Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আন-নিসা 4:157 – আন-নিসা 4:176

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আন-নিসা 4:157
  2. আন-নিসা 4:158
  3. আন-নিসা 4:159
  4. আন-নিসা 4:160
  5. আন-নিসা 4:161
  6. আন-নিসা 4:162
  7. আন-নিসা 4:163
  8. আন-নিসা 4:164
  9. আন-নিসা 4:165
  10. আন-নিসা 4:166
  11. আন-নিসা 4:167
  12. আন-নিসা 4:168
  13. আন-নিসা 4:169
  14. আন-নিসা 4:170
  15. আন-নিসা 4:171
  16. আন-নিসা 4:172
  17. আন-নিসা 4:173
  18. আন-নিসা 4:174
  19. আন-নিসা 4:175
  20. আন-নিসা 4:176

আন-নিসা 4:157

১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।' এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনিঅত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।" এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন। যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তার যুগে সমস্ত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু ইসলাম ধর্মই থাকবে। তার যুগে আল্লাহ আআলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন। অতঃপর সারা জগতে নিরাপত্তা বিরাজ করবে। এমনকি কৃষ্ণ সর্প উটের সঙ্গে, চিতা ব্যাঘ্র গাভীর সঙ্গে এবং নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে চরে বেড়াবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলা করবে। তারা তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়াবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের এ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি ইসলামের জন্যে লোকের সঙ্গে জিহাদ করবেন। এ হাদীসের একটি অংশ সহীহ বুখারীর মধ্যেও রয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ, “দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত রোমকগণ ‘আ’মাক’ বা ‘দাবিকে অবতরণ না করবে এবং তাদের মোকাবিলায় মদীনা হতে মুসলিম সেনাবাহিনী গমন না করবে। সে সময় ঐ মুসলমানেরা সারা দুনিয়ার লোকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবে।যখন তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাবে তখন রোমকগণ তাদেরকে বলবে‘আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে। আমাদের মধ্য হতে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে তোমাদের নিকট চলে এসেছে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। তোমরা তাদের মধ্য হতে সরে যাও।' তখন মুসলমানেরা বলবেআল্লাহর শপথ! এটা কখনও হতে পারে না যে, আমরা আমাদের দুর্বল ভাইদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে দেবো। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঐ মুসলিম সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। তাদের তাওবা আল্লাহ তা'আলা কখনও গ্রহণ করবেন না। এক তৃতীয়াংশ শহীদ হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম শহীদ। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর জয়লাভ করবে। এরপর তারা আর কোন হাঙ্গামায় পতিত হবে না।তারা (মুসলমানেরা) কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা যায়তুন বৃক্ষের উপর নিজেদের তরবারী ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে থাকবে। এমন সময় শয়তান চীৎকার করে বলবেঃ “তোমাদের সন্তানদের মধ্য দাজ্জাল এসে গেছে। তারা এ মিথ্যা কথাকে সত্য মনে করে এখান হতে বেরিয়ে সিরিয়ায় পৌছে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যুহ ঠিক করতে থাকবে? এমন সময় অন্যদিকে নামাযের ইকামত হবে এবং হযরত ঈসা ইনে। মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে তাদের ইমামতি করবেন। শত্রু বাহিনী যখন মুসলমানদেরকে দেখবে তখন তারা গলে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে ছেড়েও দেন তবুও তারা গলে গলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হাতে তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় বর্শার রক্ত তাদেরকে দেখাবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ,ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হররত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ ‘এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।' হযরত মূসা (আঃ)-ও এরূপই বলেন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। হ্যা, তবে আমার প্রভু আমার নিকট যে অঙ্গীকার করেছেন তা এই যে, দাজ্জাল বের হবে। দু’টি দল তার সঙ্গী হবে। সে আমাকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমনভাবে সীসা গলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দেবেন। এমন কি পাথর ও গাছ বলবে-হে মুসলমান! এখানে আমার পিছনে একটি কাফির আছে, তাকে হত্যা কর। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করবেন এবং মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফিরে যাবে। তারপরে ইয়াজুয ও মাজুয বের হবে এবং চতুর্দিক হতে তারা আক্রমণ চালাবে। সমস্ত শহরকে তারা ধ্বংস করবে। যেসব স্থান তারা অতিক্রম করবে ঐ সবই ধ্বংস করে দেবে। যে পানির পার্শ্ব দিয়ে তারা গমন করবে তার সবই পান করে নেবে। লোকেরা পুনরায় আমার নিকট ফিরে আসবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবো। তিনি তখন তাদের সকলকেই একই সাথে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু তাদের মৃত দেহের দুর্গন্ধে বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়বে। ফলে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। অতঃপর এত বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হবে যে, ঐ সমস্ত মৃতদেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কিয়ামতের সংঘটন এত নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর অবস্থা হয়ে থাকে যে, সকালে হবে কি সন্ধ্যায় হবে বা দিনে হবে কি রাত্রে হবে তা তার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারে না।”মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু নায়রা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা জুমআর দিন হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করি, আমার লিখিত কুরআন কারীমকে তাঁর পঠনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াই আমার তাঁর নিকট আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। জুমআর নামাযের সময় হলে তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “গোলস করুন। তারপর তিনি সুগন্ধি নিয়ে আসেন। আমরা সুগন্ধি মেখে মসজিদে হাযির হই এবং একটি লোকের পার্শ্বে বসে পড়ি। এ লোকটি দাজ্জালের হাদীস বর্ণনা করছিলেন। অতঃপর হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, মুসলমানদের তিনটি শহর হবে, একটি হবে দু’টি সমুদ্রের মিলিত হওয়ার জায়গায়, দ্বিতীয়টি হবে হীরায় এবং তৃতীয়টি হবে সিরিয়ায়। তারপর মানুষ তিনটি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হবে। অতঃপর দাজ্জাল বহির্গত হবে। তারা প্রথম শহরটিতে যাবে। তথাকার লোক তিন অংশে বিভক্ত হবে। এক অংশ বলবে- আমরা তাদের মোকাবিলা করবো এবং কি সংঘটিত হয় তা দেখবো। দ্বিতীয় দলটি গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে এবং তৃতীয় দল তাদের নিকটবর্তী শহরে চলে যাবে। দাজ্জালের সঙ্গে সত্তর হাজার লোক থাকবে। তাদের মাথায় মুকুট থাকবে। তাদের অধিকাংশই হবে ইয়াহুদী ও স্ত্রীলোক। এখানকার মুসলমানগণ একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ হবে। তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মাঠে চরতে গিয়েছিল ঐগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের বিপদ খুব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়বে। এমনকি তারা তাদের কামানের তারগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে থাকবে। এরূপ সংকটময় অবস্থায় সমুদ্রের মধ্য হতে তাদের কানে শব্দ আসবে- হে লোক সকল! তোমাদের জন্যে সাহায্য এসে গেছে। এ শব্দ শুনে লোকগুলো খুব খুশী হবে। কেননা, তারা বুঝতে পারবে যে, এটা কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কথা। ঠিক ফজরের নামাযের সময় ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। মুসলমাদের আমীর তাঁকে বলবেন- “হে রূহুল্লাহ (আঃ)! আগে বাড়ুন এবং নামায পড়িয়ে দিন। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘এ উম্মতের কিছু সংখ্যক লোক কিছু সংখ্যক লোকের আমীর রয়েছে। সুতরাং এ দলের আমীরই তাদের নামাযের ইমাম হবে। অতএব, তাদের আমীরই ইমাম হয়ে নামায পড়াবেন। নামায শেষ করেই হযরত ঈসা (আঃ) বর্শা হাতে নিয়ে মাসীহ দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। দাজ্জাল তাঁকে দেখামাত্রই সীসার মত গলতে থাকবে। তিনি তার বক্ষে আঘাত করবেন। ঐ আঘাতেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সঙ্গীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু কোন স্থানেই তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। এমনকি তারা যদি কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেই গাছও বলবে-“হে মুমিন! একটি কাফির আমার নিকট লুকিয়ে রয়েছে।' এ কথা পাথরও বলবে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক ভাষণের কম বেশী অংশ দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনায় এবং সে দাজ্জাল হতে ভয় প্রদর্শনেই কাটিয়ে দেন। সে ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এর অপেক্ষা বড় হাঙ্গামা আর নেই। সমস্ত নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। সে নিশ্চিতরূপে তোমাদের মধ্যেই আসবে। যদি আমার জীবদ্দশায় সে এসে পড়ে তবে তো আমি তাকে বাধা দান করবো। আর যদি আমার পরে আসে তবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমি আল্লাহ তা'আলাকেই প্রত্যেক মুসলমানের অভিভাবক করে যাচ্ছি। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বের হবে। সে ডান ও বামে খুব ঘুরাফেরা করবে। হে জনমণ্ডলী ও হে আল্লাহর বান্দাগণ! দেখ, তোমরা অটল থাকবে। জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে তার এমন পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছি যা অন্য কোন নবী স্বীয় উম্মতকে জানিয়ে যাননি। সে প্রথমতঃ দাবী করবে-আমি নবী। সুতরাং তোমরা স্মরণ রেখো যে, আমার পরে কোন নবী নেই। অতঃপর এর চেয়েও বেড়ে গিয়ে বলবে-“আমি আল্লাহ'। অতএব তথায় তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহকে এই চোখে কেউ দেখতে পারে না। মৃত্যুর পর তথায় তার দর্শন লাভ ঘটতে পারে। আরও স্মরণ রেখো যে, সে এক চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং তোমাদের প্রভু এক চক্ষু বিশিষ্ট নন। তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে কাফির' লিখিত থাকবে যা প্রত্যেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মোটকথা প্রত্যেক ঈমানদারই পড়তে পারবে।তার সাথে আগুন থাকবে ও বাগান থাকবে। তার আগুন হবে আসলে জান্নাত এবং বাগানটি হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম। তোমাদের মধ্যে যাকে সে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। ঐ আগুন তার জন্যে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর নমরূদের আগুন শান্তিদায়ক হয়েছিল। তার এক হাঙ্গামা এও হবে যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে-“আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করতে পারি তবে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে?' এমন সময়ে দু’জন শয়তান তার পিতা-মাতার আকারে প্রকাশিত হবে এবং তাকে বলবে-বৎস! এটাই তোমার প্রভু। সুতরাং তাকে মেনে নাও।' তার আর একটা ফিত্না এও হবে যে, তাকে একটি লোকের উপর জয়যুক্ত করা হবে। সে তাকে করাত দ্বারা ফেড়ে দু’টুকরো করে দেবে। তারপর সে জনগণকে বলবেঃ আমার এ বান্দাকে তোমরা দেখ, এখন আমি তাকে জীবিত করবো। কিন্তু সে পুনরায় এ কথাই বলবে যে, তার প্রভু আমি ছাড়া অন্য কেউ। অতঃপর এ দু' দুবৃত্ত তাকে উঠা-বসা করাবে এবং বলবেঃ তোমার প্রভু কে? সে উত্তরে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ এবং তুমি তার শত্রু দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! এখন তো আমার পূর্বাপেক্ষাও বেশী বিশ্বাস হয়েছে। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ মুমিন ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণীর জান্নাতের অধিকারী হবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, এ হাদীসটি শুনে আমাদের ধারণা হয় যে, এ লোকটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাবই (রাঃ) হবেন, তাঁর শাহাদাত লাভ পর্যন্ত আমাদের ধারণা এটাই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার একটি হাঙ্গামা এও হবে যে, সে আকাশকে পানি বর্ষণ করার নির্দেশ দেবে এবং আকাশ হতে পানি বর্ষিত হবে। সে যমীনকে ফসল উৎপাদন করার নির্দেশ দেবে এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদিত হবে।তার আর একটি ফিত্না এও হবে যে, সে একটি গোত্রের নিকট যাবে এবং তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। সে সময়ই তাদের সমস্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট যাবে। তৎক্ষণাৎ তার হুকুমে আকাশ। হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং যমীনে ফলস উৎপাদিত হবে। তাদের গৃহপালিত পশু পূর্বাপেক্ষা বেশী মোটা-তাজা ও দুগ্ধবতী হয়ে যাবে। তারা মক্কা ও মদীনা ছাড়া যমীনের সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যে যখন মদীনামুখী হবে তখন সারা পথে সে তরবারীধারী ফেরেশতাগণকে দেখতে পাবে। সে তখন ‘সানতার শেষ প্রান্তে, যারীবে আহমারের নিকট থেমে যাবে। অতঃপর মদীনায় তিনটি ভূমিকম্প হবে। ফলে মদীনায় যত মুনাফিক নর ও নারী থাকবে সবাই মদীনা হতে বেরিয়ে গিয়ে দাজ্জালের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এভাবে মদীনা নিজের মধ্য হতে অপবিত্র লোকদেরকে দূর করে দেবে যেমন লোহার ভাটা লোহার মরিচা দূর করে থাকে। সেদিনের নাম হবে ‘ইয়াওমুল খালাস’ (মুক্তির দিন)।হযরত উম্মে শুরায়েক (রাঃ) রাসূলুরলাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেদিন আরববাসী কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ প্রথমতঃ তারা থাকবেই খুব কম এবং তাদের অধিকাংশই থাকবে বাইতুল মুকাদ্দাসে। তাদের ইমাম হবে একজন সৎ ব্যক্তি। সে ফজরের নামায পড়াতে থাকবে এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। ঐ ইমাম তখন পিছনে সরতে থাকবে যেন ঈসা (আঃ) ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি তার স্কন্ধে হাত রেখে বলবেনঃ “তুমি সামনে এগিয়ে নামায পড়িয়ে দাও, ইকামত তোমার জন্যেই দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের ইমামই নামায পড়িয়ে দেবে। নামায শেষে তিনি বলবেনঃ দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দেয়া হবে। এদিকে দাজ্জাল সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে হাযির হবে। তাদের মস্তকে মুকুট থাকবে এবং তাদের তরবারীর উপর সোনা থাকবে। দাজ্জাল তাঁকে দেখে এমনভাবে গলতে থাকবে যেমনভাবে পানিতে লবণ গলে থাকে। অতঃপর সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতঃ পালাতে শুরু করবে। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা এটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তুমি আমার হাতেই একটা মার খাবে, সুতরাং ওটা হতে রক্ষা পেতে পার না। অতএব, তিনি তাকে পূর্ব দরজা লুদ-এর নিকট ধরে নেবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন ইয়াহূদীরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু তারা কোথাও মাথা লুকানোর জায়গা পাবে না। প্রত্যেক পাথর, বৃক্ষ, দেয়াল ও জীবজন্তু বলতে থাকবেঃ “হে মুসলমান! এখানে ইয়াহুদী রয়েছে। এসে তাকে হত্যা কর।” তবে বাবলা গাছ হচ্ছে ইয়াহূদীদের গাছ। সে কিন্তু বলবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে চল্লিশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বছর হবে অর্ধ বছরের মত, বছর হবে মাসের মত, মাস হবে জুম'আর মত এবং শেষ দিনগুলো হবে ‘শারারার মত। তোমাদের কোন লোক সকালে শহরের একটি দরজা হতে চলতে আরম্ভ করে দ্বিতীয় দরজায় পৌছতে পারবে না। এমন সময়েই সন্ধ্যা হবে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ছোট দিনগুলোতে আমরা কিভাবে নামায আদায় করবো?" তিনি বলেনঃ “তোমরা এ দীর্ঘ দিনগুলোতে যেমনভাবে অনুমান করে নামায পড়ছো, তখনও সেভাবেই অনুমান করে নামায পড়বে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারপর হযরত ঈসা (আঃ) আমার উম্মতের মধ্যে শাসনকর্তা হবেন, ন্যায়পরায়ণ হবেন, ইমাম হবেন এবং ন্যায় বিচারক হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। তিনি সাদকা গ্রহণ করবেন না। সুতরাং ছাগল ও উটের উপর কোন চেষ্টা করা হবে না। হিংসা বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে। প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণীর বিষক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হবে। শিশু স্বীয় অঙ্গুলি সাপের মুখে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ওটা তার কোন ক্ষতি করবে না। ছেলেরা সিংহের সাথে খেলা করবে, অথচ তাদের কোন বিপদ ঘটবে না। নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে এমন গলায় গলায় মিলে থাকবে যে, যেন সে পাহারাদার কুকুর। সমগ্র জগৎ ইসলাম ও ন্যায়নীতিতে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে যেমনভাবে বর্তন পানিতে পরিপূর্ণ হয়। সকলের একই কালেমা’ হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না। যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কুরাইশ স্বীয় রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। পৃথিবী সাদা চাদির ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। হযরত আদম (আঃ)-এর বরকতময় যুগের ন্যায় ফসল উৎপাদিত হবে। একটা দলের পরিতৃপ্তির জন্যে এক গুচ্ছ আঙ্গুরই যথেষ্ট হবে। এক একটি ডালিম ফল এত বড় হবে যে, একটি দল একটি ডালিম খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। বলদ এরূপ মূল্যে পাওয়া যাবে’ (অর্থাৎ বলদের মূল্য খুব বেশী হবে) এবং ঘোড়া কতগুলো দিরহামের বিনিময়েই পাওয়া যাবে।”জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঘোড়ার মূল্য হ্রাস পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, যুদ্ধে ওর সোয়ারী মোটেই নেয়া হবে না। তারা প্রশ্ন করেনঃ “বলদের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, সমগ্র পৃথিবীতে কৃষিকার্য শুরু হয়ে যাবে।” দাজ্জাল প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পূর্বেই ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। প্রথম বছরে বৃষ্টির এক তৃতীয়াংশ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপরে ভূমির উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশ কমে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় বছরে আকাশকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, সে যেন বৃষ্টি দুই তৃতীয়াংশ বন্ধ রাখে এবং এ নির্দেশ ভূমিকেও দেয়া হবে যে, সে যেন উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশ কম করে। তৃতীয় বছর আকাশ হতে বৃষ্টির এক ফোটাও বর্ষিত হবে না। অনুরূপভাবে ভূমিতে একটি চারাগাছও জন্ম নেবে না। সমস্ত জীবজন্তু এ দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে রক্ষা করবেন সেই রক্ষা পাবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সে সময় মানুষ কিরূপে জীবিত থাকবে?' তিনি বলেনঃ “সে সময় তাদের খাদ্যের স্থলবর্তী হবে তাদের লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করা, সুবহানাল্লাহ পাঠ করা এবং আলহামদুল্লিাহ বলা।” ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বলেন, আমার উস্তাদ তাঁর উস্তাদ হতে শুনেছেন, তিনি বলতেনঃ “এ হাদীসটি এ যোগ্যতা রাখে যে, শিশুদের শিক্ষক শিশুদেরকেও এটা শিক্ষা দেবেন, এমনকি লিখিয়ে দেবেন, যেন তাদেরও এটা স্মরণ থাকে।” এ হাদীসটি এ সম্বন্ধে গারীব বটে, কিন্তু এর কোন কোন অংশের প্রমাণ স্বরূপ অন্য হাদীসও রয়েছে। এ হাদীসের মতই একটি হাদীস হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আমরা ওটাও এখানে বর্ণনা করছি।সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত নাওয়াস ইবনে শামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকালে দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এমনভাবে তাকে উঁচু ও নীচু করেন যে, আমাদের মনে হয় না জানি সে মদীনার খেজুরের বাগানেই বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আমরা তাঁর নিকট ফিরে আসলে আমাদের চেহারা দেখে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” তখন আমরা তা বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও আর একটা বেশী ভয় রয়েছে। আমার বিদ্যমানতায় যদি সে বের হয় তবে আমি তাকে বুঝে নেবো। কিন্তু যদি আমার পরে সে বের হয় তবে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাকে বাধা দিতে হবে। আমি মহান আল্লাহকেই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিনিধি বানিয়ে দিয়েছি। জেনে রেখো, সে যুবক হবে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এটুকু বুঝে নাও যে, সে দেখতে অনেকটা আবদুল উয্যা ইবনে কাতনের মত হবে। তোমাদের যে তাকে দেখবে সে যেন সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী প্রান্ত হতে বের হবে এবং ডানে-বামে ঘুরে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (ঈমানের উপরে) খুব অটল থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কতদিন অবস্থান করবে। তিনি বললেনঃ “চল্লিশ দিন। এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান, একদিন হবে এক জুমআর সমান এবং অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মত হবে।”অতঃপর আমরা জিজ্ঞেস করি, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা অনুমান করে নেবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের চলন গতি কিরূপ দ্রুত হবে? তিনি বলেনঃ মেঘ যেমন বাতাসে তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। সে একটি গোত্রকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তাকে মেনে নেবে। তখন তাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যমীন হতে ফলস উৎপাদিত হবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মোটা তাজা হয়ে যাবে ও খুব বেশী দুধ দেবে। সে আর এক সম্প্রদায়ের নিকট যাবে। তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও অস্বীকার করবে। সে সেখান হতে ফিরে আসবে। তখন তাদের হাতে মাল-ধন কিছুই থাকবে না। সে অনুর্বর ভূমির উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেবে, “হে যমীন! তোমার ধনাগারকে বের করে দাও।" তখন যমীনের মধ্য হতে ধন-ভাণ্ডার বেরিয়ে আসবে।সে তখন মৌমাছির মত ঐ ধনের পিছনে পিছনে ফিরতে থাকবে। সে একজন নব্য যুবককে আহ্বান করবে এবং তাকে হত্যা করতঃ দু'টুকরো করে এতদূরে নিক্ষেপ করবে যতো দূরে একটি তীর চলে থাকে। তারপরে তাকে ডাক দেবে এবং সে তখন জীবিত হয়ে হাসতে হাসতে তার নিকট চলে। আসবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি। দু’টি চাদর পরিহিত হয়ে দু'জন ফেরেশতার ডানার উপর হাত রেখে দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা স্তম্ভের নিকট অবতরণ করবেন। যখন তিনি মস্তক কুঁকাবেন তখন তার মস্তক হতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরে পড়বে এবং যখন তিনি মস্তক উত্তোলন করবেন তখন ঐ ফোটাগুলো মুক্তার মত গড়িয়ে পড়বে। যে কাফির পর্যন্ত তার শ্বাস পৌছবে, সে মরে যাবে এবং তার শ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছবে যে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌছে থাকে।তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং ‘লুদ’ নামক স্থানে তাকে ধরেফেলে সেখানেই হত্যা করবেন। তারপরে তিনি ঐ লোকদের নিকট আসবেন যারা এ হাঙ্গামায় রক্ষা পেয়ে যাবে। তিনি তাদের চেহারায় হাত ফিরিয়ে দেবেন। এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিকট অহী আসবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন-‘আমি আমার এমন বান্দাহদেরকে প্রেরণ করেছি যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেউই করতে পারবে না। তুমি আমার এ বিশিষ্ট বান্দাহদেরকে তূর পর্বতের নিকট নিয়ে যাও।' তারপর ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে এবং তারা চতুর্দিক হতে লাফাতে লাফাতে চলে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘বাহীরা-ই-তাবারিয়ায় আসবে এবং ওর সমস্ত পানি পান করে নেবে। তাদের পর পরই যখন অন্য দলটি আসবে তখন তারা ওটাকে এমন শুষ্ক অবস্থায় পাবে যে, তারা বলবে, সম্ভবতঃ এখানে কোন সময় পানি ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গী মুমিনগণ তথায় এমনভাবে অবরুদ্ধ থাকবেন যে, একটি বলদের মাথাও তাদের নিকট এমন পছন্দনীয় মনে হবে যেমন আজ তোমাদের নিকট একশটি স্বর্ণমুদ্রা পছন্দনীয়। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় শত্রুদেরকে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত করবেন। ফলে তারা সবাই একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সঙ্গীগণসহ যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু যমীনে অর্ধহাত পরিমাণ জায়গাও এমন পাবেন না যা তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধ হতে শূন্য থাকবে। পুনরায় তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাবেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা উটের ঘাড়ের মত এক প্রকার পাখি পাঠিয়ে দেবেন। ঐ পাখিগুলো তাদের সমস্ত মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছেমত জায়গায় নিক্ষেপ করবে। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। ফলে সমস্ত যমীন হাতের তালুর মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারপর যমীনকে শস্য এবং ফল উৎপাদনের ও বরকত ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হবে। সেদিন একটি ডালিম ফল এক দল লোকের পক্ষে যথেষ্ট হবে। তারা সবাই ওর ছালের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবে। একটি উন্ত্রীর দুগ্ধ একটি গোটা সম্প্রদায়ের লোকও পান করে শেষ করতে পারবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এক মৃদু ও নির্মল বায়ু প্রবাহিত করবেন যা সমস্ত ঈমানদার নর ও নারীর বগলের নিম্নদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাণ বায়ুও নির্গত হয়ে যাবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরা বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মত পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকবে। তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে। ওটা আমরা ইনশাআল্লাহ (সূরা-ই-আম্বিয়ার) (আরবী) (২১:৯৬) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিকট বললেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি বলে থাকেন-কিয়ামত অমুক অমুক জায়গা পর্যন্ত পৌছে যাবে, এটা কি ব্যাপার? তিনি তখন ‘সুবহানাল্লাহ' এবং 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পর বললেনঃ “আমার ইচ্ছে হচ্ছে যে, এখন তোমাকে কোন হাদীস শুনাবো না। আমি তো একথা বলেছিলাম যে, কিছুকাল পরে তোমরা বড় বড় ব্যাপার সংঘটিত হতে দেখবে, যেমন বায়তুল্লাহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং এই হবে, এই হবে ইত্যাদি।” অতঃপর তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাজ্জাল বের হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমার জানা নেই যে, সেটা চল্লিশ মাস হবে অথবা চল্লিশ বছর হবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মত। তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন। তারপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন মিলে মিশে থাকবে যে, দু'জনের মধ্যে মোটেই কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর সিরিয়ার দিক হতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, যা সমস্ত ঈমানদারের মৃত্যু ঘটিয়ে দেবে। যার অন্তরে অণুপরিমাণও সততা বা ঈমান থাকবে, সে পর্বতের গুহায় অবস্থান করলেও মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরাই বেচে থাকবে, যারা পাখীর ন্যায় হালকা হবে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় মস্তক বিশিষ্ট হবে। ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করার শক্তি তাদের থাকবে না। শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করতঃ তাদেরকে মূর্তি পূজার দিকে আকষ্ট করবে। কিন্তু তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের জন্যে আহার্যের দরজা খোলা থাকবে এবং জীবন খুবই শান্তিতে অতিবাহিত হবে। তারপর শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। এর ফলে মানুষ পতিত হতে থাকবে। একটি লোক যে তার উষ্ট্রগুলোকে পানি পান করাবার জন্যে তাদের চৌবাচ্চা ঠিক করতে থাকবে সেই সর্বপ্রথম শিঙ্গার শব্দ শুনতে পাবে। এর ফলে সে এবং অন্য সমস্ত লোক অচৈতন্য হয়ে পড়বে।মোটকথা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা হবে শিশিরের বা ছায়ার মত। তার ফলে দ্বিতীয়বার দেহ সৃষ্টি হবে। তারপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। তখন সবাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে-“হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে চল।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ" (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফেরেশতাগণ) তাদেরকে থামিয়ে দাও, নিশ্চয়ই তারা (প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪) এরপর বলা হবে-জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।' জিজ্ঞেস করা হবে-কতার মধ্য হতে কতো জনকে?' উত্তরে বলা হবে-প্রতি হাজারে ন’শ নিরানব্বই জনকে। (আল্লাহ) বলবেন-এটা এমন দিন যা ছেলেদেরকে বুড়ো করে দেবে এবং এটা এমন দিন যাতে পায়ের গোছা খুলে যাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইবনে মারইয়াম (আঃ) বাব-ই-লুদের’ নিকট কিংবা ‘লুদের’ পার্শ্বে মাসীহ দাজ্জালকে হত্যা করবেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে বাব-ই-লুদ রয়েছে এবং এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর পরে ইমাম তিরিমিযী (রঃ) আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-এর নাম নিয়েছেন যে, তাঁদের হতেও এ অধ্যায়ের হাদীসগুলো বর্ণিত আছে, যেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের হযরত ঈসা (আঃ)-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা বর্ণিত রয়েছে। শুধুমাত্র দাজ্জালের বর্ণনার হাদীসগুলোই তো অসংখ্য রয়েছে, যেগুলো একত্রিত করা খুবই কঠিন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, আরাফা হতে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের এক মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। সে সময় তথায় কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বলেনঃ “যে পর্যন্ত দশটি ব্যাপার সংঘটিত না হবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। (১) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। (২) ধূয়া নির্গত হওয়া। (৩) 'দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটা। (৫) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া। (৬) দাজ্জালের আবির্ভাব।.(৭) যমীনের তিন জায়গা ধ্বসে যাওয়া। (৭ক) পূর্বে (৮খ) পশ্চিমে (৯গ) আরব উপদ্বীপে এবং (১০) আদন হতে একটা আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় একত্রিত করবে। ওটা (আগুন) রাত্রিও তাদের সাথে অতিবাহিত করবে। যখন দুপুরের সময় তারা বিশ্রাম গ্রহণ করবে তখনও এ আগুন তাদের সঙ্গেই থাকবে।”উক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানের মধ্যে রয়েছে। হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ মুতাওয়াতির হাদীসগুলো যা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ), হযরত আবু উমামা (রাঃ), হযরত লাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত মাজমা ইবনে জারিয়া (রাঃ), হযরত আবূ শুরাইহা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) (আকাশ হতে) অবতরণ করবেন। সাথে সাথে কিভাবে, কোথায় এবং কোন্ সময় তাঁর অবতরণ ঘটবে তাতে এটাও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ ফজরের নামাযের ইকামতের সময় সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পূর্বদিকের স্তম্ভের উপর তিনি অবতরণ করবেন।সেই যুগে অর্থাৎ ৭৪১ হিঃ সালে জামে' উমভী’র স্তম্ভটি সাদা পাথরে মজবুত করে বানানো হয়েছে। কেননা, ওটা আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছিল, যে আগুন সম্ভবতঃ অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরাই লাগিয়েছিল। এতে বিস্ময়ের কি আছে যে, এটাই হয়তো সেই স্তম্ভ যার উপর হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন এবং শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন ও ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ দিয়েছেন ও তাকে সাব্যস্ত করেছেন। এটা ঐ সময় হবে যখন সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হবে এবং মানুষ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসরণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। যেমন কুরআন কারীমে উক্ত (আরবী) হয়েছে। (৪৩:৬১) এবং একটি পঠনে (আরবী) লাআলামুন রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ কিয়ামতের (কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার) একটি বড় নিদর্শন। কেননা, তিনি দাজ্জালের আগমনের পর আগমন করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকের তিনি ব্যবস্থা রাখেননি। তার সময়েই ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব ঘটবে, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'আর বরকতে ধ্বংস করবেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার সংবাদ কালাম পাকের মধ্যেও রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; ।'(২১৪ ৯৬-৯৭) অর্থাৎ তাদের বের হওয়াও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি প্রমাণ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিশেষণঃ পূর্ব বর্ণিত দু'টি হাদীসেও তাঁর বিশেষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি মধ্যম দেহ ও পরিষ্কার চুল বিশিষ্ট, যেমন শানূআহ্ গোত্রের লোক হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি। তিনি লাল বর্ণের এবং মধ্যম দেহ বিশিষ্ট। মনে হচ্ছিল যে, যেন তিনি সবেমাত্র গোসল খানা হতে বের হয়ে এলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তিনি একেবারে আমার মতই ছিলেন।সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) রক্তিম বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং চওড়া বক্ষ বিশিষ্ট ছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণ, মোটা দেহ এবং সোজা চুল বিশিষ্ট ছিলেন-যেমন যিতের লোক হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তিনি দাজ্জালের শরীরিক গঠনও বর্ণনা করেছেন যে, তার ডান চক্ষু কানা হবে যেন ওটা ফুলা আঙ্গুর। তিনি বলেনঃ কাবা শরীফের নিকটে আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছে যে, একজন খুবই গোধূম বর্ণের লোক, যার মাথার চুল তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত লটকে ছিল এবং চুল ছিল পরিপাটি। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছিল। তিনি দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করি- ইনি কে? তখনই আমাকে বলা হয়-“ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম (আঃ)। তার পিছনে আমি আর একটি লোককে দেখতে পাই যার ডান চক্ষুটি কানা ছিল। ইবনে কাতানের সঙ্গে সে অনেকটা সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। সেও দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করি-এটা কে? বলা হয়- মাসীহ দাজ্জাল।সহীহ বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-কে লাল বর্ণের বলেননি, বরং গোধূম বর্ণের বলেছেন। পরে উপরে বর্ণিত পূর্ণ হাদীসটি রয়েছে। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ইবনে কাতান খুযাআহ্ গোত্রের একটি লোক ছিল। সে অজ্ঞতার যুগে মারা গিয়েছিল। পূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, হযরত মাসীহ (আঃ) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর এখানে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়বে।তবে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, তিনি এখানে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে খুব সম্ভব, যে হাদীসে চল্লিশ বছর অবস্থানের কথা রয়েছে তা ঐ সময় সহই হবে যা তিনি তার আকাশে উঠে যাওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছিলেন। যে সময় তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সে সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। পরে এসে তিনি পৃথিবীতে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে পূর্ণ চল্লিশ বছর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই সব চেয়ে ভাল জানেন। (ইবনে আসাকের) কেউ কেউ বলেন যে, যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল দেড় বছর। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে কথা। তবে হাফিয আবুল কাসিম (রঃ) স্বীয় ইতিহাসে পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী হতে এটাও এনেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কক্ষে তাঁর সাথেই সমাধিস্থ হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘উত্থান দিবসে সে তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবে। অর্থাৎ এ কথার তিনি সাক্ষ্য দান করবেন যে, তিনি আল্লাহর রিসালাত তাঁদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার শেষ দিকে বলেনঃ (আরবী) (৫:১১৬-১১৮) পর্যন্ত।

আন-নিসা 4:158

১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।' এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনিঅত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।" এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন। যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তার যুগে সমস্ত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু ইসলাম ধর্মই থাকবে। তার যুগে আল্লাহ আআলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন। অতঃপর সারা জগতে নিরাপত্তা বিরাজ করবে। এমনকি কৃষ্ণ সর্প উটের সঙ্গে, চিতা ব্যাঘ্র গাভীর সঙ্গে এবং নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে চরে বেড়াবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলা করবে। তারা তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়াবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের এ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি ইসলামের জন্যে লোকের সঙ্গে জিহাদ করবেন। এ হাদীসের একটি অংশ সহীহ বুখারীর মধ্যেও রয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ, “দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত রোমকগণ ‘আ’মাক’ বা ‘দাবিকে অবতরণ না করবে এবং তাদের মোকাবিলায় মদীনা হতে মুসলিম সেনাবাহিনী গমন না করবে। সে সময় ঐ মুসলমানেরা সারা দুনিয়ার লোকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবে।যখন তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাবে তখন রোমকগণ তাদেরকে বলবে‘আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে। আমাদের মধ্য হতে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে তোমাদের নিকট চলে এসেছে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। তোমরা তাদের মধ্য হতে সরে যাও।' তখন মুসলমানেরা বলবেআল্লাহর শপথ! এটা কখনও হতে পারে না যে, আমরা আমাদের দুর্বল ভাইদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে দেবো। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঐ মুসলিম সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। তাদের তাওবা আল্লাহ তা'আলা কখনও গ্রহণ করবেন না। এক তৃতীয়াংশ শহীদ হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম শহীদ। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর জয়লাভ করবে। এরপর তারা আর কোন হাঙ্গামায় পতিত হবে না।তারা (মুসলমানেরা) কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা যায়তুন বৃক্ষের উপর নিজেদের তরবারী ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে থাকবে। এমন সময় শয়তান চীৎকার করে বলবেঃ “তোমাদের সন্তানদের মধ্য দাজ্জাল এসে গেছে। তারা এ মিথ্যা কথাকে সত্য মনে করে এখান হতে বেরিয়ে সিরিয়ায় পৌছে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যুহ ঠিক করতে থাকবে? এমন সময় অন্যদিকে নামাযের ইকামত হবে এবং হযরত ঈসা ইনে। মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে তাদের ইমামতি করবেন। শত্রু বাহিনী যখন মুসলমানদেরকে দেখবে তখন তারা গলে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে ছেড়েও দেন তবুও তারা গলে গলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হাতে তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় বর্শার রক্ত তাদেরকে দেখাবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ,ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হররত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ ‘এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।' হযরত মূসা (আঃ)-ও এরূপই বলেন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। হ্যা, তবে আমার প্রভু আমার নিকট যে অঙ্গীকার করেছেন তা এই যে, দাজ্জাল বের হবে। দু’টি দল তার সঙ্গী হবে। সে আমাকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমনভাবে সীসা গলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দেবেন। এমন কি পাথর ও গাছ বলবে-হে মুসলমান! এখানে আমার পিছনে একটি কাফির আছে, তাকে হত্যা কর। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করবেন এবং মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফিরে যাবে। তারপরে ইয়াজুয ও মাজুয বের হবে এবং চতুর্দিক হতে তারা আক্রমণ চালাবে। সমস্ত শহরকে তারা ধ্বংস করবে। যেসব স্থান তারা অতিক্রম করবে ঐ সবই ধ্বংস করে দেবে। যে পানির পার্শ্ব দিয়ে তারা গমন করবে তার সবই পান করে নেবে। লোকেরা পুনরায় আমার নিকট ফিরে আসবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবো। তিনি তখন তাদের সকলকেই একই সাথে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু তাদের মৃত দেহের দুর্গন্ধে বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়বে। ফলে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। অতঃপর এত বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হবে যে, ঐ সমস্ত মৃতদেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কিয়ামতের সংঘটন এত নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর অবস্থা হয়ে থাকে যে, সকালে হবে কি সন্ধ্যায় হবে বা দিনে হবে কি রাত্রে হবে তা তার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারে না।”মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু নায়রা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা জুমআর দিন হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করি, আমার লিখিত কুরআন কারীমকে তাঁর পঠনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াই আমার তাঁর নিকট আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। জুমআর নামাযের সময় হলে তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “গোলস করুন। তারপর তিনি সুগন্ধি নিয়ে আসেন। আমরা সুগন্ধি মেখে মসজিদে হাযির হই এবং একটি লোকের পার্শ্বে বসে পড়ি। এ লোকটি দাজ্জালের হাদীস বর্ণনা করছিলেন। অতঃপর হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, মুসলমানদের তিনটি শহর হবে, একটি হবে দু’টি সমুদ্রের মিলিত হওয়ার জায়গায়, দ্বিতীয়টি হবে হীরায় এবং তৃতীয়টি হবে সিরিয়ায়। তারপর মানুষ তিনটি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হবে। অতঃপর দাজ্জাল বহির্গত হবে। তারা প্রথম শহরটিতে যাবে। তথাকার লোক তিন অংশে বিভক্ত হবে। এক অংশ বলবে- আমরা তাদের মোকাবিলা করবো এবং কি সংঘটিত হয় তা দেখবো। দ্বিতীয় দলটি গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে এবং তৃতীয় দল তাদের নিকটবর্তী শহরে চলে যাবে। দাজ্জালের সঙ্গে সত্তর হাজার লোক থাকবে। তাদের মাথায় মুকুট থাকবে। তাদের অধিকাংশই হবে ইয়াহুদী ও স্ত্রীলোক। এখানকার মুসলমানগণ একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ হবে। তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মাঠে চরতে গিয়েছিল ঐগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের বিপদ খুব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়বে। এমনকি তারা তাদের কামানের তারগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে থাকবে। এরূপ সংকটময় অবস্থায় সমুদ্রের মধ্য হতে তাদের কানে শব্দ আসবে- হে লোক সকল! তোমাদের জন্যে সাহায্য এসে গেছে। এ শব্দ শুনে লোকগুলো খুব খুশী হবে। কেননা, তারা বুঝতে পারবে যে, এটা কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কথা। ঠিক ফজরের নামাযের সময় ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। মুসলমাদের আমীর তাঁকে বলবেন- “হে রূহুল্লাহ (আঃ)! আগে বাড়ুন এবং নামায পড়িয়ে দিন। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘এ উম্মতের কিছু সংখ্যক লোক কিছু সংখ্যক লোকের আমীর রয়েছে। সুতরাং এ দলের আমীরই তাদের নামাযের ইমাম হবে। অতএব, তাদের আমীরই ইমাম হয়ে নামায পড়াবেন। নামায শেষ করেই হযরত ঈসা (আঃ) বর্শা হাতে নিয়ে মাসীহ দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। দাজ্জাল তাঁকে দেখামাত্রই সীসার মত গলতে থাকবে। তিনি তার বক্ষে আঘাত করবেন। ঐ আঘাতেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সঙ্গীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু কোন স্থানেই তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। এমনকি তারা যদি কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেই গাছও বলবে-“হে মুমিন! একটি কাফির আমার নিকট লুকিয়ে রয়েছে।' এ কথা পাথরও বলবে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক ভাষণের কম বেশী অংশ দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনায় এবং সে দাজ্জাল হতে ভয় প্রদর্শনেই কাটিয়ে দেন। সে ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এর অপেক্ষা বড় হাঙ্গামা আর নেই। সমস্ত নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। সে নিশ্চিতরূপে তোমাদের মধ্যেই আসবে। যদি আমার জীবদ্দশায় সে এসে পড়ে তবে তো আমি তাকে বাধা দান করবো। আর যদি আমার পরে আসে তবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমি আল্লাহ তা'আলাকেই প্রত্যেক মুসলমানের অভিভাবক করে যাচ্ছি। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বের হবে। সে ডান ও বামে খুব ঘুরাফেরা করবে। হে জনমণ্ডলী ও হে আল্লাহর বান্দাগণ! দেখ, তোমরা অটল থাকবে। জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে তার এমন পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছি যা অন্য কোন নবী স্বীয় উম্মতকে জানিয়ে যাননি। সে প্রথমতঃ দাবী করবে-আমি নবী। সুতরাং তোমরা স্মরণ রেখো যে, আমার পরে কোন নবী নেই। অতঃপর এর চেয়েও বেড়ে গিয়ে বলবে-“আমি আল্লাহ'। অতএব তথায় তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহকে এই চোখে কেউ দেখতে পারে না। মৃত্যুর পর তথায় তার দর্শন লাভ ঘটতে পারে। আরও স্মরণ রেখো যে, সে এক চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং তোমাদের প্রভু এক চক্ষু বিশিষ্ট নন। তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে কাফির' লিখিত থাকবে যা প্রত্যেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মোটকথা প্রত্যেক ঈমানদারই পড়তে পারবে।তার সাথে আগুন থাকবে ও বাগান থাকবে। তার আগুন হবে আসলে জান্নাত এবং বাগানটি হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম। তোমাদের মধ্যে যাকে সে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। ঐ আগুন তার জন্যে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর নমরূদের আগুন শান্তিদায়ক হয়েছিল। তার এক হাঙ্গামা এও হবে যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে-“আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করতে পারি তবে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে?' এমন সময়ে দু’জন শয়তান তার পিতা-মাতার আকারে প্রকাশিত হবে এবং তাকে বলবে-বৎস! এটাই তোমার প্রভু। সুতরাং তাকে মেনে নাও।' তার আর একটা ফিত্না এও হবে যে, তাকে একটি লোকের উপর জয়যুক্ত করা হবে। সে তাকে করাত দ্বারা ফেড়ে দু’টুকরো করে দেবে। তারপর সে জনগণকে বলবেঃ আমার এ বান্দাকে তোমরা দেখ, এখন আমি তাকে জীবিত করবো। কিন্তু সে পুনরায় এ কথাই বলবে যে, তার প্রভু আমি ছাড়া অন্য কেউ। অতঃপর এ দু' দুবৃত্ত তাকে উঠা-বসা করাবে এবং বলবেঃ তোমার প্রভু কে? সে উত্তরে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ এবং তুমি তার শত্রু দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! এখন তো আমার পূর্বাপেক্ষাও বেশী বিশ্বাস হয়েছে। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ মুমিন ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণীর জান্নাতের অধিকারী হবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, এ হাদীসটি শুনে আমাদের ধারণা হয় যে, এ লোকটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাবই (রাঃ) হবেন, তাঁর শাহাদাত লাভ পর্যন্ত আমাদের ধারণা এটাই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার একটি হাঙ্গামা এও হবে যে, সে আকাশকে পানি বর্ষণ করার নির্দেশ দেবে এবং আকাশ হতে পানি বর্ষিত হবে। সে যমীনকে ফসল উৎপাদন করার নির্দেশ দেবে এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদিত হবে।তার আর একটি ফিত্না এও হবে যে, সে একটি গোত্রের নিকট যাবে এবং তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। সে সময়ই তাদের সমস্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট যাবে। তৎক্ষণাৎ তার হুকুমে আকাশ। হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং যমীনে ফলস উৎপাদিত হবে। তাদের গৃহপালিত পশু পূর্বাপেক্ষা বেশী মোটা-তাজা ও দুগ্ধবতী হয়ে যাবে। তারা মক্কা ও মদীনা ছাড়া যমীনের সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যে যখন মদীনামুখী হবে তখন সারা পথে সে তরবারীধারী ফেরেশতাগণকে দেখতে পাবে। সে তখন ‘সানতার শেষ প্রান্তে, যারীবে আহমারের নিকট থেমে যাবে। অতঃপর মদীনায় তিনটি ভূমিকম্প হবে। ফলে মদীনায় যত মুনাফিক নর ও নারী থাকবে সবাই মদীনা হতে বেরিয়ে গিয়ে দাজ্জালের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এভাবে মদীনা নিজের মধ্য হতে অপবিত্র লোকদেরকে দূর করে দেবে যেমন লোহার ভাটা লোহার মরিচা দূর করে থাকে। সেদিনের নাম হবে ‘ইয়াওমুল খালাস’ (মুক্তির দিন)।হযরত উম্মে শুরায়েক (রাঃ) রাসূলুরলাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেদিন আরববাসী কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ প্রথমতঃ তারা থাকবেই খুব কম এবং তাদের অধিকাংশই থাকবে বাইতুল মুকাদ্দাসে। তাদের ইমাম হবে একজন সৎ ব্যক্তি। সে ফজরের নামায পড়াতে থাকবে এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। ঐ ইমাম তখন পিছনে সরতে থাকবে যেন ঈসা (আঃ) ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি তার স্কন্ধে হাত রেখে বলবেনঃ “তুমি সামনে এগিয়ে নামায পড়িয়ে দাও, ইকামত তোমার জন্যেই দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের ইমামই নামায পড়িয়ে দেবে। নামায শেষে তিনি বলবেনঃ দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দেয়া হবে। এদিকে দাজ্জাল সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে হাযির হবে। তাদের মস্তকে মুকুট থাকবে এবং তাদের তরবারীর উপর সোনা থাকবে। দাজ্জাল তাঁকে দেখে এমনভাবে গলতে থাকবে যেমনভাবে পানিতে লবণ গলে থাকে। অতঃপর সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতঃ পালাতে শুরু করবে। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা এটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তুমি আমার হাতেই একটা মার খাবে, সুতরাং ওটা হতে রক্ষা পেতে পার না। অতএব, তিনি তাকে পূর্ব দরজা লুদ-এর নিকট ধরে নেবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন ইয়াহূদীরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু তারা কোথাও মাথা লুকানোর জায়গা পাবে না। প্রত্যেক পাথর, বৃক্ষ, দেয়াল ও জীবজন্তু বলতে থাকবেঃ “হে মুসলমান! এখানে ইয়াহুদী রয়েছে। এসে তাকে হত্যা কর।” তবে বাবলা গাছ হচ্ছে ইয়াহূদীদের গাছ। সে কিন্তু বলবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে চল্লিশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বছর হবে অর্ধ বছরের মত, বছর হবে মাসের মত, মাস হবে জুম'আর মত এবং শেষ দিনগুলো হবে ‘শারারার মত। তোমাদের কোন লোক সকালে শহরের একটি দরজা হতে চলতে আরম্ভ করে দ্বিতীয় দরজায় পৌছতে পারবে না। এমন সময়েই সন্ধ্যা হবে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ছোট দিনগুলোতে আমরা কিভাবে নামায আদায় করবো?" তিনি বলেনঃ “তোমরা এ দীর্ঘ দিনগুলোতে যেমনভাবে অনুমান করে নামায পড়ছো, তখনও সেভাবেই অনুমান করে নামায পড়বে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারপর হযরত ঈসা (আঃ) আমার উম্মতের মধ্যে শাসনকর্তা হবেন, ন্যায়পরায়ণ হবেন, ইমাম হবেন এবং ন্যায় বিচারক হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। তিনি সাদকা গ্রহণ করবেন না। সুতরাং ছাগল ও উটের উপর কোন চেষ্টা করা হবে না। হিংসা বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে। প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণীর বিষক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হবে। শিশু স্বীয় অঙ্গুলি সাপের মুখে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ওটা তার কোন ক্ষতি করবে না। ছেলেরা সিংহের সাথে খেলা করবে, অথচ তাদের কোন বিপদ ঘটবে না। নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে এমন গলায় গলায় মিলে থাকবে যে, যেন সে পাহারাদার কুকুর। সমগ্র জগৎ ইসলাম ও ন্যায়নীতিতে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে যেমনভাবে বর্তন পানিতে পরিপূর্ণ হয়। সকলের একই কালেমা’ হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না। যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কুরাইশ স্বীয় রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। পৃথিবী সাদা চাদির ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। হযরত আদম (আঃ)-এর বরকতময় যুগের ন্যায় ফসল উৎপাদিত হবে। একটা দলের পরিতৃপ্তির জন্যে এক গুচ্ছ আঙ্গুরই যথেষ্ট হবে। এক একটি ডালিম ফল এত বড় হবে যে, একটি দল একটি ডালিম খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। বলদ এরূপ মূল্যে পাওয়া যাবে’ (অর্থাৎ বলদের মূল্য খুব বেশী হবে) এবং ঘোড়া কতগুলো দিরহামের বিনিময়েই পাওয়া যাবে।”জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঘোড়ার মূল্য হ্রাস পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, যুদ্ধে ওর সোয়ারী মোটেই নেয়া হবে না। তারা প্রশ্ন করেনঃ “বলদের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, সমগ্র পৃথিবীতে কৃষিকার্য শুরু হয়ে যাবে।” দাজ্জাল প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পূর্বেই ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। প্রথম বছরে বৃষ্টির এক তৃতীয়াংশ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপরে ভূমির উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশ কমে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় বছরে আকাশকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, সে যেন বৃষ্টি দুই তৃতীয়াংশ বন্ধ রাখে এবং এ নির্দেশ ভূমিকেও দেয়া হবে যে, সে যেন উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশ কম করে। তৃতীয় বছর আকাশ হতে বৃষ্টির এক ফোটাও বর্ষিত হবে না। অনুরূপভাবে ভূমিতে একটি চারাগাছও জন্ম নেবে না। সমস্ত জীবজন্তু এ দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে রক্ষা করবেন সেই রক্ষা পাবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সে সময় মানুষ কিরূপে জীবিত থাকবে?' তিনি বলেনঃ “সে সময় তাদের খাদ্যের স্থলবর্তী হবে তাদের লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করা, সুবহানাল্লাহ পাঠ করা এবং আলহামদুল্লিাহ বলা।” ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বলেন, আমার উস্তাদ তাঁর উস্তাদ হতে শুনেছেন, তিনি বলতেনঃ “এ হাদীসটি এ যোগ্যতা রাখে যে, শিশুদের শিক্ষক শিশুদেরকেও এটা শিক্ষা দেবেন, এমনকি লিখিয়ে দেবেন, যেন তাদেরও এটা স্মরণ থাকে।” এ হাদীসটি এ সম্বন্ধে গারীব বটে, কিন্তু এর কোন কোন অংশের প্রমাণ স্বরূপ অন্য হাদীসও রয়েছে। এ হাদীসের মতই একটি হাদীস হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আমরা ওটাও এখানে বর্ণনা করছি।সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত নাওয়াস ইবনে শামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকালে দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এমনভাবে তাকে উঁচু ও নীচু করেন যে, আমাদের মনে হয় না জানি সে মদীনার খেজুরের বাগানেই বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আমরা তাঁর নিকট ফিরে আসলে আমাদের চেহারা দেখে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” তখন আমরা তা বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও আর একটা বেশী ভয় রয়েছে। আমার বিদ্যমানতায় যদি সে বের হয় তবে আমি তাকে বুঝে নেবো। কিন্তু যদি আমার পরে সে বের হয় তবে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাকে বাধা দিতে হবে। আমি মহান আল্লাহকেই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিনিধি বানিয়ে দিয়েছি। জেনে রেখো, সে যুবক হবে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এটুকু বুঝে নাও যে, সে দেখতে অনেকটা আবদুল উয্যা ইবনে কাতনের মত হবে। তোমাদের যে তাকে দেখবে সে যেন সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী প্রান্ত হতে বের হবে এবং ডানে-বামে ঘুরে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (ঈমানের উপরে) খুব অটল থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কতদিন অবস্থান করবে। তিনি বললেনঃ “চল্লিশ দিন। এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান, একদিন হবে এক জুমআর সমান এবং অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মত হবে।”অতঃপর আমরা জিজ্ঞেস করি, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা অনুমান করে নেবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের চলন গতি কিরূপ দ্রুত হবে? তিনি বলেনঃ মেঘ যেমন বাতাসে তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। সে একটি গোত্রকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তাকে মেনে নেবে। তখন তাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যমীন হতে ফলস উৎপাদিত হবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মোটা তাজা হয়ে যাবে ও খুব বেশী দুধ দেবে। সে আর এক সম্প্রদায়ের নিকট যাবে। তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও অস্বীকার করবে। সে সেখান হতে ফিরে আসবে। তখন তাদের হাতে মাল-ধন কিছুই থাকবে না। সে অনুর্বর ভূমির উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেবে, “হে যমীন! তোমার ধনাগারকে বের করে দাও।" তখন যমীনের মধ্য হতে ধন-ভাণ্ডার বেরিয়ে আসবে।সে তখন মৌমাছির মত ঐ ধনের পিছনে পিছনে ফিরতে থাকবে। সে একজন নব্য যুবককে আহ্বান করবে এবং তাকে হত্যা করতঃ দু'টুকরো করে এতদূরে নিক্ষেপ করবে যতো দূরে একটি তীর চলে থাকে। তারপরে তাকে ডাক দেবে এবং সে তখন জীবিত হয়ে হাসতে হাসতে তার নিকট চলে। আসবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি। দু’টি চাদর পরিহিত হয়ে দু'জন ফেরেশতার ডানার উপর হাত রেখে দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা স্তম্ভের নিকট অবতরণ করবেন। যখন তিনি মস্তক কুঁকাবেন তখন তার মস্তক হতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরে পড়বে এবং যখন তিনি মস্তক উত্তোলন করবেন তখন ঐ ফোটাগুলো মুক্তার মত গড়িয়ে পড়বে। যে কাফির পর্যন্ত তার শ্বাস পৌছবে, সে মরে যাবে এবং তার শ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছবে যে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌছে থাকে।তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং ‘লুদ’ নামক স্থানে তাকে ধরেফেলে সেখানেই হত্যা করবেন। তারপরে তিনি ঐ লোকদের নিকট আসবেন যারা এ হাঙ্গামায় রক্ষা পেয়ে যাবে। তিনি তাদের চেহারায় হাত ফিরিয়ে দেবেন। এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিকট অহী আসবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন-‘আমি আমার এমন বান্দাহদেরকে প্রেরণ করেছি যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেউই করতে পারবে না। তুমি আমার এ বিশিষ্ট বান্দাহদেরকে তূর পর্বতের নিকট নিয়ে যাও।' তারপর ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে এবং তারা চতুর্দিক হতে লাফাতে লাফাতে চলে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘বাহীরা-ই-তাবারিয়ায় আসবে এবং ওর সমস্ত পানি পান করে নেবে। তাদের পর পরই যখন অন্য দলটি আসবে তখন তারা ওটাকে এমন শুষ্ক অবস্থায় পাবে যে, তারা বলবে, সম্ভবতঃ এখানে কোন সময় পানি ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গী মুমিনগণ তথায় এমনভাবে অবরুদ্ধ থাকবেন যে, একটি বলদের মাথাও তাদের নিকট এমন পছন্দনীয় মনে হবে যেমন আজ তোমাদের নিকট একশটি স্বর্ণমুদ্রা পছন্দনীয়। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় শত্রুদেরকে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত করবেন। ফলে তারা সবাই একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সঙ্গীগণসহ যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু যমীনে অর্ধহাত পরিমাণ জায়গাও এমন পাবেন না যা তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধ হতে শূন্য থাকবে। পুনরায় তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাবেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা উটের ঘাড়ের মত এক প্রকার পাখি পাঠিয়ে দেবেন। ঐ পাখিগুলো তাদের সমস্ত মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছেমত জায়গায় নিক্ষেপ করবে। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। ফলে সমস্ত যমীন হাতের তালুর মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারপর যমীনকে শস্য এবং ফল উৎপাদনের ও বরকত ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হবে। সেদিন একটি ডালিম ফল এক দল লোকের পক্ষে যথেষ্ট হবে। তারা সবাই ওর ছালের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবে। একটি উন্ত্রীর দুগ্ধ একটি গোটা সম্প্রদায়ের লোকও পান করে শেষ করতে পারবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এক মৃদু ও নির্মল বায়ু প্রবাহিত করবেন যা সমস্ত ঈমানদার নর ও নারীর বগলের নিম্নদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাণ বায়ুও নির্গত হয়ে যাবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরা বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মত পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকবে। তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে। ওটা আমরা ইনশাআল্লাহ (সূরা-ই-আম্বিয়ার) (আরবী) (২১:৯৬) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিকট বললেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি বলে থাকেন-কিয়ামত অমুক অমুক জায়গা পর্যন্ত পৌছে যাবে, এটা কি ব্যাপার? তিনি তখন ‘সুবহানাল্লাহ' এবং 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পর বললেনঃ “আমার ইচ্ছে হচ্ছে যে, এখন তোমাকে কোন হাদীস শুনাবো না। আমি তো একথা বলেছিলাম যে, কিছুকাল পরে তোমরা বড় বড় ব্যাপার সংঘটিত হতে দেখবে, যেমন বায়তুল্লাহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং এই হবে, এই হবে ইত্যাদি।” অতঃপর তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাজ্জাল বের হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমার জানা নেই যে, সেটা চল্লিশ মাস হবে অথবা চল্লিশ বছর হবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মত। তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন। তারপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন মিলে মিশে থাকবে যে, দু'জনের মধ্যে মোটেই কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর সিরিয়ার দিক হতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, যা সমস্ত ঈমানদারের মৃত্যু ঘটিয়ে দেবে। যার অন্তরে অণুপরিমাণও সততা বা ঈমান থাকবে, সে পর্বতের গুহায় অবস্থান করলেও মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরাই বেচে থাকবে, যারা পাখীর ন্যায় হালকা হবে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় মস্তক বিশিষ্ট হবে। ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করার শক্তি তাদের থাকবে না। শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করতঃ তাদেরকে মূর্তি পূজার দিকে আকষ্ট করবে। কিন্তু তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের জন্যে আহার্যের দরজা খোলা থাকবে এবং জীবন খুবই শান্তিতে অতিবাহিত হবে। তারপর শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। এর ফলে মানুষ পতিত হতে থাকবে। একটি লোক যে তার উষ্ট্রগুলোকে পানি পান করাবার জন্যে তাদের চৌবাচ্চা ঠিক করতে থাকবে সেই সর্বপ্রথম শিঙ্গার শব্দ শুনতে পাবে। এর ফলে সে এবং অন্য সমস্ত লোক অচৈতন্য হয়ে পড়বে।মোটকথা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা হবে শিশিরের বা ছায়ার মত। তার ফলে দ্বিতীয়বার দেহ সৃষ্টি হবে। তারপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। তখন সবাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে-“হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে চল।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ" (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফেরেশতাগণ) তাদেরকে থামিয়ে দাও, নিশ্চয়ই তারা (প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪) এরপর বলা হবে-জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।' জিজ্ঞেস করা হবে-কতার মধ্য হতে কতো জনকে?' উত্তরে বলা হবে-প্রতি হাজারে ন’শ নিরানব্বই জনকে। (আল্লাহ) বলবেন-এটা এমন দিন যা ছেলেদেরকে বুড়ো করে দেবে এবং এটা এমন দিন যাতে পায়ের গোছা খুলে যাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইবনে মারইয়াম (আঃ) বাব-ই-লুদের’ নিকট কিংবা ‘লুদের’ পার্শ্বে মাসীহ দাজ্জালকে হত্যা করবেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে বাব-ই-লুদ রয়েছে এবং এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর পরে ইমাম তিরিমিযী (রঃ) আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-এর নাম নিয়েছেন যে, তাঁদের হতেও এ অধ্যায়ের হাদীসগুলো বর্ণিত আছে, যেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের হযরত ঈসা (আঃ)-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা বর্ণিত রয়েছে। শুধুমাত্র দাজ্জালের বর্ণনার হাদীসগুলোই তো অসংখ্য রয়েছে, যেগুলো একত্রিত করা খুবই কঠিন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, আরাফা হতে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের এক মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। সে সময় তথায় কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বলেনঃ “যে পর্যন্ত দশটি ব্যাপার সংঘটিত না হবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। (১) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। (২) ধূয়া নির্গত হওয়া। (৩) 'দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটা। (৫) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া। (৬) দাজ্জালের আবির্ভাব।.(৭) যমীনের তিন জায়গা ধ্বসে যাওয়া। (৭ক) পূর্বে (৮খ) পশ্চিমে (৯গ) আরব উপদ্বীপে এবং (১০) আদন হতে একটা আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় একত্রিত করবে। ওটা (আগুন) রাত্রিও তাদের সাথে অতিবাহিত করবে। যখন দুপুরের সময় তারা বিশ্রাম গ্রহণ করবে তখনও এ আগুন তাদের সঙ্গেই থাকবে।”উক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানের মধ্যে রয়েছে। হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ মুতাওয়াতির হাদীসগুলো যা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ), হযরত আবু উমামা (রাঃ), হযরত লাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত মাজমা ইবনে জারিয়া (রাঃ), হযরত আবূ শুরাইহা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) (আকাশ হতে) অবতরণ করবেন। সাথে সাথে কিভাবে, কোথায় এবং কোন্ সময় তাঁর অবতরণ ঘটবে তাতে এটাও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ ফজরের নামাযের ইকামতের সময় সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পূর্বদিকের স্তম্ভের উপর তিনি অবতরণ করবেন।সেই যুগে অর্থাৎ ৭৪১ হিঃ সালে জামে' উমভী’র স্তম্ভটি সাদা পাথরে মজবুত করে বানানো হয়েছে। কেননা, ওটা আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছিল, যে আগুন সম্ভবতঃ অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরাই লাগিয়েছিল। এতে বিস্ময়ের কি আছে যে, এটাই হয়তো সেই স্তম্ভ যার উপর হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন এবং শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন ও ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ দিয়েছেন ও তাকে সাব্যস্ত করেছেন। এটা ঐ সময় হবে যখন সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হবে এবং মানুষ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসরণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। যেমন কুরআন কারীমে উক্ত (আরবী) হয়েছে। (৪৩:৬১) এবং একটি পঠনে (আরবী) লাআলামুন রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ কিয়ামতের (কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার) একটি বড় নিদর্শন। কেননা, তিনি দাজ্জালের আগমনের পর আগমন করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকের তিনি ব্যবস্থা রাখেননি। তার সময়েই ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব ঘটবে, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'আর বরকতে ধ্বংস করবেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার সংবাদ কালাম পাকের মধ্যেও রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; ।'(২১৪ ৯৬-৯৭) অর্থাৎ তাদের বের হওয়াও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি প্রমাণ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিশেষণঃ পূর্ব বর্ণিত দু'টি হাদীসেও তাঁর বিশেষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি মধ্যম দেহ ও পরিষ্কার চুল বিশিষ্ট, যেমন শানূআহ্ গোত্রের লোক হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি। তিনি লাল বর্ণের এবং মধ্যম দেহ বিশিষ্ট। মনে হচ্ছিল যে, যেন তিনি সবেমাত্র গোসল খানা হতে বের হয়ে এলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তিনি একেবারে আমার মতই ছিলেন।সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) রক্তিম বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং চওড়া বক্ষ বিশিষ্ট ছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণ, মোটা দেহ এবং সোজা চুল বিশিষ্ট ছিলেন-যেমন যিতের লোক হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তিনি দাজ্জালের শরীরিক গঠনও বর্ণনা করেছেন যে, তার ডান চক্ষু কানা হবে যেন ওটা ফুলা আঙ্গুর। তিনি বলেনঃ কাবা শরীফের নিকটে আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছে যে, একজন খুবই গোধূম বর্ণের লোক, যার মাথার চুল তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত লটকে ছিল এবং চুল ছিল পরিপাটি। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছিল। তিনি দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করি- ইনি কে? তখনই আমাকে বলা হয়-“ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম (আঃ)। তার পিছনে আমি আর একটি লোককে দেখতে পাই যার ডান চক্ষুটি কানা ছিল। ইবনে কাতানের সঙ্গে সে অনেকটা সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। সেও দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করি-এটা কে? বলা হয়- মাসীহ দাজ্জাল।সহীহ বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-কে লাল বর্ণের বলেননি, বরং গোধূম বর্ণের বলেছেন। পরে উপরে বর্ণিত পূর্ণ হাদীসটি রয়েছে। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ইবনে কাতান খুযাআহ্ গোত্রের একটি লোক ছিল। সে অজ্ঞতার যুগে মারা গিয়েছিল। পূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, হযরত মাসীহ (আঃ) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর এখানে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়বে।তবে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, তিনি এখানে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে খুব সম্ভব, যে হাদীসে চল্লিশ বছর অবস্থানের কথা রয়েছে তা ঐ সময় সহই হবে যা তিনি তার আকাশে উঠে যাওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছিলেন। যে সময় তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সে সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। পরে এসে তিনি পৃথিবীতে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে পূর্ণ চল্লিশ বছর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই সব চেয়ে ভাল জানেন। (ইবনে আসাকের) কেউ কেউ বলেন যে, যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল দেড় বছর। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে কথা। তবে হাফিয আবুল কাসিম (রঃ) স্বীয় ইতিহাসে পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী হতে এটাও এনেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কক্ষে তাঁর সাথেই সমাধিস্থ হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘উত্থান দিবসে সে তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবে। অর্থাৎ এ কথার তিনি সাক্ষ্য দান করবেন যে, তিনি আল্লাহর রিসালাত তাঁদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার শেষ দিকে বলেনঃ (আরবী) (৫:১১৬-১১৮) পর্যন্ত।

