Tafsir Ahsanul Bayaan — আর-রাদ 13:1 – আন-নাহল 16:128
Contents
- আর-রাদ 13:1
- আর-রাদ 13:2
- আর-রাদ 13:3
- আর-রাদ 13:4
- আর-রাদ 13:5
- আর-রাদ 13:6
- আর-রাদ 13:7
- আর-রাদ 13:8
- আর-রাদ 13:9
- আর-রাদ 13:10
- আর-রাদ 13:11
- আর-রাদ 13:12
- আর-রাদ 13:13
- আর-রাদ 13:14
- আর-রাদ 13:15
- আর-রাদ 13:16
- আর-রাদ 13:17
- আর-রাদ 13:18
- আর-রাদ 13:19
- আর-রাদ 13:20
- আর-রাদ 13:21
- আর-রাদ 13:22
- আর-রাদ 13:23
- আর-রাদ 13:24
- আর-রাদ 13:25
- আর-রাদ 13:26
- আর-রাদ 13:27
- আর-রাদ 13:28
- আর-রাদ 13:29
- আর-রাদ 13:30
- আর-রাদ 13:31
- আর-রাদ 13:32
- আর-রাদ 13:33
- আর-রাদ 13:34
- আর-রাদ 13:35
- আর-রাদ 13:36
- আর-রাদ 13:37
- আর-রাদ 13:38
- আর-রাদ 13:39
- আর-রাদ 13:40
- আর-রাদ 13:41
- আর-রাদ 13:42
- আর-রাদ 13:43
- ইবরাহীম 14:1
- ইবরাহীম 14:2
- ইবরাহীম 14:3
- ইবরাহীম 14:4
- ইবরাহীম 14:5
- ইবরাহীম 14:6
- ইবরাহীম 14:7
- ইবরাহীম 14:8
- ইবরাহীম 14:9
- ইবরাহীম 14:10
- ইবরাহীম 14:11
- ইবরাহীম 14:12
- ইবরাহীম 14:13
- ইবরাহীম 14:14
- ইবরাহীম 14:15
- ইবরাহীম 14:16
- ইবরাহীম 14:17
- ইবরাহীম 14:18
- ইবরাহীম 14:19
- ইবরাহীম 14:20
- ইবরাহীম 14:21
- ইবরাহীম 14:22
- ইবরাহীম 14:23
- ইবরাহীম 14:24
- ইবরাহীম 14:25
- ইবরাহীম 14:26
- ইবরাহীম 14:27
- ইবরাহীম 14:28
- ইবরাহীম 14:29
- ইবরাহীম 14:30
- ইবরাহীম 14:31
- ইবরাহীম 14:32
- ইবরাহীম 14:33
- ইবরাহীম 14:34
- ইবরাহীম 14:35
- ইবরাহীম 14:36
- ইবরাহীম 14:37
- ইবরাহীম 14:38
- ইবরাহীম 14:39
- ইবরাহীম 14:40
- ইবরাহীম 14:41
- ইবরাহীম 14:42
- ইবরাহীম 14:43
- ইবরাহীম 14:44
- ইবরাহীম 14:45
- ইবরাহীম 14:46
- ইবরাহীম 14:47
- ইবরাহীম 14:48
- ইবরাহীম 14:49
- ইবরাহীম 14:50
- ইবরাহীম 14:51
- ইবরাহীম 14:52
- আল-হিজর 15:1
- আল-হিজর 15:2
- আল-হিজর 15:3
- আল-হিজর 15:4
- আল-হিজর 15:5
- আল-হিজর 15:6
- আল-হিজর 15:7
- আল-হিজর 15:8
- আল-হিজর 15:9
- আল-হিজর 15:10
- আল-হিজর 15:11
- আল-হিজর 15:12
- আল-হিজর 15:13
- আল-হিজর 15:14
- আল-হিজর 15:15
- আল-হিজর 15:16
- আল-হিজর 15:17
- আল-হিজর 15:18
- আল-হিজর 15:19
- আল-হিজর 15:20
- আল-হিজর 15:21
- আল-হিজর 15:22
- আল-হিজর 15:23
- আল-হিজর 15:24
- আল-হিজর 15:25
- আল-হিজর 15:26
- আল-হিজর 15:27
- আল-হিজর 15:28
- আল-হিজর 15:29
- আল-হিজর 15:30
- আল-হিজর 15:31
- আল-হিজর 15:32
- আল-হিজর 15:33
- আল-হিজর 15:34
- আল-হিজর 15:35
- আল-হিজর 15:36
- আল-হিজর 15:37
- আল-হিজর 15:38
- আল-হিজর 15:39
- আল-হিজর 15:40
- আল-হিজর 15:41
- আল-হিজর 15:42
- আল-হিজর 15:43
- আল-হিজর 15:44
- আল-হিজর 15:45
- আল-হিজর 15:46
- আল-হিজর 15:47
- আল-হিজর 15:48
- আল-হিজর 15:49
- আল-হিজর 15:50
- আল-হিজর 15:51
- আল-হিজর 15:52
- আল-হিজর 15:53
- আল-হিজর 15:54
- আল-হিজর 15:55
- আল-হিজর 15:56
- আল-হিজর 15:57
- আল-হিজর 15:58
- আল-হিজর 15:59
- আল-হিজর 15:60
- আল-হিজর 15:61
- আল-হিজর 15:62
- আল-হিজর 15:63
- আল-হিজর 15:64
- আল-হিজর 15:65
- আল-হিজর 15:66
- আল-হিজর 15:67
- আল-হিজর 15:68
- আল-হিজর 15:69
- আল-হিজর 15:70
- আল-হিজর 15:71
- আল-হিজর 15:72
- আল-হিজর 15:73
- আল-হিজর 15:74
- আল-হিজর 15:75
- আল-হিজর 15:76
- আল-হিজর 15:77
- আল-হিজর 15:78
- আল-হিজর 15:79
- আল-হিজর 15:80
- আল-হিজর 15:81
- আল-হিজর 15:82
- আল-হিজর 15:83
- আল-হিজর 15:84
- আল-হিজর 15:85
- আল-হিজর 15:86
- আল-হিজর 15:87
- আল-হিজর 15:88
- আল-হিজর 15:89
- আল-হিজর 15:90
- আল-হিজর 15:91
- আল-হিজর 15:92
- আল-হিজর 15:93
- আল-হিজর 15:94
- আল-হিজর 15:95
- আল-হিজর 15:96
- আল-হিজর 15:97
- আল-হিজর 15:98
- আল-হিজর 15:99
- আন-নাহল 16:1
- আন-নাহল 16:2
- আন-নাহল 16:3
- আন-নাহল 16:4
- আন-নাহল 16:5
- আন-নাহল 16:6
- আন-নাহল 16:7
- আন-নাহল 16:8
- আন-নাহল 16:9
- আন-নাহল 16:10
- আন-নাহল 16:11
- আন-নাহল 16:12
- আন-নাহল 16:13
- আন-নাহল 16:14
- আন-নাহল 16:15
- আন-নাহল 16:16
- আন-নাহল 16:17
- আন-নাহল 16:18
- আন-নাহল 16:19
- আন-নাহল 16:20
- আন-নাহল 16:21
- আন-নাহল 16:22
- আন-নাহল 16:23
- আন-নাহল 16:24
- আন-নাহল 16:25
- আন-নাহল 16:26
- আন-নাহল 16:27
- আন-নাহল 16:28
- আন-নাহল 16:29
- আন-নাহল 16:30
- আন-নাহল 16:31
- আন-নাহল 16:32
- আন-নাহল 16:33
- আন-নাহল 16:34
- আন-নাহল 16:35
- আন-নাহল 16:36
- আন-নাহল 16:37
- আন-নাহল 16:38
- আন-নাহল 16:39
- আন-নাহল 16:40
- আন-নাহল 16:41
- আন-নাহল 16:42
- আন-নাহল 16:43
- আন-নাহল 16:44
- আন-নাহল 16:45
- আন-নাহল 16:46
- আন-নাহল 16:47
- আন-নাহল 16:48
- আন-নাহল 16:49
- আন-নাহল 16:50
- আন-নাহল 16:51
- আন-নাহল 16:52
- আন-নাহল 16:53
- আন-নাহল 16:54
- আন-নাহল 16:55
- আন-নাহল 16:56
- আন-নাহল 16:57
- আন-নাহল 16:58
- আন-নাহল 16:59
- আন-নাহল 16:60
- আন-নাহল 16:61
- আন-নাহল 16:62
- আন-নাহল 16:63
- আন-নাহল 16:64
- আন-নাহল 16:65
- আন-নাহল 16:66
- আন-নাহল 16:67
- আন-নাহল 16:68
- আন-নাহল 16:69
- আন-নাহল 16:70
- আন-নাহল 16:71
- আন-নাহল 16:72
- আন-নাহল 16:73
- আন-নাহল 16:74
- আন-নাহল 16:75
- আন-নাহল 16:76
- আন-নাহল 16:77
- আন-নাহল 16:78
- আন-নাহল 16:79
- আন-নাহল 16:80
- আন-নাহল 16:81
- আন-নাহল 16:82
- আন-নাহল 16:83
- আন-নাহল 16:84
- আন-নাহল 16:85
- আন-নাহল 16:86
- আন-নাহল 16:87
- আন-নাহল 16:88
- আন-নাহল 16:89
- আন-নাহল 16:90
- আন-নাহল 16:91
- আন-নাহল 16:92
- আন-নাহল 16:93
- আন-নাহল 16:94
- আন-নাহল 16:95
- আন-নাহল 16:96
- আন-নাহল 16:97
- আন-নাহল 16:98
- আন-নাহল 16:99
- আন-নাহল 16:100
- আন-নাহল 16:101
- আন-নাহল 16:102
- আন-নাহল 16:103
- আন-নাহল 16:104
- আন-নাহল 16:105
- আন-নাহল 16:106
- আন-নাহল 16:107
- আন-নাহল 16:108
- আন-নাহল 16:109
- আন-নাহল 16:110
- আন-নাহল 16:111
- আন-নাহল 16:112
- আন-নাহল 16:113
- আন-নাহল 16:114
- আন-নাহল 16:115
- আন-নাহল 16:116
- আন-নাহল 16:117
- আন-নাহল 16:118
- আন-নাহল 16:119
- আন-নাহল 16:120
- আন-নাহল 16:121
- আন-নাহল 16:122
- আন-নাহল 16:123
- আন-নাহল 16:124
- আন-নাহল 16:125
- আন-নাহল 16:126
- আন-নাহল 16:127
- আন-নাহল 16:128
আর-রাদ 13:1
আলিফ লা-ম মী-ম রা। এগুলি কুরআনের আয়াত; যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তাই সত্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এতে বিশ্বাস করে না।
আর-রাদ 13:2
আল্লাহই স্তম্ভ ছাড়া আকাশমন্ডলীকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন; তোমরা তা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন[১] এবং সূর্য ও চন্দ্রকে বশীভূত করেছেন; প্রত্যেকে নির্দিষ্ট মিয়াদে আবর্তন করে।[২] তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।
[১] استَوَى عَلَى العَرش এর ভাবার্থ ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর অর্থ মহান আল্লাহর আরশে অবস্থান করা। হাদীস বিশারদদের তরীকা এটাই যে, তাঁরা আল্লাহর কোন গুণের তা'বীল (অপব্যাখ্যা) করেন না, যেমন অন্যরা মহান আল্লাহর উক্ত গুণের এবং তাঁর অন্যান্য গুণের অপব্যাখ্যা করে থাকে। হাদীস বিশারদগণ এও বলেছেন যে, তাঁর গুণাবলীর কেমনত্বও বর্ণনা করা যাবে না এবং কোন কিছুর সাথে তুলনাও করা যাবে না। তিনি বলেন: ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ﴾ অর্থ, কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা শূরা ৪২:১১)[২] এর একটি অর্থ এই যে, 'প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করবে।' অর্থাৎ কিয়ামত অবধি আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক চলতে থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ﴾ অর্থাৎ, সূর্য তার স্থির হওয়ার সময় পর্যন্ত চলছে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৮) দ্বিতীয় অর্থ এই যে, চন্দ্র এবং সূর্য উভয়েই নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করছে। সূর্য নিজের চক্র এক বছরে এবং চন্দ্র এক মাসে পূর্ণ করে নেয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ﴾ অর্থাৎ, চন্দ্রের জন্যে আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিনণ কক্ষপথ। (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৯) সাতটি বৃহৎ বৃহৎ গ্রহ রয়েছে, ওদের মধ্যে দু'টি হলো সূর্য এবং চন্দ্র। এখানে শুধু উক্ত দু'টি গ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন, কেননা এ দুটিই (মানুষের চক্ষুদৃষ্টিতে) সর্বাধিক বিশাল এবং মহত্বপূর্ণ। এ দুটিও যখন আল্লাহর নির্দেশাধীন, তাহলে অন্যগুলো নিশ্চিতরূপে তাঁর নির্দেশাধীন হবে। আর যখন এরা আল্লাহর হুকুমের অধীনে, তখন এরা মা'বূদ (উপাস্য) হতে পারে না। মা'বূদ তো তিনিই, যিনি এদেরকে অধীনস্থ করে রেখেছেন। তাই তিনি বলেন,﴿لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِله الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ﴾ অর্থাৎ, চন্দ্র-সূর্যকে সিজদা করো না, সেই আল্লাহকে সিজদা কর, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করতে চাও। (সূরা ফুসস্বিলাত ৪১:৩৭) অন্যত্র বলেন, ﴿وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ﴾ অর্থাৎ, সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সবই তাঁর হুকুমের অনুগত। (সূরা আ'রাফ ৭:৫৪)
আর-রাদ 13:3
তিনিই ভূতলকে বিস্তৃত করেছেন এবং ওতে পর্বত ও নদী সৃষ্টি করেছেন[১] এবং প্রত্যেক প্রকারের ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়।[২] তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন; এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।
[১] পৃথিবীর দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুমান করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন। উঁচু ও বিশাল পর্বতমালাকে ভূপৃষ্ঠে কীলক স্বরূপ গেড়ে দেওয়া হয়েছে। নদী-নালা, সমুদ্র ও ঝর্ণাদির এমন ব্যবস্থাপনা রেখেছেন, যার দ্বারা মানুষ নিজেও উপকৃত হয় এবং ক্ষেত-বাগানও সেচন করে থাকে। ফলে বিভিন্ন প্রকারের শস্য ও ফল উৎপাদন হয়, যাদের আকার-প্রকারও ভিন্ন এবং স্বাদও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
[২] এর একটি অর্থ এই যে, নর-মাদী দুটোই বানিয়েছেন, যেমনটি আধুনিক আবিষ্কর্তারাও এর সত্যায়ন করেছেন। (জোড়ায় জোড়ায়)এর দ্বিতীয় অর্থ বিপরীতমুখী, যেমনঃ মিষ্টি-টক, ঠান্ডা-গরম, কালো-সাদা এবং সুস্বাদ-বিস্বাদ, এ ধরণের পারস্পরিক বিপরীতধর্মী বস্তু সৃষ্টি করেছেন।
আর-রাদ 13:4
পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূ-খন্ড;[১] ওতে আছে আঙ্গুর-কানন, শস্যক্ষেত্র, একাধিক ফেঁকড়া-বিশিষ্ট অথবা ফেঁকড়াহীন খেজুর বৃক্ষ,[২] যা একই পানিতে সিঞ্চিত হয়ে থাকে। ফল হিসাবে ওগুলির কতককে কতকের উপর আমি উৎকৃষ্টতা দিয়ে থাকি,[৩] অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন।
[১] مُتَجَاوِرَاتٌ এক অপরের নিকটবর্তী ও পাশাপাশি। অর্থাৎ, ভূখন্ডের একটি ক্ষেত্র শস্য-শ্যামল ও উর্বর, যা অত্যধিক ফসল উৎপন্ন করে। আর তারই পাশাপাশি অনুর্বর ভূমি রয়েছে যাতে কোন প্রকারের ফসল উৎপন্ন হয় না।
[২] صِنْوَانٌ এর একটি অর্থ মিলিত এবং غَيْرُ صِنْوَانٍএর অর্থ পৃথক পৃথক করা হয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, صِنْوَانٌ একটি বৃক্ষ যার শাখা ও ফেঁকড়া রয়েছে যেমন ডালিম, ডুমুর এবং কোন কোন খেজুর গাছ। আর غَيْرُ صِنْوَانٍ যা উক্ত প্রকারের নয় বরং একটিই কান্ড বিশিষ্ট (যেমনঃ খেজুর, তাল, সুপারী ইত্যাদি)।
[৩] অর্থাৎ মাটিও এক, পানি ও আলো-বাতাসও এক; কিন্তু ফল ও শস্যাদি বিভিন্ন প্রকারের এবং স্বাদ ও আকার-প্রকারও এক অপর থেকে ভিন্ন।
আর-রাদ 13:5
যদি তুমি বিস্মিত হও, তাহলে বিস্ময়ের বিষয় তাদের কথা, ‘(মৃত্যুর পর) মাটিতে পরিণত হওয়ার পরও কি আমরা নতুন জীবন লাভ করব?’[১] ওরাই ওদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে এবং ওদেরই গলদেশে থাকবে বেড়ি। ওরাই হবে দোযখবাসী, সেখানে ওরা চিরস্থায়ীভাবে বাস করবে।
[১] অর্থাৎ যে সত্তা প্রথম বার সৃষ্টি করেছেন, দ্বিতীয় বার উক্ত বস্তুর সৃজন তাঁর জন্য কঠিন কাজ নয়। কিন্তু কাফেররা আশ্চর্য কথা বলছে যে, দ্বিতীয় বার আমাদেরকে কিভাবে সৃষ্টি করা হবে?
আর-রাদ 13:6
মঙ্গলের পূর্বে তারা তোমাকে অমঙ্গল ত্বরান্বিত করতে বলে; অথচ তাদের পূর্বে এর বহু দৃষ্টান্ত গত হয়েছে।[১] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক মানুষের সীমালংঘন সত্ত্বেও তাদের প্রতি ক্ষমাশীল[২] এবং নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক শাস্তি দানেও কঠোর। [৩]
[১] অর্থাৎ আল্লাহর আযাবে বহু সম্প্রদায় ও জনপদ ধ্বংসের অনেক উদাহরণ পূর্বে এসেছে, তা সত্ত্বেও তারা আযাব শীঘ্র প্রার্থনা করে? এ কথা কাফেরদের জবাবে বলা হয়েছে, যারা বলেছিল যে, হে নবী! যদি তুমি সত্য হও, তাহলে আমাদের উপর সেই আযাব আনয়ন কর, যার ভয় তুমি আমাদেরকে দেখাচ্ছ।[২] অর্থাৎ মানুষের অন্যায়-অত্যাচার ও অবাধ্যতার পরও তিনি আযাবে শীঘ্র গ্রেপ্তার না করে অবকাশ দিয়ে থাকেন। কখনো কখনো আযাবের ব্যাপারটা কিয়ামত অবধি বিলম্বিত করেন। এটা তাঁর দয়া, কৃপা, করুণা ও ক্ষমাশীলতার পরিণাম। নচেৎ তিনি যদি তাদেরকে আযাবে শীঘ্রই গ্রেপ্তার করতেন, তাহলে পৃথিবীতে কোন মানুষ অবশিষ্ট থাকতো না। তিনি এরশাদ করেন, ﴿وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ﴾ অর্থাৎ, যদি আল্লাহ মানুষদেরকে তাদের কার্যকলাপের কারণে পাকড়াও করতেন, তাহলে ভূ-পৃষ্ঠে একটি জীবকেও রেহাই দিতেন না। (সূরা ফাত্বির ৩৫:৪৫)[৩] এখানে মহান আল্লাহর দ্বিতীয় গুণের কথা উল্লেখ হয়েছে, যেন মানুষ শুধু একটিই দিকের প্রতি দৃষ্টি না রাখে, বরং অন্য দিকের প্রতিও লক্ষ্য রাখে। কেননা একটিই দিকের প্রতি ধারাবাহিক দৃষ্টি রাখলে অনেক কিছু অদৃশ্য থেকে যায়। সঙ্গত কারণেই কুরআন মাজীদে যেখানে আল্লাহর করুণা ও ক্ষমাবিশিষ্ট গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে তার সঙ্গে তাঁর ক্রোধ ও প্রবলতাবিশিষ্ট গুণেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন এখানেও রয়েছে। যেন বান্দার মনে আশা ও ভয় দুটো দিকই সক্রিয় থাকে। কেননা আশা আর আশাই যদি সক্রিয় থাকে, তাহলে মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে ভয়শূন্য ও দুঃসাহসিক হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যদি সব সময় মস্তিষ্কে ভয় আর ভয়ই ঢুকে থাকে, তাহলে সে তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ে যায়। উক্ত দুটো দিকই ভুল এবং মানুষের জন্য সর্বনাশী। এই জন্য বলা হয়, الْإِيْمَانُ بَيْنَ الْخَوْفِ وَالرَّجَاءِ ঈমান ভয় ও আশার মধ্যে। অর্থাৎ, উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার নাম ঈমান। যেন মানুষ তাঁর আযাব থেকে না নির্ভয় হয় আর না তাঁর রহমত থেকে নিরাশ।(উক্ত বিষয়ের জন্য দেখুনঃ সূরা আনআম ৬:৪৭ নং আয়াত, সূরা আ'রাফ ৭:১৬৭ নং আয়াত, সূরা হিজর ১৫:৪৯-৫০ নং আয়াত।)
আর-রাদ 13:7
যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ তুমি তো শুধুমাত্র একজন সতর্ককারী।[১] আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথ প্রদর্শক রয়েছে। [২]
[১] প্রত্যেক নবীকে মহান আল্লাহ অবস্থা, প্রয়োজন এবং স্বীয় ইচ্ছা ও হিকমত মোতাবেক কিছু নিদর্শন ও মু'জিযা দান করেছেন। কিন্তু কাফেররা নিজ খেয়াল-খুশি অনুযায়ী মু'জিযা তলব করতে থাকে। যেমন মক্কার কাফেররা নবী (সাঃ)-কে বলত যে, সাফা পর্বতকে সোনার বানিয়ে দেওয়া হোক অথবা পর্বতের স্থানে নদী ও ঝর্ণা প্রবাহিত করে দেওয়া হোক ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের মন মত মু'জিযা না দেখানো হলে তারা বলতে আরম্ভ করত যে, এর উপর কোন মু'জিযা কেন অবতীর্ণ করা হলো না? মহান আল্লাহ বলেন, হে নবী! তোমার কাজ শুধু সতর্ক করা এবং পৌঁছে দেওয়া। এটা তুমি করতে থাক। কেউ মানুক বা না মানুক, সেটা তোমার দেখার নয়। কেননা হিদায়াত দান করা আমার কাজ। তোমার কাজ পথ দেখানো। তাকে উক্ত পথে চালানো তোমার কাজ নয়, সে কাজ আমার।[২] প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট মহান আল্লাহ তাদের নির্দেশনার জন্য পথপ্রদর্শক অবশ্যই পাঠিয়েছেন। এটা ভিন্ন কথা যে, সম্প্রদায়ের মানুষেরা হিদায়াতের পথ অবলম্বন করল বা করল না। কিন্তু সঠিক পথ দেখাবার জন্য পয়গম্বর অবশ্যই এসেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿وَإنْ مِنْ أُمَّةٍ إلَّا خَلَا فِيْهَا نَذِيْرٌ﴾ অর্থাৎ, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট সতর্ককারী অবশ্যই এসেছে। (সূরা ফাতির ৩৫:২৪)
আর-রাদ 13:8
প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে[১] এবং জরায়ুতে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন[২] এবং তাঁর নিকটে প্রত্যেক বস্তুই নির্দিষ্ট পরিমাণে আছে। [৩]
[১] মাতৃগর্ভে কি আছে; ছেলে না মেয়ে, সুশ্রী না কুশ্রী, সুজন না কুজন, দীর্ঘায়ু না অল্পায়ু? এসব শুধু মহান আল্লাহই জানেন।
[২] এ থেকে উদ্দিষ্ট গর্ভের সময়কাল; যা সাধারণতঃ নয় মাস হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে কমা-বাড়াও হয়; কখনো দশ মাস, কখনো সাত মাস, কখনো আট মাস। এর জ্ঞানও মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে নেই।
[৩] অর্থাৎ কার জীবনকাল কত দিন? সে রুযীর কত অংশ পাবে? এর পূর্ণ জ্ঞান আল্লাহর কাছেই আছে।
আর-রাদ 13:9
অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সম্বন্ধে তিনি অবগত; তিনি সুমহান, সর্বোচ্চ।
আর-রাদ 13:10
তোমাদের মধ্যে যে গোপনে কথা বলে এবং যে তা প্রকাশ্যে বলে, যে রাত্রে আত্মগোপন করে এবং যে দিবসে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা (আল্লাহর জ্ঞানে) সবাই সমান।
আর-রাদ 13:11
মানুষের জন্য তার সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে;[১] ওরা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।[২] আর কোন সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তাহলে তা রদ করবার কেউ নেই এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন অভিভাবক নেই।
[১] مُعَقِّبَاتٌ শব্দটি مُعَقِّبَةٌ শব্দের বহুবচন, এর অর্থ এক অপরের পিছে আগমনকারী। অর্থাৎ ফিরিশতাবর্গ যাঁরা পালাক্রমে এক অপরের পরে আসতে থাকেন। দিনের ফিরিশতা গেলে রাতের ফিরিশতা আসেন এবং রাতের ফিরিশতা গেলে দিনের ফিরিশতা আসেন।[২] এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য দেখুন সূরা আনফালের ৮:৫৩ নং আয়াতের টীকা।
আর-রাদ 13:12
তিনিই তোমাদেরকে ভয় ও আকাঙ্ক্ষা স্বরূপ বিজলী দেখান[১] এবং তিনিই সৃষ্টি করেন ভারী মেঘ।[২]
[১] ফলে পথচারী মুসাফির ভয় পায় এবং বাড়িতে অবস্থানকারী কৃষক-চাষী এর বরকত ও লাভের আশাবাদী হয়।
[২] ঘন মেঘ অর্থাৎ, বর্ষণশীল মেঘ।
আর-রাদ 13:13
বজ্রধ্বনি ও ফিরিশতাগণ সভয়ে তাঁর সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে।[১] তিনি বজ্রসমূহ প্রেরণ করেন এবং যাকে ইচ্ছা তা দ্বারা আঘাত করেন।[২] ওরা আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে; আর তিনি মহাশক্তিশালী। [৩]
[১] যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلاَّ يُسَبِّحُ بِحَمْدَهِ﴾ অর্থাৎ, প্রত্যেক বস্তু তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। (সূরা ইসরা ১৭:৪৪)[২] অর্থাৎ, এর মাধ্যমে যাকে চান ধংস করে দেন।[৩] مِحَال এর অর্থ শক্তি, পাকড়াও এবং পরিচালনা ইত্যাদি করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি বড্ড শক্তিমান, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব-নিকাশকারী এবং সুপরিচালক।
আর-রাদ 13:14
সত্যের আহবান তাঁরই।[১] আর যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদেরকে আহবান করে ওরা তাদেরকে কোনই সাড়া দেয় না; তাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মত, যে নিজ হস্তদ্বয় পানির দিকে প্রসারিত করে; যাতে তার মুখে পৌঁছে। অথচ তা তাতে পৌঁছবার নয়।[২] বস্তুতঃ অবিশ্বাসীদের আহবান ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়।[৩]
[১] অর্থাৎ ভয় এবং আশার সময় শুধু এক আল্লাহকেই ডাকা উচিত। কেননা তিনিই প্রত্যেকের ডাক শোনেন এবং কবুল করেন। অথবা দা'ওয়াত শব্দের অর্থ ইবাদত অর্থাৎ তাঁরই ইবাদত সত্য এবং শুদ্ধ, তিনি ব্যতীত কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। কেননা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পরিচালক তিনিই। সুতরাং ইবাদতও একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
[২]অর্থাৎ যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে, তাদের উদাহরণ এমন যেমন কোন মানুষ দূর থেকে পানির দিকে দুই হাত বাড়িয়ে পানিকে বলে যে, তুই আমার মুখ পর্যন্ত চলে আয়। স্পষ্ট কথা যে, পানি অচল (নির্জীব) বস্তু, তাকে খবরই নেই যে, হাত প্রসারণকারীর প্রয়োজন কী? আর না সে এটা জানে যে, সে মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার অনুরোধ করছে? আর না তার মধ্যে এই ক্ষমতাই আছে যে, সে নিজের স্থান থেকে চলে তার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অনুরূপ এই মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে আহবান করে, তারা না এটা জানে যে, তাদেরকে কেউ আহবান করছে এবং তার অমুক প্রয়োজন রয়েছে, আর না তাদের মধ্যে প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতাই আছে।
[৩] এবং বেকারও বটে, কেননা এতে তাদের কোন লাভ হবে না।
আর-রাদ 13:15
আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের ছায়াগুলিও সকাল ও সন্ধ্যায়।[১] (সাজদাহ-২)
[১] এতে আল্লাহর মহিমা ও ক্ষমতার কথা উল্লেখ হয়েছে যে, প্রত্যেক বস্তুর উপর তাঁর আধিপত্য রয়েছে এবং প্রত্যেক বস্তু তাঁর অধীন ও তাঁর সামনে সিজদাবনত। চাহে মুমিনদের ন্যায় স্বেচ্ছায় করুক বা মুশরিকদের ন্যায় অনিচ্ছায়। তাদের ছায়াও সকাল-সন্ধ্যায় সিজদা করে। যেমন তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿أَوَ لَمْ يَرَوْاْ إِلَى مَا خَلَقَ اللهُ مِن شَيْءٍ يَتَفَيَّأُ ظِلاَلُهُ عَنِ الْيَمِينِ وَالْشَّمَآئِلِ سُجَّدًا لِله وَهُمْ دَاخِرُونَ﴾ অর্থাৎ, তারা কি লক্ষ্য করে না আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর প্রতি যার ছায়া বিনীতভাবে আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয়ে ডানে ও বামে ঢলে পড়ে? (সূরা নাহল ১৬:৪৮) উক্ত সিজদার স্বরূপ কি? এটা মহান আল্লাহই ভাল জানেন। অথবা দ্বিতীয় অর্থ এর এই যে, কাফের সমেত সকল সৃষ্টি আল্লাহর আদেশাধীন, কারো তা লঙ্ঘন করার শক্তি নেই। আল্লাহ কাউকে সুস্থ করুন অথবা অসুস্থ, ধনী করুন অথবা কাঙ্গাল, জীবন দান করুন অথবা মৃত্যু। উক্ত সৃষ্টিমূলক নিয়মকে অমান্য করার শক্তি কোন কাফেরেরও নেই। ---(এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
আর-রাদ 13:16
বল, ‘কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক?’ বল, ‘তিনি আল্লাহ।’[১] বল, ‘তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে, যারা নিজেদের লাভ ও ক্ষতির মালিক নয়?’[২] বল, ‘অন্ধ ও চক্ষুষমান কি সমান অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক?’[৩] অথবা তারা কি আল্লাহর এমন শরীক স্থাপন করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যার কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে তালগোল খেয়ে গেছে? বল, ‘আল্লাহ সকল বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনিই অদ্বিতীয়,[৪] পরাক্রমশালী।’
[১] এখানে নবী (সাঃ)-এর জবানে স্বীকারোক্তি রয়েছে, কিন্তু কুরআনের অন্যান্য স্থানে স্পষ্ট রয়েছে যে, মুশরিকদের জবাবও এটাই ছিল।[২] অর্থাৎ যখন তোমরা স্বীকার করছ যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি অন্যের অংশীদারিত ছাড়া সকল ক্ষমতা ও এখতিয়ারের মালিক, তাহলে এর পরও কেন তোমরা তাঁকে ছেড়ে এমন সৃষ্টিদেরকে অভিভাবক, বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক মনে করছ, যারা নিজেদের লাভ-ক্ষতিরও এখতিয়ার রাখে না।[৩] অর্থাৎ, যেমন দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান সমান হতে পারে না, তেমনি তওহীদবাদী ও মুশরিক (অংশীবাদী) সমান হতে পারে না। কেননা তওহীদবাদীর হৃদয় তওহীদের জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় থাকে, পক্ষান্তরে মুশরিক তা হতে বঞ্চিত থাকে। একত্ববাদীর দৃষ্টিশক্তি রয়েছে, সে তওহীদের জ্যোতি দেখতে পায়। পক্ষান্তরে অংশীবাদী তওহীদের জ্যোতি দেখতে পায় না, কেননা সে অন্ধ। অনুরূপ যেমন অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে না, তেমনি এক আল্লাহর ইবাদতকারী; যার হৃদয় ঈমানী জ্যোতিতে পরিপূর্ণ এবং মুশরিক; যার হৃদয় অজ্ঞতা ও কুসংস্কার তথা অলীক বিশ্বএর অন্ধকারে বিচরণ করে, উভয়ে সমান হতে পারে না।[৪] অর্থাৎ এমন কথা নয় যে, তারা তালগোল বা সন্দেহের শিকার হয়েছে, বরং তারা মানে যে, প্রত্যেক বস্তুর সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র মহান আল্লাহই।
আর-রাদ 13:17
তিনি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, ফলে উপত্যকাসমূহ ওদের পরিমাণ অনুসারে প্রবাহিত হয়।[১] সুতরাং স্রোত-প্রবাহ ভাসমান ফেনাকে বয়ে নিয়ে যায়।[২] অনুরূপ (ফেনার মত) আবর্জনা নির্গত হয়, যখন অলংকার অথবা তৈজসপত্র নির্মাণ উদ্দেশ্যে কিছু (পদার্থ)কে অগ্নিতে উত্তপ্ত করা হয়।[৩] এভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে থাকেন;[৪] সুতরাং যা ফেনা (বা আবর্জনা) তা উপেক্ষিত ও নিশ্চিহ্ন হয়[৫] এবং যা মানুষের উপকারে আসে তা ভূমিতে থেকে যায়।[৬] এভাবেই আল্লাহ উপমা দিয়ে থাকেন।[৭]
[১] بِقَدَرِهَا (বিস্তৃতি বা পরিমাণ অনুসারে) এর অর্থ নালা অর্থাৎ উপত্যকা (দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান) সংকীর্ণ হলে অল্প, আর বিস্তৃত হলে অধিক পানি গ্রহণ করে। অর্থাৎ, পথের দিশারী ও জীবন-সংবিধান কুরআনের অবতীর্ণ হওয়াকে বৃষ্টি বর্ষণের সাথে তুলনা করেছেন। কেননা কুরআনের উপকারিতাও বৃষ্টির উপকারিতার মত সার্বিক বা ব্যাপক। আর উপত্যকাকে তুলনা করেছেন হৃদয়ের সঙ্গে। কেননা উপত্যকায় পানি গিয়ে স্থির হয়ে যায়, যেমন কুরআন ও ঈমান মুমিনের হৃদয়ে স্থির হয়ে যায়।[২] এই ফেনা --যা পানির উপরাংশে জমে ওঠে এবং যা ক্ষণকাল পরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অথবা যাকে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়-- এর অর্থ কুফরী, যা ফেনার মতই উড়ে যায় এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।[৩] এটি দ্বিতীয় উদাহরণ যে, অলংকার অথবা সামগ্রী ইত্যাদি তৈরী করার জন্য তামা, পিতল, সীসা অথবা সোনা-রুপোকে আগুনে গরম করা হলে তার উপরও ফেনা (খাদ) চলে আসে। এই ফেনার অর্থ সেই আবর্জনা বা ময়লা যা উক্ত ধাতুর মধ্যে থাকে। আগুনে গরম করলে ফেনার আকারে তা উপরে চলে আসে। অতঃপর ক্ষণেকের ভিতরে উক্ত ফেনা নিশ্চিহ্ন হয়ে খাঁটি ধাতু থেকে যায়।[৪] অর্থাৎ যখন সত্য ও অসত্যের পরস্পর সংঘর্ষ হয়, তখন অসত্যের স্থায়িত্ব থাকে না; যেমন প্লাবন ধারার ফেনার পানির উপর এবং ধাতুর ফেনার --যা আগুনে গরম করা হয়-- ধাতুর উপর কোন স্থায়িত্ব থাকে না; বরং নিশ্চিহ্ন ও নষ্ট হয়ে যায়।[৫] অর্থাৎ, তার দ্বারা কোন উপকার হয় না। কেননা পানি অথবা ধাতুর সাথে ফেনা অবশিষ্টই থাকে না, বরং আস্তে আস্তে বসে যায় কিংবা বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়, অসত্যের উদাহরণও ঠিক ফেনারই মত।[৬] অর্থাৎ, পানি এবং সোনা-রুপো, তামা, পিতল ইত্যাদি এসব জিনিস থেকে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত ও লাভবান হয়। অনুরূপ সত্য টিঁকে থাকে, যার অস্তিত্বে বিনাশ ঘটে না এবং এর উপকারিতাও স্থায়ী।[৭] অর্থাৎ, কথা বুঝাবার এবং মস্তিষ্কে বসাবার জন্য উদাহরণ পেশ করেন, যেমন এখানে দু'টি উদাহরণ পেশ করেছেন এবং অনুরূপ সূরা বাক্বারার প্রারম্ভে মুনাফিকদের জন্যে উদাহরণ পেশ করেছেন। অনুরূপ সূরা নূরের ২৪:৩৯-৪০ নং আয়াতে কাফেরদের জন্য দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন। আর হাদীসের মধ্যেও নবী (সাঃ) অনেক কথা উপমা দিয়ে মানুষকে বুঝিয়েছেন।(বিস্তারিত জানার জন্য 'তাফসীর ইবনে কাসীর' দেখুন)।
আর-রাদ 13:18
যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল। আর যারা তাঁর আহবানে সাড়া দেয় না, তাদের যদি পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সমস্তই থাকতো এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরো কিছু থাকতো, তাহলে অবশ্যই তারা মুক্তিপণ স্বরূপ তা প্রদান করতো।[১] তাদের হবে কঠোর হিসাব[২] এবং জাহান্নাম হবে তাদের আবাস। আর তা কত নিকৃষ্ট শয়নাগার।
[১] এ বিষয়টি ইতিপূর্বেও দুই-তিন স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। (দেখুনঃ সূরা আলে ইমরান ৩:৯১, সূরা মাইদাহ ৫:৩৬, সূরা যুমার ৩৯:৪৭)[২] কেননা তাদের নিকট থেকে প্রত্যেক ছোট-বড় কর্মের হিসাব নেওয়া হবে এবং তাদের ব্যাপারটা مَنْ نُوْقِشَ الْحِسَابَ عُذِّبَ অর্থাৎ (হিসাবে যাকে জেরা করা হবে তার বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে, সে আযাবে গ্রেপ্তার হবেই) এর মত হবে। এ জন্য এর পরে বলেছেন, 'জাহান্নাম হবে তাদের আবাস।'
আর-রাদ 13:19
তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান?[১] কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। [২]
[১] অর্থাৎ, কুরআনের সঠিকতা ও সত্যতার উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তি এবং অন্ধ অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? এটা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন, অর্থাৎ উক্ত দুই ব্যক্তি তেমনই সমান হতে পারে না, যেমন ফেনা এবং পানি অথবা সোনা, তামা এবং ওর খাদ সমান হতে পারে না।
[২] অর্থাৎ, যার কাছে নীরোগ হৃদয় ও সুস্থ বিবেক না থাকে এবং যে নিজ হৃদয়কে পাপের মরিচায় মলিন করে রাখে এবং বিবেক-বুদ্ধি বিলুপ্ত করে ফেলে, সে এই কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণই করতে পারে না।
আর-রাদ 13:20
যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে[১] এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না। [২]
[১] এখানে জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হচ্ছে। 'আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি' এর অর্থ, তাঁর বিধি-নিষেধ যা তারা পালন করে থাকে। অথবা সেই অঙ্গীকার যা 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই' অঙ্গীকার নামে পরিচিত, যার কথা সূরা আ'রাফে (৭:১৭২ নং আয়াতে) বিবৃত হয়েছে।[২] এর অর্থ সেই সন্ধি, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যা মানুষ পরস্পর করে থাকে। অথবা যা তাদের এবং তাদের রবের মধ্যে হয়েছে।
আর-রাদ 13:21
আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ´ রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ´ রাখে[১] এবং ভয় করে তাদের প্রতিপালককে ও ভয় করে কঠোর হিসাবকে।
[১] অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বন্ধন নষ্ট করে না; বরং সম্পর্ক গড়ে এবং আত্মীয়তা বন্ধন রক্ষা করে।
আর-রাদ 13:22
আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে,[১] নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করে,[২] আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে[৩] এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে[৪] তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); [৫]
[১] আল্লাহর অবাধ্যতা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকে। এটা এক প্রকার ধৈর্য। দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে। এটা ধৈর্যের দ্বিতীয় প্রকার। জ্ঞানীরা উভয় প্রকার ধৈর্য অবলম্বন করে।[২] তার সময়-সীমা বহাল রেখে, বিনয়-নম্রতার সাথে এবং ধীর-স্থির চিত্তে, বিশুদ্ধ-চিত্তে, রসূল (সাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী; নিজের মন মত পদ্ধতিতে নয়।[৩] যখন যেখানে ব্যয় করার প্রয়োজন হয়, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মাঝে প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যয় করে থাকে।[৪] অর্থাৎ তাদের সাথে কেউ অসঙ্গত ব্যবহার করলে তারা তার জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দিয়ে থাকে, অথবা ক্ষমা করে দিয়ে ধৈর্য ধারণ করে নেয়। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: ﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ অর্থাৎ, মন্দের জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দাও, (যদি তোমরা এমনটি কর) তাহলে যে ব্যক্তি তোমার শত্রু, সে এমন হয়ে যাবে যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৩৪)[৫] অর্থাৎ যে এই উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবে এবং উল্লিখিত গুণাবলীতে গুণান্বিত হবে, তার জন্য রয়েছে শুভ পরিণামের গৃহ (বেহেশত)।
আর-রাদ 13:23
স্থায়ী জান্নাত,[১] তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতিপত্নি ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও।[২] আর ফিরিশতাগণ তাদের কাছে প্রবেশ করবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে।
[১] 'আদন' এর অর্থ হলো স্থায়ী অর্থাৎ চিরস্থায়ী বাগান।[২] অর্থাৎ এমনিভাবে সৎশীল (জান্নাতী) আত্মীয়দেরকে পরস্পর একত্র করে দেবেন, যাতে একে অপরকে দেখে তাদের চক্ষু শীতল হয়। এমনকি নিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীদের উচ্চ শ্রেণীর মর্যাদা দান করবেন, যাতে তারা সব সব আত্মীয়ের সাথে একত্রিত হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ ﴾ অর্থাৎ, যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না। (সূরা ত্বূ-র ৫২:২১) এখান থেকে যেমন এটা জানা গেল যে, মহান আল্লাহ আত্মীয়দেরকে জান্নাতে একত্র করে দেবেন, তেমন এটাও জানা গেল যে, যদি কারো কাছে ঈমান ও সৎ আমলের সম্বল না থাকে তাহলে সে জান্নাতে যাবে না, যদিও তার অন্যান্য অত্যন্ত নিকটাত্মীয় জান্নাতে চলে যায়। কেননা জান্নাতে প্রবেশ জাত-কূলের ভিত্তিতে হয় না, বরং ঈমান ও সৎ আমলের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। মহানবী (সাঃ) বলেন, "যাকে তার আমল পিছে ছেড়ে দেয়, তার বংশ তাকে সামনে বাড়াবে না।" (মুসলিম)
আর-রাদ 13:24
(তারা বলবে,) তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি! কতই না ভাল এই পরিণাম।
আর-রাদ 13:25
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ´ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। [১]
[১] এখানে সৎকর্মশীলদের সাথে অসৎকর্মশীলদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন, যেন মানুষ এই পরিণাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করে।
আর-রাদ 13:26
আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন।[১] কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; [২] অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র। [৩]
[১] যখন কাফের এবং মুশরিকদের ব্যাপারে বললেন যে, তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট স্থান, তখন মস্তিষ্কে এই প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে যে, তারা তো পৃথিবীতে হরেক রকমের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে থাকে। এ কথা খন্ডনের জন্য বললেন যে, পার্থিব উপায়-উপকরণ ও জীবিকার কম-বেশি হওয়ার এখতিয়ার আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি নিজ হিকমত ও ইচ্ছা অনুযায়ী (যা শুধু তিনিই জানেন) কাউকে বেশি এবং কাউকে কম দিয়ে থাকেন। জীবিকার আধিক্য এ কথার প্রমাণ নয় যে, মহান আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট এবং কমতির অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলা তার উপর অসন্তুষ্ট।
[২] আল্লাহর অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ পার্থিব সম্পদ পায়, তাহলে তাতে আনন্দ-উল্লাসের কিছু নেই। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ হতে অবকাশ মাত্র। কারো জানা নেই যে, অকস্মাৎ কখন এই অবকাশ সময়ের অবসান ঘটবে এবং তাঁর পাকড়াও এসে আক্রমণ করবে।
[৩] হাদীসে এসেছে যে, পরকালের অপেক্ষা ইহকালের মূল্য ততটুক, যতটুক কোন ব্যক্তি তার আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবায় অতঃপর তা বের করে দেখে যে সমুদ্রের পানির তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটুক পরিমাণ পানি এসেছে? (মুসলিমঃ কিতাবুল জান্নাহ) অন্য এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি মৃত ছাগলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তা দেখে বললেন, আল্লাহর শপথ! দুনিয়া আল্লাহর নিকট এটির চাইতেও বেশি তুচ্ছ, যতটা এই মৃত ছাগল তার মালিকদের নিকট সেই সময় তুচ্ছ ছিল, যে সময় তারা তাকে ফেলে দিয়েছিল। (মুসলিম, কিতাবুযযুহ্দি অররিক্বাক)
আর-রাদ 13:27
যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকেই তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী;
আর-রাদ 13:28
যারা বিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়। [১]
[১] আল্লাহর স্মরণ বা যিকরের অর্থ তাঁর তওহীদের (একত্ববাদের) বর্ণনা, যার দ্বারা মুশরিকদের অন্তর সঙ্কুচিত হয়ে যায়। অথবা যিকর অর্থঃ তাঁর ইবাদত, কুরআন তিলাঅত, নফল ইবাদত এবং দু'আ ও মুনাজাত; যা ঈমানদারদের মনের খোরাক। অথবা তাঁর আদেশ-নির্দেশ পালন করা; যা ব্যতিরেকে ঈমানদার ও পরহেযগারগণ অস্থির থাকেন।
আর-রাদ 13:29
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, কল্যাণ[১] ও শুভ পরিণাম তাদেরই।’
[১] طُوْبَى এর একাধিক অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপঃ কল্যাণ, পুণ্য, কারামত, ঈর্ষা, জান্নাতের বিশেষ গাছ অথবা বিশেষ স্থান ইত্যাদি। সবের ভাবার্থ প্রায় একই; অর্থাৎ জান্নাতে উত্তম স্থান এবং তার সুখ-সুবিধা।
আর-রাদ 13:30
এইভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি যার পূর্বে বহু জাতি গত হয়েছে;[১] যাতে আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তাদের নিকট তা আবৃত্তি কর। তারা পরম দয়াময়কে অস্বীকার করে।[২] তুমি বল, ‘তিনিই আমার প্রতিপালক; তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[৩] তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে।’
[১] যেমন আমি তোমাকে আমার বার্তা পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছি, অনুরূপ তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের মাঝেও রসূল প্রেরণ করেছিলাম, তাদেরকেও তেমনই মিথ্যাজ্ঞান করা হয়েছিল যেমন তোমাকে করা হয়েছে এবং যেমন উক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে আযাবগ্রস্ত হয়েছিল, এদেরও সেই পরিণাম থেকে নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নয়।
[২] মক্কার মুশরিকরা 'রাহমান' শব্দে চরম চকিত হত। হুদাইবিয়া সন্ধির সময় যখন 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' এর শব্দাবলী লেখা হয়েছিল, তখন তারা বলেছিল, 'রাহমান রাহীম' কি আমরা জানি না। (ইবনে কাসীর)
[৩] অর্থাৎ, 'রাহমান' আমার সেই প্রতিপালক, যিনি ব্যতীত কোন মা'বূদ নেই।
আর-রাদ 13:31
যদি কোন কুরআন এমন হত, যার দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত, (তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করত না)। বরং সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।[১] তবে কি যারা বিশ্বাস করেছে তাদের প্রত্যয় হয়নি যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন; যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের কর্মফলের জন্য তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে অথবা বিপর্যয় তাদের আশে পাশে আপতিত হতেই থাকবে;[২] যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এসে উপস্থিত হবে।[৩] নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।
[১] ('কোন কুরআন' থেকে বুঝা যায়, কুরআন একাধিক।) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, প্রত্যেক আসমানী গ্রন্থকে কুরআন বলা হয়। যেমন একটি হাদীসে এসেছে যে, "দাউদ (আঃ) সওয়ারী প্রস্তুত করার হুকুম দিতেন, এবং এই অবসরে কুরআনের অযীফা পড়ে নিতেন। (বুখারী, আম্বিয়া অধ্যায়) এখানে স্পষ্ট যে কুরআনের অর্থ যাবূর। আয়াতের অর্থ এই যে, যদি পূর্বে কোন আসমানী গ্রন্থ অবতীর্ণ হত, যা শুনে পাহাড় চলতে আরম্ভ করত অথবা পৃথিবীর পথ-দূরত্ব কমে আসত (অথবা ভূমি বিদীর্ণ করে নদী সৃষ্টি হত) অথবা মৃতেরা কথা বলত, তাহলে কুরআন কারীমের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য উত্তম রূপে পাওয়া যেত। কেননা কুরআন পূর্ববর্তী সমস্ত গ্রন্থের তুলনায় মু'জিযা এবং সাহিত্য-শৈলীতে উচ্চতর। কেউ কেউ এর অর্থ বলেছেন যে, যদি কুরআনের মাধ্যমে উক্ত মু'জিযাগুলি প্রকাশ পেত, তবুও এই কাফেররা ঈমান আনয়ন করত না, কেননা কারো ঈমান আনয়নের ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল; মু'জিযার উপর নয়। তাই বলেছেন, "সমস্ত বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।"
[২] যা তারা দেখতে অথবা জানতে অবশ্যই পারবে, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।
[৩] অর্থাৎ, কিয়ামত চলে আসবে অথবা মুসলিমরা পূর্ণ বিজয় লাভ করবে।
আর-রাদ 13:32
তোমার পূর্বেও অনেক রসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। সুতরাং যারা অবিশ্বাস করেছিল তাদেরকে কিছু অবকাশ দিয়েছিলাম, তারপর তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম; অতএব কেমন ছিল আমার শাস্তি![১]
[১] হাদীসেও এসেছে, "আল্লাহ অত্যাচারীকে ঢিল দেন। অবশেষে যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন আর ছাড়েন না।" অতঃপর নবী (সাঃ) এই আয়াত পাঠ করলেন, ﴿وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ﴾ অর্থাৎ, এরূপেই তখন তিনি কোন জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন, যখন তারা অত্যাচার করে; নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও হচ্ছে অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। (সূরা হূদ ১১:১০২) (বুখারীঃ সূরা হূদের তাফসীর, মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র)
আর-রাদ 13:33
তবে কি প্রত্যেক মানুষ যা করে তার যিনি পর্যবেক্ষক, তিনি (এদের অক্ষম উপাস্যগুলির মত)?[১] তারা আল্লাহর বহু শরীক করেছে। তুমি বল, ‘তোমরা তাদের নাম উল্লেখ কর;[২] তোমরা কি পৃথিবীর মধ্যে এমন কিছুর সংবাদ তাঁকে দিতে চাও, যা তিনি জানেন না? অথবা তা অসার উক্তি?’[৩] বরং যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের চক্রান্তকে তাদের নিকট সুশোভিত করা হয়েছে[৪] এবং তাদেরকে সঠিক পথ হতে বিরত রাখা হয়েছে। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। [৫]
[১] এখানে এর জবাব ঊহ্য রয়েছে, অর্থাৎ মহান আল্লাহ এবং ঐ মিথ্যা দেবতারা কি সমান হতে পারে, এরা যাদের পূজা-অর্চনা করছে? যারা না কারো ইষ্টানিষ্ট করতে সক্ষম, না তারা দেখতে পায় আর না তারা বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী।[২] অর্থাৎ, আমাকেও বল, যেন আমি তাদেরকে চিনতে পারি, এই জন্য যে তাদের কোন বাস্তবতাই নেই। এ জন্য পরবর্তীতে বলেছেন, তোমরা কি আল্লাহকে সেসব কথার সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি পৃথিবীতে জানেন না? অর্থাৎ তাদের অস্তিত্বই নেই, কেননা পৃথিবীতে যদি তাদের অস্তিত্ব থাকত, তাহলে মহান আল্লাহ অবশ্যই জানতেন। যেহেতু তাঁর জ্ঞানে কোন কিছু গোপন নেই।[৩] এখানে ظَاهِر من القول এর অর্থ ধারণা। অর্থাৎ এগুলি কেবল তাদের ধারণাপ্রসূত কথা। অর্থ এই যে, তোমরা মূর্তিপূজা এই ধারণা নিয়ে করছ যে, তারা ইষ্টানিষ্ট করার ক্ষমতা রাখে এবং তোমরা তাদের নামও উপাস্য রেখে নিয়েছ। অথচ "এগুলো কতক নাম মাত্র, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখে দিয়েছ, যার সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল প্রেরণ করেননি। তারা তো অনুমান এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে।" (সূরা নাজ্ম ৫৩:২৩)[৪] مَكْر (চক্রান্ত)এর অর্থ তাদের ঐসব ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও আমল, যাতে শয়তান তাদেরকে ফাঁসিয়ে রেখেছে, শয়তান ভ্রষ্টতার উপরও আকর্ষণীয় আবরণ চড়িয়ে রাখে।[৫] যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿وَمَن يُرِدِ اللهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا﴾ অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন তার জন্যে আল্লাহর সাথে তোমার কোন জোর চলতে পারে না।" (সূরা মায়িদাহ ৫:৪১) তিনি আরো বলেন, ﴿إِن تَحْرِصْ عَلَى هُدَاهُمْ فَإِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي مَن يُضِلُّ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ﴾ অর্থাৎ, তুমি তাদের পথপ্রদর্শন করতে আগ্রহী হলেও আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেছেন, তাকে তিনি সৎপথে পরিচালিত করবেন না এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই। (সূরা নাহল ১৬:৩৭)
আর-রাদ 13:34
তাদের জন্য পার্থিব জীবনে আছে শাস্তি[১] এবং পরকালের শাস্তি তো আরো কঠোর।[২] আর আল্লাহর (শাস্তি) হতে রক্ষাকর্তা তাদের কেউ নেই।
[১] এর অর্থ হত্যা ও বন্দিদশা, যা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় এই কাফেরদের ভাগে আসে।
[২] যেমন নবী (সাঃ) লিআনকারী ও লিআনকারিণীকে বলেছিলেন, "দুনিয়ার শাস্তি আখেরাতের শাস্তির তুলনায় হাল্কা ও সহজ।" (মুসলিম, কিতাবুল লিআন, লিআনের সংজ্ঞা জানতে সূরা নূর ২৪:৭নং আয়াতের টীকা দ্রঃ) এ ছাড়া দুনিয়ার শাস্তি (যেমনই হোক এবং যতই হোক তা কাফেরদের জন্য) সাময়িক ও অস্থায়ী এবং আখেরাতের শাস্তি চিরস্থায়ী, যা শেষ হবে না। তাছাড়া জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের তুলনায় ঊনসত্তর গুণ বেশি তীব্র। অনুরূপ অন্য কিছুও রয়েছে। সুতরাং শাস্তির কঠিন হওয়ার ব্যাপারে কি সন্দেহ থাকতে পারে?
আর-রাদ 13:35
সাবধানীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার বিবরণ এইরূপঃ ওর পাদদেশে নদী প্রবাহিত, ওর ফলমূলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী; যারা সাবধানী এটা তাদের পরিণাম।[১] আর অবিশ্বাসীদের পরিণাম হল জাহান্নাম।
[১] কাফেরদের অশুভ পরিণামের সাথে ঈমানদারদের শুভ পরিণামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে জান্নাত লাভের প্রতি আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। এই স্থানে ইমাম ইবনে কাসীর জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিশেষ অবস্থা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন, যেগুলো ওখানে দেখা যেতে পারে।
আর-রাদ 13:36
আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা[১] যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে আনন্দিত হয়,[২] আর কোন কোন দল ওর কতক অংশকে অস্বীকার করে।[৩] তুমি বল, ‘আমি তো কেবল আল্লাহরই ইবাদত করতে এবং তাঁর কোন শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি। আমি তাঁরই প্রতি আহবান করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন।’
[১] এর অর্থ মুসলমান; যারা কুরআনের আদেশ মোতাবেক আমল করে।
[২] অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার দলীল-প্রমাণ দেখে অধিক আনন্দিত হয়।
[৩] এ থেকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কতিপয় উলামার নিকট কিতাবের অর্থ তাওরাত ও ইঞ্জীল। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা আনন্দিত হয়। অস্বীকারকারী সেই ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি।
আর-রাদ 13:37
আর এভাবে আমি এ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় জীবন-বিধান স্বরূপ;[১] জ্ঞান প্রাপ্তির[২] পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর,[৩] তাহলে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা থাকবে না।[৪]
[১] অর্থাৎ, যেমন তোমার পূর্ববর্তী রসূলদের প্রতি স্থানীয় ভাষায় গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছিলাম, তেমনই তোমার উপর কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করলাম। কেননা তোমার প্রথম সম্বোধিত লোকেরা আরব, যারা কেবল আরবী ভাষাই জানে। যদি এই কুরআন অন্য কোন ভাষায় অবতীর্ণ করা হত, তাহলে তারা বুঝতে সক্ষম হতো না, ফলে হিদায়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের জন্য ওজর রয়ে যেত। সুতরাং আমি আরবী ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করে তাদের এই ওজর খন্ডন করে দিলাম।
[২] এর অর্থ সেই জ্ঞান যা অহীর মাধ্যমে নবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে, যাতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের আকীদা-বিশ্বাসের বাস্তব রূপও তাঁর কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
[৩] এ থেকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের কতিপয় খেয়াল-খুশী ও আকাঙ্ক্ষাকে বুঝানো হয়েছে, যার সম্বন্ধে তারা চেয়েছিল যে, শেষ নবী যেন তা পূরণ করেন, যেমন; বাইতুল মাকদিসকে সর্বদা কিবলা করে রাখা এবং তাদের আকীদা-বিশ্বাসের বিরোধিতা না করা প্রভৃতি।
[৪] এটা বাস্তবে উম্মতের উলামাদের জন্য সতর্কবাণী যে, তারা যেন পার্থিব ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বার্থ লাভের জন্য কুরআন ও হাদীসের মোকাবিলায় লোকেদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ না করে। যদি তারা এমনটি করে, তাহলে তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
আর-রাদ 13:38
তোমার পূর্বেও আমি অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করেছিলাম।[১] আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়;[২] প্রত্যেক নির্ধারিত কালের লিপিবদ্ধ গ্রন্থ আছে। [৩]
[১] অর্থাৎ, যত নবী ও রসূল এসেছেন সবাই মানুষই ছিলেন, তাঁদের নিজসব পরিবার, বংশ, স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি ছিল। তাঁরা না ফিরিশতা ছিলেন আর না মানব রূপে নূরের সৃষ্টি ছিলেন। বরং তারা মানবকুল থেকেই ছিলেন। কেননা যদি তাঁরা ফিরিশতা হতেন তাহলে মানুষের জন্য তাঁদের প্রকৃতির সাথে স্বাভাবিক হওয়া এবং তাঁদের কাছাকাছি হওয়া অসম্ভব ছিল, যার ফলে তাঁদেরকে প্রেরণ করার মুখ্য উদ্দেশ্যই বিফল হয়ে যেত। আর যদি উক্ত ফিরিশতাগণ মানব রূপে আসতেন তাহলে দুনিয়াতে না তাদের পরিবার ও বংশ হতো আর না স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি হতো। এ থেকে জানা গেল যে, সকল নবীগণ মানবকুল থেকেই ছিলেন, মানবরূপে ফিরিশতা অথবা কোন নূরের সৃষ্টি ছিলেন না। উল্লিখিত আয়াতে أزْوَاجًا (স্ত্রী দান করেছিলাম) থেকে বৈরাগ্য বা সন্ন্যাস্বাদ খন্ডন হয়। আর ذُرِّيَّةٌ (সন্তান-সন্ততি দান করেছিলাম) থেকে পরিবার পরিকল্পনার কথা খন্ডন হয়, কেননা ذُرِّيَّةٌ (অর্থগত) বহুবচন শব্দ; যা কমপক্ষে তিন হবে।
[২] অর্থাৎ মু'জিযা (অলৌকিক ঘটনা) প্রদর্শন রসূলদের এখতিয়ারে নেই যে, যখন তাদের কাছে তলব করা হবে, তখনই তা প্রকাশ করে দেখিয়ে দেবেন, বরং এটা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর এখতিয়ারে, তিনি স্বীয় হিকমত ও ইচ্ছা অনুসারে ফায়সালা করেন যে, মু'জিযার প্রয়োজন আছে না নেই। আর যদি আছে, তাহলে কি রকম এবং কখন তা দেখাবার প্রয়োজন আছে।
[৩] অর্থাৎ আল্লাহ যা কিছুরই ওয়াদা করেছেন, তার একটি সময় নির্ধারিত আছে, উক্ত নির্ধারিত সময়ে তা অবশ্যই ঘটবে, কেননা আল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ হয় না। কেউ কেউ বলেছেন যে বাক্যে আগে-পিছে রয়েছে, মূল বাক্য এরূপ لِكُلِّ كِتَابٍ أجَلٌ অর্থাৎ প্রত্যেক সেই বিষয় যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তার একটা সময় নির্ধারিত আছে। অর্থাৎ বিষয়টি কাফেরদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর নয়; বরং কেবল মাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
আর-রাদ 13:39
(তার মধ্য হতে) আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা তা বহাল রাখেন। আর তাঁর নিকট রয়েছে মূল গ্রন্থ।[১]
[১] এর একটি অর্থ এই যে, তিনি স্বীয় ইচ্ছা মোতাবেক কোন হুকুমকে রহিত করেন এবং কোন হুকুমকে বহাল রাখেন। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তিনি যে ভাগ্য লিখে রেখেছেন তাতে পরিবর্তন করতে থাকেন। কতিপয় হাদীস দ্বারা এর সমর্থন হয়, তন্মধ্যে একটি হাদীস হলো, "মানুষকে পাপের কারণে রুযী থেকে বঞ্চিত করা হয়, দু'আর মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন হয় এবং আত্মীয়তা বন্ধন বজায় রাখার কারণে আয়ু বৃদ্ধি পায়।" (মুসনাদ আহমাদ ৫/২৭৭) কতিপয় সাহাবা থেকে নিম্নলিখিত দু'আটি বর্ণিত হয়েছে,(اللَّهُمَّ إنْ كُنْتَ كَتَبْتَنَا أشْقِيَاءَ فَامْحُنَا وَاكْتُبْنَا سُعَدَاءَ، وَإنْ كُنْتَ كَتَبْتَنَا سُعَدَاءَ فَأثْبِتْنَا، فَإنَّكَ تَمْحُوْ مَا تَشَاءُ وَتُثْبِتُ وَعِنْدَكَ أُمُّ الْكِتَابِ) । অর্থাৎ, হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাদেরকে দুর্ভাগ্যবান বলে লিখে দিয়েছ, তাহলে তা মিটিয়ে দিয়ে আমাদেরকে সৌভাগ্যবান বলে লিখে দাও। আর যদি সৌভাগ্যবান বলে লিখেছ, তাহলে সেটাই বহাল রাখো, কেননা তুমি যা চাও মিটিয়ে দাও আর যা চাও বহাল রাখ এবং তোমার কাছেই রয়েছে লওহে মাহফূয বা সংরক্ষিত ফলক। উমার (রাঃ) সম্বন্ধে উল্লেখ আছে যে, তিনি তাওয়াফ কালীন সময়ে কাঁদতেন এবং এই দু'আ পড়তেন: ((اللَّهُمَّ إنْ كُنْتَ كَتَبْتَ عَلَيَّ شَقْوَةً أوْ ذَنْبًا فَامْحُهُ، فَإنَّكَ تَمْحُوْ مَا تَشَاءُ وَتُثْبِتُ، وَعِنْدَكَ أُمُّ الْكِتَابِ، فَاجْعَلْهُ سَعَادَةً وَمَغْفِرَةً))। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! যদি তুমি আমার ব্যাপারে দুর্ভাগ্য বা পাপ লিখে দিয়েছ, তাহলে তা মিটিয়ে দাও, কেননা তুমি যা চাও মিটিয়ে দাও আর যা চাও বহাল রাখ, আর তোমার কাছেই রয়েছে লওহে মাহফূয বা সংরক্ষিত ফলক, সুতরাং তা তুমি সৌভাগ্য ও ক্ষমায় পরিবর্তন করে দাও। (ইবনে কাসীর) এই অর্থের উপর আপত্তি আসতে পারে যে, অন্য হাদীসে তো এসেছে, (جَفَّ الْقَلَمُ بِمَا هُوَ كَائِنٌ) অর্থাৎ, যা কিছু ঘটবে, তা লিখে কলম শুকিয়ে গেছে। (বুখারী, হাদীস নং ৫০৭৬) এর জবাব এই দেয়া হয়েছে যে, এই পরিবর্তনও ভাগ্যে লিখিত বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল কাদীর)
আর-রাদ 13:40
আমি তাদেরকে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিই, তার কিছু যদি তোমাকে দেখিয়ে দিই অথবা যদি এর পূর্বে তোমার মৃত্যু ঘটিয়েই দিই, তাহলে তোমার কর্তব্য তো শুধু প্রচার করা, আর আমার কাজ হিসাব গ্রহণ করা।
আর-রাদ 13:41
তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের দেশ) পৃথিবীকে চারদিক হতে সংকুচিত করে আনছি?[১] আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই[২] এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।
[১] অর্থাৎ, আরব ভূমি ক্রমান্বয়ে মুশরিকদের উপর সংকীর্ণ হয়ে আসছে এবং ইসলামের জয় ও উত্থান হচ্ছে। (অনেকে এই আয়াত ও সূরা আম্বিয়ার ২১:৪৪ নং আয়াত দ্বারা পৃথিবীর ভূমিক্ষয় ও তার কিছু অংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া বুঝেছেন। অল্লাহু আ'লাম। -সম্পাদক)[২] অর্থাৎ, কেউ আল্লাহর আদেশাবলী রদ করতে পারে না।
আর-রাদ 13:42
তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু সমস্ত চক্রান্ত আল্লাহর অধীনস্থ;[১] প্রত্যেক ব্যক্তি যা করে তা তিনি জানেন[২] এবং অবিশ্বাসীরা শীঘ্রই জানবে শুভ পরিণাম কাদের জন্য।
[১] অর্থাৎ, মক্কার মুশরিকদের পূর্বেও লোকেরা রসূলদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে, কিন্তু আল্লাহর কৌশলের সামনে তাদের কোন চক্রান্ত সফল হয়নি। অনুরূপ ভবিষ্যতেও তাদের কোন চক্রান্ত আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কৃতকার্য হতে পারবে না।
[২] এবং তিনি সেই মোতাবেক প্রত্যেককে বিনিময় দান করবেন, পুণ্যবানকে তার পুণ্যের বদলা এবং পাপীকে তার পাপের শাস্তি।
আর-রাদ 13:43
যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তুমি আল্লাহর প্রেরিত নও।’ তুমি বল, ‘আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট[১] এবং তারা যাদের নিকট কিতাবের জ্ঞান আছে।’[২]
[১] সুতরাং তিনি জানেন যে, আমি তাঁর সত্য রসূল ও তাঁর বার্তা প্রচারক। আর তোমরা হলে মিথ্যাবাদী।
[২] কিতাবের অর্থ কিতাবের শ্রেণীকে বুঝানো হয়েছে; উদ্দেশ্য তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞান। অর্থাৎ ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা মুসলমান হয়েছে; যেমন আব্দুল্লাহ বিন সালাম, সালমান ফারসী এবং তামীম দারী ইত্যাদি (রাঃ), এরাও জানত যে, আমি আল্লাহর রসূল। আরবের মুশরিকরা বিশেষ সমস্যার সময় ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানদের নিকট রুজু করত এবং তাদেরকে সমাধান জিজ্ঞাসা করত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পথ দেখালেন যে, ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানরা জানে, তাদেরকে তোমরা জিজ্ঞাসা করে নাও। কিছু উলামা বলেন যে, কিতাব থেকে কুরআনকে এবং কিতাবের জ্ঞানী থেকে মুসলিমদেরকে বুঝানো হয়েছে। আবার কোন কোন আলেম কিতাবের অর্থ 'লাওহে মাহফূয' (সংরক্ষিত ফলক) নিয়েছেন, অর্থাৎ যার কাছে সংরক্ষিত ফলকের জ্ঞান রয়েছে অর্থাৎ মহান আল্লাহ। তবে প্রথম অর্থটাই বেশি উপযুক্ত।
ইবরাহীম 14:1
আলিফ লা-ম রা। এই কিতাব এটা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে[১] অন্ধকার হতে আলোকের দিকে;[২] পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পার।
[১] অর্থাৎ, নবীর কাজ শুধু হিদায়াতের রাস্তা দেখানো। যদি কেউ হিদায়াতের পথ অবলম্বন করে, তাহলে তা একমাত্র আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার ভিত্তিতেই করে থাকে। কেননা মূল হিদায়াতদানকারী তো তিনিই। যদি তাঁর ইচ্ছা না হয়, তাহলে নবী যতই ওয়ায-নসীহত করুক না কেন, লোকেরা হিদায়াতের পথে আসতে প্রস্তুত হবে না। এর বিভিন্ন উদাহরণ পূর্ববর্তী নবীদের জীবনে বিদ্যমান রয়েছে। স্বয়ং শেষনবী (সাঃ)-এর কঠিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দয়ার্দ্র চাচা আবূ তালেবকে মুসলমান করতে পারেননি।[২] যেমন মহান আল্লাহ অন্য স্থানেও বলেছেন, ﴿هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴾ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোর দিকে আনার জন্য। (সূরা হাদীদ ৫৭:৯) তিনি আরো বলেন, ﴿اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান। (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৭)
ইবরাহীম 14:2
আল্লাহর পথে; যাঁর মালিকানাধীন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে। কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ অবিশ্বাসীদের জন্য।
ইবরাহীম 14:3
যারা ইহজীবনকে পরজীবনের উপর প্রাধান্য দেয়, মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে;[১] তারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে।[২]
[১] এর একটি অর্থ এই যে, ইসলামের শিক্ষার ব্যাপারে মানুষের মাঝে কুধারণা উৎপন্ন করার জন্য ত্রুটি বের করে এবং তা বিকৃত করে পেশ করে। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, নিজ মনমত তাতে পরিবর্তন সাধন করতে চায়।
[২] কেননা তাদের মধ্যে উল্লিখিত বিভিন্ন অপরাধ একত্রিত হয়েছে, যেমন; আখেরাতের তুলনায় দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া, আল্লাহর রাস্তা থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করা এবং ইসলাম ধর্মের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করা।
ইবরাহীম 14:4
আমি প্রত্যেক রসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য।[১] আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [২]
[১] মহান আল্লাহ দুনিয়াবাসীর প্রতি এই অনুগ্রহ করলেন যে, তাদের হিদায়াতের জন্য কিতাব অবতীর্ণ করলেন এবং রসূলগণকে প্রেরণ করলেন এবং উক্ত অনুগ্রহকে এভাবে পরিপূর্ণতা দান করলেন যে, প্রত্যেক রসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করলেন, যাতে হিদায়াতের রাস্তা বুঝতে কোন প্রকার জটিলতা না আসে।
[২] কিন্তু উক্ত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও হিদায়াত সেই পাবে, যাকে আল্লাহ দিতে চাইবেন।
ইবরাহীম 14:5
মূসাকে আমি আমার নিদর্শনাবলীসহ প্রেরণ করেছিলাম (এবং বলেছিলাম,) তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনো[১] এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলি স্মরণ করিয়ে দাও।[২] এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য। [৩]
[১] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! যেমন আমি তোমাকে তোমার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি এবং কিতাব দিয়েছি যাতে তুমি স্বীয় সম্প্রদায়কে কুফরী ও শিরকের অন্ধকার থেকে ঈমানের আলোর দিকে বের করে আনো, তেমনই আমি মূসাকে মু'জিযা ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি, যেন সে তাদেরকে কুফরী ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে ঈমানের আলো দান করে। আয়াতে উদ্দেশ্য হল সেই সব মু'জিযা; যা মূসা (আঃ)-কে প্রদান করা হয়েছিল অথবা সেই ন'টি মু'জিযা যার উল্লেখ সূরা বানী ইস্রাঈলে করা হয়েছে।
[২] أيام الله (আল্লাহর দিনগুলি) এর অর্থ আল্লাহর সেসব অনুগ্রহ, যা বানী ইসরাঈলের প্রতি করা হয়েছিল, যেসবের বিবরণ পূর্বে কয়েকবার এসেছে। অথবা أيام এর অর্থ ঘটনাবলী। অর্থাৎ ঐসব ঘটনা তাদেরকে স্মরণ করাও, যা ঘটতে তারা দেখেছে এবং যাতে তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুকম্পা অবতীর্ণ হয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটির বর্ণনা এখানেও আসছে।
[৩] ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা দুটি মহৎ গুণ; যার উপর নির্ভর করে ঈমান, এজন্য এখানে এ দু'টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ শব্দ দু'টি অতিশয়োক্তি রূপে এসেছে। صبّار অত্যধিক ধৈর্যশীল شكور অত্যধিক কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার পূর্বে ধৈর্যের উল্লেখ এই কারণে করা হয়েছে যে কৃতজ্ঞতা ধৈর্যের ফলাফল। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "মুমিনদের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। মহান আল্লাহ তার ক্ষেত্রে যা কিছুরই ফায়সালা করুন, তা তার জন্য মঙ্গলজনক। যদি তাকে দুঃখ পৌঁছে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে এটাও তার পক্ষে উত্তম। আর যদি তাকে সুখ পৌঁছে এবং সে এর উপর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাহলে এটাও তার পক্ষে উত্তম। (মুসলিম, কিতাবুয যুহ্দ)
ইবরাহীম 14:6
যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউনীয় সম্প্রদায়ের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে ছিল তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহাপরীক্ষা।[১]
[১] অর্থাৎ, যেরূপ এটা আল্লাহর এক বিরাট পরীক্ষা ছিল, অনুরূপ এ থেকে মুক্তিলাভ আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ ছিল। এ জন্যই কোন কোন অনুবাদক بَلَاءٌ এর অনুবাদ 'পরীক্ষা' এবং কেউ কেউ এর অনুবাদ 'অনুগ্রহ' করেছেন।
ইবরাহীম 14:7
যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেছিলেন,[১] তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দান করব,[২] আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ [৩]
[১] تَأذَّنَ এর অর্থ أعْلَمَكُمْ بِوَعْدِهِ لَكُمْ তিনি তোমাদেরকে তাঁর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। আর এও হতে পারে যে, এটা শপথের অর্থে, অর্থাৎ যখন তোমাদের প্রতিপালক স্বীয় গৌারব-মর্যাদার শপথ করে বলেছিলেন। (ইবনে কাসীর)
[২] অর্থাৎ, নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা করলে তোমাদেরকে অধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত করব।
[৩] এর অর্থ এই যে, নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা আল্লাহ অত্যন্ত অপছন্দ করেন। যার জন্য তিনি কঠিন শাস্তির ধমক দিয়েছেন। এই জন্য নবী (সাঃ)ও বলেছেন যে, অধিকাংশ মহিলারা স্বামীর অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে জাহান্নামে যাবে। (মুসলিম, আল-ঈদাইন)
ইবরাহীম 14:8
মূসা বলেছিল, ‘তোমরা এবং পৃথিবীর সকলেই যদি অকৃতজ্ঞ হও; তবুও নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং সর্বপ্রশংসিত।’[১]
[১] ভাবার্থ এই যে মানুষ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে তারই লাভ রয়েছে, আর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে আল্লাহর কি ক্ষতি? তিনি তো অমুখাপেক্ষী। সারা বিশ্ব অকৃতজ্ঞ হয়ে গেলে তাঁর কি আসে যায়? যেমন হাদীসে কুদসীতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, "হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায়, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের একটুও শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক বড় পাপী একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায়, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের কিছুই কম হবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব যদি একটি জায়গাতে সমবেত হয় এবং প্রত্যেকেই আমার নিকট প্রার্থনা করে, আর আমি প্রত্যেকের চাহিদা পূরণ করি, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকু পরিমাণ কম হবে, যতটুকু সমুদ্রে সুচ ডুবিয়ে তা তুলে নিলে তা থেকে কমে যায়। (মুসলিম, কিতাবুল বির্র) সুতরাং তিনি পূত-পবিত্র, মহিমান্বিত, অভাবমুক্ত ও সর্বপ্রশংসনীয়।
ইবরাহীম 14:9
তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; নূহের সম্প্রদায়ের, আ’দের ও সামূদের এবং তাদের পরবর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না; তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ তাদের রসূলগণ এসেছিল; তারা তাদের হাত তাদের মুখে স্থাপন করল[১] এবং বলল, ‘যা নিয়ে তোমরা প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং যার প্রতি তোমরা আমাদেরকে আহবান করছ, তাতে আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি।’ [২]
[১] ব্যাখ্যাকারিগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন, যেমন (ক) তারা নিজ হাত নিজ মুখে রেখে বলল, আমাদের তো শুধু একটিই উত্তর যে, আমরা তোমার রিসালাতকে অস্বীকার করি। (খ) তারা নিজ আঙ্গুল দ্বারা নিজ মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, চুপ থাকো এবং এই লোক যে পয়গাম নিয়ে এসেছে সেদিকে ধ্যান দিও না। (গ) তারা নিজ হাত নিজ মুখে বিদ্রূপ বা বিস্ময় প্রকাশ করে রেখে নিল, যেমন কোন ব্যক্তি হাসি দমানোর জন্য এমনটি করে থাকে। (ঘ) তারা নিজ হাত রসূলদের মুখে রেখে বলল, চুপ থাকো। (ঙ) তারা ক্রোধান্বিত হয়ে নিজ হাত মুখে রেখে নিল, যেমন মুনাফিকদের সম্পর্কে দ্বিতীয় স্থানে এসেছে, ﴿عَضُّواْ عَلَيْكُمُ الأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ﴾ তারা তোমাদের প্রতি আক্রোশে আঙ্গুলসমূহ দংশন করে। (সূরা আলে ইমরান ৩:১১৯) ইমাম শওকানী ও ইমাম ত্বাবারী এই শেষ অর্থটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
[২] مُرِيْبٌ অর্থাৎ এমন সন্দেহ, যাতে মন অত্যন্ত ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্যের শিকার হয়।
ইবরাহীম 14:10
তাদের রসূলগণ বলেছিল, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে? তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করবার জন্য[১] এবং নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দিবার জন্য তিনি তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছেন।’ তারা বলল, ‘তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ;[২] আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের উপাসনা করত, তোমরা তাদের উপাসনা করা হতে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও।[৩] সুতরাং তোমরা আমাদের কাছে কোন অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত কর।’ [৪]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ সম্বন্ধে তোমাদের সংশয় আছে, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা। এছাড়া তিনি তোমাদের কাছে ঈমান ও তাওহীদের দাওয়াতও শুধু তোমাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে পেশ করেন, তা সত্ত্বেও তোমরা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টাকে মানতে প্রস্তুত নও এবং তাঁর দাওয়াতকে অস্বীকার কর?
[২] এটা সেই প্রশ্ন যা কাফেরদের মনে উদ্রেক হতে থাকে যে, মানুষ কিভাবে আল্লাহর অহী এবং নবুঅত ও রিসালতের অধিকারী হতে পারে?
[৩] এটা দ্বিতীয় প্রতিবন্ধক যে আমরা সেসব উপাস্যের পূজা কি করে বর্জন করি, যাদের পূজা আমাদের পূর্বপুরুষরা করে এসেছে? অথচ তোমাদের উদ্দেশ্য আমাদেরকে তাদের পূজা থেকে সরিয়ে দিয়ে এক উপাস্যের ইবাদতে লাগিয়ে দেওয়া।
[৪] প্রমাণ, নিদর্শন ও মু'জিযা তো প্রত্যেক নবীকে দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ এমন প্রমাণ, নিদর্শন অথবা মু'জিযা, যা দেখার জন্য তারা আকাঙ্ক্ষিত ছিল। যেমন; মক্কার মুশরিকরা নবী (সাঃ)-এর কাছে বিভিন্ন ধরনের মু'জিযা তলব করেছিল, যেগুলোর বিবরণ সূরা বানী ইস্রাঈলে আসবে।
ইবরাহীম 14:11
তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলল, ‘(সত্য বটে) আমরা তোমাদের মত মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করে থাকেন;[১] আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের নিকট প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়।[২] আর বিশ্বাসীদের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা। [৩]
[১] রসূলগণ প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিলেন যে, অবশ্যই আমরা তোমাদের মত মানুষ, সুতরাং মানুষ রসূল হতে পারে না, তোমাদের এই ধারণা ভুল। মহান আল্লাহ মানবকুলের হিদায়াতের জন্য তাদের মধ্য থেকেই কতিপয় মানুষকে নির্বাচন করে নেন এবং তোমাদের মধ্য হতে এই অনুগ্রহ আমাদের প্রতি করেছেন।
[২] তাদের মন মোতাবেক মু'জিযা প্রদর্শনের ব্যাপারে রসূলগণ জবাব দিলেন যে, মু'জিযা প্রদর্শনের এখতিয়ার আমাদের হাতে নয়, বরং তা শুধু মাত্র আল্লাহর হাতে।
[৩] এখানে 'বিশ্বাসীদের' বলে উদ্দেশ্য প্রথমত নবীগণ। অর্থাৎ আমাদের উচিত, আল্লাহর উপরেই সম্পূর্ণ ভরসা রাখা, যেমন পরবর্তী আয়াতে বলেছেন, "আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করব না কেন?"
ইবরাহীম 14:12
আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করব না কেন? তিনিই তো আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন; তোমরা আমাদেরকে যে ক্লেশ দিচ্ছ, আমরা অবশ্যই তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করব। আর নির্ভরকারীদের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা।’ [১]
[১] নির্ভর এই যে, তিনিই কাফেরদের বদমায়েশি ও মূর্খামি থেকে রক্ষাকারী। এই অর্থও হতে পারে যে, আমাদের কাছে মু'জিযা তলব না করে আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। তাঁর ইচ্ছা হলে তিনি মু'জিযা প্রকাশ করবেন, না হলে না।
ইবরাহীম 14:13
অবিশ্বাসীগণ তাদের রসূলদেরকে বলেছিল, ‘আমরা তোমাদেরকে অবশ্যই আমাদের দেশ হতে বহিষ্কৃত করব, অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ধর্মান্তরিত হতেই হবে।’[১] অতঃপর রসূলদের প্রতিপালক তাদের প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করলেন, ‘সীমালংঘনকারীদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করব।[২]
[১] এখানে অনেকে ধর্মাদর্শে ফিরে আসার অনুবাদ করেছেন। কিন্তু নবীগণ আদৌ কুফরী ধর্মাদর্শে ছিলেন না। অতএব ফিরে আসার অনুবাদ না করাই উত্তম। (ফাতহুল কাদীর) (সূরা আ'রাফ ৭:৮৮ নং আয়াতের টীকা দ্রঃ)[২] যেমন আরো কয়েক জায়গাতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ﴿وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ. إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنصُورُونَ. وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ﴾ অর্থাৎ, আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী। (সূরা সাফ্ফাত ৩৭:১৭১-১৭৩) ﴿كَتَبَ اللَّهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِي﴾ অর্থাৎ, আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন যে, আমি এবং আমার রসূল অবশ্যই বিজয়ী হব। (সূরা মুজাদালা ৫৮:২১)
ইবরাহীম 14:14
তাদের পরে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে দেশে পুনর্বাসিত করব;[১] এটা তাদের জন্য যারা ভয় রাখে আমার সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার এবং ভয় রাখে আমার (শাস্তির) হুমকির।’ [২]
[১] এ বিষয়ও মহান আল্লাহ কয়েক জায়গাতে বর্ণনা করেছেন; যেমন, ﴿وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ﴾ অর্থাৎ, আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে। (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৫) (আরো দেখুন সূরা আ'রাফ ৭:১২৮-১৩৭) অতএব এই মোতাবেক মহান আল্লাহ নাবী (সাঃ)-এর সাহায্য করেন। তাঁকে বড় দুঃখ-বেদনা নিয়ে মক্কা থেকে বের হতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কয়েক বছর পরেই তিনি বিজয়ী রূপে মক্কা প্রবেশ করেন এবং তাঁকে বের হতে বাধ্যকারী যালেম মুশরিকরা তাঁর সামনে অবনত মস্তকে দন্ডায়মান হয়ে তাঁর চোখের ইশারার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তিনি মহান চরিত্রের প্রমাণ দিলেন এবং 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই' বলে সকলকে ক্ষমা করে দিলেন।[২] যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى﴾ 'অর্থাৎ, যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার অবস্থান ক্ষেত্র। (সূরা নাযিআত ৭৯:৪০-৪১)﴿وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ﴾ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দুটি জান্নাত। (সূরা রাহমান ৫৫:৪৬)
ইবরাহীম 14:15
তারা ফায়সালা কামনা করল[১] এবং প্রত্যেক উদ্ধত হঠকারী ব্যর্থকাম হল।
[১] 'তারা' বলতে অত্যাচারী মুশরিকরাও হতে পারে। অর্থাৎ, তারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে ফায়সালা তলব করল যে, এই রসূল যদি সত্য হন, তাহলে হয় আল্লাহ আমাদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দিন; যেমন মক্কার মুশরিকরা বলেছিল, ﴿اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَاء أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ﴾ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! এই কুরআন যদি তোমার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আকাশ থেকে আমাদের উপর প্রস্তর বর্ষণ কর অথবা আমাদের উপর কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি এনে দাও! (সূরা আনফাল ৮:৩২) আর না হয় যেমন বদর যুদ্ধের সময়েও মক্কার মুশরিকরা এই ধরনেরই কামনা করেছিল, যার উল্লেখ মহান আল্লাহ সূরা আনফালের ৮:১৯ নং আয়াতে করেছেন। অথবা 'তারা' বলতে রসূলগণ হতে পারেন। অর্থাৎ, তাঁরা আল্লাহর কাছে বিজয় ও সাহায্য চেয়ে দু'আ করলেন, যা মহান আল্লাহ কবুল করলেন।
ইবরাহীম 14:16
তাদের প্রত্যেকের সম্মুখে রয়েছে জাহান্নাম এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে পূঁজমিশ্রিত পানি।[১]
[১] صَدِيْدٌ জাহান্নামীদের শরীর ও চামড়া থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত। কতিপয় হাদীসে বলা হয়েছে, (عُصَارَةُ أهْلِ النَّارِ) (জাহান্নামীদের দেহ-নিঃসৃত রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি) এবং কতিপয় হাদীসে আছে যে, উক্ত পুঁজ ও রক্ত এত গরম ও ফুটন্ত অবস্থায় হবে যে, তাদের মুখ পর্যন্ত পৌঁছতেই তাদের মুখমন্ডলের চামড়া ঝলসে খসে পড়বে এবং এর এক ঢোক পান করতেই তাদের পেটের নাড়ীভুঁড়ি পায়খানা-দ্বার দিয়ে বেরিয়ে পড়বে। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
ইবরাহীম 14:17
যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে এবং তা গিলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু-যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না[১] এবং তার পরে থাকবে কঠোর শাস্তি।
[১] অর্থাৎ, বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি আস্বাদন করতে করতে তারা মৃত্যু-কামনা করবে, কিন্তু সেথায় মৃত্যু কোথায়? সেখানে তো তাদের এই ধরনের অবিরাম শাস্তি হতেই থাকবে।
ইবরাহীম 14:18
যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের বিবরণ এই যে, তাদের কর্মাবলী ভষ্মের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়।[১]যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।
[১] কিয়ামতের দিন কাফেরদের ভালো কর্মসমূহেরও এই অবস্থা হবে যে তারা তার কোন প্রতিফল ও নেকী পাবে না।
ইবরাহীম 14:19
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যথার্থই সৃষ্টি করেছেন? তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অস্তিত্ব বিলোপ করতে পারেন এবং এক নতুন সৃষ্টি অস্তিত্বে আনতে পারেন।
ইবরাহীম 14:20
আর এটা আল্লাহর জন্য আদৌ কঠিন নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, তোমরা যদি অবাধ্যতা হতে বিরত না হও, তাহলে মহান আল্লাহ এটা করতে সক্ষম যে, তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তোমাদের স্থলে নতুন সৃষ্টিকুল সৃষ্টি করবেন। উক্ত বিষয়টিই মহান আল্লাহ সূরা ফাতির ৩৫:১৫-১৭, সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮, সূরা মাইদা ৫:৫৪ এবং সূরা নিসার ৪:১৩৩ নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন।
ইবরাহীম 14:21
সবাই আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে;[১] যারা অহংকার করত দুর্বলেরা তাদেরকে বলবে, ‘আমরা তো তোমাদের অনুসারী ছিলাম; এখন তোমরা কি আল্লাহর শাস্তি হতে আমাদেরকে কিছুমাত্র রক্ষা করতে পারবে?’ তারা বলবে, ‘আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করলে আমরাও তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করতাম; এখন আমাদের ধৈর্যচ্যুত হওয়া অথবা ধৈর্যশীল হওয়া একই কথা; আমাদের কোন নিষ্কৃতি নেই।’[২]
[১] অর্থাৎ, সকলেই হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, কেউ কোথাও লুকাতে পারবে না।[২] কতিপয় উলামা বলেন যে, জাহান্নামীরা পরস্পর বলাবলি করবে, 'জান্নাতীরা জান্নাত এ কারণে পেয়েছে যে, তারা আল্লাহর সমীপে কাকুতি-মিনতি ও রোদন করত, এসো আমরাও আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করি।' অতএব তারা অত্যধিক কান্নাকাটি করবে, কিন্তু এর কোন ফল হবে না। অতঃপর বলবে, 'জান্নাতীরা জান্নাত ধৈর্যের কারণে পেয়েছে, চলো আমরাও ধৈর্য ধারণ করি।' অতএব তারা পরিপূর্ণ ধৈর্য প্রদর্শন করবে, কিন্তু তাতেও কোন লাভ হবে না। তখন তারা বলবে, 'আমরা ধৈর্য ধারণ করি অথবা কান্নাকাটি করি, নিষ্কৃতির কোন পথ নেই।' এই পারস্পরিক কথোপকথন জাহান্নামের মধ্যে হবে। কুরআন কারীমের মধ্যে এ বিষয়টি আরো কয়েক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন; সূরা মু'মিন ৪০:৪৭-৪৮, সূরা আ'রাফ ৭:৩৮-৩৯, সূরা আহযাব ৩৩:৬৬-৬৮ নং আয়াত। এ ছাড়া তারা পরস্পর ঝগড়াও করবে এবং একে অপরকে পথভ্রষ্ট করার অপবাদ দিবে। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, ঝগড়া হাশরের ময়দানে হবে। মহান আল্লাহ এর বিস্তারিত বিবরণ সূরা সাবা' ৩৪:৩১-৩৩ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
ইবরাহীম 14:22
যখন সব কিছুর ফায়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে,[১] ‘আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি। আর আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম; কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি;[২] আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না,[৩] আমি শুধু তোমাদেরকে আহবান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহবানে সাড়া দিয়েছিলে।[৪] সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতিই দোষারোপ কর।[৫] আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও;[৬] তোমরা যে পূর্বে আমাকে (আল্লাহর) শরীক করেছিলে, সে কথা তো আমি মানিই না।’[৭] অত্যাচারীদের জন্য তো বেদনাদায়ক শাস্তি আছে। [৮]
[১] অর্থাৎ, ঈমানদারগণ জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে, তখন শয়তান জাহান্নামীদেরকে বলবে।
[২] আল্লাহ যে প্রতিশ্রুতি নবীগণের মাধ্যমে দিয়েছিলেন যে, মুক্তি আমার নবীগণের প্রতি ঈমান আনার উপর নির্ভরশীল, তা সত্য। পক্ষান্তরে আমার সমূহ প্রতিশ্রুতি ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা ছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, ﴿يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلاَّ غُرُورًا﴾ অর্থাৎ, শয়তান তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আশা প্রদান করে। কিন্তু শয়তানের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা মাত্র। (সূরা নিসা ৪:১২০ আয়াত)
[৩] দ্বিতীয় এই যে, আমার কথার না কোন দলীল-প্রমাণ ছিল, আর না আমার পক্ষ থেকে তোমাদের উপর কোন চাপই ছিল।
[৪] হ্যাঁ, শুধু আমার ডাক ও আহবান ছিল। আর তোমরা আমার সেই দলীলহীন আহবান মেনে নিয়েছিলে এবং নবীগণের পরিপূর্ণ দলীল-প্রমাণ সমর্থিত কথাকে খন্ডন ও প্রত্যাখ্যান করেছিলে।
[৫] কেননা সম্পূর্ণ দোষ তো তোমাদেরই, তোমরা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে কাজ করনি, স্পষ্ট দলীল-প্রমাণকে তোমরা উপেক্ষা করেছিলে এবং শুধুমাত্র দলীলহীন দাবীর অনুসরণ করেছিলে।
[৬] অর্থাৎ, না আমি তোমাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করতে পারব, যাতে তোমরা গ্রেপ্তার হয়েছ, আর না তোমরা আমাকে সেই শাস্তি ও ক্রোধ থেকে বাঁচাতে পারবে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপর এসেছে।
[৭] আমি এ কথাও অস্বীকার করি যে, আমি আল্লাহর শরীক বা অংশীদার। যদি তোমরা আমাকে অথবা অন্য কাউকে শরীক মনে করতে, তাহলে এটা তোমাদের নিজেদেই ভুল ও মূর্খতা। কেননা যে আল্লাহ নিখিল বিশ্ব সৃষ্টি করে তা পরিচালনাও করতেন, তাঁর শরীক কেউ কি করে হতে পারে?
[৮] কতিপয় উলামা বলেন যে, এ উক্তিটিও শয়তানেরই এবং এটি তার উল্লিখিত বক্তব্যের সম্পূরক। পক্ষান্তরে কতিপয় উলামা বলেন, শয়তানের কথা مِن قَبل '---মানিই না' পর্যন্ত শেষ। পরের এই বাক্যটি মহান আল্লাহর কথা।
ইবরাহীম 14:23
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত; সেখানে তারা তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে;[১] সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’। [২]
[১] এটা দুর্ভাগ্যবান ও কাফেরদের মুকাবেলায় সৌভাগ্যবান ও ঈমানদারদের বর্ণনা। এদের উল্লেখ তাদের সাথে এই জন্য করা হয়েছে যে, যাতে মানুষের মধ্যে ঈমানদারদের মত চরিত্র গ্রহণ করার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়।
[২] অর্থাৎ, তাদের পরস্পরের উপহার হবে একে অপরকে সালাম করা। এ ছাড়া ফিরিশতাবর্গও প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে সালাম পেশ করবেন।
ইবরাহীম 14:24
তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের উপমা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ; যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত।
ইবরাহীম 14:25
যা তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অহরহ ফল দান করে।[১] আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা বর্ণনা করে থাকেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।
[১] এর অর্থ এই যে, মু'মিনদের উদাহরণ ঐ (বারমেসে ফলদার) গাছের ন্যায়, যে গাছ শীত-গ্রীষ্ম সব সময় ফল দান করে। অনুরূপ মু'মিনদের সৎ কার্যাবলী দিবানিশির ক্ষণে ক্ষণে আকাশের দিকে (আল্লাহর কাছে) নিয়ে যাওয়া হয়। كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ (সৎবাক্য) থেকে উদ্দেশ্য, ইসলাম অথবা কলেমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এবং شَجَرَة طَيِّبَة (উৎকৃষ্ট বৃক্ষ) বলতে খেজুর বৃক্ষকে বুঝানো হয়েছে, যেমন সহীহ হাদীস থেকে এ কথা প্রমাণিত। (বুখারীঃ কিতাবুল ইলম, মুসলিম, কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ)
ইবরাহীম 14:26
পক্ষান্তরে কুবাক্যের উপমা এক মন্দ বৃক্ষ; যার মূল ভূপৃষ্ঠ হতে বিছিন্ন, যার কোন স্থায়িত্ব নেই।[১]
[১] كَلِمَة خَبِيْثَة (কুবাক্য) থেকে কুফরী এবং شَجَرَة خَبِيْثَة (মন্দ বৃক্ষ) থেকে হানযাল (তেলাকচু বা মাকাল) গাছকে বুঝানো হয়েছে যার শিকড় মাটির উপরেই থাকে এবং একটু টান দিতেই উপড়ে যায়। অর্থাৎ কাফেরদের আমল একেবারেই মূল্যহীন; তা না আকাশে যায়, আর না আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয়।
ইবরাহীম 14:27
যারা বিশ্বাসী তাদেরকে আল্লাহ শাশ্বত বাণী দ্বারা ইহজীবনে ও পরজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন[১] এবং যারা সীমালংঘনকারী আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্ত করেন; আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।
[১] এর ব্যাখ্যা হাদীসে এরূপ এসেছে যে, মৃত্যুর পর কবরে মুসলিমকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে উত্তরে এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন (সত্য) মা'বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রসূল। সুতরাং এটাই অর্থ হচ্ছে আল্লাহর এই বাণীর ﴿يُثَبِّتُ اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ﴾ (বুখারীঃ তাফসীর সূরা ইবরাহীম, মুসলিমঃ কিতাবুল জান্নাতি ওয়া সিফাতি নাঈমিহা) অন্য এক হাদীসে আছে যে, যখন বান্দাকে কবরে রাখা হয় এবং তার সঙ্গীরা চলে আসে, তখন সে তাদের জুতার আওয়াজ শোনে। অতঃপর তার নিকট দু'জন ফিরিশতা আসেন এবং তাকে উঠিয়ে (নবী (সাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে) জিজ্ঞেস করেন যে, 'এই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মত কি?' সে মু'মিন হলে উত্তর দেয় যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসূল। ফিরিশতাগণ তাকে জাহান্নামের ঠিকানা দেখিয়ে বলেন যে, আল্লাহ এর পরিবর্তে তোমার জন্য জান্নাতে ঠিকানা বানিয়ে দিয়েছেন। সে উক্ত উভয় ঠিকানা দেখে এবং তার কবর সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেওয়া হয় এবং তার কবরকে কিয়ামত অবধি নিয়ামত সম্ভার দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়। (মুসলিম, উপরোক্ত পরিচ্ছেদ) আরেক হাদীসে আছে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?' সুতরাং আল্লাহ তাআলা অটলতা দান করেন এবং সে উত্তর দেয়, 'আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ইসলাম এবং আমার নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)।' (তাফসীর ইবনে কাসীর)
ইবরাহীম 14:28
তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি যারা আল্লাহর অনুগ্রহের (কৃতজ্ঞতার) বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং তাদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে এনেছে ধ্বংসের মুখে; [১]
[১] এর ব্যাখ্যা সহীহ বুখারীতে আছে যে, এ থেকে কাফেরদেরকে বুঝানো হয়েছে। (বুখারী, তাফসীর সূরা ইবরাহীম) যারা (আল্লাহর নিয়ামত) মুহাম্মাদী রিসালতকে অস্বীকার করে (কৃতঘ্ন হয়ে) এবং বদরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই লড়ে নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে ধ্বংস করল। তবে ভাবার্থের দিক থেকে এটা ব্যাপক। আর এর অর্থ এই যে, মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত ও নিয়ামত করে পাঠিয়েছেন, যে এই নিয়ামতকে গ্রহণ করে তার কদর করবে, সে কৃতঘ্ন এবং সে জান্নাতী হবে। পক্ষান্তরে যে এই নিয়ামতকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তার বদলে কুফরীকে এখতিয়ার করবে, সে কৃতঘ্ন এবং সে জাহান্নামী হবে।
ইবরাহীম 14:29
জাহান্নামে, যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে। আর কত নিকৃষ্ট সে আবাসস্থল।
ইবরাহীম 14:30
তারা আল্লাহর সমকক্ষ উদ্ভাবন করেছে তাঁর পথ হতে বিভ্রান্ত করার জন্য। তুমি বল, ‘ভোগ করে নাও, পরিণামে দোযখই তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল।’ [১]
[১] এটা ধমক ও তিরস্কার যে, পৃথিবীতে যাচ্ছে তাই করে নাও, কিন্তু কতক্ষণ পর্যন্ত? শেষে তোমাদের বাসস্থান তো জাহান্নামই বটে।
ইবরাহীম 14:31
আমার বান্দাদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী তাদেরকে বল, ‘তারা যেন নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; সেদিন আসার পূর্বে যেদিন কোন ক্রয়-বিক্রয় থাকবে না এবং থাকবে না কোন বন্ধুত্ব।’[১]
[১] নামায কায়েম বা প্রতিষ্ঠা করার অর্থ এই যে, তা নবী (সাঃ)-এর তরীকা মোতাবেক যথাসময়ে, মনোযোগ সহকারে এবং বিনয়-নম্রতা বজায় রেখে সম্পন্ন করা। ব্যয় করার অর্থ যাকাত আদায় করা, তার মাধ্যমে আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা এবং অন্যান্য অভাবীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। শুধু এই নয় যে, মুসলিম নিজের স্বার্থে ও নিজস্ব প্রয়োজনে অকুণ্ঠভাবে বহু অর্থ ব্যয় করবে; কিন্তু আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে। কিয়ামতের দিন এমন হবে যেখানে না ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব হবে, আর না কোন বন্ধুত্ব কারো কাজে আসবে।
ইবরাহীম 14:32
আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করেছেন; যাতে তাঁর নির্দেশে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।[১]
[১] মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলের প্রতি যেসব অনুগ্রহ ও সম্পদ দান করেছেন, সেসবের মধ্যে কিছুর বর্ণনা এখানে করা হচ্ছে। বলেছেন, তিনি আকাশকে ছাদ এবং যমীনকে বিছানা বানিয়েছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিভিন্ন প্রকারের গাছপালা এবং ফসল উৎপন্ন করেছেন; যার মধ্যে রয়েছে স্বাদ উপভোগ ও শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ফলমূল এবং নানা ধরনের শস্য; যার রং ও আকার এক অপর থেকে ভিন্ন এবং স্বাদ, সুগন্ধি ও উপকারিতাও পৃথক পৃথক। নৌকা ও জলজাহাজকে মানুষের খিদমতে লাগিয়ে দিয়েছেন, যা উত্তাল তরঙ্গ ভেদ করে চলে, মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে দেয় এবং পণ্যসামগ্রীও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করে। ভূপৃষ্ঠ ও পাহাড় থেকে ঝর্ণাধারা ও নদী-নালা প্রবাহিত করেছেন, যাতে করে তোমরা নিজেরাও পানি পান করতে পার এবং বাগান-ক্ষেতও সেচতে সক্ষম হও।
ইবরাহীম 14:33
তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে; যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী[১] এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি ও দিবসকে। [২]
[১] অর্থাৎ, অবিরাম চলতে থাকে, কখনও থামে না, না রাতে না দিনে। এ ছাড়া এক অপরের পিছে চলে, কিন্তু কখনো পরস্পর ধাক্কা খায় না।
[২] রাত ও দিন, এদের পরস্পর ব্যবধান অব্যাহত থাকে। কখনো রাত দিনের কিছু অংশ নিয়ে বড় হয়ে যায় এবং কখনো দিন রাতের কিছু অংশ নিয়ে বড় হয়ে যায়। আর এ পরম্পরা সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে, এতে এক চুল পরিমাণও কোন পার্থক্য আসেনি।
ইবরাহীম 14:34
আর তিনি তোমাদেরকে প্রত্যেকটি সেই জিনিস দিয়েছেন যা তোমরা তাঁর নিকট চেয়েছ।[১] তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না;[২] মানুষ অবশ্যই অতি মাত্রায় সীমালংঘনকারী অকৃতজ্ঞ। [৩]
[১] অর্থাৎ, তিনি তোমাদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু যা তোমরা তাঁর কাছে চাও তোমাদের জন্য সরবরাহ করে দিয়েছেন। কতিপয় উলামা বলেন যে, যা তোমরা চাও তাও দেন এবং যা চাও না, অথচ তিনি জানেন যে, তা তোমাদের প্রয়োজন তাও দেন। মোট কথা জীবনযাপন করার সমস্ত সুবিধা তোমাদেরকে যোগান।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহর নিয়ামতরাজি অগণন, তা কেউ গুনে শেষ করতে পারে না; উক্ত নিয়ামতসমূহের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারা তো দূরের কথা। একটি বর্ণনায় আছে যে, একদা দাঊদ (আঃ) বললেন, 'হে রব! আমি তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করব? অথচ স্বয়ং কৃতজ্ঞতা প্রকাশই তোমার পক্ষ থেকে আমার প্রতি এক নিয়ামত।' মহান আল্লাহ বললেন, "হে দাঊদ! তুমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে, যখন তুমি স্বীকার করে বললে যে, 'হে আল্লাহ! আমি তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অপারক।" (তাফসীর ইবনে কাসীর)
[৩] আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে গাফিলতির কারণে মানুষ সীমালংঘন করে এবং স্বীয় আত্মার প্রতি অত্যাচার করে, বিশেষ করে কাফেররা; যারা পূর্ণরূপে আল্লাহ সম্বন্ধে উদাসীন।
ইবরাহীম 14:35
আর (স্মরণ কর,) যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ কর[১] এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখ।
[১] এই শহর অর্থাৎ মক্কা। 'এই শহরকে নিরাপদ কর' অন্যান্য দু'আর পূর্বে এই দু'আ করলেন এই কারণে যে, নিরাপত্তা ও শান্তি কায়েম থাকলে মানুষ অন্যান্য নিয়ামত থেকেও ঠিকভাবে উপকৃত হতে পারবে, নচেৎ শান্তি-স্বস্তি ব্যতীত সমস্ত সুখ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ভয় ও আতঙ্ক মানুষকে কাতর ও পেরেশান করে রাখে। যেমন বর্তমানে সঊদী আরব ছাড়া অন্যান্য দেশের অবস্থা। সঊদী আরবে আজও সেই দু'আর বর্কতে এবং ইসলামী আইন চালু থাকার কারণে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি বিরাজ করছে। আল্লাহ এ দেশকে যাবতীয় অমঙ্গল ও ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আমীন। এখানে মহান আল্লাহর নানা অনুগ্রহের অন্তর্গত নিরাপত্তার মত একটি বড় অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে ইঙ্গিত করেছেন যে, কুরাইশ যেরূপ আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামত থেকে উদাসীন, অনুরূপ এই বিশেষ নিয়ামত থেকেও উদাসীন যে, তিনি তাদেরকে মক্কার মত নিরাপদ ও শান্তিময় শহরের বাসিন্দা বানিয়েছেন।
ইবরাহীম 14:36
হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে;[১] সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।
[১] পথভ্রষ্ট করার কাজের সম্পর্ক জোড়া হয়েছে ঐ পাথরের মূর্তিদের সাথে, মুশরিকরা যাদের পূজা-অর্চনা করত, অথচ তারা নির্বোধ, কেননা সেসব মূর্তি মানুষের পথভ্রষ্টের কারণ ছিল।
ইবরাহীম 14:37
হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার কিছু বংশধরকে[১] ফল-ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট বসবাস করালাম; হে আমাদের প্রতিপালক! যাতে তারা নামায কায়েম করে।[২] সুতরাং তুমি কিছু লোকের[৩] অন্তরকে ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলমূল দ্বারা তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর;[৪] যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
[১] مِنْ ذُرِّيَّتِيْ তে مِنْ তাব'ঈযের (অর্থাৎ আংশিক অর্থ প্রকাশের) জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ কিছু বংশধরকে। বলা হয় যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর ঔরসজাত ছেলে আটজন, তাদের মধ্যে শুধু ইসমাঈল (আঃ)-কে এখানে বসবাস করিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর)
[২] ইবাদতসমূহের মধ্যে শুধু নামাযের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে নামাযের গুরুত্ব প্রকাশ পায়।
[৩] এখানেও مِنْ তাব'ঈযের (অর্থাৎ আংশিক অর্থ প্রকাশের) জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, কিছু লোকের; উদ্দেশ্য মুসলিমগণ। সুতরাং দেখে নিন যে, কিভাবে নিখিল বিশ্বের মুসলিমরা মক্কা মুকার্রামায় একত্রিত হয়ে থাকে এবং হজ্জের মৌসম ছাড়াও সারা বছর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। যদি ইবরাহীম (আঃ) أفْئِدَةَ النَّاسِ (মানুষের অন্তর) বলতেন, তাহলে খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী, অগ্নিপূজক এবং অন্যান্য সমস্ত মানুষ মক্কা পৌঁছত। مِنَ النَّاسِ এর مِنْ শব্দটি এই দু'আকে মুসলমান পর্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। (ইবনে কাসীর)
[৪] এ দু'আরও প্রভাব লক্ষণীয় যে, মক্কার মত বৃক্ষ-পানিহীন অনাবাদ জায়গাতে যেখানে কোন ফলদার বৃক্ষ ছিল না, আজ সেখানে বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। হজ্জের মৌসুমেও ফল-ফ্রুটের কোন প্রকার ঘাটতি হয় না, অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়। এটা মহান আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আর বদৌলতে তাঁর (আল্লাহর) পক্ষ থেকে দয়া, কৃপা, অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও বরকত। বলা হয় যে, তিনি উক্ত দু'আ কা'বাঘর নির্মাণ করার পর করেছিলেন। পক্ষান্তরে প্রথম দু'আটি (নিরাপদ কর) সেই সময় করেছিলেন, যখন স্বীয় স্ত্রী ও নবজাত শিশু ইসমাঈলকে আল্লাহর নির্দেশে সেখানে রেখে চলে গিয়েছিলেন। (ইবনে কাসীর)
ইবরাহীম 14:38
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি তা নিশ্চয় তুমি জানো। আর পৃথিবী ও আকাশের কোন কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না। [১]
[১] অর্থাৎ আমার দু'আর উদ্দেশ্য তুমি তো ভালভাবে জান। এই শহরবাসীর জন্য দু'আর মূল উদ্দেশ্য তোমার সন্তুষ্টি। তুমি তো প্রত্যেক জিনিসের বাস্তবতা সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত, আকাশ ও পৃথিবীর কোন কিছু তোমার কাছে গোপন নেই।
ইবরাহীম 14:39
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য যিনি আমাকে (আমার) বার্ধক্য সত্ত্বেও ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই দুআ শ্রবণকারী।
ইবরাহীম 14:40
হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানাও এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও।[১] হে আমাদের প্রতিপালক! আমার দুআ কবুল কর।
[১] নিজের সাথে স্বীয় সন্তানদের জন্যও দু'আ করলেন। ইতিপূর্বেও নিজের সাথে স্বীয় সন্তানদের জন্য দু'আ করলেন যে, তাদেরকে পাথরের মূর্তিপূজা থেকে বাঁচিয়ে রাখো। এ থেকে জানা গেল যে, দ্বীনের আহবায়কদেরকে স্বীয় পরিবারের হিদায়াত এবং তাদের দ্বীনী শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে উদাসীন থাকা উচিত নয়। বরং দাওয়াত ও তবলীগে তাদেরকে প্রাথমিক পর্যায়ে রাখা উচিত। যেমন মহান আল্লাহ স্বীয় শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কেও নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾ অর্থাৎ, স্বীয় নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক কর। (সূরা শু'আরা ২৬:২১৪)
ইবরাহীম 14:41
হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসাব হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে[১] এবং বিশ্বাসীদেরকে ক্ষমা করো।’
[১] ইবরাহীম (আঃ) এই দু'আ তখন করেছিলেন যখন তাঁর কাছে স্বীয় পিতার ব্যাপারে আল্লাহর দুশমন হওয়ার কথা প্রকাশ পায়নি। যখন প্রকাশ পেয়ে গেল যে, তাঁর পিতা আল্লাহর দুশমন, তখন তিনি সম্পর্কছিন্নতা ব্যক্ত করলেন। কেননা যতই নিকটাত্মীয় হোক না কেন, মুশরিকদের জন্য (ক্ষমা প্রার্থনার) দু'আ করা বৈধ নয়।
ইবরাহীম 14:42
তুমি কখনো মনে করো না যে, সীমালংঘনকারীরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। আসলে তিনি সেদিন পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন, যেদিন সকল চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। [১]
[১] অর্থাৎ কিয়ামতের ভয়াবহতার কারণে। যদি মহান আল্লাহ পৃথিবীতে কাউকে বেশি অবকাশ দিয়ে আমরণ তাকে পাকড়াও না করেন, তাহলে কিয়ামতের দিন তাঁর পাকড়াও থেকে তো সে বাঁচতে পারবে না, যে দিন কাফেরদের জন্য এত ভয়ঙ্কর হবে যে, তাদের চক্ষু বিস্ফারিত ও স্থির হয়ে যাবে।
ইবরাহীম 14:43
ভীত-বিহব্বল চিত্তে আকাশের দিকে চেয়ে তারা ছুটাছুটি করবে[১] নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে (জ্ঞান) শূন্য। [২]
[১] مُهْطِعِيْنَ দ্রুত ছুটাছুটি করতে থাকবে। তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿مُّهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ﴾ অর্থাৎ, আহবানকারীর দিকে দৌড়বে। (সূরা ক্বামার ৫৪:৮) مُقْنِعِيْ رُءُوسِهِمْ ভয়-বিহব্বলতায় তাদের মাথা উপর দিকে উঠে থাকবে।[২] যে ভয়াবহতা দর্শন তারা করবে এবং নিজেদের ব্যাপারে যে চিন্তা-ভাবনা ও ভয়-ভীতি হবে, তার কারণে তাদের চক্ষু ক্ষণেকের জন্যও নীচু হবে না এবং প্রচন্ড ভয়ের কারণে তাদের হৃদয় ভগ্ন ও শূন্য থাকবে।
ইবরাহীম 14:44
সেদিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর যেদিন তাদের শাস্তি আসবে, যখন সীমালংঘনকারীরা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্য অবকাশ দাও; আমরা তোমার আহবানে সাড়া দিব এবং রসূলদের অনুসরণ করব।’ (তখন তাদেরকে বলা হবে,) ‘তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের কোন পতন নেই? [১]
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে তোমরা কসম খেয়ে বলতে যে, কোন হিসাব-নিকাশ এবং জান্নাত-জাহান্নাম নেই এবং পুনর্বার কে জীবিত হবে?
