Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-মায়িদা 5:1 – আল-মায়িদা 5:21

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-মায়িদা 5:1
  2. আল-মায়িদা 5:2
  3. আল-মায়িদা 5:3
  4. আল-মায়িদা 5:4
  5. আল-মায়িদা 5:5
  6. আল-মায়িদা 5:6
  7. আল-মায়িদা 5:7
  8. আল-মায়িদা 5:8
  9. আল-মায়িদা 5:9
  10. আল-মায়িদা 5:10
  11. আল-মায়িদা 5:11
  12. আল-মায়িদা 5:12
  13. আল-মায়িদা 5:13
  14. আল-মায়িদা 5:14
  15. আল-মায়িদা 5:15
  16. আল-মায়িদা 5:16
  17. আল-মায়িদা 5:17
  18. আল-মায়িদা 5:18
  19. আল-মায়িদা 5:19
  20. আল-মায়িদা 5:20
  21. আল-মায়িদা 5:21

আল-মায়িদা 5:1

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একটি হাদীসের উল্লেখ করে বলেছেন যে, আসমা বিনতে ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আযরা নাম্নী উন্ত্রীর লাগাম ধারণ করেছিলাম। তখন হঠাৎ তার উপর সম্পূর্ণ সূরা মায়িদাহ্অবতীর্ণ হয়। এ সূরার ভারে তখন উন্ত্রীর পায়ের উপরিভাগ ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আসেম আল আইওয়াল বর্ণনা করেন যে, আমর তাঁর চাচার নিকট থেকে তাঁর নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তাঁর চাচা একদা রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর সূরা মায়িদাহ অবতীর্ণ হয়। সূরা মায়িদাহর। ভারে তাঁর বাহনের ঘাড় ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আবার আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলে কারীম (সঃ) যখন তাঁর বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন তখন তার উপর সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়, এর ফলে বাহনটি তাকে বহন করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে। তখন তিনি তাঁর বাহন হতে অবতরণ করেন। এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একাই বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে একটু অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা মায়িদাহ' ও সূরা আল-ফাতহ সর্বশেষ সূরা। এরপর ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটা একটা গারীব’ ও ‘হাসান হাদীস। তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা হলোঃ (আরবী) (১১০:১) হাকিম তার মুসতাদরিক’ গ্রন্থে তিরমিযীর বর্ণনার ন্যায় আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কেউই এ হাদীসটিকে তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেননি। হাকিম আরও বর্ণনা করেন যে, যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি একদা হজ্বে গমন করি। এরপর আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে দেখা করি। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি কি সূরা মায়িদাহ্ পড়?' আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। তখন তিনি বললেনঃ “এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ শেষ সূরা। সুতরাং তোমরা তার মাধ্যমে যেসব বিষয় বৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ কর। আর যেগুলোকে অবৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে অবৈধ হিসেবে গ্রহণ কর।” অতঃপর হাকিম এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু হাদীসটিকে তারা তাদের গ্রন্থে স্থান দেননি।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আবদুর রহমান ইবনে মাহদীর সনদের মাধ্যমে মুআবিয়া ইবনে সালেহ হতে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং কিছু বেশী অংশ যোগ করেন। এ বেশী অংশটুকু নিম্নরূপঃ যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন যে, পবিত্র কুরআনই তাঁর চরিত্র।” ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটিকে আবদুর রহমান ইবনে মাহ্দীর সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। ১-২ নং আয়াতের তাফসীর: মা'আন অথবা আউফ হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে অনুরোধ করেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) কথাটি শ্রবণ কর তখন তার জন্যে তোমার কানকে সতর্ক করে দিও। কারণ, হয়তো তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে কোন ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করছেন। আবার যুহরী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ (আরবী) বলে কোন কাজের নির্দেশ দেন তখন তোমরা ঐ কাজ কর। কারণ, উক্ত সম্বোধনের মধ্যে যারা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আল্লাহর নবীও (সঃ) আছেন। আবার খাইসুমা হতে বর্ণিত আছে যে, পবিত্র কুরআনে যে অবস্থায় (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে সেই অবস্থায় পবিত্র তাওরাত গ্রন্থে (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে ইসমাঈল তাঁর সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির মূল রাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত (আরবী) দ্বারা যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত। কারণ, পবিত্র কুরআনে একমাত্র হযরত আলী (রাঃ) ছাড়া অন্যান্য সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-কে কুরআনের কোথাও ভর্সনা করা হয়নি।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি গারীব’। এ হাদীসের মধ্যে কতগুলো অশোভনীয় শব্দ রয়েছে এবং এর সনদ সম্পর্কেও মন্তব্য করার অবকাশ আছে। এ হাদীসের একজন রাবী ঈসা ইবনে রাশেদ সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রঃ) মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তি এবং হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী তাঁর হাদীস মুনকার'। ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত হাদীসের একজন রাবী আলী ইবনে বুজাইমা সম্পর্কে বলেন যে, যদিও তিনি একজন বিশ্বস্ত রাবী, কিন্তু তিনি শিয়া মতাবলম্বী। তার থেকে বর্ণিত এ ধরনের হাদীসের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ থাকায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ হাদীসে উল্লেখ আছে যে, পবিত্র কুরআনে আলী (রাঃ) ছাড়া আর সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। অবশ্য এর দ্বারা পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে আয়াতে সাহাবীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলাপ করার পূর্বে সাদকা’ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন যে, একমাত্র আলী (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করেননি। আর এ সাদকা দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাক পরবর্তীতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন“তোমরা কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলোচনা করার পূর্বে সাদকা দিতে ভয় পাও? যখন তোমরা তা করনি তখন আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”এ আয়াতের দ্বারা যে ভৎর্সনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, কেউ কেউ বলেছেন যে, সাদকা দেয়ার নির্দেশটি মুস্তাহাব ছিল, ওয়াজিব ছিল না। আর তাছাড়া কার্যকরী করার পূর্বেই ততা আয়াতের নির্দেশকে তাদের জন্যে মওকুফ করা হয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, সাহাবীদের কারও নিকট থেকেই এ আয়াতের নির্দেশের বিপরীত কোন কাজ প্রকাশ পায়নি। আর এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে হযরত আলী (রাঃ)-কে কখনই ভৎসনা করা হয়নি বলে রাবী যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়ে মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে সূরা আনফালে যে আয়াতটি আছে তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, যারা মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে মত দিয়েছিলেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই এ আয়াতটি প্রযোজ্য। হযরত উমার (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ তিরস্কার হতে মুক্ত নন। অতএব, পূর্বাপর ঘটনা হতে বুঝা যায় যে, উক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লাহ পাকই ভাল জানেন।মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমর ইবনে হাকামকে যখন নাজরানে পাঠিয়েছিলেন তখন তিনি তাঁকে যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেই চিঠিটি আমি পড়েছি। উক্ত চিঠিটি পরবর্তীকালে আবু বকর ইবনে হাযমের নিকট ছিল। চিঠির প্রথমাংশ নিম্নরূপঃএটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নিকট হতে বর্ণনা-হে ঈমানদারগণ! তোমরা ওয়াদাগুলো পূরণ কর।' এরপর তিনি সূরা মায়িদাহ’র (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর’ (৫৪ ৪) পর্যন্ত লিখেন। আবদুল্লাহ তার পিতা আবু বকর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেই চিঠি যা তিনি আমর ইবনে হাযমকে দিয়েছিলেন। যখন তিনি তাঁকে ইয়ামান বাসীদেরকে জ্ঞান দান, তার শিক্ষাদান এবং সাদকা আদায়ের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি এ চিঠিটি লিখে দিয়েছিলেন। উক্ত চিঠিতে তিনি তাঁকে কতগুলো উপদেশ এবং তাঁর কার্যাবলী সম্বন্ধে কতগুলো নির্দেশ দিয়েছিলেন। চিঠির শুরুতে তিনি লিখেনঃ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে চিঠি।' অতঃপর তিনি সূরা মায়িদাহ্র নিম্নের আয়াত দ্বারা শুরু করেনঃ“হে মুমিনগণ! তোমরা প্রতিজ্ঞাগুলো পূরণ কর। যখন তিনি আমর ইবনে • হাযমকে ইয়ামানে পাঠান তখন তিনি তাকে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করেন। উক্ত অঙ্গীকারনামায় তিনি তাঁকে তাঁর প্রতিটি কাজে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দেন। কারণ আল্লাহ পরহেযগার ও সৎকর্মশীলদের সাথে থাকেন।(আরবী) তাফসীরকারক এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ) এবং আরও অনেকে বলেছেন - শব্দের দ্বারা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে জাবির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে -এর অর্থের ব্যাপারে তাফসীরকারকগণ একমত। তিনি বলেন যে, কোন কিছুর ব্যাপারে পরস্পরের শপথ বা অঙ্গীকারকে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। আলী ইবনে আবু তালহা (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা (আরবী) বা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ ঘোষণা করেছেন, যেসব বিষয় অবশ্যকরণীয় করেছেন এবং যেসব বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে। (আরবী) বলে সাবধান করেছেন, (আরবী) দ্বারা সেসব বিষয়কে বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ এ সম্পর্কে আরও কঠোর ভাষায় বলেনঃ “আল্লাহর সাথে ওয়াদা করার পর যারা উক্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং তিনি যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে বলেছেন তা ছিন্ন করে..........তাদের জন্যে জঘন্য আবাসস্থল রয়েছে। আবার যহহাক (রঃ) (আরবী)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ করেছেন এবং তাঁর কিতাব ও নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের নিকট হতে তিনি বৈধ ও অবৈধ সংক্রান্ত বিভিন্ন আবশ্যকীয় যে কাজগুলো করার ওয়াদা নিয়েছেন (আরবী) দ্বারা সেগুলোকে বুঝায়। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ছয়টি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। (ক) আল্লাহর সাথে ওয়াদা, (খ) শপথ করা, চুক্তি করা, (গ) অংশীদারী সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঘ) ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঙ) বিবাহ বন্ধন এবং (চ) কসম খাওয়া। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, (আরবী) বলতে পাঁচটি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। ওগুলোর একটি হচ্ছে অজ্ঞতার যুগে কৃত চুক্তিনামা। আর অন্যটি হচ্ছে অংশীদারী সংক্রান্ত চুক্তি। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর উক্ত স্থানে অবস্থানকালেও উক্ত বস্তু গ্রহণ করা বা না করার কোন ইখতিয়ার ক্রেতা বা বিক্রেতার থাকে না। এ মতে যারা বিশ্বাসী তারা (আরবী) দ্বারা তাঁদের পক্ষে দলীল গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বলেন যে, এ আয়াতটি উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও চুক্তিটিকে প্রতিষ্ঠিত ও অবশ্যপালনীয় করার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও বস্তু গ্রহণ করা না করার ইখতিয়ারকে অস্বীকার করে। এটাই ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর মত। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে গৃহীত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর একটি হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতার বস্তু গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” সহীহ বুখারীতে অন্যভাবেও হাদীসটি এসেছে। তা নিম্নরূপঃ“যখন দু’জন লোক ক্রয়-বিক্রয় করে তখন বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর (রঃ) মন্তব্য করেন যে, এ হাদীসটি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদনের পরেও উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায় বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ারকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে প্রকাশ্য দলীল। উক্ত ইখতিয়ারের প্রশ্নটি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরে আসে। অতএব এই ইখতিয়ার চুক্তি সম্পাদিত হওয়াকে অস্বীকার করে না, বরং চুক্তিকে আইনগতভাবে কার্যকরী করে। অতএব চুক্তিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে অঙ্গীকারকে পূর্ণ করা। (আরবী) -এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তু বলতে এখানে উট, গরু ও বকরীকে বুঝানো হয়েছে। আবুল হাসান, কাতাদা এবং আরও অনেকের এটাই মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন। যে, আরবদের ভাষা অনুযায়ী চতুষ্পদ জন্তু বলতে এটাই বুঝানো হয়। ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আরও অনেকে এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, যবেহকৃত গাভীর পেটে যদি মৃত বাচ্চা পাওয়া যায় তাহলে ঐ মৃত বাচ্চার গোশত খাওয়া মুবাহ। এ প্রসঙ্গে হাদীসের সুনান গ্রন্থসমূহে বহু হাদীস এসেছে। যেমন আবু দাউদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা উট, গাভী এবং বকরী যবেহ করি। ওগুলোর পেটের মধ্যে কখনও কখনও বাচ্চা পাই। আমরা কি তা ফেলে দেবো, না ভক্ষণ করবো? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে তা খেতে পার। কেননা, তার মাকে যবেহ করাই হচ্ছে তাকেও যবেহ করা।” ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটি একটি হাসান হাদীস। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মাকে যবেহ করাই হচ্ছে বাচ্চাকেও যবেহ করা।” এ হাদীসটিকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) একাই তাঁর হাদীস গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।(আরবী) আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু, রক্ত এবং শূকরের মাংসকে বুঝানো হয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু এবং যে পশুকে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তাকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহই এর সঠিক অর্থ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত। তবে প্রকাশ্যভাবে বুঝা যায় যে, এর দ্বারা (আরবী) (৫:৩)-এ আয়াতের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে , মৃত পশু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, গলা টিপে মারা পশু, প্রহারে মৃত পশু, শিং-এর আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু”। যদিও এগুলো চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভুক্ত তবুও উল্লিখিত কারণে সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে। এ জন্যে আল্লাহ বলেছেনঃ “তবে তোমরা যেগুলোকে যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ সেগুলো হালাল এবং যেগুলোকে মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে সেগুলোও হারাম।” অর্থাৎ উক্ত পশুগুলোকে এজন্যে হারাম করা হয়েছে যে, তাদেরকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না এবং হালাল পশুর সাথে আর যুক্ত করা যাবে না। আর এ কারণেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তোমদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলো হারাম হওয়া সম্পর্কে তোমাদের উপর কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলো হারাম।” অর্থাৎ এসব পশুর মধ্য হতে বিশেষ অবস্থায় কোন কোন পশুর হারাম হওয়া সংক্রান্ত আয়াত অতিসত্বর তোমাদের উপর অবতীর্ণ হবে।(আরবী) কোন কোন ব্যাকরণবিদের মতে এ বাক্যটি (আরবী) হওয়ার কারণে হালাতে নাসাবীতে আছে। আনআম বলতে উট, গরু, ছাগল প্রভৃতি গৃহপালিত পশু এবং হরিণ, গাভী, গাধা প্রভৃতি বন্য পশুকে বুঝানো হয়। আর গৃহপালিত হালাল পশুগুলোর মধ্যে উক্ত পশুগুলোকে এবং বন্য হালাল পশুগুলোর মধ্য হতে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করা পশুগুলোকে হারাম বলে পৃথক করা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারক বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-আমরা তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি। তবে জন্তুগুলো হতে যেগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সেগুলো হালাল নয়। আর এ নির্দেশ ঐ ব্যক্তির জন্যেই প্রযোজ্য যে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম বলে গ্রহণ করেছে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ “তবে যে মৃতপ্রায় অথচ অন্যায়কারী ও সীমালংঘনকারী নয়, তার জন্যে অবৈধ জানোয়ার খাওয়া হালাল। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু”। অর্থাৎ উক্ত আয়াতের ন্যায় এখানেও আল্লাহ বলেনঃ আমরা যেভাবে সর্বাবস্থায় চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি, ঠিক সেভাবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম মনে কর। কারণ আল্লাহ পাকই এ নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি যা করা বা না করার নির্দেশ দেন সেগুলোর সবকিছুই হিকমতে পরিপূর্ণ। এজন্যেই তিনি বলেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ইচ্ছামত হুকুম করেন।(আরবী) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের দ্বারা হজ্বের নিদর্শনাবলীকে বুঝানো হয়েছে। আর মুজাহিদ বলেন যে, এর দ্বারা সাফা, মারওয়া, কুরবানীর পশু ও উটকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ পাক যে সমস্ত বস্তুকে হারাম করেছেন সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ কর্তৃক হারাম ঘোষিত বস্তুগুলোকে হালাল মনে করো না। এ জন্যে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিষিদ্ধ মাসগুলোকেও তোমরা অবমাননা করো না।” অর্থাৎ মাসগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর এবং তোমরা এ মাসে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার মত নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার কর। যেমন অল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বল- ঐ মাসে যুদ্ধ করা বড় গুনাহ। আল্লাহ পাক অন্যত্র আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা ১২টি।” সহীহ বুখারীতে আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার দিন আল্লাহ যামানাকে যেরূপ সৃষ্টি করেছিলেন এখন তা সেরূপে ফিরে এসেছে। ১২ মাসে একটি বছর হয়। এর মধ্যে ৪টি মাস নিষিদ্ধ। তার মধ্যে ৩টি মাস পরস্পর সংযুক্ত। যেমন যুলকাদা, যুলহাজ্বা এবং মুহাররম। আর অন্যটি হলো মুজার গোত্র কর্তৃক কথিত রজব মাস। এ মাসটি জমাদিউস্সানী এবং শাবান মাসের মাঝখানে অবস্থিত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ মাসগুলোর এ জাতীয় সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ “তোমরা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করাকে বৈধ মনে করো না।” মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, আবদুল করীম ইবনে মালিক আলজারী এবং ইবনে জারীরও এ মতই পোষণ করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, আয়াতটির নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে এবং উক্ত নিষিদ্ধ মাসগুলোতে কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রথমে যুদ্ধ ঘোষণা করা এখন বৈধ। কুরআনের নিম্নের আয়াতটি তাদের দলীলঃ“যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যায় তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানে পাও সেখানেই হত্যা কর।" এর অর্থ এই যে, মাসগুলোর অতীত সম্মান যখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তখন তোমরা কাফিরদের সাথে সব সময় জিহাদ করতে থাক। এটা এখন তোমাদের জন্যে বৈধ হয়ে গেল। পবিত্র কুরআন এরপর আর কোন মাসকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেনি। ইমাম আবু জাফর এ পর্যায়ে আলেমদের ইজমার উল্লেখ করে বলেন যে, আল্লাহ পাক যে কোন সময় এবং যে কোন মাসে জিহাদ করা বৈধ রেখেছেন। তিনি আলেমদের আর একটি ইজমার উল্লেখ করে বলেছেন যে, যদি কোন মুশরিক হারাম শরীফের যাবতীয় বৃক্ষের ছাল দ্বারা নিজেকে আবৃত করে এবং পূর্ব থেকে কোন মুসলমান তাকে নিরাপত্তা প্রদান না করে থাকে তবে সে নিরাপত্তা পাবে না। এ বিষয়টি এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণন করা সম্ভব নয়।(আরবী) অর্থাৎ তোমরা কা'বা গৃহের দিকে কুরবানীর পশু পাঠানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এতে আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়। আর তোমরা কুরবানীর পশুর গলায় কালাদা (চেইন) পরানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এর দ্বারা এ পশুগুলোকে অন্যান্য পশু হতে পৃথক করা হয়। আর এর দ্বারা এটাও প্রকাশ পায় যে, পশুগুলো কুরবানীর উদ্দেশ্যে কা'বা গৃহে পাঠানো হয়েছে। ফলে মানুষ এ পশুগুলোর ক্ষতি করা হতে বিরত থাকে। আর পশুগুলোকে দেখে অন্যান্যরা এ জাতীয় পশু কুরবানী পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর যে ব্যক্তি অন্যকে কুরবানী করার প্রতি উৎসাহদান করে, তাকে তার অনুসরণকারীর অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়। অথচ অনুসরণকারীর পুরষ্কার কোন অংশেই কম করা হয় না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের সময় যুলহুলাইফাতে রাত্রি যাপন করেন। এ যুলহুলাইফাকে ওয়াদিউল আকীকও বলা হয়। অতঃপর তিনি সকাল বেলা তার ৯ জন স্ত্রীর নিকট গমন করেন এবং গোসল শেষে খোশবু ব্যবহার করেন ও দু'রাকআত নফল নামায আদায় করেন। অতঃপর কুরবানীর পশুর চুটি ক্ষত করেন এবং ওর গলায় কালাদা (চেইন) পরান। এরপর হজ্ব এবং উমরার জন্যে তিনি ইহরাম বাঁধেন। তাঁর কুরবানীর পশুর সংখ্যা ছিল ষাটটির অধিক। তাদের গায়ের রং ও শারীরিক গঠন ছিল অতি উত্তম। যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তবে সেটা তার অন্তরের তাকওয়া প্রকাশ করে। কেউ কেউ সম্মান প্রদর্শন শব্দটির দ্বারা কুরবানীর পশুকে উত্তম স্থানে রাখা, ভাল খাওয়ানো এবং তাকে মোটা তাজা করানোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে কুরবানীর পশুর চোখ ও কানকে ভালভাবে লক্ষ্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন।" মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেনঃ (আরবী) দ্বারা জাহেলিয়া যুগের লোকদের মত কালাদা ব্যবহার করাকে হালাল মনে করো না। কারণ জাহেলিয়া যুগে হারাম শরীফের বাইরে বসবাসকারী আরবরা যখন নিষিদ্ধ মাস ব্যতীত অন্য মাসে তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ পশম ও চুল ব্যবহার করতো। আর হারাম শরীফের মুশকির অধিবাসীগণ যখন তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ হারাম শরীফের গাছের ছাল ব্যবহার করতো। এর ফলে লোকেরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করতো। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মায়িদাহ্র দু’টি আয়াত মানসূখ হয়ে গেছে। একটি কালাদার আয়াত, আর অপরটি হচ্ছে (আরবী) (৫:৪২)-এ আয়াতটি। ইবনে আউফ (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম- সূরা মায়িদাহ্র কি কোন অংশ মানসূখ বা রহিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন :“না।” আতা (রঃ) বলেন যে, হারাম শরীফের অধিবাসীগণ বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করতো। ওটা দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতো, ফলে আল্লাহ পাক হারাম শরীফের বৃক্ষ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ ও মত পোষণ করেন।(আরবী) -এ অংশের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে যারা রওয়ানা হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করা হালাল মনে করো না। কারণ, ঐ ঘরে যে ব্যক্তি প্রবেশ করে সে শত্রু হতে নিরাপত্তা লাভ করে। এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর দয়া ও সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়, তোমরা তাকে বাধা দিও না, বিরত রেখো না এবং কোন প্রকার কুৎসা রটনা করো না। কাতাদা, মুজাহিদ, আতা প্রমুখ মুফাসিরদের মতে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণের অর্থ ব্যবসা করা। পবিত্র কুরআনের পূর্ববর্তী আয়াত (আরবী) (২:১৯৮) দ্বারাও ব্যবসাকে বুঝানো হয়েছে। আর শব্দের ব্যখ্যায়-ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ্বে গমনকারী ব্যক্তিগণ হজ্বের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে থাকেন। ইকরামা ও ইবনে জারীর প্রমুখ তাফসীরকারকগণ বলেন যে, এ আয়াতটি হাতিম ইবনে হিন্দ আল বাকরীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। একদা সে মদীনার একটি চারণভূমি লুণ্ঠন করে এবং পরবর্তী বছর সে বায়তুল্লাহ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এ সময় কোন কোন সাহাবী পথিমধ্যে তাকে বাধা দেয়ার মনস্থ করলে আল্লাহ পাক এ আয়াত নাযিল করেন। ইবনে জারীর আলেমদের ইজমার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, কোন মুশরিক ব্যক্তিকে যদি কোন মুসলমান কর্তৃক নিরাপত্তা প্রদান করা না হয় তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে। যদিও সে বায়তুল্লাহ বা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কেননা, উল্লিখিত আয়াতের নির্দেশ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি নাফরমানী, শিরক ও কুফরী করার উদ্দেশ্যে কাবা শরীফের দিকে রওয়ানা হয় তাকেও বাধা দেয়া বৈধ। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র। অতএব তারা যেন এ বছরের পর আর কখনও কা'বা গৃহের নিকটবর্তী না হয়।” এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবম হিজরীতে যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে আমীরুল ইজ্ব হিসেবে পাঠান তখন হযরত আলী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান এবং তাকে এ ঘোষণা করতে। নির্দেশ দেন যে, মুসলমান ও মুশরিক একে অপর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, এ বছরের পর যেন কোন মুশরিক হজ্ব করতে না আসে এবং কোন ব্যক্তি যেন উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, প্রথমে ঈমানদার ও মুশরিকগণ একত্রে হজ্ব করতো এবং আল্লাহ পাক কাফিরদেরকে বাধা প্রদান না করতে ঈমানদারদের প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে (আরবী) (৯:২৮)-এ, আয়াত দ্বারা কাফিরদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে একমাত্র তারাই আল্লাহর ঘরকে আবাদ করবে।” অতএব উক্ত আয়াতগুলো দ্বারা মুশরিকদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাতাদা বর্ণনা করেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। অজ্ঞতার যুগে যখন কোন ব্যক্তি হজ্বের উদ্দেশ্যে তার গৃহ হতে বের হতো তখন সে বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা পরিধান করতো। ফলে কেউ তাকে কষ্ট দিতো না। আবার ঘরে ফেরার সময় চুলের তৈরী কালাদা পরিধান করতো। এর ফলে কোন লোক তাকে কষ্ট দিতো না। ঐ সময় মুশরিকদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করা হতো না। আর মুসলমানদেরকে নিষিদ্ধ মাসসমূহে এবং কা'বা গৃহের আশে পাশে যুদ্ধ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অতঃপর এ আয়াতের নির্দেশকে আল্লাহর অপর আয়াত (আরবী) (৯:৫) দ্বারা মানসূখ করা হয়েছে। ইবনে জারীর এ মত পোষণ করেন যে, (আরবী) দ্বারা যদি মুশরিকরা হারামেরু বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করে তবে তোমরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান কর’- এটাই বুঝানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, এ জন্যেই যে ব্যক্তি এ নির্দেশের অবমাননা করতো আরবরা তাকে সর্বদাই লজ্জা দিতো। তিনি এ পর্যায়ে হত্যাকারীদের প্রতি একজন কবির ব্যাঙ্গোক্তির উল্লেখ করেছেন।(আরবী)-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, যখন তোমরা তোমাদের ইহরাম খুলে ফেল এবং মুক্ত হয়ে যাও তখন তোমাদের জন্যে পূর্বে ইহরাম অবস্থায় যা হারাম ছিল এখন তা হালাল করা হলো। অর্থাৎ এখন শিকার করা হালাল ও হালাল হওয়ার এ নির্দেশটি অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর আবার বৈধ ঘোষিত হয়েছে। আর এ ব্যাপারে সঠিক মত এই যে, কোন বস্তু অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর বৈধ ঘোষিত হলে তা অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বাবস্থা (বৈধতা) ফিরে পাবে। সুতরাং পূর্বে যা ওয়াজিব ছিল পরে তা ওয়াজিব হবে, মুস্তাহাব মুস্তাহাব হবে এবং মুবাহ মুবাহ হবে। কারও মতে নির্দেশটি শুধু ওয়াজিবের জন্যে এবং কারও মতে শুধু মুবাহ কাজের জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু এ উভয় মতেরই বিপক্ষে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট আয়াত রয়েছে। সুতরাং আমরা যা বর্ণনা করেছি সেটাই সঠিক মত। আর এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন উসুলবিদও এ মত পোষণ করেন।(আরবী) তাফসীরকারক এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ যে জাতি তোমাদেরকে হুদায়বিয়ার বছর কা'বা গৃহে যেতে বাধা দিয়েছিল, তোমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম লংঘন করো না, বরং আল্লাহ তোমাদেরকে যেভাবে প্রত্যেকের সাথে ন্যায় বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন কর। আর পবিত্র কুরআনের আর একটি আয়াতও এ অর্থ বহন করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ কোন জাতির শত্রুতা তোমাদেরকে যেন ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে, বরং তোমরা ন্যায় বিচার কর। আর এটাই তাকওয়ার অতি নিকটবর্তী।' অর্থাৎ কোন সম্প্রদায়ের হিংসা-বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে। কারণ, যে ন্যায় বিচার করা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব, ওটা যে কোন অবস্থায়ই প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নাফরমানী করে তবে তোমার উচিত হবে তার ব্যাপারে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ করা। ন্যায়-নীতির উপরই আসমান-যমীন প্রতিষ্ঠিত ইবনে আবি হাতিম যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ যখন মুশরিকগণ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হুদায়বিয়া প্রান্তরে কষ্টকর অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন তখন পূর্বাঞ্চলীয় একদল মুশরিক কাবা ঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।এমতাবস্থায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমরা এ লোকগুলোকে কা'বা গৃহে যেতে বাধা দেবো যেমন তাদের সাথীরা আমাদেরকে বাধা দিয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াতটি নাযিল করেন। এখানে শব্দ দ্বারা হিংসা-বিদ্বেষকে বুঝানো হয়েছে। এটাই ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্যদের মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কোন কোন আরব (আরবী)-এর (আরবী) কে (আরবী) এর পরিবর্তে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন এবং আরবী কবিতায়ও এ জাতীয় পঠনের রীতি দেখা যায়। অবশ্য কোন কারী এভাবে পড়েছেন কি-না তা আমাদের জানা নেই।(আরবী) আল্লাহ পাক এ আয়াতের দ্বারা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে এবং খারাপ কাজ পরিহার করে নৈকট্য ও পরহেযগারী অর্জন করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে শরীয়ত পরিপন্থী কাজ, পাপ কাজ এবং অবৈধ কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে নিষেধ করছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ যে কাজ করতে আদেশ করেছেন তা পরিহার করাকেই পাপ কাজ বলা হয় এবং (আরবী) বা সীমালংঘন করার দ্বারা ধৈর্যের নির্দষ্ট সীমা অতিক্রম করা এবং নিজের ও অন্যের ব্যাপারে অবশ্যকরণীয় কাজের সীমালংঘন করাকেই বুঝানো হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর যদিও সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত হয়।” তখন কোন কোন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অত্যাচারিত ভাইকে সাহায্য করার অর্থ তো আমরা বুঝলাম, কিন্তু অত্যাচারী ভাইকে কি করে আমরা সাহায্য করবো?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বাধা প্রদান কর ও নিষেধ কর। আর এটাই তাকে সাহায্য করা হবে।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) একজন সাহাবী হতে বর্ণনা করেন যে, যে ঈমানদার ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করে সেই ব্যক্তি ঐ ঈমানদার ব্যক্তি হতে অধিক প্রতিদান পাবে যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টও সহ্য করে না। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে অন্য একটি সনদেও এসেছে। ইমাম তিরযিমীও (রঃ) হাদীসটিকে অন্য আর একটি সনদে তাঁর গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। আবু বকর আল বাযযার তাঁর হাদীস গ্রন্থে আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সকাজের প্রতি পথ-প্রদর্শন করে সে সকর্মকারীর ন্যায় প্রতিদান পাবে।” ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসের অনুরূপ আর একটি সহীহ হাদীস আছে। তা হচ্ছে- “যে ব্যক্তি মানুষকে সৎপথে আহ্বান করে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ সৎপথ যত ব্যক্তি অনুসরণ করবে তাদের সকলের প্রতিদানের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হবে। অথচ এ ব্যাপারে সৎপথ অনুসরণকারীদের প্রতিদান কমানো হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানুষকে অসৎ পথে আহ্বান করে, তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ অসৎ পথ যত লোক অনুসরণ করবে তাদের সকলের পাপের অনুরূপ পাপ প্রদান করা হবে। অথচ এ ব্যাপারে অসৎ পথ অনুসরণকারীদের পাপ কোন অংশে কমানো হবে না।" ইমাম তিবরানী আবুল হাসান ইবনে সাখার হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে চলাফেরা করে, অথচ সে জানে যে, ঐ ব্যক্তি একজন অত্যাচারী, তাহলে সে ইসলাম হতে বহিস্কৃত বলে গণ্য হবে।”

আল-মায়িদা 5:2

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একটি হাদীসের উল্লেখ করে বলেছেন যে, আসমা বিনতে ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আযরা নাম্নী উন্ত্রীর লাগাম ধারণ করেছিলাম। তখন হঠাৎ তার উপর সম্পূর্ণ সূরা মায়িদাহ্অবতীর্ণ হয়। এ সূরার ভারে তখন উন্ত্রীর পায়ের উপরিভাগ ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আসেম আল আইওয়াল বর্ণনা করেন যে, আমর তাঁর চাচার নিকট থেকে তাঁর নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তাঁর চাচা একদা রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর সূরা মায়িদাহ অবতীর্ণ হয়। সূরা মায়িদাহর। ভারে তাঁর বাহনের ঘাড় ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আবার আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলে কারীম (সঃ) যখন তাঁর বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন তখন তার উপর সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়, এর ফলে বাহনটি তাকে বহন করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে। তখন তিনি তাঁর বাহন হতে অবতরণ করেন। এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একাই বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে একটু অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা মায়িদাহ' ও সূরা আল-ফাতহ সর্বশেষ সূরা। এরপর ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটা একটা গারীব’ ও ‘হাসান হাদীস। তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা হলোঃ (আরবী) (১১০:১) হাকিম তার মুসতাদরিক’ গ্রন্থে তিরমিযীর বর্ণনার ন্যায় আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কেউই এ হাদীসটিকে তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেননি। হাকিম আরও বর্ণনা করেন যে, যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি একদা হজ্বে গমন করি। এরপর আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে দেখা করি। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি কি সূরা মায়িদাহ্ পড়?' আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। তখন তিনি বললেনঃ “এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ শেষ সূরা। সুতরাং তোমরা তার মাধ্যমে যেসব বিষয় বৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ কর। আর যেগুলোকে অবৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে অবৈধ হিসেবে গ্রহণ কর।” অতঃপর হাকিম এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু হাদীসটিকে তারা তাদের গ্রন্থে স্থান দেননি।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আবদুর রহমান ইবনে মাহদীর সনদের মাধ্যমে মুআবিয়া ইবনে সালেহ হতে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং কিছু বেশী অংশ যোগ করেন। এ বেশী অংশটুকু নিম্নরূপঃ যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন যে, পবিত্র কুরআনই তাঁর চরিত্র।” ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটিকে আবদুর রহমান ইবনে মাহ্দীর সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। ১-২ নং আয়াতের তাফসীর: মা'আন অথবা আউফ হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে অনুরোধ করেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) কথাটি শ্রবণ কর তখন তার জন্যে তোমার কানকে সতর্ক করে দিও। কারণ, হয়তো তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে কোন ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করছেন। আবার যুহরী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ (আরবী) বলে কোন কাজের নির্দেশ দেন তখন তোমরা ঐ কাজ কর। কারণ, উক্ত সম্বোধনের মধ্যে যারা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আল্লাহর নবীও (সঃ) আছেন। আবার খাইসুমা হতে বর্ণিত আছে যে, পবিত্র কুরআনে যে অবস্থায় (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে সেই অবস্থায় পবিত্র তাওরাত গ্রন্থে (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে ইসমাঈল তাঁর সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির মূল রাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত (আরবী) দ্বারা যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত। কারণ, পবিত্র কুরআনে একমাত্র হযরত আলী (রাঃ) ছাড়া অন্যান্য সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-কে কুরআনের কোথাও ভর্সনা করা হয়নি।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি গারীব’। এ হাদীসের মধ্যে কতগুলো অশোভনীয় শব্দ রয়েছে এবং এর সনদ সম্পর্কেও মন্তব্য করার অবকাশ আছে। এ হাদীসের একজন রাবী ঈসা ইবনে রাশেদ সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রঃ) মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তি এবং হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী তাঁর হাদীস মুনকার'। ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত হাদীসের একজন রাবী আলী ইবনে বুজাইমা সম্পর্কে বলেন যে, যদিও তিনি একজন বিশ্বস্ত রাবী, কিন্তু তিনি শিয়া মতাবলম্বী। তার থেকে বর্ণিত এ ধরনের হাদীসের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ থাকায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ হাদীসে উল্লেখ আছে যে, পবিত্র কুরআনে আলী (রাঃ) ছাড়া আর সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। অবশ্য এর দ্বারা পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে আয়াতে সাহাবীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলাপ করার পূর্বে সাদকা’ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন যে, একমাত্র আলী (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করেননি। আর এ সাদকা দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাক পরবর্তীতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন“তোমরা কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলোচনা করার পূর্বে সাদকা দিতে ভয় পাও? যখন তোমরা তা করনি তখন আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”এ আয়াতের দ্বারা যে ভৎর্সনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, কেউ কেউ বলেছেন যে, সাদকা দেয়ার নির্দেশটি মুস্তাহাব ছিল, ওয়াজিব ছিল না। আর তাছাড়া কার্যকরী করার পূর্বেই ততা আয়াতের নির্দেশকে তাদের জন্যে মওকুফ করা হয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, সাহাবীদের কারও নিকট থেকেই এ আয়াতের নির্দেশের বিপরীত কোন কাজ প্রকাশ পায়নি। আর এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে হযরত আলী (রাঃ)-কে কখনই ভৎসনা করা হয়নি বলে রাবী যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়ে মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে সূরা আনফালে যে আয়াতটি আছে তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, যারা মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে মত দিয়েছিলেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই এ আয়াতটি প্রযোজ্য। হযরত উমার (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ তিরস্কার হতে মুক্ত নন। অতএব, পূর্বাপর ঘটনা হতে বুঝা যায় যে, উক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লাহ পাকই ভাল জানেন।মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমর ইবনে হাকামকে যখন নাজরানে পাঠিয়েছিলেন তখন তিনি তাঁকে যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেই চিঠিটি আমি পড়েছি। উক্ত চিঠিটি পরবর্তীকালে আবু বকর ইবনে হাযমের নিকট ছিল। চিঠির প্রথমাংশ নিম্নরূপঃএটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নিকট হতে বর্ণনা-হে ঈমানদারগণ! তোমরা ওয়াদাগুলো পূরণ কর।' এরপর তিনি সূরা মায়িদাহ’র (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর’ (৫৪ ৪) পর্যন্ত লিখেন। আবদুল্লাহ তার পিতা আবু বকর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেই চিঠি যা তিনি আমর ইবনে হাযমকে দিয়েছিলেন। যখন তিনি তাঁকে ইয়ামান বাসীদেরকে জ্ঞান দান, তার শিক্ষাদান এবং সাদকা আদায়ের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি এ চিঠিটি লিখে দিয়েছিলেন। উক্ত চিঠিতে তিনি তাঁকে কতগুলো উপদেশ এবং তাঁর কার্যাবলী সম্বন্ধে কতগুলো নির্দেশ দিয়েছিলেন। চিঠির শুরুতে তিনি লিখেনঃ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে চিঠি।' অতঃপর তিনি সূরা মায়িদাহ্র নিম্নের আয়াত দ্বারা শুরু করেনঃ“হে মুমিনগণ! তোমরা প্রতিজ্ঞাগুলো পূরণ কর। যখন তিনি আমর ইবনে • হাযমকে ইয়ামানে পাঠান তখন তিনি তাকে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করেন। উক্ত অঙ্গীকারনামায় তিনি তাঁকে তাঁর প্রতিটি কাজে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দেন। কারণ আল্লাহ পরহেযগার ও সৎকর্মশীলদের সাথে থাকেন।(আরবী) তাফসীরকারক এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ) এবং আরও অনেকে বলেছেন - শব্দের দ্বারা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে জাবির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে -এর অর্থের ব্যাপারে তাফসীরকারকগণ একমত। তিনি বলেন যে, কোন কিছুর ব্যাপারে পরস্পরের শপথ বা অঙ্গীকারকে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। আলী ইবনে আবু তালহা (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা (আরবী) বা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ ঘোষণা করেছেন, যেসব বিষয় অবশ্যকরণীয় করেছেন এবং যেসব বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে। (আরবী) বলে সাবধান করেছেন, (আরবী) দ্বারা সেসব বিষয়কে বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ এ সম্পর্কে আরও কঠোর ভাষায় বলেনঃ “আল্লাহর সাথে ওয়াদা করার পর যারা উক্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং তিনি যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে বলেছেন তা ছিন্ন করে..........তাদের জন্যে জঘন্য আবাসস্থল রয়েছে। আবার যহহাক (রঃ) (আরবী)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ করেছেন এবং তাঁর কিতাব ও নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের নিকট হতে তিনি বৈধ ও অবৈধ সংক্রান্ত বিভিন্ন আবশ্যকীয় যে কাজগুলো করার ওয়াদা নিয়েছেন (আরবী) দ্বারা সেগুলোকে বুঝায়। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ছয়টি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। (ক) আল্লাহর সাথে ওয়াদা, (খ) শপথ করা, চুক্তি করা, (গ) অংশীদারী সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঘ) ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঙ) বিবাহ বন্ধন এবং (চ) কসম খাওয়া। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, (আরবী) বলতে পাঁচটি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। ওগুলোর একটি হচ্ছে অজ্ঞতার যুগে কৃত চুক্তিনামা। আর অন্যটি হচ্ছে অংশীদারী সংক্রান্ত চুক্তি। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর উক্ত স্থানে অবস্থানকালেও উক্ত বস্তু গ্রহণ করা বা না করার কোন ইখতিয়ার ক্রেতা বা বিক্রেতার থাকে না। এ মতে যারা বিশ্বাসী তারা (আরবী) দ্বারা তাঁদের পক্ষে দলীল গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বলেন যে, এ আয়াতটি উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও চুক্তিটিকে প্রতিষ্ঠিত ও অবশ্যপালনীয় করার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও বস্তু গ্রহণ করা না করার ইখতিয়ারকে অস্বীকার করে। এটাই ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর মত। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে গৃহীত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর একটি হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতার বস্তু গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” সহীহ বুখারীতে অন্যভাবেও হাদীসটি এসেছে। তা নিম্নরূপঃ“যখন দু’জন লোক ক্রয়-বিক্রয় করে তখন বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর (রঃ) মন্তব্য করেন যে, এ হাদীসটি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদনের পরেও উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায় বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ারকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে প্রকাশ্য দলীল। উক্ত ইখতিয়ারের প্রশ্নটি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরে আসে। অতএব এই ইখতিয়ার চুক্তি সম্পাদিত হওয়াকে অস্বীকার করে না, বরং চুক্তিকে আইনগতভাবে কার্যকরী করে। অতএব চুক্তিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে অঙ্গীকারকে পূর্ণ করা। (আরবী) -এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তু বলতে এখানে উট, গরু ও বকরীকে বুঝানো হয়েছে। আবুল হাসান, কাতাদা এবং আরও অনেকের এটাই মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন। যে, আরবদের ভাষা অনুযায়ী চতুষ্পদ জন্তু বলতে এটাই বুঝানো হয়। ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আরও অনেকে এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, যবেহকৃত গাভীর পেটে যদি মৃত বাচ্চা পাওয়া যায় তাহলে ঐ মৃত বাচ্চার গোশত খাওয়া মুবাহ। এ প্রসঙ্গে হাদীসের সুনান গ্রন্থসমূহে বহু হাদীস এসেছে। যেমন আবু দাউদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা উট, গাভী এবং বকরী যবেহ করি। ওগুলোর পেটের মধ্যে কখনও কখনও বাচ্চা পাই। আমরা কি তা ফেলে দেবো, না ভক্ষণ করবো? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে তা খেতে পার। কেননা, তার মাকে যবেহ করাই হচ্ছে তাকেও যবেহ করা।” ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটি একটি হাসান হাদীস। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মাকে যবেহ করাই হচ্ছে বাচ্চাকেও যবেহ করা।” এ হাদীসটিকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) একাই তাঁর হাদীস গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।(আরবী) আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু, রক্ত এবং শূকরের মাংসকে বুঝানো হয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু এবং যে পশুকে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তাকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহই এর সঠিক অর্থ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত। তবে প্রকাশ্যভাবে বুঝা যায় যে, এর দ্বারা (আরবী) (৫:৩)-এ আয়াতের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে , মৃত পশু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, গলা টিপে মারা পশু, প্রহারে মৃত পশু, শিং-এর আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু”। যদিও এগুলো চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভুক্ত তবুও উল্লিখিত কারণে সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে। এ জন্যে আল্লাহ বলেছেনঃ “তবে তোমরা যেগুলোকে যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ সেগুলো হালাল এবং যেগুলোকে মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে সেগুলোও হারাম।” অর্থাৎ উক্ত পশুগুলোকে এজন্যে হারাম করা হয়েছে যে, তাদেরকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না এবং হালাল পশুর সাথে আর যুক্ত করা যাবে না। আর এ কারণেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তোমদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলো হারাম হওয়া সম্পর্কে তোমাদের উপর কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলো হারাম।” অর্থাৎ এসব পশুর মধ্য হতে বিশেষ অবস্থায় কোন কোন পশুর হারাম হওয়া সংক্রান্ত আয়াত অতিসত্বর তোমাদের উপর অবতীর্ণ হবে।(আরবী) কোন কোন ব্যাকরণবিদের মতে এ বাক্যটি (আরবী) হওয়ার কারণে হালাতে নাসাবীতে আছে। আনআম বলতে উট, গরু, ছাগল প্রভৃতি গৃহপালিত পশু এবং হরিণ, গাভী, গাধা প্রভৃতি বন্য পশুকে বুঝানো হয়। আর গৃহপালিত হালাল পশুগুলোর মধ্যে উক্ত পশুগুলোকে এবং বন্য হালাল পশুগুলোর মধ্য হতে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করা পশুগুলোকে হারাম বলে পৃথক করা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারক বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-আমরা তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি। তবে জন্তুগুলো হতে যেগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সেগুলো হালাল নয়। আর এ নির্দেশ ঐ ব্যক্তির জন্যেই প্রযোজ্য যে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম বলে গ্রহণ করেছে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ “তবে যে মৃতপ্রায় অথচ অন্যায়কারী ও সীমালংঘনকারী নয়, তার জন্যে অবৈধ জানোয়ার খাওয়া হালাল। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু”। অর্থাৎ উক্ত আয়াতের ন্যায় এখানেও আল্লাহ বলেনঃ আমরা যেভাবে সর্বাবস্থায় চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি, ঠিক সেভাবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম মনে কর। কারণ আল্লাহ পাকই এ নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি যা করা বা না করার নির্দেশ দেন সেগুলোর সবকিছুই হিকমতে পরিপূর্ণ। এজন্যেই তিনি বলেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ইচ্ছামত হুকুম করেন।(আরবী) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের দ্বারা হজ্বের নিদর্শনাবলীকে বুঝানো হয়েছে। আর মুজাহিদ বলেন যে, এর দ্বারা সাফা, মারওয়া, কুরবানীর পশু ও উটকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ পাক যে সমস্ত বস্তুকে হারাম করেছেন সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ কর্তৃক হারাম ঘোষিত বস্তুগুলোকে হালাল মনে করো না। এ জন্যে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিষিদ্ধ মাসগুলোকেও তোমরা অবমাননা করো না।” অর্থাৎ মাসগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর এবং তোমরা এ মাসে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার মত নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার কর। যেমন অল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বল- ঐ মাসে যুদ্ধ করা বড় গুনাহ। আল্লাহ পাক অন্যত্র আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা ১২টি।” সহীহ বুখারীতে আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার দিন আল্লাহ যামানাকে যেরূপ সৃষ্টি করেছিলেন এখন তা সেরূপে ফিরে এসেছে। ১২ মাসে একটি বছর হয়। এর মধ্যে ৪টি মাস নিষিদ্ধ। তার মধ্যে ৩টি মাস পরস্পর সংযুক্ত। যেমন যুলকাদা, যুলহাজ্বা এবং মুহাররম। আর অন্যটি হলো মুজার গোত্র কর্তৃক কথিত রজব মাস। এ মাসটি জমাদিউস্সানী এবং শাবান মাসের মাঝখানে অবস্থিত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ মাসগুলোর এ জাতীয় সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ “তোমরা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করাকে বৈধ মনে করো না।” মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, আবদুল করীম ইবনে মালিক আলজারী এবং ইবনে জারীরও এ মতই পোষণ করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, আয়াতটির নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে এবং উক্ত নিষিদ্ধ মাসগুলোতে কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রথমে যুদ্ধ ঘোষণা করা এখন বৈধ। কুরআনের নিম্নের আয়াতটি তাদের দলীলঃ“যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যায় তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানে পাও সেখানেই হত্যা কর।" এর অর্থ এই যে, মাসগুলোর অতীত সম্মান যখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তখন তোমরা কাফিরদের সাথে সব সময় জিহাদ করতে থাক। এটা এখন তোমাদের জন্যে বৈধ হয়ে গেল। পবিত্র কুরআন এরপর আর কোন মাসকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেনি। ইমাম আবু জাফর এ পর্যায়ে আলেমদের ইজমার উল্লেখ করে বলেন যে, আল্লাহ পাক যে কোন সময় এবং যে কোন মাসে জিহাদ করা বৈধ রেখেছেন। তিনি আলেমদের আর একটি ইজমার উল্লেখ করে বলেছেন যে, যদি কোন মুশরিক হারাম শরীফের যাবতীয় বৃক্ষের ছাল দ্বারা নিজেকে আবৃত করে এবং পূর্ব থেকে কোন মুসলমান তাকে নিরাপত্তা প্রদান না করে থাকে তবে সে নিরাপত্তা পাবে না। এ বিষয়টি এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণন করা সম্ভব নয়।(আরবী) অর্থাৎ তোমরা কা'বা গৃহের দিকে কুরবানীর পশু পাঠানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এতে আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়। আর তোমরা কুরবানীর পশুর গলায় কালাদা (চেইন) পরানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এর দ্বারা এ পশুগুলোকে অন্যান্য পশু হতে পৃথক করা হয়। আর এর দ্বারা এটাও প্রকাশ পায় যে, পশুগুলো কুরবানীর উদ্দেশ্যে কা'বা গৃহে পাঠানো হয়েছে। ফলে মানুষ এ পশুগুলোর ক্ষতি করা হতে বিরত থাকে। আর পশুগুলোকে দেখে অন্যান্যরা এ জাতীয় পশু কুরবানী পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর যে ব্যক্তি অন্যকে কুরবানী করার প্রতি উৎসাহদান করে, তাকে তার অনুসরণকারীর অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়। অথচ অনুসরণকারীর পুরষ্কার কোন অংশেই কম করা হয় না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের সময় যুলহুলাইফাতে রাত্রি যাপন করেন। এ যুলহুলাইফাকে ওয়াদিউল আকীকও বলা হয়। অতঃপর তিনি সকাল বেলা তার ৯ জন স্ত্রীর নিকট গমন করেন এবং গোসল শেষে খোশবু ব্যবহার করেন ও দু'রাকআত নফল নামায আদায় করেন। অতঃপর কুরবানীর পশুর চুটি ক্ষত করেন এবং ওর গলায় কালাদা (চেইন) পরান। এরপর হজ্ব এবং উমরার জন্যে তিনি ইহরাম বাঁধেন। তাঁর কুরবানীর পশুর সংখ্যা ছিল ষাটটির অধিক। তাদের গায়ের রং ও শারীরিক গঠন ছিল অতি উত্তম। যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তবে সেটা তার অন্তরের তাকওয়া প্রকাশ করে। কেউ কেউ সম্মান প্রদর্শন শব্দটির দ্বারা কুরবানীর পশুকে উত্তম স্থানে রাখা, ভাল খাওয়ানো এবং তাকে মোটা তাজা করানোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে কুরবানীর পশুর চোখ ও কানকে ভালভাবে লক্ষ্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন।" মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেনঃ (আরবী) দ্বারা জাহেলিয়া যুগের লোকদের মত কালাদা ব্যবহার করাকে হালাল মনে করো না। কারণ জাহেলিয়া যুগে হারাম শরীফের বাইরে বসবাসকারী আরবরা যখন নিষিদ্ধ মাস ব্যতীত অন্য মাসে তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ পশম ও চুল ব্যবহার করতো। আর হারাম শরীফের মুশকির অধিবাসীগণ যখন তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ হারাম শরীফের গাছের ছাল ব্যবহার করতো। এর ফলে লোকেরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করতো। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মায়িদাহ্র দু’টি আয়াত মানসূখ হয়ে গেছে। একটি কালাদার আয়াত, আর অপরটি হচ্ছে (আরবী) (৫:৪২)-এ আয়াতটি। ইবনে আউফ (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম- সূরা মায়িদাহ্র কি কোন অংশ মানসূখ বা রহিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন :“না।” আতা (রঃ) বলেন যে, হারাম শরীফের অধিবাসীগণ বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করতো। ওটা দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতো, ফলে আল্লাহ পাক হারাম শরীফের বৃক্ষ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ ও মত পোষণ করেন।(আরবী) -এ অংশের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে যারা রওয়ানা হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করা হালাল মনে করো না। কারণ, ঐ ঘরে যে ব্যক্তি প্রবেশ করে সে শত্রু হতে নিরাপত্তা লাভ করে। এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর দয়া ও সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়, তোমরা তাকে বাধা দিও না, বিরত রেখো না এবং কোন প্রকার কুৎসা রটনা করো না। কাতাদা, মুজাহিদ, আতা প্রমুখ মুফাসিরদের মতে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণের অর্থ ব্যবসা করা। পবিত্র কুরআনের পূর্ববর্তী আয়াত (আরবী) (২:১৯৮) দ্বারাও ব্যবসাকে বুঝানো হয়েছে। আর শব্দের ব্যখ্যায়-ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ্বে গমনকারী ব্যক্তিগণ হজ্বের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে থাকেন। ইকরামা ও ইবনে জারীর প্রমুখ তাফসীরকারকগণ বলেন যে, এ আয়াতটি হাতিম ইবনে হিন্দ আল বাকরীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। একদা সে মদীনার একটি চারণভূমি লুণ্ঠন করে এবং পরবর্তী বছর সে বায়তুল্লাহ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এ সময় কোন কোন সাহাবী পথিমধ্যে তাকে বাধা দেয়ার মনস্থ করলে আল্লাহ পাক এ আয়াত নাযিল করেন। ইবনে জারীর আলেমদের ইজমার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, কোন মুশরিক ব্যক্তিকে যদি কোন মুসলমান কর্তৃক নিরাপত্তা প্রদান করা না হয় তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে। যদিও সে বায়তুল্লাহ বা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কেননা, উল্লিখিত আয়াতের নির্দেশ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি নাফরমানী, শিরক ও কুফরী করার উদ্দেশ্যে কাবা শরীফের দিকে রওয়ানা হয় তাকেও বাধা দেয়া বৈধ। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র। অতএব তারা যেন এ বছরের পর আর কখনও কা'বা গৃহের নিকটবর্তী না হয়।” এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবম হিজরীতে যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে আমীরুল ইজ্ব হিসেবে পাঠান তখন হযরত আলী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান এবং তাকে এ ঘোষণা করতে। নির্দেশ দেন যে, মুসলমান ও মুশরিক একে অপর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, এ বছরের পর যেন কোন মুশরিক হজ্ব করতে না আসে এবং কোন ব্যক্তি যেন উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, প্রথমে ঈমানদার ও মুশরিকগণ একত্রে হজ্ব করতো এবং আল্লাহ পাক কাফিরদেরকে বাধা প্রদান না করতে ঈমানদারদের প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে (আরবী) (৯:২৮)-এ, আয়াত দ্বারা কাফিরদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে একমাত্র তারাই আল্লাহর ঘরকে আবাদ করবে।” অতএব উক্ত আয়াতগুলো দ্বারা মুশরিকদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাতাদা বর্ণনা করেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। অজ্ঞতার যুগে যখন কোন ব্যক্তি হজ্বের উদ্দেশ্যে তার গৃহ হতে বের হতো তখন সে বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা পরিধান করতো। ফলে কেউ তাকে কষ্ট দিতো না। আবার ঘরে ফেরার সময় চুলের তৈরী কালাদা পরিধান করতো। এর ফলে কোন লোক তাকে কষ্ট দিতো না। ঐ সময় মুশরিকদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করা হতো না। আর মুসলমানদেরকে নিষিদ্ধ মাসসমূহে এবং কা'বা গৃহের আশে পাশে যুদ্ধ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অতঃপর এ আয়াতের নির্দেশকে আল্লাহর অপর আয়াত (আরবী) (৯:৫) দ্বারা মানসূখ করা হয়েছে। ইবনে জারীর এ মত পোষণ করেন যে, (আরবী) দ্বারা যদি মুশরিকরা হারামেরু বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করে তবে তোমরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান কর’- এটাই বুঝানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, এ জন্যেই যে ব্যক্তি এ নির্দেশের অবমাননা করতো আরবরা তাকে সর্বদাই লজ্জা দিতো। তিনি এ পর্যায়ে হত্যাকারীদের প্রতি একজন কবির ব্যাঙ্গোক্তির উল্লেখ করেছেন।(আরবী)-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, যখন তোমরা তোমাদের ইহরাম খুলে ফেল এবং মুক্ত হয়ে যাও তখন তোমাদের জন্যে পূর্বে ইহরাম অবস্থায় যা হারাম ছিল এখন তা হালাল করা হলো। অর্থাৎ এখন শিকার করা হালাল ও হালাল হওয়ার এ নির্দেশটি অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর আবার বৈধ ঘোষিত হয়েছে। আর এ ব্যাপারে সঠিক মত এই যে, কোন বস্তু অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর বৈধ ঘোষিত হলে তা অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বাবস্থা (বৈধতা) ফিরে পাবে। সুতরাং পূর্বে যা ওয়াজিব ছিল পরে তা ওয়াজিব হবে, মুস্তাহাব মুস্তাহাব হবে এবং মুবাহ মুবাহ হবে। কারও মতে নির্দেশটি শুধু ওয়াজিবের জন্যে এবং কারও মতে শুধু মুবাহ কাজের জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু এ উভয় মতেরই বিপক্ষে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট আয়াত রয়েছে। সুতরাং আমরা যা বর্ণনা করেছি সেটাই সঠিক মত। আর এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন উসুলবিদও এ মত পোষণ করেন।(আরবী) তাফসীরকারক এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ যে জাতি তোমাদেরকে হুদায়বিয়ার বছর কা'বা গৃহে যেতে বাধা দিয়েছিল, তোমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম লংঘন করো না, বরং আল্লাহ তোমাদেরকে যেভাবে প্রত্যেকের সাথে ন্যায় বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন কর। আর পবিত্র কুরআনের আর একটি আয়াতও এ অর্থ বহন করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ কোন জাতির শত্রুতা তোমাদেরকে যেন ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে, বরং তোমরা ন্যায় বিচার কর। আর এটাই তাকওয়ার অতি নিকটবর্তী।' অর্থাৎ কোন সম্প্রদায়ের হিংসা-বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে। কারণ, যে ন্যায় বিচার করা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব, ওটা যে কোন অবস্থায়ই প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নাফরমানী করে তবে তোমার উচিত হবে তার ব্যাপারে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ করা। ন্যায়-নীতির উপরই আসমান-যমীন প্রতিষ্ঠিত ইবনে আবি হাতিম যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ যখন মুশরিকগণ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হুদায়বিয়া প্রান্তরে কষ্টকর অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন তখন পূর্বাঞ্চলীয় একদল মুশরিক কাবা ঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।এমতাবস্থায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমরা এ লোকগুলোকে কা'বা গৃহে যেতে বাধা দেবো যেমন তাদের সাথীরা আমাদেরকে বাধা দিয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াতটি নাযিল করেন। এখানে শব্দ দ্বারা হিংসা-বিদ্বেষকে বুঝানো হয়েছে। এটাই ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্যদের মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কোন কোন আরব (আরবী)-এর (আরবী) কে (আরবী) এর পরিবর্তে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন এবং আরবী কবিতায়ও এ জাতীয় পঠনের রীতি দেখা যায়। অবশ্য কোন কারী এভাবে পড়েছেন কি-না তা আমাদের জানা নেই।(আরবী) আল্লাহ পাক এ আয়াতের দ্বারা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে এবং খারাপ কাজ পরিহার করে নৈকট্য ও পরহেযগারী অর্জন করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে শরীয়ত পরিপন্থী কাজ, পাপ কাজ এবং অবৈধ কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে নিষেধ করছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ যে কাজ করতে আদেশ করেছেন তা পরিহার করাকেই পাপ কাজ বলা হয় এবং (আরবী) বা সীমালংঘন করার দ্বারা ধৈর্যের নির্দষ্ট সীমা অতিক্রম করা এবং নিজের ও অন্যের ব্যাপারে অবশ্যকরণীয় কাজের সীমালংঘন করাকেই বুঝানো হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর যদিও সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত হয়।” তখন কোন কোন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অত্যাচারিত ভাইকে সাহায্য করার অর্থ তো আমরা বুঝলাম, কিন্তু অত্যাচারী ভাইকে কি করে আমরা সাহায্য করবো?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বাধা প্রদান কর ও নিষেধ কর। আর এটাই তাকে সাহায্য করা হবে।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) একজন সাহাবী হতে বর্ণনা করেন যে, যে ঈমানদার ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করে সেই ব্যক্তি ঐ ঈমানদার ব্যক্তি হতে অধিক প্রতিদান পাবে যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টও সহ্য করে না। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে অন্য একটি সনদেও এসেছে। ইমাম তিরযিমীও (রঃ) হাদীসটিকে অন্য আর একটি সনদে তাঁর গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। আবু বকর আল বাযযার তাঁর হাদীস গ্রন্থে আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সকাজের প্রতি পথ-প্রদর্শন করে সে সকর্মকারীর ন্যায় প্রতিদান পাবে।” ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসের অনুরূপ আর একটি সহীহ হাদীস আছে। তা হচ্ছে- “যে ব্যক্তি মানুষকে সৎপথে আহ্বান করে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ সৎপথ যত ব্যক্তি অনুসরণ করবে তাদের সকলের প্রতিদানের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হবে। অথচ এ ব্যাপারে সৎপথ অনুসরণকারীদের প্রতিদান কমানো হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানুষকে অসৎ পথে আহ্বান করে, তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ অসৎ পথ যত লোক অনুসরণ করবে তাদের সকলের পাপের অনুরূপ পাপ প্রদান করা হবে। অথচ এ ব্যাপারে অসৎ পথ অনুসরণকারীদের পাপ কোন অংশে কমানো হবে না।" ইমাম তিবরানী আবুল হাসান ইবনে সাখার হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে চলাফেরা করে, অথচ সে জানে যে, ঐ ব্যক্তি একজন অত্যাচারী, তাহলে সে ইসলাম হতে বহিস্কৃত বলে গণ্য হবে।”

আল-মায়িদা 5:3

আল্লাহ পাক উল্লিখিত আয়াতে যে সমস্ত বস্তু খাওয়া অবৈধ তার বর্ণনা দিয়েছেন। মৃত ঐ জানোয়ারকে বলা হয়, যে জানোয়ার যবেহ অথবা শিকার ব্যতীত নিজেই মৃত্যুবরণ করে। মৃত পশু খাওয়া এ জন্যেই নিষিদ্ধ যে, তাতে। শরীর ও দ্বীনের জন্যে ক্ষতিকর রক্ত থেকে যায়। তবে মৃত মাছ খাওয়া হালাল। কারণ মুআত্তায়ে মালিক, মুসনাদে শাফিঈ, মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, সহীহ ইবনে খুযাইমা এবং সহীহ ইবনে হাব্বানে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সমুদ্রের পানি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। তখন তিনি বলেন যে, ওর পানি পবিত্র এবং ওর মধ্যেকার মৃত হালাল। এ সম্পর্কীয় একটি হাদীস সামনে রয়েছে।(আরবী) শব্দ দ্বারা প্রবাহিত রক্তকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবী) (৬:১৪৬)-এর দ্বারাও প্রবাহিত রক্তকে বুঝানো হয়েছে। এটাই আব্বাস (রাঃ) ও সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ)-এর মত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাসকে প্লীহা ও কলিজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেনঃ “তোমরা তা খাও।” তখন লোকেরা বললোঃ “ওটা তো রক্ত।' তিনি বললেনঃ “তোমাদের উপর শুধুমাত্র প্রবাহিত রক্তকেই হারাম করা হয়েছে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ ‘শুধু প্রবাহিত রক্তকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু'টি মৃত জন্তু ও দু'প্রকারের রক্ত হালাল করা হয়েছে। মৃত জন্তু দু'টি হলো মাছ ও ফড়িং এবং দু’প্রকার রক্ত হলো কলিজা ও প্লীহা।” এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, দারেকুতনী এবং বায়হাকীতেও বর্ণনাকারী আবদুর রহমান ইবনে আসলামের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ আবদুর রহমান একজন দুর্বল রাবী। হাফিয বায়হাকী বলেন যে, এ হাদীসটিকে ইসমাঈল ইবনে ইদরীস এবং আবদুল্লাহও বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ দু’জনও দুর্বল রাবী। তবে তাদের দুর্বলতার মধ্যে কিছু কম বেশী আছে। সুলাইমান ইবনে বিলালও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। যদিও তিনি একজন বিশ্বস্ত রাবী তবুও কারও কারও মতে এটি একটি মওকুফ হাদীস। এর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)। হাফিয আবু জার আরাফীর মতে এ হাদীসটি মওকুফ হওয়া সঠিক। ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী ইবনে আজলান হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আহ্বান করার জন্যে প্রেরণ করেন এবং ইসলামের আহ্বানগুলো তাদের নিকট ব্যক্ত করার নির্দেশ দেন। আমি তাদের মধ্যে আমার কাজ করছিলাম। হঠাৎ একদিন তারা আমার নিকট এক পেয়ালা রক্ত নিয়ে উপস্থিত হলো এবং তারা সবাই মিলে ঐ রক্ত পান করার জন্যে প্রস্তুতি নিলো। তারা আমাকেও ঐ রক্ত পান করার জন্যে অনুরোধ করলো। তখন আমি তাদেরকে বললাম, তোমাদের জন্যে আফসোস! আমি তোমাদের কাছে এমন এক ব্যক্তির নিকট হতে এসেছি যিনি তোমাদের জন্য এ রক্তকে হারাম করেছেন। তখন তারা সকলে আমাকে সেই হুকুমটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। তখন আমি তাদেরকে এ আয়াতটি পড়ে শুনালাম। হাফিয আবু বকর তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুদ্দী বলেন, আমি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকি। কিন্তু তারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। একদিন আমি তাদেরকে আমাকে এক গ্লাস পানি পান করাতে বলি। কারণ আমি সে সময় অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত ছিলাম। তখন তারা বললোঃ “না, আমরা তোমাকে মৃত্যু পর্যন্তও পানি পান করাবো না। আমি তখন চিন্তিত অবস্থায় ভীষণ গরমের মধ্যে উত্তপ্ত পাথরের উপর আবা’ মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমন্ত অবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, এক ব্যক্তি অতি সুন্দর একটি কাচের পেয়ালায় উত্তম সুমিষ্ট পানীয় নিয়ে আমার নিকট উপস্থিত হলো এবং আমাকে পেয়ালাটি দিলো। আমি তখন তা হতে পান করলাম এবং সাথে সাথেই জেগে উঠলাম। জেগে দেখলাম যে, আমার কোন পিপাসা নেই, বরং এরপর আজ পর্যন্ত আমি কখনও পিপাসার্ত হইনি। হাকিম তার মুসতাদরিক গ্রন্থে এ অংশটি বেশী বর্ণনা করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন, এরপর আমি আমার সম্প্রদায়ের লোককে বলাবলি করতে শুনলামঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের সম্প্রদায় হতে একজন সর্দার এসেছেন; অথচ তোমরা তাকে এক ঢাক পানিও প্রদান করলে না!” এরপর তারা আমার নিকট পানীয় দ্রব্য নিয়ে আসলো। তখন আমি বললাম, এখন আমার এর প্রয়োজন নেই। কারণ, আল্লাহ আমাকে খাইয়েছেন এবং পানও করিয়েছেন। আমি তাদেরকে আমার খাবারপূর্ণ পেট দেখালাম। তারপর তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করলো। কবি আশা তাঁর কবিতায় কত সুন্দরই না বর্ণনা করেছেনঃ “এবং তুমি কখনও ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে মৃত জন্তুর নিকট যেওনা এবং পশুর শরীরে আঘাত করে তা হতে নির্গত রক্ত পান করার উদ্দেশ্যে ধারাল অস্ত্র গ্রহণ করো না। আর তোমরা পূজার বেদীর উপর স্থাপিত কোন জন্তুকে খেওনা, মূর্তিপূজা করো না, বরং আল্লাহর ইবাদত কর।” কাসীদার এ অংশটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।(আরবী) তাফসীরকারক এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, গৃহপালিত এবং বন্য শূকর উভয়ই হারাম। শূকরের মাংস বলতে চর্বি এবং তার অন্যান্য অংশকে বুঝায়। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, (আরবী) শব্দের দ্বারা মাংসকে বুঝানো হয়। শূকরের চর্বি বা অন্যান্য অংশ কি করে গ্রহণ করা যেতে পারে? এর উত্তরে যাহেরী সম্প্রদায় বলেন যে, কুরআন মাজীদের অন্য একটি আয়াতে আছে-(আরবী) (৬:১৪৬)। এখানে (আরবী)-এর (আরবী) এর দ্বারা (আরবী) কে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) বলতে তার যাবতীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গকেই বুঝায়। কিন্তু এটা আরবী ভাষার রীতি অনুযায়ী সঠিক। নয়। কারণ, (আরবী) আরবীতে বা সর্বনাম সব সময়ই (আরবী) -এর দিকে ফিরে, কখনও (আরবী)-এর দিকে না। আর এখানে (আরবী) হলো (আরবী) শব্দটি। আসলে এর সঠিক উত্তর হলো এই যে, (আরবী) বা গোশত বলতে আরবরা উক্ত জন্তুর প্রতিটি অঙ্গকেই গ্রহণ করে থাকে। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খেলায় অংশগ্রহণ করে সে যেন তার হস্তকে শূকরের গোশত ও তার রক্তে রঞ্জিত করলো। এখানে শূকরের গোশত ও রক্ত স্পর্শ করার প্রতি ঘৃণা পোষণ করা হয়েছে। অতএব ওটা ভক্ষণ করা নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ। এ হাদীস শূকরের গোশত ও রক্তসহ যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবৈধ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরও উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ পাক মদ, মৃত, শূকর এবং মূর্তির ব্যবসাকে হারাম করেছেন।” তখন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ মৃতের চর্বি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? কারণ মানুষ তা দ্বারা নৌকায় প্রলেপ দেয়, চামড়াতে মালিশ করে এবং প্রদীপ জ্বালায়। তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওগুলোও হারাম।” সহীহ বুখারীতে আবু সুফিয়ানের হাদীসে উল্লেখ আছে যে, একদা রোম সম্রাট আবু সুফিয়ানের নিকট জানতে চেয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কোন্ কোন্ বিষয়ে নিষেধ করেছেন? তদুত্তরে আবু সুফিয়ান বলেছিলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে মৃত ও রক্ত খেতে নিষেধ করেছেন।'(আরবী)-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, এর দ্বারা যে জন্তুকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ করা হয় তাকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, আল্লাহ তার সৃষ্টজীবকে তাঁর মহান নামের উপর যবেহ্ করা ওয়াজিব করেছেন। অতএব যখন তার নির্দেশকে লংঘন করে মূর্তি বা অন্য কোন সৃষ্টজীবের নামে যবেহ করা হয় তখন তা হারাম হবে। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। তবে যদি কোন পশু যবেহ করার সময় ভুলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ পড়া না হয় তবে উক্ত পশু হারাম বা হালাল হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। এ বিষয়ে সূরা আন-আমের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ইবনে আবি হাতিম আবু তোফাইল হতে বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত আদম (আঃ) পৃথিবীতে অবতরণ করেন তখন তার উপর চারটি বস্তু হারাম করা হয়েছিল। সেগুলো হলো মৃত পশু, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গিত পশু। এ চারটি বস্তুকে কখনও হালাল করা হয়নি। বরং আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করার পর হতেই এগুলো হারাম ছিল। ইসরাঈলীদের পাপের কারণে আল্লাহ পাক তাদের জন্যে কিছু কিছু হালাল বস্তুকে হারাম করে দিয়েছিলেন। এরপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর যুগের ন্যায় নির্দেশ আসে এবং উল্লিখিতি চারটি বস্তু ছাড়া সবকিছুই হালাল হয়ে যায়। কিন্তু তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে এবং তার নির্দেশ অমান্য করে। হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি ‘গারীব'। ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেন যে, বান্ রেবা গোত্রের ইবনে ওয়ায়েল নামে এক ব্যক্তি এবং ফারাজদাকের পিতা গালিব উভয়েই একশটি করে উটের পা কাটার জন্যে বাজি ধরে। কুফা শহরের উপকণ্ঠে একটি ঝর্ণার ধারে তারা তাদের উটগুলোর পা কাটা শুরু করে। তখন জনসাধারণ তাদের গাধা ও খচ্চরের পিঠে চড়ে উটের গোশত নেয়ার জন্যে তথায় গমন করে। এ দেখে হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি সাদা খচ্চরের পিঠে চড়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা এ উটগুলোর গোশত খেওনা। কেননা, এগুলোকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।" হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটিও একটি ‘গারীব' হাদীস। তবে আবু দাঊদের সুনানে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারা এ হাদীসের বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয়। হাদীসটি নিম্নরূপঃইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরব বেদুঈনদের মত পরস্পর বাজি রেখে উটের পা কাটতে নিষেধ করেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) আরও বলেন যে, মুহাম্মাদ ইবনে জাফর এ হাদীসটিকে একটি মওকুফ হাদীস বলে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)। ইমাম আবূ দাউদ ইকরামা হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত খাবার খেতে নিষেধ করেছেন।(আরবী)-এ শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, ইচ্ছাকৃতভাবে যে জন্তুকে গলাটিপে মারা হয় অথবা যে জন্তু আকস্মিকভাবে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় তাকে বলা হয়। যেমন কোন পশুকে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলে ছুটাছুটি করার ফলে গলায় দডির ফাঁস লেগে যদি দম বন্ধ হয়ে মারা যায় তবে তা খাওয়া হারাম। আর (আরবী) শব্দের দ্বারা ঐ মৃত জন্তুকে বুঝানো হয়েছে। যাকে ভারী অথচ ধারাল নয় এমন অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে মারা হয়েছে। যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে জন্তুকে লাঠি দ্বারা আঘাত করে মারা হয় তাকে (আরবী) বলা হয়। কাতাদা বলেন যে, জাহেলি যুগের লোকেরা লাঠি দ্বারা আঘাত করে পশু মেরে খেতো। হাদীসের সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, আদি ইবনে হাতিম (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এক পার্শ্বে ধারাল এবং অপর পার্শ্বে ধারহীন এ জাতীয় এক প্রকার প্রশস্ত অস্ত্র দ্বারা শিকার করি। এ শিকার খাওয়া কি জায়েয?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যদি ওটা ধারাল পার্শ্ব দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয় তবে তা খাওয়া জায়েয। আর যদি ওটা ধারহীন অংশ দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মারা যায় তবে তা অপবিত্র এবং তা খাওয়া জায়েয নয়।”এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ধারহীন অস্ত্র এবং ধারাল অস্ত্রের দ্বারা শিকার করা জন্তুর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি ধারাল অংশের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তুকে খাওয়া জায়েয করেছেন এবং ধারহীন অংশ দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তুকে খাওয়া নাজায়েয করেছেন। ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ এ ব্যাপারে একমত। তবে যদি ক্ষত না করে শুধু অস্ত্রের ভারত্বের দ্বারা কোন জন্তু নিহত হয় তবে তা হারাম বা হালাল হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। ইমাম শাফিঈ উভয় মতই পোষণ করেন। তাঁর এক মতানুযায়ী উল্লিখিত হাদীসের আলোকে এ জন্তুটি হালাল নয়। অন্য মতানুযায়ী কুকুর দ্বারা শিকার করা জন্তু খাওয়া যেহেতু হালাল, সেহেত ভারী অস্ত্র দ্বারা শিকার করা জন্তুকে খাওয়াও হালাল। এ বিষয়টি নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃযদি শিকারী কুকুরকে শিকারের জন্যে পাঠানো হয় এবং সে ক্ষত না করে ভারত্বের দ্বারা অথবা আঘাতের দ্বারা তাকে হত্যা করে তবে তা হালাল ও হারাম হওয়ার ব্যাপার আলেমদের দুটি মত আছে। এক মতানুসারে তা খাওয়া হালাল। কারণ কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে- “কুকুর তোমাদের জন্যে যা শিকার করে আনে তোমরা তা খাও।” এ আয়াতটি ক্ষত করা বা না করা উভয় ধরনের শিকারকেই বুঝিয়েছে। ঠিক একইভাবে আদি ইবনে হাতিমের হাদীসেও এ জাতীয় নির্দেশের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এটা ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর মত। ইমাম নববী ও ইমাম রাফেয়ী প্রমুখ আলেমগণও ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এ মতকে সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। তাফসীরকারক ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর (আরবী) -এবং (আরবী) নামক গ্রন্থে বর্ণিত তাঁর কথা হতে এ জাতীয় নির্দেশের প্রতি ইঙ্গিত বুঝায় না। উক্ত গ্রন্থদ্বয়ে বর্ণিত তাঁর বক্তব্য দ্ব্যর্থবোধক। তাঁর অনুসারীগণ এ ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে দু'দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এবং উভয় দলই তাঁর বক্তব্যকে নিজ নিজ দলের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। অবশ্য আল্লাহ পাকই এ বিষয়ে সম্যক অবগত। তবে তার এ বক্তব্যে উক্ত পশু হালাল হওয়ার প্রতি অতি সামান্য ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। আসলে এ জাতীয় পশু হালাল না হারাম এ প্রসঙ্গে তিনি খোলাখুলি কোন মন্তব্য করেননি। ইবনে সাব্বাগ হাসান ইবনে যিয়াদের বর্ণনানুযায়ী ইমাম আবু হানীফা (রঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, এ জাতীয় পশু হালাল। ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, সালমান ফারসী (রাঃ), আবূ হুরাইরা (রাঃ), সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং ইবনে উমার (রাঃ)-এর মতে এ জাতীয় পশু হালাল। কিন্তু হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি গারীব। কারণ তাদের পক্ষ হতে এ জাতীয় কোন প্রকাশ্য বক্তব্য নেই। ইবনে কাসীর ইবনে জারীরের এ রিওয়ায়াত সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেন।শিকারী কুকুর কর্তৃক ভার বা আঘাত দ্বারা নিহত পশু খাওয়া হালাল কি হারাম এ ব্যাপারে আলেমদের দ্বিতীয় মত হলো এই যে, ঐ পশু খাওয়া হালাল নয়। আর এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর আর একটি মত। ইমাম মুযানীও তার এ মতকে সমর্থন করেন। ইবনে সাব্বাগও ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এ দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) ইমাম আবু হানীফা (রঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এ জাতীয় পশু হালাল নয়। আর এটাই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মত। ইবনে কাসীর (রঃ)-এর মতে এ মতটি সঠিক হওয়ারই সম্ভাবনা বেশী। কারণ এটাই ইসলামী আইনের নীতিমালার সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইবনে সাব্বাগ এ মতের পক্ষে রাফে ইবনে খুদাইজের হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃরাফে ইবনে খুদাইজ (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা আগামীকাল শত্রুর সম্মুখীন হবো। তখন কাছে কোন ছুরি থাকবে না। আমরা কি বাশের ধারাল অংশ দ্বারা কোন শিকারকে যবেহ করতে পারি? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে অস্ত্র রক্ত প্রবাহিত করে এবং যে জন্তুকে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয় তোমরা তা খেতে পার।" এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম উভয় গ্রন্থেই রয়েছে। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, যদিও এ হাদীসটি একটি বিশেষ কারণে বর্ণনা করা হয়েছে, তবুও অধিকাংশ উসুলবিদ ও আইনবিদ হাদীসটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একদা মধুর তৈরী নাবীজ জাতীয় পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “যে সমস্ত পানীয় মানুষের মধ্যে মাতলামি এনে দেয় সেগুলো হারাম।" এ হাদীটি সম্পর্কে কোন কোন ফিকাহবিদ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খাস করে মধুর তৈরী পানীয় সম্পর্কেই এ মন্তব্য করেছেন। ঠিক এমনিভাবে উল্লিখিত হাদীসটিতে যদিও একটি বিশেষ যবেহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল তথাপি এর জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন একটি মন্তব্য করেন যা উক্ত বিশেষ যবেহ্ এবং এর সাথে সংযুক্ত অন্যান্য যবেহূকে শামিল করে। কারণ আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বক্তব্য রাখার ক্ষমতা দান করেছিলেন। অতএব দেখা যাচ্ছে। যে, যদি শিকারী কুকুর আঘাত বা তার ভারত্বের দ্বারা কোন পশুকে হত্যা করে অথচ এতে রক্ত প্রবাহিত না হয় তাহলে উক্ত পশু খাওয়া হালাল নয়। কারণ উপরোক্ত হাদীসে যে অবস্থায় পশুকে হালাল করা হয়েছে তার বিপরীত অবস্থায় তা নিশ্চয়ই হারাম হবে। এ হাদীস হতে কুকুরের শিকার করা পশু সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে সে সম্পর্কে কেউ কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যবেহ করার অস্ত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তাকে যবেহ করা পশু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়নি। এজন্যে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্য এক হাদীসে দাত ও নখের দ্বারা কোন পশু যবেহ করতে নিষেধ করেছেন। আর এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, দাঁত হাড়ের অনুরূপ এবং নখ দ্বারা অমুসলিম হাবসীরা যবেহ করতো। এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে দু’টি বস্তু দ্বারা পশু যবেহ করতে নিষেধ করেছেন। সে বস্তু দু’টো যবেহের অস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। ওটা নিশ্চয়ই যবেহকৃত পশুর প্রতি কোন ইঙ্গিত বহন করে না। অতএব পূর্ববর্তী হাদীসে কুকুরের শিকার পশু সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত নেই। ইবনে কাসীর (রঃ) এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বস্তু রক্ত প্রবাহিত করে এবং যে জন্তু আল্লাহর নামে যবেহ করা হয় তা খাওয়া তোমাদের জন্যে হালাল। এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বস্তু রক্ত প্রবাহিত করে সেই অস্ত্র দ্বারাই তোমরা পশুকে যবেহ কর’একথা বলেননি। অতএব এ হাদীসটি হতে একই সাথে দু'টি নির্দেশ পাওয়া যায়। একটি অস্ত্র সম্পর্কিত এবং অপরটি যবেহকৃত পশু সম্পর্কিত। অর্থাৎ পশুকে এমন অস্ত্র দ্বারা যবেহ করতে হবে যা রক্ত প্রবাহিত করে। কিন্তু তা দাঁত বা হাড় হওয়া চলবে না। উল্লিখিত হাদীস হতে কুকুরের শিকার সম্পর্কে ইমাম মুযানী এভাবে দলীল গ্রহণ করে থাকেন যে, হাদীসটিতে তীর দ্বারা শিকার করা পশু সম্পর্কে বলা হয়েছে-‘যদি অস্ত্রের ধারহীন অংশের আঘাত দ্বারা শিকার করা পশু মারা যায় তবে তা খেয়ো না। আর যদি ধারাল অংশের আঘাতে মারা যায় তবে তা খাও।' কিন্তু কুকুর সম্পর্কে সাধারণ মন্তব্য করা হয়েছে। এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ সাধারণ মন্তব্যকে বিশেষ অর্থে গ্রহণ করতে হবে। কারণ দু'টি ভিন্ন জাতীয় বস্তু দ্বারা শিকার করা হলেও নির্দেশটি শিকার করা পশু সম্পর্কিত। যেমন পবিত্র কুরআনে অন্যায়ভাবে হত্যাকারীকে একটি মুমিন গেলাম আযাদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু যেহার' সম্পর্কিত নির্দেশে শুধু গোলাম আযাদ করার কথাই বলা হয়েছে। এখানে যদিও এক জায়গায় মুমিন গোলামের কথা বলা হয়েছে এবং অন্য জায়গায় শুধু গোলামের কথা বলা হয়েছে, তবুও উভয় ক্ষেত্রেই মুমিন গোলাম আযাদ করার অর্থই গ্রহণ করতে হবে। ইবনে কাসীর (রঃ)-এর মতে ইমাম মুযানীর এ মতটি সঠিক। বিশেষভাবে যারা এ মতবাদের মূলনীতিকে গ্রহণ করেন তাঁদের জন্যে এ যুক্তিটি উত্তম বলে মনে হবে। সুতরাং যারা এর বিরোধিতা করে থাকেন তাদের পক্ষে এ ব্যাপারে সঠিক ও যুক্তিসম্মত মত পেশ করা উচিত। ইবনে কাসীর (রঃ) ইমাম মুযানীর (রঃ) পক্ষে বলেনঃ আমরা জানি যে, হাদীসে এসেছে-‘অস্ত্রের ধারহীন অংশের আঘাত দ্বারা মৃত শিকার খাওয়া হালাল নয়।' এ হাদীসের উপর কিয়াস করেও আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, কুকুর তার ভারত্বের দ্বারা কোন শিকারকে হত্যা করলে তা খাওয়া হালাল হবে না। কারণ এ দু'টোই শিকারের অস্ত্র স্বরূপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উল্লিখিত আয়াতটিতে (আরবী) (৫:৪) কুকুরের শিকার সম্পর্কে একটি সাধারণ নির্দেশ আছে। এখানে কোন শর্তের পশুর উল্লেখ করা হয়নি। আমরা কিয়াসের দ্বারা কুকুরের শিকারের প্রতি বিশেষ শর্ত আরোপ করছি। কারণ, এ জাতীয় অবস্থায় সাধারণ নির্দেশের পরিবর্তে কিয়াসের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এটাই চার ইমাম এবং অধিকাংশ আলেমের মত। ইবনে কাসীর (রঃ)-এর মতেও এটা উত্তম মতবাদ। দ্বিতীয় কথা হলো এই যে, (আরবী) (৫:৪) আয়াতটিতে একটি সাধারণ নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কিন্তু উপরে আলোচিত মৃত শিকার শিং বা এ জাতীয় কোন বস্তু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত অথবা দম বন্ধ হয়ে বা এ জাতীয় অন্য কোনভাবে মৃত জন্তু নির্দেশিত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। তবে যে কোন অবস্থায় (আরবী) (৫:৪) নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ শরীয়ত এ আয়াতের নির্দেশকে শিকারের ব্যাপারেই গ্রহণ করেছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আদি ইবনে হাতিম (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ যদি শিকার তীরের ধারহীন অংশের আঘাতে মারা যায় তবে তা অপবিত্র। কাজেই তোমরা তা খেয়ো না।' ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ আমাদের জানামতে এমন কোন আলেম নেই যিনি কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের মধ্যে পার্থক্য করে একথা বলেছেন যে, শুধু অস্ত্রের ধারহীন অংশ দ্বারা শিকার করা জন্তুই শিকারের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং শিং- এর আঘাতে মৃত জন্তু শিকারের নির্দেশের আওতায় পড়ে না। সুতরাং আলোচ্য মৃত শিকারকে যদি হালাল বলা হয় তবে এর দ্বারা সমস্ত আলেমের ইজমার বিরোধিতা করা হবে। অথচ ইজমার বিরোধিতা করা কারো মতেই জায়েয নয়, বরং অধিকাংশ আলেম এ ধরনের কাজকেই বিধি বহির্ভূত বলেছেন। দ্বিতীয়তঃ (আরবী) (৫:৪) -এ আয়াতটি আলেমদের ইজমা অনুযায়ী সাধারণ নির্দেশ বহন করে না। বরং এ আয়াতের দ্বারা শুধুমাত্র ঐ ধরনের জ্যুকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল। সুতরাং এর সাধারণ নির্দেশ হতে হারাম জন্তুগুলো বাদ পড়ে যায়। কেননা, শরীয়তের সাধারণ নির্দেশের দুটি স্তর আছে, একটিতে সীমা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে এবং অন্যটিতে কোন সীমা নির্ধারণ করা থাকে না। আর এ জাতীয় সাধারণ নির্দেশের বেলায় সীমা নির্ধারিত নির্দেশকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। অন্য আর একটি মতে বলা হয়েছে যে, এ ধরনের শিকার মৃত জন্তুর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এ ধরনের শিকারের মধ্যে রক্ত ও যাবতীয় রস ওর ভেতরেই থেকে যায়। আর মৃত জন্তুও এ কারণেই হারাম হয়ে থাকে। সুতরাং কিয়াস অনুযায়ী উপরোক্ত শিকারও হালাল নয়। অন্য আর একটি মত এই যে, পবিত্র কুরআনের (আরবী) আয়াতটি হারাম জন্তুর বর্ণনায় একটি মুহকাম আয়াত। এর কোন হুকুম অন্য কোন আয়াতের হুকুম দ্বারা বাতিল হয় না। ঠিক এমনিভাবেই পবিত্র কুরআনের (আরবী) (৫:৪)-এ আয়াতটি হালাল জন্তুর বর্ণনায় একটি মুহকাম আয়াত। মূলতঃ এ ধরনের আয়াতের নির্দেশের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আর এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা হাদীস শরীফে রয়েছে। যেমন তীর দ্বারা শিকার করা জন্তু সম্পর্কিত। হাদীসটি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ হাদীসে যে জন্তু হালাল সম্পর্কিত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত তার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ অস্ত্রের ধারাল অংশ দ্বারা যা শিকার করা হয় তা হালাল। কারণ তা পবিত্র বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে যে জন্তু হারাম সম্পর্কিত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অস্ত্রের ধারহীন অংশ দ্বারা যে জন্তুকে শিকার করা হয়েছে তা হারাম। কারণ তা অপবিত্র। আর এটা অপবিত্র বস্তু হারাম সম্পর্কিত আয়াতের নির্দেশের একটি অঙ্গও বটে। অতএব কুকুর যে শিকারকে ক্ষত করে মেরে ফেলে তা হালাল সম্পর্কিত আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। আর কুকুর যে শিকারকে আঘাতে বা ভারের দ্বারা মেরেছে তা শিং বা ঐ জাতীয় বস্তু দ্বারা মৃত জন্তু সম্পর্কিত নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তা হালাল নয়। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, কুকুরের শিকার সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কেন নির্দেশ দেয়া হয়নি? যেমন যদি কুকুর শিকারকে ক্ষত করে মেরে ফেলে তবে তা হালাল। আর যদি ক্ষত না করে মেরে ফেলে তবে তা হালাল নয়। তাফসীরকারক এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে, ভার বা আঘাতের দ্বারা শিকারকে মেরে ফেলার উদাহরণ বিরল।কারণ কুকুর সাধারণতঃ নখ বা থাবা অথবা এ দু'টো দ্বারাই শিকারকে হত্যা করে থাকে। সুতরাং কুকুরের শিকার সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম দেয়ার কোন প্রশ্ন উঠে না। অথবা যদি কুকুর ভার বা আঘাতের দ্বারা শিকারকে হত্যা করে তবে এর হুকুম ঐ ব্যক্তির নিকট স্পষ্ট। কারণ সে জানে যে, এর হুকুম মৃতজন্তু, দম আটকিয়ে মৃতজন্তু, প্রহারে মৃতজন্তু, পতনে মৃতজস্তু এবং শিং-এর আঘাতে মৃত্যুর হুকুমেরই মত। তবে শিকারী কোন কোন সময় তীর বা ধারহীন অস্ত্রকে (আরবী) ভুল বশতঃ বা খেলাচ্ছলে শিকারের গায়ে ঠিকমত লাগাতে পারে না। বরং অধিকাংশ সময়েই ঠিকভাবে শিকারের গায়ে লাগাতে ব্যর্থ হয়ে থাকে। শিকার ক্ষত না হয়ে অস্ত্রের চাপ বা আঘাতের ফলে মারা যায়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এ দু’ব্যাপারে বিস্তারিত হুকুম দান করেছেন। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সম্যক অবগত আছেন। ঠিক এমনিভাবে কুকুর তার অভ্যাস বশতঃ কখনো কখনো শিকারকৃত জন্তুকে খেয়ে ফেলে। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর সম্পর্কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেনঃ “যদি কুকুর শিকারকে খেয়ে ফেলে তবে তোমরা তা খেয়ো না। কারণ আমি ভয় করি যে, কুকুর তার নিজের জন্যেই ঐ জন্তুকে রেখে দিয়েছে। হাদীসের এ বর্ণনাটি সঠিক। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম উভয় গ্রন্থে হাদীসটি স্থান পেয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে কুকুরের শিকার সম্পর্কে এ নির্দেশটিকে কুকুরের শিকার হালাল হওয়া সম্পর্কিত আয়াতের নির্দেশ হতে পৃথক করে বলা হয়েছে যে, কুকুর যদি তার শিকারের কোন অংশ খেয়ে ফেলে তবে তা হালাল নয়। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এরূপ বর্ণিত হয়েছে। হাসান (রঃ), শাবী (রঃ) এবং নাখঈরও (রঃ) এ অভিমত। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ), ইমাম আবূ ইউসুফ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি প্রসিদ্ধ অভিমতও এটাই। ইবনে জারীর (রঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে আলী (রাঃ), সাঈদ (রঃ), সালমান (রঃ), আবূ হুরাইরা (রাঃ), ইবনে উমার (রাঃ) এবং ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, কুকুরের শিকার খাওয়া যাবে যদিও সে শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে। এমন কি সাঈদ (রঃ), সালমান (রঃ), আবু হুরাইরা (রাঃ) ও অন্যান্যদের মতে যদি কুকুর শিকারের এক টুকরা গোশত ব্যতীত সবটুকু খেয়ে ফেলে তবুও ঐ গোশতের টুকরাটি খাওয়া যাবে। ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর পূর্ব মতও এটাই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) তাঁর পরবর্তী নতুন অভিমতে কুকুরের শিকার সম্পর্কিত দু'টি অভিমতের প্রতিই ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। আবু মনসুর ইবনে সাব্বাগ ও অন্যান্য শাফিঈ মতাবলম্বী ইমামগণ ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে তার এ অভিমত বর্ণনা করেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) উত্তম ও জোরালো সনদ দ্বারা আবু সা'লাবা আল খুশানী হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুকুরের শিকার সম্পর্কে বলেছেনঃ “যদি তুমি কুকুরকে শিকারের জন্যে পাঠাবার সময় আল্লাহর নাম উল্লেখ করে থাক তবে তুমি শিকারকে খাও, যদিও কুকুর তার কিছু অংশ খেয়ে ফেলে এবং তোমার হস্ত তোমার প্রতি যা ফিরিয়ে দেয় তা খাও।” ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটি আমর ইবনে শশাআইবের সনদের দ্বারা তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে নিম্নরূপঃআবু সা'লাবা নামক এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল!.......” ইমাম নাসাঈ (রঃ) হাদীসটির পরবর্তী অংশটুকু আবু দাউদ (রঃ)-এর রিওয়ায়াতের মতই বর্ণনা করেন। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে জারীর (রঃ) তার তাফসীর গ্রন্থে সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন লোক তার কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে এবং কুকুর শিকারকৃত জন্তুর কিছু অংশ খেয়ে নেয় তবে বাকী অংশ সে খেতে পারে।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ হাদীসটিকে হযরত সালমান (রাঃ) হতে মাওকুফ হাদীস বলে অভিমত প্রকাশ করেন। অধিকাংশ আলেম কুকুরের শিকার সম্পর্কিত নির্দেশের ক্ষেত্রে আদি কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন এবং আবু সা'লাবা প্রমুখের বর্ণিত হাদীসকে দুর্বল বলে অভিমত প্রকাশ করেন। কোন কোন আলেম আবু সা'লাবা বর্ণিত হাদীসকে এ অর্থে গ্রহণ করেছেন যে, কুকুর শিকার করার পর যদি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মালিকের অপেক্ষা করার পর ক্ষুধার তাড়নায় বা এ জাতীয় কোন কারণে শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে তবে বাকী অংশটুকু খেতে কোন দোষ নেই। কেননা, এ অবস্থায় এ আশংকা করা যায় না যে, কুকুর শিকারকে তার নিজের জন্যেই গ্রহণ করেছে। তবে কুকুর যদি শিকার করা মাত্রই তা ভক্ষণ করতে শুরু করে তবে এ অবস্থায় বুঝা যাবে যে, সে শিকারকে তার নিজের জন্যেই গ্রহণ করেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে মহান আল্লাহই সম্যক অবগত।শিকারী পাখী সম্পর্কে ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এর শিকারের হুকুমও কুকুরের শিকারের ন্যায়। অধিকাংশ আলেমের মতে যদি শিকারী পাখী শিকার করে তার কিছু অংশ খেয়ে ফেলে তবে তা খাওয়া হারাম। কিন্তু অপর একদল আলেমের মতে তা খাওয়া হারাম নয়। শাফিঈ মতাবলম্বী ইমাম মুযানী পাখীর শিকার সম্পর্কে এ অভিমত পোষণ করেন যে, শিকারী পাখী যদি শিকার করার পর শিকারের কোন অংশ খেয়ে ফেলে তবে তা খাওয়া হারাম নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর মতও এটাই। তারা এর কারণ প্রসঙ্গে বলেন যে, কুকুরকে যেমন মারপিট করে শিকার করা শিক্ষা দেয়া যায়, পাখীকে সেরূপভাবে শিকার করা শিখানো যায় না। আর তা ছাড়া শিকার খাওয়া ব্যতীত পাখীকে শিকার করা শিক্ষা দেয়া সম্ভবপর নয়। সুতরাং এটা ধর্তব্য নয়। এ ছাড়া কুকুরের শিকার সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশ এসেছে। কিন্তু পাখীর শিকার সম্পর্কে শরীয়তে কোন নির্দেশ আসেনি। শেখ আবু আলী তার ‘ইফসাহ্' গ্রন্থে লিখেছেনঃ যেহেতু আমরা শিকারী কুকুর কর্তৃক শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলার পরে ঐ শিকারকে হারাম বলে গণ্য করি, সেহেতু শিকারী পাখী কর্তৃক শিকারের কিছু অংশ খাওয়া হলে উক্ত শিকার হারাম হওয়ার ব্যাপারে দুটি দিক রয়েছে। কিন্তু কাযী আবু তাইয়্যেব আবু আলী কর্তৃক এ বিশ্লেষণকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) কুকুরের ও পাখীর শিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য এ ব্যাপারে আল্লাহই সম্যক জ্ঞান রাখেন।(আরবী) ঐ মৃত জন্তুকে বলা হয় যা পাহাড় বা কোন উঁচু স্থান হতে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। এ ধরনের জন্তু খাওয়া হালাল নয়। আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, (আরবী) ঐ জন্তুকে বলা হয়, যে পাহাড় হতে পড়ে মারা যায়। কাতাদার মতে এটা ঐ ধরনের জন্তু যা কূপে পড়ে মারা যায়। সুদী বলেন যে, যে জন্তু পাহাড় হতে পড়ে অথবা কূপে পড়ে মারা যায় তাকেই (আরবী) বলা হয়।(আরবী) ঐ জন্তুকে বলা হয় যা অন্য জন্তুর শিং-এর আঘাতে মারা যায়। যদি ওটা শিং দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং তা হতে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং ঐ আঘাত যদি যবেহ করার স্থানেও লাগে তবুও ঐ ধরনের জন্তু খাওয়া হারাম। আরবী ভাষায় (আরবী) শব্দটি (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) -এর অর্থে ব্যবহৃত হয়। আরবী ভাষায় এ ধরনের শব্দ অধিকাংশ সময় ব্যতীতই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা (আরবী) অর্থাৎ সুরমা লাগান চোখ এবং (আরবী) অর্থাৎ খেযাব লাগান হস্ততালু। আরবী ভাষায় এটা কখনও (আরবী) এবং (আরবী) হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু উক্ত আয়াতের শব্দগুলোতে ব্যবহৃত হওয়া সম্পর্কে কোন কোন ব্যাকরণবিদ বলেন যে, উক্ত শব্দগুলো (আরবী)-এর স্থানে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ওর শেষে (আরবী)-এর ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরবরা বলে থাকে (আরবী) কিন্তু কেউ কেউ বলে থাকেন যে, উক্ত শব্দগুলোতে এ জন্যেই ব্যবহার করা হয়েছে যাতে দেখা মাত্রই বুঝা যায় যে, এ শব্দগুলো (আরবী) বা স্ত্রীলিঙ্গ। ত (আরবী) ও (আরবী) '-এর বেলায় প্রথম দৃষ্টেই ওটা (আরবী) বলে মনে হয়।(আরবী) -এ অংশের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, সিংহ, নেকড়ে বাঘ, চিতা বাঘ বা কুকুর যে জন্তুকে আক্রমণ করে এবং ওর কিছু অংশ খেয়ে ফেলার কারণে ওটা মারা যায় তা খাওয়া হারাম। যদিও আঘাতের কারণে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং উক্ত আঘাত জন্তু যবেহ্ করার স্থানে লাগে তবুও আলেমদের ইজমা অনুযায়ী উক্ত জন্তু খাওয়া হালাল নয়। যদি হিংস্র জন্তু ছাগল, উট, গরু বা এ জাতীয় কোন জন্তুকে মেরে কিছু অংশ খেয়ে ফেলতো তবুও অজ্ঞতার যুগের লোকেরা উক্ত জন্তুর বাকী অংশ খেতো। কিন্তু আল্লাহ পাক মুমিনদের জন্যে ওটা হারাম করে দেন।(আরবী) অর্থাৎ দম আটকিয়ে পড়া, প্রহারে আহত, পতনে ও শিং-এর আঘাতে এবং জন্তুর আক্রমণে মৃতপ্রায় জন্তুকে যদি জীবিতাবস্থায় পাওয়া যায় ও তাকে যবেহ করা যায় তবে তা খাওয়া হালাল। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ “যদি এ ধরনের জন্তুগুলোকে তোমরা প্রাণ থাকা অবস্থায় যবেহ করতে সক্ষম হও তবে তোমরা সেগুলো খাও। কারণ ওগুলো পবিত্র।” সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) এ অভিমত পোষণ করেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যদি এ ধরনের জন্তুগুলোকে যবেহ করার পর ওগুলো লেজ, গাখা ও চোখ নাড়ে তবে সেগুলো খাওয়া হালাল। ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, যদি তোমরা প্রহারে, পতনে বা শিং-এর আঘাতে মৃতপ্রায় জন্তুকে হাত বা পা নাড়া অবস্থায় পাও তবে ওকে যবেহ করে খাও। তাউস, হাসান, কাতাদা, উবাইদ ইবনে উমাইর, যহহাক এবং আরও অনেকের মতে যদি যবেহ করার পর জন্তু তার কোন অংশকে নাড়ে এবং যবেহ করার পরও বুঝা যায় যে, ওর প্রাণ আছে তবে তা খাওয়া হালাল। এটাই অধিকাংশ ফিকাহবিদের মত। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলও (রঃ) এ অভিমতই পোষণ করেন। ইবনে ওয়াহ্হাব (রঃ) বলেন যে, একদা ইমাম মালিক (রঃ)-কে এমন বকরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যাকে কোন হিংস্র জন্তু আঘাত করার ফলে নাড়ি ভুড়ি বেরিয়ে পড়ে। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার মতে ওকে যবেহ করার প্রয়োজন নেই।" আশহাব বলেন যে, ইমাম মালিক (রঃ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়, যদি হিংস্র জন্তু কোন বকরীকে আঘাত করে তার পিঠকে ভেঙ্গে দেয় তবে ওটা মারা যাওয়ার পূর্বে কি ওকে যবেহ করা যাবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “যদি আঘাত ওর গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবে আমার মতে ওটা খাওয়া ঠিক নয়। তবে যদি ওর দেহের কোন একাংশে আঘাত লেগে থাকে তাহলে আমার মতে ওটা খেতে কোন অসুবিধা নেই। তাকে আরো প্রশ্ন করা হয়, কোন হিংস্র জন্তু যদি বকরীর উপর লাফিয়ে পড়ে তার পিঠ ভেঙ্গে ফেলে তবে ওটা খাওয়া কি হালাল? তিনি জবাবে বলেনঃ “আমার মতে ওটা খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এত বড় আঘাতের পরে ওটা জীবিত থাকতে পারে না। তাকে আরও জিজ্ঞেস করা হয়, যদি হিংস্র জন্তু উক্ত বকরীর পেটকে চিরে ফেলে অথচ ওর নাড়ি ভুড়ি বের না হয় তবে কি ওটা খাওয়া হালাল হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার মতে ওটা খাওয়া যাবে না। আর এটাই ইমাম মালিক (রঃ)-এর মাযহাবপন্থীদের মত। ইবনে কাসীর (রঃ) ইমাম মালিক (রঃ)-এর উল্লিখিত মতামত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, উক্ত আয়াতটি একটি সাধারণ নির্দেশ বহন করে। ইমাম মালিক (রঃ) এ সাধারণ নির্দেশ হতে যে বিশেষ নির্দেশগুলো বের করেছেন। এর পক্ষে বিশেষ দলীল প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্থেই রাফে ইবনে খুদাইজ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ আমরা আগামীকাল শক্রর সম্মুখীন হবো। এমতাবস্থায় আমাদের সাথে যদি কোন ছুরি না থাকে তবে বাঁশের ধারাল অংশ দ্বারা আমরা যবেহ করতে পারব কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ যদি রক্ত প্রবাহিত করে এবং যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয় তবে তোমরা ঐ জন্তু খাও। কিন্তু দাঁত না নখ দ্বারা কোন জন্তু যবেহ করা যাবে না। আর এর কারণ সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে এই বলি যে, দাঁত হচ্ছে হাড় স্বরূপ, আর নখ হচ্ছে আবিসিনিয়ার অমুসলিমদের অস্ত্র। দারেকুতনী (রঃ) যে হাদীসকে মারফু হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন সে সম্পর্কে মন্তব্যের অবকাশ আছে। হযরত উমার (রাঃ) হতে যে মওকুফ হাদীসটি বর্ণিত আছে ওটাই অধিক বিশুদ্ধ। হাদীসটি নিম্নরূপঃ কণ্ঠ ও লুব্বা যবেহ করার প্রকৃত স্থান এবং তোমরা প্রাণ বের হওয়ার জন্যে তাড়াহুড়া করো না।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মুসনাদে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ কণ্ঠ ও লুব্বর মধ্যে যবেহ করাই কি সঠিক? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘তার রানে আঘাত করলেও তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে।' সনদের দিক থেকে এটা একটা বিশুদ্ধ হাদীস। তবে হাদীসের নির্দেশটি ঐ বিশেষ অবস্থায় প্রযোজ্য হবে যখন জন্তুটির কণ্ঠ বা লুব্বাতে যবেহ করা সম্ভবপর হবে না।(আরবী) মুজাহিদ এবং ইবনে জুরাইদ বলেন যে, কাবা শরীফের এলাকায় অবস্থিত একটি পাথরকে (আরবী) বলা হয়। ইবনে জুরাইদ আরও বলেন যে, সেখানে ৩৬০টি পূজার বেদী ছিল। জাহেলিয়াত যুগের লোকেরা এ বেদীগুলোর নিকটে পশু বলি দিত এবং তারা পবিত্র কা'বা গৃহের নিকটবর্তী বেদীগুলোতে বলি দেয়া পশুগুলোর রক্ত ছিটিয়ে দিতো। তারা উক্ত পশুগুলোর গোশত বেদীতে রেখে দিতো। আরও অনেক তাফসীরকারকও এ বর্ণনা দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন এবং পূজার বেদীর বলি দেয়া পশুগুলোকে খাওয়া হারাম করে দেন। এমনকি পূজার বেদীর উপর বলিদানকৃত পশুগুলোকে হত্যা করার সময় আল্লাহর নাম নিলেও তা খাওয়া হারাম। কারণ এটা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) এ জাতীয় শিরককে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন। আর এটা হারাম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে যবেহ করা জন্তুর হারাম হওয়া সম্পর্কিত নির্দেশ ইতিপূর্বেই দেয়া হয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তীরের সাহায্যে অংশ বণ্টন করাও তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে। (আরবী) শব্দের একবচন (আরবী) যুলাম। শব্দটি। কখনো কখনো একে যালামও পড়া হয়। অজ্ঞতার যুগে আরবরা এ তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ধারণ করতো। সেখানে তিনটি তীর থাকতো। একটিতে লিখা থাকতো (আরবী) বা কর। দ্বিতীয়টিতে লিখা থাকতো বা (আরবী) করো না। আর তৃতীয়টিতে কিছুই লিখা থাকতো না। কারো কারো বর্ণনানুযায়ী প্রথমটিতে লিখা থাকতো (আরবী) অর্থাৎ আমার প্রভু আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়টিতে লিখা থাকতো (আরবী) অর্থাৎ আমার প্রভু আমাকে নিষেধ করেছেন। আর তৃতীয়টিতে কিছুই লিখা থাকতো না। যখন তাদের কোন কাজে দ্বিধা-সংকোচ আসতো তখন তারা এ তীর নিক্ষেপ করতো। যদি নির্দেশসূচক তীরটি উঠতো তখন তারা ঐ কাজটি করতো।নিষেধসূচক তীরটি উঠলে তারা ঐ কাজটি থেকে বিরত থাকতো। আর শূন্য তীরটি উঠলে তারা পুনরায় তীর নিক্ষেপ করতো। (আরবী) শব্দটি আরবী ভাষায় তীরের দ্বারা অংশ অন্বেষণ করার অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটাই আবু জাফর ইবনে জারীরের অভিমত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, (আরবী) এমন ধরনের তীরকে বলা হতো যদ্বারা তারা তাদের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। মুজাহিদ, ইবরাহীম নাখঈ, হাসান বসরী এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান থেকেও এই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এবং অন্যান্যদের মতে কুরাইশদের সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মূর্তিটির নাম ছিল হুবল। ওটা পবিত্র কাবা গৃহের ভেতরের কূপের মধ্যে পোঁতা ছিল। কাবা শরীফের জন্যে যে সমস্ত উপঢৌকন ও অন্যান্য দ্রব্যাদি আসতো তা উক্ত কূপে সংরক্ষিত রাখা হতো। হুবলের নিকট সাতটি তীর রাখা হতো, এ তীরগুলোতে কিছু লিখা থাকতো। তাদের বিভিন্ন কাজে যখন দ্বিধা-সংকোচের সৃষ্টি হতো তখন তারা এ তীরগুলো নিক্ষেপ করতো এবং তীরের নির্দেশানুযায়ী কাজ করতো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কা'বা গৃহে প্রবেশ করেন তখন তিনি তথায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর পূর্ণ মূর্তি দেখতে পান। তাদের দু’হাতে তীর রাখা ছিল। নবী করীম (সঃ) তখন বলেনঃ “আল্লাহ তাদেরকে (অজ্ঞতা যুগের আরবদেরকে) ধ্বংস করুন। কারণ তারা জানতো যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কখনও ভাগ্য নির্ধারণে এ তীর ব্যবহার করতেন না।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরও বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আবু বকর (রাঃ) মদীনায় হিজরতের জন্যে রওয়ানা হন তখন। সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জাশাম তাদেরকে ধরে জীবিতাবস্থায় মক্কায় ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সুরাকা বলেন যে, তিনি তাঁরেদকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবেন কি না তা বের হওয়ার পূর্বেই তীর নিক্ষেপ করে জানবার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেখা গেল যে, তীর টানার ফলে তার অপছন্দনীয় বস্তুটি প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ তিনি তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবেন না। এরপর তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারও তীর নিক্ষেপ করেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর অপছন্দনীয় বস্তুটি প্রকাশ পেতে থাকে। এতদ্সত্ত্বেও তিনি তাঁদের অন্বেষণে বের হন। অবশ্য তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবনে মিরদুওয়াই হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ভবিষ্যদ্বাণী করে অথবা তীরের দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করে এবং কোন বিশেষ ঘটনাকে অশুভ মনে করে সফর হতে বিরতণ থাকে, সে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারবে না।' হযরত মুজাহিদ (রহঃ) (আরবী) এর ব্যাখ্যায় আরও বলেন যে, (আরবী) বলতে আরবদের জুয়াখেলার তীর এবং পারস্য ও রোমবাসীদের -কে বুঝানো হতো। তাফসীরকারক বলেন যে, মুজাহিদের এ মত সম্পর্কে মন্তব্যের অবকাশ আছে। তবে এটা বলা যেতে পারে যে, আরবরা তীর দ্বারা জুয়া খেলতো এবং ইস্তাখারা করতো। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন।মহান আল্লাহ তীর এবং জুয়াখেলা এ দু’টিকে একই সাথে বর্ণনা করেছেন। যেমন এ সূরার শেষাংশে আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা ওটা বর্জন কর। যেন তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ-জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায হতে বাধা দিতে চায়। তবুও কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না” ঠিক এমনিভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করা জঘন্যতা, ভ্রষ্টতা, মূখতা এবং একটি শিরকী কাজ। আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা যখন তাদের কোন কাজে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয় তখন যেন তারা আল্লাহর ইবাদত করে, তাদের বাঞ্ছিত কাজের জন্যে ইসতাখারা করে এবং আল্লাহর কাছে তাদের কাজের জন্যে মঙ্গল কামনা করে। মুসনাদে আহমাদ, সহীহ বুখারী এবং সুনান গ্রন্থসমূহে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে যাবতীয় কাজে পবিত্র কুরআনের শিখানোর মত করে ইসতাখারা করা শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যখন তোমাদের কাছে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে পড়বে তখন তোমরা দু'রাকআত নফল নামায পড়ে নিয়ে নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবী) অনুবাদঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করছি এবং আপনার ক্ষমতার ওসিলায় আপনার নিকট শক্তি কামনা করছি। আপনার নিকট আপনার মহান দান যাজ্ঞা করছি। কারণ আপনি ক্ষমতাবান আর আমি অক্ষম। আপনি জানেন আর আমি কিছুই জানি না। আপনি অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে সম্যক অবগত। হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, এ কাজে (কাজের নাম বলতে হবে) আমার দ্বীন, দুনিয়া, ইহজীবন ও পরজীবন অথবা বর্তমান বা ভবিষ্যতের জন্যে কোন মঙ্গল নিহিত রয়েছে, তবে আপনি তা আমার জন্যে নির্ধারিত করে দিন এবং সহজ করে দিন, অতঃপর তাতে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! যদি আপনি জানেন যে, আমার এ কাজে আমার দ্বীন, দুনিয়া, ইহজীবন ও পরজীবনে কোন অমঙ্গল রয়েছে, তবে আমাকে তা হতে বিরত রাখুন এবং উক্ত কাজকেও আমা হতে দূরে রাখুন। আর যে কাজে আমার জন্যে মঙ্গল রয়েছে তা আমার জন্যে নির্ধারিত করে দিন। এবং ঐ কাজে আমার সন্তুষ্টি দান করুন।” উক্ত দু'আয় বর্ণিত শব্দগুলো মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেনঃ “হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি একটি হাসান সহীহ এবং গারীব হাদীস। এ হাদীসটিকে আমরা শুধু আবুল মাওয়ালীর সনদের মাধ্যমে পাই।”(আরবী) আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, কাফিররা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা তোমাদের ধর্মের সাথে তাদের ধর্মকে মিশিয়ে দেয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে। আতা ইবনে আবি রাবাহ, সুদ্দী ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান হতেও এ ধরনের বর্ণনা রয়েছে। আয়াতের এ অর্থ বহনকারী একটি সহীহ হাদীস পাওয়া যায়। হাদীসটি নিম্নরূপঃরাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আরব উপদ্বীপের নামাযীগণ শয়তানের পূজা করবে, শয়তান এটা থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। তবে সে তাদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে থাকবে।” উক্ত আয়াতটির অর্থ এটাও হতে পারে যে, মক্কার মুশরিকগণ মুসলমানদের মত রূপ ধারণ করার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। কারণ, ইসলামের নির্দেশাবলী এ দু'টি সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। এ জন্যেই তো আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা ধৈর্য ধারণ করে, কাফিরদের বিরোধিতায় দৃঢ় তাকে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় না করে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলেছেনঃ “কাফিরগণ কর্তৃক তোমাদের বিরোধিতা করা হলে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং তোমরা আমাকে ভয় কর। আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো, তাদের উপর বিজয় দান করবো এবং তোমাদেরকে হিফাজত করবো যেন তারা তোমাদের ক্ষতি করতে না পারে। আর সর্বোপরি দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করবো।” (আরবী) এটা উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার প্রতি আল্লাহর মহান দান। কারণ, তিনি এ উম্মতের জীবন বিধানকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন, যার ফলে তারা অন্য বিধানের মুখাপেক্ষী নয়। এমনিভাবে তিনি তাদের নবী (সঃ)-কে ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’ বা সর্বশেষ নবী করেছেন এবং অন্য কোন নবীর মুখাপেক্ষী করেননি। আর তাদের নবীকে সমগ্র মানব জাতির ও বিশ্ববাসীর নবী করে পাঠিয়েছেন। তিনি যে বস্তুকে হালাল করেছেন সেটাই হালাল এবং যেই বস্তুকে হারাম করেছেন সেটাই হারাম। তিনি যে দ্বীনকে প্রবর্তন করেছেন ওটাই একমাত্র দ্বীন এবং তিনি যে সংবাদ প্রদান করেছেন ওটা ন্যায় ও সত্য তাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা বৈপরিত্য নেই। যেমন আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেনঃ “(হে। নবী!) তুমি যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছ সেগুলো সত্য এবং যে সমস্ত আদেশ ও নিষেধ করেছ সেগুলো ন্যায় নীতি ভিত্তিক।” আল্লাহ এ উম্মতের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করার মাধ্যমে তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। আর এজন্যেই তিনি বলেছেনঃ “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেছি এবং তোমাদের জন্যে আমার দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছি। আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছি। সুতরাং তোমরা ওটাকে তোমাদের নিজেদের জন্যে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হও। কেননা, ওটা সেই দ্বীন যাকে আল্লাহ ভালবাসেন ও পছন্দ করেন। আর এ দ্বীনসহ তিনি তাঁর সম্মানিত রাসূলদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়েছেন। এ দ্বীনসহ তিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থকে অবতীর্ণ করেছেন। হযরত আলী ইবনে তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, দ্বীনের দ্বারা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাঁর নবী ও মুমিনদেরকে এ আয়াতের দ্বারা এ সংবাদ প্রদান করেন যে, তিনি তাদের ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছেন। সুতরাং তারা আর কখনও এর চেয়ে অধিক বস্তুর মুখাপেক্ষী হবে না। আর আল্লাহ যখন এ দ্বীনকে একবার পরিপূর্ণতা দান করেছেন তখন তিনি আর কখনও তাকে অসম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবেন না। আল্লাহ একবার যখন ওর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন তখন আর কখনও ওর প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না। আসবাত সুদ্দী হতে বর্ণনা করেন যে, এ আয়াত আরাফার দিনে অবতীর্ণ হয়। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হালাল এবং হারাম সম্পর্কিত আর কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পরই ইন্তেকাল করেন। আসমা বিনতে উমাইস বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব করেছিলাম। যখন আমরা সফরের অবস্থায় ছিলাম তখন একদিন হঠাৎ জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বাহনের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় একটু নীচের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বাহনটি তখন অহীর ভার সহ্য করতে না পারায় বসে পড়ে। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শরীরের উপর আমার চাদরটি বিছিয়ে দিলাম।” ইবনে জারীর এবং আরও অনেকের মতে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আরাফাত দিবসের ৮১ দিন পরে ইন্তেকাল করেন। ইবনে জারীর আনতারার উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন যে, উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিনটি ছিল হজ্বে আকবরের দিন। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত উমার (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করেন। উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমরা এ দ্বীন সম্পর্কে আরও বেশী কিছু আশা করছিলাম। কিন্তু এটা যখন পূর্ণতা লাভ করেছে, তখন সাধারণ নিয়মানুযায়ী এখন তা অবনতির দিকে যেতে পারে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি সত্য কথাই বলেছো।” এ হাদীসের অর্থের স্বপক্ষে অন্য একটি সহীহ হাদীস এসেছে, হাদীসটি নিম্নরূপঃ“ইসলাম স্বল্প সংখ্যক লোক নিয়ে শুরু হয়েছিল এবং অতিসত্বরই তা স্বল্প সংখ্যার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। অতএব এ স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্যে সুসংবাদ।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) তারিক ইবনে শিহাব হতে বর্ণনা করেন যে, একজন ইয়াহূদী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের ধর্মীয় গ্রন্থে একটি আয়াত আছে, তা যদি ইয়াহুদীদের উপর অবতীর্ণ হতো তবে আমরা ঐ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে একটি ঈদের দিন হিসেবে গণ্য করতাম।” তখন হযরত উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আয়াতটি কি?” উত্তরে ইয়াহূদী বলেঃ (আরবী)-এ আয়াতটি। হযরত উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! যে দিনে ও যে সময়ে উক্ত আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল আমি উক্ত দিন ও সময় সম্পর্কে অবগত আছি। ওটা ছিল আরাফার দিন শুক্রবার সন্ধ্যার সময়।" ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটিকে তাদের গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থের কিতাবুত তাফসীরে এ হাদীসটি তারিক হতে বর্ণনা করেন তিনি বলেন যে, ইয়াহুদীগণ হযরত উমার (রাঃ) বললোঃ “আপনারা আপনাদের পবিত্র কুরআনের এমন একটি আয়াত পাঠ করে থাকেন যে, যদি ঐ আয়াতটি আমাদের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের উপর অবতীর্ণ হতো তবে আমরা ঐ দিনকেই ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করতাম।" তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমি এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় ও স্থান সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছি। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন কোথায় ছিলেন সেটাও জানি। উক্ত দিনটি ছিল আরাফার দিন এবং আল্লাহর শপথ! আমিও সে সময় আরাফায় ছিলাম।” সুফিয়ান বলেনঃ “আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল কি-না এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে।” ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ সুফিয়ান যদি এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে থাকেন যে, শুক্রবারের কথাটি হাদীসের বর্ণনার মধ্যে রয়েছে কি-না, তবে এটা হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে তাঁর অসতর্কতা। কারণ, তিনি সন্দেহ করেছেন যে, তাঁর শায়েখ তাঁকে শুক্রবারের কথা বলেছেন কি বলেননি। আর যদি তার এ ব্যাপারে সন্দেহ হয়ে থাকে যে, বিদায় হজ্বের বছর আরাফায় অবস্থান শুক্রবার দিন হয়েছিল কি-না? তবে আমার ধারণায় এ সন্দেহ সুফিয়ান সওরী কর্তৃক হতে পারে না। কারণ, এটা এমন একটি জানা ও প্রসিদ্ধ ঘটনা যাতে মাগাযী’ ও ‘সিয়র লেখক এবং ফকীহগণ একমত। এ ব্যাপারে এতো অধিকসংখ্যক প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণিত রয়েছে যে, এতে সন্দেহের কোন অবকাশই থাকতে পারে না। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি বহু সনদের মাধ্যমেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত কা'ব (রঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “যদি অন্য কোন উম্মতের উপর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হতো তবে তারা ঐ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে একটি ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করতো এবং সেই দিনে তারা সকলেই একত্রিত হতো।”তখন হযরত উমার (রাঃ) হযরত কা'ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কোন, আয়াত?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবী)-এ আয়াতটি। তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমি এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দিন ও সময় সম্পর্কে জানি। ওটা ছিল জুমআ ও আরাফার দিন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, এ দু’দিনই আমাদের ঈদের দিন।” ইবনে জারীর (রঃ) আম্মারা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)। আয়াতটি পাঠ করেন। তখন একজন ইয়াহূদী তাঁকে বলেনঃ “যদি এ আয়াতটি আমাদের উপর অবতীর্ণ হতো তবে আমরা ওর অবতীর্ণ হওয়ার দিনকেই ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করতাম।” উত্তরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ওটা দু'টি ঈদের দিনে অবতীর্ণ হয়েছে। একটি ঈদের দিন এবং অপরটি জুম'আর দিন।” হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, .. (আরবী) আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর আরাফার দিন সন্ধ্যার সময় অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দণ্ডায়মান অবস্থায় ছিলেন। আমর ইবনে কায়েস আসসাকুনী বলেন যে, তিনি মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর দণ্ডায়মান অবস্থায় ... (আরবী) পূর্ণ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে শুনেন। অতঃপর মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াতটি আরাফার দিন অবতীর্ণ হয়। নবী করীম (সঃ) সে সময় মাওকাফে অবস্থান করছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এবং তিবরানী (রঃ) তাঁদের সনদের মাধ্যমে হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সঃ) সোমবার দিন জন্মগ্রহণ করেন, সোমবার দিন তিনি মক্কা হতে হিজরত করেন, সোমবার দিন তিনি মদীনায় প্রবেশ করেন এবং সোমবার দিন তিনি বদরের যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এ সোমবার দিন সূরা মায়িদাহ্ তথা ... (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং সোমবারের যিকরের (ইবাদতের) অধিক মূল্য দেয়া হয়েছে। ইবনে কাসীর (রঃ) এ হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেনঃ হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটি একটি ‘গারীব হাদীস এবং এর সনদ দুর্বল। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) তার সনদের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সঃ) সোমবার দিন জন্মগ্রহণ করেছেন, সোমবার দিন তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে, সোমবার দিন তিনি মক্কা হতে মদীনার দিকে হিজরত করেছেন এবং সোমবার দিন হাজরে আসওয়াদকে স্থাপন করা হয়েছে। তাফসীরকারক বলেনঃ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর এ বর্ণনায় সোমবার দিন সূরা মায়েদাহ অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ নেই। আল্লাহ পাক এ বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত।ইবনে কাসীর (রঃ) আরও বলেনঃ সম্ভবতঃ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতে চেয়েছিলেন যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দিন তিন প্রকারের ঈদের দিন ছিল। কিন্তু বর্ণনাকারী ভুল বশতঃ (আরবী) শব্দের দ্বারা সোমবারের অর্থ করেছেন। আল্লাহই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জানেন।ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় সম্পর্কে আরও দু'টি অভিমত রয়েছে। একটি অভিমত হলো এই যে, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিন কারও জানা নেই। ইবনে জারীর এ অভিমতের স্বপক্ষে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একটি হাদীসের উল্লেখ করেছেন। আর একটি মতানুযায়ী বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিদায় হজ্বের সফরে অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে জারীর এ হাদীসটি তার সনদের মাধ্যমে রাবী ইবনে আসাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ ইবনে মিরদুওয়াই তাঁর সনদের মাধ্যমে আবু সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর গাদিরে জুমের দিন অবতীর্ণ হয়েছে এবং ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমি যার নেতা আলীও তার নেতা।” ইবনে মিরদুওয়াই এ হাদীসটি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঐদিনটি ছিল ১৮ই যিলহজ্ব। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিদায় হজ্ব থেকে প্রবর্তনের দিন। ইবনে কাসীর (রঃ) উপরোক্ত মতগুলোর কোনটিই শুদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেছেন। বরং সঠিক ও সন্দেহাতীত অভিমত এই যে, আয়াতটি আরাফার দিন অবতীর্ণ হয়েছে। আর সেদিন ছিল জুম'আর দিন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ), আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), ইসলামের প্রথম বাদশাহ্ মু'আবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রাঃ), কুরআনের ভাষ্যকার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হতেও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আরাফার দিনটি ছিল জুম'আর দিন। শা'বী, কাতাদাহ ইবনে দিমাআহ, শাহর ইবনে হাওশাব এবং বহু ইমাম ও আলেমেরও অভিমত এটাই। ইবনে জারীর তাবারীও এ মতটিই গ্রহণ করেছেন।(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ যে সমস্ত বস্তুকে হারাম করেছেন, প্রয়োজনের তাকিদে যদি কোন লোক ওগুলো খেতে বাধ্য হয় তবে সেগুলো খেতে পারে। আল্লাহ এ ব্যাপারে তার প্রতি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কেননা, আল্লাহ জানেন যে, সে অপারগ ও অক্ষম হয়ে হারাম বস্তুকে গ্রহণ করেছে। সুতরাং তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। ইবনে হিব্বানের সহীহ গ্রন্থে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে যে কাজ করার অনুমতি প্রদান করেছেন তা পালন করাকে তিনি ঐরকম পছন্দ করেন যেমন তিনি তার অবাধ্য না হওয়াকে পছন্দ করে থাকেন।আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর মুসনাদে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুমতিকে গ্রহণ করলো না সে যেন আরাফার পাহাড় সমূহের সমান গুনাহ্ করলো। এজন্যেই ফিকাহূবিদগণের মতে কখনও মৃত জন্তু খাওয়া ওয়াজিব এবং ওটা ঐ সময়, যখন হালাল বস্তু পাওয়া যায় না, আর ক্ষুধার কারণে মৃত্যুর আশংকা রয়েছে। আবার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কখনও মৃত জন্তু খাওয়া মুস্তাহাব এবং কখনও মুবাহ্। অবশ্য প্রয়োজনের তাকিদে হারাম বস্তু কি পরিমাণ গ্রহণ করা যাবে এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে যে পরিমাণ খেলে জান বাঁচে তার বেশী নয়। কারও মতে পেট ভরেও খাওয়া যাবে। আবার কারো কারো মতে পেট ভরে খাওয়াও যাবে এবং ভবিষ্যতের জন্যে রেখেও দেয়া যাবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আহকাম সম্পর্কিত কিতাবে পাওয়া যাবে।যদি কোন ব্যক্তি ক্ষুধার তাড়নায় বিব্রত হয়ে পড়ে, এমতাবস্থায় মৃত জন্তু পেলে বা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার পেলে সে কি মৃত জন্তু বা শিকারকৃত জন্তু খেয়ে নেবে না অন্যের খাদ্য তার বিনানুমতিতেই খেয়ে নেবে এবং পরে মালিককে সেই পরিমাণ খাদ্য দিয়ে দেবে, এ ব্যাপারে আলেমদের দু'ধরনের অভিমত রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতে দু'ধরনের অভিমতই বর্ণিত হয়েছে। অধিকাংশ সাধারণ লোকের মধ্যে ধারণা প্রচলিত আছে যে, মৃতজন্তু হালাল হওয়ার জন্যে তিন দিন পর্যন্ত ক্ষুধার্ত থাকা শর্ত। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন। যে, এ শর্ত ঠিক নয়, বরং যখনই কোন ব্যক্তি ক্ষুধার তাড়নায় মৃত খেতে বাধ্য ও মজবুর হয়ে পড়বে তখনই তার জন্যে তা খাওয়া জায়েয। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) তার সনদের মাধ্যমে আবু ওয়াকিদ আল লায়সী হতে বর্ণনা করেন যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমরা কখনও কখনও এমন স্থানে উপস্থিত হই সেখানে আমরা ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ি। তখন কোন্ কোন্ অবস্থায় আমাদের জন্যে মৃত জন্তু খাওয়া হালাল হবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যখন তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় কোন খাদ্য বা তরিতরকারী না পাও তখন তোমরা তা (মৃত জন্তু) খেতে পার।” হাদীসে উল্লিখিত সনদটি ইমাম আহমাদ একাই তাঁর গ্রন্থে এনেছেন। অবশ্য সনদটি সহীহ। কারণ, ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) সনদ সহীহ হওয়ার জন্যে যেসব শর্ত আরোপ করেছেন তা উক্ত শর্তগুলো পূরণ করে। এ হাদীসটি ইবনে জারীরও তার সনদের মাধ্যমে ইমাম আওযায়ী হতে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ এ হাদীসটিকে “মুরসাল" সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, যে সনদে কোন সাহাবীর নাম উল্লেখ থাকে না তাকে মুরসাল সনদ বলে। ইবনে জারীর তার সনদের মাধ্যমে ইবনে আউন হতে বর্ণনা করেন, আমি হাসানের নিকট সামুরার কিতাব দেখতে পাই এবং তার সম্মুখে ওটা পাঠ করি। তাতে লিপিবদ্ধ ছিল যে, সকাল বা সন্ধ্যায় খাদ্য পাওয়া না গেলে ঐ অবস্থাকে ক্ষুধার চরম অবস্থা বলে বিবেচনা করা যাবে। (আর এ অবস্থায় মৃত জন্তু খাওয়া যেতে পারে) হাসান বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ কোন অবস্থায় হারাম বস্তু খাওয়া যায়? তিনি উত্তরে বলেনঃ “যখন তুমি তোমার পরিবারবর্গের জন্যে দুধ অথবা অন্য খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করতে না পার তখন হারাম বস্তু (মৃত জন্তু) খেতে পার।” অপর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হালাল ও হারাম বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। উত্তরে তিনি বলেনঃ “তোমার জন্যে পবিত্র বস্তু খাওয়া হালাল এবং অপবিত্র বস্তু খাওয়া হারাম। তবে যদি তুমি কখনো কোন খাদ্য খেতে বাধ্য হও তাহলে হালাল বা হারাম বিবেচনা না করে খেতে পার। কিন্তু যে অবস্থায় তুমি তা পরিহার করে চলতে পার সে অবস্থায় তা খাওয়া হারাম।” ঐ ব্যক্তি তখন তাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, উক্ত অনন্যোপায় অবস্থাটা কি? যে অবস্থায় আমার জন্যে হারাম খাওয়া সিদ্ধ এবং ঐ অবস্থাই বা কি, যে অবস্থা আমাকে হারাম বস্তু খাওয়া থেকে নিবৃত্ত রাখবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “ঐ অবস্থাকে অনন্যোপায় অবস্থা বলা হয়, যে অবস্থায় তুমি কোন হালাল বস্তু না পাও অথচ তোমার আকাক্ষিত বস্তুগুলো হারাম বস্তু হিসেবে পেয়ে থাক। ঐ সময় তুমি ওগুলো দ্বারা প্রয়োজনমত তোমার পরিবার পরিজনকে খাওয়াও। তবে যখন ওগুলো পরিহার করে চলার অবস্থা সৃষ্টি হয় তখন সেগুলো খাওয়া বন্ধ কর। আর অনুকূল অবস্থা বলতে ঐ অবস্থাকে বুঝায়, যে অবস্থায় তুমি তোমার পরিজনকে শুধুমাত্র রাতের বেলায় সামান্য পরিমাণ পানীয় বস্তু দিতে পার। এ অবস্থায় তুমি হারাম বস্তু পরিহার কর। কারণ এটা তোমার জন্যে অনুকূল অবস্থা। তাই এ অবস্থায় কোন হারাম খাওয়া জায়েয নয়।” ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাঁর সনদের মাধ্যমে নুয়ায়ী আল-আমেরীর মাধ্যমে বর্ণনা করেন যে, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ কোন অবস্থায় আমাদের জন্যে মৃত জন্তু খাওয়া হালাল? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমাদের খাদ্য কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ আমরা সকালে এক পেয়ালা এবং বিকালে এক পেয়ালা দুধ পান করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এ অবস্থাকে ক্ষুধার্ত অবস্থা বলা যায়।” তিনি এ অবস্থায় তাঁদেরকে মৃত জন্তু খেতে অনুমতি দেন। ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) এ হাদীসটিকে একাই তাঁর গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ তারা সকাল ও বিকাল বেলায় যা খেতো তা তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিলনা বলেই তাদের প্রয়োজন মিটানোর জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে মৃতজন্তু খেতে অনুমতি দিয়েছেন। ফিকাহবিদদের একটি দল এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, এ জাতীয় লোকদের জন্যে পেট ভরেও হারাম বস্তু খাওয়া জায়েয। শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর জন্যে খাওয়া যেতে পারে, এরূপ শর্ত তারা আরোপ করেননি। অবশ্য আল্লাহই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জানেন।ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাঁর সনদের মাধ্যমে সামুরা হতে, আর একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, একটি লোক তাঁর পরিবার পরিজনসহ হাররা নামক স্থানে অবতরণ করে। তথায় এক ব্যক্তি তার উষ্ট্রীকে হারিয়েছিল। সে এ লোকটিকে বললোঃ 'যদি তুমি আমার হারানো উটটি পাও তবে তোমার কাছে রেখে দিও।' এরপর সে উষ্ট্ৰীটি পেল এবং বহু খোজাখুজির পরেও মালিকের কোন সন্ধান পেলো না। ইত্যবসরে এ উষ্ট্ৰীটি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লো। তখন তার স্ত্রী তাকে বললোঃ তুমি উষ্ট্রীটিকে যবেহ কর। কিন্তু সে যবেহ করতে অস্বীকার করলো এবং পরে উষ্ট্ৰীটি মারা গেল। মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী তাকে উষ্ট্রীটির চামড়া ছাড়াতে এবং ওর গোশত ও চর্বি শুকিয়ে নিতে বললো, যেন তারা তা খেতে পারে। তখন সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস না করে তা করতে অস্বীকার করলো। এর পর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কাছে কি এ পরিমাণ খাদ্য আছে যে, ওর ফলে তুমি এ মৃত উস্ত্রীর গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পার?” উত্তরে লোকটি বললোঃ না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে তা খেতে অনুমতি দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন যে, এরপর উষ্ট্রীর মালিক ফিরে আসে এবং লোকটি তাকে সমস্ত খবর খুলে বলে। উষ্ট্রীর মালিক তাকে বলে, তুমি প্রথমেই কেন উষ্ট্রীকে যবেহ করে খাওনি? সে উত্তরে বলেঃ আমি তোমার সামনে লজ্জিত হবো বলেই যবেহ করিনি।' এ হাদীসটিও ইমাম আবূ দাউদ (রঃ) একাই বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের আলোকে ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের অপর একটি দল দলীল গ্রহণ করেন যে, এ প্রকার লোকদের জন্যে হারাম বস্তু পেট ভরে খাওয়া, প্রয়োজনবোধে কিছু সময়ের জন্যে সঞ্চিত করা উভয়ই জায়েয। তবে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন।(আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে লিপ্ত না হয় তার জন্যেই এ প্রকারের হারাম বস্তু ভক্ষণ করা বৈধ। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ মহান আল্লাহ সূরা মায়িদাহর এ আয়াতে শুধুমাত্র পাপে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্যে হারাম বস্তু ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু সীমালংঘনকারীদের জন্যেও যে তা ভক্ষণ করা হারাম তার কোন উল্লেখ নেই। যেমন সূরা বাকারার আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। আয়াতটি নিম্নরূপঃ“যারা অনন্যোপায় অবস্থায় অন্যায়কারী, কিন্তু সীমালংঘনকারী নয় তাদের কোন পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” এ আয়াত হতে ফিকাহবিদগণের একটি দল প্রমাণ গ্রহণ করেন যে, যে ব্যক্তি সফরে নাফরমানীমূলক কাজে লিপ্ত থাকে, সে সফর সংক্রান্ত ব্যাপারে শরীয়তের শিথিলতা পাওয়ার যোগ্য নয়। কেননা, পাপ কার্যে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্যে শিথিলতা প্রযোজ্য নয়। তবে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-মায়িদা 5:4

মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী আয়াতে শরীর বা দ্বীন অথবা উভয়ের পক্ষে ক্ষতিকর ও অপবিত্র বস্তুগুলোকে হারাম করেছেন। তবে প্রয়োজনবোধে আবার ঐগুলোকে হালাল করেছেন। যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলেছেনঃ “আল্লাহ তোমাদের জন্যে বিশদভাবে হারাম বস্তুগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। তবে যদি তোমরা অনন্যোপায় হয়ে পড় তবে ঐগুলো খাওয়া তোমাদের জন্যে হালাল।” এরপর মহান আল্লাহ কোন কোন বস্তু হালাল সে সম্পর্কে এ আয়াতে বর্ণনা করেছেন। যেমন সূরা আ'রাফে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পবিত্র বস্তুগুলোকে তার উম্মতের জন্যে হালাল করেছেন এবং অপবিত্র বস্তুগুলো তাদের জন্যে হারাম করেছেন। ইবনে আবি হাতিম তাঁর সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেন যে, একদা তাই গোত্রের আলী ইবনে হাতিম নামক একজন লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ মৃত্যু কে হারাম করেছেন। এখন আমাদের জন্যে কোন বস্তুগুলো হালাল?” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সাঈদ বলেন যে, যবেহকৃত জন্তুকেই তাইয়েব বলা হয়। একদা ইমাম যুহরীকে “ওষুধ হিসেবে প্রস্রাব পান করা জায়েয কি না”-এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “ওটা পবিত্র নয়?” ইবনে আবি হাতিম এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে ওয়াহ্হাব বলেন যে, মানুষ যে সমস্ত পশু খায় না সেগুলো বেচা-কেনা করা জায়েয কি না সে সম্পর্কে একদা। ইমাম মালিক (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেন যে, ওগুলোর বিক্রয়লব্ধ অর্থ পবিত্র বস্তুর অন্তর্ভুক্ত নয়।(আরবী) কুকুর, চিতাবাঘ, বাজপাখী প্রভৃতি শিকারী জানোয়ার তোমাদের জন্যে যা শিকার করে আনে সেটাও তোমাদের জন্যে হালাল। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেঈ এবং ইমামের এটাই অভিমত। আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, শিকারী পশু বলতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর, বাজপাখী এবং অন্যান্য পশুকে বুঝানো হয়। এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও বলেন যে, খায়সামা, তাউস, মুজাহিদ, মাকহুল এবং ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর হতেও এ ধরনের বর্ণনা এসেছে। হাসান হতে বর্ণিত আছে যে, বাজ ও সাকার’ পাখী দু’টিও -এর অন্তর্ভুক্ত। আলী ইবনে হুসাইন হতেও এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। মুজাহিদের মতে যে কোন ধরনের পাখীর শিকার খাওয়া মাকরূহ। তার এ মতের স্বপক্ষে তিনি (আরবী) -এ আয়াতটি উল্লেখ করেন। সাঈদ ইবনে যুবাইর হতেও এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনে জারীর এ মতটি যহ্হাক এবং সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর তাঁর সনদের মাধ্যমে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, বাজ এবং অন্যান্য শিকারী পাখীর শিকার যদি জীবিতাবস্থায় পাওয়া যায় তবে তা যবেহ করে। খাওয়া হালাল, অন্যথায় তা হালাল নয়। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ অধিকাংশ আলেমের মতে শিকারী পাখীর শিকার শিকারী কুকুরের শিকারের ন্যায় খাওয়া হালাল। কারণ, শিকারী কুকুর যেমন শিকারকে থাবা দ্বারা যখম করে, অনুরূপভাবে পাখীও শিকারকে থাবা দ্বারা যখম করে। সুতরাং পাখী এবং কুকুরের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন পার্থক্য নেই। এটাই ইমাম চতুষ্টয় এবং অন্যান্যদের অভিমত। ইবনে জারীরও এ মতকেই সমর্থন করেন। তারা এ মতের স্বপক্ষে আদী ইবনে হাতিমের হাদীসটিকে উল্লেখ করেছেন। আদী ইবনে হাতিম বলেনঃ আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাজ পাখীর শিকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেনঃ “যদি সে তোমার জন্যে শিকার করে নিয়ে আসে তবে তুমি তা খেতে পার।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর মতে কাল কুকুর দ্বারা শিকার করা জায়েয় নয়। তিনি প্রমাণ হিসেবে সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃরাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি জিনিস নামায ভঙ্গ করে থাকে। গাধা, স্ত্রীলোক ও কালো কুকুর ।” বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ লাল কুকুর হতে কালো কুকুরকে পার্থক্য করার কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেন :“কালো।” অন্য আর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকল প্রকার কুকুরকে হত্যা করার জন্যে আদেশ দেন। পরে তিনি আবার বলেনঃ “সকল প্রকার কুকুরকে হত্যা করার প্রয়োজন নেই। শুধু কালো কুকুরগুলোকে তোমরা হত্যা কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) ধাতু হতে উদ্ভূত। (আরবী)-এর অর্থ হলো অর্জন করা। যেহেতু শিকারী জন্তুগুলো মালিকের জন্যে শিকারকে অর্জন করে নিয়ে আসে, সেহেতু এ জন্তুগুলোকে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। আর আরবের অধিবাসীরা এ কথাটি ঐ সময় বলে যে সময় কোন ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনের জন্যে ভাল কিছু অর্জন করে নিয়ে আসে। ঠিক এমনিভাবে তারা বলে থাকে (আরবী)” অর্থাৎ অমুক ব্যক্তির কোন অর্জনকারী নেই! পবিত্র কুরআনেও (আরবী) শব্দটি অর্জন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দিবাভাগে ভাল বা মন্দ যাই কর, আল্লাহ তা সম্যক অবগত আছেন।”(৬:৬০) এ আয়াতের শানে নকূল প্রসঙ্গে ইবনে আবি হাতিম বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে। হাদীসটি নিম্নরূপঃ আবু রাফে’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সকল প্রকার কুকুরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। তখন বহু কুকুরকে হত্যা করা হলো। ফলে সাহাবীগণ রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যেগুলোকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলো দ্বারা আমাদের কি ধরনের উপকার বৈধ?” তিনি তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে চুপ থাকলেন। তখন পবিত্র কুরআনের (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যখন কোন লোক তার কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠায় এবং পাঠাবার সময় আল্লাহর নাম উল্লেখ করে, এমতাবস্থায় যদি কুকুর শিকার করে মালিকের জন্যে রেখে দেয় এবং তা না খায় তবে উক্ত শিকার খাওয়া যাবে।" ইবনে জারীর তার সনদের মাধ্যমে আবু রাফে’ হতে বর্ণনা করেন যে, একদা হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন, কিন্তু অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও যখন তিনি ভেতরে আসলেন না তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আল্লাহর দূত! আমাদের অনুমতি দেয়া সত্ত্বেও কেন আপনি ভেতরে প্রবেশ করছেন না? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যেই ঘরে কুকুর থাকে সেই ঘরে আমরা প্রবেশ করি না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু রাফে’ (রাঃ)-কে মদীনার সকল প্রকার কুকুর হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করেন। হযরত আবু রাফে’ বলেনঃ “আমি তখন সকল প্রকার কুকুরকে হত্যা করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমি এক বৃদ্ধা মহিলার একটি কুকুরকে হত্যা করতে উদ্যত হলাম। কুকুরটি তখন মহিলাটির নিকট গিয়ে ঘেউ ঘেউ করে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। এ দেখে আমার অন্তরে দয়ার উদ্রেক হলো। আমি তখন কুকুরটিকে হত্যা করা হতে বিরত থাকলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে এসে ব্যাপারটি বললাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে পুনরায় কুকুরটিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। সুতরাং আমি ওকে হত্যা করি। সাহাবায়ে কিরাম তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যে জন্তুগুলোকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, ওগুলো দ্বারা আমরা কোন উপকার লাভ করতে পারি কি?”ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। হাকিম এ হাদীসটিকে তাঁর গ্রন্থে স্থান (আরবী) দিয়েছেন এবং হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, এটি একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু ইমাম বুখারী ও মুসলিম এ হাদীসটিকে তাঁদের গ্রন্থে স্থান দেননি।ইবনে জারীর ইকরামা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবু রাফে’ (রাঃ)-কে কুকুর হত্যা করার জন্যে প্রেরণ করেন। তিনি তখন কুকুর হত্যা করতে করতে মদীনার উঁচু এলাকায় উপস্থিত হন। সে সময় আসিল ইবনে আদী (রাঃ), সা’দ ইবনে খুযাইমা (রাঃ) এবং ওয়াইম ইবনে সায়েদা (রাঃ) নামক সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে বলেনঃ “আমরা এ জন্তুগুলো হতে কি ধরনের উপকার গ্রহণ করতে পারি?” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হাকিমও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কুরজীও এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন যে, কুকুর হত্যা প্রসঙ্গে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে।(আরবী) এটা (আরবী) –এর (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে। এ অবস্থায় এটা বাক্যের কর্তার অবস্থা বর্ণনা করে। এটা (আরবী) –এরও (আরবী) হতে পারে। এ অবস্থায় এটা বাক্যের কর্মের অবস্থা বর্ণনা করে। অর্থাৎ যে সমস্ত শিকারী পশুকে তোমরা শিকার করা শিক্ষা দিয়েছ, আর তারা তাদের থাবা এবং নখ দ্বারা শিকার করে, তাদের শিকার তোমরা খেতে পারবে। সুতরাং এ হতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শিকারী জন্তু যদি তার আঘাতের দ্বারা শিকারকে হত্যা করে তবে তা খাওয়া জায়েয হবে না। এটা ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দু'টি উক্তির একটি। একদল আলেমও এ অভিমত পোষণ করেন।(আরবী) অর্থাৎ জন্তু তখনই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবে যখন তার মধ্যে নিম্নলিখিত তিনটি গুণ পাওয়া যাবে। (ক) যখন তাকে শিকারের জন্যে পাঠানো হয় তখন সে ছুটে যায়, (খ) যখন তাকে ডাকা হয় তখন সাথে সাথে ফিরে আসে এবং (গ) শিকার করার পর ওটা সে নিজে ভক্ষণ না করে তার মালিকের জন্যে রেখে দেয়। আর আল্লাহ এজন্যেই বলেনঃ “শিকারী জন্তুগুলো তোমাদের জন্যে যা রেখে দেয় তা তোমরা খাও এবং শিকারী পশুগুলোকে শিকারের জন্যে পাঠাবার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ কর।” অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জন্তুকে শিকারের জন্যে পাঠাবার সময় যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় তবে ওর শিকার খাওয়া হালাল, যদিও সে শিকার করার পর ওকে হত্যা করে ফেলে। এ ব্যাপারে সকল আলেমই একমত। এ আয়াত শিকার সম্পর্কে যে নির্দেশের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে, হাদীসেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবূ ইবনে হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাতিম, (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে শিকারের জন্যে পাঠাই এবং ঐ সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তোমার কুকুর যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয় এবং ওকে শিকারের জন্যে পাঠাবার সময় যদি তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে থাক তবে ওটা তোমার জন্যে যা শিকার করে আনবে তা তুমি খেতে পার, যদিও কুকুর ওকে মেরেও ফেলে। তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই জরুরী যে, ওটা শিকারের সময় অন্য কুকুর যেন ওর। সাথে মিলিত না হয়। কেননা, তুমি তোমার কুকুরটিকে আল্লাহর নাম নিয়ে ছেড়েছো বটে, কিন্তু অন্য কুকুরটিকে তো বিসমিল্লাহ বলে ছাড়া হয়নি।”আমি বললাম, আমি ধারাল খড়ি দ্বারা শিকার করে থাকি। তিনি বললেনঃ “যদি ওটা তীক্ষ প্রান্ত দিয়ে আহত করে তবে তুমি খেতে পার। কিন্তু যদি ভোতা দিক দিয়ে আহত করে তবে খেয়ো না। কেননা, ওকে ঝাপটা দিয়ে মারা হয়েছে।” অন্য বর্ণনায় নিম্নরূপ শব্দ রয়েছে-যখন তুমি তোমার কুকুরটিকে ছেড়ে দেবে তখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে। অতঃপর যদি ওটা শিকারকে ধরে রাখে এবং তোমার নিকট পৌছার সময় ঐ শিকার জীবিত থাকে তবে ওকে যবেহ করবে। আর যদি কুকুরটাই ওকে মেরে ফেলে এবং তার থেকে কিছুই ভক্ষণ না করে তবে ওটাও তুমি খেতে পার। কেননা, কুকুরের ওটাকে শিকার করাই হচ্ছে ওকে যবেহ করা। আর এক বর্ণনায় নিম্নরূপ শব্দগুলোও রয়েছে- যদি ওটা ওকে ভক্ষণ করে তাহলে তুমি ওটা খেয়ো না। কেননা, আমার আশংকা হচ্ছে যে, কুকুরটি শিকারটিকে নিজের জন্যেই তো ধরে রাখেনি? এটাই জমহূরের দলীল। আর প্রকৃতপক্ষে ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর সহীহ মাযহাবও এটাই যে, কুকুর যখন শিকারকে খেয়ে নেবে তখন ওটা সাধারণভাবেই হারাম হয়ে যাবে। এতে কোন ব্যাখ্যা নেই, যেমন হাদীসে রয়েছে। হ্যাঁ, তবে পূর্ববর্তী গুরুজনদের একটি দলের উক্তিও এটাই যে, ওটা সাধারণভাবেই হালাল। তাদের দলীল হচ্ছে নিম্নরূপঃ হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) বলেনঃ তুমি (ঐ শিকার) খেতে পার, যদিও কুকুরটি ওর এক তৃতীয়াংশ খেয়ে ফেলে। হযরত সাঈদ ইবনে আবি আক্কাস (রাঃ) বলেনঃ কুকুর যদি দুই তৃতীয়াংশও খেয়ে ফেলে তবুও তুমি ওটা খেতে পার। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর এটাই নির্দেশ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “যখন তুমি বিসমিল্লাহ বলে তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরটিকে শিকারের জন্যে ছেড়ে দেবে তখন ওটা যে জন্তুটিকে তোমার জন্যে ধরে রাখবে, তুমি ওটা খাবে, কুকুরটি ওটা থেকে কিছু খেয়ে থাকুক বা না থাকুক।” হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আতা' (রঃ) এবং হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে এ ব্যাপারে বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত আছে। যুহরী (রঃ) রাবীআহ (রঃ)-এবং মালিক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় প্রথম উক্তিতে এ দিকেই গেছেন এবং নতুন উক্তিতেও ঐ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত ইবনে জারীর (রঃ)-এর একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন লোক শিকারের উদ্দেশ্যে স্বীয় কুকুরটিকে প্রেরণ করে, অতঃপর শিকারকে এমন অবস্থায় পায় যে, কুকুরটি ওকে খেয়ে ফেলেছে তখন যা অবশিষ্ট রয়েছে সে তা খেতে পারে।” এ হাদীসের সনদে ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে এবং বর্ণনাকারী সাঈদ (রঃ)-এর হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) হতে শ্রবণ জানা যায়নি। আর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী ওকে মারফু করেন না, বরং হযরত সালমান ফারসী (রাঃ)-এর উক্তি নকল করেন মাত্র। এ উক্তিটি সঠিক বটে, কিন্ত এ অর্থেরই অন্যান্য মারফু হাদীসও বর্ণিত আছে। সুনানে আবি দাউদে হযরত আমর ইবনে শুআইব তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, আবু সা'লাবা (রাঃ) নামক একজন গ্রাম্য লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী কুকুর রয়েছে। ওর শিকার সম্পর্কে ফতওয়া কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ওটা যে জন্তু তোমার জন্যে ধরে আনে তা তোমার জন্যে হালাল।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ যবেহ করতে পারি বা না পারি, সর্বাবস্থাতেই কি (হালাল)? এবং কুকুরটি তা খেয়ে থাকে তবুও কি (হালাল)? তিনি জবাবে বললেনঃ হ্যাঁ, যদি খেয়ে থাকে তবুও (হালাল)।' তিনি আর একটি প্রশ্ন করলেনঃ আমি আমার তীর ও কামান দ্বারা শিকার করবো, এ ব্যাপারে ফতওয়া কি? তিনি জবাব দিলেনঃ “এমনকি যদি তুমি দেখতেও না পাও এবং অনুসন্ধানের পর পাওয়া যায় তবুও, যদি না তাতে অন্য কারও তীরের চিহ্ন থাকে। তিনি তৃতীয় প্রশ্ন করলেনঃ প্রয়োজনবোধে অগ্নিপূজকদের বরতন ব্যবহার করা আমাদের জন্যে কিরূপ? তিনি উত্তরে বললেনঃ “তুমি ওটা ধুয়ে নাও। অতঃপর তুমি তাতে খেতে ও পান করতে পার।” হাদীসটি সুনানে নাসাঈর মধ্যে রয়েছে। সুনানে আবি দাউদের দ্বিতীয় হাদীসে রয়েছেঃ “যখন তুমি স্বীয় কুকুরকে আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠাও তখন তুমি ওর শিকারকে খেতে পার, যদিও কুকুর তা থেকে কিছু খেয়েও নেয়। আর তোমার হাত যে শিকারকে তোমার জন্যে নিয়ে আসে ওটাও তুমি খেতে পার।” এ দু'টি হাদীসের সনদ খুবই মজবুত ও উত্তম। অন্য হাদীসে আছে-তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর যে, শিকার তোমার জন্যে ধরে আনে, তুমি ওটা খেয়ে নাও। হযরত আদী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ যদি কুকুর তা থেকে কিছু খেয়ে নেয় তবুও কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তবুও?” এসব আছার ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, শিকারী কুকুর শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেললেও বাকী অংশ কুকুরের প্রভু খেতে পারে। এসব হচ্ছে ঐসব লোকের দলীল, যারা কুকুর ইত্যাদির ভক্ষণকৃত শিকারকে হারাম বলেন না। এ দুটি দলের (যারা সরাসরি হারাম বলেন বা হালাল বলেন) মাঝামাঝি আর একটি দল রয়েছেন। তারা বলেন যে, যদি কুকুর শিকার ধরার পর পরই তা খেয়ে ফেলে তবে বাকী অংশ হারাম। কিন্তু যদি শিকার ধরার পর স্বীয় প্রভুর জন্যে অপেক্ষা করে এবং দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও প্রভুকে না পায়, তারপর ক্ষুধার তাড়নায় তা খেয়ে ফেলে তবে অবশিষ্ট অংশ হালাল। প্রথম কথাটির উপর প্রযোজ্য হয় হযরত আদী (রাঃ) সম্বলিত হাদীস। দ্বিতীয় কথাটির উপর প্রযোজ্য হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ) সম্বলিত হাদীস। এ দু'টি মতভেদ অতি উত্তম এবং এর দ্বারা দু’টি বিশুদ্ধ হাদীস একত্রিত হচ্ছে। উস্তাদ আবুল মায়ালী জুয়াইনী (রাঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘নিহায়ার মধ্যে এ আশা করেছেন যে, যদি কেউ এর মধ্যে এ ব্যাখ্যা করে নেয়। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা যে, জনগণই এর ব্যাখ্যা করে নিয়েছে। এ মাসআলায় চতুর্থাংশের মত এই যে, কুকুরের ভক্ষিত শিকার হারাম, যেমন নাকি হযরত আদী (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে। আর বাজ পাখীর ভক্ষিত শিকার হারাম নয়, কেননা সে তো খাবারের মাধ্যমেই শিক্ষা অর্জন করে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যদি পাখী স্বীয় মনিবের কাছে ফিরে আসে এবং শিকারকে হত্যা না করে, অতঃপর সে যদি পাখায় খামচা দেয় অথবা গোস্ত খায় তবে তুমি তা খেয়ে নাও। ইবরাহীম নাখঈ, শা’বী ও হাম্মাদ ইবনে সুলাইমানও এ কথা বলেন। তাদের দলীল হযরত ইবনে আবু হাতিমের বর্ণনা করা এ হাদীস যে, হযরত আদী (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমরা কুকুর এবং বাজের দ্বারা শিকার করে থাকি। এটা কি আমাদের জন্যে হালাল? তিনি (সঃ) বলেনঃ “যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী জন্তু তোমাদের জন্যে শিকারকে ধরে রাখে এবং তোমরা ওকে পাঠাবার সময় আল্লাহর নাম করে থাক, তোমরা ঐ শিকার খেয়ে নাও।” তিনি পুনরায় বললেনঃ “তুমি যে কুকুরকে আল্লাহর নাম নিয়ে ছেড়েছো, সে যে জন্তুকে ধরে রাখবে, তুমি তা খাও।” (আদী রাঃ বলেনঃ) আমি বললামঃ সে যদি ওকে মেরে ফেলে তবুও কি? তিনি উত্তর দিলেনঃ “মেরে ফেলে তবুও। তবে শর্ত এই যে, যেন খেয়ে না থাকে।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলামঃ যদি ঐ কুকুরের সঙ্গে অন্য কুকুরও মিলিত হয়ে যায় তাহলে? তিনি জবাবে বললেনঃ “তাহলে তা তুমি খেয়ে না যে পর্যন্ত না তোমার মনে বিশ্বাস জন্মে যে, তোমার কুকুরই ওকে শিকার করেছে।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলামঃ মানুষ তীর দ্বারা শিকার করে থাকে। ওর মধ্যে কোনটা হালাল? তিনি উত্তর দিলেনঃ “যে তীর আহত করে এবং তুমি ওটা ছাড়বার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে থাকে, ঐ শিকার তুমি খেতে পার।” প্রকাশ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুকুরের বেলায় না খাওয়ার শর্ত আরোপ করলেন, কিন্তু বাজ পাখীর বেলায় সেই শর্ত আরোপ করলেন না। সুতরাং এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য সাব্যস্ত হয়ে গেল। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ তোমাদের জন্তুগুলো যে হালাল জন্তুগুলো শিকার করে আনে তা তোমরা খাও এবং ঐ শিকারী জন্তুগুলোকে ছাড়বার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। যেমন হযরত আদী (রাঃ) ও হযরত সা'লাবা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। এজন্যেই ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখ ইমামগণ এ শর্ত গুরুত্বের সাথে আরোপ করেছেন যে, শিকারের জন্যে শিকারী জন্তুকে ছাড়বার সময় এবং তীর ছাড়বার সময় বিসৃমিল্লাহ্ অবশ্যই উচ্চারণ করতে হবে। জমহুরের প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই যে, এ আয়াত ও হাদীসের ভাবার্থ হচ্ছে শিকারী জন্তুকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠাবার সময় অল্লাহর নাম নেয়া। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “শিকারী জন্তুকে শিকারের জন্যে প্রেরণের সময় বিসমিল্লাহ পড়ে নাও। তবে ভুলে গেলে কোন দোষ নেই। কেউ কেউ বলেন। যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে খাওয়ার সময় বিসৃমিল্লাহ বলা। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার ইবনে আবূ সালমা (রাঃ)-এর পালিতা মেয়েকে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খাও।' সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এমন লোকেরা আমাদের নিকট গোশত নিয়ে আসে যারা নওমুসলিম, তারা (জন্তু যবেহ্ করার সময়) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কি করে না তা আমাদের জানা নেই। আমরা সেই গোশত খেতে পারি কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তা খেয়ে নাও।' মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ছয়জন সাহাবীর সাথে খানা খাচ্ছিলেন। এমন সময় একজন বেদুঈন এসে তা হতে দু’গ্রাস খেয়ে নেয়। তখন নবী (সঃ) বললেনঃ “যদি লোকটি বিসমিল্লাহ বলতো তবে এ খাদ্য তোমাদের সকলের জন্যেই যথেষ্ট হতো। তোমাদের কেউ যখন খানা খেতে বসবে তখন সে যেন বিসমিল্লাহ বলে নেয়। যদি প্রথমে (বিসমিল্লাহ বলতে) ভুলে যায়। তবে যখন স্মরণ হবে তখন যেন বলে (আরবী) আল্লাহর নামে শুরু করছি এর প্রথমের জন্য ও শেষের জন্য। এ হাদীসটিই মনকাতা সনদে সুনানে ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। অন্য সনদে এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে। ইমাম তিরিমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। জাবির ইবনে সাবীহ (রঃ) বলেনঃ “আমি (একবার) হযরত মুসা ইবনে আবদুর রহমান খুযাঈর সাথে (ওয়াসিত নামক জায়গা)-এর সফরে বের হই। তার অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি খাদ্য খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতেন এবং শেষ গ্রাসের সময় (আরবী) বলতেন। তিনি আমাকে বললেন যে, খালিদ ইবনে উমাইয়া ইবনে মাখশা (রাঃ) নামক সাহাবী বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আহারের সময় বিসমিল্লাহ বলে না তার সাথে শয়তান খেতে থাকে। অতঃপর যখন সে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তখন তার (শয়তানের) বমি হয়ে যায় এবং যতটা সে খেয়েছে তার সবই বেরিয়ে পড়ে।” (মুসনাদ আহমাদ ইত্যাদি) ইবনে মুঈন (রঃ) এবং নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসের বর্ণনাকারীকে নির্ভরযোগ্য বলেন বটে, কিন্তু আবু ফাতহ ইযদী (রঃ) বলেন যে, এ বর্ণনাকারীর হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ আমরা যখন নবী (সঃ)-এর সাথে আহারে বসতাম তখন খাদ্যে তাঁর হাত দেয়ার পূর্বে আমরা হাত দিতাম না। (একদা) আমরা তার সাথে আহার করছিলাম, এমন সময় একটি মেয়ে পড়তে পড়তে আসলো, কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিচ্ছিল। এসেই সে মুখে গ্রাস উঠিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু নবী (সঃ) তার হাত ধরে নিলেন। এরপর এভাবেই একজন বেদুঈন আসলো এবং এসেই পাত্রে হাত দিতে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তারও হাতটি ধরে ফেললেন এবং বললেনঃ “যখন কোন খাদ্যের উপর বিসমিল্লাহ বলা হয় না তখন শয়তান ঐ খাদ্যকে নিজের জন্যে হালাল করে নেয়। সে আমাদের সাথে খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে এ মেয়েটির সাথে এসেছে, এমতাবস্থায় আমি তার হাত ধরে ফেলেছি। তারপর সে এ বেদুঈনের সাথে এসেছে। আমি তার হাত ধরে ফেলেছি। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এ দু’জনের হাতের সাথে শয়তানের হাতও আমার হাতের মধ্যে রয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে নাসাঈতে রয়েছে)সহীহ মুসলিম, সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসাঈ ও সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ মানুষ যখন বাড়ীতে প্রবেশের সময় ও খাদ্য খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তখন শয়তান (তার অধীনস্থদেরকে) বলে-“তোমাদের জন্যে না আছে রাত্রি কাটানোর জায়গা এবং না আছে রাত্রির আহারের ব্যবস্থা।” আর যখন বাড়ীতে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না তখন শয়তান বলে-“তোমরা রাত্রি কাটানোর এবং রাত্রির আহারের জায়গা পেয়ে গেছো।" মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে অভিযোগের সুরে বললোঃ আমরা খাদ্য খাই কিন্তু পরিতৃপ্ত হই না, (এর কারণ কি)। তিনি উত্তরে বললেনঃ “সম্ভবতঃ তোমরা পৃথক পৃথকভাবে খানা খেয়ে থাক। তোমরা সবাই মিলিতভাবে খানা খাও এবং বিসমিল্লাহ বল। এতে আল্লাহ তোমাদের জন্যে (খাদ্যে) বরকত দান কররেন।”

আল-মায়িদা 5:5

হালাল ও হারামের বর্ণনা দেয়ার পর এটাকে পরিষ্কার রূপে বর্ণনা করার জন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, সমুদয় পবিত্র বস্তু হালাল। তারপর তিনি ইয়াহূদ ও নাসারাদের যবেহকৃত জীবগুলোর বৈধতার বর্ণনা দিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবূ উমামাহ (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), ইকরামা (রঃ), আতা’ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মাকহ্ল (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), মুকাতিল (রঃ) এবং ইবনে হাইয়ানও (রঃ) একথাই বলেন যে, এখানে এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের স্বহস্তে যবেহকৃত জানোয়ার। এটা খাওয়া মুসলমানদের জন্যে হালাল। কেননা, তারাও গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করাকে নাজায়েয মনে করে এবং যবেহ করার সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নাম নেয় না। যদিও আল্লাহ সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে অমূলক, যা থেকে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা পবিত্র ও বহু। ঊর্ধ্বে। সহীহ হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে আমি চর্বি ভর্তি একটি মশক প্রাপ্ত হই। আমি ওটাকে নিজের অধিকারে নিয়ে নিই এবং বলি, আজ আমি কাউকেও এর অংশ দেবো না। তারপর এদিক ওদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। হঠাৎ দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং মুচকি হাসছেন। এ হাদীসটি দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা হয়েছে সে, গনীমতের মধ্য হতে পানাহারের কোন প্রয়োজনীয় জিনিস বন্টনের পূর্বেও নিয়ে নেয়া জায়েয। এ দলীল এ হাদীসের দ্বারা পরিষ্কার রূপে প্রকাশ পেয়েছে। তিন মাযহাবের ফকীহগণ মালেকীদের সামনে এ সনদ পেশ করে বলেছেনঃ তোমরা যে বলে থাক, আহলে কিতাবের নিকট যে খাদ্য হালাল সেই খাদ্য আমাদের নিকটও হালাল- এটা ভুল। দেখো, ইয়াহূদীরা চর্বিকে তাদের জন্যে হারাম মনে করে থাকে, অথচ মুসলমান ওটা গ্রহণ করছে। কিন্তু তাদের এ কথা বলা ঠিক নয়। কেননা, ওটা ছিল একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাছাড়া এটাও হতে পারে যে, ওটা ছিল এমন চর্বি যা ইয়াহূদীরাও তাদের জন্যে হালাল মনে করে থাকে। অর্থাৎ পিঠের চর্বি, নাড়ি সংলগ্ন চর্বি এবং হাড়ের সাথে লেগে থাকা চর্বি। এর চেয়ে আরও বেশী প্রমাণযুক্ত ঐ দলীলটি যাতে রয়েছে যে, খায়বারবাসী সদ্য ভাজা একটি ছাগী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপঢৌকন দিয়েছিল যার একটি কাঁধে তারা বিষ মিশ্রিত করেছিল। কেননা, তাদের জানা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাদের গোশত পছন্দ করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ গোশত মুখে দিয়ে দাঁত দ্বারা কাটা মাত্রই আল্লাহর নির্দেশক্রমে ঐ কাঁধ বলে উঠলোঃ “আমাতে বিষ মিশ্রিত রয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ওটা থুথু করে ফেলে দিলেন। ওর ক্রিয়া তাঁর সামনের দাঁতে রয়েও গেল। আহারে তার সাথে হযরত বাসার ইবনে মারূরও (রাঃ) ছিলেন। ঐ বিষক্রিয়াতেই তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হলেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে বিষ মিশ্রিতকারিণী মহিলাটিকেও হত্যা করা হলো, যার নাম ছিল যয়নব। এটা প্রমাণরূপে স্বীকৃত হওয়ার কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং সঙ্গীগণসহ ঐ গোশত ভক্ষণের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন এবং তারা যে চর্বিকে হারাম মনে করতো তা তারা বের করে ফেলেছে কি-না সেটাও তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন না। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, একজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দাওয়াত দেয় এবং তার সামনে যবের রুটি এবং পুরাতন শুষ্ক চর্বি হাযির করে। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া না হবে এটা খাওয়া হারাম করার পর আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের উপর দয়া পরবশ হয়ে তা মানসূখ বা রহিত করতঃ আহলে কিতাবের যবেহকৃত জন্তু তাদের জন্যে হালাল করে দেন। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, আহূলে কিতাবের যবেহকৃত জন্তু তাদের জন্যে হালাল করার দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয় না যে, যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হবে না সেটাও হালাল হবে। কেননা, তাদের মধ্যে মুশরিকও ছিল, যারা যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নিতো না, এমনকি তাদের গোশত ভক্ষণ যবেহর উপরই নির্ভরশীল ছিল না। বরং তারা মৃত জন্তুরও গোশত ভক্ষণ করতো। কিন্তু আহলে কিতাব এদের বিপরীত এবং এদের মত আরও কয়েকটি সম্প্রদায় রয়েছে। যেমন সামেরাহ, সায়েবাহ এবং ইবরাহীম (আঃ) ও শীষ (আঃ) প্রমুখ গয়গম্বরদের ধর্মের দাবীদার। যেমন আলেমদের দু’টি উক্তির মধ্যে একটি উক্তি রয়েছে। আর আরবের খ্রীষ্টান যেমন বানূ তাগলিব, তানূখ, বাহরা, জুযাম, লাখম, আমেলা এবং তাদের ন্যায় আরও। জমহুরের মতে এদের হাতে যবেহকত জানোয়ারের গোশত খাওয়া চলবে না। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা বা তাগলিবের হাতে যবেহকৃত জানোয়ারের গোশত ভক্ষণ করো না। কেননা, তারা তো শুধুমাত্র মদ্যপান ছাড়া খ্রীষ্টানদের নিকট হতে আর কিছুই গ্রহণ করেনি।”তবে সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে বান্ তাগলিবের খ্রীষ্টানদের হাতে যবেহকৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণে কোন দোষ নেই। এখন বাকি থাকলো মাজুসীদের ব্যাপারটা, তাদেরকে খ্রীষ্টানদের সাথে মিলিয়ে দিয়ে তাদের অনুগামী করতঃ তাদের নিকট জিযিয়া আদায় করা হলেও তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করা এবং তাদের যবেহকৃত জীবের গোশত ভক্ষণ করা জায়েয নয়। হ্যাঁ, তবে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর সঙ্গী সাথীদের অনুসারী আবু সউর ইবরাহীম ইবনে খালিদ কালবী এর বিপরীত মত পোষণ করেন। যখন তিনি এ কথা বলেন এবং জনগণের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়ে তখন ফকীহগণ এ কথার ভীষণভাবে প্রতিবাদ করেন। এমনকি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) তো একথাও বলে ফেলেন যে, এ মাসআলায় তিনি নিজের নামের মতই বটে অর্থাৎ বলদের পিতা। আবু সাউর একটি সাধারণ হাদীসকে সামনে রেখে একথা বলে দিয়েছেন যে, হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা মাজুসীদের সাথে আহলে কিতাবের ন্যায় ব্যবহার কর।” কিন্তু প্রথমতঃ এ বর্ণনা তো এ শব্দগুলো দ্বারা সাব্যস্তই নয়। দ্বিতীয়তঃ এ বর্ণনাটি মুরসাল'। হ্যাঁ, তবে সহীহ বুখারীতে শুধু এটুকু তো অবশ্যই রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হিজরের মাজুসীদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করেছিলেন। এসব ছাড়া আমরা বলি যে, আবু সাউরের পেশকৃত হাদীসকে যদি আমরা মেনেও নেই তথাপি আমরা বলতে পারি যে, এর ‘উমুম' দ্বারাও এ আয়াতের মাফহূম-মুখালিফের দলীলের মাধ্যমে আহলে কিতাব ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের যবেহকৃত জন্তু আমাদের জন্যে হারাম সাব্যস্ত হচ্ছে। এরপর বলা হচ্ছে-তোমাদের (মুসলমানদের) যবেহকৃত জীব তাদের (আহলে কিতাবদের) জন্যে হালাল। অর্থাৎ হে মুসলমানরা! তোমরা আহলে কিতাবদেরকে তোমাদের যবেহকৃত জীবের গোশত খাওয়াতে পার। এটা এ আমরের খবর নয় যে, তাদের ধর্মে তাদের জন্যে তোমাদের যবেহকৃত প্রাণী হালাল। হ্যা, তবে খুব বেশী বলা গেলে এটুকুই বলা যেতে পারেঃ এটা এ কথারই খবর হবে- তাদেরকেও তাদের কিতাবে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যে জীবকে আল্লাহর নামে যবেহ্ করা হয়েছে তা তারা খেতে পারে। এ ব্যাপারে এটা সাধারণ কথা যে, যবেহকারী তাদের ধর্মের অনুসারীই হোক বা অন্য কেউ হোক। কিন্তু প্রথম উক্তিটি হচ্ছে সবচেয়ে বেশী সুন্দর অর্থাৎ তোমাদের জন্যে অনুমতি রয়েছে যে, তোমরা আহ্লে কিতাবদেরকে তোমাদের যবেহকৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণ করাও, যেমন তোমরা তাদের যবেহকৃত জন্তুর গোশত খেতে পার। এটা যেন অদল বদলের হিসেবে বলা হয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালকে নিজের বিশেষ জামা দ্বারা কাফন পরিয়েছিলেন। কোন কোন গুরুজন যার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাকে নিজের জামাটি প্রদান করেছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বিনিময়ে তার কাফনের জন্যে স্বীয় জামাটি প্রদান করেছিলেন। হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মুমিন ছাড়া আর কারও সাথে উঠা বসা করো না এবং মুত্তাকীদের ছাড়া আর কাউকেও নিজেদের খাদ্য খেতে দিও না।" এ হাদীসটিকে এ অদল বদলের বিপরীত মনে করা ঠিক হবে না। কেননা, হতে পারে যে, মুস্তাহাব হিসেবে এ হুকুম দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ঘোষিত হচ্ছে-সতী সাধ্বী মুসলিম নারীদেরকে বিয়ে করা তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। এটা অবতরণিকা হিসেবে বলা হয়েছে। এ জন্যেই এর পরই বলা হচ্ছে-তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের সতী সাধ্বী নারীদেরকে বিয়ে করা তোমাদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে। এ উক্তিও রয়েছে যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বাধীনা নারীগণ। অর্থাৎ দাসী যেন না হয়। এ উক্তিটি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত। মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তির শব্দগুলো হচ্ছে নিম্নরূপঃ(আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী) বা স্বাধীনা নারীগণ। ভাবার্থ যখন এটা হবে যে, দাসীরা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তখন এ অর্থও নেয়া যেতে পারে যে, সতী সাধ্বী নারীগণকে বিয়ে করা হালাল। কেননা, তার থেকে এ শব্দগুলো দ্বারাই অন্য একটি বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। জমহুরও এ কথা বলেন। আর এটাই সঠিকতমও বটে। এটা না হলে যিম্মীয়া এবং অসতী নারীও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে অবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিগড়ে যাবে এবং তার “শুধু পেট ভর্তি ও খারাপ পরিমাপ”-এ প্রবাদ বাক্যের নায়কে পরিণত হবে। সুতরাং এটাই সঠিক মনে হচ্ছে যে, এখানে (আরবী)-এর ভাবার্থ হবে ঐ সব নারী যারা সতী সাধ্বী ও ব্যভিচার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যেমন অন্য আয়াতে (আরবী) -এর সাথে (আরবী) শব্দগুলো রয়েছে। আলেম ও মুফাসৃসিরগণের মধ্যেএ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, আহলে কিতাবদের স্বাধীন ও দাসী সকল সতী সাধ্বী নারীই কি এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত? তাফসীরে ইবনে জারীরের মধ্যে পূর্ববর্তী গুরুজনদের একটি দলের উক্তি নকল করা হয়েছে। তারা বলেন যে, -এর অর্থ হচ্ছে সতী সাধ্বী। একটি উক্তি এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে যিম্মীয়া নারীগণ, স্বাধীনা নারীগণ। নয়। এর দলীল হিসেবে। (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে না, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর।" (৯:২৯)-এ আয়াতটি পেশ করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) খ্রীষ্টান নারীদেরকে বিয়ে করা নাজায়েয মনে করতেন এবং বলতেনঃ তারা বলে যে তাদের প্রভু হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ), এর চেয়ে বড় শিরক আর কি হতে পারে? আর তারা যখন মুশরিক রূপে পরিগণিত হলো তখন কুরআন কারীমের। (আরবী) (অর্থাৎ “মুশরিকা নারীগণ যে পর্যন্ত ঈমান না আনে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না।" (২৪ ২২১)-এ আয়াতটি উপর অবশ্যই প্রযোজ্য হবে।ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, যখন মুশরিকদেরকে বিয়ে না করার হুকুম নাযিল হয় তখন সাহাবায়ে কিরাম তা থেকে বিরত থাকেন। অতঃপর যখন আহলে কিতাবের সতী সাধ্বীদেরকে বিয়ে করার অনুমতি যুক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন জনগণ তাদেরকে বিয়ে করেন। সাহাবীদের একটি দল এ আয়াতটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করতঃ খ্রীষ্টান নারীদেরকে বিয়ে করেন এবং এটাকে কোন অপরাধমূলক কাজ মনে করেননি। তাহলে এটা যেন সূরায়ে বাকারায় নিষেধযুক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পরে অন্য আয়াত একে বিশিষ্ট করে দিয়েছেন। এটা ঐ সময় প্রযোজ্য হবে যখন মেনে নেয়া হবে যে, নিষেধযুক্ত আয়াতের মধ্যে এটাও শামিল ছিল। নচেৎ এ দুটি আয়াতের মধ্যে কোনই বৈপরীত্ব নেই। কেননা, আরও বহু আয়াতে আলে কিতাবদেরকে মুশরিকদের হতে পৃথকরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ (আরবী) (৩:২০) আয়াত দু'টিতে তাদেরকে মুশরিকদের হতে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা তাদেরকে তাদের নির্দিষ্ট মহর প্রদান কর। অর্থাৎ যেহেতু তারা নিজেদেরকে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেহেতু তোমরা তাদেরকে তাদের ন্যায্য মহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ), আমির শা’বী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ)-এর ফতওয়া এই যে, যদি কোন লোক কোন নারীকে বিয়ে করে এবং সহবাসের পূর্বে তার স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে স্বামী-স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে যে মহর প্রদান করেছে তা তার নিকট থেকে ফিরিয়ে নিতে হবে। (তাফসীরে ইবনে জারীর)বলা হচ্ছে-তোমরা তাদেরকে পত্নী রূপে গ্রহণ করে নাও, না প্রকাশ্যে ব্যভিচার কর, আর না গোপন প্রণয় কর। সুতরাং নারীদের জন্যে যেমন পবিত্রতা ও সতীত্বের শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তেমনই পুরুষদের জন্যেও এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। আর সাথে সাথেই বলা হয়েছে যে, তারা যেন না প্রকাশ্য ব্যভিচারী হয়, না এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে এবং না বিশেষ সম্পর্কের কারণে হারাম কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুরায়ে নিসার মধ্যে এরূপই নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদও (রঃ) এদিকেই গেছেন যে, ব্যভিচারিণী নারীর সাথে তাওবা করার পূর্বে কোন সৎ লোকের বিবাহ কখনও জায়েয নয়। আর তাঁর নিকট পুরুষদের ব্যাপারেও এ হুকুমই প্রযোজ্য যে, কোন ব্যভিচারী পুরুষের সাথে কোন সতী সাধ্বী নারীর বিবাহ জায়েয নয় যে পর্যন্ত না সে। খাটি অন্তরে তাওবা করে এবং জঘন্য কাজ থেকে বিরত হয়। তাঁর দলীল হিসেবে একটি হাদীসও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, ব্যভিচারী লোক চাবুক দ্বারা প্রহৃত হওয়ার পর একমাত্র তার মত নারীকেই বিয়ে করতে পারে। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একবার বলেনঃ “কোন মুসলমান যদি ব্যভিচার করে তবে আমি চাই যে, কোন সতী সাধ্বী মুসলমান নারীর সাথে তার বিয়ে কখনও হতে দেবো না।” হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! শিরকের পাপ তো এর চেয়ে অনেক বড় তথাপি মুশরিকদের তাওবাও তো ককূল হয়ে থাকে।” এ মাসআলাকে আমারা (আরবী) (২৪:৩)-এ আয়াতের তাফসীরে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করবো। আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-কাফিরদের আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং পরকালে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আল-মায়িদা 5:6

অধিকাংশ মুফাসির বলেছেন যে, মানুষের যখন অযু থাকবে না সে সময়। তার জন্যে অযুর নির্দেশ প্রযোজ্য হবে। একটি দল বলেন যে, যখন তোমরা দণ্ডায়মান হও অর্থ হচ্ছে-যখন তোমরা ঘুম থেকে জাগরিত হও। এ দু'টি উক্তির ভাবার্থ প্রায় একই। অন্যান্য মনীষীরা বলেন যে, আয়াত তো সাধারণ, সুতরাং তা নিজের সাধারণত্বের উপরই থাকবে। কিন্তু যার অযু থাকবে না তার জন্যে অযুর নির্দেশ ওয়াজিব হিসেবে প্রযোজ্য হবে। আর যার অযু থাকবে তার জন্যে অযুর নির্দেশ হবে মুস্তাহাব হিসেবে। একটি দলের ধারণা এই যে, ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় প্রত্যেক নামাযের জন্যে অযুর নির্দেশ ছিল। কিন্তু পরে তা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের জন্যে নতুনভাবে অযু করতেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি অযু করে মোজার উপর মাসেহ্ করেছিলেন এবং ঐ একই অযুতে কয়েক ওয়াক্ত নামায আদায় করেছিলেন। এটা দেখে হযরত উমার (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ আপনি এমন কাজ করলেন যা ইতিপূর্বে কখনও করেননি। তখন তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, আমি ভুলে এরূপ করিনি, ববং জেনে শুনে ইচ্ছে করেই করেছি।” সুনানে ইবনে মাজা ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে যে, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) এক অযুতে কয়েক ওয়াক্ত নামায পড়তেন। তবে প্রস্রাব করলে বা অযু ভেঙ্গে গেলে নতুনভাবে অযু করতেন এবং অযুরই অবশিষ্ট পানি দ্বারা মোজার উপর মাসেহ করতেন। এটা দেখে হযরত ফযল ইবনে বাশীর (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ এটা কি আপনি নিজের মতানুযায়ী করেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ না, আমি নবী (সঃ)-কে এরূপ করত দেখেছি। মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের জন্যে নতুনভাবে অযু করতেন, অযু নষ্ট হোক বা না হোক। এটা দেখে তাঁর পুত্র হযরত উবাইদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় এর সনদ কি? উত্তরে তিনি বলেন যে, তার কাছে হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা, যিনি এমন লোকের পুত্র ছিলেন যাকে ফেরেশতাগণ গোসল দিয়েছিলেন। বর্ণনাটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রত্যেক নামাযের জন্যে নতুনভাবে অযু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অযু থাক বা নষ্ট হয়ে যাক। কিন্তু এটা তার জন্যে কষ্টকর হলে প্রত্যেক নামাযে অযু করার পবিরর্তে মিসওয়াক করার নির্দেশ দেয়া হয়। হ্যাঁ, তবে অযু ভেঙ্গে গেলে নামাযের জন্যে নতুনভাবে অযু করা জরুরী। এটাকে সামনে রেখে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর খেয়াল হয় যে, তার তো শক্তি রয়েছে, এজন্যে তিনি প্রত্যেক নামাযের জন্যে অযু করতেন। মৃত্যু পর্যন্ত তার সেই অবস্থাই থাকে। এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রাঃ)। কিন্তু যেহেতু তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন সেহেতু দলীস' এর ভয়ও দূর হয়ে গেল। তবে ইবনে আসাকিরের বর্ণনায় এ শব্দগুলো নেই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর এই কাজ এবং তাঁর এতে সদা লেগে থাকা। এটাই প্রমাণ করে যে, এটা অবশ্যই মুস্তাহাব এবং জমহূরের এটাই মাযহাব। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, খলীফাগণ প্রত্যেক নামাযের জন্যে অযু করতেন। হযরত আলী (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের জন্যে অযু করতেন এবং দলীল হিসেবে এ আয়াতটি পাঠ করতেন। একদা তিনি যোহরের নামায আদায় করে জনসমাবেশে উপস্থিত হন। অতঃপর তার নিকট পানি আনা হলে তিনি মুখ ও হাত ধৌত করেন এবং মাথা ও পা মাসেহ করেন। এরপর বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির অযু যার অযু রয়েছে। একবার তিনি হালকাভাবে অযু করে একথাই বলেছিলেন। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। সুনানে আবি দাউদ তায়ালেসীর মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, অযু থাকা অবস্থায় অযু করা বাড়াবাড়ি। তবে প্রথমতঃ সনদের দিক দিয়ে এ উক্তিটি খুবই দুর্বল। দ্বিতীয়তঃ এটা ঐ ব্যক্তির জন্যে প্রযোজ্য যে একে ওয়াজিব মনে করে। আর যে ব্যক্তি একে মুস্তাহাব মনে" করে পালন করে সে তো হাদীসের উপরই আমলকারী। সহীহ বুখারী, সুনান প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের জন্যে নতুনভাবে অযু করতেন। একজন আনসারী এ কথা শুনে হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনারা কি করতেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমরা অযু নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একই অযুতে কয়েক ওয়াক্ত নামায আদায় করতাম।” তাফসীরে ইবনে জারীরের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশ বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি অযু থাকতে অযু করে তার জন্যে দশটি পুণ্য লিখা হয়। জামেউত তিরমিযী ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থের মধ্যেও এ বর্ণনা রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে দুর্বল বলেছেন। একটি দল বলেন, আয়াতের উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, অন্য কোন কাজের সময় অযু করা ওয়াজিব নয়, শুধুমাত্র নামাযের জন্যেই অযু ওয়াজিব। এ নির্দেশ এ জন্যেই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু ভেঙ্গে যাওয়ার পর নতুনভাবে অযু না করা পর্যন্ত কোন কাজ করতেন না। এটাই ছিল তাঁর নীতি। হাদীসে ইবনে আবি হাতিম প্রভৃতির মধ্যে একটি দুর্বল বর্ণনা রয়েছে, বর্ণনাকারী বলেনঃ যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রস্রাবের ইচ্ছে করতেন তখন আমরা তাঁকে কিছু বললে তিনি উত্তর দিতেন না এবং সালাম দিলে সালামের জবাবও দিতেন না। অবশেষে রুখসাতের এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুনানে আবি দাউদের মধ্যে রয়েছে, বর্ণনাকারী বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পায়খানা হতে বের হন এবং তাঁর সামনে খাদ্য হাযির করা হয়। আমরা তাঁকে বললাম-আপনার নির্দেশহলে অযুর পানি নিয়ে আসি। তখন তিনি বললেনঃ “যখন আমি নামাযের মধ্যে দাঁড়াই তখনই শুধু আমার প্রতি অযুর নির্দেশ রয়েছে।” ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন। অন্য একটি রিওয়ায়াতে রয়েছে, নবী (সঃ) বলেনঃ “আমাকে এমন খুব কম নামাযই পড়তে হয় যাতে আমি অযু করে থাকি।” যখন তোমরা নামাযের জন্যে দাড়াও তখন অযু করে নাও' -আয়াতের এ শব্দগুলো দ্বারা উলামায়ে কিরামের একটি দল দলীল গ্রহণ করেছেন যে, অযুতে নিয়ত ওয়াজিব। কালামুল্লাহর ভাবার্থ হচ্ছে তোমরা নামাযের জন্যে অযু করে নাও। যেমন আরবের লোকেরা বলে থাকে, যখন তোমরা আমীরকে দেখ তখন দাঁড়িয়ে যাও অর্থাৎ আমীরের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে- “আমলের পরিণাম নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক মানুষের জন্যে শুধু ওটাই রয়েছে যার সে নিয়ত করেছে। অযুতে মুখমণ্ডল ধৌত করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা মুস্তাহাব। কেননা, একটি খুবই বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অযুতে বিসমিল্লাহ বললো না তার অযু হলো না।” এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, অযুর পানির বরতনে হাত প্রবেশ করানোর পূর্বে হাত ধুয়ে নেয়া মুস্তাহাব। আর যখন কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠবে তার জন্যে তো এ ব্যাপারে খুবই তাগীদ রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠবে তখন যেন সে তার হাত তিনবার ধুয়ে নেয়ার পূর্বে বরতনে প্রবেশ না করায়, কেননা তোমাদের কেউই জানেনা যে, রাত্রে তার হাতটি কোথায় ছিল।” মুখমণ্ডলের সীমা দৈর্ঘে সাধারণতঃ মাথার চুল গজাবার যেটা জায়গা সেখান থেকে নিয়ে দাড়ির হাড় ও থুতনি পর্যন্ত এবং প্রস্থে এক কান থেকে নিয়ে অপর কান পর্যন্ত। কপালের দু’দিকে চুল গজিয়ে ওঠার জায়গাটা মাথার অন্তর্ভুক্ত কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আর দাড়ির লটকে থাকা চুল ধৌত করা মুখমণ্ডল ধৌত করার ফরযিয়াতের অন্তর্ভুক্ত কি না এ ব্যাপার দু'টি উক্তি রয়েছে। এক তো এই যে, ওর উপর পানি বইয়ে দেয়া ওয়াজিব। কেননা, মুখমণ্ডল সামনে করার সময় ওটাও সামনে হয়ে থাকে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে দাড়ি ঢেকে রাখা অবস্থায় দেখে বলেনঃ “ওটা খুলে ফেল, কেননা ওটা মুখমণ্ডলেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ আরবাসীদেরও অভ্যাস এই যে, ছেলেদের যখন দাড়ি গজিয়ে ওঠে তখন তারা বলে (অর্থাৎতার চেহারা প্রকাশ পেয়েছে)। সুতরাং বুঝা গেল যে, আরববাসী দাড়িকেও মুখের অন্তর্ভুক্ত মনে করে থাকে। দাড়ি ঘন হলে ওটা খিলাল করাও মুস্তাহাব। হযরত উসমান (রাঃ)-এর অযুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বর্ণনাকারী বলেন যে, তিনি মুখমণ্ডল ধৌত করার সময় তিনবার দাড়ি খিলাল করেছেন এবং বলেছেনঃ “তোমরা আমাকে যেভাবে অযু করতে দেখলে ঠিক সেভাবেই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অযু করতে দেখেছি।” (জামেউত তিরমিযী ইত্যাদি) এ রিওয়ায়াতকে ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাসান বলেছেন। সুনানে আবি দাউদে হযরত হাসান ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করার সময় এক অঞ্জলী পানি নিয়ে থুতনির নীচে দিতেন এবং দাড়ি মুবারক খিলাল করতেন ও বলতেনঃ “আমাকে আমার মহিমান্বিত প্রভু এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।” ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেন যে, দাড়ি খিলাল করা হযরত আম্মার (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং একে ছেড়ে দেয়ার রুখসত হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং তাবেঈগণের একটি জামআত হতে বর্ণিত রয়েছে। সিহাহ ইত্যাদিতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন অযু করতে বসতেন তখন তিনি কুলি করতেন এবং নাকে পানি দিতেন। এ দু'টো কাজ অযু ও গোসলে ওয়াজিব কি মুস্তাহাব এ ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর মাযহাবে এটা ওয়াজিব। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ) এটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তাদের দলীল হচ্ছে সুনানের ঐ সহীহ হাদীসটি যাতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী লোকটিকে বলেছিলেনঃ “তুমি সেভাবে অযু কর যেভাবে আল্লাহ তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।” ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, এই দু'টো কাজ গোসলে ওয়াজিব, অযুতে ওয়াজিব নয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে একটি রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে যে, নাকে পানি দেয়া ওয়াজিব কিন্তু কুলি করা মুস্তাহাব। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অযু করবে সে যেন নাকে পানি দেয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে- “তোমাদের কেউ যখন অযু করবে তখন সে যেন তার নাকের দু’টি ছিদ্রে পানি প্রবেশ করিয়ে দেয়, তারপরে যেন নাক ঝাড়ে।” অর্থাৎ যেন নাকের ছিদ্রে ভালভাবে পানি প্রবেশ করিয়ে দিয়ে উত্তম রূপে নাক পরিষ্কার করে।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি অযু করতে বসে মুখমণ্ডল ধৌত করলেন। এরপর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে তা দ্বারা কুলি করলেন ও নাক পরিষ্কার করলেন। তারপর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে ডান হাত ধুলেন। এরপর আর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে বাম হাত ধুলেন। তারপর মাথা মাসেহ করলেন। এরপর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে তা ডান পায়ে ঢেলে দিলেন এবং পা ধৌত করলেন। অতঃপর আর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে বাম পা ধুয়ে ফেললেন। এরপর বললেনঃ “এভাবেই আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে অযু করতে দেখেছি।" (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছেঅর্থাৎ কনুইসহ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের মালসহ তাদের (ইয়াতীমদের) মাল ভক্ষণ করো না, নিশ্চয়ই এটা গুরুতর পাপ। দ্রুপ এখানেও অর্থ হবে তোমরা হাতকে কনুই পর্যন্ত নয় বরং কনুইসহ ধৌত কর। ইমাম দারেকুতনী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করার সময় স্বীয় কনুইদ্বয়ের উপর পানি বইয়ে দিতেন। কিন্তু এ হাদীসের দু’জন বর্ণনাকারীর সমালোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। অযু কারীর জন্যে এটা উত্তম যে, সে যেন অযুতে কনুই-এর সাথে বাহুকেও ধুয়ে নেয়। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আমার উম্মত অযুর চিহ্নের কারণে উজ্জ্বল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিশিষ্ট অবস্থায় আগমন করবে। সুতরাং তোমাদের কারও সম্ভব হলে সে যেন তার ঔজ্জ্বল্যের দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি আমার বন্ধু (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- মুমিনকে ঐ স্থান পর্যন্ত অলংকার পরানো হবে যে স্থান পর্যন্ত তার অযুর পানি পৌছবে।(আরবী) -এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি (আরবী) বা মিলিয়ে দেয়ার জন্যে হওয়াই সুস্পষ্ট। কিন্তু এটা (আরবী) বা কিছু অংশের জন্যে হওয়ার মধ্যে চিন্তা ভাবনা করার অবকাশ রয়েছে। কোন কোন মূলনীতি বিশারদ বলেন যে, যেহেতু আয়াত হচ্ছে সংক্ষিপ্ত সেহেতু সুন্নাহ এর ব্যাখ্যা যা দিয়েছে সেটাই কর্তব্য এবং সেদিকেই ফিরে যেতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সায়েদ ইবনে ‘আসিম (রাঃ) নামক সাহাবীকে একটি লোক বলেনঃ আপনি অযু করে আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। তখন তিনি পানি চাইলেন এবং হাত দু'টি দু'বার করে ধুলেন, তারপর তিনবার কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিলেন। এরপর চেহারা ধৌত করলেন। তারপর কনুইসহ হাত দু’টি দু’বার ধুলেন। অতঃপর দু’হাত দিয়ে মাথা মাসেহ করলেন, মাথার প্রথম অংশ থেকে শুরু করে গ্রীবা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তারপর সেখান থেকে এখন পর্যন্ত ফিরিয়ে আনলেন। তারপর পা দু’টি ধৌত করলেন। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর নিয়ম হযরত আলী (রাঃ) হতেও এ রকমই বর্ণিত আছে। সুনানে আবি দাউদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবং হযরত মিকদাদ (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত রয়েছে। এ হাদীসগুলো হচ্ছে সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা ফরয হওয়ার দলীল। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এবং হযরত আহমাদ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। আর এটাই মাযহাব ঐ সব গুরুজনেরও যারা আয়াতকে সংক্ষিপ্ত বলে মেনে থাকেন এবং হাদীসকে এর ব্যাখ্যাকারী মনে করে থাকেন। হানাফীদের ধারণা এই যে, মাথার এক চতুর্থাংশ মাসেই করা ফরয যা হচ্ছে মাথার প্রথম অংশ। আমাদের সাথী বলেন যে, ফরয শুধু ঐ টুকু যার উপর মাসেহর প্রয়োগ হয়ে থাকে। তার কোন সীমা নির্ধারিত নেই। মাথার কতক চুলের উপর মাসেহ হলেও ফরয আদায় হয়ে যাবে। এ দু'দলের দলীল হচ্ছে হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি। তিনি বলেনঃ (একবার সফরে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) পেছনে রয়ে যান এবং আমিও তার সাথে পেছনে থেকে যাই। যখন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করে ফেলেন তখন আমার নিকট পানি চান। আমি লোটা (পানি পাত্র) নিয়ে আসি। তিনি হাতের কজি দু’টি ধুলেন। তারপর মুখমণ্ডল ধৌত করলেন। এরপর কজি হতে কাপড় সরিয়ে ফেললেন এবং কপালের সাথে মিলে থাকা চুল ও পাগড়ির উপর মাসেহ করলেন। (সহীহ মুসলিম) ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণ এর উত্তর দেন যে, তিনি মাথার প্রথম অংশের উপর মাসেহ করে অবশিষ্ট মাসেই পাগড়ির উপর পুরো করেন। এর বহু দৃষ্টান্ত হাদীসে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বরাবরই পাগড়ির উপর ও মাথার উপর মাসেহ করতেন। সুতরাং এটাই উত্তম এবং এটা কোনক্রমেই প্রমাণ করে না যে, মাথার কিছু অংশের উপর বা শুধুমাত্র কপালের চুলের উপর মাসেহ করতে হবে, আর এর পূর্ণতা পাগড়ির উপর হবে না। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।আবার মাথার উপর মাসেহ তিনবার হবে কি একবারই হবে এ ব্যাপারেও মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর মতে মাসেহ তিনবার করতে হবে। কিন্তু ইমাম আহমাদ (রঃ) ও তাঁর অনুসারীদের মতে মাসেহ একবারই করতে হবে। তাদের দলীল এই যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) অযু করতে বসে দু'হাতের উপর তিনবার পানি ঢালেন ও হাত দুটি তিনবার ধৌত করেন, তারপর কুলি করেন ও নাকে পানি দেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধৌত করেন। এরপর তিনবার হাত দু’টি কনুই পর্যন্ত ধৌত করেন, প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাত। তারপর মাথা মাসেহ করেন। এরপর তিনবার করে পা দু’টি ধৌত করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার এ অযুর মত অযু করে শুদ্ধ অন্তরে দু'রাকআত নামায আদায় করে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসিলম) সুনানে আবি দাউদের মধ্যে এ রিওয়ায়াতেই মাথা মাসেহ করার সাথে সাথে এ শব্দও রয়েছে যে, তিনি মাথা একবার মাসেহ করেন। হযরত আলী (রাঃ) থেকেও এরূপই বর্ণিত আছে। আর যারা মাথা মাসেহকেও তিনবার করার কথা বলেন তাঁরা ঐ হাদীস থেকে দলীল নিয়েছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার করে অযুর অঙ্গগুলো ধুয়েছিলেন। হযরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি অযু করেন। তারপর এরূপই রিওয়ায়াত রয়েছে এবং তাতে কুলি করা ও নাকে পানি দেয়ার উল্লেখ নেই। আর তাতে আছে যে, অতঃপর তিনি তিনবার মাথা মাসেহ করেন এবং তিনবার স্বীয় পা দু’টি ধৌত করেন। অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই অযু করতে দেখেছি।” তিনি আরও বলেনঃ “যে ব্যক্তি এরূপভাবে অযু করে, তার জন্যে এটাই যথেষ্ট। কিন্তু হাদীস গ্রন্থে যে হাদীসগুলো হযরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে সেগুলো দ্বারা মাথা মাসেহ একবার করাই সাব্যস্ত হচ্ছে। (আরবী) -এর কে (আরবী) -এর উপর (আরবী) করে (আরবী) পড়া হয়েছে এবং এভাবে ধৌত করার দিকে ফিরোনো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপভাবেই পাঠ করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে। মাসউদ (রাঃ) এটাই করতেন। হযরত উরওয়া (রঃ), হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইবরাহীম তাইমীরও (রঃ) এটাই উক্তি। আর সুস্পষ্ট কথা এটাই যে, পা ধুতেই হবে। পূর্ববর্তী গুরুজনদেরও এটাই নির্দেশ যে, পা ধুতেই হবে। এখান থেকেই জমহুর এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, অযুতে তরতীব ওয়াজিব। একমাত্র ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি অযুতে তরতীব বা ক্রমান্বয়ে করাকে শর্ত মনে করতেন না। তাঁর মতে যদি কেউ প্রথমে পা ধুয়ে নেয়, এরপর মাথা মাসেহ করে, তারপর হাত ধৌত করে, অতঃপর মুখমণ্ডল ধৌত করে তবুও জায়েয হবে। কেননা, আয়াতে এ অঙ্গগুলোকে ধৌত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (আরবী) -এর (আরবী) কখনও তরতীবের উপর হয় না। জমহুর এর কয়েকটি জবাব দিয়েছেন। একটি এই যে, অক্ষরটি তরতীবের উপর (আরবী) করে। আয়াতের শব্দগুলোতে নামায আদায়কারীকে মুখমণ্ডল ধৌত করার নির্দেশ (আরবী) শব্দ দ্বারা হচ্ছে। তাহলে কমপক্ষে মুখমণ্ডলকে প্রথম ধৌত করা তো শব্দগুলো দ্বারাই সাব্যস্ত হচ্ছে। এখন এর পরের অঙ্গগুলোতে তরতীব ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। এটা বিবেক বিরুদ্ধও নয়। অতঃপর (আরবী) অক্ষরটি যা (আরবী) বা অনুসরণের জন্যে আসে এবং যা (আরবী) বা ক্রমান্বয়ের দাবীদার, যখন। একটির উপর এসেছে তখন একটির তরতীব মেনে নিয়ে অন্যটির তরতীব কেউ অস্বীকার করে না, বরং হয়তো বা সবকটির তরতীব স্বীকারকারী হয়, নয় তো কোন একটিরও তরতীব স্বীকারকারী হয় না। সুতরাং এ আয়াতটি নিশ্চিতরূপে তাঁদের উপর দলীল হচ্ছে যারা মোটেই তরতীব স্বীকার করেন না। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, (আরবী) অক্ষরটি তরতীবের উপর (আরবী) করে না এটাও আমরা স্বীকার করি না। বরং ওটা তৱতীবের উপর (আরবী) করে। যেমন ব্যাকরণবিদগণের একটি দলের এবং ফিকাহশাস্ত্রবিদদের কারও কারও মাযহাব এটাই। তাছাড়া এ বিষয়টিও চিন্তা ভাবনার যোগ্য যে, আভিধানিক অর্থে এটা তরতীবের উপর করে না (আরবী) এটা যদি মেনে নেয়াও হয়, তথাপি শরীয়তের অর্থে যে জিনিসগুলোতে তরতীব হতে পারে সেগুলোতে এর (আরবী) তরতীবের উপর হয়ে থাকে। সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে সাফার দরজা হতে বের হন, তখন (আরবী) (২:১৫৮)-এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি সেখান থেকেই শুরু করবো যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা প্রথম দিয়েছেন।” সুতরাং তিনি সাফা থেকে দৌড় শুরু করেন। সুনানে নাসাঈতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশও বর্ণিত আছে- “তোমরা সেখান থেকেই শুরু কর যেখান থেকে আল্লাহ শুরু করেছেন।” এর ইসনাদও বিশুদ্ধ এবং এতে আমর বা নির্দেশ রয়েছে। অতএব জানা গেল যে, যার বর্ণনা পূর্বে হয়েছে তাকে পূর্বে করা এবং যার বর্ণনা পরে হয়েছে তাকে পরে করা ওয়াজিব। সুতরাং সুস্পষ্টরূপে সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, এরূপ স্থলে শরীয়তের দিক দিয়ে তরতীব উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।তৃতীয় দল উত্তরে বলেন যে, হাত কনুইসহ ধৌত করার হুকুম এবং পা ধৌত করার হুকুমের মধ্যভাগে মাথা মাসেহ করার হুকুম বর্ণনা করা এ কথারই স্পষ্ট দলীল যে, তরতীবকে বাকী রাখাই হচ্ছে উদ্দেশ্য। নতুবা নামে কালাম বা কথার ছন্দ উলট পালট করা হতো না। এর প্রথম উত্তর এটাও যে, সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদির মধ্যে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযুর অঙ্গগুলো একবার একবার করে ধৌত করেন। অতঃপর বলেনঃ “এটাই হচ্ছে অযু যা ছাড়া আল্লাহ নামায কবুল করেন না। এখন অবস্থা হলো দু’টি, হয় ঐ অযুতে তরতীব ছিল, নয় তো ছিল না। যদি বলা হয় যে, নবী (সঃ)-এর ঐ অযু তরতীবসহ ছিল অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে একটি অঙ্গের পর আর এক অঙ্গ ছিল তাহলে বুঝতে হবে যে, যে অযুতে আগা পিছা হবে এবং সঠিকভাবে তরতীব থাকবে না সেই অযুতে নামায গ্রহণীয় হবে না। তাহলে জানতে হবে যে, অযুতে তরতীব ওয়াজীব ও ফরয। আর যদি মেনে নেয়া হয় যে, ঐ অযুতে তরবীত ছিল না, বরং এলোমেলো ছিল, যেমন পা ধুয়েছিলেন, তারপর কুলি করেছিলেন, এর পর মাসেহ করেছিলেন, তারপর মুখ ধুয়েছিলেন ইত্যাদি, তাহলে তরতীব না করাই ওয়াজিব হয়ে যাবে! অথচ এরূপ মত পোষণকারী উম্মতের মধ্যে একজনও নেই। অতএব, সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, অযুতে তরতীব ফরয। আয়াতের এ অংশের একটি কিরআত ওয়া আরজুলিকুম অর্থাৎ কে যের দিয়েও রয়েছে। আর এটা থেকেই শী'আ সম্প্রদায় এ দলীল গ্রহণ করেছে। যে, পায়ের উপর মাসেহ্ করা ওয়াজিব। কেননা, তাদের নিকট এর (আরবী) বা সংযোগ (আরবী)-এর উপর হয়েছে। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন হতেও এরূপ উক্তি বর্ণিত আছে। যার ফলে পা মাসেহ করার কল্পনা জেগে ওঠে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন-মূসা ইবনে আনাস জনসমাবেশে হযরত আনাস (রাঃ)-কে বলেন যে, হাজ্জায আহ্ওয়ায নামক স্থানে ভাষণ দিতে গিয়ে তাহারাত ও অযুর আহকামের ব্যাপারে বলেছেনঃ “তোমরা মুখমণ্ডল ও হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ্ কর এবং পা ধুয়ে ফেল। সাধারণতঃ পায়েই ধূলা ময়লা লেগে যায়। সুত্রং পায়ের তলা, উপরিভাগ ও গোড়ালিকে উত্তমরূপে ধৌত কর।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সত্যবাদী এবং হাজ্জায মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) হযরত আনাস (রাঃ)-এর অভ্যাস ছিল যে, যখন তিনি পায়ের মাসেহ করতেন তখন পা সম্পূর্ণরূপে ভিজিয়ে দিতেন। অথচ তার থেকেই বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমে পায়ের উপর মাসেহ করার হুকুম রয়েছে। হাঁ, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাত হচ্ছে পা ধৌত করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অযুতে দু'টো অঙ্গ ধুতে হয় এবং দু'টো অঙ্গ মাসেহ করতে হয়। হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আয়াতটিতে পায়ের উপর মাসেহ করার বর্ণনা রয়েছে। ইবনে উমার (রাঃ), আলকামাহ। (রঃ), আবু জাফর (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ) এবং এক রিওয়ায়াতে হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত জাবির ইবনে যায়েদ (রঃ) এবং আর এক রিওয়ায়াতে হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামা (রাঃ) পায়ের উপর মাসেহ করতেন। শাবী (রঃ) বলেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে মাসেহর হুকম নাযিল হয়েছে। তার থেকে এটাও বর্ণিত আছে- “তোমরা কি দেখছো না যে, যে অঙ্গগুলোর উপর বোয়ার নির্দেশ ছিল, ঐগুলোর উপর তো তায়াম্মুমের সময় মাসেহ করার হুকুম রয়েছে। আর যেগুলোর উপর মাসেহ করার হুকুম ছিল, তায়াম্মুমের সময় ওগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে।” হযরত আমির (রাঃ)-কে কেউ বললেনঃ “লোকেরা বলছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) পা ধোয়ার হুকুম নিয়ে এসেছেন।" হযরত আমির (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “হযরত জিবরাঈল (আঃ) মাসেহ করার হুকুম নিয়ে নাযিল হয়েছিলেন। সুতরাং এসব আছার সম্পূর্ণরূপেই গারীব এবং ঐ বিষয়ের উপর মাহমুল যে, এখানে মাসেহর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ গুরুজনদের হালকাভাবে ধৌতকরণ। কেননা, সুন্নাত দ্বারা এটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে যে, পা ধৌত করা ওয়াজিব। স্মরণ রাখতে হবে যে, যেরের কিরআতটি হয় তো ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও সৌষ্ঠবের জন্যেই হবে। যেমন আরবদের কথায় আছে (আরবী) এবং আল্লাহ পাকের কালামে রয়েছে (আরবী) (৭৬:২১) আরবদের ভাষায় এটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এ কারণে উভয় শব্দকে একই দিয়ে দেয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা দেখা যায়। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর একটি কারণ এও বর্ণনা করেছেন যে, এ হুকুম ঐ সময় প্রযোজ্য হবে যখন পায়ে মোজা থাকবে। কেউ কেউ বলেন যে, এখানে মাসেহর অর্থ হচ্ছে হালকাভাবে ধৌত করা, যেমন কতক রিওয়ায়াতে সুন্নাত দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়েছে। মোটকথা পা ধোয়া ফরয, এটা ছাড়া অযুই হবে না, আয়াতেও এটাই আছে এবং হাদীসেও তাই আছে। যেগুলো আমরা পেশ করছি। ইনশাআল্লাহ।হাদীসে বায়হাকীতে রয়েছে, একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) যোহরের নামায আদায় করার পর বসে থাকেন এবং আসর পর্যন্ত জনগণের কাজ কামে লিপ্ত থাকেন। তারপর পানি আনিয়ে নেন এবং অঞ্জলি দ্বারা মুখমণ্ডল, হস্তদ্বয়, মাথা ও পদদ্বয় মাসেহ করেন এবং অবশিষ্ট পানি দাড়িয়ে পান করে নেন। অতঃপর বলেনঃ “লোকেরা দাঁড়িয়ে পানি পান করাকে অপছন্দনীয় মনে করে। অথচ আমি যা করলাম তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে করতে দেখেছি।”এরপর তিনি বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির অযু যার অযু রয়েছে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) শী'আদের মধ্যে যারা পায়ের মাসেহ মোজার মাসেহর মত বলেছেন তারা অবশ্যই ভুল করেছেন এবং জনগণকে ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন। তদ্রুপ তারাও ভুল করেছেন যারা মাসেহ করা ও ধৌত করা দুটোকেই জায়েয বলেছেন। আবার যারা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করেছেন যে, তিনি হাদীসসমূহের উপর ভিত্তি করে পা ধোয়া এবং আয়াতে কুরআনীর উপর ভিত্তি করে পায়ের উপর মাসেহ করাকে ফরয বলেছেন তাঁদের তাহকীক বা বিশ্লেষণও ঠিক নয়। তাফসীরে ইবনে জারীর আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে। তার কথার ব্যাখ্যা এই যে, পা দু’টিকে রগড়ানো ওয়াজিব। কিন্তু অন্য অঙ্গগুলোর ব্যপারে এটা ওয়াজিব নয়। কেননা, পা দ্বারা মাটিতে চলাফেরা করতে হয়। কাজেই পায়ে ময়লা মাটি ভরে যায়। তাই পা ধোয়া জরুরী, যাতে পায়ে কিছু লেগে থাকলে ধোয়ার ফলে তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু এ রগড়ানোর জন্যে তিনি মাসেহ শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। আর এতেই কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগে ওঠে এবং তারা বুঝে নেন যে, তিনি ধৌত করা ও মাসেহ করাকে এভাবে জমা করে দিয়েছেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে এর কোন অর্থই হয় না। মাসেহ তো ধৌত করারই অন্তর্ভুক্ত, তা আগেই তোক বা পরেই হোক। সুতরাং আসলে ইমাম সাহেবের ইচ্ছা ওটাই যা আমি উল্লেখ করলাম। আর একে না বুঝে অধিকাংশ ফেকাহ শাস্ত্রবিদ ওটা মুশকিল জেনেছেন। আমি খুব চিন্তা ভাবনা করলে আমার কাছে এটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইমাম সাহেব উভয় কিরআতকে একত্রিত করারই পন্থা খুঁজছিলেন। সুতরাং তিনি যেরের কিরআত অর্থাৎ মাসেহকে তো মাহমুল করেছেন , বা ভালভাবে রগড়িয়ে পরিষ্কার করার উপর আর যবরের কিরআত তো বা ধৌত করার উপর আছেই। সুতরাং তিনি ধৌত করা ও রগড়ানো উভয়কেই ওয়াজিব বলেছেন, যাতে যের ও যবর উভয় কিরআতের উপর একই সাথে আমল হয়ে যায়। এখন পা ধৌত করা জরুরী হওয়া সম্পর্কে যে হাদীসগুলো এসেছে। সেগুলোর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে-আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ), আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবং হযরত মিকদাদ ইবনে মাদীকারব (রাঃ)-এর বর্ণনাগুলো ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করার সময় স্বীয় পদদ্বয় একবার, দু’বার বা তিনবার ধুয়েছেন। হযরত আমর ইবনে শুআইব (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করেছেন এবং স্বীয় পা দু'টি ধুয়েছেন। তারপর বলেছেনঃ “এটা হচ্ছে অযু, যা ব্যতীত আল্লাহ তাআলা নামায কবূল করেন না।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন। যখন তিনি আগমন করেন তখন আমরা তাড়াতাড়ি অযু করছিলাম। আমরা তাড়াহুড়া করে আমাদের পাগুলো স্পর্শ করা শুরু করে দেই। সেই সময় তিনি খুবই উচ্চৈঃস্বরে বললেনঃ “অযু পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন কর। আগুনে পায়ের গোড়ালির অমঙ্গল রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে আছে-“আগুনে পায়ের গোড়ালির ও পায়ের তলার অমঙ্গল রয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও ইমাম হাকিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি হাদীসে রয়েছেঃ “আগুনের কারণে পায়ের গিটের অমঙ্গল রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মুসনাদে রয়েছে) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোকের পায়ের এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা শুষ্ক দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আগুনের কারণে পায়ের গোড়ালির জন্যে অমঙ্গল রয়েছে।” ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সম্প্রদায়কে নামায পড়তে দেখেন যাদের একজনের পায়ের গোড়ালির এক দিরহাম পরিমাণ জায়গায় বা নখ পরিমাণ জায়গায় পানি পৌছেনি, তখন তিনি বলেনঃ “আগুনের কারণে গোড়ালির জন্যে অমঙ্গল রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন যে, এরপর মসজিদে ইতর দ্র এমন কেউ থাকতো না যে ঘুরে ফিরে নিজের গোড়ালির দিকে চেয়ে দেখতো না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন একটি লোককে নামায পড়তে দেখেন যার পায়ের গোড়ালির এক দিরহাম পরিমাণ চামড়া শুষ্ক ছিল। এ দেখে তিনি উক্ত রূপ মন্তব্য করেন। তখন অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, কারও যদি সামান্য পরিমাণ জায়গা শুষ্ক থেকে যেতো তবে সে পুনরায় শুরু থেকে অযু করতো। সুতরাং এই হাদীসসমূহ দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, পা ধৌত করা ফরয। যদি মাসেহ করা ফরয হতো তবে সামান্য পরিমাণ জায়গা শুষ্ক থাকায় আল্লাহর নবী (সঃ) জাহান্নামের আগুনের ভয় প্রদর্শন করতেন না। কেননা, মাসেহর সময় পায়ের সব জায়গায় হাত পৌছানোই হয় না, বরং মোজার উপর যেভাবে মাসেহ করা হয় সেভাবেই পায়ের উপর মাসেহ করা হয়। এ কথাটাই ইবনে জারীর (রঃ), শী'আদের মোকাবিলায় পেশ করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে অযু করতে দেখতে পান যার পায়ে নখ পরিমাণ জায়গায় পানি পৌছেনি, বরং শুষ্ক রয়ে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ফিরে যাও এবং ভালভাবে অযু করে এসো।” ইমাম বায়হাকীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হযরত খালিদ ইবনে মি’দান (রঃ)-এর মাধ্যমে নবী (সঃ)-এর কোন একজন স্ত্রী হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) এমন একজন। লোককে দেখতে পান যার পায়ের গোড়ালির উপরিভাগের এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা শুষ্ক রয়ে গিয়েছিল, সেখানে পানি পৌছেনি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে পুনরায় অযু করার নির্দেশ দেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি (আরবী) বা নামায শব্দটি অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। এ ইসনাদটি উত্তম, মজবুত ও বিশুদ্ধ। আল্লাহই ভাল জানেন।হযরত উসমান (রাঃ) হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর যে নিয়ম বর্ণিত হয়েছে তাতে এও রয়েছে যে, তিনি অঙ্গুলিগুলোর খিলালও করেছিলেন। সুনান গ্রন্থগুলোতে রয়েছে যে, হযরত সাবরা (রাঃ) রাসূল্লাহ (সঃ)-কে অযু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “অযু পূর্ণভাবে ও উত্তমরূপে কর, অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে খিলাল কর এবং নাকে উত্তমরূপে পানি দাও। তবে যদি রোযার অবস্থায় থাক তাহলে অন্য কথা।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে, তিনি হযরত আমর ইবনে আবসা’ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (আমর ইবনে আবসা') বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (স)! আমাকে অযু সম্পর্কে সংবাদ দিন! তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি অযুর পানি নিয়ে কুলি করে ও নাকে পানি দেয়, পানির সাথে সাথে ও নাক ঝাড়ার সাথে সাথে তার মুখ ও নাকের ছিদ্র হতে পাপরাশি ঝরে পড়ে। তারপর আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী যখন সে মুখমণ্ডল ধৌত করে তখন দাড়ির ধার ও দাড়ির চুল হতে পানি ঝরে পড়ার সাথে সাথে তার মুখের পাপরাশি ঝরে পড়ে। অতঃপর যখন সে কনুইসহ হাত দু'টি ধৌত করে তখন তার অঙ্গুলির দিক থেকে পাপরাশি ঝরে পড়ে। এর পর যখন সে মাথা মাসেহ্ করে তখন তার চুলের ধার দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তার মাথার পাপরাশি ঝরে পড়ে। তারপর যখন সে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পা দু’টি গোড়ালিসহ ধৌত করে তখন পায়ের অঙ্গুলি দিয়ে পানি টপ টপ করে পড়ার সাথে সাথেই তার পায়ের পাপরাশি দূর হয়ে যায়। অতঃপর যখন সে দাঁড়িয়ে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা ও গুণ বর্ণান করতঃ দু’রাকআত নামায আদায় করে তখন সে পাপ থেকে এমনভাবে পবিত্র হয়ে যায় যে, যেন সে আজকেই জন্মগ্রহণ করলো।” এটা শুনে হযরত আবু উমামা (রাঃ) হযরত আমর ইবনে আবসা (রাঃ)-কে বললেনঃ আপনি কি বলছেন তা খুব চিন্তা করে দেখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে আপনি এরূপই শুনেছেন তো? এ সব কিছুই কি মানুষ একই স্থানে লাভ করে থাকে। হযরত আমর (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “দেখুন আবু উমামা! আমি বুড়িয়ে গেছি। আমার অস্থিগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার মৃত্যু নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করায় আমার লাভ কি? একবার নয়, দু’বার নয়, তিনবার নয়, আমি এটা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মুখে সাতবার বরং তার চেয়েও অধিকবার শুনেছি।” এ হাদীসের ইসনাদ সম্পূর্ণরূপেই বিশুদ্ধ। সহীহ মুসলিমের অন্য সনদযুক্ত হাদীসে রয়েছেঃ “তারপর সে স্বীয় পদদ্বয় ধৌত করে যেমনভাবে ধৌত করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং জানা গেলো যে, কুরআন কারীমের হুকুম হচ্ছে পা ধুয়ে নেয়। আবু ইসহাক সাবীঈ হযরত হারিসের মাধ্যমে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ “স্বীয় পদদ্বয় গোড়ালির উপর পর্যন্ত ধৌত কর যেমন তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা এটাও জানা গেল যে, যে রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বীয় পদদ্বয় জুতার মধ্যেই ভিজিয়ে নেয়া হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ওর ভাবার্থ হচ্ছে জুতার মধ্যে হালকাভাবে ধুয়ে নেয়া। আর চটি জুতা পায়ে থাকলে এভাবে পা ধোয়া যেতে পারে। মোটকথা এ হাদীসও পা ধোয়ার দলীল। অবশ্য এর দ্বারা সংশয়ে পতিত লোকদের খণ্ডন হয়ে থাকে যারা সীমা ছাড়িয়ে যায়। এমনিভাবে অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সম্প্রদায়ের ময়লা ও খড়কুটা ফেলার জায়গায় দাড়িয়ে প্রস্রাব করেন। তারপর পানি চেয়ে নিয়ে অযু করেন এবং স্বীয় স্যাণ্ডেলের উপর মাসেহ করেন। কিন্তু এ হাদীসটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে এবং তাতে রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মোজার উপর মাসেহ করেন। এগুলো এভাবে একত্রিত করা যেতে পারে যে, তাঁর পায়ে মোজা ছিল এবং মোজার উপর স্যাণ্ডেল ছিল। ঐ দু'টোর উপর তিনি মাসেহ করেছিলেন। এ হাদীসেরও ভাবার্থ এটাই হবে। মুসনাদে আহমাদে আউস ইবনে আবি আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি দেখতে ছিলাম এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অযু করেন এবং স্বীয় স্যান্ডেলের উপর মাসেহ করেন। তারপর নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হন।” এ রিওয়ায়াতটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে এবং তাতে তার খড়কুটোর উপর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, তারপর অযু করা এবং স্যাণ্ডেলদ্বয় ও পদদ্বয়ের উপর মাসেহ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হাদীসটি এনেছেন, অতঃপর বলেছেনঃ “এটা মাহমুল হচ্ছে ওর উপর যে, ঐ সময় তার প্রথম অযু ছিল।" কোন মুসলমান এটা কিরূপে মেনে নিতে পারে যে, আল্লাহর ফরয ও তাঁর নবী (সঃ)-এর সুন্নাতের মধ্যে বৈপরীত্ব দেখা দেবে। আল্লাহ এক কথা বলবেন এবং নবী (সঃ) অন্য কিছু করবেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চিরস্থায়ী কাজ হিসেবে অযুতে পা ধৌতকরণ দ্বারা এর ফরয হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে। আর আয়াতের সহীহ মতলবও এটাই। যার কান পর্যন্ত এ দলীলগুলো পৌঁছে যাবে, তার উপর আল্লাহর হুজ্জত পূর্ণ হয়ে যাবে। যবরের কিরআত দ্বারা পা ধৌত করা এবং যেরের কিরআতও এরই উপর মাহমুল হওয়ার ফলে ওটা যে ফরয তা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হয়ে গেল। এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষী তো একথাও বলেছেন যে, এ আয়াত দ্বারা মোজার উপর মাসেহ মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। যদিও হযরত আলী (রাঃ) হতেও এরূপ একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে, কিন্তু ওর ইসনাদ বিশুদ্ধ নয়, বরং স্বয়ং তাঁর থেকেই বিশুদ্ধতার সাথে এর বিপরীত সাব্যস্ত হয়েছে। আর যাঁরই কথা এটা হোক না কেন, তার এ ধারণাই ঠিক নয়। কেননা, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোজার উপর মাসেহ করা সাব্যস্ত আছে। মুসনাদে আহমাদে হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “সূরায়ে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার পরই আমি মুসলমান হই। আমার ইসলাম গ্রহণের পরে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মোজার উপর মাসেহ করতে দেখেছি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত হাম্মাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, হযরত জারীর (রাঃ) প্রস্রাব করেন, তারপর অযু করেন এবং মোজার উপর মাসেহ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ আপনি এরূপ করে থাকেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এরূপই করতে দেখেছি।” হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, জনগণের কাছে এ হাদীসটি খুবই ভাল লাগতো। কেননা, হযরত জারীরের ইসলাম গ্রহণই সূরায়ে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা ছিল। আহকামের বড় বড় কিতাবগুলোতে ধারাবাহিকতার সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা ও কাজের দ্বারা মোজার উপর মাসেহ সাব্যস্ত রয়েছে। এখন মাসেহর জন্যে মুদ্দত বা সময়ের দৈর্ঘ্য আছে কি নেই তা আলোচনার জায়গা এটা নয়। আহকামের কিতাবগুলোতে এর বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। রাফেযীগণ এতেও মতভেদ সৃষ্টি করেছে। তাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণ নেই, আছে শুধু অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি। স্বয়ং হযরত আলী (রাঃ)-এর বর্ণনায় সহীহ মুসলিমে এটা সাব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু রাফেযীরা তা মানে না। যেমন হযরত আলী (রাঃ)-এর রিওয়ায়াত দ্বারা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের নিকাহে মুতআর নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হয়েছে, তথাপি শী'আরা ওটাকে বৈধ বলেছে। ঠিক দ্রুপ এ আয়াতে কারীমা পদদ্বয় ধৌত করার উপর স্পষ্টভাবে পথ নির্দেশ করছে এবং এই কাজটিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারাবাহিক হাদীসসমূহ দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে, তথাপি শী'আ সম্প্রদায় এর বিরোধিতা করছে। প্রকৃতপক্ষে এ মাসায়েলের ব্যাপারে তাদের হাত দলীল-প্রমাণ হতে সম্পূর্ণ শূন্য। আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। অনুরূপভাবে এ লোকগুলো পায়ের গিঠদ্বয়ের ব্যাপারেও আয়াতের ও পূর্ববর্তী গুরুজনদের বিরোধিতা করেছে। তারা বলে যে ওটা পায়ের পিঠের উপর রয়েছে। সুতরাং তাদের নিকট প্রত্যেক পায়ে একটি মাত্র গিঁঠ রয়েছে। আর জমহুরের নিকট গিঠের ঐ হাড়গুলো যা পায়ের গোছা ও পায়ের মধ্যভাগে রয়েছে ঐগুলো হচ্ছে (আরবী)। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর ফরমান এই যে, যে (আরবী) -এর আলোচনা এখানে হয়েছে ওটা গিঁঠের ঐ হাড় দু’টি যা দু'দিকেই প্রকাশমান রয়েছে, তা একই পায়ে দু'টি গিঁঠ। এটা জনগণের মধ্যেও সুপরিচিত। আর হাদীসের পথ নির্দেশও এর উপরই। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উসমান (রাঃ) অযু করার সময় ডান পা (আরবী) বা গিঁঠ দু’টিসহ ধৌত করেন। তারপর বাম পাটিও এভাবেই ধৌত করেন। সহীহ ইবনে খুযাইমা এবং সুনানে আবি দাউদের মধ্যে রয়েছে, বর্ণনাকারী নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! হয় তোমরা তোমাদের সারিগুলো সোজা করে নাও, নয়তো আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অন্তরে বক্রতা সৃষ্টি করে দেবেন।” হাদীসের বর্ণনাকারী নো’মান ইবনে বাশীর (রাঃ) বলেনঃ তখন থেকে এই অবস্থা দাঁড়ালো যে, প্রতিটি লোক তার পার্শ্ববর্তী লোকের গিঠের সাথে গিঠ, জানুর সাথে জানু এবং কাধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে রাখতো। এ বর্ণনা দ্বারা পরিষ্কারভাবে জানা গেল যে, (আরবী) ঐ হাড়ের নাম নয় যা পায়ের পিঠের দিকে রয়েছে। কেননা, পাশাপাশি দাঁড়ানো দু’টি লোকের পক্ষে ওটা মিলানো সম্ভব নয়। বরং ওটা ঐ দু'টি উথিত হওয়া হাড় যা পায়ের গোছার শেষ ভাগে রয়েছে। আহলে সুন্নাতের মাযহাব এটাই। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ইয়াহইয়া ইবনে হারিস তাইমী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ “যায়েদের যে শীআ সঙ্গীটিকে হত্যা করা হয়েছিল তাকে আমি দেখেছি। তার গিঁঠটি পায়ের পিঠের উপর পেয়েছি। এটা ছিল তার কুদরতী শাস্তি, যা তার মৃত্যুর পরে প্রকাশ করা হয়েছে এবং সত্যের বিরোধিতা ও সত্য গোপন করার প্রতিফল দেয়া হয়েছে।”এরপর তায়াম্মুমের নিয়মের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এর পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে নিসায় হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। আয়াতে তায়াম্মুমের শানে নকূলও সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু হাদীস শাস্ত্রে আমীরুল মুমিনীন ইমাম বুখারী (রঃ) এ আয়াত সম্পর্কে একটি বিশেষ হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি নিম্নে দেয়া হলোঃউম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমার গলার হারটি বায়দা নামক স্থানে পড়ে যায়। আমরা মদীনায় প্রবেশকারী ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সওয়ারীটি থামিয়ে দেন এবং আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। ইত্যবসরে আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমাকে তিরস্কারের সূরে বলেনঃ “তুমি হার হারিয়ে দিয়ে লোকদেরকে থামিয়ে দিয়েছো?” এ কথা বলে তিনি আমাকে প্রহার করতে শুরু করেন যার ফলে আমার কষ্টবোধ হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে মনে করে আমি নড়াচড়া করা হতে বিরত থাকি। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে ওঠেন এবং ইতিমধ্যে ফজরের নামাযের সময় হয়ে যায়। সুতরাং তিনি পানি খোঁজ করেন। কিন্তু পানি পাওয়া গেল না। সেই সময় এ পূর্ণ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন হযরত উসাইদ ইবনে হুযাইর (রাঃ) বলে ওঠেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)-এর বংশধর, আল্লাহ জনগণের জন্যে তোমাদেরকে কল্যাণময় বানিয়ে দিয়েছেন। তোমরা তাদের জন্যে পুরোপুরি কল্যাণময় হয়ে গেলে।” (সুইউতী (রঃ) বলেনঃ হাদীসটি এটাই প্রমাণ করছে যে, আয়াতটি নাযিল হওয়ার পূর্বেই তাদের উপর অযু ওয়াজিব ছিল। এ কারণেই পানিশূন্য জায়গায় অবতরণ করাকে তারা খুবই বড় করে দেখেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এ মত পোষণ করেন যে, আয়াতের প্রথম অংশ অযু ফরয হওয়ার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। তারপর বাকী অংশ তায়াম্মুমের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তবে প্রথমটি বেশী ঠিক, কেননা মক্কায় নামায ফরয হওয়ার সাথে সাথে অযুও ফরয করা হয়। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনায়)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকারের সংকীর্ণতা ও অসুবিধায় ফেলতে চান না। এজন্যেই তিনি দ্বীনকে সহজ ও হালকা করে দিয়েছেন, কঠিন ও মুশকিল করেননি। হুকুমতো ছিল এই যে, তোমরা পানি দ্বারা অযু করবে। কিন্তু যদি পানি পাওয়া না যায় কিংবা তোমরা রোগাক্রান্ত হয়ে পড় তবে তোমাদেকে তায়াম্মুম করার অনুমতি দেয়া হলো। বাকী হুকুমের জন্যে আহকামের কিতাবগুলো দ্রষ্টব্য।ইরশাদ হচ্ছে-বরং আল্লাহ তোমাদেরকে পবিত্র করতে এবং তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামত পরিপূর্ণ করতে চান, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। অর্থাৎ তার প্রশস্ত আহকাম, কোমলতা, দয়া, সহজকরণ এবং অবকাশ দানের প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অযুর পরে আল্লাহর রাসূল (সঃ) একটি দু'আ শিক্ষা দিয়েছেন, তা যেন এ আয়াতেরই আওতাভুক্ত রয়েছে। মুসনাদে আহমাদ, সুনান। এবং সহীহ মুসলিমে হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমরা পালাক্রমে উট চরাতাম। আমি আমার পালার দিন রাত্রে ইশার সময় আগমন করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাড়িয়ে জনগণকে কিছু বলতে রয়েছেন। আমি যখন পৌছে গেলাম তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে শুনতে পেলামঃ “যে মুসলমান ভালভাবে অযু করে আন্তরিকতার সাথে দু'রাকআত নামায পড়বে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব।” এ কথা শুনে আমি বললাম, বাঃ বাঃ! এটা তো খুবই ভাল কথা। আমার এ কথা শুনে আমার সামনে উপবিষ্ট একজন সাথী বললেনঃ “এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কথাটি বলেছিলেন তা এর চেয়েও অধিক উত্তম।” আমি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করে বুঝলাম যে, তিনি হচ্ছেন হযরত উমার ফারূক (রাঃ)। আমাকে তিনি বললেন, তুমি তো এখনই আসলে। তোমার আসার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করার পর বলে- (আরবী) আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরজা-ই খুলে যায়, সে যেটা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন মুসলমান বা মুমিন অযু করতে বসে, অতঃপর তার মুখমণ্ডল ধৌত করে, তখন পানির সাথে সাথে বা পানির শেষ ফোটার সাথে সাথে তার চক্ষুদ্বয়ের সমুদয় পাপ ঝরে পড়ে। অনুরূপভাবে হাত ধোয়ার সময় হাতের সমুদয় পাপ এবং এভাবেই পা ধোয়ার সময় পায়ের সমুদয় পাপ পানির সাথে সাথে বা পানির শেষ ফোটার সাথে সাথে ঝরে পড়ে। অবশেষে সে পাপসমূহ থেকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র হয়ে যায়।” ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন ব্যক্তি "অযু করার সময় যখন হাত দুটি ধৌত করে তখন হাত হতে পাপরাশি বিদূরিত হয়ে যায়। যখন মুখমণ্ডল ধৌত করে তখন মুখমণ্ডল হতে পাপসমূহ দূর হয়ে যায়। যখন মাথা মাসেহ করে তখন মাথার গুনাহ দূরীভূত হয়। যখন পা ধুয়ে নেয় তখন পা হতে পাপরাশি ঝরে পড়ে।” অন্য সনদে মাসেহ করার কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করে নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হয়, তার কান হতে, চোখ হতে, হাত হতে এবং পা হতে সমস্ত গুনাহ ঝড়ে পড়ে।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অযু হচ্ছে অর্ধেক ঈমান। আল-হামদুলিল্লাহ' বলার কারণে পুণ্যের পাল্লা পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানকে পূর্ণ করে ফেলে। রোযা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ, ধৈর্য হচ্ছে জ্যোতি স্বরূপ এবং সাদকা হচ্ছে দলীল স্বরূপ। কুরআন তোমার স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। প্রত্যেক লোক সকালে উঠেই স্বীয় প্রাণকে ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে। অতঃপর সে ওকে মুক্ত করে দেয় অথবা ধ্বংস করে ফেলে।” সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হারাম মালের সাদকা আল্লাহ কবুল করেন না এবং অযু ছাড়া নামাযও কবুল করেন না।”

আল-মায়িদা 5:7

৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

আল-মায়িদা 5:8

৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

আল-মায়িদা 5:9

৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

আল-মায়িদা 5:10

৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

আল-মায়িদা 5:11

৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

আল-মায়িদা 5:12

১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে অঙ্গীকার পুরো করা, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাথে সাথে প্রকাশ্য ও গোপনীয় নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন এ আয়াতগুলোতে তাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের নিকট হতে গ্রহণকৃত অঙ্গীকারের হাকীকত ও অবস্থা বর্ণনা করছেন। তারপর তারা যখন আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দেয় তখন তাদের পরিণাম কি হলো তা বর্ণনা করে মুসলমানদেরকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা থেকে বিরত রাখছেন। তাদের বারোজন সর্দার ছিল অর্থাৎ গোত্রের বারোজন চৌধুরী ছিল যারা তাদের নিকট বায়আত গ্রহণ করতো যে, তারা যেন আল্লাহর এ রাসূলের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করে। হযরত মূসা (আঃ) যখন অবাধ্যদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে গমন করেন তখন তিনি প্রত্যেক গোত্রের নেতা হতে একজন করে সর্দার নির্বাচন করে যান। (১) আদবীল গোত্রের নেতা ছিল শামুন ইবনে আকওয়ান, (২) শামউনের চৌধুরী ছিল শাফাত ইবনে জাদ্দী, (৩) ইয়াহুদার নেতা ছিল কালিব ইবনে ইউফনা, (৪) ফীখাইলের নেতা ছিল ইবনে ইউসুফ, (৫) ইফরাঈমের সর্দার ছিল ইউশা ইবনে নূন, (৬) বিন ইয়ামীন গোত্রের চৌধুরী ছিল কিতাতামী ইবনে ওয়াফুন, (৭) যাবুকূনের সর্দার ছিল জাদ্দী ইবনে শূরী, (৮) মিনশারীর নেতা ছিল হদ্দিী ইবনে সূফী, (৯) দান আমলাসিলের সর্দার ছিল ইবনে হামল, (১০) আশা গোত্রের সর্দার ছিল সাতুর, (১১) নাফতালীর সর্দার ছিল বাহর, (১২) ইয়াখারার গোত্রের নেতা ছিল লাবিল। তাওরাতের ৪র্থ খণ্ডে বানূ ইসরাঈলের গোত্রগুলোর সর্দারদের নাম উল্লিখিত রয়েছে। ঐ নামগুলো এবং এ নামগুলোর মধ্যে কিছু গরমিল দেখা যায়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বর্তমান তাওরাতের নামগুলো নিম্নরূপঃ (১) বান্ আদবীল গোত্রের নেতা সুফী ইবনে সাদুন, (২) বান্ শামউনের সর্দার শামওয়াল ইবনে সূর, (৩) বানূ ইয়াহুদার সর্দার হাশূর ইবনে উমাইয়াযার, (৪) বানূ ইয়াসখারের নেতা শাল ইবনে সাউন, (৫) বান্ যাবুর নেতা আলাইয়াব ইবনে হাল্ব, (৬) বানূ ফারাইয়ামের সর্দার মিনশা ইবনে গামছুর, (৭) বা মিনশার নেতা হামইয়াঈল, (৮) বান্ বিন ইয়ামীনের নেতা আবদীনা, (৯) বানূ দানের সর্দার জাইযার, (১) বানূ আশারের নেতা নাহাবিল, (১১) বান্ কানের সর্দার সায়েফ ইবনে দাওয়াবীল এবং (১২) বানূ নাফতারীর নেতা আজযা।এটা স্মরণীয় বিষয় যে, লাইলাতুল আকাবায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আনসারদের নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করেন সে সময় তাদের সর্দারও বারজনই ছিলেন। আউস গোত্রের ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেনঃ (১) হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ), (২) হযরত সা'দ ইবনে হালীমা (রাঃ) এবং (৩) হযরত রুফাআ ইবনে আবদুল মুগযির (রাঃ)। অন্য বর্ণনায় হযরত রুফাআর (রাঃ) স্থলে হযরত আবদুল হাইসাম ইবনে তাইহান (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। বাকী নয়জন সর্দার ছিলেন খাযরাজ গোত্রের মধ্য হতে। তারা হচ্ছেনঃ (১) আবু উমামাহ আসআদ ইবনে যারারাহ (রাঃ), (২) সা’দ ইবনে রাবী' (রাঃ), (৩) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), (৪) রাফি ইবনে মালিক ইবনে আজলান (রাঃ), (৫) বারা ইবনে মারূর (রাঃ), (৬) উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ), (৭) সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ), (৮) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) এবং (৯) মুনযির ইবনে আমর ইবনে খামরাস (রাঃ)। এ সর্দারগণ নিজ নিজ কওমের পক্ষ থেকে শেষ নবী (সঃ)-এর হাতে শ্রবণ করার ও মান্য করার বায়আত গ্রহণ করেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেনঃ আমরা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। তিনি সে সময় আমাদেরকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এমন সময় একটি লোক তাকে জিজ্ঞেস করেন –এ উম্মতের ক’জন খলীফা হবেন এ কথা কি আপনারা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন? হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ যখন থেকে আমি ইরাকে এসেছি, আপনি ছাড়া আর কেউ আমাকে এটা জিজ্ঞেস করেননি। এ সম্বন্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “বারোজন হবে। বানী ইসরাঈলের দলপতিদেরও এ সংখ্যাই ছিল।'সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু হাদীসের বিষয়বস্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে। হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “মানুষের কাজ চলতে থাকবে যে পর্যন্ত তাদের অলী বারোজন হবে। তারপর নবী (সঃ) একটি কথা বলেন যা আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন অন্যকে জিজ্ঞেস করি-নবী (সঃ) এখন কি বললেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা সব কুরাইশ হবে।” সহীহ মুসলিমে এ শব্দই রয়েছে। এ হাদীসের ভাবার্থ এই যে, বারোজন সৎ খলীফা হবেন যারা হক প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং লোকদের মধ্যে আদল ও ইনসাফ কায়েম করবেন। এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তারা সবাই পর্যাক্রমেই হবেন। তাদের মধ্যে চারজন খলীফা তো পর্যাক্রমেই হয়েছেন। তারা হচ্ছেনঃ হযতর আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। এ চারজন খলীফার খিলাফত নবুওয়াতের তরীকা অনুযায়ীই ছিল। ঐ বারোজন খলীফার মধ্যে পঞ্চম হচ্ছেনউমার ইবনে আবদুল আযীয। বানূ আব্বাসের মধ্যে কেউ কেউ এরূপ খলীফা ছিলেন। কিয়ামতের পূর্বে এ বারো সংখ্যা পূর্ণ হওয়া অবশ্যই জরুরী। তাঁদের মধ্য হতেই একজন হচ্ছেন ইমাম মাহদী (রঃ), যার সুসংবাদ হাদীসে এসেছে। নবী (সঃ)-এর নামে তাঁর নাম হবে এবং নবী (সঃ)-এর পিতার নামে তাঁর পিতার নাম হবে। তিনি ভূ-পৃষ্ঠকে আদল ও ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন। অথচ তার পূর্বে পৃথিবী অত্যাচার ও অনাচারে ভরপুর থাকবে। কিন্তু শী আ সম্প্রদায় যে ইমামের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে তিনি সেই ইমাম নন। শী'আদের ঐ ইমামের আসলে তো কোন অস্তিত্বই নেই। এটা তো শুধু তাদের ধারণা ও কল্পনা মাত্র। এ হাদীস শী'আদের বারো ফিরকার ইমামদেরকে বুঝায় না। এ হাদীসকেই ঐ বারোজন ইমামের উপর মাহমুল করাও শী'আদের ঐ ফিরকার বানানো কথা মাত্র। এটা তো তাদের অজ্ঞতা এবং জ্ঞানের স্বল্পতাই প্রমাণ করে। তাওরাতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর শুভ সংবাদের সাথে সাথে লিখিত আছে যে, তাঁর বংশের মধ্যে বারোজন মহান ব্যক্তি হবেন। এর দ্বারাও মুসলমানদের এ বারোজন কুরায়েশী বাদশাহকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু যেসব ইয়াহূদী মুসলমান হয়েছিল তারা ছিল অন্য। তারা নিজেদের ইসলামে কাঁচা ছিল এবং সাথে সাথে মূখও ছিল। তারা হয় তো শী'আদের কানে এটা কুঁকে দিয়েছিল এবং এর ফলেই তারা মনে করে নিয়েছিল যে, এর দ্বারা বারোজন ইমামকে বুঝানো হয়েছে। নতুবা হাদীসে তো পরিষ্কারভাবে এর উল্টোই বিদ্যমান রয়েছে। এখন ঐ আহাদ ও অঙ্গীকারের আলোচনা করা হচ্ছে যা আল্লাহ তাআলা। ইয়াহূদীদের নিকট গ্রহণ করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার এই যে, তারা নামায পড়বে, যাকাত দেবে, আল্লাহর রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করবে, তাদের সাহায্য সহানুভূতি করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেদের মাল খরচ করবে। তারা যদি এ সব কিছু পালন করে তবে আল্লাহর সাহায্য সহায়তা তাদের সাথে থাকবে, তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে। আর তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা হবে এবং তাদের ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে তারা যদি এ অঙ্গীকারের পরও তা থেকে ফিরে যায় এবং ওগুলো পালন না করে তবে অবশ্যই তারা সত্য পথ থেকে দূরে সরে পড়বে এবং বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। সুতরাং হলোও তা-ই। তারা অঙ্গীকার ভেঙ্গে দিলো এবং ওয়াদা খেলাফ করলো। তখন তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হলো, তারা হিদায়াত থেকে দূরে সরে পড়লো, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তারা ওয়াজ-নসীহতে মোটেই উপকৃত হলো না, তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিগড়ে গেল, আল্লাহর কথাকে তারা হেরফের করতে লাগলো এবং ভুল ও মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে লাগলো। কালামুল্লাহর প্রকৃত ভাবার্থ যা হবে তা পরিবর্তন করে দিয়ে অন্য ভাবার্থ বুঝতে ও বুঝাতে লাগলো এবং আল্লাহর নাম নিয়ে ঐসব মাসআলা বর্ণনা করতে লাগলো যা আল্লাহ বলেননি। অবশেষে আল্লাহর কিতাব তাদের হাত থেকে ছুটে গেল এবং তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-আমল হয়ে গেল, আর তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে লাগলো। দ্বীনের আসল আমল যখন তাদের হাত থেকে ছুটে গেল তখন ফুরূঈ আমল কিরূপে ককূল হতে পারে? আমল ছুটে যাওয়ার কারণে না অন্তর ঠিক থাকলো, না স্বভাব ভাল থাকলো, না আন্তরিকতা রইলো। প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে নিজেদের নীতিতে অভ্যাস বানিয়ে নিলো। আর তারা নবী (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের বিরোধিতা করতে লাগলো।নবী (সঃ)-কে বলা হচ্ছে- তুমি তাদেকে ক্ষমা ও মার্জনা করতে থাক। তাদের সাথে এরূপ ব্যবহার করা উত্তম হবে। হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি তোমার সাথে আল্লাহর নাফরমানীমূলক ব্যবহার করে, তুমি তাকে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আহ্বান কর।” এতে যৌক্তিকতা ও পরিণামদর্শিতা এই রয়েছে যে, ফলে সে হয় তো ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং আল্লাহ তাকে হিদায়াত নসীব করবেন। ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহ সৎকর্মশীদের ভালবাসেন। অর্থাৎ যারা অপরের দুর্ব্যবহার ক্ষমা করতঃ তার সাথে সৎ ব্যবহার করে, এরূপ লোককে আল্লাহ খুবই ভালবাসেন। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, দুর্ব্যবহারকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম জিহাদের আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।ঘোষণ করা হচ্ছে-খ্রীষ্টানদের নিকট থেকেও আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম যে, তারা আমার প্রেরিত রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনবে, তাঁকে সাহায্য করবে এবং তার আনুগত্য স্বীকার করবে। কিন্তু ইয়াহূদীদের মত তারাও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছি এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে। তারা আজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল অপর দলকে কাফির ও অভিশপ্ত বলছে এবং নিজেদের উপাসনালয়েও আসতে দেয় না। মালেকিয়াহ দল ইয়াকুবিয়্যাহ দলকে খোলাখুলিভাবে কাফির বলছে। এরূপ সমস্ত দলই করতে রয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সংবাদ দেবেন। এ কথা দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। তারা মহান আল্লাহর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করা হবে। আল্লাহ তো হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। আর তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ কেউই নেই।

আল-মায়িদা 5:13

১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে অঙ্গীকার পুরো করা, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাথে সাথে প্রকাশ্য ও গোপনীয় নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন এ আয়াতগুলোতে তাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের নিকট হতে গ্রহণকৃত অঙ্গীকারের হাকীকত ও অবস্থা বর্ণনা করছেন। তারপর তারা যখন আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দেয় তখন তাদের পরিণাম কি হলো তা বর্ণনা করে মুসলমানদেরকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা থেকে বিরত রাখছেন। তাদের বারোজন সর্দার ছিল অর্থাৎ গোত্রের বারোজন চৌধুরী ছিল যারা তাদের নিকট বায়আত গ্রহণ করতো যে, তারা যেন আল্লাহর এ রাসূলের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করে। হযরত মূসা (আঃ) যখন অবাধ্যদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে গমন করেন তখন তিনি প্রত্যেক গোত্রের নেতা হতে একজন করে সর্দার নির্বাচন করে যান। (১) আদবীল গোত্রের নেতা ছিল শামুন ইবনে আকওয়ান, (২) শামউনের চৌধুরী ছিল শাফাত ইবনে জাদ্দী, (৩) ইয়াহুদার নেতা ছিল কালিব ইবনে ইউফনা, (৪) ফীখাইলের নেতা ছিল ইবনে ইউসুফ, (৫) ইফরাঈমের সর্দার ছিল ইউশা ইবনে নূন, (৬) বিন ইয়ামীন গোত্রের চৌধুরী ছিল কিতাতামী ইবনে ওয়াফুন, (৭) যাবুকূনের সর্দার ছিল জাদ্দী ইবনে শূরী, (৮) মিনশারীর নেতা ছিল হদ্দিী ইবনে সূফী, (৯) দান আমলাসিলের সর্দার ছিল ইবনে হামল, (১০) আশা গোত্রের সর্দার ছিল সাতুর, (১১) নাফতালীর সর্দার ছিল বাহর, (১২) ইয়াখারার গোত্রের নেতা ছিল লাবিল। তাওরাতের ৪র্থ খণ্ডে বানূ ইসরাঈলের গোত্রগুলোর সর্দারদের নাম উল্লিখিত রয়েছে। ঐ নামগুলো এবং এ নামগুলোর মধ্যে কিছু গরমিল দেখা যায়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বর্তমান তাওরাতের নামগুলো নিম্নরূপঃ (১) বান্ আদবীল গোত্রের নেতা সুফী ইবনে সাদুন, (২) বান্ শামউনের সর্দার শামওয়াল ইবনে সূর, (৩) বানূ ইয়াহুদার সর্দার হাশূর ইবনে উমাইয়াযার, (৪) বানূ ইয়াসখারের নেতা শাল ইবনে সাউন, (৫) বান্ যাবুর নেতা আলাইয়াব ইবনে হাল্ব, (৬) বানূ ফারাইয়ামের সর্দার মিনশা ইবনে গামছুর, (৭) বা মিনশার নেতা হামইয়াঈল, (৮) বান্ বিন ইয়ামীনের নেতা আবদীনা, (৯) বানূ দানের সর্দার জাইযার, (১) বানূ আশারের নেতা নাহাবিল, (১১) বান্ কানের সর্দার সায়েফ ইবনে দাওয়াবীল এবং (১২) বানূ নাফতারীর নেতা আজযা।এটা স্মরণীয় বিষয় যে, লাইলাতুল আকাবায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আনসারদের নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করেন সে সময় তাদের সর্দারও বারজনই ছিলেন। আউস গোত্রের ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেনঃ (১) হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ), (২) হযরত সা'দ ইবনে হালীমা (রাঃ) এবং (৩) হযরত রুফাআ ইবনে আবদুল মুগযির (রাঃ)। অন্য বর্ণনায় হযরত রুফাআর (রাঃ) স্থলে হযরত আবদুল হাইসাম ইবনে তাইহান (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। বাকী নয়জন সর্দার ছিলেন খাযরাজ গোত্রের মধ্য হতে। তারা হচ্ছেনঃ (১) আবু উমামাহ আসআদ ইবনে যারারাহ (রাঃ), (২) সা’দ ইবনে রাবী' (রাঃ), (৩) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), (৪) রাফি ইবনে মালিক ইবনে আজলান (রাঃ), (৫) বারা ইবনে মারূর (রাঃ), (৬) উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ), (৭) সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ), (৮) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) এবং (৯) মুনযির ইবনে আমর ইবনে খামরাস (রাঃ)। এ সর্দারগণ নিজ নিজ কওমের পক্ষ থেকে শেষ নবী (সঃ)-এর হাতে শ্রবণ করার ও মান্য করার বায়আত গ্রহণ করেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেনঃ আমরা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। তিনি সে সময় আমাদেরকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এমন সময় একটি লোক তাকে জিজ্ঞেস করেন –এ উম্মতের ক’জন খলীফা হবেন এ কথা কি আপনারা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন? হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ যখন থেকে আমি ইরাকে এসেছি, আপনি ছাড়া আর কেউ আমাকে এটা জিজ্ঞেস করেননি। এ সম্বন্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “বারোজন হবে। বানী ইসরাঈলের দলপতিদেরও এ সংখ্যাই ছিল।'সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু হাদীসের বিষয়বস্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে। হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “মানুষের কাজ চলতে থাকবে যে পর্যন্ত তাদের অলী বারোজন হবে। তারপর নবী (সঃ) একটি কথা বলেন যা আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন অন্যকে জিজ্ঞেস করি-নবী (সঃ) এখন কি বললেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা সব কুরাইশ হবে।” সহীহ মুসলিমে এ শব্দই রয়েছে। এ হাদীসের ভাবার্থ এই যে, বারোজন সৎ খলীফা হবেন যারা হক প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং লোকদের মধ্যে আদল ও ইনসাফ কায়েম করবেন। এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তারা সবাই পর্যাক্রমেই হবেন। তাদের মধ্যে চারজন খলীফা তো পর্যাক্রমেই হয়েছেন। তারা হচ্ছেনঃ হযতর আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। এ চারজন খলীফার খিলাফত নবুওয়াতের তরীকা অনুযায়ীই ছিল। ঐ বারোজন খলীফার মধ্যে পঞ্চম হচ্ছেনউমার ইবনে আবদুল আযীয। বানূ আব্বাসের মধ্যে কেউ কেউ এরূপ খলীফা ছিলেন। কিয়ামতের পূর্বে এ বারো সংখ্যা পূর্ণ হওয়া অবশ্যই জরুরী। তাঁদের মধ্য হতেই একজন হচ্ছেন ইমাম মাহদী (রঃ), যার সুসংবাদ হাদীসে এসেছে। নবী (সঃ)-এর নামে তাঁর নাম হবে এবং নবী (সঃ)-এর পিতার নামে তাঁর পিতার নাম হবে। তিনি ভূ-পৃষ্ঠকে আদল ও ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন। অথচ তার পূর্বে পৃথিবী অত্যাচার ও অনাচারে ভরপুর থাকবে। কিন্তু শী আ সম্প্রদায় যে ইমামের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে তিনি সেই ইমাম নন। শী'আদের ঐ ইমামের আসলে তো কোন অস্তিত্বই নেই। এটা তো শুধু তাদের ধারণা ও কল্পনা মাত্র। এ হাদীস শী'আদের বারো ফিরকার ইমামদেরকে বুঝায় না। এ হাদীসকেই ঐ বারোজন ইমামের উপর মাহমুল করাও শী'আদের ঐ ফিরকার বানানো কথা মাত্র। এটা তো তাদের অজ্ঞতা এবং জ্ঞানের স্বল্পতাই প্রমাণ করে। তাওরাতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর শুভ সংবাদের সাথে সাথে লিখিত আছে যে, তাঁর বংশের মধ্যে বারোজন মহান ব্যক্তি হবেন। এর দ্বারাও মুসলমানদের এ বারোজন কুরায়েশী বাদশাহকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু যেসব ইয়াহূদী মুসলমান হয়েছিল তারা ছিল অন্য। তারা নিজেদের ইসলামে কাঁচা ছিল এবং সাথে সাথে মূখও ছিল। তারা হয় তো শী'আদের কানে এটা কুঁকে দিয়েছিল এবং এর ফলেই তারা মনে করে নিয়েছিল যে, এর দ্বারা বারোজন ইমামকে বুঝানো হয়েছে। নতুবা হাদীসে তো পরিষ্কারভাবে এর উল্টোই বিদ্যমান রয়েছে। এখন ঐ আহাদ ও অঙ্গীকারের আলোচনা করা হচ্ছে যা আল্লাহ তাআলা। ইয়াহূদীদের নিকট গ্রহণ করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার এই যে, তারা নামায পড়বে, যাকাত দেবে, আল্লাহর রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করবে, তাদের সাহায্য সহানুভূতি করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেদের মাল খরচ করবে। তারা যদি এ সব কিছু পালন করে তবে আল্লাহর সাহায্য সহায়তা তাদের সাথে থাকবে, তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে। আর তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা হবে এবং তাদের ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে তারা যদি এ অঙ্গীকারের পরও তা থেকে ফিরে যায় এবং ওগুলো পালন না করে তবে অবশ্যই তারা সত্য পথ থেকে দূরে সরে পড়বে এবং বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। সুতরাং হলোও তা-ই। তারা অঙ্গীকার ভেঙ্গে দিলো এবং ওয়াদা খেলাফ করলো। তখন তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হলো, তারা হিদায়াত থেকে দূরে সরে পড়লো, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তারা ওয়াজ-নসীহতে মোটেই উপকৃত হলো না, তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিগড়ে গেল, আল্লাহর কথাকে তারা হেরফের করতে লাগলো এবং ভুল ও মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে লাগলো। কালামুল্লাহর প্রকৃত ভাবার্থ যা হবে তা পরিবর্তন করে দিয়ে অন্য ভাবার্থ বুঝতে ও বুঝাতে লাগলো এবং আল্লাহর নাম নিয়ে ঐসব মাসআলা বর্ণনা করতে লাগলো যা আল্লাহ বলেননি। অবশেষে আল্লাহর কিতাব তাদের হাত থেকে ছুটে গেল এবং তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-আমল হয়ে গেল, আর তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে লাগলো। দ্বীনের আসল আমল যখন তাদের হাত থেকে ছুটে গেল তখন ফুরূঈ আমল কিরূপে ককূল হতে পারে? আমল ছুটে যাওয়ার কারণে না অন্তর ঠিক থাকলো, না স্বভাব ভাল থাকলো, না আন্তরিকতা রইলো। প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে নিজেদের নীতিতে অভ্যাস বানিয়ে নিলো। আর তারা নবী (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের বিরোধিতা করতে লাগলো।নবী (সঃ)-কে বলা হচ্ছে- তুমি তাদেকে ক্ষমা ও মার্জনা করতে থাক। তাদের সাথে এরূপ ব্যবহার করা উত্তম হবে। হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি তোমার সাথে আল্লাহর নাফরমানীমূলক ব্যবহার করে, তুমি তাকে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আহ্বান কর।” এতে যৌক্তিকতা ও পরিণামদর্শিতা এই রয়েছে যে, ফলে সে হয় তো ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং আল্লাহ তাকে হিদায়াত নসীব করবেন। ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহ সৎকর্মশীদের ভালবাসেন। অর্থাৎ যারা অপরের দুর্ব্যবহার ক্ষমা করতঃ তার সাথে সৎ ব্যবহার করে, এরূপ লোককে আল্লাহ খুবই ভালবাসেন। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, দুর্ব্যবহারকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম জিহাদের আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।ঘোষণ করা হচ্ছে-খ্রীষ্টানদের নিকট থেকেও আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম যে, তারা আমার প্রেরিত রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনবে, তাঁকে সাহায্য করবে এবং তার আনুগত্য স্বীকার করবে। কিন্তু ইয়াহূদীদের মত তারাও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছি এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে। তারা আজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল অপর দলকে কাফির ও অভিশপ্ত বলছে এবং নিজেদের উপাসনালয়েও আসতে দেয় না। মালেকিয়াহ দল ইয়াকুবিয়্যাহ দলকে খোলাখুলিভাবে কাফির বলছে। এরূপ সমস্ত দলই করতে রয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সংবাদ দেবেন। এ কথা দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। তারা মহান আল্লাহর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করা হবে। আল্লাহ তো হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। আর তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ কেউই নেই।

আল-মায়িদা 5:14

১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে অঙ্গীকার পুরো করা, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাথে সাথে প্রকাশ্য ও গোপনীয় নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন এ আয়াতগুলোতে তাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের নিকট হতে গ্রহণকৃত অঙ্গীকারের হাকীকত ও অবস্থা বর্ণনা করছেন। তারপর তারা যখন আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দেয় তখন তাদের পরিণাম কি হলো তা বর্ণনা করে মুসলমানদেরকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা থেকে বিরত রাখছেন। তাদের বারোজন সর্দার ছিল অর্থাৎ গোত্রের বারোজন চৌধুরী ছিল যারা তাদের নিকট বায়আত গ্রহণ করতো যে, তারা যেন আল্লাহর এ রাসূলের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করে। হযরত মূসা (আঃ) যখন অবাধ্যদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে গমন করেন তখন তিনি প্রত্যেক গোত্রের নেতা হতে একজন করে সর্দার নির্বাচন করে যান। (১) আদবীল গোত্রের নেতা ছিল শামুন ইবনে আকওয়ান, (২) শামউনের চৌধুরী ছিল শাফাত ইবনে জাদ্দী, (৩) ইয়াহুদার নেতা ছিল কালিব ইবনে ইউফনা, (৪) ফীখাইলের নেতা ছিল ইবনে ইউসুফ, (৫) ইফরাঈমের সর্দার ছিল ইউশা ইবনে নূন, (৬) বিন ইয়ামীন গোত্রের চৌধুরী ছিল কিতাতামী ইবনে ওয়াফুন, (৭) যাবুকূনের সর্দার ছিল জাদ্দী ইবনে শূরী, (৮) মিনশারীর নেতা ছিল হদ্দিী ইবনে সূফী, (৯) দান আমলাসিলের সর্দার ছিল ইবনে হামল, (১০) আশা গোত্রের সর্দার ছিল সাতুর, (১১) নাফতালীর সর্দার ছিল বাহর, (১২) ইয়াখারার গোত্রের নেতা ছিল লাবিল। তাওরাতের ৪র্থ খণ্ডে বানূ ইসরাঈলের গোত্রগুলোর সর্দারদের নাম উল্লিখিত রয়েছে। ঐ নামগুলো এবং এ নামগুলোর মধ্যে কিছু গরমিল দেখা যায়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বর্তমান তাওরাতের নামগুলো নিম্নরূপঃ (১) বান্ আদবীল গোত্রের নেতা সুফী ইবনে সাদুন, (২) বান্ শামউনের সর্দার শামওয়াল ইবনে সূর, (৩) বানূ ইয়াহুদার সর্দার হাশূর ইবনে উমাইয়াযার, (৪) বানূ ইয়াসখারের নেতা শাল ইবনে সাউন, (৫) বান্ যাবুর নেতা আলাইয়াব ইবনে হাল্ব, (৬) বানূ ফারাইয়ামের সর্দার মিনশা ইবনে গামছুর, (৭) বা মিনশার নেতা হামইয়াঈল, (৮) বান্ বিন ইয়ামীনের নেতা আবদীনা, (৯) বানূ দানের সর্দার জাইযার, (১) বানূ আশারের নেতা নাহাবিল, (১১) বান্ কানের সর্দার সায়েফ ইবনে দাওয়াবীল এবং (১২) বানূ নাফতারীর নেতা আজযা।এটা স্মরণীয় বিষয় যে, লাইলাতুল আকাবায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আনসারদের নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করেন সে সময় তাদের সর্দারও বারজনই ছিলেন। আউস গোত্রের ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেনঃ (১) হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ), (২) হযরত সা'দ ইবনে হালীমা (রাঃ) এবং (৩) হযরত রুফাআ ইবনে আবদুল মুগযির (রাঃ)। অন্য বর্ণনায় হযরত রুফাআর (রাঃ) স্থলে হযরত আবদুল হাইসাম ইবনে তাইহান (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। বাকী নয়জন সর্দার ছিলেন খাযরাজ গোত্রের মধ্য হতে। তারা হচ্ছেনঃ (১) আবু উমামাহ আসআদ ইবনে যারারাহ (রাঃ), (২) সা’দ ইবনে রাবী' (রাঃ), (৩) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), (৪) রাফি ইবনে মালিক ইবনে আজলান (রাঃ), (৫) বারা ইবনে মারূর (রাঃ), (৬) উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ), (৭) সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ), (৮) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) এবং (৯) মুনযির ইবনে আমর ইবনে খামরাস (রাঃ)। এ সর্দারগণ নিজ নিজ কওমের পক্ষ থেকে শেষ নবী (সঃ)-এর হাতে শ্রবণ করার ও মান্য করার বায়আত গ্রহণ করেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেনঃ আমরা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। তিনি সে সময় আমাদেরকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এমন সময় একটি লোক তাকে জিজ্ঞেস করেন –এ উম্মতের ক’জন খলীফা হবেন এ কথা কি আপনারা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন? হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ যখন থেকে আমি ইরাকে এসেছি, আপনি ছাড়া আর কেউ আমাকে এটা জিজ্ঞেস করেননি। এ সম্বন্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “বারোজন হবে। বানী ইসরাঈলের দলপতিদেরও এ সংখ্যাই ছিল।'সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু হাদীসের বিষয়বস্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে। হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “মানুষের কাজ চলতে থাকবে যে পর্যন্ত তাদের অলী বারোজন হবে। তারপর নবী (সঃ) একটি কথা বলেন যা আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন অন্যকে জিজ্ঞেস করি-নবী (সঃ) এখন কি বললেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা সব কুরাইশ হবে।” সহীহ মুসলিমে এ শব্দই রয়েছে। এ হাদীসের ভাবার্থ এই যে, বারোজন সৎ খলীফা হবেন যারা হক প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং লোকদের মধ্যে আদল ও ইনসাফ কায়েম করবেন। এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তারা সবাই পর্যাক্রমেই হবেন। তাদের মধ্যে চারজন খলীফা তো পর্যাক্রমেই হয়েছেন। তারা হচ্ছেনঃ হযতর আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। এ চারজন খলীফার খিলাফত নবুওয়াতের তরীকা অনুযায়ীই ছিল। ঐ বারোজন খলীফার মধ্যে পঞ্চম হচ্ছেনউমার ইবনে আবদুল আযীয। বানূ আব্বাসের মধ্যে কেউ কেউ এরূপ খলীফা ছিলেন। কিয়ামতের পূর্বে এ বারো সংখ্যা পূর্ণ হওয়া অবশ্যই জরুরী। তাঁদের মধ্য হতেই একজন হচ্ছেন ইমাম মাহদী (রঃ), যার সুসংবাদ হাদীসে এসেছে। নবী (সঃ)-এর নামে তাঁর নাম হবে এবং নবী (সঃ)-এর পিতার নামে তাঁর পিতার নাম হবে। তিনি ভূ-পৃষ্ঠকে আদল ও ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন। অথচ তার পূর্বে পৃথিবী অত্যাচার ও অনাচারে ভরপুর থাকবে। কিন্তু শী আ সম্প্রদায় যে ইমামের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে তিনি সেই ইমাম নন। শী'আদের ঐ ইমামের আসলে তো কোন অস্তিত্বই নেই। এটা তো শুধু তাদের ধারণা ও কল্পনা মাত্র। এ হাদীস শী'আদের বারো ফিরকার ইমামদেরকে বুঝায় না। এ হাদীসকেই ঐ বারোজন ইমামের উপর মাহমুল করাও শী'আদের ঐ ফিরকার বানানো কথা মাত্র। এটা তো তাদের অজ্ঞতা এবং জ্ঞানের স্বল্পতাই প্রমাণ করে। তাওরাতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর শুভ সংবাদের সাথে সাথে লিখিত আছে যে, তাঁর বংশের মধ্যে বারোজন মহান ব্যক্তি হবেন। এর দ্বারাও মুসলমানদের এ বারোজন কুরায়েশী বাদশাহকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু যেসব ইয়াহূদী মুসলমান হয়েছিল তারা ছিল অন্য। তারা নিজেদের ইসলামে কাঁচা ছিল এবং সাথে সাথে মূখও ছিল। তারা হয় তো শী'আদের কানে এটা কুঁকে দিয়েছিল এবং এর ফলেই তারা মনে করে নিয়েছিল যে, এর দ্বারা বারোজন ইমামকে বুঝানো হয়েছে। নতুবা হাদীসে তো পরিষ্কারভাবে এর উল্টোই বিদ্যমান রয়েছে। এখন ঐ আহাদ ও অঙ্গীকারের আলোচনা করা হচ্ছে যা আল্লাহ তাআলা। ইয়াহূদীদের নিকট গ্রহণ করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার এই যে, তারা নামায পড়বে, যাকাত দেবে, আল্লাহর রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করবে, তাদের সাহায্য সহানুভূতি করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেদের মাল খরচ করবে। তারা যদি এ সব কিছু পালন করে তবে আল্লাহর সাহায্য সহায়তা তাদের সাথে থাকবে, তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে। আর তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা হবে এবং তাদের ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে তারা যদি এ অঙ্গীকারের পরও তা থেকে ফিরে যায় এবং ওগুলো পালন না করে তবে অবশ্যই তারা সত্য পথ থেকে দূরে সরে পড়বে এবং বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। সুতরাং হলোও তা-ই। তারা অঙ্গীকার ভেঙ্গে দিলো এবং ওয়াদা খেলাফ করলো। তখন তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হলো, তারা হিদায়াত থেকে দূরে সরে পড়লো, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তারা ওয়াজ-নসীহতে মোটেই উপকৃত হলো না, তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিগড়ে গেল, আল্লাহর কথাকে তারা হেরফের করতে লাগলো এবং ভুল ও মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে লাগলো। কালামুল্লাহর প্রকৃত ভাবার্থ যা হবে তা পরিবর্তন করে দিয়ে অন্য ভাবার্থ বুঝতে ও বুঝাতে লাগলো এবং আল্লাহর নাম নিয়ে ঐসব মাসআলা বর্ণনা করতে লাগলো যা আল্লাহ বলেননি। অবশেষে আল্লাহর কিতাব তাদের হাত থেকে ছুটে গেল এবং তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-আমল হয়ে গেল, আর তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে লাগলো। দ্বীনের আসল আমল যখন তাদের হাত থেকে ছুটে গেল তখন ফুরূঈ আমল কিরূপে ককূল হতে পারে? আমল ছুটে যাওয়ার কারণে না অন্তর ঠিক থাকলো, না স্বভাব ভাল থাকলো, না আন্তরিকতা রইলো। প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে নিজেদের নীতিতে অভ্যাস বানিয়ে নিলো। আর তারা নবী (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের বিরোধিতা করতে লাগলো।নবী (সঃ)-কে বলা হচ্ছে- তুমি তাদেকে ক্ষমা ও মার্জনা করতে থাক। তাদের সাথে এরূপ ব্যবহার করা উত্তম হবে। হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি তোমার সাথে আল্লাহর নাফরমানীমূলক ব্যবহার করে, তুমি তাকে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আহ্বান কর।” এতে যৌক্তিকতা ও পরিণামদর্শিতা এই রয়েছে যে, ফলে সে হয় তো ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং আল্লাহ তাকে হিদায়াত নসীব করবেন। ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহ সৎকর্মশীদের ভালবাসেন। অর্থাৎ যারা অপরের দুর্ব্যবহার ক্ষমা করতঃ তার সাথে সৎ ব্যবহার করে, এরূপ লোককে আল্লাহ খুবই ভালবাসেন। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, দুর্ব্যবহারকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম জিহাদের আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।ঘোষণ করা হচ্ছে-খ্রীষ্টানদের নিকট থেকেও আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম যে, তারা আমার প্রেরিত রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনবে, তাঁকে সাহায্য করবে এবং তার আনুগত্য স্বীকার করবে। কিন্তু ইয়াহূদীদের মত তারাও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছি এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে। তারা আজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল অপর দলকে কাফির ও অভিশপ্ত বলছে এবং নিজেদের উপাসনালয়েও আসতে দেয় না। মালেকিয়াহ দল ইয়াকুবিয়্যাহ দলকে খোলাখুলিভাবে কাফির বলছে। এরূপ সমস্ত দলই করতে রয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সংবাদ দেবেন। এ কথা দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। তারা মহান আল্লাহর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করা হবে। আল্লাহ তো হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। আর তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ কেউই নেই।

আল-মায়িদা 5:15

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হিদায়াত ও দ্বীনে হকসহ সমস্ত মাখলুকের নিকট পাঠিয়েছেন। মুজিযা ও উজ্জ্বল প্রমাণাদি তাঁকে দান করেছেন। যে কথাগুলো ইয়াহূদ ও নাসারাগণ বদলিয়ে দিয়েছিল, ভুল ব্যাখ্যা করে অন্য অর্থ বানিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহর সত্তার উপর অপবাদ দিয়েছিল, কিতাবুল্লাহর যে অংশটি তাদের জীবনের প্রতিকুল ছিল তা তারা গোপন করে দিয়েছিল। ঐ সব কিছুই এ রাসূল (সঃ) প্রকাশ করে দেন। তবে যেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন। নেই সেগুলো তিনি বর্ণনা করেন না। মুসতাদরিকে হাকিম গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি রজম বা ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করার মাসআলাকে অস্বীকার করলো সে অজ্ঞতা বশতঃ কুরআন কারীমকে অস্বীকার করলো। কেননা,এ আয়াতে ঐ রজমকেই গোপন করার উল্লেখ রয়েছে। (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে রজম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পণ্ডিত কে?' তারা ইঙ্গিতে ইবনে সুরিয়াকে দেখালো। তখন তিনি তাকে সেই আল্লাহর কসম দিলেন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের উপর তুর পাহাড় ও অঙ্গীকার তুলে ধরেছিলেন। তখন সে বললোঃ “যখন আমাদের মধ্যে ব্যভিচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তখন ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে একশ চাবুক মারার ও মাথা মুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর রজমের বিধান জারী করেন। সে সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন)এরপর মহান আল্লাহ কুরআন কারীম সম্পর্কে বলেন যে, তিনিই তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর উপর তার এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা সত্য সন্ধানীদেরকে শান্তির পথ দেখিয়ে দেয়, লোকদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসে এবং তাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে। এ কিতাবের কারণে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ লাভ করা এবং তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়া খুবই সহজ। এটা ভ্রান্তিকে বিদূরিতকারী এবং হিদায়াতকে প্রকাশকারী।

আল-মায়িদা 5:16

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হিদায়াত ও দ্বীনে হকসহ সমস্ত মাখলুকের নিকট পাঠিয়েছেন। মুজিযা ও উজ্জ্বল প্রমাণাদি তাঁকে দান করেছেন। যে কথাগুলো ইয়াহূদ ও নাসারাগণ বদলিয়ে দিয়েছিল, ভুল ব্যাখ্যা করে অন্য অর্থ বানিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহর সত্তার উপর অপবাদ দিয়েছিল, কিতাবুল্লাহর যে অংশটি তাদের জীবনের প্রতিকুল ছিল তা তারা গোপন করে দিয়েছিল। ঐ সব কিছুই এ রাসূল (সঃ) প্রকাশ করে দেন। তবে যেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন। নেই সেগুলো তিনি বর্ণনা করেন না। মুসতাদরিকে হাকিম গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি রজম বা ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করার মাসআলাকে অস্বীকার করলো সে অজ্ঞতা বশতঃ কুরআন কারীমকে অস্বীকার করলো। কেননা,এ আয়াতে ঐ রজমকেই গোপন করার উল্লেখ রয়েছে। (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে রজম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পণ্ডিত কে?' তারা ইঙ্গিতে ইবনে সুরিয়াকে দেখালো। তখন তিনি তাকে সেই আল্লাহর কসম দিলেন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের উপর তুর পাহাড় ও অঙ্গীকার তুলে ধরেছিলেন। তখন সে বললোঃ “যখন আমাদের মধ্যে ব্যভিচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তখন ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে একশ চাবুক মারার ও মাথা মুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর রজমের বিধান জারী করেন। সে সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন)এরপর মহান আল্লাহ কুরআন কারীম সম্পর্কে বলেন যে, তিনিই তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর উপর তার এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা সত্য সন্ধানীদেরকে শান্তির পথ দেখিয়ে দেয়, লোকদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসে এবং তাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে। এ কিতাবের কারণে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ লাভ করা এবং তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়া খুবই সহজ। এটা ভ্রান্তিকে বিদূরিতকারী এবং হিদায়াতকে প্রকাশকারী।

আল-মায়িদা 5:17

১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খ্রীষ্টানদের কুফরের কথা বর্ণনা করছেন যে, তারা আল্লাহরই সৃষ্টকে তাঁরই মর্যাদা প্রদান করছে। অথচ আল্লাহ শিরক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্ত বস্তুই তার অনুগত এবং প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। সবকিছুরই উপরই তার আধিপত্য রয়েছে। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে থেকে বিরত রাখতে পারে। যদি তিনি মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত সৃষ্টজীবকে ধ্বংস করে দেয়ার ইচ্ছা করেন। তবুও কারও শক্তি নেই যে, তার সামনে এগিয়ে আসে এবং তাকে বাধা প্রদান করে। সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্ট বস্তুর উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা তিনিই। সকলের মালিক ও অধিকর্তা তিনিই। তিনি যা চান তা-ই করেন। কোন জিনিসই তার ক্ষমতার বাইরে নেই। কেউই তার কাজের কোন হিসাব নিতে পারে না। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্য খুবই প্রশস্ত। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব খুবই উচ্চ। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, তিনি মহাকারিগর। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ভাঙ্গেন ও গড়েন। তার শক্তির কোন সীমা নেই। খ্রীষ্টানদের দাবী খণ্ডনের পর এখন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয়েরই দাবীকে খণ্ডন করছেন। তারা আল্লাহর উপর একটা মিথ্যা আরোপ এভাবে করেছে যে, তারা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা) ও প্রিয় পাত্র। তারা নবীদের পুত্র এবং আল্লাহর আদরের সন্তান। তারা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করে বলে যে, আল্লাহ তাআলা ইসরাঈল (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ অতঃপর তারা এর ভুল ব্যাখ্যা করে ভাবার্থ বদলিয়ে দিয়ে বলে তিনি যখন আল্লাহর পুত্র হলেন তখন আমরাও তাঁর পুত্র ও প্রিয়পাত্র হলাম। অথচ তাদেরই মধ্যে যারা ছিল জ্ঞানী ও বিবেচক তারাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিল যে, এ শব্দগুলো দ্বারা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর শুধু মর্যাদা ও সম্মানই প্রমাণিত হচ্ছে মাত্র। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর সাথে আত্মীয়তার বা রক্তের সম্পর্ক কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ অর্থেরই আয়াত খ্রীষ্টানেরা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করেছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) -এর দ্বারাও প্রকৃত পিতাকে বুঝায় না, বরং তাদের পরিভাষায় আল্লাহর জন্যেও এরূপ শব্দ ব্যবহৃত হতো। অতএব, এর ভাবার্থ হবে-আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর নিকট যাচ্ছি। আর এর দ্বারা এটাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে এ আয়াতে যে সম্পর্ক হযরত ঈসা (আঃ)-এর রয়েছে ঐ সম্পর্কই তাঁর সমস্ত উম্মতের দিকেও রয়েছে। কিন্তু এ লোকগুলো নিজেদের ভুল আকীদায় আল্লাহর সাথে হযরত ঈসা (আঃ)-এর যে সম্পর্ক স্থাপন করতে, নিজেদের ব্যাপারে তা মনে করতো না। সুতরাং এ শব্দ শুধুমাত্র সম্মান ও মর্যাদার জন্যেই ছিল, অন্য কিছুর জন্যে ছিল না।আল্লাহ পাক তাদেরকে উত্তর দিচ্ছেন-যদি এটা ঠিকই হয় তবে তোমাদের কুফর ও মিথ্যা আরোপের কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন কেন? কোন একজন সুফী একজন ফিকাহশাস্ত্রবিদকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কুরআন মাজীদের মধ্যে কোন জায়গায় এটাও কি আছে যে, বন্ধু স্বীয় বন্ধুকে শাস্তি দেন না? তিনি এর কোন উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। সুফী তখন এ আয়াতটিই পাঠ করলেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম। আর এরই দলীল হচ্ছে মুসনাদের এ হাদীসটি যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। একটি ছোট ছেলে পথে খেলা করছিল। তার মা যখন দেখলো যে, একটি বিরাট দল ঐ পথ দিয়েই আসছেন তখন সে ভয় পেয়ে গেল যে, না জানি তারা তার ছেলেকে পদতলে পিষ্ট করে ফেলবেন। তাই সে “আমার ছেলে আমার ছেলে” বলতে বলতে দৌড়িয়ে আসলো এবং অতি তাড়াতাড়ি তার ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিলো। এই দেখে সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মহিলাটি তো তার প্রিয় ছেলেটিকে কখনও আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে না!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ঠিক কথাই বটে। আল্লাহ তা'আলাও কখনও তার প্রিয় বান্দাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবেন না।” ইয়াহুদীদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ অন্যান্য মানুষের মত তোমারও মানুষই বটে। অন্যান্য লোকদের উপর তোমাদের কোনই প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর মহা বিচারক এবং তিনিই হচ্ছেন তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালাকারী; তিনি যাকে ইচ্ছা মার্জনা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। তার কোন হুকুমকেই কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। তিনি সত্বরই বান্দাদের কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণকারী। যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের সমুদয় মখলুক তারই অধিকারে রয়েছে। সবকিছুরই প্রভু তিনিই। সমস্তই তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনিই বান্দাদের ফায়সালা করবেন। তিনি অত্যাচারী নন, তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি পুণ্যবানদেরকে শান্তি এবং অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। নোমান ইবনে আ’সা, বাহর ইবনে উমার, শাস ইবনে আদী প্রমুখ ইয়াহুদীদের বড় বড় আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে অনেক বুঝালেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বললো, “জনাব! আপনি আমাদেরকে কিসের ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র।" খ্রীষ্টানেরাও এ কথা বলতো, তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তারা পরস্পরের মধ্যে বানিয়ে সানিয়ে এ কথাটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর নিকট প্রত্যাদেশ করেছিলেন-তোমার প্রথম পুত্রটি আমার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তার সন্তানরা চল্লিশদিন পর্যন্ত জাহান্নামে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আগুন তাদেরকে পবিত্র করে দেবে এবং তাদের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবে। তারপর একজন ফেরেশতা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “ইসরাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারই খত্না করা আছে সে যেন বেরিয়ে আসে।” কুরআন কারীমে তাদের যে উক্তিটি বর্ণিত আছে তার অর্থ এটাই যে, তারা বলেঃ “আমাদেরকে গণনাকৃত কয়েকটি দিন মাত্র জাহান্নামে থাকতে হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-মায়িদা 5:18

১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খ্রীষ্টানদের কুফরের কথা বর্ণনা করছেন যে, তারা আল্লাহরই সৃষ্টকে তাঁরই মর্যাদা প্রদান করছে। অথচ আল্লাহ শিরক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্ত বস্তুই তার অনুগত এবং প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। সবকিছুরই উপরই তার আধিপত্য রয়েছে। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে থেকে বিরত রাখতে পারে। যদি তিনি মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত সৃষ্টজীবকে ধ্বংস করে দেয়ার ইচ্ছা করেন। তবুও কারও শক্তি নেই যে, তার সামনে এগিয়ে আসে এবং তাকে বাধা প্রদান করে। সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্ট বস্তুর উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা তিনিই। সকলের মালিক ও অধিকর্তা তিনিই। তিনি যা চান তা-ই করেন। কোন জিনিসই তার ক্ষমতার বাইরে নেই। কেউই তার কাজের কোন হিসাব নিতে পারে না। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্য খুবই প্রশস্ত। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব খুবই উচ্চ। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, তিনি মহাকারিগর। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ভাঙ্গেন ও গড়েন। তার শক্তির কোন সীমা নেই। খ্রীষ্টানদের দাবী খণ্ডনের পর এখন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয়েরই দাবীকে খণ্ডন করছেন। তারা আল্লাহর উপর একটা মিথ্যা আরোপ এভাবে করেছে যে, তারা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা) ও প্রিয় পাত্র। তারা নবীদের পুত্র এবং আল্লাহর আদরের সন্তান। তারা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করে বলে যে, আল্লাহ তাআলা ইসরাঈল (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ অতঃপর তারা এর ভুল ব্যাখ্যা করে ভাবার্থ বদলিয়ে দিয়ে বলে তিনি যখন আল্লাহর পুত্র হলেন তখন আমরাও তাঁর পুত্র ও প্রিয়পাত্র হলাম। অথচ তাদেরই মধ্যে যারা ছিল জ্ঞানী ও বিবেচক তারাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিল যে, এ শব্দগুলো দ্বারা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর শুধু মর্যাদা ও সম্মানই প্রমাণিত হচ্ছে মাত্র। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর সাথে আত্মীয়তার বা রক্তের সম্পর্ক কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ অর্থেরই আয়াত খ্রীষ্টানেরা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করেছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) -এর দ্বারাও প্রকৃত পিতাকে বুঝায় না, বরং তাদের পরিভাষায় আল্লাহর জন্যেও এরূপ শব্দ ব্যবহৃত হতো। অতএব, এর ভাবার্থ হবে-আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর নিকট যাচ্ছি। আর এর দ্বারা এটাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে এ আয়াতে যে সম্পর্ক হযরত ঈসা (আঃ)-এর রয়েছে ঐ সম্পর্কই তাঁর সমস্ত উম্মতের দিকেও রয়েছে। কিন্তু এ লোকগুলো নিজেদের ভুল আকীদায় আল্লাহর সাথে হযরত ঈসা (আঃ)-এর যে সম্পর্ক স্থাপন করতে, নিজেদের ব্যাপারে তা মনে করতো না। সুতরাং এ শব্দ শুধুমাত্র সম্মান ও মর্যাদার জন্যেই ছিল, অন্য কিছুর জন্যে ছিল না।আল্লাহ পাক তাদেরকে উত্তর দিচ্ছেন-যদি এটা ঠিকই হয় তবে তোমাদের কুফর ও মিথ্যা আরোপের কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন কেন? কোন একজন সুফী একজন ফিকাহশাস্ত্রবিদকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কুরআন মাজীদের মধ্যে কোন জায়গায় এটাও কি আছে যে, বন্ধু স্বীয় বন্ধুকে শাস্তি দেন না? তিনি এর কোন উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। সুফী তখন এ আয়াতটিই পাঠ করলেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম। আর এরই দলীল হচ্ছে মুসনাদের এ হাদীসটি যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। একটি ছোট ছেলে পথে খেলা করছিল। তার মা যখন দেখলো যে, একটি বিরাট দল ঐ পথ দিয়েই আসছেন তখন সে ভয় পেয়ে গেল যে, না জানি তারা তার ছেলেকে পদতলে পিষ্ট করে ফেলবেন। তাই সে “আমার ছেলে আমার ছেলে” বলতে বলতে দৌড়িয়ে আসলো এবং অতি তাড়াতাড়ি তার ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিলো। এই দেখে সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মহিলাটি তো তার প্রিয় ছেলেটিকে কখনও আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে না!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ঠিক কথাই বটে। আল্লাহ তা'আলাও কখনও তার প্রিয় বান্দাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবেন না।” ইয়াহুদীদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ অন্যান্য মানুষের মত তোমারও মানুষই বটে। অন্যান্য লোকদের উপর তোমাদের কোনই প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর মহা বিচারক এবং তিনিই হচ্ছেন তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালাকারী; তিনি যাকে ইচ্ছা মার্জনা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। তার কোন হুকুমকেই কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। তিনি সত্বরই বান্দাদের কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণকারী। যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের সমুদয় মখলুক তারই অধিকারে রয়েছে। সবকিছুরই প্রভু তিনিই। সমস্তই তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনিই বান্দাদের ফায়সালা করবেন। তিনি অত্যাচারী নন, তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি পুণ্যবানদেরকে শান্তি এবং অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। নোমান ইবনে আ’সা, বাহর ইবনে উমার, শাস ইবনে আদী প্রমুখ ইয়াহুদীদের বড় বড় আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে অনেক বুঝালেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বললো, “জনাব! আপনি আমাদেরকে কিসের ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র।" খ্রীষ্টানেরাও এ কথা বলতো, তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তারা পরস্পরের মধ্যে বানিয়ে সানিয়ে এ কথাটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর নিকট প্রত্যাদেশ করেছিলেন-তোমার প্রথম পুত্রটি আমার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তার সন্তানরা চল্লিশদিন পর্যন্ত জাহান্নামে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আগুন তাদেরকে পবিত্র করে দেবে এবং তাদের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবে। তারপর একজন ফেরেশতা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “ইসরাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারই খত্না করা আছে সে যেন বেরিয়ে আসে।” কুরআন কারীমে তাদের যে উক্তিটি বর্ণিত আছে তার অর্থ এটাই যে, তারা বলেঃ “আমাদেরকে গণনাকৃত কয়েকটি দিন মাত্র জাহান্নামে থাকতে হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-মায়িদা 5:19

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ আমি তোমাদের সকলের নিকট স্বীয় রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে শেষ নবী, যার পরে আর কোন নবী বা রাসূল আসবে না। দেখো, হয়রত ঈসা (আঃ) থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন রাসূলের আগমন ঘটেনি। এ সুদীর্ঘ সময়ের পরে এ নবী আগমন করেছে। কেউ কেউ বলেন যে, এ দীর্ঘ সময় ছিল ছ’শ বছর। কারও কারও মতে ওটা ছিল সাড়ে পাঁচশ বছর। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তা ছিল পাঁচশ চল্লিশ বছর। অন্য কারও মতে তা ছিল চারশ বছর এবং আরও ত্রিশ বছরের কিছু বেশী। ইবনে আসাকির (রঃ) শাবী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া এবং আমাদের নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরত করার মাঝে ৯৩৩ বছরের ব্যবধান ছিল। কিন্তু সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথমটিই অর্থাৎ ছ'শ ত্রিশ বছর। এ দু'টি উক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এভাবে করা যেতে পারে যে, প্রথম উক্তি সূর্য মাস হিসেবে এবং এবং দ্বিতীয় উক্তি চান্দ্র মাস হিসেবে। এ গণনায় প্রতি তিনশ বছরে আট বছরের ব্যবধান হয়ে যাবে। এ জন্যেই আহলে কাহাফের ঘটনায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাদের গুহায় তিনশ বছর অবস্থান করে এবং আরও নয় বছর বাড়িয়ে দেয়।” (১৮:২৫) সুতরাং সূর্য হিসেবে তাদের গর্তে অবস্থানের সময়কাল আহলে কিতাবের যা জানা ছিল তা ছিল তিনশ বছর। তার সাথে ন’বছর বাড়িয়ে দিয়ে চন্দ্র হিসেবে পূর্ণ হয়ে গেল। এ আয়াতের দ্বারা জানা গেল যে, বানী ইসরাঈলের শেষ নবী হযরত ঈসা (আঃ) হতে নিয়ে সাধারণভাবে বানী আদমের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) পর্যন্ত এই মধ্যবর্তী সময়ে কোন নবী আসেননি। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অন্যান্য লোকদের তুলনায় ঈসা (আঃ)-এর সাথে আমার সম্পর্ক বেশী রয়েছে। কেননা, আমার ও তার মাঝে কোন নবী নেই।” ঐ হাদীস দ্বারা এসব লোকের ধারণাকে খণ্ডন করা হয়েছে। যারা মনে করে যে, এ দুই মর্যাদা সম্পন্ন নবীর মাঝে আরও একজন নবী ছিলেন। যার নাম খালিদ ইবনে সিনান। যেমন কাযাঈ প্রমুখ লোক বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, শেষ নবী আল্লাহর হাবীব হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) দুনিয়ার বুকে ঐ সময় আগমন করেছেন যে সময় রাসূলগণের শিক্ষা লোপ পেয়েছিল, তাঁদের পথ নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছিল, দুনিয়া তাওহীদ বা একত্ববাদকে ভুলে গিয়েছিল, স্থানে স্থানে মাখলুকের পূজা শুরু হয়েছিল, সূর্য, চন্দ্র ও মূর্তিপূজা চলছিল, আল্লাহর দ্বীন বদলে গিয়েছিল, দ্বীনের আলোর উপর কুফরীর অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিল, দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতা ছড়িয়ে পড়েছিল, আদল ও ইনসাফ এমনকি মনুষ্যত্ব পর্যন্ত দুনিয়া হতে মুছে গিয়েছিল, মূর্খতা ও অজ্ঞতার শাসন চালু হয়েছিল এবং মুষ্টিমেয় কতক লোক ছাড়া ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহর নাম উচ্চারণকারী কেউ ছিল না। অতএব জানা গেল যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত বেশী ছিল এবং তিনি যে প্রেরিতত্বের কাজ আঞ্জাম দিয়েছিলেন তা কোন সাধারণ প্রেরিতত্ব ছিল না।মুসনাদে আহমাদে হযরত আইয়ায ইবনে হাম্মাদুল মাজেশেঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) একদা খুবায় বলেনঃ আমার প্রভু আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা যা জান না তা আমি তোমাদেরকে শিক্ষা দেই। আল্লাহ আমাকে আজই জানিয়ে দিয়েছেন-আমি আমার বান্দাদেরকে যা কিছু দান। করেছি তার সবই তাদের জন্যে হালাল করেছি। আমি আমার সকল বান্দাকেই একত্ববাদীরূপে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান তাদের কাছে এসে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে এবং আমার হালালকৃত বস্তু তাদের উপর হারাম করে দেয়। আর সে তাদেরকে বলে যে, তারা যেন কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আমার সাথে অংশীদার স্থাপন করে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীবাসীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন এবং সমস্ত আরব ও আজমকে অপছন্দ করেছেন, শুধু বানী ইসরাঈদের কতক লোককে নয় যারা তাওহীদ বা একত্ববাদের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তারপর তিনি আমাকে বলেছেনঃ আমি তোমাকে এজন্যেই নবী করে প্রেরণ করেছি যে, তোমাকে পরীক্ষা করবো এবং তোমারই কারণে অন্যদেরকেও পরীক্ষা করে নেবো। আমি তোমার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাকে পানিতে ধুয়ে ফেলতে পারবে না, যাকে তুমি ঘুমন্ত ও জাগ্রত সর্বাবস্থায় পাঠ করে থাক। অতঃপর আমার প্রভু আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন কুরাইশদের মধ্যে আল্লাহর পয়গাম পৌছিয়ে দেই। আমি তখন বললাম-হে আল্লাহ! এরা তো আমার মাথায় আঘাত করে রুটির মত করে দেবে। তখন আমার প্রভু আমাকে বলেনঃ তুমি তাদেরকে বের করে দাও যেমন তারা তোমাকে বের করে দিয়েছে। তুমি তাদের সাথে যুদ্ধ কর, তোমাকে সাহায্য করা হবে। তুমি তাদের উপর খরচ কর, তোমার উপরও খরচ করা হবে। তুমি তাদের মোকাবিলায় সেনাবাহিনী প্রেরণ কর, আমি তার উপর আরও পাঁচগুণ সৈন্য প্রেরণ করবো। তুমি অনুগতদেরকে নিয়ে অবাধ্যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর।জান্নাতী লোক তিন প্রকারের। (১) ন্যায়পরায়ণ, সৎ ব্যবহাকারী ও দান খয়রাতকারী বাদশাহ। (২) দয়ালু ব্যক্তি, যিনি প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলমানের সাথে বিনয় ও নম্র ব্যবহার করে থাকেন। (৩) ঐ ব্যক্তি, যিনি দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও হারাম থেকে বেঁচে থাকেন, অথচ তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে রয়েছে। আর জাহান্নামী লোক পাঁচ প্রকারের। (১) ঐ দুর্বল ও নিম্ন শ্রেণীর লোক, যার কোন ধর্ম নেই। সে অধীনস্থ লোক এবং তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও মালধন নেই। (২) ঐ খিয়ানতকারী ব্যক্তি, যার দাঁত ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসের উপরও লেগে থাকে এবং সে অতি তুচ্ছ ও নগণ্য জিনিসের প্রতি খিয়ানত করতেও ছাড়ে না। (৩) এসব লোক, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় জনগণকে তাদের পরিবার ও মালধনে ধোকা দিয়ে থাকে। (৪) কৃপণ অথবা (বর্ণনাকরীর সন্দেহ) মিথ্যাবাদী। (৫) অকথ্য ভাষা প্রয়োগকারী। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। এটা বলার উদ্দেশ্য এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রেরণের সময় ভূ-পৃষ্ঠে কোন সত্য ধর্ম বিদ্যমান ছিল না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার ও ভ্রান্ত পথ থেকে বের করে আলো ও হিদায়াতের পথে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে সরল সঠিক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেন। তাদেরকে তিনি উজ্জ্বল ও স্পষ্ট শরীয়ত দান করেন, যাতে তাদের ওযর পেশ করার কোন অবকাশ না থাকে এবং তারা একথা বলার সুযোগ না পায় যে, তাদের কাছে কোন নবী-রাসূল আগমন করেননি এবং তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেননি ও জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শন করেননি। সুতরাং ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ স্বীয় মনোনীত নবী (সঃ)-কে সারা বিশ্বের হিদায়াতের জন্যে প্রেরণ করেন। আমাদের মহান প্রভু তাঁর বাধ্য ও অনুগত বান্দাদেরকে জান্নাতী শান্তি প্রদানে এবং অবাধ্য বান্দাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি প্রদানে পূর্ণভাবে সক্ষম।

আল-মায়িদা 5:20

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:21

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।