আন-নিসা 4:159

১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।' এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনিঅত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।" এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন। যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তার যুগে সমস্ত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু ইসলাম ধর্মই থাকবে। তার যুগে আল্লাহ আআলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন। অতঃপর সারা জগতে নিরাপত্তা বিরাজ করবে। এমনকি কৃষ্ণ সর্প উটের সঙ্গে, চিতা ব্যাঘ্র গাভীর সঙ্গে এবং নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে চরে বেড়াবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলা করবে। তারা তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়াবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের এ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি ইসলামের জন্যে লোকের সঙ্গে জিহাদ করবেন। এ হাদীসের একটি অংশ সহীহ বুখারীর মধ্যেও রয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ, “দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত রোমকগণ ‘আ’মাক’ বা ‘দাবিকে অবতরণ না করবে এবং তাদের মোকাবিলায় মদীনা হতে মুসলিম সেনাবাহিনী গমন না করবে। সে সময় ঐ মুসলমানেরা সারা দুনিয়ার লোকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবে।যখন তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাবে তখন রোমকগণ তাদেরকে বলবে‘আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে। আমাদের মধ্য হতে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে তোমাদের নিকট চলে এসেছে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। তোমরা তাদের মধ্য হতে সরে যাও।' তখন মুসলমানেরা বলবেআল্লাহর শপথ! এটা কখনও হতে পারে না যে, আমরা আমাদের দুর্বল ভাইদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে দেবো। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঐ মুসলিম সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। তাদের তাওবা আল্লাহ তা'আলা কখনও গ্রহণ করবেন না। এক তৃতীয়াংশ শহীদ হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম শহীদ। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর জয়লাভ করবে। এরপর তারা আর কোন হাঙ্গামায় পতিত হবে না।তারা (মুসলমানেরা) কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা যায়তুন বৃক্ষের উপর নিজেদের তরবারী ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে থাকবে। এমন সময় শয়তান চীৎকার করে বলবেঃ “তোমাদের সন্তানদের মধ্য দাজ্জাল এসে গেছে। তারা এ মিথ্যা কথাকে সত্য মনে করে এখান হতে বেরিয়ে সিরিয়ায় পৌছে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যুহ ঠিক করতে থাকবে? এমন সময় অন্যদিকে নামাযের ইকামত হবে এবং হযরত ঈসা ইনে। মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে তাদের ইমামতি করবেন। শত্রু বাহিনী যখন মুসলমানদেরকে দেখবে তখন তারা গলে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে ছেড়েও দেন তবুও তারা গলে গলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হাতে তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় বর্শার রক্ত তাদেরকে দেখাবেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ,ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হররত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তারা পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ ‘এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।' হযরত মূসা (আঃ)-ও এরূপই বলেন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। হ্যা, তবে আমার প্রভু আমার নিকট যে অঙ্গীকার করেছেন তা এই যে, দাজ্জাল বের হবে। দু’টি দল তার সঙ্গী হবে। সে আমাকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমনভাবে সীসা গলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দেবেন। এমন কি পাথর ও গাছ বলবে-হে মুসলমান! এখানে আমার পিছনে একটি কাফির আছে, তাকে হত্যা কর। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করবেন এবং মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফিরে যাবে। তারপরে ইয়াজুয ও মাজুয বের হবে এবং চতুর্দিক হতে তারা আক্রমণ চালাবে। সমস্ত শহরকে তারা ধ্বংস করবে। যেসব স্থান তারা অতিক্রম করবে ঐ সবই ধ্বংস করে দেবে। যে পানির পার্শ্ব দিয়ে তারা গমন করবে তার সবই পান করে নেবে। লোকেরা পুনরায় আমার নিকট ফিরে আসবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবো। তিনি তখন তাদের সকলকেই একই সাথে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু তাদের মৃত দেহের দুর্গন্ধে বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়বে। ফলে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। অতঃপর এত বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হবে যে, ঐ সমস্ত মৃতদেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কিয়ামতের সংঘটন এত নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর অবস্থা হয়ে থাকে যে, সকালে হবে কি সন্ধ্যায় হবে বা দিনে হবে কি রাত্রে হবে তা তার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারে না।”মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু নায়রা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা জুমআর দিন হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করি, আমার লিখিত কুরআন কারীমকে তাঁর পঠনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াই আমার তাঁর নিকট আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। জুমআর নামাযের সময় হলে তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “গোলস করুন। তারপর তিনি সুগন্ধি নিয়ে আসেন। আমরা সুগন্ধি মেখে মসজিদে হাযির হই এবং একটি লোকের পার্শ্বে বসে পড়ি। এ লোকটি দাজ্জালের হাদীস বর্ণনা করছিলেন। অতঃপর হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, মুসলমানদের তিনটি শহর হবে, একটি হবে দু’টি সমুদ্রের মিলিত হওয়ার জায়গায়, দ্বিতীয়টি হবে হীরায় এবং তৃতীয়টি হবে সিরিয়ায়। তারপর মানুষ তিনটি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হবে। অতঃপর দাজ্জাল বহির্গত হবে। তারা প্রথম শহরটিতে যাবে। তথাকার লোক তিন অংশে বিভক্ত হবে। এক অংশ বলবে- আমরা তাদের মোকাবিলা করবো এবং কি সংঘটিত হয় তা দেখবো। দ্বিতীয় দলটি গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে এবং তৃতীয় দল তাদের নিকটবর্তী শহরে চলে যাবে। দাজ্জালের সঙ্গে সত্তর হাজার লোক থাকবে। তাদের মাথায় মুকুট থাকবে। তাদের অধিকাংশই হবে ইয়াহুদী ও স্ত্রীলোক। এখানকার মুসলমানগণ একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ হবে। তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মাঠে চরতে গিয়েছিল ঐগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের বিপদ খুব বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়বে। এমনকি তারা তাদের কামানের তারগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে থাকবে। এরূপ সংকটময় অবস্থায় সমুদ্রের মধ্য হতে তাদের কানে শব্দ আসবে- হে লোক সকল! তোমাদের জন্যে সাহায্য এসে গেছে। এ শব্দ শুনে লোকগুলো খুব খুশী হবে। কেননা, তারা বুঝতে পারবে যে, এটা কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কথা। ঠিক ফজরের নামাযের সময় ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। মুসলমাদের আমীর তাঁকে বলবেন- “হে রূহুল্লাহ (আঃ)! আগে বাড়ুন এবং নামায পড়িয়ে দিন। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘এ উম্মতের কিছু সংখ্যক লোক কিছু সংখ্যক লোকের আমীর রয়েছে। সুতরাং এ দলের আমীরই তাদের নামাযের ইমাম হবে। অতএব, তাদের আমীরই ইমাম হয়ে নামায পড়াবেন। নামায শেষ করেই হযরত ঈসা (আঃ) বর্শা হাতে নিয়ে মাসীহ দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। দাজ্জাল তাঁকে দেখামাত্রই সীসার মত গলতে থাকবে। তিনি তার বক্ষে আঘাত করবেন। ঐ আঘাতেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সঙ্গীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু কোন স্থানেই তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। এমনকি তারা যদি কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেই গাছও বলবে-“হে মুমিন! একটি কাফির আমার নিকট লুকিয়ে রয়েছে।' এ কথা পাথরও বলবে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক ভাষণের কম বেশী অংশ দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনায় এবং সে দাজ্জাল হতে ভয় প্রদর্শনেই কাটিয়ে দেন। সে ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এর অপেক্ষা বড় হাঙ্গামা আর নেই। সমস্ত নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। আমি সর্বশেষ নবী এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত। সে নিশ্চিতরূপে তোমাদের মধ্যেই আসবে। যদি আমার জীবদ্দশায় সে এসে পড়ে তবে তো আমি তাকে বাধা দান করবো। আর যদি আমার পরে আসে তবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমি আল্লাহ তা'আলাকেই প্রত্যেক মুসলমানের অভিভাবক করে যাচ্ছি। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বের হবে। সে ডান ও বামে খুব ঘুরাফেরা করবে। হে জনমণ্ডলী ও হে আল্লাহর বান্দাগণ! দেখ, তোমরা অটল থাকবে। জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে তার এমন পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছি যা অন্য কোন নবী স্বীয় উম্মতকে জানিয়ে যাননি। সে প্রথমতঃ দাবী করবে-আমি নবী। সুতরাং তোমরা স্মরণ রেখো যে, আমার পরে কোন নবী নেই। অতঃপর এর চেয়েও বেড়ে গিয়ে বলবে-“আমি আল্লাহ'। অতএব তথায় তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহকে এই চোখে কেউ দেখতে পারে না। মৃত্যুর পর তথায় তার দর্শন লাভ ঘটতে পারে। আরও স্মরণ রেখো যে, সে এক চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং তোমাদের প্রভু এক চক্ষু বিশিষ্ট নন। তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে কাফির' লিখিত থাকবে যা প্রত্যেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মোটকথা প্রত্যেক ঈমানদারই পড়তে পারবে।তার সাথে আগুন থাকবে ও বাগান থাকবে। তার আগুন হবে আসলে জান্নাত এবং বাগানটি হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম। তোমাদের মধ্যে যাকে সে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। ঐ আগুন তার জন্যে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর নমরূদের আগুন শান্তিদায়ক হয়েছিল। তার এক হাঙ্গামা এও হবে যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে-“আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করতে পারি তবে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে?' এমন সময়ে দু’জন শয়তান তার পিতা-মাতার আকারে প্রকাশিত হবে এবং তাকে বলবে-বৎস! এটাই তোমার প্রভু। সুতরাং তাকে মেনে নাও।' তার আর একটা ফিত্না এও হবে যে, তাকে একটি লোকের উপর জয়যুক্ত করা হবে। সে তাকে করাত দ্বারা ফেড়ে দু’টুকরো করে দেবে। তারপর সে জনগণকে বলবেঃ আমার এ বান্দাকে তোমরা দেখ, এখন আমি তাকে জীবিত করবো। কিন্তু সে পুনরায় এ কথাই বলবে যে, তার প্রভু আমি ছাড়া অন্য কেউ। অতঃপর এ দু' দুবৃত্ত তাকে উঠা-বসা করাবে এবং বলবেঃ তোমার প্রভু কে? সে উত্তরে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ এবং তুমি তার শত্রু দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! এখন তো আমার পূর্বাপেক্ষাও বেশী বিশ্বাস হয়েছে। অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এ মুমিন ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণীর জান্নাতের অধিকারী হবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, এ হাদীসটি শুনে আমাদের ধারণা হয় যে, এ লোকটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাবই (রাঃ) হবেন, তাঁর শাহাদাত লাভ পর্যন্ত আমাদের ধারণা এটাই ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার একটি হাঙ্গামা এও হবে যে, সে আকাশকে পানি বর্ষণ করার নির্দেশ দেবে এবং আকাশ হতে পানি বর্ষিত হবে। সে যমীনকে ফসল উৎপাদন করার নির্দেশ দেবে এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদিত হবে।তার আর একটি ফিত্না এও হবে যে, সে একটি গোত্রের নিকট যাবে এবং তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। সে সময়ই তাদের সমস্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট যাবে। তৎক্ষণাৎ তার হুকুমে আকাশ। হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং যমীনে ফলস উৎপাদিত হবে। তাদের গৃহপালিত পশু পূর্বাপেক্ষা বেশী মোটা-তাজা ও দুগ্ধবতী হয়ে যাবে। তারা মক্কা ও মদীনা ছাড়া যমীনের সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যে যখন মদীনামুখী হবে তখন সারা পথে সে তরবারীধারী ফেরেশতাগণকে দেখতে পাবে। সে তখন ‘সানতার শেষ প্রান্তে, যারীবে আহমারের নিকট থেমে যাবে। অতঃপর মদীনায় তিনটি ভূমিকম্প হবে। ফলে মদীনায় যত মুনাফিক নর ও নারী থাকবে সবাই মদীনা হতে বেরিয়ে গিয়ে দাজ্জালের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এভাবে মদীনা নিজের মধ্য হতে অপবিত্র লোকদেরকে দূর করে দেবে যেমন লোহার ভাটা লোহার মরিচা দূর করে থাকে। সেদিনের নাম হবে ‘ইয়াওমুল খালাস’ (মুক্তির দিন)।হযরত উম্মে শুরায়েক (রাঃ) রাসূলুরলাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেদিন আরববাসী কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ প্রথমতঃ তারা থাকবেই খুব কম এবং তাদের অধিকাংশই থাকবে বাইতুল মুকাদ্দাসে। তাদের ইমাম হবে একজন সৎ ব্যক্তি। সে ফজরের নামায পড়াতে থাকবে এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। ঐ ইমাম তখন পিছনে সরতে থাকবে যেন ঈসা (আঃ) ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি তার স্কন্ধে হাত রেখে বলবেনঃ “তুমি সামনে এগিয়ে নামায পড়িয়ে দাও, ইকামত তোমার জন্যেই দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের ইমামই নামায পড়িয়ে দেবে। নামায শেষে তিনি বলবেনঃ দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দেয়া হবে। এদিকে দাজ্জাল সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে হাযির হবে। তাদের মস্তকে মুকুট থাকবে এবং তাদের তরবারীর উপর সোনা থাকবে। দাজ্জাল তাঁকে দেখে এমনভাবে গলতে থাকবে যেমনভাবে পানিতে লবণ গলে থাকে। অতঃপর সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতঃ পালাতে শুরু করবে। কিন্তু তিনি বলবেনঃ ‘আল্লাহ তাআলা এটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তুমি আমার হাতেই একটা মার খাবে, সুতরাং ওটা হতে রক্ষা পেতে পার না। অতএব, তিনি তাকে পূর্ব দরজা লুদ-এর নিকট ধরে নেবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন ইয়াহূদীরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। কিন্তু তারা কোথাও মাথা লুকানোর জায়গা পাবে না। প্রত্যেক পাথর, বৃক্ষ, দেয়াল ও জীবজন্তু বলতে থাকবেঃ “হে মুসলমান! এখানে ইয়াহুদী রয়েছে। এসে তাকে হত্যা কর।” তবে বাবলা গাছ হচ্ছে ইয়াহূদীদের গাছ। সে কিন্তু বলবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে চল্লিশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বছর হবে অর্ধ বছরের মত, বছর হবে মাসের মত, মাস হবে জুম'আর মত এবং শেষ দিনগুলো হবে ‘শারারার মত। তোমাদের কোন লোক সকালে শহরের একটি দরজা হতে চলতে আরম্ভ করে দ্বিতীয় দরজায় পৌছতে পারবে না। এমন সময়েই সন্ধ্যা হবে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ ছোট দিনগুলোতে আমরা কিভাবে নামায আদায় করবো?" তিনি বলেনঃ “তোমরা এ দীর্ঘ দিনগুলোতে যেমনভাবে অনুমান করে নামায পড়ছো, তখনও সেভাবেই অনুমান করে নামায পড়বে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারপর হযরত ঈসা (আঃ) আমার উম্মতের মধ্যে শাসনকর্তা হবেন, ন্যায়পরায়ণ হবেন, ইমাম হবেন এবং ন্যায় বিচারক হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। তিনি সাদকা গ্রহণ করবেন না। সুতরাং ছাগল ও উটের উপর কোন চেষ্টা করা হবে না। হিংসা বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে। প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণীর বিষক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হবে। শিশু স্বীয় অঙ্গুলি সাপের মুখে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ওটা তার কোন ক্ষতি করবে না। ছেলেরা সিংহের সাথে খেলা করবে, অথচ তাদের কোন বিপদ ঘটবে না। নেকড়ে বাঘ ছাগলের সঙ্গে এমন গলায় গলায় মিলে থাকবে যে, যেন সে পাহারাদার কুকুর। সমগ্র জগৎ ইসলাম ও ন্যায়নীতিতে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে যেমনভাবে বর্তন পানিতে পরিপূর্ণ হয়। সকলের একই কালেমা’ হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না। যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কুরাইশ স্বীয় রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। পৃথিবী সাদা চাদির ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। হযরত আদম (আঃ)-এর বরকতময় যুগের ন্যায় ফসল উৎপাদিত হবে। একটা দলের পরিতৃপ্তির জন্যে এক গুচ্ছ আঙ্গুরই যথেষ্ট হবে। এক একটি ডালিম ফল এত বড় হবে যে, একটি দল একটি ডালিম খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। বলদ এরূপ মূল্যে পাওয়া যাবে’ (অর্থাৎ বলদের মূল্য খুব বেশী হবে) এবং ঘোড়া কতগুলো দিরহামের বিনিময়েই পাওয়া যাবে।”জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঘোড়ার মূল্য হ্রাস পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, যুদ্ধে ওর সোয়ারী মোটেই নেয়া হবে না। তারা প্রশ্ন করেনঃ “বলদের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “কেননা, সমগ্র পৃথিবীতে কৃষিকার্য শুরু হয়ে যাবে।” দাজ্জাল প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পূর্বেই ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। প্রথম বছরে বৃষ্টির এক তৃতীয়াংশ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপরে ভূমির উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশ কমে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় বছরে আকাশকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, সে যেন বৃষ্টি দুই তৃতীয়াংশ বন্ধ রাখে এবং এ নির্দেশ ভূমিকেও দেয়া হবে যে, সে যেন উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশ কম করে। তৃতীয় বছর আকাশ হতে বৃষ্টির এক ফোটাও বর্ষিত হবে না। অনুরূপভাবে ভূমিতে একটি চারাগাছও জন্ম নেবে না। সমস্ত জীবজন্তু এ দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে রক্ষা করবেন সেই রক্ষা পাবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সে সময় মানুষ কিরূপে জীবিত থাকবে?' তিনি বলেনঃ “সে সময় তাদের খাদ্যের স্থলবর্তী হবে তাদের লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করা, সুবহানাল্লাহ পাঠ করা এবং আলহামদুল্লিাহ বলা।” ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বলেন, আমার উস্তাদ তাঁর উস্তাদ হতে শুনেছেন, তিনি বলতেনঃ “এ হাদীসটি এ যোগ্যতা রাখে যে, শিশুদের শিক্ষক শিশুদেরকেও এটা শিক্ষা দেবেন, এমনকি লিখিয়ে দেবেন, যেন তাদেরও এটা স্মরণ থাকে।” এ হাদীসটি এ সম্বন্ধে গারীব বটে, কিন্তু এর কোন কোন অংশের প্রমাণ স্বরূপ অন্য হাদীসও রয়েছে। এ হাদীসের মতই একটি হাদীস হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আমরা ওটাও এখানে বর্ণনা করছি।সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত নাওয়াস ইবনে শামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকালে দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এমনভাবে তাকে উঁচু ও নীচু করেন যে, আমাদের মনে হয় না জানি সে মদীনার খেজুরের বাগানেই বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর আমরা তাঁর নিকট ফিরে আসলে আমাদের চেহারা দেখে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” তখন আমরা তা বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও আর একটা বেশী ভয় রয়েছে। আমার বিদ্যমানতায় যদি সে বের হয় তবে আমি তাকে বুঝে নেবো। কিন্তু যদি আমার পরে সে বের হয় তবে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাকে বাধা দিতে হবে। আমি মহান আল্লাহকেই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিনিধি বানিয়ে দিয়েছি। জেনে রেখো, সে যুবক হবে, টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এটুকু বুঝে নাও যে, সে দেখতে অনেকটা আবদুল উয্যা ইবনে কাতনের মত হবে। তোমাদের যে তাকে দেখবে সে যেন সূরা-ই-কাহাফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী প্রান্ত হতে বের হবে এবং ডানে-বামে ঘুরে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (ঈমানের উপরে) খুব অটল থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কতদিন অবস্থান করবে। তিনি বললেনঃ “চল্লিশ দিন। এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান, একদিন হবে এক জুমআর সমান এবং অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মত হবে।”অতঃপর আমরা জিজ্ঞেস করি, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা অনুমান করে নেবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের চলন গতি কিরূপ দ্রুত হবে? তিনি বলেনঃ মেঘ যেমন বাতাসে তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। সে একটি গোত্রকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তাকে মেনে নেবে। তখন তাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যমীন হতে ফলস উৎপাদিত হবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলো মোটা তাজা হয়ে যাবে ও খুব বেশী দুধ দেবে। সে আর এক সম্প্রদায়ের নিকট যাবে। তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও অস্বীকার করবে। সে সেখান হতে ফিরে আসবে। তখন তাদের হাতে মাল-ধন কিছুই থাকবে না। সে অনুর্বর ভূমির উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেবে, “হে যমীন! তোমার ধনাগারকে বের করে দাও।" তখন যমীনের মধ্য হতে ধন-ভাণ্ডার বেরিয়ে আসবে।সে তখন মৌমাছির মত ঐ ধনের পিছনে পিছনে ফিরতে থাকবে। সে একজন নব্য যুবককে আহ্বান করবে এবং তাকে হত্যা করতঃ দু'টুকরো করে এতদূরে নিক্ষেপ করবে যতো দূরে একটি তীর চলে থাকে। তারপরে তাকে ডাক দেবে এবং সে তখন জীবিত হয়ে হাসতে হাসতে তার নিকট চলে। আসবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি। দু’টি চাদর পরিহিত হয়ে দু'জন ফেরেশতার ডানার উপর হাত রেখে দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা স্তম্ভের নিকট অবতরণ করবেন। যখন তিনি মস্তক কুঁকাবেন তখন তার মস্তক হতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরে পড়বে এবং যখন তিনি মস্তক উত্তোলন করবেন তখন ঐ ফোটাগুলো মুক্তার মত গড়িয়ে পড়বে। যে কাফির পর্যন্ত তার শ্বাস পৌছবে, সে মরে যাবে এবং তার শ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছবে যে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌছে থাকে।তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং ‘লুদ’ নামক স্থানে তাকে ধরেফেলে সেখানেই হত্যা করবেন। তারপরে তিনি ঐ লোকদের নিকট আসবেন যারা এ হাঙ্গামায় রক্ষা পেয়ে যাবে। তিনি তাদের চেহারায় হাত ফিরিয়ে দেবেন। এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিকট অহী আসবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন-‘আমি আমার এমন বান্দাহদেরকে প্রেরণ করেছি যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেউই করতে পারবে না। তুমি আমার এ বিশিষ্ট বান্দাহদেরকে তূর পর্বতের নিকট নিয়ে যাও।' তারপর ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে এবং তারা চতুর্দিক হতে লাফাতে লাফাতে চলে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘বাহীরা-ই-তাবারিয়ায় আসবে এবং ওর সমস্ত পানি পান করে নেবে। তাদের পর পরই যখন অন্য দলটি আসবে তখন তারা ওটাকে এমন শুষ্ক অবস্থায় পাবে যে, তারা বলবে, সম্ভবতঃ এখানে কোন সময় পানি ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গী মুমিনগণ তথায় এমনভাবে অবরুদ্ধ থাকবেন যে, একটি বলদের মাথাও তাদের নিকট এমন পছন্দনীয় মনে হবে যেমন আজ তোমাদের নিকট একশটি স্বর্ণমুদ্রা পছন্দনীয়। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় শত্রুদেরকে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত করবেন। ফলে তারা সবাই একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সঙ্গীগণসহ যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু যমীনে অর্ধহাত পরিমাণ জায়গাও এমন পাবেন না যা তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধ হতে শূন্য থাকবে। পুনরায় তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাবেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা উটের ঘাড়ের মত এক প্রকার পাখি পাঠিয়ে দেবেন। ঐ পাখিগুলো তাদের সমস্ত মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছেমত জায়গায় নিক্ষেপ করবে। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। ফলে সমস্ত যমীন হাতের তালুর মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারপর যমীনকে শস্য এবং ফল উৎপাদনের ও বরকত ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হবে। সেদিন একটি ডালিম ফল এক দল লোকের পক্ষে যথেষ্ট হবে। তারা সবাই ওর ছালের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবে। একটি উন্ত্রীর দুগ্ধ একটি গোটা সম্প্রদায়ের লোকও পান করে শেষ করতে পারবে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এক মৃদু ও নির্মল বায়ু প্রবাহিত করবেন যা সমস্ত ঈমানদার নর ও নারীর বগলের নিম্নদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাণ বায়ুও নির্গত হয়ে যাবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরা বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মত পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকবে। তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে। ওটা আমরা ইনশাআল্লাহ (সূরা-ই-আম্বিয়ার) (আরবী) (২১:৯৬) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর নিকট বললেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি বলে থাকেন-কিয়ামত অমুক অমুক জায়গা পর্যন্ত পৌছে যাবে, এটা কি ব্যাপার? তিনি তখন ‘সুবহানাল্লাহ' এবং 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পর বললেনঃ “আমার ইচ্ছে হচ্ছে যে, এখন তোমাকে কোন হাদীস শুনাবো না। আমি তো একথা বলেছিলাম যে, কিছুকাল পরে তোমরা বড় বড় ব্যাপার সংঘটিত হতে দেখবে, যেমন বায়তুল্লাহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং এই হবে, এই হবে ইত্যাদি।” অতঃপর তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাজ্জাল বের হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমার জানা নেই যে, সেটা চল্লিশ মাস হবে অথবা চল্লিশ বছর হবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মত। তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন। তারপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন মিলে মিশে থাকবে যে, দু'জনের মধ্যে মোটেই কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর সিরিয়ার দিক হতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, যা সমস্ত ঈমানদারের মৃত্যু ঘটিয়ে দেবে। যার অন্তরে অণুপরিমাণও সততা বা ঈমান থাকবে, সে পর্বতের গুহায় অবস্থান করলেও মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুষ্ট ও বেঈমান লোকেরাই বেচে থাকবে, যারা পাখীর ন্যায় হালকা হবে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় মস্তক বিশিষ্ট হবে। ভাল ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করার শক্তি তাদের থাকবে না। শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করতঃ তাদেরকে মূর্তি পূজার দিকে আকষ্ট করবে। কিন্তু তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের জন্যে আহার্যের দরজা খোলা থাকবে এবং জীবন খুবই শান্তিতে অতিবাহিত হবে। তারপর শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। এর ফলে মানুষ পতিত হতে থাকবে। একটি লোক যে তার উষ্ট্রগুলোকে পানি পান করাবার জন্যে তাদের চৌবাচ্চা ঠিক করতে থাকবে সেই সর্বপ্রথম শিঙ্গার শব্দ শুনতে পাবে। এর ফলে সে এবং অন্য সমস্ত লোক অচৈতন্য হয়ে পড়বে।মোটকথা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা হবে শিশিরের বা ছায়ার মত। তার ফলে দ্বিতীয়বার দেহ সৃষ্টি হবে। তারপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে। তখন সবাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে-“হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে চল।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ" (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফেরেশতাগণ) তাদেরকে থামিয়ে দাও, নিশ্চয়ই তারা (প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪) এরপর বলা হবে-জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।' জিজ্ঞেস করা হবে-কতার মধ্য হতে কতো জনকে?' উত্তরে বলা হবে-প্রতি হাজারে ন’শ নিরানব্বই জনকে। (আল্লাহ) বলবেন-এটা এমন দিন যা ছেলেদেরকে বুড়ো করে দেবে এবং এটা এমন দিন যাতে পায়ের গোছা খুলে যাবে।' মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইবনে মারইয়াম (আঃ) বাব-ই-লুদের’ নিকট কিংবা ‘লুদের’ পার্শ্বে মাসীহ দাজ্জালকে হত্যা করবেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে বাব-ই-লুদ রয়েছে এবং এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর পরে ইমাম তিরিমিযী (রঃ) আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-এর নাম নিয়েছেন যে, তাঁদের হতেও এ অধ্যায়ের হাদীসগুলো বর্ণিত আছে, যেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের হযরত ঈসা (আঃ)-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা বর্ণিত রয়েছে। শুধুমাত্র দাজ্জালের বর্ণনার হাদীসগুলোই তো অসংখ্য রয়েছে, যেগুলো একত্রিত করা খুবই কঠিন।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, আরাফা হতে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের এক মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। সে সময় তথায় কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বলেনঃ “যে পর্যন্ত দশটি ব্যাপার সংঘটিত না হবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। (১) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। (২) ধূয়া নির্গত হওয়া। (৩) 'দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ঘটা। (৫) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া। (৬) দাজ্জালের আবির্ভাব।.(৭) যমীনের তিন জায়গা ধ্বসে যাওয়া। (৭ক) পূর্বে (৮খ) পশ্চিমে (৯গ) আরব উপদ্বীপে এবং (১০) আদন হতে একটা আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় একত্রিত করবে। ওটা (আগুন) রাত্রিও তাদের সাথে অতিবাহিত করবে। যখন দুপুরের সময় তারা বিশ্রাম গ্রহণ করবে তখনও এ আগুন তাদের সঙ্গেই থাকবে।”উক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানের মধ্যে রয়েছে। হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ মুতাওয়াতির হাদীসগুলো যা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ), হযরত আবু উমামা (রাঃ), হযরত লাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ), হযরত মাজমা ইবনে জারিয়া (রাঃ), হযরত আবূ শুরাইহা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) (আকাশ হতে) অবতরণ করবেন। সাথে সাথে কিভাবে, কোথায় এবং কোন্ সময় তাঁর অবতরণ ঘটবে তাতে এটাও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ ফজরের নামাযের ইকামতের সময় সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পূর্বদিকের স্তম্ভের উপর তিনি অবতরণ করবেন।সেই যুগে অর্থাৎ ৭৪১ হিঃ সালে জামে' উমভী’র স্তম্ভটি সাদা পাথরে মজবুত করে বানানো হয়েছে। কেননা, ওটা আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছিল, যে আগুন সম্ভবতঃ অভিশপ্ত খ্রীষ্টানেরাই লাগিয়েছিল। এতে বিস্ময়ের কি আছে যে, এটাই হয়তো সেই স্তম্ভ যার উপর হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন এবং শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন ও ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ দিয়েছেন ও তাকে সাব্যস্ত করেছেন। এটা ঐ সময় হবে যখন সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হবে এবং মানুষ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসরণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। যেমন কুরআন কারীমে উক্ত (আরবী) হয়েছে। (৪৩:৬১) এবং একটি পঠনে (আরবী) লাআলামুন রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ কিয়ামতের (কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার) একটি বড় নিদর্শন। কেননা, তিনি দাজ্জালের আগমনের পর আগমন করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকের তিনি ব্যবস্থা রাখেননি। তার সময়েই ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব ঘটবে, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'আর বরকতে ধ্বংস করবেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার সংবাদ কালাম পাকের মধ্যেও রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; ।'(২১৪ ৯৬-৯৭) অর্থাৎ তাদের বের হওয়াও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি প্রমাণ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিশেষণঃ পূর্ব বর্ণিত দু'টি হাদীসেও তাঁর বিশেষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি মধ্যম দেহ ও পরিষ্কার চুল বিশিষ্ট, যেমন শানূআহ্ গোত্রের লোক হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি। তিনি লাল বর্ণের এবং মধ্যম দেহ বিশিষ্ট। মনে হচ্ছিল যে, যেন তিনি সবেমাত্র গোসল খানা হতে বের হয়ে এলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তিনি একেবারে আমার মতই ছিলেন।সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) রক্তিম বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং চওড়া বক্ষ বিশিষ্ট ছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণ, মোটা দেহ এবং সোজা চুল বিশিষ্ট ছিলেন-যেমন যিতের লোক হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তিনি দাজ্জালের শরীরিক গঠনও বর্ণনা করেছেন যে, তার ডান চক্ষু কানা হবে যেন ওটা ফুলা আঙ্গুর। তিনি বলেনঃ কাবা শরীফের নিকটে আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছে যে, একজন খুবই গোধূম বর্ণের লোক, যার মাথার চুল তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত লটকে ছিল এবং চুল ছিল পরিপাটি। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছিল। তিনি দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করি- ইনি কে? তখনই আমাকে বলা হয়-“ইনি হচ্ছেন হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম (আঃ)। তার পিছনে আমি আর একটি লোককে দেখতে পাই যার ডান চক্ষুটি কানা ছিল। ইবনে কাতানের সঙ্গে সে অনেকটা সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। সেও দু'ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করি-এটা কে? বলা হয়- মাসীহ দাজ্জাল।সহীহ বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)। বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-কে লাল বর্ণের বলেননি, বরং গোধূম বর্ণের বলেছেন। পরে উপরে বর্ণিত পূর্ণ হাদীসটি রয়েছে। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ইবনে কাতান খুযাআহ্ গোত্রের একটি লোক ছিল। সে অজ্ঞতার যুগে মারা গিয়েছিল। পূর্বে ঐ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, হযরত মাসীহ (আঃ) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর এখানে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলমানেরা তার জানাযার নামায পড়বে।তবে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, তিনি এখানে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে খুব সম্ভব, যে হাদীসে চল্লিশ বছর অবস্থানের কথা রয়েছে তা ঐ সময় সহই হবে যা তিনি তার আকাশে উঠে যাওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছিলেন। যে সময় তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সে সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। পরে এসে তিনি পৃথিবীতে সাত বছর অবস্থান করবেন। তাহলে পূর্ণ চল্লিশ বছর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই সব চেয়ে ভাল জানেন। (ইবনে আসাকের) কেউ কেউ বলেন যে, যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল দেড় বছর। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে কথা। তবে হাফিয আবুল কাসিম (রঃ) স্বীয় ইতিহাসে পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী হতে এটাও এনেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কক্ষে তাঁর সাথেই সমাধিস্থ হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘উত্থান দিবসে সে তাদের উপর সাক্ষ্য দান করবে। অর্থাৎ এ কথার তিনি সাক্ষ্য দান করবেন যে, তিনি আল্লাহর রিসালাত তাঁদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার শেষ দিকে বলেনঃ (আরবী) (৫:১১৬-১১৮) পর্যন্ত।

আন-নিসা 4:160

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতের দু’টি ভাবার্থ হতে পারে। একটি তো এই যে, এটা হুরমতে কাদরী’ অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এটা লিখেই রেখেছিলেন যে, এ লোকগুলো স্বীয় গ্রন্থকে পরিবর্তিত করবে এবং বৈধ জিনিসকে নিজেদের উপর অবৈধ করে নেবে। ওটা শুধুমাত্র তাদের কঠোরতার কারণেই ছিল। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, এটা ছিল শারঈ হুরমাত’ অর্থাৎ তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে যে কতক জিনিস তাদের উপর হালাল ছিল তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাদের কিছু অপরাধের কারণে হারাম করে দেয়া হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক খাদ্যই বানী ইসরাঈলের জন্যে হালাল ছিল। কিন্তু তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ইসরাঈল নিজের উপর যা হারাম করে নিয়েছিল তাই তাদের উপর হারাম করা হয়েছিল” (৩:৯৩) এ আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বানী ইসরাঈলের উপর সমস্ত খাদ্যই বৈধ ছিল। কিন্তু হযরত ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর উটের গোশত ও দুধ হারাম করেছিলেন। সুতরাং তাওরাতে তাদের জন্য ঐ দুটো জিনিস হারাম করে দেয়া হয়। যেমন সূরা-ই আনআমে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ইয়াহূদীদের জন্যে আমি সমস্ত খুর বিশিষ্ট পশু অবৈধ করেছিলাম এবং ছাগ, গরু ও ওদের চর্বি যা পৃষ্ঠে ও অন্ত্রে সংযুক্ত অথবা অস্থিতে সংলিপ্ত-তদ্ব্যতীত তাদের জন্যে হারাম করেছিলাম; এভাবে আমি তাদের অবাধ্যতার জন্যে তাদেরকে প্রতিফল প্রদান করেছিলাম এবং নিশ্চয়ই আমি সত্যপরায়ণ।” (৬:১৪৬)সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তাদের অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি, নিজে আল্লাহ তা'আলার পথ হতে সরে যাওয়া ও অপরকে সরিয়ে দেয়া, যা তাদের চিরন্তন অভ্যাস ছিল, রাসূলগণকে হত্যা করা, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, বিভিন্ন প্রকার কৌশল অবলম্বন করতঃ সুদ ভক্ষণ করা, অন্যায়ভাবে অপরের মাল আত্মসাৎ করা, এ সমস্ত কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর এমন কতগুলো জিনিস হারাম করেন যেগুলো তাদের জন্যে হালাল ছিল। ঐসব কাফিরদের জন্যে তিনি বেদনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সত্য ধর্মে পূর্ণ বিশ্বাসী, তারা কুরআন কারীম ও পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। এ বাক্যটির তাফসীর সূরা-ই-আলে ইমরানের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত সা'লাবা ইবনে সাঈদ (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাঈদ (রাঃ) এবং হযরত উসায়েদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অগ্রবর্তী (আরবী) বাক্যটি সমস্ত ইমামের মাসহাফে’ ও হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ)-এর মাসহাফে এরূপই আছে। কিন্তু আল্লামা ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সহীফায় (আরবী) রয়েছে। প্রথম পঠনটিই বিশুদ্ধ। যারা বলেন যে, এটা লিখার ভুল, তারা ভুল বলেছেন। কেউ কেউ তো বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) -এর কারণে, যেমন (আরবী) (২৪:১৭৭)এ আয়াতে হয়েছে। তাছাড়া আরবাসীর কথা-বার্তায় এবং কবিতায়ও এ নিয়ম বরাবর চালু রয়েছে। আবার কেউ বলেন যে, (আরবী) (২৪:৪)-এ বাক্যের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। অর্থাৎ তারা ওগুলোর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠিত করার উপরও তাদের বিশ্বাস রয়েছে। অর্থাৎ তারা নামাযের অপরিহার্যতা ও সত্যতা স্বীকার করে। কিংবা এর ভাবার্থ হচ্ছে ফেরেশতা। অর্থাৎ তাদের কুরআন কারীমের উপর, অন্যান্য আসমানী কিতাবের উপর এবং ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এতে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সবেচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা যাকাত প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ মালের বা জীবনের যাকাত দিয়ে থাকে। ভাবার্থ দুটোও হতে পারে। আর তারা একমাত্র আল্লাহকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করে থাকে এবং তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের উপরও পূর্ণ বিশ্বাস রাখে যে, সেদিন প্রত্যেক ভাল-মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে। এ প্রকারের লোককেই আমি মহা প্রতিদান অর্থাৎ জান্নাত প্রদান করবো।

আন-নিসা 4:161

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতের দু’টি ভাবার্থ হতে পারে। একটি তো এই যে, এটা হুরমতে কাদরী’ অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এটা লিখেই রেখেছিলেন যে, এ লোকগুলো স্বীয় গ্রন্থকে পরিবর্তিত করবে এবং বৈধ জিনিসকে নিজেদের উপর অবৈধ করে নেবে। ওটা শুধুমাত্র তাদের কঠোরতার কারণেই ছিল। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, এটা ছিল শারঈ হুরমাত’ অর্থাৎ তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে যে কতক জিনিস তাদের উপর হালাল ছিল তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাদের কিছু অপরাধের কারণে হারাম করে দেয়া হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক খাদ্যই বানী ইসরাঈলের জন্যে হালাল ছিল। কিন্তু তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ইসরাঈল নিজের উপর যা হারাম করে নিয়েছিল তাই তাদের উপর হারাম করা হয়েছিল” (৩:৯৩) এ আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বানী ইসরাঈলের উপর সমস্ত খাদ্যই বৈধ ছিল। কিন্তু হযরত ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর উটের গোশত ও দুধ হারাম করেছিলেন। সুতরাং তাওরাতে তাদের জন্য ঐ দুটো জিনিস হারাম করে দেয়া হয়। যেমন সূরা-ই আনআমে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ইয়াহূদীদের জন্যে আমি সমস্ত খুর বিশিষ্ট পশু অবৈধ করেছিলাম এবং ছাগ, গরু ও ওদের চর্বি যা পৃষ্ঠে ও অন্ত্রে সংযুক্ত অথবা অস্থিতে সংলিপ্ত-তদ্ব্যতীত তাদের জন্যে হারাম করেছিলাম; এভাবে আমি তাদের অবাধ্যতার জন্যে তাদেরকে প্রতিফল প্রদান করেছিলাম এবং নিশ্চয়ই আমি সত্যপরায়ণ।” (৬:১৪৬)সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তাদের অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি, নিজে আল্লাহ তা'আলার পথ হতে সরে যাওয়া ও অপরকে সরিয়ে দেয়া, যা তাদের চিরন্তন অভ্যাস ছিল, রাসূলগণকে হত্যা করা, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, বিভিন্ন প্রকার কৌশল অবলম্বন করতঃ সুদ ভক্ষণ করা, অন্যায়ভাবে অপরের মাল আত্মসাৎ করা, এ সমস্ত কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর এমন কতগুলো জিনিস হারাম করেন যেগুলো তাদের জন্যে হালাল ছিল। ঐসব কাফিরদের জন্যে তিনি বেদনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সত্য ধর্মে পূর্ণ বিশ্বাসী, তারা কুরআন কারীম ও পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। এ বাক্যটির তাফসীর সূরা-ই-আলে ইমরানের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত সা'লাবা ইবনে সাঈদ (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাঈদ (রাঃ) এবং হযরত উসায়েদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অগ্রবর্তী (আরবী) বাক্যটি সমস্ত ইমামের মাসহাফে’ ও হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ)-এর মাসহাফে এরূপই আছে। কিন্তু আল্লামা ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সহীফায় (আরবী) রয়েছে। প্রথম পঠনটিই বিশুদ্ধ। যারা বলেন যে, এটা লিখার ভুল, তারা ভুল বলেছেন। কেউ কেউ তো বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) -এর কারণে, যেমন (আরবী) (২৪:১৭৭)এ আয়াতে হয়েছে। তাছাড়া আরবাসীর কথা-বার্তায় এবং কবিতায়ও এ নিয়ম বরাবর চালু রয়েছে। আবার কেউ বলেন যে, (আরবী) (২৪:৪)-এ বাক্যের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। অর্থাৎ তারা ওগুলোর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠিত করার উপরও তাদের বিশ্বাস রয়েছে। অর্থাৎ তারা নামাযের অপরিহার্যতা ও সত্যতা স্বীকার করে। কিংবা এর ভাবার্থ হচ্ছে ফেরেশতা। অর্থাৎ তাদের কুরআন কারীমের উপর, অন্যান্য আসমানী কিতাবের উপর এবং ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এতে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সবেচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা যাকাত প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ মালের বা জীবনের যাকাত দিয়ে থাকে। ভাবার্থ দুটোও হতে পারে। আর তারা একমাত্র আল্লাহকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করে থাকে এবং তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের উপরও পূর্ণ বিশ্বাস রাখে যে, সেদিন প্রত্যেক ভাল-মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে। এ প্রকারের লোককেই আমি মহা প্রতিদান অর্থাৎ জান্নাত প্রদান করবো।

আন-নিসা 4:162

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতের দু’টি ভাবার্থ হতে পারে। একটি তো এই যে, এটা হুরমতে কাদরী’ অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এটা লিখেই রেখেছিলেন যে, এ লোকগুলো স্বীয় গ্রন্থকে পরিবর্তিত করবে এবং বৈধ জিনিসকে নিজেদের উপর অবৈধ করে নেবে। ওটা শুধুমাত্র তাদের কঠোরতার কারণেই ছিল। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, এটা ছিল শারঈ হুরমাত’ অর্থাৎ তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে যে কতক জিনিস তাদের উপর হালাল ছিল তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাদের কিছু অপরাধের কারণে হারাম করে দেয়া হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক খাদ্যই বানী ইসরাঈলের জন্যে হালাল ছিল। কিন্তু তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ইসরাঈল নিজের উপর যা হারাম করে নিয়েছিল তাই তাদের উপর হারাম করা হয়েছিল” (৩:৯৩) এ আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বানী ইসরাঈলের উপর সমস্ত খাদ্যই বৈধ ছিল। কিন্তু হযরত ইসরাঈল (আঃ) নিজের উপর উটের গোশত ও দুধ হারাম করেছিলেন। সুতরাং তাওরাতে তাদের জন্য ঐ দুটো জিনিস হারাম করে দেয়া হয়। যেমন সূরা-ই আনআমে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ইয়াহূদীদের জন্যে আমি সমস্ত খুর বিশিষ্ট পশু অবৈধ করেছিলাম এবং ছাগ, গরু ও ওদের চর্বি যা পৃষ্ঠে ও অন্ত্রে সংযুক্ত অথবা অস্থিতে সংলিপ্ত-তদ্ব্যতীত তাদের জন্যে হারাম করেছিলাম; এভাবে আমি তাদের অবাধ্যতার জন্যে তাদেরকে প্রতিফল প্রদান করেছিলাম এবং নিশ্চয়ই আমি সত্যপরায়ণ।” (৬:১৪৬)সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তাদের অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি, নিজে আল্লাহ তা'আলার পথ হতে সরে যাওয়া ও অপরকে সরিয়ে দেয়া, যা তাদের চিরন্তন অভ্যাস ছিল, রাসূলগণকে হত্যা করা, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, বিভিন্ন প্রকার কৌশল অবলম্বন করতঃ সুদ ভক্ষণ করা, অন্যায়ভাবে অপরের মাল আত্মসাৎ করা, এ সমস্ত কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর এমন কতগুলো জিনিস হারাম করেন যেগুলো তাদের জন্যে হালাল ছিল। ঐসব কাফিরদের জন্যে তিনি বেদনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সত্য ধর্মে পূর্ণ বিশ্বাসী, তারা কুরআন কারীম ও পূর্বের সমস্ত কিতাবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। এ বাক্যটির তাফসীর সূরা-ই-আলে ইমরানের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত সা'লাবা ইবনে সাঈদ (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাঈদ (রাঃ) এবং হযরত উসায়েদ ইবনে উবায়েদ (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অগ্রবর্তী (আরবী) বাক্যটি সমস্ত ইমামের মাসহাফে’ ও হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ)-এর মাসহাফে এরূপই আছে। কিন্তু আল্লামা ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সহীফায় (আরবী) রয়েছে। প্রথম পঠনটিই বিশুদ্ধ। যারা বলেন যে, এটা লিখার ভুল, তারা ভুল বলেছেন। কেউ কেউ তো বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) -এর কারণে, যেমন (আরবী) (২৪:১৭৭)এ আয়াতে হয়েছে। তাছাড়া আরবাসীর কথা-বার্তায় এবং কবিতায়ও এ নিয়ম বরাবর চালু রয়েছে। আবার কেউ বলেন যে, (আরবী) (২৪:৪)-এ বাক্যের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। অর্থাৎ তারা ওগুলোর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠিত করার উপরও তাদের বিশ্বাস রয়েছে। অর্থাৎ তারা নামাযের অপরিহার্যতা ও সত্যতা স্বীকার করে। কিংবা এর ভাবার্থ হচ্ছে ফেরেশতা। অর্থাৎ তাদের কুরআন কারীমের উপর, অন্যান্য আসমানী কিতাবের উপর এবং ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এতে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সবেচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা যাকাত প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ মালের বা জীবনের যাকাত দিয়ে থাকে। ভাবার্থ দুটোও হতে পারে। আর তারা একমাত্র আল্লাহকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করে থাকে এবং তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের উপরও পূর্ণ বিশ্বাস রাখে যে, সেদিন প্রত্যেক ভাল-মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে। এ প্রকারের লোককেই আমি মহা প্রতিদান অর্থাৎ জান্নাত প্রদান করবো।

আন-নিসা 4:163

১৬৩-১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাকীন ও আদী ইবনে যায়েদ বলেছিল, “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমরা স্বীকার করি না যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেছেন। তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন। যে, যখন (আরবী) (৪:১৫৩-১৫৬) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং ইয়াহূদীদের দুষ্কার্যাবলী তাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হয়, তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর নিজের কোন কালাম অবতীর্ণই করেননি, না মূসা (আঃ)-এর উপর, না ঈসা (আঃ)-এর উপর, না অন্য কোন নবীর উপর। সেই সময় আল্লাহ তা'আলা। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। কিন্তু এ উক্তিটি সন্দেহযুক্ত। কেননা, সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি মাক্কী'। আর সূরা-ই-নিসার উপরোক্ত আয়াতটি ‘মাদানী’ যা তাদের ‘আপনি আকাশ হতে কোন কিতাব আনয়ন করুন এ কথার খণ্ডনে অবতীর্ণ হয়। তাদের এ কথার উত্তরে বলা হয় যে, তারা হযরত মূসাকে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন করেছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের দোষগুলো বর্ণনা করেন এবং তাদের পূর্বের ও বর্তমানের জঘন্য কার্যাবলী প্রকাশ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন যেমন প্রত্যাদেশ করেছিলেন তিনি অন্যান্য নবীদের উপর। 'যাবুর ঐ আসমানী কিতাবের নাম যা হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর নাযিল হয়েছিল। ঐ নবীদের ঘটনা আমরা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-কাসাসে বর্ণনা করবো।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আয়াত অর্থাৎ মাক্কী সূরার আয়াতের পূর্বে বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এবং বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়নি। যে নবীগণের নাম কুরআন কারীমের মধ্যে এসেছে সেগুলো নিম্নরূপঃহযরত আদম (আঃ), হযরত ইদরীস (আঃ), হযরত নূহ (আঃ), হযরত হযরত হূদ (আঃ), হযরত সালিহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত নূত (আঃ), হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ), হযরত ইয়াকূব। (আঃ), হযরত ইউসুফ (আঃ), হযরত আইয়ূব (আঃ), হযরত শুআইব (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারূন (আঃ), হযরত ইউনুস (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ), হযরত সুলাইমান (আঃ), হযরত ইলিয়াস (আঃ), হযরত ইয়াসাআ (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে হযরত যুলকিফল (আঃ) এবং সর্বশেষ ও নবীগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তাফা (সঃ)। বহু নবী এমনও রয়েছেন যাদের নাম কুরআন কারীমে উল্লিখিত হয়নি। এ কারণেই রাসূল ও নবীগণের সংখ্যায় মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ হাদীস হচ্ছে হযরত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি। হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ “এক লক্ষ চব্বিশ হাজার।" হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ “তিনশ তেরোজন। বড় একটি দল।" পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ “হযরত আদম (আঃ)। তিনি বলেন, তিনি কি রাসূল ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা! আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তার মধ্যে রূহ্ ঠুকে দেন এবং ঠিকঠাক করে দেন।”অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! চারজন হচ্ছেন সূরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হযরত নহ (আঃ) এবং (৪) হযরত খানখ (আঃ) যার প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে ইদরীস (আঃ)। তিনিই সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেন। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত সালিহ্ (আঃ), (৩) হযরত শুআইব (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)। হে আবু যার (রাঃ)! বানী ইসরাঈলের প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত মূসা (আঃ) এবং শেষ নবী হচ্ছেন হযরত ঈসা (আঃ)। সমস্ত নবীর মধ্যে প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ নবী হচ্ছেন তোমাদের নবী (সঃ)”। এ সুদীর্ঘ হাদীসটি হাফিয আবূ হাতিম (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ আল আনওয়া ওয়াত্তাফাসীমে বর্ণনা করেছেন যার উপর তিনি বিশুদ্ধতার চিহ্ন দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত ইমাম আবু ফারাজ ইবনে জাওযী ওটাকে সম্পূর্ণরূপে কল্পিত বলেছেন। ইবরাহীম ইবনে হাসিম ওর একজন বর্ণনাকারীকে কল্পনাকারী রূপে সন্দেহ করেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, খণ্ডনকারী ইমামগণের মধ্যে অনেকেই এ হাদীসের কারণে তার সমালোচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আর এ হাদীসটি অন্য সনদে হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু ওতে মাআন ইবনে রিফাআহ্ দুর্বল, আলী ইবনে ইয়াযিদও দুর্বল এবং কাসিম ইবনে আবদুর রহমানও দুর্বল। আবু ইয়ালা (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আট হাজার নবী পাঠিয়েছেন। চার হাজার পাঠিয়েছেন বানী ইসরাঈলের নিকট এবং চার হাজার পাঠিয়েছেন অবশিষ্ট অন্যান্য লোকদের উপর”। এ হাদীসটিও দুর্বল। এতে যাইদী এবং তার শিক্ষক রুকাশী দু'জনই দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আবূ ইয়ালার আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ভাই আট হাজার নবী অতীত হয়েছেন। তাঁদের পরে হযরত ঈসা (আঃ) এসেছেন এবং তার পরে আমি এসেছি।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি আট হাজার নবীর পরে এসেছি, তাঁদের মধ্যে চার হাজার ছিলেন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত।' এ হাদীসটি এ সনদে তো গারীব বটেই কিন্তু এর সমস্ত বর্ণনাকারী সুপরিচিত। শুধুমাত্র আহমাদ ইবনে তারিকের সততা বা দৌর্বল্য সম্পর্কে আমার অজানা রয়েছে।নবীগণের সংখ্যা সম্পর্কে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসটিও এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ আমি মসজিদে প্রবেশ করি। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একাকী মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমিও তার পার্শ্বে বসে পড়ি এবং বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাকে নামাযের নির্দেশ দিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হ্যা, নামায উত্তম কাজ। তাই, হয় তুমি নামায বেশী করে পড় না হয় কম করে পড়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল উত্তম? তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ মুমিন উত্তম। তিনি বলেনঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম মুসলমান কে? তিনি বলেনঃ “যার কথা ও হাত হতে মানুষ নিরাপদে থাকে।” আমি বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হিজরত উত্তম? তিনি বলেন :মন্দকে পরিত্যাগ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন গোলাম আযাদ করা উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে গোলামের মূল্য বেশী ও তার মনিবের নিকট বেশী পছন্দীয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ সাদকা সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ ‘অল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির চেষ্টা করা ও গোপনে দরিদ্রকে দান করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে বড় মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত কোনটি? তিনি বলেনঃ “আয়তুল কুরসী।”অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! সাতটি আকাশ কুরসীর তুলনায় ঐরূপ যেরূপ কোন মরুপ্রান্তরে একটি বৃত্ত এবং কুরসীর উপর আরশের মর্যাদা ঐরূপ যেরূপ প্রশস্ত প্রান্তরের মর্যাদা বৃত্তের উপর। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি বলি, তাদের মধ্যে রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ ‘তিনশ জন, বড় পবিত্র দল। আমি জিজ্ঞেস করি, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ হযরত আদম (আঃ)। আমি বলি, তিনিও কি রাসূল ছিলেন? তিনি বলেনঃ হ্যা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করতঃ ওঁর মধ্যে রূহ্ কুঁকে দেন এবং তাঁকে ঠিকঠাক করেন।' অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, চারজন হচ্ছেন সুরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হরত খানুখ (আঃ) তিনিই হচ্ছেন হযরত ইদরীস (আঃ), যিনি সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেছেন এবং (৪) হযরত নূহ (আঃ)। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত শুআইব (আঃ), (৩) হযরত সালিহ (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। সর্বপ্রথম রাসূল হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ রাসূল হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কতখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন? তিনি বলেনঃ “একশ চারখানা। হযরত শীষ (আঃ)-এর উপর পঞ্চাশ খানা সহীফা, হযরত খানুখ (আঃ)-এর উপর তিনখানা সহীফা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর দশখানা সহীফা, হযরত মূসা (আঃ) -এর উপর তাওরাতের পূর্বে দশখানা সাহীফা ও তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল, ও ফুরকান নাযিল করেন। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাহীফায় কি ছিল? তিনি বলেনঃ ওর সম্পূর্ণটাই ছিল নিম্নরূপ-‘হে বিজয়ী বাদশাহ! আমি তোমাকে দুনিয়া জমা করার জন্যে পাঠাইনি, বরং এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, তুমি অত্যাচারিতের প্রার্থনা আমার সামনে হতে সরিয়ে দেবে। যদি তা আমার নিকট পৌছে যায় তবে আমি তা প্রখ্যাত্যান করবো না। তাতে নিম্নরূপ দৃষ্টান্তও ছিল- জ্ঞানীর এটা অপরিহার্য কর্তব্য যে, সে যেন তার সময় কয়েক ভাগে ভাগ করে। একটি অংশে সে নিজের জীবনের হিসেব গ্রহণ করবে। এক অংশে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করবে, একাংশে সে পানাহারের চিন্তা করবে। জ্ঞানীর নিজেকে তিনটি জিনিস ছাড়া অন্য কোন জিনিসে লিপ্ত রাখা উচিত নয়। প্রথম হচ্ছে পরকালের পাথেয়, দ্বিতীয় হচ্ছে জীবিকা লাভ এবং তৃতীয় হচ্ছে বৈধ জিনিসে আনন্দ ও মজা উপভোগ। জ্ঞানীর উচিত যে, সে যেন নিজের সময়কে দেখতে থাকে, স্বীয় কার্যে লেগে থাকে এবং স্বীয় জিহ্বাকে সংযত রাখে। যে ব্যক্তি স্বীয় কথাকে তার কাজের সঙ্গে মিলাতে থাকে সে খুব কম কথা বলবে। তোমরা শুধু ঐ কথাই বল, যাতে তোমাদের উপকার হয়।”আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত মূসা (আঃ)-এর সহীফাসমূহে কি ছিল? তিনি বলেনঃ “ওটা শুধু উপদেশে পরিপূর্ণ। যেমন আমি ঐ ব্যক্তিকে দেখে বিস্মিত হই যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকে। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখে অথচ হায় হায় করে। দুনিয়ার অস্থায়িত্ব অবলোকন করে অথচ নিশ্চিন্ত থাকে। কিয়ামতের দিন যে হিসাব দিতে হবে এটা জানে অথচ আমল করে না”। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে যা কিছু ছিল ওগুলোর মধ্যে আমাদের গ্রন্থেও কিছু রয়েছে কি? তিনি বলেনঃ হ্যা, হে আবূ যার! দেখ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মুক্তি পেয়েছে ঐ ব্যক্তি যে পবিত্র হয়েছে। আর তার প্রভুর নাম স্মরণ করতঃ নামায পড়েছে। বরং তোমরা ইহলৌকিক জীবনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছ, অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী সাহীফাগুলোতে রয়েছে। রয়েছে ইবরাহীম ও মূসার সাহীফায়।' (৮৭:১৪-১৯)আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহকে ভয় করতে থাক। এটাই হচ্ছে তোমার কার্যের প্রধান অংশ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ কুরআন পাঠ ও আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাক।এটা তোমার জন্যে আকাশসমূহে যিকিরের এবং পৃথিবীতে আলোকের কারণ হবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন। তিনি বলেনঃ “সাবধান! অতিরিক্তি হাসি হতে বিরত হও। এর ফলে অন্তর মরে যায় এবং চেহারার ঔজ্জ্বল্য দূর হয়ে যায়।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ “জিহাদে লিপ্ত থাক, আমার উম্মতের জন্যে এটাই হচ্ছে সংসার ত্যাগ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “উত্তম কথা বলা ছাড়া মুখ বন্ধ রেখো। এতে শয়তান পলায়ন করে এবং ধর্মীয় কাজে বিশেষ সহায়তা লাভ হয়।আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘তোমা অপেক্ষা নিম্ন পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখ, তোমা অপেক্ষা উচ্চ পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখো না। এতে তোমার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতরাজীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন! তিনি বলেনঃ ‘দরিদ্রদের প্রতি ভালবাসা রেখো এবং তাদের সাথে উঠাবসা কর। এতে আল্লাহ তা'আলার করুণা তোমার কাছে খুব বড় বলে মনে হবে। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘আত্মীয়দের সাথে মিলিত থাক যদিও তারা মিলিত না হয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘সত্য কথা বলতে থাক যদিও তা কারও কাছে তিক্ত বলে মনে হয়। আমি তাঁর নিকট আরও উপদেশ যাঞা করি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে ভয় করো না। আমি বলি, আরও বলন। তিনি বলেনঃ “নিজের দোষ-ক্রটির। প্রতি লক্ষ্য কর। অন্যের দোষ-ক্রটির প্রতি লক্ষ্য রাখা হতে বিরত থাক। অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তদবীরের মত কোন বুদ্ধিমত্তা নেই, হারাম হতে বিরত থাকার মত কোন তাকওয়া নেই এবং উত্তম চরিত্রের মত কোন বংশ নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এ হাদীসটি কিছু কম-বেশীর সাথে বর্ণিত আছে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “খারেজীগণও কি দাজ্জালকে স্বীকার করে? উত্তর আসেঃ না। তিনি তখন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক হাজার বরং তার চেয়েও বেশী নবীর শেষে এসেছি। প্রত্যেক নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমার সামনে তার এমন কতগুলো নিদর্শন বর্ণনা করেছেন যেগুলো অন্যান্য নবীদের নিকট বর্ণনা করেননি। জেনে রেখো যে, সে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং প্রভু এরূপ হতে পারেন না। তার ডান চক্ষু কানা হবে ও উপর দিকে উঠে থাকবে যেমন চুনকামকৃত কোন পরিষ্কার দেয়ালে কোন ফুটা জায়গা থাকে। তার বাম চক্ষুটি উজ্জ্বল তারকার ন্যায় হবে। সে সমস্ত ভাষায় কথা বলবে। তার নিকট সবুজ শ্যামল জান্নাতের ছবি থাকবে যেখানে পানি প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তার নিকট জাহান্নামেরও ছবি থাকবে। তথায় কালো ধুয়া দেখা যাবে।' অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক লক্ষ বরং তার চেয়েও বেশী নবী (আঃ)-এর শেষে আগমন করেছি। আল্লাহ তাআলা যত নবী পাঠিয়েছেন প্রত্যেকেই স্বীয় গোত্রকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন।” তারপরে পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এবং আল্লাহ প্রত্যক্ষ বাক্যে মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছেন। এটা তার একটা বিশেষ গুণ যে, তিনি কালীমুল্লাহ ছিলেন। একটি লোক হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ একটি লোক এ বাক্যটিকে। (আরবী) এরূপ পড়ে থাকে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন।' একথা শুনে হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ) রাগান্বিত হয়ে বলেন :“কোন কাফির এভাবে পড়ে থাকবে। আমি হযরত আ’মাশ (রঃ) হতে, তিনি ইয়াহইয়া (রঃ) হতে, তিনি আবদুর রহমান (রঃ) হতে, তিনি হযরত আলী (রাঃ) হতে এবং হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে (আরবী) এরূপই পড়েছেন। মোটকথা ঐ লোকটির অর্থ ও শব্দের পরিবর্তন করে দেয়া দেখে তিনি এরূপ রাগান্বিত হন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, এটা কোন মুতাযেলীই হবে। কেননা, মুতাযেলীদের বিশ্বাস এই যে, আল্লাহ তা'আলা না হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলছেন না অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছেন। কোন একজন মুতাযেলী কোন একজন মনীষীর নিকট এসে এ আয়াতটিকে এভাবে পাঠ করলে তিনি তাকে মন্দ বলেন। অতঃপর তাকে বলেনঃ “তাহলে তুমি (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং যখন মূসা আমার প্রতিশ্রুত সময়ে আগমন করে এবং তার প্রভু তার সাথে কথা বলেন'(৭:১৪৩)-এ আয়াতটিকে কিভাবে অস্বীকার করবে”? ভাবার্থ এই যে, এখানে এ ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন চলবে না।“তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’-এর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলেন তখন তিনি একটি কৃষ্ণ বর্ণের পিপীলিকার অন্ধকার রাত্রে কোন পরিষ্কার পাথরের উপর চলাও দেখতে পেতেন।” এ হাদীসটি দুর্বল এবং এর ইসনাদও সহীহ নয়। কিন্তু এটা যদি সহীহ ‘মাওকুফ’ হিসেবে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি রূপে প্রমাণিত হয় তবে খুব ভাল কথা। মুসতাদরিক-ইহাকিম’ প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেন তখন তিনি পশমের চাদর, পায়জামা এবং যবাইহীন গাধার চামড়ার জুতো পরিহিত ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তিন দিনে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কথা বলেন যেগুলোর সবই ছিল উপদেশ। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ)-এর কর্ণে মানুষের কথা প্রবেশ করেনি। কেননা তখন তার কর্ণে ঐ পবিত্র কালামই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এর ইসনাদও দুর্বল। তাছাড়া এতে ইনকিতা রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেনঃ ‘তুর দিবসে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যে কথা বলেছিলেন ওর বিশেষণ ঐদিনের কথার বিশেষণ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল যে দিন তিনি তাঁকে আহ্বান করেছিলেন। তখন হযরত মূসা (আঃ) এর রহস্য জানতে চাইলে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মূসা! এ পর্যন্ত তো আমি দশ হাজার ভাষার সমান ক্ষমতায় কথা বলেছি। অথচ আমার সমস্ত ভাষায় কথা বলারই ক্ষমতা রয়েছে, এমন কি এর চেয়েও বেশী ক্ষমতা রয়েছে।”বানী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রভুর কালামের বিশেষণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো কিছুই বলতে পারি না। তখন তারা বলেঃ “আচ্ছা, কিছু সাদৃশ্য বর্ণনা করুন।” তিনি বলেনঃ “তোমরা তো বজের শব্দ শুনে থাকবে। ওটা অনেকটা ঐরূপ ছিল কিন্তু বেশী ছিল না।” এর একজন বর্ণনাকারী রুকাশী খুবই দুর্বল। হযরত কা'ব (রঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যখন কথা বলেন তখন তিনি সমস্ত ভাষাতেই কথা বলেন। স্বীয় কথার মধ্যে হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ পাককে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! এটাই কি আপনার কথা?' তিনি বলেনঃ না। তুমি আমার কথা সহ্য করতে পারবে না।' হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনার মাখলুকের কারও কথার সঙ্গে আপনার কথার সাদৃশ্য আছে কি? আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘ভয়ংকর বজ্রধ্বনি ছাড়া আর কিছুরই সাদৃশ্য নেই।' এ বর্ণনাটিও মাওকুফ এবং এটা স্পষ্ট কথা যে, হযরত কা'ব (রঃ) পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ হতে বর্ণনা করতেন, যেসব কিতাবে বানী ইসরাঈলের সত্য-মিথ্যা সব ঘটনাই থাকতো।এরপর বলা হচ্ছে- তারা এমন রাসূল যারা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য স্বীকারকারীদেরকে ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনাকারীদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে এবং তাঁর আদেশ অমান্যকারীদের ও তাঁর রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কারীদেরকে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করে থাকে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যে স্বীয় গ্রন্থরাজি অবতীর্ণ করেছেন ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং তাদেরকে স্বীয় সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন তা এ জন্যে যে, যেন কারও কোন প্রমাণ এবং ওর অবশিষ্ট না থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি আমি এর পূর্বেই তাদেরকে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তবে তারা অবশ্যই বলতো-হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের নিকট রাসূল পাঠাননি কেন? তাহলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই আপনার নিদর্শনসমূহকে মেনে নিতাম।' (২০:১৩৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার মত মর্যাদা বোধ আর কারও নেই। এ জন্যেই তিনি সমস্ত মন্দকে হারাম করেছেন তা প্রকাশ্যই হোক আর গোপনীয়ই হোক এবং এমনও কেউ নেই যার কাছে প্রশংসা আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী পছন্দনীয় হয়। এ কারণেই তিনি নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন। এমনও কেউ নেই যার নিকট ওযর আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়। এ জন্যেই তিনি নবীগণকে সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নের শব্দগুলোও রয়েছে- “এ কারণেই তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন ও গ্রন্থাবলী অবতীর্ণ করেছেন।”

আন-নিসা 4:164

১৬৩-১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাকীন ও আদী ইবনে যায়েদ বলেছিল, “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমরা স্বীকার করি না যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেছেন। তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন। যে, যখন (আরবী) (৪:১৫৩-১৫৬) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং ইয়াহূদীদের দুষ্কার্যাবলী তাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হয়, তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর নিজের কোন কালাম অবতীর্ণই করেননি, না মূসা (আঃ)-এর উপর, না ঈসা (আঃ)-এর উপর, না অন্য কোন নবীর উপর। সেই সময় আল্লাহ তা'আলা। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। কিন্তু এ উক্তিটি সন্দেহযুক্ত। কেননা, সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি মাক্কী'। আর সূরা-ই-নিসার উপরোক্ত আয়াতটি ‘মাদানী’ যা তাদের ‘আপনি আকাশ হতে কোন কিতাব আনয়ন করুন এ কথার খণ্ডনে অবতীর্ণ হয়। তাদের এ কথার উত্তরে বলা হয় যে, তারা হযরত মূসাকে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন করেছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের দোষগুলো বর্ণনা করেন এবং তাদের পূর্বের ও বর্তমানের জঘন্য কার্যাবলী প্রকাশ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন যেমন প্রত্যাদেশ করেছিলেন তিনি অন্যান্য নবীদের উপর। 'যাবুর ঐ আসমানী কিতাবের নাম যা হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর নাযিল হয়েছিল। ঐ নবীদের ঘটনা আমরা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-কাসাসে বর্ণনা করবো।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আয়াত অর্থাৎ মাক্কী সূরার আয়াতের পূর্বে বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এবং বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়নি। যে নবীগণের নাম কুরআন কারীমের মধ্যে এসেছে সেগুলো নিম্নরূপঃহযরত আদম (আঃ), হযরত ইদরীস (আঃ), হযরত নূহ (আঃ), হযরত হযরত হূদ (আঃ), হযরত সালিহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত নূত (আঃ), হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ), হযরত ইয়াকূব। (আঃ), হযরত ইউসুফ (আঃ), হযরত আইয়ূব (আঃ), হযরত শুআইব (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারূন (আঃ), হযরত ইউনুস (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ), হযরত সুলাইমান (আঃ), হযরত ইলিয়াস (আঃ), হযরত ইয়াসাআ (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে হযরত যুলকিফল (আঃ) এবং সর্বশেষ ও নবীগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তাফা (সঃ)। বহু নবী এমনও রয়েছেন যাদের নাম কুরআন কারীমে উল্লিখিত হয়নি। এ কারণেই রাসূল ও নবীগণের সংখ্যায় মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ হাদীস হচ্ছে হযরত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি। হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ “এক লক্ষ চব্বিশ হাজার।" হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ “তিনশ তেরোজন। বড় একটি দল।" পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ “হযরত আদম (আঃ)। তিনি বলেন, তিনি কি রাসূল ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা! আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তার মধ্যে রূহ্ ঠুকে দেন এবং ঠিকঠাক করে দেন।”অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! চারজন হচ্ছেন সূরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হযরত নহ (আঃ) এবং (৪) হযরত খানখ (আঃ) যার প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে ইদরীস (আঃ)। তিনিই সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেন। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত সালিহ্ (আঃ), (৩) হযরত শুআইব (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)। হে আবু যার (রাঃ)! বানী ইসরাঈলের প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত মূসা (আঃ) এবং শেষ নবী হচ্ছেন হযরত ঈসা (আঃ)। সমস্ত নবীর মধ্যে প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ নবী হচ্ছেন তোমাদের নবী (সঃ)”। এ সুদীর্ঘ হাদীসটি হাফিয আবূ হাতিম (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ আল আনওয়া ওয়াত্তাফাসীমে বর্ণনা করেছেন যার উপর তিনি বিশুদ্ধতার চিহ্ন দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত ইমাম আবু ফারাজ ইবনে জাওযী ওটাকে সম্পূর্ণরূপে কল্পিত বলেছেন। ইবরাহীম ইবনে হাসিম ওর একজন বর্ণনাকারীকে কল্পনাকারী রূপে সন্দেহ করেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, খণ্ডনকারী ইমামগণের মধ্যে অনেকেই এ হাদীসের কারণে তার সমালোচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আর এ হাদীসটি অন্য সনদে হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু ওতে মাআন ইবনে রিফাআহ্ দুর্বল, আলী ইবনে ইয়াযিদও দুর্বল এবং কাসিম ইবনে আবদুর রহমানও দুর্বল। আবু ইয়ালা (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আট হাজার নবী পাঠিয়েছেন। চার হাজার পাঠিয়েছেন বানী ইসরাঈলের নিকট এবং চার হাজার পাঠিয়েছেন অবশিষ্ট অন্যান্য লোকদের উপর”। এ হাদীসটিও দুর্বল। এতে যাইদী এবং তার শিক্ষক রুকাশী দু'জনই দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আবূ ইয়ালার আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ভাই আট হাজার নবী অতীত হয়েছেন। তাঁদের পরে হযরত ঈসা (আঃ) এসেছেন এবং তার পরে আমি এসেছি।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি আট হাজার নবীর পরে এসেছি, তাঁদের মধ্যে চার হাজার ছিলেন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত।' এ হাদীসটি এ সনদে তো গারীব বটেই কিন্তু এর সমস্ত বর্ণনাকারী সুপরিচিত। শুধুমাত্র আহমাদ ইবনে তারিকের সততা বা দৌর্বল্য সম্পর্কে আমার অজানা রয়েছে।নবীগণের সংখ্যা সম্পর্কে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসটিও এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ আমি মসজিদে প্রবেশ করি। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একাকী মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমিও তার পার্শ্বে বসে পড়ি এবং বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাকে নামাযের নির্দেশ দিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হ্যা, নামায উত্তম কাজ। তাই, হয় তুমি নামায বেশী করে পড় না হয় কম করে পড়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল উত্তম? তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ মুমিন উত্তম। তিনি বলেনঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম মুসলমান কে? তিনি বলেনঃ “যার কথা ও হাত হতে মানুষ নিরাপদে থাকে।” আমি বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হিজরত উত্তম? তিনি বলেন :মন্দকে পরিত্যাগ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন গোলাম আযাদ করা উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে গোলামের মূল্য বেশী ও তার মনিবের নিকট বেশী পছন্দীয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ সাদকা সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ ‘অল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির চেষ্টা করা ও গোপনে দরিদ্রকে দান করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে বড় মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত কোনটি? তিনি বলেনঃ “আয়তুল কুরসী।”অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! সাতটি আকাশ কুরসীর তুলনায় ঐরূপ যেরূপ কোন মরুপ্রান্তরে একটি বৃত্ত এবং কুরসীর উপর আরশের মর্যাদা ঐরূপ যেরূপ প্রশস্ত প্রান্তরের মর্যাদা বৃত্তের উপর। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি বলি, তাদের মধ্যে রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ ‘তিনশ জন, বড় পবিত্র দল। আমি জিজ্ঞেস করি, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ হযরত আদম (আঃ)। আমি বলি, তিনিও কি রাসূল ছিলেন? তিনি বলেনঃ হ্যা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করতঃ ওঁর মধ্যে রূহ্ কুঁকে দেন এবং তাঁকে ঠিকঠাক করেন।' অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, চারজন হচ্ছেন সুরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হরত খানুখ (আঃ) তিনিই হচ্ছেন হযরত ইদরীস (আঃ), যিনি সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেছেন এবং (৪) হযরত নূহ (আঃ)। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত শুআইব (আঃ), (৩) হযরত সালিহ (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। সর্বপ্রথম রাসূল হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ রাসূল হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কতখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন? তিনি বলেনঃ “একশ চারখানা। হযরত শীষ (আঃ)-এর উপর পঞ্চাশ খানা সহীফা, হযরত খানুখ (আঃ)-এর উপর তিনখানা সহীফা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর দশখানা সহীফা, হযরত মূসা (আঃ) -এর উপর তাওরাতের পূর্বে দশখানা সাহীফা ও তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল, ও ফুরকান নাযিল করেন। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাহীফায় কি ছিল? তিনি বলেনঃ ওর সম্পূর্ণটাই ছিল নিম্নরূপ-‘হে বিজয়ী বাদশাহ! আমি তোমাকে দুনিয়া জমা করার জন্যে পাঠাইনি, বরং এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, তুমি অত্যাচারিতের প্রার্থনা আমার সামনে হতে সরিয়ে দেবে। যদি তা আমার নিকট পৌছে যায় তবে আমি তা প্রখ্যাত্যান করবো না। তাতে নিম্নরূপ দৃষ্টান্তও ছিল- জ্ঞানীর এটা অপরিহার্য কর্তব্য যে, সে যেন তার সময় কয়েক ভাগে ভাগ করে। একটি অংশে সে নিজের জীবনের হিসেব গ্রহণ করবে। এক অংশে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করবে, একাংশে সে পানাহারের চিন্তা করবে। জ্ঞানীর নিজেকে তিনটি জিনিস ছাড়া অন্য কোন জিনিসে লিপ্ত রাখা উচিত নয়। প্রথম হচ্ছে পরকালের পাথেয়, দ্বিতীয় হচ্ছে জীবিকা লাভ এবং তৃতীয় হচ্ছে বৈধ জিনিসে আনন্দ ও মজা উপভোগ। জ্ঞানীর উচিত যে, সে যেন নিজের সময়কে দেখতে থাকে, স্বীয় কার্যে লেগে থাকে এবং স্বীয় জিহ্বাকে সংযত রাখে। যে ব্যক্তি স্বীয় কথাকে তার কাজের সঙ্গে মিলাতে থাকে সে খুব কম কথা বলবে। তোমরা শুধু ঐ কথাই বল, যাতে তোমাদের উপকার হয়।”আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত মূসা (আঃ)-এর সহীফাসমূহে কি ছিল? তিনি বলেনঃ “ওটা শুধু উপদেশে পরিপূর্ণ। যেমন আমি ঐ ব্যক্তিকে দেখে বিস্মিত হই যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকে। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখে অথচ হায় হায় করে। দুনিয়ার অস্থায়িত্ব অবলোকন করে অথচ নিশ্চিন্ত থাকে। কিয়ামতের দিন যে হিসাব দিতে হবে এটা জানে অথচ আমল করে না”। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে যা কিছু ছিল ওগুলোর মধ্যে আমাদের গ্রন্থেও কিছু রয়েছে কি? তিনি বলেনঃ হ্যা, হে আবূ যার! দেখ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মুক্তি পেয়েছে ঐ ব্যক্তি যে পবিত্র হয়েছে। আর তার প্রভুর নাম স্মরণ করতঃ নামায পড়েছে। বরং তোমরা ইহলৌকিক জীবনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছ, অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী সাহীফাগুলোতে রয়েছে। রয়েছে ইবরাহীম ও মূসার সাহীফায়।' (৮৭:১৪-১৯)আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহকে ভয় করতে থাক। এটাই হচ্ছে তোমার কার্যের প্রধান অংশ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ কুরআন পাঠ ও আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাক।এটা তোমার জন্যে আকাশসমূহে যিকিরের এবং পৃথিবীতে আলোকের কারণ হবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন। তিনি বলেনঃ “সাবধান! অতিরিক্তি হাসি হতে বিরত হও। এর ফলে অন্তর মরে যায় এবং চেহারার ঔজ্জ্বল্য দূর হয়ে যায়।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ “জিহাদে লিপ্ত থাক, আমার উম্মতের জন্যে এটাই হচ্ছে সংসার ত্যাগ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “উত্তম কথা বলা ছাড়া মুখ বন্ধ রেখো। এতে শয়তান পলায়ন করে এবং ধর্মীয় কাজে বিশেষ সহায়তা লাভ হয়।আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘তোমা অপেক্ষা নিম্ন পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখ, তোমা অপেক্ষা উচ্চ পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখো না। এতে তোমার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতরাজীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন! তিনি বলেনঃ ‘দরিদ্রদের প্রতি ভালবাসা রেখো এবং তাদের সাথে উঠাবসা কর। এতে আল্লাহ তা'আলার করুণা তোমার কাছে খুব বড় বলে মনে হবে। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘আত্মীয়দের সাথে মিলিত থাক যদিও তারা মিলিত না হয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘সত্য কথা বলতে থাক যদিও তা কারও কাছে তিক্ত বলে মনে হয়। আমি তাঁর নিকট আরও উপদেশ যাঞা করি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে ভয় করো না। আমি বলি, আরও বলন। তিনি বলেনঃ “নিজের দোষ-ক্রটির। প্রতি লক্ষ্য কর। অন্যের দোষ-ক্রটির প্রতি লক্ষ্য রাখা হতে বিরত থাক। অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তদবীরের মত কোন বুদ্ধিমত্তা নেই, হারাম হতে বিরত থাকার মত কোন তাকওয়া নেই এবং উত্তম চরিত্রের মত কোন বংশ নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এ হাদীসটি কিছু কম-বেশীর সাথে বর্ণিত আছে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “খারেজীগণও কি দাজ্জালকে স্বীকার করে? উত্তর আসেঃ না। তিনি তখন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক হাজার বরং তার চেয়েও বেশী নবীর শেষে এসেছি। প্রত্যেক নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমার সামনে তার এমন কতগুলো নিদর্শন বর্ণনা করেছেন যেগুলো অন্যান্য নবীদের নিকট বর্ণনা করেননি। জেনে রেখো যে, সে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং প্রভু এরূপ হতে পারেন না। তার ডান চক্ষু কানা হবে ও উপর দিকে উঠে থাকবে যেমন চুনকামকৃত কোন পরিষ্কার দেয়ালে কোন ফুটা জায়গা থাকে। তার বাম চক্ষুটি উজ্জ্বল তারকার ন্যায় হবে। সে সমস্ত ভাষায় কথা বলবে। তার নিকট সবুজ শ্যামল জান্নাতের ছবি থাকবে যেখানে পানি প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তার নিকট জাহান্নামেরও ছবি থাকবে। তথায় কালো ধুয়া দেখা যাবে।' অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক লক্ষ বরং তার চেয়েও বেশী নবী (আঃ)-এর শেষে আগমন করেছি। আল্লাহ তাআলা যত নবী পাঠিয়েছেন প্রত্যেকেই স্বীয় গোত্রকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন।” তারপরে পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এবং আল্লাহ প্রত্যক্ষ বাক্যে মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছেন। এটা তার একটা বিশেষ গুণ যে, তিনি কালীমুল্লাহ ছিলেন। একটি লোক হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ একটি লোক এ বাক্যটিকে। (আরবী) এরূপ পড়ে থাকে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন।' একথা শুনে হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ) রাগান্বিত হয়ে বলেন :“কোন কাফির এভাবে পড়ে থাকবে। আমি হযরত আ’মাশ (রঃ) হতে, তিনি ইয়াহইয়া (রঃ) হতে, তিনি আবদুর রহমান (রঃ) হতে, তিনি হযরত আলী (রাঃ) হতে এবং হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে (আরবী) এরূপই পড়েছেন। মোটকথা ঐ লোকটির অর্থ ও শব্দের পরিবর্তন করে দেয়া দেখে তিনি এরূপ রাগান্বিত হন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, এটা কোন মুতাযেলীই হবে। কেননা, মুতাযেলীদের বিশ্বাস এই যে, আল্লাহ তা'আলা না হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলছেন না অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছেন। কোন একজন মুতাযেলী কোন একজন মনীষীর নিকট এসে এ আয়াতটিকে এভাবে পাঠ করলে তিনি তাকে মন্দ বলেন। অতঃপর তাকে বলেনঃ “তাহলে তুমি (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং যখন মূসা আমার প্রতিশ্রুত সময়ে আগমন করে এবং তার প্রভু তার সাথে কথা বলেন'(৭:১৪৩)-এ আয়াতটিকে কিভাবে অস্বীকার করবে”? ভাবার্থ এই যে, এখানে এ ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন চলবে না।“তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’-এর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলেন তখন তিনি একটি কৃষ্ণ বর্ণের পিপীলিকার অন্ধকার রাত্রে কোন পরিষ্কার পাথরের উপর চলাও দেখতে পেতেন।” এ হাদীসটি দুর্বল এবং এর ইসনাদও সহীহ নয়। কিন্তু এটা যদি সহীহ ‘মাওকুফ’ হিসেবে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি রূপে প্রমাণিত হয় তবে খুব ভাল কথা। মুসতাদরিক-ইহাকিম’ প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেন তখন তিনি পশমের চাদর, পায়জামা এবং যবাইহীন গাধার চামড়ার জুতো পরিহিত ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তিন দিনে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কথা বলেন যেগুলোর সবই ছিল উপদেশ। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ)-এর কর্ণে মানুষের কথা প্রবেশ করেনি। কেননা তখন তার কর্ণে ঐ পবিত্র কালামই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এর ইসনাদও দুর্বল। তাছাড়া এতে ইনকিতা রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেনঃ ‘তুর দিবসে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যে কথা বলেছিলেন ওর বিশেষণ ঐদিনের কথার বিশেষণ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল যে দিন তিনি তাঁকে আহ্বান করেছিলেন। তখন হযরত মূসা (আঃ) এর রহস্য জানতে চাইলে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মূসা! এ পর্যন্ত তো আমি দশ হাজার ভাষার সমান ক্ষমতায় কথা বলেছি। অথচ আমার সমস্ত ভাষায় কথা বলারই ক্ষমতা রয়েছে, এমন কি এর চেয়েও বেশী ক্ষমতা রয়েছে।”বানী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রভুর কালামের বিশেষণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো কিছুই বলতে পারি না। তখন তারা বলেঃ “আচ্ছা, কিছু সাদৃশ্য বর্ণনা করুন।” তিনি বলেনঃ “তোমরা তো বজের শব্দ শুনে থাকবে। ওটা অনেকটা ঐরূপ ছিল কিন্তু বেশী ছিল না।” এর একজন বর্ণনাকারী রুকাশী খুবই দুর্বল। হযরত কা'ব (রঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যখন কথা বলেন তখন তিনি সমস্ত ভাষাতেই কথা বলেন। স্বীয় কথার মধ্যে হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ পাককে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! এটাই কি আপনার কথা?' তিনি বলেনঃ না। তুমি আমার কথা সহ্য করতে পারবে না।' হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনার মাখলুকের কারও কথার সঙ্গে আপনার কথার সাদৃশ্য আছে কি? আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘ভয়ংকর বজ্রধ্বনি ছাড়া আর কিছুরই সাদৃশ্য নেই।' এ বর্ণনাটিও মাওকুফ এবং এটা স্পষ্ট কথা যে, হযরত কা'ব (রঃ) পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ হতে বর্ণনা করতেন, যেসব কিতাবে বানী ইসরাঈলের সত্য-মিথ্যা সব ঘটনাই থাকতো।এরপর বলা হচ্ছে- তারা এমন রাসূল যারা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য স্বীকারকারীদেরকে ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনাকারীদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে এবং তাঁর আদেশ অমান্যকারীদের ও তাঁর রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কারীদেরকে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করে থাকে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যে স্বীয় গ্রন্থরাজি অবতীর্ণ করেছেন ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং তাদেরকে স্বীয় সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন তা এ জন্যে যে, যেন কারও কোন প্রমাণ এবং ওর অবশিষ্ট না থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি আমি এর পূর্বেই তাদেরকে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তবে তারা অবশ্যই বলতো-হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের নিকট রাসূল পাঠাননি কেন? তাহলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই আপনার নিদর্শনসমূহকে মেনে নিতাম।' (২০:১৩৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার মত মর্যাদা বোধ আর কারও নেই। এ জন্যেই তিনি সমস্ত মন্দকে হারাম করেছেন তা প্রকাশ্যই হোক আর গোপনীয়ই হোক এবং এমনও কেউ নেই যার কাছে প্রশংসা আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী পছন্দনীয় হয়। এ কারণেই তিনি নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন। এমনও কেউ নেই যার নিকট ওযর আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়। এ জন্যেই তিনি নবীগণকে সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নের শব্দগুলোও রয়েছে- “এ কারণেই তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন ও গ্রন্থাবলী অবতীর্ণ করেছেন।”

আন-নিসা 4:165

১৬৩-১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাকীন ও আদী ইবনে যায়েদ বলেছিল, “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমরা স্বীকার করি না যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেছেন। তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন। যে, যখন (আরবী) (৪:১৫৩-১৫৬) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং ইয়াহূদীদের দুষ্কার্যাবলী তাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হয়, তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের উপর নিজের কোন কালাম অবতীর্ণই করেননি, না মূসা (আঃ)-এর উপর, না ঈসা (আঃ)-এর উপর, না অন্য কোন নবীর উপর। সেই সময় আল্লাহ তা'আলা। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। কিন্তু এ উক্তিটি সন্দেহযুক্ত। কেননা, সূরা-ই-আনআমের এ আয়াতটি মাক্কী'। আর সূরা-ই-নিসার উপরোক্ত আয়াতটি ‘মাদানী’ যা তাদের ‘আপনি আকাশ হতে কোন কিতাব আনয়ন করুন এ কথার খণ্ডনে অবতীর্ণ হয়। তাদের এ কথার উত্তরে বলা হয় যে, তারা হযরত মূসাকে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন করেছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের দোষগুলো বর্ণনা করেন এবং তাদের পূর্বের ও বর্তমানের জঘন্য কার্যাবলী প্রকাশ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন যেমন প্রত্যাদেশ করেছিলেন তিনি অন্যান্য নবীদের উপর। 'যাবুর ঐ আসমানী কিতাবের নাম যা হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর নাযিল হয়েছিল। ঐ নবীদের ঘটনা আমরা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-কাসাসে বর্ণনা করবো।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আয়াত অর্থাৎ মাক্কী সূরার আয়াতের পূর্বে বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এবং বহু নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়নি। যে নবীগণের নাম কুরআন কারীমের মধ্যে এসেছে সেগুলো নিম্নরূপঃহযরত আদম (আঃ), হযরত ইদরীস (আঃ), হযরত নূহ (আঃ), হযরত হযরত হূদ (আঃ), হযরত সালিহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত নূত (আঃ), হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ), হযরত ইয়াকূব। (আঃ), হযরত ইউসুফ (আঃ), হযরত আইয়ূব (আঃ), হযরত শুআইব (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারূন (আঃ), হযরত ইউনুস (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ), হযরত সুলাইমান (আঃ), হযরত ইলিয়াস (আঃ), হযরত ইয়াসাআ (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে হযরত যুলকিফল (আঃ) এবং সর্বশেষ ও নবীগণের নেতা হযরত মুহাম্মাদ মোস্তাফা (সঃ)। বহু নবী এমনও রয়েছেন যাদের নাম কুরআন কারীমে উল্লিখিত হয়নি। এ কারণেই রাসূল ও নবীগণের সংখ্যায় মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ হাদীস হচ্ছে হযরত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি। হাদীসটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ “এক লক্ষ চব্বিশ হাজার।" হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ “তিনশ তেরোজন। বড় একটি দল।" পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ “হযরত আদম (আঃ)। তিনি বলেন, তিনি কি রাসূল ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা! আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তার মধ্যে রূহ্ ঠুকে দেন এবং ঠিকঠাক করে দেন।”অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! চারজন হচ্ছেন সূরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হযরত নহ (আঃ) এবং (৪) হযরত খানখ (আঃ) যার প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে ইদরীস (আঃ)। তিনিই সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেন। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত সালিহ্ (আঃ), (৩) হযরত শুআইব (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)। হে আবু যার (রাঃ)! বানী ইসরাঈলের প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত মূসা (আঃ) এবং শেষ নবী হচ্ছেন হযরত ঈসা (আঃ)। সমস্ত নবীর মধ্যে প্রথম নবী হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ নবী হচ্ছেন তোমাদের নবী (সঃ)”। এ সুদীর্ঘ হাদীসটি হাফিয আবূ হাতিম (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ আল আনওয়া ওয়াত্তাফাসীমে বর্ণনা করেছেন যার উপর তিনি বিশুদ্ধতার চিহ্ন দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত ইমাম আবু ফারাজ ইবনে জাওযী ওটাকে সম্পূর্ণরূপে কল্পিত বলেছেন। ইবরাহীম ইবনে হাসিম ওর একজন বর্ণনাকারীকে কল্পনাকারী রূপে সন্দেহ করেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, খণ্ডনকারী ইমামগণের মধ্যে অনেকেই এ হাদীসের কারণে তার সমালোচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আর এ হাদীসটি অন্য সনদে হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু ওতে মাআন ইবনে রিফাআহ্ দুর্বল, আলী ইবনে ইয়াযিদও দুর্বল এবং কাসিম ইবনে আবদুর রহমানও দুর্বল। আবু ইয়ালা (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আট হাজার নবী পাঠিয়েছেন। চার হাজার পাঠিয়েছেন বানী ইসরাঈলের নিকট এবং চার হাজার পাঠিয়েছেন অবশিষ্ট অন্যান্য লোকদের উপর”। এ হাদীসটিও দুর্বল। এতে যাইদী এবং তার শিক্ষক রুকাশী দু'জনই দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আবূ ইয়ালার আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ভাই আট হাজার নবী অতীত হয়েছেন। তাঁদের পরে হযরত ঈসা (আঃ) এসেছেন এবং তার পরে আমি এসেছি।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমি আট হাজার নবীর পরে এসেছি, তাঁদের মধ্যে চার হাজার ছিলেন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত।' এ হাদীসটি এ সনদে তো গারীব বটেই কিন্তু এর সমস্ত বর্ণনাকারী সুপরিচিত। শুধুমাত্র আহমাদ ইবনে তারিকের সততা বা দৌর্বল্য সম্পর্কে আমার অজানা রয়েছে।নবীগণের সংখ্যা সম্পর্কে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসটিও এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ আমি মসজিদে প্রবেশ করি। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একাকী মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমিও তার পার্শ্বে বসে পড়ি এবং বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাকে নামাযের নির্দেশ দিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হ্যা, নামায উত্তম কাজ। তাই, হয় তুমি নামায বেশী করে পড় না হয় কম করে পড়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল উত্তম? তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ মুমিন উত্তম। তিনি বলেনঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম মুসলমান কে? তিনি বলেনঃ “যার কথা ও হাত হতে মানুষ নিরাপদে থাকে।” আমি বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হিজরত উত্তম? তিনি বলেন :মন্দকে পরিত্যাগ করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন গোলাম আযাদ করা উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে গোলামের মূল্য বেশী ও তার মনিবের নিকট বেশী পছন্দীয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ সাদকা সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ ‘অল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির চেষ্টা করা ও গোপনে দরিদ্রকে দান করা। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে বড় মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত কোনটি? তিনি বলেনঃ “আয়তুল কুরসী।”অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! সাতটি আকাশ কুরসীর তুলনায় ঐরূপ যেরূপ কোন মরুপ্রান্তরে একটি বৃত্ত এবং কুরসীর উপর আরশের মর্যাদা ঐরূপ যেরূপ প্রশস্ত প্রান্তরের মর্যাদা বৃত্তের উপর। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি বলি, তাদের মধ্যে রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ ‘তিনশ জন, বড় পবিত্র দল। আমি জিজ্ঞেস করি, সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ হযরত আদম (আঃ)। আমি বলি, তিনিও কি রাসূল ছিলেন? তিনি বলেনঃ হ্যা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করতঃ ওঁর মধ্যে রূহ্ কুঁকে দেন এবং তাঁকে ঠিকঠাক করেন।' অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, চারজন হচ্ছেন সুরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হরত খানুখ (আঃ) তিনিই হচ্ছেন হযরত ইদরীস (আঃ), যিনি সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেছেন এবং (৪) হযরত নূহ (আঃ)। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত শুআইব (আঃ), (৩) হযরত সালিহ (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। সর্বপ্রথম রাসূল হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ রাসূল হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কতখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন? তিনি বলেনঃ “একশ চারখানা। হযরত শীষ (আঃ)-এর উপর পঞ্চাশ খানা সহীফা, হযরত খানুখ (আঃ)-এর উপর তিনখানা সহীফা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর দশখানা সহীফা, হযরত মূসা (আঃ) -এর উপর তাওরাতের পূর্বে দশখানা সাহীফা ও তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল, ও ফুরকান নাযিল করেন। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাহীফায় কি ছিল? তিনি বলেনঃ ওর সম্পূর্ণটাই ছিল নিম্নরূপ-‘হে বিজয়ী বাদশাহ! আমি তোমাকে দুনিয়া জমা করার জন্যে পাঠাইনি, বরং এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, তুমি অত্যাচারিতের প্রার্থনা আমার সামনে হতে সরিয়ে দেবে। যদি তা আমার নিকট পৌছে যায় তবে আমি তা প্রখ্যাত্যান করবো না। তাতে নিম্নরূপ দৃষ্টান্তও ছিল- জ্ঞানীর এটা অপরিহার্য কর্তব্য যে, সে যেন তার সময় কয়েক ভাগে ভাগ করে। একটি অংশে সে নিজের জীবনের হিসেব গ্রহণ করবে। এক অংশে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করবে, একাংশে সে পানাহারের চিন্তা করবে। জ্ঞানীর নিজেকে তিনটি জিনিস ছাড়া অন্য কোন জিনিসে লিপ্ত রাখা উচিত নয়। প্রথম হচ্ছে পরকালের পাথেয়, দ্বিতীয় হচ্ছে জীবিকা লাভ এবং তৃতীয় হচ্ছে বৈধ জিনিসে আনন্দ ও মজা উপভোগ। জ্ঞানীর উচিত যে, সে যেন নিজের সময়কে দেখতে থাকে, স্বীয় কার্যে লেগে থাকে এবং স্বীয় জিহ্বাকে সংযত রাখে। যে ব্যক্তি স্বীয় কথাকে তার কাজের সঙ্গে মিলাতে থাকে সে খুব কম কথা বলবে। তোমরা শুধু ঐ কথাই বল, যাতে তোমাদের উপকার হয়।”আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত মূসা (আঃ)-এর সহীফাসমূহে কি ছিল? তিনি বলেনঃ “ওটা শুধু উপদেশে পরিপূর্ণ। যেমন আমি ঐ ব্যক্তিকে দেখে বিস্মিত হই যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকে। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখে অথচ হায় হায় করে। দুনিয়ার অস্থায়িত্ব অবলোকন করে অথচ নিশ্চিন্ত থাকে। কিয়ামতের দিন যে হিসাব দিতে হবে এটা জানে অথচ আমল করে না”। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে যা কিছু ছিল ওগুলোর মধ্যে আমাদের গ্রন্থেও কিছু রয়েছে কি? তিনি বলেনঃ হ্যা, হে আবূ যার! দেখ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মুক্তি পেয়েছে ঐ ব্যক্তি যে পবিত্র হয়েছে। আর তার প্রভুর নাম স্মরণ করতঃ নামায পড়েছে। বরং তোমরা ইহলৌকিক জীবনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছ, অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী সাহীফাগুলোতে রয়েছে। রয়েছে ইবরাহীম ও মূসার সাহীফায়।' (৮৭:১৪-১৯)আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহকে ভয় করতে থাক। এটাই হচ্ছে তোমার কার্যের প্রধান অংশ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ কুরআন পাঠ ও আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাক।এটা তোমার জন্যে আকাশসমূহে যিকিরের এবং পৃথিবীতে আলোকের কারণ হবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন। তিনি বলেনঃ “সাবধান! অতিরিক্তি হাসি হতে বিরত হও। এর ফলে অন্তর মরে যায় এবং চেহারার ঔজ্জ্বল্য দূর হয়ে যায়।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ “জিহাদে লিপ্ত থাক, আমার উম্মতের জন্যে এটাই হচ্ছে সংসার ত্যাগ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ “উত্তম কথা বলা ছাড়া মুখ বন্ধ রেখো। এতে শয়তান পলায়ন করে এবং ধর্মীয় কাজে বিশেষ সহায়তা লাভ হয়।আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘তোমা অপেক্ষা নিম্ন পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখ, তোমা অপেক্ষা উচ্চ পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখো না। এতে তোমার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতরাজীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে।' আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন! তিনি বলেনঃ ‘দরিদ্রদের প্রতি ভালবাসা রেখো এবং তাদের সাথে উঠাবসা কর। এতে আল্লাহ তা'আলার করুণা তোমার কাছে খুব বড় বলে মনে হবে। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘আত্মীয়দের সাথে মিলিত থাক যদিও তারা মিলিত না হয়। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘সত্য কথা বলতে থাক যদিও তা কারও কাছে তিক্ত বলে মনে হয়। আমি তাঁর নিকট আরও উপদেশ যাঞা করি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে ভয় করো না। আমি বলি, আরও বলন। তিনি বলেনঃ “নিজের দোষ-ক্রটির। প্রতি লক্ষ্য কর। অন্যের দোষ-ক্রটির প্রতি লক্ষ্য রাখা হতে বিরত থাক। অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তদবীরের মত কোন বুদ্ধিমত্তা নেই, হারাম হতে বিরত থাকার মত কোন তাকওয়া নেই এবং উত্তম চরিত্রের মত কোন বংশ নেই। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এ হাদীসটি কিছু কম-বেশীর সাথে বর্ণিত আছে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “খারেজীগণও কি দাজ্জালকে স্বীকার করে? উত্তর আসেঃ না। তিনি তখন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক হাজার বরং তার চেয়েও বেশী নবীর শেষে এসেছি। প্রত্যেক নবী (আঃ) নিজ নিজ উম্মতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমার সামনে তার এমন কতগুলো নিদর্শন বর্ণনা করেছেন যেগুলো অন্যান্য নবীদের নিকট বর্ণনা করেননি। জেনে রেখো যে, সে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে এবং প্রভু এরূপ হতে পারেন না। তার ডান চক্ষু কানা হবে ও উপর দিকে উঠে থাকবে যেমন চুনকামকৃত কোন পরিষ্কার দেয়ালে কোন ফুটা জায়গা থাকে। তার বাম চক্ষুটি উজ্জ্বল তারকার ন্যায় হবে। সে সমস্ত ভাষায় কথা বলবে। তার নিকট সবুজ শ্যামল জান্নাতের ছবি থাকবে যেখানে পানি প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তার নিকট জাহান্নামেরও ছবি থাকবে। তথায় কালো ধুয়া দেখা যাবে।' অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এক লক্ষ বরং তার চেয়েও বেশী নবী (আঃ)-এর শেষে আগমন করেছি। আল্লাহ তাআলা যত নবী পাঠিয়েছেন প্রত্যেকেই স্বীয় গোত্রকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন।” তারপরে পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এবং আল্লাহ প্রত্যক্ষ বাক্যে মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছেন। এটা তার একটা বিশেষ গুণ যে, তিনি কালীমুল্লাহ ছিলেন। একটি লোক হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ একটি লোক এ বাক্যটিকে। (আরবী) এরূপ পড়ে থাকে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন।' একথা শুনে হযরত আবু বকর ইবনে আয়্যাশ (রঃ) রাগান্বিত হয়ে বলেন :“কোন কাফির এভাবে পড়ে থাকবে। আমি হযরত আ’মাশ (রঃ) হতে, তিনি ইয়াহইয়া (রঃ) হতে, তিনি আবদুর রহমান (রঃ) হতে, তিনি হযরত আলী (রাঃ) হতে এবং হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে (আরবী) এরূপই পড়েছেন। মোটকথা ঐ লোকটির অর্থ ও শব্দের পরিবর্তন করে দেয়া দেখে তিনি এরূপ রাগান্বিত হন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, এটা কোন মুতাযেলীই হবে। কেননা, মুতাযেলীদের বিশ্বাস এই যে, আল্লাহ তা'আলা না হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলছেন না অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছেন। কোন একজন মুতাযেলী কোন একজন মনীষীর নিকট এসে এ আয়াতটিকে এভাবে পাঠ করলে তিনি তাকে মন্দ বলেন। অতঃপর তাকে বলেনঃ “তাহলে তুমি (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং যখন মূসা আমার প্রতিশ্রুত সময়ে আগমন করে এবং তার প্রভু তার সাথে কথা বলেন'(৭:১৪৩)-এ আয়াতটিকে কিভাবে অস্বীকার করবে”? ভাবার্থ এই যে, এখানে এ ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন চলবে না।“তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’-এর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে কথা বলেন তখন তিনি একটি কৃষ্ণ বর্ণের পিপীলিকার অন্ধকার রাত্রে কোন পরিষ্কার পাথরের উপর চলাও দেখতে পেতেন।” এ হাদীসটি দুর্বল এবং এর ইসনাদও সহীহ নয়। কিন্তু এটা যদি সহীহ ‘মাওকুফ’ হিসেবে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি রূপে প্রমাণিত হয় তবে খুব ভাল কথা। মুসতাদরিক-ইহাকিম’ প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেন তখন তিনি পশমের চাদর, পায়জামা এবং যবাইহীন গাধার চামড়ার জুতো পরিহিত ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তিন দিনে হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কথা বলেন যেগুলোর সবই ছিল উপদেশ। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ)-এর কর্ণে মানুষের কথা প্রবেশ করেনি। কেননা তখন তার কর্ণে ঐ পবিত্র কালামই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এর ইসনাদও দুর্বল। তাছাড়া এতে ইনকিতা রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যে, হযরত জাবির (রাঃ) বলেনঃ ‘তুর দিবসে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যে কথা বলেছিলেন ওর বিশেষণ ঐদিনের কথার বিশেষণ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল যে দিন তিনি তাঁকে আহ্বান করেছিলেন। তখন হযরত মূসা (আঃ) এর রহস্য জানতে চাইলে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মূসা! এ পর্যন্ত তো আমি দশ হাজার ভাষার সমান ক্ষমতায় কথা বলেছি। অথচ আমার সমস্ত ভাষায় কথা বলারই ক্ষমতা রয়েছে, এমন কি এর চেয়েও বেশী ক্ষমতা রয়েছে।”বানী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রভুর কালামের বিশেষণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো কিছুই বলতে পারি না। তখন তারা বলেঃ “আচ্ছা, কিছু সাদৃশ্য বর্ণনা করুন।” তিনি বলেনঃ “তোমরা তো বজের শব্দ শুনে থাকবে। ওটা অনেকটা ঐরূপ ছিল কিন্তু বেশী ছিল না।” এর একজন বর্ণনাকারী রুকাশী খুবই দুর্বল। হযরত কা'ব (রঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যখন কথা বলেন তখন তিনি সমস্ত ভাষাতেই কথা বলেন। স্বীয় কথার মধ্যে হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ পাককে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! এটাই কি আপনার কথা?' তিনি বলেনঃ না। তুমি আমার কথা সহ্য করতে পারবে না।' হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনার মাখলুকের কারও কথার সঙ্গে আপনার কথার সাদৃশ্য আছে কি? আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘ভয়ংকর বজ্রধ্বনি ছাড়া আর কিছুরই সাদৃশ্য নেই।' এ বর্ণনাটিও মাওকুফ এবং এটা স্পষ্ট কথা যে, হযরত কা'ব (রঃ) পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ হতে বর্ণনা করতেন, যেসব কিতাবে বানী ইসরাঈলের সত্য-মিথ্যা সব ঘটনাই থাকতো।এরপর বলা হচ্ছে- তারা এমন রাসূল যারা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য স্বীকারকারীদেরকে ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনাকারীদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে এবং তাঁর আদেশ অমান্যকারীদের ও তাঁর রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কারীদেরকে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করে থাকে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যে স্বীয় গ্রন্থরাজি অবতীর্ণ করেছেন ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং তাদেরকে স্বীয় সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন তা এ জন্যে যে, যেন কারও কোন প্রমাণ এবং ওর অবশিষ্ট না থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যদি আমি এর পূর্বেই তাদেরকে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তবে তারা অবশ্যই বলতো-হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের নিকট রাসূল পাঠাননি কেন? তাহলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই আপনার নিদর্শনসমূহকে মেনে নিতাম।' (২০:১৩৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার মত মর্যাদা বোধ আর কারও নেই। এ জন্যেই তিনি সমস্ত মন্দকে হারাম করেছেন তা প্রকাশ্যই হোক আর গোপনীয়ই হোক এবং এমনও কেউ নেই যার কাছে প্রশংসা আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী পছন্দনীয় হয়। এ কারণেই তিনি নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন। এমনও কেউ নেই যার নিকট ওযর আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয়। এ জন্যেই তিনি নবীগণকে সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছেন। অন্য বর্ণনায় নিম্নের শব্দগুলোও রয়েছে- “এ কারণেই তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন ও গ্রন্থাবলী অবতীর্ণ করেছেন।”

আন-নিসা 4:166

১৬৬-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করা হয়েছে এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। এজন্যেই এখানে বলা হচ্ছে-‘হে নবী (সঃ)! গুটিকতক লোক তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এবং তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বটে কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-আল্লাহ তোমার উপর কুরআন মাজীদ ও ফুরকান-ই-হামীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার কাছে বাতিল টিকতে পারে না। এর মধ্যে ঐ সমুদয় জিনিসের জ্ঞান রয়েছে। যার উপর তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করতে চান। অর্থাৎ প্রমাণাদি, হিদায়াত, ফুরকান, আল্লাহর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টির আহকাম, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সংবাদসমূহ এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র গুণাবলী। যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা অবহিত না করা পর্যন্ত কোন রাসূল বা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাও জানতে পারেন না! যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছে করেন তদ্ব্যতীত কেউই তার অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই ধারণা করতে পারে না। (২:২৫৫) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাঁর জ্ঞান আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারে না।” (আরবী) হযরত আতা ইবনে সায়েব (রঃ) যখন হযরত আবু আবদুর রহমান (রঃ)-এর নিকট কুরআন কারীম পাঠ শেষ করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যে আমলে তোমার চেয়ে বেড়ে যাবে সে ছাড়া আজ তোমার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর সাক্ষ্যের সাথে সাথে ফেরেশতাগণেরও সাক্ষ্য রয়েছে যে, যা তোমার নিকট এসেছে এবং যে অহী তোমারা উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য।ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার নিশ্চিত রূপে জানা রয়েছে যে, আমার রিসালাতের অবগতি তোমাদের রয়েছে।” ঐ লোকগুলো ঐ কথা অস্বীকার করে। তখন মহাসম্মানিত আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যেসব লোক কুফরী করতঃ সত্যের অনুসরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এমনকি অন্য লোকদেরকেও সত্য পথে আসতে বাধা দিয়েছে তারা সঠিক পথ হতে সরে পড়েছে এবং প্রকৃত জিনিস থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তারা সুপথকে হারিয়ে ফেলেছে। এসব লোক, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে, আমার কিতাবকে অমান্য করেছে, আমার পথে আসতে মানুষকে বাধা দিয়েছে, আমার নিষিদ্ধ কার্যাবলী করতে রয়েছে এবং আমার নির্দেশাবলী অমান্য করেছে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করবো না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনও করবো না, বরং তাদেরকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শন করবো। তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য নিয়ে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন। তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তার আনুগত্য স্বীকার কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। তোমাদের ঈমান আনয়নে তাঁর কোন লাভও নেই এবং তোমাদের অস্বীকার করাতে তাঁর কোন ক্ষতিও নেই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। একথাই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ “যদি তোমরা এবং সারা জগতের সমস্ত লোকও কাফির হয়ে যায় তবুও মহান আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সারা বিশ্ব হতে অমুখাপেক্ষী; তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই জানেন কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য। তিনি বিজ্ঞানময়। তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর শরীয়ত এবং তার বিধান সবকিছুই নিপুণতাপূর্ণ।”

আন-নিসা 4:167

১৬৬-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করা হয়েছে এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। এজন্যেই এখানে বলা হচ্ছে-‘হে নবী (সঃ)! গুটিকতক লোক তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এবং তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বটে কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-আল্লাহ তোমার উপর কুরআন মাজীদ ও ফুরকান-ই-হামীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার কাছে বাতিল টিকতে পারে না। এর মধ্যে ঐ সমুদয় জিনিসের জ্ঞান রয়েছে। যার উপর তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করতে চান। অর্থাৎ প্রমাণাদি, হিদায়াত, ফুরকান, আল্লাহর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টির আহকাম, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সংবাদসমূহ এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র গুণাবলী। যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা অবহিত না করা পর্যন্ত কোন রাসূল বা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাও জানতে পারেন না! যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছে করেন তদ্ব্যতীত কেউই তার অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই ধারণা করতে পারে না। (২:২৫৫) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাঁর জ্ঞান আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারে না।” (আরবী) হযরত আতা ইবনে সায়েব (রঃ) যখন হযরত আবু আবদুর রহমান (রঃ)-এর নিকট কুরআন কারীম পাঠ শেষ করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যে আমলে তোমার চেয়ে বেড়ে যাবে সে ছাড়া আজ তোমার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর সাক্ষ্যের সাথে সাথে ফেরেশতাগণেরও সাক্ষ্য রয়েছে যে, যা তোমার নিকট এসেছে এবং যে অহী তোমারা উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য।ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার নিশ্চিত রূপে জানা রয়েছে যে, আমার রিসালাতের অবগতি তোমাদের রয়েছে।” ঐ লোকগুলো ঐ কথা অস্বীকার করে। তখন মহাসম্মানিত আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যেসব লোক কুফরী করতঃ সত্যের অনুসরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এমনকি অন্য লোকদেরকেও সত্য পথে আসতে বাধা দিয়েছে তারা সঠিক পথ হতে সরে পড়েছে এবং প্রকৃত জিনিস থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তারা সুপথকে হারিয়ে ফেলেছে। এসব লোক, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে, আমার কিতাবকে অমান্য করেছে, আমার পথে আসতে মানুষকে বাধা দিয়েছে, আমার নিষিদ্ধ কার্যাবলী করতে রয়েছে এবং আমার নির্দেশাবলী অমান্য করেছে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করবো না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনও করবো না, বরং তাদেরকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শন করবো। তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য নিয়ে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন। তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তার আনুগত্য স্বীকার কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। তোমাদের ঈমান আনয়নে তাঁর কোন লাভও নেই এবং তোমাদের অস্বীকার করাতে তাঁর কোন ক্ষতিও নেই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। একথাই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ “যদি তোমরা এবং সারা জগতের সমস্ত লোকও কাফির হয়ে যায় তবুও মহান আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সারা বিশ্ব হতে অমুখাপেক্ষী; তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই জানেন কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য। তিনি বিজ্ঞানময়। তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর শরীয়ত এবং তার বিধান সবকিছুই নিপুণতাপূর্ণ।”

আন-নিসা 4:168

১৬৬-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করা হয়েছে এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। এজন্যেই এখানে বলা হচ্ছে-‘হে নবী (সঃ)! গুটিকতক লোক তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এবং তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বটে কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-আল্লাহ তোমার উপর কুরআন মাজীদ ও ফুরকান-ই-হামীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার কাছে বাতিল টিকতে পারে না। এর মধ্যে ঐ সমুদয় জিনিসের জ্ঞান রয়েছে। যার উপর তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করতে চান। অর্থাৎ প্রমাণাদি, হিদায়াত, ফুরকান, আল্লাহর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টির আহকাম, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সংবাদসমূহ এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র গুণাবলী। যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা অবহিত না করা পর্যন্ত কোন রাসূল বা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাও জানতে পারেন না! যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছে করেন তদ্ব্যতীত কেউই তার অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই ধারণা করতে পারে না। (২:২৫৫) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাঁর জ্ঞান আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারে না।” (আরবী) হযরত আতা ইবনে সায়েব (রঃ) যখন হযরত আবু আবদুর রহমান (রঃ)-এর নিকট কুরআন কারীম পাঠ শেষ করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যে আমলে তোমার চেয়ে বেড়ে যাবে সে ছাড়া আজ তোমার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর সাক্ষ্যের সাথে সাথে ফেরেশতাগণেরও সাক্ষ্য রয়েছে যে, যা তোমার নিকট এসেছে এবং যে অহী তোমারা উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য।ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার নিশ্চিত রূপে জানা রয়েছে যে, আমার রিসালাতের অবগতি তোমাদের রয়েছে।” ঐ লোকগুলো ঐ কথা অস্বীকার করে। তখন মহাসম্মানিত আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যেসব লোক কুফরী করতঃ সত্যের অনুসরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এমনকি অন্য লোকদেরকেও সত্য পথে আসতে বাধা দিয়েছে তারা সঠিক পথ হতে সরে পড়েছে এবং প্রকৃত জিনিস থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তারা সুপথকে হারিয়ে ফেলেছে। এসব লোক, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে, আমার কিতাবকে অমান্য করেছে, আমার পথে আসতে মানুষকে বাধা দিয়েছে, আমার নিষিদ্ধ কার্যাবলী করতে রয়েছে এবং আমার নির্দেশাবলী অমান্য করেছে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করবো না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনও করবো না, বরং তাদেরকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শন করবো। তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য নিয়ে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন। তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তার আনুগত্য স্বীকার কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। তোমাদের ঈমান আনয়নে তাঁর কোন লাভও নেই এবং তোমাদের অস্বীকার করাতে তাঁর কোন ক্ষতিও নেই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। একথাই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ “যদি তোমরা এবং সারা জগতের সমস্ত লোকও কাফির হয়ে যায় তবুও মহান আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সারা বিশ্ব হতে অমুখাপেক্ষী; তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই জানেন কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য। তিনি বিজ্ঞানময়। তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর শরীয়ত এবং তার বিধান সবকিছুই নিপুণতাপূর্ণ।”

আন-নিসা 4:169

১৬৬-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করা হয়েছে এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। এজন্যেই এখানে বলা হচ্ছে-‘হে নবী (সঃ)! গুটিকতক লোক তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এবং তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বটে কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-আল্লাহ তোমার উপর কুরআন মাজীদ ও ফুরকান-ই-হামীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার কাছে বাতিল টিকতে পারে না। এর মধ্যে ঐ সমুদয় জিনিসের জ্ঞান রয়েছে। যার উপর তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করতে চান। অর্থাৎ প্রমাণাদি, হিদায়াত, ফুরকান, আল্লাহর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টির আহকাম, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সংবাদসমূহ এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র গুণাবলী। যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা অবহিত না করা পর্যন্ত কোন রাসূল বা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাও জানতে পারেন না! যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছে করেন তদ্ব্যতীত কেউই তার অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই ধারণা করতে পারে না। (২:২৫৫) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাঁর জ্ঞান আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারে না।” (আরবী) হযরত আতা ইবনে সায়েব (রঃ) যখন হযরত আবু আবদুর রহমান (রঃ)-এর নিকট কুরআন কারীম পাঠ শেষ করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যে আমলে তোমার চেয়ে বেড়ে যাবে সে ছাড়া আজ তোমার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর সাক্ষ্যের সাথে সাথে ফেরেশতাগণেরও সাক্ষ্য রয়েছে যে, যা তোমার নিকট এসেছে এবং যে অহী তোমারা উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য।ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার নিশ্চিত রূপে জানা রয়েছে যে, আমার রিসালাতের অবগতি তোমাদের রয়েছে।” ঐ লোকগুলো ঐ কথা অস্বীকার করে। তখন মহাসম্মানিত আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যেসব লোক কুফরী করতঃ সত্যের অনুসরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এমনকি অন্য লোকদেরকেও সত্য পথে আসতে বাধা দিয়েছে তারা সঠিক পথ হতে সরে পড়েছে এবং প্রকৃত জিনিস থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তারা সুপথকে হারিয়ে ফেলেছে। এসব লোক, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে, আমার কিতাবকে অমান্য করেছে, আমার পথে আসতে মানুষকে বাধা দিয়েছে, আমার নিষিদ্ধ কার্যাবলী করতে রয়েছে এবং আমার নির্দেশাবলী অমান্য করেছে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করবো না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনও করবো না, বরং তাদেরকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শন করবো। তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য নিয়ে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন। তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তার আনুগত্য স্বীকার কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। তোমাদের ঈমান আনয়নে তাঁর কোন লাভও নেই এবং তোমাদের অস্বীকার করাতে তাঁর কোন ক্ষতিও নেই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। একথাই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ “যদি তোমরা এবং সারা জগতের সমস্ত লোকও কাফির হয়ে যায় তবুও মহান আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সারা বিশ্ব হতে অমুখাপেক্ষী; তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই জানেন কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য। তিনি বিজ্ঞানময়। তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর শরীয়ত এবং তার বিধান সবকিছুই নিপুণতাপূর্ণ।”

আন-নিসা 4:170

১৬৬-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করা হয়েছে এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। এজন্যেই এখানে বলা হচ্ছে-‘হে নবী (সঃ)! গুটিকতক লোক তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এবং তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বটে কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তোমার রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-আল্লাহ তোমার উপর কুরআন মাজীদ ও ফুরকান-ই-হামীদ অবতীর্ণ করেছেন, যার কাছে বাতিল টিকতে পারে না। এর মধ্যে ঐ সমুদয় জিনিসের জ্ঞান রয়েছে। যার উপর তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করতে চান। অর্থাৎ প্রমাণাদি, হিদায়াত, ফুরকান, আল্লাহর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টির আহকাম, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সংবাদসমূহ এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র গুণাবলী। যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা অবহিত না করা পর্যন্ত কোন রাসূল বা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাও জানতে পারেন না! যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছে করেন তদ্ব্যতীত কেউই তার অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই ধারণা করতে পারে না। (২:২৫৫) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাঁর জ্ঞান আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারে না।” (আরবী) হযরত আতা ইবনে সায়েব (রঃ) যখন হযরত আবু আবদুর রহমান (রঃ)-এর নিকট কুরআন কারীম পাঠ শেষ করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যে আমলে তোমার চেয়ে বেড়ে যাবে সে ছাড়া আজ তোমার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর সাক্ষ্যের সাথে সাথে ফেরেশতাগণেরও সাক্ষ্য রয়েছে যে, যা তোমার নিকট এসেছে এবং যে অহী তোমারা উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য।ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার নিশ্চিত রূপে জানা রয়েছে যে, আমার রিসালাতের অবগতি তোমাদের রয়েছে।” ঐ লোকগুলো ঐ কথা অস্বীকার করে। তখন মহাসম্মানিত আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যেসব লোক কুফরী করতঃ সত্যের অনুসরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এমনকি অন্য লোকদেরকেও সত্য পথে আসতে বাধা দিয়েছে তারা সঠিক পথ হতে সরে পড়েছে এবং প্রকৃত জিনিস থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তারা সুপথকে হারিয়ে ফেলেছে। এসব লোক, যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে, আমার কিতাবকে অমান্য করেছে, আমার পথে আসতে মানুষকে বাধা দিয়েছে, আমার নিষিদ্ধ কার্যাবলী করতে রয়েছে এবং আমার নির্দেশাবলী অমান্য করেছে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করবো না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শনও করবো না, বরং তাদেরকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শন করবো। তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য নিয়ে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন। তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তার আনুগত্য স্বীকার কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। তোমাদের ঈমান আনয়নে তাঁর কোন লাভও নেই এবং তোমাদের অস্বীকার করাতে তাঁর কোন ক্ষতিও নেই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। একথাই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ “যদি তোমরা এবং সারা জগতের সমস্ত লোকও কাফির হয়ে যায় তবুও মহান আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সারা বিশ্ব হতে অমুখাপেক্ষী; তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই জানেন কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য। তিনি বিজ্ঞানময়। তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর শরীয়ত এবং তার বিধান সবকিছুই নিপুণতাপূর্ণ।”

আন-নিসা 4:171

আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবকে বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করছেন। খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে সীমা অতিক্রম করেছিল এবং তাকে নবুওয়াত হতে বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছিল। তারা তার আনুগত্য ছেড়ে তাঁর ইবাদতে লেগে পড়েছিল, এমনকি অন্যান্য মনীষীর ব্যাপারেও তাদের ধারণা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খ্রীষ্টান ধর্মের আলেমদেরকেও তারা নিস্পাপ মনে করতে থাকে এবং এ ধারণা করে নেয় যে, ধর্মের আলেমগণ যা কিছু বলেন তা মেনে নেয়াই অপরিহার্য কর্তব্য। সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল এবং সুপথ-ভ্রান্তির পথ পরীক্ষা করার কোন অধিকার তাদের নেই। যার বর্ণনা কুরআন কারীমের নিম্নের এ আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাদের আলেমদেরকে ও ধর্মাজকদেরকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল।”(৯:৩১)।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমাকে এমনভাবে বাড়িয়ে দিও না যেমনভাবে খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তো একজন দাস মাত্র। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর রাসূল বলবে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে আমাদের নেতা ও নেতার। ছেলে! হে আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তির ছেলে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের কথার প্রতি খেয়াল রেখো। দেখ, শয়তান যেন তোমাদেরকে এদিক-ওদিক করে না দেয়। আমি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সঃ)। আমি আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমি চাইনে যে, তোমরা আমাকে আমার মর্যাদা অপেক্ষা বেশী বাড়িয়ে দেবে।”এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিও না। তোমরা তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করো না। তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা হতে তিনি বহু দূরে ও বহু উচ্চে রয়েছেন। তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদায় তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া কেউ মা'বুদ ও প্রভু নেই। হযরত মাসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার রাসূল। তিনি তার দাসদের মধ্যে একজন দাস এবং তার একজন সৃষ্ট ব্যক্তি। তিনি শুধু। শব্দের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। যে শব্দটি নিয়ে হযরত জিবরাইল (আঃ) হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর নিকট এসেছিনে এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ঐ কালেমা তাঁর মধ্যে ফুঁকে দেন। এর ফলেই হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়। পিতা ছাড়াই একমাত্র এ কালেমার মাধ্যমেই তিনি সৃষ্টি হন বলেই তাকে বিশেষভাবে কালেমাতুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কুরআন মাজীদের অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অথাৎ হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল অতীত হয়েছেন, তার মাতা সত্যবাদিনী, তারা দু'জন আহার্য ভোজন করতো।' (৫:৭৫) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃঅর্থাৎ “ঈসার দৃষ্টান্ত আল্লাহ তা'আলার নিকট আদমের মতই, তাকে তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন অতঃপর বলেছেন- হও, আর তেমনই হয়ে গেছে।”(৩:৫৯) কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছে এবং আমি স্বীয় রূহ তার মধ্যে ফুকে দিয়েছি এবং তাকে ও তার পুত্রকে বিশ্ববাসীর জন্যে নিদর্শন বানিয়েছি।” (২১৪ ৯১) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছে।” (৬৬:১২) হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে এ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “সে (ঈসা আঃ) একজন দাস ছাড়া কিছুই নয়, আমি তাকে পুরস্কৃত করেছিলাম।” (৪৩:৫৯) সুতরাং ভাবার্থ এই নয় যে, স্বয়ং আল্লাহর কালেমাই ঈসা (আঃ) হয়ে গেছেন। বরং ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলার কালেমার মাধ্যমে হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়েছে যে আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দাহ্ ও রাসূল, ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের মধ্যে ফুকে দিয়েছিলেন ও তিনি তাঁর রূহ এবং আরও সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, তার আমল যাই হোক না কেন আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।” অন্য বর্ণনায় এতটুকু বেশী রয়েছে যে, সে জান্নাতের আটটি দরজার মধ্যে যেটি দিয়ে ইচ্ছে প্রবেশ করবে। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যেমন হাদীসে ও কুরআনে বলা (আরবী) হয়েছে ঐ রকমই কুরআন কারীমের একটি আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তিনি যা কিছু আকাশে ও যা কিছু যমীনে রয়েছে সমস্তই নিজের পক্ষ হতে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন।” (৪৫:১৩) অর্থাৎ স্বীয় মাখলুক হতে ও নিজের রূহ হতে (আরবী)-এর ভাবার্থ এটাই। সুতরাং এখানে শব্দটি (আরবী) - এর জন্যে অর্থাৎ কতককে বুঝাবার জন্যে নয়, যেমন অভিশপ্ত খ্রীষ্টানদের ধারণা রয়েছে যে হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর একটা অংশ ছিলেন। বরং (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থাৎ প্রারম্ভের জন্যে এসেছে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তার পক্ষ হতে রাসূল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী) কিন্তু বেশী স্পষ্ট হচ্ছে প্রথম উক্তিটি। অর্থাৎ তাকে রূহ দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে যা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার মাখলুক। সুতরাং তাকে ‘রূহুল্লাহ’ বলা ঐরূপই যেরূপ বলা হয় নাকাতুল্লাহ' (আল্লাহর উষ্ট্রী) এবং বায়তুল্লাহ'। অর্থাৎ শুধুমাত্র সৌজন্য প্রকাশ করার উদ্দেশ্যেই নিজের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়েছেন। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আমার প্রভুর নিকট তাঁর ঘরে যাবো।”তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা এ বিশ্বাস করে নাও যে, আল্লাহ এক, তিনি স্ত্রী ও সন্তানাদি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং এটাও বিশ্বাস করে নাও যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর দাস, তাঁর সৃষ্ট এবং তার সম্মানিত রাসূল। তোমরা তিন’ বলল না। অর্থাৎ ঈসা (আঃ) ও মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর সাথে অংশীদার করো না। কেউ যে তাঁর অংশীদার হবে এ হতে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। সূরা-ই-মায়েদায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যারা বলে যে, আল্লাহ তিনজনের মধ্যে একজন তারা অবশ্যই কাফির হয়ে গেছে, আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই। (৫৪৭৩) যেমন আল্লাহ তা'আলা সূরা-ই-মায়েদার শেষে বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ বললেন- হে মারইয়াম নন্দন ঈসা, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে পরিত্যাগ করে তোমরা আমাকে ও আমার মাতাকে দুই মাদরূপে গ্রহণ কর?' (৫:১১৬) হযরত ঈসা (আঃ) ওটা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করবেন। খ্রীষ্টানদের নিকট এ ব্যাপারে দলীল প্রমাণ কিছুই নেই। অযথা তারা ভ্রান্তির পথে চালিত হয়ে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। আর কেউ কেউ তাঁকে আল্লাহ তা'আলার শরীক মনে করছে। আবার কেউ কেউ তাঁকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলছে।সত্য কথা এই যে, যদি দশজন খ্রীষ্টান একত্রিত হয় তবে তাদের খেয়াল হবে এগার রকম। সাঈদ ইবনে বাতরীক ইসকানদারী নামক খ্রীষ্টানদের একজন বড় পণ্ডিত প্রায় চারশ হিজরীতে বর্ণনা করেছে যে, কনসটান্টিনোপলের প্রতিষ্ঠাতা কুসতুনতীনের আমলে সে যুগীয় বাদশাহর নির্দেশক্রমে খ্রীষ্টানদের এক সম্মেলন হয়। তথায় তাদের দু’হাজারেরও বেশী বড় বড় পাদরী ছিল। অতঃপর তাদের মধ্যে এত বেশী মতবিরোধ সৃষ্টি হয় যে, কোন বিষয়ের উপর সত্তর আশি জনের বেশী লোক একমত হতে পারেনি। দশজনের এক রকম বিশ্বাস, বিশজনের আর এক খেয়াল, চল্লিশজন অন্য কিছু বলে এবং ষাট জন অন্য দিকে যায়। মোটকথা, হাজার হাজার লোকের মধ্যে অতিকষ্টে মাত্র তিনশ আঠারোজন লোক এক সিদ্ধান্তে একমত হয়। বাদশাহ ঐ আকীদাকেই গ্রহণ করে এবং বাকীগুলো পরিত্যাগ করে। তাদেরই সে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং তাদের জন্যে গীর্জা বানিয়ে দেয়, গ্রন্থরাজি লিখিয়ে দেয় ও আইন কানুন লিপিবদ্ধ করে। ওরাই আমানত-ই-কুবরার মাসআলা বের করে যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম। খেয়ানতই ছিল। ঐ লোকগুলোকে মালেকানিয়্যাহ' বলা হয়। দ্বিতীয় বার সম্মেলনে যে দলটি গঠিত হয়, তার নাম হচ্ছে ইয়াকুবিয়্যাহ। অতঃপর তৃতীয় সম্মেলনে যে দলটি গঠিত হয় তার নাম নাসতুরিয়্যাহ।' এ তিনটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তিনটি উক্তি করে থাকে। (অর্থাৎ একদল তাঁকেই আল্লাহ বলে, একদল তাঁকে আল্লাহর অংশীদার বলে এবং একদল তাকে আল্লাহর পুত্র বলে)। তারা আবার একে অপরকে কাফির বলে থাকে। আর আমাদের নিকট তো তারা সবাই কাফির। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা এটা হতে বিরত হও এবং এ বিরত থাকাই তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। আল্লাহ তো এক, সন্তান হওয়া হতে তাঁর সত্তা সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্তই তার সৃষ্ট এবং সমস্ত কিছুই তার অধিকারে রয়েছে। সকলেই তাঁর দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সবকিছুই তার উপর নির্ভরশীল। তাহলে তাঁরই মাখলুকের মধ্যে কেউ তার স্ত্রী এবং কেউ তার সন্তান কিরূপে হতে পারে? অন্য একটি আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি তো হচ্ছেন প্রথম আকাশ ও যমীনের সৃষ্টিকারী, সুতরাং কিরূপে তাঁর সন্তান হতে পারে? (৬:১০১) সূরা-ই-মারইয়ামের (আরবী) হতে (আরবী) (১৯:৮৮-৯৫) পর্যন্ত আয়াতেও বিস্তারিতভাবে এর অস্বীকৃতি রয়েছে।

আন-নিসা 4:172

১৭২-১৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, হযরত মাসীহ (আঃ) ও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতাগণও আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে মোটেই সংকোচবোধ করেন না এবং অহংকারও করেন না। এটা তাদের জন্যে শোভনীয়ও নয়। বরং যাঁরা যত বেশী আল্লাহ তাআলার নৈকট লাভ করেন তারা ততো বেশী পরিমাণ তাঁর ইবাদত করে থাকেন। কেউ কেউ এ আয়াত দ্বারা এ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, ফেরেশতাগণ মানুষ অপেক্ষা উত্তম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আয়াত দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয় না। কেননা, এখানে (আরবী)-এর উপর (আরবী) শব্দের সংযোগ হয়েছে। আর (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরত হওয়া এবং ফেরেশতাদের মধ্যে এ শক্তি হযরত মাসীহ (আঃ) অপেক্ষা বেশী আছে। এ জন্যে এটা বলা হয়েছে। কিন্তু বিরত হওয়ার উপর বেশী ক্ষমতাবান হওয়াতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। এও বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে যেমন মানুষ পূজো করতো তেমন ফেরেশতাদেরকেও পূজো করতো। তাই এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) মানুষকে আল্লাহর ইবাদত হতে বাধা দেননি। তারপরে ফেরেশতাদেরও এ অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। যার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। যে, তারা যাদের পূজো করছে তারাও স্বয়ং আল্লাহর ইবাদত করে থাকেন। সুতরাং তাদেরকে পূজো করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কি হতে পারে? যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, আল্লাহ তাআলা সন্তান বানিয়ে নিয়েছেন। অথচ তিনি তা হতে পবিত্র, বরং তারা সম্মানিত দাস।” (২১:২৬) তাই, এখানেও বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং অহংকার করছে তারা একদিন তার নিকটই প্রত্যাবর্তিত হবে এবং সেদিন তাদের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা তারা নিজেরাই শুনে নেবে। পক্ষান্তরে যারা বিশ্বাস স্থাপন করতঃ সকার্যাবলী সম্পাদন করে তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় করুণা দ্বারা পুরস্কৃত করবেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তো এই যে, তাকে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন এবং (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যার জন্যে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে তার জন্যেও ঐ সব লোক সুপারিশ করবে যাদের সাথে সে দুনিয়ায় ভাল ব্যবহার করেছে। কিন্তু এর সনদ প্রমাণিত নয়। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তির উপরেই ওটা বর্ণনা করা হয় তবে ঠিকই আছে। অতঃপর বলা হচ্ছে- যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য হতে সরে পড়ে এবং অহংকার করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। তারা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা আমার ইবাদত হতে অংহকার করে তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (৪০:৬০) অর্থাৎ তাদের অস্বীকার ও অহংকারের প্রতিদান এই দেয়া হবে যে, তারা ঘৃণ্য, লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

আন-নিসা 4:173

১৭২-১৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: ভাবার্থ এই যে, হযরত মাসীহ (আঃ) ও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতাগণও আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে মোটেই সংকোচবোধ করেন না এবং অহংকারও করেন না। এটা তাদের জন্যে শোভনীয়ও নয়। বরং যাঁরা যত বেশী আল্লাহ তাআলার নৈকট লাভ করেন তারা ততো বেশী পরিমাণ তাঁর ইবাদত করে থাকেন। কেউ কেউ এ আয়াত দ্বারা এ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, ফেরেশতাগণ মানুষ অপেক্ষা উত্তম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আয়াত দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয় না। কেননা, এখানে (আরবী)-এর উপর (আরবী) শব্দের সংযোগ হয়েছে। আর (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরত হওয়া এবং ফেরেশতাদের মধ্যে এ শক্তি হযরত মাসীহ (আঃ) অপেক্ষা বেশী আছে। এ জন্যে এটা বলা হয়েছে। কিন্তু বিরত হওয়ার উপর বেশী ক্ষমতাবান হওয়াতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। এও বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে যেমন মানুষ পূজো করতো তেমন ফেরেশতাদেরকেও পূজো করতো। তাই এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) মানুষকে আল্লাহর ইবাদত হতে বাধা দেননি। তারপরে ফেরেশতাদেরও এ অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। যার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। যে, তারা যাদের পূজো করছে তারাও স্বয়ং আল্লাহর ইবাদত করে থাকেন। সুতরাং তাদেরকে পূজো করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কি হতে পারে? যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, আল্লাহ তাআলা সন্তান বানিয়ে নিয়েছেন। অথচ তিনি তা হতে পবিত্র, বরং তারা সম্মানিত দাস।” (২১:২৬) তাই, এখানেও বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং অহংকার করছে তারা একদিন তার নিকটই প্রত্যাবর্তিত হবে এবং সেদিন তাদের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা তারা নিজেরাই শুনে নেবে। পক্ষান্তরে যারা বিশ্বাস স্থাপন করতঃ সকার্যাবলী সম্পাদন করে তাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় করুণা দ্বারা পুরস্কৃত করবেন।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তো এই যে, তাকে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন এবং (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যার জন্যে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে তার জন্যেও ঐ সব লোক সুপারিশ করবে যাদের সাথে সে দুনিয়ায় ভাল ব্যবহার করেছে। কিন্তু এর সনদ প্রমাণিত নয়। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তির উপরেই ওটা বর্ণনা করা হয় তবে ঠিকই আছে। অতঃপর বলা হচ্ছে- যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য হতে সরে পড়ে এবং অহংকার করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। তারা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা আমার ইবাদত হতে অংহকার করে তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (৪০:৬০) অর্থাৎ তাদের অস্বীকার ও অহংকারের প্রতিদান এই দেয়া হবে যে, তারা ঘৃণ্য, লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

আন-নিসা 4:174

১৭৪-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মানব জাতিকে সম্বোধন করে বলেছেন-আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট পূর্ণ দলীল, ওযর, আপত্তি ও সন্দেহ দূরকারী প্রমাণাদি অবতীর্ণ করা হয়েছে। আমি তোমাদের উপর স্পষ্ট জ্যোতি (কুরআন কারীম) অবতীর্ণ করেছি, যার দ্বারা সত্যের পথ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে জুরায়েজ প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এর দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝান হয়েছে। এখন যারা আল্লাহ তা'আলার উপর ঈমান আনয়ন করবে, তার উপরই পূর্ণ নির্ভরশীল হবে, তাঁকেই দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, তারই দাসত্ব করবে, সমস্ত কাজ তাঁকেই সমর্পণ করবে এবং এও হতে পারে যে, যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তাঁর কিতাবকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে তাদের উপর তিনি স্বীয় করুণা ও অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন, তাদেরকে সুখময় জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, তাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করবেন, তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং তাদেরকে এমন সরল সঠিক পথ-প্রদর্শন করবেন যা না কোন দিকে বাঁকা থাকবে, না কোন জায়গা সংকীর্ণ হবে। সুতরাং মুমিন ব্যক্তি পৃথিবীতে সরল ও সোজা পথের উপরে থাকে এবং ইসলামের পথে থাকে। আর পরকালে থাকে জান্নাতের পথে ও শান্তির পথে। তাফসীরের প্রারম্ভে একটি পূর্ণ হাদীস অতীত হয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা রয়েছে-- আল্লাহর সরল ও সোজা পথ এবং তার সুদৃঢ় রঙ্গু হচ্ছে কুরআন কারীম।

আন-নিসা 4:175

১৭৪-১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মানব জাতিকে সম্বোধন করে বলেছেন-আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট পূর্ণ দলীল, ওযর, আপত্তি ও সন্দেহ দূরকারী প্রমাণাদি অবতীর্ণ করা হয়েছে। আমি তোমাদের উপর স্পষ্ট জ্যোতি (কুরআন কারীম) অবতীর্ণ করেছি, যার দ্বারা সত্যের পথ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে জুরায়েজ প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এর দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝান হয়েছে। এখন যারা আল্লাহ তা'আলার উপর ঈমান আনয়ন করবে, তার উপরই পূর্ণ নির্ভরশীল হবে, তাঁকেই দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, তারই দাসত্ব করবে, সমস্ত কাজ তাঁকেই সমর্পণ করবে এবং এও হতে পারে যে, যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তাঁর কিতাবকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে তাদের উপর তিনি স্বীয় করুণা ও অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন, তাদেরকে সুখময় জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন, তাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করবেন, তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং তাদেরকে এমন সরল সঠিক পথ-প্রদর্শন করবেন যা না কোন দিকে বাঁকা থাকবে, না কোন জায়গা সংকীর্ণ হবে। সুতরাং মুমিন ব্যক্তি পৃথিবীতে সরল ও সোজা পথের উপরে থাকে এবং ইসলামের পথে থাকে। আর পরকালে থাকে জান্নাতের পথে ও শান্তির পথে। তাফসীরের প্রারম্ভে একটি পূর্ণ হাদীস অতীত হয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা রয়েছে-- আল্লাহর সরল ও সোজা পথ এবং তার সুদৃঢ় রঙ্গু হচ্ছে কুরআন কারীম।

আন-নিসা 4:176

হযরত বারা' (রাঃ) বলেন যে, সূরাসমূহের মধ্যে সর্বশেষ অবতীর্ণ হয় সূরা-ই-বারাআত এবং আয়াতসমূহের মধ্যে সর্বশেষে অবতীর্ণ হয় (আরবী) -এ আয়াতটি। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি রোগে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখতে আসেন। তিনি অযু করে সেই পানি আমার উপর নিক্ষেপ করেন, ফলে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আমি তাঁকে বলি! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমিতো কালালা। আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তি কিভাবে বন্টিত হবে? সে সময় আল্লাহ তা'আলা ফরায়েযের আয়াত অবতীর্ণ করেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)অন্য বর্ণনায় এ আয়াতটিই অবতীর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানুষ তোমাকে জিজ্ঞেস করে অর্থাৎ কালালা’ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। প্রথমে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, কালালা' শব্দটি শব্দ হতে নেয়া হয়েছে যা চতুর্দিক হতে মাথাকে ঘিরে থাকে। অধিকাংশ আলেমের মতে ‘কালালা’ ঐ মৃত ব্যক্তিকে বলা হয় যার পুত্র ও পৌত্র না থাকে। আবার কারও কারও উক্তি এও আছে যে, যার পুত্র না থাকে। যেমন এ আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর সামনে যেসব জটিল প্রশ্ন এসেছিল তন্মধ্যে এটিও ছিল একটি। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয় সম্বন্ধে আমার এ আকাঙখা রয়ে গেল যে, যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সব ব্যাপারে আমাদের নিকট কোন অঙ্গীকার করতেন তাহলে আমরা ঐ দিকে প্রত্যাবর্তন করতাম। ঐগুলো হচ্ছে দাদা, কালালা এবং সুদের অধ্যায়সমূহ। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কালালা’ সম্বন্ধে যত প্রশ্ন করেছি অন্য কোন মাসআলা সম্বন্ধে ততো প্রশ্ন করিনি। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার বক্ষে স্বীয় আঙ্গুলির দ্বারা আঘাত করে আমাকে বলেনঃ “তোমার জন্যে গ্রীষ্মকালের আয়াতটিই যথেষ্ট যা সূরা-ই-নিসার শেষে রয়েছে।”অন্য হাদীসে রয়েছে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে আরও বেশী করে জেনে নিতাম তবে আমার জন্যে লাল উট পাওয়া অপক্ষোও উত্তম হতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথার ভাবার্থ হয়তো এই হবে যে, আয়াতটি সম্ভবতঃ গ্রীষ্মকালে অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। রাসূলল্লাহ (সঃ) তাকে বুঝবার উপায় বলে দিয়েছিলেন এবং ওতেই যথেষ্ট হবে একথা বলেছিলেন, তাই তিনি ওর অর্থ জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি দুঃখ প্রকাশ করতে থাকেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কালালা’ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কি এটা বর্ণনা করেননি?” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবূ বকর (রাঃ) স্বীয় ভাষণে বলেনঃ “সূরা-ই-নিসার প্রথম দিকে ফারায়েযের ব্যাপারে যে আয়াতটি রয়েছে তা পুত্র ও পিতার জন্যে, দ্বিতীয় আয়াতটি স্বামী-স্ত্রী, বৈপিত্রীয় ভাইদের জন্যে এবং যে আয়াত দ্বারা সূরা-ই-নিসাকে সমাপ্ত করা হয়েছে ওটা সহোদর ভাই-বোনদের জন্যে। আর যে আয়াত দ্বারা সূরা-ই-আনফালকে শেষ করা হয়েছে তা হচ্ছে আত্মীয়দের জন্যে যে আতীয়তার মধ্যে আসাবা’ চালু রয়েছে”। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)অর্থের উপর কালামের বর্ণনাঃএ আয়াতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ মরে গেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলার সত্তা ছাড়া সমস্ত জিনিসই মরণশীল।” (২৮:৮৮) অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “এর উপর যা রয়েছে সবই মরণশীল, শুধু তোমার প্রভুর চেহারা অবশিষ্ট থাকবে যিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহা সম্মানিত।" (৫৫:২৬-২৭)।এরপর বলা হচ্ছে-তার পুত্র নেই। এর দ্বারা কেউ কেউ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কালালার’ শর্তে পিতা না হওয়া নেই বরং যার পুত্র নেই সেই কালালা'। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে।কিন্তু জমহরের উক্তিই হচ্ছে সঠিক এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) -এরও সিদ্ধান্ত এটাই যে, কালালা’ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার পুত্র ও পিতা নেই এবং আয়াতের পরবর্তী শব্দ দ্বারাও এটাই বুঝা যাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তার ভগ্নী থাকে তবে তার জন্যে সমস্ত পরিত্যক্ত সম্পদ হতে অর্ধাংশ। আর যদি বোনের সঙ্গে পিতা থাকে তবে পিতা তাকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করে দেবে। সবারই মত এই যে, (আরবী) ঐ অবস্থায় বোন কিছুই পাবে না। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার পুত্র না থাকে এবং এটা প্রকাশ্য দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। আর যদি পিতাও না থাকে এবং এটাও দলীল দ্বারাই সাব্যস্ত হচ্ছে বটে, কিন্তু কিছুক্ষণ চিন্তার পর। কেননা, পিতার বিদ্যমানতায় বোন অর্ধাংশতো পায়ই না, এমন কি সে উত্তরাধিকার হতে সম্পূর্ণরূপেই বঞ্চিতা হয়। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ)-কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হয় যে, একটি স্ত্রী লোক মারা গেছে। তার স্বামী ও একটি সহোদরা ভগ্নী রয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “অর্ধেক স্বামীকে দাও অর্ধেক ভগ্নীকে দাও।” তাঁকে এর দলীল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এরূপ অবস্থায় এ ফায়সালাই করেছিলেন”। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে নকল করা হয়েছে, যে মৃত ব্যক্তি একটি মেয়ে ও একটি বোন ছেড়ে যায় এর ব্যাপারে তাঁদের উভয়েরই ফতওয়া ছিল এই যে, ঐ অবস্থায় বোন বঞ্চিত হয়ে যাবে, সে কিছুই পাবে না। কেননা, কুরআন কারীমের এ আয়াতে বোনের অর্ধাংশ পাওয়ার অবস্থা এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকে। আর এখানে সন্তান রয়েছে। কিন্তু জামহুর এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, ঐ অবস্থাতেই নির্ধারিত অংশ হিসেবে মেয়ে অর্ধেক পাবে এবং ‘আসাবা হিসেবে বোনও অর্ধেক পাবে।হযরত ইবরাহীম ইবনে আসওয়াদ (রঃ) বলেনঃ আমাদের মধ্যে হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এ ফায়সালা করেন যে, অর্ধেক মেয়ে পাবে ও অর্ধেক ভগ্নী পাবে। সহীহ বুখারীর আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর মেয়ে, পৌত্রী ও বোনের ব্যাপারে মেয়েকে অর্ধেক ও বোনকে অর্ধেক দেয়ার ফতওয়া দেন, অতঃপর বলেনঃ “হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কেও একটু জিজ্ঞেস করে এসো। সম্ভবতঃ তিনি আমার মতই ফতওয়া দেবেন। কিন্তু যখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয় এবং সাথে সাথে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর ফতওয়াও তাকে শুনিয়ে দেয়া হয় তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে তো আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো এবং সুপথ প্রাপ্ত লোকদের মধ্যে আমি গণ্য হবে না। জেনে রেখো এ ব্যাপারে আমি ঐ ফায়সালাই করবো যে ফায়সালা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) করেছেন। অর্ধেক দাও মেয়েকে, এক ষষ্ঠাংশ দাও পৌত্রীকে, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ পূর্ণ হয়ে গেল এবং যা অবশিষ্ট থাকলে তা বোনকে দিয়ে দাও।" আমরা ফিরে এসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-কে এ সংবাদ দিলে তিনি বলেনঃ “যে পর্যন্ত এ আল্লামা তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকেন সে পর্যন্ত তোমরা আমার নিকট এ মাসআলা জিজ্ঞেস করতে এসো না।”অতঃপর বলা হচ্ছে-এ তার উত্তরাধিকারী হবে যদি তার সন্তান না থাকে। অর্থাৎ ভাই তার বোনের মালের উত্তরাধিকারী হবে যদি সে কালালা’ হয় অর্থাৎ যদি তার সন্তান ও পিতা না থাকে। কেননা, পিতার বর্তমানে ভাই কোন অংশ পাবে না। হ্যাঁ, তবে যদি ভাই-এর সঙ্গে অন্য কোন নির্দিষ্ট অংশ বিশিষ্ট উত্তরাধিকারী থাকে, যেমন স্বামী বা বৈপিত্রেয় ভাই, তবে তাকে তার অংশ দিয়ে দেয়া হবে এবং অবশিষ্ট মালের উত্তরাধিকারী ভাই হবে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ফারায়েযকে ওর প্রাপকের সঙ্গে মিলিয়ে দাও। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকবে তা ঐ পুরুষলোকের জন্যে যে বেশী। নিকটবর্তী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘বোন যদি দু’টো হয় তবে তারা পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ পাবে। দু’য়ের বেশী বোনেরও একই হুকুম। এখান হতেই একটি দল দুই মেয়ের হুকুম গ্রহণ করেছেন। যেমন দু’য়ের বেশী বোনের হুকুম দু'টি মেয়ের হুকুম হতে নিয়েছেন যে আয়াতের শব্দগুলো নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা দু'য়ের উপর স্ত্রীলোক হয় তবে সে যা ছেড়ে যাবে তা হতে তাদের জন্যে দুই তৃতীয়াংশ।”অতঃপর বলা হচ্ছে- যদি ভাই ও বোন উভয়ই থাকে তবে প্রত্যেক পুরুষের অংশ দু’জন নারীর সমান। আসাবা’রও এ হুকুমই। তারা ছেলেই হোক বা পৌত্রই হোক অথবা ভাই হোক যখন তাদের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়েই থাকবে তখন দু’জন নারী যা পাবে একজন পুরুষও তাই পাবে। আল্লাহ স্বীয় ফারায়েয বর্ণনা করছেন, স্বীয় সীমা নির্ধারণ করছেন এবং স্বীয় শরীয়ত প্রকাশ করছেন যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও।' আল্লাহ তা'আলা সমস্ত কার্যের পরিণাম অবগত রয়েছেন, বান্দাদের মঙ্গল ও অমঙ্গল সম্বন্ধে তিনি পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। প্রাপকের প্রাপ্য কি তা তিনি খুব ভালই জানেন।তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে কোন জায়গায় যাচ্ছিলেন। তাঁরা সফরে ছিলেন। হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর সোয়ারীর মাথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে উবিষ্ট সাহাবীর নিকটে ছিল এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর সোয়ারীর মাথা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর সোয়ারীর দ্বিতীয় আরোহীর নিকটে ছিল। এমন সময়ে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত হুযাইফা (রাঃ)-কে এটা শুনিয়ে দেন এবং হযরত হুযাইফা (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে শুনিয়ে দেন। এরপর আবার যখন হযরত উমার (রাঃ) এটা জিজ্ঞেস করেন তখন হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ আপনি অবুঝ। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে যেমনভাবে শুনিয়ে ছিলেন তেমনই আমিও আপনাকে শুনিয়েছি। আল্লাহর শপথ! আমি এর উপর কিছুই বেশী করতে পারি না। তাই হযরত উমার ফারুক (রাঃ) বলতেন, “হে আল্লাহ! আপনি প্রকাশ করেছেন বটে কিন্তু আমার নিকট তা প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুনকাতা'। এ বর্ণনারই অন্য সনদে আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) তার এ দ্বিতীয় বার প্রশ্ন তাঁর খিলাফতের যুগে করেছিলেন।অন্য হাদীসে রয়েছে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “কালালার উত্তরাধিকার কিভাবে বন্টিত হবে”। সে সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। কিন্তু তিনি তাতেও পূর্ণভাবে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেননি বলে স্বীয় কন্যা ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খুশীর অবস্থায় তুমি এটা জিজ্ঞেস করে নিও।” অতএব হযরত হাফসা (রাঃ) একদা এরূপ সুযোগ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “সম্ভবতঃ তোমার পিতা তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করতে বলেছেন। আমার ধারণা তিনি এটা মনে রাখতে পারবেন না।” হযরত উমার (রাঃ) একথা শুনতে পেয়ে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহই (সঃ) যখন এ কথা বলেছেন তখন আমি ওটা জানতে পারি না।”অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর নির্দেশক্রমে হযরত হাফসা (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঝুঁটির উপর এ আয়াতটি লিখিয়ে দেন, অতঃপর হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “উমার (রাঃ) কি তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন? আমার ধারণা যে তিনি এটা ঠিক রাখতে পারবেন না। তার জন্যে কি গ্রীষ্ম কালের ঐ আয়াতটি যথেষ্ট নয় যা সূরা-ই-নিসায় রয়েছে?” ওটা হচ্ছেঃ (আরবী)-এ আয়াতটি। তার পরে জনগণ যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন তখন ঐ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় যা সূরা-ই-নিসার শেষে রয়েছে এবং ঝুঁটি নিক্ষেপ করা হয়। এ হাদীসটি মুরসাল।একদা হযরত উমার (রাঃ) সাহাবীগণকে একত্রিত করেন এবং ঝুঁটির একটি খণ্ড নিয়ে বলেনঃ “আজ আমি এমন একটা ফায়সালা করবো যে, পর্দানশীন নারীরাও জানতে পারবে।” ঐ সময়েই ঘর হতে একটি সাপ বেরিয়ে আসে এবং সমস্ত লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক চলে যায়। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “মহা সম্মানিত আল্লাহর যদি এ কাজ পূর্ণ করার ইচ্ছে থাকতো তবে তিনি অবশ্যই তা পূর্ণ করিয়ে দিতেন।” এর ইসনাদ সহীহ।মুসতাদরিক-ই-হাকিম গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যদি আমি তিনটি জিজ্ঞাস্য বিষয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে নিতাম তবে তা আমার নিকট লালবর্ণের উট পাওয়া অপেক্ষাও পছন্দনীয় হতো। প্রথম হচ্ছে এই যে, তার পরে খলীফা কে হবেন? দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, যেসব লোক যাকাতকে স্বীকার করে বটে কিন্তু বলে-আমরা আপনার নিকট আদায় করবো না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হালাল কি না? তৃতীয় হচ্ছে ‘কালালা’ স্মম্বন্ধে" , অন্য হাদীসে যাকাত আদায় না করার স্থলে সুদের মাসআলার বর্ণনা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত উমার (রাঃ)-এর শেষ যুগে আমি তাকে বলতে শুনেছিঃ কথা ওটাই যা আমি বলেছি। আমি জিজ্ঞেস করি-ওটা কি? তিনি বলেন, (আরবী) তাকেই বলে যার সন্তান না থাকে।”অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ (আরবী)-এর ব্যাপারে আমার ও হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং কথা ছিল ওটাই যা আমি বলছিলাম।” হযরত উমার (রাঃ) সহোদর ভাইদেরকেও বৈপিত্রেয় ভাইদেরকে এক তৃতীয়াংশে অংশীদার করতেন যখন তারা একত্রিত হতো। কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর বিপরীত ছিলেন। তাফসীর-ইইবনে জারীরে রয়েছে যে, মুসলমানদের খলীফা হযরত উমার (রাঃ) একবার দাদার উত্তরাধিকার ও কালালা’র ব্যাপারে এক টুকরো কাগজে কিছু লিখেছিলেন। তারপর তিনি ইসতিখারা (লক্ষণ দেখে শুভাশুভ বিচার) করেন এবং অপেক্ষা করতে থাকেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে থাকেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনার জ্ঞানে যদি এতে মঙ্গল নিহিত থাকে তবে তা আপনি চালু করে দিন।” অতঃপর যখন তাকে আহত করা হয় তখন তিনি ঐ কাগজ খণ্ডকে চেয়ে নিয়ে লিখা উঠিয়ে ফেলেন। জনগণ জানতে পারলো না যে, তাতে কি লিখা ছিল। অতঃপর তিনি নিজেই বলেনঃ “আমি ওতে পিতামহ ও কালালা’র কথা লিখেছিলাম এবং আমি ইসতিখারা করেছিলাম। তারপরে আমার ধারণা হয় যে, তোমরা যার উপরে ছিলে তার উপরেই তোমাদেরকে ছেড়ে দেই।” তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এ ব্যাপারে আমি হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বিরোধিতা করায় লজ্জাবোধ করছি।” হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর উক্তি ছিলঃ ‘কালালা’ ঐ ব্যক্তি যার পিতা ও পুত্র না থাকে। এর উপরেই রয়েছেন জমহুর-ই-সাহাবা (রাঃ), তাবেঈন এবং আইম্মা-ই-দ্বীন। ইমাম চতুষ্টয় ও সপ্ত ধর্মশাস্ত্রবিদেরও এটাই মাযহাব। পবিত্র কুরআনেও এরই প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্যে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও এবং আল্লাহ তা'আলা সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী।” আল্লাহ তা'আলই সবচেয়ে ভাল জানেন।