ইবরাহীম 14:45
তোমরা বাস করতে তাদের বাসভূমিতে যারা নিজেদের প্রতি যুলম করেছিল এবং তাদের প্রতি আমি কি করেছিলাম, তাও তোমাদের নিকট সুবিদিত ছিল এবং তোমাদের নিকট আমি দৃষ্টান্তও উপস্থিত করেছিলাম।’ [১]
[১] অর্থাৎ, উপদেশ গ্রহণ করার জন্য আমি তো পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা করে দিয়েছি, যাদের বাড়ি-ঘরে এখন তোমরা বসবাস করছ এবং তাদের জীর্ণ বাড়ি-ঘরও তোমাদেরকে চিন্তা-ভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। যদি তোমরা এ থেকে উপদেশ গ্রহণ না কর এবং তাদের পরিণাম থেকে বাঁচার জন্য চিন্তা-ভাবনা না কর, তাহলে তোমাদের মর্জি। সুতরাং তোমরাও অনুরূপ পরিণামের জন্য প্রস্তুত থাকো।
ইবরাহীম 14:46
তারা ভীষণ চক্রান্ত করেছিল, অথচ আল্লাহর নিকট তাদের চক্রান্ত (জানা) ছিল।[১] তাদের চক্রান্ত এমন ছিল না যাতে পর্বত টলে যেত।[২]
[১] এটা অবস্থা বর্ণনামূলক বাক্য। অর্থাৎ, আমি তাদের সাথে যা করলাম তা করলাম, অথচ অবস্থা এই যে, তারা বাতিলকে সাব্যস্ত এবং সত্যকে খন্ডন করার জন্য সর্বশক্তি ব্যয় পূর্বক কৌশল ও চক্রান্ত করল। আর আল্লাহর কাছে এসব চক্রান্তের জ্ঞান আছে; অর্থাৎ তাঁর কাছে লিপিবদ্ধ আছে যার শাস্তি তিনি তাদেরকে দেবেন।[২] কেননা যদি পাহাড় টলে যেত, তাহলে তা স্বস্থানে থাকতো না, অথচ সমস্ত পাহাড় স্ব স্ব স্থানে অটল রয়েছে। এ হল إنْ নেতিবাচক مَا এর অর্থ। দ্বিতীয় অর্থ إنْ মূলতঃ إنَّ ছিল। অর্থাৎ নিশ্চয় তাদের চক্রান্ত এত বড় ছিল যে, তার ফলে পাহাড়ও স্বস্থান থেকে সরে যেত! তিনি তো মহান আল্লাহই যিনি তাদের চক্রান্তকে সফল হতে দেননি। যেমন মহান আল্লাহ কাফেরদের সম্বন্ধে বলেছেন, ﴿تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا. أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا﴾ অর্থাৎ, এতে যেন আকাশ সমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে ও পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। যেহেতু তারা পরম দয়াময়ের উপর সন্তান আরোপ করে। (সূরা মারয়্যাম ১৯:৯০-৯১)
ইবরাহীম 14:47
সুতরাং তুমি কখনো মনে করো না যে, আল্লাহ তাঁর রসূলদের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন;[১] আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধগ্রহণকারী। [২]
[১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ স্বীয় রসূলদের সাথে পৃথিবীতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অবশ্যই সত্য, তাঁর তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়া অসম্ভব।
[২] অর্থাৎ স্বীয় বন্ধুদের জন্য স্বীয় শত্রুদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
ইবরাহীম 14:48
(স্মরণ কর,) যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও।[১] আর মানুষ (কবর থেকে) বের হবে একক প্রতাপশালী আল্লাহর জন্য।
[১] ইমাম শওকানী বলেন, আয়াতে দুটো সম্ভাবনাই রয়েছে যে, এই পরিবর্তন গুণগত দিক থেকেও হতে পারে এবং পদার্থগত দিক থেকেও হতে পারে। অর্থাৎ এই আকাশ ও পৃথিবী নিজ নিজ গুণগত দিক দিয়ে পরিবর্তিত হবে অথবা অনুরূপ পদার্থগত দিক থেকে তার পরিবর্তন আসবে, না এই পৃথিবী থাকবে আর না এ আকাশ। পৃথিবীও অন্য হবে এবং আকাশও অন্য। রসূল (সাঃ) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন মানুষ সাদা ও লালচে সাদা রঙের ভূমিতে একত্রিত হবে, যা ময়দার রুটির মত হবে, তাতে কারো কোন (মালিকানার) চিহ্ন থাকবে না। (মুসলিম, সিফাতুল কিয়ামাহ) একদা আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, যখন এই আকাশ ও পৃথিবী পরিবর্তন হবে, তখন সেই দিন লোকেরা কোথায় অবস্থান করবে? উত্তরে নবী (সাঃ) বললেন, পুল সিরাতের উপর। (সাবেক উদ্ধৃতি) এক ইহুদীর প্রশ্নের উত্তরে নবী (সাঃ) বলেছিলেন, "সেই দিন লোকেরা পুলের নিকট অন্ধকারে অবস্থান করবে। (মুসলিম, কিতাবুল হায়য)
ইবরাহীম 14:49
সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শিকল দ্বারা বাঁধা অবস্থায়।
ইবরাহীম 14:50
তাদের জামা হবে আলকাতরার[১] এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমন্ডল।
[১] যা দ্রুতদাহ্য; আগুনে সত্ত্বর জলে ওঠে। তা ছাড়া অগ্নি তাদের চেহারাকেও ঢেকে রাখবে।
ইবরাহীম 14:51
যাতে আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।
ইবরাহীম 14:52
এটা[১] মানুষের জন্য এক বার্তা; যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র উপাস্য এবং যাতে জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।
[১] 'এটা' বলে কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অথবা পূর্বোল্লিখিত বিবরণের দিকে ইশারা করা হয়েছে, যা ﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ غَافِلًا﴾ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-হিজর 15:1
আলিফ লা-ম রা। এগুলি আয়াত মহাগ্রন্থের, সুস্পষ্ট কুরআনের। [১]
[১] মহাগ্রন্থ এবং সুস্পষ্ট কুরআন থেকে নবী (সাঃ)-এর উপর নাযিলকৃত কুরআনকেই বুঝানো হয়েছে, যেমন ﴿قَدْ جَاءكُم مِّنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ﴾ (১৫) سورة المائدة এ নূর (আলো) এবং কিতাব উভয় থেকে কুরআন কারীমকেই বুঝানো হয়েছে। কুরআনের মর্যাদা বর্ধনের উদ্দেশ্যে কুরআনকে নাকেরা (অনির্দিষ্ট বিশেষ্য) রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই কুরআন সম্পূর্ণ এবং অত্যন্ত মর্যাদা ও মাহাত্ম্যপূর্ণ।
আল-হিজর 15:2
কোন এক সময় অবিশ্বাসীরা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত! [১]
[১] এই আকাঙ্ক্ষা কখন করবে? মৃত্যুর সময় যখন ফিরিশতারা জাহান্নামের আগুন দেখাবেন তখন, নাকি যখন জাহান্নামে চলে যাবে তখন। অথবা যখন গোনাহগার মু'মিনদেরকে কিছুদিন জাহান্নামে শাস্তি স্বরূপ রাখার পর বের করে নেওয়া হবে তখন, নাকি যখন হাশরের মাঠে বিচার চলবে আর কাফেররা দেখবে যে, মু'মিনরা জান্নাতে যাচ্ছে তখন কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে, হায় তারাও যদি মুসলমান হতো। ربما অধিকাংশ 'অধিক' অর্থে ব্যবহার হয়, তবে কখনো কখনো 'অল্প' অর্থেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন, তারা এই আকাঙ্ক্ষা সর্ব অবস্থায় করবে কিন্তু তাদের এই আকাঙ্ক্ষা কোন কাজে লাগবে না।
আল-হিজর 15:3
তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক, পরিণামে তারা বুঝবে। [১]
[১] এটি তিরঙ্কার ও ধমক, যদি কাফের ও মুশরিকরা কুফরী ও শিরক থেকে ফিরে না আসে, তাহলে তাদেরকে ছেড়ে দাও। তারা ভোগ বিলাসে ডুবে থাকুক, আশা করতে থাকুক, অচিরেই তারা তাদের কুফরী ও শিরকের পরিণাম বুঝতে পারবে।
আল-হিজর 15:4
আমি কোন জনপদকে তার নির্দিষ্টকাল পূর্ণ না হলে ধ্বংস করিনি।
আল-হিজর 15:5
কোন জাতি তার নির্দিষ্ট কালকে তরান্বিত করতে পারে না এবং বিলম্বিতও করতে পারে না।[১]
[১] যখন কোন জনপদকে তাদের পাপের জন্য ধ্বংস করি, তখন হঠাৎ করি না; বরং তাদের জন্য একটা সময় নিদিষ্ট করে থাকি, সেই সময় পর্যন্ত তাদের অবকাশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট সময় এসে গেলেই তাদেরকে ধ্বংস করে দিই। সুতরাং সেই সময়কে তাদের জন্য আগা-পিছা করা হয় না।
আল-হিজর 15:6
তারা বলে, ‘ওহে যার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে! তুমি তো নিশ্চয় উন্মাদ।
আল-হিজর 15:7
তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের নিকট ফিরিশতাবর্গ হাযির করছ না কেন?’ [১]
[১] এটি কাফেরদের কুফরী ও বিরূদ্ধাচরণের বর্ণনা। তারা নবী (সাঃ)-কে পাগল বলত। আর বলত যে, তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে তুমি তোমার আল্লাহকে বল, তিনি কোন ফিরিশতা পাঠান, যিনি তোমার রিসালতের সত্যতা বর্ণনা করবেন অথবা আমাদেরকে ধ্বংস করবেন।
আল-হিজর 15:8
আমি ফিরিশতাদেরকে যথার্থ কারণ ব্যতীত অবতীর্ণ করি না; আর (ফিরিশতা অবতীর্ণ করলে) তখন তারা অবকাশ পাবে না। [১]
[১] মহান আল্লাহ বলেন, আমি ফিরিশতা যথার্থ কারণে পাঠিয়ে থাকি। অর্থাৎ যখন আমার ইচ্ছা ও হিকমত আযাব পাঠানোর হয়, তখন ফিরিশতা অবতীর্ণ করে থাকি, আর তখন অবকাশ দেওয়া হয় না বরং ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
আল-হিজর 15:9
নিশ্চয় আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর সংরক্ষক।[১]
[১] অর্থাৎ কুরআনে অবৈধ হস্তক্ষেপ, বিকৃতি সাধন ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন হতে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। অতএব কুরআন সেইভাবেই আজও সুরক্ষিত আছে, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল। ভ্রষ্ট ফির্কাগুলো নিজ নিজ আকীদার সর্মথনে কুরআনের আয়াতের আর্থিক বিকৃতি ঘটিয়েছে এবং আজও ঘটাচ্ছে। তবে শাব্দিক বিকৃতি ও পরিবর্তন হতে তা এখনও সুরক্ষিত। এ ছাড়াও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি দল আর্থিক বিকৃতির পর্দা ছিঁড়ে ফেলার জন্য সর্বকালেই বিদ্যমান, যারা তাদের আকীদার ও তাদের ভুল দলীল-প্রমাণাদির অসারতা প্রমাণ করেছেন এবং আজও তাঁরা সেই কাজে সচেষ্ট। তাছাড়া কুরআনকে এখানে যিকর (উপদেশ) বলে ব্যক্ত করা হয়েছে, যাতে বুঝা যায় যে, নবী (সাঃ)-এর স্বর্ণোজ্জ্বল জীবনাদর্শ ও তাঁর অমিয় বাণীকে সুরক্ষিত করে কুরআন কারীমের বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ হওয়ার দিকটাকে কিয়ামত পর্যন্ত সুরক্ষিত করা হয়েছে। অতএব কুরআন কারীম ও নবী (সাঃ)-এর জীবনাদর্শ দ্বারা বিশ্ববাসীকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পথ সর্বকালের জন্য খোলা রয়েছে। উক্ত মর্যাদা ও সুরক্ষার বৈশিষ্ট্য পূর্বের কোন নবী বা কিতাবকে দেওয়া হয়নি।
আল-হিজর 15:10
অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি অনেক সম্প্রদায়ের নিকট রসূল পাঠিয়েছিলাম।
আল-হিজর 15:11
তাদের নিকট এমন কোন রসূল আসেনি, যাকে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত না। [১]
[১] এখানে নবী (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, এরা শুধু তোমাকেই মিথ্যাবাদী বলছে তা নয়; বরং প্রত্যেক নবীর সাথেই এরূপ আচরণ করা হয়েছে।
আল-হিজর 15:12
এভাবে আমি অপরাধীদের অন্তরে তা সঞ্চার করি। [১]
[১] অর্থাৎ, কুফরী ও রসুলদেরকে বিদ্রূপ করা আমি তাদের অন্তরে প্রক্ষিপ্ত করে দিয়েছি। এখানে এই কর্মের সম্পর্ক মহান আল্লাহ নিজের দিকে করেছেন যেহেতু প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা তিনিই। অতএব তাদের এই কর্ম তাদের ক্রমাগত পাপের পরিণতিতে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় প্রকাশ পেয়েছে।
আল-হিজর 15:13
তারা কুরআনে বিশ্বাস করবে না। আর অবশ্যই পূর্ববর্তিগণের রীতি গত হয়েছে। [১]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে ধ্বংস করার রীতি তাই, যা মহান আল্লাহ প্রথম থেকেই নির্ধারিত করে রেখেছেন, আর তা হল মিথ্যাজ্ঞান ও বিদ্রূপ করার পর তাদেরকে ধ্বংস করা।
আল-হিজর 15:14
যদি তাদের জন্য আমি আকাশের কোন দুয়ার খুলে দিই এবং তারা তাতে চড়তেও থাকে।
আল-হিজর 15:15
তবুও তারা বলবে, ‘আমাদের দৃষ্টিভ্রম ঘটানো হয়েছে; বরং আমরা এক যাদুগ্রস্ত সম্প্রদায়।’ [১]
[১] তাদের কুফরী ও বিরুদ্ধাচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ফিরিশতা অবতীর্ণ হওয়া তো দূরের কথা, যদি তাদের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তারা সেই দরজা দিয়ে আকাশে যাওয়া-আসা শুরু করে, তবুও তাদের চক্ষুতে বিশ্বাস হবে না এবং রসূলগণকে সত্যবাদী বলে মেনে নেবে না। বরং তারা বলবে, আমাদের চোখে বা আমাদের উপর যাদু করা হয়েছে, যার কারণে আমাদেরকে এরকম মনে হচ্ছে যে, আমরা আকাশে আসা যাওয়া করছি; অথচ এমনটি নয়!
আল-হিজর 15:16
আকাশে আমি গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি[১] এবং ওকে করেছি দর্শকদের জন্য সুশোভিত।
[১] بروج শব্দটি برج এর বহুবচন। যার অর্থ প্রকাশ হওয়া। আর এর থেকেই تبرج শব্দের উৎপত্তি; যার অর্থ মহিলাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করা। এখানে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রকে بروج বলা হয়েছে, কারণ সেগুলি বড় উঁচুতে প্রকাশমান। কেউ কেউ বলেন, بروج বলতে সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথসমূহকে বুঝানো হয়েছে যা তাদের জন্য নির্দিষ্ট। আর তা হল বারটি; মেষরাশি, বৃষরাশি, মিথুনরাশি, কর্কটরাশি, সিংহরাশি, কন্যারাশি, তুলারাশি, বৃশ্চিকরাশি, ধনুঃরাশি, মকররাশি, কুম্ভরাশি ও মীনরাশি। আরবের লোকেরা এই সকল রাশিচক্র দ্বারা আবহাওয়ার অবস্থা জানার চেষ্টা করত। অবশ্য এতে কোন দোষ নেই, দোষ হল তার দ্বারা কোন পরিবর্তমান সংঘটিতব্য ঘটনা জানার দাবি করা, যেমন আজকাল কিছু অজ্ঞ মানুষদের মধ্যে তার প্রচলন রয়েছে; যাদের মাধ্যমে অনেকে নিজেদের ভূত-ভবিষ্যৎ ও ভাগ্য পরীক্ষা করে ও জেনে থাকে। অথচ পৃথিবীতে সংঘটিতব্য ঘটনা ও মঙ্গলামঙ্গলের সাথে এ সবের কোন সম্পর্ক নেই। যা কিছু হয় তা একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। এখানে মহান আল্লাহ ঐ সকল গ্রহ-নক্ষত্রের কথা উল্লেখ নিজ অসীম ক্ষমতা ও অনন্য সৃষ্টিকৌশল প্রকাশ করার জন্য করেছেন। এ ছাড়া তিনি এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ সকল আকাশের সৌন্দর্য স্বরূপ সৃষ্ট।(আরো দ্রষ্টব্য সূরা ফুরক্বানের ২৫:৬১ নং আয়াতের টীকা)
আল-হিজর 15:17
প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে আমি ওকে নিরাপদ রেখেছি। [১]
[১] رجيم শব্দটি مرجوم এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। رجم (রজম)এর অর্থ পাথর ছুঁড়ে মারা। শয়তানকে 'রাজীম' এই জন্য বলা হয় যে, সে যখন আকাশের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন তাকে আকাশ থেকে জ্বলন্ত শিখা (উল্কা) ছুঁড়ে মারা হয়। রাজীম অভিশপ্ত ও বিতাড়িত অর্থেও ব্যবহার হয়। কারণ যাকে পাথর ছুঁড়ে মারা হয় তাকে চতুর্দিক থেকে অভিসম্পাত করা হয়। এখানে মহান আল্লাহ এ কথাই বলেছেন যে, আমি আকাশকে প্রত্যেক অভিশপ্ত শয়তান হতে রক্ষা করে থাকি ঐ সকল গ্রহ-নক্ষত্র দ্বারা, যা আঘাত হেনে শয়তানকে পালাতে বাধ্য করে।
আল-হিজর 15:18
আর কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে ওর পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত উল্কা। [১]
[১] এর অর্থ এই যে, শয়তানেরা আকাশে কথা শোনার জন্য যাওয়ার চেষ্টা করে। যার ফলে তাদের উপর জলন্ত উল্কা এসে পড়ে। যার কারণে কেউ মারা যায়, কেউ পালাতে সক্ষম হয়, আবার কেউ কিছু শুনে ফেলে। এর ব্যাখ্যা হাদীসে এভাবে এসেছে; নবী (সাঃ) বলেছেন, যখন মহান আল্লাহ আকাশে কোন কিছুর ফায়সালা করেন, তখন তা শুনে ফিরিশতাগণ অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ স্বরূপ ডানা নাড়তে শুরু করেন, যেন তা লোহার শিকল দ্বারা কোন পাথরের উপর মারার শব্দ। অতপর যখন তাদের মন থেকে আল্লাহর ভয় কিছুটা কমে আসে তখন তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করে যে, তোমাদের প্রভু কি বললেন? তাঁরা বলেন, তিনি যা বলেছেন সত্য বলেছেন এবং তিনি সুমহান ও সুউচ্চ। তারপর সেই ফায়সালার কথা ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন আসমান পর্যন্ত ফিরিশতাবর্গ পরস্পর শোনাশুনি করেন। এই সময় শয়তানরাও তা শোনার জন্য চুপি চুপি গিয়ে কান পাতে এবং তারাও এক অপরের একটু দূরে থেকে তা শোনার চেষ্টা করে এবং কেউ কেউ এক আধটি শব্দ শুনে ফেলে ও পরে তা কোন গণকের কানে পৌঁছে দেয়। গণক সেই কথার সাথে আরও একশত মিথ্যা কথা মিলিয়ে মানুষের কাছে বর্ণনা করে। (সংক্ষেপে সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা হিজর)
আল-হিজর 15:19
পৃথিবীকে আমি বিস্তৃত করেছি এবং ওতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি; আমি ওতে প্রত্যেক বস্তু উদ্গত করেছি সুপরিমিতভাবে। [১]
[১] موزون শব্দটি معلوم এর অর্থে ব্যবহূত, অথবা এর অর্থ, পরিমিত বা প্রয়োজন মত।
আল-হিজর 15:20
আর আমি ওতে জীবিকার অনেক ব্যবস্থা করেছি তোমাদের জন্য[১] আর তোমরা যাদের জীবিকাদাতা নও তাদের জন্যেও। [২]
[১] معايش শব্দটি معيشة এর বহুবচন, অর্থ তোমাদের জন্য পৃথিবীতে জীবিকার অসংখ্য পথ ও উপায় সৃষ্টি করেছি।
[২] অর্থাৎ, দাস-দাসী চাকর-ভৃত্য ও জীবজন্তু। অর্থাৎ, পশুকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছি, যাকে তোমরা বাহনরূপে ব্যবহার কর, যার উপর মালপত্র বহন কর এবং কিছুকে তোমরা ভক্ষণও কর। দাস-দাসী থেকে তোমরা তোমাদের কাজ নিয়ে থাক। যদিও এরা তোমাদের অধীনস্থ, তোমরা তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে থাক, কিন্তু তাদের আসল জীবিকা নির্বাহকারী আমিই। তোমরা এটা মনে করো না যে, তোমরাই তাদের রুযীদাতা, তোমরা তাদেরকে খেতে না দিলে তারা মারা যাবে।
আল-হিজর 15:21
আমারই কাছে আছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার[১] এবং আমি তা প্রয়োজনীয় পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।
[১] কেউ কেউ خزائن (ভান্ডার) থেকে বৃষ্টি অর্থ নিয়েছেন। কারণ বৃষ্টিই শস্য উৎপাদনের মূল উপাদান। কিন্তু এখানে সঠিক অর্থে পৃথিবীর সকল ভান্ডারকে বুঝানো হয়েছে। যে সবকে মহান আল্লাহ নিজ ইচ্ছানুসারে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিতত্ত্ব দান করেন।
আল-হিজর 15:22
আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু প্রেরণ করি[১] অতঃপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদেরকে পান করাই এবং ওর ভান্ডার তোমাদের কাছে নেই। [২]
[১] لواقح বৃষ্টিগর্ভ, বৃষ্টিবাহী বা ভারী বায়ু এই জন্য বলা হয়েছে, যেহেতু বায়ু বৃষ্টি ভর্তি মেঘমালাকে বহন করে। যেমন لقحة এমন গাভীন উটনীকে বলা হয়, যে তার পেটে বাচ্চা বহন করে।
[২] এই বৃষ্টি যা আমি বর্ষণ করি, তাকে তোমরা জমা করে রাখতে সক্ষম নও। এটি আমারই কুদরত ও অনুগ্রহ যে আমি তাকে ঝর্ণা, কূপ ও নদী-নালার মাধ্যমে সংরক্ষণ করে থাকি। তাছাড়া আমি চাইলে পানিকে এত নীচে পৌছে দিতে পারি যে, ঝর্ণা ও কূপ হতে পানি সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে যাবে। যেমন কখনও কখনও কোন কোন এলাকায় মহান আল্লাহ তাঁর কুদরতের কিছু কিছু নমুনা দেখিয়ে থাকেন। (আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।)
আল-হিজর 15:23
নিশ্চয় আমিই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।
আল-হিজর 15:24
অবশ্যই আমি তোমাদের অগ্রগামীদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তোমাদের পশ্চাতগামীদেরকেও।
আল-হিজর 15:25
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই তাদেরকে সমবেত করবেন; নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
আল-হিজর 15:26
নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কালো পচা শুষ্ক ঠনঠনে মাটি হতে।[১]
[১] মাটির বিভিন্ন অবস্থার কারণে বিভিন্ন নামে নামকরণ হয়ে থাকে। শুকনো মাটিকে تراب, ভিজে মাটিকে طين, দুর্গন্ধযুক্ত পচা কাদা মাটিকে حمأ مسنون বলা হয়। যেমন তা শুকিয়ে গিয়ে তা থেকে ঠনঠন্ শব্দ বের হলে তাকে صلصال এবং আগুনে পোড়ালে فخَّار বলা হয়। এখানে মহান আল্লাহ মানুষের সৃষ্টির কথা যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে মনে হয় যে, আদমের দেহ প্রথমে দুর্গন্ধযুক্ত কাদামাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং যখন তা শুকিয়ে তা থেকে ঠনঠন্ শব্দ বের হতে শুরু করল, তখন তার মধ্যে জীবন দান করেছিলেন। এই صلصال কে কুরআনের অন্যত্র كالفخّار বলা হয়েছে। (সূরা রাহমান ৫৫:১৪ আয়াত দ্রঃ)
আল-হিজর 15:27
আর এর পূর্বে জীনকে সৃষ্টি করেছি ধূম্রহীন বিশুদ্ধ অগ্নি হতে।[১]
[১] جن মানে ঢাকা। জীনকে জীন এই কারণেই বলা হয়, যেহেতু তারা মানুষের চোখে অদৃশ্য থাকে। সূরা রাহমান ৫৫:১৫ নং আয়াতে জিনের সৃষ্টি অগ্নিশিখা থেকে বলা হয়েছে এবং সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসেও ঐ একই কথাই বলা হয়েছে। এই হিসাবে অগ্নিশিখা ও ধূম্রহীন বিশুদ্ধ অগ্নি থেকে উদ্দেশ্য একই হবে।
আল-হিজর 15:28
স্মরণ কর; যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদেরকে বললেন, ‘আমি কালো পচা শুষ্ক ঠনঠনে মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করব।
আল-হিজর 15:29
যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ [১]
[১] সিজদার আদেশ আদমের সম্মানের জন্য ছিল, ইবাদতের জন্য ছিল না। আর যেহেতু এটি ছিল আল্লাহর আদেশ, সেহেতু তার আবশ্যকতায় কোন সন্দেহ নেই। তবে এখন শরীয়তে কারও জন্য সিজদা বৈধ নয়।
আল-হিজর 15:30
তখন ফিরিশতাগণ সবাই একত্রে সিজদা করল।
আল-হিজর 15:31
কিন্তু ইবলীস করল না। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করল।
আল-হিজর 15:32
তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে ইবলীস! তোমার কি হল যে, তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলে না?’
