা। একে অপরের সহযোগিতা করতঃ আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মধ্যে ন্যায় বিচার কায়েম করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা সাক্ষ্য প্রদান কর। (৬৫:২) সাক্ষ্য আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হলেই তা হবে সম্পূর্ণ সঠিক, ন্যায় ভিত্তিক ও সত্য। তাতে থাকবে না কোন পরিবর্তন ও গোপন করার প্রবণতা। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা স্পষ্ট ও সত্য সাক্ষ্য প্রদান কর যদিও তা তোমাদের নিজেদের প্রতিকূল হয়। তোমরা সত্য কথা বলা হতে বিরত হয়ো না এবং বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগত দাসদের মুক্তির বহু উপায় বের করে থাকেন। তোমাদের মুক্তি যে মিথ্যা সাক্ষ্যের উপরই নির্ভর করে এমন কোন কথা নয়। তারপর বলা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ যদিও সত্য সাক্ষ্য পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে হয় তথাপি তোমরা সত্য সাক্ষ্য প্রদান হতে হাত মুখ ফিরিয়ে নিও না। কেননা, সত্য প্রত্যেকের উপর বিচারক। সাক্ষ্য প্রদানের সময় ধনীর প্রতি কোন লক্ষ্য রেখো না বা গরীবের উপরও দয়া প্রদর্শন করো না। তাদের মঙ্গলের বিবেচনা তোমাদের অপেক্ষা তাঁরই বেশী রয়েছে। তোমরা সর্বাবস্থায় সত্য সাক্ষ্যই প্রদান কর। চিন্তা করো, কারও ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি সাধন করো না, প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কারও প্রতি শত্রুতা করতঃ ন্যায় ও সাম্য হাত ছাড়া করো না। সদা-সর্বদা ন্যায়ের উপর অটল থাক। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে অন্যায় করতে উত্তেজিত না করে, তোমরা সুবিচার করতে থাক, এটাই হচ্ছে মুত্তাকী হওয়ার খুবই নিকটবর্তী।” (৫:৮)রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-কে যখন খাইবারবাসীদের ক্ষেত্র ও শস্য পরিমাপের জন্যে প্রেরণ করেন তখন খাইবারবাসী তাকে এ জন্যে ঘুষ প্রদান করতে চায় যে, তিনি যেন পরিমাণ কম বলেন। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহর শপথ! সমস্ত মাখলুকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়, পক্ষান্তরে তোমরা আমার নিকট কুকুর ও শূকর হতেও জঘন্য। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রেমে পড়ে বা তোমাদের শত্রুতাকে সামনে রেখে আমি যে সুবিচার হতে সরে পড়বো ও তোমাদের প্রতি অন্যায় করবো, এটা সম্ভব নয়।” একথা শুনে তারা বলে, “এর দ্বারাই তো আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এ পূর্ণ হাদীসটি সূরা-ই-মায়েদার তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-তোমরা যদি সাক্ষ্যে পরিবর্তন আনয়ন কর, মিথ্যা কথা দ্বারা কার্য সাধন কর, প্রকৃত ঘটনার বিপরীত সাক্ষ্য দান কর, জিহ্বা বাঁকা করে পেঁচযুক্ত কথা বলে ঘটনা কম-বেশী কর, কিছু গোপন কর ও কিছু প্রকাশ কর তবে জেনে রেখো যে সর্বজ্ঞ মহাবিচারক আল্লাহ তাআলার সামনে কোন কৌশলে কাজ দেবে না। সেখানে গিয়ে এর প্রতিদান পাবে এবং শাস্তি ভোগ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেনঃ সর্বোত্তম সাক্ষী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে জিজ্ঞাসার পূর্বেই সত্য সাক্ষ্য প্রদান করে।
আন-নিসা 4:136
মুমিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন ঈমানের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে। সমস্ত আদেশ ও নিষেধ, সমস্ত শরীয়ত এবং ঈমানের সমুদয় শাখাকে যেন মেনে নেয়। এতে তাহসীলে হাসিল নেই, বরং রয়েছে তাকমীলে কামেল। অর্থাৎ যদি তারা ঈমান এনে থাকে তবে তার উপরেই যেন প্রতিষ্ঠিত থাকে। যদি তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে তবে তিনি তাদেরকে আরও যত কিছুর উপর বিশ্বাস রাখতে বলেছেন ঐ সব কিছুর উপর যেন বিশ্বাস রাখে। প্রত্যেক মুসলমানের (আরবী) “আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন"-এ প্রার্থনার ভাবার্থ এটাই। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি সরল সঠিক পথে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখুন, ওর উপরেই আমাদেরকে অটল রাখুন এবং আমাদের হিদায়াতকে দিনের পর দিন বৃদ্ধি করতে থাকুন। অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে স্বীয় সত্তার উপর এবং স্বীয় রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে বলেছেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' (৫৭:২৮)(আরবী) এ কিতাবের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন এবং (আরবী) এ কিতাবের ভাবার্থ হচ্ছে পূর্ববর্তী নবীদের উপর অবতারিত কিতাবসমূহ। কুরআন কারীমের জন্য নালা এবং অন্যান্য কিতাবের জন্যে ‘আন্যালা’ ক্রিয়া ব্যবহার করার কারণ এই যে, কুরআন কারীম মাঝে মাঝে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়। পক্ষান্তরে অন্যান্য কিতাবসমূহ সমস্তই একই সাথে অবতীর্ণ হয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-যে কেউ আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাগণকে, তার কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবং পরকালকে অস্বীকার করেছে সে সুদূর বিপথে বিভ্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ হিদায়াতের পথ হতে সরে বহু দূরে গিয়ে পড়েছে। সুতরাং তাদের সুপথ প্রাপ্তির আশা সুদূর পরাহত।
আন-নিসা 4:137
১৩৭-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে-‘যে ঈমান আনয়নের পর পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে যায়, অতঃপর আবার মুমিন হয়ে পুনরায় কাফির হয়ে যায়, তারপর কুফরীর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তার প্রার্থনা গৃহীত হবে না, তার ক্ষমার ও মুক্তির কোন আশা নেই এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা সরল সঠিক পথে আনয়ন করবেন না।' হযরত আলী (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলতেনঃ ধর্মত্যাগীকে তিনবার বলা হবে- তাওবা করে নাও?' এরপর আল্লাহ তা'আলা। বলেন-এ মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, শেষে তাদের অন্তরে মোহর লেগে যায়। তাই, তারা মুনিমদের ছেড়ে কাফিরদেকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। এদিকে বাহ্যতঃ মুমিনদের সাথে মিলেমিশে থাকে আর ওদিকে কাফিরদের নিকট বসে তাদের সামনে মুমিনদের সম্পর্কে উপহাসমূলক কথা বলে বেশ আনন্দ উপভোগ করে। তাদেরকে বলে-“আমরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে দিয়েছি। আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাদের সামনে পেশ করতঃ তাতে তাদের অকৃতকার্যতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-“তোমরা চাও যে, কাফিরদের নিকট যেন তোমাদের সম্মান লাভ হয়। কিন্তু তোমাদের ধারণা মমাটেই ঠিক নয়। তারা তোমাদের সাথে প্রতারণা করছে। জেনে রেখো যে, সম্মানের মালিক হচ্ছেন এক এবং অংশীবিহীন আল্লাহ তা'আলা। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন, সম্মান দান করেন। যেমন তিনি অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে সম্মান যাজ্ঞা করে তবে সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। (৩৫:১০) আর একটি আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সম্মান আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূলের জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে, কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।' (৬৩:৮) ভাবার্থ এই যে, হে মুনাফিকের দল! যদি তোমরা প্রকৃত সম্মান পেতে চাও তবে আল্লাহর সৎ বান্দাদের সাথে মিলিত হও, তাঁর ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড় এবং তাঁর নিকট সম্মান যা কর তাহলেই তিনি তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান দান করবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু রাইহানা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অহংকারের বশবর্তী হয়ে স্বীয় মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বীয় বংশের সংযোগ তার কাফির বাপ-দাদার সঙ্গে জুড়ে দেয় এবং নবম পর্যন্ত পৌছে যায়, সেও তাদের সঙ্গে দশম জাহান্নামী।' এরপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে বলেন-“আমি যখন তোমাদেরকে নিষেধ করেছি যে, যে মজলিসে আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তোমরা সে মজলিসে বসো না। এরপরেও তোমরা ঐ রূপ মজলিসে অংশগ্রহণ কর তবে তোমাদেরকেও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত মনে করা হবে এবং তাদের পাপে তোমরাও অংশীদার হবে। যেমন একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে দস্তরখানায় মদ্যপান করা হচ্ছে তার উপর কোন এমন এক ব্যক্তির উপবেশন করা উচিত নয়, যে আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এ আয়াতে যে নিষেধাজ্ঞার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে মক্কায় অবতীর্ণ সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা আমার নির্দেশাবলী সম্বন্ধে বিতর্ক করছে, তখন তুমি তাদের দিক হতে বিমুখ হও।' (৬:৬৮) হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এ আয়াতের (আরবী)-এ ঘোষণাটি আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ মুত্তাকীদের উপর তাদের (মুনাফিকদের) হিসেবের কোন বোঝা নেই, কিন্তু রয়েছে শুধু উপদেশ যে হয় তো তারা বেঁচে যাবে।' (৬:৬৯)অতঃপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-“আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।' অর্থাৎ যেমন এ মুনাফিকেরা এখানে ঐ কাফিরদের কুফরীতে অংশীদার রয়েছে, তেমনই কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে, কয়েদখানার লৌহ শৃংখলে, গরম পানি ও রক্ত-পুঁজ পানে তাদের সঙ্গেই থাকবে এবং তাদের সকলকেই একই সাথে চিরস্থায়ী শাস্তির ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হবে।
আন-নিসা 4:138
১৩৭-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে-‘যে ঈমান আনয়নের পর পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে যায়, অতঃপর আবার মুমিন হয়ে পুনরায় কাফির হয়ে যায়, তারপর কুফরীর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তার প্রার্থনা গৃহীত হবে না, তার ক্ষমার ও মুক্তির কোন আশা নেই এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা সরল সঠিক পথে আনয়ন করবেন না।' হযরত আলী (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলতেনঃ ধর্মত্যাগীকে তিনবার বলা হবে- তাওবা করে নাও?' এরপর আল্লাহ তা'আলা। বলেন-এ মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, শেষে তাদের অন্তরে মোহর লেগে যায়। তাই, তারা মুনিমদের ছেড়ে কাফিরদেকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। এদিকে বাহ্যতঃ মুমিনদের সাথে মিলেমিশে থাকে আর ওদিকে কাফিরদের নিকট বসে তাদের সামনে মুমিনদের সম্পর্কে উপহাসমূলক কথা বলে বেশ আনন্দ উপভোগ করে। তাদেরকে বলে-“আমরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে দিয়েছি। আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাদের সামনে পেশ করতঃ তাতে তাদের অকৃতকার্যতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-“তোমরা চাও যে, কাফিরদের নিকট যেন তোমাদের সম্মান লাভ হয়। কিন্তু তোমাদের ধারণা মমাটেই ঠিক নয়। তারা তোমাদের সাথে প্রতারণা করছে। জেনে রেখো যে, সম্মানের মালিক হচ্ছেন এক এবং অংশীবিহীন আল্লাহ তা'আলা। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন, সম্মান দান করেন। যেমন তিনি অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে সম্মান যাজ্ঞা করে তবে সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। (৩৫:১০) আর একটি আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সম্মান আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূলের জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে, কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।' (৬৩:৮) ভাবার্থ এই যে, হে মুনাফিকের দল! যদি তোমরা প্রকৃত সম্মান পেতে চাও তবে আল্লাহর সৎ বান্দাদের সাথে মিলিত হও, তাঁর ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড় এবং তাঁর নিকট সম্মান যা কর তাহলেই তিনি তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান দান করবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু রাইহানা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অহংকারের বশবর্তী হয়ে স্বীয় মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বীয় বংশের সংযোগ তার কাফির বাপ-দাদার সঙ্গে জুড়ে দেয় এবং নবম পর্যন্ত পৌছে যায়, সেও তাদের সঙ্গে দশম জাহান্নামী।' এরপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে বলেন-“আমি যখন তোমাদেরকে নিষেধ করেছি যে, যে মজলিসে আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তোমরা সে মজলিসে বসো না। এরপরেও তোমরা ঐ রূপ মজলিসে অংশগ্রহণ কর তবে তোমাদেরকেও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত মনে করা হবে এবং তাদের পাপে তোমরাও অংশীদার হবে। যেমন একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে দস্তরখানায় মদ্যপান করা হচ্ছে তার উপর কোন এমন এক ব্যক্তির উপবেশন করা উচিত নয়, যে আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এ আয়াতে যে নিষেধাজ্ঞার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে মক্কায় অবতীর্ণ সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা আমার নির্দেশাবলী সম্বন্ধে বিতর্ক করছে, তখন তুমি তাদের দিক হতে বিমুখ হও।' (৬:৬৮) হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এ আয়াতের (আরবী)-এ ঘোষণাটি আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ মুত্তাকীদের উপর তাদের (মুনাফিকদের) হিসেবের কোন বোঝা নেই, কিন্তু রয়েছে শুধু উপদেশ যে হয় তো তারা বেঁচে যাবে।' (৬:৬৯)অতঃপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-“আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।' অর্থাৎ যেমন এ মুনাফিকেরা এখানে ঐ কাফিরদের কুফরীতে অংশীদার রয়েছে, তেমনই কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে, কয়েদখানার লৌহ শৃংখলে, গরম পানি ও রক্ত-পুঁজ পানে তাদের সঙ্গেই থাকবে এবং তাদের সকলকেই একই সাথে চিরস্থায়ী শাস্তির ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হবে।
আন-নিসা 4:139
১৩৭-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে-‘যে ঈমান আনয়নের পর পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে যায়, অতঃপর আবার মুমিন হয়ে পুনরায় কাফির হয়ে যায়, তারপর কুফরীর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তার প্রার্থনা গৃহীত হবে না, তার ক্ষমার ও মুক্তির কোন আশা নেই এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা সরল সঠিক পথে আনয়ন করবেন না।' হযরত আলী (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলতেনঃ ধর্মত্যাগীকে তিনবার বলা হবে- তাওবা করে নাও?' এরপর আল্লাহ তা'আলা। বলেন-এ মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, শেষে তাদের অন্তরে মোহর লেগে যায়। তাই, তারা মুনিমদের ছেড়ে কাফিরদেকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। এদিকে বাহ্যতঃ মুমিনদের সাথে মিলেমিশে থাকে আর ওদিকে কাফিরদের নিকট বসে তাদের সামনে মুমিনদের সম্পর্কে উপহাসমূলক কথা বলে বেশ আনন্দ উপভোগ করে। তাদেরকে বলে-“আমরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে দিয়েছি। আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাদের সামনে পেশ করতঃ তাতে তাদের অকৃতকার্যতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-“তোমরা চাও যে, কাফিরদের নিকট যেন তোমাদের সম্মান লাভ হয়। কিন্তু তোমাদের ধারণা মমাটেই ঠিক নয়। তারা তোমাদের সাথে প্রতারণা করছে। জেনে রেখো যে, সম্মানের মালিক হচ্ছেন এক এবং অংশীবিহীন আল্লাহ তা'আলা। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন, সম্মান দান করেন। যেমন তিনি অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে সম্মান যাজ্ঞা করে তবে সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। (৩৫:১০) আর একটি আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সম্মান আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূলের জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে, কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।' (৬৩:৮) ভাবার্থ এই যে, হে মুনাফিকের দল! যদি তোমরা প্রকৃত সম্মান পেতে চাও তবে আল্লাহর সৎ বান্দাদের সাথে মিলিত হও, তাঁর ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড় এবং তাঁর নিকট সম্মান যা কর তাহলেই তিনি তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান দান করবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু রাইহানা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অহংকারের বশবর্তী হয়ে স্বীয় মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বীয় বংশের সংযোগ তার কাফির বাপ-দাদার সঙ্গে জুড়ে দেয় এবং নবম পর্যন্ত পৌছে যায়, সেও তাদের সঙ্গে দশম জাহান্নামী।' এরপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে বলেন-“আমি যখন তোমাদেরকে নিষেধ করেছি যে, যে মজলিসে আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তোমরা সে মজলিসে বসো না। এরপরেও তোমরা ঐ রূপ মজলিসে অংশগ্রহণ কর তবে তোমাদেরকেও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত মনে করা হবে এবং তাদের পাপে তোমরাও অংশীদার হবে। যেমন একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে দস্তরখানায় মদ্যপান করা হচ্ছে তার উপর কোন এমন এক ব্যক্তির উপবেশন করা উচিত নয়, যে আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এ আয়াতে যে নিষেধাজ্ঞার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে মক্কায় অবতীর্ণ সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা আমার নির্দেশাবলী সম্বন্ধে বিতর্ক করছে, তখন তুমি তাদের দিক হতে বিমুখ হও।' (৬:৬৮) হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এ আয়াতের (আরবী)-এ ঘোষণাটি আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ মুত্তাকীদের উপর তাদের (মুনাফিকদের) হিসেবের কোন বোঝা নেই, কিন্তু রয়েছে শুধু উপদেশ যে হয় তো তারা বেঁচে যাবে।' (৬:৬৯)অতঃপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-“আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।' অর্থাৎ যেমন এ মুনাফিকেরা এখানে ঐ কাফিরদের কুফরীতে অংশীদার রয়েছে, তেমনই কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে, কয়েদখানার লৌহ শৃংখলে, গরম পানি ও রক্ত-পুঁজ পানে তাদের সঙ্গেই থাকবে এবং তাদের সকলকেই একই সাথে চিরস্থায়ী শাস্তির ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হবে।
আন-নিসা 4:140
১৩৭-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে-‘যে ঈমান আনয়নের পর পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে যায়, অতঃপর আবার মুমিন হয়ে পুনরায় কাফির হয়ে যায়, তারপর কুফরীর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তার প্রার্থনা গৃহীত হবে না, তার ক্ষমার ও মুক্তির কোন আশা নেই এবং তাকে আল্লাহ তা'আলা সরল সঠিক পথে আনয়ন করবেন না।' হযরত আলী (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলতেনঃ ধর্মত্যাগীকে তিনবার বলা হবে- তাওবা করে নাও?' এরপর আল্লাহ তা'আলা। বলেন-এ মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, শেষে তাদের অন্তরে মোহর লেগে যায়। তাই, তারা মুনিমদের ছেড়ে কাফিরদেকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। এদিকে বাহ্যতঃ মুমিনদের সাথে মিলেমিশে থাকে আর ওদিকে কাফিরদের নিকট বসে তাদের সামনে মুমিনদের সম্পর্কে উপহাসমূলক কথা বলে বেশ আনন্দ উপভোগ করে। তাদেরকে বলে-“আমরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে দিয়েছি। আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাদের সামনে পেশ করতঃ তাতে তাদের অকৃতকার্যতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-“তোমরা চাও যে, কাফিরদের নিকট যেন তোমাদের সম্মান লাভ হয়। কিন্তু তোমাদের ধারণা মমাটেই ঠিক নয়। তারা তোমাদের সাথে প্রতারণা করছে। জেনে রেখো যে, সম্মানের মালিক হচ্ছেন এক এবং অংশীবিহীন আল্লাহ তা'আলা। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন, সম্মান দান করেন। যেমন তিনি অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে সম্মান যাজ্ঞা করে তবে সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। (৩৫:১০) আর একটি আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘সম্মান আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূলের জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে, কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।' (৬৩:৮) ভাবার্থ এই যে, হে মুনাফিকের দল! যদি তোমরা প্রকৃত সম্মান পেতে চাও তবে আল্লাহর সৎ বান্দাদের সাথে মিলিত হও, তাঁর ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড় এবং তাঁর নিকট সম্মান যা কর তাহলেই তিনি তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান দান করবেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু রাইহানা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অহংকারের বশবর্তী হয়ে স্বীয় মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বীয় বংশের সংযোগ তার কাফির বাপ-দাদার সঙ্গে জুড়ে দেয় এবং নবম পর্যন্ত পৌছে যায়, সেও তাদের সঙ্গে দশম জাহান্নামী।' এরপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে বলেন-“আমি যখন তোমাদেরকে নিষেধ করেছি যে, যে মজলিসে আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তোমরা সে মজলিসে বসো না। এরপরেও তোমরা ঐ রূপ মজলিসে অংশগ্রহণ কর তবে তোমাদেরকেও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত মনে করা হবে এবং তাদের পাপে তোমরাও অংশীদার হবে। যেমন একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে দস্তরখানায় মদ্যপান করা হচ্ছে তার উপর কোন এমন এক ব্যক্তির উপবেশন করা উচিত নয়, যে আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এ আয়াতে যে নিষেধাজ্ঞার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে মক্কায় অবতীর্ণ সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা আমার নির্দেশাবলী সম্বন্ধে বিতর্ক করছে, তখন তুমি তাদের দিক হতে বিমুখ হও।' (৬:৬৮) হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এ আয়াতের (আরবী)-এ ঘোষণাটি আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ মুত্তাকীদের উপর তাদের (মুনাফিকদের) হিসেবের কোন বোঝা নেই, কিন্তু রয়েছে শুধু উপদেশ যে হয় তো তারা বেঁচে যাবে।' (৬:৬৯)অতঃপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-“আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।' অর্থাৎ যেমন এ মুনাফিকেরা এখানে ঐ কাফিরদের কুফরীতে অংশীদার রয়েছে, তেমনই কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে, কয়েদখানার লৌহ শৃংখলে, গরম পানি ও রক্ত-পুঁজ পানে তাদের সঙ্গেই থাকবে এবং তাদের সকলকেই একই সাথে চিরস্থায়ী শাস্তির ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হবে।
আন-নিসা 4:141
এখানে মুনাফিকদের মন্দ অন্তরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সব সময় মুসলমানদের ধ্বংস ও অবনতির অনুসন্ধানে লেগে থাকে। কোন জিহাদে মুসলমানদের বিজয় লাভ ঘটলে তারা নিজেদেরকে মুসলমানদের বন্ধুরূপে পরিচিত করার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট এসে বলেঃ আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?' পক্ষান্তরে যদি কোন কোন সময় মুসলমানদেরকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাদের উপর আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে জয়যুক্ত করেন তবে তারা তাদের দিকে দ্রুত বেগে ধাবিত হয়ে বলেঃ “আমরা তো গোপনে তোমাদেরকেই সাহায্য করেছি এবং সর্বদা মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করেছি। এটা ছিল আমাদের একটা কৌশল যার বলে আজ তোমরা বিজয় লাভ করলে। এটা হচ্ছে তাদের কাজ যে, তারা দু’নৌকায় পা দিয়ে থাকে। যদিও তারা তাদের এ কৌশলকে নিজেদের পক্ষে গৌরবের কারণ মনে করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা তাদের বেঈমানির পরিচায়ক। কাঁচা রং কয়দিন থাকবে? গাজরের বাঁশী কয়দিন বাজবে? কাগজের নৌকাই বা কয়দিন চলবে? এমনই সময় আসছে যে, তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে লজ্জিত হবে। স্বীয় কৃতকর্মের জন্যে তারা আফসোস করবে। স্বীয় লজ্জাজনক কাজের কারণে কেঁদে কেঁদে চক্ষু ভাসাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার সত্য মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য হবে এবং সমস্ত মঙ্গল হতে নিরাশ হয়ে যাবে। সেদিন তাদের ভুল ভেঙ্গে যাবে। তাদের গোপনীয়তা সেদিন প্রকাশ পেয়ে যাবে। সমস্ত রহস্য সেদিন উদ্ঘাটিত হয়ে যাবে। তাদের জঘন্য কাজ অত্যন্ত ভয়াবহ আকারে সামনে এসে হাযির হবে এবং তারা আল্লাহ তা'আলার ভীষণ শাস্তির শিকারে পরিণত হয়ে যাবে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“আল্লাহ তা'আলা কখনও মুমিনদের বিপক্ষে কাফিরদেরকে বিজয়ী করবেন না। এক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি এ বাক্যটিকে পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে পাঠ করেন। ভাবার্থ ছিল এই যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর কাফিরদেরকে বিজয়ী করবেন না। এও বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে প্রমাণ। কিন্তু তথাপিও এর প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য হওয়াতেও কোন অসুবিধে নেই। অর্থাৎ এটা অসম্ভব যে, আল্লাহ তা'আলা এখন থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এমন কোন সময় আনয়ন করবেন যখন কাফিররা মুসলমানদের নাম ও নিশানা মিটিয়ে দেয়ার মত শক্তি অর্জন করতে পারবে। পৃথিবীতে কোন সময় হয়তো তারা বিজয়ী হয়ে যায় সেটা অন্য কথা। কিন্তু পরিণামে জয় মুসলমানদেরই দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে এবং মুমিনগণকে ইহলৌকিক জগতে অবশ্যই সাহায্য করবো।' (৪০:৫১) এ অর্থের মধ্যে একটা সৌন্দর্য এই রয়েছে যে, মুনাফিকরা ঐ সময়ে আগমনের জন্যে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল যে সময়ে তারা মুসলমানদের ধ্বংস কামনা করছিল। তাতে তাদেরকে নিরাশ করে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, কাফিরদেরকে তিনি মুসলমানদের উপর এমনভাবে বিজয়ী করবেন না, যার ফলে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। তারা যে ভয়ে মুসলমানদের সাথে প্রকাশ্যভাবে মিশতে পারছিল না সেই ভয়কেও তিনি দূর করে দিয়ে বলেন যে, মুসলমানেরা যে ভূ-পৃষ্ঠ হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এটা যেন তারা মনে না করে। এ ভাবার্থকেই তিনি (আরবী) (৫:৫২)-এ আয়াতে পরিষ্কার করেছেন।উপরোক্ত আয়াত-ই-কারীমা দ্বারা উলামা-ই-কিরাম যুক্তি নিয়েছেন যে, মুসলমান দাসকে কাফিরদের হাতে বিক্রী করা বৈধ নয়। কেননা, ঐ অবস্থায় কাফিরদেকে মুসলমানের উপর বিজয়ী করে দেয়া হয় এবং এতে মুসলমানের হীনতা প্রকাশ পায়। যারা একে জায়েয রেখেছেন তারা তাকে নির্দেশ দেন যে, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার উপর হতে স্বীয় অধিকার নষ্ট করে দেয়।
আন-নিসা 4:142
১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরা-ই-বাকারার প্রথমেও (আরবী) (২:৯) -এ আয়াতটির তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। এখানেও বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এ নির্বোধ মুনাফিকরা আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতারণা করতে রয়েছে, অথচ তিনি তাদের অন্তরের সমস্ত কথা সম্যক অবগত রয়েছেন। স্বল্প বুদ্ধির কারণে এ মুনাফিকরা মনে করে নিয়েছে যে, তাদের কপটতা যেমন দুনিয়ায় চলছে এবং মুসলমানদের মধ্যে চলছে, তদ্রুপ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সমীপেও চলবে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছে-কিয়ামতের দিনেও এরা আল্লাহ তাআলার সম্মুখে শপথ করে বলবে যে, তারা সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেমন আজ তারা তোমাদের সামনে শপথ করে বলছে। কিন্তু সেই সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর সামনে তাদের এ বাজে শপথে কোনই কাজ দেবে না। আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে প্রতারণা প্রত্যার্পণকারী। তিনি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন। তাই তারা আজ বেড়ে চলেছে ও ফুলে উঠেছে এবং এটাকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে করেছে।কিয়ামতের দিনেও তাদের অবস্থা এমনই হবে। তারা মুসলমানদের আলোকের উপর নির্ভর করে থাকবে। মুসলমানেরা সামনে এগিয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা তখন তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবে-তোমরা থাম, আমরা তোমাদের আলোকের সাহায্যে চলতে থাকি। মুসলমানেরা তখন উত্তর দেবে-তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর। তারা পিছনে ফিরবে এমন সময় তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে। মুসলমানদের দিকে থাকবে করুণা এবং তাদের দিকে থাকবে দুঃখ ও বেদনা।হাদীস শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি শুনাবে আল্লাহ তা'আলা সেটা শুনিয়ে দেবেন এবং যে রিয়াকারী করবে আল্লাহ তা'আলা সেটা দেখিয়ে দেবেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ঐ মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের সম্পর্কে বাহ্যতঃ লোকের সামনে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেবেন। ফেরেশতাগণ তখন তাদেরকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহ পাক আমাদেকে ওটা হতে রক্ষা করুন।আল্লাহ তা'আলা বলেন-'যখন তারা নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হয় তখন তারা শৈথিল্যের সাথে দণ্ডায়মান হয়। অর্থাৎ নামাযের মত উত্তম ইবাদত তারা একাগ্রচিত্তে ও আন্তরিকতার সাথে আদায় করে না। কেননা সত্য নিয়ত, উত্তম আমল, প্রকৃত ঈমান এবং সত্য বিশ্বাস তাদের মধ্যে মোটেই নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পরিশ্রান্ত দেহে ছটফট করা অবস্থায় নামায পড়াকে মাকরূহ মনে করতেন এবং বলতেনঃ মানুষের উচিত যে, সে যেন পূর্ণ আগ্রহ ও একাগ্রতার সাথে নামাযে দণ্ডায়মান হয় এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, তার কথার উপর আল্লাহর কান রয়েছে। তিনি তার আকাঙ্খা পুরো করার জন্যে সদা প্রস্তুত রয়েছেন। এ তো হলো মুনাফিকদের বাহ্যিক অবস্থা যে তারা পরিশ্রান্ত দেহে ও সংকীর্ণ অন্তরে বেগার পরিশোধের নামাযের জন্যে আগমন করে। আর তাদের আভ্যন্তরীণ অবস্থা এই যে, আন্তরিকতা হতে বহু দূরে রয়েছে। তারা প্রভুর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। তারা শুধু মানুষের মধ্যে নামাযী রূপে পরিচিত হবার জন্যে এবং নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে নামায পড়ে থাকে। তাহলে এ অস্থিরচিত্ত মানুষেরা নামাযে কি পাবে? এ কারণেই তারা ঐ নামাযে অনুপস্থিত থাকে যে নামাযে মানুষ একে অপরকে দেখতে কম পায়। যেমন ইশা ও ফজরের নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুনাফিকদের উপর সবচেয়ে ভারী নামায হচ্ছে ইশা ও ফজরের নামায। যদি তারা এ নামাযের ফযীলতের কথা অন্তরে বিশ্বাস করতো তবে জানুর ভরে চলে হলেও অবশ্যই এ নামাযে হাযির হতো। কাজেই আমি তখন ইচ্ছে করি যে, তাকবীর বলিয়ে দিয়ে কাউকে ইমামতির স্থানে দাঁড় করতঃ নামায আরম্ভ করিয়ে দেই, অতঃপর আমি গিয়ে লোকদেরকে বলি যে তারা যেন জ্বালানী কাষ্ঠ নিয়ে এসে ঐ লোকদের বাড়ীর চতুর্দিকে রেখে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দেয় যারা জামাআতে হাজির হয় না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! যদি তাদের একটি চর্বিযুক্ত অস্থি বা দু'টি উত্তম (পশ্বাদির) খুর পাওয়ার আশা থাকতো তবে তারা দৌড়ে চলে আসতো। কিন্তু তাদের নিকট আখিরাতের এবং আল্লাহ প্রদত্ত পুণ্যের ওর সমানও মর্যাদা নেই। বাড়ীতে যেসব স্ত্রীলোক ও শিশু অবস্থান করে তাদের খেয়াল যদি আমার না থাকতো তবে অবশ্যই আমি তাদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিতাম। মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লোকদের উপস্থিতির সময় তো নামাযকে সুন্দরভাবে থেমে থেমে আদায় করে কিন্তু যখন কেউ থাকে না তখন যেন-তেনভাবে পড়ে নেয়, সে ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় প্রভুর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে।আল্লাহর তা'আলা বলেন-তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে। অর্থাৎ নামায়ে তাদের মোটেই মন বসে না। তারা যে কথা বলে তা নিজেই বুঝে না বরং তারা উদাসীনভাবে নামায পড়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ওটা মুনাফিকের নামায যে ব্যক্তি বসে বসে সূর্যের দিকে তাকাতে রয়েছে, অবশেষে ওটা অস্তমিত হতে চলেছে এবং শয়তানের শৃংগদ্বয়ের মধ্যে হয়ে গেছে সে সময় সে উঠে পড়ে এবং তাড়াতাড়ি চার রাকআত নামায আদায় করে নেয় যার মধ্যে আল্লাহর যিকির নামেমাত্র করে থাকে।' (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) এ মুনাফিক সদা স্তম্ভিত ও হতভম্ব অবস্থায় কালাতিপাত করে। ঈমান ও কুফরীর মধ্যে তাদের মন অস্থির থাকে। তারা না স্পষ্টভাবে মুসলমানদের সঙ্গী, না সম্পূর্ণরূপে কাফিরদের সাথী। কখনও ঈমানের জ্যোতি অন্তরে পরিস্ফুট হয়ে উঠলে তারা ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতে থাকে। আবার কখনও কুফরীর অন্ধকার তাদের উপর জয়যুক্ত হলে তারা ঈমান হতে দূরে সরে পড়ে। না তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের দিকে রয়েছে, না ইয়াহূদীদের পক্ষে রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুনাফিকের অবস্থা হচ্ছে দু'টি পালের মধ্যস্থিত ছাগলের অবস্থার ন্যায় যা ভ্যা-ভ্যা করতে করতে কখনও এ পালের দিকে দৌড় দেয় এবং কখনও ঐপালের দিকে দৌড় দেয়। সে এখনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি যে, এর পিছনে যাবে কি ওর পিছনে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ অর্থের হাদীসটি হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর উপস্থিতিতে শব্দের কিছু হেরফের করে বর্ণনা করলে তিনি নিজ কানে শুনা শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করতঃ বলেন যে, সেরূপ নয়, বরং প্রকৃত হাদীস হচ্ছে এরূপ।' এতে হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) অসন্তুষ্ট হন।‘মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, মুমিন, কাফির এবং মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ তিনটি লোকের ন্যায় যারা একটি নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছে। একজন তীরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, দ্বিতীয়জন নদী অতিক্রম করতঃ গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছে এবং তৃতীয় ব্যক্তি নদীতে নেমে পড়েছে। যখন সে নদীর মধ্যস্থলে * পৌছেছে তখন এ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে- ‘ধ্বংস হতে কোথায় চলেছে এ তীরে ফিরে এসো।' আবার ঐ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে-এ তীরে চলে এসো, মুক্তি পেয়ে যাবে এবং আমার মত গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারবে, অর্ধেক পথতো অতিক্রম করেই ফেলেছে। এখন সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার এদিকে দেখে এবং একবার ওদিকে দেখে। এ দোদুল্যমান অবস্থায় সে রয়েছে এমন সময় একটি বিরাট তরঙ্গ এসে তাকে ভাসিয়ে নেয় এবং অবশেষে সে নদীতে নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলে। অতএব নদী অতিক্রমকারী হচ্ছে মুসলমান, তীরে দণ্ডায়মান ব্যক্তি হচ্ছে কাফির এবং ডুবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ ছাগলটির ন্যায় যে একটি সবুজ শ্যামল পাহাড়ের উপর গুটিকয়েক ছাগল দেখে তথায় আসে এবং শুঁকে চলে যায়। তারপরে আর একটি পাহাড়ের উপর উঠে এবং শুঁকে চলে আসে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ যাকে পথভ্রান্ত করেছেন, তার পথ প্রদর্শক আর কে আছে? আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদেরকে তাদের জঘন্য কার্যের কারণে সঠিক পথ হতে ধাক্কা দিয়ে দূরে নিক্ষেপ করেছেন। এখন আর কেউ তাকে সঠিক পথের উপর আনতেও পারবে না এবং তার মুক্তির ব্যবস্থাও করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছের বিপরীত কাজ কেউ করতে পারবে না। তিনি সকলেরই শাসনকর্তা। তার উপর কারও শাসন ক্ষমতা নেই।
আন-নিসা 4:143
১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরা-ই-বাকারার প্রথমেও (আরবী) (২:৯) -এ আয়াতটির তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। এখানেও বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এ নির্বোধ মুনাফিকরা আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতারণা করতে রয়েছে, অথচ তিনি তাদের অন্তরের সমস্ত কথা সম্যক অবগত রয়েছেন। স্বল্প বুদ্ধির কারণে এ মুনাফিকরা মনে করে নিয়েছে যে, তাদের কপটতা যেমন দুনিয়ায় চলছে এবং মুসলমানদের মধ্যে চলছে, তদ্রুপ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সমীপেও চলবে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছে-কিয়ামতের দিনেও এরা আল্লাহ তাআলার সম্মুখে শপথ করে বলবে যে, তারা সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেমন আজ তারা তোমাদের সামনে শপথ করে বলছে। কিন্তু সেই সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর সামনে তাদের এ বাজে শপথে কোনই কাজ দেবে না। আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে প্রতারণা প্রত্যার্পণকারী। তিনি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন। তাই তারা আজ বেড়ে চলেছে ও ফুলে উঠেছে এবং এটাকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে করেছে।কিয়ামতের দিনেও তাদের অবস্থা এমনই হবে। তারা মুসলমানদের আলোকের উপর নির্ভর করে থাকবে। মুসলমানেরা সামনে এগিয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা তখন তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবে-তোমরা থাম, আমরা তোমাদের আলোকের সাহায্যে চলতে থাকি। মুসলমানেরা তখন উত্তর দেবে-তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর। তারা পিছনে ফিরবে এমন সময় তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে। মুসলমানদের দিকে থাকবে করুণা এবং তাদের দিকে থাকবে দুঃখ ও বেদনা।হাদীস শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি শুনাবে আল্লাহ তা'আলা সেটা শুনিয়ে দেবেন এবং যে রিয়াকারী করবে আল্লাহ তা'আলা সেটা দেখিয়ে দেবেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ঐ মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের সম্পর্কে বাহ্যতঃ লোকের সামনে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেবেন। ফেরেশতাগণ তখন তাদেরকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহ পাক আমাদেকে ওটা হতে রক্ষা করুন।আল্লাহ তা'আলা বলেন-'যখন তারা নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হয় তখন তারা শৈথিল্যের সাথে দণ্ডায়মান হয়। অর্থাৎ নামাযের মত উত্তম ইবাদত তারা একাগ্রচিত্তে ও আন্তরিকতার সাথে আদায় করে না। কেননা সত্য নিয়ত, উত্তম আমল, প্রকৃত ঈমান এবং সত্য বিশ্বাস তাদের মধ্যে মোটেই নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পরিশ্রান্ত দেহে ছটফট করা অবস্থায় নামায পড়াকে মাকরূহ মনে করতেন এবং বলতেনঃ মানুষের উচিত যে, সে যেন পূর্ণ আগ্রহ ও একাগ্রতার সাথে নামাযে দণ্ডায়মান হয় এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, তার কথার উপর আল্লাহর কান রয়েছে। তিনি তার আকাঙ্খা পুরো করার জন্যে সদা প্রস্তুত রয়েছেন। এ তো হলো মুনাফিকদের বাহ্যিক অবস্থা যে তারা পরিশ্রান্ত দেহে ও সংকীর্ণ অন্তরে বেগার পরিশোধের নামাযের জন্যে আগমন করে। আর তাদের আভ্যন্তরীণ অবস্থা এই যে, আন্তরিকতা হতে বহু দূরে রয়েছে। তারা প্রভুর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। তারা শুধু মানুষের মধ্যে নামাযী রূপে পরিচিত হবার জন্যে এবং নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে নামায পড়ে থাকে। তাহলে এ অস্থিরচিত্ত মানুষেরা নামাযে কি পাবে? এ কারণেই তারা ঐ নামাযে অনুপস্থিত থাকে যে নামাযে মানুষ একে অপরকে দেখতে কম পায়। যেমন ইশা ও ফজরের নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুনাফিকদের উপর সবচেয়ে ভারী নামায হচ্ছে ইশা ও ফজরের নামায। যদি তারা এ নামাযের ফযীলতের কথা অন্তরে বিশ্বাস করতো তবে জানুর ভরে চলে হলেও অবশ্যই এ নামাযে হাযির হতো। কাজেই আমি তখন ইচ্ছে করি যে, তাকবীর বলিয়ে দিয়ে কাউকে ইমামতির স্থানে দাঁড় করতঃ নামায আরম্ভ করিয়ে দেই, অতঃপর আমি গিয়ে লোকদেরকে বলি যে তারা যেন জ্বালানী কাষ্ঠ নিয়ে এসে ঐ লোকদের বাড়ীর চতুর্দিকে রেখে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দেয় যারা জামাআতে হাজির হয় না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! যদি তাদের একটি চর্বিযুক্ত অস্থি বা দু'টি উত্তম (পশ্বাদির) খুর পাওয়ার আশা থাকতো তবে তারা দৌড়ে চলে আসতো। কিন্তু তাদের নিকট আখিরাতের এবং আল্লাহ প্রদত্ত পুণ্যের ওর সমানও মর্যাদা নেই। বাড়ীতে যেসব স্ত্রীলোক ও শিশু অবস্থান করে তাদের খেয়াল যদি আমার না থাকতো তবে অবশ্যই আমি তাদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিতাম। মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লোকদের উপস্থিতির সময় তো নামাযকে সুন্দরভাবে থেমে থেমে আদায় করে কিন্তু যখন কেউ থাকে না তখন যেন-তেনভাবে পড়ে নেয়, সে ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় প্রভুর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে।আল্লাহর তা'আলা বলেন-তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে। অর্থাৎ নামায়ে তাদের মোটেই মন বসে না। তারা যে কথা বলে তা নিজেই বুঝে না বরং তারা উদাসীনভাবে নামায পড়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ওটা মুনাফিকের নামায যে ব্যক্তি বসে বসে সূর্যের দিকে তাকাতে রয়েছে, অবশেষে ওটা অস্তমিত হতে চলেছে এবং শয়তানের শৃংগদ্বয়ের মধ্যে হয়ে গেছে সে সময় সে উঠে পড়ে এবং তাড়াতাড়ি চার রাকআত নামায আদায় করে নেয় যার মধ্যে আল্লাহর যিকির নামেমাত্র করে থাকে।' (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) এ মুনাফিক সদা স্তম্ভিত ও হতভম্ব অবস্থায় কালাতিপাত করে। ঈমান ও কুফরীর মধ্যে তাদের মন অস্থির থাকে। তারা না স্পষ্টভাবে মুসলমানদের সঙ্গী, না সম্পূর্ণরূপে কাফিরদের সাথী। কখনও ঈমানের জ্যোতি অন্তরে পরিস্ফুট হয়ে উঠলে তারা ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতে থাকে। আবার কখনও কুফরীর অন্ধকার তাদের উপর জয়যুক্ত হলে তারা ঈমান হতে দূরে সরে পড়ে। না তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের দিকে রয়েছে, না ইয়াহূদীদের পক্ষে রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুনাফিকের অবস্থা হচ্ছে দু'টি পালের মধ্যস্থিত ছাগলের অবস্থার ন্যায় যা ভ্যা-ভ্যা করতে করতে কখনও এ পালের দিকে দৌড় দেয় এবং কখনও ঐপালের দিকে দৌড় দেয়। সে এখনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি যে, এর পিছনে যাবে কি ওর পিছনে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ অর্থের হাদীসটি হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর উপস্থিতিতে শব্দের কিছু হেরফের করে বর্ণনা করলে তিনি নিজ কানে শুনা শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করতঃ বলেন যে, সেরূপ নয়, বরং প্রকৃত হাদীস হচ্ছে এরূপ।' এতে হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) অসন্তুষ্ট হন।‘মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, মুমিন, কাফির এবং মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ তিনটি লোকের ন্যায় যারা একটি নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছে। একজন তীরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, দ্বিতীয়জন নদী অতিক্রম করতঃ গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছে এবং তৃতীয় ব্যক্তি নদীতে নেমে পড়েছে। যখন সে নদীর মধ্যস্থলে * পৌছেছে তখন এ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে- ‘ধ্বংস হতে কোথায় চলেছে এ তীরে ফিরে এসো।' আবার ঐ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে-এ তীরে চলে এসো, মুক্তি পেয়ে যাবে এবং আমার মত গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারবে, অর্ধেক পথতো অতিক্রম করেই ফেলেছে। এখন সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার এদিকে দেখে এবং একবার ওদিকে দেখে। এ দোদুল্যমান অবস্থায় সে রয়েছে এমন সময় একটি বিরাট তরঙ্গ এসে তাকে ভাসিয়ে নেয় এবং অবশেষে সে নদীতে নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলে। অতএব নদী অতিক্রমকারী হচ্ছে মুসলমান, তীরে দণ্ডায়মান ব্যক্তি হচ্ছে কাফির এবং ডুবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ ছাগলটির ন্যায় যে একটি সবুজ শ্যামল পাহাড়ের উপর গুটিকয়েক ছাগল দেখে তথায় আসে এবং শুঁকে চলে যায়। তারপরে আর একটি পাহাড়ের উপর উঠে এবং শুঁকে চলে আসে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ যাকে পথভ্রান্ত করেছেন, তার পথ প্রদর্শক আর কে আছে? আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদেরকে তাদের জঘন্য কার্যের কারণে সঠিক পথ হতে ধাক্কা দিয়ে দূরে নিক্ষেপ করেছেন। এখন আর কেউ তাকে সঠিক পথের উপর আনতেও পারবে না এবং তার মুক্তির ব্যবস্থাও করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছের বিপরীত কাজ কেউ করতে পারবে না। তিনি সকলেরই শাসনকর্তা। তার উপর কারও শাসন ক্ষমতা নেই।
আন-নিসা 4:144
১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সর্বদা উঠাবসা করতে, মুসলমানদের গুপ্তকথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নিষেধ করছেন। অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ 'মুমিনগণ যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন মঙ্গলের অধিকারী নয়। হঁ্যা, তবে যদি আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যিক ভালবাসা রাখ সেটা অন্য কথা এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।' (৩:২৮) অর্থাৎ তোমরা যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে তোমাদের তাঁর হতে ভীত হওয়া উচিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই এরূপ ইবাদতের মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে তথায় তার ভাবার্থ হচ্ছে দলীল। অর্থাৎ তোমরা যদি মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তবে তোমাদের ঐ কাজ তোমাদের উপর ঐ বিষয়ের দলীল হয়ে যাবে যে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। পূর্বযুগীয় কয়েকজন মুফাসৃসির এ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের কঠিন কুফরীর কারণে জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে প্রবেশ করবে। (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বিপরীত। জান্নাতের দরজা রয়েছে একটির উপর আরেকটি। পক্ষান্তরে জাহান্নামের দারক’ রয়েছে একটির নীচে অপরটি। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, মুনাফিকদেরকে আগুনের বাক্সে পুরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর মধ্যে জ্বলতে পুড়তে থাকবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এ বাক্সটি হবে লোহার, যাতে আগুন দেয়া মাত্রই আগুন হয়ে যাবে এবং তার চার দিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কেউ এমন হবে না যে তাকে কোন প্রকারের সাহায্য করতে পারে বা তাকে জাহান্নাম হতে বের করতে পারে অথবা শাস্তি কিছু কম করাতে পারে। তবে হ্যা, তাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, লজ্জিত হবে এবং ঐ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অতঃপর সংশোধিত হয়ে যাবে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সকার্য সম্পাদন করবে, রিয়াকে আন্তরিকতার সাথে পরিহার করবে এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে, তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদেরকে খাঁটি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উত্তম পুণ্যের অধিকারী করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের দ্বীনকে খাটি কর তবে অল্প আমলই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন বেনিয়ায, তিনি বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে চান না। হ্যাঁ, তবে যদি সে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে পাপ কার্য করতে থাকে তবে অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা তোমাদের আমল সুন্দর করে নাও এবং আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর অন্তরের সাথে বিশ্বাস স্থাপন কর তবে কোন কারণ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। তিনিতো ছোট ছোট পুণ্যের বেশ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তাকে সম্মান দিয়ে থাকেন। তিনি পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। কার আমল যে খাটি ও গ্রহণযোগ্য তা তিনি ভালই জানেন। কার অন্তরে যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং কার অন্তর যে ঈমান শূন্য তিনি সেটাও জানেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।
আন-নিসা 4:145
১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সর্বদা উঠাবসা করতে, মুসলমানদের গুপ্তকথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নিষেধ করছেন। অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ 'মুমিনগণ যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন মঙ্গলের অধিকারী নয়। হঁ্যা, তবে যদি আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যিক ভালবাসা রাখ সেটা অন্য কথা এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।' (৩:২৮) অর্থাৎ তোমরা যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে তোমাদের তাঁর হতে ভীত হওয়া উচিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই এরূপ ইবাদতের মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে তথায় তার ভাবার্থ হচ্ছে দলীল। অর্থাৎ তোমরা যদি মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তবে তোমাদের ঐ কাজ তোমাদের উপর ঐ বিষয়ের দলীল হয়ে যাবে যে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। পূর্বযুগীয় কয়েকজন মুফাসৃসির এ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের কঠিন কুফরীর কারণে জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে প্রবেশ করবে। (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বিপরীত। জান্নাতের দরজা রয়েছে একটির উপর আরেকটি। পক্ষান্তরে জাহান্নামের দারক’ রয়েছে একটির নীচে অপরটি। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, মুনাফিকদেরকে আগুনের বাক্সে পুরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর মধ্যে জ্বলতে পুড়তে থাকবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এ বাক্সটি হবে লোহার, যাতে আগুন দেয়া মাত্রই আগুন হয়ে যাবে এবং তার চার দিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কেউ এমন হবে না যে তাকে কোন প্রকারের সাহায্য করতে পারে বা তাকে জাহান্নাম হতে বের করতে পারে অথবা শাস্তি কিছু কম করাতে পারে। তবে হ্যা, তাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, লজ্জিত হবে এবং ঐ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অতঃপর সংশোধিত হয়ে যাবে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সকার্য সম্পাদন করবে, রিয়াকে আন্তরিকতার সাথে পরিহার করবে এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে, তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদেরকে খাঁটি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উত্তম পুণ্যের অধিকারী করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের দ্বীনকে খাটি কর তবে অল্প আমলই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন বেনিয়ায, তিনি বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে চান না। হ্যাঁ, তবে যদি সে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে পাপ কার্য করতে থাকে তবে অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা তোমাদের আমল সুন্দর করে নাও এবং আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর অন্তরের সাথে বিশ্বাস স্থাপন কর তবে কোন কারণ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। তিনিতো ছোট ছোট পুণ্যের বেশ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তাকে সম্মান দিয়ে থাকেন। তিনি পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। কার আমল যে খাটি ও গ্রহণযোগ্য তা তিনি ভালই জানেন। কার অন্তরে যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং কার অন্তর যে ঈমান শূন্য তিনি সেটাও জানেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।
আন-নিসা 4:146
১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সর্বদা উঠাবসা করতে, মুসলমানদের গুপ্তকথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নিষেধ করছেন। অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ 'মুমিনগণ যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন মঙ্গলের অধিকারী নয়। হঁ্যা, তবে যদি আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যিক ভালবাসা রাখ সেটা অন্য কথা এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।' (৩:২৮) অর্থাৎ তোমরা যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে তোমাদের তাঁর হতে ভীত হওয়া উচিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই এরূপ ইবাদতের মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে তথায় তার ভাবার্থ হচ্ছে দলীল। অর্থাৎ তোমরা যদি মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তবে তোমাদের ঐ কাজ তোমাদের উপর ঐ বিষয়ের দলীল হয়ে যাবে যে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। পূর্বযুগীয় কয়েকজন মুফাসৃসির এ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের কঠিন কুফরীর কারণে জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে প্রবেশ করবে। (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বিপরীত। জান্নাতের দরজা রয়েছে একটির উপর আরেকটি। পক্ষান্তরে জাহান্নামের দারক’ রয়েছে একটির নীচে অপরটি। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, মুনাফিকদেরকে আগুনের বাক্সে পুরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর মধ্যে জ্বলতে পুড়তে থাকবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এ বাক্সটি হবে লোহার, যাতে আগুন দেয়া মাত্রই আগুন হয়ে যাবে এবং তার চার দিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কেউ এমন হবে না যে তাকে কোন প্রকারের সাহায্য করতে পারে বা তাকে জাহান্নাম হতে বের করতে পারে অথবা শাস্তি কিছু কম করাতে পারে। তবে হ্যা, তাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, লজ্জিত হবে এবং ঐ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অতঃপর সংশোধিত হয়ে যাবে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সকার্য সম্পাদন করবে, রিয়াকে আন্তরিকতার সাথে পরিহার করবে এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে, তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদেরকে খাঁটি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উত্তম পুণ্যের অধিকারী করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের দ্বীনকে খাটি কর তবে অল্প আমলই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন বেনিয়ায, তিনি বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে চান না। হ্যাঁ, তবে যদি সে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে পাপ কার্য করতে থাকে তবে অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা তোমাদের আমল সুন্দর করে নাও এবং আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর অন্তরের সাথে বিশ্বাস স্থাপন কর তবে কোন কারণ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। তিনিতো ছোট ছোট পুণ্যের বেশ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তাকে সম্মান দিয়ে থাকেন। তিনি পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। কার আমল যে খাটি ও গ্রহণযোগ্য তা তিনি ভালই জানেন। কার অন্তরে যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং কার অন্তর যে ঈমান শূন্য তিনি সেটাও জানেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।
আন-নিসা 4:147
১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সর্বদা উঠাবসা করতে, মুসলমানদের গুপ্তকথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নিষেধ করছেন। অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ 'মুমিনগণ যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন মঙ্গলের অধিকারী নয়। হঁ্যা, তবে যদি আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যিক ভালবাসা রাখ সেটা অন্য কথা এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।' (৩:২৮) অর্থাৎ তোমরা যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে তোমাদের তাঁর হতে ভীত হওয়া উচিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই এরূপ ইবাদতের মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে তথায় তার ভাবার্থ হচ্ছে দলীল। অর্থাৎ তোমরা যদি মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তবে তোমাদের ঐ কাজ তোমাদের উপর ঐ বিষয়ের দলীল হয়ে যাবে যে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। পূর্বযুগীয় কয়েকজন মুফাসৃসির এ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের কঠিন কুফরীর কারণে জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে প্রবেশ করবে। (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বিপরীত। জান্নাতের দরজা রয়েছে একটির উপর আরেকটি। পক্ষান্তরে জাহান্নামের দারক’ রয়েছে একটির নীচে অপরটি। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, মুনাফিকদেরকে আগুনের বাক্সে পুরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর মধ্যে জ্বলতে পুড়তে থাকবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এ বাক্সটি হবে লোহার, যাতে আগুন দেয়া মাত্রই আগুন হয়ে যাবে এবং তার চার দিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কেউ এমন হবে না যে তাকে কোন প্রকারের সাহায্য করতে পারে বা তাকে জাহান্নাম হতে বের করতে পারে অথবা শাস্তি কিছু কম করাতে পারে। তবে হ্যা, তাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, লজ্জিত হবে এবং ঐ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অতঃপর সংশোধিত হয়ে যাবে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সকার্য সম্পাদন করবে, রিয়াকে আন্তরিকতার সাথে পরিহার করবে এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে, তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদেরকে খাঁটি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উত্তম পুণ্যের অধিকারী করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের দ্বীনকে খাটি কর তবে অল্প আমলই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন বেনিয়ায, তিনি বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে চান না। হ্যাঁ, তবে যদি সে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে পাপ কার্য করতে থাকে তবে অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা তোমাদের আমল সুন্দর করে নাও এবং আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর অন্তরের সাথে বিশ্বাস স্থাপন কর তবে কোন কারণ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। তিনিতো ছোট ছোট পুণ্যের বেশ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তাকে সম্মান দিয়ে থাকেন। তিনি পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। কার আমল যে খাটি ও গ্রহণযোগ্য তা তিনি ভালই জানেন। কার অন্তরে যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং কার অন্তর যে ঈমান শূন্য তিনি সেটাও জানেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।
আন-নিসা 4:148
১৪৮-১৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, কোন মুসলমানের জন্য বদ দু'আ করা বৈধ নয়। তবে যার উপর অত্যাচার করা হবে সে অত্যাচারীর জন্যে বদ দু'আ করতে পারে। কিন্তু সেও যদি ধৈর্যধারণ করে তবে ফযীলত তাতেই রয়েছে। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কোন জিনিস চুরি যায়। তখন তিনি চোরের জন্যে বদ দুআ করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনে বলেনঃ তার বোঝা হালকা করছো কেন? হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, তার জন্যে বদ দু'আ করা উচিত নয়, বরং নিম্নের দু'আটি পাঠ করা উচিতঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তার উপর সাহায্য করুন এবং তার নিকট হতে আমার প্রাপ্য বের করে দিন। এ মনীষী হতেই বর্ণিত আছে যে, অত্যাচারীর জন্যে বদ দু'আ করার অনুমতি যদিও অত্যাচারিত ব্যক্তির রয়েছে, কিন্তু সেটা যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায়, সেদিকে তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে।হযরত আবদুল করিম ইবনে মালিক জাযারী (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, যে ব্যক্তি গালি দেবে অর্থাৎ মন্দ বলবে তাকে মন্দ বলা যাবে, কিন্তু কেউ অপবাদ দিলে তাকে অপবাদ দেয়া যারে না। অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যে অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারী হতে তার অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের উপর কোন জবাবদিহী নেই। (৪২:৪১) সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘দু’জন গালিদাতা যা বলে ওর শাস্তি তার উপর রয়েছে যে প্রথমে গালি দিয়েছে যে পর্যন্ত না অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “যদি কোন ব্যক্তি কারও নিকট অতিথি হিসেবে আগমন করে এবং অতিথি সেবক তার আতিথেয়তার হক আদায় না করে তবে অতিথি সেবকের দুর্নাম করতে পারে যে পর্যন্ত না সে জিয়াফতের হক আদায় করে।' সুনান-ই-আবি দাউদ, সুনান-ই-ইবনে মাজা প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অভিযোগ পেশ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে থাকেন। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, তথাকার লোক আমাদের মেহমানদারী করে না। এতে আপনার অভিমত কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ যখন তোমরা কোন সম্প্রদায়ের নিকট গমন করবে তখন যদি তারা মেহমানের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে তোমরা তা কবুল করবে। আর যদি তারা তা না করে তবে তোমরা তাদের সাধ্য অনুপাতে তাদের নিকট হতে অতিথির উপযুক্ত প্রাপ্য আদায় করবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান। কোন এক লোকের বাড়ীতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়, রাত্রি অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ তারা তার আতিথ্যের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না, সে সময় প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্যকর্তব্য হবে ঐ ব্যক্তির মাল হতে ও ক্ষেত হতে ঐ রাত্রির মেহমানদারীর জিনিস আদায় করে দিয়ে অতিথিকে সাহায্য করা।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জিয়াফতের রাত্রি প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব। যদি কোন মুসাফির সকাল পর্যন্ত বঞ্চিত থাকে, তবে এটা ঐ মেজবানের দায়িত্বে কর্জ রূপে থাকবে, এখন সে তা আদায় করুক বা ছেড়ে দিক।' এসব হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ মনীষীর মাযহাব এই যে, নিমন্ত্রণ ওয়াজিব। সুনান-ই-আবি দাউদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার প্রতিবেশী আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি এক কাজ কর, তোমার বাড়ীর সমস্ত আসবাবপত্র বাইরে এনে রেখে দাও। লোকটি ঐ কাজই করে এবং সমস্ত আসবাবপত্র রাস্তার উপর রেখে বসে পড়ে। রাস্তা দিয়ে যেই গমন করে সেই তাকে জিজ্ঞেস করে-ব্যাপার কি? সে বলে, আমার প্রতিবেশী আমাকে জ্বালাতন করছে। আমি অধৈর্য হয়ে এখানে চলে এসেছি। সবাই তখন তার প্রতিবেশীকে ভাল-মন্দ বলতে থাকে। কেউ বলে যে, তার উপর আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ বর্ষিত হোক। কেউ বলে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করুন, তার প্রতিবেশী যখন এভাবে অপমানিত হওয়ার কথা জানতে পারে, তখন সে অনুরোধ করে তাকে বাড়ী নিয়ে যায় এবং বলে-আল্লাহর শপথ! এখন আর মৃত্যু পর্যন্ত আপনার প্রতি কোন অত্যাচার করবো না। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘হে লোক সকল! যদি তোমরা কোন সৎ কার্য প্রকাশ কর বা গোপন কর, কিংবা তোমার উপর কেউ হয়তো অত্যাচার করেছে, তাকে তুমি ক্ষমা কর তবে আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমার জন্যে রয়েছে বড় পুণ্য ও মহা প্রতিদান। তিনি নিজেও ক্ষমাকারী এবং বান্দার মধ্যেও তিনি এ অভ্যাস পছন্দ করেন। প্রতিশোধ নেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমা করে থাকেন। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ। আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠ করে থাকেন। কেউ বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি যে, আপনি জানা। সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন। আবার কেউ কেউ বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘হে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমকারী প্রভু! সমস্ত পবিত্রতা আপনার সত্তার জন্যই উপযুক্ত।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, সাদকা ও খায়রাতের কারণে কারও মাল কমে যায় না। ক্ষমা ও মাফ করে দেয়ার কারণে আল্লাহ তা'আলা সম্মান বৃদ্ধি করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে, আল্লাহ তা'আলা তার সম্মান ও মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন।
আন-নিসা 4:149
১৪৮-১৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, কোন মুসলমানের জন্য বদ দু'আ করা বৈধ নয়। তবে যার উপর অত্যাচার করা হবে সে অত্যাচারীর জন্যে বদ দু'আ করতে পারে। কিন্তু সেও যদি ধৈর্যধারণ করে তবে ফযীলত তাতেই রয়েছে। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কোন জিনিস চুরি যায়। তখন তিনি চোরের জন্যে বদ দুআ করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনে বলেনঃ তার বোঝা হালকা করছো কেন? হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, তার জন্যে বদ দু'আ করা উচিত নয়, বরং নিম্নের দু'আটি পাঠ করা উচিতঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তার উপর সাহায্য করুন এবং তার নিকট হতে আমার প্রাপ্য বের করে দিন। এ মনীষী হতেই বর্ণিত আছে যে, অত্যাচারীর জন্যে বদ দু'আ করার অনুমতি যদিও অত্যাচারিত ব্যক্তির রয়েছে, কিন্তু সেটা যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায়, সেদিকে তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে।হযরত আবদুল করিম ইবনে মালিক জাযারী (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, যে ব্যক্তি গালি দেবে অর্থাৎ মন্দ বলবে তাকে মন্দ বলা যাবে, কিন্তু কেউ অপবাদ দিলে তাকে অপবাদ দেয়া যারে না। অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যে অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারী হতে তার অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের উপর কোন জবাবদিহী নেই। (৪২:৪১) সুনান-ই-আবি দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘দু’জন গালিদাতা যা বলে ওর শাস্তি তার উপর রয়েছে যে প্রথমে গালি দিয়েছে যে পর্যন্ত না অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “যদি কোন ব্যক্তি কারও নিকট অতিথি হিসেবে আগমন করে এবং অতিথি সেবক তার আতিথেয়তার হক আদায় না করে তবে অতিথি সেবকের দুর্নাম করতে পারে যে পর্যন্ত না সে জিয়াফতের হক আদায় করে।' সুনান-ই-আবি দাউদ, সুনান-ই-ইবনে মাজা প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অভিযোগ পেশ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে থাকেন। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, তথাকার লোক আমাদের মেহমানদারী করে না। এতে আপনার অভিমত কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ যখন তোমরা কোন সম্প্রদায়ের নিকট গমন করবে তখন যদি তারা মেহমানের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে তোমরা তা কবুল করবে। আর যদি তারা তা না করে তবে তোমরা তাদের সাধ্য অনুপাতে তাদের নিকট হতে অতিথির উপযুক্ত প্রাপ্য আদায় করবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান। কোন এক লোকের বাড়ীতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়, রাত্রি অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ তারা তার আতিথ্যের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না, সে সময় প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্যকর্তব্য হবে ঐ ব্যক্তির মাল হতে ও ক্ষেত হতে ঐ রাত্রির মেহমানদারীর জিনিস আদায় করে দিয়ে অতিথিকে সাহায্য করা।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জিয়াফতের রাত্রি প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব। যদি কোন মুসাফির সকাল পর্যন্ত বঞ্চিত থাকে, তবে এটা ঐ মেজবানের দায়িত্বে কর্জ রূপে থাকবে, এখন সে তা আদায় করুক বা ছেড়ে দিক।' এসব হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ মনীষীর মাযহাব এই যে, নিমন্ত্রণ ওয়াজিব। সুনান-ই-আবি দাউদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার প্রতিবেশী আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি এক কাজ কর, তোমার বাড়ীর সমস্ত আসবাবপত্র বাইরে এনে রেখে দাও। লোকটি ঐ কাজই করে এবং সমস্ত আসবাবপত্র রাস্তার উপর রেখে বসে পড়ে। রাস্তা দিয়ে যেই গমন করে সেই তাকে জিজ্ঞেস করে-ব্যাপার কি? সে বলে, আমার প্রতিবেশী আমাকে জ্বালাতন করছে। আমি অধৈর্য হয়ে এখানে চলে এসেছি। সবাই তখন তার প্রতিবেশীকে ভাল-মন্দ বলতে থাকে। কেউ বলে যে, তার উপর আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ বর্ষিত হোক। কেউ বলে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করুন, তার প্রতিবেশী যখন এভাবে অপমানিত হওয়ার কথা জানতে পারে, তখন সে অনুরোধ করে তাকে বাড়ী নিয়ে যায় এবং বলে-আল্লাহর শপথ! এখন আর মৃত্যু পর্যন্ত আপনার প্রতি কোন অত্যাচার করবো না। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘হে লোক সকল! যদি তোমরা কোন সৎ কার্য প্রকাশ কর বা গোপন কর, কিংবা তোমার উপর কেউ হয়তো অত্যাচার করেছে, তাকে তুমি ক্ষমা কর তবে আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমার জন্যে রয়েছে বড় পুণ্য ও মহা প্রতিদান। তিনি নিজেও ক্ষমাকারী এবং বান্দার মধ্যেও তিনি এ অভ্যাস পছন্দ করেন। প্রতিশোধ নেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমা করে থাকেন। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ। আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠ করে থাকেন। কেউ বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি যে, আপনি জানা। সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন। আবার কেউ কেউ বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘হে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমকারী প্রভু! সমস্ত পবিত্রতা আপনার সত্তার জন্যই উপযুক্ত।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, সাদকা ও খায়রাতের কারণে কারও মাল কমে যায় না। ক্ষমা ও মাফ করে দেয়ার কারণে আল্লাহ তা'আলা সম্মান বৃদ্ধি করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে, আল্লাহ তা'আলা তার সম্মান ও মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন।
আন-নিসা 4:150
১৫০-১৫২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে যে, মাত্র একজন নবীকেও যে মানে না সেও কাফির। ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া অন্যান্য সমস্ত নবীকেই মানতো। খ্রীষ্টানেরা শুধুমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করতো। সামেরীরা হযরত ইউশা’ (আঃ)-এর পরে অন্য কোন নবী (আঃ)-কে স্বীকার করতো না। হযরত ইউশা (আঃ) হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর খলীফা ছিলেন। মাজুসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা তাদের নবী যারাদাশতকে স্বীকার করতো। কিন্তু তারা যখন তাঁর শরীয়তকে অস্বীকার করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শরীয়তকে উঠিয়ে নেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। সুতরাং এ লোকগুলো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করতো অর্থাৎ কোন নবীকে মানতো ও কোন নবীকে মানতো না, তা যে, আল্লাহ প্রদত্ত দলীলের উপর ভিত্তি করে তা নয়। বরং শুধুমাত্র মনের ইচ্ছা, অত্যন্ত গোঁড়ামি এবং পূর্ব পুরুষের কথার উপর অন্ধ বিশ্বাসের কারণেই তারা এরূপ করতো। এর দ্বারা এটাও জানা গেল যে, যে ব্যক্তি মাত্র একজন নবীকে মানে না সে আল্লাহ তাআলার নিকট সমস্ত নবীকেই অস্বীকারকারী। সুতরাং তারা নিঃসন্দেহেই কাফির। প্রকৃতপক্ষে শারঈ ঈমান তাদের কারও উপরেই নেই, বরং রয়েছে শুধু গোঁড়ামি ও প্রবৃত্তির ঈমান। আর এরূপ ঈমান মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব এ কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে। কেননা, যাদের উপর ঈমান না এনে তাঁদের মর্যাদার হানি করেছে তার প্রতিফল এটাই যে, তাদেরকে লাঞ্ছনাজনক শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তারা যে তাদের উপর ঈমান আনছে না তা তাদের চিন্তা-শক্তির অভাবের কারণেই হোক বা সত্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর ইহলৌকিক কোন স্বার্থের কারণেই হোক, যেমন ইয়াহূদী আলেমদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যাপারে এ অভ্যাস ছিল যে, তারা একমাত্র হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছিল এবং তার বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতার কাজে উঠে পড়ে লেগেছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত করেন এবং পরকালেও রয়েছে তাদের জন্যে অপমানকর শাস্তি। অতঃপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করে এবং তাঁদের মধ্যে কোন ভিন্নতা সৃষ্টি করে না। আল্লাহ তাআলার শেষ গ্রন্থ কুরআন কারীমের উপর ঈমান এনে অন্যান্য সমস্ত আসমানী কিতাবকেও তারা বিশ্বাস করে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা। (আরবী) (২:২৮৫)-এ আয়াতে বলেছেন। এরপর তাদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি তাদেরকে তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনয়নের কারণে সত্বরই প্রতিদান প্রদান করবেন। তারা যদি কোন পাপকার্যও করে বসে তবুও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের উপর স্বীয় করুণা বর্ষণ করবেন। কেননা তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
আন-নিসা 4:151
১৫০-১৫২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে যে, মাত্র একজন নবীকেও যে মানে না সেও কাফির। ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া অন্যান্য সমস্ত নবীকেই মানতো। খ্রীষ্টানেরা শুধুমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করতো। সামেরীরা হযরত ইউশা’ (আঃ)-এর পরে অন্য কোন নবী (আঃ)-কে স্বীকার করতো না। হযরত ইউশা (আঃ) হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর খলীফা ছিলেন। মাজুসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা তাদের নবী যারাদাশতকে স্বীকার করতো। কিন্তু তারা যখন তাঁর শরীয়তকে অস্বীকার করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শরীয়তকে উঠিয়ে নেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। সুতরাং এ লোকগুলো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করতো অর্থাৎ কোন নবীকে মানতো ও কোন নবীকে মানতো না, তা যে, আল্লাহ প্রদত্ত দলীলের উপর ভিত্তি করে তা নয়। বরং শুধুমাত্র মনের ইচ্ছা, অত্যন্ত গোঁড়ামি এবং পূর্ব পুরুষের কথার উপর অন্ধ বিশ্বাসের কারণেই তারা এরূপ করতো। এর দ্বারা এটাও জানা গেল যে, যে ব্যক্তি মাত্র একজন নবীকে মানে না সে আল্লাহ তাআলার নিকট সমস্ত নবীকেই অস্বীকারকারী। সুতরাং তারা নিঃসন্দেহেই কাফির। প্রকৃতপক্ষে শারঈ ঈমান তাদের কারও উপরেই নেই, বরং রয়েছে শুধু গোঁড়ামি ও প্রবৃত্তির ঈমান। আর এরূপ ঈমান মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব এ কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে। কেননা, যাদের উপর ঈমান না এনে তাঁদের মর্যাদার হানি করেছে তার প্রতিফল এটাই যে, তাদেরকে লাঞ্ছনাজনক শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তারা যে তাদের উপর ঈমান আনছে না তা তাদের চিন্তা-শক্তির অভাবের কারণেই হোক বা সত্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর ইহলৌকিক কোন স্বার্থের কারণেই হোক, যেমন ইয়াহূদী আলেমদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যাপারে এ অভ্যাস ছিল যে, তারা একমাত্র হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছিল এবং তার বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতার কাজে উঠে পড়ে লেগেছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত করেন এবং পরকালেও রয়েছে তাদের জন্যে অপমানকর শাস্তি। অতঃপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করে এবং তাঁদের মধ্যে কোন ভিন্নতা সৃষ্টি করে না। আল্লাহ তাআলার শেষ গ্রন্থ কুরআন কারীমের উপর ঈমান এনে অন্যান্য সমস্ত আসমানী কিতাবকেও তারা বিশ্বাস করে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা। (আরবী) (২:২৮৫)-এ আয়াতে বলেছেন। এরপর তাদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি তাদেরকে তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনয়নের কারণে সত্বরই প্রতিদান প্রদান করবেন। তারা যদি কোন পাপকার্যও করে বসে তবুও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের উপর স্বীয় করুণা বর্ষণ করবেন। কেননা তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
আন-নিসা 4:152
১৫০-১৫২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে যে, মাত্র একজন নবীকেও যে মানে না সেও কাফির। ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া অন্যান্য সমস্ত নবীকেই মানতো। খ্রীষ্টানেরা শুধুমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ছাড়া সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করতো। সামেরীরা হযরত ইউশা’ (আঃ)-এর পরে অন্য কোন নবী (আঃ)-কে স্বীকার করতো না। হযরত ইউশা (আঃ) হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর খলীফা ছিলেন। মাজুসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা তাদের নবী যারাদাশতকে স্বীকার করতো। কিন্তু তারা যখন তাঁর শরীয়তকে অস্বীকার করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শরীয়তকে উঠিয়ে নেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। সুতরাং এ লোকগুলো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে প্রভেদ আনয়ন করতো অর্থাৎ কোন নবীকে মানতো ও কোন নবীকে মানতো না, তা যে, আল্লাহ প্রদত্ত দলীলের উপর ভিত্তি করে তা নয়। বরং শুধুমাত্র মনের ইচ্ছা, অত্যন্ত গোঁড়ামি এবং পূর্ব পুরুষের কথার উপর অন্ধ বিশ্বাসের কারণেই তারা এরূপ করতো। এর দ্বারা এটাও জানা গেল যে, যে ব্যক্তি মাত্র একজন নবীকে মানে না সে আল্লাহ তাআলার নিকট সমস্ত নবীকেই অস্বীকারকারী। সুতরাং তারা নিঃসন্দেহেই কাফির। প্রকৃতপক্ষে শারঈ ঈমান তাদের কারও উপরেই নেই, বরং রয়েছে শুধু গোঁড়ামি ও প্রবৃত্তির ঈমান। আর এরূপ ঈমান মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব এ কাফিরদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে। কেননা, যাদের উপর ঈমান না এনে তাঁদের মর্যাদার হানি করেছে তার প্রতিফল এটাই যে, তাদেরকে লাঞ্ছনাজনক শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তারা যে তাদের উপর ঈমান আনছে না তা তাদের চিন্তা-শক্তির অভাবের কারণেই হোক বা সত্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর ইহলৌকিক কোন স্বার্থের কারণেই হোক, যেমন ইয়াহূদী আলেমদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যাপারে এ অভ্যাস ছিল যে, তারা একমাত্র হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছিল এবং তার বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতার কাজে উঠে পড়ে লেগেছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত করেন এবং পরকালেও রয়েছে তাদের জন্যে অপমানকর শাস্তি। অতঃপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ সমস্ত নবীকেই বিশ্বাস করে এবং তাঁদের মধ্যে কোন ভিন্নতা সৃষ্টি করে না। আল্লাহ তাআলার শেষ গ্রন্থ কুরআন কারীমের উপর ঈমান এনে অন্যান্য সমস্ত আসমানী কিতাবকেও তারা বিশ্বাস করে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা। (আরবী) (২:২৮৫)-এ আয়াতে বলেছেন। এরপর তাদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি তাদেরকে তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনয়নের কারণে সত্বরই প্রতিদান প্রদান করবেন। তারা যদি কোন পাপকার্যও করে বসে তবুও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের উপর স্বীয় করুণা বর্ষণ করবেন। কেননা তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
আন-নিসা 4:153
১৫৩-১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিল- হযরত মূসা (আঃ) যেমন তাওরাত একই সাথে লিখিত অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এনেছিলেন, দ্রুপ আপনিও পূর্ণভাবে লিখিত কোন আসমানী কিতাব আনয়ন করুন। এও বর্ণিত আছে যে, তারা বলেছিল-আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে আমাদের নামে এমন পত্র আনয়ন করুন যাতে আপনাকে নবীরূপে মেনে নেয়ার নির্দেশ থাকে। এরূপ প্রশ্ন তারা বিদ্রুপ, অবাধ্যতা এবং কুফরীর উদ্দেশ্যেই করেছিল। যেমন মক্কাবাসীও তাকে অনুরূপ এক প্রশ্ন করেছিল যা সূরা-ই-সুবহানে উল্লিখিত আছে। তারা বলেছিল-“যে পর্যন্ত আরব ভূমির উপর আপনি নদী প্রবাহিত করে তাকে সবুজ শ্যামল প্রান্তরে পরিণত না করবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো না। সুতরাং আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন-তাদের এ অবাধ্যতা এবং বাজে প্রশ্নের কারণে আপনি মোটেই দুঃখিত হবেন না। তাদের এটা পুরাতন অভ্যাস। তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে এর চেয়েও জঘন্যতর প্রশ্ন করেছিল। তারা তাকে বলেছিল-আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে প্রদর্শন কর। এ অহংকার, অবাধ্যতা এবং বাজে প্রশ্নের প্রতিফলও তাদেরকে ভোগ করতে হয়েছে। অর্থাৎ আকাশের বিদ্যুৎ তাদের উপর পতিত হয়েছিল। যেমন সূরা-ই-বাকারায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তোমরা বলেছিলে-হে মূসা, আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে দর্শন না করা পর্যন্ত তোমাকে বিশ্বাস করবো না। তখন বিদ্যুৎ তোমাদেরকে আক্রমণ করেছিল ও তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। তৎপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদেরকে সঞ্জীবিত করেছিলাম-যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (২:৫৫-৫৬)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘বড় বড় নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ করার পরেও তারা গো বৎসের পূজো আরম্ভ করে দেয়। মিসরে তাদের শত্রু ফিরআউনের হযরত মূসা (আঃ)-এর মোকাবিলায় ডুবে মরা, তার সমস্ত সৈন্যের দুর্ভাগ্যের মৃত্যুবরণ করা, তাদের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সমুদ্র অতিক্রম করে যাওয়া, এ সবগুলোই তাদের চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছে। তথাপি সেখান হতে কিছু দূর গিয়েই তারা মূর্তি পূজকদেরকে মূর্তিপূজো করতে দেখে স্বীয় নবী (আঃ)-কে বলে-আমাদের জন্যও এরূপ একটি মা’রূদ বানিয়ে দাও।' এর পূর্ণ বিবরণ সূরা-ই-আরাফ এবং সূরা-ই-ত্বাহার মধ্যেও রয়েছে।অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন এবং তাদের তাওবা কবূল হওয়ার পন্থা এই বলে দেয়া হয় যে, যারা গো-বৎসের পূজো করেনি তারা পূজোকারীদেরকে হত্যা করবে। যখন হত্যাকার্য আরম্ভ হয়ে যায় তখন আল্লাহ পাক তাদের তাওবা কবুল করলেন এবং মৃতদেরকেও জীবিত করে দেন। তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন-ওটাকেও আমি ক্ষমা করে দিয়েছি এবং এ মহা পাপকেও আমি মাফ করেছি। আর হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রকাশ্য প্রভাব প্রদান করেছি।যখন তারা তাওরাতের নির্দেশাবলী মান্য করতে অস্বীকার করে এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারে অসম্মত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মাথার উপর তুর পাহাড়কে সমুচ্চ করেন এবং তাদেরকে বলেন-“তোমরা এখন আমার আহকাম মানবে কি-না বল? নতুবা এ পর্বতকে আমি তোমাদের উপর নিক্ষেপ করবো। তখন তারা সবাই সিজদায় পড়ে গিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে এবং নির্দেশাবলী মেনে নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। তাদের অন্তরে এত ভয় হয়েছিল যে, সিজদার মধ্যেও তারা আড় চোখে উপরের দিকে দেখে যে, না জানি পর্বত তাদের উপর পড়ে যায় এবং তারা মৃত্যু মুখে পতিত হয়ে যায়। অতঃপর পর্বত সরিয়ে দেয়া হয়।এরপর তাদের অন্য অবাধ্যতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা কথা ও কাজ দু'টোই পরিবর্তন করেছিল। তাদেরকে বলা হয়েছিল-“তোমরা সিজদা করতে করতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় প্রবেশ কর এবং (আরবী) বল।' অর্থাৎ তোমরা বল হে আল্লাহ! আপনি আমাদের পাপ মার্জনা করুন। আমরা আপনার পথে জিহাদ করা হতে বিরত রয়েছি, যার শাস্তি স্বরূপ আমরা ‘তিহ’ প্রান্তরে হতবুদ্ধি হয়ে চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঘুরে বেরিয়েছি। কিন্তু এখানেও তাদের হঠকারিতা প্রকাশ পেয়েছে। তারা হাঁটুর ভরে চলতে চলতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় পৌছে এবং (আরবী) বলে। অর্থাৎ আমাদেরকে চুলের মধ্যে গম দান। করুন। তাদের আরও দুষ্টামি এই যে, শনিবারের মর্যাদা রক্ষার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধাচরণেও তারা প্রস্তুত হয়ে যায় এবং কৌশল করে পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-আ'রাফের (আরবী) (৭:১৬৩) -এ আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।একটি হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ইয়াহূদীদের নিকট বিশেষ করে শনিবারের মর্যাদা রক্ষার উপর অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। এ পূর্ণ হাদীসটি সূরা-ই-সুবহানের (১৭:১০১)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।
আন-নিসা 4:154
১৫৩-১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিল- হযরত মূসা (আঃ) যেমন তাওরাত একই সাথে লিখিত অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এনেছিলেন, দ্রুপ আপনিও পূর্ণভাবে লিখিত কোন আসমানী কিতাব আনয়ন করুন। এও বর্ণিত আছে যে, তারা বলেছিল-আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে আমাদের নামে এমন পত্র আনয়ন করুন যাতে আপনাকে নবীরূপে মেনে নেয়ার নির্দেশ থাকে। এরূপ প্রশ্ন তারা বিদ্রুপ, অবাধ্যতা এবং কুফরীর উদ্দেশ্যেই করেছিল। যেমন মক্কাবাসীও তাকে অনুরূপ এক প্রশ্ন করেছিল যা সূরা-ই-সুবহানে উল্লিখিত আছে। তারা বলেছিল-“যে পর্যন্ত আরব ভূমির উপর আপনি নদী প্রবাহিত করে তাকে সবুজ শ্যামল প্রান্তরে পরিণত না করবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো না। সুতরাং আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন-তাদের এ অবাধ্যতা এবং বাজে প্রশ্নের কারণে আপনি মোটেই দুঃখিত হবেন না। তাদের এটা পুরাতন অভ্যাস। তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে এর চেয়েও জঘন্যতর প্রশ্ন করেছিল। তারা তাকে বলেছিল-আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে প্রদর্শন কর। এ অহংকার, অবাধ্যতা এবং বাজে প্রশ্নের প্রতিফলও তাদেরকে ভোগ করতে হয়েছে। অর্থাৎ আকাশের বিদ্যুৎ তাদের উপর পতিত হয়েছিল। যেমন সূরা-ই-বাকারায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তথায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তোমরা বলেছিলে-হে মূসা, আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে দর্শন না করা পর্যন্ত তোমাকে বিশ্বাস করবো না। তখন বিদ্যুৎ তোমাদেরকে আক্রমণ করেছিল ও তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। তৎপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদেরকে সঞ্জীবিত করেছিলাম-যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (২:৫৫-৫৬)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘বড় বড় নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ করার পরেও তারা গো বৎসের পূজো আরম্ভ করে দেয়। মিসরে তাদের শত্রু ফিরআউনের হযরত মূসা (আঃ)-এর মোকাবিলায় ডুবে মরা, তার সমস্ত সৈন্যের দুর্ভাগ্যের মৃত্যুবরণ করা, তাদের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সমুদ্র অতিক্রম করে যাওয়া, এ সবগুলোই তাদের চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছে। তথাপি সেখান হতে কিছু দূর গিয়েই তারা মূর্তি পূজকদেরকে মূর্তিপূজো করতে দেখে স্বীয় নবী (আঃ)-কে বলে-আমাদের জন্যও এরূপ একটি মা’রূদ বানিয়ে দাও।' এর পূর্ণ বিবরণ সূরা-ই-আরাফ এবং সূরা-ই-ত্বাহার মধ্যেও রয়েছে।অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন এবং তাদের তাওবা কবূল হওয়ার পন্থা এই বলে দেয়া হয় যে, যারা গো-বৎসের পূজো করেনি তারা পূজোকারীদেরকে হত্যা করবে। যখন হত্যাকার্য আরম্ভ হয়ে যায় তখন আল্লাহ পাক তাদের তাওবা কবুল করলেন এবং মৃতদেরকেও জীবিত করে দেন। তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন-ওটাকেও আমি ক্ষমা করে দিয়েছি এবং এ মহা পাপকেও আমি মাফ করেছি। আর হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রকাশ্য প্রভাব প্রদান করেছি।যখন তারা তাওরাতের নির্দেশাবলী মান্য করতে অস্বীকার করে এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারে অসম্মত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মাথার উপর তুর পাহাড়কে সমুচ্চ করেন এবং তাদেরকে বলেন-“তোমরা এখন আমার আহকাম মানবে কি-না বল? নতুবা এ পর্বতকে আমি তোমাদের উপর নিক্ষেপ করবো। তখন তারা সবাই সিজদায় পড়ে গিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে এবং নির্দেশাবলী মেনে নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। তাদের অন্তরে এত ভয় হয়েছিল যে, সিজদার মধ্যেও তারা আড় চোখে উপরের দিকে দেখে যে, না জানি পর্বত তাদের উপর পড়ে যায় এবং তারা মৃত্যু মুখে পতিত হয়ে যায়। অতঃপর পর্বত সরিয়ে দেয়া হয়।এরপর তাদের অন্য অবাধ্যতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা কথা ও কাজ দু'টোই পরিবর্তন করেছিল। তাদেরকে বলা হয়েছিল-“তোমরা সিজদা করতে করতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় প্রবেশ কর এবং (আরবী) বল।' অর্থাৎ তোমরা বল হে আল্লাহ! আপনি আমাদের পাপ মার্জনা করুন। আমরা আপনার পথে জিহাদ করা হতে বিরত রয়েছি, যার শাস্তি স্বরূপ আমরা ‘তিহ’ প্রান্তরে হতবুদ্ধি হয়ে চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঘুরে বেরিয়েছি। কিন্তু এখানেও তাদের হঠকারিতা প্রকাশ পেয়েছে। তারা হাঁটুর ভরে চলতে চলতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় পৌছে এবং (আরবী) বলে। অর্থাৎ আমাদেরকে চুলের মধ্যে গম দান। করুন। তাদের আরও দুষ্টামি এই যে, শনিবারের মর্যাদা রক্ষার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধাচরণেও তারা প্রস্তুত হয়ে যায় এবং কৌশল করে পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন সূরা-ই-আ'রাফের (আরবী) (৭:১৬৩) -এ আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।একটি হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ইয়াহূদীদের নিকট বিশেষ করে শনিবারের মর্যাদা রক্ষার উপর অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। এ পূর্ণ হাদীসটি সূরা-ই-সুবহানের (১৭:১০১)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।
আন-নিসা 4:155
১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।' এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনিঅত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।" এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন। যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তার যুগে সমস্ত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু ইসলাম ধর্মই থাকবে। তার যুগে আল্লাহ আআলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন। অতঃপর সারা জগতে নিরাপত্তা বিরাজ করবে। এমনকি কৃষ্ণ সর্প উটের সঙ্গে, চিতা ব্যাঘ্র গাভীর সঙ্গে এবং নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে চরে বেড়াবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলা করবে। তারা তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়াবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের এ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি ইসলামের জন্যে লোকের সঙ্গে জিহাদ করবেন। এ হাদীসের একটি অংশ সহীহ বুখারীর মধ্যেও রয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ, “দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত রোমকগণ ‘আ’মাক’ বা ‘দাবিকে অবতরণ না করবে এবং তাদের মোকাবিলায় মদীনা হতে মুসলিম সেনাবাহিনী গমন না করবে। সে সময় ঐ মুসলমানেরা সারা দুনিয়ার লোকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবে।যখন তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাবে তখন রোমকগণ তাদেরকে বলবে‘আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে। আমাদের মধ্য হতে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে তোমাদের নিকট চলে এসেছে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। তোমরা তাদের মধ্য হতে সরে যাও।' তখন মুসলমানেরা বলবেআল্লাহর শপথ! এটা কখনও হতে পারে না যে, আমরা আমাদের দুর্বল ভাইদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে দেবো। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঐ মুসলিম সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। তাদের তাওবা আল্লাহ তা'আলা কখনও গ্রহণ করবেন না। এক তৃতীয়াংশ শহীদ হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম শহীদ। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর জয়লাভ করবে। এরপর তারা আর কোন হাঙ্গামায় পতিত হবে না।তারা (মুসলমানেরা) কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা যায়তুন বৃক্ষের উপর নিজেদের তরবারী ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে থাকবে। এমন সময় শয়তান চীৎকার করে বলবেঃ “তোমাদের সন্তানদের মধ্য দাজ্জাল এসে গেছে। তারা এ মিথ্যা কথাকে সত্য মনে করে এখান হতে বেরিয়ে সিরিয়ায় পৌছে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যুহ ঠিক করতে থাকবে? এমন সময় অন্যদিকে নামাযের ইকামত হবে এবং হযরত ঈসা ইনে। মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে তাদের ইমামতি করবেন। শত্রু বাহিনী যখন মুসলমানদেরকে দেখবে তখন তারা গলে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে ছেড়েও দেন তবুও তারা গলে গলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হাতে তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় বর্শার রক্ত তাদেরকে দেখাবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ,ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হররত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ ‘এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।' হযরত মূসা (আঃ)-ও এরূপই বলেন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। হ্যা, তবে আমার প্রভু আমার নিকট যে অঙ্গীকার করেছেন তা এই যে, দাজ্জাল বের হবে। দু’টি দল তার সঙ্গী হবে। সে আমাকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমনভাবে সীসা গলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দেবেন। এমন কি পাথর ও গাছ বলবে-হে মুসলমান! এখানে আমার পিছনে একটি কাফির আছে, তাকে হত্যা কর। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করবেন এবং মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফিরে যাবে। তারপরে ইয়াজুয ও মাজুয বের হবে এবং চতুর্দিক হতে তারা আক্রমণ চালাবে। সমস্ত শহরকে তারা ধ্বংস করবে। যেসব স্থান তারা অতিক্রম করবে ঐ সবই ধ্বংস করে দেবে। যে পানির পার্শ্ব দিয়ে তারা গমন করবে তার সবই পান করে নেবে। লোকেরা পুনরায় আমার নিকট ফিরে আসবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবো। তিনি তখন তাদের সকলকেই একই সাথে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু তাদের মৃত দেহের দুর্গন্ধে বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়বে। ফলে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। অতঃপর এত বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হবে যে, ঐ সমস্ত মৃতদেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কিয়ামতের সংঘটন এত নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর অবস্থা হয়ে থাকে যে, সকালে হবে কি সন্ধ্যায় হবে বা দিনে হবে কি রাত্রে হবে তা তার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারে না।”মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু নায়রা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা জুমআর দিন হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করি, আমার লিখিত কুরআন কারীমকে তাঁর পঠনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াই আমার তাঁর নিকট আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। জুমআর নামাযের সময় হলে তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “গোলস করুন। তারপর তিনি সুগন্ধি নিয়ে আসেন। আমরা সুগন্ধি মেখে মসজিদে হাযির হই এবং একটি লোকের পার্শ্বে বসে পড়ি। এ লোকটি দাজ্জালের হাদীস বর্ণনা করছিলেন। অতঃপর হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, মুসলমানদের তিনটি শহর হবে, একটি হবে দু’টি সমুদ্রের মিলিত হওয়ার জায়গায়, দ্বিতীয়টি হবে হীরায় এবং তৃতীয়টি হবে সিরিয়ায়। তারপর মানুষ তিনটি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হবে। অতঃপর দাজ্জাল বহির্গত হবে। তারা প্রথম শহরটিতে যাবে। তথাকার লোক তিন অংশে বিভক্ত হবে। এক অংশ বলবে- আমরা তাদের মোকাবিলা করবো এবং কি সংঘটিত হয় তা দেখবো। দ্বিতীয় দলটি গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে এবং তৃতীয় দল তাদের নিকটবর্তী শহরে চলে যাবে। দাজ্জালের সঙ্গে সত্তর হাজার লোক থাকবে। তাদের মাথায় মুকুট থাকবে। তাদের অধিকাংশই হবে ইয়াহুদী ও স্ত্রীলোক। এখানকার মুসলমানগণ একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ হবে। তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মাঠে চরতে গিয়েছিল ঐগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের বিপদ খুব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়বে। এমনকি তারা তাদের কামানের তারগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে থাকবে। এরূপ সংকটময় অবস্থায় সমুদ্রের মধ্য হতে তাদের কানে শব্দ আসবে- হে লোক সকল! তোমাদের জন্যে সাহায্য এসে গেছে। এ শব্দ শুনে লোকগুলো খুব খুশী হবে। কেননা, তারা বুঝতে পারবে যে, এটা কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কথা। ঠিক ফজরের নামাযের সময় ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। মুসলমাদের আমীর তাঁকে বলবেন- “হে রূহুল্লাহ (আঃ)! আগে বাড়ুন এবং নামায পড়িয়ে দিন। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘এ উম্মতের কিছু সংখ্যক লোক কিছু সংখ্যক লোকের আমীর রয়েছে। সুতরাং এ দলের আমীরই তাদের নামাযের ইমাম হবে। অতএব, তাদের আমীরই ইমাম হয়ে নামায পড়াবেন। নামায শেষ করেই হযরত ঈসা (আঃ) বর্শা হাতে নিয়ে মাসীহ দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। দাজ্জাল তাঁকে দেখামাত্রই সীসার মত গলতে থাকবে। তিনি তার বক্ষে আঘাত করবেন। ঐ আঘাতেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সঙ্গীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু কোন স্থানেই তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। এমনকি তারা যদি কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেই গাছও বলবে-“হে মুমিন! একটি কাফির আমার নিকট লুকিয়ে রয়েছে।' এ কথা পাথরও বলবে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক ভাষণের কম বেশী অংশ দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনায় এবং সে দাজ্জাল হতে ভয় প্রদর্শনেই কাটিয়ে দেন। সে ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এর অপেক্ষা বড় হাঙ্গামা আর নেই। সমস্ত নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। সে নিশ্চিতরূপে তোমাদের মধ্যেই আসবে। যদি আমার জীবদ্দশায় সে এসে পড়ে তবে তো আমি তাকে বাধা দান করবো। আর যদি আমার পরে আসে তবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমি আল্লাহ তা'আলাকেই প্রত্যেক মুসলমানের অভিভাবক করে যাচ্ছি। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বের হবে। সে ডান ও বামে খুব ঘুরাফেরা করবে। হে জনমণ্ডলী ও হে আল্লাহর বান্দাগণ! দেখ, তোমরা অটল থাকবে। জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে তার এমন পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছি যা অন্য কোন নবী স্বীয় উম্মতকে জানিয়ে যাননি। সে প্রথমতঃ দাবী করবে-আমি নবী। সুতরাং তোমরা স্মরণ রেখো যে, আমার পরে কোন নবী নেই। অতঃপর এর চেয়েও বেড়ে গিয়ে বলবে-“আমি আল্লাহ'। অতএব তথায় তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহকে এই চোখে কেউ দেখতে পারে না। মৃত্যুর পর তথায় তার দর্শন লাভ ঘটতে পারে। আরও স্মরণ রেখো যে, সে এক চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং তোমাদের প্রভু এক চক্ষু বিশিষ্ট নন। তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে কাফির' লিখিত থাকবে যা প্রত্যেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মোটকথা প্রত্যেক ঈমানদারই পড়তে পারবে।তার সাথে আগুন থাকবে ও বাগান থাকবে। তার আগুন হবে আসলে জান্নাত এবং বাগানটি হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম। তোমাদের মধ্যে যাকে সে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। ঐ আগুন তার জন্যে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর নমরূদের আগুন শান্তিদায়ক হয়েছিল। তার এক হাঙ্গামা এও হবে যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে-“আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করতে পারি তবে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে?' এমন সময়ে দু’জন শয়তান তার পিতা-মাতার আকারে প্রকাশিত হবে এবং তাকে বলবে-বৎস! এটাই তোমার প্রভু। সুতরাং তাকে মেনে নাও।' তার আর একটা ফিত্না এও হবে যে, তাকে একটি লোকের উপর জয়যুক্ত করা হবে। সে তাকে করাত দ্বারা ফেড়ে দু’টুকরো করে দেবে। তারপর সে জনগণকে বলবেঃ আমার এ বান্দাকে তোমরা দেখ, এখন আমি তাকে জীবিত করবো। কিন্তু সে পুনরায় এ কথাই বলবে যে, তার প্রভু আমি ছাড়া অন্য কেউ। অতঃপর এ দু' দুবৃত্ত তাকে উঠা-বসা করাবে এবং বলবেঃ তোমার প্রভু কে? সে উত্তরে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ এবং তুমি তার শত্রু দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! এখন তো আমার পূর্বাপেক্ষাও বেশী বিশ্বাস হয়েছে। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ মুমিন ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণীর জান্নাতের অধিকারী হবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, এ হাদীসটি শুনে আমাদের ধারণা হয় যে, এ লোকটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাবই (রাঃ) হবেন, তাঁর শাহাদাত লাভ পর্যন্ত আমাদের ধারণা এটাই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার একটি হাঙ্গামা এও হবে যে, সে আকাশকে পানি বর্ষণ করার নির্দেশ দেবে এবং আকাশ হতে পানি বর্ষিত হবে। সে যমীনকে ফসল উৎপাদন করার নির্দেশ দেবে এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদিত হবে।তার আর একটি ফিত্না এও হবে যে, সে একটি গোত্রের নিকট যাবে এবং তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। সে সময়ই তাদের সমস্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট যাবে। তৎক্ষণাৎ তার হুকুমে আকাশ। হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং যমীনে ফলস উৎপাদিত হবে। তাদের গৃহপালিত পশু পূর্বাপেক্ষা বেশী মোটা-তাজা ও দুগ্ধবতী হয়ে যাবে। তারা মক্কা ও মদীনা ছাড়া যমীনের সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যে যখন মদীনামুখী হবে তখন সারা পথে সে তরবারীধারী ফেরেশতাগণকে দেখতে পাবে। সে তখন ‘সানতার শেষ প্রান্তে, যারীবে আহমারের নিকট থেমে যাবে। অতঃপর মদীনায় তিনটি ভূমিকম্প হবে। ফলে মদীনায় যত মুনাফিক নর ও নারী থাকবে সবাই মদীনা হতে বেরিয়ে গিয়ে দাজ্জালের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এভাবে মদীনা নিজের মধ্য হতে অপবিত্র লোকদেরকে দূর করে দেবে যেমন লোহার ভাটা লোহার মরিচা দূর করে থাকে। সেদিনের নাম হবে ‘ইয়াওমুল খালাস’ (মুক্তির দিন)।হযরত উম্মে শুরায়েক (রাঃ) রাসূলুরলাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেদিন আরববাসী কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ প্রথমতঃ তারা থাকবেই খুব কম এবং তাদের অধিকাংশই থাকবে বাইতুল মুকাদ্দাসে। তাদের ইমাম হবে একজন সৎ ব্যক্তি। সে ফজরের নামায পড়াতে থাকবে এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। ঐ ইমাম তখন পিছনে সরতে থাকবে যেন ঈসা (আঃ) ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি তার স্কন্ধে হাত রেখে বলবেনঃ “তুমি সামনে এগিয়ে নামায পড়িয়ে দাও, ইকামত তোমার জন্যেই দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের ইমামই নামায পড়িয়ে দেবে। নামায শেষে তিনি বলবেনঃ দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দেয়া হবে। এদিকে দাজ্জাল সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে হাযির হবে। তাদের মস্তকে মুকুট থাকবে এবং তাদের তরবারীর উপর সোনা থাকবে। দাজ্জাল তাঁকে দেখে এমনভাবে গলতে থাকবে যেমনভাবে পানিতে লবণ গলে থাকে। অতঃপর সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতঃ পালাতে শুরু করবে। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা এটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তুমি আমার হাতেই একটা মার খাবে, সুতরাং ওটা হতে রক্ষা পেতে পার না। অতএব, তিনি তাকে পূর্ব দরজা লুদ-এর নিকট ধরে নেবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন ইয়াহূদীরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু তারা কোথাও মাথা লুকানোর জায়গা পাবে না। প্রত্যেক পাথর, বৃক্ষ, দেয়াল ও জীবজন্তু বলতে থাকবেঃ “হে মুসলমান! এখানে ইয়াহুদী রয়েছে। এসে তাকে হত্যা কর।” তবে বাবলা গাছ হচ্ছে ইয়াহূদীদের গাছ। সে কিন্তু বলবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে চল্লিশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বছর হবে অর্ধ বছরের মত, বছর হবে মাসের মত, মাস হবে জুম'আর মত এবং শেষ দিনগুলো হবে ‘শারারার মত। তোমাদের কোন লোক সকালে শহরের একটি দরজা হতে চলতে আরম্ভ করে দ্বিতীয় দরজায় পৌছতে পারবে না। এমন সময়েই সন্ধ্যা হবে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ছোট দিনগুলোতে আমরা কিভাবে নামায আদায় করবো?" তিনি বলেনঃ “তোমরা এ দীর্ঘ দিনগুলোতে যেমনভাবে অনুমান করে নামায পড়ছো, তখনও সেভাবেই অনুমান করে নামায পড়বে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারপর হযরত ঈসা (আঃ) আমার উম্মতের মধ্যে শাসনকর্তা হবেন, ন্যায়পরায়ণ হবেন, ইমাম হবেন এবং ন্যায় বিচারক হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। তিনি সাদকা গ্রহণ করবেন না। সুতরাং ছাগল ও উটের উপর কোন চেষ্টা করা হবে না। হিংসা বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে। প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণীর বিষক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হবে। শিশু স্বীয় অঙ্গুলি সাপের মুখে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ওটা তার কোন ক্ষতি করবে না। ছেলেরা সিংহের সাথে খেলা করবে, অথচ তাদের কোন বিপদ ঘটবে না। নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে এমন গলায় গলায় মিলে থাকবে যে, যেন সে পাহারাদার কুকুর। সমগ্র জগৎ ইসলাম ও ন্যায়নীতিতে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে যেমনভাবে বর্তন পানিতে পরিপূর্ণ হয়। সকলের একই কালেমা’ হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না। যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কুরাইশ স্বীয় রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। পৃথিবী সাদা চাদির ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। হযরত আদম (আঃ)-এর বরকতময় যুগের ন্যায় ফসল উৎপাদিত হবে। একটা দলের পরিতৃপ্তির জন্যে এক গুচ্ছ আঙ্গুরই যথেষ্ট হবে। এক একটি ডালিম ফল এত বড় হবে যে, একটি দল একটি ডালিম খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। বলদ এরূপ মূল্যে পাওয়া যাবে’ (অর্থাৎ বলদের মূল্য খুব বেশী হবে) এবং ঘোড়া কতগুলো দিরহামের বিনিময়েই পাওয়া যাবে।”জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঘোড়ার মূল্য হ্রাস পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, যুদ্ধে ওর সোয়ারী মোটেই নেয়া হবে না। তারা প্রশ্ন করেনঃ “বলদের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, সমগ্র পৃথিবীতে কৃষিকার্য শুরু হয়ে যাবে।” দাজ্জাল প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পূর্বেই ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। প্রথম বছরে বৃষ্টির এক তৃতীয়াংশ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপরে ভূমির উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশ কমে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় বছরে আকাশকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, সে যেন বৃষ্টি দুই তৃতীয়াংশ বন্ধ রাখে এবং এ নির্দেশ ভূমিকেও দেয়া হবে যে, সে যেন উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশ কম করে। তৃতীয় বছর আকাশ হতে বৃষ্টির এক ফোটাও বর্ষিত হবে না। অনুরূপভাবে ভূমিতে একটি চারাগাছও জন্ম নেবে না। সমস্ত জীবজন্তু এ দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে রক্ষা করবেন সেই রক্ষা পাবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সে সময় মানুষ কিরূপে জীবিত থাকবে?' তিনি বলেনঃ “সে সময় তাদের খাদ্যের স্থলবর্তী হবে তাদের লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করা, সুবহানাল্লাহ পাঠ করা এবং আলহামদুল্লিাহ বলা।” ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বলেন, আমার উস্তাদ তাঁর উস্তাদ হতে শুনেছেন, তিনি বলতেনঃ “এ হাদীসটি এ যোগ্যতা রাখে যে, শিশুদের শিক্ষক শিশুদেরকেও এটা শিক্ষা দেবেন, এমনকি লিখিয়ে দেবেন, যেন তাদেরও এটা স্মরণ থাকে।” এ হাদীসটি এ সম্বন্ধে গারীব বটে, কিন্তু এর কোন কোন অংশের প্রমাণ স্বরূপ অন্য হাদীসও রয়েছে। এ হাদীসের মতই একটি হাদীস হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আমরা ওটাও এখানে বর্ণনা করছি।সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত নাওয়াস ইবনে শামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকালে দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এমনভাবে তাকে উঁচু ও নীচু করেন যে, আমাদের মনে হয় না জানি সে মদীনার খেজুরের বাগানেই বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আমরা তাঁর নিকট ফিরে আসলে আমাদের চেহারা দেখে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” তখন আমরা তা বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও আর একটা বেশী ভয় রয়েছে। আমার বিদ্যমানতায় যদি সে বের হয় তবে আমি তাকে বুঝে নেবো। কিন্তু যদি আমার পরে সে বের হয় তবে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাকে বাধা দিতে হবে। আমি মহান আল্লাহকেই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিনিধি বানিয়ে দিয়েছি। জেনে রেখো, সে যুবক হবে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এটুকু বুঝে নাও যে, সে দেখতে অনেকটা আবদুল উয্যা ইবনে কাতনের মত হবে। তোমাদের যে তাকে দেখবে সে যেন সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী প্রান্ত হতে বের হবে এবং ডানে-বামে ঘুরে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (ঈমানের উপরে) খুব অটল থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কতদিন অবস্থান করবে। তিনি বললেনঃ “চল্লিশ দিন। এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান, একদিন হবে এক জুমআর সমান এবং অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মত হবে।”অতঃপর আমরা জিজ্ঞেস করি, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা অনুমান করে নেবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের চলন গতি কিরূপ দ্রুত হবে? তিনি বলেনঃ মেঘ যেমন বাতাসে তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। সে একটি গোত্রকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তাকে মেনে নেবে। তখন তাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যমীন হতে ফলস উৎপাদিত হবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মোটা তাজা হয়ে যাবে ও খুব বেশী দুধ দেবে। সে আর এক সম্প্রদায়ের নিকট যাবে। তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও অস্বীকার করবে। সে সেখান হতে ফিরে আসবে। তখন তাদের হাতে মাল-ধন কিছুই থাকবে না। সে অনুর্বর ভূমির উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেবে, “হে যমীন! তোমার ধনাগারকে বের করে দাও।" তখন যমীনের মধ্য হতে ধন-ভাণ্ডার বেরিয়ে আসবে।সে তখন মৌমাছির মত ঐ ধনের পিছনে পিছনে ফিরতে থাকবে। সে একজন নব্য যুবককে আহ্বান করবে এবং তাকে হত্যা করতঃ দু'টুকরো করে এতদূরে নিক্ষেপ করবে যতো দূরে একটি তীর চলে থাকে। তারপরে তাকে ডাক দেবে এবং সে তখন জীবিত হয়ে হাসতে হাসতে তার নিকট চলে। আসবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি। দু’টি চাদর পরিহিত হয়ে দু'জন ফেরেশতার ডানার উপর হাত রেখে দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা স্তম্ভের নিকট অবতরণ করবেন। যখন তিনি মস্তক কুঁকাবেন তখন তার মস্তক হতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরে পড়বে এবং যখন তিনি মস্তক উত্তোলন করবেন তখন ঐ ফোটাগুলো মুক্তার মত গড়িয়ে পড়বে। যে কাফির পর্যন্ত তার শ্বাস পৌছবে, সে মরে যাবে এবং তার শ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছবে যে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌছে থাকে।তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং ‘লুদ’ নামক স্থানে তাকে ধরেফেলে সেখানেই হত্যা করবেন। তারপরে তিনি ঐ লোকদের নিকট আসবেন যারা এ হাঙ্গামায় রক্ষা পেয়ে যাবে। তিনি তাদের চেহারায় হাত ফিরিয়ে দেবেন। এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিকট অহী আসবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন-‘আমি আমার এমন বান্দাহদেরকে প্রেরণ করেছি যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেউই করতে পারবে না। তুমি আমার এ বিশিষ্ট বান্দাহদেরকে তূর পর্বতের নিকট নিয়ে যাও।' তারপর ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে এবং তারা চতুর্দিক হতে লাফাতে লাফাতে চলে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘বাহীরা-ই-তাবারিয়ায় আসবে এবং ওর সমস্ত পানি পান করে নেবে। তাদের পর পরই যখন অন্য দলটি আসবে তখন তারা ওটাকে এমন শুষ্ক অবস্থায় পাবে যে, তারা বলবে, সম্ভবতঃ এখানে কোন সময় পানি ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গী মুমিনগণ তথায় এমনভাবে অবরুদ্ধ থাকবেন যে, একটি বলদের মাথাও তাদের নিকট এমন পছন্দনীয় মনে হবে যেমন আজ তোমাদের নিকট একশটি স্বর্ণমুদ্রা পছন্দনীয়। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় শত্রুদেরকে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত করবেন। ফলে তারা সবাই একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সঙ্গীগণসহ যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু যমীনে অর্ধহাত পরিমাণ জায়গাও এমন পাবেন না যা তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধ হতে শূন্য থাকবে। পুনরায় তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাবেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা উটের ঘাড়ের মত এক প্রকার পাখি পাঠিয়ে দেবেন। ঐ পাখিগুলো তাদের সমস্ত মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছেমত জায়গায় নিক্ষেপ করবে। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। ফলে সমস্ত যমীন হাতের তালুর মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারপর যমীনকে শস্য এবং ফল উৎপাদনের ও বরকত ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হবে। সেদিন একটি ডালিম ফল এক দল লোকের পক্ষে যথেষ্ট হবে। তারা সবাই ওর ছালের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবে। একটি উন্ত্রীর দুগ্ধ একটি গোটা সম্প্রদায়ের লোকও পান করে শেষ করতে পারবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এক মৃদু ও নির্মল বায়ু প্রবাহিত করবেন যা সমস্ত ঈমানদার নর ও নারীর বগলের নিম্নদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাণ বায়ুও নির্গত হয়ে যাবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরা বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মত পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকবে। তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে। ওটা আমরা ইনশাআল্লাহ (সূরা-ই-আম্বিয়ার) (আরবী) (২১:৯৬) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিকট বললেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি বলে থাকেন-কিয়ামত অমুক অমুক জায়গা পর্যন্ত পৌছে যাবে, এটা কি ব্যাপার? তিনি তখন ‘সুবহানাল্লাহ' এবং 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পর বললেনঃ “আমার ইচ্ছে হচ্ছে যে, এখন তোমাকে কোন হাদীস শুনাবো না। আমি তো একথা বলেছিলাম যে, কিছুকাল পরে তোমরা বড় বড় ব্যাপার সংঘটিত হতে দেখবে, যেমন বায়তুল্লাহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং এই হবে, এই হবে ইত্যাদি।” অতঃপর তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাজ্জাল বের হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমার জানা নেই যে, সেটা চল্লিশ মাস হবে অথবা চল্লিশ বছর হবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মত। তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন। তারপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন মিলে মিশে থাকবে যে, দু'জনের মধ্যে মোটেই কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর সিরিয়ার দিক হতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, যা সমস্ত ঈমানদারের মৃত্যু ঘটিয়ে দেবে। যার অন্তরে অণুপরিমাণও সততা বা ঈমান থাকবে, সে পর্বতের গুহায় অবস্থান করলেও মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরাই বেচে থাকবে, যারা পাখীর ন্যায় হালকা হবে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় মস্তক বিশিষ্ট হবে। ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করার শক্তি তাদের থাকবে না। শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করতঃ তাদেরকে মূর্তি পূজার দিকে আকষ্ট করবে। কিন্তু তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের জন্যে আহার্যের দরজা খোলা থাকবে এবং জীবন খুবই শান্তিতে অতিবাহিত হবে। তারপর শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। এর ফলে মানুষ পতিত হতে থাকবে। একটি লোক যে তার উষ্ট্রগুলোকে পানি পান করাবার জন্যে তাদের চৌবাচ্চা ঠিক করতে থাকবে সেই সর্বপ্রথম শিঙ্গার শব্দ শুনতে পাবে। এর ফলে সে এবং অন্য সমস্ত লোক অচৈতন্য হয়ে পড়বে।মোটকথা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা হবে শিশিরের বা ছায়ার মত। তার ফলে দ্বিতীয়বার দেহ সৃষ্টি হবে। তারপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। তখন সবাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে-“হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে চল।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ" (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফেরেশতাগণ) তাদেরকে থামিয়ে দাও, নিশ্চয়ই তারা (প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪) এরপর বলা হবে-জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।' জিজ্ঞেস করা হবে-কতার মধ্য হতে কতো জনকে?' উত্তরে বলা হবে-প্রতি হাজারে ন’শ নিরানব্বই জনকে। (আল্লাহ) বলবেন-এটা এমন দিন যা ছেলেদেরকে বুড়ো করে দেবে এবং এটা এমন দিন যাতে পায়ের গোছা খুলে যাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইবনে মারইয়াম (আঃ) বাব-ই-লুদের’ নিকট কিংবা ‘লুদের’ পার্শ্বে মাসীহ দাজ্জালকে হত্যা করবেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে বাব-ই-লুদ রয়েছে এবং এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর পরে ইমাম তিরিমিযী (রঃ) আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-এর নাম নিয়েছেন যে, তাঁদের হতেও এ অধ্যায়ের হাদীসগুলো বর্ণিত আছে, যেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের হযরত ঈসা (আঃ)-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা বর্ণিত রয়েছে। শুধুমাত্র দাজ্জালের বর্ণনার হাদীসগুলোই তো অসংখ্য রয়েছে, যেগুলো একত্রিত করা খুবই কঠিন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, আরাফা হতে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের এক মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। সে সময় তথায় কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বলেনঃ “যে পর্যন্ত দশটি ব্যাপার সংঘটিত না হবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। (১) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। (২) ধূয়া নির্গত হওয়া। (৩) 'দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটা। (৫) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া। (৬) দাজ্জালের আবির্ভাব।.(৭) যমীনের তিন জায়গা ধ্বসে যাওয়া। (৭ক) পূর্বে (৮খ) পশ্চিমে (৯গ) আরব উপদ্বীপে এবং (১০) আদন হতে একটা আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় একত্রিত করবে। ওটা (আগুন) রাত্রিও তাদের সাথে অতিবাহিত করবে। যখন দুপুরের সময় তারা বিশ্রাম গ্রহণ করবে তখনও এ আগুন তাদের সঙ্গেই থাকবে।”উক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানের মধ্যে রয়েছে। হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ মুতাওয়াতির হাদীসগুলো যা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ), হযরত আবু উমামা (রাঃ), হযরত লাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত মাজমা ইবনে জারিয়া (রাঃ), হযরত আবূ শুরাইহা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) (আকাশ হতে) অবতরণ করবেন। সাথে সাথে কিভাবে, কোথায় এবং কোন্ সময় তাঁর অবতরণ ঘটবে তাতে এটাও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ ফজরের নামাযের ইকামতের সময় সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পূর্বদিকের স্তম্ভের উপর তিনি অবতরণ করবেন।সেই যুগে অর্থাৎ ৭৪১ হিঃ সালে জামে' উমভী’র স্তম্ভটি সাদা পাথরে মজবুত করে বানানো হয়েছে। কেননা, ওটা আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছিল, যে আগুন সম্ভবতঃ অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরাই লাগিয়েছিল। এতে বিস্ময়ের কি আছে যে, এটাই হয়তো সেই স্তম্ভ যার উপর হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন এবং শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন ও ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ দিয়েছেন ও তাকে সাব্যস্ত করেছেন। এটা ঐ সময় হবে যখন সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হবে এবং মানুষ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসরণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। যেমন কুরআন কারীমে উক্ত (আরবী) হয়েছে। (৪৩:৬১) এবং একটি পঠনে (আরবী) লাআলামুন রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ কিয়ামতের (কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার) একটি বড় নিদর্শন। কেননা, তিনি দাজ্জালের আগমনের পর আগমন করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকের তিনি ব্যবস্থা রাখেননি। তার সময়েই ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব ঘটবে, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'আর বরকতে ধ্বংস করবেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার সংবাদ কালাম পাকের মধ্যেও রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; ।'(২১৪ ৯৬-৯৭) অর্থাৎ তাদের বের হওয়াও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি প্রমাণ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিশেষণঃ পূর্ব বর্ণিত দু'টি হাদীসেও তাঁর বিশেষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি মধ্যম দেহ ও পরিষ্কার চুল বিশিষ্ট, যেমন শানূআহ্ গোত্রের লোক হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি। তিনি লাল বর্ণের এবং মধ্যম দেহ বিশিষ্ট। মনে হচ্ছিল যে, যেন তিনি সবেমাত্র গোসল খানা হতে বের হয়ে এলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তিনি একেবারে আমার মতই ছিলেন।সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) রক্তিম বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং চওড়া বক্ষ বিশিষ্ট ছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণ, মোটা দেহ এবং সোজা চুল বিশিষ্ট ছিলেন-যেমন যিতের লোক হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তিনি দাজ্জালের শরীরিক গঠনও বর্ণনা করেছেন যে, তার ডান চক্ষু কানা হবে যেন ওটা ফুলা আঙ্গুর। তিনি বলেনঃ কাবা শরীফের নিকটে আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছে যে, একজন খুবই গোধূম বর্ণের লোক, যার মাথার চুল তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত লটকে ছিল এবং চুল ছিল পরিপাটি। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছিল। তিনি দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করি- ইনি কে? তখনই আমাকে বলা হয়-“ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম (আঃ)। তার পিছনে আমি আর একটি লোককে দেখতে পাই যার ডান চক্ষুটি কানা ছিল। ইবনে কাতানের সঙ্গে সে অনেকটা সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। সেও দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করি-এটা কে? বলা হয়- মাসীহ দাজ্জাল।সহীহ বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-কে লাল বর্ণের বলেননি, বরং গোধূম বর্ণের বলেছেন। পরে উপরে বর্ণিত পূর্ণ হাদীসটি রয়েছে। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ইবনে কাতান খুযাআহ্ গোত্রের একটি লোক ছিল। সে অজ্ঞতার যুগে মারা গিয়েছিল। পূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, হযরত মাসীহ (আঃ) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর এখানে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়বে।তবে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, তিনি এখানে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে খুব সম্ভব, যে হাদীসে চল্লিশ বছর অবস্থানের কথা রয়েছে তা ঐ সময় সহই হবে যা তিনি তার আকাশে উঠে যাওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছিলেন। যে সময় তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সে সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। পরে এসে তিনি পৃথিবীতে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে পূর্ণ চল্লিশ বছর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই সব চেয়ে ভাল জানেন। (ইবনে আসাকের) কেউ কেউ বলেন যে, যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল দেড় বছর। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে কথা। তবে হাফিয আবুল কাসিম (রঃ) স্বীয় ইতিহাসে পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী হতে এটাও এনেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কক্ষে তাঁর সাথেই সমাধিস্থ হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘উত্থান দিবসে সে তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবে। অর্থাৎ এ কথার তিনি সাক্ষ্য দান করবেন যে, তিনি আল্লাহর রিসালাত তাঁদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার শেষ দিকে বলেনঃ (আরবী) (৫:১১৬-১১৮) পর্যন্ত।
আন-নিসা 4:156
১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।' এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনিঅত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।" এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন। যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তার যুগে সমস্ত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু ইসলাম ধর্মই থাকবে। তার যুগে আল্লাহ আআলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন। অতঃপর সারা জগতে নিরাপত্তা বিরাজ করবে। এমনকি কৃষ্ণ সর্প উটের সঙ্গে, চিতা ব্যাঘ্র গাভীর সঙ্গে এবং নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে চরে বেড়াবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলা করবে। তারা তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়াবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের এ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি ইসলামের জন্যে লোকের সঙ্গে জিহাদ করবেন। এ হাদীসের একটি অংশ সহীহ বুখারীর মধ্যেও রয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ, “দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত রোমকগণ ‘আ’মাক’ বা ‘দাবিকে অবতরণ না করবে এবং তাদের মোকাবিলায় মদীনা হতে মুসলিম সেনাবাহিনী গমন না করবে। সে সময় ঐ মুসলমানেরা সারা দুনিয়ার লোকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবে।যখন তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাবে তখন রোমকগণ তাদেরকে বলবে‘আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে। আমাদের মধ্য হতে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে তোমাদের নিকট চলে এসেছে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। তোমরা তাদের মধ্য হতে সরে যাও।' তখন মুসলমানেরা বলবেআল্লাহর শপথ! এটা কখনও হতে পারে না যে, আমরা আমাদের দুর্বল ভাইদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে দেবো। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঐ মুসলিম সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। তাদের তাওবা আল্লাহ তা'আলা কখনও গ্রহণ করবেন না। এক তৃতীয়াংশ শহীদ হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম শহীদ। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর জয়লাভ করবে। এরপর তারা আর কোন হাঙ্গামায় পতিত হবে না।তারা (মুসলমানেরা) কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা যায়তুন বৃক্ষের উপর নিজেদের তরবারী ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে থাকবে। এমন সময় শয়তান চীৎকার করে বলবেঃ “তোমাদের সন্তানদের মধ্য দাজ্জাল এসে গেছে। তারা এ মিথ্যা কথাকে সত্য মনে করে এখান হতে বেরিয়ে সিরিয়ায় পৌছে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যুহ ঠিক করতে থাকবে? এমন সময় অন্যদিকে নামাযের ইকামত হবে এবং হযরত ঈসা ইনে। মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে তাদের ইমামতি করবেন। শত্রু বাহিনী যখন মুসলমানদেরকে দেখবে তখন তারা গলে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে ছেড়েও দেন তবুও তারা গলে গলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হাতে তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় বর্শার রক্ত তাদেরকে দেখাবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ,ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হররত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ ‘এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।' হযরত মূসা (আঃ)-ও এরূপই বলেন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। হ্যা, তবে আমার প্রভু আমার নিকট যে অঙ্গীকার করেছেন তা এই যে, দাজ্জাল বের হবে। দু’টি দল তার সঙ্গী হবে। সে আমাকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমনভাবে সীসা গলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দেবেন। এমন কি পাথর ও গাছ বলবে-হে মুসলমান! এখানে আমার পিছনে একটি কাফির আছে, তাকে হত্যা কর। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করবেন এবং মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফিরে যাবে। তারপরে ইয়াজুয ও মাজুয বের হবে এবং চতুর্দিক হতে তারা আক্রমণ চালাবে। সমস্ত শহরকে তারা ধ্বংস করবে। যেসব স্থান তারা অতিক্রম করবে ঐ সবই ধ্বংস করে দেবে। যে পানির পার্শ্ব দিয়ে তারা গমন করবে তার সবই পান করে নেবে। লোকেরা পুনরায় আমার নিকট ফিরে আসবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবো। তিনি তখন তাদের সকলকেই একই সাথে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু তাদের মৃত দেহের দুর্গন্ধে বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়বে। ফলে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। অতঃপর এত বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হবে যে, ঐ সমস্ত মৃতদেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কিয়ামতের সংঘটন এত নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর অবস্থা হয়ে থাকে যে, সকালে হবে কি সন্ধ্যায় হবে বা দিনে হবে কি রাত্রে হবে তা তার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারে না।”মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু নায়রা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা জুমআর দিন হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করি, আমার লিখিত কুরআন কারীমকে তাঁর পঠনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াই আমার তাঁর নিকট আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। জুমআর নামাযের সময় হলে তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “গোলস করুন। তারপর তিনি সুগন্ধি নিয়ে আসেন। আমরা সুগন্ধি মেখে মসজিদে হাযির হই এবং একটি লোকের পার্শ্বে বসে পড়ি। এ লোকটি দাজ্জালের হাদীস বর্ণনা করছিলেন। অতঃপর হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, মুসলমানদের তিনটি শহর হবে, একটি হবে দু’টি সমুদ্রের মিলিত হওয়ার জায়গায়, দ্বিতীয়টি হবে হীরায় এবং তৃতীয়টি হবে সিরিয়ায়। তারপর মানুষ তিনটি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হবে। অতঃপর দাজ্জাল বহির্গত হবে। তারা প্রথম শহরটিতে যাবে। তথাকার লোক তিন অংশে বিভক্ত হবে। এক অংশ বলবে- আমরা তাদের মোকাবিলা করবো এবং কি সংঘটিত হয় তা দেখবো। দ্বিতীয় দলটি গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে এবং তৃতীয় দল তাদের নিকটবর্তী শহরে চলে যাবে। দাজ্জালের সঙ্গে সত্তর হাজার লোক থাকবে। তাদের মাথায় মুকুট থাকবে। তাদের অধিকাংশই হবে ইয়াহুদী ও স্ত্রীলোক। এখানকার মুসলমানগণ একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ হবে। তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মাঠে চরতে গিয়েছিল ঐগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের বিপদ খুব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়বে। এমনকি তারা তাদের কামানের তারগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে থাকবে। এরূপ সংকটময় অবস্থায় সমুদ্রের মধ্য হতে তাদের কানে শব্দ আসবে- হে লোক সকল! তোমাদের জন্যে সাহায্য এসে গেছে। এ শব্দ শুনে লোকগুলো খুব খুশী হবে। কেননা, তারা বুঝতে পারবে যে, এটা কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কথা। ঠিক ফজরের নামাযের সময় ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। মুসলমাদের আমীর তাঁকে বলবেন- “হে রূহুল্লাহ (আঃ)! আগে বাড়ুন এবং নামায পড়িয়ে দিন। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘এ উম্মতের কিছু সংখ্যক লোক কিছু সংখ্যক লোকের আমীর রয়েছে। সুতরাং এ দলের আমীরই তাদের নামাযের ইমাম হবে। অতএব, তাদের আমীরই ইমাম হয়ে নামায পড়াবেন। নামায শেষ করেই হযরত ঈসা (আঃ) বর্শা হাতে নিয়ে মাসীহ দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। দাজ্জাল তাঁকে দেখামাত্রই সীসার মত গলতে থাকবে। তিনি তার বক্ষে আঘাত করবেন। ঐ আঘাতেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সঙ্গীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু কোন স্থানেই তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। এমনকি তারা যদি কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেই গাছও বলবে-“হে মুমিন! একটি কাফির আমার নিকট লুকিয়ে রয়েছে।' এ কথা পাথরও বলবে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক ভাষণের কম বেশী অংশ দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনায় এবং সে দাজ্জাল হতে ভয় প্রদর্শনেই কাটিয়ে দেন। সে ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এর অপেক্ষা বড় হাঙ্গামা আর নেই। সমস্ত নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। সে নিশ্চিতরূপে তোমাদের মধ্যেই আসবে। যদি আমার জীবদ্দশায় সে এসে পড়ে তবে তো আমি তাকে বাধা দান করবো। আর যদি আমার পরে আসে তবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমি আল্লাহ তা'আলাকেই প্রত্যেক মুসলমানের অভিভাবক করে যাচ্ছি। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বের হবে। সে ডান ও বামে খুব ঘুরাফেরা করবে। হে জনমণ্ডলী ও হে আল্লাহর বান্দাগণ! দেখ, তোমরা অটল থাকবে। জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে তার এমন পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছি যা অন্য কোন নবী স্বীয় উম্মতকে জানিয়ে যাননি। সে প্রথমতঃ দাবী করবে-আমি নবী। সুতরাং তোমরা স্মরণ রেখো যে, আমার পরে কোন নবী নেই। অতঃপর এর চেয়েও বেড়ে গিয়ে বলবে-“আমি আল্লাহ'। অতএব তথায় তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহকে এই চোখে কেউ দেখতে পারে না। মৃত্যুর পর তথায় তার দর্শন লাভ ঘটতে পারে। আরও স্মরণ রেখো যে, সে এক চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং তোমাদের প্রভু এক চক্ষু বিশিষ্ট নন। তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে কাফির' লিখিত থাকবে যা প্রত্যেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মোটকথা প্রত্যেক ঈমানদারই পড়তে পারবে।তার সাথে আগুন থাকবে ও বাগান থাকবে। তার আগুন হবে আসলে জান্নাত এবং বাগানটি হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম। তোমাদের মধ্যে যাকে সে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। ঐ আগুন তার জন্যে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর নমরূদের আগুন শান্তিদায়ক হয়েছিল। তার এক হাঙ্গামা এও হবে যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে-“আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করতে পারি তবে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে?' এমন সময়ে দু’জন শয়তান তার পিতা-মাতার আকারে প্রকাশিত হবে এবং তাকে বলবে-বৎস! এটাই তোমার প্রভু। সুতরাং তাকে মেনে নাও।' তার আর একটা ফিত্না এও হবে যে, তাকে একটি লোকের উপর জয়যুক্ত করা হবে। সে তাকে করাত দ্বারা ফেড়ে দু’টুকরো করে দেবে। তারপর সে জনগণকে বলবেঃ আমার এ বান্দাকে তোমরা দেখ, এখন আমি তাকে জীবিত করবো। কিন্তু সে পুনরায় এ কথাই বলবে যে, তার প্রভু আমি ছাড়া অন্য কেউ। অতঃপর এ দু' দুবৃত্ত তাকে উঠা-বসা করাবে এবং বলবেঃ তোমার প্রভু কে? সে উত্তরে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ এবং তুমি তার শত্রু দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! এখন তো আমার পূর্বাপেক্ষাও বেশী বিশ্বাস হয়েছে। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ মুমিন ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণীর জান্নাতের অধিকারী হবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, এ হাদীসটি শুনে আমাদের ধারণা হয় যে, এ লোকটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাবই (রাঃ) হবেন, তাঁর শাহাদাত লাভ পর্যন্ত আমাদের ধারণা এটাই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার একটি হাঙ্গামা এও হবে যে, সে আকাশকে পানি বর্ষণ করার নির্দেশ দেবে এবং আকাশ হতে পানি বর্ষিত হবে। সে যমীনকে ফসল উৎপাদন করার নির্দেশ দেবে এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদিত হবে।তার আর একটি ফিত্না এও হবে যে, সে একটি গোত্রের নিকট যাবে এবং তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। সে সময়ই তাদের সমস্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট যাবে। তৎক্ষণাৎ তার হুকুমে আকাশ। হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং যমীনে ফলস উৎপাদিত হবে। তাদের গৃহপালিত পশু পূর্বাপেক্ষা বেশী মোটা-তাজা ও দুগ্ধবতী হয়ে যাবে। তারা মক্কা ও মদীনা ছাড়া যমীনের সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যে যখন মদীনামুখী হবে তখন সারা পথে সে তরবারীধারী ফেরেশতাগণকে দেখতে পাবে। সে তখন ‘সানতার শেষ প্রান্তে, যারীবে আহমারের নিকট থেমে যাবে। অতঃপর মদীনায় তিনটি ভূমিকম্প হবে। ফলে মদীনায় যত মুনাফিক নর ও নারী থাকবে সবাই মদীনা হতে বেরিয়ে গিয়ে দাজ্জালের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এভাবে মদীনা নিজের মধ্য হতে অপবিত্র লোকদেরকে দূর করে দেবে যেমন লোহার ভাটা লোহার মরিচা দূর করে থাকে। সেদিনের নাম হবে ‘ইয়াওমুল খালাস’ (মুক্তির দিন)।হযরত উম্মে শুরায়েক (রাঃ) রাসূলুরলাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেদিন আরববাসী কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ প্রথমতঃ তারা থাকবেই খুব কম এবং তাদের অধিকাংশই থাকবে বাইতুল মুকাদ্দাসে। তাদের ইমাম হবে একজন সৎ ব্যক্তি। সে ফজরের নামায পড়াতে থাকবে এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। ঐ ইমাম তখন পিছনে সরতে থাকবে যেন ঈসা (আঃ) ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি তার স্কন্ধে হাত রেখে বলবেনঃ “তুমি সামনে এগিয়ে নামায পড়িয়ে দাও, ইকামত তোমার জন্যেই দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের ইমামই নামায পড়িয়ে দেবে। নামায শেষে তিনি বলবেনঃ দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দেয়া হবে। এদিকে দাজ্জাল সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে হাযির হবে। তাদের মস্তকে মুকুট থাকবে এবং তাদের তরবারীর উপর সোনা থাকবে। দাজ্জাল তাঁকে দেখে এমনভাবে গলতে থাকবে যেমনভাবে পানিতে লবণ গলে থাকে। অতঃপর সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতঃ পালাতে শুরু করবে। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা এটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তুমি আমার হাতেই একটা মার খাবে, সুতরাং ওটা হতে রক্ষা পেতে পার না। অতএব, তিনি তাকে পূর্ব দরজা লুদ-এর নিকট ধরে নেবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন ইয়াহূদীরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু তারা কোথাও মাথা লুকানোর জায়গা পাবে না। প্রত্যেক পাথর, বৃক্ষ, দেয়াল ও জীবজন্তু বলতে থাকবেঃ “হে মুসলমান! এখানে ইয়াহুদী রয়েছে। এসে তাকে হত্যা কর।” তবে বাবলা গাছ হচ্ছে ইয়াহূদীদের গাছ। সে কিন্তু বলবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে চল্লিশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বছর হবে অর্ধ বছরের মত, বছর হবে মাসের মত, মাস হবে জুম'আর মত এবং শেষ দিনগুলো হবে ‘শারারার মত। তোমাদের কোন লোক সকালে শহরের একটি দরজা হতে চলতে আরম্ভ করে দ্বিতীয় দরজায় পৌছতে পারবে না। এমন সময়েই সন্ধ্যা হবে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ছোট দিনগুলোতে আমরা কিভাবে নামায আদায় করবো?" তিনি বলেনঃ “তোমরা এ দীর্ঘ দিনগুলোতে যেমনভাবে অনুমান করে নামায পড়ছো, তখনও সেভাবেই অনুমান করে নামায পড়বে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারপর হযরত ঈসা (আঃ) আমার উম্মতের মধ্যে শাসনকর্তা হবেন, ন্যায়পরায়ণ হবেন, ইমাম হবেন এবং ন্যায় বিচারক হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। তিনি সাদকা গ্রহণ করবেন না। সুতরাং ছাগল ও উটের উপর কোন চেষ্টা করা হবে না। হিংসা বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে। প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণীর বিষক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হবে। শিশু স্বীয় অঙ্গুলি সাপের মুখে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ওটা তার কোন ক্ষতি করবে না। ছেলেরা সিংহের সাথে খেলা করবে, অথচ তাদের কোন বিপদ ঘটবে না। নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে এমন গলায় গলায় মিলে থাকবে যে, যেন সে পাহারাদার কুকুর। সমগ্র জগৎ ইসলাম ও ন্যায়নীতিতে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে যেমনভাবে বর্তন পানিতে পরিপূর্ণ হয়। সকলের একই কালেমা’ হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না। যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কুরাইশ স্বীয় রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। পৃথিবী সাদা চাদির ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। হযরত আদম (আঃ)-এর বরকতময় যুগের ন্যায় ফসল উৎপাদিত হবে। একটা দলের পরিতৃপ্তির জন্যে এক গুচ্ছ আঙ্গুরই যথেষ্ট হবে। এক একটি ডালিম ফল এত বড় হবে যে, একটি দল একটি ডালিম খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। বলদ এরূপ মূল্যে পাওয়া যাবে’ (অর্থাৎ বলদের মূল্য খুব বেশী হবে) এবং ঘোড়া কতগুলো দিরহামের বিনিময়েই পাওয়া যাবে।”জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঘোড়ার মূল্য হ্রাস পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, যুদ্ধে ওর সোয়ারী মোটেই নেয়া হবে না। তারা প্রশ্ন করেনঃ “বলদের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, সমগ্র পৃথিবীতে কৃষিকার্য শুরু হয়ে যাবে।” দাজ্জাল প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পূর্বেই ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। প্রথম বছরে বৃষ্টির এক তৃতীয়াংশ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপরে ভূমির উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশ কমে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় বছরে আকাশকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, সে যেন বৃষ্টি দুই তৃতীয়াংশ বন্ধ রাখে এবং এ নির্দেশ ভূমিকেও দেয়া হবে যে, সে যেন উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশ কম করে। তৃতীয় বছর আকাশ হতে বৃষ্টির এক ফোটাও বর্ষিত হবে না। অনুরূপভাবে ভূমিতে একটি চারাগাছও জন্ম নেবে না। সমস্ত জীবজন্তু এ দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে রক্ষা করবেন সেই রক্ষা পাবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সে সময় মানুষ কিরূপে জীবিত থাকবে?' তিনি বলেনঃ “সে সময় তাদের খাদ্যের স্থলবর্তী হবে তাদের লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করা, সুবহানাল্লাহ পাঠ করা এবং আলহামদুল্লিাহ বলা।” ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বলেন, আমার উস্তাদ তাঁর উস্তাদ হতে শুনেছেন, তিনি বলতেনঃ “এ হাদীসটি এ যোগ্যতা রাখে যে, শিশুদের শিক্ষক শিশুদেরকেও এটা শিক্ষা দেবেন, এমনকি লিখিয়ে দেবেন, যেন তাদেরও এটা স্মরণ থাকে।” এ হাদীসটি এ সম্বন্ধে গারীব বটে, কিন্তু এর কোন কোন অংশের প্রমাণ স্বরূপ অন্য হাদীসও রয়েছে। এ হাদীসের মতই একটি হাদীস হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আমরা ওটাও এখানে বর্ণনা করছি।সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত নাওয়াস ইবনে শামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকালে দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এমনভাবে তাকে উঁচু ও নীচু করেন যে, আমাদের মনে হয় না জানি সে মদীনার খেজুরের বাগানেই বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আমরা তাঁর নিকট ফিরে আসলে আমাদের চেহারা দেখে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” তখন আমরা তা বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও আর একটা বেশী ভয় রয়েছে। আমার বিদ্যমানতায় যদি সে বের হয় তবে আমি তাকে বুঝে নেবো। কিন্তু যদি আমার পরে সে বের হয় তবে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাকে বাধা দিতে হবে। আমি মহান আল্লাহকেই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিনিধি বানিয়ে দিয়েছি। জেনে রেখো, সে যুবক হবে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এটুকু বুঝে নাও যে, সে দেখতে অনেকটা আবদুল উয্যা ইবনে কাতনের মত হবে। তোমাদের যে তাকে দেখবে সে যেন সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী প্রান্ত হতে বের হবে এবং ডানে-বামে ঘুরে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (ঈমানের উপরে) খুব অটল থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কতদিন অবস্থান করবে। তিনি বললেনঃ “চল্লিশ দিন। এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান, একদিন হবে এক জুমআর সমান এবং অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মত হবে।”অতঃপর আমরা জিজ্ঞেস করি, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা অনুমান করে নেবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের চলন গতি কিরূপ দ্রুত হবে? তিনি বলেনঃ মেঘ যেমন বাতাসে তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। সে একটি গোত্রকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তাকে মেনে নেবে। তখন তাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যমীন হতে ফলস উৎপাদিত হবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মোটা তাজা হয়ে যাবে ও খুব বেশী দুধ দেবে। সে আর এক সম্প্রদায়ের নিকট যাবে। তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও অস্বীকার করবে। সে সেখান হতে ফিরে আসবে। তখন তাদের হাতে মাল-ধন কিছুই থাকবে না। সে অনুর্বর ভূমির উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেবে, “হে যমীন! তোমার ধনাগারকে বের করে দাও।" তখন যমীনের মধ্য হতে ধন-ভাণ্ডার বেরিয়ে আসবে।সে তখন মৌমাছির মত ঐ ধনের পিছনে পিছনে ফিরতে থাকবে। সে একজন নব্য যুবককে আহ্বান করবে এবং তাকে হত্যা করতঃ দু'টুকরো করে এতদূরে নিক্ষেপ করবে যতো দূরে একটি তীর চলে থাকে। তারপরে তাকে ডাক দেবে এবং সে তখন জীবিত হয়ে হাসতে হাসতে তার নিকট চলে। আসবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি। দু’টি চাদর পরিহিত হয়ে দু'জন ফেরেশতার ডানার উপর হাত রেখে দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা স্তম্ভের নিকট অবতরণ করবেন। যখন তিনি মস্তক কুঁকাবেন তখন তার মস্তক হতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরে পড়বে এবং যখন তিনি মস্তক উত্তোলন করবেন তখন ঐ ফোটাগুলো মুক্তার মত গড়িয়ে পড়বে। যে কাফির পর্যন্ত তার শ্বাস পৌছবে, সে মরে যাবে এবং তার শ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছবে যে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌছে থাকে।তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং ‘লুদ’ নামক স্থানে তাকে ধরেফেলে সেখানেই হত্যা করবেন। তারপরে তিনি ঐ লোকদের নিকট আসবেন যারা এ হাঙ্গামায় রক্ষা পেয়ে যাবে। তিনি তাদের চেহারায় হাত ফিরিয়ে দেবেন। এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিকট অহী আসবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন-‘আমি আমার এমন বান্দাহদেরকে প্রেরণ করেছি যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেউই করতে পারবে না। তুমি আমার এ বিশিষ্ট বান্দাহদেরকে তূর পর্বতের নিকট নিয়ে যাও।' তারপর ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে এবং তারা চতুর্দিক হতে লাফাতে লাফাতে চলে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘বাহীরা-ই-তাবারিয়ায় আসবে এবং ওর সমস্ত পানি পান করে নেবে। তাদের পর পরই যখন অন্য দলটি আসবে তখন তারা ওটাকে এমন শুষ্ক অবস্থায় পাবে যে, তারা বলবে, সম্ভবতঃ এখানে কোন সময় পানি ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গী মুমিনগণ তথায় এমনভাবে অবরুদ্ধ থাকবেন যে, একটি বলদের মাথাও তাদের নিকট এমন পছন্দনীয় মনে হবে যেমন আজ তোমাদের নিকট একশটি স্বর্ণমুদ্রা পছন্দনীয়। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় শত্রুদেরকে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত করবেন। ফলে তারা সবাই একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সঙ্গীগণসহ যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু যমীনে অর্ধহাত পরিমাণ জায়গাও এমন পাবেন না যা তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধ হতে শূন্য থাকবে। পুনরায় তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাবেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা উটের ঘাড়ের মত এক প্রকার পাখি পাঠিয়ে দেবেন। ঐ পাখিগুলো তাদের সমস্ত মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছেমত জায়গায় নিক্ষেপ করবে। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। ফলে সমস্ত যমীন হাতের তালুর মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারপর যমীনকে শস্য এবং ফল উৎপাদনের ও বরকত ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হবে। সেদিন একটি ডালিম ফল এক দল লোকের পক্ষে যথেষ্ট হবে। তারা সবাই ওর ছালের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবে। একটি উন্ত্রীর দুগ্ধ একটি গোটা সম্প্রদায়ের লোকও পান করে শেষ করতে পারবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এক মৃদু ও নির্মল বায়ু প্রবাহিত করবেন যা সমস্ত ঈমানদার নর ও নারীর বগলের নিম্নদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাণ বায়ুও নির্গত হয়ে যাবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরা বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মত পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকবে। তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে। ওটা আমরা ইনশাআল্লাহ (সূরা-ই-আম্বিয়ার) (আরবী) (২১:৯৬) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিকট বললেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি বলে থাকেন-কিয়ামত অমুক অমুক জায়গা পর্যন্ত পৌছে যাবে, এটা কি ব্যাপার? তিনি তখন ‘সুবহানাল্লাহ' এবং 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পর বললেনঃ “আমার ইচ্ছে হচ্ছে যে, এখন তোমাকে কোন হাদীস শুনাবো না। আমি তো একথা বলেছিলাম যে, কিছুকাল পরে তোমরা বড় বড় ব্যাপার সংঘটিত হতে দেখবে, যেমন বায়তুল্লাহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং এই হবে, এই হবে ইত্যাদি।” অতঃপর তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাজ্জাল বের হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমার জানা নেই যে, সেটা চল্লিশ মাস হবে অথবা চল্লিশ বছর হবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মত। তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন। তারপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন মিলে মিশে থাকবে যে, দু'জনের মধ্যে মোটেই কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর সিরিয়ার দিক হতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, যা সমস্ত ঈমানদারের মৃত্যু ঘটিয়ে দেবে। যার অন্তরে অণুপরিমাণও সততা বা ঈমান থাকবে, সে পর্বতের গুহায় অবস্থান করলেও মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরাই বেচে থাকবে, যারা পাখীর ন্যায় হালকা হবে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় মস্তক বিশিষ্ট হবে। ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করার শক্তি তাদের থাকবে না। শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করতঃ তাদেরকে মূর্তি পূজার দিকে আকষ্ট করবে। কিন্তু তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের জন্যে আহার্যের দরজা খোলা থাকবে এবং জীবন খুবই শান্তিতে অতিবাহিত হবে। তারপর শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। এর ফলে মানুষ পতিত হতে থাকবে। একটি লোক যে তার উষ্ট্রগুলোকে পানি পান করাবার জন্যে তাদের চৌবাচ্চা ঠিক করতে থাকবে সেই সর্বপ্রথম শিঙ্গার শব্দ শুনতে পাবে। এর ফলে সে এবং অন্য সমস্ত লোক অচৈতন্য হয়ে পড়বে।মোটকথা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা হবে শিশিরের বা ছায়ার মত। তার ফলে দ্বিতীয়বার দেহ সৃষ্টি হবে। তারপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। তখন সবাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে-“হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে চল।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ" (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফেরেশতাগণ) তাদেরকে থামিয়ে দাও, নিশ্চয়ই তারা (প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪) এরপর বলা হবে-জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।' জিজ্ঞেস করা হবে-কতার মধ্য হতে কতো জনকে?' উত্তরে বলা হবে-প্রতি হাজারে ন’শ নিরানব্বই জনকে। (আল্লাহ) বলবেন-এটা এমন দিন যা ছেলেদেরকে বুড়ো করে দেবে এবং এটা এমন দিন যাতে পায়ের গোছা খুলে যাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইবনে মারইয়াম (আঃ) বাব-ই-লুদের’ নিকট কিংবা ‘লুদের’ পার্শ্বে মাসীহ দাজ্জালকে হত্যা করবেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে বাব-ই-লুদ রয়েছে এবং এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর পরে ইমাম তিরিমিযী (রঃ) আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-এর নাম নিয়েছেন যে, তাঁদের হতেও এ অধ্যায়ের হাদীসগুলো বর্ণিত আছে, যেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের হযরত ঈসা (আঃ)-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা বর্ণিত রয়েছে। শুধুমাত্র দাজ্জালের বর্ণনার হাদীসগুলোই তো অসংখ্য রয়েছে, যেগুলো একত্রিত করা খুবই কঠিন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, আরাফা হতে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের এক মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। সে সময় তথায় কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বলেনঃ “যে পর্যন্ত দশটি ব্যাপার সংঘটিত না হবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। (১) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। (২) ধূয়া নির্গত হওয়া। (৩) 'দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটা। (৫) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া। (৬) দাজ্জালের আবির্ভাব।.(৭) যমীনের তিন জায়গা ধ্বসে যাওয়া। (৭ক) পূর্বে (৮খ) পশ্চিমে (৯গ) আরব উপদ্বীপে এবং (১০) আদন হতে একটা আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় একত্রিত করবে। ওটা (আগুন) রাত্রিও তাদের সাথে অতিবাহিত করবে। যখন দুপুরের সময় তারা বিশ্রাম গ্রহণ করবে তখনও এ আগুন তাদের সঙ্গেই থাকবে।”উক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানের মধ্যে রয়েছে। হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ মুতাওয়াতির হাদীসগুলো যা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ), হযরত আবু উমামা (রাঃ), হযরত লাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত মাজমা ইবনে জারিয়া (রাঃ), হযরত আবূ শুরাইহা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) (আকাশ হতে) অবতরণ করবেন। সাথে সাথে কিভাবে, কোথায় এবং কোন্ সময় তাঁর অবতরণ ঘটবে তাতে এটাও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ ফজরের নামাযের ইকামতের সময় সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পূর্বদিকের স্তম্ভের উপর তিনি অবতরণ করবেন।সেই যুগে অর্থাৎ ৭৪১ হিঃ সালে জামে' উমভী’র স্তম্ভটি সাদা পাথরে মজবুত করে বানানো হয়েছে। কেননা, ওটা আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছিল, যে আগুন সম্ভবতঃ অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরাই লাগিয়েছিল। এতে বিস্ময়ের কি আছে যে, এটাই হয়তো সেই স্তম্ভ যার উপর হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন এবং শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন ও ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ দিয়েছেন ও তাকে সাব্যস্ত করেছেন। এটা ঐ সময় হবে যখন সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হবে এবং মানুষ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসরণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। যেমন কুরআন কারীমে উক্ত (আরবী) হয়েছে। (৪৩:৬১) এবং একটি পঠনে (আরবী) লাআলামুন রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ কিয়ামতের (কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার) একটি বড় নিদর্শন। কেননা, তিনি দাজ্জালের আগমনের পর আগমন করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকের তিনি ব্যবস্থা রাখেননি। তার সময়েই ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব ঘটবে, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'আর বরকতে ধ্বংস করবেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার সংবাদ কালাম পাকের মধ্যেও রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; ।'(২১৪ ৯৬-৯৭) অর্থাৎ তাদের বের হওয়াও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি প্রমাণ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিশেষণঃ পূর্ব বর্ণিত দু'টি হাদীসেও তাঁর বিশেষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি মধ্যম দেহ ও পরিষ্কার চুল বিশিষ্ট, যেমন শানূআহ্ গোত্রের লোক হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি। তিনি লাল বর্ণের এবং মধ্যম দেহ বিশিষ্ট। মনে হচ্ছিল যে, যেন তিনি সবেমাত্র গোসল খানা হতে বের হয়ে এলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তিনি একেবারে আমার মতই ছিলেন।সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) রক্তিম বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং চওড়া বক্ষ বিশিষ্ট ছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণ, মোটা দেহ এবং সোজা চুল বিশিষ্ট ছিলেন-যেমন যিতের লোক হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তিনি দাজ্জালের শরীরিক গঠনও বর্ণনা করেছেন যে, তার ডান চক্ষু কানা হবে যেন ওটা ফুলা আঙ্গুর। তিনি বলেনঃ কাবা শরীফের নিকটে আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছে যে, একজন খুবই গোধূম বর্ণের লোক, যার মাথার চুল তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত লটকে ছিল এবং চুল ছিল পরিপাটি। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছিল। তিনি দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করি- ইনি কে? তখনই আমাকে বলা হয়-“ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম (আঃ)। তার পিছনে আমি আর একটি লোককে দেখতে পাই যার ডান চক্ষুটি কানা ছিল। ইবনে কাতানের সঙ্গে সে অনেকটা সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। সেও দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করি-এটা কে? বলা হয়- মাসীহ দাজ্জাল।সহীহ বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-কে লাল বর্ণের বলেননি, বরং গোধূম বর্ণের বলেছেন। পরে উপরে বর্ণিত পূর্ণ হাদীসটি রয়েছে। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ইবনে কাতান খুযাআহ্ গোত্রের একটি লোক ছিল। সে অজ্ঞতার যুগে মারা গিয়েছিল। পূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, হযরত মাসীহ (আঃ) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর এখানে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়বে।তবে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, তিনি এখানে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে খুব সম্ভব, যে হাদীসে চল্লিশ বছর অবস্থানের কথা রয়েছে তা ঐ সময় সহই হবে যা তিনি তার আকাশে উঠে যাওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছিলেন। যে সময় তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সে সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। পরে এসে তিনি পৃথিবীতে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে পূর্ণ চল্লিশ বছর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই সব চেয়ে ভাল জানেন। (ইবনে আসাকের) কেউ কেউ বলেন যে, যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল দেড় বছর। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে কথা। তবে হাফিয আবুল কাসিম (রঃ) স্বীয় ইতিহাসে পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী হতে এটাও এনেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কক্ষে তাঁর সাথেই সমাধিস্থ হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘উত্থান দিবসে সে তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবে। অর্থাৎ এ কথার তিনি সাক্ষ্য দান করবেন যে, তিনি আল্লাহর রিসালাত তাঁদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার শেষ দিকে বলেনঃ (আরবী) (৫:১১৬-১১৮) পর্যন্ত।