Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-মায়িদা 5:22 – আল-মায়িদা 5:39

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-মায়িদা 5:22
  2. আল-মায়িদা 5:23
  3. আল-মায়িদা 5:24
  4. আল-মায়িদা 5:25
  5. আল-মায়িদা 5:26
  6. আল-মায়িদা 5:27
  7. আল-মায়িদা 5:28
  8. আল-মায়িদা 5:29
  9. আল-মায়িদা 5:30
  10. আল-মায়িদা 5:31
  11. আল-মায়িদা 5:32
  12. আল-মায়িদা 5:33
  13. আল-মায়িদা 5:34
  14. আল-মায়িদা 5:35
  15. আল-মায়িদা 5:36
  16. আল-মায়িদা 5:37
  17. আল-মায়িদা 5:38
  18. আল-মায়িদা 5:39

আল-মায়িদা 5:22

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:23

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:24

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:25

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:26

২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এরই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের একথা স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একের পর এক নবী পাঠাতে রয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পর হতে আজ পর্যন্ত তাঁরই বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত রয়েছে। এসব নবী তোমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে রয়েছেন।এ ক্রমপরম্পরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর শেষ হয়েছে। অতঃপর নবী ও রাসূলদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে পরিপূর্ণ নবুওয়াত দান করা হয়। তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিই ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। হে আমার কওম! তোমরা আরও স্মরণ কর যে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়ে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বাদশাহ বানিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে খাদেম, স্ত্রী এবং ঘরবাড়ী দান করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন লোকের স্ত্রী, খাদেম ও ঘরবাড়ী থাকলেই তাকে বাদশাহ বলা হতো। ইবনে জারীর (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তাকে একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি কি মুহাজির দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত নই।” তিনি (আবদুল্লাহ) উত্তরে বলেনঃ “তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?" তিনি বলেনঃ ‘হ্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার কি ঘরবাড়ী রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা”; তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তাহলে তো তুমি ধনীদেরই অন্তর্ভুক্ত।” লোকটি তখন বললেনঃ “আমার খাদেমও রয়েছে।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তাহলে বাদশাহদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, যার সওয়ারী, খাদেম ও ঘরবাড়ী রয়েছে সেই বাদশাহ। কাতাদার (রঃ) উক্তি এই যে, প্রথম প্রথম বানী ইসরাঈলের মধ্যেই খাদেমদের প্রচলন হয়েছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যার কাছে খাদেম, সওয়ারী ও স্ত্রী থাকতো তাকেই বাদশাহ বলা হতো। আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, যার ঘরবাড়ী ও খাদেম রয়েছে সে বাদশাহ। এ হাদীসটি মুরসাল’ ও ‘গারীব। একটি হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করলো যে, তার শরীর সুস্থ, তার প্রাণে শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে এবং সারাদিনের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ খাবারও তার কাছে রয়েছে, সে যেন সারা দুনিয়াকেই পেয়ে বসেছে। সেই সময় যে ইউনানী, কিবতী ইত্যাদি ছিল তাদের চেয়ে এদেরকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর আয়াতে রয়েছে- আমি বানী ইসরাঈলকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলাম। যখন বানী ইসরাঈল মুশরিকদের দেখাদেখি হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ বানাতে বললো তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে উত্তরে বলেছিলেনঃ “তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” এর ভাবার্থ সব জায়গায় একই যে, আল্লাহ পাক বানী ইসরাঈলকে সেই যুগের সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছিলেন। কেননা, এটাতো প্রমাণিত বিষয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের অপেক্ষা সবদিক দিয়েই উত্তম। কেননা, স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষণা করা হচ্ছে- (আরবী) (৩:১১০) এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- (আরবী) (২:১২৪) একথাও বলা হয়েছে যে, এ ফযীলতে উম্মতে মুহাম্মাদীকেও বানী ইসরাঈলদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মান’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাদ্য অবতরণ করা, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করা ইত্যাদি, যা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের উক্তি ওটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-- তাদেরকে সেই সময়ের লোকদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তাদের দাদা হযরত ইয়াকূব (আঃ)- এর যুগে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রকৃতপক্ষে তাদেরই দখলে ছিল এবং যখন তারা সপরিবারে মিসরে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট চলে গিয়েছিল তখন তথায় আমালেকা জাতি তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের হাত পা ছিল অত্যন্ত শক্ত। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরায় তোমাদের দখলে এনে দেবেন। কিন্তু বানী ইসরাঈল ভীরুতা প্রদর্শন করতঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা অমান্য করলো। এরই শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহ ময়দানে উদ্বিগ্ন অবস্থায় অবস্থান করতে হলো (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তূর পর্বত ও ওর চার পাশের ভূমিকে বুঝানো হয়েছে এবং ওটাকে ‘ঈলিয়া’ বলা হয়। একটি বর্ণনায় (আরবী) শব্দের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, (আরবী) কে জয় করা উদ্দেশ্যও ছিল না এবং ওটা তাদের পথের উপরেও ছিল না। কারণ, ফিরাউনের ধ্বংস সাধনের পর তারা মিসর শহর থেকেই আসছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে ভ্রমণ করছিল। এটা হতে পারে যে, ওটা ঐ বিখ্যাত শহরই হবে যা তূর পর্বতের দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।‘যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে লিখে দিয়েছেন’-এর ভাবার্থ এই যে, বানী ইসরাঈলকে বলা হচ্ছে- তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ পুণ্যভূমি তিনি তার পরবর্তী মুমিন সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করবেন। সুতরাং হে বানী ইসরাঈল! তোমরা যখন ওটাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছ তখন তোমরা ধর্মত্যাগী হয়ে যেয়ো না। অর্থাৎ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে পড়ো না, নতুবা তোমরা ভীষণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা তখন উত্তরে হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আমাদেরকে যে শহরে যেতে বলেছেন এবং যে শহরবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে, তারা যে খুব শক্তিশালী বীর পুরুষ তা আমাদের বেশ ভালভাবেই জানা আছে। সুতরাং আমরা তাদের সাথে মোকাবিলা করতে পারবো না। আর যে পর্যন্ত তারা ঐ শহরে বিদ্যমান থাকবে। সে পর্যন্ত আমরা ওর মধ্যে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম থাকবো। তবে যদি তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে আমরা তথায় প্রবেশ করবো। এটা ছাড়া আপনার নির্দেশ পালন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)‘আরীহা'র নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি বারোজন গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। বানী ইসরাঈলের প্রত্যেক গোত্র থেকে তিনি একজন করে গুপ্তচর গ্রহণ করলেন। অতঃপর সঠিক সংবাদ আনয়নের জন্যে তাদেরকে আরীহায় প্রেরণ করলেন। এ লোকগুলো তথায় গিয়ে তাদের মোটা দেহ ও শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তারা সবাই একটা বাগানে অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক ফল পাড়ার জন্যে তথায় আগমন করলো। সে ফল পেড়ে নিয়ে ফলের সাথে সাথে ঐগুলোকেও গাঁঠরির মধ্যে ভরে নিলো এবং বাদশাহর সামনে হাযির হয়ে ফলের গাঠরি খুলে ফেললো। গাঠরির মধ্যে এরা সবাই ছিল। বাদশাহ তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমাদের শক্তি অনুমান করতে পেরেছো। আমি তোমাদেরকে হত্যা করছি না। যাও, তোমাদের লোকদের কাছে ফিরে আমাদের সম্পর্কে অবহিত কর।” সুতরাং তারা ফিরে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো, যার ফলে বানী ইসরাঈল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু এ হাদীসটির ইসনাদ ঠিক নয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ঐ বারোজন লোককে ধরে ফেললো এবং স্বীয় চাদরের গাঠরিতে তাদেরকে বেঁধে ফেললো এবং শহরে নিয়ে গিয়ে জনগণের সামনে তাদেরকে নিক্ষেপ করলো। তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের লোক। আপনাদের খবরাখবর নেয়ার জন্যে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তারা এমন একটি আঙ্গুর তাদেরকে প্রদান করলো যা একটি লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আর তারা তাদেরকে বললোঃ “যাও, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে বলে দাও যে, এটা হচ্ছে তাদের ফল।” তারা ফিরে গিয়ে স্বীয় কওমের নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশ করার ও শহরবাসীদের সাথে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন। তারা তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলো-আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন, অতঃপর যুদ্ধ করুন, আমরা এখান হতে নড়ছি না। হযরত আনাস (রাঃ) একটি বাঁশ মেপে নেন যার দৈর্ঘ্য ছিল পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন হাত। অতঃপর তিনি ওটা গেড়ে দিয়ে বলেনঃ “ঐ আমালীকদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা ছিল।” মুফাসসিরগণ অনেক ইসরাঈলী রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলোর এ পরিমাণ শক্তি ছিল, তারা এ পরিমাণ মোটা ছিল এবং এতোটা লম্বা ছিল। আওজ ইবনে আনাক ইবনে হযরত আদম (আঃ) তাদেরই মধ্যে একজন ছিল যার দেহ ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ গজ লম্বা এবং দেহের প্রস্থ ছিল তিন গজ। কিন্তু এসব একেবারেই বাজে কথা এবং এ কথা উল্লেখ করাই লজ্জাজনক ব্যাপার। এগুলো সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর আজ পর্যন্ত মখলুকের দেহের দৈর্ঘ হ্রাস পেতে আছে। এই ইসরাঈলী রিওয়ায়াতগুলোতে এও রয়েছে যে, আওজ ইবনে আনাক কাফির ও জারজ ছিল। সে হযরত নূহ (আঃ)-এর তুফানের সময় বিদ্যামান ছিল। সে নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠেনি। তথাপি পানি তার জানু পর্যন্ত পৌছেনি। এটাও একেবারে ভিত্তিহীন, বাজে ও মিথ্যা কথা। কুরআন কারীমের এটা সম্পূর্ণ উলটো। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনার উল্লেখ আছে। তিনি প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! ভূ-পৃষ্ঠে একজন কাফিরও যেন রক্ষা না পায়।” প্রার্থনা কবুলও হয়েছিল। আর হয়েছিলও তা-ই। কুরআনে কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “আমি নূহ (আঃ)-কে এবং তার নৌকার আরোহীদেরকে রক্ষা করেছিলাম এবং সমস্ত কাফিরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” স্বয়ং কুরআনে উল্লিখিত রয়েছে- “যাদের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে তারা ছাড়া আজকের দিন কেউই রক্ষা পাবে না।” বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, স্বয়ং নূহ (আঃ)-এর ছেলেও ঈমানদার ছিল না বলে রক্ষা পায়নি, অথচ কাফির ও জারজ সন্তান আওজ ইবনে আনাক বেঁচে গেল। এটা আকল ও নাকল উভয়েরই বিপরীত। বরং আওজ ইবনে আনাক বলে যে কোন লোক ছিল এটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। বানী ইসরাঈল যখন তাদের নবীকে মানলো না বরং বেআদবী করলো, তখন যে দু’ব্যক্তির উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল তারা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল যে, বানী ইসরাঈলের শয়তানীর কারণে না জানি আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। এক কিরআতে (আরবী) শব্দের পরিবর্তে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, কওমের মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তির ইজ্জত ও সম্মান ছিল। একজনের নাম ছিল হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং অপরজনের নাম ছিল হযরত কালিব ইবনে ইউফনা। তারা দু'জন তাদেরকে বললেনঃ “যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, তাঁর রাসূলের অনুগত হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ঐ শক্রদের উপর জয়যুক্ত করবেন এবং স্বয়ং তিনি তোমাদেরকে শক্তি ও সাহায্য দান করবেন। তোমরা এই শহরে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করবে। তোমরা দরজা পর্যন্ত তো চল এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, বিজয় লাভ তোমাদেরই হবে।” ঐ কাপুরুষের দল তখন তাদের প্রথম উত্তরকে আরও মজবুত করে বললোঃ “এই প্রতাপশালী কওমের বিদ্যমানতায় আমরা একটি কদমও বাড়াতে পারবো না।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) তাদের এই অবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বিনয়ও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই মানলো না। এই অবস্থা দেখে হযরত ইউশা এবং হযরত কালিব নিজেদের কাপড় ফেড়ে ফেললেন এবং তাদেরকে অনেক ভৎসনা করলেন। কিন্তু সেই হতভাগার দল অবাধ্যতার উপর অটল থাকলো। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে, তারা ঐ মহান ব্যক্তিদ্বয়কে পাথর মেরে শহীদ করে দিয়েছিল। হঠকারিতার তুফান শুরু হয়ে গেল এবং তারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে অবিচল থাকলো।হযরত মূসা (আঃ)-এর কওম বানী ইসরাঈলের এই অবস্থাকে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। মক্কার ৯০০ বা ১০০০ কাফির যখন তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমন করলো, তখন সেই কাফেলা তো অন্য পথ ধরে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু তাদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গমনকারী কাফিররা নিজেদের শক্তির দাপটের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতি সাধন ব্যতিরেকে মক্কা ফিরে যাওয়া অপমানজনক মনে করে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পদতলে পিষ্ট করার ইচ্ছায় মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই অবস্থা অবগত হলেন তখন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে নিজেদের জান, মাল এবং স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে রেখে দিয়ে বললেনঃ “আপনিই এগুলোর মালিক। আমরা সংখ্যাও দেখতে চাই না, বিজয়ও দেখতে চাই না, বরং আমরা চাই শুধু আপনার নির্দেশের প্রতি নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে।” সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর মুহাজির সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজন এ প্রকারের ভাষণ দিলেন। কিন্তু এর পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল আনসারদের আন্তরিক বাসনা অবগত হওয়া। কেননা, ওটা স্থান ছিল তাদেরই স্থান এবং তাঁরা ছিলেন মুহাজিরদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। তখন হযরত সা'দ ইবনে 'মুআয (রাঃ) নামক আনসারী দাড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মনে হয় আপনি আমাদের (আনসারদের) মনের ইচ্ছা জানতে চাচ্ছেন। তাহলে শুনুন! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে সমুদ্রের তীরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাহলে আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি দেখবেন যে, আমাদের মধ্যে একজনও এমন থাকবে না যে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আগ্রহের সাথে আমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলার জন্যে নিয়ে চলুন, আমরা যে যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে স্থির পদে টিকে থাকি তা আপনি দেখতে পাবেন। আপনি জেনে নেবেন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে সত্য বলে জানি। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে পড়ন। আমাদের বীরত্ব ও ধৈর্য দেখে ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে।”এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সঃ) খুশী হয়ে যান এবং আনসারদের এই কথা তার কাছে খুবই ভাল মনে হয় (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। এক রিওয়ায়াতে আছে যে, বদরের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রাঃ) কিছু বক্তব্য পেশ করেন। তার পর আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের নিকট থেকে কিছু শুনতে চান তবে শুনুন! আমরা বানী ইসরাঈলদের মত নই যে, বলবো- আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি। বরং আমাদের উত্তর হচ্ছে- আপনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে জিহাদের জন্যে চলুন। আমরা আমাদের জান ও মালসহ আপনার সাথে রয়েছি।” হযরত মিকদাদ আনসারীও (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই কথায় খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যুদ্ধের সময় আপনি দেখে নেবেন যে, আপনার সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে আমরাই রয়েছি।” (হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন) “যদি আমি এমন সুযোগ পেতাম যাতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ রকম সন্তুষ্ট করতে পারতাম (তবে কতই না ভাল হতো)।”একটি বর্ণনায় হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এই উক্তিটি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনে বর্ণিত আছে, যখন মুশরিকরা তাঁকে উমরার জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে বাধা প্রদান করেছিল এবং কুরবানীর জন্তুও যবেহ স্থলে পৌছতে পারেনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি তো আমার কুরবানীর জন্তু নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছে কুরবানী করতে চাই।” তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) বলেনঃ আমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর আসহাবের মত নই। এটা ওদের জন্যেই সম্ভব হয়েছে যে, ওরা ওদের নবীকে বলেছিল- “আপনি এবং আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে রয়েছি।” বরং আমরা বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি চলুন, আপনার প্রতি আল্লাহর সাহায্য থাকবে এবং আমরা সবাই আপনার সাথে রয়েছি। এ কথা শুনে অন্যান্য সাহাবীগণও তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ওয়াদা করতে শুরু করলেন। সুতরাং এই বর্ণনায় যদি হুদায়বিয়ার কথাই উল্লেখ থাকে তবে হতে পারে যে, তিনি (মিকদাদ) বদরের দিনও এ কথা বলেছিলেন এবং হুদায়বিয়ার দিনও এটা বলেছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ কথা শুনে হযরত মূসা (আঃ)-এর তার উম্মতের উপর ভীষণ রাগ হয়। এবং তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতঃ, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানান। “হে রাব্বল আলামীন! আমার অধিকার তো শুধু নিজের উপর এবং ভাই-এর উপর রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের উভয়ের এবং এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিন। মহান আল্লাহ তাঁর এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বললেনঃ এরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারবে না। তারা তীহ’ ময়দানে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কোনক্রমেই তারা এর সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তারা কতগুলো বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক বিষয়। অবলোকন করলো। যেমন তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করণ, মান ও ‘সালওয়া' অবতরণ, তাদের কাছে বিদ্যমান একটি পাথর হতে পানি বের হওয়া ইত্যাদি। হযরত মূসা (আঃ) ঐ পাথরকে লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই ওর মধ্য হতে বারোটি প্রস্রবণ বেরিয়ে পড়লো। প্রত্যেক গোত্রের দিকে একটি করে ঝরণা বয়ে যেতে লাগলো। এ ছাড়াও বানী ইসরাঈল তথায় আরও মুজিযা দেখলো। এখানে তাওরাত অবতীর্ণ হলো, আল্লাহর আহকাম নাযিল হলো ইত্যাদি। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা উদ্বিগ্নভাবে ঐ ময়দানেই ঘুরাফেরা করলো এবং সেখান থেকে বের হবার কোন পথ পেলো না। হ্যাঁ, তবে তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া করা হয়েছিল এবং মান’ ও ‘সালওয়া তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। ফুনুনের লম্বা চওড়া হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এসব বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর হযরত হারূনের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুর তিন বছর পর কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ) ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করা হয়। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু বানী ইসরাঈলের মৃত্যু ঘটে। এমনকি বলা হয় যে, শুধুমাত্র হযরত ইউশা (আঃ) ও কালিব (আঃ) অবশিষ্ট থাকেন।কোন কোন মুফাসসির ‘সানাতান' শব্দের উপর পূর্ণভাবে (আরবী) করেন এবং আরবায়ীনা সানাতান শব্দ দুটিকে (আরবী) -এর অবস্থা মেনে থাকেন এবং বলেন যে, এর (আরবী) হচ্ছে ইয়াতীহুনা ফিল আরযে শব্দগুলো। এ চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে কয়জন বানী ইসরাঈল অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে নিয়ে হযরত ইউশা (আঃ) বেরিয়ে পড়েন। অন্যান্য পাহাড় থেকেও বাকী বানী ইসরাঈল তাঁর সাথী হয়ে যায়। হযতর ইউশা (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। জুমআর দিন আসরের পরে যখন বিজয়ের সময় উপস্থিত হয় তখন শক্রদের পাগুলো অচল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়। জুমআর দিনের মর্যাদার কারণে সে যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে সেই দিন আর যুদ্ধ করা চলতো না। এ জন্যে আল্লাহর নবী (হযরত ইউশা) বললেনঃ “হে সূর্য! তুমিও তো আল্লাহরই দাস। আর আমি তারই অধীনস্থ বান্দা। হে আল্লাহ একে আরও কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখুন। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশক্রমে সূর্য থেমে গেল এবং তিনি মনমত যুদ্ধ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নিলেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলোঃ বানী ইসরাঈলকে বলে দাও যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় এ শহরের দরজায় প্রবেশ করে এবং (আরবী) (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মার্জনা করুন!) বলে। কিন্তু তারা আল্লাহর এ হুকুমকে বদলিয়ে দিলো এবং হামাগুড়ি দিয়ে চললো, আর মুখে (আরবী) এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকলো। বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় করা হয়েছে। অপর এক বর্ণনায় এটুকু বেশী রয়েছে যে, বানী ইসরাঈল এ যুদ্ধে এতো বেশী গনীমতের মাল লাভ করেছিল যা তারা ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুযায়ী ওগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে আগুনের পার্শ্বে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ওগুলো আগুনে পুড়লো না। তখন হযরত ইউশা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ অবশ্যই এ মাল থেকে কিছু চুরি করেছে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক গোত্রের নেতা যেন আমার নিকট এসে আমার হাতে হাত রাখে।” তাই করা হলো। একটি গোত্রের নেতার হাত নবীর হাতের সাথে লেগে গেলো। নবী (ইউশা আঃ) বললেনঃ এ খিয়ানতের জিনিস তোমার নিকট রয়েছে সুতরাং তুমি ওটা নিয়ে আসো।' সে সোনার তৈরী গরুর একটি মাথা নিয়ে আসলো যার চক্ষুগুলো ছিল ইয়াকুতের তৈরী এবং দাঁতগুলো ছিল মুক্তার তৈরী। অন্য মালের সাথে ওটিকেও যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো তখন সমস্তই আগুনে পুড়ে গেল। ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আরবাঈনা সানাতান-এর (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দগুলো। বানী ইসরাঈলের এ দলটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঐ তীহের ময়দানে উদ্বিগ্নভাবে ফিরতে থাকে। তারপর মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। পূর্ববর্তী ইয়াহূদী আলেমদের ইজমাই হচ্ছে এর দলীল যে, আউজ ইবনে আনাককে হযরত মূসাই (আঃ) হত্যা করেছিলেন। তাহলে যদি তার হত্যা আমালীকের এ যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা হতো তবে বানী ইসরাঈলের আমলীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকতো না। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা হচ্ছে ‘তীহ' হতে পরিত্রাণ পাওয়ার পরবর্তী ঘটনা।ইয়াহুদী আলেমদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, বালআম ইবনে বাউর আমালীক সম্প্রদায়ের প্রতাপশালীদেরকে সাহায্য করেছিল এবং সে হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর বদদু'আ করেছিল। এ ঘটনাটিও ঐ ময়দান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ঘটেছিল। কেননা, এর পূর্বে তো প্রতাপশালীদের হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওম হতে ভয়ই ছিল না। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এটাই দলীল। তিনি এ কথাও বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ছিল দশ হাত এবং তার দেহও ছিল দশ হাত। তিনি ভূমি হতে দশ হাত লাফিয়ে গিয়ে আউজ ইবনে আনাককে ঐ লাঠি দ্বারা মেরেছিলেন যা তার পায়ের গিটে লেগেছিল এবং তাতেই সে মারা গিয়েছিল। তার দেহ দ্বারা নীল নদের সাঁকো বানানো হয়েছিল যার উপর দিয়ে বহু বছর ধরে নীলবাসী যাতায়াত করতো। নাওফ বাককালী বলেন যে, তার সিংহাসনটি তিনশ গজের ছিল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে কোন দুঃখ করো না। তারা ঐ জেলখানারই যোগ্য।সুতরাং এ ঘটনায় ইয়াহূদীদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে এবং এতে তাদের বিরুদ্ধাচরণের ও দুষ্টামির বর্ণনা রয়েছে যে, আল্লাহর এ শক্ররা বিপদের সময়ও তাঁর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকছে না। তারা রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করছে না ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যে সম্মানিত রাসূলের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ কথা বলেছিলেন তার বিদ্যমানতায় তার অঙ্গীকার ও আদেশের কোনই গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিন রাত তারা তাঁর মুজিযা দেখতে রয়েছে এবং ফেরাউনের বিধ্বস্তি স্বচক্ষে দেখেছে, অথচ অল্প দিনও অতিবাহিত হয়নি এবং স্বয়ং সম্মানিত নবী সঙ্গে রয়েছেন, তথাপি তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতাই প্রদর্শন করছে। তারা আল্লাহর নবীর সাথে বে-আদবী করছে এবং স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। তারা তো স্বচক্ষে দেখেছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ন্যায় সাজ-সরঞ্জামপূর্ণ বাদশাহকেও তার সাজ-সরঞ্জাম, লোক-লস্কর ও প্রজাসহ ডুবিয়ে মেরেছেন! তথাপি তারা সেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঐ গ্রামবাসীর দিকে ধাবিত হচ্ছে না এবং তাঁর হুকুম পালন করছে না। অথচ তারা তো ফিরাউনের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধে পতিত হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা আরও বৃদ্ধি পাবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে মনে করলেও তা ছিল প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে তারা বেরিয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকার শাস্তিতে তারা পতিত হয়েছিল। তাদেরকে শূকর ও বানরে পরিণত করা হয়েছিল। এখানে তারা চিরস্থায়ী অভিশাপে পতিত হয়ে পারলৌকিক স্থায়ী শাস্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। অতএব, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

আল-মায়িদা 5:27

২৭-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ কাহিনীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, কিভাবে আদম (আঃ)-এর দুই সহোদর পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং একজন আল্লাহর ভয়ে অত্যাচারিত অবস্থায় মারা যায় ও জান্নাতে স্বীয় বাসস্থান বানিয়ে নেয়; আর অপরজন তার প্রতি অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে বিনা কারণে তাকে হত্যা করে ফেলে এবং উভয় জগতে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! আহলে কিতাবদেরকে তুমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু'টি সন্তানের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও।' তাদের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। বর্ণিত আছে, ঐ সময়টা ছিল দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা। তাই সেই সময় একই উদরে দুটো সন্তান জন্মগ্রহণ করতো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তখন একটি গর্ভের ছেলের সাথে আর একটি গর্ভের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। সুতরাং কাবীল নিজের যমজ বোনকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা হলো যে, তারা উভয়ে যেন আল্লাহর নামে কিছু কুরবানী করে। যার কুরবানী ককূল হবে, মেয়েটির সাথে তারই বিয়ে দেয়া হবে। হাবীলের কুরবানী ককূল হয়, যার বর্ণনা কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলোতে রয়েছে। মুফাসসিরদের উক্তিগুলো নিম্নে দেয়া হলোঃহযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত সন্তানদের বিয়ের নিয়ম যা উপরে উল্লিখিত হলো তা বর্ণনা করার পর বর্ণিত আছে যে, বড় ভাই কাবীল কৃষি কাজ করতো এবং ছোট ভাই হাবীল ছাগলের মালিক ছিল। হাবীলের বোনের তুলনায় কাবীলের বোনটি ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্যে যখন হাবীলের প্রস্তাব যায়। তখন কাবীল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চায়। এতে হযরত আদম (আঃ) তাকে বাধা প্রদান করেন। তখন উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো যে, যার কুরবানী ককূল হবে সেই তাকে বিয়ে করবে। হযরত আদম (আঃ) সেই সময় মক্কাভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন যে, দেখা যাক কি ঘটে? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বললেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমার যে ঘরটি রয়েছে তা তুমি চেনো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” আল্লাহ বললেনঃ “ওটা মক্কায় রয়েছে। তুমি সেখানে চলে যাও।” হযরত আদম (আঃ) আকাশকে বললেনঃ “তুমি কি আমার সন্তানদেরকে হিফাযত করবে?" আকাশ তা অস্বীকার করলো। তখন যমীনকে ঐ কথা বললেন। যমীনও অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড়গুলোকে বললেন। তারাও অস্বীকার করলো। তারপর তিনি কাবীলকে ঐ কথা বললে সে বললোঃ “হাঁ, আমি রক্ষক হয়ে গেলাম। আপনি ফিরে এসে দেখে নেবেন এবং খুশী হবেন।” এখন হাবীল একটি মোটাতাজা মেষ আল্লাহর নামে যবেহ করলেন এবং বড় কাবীল স্বীয় ভূমির শস্যের একটা অংশ আল্লাহর নামে বের করলো। আগুন এসে হাবীলের নযর তত জ্বালিয়ে ফেললো, যা ছিল সে যুগে কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন, কিন্তু কাবীলের নযর গৃহীত হলো না। তার ভূমির শস্য যা ছিল তা-ই থাকলো। সে ওটাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর শিষ হতে ভালভাল দানাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। এখন কাবীলের তার বোনকে বিয়ে করার আশার গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছিল। তাই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। তখন হাবীল বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই ককূল করে থাকেন। এতে আমার অপরাধ কি আছে?” একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এ মেষটিকেই জান্নাতে পালন করা হয়েছে এবং এটা ঐ মেষ যাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের বিনিময়ে যবেহ করেছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হাবীল স্বীয় জানোয়ারগুলির মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় জন্তু আল্লাহর নামে খুশী মনে কুরবানী করেছিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল স্বীয় কৃষিভূমির অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের শস্য আল্লাহর নামে বের করেছিল, সেটাও আবার খুশী মনে বের করেনি। হাবীলের দৈহিক শক্তিও কাবীল অপেক্ষা বেশী ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে স্বীয় ভ্রাতা কাবীলের অত্যাচার ও বাড়বাড়ি নীরবে সহ্য করলেন এবং ভাইয়ের উপর হাত উঠালেন না। বড় ভাইয়ের কুরবানী যখন ককূল হলো না এবং হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কথা বললেন তখন সে তাঁকে বললোঃ “আপনি হাবীলকে ভালবাসেন বলে তার কুরবানী কবূল করবার জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, ফলে তার কুরবানী ককূল হয়েছে।” এখন সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলার দৃঢ় সংকল্প করে বসলো। সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন ঘটনাক্রমে হাবীলের বাড়ী আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত আদম (আঃ) তাকে ডেকে আনার জন্যে কাবীলকে প্রেরণ করেন। সে তখন গুপ্তভাবে একটা ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পথেই দু’ভাইয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন কাবীল তাকে বলেঃ “আমি তো তোমাকে মেরে ফেলবো। কেননা, তোমার কুরবানী ককূল হয়েছে, আর আমার কুরবানী ককূল হয়নি।” তখন হাবীল বললেনঃ “আমি উত্তম ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়েছি, আর তুমি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস তার নামে কুরবানী দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবূল করে থাকেন। এতে সে আরও বিগড়ে গেল এবং পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। হাবীল বলতেই থাকলেনঃ “তুমি আল্লাহকে কি উত্তর দেবে? আল্লাহর কাছে তোমার এ অত্যাচারের প্রতিশোধ জঘন্যভাবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা করো না।” কিন্তু সেই নিষ্ঠুর কাবীল নিজের ভাই হাবীলকে মেরে ফেললো।কাবীল তার যমজ বোনকেই বিয়ে করার আরও একটা কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেঃ “আমরা দু’জন জান্নাতে জন্মগ্রহণ করেছি, আর এরা দু'জন (হাবীল ও তার যমজ বোন) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং আমার যমজ বোনকে বিয়ে করার হক আমারই রয়েছে।” এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল গম বের করেছিল এবং হাবীল গরু কুরবানী করেছিলেন। তখন তো কোন মিস্কীন ছিল না যে, তাকে সাদকা দেয়া যাবে। তাই এ প্রথা চালু ছিল যে, যে সাদকা দেয়া হতো, আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এটা ছিল সাদকা। কবুল হওয়ার নিদর্শন। ছোট ভাই এ মর্যাদা লাভ করেছিলেন বলে বড় ভাই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হত্যা করার সংকল্প করে বসে। তারা যে বিয়ের মতানৈক্য দূর করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিল তা নয় বরং এমনিই তারা তা করেছিল। কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, বড় ভাই কাবীলের ছোট ভাই হাবীলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তার কুরবানী না হওয়া, অন্য আর কোন কারণ ছিল না। আর একটি বর্ণনায় উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর বিপরীত কথা রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, কাবীল তার যে শস্য আল্লাহর নামে নযর দিয়েছিল তা ককূল হয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, এতে বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ঠিক নেই এবং এটা প্রসিদ্ধ বিষয়ের উল্টোও বটে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।“আল্লাহ মুত্তাকীদের আমলই কবুল করে থাকেন।” হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত থাকবে এমন সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “মুত্তাকীরা কোথায়?” তখন মুত্তাকীরা আল্লাহর কুদরতী ডানার নীচে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাদের থেকে কোনই পর্দাই করবেন না, বরং প্রত্যক্ষভাবে তাদেরকে দেখা দেবেন। হাদীসটিব বর্ণনাকারী আবু আফীফকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “মুত্তাকী কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুত্তাকী তারাই যারা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকে এবং খাটি অন্তরে আল্লাহরই ইবাদত করে।” অতঃপর এসব লোক জান্নাতে চলে যাবে। হাবীল বললেনঃ “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে হস্ত প্রসারিত কর তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যে তোমার দিকে কখনও আমার হাত বাড়াবো না। আমি তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” শক্তিতে তো তিনি ভাই অপেক্ষা উর্ধ্বে ছিলেন। তথাপি সততা, বিনয়, নম্রতা এবং তাকওয়ার কারণেই তিনি এ কথা বললেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে (একে অপরকে হত্যা করার জন্য) তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন :“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি অপরাধী হবে কেন?” তিনি উত্তরে বললেন :“কারণ এই যে, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লোভ করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) বাশার ইবন সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন বিদ্রোহীগণ উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী অবরোধ করেছিলেন তখন সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রাঃ) বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই হাঙ্গামা লেগে যাবে, সেই সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে এবং চলমান ব্যক্তি দৌড়ালু অপেক্ষা উত্তম হবে। কোন একজন জিজ্ঞেস করলেন : “যদি কোন লোক আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করে (তাহলে আমি কি করব)?” তিনি উত্তরে বললেন। সে সময় তুমি আদমের পুত্রের মত হয়ে যাও।' একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন। আইউব সুখইয়ানী বলেন যে, সর্বপ্রথম যিনি এ আয়াতের উপর আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান ইবন আফফান (রাঃ)। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি জন্তুর উপর সওয়ার ছিলেন এবং তার পিছনে বসেছিলেন হযরত আবু যার (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)। আচ্ছা বলতো, যখন মানুষ এমন দারিদ্রের সম্মুখীন হবে যে, তারা (ক্ষুধার কারণে) বাড়ী হতে মসজিদ পর্যন্তও যেতে পারবে না, তখন তুমি কি করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যা নির্দেশ হবে তা-ই করবো।” তিনি বললেনঃ “যখন পরস্পরের মধ্যে খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে, এমনকি মরুভূমির পাথরও রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তখন কি করবে?" (হযরত আবু যার রাঃ বলেন) আমি ঐ উত্তরই দিলাম। তিনি বললেনঃ “বাড়ীতেই অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে।” আমি বললাম, আমি যদি তাতে অংশগ্রহণ না করি তবুও কি? তিনি বললেনঃ “তুমি যাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেই চলে যাবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি অস্ত্র ধারণ করবো না কেন? তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমিও তাদের মধ্যেই শামিল হয়ে গেলে। বরং যদি কারও তরবারীর ঝলক তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে তবে তখনও তুমি তোমার মুখের উপর কাপড় দিয়ে দেবে যাতে সে তোমার ও তার নিজের পাপগুলো নিয়ে যায়।” হযরত রাবঈ (রঃ) বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর জানাযায় হাযির ছিলাম। একজন লোক বললেনঃ আমি এঁর (হযরত হুযাইফার) মুখে শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শোনা হাদীসগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেনঃ “তোমরা যদি পরস্পর লড়াই কর তবে আমি আমার সবচেয়ে দূরের বাড়ীতে চলে যাবো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়বো। যদি সেখানেও কেউ ঢুকে পড়ে তবে আমি তাকে বলে দেবো, তুমি তোমার ও আমার পাপরাশি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে যিনি উত্তম ছিলেন তার মতই হয়ে যাবো।”“আমি চাই যে, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ সমস্তই নিজের মাথায় উঠিয়ে নাও” -এ কথা হাবীল কাবীলকে বলেছিলেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে কাবীল! তুমি ইতিপূর্বে যে পাপ করেছে তা এবং এখন আমাকে হত্যা করার পাপ, এ সমস্তই নিয়ে তুমি কিয়ামতের দিন উঠবে এটাই আমি চাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, আমার নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সবগুলোই তুমি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি (ইবনে কাসীর) বলি যে, সম্ভবতঃ মুজাহিদ (রহঃ)-এর এ দ্বিতীয় উক্তিটি সাব্যস্ত নয়। এর উপর ভিত্তি করেই কতক লোক বলেন যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ নিজের মাথায় বহন করবে। আর এ অর্থের একটি হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই। হাফিয আবু বকর আল বায (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ "বিনা কারণে হত্যা (নিহত ব্যক্তির) সমস্ত পাপ মিটিয়ে দেয়।" এ হাদীসটি উপরে বর্ণিত হাদীসের অর্থে না হলেও এটাও বিশুদ্ধ হাদীস নয়। আর এ রিওয়ায়াতের ভাবার্থ এটাও হবে যে, হত্যার কষ্টের কারণে আল্লাহ নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করে থাকেন। এখন ঐ পাপ কি হত্যাকারীর উপর এসে যাবে? এ কথাটি সাব্যস্ত নয়। তবে কতক হত্যাকারী ঐরূপও হতে পারে। কিয়ামতের মাঠে নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে খুঁজতে থাকবে এবং তার অত্যাচার মোতাবেক তার পুণ্য নিতে থাকবে। পুণ্য নেয়ার পরেও যদি অত্যাচার শেষ না হয় তবে নিহত ব্যক্তির পাপ হত্যাকারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। তাহলে হতে পারে যে, নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপই কতক হত্যাকারীর মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কেননা, অত্যাচারের এভাবে বদলা নেয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, হত্যা সবচেয়ে বড় অত্যাচার এবং অতি জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা'আলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ বাক্যের বিশুদ্ধতম অর্থ হচ্ছে- হে কাবীল! আমি চাই যে, তুমি নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সমস্তই নিজের উপর নিয়ে নেবে। তোমার অন্যান্য পাপের সাথে এই একটি পাপও বেড়ে যাক। আমার পাপও তোমার ঘাড়ে চেপে বসুক-এ বাক্যের ভাবার্থ কখনও এটা হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ প্রত্যেক আমলকারীকে তার আমলের প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা কিরূপে সম্ভব হবে যে, নিহত ব্যক্তির সারা জীবনের পাপ হত্যাকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়া হবে? এখন বাকী থাকছে এই কথা যে, হাবীল তার ভাইকে এ কথা কেন বললেন? এর উত্তর এই যে, তিনি শেষবারের মত তাকে উপদেশ দেন এবং ভয় প্রদর্শন করেন যে, সে যেন এ কাজ থেকে বিরত থাকে, নতুবা সে পাপী হয়ে জাহান্নামবাসী হয়ে যাবে। কারণ, তিনি তো তার মোকাবিলা করছেন না। সুতরাং সমস্ত পাপের বোঝা তার উপরই পড়বে এবং সেই অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে। আর অত্যাচারীদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (এই উপদেশ সত্ত্বেও) তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃহত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলো। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেললল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ শয়তান কাবীলকে তার ভাই এর হত্যার প্রতি উত্তেজিত করলো এবং সে স্বীয় নাফসে আম্মারার অনুসরণ করলো আর লোহা দ্বারা তাকে মেরে ফেললো। একটি বর্ণনায় আছে যে, হাবীল স্বীয় পশুপাল নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিলেন, আর এদিকে কাবীল তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়ে পৌছে যায়। সে একটি ভারী পাথর উঠিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় মেরে দেয়। ঐ সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল বা তাঁর গলা কেটে নিয়েছিল। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঐ শয়তানের হত্যা করার নিয়ম জানা ছিল না, তাই সে তাঁর গলা মোচড়াচ্ছিল। অতঃপর সে একটা জন্তুকে ধরে তার মাথাটি একটি পাথরের উপর রাখলো। তারপর একটি পাথর সজোরে তার মাথায় মেরে দিলো। তৎক্ষণাৎ জন্তুটি মারা গেল। এই দেখে সে তার ভাইয়ের সাথেও ঐ ব্যবহার করলো। এও বর্ণিত আছে যে, যেহেতু তখন পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠে কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, ফলে কাবীল কখনও বা তার ভাইয়ের চক্ষুগুলো বন্ধ করতো এবং কখনও বা থাপ্পড় ঘুষি মারতো। এই দেখে অভিশপ্ত ইবলীস তার কাছে এসে বললো, “একটা পাথর নিয়ে এসো এবং তা দিয়ে তার মাথা থেতলিয়ে দাও।” সে তাই করলো। তখন সেই মালউন দৌড়িয়ে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হত্যা কিরূপে হয়?" সে উত্তরে বললোঃ “এখন সে না পানাহার করতে পারবে, কথা বলতে এবং না নড়াচড়া করতে পারবে।” তিনি তখন বললেনঃ “সম্ভবতঃ তার মৃত্যু হয়ে গেছে।” সে বললোঃ “হ্যা, এটাই মৃত্যু। তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইতিমধ্যে হ্যরত আদম (আঃ) এসে পড়লেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” কিন্তু শোকে দুঃখে তার মুখে কোন কথা সরলো না। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমি তোমার কন্যাগণসহ হা-হুতাশ করতে থাক। আর আমিও আমার পুত্রগণ এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কাবীল ক্ষগ্রিস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোকেই নষ্ট করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তার খুনের বোঝা হযরত আদম (আঃ)-এর ঐ সন্তানের উপরই পতিত হয়। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে রক্ত বইয়েছিল।" মুজাহিদ (রহঃ)-এর উক্তি এই যে, ঐ হত্যাকারীর একটি পায়ের গোছাকে উরুর সাথে লটকানো হয়েছে এবং তার মুখটা সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর ঘুরার সাথে সাথে সেও ঘুরতে রয়েছে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে আগুন ও বরফের গর্তে থাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি সে-ই। ভূ-পৃষ্ঠে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্যে সে-ই দায়ী। ইমাম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অন্যায় খুনের বোঝা তার উপর ও শয়তানের উপর পড়ে থাকে।তাঁকে হত্যা করে দেয়ার পর কি করতে হবে, মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হবে সে ব্যাপারে তার কিছুই জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা'আলা দু'টি কাক প্রেরণ করলেন যারা একে অপরের ভাই ছিল। তারা তার সামনে লড়তে লাগলো। অবশেষে একে অপরকে মেরে ফেললো। তারপর জীবিত কাকটি একটি গর্ত খনন করলো এবং মত কাকটিকে ওর মধ্যে রেখে দিয়ে মাটি চাপিয়ে দিলো। এ দেখে কাবীলের বুদ্ধি জেগে গেল এবং সে-ও ঐরূপ করলো। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নিজে নিজেই মৃত একটি কাককে অপর একটি কাক এভাবে গর্ত খনন করে দাফন করে দিয়েছিল। এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল এক বছর পর্যন্ত তার মৃত ভাইয়ের মৃতদেহ স্বীয় স্কন্ধে বহন করে ফিরছিল। অতঃপর কাকটিকে ঐরূপ করতে দেখে সে নিজেকে ভৎসনা করে বলতে লাগলো-“হায়! আমি এ কাকটির মত কাজও করতে পারলাম না।” একথাও বর্ণিত আছে যে, সে ভাইকে মেরে ফেলার পর খুবই অনুতপ্ত হয়েছিল এবং মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে পড়েছিল। আর তা এ জন্যও ছিল যে, ভূ-পৃষ্ঠে প্রথম মৃত ও প্রথম হত্যা ওটাই ছিল। তাওরাত ধারীরা বলে যে, যখন কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করলো তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে কাবীল! তোমার ভাই হাবীল কোথায়? সে উত্তরে বললোঃ আমি জানি না। আমি তার প্রহরী ছিলাম না। আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “এখন তোমার ভাইয়ের রক্ত যমীন হতে আমাকে ডাক দিচ্ছে। যে যমীনের মুখ খুলে দিয়ে তুমি ওর মুখে তোমার নিস্পাপ ভাইয়ের রক্ত ঢেলে দিয়েছ সেই ভূমি তোমাকে লানত করছে। তুমি এ যমীনে যে চাষাবাদ করবে তাতে তুমি কোন ফসল পাবে না যে পর্যন্ত না তুমি চিন্তান্বিত হবে। সে তখন ঐ কাজই করলো।অতঃপর সে খুব লজ্জিত হলো এবং অনুতাপ করতে থাকলো! ওটা যেন শাস্তির উপরে শাস্তি ছিল। এ কাহিনীতে মুফাসৃসিরগণ এ ব্যাপারে তো একমত যে, এ দু’জন হযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত পুত্র ছিল এবং কুরআন কারীমের শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। আর হাদীসেও রয়েছে যে, যমীনের বুকে যেসব হত্যাকাণ্ড চলছে তার এক অংশের বোঝা ও পাপ হযরত আদম (আঃ)-এর এ প্রথম পুত্রের উপর পড়েছে। কেননা সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরবানী সর্বপ্রথম তাদের মধ্যেই চালু হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আদম (আঃ) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। তাছাড়া এর ইসনাদও সঠিক নয়। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এ ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যেন এর মধ্য থেকে ভালটি গ্রহণ করে এবং মন্দটি পরিত্যাগ করে। (ইবনে জারীর (রঃ) হাসান বসরী (রঃ) হতে এটা মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) এ হাদীসটি মুরসাল। কথিত আছে যে, এ আকস্মিক দুর্ঘটনায় হযরত আদম (আঃ) শশাকে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং এক বছর ধরে তার মুখে হাসি ফুটেনি। অবশেষে ফেরেশতাগণ তার দুঃখ দূর হওয়ার ও মুখে হাসি আসার জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করেন। হযরত আদম (আঃ) ঐ সময় শোকে ও দুঃখে এ কথাও বলেছিলেন যে, শহর ও শহরের সবকিছু বদলে গেছে, পৃথিবীর রং -এর পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর চেহারা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সব জিনিসেরই রং ও স্বাদ বিদায় নিয়েছে এবং আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর সৌন্দর্য লোপ পেয়েছে। জবাবে বলা হলো যে, ঐ মৃত ব্যক্তির সাথে এ জীবিত ব্যক্তিও যেন নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল ওর বোঝা তার উপর এসে গেছে। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, কাবীলকে তখনই কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে, তার পায়ের গোছাকে তার উরুর সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডল সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর সাথে সাথেই সে ঘুরতে ছিল। অর্থাৎ সূর্য যেদিকেই থাকতো সেদিকেই তার মুখখানা ঘুরে যেতো। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো গুনাহ এরই উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাড়াতাড়ি করে ও শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করবেন এবং পরকালেও তার জন্যে ভীষণ শাস্তি জমা রাখবেন, ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে সমসাময়িক শাসনকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া!” কাবীলের মধ্যে এ দু'টো পাপই জমা হয়েছিল। (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।' (২:১৫৬)

আল-মায়িদা 5:28

২৭-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ কাহিনীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, কিভাবে আদম (আঃ)-এর দুই সহোদর পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং একজন আল্লাহর ভয়ে অত্যাচারিত অবস্থায় মারা যায় ও জান্নাতে স্বীয় বাসস্থান বানিয়ে নেয়; আর অপরজন তার প্রতি অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে বিনা কারণে তাকে হত্যা করে ফেলে এবং উভয় জগতে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! আহলে কিতাবদেরকে তুমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু'টি সন্তানের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও।' তাদের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। বর্ণিত আছে, ঐ সময়টা ছিল দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা। তাই সেই সময় একই উদরে দুটো সন্তান জন্মগ্রহণ করতো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তখন একটি গর্ভের ছেলের সাথে আর একটি গর্ভের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। সুতরাং কাবীল নিজের যমজ বোনকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা হলো যে, তারা উভয়ে যেন আল্লাহর নামে কিছু কুরবানী করে। যার কুরবানী ককূল হবে, মেয়েটির সাথে তারই বিয়ে দেয়া হবে। হাবীলের কুরবানী ককূল হয়, যার বর্ণনা কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলোতে রয়েছে। মুফাসসিরদের উক্তিগুলো নিম্নে দেয়া হলোঃহযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত সন্তানদের বিয়ের নিয়ম যা উপরে উল্লিখিত হলো তা বর্ণনা করার পর বর্ণিত আছে যে, বড় ভাই কাবীল কৃষি কাজ করতো এবং ছোট ভাই হাবীল ছাগলের মালিক ছিল। হাবীলের বোনের তুলনায় কাবীলের বোনটি ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্যে যখন হাবীলের প্রস্তাব যায়। তখন কাবীল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চায়। এতে হযরত আদম (আঃ) তাকে বাধা প্রদান করেন। তখন উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো যে, যার কুরবানী ককূল হবে সেই তাকে বিয়ে করবে। হযরত আদম (আঃ) সেই সময় মক্কাভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন যে, দেখা যাক কি ঘটে? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বললেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমার যে ঘরটি রয়েছে তা তুমি চেনো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” আল্লাহ বললেনঃ “ওটা মক্কায় রয়েছে। তুমি সেখানে চলে যাও।” হযরত আদম (আঃ) আকাশকে বললেনঃ “তুমি কি আমার সন্তানদেরকে হিফাযত করবে?" আকাশ তা অস্বীকার করলো। তখন যমীনকে ঐ কথা বললেন। যমীনও অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড়গুলোকে বললেন। তারাও অস্বীকার করলো। তারপর তিনি কাবীলকে ঐ কথা বললে সে বললোঃ “হাঁ, আমি রক্ষক হয়ে গেলাম। আপনি ফিরে এসে দেখে নেবেন এবং খুশী হবেন।” এখন হাবীল একটি মোটাতাজা মেষ আল্লাহর নামে যবেহ করলেন এবং বড় কাবীল স্বীয় ভূমির শস্যের একটা অংশ আল্লাহর নামে বের করলো। আগুন এসে হাবীলের নযর তত জ্বালিয়ে ফেললো, যা ছিল সে যুগে কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন, কিন্তু কাবীলের নযর গৃহীত হলো না। তার ভূমির শস্য যা ছিল তা-ই থাকলো। সে ওটাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর শিষ হতে ভালভাল দানাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। এখন কাবীলের তার বোনকে বিয়ে করার আশার গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছিল। তাই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। তখন হাবীল বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই ককূল করে থাকেন। এতে আমার অপরাধ কি আছে?” একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এ মেষটিকেই জান্নাতে পালন করা হয়েছে এবং এটা ঐ মেষ যাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের বিনিময়ে যবেহ করেছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হাবীল স্বীয় জানোয়ারগুলির মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় জন্তু আল্লাহর নামে খুশী মনে কুরবানী করেছিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল স্বীয় কৃষিভূমির অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের শস্য আল্লাহর নামে বের করেছিল, সেটাও আবার খুশী মনে বের করেনি। হাবীলের দৈহিক শক্তিও কাবীল অপেক্ষা বেশী ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে স্বীয় ভ্রাতা কাবীলের অত্যাচার ও বাড়বাড়ি নীরবে সহ্য করলেন এবং ভাইয়ের উপর হাত উঠালেন না। বড় ভাইয়ের কুরবানী যখন ককূল হলো না এবং হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কথা বললেন তখন সে তাঁকে বললোঃ “আপনি হাবীলকে ভালবাসেন বলে তার কুরবানী কবূল করবার জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, ফলে তার কুরবানী ককূল হয়েছে।” এখন সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলার দৃঢ় সংকল্প করে বসলো। সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন ঘটনাক্রমে হাবীলের বাড়ী আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত আদম (আঃ) তাকে ডেকে আনার জন্যে কাবীলকে প্রেরণ করেন। সে তখন গুপ্তভাবে একটা ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পথেই দু’ভাইয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন কাবীল তাকে বলেঃ “আমি তো তোমাকে মেরে ফেলবো। কেননা, তোমার কুরবানী ককূল হয়েছে, আর আমার কুরবানী ককূল হয়নি।” তখন হাবীল বললেনঃ “আমি উত্তম ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়েছি, আর তুমি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস তার নামে কুরবানী দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবূল করে থাকেন। এতে সে আরও বিগড়ে গেল এবং পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। হাবীল বলতেই থাকলেনঃ “তুমি আল্লাহকে কি উত্তর দেবে? আল্লাহর কাছে তোমার এ অত্যাচারের প্রতিশোধ জঘন্যভাবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা করো না।” কিন্তু সেই নিষ্ঠুর কাবীল নিজের ভাই হাবীলকে মেরে ফেললো।কাবীল তার যমজ বোনকেই বিয়ে করার আরও একটা কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেঃ “আমরা দু’জন জান্নাতে জন্মগ্রহণ করেছি, আর এরা দু'জন (হাবীল ও তার যমজ বোন) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং আমার যমজ বোনকে বিয়ে করার হক আমারই রয়েছে।” এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল গম বের করেছিল এবং হাবীল গরু কুরবানী করেছিলেন। তখন তো কোন মিস্কীন ছিল না যে, তাকে সাদকা দেয়া যাবে। তাই এ প্রথা চালু ছিল যে, যে সাদকা দেয়া হতো, আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এটা ছিল সাদকা। কবুল হওয়ার নিদর্শন। ছোট ভাই এ মর্যাদা লাভ করেছিলেন বলে বড় ভাই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হত্যা করার সংকল্প করে বসে। তারা যে বিয়ের মতানৈক্য দূর করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিল তা নয় বরং এমনিই তারা তা করেছিল। কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, বড় ভাই কাবীলের ছোট ভাই হাবীলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তার কুরবানী না হওয়া, অন্য আর কোন কারণ ছিল না। আর একটি বর্ণনায় উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর বিপরীত কথা রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, কাবীল তার যে শস্য আল্লাহর নামে নযর দিয়েছিল তা ককূল হয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, এতে বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ঠিক নেই এবং এটা প্রসিদ্ধ বিষয়ের উল্টোও বটে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।“আল্লাহ মুত্তাকীদের আমলই কবুল করে থাকেন।” হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত থাকবে এমন সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “মুত্তাকীরা কোথায়?” তখন মুত্তাকীরা আল্লাহর কুদরতী ডানার নীচে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাদের থেকে কোনই পর্দাই করবেন না, বরং প্রত্যক্ষভাবে তাদেরকে দেখা দেবেন। হাদীসটিব বর্ণনাকারী আবু আফীফকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “মুত্তাকী কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুত্তাকী তারাই যারা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকে এবং খাটি অন্তরে আল্লাহরই ইবাদত করে।” অতঃপর এসব লোক জান্নাতে চলে যাবে। হাবীল বললেনঃ “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে হস্ত প্রসারিত কর তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যে তোমার দিকে কখনও আমার হাত বাড়াবো না। আমি তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” শক্তিতে তো তিনি ভাই অপেক্ষা উর্ধ্বে ছিলেন। তথাপি সততা, বিনয়, নম্রতা এবং তাকওয়ার কারণেই তিনি এ কথা বললেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে (একে অপরকে হত্যা করার জন্য) তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন :“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি অপরাধী হবে কেন?” তিনি উত্তরে বললেন :“কারণ এই যে, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লোভ করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) বাশার ইবন সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন বিদ্রোহীগণ উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী অবরোধ করেছিলেন তখন সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রাঃ) বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই হাঙ্গামা লেগে যাবে, সেই সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে এবং চলমান ব্যক্তি দৌড়ালু অপেক্ষা উত্তম হবে। কোন একজন জিজ্ঞেস করলেন : “যদি কোন লোক আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করে (তাহলে আমি কি করব)?” তিনি উত্তরে বললেন। সে সময় তুমি আদমের পুত্রের মত হয়ে যাও।' একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন। আইউব সুখইয়ানী বলেন যে, সর্বপ্রথম যিনি এ আয়াতের উপর আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান ইবন আফফান (রাঃ)। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি জন্তুর উপর সওয়ার ছিলেন এবং তার পিছনে বসেছিলেন হযরত আবু যার (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)। আচ্ছা বলতো, যখন মানুষ এমন দারিদ্রের সম্মুখীন হবে যে, তারা (ক্ষুধার কারণে) বাড়ী হতে মসজিদ পর্যন্তও যেতে পারবে না, তখন তুমি কি করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যা নির্দেশ হবে তা-ই করবো।” তিনি বললেনঃ “যখন পরস্পরের মধ্যে খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে, এমনকি মরুভূমির পাথরও রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তখন কি করবে?" (হযরত আবু যার রাঃ বলেন) আমি ঐ উত্তরই দিলাম। তিনি বললেনঃ “বাড়ীতেই অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে।” আমি বললাম, আমি যদি তাতে অংশগ্রহণ না করি তবুও কি? তিনি বললেনঃ “তুমি যাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেই চলে যাবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি অস্ত্র ধারণ করবো না কেন? তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমিও তাদের মধ্যেই শামিল হয়ে গেলে। বরং যদি কারও তরবারীর ঝলক তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে তবে তখনও তুমি তোমার মুখের উপর কাপড় দিয়ে দেবে যাতে সে তোমার ও তার নিজের পাপগুলো নিয়ে যায়।” হযরত রাবঈ (রঃ) বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর জানাযায় হাযির ছিলাম। একজন লোক বললেনঃ আমি এঁর (হযরত হুযাইফার) মুখে শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শোনা হাদীসগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেনঃ “তোমরা যদি পরস্পর লড়াই কর তবে আমি আমার সবচেয়ে দূরের বাড়ীতে চলে যাবো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়বো। যদি সেখানেও কেউ ঢুকে পড়ে তবে আমি তাকে বলে দেবো, তুমি তোমার ও আমার পাপরাশি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে যিনি উত্তম ছিলেন তার মতই হয়ে যাবো।”“আমি চাই যে, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ সমস্তই নিজের মাথায় উঠিয়ে নাও” -এ কথা হাবীল কাবীলকে বলেছিলেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে কাবীল! তুমি ইতিপূর্বে যে পাপ করেছে তা এবং এখন আমাকে হত্যা করার পাপ, এ সমস্তই নিয়ে তুমি কিয়ামতের দিন উঠবে এটাই আমি চাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, আমার নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সবগুলোই তুমি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি (ইবনে কাসীর) বলি যে, সম্ভবতঃ মুজাহিদ (রহঃ)-এর এ দ্বিতীয় উক্তিটি সাব্যস্ত নয়। এর উপর ভিত্তি করেই কতক লোক বলেন যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ নিজের মাথায় বহন করবে। আর এ অর্থের একটি হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই। হাফিয আবু বকর আল বায (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ "বিনা কারণে হত্যা (নিহত ব্যক্তির) সমস্ত পাপ মিটিয়ে দেয়।" এ হাদীসটি উপরে বর্ণিত হাদীসের অর্থে না হলেও এটাও বিশুদ্ধ হাদীস নয়। আর এ রিওয়ায়াতের ভাবার্থ এটাও হবে যে, হত্যার কষ্টের কারণে আল্লাহ নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করে থাকেন। এখন ঐ পাপ কি হত্যাকারীর উপর এসে যাবে? এ কথাটি সাব্যস্ত নয়। তবে কতক হত্যাকারী ঐরূপও হতে পারে। কিয়ামতের মাঠে নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে খুঁজতে থাকবে এবং তার অত্যাচার মোতাবেক তার পুণ্য নিতে থাকবে। পুণ্য নেয়ার পরেও যদি অত্যাচার শেষ না হয় তবে নিহত ব্যক্তির পাপ হত্যাকারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। তাহলে হতে পারে যে, নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপই কতক হত্যাকারীর মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কেননা, অত্যাচারের এভাবে বদলা নেয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, হত্যা সবচেয়ে বড় অত্যাচার এবং অতি জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা'আলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ বাক্যের বিশুদ্ধতম অর্থ হচ্ছে- হে কাবীল! আমি চাই যে, তুমি নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সমস্তই নিজের উপর নিয়ে নেবে। তোমার অন্যান্য পাপের সাথে এই একটি পাপও বেড়ে যাক। আমার পাপও তোমার ঘাড়ে চেপে বসুক-এ বাক্যের ভাবার্থ কখনও এটা হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ প্রত্যেক আমলকারীকে তার আমলের প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা কিরূপে সম্ভব হবে যে, নিহত ব্যক্তির সারা জীবনের পাপ হত্যাকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়া হবে? এখন বাকী থাকছে এই কথা যে, হাবীল তার ভাইকে এ কথা কেন বললেন? এর উত্তর এই যে, তিনি শেষবারের মত তাকে উপদেশ দেন এবং ভয় প্রদর্শন করেন যে, সে যেন এ কাজ থেকে বিরত থাকে, নতুবা সে পাপী হয়ে জাহান্নামবাসী হয়ে যাবে। কারণ, তিনি তো তার মোকাবিলা করছেন না। সুতরাং সমস্ত পাপের বোঝা তার উপরই পড়বে এবং সেই অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে। আর অত্যাচারীদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (এই উপদেশ সত্ত্বেও) তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃহত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলো। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেললল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ শয়তান কাবীলকে তার ভাই এর হত্যার প্রতি উত্তেজিত করলো এবং সে স্বীয় নাফসে আম্মারার অনুসরণ করলো আর লোহা দ্বারা তাকে মেরে ফেললো। একটি বর্ণনায় আছে যে, হাবীল স্বীয় পশুপাল নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিলেন, আর এদিকে কাবীল তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়ে পৌছে যায়। সে একটি ভারী পাথর উঠিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় মেরে দেয়। ঐ সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল বা তাঁর গলা কেটে নিয়েছিল। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঐ শয়তানের হত্যা করার নিয়ম জানা ছিল না, তাই সে তাঁর গলা মোচড়াচ্ছিল। অতঃপর সে একটা জন্তুকে ধরে তার মাথাটি একটি পাথরের উপর রাখলো। তারপর একটি পাথর সজোরে তার মাথায় মেরে দিলো। তৎক্ষণাৎ জন্তুটি মারা গেল। এই দেখে সে তার ভাইয়ের সাথেও ঐ ব্যবহার করলো। এও বর্ণিত আছে যে, যেহেতু তখন পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠে কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, ফলে কাবীল কখনও বা তার ভাইয়ের চক্ষুগুলো বন্ধ করতো এবং কখনও বা থাপ্পড় ঘুষি মারতো। এই দেখে অভিশপ্ত ইবলীস তার কাছে এসে বললো, “একটা পাথর নিয়ে এসো এবং তা দিয়ে তার মাথা থেতলিয়ে দাও।” সে তাই করলো। তখন সেই মালউন দৌড়িয়ে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হত্যা কিরূপে হয়?" সে উত্তরে বললোঃ “এখন সে না পানাহার করতে পারবে, কথা বলতে এবং না নড়াচড়া করতে পারবে।” তিনি তখন বললেনঃ “সম্ভবতঃ তার মৃত্যু হয়ে গেছে।” সে বললোঃ “হ্যা, এটাই মৃত্যু। তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইতিমধ্যে হ্যরত আদম (আঃ) এসে পড়লেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” কিন্তু শোকে দুঃখে তার মুখে কোন কথা সরলো না। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমি তোমার কন্যাগণসহ হা-হুতাশ করতে থাক। আর আমিও আমার পুত্রগণ এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কাবীল ক্ষগ্রিস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোকেই নষ্ট করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তার খুনের বোঝা হযরত আদম (আঃ)-এর ঐ সন্তানের উপরই পতিত হয়। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে রক্ত বইয়েছিল।" মুজাহিদ (রহঃ)-এর উক্তি এই যে, ঐ হত্যাকারীর একটি পায়ের গোছাকে উরুর সাথে লটকানো হয়েছে এবং তার মুখটা সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর ঘুরার সাথে সাথে সেও ঘুরতে রয়েছে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে আগুন ও বরফের গর্তে থাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি সে-ই। ভূ-পৃষ্ঠে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্যে সে-ই দায়ী। ইমাম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অন্যায় খুনের বোঝা তার উপর ও শয়তানের উপর পড়ে থাকে।তাঁকে হত্যা করে দেয়ার পর কি করতে হবে, মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হবে সে ব্যাপারে তার কিছুই জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা'আলা দু'টি কাক প্রেরণ করলেন যারা একে অপরের ভাই ছিল। তারা তার সামনে লড়তে লাগলো। অবশেষে একে অপরকে মেরে ফেললো। তারপর জীবিত কাকটি একটি গর্ত খনন করলো এবং মত কাকটিকে ওর মধ্যে রেখে দিয়ে মাটি চাপিয়ে দিলো। এ দেখে কাবীলের বুদ্ধি জেগে গেল এবং সে-ও ঐরূপ করলো। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নিজে নিজেই মৃত একটি কাককে অপর একটি কাক এভাবে গর্ত খনন করে দাফন করে দিয়েছিল। এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল এক বছর পর্যন্ত তার মৃত ভাইয়ের মৃতদেহ স্বীয় স্কন্ধে বহন করে ফিরছিল। অতঃপর কাকটিকে ঐরূপ করতে দেখে সে নিজেকে ভৎসনা করে বলতে লাগলো-“হায়! আমি এ কাকটির মত কাজও করতে পারলাম না।” একথাও বর্ণিত আছে যে, সে ভাইকে মেরে ফেলার পর খুবই অনুতপ্ত হয়েছিল এবং মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে পড়েছিল। আর তা এ জন্যও ছিল যে, ভূ-পৃষ্ঠে প্রথম মৃত ও প্রথম হত্যা ওটাই ছিল। তাওরাত ধারীরা বলে যে, যখন কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করলো তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে কাবীল! তোমার ভাই হাবীল কোথায়? সে উত্তরে বললোঃ আমি জানি না। আমি তার প্রহরী ছিলাম না। আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “এখন তোমার ভাইয়ের রক্ত যমীন হতে আমাকে ডাক দিচ্ছে। যে যমীনের মুখ খুলে দিয়ে তুমি ওর মুখে তোমার নিস্পাপ ভাইয়ের রক্ত ঢেলে দিয়েছ সেই ভূমি তোমাকে লানত করছে। তুমি এ যমীনে যে চাষাবাদ করবে তাতে তুমি কোন ফসল পাবে না যে পর্যন্ত না তুমি চিন্তান্বিত হবে। সে তখন ঐ কাজই করলো।অতঃপর সে খুব লজ্জিত হলো এবং অনুতাপ করতে থাকলো! ওটা যেন শাস্তির উপরে শাস্তি ছিল। এ কাহিনীতে মুফাসৃসিরগণ এ ব্যাপারে তো একমত যে, এ দু’জন হযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত পুত্র ছিল এবং কুরআন কারীমের শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। আর হাদীসেও রয়েছে যে, যমীনের বুকে যেসব হত্যাকাণ্ড চলছে তার এক অংশের বোঝা ও পাপ হযরত আদম (আঃ)-এর এ প্রথম পুত্রের উপর পড়েছে। কেননা সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরবানী সর্বপ্রথম তাদের মধ্যেই চালু হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আদম (আঃ) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। তাছাড়া এর ইসনাদও সঠিক নয়। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এ ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যেন এর মধ্য থেকে ভালটি গ্রহণ করে এবং মন্দটি পরিত্যাগ করে। (ইবনে জারীর (রঃ) হাসান বসরী (রঃ) হতে এটা মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) এ হাদীসটি মুরসাল। কথিত আছে যে, এ আকস্মিক দুর্ঘটনায় হযরত আদম (আঃ) শশাকে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং এক বছর ধরে তার মুখে হাসি ফুটেনি। অবশেষে ফেরেশতাগণ তার দুঃখ দূর হওয়ার ও মুখে হাসি আসার জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করেন। হযরত আদম (আঃ) ঐ সময় শোকে ও দুঃখে এ কথাও বলেছিলেন যে, শহর ও শহরের সবকিছু বদলে গেছে, পৃথিবীর রং -এর পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর চেহারা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সব জিনিসেরই রং ও স্বাদ বিদায় নিয়েছে এবং আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর সৌন্দর্য লোপ পেয়েছে। জবাবে বলা হলো যে, ঐ মৃত ব্যক্তির সাথে এ জীবিত ব্যক্তিও যেন নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল ওর বোঝা তার উপর এসে গেছে। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, কাবীলকে তখনই কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে, তার পায়ের গোছাকে তার উরুর সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডল সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর সাথে সাথেই সে ঘুরতে ছিল। অর্থাৎ সূর্য যেদিকেই থাকতো সেদিকেই তার মুখখানা ঘুরে যেতো। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো গুনাহ এরই উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাড়াতাড়ি করে ও শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করবেন এবং পরকালেও তার জন্যে ভীষণ শাস্তি জমা রাখবেন, ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে সমসাময়িক শাসনকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া!” কাবীলের মধ্যে এ দু'টো পাপই জমা হয়েছিল। (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।' (২:১৫৬)

আল-মায়িদা 5:29

২৭-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ কাহিনীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, কিভাবে আদম (আঃ)-এর দুই সহোদর পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং একজন আল্লাহর ভয়ে অত্যাচারিত অবস্থায় মারা যায় ও জান্নাতে স্বীয় বাসস্থান বানিয়ে নেয়; আর অপরজন তার প্রতি অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে বিনা কারণে তাকে হত্যা করে ফেলে এবং উভয় জগতে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! আহলে কিতাবদেরকে তুমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু'টি সন্তানের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও।' তাদের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। বর্ণিত আছে, ঐ সময়টা ছিল দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা। তাই সেই সময় একই উদরে দুটো সন্তান জন্মগ্রহণ করতো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তখন একটি গর্ভের ছেলের সাথে আর একটি গর্ভের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। সুতরাং কাবীল নিজের যমজ বোনকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা হলো যে, তারা উভয়ে যেন আল্লাহর নামে কিছু কুরবানী করে। যার কুরবানী ককূল হবে, মেয়েটির সাথে তারই বিয়ে দেয়া হবে। হাবীলের কুরবানী ককূল হয়, যার বর্ণনা কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলোতে রয়েছে। মুফাসসিরদের উক্তিগুলো নিম্নে দেয়া হলোঃহযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত সন্তানদের বিয়ের নিয়ম যা উপরে উল্লিখিত হলো তা বর্ণনা করার পর বর্ণিত আছে যে, বড় ভাই কাবীল কৃষি কাজ করতো এবং ছোট ভাই হাবীল ছাগলের মালিক ছিল। হাবীলের বোনের তুলনায় কাবীলের বোনটি ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্যে যখন হাবীলের প্রস্তাব যায়। তখন কাবীল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চায়। এতে হযরত আদম (আঃ) তাকে বাধা প্রদান করেন। তখন উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো যে, যার কুরবানী ককূল হবে সেই তাকে বিয়ে করবে। হযরত আদম (আঃ) সেই সময় মক্কাভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন যে, দেখা যাক কি ঘটে? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বললেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমার যে ঘরটি রয়েছে তা তুমি চেনো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” আল্লাহ বললেনঃ “ওটা মক্কায় রয়েছে। তুমি সেখানে চলে যাও।” হযরত আদম (আঃ) আকাশকে বললেনঃ “তুমি কি আমার সন্তানদেরকে হিফাযত করবে?" আকাশ তা অস্বীকার করলো। তখন যমীনকে ঐ কথা বললেন। যমীনও অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড়গুলোকে বললেন। তারাও অস্বীকার করলো। তারপর তিনি কাবীলকে ঐ কথা বললে সে বললোঃ “হাঁ, আমি রক্ষক হয়ে গেলাম। আপনি ফিরে এসে দেখে নেবেন এবং খুশী হবেন।” এখন হাবীল একটি মোটাতাজা মেষ আল্লাহর নামে যবেহ করলেন এবং বড় কাবীল স্বীয় ভূমির শস্যের একটা অংশ আল্লাহর নামে বের করলো। আগুন এসে হাবীলের নযর তত জ্বালিয়ে ফেললো, যা ছিল সে যুগে কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন, কিন্তু কাবীলের নযর গৃহীত হলো না। তার ভূমির শস্য যা ছিল তা-ই থাকলো। সে ওটাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর শিষ হতে ভালভাল দানাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। এখন কাবীলের তার বোনকে বিয়ে করার আশার গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছিল। তাই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। তখন হাবীল বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই ককূল করে থাকেন। এতে আমার অপরাধ কি আছে?” একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এ মেষটিকেই জান্নাতে পালন করা হয়েছে এবং এটা ঐ মেষ যাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের বিনিময়ে যবেহ করেছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হাবীল স্বীয় জানোয়ারগুলির মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় জন্তু আল্লাহর নামে খুশী মনে কুরবানী করেছিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল স্বীয় কৃষিভূমির অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের শস্য আল্লাহর নামে বের করেছিল, সেটাও আবার খুশী মনে বের করেনি। হাবীলের দৈহিক শক্তিও কাবীল অপেক্ষা বেশী ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে স্বীয় ভ্রাতা কাবীলের অত্যাচার ও বাড়বাড়ি নীরবে সহ্য করলেন এবং ভাইয়ের উপর হাত উঠালেন না। বড় ভাইয়ের কুরবানী যখন ককূল হলো না এবং হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কথা বললেন তখন সে তাঁকে বললোঃ “আপনি হাবীলকে ভালবাসেন বলে তার কুরবানী কবূল করবার জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, ফলে তার কুরবানী ককূল হয়েছে।” এখন সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলার দৃঢ় সংকল্প করে বসলো। সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন ঘটনাক্রমে হাবীলের বাড়ী আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত আদম (আঃ) তাকে ডেকে আনার জন্যে কাবীলকে প্রেরণ করেন। সে তখন গুপ্তভাবে একটা ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পথেই দু’ভাইয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন কাবীল তাকে বলেঃ “আমি তো তোমাকে মেরে ফেলবো। কেননা, তোমার কুরবানী ককূল হয়েছে, আর আমার কুরবানী ককূল হয়নি।” তখন হাবীল বললেনঃ “আমি উত্তম ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়েছি, আর তুমি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস তার নামে কুরবানী দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবূল করে থাকেন। এতে সে আরও বিগড়ে গেল এবং পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। হাবীল বলতেই থাকলেনঃ “তুমি আল্লাহকে কি উত্তর দেবে? আল্লাহর কাছে তোমার এ অত্যাচারের প্রতিশোধ জঘন্যভাবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা করো না।” কিন্তু সেই নিষ্ঠুর কাবীল নিজের ভাই হাবীলকে মেরে ফেললো।কাবীল তার যমজ বোনকেই বিয়ে করার আরও একটা কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেঃ “আমরা দু’জন জান্নাতে জন্মগ্রহণ করেছি, আর এরা দু'জন (হাবীল ও তার যমজ বোন) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং আমার যমজ বোনকে বিয়ে করার হক আমারই রয়েছে।” এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল গম বের করেছিল এবং হাবীল গরু কুরবানী করেছিলেন। তখন তো কোন মিস্কীন ছিল না যে, তাকে সাদকা দেয়া যাবে। তাই এ প্রথা চালু ছিল যে, যে সাদকা দেয়া হতো, আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এটা ছিল সাদকা। কবুল হওয়ার নিদর্শন। ছোট ভাই এ মর্যাদা লাভ করেছিলেন বলে বড় ভাই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হত্যা করার সংকল্প করে বসে। তারা যে বিয়ের মতানৈক্য দূর করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিল তা নয় বরং এমনিই তারা তা করেছিল। কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, বড় ভাই কাবীলের ছোট ভাই হাবীলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তার কুরবানী না হওয়া, অন্য আর কোন কারণ ছিল না। আর একটি বর্ণনায় উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর বিপরীত কথা রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, কাবীল তার যে শস্য আল্লাহর নামে নযর দিয়েছিল তা ককূল হয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, এতে বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ঠিক নেই এবং এটা প্রসিদ্ধ বিষয়ের উল্টোও বটে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।“আল্লাহ মুত্তাকীদের আমলই কবুল করে থাকেন।” হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত থাকবে এমন সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “মুত্তাকীরা কোথায়?” তখন মুত্তাকীরা আল্লাহর কুদরতী ডানার নীচে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাদের থেকে কোনই পর্দাই করবেন না, বরং প্রত্যক্ষভাবে তাদেরকে দেখা দেবেন। হাদীসটিব বর্ণনাকারী আবু আফীফকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “মুত্তাকী কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুত্তাকী তারাই যারা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকে এবং খাটি অন্তরে আল্লাহরই ইবাদত করে।” অতঃপর এসব লোক জান্নাতে চলে যাবে। হাবীল বললেনঃ “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে হস্ত প্রসারিত কর তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যে তোমার দিকে কখনও আমার হাত বাড়াবো না। আমি তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” শক্তিতে তো তিনি ভাই অপেক্ষা উর্ধ্বে ছিলেন। তথাপি সততা, বিনয়, নম্রতা এবং তাকওয়ার কারণেই তিনি এ কথা বললেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে (একে অপরকে হত্যা করার জন্য) তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন :“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি অপরাধী হবে কেন?” তিনি উত্তরে বললেন :“কারণ এই যে, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লোভ করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) বাশার ইবন সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন বিদ্রোহীগণ উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী অবরোধ করেছিলেন তখন সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রাঃ) বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই হাঙ্গামা লেগে যাবে, সেই সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে এবং চলমান ব্যক্তি দৌড়ালু অপেক্ষা উত্তম হবে। কোন একজন জিজ্ঞেস করলেন : “যদি কোন লোক আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করে (তাহলে আমি কি করব)?” তিনি উত্তরে বললেন। সে সময় তুমি আদমের পুত্রের মত হয়ে যাও।' একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন। আইউব সুখইয়ানী বলেন যে, সর্বপ্রথম যিনি এ আয়াতের উপর আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান ইবন আফফান (রাঃ)। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি জন্তুর উপর সওয়ার ছিলেন এবং তার পিছনে বসেছিলেন হযরত আবু যার (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)। আচ্ছা বলতো, যখন মানুষ এমন দারিদ্রের সম্মুখীন হবে যে, তারা (ক্ষুধার কারণে) বাড়ী হতে মসজিদ পর্যন্তও যেতে পারবে না, তখন তুমি কি করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যা নির্দেশ হবে তা-ই করবো।” তিনি বললেনঃ “যখন পরস্পরের মধ্যে খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে, এমনকি মরুভূমির পাথরও রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তখন কি করবে?" (হযরত আবু যার রাঃ বলেন) আমি ঐ উত্তরই দিলাম। তিনি বললেনঃ “বাড়ীতেই অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে।” আমি বললাম, আমি যদি তাতে অংশগ্রহণ না করি তবুও কি? তিনি বললেনঃ “তুমি যাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেই চলে যাবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি অস্ত্র ধারণ করবো না কেন? তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমিও তাদের মধ্যেই শামিল হয়ে গেলে। বরং যদি কারও তরবারীর ঝলক তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে তবে তখনও তুমি তোমার মুখের উপর কাপড় দিয়ে দেবে যাতে সে তোমার ও তার নিজের পাপগুলো নিয়ে যায়।” হযরত রাবঈ (রঃ) বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর জানাযায় হাযির ছিলাম। একজন লোক বললেনঃ আমি এঁর (হযরত হুযাইফার) মুখে শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শোনা হাদীসগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেনঃ “তোমরা যদি পরস্পর লড়াই কর তবে আমি আমার সবচেয়ে দূরের বাড়ীতে চলে যাবো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়বো। যদি সেখানেও কেউ ঢুকে পড়ে তবে আমি তাকে বলে দেবো, তুমি তোমার ও আমার পাপরাশি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে যিনি উত্তম ছিলেন তার মতই হয়ে যাবো।”“আমি চাই যে, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ সমস্তই নিজের মাথায় উঠিয়ে নাও” -এ কথা হাবীল কাবীলকে বলেছিলেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে কাবীল! তুমি ইতিপূর্বে যে পাপ করেছে তা এবং এখন আমাকে হত্যা করার পাপ, এ সমস্তই নিয়ে তুমি কিয়ামতের দিন উঠবে এটাই আমি চাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, আমার নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সবগুলোই তুমি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি (ইবনে কাসীর) বলি যে, সম্ভবতঃ মুজাহিদ (রহঃ)-এর এ দ্বিতীয় উক্তিটি সাব্যস্ত নয়। এর উপর ভিত্তি করেই কতক লোক বলেন যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ নিজের মাথায় বহন করবে। আর এ অর্থের একটি হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই। হাফিয আবু বকর আল বায (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ "বিনা কারণে হত্যা (নিহত ব্যক্তির) সমস্ত পাপ মিটিয়ে দেয়।" এ হাদীসটি উপরে বর্ণিত হাদীসের অর্থে না হলেও এটাও বিশুদ্ধ হাদীস নয়। আর এ রিওয়ায়াতের ভাবার্থ এটাও হবে যে, হত্যার কষ্টের কারণে আল্লাহ নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করে থাকেন। এখন ঐ পাপ কি হত্যাকারীর উপর এসে যাবে? এ কথাটি সাব্যস্ত নয়। তবে কতক হত্যাকারী ঐরূপও হতে পারে। কিয়ামতের মাঠে নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে খুঁজতে থাকবে এবং তার অত্যাচার মোতাবেক তার পুণ্য নিতে থাকবে। পুণ্য নেয়ার পরেও যদি অত্যাচার শেষ না হয় তবে নিহত ব্যক্তির পাপ হত্যাকারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। তাহলে হতে পারে যে, নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপই কতক হত্যাকারীর মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কেননা, অত্যাচারের এভাবে বদলা নেয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, হত্যা সবচেয়ে বড় অত্যাচার এবং অতি জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা'আলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ বাক্যের বিশুদ্ধতম অর্থ হচ্ছে- হে কাবীল! আমি চাই যে, তুমি নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সমস্তই নিজের উপর নিয়ে নেবে। তোমার অন্যান্য পাপের সাথে এই একটি পাপও বেড়ে যাক। আমার পাপও তোমার ঘাড়ে চেপে বসুক-এ বাক্যের ভাবার্থ কখনও এটা হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ প্রত্যেক আমলকারীকে তার আমলের প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা কিরূপে সম্ভব হবে যে, নিহত ব্যক্তির সারা জীবনের পাপ হত্যাকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়া হবে? এখন বাকী থাকছে এই কথা যে, হাবীল তার ভাইকে এ কথা কেন বললেন? এর উত্তর এই যে, তিনি শেষবারের মত তাকে উপদেশ দেন এবং ভয় প্রদর্শন করেন যে, সে যেন এ কাজ থেকে বিরত থাকে, নতুবা সে পাপী হয়ে জাহান্নামবাসী হয়ে যাবে। কারণ, তিনি তো তার মোকাবিলা করছেন না। সুতরাং সমস্ত পাপের বোঝা তার উপরই পড়বে এবং সেই অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে। আর অত্যাচারীদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (এই উপদেশ সত্ত্বেও) তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃহত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলো। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেললল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ শয়তান কাবীলকে তার ভাই এর হত্যার প্রতি উত্তেজিত করলো এবং সে স্বীয় নাফসে আম্মারার অনুসরণ করলো আর লোহা দ্বারা তাকে মেরে ফেললো। একটি বর্ণনায় আছে যে, হাবীল স্বীয় পশুপাল নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিলেন, আর এদিকে কাবীল তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়ে পৌছে যায়। সে একটি ভারী পাথর উঠিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় মেরে দেয়। ঐ সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল বা তাঁর গলা কেটে নিয়েছিল। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঐ শয়তানের হত্যা করার নিয়ম জানা ছিল না, তাই সে তাঁর গলা মোচড়াচ্ছিল। অতঃপর সে একটা জন্তুকে ধরে তার মাথাটি একটি পাথরের উপর রাখলো। তারপর একটি পাথর সজোরে তার মাথায় মেরে দিলো। তৎক্ষণাৎ জন্তুটি মারা গেল। এই দেখে সে তার ভাইয়ের সাথেও ঐ ব্যবহার করলো। এও বর্ণিত আছে যে, যেহেতু তখন পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠে কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, ফলে কাবীল কখনও বা তার ভাইয়ের চক্ষুগুলো বন্ধ করতো এবং কখনও বা থাপ্পড় ঘুষি মারতো। এই দেখে অভিশপ্ত ইবলীস তার কাছে এসে বললো, “একটা পাথর নিয়ে এসো এবং তা দিয়ে তার মাথা থেতলিয়ে দাও।” সে তাই করলো। তখন সেই মালউন দৌড়িয়ে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হত্যা কিরূপে হয়?" সে উত্তরে বললোঃ “এখন সে না পানাহার করতে পারবে, কথা বলতে এবং না নড়াচড়া করতে পারবে।” তিনি তখন বললেনঃ “সম্ভবতঃ তার মৃত্যু হয়ে গেছে।” সে বললোঃ “হ্যা, এটাই মৃত্যু। তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইতিমধ্যে হ্যরত আদম (আঃ) এসে পড়লেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” কিন্তু শোকে দুঃখে তার মুখে কোন কথা সরলো না। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমি তোমার কন্যাগণসহ হা-হুতাশ করতে থাক। আর আমিও আমার পুত্রগণ এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কাবীল ক্ষগ্রিস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোকেই নষ্ট করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তার খুনের বোঝা হযরত আদম (আঃ)-এর ঐ সন্তানের উপরই পতিত হয়। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে রক্ত বইয়েছিল।" মুজাহিদ (রহঃ)-এর উক্তি এই যে, ঐ হত্যাকারীর একটি পায়ের গোছাকে উরুর সাথে লটকানো হয়েছে এবং তার মুখটা সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর ঘুরার সাথে সাথে সেও ঘুরতে রয়েছে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে আগুন ও বরফের গর্তে থাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি সে-ই। ভূ-পৃষ্ঠে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্যে সে-ই দায়ী। ইমাম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অন্যায় খুনের বোঝা তার উপর ও শয়তানের উপর পড়ে থাকে।তাঁকে হত্যা করে দেয়ার পর কি করতে হবে, মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হবে সে ব্যাপারে তার কিছুই জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা'আলা দু'টি কাক প্রেরণ করলেন যারা একে অপরের ভাই ছিল। তারা তার সামনে লড়তে লাগলো। অবশেষে একে অপরকে মেরে ফেললো। তারপর জীবিত কাকটি একটি গর্ত খনন করলো এবং মত কাকটিকে ওর মধ্যে রেখে দিয়ে মাটি চাপিয়ে দিলো। এ দেখে কাবীলের বুদ্ধি জেগে গেল এবং সে-ও ঐরূপ করলো। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নিজে নিজেই মৃত একটি কাককে অপর একটি কাক এভাবে গর্ত খনন করে দাফন করে দিয়েছিল। এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল এক বছর পর্যন্ত তার মৃত ভাইয়ের মৃতদেহ স্বীয় স্কন্ধে বহন করে ফিরছিল। অতঃপর কাকটিকে ঐরূপ করতে দেখে সে নিজেকে ভৎসনা করে বলতে লাগলো-“হায়! আমি এ কাকটির মত কাজও করতে পারলাম না।” একথাও বর্ণিত আছে যে, সে ভাইকে মেরে ফেলার পর খুবই অনুতপ্ত হয়েছিল এবং মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে পড়েছিল। আর তা এ জন্যও ছিল যে, ভূ-পৃষ্ঠে প্রথম মৃত ও প্রথম হত্যা ওটাই ছিল। তাওরাত ধারীরা বলে যে, যখন কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করলো তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে কাবীল! তোমার ভাই হাবীল কোথায়? সে উত্তরে বললোঃ আমি জানি না। আমি তার প্রহরী ছিলাম না। আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “এখন তোমার ভাইয়ের রক্ত যমীন হতে আমাকে ডাক দিচ্ছে। যে যমীনের মুখ খুলে দিয়ে তুমি ওর মুখে তোমার নিস্পাপ ভাইয়ের রক্ত ঢেলে দিয়েছ সেই ভূমি তোমাকে লানত করছে। তুমি এ যমীনে যে চাষাবাদ করবে তাতে তুমি কোন ফসল পাবে না যে পর্যন্ত না তুমি চিন্তান্বিত হবে। সে তখন ঐ কাজই করলো।অতঃপর সে খুব লজ্জিত হলো এবং অনুতাপ করতে থাকলো! ওটা যেন শাস্তির উপরে শাস্তি ছিল। এ কাহিনীতে মুফাসৃসিরগণ এ ব্যাপারে তো একমত যে, এ দু’জন হযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত পুত্র ছিল এবং কুরআন কারীমের শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। আর হাদীসেও রয়েছে যে, যমীনের বুকে যেসব হত্যাকাণ্ড চলছে তার এক অংশের বোঝা ও পাপ হযরত আদম (আঃ)-এর এ প্রথম পুত্রের উপর পড়েছে। কেননা সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরবানী সর্বপ্রথম তাদের মধ্যেই চালু হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আদম (আঃ) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। তাছাড়া এর ইসনাদও সঠিক নয়। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এ ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যেন এর মধ্য থেকে ভালটি গ্রহণ করে এবং মন্দটি পরিত্যাগ করে। (ইবনে জারীর (রঃ) হাসান বসরী (রঃ) হতে এটা মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) এ হাদীসটি মুরসাল। কথিত আছে যে, এ আকস্মিক দুর্ঘটনায় হযরত আদম (আঃ) শশাকে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং এক বছর ধরে তার মুখে হাসি ফুটেনি। অবশেষে ফেরেশতাগণ তার দুঃখ দূর হওয়ার ও মুখে হাসি আসার জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করেন। হযরত আদম (আঃ) ঐ সময় শোকে ও দুঃখে এ কথাও বলেছিলেন যে, শহর ও শহরের সবকিছু বদলে গেছে, পৃথিবীর রং -এর পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর চেহারা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সব জিনিসেরই রং ও স্বাদ বিদায় নিয়েছে এবং আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর সৌন্দর্য লোপ পেয়েছে। জবাবে বলা হলো যে, ঐ মৃত ব্যক্তির সাথে এ জীবিত ব্যক্তিও যেন নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল ওর বোঝা তার উপর এসে গেছে। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, কাবীলকে তখনই কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে, তার পায়ের গোছাকে তার উরুর সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডল সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর সাথে সাথেই সে ঘুরতে ছিল। অর্থাৎ সূর্য যেদিকেই থাকতো সেদিকেই তার মুখখানা ঘুরে যেতো। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো গুনাহ এরই উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাড়াতাড়ি করে ও শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করবেন এবং পরকালেও তার জন্যে ভীষণ শাস্তি জমা রাখবেন, ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে সমসাময়িক শাসনকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া!” কাবীলের মধ্যে এ দু'টো পাপই জমা হয়েছিল। (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।' (২:১৫৬)

আল-মায়িদা 5:30

২৭-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ কাহিনীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, কিভাবে আদম (আঃ)-এর দুই সহোদর পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং একজন আল্লাহর ভয়ে অত্যাচারিত অবস্থায় মারা যায় ও জান্নাতে স্বীয় বাসস্থান বানিয়ে নেয়; আর অপরজন তার প্রতি অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে বিনা কারণে তাকে হত্যা করে ফেলে এবং উভয় জগতে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! আহলে কিতাবদেরকে তুমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু'টি সন্তানের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও।' তাদের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। বর্ণিত আছে, ঐ সময়টা ছিল দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা। তাই সেই সময় একই উদরে দুটো সন্তান জন্মগ্রহণ করতো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তখন একটি গর্ভের ছেলের সাথে আর একটি গর্ভের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। সুতরাং কাবীল নিজের যমজ বোনকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা হলো যে, তারা উভয়ে যেন আল্লাহর নামে কিছু কুরবানী করে। যার কুরবানী ককূল হবে, মেয়েটির সাথে তারই বিয়ে দেয়া হবে। হাবীলের কুরবানী ককূল হয়, যার বর্ণনা কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলোতে রয়েছে। মুফাসসিরদের উক্তিগুলো নিম্নে দেয়া হলোঃহযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত সন্তানদের বিয়ের নিয়ম যা উপরে উল্লিখিত হলো তা বর্ণনা করার পর বর্ণিত আছে যে, বড় ভাই কাবীল কৃষি কাজ করতো এবং ছোট ভাই হাবীল ছাগলের মালিক ছিল। হাবীলের বোনের তুলনায় কাবীলের বোনটি ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্যে যখন হাবীলের প্রস্তাব যায়। তখন কাবীল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চায়। এতে হযরত আদম (আঃ) তাকে বাধা প্রদান করেন। তখন উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো যে, যার কুরবানী ককূল হবে সেই তাকে বিয়ে করবে। হযরত আদম (আঃ) সেই সময় মক্কাভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন যে, দেখা যাক কি ঘটে? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বললেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমার যে ঘরটি রয়েছে তা তুমি চেনো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” আল্লাহ বললেনঃ “ওটা মক্কায় রয়েছে। তুমি সেখানে চলে যাও।” হযরত আদম (আঃ) আকাশকে বললেনঃ “তুমি কি আমার সন্তানদেরকে হিফাযত করবে?" আকাশ তা অস্বীকার করলো। তখন যমীনকে ঐ কথা বললেন। যমীনও অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড়গুলোকে বললেন। তারাও অস্বীকার করলো। তারপর তিনি কাবীলকে ঐ কথা বললে সে বললোঃ “হাঁ, আমি রক্ষক হয়ে গেলাম। আপনি ফিরে এসে দেখে নেবেন এবং খুশী হবেন।” এখন হাবীল একটি মোটাতাজা মেষ আল্লাহর নামে যবেহ করলেন এবং বড় কাবীল স্বীয় ভূমির শস্যের একটা অংশ আল্লাহর নামে বের করলো। আগুন এসে হাবীলের নযর তত জ্বালিয়ে ফেললো, যা ছিল সে যুগে কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন, কিন্তু কাবীলের নযর গৃহীত হলো না। তার ভূমির শস্য যা ছিল তা-ই থাকলো। সে ওটাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর শিষ হতে ভালভাল দানাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। এখন কাবীলের তার বোনকে বিয়ে করার আশার গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছিল। তাই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। তখন হাবীল বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই ককূল করে থাকেন। এতে আমার অপরাধ কি আছে?” একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এ মেষটিকেই জান্নাতে পালন করা হয়েছে এবং এটা ঐ মেষ যাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের বিনিময়ে যবেহ করেছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হাবীল স্বীয় জানোয়ারগুলির মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় জন্তু আল্লাহর নামে খুশী মনে কুরবানী করেছিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল স্বীয় কৃষিভূমির অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের শস্য আল্লাহর নামে বের করেছিল, সেটাও আবার খুশী মনে বের করেনি। হাবীলের দৈহিক শক্তিও কাবীল অপেক্ষা বেশী ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে স্বীয় ভ্রাতা কাবীলের অত্যাচার ও বাড়বাড়ি নীরবে সহ্য করলেন এবং ভাইয়ের উপর হাত উঠালেন না। বড় ভাইয়ের কুরবানী যখন ককূল হলো না এবং হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কথা বললেন তখন সে তাঁকে বললোঃ “আপনি হাবীলকে ভালবাসেন বলে তার কুরবানী কবূল করবার জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, ফলে তার কুরবানী ককূল হয়েছে।” এখন সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলার দৃঢ় সংকল্প করে বসলো। সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন ঘটনাক্রমে হাবীলের বাড়ী আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত আদম (আঃ) তাকে ডেকে আনার জন্যে কাবীলকে প্রেরণ করেন। সে তখন গুপ্তভাবে একটা ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পথেই দু’ভাইয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন কাবীল তাকে বলেঃ “আমি তো তোমাকে মেরে ফেলবো। কেননা, তোমার কুরবানী ককূল হয়েছে, আর আমার কুরবানী ককূল হয়নি।” তখন হাবীল বললেনঃ “আমি উত্তম ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়েছি, আর তুমি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস তার নামে কুরবানী দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবূল করে থাকেন। এতে সে আরও বিগড়ে গেল এবং পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। হাবীল বলতেই থাকলেনঃ “তুমি আল্লাহকে কি উত্তর দেবে? আল্লাহর কাছে তোমার এ অত্যাচারের প্রতিশোধ জঘন্যভাবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা করো না।” কিন্তু সেই নিষ্ঠুর কাবীল নিজের ভাই হাবীলকে মেরে ফেললো।কাবীল তার যমজ বোনকেই বিয়ে করার আরও একটা কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেঃ “আমরা দু’জন জান্নাতে জন্মগ্রহণ করেছি, আর এরা দু'জন (হাবীল ও তার যমজ বোন) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং আমার যমজ বোনকে বিয়ে করার হক আমারই রয়েছে।” এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল গম বের করেছিল এবং হাবীল গরু কুরবানী করেছিলেন। তখন তো কোন মিস্কীন ছিল না যে, তাকে সাদকা দেয়া যাবে। তাই এ প্রথা চালু ছিল যে, যে সাদকা দেয়া হতো, আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এটা ছিল সাদকা। কবুল হওয়ার নিদর্শন। ছোট ভাই এ মর্যাদা লাভ করেছিলেন বলে বড় ভাই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হত্যা করার সংকল্প করে বসে। তারা যে বিয়ের মতানৈক্য দূর করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিল তা নয় বরং এমনিই তারা তা করেছিল। কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, বড় ভাই কাবীলের ছোট ভাই হাবীলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তার কুরবানী না হওয়া, অন্য আর কোন কারণ ছিল না। আর একটি বর্ণনায় উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর বিপরীত কথা রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, কাবীল তার যে শস্য আল্লাহর নামে নযর দিয়েছিল তা ককূল হয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, এতে বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ঠিক নেই এবং এটা প্রসিদ্ধ বিষয়ের উল্টোও বটে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।“আল্লাহ মুত্তাকীদের আমলই কবুল করে থাকেন।” হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত থাকবে এমন সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “মুত্তাকীরা কোথায়?” তখন মুত্তাকীরা আল্লাহর কুদরতী ডানার নীচে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাদের থেকে কোনই পর্দাই করবেন না, বরং প্রত্যক্ষভাবে তাদেরকে দেখা দেবেন। হাদীসটিব বর্ণনাকারী আবু আফীফকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “মুত্তাকী কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুত্তাকী তারাই যারা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকে এবং খাটি অন্তরে আল্লাহরই ইবাদত করে।” অতঃপর এসব লোক জান্নাতে চলে যাবে। হাবীল বললেনঃ “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে হস্ত প্রসারিত কর তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যে তোমার দিকে কখনও আমার হাত বাড়াবো না। আমি তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” শক্তিতে তো তিনি ভাই অপেক্ষা উর্ধ্বে ছিলেন। তথাপি সততা, বিনয়, নম্রতা এবং তাকওয়ার কারণেই তিনি এ কথা বললেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে (একে অপরকে হত্যা করার জন্য) তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন :“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি অপরাধী হবে কেন?” তিনি উত্তরে বললেন :“কারণ এই যে, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লোভ করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) বাশার ইবন সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন বিদ্রোহীগণ উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী অবরোধ করেছিলেন তখন সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রাঃ) বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই হাঙ্গামা লেগে যাবে, সেই সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে এবং চলমান ব্যক্তি দৌড়ালু অপেক্ষা উত্তম হবে। কোন একজন জিজ্ঞেস করলেন : “যদি কোন লোক আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করে (তাহলে আমি কি করব)?” তিনি উত্তরে বললেন। সে সময় তুমি আদমের পুত্রের মত হয়ে যাও।' একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন। আইউব সুখইয়ানী বলেন যে, সর্বপ্রথম যিনি এ আয়াতের উপর আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান ইবন আফফান (রাঃ)। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি জন্তুর উপর সওয়ার ছিলেন এবং তার পিছনে বসেছিলেন হযরত আবু যার (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)। আচ্ছা বলতো, যখন মানুষ এমন দারিদ্রের সম্মুখীন হবে যে, তারা (ক্ষুধার কারণে) বাড়ী হতে মসজিদ পর্যন্তও যেতে পারবে না, তখন তুমি কি করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যা নির্দেশ হবে তা-ই করবো।” তিনি বললেনঃ “যখন পরস্পরের মধ্যে খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে, এমনকি মরুভূমির পাথরও রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তখন কি করবে?" (হযরত আবু যার রাঃ বলেন) আমি ঐ উত্তরই দিলাম। তিনি বললেনঃ “বাড়ীতেই অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে।” আমি বললাম, আমি যদি তাতে অংশগ্রহণ না করি তবুও কি? তিনি বললেনঃ “তুমি যাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেই চলে যাবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি অস্ত্র ধারণ করবো না কেন? তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমিও তাদের মধ্যেই শামিল হয়ে গেলে। বরং যদি কারও তরবারীর ঝলক তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে তবে তখনও তুমি তোমার মুখের উপর কাপড় দিয়ে দেবে যাতে সে তোমার ও তার নিজের পাপগুলো নিয়ে যায়।” হযরত রাবঈ (রঃ) বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর জানাযায় হাযির ছিলাম। একজন লোক বললেনঃ আমি এঁর (হযরত হুযাইফার) মুখে শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শোনা হাদীসগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেনঃ “তোমরা যদি পরস্পর লড়াই কর তবে আমি আমার সবচেয়ে দূরের বাড়ীতে চলে যাবো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়বো। যদি সেখানেও কেউ ঢুকে পড়ে তবে আমি তাকে বলে দেবো, তুমি তোমার ও আমার পাপরাশি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে যিনি উত্তম ছিলেন তার মতই হয়ে যাবো।”“আমি চাই যে, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ সমস্তই নিজের মাথায় উঠিয়ে নাও” -এ কথা হাবীল কাবীলকে বলেছিলেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে কাবীল! তুমি ইতিপূর্বে যে পাপ করেছে তা এবং এখন আমাকে হত্যা করার পাপ, এ সমস্তই নিয়ে তুমি কিয়ামতের দিন উঠবে এটাই আমি চাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, আমার নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সবগুলোই তুমি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি (ইবনে কাসীর) বলি যে, সম্ভবতঃ মুজাহিদ (রহঃ)-এর এ দ্বিতীয় উক্তিটি সাব্যস্ত নয়। এর উপর ভিত্তি করেই কতক লোক বলেন যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ নিজের মাথায় বহন করবে। আর এ অর্থের একটি হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই। হাফিয আবু বকর আল বায (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ "বিনা কারণে হত্যা (নিহত ব্যক্তির) সমস্ত পাপ মিটিয়ে দেয়।" এ হাদীসটি উপরে বর্ণিত হাদীসের অর্থে না হলেও এটাও বিশুদ্ধ হাদীস নয়। আর এ রিওয়ায়াতের ভাবার্থ এটাও হবে যে, হত্যার কষ্টের কারণে আল্লাহ নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করে থাকেন। এখন ঐ পাপ কি হত্যাকারীর উপর এসে যাবে? এ কথাটি সাব্যস্ত নয়। তবে কতক হত্যাকারী ঐরূপও হতে পারে। কিয়ামতের মাঠে নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে খুঁজতে থাকবে এবং তার অত্যাচার মোতাবেক তার পুণ্য নিতে থাকবে। পুণ্য নেয়ার পরেও যদি অত্যাচার শেষ না হয় তবে নিহত ব্যক্তির পাপ হত্যাকারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। তাহলে হতে পারে যে, নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপই কতক হত্যাকারীর মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কেননা, অত্যাচারের এভাবে বদলা নেয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, হত্যা সবচেয়ে বড় অত্যাচার এবং অতি জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা'আলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ বাক্যের বিশুদ্ধতম অর্থ হচ্ছে- হে কাবীল! আমি চাই যে, তুমি নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সমস্তই নিজের উপর নিয়ে নেবে। তোমার অন্যান্য পাপের সাথে এই একটি পাপও বেড়ে যাক। আমার পাপও তোমার ঘাড়ে চেপে বসুক-এ বাক্যের ভাবার্থ কখনও এটা হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ প্রত্যেক আমলকারীকে তার আমলের প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা কিরূপে সম্ভব হবে যে, নিহত ব্যক্তির সারা জীবনের পাপ হত্যাকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়া হবে? এখন বাকী থাকছে এই কথা যে, হাবীল তার ভাইকে এ কথা কেন বললেন? এর উত্তর এই যে, তিনি শেষবারের মত তাকে উপদেশ দেন এবং ভয় প্রদর্শন করেন যে, সে যেন এ কাজ থেকে বিরত থাকে, নতুবা সে পাপী হয়ে জাহান্নামবাসী হয়ে যাবে। কারণ, তিনি তো তার মোকাবিলা করছেন না। সুতরাং সমস্ত পাপের বোঝা তার উপরই পড়বে এবং সেই অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে। আর অত্যাচারীদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (এই উপদেশ সত্ত্বেও) তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃহত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলো। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেললল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ শয়তান কাবীলকে তার ভাই এর হত্যার প্রতি উত্তেজিত করলো এবং সে স্বীয় নাফসে আম্মারার অনুসরণ করলো আর লোহা দ্বারা তাকে মেরে ফেললো। একটি বর্ণনায় আছে যে, হাবীল স্বীয় পশুপাল নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিলেন, আর এদিকে কাবীল তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়ে পৌছে যায়। সে একটি ভারী পাথর উঠিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় মেরে দেয়। ঐ সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল বা তাঁর গলা কেটে নিয়েছিল। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঐ শয়তানের হত্যা করার নিয়ম জানা ছিল না, তাই সে তাঁর গলা মোচড়াচ্ছিল। অতঃপর সে একটা জন্তুকে ধরে তার মাথাটি একটি পাথরের উপর রাখলো। তারপর একটি পাথর সজোরে তার মাথায় মেরে দিলো। তৎক্ষণাৎ জন্তুটি মারা গেল। এই দেখে সে তার ভাইয়ের সাথেও ঐ ব্যবহার করলো। এও বর্ণিত আছে যে, যেহেতু তখন পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠে কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, ফলে কাবীল কখনও বা তার ভাইয়ের চক্ষুগুলো বন্ধ করতো এবং কখনও বা থাপ্পড় ঘুষি মারতো। এই দেখে অভিশপ্ত ইবলীস তার কাছে এসে বললো, “একটা পাথর নিয়ে এসো এবং তা দিয়ে তার মাথা থেতলিয়ে দাও।” সে তাই করলো। তখন সেই মালউন দৌড়িয়ে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হত্যা কিরূপে হয়?" সে উত্তরে বললোঃ “এখন সে না পানাহার করতে পারবে, কথা বলতে এবং না নড়াচড়া করতে পারবে।” তিনি তখন বললেনঃ “সম্ভবতঃ তার মৃত্যু হয়ে গেছে।” সে বললোঃ “হ্যা, এটাই মৃত্যু। তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইতিমধ্যে হ্যরত আদম (আঃ) এসে পড়লেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” কিন্তু শোকে দুঃখে তার মুখে কোন কথা সরলো না। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমি তোমার কন্যাগণসহ হা-হুতাশ করতে থাক। আর আমিও আমার পুত্রগণ এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কাবীল ক্ষগ্রিস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোকেই নষ্ট করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তার খুনের বোঝা হযরত আদম (আঃ)-এর ঐ সন্তানের উপরই পতিত হয়। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে রক্ত বইয়েছিল।" মুজাহিদ (রহঃ)-এর উক্তি এই যে, ঐ হত্যাকারীর একটি পায়ের গোছাকে উরুর সাথে লটকানো হয়েছে এবং তার মুখটা সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর ঘুরার সাথে সাথে সেও ঘুরতে রয়েছে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে আগুন ও বরফের গর্তে থাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি সে-ই। ভূ-পৃষ্ঠে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্যে সে-ই দায়ী। ইমাম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অন্যায় খুনের বোঝা তার উপর ও শয়তানের উপর পড়ে থাকে।তাঁকে হত্যা করে দেয়ার পর কি করতে হবে, মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হবে সে ব্যাপারে তার কিছুই জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা'আলা দু'টি কাক প্রেরণ করলেন যারা একে অপরের ভাই ছিল। তারা তার সামনে লড়তে লাগলো। অবশেষে একে অপরকে মেরে ফেললো। তারপর জীবিত কাকটি একটি গর্ত খনন করলো এবং মত কাকটিকে ওর মধ্যে রেখে দিয়ে মাটি চাপিয়ে দিলো। এ দেখে কাবীলের বুদ্ধি জেগে গেল এবং সে-ও ঐরূপ করলো। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নিজে নিজেই মৃত একটি কাককে অপর একটি কাক এভাবে গর্ত খনন করে দাফন করে দিয়েছিল। এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল এক বছর পর্যন্ত তার মৃত ভাইয়ের মৃতদেহ স্বীয় স্কন্ধে বহন করে ফিরছিল। অতঃপর কাকটিকে ঐরূপ করতে দেখে সে নিজেকে ভৎসনা করে বলতে লাগলো-“হায়! আমি এ কাকটির মত কাজও করতে পারলাম না।” একথাও বর্ণিত আছে যে, সে ভাইকে মেরে ফেলার পর খুবই অনুতপ্ত হয়েছিল এবং মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে পড়েছিল। আর তা এ জন্যও ছিল যে, ভূ-পৃষ্ঠে প্রথম মৃত ও প্রথম হত্যা ওটাই ছিল। তাওরাত ধারীরা বলে যে, যখন কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করলো তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে কাবীল! তোমার ভাই হাবীল কোথায়? সে উত্তরে বললোঃ আমি জানি না। আমি তার প্রহরী ছিলাম না। আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “এখন তোমার ভাইয়ের রক্ত যমীন হতে আমাকে ডাক দিচ্ছে। যে যমীনের মুখ খুলে দিয়ে তুমি ওর মুখে তোমার নিস্পাপ ভাইয়ের রক্ত ঢেলে দিয়েছ সেই ভূমি তোমাকে লানত করছে। তুমি এ যমীনে যে চাষাবাদ করবে তাতে তুমি কোন ফসল পাবে না যে পর্যন্ত না তুমি চিন্তান্বিত হবে। সে তখন ঐ কাজই করলো।অতঃপর সে খুব লজ্জিত হলো এবং অনুতাপ করতে থাকলো! ওটা যেন শাস্তির উপরে শাস্তি ছিল। এ কাহিনীতে মুফাসৃসিরগণ এ ব্যাপারে তো একমত যে, এ দু’জন হযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত পুত্র ছিল এবং কুরআন কারীমের শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। আর হাদীসেও রয়েছে যে, যমীনের বুকে যেসব হত্যাকাণ্ড চলছে তার এক অংশের বোঝা ও পাপ হযরত আদম (আঃ)-এর এ প্রথম পুত্রের উপর পড়েছে। কেননা সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরবানী সর্বপ্রথম তাদের মধ্যেই চালু হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আদম (আঃ) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। তাছাড়া এর ইসনাদও সঠিক নয়। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এ ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যেন এর মধ্য থেকে ভালটি গ্রহণ করে এবং মন্দটি পরিত্যাগ করে। (ইবনে জারীর (রঃ) হাসান বসরী (রঃ) হতে এটা মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) এ হাদীসটি মুরসাল। কথিত আছে যে, এ আকস্মিক দুর্ঘটনায় হযরত আদম (আঃ) শশাকে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং এক বছর ধরে তার মুখে হাসি ফুটেনি। অবশেষে ফেরেশতাগণ তার দুঃখ দূর হওয়ার ও মুখে হাসি আসার জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করেন। হযরত আদম (আঃ) ঐ সময় শোকে ও দুঃখে এ কথাও বলেছিলেন যে, শহর ও শহরের সবকিছু বদলে গেছে, পৃথিবীর রং -এর পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর চেহারা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সব জিনিসেরই রং ও স্বাদ বিদায় নিয়েছে এবং আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর সৌন্দর্য লোপ পেয়েছে। জবাবে বলা হলো যে, ঐ মৃত ব্যক্তির সাথে এ জীবিত ব্যক্তিও যেন নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল ওর বোঝা তার উপর এসে গেছে। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, কাবীলকে তখনই কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে, তার পায়ের গোছাকে তার উরুর সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডল সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর সাথে সাথেই সে ঘুরতে ছিল। অর্থাৎ সূর্য যেদিকেই থাকতো সেদিকেই তার মুখখানা ঘুরে যেতো। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো গুনাহ এরই উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাড়াতাড়ি করে ও শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করবেন এবং পরকালেও তার জন্যে ভীষণ শাস্তি জমা রাখবেন, ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে সমসাময়িক শাসনকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া!” কাবীলের মধ্যে এ দু'টো পাপই জমা হয়েছিল। (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।' (২:১৫৬)

আল-মায়িদা 5:31

২৭-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ কাহিনীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, কিভাবে আদম (আঃ)-এর দুই সহোদর পুত্রের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং একজন আল্লাহর ভয়ে অত্যাচারিত অবস্থায় মারা যায় ও জান্নাতে স্বীয় বাসস্থান বানিয়ে নেয়; আর অপরজন তার প্রতি অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে বিনা কারণে তাকে হত্যা করে ফেলে এবং উভয় জগতে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! আহলে কিতাবদেরকে তুমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু'টি সন্তানের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও।' তাদের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। বর্ণিত আছে, ঐ সময়টা ছিল দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা। তাই সেই সময় একই উদরে দুটো সন্তান জন্মগ্রহণ করতো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তখন একটি গর্ভের ছেলের সাথে আর একটি গর্ভের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। সুতরাং কাবীল নিজের যমজ বোনকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা হলো যে, তারা উভয়ে যেন আল্লাহর নামে কিছু কুরবানী করে। যার কুরবানী ককূল হবে, মেয়েটির সাথে তারই বিয়ে দেয়া হবে। হাবীলের কুরবানী ককূল হয়, যার বর্ণনা কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলোতে রয়েছে। মুফাসসিরদের উক্তিগুলো নিম্নে দেয়া হলোঃহযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত সন্তানদের বিয়ের নিয়ম যা উপরে উল্লিখিত হলো তা বর্ণনা করার পর বর্ণিত আছে যে, বড় ভাই কাবীল কৃষি কাজ করতো এবং ছোট ভাই হাবীল ছাগলের মালিক ছিল। হাবীলের বোনের তুলনায় কাবীলের বোনটি ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্যে যখন হাবীলের প্রস্তাব যায়। তখন কাবীল তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চায়। এতে হযরত আদম (আঃ) তাকে বাধা প্রদান করেন। তখন উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো যে, যার কুরবানী ককূল হবে সেই তাকে বিয়ে করবে। হযরত আদম (আঃ) সেই সময় মক্কাভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন যে, দেখা যাক কি ঘটে? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বললেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমার যে ঘরটি রয়েছে তা তুমি চেনো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” আল্লাহ বললেনঃ “ওটা মক্কায় রয়েছে। তুমি সেখানে চলে যাও।” হযরত আদম (আঃ) আকাশকে বললেনঃ “তুমি কি আমার সন্তানদেরকে হিফাযত করবে?" আকাশ তা অস্বীকার করলো। তখন যমীনকে ঐ কথা বললেন। যমীনও অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড়গুলোকে বললেন। তারাও অস্বীকার করলো। তারপর তিনি কাবীলকে ঐ কথা বললে সে বললোঃ “হাঁ, আমি রক্ষক হয়ে গেলাম। আপনি ফিরে এসে দেখে নেবেন এবং খুশী হবেন।” এখন হাবীল একটি মোটাতাজা মেষ আল্লাহর নামে যবেহ করলেন এবং বড় কাবীল স্বীয় ভূমির শস্যের একটা অংশ আল্লাহর নামে বের করলো। আগুন এসে হাবীলের নযর তত জ্বালিয়ে ফেললো, যা ছিল সে যুগে কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন, কিন্তু কাবীলের নযর গৃহীত হলো না। তার ভূমির শস্য যা ছিল তা-ই থাকলো। সে ওটাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর শিষ হতে ভালভাল দানাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। এখন কাবীলের তার বোনকে বিয়ে করার আশার গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছিল। তাই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। তখন হাবীল বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই ককূল করে থাকেন। এতে আমার অপরাধ কি আছে?” একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এ মেষটিকেই জান্নাতে পালন করা হয়েছে এবং এটা ঐ মেষ যাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের বিনিময়ে যবেহ করেছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হাবীল স্বীয় জানোয়ারগুলির মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় জন্তু আল্লাহর নামে খুশী মনে কুরবানী করেছিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল স্বীয় কৃষিভূমির অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের শস্য আল্লাহর নামে বের করেছিল, সেটাও আবার খুশী মনে বের করেনি। হাবীলের দৈহিক শক্তিও কাবীল অপেক্ষা বেশী ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে স্বীয় ভ্রাতা কাবীলের অত্যাচার ও বাড়বাড়ি নীরবে সহ্য করলেন এবং ভাইয়ের উপর হাত উঠালেন না। বড় ভাইয়ের কুরবানী যখন ককূল হলো না এবং হযরত আদম (আঃ) তাকে এ কথা বললেন তখন সে তাঁকে বললোঃ “আপনি হাবীলকে ভালবাসেন বলে তার কুরবানী কবূল করবার জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, ফলে তার কুরবানী ককূল হয়েছে।” এখন সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলার দৃঢ় সংকল্প করে বসলো। সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন ঘটনাক্রমে হাবীলের বাড়ী আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত আদম (আঃ) তাকে ডেকে আনার জন্যে কাবীলকে প্রেরণ করেন। সে তখন গুপ্তভাবে একটা ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পথেই দু’ভাইয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন কাবীল তাকে বলেঃ “আমি তো তোমাকে মেরে ফেলবো। কেননা, তোমার কুরবানী ককূল হয়েছে, আর আমার কুরবানী ককূল হয়নি।” তখন হাবীল বললেনঃ “আমি উত্তম ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়েছি, আর তুমি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস তার নামে কুরবানী দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবূল করে থাকেন। এতে সে আরও বিগড়ে গেল এবং পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। হাবীল বলতেই থাকলেনঃ “তুমি আল্লাহকে কি উত্তর দেবে? আল্লাহর কাছে তোমার এ অত্যাচারের প্রতিশোধ জঘন্যভাবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা করো না।” কিন্তু সেই নিষ্ঠুর কাবীল নিজের ভাই হাবীলকে মেরে ফেললো।কাবীল তার যমজ বোনকেই বিয়ে করার আরও একটা কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেঃ “আমরা দু’জন জান্নাতে জন্মগ্রহণ করেছি, আর এরা দু'জন (হাবীল ও তার যমজ বোন) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং আমার যমজ বোনকে বিয়ে করার হক আমারই রয়েছে।” এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল গম বের করেছিল এবং হাবীল গরু কুরবানী করেছিলেন। তখন তো কোন মিস্কীন ছিল না যে, তাকে সাদকা দেয়া যাবে। তাই এ প্রথা চালু ছিল যে, যে সাদকা দেয়া হতো, আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এটা ছিল সাদকা। কবুল হওয়ার নিদর্শন। ছোট ভাই এ মর্যাদা লাভ করেছিলেন বলে বড় ভাই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হত্যা করার সংকল্প করে বসে। তারা যে বিয়ের মতানৈক্য দূর করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিল তা নয় বরং এমনিই তারা তা করেছিল। কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, বড় ভাই কাবীলের ছোট ভাই হাবীলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তার কুরবানী না হওয়া, অন্য আর কোন কারণ ছিল না। আর একটি বর্ণনায় উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর বিপরীত কথা রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, কাবীল তার যে শস্য আল্লাহর নামে নযর দিয়েছিল তা ককূল হয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, এতে বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি ঠিক নেই এবং এটা প্রসিদ্ধ বিষয়ের উল্টোও বটে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।“আল্লাহ মুত্তাকীদের আমলই কবুল করে থাকেন।” হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত থাকবে এমন সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ “মুত্তাকীরা কোথায়?” তখন মুত্তাকীরা আল্লাহর কুদরতী ডানার নীচে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাদের থেকে কোনই পর্দাই করবেন না, বরং প্রত্যক্ষভাবে তাদেরকে দেখা দেবেন। হাদীসটিব বর্ণনাকারী আবু আফীফকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “মুত্তাকী কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুত্তাকী তারাই যারা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকে এবং খাটি অন্তরে আল্লাহরই ইবাদত করে।” অতঃপর এসব লোক জান্নাতে চলে যাবে। হাবীল বললেনঃ “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে হস্ত প্রসারিত কর তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যে তোমার দিকে কখনও আমার হাত বাড়াবো না। আমি তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” শক্তিতে তো তিনি ভাই অপেক্ষা উর্ধ্বে ছিলেন। তথাপি সততা, বিনয়, নম্রতা এবং তাকওয়ার কারণেই তিনি এ কথা বললেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে (একে অপরকে হত্যা করার জন্য) তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন :“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি অপরাধী হবে কেন?” তিনি উত্তরে বললেন :“কারণ এই যে, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লোভ করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) বাশার ইবন সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন বিদ্রোহীগণ উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী অবরোধ করেছিলেন তখন সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রাঃ) বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই হাঙ্গামা লেগে যাবে, সেই সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে এবং চলমান ব্যক্তি দৌড়ালু অপেক্ষা উত্তম হবে। কোন একজন জিজ্ঞেস করলেন : “যদি কোন লোক আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করে (তাহলে আমি কি করব)?” তিনি উত্তরে বললেন। সে সময় তুমি আদমের পুত্রের মত হয়ে যাও।' একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন। আইউব সুখইয়ানী বলেন যে, সর্বপ্রথম যিনি এ আয়াতের উপর আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান ইবন আফফান (রাঃ)। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি জন্তুর উপর সওয়ার ছিলেন এবং তার পিছনে বসেছিলেন হযরত আবু যার (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)। আচ্ছা বলতো, যখন মানুষ এমন দারিদ্রের সম্মুখীন হবে যে, তারা (ক্ষুধার কারণে) বাড়ী হতে মসজিদ পর্যন্তও যেতে পারবে না, তখন তুমি কি করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যা নির্দেশ হবে তা-ই করবো।” তিনি বললেনঃ “যখন পরস্পরের মধ্যে খুনাখুনি শুরু হয়ে যাবে, এমনকি মরুভূমির পাথরও রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তখন কি করবে?" (হযরত আবু যার রাঃ বলেন) আমি ঐ উত্তরই দিলাম। তিনি বললেনঃ “বাড়ীতেই অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে।” আমি বললাম, আমি যদি তাতে অংশগ্রহণ না করি তবুও কি? তিনি বললেনঃ “তুমি যাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেই চলে যাবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি অস্ত্র ধারণ করবো না কেন? তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমিও তাদের মধ্যেই শামিল হয়ে গেলে। বরং যদি কারও তরবারীর ঝলক তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে তবে তখনও তুমি তোমার মুখের উপর কাপড় দিয়ে দেবে যাতে সে তোমার ও তার নিজের পাপগুলো নিয়ে যায়।” হযরত রাবঈ (রঃ) বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর জানাযায় হাযির ছিলাম। একজন লোক বললেনঃ আমি এঁর (হযরত হুযাইফার) মুখে শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শোনা হাদীসগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেনঃ “তোমরা যদি পরস্পর লড়াই কর তবে আমি আমার সবচেয়ে দূরের বাড়ীতে চলে যাবো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়বো। যদি সেখানেও কেউ ঢুকে পড়ে তবে আমি তাকে বলে দেবো, তুমি তোমার ও আমার পাপরাশি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি হযরত আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে যিনি উত্তম ছিলেন তার মতই হয়ে যাবো।”“আমি চাই যে, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ সমস্তই নিজের মাথায় উঠিয়ে নাও” -এ কথা হাবীল কাবীলকে বলেছিলেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে কাবীল! তুমি ইতিপূর্বে যে পাপ করেছে তা এবং এখন আমাকে হত্যা করার পাপ, এ সমস্তই নিয়ে তুমি কিয়ামতের দিন উঠবে এটাই আমি চাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, আমার নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সবগুলোই তুমি তোমার মাথায় উঠিয়ে নাও। আমি (ইবনে কাসীর) বলি যে, সম্ভবতঃ মুজাহিদ (রহঃ)-এর এ দ্বিতীয় উক্তিটি সাব্যস্ত নয়। এর উপর ভিত্তি করেই কতক লোক বলেন যে, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ নিজের মাথায় বহন করবে। আর এ অর্থের একটি হাদীসও রয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই। হাফিয আবু বকর আল বায (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ "বিনা কারণে হত্যা (নিহত ব্যক্তির) সমস্ত পাপ মিটিয়ে দেয়।" এ হাদীসটি উপরে বর্ণিত হাদীসের অর্থে না হলেও এটাও বিশুদ্ধ হাদীস নয়। আর এ রিওয়ায়াতের ভাবার্থ এটাও হবে যে, হত্যার কষ্টের কারণে আল্লাহ নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপ ক্ষমা করে থাকেন। এখন ঐ পাপ কি হত্যাকারীর উপর এসে যাবে? এ কথাটি সাব্যস্ত নয়। তবে কতক হত্যাকারী ঐরূপও হতে পারে। কিয়ামতের মাঠে নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে খুঁজতে থাকবে এবং তার অত্যাচার মোতাবেক তার পুণ্য নিতে থাকবে। পুণ্য নেয়ার পরেও যদি অত্যাচার শেষ না হয় তবে নিহত ব্যক্তির পাপ হত্যাকারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। তাহলে হতে পারে যে, নিহত ব্যক্তির সমস্ত পাপই কতক হত্যাকারীর মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কেননা, অত্যাচারের এভাবে বদলা নেয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, হত্যা সবচেয়ে বড় অত্যাচার এবং অতি জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা'আলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ বাক্যের বিশুদ্ধতম অর্থ হচ্ছে- হে কাবীল! আমি চাই যে, তুমি নিজের পাপ এবং আমাকে হত্যা করার পাপ এ সমস্তই নিজের উপর নিয়ে নেবে। তোমার অন্যান্য পাপের সাথে এই একটি পাপও বেড়ে যাক। আমার পাপও তোমার ঘাড়ে চেপে বসুক-এ বাক্যের ভাবার্থ কখনও এটা হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ প্রত্যেক আমলকারীকে তার আমলের প্রতিদান ও শাস্তি দেয়া হবে। তাহলে এটা কিরূপে সম্ভব হবে যে, নিহত ব্যক্তির সারা জীবনের পাপ হত্যাকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়া হবে? এখন বাকী থাকছে এই কথা যে, হাবীল তার ভাইকে এ কথা কেন বললেন? এর উত্তর এই যে, তিনি শেষবারের মত তাকে উপদেশ দেন এবং ভয় প্রদর্শন করেন যে, সে যেন এ কাজ থেকে বিরত থাকে, নতুবা সে পাপী হয়ে জাহান্নামবাসী হয়ে যাবে। কারণ, তিনি তো তার মোকাবিলা করছেন না। সুতরাং সমস্ত পাপের বোঝা তার উপরই পড়বে এবং সেই অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে। আর অত্যাচারীদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (এই উপদেশ সত্ত্বেও) তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃহত্যার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলো। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেললল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ শয়তান কাবীলকে তার ভাই এর হত্যার প্রতি উত্তেজিত করলো এবং সে স্বীয় নাফসে আম্মারার অনুসরণ করলো আর লোহা দ্বারা তাকে মেরে ফেললো। একটি বর্ণনায় আছে যে, হাবীল স্বীয় পশুপাল নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিলেন, আর এদিকে কাবীল তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়ে পৌছে যায়। সে একটি ভারী পাথর উঠিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় মেরে দেয়। ঐ সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল বা তাঁর গলা কেটে নিয়েছিল। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঐ শয়তানের হত্যা করার নিয়ম জানা ছিল না, তাই সে তাঁর গলা মোচড়াচ্ছিল। অতঃপর সে একটা জন্তুকে ধরে তার মাথাটি একটি পাথরের উপর রাখলো। তারপর একটি পাথর সজোরে তার মাথায় মেরে দিলো। তৎক্ষণাৎ জন্তুটি মারা গেল। এই দেখে সে তার ভাইয়ের সাথেও ঐ ব্যবহার করলো। এও বর্ণিত আছে যে, যেহেতু তখন পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠে কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, ফলে কাবীল কখনও বা তার ভাইয়ের চক্ষুগুলো বন্ধ করতো এবং কখনও বা থাপ্পড় ঘুষি মারতো। এই দেখে অভিশপ্ত ইবলীস তার কাছে এসে বললো, “একটা পাথর নিয়ে এসো এবং তা দিয়ে তার মাথা থেতলিয়ে দাও।” সে তাই করলো। তখন সেই মালউন দৌড়িয়ে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হত্যা কিরূপে হয়?" সে উত্তরে বললোঃ “এখন সে না পানাহার করতে পারবে, কথা বলতে এবং না নড়াচড়া করতে পারবে।” তিনি তখন বললেনঃ “সম্ভবতঃ তার মৃত্যু হয়ে গেছে।” সে বললোঃ “হ্যা, এটাই মৃত্যু। তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইতিমধ্যে হ্যরত আদম (আঃ) এসে পড়লেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” কিন্তু শোকে দুঃখে তার মুখে কোন কথা সরলো না। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তুমি তোমার কন্যাগণসহ হা-হুতাশ করতে থাক। আর আমিও আমার পুত্রগণ এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কাবীল ক্ষগ্রিস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোকেই নষ্ট করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তার খুনের বোঝা হযরত আদম (আঃ)-এর ঐ সন্তানের উপরই পতিত হয়। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে রক্ত বইয়েছিল।" মুজাহিদ (রহঃ)-এর উক্তি এই যে, ঐ হত্যাকারীর একটি পায়ের গোছাকে উরুর সাথে লটকানো হয়েছে এবং তার মুখটা সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর ঘুরার সাথে সাথে সেও ঘুরতে রয়েছে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে আগুন ও বরফের গর্তে থাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি সে-ই। ভূ-পৃষ্ঠে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্যে সে-ই দায়ী। ইমাম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অন্যায় খুনের বোঝা তার উপর ও শয়তানের উপর পড়ে থাকে।তাঁকে হত্যা করে দেয়ার পর কি করতে হবে, মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হবে সে ব্যাপারে তার কিছুই জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা'আলা দু'টি কাক প্রেরণ করলেন যারা একে অপরের ভাই ছিল। তারা তার সামনে লড়তে লাগলো। অবশেষে একে অপরকে মেরে ফেললো। তারপর জীবিত কাকটি একটি গর্ত খনন করলো এবং মত কাকটিকে ওর মধ্যে রেখে দিয়ে মাটি চাপিয়ে দিলো। এ দেখে কাবীলের বুদ্ধি জেগে গেল এবং সে-ও ঐরূপ করলো। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নিজে নিজেই মৃত একটি কাককে অপর একটি কাক এভাবে গর্ত খনন করে দাফন করে দিয়েছিল। এও বর্ণিত আছে যে, কাবীল এক বছর পর্যন্ত তার মৃত ভাইয়ের মৃতদেহ স্বীয় স্কন্ধে বহন করে ফিরছিল। অতঃপর কাকটিকে ঐরূপ করতে দেখে সে নিজেকে ভৎসনা করে বলতে লাগলো-“হায়! আমি এ কাকটির মত কাজও করতে পারলাম না।” একথাও বর্ণিত আছে যে, সে ভাইকে মেরে ফেলার পর খুবই অনুতপ্ত হয়েছিল এবং মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে পড়েছিল। আর তা এ জন্যও ছিল যে, ভূ-পৃষ্ঠে প্রথম মৃত ও প্রথম হত্যা ওটাই ছিল। তাওরাত ধারীরা বলে যে, যখন কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করলো তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে কাবীল! তোমার ভাই হাবীল কোথায়? সে উত্তরে বললোঃ আমি জানি না। আমি তার প্রহরী ছিলাম না। আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “এখন তোমার ভাইয়ের রক্ত যমীন হতে আমাকে ডাক দিচ্ছে। যে যমীনের মুখ খুলে দিয়ে তুমি ওর মুখে তোমার নিস্পাপ ভাইয়ের রক্ত ঢেলে দিয়েছ সেই ভূমি তোমাকে লানত করছে। তুমি এ যমীনে যে চাষাবাদ করবে তাতে তুমি কোন ফসল পাবে না যে পর্যন্ত না তুমি চিন্তান্বিত হবে। সে তখন ঐ কাজই করলো।অতঃপর সে খুব লজ্জিত হলো এবং অনুতাপ করতে থাকলো! ওটা যেন শাস্তির উপরে শাস্তি ছিল। এ কাহিনীতে মুফাসৃসিরগণ এ ব্যাপারে তো একমত যে, এ দু’জন হযরত আদম (আঃ)-এর ঔরসজাত পুত্র ছিল এবং কুরআন কারীমের শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। আর হাদীসেও রয়েছে যে, যমীনের বুকে যেসব হত্যাকাণ্ড চলছে তার এক অংশের বোঝা ও পাপ হযরত আদম (আঃ)-এর এ প্রথম পুত্রের উপর পড়েছে। কেননা সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরবানী সর্বপ্রথম তাদের মধ্যেই চালু হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আদম (আঃ) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। তাছাড়া এর ইসনাদও সঠিক নয়। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এ ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যেন এর মধ্য থেকে ভালটি গ্রহণ করে এবং মন্দটি পরিত্যাগ করে। (ইবনে জারীর (রঃ) হাসান বসরী (রঃ) হতে এটা মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) এ হাদীসটি মুরসাল। কথিত আছে যে, এ আকস্মিক দুর্ঘটনায় হযরত আদম (আঃ) শশাকে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং এক বছর ধরে তার মুখে হাসি ফুটেনি। অবশেষে ফেরেশতাগণ তার দুঃখ দূর হওয়ার ও মুখে হাসি আসার জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করেন। হযরত আদম (আঃ) ঐ সময় শোকে ও দুঃখে এ কথাও বলেছিলেন যে, শহর ও শহরের সবকিছু বদলে গেছে, পৃথিবীর রং -এর পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর চেহারা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সব জিনিসেরই রং ও স্বাদ বিদায় নিয়েছে এবং আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর সৌন্দর্য লোপ পেয়েছে। জবাবে বলা হলো যে, ঐ মৃত ব্যক্তির সাথে এ জীবিত ব্যক্তিও যেন নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল ওর বোঝা তার উপর এসে গেছে। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, কাবীলকে তখনই কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে, তার পায়ের গোছাকে তার উরুর সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডল সূর্যের দিকে করে দেয়া হয়েছে। ওর সাথে সাথেই সে ঘুরতে ছিল। অর্থাৎ সূর্য যেদিকেই থাকতো সেদিকেই তার মুখখানা ঘুরে যেতো। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যতগুলো গুনাহ এরই উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাড়াতাড়ি করে ও শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করবেন এবং পরকালেও তার জন্যে ভীষণ শাস্তি জমা রাখবেন, ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে সমসাময়িক শাসনকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া!” কাবীলের মধ্যে এ দু'টো পাপই জমা হয়েছিল। (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।' (২:১৫৬)

আল-মায়িদা 5:32

৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আদমের এ ছেলের অন্যায়ভাবে তার ভাইকে হত্যার কারণে আমি বানী ইসরাঈলকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, তাদের কিতাবে লিখে দিয়েছি এবং তাদের শরঈ হুকুম করে দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কাউকে বিনা কারণে হত্যা করে ফেললো, না সে নিহত ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছিল, না সে ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাহলে সে যেন দুনিয়ার সমস্ত লোককেই হত্যা করে ফেললো। কেননা, আল্লাহর কাছে সমস্ত সৃষ্টজীব সমান। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন নির্দোষ লোককে হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, ওটাকে হারাম জানলো, তবে সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ বাঁচালো। কেননা, সমস্ত মানুষ এভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ)-কে যখন বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলে, তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন। আমি আপনার পক্ষ হয়ে আপনার বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছি। আপনি লক্ষ্য করুন যে, পানি এখন মাথার উপরে উঠে গেছে। সুতরাং এখন তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।” এ কথা শুনে হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “তুমি কি সমস্ত লোককে হত্যা করার প্রতি উত্তেজিত হয়েছে যাদের মধ্যে আমিও একজন?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, না।” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি যদি একজন লোককেই হত্যা কর তবে যেন তুমি সমস্ত লোককেই হত্যা করলে। যাও, ফিরে যাও আমি চাই যে, আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করুন, পাপকার্যে লিপ্ত না করুন।” এ কথা শুনে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ফিরে গেলেন, যুদ্ধ করলেন না। ভাবার্থ এই যে, হত্যা হচ্ছে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা বৈধ মনে করে সে সমস্ত লোকের ঘাতক। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকে সে যেন সমস্ত লোকেরই প্রাণ রক্ষা করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবীকে এবং ন্যায়পরায়ণ মুসলমান বাদশাহকে হত্যাকারীর উপর সারা বিশ্বের মানুষের হত্যার পাপ বর্তিত হয়। আর নবী এবং ন্যায়পরায়ণ ইমামের বাহুকে মজবুত করা বিশ্ববাসীর জীবন রক্ষা করার শামিল। (তাফসীরে ইবনে জারীর)অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলেই সে জাহান্নামী হয়ে যায়। সে যেন সমস্ত মানুষকেই হত্যা করলো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কোন মুমিনকে কোন শরঈ কারণ ছাড়াই হত্যাকারী জাহান্নামী, আল্লাহর দুশমন, অভিশপ্ত এবং শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়। সুতরাং সে যদি সমস্ত লোককেও হত্যা করতো তবে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতো? যে ব্যক্তি হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, তার পক্ষ থেকে যেন সবারই জীবন রক্ষা পেলো। আব্দুর রহমান বলেন যে, এক হত্যার বদলেই তার খুন হালাল হয়ে গেলো। এটা নয় যে, কয়েকটি হত্যার পর সে কিসাসের যোগ্য হবে। আর যে তাকে জীবিত রাখবে অর্থাৎ নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে, সে যেন লোকদেরকে জীবিত রাখলো। আবার এই ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি মানুষের জীবন বাঁচাবে, যেমন ডুবন্ত মানুষকে উঠিয়ে নেবে, আগুনে পড়ে যাচ্ছে এমন লোককে আগুন থেকে রক্ষা করবে এবং কাউকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নেবে ইত্যাদি। উদ্দেশ্য হচ্ছে-মানুষকে অন্যায় খুন থেকে বিরত রাখা, তাদেরকে মানুষের কল্যাণ কামনা, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বানী ইসরাঈল যেমন এ হুকুমের আওতাভুক্ত ছিল তদ্রুপ আমরাও কি এ হুকুমেরই আওতাভুক্ত?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আল্লাহর শপথ! বানী ইসরাঈলের রক্ত আল্লাহর নিকট আমাদের রক্ত অপেক্ষা কোনক্রমেই মর্যাদাপূর্ণ নয়।” সুতরাং একটি লোককে বিনা কারণে হত্যা করা সকলকে হত্যা করার শামিল এবং একটি লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্য সমস্ত লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্যের সমান। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, একদা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কাজ বাতলিয়ে দিন যা আমার জীবনকে সুখময় করে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে হামযা (রাঃ)! কারও জীবন রক্ষা করা আপনার নিকট পছন্দনীয় কাজ, না কাউকে মেরে ফেলা পছন্দনীয় কাজ?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “কারও জীবন রক্ষা করাই আমার নিকট পছন্দনীয় কাজ।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে আপনি এ কাজেই লেগে থাকুন।”মহান আল্লাহ বলেনঃ বানী ইসরাঈলের কাছে আমার বহু রাসূলও স্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিয়ে আগমন করেছিল, তবু এর পরেও তাদের মধ্য হতে অনেকেই ভূ-পৃষ্ঠে সীমালংঘনকারী রয়ে গেছে। যেমন ইয়াহুদী বানূ কুরাইযা ও বানূ নাযীর আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের সাথে মিলিত হয়ে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতো এবং নিহত ব্যক্তির মুক্তিপণ আদায় করতো। তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে আয়াত নাযিল করা হয়- তোমাদের নিকট এই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে হত্যা করবে না এবং তাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে না। কিন্তু এই মজবুত আহাদ ও অঙ্গীকার সত্ত্বেও তোমরা তার উল্টো করেছে। যদিও মুক্তিপণ আদায় করেছে, কিন্তু তাদেরকে দেশ হতে বের করে দেয়াও তো হারাম ছিল। এর কি অর্থ হতে পারে যে, তোমরা কোন কোন হুকুম মানবে এবং কোন কোনটা মানবে না? এরূপ লোকদের শস্তি তো এটাই যে, তারা দুনিয়াতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম থেকে উদাসীন নন।(আরবী) এ আয়াতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরুদ্ধাচরণ করা এবং হুকুমের বিপরীত করা। এর ভাবার্থ হচ্ছে কুফরী করা, ডাকাতি করা, ব্যভিচার করা এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকারের অশান্তি সৃষ্টি করা। এমনকি পূর্ববর্তী অনেক মনীষী, যাঁদের মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) রয়েছেন, বলেন যে, রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রা অধিকার করে নেয়াও হচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টি করার শামিল। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেছেনঃ যখন কাউকে কোন কাজের অলী বানিয়ে দেয়া হয় তখন সে ফাসাদ ও অশান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং চাষাবাদের ভূমি ও মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলে, আর আল্লাহ ফাসাদকে ভালবাসেন না। এ আয়াতটি মশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কেননা, এতে এটাও আছে যে, যখন এরূপ লোক এ কাজগুলো করার পর মুসলমানদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই তাওবা করে নেয় তবে তার কোন জবাবদিহি নেই। পক্ষান্তরে যদি কোন মুসলমান এমন কাজ করে এবং পলায়ন করে কাফিরদের নিকট চলে যায় তবে শরঈ হদ থেকে মুক্ত হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ যদি মুসলমানদের হাতে পড়ে যাওয়ার পূর্বে তাওবা করে নেয় তবে তার কৃতকর্মের দরুন যে হুকুম তার উপর সাব্যস্ত হয়ে গেছে তা টলতে পারে না। হযরত উবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে কিতাবের একটা দলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তারা তা ভঙ্গ করে এবং গণ্ডগোল সৃষ্টি করে। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে স্বাধীনতা দেন যে, তিনি ইচ্ছে করলে তাদেরকে হত্যা করতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে তাদের একদিকের হাত ও অপরদিকের পা কেটে ফেলতে পারেন। হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি হারূরিয়া খারেজীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সঠিক কথা এই যে, যে কেউই এ কাজ করবে তারই ব্যাপারে এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেহেতু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উক্কাল গোত্রের কতগুলো লোক আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং তাঁর কাছে ইসলামের বায়আত গ্রহণ করে। অতঃপর মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয় এবং তাদের পেট মোটা হয়ে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এর অভিযোগ পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা চাইলে আমাদের রাখালের সাথে চলে যাও, তথায় উটের প্রস্রাব ও দুধ পান করবে। তারা বললোঃ “হ্যা (আমরা যেতে চাই।)” সুতরাং তারা বেরিয়ে পড়লো। অতঃপর তাদের রোগ সেরে গেলো। তখন তারা রাখালকে মেরে ফেললো এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি সাহাবায়ে কিরামকে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে ধরে আনার নির্দেশ দেন। অতএব তাদেরকে পাকড়াও করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তখন তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়। অতঃপর তাদেরকে রৌদ্রে ফেলে রাখা হয় ফলে তারা ধড়ফড় করে মৃত্যুবরণ করে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো উক্কাল গোত্রের ছিল কিংবা উরাইনা গোত্রের ছিল। তারা পানি চেয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। তারা চুরিও করেছিল, হত্যাও করেছিল, ঈমান আনয়নের পর কুফরীও করেছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করেছিল এবং তারা রাখালের চোখে গরম শলাকাও ভরে দিয়েছিল। সেই সময় মদীনার আবহাওয়া ভাল ছিল না। তারা বারসাম' নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে ২০ জন ঘোড় সওয়ার আনসারীকে পাঠিয়েছিলেন। একজন পদব্রজে চলছিলেন, যিনি পদচিহ্ন দেখে দেখে পথ দেখিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মৃত্যুর সময় তারা পিপাসায় এতো কাতর হয়ে পড়েছিলো যে, মাটি চাটতে শুরু করেছিলো! তাদের ব্যাপারেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। একদা হাজ্জাজ হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকে সবচেয়ে বড় ও কঠিন যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা বর্ণনা করুন।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো বাহরাইন থেকে এসেছিল। রোগের কারণে তাদের রং হলদে বর্ণ ধারণ করেছিল। আর পেট বড় হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা সাদকার উটের নিকট গমন কর এবং ওগুলোর দুধ ও প্রস্রাব পান কর।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “তারপর আমি দেখলাম যে, হাজ্জাজ এ রিওয়ায়াতকে নিজের অত্যাচারের দলীল বানিয়ে নিলো। আমি তখন খুবই লজ্জিত হলাম যে, আমি তার কাছে এ হাদীসটি কেন বর্ণনা করলাম।” অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে চারজন লোক ছিল উরাইনা গোত্রের এবং তিনজন ছিল ইকাল গোত্রের। এরা যখন সুস্থ হয়ে উঠলো তখন ধর্মত্যাগী হয়ে গেলো। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ব্যভিচারীও ছিল। তারা যখন আগমন করে তখন দারিদ্রের কারণে তাদের পরনে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। তারা হত্যা ও লুঠ করে নিজেদের শহরের দিকে যাচ্ছিল। হযরত জারীর (রাঃ) বলেনঃ তারা তাদের কওমের কাছে প্রায় পৌছেই গিয়েছিল এমতাবস্থায় আমরা তাদেরকে ধরে ফেলি। তারা পানি চাচ্ছিল, আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ “এখন তো পানির পরিবর্তে জাহান্নামের আগুন পাবে।” এ বর্ণনায় এটাও বলা হয়েছে যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল ও গারীব। কিন্তু এর দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঐ ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যে সৈন্যদল পাঠানো হয়ছিল তাঁদের সর্দার ছিলেন হযরত জারীর (রাঃ)। এ বর্ণনার এ অংশটি একেবারই বর্জনীয় যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। কেননা, সহীহ মুসলিমে এটা বিদ্যমান আছে যে, তারা রাখালের সাথে ঐ ব্যবহার করেছিল। সুতরাং ওটা ছিল তাদের কিসাস বা প্রতিশোধ গ্রহণ। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, ঐলোকগুলো বানূ ফারাহ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শাস্তি আর কাউকেও দেননি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইয়াসার নামক এক ক্রীতদাস ছিল। সে অত্যন্ত নামাযী ছিল বলে তিনি তাকে আযাদ করে দিয়েছিলেন। অতঃপর স্বীয় উটের পালে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সে ঐ উটগুলো দেখা শোনা করতো। তাকেই ঐ ধর্মত্যাগীরা হত্যা করে ফেলেছিল এবং তার চোখে কাটা গেড়ে দিয়ে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। যে সেনাবাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করে এনেছিলেন তাদের মধ্যে একজন শক্তিশালী যুবক ছিলেন হযরত কুরম্ ইবনে ফাহরী (রাঃ)। হাফিয আবু বকর মিরদুওয়াই (রঃ) এ বর্ণনার সমস্ত তরীকা বা পন্থাকে একত্রিত করেছেন। আল্লাহ পাক তাকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন। আবু হামযাহ ইবনে আবদুল করীম (রঃ) উটের প্রস্রাবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি ঐ ধর্মত্যাগীদের কাহিনী বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও আছে যে, ঐ লোকগুলো কপটতার সাথে ঈমান এনেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মদীনার প্রতিকূল আবহাওয়ার অভিযোগ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদের প্রতারণা, হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্মত্যাগের বিষয় জানতে পারেন তখন তিনি ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর সৈন্যগণ যেন তাদের পশ্চাদ্ধাবনে বেরিয়ে পড়ে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই সাহাবীগণ কেউ কারও জন্যে অপেক্ষা না করেই তাদের পিছনে বেরিয়ে পড়েন। তাদেকে পাঠিয়ে দেয়ার পর স্বয়ং নবী করীম (সঃ) রওয়ানা হয়ে যান। ঐ বিদ্রোহী ও ডাকাতের দল তাদের নিরাপদ জায়গায় প্রায় পৌছেই গেছে, এমন সময় সাহাবায়ে কিরাম তাদেরকে ঘিরে ফেলেন। তাদের মধ্যে যে কয়েকজন গ্রেফতার হয় তাদেরকে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করেন। ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে দেশান্তরিত করা ছিল এই যে, তাদেরকে ইসলামী হুকুমতের সীমানা থেকে বের করে দিয়ে শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া হয়েছিল। এর পর নবী করীম (সঃ) আর কোন দিনই কোন লোকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেহচ্যুত করেননি, বরং তিনি তা থেকে নিষেধ করেন। জন্তুর সাথেও এরূপ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কেউ কেউ বলেন, হত্যার পর তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, ওরা বানূ সালীম গোত্রের লোক ছিল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয়নি এবং এ আয়াত দ্বারা ওটা মানসূখ। বা রহিত করে দেয়া হয়েছে। তাদের মতে এ আয়াতে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ শাস্তি দেয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন (আরবী) -এ আয়াতটি। কারও কারও মতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) “মুসলা" অর্থাৎ নাক, কান কেটে নিতে যে নিষেধ করেছেন তা দ্বারা এ শাস্তি মানসূখ হয়ে গেছে। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। তারপর এটাও জিজ্ঞাস্য বিষয় যে, মানসূখকারীর বিলম্বের দলীল কি? কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে ইসলামের হদ স্থিরীকরণের পূর্বেকার ঘটনা। কিন্তু এটাও মোটেই ঠিক নয়, বরং স্থিরীকরণের পরের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। কেননা, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)। আর তিনি সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে গেল তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকলেন। কিন্তু এটাও সঠিক কথা নয়। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ শব্দ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আজলান বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে যে কঠিন শাস্তি দিয়েছিলেন তা যে উচিত ছিল না এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। যাতে উচিত শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে আর তা হচ্ছে হাত-পা বিপরীতভাবে কেটে নেয়া এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া। আর দেখা যাচ্ছে যে, এরপর আর কোনদিন কারও চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, তারা যা করেছিল তারই প্রতিফল তারা পেয়েছিল। এখন যে আয়াত নাযিল হলো তাতে এরূপ লোকদের জন্যে একটা বিশেষ হুকুম বর্ণনা করা হলো এবং তাতে চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার হুকুম দেয়া হলো না। এ আয়াত দ্বারা জমহুর উলামা এ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পথ বন্ধ করে দিয়ে যুদ্ধ করা এবং শহরে যুদ্ধ করা দুটোই সমান। কেননা, আয়াতে (আরবী) শব্দগুলো রয়েছে। মালিক, আলঈ এবং শাফিঈর (আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হোন) এটাই মাযহাব যে, বিদ্রোহীরা শহরের ভেতরেই এসব হাঙ্গামা সৃষ্টি করুক বা শহরের বাইরেই করুক, তাদের শাস্তি এটাই। এমনকি ইমাম মালিক (রঃ) তো এতদূর পর্যন্ত বলেন যে, কোন লোক অপর কোন লোককে তার বাড়ীতে এ ধরনের প্রতারণা করে হত্যা করলে তাকে ধরে আনা হবে এবং তার কাছে যেসব মাল ও আসবাবপত্র রয়েছে সবগুলোই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আর সাথে সাথে তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। সমসাময়িক ইমামই এ কাজ করবেন, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকেরা নয়। এমনকি যদি তারা (অভিভাবকেরা) তাকে ক্ষমা করে দিতে চায় তবুও তাদেরকে এ অধিকার দেয়া হবে না। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এটা নয়। তিনি বলেন, যে ঐ সময় মেনে নেয়া হবে যখন কেউ শহরের বাইরে এরূপ হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে। কেননা, শহরে তো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শহরের বাইরে এর কোনই সম্ভাবনা নেই। এ বিদ্রোহীদের যে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি মুসলমানদের উপর তরবারী উঠাবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে, তাকে মুসলমানদের ইমাম উল্লিখিত তিনটি শাস্তির যে কোন একটি দিতে পারেন। আরও অনেকেরই এটাই উক্তি। আর অন্যান্য আয়াতের হুকুমের মধ্যেও এ ধরনের অধিকার বিদ্যমান রয়েছে। যেমন হজ্বের ইহরামের অবস্থায় কেউ শিকার করলে তাকে সেই শিকারের সমপর্যায়ের জন্তু কুরবানী করতে হয় বা মিসকীনদেরকে খানা খাওয়াতে হয় কিংবা সেই বরাবর রোযা রাখতে হয়। অনুরূপভাবে রোগ বা মাথার অসুখের কারণে কেউ ইহরামের অবস্থায় মাথা মুণ্ডন করালে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে রোযা, সাদকা বা কুরবানী করতে হয়। তদ্রপ কসমের কাফফারায় মধ্যমভাবে দশজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর বা তাদেরকে কাপড় পরানোর অথবা একটি গোলাম আযাদ করণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাহলে যেমন এখানে এ অবস্থাগুলোর মধ্য হতে যে কোন একটি পছন্দ করে নেয়ার অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনই বিদ্রোহী ধর্মত্যাগীদের শাস্তিও হচ্ছে হত্যা অথবা বিপরীতভাবে হাত-পা কেটে নেয়া কিংবা দেশ হতে বিতাড়িত করা। আর জমহরের উক্তি এই যে, এ আয়াতুটি কয়েক অবস্থার সাথে জড়িত। যখন ডাকাত হত্যা ও লুঠপাট উভয় অপরাধে অপরাধী হবে তখন সে শূলেও হত্যার যোগ্য হবে। আর যদি শুধু হত্যার দোষে দোষী হয় তবে হত্যার বদলে শুধু হত্যাই করা হবে। যদি শুধু মাল নেয় তবে উল্টোভাবে হাত-পা কেটে নিতে হবে অর্থাৎ এক দিকের হাত ও অপর দিকের পা- এভাবে কেটে নিতে হবে। আর যদি পথকে ভীতিপূর্ণ করে তোলে এবং জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, এছাড়া অন্য কোন পাপে লিপ্ত না হয় তবে শুধু তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। অধিকাংশ মনীষী ও ইমামদের মাযহাব এটাই। তারপর মনীষীদের মধ্যে এ ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে যে, তাকে শুধু শূলের উপর লটকিয়ে দিয়েই কি ছেড়ে দেয়া হবে, যাতে সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মারা যাবে? না বর্শা ইত্যাদি দ্বারা হত্যা করা হবে, যাতে মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে? না তিন দিন পর্যন্ত শূলেই রাখা হবে, তারপর নামিয়ে নেয়া হবে? না এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? কিন্তু এটা তাফসীরের স্থান নয়। যে, আমরা ছোটখাটো মতভেদ নিয়েই পড়ে থাকব এবং প্রত্যেকেরই দলীল পেশ করব। হ্যা, তবে একটি হাদীসে শাস্তির কিছু বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ওর সনদ যদি সহীহ হয় তাহলে তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ঐ বিদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা মাল চুরি করবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে তাদের হাত চুরির বদলে কেটে নেয়া হবে, যে হত্যা করবে তাকে হত্যা করে দেয়া হবে। আর যে হত্যা করবে, পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে এবং ব্যভিচার করবে তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিবে।”(আরবী) অথবা ভূ-পৃষ্ঠ হতে বের করে দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদেরকে অনুসন্ধান করে তাদের উপর হদ কায়েম করা হবে অথবা দারুল ইসলাম থেকে বের করে দেয়া হবে, যেন তারা অন্য কোথায়ও চলে যায়। কিংবা এক শহর থেকে অন্য কোন শহরে এবং সেই শহর থেকে আর এক শহরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অথবা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণরূপেই বের করে দেয়া হবে। শা'বী (রঃ) তো শুধু বের করেই দিতেন। আর আতা’ খোরাসানী (রঃ) বলেন যে, এক সেনাবাহিনী থেকে অন্য সেনাবাহিনীর মধ্যে পৌছিয়ে দেয়া হবে। এমনিভাবে তাকে কয়েক বছর পর্যন্ত যেখানে সেখানে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানো হবে। কিন্তু তাকে দারুল ইসলাম থেকে বের করা হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর পছন্দনীয় কথা এই যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে বের করে দিয়ে অন্য কোন শহরের জেলখানায় ভরে দেয়া হবে।(আরবী) আয়াতের এ সব লোকের পক্ষপাতিত্ব করছে যারা বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানদের ব্যাপারে রয়েছে ঐ বিশুদ্ধ হাদীসটি যাতে আছে যে, বর্ণনাকারী হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট থেকে ঐ অঙ্গীকারই গ্রহণ করেন যা তিনি স্ত্রীলোকদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তা হচ্ছে-আমরা যেন চুরি না করি, ব্যভিচারে লিপ্ত না হই, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা না করি এবং একে অপরের নাফরমানী না করি। (অর্থাৎ কেউ যেন কারও উপর মিথ্যা অপবাদ না দেয়) যারা এ অঙ্গীকার পূর্ণ করবে তাদের পুরস্কার রয়েছে আল্লাহর দায়িত্বে। আর যারা এগুলোর মধ্যে কোন একটি পাপকার্যে লিপ্ত হবে এবং ওর শাস্তিও প্রাপ্ত হবে তবে সেটাই তার সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ সেটা গোপন করেন তবে তার সে বিষয়ের দায়িত্ব তারই উপর থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দেবেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকাজ করলো, অতঃপর তাকে শাস্তি দেয়া হলো, তাহলে আল্লাহ যে তাকে পুনরায় শাস্তি দেবেন এ থেকে তাঁর আদল ও ইনসাফ বহু ঊর্ধ্বে। আর যে ব্যক্তি কোন পাপ করলো, অতঃপর আল্লাহ তা ঢেকে নিলেন এবং ক্ষমা করে দিলেন, তবে আল্লাহর করুণা এর বহু ঊর্ধ্বে যে, তিনি তাঁর বান্দার কোন পাপ ক্ষমা করে দেয়ার পর আবার ওর শাস্তি ফিরিয়ে আনবেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তবে এ শাস্তিপ্রাপ্তির পর যদি তাওবা ছাড়াই মারা যায় তবে পরকালের শাস্তি বাকী থেকে যাবে, যার সঠিক কল্পনা করাও এখন অসম্ভব। হ্যা, তবে যদি তাওবা নসীব হয় তাহলে অন্য কথা। তারপর তাওবাকারীদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার প্রকাশ ঐ অবস্থায় তো স্পষ্ট যে, এ আয়াতকে মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ মেনে নেয়া হবে। কিন্তু যে মুসলমান বিদ্রোহী হবে এবং সে অধিকারে আসার পূর্বেই যদি তাওবা করে নেয় তবে তার উপর হত্যা, শূল এবং পা কেটে নেয়া তো প্রযোজ্য হবেই না, এমনকি তার হাতও কাটা যাবে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি উক্তি রয়েছে। আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দ্বারা এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত শাস্তিই তার উপর থেকে উঠে যাবে। সাহাবীদের আমলও এরই উপর রয়েছে। যেমন জারিয়া ইবনে বদর তাইমী বসরী যমীনে ফাসাদ বা হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ ব্যাপারে কয়েকজন কুরাইশী হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন, যাদের মধ্যে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফরও (রাঃ) ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে নিরাপত্তা দান করতে অস্বীকার করেন। জারিয়া ইবনে বদর তখন সাঈদ ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে নিজের বাড়ীতে রেখে হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেনঃ আচ্ছা বলুন তো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে, অতঃপর তিনি এ আয়াতগুলো (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তখন হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপ ব্যক্তির জন্যে তো আমি নিরাপত্তা দান করবো।” হযরত সাঈদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সে হচ্ছে জারিয়া ইবনে বদর।” এরপর জারিয়া তার প্রশংসায় কবিতাও রচনা করেন।ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক কুফার মসজিদে কোন এক ফরয নামাযের পরে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। সে সময় তিনি কুফার শাসনকর্তা ছিলেন। লোকটি এসে তাকে বলেঃ “হে আমীরে কুফা! আমি মুরাদ গোত্রের অমুকের পুত্র অমুক। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে লড়েছি এবং ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনারা আমার উপর ক্ষমতা লাভ করার পূর্বেই তাওবা করেছি। আমি এখন আপনার আশ্রয়স্থলে দাড়িয়েছি।” একথা শুনে হযরত আব মুসা আশআরী দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে লোক সকল! এ তাওবার পরে তোমাদের কেউ যেন এর সাথে কোন প্রকারের দুর্ব্যবহার না করে। যদি সে তার তাওবায় সত্যবাদী হয় তবে তো ভাল কথা, আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার পাপই তাকে ধ্বংস করবে।” লোকটি কিছুকাল পর্যন্ত তো ঠিকভাবেই থাকলো। তারপর সে পুনরায় মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলাও তাকে তার পাপের কারণে ধ্বংস করে দিলেন এবং তাকে হত্যা করা হলো।ইবনে জারীর (রাঃ) আরও বর্ণনা করেছেন যে, আলী আসাদী নামক একটি লোক মানুষের পথকে বিপজ্জনক করে তোলে। সে মানুষকে হত্যা করে এবং তাদের মালধন লুঠপাট করতে থাকে। বাদশাহ, সেনাবাহিনী এবং জনসাধারণ সদা তাকে গ্রেফতার করার চেষ্টায় থাকে, কিন্তু অকৃতকার্য হয়। একদা সে জঙ্গলে অবস্থান করছিল এমন সময় একটি লোককে কুরআন পাঠ করতে শুনলো। লোকটি সেই সময় (আরবী) (৩৯:৫৩)-এ আয়াটি পাঠ করছিল। এটা শুনে সে থমকে দাঁড়ালো এবং তাকে বললোঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ আয়াতটি পুনরায় আমাকে পাঠ করে শুনাও। লোকটি আবার তা পাঠ করলো। তখন আলী স্বীয় তরবারীখানা খাপে রেখে দিল। তৎক্ষণাৎ সে বিশুদ্ধ মনে তাওবা করলো এবং ফজরের নামাযের পূর্বেই মদীনায় পৌছে গেল। তার পর গোসল করলো এবং মসজিদে নববীতে (সঃ) প্রবেশ করে জামাআতে ফজরের নামায আদায় করলো। নামায শেষে লোকেরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর পাশে বসে পড়লো। সেও তখন তাদেরই মধ্যে একধারে বসে গেল। ফর্সা হয়ে গেলে লোকেরা তাকে দেখে চিনে ফেললো এবং তাকে গ্রেফতার করতে উদ্যত হলো। সে বললোঃ “দেখুন, আমার উপর আপনাদের ক্ষমতা লাভ হওয়ার পূর্বেই আমি তাওবা করেছি এবং তাওবা করার পর আপনাদের নিকট হাযির হয়েছি। সুতরাং এখন আমার উপর আপনাদের বল প্রয়োগের কোন পথ নেই।” তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বললেনঃ “লোকটি সত্য কথাই বলেছে।” অতঃপর তিনি তার হাত ধরে মারওয়ান ইবনে হাকামের নিকট নিয়ে গেলেন। সে সময় তিনি মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁকে বললেনঃ “এ হচ্ছে আলী আসাদী, সে তাওবা করেছে সুতরাং এর উপর আপনি কোন বল প্রয়োগ করতে পারেন না।" ফলে কেউই তার সাথে কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করলেন না। মুজাহিদের একটি দল যখন রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে রওয়ানা হলেন, তাঁদের সাথে এ আলী আসাদীও গেল। তাদের নৌকা সমুদ্রে চলছিল। তাদের সামনে রোমকদের কতগুলো নৌকা এসে পড়লো। তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্যে সে নিজেদের নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ে তাদের নৌকায় গিয়ে উঠলো। তারা তার তরবারীর চমক সহ্য করতে না পেরে পালে টান দিল। আলীও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হলো। ফলে নৌকা ডুবে গেলো এবং রোমকদের সবাই ডুবে মরলো। তাদের সাথে হযরত আলী আসাদীও (রাঃ) ডুবে গিয়ে শাহাদত বরণ করলো।

আল-মায়িদা 5:33

৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আদমের এ ছেলের অন্যায়ভাবে তার ভাইকে হত্যার কারণে আমি বানী ইসরাঈলকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, তাদের কিতাবে লিখে দিয়েছি এবং তাদের শরঈ হুকুম করে দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কাউকে বিনা কারণে হত্যা করে ফেললো, না সে নিহত ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছিল, না সে ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাহলে সে যেন দুনিয়ার সমস্ত লোককেই হত্যা করে ফেললো। কেননা, আল্লাহর কাছে সমস্ত সৃষ্টজীব সমান। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন নির্দোষ লোককে হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, ওটাকে হারাম জানলো, তবে সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ বাঁচালো। কেননা, সমস্ত মানুষ এভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ)-কে যখন বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলে, তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন। আমি আপনার পক্ষ হয়ে আপনার বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছি। আপনি লক্ষ্য করুন যে, পানি এখন মাথার উপরে উঠে গেছে। সুতরাং এখন তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।” এ কথা শুনে হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “তুমি কি সমস্ত লোককে হত্যা করার প্রতি উত্তেজিত হয়েছে যাদের মধ্যে আমিও একজন?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, না।” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি যদি একজন লোককেই হত্যা কর তবে যেন তুমি সমস্ত লোককেই হত্যা করলে। যাও, ফিরে যাও আমি চাই যে, আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করুন, পাপকার্যে লিপ্ত না করুন।” এ কথা শুনে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ফিরে গেলেন, যুদ্ধ করলেন না। ভাবার্থ এই যে, হত্যা হচ্ছে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা বৈধ মনে করে সে সমস্ত লোকের ঘাতক। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকে সে যেন সমস্ত লোকেরই প্রাণ রক্ষা করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবীকে এবং ন্যায়পরায়ণ মুসলমান বাদশাহকে হত্যাকারীর উপর সারা বিশ্বের মানুষের হত্যার পাপ বর্তিত হয়। আর নবী এবং ন্যায়পরায়ণ ইমামের বাহুকে মজবুত করা বিশ্ববাসীর জীবন রক্ষা করার শামিল। (তাফসীরে ইবনে জারীর)অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলেই সে জাহান্নামী হয়ে যায়। সে যেন সমস্ত মানুষকেই হত্যা করলো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কোন মুমিনকে কোন শরঈ কারণ ছাড়াই হত্যাকারী জাহান্নামী, আল্লাহর দুশমন, অভিশপ্ত এবং শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়। সুতরাং সে যদি সমস্ত লোককেও হত্যা করতো তবে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতো? যে ব্যক্তি হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, তার পক্ষ থেকে যেন সবারই জীবন রক্ষা পেলো। আব্দুর রহমান বলেন যে, এক হত্যার বদলেই তার খুন হালাল হয়ে গেলো। এটা নয় যে, কয়েকটি হত্যার পর সে কিসাসের যোগ্য হবে। আর যে তাকে জীবিত রাখবে অর্থাৎ নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে, সে যেন লোকদেরকে জীবিত রাখলো। আবার এই ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি মানুষের জীবন বাঁচাবে, যেমন ডুবন্ত মানুষকে উঠিয়ে নেবে, আগুনে পড়ে যাচ্ছে এমন লোককে আগুন থেকে রক্ষা করবে এবং কাউকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নেবে ইত্যাদি। উদ্দেশ্য হচ্ছে-মানুষকে অন্যায় খুন থেকে বিরত রাখা, তাদেরকে মানুষের কল্যাণ কামনা, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বানী ইসরাঈল যেমন এ হুকুমের আওতাভুক্ত ছিল তদ্রুপ আমরাও কি এ হুকুমেরই আওতাভুক্ত?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আল্লাহর শপথ! বানী ইসরাঈলের রক্ত আল্লাহর নিকট আমাদের রক্ত অপেক্ষা কোনক্রমেই মর্যাদাপূর্ণ নয়।” সুতরাং একটি লোককে বিনা কারণে হত্যা করা সকলকে হত্যা করার শামিল এবং একটি লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্য সমস্ত লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্যের সমান। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, একদা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কাজ বাতলিয়ে দিন যা আমার জীবনকে সুখময় করে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে হামযা (রাঃ)! কারও জীবন রক্ষা করা আপনার নিকট পছন্দনীয় কাজ, না কাউকে মেরে ফেলা পছন্দনীয় কাজ?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “কারও জীবন রক্ষা করাই আমার নিকট পছন্দনীয় কাজ।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে আপনি এ কাজেই লেগে থাকুন।”মহান আল্লাহ বলেনঃ বানী ইসরাঈলের কাছে আমার বহু রাসূলও স্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিয়ে আগমন করেছিল, তবু এর পরেও তাদের মধ্য হতে অনেকেই ভূ-পৃষ্ঠে সীমালংঘনকারী রয়ে গেছে। যেমন ইয়াহুদী বানূ কুরাইযা ও বানূ নাযীর আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের সাথে মিলিত হয়ে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতো এবং নিহত ব্যক্তির মুক্তিপণ আদায় করতো। তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে আয়াত নাযিল করা হয়- তোমাদের নিকট এই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে হত্যা করবে না এবং তাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে না। কিন্তু এই মজবুত আহাদ ও অঙ্গীকার সত্ত্বেও তোমরা তার উল্টো করেছে। যদিও মুক্তিপণ আদায় করেছে, কিন্তু তাদেরকে দেশ হতে বের করে দেয়াও তো হারাম ছিল। এর কি অর্থ হতে পারে যে, তোমরা কোন কোন হুকুম মানবে এবং কোন কোনটা মানবে না? এরূপ লোকদের শস্তি তো এটাই যে, তারা দুনিয়াতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম থেকে উদাসীন নন।(আরবী) এ আয়াতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরুদ্ধাচরণ করা এবং হুকুমের বিপরীত করা। এর ভাবার্থ হচ্ছে কুফরী করা, ডাকাতি করা, ব্যভিচার করা এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকারের অশান্তি সৃষ্টি করা। এমনকি পূর্ববর্তী অনেক মনীষী, যাঁদের মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) রয়েছেন, বলেন যে, রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রা অধিকার করে নেয়াও হচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টি করার শামিল। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেছেনঃ যখন কাউকে কোন কাজের অলী বানিয়ে দেয়া হয় তখন সে ফাসাদ ও অশান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং চাষাবাদের ভূমি ও মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলে, আর আল্লাহ ফাসাদকে ভালবাসেন না। এ আয়াতটি মশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কেননা, এতে এটাও আছে যে, যখন এরূপ লোক এ কাজগুলো করার পর মুসলমানদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই তাওবা করে নেয় তবে তার কোন জবাবদিহি নেই। পক্ষান্তরে যদি কোন মুসলমান এমন কাজ করে এবং পলায়ন করে কাফিরদের নিকট চলে যায় তবে শরঈ হদ থেকে মুক্ত হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ যদি মুসলমানদের হাতে পড়ে যাওয়ার পূর্বে তাওবা করে নেয় তবে তার কৃতকর্মের দরুন যে হুকুম তার উপর সাব্যস্ত হয়ে গেছে তা টলতে পারে না। হযরত উবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে কিতাবের একটা দলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তারা তা ভঙ্গ করে এবং গণ্ডগোল সৃষ্টি করে। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে স্বাধীনতা দেন যে, তিনি ইচ্ছে করলে তাদেরকে হত্যা করতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে তাদের একদিকের হাত ও অপরদিকের পা কেটে ফেলতে পারেন। হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি হারূরিয়া খারেজীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সঠিক কথা এই যে, যে কেউই এ কাজ করবে তারই ব্যাপারে এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেহেতু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উক্কাল গোত্রের কতগুলো লোক আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং তাঁর কাছে ইসলামের বায়আত গ্রহণ করে। অতঃপর মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয় এবং তাদের পেট মোটা হয়ে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এর অভিযোগ পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা চাইলে আমাদের রাখালের সাথে চলে যাও, তথায় উটের প্রস্রাব ও দুধ পান করবে। তারা বললোঃ “হ্যা (আমরা যেতে চাই।)” সুতরাং তারা বেরিয়ে পড়লো। অতঃপর তাদের রোগ সেরে গেলো। তখন তারা রাখালকে মেরে ফেললো এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি সাহাবায়ে কিরামকে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে ধরে আনার নির্দেশ দেন। অতএব তাদেরকে পাকড়াও করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তখন তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়। অতঃপর তাদেরকে রৌদ্রে ফেলে রাখা হয় ফলে তারা ধড়ফড় করে মৃত্যুবরণ করে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো উক্কাল গোত্রের ছিল কিংবা উরাইনা গোত্রের ছিল। তারা পানি চেয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। তারা চুরিও করেছিল, হত্যাও করেছিল, ঈমান আনয়নের পর কুফরীও করেছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করেছিল এবং তারা রাখালের চোখে গরম শলাকাও ভরে দিয়েছিল। সেই সময় মদীনার আবহাওয়া ভাল ছিল না। তারা বারসাম' নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে ২০ জন ঘোড় সওয়ার আনসারীকে পাঠিয়েছিলেন। একজন পদব্রজে চলছিলেন, যিনি পদচিহ্ন দেখে দেখে পথ দেখিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মৃত্যুর সময় তারা পিপাসায় এতো কাতর হয়ে পড়েছিলো যে, মাটি চাটতে শুরু করেছিলো! তাদের ব্যাপারেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। একদা হাজ্জাজ হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকে সবচেয়ে বড় ও কঠিন যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা বর্ণনা করুন।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো বাহরাইন থেকে এসেছিল। রোগের কারণে তাদের রং হলদে বর্ণ ধারণ করেছিল। আর পেট বড় হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা সাদকার উটের নিকট গমন কর এবং ওগুলোর দুধ ও প্রস্রাব পান কর।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “তারপর আমি দেখলাম যে, হাজ্জাজ এ রিওয়ায়াতকে নিজের অত্যাচারের দলীল বানিয়ে নিলো। আমি তখন খুবই লজ্জিত হলাম যে, আমি তার কাছে এ হাদীসটি কেন বর্ণনা করলাম।” অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে চারজন লোক ছিল উরাইনা গোত্রের এবং তিনজন ছিল ইকাল গোত্রের। এরা যখন সুস্থ হয়ে উঠলো তখন ধর্মত্যাগী হয়ে গেলো। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ব্যভিচারীও ছিল। তারা যখন আগমন করে তখন দারিদ্রের কারণে তাদের পরনে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। তারা হত্যা ও লুঠ করে নিজেদের শহরের দিকে যাচ্ছিল। হযরত জারীর (রাঃ) বলেনঃ তারা তাদের কওমের কাছে প্রায় পৌছেই গিয়েছিল এমতাবস্থায় আমরা তাদেরকে ধরে ফেলি। তারা পানি চাচ্ছিল, আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ “এখন তো পানির পরিবর্তে জাহান্নামের আগুন পাবে।” এ বর্ণনায় এটাও বলা হয়েছে যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল ও গারীব। কিন্তু এর দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঐ ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যে সৈন্যদল পাঠানো হয়ছিল তাঁদের সর্দার ছিলেন হযরত জারীর (রাঃ)। এ বর্ণনার এ অংশটি একেবারই বর্জনীয় যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। কেননা, সহীহ মুসলিমে এটা বিদ্যমান আছে যে, তারা রাখালের সাথে ঐ ব্যবহার করেছিল। সুতরাং ওটা ছিল তাদের কিসাস বা প্রতিশোধ গ্রহণ। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, ঐলোকগুলো বানূ ফারাহ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শাস্তি আর কাউকেও দেননি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইয়াসার নামক এক ক্রীতদাস ছিল। সে অত্যন্ত নামাযী ছিল বলে তিনি তাকে আযাদ করে দিয়েছিলেন। অতঃপর স্বীয় উটের পালে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সে ঐ উটগুলো দেখা শোনা করতো। তাকেই ঐ ধর্মত্যাগীরা হত্যা করে ফেলেছিল এবং তার চোখে কাটা গেড়ে দিয়ে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। যে সেনাবাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করে এনেছিলেন তাদের মধ্যে একজন শক্তিশালী যুবক ছিলেন হযরত কুরম্ ইবনে ফাহরী (রাঃ)। হাফিয আবু বকর মিরদুওয়াই (রঃ) এ বর্ণনার সমস্ত তরীকা বা পন্থাকে একত্রিত করেছেন। আল্লাহ পাক তাকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন। আবু হামযাহ ইবনে আবদুল করীম (রঃ) উটের প্রস্রাবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি ঐ ধর্মত্যাগীদের কাহিনী বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও আছে যে, ঐ লোকগুলো কপটতার সাথে ঈমান এনেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মদীনার প্রতিকূল আবহাওয়ার অভিযোগ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদের প্রতারণা, হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্মত্যাগের বিষয় জানতে পারেন তখন তিনি ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর সৈন্যগণ যেন তাদের পশ্চাদ্ধাবনে বেরিয়ে পড়ে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই সাহাবীগণ কেউ কারও জন্যে অপেক্ষা না করেই তাদের পিছনে বেরিয়ে পড়েন। তাদেকে পাঠিয়ে দেয়ার পর স্বয়ং নবী করীম (সঃ) রওয়ানা হয়ে যান। ঐ বিদ্রোহী ও ডাকাতের দল তাদের নিরাপদ জায়গায় প্রায় পৌছেই গেছে, এমন সময় সাহাবায়ে কিরাম তাদেরকে ঘিরে ফেলেন। তাদের মধ্যে যে কয়েকজন গ্রেফতার হয় তাদেরকে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করেন। ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে দেশান্তরিত করা ছিল এই যে, তাদেরকে ইসলামী হুকুমতের সীমানা থেকে বের করে দিয়ে শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া হয়েছিল। এর পর নবী করীম (সঃ) আর কোন দিনই কোন লোকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেহচ্যুত করেননি, বরং তিনি তা থেকে নিষেধ করেন। জন্তুর সাথেও এরূপ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কেউ কেউ বলেন, হত্যার পর তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, ওরা বানূ সালীম গোত্রের লোক ছিল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয়নি এবং এ আয়াত দ্বারা ওটা মানসূখ। বা রহিত করে দেয়া হয়েছে। তাদের মতে এ আয়াতে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ শাস্তি দেয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন (আরবী) -এ আয়াতটি। কারও কারও মতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) “মুসলা" অর্থাৎ নাক, কান কেটে নিতে যে নিষেধ করেছেন তা দ্বারা এ শাস্তি মানসূখ হয়ে গেছে। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। তারপর এটাও জিজ্ঞাস্য বিষয় যে, মানসূখকারীর বিলম্বের দলীল কি? কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে ইসলামের হদ স্থিরীকরণের পূর্বেকার ঘটনা। কিন্তু এটাও মোটেই ঠিক নয়, বরং স্থিরীকরণের পরের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। কেননা, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)। আর তিনি সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে গেল তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকলেন। কিন্তু এটাও সঠিক কথা নয়। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ শব্দ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আজলান বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে যে কঠিন শাস্তি দিয়েছিলেন তা যে উচিত ছিল না এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। যাতে উচিত শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে আর তা হচ্ছে হাত-পা বিপরীতভাবে কেটে নেয়া এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া। আর দেখা যাচ্ছে যে, এরপর আর কোনদিন কারও চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, তারা যা করেছিল তারই প্রতিফল তারা পেয়েছিল। এখন যে আয়াত নাযিল হলো তাতে এরূপ লোকদের জন্যে একটা বিশেষ হুকুম বর্ণনা করা হলো এবং তাতে চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার হুকুম দেয়া হলো না। এ আয়াত দ্বারা জমহুর উলামা এ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পথ বন্ধ করে দিয়ে যুদ্ধ করা এবং শহরে যুদ্ধ করা দুটোই সমান। কেননা, আয়াতে (আরবী) শব্দগুলো রয়েছে। মালিক, আলঈ এবং শাফিঈর (আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হোন) এটাই মাযহাব যে, বিদ্রোহীরা শহরের ভেতরেই এসব হাঙ্গামা সৃষ্টি করুক বা শহরের বাইরেই করুক, তাদের শাস্তি এটাই। এমনকি ইমাম মালিক (রঃ) তো এতদূর পর্যন্ত বলেন যে, কোন লোক অপর কোন লোককে তার বাড়ীতে এ ধরনের প্রতারণা করে হত্যা করলে তাকে ধরে আনা হবে এবং তার কাছে যেসব মাল ও আসবাবপত্র রয়েছে সবগুলোই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আর সাথে সাথে তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। সমসাময়িক ইমামই এ কাজ করবেন, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকেরা নয়। এমনকি যদি তারা (অভিভাবকেরা) তাকে ক্ষমা করে দিতে চায় তবুও তাদেরকে এ অধিকার দেয়া হবে না। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এটা নয়। তিনি বলেন, যে ঐ সময় মেনে নেয়া হবে যখন কেউ শহরের বাইরে এরূপ হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে। কেননা, শহরে তো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শহরের বাইরে এর কোনই সম্ভাবনা নেই। এ বিদ্রোহীদের যে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি মুসলমানদের উপর তরবারী উঠাবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে, তাকে মুসলমানদের ইমাম উল্লিখিত তিনটি শাস্তির যে কোন একটি দিতে পারেন। আরও অনেকেরই এটাই উক্তি। আর অন্যান্য আয়াতের হুকুমের মধ্যেও এ ধরনের অধিকার বিদ্যমান রয়েছে। যেমন হজ্বের ইহরামের অবস্থায় কেউ শিকার করলে তাকে সেই শিকারের সমপর্যায়ের জন্তু কুরবানী করতে হয় বা মিসকীনদেরকে খানা খাওয়াতে হয় কিংবা সেই বরাবর রোযা রাখতে হয়। অনুরূপভাবে রোগ বা মাথার অসুখের কারণে কেউ ইহরামের অবস্থায় মাথা মুণ্ডন করালে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে রোযা, সাদকা বা কুরবানী করতে হয়। তদ্রপ কসমের কাফফারায় মধ্যমভাবে দশজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর বা তাদেরকে কাপড় পরানোর অথবা একটি গোলাম আযাদ করণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাহলে যেমন এখানে এ অবস্থাগুলোর মধ্য হতে যে কোন একটি পছন্দ করে নেয়ার অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনই বিদ্রোহী ধর্মত্যাগীদের শাস্তিও হচ্ছে হত্যা অথবা বিপরীতভাবে হাত-পা কেটে নেয়া কিংবা দেশ হতে বিতাড়িত করা। আর জমহরের উক্তি এই যে, এ আয়াতুটি কয়েক অবস্থার সাথে জড়িত। যখন ডাকাত হত্যা ও লুঠপাট উভয় অপরাধে অপরাধী হবে তখন সে শূলেও হত্যার যোগ্য হবে। আর যদি শুধু হত্যার দোষে দোষী হয় তবে হত্যার বদলে শুধু হত্যাই করা হবে। যদি শুধু মাল নেয় তবে উল্টোভাবে হাত-পা কেটে নিতে হবে অর্থাৎ এক দিকের হাত ও অপর দিকের পা- এভাবে কেটে নিতে হবে। আর যদি পথকে ভীতিপূর্ণ করে তোলে এবং জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, এছাড়া অন্য কোন পাপে লিপ্ত না হয় তবে শুধু তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। অধিকাংশ মনীষী ও ইমামদের মাযহাব এটাই। তারপর মনীষীদের মধ্যে এ ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে যে, তাকে শুধু শূলের উপর লটকিয়ে দিয়েই কি ছেড়ে দেয়া হবে, যাতে সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মারা যাবে? না বর্শা ইত্যাদি দ্বারা হত্যা করা হবে, যাতে মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে? না তিন দিন পর্যন্ত শূলেই রাখা হবে, তারপর নামিয়ে নেয়া হবে? না এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? কিন্তু এটা তাফসীরের স্থান নয়। যে, আমরা ছোটখাটো মতভেদ নিয়েই পড়ে থাকব এবং প্রত্যেকেরই দলীল পেশ করব। হ্যা, তবে একটি হাদীসে শাস্তির কিছু বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ওর সনদ যদি সহীহ হয় তাহলে তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ঐ বিদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা মাল চুরি করবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে তাদের হাত চুরির বদলে কেটে নেয়া হবে, যে হত্যা করবে তাকে হত্যা করে দেয়া হবে। আর যে হত্যা করবে, পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে এবং ব্যভিচার করবে তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিবে।”(আরবী) অথবা ভূ-পৃষ্ঠ হতে বের করে দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদেরকে অনুসন্ধান করে তাদের উপর হদ কায়েম করা হবে অথবা দারুল ইসলাম থেকে বের করে দেয়া হবে, যেন তারা অন্য কোথায়ও চলে যায়। কিংবা এক শহর থেকে অন্য কোন শহরে এবং সেই শহর থেকে আর এক শহরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অথবা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণরূপেই বের করে দেয়া হবে। শা'বী (রঃ) তো শুধু বের করেই দিতেন। আর আতা’ খোরাসানী (রঃ) বলেন যে, এক সেনাবাহিনী থেকে অন্য সেনাবাহিনীর মধ্যে পৌছিয়ে দেয়া হবে। এমনিভাবে তাকে কয়েক বছর পর্যন্ত যেখানে সেখানে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানো হবে। কিন্তু তাকে দারুল ইসলাম থেকে বের করা হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর পছন্দনীয় কথা এই যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে বের করে দিয়ে অন্য কোন শহরের জেলখানায় ভরে দেয়া হবে।(আরবী) আয়াতের এ সব লোকের পক্ষপাতিত্ব করছে যারা বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানদের ব্যাপারে রয়েছে ঐ বিশুদ্ধ হাদীসটি যাতে আছে যে, বর্ণনাকারী হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট থেকে ঐ অঙ্গীকারই গ্রহণ করেন যা তিনি স্ত্রীলোকদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তা হচ্ছে-আমরা যেন চুরি না করি, ব্যভিচারে লিপ্ত না হই, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা না করি এবং একে অপরের নাফরমানী না করি। (অর্থাৎ কেউ যেন কারও উপর মিথ্যা অপবাদ না দেয়) যারা এ অঙ্গীকার পূর্ণ করবে তাদের পুরস্কার রয়েছে আল্লাহর দায়িত্বে। আর যারা এগুলোর মধ্যে কোন একটি পাপকার্যে লিপ্ত হবে এবং ওর শাস্তিও প্রাপ্ত হবে তবে সেটাই তার সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ সেটা গোপন করেন তবে তার সে বিষয়ের দায়িত্ব তারই উপর থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দেবেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকাজ করলো, অতঃপর তাকে শাস্তি দেয়া হলো, তাহলে আল্লাহ যে তাকে পুনরায় শাস্তি দেবেন এ থেকে তাঁর আদল ও ইনসাফ বহু ঊর্ধ্বে। আর যে ব্যক্তি কোন পাপ করলো, অতঃপর আল্লাহ তা ঢেকে নিলেন এবং ক্ষমা করে দিলেন, তবে আল্লাহর করুণা এর বহু ঊর্ধ্বে যে, তিনি তাঁর বান্দার কোন পাপ ক্ষমা করে দেয়ার পর আবার ওর শাস্তি ফিরিয়ে আনবেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তবে এ শাস্তিপ্রাপ্তির পর যদি তাওবা ছাড়াই মারা যায় তবে পরকালের শাস্তি বাকী থেকে যাবে, যার সঠিক কল্পনা করাও এখন অসম্ভব। হ্যা, তবে যদি তাওবা নসীব হয় তাহলে অন্য কথা। তারপর তাওবাকারীদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার প্রকাশ ঐ অবস্থায় তো স্পষ্ট যে, এ আয়াতকে মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ মেনে নেয়া হবে। কিন্তু যে মুসলমান বিদ্রোহী হবে এবং সে অধিকারে আসার পূর্বেই যদি তাওবা করে নেয় তবে তার উপর হত্যা, শূল এবং পা কেটে নেয়া তো প্রযোজ্য হবেই না, এমনকি তার হাতও কাটা যাবে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি উক্তি রয়েছে। আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দ্বারা এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত শাস্তিই তার উপর থেকে উঠে যাবে। সাহাবীদের আমলও এরই উপর রয়েছে। যেমন জারিয়া ইবনে বদর তাইমী বসরী যমীনে ফাসাদ বা হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ ব্যাপারে কয়েকজন কুরাইশী হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন, যাদের মধ্যে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফরও (রাঃ) ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে নিরাপত্তা দান করতে অস্বীকার করেন। জারিয়া ইবনে বদর তখন সাঈদ ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে নিজের বাড়ীতে রেখে হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেনঃ আচ্ছা বলুন তো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে, অতঃপর তিনি এ আয়াতগুলো (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তখন হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপ ব্যক্তির জন্যে তো আমি নিরাপত্তা দান করবো।” হযরত সাঈদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সে হচ্ছে জারিয়া ইবনে বদর।” এরপর জারিয়া তার প্রশংসায় কবিতাও রচনা করেন।ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক কুফার মসজিদে কোন এক ফরয নামাযের পরে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। সে সময় তিনি কুফার শাসনকর্তা ছিলেন। লোকটি এসে তাকে বলেঃ “হে আমীরে কুফা! আমি মুরাদ গোত্রের অমুকের পুত্র অমুক। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে লড়েছি এবং ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনারা আমার উপর ক্ষমতা লাভ করার পূর্বেই তাওবা করেছি। আমি এখন আপনার আশ্রয়স্থলে দাড়িয়েছি।” একথা শুনে হযরত আব মুসা আশআরী দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে লোক সকল! এ তাওবার পরে তোমাদের কেউ যেন এর সাথে কোন প্রকারের দুর্ব্যবহার না করে। যদি সে তার তাওবায় সত্যবাদী হয় তবে তো ভাল কথা, আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার পাপই তাকে ধ্বংস করবে।” লোকটি কিছুকাল পর্যন্ত তো ঠিকভাবেই থাকলো। তারপর সে পুনরায় মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলাও তাকে তার পাপের কারণে ধ্বংস করে দিলেন এবং তাকে হত্যা করা হলো।ইবনে জারীর (রাঃ) আরও বর্ণনা করেছেন যে, আলী আসাদী নামক একটি লোক মানুষের পথকে বিপজ্জনক করে তোলে। সে মানুষকে হত্যা করে এবং তাদের মালধন লুঠপাট করতে থাকে। বাদশাহ, সেনাবাহিনী এবং জনসাধারণ সদা তাকে গ্রেফতার করার চেষ্টায় থাকে, কিন্তু অকৃতকার্য হয়। একদা সে জঙ্গলে অবস্থান করছিল এমন সময় একটি লোককে কুরআন পাঠ করতে শুনলো। লোকটি সেই সময় (আরবী) (৩৯:৫৩)-এ আয়াটি পাঠ করছিল। এটা শুনে সে থমকে দাঁড়ালো এবং তাকে বললোঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ আয়াতটি পুনরায় আমাকে পাঠ করে শুনাও। লোকটি আবার তা পাঠ করলো। তখন আলী স্বীয় তরবারীখানা খাপে রেখে দিল। তৎক্ষণাৎ সে বিশুদ্ধ মনে তাওবা করলো এবং ফজরের নামাযের পূর্বেই মদীনায় পৌছে গেল। তার পর গোসল করলো এবং মসজিদে নববীতে (সঃ) প্রবেশ করে জামাআতে ফজরের নামায আদায় করলো। নামায শেষে লোকেরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর পাশে বসে পড়লো। সেও তখন তাদেরই মধ্যে একধারে বসে গেল। ফর্সা হয়ে গেলে লোকেরা তাকে দেখে চিনে ফেললো এবং তাকে গ্রেফতার করতে উদ্যত হলো। সে বললোঃ “দেখুন, আমার উপর আপনাদের ক্ষমতা লাভ হওয়ার পূর্বেই আমি তাওবা করেছি এবং তাওবা করার পর আপনাদের নিকট হাযির হয়েছি। সুতরাং এখন আমার উপর আপনাদের বল প্রয়োগের কোন পথ নেই।” তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বললেনঃ “লোকটি সত্য কথাই বলেছে।” অতঃপর তিনি তার হাত ধরে মারওয়ান ইবনে হাকামের নিকট নিয়ে গেলেন। সে সময় তিনি মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁকে বললেনঃ “এ হচ্ছে আলী আসাদী, সে তাওবা করেছে সুতরাং এর উপর আপনি কোন বল প্রয়োগ করতে পারেন না।" ফলে কেউই তার সাথে কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করলেন না। মুজাহিদের একটি দল যখন রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে রওয়ানা হলেন, তাঁদের সাথে এ আলী আসাদীও গেল। তাদের নৌকা সমুদ্রে চলছিল। তাদের সামনে রোমকদের কতগুলো নৌকা এসে পড়লো। তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্যে সে নিজেদের নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ে তাদের নৌকায় গিয়ে উঠলো। তারা তার তরবারীর চমক সহ্য করতে না পেরে পালে টান দিল। আলীও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হলো। ফলে নৌকা ডুবে গেলো এবং রোমকদের সবাই ডুবে মরলো। তাদের সাথে হযরত আলী আসাদীও (রাঃ) ডুবে গিয়ে শাহাদত বরণ করলো।

আল-মায়িদা 5:34

৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আদমের এ ছেলের অন্যায়ভাবে তার ভাইকে হত্যার কারণে আমি বানী ইসরাঈলকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, তাদের কিতাবে লিখে দিয়েছি এবং তাদের শরঈ হুকুম করে দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কাউকে বিনা কারণে হত্যা করে ফেললো, না সে নিহত ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছিল, না সে ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাহলে সে যেন দুনিয়ার সমস্ত লোককেই হত্যা করে ফেললো। কেননা, আল্লাহর কাছে সমস্ত সৃষ্টজীব সমান। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন নির্দোষ লোককে হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, ওটাকে হারাম জানলো, তবে সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ বাঁচালো। কেননা, সমস্ত মানুষ এভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ)-কে যখন বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলে, তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে বলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন। আমি আপনার পক্ষ হয়ে আপনার বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছি। আপনি লক্ষ্য করুন যে, পানি এখন মাথার উপরে উঠে গেছে। সুতরাং এখন তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।” এ কথা শুনে হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “তুমি কি সমস্ত লোককে হত্যা করার প্রতি উত্তেজিত হয়েছে যাদের মধ্যে আমিও একজন?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, না।” তখন তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি যদি একজন লোককেই হত্যা কর তবে যেন তুমি সমস্ত লোককেই হত্যা করলে। যাও, ফিরে যাও আমি চাই যে, আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করুন, পাপকার্যে লিপ্ত না করুন।” এ কথা শুনে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ফিরে গেলেন, যুদ্ধ করলেন না। ভাবার্থ এই যে, হত্যা হচ্ছে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা বৈধ মনে করে সে সমস্ত লোকের ঘাতক। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকে সে যেন সমস্ত লোকেরই প্রাণ রক্ষা করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবীকে এবং ন্যায়পরায়ণ মুসলমান বাদশাহকে হত্যাকারীর উপর সারা বিশ্বের মানুষের হত্যার পাপ বর্তিত হয়। আর নবী এবং ন্যায়পরায়ণ ইমামের বাহুকে মজবুত করা বিশ্ববাসীর জীবন রক্ষা করার শামিল। (তাফসীরে ইবনে জারীর)অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলেই সে জাহান্নামী হয়ে যায়। সে যেন সমস্ত মানুষকেই হত্যা করলো। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কোন মুমিনকে কোন শরঈ কারণ ছাড়াই হত্যাকারী জাহান্নামী, আল্লাহর দুশমন, অভিশপ্ত এবং শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়। সুতরাং সে যদি সমস্ত লোককেও হত্যা করতো তবে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতো? যে ব্যক্তি হত্যা করা থেকে বিরত থাকলো, তার পক্ষ থেকে যেন সবারই জীবন রক্ষা পেলো। আব্দুর রহমান বলেন যে, এক হত্যার বদলেই তার খুন হালাল হয়ে গেলো। এটা নয় যে, কয়েকটি হত্যার পর সে কিসাসের যোগ্য হবে। আর যে তাকে জীবিত রাখবে অর্থাৎ নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে, সে যেন লোকদেরকে জীবিত রাখলো। আবার এই ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি মানুষের জীবন বাঁচাবে, যেমন ডুবন্ত মানুষকে উঠিয়ে নেবে, আগুনে পড়ে যাচ্ছে এমন লোককে আগুন থেকে রক্ষা করবে এবং কাউকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নেবে ইত্যাদি। উদ্দেশ্য হচ্ছে-মানুষকে অন্যায় খুন থেকে বিরত রাখা, তাদেরকে মানুষের কল্যাণ কামনা, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বানী ইসরাঈল যেমন এ হুকুমের আওতাভুক্ত ছিল তদ্রুপ আমরাও কি এ হুকুমেরই আওতাভুক্ত?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আল্লাহর শপথ! বানী ইসরাঈলের রক্ত আল্লাহর নিকট আমাদের রক্ত অপেক্ষা কোনক্রমেই মর্যাদাপূর্ণ নয়।” সুতরাং একটি লোককে বিনা কারণে হত্যা করা সকলকে হত্যা করার শামিল এবং একটি লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্য সমস্ত লোকের জীবন রক্ষা করার পুণ্যের সমান। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, একদা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন কাজ বাতলিয়ে দিন যা আমার জীবনকে সুখময় করে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে হামযা (রাঃ)! কারও জীবন রক্ষা করা আপনার নিকট পছন্দনীয় কাজ, না কাউকে মেরে ফেলা পছন্দনীয় কাজ?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “কারও জীবন রক্ষা করাই আমার নিকট পছন্দনীয় কাজ।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে আপনি এ কাজেই লেগে থাকুন।”মহান আল্লাহ বলেনঃ বানী ইসরাঈলের কাছে আমার বহু রাসূলও স্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিয়ে আগমন করেছিল, তবু এর পরেও তাদের মধ্য হতে অনেকেই ভূ-পৃষ্ঠে সীমালংঘনকারী রয়ে গেছে। যেমন ইয়াহুদী বানূ কুরাইযা ও বানূ নাযীর আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের সাথে মিলিত হয়ে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতো এবং নিহত ব্যক্তির মুক্তিপণ আদায় করতো। তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে আয়াত নাযিল করা হয়- তোমাদের নিকট এই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, তোমরা তোমাদের লোকদেরকে হত্যা করবে না এবং তাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে না। কিন্তু এই মজবুত আহাদ ও অঙ্গীকার সত্ত্বেও তোমরা তার উল্টো করেছে। যদিও মুক্তিপণ আদায় করেছে, কিন্তু তাদেরকে দেশ হতে বের করে দেয়াও তো হারাম ছিল। এর কি অর্থ হতে পারে যে, তোমরা কোন কোন হুকুম মানবে এবং কোন কোনটা মানবে না? এরূপ লোকদের শস্তি তো এটাই যে, তারা দুনিয়াতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম থেকে উদাসীন নন।(আরবী) এ আয়াতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরুদ্ধাচরণ করা এবং হুকুমের বিপরীত করা। এর ভাবার্থ হচ্ছে কুফরী করা, ডাকাতি করা, ব্যভিচার করা এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকারের অশান্তি সৃষ্টি করা। এমনকি পূর্ববর্তী অনেক মনীষী, যাঁদের মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) রয়েছেন, বলেন যে, রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রা অধিকার করে নেয়াও হচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টি করার শামিল। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেছেনঃ যখন কাউকে কোন কাজের অলী বানিয়ে দেয়া হয় তখন সে ফাসাদ ও অশান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং চাষাবাদের ভূমি ও মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলে, আর আল্লাহ ফাসাদকে ভালবাসেন না। এ আয়াতটি মশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কেননা, এতে এটাও আছে যে, যখন এরূপ লোক এ কাজগুলো করার পর মুসলমানদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই তাওবা করে নেয় তবে তার কোন জবাবদিহি নেই। পক্ষান্তরে যদি কোন মুসলমান এমন কাজ করে এবং পলায়ন করে কাফিরদের নিকট চলে যায় তবে শরঈ হদ থেকে মুক্ত হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ যদি মুসলমানদের হাতে পড়ে যাওয়ার পূর্বে তাওবা করে নেয় তবে তার কৃতকর্মের দরুন যে হুকুম তার উপর সাব্যস্ত হয়ে গেছে তা টলতে পারে না। হযরত উবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে কিতাবের একটা দলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তারা তা ভঙ্গ করে এবং গণ্ডগোল সৃষ্টি করে। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে স্বাধীনতা দেন যে, তিনি ইচ্ছে করলে তাদেরকে হত্যা করতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে তাদের একদিকের হাত ও অপরদিকের পা কেটে ফেলতে পারেন। হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটি হারূরিয়া খারেজীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সঠিক কথা এই যে, যে কেউই এ কাজ করবে তারই ব্যাপারে এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেহেতু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উক্কাল গোত্রের কতগুলো লোক আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং তাঁর কাছে ইসলামের বায়আত গ্রহণ করে। অতঃপর মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয় এবং তাদের পেট মোটা হয়ে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এর অভিযোগ পেশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা চাইলে আমাদের রাখালের সাথে চলে যাও, তথায় উটের প্রস্রাব ও দুধ পান করবে। তারা বললোঃ “হ্যা (আমরা যেতে চাই।)” সুতরাং তারা বেরিয়ে পড়লো। অতঃপর তাদের রোগ সেরে গেলো। তখন তারা রাখালকে মেরে ফেললো এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি সাহাবায়ে কিরামকে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে ধরে আনার নির্দেশ দেন। অতএব তাদেরকে পাকড়াও করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তখন তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়। অতঃপর তাদেরকে রৌদ্রে ফেলে রাখা হয় ফলে তারা ধড়ফড় করে মৃত্যুবরণ করে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো উক্কাল গোত্রের ছিল কিংবা উরাইনা গোত্রের ছিল। তারা পানি চেয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। তারা চুরিও করেছিল, হত্যাও করেছিল, ঈমান আনয়নের পর কুফরীও করেছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করেছিল এবং তারা রাখালের চোখে গরম শলাকাও ভরে দিয়েছিল। সেই সময় মদীনার আবহাওয়া ভাল ছিল না। তারা বারসাম' নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে ২০ জন ঘোড় সওয়ার আনসারীকে পাঠিয়েছিলেন। একজন পদব্রজে চলছিলেন, যিনি পদচিহ্ন দেখে দেখে পথ দেখিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মৃত্যুর সময় তারা পিপাসায় এতো কাতর হয়ে পড়েছিলো যে, মাটি চাটতে শুরু করেছিলো! তাদের ব্যাপারেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। একদা হাজ্জাজ হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকে সবচেয়ে বড় ও কঠিন যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা বর্ণনা করুন।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও রয়েছে যে, ঐ লোকগুলো বাহরাইন থেকে এসেছিল। রোগের কারণে তাদের রং হলদে বর্ণ ধারণ করেছিল। আর পেট বড় হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা সাদকার উটের নিকট গমন কর এবং ওগুলোর দুধ ও প্রস্রাব পান কর।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “তারপর আমি দেখলাম যে, হাজ্জাজ এ রিওয়ায়াতকে নিজের অত্যাচারের দলীল বানিয়ে নিলো। আমি তখন খুবই লজ্জিত হলাম যে, আমি তার কাছে এ হাদীসটি কেন বর্ণনা করলাম।” অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে চারজন লোক ছিল উরাইনা গোত্রের এবং তিনজন ছিল ইকাল গোত্রের। এরা যখন সুস্থ হয়ে উঠলো তখন ধর্মত্যাগী হয়ে গেলো। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ব্যভিচারীও ছিল। তারা যখন আগমন করে তখন দারিদ্রের কারণে তাদের পরনে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। তারা হত্যা ও লুঠ করে নিজেদের শহরের দিকে যাচ্ছিল। হযরত জারীর (রাঃ) বলেনঃ তারা তাদের কওমের কাছে প্রায় পৌছেই গিয়েছিল এমতাবস্থায় আমরা তাদেরকে ধরে ফেলি। তারা পানি চাচ্ছিল, আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছিলেনঃ “এখন তো পানির পরিবর্তে জাহান্নামের আগুন পাবে।” এ বর্ণনায় এটাও বলা হয়েছে যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল ও গারীব। কিন্তু এর দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঐ ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যে সৈন্যদল পাঠানো হয়ছিল তাঁদের সর্দার ছিলেন হযরত জারীর (রাঃ)। এ বর্ণনার এ অংশটি একেবারই বর্জনীয় যে, তাদের চোখে শলাকা ভরে দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। কেননা, সহীহ মুসলিমে এটা বিদ্যমান আছে যে, তারা রাখালের সাথে ঐ ব্যবহার করেছিল। সুতরাং ওটা ছিল তাদের কিসাস বা প্রতিশোধ গ্রহণ। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, ঐলোকগুলো বানূ ফারাহ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শাস্তি আর কাউকেও দেননি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইয়াসার নামক এক ক্রীতদাস ছিল। সে অত্যন্ত নামাযী ছিল বলে তিনি তাকে আযাদ করে দিয়েছিলেন। অতঃপর স্বীয় উটের পালে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সে ঐ উটগুলো দেখা শোনা করতো। তাকেই ঐ ধর্মত্যাগীরা হত্যা করে ফেলেছিল এবং তার চোখে কাটা গেড়ে দিয়ে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। যে সেনাবাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করে এনেছিলেন তাদের মধ্যে একজন শক্তিশালী যুবক ছিলেন হযরত কুরম্ ইবনে ফাহরী (রাঃ)। হাফিয আবু বকর মিরদুওয়াই (রঃ) এ বর্ণনার সমস্ত তরীকা বা পন্থাকে একত্রিত করেছেন। আল্লাহ পাক তাকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন। আবু হামযাহ ইবনে আবদুল করীম (রঃ) উটের প্রস্রাবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি ঐ ধর্মত্যাগীদের কাহিনী বর্ণনা করেন। তাতে এ কথাও আছে যে, ঐ লোকগুলো কপটতার সাথে ঈমান এনেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মদীনার প্রতিকূল আবহাওয়ার অভিযোগ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদের প্রতারণা, হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্মত্যাগের বিষয় জানতে পারেন তখন তিনি ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর সৈন্যগণ যেন তাদের পশ্চাদ্ধাবনে বেরিয়ে পড়ে। এ ঘোষণা শোনা মাত্রই সাহাবীগণ কেউ কারও জন্যে অপেক্ষা না করেই তাদের পিছনে বেরিয়ে পড়েন। তাদেকে পাঠিয়ে দেয়ার পর স্বয়ং নবী করীম (সঃ) রওয়ানা হয়ে যান। ঐ বিদ্রোহী ও ডাকাতের দল তাদের নিরাপদ জায়গায় প্রায় পৌছেই গেছে, এমন সময় সাহাবায়ে কিরাম তাদেরকে ঘিরে ফেলেন। তাদের মধ্যে যে কয়েকজন গ্রেফতার হয় তাদেরকে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করেন। ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে দেশান্তরিত করা ছিল এই যে, তাদেরকে ইসলামী হুকুমতের সীমানা থেকে বের করে দিয়ে শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া হয়েছিল। এর পর নবী করীম (সঃ) আর কোন দিনই কোন লোকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেহচ্যুত করেননি, বরং তিনি তা থেকে নিষেধ করেন। জন্তুর সাথেও এরূপ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কেউ কেউ বলেন, হত্যার পর তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, ওরা বানূ সালীম গোত্রের লোক ছিল। কোন কোন মনীষী বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছিলেন তা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয়নি এবং এ আয়াত দ্বারা ওটা মানসূখ। বা রহিত করে দেয়া হয়েছে। তাদের মতে এ আয়াতে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ শাস্তি দেয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন (আরবী) -এ আয়াতটি। কারও কারও মতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) “মুসলা" অর্থাৎ নাক, কান কেটে নিতে যে নিষেধ করেছেন তা দ্বারা এ শাস্তি মানসূখ হয়ে গেছে। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। তারপর এটাও জিজ্ঞাস্য বিষয় যে, মানসূখকারীর বিলম্বের দলীল কি? কেউ কেউ বলেন যে, এটা হচ্ছে ইসলামের হদ স্থিরীকরণের পূর্বেকার ঘটনা। কিন্তু এটাও মোটেই ঠিক নয়, বরং স্থিরীকরণের পরের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। কেননা, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)। আর তিনি সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে গেল তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকলেন। কিন্তু এটাও সঠিক কথা নয়। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ শব্দ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের চোখে গরম শলাকা ভরে দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আজলান বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে যে কঠিন শাস্তি দিয়েছিলেন তা যে উচিত ছিল না এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। যাতে উচিত শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে আর তা হচ্ছে হাত-পা বিপরীতভাবে কেটে নেয়া এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া। আর দেখা যাচ্ছে যে, এরপর আর কোনদিন কারও চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়া হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, তারা যা করেছিল তারই প্রতিফল তারা পেয়েছিল। এখন যে আয়াত নাযিল হলো তাতে এরূপ লোকদের জন্যে একটা বিশেষ হুকুম বর্ণনা করা হলো এবং তাতে চোখে গরম শলাকা ভরে দেয়ার হুকুম দেয়া হলো না। এ আয়াত দ্বারা জমহুর উলামা এ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পথ বন্ধ করে দিয়ে যুদ্ধ করা এবং শহরে যুদ্ধ করা দুটোই সমান। কেননা, আয়াতে (আরবী) শব্দগুলো রয়েছে। মালিক, আলঈ এবং শাফিঈর (আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হোন) এটাই মাযহাব যে, বিদ্রোহীরা শহরের ভেতরেই এসব হাঙ্গামা সৃষ্টি করুক বা শহরের বাইরেই করুক, তাদের শাস্তি এটাই। এমনকি ইমাম মালিক (রঃ) তো এতদূর পর্যন্ত বলেন যে, কোন লোক অপর কোন লোককে তার বাড়ীতে এ ধরনের প্রতারণা করে হত্যা করলে তাকে ধরে আনা হবে এবং তার কাছে যেসব মাল ও আসবাবপত্র রয়েছে সবগুলোই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আর সাথে সাথে তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। সমসাময়িক ইমামই এ কাজ করবেন, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকেরা নয়। এমনকি যদি তারা (অভিভাবকেরা) তাকে ক্ষমা করে দিতে চায় তবুও তাদেরকে এ অধিকার দেয়া হবে না। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মাযহাব এটা নয়। তিনি বলেন, যে ঐ সময় মেনে নেয়া হবে যখন কেউ শহরের বাইরে এরূপ হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে। কেননা, শহরে তো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শহরের বাইরে এর কোনই সম্ভাবনা নেই। এ বিদ্রোহীদের যে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি মুসলমানদের উপর তরবারী উঠাবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে, তাকে মুসলমানদের ইমাম উল্লিখিত তিনটি শাস্তির যে কোন একটি দিতে পারেন। আরও অনেকেরই এটাই উক্তি। আর অন্যান্য আয়াতের হুকুমের মধ্যেও এ ধরনের অধিকার বিদ্যমান রয়েছে। যেমন হজ্বের ইহরামের অবস্থায় কেউ শিকার করলে তাকে সেই শিকারের সমপর্যায়ের জন্তু কুরবানী করতে হয় বা মিসকীনদেরকে খানা খাওয়াতে হয় কিংবা সেই বরাবর রোযা রাখতে হয়। অনুরূপভাবে রোগ বা মাথার অসুখের কারণে কেউ ইহরামের অবস্থায় মাথা মুণ্ডন করালে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে রোযা, সাদকা বা কুরবানী করতে হয়। তদ্রপ কসমের কাফফারায় মধ্যমভাবে দশজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর বা তাদেরকে কাপড় পরানোর অথবা একটি গোলাম আযাদ করণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাহলে যেমন এখানে এ অবস্থাগুলোর মধ্য হতে যে কোন একটি পছন্দ করে নেয়ার অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনই বিদ্রোহী ধর্মত্যাগীদের শাস্তিও হচ্ছে হত্যা অথবা বিপরীতভাবে হাত-পা কেটে নেয়া কিংবা দেশ হতে বিতাড়িত করা। আর জমহরের উক্তি এই যে, এ আয়াতুটি কয়েক অবস্থার সাথে জড়িত। যখন ডাকাত হত্যা ও লুঠপাট উভয় অপরাধে অপরাধী হবে তখন সে শূলেও হত্যার যোগ্য হবে। আর যদি শুধু হত্যার দোষে দোষী হয় তবে হত্যার বদলে শুধু হত্যাই করা হবে। যদি শুধু মাল নেয় তবে উল্টোভাবে হাত-পা কেটে নিতে হবে অর্থাৎ এক দিকের হাত ও অপর দিকের পা- এভাবে কেটে নিতে হবে। আর যদি পথকে ভীতিপূর্ণ করে তোলে এবং জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, এছাড়া অন্য কোন পাপে লিপ্ত না হয় তবে শুধু তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। অধিকাংশ মনীষী ও ইমামদের মাযহাব এটাই। তারপর মনীষীদের মধ্যে এ ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে যে, তাকে শুধু শূলের উপর লটকিয়ে দিয়েই কি ছেড়ে দেয়া হবে, যাতে সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মারা যাবে? না বর্শা ইত্যাদি দ্বারা হত্যা করা হবে, যাতে মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে? না তিন দিন পর্যন্ত শূলেই রাখা হবে, তারপর নামিয়ে নেয়া হবে? না এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? কিন্তু এটা তাফসীরের স্থান নয়। যে, আমরা ছোটখাটো মতভেদ নিয়েই পড়ে থাকব এবং প্রত্যেকেরই দলীল পেশ করব। হ্যা, তবে একটি হাদীসে শাস্তির কিছু বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ওর সনদ যদি সহীহ হয় তাহলে তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ঐ বিদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা মাল চুরি করবে এবং পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে তাদের হাত চুরির বদলে কেটে নেয়া হবে, যে হত্যা করবে তাকে হত্যা করে দেয়া হবে। আর যে হত্যা করবে, পথকে বিপজ্জনক করে তুলবে এবং ব্যভিচার করবে তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিবে।”(আরবী) অথবা ভূ-পৃষ্ঠ হতে বের করে দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদেরকে অনুসন্ধান করে তাদের উপর হদ কায়েম করা হবে অথবা দারুল ইসলাম থেকে বের করে দেয়া হবে, যেন তারা অন্য কোথায়ও চলে যায়। কিংবা এক শহর থেকে অন্য কোন শহরে এবং সেই শহর থেকে আর এক শহরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অথবা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণরূপেই বের করে দেয়া হবে। শা'বী (রঃ) তো শুধু বের করেই দিতেন। আর আতা’ খোরাসানী (রঃ) বলেন যে, এক সেনাবাহিনী থেকে অন্য সেনাবাহিনীর মধ্যে পৌছিয়ে দেয়া হবে। এমনিভাবে তাকে কয়েক বছর পর্যন্ত যেখানে সেখানে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানো হবে। কিন্তু তাকে দারুল ইসলাম থেকে বের করা হবে না। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর পছন্দনীয় কথা এই যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে বের করে দিয়ে অন্য কোন শহরের জেলখানায় ভরে দেয়া হবে।(আরবী) আয়াতের এ সব লোকের পক্ষপাতিত্ব করছে যারা বলেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানদের ব্যাপারে রয়েছে ঐ বিশুদ্ধ হাদীসটি যাতে আছে যে, বর্ণনাকারী হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট থেকে ঐ অঙ্গীকারই গ্রহণ করেন যা তিনি স্ত্রীলোকদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তা হচ্ছে-আমরা যেন চুরি না করি, ব্যভিচারে লিপ্ত না হই, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা না করি এবং একে অপরের নাফরমানী না করি। (অর্থাৎ কেউ যেন কারও উপর মিথ্যা অপবাদ না দেয়) যারা এ অঙ্গীকার পূর্ণ করবে তাদের পুরস্কার রয়েছে আল্লাহর দায়িত্বে। আর যারা এগুলোর মধ্যে কোন একটি পাপকার্যে লিপ্ত হবে এবং ওর শাস্তিও প্রাপ্ত হবে তবে সেটাই তার সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ সেটা গোপন করেন তবে তার সে বিষয়ের দায়িত্ব তারই উপর থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দেবেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন পাপকাজ করলো, অতঃপর তাকে শাস্তি দেয়া হলো, তাহলে আল্লাহ যে তাকে পুনরায় শাস্তি দেবেন এ থেকে তাঁর আদল ও ইনসাফ বহু ঊর্ধ্বে। আর যে ব্যক্তি কোন পাপ করলো, অতঃপর আল্লাহ তা ঢেকে নিলেন এবং ক্ষমা করে দিলেন, তবে আল্লাহর করুণা এর বহু ঊর্ধ্বে যে, তিনি তাঁর বান্দার কোন পাপ ক্ষমা করে দেয়ার পর আবার ওর শাস্তি ফিরিয়ে আনবেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তবে এ শাস্তিপ্রাপ্তির পর যদি তাওবা ছাড়াই মারা যায় তবে পরকালের শাস্তি বাকী থেকে যাবে, যার সঠিক কল্পনা করাও এখন অসম্ভব। হ্যা, তবে যদি তাওবা নসীব হয় তাহলে অন্য কথা। তারপর তাওবাকারীদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার প্রকাশ ঐ অবস্থায় তো স্পষ্ট যে, এ আয়াতকে মুশরিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ মেনে নেয়া হবে। কিন্তু যে মুসলমান বিদ্রোহী হবে এবং সে অধিকারে আসার পূর্বেই যদি তাওবা করে নেয় তবে তার উপর হত্যা, শূল এবং পা কেটে নেয়া তো প্রযোজ্য হবেই না, এমনকি তার হাতও কাটা যাবে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি উক্তি রয়েছে। আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দ্বারা এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত শাস্তিই তার উপর থেকে উঠে যাবে। সাহাবীদের আমলও এরই উপর রয়েছে। যেমন জারিয়া ইবনে বদর তাইমী বসরী যমীনে ফাসাদ বা হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ ব্যাপারে কয়েকজন কুরাইশী হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন, যাদের মধ্যে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফরও (রাঃ) ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে নিরাপত্তা দান করতে অস্বীকার করেন। জারিয়া ইবনে বদর তখন সাঈদ ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে নিজের বাড়ীতে রেখে হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেনঃ আচ্ছা বলুন তো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে, অতঃপর তিনি এ আয়াতগুলো (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তখন হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপ ব্যক্তির জন্যে তো আমি নিরাপত্তা দান করবো।” হযরত সাঈদ (রাঃ) তখন বলেনঃ “সে হচ্ছে জারিয়া ইবনে বদর।” এরপর জারিয়া তার প্রশংসায় কবিতাও রচনা করেন।ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক কুফার মসজিদে কোন এক ফরয নামাযের পরে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। সে সময় তিনি কুফার শাসনকর্তা ছিলেন। লোকটি এসে তাকে বলেঃ “হে আমীরে কুফা! আমি মুরাদ গোত্রের অমুকের পুত্র অমুক। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে লড়েছি এবং ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনারা আমার উপর ক্ষমতা লাভ করার পূর্বেই তাওবা করেছি। আমি এখন আপনার আশ্রয়স্থলে দাড়িয়েছি।” একথা শুনে হযরত আব মুসা আশআরী দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে লোক সকল! এ তাওবার পরে তোমাদের কেউ যেন এর সাথে কোন প্রকারের দুর্ব্যবহার না করে। যদি সে তার তাওবায় সত্যবাদী হয় তবে তো ভাল কথা, আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার পাপই তাকে ধ্বংস করবে।” লোকটি কিছুকাল পর্যন্ত তো ঠিকভাবেই থাকলো। তারপর সে পুনরায় মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলাও তাকে তার পাপের কারণে ধ্বংস করে দিলেন এবং তাকে হত্যা করা হলো।ইবনে জারীর (রাঃ) আরও বর্ণনা করেছেন যে, আলী আসাদী নামক একটি লোক মানুষের পথকে বিপজ্জনক করে তোলে। সে মানুষকে হত্যা করে এবং তাদের মালধন লুঠপাট করতে থাকে। বাদশাহ, সেনাবাহিনী এবং জনসাধারণ সদা তাকে গ্রেফতার করার চেষ্টায় থাকে, কিন্তু অকৃতকার্য হয়। একদা সে জঙ্গলে অবস্থান করছিল এমন সময় একটি লোককে কুরআন পাঠ করতে শুনলো। লোকটি সেই সময় (আরবী) (৩৯:৫৩)-এ আয়াটি পাঠ করছিল। এটা শুনে সে থমকে দাঁড়ালো এবং তাকে বললোঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ আয়াতটি পুনরায় আমাকে পাঠ করে শুনাও। লোকটি আবার তা পাঠ করলো। তখন আলী স্বীয় তরবারীখানা খাপে রেখে দিল। তৎক্ষণাৎ সে বিশুদ্ধ মনে তাওবা করলো এবং ফজরের নামাযের পূর্বেই মদীনায় পৌছে গেল। তার পর গোসল করলো এবং মসজিদে নববীতে (সঃ) প্রবেশ করে জামাআতে ফজরের নামায আদায় করলো। নামায শেষে লোকেরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর পাশে বসে পড়লো। সেও তখন তাদেরই মধ্যে একধারে বসে গেল। ফর্সা হয়ে গেলে লোকেরা তাকে দেখে চিনে ফেললো এবং তাকে গ্রেফতার করতে উদ্যত হলো। সে বললোঃ “দেখুন, আমার উপর আপনাদের ক্ষমতা লাভ হওয়ার পূর্বেই আমি তাওবা করেছি এবং তাওবা করার পর আপনাদের নিকট হাযির হয়েছি। সুতরাং এখন আমার উপর আপনাদের বল প্রয়োগের কোন পথ নেই।” তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বললেনঃ “লোকটি সত্য কথাই বলেছে।” অতঃপর তিনি তার হাত ধরে মারওয়ান ইবনে হাকামের নিকট নিয়ে গেলেন। সে সময় তিনি মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁকে বললেনঃ “এ হচ্ছে আলী আসাদী, সে তাওবা করেছে সুতরাং এর উপর আপনি কোন বল প্রয়োগ করতে পারেন না।" ফলে কেউই তার সাথে কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করলেন না। মুজাহিদের একটি দল যখন রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে রওয়ানা হলেন, তাঁদের সাথে এ আলী আসাদীও গেল। তাদের নৌকা সমুদ্রে চলছিল। তাদের সামনে রোমকদের কতগুলো নৌকা এসে পড়লো। তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্যে সে নিজেদের নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ে তাদের নৌকায় গিয়ে উঠলো। তারা তার তরবারীর চমক সহ্য করতে না পেরে পালে টান দিল। আলীও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হলো। ফলে নৌকা ডুবে গেলো এবং রোমকদের সবাই ডুবে মরলো। তাদের সাথে হযরত আলী আসাদীও (রাঃ) ডুবে গিয়ে শাহাদত বরণ করলো।

আল-মায়িদা 5:35

৩৫-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে তাকওয়া ও সংযমশীলতার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং সেটাও আবার আনুগত্যের সাথে মিশ্রিতভাবে। ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহ পাকের নিষেধকৃত কাজ থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। ‘ওয়াসীলা'র অর্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ, হযরত আবু ওয়ায়েল, হযরত হাসান, হযরত যায়েদ (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সদয় হোন) প্রমুখ মুফাসৃসিরগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে।কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ পাকের আনুগত্য স্বীকার করে এবং তার মর্জি মুতাবিক আমল করে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। ইবনে যায়েদ (রঃ) নিম্নের আয়াতটিও পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তো ওরাই যারা তাদের প্রভুর নৈকট্য অনুসন্ধান করে থাকে। (১৭:৫৭) এ ইমামগণ শব্দটির যে অর্থ করেছেন তার উপর সমস্ত মুফাসসিরেরই ইজমা রয়েছে। তাঁদের কেউ এর বিপরীত অর্থ করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর উপর একটি আরবী কবিতাও পেশ করেছেন, যাতে ওয়াসীলাহ্ শব্দটি নৈকট্যের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়াসীলাহ-এর অর্থ ঐ জিনিস যার দ্বারা আকাংখিত বস্তু লাভ করা যায়। ওয়াসীলাহ্ জান্নাতের ঐ উচ্চ ও মনোরম জায়গার নাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জায়গা এবং সেটা আরশের অতি নিকটে। সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আযান শুনে (আরবী)-এ দু'আটি পাঠ করে তার জন্যে কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত হালাল হয়ে যাবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আযান শুনবে তখন মুআযযিন যা বলে তোমরাও তা-ই বল, তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ কর, এক দরূদের বিনিময়ে তোমাদের উপর আল্লাহ দশটি রহমত নাযিল করবেন। এরপর আমার জন্যে তোমরা আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যাজ্ঞা কর। ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি মনযিল যা শুধু একটি বান্দা লাভ করবে। আশা করি যে, ঐ বান্দা আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা করলো তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে গেল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করবে তখন আমার জন্যে ওয়াসীলাও প্রার্থনা করবে।” তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াসীলা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি উঁচু স্থান যা একটিমাত্র লোক লাভ করবে। আমি আশা করি যে, সেই লোকটি আমিই।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যা কর। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আমার জন্যে এ প্রার্থনা করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্যে সাক্ষী ও সুপারিশকারী হয়ে যাব।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে ওয়াসীলা অপেক্ষা বড় জায়গা আর নেই। অতএব, তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রাপ্তির প্রার্থনা কর।" একটি গারীব ও মুনকার হাদীসে এতটুকু বেশীও রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ এই ওয়াসীলায় আপনার সাথে আর কে থাকবেন? উত্তরে তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ) এবং হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর নাম উচ্চারণ করেন। আর একটি অত্যন্ত গারীব হাদীসে আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ জান্নাতে দু’টি মুক্তা রয়েছে, একটি সাদা ও অপরটি হলদে। হলদেটি তো আরশের নীচে রয়েছে। আর মাকামে মাহমুদ হচ্ছে সাদা মুক্তার তৈরী, যাতে সত্তর হাজার প্রাসাদ রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিন মাইলের সমান। ওর দরজা, জানালা, আসন ইত্যাদি যেন একই মূলের তৈরী। ওরই নাম হচ্ছে ওয়াসীলা। ওটাই হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তার আহূলে বায়তের জন্যে। (আরবী) তাকওয়া অর্থাৎ নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হতে বিরত থাকা এবং আদিষ্ট বিষয়গুলো মেনে চলার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। মুশরিক, কাফির অর্থাৎ যারা তার শত্রু, যারা তার দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে, তোমরা তাদেরকে হত্যা কর। আর এসব মুজাহিদ হচ্ছে সফলকাম। কৃতকার্যতা, সৌভাগ্য এবং মর্যাদা তাদেরই। জান্নাতের উচ্চ উচ্চ অট্টালিকা এবং আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত তাদেরই জন্যে। তাদেরকে এ জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেখানে মৃত্যু ও ধ্বংস নেই, যেখানে ঘাটতি ও লোকসান নেই, যেখানে রয়েছে চির যৌবন, অটুট স্বাস্থ্য এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি। স্বীয় প্রিয়পাত্রদের উত্তম পরিণাম বর্ণনা করার পর এখন আল্লাহ পাক তার শক্রদের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন- তাদেরকে এমন কঠিন ও জঘন্য শাস্তি দেয়া হবে যে, সেই সময় যদি তারা সারা বিশ্বের অধিপতি হয়ে যায় এমনকি আরও এরই সমান হয় এবং এমতাবস্থায় সেই কঠিনতম শাস্তি থেকে বাচার জন্যে বিনিময় হিসেবে এ সবগুলো দিতেও চায় তবুও তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করা হবে না। বরং যে শাস্তি তাদের উপর হবে তা হবে চিরস্থায়ী শাস্তি। তা হতে কোনক্রমেই রক্ষা পাওয়া যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেজাহান্নামীরা যখন জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে তখন পুনরায় তাদেরকে ওরই মধ্যে ফিরিয়ে আনা হবে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সাথে যখন তারা উপরে উঠে আসবে তখন তাদেরকে লোহার হাতুড় মেরে মেরে পুনরায় জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। মোটকথা তাদের সেই চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বের হওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামের একটি লোককে আনয়ন করা হবে। তারপরে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে-হে আদম সন্তান! তোমার জায়গা কেমন পেয়েছো?" সে উত্তরে বলবেঃ ‘আমার জায়গা অত্যন্ত খারাপ পেয়েছি।" আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কি এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ প্রদানে সম্মত আছ?” সে উত্তর দেবেঃ “হে আমার প্রভু! হ্যা (আমি সম্মত আছি।)” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছে। আমি তো তোমার কাছে এর চেয়েও বহু কম চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সেটাও দাওনি।” অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম ও ইমাম নাসাঈ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতেমাররূপে বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।” বর্ণনাকারী হযরত ইয়াযীদ ফকীর (রঃ) বলেনঃ আমি যখন হযরত জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে (আরবী) অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না-এ আয়াতের অর্থ কি হবে? তখন তিনি বললেনঃ এর পূর্বের আয়াতটি (আরবী) পাঠ কর। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এরা কাফির। সুতরাং কখনও জাহান্নাম হতে বের হতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে-হযরত ইয়াযীদেরও এ বিশ্বাস ছিল যে, জাহান্নাম থেকে কেউই বের হতে পারবে না, কাজেই উপরোক্ত হাদীসটি শুনে তিনি হযরত জাবির (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার অন্য লোকের উপর তো কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ শুধু আপনাদের ন্যায় সাহাবীদের উপর যে, আপনারাও কুরআন কারীমের বিপরীত কথা বলে থাকেন? ঐ সময় আমার খুব রাগও হয়েছিল। আমার এ কথা শুনে হযরত জাবির (রাঃ)-এর সঙ্গীগণ আমাকে খুব ধমক দেন। কিন্তু হযরত জাবির (রাঃ) অত্যন্ত সহিষ্ণু ছিলেন বলে আমাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “কুরআন কারীমে যাদের জাহান্নাম থেকে বের না হওয়ার বর্ণনা রয়েছে তারা হচ্ছে কাফির। তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা, পড়েছি। আমার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ আছে। তখন তিনি বলেনঃ তাহলে তোমার কি কুরআনের (আরবী) (১৭:৭৯)-এ আয়াতটি স্মরণ নেই? এ আয়াতে মাকামে মাহমুদের উল্লেখ রয়েছে। আর এটা হচ্ছে শাফাআতের জায়গা। আল্লাহ তাআলা কতক লোককে তাদের পাপের কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং যতদিন ইচ্ছা জাহান্নামে রাখবেন। তারপর যখন ইচ্ছা তাদেরকে তিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। হযরত ইয়াযীদ (রঃ) বলেন-এরপর থেকে আমার ধারণা শুধরে যায়। (এটা হাফিয ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত তলাক ইবনে হাবীব (রঃ) বলেনঃ “আমিও জাহান্নামীদের জন্যে শাফাআতের অস্বীকারকারী ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। অতঃপর আমার দাবী সাব্যস্তকরণে যেসব আয়াতে জাহান্নামে চির অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে সেগুলো পাঠ করে শুনাই। তিনি শুনে বলেনঃ “হে তলাক! তুমি কি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের ইলমের বিষয়ে নিজেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে কর? জেনে রেখো যে, যেসব আয়াত তুমি পাঠ করে শুনালে সেগুলো হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী অর্থাৎ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। কিন্তু যারা জাহান্নাম থেকে বের হবে তারা ঐসব লোক যারা মুশরিক নয়, তবে পাপী। পাপ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।” হযরত জাবির (রাঃ) এসব বলার পর স্বীয় হাত দুটি দ্বারা স্বীয় কান দু'টির দিকে ইশারা করে বলেনঃ আমি যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ) থেকে শুনে না থাকি যে, জাহান্নামে প্রবেশের পরও মানুষকে তা থেকে বের করা হবে তবে আমার এ দু'টি (কান) বধির হয়ে যাক। আল-কুরআনের আয়াতগুলো যেমন তোমরা পড় তেমন আমিও পড়ি। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই বর্ণনা করেছেন)

আল-মায়িদা 5:36

৩৫-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে তাকওয়া ও সংযমশীলতার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং সেটাও আবার আনুগত্যের সাথে মিশ্রিতভাবে। ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহ পাকের নিষেধকৃত কাজ থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। ‘ওয়াসীলা'র অর্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ, হযরত আবু ওয়ায়েল, হযরত হাসান, হযরত যায়েদ (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সদয় হোন) প্রমুখ মুফাসৃসিরগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে।কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ পাকের আনুগত্য স্বীকার করে এবং তার মর্জি মুতাবিক আমল করে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। ইবনে যায়েদ (রঃ) নিম্নের আয়াতটিও পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তো ওরাই যারা তাদের প্রভুর নৈকট্য অনুসন্ধান করে থাকে। (১৭:৫৭) এ ইমামগণ শব্দটির যে অর্থ করেছেন তার উপর সমস্ত মুফাসসিরেরই ইজমা রয়েছে। তাঁদের কেউ এর বিপরীত অর্থ করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর উপর একটি আরবী কবিতাও পেশ করেছেন, যাতে ওয়াসীলাহ্ শব্দটি নৈকট্যের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়াসীলাহ-এর অর্থ ঐ জিনিস যার দ্বারা আকাংখিত বস্তু লাভ করা যায়। ওয়াসীলাহ্ জান্নাতের ঐ উচ্চ ও মনোরম জায়গার নাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জায়গা এবং সেটা আরশের অতি নিকটে। সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আযান শুনে (আরবী)-এ দু'আটি পাঠ করে তার জন্যে কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত হালাল হয়ে যাবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আযান শুনবে তখন মুআযযিন যা বলে তোমরাও তা-ই বল, তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ কর, এক দরূদের বিনিময়ে তোমাদের উপর আল্লাহ দশটি রহমত নাযিল করবেন। এরপর আমার জন্যে তোমরা আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যাজ্ঞা কর। ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি মনযিল যা শুধু একটি বান্দা লাভ করবে। আশা করি যে, ঐ বান্দা আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা করলো তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে গেল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করবে তখন আমার জন্যে ওয়াসীলাও প্রার্থনা করবে।” তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াসীলা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি উঁচু স্থান যা একটিমাত্র লোক লাভ করবে। আমি আশা করি যে, সেই লোকটি আমিই।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যা কর। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আমার জন্যে এ প্রার্থনা করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্যে সাক্ষী ও সুপারিশকারী হয়ে যাব।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে ওয়াসীলা অপেক্ষা বড় জায়গা আর নেই। অতএব, তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রাপ্তির প্রার্থনা কর।" একটি গারীব ও মুনকার হাদীসে এতটুকু বেশীও রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ এই ওয়াসীলায় আপনার সাথে আর কে থাকবেন? উত্তরে তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ) এবং হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর নাম উচ্চারণ করেন। আর একটি অত্যন্ত গারীব হাদীসে আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ জান্নাতে দু’টি মুক্তা রয়েছে, একটি সাদা ও অপরটি হলদে। হলদেটি তো আরশের নীচে রয়েছে। আর মাকামে মাহমুদ হচ্ছে সাদা মুক্তার তৈরী, যাতে সত্তর হাজার প্রাসাদ রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিন মাইলের সমান। ওর দরজা, জানালা, আসন ইত্যাদি যেন একই মূলের তৈরী। ওরই নাম হচ্ছে ওয়াসীলা। ওটাই হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তার আহূলে বায়তের জন্যে। (আরবী) তাকওয়া অর্থাৎ নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হতে বিরত থাকা এবং আদিষ্ট বিষয়গুলো মেনে চলার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। মুশরিক, কাফির অর্থাৎ যারা তার শত্রু, যারা তার দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে, তোমরা তাদেরকে হত্যা কর। আর এসব মুজাহিদ হচ্ছে সফলকাম। কৃতকার্যতা, সৌভাগ্য এবং মর্যাদা তাদেরই। জান্নাতের উচ্চ উচ্চ অট্টালিকা এবং আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত তাদেরই জন্যে। তাদেরকে এ জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেখানে মৃত্যু ও ধ্বংস নেই, যেখানে ঘাটতি ও লোকসান নেই, যেখানে রয়েছে চির যৌবন, অটুট স্বাস্থ্য এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি। স্বীয় প্রিয়পাত্রদের উত্তম পরিণাম বর্ণনা করার পর এখন আল্লাহ পাক তার শক্রদের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন- তাদেরকে এমন কঠিন ও জঘন্য শাস্তি দেয়া হবে যে, সেই সময় যদি তারা সারা বিশ্বের অধিপতি হয়ে যায় এমনকি আরও এরই সমান হয় এবং এমতাবস্থায় সেই কঠিনতম শাস্তি থেকে বাচার জন্যে বিনিময় হিসেবে এ সবগুলো দিতেও চায় তবুও তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করা হবে না। বরং যে শাস্তি তাদের উপর হবে তা হবে চিরস্থায়ী শাস্তি। তা হতে কোনক্রমেই রক্ষা পাওয়া যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেজাহান্নামীরা যখন জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে তখন পুনরায় তাদেরকে ওরই মধ্যে ফিরিয়ে আনা হবে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সাথে যখন তারা উপরে উঠে আসবে তখন তাদেরকে লোহার হাতুড় মেরে মেরে পুনরায় জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। মোটকথা তাদের সেই চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বের হওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামের একটি লোককে আনয়ন করা হবে। তারপরে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে-হে আদম সন্তান! তোমার জায়গা কেমন পেয়েছো?" সে উত্তরে বলবেঃ ‘আমার জায়গা অত্যন্ত খারাপ পেয়েছি।" আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কি এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ প্রদানে সম্মত আছ?” সে উত্তর দেবেঃ “হে আমার প্রভু! হ্যা (আমি সম্মত আছি।)” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছে। আমি তো তোমার কাছে এর চেয়েও বহু কম চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সেটাও দাওনি।” অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম ও ইমাম নাসাঈ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতেমাররূপে বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।” বর্ণনাকারী হযরত ইয়াযীদ ফকীর (রঃ) বলেনঃ আমি যখন হযরত জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে (আরবী) অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না-এ আয়াতের অর্থ কি হবে? তখন তিনি বললেনঃ এর পূর্বের আয়াতটি (আরবী) পাঠ কর। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এরা কাফির। সুতরাং কখনও জাহান্নাম হতে বের হতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে-হযরত ইয়াযীদেরও এ বিশ্বাস ছিল যে, জাহান্নাম থেকে কেউই বের হতে পারবে না, কাজেই উপরোক্ত হাদীসটি শুনে তিনি হযরত জাবির (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার অন্য লোকের উপর তো কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ শুধু আপনাদের ন্যায় সাহাবীদের উপর যে, আপনারাও কুরআন কারীমের বিপরীত কথা বলে থাকেন? ঐ সময় আমার খুব রাগও হয়েছিল। আমার এ কথা শুনে হযরত জাবির (রাঃ)-এর সঙ্গীগণ আমাকে খুব ধমক দেন। কিন্তু হযরত জাবির (রাঃ) অত্যন্ত সহিষ্ণু ছিলেন বলে আমাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “কুরআন কারীমে যাদের জাহান্নাম থেকে বের না হওয়ার বর্ণনা রয়েছে তারা হচ্ছে কাফির। তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা, পড়েছি। আমার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ আছে। তখন তিনি বলেনঃ তাহলে তোমার কি কুরআনের (আরবী) (১৭:৭৯)-এ আয়াতটি স্মরণ নেই? এ আয়াতে মাকামে মাহমুদের উল্লেখ রয়েছে। আর এটা হচ্ছে শাফাআতের জায়গা। আল্লাহ তাআলা কতক লোককে তাদের পাপের কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং যতদিন ইচ্ছা জাহান্নামে রাখবেন। তারপর যখন ইচ্ছা তাদেরকে তিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। হযরত ইয়াযীদ (রঃ) বলেন-এরপর থেকে আমার ধারণা শুধরে যায়। (এটা হাফিয ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত তলাক ইবনে হাবীব (রঃ) বলেনঃ “আমিও জাহান্নামীদের জন্যে শাফাআতের অস্বীকারকারী ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। অতঃপর আমার দাবী সাব্যস্তকরণে যেসব আয়াতে জাহান্নামে চির অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে সেগুলো পাঠ করে শুনাই। তিনি শুনে বলেনঃ “হে তলাক! তুমি কি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের ইলমের বিষয়ে নিজেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে কর? জেনে রেখো যে, যেসব আয়াত তুমি পাঠ করে শুনালে সেগুলো হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী অর্থাৎ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। কিন্তু যারা জাহান্নাম থেকে বের হবে তারা ঐসব লোক যারা মুশরিক নয়, তবে পাপী। পাপ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।” হযরত জাবির (রাঃ) এসব বলার পর স্বীয় হাত দুটি দ্বারা স্বীয় কান দু'টির দিকে ইশারা করে বলেনঃ আমি যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ) থেকে শুনে না থাকি যে, জাহান্নামে প্রবেশের পরও মানুষকে তা থেকে বের করা হবে তবে আমার এ দু'টি (কান) বধির হয়ে যাক। আল-কুরআনের আয়াতগুলো যেমন তোমরা পড় তেমন আমিও পড়ি। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই বর্ণনা করেছেন)

আল-মায়িদা 5:37

৩৫-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে তাকওয়া ও সংযমশীলতার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং সেটাও আবার আনুগত্যের সাথে মিশ্রিতভাবে। ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহ পাকের নিষেধকৃত কাজ থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। ‘ওয়াসীলা'র অর্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ, হযরত আবু ওয়ায়েল, হযরত হাসান, হযরত যায়েদ (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সদয় হোন) প্রমুখ মুফাসৃসিরগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে।কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ পাকের আনুগত্য স্বীকার করে এবং তার মর্জি মুতাবিক আমল করে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। ইবনে যায়েদ (রঃ) নিম্নের আয়াতটিও পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তো ওরাই যারা তাদের প্রভুর নৈকট্য অনুসন্ধান করে থাকে। (১৭:৫৭) এ ইমামগণ শব্দটির যে অর্থ করেছেন তার উপর সমস্ত মুফাসসিরেরই ইজমা রয়েছে। তাঁদের কেউ এর বিপরীত অর্থ করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর উপর একটি আরবী কবিতাও পেশ করেছেন, যাতে ওয়াসীলাহ্ শব্দটি নৈকট্যের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়াসীলাহ-এর অর্থ ঐ জিনিস যার দ্বারা আকাংখিত বস্তু লাভ করা যায়। ওয়াসীলাহ্ জান্নাতের ঐ উচ্চ ও মনোরম জায়গার নাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জায়গা এবং সেটা আরশের অতি নিকটে। সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আযান শুনে (আরবী)-এ দু'আটি পাঠ করে তার জন্যে কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত হালাল হয়ে যাবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আযান শুনবে তখন মুআযযিন যা বলে তোমরাও তা-ই বল, তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ কর, এক দরূদের বিনিময়ে তোমাদের উপর আল্লাহ দশটি রহমত নাযিল করবেন। এরপর আমার জন্যে তোমরা আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যাজ্ঞা কর। ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি মনযিল যা শুধু একটি বান্দা লাভ করবে। আশা করি যে, ঐ বান্দা আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা করলো তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে গেল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করবে তখন আমার জন্যে ওয়াসীলাও প্রার্থনা করবে।” তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াসীলা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি উঁচু স্থান যা একটিমাত্র লোক লাভ করবে। আমি আশা করি যে, সেই লোকটি আমিই।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যা কর। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আমার জন্যে এ প্রার্থনা করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্যে সাক্ষী ও সুপারিশকারী হয়ে যাব।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে ওয়াসীলা অপেক্ষা বড় জায়গা আর নেই। অতএব, তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রাপ্তির প্রার্থনা কর।" একটি গারীব ও মুনকার হাদীসে এতটুকু বেশীও রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ এই ওয়াসীলায় আপনার সাথে আর কে থাকবেন? উত্তরে তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ) এবং হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর নাম উচ্চারণ করেন। আর একটি অত্যন্ত গারীব হাদীসে আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ জান্নাতে দু’টি মুক্তা রয়েছে, একটি সাদা ও অপরটি হলদে। হলদেটি তো আরশের নীচে রয়েছে। আর মাকামে মাহমুদ হচ্ছে সাদা মুক্তার তৈরী, যাতে সত্তর হাজার প্রাসাদ রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিন মাইলের সমান। ওর দরজা, জানালা, আসন ইত্যাদি যেন একই মূলের তৈরী। ওরই নাম হচ্ছে ওয়াসীলা। ওটাই হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তার আহূলে বায়তের জন্যে। (আরবী) তাকওয়া অর্থাৎ নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হতে বিরত থাকা এবং আদিষ্ট বিষয়গুলো মেনে চলার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। মুশরিক, কাফির অর্থাৎ যারা তার শত্রু, যারা তার দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে, তোমরা তাদেরকে হত্যা কর। আর এসব মুজাহিদ হচ্ছে সফলকাম। কৃতকার্যতা, সৌভাগ্য এবং মর্যাদা তাদেরই। জান্নাতের উচ্চ উচ্চ অট্টালিকা এবং আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত তাদেরই জন্যে। তাদেরকে এ জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেখানে মৃত্যু ও ধ্বংস নেই, যেখানে ঘাটতি ও লোকসান নেই, যেখানে রয়েছে চির যৌবন, অটুট স্বাস্থ্য এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি। স্বীয় প্রিয়পাত্রদের উত্তম পরিণাম বর্ণনা করার পর এখন আল্লাহ পাক তার শক্রদের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন- তাদেরকে এমন কঠিন ও জঘন্য শাস্তি দেয়া হবে যে, সেই সময় যদি তারা সারা বিশ্বের অধিপতি হয়ে যায় এমনকি আরও এরই সমান হয় এবং এমতাবস্থায় সেই কঠিনতম শাস্তি থেকে বাচার জন্যে বিনিময় হিসেবে এ সবগুলো দিতেও চায় তবুও তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করা হবে না। বরং যে শাস্তি তাদের উপর হবে তা হবে চিরস্থায়ী শাস্তি। তা হতে কোনক্রমেই রক্ষা পাওয়া যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেজাহান্নামীরা যখন জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে তখন পুনরায় তাদেরকে ওরই মধ্যে ফিরিয়ে আনা হবে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সাথে যখন তারা উপরে উঠে আসবে তখন তাদেরকে লোহার হাতুড় মেরে মেরে পুনরায় জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। মোটকথা তাদের সেই চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বের হওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামের একটি লোককে আনয়ন করা হবে। তারপরে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে-হে আদম সন্তান! তোমার জায়গা কেমন পেয়েছো?" সে উত্তরে বলবেঃ ‘আমার জায়গা অত্যন্ত খারাপ পেয়েছি।" আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কি এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ প্রদানে সম্মত আছ?” সে উত্তর দেবেঃ “হে আমার প্রভু! হ্যা (আমি সম্মত আছি।)” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছে। আমি তো তোমার কাছে এর চেয়েও বহু কম চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সেটাও দাওনি।” অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম ও ইমাম নাসাঈ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতেমাররূপে বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।” বর্ণনাকারী হযরত ইয়াযীদ ফকীর (রঃ) বলেনঃ আমি যখন হযরত জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে (আরবী) অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না-এ আয়াতের অর্থ কি হবে? তখন তিনি বললেনঃ এর পূর্বের আয়াতটি (আরবী) পাঠ কর। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এরা কাফির। সুতরাং কখনও জাহান্নাম হতে বের হতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে-হযরত ইয়াযীদেরও এ বিশ্বাস ছিল যে, জাহান্নাম থেকে কেউই বের হতে পারবে না, কাজেই উপরোক্ত হাদীসটি শুনে তিনি হযরত জাবির (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার অন্য লোকের উপর তো কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ শুধু আপনাদের ন্যায় সাহাবীদের উপর যে, আপনারাও কুরআন কারীমের বিপরীত কথা বলে থাকেন? ঐ সময় আমার খুব রাগও হয়েছিল। আমার এ কথা শুনে হযরত জাবির (রাঃ)-এর সঙ্গীগণ আমাকে খুব ধমক দেন। কিন্তু হযরত জাবির (রাঃ) অত্যন্ত সহিষ্ণু ছিলেন বলে আমাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “কুরআন কারীমে যাদের জাহান্নাম থেকে বের না হওয়ার বর্ণনা রয়েছে তারা হচ্ছে কাফির। তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা, পড়েছি। আমার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ আছে। তখন তিনি বলেনঃ তাহলে তোমার কি কুরআনের (আরবী) (১৭:৭৯)-এ আয়াতটি স্মরণ নেই? এ আয়াতে মাকামে মাহমুদের উল্লেখ রয়েছে। আর এটা হচ্ছে শাফাআতের জায়গা। আল্লাহ তাআলা কতক লোককে তাদের পাপের কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং যতদিন ইচ্ছা জাহান্নামে রাখবেন। তারপর যখন ইচ্ছা তাদেরকে তিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। হযরত ইয়াযীদ (রঃ) বলেন-এরপর থেকে আমার ধারণা শুধরে যায়। (এটা হাফিয ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত তলাক ইবনে হাবীব (রঃ) বলেনঃ “আমিও জাহান্নামীদের জন্যে শাফাআতের অস্বীকারকারী ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। অতঃপর আমার দাবী সাব্যস্তকরণে যেসব আয়াতে জাহান্নামে চির অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে সেগুলো পাঠ করে শুনাই। তিনি শুনে বলেনঃ “হে তলাক! তুমি কি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের ইলমের বিষয়ে নিজেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে কর? জেনে রেখো যে, যেসব আয়াত তুমি পাঠ করে শুনালে সেগুলো হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী অর্থাৎ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। কিন্তু যারা জাহান্নাম থেকে বের হবে তারা ঐসব লোক যারা মুশরিক নয়, তবে পাপী। পাপ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।” হযরত জাবির (রাঃ) এসব বলার পর স্বীয় হাত দুটি দ্বারা স্বীয় কান দু'টির দিকে ইশারা করে বলেনঃ আমি যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ) থেকে শুনে না থাকি যে, জাহান্নামে প্রবেশের পরও মানুষকে তা থেকে বের করা হবে তবে আমার এ দু'টি (কান) বধির হয়ে যাক। আল-কুরআনের আয়াতগুলো যেমন তোমরা পড় তেমন আমিও পড়ি। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই বর্ণনা করেছেন)

আল-মায়িদা 5:38

৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। এ কিরআতটি খুবই বিরল হলেও আমল কিন্তু এর উপরই। তবে আমল এই কিরআতের কারণে নয়, বরং অন্যান্য দলীল প্রমাণের উপর ভিত্তি করে। চোরের হাত কাটার নিয়ম ইসলামপূর্ব যুগেও ছিল। ইসলাম একে বিস্তারিত এবং শৃংখলিত করেছে। অনুরূপভাবে কাসামাত, দিয়াত, ফারায়েয প্রভৃতি মাসআলাও পূর্ব থেকেই ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল বিশৃংখল ও অসম্পূর্ণভাবে। ইসলাম ঐগুলোকে ঠিকঠাক করে দিয়েছে। একটা উক্তি এটাও আছে যে, কুরাইশরা সর্বপ্রথম চুরির অপরাধে খুযাআ গোত্রের দুওয়াইক নামক একটি লোকের হাত কেটে নিয়েছিল। সে কাবা ঘরের গেলাফ বা আবরণ চুরি করেছিল। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, চোরেরা ওটা তার নিকট রেখে দিয়েছিল। কতক ধর্মশাস্ত্রবিদের অভিমত এই যে, চুরির বস্তুর কোন সীমা নেই। তা অল্পই হোক আর বেশীই হোক এবং সুরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক বা অরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক, সর্বাবস্থাতেই চোরের হাত কাটা যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি সাধারণ। তাহলে এ উক্তিটির ভাবার্থ এটাও হতে পারে এবং অন্যটাও হতে পারে। যারা উপরোক্ত মত পোষণ করেন তাঁদের একটি দলীল হচ্ছে এ হাদীসটি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ চোরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন যে, সে সামান্য ডিম চুরি করে হাত কাটিয়ে নেয়, সে দড়ি বা রঞ্জু চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা হয়।” জমহুর উলামার অভিমত এই যে, চোরাই মালের সীমা নির্দিষ্ট আছে, যদিও সেই নির্দিষ্ট সীমার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, তিনটি খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা বা এ পরিমাণ মূল্যের কোন জিনিস চুরি করলে হাত কাটা হবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি চোরের হাত একটা ঢাল চুরি করার অপরাধে কেটে নেয়ার কথা বর্ণিত আছে। আর ওর মূল্য এ পরিমাণই ছিল। একটি চোর দরজা বা জানালার উপরিস্থিত কাঠ চুরি করেছিল। এ অপরাধে হযরত উসমান (রাঃ) তার হাত কেটে নিয়েছিলেন। ঐ কাঠটির মূল্য তিন দিরহামই ছিল। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এ কাজটি যেন সাহাবায়ে কিরামের নীরব ইজমা’ই ছিল এবং এর দ্বারা এটাও সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ফল চোরের হাত কেটে নেয়া হবে। হানাফীগণ এটা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে চোরাই মাল দশ দিরহাম মূল্যের হওয়া জরুরী। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি চোরাই মালের জন্যে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা পরিমাণ মূল্য বা তার চেয়ে বেশী নির্দিষ্ট করেছেন। তাঁর দলীল হচ্ছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটি। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশীতে চোরের হাত কেটে নেয়া হবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশী না হলে চোরের হাত কাটা যাবে না। সুতরাং এ হাদীস স্পষ্টভাবে এ মাসআলার মীমাংসা করে দেয়। আর যে হাদীসে তিন দিরহামে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চোরের হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ বর্ণিত আছে, ওটা এর বিপরীত নয়। কেননা, ঐ সময় দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা বারোটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা পরিমাণ মূল্যের ছিল। অতএব, মূল হচ্ছে এক চতুর্থাংশ দীনার, তিন দিরহাম নয়। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ), লায়েস ইবনে সা'দ আওযায়ী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রঃ) এবং আবু সাউর দাউদ ইবনে আলী যাহেরীরও (রঃ) এটাই উক্তি। এক রিওয়ায়াতে ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াই (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, চতুর্থাংশ দীনারই হোক বা তিন দিরহামই হোক, দু'টোই হচ্ছে চোরের হাত কেটে ফেলার নেসাব। মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার মূল্যের বস্তু চুরিতে তোমরা চোরের হাত কেটে নাও, তার কম পরিমাণ মূল্যের জিনিস চুরিতে হাত কেটো না।” ঐ সময় দীনার ছিল বারো দিরহামের। সুতরাং এক চতুর্থাংশ দীনার তিন দিরহামই হয়। সুনানে নাসাঈর শব্দ হচ্ছে নিম্নরূপঃ “চোরের হাত ঢালের মূল্যের কমে কাটা হবে না।” হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ঢালের মূল্য কত? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার।” সুতরাং এ সমুদয় হাদীস দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, হাত কাটার জন্যে দশ দিরহামের শর্ত করা ভুল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যে ঢাল চুরির অপরাধে চোরের হাত কেটে নেয়া হয়েছিল ওর * মূল্য ছিল দশ দিরহাম। যেমন আবু বকর ইবনে আবি শায়বা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ)-এর যুগে ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। আমর ইবনে শুআইব তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঢালের মূল্যের কমে চোরের হাত কাটা হবে না।” আর ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। হানাফীগণ বলেনঃ “ঢালের মূল্যের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বিরোধিতা করেছেন। আর হুদূদের ব্যাপারে সাবধানতার উপর আমল করা উচিত এবং বেশীতেই সাবধানতা আছে। এ কারণেই আমরা চোরের হাত কাটার ব্যাপারে নেসাব নির্ধারণ করেছি দশ দিরহাম।” পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষী বলেন যে, এর হদ হচ্ছে দশ দিরহাম বা এক দীনার। আলী ইবনে মাসউদ (রঃ), ইবরাহীম নখঈ (রঃ) এবং আবু জাফর (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, পাঁচ দীনার বা পঞ্চাশ দিরহামের সমান মূল্যের দ্রব্য চুরি ছাড়া পঞ্চমাংশ কেটে নেয়া হবে না। যাহেরিয়ার মাযহাব এই যে, চুরির মাল অল্পই হোক আর বেশীই হোক, তাতে হাত কেটে নেয়া হবে। তাদেরকে জমহুর এ উত্তর দিয়েছেন যে, প্রথমতঃ তো এ প্রয়োগই মানসূখ বা রহিত। কিন্তু এ উত্তর ঠিক নয়। কেননা, রহিত করণের ইতিহাসের কোন নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, ডিমের ভাবার্থ হচ্ছে লোহার ডিম এবং রজ্জ্বর ভাবার্থ হচ্ছে নৌকার মূল্যবান রঞ্জু। তৃতীয় উত্তর এই যে, পরিণামের দিকে লক্ষ্য রেখে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ চোর এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ জিনিসগুলো চুরি করতে করতে শেষ পর্যন্ত মূল্যবান জিনিস চুরি করতে শুরু করে এবং এর ফলে তার হাত কেটে নেয়া হয়। আবার এও হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশ ঘটনার বর্ণনা হিসেবে ছিল। অজ্ঞতার যুগে ছোট ছোট জিনিস চুরি করলেও হাত কেটে নেয়া হতো। সুতরাং তিনি হয়তো আফসোস করে এবং চোরকে লজ্জা দিতে গিয়ে বলেছিলেনঃ সে কতই না লাঞ্ছিত ও বেওকুফ যে, সাধারণ জিনিসের কারণে হাতের মত এমন একটি নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্ণিত আছে যে, আবুল আলা মাআরবী যখন বাগদাদে আসে তখন সে এ ব্যাপারে বড় রকম আপত্তি করে বসে এবং তার মনে এ খেয়াল জাগে যে, তার এ আপত্তির কেউ কোন জবাব দিতে পারবে না। তাই সে এ ব্যাপারে একটি কবিতা রচনা করে। কবিতাটির অনুবাদ নিম্নরূপ-“যদি হাত কেটে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তবে এর দিয়্যাত হিসাবে পাঁচশ’ দেয়া হবে, আবার এই হাতকে মাত্র এক চতুর্থাংশ দীনার চুরির কারণে কেটে নেয়া হবে। এটা এমন একটি পরস্পর বিরোধী কথা যা আমার বোধগম্য হয় না, কাজেই আমাকে নীবর থাকতে হয়, আর আমি আমার মাওলার নিকট জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” যখন তার এ উক্তির প্রসিদ্ধি লাভ ঘটলো তখন উলামায়ে কিরাম তার জবাব দিতে চাইলেন। এ দেখে সে পালিয়ে গেলো। কাযী আবদুল অহ্হাব তার এ উক্তির জবাবে বলেছিলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত হাত বিশ্বস্ত ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত তা মূল্যবান ছিল এবং যখন সে বিশ্বাসঘাতকতা করলো অর্থাৎ চুরি করলো তখন তার মূল্য কমে গেল।” কোন কোন মনীষী কিছু বিস্তারিতভাবে এর উত্তর দিয়েছেন। তারা বলেছেনঃ এর দ্বারা শরীয়তের পূর্ণ হিকমত প্রকাশ পাচ্ছে এবং দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে কেউ যদি কারও হাত বিনা কারণে কেটে দেয় তাহলে সে জন্যে বড় রকমের ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে তোক এ জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকে। সেখানে এ হুকুমই উপযুক্ত ছিল। সামান্য জিনিস চুরি করার কারণে হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে এ ভয়ে চুরির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং এটাই তো হচ্ছে প্রকৃত হিকমতের পরিচয়। যদি চুরিতেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের শর্ত লাগানো হতো তবে চুরির পথ বন্ধ হতো না। এটা কৃতকর্মেরই প্রতিফল। উচিত পন্থা এটাই যে, যে অঙ্গ দ্বারা সে অপরের ক্ষতিসাধন করেছে ঐ অঙ্গের উপরই শাস্তি হবে, যাতে তার যথেষ্ট শিক্ষা লাভ হয় এবং অন্যেরাও সতর্ক হয়। আল্লাহ প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত এবং স্বীয় আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে পূর্ণ বিজ্ঞানময়।(আরবী) যে ব্যক্তি সীমালংঘন করার পর অর্থাৎ চুরি করার পর তাওবা করে নেয় এবং আমলকে সংশোধন করে নেয়, তার প্রতি আল্লাহ (রহমতের) দৃষ্টি করবেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কারও মাল চুরি করার পর তা নিজের কাছেই রেখে দেয় তাহলে শুধুমাত্র তাওবা করলেই গুনাহ মাফ হবে না। যে পর্যন্ত না সেই মাল মালিককে ফিরিয়ে না দেবে অথবা ওর পূর্ণ মূল্য প্রদান করবে। জমহুর ইমামদের এটাই অভিমত। শুধুমাত্র ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, যদি চুরির অপরাধে হাত কেটে নেয়া হয় এবং চোরাই মাল নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে তবে দুনিয়ায় ওর বদলা প্রদান করা তার উপর জরুরী নয়। ইমাম দারেকুনীর হাদীস গ্রন্থের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে একটি চোরকে হাযির করা হয়। লোকটি একটি চাদর চুরি করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার মনে হয় তুমি চুরি করনি।”সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদেরকে বলেনঃ “তোমরা একে নিয়ে গিয়ে হাত কেটে দাও।” তার হাত কেটে নেয়া হলে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে বলেনঃ তাওবা কর। সে তখন তওবা করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আল্লাহ তোমার তাওবা কবূল করেছেন।সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করে নিন। আমি অমুক কাবীলার উট চুরি করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন সেই কাবীলার লোকদের নিকট সংবাদ পাঠিয়ে জানতে চান যে, ওটা সত্য কি-না। তারা বলেঃ “আমাদের একটি উট অবশ্যই চুরি হয়েছে। তখন তাঁর নির্দেশক্রমে হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ)-এর হাত কেটে নেয়া হয়। তিনি তখন হাতকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি সেই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যিনি আমার দেহ হতে তোমাকে পৃথক করে দিয়েছেন। তুমি আমার সমস্ত দেহকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে।”ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর যুগে একটি স্ত্রীলোক চুরি করেছিল। তখন যে লোকদের সে চুরি করেছিল তারা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। অতঃপর তারা বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ স্ত্রীলোকটি আমাদের চুরি করেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” তার গোত্রীয় লোকেরা পুনরায় বলেঃ “আমরা তার মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচশ’ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনও বললেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” ফলে তার ডান হাত কেটে নেয়া হলো। স্ত্রীলোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতে আমার তাওবাও কি হয়ে গেল?” তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমি পাপ থেকে এমন পাকসাফ হয়ে গেলে যে, যেন তুমি আজকেই জন্মগ্রহণ করলে।”তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ঐ স্ত্রীলোকটি ছিল মাখযুম গোত্রের। এ ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও আছে। স্ত্রীলোকটি ভ্রান্ত বংশের ছিল বলে তার ব্যাপারে লোকদের মধ্যে খুবই দুশ্চিন্তা দেখা দেয় এবং তারা ইচ্ছা করে যে, রাসূলুল্লাহ(সঃ)-কে তার সম্পর্কে কিছু সুপারিশ করা হোক। এ ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের সময় ঘটেছিল। অবশেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর মাধ্যমে সুপারিশ করা হোক। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। সুতরাং হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তার জন্যে সুপারিশ করেন তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং রাগতঃস্বরে বলেনঃ “উসামা (রাঃ)! তুমি আল্লাহর হদসমূহের মধ্যে একটি হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছো?” একথা শুনে হযরত উসামা (রাঃ) অত্যন্ত ঘাবড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি বড়ই অপরাধ করে ফেলেছি, দয়া করে আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” সন্ধ্যার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাতে তিনি আল্লাহর পূর্ণ প্রশংসা ও স্তুতিবাদের পর বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ স্বভাবের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভান্ত লোক চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। পক্ষান্তরে কোন সাধারণ লোক চুরি করলে তার উপর হদ জারি করতো। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) চুরি করে তবে তারও হাত কেটে নেবো।" অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে মহিলাটির হাত কেটে নেয়া হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর ঐ মহিলাটি বিশুদ্ধ অন্তরে তাওবা করে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারপর থেকে সে কোন কাজে কামে আমার কাছে আসতো এবং তার প্রয়োজনের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তুলে ধরতাম।”সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, একটি মহিলা লোকদের কাছ থেকে আসবাবপত্র ধার করতো, তারপর তা অস্বীকার করে বসতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেন। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, মহিলাটি এভাবে অলংকার গ্রহণ করতে এবং হযরত বিলাল (রাঃ)-কে তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আহকামের কিতাবগুলোর মধ্যে এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে যেগুলো চুরির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহ পাকের জন্যই সমুদয় প্রশংসা। সমস্ত বাদশাহর বাদশাহ, সারা বিশ্বের প্রকৃত বাদশাহ এবং সঠিক শাসনকর্তা একমাত্র আল্লাহ, যার কোন নির্দেশকে কেউ বাধা দিতে পারে না এবং যার কোন ইচ্ছাকে কেউ বদলিয়ে দিতে সক্ষম নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান।

আল-মায়িদা 5:39

৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। এ কিরআতটি খুবই বিরল হলেও আমল কিন্তু এর উপরই। তবে আমল এই কিরআতের কারণে নয়, বরং অন্যান্য দলীল প্রমাণের উপর ভিত্তি করে। চোরের হাত কাটার নিয়ম ইসলামপূর্ব যুগেও ছিল। ইসলাম একে বিস্তারিত এবং শৃংখলিত করেছে। অনুরূপভাবে কাসামাত, দিয়াত, ফারায়েয প্রভৃতি মাসআলাও পূর্ব থেকেই ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল বিশৃংখল ও অসম্পূর্ণভাবে। ইসলাম ঐগুলোকে ঠিকঠাক করে দিয়েছে। একটা উক্তি এটাও আছে যে, কুরাইশরা সর্বপ্রথম চুরির অপরাধে খুযাআ গোত্রের দুওয়াইক নামক একটি লোকের হাত কেটে নিয়েছিল। সে কাবা ঘরের গেলাফ বা আবরণ চুরি করেছিল। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, চোরেরা ওটা তার নিকট রেখে দিয়েছিল। কতক ধর্মশাস্ত্রবিদের অভিমত এই যে, চুরির বস্তুর কোন সীমা নেই। তা অল্পই হোক আর বেশীই হোক এবং সুরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক বা অরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক, সর্বাবস্থাতেই চোরের হাত কাটা যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি সাধারণ। তাহলে এ উক্তিটির ভাবার্থ এটাও হতে পারে এবং অন্যটাও হতে পারে। যারা উপরোক্ত মত পোষণ করেন তাঁদের একটি দলীল হচ্ছে এ হাদীসটি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ চোরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন যে, সে সামান্য ডিম চুরি করে হাত কাটিয়ে নেয়, সে দড়ি বা রঞ্জু চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা হয়।” জমহুর উলামার অভিমত এই যে, চোরাই মালের সীমা নির্দিষ্ট আছে, যদিও সেই নির্দিষ্ট সীমার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, তিনটি খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা বা এ পরিমাণ মূল্যের কোন জিনিস চুরি করলে হাত কাটা হবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি চোরের হাত একটা ঢাল চুরি করার অপরাধে কেটে নেয়ার কথা বর্ণিত আছে। আর ওর মূল্য এ পরিমাণই ছিল। একটি চোর দরজা বা জানালার উপরিস্থিত কাঠ চুরি করেছিল। এ অপরাধে হযরত উসমান (রাঃ) তার হাত কেটে নিয়েছিলেন। ঐ কাঠটির মূল্য তিন দিরহামই ছিল। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এ কাজটি যেন সাহাবায়ে কিরামের নীরব ইজমা’ই ছিল এবং এর দ্বারা এটাও সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ফল চোরের হাত কেটে নেয়া হবে। হানাফীগণ এটা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে চোরাই মাল দশ দিরহাম মূল্যের হওয়া জরুরী। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি চোরাই মালের জন্যে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা পরিমাণ মূল্য বা তার চেয়ে বেশী নির্দিষ্ট করেছেন। তাঁর দলীল হচ্ছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটি। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশীতে চোরের হাত কেটে নেয়া হবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশী না হলে চোরের হাত কাটা যাবে না। সুতরাং এ হাদীস স্পষ্টভাবে এ মাসআলার মীমাংসা করে দেয়। আর যে হাদীসে তিন দিরহামে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চোরের হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ বর্ণিত আছে, ওটা এর বিপরীত নয়। কেননা, ঐ সময় দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা বারোটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা পরিমাণ মূল্যের ছিল। অতএব, মূল হচ্ছে এক চতুর্থাংশ দীনার, তিন দিরহাম নয়। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ), লায়েস ইবনে সা'দ আওযায়ী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রঃ) এবং আবু সাউর দাউদ ইবনে আলী যাহেরীরও (রঃ) এটাই উক্তি। এক রিওয়ায়াতে ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াই (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, চতুর্থাংশ দীনারই হোক বা তিন দিরহামই হোক, দু'টোই হচ্ছে চোরের হাত কেটে ফেলার নেসাব। মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার মূল্যের বস্তু চুরিতে তোমরা চোরের হাত কেটে নাও, তার কম পরিমাণ মূল্যের জিনিস চুরিতে হাত কেটো না।” ঐ সময় দীনার ছিল বারো দিরহামের। সুতরাং এক চতুর্থাংশ দীনার তিন দিরহামই হয়। সুনানে নাসাঈর শব্দ হচ্ছে নিম্নরূপঃ “চোরের হাত ঢালের মূল্যের কমে কাটা হবে না।” হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ঢালের মূল্য কত? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার।” সুতরাং এ সমুদয় হাদীস দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, হাত কাটার জন্যে দশ দিরহামের শর্ত করা ভুল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যে ঢাল চুরির অপরাধে চোরের হাত কেটে নেয়া হয়েছিল ওর * মূল্য ছিল দশ দিরহাম। যেমন আবু বকর ইবনে আবি শায়বা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ)-এর যুগে ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। আমর ইবনে শুআইব তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঢালের মূল্যের কমে চোরের হাত কাটা হবে না।” আর ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। হানাফীগণ বলেনঃ “ঢালের মূল্যের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বিরোধিতা করেছেন। আর হুদূদের ব্যাপারে সাবধানতার উপর আমল করা উচিত এবং বেশীতেই সাবধানতা আছে। এ কারণেই আমরা চোরের হাত কাটার ব্যাপারে নেসাব নির্ধারণ করেছি দশ দিরহাম।” পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষী বলেন যে, এর হদ হচ্ছে দশ দিরহাম বা এক দীনার। আলী ইবনে মাসউদ (রঃ), ইবরাহীম নখঈ (রঃ) এবং আবু জাফর (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, পাঁচ দীনার বা পঞ্চাশ দিরহামের সমান মূল্যের দ্রব্য চুরি ছাড়া পঞ্চমাংশ কেটে নেয়া হবে না। যাহেরিয়ার মাযহাব এই যে, চুরির মাল অল্পই হোক আর বেশীই হোক, তাতে হাত কেটে নেয়া হবে। তাদেরকে জমহুর এ উত্তর দিয়েছেন যে, প্রথমতঃ তো এ প্রয়োগই মানসূখ বা রহিত। কিন্তু এ উত্তর ঠিক নয়। কেননা, রহিত করণের ইতিহাসের কোন নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, ডিমের ভাবার্থ হচ্ছে লোহার ডিম এবং রজ্জ্বর ভাবার্থ হচ্ছে নৌকার মূল্যবান রঞ্জু। তৃতীয় উত্তর এই যে, পরিণামের দিকে লক্ষ্য রেখে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ চোর এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ জিনিসগুলো চুরি করতে করতে শেষ পর্যন্ত মূল্যবান জিনিস চুরি করতে শুরু করে এবং এর ফলে তার হাত কেটে নেয়া হয়। আবার এও হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশ ঘটনার বর্ণনা হিসেবে ছিল। অজ্ঞতার যুগে ছোট ছোট জিনিস চুরি করলেও হাত কেটে নেয়া হতো। সুতরাং তিনি হয়তো আফসোস করে এবং চোরকে লজ্জা দিতে গিয়ে বলেছিলেনঃ সে কতই না লাঞ্ছিত ও বেওকুফ যে, সাধারণ জিনিসের কারণে হাতের মত এমন একটি নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্ণিত আছে যে, আবুল আলা মাআরবী যখন বাগদাদে আসে তখন সে এ ব্যাপারে বড় রকম আপত্তি করে বসে এবং তার মনে এ খেয়াল জাগে যে, তার এ আপত্তির কেউ কোন জবাব দিতে পারবে না। তাই সে এ ব্যাপারে একটি কবিতা রচনা করে। কবিতাটির অনুবাদ নিম্নরূপ-“যদি হাত কেটে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তবে এর দিয়্যাত হিসাবে পাঁচশ’ দেয়া হবে, আবার এই হাতকে মাত্র এক চতুর্থাংশ দীনার চুরির কারণে কেটে নেয়া হবে। এটা এমন একটি পরস্পর বিরোধী কথা যা আমার বোধগম্য হয় না, কাজেই আমাকে নীবর থাকতে হয়, আর আমি আমার মাওলার নিকট জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” যখন তার এ উক্তির প্রসিদ্ধি লাভ ঘটলো তখন উলামায়ে কিরাম তার জবাব দিতে চাইলেন। এ দেখে সে পালিয়ে গেলো। কাযী আবদুল অহ্হাব তার এ উক্তির জবাবে বলেছিলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত হাত বিশ্বস্ত ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত তা মূল্যবান ছিল এবং যখন সে বিশ্বাসঘাতকতা করলো অর্থাৎ চুরি করলো তখন তার মূল্য কমে গেল।” কোন কোন মনীষী কিছু বিস্তারিতভাবে এর উত্তর দিয়েছেন। তারা বলেছেনঃ এর দ্বারা শরীয়তের পূর্ণ হিকমত প্রকাশ পাচ্ছে এবং দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে কেউ যদি কারও হাত বিনা কারণে কেটে দেয় তাহলে সে জন্যে বড় রকমের ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে তোক এ জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকে। সেখানে এ হুকুমই উপযুক্ত ছিল। সামান্য জিনিস চুরি করার কারণে হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে এ ভয়ে চুরির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং এটাই তো হচ্ছে প্রকৃত হিকমতের পরিচয়। যদি চুরিতেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের শর্ত লাগানো হতো তবে চুরির পথ বন্ধ হতো না। এটা কৃতকর্মেরই প্রতিফল। উচিত পন্থা এটাই যে, যে অঙ্গ দ্বারা সে অপরের ক্ষতিসাধন করেছে ঐ অঙ্গের উপরই শাস্তি হবে, যাতে তার যথেষ্ট শিক্ষা লাভ হয় এবং অন্যেরাও সতর্ক হয়। আল্লাহ প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত এবং স্বীয় আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে পূর্ণ বিজ্ঞানময়।(আরবী) যে ব্যক্তি সীমালংঘন করার পর অর্থাৎ চুরি করার পর তাওবা করে নেয় এবং আমলকে সংশোধন করে নেয়, তার প্রতি আল্লাহ (রহমতের) দৃষ্টি করবেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কারও মাল চুরি করার পর তা নিজের কাছেই রেখে দেয় তাহলে শুধুমাত্র তাওবা করলেই গুনাহ মাফ হবে না। যে পর্যন্ত না সেই মাল মালিককে ফিরিয়ে না দেবে অথবা ওর পূর্ণ মূল্য প্রদান করবে। জমহুর ইমামদের এটাই অভিমত। শুধুমাত্র ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, যদি চুরির অপরাধে হাত কেটে নেয়া হয় এবং চোরাই মাল নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে তবে দুনিয়ায় ওর বদলা প্রদান করা তার উপর জরুরী নয়। ইমাম দারেকুনীর হাদীস গ্রন্থের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে একটি চোরকে হাযির করা হয়। লোকটি একটি চাদর চুরি করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার মনে হয় তুমি চুরি করনি।”সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদেরকে বলেনঃ “তোমরা একে নিয়ে গিয়ে হাত কেটে দাও।” তার হাত কেটে নেয়া হলে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে বলেনঃ তাওবা কর। সে তখন তওবা করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আল্লাহ তোমার তাওবা কবূল করেছেন।সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করে নিন। আমি অমুক কাবীলার উট চুরি করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন সেই কাবীলার লোকদের নিকট সংবাদ পাঠিয়ে জানতে চান যে, ওটা সত্য কি-না। তারা বলেঃ “আমাদের একটি উট অবশ্যই চুরি হয়েছে। তখন তাঁর নির্দেশক্রমে হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ)-এর হাত কেটে নেয়া হয়। তিনি তখন হাতকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি সেই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যিনি আমার দেহ হতে তোমাকে পৃথক করে দিয়েছেন। তুমি আমার সমস্ত দেহকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে।”ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর যুগে একটি স্ত্রীলোক চুরি করেছিল। তখন যে লোকদের সে চুরি করেছিল তারা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। অতঃপর তারা বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ স্ত্রীলোকটি আমাদের চুরি করেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” তার গোত্রীয় লোকেরা পুনরায় বলেঃ “আমরা তার মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচশ’ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনও বললেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” ফলে তার ডান হাত কেটে নেয়া হলো। স্ত্রীলোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতে আমার তাওবাও কি হয়ে গেল?” তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমি পাপ থেকে এমন পাকসাফ হয়ে গেলে যে, যেন তুমি আজকেই জন্মগ্রহণ করলে।”তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ঐ স্ত্রীলোকটি ছিল মাখযুম গোত্রের। এ ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও আছে। স্ত্রীলোকটি ভ্রান্ত বংশের ছিল বলে তার ব্যাপারে লোকদের মধ্যে খুবই দুশ্চিন্তা দেখা দেয় এবং তারা ইচ্ছা করে যে, রাসূলুল্লাহ(সঃ)-কে তার সম্পর্কে কিছু সুপারিশ করা হোক। এ ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের সময় ঘটেছিল। অবশেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর মাধ্যমে সুপারিশ করা হোক। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। সুতরাং হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তার জন্যে সুপারিশ করেন তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং রাগতঃস্বরে বলেনঃ “উসামা (রাঃ)! তুমি আল্লাহর হদসমূহের মধ্যে একটি হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছো?” একথা শুনে হযরত উসামা (রাঃ) অত্যন্ত ঘাবড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি বড়ই অপরাধ করে ফেলেছি, দয়া করে আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” সন্ধ্যার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাতে তিনি আল্লাহর পূর্ণ প্রশংসা ও স্তুতিবাদের পর বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ স্বভাবের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভান্ত লোক চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। পক্ষান্তরে কোন সাধারণ লোক চুরি করলে তার উপর হদ জারি করতো। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) চুরি করে তবে তারও হাত কেটে নেবো।" অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে মহিলাটির হাত কেটে নেয়া হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর ঐ মহিলাটি বিশুদ্ধ অন্তরে তাওবা করে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারপর থেকে সে কোন কাজে কামে আমার কাছে আসতো এবং তার প্রয়োজনের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তুলে ধরতাম।”সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, একটি মহিলা লোকদের কাছ থেকে আসবাবপত্র ধার করতো, তারপর তা অস্বীকার করে বসতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেন। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, মহিলাটি এভাবে অলংকার গ্রহণ করতে এবং হযরত বিলাল (রাঃ)-কে তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আহকামের কিতাবগুলোর মধ্যে এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে যেগুলো চুরির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহ পাকের জন্যই সমুদয় প্রশংসা। সমস্ত বাদশাহর বাদশাহ, সারা বিশ্বের প্রকৃত বাদশাহ এবং সঠিক শাসনকর্তা একমাত্র আল্লাহ, যার কোন নির্দেশকে কেউ বাধা দিতে পারে না এবং যার কোন ইচ্ছাকে কেউ বদলিয়ে দিতে সক্ষম নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান।