Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আনআম 6:161 – আল-আরাফ 7:74

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আনআম 6:161
  2. আল-আনআম 6:162
  3. আল-আনআম 6:163
  4. আল-আনআম 6:164
  5. আল-আনআম 6:165
  6. আল-আরাফ 7:1
  7. আল-আরাফ 7:2
  8. আল-আরাফ 7:3
  9. আল-আরাফ 7:4
  10. আল-আরাফ 7:5
  11. আল-আরাফ 7:6
  12. আল-আরাফ 7:7
  13. আল-আরাফ 7:8
  14. আল-আরাফ 7:9
  15. আল-আরাফ 7:10
  16. আল-আরাফ 7:11
  17. আল-আরাফ 7:12
  18. আল-আরাফ 7:13
  19. আল-আরাফ 7:14
  20. আল-আরাফ 7:15
  21. আল-আরাফ 7:16
  22. আল-আরাফ 7:17
  23. আল-আরাফ 7:18
  24. আল-আরাফ 7:19
  25. আল-আরাফ 7:20
  26. আল-আরাফ 7:21
  27. আল-আরাফ 7:22
  28. আল-আরাফ 7:23
  29. আল-আরাফ 7:24
  30. আল-আরাফ 7:25
  31. আল-আরাফ 7:26
  32. আল-আরাফ 7:27
  33. আল-আরাফ 7:28
  34. আল-আরাফ 7:29
  35. আল-আরাফ 7:30
  36. আল-আরাফ 7:31
  37. আল-আরাফ 7:32
  38. আল-আরাফ 7:33
  39. আল-আরাফ 7:34
  40. আল-আরাফ 7:35
  41. আল-আরাফ 7:36
  42. আল-আরাফ 7:37
  43. আল-আরাফ 7:38
  44. আল-আরাফ 7:39
  45. আল-আরাফ 7:40
  46. আল-আরাফ 7:41
  47. আল-আরাফ 7:42
  48. আল-আরাফ 7:43
  49. আল-আরাফ 7:44
  50. আল-আরাফ 7:45
  51. আল-আরাফ 7:46
  52. আল-আরাফ 7:47
  53. আল-আরাফ 7:48
  54. আল-আরাফ 7:49
  55. আল-আরাফ 7:50
  56. আল-আরাফ 7:51
  57. আল-আরাফ 7:52
  58. আল-আরাফ 7:53
  59. আল-আরাফ 7:54
  60. আল-আরাফ 7:55
  61. আল-আরাফ 7:56
  62. আল-আরাফ 7:57
  63. আল-আরাফ 7:58
  64. আল-আরাফ 7:59
  65. আল-আরাফ 7:60
  66. আল-আরাফ 7:61
  67. আল-আরাফ 7:62
  68. আল-আরাফ 7:63
  69. আল-আরাফ 7:64
  70. আল-আরাফ 7:65
  71. আল-আরাফ 7:66
  72. আল-আরাফ 7:67
  73. আল-আরাফ 7:68
  74. আল-আরাফ 7:69
  75. আল-আরাফ 7:70
  76. আল-আরাফ 7:71
  77. আল-আরাফ 7:72
  78. আল-আরাফ 7:73
  79. আল-আরাফ 7:74

আল-আনআম 6:161

১৬১-১৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, তুমি সংবাদ দিয়ে দাও-আল্লাহ তাঁর নবী (সঃ)-এর উপর কিরূপ ইন'আম বর্ষণ করেছেন যে, তাকে সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছেন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। ওটা হচ্ছে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং ওটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)। তিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তিনি কখনও শিক করেননি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “নির্বোধেরা ছাড়া আর কেউই মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না।” অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর পথে এমন চেষ্টা তদবীর কর যেমন চেষ্টা তদবীরের হক রয়েছে। তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি, এটাই হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “ইবরাহীম বড়ই আবেদ ছিল, সে ছিল নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী এবং শিরুক থেকে বহু দূরে অবস্থানকারী। সে ছিল আল্লাহর নিয়ামতের বড়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আমি তাঁকে সরল-সোজা পথে পরিচালিত করেছিলাম। দুনিয়াতেও সে বহু পুণ্য লাভ করেছিল এবং আখিরাতেও সে আল্লাহর সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন আমি তোমার কাছে এই অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসরণ করো।” নবী (সঃ)-কে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণ করতে বলা হলো বলে যে তার উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো তা নয়। কেননা, নবী (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাযহাবের অনুসরণের মাধ্যমে তার মাযহাবকে আরও সুদৃঢ় করেছেন এবং তার মাধ্যমেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। অন্য কোন নবী তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দানে সক্ষম হননি। আমাদের নবী (সঃ) তো খাতেমুল আম্বিয়া। তিনি সাধারণভাবে আদম সন্তানের নেতা এবং মাকামে মাহমূদের উপর তিনি সমাসীন থাকবেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুক তাঁরই দিকে ফিরে আসবে, এমন কি স্বয়ং ইবরাহীম খলীল (আঃ)-ও। ইবনে ইবী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন সকাল হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমরা মিল্লাতে ইসলাম ও কালেমায়ে ইখলাসের উপর এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দ্বীনের উপর ও আমাদের পিতা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর সকাল করলাম যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কাছে কোন দ্বীন সব চেয়ে প্রিয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ইবরাহীম হানীফ (আঃ)-এর ধর্ম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) মুসনাদে আহমাদে তাখরীজ করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি স্বীয় থুনী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাঁধের উপর রাখতাম এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশের পিছনে থেকে হাবশীদের নাচ দেখতাম। অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন সরে আসতাম। ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “ইয়াহূদীদের এটা জেনে নেয়া উচিত যে, আমাদের ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং আমাকে এমন দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যা শির্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।” ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমার নামায, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক কলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর জন্যেই নামায পড় এবং তারই জন্যে কুরবানী কর।”মুশরিকরা তো মূর্তির পূজা করতো এবং মূর্তির নামেই কুরবানী করতো। আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কলুষমুক্ত অন্তঃকরণ নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন থাকতে মুসলমানদেরকে হুকুম করছেন। যেমন তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলতে বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী সব কিছুই বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।" (আরবী) হজ্ব ও উমরা পালনের সময় কুরবানী করাকে বলা হয়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদুল আযহার দিন দু'টি দুম্বা যবাই করেন এবং যবাই করার সময় বলেন : (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে একনিষ্ঠভাবে ফিরাচ্ছি যিনি আকাশসমূহ ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বপ্রভু আল্লাহরই জন্যে। তার কোন অংশীদার নেই, আমি এর জন্যেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা ঐ উম্মতের প্রথম মুসলমান বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী সকল নবী ইসলামেরই দাওয়াত দিতেন। প্রকৃত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহকে মা'বুদ মেনে নেয়া এবং তাঁকে এক ও শরীক বিহীন বলে বিশ্বাস করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছিলাম তাদের সকলের কাছেই এই অহী করেছিলাম যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নূহ তার কওমকে বললো-তোমরা যদি আমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে বলতো- আমি কি তাবলীগ করার বিনিময়ে তোমাদের কাছে। কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি? আমাকে পারিশ্রমিক তো আল্লাহই প্রদান করবেন। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করি।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে বড়ই নির্বোধ। আমি তাকে দুনিয়াতেও মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে আল্লাহর ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” যখন আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেনঃ ইসলাম গ্রহণ কর, তখন সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো-আমি সারা জাহানের প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানদেরকে অসিয়ত করেছিলো এবং ইয়াকূব (আঃ)ঃ “হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে এই দ্বীনকে নির্দিষ্ট করেছেন, সুতরাং তোমরা কখনও মুসলমান না হয়ে মরো না।” হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে রাজত্বের বিরাট অংশ দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নফল বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন, হে আকাশসমূহের ও ভূ-মণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমার কার্য নির্বাহক দুনিয়াতেও আখিরাতেও, আমাকে পূর্ণ আনুগত্যের অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে বিশিষ্ট নেক বান্দাদের মধ্যে পরিগণিত করুন।” হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক তবে তাঁরই উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুসলমান হও।” তখন তাঁর উম্মত বলেছিলঃ “আমরা আমাদের প্রভুর উপরই ভরসা করছি। হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেন না এবং স্বীয় রহমতে আমাদেরকে কফিরদের আধিপত্য হতে মুক্তি দান করুন!”আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম যার মধ্যে হিদায়াত ও নূর রয়েছে, যার মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী নবীরা ইয়াহুদী, আল্লাহওয়ালা ও আলেমদের মধ্যে ফায়সালা করতো।” অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আমি হাওয়ারীদের কাছে অহী করেছিলাম-তোমরা আমার উপর ও আমার রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন কর, তখন তারা বললো- আমরা ঈমান আনলাম, আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলমান।” এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিলেন যে, তিনি সমস্ত নবীকে ইসলাম দিয়ে পঠিয়েছিলেন। কিন্তু নবীদের উম্মতেরা নিজ নিজ শরীয়তের প্রতি লক্ষ্য রেখে পৃথক পৃথক ধর্মের উপর ছিল। কোন কোন নবী পূর্ববর্তী নবীর শাখা ধর্মকে রহিত করে দিয়ে নিজস্ব ধর্ম চালু করেন। শেষ পর্যন্ত শরীয়তে মুহাম্মাদীর মাধ্যমে অন্যান্য সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায় এবং দ্বীনে মুহাম্মাদী কখনও রহিত হবে না, বরং চির বিদ্যমান থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত এর পতাকা উঁচু হয়েই থাকবে। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা পরস্পর বৈমাত্রেয় সন্তান। অর্থাৎ বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তদ্রুপ আমাদেরও সবারই দ্বীন একই। আমরা। সবাই সেই আল্লাহকে মেনে থাকি যিনি এক ও অংশীবিহীন। আমরা তাঁরই ইবাদত করে থাকি। যদিও আমাদের শরীয়ত বিভিন্ন; কিন্তু এই শরীয়তগুলো মায়ের মত। যেমন বৈপিত্রেয় ভাই বৈমাত্রেয় ভাই এর বিপরীত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মা এক এবং পিতা পৃথক পৃথক। আর প্রকৃত ভাই একই মা ও একই পিতার সন্তান হয়ে থাকে। তাহলে উম্মতের দৃষ্টান্ত পরম্পর এক মায়েরই সন্তানের মত।” হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) যখন নামায শুরু করতেন তখন তাকবীর বলতেন। তারপর (আরবী) বলতেন। এরপর নিম্নের দু'আটি বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ। আপনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। আপনি আমার প্রভু এবং আমি আপনার দাস। আমি আমার নিজের উপর অত্যাচার করেছি এবং আমি আমার পাপের কথা স্বীকার করছি। সুতরাং আপনি আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া আর কেউ পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিতে পারে না। আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করতে পারে না। আপনি কল্যাণময় ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং (পাপকার্য থেকে) আপনার কাছে তাওবা করছি।” তারপর তিনি রুকূ ও সিজদায় এবং তাশাহহুদে যা বলেছিলেন সেগুলো সম্বলিত সম্পূর্ন হাদীসটি বর্ণনা করা হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

আল-আনআম 6:162

১৬১-১৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, তুমি সংবাদ দিয়ে দাও-আল্লাহ তাঁর নবী (সঃ)-এর উপর কিরূপ ইন'আম বর্ষণ করেছেন যে, তাকে সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছেন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। ওটা হচ্ছে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং ওটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)। তিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তিনি কখনও শিক করেননি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “নির্বোধেরা ছাড়া আর কেউই মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না।” অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর পথে এমন চেষ্টা তদবীর কর যেমন চেষ্টা তদবীরের হক রয়েছে। তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি, এটাই হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “ইবরাহীম বড়ই আবেদ ছিল, সে ছিল নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী এবং শিরুক থেকে বহু দূরে অবস্থানকারী। সে ছিল আল্লাহর নিয়ামতের বড়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আমি তাঁকে সরল-সোজা পথে পরিচালিত করেছিলাম। দুনিয়াতেও সে বহু পুণ্য লাভ করেছিল এবং আখিরাতেও সে আল্লাহর সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন আমি তোমার কাছে এই অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসরণ করো।” নবী (সঃ)-কে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণ করতে বলা হলো বলে যে তার উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো তা নয়। কেননা, নবী (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাযহাবের অনুসরণের মাধ্যমে তার মাযহাবকে আরও সুদৃঢ় করেছেন এবং তার মাধ্যমেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। অন্য কোন নবী তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দানে সক্ষম হননি। আমাদের নবী (সঃ) তো খাতেমুল আম্বিয়া। তিনি সাধারণভাবে আদম সন্তানের নেতা এবং মাকামে মাহমূদের উপর তিনি সমাসীন থাকবেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুক তাঁরই দিকে ফিরে আসবে, এমন কি স্বয়ং ইবরাহীম খলীল (আঃ)-ও। ইবনে ইবী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন সকাল হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমরা মিল্লাতে ইসলাম ও কালেমায়ে ইখলাসের উপর এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দ্বীনের উপর ও আমাদের পিতা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর সকাল করলাম যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কাছে কোন দ্বীন সব চেয়ে প্রিয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ইবরাহীম হানীফ (আঃ)-এর ধর্ম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) মুসনাদে আহমাদে তাখরীজ করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি স্বীয় থুনী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাঁধের উপর রাখতাম এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশের পিছনে থেকে হাবশীদের নাচ দেখতাম। অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন সরে আসতাম। ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “ইয়াহূদীদের এটা জেনে নেয়া উচিত যে, আমাদের ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং আমাকে এমন দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যা শির্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।” ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমার নামায, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক কলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর জন্যেই নামায পড় এবং তারই জন্যে কুরবানী কর।”মুশরিকরা তো মূর্তির পূজা করতো এবং মূর্তির নামেই কুরবানী করতো। আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কলুষমুক্ত অন্তঃকরণ নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন থাকতে মুসলমানদেরকে হুকুম করছেন। যেমন তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলতে বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী সব কিছুই বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।" (আরবী) হজ্ব ও উমরা পালনের সময় কুরবানী করাকে বলা হয়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদুল আযহার দিন দু'টি দুম্বা যবাই করেন এবং যবাই করার সময় বলেন : (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে একনিষ্ঠভাবে ফিরাচ্ছি যিনি আকাশসমূহ ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বপ্রভু আল্লাহরই জন্যে। তার কোন অংশীদার নেই, আমি এর জন্যেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা ঐ উম্মতের প্রথম মুসলমান বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী সকল নবী ইসলামেরই দাওয়াত দিতেন। প্রকৃত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহকে মা'বুদ মেনে নেয়া এবং তাঁকে এক ও শরীক বিহীন বলে বিশ্বাস করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছিলাম তাদের সকলের কাছেই এই অহী করেছিলাম যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নূহ তার কওমকে বললো-তোমরা যদি আমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে বলতো- আমি কি তাবলীগ করার বিনিময়ে তোমাদের কাছে। কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি? আমাকে পারিশ্রমিক তো আল্লাহই প্রদান করবেন। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করি।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে বড়ই নির্বোধ। আমি তাকে দুনিয়াতেও মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে আল্লাহর ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” যখন আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেনঃ ইসলাম গ্রহণ কর, তখন সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো-আমি সারা জাহানের প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানদেরকে অসিয়ত করেছিলো এবং ইয়াকূব (আঃ)ঃ “হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে এই দ্বীনকে নির্দিষ্ট করেছেন, সুতরাং তোমরা কখনও মুসলমান না হয়ে মরো না।” হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে রাজত্বের বিরাট অংশ দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নফল বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন, হে আকাশসমূহের ও ভূ-মণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমার কার্য নির্বাহক দুনিয়াতেও আখিরাতেও, আমাকে পূর্ণ আনুগত্যের অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে বিশিষ্ট নেক বান্দাদের মধ্যে পরিগণিত করুন।” হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক তবে তাঁরই উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুসলমান হও।” তখন তাঁর উম্মত বলেছিলঃ “আমরা আমাদের প্রভুর উপরই ভরসা করছি। হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেন না এবং স্বীয় রহমতে আমাদেরকে কফিরদের আধিপত্য হতে মুক্তি দান করুন!”আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম যার মধ্যে হিদায়াত ও নূর রয়েছে, যার মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী নবীরা ইয়াহুদী, আল্লাহওয়ালা ও আলেমদের মধ্যে ফায়সালা করতো।” অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আমি হাওয়ারীদের কাছে অহী করেছিলাম-তোমরা আমার উপর ও আমার রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন কর, তখন তারা বললো- আমরা ঈমান আনলাম, আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলমান।” এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিলেন যে, তিনি সমস্ত নবীকে ইসলাম দিয়ে পঠিয়েছিলেন। কিন্তু নবীদের উম্মতেরা নিজ নিজ শরীয়তের প্রতি লক্ষ্য রেখে পৃথক পৃথক ধর্মের উপর ছিল। কোন কোন নবী পূর্ববর্তী নবীর শাখা ধর্মকে রহিত করে দিয়ে নিজস্ব ধর্ম চালু করেন। শেষ পর্যন্ত শরীয়তে মুহাম্মাদীর মাধ্যমে অন্যান্য সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায় এবং দ্বীনে মুহাম্মাদী কখনও রহিত হবে না, বরং চির বিদ্যমান থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত এর পতাকা উঁচু হয়েই থাকবে। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা পরস্পর বৈমাত্রেয় সন্তান। অর্থাৎ বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তদ্রুপ আমাদেরও সবারই দ্বীন একই। আমরা। সবাই সেই আল্লাহকে মেনে থাকি যিনি এক ও অংশীবিহীন। আমরা তাঁরই ইবাদত করে থাকি। যদিও আমাদের শরীয়ত বিভিন্ন; কিন্তু এই শরীয়তগুলো মায়ের মত। যেমন বৈপিত্রেয় ভাই বৈমাত্রেয় ভাই এর বিপরীত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মা এক এবং পিতা পৃথক পৃথক। আর প্রকৃত ভাই একই মা ও একই পিতার সন্তান হয়ে থাকে। তাহলে উম্মতের দৃষ্টান্ত পরম্পর এক মায়েরই সন্তানের মত।” হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) যখন নামায শুরু করতেন তখন তাকবীর বলতেন। তারপর (আরবী) বলতেন। এরপর নিম্নের দু'আটি বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ। আপনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। আপনি আমার প্রভু এবং আমি আপনার দাস। আমি আমার নিজের উপর অত্যাচার করেছি এবং আমি আমার পাপের কথা স্বীকার করছি। সুতরাং আপনি আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া আর কেউ পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিতে পারে না। আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করতে পারে না। আপনি কল্যাণময় ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং (পাপকার্য থেকে) আপনার কাছে তাওবা করছি।” তারপর তিনি রুকূ ও সিজদায় এবং তাশাহহুদে যা বলেছিলেন সেগুলো সম্বলিত সম্পূর্ন হাদীসটি বর্ণনা করা হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

আল-আনআম 6:163

১৬১-১৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, তুমি সংবাদ দিয়ে দাও-আল্লাহ তাঁর নবী (সঃ)-এর উপর কিরূপ ইন'আম বর্ষণ করেছেন যে, তাকে সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছেন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। ওটা হচ্ছে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং ওটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)। তিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তিনি কখনও শিক করেননি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “নির্বোধেরা ছাড়া আর কেউই মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না।” অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর পথে এমন চেষ্টা তদবীর কর যেমন চেষ্টা তদবীরের হক রয়েছে। তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি, এটাই হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “ইবরাহীম বড়ই আবেদ ছিল, সে ছিল নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী এবং শিরুক থেকে বহু দূরে অবস্থানকারী। সে ছিল আল্লাহর নিয়ামতের বড়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আমি তাঁকে সরল-সোজা পথে পরিচালিত করেছিলাম। দুনিয়াতেও সে বহু পুণ্য লাভ করেছিল এবং আখিরাতেও সে আল্লাহর সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন আমি তোমার কাছে এই অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসরণ করো।” নবী (সঃ)-কে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণ করতে বলা হলো বলে যে তার উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো তা নয়। কেননা, নবী (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাযহাবের অনুসরণের মাধ্যমে তার মাযহাবকে আরও সুদৃঢ় করেছেন এবং তার মাধ্যমেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। অন্য কোন নবী তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দানে সক্ষম হননি। আমাদের নবী (সঃ) তো খাতেমুল আম্বিয়া। তিনি সাধারণভাবে আদম সন্তানের নেতা এবং মাকামে মাহমূদের উপর তিনি সমাসীন থাকবেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুক তাঁরই দিকে ফিরে আসবে, এমন কি স্বয়ং ইবরাহীম খলীল (আঃ)-ও। ইবনে ইবী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন সকাল হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমরা মিল্লাতে ইসলাম ও কালেমায়ে ইখলাসের উপর এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দ্বীনের উপর ও আমাদের পিতা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর সকাল করলাম যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কাছে কোন দ্বীন সব চেয়ে প্রিয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ইবরাহীম হানীফ (আঃ)-এর ধর্ম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) মুসনাদে আহমাদে তাখরীজ করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি স্বীয় থুনী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাঁধের উপর রাখতাম এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশের পিছনে থেকে হাবশীদের নাচ দেখতাম। অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন সরে আসতাম। ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “ইয়াহূদীদের এটা জেনে নেয়া উচিত যে, আমাদের ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং আমাকে এমন দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যা শির্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।” ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমার নামায, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক কলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর জন্যেই নামায পড় এবং তারই জন্যে কুরবানী কর।”মুশরিকরা তো মূর্তির পূজা করতো এবং মূর্তির নামেই কুরবানী করতো। আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কলুষমুক্ত অন্তঃকরণ নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন থাকতে মুসলমানদেরকে হুকুম করছেন। যেমন তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলতে বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী সব কিছুই বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।" (আরবী) হজ্ব ও উমরা পালনের সময় কুরবানী করাকে বলা হয়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদুল আযহার দিন দু'টি দুম্বা যবাই করেন এবং যবাই করার সময় বলেন : (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে একনিষ্ঠভাবে ফিরাচ্ছি যিনি আকাশসমূহ ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বপ্রভু আল্লাহরই জন্যে। তার কোন অংশীদার নেই, আমি এর জন্যেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা ঐ উম্মতের প্রথম মুসলমান বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী সকল নবী ইসলামেরই দাওয়াত দিতেন। প্রকৃত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহকে মা'বুদ মেনে নেয়া এবং তাঁকে এক ও শরীক বিহীন বলে বিশ্বাস করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছিলাম তাদের সকলের কাছেই এই অহী করেছিলাম যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নূহ তার কওমকে বললো-তোমরা যদি আমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে বলতো- আমি কি তাবলীগ করার বিনিময়ে তোমাদের কাছে। কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি? আমাকে পারিশ্রমিক তো আল্লাহই প্রদান করবেন। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করি।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে বড়ই নির্বোধ। আমি তাকে দুনিয়াতেও মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে আল্লাহর ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” যখন আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেনঃ ইসলাম গ্রহণ কর, তখন সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো-আমি সারা জাহানের প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানদেরকে অসিয়ত করেছিলো এবং ইয়াকূব (আঃ)ঃ “হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে এই দ্বীনকে নির্দিষ্ট করেছেন, সুতরাং তোমরা কখনও মুসলমান না হয়ে মরো না।” হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে রাজত্বের বিরাট অংশ দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নফল বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন, হে আকাশসমূহের ও ভূ-মণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমার কার্য নির্বাহক দুনিয়াতেও আখিরাতেও, আমাকে পূর্ণ আনুগত্যের অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে বিশিষ্ট নেক বান্দাদের মধ্যে পরিগণিত করুন।” হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক তবে তাঁরই উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুসলমান হও।” তখন তাঁর উম্মত বলেছিলঃ “আমরা আমাদের প্রভুর উপরই ভরসা করছি। হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেন না এবং স্বীয় রহমতে আমাদেরকে কফিরদের আধিপত্য হতে মুক্তি দান করুন!”আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম যার মধ্যে হিদায়াত ও নূর রয়েছে, যার মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী নবীরা ইয়াহুদী, আল্লাহওয়ালা ও আলেমদের মধ্যে ফায়সালা করতো।” অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আমি হাওয়ারীদের কাছে অহী করেছিলাম-তোমরা আমার উপর ও আমার রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন কর, তখন তারা বললো- আমরা ঈমান আনলাম, আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলমান।” এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিলেন যে, তিনি সমস্ত নবীকে ইসলাম দিয়ে পঠিয়েছিলেন। কিন্তু নবীদের উম্মতেরা নিজ নিজ শরীয়তের প্রতি লক্ষ্য রেখে পৃথক পৃথক ধর্মের উপর ছিল। কোন কোন নবী পূর্ববর্তী নবীর শাখা ধর্মকে রহিত করে দিয়ে নিজস্ব ধর্ম চালু করেন। শেষ পর্যন্ত শরীয়তে মুহাম্মাদীর মাধ্যমে অন্যান্য সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায় এবং দ্বীনে মুহাম্মাদী কখনও রহিত হবে না, বরং চির বিদ্যমান থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত এর পতাকা উঁচু হয়েই থাকবে। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা পরস্পর বৈমাত্রেয় সন্তান। অর্থাৎ বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তদ্রুপ আমাদেরও সবারই দ্বীন একই। আমরা। সবাই সেই আল্লাহকে মেনে থাকি যিনি এক ও অংশীবিহীন। আমরা তাঁরই ইবাদত করে থাকি। যদিও আমাদের শরীয়ত বিভিন্ন; কিন্তু এই শরীয়তগুলো মায়ের মত। যেমন বৈপিত্রেয় ভাই বৈমাত্রেয় ভাই এর বিপরীত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মা এক এবং পিতা পৃথক পৃথক। আর প্রকৃত ভাই একই মা ও একই পিতার সন্তান হয়ে থাকে। তাহলে উম্মতের দৃষ্টান্ত পরম্পর এক মায়েরই সন্তানের মত।” হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) যখন নামায শুরু করতেন তখন তাকবীর বলতেন। তারপর (আরবী) বলতেন। এরপর নিম্নের দু'আটি বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ। আপনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। আপনি আমার প্রভু এবং আমি আপনার দাস। আমি আমার নিজের উপর অত্যাচার করেছি এবং আমি আমার পাপের কথা স্বীকার করছি। সুতরাং আপনি আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া আর কেউ পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিতে পারে না। আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করতে পারে না। আপনি কল্যাণময় ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং (পাপকার্য থেকে) আপনার কাছে তাওবা করছি।” তারপর তিনি রুকূ ও সিজদায় এবং তাশাহহুদে যা বলেছিলেন সেগুলো সম্বলিত সম্পূর্ন হাদীসটি বর্ণনা করা হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

আল-আনআম 6:164

এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! মুশরিকদেরকে নির্ভেজাল ইবাদত ও আল্লাহর উপর ভরসাকরণ সম্পর্কে তুমি বলে দাও-আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে স্বীয় প্রতিপালক বানিয়ে নিবো ? অথচ তিনিই তো প্রত্যেক বস্তুর প্রতিপালকু। সুতরাং আমি তাকেই আমার প্রতিপালক বানিয়ে নিবো। আমার এই প্রতিপালক একাকীই আমাকে। লালন-পালন করে থাকেন, আমার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন এবং আমার প্রতিটি বিষয়ে তিনি আমার তদবীরকারী। তাই আমি তিনি ছাড়া আর কারও সামনে মাথা নত করবো না। কেননা, সমস্ত সৃষ্টবস্তু ও সৃষ্টজীব তারই। নির্দেশ প্রদানের হক একমাত্র তাঁরই রয়েছে। মোটকথা, এ আয়াতে ইবাদতে আন্তরিকতা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার নির্দেশ রয়েছে। যেমন এর পূর্ববর্তী আয়াতে ইবাদতে আন্তরিকতা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। আর কুরআন কারীমে এই বিষয়ের পারস্পরিক মিলন অধিক পরিলক্ষিত হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা বল- “আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তারই ইবাদত কর এবং তাঁরই উপর ভরসা কর।” অন্যত্র বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-তিনি পরম দাতা ও দয়ালু, আমরা তাঁরই উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর ভরসা করেছি।” আর এক জায়গায় বলেনঃ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তাকেই ভরসার কেন্দ্রস্থল বানিয়ে নাও।” এর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত আয়াত আরও রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “কেউ কোন দুষ্কর্ম করলে ওর পাপের ফল তাকেই ভোগ করতে হবে, কারও পাপের বোঝা অপর কেউ বহন করবে না।” এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এই সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন যে শাস্তি দেয়া হবে তা নিপুণতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতেই হবে। আমলের প্রতিফল আমলকারীই পাবে। ভাল লোককে ভাল প্রতিদান এবং মন্দ লোককে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। একজনের পাপের কারণে অপরজনকে শাস্তি দেয়া হবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “পাপের বোঝা বহনকারী কেউ যদি তার সেই বোঝা বহনের জন্যে কাউকে আহ্বান করে তবে সে তার ঐ বোঝা বহন করবে না। যদিও সে তার নিকটতম আত্মীয়ও হয়।” (আরবী) (২০:১১২) -এর তাফসীরে আলেমগণ বলেন যে, কোন লোককে অপর কোন লোকের পাপের বোঝা বহন করতে বলে তার প্রতি অত্যাচার করা হবে নাএবং তার পুণ্য কিছু কমিয়ে দিয়েও তার উপর যুলুম করা হবে না । আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের জন্যে আবদ্ধ রাখা হবে, শাস্তি প্রাপ্তির পূর্বে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে না, তবে এটা ডানদিক ওয়ালাদের জন্যে প্রযোজ্য নয়। কেননা, তাদের নেক আমলের বরকত তাদের সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত পৌছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরায়ে তুরে বলেছেনঃ “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমান আনয়নে তাদের সঙ্গী হয়েছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকেও (মর্যাদায়) তাদের সাথে শামিল করে দিবো, আর (এই জন্যে) আমি তাদের আমলসমূহ হতে কিছুমাত্রও কম করবো না।” অর্থাৎ পূর্ববর্তীরাও পরবর্তীদের সৎ আমলের পুণ্য লাভ করবে কিন্তু তাই বলে পরবর্তীদের প্রতিদান হতে একটুও কম করা হবে না এবং জান্নাতে উচ্চ আসনে সৎ সন্তানদের নিকটে তাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও পৌছিয়ে দেয়া হবে। পুত্রের পুণ্য পিতাও লাভ করে থাকে, যদিও সে সৎ আমলে পুত্রের সাথে শরীক না থাকে। এ কারণে যে পুত্রের প্রতিদান কিছু কেটে নেয়া হবে তা নয়, বরং দু’জনকেই সমান সমান বিনিময় প্রদান করা হবে। এমন কি আল্লাহ তা'আলা পুত্রদেরকেও পিতাদের আমলের বরকতের কারণে তাদের মনযিল পর্যন্ত। পৌছিয়ে থাকেন। এটা তার বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, প্রত্যেকে তার কৃতকর্মের জন্যে আবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ তাকে তার কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করা হবে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর কাছেই ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ তোমরা যা করতে চাও স্বীয় জায়গায়। করতে থাক, আমিও আমার জায়গায় আমার কাজ করবো। শেষ পর্যন্ত একদিন তোমাদেরকে আমার কাছে আসতেই হবে। সেই দিন আমি মুমিন ও মুশরিক সবকেই তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবো এবং তারা দুনিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় প্রকাল সম্পর্কে যে মতানৈক্য রাখতো, সেই দিন সবকিছুই প্রতীয়মান হয়ে পড়বে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিক ও কাফিরদেরকে বলে দাও-আমাদের কার্য সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না এবং তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আমরাও জিজ্ঞাসিত হবো না। তুমি আরও বলআমাদের প্রভু আমাদের সকলকেই একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে হক ও ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবেন, তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে উত্তম ফায়সালাকারী, সবকিছু অবহিত।”

আল-আনআম 6:165

ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা একের পর এক ভূ-পৃষ্ঠে বসতি স্থাপন করে আসছিলে এবং পূর্ববর্তীদের পর পরবর্তীদের যুগ আসতে রয়েছিল। আর একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “যদি আমি ইচ্ছা করতাম তবে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত তোমাদের সন্তানদেরকে বা অন্য কাউকেও না বানিয়ে ফেরেশতাদেরকে বানাতাম এবং তারা তোমাদের পর তোমাদের স্থান দখল করে নিত।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “এ যমীনকে তিনি তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে একের পর অপরকে প্রদান করেছেন।” অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমি নিজের প্রতিনিধি বানাতে চাই।” আর এক জায়গায় বলেনঃ “এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, সত্বরই তোমাদের প্রভু তোমাদের শক্রকে ধ্বংস করে দিবেন। এবং তোমাদেরকে তাদের স্থানে বসাবেন, অতঃপর তিনি দেখবেন যে, তাদের স্থানে তোমরা এসে কিরূপ আমল পেশ করছে।”আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনি কতককে কতকের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন, অর্থাৎ জীবিকা, চরিত্র, সৌন্দর্য, সমতা, দৃশ্য, দৈহিক গঠন, রং ইত্যাদিতে একে অপরের অপেক্ষা কম-বেশী রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “আমি তাদের পার্থিব জীবনে তাদের পারস্পরিক জীবিকা বন্টন করে দিয়েছি এবং একের মর্যাদা অপরের চেয়ে উচ্চ করেছি।” কেউ আমীর, কেউ গরীব, কেউ মনিব এবং কেউ তার চাকর । মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেনঃ “লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে একের উপরে অপরকে প্রাধান্য ও মর্যাদা দান করেছি, তবে পার্থিব জীবনের মর্যাদার তুলনায় পারলৌকিক মর্যাদা ও প্রাধান্য বহু গুণে গুরুত্বপূর্ণ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “এই মর্যাদার বিভিন্নতার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চাই, ধনীকে ধন দিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে ধন-সম্পদের শাকরিয়া কিভাবে আদায় করেছে এবং গরীবকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে স্বীয় দারিদ্রের উপর ধৈর্যধারণ করেছে কি করেনি।”সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া হচ্ছে সুমিষ্ট, শ্যামল ও সবুজ। আল্লাহ তোমাদেরকে অন্যান্যদের পরে দুনিয়া ভোগ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন। এখন তিনি দেখতে চান তোমরা কিরূপ আমল করছো। তোমরা দুনিয়াকে ভয় কর এবং নারীদেরকেও ভয় করে চল। বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যে ফিত্না সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল নারী সম্পৰ্কীয়ই।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলার উক্তি- (আরবী) হে মুহাম্মাদ (সঃ)! নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক ত্বড়িত শাস্তিদাতা এবং অবশ্যই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালুও বটে। অর্থাৎ তোমাদের পার্থিব জীবন সত্বরই শেষ হয়ে যাবে ও তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং দয়ালুও বটে। এখানে ভয়ও প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং উৎসাহও প্রদান করা হচ্ছে যে, তাঁর হিসাব ও শাস্তি সত্বরই এসে যাবে এবং তার অবাধ্যরা ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতাকারীরা পাকড়াও হয়ে যাবে। আর যারা তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহ তাদের অলী এবং তাদের প্রতি তিনি ক্ষমাশীল ও কৃপানিধান । কুরআন কারীমের অধিকাংশ স্থানে এ দুটি বিশেষণ অর্থাৎ ক্ষমাশীল ও দয়ালু এক সাথে এসেছে। যেমন তিনি বলেনঃ “তেমাদের প্রভু স্বীয় বান্দাদের পাপরাশি ক্ষমা করার ব্যাপারে বড় ক্ষমাশীল, কিন্তু এর সাথে সাথে তাঁর পাকড়াও খুবই কঠিন।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি বলে দাও-আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু এবং আমার শাস্তিও বড়ই কঠিন।” উৎসাহ ও আশা প্রদান এবং ভয় প্রদর্শনের আয়াত অনেক রয়েছে। কখনও তো আল্লাহ পাক জান্নাতের গুণাবলী বর্ণনা করে বান্দাদেরকে উৎসাহ ও আশা প্রদান করেন, আবার কখনও জাহান্নামের বর্ণনা দিয়ে ওর শাস্তি এবং কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য থেকে ভয় প্রদর্শন করে থাকেন। মাঝে মাঝে আবার দু’টোর বর্ণনা একই সাথে দিয়েছেন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর বিধানসমূহ মেনে চলার তাওফীক প্রদান করেন এবং পাপীদের দল থেকে যেন আমাদেরকে দূরে রাখেন।আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শাস্তি যে কত কঠিন তা যদি মুমিন জানতো তবে কেউ জান্নাতের লালসা করতো না (সে বলতো--যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাই তবে এটাই যথেষ্ট)। পক্ষান্তরে আল্লাহর দয়া ও রহমত যে কত ব্যাপক তা যদি কাফির জানতো তবে কেউ জান্নাত থেকে নিরাশ হতো না (অথচ জান্নাত তো কাফিরের প্রাপ্যই নয়)। আল্লাহ একশ’ ভাগ রহমত রেখেছেন। এর মধ্য থেকে একটি মাত্র অংশ সারা মাখলুকাতের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন। এই এক ভাগ রহমতের কারণেই মানুষ ও জীবজন্তু একে অপরের উপর দয়া করে থাকে। আর নিরানব্বই ভাগ রহমত আল্লাহর কাছেই রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) তাঁর রহমত যে কত বেশী তা এটা থেকেই অনুমান করা যেতে পারে!আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকেই বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ একশ’ ভাগ রহমত রেখেছেন। এর মধ্য থেকে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে রেখেছেন এবং এক ভাগ যমীনে অবতীর্ণ করেছেন। এই এক ভাগ রহমতের বরকতেই সৃষ্টজীবগুলো একে অপরের উপর দয়া করে থাকে, এমন কি চতুষ্পদ জন্তুও ওর বাচ্চাকে খুরের আঘাত থেকে রক্ষা করে থাকে এই ভয়ে যে, সে কষ্ট পাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন আল্লাহ মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেন তখন আরশের উপর অবস্থিত লাওহে মাহফুযে তিনি লিপিবদ্ধ করেনঃ “আমার রহমত আমার গযবের উপর জয়যুক্ত থাকবে।”

আল-আরাফ 7:1

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এবং এগুলোর অর্থ ও এগুলো সম্পর্কে যেসব মতবিরোধ রয়েছে এ সবকিছু সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে আমি আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে থাকি। (হে নবী সঃ!) এই কিতাব (কুরআন) তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এর প্রচার এবং এর দ্বারা মানুষকে ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে এবং এমন ধৈর্য অবলম্বন কর যেমন দুঃসাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীরা অবলম্বন করেছিল। এটা অবতরণের উদ্দেশ্য এই যে, তুমি এর মাধ্যমে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে। আর মুমিনদের জন্যে তো এ কুরআন উপদেশবাণী। এই মুমিনরা তো কুরআনে অবতীর্ণ বিষয়ের অনুসরণ করেছে এবং উম্মী নবী (সঃ) যে কিতাব তাদের সামনে পেশ করেছেন তার তারা পদাংক অনুসরণ করেছে। এখন একে ছেড়ে অন্যের পিছনে পড়ো না এবং আল্লাহর হুকুমের সীমা ছাড়িয়ে অপরের হুকুমের উপর চলো না। কিন্তু উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। হে নবী (সঃ)! তুমি যতই বাসনা, কামনা, লোভ ও চেষ্টা কর না কেন এদের সকলকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করাতে পারবে না।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যদি সকলকেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা কর তবে এই লোকেরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবে এবং তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না, বরং মুশরিকই থেকে যায়।

আল-আরাফ 7:2

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এবং এগুলোর অর্থ ও এগুলো সম্পর্কে যেসব মতবিরোধ রয়েছে এ সবকিছু সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে আমি আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে থাকি। (হে নবী সঃ!) এই কিতাব (কুরআন) তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এর প্রচার এবং এর দ্বারা মানুষকে ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে এবং এমন ধৈর্য অবলম্বন কর যেমন দুঃসাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীরা অবলম্বন করেছিল। এটা অবতরণের উদ্দেশ্য এই যে, তুমি এর মাধ্যমে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে। আর মুমিনদের জন্যে তো এ কুরআন উপদেশবাণী। এই মুমিনরা তো কুরআনে অবতীর্ণ বিষয়ের অনুসরণ করেছে এবং উম্মী নবী (সঃ) যে কিতাব তাদের সামনে পেশ করেছেন তার তারা পদাংক অনুসরণ করেছে। এখন একে ছেড়ে অন্যের পিছনে পড়ো না এবং আল্লাহর হুকুমের সীমা ছাড়িয়ে অপরের হুকুমের উপর চলো না। কিন্তু উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। হে নবী (সঃ)! তুমি যতই বাসনা, কামনা, লোভ ও চেষ্টা কর না কেন এদের সকলকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করাতে পারবে না।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যদি সকলকেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা কর তবে এই লোকেরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবে এবং তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না, বরং মুশরিকই থেকে যায়।

আল-আরাফ 7:3

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এবং এগুলোর অর্থ ও এগুলো সম্পর্কে যেসব মতবিরোধ রয়েছে এ সবকিছু সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে আমি আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে থাকি। (হে নবী সঃ!) এই কিতাব (কুরআন) তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এর প্রচার এবং এর দ্বারা মানুষকে ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে এবং এমন ধৈর্য অবলম্বন কর যেমন দুঃসাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীরা অবলম্বন করেছিল। এটা অবতরণের উদ্দেশ্য এই যে, তুমি এর মাধ্যমে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে। আর মুমিনদের জন্যে তো এ কুরআন উপদেশবাণী। এই মুমিনরা তো কুরআনে অবতীর্ণ বিষয়ের অনুসরণ করেছে এবং উম্মী নবী (সঃ) যে কিতাব তাদের সামনে পেশ করেছেন তার তারা পদাংক অনুসরণ করেছে। এখন একে ছেড়ে অন্যের পিছনে পড়ো না এবং আল্লাহর হুকুমের সীমা ছাড়িয়ে অপরের হুকুমের উপর চলো না। কিন্তু উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। হে নবী (সঃ)! তুমি যতই বাসনা, কামনা, লোভ ও চেষ্টা কর না কেন এদের সকলকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করাতে পারবে না।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যদি সকলকেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা কর তবে এই লোকেরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবে এবং তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না, বরং মুশরিকই থেকে যায়।

আল-আরাফ 7:4

৪-৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের কারণে আমি কত লোকালয়কেই ধ্বংস করেছি! আর দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে উপহাস করা হয়েছিল, ফলে ঐ উপহাসের শাস্তি হিসেবে সেই উপহাসকারীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন আমি পাপের কারণে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম তখন তাদের বড় বড় অট্টালিকা ও মজবুত ঘরবাড়ী ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়লো এবং তাদের প্রস্রবণ ও নদী-নালা তছনছ হয়ে গেল।” অন্য জায়গায় বলেনঃ “জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে যখন তারা অহংকারে ফেটে পড়লো তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম, তাদের বাড়ীঘর এমন হয়ে গেল যে, যেন তারা তাতে কোন দিন বসবাসই করেনি, কিন্তু অল্প কয়েকজন বেঁচে গেল, এখন তাদের উত্তরাধিকারী একমাত্র আমিই।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার শাস্তি তাদের উপর রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা ভরা দ্বিপ্রহরে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল তখনই আপতিত হয়েছে। আর এ দু'টোই হচ্ছে উদাসীন থাকার সময়। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ “ঐ লোকদের কি এই ভয় নেই যে, আমার শাস্তি রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অকস্মাৎ তাদেরকে ঘিরে ফেলে অথবা অতি প্রত্যুষে তাদের উপর এসে পড়ে যখন তারা অশ্লীল ও বাজে কাজে লিপ্ত থাকে? আর নিজেদের পাপরাশির মাধ্যমে চালবাজীকারীরা এটাকে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে তাদেরকে ভূ-গর্ভে ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম অথবা এমনভাবে তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দ্বারা গ্রেফতার করতে পারেন যা তারা কল্পনা বা ধারণাও করতে পারবে না? কিংবা তাদের সফরে তাদেরকে পাকড়াও করবেন যা তারা প্রতিরোধ করতে পারবে না?” যেমন তিনি আরও বলেনঃ “যখন তাদের উপর শাস্তি এসেই পড়ে তখন ‘বাস্তবিকই আমরা অপরাধী ছিলাম’ একথা বলা ছাড়া তাদের আর কিছুই বলার থাকে না। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যারা সীমালংঘন করেছিল এরূপ বহু গ্রামবাসীকে আমি সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছি।” উপরোক্ত আয়াতগুলো নবী (সঃ)-এর নিম্নের হাদীসের স্পষ্ট দলীলঃ “ কোন কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়নি যে পর্যন্ত না তাদের সমস্ত শাস্তি শেষ করে দেয়া হয়েছে।” আবদুল মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “এটা কিরূপ হবে?” তখন তিনি “আমার শাস্তি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছিল তখন তাদের মুখে-বাস্তবিকই আমরা অত্যাচারী ছিলাম এই কথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না” এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসবাদ করবো।” যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “রাসূলগণ যখন প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল তখন তোমরা তাদেরকে কি উত্তর দিয়েছিলে?” আরও এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “সেইদিন আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করবেনতোমাদের কওম তোমাদেরকে কি জবাব দিয়েছিল? তারা উত্তরে বলবে-আমাদের জানা নেই, আপনিই গায়েবের সংবাদ রাখেন। তখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-তোমরা রাসূলদেরকে কি জবাব দিয়েছিলে?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “আমি রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল নেতা। তোমাদের সকলকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বাদশাহ্ তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, পুরুষ লোককে তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসিত হবে তার স্বামী সম্পর্কে এবং খাদেমকে জিজ্ঞেস করা হবে তার মনিবের মাল সম্পর্কে।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দেবো, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমি তো বে-খবর ছিলাম না।” কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা খুলে দেয়া হবে এবং তাদের আমল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখতে রয়েছেন। তিনি তো গোপন দৃষ্টিপাত সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। যদি গাছের কোন পাতা পড়ে যায় বা অন্ধকারে কোন বীজ পড়ে থাকে তবে সেটাও তার দৃষ্টির অন্তরালে থাকে না। স্পষ্ট কিতাবের মধ্যে কী নেই? আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সবকিছুই তো লিপিবদ্ধ রয়েছে এতে।

আল-আরাফ 7:5

৪-৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের কারণে আমি কত লোকালয়কেই ধ্বংস করেছি! আর দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে উপহাস করা হয়েছিল, ফলে ঐ উপহাসের শাস্তি হিসেবে সেই উপহাসকারীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন আমি পাপের কারণে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম তখন তাদের বড় বড় অট্টালিকা ও মজবুত ঘরবাড়ী ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়লো এবং তাদের প্রস্রবণ ও নদী-নালা তছনছ হয়ে গেল।” অন্য জায়গায় বলেনঃ “জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে যখন তারা অহংকারে ফেটে পড়লো তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম, তাদের বাড়ীঘর এমন হয়ে গেল যে, যেন তারা তাতে কোন দিন বসবাসই করেনি, কিন্তু অল্প কয়েকজন বেঁচে গেল, এখন তাদের উত্তরাধিকারী একমাত্র আমিই।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার শাস্তি তাদের উপর রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা ভরা দ্বিপ্রহরে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল তখনই আপতিত হয়েছে। আর এ দু'টোই হচ্ছে উদাসীন থাকার সময়। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ “ঐ লোকদের কি এই ভয় নেই যে, আমার শাস্তি রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অকস্মাৎ তাদেরকে ঘিরে ফেলে অথবা অতি প্রত্যুষে তাদের উপর এসে পড়ে যখন তারা অশ্লীল ও বাজে কাজে লিপ্ত থাকে? আর নিজেদের পাপরাশির মাধ্যমে চালবাজীকারীরা এটাকে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে তাদেরকে ভূ-গর্ভে ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম অথবা এমনভাবে তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দ্বারা গ্রেফতার করতে পারেন যা তারা কল্পনা বা ধারণাও করতে পারবে না? কিংবা তাদের সফরে তাদেরকে পাকড়াও করবেন যা তারা প্রতিরোধ করতে পারবে না?” যেমন তিনি আরও বলেনঃ “যখন তাদের উপর শাস্তি এসেই পড়ে তখন ‘বাস্তবিকই আমরা অপরাধী ছিলাম’ একথা বলা ছাড়া তাদের আর কিছুই বলার থাকে না। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যারা সীমালংঘন করেছিল এরূপ বহু গ্রামবাসীকে আমি সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছি।” উপরোক্ত আয়াতগুলো নবী (সঃ)-এর নিম্নের হাদীসের স্পষ্ট দলীলঃ “ কোন কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়নি যে পর্যন্ত না তাদের সমস্ত শাস্তি শেষ করে দেয়া হয়েছে।” আবদুল মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “এটা কিরূপ হবে?” তখন তিনি “আমার শাস্তি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছিল তখন তাদের মুখে-বাস্তবিকই আমরা অত্যাচারী ছিলাম এই কথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না” এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসবাদ করবো।” যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “রাসূলগণ যখন প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল তখন তোমরা তাদেরকে কি উত্তর দিয়েছিলে?” আরও এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “সেইদিন আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করবেনতোমাদের কওম তোমাদেরকে কি জবাব দিয়েছিল? তারা উত্তরে বলবে-আমাদের জানা নেই, আপনিই গায়েবের সংবাদ রাখেন। তখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-তোমরা রাসূলদেরকে কি জবাব দিয়েছিলে?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “আমি রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল নেতা। তোমাদের সকলকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বাদশাহ্ তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, পুরুষ লোককে তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসিত হবে তার স্বামী সম্পর্কে এবং খাদেমকে জিজ্ঞেস করা হবে তার মনিবের মাল সম্পর্কে।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দেবো, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমি তো বে-খবর ছিলাম না।” কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা খুলে দেয়া হবে এবং তাদের আমল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখতে রয়েছেন। তিনি তো গোপন দৃষ্টিপাত সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। যদি গাছের কোন পাতা পড়ে যায় বা অন্ধকারে কোন বীজ পড়ে থাকে তবে সেটাও তার দৃষ্টির অন্তরালে থাকে না। স্পষ্ট কিতাবের মধ্যে কী নেই? আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সবকিছুই তো লিপিবদ্ধ রয়েছে এতে।

আল-আরাফ 7:6

৪-৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের কারণে আমি কত লোকালয়কেই ধ্বংস করেছি! আর দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে উপহাস করা হয়েছিল, ফলে ঐ উপহাসের শাস্তি হিসেবে সেই উপহাসকারীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন আমি পাপের কারণে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম তখন তাদের বড় বড় অট্টালিকা ও মজবুত ঘরবাড়ী ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়লো এবং তাদের প্রস্রবণ ও নদী-নালা তছনছ হয়ে গেল।” অন্য জায়গায় বলেনঃ “জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে যখন তারা অহংকারে ফেটে পড়লো তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম, তাদের বাড়ীঘর এমন হয়ে গেল যে, যেন তারা তাতে কোন দিন বসবাসই করেনি, কিন্তু অল্প কয়েকজন বেঁচে গেল, এখন তাদের উত্তরাধিকারী একমাত্র আমিই।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার শাস্তি তাদের উপর রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা ভরা দ্বিপ্রহরে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল তখনই আপতিত হয়েছে। আর এ দু'টোই হচ্ছে উদাসীন থাকার সময়। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ “ঐ লোকদের কি এই ভয় নেই যে, আমার শাস্তি রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অকস্মাৎ তাদেরকে ঘিরে ফেলে অথবা অতি প্রত্যুষে তাদের উপর এসে পড়ে যখন তারা অশ্লীল ও বাজে কাজে লিপ্ত থাকে? আর নিজেদের পাপরাশির মাধ্যমে চালবাজীকারীরা এটাকে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে তাদেরকে ভূ-গর্ভে ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম অথবা এমনভাবে তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দ্বারা গ্রেফতার করতে পারেন যা তারা কল্পনা বা ধারণাও করতে পারবে না? কিংবা তাদের সফরে তাদেরকে পাকড়াও করবেন যা তারা প্রতিরোধ করতে পারবে না?” যেমন তিনি আরও বলেনঃ “যখন তাদের উপর শাস্তি এসেই পড়ে তখন ‘বাস্তবিকই আমরা অপরাধী ছিলাম’ একথা বলা ছাড়া তাদের আর কিছুই বলার থাকে না। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যারা সীমালংঘন করেছিল এরূপ বহু গ্রামবাসীকে আমি সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছি।” উপরোক্ত আয়াতগুলো নবী (সঃ)-এর নিম্নের হাদীসের স্পষ্ট দলীলঃ “ কোন কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়নি যে পর্যন্ত না তাদের সমস্ত শাস্তি শেষ করে দেয়া হয়েছে।” আবদুল মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “এটা কিরূপ হবে?” তখন তিনি “আমার শাস্তি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছিল তখন তাদের মুখে-বাস্তবিকই আমরা অত্যাচারী ছিলাম এই কথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না” এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসবাদ করবো।” যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “রাসূলগণ যখন প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল তখন তোমরা তাদেরকে কি উত্তর দিয়েছিলে?” আরও এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “সেইদিন আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করবেনতোমাদের কওম তোমাদেরকে কি জবাব দিয়েছিল? তারা উত্তরে বলবে-আমাদের জানা নেই, আপনিই গায়েবের সংবাদ রাখেন। তখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-তোমরা রাসূলদেরকে কি জবাব দিয়েছিলে?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “আমি রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল নেতা। তোমাদের সকলকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বাদশাহ্ তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, পুরুষ লোককে তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসিত হবে তার স্বামী সম্পর্কে এবং খাদেমকে জিজ্ঞেস করা হবে তার মনিবের মাল সম্পর্কে।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দেবো, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমি তো বে-খবর ছিলাম না।” কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা খুলে দেয়া হবে এবং তাদের আমল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখতে রয়েছেন। তিনি তো গোপন দৃষ্টিপাত সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। যদি গাছের কোন পাতা পড়ে যায় বা অন্ধকারে কোন বীজ পড়ে থাকে তবে সেটাও তার দৃষ্টির অন্তরালে থাকে না। স্পষ্ট কিতাবের মধ্যে কী নেই? আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সবকিছুই তো লিপিবদ্ধ রয়েছে এতে।

আল-আরাফ 7:7

৪-৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের কারণে আমি কত লোকালয়কেই ধ্বংস করেছি! আর দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে উপহাস করা হয়েছিল, ফলে ঐ উপহাসের শাস্তি হিসেবে সেই উপহাসকারীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন আমি পাপের কারণে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম তখন তাদের বড় বড় অট্টালিকা ও মজবুত ঘরবাড়ী ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়লো এবং তাদের প্রস্রবণ ও নদী-নালা তছনছ হয়ে গেল।” অন্য জায়গায় বলেনঃ “জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে যখন তারা অহংকারে ফেটে পড়লো তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম, তাদের বাড়ীঘর এমন হয়ে গেল যে, যেন তারা তাতে কোন দিন বসবাসই করেনি, কিন্তু অল্প কয়েকজন বেঁচে গেল, এখন তাদের উত্তরাধিকারী একমাত্র আমিই।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার শাস্তি তাদের উপর রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা ভরা দ্বিপ্রহরে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল তখনই আপতিত হয়েছে। আর এ দু'টোই হচ্ছে উদাসীন থাকার সময়। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ “ঐ লোকদের কি এই ভয় নেই যে, আমার শাস্তি রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অকস্মাৎ তাদেরকে ঘিরে ফেলে অথবা অতি প্রত্যুষে তাদের উপর এসে পড়ে যখন তারা অশ্লীল ও বাজে কাজে লিপ্ত থাকে? আর নিজেদের পাপরাশির মাধ্যমে চালবাজীকারীরা এটাকে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে তাদেরকে ভূ-গর্ভে ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম অথবা এমনভাবে তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দ্বারা গ্রেফতার করতে পারেন যা তারা কল্পনা বা ধারণাও করতে পারবে না? কিংবা তাদের সফরে তাদেরকে পাকড়াও করবেন যা তারা প্রতিরোধ করতে পারবে না?” যেমন তিনি আরও বলেনঃ “যখন তাদের উপর শাস্তি এসেই পড়ে তখন ‘বাস্তবিকই আমরা অপরাধী ছিলাম’ একথা বলা ছাড়া তাদের আর কিছুই বলার থাকে না। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যারা সীমালংঘন করেছিল এরূপ বহু গ্রামবাসীকে আমি সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছি।” উপরোক্ত আয়াতগুলো নবী (সঃ)-এর নিম্নের হাদীসের স্পষ্ট দলীলঃ “ কোন কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়নি যে পর্যন্ত না তাদের সমস্ত শাস্তি শেষ করে দেয়া হয়েছে।” আবদুল মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “এটা কিরূপ হবে?” তখন তিনি “আমার শাস্তি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছিল তখন তাদের মুখে-বাস্তবিকই আমরা অত্যাচারী ছিলাম এই কথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না” এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসবাদ করবো।” যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “রাসূলগণ যখন প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল তখন তোমরা তাদেরকে কি উত্তর দিয়েছিলে?” আরও এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “সেইদিন আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করবেনতোমাদের কওম তোমাদেরকে কি জবাব দিয়েছিল? তারা উত্তরে বলবে-আমাদের জানা নেই, আপনিই গায়েবের সংবাদ রাখেন। তখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-তোমরা রাসূলদেরকে কি জবাব দিয়েছিলে?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “আমি রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল নেতা। তোমাদের সকলকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বাদশাহ্ তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, পুরুষ লোককে তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসিত হবে তার স্বামী সম্পর্কে এবং খাদেমকে জিজ্ঞেস করা হবে তার মনিবের মাল সম্পর্কে।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দেবো, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমি তো বে-খবর ছিলাম না।” কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা খুলে দেয়া হবে এবং তাদের আমল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখতে রয়েছেন। তিনি তো গোপন দৃষ্টিপাত সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। যদি গাছের কোন পাতা পড়ে যায় বা অন্ধকারে কোন বীজ পড়ে থাকে তবে সেটাও তার দৃষ্টির অন্তরালে থাকে না। স্পষ্ট কিতাবের মধ্যে কী নেই? আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সবকিছুই তো লিপিবদ্ধ রয়েছে এতে।

আল-আরাফ 7:8

৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আমলসমূহ ওজন করা হবে এটা সত্য কথা, যেন কারো উপর যুলুম না হতে পারে। যেমন এক জায়গায় বলেনঃ “কিয়ামতের দিন আমি সত্য ও ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো যাতে কারো উপর বিন্দুমাত্রও যুলুম না হতে পারে। সরিষার দানা পরিমাণও যদি কোন আমল থেকে থাকে সেটাও ছুটে যাবে না। গণনার জন্যে আমিই যথেষ্ট।” অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ অণু পরিমাণও কারো উপর অত্যাচার করবেন না। যদি একটি পুণ্য হয় তবে ওকে দ্বিগুন ত্রিগুণ করে দেয়া হবে। তাঁর এই বিরাট প্রতিদান তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কার স্বরূপ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যার (পুণ্যের) পাল্লা ভারী হবে সে তো তার বাসনানুরূপ সুখে অবস্থান করবে। আর যার (পুণ্যের) পাল্লা হাল্কা হবে, তার বাসস্থান হবে হাবিয়া। তোমার কি জানা আছে, ওটা কি? ওটা হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নি।” আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফু দেয়া হবে তখন আত্মীয়তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেউ কাউকেও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। যার (পুণ্যের) ওজন ভারী, হবে সে তো হবে কৃতকার্য ও সফলকাম, আর যর (পুণ্যের) ওজন হালকা হবে সে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত ও বিফল মনোরথ হবে। আর তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।” দাড়িপাল্লায় যা ওজন করা হবে তা হচ্ছে কারো কারো মতে স্বয়ং আমল। যদিও ওর কোন আকার নেই অর্থাৎ যদিও ওটা কোন দৃশ্যমান অস্তিত্ব বিশিষ্ট পদার্থ নয়, তবুও সেই দিন আল্লাহ তা'আলা ওকে পদার্থের আকার দান করবেন। এই বিষয়েরই হাদীস হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাকারা’ এবং সূরায়ে আলে-ইমরান’ কিয়ামতের দিন দু’টি মেঘখণ্ডের আকারে সামনে আসবে। অথবা দু’টি সামিয়ানার আকারে কিংবা আকাশে ছড়িয়ে পড়া পাখীদের আঁকের আকারে আসবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন পাঠকের কাছে কুরআন মাজীদ একজন নবযুবকের আকারে হজির হবে। কুরআনের পাঠক তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে উত্তরে বলবেঃ “আমি কুরআন। আমি তোমাকে রাত্রিকালে জাগিয়ে রাখতাম এবং সারাদিন রোযার হুকুম পালনার্থে পিপাসার্ত রাখতাম।” কবরের প্রশ্নের ঘটনায় রয়েছে যে, কবরে মুমিনের কাছে একজন সুগন্ধময় সুন্দর যুবক আগমন করবে। কবরবাসী তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে বলবেঃ “আমি তোমার সৎ আমল।”হাদীসে বেতাকার মধ্যে রয়েছে যে, একজন লোককে একটি কাগজের টুকরা দেয়া হবে এবং ওটা তারাযুর এক পাল্লায় রাখা হবে। আর অপর পাল্লায় রাখা হবে কাগজের নিরানব্বইটি দফতর। এক একটি দফতর এতো বড় হবে যে, যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে। ঐ কাগজের টুকরায় (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু’ লিখা থাকবে। লোকটি বলবেঃ “কোথায় এই কাগজের টুকরাটি এবং কোথায় ঐ বড় বড় দফতরগুলো।” তখন আল্লাহ পাক তাকে বলবেনঃ “আজ কিন্তু তোমার উপর অত্যাচার করা হবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তার পাপরাশির বড় বড় দফতরের পাল্লা হালকা হয়ে যাবে এবং ঐ কাগজখণ্ডের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে।আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, আমল বা আমলনামা ওজন করা হবে না, বরং আমলকারীকে ওজন করা হবে। যেমন হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন একজন মোটা লোকটে আনয়ন করা হবে, কিন্তু সে আল্লাহর কাছে পাখীর পালকের সমানও ওজনের হবে না। অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “তোমরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সরু সরু পা দেখে কেন বিস্ময় বোধ করছো? আল্লাহর শপথ! এটা দাঁড়িপাল্লায় ওজন করলে এর ওজন উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বেশী হবে।” এই তিনটি বর্ণনাকে এভাবে জমা করা যেতে পারে যে, কখনো ওজন করা হবে আমল, কখনো আমলনামা এবং কখনো আমলকারীকে।

আল-আরাফ 7:9

৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আমলসমূহ ওজন করা হবে এটা সত্য কথা, যেন কারো উপর যুলুম না হতে পারে। যেমন এক জায়গায় বলেনঃ “কিয়ামতের দিন আমি সত্য ও ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো যাতে কারো উপর বিন্দুমাত্রও যুলুম না হতে পারে। সরিষার দানা পরিমাণও যদি কোন আমল থেকে থাকে সেটাও ছুটে যাবে না। গণনার জন্যে আমিই যথেষ্ট।” অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ অণু পরিমাণও কারো উপর অত্যাচার করবেন না। যদি একটি পুণ্য হয় তবে ওকে দ্বিগুন ত্রিগুণ করে দেয়া হবে। তাঁর এই বিরাট প্রতিদান তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কার স্বরূপ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যার (পুণ্যের) পাল্লা ভারী হবে সে তো তার বাসনানুরূপ সুখে অবস্থান করবে। আর যার (পুণ্যের) পাল্লা হাল্কা হবে, তার বাসস্থান হবে হাবিয়া। তোমার কি জানা আছে, ওটা কি? ওটা হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নি।” আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফু দেয়া হবে তখন আত্মীয়তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেউ কাউকেও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। যার (পুণ্যের) ওজন ভারী, হবে সে তো হবে কৃতকার্য ও সফলকাম, আর যর (পুণ্যের) ওজন হালকা হবে সে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত ও বিফল মনোরথ হবে। আর তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।” দাড়িপাল্লায় যা ওজন করা হবে তা হচ্ছে কারো কারো মতে স্বয়ং আমল। যদিও ওর কোন আকার নেই অর্থাৎ যদিও ওটা কোন দৃশ্যমান অস্তিত্ব বিশিষ্ট পদার্থ নয়, তবুও সেই দিন আল্লাহ তা'আলা ওকে পদার্থের আকার দান করবেন। এই বিষয়েরই হাদীস হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাকারা’ এবং সূরায়ে আলে-ইমরান’ কিয়ামতের দিন দু’টি মেঘখণ্ডের আকারে সামনে আসবে। অথবা দু’টি সামিয়ানার আকারে কিংবা আকাশে ছড়িয়ে পড়া পাখীদের আঁকের আকারে আসবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন পাঠকের কাছে কুরআন মাজীদ একজন নবযুবকের আকারে হজির হবে। কুরআনের পাঠক তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে উত্তরে বলবেঃ “আমি কুরআন। আমি তোমাকে রাত্রিকালে জাগিয়ে রাখতাম এবং সারাদিন রোযার হুকুম পালনার্থে পিপাসার্ত রাখতাম।” কবরের প্রশ্নের ঘটনায় রয়েছে যে, কবরে মুমিনের কাছে একজন সুগন্ধময় সুন্দর যুবক আগমন করবে। কবরবাসী তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে বলবেঃ “আমি তোমার সৎ আমল।”হাদীসে বেতাকার মধ্যে রয়েছে যে, একজন লোককে একটি কাগজের টুকরা দেয়া হবে এবং ওটা তারাযুর এক পাল্লায় রাখা হবে। আর অপর পাল্লায় রাখা হবে কাগজের নিরানব্বইটি দফতর। এক একটি দফতর এতো বড় হবে যে, যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে। ঐ কাগজের টুকরায় (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু’ লিখা থাকবে। লোকটি বলবেঃ “কোথায় এই কাগজের টুকরাটি এবং কোথায় ঐ বড় বড় দফতরগুলো।” তখন আল্লাহ পাক তাকে বলবেনঃ “আজ কিন্তু তোমার উপর অত্যাচার করা হবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তার পাপরাশির বড় বড় দফতরের পাল্লা হালকা হয়ে যাবে এবং ঐ কাগজখণ্ডের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে।আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, আমল বা আমলনামা ওজন করা হবে না, বরং আমলকারীকে ওজন করা হবে। যেমন হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন একজন মোটা লোকটে আনয়ন করা হবে, কিন্তু সে আল্লাহর কাছে পাখীর পালকের সমানও ওজনের হবে না। অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “তোমরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সরু সরু পা দেখে কেন বিস্ময় বোধ করছো? আল্লাহর শপথ! এটা দাঁড়িপাল্লায় ওজন করলে এর ওজন উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বেশী হবে।” এই তিনটি বর্ণনাকে এভাবে জমা করা যেতে পারে যে, কখনো ওজন করা হবে আমল, কখনো আমলনামা এবং কখনো আমলকারীকে।

আল-আরাফ 7:10

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর নিজের অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেনঃ আমি তোমাদেরকে এতো ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দান করেছি যে, তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে শাসন কায়েম করেছো এবং দুনিয়ায় নিজেদের মূল শক্ত করে নিয়েছো । সেখানে তোমরা নদী-নালা প্রবাহিত করেছে, ঘর ও চাকচিক্যময় অট্টালিকা বনিয়েছে এবং নিজেদের জন্যে সমুদয় উপকারী জিনিস উৎপাদন করেছে । আমি আমার বান্দাদের জন্যে মেঘমালাকে কাজে লাগিয়ে রেখেছি, উদ্দেশ্য হচ্ছে তার থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের জন্যে ফসল উৎপন্ন করা। যমীনে আমি তাদের জীবিকা লাভের বিভিন্ন মাধ্যম রেখেছি। সেখানে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে এবং নিজেদের জন্যে নানা প্রকারের সুখের সামগ্রী তৈরী করছে। তথাপি তারা এসব নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করছে না। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেনঃ “ যদি তোমরা আমার নিয়ামতরাজি গণনা করার ইচ্ছা কর তবে সেগুলো গণনা করতে পারবে না। মানুষ বড়ই অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।” (আরবী) শব্দটিকে সবাই (আরবী)-এর সাথে পড়ে থাকেন অর্থাৎ (আরবী) এর সাথে পড়েন না। কিন্তু আবদুর রহমান ইবনে হরমু একে (আরবী) দিয়ে পড়েন। অধিকাংশ লোক যেভাবে পড়েন সেটাই বিশুদ্ধতম (আরবী) অর্থাৎ দিয়ে না পড়া। কেননা, (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর বহুবচন। এটা হচ্ছে (আরবী) এবং এটা (আরবী) হবে। এই (আরবী)-এর মূল হচ্ছে মায়ূইশাতুন অর্থাৎ (আরবী)- তে (আরবী) দিয়ে। (আরবী)- তে (আরবী) ভারী হওয়ায় (আরবী) টি (আরবী)-এ দেয়া হয়েছে এবং এভাবে মায়ূইশাতুন শব্দটি মায়ীশাতুন হয়েছে। তারপর এর একবচনকে যখন বহুবচন বানানো হলো তখন (আরবী)-এর (আরবী) টি আবার তাতে ফিরে আসলো। কেননা, কাঠিন্য আর অবশিষ্ট থাকলো না। বলা হয়েছে যে, (আরবী)-এর ওযন হচ্ছে (আরবী) কেননা এই শব্দে (আরবী) টি মূলে রয়েছে। এটা (আরবী) এবং (আরবী)-এর মত নয়। এগুলো হচ্ছে যথাক্রমে (আরবী) এবং (আরবী)-এর বহুবচন। কেননা, (আরবী) অক্ষরটি হচ্ছে এখানে অতিরিক্ত। সুতরাং এগুলোর বহুবচন (আরবী)-এর ওযনে হবে। আর এখানে (আরবী) অক্ষরটিও আসবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আরাফ 7:11

এখানে আল্লাহ পাক মানব-পিতা আদম (আঃ)-এর মর্যাদা এবং তাঁর শত্রু ইবলীসের বর্ণনা দিচ্ছেন, যে ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের সাথে শত্রুতা রাখে। যেন মানুষ তাদের শত্রু ইবলীস থেকে বেঁচে থাকে এবং তার পথে না চলে। তাই তিনি মানব জাতিকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আকৃতি দান করেছি। তারপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি-আদিম (আঃ)-কে সিজদা কর । আমার এ নির্দেশ পালনার্থে সবাই সিজদা করলো। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতামণ্ডলীকে বলেছিলেন-আমি মানব সৃষ্টি করবো, যাকে আমি ঠনঠনে শুষ্ক মাটি দ্বারা তৈরী করবো। সুতরাং যখন আমি ওকে তৈরী করে ওতে রূহ ফুঁকে দিলাম এবং একটা জীবন্ত দেহ তৈরী হয়ে গেল, তখন আমার এই ক্ষমতা দেখে সবাই আদম (আঃ)-এর সিজদায় পড়ে গেল। আর এর প্রয়োজনীয়তা এজন্যেই ছিল যে, যখন আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে নিজের হাতে মসৃন চটচটে মাটি দ্বারা তৈরী করলেন এবং তাকে একটা সোজা দেহবিশিষ্ট মানবীয় রূপ দান করলেন আর তার মধ্যে রূহ ফুকে দিলেন, তখন তিনি ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন- ‘কুন’ শব্দ দ্বারা বানানো মাখলুককে নয়, বরং স্বয়ং আমার হাতে বানানো পুতুলকে সিজদা কর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল কুদরতে ইলাহীকে সিজদা করা এবং তার শান শওকতের সম্মান করা। এই নির্দেশ দেয়া মাত্রই সমস্ত ফেরেশতা নির্দেশ পালনার্থে সিজদা করলেন। কিন্তু একমাত্র ইবলীস সিজদাহ করলো না। প্রথম সূরা অর্থাৎ সূরায়ে বাকারায় এর উপর যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। এখন এই স্থানে আমরা যা কিছু আলোচনা করলাম তা হচ্ছে। ওটাই যা ইবনে জারীর (রঃ) অবলম্বন করেছেন।(আরবী) -এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রথমে মানুষকে পুরুষ লোকদের পৃষ্ঠদেশে সৃষ্টি করা হয়। এরপর স্ত্রী লোকদের গর্ভাশয়ে তার আকৃতি দান করা হয়। কাতাদাহ (রঃ) এবং যহ্হাক (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-আমি আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছি। তারপর তার সন্তানের আকৃতি দান করেছি। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এর পরেই আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী)-এটা একথাই প্রমাণ করছে যে, এর দ্বারা আদম (আঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে। আর এখানে বহুবচনের সাথে যে বলা হয়েছে, এর কারণ এই যে, আদম (আঃ) হচ্ছেন মানব জাতির পিতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা তো সম্বোধন করছেন নবী (সঃ)-এর যুগের বানী ইসরাঈলদেরকে। অর্থাৎ (আরবী) (২:৫৭) অর্থাৎ গামাম’, ‘মান’ ও ‘সালওয়া তো এসেছিল বর্তমান যুগের বানী ইসরাঈলের পূর্বপূরুষদের উপর। তাহলে এর দ্বারা তো ঐ লোকদেরকেই বুঝানো হয়েছে যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে ছিল। কিন্তু বাপ-দাদাদের উপর অনুগ্রহ করাও প্রকতপক্ষে তাদের বংশধরদের উপরও অনুগহ করা হয়ে থাকে। তাহলে এই অনুগ্রহ যেন সন্তানদের উপরও করা হয়েছিল। এ জন্যেই (আরবী) সে দ্বারা সম্বোধন করেছেন। তাহলে যেন (আরবী) শব্দ দ্বারা আদম (আঃ) এবং তাঁর সন্তানগণ সকলকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সকলকেই একত্রিত করা হয়েছে। এটা আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তির বিপরীতঃ (আরবী) (২৩:১২) এখানে (আরবী) শব্দ দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বহুবচন উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি আত্মা অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ)-এর সত্তা উদ্দেশ্য, যাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সমস্ত সন্তানকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়নি, বরং নুঙ্কা' বা বীর্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন যে বলা হয়-“মানুষকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে তা শুধু এই কারণে যে, মানুষের পিতা আদম (আঃ)-কে মানুষের মত বীর্য থেকে নয়, বরং মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আরাফ 7:12

কোন কোন আরবী ব্যাকরণবিদের উক্তি অনুসারে (আরবী)-এই স্থানে (আরবী) শব্দটি অতিরিক্ত এবং একে ইনকার বা অস্বীকৃতির প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে আনা হয়েছে। যেমন কোন কবি বলেছেন(আরবী) এখানে (আরবী) -শব্দটি (আরবী)-এর জন্যে এসেছে এবং একে (আরবী)-এর উপর গুরুত্ব বুঝাবার জন্যে আনা হয়েছে। এখানে যেন (আরবী) শব্দটি অতিরিক্ত। (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তিটি এর পূর্বেই এসেছে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এই যে, (আরবী) অন্য একটি (আরবী) -এর অন্তর্ভুক্ত। যার অর্থ হবে“কোন জিনিসটি তোমাকে বাধ্য করেছিল যে, তুমি সিজদা করবে না, অথচ আমার নির্দেশ বিদ্যমান ছিল?” এ উক্তিটি সবল ও উত্তম। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবলীস উত্তরে বলেছিল-“আমি আদম (আঃ)-এর চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। আর যে শ্রেষ্ঠ সে এমন কাউকে সিজদা করতে পারে না যার উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। সুতরাং আমার প্রতি আদম (আঃ)-এর সিজদা করার হুকুম হল কেন?” সে দলীল পেশ করেছিল যে, তাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আগুন হচ্ছে মাটি হতে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন যা দ্বারা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে লক্ষ্য করেছে উপাদানের প্রতি, কিন্তু ঐ শরীফ আদম (আঃ)-এর প্রতি লক্ষ্য করেনি যাকে মহান আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে স্বীয় রূহ ভরে দিয়েছেন! সে একটা বিকৃত অনুমান কায়েম করেছে যা মহান আল্লাহর প্রকাশ্য হুকুমের বিরোধী।মোটকথা, সমস্ত ফেরেস্তা সিজদায় পড়ে গেলেন। ইবলীস সিজদা না করার কারণে ফেরেশতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো এবং আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ে গেল। এই নৈরাশ্য প্রকৃতপক্ষে হচ্ছে তার নিজের ভুলেরই প্রতিফল এবং সে কিয়াস বা অনুমানেও ভুল করেছিল। তার দাবী ছিল এই যে, আগুন মাটি হতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু মাটির শান হচ্ছে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, নম্রতা এবং কাজে স্থিরতা। তা ছাড়া মাটি হচ্ছে উদ্ভিদ ও লতাপাতা জন্মিবার স্থান। আগুনের শান হচ্ছে পুড়িয়ে দেয়া, ইন্দ্রিয়াবেগ এবং দ্রুততা। ইবলীসের উপাদান তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর আদম (আঃ)-এর উপাদান রুজু, অপারগতা এবং আনুগত্য স্বীকার করে তার উপকার সাধন করেছিল । হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, ইবলীসকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অগ্নিশিখা দ্বারা, আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি দ্বারা এবং হ্রদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে যাফরান দ্বারা।” ইবলীস কিয়াস বা অনুমান কায়েমকারী। আর সূর্য ও চন্দ্রের ইবাদতও কিয়াসের উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়।

আল-আরাফ 7:13

১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক এখানে ইবলীসকে এমন বিষয় সম্পর্কে সম্বোধন করলেন যা অবশ্যই সংঘটিত হবে। তিনি বললেন-তুমি আমার আদেশ অমান্য করা এবং আমার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার অহংকার করার কোন অধিকার ছিল না।অধিকাংশ মুফাসসির (আরবী)-এর (আরবী) সর্বনামটিকে (আরবী)-এর দিকে ফিরিয়ে থাকেন। আবার ইবলীসের (আরবী)-তে যে মর্যাদা ছিল সেইদিকে (আরবী) সর্বনামটির ফিরারও সম্ভাবনা রয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন-তুমি বেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। এটা ছিল ইবলীসের হঠকারিতারই প্রতিফল। এখানে ইবলীস একটা কথা চিন্তা করলো এবং কিয়ামতের দিবস পর্যন্ত অবকাশ চাইলো। সে আরয করলোঃ হে আল্লাহ! শাস্তি প্রদানে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ পাক তখন তাকে বললেন-“যাও তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো। এর মধ্যেও আল্লাহ তা'আলার নিপুণতা লুকায়িত ছিল এবং তাঁর ইচ্ছাই কাজ করছিল। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা যেতে পারে না। তাঁর হুকুমের পর আর কারো হুকুম চলতে পারে না। তিনি সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।

আল-আরাফ 7:14

১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক এখানে ইবলীসকে এমন বিষয় সম্পর্কে সম্বোধন করলেন যা অবশ্যই সংঘটিত হবে। তিনি বললেন-তুমি আমার আদেশ অমান্য করা এবং আমার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার অহংকার করার কোন অধিকার ছিল না।অধিকাংশ মুফাসসির (আরবী)-এর (আরবী) সর্বনামটিকে (আরবী)-এর দিকে ফিরিয়ে থাকেন। আবার ইবলীসের (আরবী)-তে যে মর্যাদা ছিল সেইদিকে (আরবী) সর্বনামটির ফিরারও সম্ভাবনা রয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন-তুমি বেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। এটা ছিল ইবলীসের হঠকারিতারই প্রতিফল। এখানে ইবলীস একটা কথা চিন্তা করলো এবং কিয়ামতের দিবস পর্যন্ত অবকাশ চাইলো। সে আরয করলোঃ হে আল্লাহ! শাস্তি প্রদানে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ পাক তখন তাকে বললেন-“যাও তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো। এর মধ্যেও আল্লাহ তা'আলার নিপুণতা লুকায়িত ছিল এবং তাঁর ইচ্ছাই কাজ করছিল। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা যেতে পারে না। তাঁর হুকুমের পর আর কারো হুকুম চলতে পারে না। তিনি সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।

আল-আরাফ 7:15

১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক এখানে ইবলীসকে এমন বিষয় সম্পর্কে সম্বোধন করলেন যা অবশ্যই সংঘটিত হবে। তিনি বললেন-তুমি আমার আদেশ অমান্য করা এবং আমার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার অহংকার করার কোন অধিকার ছিল না।অধিকাংশ মুফাসসির (আরবী)-এর (আরবী) সর্বনামটিকে (আরবী)-এর দিকে ফিরিয়ে থাকেন। আবার ইবলীসের (আরবী)-তে যে মর্যাদা ছিল সেইদিকে (আরবী) সর্বনামটির ফিরারও সম্ভাবনা রয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন-তুমি বেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। এটা ছিল ইবলীসের হঠকারিতারই প্রতিফল। এখানে ইবলীস একটা কথা চিন্তা করলো এবং কিয়ামতের দিবস পর্যন্ত অবকাশ চাইলো। সে আরয করলোঃ হে আল্লাহ! শাস্তি প্রদানে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ পাক তখন তাকে বললেন-“যাও তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো। এর মধ্যেও আল্লাহ তা'আলার নিপুণতা লুকায়িত ছিল এবং তাঁর ইচ্ছাই কাজ করছিল। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা যেতে পারে না। তাঁর হুকুমের পর আর কারো হুকুম চলতে পারে না। তিনি সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।

আল-আরাফ 7:16

১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: যখন ইবলীস কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ পেয়ে গেল এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো তখন সে বিদ্রোহ ও একগুয়েমী শুরু করে দিলো। সে বললো-“হে আল্লাহ! যেমনভাবে আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করে দিলেন, তেমনভাবেই আমিও আপনার বান্দাদেরকে সরল সোজা পথ থেকে বিভ্রান্ত করে দেবো।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী)-এর অনুবাদ (আরবী) করেছেন। আর অন্যেরা (আরবী) করেছেন। সে বললো- “আমি আদম (আঃ)-এর প্রতিশোধ তার বংশধর হতে গ্রহণ করবো। কেননা, তারই কারণে আমি আপনার দরবার হতে বহিষ্কৃত হয়েছি।” সিরাতে মুসতাকীম দ্বারা সত্যপথ ও মুক্তির পথ বুঝানো হয়েছে। (ইবলীস বললোঃ) “আমি আপনার বান্দাদেরকে এইভাবে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করবো যে, তারা আপনার ইবাদত করবে না এবং আপনার একত্ববাদ থেকে দূরে থাকবে। কোন কোন আরবী ব্যাকরণবিদ বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের আক্ষরটি কসমের জন্যে আনা হয়েছে। যেন বলা হয়েছে-আপনার কুপথে পরিচালনার শপথ, যা আমার প্রতি করা হয়েছে।মুজাহিদ (রঃ) “সিরাত’ (আরবী) বুঝিয়েছেন। আর মুহাম্মাদ ইবনে সাওকার মতে এর দ্বারা মক্কার পথ’ বুঝানো হয়েছে। আর ইবনে জারীর (রঃ) বলেন-সঠিক কথা তো এই যে, এই শব্দটি এই সমুদয় অর্থের জন্যে আম’ বা সাধারণ। সীরা ইবনে আবিল ফাকা’ হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, শয়তান বিভিন্ন পন্থায় বানী আদমকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সে ইসলামের পথের উপর এসে বসে পড়ে এবং বলে- “তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করবে এবং স্বীয় বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করবে?” কিন্তু ঐ লোকটি শয়তানের অবাধ্য হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সে লোকটির হিজরতের পথে এসে বসে যায় এবং বলে- “তুমি স্বীয় দেশ ছেড়ে কেন হিজরত করছো? মুহাজিরের মর্যাদা একটা জানোয়ার ও ঘোড়ার চেয়ে বেশী হয় না। কিন্তু সে তার কথা অমান্য করে ও হিজরতের পথ অবলম্বন করে। এরপর শয়তান তার জিহাদে গমন বন্ধ করার জন্যে পথে বসে পড়ে। জিহাদ জীবন দিয়েও হতে পারে এবং মালধন দিয়েও হতে পারে। সে তাকে বলে- “তুমি কি যুদ্ধ করার জন্যে বের হচ্ছো? সাবধান! তুমি নিহত হয়ে যাবে এবং তোমার স্ত্রী অন্যের সাথে বিবাহিতা হয়ে যাবে। আর তোমার মালধন লোকেরা পরস্পরের মধ্যে ভাগ বণ্টন করে নেবে।” কিন্তু তবুও সে জিহাদের জন্যে বেরিয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ যে ব্যক্তি এই কাজ করে এবং মারা যায়, তাকে জান্নাতে স্থান দেয়া আল্লাহ পাকের জন্যে অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ে, হয় সে নিহতই হাক বা পথে ডুবেই মরুক অথবা পথিমধ্যে কোন জীন-জন্তু দ্বারা পদদলিতই হাক।”শয়তান বললো-আমি বানী আদমের সামনের দিক থেকেও আসবো এবং পিছনের দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ পরকাল সম্পর্কে তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেবো এবং দুনিয়ার আসক্তির প্রতি তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবো। আর ডান দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ আমরে দ্বীন তাদের উপর সন্দেহপূর্ণ করে তুলবো। তাদের বাম দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ পাপ ও অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ তাদের জন্যে যোগ্য ও গ্রহণীয় বানিয়ে দেবো।আবার বিভিন্ন লোক এর বিভিন্ন ভাবার্থ নিয়ে থাকেন, যেগুলো প্রয়ি কাছাকাছি। শয়তান ‘আমি উপরের দিক থেকেও আসবো’ এ কথা বলেনি। কেননা, উপর থেকে তো শুধুমাত্র আল্লাহর রহমতই আসতে পারে। সে বললোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আপনার বান্দাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অর্থাৎ একত্ববাদীরূপে পাবেন না” এ কথাটা শয়তান স্বীয় খেয়াল ও ধারণার ভিত্তিতেই বলেছিল বটে, কিন্তু সেটা সত্যে পরিণত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইবলীসের এ ধারণা ঠিকই ছিল। কেননা, মুমিনরা ছাড়া সবাই তার অনুসরণ করছে। কিন্তু মুমিনদের উপর সে তার জাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। আর আমি যে শয়তানকে এই চেষ্টা-তদবীরের ক্ষমতা দিয়েছি তার উদ্দেশ্য এই যে, কে পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং কে সন্দেহ পোষণকারী তা যেন প্রকাশ পেয়ে যায়। আর আল্লাহ তো প্রত্যেক জিনিসেরই রক্ষক।এ জন্যেই তো হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে এইভাবে আশ্রয় প্রার্থনা কর- “হে আল্লাহ! কোন দিক থেকেই সে যেন আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং প্রার্থনায় বলতেন- “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি, দ্বীনের জন্যেও দুনিয়ার জন্যেও এবং পরিবার ও ধন-সম্পদের জন্যেও। হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো মাফ করে দিন, ভয় থেকে আমাকে নিরাপদে রাখুন। আর সামনের দিক থেকেও আমাকে রক্ষা করুন, পিছনের দিক থেকেও রক্ষা করুন এবং ডান দিক থেকেও আমাকে হিফাযত করুন, বাম দিক থেকেও আমাকে হিফাযত করুন এবং উপর দিক থেকেও রক্ষা করুন! আর শয়তান নীচের দিক থেকে আমার উপর প্রতারণার জাল বিস্তার করে, এ থেকে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

আল-আরাফ 7:17

১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: যখন ইবলীস কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ পেয়ে গেল এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো তখন সে বিদ্রোহ ও একগুয়েমী শুরু করে দিলো। সে বললো-“হে আল্লাহ! যেমনভাবে আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করে দিলেন, তেমনভাবেই আমিও আপনার বান্দাদেরকে সরল সোজা পথ থেকে বিভ্রান্ত করে দেবো।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী)-এর অনুবাদ (আরবী) করেছেন। আর অন্যেরা (আরবী) করেছেন। সে বললো- “আমি আদম (আঃ)-এর প্রতিশোধ তার বংশধর হতে গ্রহণ করবো। কেননা, তারই কারণে আমি আপনার দরবার হতে বহিষ্কৃত হয়েছি।” সিরাতে মুসতাকীম দ্বারা সত্যপথ ও মুক্তির পথ বুঝানো হয়েছে। (ইবলীস বললোঃ) “আমি আপনার বান্দাদেরকে এইভাবে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করবো যে, তারা আপনার ইবাদত করবে না এবং আপনার একত্ববাদ থেকে দূরে থাকবে। কোন কোন আরবী ব্যাকরণবিদ বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের আক্ষরটি কসমের জন্যে আনা হয়েছে। যেন বলা হয়েছে-আপনার কুপথে পরিচালনার শপথ, যা আমার প্রতি করা হয়েছে।মুজাহিদ (রঃ) “সিরাত’ (আরবী) বুঝিয়েছেন। আর মুহাম্মাদ ইবনে সাওকার মতে এর দ্বারা মক্কার পথ’ বুঝানো হয়েছে। আর ইবনে জারীর (রঃ) বলেন-সঠিক কথা তো এই যে, এই শব্দটি এই সমুদয় অর্থের জন্যে আম’ বা সাধারণ। সীরা ইবনে আবিল ফাকা’ হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, শয়তান বিভিন্ন পন্থায় বানী আদমকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সে ইসলামের পথের উপর এসে বসে পড়ে এবং বলে- “তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করবে এবং স্বীয় বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করবে?” কিন্তু ঐ লোকটি শয়তানের অবাধ্য হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সে লোকটির হিজরতের পথে এসে বসে যায় এবং বলে- “তুমি স্বীয় দেশ ছেড়ে কেন হিজরত করছো? মুহাজিরের মর্যাদা একটা জানোয়ার ও ঘোড়ার চেয়ে বেশী হয় না। কিন্তু সে তার কথা অমান্য করে ও হিজরতের পথ অবলম্বন করে। এরপর শয়তান তার জিহাদে গমন বন্ধ করার জন্যে পথে বসে পড়ে। জিহাদ জীবন দিয়েও হতে পারে এবং মালধন দিয়েও হতে পারে। সে তাকে বলে- “তুমি কি যুদ্ধ করার জন্যে বের হচ্ছো? সাবধান! তুমি নিহত হয়ে যাবে এবং তোমার স্ত্রী অন্যের সাথে বিবাহিতা হয়ে যাবে। আর তোমার মালধন লোকেরা পরস্পরের মধ্যে ভাগ বণ্টন করে নেবে।” কিন্তু তবুও সে জিহাদের জন্যে বেরিয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ যে ব্যক্তি এই কাজ করে এবং মারা যায়, তাকে জান্নাতে স্থান দেয়া আল্লাহ পাকের জন্যে অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ে, হয় সে নিহতই হাক বা পথে ডুবেই মরুক অথবা পথিমধ্যে কোন জীন-জন্তু দ্বারা পদদলিতই হাক।”শয়তান বললো-আমি বানী আদমের সামনের দিক থেকেও আসবো এবং পিছনের দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ পরকাল সম্পর্কে তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেবো এবং দুনিয়ার আসক্তির প্রতি তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবো। আর ডান দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ আমরে দ্বীন তাদের উপর সন্দেহপূর্ণ করে তুলবো। তাদের বাম দিক থেকেও আসবো। অর্থাৎ পাপ ও অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ তাদের জন্যে যোগ্য ও গ্রহণীয় বানিয়ে দেবো।আবার বিভিন্ন লোক এর বিভিন্ন ভাবার্থ নিয়ে থাকেন, যেগুলো প্রয়ি কাছাকাছি। শয়তান ‘আমি উপরের দিক থেকেও আসবো’ এ কথা বলেনি। কেননা, উপর থেকে তো শুধুমাত্র আল্লাহর রহমতই আসতে পারে। সে বললোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আপনার বান্দাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী অর্থাৎ একত্ববাদীরূপে পাবেন না” এ কথাটা শয়তান স্বীয় খেয়াল ও ধারণার ভিত্তিতেই বলেছিল বটে, কিন্তু সেটা সত্যে পরিণত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইবলীসের এ ধারণা ঠিকই ছিল। কেননা, মুমিনরা ছাড়া সবাই তার অনুসরণ করছে। কিন্তু মুমিনদের উপর সে তার জাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। আর আমি যে শয়তানকে এই চেষ্টা-তদবীরের ক্ষমতা দিয়েছি তার উদ্দেশ্য এই যে, কে পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং কে সন্দেহ পোষণকারী তা যেন প্রকাশ পেয়ে যায়। আর আল্লাহ তো প্রত্যেক জিনিসেরই রক্ষক।এ জন্যেই তো হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে এইভাবে আশ্রয় প্রার্থনা কর- “হে আল্লাহ! কোন দিক থেকেই সে যেন আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং প্রার্থনায় বলতেন- “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি, দ্বীনের জন্যেও দুনিয়ার জন্যেও এবং পরিবার ও ধন-সম্পদের জন্যেও। হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো মাফ করে দিন, ভয় থেকে আমাকে নিরাপদে রাখুন। আর সামনের দিক থেকেও আমাকে রক্ষা করুন, পিছনের দিক থেকেও রক্ষা করুন এবং ডান দিক থেকেও আমাকে হিফাযত করুন, বাম দিক থেকেও আমাকে হিফাযত করুন এবং উপর দিক থেকেও রক্ষা করুন! আর শয়তান নীচের দিক থেকে আমার উপর প্রতারণার জাল বিস্তার করে, এ থেকে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

আল-আরাফ 7:18

আল্লাহ পাক মালায়ে আ’লার প্রাসাদ হতে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে গিয়ে ইবলীসকে বলেনঃ তুমি লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত অবস্থায় এখান থেকে বেরিয়ে যাও। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে দোষী ও অপমানিত। দোষের স্থলে (আরবী) শব্দ ব্যবহার করা অপেক্ষা (আরবী) শব্দের ব্যবহারই বেশী অলংকারপূর্ণ। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিতাড়িত ও বহিস্কৃত। প্রকৃতপক্ষে(আরবী)-এর অর্থ একই। আর শয়তানের প্রতি আল্লাহ পাকের “যারা তোমার অনুসরণ করবে, আমি এইসব লোক দ্বারা এবং তোমার দলবল দ্বারা জাহান্নামকে পূর্ণ করব” এই উক্তি তাঁর প্রতি নিমের উক্তিরই অনুরূপ। “তুমি বেরিয়ে যাও, যে লোকেরা তোমার অনুসরণ করবে, জাহান্নাম তাদের পূর্ণ প্রতিফল। যাদের উপর তোমার ক্ষমতা চলে তাদেরকে ডেকে নাও, স্বীয় সেনাবাহিনী ও সন্তানদের মাধ্যমে তাদের উপর বিজয় লাভ কর এবং মালধন ও সন্তান-সন্ততিতে তাদের শরীক হয়ে যাও। আর তাদের সাথে খুব বেশী বেশী মিথ্যা অঙ্গীকার কর। শয়তানের অঙ্গীকার তো শুধুমাত্র প্রতারিত করার জন্যেই হয়ে থাকে। কিন্তু আমার বিশিষ্ট বান্দাদের উপর কখনও তোমার ক্ষমতা চলবে না। আল্লাহ তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব করবেন।”

আল-আরাফ 7:19

১৯-২১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আদম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আঃ)-এর জন্যে জান্নাতকে বাসস্থান বানানো হয়েছিল এবং তাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা জান্নাতের একটি গাছের ফল ছাড়া সমস্ত গাছের ফল খেতে পার। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। এ ব্যাপার দেখে শয়তানের তাদের দু’জনের উপর হিংসা হলো। সুতরাং সে প্রতারণার মাধ্যমে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতে লাগলো যেন যে নিয়ামত ও সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ তারা লাভ করেছেন তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দেয়। এখন ইবলীস আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে বললোঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন এর মধ্যে যৌক্তিকতা এই রয়েছে যে, তোমরা যেন মালাইকা হয়ে না যাও এবং এখানে চিরকাল বসবাস করার অধিকারী হয়ে না পড়। সুতরাং যদি তোমরা এই গাছের ফল খেয়ে নাও তবে তোমরা এই সুযোগ লাভ করতে পারবে।” যেমন সে বলেছিলঃ “হে আদম (আঃ)! আমি কি তোমাকে এমন গাছের কথা ও এমন ভূ-সম্পত্তির কথা বলে দেবো যা কখনো ধ্বংস হবে না?” যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে এ কথা খোলাখুলিভাবে এ জন্যে বুঝাতে রয়েছেন যে, যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়।” এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। (৪:১৭৬) আর এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “তিনি যমীনে পাহাড়ের পেরেক মেরে দিয়েছেন যেন তা হেলা দোলা ও টলমল না করে।” এখানেও (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী)অর্থাৎ যেন যমীন তোমাদেরকে নিয়ে টলমল না করে। (১৬:১৫)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) মালাকাইনে শব্দটিকে ‘মালিকাইনে অর্থাৎ দিয়ে (আরবী) পড়তেন। কিন্তু জমহুর উলামা দিয়ে পড়ে থাকেন।(আরবী) অর্থাৎ ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর সামনে আল্লাহর নামে শপথ করে বললোঃ “আমি তোমাদের শুভাকাংখী। তোমাদের পূর্বে আমি এখানে অবস্থান করতাম এবং আমি এই জান্নাতের জায়গাগুলোর সঙ্গে সম্যক পরিচিত।” (আরবী) ক্রিয়া পদটির হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী)-এর একটি (আরবী) হচ্ছে (আরবী) বা মিলন। কিন্তু কোন কোন সময় একমুখীই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ আদম (আঃ) ও ইবলীস দু'জনে নয়; বরং শুধুমাত্র ইবলীসই পুথ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সে প্রতারণায় সফলকাম হয়েছিল। আর আল্লাহর নাম নিয়ে মুমিনকে প্রতারিত করা যেতে পারে। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেনঃ “যে আমাকে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রতারণা করেছে, আমি সদা-সর্বদা তার কছে প্রতারিত হয়েছি। তাহলে আদম (আঃ) প্রতারিত হবেন না কেন?”

আল-আরাফ 7:20

১৯-২১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আদম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আঃ)-এর জন্যে জান্নাতকে বাসস্থান বানানো হয়েছিল এবং তাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা জান্নাতের একটি গাছের ফল ছাড়া সমস্ত গাছের ফল খেতে পার। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। এ ব্যাপার দেখে শয়তানের তাদের দু’জনের উপর হিংসা হলো। সুতরাং সে প্রতারণার মাধ্যমে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতে লাগলো যেন যে নিয়ামত ও সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ তারা লাভ করেছেন তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দেয়। এখন ইবলীস আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে বললোঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন এর মধ্যে যৌক্তিকতা এই রয়েছে যে, তোমরা যেন মালাইকা হয়ে না যাও এবং এখানে চিরকাল বসবাস করার অধিকারী হয়ে না পড়। সুতরাং যদি তোমরা এই গাছের ফল খেয়ে নাও তবে তোমরা এই সুযোগ লাভ করতে পারবে।” যেমন সে বলেছিলঃ “হে আদম (আঃ)! আমি কি তোমাকে এমন গাছের কথা ও এমন ভূ-সম্পত্তির কথা বলে দেবো যা কখনো ধ্বংস হবে না?” যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে এ কথা খোলাখুলিভাবে এ জন্যে বুঝাতে রয়েছেন যে, যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়।” এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। (৪:১৭৬) আর এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “তিনি যমীনে পাহাড়ের পেরেক মেরে দিয়েছেন যেন তা হেলা দোলা ও টলমল না করে।” এখানেও (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী)অর্থাৎ যেন যমীন তোমাদেরকে নিয়ে টলমল না করে। (১৬:১৫)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) মালাকাইনে শব্দটিকে ‘মালিকাইনে অর্থাৎ দিয়ে (আরবী) পড়তেন। কিন্তু জমহুর উলামা দিয়ে পড়ে থাকেন।(আরবী) অর্থাৎ ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর সামনে আল্লাহর নামে শপথ করে বললোঃ “আমি তোমাদের শুভাকাংখী। তোমাদের পূর্বে আমি এখানে অবস্থান করতাম এবং আমি এই জান্নাতের জায়গাগুলোর সঙ্গে সম্যক পরিচিত।” (আরবী) ক্রিয়া পদটির হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী)-এর একটি (আরবী) হচ্ছে (আরবী) বা মিলন। কিন্তু কোন কোন সময় একমুখীই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ আদম (আঃ) ও ইবলীস দু'জনে নয়; বরং শুধুমাত্র ইবলীসই পুথ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সে প্রতারণায় সফলকাম হয়েছিল। আর আল্লাহর নাম নিয়ে মুমিনকে প্রতারিত করা যেতে পারে। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেনঃ “যে আমাকে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রতারণা করেছে, আমি সদা-সর্বদা তার কছে প্রতারিত হয়েছি। তাহলে আদম (আঃ) প্রতারিত হবেন না কেন?”

আল-আরাফ 7:21

১৯-২১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আদম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আঃ)-এর জন্যে জান্নাতকে বাসস্থান বানানো হয়েছিল এবং তাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা জান্নাতের একটি গাছের ফল ছাড়া সমস্ত গাছের ফল খেতে পার। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। এ ব্যাপার দেখে শয়তানের তাদের দু’জনের উপর হিংসা হলো। সুতরাং সে প্রতারণার মাধ্যমে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতে লাগলো যেন যে নিয়ামত ও সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ তারা লাভ করেছেন তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দেয়। এখন ইবলীস আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে বললোঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন এর মধ্যে যৌক্তিকতা এই রয়েছে যে, তোমরা যেন মালাইকা হয়ে না যাও এবং এখানে চিরকাল বসবাস করার অধিকারী হয়ে না পড়। সুতরাং যদি তোমরা এই গাছের ফল খেয়ে নাও তবে তোমরা এই সুযোগ লাভ করতে পারবে।” যেমন সে বলেছিলঃ “হে আদম (আঃ)! আমি কি তোমাকে এমন গাছের কথা ও এমন ভূ-সম্পত্তির কথা বলে দেবো যা কখনো ধ্বংস হবে না?” যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে এ কথা খোলাখুলিভাবে এ জন্যে বুঝাতে রয়েছেন যে, যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়।” এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। (৪:১৭৬) আর এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “তিনি যমীনে পাহাড়ের পেরেক মেরে দিয়েছেন যেন তা হেলা দোলা ও টলমল না করে।” এখানেও (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী)অর্থাৎ যেন যমীন তোমাদেরকে নিয়ে টলমল না করে। (১৬:১৫)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রঃ) মালাকাইনে শব্দটিকে ‘মালিকাইনে অর্থাৎ দিয়ে (আরবী) পড়তেন। কিন্তু জমহুর উলামা দিয়ে পড়ে থাকেন।(আরবী) অর্থাৎ ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর সামনে আল্লাহর নামে শপথ করে বললোঃ “আমি তোমাদের শুভাকাংখী। তোমাদের পূর্বে আমি এখানে অবস্থান করতাম এবং আমি এই জান্নাতের জায়গাগুলোর সঙ্গে সম্যক পরিচিত।” (আরবী) ক্রিয়া পদটির হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী)-এর একটি (আরবী) হচ্ছে (আরবী) বা মিলন। কিন্তু কোন কোন সময় একমুখীই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ আদম (আঃ) ও ইবলীস দু'জনে নয়; বরং শুধুমাত্র ইবলীসই পুথ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সে প্রতারণায় সফলকাম হয়েছিল। আর আল্লাহর নাম নিয়ে মুমিনকে প্রতারিত করা যেতে পারে। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেনঃ “যে আমাকে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রতারণা করেছে, আমি সদা-সর্বদা তার কছে প্রতারিত হয়েছি। তাহলে আদম (আঃ) প্রতারিত হবেন না কেন?”

আল-আরাফ 7:22

২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) খেজুরবৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘাকৃতির লোক ছিলেন। তার মাথার চুল ছিল ঘন ও লম্বা। যখন তিনি ভুল করে বসলেন তখন তার দেহাবরণ খুলে গেল। এর পূর্বে তিনি স্বীয় গুপ্তাঙ্গের প্রতি লক্ষ্য করতেন না। এখন তিনি ব্যাকুল হয়ে জান্নাতের মধ্যে এদিক ওদিক ফিরতে লাগলেন। জান্নাতের এক গাছের সঙ্গে তার মাথার চুল জড়িয়ে পড়লো। তিনি বলতে লাগলেনঃ হে গাছ! আমাকে ছেড়ে দাও! গাছ বলে উঠলোঃ “আমি আপনাকে ছাড়বো না।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “তুমি কি আমার নিকট থেকে পালিয়ে যাচ্ছ?” আদম (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার কাছে লজ্জা বোধ করছি। কেননা, আমার দেহাবরণ খুলে গেছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আদম (আঃ)-কে যে গাছের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল তা ছিল গমের শীষ। যখন আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) ওটা খেয়ে ফেলেন তখন তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এখন তারা গাছের পাতা দ্বারা দেহ আবৃত করতে থাকেন এবং একটিকে অপরটির সাথে জোড়া দিয়ে শরীরের উপর লাগাতে থাকেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! আমি তোমাদেরকে জান্নাত দান করেছিলাম এবং তথাকার সব জিনিসই তোমাদের জন্যে বৈধ করে দিয়েছিলাম। একমাত্র একটি গাছ তোমাদের জন্যে অবৈধ করেছিলাম এবং ওর ফল খেতে নিষেধ করেছিলাম, এটা কি সত্য নয়?” আদম (আঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হ্যা এটা সত্য বটে, তবে আপনার মর্যাদার শপথ! আমার এটা ধারণাও ছিল না যে, আপনার নামে কসম খেয়ে কেউ মিথ্যা কথা বলতে পারে!” যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কসম খেয়ে বলছি যে আমি তোমাদের শুভাকাংখী।” (৭:২১)। এরপর আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ)-কে বলেনঃ “ আমিও স্বীয় মর্যাদার শপথ করে বলছি যে, আমি তোমাদেরকে যমীনে পাঠিয়ে দেবো। সেখানে তোমাদেরকে পরিশ্রম করতে হবে ও বিপদ আপদে পড়তে হবে এবং সেখানে তোমরা কোন শান্তি পাবে না।” অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা জান্নাত থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে যাও। জান্নাতে তোমরা সর্বপ্রকারের নিয়ামত ভোগ করছিলে, কিন্তু এখন খাদ্য ও পানীয়ের কোন সুস্বাদু নিয়ামত তোমরা প্রাপ্ত হবে না।” মহান আল্লাহ দুনিয়ায় আদম (আঃ)-এর লোহার উপকারিতা সম্পর্কে শিক্ষা দান করলেন এবং তাঁকে কৃষিকার্য শিক্ষা দিলেন। হযরত আদম (আঃ) কৃষিকার্য শুরু করে দিলেন। ক্ষেতে পানি সেচন করলেন। শস্য পেকে উঠলে তিনি তা কেটে নিলেন এবং ওটা মাড়াই করে দানা বের করলেন। তারপর তা পেষণ করলেন এবং ওটা ঠাসলেন। এরপর রুটি পাকিয়ে তা খেয়ে নিলেন। যে কষ্ট তাদের ভাগ্যে লিখা ছিল তা আল্লাহ পাকের ইচ্ছা অনুযায়ীই লিখিত হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) জান্নাতের ডুমুরের পাতাকে পোশাকের আকারে দেহে জড়িয়েছিলেন। অহাব। ইবনে মুনাব্বাহ্ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর নূরানী পোশাক ছিল, ফলে একে অপরকে উলঙ্গরূপে দেখতে পেতেন না। যখন তাদের উলঙ্গরূপ প্রকাশ পেয়ে গেল তখন তা আবৃত করার খেয়াল তাদের অন্তরে প্রকৃতিগতভাবে জেগে উঠলো। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) বলেছিলেন-“হে আমার প্রতিপালক! আমার তাওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করার কোন উপায় আছে কি?” উত্তরে আল্লাহ পাক বলেনঃ হ্যাঁ, আছে। ঐ অবস্থায় আমি তোমাদেরকে পুনরায় জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। কিন্তু ইবলীস তাওবার অনুমতি চাওয়ার পরিবর্তে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার অনুমতি চাইলো। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে দু'জনকেই তাদের প্রার্থিত জিনিস দান করা হলো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত আদম (আঃ) গম খেয়ে নিলেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বললেনঃ “আমি তোমাকে এ গাছ থেকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তুমি এর ফল খেলে কেন?” তখন তিনি জবাবে বললেনঃ “হাওয়া আমাকে এটা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।” আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “আমি হাওয়াকে এ শাস্তি দিলাম যে, গর্ভবতী থাকা অবস্থায় সে ব্যথা ও কষ্ট পাবে এবং সন্তান প্রসবের সময়ও তাকে কষ্ট দেয়া হবে।” এ কথা শুনে হযরত হাওয়া (আঃ) কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ তা'আলা আরও বললেনঃ “যখন তুমি সন্তান প্রসব করবে তখন তুমি ও তোমার সন্তান উভয়েই কাঁদবে।” হযরত আদম (আঃ) তাঁর প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা চাওয়ার জন্যে যে কথাগুলো শিখেছিলেন তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ(আরবী) অর্থাৎ “ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বো।”

আল-আরাফ 7:23

২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) খেজুরবৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘাকৃতির লোক ছিলেন। তার মাথার চুল ছিল ঘন ও লম্বা। যখন তিনি ভুল করে বসলেন তখন তার দেহাবরণ খুলে গেল। এর পূর্বে তিনি স্বীয় গুপ্তাঙ্গের প্রতি লক্ষ্য করতেন না। এখন তিনি ব্যাকুল হয়ে জান্নাতের মধ্যে এদিক ওদিক ফিরতে লাগলেন। জান্নাতের এক গাছের সঙ্গে তার মাথার চুল জড়িয়ে পড়লো। তিনি বলতে লাগলেনঃ হে গাছ! আমাকে ছেড়ে দাও! গাছ বলে উঠলোঃ “আমি আপনাকে ছাড়বো না।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “তুমি কি আমার নিকট থেকে পালিয়ে যাচ্ছ?” আদম (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার কাছে লজ্জা বোধ করছি। কেননা, আমার দেহাবরণ খুলে গেছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আদম (আঃ)-কে যে গাছের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল তা ছিল গমের শীষ। যখন আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) ওটা খেয়ে ফেলেন তখন তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এখন তারা গাছের পাতা দ্বারা দেহ আবৃত করতে থাকেন এবং একটিকে অপরটির সাথে জোড়া দিয়ে শরীরের উপর লাগাতে থাকেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! আমি তোমাদেরকে জান্নাত দান করেছিলাম এবং তথাকার সব জিনিসই তোমাদের জন্যে বৈধ করে দিয়েছিলাম। একমাত্র একটি গাছ তোমাদের জন্যে অবৈধ করেছিলাম এবং ওর ফল খেতে নিষেধ করেছিলাম, এটা কি সত্য নয়?” আদম (আঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হ্যা এটা সত্য বটে, তবে আপনার মর্যাদার শপথ! আমার এটা ধারণাও ছিল না যে, আপনার নামে কসম খেয়ে কেউ মিথ্যা কথা বলতে পারে!” যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কসম খেয়ে বলছি যে আমি তোমাদের শুভাকাংখী।” (৭:২১)। এরপর আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ)-কে বলেনঃ “ আমিও স্বীয় মর্যাদার শপথ করে বলছি যে, আমি তোমাদেরকে যমীনে পাঠিয়ে দেবো। সেখানে তোমাদেরকে পরিশ্রম করতে হবে ও বিপদ আপদে পড়তে হবে এবং সেখানে তোমরা কোন শান্তি পাবে না।” অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা জান্নাত থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে যাও। জান্নাতে তোমরা সর্বপ্রকারের নিয়ামত ভোগ করছিলে, কিন্তু এখন খাদ্য ও পানীয়ের কোন সুস্বাদু নিয়ামত তোমরা প্রাপ্ত হবে না।” মহান আল্লাহ দুনিয়ায় আদম (আঃ)-এর লোহার উপকারিতা সম্পর্কে শিক্ষা দান করলেন এবং তাঁকে কৃষিকার্য শিক্ষা দিলেন। হযরত আদম (আঃ) কৃষিকার্য শুরু করে দিলেন। ক্ষেতে পানি সেচন করলেন। শস্য পেকে উঠলে তিনি তা কেটে নিলেন এবং ওটা মাড়াই করে দানা বের করলেন। তারপর তা পেষণ করলেন এবং ওটা ঠাসলেন। এরপর রুটি পাকিয়ে তা খেয়ে নিলেন। যে কষ্ট তাদের ভাগ্যে লিখা ছিল তা আল্লাহ পাকের ইচ্ছা অনুযায়ীই লিখিত হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) জান্নাতের ডুমুরের পাতাকে পোশাকের আকারে দেহে জড়িয়েছিলেন। অহাব। ইবনে মুনাব্বাহ্ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর নূরানী পোশাক ছিল, ফলে একে অপরকে উলঙ্গরূপে দেখতে পেতেন না। যখন তাদের উলঙ্গরূপ প্রকাশ পেয়ে গেল তখন তা আবৃত করার খেয়াল তাদের অন্তরে প্রকৃতিগতভাবে জেগে উঠলো। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) বলেছিলেন-“হে আমার প্রতিপালক! আমার তাওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করার কোন উপায় আছে কি?” উত্তরে আল্লাহ পাক বলেনঃ হ্যাঁ, আছে। ঐ অবস্থায় আমি তোমাদেরকে পুনরায় জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো। কিন্তু ইবলীস তাওবার অনুমতি চাওয়ার পরিবর্তে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার অনুমতি চাইলো। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে দু'জনকেই তাদের প্রার্থিত জিনিস দান করা হলো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত আদম (আঃ) গম খেয়ে নিলেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বললেনঃ “আমি তোমাকে এ গাছ থেকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তুমি এর ফল খেলে কেন?” তখন তিনি জবাবে বললেনঃ “হাওয়া আমাকে এটা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।” আল্লাহ পাক তখন বললেনঃ “আমি হাওয়াকে এ শাস্তি দিলাম যে, গর্ভবতী থাকা অবস্থায় সে ব্যথা ও কষ্ট পাবে এবং সন্তান প্রসবের সময়ও তাকে কষ্ট দেয়া হবে।” এ কথা শুনে হযরত হাওয়া (আঃ) কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ তা'আলা আরও বললেনঃ “যখন তুমি সন্তান প্রসব করবে তখন তুমি ও তোমার সন্তান উভয়েই কাঁদবে।” হযরত আদম (আঃ) তাঁর প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা চাওয়ার জন্যে যে কথাগুলো শিখেছিলেন তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ(আরবী) অর্থাৎ “ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বো।”

আল-আরাফ 7:24

২৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: জান্নাত হতে নীচে নেমে যাওয়ার এ সম্বোধন আদম (আঃ), হাওয়া (আঃ) ও ইবলীসকে করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ সাপকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কেননা সাপই আদম (আঃ) ও ইবলীসের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ জন্যেই সূরায়ে তা’হায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা সবাই নেমে যাও।” হাওয়া (আঃ) তো আদম (আঃ)-এর বাধ্যই ছিলেন। আর সাপকেও যদি এদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয় তবে সে ছিল ইবলীসের অনুগত। মুফাসসিরগণ ঐ স্থানগুলোর উল্লেখ করেছেন যেগুলোতে তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এসব খবর ইসরাঈলিয়াত হতে নেয়া হয়েছে। এগুলোর সত্যাসত্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই অবহিত রয়েছেন। যেসব স্থানে তারা পতিত হয়েছিল সেগুলোর নির্দিষ্ট করণে যদি কোন উপকারিতা থাকতো তবে অবশ্যই আল্লাহ পাক সেগুলো উল্লেখ করতেন অথবা হাদীসে কোন জায়গায় বর্ণিত হতো। ইরশাদ হচ্ছে- পৃথিবীই তোমাদের বাসস্থান হবে এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই তোমাদের জীবন ধারণের উপযোগী সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটা ভাগ্যেও লিখা ছিল এবং লাওহে মাহফুযেও তা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা কবর অথবা পৃথিবীর উপরিভাগ ও তলদেশ বুঝানো হয়েছে।ঘোষিত হচ্ছে-এখন তোমাদেরকে পৃথিবীতেই জীবন-যাপন করতে হবে, সেখানেই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেই পুনরায় উত্থিত হবে । যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেবো এবং পুনরায় তোমাদেরকে মাটি থেকেই বের করবো।” (২০:৫৫) আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আদম (আঃ)-এর জীবন পর্যন্ত পৃথিবীকে বাসস্থান বানানো হয়েছে। জীবিতাবস্থায় সে এখানেই থাকবে, এখানেই মৃত্যুবরণ করবে, এখানেই তার কবর হবে এবং কিয়ামতের দিন তাকে এখান থেকেই উঠানো হবে। অতঃপর স্বীয় আমলের হিসাব দিতে হবে।

আল-আরাফ 7:25

২৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: জান্নাত হতে নীচে নেমে যাওয়ার এ সম্বোধন আদম (আঃ), হাওয়া (আঃ) ও ইবলীসকে করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ সাপকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কেননা সাপই আদম (আঃ) ও ইবলীসের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ জন্যেই সূরায়ে তা’হায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা সবাই নেমে যাও।” হাওয়া (আঃ) তো আদম (আঃ)-এর বাধ্যই ছিলেন। আর সাপকেও যদি এদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয় তবে সে ছিল ইবলীসের অনুগত। মুফাসসিরগণ ঐ স্থানগুলোর উল্লেখ করেছেন যেগুলোতে তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এসব খবর ইসরাঈলিয়াত হতে নেয়া হয়েছে। এগুলোর সত্যাসত্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই অবহিত রয়েছেন। যেসব স্থানে তারা পতিত হয়েছিল সেগুলোর নির্দিষ্ট করণে যদি কোন উপকারিতা থাকতো তবে অবশ্যই আল্লাহ পাক সেগুলো উল্লেখ করতেন অথবা হাদীসে কোন জায়গায় বর্ণিত হতো। ইরশাদ হচ্ছে- পৃথিবীই তোমাদের বাসস্থান হবে এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই তোমাদের জীবন ধারণের উপযোগী সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটা ভাগ্যেও লিখা ছিল এবং লাওহে মাহফুযেও তা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা কবর অথবা পৃথিবীর উপরিভাগ ও তলদেশ বুঝানো হয়েছে।ঘোষিত হচ্ছে-এখন তোমাদেরকে পৃথিবীতেই জীবন-যাপন করতে হবে, সেখানেই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেই পুনরায় উত্থিত হবে । যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেবো এবং পুনরায় তোমাদেরকে মাটি থেকেই বের করবো।” (২০:৫৫) আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, আদম (আঃ)-এর জীবন পর্যন্ত পৃথিবীকে বাসস্থান বানানো হয়েছে। জীবিতাবস্থায় সে এখানেই থাকবে, এখানেই মৃত্যুবরণ করবে, এখানেই তার কবর হবে এবং কিয়ামতের দিন তাকে এখান থেকেই উঠানো হবে। অতঃপর স্বীয় আমলের হিসাব দিতে হবে।

আল-আরাফ 7:26

আল্লাহ পাক বান্দাদের উপর স্বীয় অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেনঃ আমি তোমাদেরকে পোশাকে ভূষিত করেছি। পোশাক পরিচ্ছদ তো দেহ ও গুপ্তস্থান আবত করার কাজে লেগে থাকে। আর (আরবী) হচ্ছে ঐ পোশাক যা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে পরিধান করা হয়। প্রথমটা প্রয়োজনীয়তার অন্তর্ভুক্ত এবং দ্বিতীয়টা পরিপূর্ণতা ও অতিরিক্ততার অন্তর্ভুক্ত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আরবী ভাষায় বাড়ীর আসবাবপত্র ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাককে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অর্থ নিয়েছেন মালধন ও বিলাসিতা। আবু উমামা (রঃ) যখন কোন নতুন কাপড় কষ্ঠ পর্যন্ত পরিধান করতেন তখন তিনি বলতেন- “আমি ঐ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি যিনি আমাকে পোশাক পরিয়েছেন, যার দ্বারা আমি জরুরী ভিত্তিতে স্বীয় দেহ আবৃত করছি এবং সাথে সাথে নিজের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন নতুন কাপড় পরিধান করে তা গলা পর্যন্ত জড়িয়ে নেয়ার পর বলে- “সেই আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাকে পোশাক পরালেন, যা দ্বারা আমি আমার অনাবৃত দেহ আবৃত করলাম এবং যা আমার জীবদ্দশায় আমার সৌন্দর্য বৃদ্ধির কারণ।” অতঃপর সে তার খুলে ফেলা কাপড় কোন গরীব দুঃখীকে দান করে দেয়, সে আল্লাহর দায়িত্বে এসে যায়, এটা জীবদ্দশাতেও এবং মৃত্যুর পরেও। হযরত আলী (রাঃ) একটি ছেলের কাছ থেকে তিন দিরহামের বিনিময়ে একটি জামা খরিদ করেছিলেন এবং হাতের কজি হতে পায়ের গিঁঠ পর্যন্ত ওটা পরিধান করে বলেছিলেনঃ “ সেই আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাকে (আরবী) সৌন্দর্য মণ্ডিত করলেন এবং তা দ্বারা আমি আমার দেহের গুপ্তাংশকে আবৃত করলাম।” তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “এটা আপনি নিজের পক্ষ থেকেই বললেন, না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ থেকে শুনেছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি এটা শুনেছি।” ইরশাদ হচ্ছে- তাকওয়ার পোশাকই হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক। কেউ কেউ (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ একে (আরবী) হিসেবে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন। (আরবী) হচ্ছে এর (আরবী) বা বিধেয়। মুফাসসিরদের মধ্যে (আরবী) শব্দের অর্থ নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ পোশাক বুঝানো হয়েছে যা কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে পরানো হবে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ‘ঈমান'। উরওরা (রঃ) (আরবী) দ্বারা ‘আল্লাহর ভয়’ অর্থ নিয়েছেন। এসবের অর্থ প্রায় কাছাকাছিই। এটা নিম্নের হাদীসের সহায়কঃহযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মিম্বরের উপর উঠলেন। সেই সময় তিনি এমন একটি জামা পরিহিত ছিলেন যার বুতামগুলো খোলা ছিল। তিনি কুকুরগুলোকে মেরে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছিলেন এবং কবুতরবাজি থেকে বিরত রাখছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ হে লোক সকল! গোপনে গোপনে কাজ করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “আল্লাহর শপথ! কেউ যদি লুকিয়ে চুকিয়ে কোন কাজ করে তবে আল্লাহ সেই কাজকে প্রকাশ করে দেবেন। সেই কাজ যদি ভাল হয় তবে তো সুনাম হবে, আর মন্দ হলে দুর্ণাম হবে।” অতঃপর তিনি উপরে বর্ণিত আয়াতটিই পাঠ করেন।

আল-আরাফ 7:27

আল্লাহ তা'আলা এখানে আদম সন্তানদেরকে ইবলীস ও তার সন্তানদের থেকে ভয় প্রদর্শন করে বলছেন- মানব-পিতা আদম (আঃ)-এর প্রতি ইবলীসের পুরাতন শক্রতা রয়েছে। এ কারণেই সে তাকে সুখময় স্থান জান্নাত থেকে বের করিয়ে কষ্টের জায়গা নশ্বর জগতে বসতি স্থাপন করিয়েছে। আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর আবৃত দেহ অনাবৃত হয়ে পড়ে। এসব ছিল তাঁর প্রতি চরম শক্রতারই পরিচায়ক। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি আমাকে ছেড়ে ইবলীস ও তার সন্তানদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নিচ্ছ? অথচ তারা তো তোমাদের শত্রু! অত্যাচারীদের জন্যে জঘন্য প্রতিদান রয়েছে।”(১৮:৫০)

আল-আরাফ 7:28

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কা'বার তাওয়াফ করতো এবং বলতোঃ “জন্মের সময় আমরা যেমন ছিলাম তেমনভাবেই আমরা তাওয়াফ করবো।” স্ত্রীলোকেরা কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার কোন ছোট অংশ বা অন্য কোন বস্তু লজ্জাস্থানে বেঁধে নিতে এবং দেহের অবশিষ্ট অংশগুলো উলঙ্গই থাকতো। তাদেরকে বলা হতো- আজ দেহের কিছু অংশ অথবা সম্পূর্ণ অংশ খোলা রাখা হবে। কিন্তু যে অংশই খোলা থাকবে তা কারো জন্যে হালাল নয়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এই লোকগুলো যখন কোন লজ্জাজনক কাজ করে তখন বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি এবং আল্লাহর নির্দেশ এটাই।” কুরাইশরা ছাড়া সারা আরববাসী তাদের দিন ও রাত্রির পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করতো না এবং এর কারণ বর্ণনা করতো যে, যে কাপড় পরিধান করে তারা পাপ কাজ করেছে, সে কাপড় পরে কি করে তারা তাওয়াফ করতে পারে? কিন্তু কুরাইশ গোত্র কাপড় পরেই কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতো। স্ত্রীলোকেরাও প্রায় উলঙ্গ হয়েই তাওয়াফ করতো এবং তারা তাওয়াফ করতো রাত্রে। এগুলো তারা নিজেদের পক্ষ থেকেই আবিষ্কার করে নিয়েছিল এবং পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, তাদের পূর্বপুরুষদের এই কাজগুলো আল্লাহ তা'আলার হুকুমের ভিত্তিতেই ছিল। তাই মহান আল্লাহ তাদের এ দাবী খণ্ডন করে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)!তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যে বেহায়াপনা, অশ্লীল ও অশোভনীয় কাজে লিপ্ত রয়েছে, আল্লাহ এ ধরনের কাজের কখনও হুকুম দেন না। তোমরা এমন বিষয়ে আল্লাহকে সম্বন্ধযুক্ত করছো যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই। হে নবী (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- আমার প্রভু ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং তিনি এই নির্দেশও দেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদতের সময় তোমাদের মুখমণ্ডলকে স্থির রাখবে। এতেই রয়েছে রাসূলদের আনুগত্য, যারা আল্লাহর শয়ীয়ত পেশ করেছেন এবং মু'জিযা প্রদর্শন করে জোর দিয়ে বলেছেনঃ “এখন মনের বিশুদ্ধতা আনয়ন কর এবং যে পর্যন্ত এ দুটো অর্থাৎ শরীয়তের অনুসরণ ও ইবাদতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ না হবে সে পর্যন্ত তোমাদের ইবাদত গৃহীত হবে না।আল্লাহ তাআলার (আরবী) উক্তির অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। তিনি দুনিয়ায় সৃষ্টি করেছেন এবং পরকালে উঠাবেন। যখন তোমরা কিছুই ছিলে না তখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা মরে যাবে, এরপর তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ায ও নসীহত করার জন্যে দাঁড়ালেন এবং জনগণকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা (কিয়ামতের দিন) উলঙ্গ ও খত্না না করা অবস্থায় উত্থিত হবে। কেননা, তোমরা জন্মগ্রহণের সময় এই রূপই ছিলে। এটা আমাদের উপর ফরয। যদি আমাদেরকে করতে হয় তবে এটাই করবো।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মুসলমানকে মুসলমান অবস্থায় এবং কাফিরকে কাফির অবস্থায় উঠানো হবে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে - আল্লাহর ইলম অনুযায়ী কিংবা যেরূপ তোমাদের আমল ছিল সে অনুযায়ী তোমরা উখিত হবে। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর ধারণায় এর অর্থ হচ্ছে- যদি কারো জন্ম হয় দুর্ভাগ্যের উপর তবে তাকে দুর্ভাগা অবস্থায় এবং যদি সৌভাগ্যের উপর তার জন্ম হয়ে থাকে তবে ভাগ্যবান অবস্থায় সে উখিত হবে। যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর আমলের যাদুকরগণ সারা জীবন ধরে পাপিষ্ঠদের আমল করতে রয়েছিল, কিন্তু মানবের সৃষ্টি সৌভাগ্যের ভিত্তির উপর হয়েছিল বলেই ঐ ভিত্তির উপরই তার উত্থান হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে মুমিন করে এবং কাউকে কাফির করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।” (৬৪:২)।“যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনিভাবে তোমরা ফিরে আসবে।” আল্লাহ পাকের এই উক্তিরই সহায়ক হচ্ছে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত সহীহ বুখারীর নিম্নের হাদীসটি –রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক জান্নাতীদের আমল করতে থাকে এমন কি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক গজের ব্যবধান থেকে যায়। এমতাবস্থায় তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করতে শুরু করে এবং ওর উপরই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে কোন লোক সারা জীবন ধরে জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে এবং জাহান্নাম হতে মাত্র এক গজ দূরে অবস্থান করে। এমন সময় আল্লাহর লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়, ফলে সে জান্নাতীদের আমল শুরু করে দেয় এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “কোন লোকের আমল জনগণের দৃষ্টিতে জান্নাতীদের আমলরূপে পরিদৃষ্ট হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামের অধিবাসী। অন্য একটি লোকের আমল জাহান্নামীদের আমলরূপে পরিলক্ষিত হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের অধিবাসী।” সনদ বা দলীল তো হবে ঐ আমল যা শেষ সময়ে প্রকাশ পাবে এবং কালেমায়ে শাহাদাতের উপর প্রাণবায়ু নির্গত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “মৃত্যুর সময় যেমন ছিল তেমনিভাবেই উথিত হবে।” এখন এই উক্তি ও (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপিত হওয়া জরুরী।আল্লাহ পাকের উক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকটি শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তার পিতামাতাই তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মজুসী (অগ্নিপূজক) বানিয়ে থাকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন- আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে তো সৎ স্বভাবের উপরই সৃষ্টি করেছিলাম, কিন্তু শয়তানরাই তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মোটকথা, সামঞ্জস্য বিধানের উপায় হচ্ছে এইরূপঃ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রথমে তো তারা মুমিনই হবে। কারণ, তাদের স্বভাবের মধ্যেই ঈমান রয়েছে। আবার তকদীরে এটাও লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, পরে তারা কাফির হয়ে যাবে। যদিও সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মারেফাত ও তাওহীদের স্বভাব রয়েছে, যেমন তাদের নিকট থেকে এরূপ অঙ্গীকারও নেয়া হয়েছিল এবং ওটাকে তাদের। স্বাভাবিক জিনিস বানানো হয়েছিল, তথাপি তাদের তকদীরে এটা লিখিত ছিল যে, তারা পাপিষ্ঠ হবে অথবা পুণ্যবান হবে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)বলেছেনঃ “মানুষ সকালে উঠে হয় তো বা স্বীয় প্রাণকে মুক্তির হাতে সোপর্দ করে, নয়তো ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।” তার মুক্তিতে আল্লাহরই হুকুম প্রকাশ পায়। তিনিই আল্লাহ, (আরবী) অর্থাৎ যিনি এই মীমাংসা করে দিয়েছেন যে, সে হিদায়াত প্রাপ্ত হবে। (৮৭:৩) (আরবী) অর্থাৎ যিনি প্রত্যেক জিনিসকে ওর ‘খলকত' প্রদান করেছেন, অতঃপর ওকে পথ দেখিয়েছেন। (২০:৫০)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সৎ ও ভাগ্যবান তার কাছে ভাগ্যবানদের আমল কঠিন অনুভূত হয় না। আর যে ব্যক্তি পাপিষ্ঠ ও হতভাগ্য তার কাছে হতভাগ্যদের আমল সহজ হয়ে যায়।” এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এক দলকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন এবং অপর দলের জন্যে সংগত কারণেই ভ্রান্তি নির্ধারিত হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক এর কারণ বর্ণনায় বলেছেনঃ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে অভিভাবক ও বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিল। এটা ঐ লোকদের ভুলের উপর স্পষ্ট দলীল যারা ধারণা করে থাকে যে, আল্লাহ কাউকেও নাফরমানীর কারণে বা ভুল বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দিবেন না, যখন তার আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়ার উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস থাকবে। তবে যদি কেউ জ্ঞান ও বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হঠকারিতা করে না মানে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা, যদি তাদের এ ধারণা ঠিক হয় তবে সেই পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যে হিদায়াতের উপর আছে বলে বিশ্বাস রাখে এবং সেই ব্যক্তি, যে প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত পথের উপর নেই, বরং হিদায়াতের উপর রয়েছে, এ দু’জনের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকে না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলে দিচ্ছেন যে, এই দু’ব্যক্তির মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।

আল-আরাফ 7:29

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কা'বার তাওয়াফ করতো এবং বলতোঃ “জন্মের সময় আমরা যেমন ছিলাম তেমনভাবেই আমরা তাওয়াফ করবো।” স্ত্রীলোকেরা কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার কোন ছোট অংশ বা অন্য কোন বস্তু লজ্জাস্থানে বেঁধে নিতে এবং দেহের অবশিষ্ট অংশগুলো উলঙ্গই থাকতো। তাদেরকে বলা হতো- আজ দেহের কিছু অংশ অথবা সম্পূর্ণ অংশ খোলা রাখা হবে। কিন্তু যে অংশই খোলা থাকবে তা কারো জন্যে হালাল নয়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এই লোকগুলো যখন কোন লজ্জাজনক কাজ করে তখন বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি এবং আল্লাহর নির্দেশ এটাই।” কুরাইশরা ছাড়া সারা আরববাসী তাদের দিন ও রাত্রির পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করতো না এবং এর কারণ বর্ণনা করতো যে, যে কাপড় পরিধান করে তারা পাপ কাজ করেছে, সে কাপড় পরে কি করে তারা তাওয়াফ করতে পারে? কিন্তু কুরাইশ গোত্র কাপড় পরেই কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতো। স্ত্রীলোকেরাও প্রায় উলঙ্গ হয়েই তাওয়াফ করতো এবং তারা তাওয়াফ করতো রাত্রে। এগুলো তারা নিজেদের পক্ষ থেকেই আবিষ্কার করে নিয়েছিল এবং পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, তাদের পূর্বপুরুষদের এই কাজগুলো আল্লাহ তা'আলার হুকুমের ভিত্তিতেই ছিল। তাই মহান আল্লাহ তাদের এ দাবী খণ্ডন করে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)!তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যে বেহায়াপনা, অশ্লীল ও অশোভনীয় কাজে লিপ্ত রয়েছে, আল্লাহ এ ধরনের কাজের কখনও হুকুম দেন না। তোমরা এমন বিষয়ে আল্লাহকে সম্বন্ধযুক্ত করছো যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই। হে নবী (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- আমার প্রভু ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং তিনি এই নির্দেশও দেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদতের সময় তোমাদের মুখমণ্ডলকে স্থির রাখবে। এতেই রয়েছে রাসূলদের আনুগত্য, যারা আল্লাহর শয়ীয়ত পেশ করেছেন এবং মু'জিযা প্রদর্শন করে জোর দিয়ে বলেছেনঃ “এখন মনের বিশুদ্ধতা আনয়ন কর এবং যে পর্যন্ত এ দুটো অর্থাৎ শরীয়তের অনুসরণ ও ইবাদতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ না হবে সে পর্যন্ত তোমাদের ইবাদত গৃহীত হবে না।আল্লাহ তাআলার (আরবী) উক্তির অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। তিনি দুনিয়ায় সৃষ্টি করেছেন এবং পরকালে উঠাবেন। যখন তোমরা কিছুই ছিলে না তখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা মরে যাবে, এরপর তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ায ও নসীহত করার জন্যে দাঁড়ালেন এবং জনগণকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা (কিয়ামতের দিন) উলঙ্গ ও খত্না না করা অবস্থায় উত্থিত হবে। কেননা, তোমরা জন্মগ্রহণের সময় এই রূপই ছিলে। এটা আমাদের উপর ফরয। যদি আমাদেরকে করতে হয় তবে এটাই করবো।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মুসলমানকে মুসলমান অবস্থায় এবং কাফিরকে কাফির অবস্থায় উঠানো হবে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে - আল্লাহর ইলম অনুযায়ী কিংবা যেরূপ তোমাদের আমল ছিল সে অনুযায়ী তোমরা উখিত হবে। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর ধারণায় এর অর্থ হচ্ছে- যদি কারো জন্ম হয় দুর্ভাগ্যের উপর তবে তাকে দুর্ভাগা অবস্থায় এবং যদি সৌভাগ্যের উপর তার জন্ম হয়ে থাকে তবে ভাগ্যবান অবস্থায় সে উখিত হবে। যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর আমলের যাদুকরগণ সারা জীবন ধরে পাপিষ্ঠদের আমল করতে রয়েছিল, কিন্তু মানবের সৃষ্টি সৌভাগ্যের ভিত্তির উপর হয়েছিল বলেই ঐ ভিত্তির উপরই তার উত্থান হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে মুমিন করে এবং কাউকে কাফির করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।” (৬৪:২)।“যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনিভাবে তোমরা ফিরে আসবে।” আল্লাহ পাকের এই উক্তিরই সহায়ক হচ্ছে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত সহীহ বুখারীর নিম্নের হাদীসটি –রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক জান্নাতীদের আমল করতে থাকে এমন কি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক গজের ব্যবধান থেকে যায়। এমতাবস্থায় তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করতে শুরু করে এবং ওর উপরই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে কোন লোক সারা জীবন ধরে জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে এবং জাহান্নাম হতে মাত্র এক গজ দূরে অবস্থান করে। এমন সময় আল্লাহর লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়, ফলে সে জান্নাতীদের আমল শুরু করে দেয় এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “কোন লোকের আমল জনগণের দৃষ্টিতে জান্নাতীদের আমলরূপে পরিদৃষ্ট হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামের অধিবাসী। অন্য একটি লোকের আমল জাহান্নামীদের আমলরূপে পরিলক্ষিত হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের অধিবাসী।” সনদ বা দলীল তো হবে ঐ আমল যা শেষ সময়ে প্রকাশ পাবে এবং কালেমায়ে শাহাদাতের উপর প্রাণবায়ু নির্গত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “মৃত্যুর সময় যেমন ছিল তেমনিভাবেই উথিত হবে।” এখন এই উক্তি ও (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপিত হওয়া জরুরী।আল্লাহ পাকের উক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকটি শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তার পিতামাতাই তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মজুসী (অগ্নিপূজক) বানিয়ে থাকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন- আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে তো সৎ স্বভাবের উপরই সৃষ্টি করেছিলাম, কিন্তু শয়তানরাই তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মোটকথা, সামঞ্জস্য বিধানের উপায় হচ্ছে এইরূপঃ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রথমে তো তারা মুমিনই হবে। কারণ, তাদের স্বভাবের মধ্যেই ঈমান রয়েছে। আবার তকদীরে এটাও লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, পরে তারা কাফির হয়ে যাবে। যদিও সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মারেফাত ও তাওহীদের স্বভাব রয়েছে, যেমন তাদের নিকট থেকে এরূপ অঙ্গীকারও নেয়া হয়েছিল এবং ওটাকে তাদের। স্বাভাবিক জিনিস বানানো হয়েছিল, তথাপি তাদের তকদীরে এটা লিখিত ছিল যে, তারা পাপিষ্ঠ হবে অথবা পুণ্যবান হবে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)বলেছেনঃ “মানুষ সকালে উঠে হয় তো বা স্বীয় প্রাণকে মুক্তির হাতে সোপর্দ করে, নয়তো ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।” তার মুক্তিতে আল্লাহরই হুকুম প্রকাশ পায়। তিনিই আল্লাহ, (আরবী) অর্থাৎ যিনি এই মীমাংসা করে দিয়েছেন যে, সে হিদায়াত প্রাপ্ত হবে। (৮৭:৩) (আরবী) অর্থাৎ যিনি প্রত্যেক জিনিসকে ওর ‘খলকত' প্রদান করেছেন, অতঃপর ওকে পথ দেখিয়েছেন। (২০:৫০)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সৎ ও ভাগ্যবান তার কাছে ভাগ্যবানদের আমল কঠিন অনুভূত হয় না। আর যে ব্যক্তি পাপিষ্ঠ ও হতভাগ্য তার কাছে হতভাগ্যদের আমল সহজ হয়ে যায়।” এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এক দলকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন এবং অপর দলের জন্যে সংগত কারণেই ভ্রান্তি নির্ধারিত হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক এর কারণ বর্ণনায় বলেছেনঃ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে অভিভাবক ও বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিল। এটা ঐ লোকদের ভুলের উপর স্পষ্ট দলীল যারা ধারণা করে থাকে যে, আল্লাহ কাউকেও নাফরমানীর কারণে বা ভুল বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দিবেন না, যখন তার আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়ার উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস থাকবে। তবে যদি কেউ জ্ঞান ও বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হঠকারিতা করে না মানে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা, যদি তাদের এ ধারণা ঠিক হয় তবে সেই পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যে হিদায়াতের উপর আছে বলে বিশ্বাস রাখে এবং সেই ব্যক্তি, যে প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত পথের উপর নেই, বরং হিদায়াতের উপর রয়েছে, এ দু’জনের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকে না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলে দিচ্ছেন যে, এই দু’ব্যক্তির মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।

আল-আরাফ 7:30

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কা'বার তাওয়াফ করতো এবং বলতোঃ “জন্মের সময় আমরা যেমন ছিলাম তেমনভাবেই আমরা তাওয়াফ করবো।” স্ত্রীলোকেরা কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার কোন ছোট অংশ বা অন্য কোন বস্তু লজ্জাস্থানে বেঁধে নিতে এবং দেহের অবশিষ্ট অংশগুলো উলঙ্গই থাকতো। তাদেরকে বলা হতো- আজ দেহের কিছু অংশ অথবা সম্পূর্ণ অংশ খোলা রাখা হবে। কিন্তু যে অংশই খোলা থাকবে তা কারো জন্যে হালাল নয়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এই লোকগুলো যখন কোন লজ্জাজনক কাজ করে তখন বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি এবং আল্লাহর নির্দেশ এটাই।” কুরাইশরা ছাড়া সারা আরববাসী তাদের দিন ও রাত্রির পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করতো না এবং এর কারণ বর্ণনা করতো যে, যে কাপড় পরিধান করে তারা পাপ কাজ করেছে, সে কাপড় পরে কি করে তারা তাওয়াফ করতে পারে? কিন্তু কুরাইশ গোত্র কাপড় পরেই কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতো। স্ত্রীলোকেরাও প্রায় উলঙ্গ হয়েই তাওয়াফ করতো এবং তারা তাওয়াফ করতো রাত্রে। এগুলো তারা নিজেদের পক্ষ থেকেই আবিষ্কার করে নিয়েছিল এবং পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, তাদের পূর্বপুরুষদের এই কাজগুলো আল্লাহ তা'আলার হুকুমের ভিত্তিতেই ছিল। তাই মহান আল্লাহ তাদের এ দাবী খণ্ডন করে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)!তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যে বেহায়াপনা, অশ্লীল ও অশোভনীয় কাজে লিপ্ত রয়েছে, আল্লাহ এ ধরনের কাজের কখনও হুকুম দেন না। তোমরা এমন বিষয়ে আল্লাহকে সম্বন্ধযুক্ত করছো যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই। হে নবী (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- আমার প্রভু ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং তিনি এই নির্দেশও দেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদতের সময় তোমাদের মুখমণ্ডলকে স্থির রাখবে। এতেই রয়েছে রাসূলদের আনুগত্য, যারা আল্লাহর শয়ীয়ত পেশ করেছেন এবং মু'জিযা প্রদর্শন করে জোর দিয়ে বলেছেনঃ “এখন মনের বিশুদ্ধতা আনয়ন কর এবং যে পর্যন্ত এ দুটো অর্থাৎ শরীয়তের অনুসরণ ও ইবাদতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ না হবে সে পর্যন্ত তোমাদের ইবাদত গৃহীত হবে না।আল্লাহ তাআলার (আরবী) উক্তির অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। তিনি দুনিয়ায় সৃষ্টি করেছেন এবং পরকালে উঠাবেন। যখন তোমরা কিছুই ছিলে না তখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা মরে যাবে, এরপর তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ায ও নসীহত করার জন্যে দাঁড়ালেন এবং জনগণকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা (কিয়ামতের দিন) উলঙ্গ ও খত্না না করা অবস্থায় উত্থিত হবে। কেননা, তোমরা জন্মগ্রহণের সময় এই রূপই ছিলে। এটা আমাদের উপর ফরয। যদি আমাদেরকে করতে হয় তবে এটাই করবো।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মুসলমানকে মুসলমান অবস্থায় এবং কাফিরকে কাফির অবস্থায় উঠানো হবে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে - আল্লাহর ইলম অনুযায়ী কিংবা যেরূপ তোমাদের আমল ছিল সে অনুযায়ী তোমরা উখিত হবে। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর ধারণায় এর অর্থ হচ্ছে- যদি কারো জন্ম হয় দুর্ভাগ্যের উপর তবে তাকে দুর্ভাগা অবস্থায় এবং যদি সৌভাগ্যের উপর তার জন্ম হয়ে থাকে তবে ভাগ্যবান অবস্থায় সে উখিত হবে। যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর আমলের যাদুকরগণ সারা জীবন ধরে পাপিষ্ঠদের আমল করতে রয়েছিল, কিন্তু মানবের সৃষ্টি সৌভাগ্যের ভিত্তির উপর হয়েছিল বলেই ঐ ভিত্তির উপরই তার উত্থান হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে মুমিন করে এবং কাউকে কাফির করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।” (৬৪:২)।“যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনিভাবে তোমরা ফিরে আসবে।” আল্লাহ পাকের এই উক্তিরই সহায়ক হচ্ছে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত সহীহ বুখারীর নিম্নের হাদীসটি –রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক জান্নাতীদের আমল করতে থাকে এমন কি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক গজের ব্যবধান থেকে যায়। এমতাবস্থায় তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করতে শুরু করে এবং ওর উপরই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে কোন লোক সারা জীবন ধরে জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে এবং জাহান্নাম হতে মাত্র এক গজ দূরে অবস্থান করে। এমন সময় আল্লাহর লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়, ফলে সে জান্নাতীদের আমল শুরু করে দেয় এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “কোন লোকের আমল জনগণের দৃষ্টিতে জান্নাতীদের আমলরূপে পরিদৃষ্ট হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামের অধিবাসী। অন্য একটি লোকের আমল জাহান্নামীদের আমলরূপে পরিলক্ষিত হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের অধিবাসী।” সনদ বা দলীল তো হবে ঐ আমল যা শেষ সময়ে প্রকাশ পাবে এবং কালেমায়ে শাহাদাতের উপর প্রাণবায়ু নির্গত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “মৃত্যুর সময় যেমন ছিল তেমনিভাবেই উথিত হবে।” এখন এই উক্তি ও (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপিত হওয়া জরুরী।আল্লাহ পাকের উক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকটি শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তার পিতামাতাই তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মজুসী (অগ্নিপূজক) বানিয়ে থাকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন- আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে তো সৎ স্বভাবের উপরই সৃষ্টি করেছিলাম, কিন্তু শয়তানরাই তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মোটকথা, সামঞ্জস্য বিধানের উপায় হচ্ছে এইরূপঃ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রথমে তো তারা মুমিনই হবে। কারণ, তাদের স্বভাবের মধ্যেই ঈমান রয়েছে। আবার তকদীরে এটাও লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, পরে তারা কাফির হয়ে যাবে। যদিও সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মারেফাত ও তাওহীদের স্বভাব রয়েছে, যেমন তাদের নিকট থেকে এরূপ অঙ্গীকারও নেয়া হয়েছিল এবং ওটাকে তাদের। স্বাভাবিক জিনিস বানানো হয়েছিল, তথাপি তাদের তকদীরে এটা লিখিত ছিল যে, তারা পাপিষ্ঠ হবে অথবা পুণ্যবান হবে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)বলেছেনঃ “মানুষ সকালে উঠে হয় তো বা স্বীয় প্রাণকে মুক্তির হাতে সোপর্দ করে, নয়তো ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।” তার মুক্তিতে আল্লাহরই হুকুম প্রকাশ পায়। তিনিই আল্লাহ, (আরবী) অর্থাৎ যিনি এই মীমাংসা করে দিয়েছেন যে, সে হিদায়াত প্রাপ্ত হবে। (৮৭:৩) (আরবী) অর্থাৎ যিনি প্রত্যেক জিনিসকে ওর ‘খলকত' প্রদান করেছেন, অতঃপর ওকে পথ দেখিয়েছেন। (২০:৫০)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সৎ ও ভাগ্যবান তার কাছে ভাগ্যবানদের আমল কঠিন অনুভূত হয় না। আর যে ব্যক্তি পাপিষ্ঠ ও হতভাগ্য তার কাছে হতভাগ্যদের আমল সহজ হয়ে যায়।” এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এক দলকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন এবং অপর দলের জন্যে সংগত কারণেই ভ্রান্তি নির্ধারিত হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক এর কারণ বর্ণনায় বলেছেনঃ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে অভিভাবক ও বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিল। এটা ঐ লোকদের ভুলের উপর স্পষ্ট দলীল যারা ধারণা করে থাকে যে, আল্লাহ কাউকেও নাফরমানীর কারণে বা ভুল বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দিবেন না, যখন তার আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়ার উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস থাকবে। তবে যদি কেউ জ্ঞান ও বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হঠকারিতা করে না মানে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা, যদি তাদের এ ধারণা ঠিক হয় তবে সেই পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যে হিদায়াতের উপর আছে বলে বিশ্বাস রাখে এবং সেই ব্যক্তি, যে প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত পথের উপর নেই, বরং হিদায়াতের উপর রয়েছে, এ দু’জনের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকে না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলে দিচ্ছেন যে, এই দু’ব্যক্তির মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।

আল-আরাফ 7:31

এই আয়াতে মুশরিকদের কাজের প্রতিবাদ করা হচ্ছে যে, তারা উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতো। এটাকেই শরীয়তের বিধান বলে বিশ্বাস করতো। দিনে পুরুষ লোকেরা এবং রাত্রে স্ত্রীলোকেরা কাপড় খুলে ফেলে তাওয়াফ করতো। তাই আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় (যার মধ্যে বায়তুল্লাহর তাওয়াফের ইবাদতও রয়েছে) শরীরকে উলঙ্গ অবস্থা থেকে রক্ষা কর এবং গুপ্তাঙ্গকে আবৃত করে ফেল। তাছাড়া নিজেদেরকে সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত কর। পূর্ববর্তী মনীষীগণ এটাই লিখেছেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে মারফরূপে বর্ণিত আছে যে, এটা নামাযের সময় জুতা পরিধান করা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই হাদীসে বলা হয়েছে যে, নামাযের সময় সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত হওয়া মুসতাহাব, বিশেষ করে জুমআ’ ও ঈদের দিন সুগন্ধি ব্যবহার করাও উত্তম। কেননা, এটাও সৌন্দর্যেরই অন্তর্ভুক্ত।সবচেয়ে উত্তম পোশাক হচ্ছে সাদা পোশাক। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা সাদা পোশাক পরিধান কর, কেননা, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পোশাক। নিজেদের মৃতদেরকেও এই কাপড়ের কাফন পরাও। তোমরা চোখে সুরমা ব্যবহার কর। কেননা, এটা দৃষ্টিশক্তিকে তীক্ষ করে এবং ভ্র গজিয়ে থাকে।” এ হাদীসটির ইসনাদ খুবই উত্তম। তামীম দারী (রঃ) এক হাজার দিরহামের বিনিময়ে একটি চাদর ক্রয় করেছিলেন এবং ওটা পরিধান করে নামায পড়তেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ“তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপব্যয় ও অমিতাচার করো না'। এ আয়াতে সুরুচি সম্পন্ন ও পবিত্র সমুদয় জিনিসই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা যা ইচ্ছা খাও এবং যা ইচ্ছা পান কর, তোমাদের উপর কোনই দোষারোপ করা হবে না। কিন্তু দু'টি জিনিস নিন্দনীয় বটে। একটি হচ্ছে অপব্যয় ও অমিতাচার এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে দর্প ও অহংকার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ তোমরা খাও, পর এবং অপরকেও দাও। কিন্তু অপব্যয় করো না এবং তোমাদের মধ্যে যেন অহংকার প্রকাশ না পায়। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামতরাশি প্রতীয়মান দেখতে চান।” এটা হচ্ছে পরিধান সম্পর্কীয় কথা। এখন খাওয়া সম্পর্কীয় কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ পাত্র অপেক্ষা জঘন্য পাত্র আর নেই যে পাত্রের আহার্য পেট পূর্ণ করে ভক্ষণ করা হয় । মানুষের জন্যে তো এমন কয়েক গ্রাস খাদ্যই যথেষ্ট যা তাকে স্বীয় অবস্থায় কায়েম রাখতে সক্ষম হয়। আর যদি সে আরও কিছু খেতে চায় তবে যেন পেটের এক তৃতীয়াংশে খাবার দেয়, এক তৃতীয়াংশে পানি রাখে এবং বাকী এক তৃতীয়াংশ সহজভাবে শ্বাস লওয়ার জন্যে ফাকা রেখে দেয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “ইসরাফ’ বা অপব্যয় হচ্ছে এই যে, মানুষ মনে যা চাইবে তাই খাবে।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে লোকেরা উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতো তারা হজ্বের মৌসুমে নিজেদের উপর চর্বি হারাম করে নিতো। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “চর্বি হারাম নয়। তোমরা খাও, পান কর এবং চর্বিকে হারাম করে নেয়ার ব্যাপারে যে বাড়াবড়ি করেছে তা আর করো না।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তা তোমরা খাও এবং পান কর। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেনঃ (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা খাও কিন্তু হারাম খেয়ো না। কেননা এটা বাড়াবাড়ি । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেতোমরা খাও পান কর, কিন্তু অতিরিক্ত পানাহার করো না। কেননা এটাই হচ্ছে ‘ইসরাফ’ বা অপব্যয়। আল্লাহ তা'আলা অপব্যয়কারীকে ভালবাসেন না।। শব্দ দ্বারা বা সীমালংঘনকারীকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলা সীমালংঘন কারীদেরকে ভালবাসেন না। কেননা, লোকেরা বাড়াবাড়ি করে সাবধানতা অবলম্বন করতঃ হালালকেও হারাম করে নিতো অথবা হারামকেও হালাল বানিয়ে নিতো। আল্লাহ পাকের অভিপ্রায় হচ্ছে- “তোমরা হালালকে হালাল রাখ এবং হারামকে হারাম রাখ। এটাই হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতা এবং এরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”

আল-আরাফ 7:32

এই আয়াতে ঐ ব্যক্তির দাবী খণ্ডন করা হচ্ছে যে পানাহার বা পরিধানের কোন জিনিস নিজের উপরে হারাম করে থাকে, অথচ শরীয়তে তা হারাম নয়। মহান আল্লাহ নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যেসব মুশরিক বাতিল মতাদর্শের বশবর্তী হয়ে নিজেদের উপর এক একটা জিনিস হারাম করে নিয়েছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস কর- আল্লাহর দেয়া এই শোভনীয় বস্তু ও পবিত্র জীবিকা কে হারাম করেছে? আল্লাহ এগুলো তো স্বীয় মুমিন বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। যদিও এই পার্থিব নিয়ামতে কাফিরগণও শরীক রয়েছে, কিন্তু এই নিয়ামতগুলোর হক মুমিনরাই আদায় করে থাকে এবং বিশেষ করে এ নিয়ামতগুলো কিয়ামতের দিন তারাই লাভ করবে। সেখানে কাফিররা শরীক হবে না। কেননা জান্নাতের নিয়ামতসমূহ কাফিরদের জন্যে হারাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরববাসী উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহ যিয়ারত করার সময় বাঁশি ও তালি বাজাত। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ এই পোশাক তো হচ্ছে আল্লাহর সৌন্দর্য । সুতরাং তোমরা পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ কর।

আল-আরাফ 7:33

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী লজ্জাশীল আর কেউ নেই। এ কারণেই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমুদয় পাপের কাজই তিনি হারাম করে দিয়েছেন। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে পাপকাজ এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে অন্যায়ভাবে মানুষের মাল হরণ করা বা মানহানির কাজে বাড়াবাড়ি করা। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, 'বাগী’ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে স্বয়ং নিজের উপর বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাফসীরের সারাংশ এই যে, (আরবী) হচ্ছে ঐ পাপ যা পাপীর সত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর (আরবী) হচ্ছে ঐ সীমালংঘন বা বাড়াবাড়ি যা জনগণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা'আলা এ দুটো জিনিস হারাম করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, আল্লাহর সাথে শির্ক করা হারাম যার কোন সনদ নেই। আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বানানোর অধিকারই নেই। আল্লাহ এটাও হারাম করেছেন যে, তোমরা এমন কথা বলবে যা তোমাদের জানা নেই। অর্থাৎ তোমরা (নাউযুবিল্লাহ) বলবে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে। আর এই প্রকারের কথা বলা যার সম্পর্কে কোন জ্ঞান ও বিশ্বাসই নেই। যেমন তিনি বলেনঃ “তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো।”

আল-আরাফ 7:34

৩৪-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- প্রত্যেক দলের জন্যে একটি নির্দিষ্ট দণ্ডায়মান-স্থান এবং নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত রয়েছে। যখনই সেই সময় এসে যাবে তখন মুহূর্তকালও আগা-পিছা হতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে ভয় প্রদর্শন করে বলছেন- দেখ! তোমাদের কাছে আমার রাসূলগণ যাবে। তারা তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ শুনাবে, শুভ সংবাদও দেবে এবং ভয় প্রদর্শনও করবে। সুতরাং যারা ভয় করবে, নিজেদেরকে সংশোধন করে নেবে, নিষিদ্ধ জিনিসগুলো পরিত্যাগ করবে এবং আনুগত্যের কাজ করবে, তাদের কোন ভয়ও থাকবে না এবং তারা চিন্তিত হবে না। কিন্তু যারা আমার আয়াতগুলো অবিশ্বাস করবে ও মিথ্যা জানবে এবং অহংকার করবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী। তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে।

আল-আরাফ 7:35

৩৪-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- প্রত্যেক দলের জন্যে একটি নির্দিষ্ট দণ্ডায়মান-স্থান এবং নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত রয়েছে। যখনই সেই সময় এসে যাবে তখন মুহূর্তকালও আগা-পিছা হতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে ভয় প্রদর্শন করে বলছেন- দেখ! তোমাদের কাছে আমার রাসূলগণ যাবে। তারা তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ শুনাবে, শুভ সংবাদও দেবে এবং ভয় প্রদর্শনও করবে। সুতরাং যারা ভয় করবে, নিজেদেরকে সংশোধন করে নেবে, নিষিদ্ধ জিনিসগুলো পরিত্যাগ করবে এবং আনুগত্যের কাজ করবে, তাদের কোন ভয়ও থাকবে না এবং তারা চিন্তিত হবে না। কিন্তু যারা আমার আয়াতগুলো অবিশ্বাস করবে ও মিথ্যা জানবে এবং অহংকার করবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী। তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে।

আল-আরাফ 7:36

৩৪-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- প্রত্যেক দলের জন্যে একটি নির্দিষ্ট দণ্ডায়মান-স্থান এবং নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত রয়েছে। যখনই সেই সময় এসে যাবে তখন মুহূর্তকালও আগা-পিছা হতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে ভয় প্রদর্শন করে বলছেন- দেখ! তোমাদের কাছে আমার রাসূলগণ যাবে। তারা তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ শুনাবে, শুভ সংবাদও দেবে এবং ভয় প্রদর্শনও করবে। সুতরাং যারা ভয় করবে, নিজেদেরকে সংশোধন করে নেবে, নিষিদ্ধ জিনিসগুলো পরিত্যাগ করবে এবং আনুগত্যের কাজ করবে, তাদের কোন ভয়ও থাকবে না এবং তারা চিন্তিত হবে না। কিন্তু যারা আমার আয়াতগুলো অবিশ্বাস করবে ও মিথ্যা জানবে এবং অহংকার করবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী। তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে।

আল-আরাফ 7:37

ইরশাদ হচ্ছে- ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় অত্যাচারী আর কেউই নেই যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে এবং মু'জিযাগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। এই লোকগুলো তাদের তকদীরে লিখিত অংশ অবশ্যই পেয়ে যাবে। মুফাসসিরগণ এর অর্থে মতভেদ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যাবে, অথবা এর অর্থ এই যে, যে ভাল কাজ করবে সে ভাল প্রতিদান পাবে এবং যে মন্দ কাজ করবে সে পাবে মন্দ প্রতিদান। অথবা নিজের অংশ দ্বারা নিজের আমল, নিজের জীবিকা এবং নিজের বয়স বুঝানো হয়েছে। আর এই উক্তি রচনা ভঙ্গীর দিক দিয়ে বেশী মজবুত। আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তিটিকে এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারেঃ “আমার ফেরেশতারা যখন তাদের রূহ কবয করার জন্যে আসবে।” এই আয়াতের অনুরূপ অর্থ বিশিষ্ট হচ্ছে মহান আল্লাহর এই উক্তিটিঃ “যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা পার্থিব উপভোগ হিসেবে কোনই সফলতা লাভ করবে না, অতঃপর তারা আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, আমি তখন তাদেরকে তাদের কুফরীর কারণে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।” এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যদি কেউ কুফরী করে তবে তাকে করতে দাও। তাদের কুফরী যেন তোমাদেরকে চিন্তিত না করে। তাদেরকে শেষ পর্যন্ত আমার কাছে ফিরে আসতেই হবে। ঐ সময় তাদের আমল তাদের উপর খুলে যাবে। আল্লাহ অন্তরের খবর ভালরূপেই জানেন। আমি তো কিছুদিনের জন্যে তাদেরকে পার্থিব সম্পদ উপভোগ করতে দিয়েছি।আল্লাহ পাক উপরোক্ত আয়াতে সংবাদ দিচ্ছেন- মুশরিকদের রূহ কব্য করার সময় ফেরেশতারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে এবং রূহ ক্যু করে নিয়ে জাহান্নামের দিকে তাদেরকে নিয়ে যাবে এবং বলবে- “যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক স্থাপন করতে তারা আজ কোথায়? তোমরা তো তাদের কাছে প্রার্থনা করতে এবং তাদেরই উপাসনা করতে! আজ তাদেরকে ডাক। তারা তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তিদান করুক।” তখন তারা বলবে“তাদেরকে আজ কোথায় পাবো? তারা তো আজ পালিয়ে গেছে । আজ আমরা তাদের খবরেরও কোন আশা করছি না। তারা সেদিন স্বীকারোক্তি করবে যে, তারা কুফরী করতো।

আল-আরাফ 7:38

৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক তার উপর মিথ্যা আরোপকারী মুশরিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, যখন তাদেরকে বলা হবে- তোমরা তোমাদের মত ঐ দলগুলোর সাথে মিলিত হয়ে যাও যাদের মধ্যে তোমাদের গুণাবলী বিদ্যমান ছিল এবং যারা তোমাদের পূর্বে দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেছিল। তারা মানবের অন্তর্ভুক্তই হাক অথবা দানবেরই অন্তর্ভুক্ত হাক। অতঃপর তোমরা সবাই জাহান্নামের পথ ধর। (আরবী)-এটা (আরবী) -এর (আরবী) হতে পারে আবার এও সম্ভাবনা রয়েছে যে, (আরবী) ব্যবহৃত হয়েছে (আরবী)-এর অর্থে। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন একটা নতুন দলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন একদল অপর দলকে ভালমন্দ বলতে শুরু করবে। হযরত খলীল (আঃ) বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন এক কাফির অন্য কাফিরের বিরোধী হয়ে যাবে এবং একে অপরকে ভালমন্দ বলবে। ইরশাদ হচ্ছে- যখন অনুসারী কাফিররা অনুসৃত কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং যখন তারা আল্লাহর শাস্তি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে, আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন এই অনুসারীরা বলবেঃ “যদি পুনরায় আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে যেমন আজ এরা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে তেমনই আমরাও এদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে প্রতিশোধ নিয়ে নিতাম!” আল্লাহ তাআলা এভাবেই তাদের আমল দুঃখ ও আফসোসরূপে তাদের সামনে পেশ করবেন। কিন্তু জাহান্নাম থেকে কোনক্রমেই তারা বের হতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত তারা সবাই জাহান্নামে একত্রিত হবে। জাহান্নামে প্রবেশ করার পর অনুসারীরা অনুসৃতদের বিরুদ্ধে আল্লাহ পাকের নিকট অভিযোগ করবে। কারণ তাদের তুলনায় অনুসৃতদের অপরাধ বেশী ছিল এবং তারা তাদের পূর্বেই জাহান্নামে প্রবেশ করেছিল। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রভু! এরাই আমাদেরকে সোজা-সরল পথ থেকে ভ্রষ্ট করেছিল। সুতরাং এদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেই দিন আগুনে পোড়ে তাদের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যাবে, তারা বলবে- যদি আমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করতাম! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের বড়দের কথা মেনে চলেছিলাম। তারাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আল্লাহ! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন! আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন না, বরং তোমাদের সকলকেই আমি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করবো।” যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা কুফরী করে এবং লোকদেরকে আল্লাহর পথে আসতে বাধা দেয়, আমি তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করে দেবো, তারা নিজেদের পাপের বোঝাও বহন করবে এবং অন্যদের পাপের বোঝাও বহন করবে।” যা হাক, অনুসৃতেরা অনুসারীদেরকে বলবে-আজকে আমাদের উপর তোমাদের কি শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে? আমরা যেমন নিজে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম, তোমরাও দ্রুপ আপনা আপনি পথভ্রষ্ট হয়েছিল। সুতরাং এখন নিজেদের আমলের স্বাদ গ্রহণ কর। তাদের অবস্থা এই রূপই যার সংবাদ আল্লাহ পাক দিয়েছেনঃ “হে নবী (সঃ)! যদি তুমি ঐ কাফিরদেরকে দেখতে যে, তারা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান থাকবে এবং একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে। অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে- তোমরা না থাকলে আমরা মুমিন হতাম। তখন অনুসৃতরা অনুসারীদেরকে বলবে- আমরা তো তোমাদেরকে হিদায়াত লাভে বাধা প্রদান করিনি বরং তোমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিলে। তোমরা নিজেদের বিবেক বুদ্ধি দ্বারা কাজ কেন করনি? তখন অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে- এটাতো ছিল আমাদেরকে তোমাদের রাত দিন পথভ্রষ্ট করারই ফল! তোমরা আমাদেরকে কুফরী করতে বাধ্য করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করতে! তারপর তারা মনে মনে লজ্জিত হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তারা আল্লাহর শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং আমি (আল্লাহ) তাদের স্কন্ধে গলাবন্ধ পরিয়ে দেবো এবং তারা যেরূপ কাজ করতো সেরূপই বিনিময় প্রাপ্ত হবে।”

আল-আরাফ 7:39

৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক তার উপর মিথ্যা আরোপকারী মুশরিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, যখন তাদেরকে বলা হবে- তোমরা তোমাদের মত ঐ দলগুলোর সাথে মিলিত হয়ে যাও যাদের মধ্যে তোমাদের গুণাবলী বিদ্যমান ছিল এবং যারা তোমাদের পূর্বে দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেছিল। তারা মানবের অন্তর্ভুক্তই হাক অথবা দানবেরই অন্তর্ভুক্ত হাক। অতঃপর তোমরা সবাই জাহান্নামের পথ ধর। (আরবী)-এটা (আরবী) -এর (আরবী) হতে পারে আবার এও সম্ভাবনা রয়েছে যে, (আরবী) ব্যবহৃত হয়েছে (আরবী)-এর অর্থে। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন একটা নতুন দলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন একদল অপর দলকে ভালমন্দ বলতে শুরু করবে। হযরত খলীল (আঃ) বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন এক কাফির অন্য কাফিরের বিরোধী হয়ে যাবে এবং একে অপরকে ভালমন্দ বলবে। ইরশাদ হচ্ছে- যখন অনুসারী কাফিররা অনুসৃত কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং যখন তারা আল্লাহর শাস্তি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে, আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন এই অনুসারীরা বলবেঃ “যদি পুনরায় আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে যেমন আজ এরা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে তেমনই আমরাও এদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে প্রতিশোধ নিয়ে নিতাম!” আল্লাহ তাআলা এভাবেই তাদের আমল দুঃখ ও আফসোসরূপে তাদের সামনে পেশ করবেন। কিন্তু জাহান্নাম থেকে কোনক্রমেই তারা বের হতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত তারা সবাই জাহান্নামে একত্রিত হবে। জাহান্নামে প্রবেশ করার পর অনুসারীরা অনুসৃতদের বিরুদ্ধে আল্লাহ পাকের নিকট অভিযোগ করবে। কারণ তাদের তুলনায় অনুসৃতদের অপরাধ বেশী ছিল এবং তারা তাদের পূর্বেই জাহান্নামে প্রবেশ করেছিল। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রভু! এরাই আমাদেরকে সোজা-সরল পথ থেকে ভ্রষ্ট করেছিল। সুতরাং এদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেই দিন আগুনে পোড়ে তাদের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যাবে, তারা বলবে- যদি আমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করতাম! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের বড়দের কথা মেনে চলেছিলাম। তারাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আল্লাহ! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন! আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন না, বরং তোমাদের সকলকেই আমি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করবো।” যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা কুফরী করে এবং লোকদেরকে আল্লাহর পথে আসতে বাধা দেয়, আমি তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করে দেবো, তারা নিজেদের পাপের বোঝাও বহন করবে এবং অন্যদের পাপের বোঝাও বহন করবে।” যা হাক, অনুসৃতেরা অনুসারীদেরকে বলবে-আজকে আমাদের উপর তোমাদের কি শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে? আমরা যেমন নিজে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম, তোমরাও দ্রুপ আপনা আপনি পথভ্রষ্ট হয়েছিল। সুতরাং এখন নিজেদের আমলের স্বাদ গ্রহণ কর। তাদের অবস্থা এই রূপই যার সংবাদ আল্লাহ পাক দিয়েছেনঃ “হে নবী (সঃ)! যদি তুমি ঐ কাফিরদেরকে দেখতে যে, তারা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান থাকবে এবং একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে। অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে- তোমরা না থাকলে আমরা মুমিন হতাম। তখন অনুসৃতরা অনুসারীদেরকে বলবে- আমরা তো তোমাদেরকে হিদায়াত লাভে বাধা প্রদান করিনি বরং তোমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিলে। তোমরা নিজেদের বিবেক বুদ্ধি দ্বারা কাজ কেন করনি? তখন অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে- এটাতো ছিল আমাদেরকে তোমাদের রাত দিন পথভ্রষ্ট করারই ফল! তোমরা আমাদেরকে কুফরী করতে বাধ্য করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করতে! তারপর তারা মনে মনে লজ্জিত হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তারা আল্লাহর শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং আমি (আল্লাহ) তাদের স্কন্ধে গলাবন্ধ পরিয়ে দেবো এবং তারা যেরূপ কাজ করতো সেরূপই বিনিময় প্রাপ্ত হবে।”

আল-আরাফ 7:40

৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং অহংকার ভরে সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্যে আকাশের দরজা খোলা হবে না, অর্থাৎ তাদের সৎ আমল এবং প্রার্থনা উপরে উঠানো হবে না । পাপী ব্যক্তির রূহ কব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ফেরেশতা ঐ রূহকে নিয়ে আকাশে উঠবেন এবং মালায়ে আ’লার যে ফেরেশতাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করবেন তাঁরা জিজ্ঞেস করবেন এই অপবিত্র রূহ্ কার? তখন তার জঘন্যতম নাম নিয়ে বলা হবে, অমুকের। শেষ পর্যন্ত আকাশে পৌছে বলবেন, দরজা খুলে দাও। কিন্তু দরজা খোলা হবে না। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ তাদের জন্যে আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না।”হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেন, আমরা একটি জানাযার অনুসরণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা কবরের কাছে পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে বসে পড়েন। আমরাও তার চারদিকে বসে পড়ি। আমরা এমনভাবে নীরবতা অবলম্বন করি যে, আমাদের মাথার উপর যেন পাখী বসে রয়েছে। (আমাদেরকে নীরব দেখে) তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল তা দিয়ে মাটিতে রেখা টানছিলেন। অতঃপর তিনি মাথা উঠিয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ ‘কবরের শাস্তি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর!' এ কথাটি দু'বার বা তিনবার বললেন। এরপর তিনি বললেনঃ “মুমিন যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করে আখিরাতের দিকে যাত্রা শুরু করে তখন আকাশ থেকে জ্যোতির্ময় ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন। তাঁদের হাতে থাকে জান্নাতের কাফন।জান্নাতের খোশবুও তাঁদের কাছে থাকে। তাদের সংখ্যা এতো অধিক থাকে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু ফেরেশতাতেই ভরপুর থাকে। অতঃপর একজন ফেরেশতা এসে তার শিয়রে বসে পড়েন এবং বলেন- হে শান্ত ও নিরাপদ আত্মা! আল্লাহর ক্ষমার দিকে চলো এ কথা শোনা মাত্রই আত্মা বেরিয়ে পড়ে যেমনভাবে মশকের মুখ দিয়ে পানি বের হয়ে থাকে। যেমনই আত্মা বের হয় তেমনই চোখের পলকে ফেরেশতা তাকে জান্নাতী কাফন পরিয়ে দেন এবং জান্নাতী সুগন্ধিতে তাকে সুরভিত করেন। মিশকের ঐ সুগন্ধি এতই উত্তম যে, দুনিয়ায় এর চেয়ে উত্তম সুগন্ধি আর হতে পারে না। তাকে নিয়ে ফেরেশতা আকাশে উঠে যান। যেখান দিয়েই তিনি গমন করেন সেখানেই ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেন, এটা কার পবিত্র আত্মা? উত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের। আকাশে পৌছে গিয়ে দরজা খুলতে বলা হলে তা খুলে দেয়া হয়। তার সাথে অন্যান্য সমস্ত ফেরেশতাও দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত গমন করেন। এভাবেই এক এক করে সপ্তম আকাশে পৌঁছে যান। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমার এই বান্দার নামটি ইল্লীনের তালিকায় লিপিবদ্ধ কর। অতঃপর তাকে যমীনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কেননা আমি তাকে মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করেছি। ওর মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে দেবো এবং ওর মধ্য থেকেই তাকে পুনরায় উথিত করবো। তখন যমীনে (কবরে) তার আত্মাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ওখানে দু’জন ফেরেশতা আগমন করেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রতিপালক কে? সে উত্তরে বলে, আমার প্রতিপালক হচ্ছেন আল্লাহ। আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন বা ধর্ম কি? সে উত্তর দেয়, আমার দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। পুনরায় তাকে প্রশ্ন করেন, তোমার কাছে যে লোকটিকে পাঠানো হয়েছিল তিনি কে? জবাবে সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়ে তার উপর ঈমান এনেছিলাম। তখন আকাশ থেকে একটি শব্দ আসে আমার বান্দা সত্য কথাই বলেছে। তার জন্যে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও। আর তার জন্যে জান্নাতের একটা দরজা খুলে দাও, যেন জান্নাতের হাওয়া ও সুগন্ধি সে পেতে পারে। তার কবরটি দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায়। একটি সুন্দর লোক উত্তম পোশাক পরিহিত হয়ে এবং সুগন্ধিতে সুরভিত অবস্থায় তার কাছে আগমন করে এবং বলে- তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও যে, আজ তোমার সাথে যে ওয়াদা করা হয়েছিল তা পূর্ণ করা হচ্ছে। সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার সৎ আমল। তখন মৃতব্যক্তি বলবে, হে আল্লাহ! আপনি এখনই কিয়ামত সংঘটিত করে দিন, আমি আমার পরিবারবর্গ ও ধনমালের সাথে মিলিত হবো। পক্ষান্তরে কাফির ব্যক্তির যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের সময় হয় তখন কৃষ্ণবর্ণের এক ফেরেশতা চট নিয়ে তার কাছে হাজির হন। যতদূর দৃষ্টি যায় সেই ফেরেশতা ততো বড় হন। তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তাকে বলেন, ওরে অপবিত্র আত্মা! বেরিয়ে আয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের দিকে গমন কর। ঐ আত্মা তখন দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে, কিন্তু ফেরেশতা ওকে টেনে বের করেন, যেমন লোহার পেরেককে ভিজা চুলের মধ্য থেকে বের করা হয়। ঐ ফেরেশতা ওকে ধরা মাত্রই চোখের পলকে ঐ চটের মধ্যে জড়িয়ে নেন। ওর মধ্য থেকে সড়া-পচা মৃতদেহের মত দুর্গন্ধ ছুটতে থাকে। ফেরেশতা ওকে নিয়ে আকাশে উঠে যান এবং যেখান দিয়েই গমন করেন সেখানেই ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেন, এই অপবিত্র আত্মা কার? উত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের। আসমানে পৌছে যখন বলেন, দরজা খুলে দাও। তখন দরজা খোলা হয় না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, একে যমীনের নিম্নস্তরের সিজ্জিনে নিয়ে যাও। তখন তার আত্মাকে সেখানে নিক্ষেপ করা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন, যে আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে সে যেন আসমান থেকে পড়ে গেল এবং পাখী তার মাংস ছিড়তে রয়েছে। অথবা বায় তাকে দূর দূরান্তে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার আত্মা তার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। দু’জন ফেরেশতা এসে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রভু কে? সে উত্তর দেয়, আফসোস! আমি জানি না। আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন কি? জবাবে সে বলে, হায়! আমি তো এটা অবগত নই। তারপর জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে। কাকে পাঠানো হয়েছিল? সে উত্তরে বলে, হায়! হায়! আমি তা জানি না। তখন আকাশ থেকে শব্দ আসে, আমার বান্দা মিথ্যা বলছে। তার জন্যে জাহান্নামের বিছানা নিয়ে এসো এবং জাহান্নামের দরজা তার জন্যে খুলে দাও যাতে তার কাছে জাহান্নামের তাপ ও গরম বায়ু পৌছে যায়। তার কবর অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং তাকে এমনভাবে চেপে ধরে যে, তার পার্শ্বদেশের অস্থি মড় মড় করে তাঙ্গতে থাকে। একটি অত্যন্ত কদাকার ও বিশ্রি লোক ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত হয়ে ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে তার কাছে হাযির হয় এবং বলে- আমি তোমাকে তোমার দুর্ভাগ্যের সংবাদ দিচ্ছি। এটা ঐ দিন যেদিনের ওয়াদা তোমাকে দেয়া হয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? সে বলে, আমি তোমার দুষ্কর্ম। সেই কাফির লোকটি তখন বলে ওঠে- আল্লাহ করুন যেন কিয়ামত সংঘটিত না হয় (তাহলে আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে না)।”হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বাইরে বের হই। আমরা জানাযার অনুসরণ করছিলাম (অবশিষ্ট বর্ণনা উপরোক্ত বর্ণনার মতই)।” যখন মুমিনের রূহ বের হয় তখন আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতাগণ তার উপর দরূদ পাঠ করেন। তার জন্যে আসমানের দরজা খুলে যায়। সমস্ত ফেরেশতা এই প্রার্থনা করতে থাকেন যে, তার রূহ যেন তাঁদের সম্মুখ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কাফিরের আত্মার উপর এমন একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হয় যিনি অন্ধ, বধির ও বোবা। তার হাতে এমন একটি হাতুড় থাকে যে, যদি ওটা দ্বারা তিনি পাহাড়ের উপর মারেন তবে সেটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তা দ্বারা তিনি কাফিরকে এমন জোরে প্রহার করেন যে, সে উচ্চস্বরে চীৎকার করে ওঠে। দানব ও মানব ছাড়া সমস্ত মাখলূক সেই শব্দ শুনতে পায়। অতঃপর জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয়। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উট বের হতে পারে তবেই কাফির জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে (কিন্তু এটা সম্ভব নয়!)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) জামাল শব্দটিকে জুম্মাল অর্থাৎ কে দিয়ে ওকে দিয়ে পড়তেন। জুম্মাল মোটা রঞ্জুকে বলা হয় যার দ্বারা নৌকা বাধা হয়।

আল-আরাফ 7:41

৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং অহংকার ভরে সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্যে আকাশের দরজা খোলা হবে না, অর্থাৎ তাদের সৎ আমল এবং প্রার্থনা উপরে উঠানো হবে না । পাপী ব্যক্তির রূহ কব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ফেরেশতা ঐ রূহকে নিয়ে আকাশে উঠবেন এবং মালায়ে আ’লার যে ফেরেশতাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করবেন তাঁরা জিজ্ঞেস করবেন এই অপবিত্র রূহ্ কার? তখন তার জঘন্যতম নাম নিয়ে বলা হবে, অমুকের। শেষ পর্যন্ত আকাশে পৌছে বলবেন, দরজা খুলে দাও। কিন্তু দরজা খোলা হবে না। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ তাদের জন্যে আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না।”হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেন, আমরা একটি জানাযার অনুসরণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা কবরের কাছে পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে বসে পড়েন। আমরাও তার চারদিকে বসে পড়ি। আমরা এমনভাবে নীরবতা অবলম্বন করি যে, আমাদের মাথার উপর যেন পাখী বসে রয়েছে। (আমাদেরকে নীরব দেখে) তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল তা দিয়ে মাটিতে রেখা টানছিলেন। অতঃপর তিনি মাথা উঠিয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ ‘কবরের শাস্তি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর!' এ কথাটি দু'বার বা তিনবার বললেন। এরপর তিনি বললেনঃ “মুমিন যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করে আখিরাতের দিকে যাত্রা শুরু করে তখন আকাশ থেকে জ্যোতির্ময় ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন। তাঁদের হাতে থাকে জান্নাতের কাফন।জান্নাতের খোশবুও তাঁদের কাছে থাকে। তাদের সংখ্যা এতো অধিক থাকে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু ফেরেশতাতেই ভরপুর থাকে। অতঃপর একজন ফেরেশতা এসে তার শিয়রে বসে পড়েন এবং বলেন- হে শান্ত ও নিরাপদ আত্মা! আল্লাহর ক্ষমার দিকে চলো এ কথা শোনা মাত্রই আত্মা বেরিয়ে পড়ে যেমনভাবে মশকের মুখ দিয়ে পানি বের হয়ে থাকে। যেমনই আত্মা বের হয় তেমনই চোখের পলকে ফেরেশতা তাকে জান্নাতী কাফন পরিয়ে দেন এবং জান্নাতী সুগন্ধিতে তাকে সুরভিত করেন। মিশকের ঐ সুগন্ধি এতই উত্তম যে, দুনিয়ায় এর চেয়ে উত্তম সুগন্ধি আর হতে পারে না। তাকে নিয়ে ফেরেশতা আকাশে উঠে যান। যেখান দিয়েই তিনি গমন করেন সেখানেই ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেন, এটা কার পবিত্র আত্মা? উত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের। আকাশে পৌছে গিয়ে দরজা খুলতে বলা হলে তা খুলে দেয়া হয়। তার সাথে অন্যান্য সমস্ত ফেরেশতাও দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত গমন করেন। এভাবেই এক এক করে সপ্তম আকাশে পৌঁছে যান। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমার এই বান্দার নামটি ইল্লীনের তালিকায় লিপিবদ্ধ কর। অতঃপর তাকে যমীনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কেননা আমি তাকে মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করেছি। ওর মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে দেবো এবং ওর মধ্য থেকেই তাকে পুনরায় উথিত করবো। তখন যমীনে (কবরে) তার আত্মাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ওখানে দু’জন ফেরেশতা আগমন করেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রতিপালক কে? সে উত্তরে বলে, আমার প্রতিপালক হচ্ছেন আল্লাহ। আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন বা ধর্ম কি? সে উত্তর দেয়, আমার দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। পুনরায় তাকে প্রশ্ন করেন, তোমার কাছে যে লোকটিকে পাঠানো হয়েছিল তিনি কে? জবাবে সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়ে তার উপর ঈমান এনেছিলাম। তখন আকাশ থেকে একটি শব্দ আসে আমার বান্দা সত্য কথাই বলেছে। তার জন্যে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও। আর তার জন্যে জান্নাতের একটা দরজা খুলে দাও, যেন জান্নাতের হাওয়া ও সুগন্ধি সে পেতে পারে। তার কবরটি দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায়। একটি সুন্দর লোক উত্তম পোশাক পরিহিত হয়ে এবং সুগন্ধিতে সুরভিত অবস্থায় তার কাছে আগমন করে এবং বলে- তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও যে, আজ তোমার সাথে যে ওয়াদা করা হয়েছিল তা পূর্ণ করা হচ্ছে। সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার সৎ আমল। তখন মৃতব্যক্তি বলবে, হে আল্লাহ! আপনি এখনই কিয়ামত সংঘটিত করে দিন, আমি আমার পরিবারবর্গ ও ধনমালের সাথে মিলিত হবো। পক্ষান্তরে কাফির ব্যক্তির যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের সময় হয় তখন কৃষ্ণবর্ণের এক ফেরেশতা চট নিয়ে তার কাছে হাজির হন। যতদূর দৃষ্টি যায় সেই ফেরেশতা ততো বড় হন। তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তাকে বলেন, ওরে অপবিত্র আত্মা! বেরিয়ে আয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের দিকে গমন কর। ঐ আত্মা তখন দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে, কিন্তু ফেরেশতা ওকে টেনে বের করেন, যেমন লোহার পেরেককে ভিজা চুলের মধ্য থেকে বের করা হয়। ঐ ফেরেশতা ওকে ধরা মাত্রই চোখের পলকে ঐ চটের মধ্যে জড়িয়ে নেন। ওর মধ্য থেকে সড়া-পচা মৃতদেহের মত দুর্গন্ধ ছুটতে থাকে। ফেরেশতা ওকে নিয়ে আকাশে উঠে যান এবং যেখান দিয়েই গমন করেন সেখানেই ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেন, এই অপবিত্র আত্মা কার? উত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের। আসমানে পৌছে যখন বলেন, দরজা খুলে দাও। তখন দরজা খোলা হয় না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, একে যমীনের নিম্নস্তরের সিজ্জিনে নিয়ে যাও। তখন তার আত্মাকে সেখানে নিক্ষেপ করা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন, যে আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে সে যেন আসমান থেকে পড়ে গেল এবং পাখী তার মাংস ছিড়তে রয়েছে। অথবা বায় তাকে দূর দূরান্তে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার আত্মা তার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। দু’জন ফেরেশতা এসে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রভু কে? সে উত্তর দেয়, আফসোস! আমি জানি না। আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন কি? জবাবে সে বলে, হায়! আমি তো এটা অবগত নই। তারপর জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে। কাকে পাঠানো হয়েছিল? সে উত্তরে বলে, হায়! হায়! আমি তা জানি না। তখন আকাশ থেকে শব্দ আসে, আমার বান্দা মিথ্যা বলছে। তার জন্যে জাহান্নামের বিছানা নিয়ে এসো এবং জাহান্নামের দরজা তার জন্যে খুলে দাও যাতে তার কাছে জাহান্নামের তাপ ও গরম বায়ু পৌছে যায়। তার কবর অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং তাকে এমনভাবে চেপে ধরে যে, তার পার্শ্বদেশের অস্থি মড় মড় করে তাঙ্গতে থাকে। একটি অত্যন্ত কদাকার ও বিশ্রি লোক ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত হয়ে ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে তার কাছে হাযির হয় এবং বলে- আমি তোমাকে তোমার দুর্ভাগ্যের সংবাদ দিচ্ছি। এটা ঐ দিন যেদিনের ওয়াদা তোমাকে দেয়া হয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? সে বলে, আমি তোমার দুষ্কর্ম। সেই কাফির লোকটি তখন বলে ওঠে- আল্লাহ করুন যেন কিয়ামত সংঘটিত না হয় (তাহলে আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে না)।”হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বাইরে বের হই। আমরা জানাযার অনুসরণ করছিলাম (অবশিষ্ট বর্ণনা উপরোক্ত বর্ণনার মতই)।” যখন মুমিনের রূহ বের হয় তখন আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতাগণ তার উপর দরূদ পাঠ করেন। তার জন্যে আসমানের দরজা খুলে যায়। সমস্ত ফেরেশতা এই প্রার্থনা করতে থাকেন যে, তার রূহ যেন তাঁদের সম্মুখ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কাফিরের আত্মার উপর এমন একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হয় যিনি অন্ধ, বধির ও বোবা। তার হাতে এমন একটি হাতুড় থাকে যে, যদি ওটা দ্বারা তিনি পাহাড়ের উপর মারেন তবে সেটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তা দ্বারা তিনি কাফিরকে এমন জোরে প্রহার করেন যে, সে উচ্চস্বরে চীৎকার করে ওঠে। দানব ও মানব ছাড়া সমস্ত মাখলূক সেই শব্দ শুনতে পায়। অতঃপর জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয়। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উট বের হতে পারে তবেই কাফির জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে (কিন্তু এটা সম্ভব নয়!)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) জামাল শব্দটিকে জুম্মাল অর্থাৎ কে দিয়ে ওকে দিয়ে পড়তেন। জুম্মাল মোটা রঞ্জুকে বলা হয় যার দ্বারা নৌকা বাধা হয়।

আল-আরাফ 7:42

৪২-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক হতভাগা ও পাপীদের অবস্থা বর্ণনার পর এখন ভাগ্যবান ও সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেনঃ যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে তারা ঐ লোকদের থেকে পৃথক যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে। এখানে এই বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হচ্ছে যে, ঈমান ও আমল কোন কঠিন ব্যাপার নয়; বরং খুবই সহজ ব্যাপার। তাই ইরশাদ হচ্ছে- আমি যে শরঈ বিধান জারি করেছি এবং ঈমান ও সৎ আমল ফরয করে দিয়েছি তা মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত নয়। আমি কখনও কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেই না। এই লোকগুলোই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী। মুমিনদের অন্তরে পারস্পরিক যা কিছু হিংসা ও বিদ্বেষ থাকবে তা আমি বের করে দেবো। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনরা যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী পুলের উপর আটক করা হবে। অতঃপর তাদের ঐসব অত্যাচার সম্পর্কে আলোচনা করা হবে যা দুনিয়ায় তাদের পরস্পরের মধ্যে করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঐ অত্যাচার ও হিংসা বিদ্বেষ থেকে যখন তাদের অন্তরকে পাক সাফ করা হবে তখন তাদেরকে জান্নাতের পথ প্রদর্শন করা হবে। আল্লাহর শপথ! তাদের কাছে তাদের জান্নাতের ঘর তাদের পার্থিব ঘর থেকে বেশী পরিচিত হবে। জান্নাতবাসীকে যখন জান্নাতের দিকে প্রেরণ করা হবে তখন তারা জান্নাতের পার্শ্বে একটা গাছ পাবে যার নিম্নদেশ দিয়ে দু'টি নিঝরিণী প্রবাহিত হতে থাকবে। একটা থেকে যখন তারা পানি পান করবে তখন তাদের অন্তরে যা কিছু হিংসা বিদ্বেষ ছিল সব কিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে শরাবে তহুর বা পবিত্র মদ। আর অন্য ঝরণায় তারা গোসল করবে। তখন জান্নাতের মতই সজীবতা ও প্রফুল্লতা তাদের চেহারায় ফুটে উঠবে। এর পর না তাদের মাথার চুল এলোমেলো হবে, না চোখে সুরমা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। অতঃপর এই লোকগুলো দলে দলে জান্নাতের দিকে রওয়ানা হয়ে যাবে।”হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, ইনশাআল্লাহ আমি, হযরত উসমান (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যুবাইর (রাঃ) ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল, কিন্তু সমস্ত পরিষ্কার করে দেয়া হবে।” হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে আহলে বদরও রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জান্নাতীকে জাহান্নামের ঠিক আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করতেন তবে আমার ঠিকানা এটাই হতো। এ জন্যে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আর প্রত্যেক জাহান্নামীকে জান্নাতের ঠিকানা বলে দেয়া হবে। সে বলবে- হায়! যদি আল্লাহ আমাকেও সুপথ প্রদর্শন করতেন তবে এটাই আমার ঠিকানা হতো। এভাবে দুঃখ ও আফসোস তাকে ছেয়ে ফেলবে। ঐ মুমিনদেরকে যখন জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হবে তখন তাদেরকে বলা হবে- এই জান্নাত হচ্ছে তোমাদের সৎকর্মের ফল স্বরূপ তোমাদের পুরস্কার। তোমাদেরকে যে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হয়েছে এটা সত্যি আল্লাহর রহমতই বটে। নিজেদের আমল অনুযায়ী আপন আপন ঠিকানা বানিয়ে নাও। আর এ সবকিছুই হচ্ছে আল্লাহর রহমতেরই কারণ।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই যেন এ কথা জেনে রাখে যে, তার আমল তাকে জান্নাতে পৌছায় না।” তখন জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আমলও কি নয়?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, আমার আমলও নয়, যদি না আল্লাহর রহমত আমার উপর বর্ষিত হয়।”

আল-আরাফ 7:43

৪২-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক হতভাগা ও পাপীদের অবস্থা বর্ণনার পর এখন ভাগ্যবান ও সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেনঃ যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে তারা ঐ লোকদের থেকে পৃথক যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে। এখানে এই বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হচ্ছে যে, ঈমান ও আমল কোন কঠিন ব্যাপার নয়; বরং খুবই সহজ ব্যাপার। তাই ইরশাদ হচ্ছে- আমি যে শরঈ বিধান জারি করেছি এবং ঈমান ও সৎ আমল ফরয করে দিয়েছি তা মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত নয়। আমি কখনও কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেই না। এই লোকগুলোই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী। মুমিনদের অন্তরে পারস্পরিক যা কিছু হিংসা ও বিদ্বেষ থাকবে তা আমি বের করে দেবো। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনরা যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী পুলের উপর আটক করা হবে। অতঃপর তাদের ঐসব অত্যাচার সম্পর্কে আলোচনা করা হবে যা দুনিয়ায় তাদের পরস্পরের মধ্যে করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঐ অত্যাচার ও হিংসা বিদ্বেষ থেকে যখন তাদের অন্তরকে পাক সাফ করা হবে তখন তাদেরকে জান্নাতের পথ প্রদর্শন করা হবে। আল্লাহর শপথ! তাদের কাছে তাদের জান্নাতের ঘর তাদের পার্থিব ঘর থেকে বেশী পরিচিত হবে। জান্নাতবাসীকে যখন জান্নাতের দিকে প্রেরণ করা হবে তখন তারা জান্নাতের পার্শ্বে একটা গাছ পাবে যার নিম্নদেশ দিয়ে দু'টি নিঝরিণী প্রবাহিত হতে থাকবে। একটা থেকে যখন তারা পানি পান করবে তখন তাদের অন্তরে যা কিছু হিংসা বিদ্বেষ ছিল সব কিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে শরাবে তহুর বা পবিত্র মদ। আর অন্য ঝরণায় তারা গোসল করবে। তখন জান্নাতের মতই সজীবতা ও প্রফুল্লতা তাদের চেহারায় ফুটে উঠবে। এর পর না তাদের মাথার চুল এলোমেলো হবে, না চোখে সুরমা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। অতঃপর এই লোকগুলো দলে দলে জান্নাতের দিকে রওয়ানা হয়ে যাবে।”হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, ইনশাআল্লাহ আমি, হযরত উসমান (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যুবাইর (রাঃ) ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল, কিন্তু সমস্ত পরিষ্কার করে দেয়া হবে।” হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে আহলে বদরও রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জান্নাতীকে জাহান্নামের ঠিক আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করতেন তবে আমার ঠিকানা এটাই হতো। এ জন্যে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আর প্রত্যেক জাহান্নামীকে জান্নাতের ঠিকানা বলে দেয়া হবে। সে বলবে- হায়! যদি আল্লাহ আমাকেও সুপথ প্রদর্শন করতেন তবে এটাই আমার ঠিকানা হতো। এভাবে দুঃখ ও আফসোস তাকে ছেয়ে ফেলবে। ঐ মুমিনদেরকে যখন জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হবে তখন তাদেরকে বলা হবে- এই জান্নাত হচ্ছে তোমাদের সৎকর্মের ফল স্বরূপ তোমাদের পুরস্কার। তোমাদেরকে যে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হয়েছে এটা সত্যি আল্লাহর রহমতই বটে। নিজেদের আমল অনুযায়ী আপন আপন ঠিকানা বানিয়ে নাও। আর এ সবকিছুই হচ্ছে আল্লাহর রহমতেরই কারণ।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই যেন এ কথা জেনে রাখে যে, তার আমল তাকে জান্নাতে পৌছায় না।” তখন জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আমলও কি নয়?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, আমার আমলও নয়, যদি না আল্লাহর রহমত আমার উপর বর্ষিত হয়।”

আল-আরাফ 7:44

৪৪-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: জাহান্নামবাসীকে জাহান্নামে যাওয়ার পর উপহাসমূলকভাবে সম্বোধন করা হচ্ছে যে, জান্নাতবাসী জাহান্নামবাসীকে সম্বোধন করে বলবেঃ “আমাদের প্রতিপালক আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা তিনি সত্যরূপে দেখিয়েছেন। তোমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলা যে ওয়াদা করেছিলেন তা তোমরা সত্যরূপে পেয়েছো কি?” (আরবী) এখানে হরফটি উহ্য উক্তির তাফসীর করছে এবং (আরবী) শব্দটি নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে এসেছে। সেই সময় কাফিররা উত্তরে বলবেঃ “হা (আমরা তা সত্যরূপে পেয়েছি)।” যেমন মহান আল্লাহ সূরায়ে সাফফাতে বলেছেন এবং তিনি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে সংবাদ দিয়েছেন যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন কাফিরের বন্ধু ছিল। ঐ মুমিন ব্যক্তি যখন তার কাফির বন্ধুকে জাহান্নামে উঁকি মেরে দেখবে তখন বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! তুমি তো আমাকেও ধ্বংস করারই উপক্রম করেছিলে, যদি না আমার প্রভুর অনুগ্রহ হতো তবে আমিও তোমার ন্যায় দণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” এই কাফিররা বলতোঃ “এই যে, আমরা মরলাম তো মরলামই, আর আমরা উথিত হবে না এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।” ফেরেশতা এখন তাদের কান খুলে দেবে এবং বলবে- দেখ, এটাই হচ্ছে সেই জাহান্নাম যা তোমরা অস্বীকার করতে। এটা কি কোন যাদু, না তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ না? এসো, জাহান্নামে প্রবেশ কর। পেরে না পেরে তোমাদেরকে সহ্য করতেই হবে। তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান পাচ্ছ।অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের নিহতদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন“হে আবু জেহেল ইবনে হিশাম, হে উৎবা ইবনে রাবীআ, হে শাইবা ইবনে রাবীআ এবং অন্যান্য মৃত কুরায়েশ নেতৃবর্গের নাম ধরে ধরে বলেছিলেন! আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছে কি? আমার প্রভু আমার সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা পূর্ণ হয়ে গেছে।” ঐ সময় হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মৃতদেরকে সম্বোধন করছেন (অথচ তারা তো শুনতেই পায় না)?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! তারা তোমাদের চেয়ে কম শুনতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা উত্তর দিতে সক্ষম নয়।”অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে- যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা হচ্ছে ঐসব লোক যারা লোকদেরকে সরল সোজা পথে আসতে বাধা প্রদান করতো। তারা জনগণকে নবীদের শরীয়তের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতো, যেন তারা বক্র পথে পরিচালিত হয় এবং নবীদের অনুসরণ না করে। তারা পরকালে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়াকে অস্বীকার করতো। কেননা, তাদের হিসাবের দিনের কোন ভয়ই ছিল না। এরা ছিল বড়ই দুষ্ট প্রকৃতির লোক।

আল-আরাফ 7:45

৪৪-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: জাহান্নামবাসীকে জাহান্নামে যাওয়ার পর উপহাসমূলকভাবে সম্বোধন করা হচ্ছে যে, জান্নাতবাসী জাহান্নামবাসীকে সম্বোধন করে বলবেঃ “আমাদের প্রতিপালক আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা তিনি সত্যরূপে দেখিয়েছেন। তোমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলা যে ওয়াদা করেছিলেন তা তোমরা সত্যরূপে পেয়েছো কি?” (আরবী) এখানে হরফটি উহ্য উক্তির তাফসীর করছে এবং (আরবী) শব্দটি নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে এসেছে। সেই সময় কাফিররা উত্তরে বলবেঃ “হা (আমরা তা সত্যরূপে পেয়েছি)।” যেমন মহান আল্লাহ সূরায়ে সাফফাতে বলেছেন এবং তিনি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে সংবাদ দিয়েছেন যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন কাফিরের বন্ধু ছিল। ঐ মুমিন ব্যক্তি যখন তার কাফির বন্ধুকে জাহান্নামে উঁকি মেরে দেখবে তখন বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! তুমি তো আমাকেও ধ্বংস করারই উপক্রম করেছিলে, যদি না আমার প্রভুর অনুগ্রহ হতো তবে আমিও তোমার ন্যায় দণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” এই কাফিররা বলতোঃ “এই যে, আমরা মরলাম তো মরলামই, আর আমরা উথিত হবে না এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।” ফেরেশতা এখন তাদের কান খুলে দেবে এবং বলবে- দেখ, এটাই হচ্ছে সেই জাহান্নাম যা তোমরা অস্বীকার করতে। এটা কি কোন যাদু, না তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ না? এসো, জাহান্নামে প্রবেশ কর। পেরে না পেরে তোমাদেরকে সহ্য করতেই হবে। তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান পাচ্ছ।অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের নিহতদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন“হে আবু জেহেল ইবনে হিশাম, হে উৎবা ইবনে রাবীআ, হে শাইবা ইবনে রাবীআ এবং অন্যান্য মৃত কুরায়েশ নেতৃবর্গের নাম ধরে ধরে বলেছিলেন! আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছে কি? আমার প্রভু আমার সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা পূর্ণ হয়ে গেছে।” ঐ সময় হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মৃতদেরকে সম্বোধন করছেন (অথচ তারা তো শুনতেই পায় না)?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! তারা তোমাদের চেয়ে কম শুনতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা উত্তর দিতে সক্ষম নয়।”অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে- যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা হচ্ছে ঐসব লোক যারা লোকদেরকে সরল সোজা পথে আসতে বাধা প্রদান করতো। তারা জনগণকে নবীদের শরীয়তের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতো, যেন তারা বক্র পথে পরিচালিত হয় এবং নবীদের অনুসরণ না করে। তারা পরকালে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়াকে অস্বীকার করতো। কেননা, তাদের হিসাবের দিনের কোন ভয়ই ছিল না। এরা ছিল বড়ই দুষ্ট প্রকৃতির লোক।

আল-আরাফ 7:46

৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: জান্নাতবাসী যে জাহান্নামবাসীকে সম্বোধন করবে এটার বর্ণনা দেয়ার পর ইরশাদ হচ্ছে যে, জাহান্নাম ও জান্নাতের মধ্যভাগে একটা পর্দা থাকবে যা জাহান্নামীদের জন্যে জান্নাতে প্রবেশের প্রতিবন্ধক হবে। যেমন, আল্লাহ পাক বলেনঃ “ও দু'টোর মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হয়েছে, যার ভিতরের দিকে একটি দরজা আছে, যাতে রহমত রয়েছে এবং ওর বাইরের দিকে রয়েছে শাস্তি।” ওটাই হচ্ছে আরাফ। এর সম্পর্কেই বলা হয়েছে যে, আরাফের উপর কতকগুলো লোক থাকবে। সুদ্দীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহ পাকের “ও দু’টোর মাঝে একটি পর্দা রয়েছে”- এই উক্তিতে যে পর্দা কথাটি রয়েছে এটা দ্বারা আ'রাফকেই বুঝানো হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহুবচন। প্রত্যেক উঁচু স্থানকেই (আরবী) বলা হয়। মোরগের মাথার পালককেও এ কারণেই (আরবী) বলা হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যভাগে একটি টিলা বা ছোট পাহাড় রয়েছে। সেখানেও মানুষ অবস্থান করবে। তারা। পাপী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আ'রাফে অবস্থানকারী লোকেরা নিজেদের লোকদেরকে চিনতে পারবে বলেই ঐ জায়গার নাম আ'রাফ রাখা হয়েছে। আরাফবাসীদের ব্যাপারে মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপ। সবগুলোরই অর্থ প্রায় কাছাকাছি। অর্থাৎ তারা হচ্ছে ঐসব লোক যাদের পাপ ও পুণ্য সমান সমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- “যাদের পাপ ও পুণ্য সমান সমান হবে তারা কোথায় থাকবে?” উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “এরাই হচ্ছে আরাফবাসী। তাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে না বটে, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা অবশ্যই করবে।” এই ধরনেরই আর একটি প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আরাফের এই অধিবাসীরা হচ্ছে ওরাই যারা পিতা মাতার অনুমতি ছাড়াই আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে বের হয়েছিল এবং শহীদ হয়েছিল। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখার কারণ এই যে, তারা পিতা মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। আর জাহান্নাম থেকে এজন্যে বাঁচানো হয়েছে যে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিল।” আর একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এরা হচ্ছে ঐ সব লোক যাদের পুণ্য ও পাপ সমান সমান ছিল। পাপগুলো তাদের জান্নাতে প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে এবং পুণ্যগুলো জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছে। এখন লোকগুলো সেই প্রাচীরের পার্শ্বেই অবস্থান করছে এবং আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করবে। তাদের দৃষ্টি যখন জাহান্নামবাসীদের উপর পড়বে তখন তারা বলবেঃ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে এই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। এভাবেই তারা দু'আ করতে থাকবে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদেরকে বলবেনঃ আচ্ছা, যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক লোকদের হিসাব গ্রহণ করবেন। যার একটি পুণ্য বেশী হবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর যার একটি পাপ বেশী হবে তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) (২৩:১০২) এই আয়াতটি পাঠ করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দাঁড়িপাল্লা তো একটি দানার পার্থক্যের কারণে নীচে বসে যায় বা উপরে চড়ে উঠে। আর পুণ্য ও পাপ সমান হয়ে গেলে তাদেরকে পুলসিরাতের উপর আটক করে দেয়া হবে। তারা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীকে চিনতে পারবে। তারা জান্নাতবাসীদেরকে দেখে সালাম জানাবে। আর বামে জাহান্নামীদেরকে দেখা যাবে। তাদেরকে দেখে আরাফবাসীরা বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে এদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।' পুণ্যবানদের সামনে একটা নূর থাকবে যার আলোতে তারা পথ চলবে। এরূপ নূর প্রত্যেক পুণ্যবান পুরুষ পুণ্যবতী নারীর সামনে থাকবে। যখন তারা পুলসিরাতের উপর পৌছবে তখন মুনাফিকদের সামনে থেকে এ নূর সরিয়ে নেয়া হবে। জান্নাতবাসীরা যখন মুনাফিকদেরকে দেখবে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদের মূরকে আপনি প্রতিষ্ঠিত রাখুন!' কিন্তু আরাফবাসীদের নূর তাদের সামনেই থাকবে, দূরে থাকবে না। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ এরা জান্নাতী নয় বটে, কিন্তু জান্নাতের আশা রাখে। বান্দা যখন একটি পুণ্যের কাজ করে তখন তার জন্যে দশটি পুণ্য লিখা হয়। আর যখন একটি পাপের কাজ করে তখন একটিমাত্র পাপ লিখা হয়। ঐ ব্যক্তি হতভাগ্য যার একক দশকের উপর জয়যুক্ত হয়। আল্লাহ পাক যখন তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন তখন তাদেরকে তিনি নদীর দিকে প্রেরণ করবেন। ঐ নদীকে নহরে হায়াত' বলা হয়। ঐ নদীর ধার সোনা দিয়ে বাঁধানো আছে এবং ওকে হীরা ও মনিমুক্তা দিয়ে এঁটে দেয়া হয়েছে। ওর মাটি হচ্ছে মিশক। আরাফবাসীদেরকে ঐ নদীতে গোসল করানো হবে। তখন তাদের রং ঠিক হয়ে যাবে এবং তাদের গ্রীবায় সাদা ও উজ্জ্বল চিহ্ন প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এই চিহ্ন দ্বারাই তাদের আরাফবাসী হওয়ার পরিচয় পাওয়া যাবে। যখন তাদের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পাবে তখন মহান আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “কি চাইবে চাও। তখন তারা তাদের মনের বাসনা প্রকাশ করবে। তাদের আশা পূর্ণ করা হবে। তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমাদের আবেদনের উপর আরও সত্তর ভাগ দেয়া হচ্ছে।' অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তাদের নাম দেয়া হবে ‘মাসাকীনে আহূলে জান্নাত’ বা জান্নাতবাসীদের মিসকীনগণ।”রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- আরাফবাসীর ফায়সালা হবে সর্বশেষে। সমস্ত বান্দার ফায়সালা করার পর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আ'রাফবাসীগণ! তোমাদের পূণ্যগুলো তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তোমাদেরকে জান্নাতের অধিবাসী করতে পারেনি। এখন তোমরা আমার আযাদকৃত হয়ে যাও। যেভাবেই চাও জান্নাত দ্বারা উপকৃত হও।”এ কথাও বলা হয়েছে যে, আরাফবাসী হচ্ছে ঐসব লোক যারা অবৈধভাবে সৃষ্ট হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জ্বিনদের মধ্যেও মুমিন রয়েছে এবং তাদের জন্যেও পুণ্য ও শাস্তি রয়েছে।” সাহাবীগণ তাদের মুমিনদের সম্পর্কে এবং পুণ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “তারা হবে আ'রাফের অধিবাসী। জান্নাতে তারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার সাথে থাকবে না।” জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “আ'রাফ কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের নিকটবর্তী একটি প্রাচীর, যার মধ্যে নহরও রয়েছে, গাছও রয়েছে এবং ফলও রয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আ'রাফবাসী হচ্ছেন ঐসব সৎ লোক যারা ফকীহ্ ও আলিম।(আরবী) এই আয়াত সম্পর্কে আবু মুজলি (রঃ) বলেন যে, যারা আ'রাফের উপর নির্ধারিত থাকবেন তারা হবেন ফেরেশতা। তারা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীকে চিনতে পারবেন এবং জান্নাতবাসীদেরকে তারা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “আস্সালামু আলাইকুম।” তাঁরা জান্নাতে থাকবেন না বটে, কিন্তু জান্নাতের জন্যে আশান্বিত হয়ে থাকবেন। আর তাঁরা জাহান্নামীদেরকে দেখে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। আ'রাফবাসীরা এমন লোকদেরকে ডাক দেবে যাদেরকে তারা তাদের উজ্জ্বল চেহারা দেখে চিনতে পারবে এবং তাদেরকে বলবেঃ তোমরা ফখর ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে না।' যে পাপী লোকগুলো আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হয়নি তারা জান্নাতী হতে পারে না। আর জান্নাতীদেরকে যখন জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তখন তাদেরকে বলা হবেঃ 'যাও, এখন জান্নাতে তোমাদের কোন ভয়ও নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না।' এ উক্তিটি অত্যন্ত দুর্বল এবং বাকরীতিও প্রকাশ্য শব্দের উলটো। জমহুরের উক্তিটিই অগ্রগণ্য। কেননা, ওটা আয়াতের প্রকাশ্য শব্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর উপরোক্ত উক্তিটিও দুর্বলতামুক্ত নয়। কুরতুবী (রঃ) এতে বারোটি উক্তি নকল করেছেন। যেমন সৎ লোকগণ, নবীগণ, ফেরেশতাগণ ইত্যাদি। আ'রাফবাসীরা জান্নাতীদেরকে তাদের চেহারার ঔজ্জ্বল্য ও শুভ্রতা দেখে চিনে নেবে। আর জাহান্নামীদেরকে চিনে নেবে তাদের কালিমাময় চেহারা দেখে।হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে এই মর্যাদা এ জন্যেই দিয়েছেন যেন তারা জানতে পারে যে জান্নাতী কারা এবং জাহান্নামী কারা। তারা জাহান্নামীদেরকে তাদের মলিন ও কালিমাময় চেহারা দেখে চিনতে পারবে এবং আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে বলবে- হে আল্লাহ! আমাদেরকে এই অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। ঐ অবস্থাতেই তারা জান্নাতবাসীদেরকে সালাম জানাবে। তারা নিজেরা তখন পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করেনি বটে, কিন্তু তারা জান্নাতে প্রবেশ লাভের আশা রাখে এবং ইনশাআল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই লোভ ও আশা তাদের অন্তরে শুধু সেই দয়া ও অনুগ্রহের কারণে রয়েছে যা আল্লাহ তাদের অবস্থার উপর যুক্ত রেখেছেন। আর তারা যে আশা রাখবে তা আল্লাহ তাদেরকে জ্ঞাত করেও দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি বলেছেনঃ “তারা জাহান্নামবাসীদেরকে দেখে বলবে- হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অবস্থা থেকে রক্ষা করুন!” ইকরাম (রঃ) বলেন যে, আরাফবাসীরা যখন জাহান্নামবাসীদের দিকে চেয়ে দেখবে তখন তাদের চেহারা ঝলসে উঠবে। অতঃপর যখন। জান্নাতবাসীদের দিকে তাকাবে তখন তাদের ঐ অবস্থা দূরীভূত হয়ে যাবে।

আল-আরাফ 7:47

৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: জান্নাতবাসী যে জাহান্নামবাসীকে সম্বোধন করবে এটার বর্ণনা দেয়ার পর ইরশাদ হচ্ছে যে, জাহান্নাম ও জান্নাতের মধ্যভাগে একটা পর্দা থাকবে যা জাহান্নামীদের জন্যে জান্নাতে প্রবেশের প্রতিবন্ধক হবে। যেমন, আল্লাহ পাক বলেনঃ “ও দু'টোর মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হয়েছে, যার ভিতরের দিকে একটি দরজা আছে, যাতে রহমত রয়েছে এবং ওর বাইরের দিকে রয়েছে শাস্তি।” ওটাই হচ্ছে আরাফ। এর সম্পর্কেই বলা হয়েছে যে, আরাফের উপর কতকগুলো লোক থাকবে। সুদ্দীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহ পাকের “ও দু’টোর মাঝে একটি পর্দা রয়েছে”- এই উক্তিতে যে পর্দা কথাটি রয়েছে এটা দ্বারা আ'রাফকেই বুঝানো হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহুবচন। প্রত্যেক উঁচু স্থানকেই (আরবী) বলা হয়। মোরগের মাথার পালককেও এ কারণেই (আরবী) বলা হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যভাগে একটি টিলা বা ছোট পাহাড় রয়েছে। সেখানেও মানুষ অবস্থান করবে। তারা। পাপী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আ'রাফে অবস্থানকারী লোকেরা নিজেদের লোকদেরকে চিনতে পারবে বলেই ঐ জায়গার নাম আ'রাফ রাখা হয়েছে। আরাফবাসীদের ব্যাপারে মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপ। সবগুলোরই অর্থ প্রায় কাছাকাছি। অর্থাৎ তারা হচ্ছে ঐসব লোক যাদের পাপ ও পুণ্য সমান সমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- “যাদের পাপ ও পুণ্য সমান সমান হবে তারা কোথায় থাকবে?” উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “এরাই হচ্ছে আরাফবাসী। তাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে না বটে, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা অবশ্যই করবে।” এই ধরনেরই আর একটি প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আরাফের এই অধিবাসীরা হচ্ছে ওরাই যারা পিতা মাতার অনুমতি ছাড়াই আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে বের হয়েছিল এবং শহীদ হয়েছিল। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখার কারণ এই যে, তারা পিতা মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। আর জাহান্নাম থেকে এজন্যে বাঁচানো হয়েছে যে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিল।” আর একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এরা হচ্ছে ঐ সব লোক যাদের পুণ্য ও পাপ সমান সমান ছিল। পাপগুলো তাদের জান্নাতে প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে এবং পুণ্যগুলো জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছে। এখন লোকগুলো সেই প্রাচীরের পার্শ্বেই অবস্থান করছে এবং আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করবে। তাদের দৃষ্টি যখন জাহান্নামবাসীদের উপর পড়বে তখন তারা বলবেঃ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে এই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। এভাবেই তারা দু'আ করতে থাকবে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদেরকে বলবেনঃ আচ্ছা, যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক লোকদের হিসাব গ্রহণ করবেন। যার একটি পুণ্য বেশী হবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর যার একটি পাপ বেশী হবে তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) (২৩:১০২) এই আয়াতটি পাঠ করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দাঁড়িপাল্লা তো একটি দানার পার্থক্যের কারণে নীচে বসে যায় বা উপরে চড়ে উঠে। আর পুণ্য ও পাপ সমান হয়ে গেলে তাদেরকে পুলসিরাতের উপর আটক করে দেয়া হবে। তারা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীকে চিনতে পারবে। তারা জান্নাতবাসীদেরকে দেখে সালাম জানাবে। আর বামে জাহান্নামীদেরকে দেখা যাবে। তাদেরকে দেখে আরাফবাসীরা বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে এদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।' পুণ্যবানদের সামনে একটা নূর থাকবে যার আলোতে তারা পথ চলবে। এরূপ নূর প্রত্যেক পুণ্যবান পুরুষ পুণ্যবতী নারীর সামনে থাকবে। যখন তারা পুলসিরাতের উপর পৌছবে তখন মুনাফিকদের সামনে থেকে এ নূর সরিয়ে নেয়া হবে। জান্নাতবাসীরা যখন মুনাফিকদেরকে দেখবে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদের মূরকে আপনি প্রতিষ্ঠিত রাখুন!' কিন্তু আরাফবাসীদের নূর তাদের সামনেই থাকবে, দূরে থাকবে না। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ এরা জান্নাতী নয় বটে, কিন্তু জান্নাতের আশা রাখে। বান্দা যখন একটি পুণ্যের কাজ করে তখন তার জন্যে দশটি পুণ্য লিখা হয়। আর যখন একটি পাপের কাজ করে তখন একটিমাত্র পাপ লিখা হয়। ঐ ব্যক্তি হতভাগ্য যার একক দশকের উপর জয়যুক্ত হয়। আল্লাহ পাক যখন তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন তখন তাদেরকে তিনি নদীর দিকে প্রেরণ করবেন। ঐ নদীকে নহরে হায়াত' বলা হয়। ঐ নদীর ধার সোনা দিয়ে বাঁধানো আছে এবং ওকে হীরা ও মনিমুক্তা দিয়ে এঁটে দেয়া হয়েছে। ওর মাটি হচ্ছে মিশক। আরাফবাসীদেরকে ঐ নদীতে গোসল করানো হবে। তখন তাদের রং ঠিক হয়ে যাবে এবং তাদের গ্রীবায় সাদা ও উজ্জ্বল চিহ্ন প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এই চিহ্ন দ্বারাই তাদের আরাফবাসী হওয়ার পরিচয় পাওয়া যাবে। যখন তাদের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পাবে তখন মহান আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “কি চাইবে চাও। তখন তারা তাদের মনের বাসনা প্রকাশ করবে। তাদের আশা পূর্ণ করা হবে। তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমাদের আবেদনের উপর আরও সত্তর ভাগ দেয়া হচ্ছে।' অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তাদের নাম দেয়া হবে ‘মাসাকীনে আহূলে জান্নাত’ বা জান্নাতবাসীদের মিসকীনগণ।”রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- আরাফবাসীর ফায়সালা হবে সর্বশেষে। সমস্ত বান্দার ফায়সালা করার পর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আ'রাফবাসীগণ! তোমাদের পূণ্যগুলো তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তোমাদেরকে জান্নাতের অধিবাসী করতে পারেনি। এখন তোমরা আমার আযাদকৃত হয়ে যাও। যেভাবেই চাও জান্নাত দ্বারা উপকৃত হও।”এ কথাও বলা হয়েছে যে, আরাফবাসী হচ্ছে ঐসব লোক যারা অবৈধভাবে সৃষ্ট হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জ্বিনদের মধ্যেও মুমিন রয়েছে এবং তাদের জন্যেও পুণ্য ও শাস্তি রয়েছে।” সাহাবীগণ তাদের মুমিনদের সম্পর্কে এবং পুণ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “তারা হবে আ'রাফের অধিবাসী। জান্নাতে তারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার সাথে থাকবে না।” জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “আ'রাফ কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের নিকটবর্তী একটি প্রাচীর, যার মধ্যে নহরও রয়েছে, গাছও রয়েছে এবং ফলও রয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আ'রাফবাসী হচ্ছেন ঐসব সৎ লোক যারা ফকীহ্ ও আলিম।(আরবী) এই আয়াত সম্পর্কে আবু মুজলি (রঃ) বলেন যে, যারা আ'রাফের উপর নির্ধারিত থাকবেন তারা হবেন ফেরেশতা। তারা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীকে চিনতে পারবেন এবং জান্নাতবাসীদেরকে তারা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “আস্সালামু আলাইকুম।” তাঁরা জান্নাতে থাকবেন না বটে, কিন্তু জান্নাতের জন্যে আশান্বিত হয়ে থাকবেন। আর তাঁরা জাহান্নামীদেরকে দেখে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। আ'রাফবাসীরা এমন লোকদেরকে ডাক দেবে যাদেরকে তারা তাদের উজ্জ্বল চেহারা দেখে চিনতে পারবে এবং তাদেরকে বলবেঃ তোমরা ফখর ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে না।' যে পাপী লোকগুলো আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হয়নি তারা জান্নাতী হতে পারে না। আর জান্নাতীদেরকে যখন জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তখন তাদেরকে বলা হবেঃ 'যাও, এখন জান্নাতে তোমাদের কোন ভয়ও নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না।' এ উক্তিটি অত্যন্ত দুর্বল এবং বাকরীতিও প্রকাশ্য শব্দের উলটো। জমহুরের উক্তিটিই অগ্রগণ্য। কেননা, ওটা আয়াতের প্রকাশ্য শব্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর উপরোক্ত উক্তিটিও দুর্বলতামুক্ত নয়। কুরতুবী (রঃ) এতে বারোটি উক্তি নকল করেছেন। যেমন সৎ লোকগণ, নবীগণ, ফেরেশতাগণ ইত্যাদি। আ'রাফবাসীরা জান্নাতীদেরকে তাদের চেহারার ঔজ্জ্বল্য ও শুভ্রতা দেখে চিনে নেবে। আর জাহান্নামীদেরকে চিনে নেবে তাদের কালিমাময় চেহারা দেখে।হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে এই মর্যাদা এ জন্যেই দিয়েছেন যেন তারা জানতে পারে যে জান্নাতী কারা এবং জাহান্নামী কারা। তারা জাহান্নামীদেরকে তাদের মলিন ও কালিমাময় চেহারা দেখে চিনতে পারবে এবং আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে বলবে- হে আল্লাহ! আমাদেরকে এই অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। ঐ অবস্থাতেই তারা জান্নাতবাসীদেরকে সালাম জানাবে। তারা নিজেরা তখন পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করেনি বটে, কিন্তু তারা জান্নাতে প্রবেশ লাভের আশা রাখে এবং ইনশাআল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই লোভ ও আশা তাদের অন্তরে শুধু সেই দয়া ও অনুগ্রহের কারণে রয়েছে যা আল্লাহ তাদের অবস্থার উপর যুক্ত রেখেছেন। আর তারা যে আশা রাখবে তা আল্লাহ তাদেরকে জ্ঞাত করেও দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি বলেছেনঃ “তারা জাহান্নামবাসীদেরকে দেখে বলবে- হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অবস্থা থেকে রক্ষা করুন!” ইকরাম (রঃ) বলেন যে, আরাফবাসীরা যখন জাহান্নামবাসীদের দিকে চেয়ে দেখবে তখন তাদের চেহারা ঝলসে উঠবে। অতঃপর যখন। জান্নাতবাসীদের দিকে তাকাবে তখন তাদের ঐ অবস্থা দূরীভূত হয়ে যাবে।

আল-আরাফ 7:48

৪৮-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে সেই তিরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যা আ'রাফবাসীরা কিয়ামতের দিন মুশরিকদের নেতৃবর্গকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত দেখে করবে। তারা তাদেরকে সম্বোধন করে বলবে- “আজকে তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোন উপকারে আসলো না এবং তোমাদের গর্ব-অহংকার ও দুষ্টামি আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে তোমাদের কোনই উপকার করলো না। তোমরা আজ শাস্তির শিকার হয়ে গেলে।” এই মুশরিকরাই আ'রাফবাসীদের সম্বন্ধে শপথ করে বলতো যে, তারা কখনো আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করবে না। এখন আল্লাহ তা'আলা আ'রাফবাসীদেরকে বলবেন- যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমাদের কোন ভয়ও নেই এবং তোমরা দুঃখিত ও চিন্তিতও হবে না।হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, আ'রাফবাসী হচ্ছে ঐসব লোক যাদের আমল সমান সমান। অর্থাৎ এতোটা নয় যে, জান্নাতে যেতে পারে এবং এরূপও নয় যে, জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। সুতরাং তারা আ'রাফের মধ্যে থেকে জাহান্নামবাসী ও জান্নাতবাসীকে তাদের চেহারা দেখেই চিনে নেবে। কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত বান্দার ফায়সালা হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা শাফাআত করার অনুমতি প্রদান করবেন। লোকেরা হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে- আপনি আমাদের পিতা। সুতরাং আপনি আল্লাহ পাকের নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশ করুন!' তিনি বলবেনঃ “তোমরা কি জান যে, আল্লাহ আমাকে ছাড়া আর কাউকেও স্বহস্তে বানিয়েছেন এবং ওর মধ্যে স্বীয় বিশেষ রূহ্ কুঁকে দিয়েছেন? আর তোমরা এটাও কি জান যে, ফেরেশতারা আমাকে ছাড়া আর কাউকেও সিজদাহ করেছেন?” জনগণ উত্তরে বলবে না।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “কিন্তু আমিও আল্লাহর সত্তার রহস্য সম্পর্কে অবহিত নই। আমার তো সুপারিশ করার ক্ষমতা নেই। তোমরা আমার সন্তান হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও।” জনগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং তাঁকে সুপারিশ করার আবেদন জানাবে। তিনি বলবেনঃ “আল্লাহ আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি স্বীয় খলীল (দোস্ত) বলে ঘোষণা করেছেন? আর আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি তার কওম অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছে?” লোকেরা বলবেঃ না।' তিনি বলবেনঃ “আমি শাফাআত করতে পারছি না। আমি আল্লাহর রহস্য অবগত নই। তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও।” হযরত মূসা (আঃ) বলবেনঃ “আমাকে ছাড়া আল্লাহ আর কারো সাথে সরাসরি কথা বলেননি। তথাপি আমিও আল্লাহর হাকীকত সম্পর্কে জ্ঞান রাখি না। তোমরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও।” হযরত ঈসা (আঃ) বলবেনঃ “আল্লাহ আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছেন? আমি ছাড়া অন্য কেউ কি কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে পেরেছে, যার কোন চিকিৎসা নেই? আর আমি ছাড়া অন্য কেউ কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম হয়েছে?” জনগণ উত্তরে বলবে না।' তিনি বলবেনঃ “আমিও কিন্তু আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ। আমি আমার নিজের চিন্তাতেই ব্যস্ত। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাও।” (রাসূলুল্লাহ সঃ বলেন) জনগণ তখন আমার কাছে আসবে। আমি তখন বুকে হাত মেরে বলবো- হ্যা, আমি তোমাদের জন্যে সুপারিশ করবো। তারপর আমি আল্লাহর আরশের সামনে দাঁড়াবো। সেই সময় আল্লাহ পাকের প্রশংসায় আমার মুখ এমনভাবে খুলে যাবে যে, এরূপ প্রশংসা তোমরা কখনও শুননি। অতঃপর আমি সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মাথা উঠাও। কি চাও, বল। শাফাআত করলে তোমার শাফাআত কবুল করা। হবে।” আমি তখন মাথা উঠিয়ে পুনরায় আল্লাহ পাকের গুণকীর্তন করবো। এরপর আবার সিজদায় পড়ে যাবো। আবার বলা হবে- “মাথা উঠাও এবং আবেদন পেশ কর।” আমি তখন মাথা উঠিয়ে আরয করবোঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মতকে ক্ষমা করে দিন । আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হ্যা ক্ষমা করে দিলাম।” এই অবস্থা দেখে এমন কোন প্রেরিত রাসূল এবং কোন ফেরেশতা থাকবেন না যিনি হিংসা করবেন না। এটাই হচ্ছে মাকামে মাহমুদ।তারপর আমি সমস্ত উম্মতকে নিয়ে জান্নাতের দিকে পা বাড়াবো। আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে যাবে। এরপর এই সমস্ত উম্মতকে নাহরে হায়াত' নামক নদীতে নিয়ে যাওয়া হবে, যার উভয় তীর মনিমুক্তা ও হীরা জহরত দ্বারা বাঁধানো থাকবে। ওর মাটি হবে মিক এবং ওর পাথর হবে ইয়াকূত। এ লোকগুলো ঐ নদীতে গোসল করবে এবং তাদের দেহের রং জান্নাতীদের মত হয়ে যাবে। আর তাদের দেহ থেকে জান্নাতীদের সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়বে। তাদেরকে দেখে মনে হবে। যেন তারা উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু তাদের বক্ষের উপর উজ্জ্বল চিহ্ন থাকবে, যা দ্বারা তাদেরকে চেনা যাবে। তাদেরকে মাসাকীনে আহলিল জান্নাহ’ বলা হবে।

আল-আরাফ 7:49

৪৮-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে সেই তিরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন যা আ'রাফবাসীরা কিয়ামতের দিন মুশরিকদের নেতৃবর্গকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত দেখে করবে। তারা তাদেরকে সম্বোধন করে বলবে- “আজকে তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোন উপকারে আসলো না এবং তোমাদের গর্ব-অহংকার ও দুষ্টামি আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে তোমাদের কোনই উপকার করলো না। তোমরা আজ শাস্তির শিকার হয়ে গেলে।” এই মুশরিকরাই আ'রাফবাসীদের সম্বন্ধে শপথ করে বলতো যে, তারা কখনো আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করবে না। এখন আল্লাহ তা'আলা আ'রাফবাসীদেরকে বলবেন- যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমাদের কোন ভয়ও নেই এবং তোমরা দুঃখিত ও চিন্তিতও হবে না।হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, আ'রাফবাসী হচ্ছে ঐসব লোক যাদের আমল সমান সমান। অর্থাৎ এতোটা নয় যে, জান্নাতে যেতে পারে এবং এরূপও নয় যে, জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। সুতরাং তারা আ'রাফের মধ্যে থেকে জাহান্নামবাসী ও জান্নাতবাসীকে তাদের চেহারা দেখেই চিনে নেবে। কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত বান্দার ফায়সালা হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা শাফাআত করার অনুমতি প্রদান করবেন। লোকেরা হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে- আপনি আমাদের পিতা। সুতরাং আপনি আল্লাহ পাকের নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশ করুন!' তিনি বলবেনঃ “তোমরা কি জান যে, আল্লাহ আমাকে ছাড়া আর কাউকেও স্বহস্তে বানিয়েছেন এবং ওর মধ্যে স্বীয় বিশেষ রূহ্ কুঁকে দিয়েছেন? আর তোমরা এটাও কি জান যে, ফেরেশতারা আমাকে ছাড়া আর কাউকেও সিজদাহ করেছেন?” জনগণ উত্তরে বলবে না।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “কিন্তু আমিও আল্লাহর সত্তার রহস্য সম্পর্কে অবহিত নই। আমার তো সুপারিশ করার ক্ষমতা নেই। তোমরা আমার সন্তান হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও।” জনগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং তাঁকে সুপারিশ করার আবেদন জানাবে। তিনি বলবেনঃ “আল্লাহ আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি স্বীয় খলীল (দোস্ত) বলে ঘোষণা করেছেন? আর আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি তার কওম অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছে?” লোকেরা বলবেঃ না।' তিনি বলবেনঃ “আমি শাফাআত করতে পারছি না। আমি আল্লাহর রহস্য অবগত নই। তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও।” হযরত মূসা (আঃ) বলবেনঃ “আমাকে ছাড়া আল্লাহ আর কারো সাথে সরাসরি কথা বলেননি। তথাপি আমিও আল্লাহর হাকীকত সম্পর্কে জ্ঞান রাখি না। তোমরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও।” হযরত ঈসা (আঃ) বলবেনঃ “আল্লাহ আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কি বিনা বাপে সৃষ্টি করেছেন? আমি ছাড়া অন্য কেউ কি কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে পেরেছে, যার কোন চিকিৎসা নেই? আর আমি ছাড়া অন্য কেউ কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম হয়েছে?” জনগণ উত্তরে বলবে না।' তিনি বলবেনঃ “আমিও কিন্তু আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ। আমি আমার নিজের চিন্তাতেই ব্যস্ত। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাও।” (রাসূলুল্লাহ সঃ বলেন) জনগণ তখন আমার কাছে আসবে। আমি তখন বুকে হাত মেরে বলবো- হ্যা, আমি তোমাদের জন্যে সুপারিশ করবো। তারপর আমি আল্লাহর আরশের সামনে দাঁড়াবো। সেই সময় আল্লাহ পাকের প্রশংসায় আমার মুখ এমনভাবে খুলে যাবে যে, এরূপ প্রশংসা তোমরা কখনও শুননি। অতঃপর আমি সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মাথা উঠাও। কি চাও, বল। শাফাআত করলে তোমার শাফাআত কবুল করা। হবে।” আমি তখন মাথা উঠিয়ে পুনরায় আল্লাহ পাকের গুণকীর্তন করবো। এরপর আবার সিজদায় পড়ে যাবো। আবার বলা হবে- “মাথা উঠাও এবং আবেদন পেশ কর।” আমি তখন মাথা উঠিয়ে আরয করবোঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মতকে ক্ষমা করে দিন । আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হ্যা ক্ষমা করে দিলাম।” এই অবস্থা দেখে এমন কোন প্রেরিত রাসূল এবং কোন ফেরেশতা থাকবেন না যিনি হিংসা করবেন না। এটাই হচ্ছে মাকামে মাহমুদ।তারপর আমি সমস্ত উম্মতকে নিয়ে জান্নাতের দিকে পা বাড়াবো। আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে যাবে। এরপর এই সমস্ত উম্মতকে নাহরে হায়াত' নামক নদীতে নিয়ে যাওয়া হবে, যার উভয় তীর মনিমুক্তা ও হীরা জহরত দ্বারা বাঁধানো থাকবে। ওর মাটি হবে মিক এবং ওর পাথর হবে ইয়াকূত। এ লোকগুলো ঐ নদীতে গোসল করবে এবং তাদের দেহের রং জান্নাতীদের মত হয়ে যাবে। আর তাদের দেহ থেকে জান্নাতীদের সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়বে। তাদেরকে দেখে মনে হবে। যেন তারা উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু তাদের বক্ষের উপর উজ্জ্বল চিহ্ন থাকবে, যা দ্বারা তাদেরকে চেনা যাবে। তাদেরকে মাসাকীনে আহলিল জান্নাহ’ বলা হবে।

আল-আরাফ 7:50

৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: জাহান্নামীদের লাঞ্ছনা এবং কিভাবে তারা জান্নাতবাসীদের নিকট খাদ্য ও পানীয় চাইবে আল্লাহ তাআলা এখানে তারই বর্ণনা দিচ্ছেন; জান্নাতীরা। তাদেরকে কিছুই দেবে না। ইরশাদ হচ্ছে- জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে বলবে, তোমাদের খাদ্য ও পানীয় আমাদেরকেও কিছু প্রদান কর। পুত্র পিতার নিকট এবং ভাই ভাই-এর নিকট চাইবে এবং বলবে, আমি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছি, সুতরাং আমাকে অল্পকিছু পানি দাও। কিন্তু তারা এই জবাবই দেবে-আল্লাহ এ দুটো জিনিস কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। আবু মূসা সাফফার (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, উত্তম সাদকা কোনটি? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বোত্তম সদকা হচ্ছে পানি। তোমরা কি শুননি যে, জাহান্নামবাসী জান্নাতবাসীর কাছে পানি ও খাদ্য চাইবে?” আবু সালিহ্ হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন জনগণ তাকে বলে-“আপনি আপনার ভ্রাতুস্পুত্রকে বলে পাঠান যে, তিনি যেন একটি জান্নাতী আঙ্গুরগুচ্ছ নিয়ে আসেন, হয়তো এর বরকতে আপনি আরোগ্য লাভ করবেন।” তখন তার দূত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আগমন করেন। সেই সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের উপর জান্নাতের প্রত্যেকটা জিনিস হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ কাফিররা কিভাবে দুনিয়ায় মাযহাব ও দ্বীনকে খেল-তামাসার বস্তুতে পরিণত করেছে এবং দুনিয়ার মধ্যে কিভাবে ভুলের মধ্যে পড়ে রয়েছে, আর কিরূপেই বা দুনিয়ার শোভা ও সৌন্দর্যের মধ্যে নিমগ্ন রয়েছে! কেমন করে তারা আখিরাতের পণ্য ক্রয় করা থেকে উদাসীন রয়েছে!এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আজকে আমি তাদেরকে তেমনিভাবে ভুলে থাকবো যেমনিভাবে তারা এই দিনের সাক্ষাতের কথা ভুলে গিয়েছিল। এই ভুলে যাওয়া শব্দটি পরস্পর আদান প্রদান ও বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে। নতুবা আল্লাহ তা'আলা কখনো কাউকেও ভুলে থাকতে পারেন না। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেন, (আরবী) (২০:৫২) এখানে উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পাল্টা ভাবের কথা বলা। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল, সুতরাং তিনিও তাদেরকে ভুলে গেছেন।” (৯:৬৭) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তোমার কাছে আমার নিদর্শনসমূহ এসে ছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে, দ্রুপ আজকে তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো। (১২৬:২০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেমন তোমরা তোমাদের এদিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে দ্রুপ আমিও তোমাদেরকে আজকে ভুলে গেলাম।” (৫১:৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাদের কল্যাণ করা ভুলে গেছেন, কিন্তু তাদেরকে শাস্তি দিতে ভুলেননি।হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বান্দাদেরকে বলবেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে প্রদান করিনি এবং তোমাদেরকে কি পুরস্কৃত করিনি? তোমাদেরকে কি আমি উট, ঘোড়া, হাতী ও সজি-সরঞ্জাম প্রদান। করেছিলাম না? তোমরা কি দুনিয়ায় নেতৃত্ব দিতে না?” বান্দা উত্তরে বলবেঃ “হে আল্লাহ! হ্যা, আপনি আমাদেরকে সবকিছুই প্রদান করেছিলেন। আল্লাহ পুনরায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “আমার সামনে তোমাদেরকে হাজির হতে হবে এটা কি তোমাদের বিশ্বাস ছিল?" তারা বলবেনঃ “হে আল্লাহ! না, আমাদের এটার প্রতি বিশ্বাস ছিল না। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেনঃ “তোমরা যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে তেমনি আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে গেলাম।”

আল-আরাফ 7:51

৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: জাহান্নামীদের লাঞ্ছনা এবং কিভাবে তারা জান্নাতবাসীদের নিকট খাদ্য ও পানীয় চাইবে আল্লাহ তাআলা এখানে তারই বর্ণনা দিচ্ছেন; জান্নাতীরা। তাদেরকে কিছুই দেবে না। ইরশাদ হচ্ছে- জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে বলবে, তোমাদের খাদ্য ও পানীয় আমাদেরকেও কিছু প্রদান কর। পুত্র পিতার নিকট এবং ভাই ভাই-এর নিকট চাইবে এবং বলবে, আমি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছি, সুতরাং আমাকে অল্পকিছু পানি দাও। কিন্তু তারা এই জবাবই দেবে-আল্লাহ এ দুটো জিনিস কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। আবু মূসা সাফফার (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, উত্তম সাদকা কোনটি? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বোত্তম সদকা হচ্ছে পানি। তোমরা কি শুননি যে, জাহান্নামবাসী জান্নাতবাসীর কাছে পানি ও খাদ্য চাইবে?” আবু সালিহ্ হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন জনগণ তাকে বলে-“আপনি আপনার ভ্রাতুস্পুত্রকে বলে পাঠান যে, তিনি যেন একটি জান্নাতী আঙ্গুরগুচ্ছ নিয়ে আসেন, হয়তো এর বরকতে আপনি আরোগ্য লাভ করবেন।” তখন তার দূত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আগমন করেন। সেই সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের উপর জান্নাতের প্রত্যেকটা জিনিস হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ কাফিররা কিভাবে দুনিয়ায় মাযহাব ও দ্বীনকে খেল-তামাসার বস্তুতে পরিণত করেছে এবং দুনিয়ার মধ্যে কিভাবে ভুলের মধ্যে পড়ে রয়েছে, আর কিরূপেই বা দুনিয়ার শোভা ও সৌন্দর্যের মধ্যে নিমগ্ন রয়েছে! কেমন করে তারা আখিরাতের পণ্য ক্রয় করা থেকে উদাসীন রয়েছে!এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আজকে আমি তাদেরকে তেমনিভাবে ভুলে থাকবো যেমনিভাবে তারা এই দিনের সাক্ষাতের কথা ভুলে গিয়েছিল। এই ভুলে যাওয়া শব্দটি পরস্পর আদান প্রদান ও বিনিময় হিসেবে বলা হয়েছে। নতুবা আল্লাহ তা'আলা কখনো কাউকেও ভুলে থাকতে পারেন না। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেন, (আরবী) (২০:৫২) এখানে উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পাল্টা ভাবের কথা বলা। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল, সুতরাং তিনিও তাদেরকে ভুলে গেছেন।” (৯:৬৭) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তোমার কাছে আমার নিদর্শনসমূহ এসে ছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে, দ্রুপ আজকে তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো। (১২৬:২০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেমন তোমরা তোমাদের এদিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে দ্রুপ আমিও তোমাদেরকে আজকে ভুলে গেলাম।” (৫১:৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাদের কল্যাণ করা ভুলে গেছেন, কিন্তু তাদেরকে শাস্তি দিতে ভুলেননি।হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বান্দাদেরকে বলবেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে প্রদান করিনি এবং তোমাদেরকে কি পুরস্কৃত করিনি? তোমাদেরকে কি আমি উট, ঘোড়া, হাতী ও সজি-সরঞ্জাম প্রদান। করেছিলাম না? তোমরা কি দুনিয়ায় নেতৃত্ব দিতে না?” বান্দা উত্তরে বলবেঃ “হে আল্লাহ! হ্যা, আপনি আমাদেরকে সবকিছুই প্রদান করেছিলেন। আল্লাহ পুনরায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “আমার সামনে তোমাদেরকে হাজির হতে হবে এটা কি তোমাদের বিশ্বাস ছিল?" তারা বলবেনঃ “হে আল্লাহ! না, আমাদের এটার প্রতি বিশ্বাস ছিল না। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেনঃ “তোমরা যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে তেমনি আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে গেলাম।”

আল-আরাফ 7:52

৫২-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের উপর দলীল পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি পয়গম্বর প্রেরণ করেছিলেন এবং কিতাবসমূহ পাঠিয়েছিলেন। যেগুলোর মধ্যে স্পষ্ট দলীলসমূহ বিদ্যমান ছিল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এমন কিতাব যার আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্মবিশিষ্ট এবং প্রত্যেক কথাকে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। (১১:১) আর তার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যে যে বিষয়গুলোর উপর আমি আলোকপাত করেছি সেগুলো সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত আছি। যেমন অন্য জায়গায় তিনি (আরবী) বলেছেন।ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তির সাথে সম্পর্ক রাখেঃ (আরবী) এই কিতাব যা তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে তোমার অন্তরে যেন কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয়।' (৭:২) আর এটা উপরোক্ত (আরবী) -এই আয়াতের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথাটি আপত্তি মূলক। কেননা এ দু'টি আয়াতের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে। তাছাড়া তাঁর এ দাবীর উপর কোন দলীলও নেই। এখানে কথা তো শুধু এটাই যে, তারা আখিরাতে কিরূপ ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই খবর দেয়ার পর এটা তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দুনিয়ায় রাসূল পাঠিয়ে ও কিতাব অবতীর্ণ করে তাদের সমুদয় ওযরের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি শাস্তি প্রদানকারী নই যে পর্যন্ত না রাসূল প্রেরণ করি।” (১৭:১৫) এ জন্যেই উপরোক্ত আয়াতে তিনি বলেছেনঃ অর্থাৎ তারা তো শুধু ঐ শাস্তির এবং জান্নাত বা জাহান্নামের অপেক্ষায় রয়েছে। যার অঙ্গীকার তাদের সাথে করা হয়েছে।মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, (আরবী) দ্বারা বিনিময় ও প্রতিদান বুঝানো হয়েছে। রাবী (রঃ) বলেন যে, হিসাবের দিনের আগমন পর্যন্ত এই প্রতিদান তারা পেতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। ঐ সময় বিনিময় আদান প্রদান শেষ হয়ে যাবে। যখন কিয়ামতের এই অবস্থা হবে তখন যেসব লোক দুনিয়ায় আমল পরিত্যাগ করেছিল তারা বলবে- আল্লাহর রাসূলগণ তো সত্য বাণী নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু এখন তারা কি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন বা অন্ততঃপক্ষে আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করা হবে? তাহলে আমরা আর আমাদের পূর্বের ঐ আমল করবো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! যদি তুমি ঐ দৃশ্য দেখতে যখন পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যে জাহান্নামের মুখে দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে-হায়! যদি আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে আমরা কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম না এবং মুমিন হয়েই থাকতাম। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, পূর্ব থেকেই কোন্ কথাটি তাদের অন্তরে লুক্কায়িত ছিল তা তারা জেনে ফেলেছে। আর যদি তাদেরকে পূনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে তখনও তারা সেখানে ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হবে। আমরা এরূপ কাজ আর করবো না’ তাদের একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যেমন এখানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ নিঃসন্দেহে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছে। এখন তো জাহান্নামে তাদের চিরস্থায়ী বাসের পালা এসেছে। তাদের মূর্তি তাদের জন্যে সুপারিশ করতে পারে না এবং তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্তি দিতেও সক্ষম নয়।

আল-আরাফ 7:53

৫২-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের উপর দলীল পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি পয়গম্বর প্রেরণ করেছিলেন এবং কিতাবসমূহ পাঠিয়েছিলেন। যেগুলোর মধ্যে স্পষ্ট দলীলসমূহ বিদ্যমান ছিল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এমন কিতাব যার আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্মবিশিষ্ট এবং প্রত্যেক কথাকে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। (১১:১) আর তার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যে যে বিষয়গুলোর উপর আমি আলোকপাত করেছি সেগুলো সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত আছি। যেমন অন্য জায়গায় তিনি (আরবী) বলেছেন।ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তির সাথে সম্পর্ক রাখেঃ (আরবী) এই কিতাব যা তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে তোমার অন্তরে যেন কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয়।' (৭:২) আর এটা উপরোক্ত (আরবী) -এই আয়াতের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। ইবনে জারীর (রঃ)-এর একথাটি আপত্তি মূলক। কেননা এ দু'টি আয়াতের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে। তাছাড়া তাঁর এ দাবীর উপর কোন দলীলও নেই। এখানে কথা তো শুধু এটাই যে, তারা আখিরাতে কিরূপ ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই খবর দেয়ার পর এটা তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দুনিয়ায় রাসূল পাঠিয়ে ও কিতাব অবতীর্ণ করে তাদের সমুদয় ওযরের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি শাস্তি প্রদানকারী নই যে পর্যন্ত না রাসূল প্রেরণ করি।” (১৭:১৫) এ জন্যেই উপরোক্ত আয়াতে তিনি বলেছেনঃ অর্থাৎ তারা তো শুধু ঐ শাস্তির এবং জান্নাত বা জাহান্নামের অপেক্ষায় রয়েছে। যার অঙ্গীকার তাদের সাথে করা হয়েছে।মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, (আরবী) দ্বারা বিনিময় ও প্রতিদান বুঝানো হয়েছে। রাবী (রঃ) বলেন যে, হিসাবের দিনের আগমন পর্যন্ত এই প্রতিদান তারা পেতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। ঐ সময় বিনিময় আদান প্রদান শেষ হয়ে যাবে। যখন কিয়ামতের এই অবস্থা হবে তখন যেসব লোক দুনিয়ায় আমল পরিত্যাগ করেছিল তারা বলবে- আল্লাহর রাসূলগণ তো সত্য বাণী নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু এখন তারা কি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন বা অন্ততঃপক্ষে আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করা হবে? তাহলে আমরা আর আমাদের পূর্বের ঐ আমল করবো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! যদি তুমি ঐ দৃশ্য দেখতে যখন পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যে জাহান্নামের মুখে দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে-হায়! যদি আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে আমরা কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম না এবং মুমিন হয়েই থাকতাম। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, পূর্ব থেকেই কোন্ কথাটি তাদের অন্তরে লুক্কায়িত ছিল তা তারা জেনে ফেলেছে। আর যদি তাদেরকে পূনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে তখনও তারা সেখানে ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হবে। আমরা এরূপ কাজ আর করবো না’ তাদের একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যেমন এখানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ নিঃসন্দেহে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছে। এখন তো জাহান্নামে তাদের চিরস্থায়ী বাসের পালা এসেছে। তাদের মূর্তি তাদের জন্যে সুপারিশ করতে পারে না এবং তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্তি দিতেও সক্ষম নয়।

আল-আরাফ 7:54

এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা। আসমান ও যমীনকে তিনি ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। যার বর্ণনা কোরআন কারীমের কয়েক জায়গায় এসেছে। ঐ ছয়দিন হচ্ছে রবিবার। সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। শুক্রবারেই সমস্ত মাখলুক একত্রিত হয়। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। দিনগুলো এই দিনের মতই ছিল কি এক হাজার বছর বিশিষ্ট দিনগুলো ছিল এ ব্যাপারেও মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর ধারণা মতে দিনগুলো ছিল হাজার বছর বিশিষ্ট দিন। এখন থাকলো শনিবার । ঐদিনে কিছু সৃষ্টি করা হয়নি। ঐদিন সৃষ্টিকার্য বন্ধ ছিল। একারণেই ঐ সপ্তম দিন অর্থাৎ শনিবারের দিনকে (আরবী) বলা হয়। আর (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কাতা' বা কর্তন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে রয়েছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা শনিবারে সৃষ্টি করেন যমীন, রবিবারে সৃষ্টি করেন পাহাড়-পর্বত, সোমবারে সৃষ্টি করেন বৃক্ষরাজী, মন্দ ও অপছন্দনীয় জিনিসগুলো সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে, বুধবারে সৃষ্টি করেন আলো, সমস্ত জীব-জন্তু সৃষ্টি করেন বৃহস্পতিবার এবং হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন শুক্রবারের শেষভাগে আসর ও মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে।” এ হাদীস দ্বারা সপ্তম দিনেও ব্যস্ত থাকা সাব্যস্ত হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ব্যস্ততার দিনের সংখ্যা ছিল ছয়। এজন্যে বুখারী (রঃ) প্রমুখ মনীষী এ হাদীসের সঠিকতার ব্যাপারে সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে, সম্ভবতঃ আবু হুরাইরা (রাঃ) এটা কা'ব আহবার থেকে শুনেই বলেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক অবগত।এই ছয়দিনের ব্যস্ততার পর আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমাসীন হন। এ স্থানে লোকেরা বহু মতামত পেশ করেছেন এবং বহু জল্পনা-কল্পনা করেছেন। এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ এখানে নেই। এ ব্যাপারে আমরা শুধুমাত্র পূর্ববর্তী গুরুজনদের মাযহাব অবলম্বন করেছি। তারা হচ্ছেন মালিক (রঃ), আওযায়ী (রঃ)-সাওরী (রঃ), লায়েস ইবনে সা'দ (রঃ), শাফিঈ (রঃ), আহমাদ (রঃ) ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রঃ) ইত্যাদি এবং নবীন ও প্রবীণ মুসলিম ইমামগণ । আর ঐ মাযহাব হচ্ছে এই যে, কোন অবস্থা ও সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়াই ওটার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। কোন জল্পনা-কল্পনা করাও চলবে না যার দ্বারা সাদৃশ্যের আকীদা মস্তিষ্কে এসে যায় এবং এটা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী হতে বহু দূরে। মোটকথা, যা কিছু আল্লাহ তাআলা বলেছেন ওটাকে কোন খেয়াল ও সন্দেহ ছাড়াই মেনে নিতে হবে এবং কোন -চুল চেরা করা চলবে না। কেননা, আল্লাহ পাক কোন বস্তুর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত নন। তিনি হচ্ছেন শ্রোতা ও দ্রষ্টা। যেমন মুজতাহিদ বা চিন্তাবিদগণ বলেছেন। এঁদের মধ্যে নাঈম ইবনে হাম্মাদ আল খুযায়ীও (রঃ) রয়েছেন, যিনি হচ্ছেন ইমাম বুখারীর (রঃ) উস্তাদ। তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে কোন মাখলুকের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত করে সে কুফরীর দোষে দোষী হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেসব গুণে ভূষিত করেছেন তা যে ব্যক্তি অস্বীকার করে সে কাফির হয়ে যায়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) যেসব গুণে তাঁকে ভূষিত করেননি সেসব গুণে তাঁকে ভূষিত করাই হচ্ছে তার সাদৃশ্য স্থাপন করা। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে ঐ সব গুণ সাব্যস্ত করে যা স্পষ্টরূপে তার আয়াতসমূহের মধ্যে ও বিশুদ্ধ হাদীসগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে এবং যদদ্বারা তার মহিমা প্রকাশ পেয়েছে ও তাঁর সত্তাকে সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত করেছে, সেই ব্যক্তিই সঠিক খেয়ালের উপর রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন অর্থাৎ রাত্রির অন্ধকারকে দিনের আলো দ্বারা এবং দিনের আলোকে রাত্রির অন্ধকার দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। এই দিন রাত্রির প্রত্যেকটি অপরটিকে খুবই ত্বড়িত গতিতে পেয়ে যায়। অর্থাৎ একটি শেষ হতে শুরু করলে অপরটি তুড়িত গতিতে এসে পড়ে এবং একটি বিদায় নিলে অপরটি তৎক্ষণাৎ এসে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাত্রিও তাদের জন্যে একটি নিদর্শন, আমি ওটা হতে দিনকে অপসারণ করি, আর তৎক্ষণাৎ তারা অন্ধকারে থেকে যায়। আর সূর্য ওর নির্দিষ্ট কক্ষে ভ্রমণ করে চলছে, ওটা তাঁরই নির্ধারিত পরিমাণ যিনি মহাপরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। আর (অন্যতম নিদর্শন) চন্দ্রের জন্যে আমি মনযিলসমূহ নির্ণীত করে রেখেছি। (এবং চন্দ্র ওটা অতিক্রম করছে) এমন কি ওটা (অতিক্রম শেষে ক্ষীণ হয়ে) এরূপ হয়ে যায় যে, যেন খেজুরের পুরাতন শাখা । সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে গিয়ে ধরবে আর না রাত্রি দিবসের পূর্বে আসতে পারবে এবং প্রত্যেকে এক একটি চক্রের মধ্যে সন্তরণ করছে।” (৩৭:৪০) এজন্যেই আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। কেউ কেউ (আরবী) এবং (আরবী) কে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন এবং কেউ কেউ পড়েছেন (আরবী) দিয়ে । উভয় অবস্থাতেই অর্থ একই হবে। অর্থাৎ সমস্ত কিছুই তার পরিচালনাধীন এবং ইচ্ছাধীন। এ জন্যেই তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ জেনে রেখো যে, সৃষ্টির একমাত্র কর্তা তিনিই এবং হুকুমের একমাত্র মালিক ও তিনিই (আরবী) অর্থাৎ ‘বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ হচ্ছেন বরকতময়।' যেমনঃ (আরবী) (২৫:৬১) বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সৎ আমল করে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না, বরং নিজের প্রশংসা করলো সে কুফরী করলো। তার আমল ছিনিয়ে নেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, আল্লাহ তা'আলা নিজের কোন হুকুমত বা কোন ক্ষমতা বান্দার কাছে হস্তান্তর করেছেন সেও কুফরী করেছে। কেননা, আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জেনে রেখো যে, সৃষ্টির একমাত্র কর্তা তিনিই এবং একমাত্র হুকুমের মালিকও তিনিই। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ হলেন বরকমত।।" দুআয়ে মাসূরায় নিম্নলিখিতভাবে দুআ করার কথা বলা হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! সমুদয় রাজ্য ও রাজত্ব আপনারই। সমুদয় প্রশংসা আপনারই জন্যে। সমস্ত বিষয় আপনারই কাছে প্রত্যাবর্তন করে। আমি আপনার কাছে সমস্ত কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং সমুদয় অকল্যাণ হতে আশ্রয় চাচ্ছি।”

আল-আরাফ 7:55

৫৫-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে প্রার্থনা করার নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিচ্ছেন যা তাদের জন্যে দ্বীন ও দুনিয়ায় মুক্তি লাভের কারণ। তিনি বলেনঃ তোমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ও সংগোপনে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর। যেমন তিনি বলেনঃ ‘প্রভুকে স্বীয় অন্তরে স্মরণ কর।' জনগণ উচ্চ স্বরে প্রার্থনা করতে শুরু করে দিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের নফসের উপর দয়া কর । তোমরা কোন বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না। তোমরা যার নিকট প্রার্থনা করছো তিনি নিকটেই রয়েছেন এবং সবকিছু শুনছেন।” অত্যন্ত কাকুতি মিনতি এবং অনুনয় বিনয়ের সাথে দুআ করবে। খুবই নত হয়ে সংগোপনে প্রার্থনা জানাবে এবং আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে। বাগাড়ম্বর করে উচ্চ স্বরে দুআ করা উচিত নয়। বিয়াকারী থেকে বাঁচবার জন্যে পূর্বকালের লোকেরা কুরআনের হাফিয হওয়া সত্ত্বেও জনগণ ঘুণাক্ষরেও তাঁদের হাফিয হওয়ার কথা জানতে পারতো না। তারা রাত্রে নিজ নিজ ঘরে দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়তেন এবং তাঁদের ঘরে মেহমান থাকতো, অথচ তারা তাঁদের নামাযের টেরই পেতো না। কিন্তু আজকাল আমরা এ ধরনের লোক দেখতে পাই যে, সংগোপনে ইবাদত করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা সদা-সর্বদা প্রকাশ্যভাবে ইবাদত করে থাকে। পূর্ব যুগের মুসলমানরা যখন দুআ করতেন তখন শুধু ফিফিস শব্দ ছাড়া তাদের মুখ থেকে কোন শব্দ শোনা যেতো না। কেননা আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা বিনীতভাবে ও সংগোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাকো।" আল্লাহ পাক তাঁর এক মনোনীত বান্দার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন সে স্বীয় প্রভুকে ডাকতো তখন খুবই উচ্চ স্বরে ডাকতো। শব্দকে উচ্চ করা অত্যন্ত অপছন্দনীয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর তাফসীরে বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- প্রার্থনায় সীমালংঘনকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন না। আবু মুজলি (রঃ) বলেনঃ “তোমরা নবীদের পদ মর্যাদা লাভ করার জন্যে দুআ করো না।সা'দ (রঃ) স্বীয় পুত্রকে দেখেন যে, সে প্রার্থনা করছেঃ “হে আল্লাহ! আমি জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামতরাজি এবং তথাকার রেশমী বস্ত্রের জন্যে প্রার্থনা করছি, আর জাহান্নাম হতে, জাহান্নামের শৃংখল ও বেড়ি হতে আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন তিনি পুত্রকে বলেনঃ হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“নিকটবর্তী যামানায় এমন লোক সৃষ্ট হবে যারা প্রার্থনা করতে গিয়ে সীমালংঘন করবে এবং অযু করার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। হে আমার পুত্র! তোমার জন্যে তো শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট, “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত এবং জান্নাতের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজের জন্যে প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নাম হতে ও জাহান্নামের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজ হতে আশ্রয় চাচ্ছি।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রঃ) স্বীয় পুত্রকে দেখেন যে, সে দুআ করছে- “হে আল্লাহ! আমি জান্নাতের ডান দিকের সাদা প্রাসাদটি যাঙ্ক্ষা করছি।” তখন তিনি পুত্রকে বলেনঃ “হে বৎস! আল্লাহর কাছে শুধু জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা কর এবং শুধু জাহান্নাম হতে আশ্রয় চাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ইসনাদ উত্তম)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ দুনিয়ায় শান্তি শৃংখলা স্থাপনের পর ওতে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করো না। কেননা, শান্তি ও নিরাপত্তার পরে ফাসাদ বিশৃংখলা অত্যন্ত খারাপ। কারণ, কাজ-কারবার যখন শান্ত পরিবেশে চলতে থাকে তখন যদি বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হয় তবে বান্দা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা। (আরবী) কথাটি যোগ করেছেন। আর তিনি বিনয়ের সাথে দুআ করতে বলেছেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ শাস্তির ভয় করে এবং নিয়ামত ও সাওয়াবের আশা রেখে তোমরা প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের অতি সন্নিকটে। অর্থাৎ তাঁর রহমত সৎ লোকদের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা হচ্ছে ঐসব লোক যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী মান্য করে চলে এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার রহমত প্রত্যেক জিনিসকে ধারণ করে রয়েছে। (৭:১৫৬) মহান আল্লাহ (আরবী) বলেছেন, (আরবী) বলেননি। অথচ (আরবী) শব্দটি বা (আরবী) স্ত্রীলিঙ্গ। সুতরাং (আরবী) টিও স্ত্রীলিঙ্গ হওয়া উচিত ছিল। এটাকে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করার কারণ এই যে, (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) -এর অর্থে নিয়ে (আরবী) হিসেবে পুংলিঙ্গ ধরা হয়েছে। অথবা এও হতে পারে যে, আল্লাহ পাকের সত্তার দিকে একে (আরবী) করা হয়েছে বলে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে। আনুগত্যের কারণে সকর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে এবং তাঁর রহমতের নিকটবর্তী হয়েছে।

আল-আরাফ 7:56

৫৫-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে প্রার্থনা করার নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিচ্ছেন যা তাদের জন্যে দ্বীন ও দুনিয়ায় মুক্তি লাভের কারণ। তিনি বলেনঃ তোমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ও সংগোপনে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর। যেমন তিনি বলেনঃ ‘প্রভুকে স্বীয় অন্তরে স্মরণ কর।' জনগণ উচ্চ স্বরে প্রার্থনা করতে শুরু করে দিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের নফসের উপর দয়া কর । তোমরা কোন বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না। তোমরা যার নিকট প্রার্থনা করছো তিনি নিকটেই রয়েছেন এবং সবকিছু শুনছেন।” অত্যন্ত কাকুতি মিনতি এবং অনুনয় বিনয়ের সাথে দুআ করবে। খুবই নত হয়ে সংগোপনে প্রার্থনা জানাবে এবং আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে। বাগাড়ম্বর করে উচ্চ স্বরে দুআ করা উচিত নয়। বিয়াকারী থেকে বাঁচবার জন্যে পূর্বকালের লোকেরা কুরআনের হাফিয হওয়া সত্ত্বেও জনগণ ঘুণাক্ষরেও তাঁদের হাফিয হওয়ার কথা জানতে পারতো না। তারা রাত্রে নিজ নিজ ঘরে দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়তেন এবং তাঁদের ঘরে মেহমান থাকতো, অথচ তারা তাঁদের নামাযের টেরই পেতো না। কিন্তু আজকাল আমরা এ ধরনের লোক দেখতে পাই যে, সংগোপনে ইবাদত করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা সদা-সর্বদা প্রকাশ্যভাবে ইবাদত করে থাকে। পূর্ব যুগের মুসলমানরা যখন দুআ করতেন তখন শুধু ফিফিস শব্দ ছাড়া তাদের মুখ থেকে কোন শব্দ শোনা যেতো না। কেননা আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা বিনীতভাবে ও সংগোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাকো।" আল্লাহ পাক তাঁর এক মনোনীত বান্দার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন সে স্বীয় প্রভুকে ডাকতো তখন খুবই উচ্চ স্বরে ডাকতো। শব্দকে উচ্চ করা অত্যন্ত অপছন্দনীয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর তাফসীরে বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- প্রার্থনায় সীমালংঘনকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন না। আবু মুজলি (রঃ) বলেনঃ “তোমরা নবীদের পদ মর্যাদা লাভ করার জন্যে দুআ করো না।সা'দ (রঃ) স্বীয় পুত্রকে দেখেন যে, সে প্রার্থনা করছেঃ “হে আল্লাহ! আমি জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামতরাজি এবং তথাকার রেশমী বস্ত্রের জন্যে প্রার্থনা করছি, আর জাহান্নাম হতে, জাহান্নামের শৃংখল ও বেড়ি হতে আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন তিনি পুত্রকে বলেনঃ হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“নিকটবর্তী যামানায় এমন লোক সৃষ্ট হবে যারা প্রার্থনা করতে গিয়ে সীমালংঘন করবে এবং অযু করার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। হে আমার পুত্র! তোমার জন্যে তো শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট, “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত এবং জান্নাতের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজের জন্যে প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নাম হতে ও জাহান্নামের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজ হতে আশ্রয় চাচ্ছি।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রঃ) স্বীয় পুত্রকে দেখেন যে, সে দুআ করছে- “হে আল্লাহ! আমি জান্নাতের ডান দিকের সাদা প্রাসাদটি যাঙ্ক্ষা করছি।” তখন তিনি পুত্রকে বলেনঃ “হে বৎস! আল্লাহর কাছে শুধু জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা কর এবং শুধু জাহান্নাম হতে আশ্রয় চাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ইসনাদ উত্তম)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ দুনিয়ায় শান্তি শৃংখলা স্থাপনের পর ওতে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করো না। কেননা, শান্তি ও নিরাপত্তার পরে ফাসাদ বিশৃংখলা অত্যন্ত খারাপ। কারণ, কাজ-কারবার যখন শান্ত পরিবেশে চলতে থাকে তখন যদি বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হয় তবে বান্দা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা। (আরবী) কথাটি যোগ করেছেন। আর তিনি বিনয়ের সাথে দুআ করতে বলেছেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ শাস্তির ভয় করে এবং নিয়ামত ও সাওয়াবের আশা রেখে তোমরা প্রার্থনা কর। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের অতি সন্নিকটে। অর্থাৎ তাঁর রহমত সৎ লোকদের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা হচ্ছে ঐসব লোক যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী মান্য করে চলে এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার রহমত প্রত্যেক জিনিসকে ধারণ করে রয়েছে। (৭:১৫৬) মহান আল্লাহ (আরবী) বলেছেন, (আরবী) বলেননি। অথচ (আরবী) শব্দটি বা (আরবী) স্ত্রীলিঙ্গ। সুতরাং (আরবী) টিও স্ত্রীলিঙ্গ হওয়া উচিত ছিল। এটাকে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করার কারণ এই যে, (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) -এর অর্থে নিয়ে (আরবী) হিসেবে পুংলিঙ্গ ধরা হয়েছে। অথবা এও হতে পারে যে, আল্লাহ পাকের সত্তার দিকে একে (আরবী) করা হয়েছে বলে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে। আনুগত্যের কারণে সকর্মশীল লোকেরা আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে এবং তাঁর রহমতের নিকটবর্তী হয়েছে।

আল-আরাফ 7:57

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহই যে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, হুকুমের মালিক একমাত্র তিনিই এবং সবকিছুর পরিচালক শুধুমাত্র তিনিই, এগুলোর বর্ণনা দেয়ার পর এখানে তিনি অবহিত করেছেন যে, তিনিই হচ্ছেন আহার্যদাতা এবং মৃতকে কিয়ামতের দিন তিনিই উথিত করবেন। বায়ুকে তিনিই প্রেরণ করেন যা বৃষ্টিপূর্ণ মেঘকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। কেউ (আরবী) শব্দকে (আরবী) পড়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও নিদর্শন যে, তিনি (বৃষ্টির) সুসংবাদ বহনকারীরূপে বাতাস প্রেরণ করেন। (৩০:৪৬)। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এখানে (আরবী) দ্বারা বৃষ্টিকে বুঝানো হয়েছে। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ “আল্লাহ তিনিই যিনি মানুষের নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন এবং তিনি তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন, তিনি হচ্ছেন প্রশংসিত বন্ধু।" অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “সুতরাং আল্লাহর রহমতের লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তিনি যমীনকে ওর মরে যাওয়ার (শুকিয়ে যাওয়ার পর পুনর্জীবিত করেন! এভাবেই তিনি মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে সক্ষম এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান।।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “যখন ঐ বাতাস ভারী মেঘমালাকে বহন করে নিয়ে আসে।” অর্থাৎ তাতে অধিক পানি থাকে, যা যমীনের নিকটবর্তী হয়। ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ ঐ মেঘমালাকে কোন নির্জীব ভূখণ্ডের দিকে প্রেরণ করি এবং ওটা হতে বারিধারা বর্ষণ করে ওকে পরিতৃপ্ত করি। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি।” (৩৬:৩৩) এজন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যেমন আমি যমীনকে ওর মরে যাওয়ার পর সঞ্জীবিত করি, তদ্রুপ দেহকেও মাটি হয়ে যাওয়ার পর কিয়ামতের দিন জীবিত করবে। আল্লাহ পাক আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং চল্লিশ দিন পর্যন্ত যমীনে বৃষ্টি বর্ষিত হতেই থাকবে এবং মানবদেহ কবর থেকে এমনিভাবে উঠতে থাকবে যেমনিভাবে ভূমিতে জীব অঙ্কুরিত হয়। এ ধরনের আয়াত কুরআন কারীমে বহু রয়েছে যে, তিনি মৃত যমীনকে পুনর্জীবিত করবেন। এগুলো তিনি কিয়ামত সংঘটনের দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (আরবী) উদ্দেশ্য এই যে, যেন তোমরা এটা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।(আরবী) ভাল ও উৎকৃষ্ট ভূমি ওর প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে খুব ভাল ফসল ফলায়। অর্থাৎ উত্তম ভূমিতে অতিসত্বর ফসল উৎপন্ন হয়। যেমন তিনি এক জায়গায় (আরবী) (৩:৩৭) বলেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যা খারাপ ভূমি, অর্থাৎ কংকরময় বা বালুকাময় ভূমি, তাতে খুব কমই ফসল হয়ে থাকে। এটা মুমিন ও কাফিরের জন্যে দৃষ্টান্ত স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে।ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমাকে যে হিদায়াত ও ইলম সহকারে পাঠিয়েছেন ওর দৃষ্টান্ত হচ্ছে মুষলধারার বৃষ্টি, যা কোন যমীনে পড়েছে। সেই যমীনের এক অংশ উৎকৃষ্ট ছিল যা সেই বৃষ্টি গ্রহণ করেছে এবং প্রচুর উদ্ভিদ ও তৃণরাশি জন্মিয়েছে। আর অপর একাংশ কঠিন (ও গভীর) ছিল যা পানি (শোষণ করেনি, কিন্তু) আটকিয়ে রেখেছে, যা দ্বারা আল্লাহ লোকের উপকার সাধন করেছেন। তারা তা পান করেছে, পান করিয়েছে এবং তার দ্বারা ক্ষেতকৃষি করেছে। আর কতক বৃষ্টি যমীনের এমন অংশে পড়েছে যা সমতল (ও কঠিন); ওটা পানি আটকিয়ে রাখে না। অথবা (শোষণ করে) ঘাস পাতাও জন্মায় না। এটা ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছে এবং যেটা সহকারে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন ওটা তার উপকার সাধন করেছে-সে শিক্ষা করেছে ও শিক্ষা দিয়েছে এবং ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে ব্যক্তি ওর (অর্থাৎ যা সহ আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন) দিকে মাথা তুলেও দেখেনি এবং আল্লাহর যে হিদায়াত আমার প্রতি পাঠানো হয়েছে তা কবূল করেনি।”

আল-আরাফ 7:58

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহই যে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, হুকুমের মালিক একমাত্র তিনিই এবং সবকিছুর পরিচালক শুধুমাত্র তিনিই, এগুলোর বর্ণনা দেয়ার পর এখানে তিনি অবহিত করেছেন যে, তিনিই হচ্ছেন আহার্যদাতা এবং মৃতকে কিয়ামতের দিন তিনিই উথিত করবেন। বায়ুকে তিনিই প্রেরণ করেন যা বৃষ্টিপূর্ণ মেঘকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। কেউ (আরবী) শব্দকে (আরবী) পড়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও নিদর্শন যে, তিনি (বৃষ্টির) সুসংবাদ বহনকারীরূপে বাতাস প্রেরণ করেন। (৩০:৪৬)। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এখানে (আরবী) দ্বারা বৃষ্টিকে বুঝানো হয়েছে। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ “আল্লাহ তিনিই যিনি মানুষের নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন এবং তিনি তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন, তিনি হচ্ছেন প্রশংসিত বন্ধু।" অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “সুতরাং আল্লাহর রহমতের লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তিনি যমীনকে ওর মরে যাওয়ার (শুকিয়ে যাওয়ার পর পুনর্জীবিত করেন! এভাবেই তিনি মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে সক্ষম এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান।।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “যখন ঐ বাতাস ভারী মেঘমালাকে বহন করে নিয়ে আসে।” অর্থাৎ তাতে অধিক পানি থাকে, যা যমীনের নিকটবর্তী হয়। ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ ঐ মেঘমালাকে কোন নির্জীব ভূখণ্ডের দিকে প্রেরণ করি এবং ওটা হতে বারিধারা বর্ষণ করে ওকে পরিতৃপ্ত করি। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি।” (৩৬:৩৩) এজন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যেমন আমি যমীনকে ওর মরে যাওয়ার পর সঞ্জীবিত করি, তদ্রুপ দেহকেও মাটি হয়ে যাওয়ার পর কিয়ামতের দিন জীবিত করবে। আল্লাহ পাক আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং চল্লিশ দিন পর্যন্ত যমীনে বৃষ্টি বর্ষিত হতেই থাকবে এবং মানবদেহ কবর থেকে এমনিভাবে উঠতে থাকবে যেমনিভাবে ভূমিতে জীব অঙ্কুরিত হয়। এ ধরনের আয়াত কুরআন কারীমে বহু রয়েছে যে, তিনি মৃত যমীনকে পুনর্জীবিত করবেন। এগুলো তিনি কিয়ামত সংঘটনের দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (আরবী) উদ্দেশ্য এই যে, যেন তোমরা এটা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।(আরবী) ভাল ও উৎকৃষ্ট ভূমি ওর প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে খুব ভাল ফসল ফলায়। অর্থাৎ উত্তম ভূমিতে অতিসত্বর ফসল উৎপন্ন হয়। যেমন তিনি এক জায়গায় (আরবী) (৩:৩৭) বলেছেন। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যা খারাপ ভূমি, অর্থাৎ কংকরময় বা বালুকাময় ভূমি, তাতে খুব কমই ফসল হয়ে থাকে। এটা মুমিন ও কাফিরের জন্যে দৃষ্টান্ত স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে।ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমাকে যে হিদায়াত ও ইলম সহকারে পাঠিয়েছেন ওর দৃষ্টান্ত হচ্ছে মুষলধারার বৃষ্টি, যা কোন যমীনে পড়েছে। সেই যমীনের এক অংশ উৎকৃষ্ট ছিল যা সেই বৃষ্টি গ্রহণ করেছে এবং প্রচুর উদ্ভিদ ও তৃণরাশি জন্মিয়েছে। আর অপর একাংশ কঠিন (ও গভীর) ছিল যা পানি (শোষণ করেনি, কিন্তু) আটকিয়ে রেখেছে, যা দ্বারা আল্লাহ লোকের উপকার সাধন করেছেন। তারা তা পান করেছে, পান করিয়েছে এবং তার দ্বারা ক্ষেতকৃষি করেছে। আর কতক বৃষ্টি যমীনের এমন অংশে পড়েছে যা সমতল (ও কঠিন); ওটা পানি আটকিয়ে রাখে না। অথবা (শোষণ করে) ঘাস পাতাও জন্মায় না। এটা ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছে এবং যেটা সহকারে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন ওটা তার উপকার সাধন করেছে-সে শিক্ষা করেছে ও শিক্ষা দিয়েছে এবং ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে ব্যক্তি ওর (অর্থাৎ যা সহ আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন) দিকে মাথা তুলেও দেখেনি এবং আল্লাহর যে হিদায়াত আমার প্রতি পাঠানো হয়েছে তা কবূল করেনি।”

আল-আরাফ 7:59

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এ সূরার প্রারম্ভে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সম্পর্কীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এখন তিনি নবীদের ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ)-এর ঘটনাই তিনি প্রথম শুরু করেছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সর্বপ্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর পরে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন নূহ ইবনে লামুক ইবনে মুতাওয়াশলাখ ইবনে উখনূখ। উখনূখের নামই ইদরীস। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, লিখন রীতি তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন উখনূখ ইবনে বুরদ ইবনে মাহ্লীল ইবনে কানীন ইবনে ইয়ানিশ ইবনে শীস ইবনে আদম (আঃ)। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, কোন নবী তাঁর কওমের পক্ষ থেকে দেয়া ততো কষ্ট সহ্য করেননি যতো কষ্ট হযরত নূহ (আঃ) সহ্য করেছেন। তবে হ্যা কোন কোন নবীকে হত্যা করাও হয়েছিল। ইয়াযীদ ইবনে কাশী (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় নফসের উপর অত্যধিক বিলাপ করতেন বলে তাঁকে ‘নূহ' নামে অভিহিত করা হয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত নূহের যুগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দশ শতাব্দীকাল অতিবাহিত হয়েছে। এসব যুগের সব লোকই ইসলামের নীতির উপর কায়েম ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও তফসীরের পণ্ডিতগণ বলেনঃ প্রতিমা পূজার সূচনা এইভাবে হয়েছিল যে, সৎ ও পুণ্যাত্মা লোকগণ যখন মারা গেলেন তখন তাঁদের অনুসারীরা তাদের কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং তাঁদের ফটো তৈরী করে মসজিদের মধ্যে রেখে দেয়, যাতে ঐগুলো দেখে তাদের অবস্থা ও ইবাদতকে স্মরণ করতে পারে। আর এর ফলে যেন নিজেদেরকে তাদের মত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যখন কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেল তখন ঐ ফটোগুলোর পরিবর্তে তাঁদের মূর্তি তৈরী করা হলো। কিছুদিন পর তারা ঐ মূর্তিগুলোকে সম্মান দেখাতে লাগলো এবং ওগুলোর ইবাদত শুরু করে দিলো।ঐ পুণ্যবান লোকদের নামে তারা ঐ মূর্তিগুলোর নাম রাখলো। যেমন ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি। যখন এই মূর্তিমানের পূজা বেড়ে চললো তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করার হুকুম করলেন। তিনি বললেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর । তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। আমি তোমাদের প্রতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করছি।” অর্থাৎ আমি এই ভয় করছি যে, কিয়ামতের দিন যখন তোমরা মুশরিক অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।তখন তাঁর কওমের মধ্যকার প্রধান ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ “নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।” অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে এসব প্রতিমার ইবাদত করতে নিষেধ করছেন, অথচ আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি। এই ব্যাপারে তো আমরা আপনাকে বড়ই পথভ্রষ্ট মনে করছি।আজকালকার ফাসিক-ফাজিরদের অবস্থাও অনুরূপ যে, তারা সঙ্কৰ্মশীলদের উপর পথভ্রষ্টতার অপবাদ দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা যখন সকর্মশীল লোকদেরকে দেখে তখন বলে যে, নিশ্চয়ই এরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট।” (৮৩:৩২) কাফিররা মুমিনদেরকে বলে-“যদি তাদের কথা সত্য হতো তবে আমরা ইতিপূর্বেই এটা অবলম্বন করতাম।” আর যেহেতু তারা নিজেরা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়নি, তাই তারা বলতে শুরু করলো- “এরা তো নিজেরাই পথভ্রষ্ট এবং এরা মিথ্যা বলছে।” এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- “নূহ বললো, হে আমার জাতি! আমি কোন ভুলভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত নই। বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালকের প্রেরিত একজন রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না তা আমি আল্লাহর নিকট থেকে জেনে থাকি।” রাসূলদের শান বা মাহাত্ম এটাই হয় যে, চারুবাক, বাগ্মী, উপদেষ্টা এবং প্রচারক হয়ে থাকেন। আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে অন্য কেউ এসব গুণে গুণান্বিত হয় না। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে,আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (অর্থাৎ আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছি কি-না তা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে)। তখন তোমরা কি উত্তর দেবে?” তারা সমস্বরে উত্তর করলেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দানে প্রস্তুত আছি যে, আপনি যথাযথভাবে প্রচারকার্য চালিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছেন।” তখন তিনি স্বীয় অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন। অতঃপর তাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সক্ষী থাকুন।”

আল-আরাফ 7:60

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এ সূরার প্রারম্ভে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সম্পর্কীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এখন তিনি নবীদের ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ)-এর ঘটনাই তিনি প্রথম শুরু করেছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সর্বপ্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর পরে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন নূহ ইবনে লামুক ইবনে মুতাওয়াশলাখ ইবনে উখনূখ। উখনূখের নামই ইদরীস। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, লিখন রীতি তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন উখনূখ ইবনে বুরদ ইবনে মাহ্লীল ইবনে কানীন ইবনে ইয়ানিশ ইবনে শীস ইবনে আদম (আঃ)। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, কোন নবী তাঁর কওমের পক্ষ থেকে দেয়া ততো কষ্ট সহ্য করেননি যতো কষ্ট হযরত নূহ (আঃ) সহ্য করেছেন। তবে হ্যা কোন কোন নবীকে হত্যা করাও হয়েছিল। ইয়াযীদ ইবনে কাশী (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় নফসের উপর অত্যধিক বিলাপ করতেন বলে তাঁকে ‘নূহ' নামে অভিহিত করা হয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত নূহের যুগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দশ শতাব্দীকাল অতিবাহিত হয়েছে। এসব যুগের সব লোকই ইসলামের নীতির উপর কায়েম ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও তফসীরের পণ্ডিতগণ বলেনঃ প্রতিমা পূজার সূচনা এইভাবে হয়েছিল যে, সৎ ও পুণ্যাত্মা লোকগণ যখন মারা গেলেন তখন তাঁদের অনুসারীরা তাদের কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং তাঁদের ফটো তৈরী করে মসজিদের মধ্যে রেখে দেয়, যাতে ঐগুলো দেখে তাদের অবস্থা ও ইবাদতকে স্মরণ করতে পারে। আর এর ফলে যেন নিজেদেরকে তাদের মত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যখন কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেল তখন ঐ ফটোগুলোর পরিবর্তে তাঁদের মূর্তি তৈরী করা হলো। কিছুদিন পর তারা ঐ মূর্তিগুলোকে সম্মান দেখাতে লাগলো এবং ওগুলোর ইবাদত শুরু করে দিলো।ঐ পুণ্যবান লোকদের নামে তারা ঐ মূর্তিগুলোর নাম রাখলো। যেমন ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি। যখন এই মূর্তিমানের পূজা বেড়ে চললো তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করার হুকুম করলেন। তিনি বললেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর । তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। আমি তোমাদের প্রতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করছি।” অর্থাৎ আমি এই ভয় করছি যে, কিয়ামতের দিন যখন তোমরা মুশরিক অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।তখন তাঁর কওমের মধ্যকার প্রধান ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ “নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।” অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে এসব প্রতিমার ইবাদত করতে নিষেধ করছেন, অথচ আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি। এই ব্যাপারে তো আমরা আপনাকে বড়ই পথভ্রষ্ট মনে করছি।আজকালকার ফাসিক-ফাজিরদের অবস্থাও অনুরূপ যে, তারা সঙ্কৰ্মশীলদের উপর পথভ্রষ্টতার অপবাদ দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা যখন সকর্মশীল লোকদেরকে দেখে তখন বলে যে, নিশ্চয়ই এরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট।” (৮৩:৩২) কাফিররা মুমিনদেরকে বলে-“যদি তাদের কথা সত্য হতো তবে আমরা ইতিপূর্বেই এটা অবলম্বন করতাম।” আর যেহেতু তারা নিজেরা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়নি, তাই তারা বলতে শুরু করলো- “এরা তো নিজেরাই পথভ্রষ্ট এবং এরা মিথ্যা বলছে।” এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- “নূহ বললো, হে আমার জাতি! আমি কোন ভুলভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত নই। বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালকের প্রেরিত একজন রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না তা আমি আল্লাহর নিকট থেকে জেনে থাকি।” রাসূলদের শান বা মাহাত্ম এটাই হয় যে, চারুবাক, বাগ্মী, উপদেষ্টা এবং প্রচারক হয়ে থাকেন। আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে অন্য কেউ এসব গুণে গুণান্বিত হয় না। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে,আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (অর্থাৎ আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছি কি-না তা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে)। তখন তোমরা কি উত্তর দেবে?” তারা সমস্বরে উত্তর করলেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দানে প্রস্তুত আছি যে, আপনি যথাযথভাবে প্রচারকার্য চালিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছেন।” তখন তিনি স্বীয় অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন। অতঃপর তাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সক্ষী থাকুন।”

আল-আরাফ 7:61

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এ সূরার প্রারম্ভে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সম্পর্কীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এখন তিনি নবীদের ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ)-এর ঘটনাই তিনি প্রথম শুরু করেছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সর্বপ্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর পরে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন নূহ ইবনে লামুক ইবনে মুতাওয়াশলাখ ইবনে উখনূখ। উখনূখের নামই ইদরীস। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, লিখন রীতি তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন উখনূখ ইবনে বুরদ ইবনে মাহ্লীল ইবনে কানীন ইবনে ইয়ানিশ ইবনে শীস ইবনে আদম (আঃ)। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, কোন নবী তাঁর কওমের পক্ষ থেকে দেয়া ততো কষ্ট সহ্য করেননি যতো কষ্ট হযরত নূহ (আঃ) সহ্য করেছেন। তবে হ্যা কোন কোন নবীকে হত্যা করাও হয়েছিল। ইয়াযীদ ইবনে কাশী (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় নফসের উপর অত্যধিক বিলাপ করতেন বলে তাঁকে ‘নূহ' নামে অভিহিত করা হয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত নূহের যুগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দশ শতাব্দীকাল অতিবাহিত হয়েছে। এসব যুগের সব লোকই ইসলামের নীতির উপর কায়েম ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও তফসীরের পণ্ডিতগণ বলেনঃ প্রতিমা পূজার সূচনা এইভাবে হয়েছিল যে, সৎ ও পুণ্যাত্মা লোকগণ যখন মারা গেলেন তখন তাঁদের অনুসারীরা তাদের কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং তাঁদের ফটো তৈরী করে মসজিদের মধ্যে রেখে দেয়, যাতে ঐগুলো দেখে তাদের অবস্থা ও ইবাদতকে স্মরণ করতে পারে। আর এর ফলে যেন নিজেদেরকে তাদের মত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যখন কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেল তখন ঐ ফটোগুলোর পরিবর্তে তাঁদের মূর্তি তৈরী করা হলো। কিছুদিন পর তারা ঐ মূর্তিগুলোকে সম্মান দেখাতে লাগলো এবং ওগুলোর ইবাদত শুরু করে দিলো।ঐ পুণ্যবান লোকদের নামে তারা ঐ মূর্তিগুলোর নাম রাখলো। যেমন ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি। যখন এই মূর্তিমানের পূজা বেড়ে চললো তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করার হুকুম করলেন। তিনি বললেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর । তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। আমি তোমাদের প্রতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করছি।” অর্থাৎ আমি এই ভয় করছি যে, কিয়ামতের দিন যখন তোমরা মুশরিক অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।তখন তাঁর কওমের মধ্যকার প্রধান ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ “নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।” অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে এসব প্রতিমার ইবাদত করতে নিষেধ করছেন, অথচ আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি। এই ব্যাপারে তো আমরা আপনাকে বড়ই পথভ্রষ্ট মনে করছি।আজকালকার ফাসিক-ফাজিরদের অবস্থাও অনুরূপ যে, তারা সঙ্কৰ্মশীলদের উপর পথভ্রষ্টতার অপবাদ দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা যখন সকর্মশীল লোকদেরকে দেখে তখন বলে যে, নিশ্চয়ই এরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট।” (৮৩:৩২) কাফিররা মুমিনদেরকে বলে-“যদি তাদের কথা সত্য হতো তবে আমরা ইতিপূর্বেই এটা অবলম্বন করতাম।” আর যেহেতু তারা নিজেরা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়নি, তাই তারা বলতে শুরু করলো- “এরা তো নিজেরাই পথভ্রষ্ট এবং এরা মিথ্যা বলছে।” এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- “নূহ বললো, হে আমার জাতি! আমি কোন ভুলভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত নই। বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালকের প্রেরিত একজন রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না তা আমি আল্লাহর নিকট থেকে জেনে থাকি।” রাসূলদের শান বা মাহাত্ম এটাই হয় যে, চারুবাক, বাগ্মী, উপদেষ্টা এবং প্রচারক হয়ে থাকেন। আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে অন্য কেউ এসব গুণে গুণান্বিত হয় না। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে,আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (অর্থাৎ আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছি কি-না তা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে)। তখন তোমরা কি উত্তর দেবে?” তারা সমস্বরে উত্তর করলেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দানে প্রস্তুত আছি যে, আপনি যথাযথভাবে প্রচারকার্য চালিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছেন।” তখন তিনি স্বীয় অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন। অতঃপর তাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সক্ষী থাকুন।”

আল-আরাফ 7:62

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এ সূরার প্রারম্ভে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সম্পর্কীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এখন তিনি নবীদের ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ)-এর ঘটনাই তিনি প্রথম শুরু করেছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সর্বপ্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর পরে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন নূহ ইবনে লামুক ইবনে মুতাওয়াশলাখ ইবনে উখনূখ। উখনূখের নামই ইদরীস। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, লিখন রীতি তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন উখনূখ ইবনে বুরদ ইবনে মাহ্লীল ইবনে কানীন ইবনে ইয়ানিশ ইবনে শীস ইবনে আদম (আঃ)। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, কোন নবী তাঁর কওমের পক্ষ থেকে দেয়া ততো কষ্ট সহ্য করেননি যতো কষ্ট হযরত নূহ (আঃ) সহ্য করেছেন। তবে হ্যা কোন কোন নবীকে হত্যা করাও হয়েছিল। ইয়াযীদ ইবনে কাশী (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় নফসের উপর অত্যধিক বিলাপ করতেন বলে তাঁকে ‘নূহ' নামে অভিহিত করা হয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত নূহের যুগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দশ শতাব্দীকাল অতিবাহিত হয়েছে। এসব যুগের সব লোকই ইসলামের নীতির উপর কায়েম ছিলেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও তফসীরের পণ্ডিতগণ বলেনঃ প্রতিমা পূজার সূচনা এইভাবে হয়েছিল যে, সৎ ও পুণ্যাত্মা লোকগণ যখন মারা গেলেন তখন তাঁদের অনুসারীরা তাদের কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং তাঁদের ফটো তৈরী করে মসজিদের মধ্যে রেখে দেয়, যাতে ঐগুলো দেখে তাদের অবস্থা ও ইবাদতকে স্মরণ করতে পারে। আর এর ফলে যেন নিজেদেরকে তাদের মত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যখন কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেল তখন ঐ ফটোগুলোর পরিবর্তে তাঁদের মূর্তি তৈরী করা হলো। কিছুদিন পর তারা ঐ মূর্তিগুলোকে সম্মান দেখাতে লাগলো এবং ওগুলোর ইবাদত শুরু করে দিলো।ঐ পুণ্যবান লোকদের নামে তারা ঐ মূর্তিগুলোর নাম রাখলো। যেমন ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি। যখন এই মূর্তিমানের পূজা বেড়ে চললো তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত নূহ (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করার হুকুম করলেন। তিনি বললেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর । তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। আমি তোমাদের প্রতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করছি।” অর্থাৎ আমি এই ভয় করছি যে, কিয়ামতের দিন যখন তোমরা মুশরিক অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।তখন তাঁর কওমের মধ্যকার প্রধান ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ “নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।” অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে এসব প্রতিমার ইবাদত করতে নিষেধ করছেন, অথচ আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি। এই ব্যাপারে তো আমরা আপনাকে বড়ই পথভ্রষ্ট মনে করছি।আজকালকার ফাসিক-ফাজিরদের অবস্থাও অনুরূপ যে, তারা সঙ্কৰ্মশীলদের উপর পথভ্রষ্টতার অপবাদ দিয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা যখন সকর্মশীল লোকদেরকে দেখে তখন বলে যে, নিশ্চয়ই এরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট।” (৮৩:৩২) কাফিররা মুমিনদেরকে বলে-“যদি তাদের কথা সত্য হতো তবে আমরা ইতিপূর্বেই এটা অবলম্বন করতাম।” আর যেহেতু তারা নিজেরা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়নি, তাই তারা বলতে শুরু করলো- “এরা তো নিজেরাই পথভ্রষ্ট এবং এরা মিথ্যা বলছে।” এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- “নূহ বললো, হে আমার জাতি! আমি কোন ভুলভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত নই। বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালকের প্রেরিত একজন রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না তা আমি আল্লাহর নিকট থেকে জেনে থাকি।” রাসূলদের শান বা মাহাত্ম এটাই হয় যে, চারুবাক, বাগ্মী, উপদেষ্টা এবং প্রচারক হয়ে থাকেন। আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে অন্য কেউ এসব গুণে গুণান্বিত হয় না। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে,আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (অর্থাৎ আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছি কি-না তা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে)। তখন তোমরা কি উত্তর দেবে?” তারা সমস্বরে উত্তর করলেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দানে প্রস্তুত আছি যে, আপনি যথাযথভাবে প্রচারকার্য চালিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছেন।” তখন তিনি স্বীয় অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন। অতঃপর তাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সক্ষী থাকুন।”

আল-আরাফ 7:63

৬৩-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এতে ব্ৰিত কেন হচ্ছ যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরই একজন লোকের উপর অহী প্রেরণ করেছেন। এটা তো তোমাদের উপর দয়া ও অনুগ্রহ। সে তোমাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছে, যেন তোমরা তার শাস্তি থেকে ভয় কর এবং শিরক থেকে বিরত থাক। এর ফলে হয়তো তোমাদের উপর দয়া প্রদর্শন করা হবে। কিন্তু হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো এবং তার বিরোধিতা করতে শুরু করে দিলো। তাদের অতি অল্প সংখ্যক লোকই ঈমান আনয়ন করলো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “সুতরাং আমি তাকে এবং তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে (আমার শাস্তি হতে) রক্ষা করলাম, আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অমান্য করেছিল, তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়া হয় এবং জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়, এখন তারা আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকেও সাহায্যকারী পায়নি।আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা অন্ধ ছিল। সত্যকে তারা দেখতেই পাচ্ছিল না। আল্লাহর বন্ধুদের সাথে শত্রুতা পোষণকারীরা কেমন শাস্তি পেলো, এই ঘটনায় আল্লাহ এর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এটাও দেখিয়েছেন যে, রাসূল ও মুমিনগণ মুক্তি পেয়ে গেল। যেমন তিনি বলেনঃ আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে সাহায্য করবো। বিজয় ও সফলতা সৎ লোকেরাই লাভ করবে, দুনিয়াতে এবং আখিরাতেও। যেমন তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ডুবিয়ে দিয়ে ধ্বংস করলেন এবং নূহ (আঃ) ও তার সঙ্গীদেরকে মুক্তি দিলেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেনঃ “নূহ (আঃ)-এর কওম এত বেশী ছিল যে, শহর ও জঙ্গল ভরে গিয়েছিল। যমীনের প্রতিটি অংশের উপর তাদের দখল ছিল। ইবনে অহাব (রঃ) বলেনঃ “ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আমার কাছে সংবাদ পৌছেছে যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে যারা নৌকায় আশ্রয় নিয়ে মুক্তি পেয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল আশিজন। তাদের মধ্যে জুরহুম’ নামক একজন লোক ছিলেন যার ভাষা ছিল আরবী।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:64

৬৩-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এতে ব্ৰিত কেন হচ্ছ যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরই একজন লোকের উপর অহী প্রেরণ করেছেন। এটা তো তোমাদের উপর দয়া ও অনুগ্রহ। সে তোমাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছে, যেন তোমরা তার শাস্তি থেকে ভয় কর এবং শিরক থেকে বিরত থাক। এর ফলে হয়তো তোমাদের উপর দয়া প্রদর্শন করা হবে। কিন্তু হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো এবং তার বিরোধিতা করতে শুরু করে দিলো। তাদের অতি অল্প সংখ্যক লোকই ঈমান আনয়ন করলো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “সুতরাং আমি তাকে এবং তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে (আমার শাস্তি হতে) রক্ষা করলাম, আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অমান্য করেছিল, তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়া হয় এবং জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়, এখন তারা আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকেও সাহায্যকারী পায়নি।আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা অন্ধ ছিল। সত্যকে তারা দেখতেই পাচ্ছিল না। আল্লাহর বন্ধুদের সাথে শত্রুতা পোষণকারীরা কেমন শাস্তি পেলো, এই ঘটনায় আল্লাহ এর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এটাও দেখিয়েছেন যে, রাসূল ও মুমিনগণ মুক্তি পেয়ে গেল। যেমন তিনি বলেনঃ আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে সাহায্য করবো। বিজয় ও সফলতা সৎ লোকেরাই লাভ করবে, দুনিয়াতে এবং আখিরাতেও। যেমন তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ডুবিয়ে দিয়ে ধ্বংস করলেন এবং নূহ (আঃ) ও তার সঙ্গীদেরকে মুক্তি দিলেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেনঃ “নূহ (আঃ)-এর কওম এত বেশী ছিল যে, শহর ও জঙ্গল ভরে গিয়েছিল। যমীনের প্রতিটি অংশের উপর তাদের দখল ছিল। ইবনে অহাব (রঃ) বলেনঃ “ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আমার কাছে সংবাদ পৌছেছে যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে যারা নৌকায় আশ্রয় নিয়ে মুক্তি পেয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল আশিজন। তাদের মধ্যে জুরহুম’ নামক একজন লোক ছিলেন যার ভাষা ছিল আরবী।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:65

৬৫-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যেমনভাবে আমি নূহ (আঃ)-এর কওমের কাছে। রাসূল পাঠিয়েছিলাম তেমনিভাবে হূদ (আঃ)-কে আ’দ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম। তারা আ’দ ইবনে ইরামের বংশধর ছিল। তারা বড় বড় অট্টালিকায় বসবাস করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তোমার প্রতিপালক আ’দ সম্প্রদায়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলেন তা তোমার জানা নেই? অর্থাৎ ইরামদের সাথে, যারা সুউচ্চ ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক ছিল? যার তুল্য (প্রাসাদ) কোন নগরে তৈরী হয়নি। এটা ছিল তাদের ভীষণ দৈহিক শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু আ’দ সম্প্রদায় ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটে পড়লো এবং বললো-আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি চিন্তা করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? তারা আমার আয়াতসমূহ ও মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করতো। তাদের বাসভূমি ছিল ইয়ামান দেশের আহকাফ নামক জায়গায়। তারা ছিল মরুচারী ও পাহাড়ীয় লোক। হযরত আলী (রাঃ) হারামাউতের একজন অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হারা মাউতের সরযমীনে এমন কোন রঙ্গীন পাহাড় দেখেছো যার মাটি লাল বর্ণের? সেই পাহাড়ের অমুক অমুক ধারে কুল (বরই) ও পীলুর বহু গাছ রয়েছে লোকটি উত্তরে বললোঃ “হ্যা। হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ! আপনি এমনভাবে বললেন যে, যেন আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বললেনঃ “আমি স্বচক্ষে দেখিনি বটে, কিন্তু এরূপ হাদীস আমার কাছে। পৌঁছেছে।” লোকটি বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এই ব্যাপারে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেখানে হূদ (আঃ)-এর সমাধি রয়েছে। এ হাদীস দ্বারা এটা জানা গেল যে, আ’দ সম্প্রদায়ের বাসস্থান ইয়ামানেই ছিল। হযরত হূদ (আঃ) সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। সমস্ত রাসূলই মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম দৈহিক ও অবয়বের দিক দিয়ে যেমন ছিল কঠিন তেমনই তাদের অন্তরও ছিল অত্যন্ত কঠিন। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কাজে তারা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে ছিল। এ কারণেই হূদ (আঃ) তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই কাফির দলটি তাকে বলে- “হে হূদ (আঃ)! আমরা তো তোমাকে বড়ই নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট দেখছি, তুমি আমাদেরকে প্রতিমাপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের পরামর্শ দিচ্ছ!” যেমন কুরাইশরা নবী (সঃ) -এর এরূপ দাওয়াতের উপর বিস্ময় বোধ করে বলেছিলঃ “তিনি কি বহু মা'বুদকে একই মা'বুদ বানিয়ে দিয়েছেন?” মোটকথা, হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা নেই, বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট হতে সত্য বাণী নিয়ে এসেছি। সমস্ত কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁরই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। সঠিক অর্থে আমি তোমাদের হিতাকাক্ষী।” এটা হচ্ছে ঐ গুণ যে গুণে রাসূলগণ ভূষিত থাকেন। অর্থাৎ সদুপদেশদাতা ও আমানতদার। তিনি আরো বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করছো যে, তোমাদের জাতিরই একটি লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার বিধান ও উপদেশ তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে এসেছে?” অর্থাৎ তোমাদের তো এতে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়, বরং তোমাদের তো এজন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তিনি সেই কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা তাদের রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া তোমাদের এ জন্যেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশী দৈহিক শক্তি প্রদান করেছেন। তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে বেশী লম্বা ও চওড়া। এ ধরনের বর্ণনা তালুতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ইলমী ও দৈহিক শক্তিতে তালূত (আঃ) বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত ও অনুগ্রহরাশি রয়েছে সেগুলোর কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (আরবী) অর্থাৎ সম্ভবতঃ তোমরা সফলকাম হবে।

আল-আরাফ 7:66

৬৫-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যেমনভাবে আমি নূহ (আঃ)-এর কওমের কাছে। রাসূল পাঠিয়েছিলাম তেমনিভাবে হূদ (আঃ)-কে আ’দ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম। তারা আ’দ ইবনে ইরামের বংশধর ছিল। তারা বড় বড় অট্টালিকায় বসবাস করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তোমার প্রতিপালক আ’দ সম্প্রদায়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলেন তা তোমার জানা নেই? অর্থাৎ ইরামদের সাথে, যারা সুউচ্চ ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক ছিল? যার তুল্য (প্রাসাদ) কোন নগরে তৈরী হয়নি। এটা ছিল তাদের ভীষণ দৈহিক শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু আ’দ সম্প্রদায় ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটে পড়লো এবং বললো-আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি চিন্তা করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? তারা আমার আয়াতসমূহ ও মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করতো। তাদের বাসভূমি ছিল ইয়ামান দেশের আহকাফ নামক জায়গায়। তারা ছিল মরুচারী ও পাহাড়ীয় লোক। হযরত আলী (রাঃ) হারামাউতের একজন অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হারা মাউতের সরযমীনে এমন কোন রঙ্গীন পাহাড় দেখেছো যার মাটি লাল বর্ণের? সেই পাহাড়ের অমুক অমুক ধারে কুল (বরই) ও পীলুর বহু গাছ রয়েছে লোকটি উত্তরে বললোঃ “হ্যা। হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ! আপনি এমনভাবে বললেন যে, যেন আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বললেনঃ “আমি স্বচক্ষে দেখিনি বটে, কিন্তু এরূপ হাদীস আমার কাছে। পৌঁছেছে।” লোকটি বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এই ব্যাপারে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেখানে হূদ (আঃ)-এর সমাধি রয়েছে। এ হাদীস দ্বারা এটা জানা গেল যে, আ’দ সম্প্রদায়ের বাসস্থান ইয়ামানেই ছিল। হযরত হূদ (আঃ) সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। সমস্ত রাসূলই মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম দৈহিক ও অবয়বের দিক দিয়ে যেমন ছিল কঠিন তেমনই তাদের অন্তরও ছিল অত্যন্ত কঠিন। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কাজে তারা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে ছিল। এ কারণেই হূদ (আঃ) তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই কাফির দলটি তাকে বলে- “হে হূদ (আঃ)! আমরা তো তোমাকে বড়ই নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট দেখছি, তুমি আমাদেরকে প্রতিমাপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের পরামর্শ দিচ্ছ!” যেমন কুরাইশরা নবী (সঃ) -এর এরূপ দাওয়াতের উপর বিস্ময় বোধ করে বলেছিলঃ “তিনি কি বহু মা'বুদকে একই মা'বুদ বানিয়ে দিয়েছেন?” মোটকথা, হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা নেই, বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট হতে সত্য বাণী নিয়ে এসেছি। সমস্ত কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁরই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। সঠিক অর্থে আমি তোমাদের হিতাকাক্ষী।” এটা হচ্ছে ঐ গুণ যে গুণে রাসূলগণ ভূষিত থাকেন। অর্থাৎ সদুপদেশদাতা ও আমানতদার। তিনি আরো বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করছো যে, তোমাদের জাতিরই একটি লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার বিধান ও উপদেশ তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে এসেছে?” অর্থাৎ তোমাদের তো এতে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়, বরং তোমাদের তো এজন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তিনি সেই কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা তাদের রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া তোমাদের এ জন্যেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশী দৈহিক শক্তি প্রদান করেছেন। তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে বেশী লম্বা ও চওড়া। এ ধরনের বর্ণনা তালুতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ইলমী ও দৈহিক শক্তিতে তালূত (আঃ) বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত ও অনুগ্রহরাশি রয়েছে সেগুলোর কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (আরবী) অর্থাৎ সম্ভবতঃ তোমরা সফলকাম হবে।

আল-আরাফ 7:67

৬৫-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যেমনভাবে আমি নূহ (আঃ)-এর কওমের কাছে। রাসূল পাঠিয়েছিলাম তেমনিভাবে হূদ (আঃ)-কে আ’দ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম। তারা আ’দ ইবনে ইরামের বংশধর ছিল। তারা বড় বড় অট্টালিকায় বসবাস করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তোমার প্রতিপালক আ’দ সম্প্রদায়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলেন তা তোমার জানা নেই? অর্থাৎ ইরামদের সাথে, যারা সুউচ্চ ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক ছিল? যার তুল্য (প্রাসাদ) কোন নগরে তৈরী হয়নি। এটা ছিল তাদের ভীষণ দৈহিক শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু আ’দ সম্প্রদায় ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটে পড়লো এবং বললো-আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি চিন্তা করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? তারা আমার আয়াতসমূহ ও মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করতো। তাদের বাসভূমি ছিল ইয়ামান দেশের আহকাফ নামক জায়গায়। তারা ছিল মরুচারী ও পাহাড়ীয় লোক। হযরত আলী (রাঃ) হারামাউতের একজন অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হারা মাউতের সরযমীনে এমন কোন রঙ্গীন পাহাড় দেখেছো যার মাটি লাল বর্ণের? সেই পাহাড়ের অমুক অমুক ধারে কুল (বরই) ও পীলুর বহু গাছ রয়েছে লোকটি উত্তরে বললোঃ “হ্যা। হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ! আপনি এমনভাবে বললেন যে, যেন আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বললেনঃ “আমি স্বচক্ষে দেখিনি বটে, কিন্তু এরূপ হাদীস আমার কাছে। পৌঁছেছে।” লোকটি বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এই ব্যাপারে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেখানে হূদ (আঃ)-এর সমাধি রয়েছে। এ হাদীস দ্বারা এটা জানা গেল যে, আ’দ সম্প্রদায়ের বাসস্থান ইয়ামানেই ছিল। হযরত হূদ (আঃ) সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। সমস্ত রাসূলই মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম দৈহিক ও অবয়বের দিক দিয়ে যেমন ছিল কঠিন তেমনই তাদের অন্তরও ছিল অত্যন্ত কঠিন। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কাজে তারা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে ছিল। এ কারণেই হূদ (আঃ) তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই কাফির দলটি তাকে বলে- “হে হূদ (আঃ)! আমরা তো তোমাকে বড়ই নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট দেখছি, তুমি আমাদেরকে প্রতিমাপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের পরামর্শ দিচ্ছ!” যেমন কুরাইশরা নবী (সঃ) -এর এরূপ দাওয়াতের উপর বিস্ময় বোধ করে বলেছিলঃ “তিনি কি বহু মা'বুদকে একই মা'বুদ বানিয়ে দিয়েছেন?” মোটকথা, হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা নেই, বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট হতে সত্য বাণী নিয়ে এসেছি। সমস্ত কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁরই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। সঠিক অর্থে আমি তোমাদের হিতাকাক্ষী।” এটা হচ্ছে ঐ গুণ যে গুণে রাসূলগণ ভূষিত থাকেন। অর্থাৎ সদুপদেশদাতা ও আমানতদার। তিনি আরো বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করছো যে, তোমাদের জাতিরই একটি লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার বিধান ও উপদেশ তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে এসেছে?” অর্থাৎ তোমাদের তো এতে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়, বরং তোমাদের তো এজন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তিনি সেই কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা তাদের রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া তোমাদের এ জন্যেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশী দৈহিক শক্তি প্রদান করেছেন। তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে বেশী লম্বা ও চওড়া। এ ধরনের বর্ণনা তালুতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ইলমী ও দৈহিক শক্তিতে তালূত (আঃ) বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত ও অনুগ্রহরাশি রয়েছে সেগুলোর কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (আরবী) অর্থাৎ সম্ভবতঃ তোমরা সফলকাম হবে।

আল-আরাফ 7:68

৬৫-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যেমনভাবে আমি নূহ (আঃ)-এর কওমের কাছে। রাসূল পাঠিয়েছিলাম তেমনিভাবে হূদ (আঃ)-কে আ’দ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম। তারা আ’দ ইবনে ইরামের বংশধর ছিল। তারা বড় বড় অট্টালিকায় বসবাস করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তোমার প্রতিপালক আ’দ সম্প্রদায়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলেন তা তোমার জানা নেই? অর্থাৎ ইরামদের সাথে, যারা সুউচ্চ ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক ছিল? যার তুল্য (প্রাসাদ) কোন নগরে তৈরী হয়নি। এটা ছিল তাদের ভীষণ দৈহিক শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু আ’দ সম্প্রদায় ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটে পড়লো এবং বললো-আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি চিন্তা করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? তারা আমার আয়াতসমূহ ও মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করতো। তাদের বাসভূমি ছিল ইয়ামান দেশের আহকাফ নামক জায়গায়। তারা ছিল মরুচারী ও পাহাড়ীয় লোক। হযরত আলী (রাঃ) হারামাউতের একজন অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হারা মাউতের সরযমীনে এমন কোন রঙ্গীন পাহাড় দেখেছো যার মাটি লাল বর্ণের? সেই পাহাড়ের অমুক অমুক ধারে কুল (বরই) ও পীলুর বহু গাছ রয়েছে লোকটি উত্তরে বললোঃ “হ্যা। হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ! আপনি এমনভাবে বললেন যে, যেন আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বললেনঃ “আমি স্বচক্ষে দেখিনি বটে, কিন্তু এরূপ হাদীস আমার কাছে। পৌঁছেছে।” লোকটি বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এই ব্যাপারে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেখানে হূদ (আঃ)-এর সমাধি রয়েছে। এ হাদীস দ্বারা এটা জানা গেল যে, আ’দ সম্প্রদায়ের বাসস্থান ইয়ামানেই ছিল। হযরত হূদ (আঃ) সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। সমস্ত রাসূলই মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম দৈহিক ও অবয়বের দিক দিয়ে যেমন ছিল কঠিন তেমনই তাদের অন্তরও ছিল অত্যন্ত কঠিন। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কাজে তারা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে ছিল। এ কারণেই হূদ (আঃ) তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই কাফির দলটি তাকে বলে- “হে হূদ (আঃ)! আমরা তো তোমাকে বড়ই নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট দেখছি, তুমি আমাদেরকে প্রতিমাপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের পরামর্শ দিচ্ছ!” যেমন কুরাইশরা নবী (সঃ) -এর এরূপ দাওয়াতের উপর বিস্ময় বোধ করে বলেছিলঃ “তিনি কি বহু মা'বুদকে একই মা'বুদ বানিয়ে দিয়েছেন?” মোটকথা, হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা নেই, বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট হতে সত্য বাণী নিয়ে এসেছি। সমস্ত কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁরই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। সঠিক অর্থে আমি তোমাদের হিতাকাক্ষী।” এটা হচ্ছে ঐ গুণ যে গুণে রাসূলগণ ভূষিত থাকেন। অর্থাৎ সদুপদেশদাতা ও আমানতদার। তিনি আরো বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করছো যে, তোমাদের জাতিরই একটি লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার বিধান ও উপদেশ তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে এসেছে?” অর্থাৎ তোমাদের তো এতে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়, বরং তোমাদের তো এজন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তিনি সেই কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা তাদের রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া তোমাদের এ জন্যেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশী দৈহিক শক্তি প্রদান করেছেন। তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে বেশী লম্বা ও চওড়া। এ ধরনের বর্ণনা তালুতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ইলমী ও দৈহিক শক্তিতে তালূত (আঃ) বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত ও অনুগ্রহরাশি রয়েছে সেগুলোর কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (আরবী) অর্থাৎ সম্ভবতঃ তোমরা সফলকাম হবে।

আল-আরাফ 7:69

৬৫-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যেমনভাবে আমি নূহ (আঃ)-এর কওমের কাছে। রাসূল পাঠিয়েছিলাম তেমনিভাবে হূদ (আঃ)-কে আ’দ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম। তারা আ’দ ইবনে ইরামের বংশধর ছিল। তারা বড় বড় অট্টালিকায় বসবাস করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তোমার প্রতিপালক আ’দ সম্প্রদায়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলেন তা তোমার জানা নেই? অর্থাৎ ইরামদের সাথে, যারা সুউচ্চ ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক ছিল? যার তুল্য (প্রাসাদ) কোন নগরে তৈরী হয়নি। এটা ছিল তাদের ভীষণ দৈহিক শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু আ’দ সম্প্রদায় ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটে পড়লো এবং বললো-আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি চিন্তা করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? তারা আমার আয়াতসমূহ ও মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করতো। তাদের বাসভূমি ছিল ইয়ামান দেশের আহকাফ নামক জায়গায়। তারা ছিল মরুচারী ও পাহাড়ীয় লোক। হযরত আলী (রাঃ) হারামাউতের একজন অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হারা মাউতের সরযমীনে এমন কোন রঙ্গীন পাহাড় দেখেছো যার মাটি লাল বর্ণের? সেই পাহাড়ের অমুক অমুক ধারে কুল (বরই) ও পীলুর বহু গাছ রয়েছে লোকটি উত্তরে বললোঃ “হ্যা। হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ! আপনি এমনভাবে বললেন যে, যেন আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বললেনঃ “আমি স্বচক্ষে দেখিনি বটে, কিন্তু এরূপ হাদীস আমার কাছে। পৌঁছেছে।” লোকটি বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এই ব্যাপারে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেখানে হূদ (আঃ)-এর সমাধি রয়েছে। এ হাদীস দ্বারা এটা জানা গেল যে, আ’দ সম্প্রদায়ের বাসস্থান ইয়ামানেই ছিল। হযরত হূদ (আঃ) সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। সমস্ত রাসূলই মর্যাদা সম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন। হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম দৈহিক ও অবয়বের দিক দিয়ে যেমন ছিল কঠিন তেমনই তাদের অন্তরও ছিল অত্যন্ত কঠিন। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কাজে তারা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে ছিল। এ কারণেই হূদ (আঃ) তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই কাফির দলটি তাকে বলে- “হে হূদ (আঃ)! আমরা তো তোমাকে বড়ই নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট দেখছি, তুমি আমাদেরকে প্রতিমাপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের পরামর্শ দিচ্ছ!” যেমন কুরাইশরা নবী (সঃ) -এর এরূপ দাওয়াতের উপর বিস্ময় বোধ করে বলেছিলঃ “তিনি কি বহু মা'বুদকে একই মা'বুদ বানিয়ে দিয়েছেন?” মোটকথা, হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা নেই, বরং আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট হতে সত্য বাণী নিয়ে এসেছি। সমস্ত কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁরই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। সঠিক অর্থে আমি তোমাদের হিতাকাক্ষী।” এটা হচ্ছে ঐ গুণ যে গুণে রাসূলগণ ভূষিত থাকেন। অর্থাৎ সদুপদেশদাতা ও আমানতদার। তিনি আরো বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করছো যে, তোমাদের জাতিরই একটি লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তার বিধান ও উপদেশ তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে এসেছে?” অর্থাৎ তোমাদের তো এতে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়, বরং তোমাদের তো এজন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তিনি সেই কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা তাদের রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া তোমাদের এ জন্যেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশী দৈহিক শক্তি প্রদান করেছেন। তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে বেশী লম্বা ও চওড়া। এ ধরনের বর্ণনা তালুতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ইলমী ও দৈহিক শক্তিতে তালূত (আঃ) বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর। অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত ও অনুগ্রহরাশি রয়েছে সেগুলোর কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (আরবী) অর্থাৎ সম্ভবতঃ তোমরা সফলকাম হবে।

আল-আরাফ 7:70

৭০-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরগণ হযরত হূদ (আঃ)-এর সাথে কিরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছিল তারই বর্ণনা আল্লাহ পাক এখানে দিচ্ছেন। তারা তাকে বলেছিল-“হে হূদ (আঃ)! আমাদের পূর্বপুরুষরা যাদের ইবাদত-বন্দেগী করতো তাদেরকে ছেড়ে আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি এজন্যেই কি তুমি আমাদের কাছে এসেছো? আচ্ছা, তুমি যদি তোমার কথায় সত্যবাদী হও তবে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।” যেমন কাফির কুরাইশরা বলছে- “তুমি আমাদেরকে শাস্তির যে ভয় দেখাচ্ছ তা যদি সত্য হয় তাহলে আকাশ থেকে পাথর বর্ষিয়ে নাও এবং আমাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেই ফেলো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম মূর্তিসমূহের পূজা করতো। একটি মূর্তির নাম ছিল সামাদ, একটির নাম ছিল ‘সামুদ' এবং একটির নাম ছিল ‘হাবা’! এজন্যেই হূদ (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, তোমাদের একথা বলার কারণেই তোমাদের উপর আল্লাহর গযব ওয়াজিব হয়ে গেছে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) -এরই প্রতিশব্দ । হ্রদ (আঃ) বলেনঃ “তোমরা কি আমার সাথে এমনসব মূর্তির ব্যাপার নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে যেগুলোর নাম তোমরা নিজেরা রেখেছে বা তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছে। এসব মূর্তি তো তোমাদের কোন লাভও করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ তোমাদেরকে এগুলোর ইবাদত করার কোন সনদও দেননি এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যদি কথা এটাই হয় তবে ঠিক আছে, তোমরা শাস্তির জন্যে অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি। এটা রাসূলের পক্ষ থেকে তাঁর কওমের প্রতি কঠিন হুমকি ও ভয় প্রদর্শন। সুতরাং এর পরই ইরশাদ হচ্ছে- আমি হদ (আঃ)-কে এবং তার অনুসারী সঙ্গী সাথীদেরকে তো বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু যারা তার উপর ঈমান আনেনি এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল আমি তাদের মূলোৎপাটন করলাম। আদ জাতির ধ্বংসের ঘটনা কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় এরূপ বর্ণিত আছে- “তাদের উপর আমি এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ু প্রেরণ করলাম এবং যাদের উপর দিয়ে ওটা বয়ে গেল তাদের সবকেই তচনচ্ করে দিলো।” যেমন অন্য একটি আয়াতে আছে- “আর আ’দ সম্প্রদায়কে এক প্রচণ্ড ঝঞাবায়ু দ্বারা বিধ্বস্ত করা হয়েছে। যে বায়ুকে আল্লাহ সাত রাত্রি ও আট দিবস পর্যন্ত তাদের উপর একাধারে চাপিয়ে রেখেছিলেন, অতএব, তুমি ঐ সম্প্রদায়কে ওতে এমনভাবে ভূপতিত দেখতে পেতে, যেন তারা উৎপাটিত খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডসমূহ। সুতরাং তাদের কাউকেও কি তুমি অবশিষ্ট দেখতে পাও?” তাদের ঔদ্ধত্যের কারণে তাদের উপর এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবার্তা প্রেরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ঐ বায়ু তাদেরকে আকাশে নিয়ে উড়তেছিল এবং পরে মাথার ভরে যমীনে নিক্ষেপ করে দিচ্ছিলো। ফলে তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে দেহ থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা সেই খেজুর গাছের কাণ্ডের মত হয়ে গিয়েছিল যেগুলো সম্পূর্ণরূপে ডাল-পাতা শূন্য ছিল। ঐ লোকগুলো ইয়ামানে আম্মান ও হারামাউতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতো। তাছাড়া তারা সারা দুনিয়ায় দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা শক্তির দাপটে জনগণের উপর অত্যাচার চালাতো। তারা মূর্তিপূজা করতো। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হূদ (আঃ)-কে পাঠালেন। তিনি তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিলেন। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন যে, তারা যেন আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে নেয় এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করে। আর তারা যেন লোকদের উপর অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে এবং তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ বলে- “আমাদের অপেক্ষা বড় শক্তিশালী আর কে আছে?” অন্যান্য লোকেরাও তাদের অনুসরণ করে। হ্রদ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী লোকের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। যখন আ’দ সম্প্রদায় এরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে শুরু করে, আর বিনা প্রয়োজনে বড় বড় অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করে, তখন হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা সব জায়গায় বিনা প্রয়োজনে ঘরবাড়ী নির্মাণ করছে এবং ওগুলোকে এতো মজবুত করে তৈরী করছো যে, মনে হচ্ছে তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে! যখন তোমরা কারো উপর ক্ষমতা প্রাপ্ত হচ্ছে তখন তার সাথে অত্যন্ত কঠোরতাপূর্ণ ব্যবহার করছো! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার কথা মেনে চল।” তারা তখন তাকে বললোঃ “হে হূদ (আঃ)! তুমি প্রমাণবিহীন কথা বলছো। তোমার কথায় আমরা আমাদের মা’বৃদদেরকে ছেড়ে দিতে পারি না এবং তোমার উপর ঈমানও আনব না। আমাদের তো ধারণা হচ্ছে যে, তোমার উপর আমাদের কোন মা'বুদের গযব পতিত হয়েছে, ফলে তুমি পাগল হয়ে গেছো।” হুদ (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমি তোমাদের শিকযুক্ত চিন্তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এখন তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে যা কিছু ছল-চাতুরী করতে চাও কর এবং আমাকে অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপরই ভরসা করছি। তিনি আমার প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু। আমার প্রতিপালক যা কিছু বলেন ঠিকই বলেন।” ঐ লোকগুলো যখন কুফরীর উপর অটল থাকলো তখন আল্লাহ তা'আলা তিন বছর পর্যন্ত তাদের উপর বৃষ্টি বন্ধ রাখলেন। তারা তখন কঠিন বিপদে পতিত হলো। যখন তারা কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতো তখন সেই বিপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানাতো। ঐ সময় তারা কাউকে বায়তুল্লাহ শরীফে পাঠিয়ে দিতো। ঐ যুগে তাদের গোত্রের আমলীক নামে পরিচিত কতকগুলো লোক মক্কায় বসবাস করছিল। তারা ছিল আমালীক ইবনে লাও ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। মুআবিয়া ইবনে বকর নামক একটি পোর্ক ছিল তাদের নেতা। তার মা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তার নাম ছিল জুলহিয়া । সে ছিল খাবীরীর কন্যা। যা হাক, আ’দ সম্প্রদায় সত্তরজন লোকের এক প্রতিনিধি দলকে হারাম শরীফের দিকে পাঠিয়ে দিলো, যেন তারা কা’বাতুল্লাহয় গিয়ে পানি বর্ষণের জন্যে প্রার্থনা করে। ঐ লোকগুলো মক্কার বাইরে তাদের গোত্রীয় লোক মুআবিয়ার নিকট অবস্থান করে। এক মাস পর্যন্ত তারা তার কাছেই অবস্থান করতে থাকে। তারা সেখানে মদ্যপান করতে এবং মুআবিয়ার দু’জন গায়িকা দাসীর গান শুনতো। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তাদের অবস্থান মুআবিয়ার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অতিথিদেরকে বিদায় হয়ে যাওয়ার কথা বলতে সে লজ্জাবোধ করছিল। অবশেষে সে কতকগুলো ছন্দ রচনা করলো এবং ওগুলো তাদের সামনে গায়িকাদেরকে গাইতে বললো। ছন্দগুলোর অনুবাদ নিম্নরূপঃ“হে কায়েল! তোমার উপর আফসোস! যাও, প্রার্থনা কর। হয়তো আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণের জন্যে মেঘ পাঠাবেন। ফলে আ’দ সম্প্রদায়ের ভূমি অদ্র ও সতেজ হয়ে উঠবে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায়ের অবস্থা তো এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তারা ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। পিপাসায় এখন তাদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। বুড়ো ও যুবক কারো জীবনের আশা নেই। তাদের মহিলাদেরও অবস্থা ভাল নয়। ক্ষুধা ও পিপাসায় এখন তাদের চলৎশক্তি রহিত। বন্য জঙুগুলো অতি সহজেই তাদের বস্তিতে ঢুকে পড়েছে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায় সম্পর্কে তাদের এখন কোন ভয় নেই যে, তারা ওদেরকে তীর মেরে হত্যা করবে। কারণ, এখন তাদের তীর চালাবার শক্তিও নেই। সুতরাং জেনে রেখো যে, তাদের এখন দিবস ও রজনী শেষ হয়েই গেছে। কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দল তোমাদের ন্যায় এতো নিষ্ঠুর হতে পারে না। তোমাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হাক!” একথা শুনে ঐ প্রতিনিধি দলের লোকদের চৈতন্য ফিরলো। তারা কাবা ঘরে গিয়ে কওমের জন্যে প্রার্থনা করতে শুরু করলো। ঐ প্রতিনিধি দলের নেতার নাম ছিল কায়েল। আল্লাহর হুকুমে তিন খণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো। এক খণ্ড সাদা, এক খণ্ড কালো এবং এক খণ্ড লাল। আকাশ থেকে একটা শব্দ শোনা গেল- “নিজের কওমের জন্যে এই তিন খণ্ড মেঘের যে কোন একখণ্ড পছন্দ করে নাও।”কায়েল বললোঃ “আমি কালো মেঘখণ্ডই পছন্দ করলাম। কালো মেঘ থেকেই অধিক বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকে।” পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো ভষ্ম ও মাটিকে পছন্দ করলে। আ’দ সম্প্রদায়ের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। এ মেঘ তো পিতাকে ছাড়বে না এবং পুত্রকেও ছাড়বে না, বরং সবকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের বানী আযিয়া গোত্র নিরাপত্তা লাভ করবে।” আ’দ সম্প্রদায়ের এ গোত্রটি মক্কায় অবস্থান করছিল। তারা শাস্তির কিছুই টের পায়নি। আ’দ সম্প্রদায়ের সবাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যারা রক্ষা পেয়েছিল তারা ছিল এই বানী আযিয়া গোত্রেরই লোক। এর বংশ ও সন্তানদের মধ্য থেকে ঐ কওম অবশিষ্ট থাকে যাদেরকে আ’দে সানী’ বা দ্বিতীয় আ’দ বলা হয়। কথিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা একটা কলো মেঘখণ্ড পাঠিয়েছিলেন যাকে কায়েল পছন্দ করেছিল এবং এটাই ঐ সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল। ঐ মেঘখণ্ডটি মুগীস নামক একটি উপত্যকা হতে উঠেছিল। জনগণ ওটা দেখে খুব খুশী হয় এবং বলে- “এটা তো বর্ষণকারী মেঘ।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “প্রবল ঝটিকা এই মেঘ বয়ে নিয়ে আসে। এরই মধ্যে ছিল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, যা সব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়। এই মেঘের মধ্যে একটি জিনিস সর্বপ্রথম যে দেখেছিল, সে ছিল একটি মহিলা। তার নাম ছিল মুমীদ। সে মেঘের মধ্যে যা দেখেছিল তা দেখে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সে বলেঃ “এই মেঘের মধ্যে আগুনের শিখা ছিল। কতকগুলো লোককে দেখা যাচ্ছিল যারা ঐ শিখাগুলো টেনে আনছিল।” সাতরাত ও আটদিন পর্যন্ত ঐ মেঘ হতে পানি বর্ষিতে থাকে। আ’দ সম্প্রদায়ের এমন লোক অবশিষ্ট ছিল না যে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। হূদ (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী মুমিনগণ এখান থেকে সরে গিয়েছিলেন এবং একটি শস্যক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ছিলেন। ঠাণ্ডা বায়ু তাদের দেহ স্পর্শ করছিল এবং তাদের আত্মাকে সতেজ ও পরিতৃপ্ত রাখছিল । কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতি ঐ মেঘ ঝটিকা পাথর বর্ষণ করছিল। তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ ঘটনার বর্ণনা খুবই দীর্ঘ এবং এর রচনাভঙ্গীও বেশ বিস্ময়কর। এর থেকে কয়েকটি ফলাফলও বের হয় । আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার আযাব যখন এসে পৌঁছেই গেল তখন আমি হূদ (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গীয় মুমিনদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে তারা নিরাপদে থাকলো।”হারিসুল বিকরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আ’লা ইবনে হারামীর অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছিলাম। আমি কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিলাম। এমতাবস্থায় বানী তামীম গোত্রের একটি মহিলা যে তার গোত্র থেকে ছুটে গিয়ে একা পড়ে গিয়েছিল, আমাকে বললো- “হে আল্লাহর বান্দা! আমাকে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তাঁর আমার প্রয়োজন রয়েছে। আমি তখন তাকে আমার উটের উপর বসিয়ে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলাম। মসজিদ লোকে পরিপূর্ণ ছিল এবং একটি কালো পতাকা উত্তোলিত ছিল। হযরত বিলাল (রাঃ) স্বীয় তরবারী লটকিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এ লোকগুলোর জমায়েত হওয়ার কারণ কি? উত্তর হলোঃ “আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রেরণ করা হচ্ছে।” আমি বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমি তার কাছে হাযির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলাম। আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। আমি তার কাছে হাযির হয়ে সালাম করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার ও তাদের মধ্যে মননামালিন্য আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, তাদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ রয়েছে। এখন আমি আপনার নিকট আসছিলাম, এমতাবস্থায় পথে বানী তামীম গোত্রের এক বুড়ীর সাথে আমার সাক্ষাত হয়। সে তার গোত্র থেকে ছাড়া পড়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলে- “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে আমার প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। সে দরজাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (আঃ) তাকে ডেকে নিলেন।সে এসে পড়লে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার ও বানী তামীমের মধ্যে আড়াল করে দিন। একথা শুনে বানী তামীম গোত্রের ঐ বুড়ীটি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে এই নিরাশ্রয়া কোথায় আশ্রয় নেবে? আমি তখন বললাম, আমার এই দৃষ্টান্ত তো হচ্ছে “বকরী নিজেই নিজের মৃত্যুকে টেনে আনলো” -এই প্রবাদ বাক্যের মতই। আমি এই বুড়ীকে নিজের সোয়ারীর উপর চড়িয়ে আনলাম, আমি কি জানতাম যে, সেই আমার শত্রুরূপে সাব্যস্ত হবে! আমি আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মত হয়ে যাই এর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের ঘটনাটি কি?” অথচ তিনি এটা আমার চেয়ে অনেক বেশী জানতেন। কিন্তু তিনি এটা আমার নিকট থেকে শুনতে আগ্রহী ছিলেন। সুতরাং আমি বলতে লাগলাম, আ’দ সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়েছিল। তাই তারা একটা প্রতিনিধি দল মক্কায় প্রেরণ করে। তাদের নেতা ছিল কায়েল নামক একটি লোক। তারা মক্কায় গিয়ে মুআবিয়া ইবনে বকরের নিকট অবস্থান করে। সেখানে তারা দীর্ঘ এক মাস ধরে বাস করে এবং মদ্যপানরত.থাকে। তাছাড়া তারা জারাদাতান নাম্নী" দু'টি দাসীর গান শুনতে থাকে। অতঃপর তাদের নেতা কায়েল মুহরার পাহাড়ের দিকে গমন করে এবং প্রার্থনা জানিয়ে বলে- “হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আমরা কোন রোগীর রোগ মুক্তির দুআ’র জন্যে আসিনি বা কোন বন্দীর মুক্তিপণের জন্যে প্রার্থনা করছি না। বরং আমাদের প্রার্থনা এই যে, আপনি আ’দ সম্প্রদায়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” তখন আল্লাহর হুকুমে তিনখণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো (মেঘখণ্ডগুলো ছিল সাদা, কালো ও লাল)। দৈববাণী হলো- “যে কোন একখণ্ড মেঘ গ্রহণ কর।” সে কালো মেঘ খণ্ডটি পছন্দ করল। পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো মাটি পাবে। আ’দ সম্প্রদায়ের একটি প্রাণীও রক্ষা পাবে না বরং সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একটা প্রবল ঝটিকা প্রেরণ করেন। সেই বায়ু ছিল বায়ু ভাণ্ডারের মধ্যে যেন আমার আংটির বৃত্তের সমপরিমাণ। তাতে সমস্ত আ’দ সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। এখন আরবের লোকেরা কোন প্রতিনিধি দল পাঠালে প্রবাদ বাক্য হিসেবে বলে থাকেঃ আদ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মতো হয়ো না। (এটা ইমাম তরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-আরাফ 7:71

৭০-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরগণ হযরত হূদ (আঃ)-এর সাথে কিরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছিল তারই বর্ণনা আল্লাহ পাক এখানে দিচ্ছেন। তারা তাকে বলেছিল-“হে হূদ (আঃ)! আমাদের পূর্বপুরুষরা যাদের ইবাদত-বন্দেগী করতো তাদেরকে ছেড়ে আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি এজন্যেই কি তুমি আমাদের কাছে এসেছো? আচ্ছা, তুমি যদি তোমার কথায় সত্যবাদী হও তবে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।” যেমন কাফির কুরাইশরা বলছে- “তুমি আমাদেরকে শাস্তির যে ভয় দেখাচ্ছ তা যদি সত্য হয় তাহলে আকাশ থেকে পাথর বর্ষিয়ে নাও এবং আমাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেই ফেলো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম মূর্তিসমূহের পূজা করতো। একটি মূর্তির নাম ছিল সামাদ, একটির নাম ছিল ‘সামুদ' এবং একটির নাম ছিল ‘হাবা’! এজন্যেই হূদ (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, তোমাদের একথা বলার কারণেই তোমাদের উপর আল্লাহর গযব ওয়াজিব হয়ে গেছে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) -এরই প্রতিশব্দ । হ্রদ (আঃ) বলেনঃ “তোমরা কি আমার সাথে এমনসব মূর্তির ব্যাপার নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে যেগুলোর নাম তোমরা নিজেরা রেখেছে বা তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছে। এসব মূর্তি তো তোমাদের কোন লাভও করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ তোমাদেরকে এগুলোর ইবাদত করার কোন সনদও দেননি এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যদি কথা এটাই হয় তবে ঠিক আছে, তোমরা শাস্তির জন্যে অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি। এটা রাসূলের পক্ষ থেকে তাঁর কওমের প্রতি কঠিন হুমকি ও ভয় প্রদর্শন। সুতরাং এর পরই ইরশাদ হচ্ছে- আমি হদ (আঃ)-কে এবং তার অনুসারী সঙ্গী সাথীদেরকে তো বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু যারা তার উপর ঈমান আনেনি এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল আমি তাদের মূলোৎপাটন করলাম। আদ জাতির ধ্বংসের ঘটনা কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় এরূপ বর্ণিত আছে- “তাদের উপর আমি এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ু প্রেরণ করলাম এবং যাদের উপর দিয়ে ওটা বয়ে গেল তাদের সবকেই তচনচ্ করে দিলো।” যেমন অন্য একটি আয়াতে আছে- “আর আ’দ সম্প্রদায়কে এক প্রচণ্ড ঝঞাবায়ু দ্বারা বিধ্বস্ত করা হয়েছে। যে বায়ুকে আল্লাহ সাত রাত্রি ও আট দিবস পর্যন্ত তাদের উপর একাধারে চাপিয়ে রেখেছিলেন, অতএব, তুমি ঐ সম্প্রদায়কে ওতে এমনভাবে ভূপতিত দেখতে পেতে, যেন তারা উৎপাটিত খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডসমূহ। সুতরাং তাদের কাউকেও কি তুমি অবশিষ্ট দেখতে পাও?” তাদের ঔদ্ধত্যের কারণে তাদের উপর এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবার্তা প্রেরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ঐ বায়ু তাদেরকে আকাশে নিয়ে উড়তেছিল এবং পরে মাথার ভরে যমীনে নিক্ষেপ করে দিচ্ছিলো। ফলে তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে দেহ থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা সেই খেজুর গাছের কাণ্ডের মত হয়ে গিয়েছিল যেগুলো সম্পূর্ণরূপে ডাল-পাতা শূন্য ছিল। ঐ লোকগুলো ইয়ামানে আম্মান ও হারামাউতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতো। তাছাড়া তারা সারা দুনিয়ায় দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা শক্তির দাপটে জনগণের উপর অত্যাচার চালাতো। তারা মূর্তিপূজা করতো। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হূদ (আঃ)-কে পাঠালেন। তিনি তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিলেন। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন যে, তারা যেন আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে নেয় এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করে। আর তারা যেন লোকদের উপর অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে এবং তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ বলে- “আমাদের অপেক্ষা বড় শক্তিশালী আর কে আছে?” অন্যান্য লোকেরাও তাদের অনুসরণ করে। হ্রদ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী লোকের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। যখন আ’দ সম্প্রদায় এরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে শুরু করে, আর বিনা প্রয়োজনে বড় বড় অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করে, তখন হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা সব জায়গায় বিনা প্রয়োজনে ঘরবাড়ী নির্মাণ করছে এবং ওগুলোকে এতো মজবুত করে তৈরী করছো যে, মনে হচ্ছে তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে! যখন তোমরা কারো উপর ক্ষমতা প্রাপ্ত হচ্ছে তখন তার সাথে অত্যন্ত কঠোরতাপূর্ণ ব্যবহার করছো! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার কথা মেনে চল।” তারা তখন তাকে বললোঃ “হে হূদ (আঃ)! তুমি প্রমাণবিহীন কথা বলছো। তোমার কথায় আমরা আমাদের মা’বৃদদেরকে ছেড়ে দিতে পারি না এবং তোমার উপর ঈমানও আনব না। আমাদের তো ধারণা হচ্ছে যে, তোমার উপর আমাদের কোন মা'বুদের গযব পতিত হয়েছে, ফলে তুমি পাগল হয়ে গেছো।” হুদ (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমি তোমাদের শিকযুক্ত চিন্তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এখন তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে যা কিছু ছল-চাতুরী করতে চাও কর এবং আমাকে অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপরই ভরসা করছি। তিনি আমার প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু। আমার প্রতিপালক যা কিছু বলেন ঠিকই বলেন।” ঐ লোকগুলো যখন কুফরীর উপর অটল থাকলো তখন আল্লাহ তা'আলা তিন বছর পর্যন্ত তাদের উপর বৃষ্টি বন্ধ রাখলেন। তারা তখন কঠিন বিপদে পতিত হলো। যখন তারা কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতো তখন সেই বিপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানাতো। ঐ সময় তারা কাউকে বায়তুল্লাহ শরীফে পাঠিয়ে দিতো। ঐ যুগে তাদের গোত্রের আমলীক নামে পরিচিত কতকগুলো লোক মক্কায় বসবাস করছিল। তারা ছিল আমালীক ইবনে লাও ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। মুআবিয়া ইবনে বকর নামক একটি পোর্ক ছিল তাদের নেতা। তার মা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তার নাম ছিল জুলহিয়া । সে ছিল খাবীরীর কন্যা। যা হাক, আ’দ সম্প্রদায় সত্তরজন লোকের এক প্রতিনিধি দলকে হারাম শরীফের দিকে পাঠিয়ে দিলো, যেন তারা কা’বাতুল্লাহয় গিয়ে পানি বর্ষণের জন্যে প্রার্থনা করে। ঐ লোকগুলো মক্কার বাইরে তাদের গোত্রীয় লোক মুআবিয়ার নিকট অবস্থান করে। এক মাস পর্যন্ত তারা তার কাছেই অবস্থান করতে থাকে। তারা সেখানে মদ্যপান করতে এবং মুআবিয়ার দু’জন গায়িকা দাসীর গান শুনতো। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তাদের অবস্থান মুআবিয়ার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অতিথিদেরকে বিদায় হয়ে যাওয়ার কথা বলতে সে লজ্জাবোধ করছিল। অবশেষে সে কতকগুলো ছন্দ রচনা করলো এবং ওগুলো তাদের সামনে গায়িকাদেরকে গাইতে বললো। ছন্দগুলোর অনুবাদ নিম্নরূপঃ“হে কায়েল! তোমার উপর আফসোস! যাও, প্রার্থনা কর। হয়তো আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণের জন্যে মেঘ পাঠাবেন। ফলে আ’দ সম্প্রদায়ের ভূমি অদ্র ও সতেজ হয়ে উঠবে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায়ের অবস্থা তো এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তারা ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। পিপাসায় এখন তাদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। বুড়ো ও যুবক কারো জীবনের আশা নেই। তাদের মহিলাদেরও অবস্থা ভাল নয়। ক্ষুধা ও পিপাসায় এখন তাদের চলৎশক্তি রহিত। বন্য জঙুগুলো অতি সহজেই তাদের বস্তিতে ঢুকে পড়েছে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায় সম্পর্কে তাদের এখন কোন ভয় নেই যে, তারা ওদেরকে তীর মেরে হত্যা করবে। কারণ, এখন তাদের তীর চালাবার শক্তিও নেই। সুতরাং জেনে রেখো যে, তাদের এখন দিবস ও রজনী শেষ হয়েই গেছে। কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দল তোমাদের ন্যায় এতো নিষ্ঠুর হতে পারে না। তোমাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হাক!” একথা শুনে ঐ প্রতিনিধি দলের লোকদের চৈতন্য ফিরলো। তারা কাবা ঘরে গিয়ে কওমের জন্যে প্রার্থনা করতে শুরু করলো। ঐ প্রতিনিধি দলের নেতার নাম ছিল কায়েল। আল্লাহর হুকুমে তিন খণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো। এক খণ্ড সাদা, এক খণ্ড কালো এবং এক খণ্ড লাল। আকাশ থেকে একটা শব্দ শোনা গেল- “নিজের কওমের জন্যে এই তিন খণ্ড মেঘের যে কোন একখণ্ড পছন্দ করে নাও।”কায়েল বললোঃ “আমি কালো মেঘখণ্ডই পছন্দ করলাম। কালো মেঘ থেকেই অধিক বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকে।” পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো ভষ্ম ও মাটিকে পছন্দ করলে। আ’দ সম্প্রদায়ের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। এ মেঘ তো পিতাকে ছাড়বে না এবং পুত্রকেও ছাড়বে না, বরং সবকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের বানী আযিয়া গোত্র নিরাপত্তা লাভ করবে।” আ’দ সম্প্রদায়ের এ গোত্রটি মক্কায় অবস্থান করছিল। তারা শাস্তির কিছুই টের পায়নি। আ’দ সম্প্রদায়ের সবাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যারা রক্ষা পেয়েছিল তারা ছিল এই বানী আযিয়া গোত্রেরই লোক। এর বংশ ও সন্তানদের মধ্য থেকে ঐ কওম অবশিষ্ট থাকে যাদেরকে আ’দে সানী’ বা দ্বিতীয় আ’দ বলা হয়। কথিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা একটা কলো মেঘখণ্ড পাঠিয়েছিলেন যাকে কায়েল পছন্দ করেছিল এবং এটাই ঐ সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল। ঐ মেঘখণ্ডটি মুগীস নামক একটি উপত্যকা হতে উঠেছিল। জনগণ ওটা দেখে খুব খুশী হয় এবং বলে- “এটা তো বর্ষণকারী মেঘ।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “প্রবল ঝটিকা এই মেঘ বয়ে নিয়ে আসে। এরই মধ্যে ছিল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, যা সব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়। এই মেঘের মধ্যে একটি জিনিস সর্বপ্রথম যে দেখেছিল, সে ছিল একটি মহিলা। তার নাম ছিল মুমীদ। সে মেঘের মধ্যে যা দেখেছিল তা দেখে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সে বলেঃ “এই মেঘের মধ্যে আগুনের শিখা ছিল। কতকগুলো লোককে দেখা যাচ্ছিল যারা ঐ শিখাগুলো টেনে আনছিল।” সাতরাত ও আটদিন পর্যন্ত ঐ মেঘ হতে পানি বর্ষিতে থাকে। আ’দ সম্প্রদায়ের এমন লোক অবশিষ্ট ছিল না যে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। হূদ (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী মুমিনগণ এখান থেকে সরে গিয়েছিলেন এবং একটি শস্যক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ছিলেন। ঠাণ্ডা বায়ু তাদের দেহ স্পর্শ করছিল এবং তাদের আত্মাকে সতেজ ও পরিতৃপ্ত রাখছিল । কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতি ঐ মেঘ ঝটিকা পাথর বর্ষণ করছিল। তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ ঘটনার বর্ণনা খুবই দীর্ঘ এবং এর রচনাভঙ্গীও বেশ বিস্ময়কর। এর থেকে কয়েকটি ফলাফলও বের হয় । আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার আযাব যখন এসে পৌঁছেই গেল তখন আমি হূদ (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গীয় মুমিনদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে তারা নিরাপদে থাকলো।”হারিসুল বিকরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আ’লা ইবনে হারামীর অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছিলাম। আমি কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিলাম। এমতাবস্থায় বানী তামীম গোত্রের একটি মহিলা যে তার গোত্র থেকে ছুটে গিয়ে একা পড়ে গিয়েছিল, আমাকে বললো- “হে আল্লাহর বান্দা! আমাকে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তাঁর আমার প্রয়োজন রয়েছে। আমি তখন তাকে আমার উটের উপর বসিয়ে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলাম। মসজিদ লোকে পরিপূর্ণ ছিল এবং একটি কালো পতাকা উত্তোলিত ছিল। হযরত বিলাল (রাঃ) স্বীয় তরবারী লটকিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এ লোকগুলোর জমায়েত হওয়ার কারণ কি? উত্তর হলোঃ “আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রেরণ করা হচ্ছে।” আমি বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমি তার কাছে হাযির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলাম। আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। আমি তার কাছে হাযির হয়ে সালাম করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার ও তাদের মধ্যে মননামালিন্য আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, তাদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ রয়েছে। এখন আমি আপনার নিকট আসছিলাম, এমতাবস্থায় পথে বানী তামীম গোত্রের এক বুড়ীর সাথে আমার সাক্ষাত হয়। সে তার গোত্র থেকে ছাড়া পড়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলে- “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে আমার প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। সে দরজাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (আঃ) তাকে ডেকে নিলেন।সে এসে পড়লে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার ও বানী তামীমের মধ্যে আড়াল করে দিন। একথা শুনে বানী তামীম গোত্রের ঐ বুড়ীটি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে এই নিরাশ্রয়া কোথায় আশ্রয় নেবে? আমি তখন বললাম, আমার এই দৃষ্টান্ত তো হচ্ছে “বকরী নিজেই নিজের মৃত্যুকে টেনে আনলো” -এই প্রবাদ বাক্যের মতই। আমি এই বুড়ীকে নিজের সোয়ারীর উপর চড়িয়ে আনলাম, আমি কি জানতাম যে, সেই আমার শত্রুরূপে সাব্যস্ত হবে! আমি আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মত হয়ে যাই এর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের ঘটনাটি কি?” অথচ তিনি এটা আমার চেয়ে অনেক বেশী জানতেন। কিন্তু তিনি এটা আমার নিকট থেকে শুনতে আগ্রহী ছিলেন। সুতরাং আমি বলতে লাগলাম, আ’দ সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়েছিল। তাই তারা একটা প্রতিনিধি দল মক্কায় প্রেরণ করে। তাদের নেতা ছিল কায়েল নামক একটি লোক। তারা মক্কায় গিয়ে মুআবিয়া ইবনে বকরের নিকট অবস্থান করে। সেখানে তারা দীর্ঘ এক মাস ধরে বাস করে এবং মদ্যপানরত.থাকে। তাছাড়া তারা জারাদাতান নাম্নী" দু'টি দাসীর গান শুনতে থাকে। অতঃপর তাদের নেতা কায়েল মুহরার পাহাড়ের দিকে গমন করে এবং প্রার্থনা জানিয়ে বলে- “হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আমরা কোন রোগীর রোগ মুক্তির দুআ’র জন্যে আসিনি বা কোন বন্দীর মুক্তিপণের জন্যে প্রার্থনা করছি না। বরং আমাদের প্রার্থনা এই যে, আপনি আ’দ সম্প্রদায়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” তখন আল্লাহর হুকুমে তিনখণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো (মেঘখণ্ডগুলো ছিল সাদা, কালো ও লাল)। দৈববাণী হলো- “যে কোন একখণ্ড মেঘ গ্রহণ কর।” সে কালো মেঘ খণ্ডটি পছন্দ করল। পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো মাটি পাবে। আ’দ সম্প্রদায়ের একটি প্রাণীও রক্ষা পাবে না বরং সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একটা প্রবল ঝটিকা প্রেরণ করেন। সেই বায়ু ছিল বায়ু ভাণ্ডারের মধ্যে যেন আমার আংটির বৃত্তের সমপরিমাণ। তাতে সমস্ত আ’দ সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। এখন আরবের লোকেরা কোন প্রতিনিধি দল পাঠালে প্রবাদ বাক্য হিসেবে বলে থাকেঃ আদ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মতো হয়ো না। (এটা ইমাম তরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-আরাফ 7:72

৭০-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরগণ হযরত হূদ (আঃ)-এর সাথে কিরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছিল তারই বর্ণনা আল্লাহ পাক এখানে দিচ্ছেন। তারা তাকে বলেছিল-“হে হূদ (আঃ)! আমাদের পূর্বপুরুষরা যাদের ইবাদত-বন্দেগী করতো তাদেরকে ছেড়ে আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি এজন্যেই কি তুমি আমাদের কাছে এসেছো? আচ্ছা, তুমি যদি তোমার কথায় সত্যবাদী হও তবে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।” যেমন কাফির কুরাইশরা বলছে- “তুমি আমাদেরকে শাস্তির যে ভয় দেখাচ্ছ তা যদি সত্য হয় তাহলে আকাশ থেকে পাথর বর্ষিয়ে নাও এবং আমাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেই ফেলো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, হযরত হূদ (আঃ)-এর কওম মূর্তিসমূহের পূজা করতো। একটি মূর্তির নাম ছিল সামাদ, একটির নাম ছিল ‘সামুদ' এবং একটির নাম ছিল ‘হাবা’! এজন্যেই হূদ (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, তোমাদের একথা বলার কারণেই তোমাদের উপর আল্লাহর গযব ওয়াজিব হয়ে গেছে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দটি (আরবী) -এরই প্রতিশব্দ । হ্রদ (আঃ) বলেনঃ “তোমরা কি আমার সাথে এমনসব মূর্তির ব্যাপার নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে যেগুলোর নাম তোমরা নিজেরা রেখেছে বা তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছে। এসব মূর্তি তো তোমাদের কোন লাভও করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ তোমাদেরকে এগুলোর ইবাদত করার কোন সনদও দেননি এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যদি কথা এটাই হয় তবে ঠিক আছে, তোমরা শাস্তির জন্যে অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি। এটা রাসূলের পক্ষ থেকে তাঁর কওমের প্রতি কঠিন হুমকি ও ভয় প্রদর্শন। সুতরাং এর পরই ইরশাদ হচ্ছে- আমি হদ (আঃ)-কে এবং তার অনুসারী সঙ্গী সাথীদেরকে তো বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু যারা তার উপর ঈমান আনেনি এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল আমি তাদের মূলোৎপাটন করলাম। আদ জাতির ধ্বংসের ঘটনা কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় এরূপ বর্ণিত আছে- “তাদের উপর আমি এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ু প্রেরণ করলাম এবং যাদের উপর দিয়ে ওটা বয়ে গেল তাদের সবকেই তচনচ্ করে দিলো।” যেমন অন্য একটি আয়াতে আছে- “আর আ’দ সম্প্রদায়কে এক প্রচণ্ড ঝঞাবায়ু দ্বারা বিধ্বস্ত করা হয়েছে। যে বায়ুকে আল্লাহ সাত রাত্রি ও আট দিবস পর্যন্ত তাদের উপর একাধারে চাপিয়ে রেখেছিলেন, অতএব, তুমি ঐ সম্প্রদায়কে ওতে এমনভাবে ভূপতিত দেখতে পেতে, যেন তারা উৎপাটিত খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডসমূহ। সুতরাং তাদের কাউকেও কি তুমি অবশিষ্ট দেখতে পাও?” তাদের ঔদ্ধত্যের কারণে তাদের উপর এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবার্তা প্রেরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ঐ বায়ু তাদেরকে আকাশে নিয়ে উড়তেছিল এবং পরে মাথার ভরে যমীনে নিক্ষেপ করে দিচ্ছিলো। ফলে তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে দেহ থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেন যে, তারা সেই খেজুর গাছের কাণ্ডের মত হয়ে গিয়েছিল যেগুলো সম্পূর্ণরূপে ডাল-পাতা শূন্য ছিল। ঐ লোকগুলো ইয়ামানে আম্মান ও হারামাউতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতো। তাছাড়া তারা সারা দুনিয়ায় দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা শক্তির দাপটে জনগণের উপর অত্যাচার চালাতো। তারা মূর্তিপূজা করতো। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হূদ (আঃ)-কে পাঠালেন। তিনি তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিলেন। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন যে, তারা যেন আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে নেয় এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করে। আর তারা যেন লোকদের উপর অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে এবং তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ বলে- “আমাদের অপেক্ষা বড় শক্তিশালী আর কে আছে?” অন্যান্য লোকেরাও তাদের অনুসরণ করে। হ্রদ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী লোকের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। যখন আ’দ সম্প্রদায় এরূপ অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে শুরু করে, আর বিনা প্রয়োজনে বড় বড় অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করে, তখন হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা সব জায়গায় বিনা প্রয়োজনে ঘরবাড়ী নির্মাণ করছে এবং ওগুলোকে এতো মজবুত করে তৈরী করছো যে, মনে হচ্ছে তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে! যখন তোমরা কারো উপর ক্ষমতা প্রাপ্ত হচ্ছে তখন তার সাথে অত্যন্ত কঠোরতাপূর্ণ ব্যবহার করছো! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার কথা মেনে চল।” তারা তখন তাকে বললোঃ “হে হূদ (আঃ)! তুমি প্রমাণবিহীন কথা বলছো। তোমার কথায় আমরা আমাদের মা’বৃদদেরকে ছেড়ে দিতে পারি না এবং তোমার উপর ঈমানও আনব না। আমাদের তো ধারণা হচ্ছে যে, তোমার উপর আমাদের কোন মা'বুদের গযব পতিত হয়েছে, ফলে তুমি পাগল হয়ে গেছো।” হুদ (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমি তোমাদের শিকযুক্ত চিন্তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এখন তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে যা কিছু ছল-চাতুরী করতে চাও কর এবং আমাকে অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপরই ভরসা করছি। তিনি আমার প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু। আমার প্রতিপালক যা কিছু বলেন ঠিকই বলেন।” ঐ লোকগুলো যখন কুফরীর উপর অটল থাকলো তখন আল্লাহ তা'আলা তিন বছর পর্যন্ত তাদের উপর বৃষ্টি বন্ধ রাখলেন। তারা তখন কঠিন বিপদে পতিত হলো। যখন তারা কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতো তখন সেই বিপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানাতো। ঐ সময় তারা কাউকে বায়তুল্লাহ শরীফে পাঠিয়ে দিতো। ঐ যুগে তাদের গোত্রের আমলীক নামে পরিচিত কতকগুলো লোক মক্কায় বসবাস করছিল। তারা ছিল আমালীক ইবনে লাও ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। মুআবিয়া ইবনে বকর নামক একটি পোর্ক ছিল তাদের নেতা। তার মা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তার নাম ছিল জুলহিয়া । সে ছিল খাবীরীর কন্যা। যা হাক, আ’দ সম্প্রদায় সত্তরজন লোকের এক প্রতিনিধি দলকে হারাম শরীফের দিকে পাঠিয়ে দিলো, যেন তারা কা’বাতুল্লাহয় গিয়ে পানি বর্ষণের জন্যে প্রার্থনা করে। ঐ লোকগুলো মক্কার বাইরে তাদের গোত্রীয় লোক মুআবিয়ার নিকট অবস্থান করে। এক মাস পর্যন্ত তারা তার কাছেই অবস্থান করতে থাকে। তারা সেখানে মদ্যপান করতে এবং মুআবিয়ার দু’জন গায়িকা দাসীর গান শুনতো। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তাদের অবস্থান মুআবিয়ার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অতিথিদেরকে বিদায় হয়ে যাওয়ার কথা বলতে সে লজ্জাবোধ করছিল। অবশেষে সে কতকগুলো ছন্দ রচনা করলো এবং ওগুলো তাদের সামনে গায়িকাদেরকে গাইতে বললো। ছন্দগুলোর অনুবাদ নিম্নরূপঃ“হে কায়েল! তোমার উপর আফসোস! যাও, প্রার্থনা কর। হয়তো আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণের জন্যে মেঘ পাঠাবেন। ফলে আ’দ সম্প্রদায়ের ভূমি অদ্র ও সতেজ হয়ে উঠবে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায়ের অবস্থা তো এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তারা ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। পিপাসায় এখন তাদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। বুড়ো ও যুবক কারো জীবনের আশা নেই। তাদের মহিলাদেরও অবস্থা ভাল নয়। ক্ষুধা ও পিপাসায় এখন তাদের চলৎশক্তি রহিত। বন্য জঙুগুলো অতি সহজেই তাদের বস্তিতে ঢুকে পড়েছে। কেননা, আ’দ সম্প্রদায় সম্পর্কে তাদের এখন কোন ভয় নেই যে, তারা ওদেরকে তীর মেরে হত্যা করবে। কারণ, এখন তাদের তীর চালাবার শক্তিও নেই। সুতরাং জেনে রেখো যে, তাদের এখন দিবস ও রজনী শেষ হয়েই গেছে। কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দল তোমাদের ন্যায় এতো নিষ্ঠুর হতে পারে না। তোমাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হাক!” একথা শুনে ঐ প্রতিনিধি দলের লোকদের চৈতন্য ফিরলো। তারা কাবা ঘরে গিয়ে কওমের জন্যে প্রার্থনা করতে শুরু করলো। ঐ প্রতিনিধি দলের নেতার নাম ছিল কায়েল। আল্লাহর হুকুমে তিন খণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো। এক খণ্ড সাদা, এক খণ্ড কালো এবং এক খণ্ড লাল। আকাশ থেকে একটা শব্দ শোনা গেল- “নিজের কওমের জন্যে এই তিন খণ্ড মেঘের যে কোন একখণ্ড পছন্দ করে নাও।”কায়েল বললোঃ “আমি কালো মেঘখণ্ডই পছন্দ করলাম। কালো মেঘ থেকেই অধিক বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকে।” পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো ভষ্ম ও মাটিকে পছন্দ করলে। আ’দ সম্প্রদায়ের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। এ মেঘ তো পিতাকে ছাড়বে না এবং পুত্রকেও ছাড়বে না, বরং সবকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের বানী আযিয়া গোত্র নিরাপত্তা লাভ করবে।” আ’দ সম্প্রদায়ের এ গোত্রটি মক্কায় অবস্থান করছিল। তারা শাস্তির কিছুই টের পায়নি। আ’দ সম্প্রদায়ের সবাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যারা রক্ষা পেয়েছিল তারা ছিল এই বানী আযিয়া গোত্রেরই লোক। এর বংশ ও সন্তানদের মধ্য থেকে ঐ কওম অবশিষ্ট থাকে যাদেরকে আ’দে সানী’ বা দ্বিতীয় আ’দ বলা হয়। কথিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা একটা কলো মেঘখণ্ড পাঠিয়েছিলেন যাকে কায়েল পছন্দ করেছিল এবং এটাই ঐ সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল। ঐ মেঘখণ্ডটি মুগীস নামক একটি উপত্যকা হতে উঠেছিল। জনগণ ওটা দেখে খুব খুশী হয় এবং বলে- “এটা তো বর্ষণকারী মেঘ।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “প্রবল ঝটিকা এই মেঘ বয়ে নিয়ে আসে। এরই মধ্যে ছিল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, যা সব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়। এই মেঘের মধ্যে একটি জিনিস সর্বপ্রথম যে দেখেছিল, সে ছিল একটি মহিলা। তার নাম ছিল মুমীদ। সে মেঘের মধ্যে যা দেখেছিল তা দেখে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সে বলেঃ “এই মেঘের মধ্যে আগুনের শিখা ছিল। কতকগুলো লোককে দেখা যাচ্ছিল যারা ঐ শিখাগুলো টেনে আনছিল।” সাতরাত ও আটদিন পর্যন্ত ঐ মেঘ হতে পানি বর্ষিতে থাকে। আ’দ সম্প্রদায়ের এমন লোক অবশিষ্ট ছিল না যে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। হূদ (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী মুমিনগণ এখান থেকে সরে গিয়েছিলেন এবং একটি শস্যক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ছিলেন। ঠাণ্ডা বায়ু তাদের দেহ স্পর্শ করছিল এবং তাদের আত্মাকে সতেজ ও পরিতৃপ্ত রাখছিল । কিন্তু আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতি ঐ মেঘ ঝটিকা পাথর বর্ষণ করছিল। তাদের মাথাগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ ঘটনার বর্ণনা খুবই দীর্ঘ এবং এর রচনাভঙ্গীও বেশ বিস্ময়কর। এর থেকে কয়েকটি ফলাফলও বের হয় । আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার আযাব যখন এসে পৌঁছেই গেল তখন আমি হূদ (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গীয় মুমিনদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে তারা নিরাপদে থাকলো।”হারিসুল বিকরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আ’লা ইবনে হারামীর অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যাচ্ছিলাম। আমি কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিলাম। এমতাবস্থায় বানী তামীম গোত্রের একটি মহিলা যে তার গোত্র থেকে ছুটে গিয়ে একা পড়ে গিয়েছিল, আমাকে বললো- “হে আল্লাহর বান্দা! আমাকে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তাঁর আমার প্রয়োজন রয়েছে। আমি তখন তাকে আমার উটের উপর বসিয়ে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলাম। মসজিদ লোকে পরিপূর্ণ ছিল এবং একটি কালো পতাকা উত্তোলিত ছিল। হযরত বিলাল (রাঃ) স্বীয় তরবারী লটকিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এ লোকগুলোর জমায়েত হওয়ার কারণ কি? উত্তর হলোঃ “আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রেরণ করা হচ্ছে।” আমি বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমি তার কাছে হাযির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলাম। আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। আমি তার কাছে হাযির হয়ে সালাম করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার ও তাদের মধ্যে মননামালিন্য আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, তাদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ রয়েছে। এখন আমি আপনার নিকট আসছিলাম, এমতাবস্থায় পথে বানী তামীম গোত্রের এক বুড়ীর সাথে আমার সাক্ষাত হয়। সে তার গোত্র থেকে ছাড়া পড়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলে- “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে আমার প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। সে দরজাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (আঃ) তাকে ডেকে নিলেন।সে এসে পড়লে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার ও বানী তামীমের মধ্যে আড়াল করে দিন। একথা শুনে বানী তামীম গোত্রের ঐ বুড়ীটি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে এই নিরাশ্রয়া কোথায় আশ্রয় নেবে? আমি তখন বললাম, আমার এই দৃষ্টান্ত তো হচ্ছে “বকরী নিজেই নিজের মৃত্যুকে টেনে আনলো” -এই প্রবাদ বাক্যের মতই। আমি এই বুড়ীকে নিজের সোয়ারীর উপর চড়িয়ে আনলাম, আমি কি জানতাম যে, সেই আমার শত্রুরূপে সাব্যস্ত হবে! আমি আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মত হয়ে যাই এর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের ঘটনাটি কি?” অথচ তিনি এটা আমার চেয়ে অনেক বেশী জানতেন। কিন্তু তিনি এটা আমার নিকট থেকে শুনতে আগ্রহী ছিলেন। সুতরাং আমি বলতে লাগলাম, আ’দ সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়েছিল। তাই তারা একটা প্রতিনিধি দল মক্কায় প্রেরণ করে। তাদের নেতা ছিল কায়েল নামক একটি লোক। তারা মক্কায় গিয়ে মুআবিয়া ইবনে বকরের নিকট অবস্থান করে। সেখানে তারা দীর্ঘ এক মাস ধরে বাস করে এবং মদ্যপানরত.থাকে। তাছাড়া তারা জারাদাতান নাম্নী" দু'টি দাসীর গান শুনতে থাকে। অতঃপর তাদের নেতা কায়েল মুহরার পাহাড়ের দিকে গমন করে এবং প্রার্থনা জানিয়ে বলে- “হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আমরা কোন রোগীর রোগ মুক্তির দুআ’র জন্যে আসিনি বা কোন বন্দীর মুক্তিপণের জন্যে প্রার্থনা করছি না। বরং আমাদের প্রার্থনা এই যে, আপনি আ’দ সম্প্রদায়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” তখন আল্লাহর হুকুমে তিনখণ্ড মেঘ প্রকাশিত হলো (মেঘখণ্ডগুলো ছিল সাদা, কালো ও লাল)। দৈববাণী হলো- “যে কোন একখণ্ড মেঘ গ্রহণ কর।” সে কালো মেঘ খণ্ডটি পছন্দ করল। পুনরায় শব্দ আসলো-“তুমি তো মাটি পাবে। আ’দ সম্প্রদায়ের একটি প্রাণীও রক্ষা পাবে না বরং সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একটা প্রবল ঝটিকা প্রেরণ করেন। সেই বায়ু ছিল বায়ু ভাণ্ডারের মধ্যে যেন আমার আংটির বৃত্তের সমপরিমাণ। তাতে সমস্ত আ’দ সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। এখন আরবের লোকেরা কোন প্রতিনিধি দল পাঠালে প্রবাদ বাক্য হিসেবে বলে থাকেঃ আদ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মতো হয়ো না। (এটা ইমাম তরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-আরাফ 7:73

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।

আল-আরাফ 7:74

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।