আল-হিজর 15:33
সে (উত্তরে) বলল, ‘কালো পচা শুষ্ক ঠনঠনে মাটি হতে যে মানুষ তুমি সৃষ্টি করেছ, আমি তাকে সিজদা করবার নই।’ [১]
[১] শয়তান তার সিজদা করতে অস্বীকার করার কারণ দর্শাল যে, আদম মাটির তৈরী মানুষ। যার অর্থ মানুষকে মানুষ হিসাবে তুচ্ছজ্ঞান করা হল শয়তানী দর্শন; যা হকপন্থীদের আকীদা হতে পারে না। এই জন্য হকপন্থীগণ নবীগণের মানুষ হওয়ার কথা অস্বীকার করেন না। কারণ তাঁদের মানুষ হওয়ার কথা কুরআন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে। তাছাড়া তাদের মানুষ হওয়াতে তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না এবং সম্মানে কোন পার্থক্যও আসে না।
আল-হিজর 15:34
তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত।
আল-হিজর 15:35
কর্মফল দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি রইল অভিশাপ।’
আল-হিজর 15:36
সে (ইবলীস) বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।’
আল-হিজর 15:37
তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘যাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে।
আল-হিজর 15:38
অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।’
আল-হিজর 15:39
সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি যে আমাকে বিপদগামী করলে তার জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপ কর্মকে অবশ্যই শোভনীয় করে তুলব এবং আমি তাদের সকলকে অবশ্যই বিপথগামী করে ছাড়ব।
আল-হিজর 15:40
তবে তাদের মধ্যে তোমার একনিষ্ঠ বান্দাগণ ছাড়া।’
আল-হিজর 15:41
তিনি বললেন, ‘এটাই আমার নিকট পৌঁছনোর সরল পথ। ( )
আল-হিজর 15:42
বিভ্রান্তদের মধ্য হতে যারা তোমার অনুসরণ করবে, তারা ছাড়া আমার (একনিষ্ঠ) বান্দাদের উপর তোমার কোন আধিপত্য থাকবে না।[১]
[১] অর্থাৎ, আমার নেক বান্দাদের উপর তোমার কোন কর্তৃত্ব চলবে না। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের দ্বারা কোন পাপ হবে না। বরং এর উদ্দেশ্য হল, তারা এমন কোন পাপ করবে না, যার পর তারা লজ্জিত হবে না বা তওবা করবে না। কারণ সেই পাপই মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়, যার পর মানুষ অনুতপ্ত হয় না এবং তওবার সাথে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে না। আর এরূপ পাপের পরই মানুষ একের পর এক পাপ করতে থাকে। আর শেষ পর্যন্ত ধ্বংসই তার ভাগ্যে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে মু'মিনদের গুণ হল তারা পাপের পর পাপ করতে থাকে না, বরং তারা সত্ত্বর তওবা করে এবং ভবিষ্যতে আর দ্বিতীয়বার তা না করতে দৃঢ়সংকল্প হয়।
আল-হিজর 15:43
অবশ্যই (তোমার অনুসারীদের) তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান হবে জাহান্নাম।’ [১]
[১] যত লোক তোমার অনুসরণ করবে তাদের সকলের স্থান হবে জাহান্নাম।
আল-হিজর 15:44
ওর সাতটি দরজা আছে; প্রত্যেক দরজার জন্য তাদের মধ্য থেকে পৃথক পৃথক দল আছে। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক দরজা এক এক ধরনের বিশেষ লোকেদের জন্য নিদিষ্ট হবে। যেমন একটি হবে মুশরিকদের জন্য, একটি হবে নাস্তিকদের জন্য, একটি হবে ধর্মদ্রোহীদের জন্য, একটি ব্যভিচারী, সুদখোর ও চোর-ডাকাত ইত্যাদিদের জন্য হবে আলাদা আলাদা। অথবা সাতটি দরজা বলতে জাহান্নামের সাতটি স্তরকে বুঝানো হয়েছে। প্রথমটির নাম জাহান্নাম, তারপর লাযা, তারপর হুত্বামাহ, তারপর সায়ীর, তারপর সাক্বার, তারপর জাহীম, তারপর হাবিয়াহ। সবার উপরের স্তরটি আল্লাহর একতত্ত্ববাদে বিশ্বাসীদের জন্য হবে। তাদেরকে (পাপ অনুপাতে) কিছুদিন শাস্তি দেওয়ার পর অথবা কারো সুপারিশের পর বের করে নেওয়া হবে। দ্বিতীয়টিতে ইয়াহুদী, তৃতীয়টিতে খ্রিষ্টান, চতুর্থটিতে সবী, পঞ্চমটিতে অগ্নিপূজক, ষষ্ঠটিতে মুশরিক এবং (সর্বনিম্ন স্তর) সপ্তমটিতে মুনাফিকরা থাকবে। সবচেয়ে উপরের স্তরটির নাম জাহান্নাম তার পর পর্যায়ক্রমে যেমন উল্লেখ হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর)
আল-হিজর 15:45
নিশ্চয় সাবধানীরা বাস করবে উদ্যান ও প্রস্রবণসমূহে। [১]
[১] জাহান্নাম ও জাহান্নামবাসীদের পর জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে, যাতে জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে মানুষ উৎসাহিত হয়। মুত্তাকীন (সাবধানী) বলতে শিরক হতে পবিত্র তওহীদবাদীদের বুঝানো হয়েছে। আবার কারো নিকট এমন মু'মিনদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা সকল পাপ হতে পবিত্র ছিল। جنة বলতে উদ্যান বা বাগান ও عيون বলতে ঝর্ণাকে বুঝানো হয়েছে। এই বাগান ও ঝর্ণায় সকল জান্নাতীর শরীকানাভুক্ত হবে। অথবা প্রত্যেকের জন্য পৃথক পৃথক একাধিক বাগান ও ঝর্ণা হবে, অথবা একটি করে বাগান ও একটি করে ঝর্ণা হবে।
আল-হিজর 15:46
(তাদেরকে বলা হবে,) ‘তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে তাতে প্রবেশ কর।’ [১]
[১] শান্তি সকল বিপদাপদ হতে এবং নিরাপত্তা সকল প্রকার ভয় হতে। অথবা এর অর্থ এক মুসলিম অপর মুসলিমকে বা ফিরিশতাগণ জান্নাতীদেরকে শান্তির দু'আ দেবে। অথবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির ঘোষণা দেওয়া হবে।
আল-হিজর 15:47
আমি তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা থাকবে তা দূর করে দেব;[১] তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে।
[১] পৃথিবীতে তাদের মধ্যে যে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা বা শত্রুতা ছিল, তা তাদের হৃদয় থেকে বের করে নেওয়া হবে। যার ফলে তাদের অন্তর হবে এক অপরের জন্য আয়নার মত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার।
আল-হিজর 15:48
সেথায় তাদেরকে অবসাদ স্পর্শ করবে না এবং তারা সেথা হতে বহিষ্কৃতও হবে না।
আল-হিজর 15:49
আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, ‘নিশ্চয় আমিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আল-হিজর 15:50
এবং আমার শাস্তিই হল অতি মর্মন্তুদ শাস্তি।’
আল-হিজর 15:51
আর তাদেরকে জানিয়ে দাও ইব্রাহীমের অতিথিদের কথা।
আল-হিজর 15:52
যখন তারা (ফিরিশতারা) তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘সালাম’, তখন সে বলেছিল, ‘আমরা তোমাদের আগমনে ভীত-সন্ত্রস্ত।’ [১]
[১] ইবরাহীম (আঃ) ফিরিশতাগণ থেকে এই জন্যই ভয় পেয়েছিলেন, যেহেতু তাঁরা তাঁর পেশকৃত বাছুরের ভুনা গোশত ভক্ষণ করেননি। যেমন সূরা হূদে (১১:৬৯-৭০ আয়াতে) বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। এর থেকে এ কথা পরিষ্কার যে আল্লাহর সম্মানিত রসূলগণও গায়বের খবর জানতেন না। যদি নবীগণ গায়েব জানতেন তাহলে ইবরাহীম (আঃ) বুঝতে পারতেন যে, আগত অতিথিগণ ফিরিশতা, যাঁদের জন্য খাবার প্রস্তুত করার প্রয়োজন নেই। কারণ ফিরিশতাগণ মানুষের মত পানাহারের মুখাপেক্ষী নন।
আল-হিজর 15:53
তারা বলল, ‘ভয় করো না। আমরা তোমাকে একজন জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি।’
আল-হিজর 15:54
সে বলল, ‘আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমরা কি আমাকে সুসংবাদ দিচ্ছ? তোমরা কিসের সুসংবাদ দিচ্ছ?’
আল-হিজর 15:55
তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে সত্য সংবাদ দিচ্ছি; সুতরাং তুমি আদৌ নিরাশ হয়ো না।’ [১]
[১] এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, যা অন্যথা হবার কথা নয়। তাছাড়া তিনি সকল কাজে ক্ষমতাবান। তাঁর জন্য কোন কাজই অসম্ভব নয়।
আল-হিজর 15:56
সে বলল, ‘পথভ্রষ্টরা ব্যতীত আর কে নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়?’ [১]
[১] অর্থাৎ, সন্তানের সুসংবাদে আমি আশ্চর্য হচ্ছি, বিমূঢ়তা প্রকাশ করছি তা একমাত্র আমার বৃদ্ধ হওয়ার কারণে। এমন নয় যে, আমি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ। আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া পথভ্রষ্ট লোকেদের কাজ।
আল-হিজর 15:57
সে বলল, ‘হে প্রেরিত (ফিরিশতা)গণ! তোমাদের ব্যাপার কি?’ [১]
[১] ইবরাহীম (আঃ) ফিরিশতাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলেন যে, তাঁরা শুধু সন্তানের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসেননি, বরং তাঁদের আগমনের আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য কিছু। সেই জন্য তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
আল-হিজর 15:58
তারা বলল, ‘আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছে।
আল-হিজর 15:59
তবে লূতের পরিবারবর্গের বিরুদ্ধে নয়, আমরা অবশ্যই তাদের সকলকে রক্ষা করব।
আল-হিজর 15:60
কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়; আমরা স্থির করেছি যে, সে অবশ্যই পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
আল-হিজর 15:61
অতঃপর ফিরিশতাগণ যখন লূত পরিবারের নিকট এল,
আল-হিজর 15:62
তখন লূত বলল, ‘তোমরা তো অপরিচিত লোক।’ [১]
[১] ঐ সকল ফিরিশতা সুদর্শন যুবকের বেশে এসেছিলেন এবং লূত (আঃ)-এর জন্য তাঁরা ছিলেন সম্পুর্ণ অপরিচিত। সেই জন্য তিনি তাঁদের সামনে পরিচয়হীনতার কথা প্রকাশ করলেন।
আল-হিজর 15:63
তারা বলল, ‘না, বরং তারা যে বিষয়ে সন্দিহান ছিল আমরা তোমার নিকট তাই নিয়ে এসেছি। [১]
[১] অর্থাৎ আল্লাহর আযাব। যার ব্যাপারে তোমার জাতির সন্দেহ হয় যে, তা কী আসতে পারে?
আল-হিজর 15:64
আমরা তোমার নিকট সত্য নিয়ে এসেছি এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী। [১]
[১] এখানেও الحق (সত্য) বলতে আযাবকেই বুঝানো হয়েছে; যার জন্য তাঁরা প্রেরিত হয়েছিলেন। সেই জন্য তাঁরা বললেন যে, আমরা সত্যবাদী। অর্থাৎ যে আযাবের কথা আমরা বলছি, তাতে আমরা সত্যবাদী। এখন এই জাতির ধ্বংসের সময়কাল অতি নিকটবর্তী।
আল-হিজর 15:65
সুতরাং তুমি রাত্রির কোন এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তুমি তাদের পশ্চাতে চল।[১] আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পিছনের দিকে না তাকায়। তোমাদেরকে যেথায় যেতে আদেশ করা হচ্ছে তোমরা সেথায় চলে যাও।’
[১] যাতে কোন মু'মিন পিছনে পড়ে না থাকে; থাকলে তুমি তাদেরকে সামনে চলতে বলবে।
আল-হিজর 15:66
আমি তাকে (লূতকে) এ বিষয়ে অবহিত করলাম যে, প্রত্যূষে তাদেরকে সমূলে বিনাশ করা হবে। [১]
[১] লূতকে অহী দ্বারা জানিয়ে দেওয়া হল যে, সকাল হওয়ার পূর্বেই তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করা হবে। অথবা دابر এর অর্থ হল, সর্বশেষ মানুষ, যে অবশিষ্ট থাকবে। অর্থাৎ, তাকেও সকাল পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
আল-হিজর 15:67
নগরবাসিগণ উল্লাসিত হয়ে উপস্থিত হল। [১]
[১] এক দিকে লূত (আঃ)-এর বাড়িতে জাতির ধ্বংসের ফায়সালা হচ্ছে, আর অন্য দিকে লূত-সম্প্রদায় জানতে পারে যে, লূতের বাড়িতে কিছু সুদর্শন যুবক অতিথি এসেছে। তারা সমকামিতার অভ্যাস দরুন খুব খুশি হলো এবং খুশি খুশি লূত (আঃ)-এর নিকট এসে দাবি করল যে, ঐসব যুবকদেরকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। যাতে তারা তাদের সাথে কুকর্ম করে নিজেদের যৌনক্ষুধা মিটাতে পারে!
আল-হিজর 15:68
সে বলল, ‘নিশ্চয় এরা আমার অতিথি; সুতরাং তোমরা আমাকে বেইজ্জত করো না। [১]
[১] লূত (আঃ) তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, এরা আমার অতিথি। কি করে তাদেরকে আমি তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারি? এ তো আমার জন্য অপমান ও লজ্জার বিষয়।
আল-হিজর 15:69
তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে লাঞ্ছিত করো না।’
আল-হিজর 15:70
তারা বলল, ‘আমরা কি দুনিয়ার লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করিনি?’ [১]
[১] তারা ধৃষ্টতা ও অসভ্য আচরণ প্রকাশ করে বলল যে, হে লূত! এই সকল অপরিচিত যুবকদের সাথে তোমার কি সম্পর্ক? তুমি কেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করছ? আমরা কি তোমাকে অপরিচিতদের পক্ষ অবলম্বন করতে নিষেধ করিনি? অথবা তাদেরকে অতিথি হিসাবে বাড়িতে আশ্রয় দিতে নিষেধ করিনি? এই কথা যখন হচ্ছিল তখনও লূত (আঃ) জানতেন না যে, অভ্যাগত অতিথিগণ আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতা, যাঁরা এই অধম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য উপস্থিত হয়েছেন, যে জাতি ওই সকল ফিরিশতাদের সাথে কুকর্ম করার জন্য অনড় ছিলো। যেমন সূরা হূদে (১১:৭৯ আয়াতে) বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এখানে তাঁদের ফিরিশতা হওয়ার কথাটা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-হিজর 15:71
লূত বলল, ‘একান্তই যদি তোমরা কিছু করতে চাও, তবে আমার এই কন্যাগণ রয়েছে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমরা এদেরকে বিবাহ করে নাও। তিনি নিজ জাতির মহিলাদেরকে নিজের কন্যা বললেন। উদ্দেশ্য, তোমরা মেয়েদেরকে বিবাহ কর অথবা যাদের স্ত্রী আছে তারা তাদের নিকট নিজ নিজ যৌনকামনা পূর্ণ কর।
আল-হিজর 15:72
(হে নবী!) তোমার আয়ুর শপথ! অবশ্যই ওরা নিজেদের মত্ততায় বিমূঢ় ছিল। [১]
[১] মহান আল্লাহ নবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে নবীর জীবনের শপথ করছেন; যাতে তাঁর সম্মান ও ফযীলত সুস্পষ্ট। তবে অন্য কারো জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কারো শপথ করা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ হচ্ছেন একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি যার ইচ্ছা শপথ করতে পারেন, তাকে বাধা দেওয়ার কে আছে? মহান আল্লাহ বলেন, যেরূপ নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি নেশা করার ফলে জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় এবং ভালোমন্দ কিছু বুঝে আসে না, অনুরূপ এরাও কুকর্মের নেশার ঘোরে ও ভ্রষ্টতায় এমনভাবে বিভোল ছিল যে, লূত (আঃ)-এর এমন যুক্তিগ্রাহ্য ও নৈতিকতাপূর্ণ কথা তাদের বুঝে এলো না।
আল-হিজর 15:73
অতঃপর সূর্যোদয়ের সময়ে বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল। [১]
[১] সূর্য উদয়ের সময় এক বিকট আওয়াজ এসে তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলল। কেউ কেউ বলেন, এই বিকট শব্দ ছিল জিবরীল (আঃ)-এর।
আল-হিজর 15:74
সুতরাং আমি (তাদের) জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নীচ করে দিলাম[১] এবং তাদের উপর ঝামা পাথর নিক্ষেপ করলাম।[২]
[১] কথিত আছে যে, তাদের জনপদকে শূন্যে তোলা হয়, তারপর সেখান থেকে উল্টিয়ে পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া হয়। এভাবে উপরকে নীচে আর নীচেকে উপর করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এও বলা হয় যে, তাদের ঘরের ছাদ সহ তাদেরকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
[২] তারপর তাদের উপর এক বিশেষ ধরনের পাথর বর্ষণ করা হয়। এভাবে তাদেরকে তিন প্রকার আযাব দিয়ে পৃথিবীর মানুষের জন্য এক নিদর্শন বানিয়ে দেওয়া হয়।
আল-হিজর 15:75
অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে সূক্ষ্ণদর্শী চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য। [১]
[১] গভীরভাবে সমীক্ষা ও চিন্তা-ভাবনাকারীদের متوسمون বলা হয়। এদের জন্য এই ঘটনায় শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
আল-হিজর 15:76
নিশ্চয় তা (ঐ জনপদের ধ্বংসস্তূপ) চালু পথের পাশে বিদ্যমান। [১]
[১] অর্থাৎ, চলাচলের সাধারণ রাস্তার ধারে। লূত-সম্প্রদায়ের জনপদ মদীনা হতে সিরিয়া যাওয়ার পথে পড়ে। প্রত্যেক যাতায়াতকারীকে তাদের জনপদের উপর দিয়েই পার হতে হয়। বলা হয় যে, তাদের মোট পাঁচটি জনবসতি ছিল। সাদুম, এটিই ছিল সবের কেন্দ্রস্থল, স্বাবাহ, সা'ওয়াহ, আসরাহ ও দূমা। বলা হয় যে, জিব্রীল (আঃ) নিজ বাহুতে ঐ সকল জনপদকে নিয়ে আকাশে চড়েন, এমনকি আসমানবাসিগণ তাদের কুকুর ও মোরগের আওয়াজ শুনতে পান। তারপর সেই জনপদকে (উষ্ট্রী দিয়ে) পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়। (ইবনে কাসীর) তবে এ কথার কোন সূত্র নেই।
আল-হিজর 15:77
অবশ্যই এতে বিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।
আল-হিজর 15:78
আর আয়কাবাসীরাও তো ছিল সীমালংঘনকারী। [১]
[১] أيكة ঘন গাছপালাকে বলা হয়। এ জনপদে ঘন গাছপালা ছিল বলে তার বাসিন্দাদেরকে আয়কাবাসী বলা হয়েছে। এ থেকে শুআইব (আঃ)-এর জাতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁর নবুঅতের সময়কাল লূত (আঃ)-এর পর এবং তাঁর এলাকা ছিল হিজায ও সিরিয়ার মাঝে লূত-সম্প্রদায়ের জনপদের সন্নিকটে; যাকে মাদয়্যান বলা হয়। এটি ছিল ইবরাহীমের পুত্রের বা পৌত্রের নাম, যাঁর নামে সেই এলাকার নামকরণ হয়। তাদের পাপ ছিল, তারা আল্লাহর সাথে শিরক করত, রাহাজানি তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আর ওজনে কম দেওয়া ছিল তাদের মজ্জাগত ব্যাপার। মেঘের ছায়ারূপে তাদের উপর আযাব এলো। তারপর এক বিকট শব্দ ও ভূমিকম্প এসে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিল।
আল-হিজর 15:79
সুতরাং আমি তাদের নিকট থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি; ওদের উভয়ই তো প্রকাশ্য পথপাশে অবস্থিত।[১]
[১] إمام مبين (প্রকাশ্য পথ)এর অর্থও আম রাস্তা, যে রাস্তা দিয়ে লোক দিনরাত্রি যাওয়া-আসা করে। উভয় শহর বলতে লূত সম্প্রদায়ের শহর ও শুআইব জাতির বসতি মাদয়্যানকে বুঝানো হয়েছে। এই দুই শহর ছিল একে অপরের সন্নিকটে।
আল-হিজর 15:80
হিজরবাসিগণও রসূলদেরকে মিথ্যা মনে করেছিল। [১]
[১] হিজর সালেহ (আঃ)-এর জাতি সামূদের জনবসতির নাম। এদেরকে أصحاب الحجر বলা হয়েছে। এ জনবসতি মদীনা ও তাবুকের মাঝে অবস্থিত ছিল। সেখানকার অধিবাসীরা তাদের নবী সালেহ (আঃ)-কে মিথ্যা মনে করেছিল। কিন্তু এখানে মহান আল্লাহ (বহুবচন শব্দ ব্যবহার করে) বলেছেন, তারা রসূলদেরকে মিথ্যা মনে করেছিল। কারণ একজন নবীকে মিথ্যা মনে করার অর্থ হল, সকল নবীদেরকে মিথ্যা মনে করা।
আল-হিজর 15:81
আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করেছিল। [১]
[১] তাদের নির্দশনের মধ্যে ছিল সেই উটনী, যা তাদের দাবী অনুসারে এক পাথর হতে মু'জিযা স্বরূপ বের করা হয়েছিল। কিন্তু যালিমরা সেটিকেও হত্যা করে ফেলে।
আল-হিজর 15:82
তারা নিশ্চিন্তে পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করত। [১]
[১] অর্থাৎ, বিনা প্রয়োজনে ও নির্ভয়ে তারা পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ করত। নবম হিজরীতে তাবুক যাওয়ার পথে যখন নবী (সাঃ) তাদের সেই জনপদের উপর দিয়ে পার হলেন, তখন তিনি মাথায় কাপড় জড়িয়ে নিলেন, নিজের সওয়ারীর গতি বাড়িয়ে দিলেন এবং সাহাবাগণকে বললেন, তোমরা কান্নারত অবস্থায় ও আল্লাহর আযাবকে স্মরণ করে এই এলাকা অতিক্রম কর।
(ইবনে কাসীর, বুখারী ৪৩৩, মুসলিম ২২৮৫নং)
আল-হিজর 15:83
অতঃপর প্রভাতকালে বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল। [১]
[১] সালেহ (আঃ) বললেন যে, তোমাদের উপর তিনদিন পর আল্লাহর আযাব আসবে। সুতরাং চতুর্থ দিনে তাদের উপর এই আযাব এসে পড়ল।
আল-হিজর 15:84
সুতরাং তারা যা অর্জন করত তা তাদের কোন কাজে আসেনি।
আল-হিজর 15:85
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এই দুয়ের অন্তর্বর্তী কোন কিছুই আমি অযথা সৃষ্টি করিনি।[১] আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী; সুতরাং তুমি পরম সৌজন্যের সাথে তাদেরকে ক্ষমা কর।
[১] এখানে হক (অযথা নয়) বলতে উপকার ও কল্যাণ, যার উদ্দেশে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি। অথবা হক বলতে সৎকর্মশীলদের সৎকর্মের প্রতিদান ও অসৎকর্মশীলদের পাপের বদলা দেওয়া। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, "আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই। যাতে তিনি যারা মন্দ কর্ম করে তাদেরকে দেন মন্দ ফল এবং যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে দেন উত্তম পুরস্কার।" (সূরা নাজম ৫৩:৩১)
আল-হিজর 15:86
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই মহাস্রষ্টা, মহাজ্ঞানী।
আল-হিজর 15:87
অবশ্যই আমি তোমাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত[১] এবং মহা কুরআন।
[১] سبع مثاني (পুনঃপুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত) থেকে উদ্দেশ্য কি? এ সর্ম্পকে মুফাসসিরীনদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য সূরা ফাতেহা এটাই সঠিক। যেহেতু এটি সাত আয়াতবিশিষ্ট এবং তা প্রত্যেক নামাযে বার বার পাঠ করা হয়। (মাসানীর অর্থ একাধিকবার পড়া।) হাদীসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। সুতরাং একটি হাদীসে নবী (সাঃ) বলেন, "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ-লামীন। এটি সাবএ মাসানী ও কুরআন আযীম, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরা হিজ্র) অন্য এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, "উম্মুল কুরআনই হল সাবএ মাসানী ও কুরআনে আযীম।" (ঐ) সূরা ফাতেহা কুরআনের একটি অংশ, সেই জন্য সাথে সাথে কুরআন আযীমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-হিজর 15:88
আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি তার প্রতি তুমি কখনো তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না এবং তাদের জন্য তুমি ক্ষোভ করো না। আর বিশ্বাসীদের জন্য তুমি তোমার বাহুকে অবনমিত রাখ।[১]
[১] অর্থাৎ, আমি তোমাকে মহা কুরআন সূরা ফাতিহার মত নিয়ামত দান করেছি, সেই কারণে পৃথিবী ও তার ভোগ-বিলাসের শোভা-সৌন্দর্য এবং বিভিন্ন শ্রেণীর দুনিয়াদারদের প্রতি তুমি দৃকপাত করবে না, আমি তাদেরকে যা কিছু দিয়েছি তা শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের বিলাস-উপকরণ। আর যারা তোমাকে মিথ্যা ভাবছে তাদের ব্যাপারে দুঃখ করো না। মু'মিনদের জন্য তোমার বাহুকে অবনমিত রাখো। অর্থাৎ তাদের জন্য নমনীয়তা ও ভালবাসা প্রকাশ করো। (বাহু অবনমিত রাখা) এই পরিভাষার মূল হল, পাখি যখন তার বাচ্চাদেরকে স্নেহ-ছায়ায় স্থান দিতে চায়, তখন সে তাদেরকে ডানা দিয়ে ঢেকে নেয়। সেই জন্য এই পরিভাষা স্নেহ-ভালবাসা ও মায়া-মমতা প্রকাশের অর্থে প্রয়োগ হয়ে থাকে।
আল-হিজর 15:89
আর তুমি বল, ‘আমি তো প্রকাশ্য সতর্ককারী।’
আল-হিজর 15:90
যেভাবে আমি অবতীর্ণ করেছি বিভক্তকারীদের উপর। [১]
[১] কিছু ব্যখ্যাকারীদের নিকট أنزلنا ক্রিয়ার কর্মকারক العذابَ ঊহ্য আছে। যার অর্থ হল, আমি তোমাদেরকে সেইরূপ আযাব হতে প্রকাশ্য সতর্ককারী; যেরূপ আযাব মহান আল্লাহ বিভক্তকারীদের উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এই বিভক্তকারী কারা? যারা কুরআনকে বিভক্ত করে নিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, তারা কুরায়েশ, যারা আল্লাহর কিতাবকে বিভক্ত করেছিল। তার কিছু অংশকে বলত যাদু, কিছু অংশকে বলত গণকের কথা, আবার কিছু অংশকে বলত উপকথা। পক্ষান্তরে কিছু মুফাসসিরীন বলেন, বিভক্তকারী বলতে আহলে কিতাব এবং কুরআন বলতে তাওরাত ও ইঞ্জীলকে বুঝানো হয়েছে। তারা ঐ সকল কিতাবকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করে রেখেছিল। আবার কেউ বলেন, এর অর্থ আপোসে শপথ বা প্রতিজ্ঞা গ্রহণকারী; এখানে সালেহ (আঃ)-এর জাতিকে বুঝানো হয়েছে, যারা আপোসে শপথ করেছিল যে, সালেহ ও তার পরিবারের সকলকে রাত্রির অন্ধকারে হত্যা করে ফেলবে। {قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ} আর তারা আসমানী কিতাবকে টুকরো টুকরোও করেছিল। (সূরা নামল ২৭:৪৯) عضين এর একটি অর্থ কিছু গ্রহণ করা ও কিছু বর্জন করা। কিতাবের কিছু অংশকে বিশক্ষাস ও কিছুকে অস্বীকার করা।
আল-হিজর 15:91
যারা কুরআনকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করেছে।
আল-হিজর 15:92
সুতরাং তোমার প্রতিপালকের শপথ! আমি তাদের সকলকে প্রশ্ন করবই।
আল-হিজর 15:93
সেই বিষয়ে যা তারা করত।
আল-হিজর 15:94
অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার কর[১] এবং অংশীবাদীদেরকে উপেক্ষা কর।
[১] اصدع এর অর্থ প্রকাশ্যে প্রচার কর, এর পূর্বে তিনি গোপনভাবে তাবলীগ করতেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হবার পর প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করেন।
আল-হিজর 15:95
বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট।
আল-হিজর 15:96
যারা আল্লাহর সাথে অপর উপাস্য প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।
আল-হিজর 15:97
আমি তো অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়।
আল-হিজর 15:98
সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।
আল-হিজর 15:99
আর তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর। [১]
[১] মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে যাদুকর, পাগল, গণক ইত্যাদি বলত। আর মানুষ হওয়ার কারণে তিনি এ সব কথায় দুঃখ পেতেন। মহান আল্লাহ সান্তনা দিয়ে বললেন, তুমি প্রশংসা কর, নামায পড় এবং নিজ আল্লাহর এবাদত কর। যাতে তোমার অন্তর শান্তি লাভ করবে এবং আল্লাহর সাহায্য আসবে। সিজদাকারী বলতে নামাযী ও ইয়াকীন বলতে মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে।
আন-নাহল 16:1
আল্লাহর আদেশ আসবেই;[১] সুতরাং তোমরা তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। তিনি মহিমার্নিত এবং ওরা যাকে অংশী করে তিনি তার উর্ধে।
[১] আদেশ বলতে কিয়ামতকে বুঝানো হয়েছে, অর্থ কিয়ামত নিকটবর্তী যাকে তোমরা দূর মনে কর। অতএব তোমরা এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করো না। অথবা সেই আযাবকে বুঝানো হয়েছে যা মুশরিকরা চাইত। এ কথাটি ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়ার পরিবর্তে অতীতকালের ক্রিয়া দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে, যেহেতু তার আগমনে কোন সন্দেহ নেই।
আন-নাহল 16:2
তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা[১] স্বীয় নির্দেশে অহী (প্রত্যাদেশ)[২] সহ ফিরিশতা অবতীর্ণ করেন, এই মর্মে সতর্ক করবার জন্য যে, আমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমাকে ভয় কর।
[১] অর্থাৎ, নবী রসূলগণ, যাঁদের উপর অহী অবতীর্ণ হত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,{اللهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ} নবুঅতের দায়িত্ব কাকে দেবেন তা আল্লাহ ভালভাবেই জানেন। (সূরা আনআম ৬:১২৪){يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ لِيُنذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ} তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী করেন স্বীয় আদেশসহ, যাতে সে সতর্ক করতে পারে কিয়ামত দিন সর্ম্পকে। (সূরা মু'মিন ৪০:১৫)[২] এখানে الروح বলতে অহী (প্রত্যাদেশ)। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,{وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ} অর্থাৎ, এভাবে আমি নিজ নির্দেশে তোমার প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) করেছি রূহ। তুমি তো জানতে না গ্রন্থ কি, ঈমান (বিশ্বাস) কি। (সূরা শূরা ৪২:৫২)
আন-নাহল 16:3
তিনি যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন;[১] তারা যাকে অংশী করে, তিনি তার ঊর্ধ্বে।
[১] অর্থাৎ, শুধু অযথা খেল-তামাশার জন্য সৃষ্টি করিনি, বরং এক লক্ষ্যকে সামনে রেখে করা হয়েছে, আর তা হল পুণ্যের প্রতিদান ও পাপের শাস্তিদান; যেমন পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা হল।
আন-নাহল 16:4
তিনি মানুষকে বীর্য হতে সৃষ্টি করেছেন; পরে সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী হয়ে বসল! [১]
[১] অর্থাৎ, এক জড়পদার্থ হতে যা জীবন্ত দেহ থেকে নির্গত হয়, যাকে বীর্য বলা হয়। তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে পার করার পর এক পূর্ণ আকার দান করা হয়। তারপর তাতে (রূহ, বিশেষ) জীবন দান করা হয়। এরপর মায়ের পেট হতে পৃথিবীতে আনা হয়। পৃথিবীতে সে জীবন যাপন করতে করতে যখন জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়, তখন সে তার প্রতিপালক আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করে, তাঁকে অস্বীকার করে বা তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।
আন-নাহল 16:5
তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের জন্য ওতে শীত নিবারক উপকরণ ও বহু উপকার রয়েছে;[১] আর তা হতে তোমরা আহার্য পেয়ে থাক।
[১] মহান আল্লাহ উক্ত অনুগ্রহের সাথে অন্য এক অনুগ্রহের কথা ব্যক্ত করছেন যে, চতুষ্পদ জন্তু (উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি) তিনিই সৃষ্টি করেছেন, যার লোম ও পশম হতে তোমরা গরম কাপড় তৈরী করে নিজেদেরকে শীত থেকে রক্ষা কর। অনুরূপ তাদের মাধ্যমে অন্যান্য উপকারও লাভ করে থাক, যেমন তাদের দুধ পান করা, তাদেরকে বাহনরূপে ব্যবহার করা, তাদের মাধ্যমে মালপত্র বহন করা, চাষ করা ইত্যাদি।
আন-নাহল 16:6
আর যখন তোমরা সন্ধ্যায় ওদেরকে চারণভূমি হতে গৃহে নিয়ে আস এবং প্রভাতে যখন ওদেরকে চারণ ভূমিতে নিয়ে যাও, তখন তোমরা ওর সৌন্দর্য উপভোগ কর। [১]
[১] تريحون যখন সন্ধ্যায় চারণভূমি থেকে বাড়িতে নিয়ে এসো, تسرحون যখন সকালে চারণ ভূমিতে নিয়ে যাও। এই দুই সময় তারা মানুষের চোখে পড়ে, যাতে তোমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। উক্ত দুই সময় ছাড়া তারা দৃষ্টির আড়ালে থাকে বা আস্তাবলে বদ্ধ থাকে।
আন-নাহল 16:7
আর ওরা তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে; যেথায় প্রাণান্তকর কষ্ট ব্যতীত তোমরা পৌঁছতে পারতে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই চরম স্নেহশীল, পরম দয়ালু।
আন-নাহল 16:8
তোমাদের আরোহণের জন্য ও শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা।[১] আর তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু যা তোমরা অবগত নও। [২]
[১] অর্থাৎ, তাদের সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য ও উপকারিতা তাদেরকে বাহনরূপে ব্যবহার করা। তা সত্ত্বেও সেসব সৌন্দর্যের কারণও বটে। ঘোড়া, খচ্চর ও গাধাকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার কারণে কোন কোন ফকীহ প্রমাণ করেছেন যে, ঘোড়াও হারাম যেমন গাধা ও খচ্চর হারাম। তাছাড়া খাদ্যরূপে ব্যবহার্য পশুর উল্লেখ প্রথমেই এসে গেছে। সেই কারণে এই আয়াতে যে সব পশুর উল্লেখ রয়েছে তা শুধু বাহনের জন্য। কিন্তু তাঁদের এই দলীল সঠিক নয়, কারণ সহীহ হাদীসে ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়ার কথা প্রমাণিত। জাবের (রাঃ) বলেন নবী (সাঃ) ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। (বুখারীঃ যবেহ অধ্যায়, মুসলিম শিকার অধ্যায়) তাছাড়া সাহাবায়ে কিরামগণ নবী (সাঃ) এর উপস্থিতিতে খাইবার ও মদীনায় ঘোড়া যবেহ করে গোশত রান্না করেছেন ও খেয়েছেন। আর নবী (সাঃ) নিষেধ করেননি। (দেখুন মুসলিম উক্ত অধ্যায়, আহমাদ ৩/৩৫৬, আবু দাউদঃ খাদ্য অধ্যায়) এই কারণে অধিকাংশ উলামা ঘোড়ার গোশত হালাল বলেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর) এখানে ঘোড়ার উল্লেখ শুধু বাহনরূপে করা হয়েছে। কারণ তার অধিক ব্যবহার এই উদ্দেশেই হয়ে থাকে এবং তা পৃথিবীতে সর্বযুগে এত বেশি মূল্যবান ও দামী থেকেছে যে তাকে খাবারের জন্য খুব কম ব্যবহার করা হয়েছে। ছাগল-ভেড়ার মত তা সাধারণতঃ যবেহ করে ভক্ষণ করা হয় না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিনা স্পষ্ট প্রমাণে তাকে হারাম সাব্যস্ত করা যেতে পারে।
[২] ভূগর্ভে, সমুদ্রে, মরুভূমিতে এবং জঙ্গলে মহান আল্লাহ অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী সৃষ্টি করে থাকেন, যার জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। এর সঙ্গে নব আবিষ্কৃত সকল বাহনও এসে যায়, যা আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও যোগ্যতা প্রয়োগ করে তাঁরই সৃষ্ট বস্তুকে বিভিন্নভাবে কাজে লাগিয়ে মানুষ তৈরী করেছে। যেমন বাস, ট্টেন, রেলগাড়ি, জলজাহাজ ও বিমান ইত্যাদি অসংখ্য যানবাহন এবং আরো অনেক কিছু, যা ভবিষ্যতে আশা করা যায়।
আন-নাহল 16:9
সরল পথের নির্দেশ করা আল্লাহর দায়িত্ব।[১] আর পথগুলির মধ্যে বক্রপথও আছে; তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন। [২]
[১] অর্থাৎ, সরল পথ প্রদর্শন করা আল্লাহর দায়িত্ব এবং তিনি তা করেছেন। সুতরাং তিনি হিদায়াত ও ভ্রষ্টতা দু'টিকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেই কারণে পরে বলছেন যে, কিছু পথ হল বক্র, অর্থাৎ বাঁকা ও ভ্রষ্ট।
[২] কিন্তু যেহেতু তাতে মানুষকে বাধ্য করে দেওয়া হত, পরীক্ষা নেওয়ার কোন অর্থ থাকত না, সেই কারণে আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় সকলকে বাধ্য করেননি, বরং দুই রাস্তার জ্ঞানদান করে মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন।
আন-নাহল 16:10
তিনিই আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, ওতে তোমাদের জন্য রয়েছে পানীয় এবং তা হতে (জন্মায়) উদ্ভিদ; যাতে তোমরা পশুচারণ করে থাক।
আন-নাহল 16:11
ওর দ্বারা তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন শস্য, যায়তুন, খর্জুর বৃক্ষ, আঙ্গুর এবং সর্বপ্রকার ফল; অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।[১]
[১] এতে বৃষ্টির উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে, যা প্রত্যেক মানুষের নিকট বিদিত ও পরীক্ষিত, যা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া এর উল্লেখ পূর্বেও হয়েছে।
আন-নাহল 16:12
তিনিই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে; আর নক্ষত্ররাজিও অধীন রয়েছে তাঁরই বিধানের; অবশ্যই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।[১]
[১] কিভাবে দিনরাত্রি ছোট বড় হয়, চন্দ্র-সূর্য কিভাবে নিজ নিজ কক্ষপথে আসা-যাওয়া করে, অথচ এর মধ্যে কোন পার্থক্য সূচিত হয় না, নক্ষত্রমালা কিভাবে আকাশের সৌন্দর্য বর্ধন করে এবং রাত্রের অন্ধকারে পথভোলা পথিকের পথ বলে দেয়। এ সকল আল্লাহর পরিপূর্ণ শক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রমাণ বহন করে।
আন-নাহল 16:13
আর যে নানা রঙের বস্তু তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন (তাও তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন); এতে সেই সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা উপদেশ গ্রহণ করে।[১]
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে যে সব খনিজ সম্পদ, গাছপালা, জড়পদার্থ ও জীবজন্তু এবং এদের মধ্যে যে সব উপকারিতা সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য রয়েছে নির্দশন।
আন-নাহল 16:14
তিনিই সমুদ্রকে অধীন করেছেন; যাতে তোমরা তা হতে তাজা গোশত (মাছ) আহার করতে পার এবং যাতে তা হতে বের করতে পার নিজেদের পরিধেয় অলংকার। এবং তোমরা দেখতে পাও, ওর বুক চিরে নৌযান চলাচল করে। আর যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।[১]
[১] এখানে সমুদ্রের পাহাড় সমান ঢেউকে মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে এ কথা বলার পর সমুদ্রের তিনটি উপকারিতার কথাও উল্লেখ করেছেন। একঃ তোমরা তাজা মাছ তা থেকে সংগ্রহ করে থাক। (মাছ মারা গেলেও তা হালাল, তাছাড়া এহরাম অবস্থায় তা শিকার করা বৈধ।) দুইঃ তার থেকে মণিমুক্তা ও মূল্যবান পাথর বের কর; যার দ্বারা তোমরা অলংকার তৈরী কর। তিনঃ তোমরা সমুদ্রের বুকে নৌকা ও জলজাহাজ চালিয়ে থাক, যার দ্বারা তোমরা এক দেশ হতে অন্য দেশে যাতায়াত কর, বাণিজ্যিক মালপত্র আমদানি-রপ্তানি কর, যার ফলে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে থাক। আর এর জন্য তোমাদের উচিত, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করা।
আন-নাহল 16:15
আর তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়[১] এবং স্থাপন করেছেন নদ-নদী ও পথ, যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পার। [২]
[১] এখানে পাহাড়ের উপকারিতা এবং আল্লাহর এক বিশাল অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। কেননা পৃথিবী নড়তে থাকলে বসবাস করা সম্ভব ছিল না। এর অনুমান ভূমিকম্প দিয়ে করা যেতে পারে, যা কয়েক সেকেন্ড্ ও ক্ষণিকের মধ্যে বিশাল বিশাল মজবুত ঘর-বাড়িকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, শহর ও গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
[২] নদ-নদীর সৃষ্টিও বড় আশ্চর্য, কোথায় শুরু হয়ে, কোথায় কোথায়, ডানে বামে, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সব দিককেই সিঞ্চিত করে। অনুরূপ তিনি রাস্তাও বানিয়েছেন, যার দ্বারা তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পার।
আন-নাহল 16:16
আর (স্থাপন করেছেন) পথ নির্ণায়ক চিহ্নসমূহও; এবং ওরা নক্ষত্রের সাহায্যেও পথের নির্দেশ পায়।
আন-নাহল 16:17
সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তারই মত, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? [১]
[১] এই সকল অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে তওহীদের গুরুতত্ত্বকে উজ্জ্বল করা হয়েছে যে, আল্লাহই এই সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু তাকে ছেড়ে যাদের তোমরা ইবাদত করছ, তারা কি কিছু সৃষ্টি করেছে? অবশ্যই না, বরং তারাই আল্লাহর সৃষ্টি। অতএব স্রষ্টা ও সৃষ্টি কিভাবে এক সমান হতে পারে? অথচ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সমতুল্য করে রেখেছ, তোমরা কি একটুও চিন্তা কর না?
আন-নাহল 16:18
তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু।
আন-নাহল 16:19
তোমরা যা গোপন রাখো এবং যা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন।[১]
[১] আর সেই হিসাবে তিনি কিয়ামত দিবসে পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন। সৎশীলকে সৎকর্মের পুরস্কার এবং অসৎশীলকে তার অসৎকর্মের শাস্তি।
আন-নাহল 16:20
যারা আল্লাহ ছাড়া অপরকে আহবান করে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়।[১]
[১] অন্যন্য আয়াতের তুলনায় এই আয়াতে গায়রুল্লাহর একটি অতিরিক্ত গুণের কথা বলা হয়েছে; তারা সৃষ্টিকর্তা নয় -- এ কথা খন্ডন করার সাথে সাথে তারা নিজেরাই যে সৃষ্ট, সে কথা সাব্যস্ত করা হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর)
আন-নাহল 16:21
তারা নিষ্প্রাণ, নির্জীব[১] এবং পুনরুত্থান কবে হবে, সে বিষয়ে তাদের কোন চেতনা (বোধ) নেই।[২]
[১] মৃত বলতে প্রাণহীন ও চেতনাহীন জড় (পাথর)ও বটে এবং মৃত সৎলোকও বটে। কারণ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের কথা বলা (যে ব্যাপারে তাদের কোন বোধ নেই) জড় ব্যতীত সৎলোকেদের জন্যই বেশী সঙ্গত বলে মনে হয়। তাদেরকে শুধু মৃতই বলা হয়নি; বরং জীবিত নয় বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যাতে কবর পূজার স্পষ্ট খন্ডন হচ্ছে। যারা বলে কবরে দাফন হওয়া ব্যক্তি মৃত নয়, জীবিত। আর আমরা জীবিতদেরকেই ডাকি। আল্লাহর এই কথার পর জানা গেল মৃত্যু এসে যাওয়ার পর পার্থিব জীবন কেউ পেতে পারে না, আর না পৃথিবীর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকে।
[২] তাহলে তাদের থেকে উপকার বা মঙ্গল কামনা কেমন করে করা যেতে পারে?
আন-নাহল 16:22
তোমাদের উপাস্য একক উপাস্য; সুতরাং যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য বিমুখ এবং তারা অহংকারী। [১]
[১] অর্থাৎ, এক আল্লাহকে মেনে নেওয়া অস্বীকারকারী মুশরিকদের জন্য বড়ই কঠিন। তারা বলে, {أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ} অর্থাৎ, সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে একটিমাত্র উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? এতো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। (সূরা স্বা-দ ৩৮:৫) অন্যত্র আরো বলেন, {وَإِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَحْدَهُ اشْمَأَزَّتْ قُلُوبُ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ وَإِذَا ذُكِرَ الَّذِينَ مِن دُونِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ} অর্থাৎ, এক আল্লাহর কথা বলা হলে যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে তাদের দেবতাদের কথা উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়। (সুরা যুমার ৩৯:৪৫)
আন-নাহল 16:23
এটা নিঃসন্দেহ যে, আল্লাহ জানেন যা তারা গোপন করে এবং যা তারা প্রকাশ করে; তিনি অহংকারীকে অবশ্যই পছন্দ করেন না। [১]
[১] استكبار এর (অহংকার বা বড়াই) এর অর্থ হল নিজেকে বড় মনে করে সত্য ও হককে অস্বীকার করা এবং অন্যকে ছোট ও তুচ্ছ মনে করা। হাদীসে অহংকারের এই সংজ্ঞাই বর্ণিত হয়েছে। (মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) অহংকার ও গর্ব আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ঘৃণিত। হাদীসে আছে যে, "যে ব্যক্তির অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সুরা যুমার ৪৫)
আন-নাহল 16:24
যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমাদের প্রতিপালক কি অবতীর্ণ করেছেন?’ উত্তরে তারা বলে, ‘পূর্ববর্তীদের উপকথা।’[১]
[১] বৈমুখ্য ও বিদ্রূপ প্রকাশ করে মিথ্যায়নকারীরা উত্তরে বলত, আল্লাহ তাআলা কিছুই অবতীর্ণ করেননি। আর মুহাম্মাদ যা কিছু পাঠ করে তা হল পূর্ববর্তীদের উপকথা; যা অপরের নিকট থেকে শুনে বর্ণনা করে।
আন-নাহল 16:25
ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট। [১]
[১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাদের মুখ দিয়ে এ কথা বের করালেন, যাতে তারা নিজেদের পাপভারের সাথে অপরের পাপভারও বহন করে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, যে মানুষকে সৎপথ দেখায়, সে ঐ সকল লোকেদের নেকী পেতে থাকে, যারা তার কথামত সৎপথ অবলম্বন করে। আর যে অসৎ পথ দেখায়, সে ঐ সকল লোকেদের পাপভার বহন করে, যারা তার কথা অনুযায়ী অসৎ পথ অবলম্বন করে। (আবূ দাঊদঃ সুন্নাহ অধ্যায়)
আন-নাহল 16:26
নিশ্চয় তাদের পূর্ববর্তীগণ চক্রান্ত করেছিল; আল্লাহ তাদের ইমারতের ভিত্তিমূলে আঘাত করলেন; ফলে ইমারতের ছাদ তাদের উপর ধসে পড়ল[১] এবং এমন দিক হতে তাদের উপর শাস্তি এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে। [২]
[১] কিছু মুফাসসির ইসরাঈলী বর্ণনার উপর ভিত্তি করে বলেন, এখানে উদ্দেশ্য নমরূদ বা বুখতে নাসর। সে কোনভাবে আকাশে চড়ে আল্লাহর বিরূদ্ধে চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু তাতে সে অসফল হয়ে ফিরে আসে। কারো কারো মতে এটি একটি উপমা মাত্র। যার উদ্দেশ্য এ কথা বলা যে, আল্লাহর সাথে কুফরী ও শিরককারীদের আমল ঐভাবেই ধ্বংস হবে, যেভাবে কোন ব্যক্তির ঘরের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং ছাদসহ ধসে ভূমিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু সঠিক কথা হল ঐ সকল জাতির পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করা, যারা নবীদেরকে মিথ্যার পর মিথ্যা মনে করে। আর শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আযাবে তারা তাদের ঘর সহ ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন আদ জাতি, লূত-সম্প্রদায় প্রভৃতি।
[২] যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন,{فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا} "সুতরাং আল্লাহর শাস্তি তাদের উপর এমন এক জায়গা হতে এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে।" (সূরা হাশর ৫৯:২ আয়াত)
আন-নাহল 16:27
পরে কিয়ামতের দিনে তিনি তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন এবং বলবেন, ‘কোথায় আমার সে সব অংশী যাদের সম্বন্ধে তোমরা বিতন্ডা করতে?’[১] যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল[২] তারা বলবে, ‘নিশ্চয় আজ লাঞ্ছনা ও অমঙ্গল অবিশ্বাসীদের জন্য।’
[১] এ ছিল পৃথিবীর আযাব। আর কিয়ামতে মহান আল্লাহ এমনভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবেন যে, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, যাদেরকে আমার সাথে শরীক করতে এবং যাদের জন্য তোমরা মু'মিনদের সঙ্গে ঝগড়া করতে, তারা আজ কোথায়?
[২] অর্থাৎ, যাদের দ্বীনী জ্ঞান ছিল, যারা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তারা উত্তর দেবে।
আন-নাহল 16:28
নিজেদের প্রতি যুলুম করতে থাকা অবস্থায় ফিরিশতাগণ যাদের প্রাণ হরণ করে, তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন মন্দ কর্ম করতাম না।’[১] অবশ্যই! তোমরা যা করতে সে বিষয়ে নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [২]
[১] এখানে মুশরিক যালিমদের মৃত্যুর সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। যখন ফিরিশতা তাদের রূহ ছিনিয়ে নেন, তখন তারা আত্মসমর্পণ করে মিনতি সহকারে বলে, আমরা কোন মন্দ কাজ করতাম না। যেমন তারা হাশরের মাঠে আল্লাহর সামনে মিথ্যা শপথ করে বলবে,{وَاللهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ} অর্থাৎ, আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না। (সূরা আনআম ৬:২৩) অন্যত্র বলেন, যেদিন আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন, সেদিন তারা আল্লাহর সামনে সেই ভাবেই মিথ্যা শপথ করবে, যেভাবে তোমার সামনে করে। (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:১৮)[২] ফিরিশতা উত্তরে বলবেন, কেন নয়? তোমরা মিথ্যা বলছ। তোমাদের পুরো জীবন মন্দ কাজেই কেটেছে। আর আল্লাহর নিকট তোমাদের সকল কাজের রেকর্ড জমা রয়েছে। তোমাদের অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
আন-নাহল 16:29
সুতরাং তোমরা জাহান্নামের দরজাগুলিতে প্রবেশ কর সেথায় চিরস্থায়ী থাকার জন্য।[১] দেখ অহংকারীদের আবাসস্থল কত নিকৃষ্ট।
[১] ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, তাদের মৃত্যুর পর পরই তাদের রূহগুলো জাহান্নামে চলে যায়। আর তাদের দেহগুলো কবরে পড়ে থাকে। (যেখানে আল্লাহ নিজ কুদরতে শরীর ও রূহের মধ্যে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এক ধরণের সম্পর্ক সৃষ্টি করে শাস্তি দেন। সকাল-সন্ধ্যা তাদের সামনে আগুন পেশ করা হয়।) অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন তাদের রূহগুলো তাদের নিজ নিজ (নতুন) দেহে ফিরে আসবে এবং চিরকালের জন্য তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আন-নাহল 16:30
আর যারা সাবধানী ছিল তাদেরকে বলা হবে, ‘তোমাদের প্রতিপালক কি অবতীর্ণ করেছিলেন?’ তারা বলবে, ‘মহাকল্যাণ।’ যারা এই দুনিয়ায় সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং পরকালের আবাস আরো উৎকৃষ্টতর; আর সাবধানীদের আবাসস্থল কত উত্তম!
আন-নাহল 16:31
ওটা স্থায়ী জান্নাত যাতে তারা প্রবেশ করবে; ওর নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত; তারা যা কিছু কামনা করবে তাতে তাদের জন্য তাই থাকবে; এভাবেই আল্লাহ সাবধানীদেরকে পুরস্কৃত করেন।
আন-নাহল 16:32
যাদের পবিত্র থাকা অবস্থায় ফিরিশতাগণ প্রাণ হরণ করে; ফিরিশতাগণ (তাদেরকে) বলে, ‘তোমাদের প্রতি শান্তি![১] তোমরা যা করতে তার ফলে জান্নাতে প্রবেশ কর।’ [২]
[১] এই আয়াতগুলিতে যালেম মুশরিকদের বিপরীতে ঈমানদার ও মুত্তাকীদের চরিত্র এবং তাদের উত্তম পরিণতির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করুন। আমীন।[২] সূরা আ'রাফের ৭:৪৩ নং আয়াতের টীকায় এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি নিজ আমলের জোরে জান্নাতে যেতে পারবে না, যতক্ষণ তার প্রতি আল্লাহর দয়া না হবে। কিন্তু এখানে বলা হচ্ছে যে, তোমরা নিজ আমলের বিনিময়ে বা ফলে জান্নাতে প্রবেশ কর। আসলে এর মধ্যে কোন পরস্পর-বিরোধিতা নেই। কারণ আল্লাহর রহমত ও দয়া পেতে হলে সৎকর্ম একান্ত জরুরী। সৎকর্ম আল্লাহর রহমত পাওয়ার একমাত্র উপায়। অতএব আমলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আমল ছাড়া পরকালে আল্লাহর রহমত কোনক্রমেই সম্ভব নয়। সুতরাং উক্ত হাদীসের অর্থ নিজ জায়গায় সঠিক এবং আমলের প্রয়োজনীয়তাও স্বস্থানে বহাল। সেই কারণে অন্য এক হাদীসে বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আকার-আকৃতি ও ধন-সম্পদ দেখবেন না, বরং তিনি দেখবেন তোমাদের হৃদয় ও কর্ম।" (মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র)
আন-নাহল 16:33
তারা শুধু প্রতীক্ষা করে তাদের কাছে ফিরিশতা আগমনের অথবা তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ আগমনের।[১] ওদের পূর্ববর্তিগণও এরূপ করেছে।[২] আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি,[৩] বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করত। [৪]
[১] অর্থাৎ এরাও কি ফিরিশতা এসে রূহ ছিনিয়ে নেওয়ার সময়ের অথবা তোমার প্রতিপালকের আদেশ (আযাব বা কিয়ামত) আসার প্রতীক্ষা করছে?
[২] অর্থাৎ পূর্বের লোকেরাও অনুরূপ অবাধ্যতা ও পাপের পথ ধরেছে, যার ফলে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নেমে এসেছে।
[৩] মহান আল্লাহ তাদের জন্য কোন ওযর-অজুহাতের সুযোগ রাখেননি, রসূল পাঠিয়ে ও কিতাব অবতীর্ণ করে তা শেষ করে দিয়েছেন।
[৪] রসূলদের বিরোধিতা ও তাঁদেরকে মিথ্যা মনে করে তারা নিজেরা নিজেদের উপরই যুলুম করেছিল।
আন-নাহল 16:34
সুতরাং তাদের প্রতি আপতিত হয়েছিল তাদেরই মন্দ কর্মের শাস্তি এবং তাদেরকে পরিবেষ্টন করেছিল তাই, যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। [১]
[১] যখন রসূল তাদের বলতেন যে, 'যদি তোমরা ঈমান আনয়ন না কর, তাহলে আল্লাহর আযাব এসে পড়বে।' তখন তারা বিদ্রূপ করে বলত, 'যাও! তোমার আল্লাহকে বল, আযাব দিয়ে আমাদেরকে ধ্বংস করে দিক।' সুতরাং সেই আযাবই তাদেরকে ঘিরে ফেলল, যে আযাবের জন্য তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং তাদের বাঁচার কোন পথই থাকল না।
আন-নাহল 16:35
অংশীবাদীরা বলবে, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা ও আমরা তিনি ব্যতীত অপর কোন কিছুর উপাসনা করতাম না এবং তাঁর নির্দেশ ব্যতীত আমরা কোন কিছু নিষিদ্ধ করতাম না।’ ওদের পূর্ববর্তিগণও এরূপ করেছে। সুতরাং রসূলদের কর্তব্য সুস্পষ্ট বাণী প্রচার করা ছাড়া আর কি? [১]
[১] এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুশরিকদের একটি ভুল ধারণা দূর করেছেন, তারা বলত, 'আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করি, বা তাঁর আদেশ ছাড়াই কিছু জিনিসকে আমরা অবৈধ করে নিই, যদি আমাদের এ সকল কাজ ভুল হয়, তাহলে মহান আল্লাহ তাঁর পরিপূর্ণ কুদরত দিয়ে আমাদেরকে বাধা দেন না কেন? তিনি চাইলে আমরা এ কাজ করতেই পারতাম না। আর যদি বাধা না দেন, তাহলে এর অর্থ এই যে, আমরা যা কিছু করছি সবই তাঁর ইচ্ছায় করছি।' মহান আল্লাহ তাদের উক্ত সন্দেহ এই বলে দূর করেছেন যে, রসূলদের কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। অর্থাৎ, তোমাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল যে, আল্লাহ তোমাদেরকে বাধা দেননি। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে শিরকী কর্মকান্ড হতে কঠিনভাবে বাধা দিয়েছেন। সেই কারণে তিনি প্রত্যেক জাতির নিকট রসূল ও কিতাব পাঠিয়েছেন, আর প্রত্যেক নবী তাঁর জাতিকে প্রথমে শিরক হতে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। যার পরিষ্কার অর্থ হল, আল্লাহ কখনই পছন্দ করেন না যে, মানুষ শিরক করুক। যদি তিনি একাজ পছন্দ করতেন, তাহলে এর প্রতিবাদে রসূল পাঠাতেন কেন? কিন্তু এর পরও যদি তোমরা রসূলদেরকে মিথ্যা মনে করে শিরকের রাস্তা অবলম্বন কর, আর আল্লাহ যদি নিজ ইচ্ছায় তোমাদেরকে বাধা না দিয়ে থাকেন, তাহলে এটা তাঁর হিকমতের এক অংশ। যেহেতু তিনি মানুষকে ইচ্ছা প্রয়োগের পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছেন। কেননা এ ছাড়া তাদের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব ছিল না। (আল্লাহ বলেন,) আমার রসূলগণ আমার বাণী তোমাদের নিকট যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেছে যে, তোমরা এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করো না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে তা ব্যবহার কর। রসূলদের যা করণীয় তারা তাই করেছে। আর তোমরা শিরক করে স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছ, যার শাস্তি হল চিরস্থায়ী আযাব।
আন-নাহল 16:36
অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও তাগূত থেকে দূরে থাক। অতঃপর তাদের কতককে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তাদের কতকের উপর ভ্রষ্টতা অবধারিত হয়।[১] সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে দেখ, যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে, তাদের পরিণাম কি হয়েছে।
[১] উক্ত সন্দেহ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন যে, আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রসূল প্রেরণ করেছি ও তাদের দ্বারা আমার এই বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি যে, শুধু এক আল্লাহর ইবাদত কর। কিন্তু যাদের উপর ভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, তারা এর পরোয়াই করেনি।
আন-নাহল 16:37
তুমি তাদের পথপ্রাপ্তির ব্যাপারে আগ্রহী হলেও আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেছেন তাকে নিশ্চয় তিনি সৎপথে পরিচালিত করবেন না এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই।[১]
[১] এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন যে, হে নবী! তোমার ইচ্ছা এরা সকলেই হেদায়তের পথ অবলম্বন করুক। কিন্তু আল্লাহর রীতি অনুসারে যারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তুমি তাদেরকে হিদায়াতের পথে চালাতে পারো না। এরা অবশ্যই শেষ পরিণতিতে পৌঁছবে, যেখানে তাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।
আন-নাহল 16:38
তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না।[১] অবশ্যই! তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেনই; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। [২]
[১] কারণ, মাটিতে মিশে যাওয়ার পর পুনর্জীবিত হওয়া ছিল তাদের নিকট অসম্ভব ও ধারণাতীত ব্যাপার। সেই কারণে যখন রসূল তাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হওয়ার কথা বলতেন, তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী ভাবত, সত্যবাদী মনে করত না। বরং এর বিপরীত পুনর্জীবিত না হওয়ার ব্যাপারে বড় দৃঢ়তার সাথে তারা শপথ করত!
[২] এই অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণেই রসূলদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করে ও তাঁদের বিরোধিতা করে কুফরীর সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে।
আন-নাহল 16:39
তিনি (পুনর্জীবিত করবেন) যাতে তাদের বিতর্কিত বিষয় তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন এবং যাতে অবিশ্বাসীরা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী।[১]
[১] এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার হিকমত ও কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে যে, সেদিন মহান আল্লাহ সেই সকল বিষয়ে ফায়সালা করবেন, যে সকল বিষয়ে তাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল। হকপন্থী ও পরহেযগারদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং কাফের ও পাপীদেরকে তাদের পাপকাজের শাস্তি দেবেন। তাছাড়া সে দিন কাফেরদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কিয়ামত হওয়ার ব্যাপারে যে শপথ তারা করত, তাতে তারা মিথ্যাবাদী ছিল।
আন-নাহল 16:40
আমি কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে সে বিষয়ে আমার কথা শুধু এই যে, আমি বলি, ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়। [১]
[১] অর্থাৎ, মানুষের নিকট কিয়ামত সংঘটিত হওয়া যতই কঠিন ও অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা অতি সহজ। পৃথিবী ও আকাশ ধ্বংস করার জন্য তাঁর শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, মিস্ত্রী বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই। তাঁর জন্য শুধু كُن (হও বা হয়ে যাও) শব্দই যথেষ্ট। তাঁর 'হও' শব্দ দ্বারা চোখের পলকের মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হবে। {وَمَا أَمْرُ السَّاعَةِ إِلاَّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ} আর কিয়ামতের ব্যাপার তো চক্ষুর পলকের ন্যায়, বরং তার চেয়েও সত্ত্বর। (সূরা নাহল ১৬:৭৭)
আন-নাহল 16:41
যারা অত্যাচারিত হবার পর আল্লাহর পথে হিজরত (স্বদেশ ত্যাগ) করেছে,[১] আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস প্রদান করব।[২] আর পরকালের পুরস্কারই অধিক বড়;[৩] যদি তারা জানত!
[১] হিজরতের অর্থ হল আল্লাহর দ্বীনের জন্য, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজ মাতৃভূমি, আত্মীয়-সজন, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে এমন স্থানে চলে যাওয়া, যেখানে সহজেই আল্লাহর দ্বীন পালন করা যেতে পারে। এই আয়াতে ঐ সকল মুহাজিরদের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতটি সাধারণ, যা প্রত্যেক মুহাজির ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য। আবার এটিও হতে পারে যে, এই আয়াত ঐ সকল মুহাজিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যাঁরা নিজ জাতির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হাবশায় (ইথিউপিয়া) হিজরত করেছিলেন। যাঁদের সংখ্যা ছিল মহিলা সহ এক শত বা তার কিছু বেশি। যাঁদের মধ্যে উসমান গনী ও তাঁর স্ত্রী নবীকন্যা রুক্বাইয়্যা (রায্বিয়াল্লাহু আনহুমা)ও ছিলেন।
[২] حسنة থেকে পবিত্র জীবিকা আবার কেউ কেউ মদীনা অর্থ নিয়েছেন, যা পরবর্তীতে মুসলিমদের কেন্দ্রস্থল হল। ইমাম ইবনে কাসীর বলেছেন, উক্ত দুই কথার মাঝে কোন বিরোধ নেই। কারণ যাঁরা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘর-বাড়ি ছেড়ে হিজরত করেছিলেন, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে পৃথিবীতেই উত্তম প্রতিদান দিয়েছিলেন। পবিত্র জীবিকাও দান করেছিলেন এবং পুরো আরবের উপর শাসন-ক্ষমতাও দিয়েছিলেন।
[৩] উমার (রাঃ) যখন মুহাজির ও আনসারদের ভাতা নির্ধারিত করলেন, তখন প্রত্যেক মুহাজিরকে ভাতা দিতে গিয়ে বলতেন, এ হল তাই, যার প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহ পৃথিবীতে দিয়েছেন। আর পরকালে যা জমা রেখেছেন তা এর চেয়ে অনেক উত্তম। (ইবনে কাসীর)
আন-নাহল 16:42
যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।
আন-নাহল 16:43
তোমার পূর্বে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; যাদের নিকট আমি অহী পাঠাতাম। তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর; [১]
[১] أهل الذكر (জ্ঞানী) বলতে আহলে কিতাবদের বুঝানো হয়েছে, যারা পূর্ববর্তী আম্বিয়া ও তাঁদের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত ছিল। উদ্দেশ্য হল, আমি যত রসূল পাঠিয়েছি, তারা সকলেই মানুষ ছিল। অতএব যদি মুহাম্মাদও মানুষ হয়, তাহলে এটা কোন নতুন কথা নয় যে, তোমরা তার মানুষ হওয়ার কারণে তার রিসালতকেই অস্বীকার করবে। যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, তাহলে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞাসা কর যে, পূর্ববর্তী নবীগণ মানুষ ছিল, না ফিরিশতা? যদি তারা ফিরিশতা ছিল, তাহলে অবশ্যই অস্বীকার করো। আর যদি তারাও সকলে মানুষ ছিল, তাহলে মুহাম্মদের মানুষ হওয়ার কারণে তার রিসালাতকে অস্বীকার কেন?
আন-নাহল 16:44
স্পষ্ট প্রমাণ ও গ্রন্থসহ। আর তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে।
আন-নাহল 16:45
যারা জঘন্য ষড়যন্ত্র করে, তারা কি এ বিষয়ে নিশ্চিত আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভূগর্ভে ধসিয়ে দেবেন না অথবা এমন দিক হতে শাস্তি আসবে না, যার তারা টেরও পাবে না?
আন-নাহল 16:46
অথবা চলাফেরা করতে থাকাকালে তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন না; [১] অতঃপর তারা তা ব্যর্থ করতে পারবে না?
[১] 'চলাফেরা করতে থাকাকালে'র কয়েকটি অর্থ হতে পারে। যেমন একঃ যখন তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাইরে যাও। দুইঃ যখন তোমরা ব্যবসার উন্নতিকল্পে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন কর। তিনঃ রাত্রে আরাম করার জন্য বিছানায় যাও। এগুলি تقلب এর বিভিন্ন অর্থ। আল্লাহ যখন চাইবেন, যে কোন অবস্থাতেই তোমাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন।
আন-নাহল 16:47
অথবা তাদেরকে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পাকড়াও করবেন না?[১] তোমাদের প্রতিপালক তো অবশ্যই অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু। [২]
[১] تخوف এর এ অর্থও হতে পারে যে, পূর্ব থেকেই অন্তরে আযাব ও পাকড়াও-এর ভয় বিদ্যমান থাকে। যেমন কোন সময় মানুষ বড় ধরনের কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর সে ভয় করে যে, যেন আল্লাহ আমাকে ধরে না ফেলেন। কোন কোন সময় এ ধরনের পাকড়াও হয়ে থাকে।
[২] তিনি পাপের পর পরই ধরে ফেলেন না; বরং অবকাশ দেন। আর এই অবকাশে অধিকাংশ মানুষ তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ লাভ করে থাকে।
আন-নাহল 16:48
তারা কি লক্ষ্য করে না আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর প্রতি, যার ছায়া বিনীতভাবে আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয়ে ডানে ও বামে ঢলে পড়ে? [১]
[১] এখানে আল্লাহর বড়ত্ত্ব, মহত্ত ও মর্যাদার উল্লেখ হচ্ছে যে, প্রত্যেক জিনিসই তাঁর সামনে অবনত-মস্তক। জড়পদার্থ হোক বা জীবজন্তু, জীন হোক বা মানুষ বা ফিরিশতা। প্রত্যেক ছায়াবিশিষ্ট বস্তু যখন তার ছায়া ডানে বামে ঢলে পড়ে, তখন সকাল-সন্ধ্যায় সে বস্তু নিজ ছায়ার সঙ্গে আল্লাহকে সিজদা করে। ইমাম মুজাহিদ বলেন, যখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে, তখন প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়।
আন-নাহল 16:49
আল্লাহকেই সিজদা করে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সকল জীব-জন্তু এবং ফিরিশতাগণও। আর তারা অহংকার করে না।
আন-নাহল 16:50
তারা ভয় করে তাদের উপরে তাদের প্রতিপালককে[১] এবং তারা তা করে, যা তাদেরকে আদেশ করা হয়। [২] (সাজদাহ-৩)
[১] আল্লাহর ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকে।[২] আল্লাহর আদেশের অন্যথা করে না বরং যা আদেশ করা হয়, তারা তাই করে। আর যা থেকে নিষেধ করা হয়, তা থেকে তারা দূরে থাকে। (এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ'রাফের শেষ আয়াতের ৭:২০৬ টীকা দেখুন।)
আন-নাহল 16:51
আল্লাহ বললেন, তোমরা দুইজন উপাস্য গ্রহণ কর না; তিনিই তো একমাত্র উপাস্য।[১] সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর।
[১] কারণ আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্যিকার) উপাস্যই নেই। যদি পৃথিবী ও আকাশে দুই উপাস্য থাকত, তাহলে বিশ্ব-জাহানের নিয়ম-শৃঙ্খলা লন্ডভন্ড হয়ে যেত এবং উভয়ই ধ্বংসের শিকার হত।
{لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا} (سورة الأنبياء : ২২) এই কারণে দুই ঈশ্বরে বিশ্বাস যা অগ্নিপূজকদের মতবাদ বা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস যা অধিকাংশ মুশরিকদের ধারণা; এই সকল বিশ্বাসই ভ্রান্ত ও বাতিল। পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা যখন এক, তিনিই যখন বিনা কারো অংশিদারিত্বে পৃথিবীর সব কিছু পরিচালনা করেন, তখন উপাসনার যোগ্যও একমাত্র তিনিই। যিনি একক, দুই বা দুয়ের অধিক নয়।
আন-নাহল 16:52
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সেসব তো তাঁরই এবং নিরবচ্ছিন্ন আনুগত্য তাঁরই প্রাপ্য;[১] তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ভয় করবে?
[১] তাঁরই নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত ও আনুগত্য আবশ্যকীয়। واصب এর অর্থ অবিরাম। যেমন অন্যত্র এসেছে,{وَلَهُمْ عَذَابٌ وَاصِبٌ} তাদের জন্য রয়েছে অবিরাম আযাব। (সূরা সাফফাত ৩৭:৯) আর আয়াতের মর্মার্থ তাই, যা অন্যত্র বলা হয়েছে,{فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ، أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ} সুতরাং আল্লাহর ইবাদত কর তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে। জেনে রেখো, খাঁটি আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। (সূরা যুমার ৩৯:২-৩)
আন-নাহল 16:53
তোমাদের মাঝে যেসব সম্পদ রয়েছে তা তো আল্লাহরই নিকট হতে;[১] আবার যখন দুঃখ-দৈন্য তোমাদেরকে স্পর্শ করে, তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে আহবান কর। [২]
[১] যখন সমস্ত নিয়ামত ও সম্পদ দাতা একমাত্র আল্লাহ, তখন ইবাদত অন্যের কোন দাবিতে?
[২] এর অর্থ এই যে, তারা যখন চতুর্দিক থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে, তখন তাদের অন্তরের অন্তস্তলে লুকিয়ে থাকা আল্লাহর বিশ্বাস তাদের সামনে এসে পড়ে।
আন-নাহল 16:54
আবার যখন আল্লাহ তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূরীভূত করেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সাথে অংশী করে।
আন-নাহল 16:55
যাতে আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা অস্বীকার করে;[১] সুতরাং তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই জানতে পারবে। [২]
[১] কিন্তু মানুষ এতই অকৃতজ্ঞ যে, দুঃখ-কষ্ট (অসুখ, দরিদ্রতা, ক্ষতি ইত্যাদি) দূর হলেই আবার আল্লাহর সাথে শিরক করতে শুরু করে।[২] এটি অনুরূপ যেমন পূর্বে বলেছেন,{قُلْ تَمَتَّعُواْ فَإِنَّ مَصِيرَكُمْ إِلَى النَّارِ} তুমি বল, ভোগ করে নাও, পরিণামে জাহান্নামই তোমাদের ঠিকানা। (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩০)
আন-নাহল 16:56
আমি তাদেরকে যে জীবিকা দান করি, তারা তার এক অংশ নির্ধারিত করে তাদের (বাতিল উপাস্যদের) জন্য, যাদের সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না।[১] শপথ আল্লাহর! তোমরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন কর, সে সম্বন্ধে তোমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে। [২]
[১] অর্থাৎ, যাদেরকে এরা বিপত্তারণ, সমস্যা দূরকারী, মা'বুদ মনে করে তারা তো মাটি বা পাথরের মূর্তি, জীন বা শয়তান, তাদের প্রকৃতত্বের জ্ঞান তাদের নেই। অনুরূপ কবরে শায়িত ব্যক্তির প্রকৃতত্বও কারো জানা নয় যে, তার সাথে কবরে কি আচরণ করা হচ্ছে? সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তালিকাভুক্ত, নাকি অপ্রিয় বান্দাদের? এ সব কথা কেউ জানে না। কিন্তু এই যালেমরা তাদের প্রকৃতত্ব না জানা সত্ত্বেও (কেবল ধারণাবশে ঐশ্বরিক মর্যাদা দিয়ে) তাদেরকে আল্লাহর শরীক করে রেখেছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের (নযর-নিয়াযের মাধ্যমে) কিছু অংশ তাদের জন্য ধার্য করে থাকে। বরং আল্লাহর অংশ বাকী থাকলে অসুবিধা নাই; কিন্তু তাদের অংশ কম করা চলবে না। যেমন সূরা আনআমের ৬:১৩৬ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।[২] তোমরা আল্লাহর উপরে যে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ যে, তাঁর এক বা একাধিক শরীক আছে --এ সম্পর্কে তোমরা কিয়ামতে জিজ্ঞাসিত হবে।
আন-নাহল 16:57
তারা নির্ধারিত করে আল্লাহর জন্য কন্যা-সন্তান অথচ তিনি পবিত্র; আর তাদের জন্য তাই যা তারা কামনা করে! [১]
[১] আরবের কয়েকটি গোত্র (খুযাআহ ও কিনানাহ) ফিরিশতার ইবাদত করত এবং তারা বলত, ফিরিশতারা আল্লাহর কন্যা। তাদের প্রথম অপরাধ হল, তারা আল্লাহর জন্য সন্তান নির্ধারণ করল; যদিও তাঁর কোন সন্তান নেই। আর করল তা আবার কন্যা সন্তান, যা তারা নিজেরাই পছন্দ করত না, তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করল। যেটিকে অন্যত্র এভাবে বলেছেন,{أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنثَى، تِلْكَ إِذًا قِسْمَةٌ ضِيزَى} পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য, আর কন্যা সন্তান তাঁর জন্য? এই প্রকার বণ্টন তো অসঙ্গত। (সূরা নাজম ৫৩:২১-২২) এখানে বললেন, তোমাদের কামনা পুত্রই হোক, কন্যা একটিও না হোক।
আন-নাহল 16:58
তাদের কাউকে যখন কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কাল হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।
আন-নাহল 16:59
তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। [১]
[১] কন্যা জন্মের সংবাদ শুনে তাদের এই অবস্থা হয়, যা বর্ণিত হয়েছে, অথচ আল্লাহর জন্য তারা কন্যা নির্ধারণ করে। তাদের সিদ্ধান্ত কতই না অসঙ্গত। অবশ্য এখানে এটা ভাবা উচিত নয় যে, মহান আল্লাহও পুত্রের তুলনায় কন্যাকে তুচ্ছ মনে করেন। না, আল্লাহর নিকট পুত্র-কন্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, আর না লিঙ্গ বা জাতিভেদের দিক দিয়ে তুচ্ছ বা মর্যাদাসম্পন্ন করার কোন ব্যাপার আছে। এখানে শুধুমাত্র আরবদের একটি অন্যায় ও গর্হিত রীতিকে স্পষ্ট করাই আসল উদ্দেশ্য। যা তারা আল্লাহর ব্যাপারে পোষণ করত; যদিও তারাও আল্লাহর সম্মান ও বড়ত্ত্বকে স্বীকার করত। যার যুক্তিসঙ্গত ফল এই ছিল যে, যে জিনিস তারা নিজেদের জন্য পছন্দ করে না, সেটিকে আল্লাহর জন্যও নির্ধারণ করবে না। কিন্তু তারা তার বিপরীত করল। এখানে শুধু এই অন্যায় আচরণকেই স্পষ্ট করা হয়েছে।
আন-নাহল 16:60
যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য নিকৃষ্ট গুণ।[১] আর আল্লাহর জন্য রয়েছে উৎকৃষ্টতম গুণ এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।[২]
[১] অর্থাৎ, যে কাফেরদের অসৎ কর্ম বর্ণিত হল, তাদের জন্যই নিকৃষ্ট উদাহরণ বা অসদগুণ, অর্থাৎ অজ্ঞতা ও কুফরীর খারাপ গুণ। অথবা এর অর্থ এই যে, আল্লাহর জন্য স্ত্রী ও সন্তান স্থির করা নিকৃষ্ট উদাহরণ, যা পরকালে অবিশ্বাসীরা আল্লাহর জন্য ব্যক্ত করে।
[২] অর্থাৎ, তাঁর প্রত্যেক গুণ সৃষ্টির গুণের তুলনায় মহত্তর। যেমন তাঁর জ্ঞান অপরিসীম, তাঁর শক্তি অতুলনীয়, তাঁর দানশীলতা দৃষ্টান্তবিহীন, অনুরূপ সকল গুণাবলী। অথবা এর অর্থ হল, তিনি শক্তিশালী, সৃষ্টিকর্তা, রুযীদাতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ইত্যাদি (তিনি সর্বগুণনিধি।) (ফাতহুল কাদীর) অথবা নিকৃষ্ট উপমা বলতে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অসম্পূর্ণতা, আর উৎকৃষ্টতম উপমা বলতে সর্বতোমুখী পরিপূর্ণতা সর্বদিক দিয়ে আল্লাহর জন্যই। (ইবনে কাসীর)
আন-নাহল 16:61
আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না,[১] কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন;[২] অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব অথবা অগ্রগামী করতে পারে না।
[১] এটি মহান আল্লাহর সহনশীলতা এবং তাঁর হিকমত ও সুকৌশলের দাবী যে, তিনি পাপ করতে দেখেও নিজ অনুগ্রহ ছিনিয়ে নেন না অথবা সত্ত্বর পাকড়াও করেন না। পক্ষান্তরে যদি তিনি পাপ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও শুরু করেন, তাহলে যুলুম, পাপ, কুফরী ও শিরক পৃথিবীতে এত ব্যাপক হয়ে গেছে যে, কোন জীবই অবশিষ্ট থাকত না। কারণ যখন পাপ ব্যাপক হয়ে পড়ে, তখন আযাবে সৎ লোকদেরকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে তারা পরকালে আল্লাহর নিকট পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (দ্রঃ বুখারী ২১১৮, মুসলিম ২২০৬, ২২১০নং)
[২] এটি সেই হিকমত ও যৌক্তিকতার বিবরণ, যার কারণে এক বিশেষ সময় পর্যন্ত অপরাধীকে অবকাশ দেওয়া হয়, প্রথমতঃ যাতে তাদের কোন ওযর-আপত্তি না থেকে যায়। আর দ্বিতীয়তঃ যাতে তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু ঈমানদার ও সৎশীল হতে পারে।
আন-নাহল 16:62
যা তারা অপছন্দ করে তাই তারা আল্লাহর প্রতি আরোপ করে;[১] তাদের জিহ্বা মিথ্যা বর্ণনা করে (বলে) যে, ‘মঙ্গল তাদেরই জন্য।’[২] স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য আছে দোযখ এবং তারাই সর্বাগ্রে তাতে নিক্ষিপ্ত হবে। [৩]
[১] অর্থাৎ, কন্যা-সন্তান। আর এ পুনরাবৃত্তি তাকীদের জন্য।
[২] এটি তাদের অন্য এক দুষ্কর্মের বর্ণনা যে, তারা আল্লাহর সাথে অন্যায় আচরণ করে। তারা মিথ্যা বলে যে, তাদের পরিণাম হবে উত্তম, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং ইহকালের মত তাদের পরকালও হবে মঙ্গলময়।
[৩] অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে তাদের পরিণাম হবে 'উত্তম' আর তা হল জাহান্নামের আগুন। জাহান্নামে তারাই হবে অগ্রগামী। فرط এর এই অর্থই হাদীসে প্রমাণিত। নবী (সাঃ) বলেছেন أنا فرطكم على الحوض অর্থাৎ, আমি হাওযে কাওসারে তোমাদের অগ্রবর্তী হব। (বুখারী ৬৫৮৪, মুসলিম ১৭৯৩নং) مفرطون এর অন্য এক অর্থ এই করা হয়েছে 'বিস্মৃত', অর্থাৎ, জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পর তাদেরকে ভুলে যাওয়া হবে।
আন-নাহল 16:63
শপথ আল্লাহর! আমি তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট রসূল প্রেরণ করেছি; কিন্তু শয়তান ঐ সব জাতির কার্যকলাপ তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল;[১] সুতরাং সে আজও তাদের অভিভাবক[২] এবং তাদেরই জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি।
[১] যার কারণে তারা নবীদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল; যেমন হে নবী! তোমাকে কুরাইশরা মিথ্যাজ্ঞান করছে।
[২] اليوم (আজ) বলতে পার্থিব সময়কে বুঝানো হয়েছে। যেমন অনুবাদে তা সুস্পষ্ট। অথবা 'আজ' বলতে পরকাল বুঝানো হয়েছে। কারণ সেখানেও সে তাদের অভিভাবক ও সঙ্গী হবে। وليهم এর هم (তাদের) বলতে মক্কার কাফেরদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শয়তান যেমন পূর্বের জাতিসমূহকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তেমনি আজও সে মক্কার কাফেরদের বন্ধু, যে তাদেরকে রিসালতকে মিথ্যা ভাবতে বাধ্য করছে।
আন-নাহল 16:64
আমি তো তোমার প্রতি গ্রন্থ এ জন্যই অবতীর্ণ করেছি; যাতে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করে, তাদেরকে তুমি তা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পার[১] এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ।
[১] এতে নবী (সাঃ)-এর দায়িত্ব বিবৃত হয়েছে যে, বিশ্বাস ও শরীয়তের বিধি-বিধানের ব্যাপারে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের মাঝে, অনুরূপ অগ্নিপূজক ও মুশরিকদের মাঝে এবং অনান্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের মাঝে যে সব মতপার্থক্য রয়েছে, তা এমনভাবে আলোচনা কর, যাতে ন্যায়-অন্যায় ও হক-বাতিল স্পষ্ট হয়ে যায়। যাতে মানুষ হককে গ্রহণ করতে ও বাতিলকে বর্জন করতে পারে।
আন-নাহল 16:65
আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। অতঃপর তার দ্বারা তিনি ভূমিকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন; অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা শ্রবণ করে।
আন-নাহল 16:66
অবশ্যই (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর[১] মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে; ওগুলির উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হতে তোমাদেরকে আমি পান করাই বিশুদ্ধ দুধ; যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।[২]
[১] أنعام (গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু) বলতে উট, গরু, ছাগল ও ভেঁড়াকে বুঝানো হয়েছে।
[২] এই চতুষ্পদ জন্তুরা যা কিছু খায় তা পেটে যায়, আর তা থেকে দুধ, রক্ত, গোবর ও প্রস্রাব তৈরী হয়। রক্ত শিরা-উপশিরায়, দুধ স্তনে, অনুরূপ গোবর ও প্রস্রাব নিজ নিজ জায়গায় পৌঁছে যায়। দুধে না রক্তের মিশ্রণ থাকে, আর না গোবর ও প্রস্রাবের দুর্গন্ধ; বরং তা নির্মল সাদা ও পরিষ্কার হয়ে বের হয় এবং তা পানকারীর জন্য হয় সুস্বাদু।
আন-নাহল 16:67
আর খেজুর ও আঙ্গুর ফল হতে তোমরা মদ[১] ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাক, এতে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।
[১] এই আয়াত তখন অবতীর্ণ হয় যখন মদ হারাম হয়নি, সেই জন্য হালাল (পবিত্র) জিনিসের সাথে তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এতে سكرا এর পর رزقا حسنا এসেছে যার মধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে মদ উত্তম খাদ্য নয়। তাছাড়া এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। যার মধ্যে মদ অপছন্দনীয় পানীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মদীনায় অবতীর্ণ সূরাগুলিতে ধীরে ধীরে তা হারাম করা হয়েছে।
আন-নাহল 16:68
তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ[১] করেছেন যে, তুমি গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে।
[১]وحي থেকে এখানে ইলহাম (অন্তরে প্রক্ষেপণ) বা এমন জ্ঞান-বুদ্ধি যা নিজ প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য প্রত্যেক জীবকে দান করা হয়েছে।
আন-নাহল 16:69
এরপর প্রত্যেক ফল হতে আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ পথ অনুসরণ কর;[১] ওর উদর হতে নির্গত হয় নানা রঙের পানীয়;[২] যাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগমুক্তি।[৩] অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।
[১] মৌমাছি প্রথমে পাহাড়ে, গাছে, মানুষের ঘরের উঁচু ছাদে এমনভাবে মৌচাক তৈরী করে যে, মাঝে কোথাও ফাঁক থাকে না। তারপর বাগান, জঙ্গল, পাহাড় ও উপত্যকায় (অনুরূপ ফুলে ভরা শস্যক্ষেতে) ঘুরে বেড়ায় এবং প্রত্যেক ফুল-ফলের মধু ও রস আহরণ করে পেটে জমা করে। আর যে রাস্তায় যায় সেই রাস্তায় ফিরে এসে মৌচাকে গিয়ে বসে। যেখানে তার মুখ দিয়ে মধু উগরে দেয়, যাকে মহান আল্লাহ পানীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
[২] লাল, সাদা, নীল, হলুদ বিভিন্ন রঙের। যে ধরনের ফুল-ফল ও ক্ষেত থেকে তারা মধু সংগ্রহ করে, সেই হিসাবে তার রঙ ও স্বাদ বিভিন্ন হয়ে থাকে।
[৩] شفاء (রোগমুক্তি) অনির্দিষ্ট বাহুল্য বর্ণনার জন্য। অর্থাৎ, মধুতে বহু রোগের আরোগ্য রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, এটি সকল রোগের ঔষধ। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, মধু অবশ্যই আরোগ্য দানকারী আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক এক পানীয়, তবে বিশেষ বিশেষ রোগের জন্য; সকল রোগের জন্য নয়। হাদীসে বর্ণিত, নবী (সাঃ) মিষ্টি জিনিস ও মধু পছন্দ করতেন। (বুখারীঃ পানীয় অধ্যায়) অন্য এক বর্ণনায় আছে তিনি (সাঃ) বলেছেন, "তিনটি জিনিসে আরোগ্য রয়েছে; শিঙ্গা লাগানোতে, মধু পান করাতে ও দাগানোতে। তবে আমি আমার উম্মতকে দাগাতে নিষেধ করছি।" (বুখারীঃ মধু দ্বারা চিকিৎসা পরিচ্ছেদ) হাদীসে একটি ঘটনাও এসেছে। নবী (সাঃ) পাতলা পায়খানার এক রোগীকে মধু পান করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাতে তার রোগ আরো বেড়ে গেল। তিনি দ্বিতীয়বার আবার মধু পান করার পরামর্শ দিলেন। যাতে রোগীর পুরাতন মল বেরিয়ে আসতে লাগল। রোগীর বাড়ির লোকেরা ভাবল যে, রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার এক ভাই আবার নবী (সাঃ)-এর নিকট এল। তখন তিনি বললেন, "আল্লাহ সত্য, তোমার ভায়ের পেট মিথ্যা। যাও, তাকে আবারো মধু পান করাও।" অতঃপর তৃতীয়বার মধু পান করালে সে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। (বুখারী, মুসলিম)
আন-নাহল 16:70
আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে উপনীত করা হয় নিকৃষ্টতম বয়সে; ফলে সে যা কিছু জানত সে সম্বন্ধে সজ্ঞান থাকে না;[১] আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।
[১] যখন মানুষের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায়, তখন তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন কি কখনো কখনো স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়, ফলে সে এক শিশুতে পরিণত হয়। এটিই হল أرذل العمر (স্থবিরতা) যা হতে নবী (সাঃ)ও আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।
আন-নাহল 16:71
আল্লাহ জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদেরকে নিজেদের জীবনোপকরণ হতে এমন কিছু দেয় না, যাতে তারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়; [১] তবে কি তারা আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করে? [২]
[১] যখন তোমরা নিজ দাসদেরকে এত সম্পদ ও জীবনোপকরণ দাও না, যাতে তারা তোমাদের সমান হয়ে যায়, তখন আল্লাহ কিভাবে পছন্দ করতে পারেন যে, তাঁরই কিছু দাসকে তাঁর শরীক করে তাঁর সমতুল্য করে দাও। এই আয়াতে এটিও প্রমাণিত হল যে, আর্থিক বিষয়ে মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়, তা আল্লাহর সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মের অনুসারী। পৃথিবীর কোন মানব-রচিত সংবিধান তাকে আইনের বলে দূর করতে পারে না, যেমন সমাজতন্ত্রে তা বিদ্যমান। জীবিকা বন্টনের সমতা প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপচেষ্টা না করে বরং প্রত্যেককেই জীবিকা সন্ধানের সমান সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
[২] আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ হতে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে নযর-নিয়ায বের করে, আর এভাবে তারা আল্লাহর (নিয়ামতের) অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা করে।
আন-নাহল 16:72
আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল হতে তোমাদের জন্য পুত্র ও পৌত্র সৃষ্টি করেছেন এবং উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন; তবুও কি তারা মিথ্যাতে বিশ্বাস করবে[১] এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?
[১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ আয়াতে বর্ণিত নিজ নিয়ামতের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন যে, সব কিছুর দাতা মহান আল্লাহ; কিন্তু তবুও কি তারা তাঁকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত করবে ও অন্যের কথাই মানবে?
আন-নাহল 16:73
তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করে, তারা তাদের জন্য আকাশমন্ডলী অথবা পৃথিবী হতে কোন জীবনোপকরণ সরবরাহ করার শক্তি রাখে না এবং তারা কিছুই করতে সক্ষম নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহকে ছেড়ে তারা এমন কিছুর ইবাদত করে, যাদের কোন জিনিসের উপর কোন ক্ষমতাই নেই।
আন-নাহল 16:74
সুতরাং তোমরা আল্লাহর সদৃশাবলী স্থির করো না।[১] নিশ্চয় আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।
[১] যেমন, মুশরিকরা উদাহরণ দিয়ে থাকে যে, যদি রাজার সাথে সাক্ষাৎ করতে হয় বা তাঁর নিকট থেকে কোন কাজ নিতে হয়, তাহলে রাজার নিকট সরাসরি যাওয়া যায় না; বরং তাঁর নিকটতম লোকেদের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ করতে হয়, (উকিল ধরতে হয়,) তবেই রাজার নিকট পৌছনো সম্ভব হয়। অনুরূপ আল্লাহ অত্যন্ত মহান ও বিশাল রাজা। তাঁর নিকট পৌছনোর জন্য আমরা এই সব উপাস্যদের উপাসনা করি বা বুযুর্গদেরকে অসীলা ও মাধ্যমরূপে ব্যবহার করি। মহান আল্লাহ এর উত্তরে বলেন, তোমরা আল্লাহকে নিজেদের উপর অনুমান করো না এবং তাঁর জন্য কোন উপমা, দৃষ্টান্ত বা সদৃশ পেশ করো না। কারণ তিনি অনুপম; তাঁর কোন উপমা নেই। তিনি একক; তাঁর কোন সদৃশ নেই। তারপর মানুষ রাজা না গায়বী খবর জানে, আর না সে সব সময় সবার নিকট উপস্থিত, না সে সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা যে, বিনা কোন মাধ্যমে প্রজাদের অবস্থা ও তাদের প্রয়োজন জানতে সক্ষম। অন্যথা মহান আল্লাহ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, দৃশ্য-অদৃশ্য প্রত্যেক বস্তুর খবর রাখেন। রাত্রির অন্ধকারে সংঘটিত কর্মও তিনি দেখতে পান। প্রত্যেকের অভাব-অভিযোগও জানতে-শুনতে সক্ষম। অতএব কিভাবে একজন পার্থিব রাজা ও শাসকের সাথে মহান রাজা আল্লাহর তুলনা ও সাদৃশ্য হতে পারে?
আন-নাহল 16:75
আল্লাহ উপমা দিচ্ছেন অপরের অধিকারভুক্ত এক দাসের যে কোন কিছুর উপর শক্তি রাখে না এবং এমন এক ব্যক্তির যাকে আমি নিজের পক্ষ হতে উত্তম জীবিকা দান করেছি এবং সে তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারা কি একে অপরের সমান?[১] সকল প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
[১] কেউ কেউ বলেন, এটি পরাধীন দাস ও স্বাধীন মানুষের উপমা; প্রথমজন দাস ও দ্বিতীয়জন স্বাধীন। এরা দুজনই সমান নয়। আবার কেউ বলেন, এটি মু'মিন ও কাফেরের উপমা; প্রথমটি কাফের আর দ্বিতীয়টি মু'মিনের। এরাও সমান নয়। কেউ বলেন, এটি আল্লাহ ও গায়রুল্লাহ (দেবদেবীর) উদাহরণ; প্রথমটিতে আল্লাহ ও দ্বিতীয়টিতে দেবদেবীকে বুঝানো হয়েছে। এরা পরস্পর সমান নয়। অর্থ এই যে, একজন দাস ও অপরজন স্বাধীন; যদিও তারা দু'জনই মানুষ, দু'জনই আল্লাহর সৃষ্ট, অনেক জিনিস দু'জনের মধ্যে সমানভাবে বিদ্যমান, তা সত্ত্বেও মর্যাদা ও সম্মানে তাদেরকে তোমরা সমান সমান মনে কর না। তাহলে মহান আল্লাহ ও পাথরের মূর্তি বা কবর কিভাবে সমান হতে পারে?
আন-নাহল 16:76
আল্লাহ আরো উপমা দিচ্ছেন দুই ব্যক্তির;[১] ওদের একজন বোবা, সে কোন কিছুরই শক্তি রাখে না এবং সে তার প্রভুর উপর বোঝা স্বরূপ; তাকে যেখানেই পাঠানো হোক না কেন, সে ভাল কিছুই করে আসতে পারে না; সে কি সমান হবে ঐ ব্যক্তির যে ন্যায়ের নির্দেশ দেয়[২] এবং যে আছে সরল পথে?
[১] এটি আরো একটি উপমা যা প্রথমটির চেয়ে স্পষ্টতর।
[২] আর প্রত্যেক কাজে সক্ষম। কেননা, সে সব কথা বলতে ও বুঝতে পারে এবং সে সরল পথে চলমান। অর্থাৎ এমন রাস্তায় চলে যাতে কোন অতিরঞ্জন, গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ি নেই। যেমন তাতে কোন প্রকার বক্রতা, অবহেলা ও ত্রুটিও নেই। এই ব্যক্তি এবং সেই ব্যক্তি যে বোবা, যে কোন কিছুরই শক্তি রাখে না এবং যে তার প্রভুর উপর বোঝা স্বরূপ, যেরূপ এরা উভয়ে এক সমান নয়, অনুরূপ মহান আল্লাহ এবং যাদেরকে এরা তাঁর সাথে শরীক করে, তারাও সমান নয়।
আন-নাহল 16:77
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই[১] এবং কিয়ামতের ব্যাপার তো চক্ষুর পলকের ন্যায়; বরং তার চেয়েও সত্বর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।[২]
[১] অর্থাৎ, আকাশ ও পৃথিবীতে অসংখ্য অদৃশ্য ও গায়বী জিনিস ও জ্ঞান আছে, যার মধ্যে কিয়ামত কখন হবে তার জ্ঞান অন্যতম। এ সকলের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। এই কারণে ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই, ঐ সব মূর্তিরা বা মৃত ব্যক্তিরা নয়, যাদের কোন জ্ঞানই নেই এবং কারো লাভ-ক্ষতি করার ক্ষমতাও নেই।
[২] মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতার একটি প্রমাণ যে, এত বিশাল পৃথিবী তাঁর আদেশে চোখের পলকে বা তার চেয়েও কম সময়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি অতিরঞ্জিত কথা নয়; বরং বাস্তব সত্য। কারণ তাঁর ক্ষমতা অপরিসীম। যার অনুমান আমরা করতেই পারি না। তিনি যা চান كُن (হও) শব্দ দিয়ে তা হয়ে যায়। কিয়ামতও তাঁর كُن বলাতেই সংঘটিত হবে।
আন-নাহল 16:78
আর আল্লাহ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না[১] এবং তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়; [২] যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [৩]
[১] شيئا অনির্দিষ্ট। অর্থাৎ, তোমরা কিছুই জানতে না। না ভাল-মন্দ, আর না লাভ-নোকসান।
[২] যাতে কান দ্বারা তোমরা শব্দ শুনতে পারো, চোখ দ্বারা সকল জিনিস দেখতে পারো। আর অন্তর অর্থাৎ, জ্ঞান (কেননা অন্তর জ্ঞানের কেন্দ্রস্থল) দান করেছেন, যাতে নানা জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে পারো, লাভ-ক্ষতি বুঝতে পারো। মানুষ ধীরে ধীরে যত বড় হয়, তার জ্ঞান-বুদ্ধি ও শক্তি বাড়তে থাকে। এমন কি যখন সে পূর্ণ বয়সে (পূর্ণ যৌবনে) পদার্পণ করে, তখন তার ঐ সকল শক্তিও পরিপূর্ণতা লাভ করে।
[৩] এই সকল শক্তি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ এই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনভাবে ব্যবহার করবে, যাতে আল্লাহ খুশি হন। তা দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত করবে। এটিই হল আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত, মহান আল্লাহ বলেন, "আমার বান্দা যে সব জিনিস দিয়ে আমার নৈকট্য লাভ করে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হল আমি যা তাদের উপর ফরয করেছি। তাছাড়া নফল ইবাদত দ্বারাও সে আমার অধিক নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয়। পরিশেষে আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে চাইলে তাকে দান করি, আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দিই।" (বুখারীঃ কিতাবুর রিক্বাক) কিছু লোক এই হাদীসের ভুল অর্থ নিয়ে আল্লাহর অলীদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তির মালিক বলে মনে করে। অথচ হাদীসের স্পষ্ট অর্থ হল যে, যখন বান্দা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নিষ্ঠাবান হয়। তখন তার প্রতিটি কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে। সে তার কান দিয়ে ঐ কথাই শোনে, চোখ দিয়ে ঐ জিনিসই দেখে, যাতে আল্লাহর অনুমতি আছে। যে জিনিস হাত দিয়ে ধরে বা যে পথে চলে, তা শরীয়ত সমর্থিত। আল্লাহর অবাধ্যতায় তা ব্যবহার করে না; বরং তা একমাত্র তাঁর আনুগত্যে ব্যবহার করে।
আন-নাহল 16:79
তারা কি লক্ষ্য করে না আকাশের শূন্যগর্ভে নিয়ন্ত্রণাধীন পাখিদের প্রতি? আল্লাহই ওদেরকে স্থির রাখেন।[১] অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
[১] তিনি তো আল্লাহই, যিনি পক্ষীকুলকে এভাবে উড়ার এবং বাতাসকে তাদের ভাসিয়ে রাখার শক্তি দান করেছেন।
আন-নাহল 16:80
আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেছেন তোমাদের আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশু-চর্মের তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন; যা তোমরা ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে সহজে বহন করে থাক।[১] আর তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন ওদের পশম, লোম ও কেশ হতে কিছু কালের গৃহসামগ্রী ও ব্যবহার্য উপকরণ।[২]
[১] অর্থাৎ চামড়ার তৈরী তাঁবু যা তোমরা সফরে সহজেই বহন করতে পারো এবং প্রয়োজনমত তাকে ব্যবহার করে ঠান্ডা ও গরম হতে নিজেদেরকে রক্ষা কর।
[২] أصواف শব্দটি صوف এর বহুবচন, ভেড়ার লোমকে বুঝায়, أوبار শব্দটি وبر এর বহুবচন, উটের পশম أشعار শব্দটি شعر এর বহুবচন দুম্বা-ছাগলের লোমকে বুঝায়। এ সব দ্বারা বিভিন্ন জিনিস তৈরী হয়। যার দ্বারা মানুষ উপার্জন করে ও এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত উপকৃতও হয়।
আন-নাহল 16:81
আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা হতে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন[১] এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; যা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, ওটা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।[২] এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
[১] অর্থাৎ, গাছ সৃষ্টি করেছেন; যার থেকে ছায়া পাওয়া যায়।
[২] অর্থাৎ, উল ও সুতোর পোশাক যা সাধারণতঃ ব্যবহার করা হয় এবং লোহার বর্ম, শিরস্ত্রাণ; যা যুদ্ধে পরা হয়।
আন-নাহল 16:82
অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমার কর্তব্য তো শুধু স্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছিয়ে দেওয়া।
আন-নাহল 16:83
তারা আল্লাহর অনুগ্রহ চিনে নেয়, অতঃপর তা অস্বীকার করে। আর তাদের অধিকাংশই অবিশ্বাসী।[১]
[১] অর্থাৎ, তারা এ কথা জানে ও বুঝে যে, এই সকল নিয়ামতের সৃষ্টিকর্তা ও তা ব্যবহারযোগ্য করার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ, তবুও তারা তাঁকে অস্বীকার করে আর অধিকাংশ অকৃতজ্ঞতা করে, অর্থাৎ আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত করে।
আন-নাহল 16:84
যেদিন আমি প্রত্যেক জাতি হতে এক একজন সাক্ষী দাঁড় করাব।[১] অতঃপর সেদিন অবিশ্বাসীদেরকে (ওযর পেশ করার) অনুমতি দেওয়া হবে না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সুযোগও দেওয়া হবে না।
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক নবী তাঁর জাতির জন্য সাক্ষ্য দেবেন যে, তিনি তাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তা অগ্রাহ্য করেছিল। ঐ সকল কাফেরদেরকে অজুহাত পেশ করার কোন সুযোগ দেওয়া হবে না। কারণ তাদের নিকট কোন অজুহাতই থাকবে না। আর না তাদেরকে প্রত্যাবর্তন বা অসন্তোষ দূর করার সময় দেওয়া হবে। কারণ তার প্রয়োজন তখন হয়, যখন কাউকে সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে। لاَ يُستَعتَبُون এর অন্য এক অর্থ হল, তাদেরকে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কোন সুযোগ দেওয়া হবে না। কারণ সে সুযোগ তাদের পৃথিবীতে দেওয়া হয়েছিল; যা ছিল কর্মস্থল। পরকাল কর্মস্থল নয়; বরং প্রতিদান দেওয়ার দিন। সেখানে মানুষ পৃথিবীতে যা করেছে, তার প্রতিদান পাবে। সেখানে কারো কিছু আমল করার সুযোগ থাকবে না।
আন-নাহল 16:85
যখন সীমালংঘনকারীরা তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদেরকে কোন ঢিল দেওয়াও হবে না। [১]
[১] শাস্তি লঘু বা কম না করার অর্থ, মাঝে কোন বিরতি দেওয়া হবে না; বরং অবিরাম শাস্তি হতে থাকবে। যেমন তাদেরকে কোন ঢিল বা অবকাশও দেওয়া হবে না; বরং তাদেরকে তৎক্ষণাৎ লাগাম দিয়ে ধরে লোহার শিকলে বেঁধে জাহান্নামে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হবে। অথবা তওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। কারণ পরকাল কর্মস্থল নয়; প্রতিদান দিবস।
আন-নাহল 16:86
অংশীবাদীরা যাদেরকে আল্লাহর অংশী করেছিল, তাদেরকে যখন দেখবে তখন বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের অংশী, যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে আহবান করতাম।’ অতঃপর প্রত্যুত্তরে তারা তাদেরকে বলবে, ‘তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’ [১]
[১] আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতকারীরা তো নিজেদের এই দাবিতে মিথ্যাবাদী হবে না, কিংবা যাদেরকে তারা আল্লাহর শরীক করত, তারা বলবে যে, এরা মিথ্যাবাদী। অথবা এখানে তাদের শিরক করার কথা খন্ডন করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদেরকে আল্লাহর শরীক করার ব্যাপারে এরা মিথ্যাবাদী; আল্লাহর শরীক কি কেউ হতে পারে? অথবা এই কারণে তারা তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলবে যে, তারা তাদের শিরক, ইবাদত ও পূজা সম্পর্কে অবগতই ছিল না। যেমন কুরআন কারীম এ কথাটিকে বহু জায়গায় উল্লেখ করেছে। যেমন, {فَكَفَى بِاللّهِ شَهِيدًا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِن كُنَّا عَنْ عِبَادَتِكُمْ لَغَافِلِينَ} অর্থাৎ, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট যে, আমরা তোমাদের ইবাদত সম্বন্ধে অবগত ছিলাম না। (সূরা ইউনুস ১০:২৯) আরো দেখুনঃ সূরা আহক্বাফ ৪৬:৫-৬, সূরা মারয়্যাম ১৯:৮১-৮২, সূরা আনকাবূত ২৯:২৫, সূরা কাহ্ফ ১৮:৫২ নং ইত্যাদি আয়াত। এর একটি অর্থ এও হতে পারে যে, আমরা তোমাদেরকে আমাদের ইবাদত করতে কখনও বলিনি। সেই জন্য তোমরাই মিথ্যাবাদী। আল্লাহর সাথে কৃত উক্ত শরীকরা যদি পাথর বা গাছপালা হয়, তাহলে মহান আল্লাহ তাদের বাকশক্তি দান করবেন। আর জীন-শয়তান হলে তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি শরীক আল্লাহর নেক বান্দা হয়ে থাকেন, যেমন বহু নেক, পরহেযগার ও বুযুর্গ আল্লাহর ওলীদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকা হয়, তাঁদের নামে নযর মানত করা হয়, তাঁদের কবরে গিয়ে এমন তা'যীম করা হয়, যেমন ভয় ও আশার সাথে কোন দেবদেবীর করা হয়, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে হাশরের মাঠে নির্দোষ ঘোষণা করবেন। আর যারা তাঁদের ইবাদত করত, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দেওয়া হবে। যেমন ঈসা (আঃ)-এর সাথে আল্লাহর প্রশ্নোত্তর সূরা মায়েদার শেষের দিকে (৫:১১৬-১১৮নং আয়াতে) বর্ণিত হয়েছে।
আন-নাহল 16:87
সেদিন তারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করত, তা তাদের নিকট হতে উধাও হয়ে যাবে।
আন-নাহল 16:88
আমি অবিশ্বাসীদের ও আল্লাহর পথে বাধাদানকারীদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব;[১] কারণ তারা অশান্তি সৃষ্টি করত।
[১] যেমন জান্নাতে জান্নাতবাসীদের মর্যাদা ভিন্ন ভিন্ন হবে, অনুরূপ জাহান্নামে কাফেরদের আযাবও বিভিন্ন ধরনের হবে। যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হওয়ার সাথে সাথে অপরকে পথভ্রষ্ট করার কারণ হয়েছিল, তাদের আযাব অন্যের তুলনায় কঠিনতর হবে।
আন-নাহল 16:89
সেদিন প্রত্যেক জাতিতে তাদেরই মধ্য হতে তাদেরই বিপক্ষে এক একজন সাক্ষী দাঁড় করাব এবং ওদের বিষয়ে তোমাকে আমি আনব সাক্ষীরূপে।[১] আর আমি তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ[২] এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের জন্য, পথনির্দেশ, করুণা ও সুসংবাদ স্বরূপ।
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক নবী তাঁর জাতির জন্য সাক্ষ্য দেবে এবং নবী (সাঃ) ও তাঁর উম্মত অন্যান্য সকল নবীদের ব্যাপারে সাক্ষী দেবেন যে, তাঁরা সত্যবাদী; তাঁরা অবশ্যই তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। (বুখারীঃ তফসীর সূরা নিসা)[২] 'গ্রন্থ' বলতে আল্লাহর কিতাব ও নবী (সাঃ)-এর ব্যাখ্যা অর্থাৎ হাদীসকে বুঝানো হয়েছে। মহানবী (সাঃ) নিজ হাদীসকেও 'আল্লাহর কিতাব' বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন এক চাকরের প্রভু-পত্নীর সাথে ব্যভিচারের ঘটনা ইত্যাদিতে উল্লিখিত। (দেখুনঃ বুখারীঃ কিতাবুল মুহারেবীন, কিতাবুস সালাত প্রভৃতি) আর 'প্রত্যেক বিষয়' বলতে অতীত ও ভবিষ্যতের এমন সংবাদ যার জ্ঞান রাখা উপকারী ও আব্যশিক। অনুরূপ হালাল হারামের বিস্তারিত আলোচনা এবং দ্বীন ও দুনিয়ার এমন সব কথা বা ইহকাল ও পরকালের এমন সব ব্যাপার যা মানুষের জানা প্রয়োজন; কুরআন ও হাদীস উভয়েই সে সব পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আন-নাহল 16:90
নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন।[১] তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।
[১] عدل এর প্রসিদ্ধ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা (সুবিচার)। অর্থাৎ, ঘর-পর সকলের ব্যাপারে সুবিচার করা। কারো সাথে শত্রুতা, ঝগড়া, ভালবাসা বা আত্মীয়তার কারণে সুবিচার যেন প্রভাবিত না হয়। এর দ্বিতীয় অর্থ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা এবং কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করা, এমন কি দ্বীনের ব্যাপারেও। কেননা, দ্বীনের মধ্যে إفراط এর পরিণাম সীমা অতিক্রম বা অতিরঞ্জন করা যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত تفريط এর অর্থ দ্বীনের মধ্যে অলসতা করা; আর এটিও অপছন্দনীয়।إحسان এর একটি অর্থ সদাচরণ, ক্ষমা ও মাফ করা। দ্বিতীয় অর্থ এহসানি বা অনুগ্রহ করা; ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকারের চেয়ে বেশি দেওয়া বা ওয়াজেব (কর্তব্য) কাজের অধিক করা। যেমন কোন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছে এক শত টাকা, কিন্তু দেওয়ার সময় একশত দশ বা বিশ টাকা দেওয়া। এক শত টাকা দেওয়া এটি ওয়াজেব (প্রাপ্য) অধিকার, আর এটাই সুবিচার, আর দশ বিশ টাকা বেশি দেওয়া এটাই হল এহসান বা অনুগ্রহ। সুবিচার দ্বারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন দ্বারা সমাজে অধিক সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার স্পৃহা সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফরয কাজ সম্পাদন করার সাথে সাথে নফল কাজে আগ্রহী হওয়া কর্তব্যের চাইতে বেশি আমল। যার দ্বারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এহসানের তৃতীয় অর্থঃ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা। যার হাদীসে أن تعبد الله كأنك تراه (আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ) বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। إيتاء ذي القربى আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায় করা, অর্থাৎ, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটাকেই হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা বলা হয়েছে এবং তার প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুবিচার, সদাচরণ অনুগ্রহের পর এর পৃথকভাবে উল্লেখ জ্ঞাতি-বন্ধন বজায় রাখার গুরুত্বকে আরো অধিকরূপে বাড়িয়ে তোলে। فحشاء অশ্লীল কাজ, আজকাল অশ্লীলতা এত ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, তার নামই সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি ও শিল্পকলা হয়ে গেছে! অথবা চিত্ত-বিনোদন বা মনোরঞ্জনের নামে তাকে বৈধ করে নেওয়া হয়েছে। তবে সুন্দর লেবেল লাগালে কোন জিনিসের আসলত্ব পাল্টে যায় না। অনুরূপ ইসলাম ব্যভিচার ও তার সকল ছিদ্রপথ; নাচ, পর্দাহীনতা, ফ্যাশন-প্রবণতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং অনুরূপ লজ্জাহীনতা প্রদর্শনকে অশ্লীলতা বলে অভিহিত করেছে। তার নাম যত সুন্দরই হোক না কেন; পাশ্চাত্য হতে আমদানীকৃত নোংরামি কোন মতেই বৈধ হতে পারে না। منكر (গর্হিত) প্রত্যেক সেই কাজ, যা শরীয়তে অবৈধ। بغي অর্থ অত্যাচার ও সীমালংঘন করা। একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ও অত্যাচার করা এই দুই পাপ মহান আল্লাহর নিকট এত ঘৃণিত যে, আল্লাহর পক্ষ হতে পরকাল ছাড়া পৃথিবীতেই তার তৎক্ষণাৎ শাস্তির আশংকা থেকে যায়। (ইবনে মাজাহ কিতাবুয যুহদ)
আন-নাহল 16:91
তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর, তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন করে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না;[১] তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন।
[১] এক প্রকার কসম বা শপথ হল, যা কোন কথা; অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা বা চুক্তিকে সুদৃঢ় করার জন্য করা হয়। আর দ্বিতীয় হল, যা অনেকে কোন সময় কসম করে বলে থাকে, 'আমি এই কাজ করব বা আমি এই কাজ করব না।' এখানে প্রথম অর্থে ব্যবহার হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, তোমরা শপথ করে আল্লাহকে যামিন করেছ, অতএব এখন তা ভঙ্গ করো না। বরং সে অঙ্গীকার পূরণ কর, যার জন্য তুমি শপথ করেছ। কারণ, দ্বিতীয় শপথের ব্যাপারে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি কোন কাজের জন্য শপথ করে সে যদি বুঝে যে বিপরীত করলে তার মঙ্গল হবে, তাহলে তার উচিত, যাতে মঙ্গল রয়েছে সে যেন সেই কাজ করে এবং শপথের কাফফারা দিয়ে দেয়। (মুসলিম ১২৭২নং) নবী (সাঃ)-এর আমলও অনুরূপ ছিল। (বুখারী ৬৬২৩, মুসলিম ১২৬৯নং)
আন-নাহল 16:92
তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকাবার পর ওর পাক খুলে নষ্ট করে দেয়;[১] তোমরা পরস্পরের মাঝে ধোঁকা স্বরূপ তোমাদের শপথকে ব্যবহার করে থাক;[২] যাতে একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক লাভবান হয়;[৩] আল্লাহ তো এটা দ্বারা শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করতে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তা নিশ্চয়ই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেবেন।
[১] শপথ দ্বারা সুদৃঢ়কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এমন, যেমন কোন নারী সুতা মজবুত করে পাকাবার পর তার পাক খুলে নষ্ট করে। এটি একটি উপমা মাত্র।
[২] ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা দেওয়ার জন্য ব্যবহার কর।
[৩] أربى অর্থ অধিকতর। অর্থাৎ যখন তোমরা মনে কর যে, তোমাদের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে, আর এর কারণে তোমরা শপথ ভঙ্গ করে ফেল; যদিও শপথ ও প্রতিশ্রুতির সময় প্রতিপক্ষ দুর্বল ছিল। কিন্তু দুর্বল থাকা সত্ত্বেও তারা নিশ্চিন্ত ছিল যে, প্রতিশ্রুতি বা চুক্তির কারণে আমাদের কোন ক্ষতি করা হবে না। কিন্তু তোমরা বাহানা ও চুক্তিভঙ্গ করে ক্ষতি কর। জাহেলিয়াতের যুগে চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণে এরূপ চুক্তি ভঙ্গ করা ছিল সাধারণ ব্যাপার। মুসলিমদেরকে এই শ্রেণীর চারিত্রিক অবনতি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
আন-নাহল 16:93
যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তাহলে তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তোমরা যা কর, সে বিষয়ে অবশ্যই তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
আন-নাহল 16:94
তোমরা পরস্পরের মাঝে ধোঁকা স্বরূপ তোমাদের শপথকে ব্যবহার করো না; করলে পা স্থির হওয়ার পর পিছলিয়ে যাবে এবং আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার কারণে তোমরা শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ করবে। আর তোমাদের জন্য থাকবে মহাশাস্তি। [১]
[১] মুসলিমদেরকে আবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। যাতে চারিত্রিক দুর্বলতার কারণে কারো পা পিছলে না যায়। আর তোমাদের এ পরিস্থিতি দেখে যেন কোন কাফের ইসলাম গ্রহণ করা থেকে বিরত না হয়। আর তার ফলে তোমরা মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার পাপের শাস্তির উপযুক্ত না হয়ে পড়। কোন কোন মুফাসসির বলেন, أيمان শব্দটি يمين এর বহুবচন; যার অর্থ রসূল (সাঃ)-এর সঙ্গে বায়আত করা। অর্থাৎ, বায়আত করার পর যেন কেউ মুরতাদ (ইসলাম-ত্যাগী) না হয়ে যায়। কারণ তোমাদের মুরতাদ হওয়া দেখে অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করা হতে বিরত থাকবে। আর এভাবে তোমরা দ্বিগুণ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাবে। (ফাতহুল কাদীর)
আন-নাহল 16:95
তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে তা উত্তম; যদি তোমরা জানতে।
আন-নাহল 16:96
তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তা চিরস্থায়ী থাকবে। যারা ধৈর্য ধারণ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।
আন-নাহল 16:97
পুরুষ ও নারী যে কেউই বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব[১] এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।
[১] حياة طيبة সুখী জীবন বলতে পৃথিবীর জীবন, কারণ পরকালের জীবনের কথা পরের আয়াতে বলা হয়েছে। যার সারমর্ম হল একজন চরিত্রবান মু'মিন সৎ ও ধর্মভীরু জীবন যাপনে, আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত ও অল্পে তুষ্ট হওয়াতে যে পরম সুখ-স্বাদ অনুভব করে, তা কোন কাফের ও পাপী ব্যক্তি পৃথিবীর সকল সুখ ভোগ করলেও সে সুখ-স্বাদ পায় না। বরং সে এক ধরনের মানসিক অশান্তি ভোগ করে। মহান আল্লাহ বলেন,{وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا} যে আমার স্মরণে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকুচিত। (সূরা তহা ২০:১২৪)
আন-নাহল 16:98
যখন তুমি কুরআন পাঠ (করার ইচ্ছা) করবে তখন অভিশপ্ত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। [১]
[১] যদিও সম্বোধন নবী (সাঃ)-কে করা হয়েছে; কিন্তু উদ্দেশ্য সকল উম্মত। অর্থাৎ কুরআন পাঠের পূর্বে أَعُوذُْ بِاللّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পাঠ কর।
আন-নাহল 16:99
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।
আন-নাহল 16:100
তার আধিপত্য শুধু তাদেরই উপর, যারা তাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং যারা আল্লাহর অংশী করে।
আন-নাহল 16:101
আমি যখন এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য এক আয়াত অবতীর্ণ করি -- আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন, তা তিনিই ভাল জানেন -- তখন তারা বলে, ‘তুমি তো শুধু একজন মিথ্যা উদ্ভাবনকারী।’ কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না। [১]
[১] একটি বিধান রহিত করার পর অন্য একটি অবতীর্ণ করেন। যার হিকমত, যৌক্তিকতা ও কারণ আল্লাহই জানেন এবং তিনি সেই অনুসারে বিধানের মধ্যে পরিবর্তন আনেন। তা শুনে কাফেররা বলে, হে মুহাম্মাদ! এই বাণী তোমার নিজস্ব রচনা। কারণ আল্লাহ এ রকম রদবদল করতে পারেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যাদের অধিকাংশই অজ্ঞ, তারা রহিত করার যুক্তি ও মর্ম কি বুঝবে। (আরো দেখুন সূরা বাক্বারাহ ২:১০৬ নং আয়াতের টীকা।)
আন-নাহল 16:102
তুমি বল, ‘তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে জিবরীল সত্যসহ কুরআন অবতীর্ণ করেছে,[১] যারা বিশ্বাসী তাদেরকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য[২] এবং তা আত্মসমর্পণকারীদের জন্য পথনির্দেশ ও সুসংবাদ স্বরূপ।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রচনা নয়। বরং তা জিবরীল (আঃ)-এর মত পবিত্র সত্তা সত্যসহ রবের নিকট হতে তা অবতীর্ণ করেছেন। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে {نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ} এ (কুরআন)-কে রূহুল আমীন (বিশ্বস্ত রূহ) জিবরীল তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে। (সূরা শুআরা ২৬:১৯৩-১৯৪)
[২] এই জন্য যে, তারা বলে নাসেখ-মানসূখ (রহিত ও রহিতকারী) উভয় বিধানই আল্লাহর পক্ষ থেকে। এ ছাড়া রহিত করণের উপকারিতা যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়, তখন তাদের হৃদয়ে দৃঢ়তা ও ঈমানী মজবুতি সৃষ্টি হয়।
[৩] আর এই কুরআন মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ ও সুসংবাদ স্বরূপ। কারণ কুরআন বৃষ্টির মত যার দ্বারা কিছু কিছু মাটি প্রচুর ফসল উৎপন্ন করে। পক্ষান্তরে কিছু মাটি কাঁটাগাছ ও আগাছা ছাড়া কিছুই উৎপন্ন করে না। মুমিনের অন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন যা কুরআনের বর্কতে এবং ঈমানের আলোকে আলোকিত হয়। আর কাফেরের অন্তর লবণাক্ত মাটির মত যা কুফর ও ভ্রষ্টতার অন্ধকারে ডুবে থাকে, যেখানে কুরআনের বৃষ্টি ও আলো কোন কাজে লাগে না।
আন-নাহল 16:103
আমি তো জানিই, তারা বলে, ‘তাকে শিক্ষা দেয় এক মানুষ।’[১] তারা যার প্রতি এটা আরোপ করে তার ভাষা তো আরবী নয়; আর এ তো স্পষ্ট আরবী ভাষা। [২]
[১] কিছু (গোলাম) দাস ছিল, যারা তওরাত ও ইঞ্জীল সর্ম্পকে অবগত ছিল। প্রথমে তারা খ্রিষ্টান বা ইয়াহুদী ছিল, পরে মুসলমান হয়ে যায়। তাদের ভাষাও ছিল অশুদ্ধ। মক্কার কাফেররা এদের প্রতিই ইঙ্গিত করে বলত যে, অমুক দাস মুহাম্মাদকে কুরআন শিক্ষা দেয়![২] মহান আল্লাহ উত্তরে বললেন, এরা যাদের কথা বলে, তারা তো শুদ্ধভাবে আরবীও বলতে পারে না, অথচ কুরআন এমন বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট আরবী ভাষায়, যার সাহিত্যশৈলী সুউচ্চ এবং যার অলৌকিকতা অতুলনীয়। চ্যালেঞ্জের পরও আজ পর্যন্ত তার মত একটি সূরা কেউ আনতে সক্ষম হয়নি। পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক মিলেও এর সমতুল বাণী রচনা করতে অক্ষম। কেউ বিশুদ্ধ আরবী বলতে না পারলে আরবের লোকেরা তাকে বোবা বলত এবং অনারবীকেও বোবা বলত। যেহেতু অলংকার ও শব্দ স্বাচ্ছন্দ্যে অন্যান্য ভাষা আরবী ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম নয়।
আন-নাহল 16:104
যারা আল্লাহর নিদর্শনে বিশ্বাস করে না, তাদেরকে আল্লাহ পথনির্দেশ করেন না এবং তাদের জন্য আছে বেদনাদায়ক শাস্তি।
আন-নাহল 16:105
যারা আল্লাহর নিদর্শনে বিশ্বাস করে না, তারাই শুধু মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তারাই মিথ্যাবাদী। [১]
[১] আমার নবী ঈমানদার লোকেদের সর্দার ও নেতা। সে কেমন করে আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করতে পারে যে, এই কিতাব আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর অবতীর্ণ হয়নি অথচ সে বলবে যে, এই কিতাব আমার উপর আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব আমার নবী মিথ্যাবাদী নয়; বরং মিথ্যুক তারাই, যারা কুরআনকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও অস্বীকার করে।
আন-নাহল 16:106
কেউ বিশ্বাস করার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং অবিশ্বাসের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি;[১] তবে তার জন্য নয়, যাকে অবিশ্বাসে বাধ্য করা হয়েছে, অথচ তার চিত্ত বিশ্বাসে অবিচল।[২]
[১] এ হল মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হওয়ার শাস্তি; সে আল্লাহর গযব ও মহাশাস্তির উপযুক্ত হবে। আর (শাসকের নিকট) তার পার্থিব শাস্তি হল হত্যা। যেমন হাদীসে উল্লেখ রয়েছে।(বিস্তারিত দেখুনঃ সূরা বাক্বারাহ ২:২১৭ ও ২:২৫৬ নং আয়াতের টীকায়।)[২] উলামাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তিকে কুফরের জন্য বাধ্য করা হয়েছে সে যদি জীবন বাঁচানোর জন্য কুফরী কোন বাক্য বলে ফেলে বা কর্ম করে বসে অথচ তার অন্তর ঈমানে অবিচল, তাহলে সে কাফের বলে গণ্য হবে না। না তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হবে, আর না তার উপর কুফরীর অন্য কোন বিধান প্রয়োগ হবে। (এ উক্তি কুরত্বুবীর, ফাতহুল কাদীর)
আন-নাহল 16:107
এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং এই জন্য যে, আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।[১]
[১] এটি ঈমান আনার পর কাফির (মুরতাদ) হয়ে যাওয়ার কারণ। প্রথমতঃ তারা ইহকালকে পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়, দ্বিতীয়তঃ তারা আল্লাহর নিকট হিদায়াত পাবার যোগ্যই নয়।
আন-নাহল 16:108
ওরাই তারা; আল্লাহ যাদের অন্তর, কর্ণ ও চক্ষু মোহর করে দিয়েছেন এবং তারাই উদাসীন।[১]
[১] অতএব তারা না ওয়ায-নসীহতের কথা শোনে, না তা বুঝে। না ঐ সকল নিদর্শন তারা দেখে, যা তাদের সত্যের পথ দেখাতে পারে। তারা এমন ঔদাস্যের শিকার, যা তাদের হিদায়াতের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।
আন-নাহল 16:109
নিঃসন্দেহে তারা পরকালে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আন-নাহল 16:110
যারা নির্যাতিত হবার পর হিজরত করে, পরে জিহাদ (ধর্মের জন্য দেশত্যাগ ও যুদ্ধ) করে এবং ধৈর্যধারণ করে; তোমার প্রতিপালক এই সবের পর, তাদের প্রতি অবশ্যই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]
[১] এখানে মক্কার ঐ সকল মুসলিমদের কথা বলা হয়েছে, যাঁরা ছিলেন দুর্বল এবং ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কাফেরদের অত্যাচারের শিকার। অবশেষে তাঁদেরকে হিজরত করার আদেশ দেওয়া হল, আর তাঁরা আত্মীয়-স্বজন, প্রিয় মাতৃভূমি, ধন সম্পদ, ঘর বাড়ি সব কিছু ছেড়ে দিয়ে হাবশা বা মদীনা চলে গেলেন। আবার যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধের অবকাশ এল তখন শৌর্য-বীর্য সহকারে তাঁরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলেন। তারপর তাঁর রাস্তায় নির্যাতন ও কষ্ট ধৈর্য সহকারে বরণ করে নিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, এ সবের পর তোমার প্রতিপালক তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া পাওয়ার জন্য ঈমান ও সৎকর্মের প্রয়োজন। যেমন উক্ত মুহাজিরগণ ঈমান ও সৎকর্মের সুন্দর নমুনা পেশ করলেন, ফলে তাঁরা আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ায় পুরস্কৃত হলেন। رضي الله عنهم ورضوا عنه
আন-নাহল 16:111
(স্মরণ কর,) যে দিন প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি উপস্থিত করতে আসবে[১] এবং প্রত্যেকের তার কৃতকর্মের পূর্ণ ফল দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [২]
[১] অর্থাৎ, কেউ অপরের সমর্থনে সামনে আসবে না। না পিতা, না ভাই, না স্ত্রী, না পুত্র আর না অন্য কেউ। বরং একে অন্য হতে পলায়ন করবে। ভাই ভাই হতে, পুত্র মাতা-পিতা হতে, স্বামী স্ত্রী হতে পলায়ন করবে। প্রত্যেক ব্যক্তি শুধু নিজের চিন্তাই করবে, যা তাকে অন্য থেকে ব্যস্ত রাখবে।{لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ} অর্থাৎ, সেদিন প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে। (সূরা আবাসা ৮০:৩৭)[২] অর্থাৎ, নেকীর প্রতিদান কম করা হবে ও পাপের বদলা বেশী দেওয়া হবে --এ রকম হবে না। কারো উপর বিন্দুমাত্র অত্যাচার করা হবে না। পাপের প্রতিদান পাপ সমতুল্য দেওয়া হবে। অবশ্য নেকীর বদলা মহান আল্লাহ খুব বেশি বেশি দিবেন। আর এটি হবে তাঁর দয়ার প্রকাশ যা পরকালে শুধুমাত্র মু'মিনদের জন্য হবে। جعلنا الله منهم
আন-নাহল 16:112
আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।[১]
[১] অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারীগণ এই জনপদ বা শহর বলতে মক্কা বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই আয়াতে মক্কা ও মক্কাবাসীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর তা ঐ সময় ঘটেছিল যখন আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাদের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, اللهم اشدد وطأتك على مضر واجعلها عليهم سنين كسني يوسف অর্থাৎ, হে আল্লাহ মুযার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের উপর এমন অনাবৃষ্টি এনে দাও যেমন ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (বুখারী ৪৮২১, মুসলিম ২১৫৬নং) অতএব মহান আল্লাহ তাদের নিরাপত্তাকে ভয় এবং সুখকে ক্ষুধা দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এমন কি তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিছু ব্যাখ্যাকারীর মতে এই জনপদ কোন নির্দিষ্ট গ্রাম নয়। বরং এটি উপমা স্বরূপ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, অকৃতজ্ঞ লোকেদের এই পরিণাম হবে। তাতে তারা যে স্থানের বা যে কালেরই হোক না কেন। এই ব্যাপকতাকে অধিকাংশ মুফাসসিরগণ অস্বীকার করেন না। যদিও এর অবতীর্ণ হবার বিশেষ কারণ আছে।العبرة بعموم اللفظ، لا بخصوص السبب
আন-নাহল 16:113
তাদের নিকট তো এসেছিল এক রসূল তাদের মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল; ফলে সীমালংঘন করা অবস্থায় শাস্তি[১] তাদেরকে গ্রাস করল।
[১] এই শাস্তি বা আযাব বলতে ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতার আযাব যা পূর্বের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা এর অর্থ মুসলিমদের হাতে বদরপ্রান্তে কাফেরদের হত্যা হওয়া।
আন-নাহল 16:114
আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তার মধ্যে যা বৈধ ও পবিত্র, তা তোমরা আহার কর এবং তোমরা যদি শুধু আল্লাহরই ইবাদত কর, তবে তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [১]
[১] এর অর্থ এই যে হালাল ও পবিত্র জিনিস অতিক্রম করে হারাম ও অপবিত্র জিনিস ব্যবহার করা এবং আল্লাহর খেয়ে-পরে তিনি ছাড়া অন্যের ইবাদত করা। এটিই হল আল্লাহর অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা।
আন-নাহল 16:115
আল্লাহ তো শুধু মৃত, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যার যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন; কিন্তু কেউ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী না হয়ে (তা খেতে) অনন্যোপায় হলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১]
[১] এই আয়াত এর পূর্বে আরো তিনবার উল্লিখিত হয়েছে। সূরা বাক্বারাহ ২:১৭৩ নং, সূরা মায়িদা ৫:৩ নং এবং সূরা আনআম ৬:১৪৫ নং আয়াতে। চতুর্থবার মহান আল্লাহ আবার আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। এখানে إنما হাসর (সীমিতকরণ)এর জন্য। কিন্তু এখানে 'হাসরে হাকিকী' (প্রকৃত সীমিতকরণ উদ্দিষ্ট) নয়; বরং 'হাসরে ইযাফী' (তূলনামূলক সীমিতকরণ উদ্দিষ্ট)। অর্থাৎ সম্বোধিত ব্যক্তিদের আকীদা ও বিশ্বাসকে সামনে রেখে সীমিতকরণ করা হয়েছে। নচেৎ আরো অন্যান্য জীবজন্তুও হারাম। অবশ্য এই আয়াতে এ কথা স্পষ্ট যে, এখানে যে চারটি হারাম জিনিসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে মহান আল্লাহ তা থেকে মুসলিমদেরকে তাকীদের সাথে বাঁচাতে চান। যার প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। তবে এখানে {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّهِ بِهِ} (যার যবেহ কালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে) এই চতুর্থ নম্বরের অর্থে দুর্বল ও দূর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে শিরকের চোরা দরজা খোলার চেষ্টা করা হয়। এই জন্য এখানে এর অধিক আলোকপাত প্রয়োজন। যে পশু আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়, তার কয়েকটি অবস্থা হতে পারে। (ক) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্য ও সন্তুষ্টির জন্য কোন পশু যবেহ করা এবং যবেহ করার সময় তারই নাম নেওয়া। (খ) উদ্দেশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্য লাভ করা কিন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া, যেমন কবর পূজারীদের নিকট প্রচলিত। তারা বুযুর্গদের নামে পশু নির্দিষ্ট করে রাখে; যেমন এই মোরগ বা খাসিটি অমুক পীর বা মাযারের জন্য বা এই গরু অমুক পীরের জন্য বা এই পশু আব্দুল কাদের জীলানীর জন্য ইত্যাদি। তারা তা 'বিসমিল্লাহ' বলেই যবেহ করে। সেই জন্য তারা বলে, প্রথমটি নিঃসন্দেহে হারাম; কিন্তু এই দ্বিতীয়টি হারাম নয়; বরং তা হালাল। কারণ তা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা হয়নি। আর এভাবে শিরকের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে; যদিও ফকীহগণ দ্বিতীয় অবস্থাকেও হারাম বলে গণ্য করেছেন। যেহেতু এটাও {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এর অর্ন্তভুক্ত। তাফসীর বায়যাবীর টিকায় রয়েছে যে, যে পশু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয় তা হারাম; যদিও সেটি আল্লাহর নামেই যবেহ করা হয়। উলামাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কোন মুসলমান গায়রুল্লাহর নামে পশু যবেহ করে, তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যায় এবং তার যবেহকৃত পশু মুর্তাদের যবেহ বলে গণ্য হয়। হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দুর্রে মুখতারে রয়েছে, কোন রাজা বা অন্য কোন বুযুর্গ ব্যক্তির আগমনে (সৌজন্য বা মেহমান-নেওয়াযীর উদ্দেশে নয় বরং তার সন্তুষ্টি বা তা'যীমের জন্য) পশু যবেহ করা হারাম। কারণ তা {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এরই পর্যায়ভুক্ত; যদিও তা আল্লাহর নামেই যবেহ করা হয়। আল্লামা শামী এর সমর্থন করেছেন। (কিতাবুয যাবায়েহ ১২৭৭ হিজরী পুরাতন ছাপা, ২৭৭পৃঃ, ফাতওয়া শামী ৫/২০৩ মায়মানা প্রেস মিসর।) অবশ্য কিছু ফুকহা দ্বিতীয় অবস্থাকে {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এর উদ্দিষ্ট অর্থ বা তার পর্যায়ভুক্ত গণ্য করেন না। কিন্তু তাতে একই হেতু (আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্যলাভ) থাকার জন্য হারাম মনে করেন। অতএব হারাম গণ্য করায় কোন মতভেদ নাই। শুধু দলীল গ্রহণের ধরন ভিন্ন। তাছাড়া এটি {وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ} (যা দেবীর নামে বা আস্তানায় বলি দেওয়া হয়েছে) এর অন্তর্ভুক্ত। যাকে সুরা মায়িদায় হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তুসমূহের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, আস্তানা, থান ও মাযারে যবেহ করা পশু হারাম। কারণ সেখানে যবেহ করা বা সেখানে নিয়ে গিয়ে বিলির উদ্দেশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন করাই হয়ে থাকে। একটি হাদীসে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি এসে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, 'আমি বুওয়ানা নামক জায়গায় উট যবাই করার মানত করেছি।' নবী (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "সেখানে জাহেলিয়াতের যুগে কোন দেব-দেবী ছিল কি, যার পূজা করা হত?" সাহাবীগণ বললেন, 'না।' তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, "সেখানে তাদের কোন ঈদ-অনুষ্ঠান পালন করা হতো কি?" তাঁরা বললেন, 'না।' তখন নবী (সাঃ) প্রশ্নকারীকে মানত পূরণ করার অনুমতি দিলেন। (আবূ দাঊদঃ কসম ও নযর অধ্যায়) এখান হতে বুঝা গেল যে, দেব-দেবী সরিয়ে নেওয়ার পরও অনাবাদ আস্তানায় পশু যবেহ করা বৈধ নয়। তাহলে ঐ সকল আস্তানায় ও মাযারে গিয়ে পশু যবেহ করা কিভাবে বৈধ হতে পারে, যা পূজা ও নযর-নিয়াযের আড্ডায় পরিণত? أعاذنا الله منه
আন-নাহল 16:116
তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা আরোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করবার জন্য তোমরা বলো না, ‘এটা হালাল এবং এটা হারাম।’[১] যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে, তারা সফলকাম হবে না।
(১) এখানে ঐ সকল পশুর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করে নিজেদের জন্য হারাম মনে করত। যেমন বাহীরা, সায়েবা, ওয়াসিলা এবং হাম ইত্যাদি। সূরা মায়িদাহ ৫:১০৩ এবং সূরা আনআম ৬:১৩৯-১৪০ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।
আন-নাহল 16:117
(ইহকালে) তাদের সামান্য সুখ-সম্ভোগ রয়েছে এবং (পরকালে) তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।
আন-নাহল 16:118
ইয়াহুদীদের জন্য আমি তো শুধু তাই নিষিদ্ধ করেছিলাম, যা তোমার নিকট আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি[১] এবং আমি তাদের উপর কোন যুলুম করিনি; বরং তারাই নিজেদের প্রতি যুলুম করত।
[১] সূরা আনআম ৬:১৪৬ নং আয়াতের টীকা দেখুন। সুরা নিসার ৪:১৬০ নং আয়াতের টীকায়ও এর বর্ণনা রয়েছে।
আন-নাহল 16:119
যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কর্ম করে, তারা পরে তওবা করলে ও নিজেদেরকে সংশোধন করলে তাদের জন্য তোমার প্রতিপালক অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আন-নাহল 16:120
নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিল একজন ইমাম।[১] আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং সে ছিল না অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।
[১] أمة এর অর্থ ইমাম, নেতা। আর أمة উম্মাত জাতি অর্থেও ব্যবহার হয়। এই অর্থে ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন একাই একটি জাতির সমান। (উম্মতের অর্থ সূরা হূদের ১১:৮ নং আয়াতের টীকায় দেখুন।)
আন-নাহল 16:121
সে ছিল আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ; আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছিলেন এবং তাকে পরিচালিত করেছিলেন সরল পথে।
আন-নাহল 16:122
আমি তাকে ইহকালে দিয়েছিলাম মঙ্গল এবং নিশ্চয়ই পরকালেও সে হবে সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম।
আন-নাহল 16:123
অতঃপর আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, তুমি একনিষ্ঠ ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর;[১] সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
[১] ملة এমন ধর্ম যা কোন নবী দ্বারা মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ বা আবশ্যিক করা হয়েছে। নবী (সাঃ) সকল আম্বিয়া সহ সকল মানুষের নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করতে আদিষ্ট হয়েছেন। যাতে ইবরাহীম (আঃ)-এর বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান স্পষ্ট হয়। অবশ্য নীতিগত দিক দিয়ে সকল নবীর শরীয়ত ও দ্বীন একই ছিল। যাতে রিসালাত সহ তাওহীদ ও পরকাল ছিল মৌলিক বিষয়।
আন-নাহল 16:124
শনিবার পালন তো শুধু তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, যারা এ বিষয়ে মতভেদ করত।[১] তারা যে বিষয়ে মতভেদ করত, তোমার প্রতিপালক অবশ্যই কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তাদের মাঝে বিচার-ফায়সালা করে দেবেন।
[১] এই মতভেদ কি ছিল? এর ব্যাখ্যায় মতানৈক্য রয়েছে। কেউ বলেন, মূসা (আঃ) তাদের জন্য শুক্রবার দিন নিদিষ্ট করেছিলেন; কিন্তু বানী ইস্রাঈলগণ তার বিরোধিতা করে শনিবারকে সম্মান ও ইবাদতের জন্য বেছে নেয়। মহান আল্লাহ বলেছিলেন, হে মূসা তারা যে দিন বেছে নিয়েছে তাই তাদের জন্য থাকতে দাও। আবার কেউ বলেন, মহান আল্লাহ তাদেরকে সপ্তাহে একটি দিন সম্মানের জন্য বেছে নিতে বলেন। দিনটি নির্দিষ্ট করায় তাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিল। অতঃপর ইয়াহুদীরা শনিবার ও খ্রিষ্টানরা রবিবার দিনকে বেছে নেয়। আর জুমআর দিনকে মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট করেন। আবার কিছু উলামা বলেন, খ্রিষ্টানরা রবিবারকে ইয়াহুদীদের বিরোধিতায় নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করে, অনুরূপ ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে ইয়াহুদীদের থেকে আলাদা রাখার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের পাথরের পূর্ব প্রান্তকে কিবলা হিসাবে বেছে নেয়। জুমআর দিনকে আল্লাহ কর্তৃক মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট করার কথা হাদীসে বর্ণিত আছে। (দেখুন বুখারীঃ জুমআহ অধ্যায়)
আন-নাহল 16:125
তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সদ্ভাবে।[১] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত এবং কে সৎপথে আছে, তাও সবিশেষ অবহিত। [২]
[১] এখানে ইসলাম প্রচার ও তাবলীগের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ, তা হবে হিকমত, সদুপদেশ ও নম্রতার উপর ভিত্তিশীল এবং আলোচনার সময় সদ্ভাব বজায় রাখা, কঠোরতা পরিহার করা ও নম্রতার পথ অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
[২] অর্থাৎ, তাঁর কাজ উল্লিখিত নীতি অনুসারে উপদেশ ও প্রচার করা। হিদায়াতের রাস্তায় পরিচালিত করা আল্লাহর আয়ত্তাধীন। আর তিনিই জানেন যে, কে হিদায়াত গ্রহণকারী, আর কে তা গ্রহণকারী নয়?
আন-নাহল 16:126
যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। [১]
[১] এর মধ্যে যদিও সীমা অতিক্রম না করে সমান সমান প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। সীমা অতিক্রম করলে সেও যালেম বলে গণ্য হবে। তবে ক্ষমা করে দেওয়া ও ধৈর্য ধারণ করা অতি উত্তম।
আন-নাহল 16:127
তুমি ধৈর্যধারণ কর; আর তোমার ধৈর্য তো হবে আল্লাহরই সাহায্যে। তাদের (অবিশ্বাসের) জন্য তুমি দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না। [১]
[১] কারণ মহান আল্লাহ তাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে মু'মিন, পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন। আর আল্লাহ যাদের সঙ্গে থাকেন পৃথিবীর লোকেদের চক্রান্ত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। যেমন পরের আয়াতে তা স্পষ্ট করা হয়েছে।
আন-নাহল 16:128
নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে থাকেন, যারা সংযম অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ।